ঢাকা, রাজধানী, হচ্ছে পুরু দেশের একটা কেন্দ্রীয় রিহেবিলেশন সেন্টারের মতো। সবাই, যুবক, বৃদ্ধ, মহিলা ঢাকা আসতে চায়। ফলে সবগুলি জেলার মানুষের সাথে ঢাকাবাসীদেরকে একাই প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে হয়। ঢাকাবাসীকে অন্য কোথাও রিহেবিলেটেশনের জন্য দৌড়াতে হয় না একমাত্র বিদেশ ছাড়া। অনুন্নত জেলার যে যুবকটি তার জেলা ছেড়ে ঢাকাগামী হয়, সে আসলে ঢাকাবাসী কোনো যুবকের থেকে একধাপ এগিয়ে থাকে। কারন সে জানে তার অবস্থা এবং অবস্থান। সে জানে যেভাবেই হোক তাকে উপরে উঠতে হবে। যখনই সে ঢাকাগামী হয়, তখন তার একটাই সপ্ন থাকে, সে কিভাবে এই রাজধানীর বুকে অন্য সবার চেয়ে দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে সেটেলড হবে। তাই সে এখানে এসে সে নিজে অথবা তার পরিবারের সিবলিং কে প্রথমে স্কুলে ভর্তি করায়, তারাও পড়াশুনায় মন দেয় এবং দিতে বলে, নিজের পায়ের মাটি শক্ত করার জন্য পরিবারের সবাই মিলে যে কোনো জব খুজতে থাকে যাতে কোনোরকমে সে শুধু ঢাকায় টিকে যেতে পারে। ইনিশিয়ালী এই জনগোষ্ঠীটা একা একা খুব অনিরাপদ মনে করায় তারা ঢাকাবাসীর কারো না কারো সাথে সখ্যতা তৈরী করে এবং খুব দ্রুত নিজেদের কিছু লোক নিয়ে লোকাল কোনো ইনফ্লুয়েনশিয়াল লোকের সংস্পর্শে এসে একটা অপ্রকাশিত দল তৈরী করে। আপাতত দেখে মনে হবে যে, তারা ঢাকাকেন্দ্রীক সেই লোকাল কমান্ডের উপর নিয়মিত লয়াল এবং সবকিছু মেনে নেয়ার একটা প্রবনতা প্রদর্শন কিন্তু তাদের সবার মনে একটাই বাসনা থাকে। একটা সুযোগ, মাত্র একটা সুযোগ, তারপর যখন একটু সাবলম্বী বোধ করে, ঠিক তখন তারা সেই ঢাকাবাসীর হাত ছেড়ে দেয়। নিজেরাই তখন কমান্ডে চলে আসে।
এই সময়ে ধীরে ধীরে তারা অত্র অঞ্চলে প্রথমে একটা সংঘটন তৈরী করে, তারপর কিছু লোক মিলে থাকার জন্য কম্বাইন্ড একটা জমি ক্রয় করে, অতঃপর ধীরলয়ে সঞ্চয়ে সঞ্চয়ে সেখানে বাড়িঘর তৈরী করে আবাসনের মাধ্যমে পরিবার সেটেল করে ফেলে। আর এটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তারা একটা ব্যাপার জানে যে, ভিলেজ পলিটিক্সই হোক বা কেন্দ্রীয়, তারা ধীরে ধীরে সেই বলয়ের মাঝে ঘেষতে হবে এবং এক সময় ঘেষেও যায়। আর এই ঘেষে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ঢাকাবাসীরাই তাদের সেই সুযোগটা করে দেয়। এভাবেই তারা একসময় মাইনোরিটি থেকে অবশেষে মেজরিটির দিকে পদার্পন করে। তারা তখন পলিটিক্যালী শক্ত অবস্থানে চলে যায়, সাপোর্টিভ মানুষের দল তৈরী হয়, এবং তারা তখন একচ্ছত্র আদিপত্য বিস্তার করে। ঢাকাবাসী এই ফেনোমেনাটাকে বুঝতে পারে না। ফলে তারাও মনে করে, তাদের সাথে কিছু বহিরাগত