১০/০৯/২০২৬-আর্মির জীবনটা আমার কাছে শুধু একটা চাকরি ছিল না

আর্মির জীবনটা আমার কাছে শুধু একটা চাকরি ছিল না—এটা ছিল আমার জীবনের একটা আলাদা অধ্যায়। একটা men’s life—যেখানে পরিস্থিতি বলে আলাদা কিছু ছিল না। যা আসত, সেটাকেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যেতে হতো। ভয়, ক্লান্তি, বৃষ্টি, শীত, অন্ধকার কিংবা বিপদ—কোনোটার জন্যই জীবন থেমে থাকত না। অন্ধকার রাত—অপারেশন আছে, কোনো অসুবিধা নাই। আমার কাছে তখন অন্ধকার মানেই থেমে যাওয়া ছিল না। আলো নেই? সমস্যা নেই। মেঠো পথ, গহীন জঙ্গল, চারপাশে শুধু অন্ধকার—তবুও আমি হাঁটতাম। পিঠে আমার প্যাক, পায়ে বুট, সঙ্গে অস্ত্র। সামনে কতদূর পথ, কোথায় গিয়ে শেষ হবে—সেটা হয়তো জানতাম না। শুধু জানতাম, আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বৃষ্টি নামত। জুপজুপ করে বৃষ্টি পড়ত শরীরের ওপর। কাপড় ভিজে যেত, বুট ভিজে যেত, শরীর ক্লান্ত হয়ে আসত। কিন্তু হাঁটা থামত না। বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হতো—এই বৃষ্টিটাও যেন আমার জীবনেরই একটা অংশ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড শীতেও একই গল্প। চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। গায়ে একটা আর্মির জ্যাকেট, আর সেই জ্যাকেটটাকেই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে আপন জিনিস মনে হতো। শীতকালীন অনুশীলনে কখনো বনে, কখনো কবরস্থানে, কখনো পরিত্যক্ত স্যাঁতসেঁতে বাগানে তাবু টেনে রাত কাটিয়েছি। তখন মনে হতো, পৃথিবীর আরাম-আয়েশ থেকে আমরা যেন সম্পূর্ণ অন্য একটা জগতে বাস করছি। কিন্তু আজ, এত বছর পর, সেই স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ, তাবুর ভেতরের ঠান্ডা, ভোরের কুয়াশা—সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুত মায়ায় ভরে গেছে।

আর আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই গভীর রাতগুলো। যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকত, তখন আমার রাতটা হয়তো সবে শুরু হয়েছে। চারপাশের বাড়িগুলো নিস্তব্ধ। মানুষের কোনো শব্দ নেই। গাছের পাখিগুলোও সারাদিনের কিচিরমিচির শেষে ঘুমিয়ে গেছে। আর আমি—হয়তো একা কোনো মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছি। কখনো হাতে একটা সিগারেট জ্বলছে। চারপাশে শুধু অন্ধকার। নিজের বুটের শব্দ—খট… খট… খট… কখনো মনে হতো, এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে হয়তো আমি ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। উপরে তাকালে দেখা যেত চাঁদটা অনেকটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। মনে হতো, আর হয়তো ঘণ্টাখানেক পরেই ভোর হবে। মানুষগুলো ঘুম থেকে উঠবে, পাখিরা ডাকবে, বাড়ির উঠোনে মানুষের ব্যস্ততা শুরু হবে। পৃথিবীটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে রাতটা শুধু আমার। দূরে কোনো এক খোঁয়াড় থেকে একটা গাভী হঠাৎ লম্বা টানে ডেকে উঠত। কোনো বাড়ির মুরগির খামার থেকে কয়েকটা রাতজাগা মুরগি একসঙ্গে ডেকে উঠত। তারপর আবার সব চুপ।

আমি হাঁটতাম। কখনো ক্লান্ত শরীর নিয়ে, কখনো ঘুমজড়ানো চোখে, কখনো নিজের চিন্তার সঙ্গে লড়তে লড়তে। 

