৩১/৫/২০২৬-৩৮ তম বিবাহ বার্ষিকী

সেই ৩০ মে ১৯৮৮ সাল।

উত্তাল আবহাওয়া, উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গন, নিজ শহর থেকে বহুদূর অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই ছিন্ন, একদিকে রাজনৈতিক হরতাল, সাথে সরকারী কার্ফিউ, অন্যদিকে দেশে চলছে আবহাওয়ার মহা ১০ নম্বর সংকেত। এরই মধ্যেই আমার জীবনে নেমে এসেছিলো জীবনের ২০ তম বিপদজনক সংকেত। কোথা থেকে কোন প্রিন্স ঢাকায় এসে আমার মিটুলকে না ভালোবেসেই বিয়ে করে সুদূর আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার পায়তারা। বাংগালীও কি এক জিনিষ। যেই আমেরিকায় থাকে বর, একেবারে গদগদ। সবাই রাজী মিটুলকে বিয়ে দিয়ে দেয়ার, শুধু বীর বাহাদূর মিটুল ছাড়া। গো ধরে বসেছিল কখন আমি তাকে উদ্ধার করে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আবার ছিনিয়ে নিয়ে যাবো।

সেনাবাহিনীতে আমার বিয়ের বয়সের এখনো শর্ত পুরন হয় নাই, সবেমাত্র সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে লেফটেন্যান্ট হয়েছি। বিয়ে করার শর্তাবলীতে আমার আরো প্রায় ৪ বছর বাকি, অসময়ে বিয়ে করলেই কোর্ট মার্শাল। শুধু কোর্ট মার্শাল নয়, একেবারে ১৪ শিকের ভিতর। আবার চাকুরীও থাকবে না। কত কত গল্প পড়েছি যে, রাজ রাজারা নাকি তাদের সিংহাসন ছেড়ে দিয়েছেন প্রেমের কারনে। আর আমি ভাবলাম, আমার না আছে সিংহাসন, না আছে সাম্রাজ্য, একটা চাকুরীই তো। তবে বিয়ে করে কেউ ১৪ শিকের ভিতরে যায়, এটা আগে কখনো শুনিনি। কিন্তু তখনকার দিনে সেনাবাহিনীর নিয়মে যাইতো। কোর্ট মার্শাল, ১৪ শিক, চাকুরী হারানো সব কিছুই তখন আমার কাছে ঐ রাজ পুত্রের সিংহাসন হারানোর মতোই যেনো ছিলো।

এমন একটা পরিস্থিতিতে আমি সেই খুলনা গিলাতলা থেকে (আমি তখন গিলাতলা সেনাবাহিনীতে কোর্ষে ছিলাম) সব কিছু ঝেরেঝুরে ঠিকই ঢাকায় চলে এসছিলাম একেবারে শুন্যহাতে, মাত্র বাসভাড়া আর রিক্সা ভাড়া নিয়ে। অবশ্য বেতনই পাই মাসে ৮৫০ টাকা, পকেট আবার ভর্তি থাকে কিভাবে? যাই হোক, যাইই ছিলো, সেটা নিয়েই আর্মির কোর্ট মার্শালের ভয় কাটিয়ে, আবহাওয়ার ১০ নম্বর মহা সংকেত পেরিয়ে উত্তাল নদ নদীতে ছোট লঞ্চ দিয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে পদ্মানদী পার হয়েছিলাম। হরতাল থাকায় কোনো বাস চলছিলো না, তাই আমি কখনো ট্রাকে, কখনো রিক্সায় আবার কখনো পায়ে হেটে অঝোর ব্রিষ্টির মধ্যে শেষ নাগাদ ঠিকই এপারের আরিচার লঞ্চ ঘাটে পৌছাই। সেখান থেকে কোনো রকমে রিক্সায় বা ট্রাকে করে মানিকগঞ্জে পৌঁছাইলেও গো ধরে থাকা বীর বাহাদূর মিটুলকে আর পাওয়া গেলো না। আবার আরেক অপারেশন, আমি আসবো জেনে ওর পরিবার তাকে লুকিয়ে ফেলেছে ঢাকার এক এজিবি কলোনীতে। কোনো রকমে ছোট দুলাভাইকে নিয়ে মিটুলের লোকেশন বের করে সেখানে ওয়ানম্যান আর্মির মতো “বিবাহ অপারেশন-১৯৮৮”।

কেউ রাজী নন, কেউ আদর তো দূরের কথা ভালোমত কথাও বলছিলো না। আমি আর মিটুল, সাথে কয়েকজন শুভাকাংখী। ন্যাটর মতো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত, করেই ফেললাম বিয়ে। সেই ৩০ মে ১৯৮৮ তারিখে বিয়ে করে তারপরের দিনই ফিরে গিয়েছিলাম আবার সেই গিলাতলা, খুলনা ক্যান্টন্মেন্ট।

আজ তার ৩৯ তম বয়সে পড়লো। তখনো বাচ্চারা সাথে ছিলো না, আজো নাই। তখন ছিলো না কারন ওদের তো জন্মই হয় নাই। আর আজ ওরা একেকজন একেক দেশে। গতকাল ৩৯তম বছরে পড়েছিলো আমাদের বিবাহের কিন্তু আমার মিসেস বাংলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হওয়াতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া তাদের কলেজে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুবার্ষিকীর প্রোগ্রাম করতে আসায় মিটুলিকে কলেজে থাকতে হয়েছিলো। তাই গতকাল ৩০ মে তে আর আমরা আমাদের বিবাহ বার্ষিকী পালন করতে পারিনি, আজ আমি আর মিটুল দুজন মিলেই শেরাটনে দুপুরের সময়টা কাটালাম। উপ্লক্ষ্য-আমাদের ৩৮ তম বিবাহ বার্ষিকী। ৩৯ এ পদার্পন।

হোটেল শেরাটনে স্নিগ্ধা সুলতানা আপাকে একটা রিজার্ভেশন করিয়েছিলাম। সাথে ছোট একটা কেক আর ফুলের তোড়া। সাধারনত হোটেল শেরাটন এগুলি করে না কিন্তু আপা চমৎকার মানুষ, নিজের উদ্যোগেই আমাকে সাহাজ্য করেছিলেন। আপাকে ধন্যবাদ।

বড় মেয়ে এবং বড় জামাই (দুজনেই ডাক্তার) খাওয়ার সময় বিদেশ থেকে ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছিলো শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। ছোট মেয়ের সময়ের সাথে আমাদের মিলছিলো না, তখন তার ওখানে রাত (আমেরিকা), ভিডিও কলেও যুক্ত হতে পারেনি। লাইফটা এই রকমই।

এক সময় সবাই থাকে, বাড়ি কিচির মিচির করে ভরপুর থাকে, আর আরেক সময় আবার শুন্য পড়ে থাকে। অনেকটা সময় পার হয়েই গেলো। ৩৯ বছর বিবাহিত জীবন। ভালো থাকুক সবাই।