লোক সংঘটিত হয়ে তার দলকে তো ভারী এবং মজবুত করছে এবং তাদেরকে তো নেতা মানছেই। কিন্তু এই লোকাল লোকগুলি জানে না যে, এই মানাটা আসলে খুবই ক্ষনস্থায়ী। যখন ঐ গোষ্ঠীর সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন যাকে কেন্দ্র করে ওদের পা শক্ত হয়েছিলো, এক নিমিষেই তারা সেই অবলম্বনকে ধাক্কা দিয়ে এমন এক জায়গায় ছুড়ে ফেলে যে, সে আর এখানের কেউ থাকে না। তার পরিবর্তে স্রিষ্টি হয় নতুন নেতৃত্ত, নতুন কমান্ড। আর সেটা অন্য জেলার অধীনে। ঢাকাবাসীরাও তাদের অধীনে চলে আসে।
একটা বিবর্তন খেয়াল করলে খুব সহজেই চোখে পড়ার কথা যে, বহিরাগত এই মানুষগুলি প্রথমে খুব নীরিহ থাকে, পড়াশুনায় মন দেয়, কাজে মন দেয়, সবার সাথে খুব মিলেমিশে থাকে, তারা আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ায় যে কোনো উপায়ে। একসময় ছোট ছোট কাজ করেও প্রশাসনিক কাজে দক্ষতা অর্জন করে, ওদের দলমত সদস্যদের জন্য একে অপরকে সররাবত্তক সাহাজ্য সহযোগীতা করে এবং ওদের একটা আলাদা বলয় তখন তৈরী হয়ে যায়। সেখানে তাদের আলাদা নেত্রিত্তও থাকে। এক সময় ওরাই লুফে নেয় গ্রামের পদ, রাজনিতির পদ এবং গড়ে তোলে আলাদা একটা ব্যবস্থা। এই অবস্থার জন্য দায়ী গুটিকতক সার্থানেষী করাপ্টেড তথাকথিত শিক্ষিত ঢাকার লোকাল মাকরশা যারা না নিজেদের উপকার করতে পারে, না অঞ্চলের। এরা তখন কোথাও যাওয়ার বা উপদেশ নেয়ার মানুষও খুজে পায় না কারন তারা সেই জনবল তৈরী করে নাই। অন্যদিকে বহিরাগত মানুষগুলি একে একে এমন একটা সার্কেল তৈরী করে ফেলে যে, সর্বত্র তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়ে যায়। ওরা নেতা হয়, ওরা ধনী হয়, ওরা প্রাসাদ নির্মান করে, আর সেখানে এই অঞ্চলের মানুষগুলি দিনের পর দিন তাদের সেবা করে। অথচ হবার কথা উল্টাটা। লোকাল মানুষ গুলি নিজেরা নিজেদের উপযুক্ত করতে না পারায় সারাদিন হাড়কাপুনী পরিশ্রমেও ওদের উন্নতি হয় না। যখন লোকাল মানুষগুলি আর টিকে থাকতে পারে না, ঠিক এই সময়ে যেটা পরিলক্ষিত হয় যে, গ্রামের অভিভাবকগন তাদের পটেনশিয়াল যুবকদেরকে কোথাও কোনো গতি না করতে পেরে অচিরেই পাঠিয়ে দেয় দেশের বাইরে যেখানে সে একজন কামলা ছাড়া আর কিছুই না, আর মেয়েদেরকে বিবাহ দিয়ে দেয় যখন তার ক্যারিয়ার গড়ার কথা। এমন কি এটাও পরিলক্ষিত হয় যে, বহিরাগত এই জঙ্গোষ্ঠীটার মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে টাকাওয়ালা হয়ে উঠায় তাদের কাছেও এই অঞ্চলের লোকাল মানুষগুলি তাদের কাছে ধর্না দেয়। বহিরাগতরাও এই সুযোগটা লুফে নিয়ে লোকালদেরকে ঋণ দিয়ে আরো কাবু করে ফেলে। ব্যাপারটা লোকাল মানুষগুলি কখনোই ভাবে না কেনো এমনটা হলো। অত্র অঞ্চলের মেজোরিটি তখন মাইনোরিটি হয়ে আদিবাসীতে রুপান্তরীত হয়।