কিন্তু আর্মির জীবন শুধু এই দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জীবনের একটা সময় বিদেশের মাটিতেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আরও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল—অচেনা দেশ, অচেনা মানুষ, অচেনা ভাষা, অচেনা পরিবেশ। অথচ সেই অচেনা মাটিতেই কখনো কখনো এমন কিছু মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি, যাদের সঙ্গে হয়তো তার আগে কোনোদিন দেখা হয়নি। ভিন্ন দেশের আর্মির অফিসার, জওয়ান—কেউ আমার ভাষা জানে না, কেউ আমার সংস্কৃতি জানে না। তবুও বিপদের মুহূর্তে আমরা যেন একই পরিবারের মানুষ হয়ে যেতাম। সেখানে বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাও ছিল অন্যরকম। কে কোন দেশের, কে কোন ধর্মের, কে কোন ভাষায় কথা বলে—এসব তখন খুব ছোট হয়ে যেত। সামনে একটা দায়িত্ব থাকত, আর পাশে থাকত একজন সহযোদ্ধা। কখনো এমন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেছি, যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান। তখন নিজের জীবন নিয়ে ভাবারও সময় থাকত না। কখনো জানতাম না সামনে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার বন্ধু নাকি শত্রু। কখনো জানতাম না পরের মুহূর্তে কোথা থেকে বিপদ আসবে। অথচ আমার অস্ত্র সবসময় প্রস্তুত থাকত। চোখ-কান খোলা থাকত। মন থাকত সতর্ক। আর দায়িত্ব—সবকিছুর ওপরে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এমন কিছু মুহূর্তও এসেছে যখন অন্য দেশের মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্বে নিজেকে এমনভাবে ডুবিয়ে দিয়েছি যে নিজের পরিবার, স্ত্রী, সন্তান—কেউ যেন সেই মুহূর্তে মাথার ভেতরেই ছিল না। পরে যখন বিপদ কেটে গেছে, যখন একটু নিরাপদ জায়গায় ফিরে এসেছি, তখন হঠাৎ মনে পড়েছে—আমারও তো একটা পরিবার আছে। কেউ হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ হয়তো জানেই না আমি এই মুহূর্তে কোথায়, কী অবস্থায় আছি। কিন্তু দায়িত্বের সময় দায়িত্বই সবকিছু। আজ ভাবলে অবাক লাগে—কীভাবে পারতাম? কীভাবে এতটা নির্ভয়ে অচেনা মানুষের জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতাম? হয়তো তখন বয়স কম ছিল। শরীরে তারুণ্যের শক্তি ছিল। ভয় ছিল, কিন্তু ভয়কে প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না। আর তার চেয়েও বড় ছিল একটা বিশ্বাস—আমি একজন সৈনিক, আমার দায়িত্ব আমাকে শেষ পর্যন্ত পালন করতেই হবে।

সেই সময়ের অনেক মানুষের নাম আজ হয়তো মনে নেই। অনেক মুখও সময়ের কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মুহূর্ত এখনও খুব পরিষ্কার। কোনো অচেনা দেশের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে বিপদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা। কোনো জওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে নীরবে বুঝে নেওয়া—আমরা প্রস্তুত। কোনো অপারেশনের আগে কয়েক মুহূর্তের সেই অদ্ভুত নীরবতা। অন্ধকারের মধ্যে অস্ত্র হাতে অপেক্ষা করা। আর মনে মনে শুধু ভাবা—আজ রাতটা পার করতে হবে। সেই দিনগুলোতে মৃত্যু খুব কাছের একটা বাস্তবতা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে আমরা মৃত্যুকে নিয়ে খুব বেশি ভাবতাম না। কারণ সৈনিকের জীবনে মৃত্যুভয়কে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হয়। ভয় থাকবে, কিন্তু পা থামানো যাবে না।

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে বুঝি—ওই জীবন আমাকে শুধু সাহস শেখায়নি। আমাকে শিখিয়েছে মানুষকে চিনতে। শিখিয়েছে বন্ধুত্বের মূল্য। শিখিয়েছে দায়িত্ব কী। শিখিয়েছে—মানুষের পরিচয় অনেক সময় তার দেশের নাম দিয়ে নয়, বিপদের মুহূর্তে সে আপনার পাশে দাঁড়ায় কি না, সেটা দিয়ে হয়।

আর শিখিয়েছে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে। তখন হয়তো বুঝিনি—কিন্তু আজ বুঝি, ওই একাকী রাতগুলো, সেই বৃষ্টিভেজা পথ, কুয়াশায় ঢাকা সকাল, হাড় কাঁপানো শীত, অচেনা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া বিপদ—এসবই আসলে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে গেছে। আজ যখন আর সেই জীবনটা প্রতিদিনের বাস্তবতা নয়, তখন অদ্ভুতভাবে সেই কষ্টগুলোকেই মিস করি।

মিস করি সেই বুটের শব্দ। মিস করি পিঠের ভারী প্যাক। মিস করি বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটা। মিস করি কুয়াশায় ঢাকা ভোর। মিস করি হাড় কাঁপানো শীতের রাত।

মিস করি গভীর অন্ধকারের সেই মেঠো পথগুলো। মিস করি অপারেশনের আগের সেই নিস্তব্ধতা। মিস করি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অফিসার আর জওয়ানদের। মিস করি সেই অচেনা দেশের অচেনা সহযোদ্ধাদের—যাদের সঙ্গে হয়তো ভাষা এক ছিল না, দেশ এক ছিল না, জীবন এক ছিল না; কিন্তু বিপদের মুহূর্তে আমরা একই মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। সবচেয়ে বেশি মিস করি—যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকত, আর আমি একা জেগে থাকতাম।

সত্যি বলতে, তখন জীবনটা যতটা কঠিন মনে হতো, আজ দূর থেকে তাকালে ততটাই সুন্দর মনে হয়। জীবনের কিছু সময় আছে, যেগুলো বেঁচে থাকার সময় আমরা শুধু পার করে দিই। তখন কষ্টকে কষ্ট মনে হয়, ক্লান্তিকে ক্লান্তি মনে হয়, রাতকে শুধু রাতই মনে হয়। কিন্তু সময় চলে যায়। মানুষ বদলে যায়। বয়স বাড়ে। জীবন অন্যদিকে চলে যায়। তারপর একদিন হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে মনে হয়— ইশ! সেই দিনগুলো যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত!

