১০/০৯/২০২৬ -যে গ্রামটা আর নেই…

আজ থেকে প্রায় ৪৬ বছর আগের কথা।

এই বাড়িটাতেই কেটেছিল আমার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো। তখন গ্রামটা ছিল খুব ছোট। মানুষ ছিল হাতে গোনা। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির দূরত্ব হয়তো ছিল কয়েকটা উঠোন, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব ছিল শূন্য। কারও বাড়িতে আনন্দ হলে সবাই আনন্দ করতো, কারও বিপদ হলে পুরো গ্রাম ছুটে যেত। মানুষগুলো তখন খুব ধনী ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য—তাদের মনগুলো ছিল ধনী! সারা গ্রামে মাত্র দুটো টিউবওয়েল ছিল। বর্ষা এলে মনে হতো, পুরো গ্রামটাই যেন পানির ওপর ভেসে আছে। উঠোন থেকে বের হলেই হাঁটুপানি, আর সেই পানির মধ্যে ছোট ছোট মাছের ছুটোছুটি। কাদা-মাটির পথ, বৃষ্টিভেজা বিকেল, পুকুরপাড়, বিশাল গাছগুলোর ছায়া—সেই সরল পৃথিবীটাকে তখন বুঝিনি। বুঝিনি, একদিন এই ছোট্ট পৃথিবীটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে থাকবে।

১৯৭৭ সালে আমি গ্রাম ছেড়ে চলে যাই। তারপর ছুটিতে মাঝে মাঝে আসতাম। একটা টান ছিল। একটা অদৃশ্য বন্ধন ছিল এই মাটির সঙ্গে। কারণ মানুষ যত দূরেই যাক, তার শৈশব বোধহয় কোথাও যায় না। সে লুকিয়ে থাকে পুরোনো উঠোনে, গাছের ছায়ায়, পুকুরের জলে, কিংবা কোনো এক বিকেলের বাতাসে। কিন্তু ২০০৩ সালে আমার মা চলে যাওয়ার পর সবকিছু কেমন যেন বদলে গেল। মায়ের সঙ্গে যেন এই গ্রামের সঙ্গেও আমার একটা বড় সম্পর্কের মৃত্যু হলো।

আসা কমে গেল। তারপর একসময় এমন হলো—নিজের গ্রামেই এসে নিজেকে অতিথি মনে হতে লাগল।

কী অদ্ভুত!

যে গ্রামের প্রতিটি পথ একসময় আমার চেনা ছিল, সেই পথেই একদিন নিজেকে অপরিচিত মনে হলো। তখন গ্রামে কোনো বিল্ডিং ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না। শহরে যাওয়ার মতো ভালো কোনো গাড়ির পথ ছিল না। কিন্তু মানুষের মধ্যে একটা জিনিস ছিল—মায়া। সেই মায়ার কোনো দাম ছিল না, কিন্তু তার মূল্য ছিল অপরিসীম। এই গ্রামেরই কত ছেলেমেয়ে নিজেদের যোগ্যতায় দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেউ ডাক্তার, কেউ ব্যারিস্টার, কেউ অধ্যাপক, কেউ আর্মি অফিসার, কেউ ব্যবসায়ী। আমাদের তখন বড় বড় ভবন ছিল না, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না—কিন্তু ছিল এমন কিছু মানুষ, যাদের নিয়ে গর্ব করা যেত।

আজ ৪৬ বছর পর গ্রামটাকে দেখি—সবকিছু আছে। কাঁচা বাড়ি প্রায় নেই। বিদ্যুৎ আছে। পাকা রাস্তা আছে। গাড়ি আছে। দালানকোঠা আছে। বিদেশে থাকা মানুষের পাঠানো টাকায় অনেকের জীবন বদলে গেছে। শুধু কোথায় যেন গ্রামটাই নেই। বাড়িগুলো বড় হয়েছে, কিন্তু হৃদয়গুলো যেন ছোট হয়ে গেছে। আধুনিকতা এসেছে, কিন্তু তার সঙ্গে এসেছে কৃত্রিমতা। মানুষের ঘর সুন্দর হয়েছে, কিন্তু সম্পর্কগুলো কোথায় যেন বিবর্ণ হয়ে গেছে। পরিচ্ছন্ন মানুষ, সুন্দর ব্যক্তিত্ব আর নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ—এখন বড্ড কম মনে হয়।

মাইগ্রেশন গ্রামটাকে অনেক বদলে দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই গ্রামের মানুষের অর্থ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা আর সাফল্য তো গ্রামটাকে আরও সুন্দর করার কথা ছিল।

কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়—আমরা সবাই গ্রাম থেকে বেরিয়ে গেছি, অথচ গ্রামটাকে সঙ্গে করে কেউ বের করে আনিনি। কেউ যেন আর এই গ্রামটার দায়িত্ব নিতে চায় না। কেউ ভাবছে না—আমাদের পরের প্রজন্ম যখন ফিরে আসবে, তখন তারা কী দেখবে? তারপরও গ্রামের পুরোনো গাছগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। নীরবে। তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বস্ত। তারা দেখেছে আমার শৈশব। দেখেছে আমার মায়ের সংসার। দেখেছে আমাদের হাসি-কান্না। দেখেছে কত মানুষ এই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। দেখেছে কত মানুষ আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। তারা হয়তো এখনও আমাকে চিনতে পারে। আমি জানি না। কিন্তু কোনো এক পুরোনো গাছের নিচে দাঁড়ালে আজও মনে হয়—এই তো সেই জায়গা… এখানেই তো একদিন আমি ছোট ছিলাম। যে উঠোনে দৌড়াতাম, সেখানে এখন অন্য মানুষের চলাফেরা। যে পথে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটতাম, সেই পথ এখন গাড়িতে ভরে গেছে। যে গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই সবাই সবাইকে চিনতো, সেখানে এখন অনেক মুখই আমার অচেনা। সময় শুধু গ্রামটাকে বদলায়নি—আমাদেরও বদলে দিয়েছে। তবু আমার ভেতরে একটা গ্রাম আজও বেঁচে আছে। সেই গ্রামে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। সেই গ্রামে   এখনও পাকা রাস্তা হয়নি। সেই গ্রামে এখনও বর্ষার পানি উঠোন ছুঁয়ে যায়। সেই পানিতে এখনও ছোট ছোট মাছ ছুটে বেড়ায়। সন্ধ্যা হলে মানুষ এখনও একে অপরের বাড়িতে বসে গল্প করে। আর আমার মা এখনও যেন সেই বাড়ির কোথাও আছেন। সেই গ্রামটাকে আমি আজও খুঁজে বেড়াই।

বাস্তবের গ্রামে গিয়ে হয়তো তাকে আর খুঁজে পাই না। কারণ— গ্রামটা হয়তো এখনও আছে, বাড়িগুলোও আছে, গাছগুলোও আছে, মানুষও আছে। শুধু আমার সেই গ্রামটা আর নেই। আর সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো—সেই গ্রামটার সঙ্গে সঙ্গে আমার শৈশবটাও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।