এই জনগোষ্ঠী থেকে যুবকেরা যে তাদের সাফল্য পায় না এমন না। যে সব অভিভাবকগন অধিক মাত্রায় নিজেরা নিজেরা সচেতন, তারা তাদের বাচ্চাদের প্রতি কেয়ারিং এবং সার্বোক্ষনিক মনিটরিং এ থাকেন, তাদের পরিবারের সন্তানরা ফাক ফোকর দিয়ে হয়তো কিছুটা সাফল্য পায় বটে কিন্তু তারা আর এই অঞ্চলে ফিরে আসে না। যারাই কখনো যদি ফিরে আসে, তখন আবারো সেই বহিরাগত সংঘটনটি ইসরাইলী ইহুদীদের মতো লোকাল কিছু তথাকথিত করাপ্টেড শিক্ষিত দস্যুদের নিয়ে নাড়ির টানে ফিরে আসা মানুষটাকে কিভাবে নাজেহাল করে তাদের বলয় থেকে দূরে রাখা যায় সেটা করতে থাকে। আবারো এরজন্য কিছু দেশীয় পাতি নেতাদের অবদান কম নয়। অথচ পাতিনেতারা তখনো জানে না যে, ওদেরকে অন্যরা ব্যবহার করছে ওদের বিরুদ্ধেই। ফলে লোকাল জনপদ আবারো সেই পিছনেই যেতে থাকে। এদের কোনো গতি হয় না। এই লোকাল জনপদ সেই বহিরাগত নেতাদের পিছনেই বারবার ঘুরতে থাকে, কারন তারা এই অঞ্চলের বাইরের কারো সাথে কোনো যোগাযোগ নাই। অন্যদিকে, সেই বহিরাগতরাই এই অঞ্চলের মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা প্রশাসক, এমন কি কেন্দ্রীয় রাজনীতির মধ্যে এমনভাবে স্থান দখল করে নেয় যে, লোকাল কেউ তাদের বলয় থেকে বেরিয়ে যাবার কোনো পথ খোলা রাখে না। আর লোকালরা সেটা করতে পারবেও না কারন তারা কোনো কিছুতেই কোয়ালিফাই করে না।
সার্ভে করলে দেখা যায় যে, যে গ্রামে অসংখ্য ডাক্তার, অসংখ্য সিভিল অফিসার, অসংখ্য মিলিটারীম্যান, অসংখ্য উকিল কিংবা উর্ধতন কর্মকর্তা থাকার কথা কিন্তু সে অনুপাতে কিন্তু এর সংখ্যা অতীব নগন্য। অন্যদিকে খেয়াল করলে দেখবেন, এই বহিরাগত মানুষগুলির বাসস্থান আছে, তারা সবগুলি পদে পদায়িত এবং তাদের সন্তানেরা যেভাবেই হোক তর তর করে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। আধিপত্যের খেলা তখন শুরু হয় আরেক মাত্রায়।
আর এর জন্য দায়ী শুধুমাত্র গুটিকতক তথাকথিত লোভী কিছু লোকাল মানুষ যারা তাদের বর্তমান সার্থের জন্য পুরু ব্যবস্থাটা এবং বন্দোবস্তটাকে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে।
ঢাকার এতো কাছের একটা জনপদ অথচ এরা কোনো উন্নতি করতে পারছে না। উত্তর বংগের কোনো এক অপরিচিত যুবক এই অঞ্চলের স্কুল কলেজের অধ্যক্ষ হয়, টিচার হয়, সে সময়ে এই অঞ্চলের কোনো এক যুবক তখন ক্ষেত খামারে চাষে ব্যস্ত, কিংবা বহিরাগত কোনো এক পরিবারের সন্তান যখন এই অঞ্চলে মেজিষ্ট্রেট হয়ে আসে, তখন সেই এই অঞ্চলের কোনো এক যুবক নেশায় ধুম হয়ে পড়ে থাকে।
এর ভবিষ্যত আমি ধূসর দেখতে পাচ্ছি।