হয়তো আবার সেই বুট জোড়া পায়ে দিতাম। পিঠে সেই ভারী প্যাকটা তুলে নিতাম। গায়ে সেই পুরোনো আর্মির জ্যাকেটটা পরতাম। আবার অফিসার-জওয়ানদের নিয়ে কোনো অচেনা পথে বেরিয়ে পড়তাম। আবার কোনো অন্ধকার রাতে মেঠো পথ ধরে হাঁটতাম। চারপাশে শুধু নীরবতা, মাথার ওপর চাঁদ, হাতে একটা সিগারেট, আর পায়ের নিচে বুটের সেই চেনা শব্দ— খট… খট… খট… হয়তো আবার কোনো অচেনা নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো—এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আমি ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। হয়তো আবার কোনো অচেনা দেশের একজন সহযোদ্ধা পাশে এসে দাঁড়াত। হয়তো আবার কোনো কঠিন মুহূর্তে অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াতাম। হয়তো আবার জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুঝতাম—জীবন আসলে কতটা মূল্যবান। আর হয়তো সেই মুহূর্তে আবার মনে পড়ত—এই তো আমার জীবন। এই তো আমার তারুণ্য। এই তো আমার সাহস। এই তো আমার পৃথিবী।

আজ সেই পৃথিবী আর নেই। মানুষগুলো ছড়িয়ে গেছে। কেউ হয়তো অবসর নিয়েছে, কেউ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, কেউ হয়তো আর এই পৃথিবীতেই নেই। অনেক মুখ ভুলে গেছি, অনেক নাম মনে নেই। কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনও কোথাও হারিয়ে যায়নি। কখনো গভীর রাতে হঠাৎ মনে হয়, আমি যেন আবার সেই পুরোনো পথে হাঁটছি। চারপাশে অন্ধকার। দূরে কোনো গাভীর ডাক। কোনো অচেনা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। হাতে জ্বলছে একটা সিগারেট। পায়ে সেই বুট। আর বুকের ভেতর সেই পুরোনো সাহস। তখন মনে হয়—সময় কি সত্যিই চলে যায়? নাকি আমাদের শরীরটা শুধু সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যায়, আর আমাদের একটা অংশ চিরকাল পড়ে থাকে সেই পুরোনো কোনো ক্যাম্পে, কোনো মেঠো পথে, কোনো বৃষ্টিভেজা রাতে, কোনো অচেনা দেশের মাটিতে?

জানি না। শুধু জানি— আর্মির সেই জীবনটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে— সেটাই ছিল আমার তারুণ্যের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। সেই জীবনে কষ্ট ছিল, ক্লান্তি ছিল, ঘাম ছিল, বৃষ্টি ছিল, শীত ছিল, অন্ধকার ছিল, ভয় ছিল, জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল। কিন্তু তার ভেতরেই ছিল আমার তারুণ্য। ছিল আমার সাহস। ছিল আমার একাকীত্ব। ছিল আমার স্বাধীনতা। ছিল বন্ধুত্বের সবচেয়ে নির্মল রূপ। ছিল দায়িত্ববোধের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। আর ছিল জীবনের কিছু সবচেয়ে সত্যিকারের মুহূর্ত।

তাই আজও মাঝেমধ্যে মনে হয়—যদি আর একবার সেই জীবনটায় ফিরে যেতে পারতাম! একবার শুধু সেই বুট জোড়া পায়ে দিতে পারতাম। একবার শুধু সেই প্যাকটা কাঁধে তুলতে পারতাম। একবার শুধু কোনো অন্ধকার রাতে, কোনো অচেনা পথে, পাশে আমার অফিসার আর জওয়ানদের নিয়ে হাঁটতে পারতাম। তাহলে হয়তো আবারও সেই পুরোনো মানুষটাকে খুঁজে পেতাম—যে মানুষটা ভয় পেত, কিন্তু ভয়কে কখনো নিজের পথের বাধা হতে দিত না।

আর্মির সেই জীবনটা খুব মিস করি। ভীষণ মিস করি। কারণ সেটা শুধু আমার চাকরি ছিল না—সেটা ছিল আমার জীবনের একটা অংশ।
আমার তারুণ্যের একটা অংশ।আমার অস্তিত্বের একটা অংশ
।