০৬/০৯/২০২৬-কোনো মিথ্যাবাদী মানুষকে কখনো জিজ্ঞেস করো না—“তুমি মিথ্যা বলেছিলে কেন?”

কোনো মিথ্যাবাদী মানুষকে কখনো জিজ্ঞেস করো না—“তুমি মিথ্যা বলেছিলে কেন?” কারণ, প্রথম মিথ্যাটাকে ব্যাখ্যা করতে গেলেই তাকে আরেকটি মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। সেই দ্বিতীয় মিথ্যাটাকে সত্যি প্রমাণ করতে প্রয়োজন হবে তৃতীয় একটি মিথ্যার। তারপর সেই তৃতীয়টাকে রক্ষা করার জন্য জন্ম নেবে চতুর্থটি। এভাবেই একটি মিথ্যা কখনো একা থাকে না।ধীরে ধীরে মিথ্যাগুলো একে অপরের ওপর এমনভাবে স্তরে স্তরে জমতে থাকে যে, একসময় সত্যটা কোথায় ছিল—সেটাই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শুরুতে একজন মিথ্যাবাদী খুব ভালো করেই জানে—কোথায় সত্য শেষ হয়েছে এবং কোথা থেকে তার মিথ্যা শুরু হয়েছে। সে জানে আসলে কী ঘটেছিল, সে জানে কী বলেছিল, কী গোপন করেছিল এবং কেন সত্যকে আড়াল করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। একই মিথ্যা বারবার বলতে বলতে, বারবার ব্যাখ্যা করতে করতে, বারবার অন্যের সামনে সেটাকে প্রতিষ্ঠা করতে করতে—একসময় মানুষটি নিজেই তার তৈরি গল্পের কিছু অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করে।

প্রতিটি নতুন মিথ্যা তখন আগের মিথ্যাটার ওপর একটি পর্দা হয়ে দাঁড়ায়। আর প্রতিটি নতুন ব্যাখ্যা সত্যের আরও একটি অংশকে আড়াল করে দেয়। একসময় সে আর শুধু অন্য মানুষকে প্রতারণা করে না—সে নিজের তৈরি একটি বাস্তবতারও বন্দী হয়ে যায়। তাকে মনে রাখতে হয়—কাকে কী বলেছে, কার কাছে কী অস্বীকার করেছে, গতকাল কী বলেছিল, আজ কী বলছে, আর কাল কী বলতে হবে। পুরোনো মিথ্যাকে টিকিয়ে রাখতে তাকে নতুন নতুন গল্প তৈরি করতে হয়। একটি গল্পের সঙ্গে আরেকটি গল্পের মিল রাখতে হয়। নিজের কথার সঙ্গে নিজের কথার হিসাব মেলাতে হয়। আর এভাবেই একদিন আসে সেই মুহূর্ত—যখন সে নিজেই আর মনে করতে পারে না, সত্যটা ঠিক কোথায় শেষ হয়েছিল এবং মিথ্যাটা কোথা থেকে শুরু হয়েছিল। তখন আসল সত্যটি ধীরে ধীরে তার স্মৃতি থেকে মুছে যায়। আর প্রথম মিথ্যাটিও হারিয়ে যায় অসংখ্য ব্যাখ্যার ভিড়ে।

আর এতদিন ধরে বলা গল্পটাই শেষ পর্যন্ত তার কাছে সত্য বলে মনে হতে থাকে। এটাই মিথ্যার সবচেয়ে ভয়ংকর পরিণতি। একজন মিথ্যাবাদী হয়তো মনে করে সে অন্য সবাইকে বোকা বানিয়েছে। অথচ অনেক সময় শেষ পর্যন্ত সে নিজেই তার সবচেয়ে বড় মিথ্যার শিকার হয়ে যায়। তাই কোনো মিথ্যাবাদীকে বারবার জিজ্ঞেস করে লাভ নেই—“তুমি মিথ্যা বলেছিলে কেন?”কারণ তার কাছে হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কোনো সত্য অপেক্ষা করছে না। অপেক্ষা করছে শুধু—আরেকটি মিথ্যা। আর সেই মিথ্যাটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও একটি। শেষ পর্যন্ত এমন এক সময় আসে, যখন সত্য আর তার কাছে কোনো গল্প থাকে না—মিথ্যাটাই হয়ে যায় তার একমাত্র মনে থাকা গল্প।