৭/৯/২০২৬-কয়েকদিন আগে একজন পরিচিত মানুষের দাফনের সময় দাঁড়িয়ে ছিলাম।

কয়েকদিন আগে একজন পরিচিত মানুষের দাফনের সময় দাঁড়িয়ে ছিলাম। বৃষ্টিতে কবরের পাড় বারবার ভেঙে পড়ছিল। মাটি খুঁড়তেই নিচ থেকে গলগল করে পানি উঠে আসছিল। তিনটি কলাগাছ কবরের ভেতর রাখা হলো। তার ওপর শুইয়ে দেওয়া হলো মানুষটিকে। আমি শুধু দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। ভাবছিলাম—এই মানুষটিও তো একদিন কারও পৃথিবী ছিল। কারও বাবা। কারও স্বামী। কারও সন্তান। কারও সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। হয়তো তার জন্য কেউ রাত জেগেছে। কেউ তার অপেক্ষায় থেকেছে।

কেউ তার একটি ফোনকলের জন্য সারাদিন তাকিয়ে থেকেছে। অথচ আজ? আজ তাকে যত দ্রুত সম্ভব মাটির নিচে নামিয়ে দিতে পারলেই যেন সবার দায়িত্ব শেষ। তারপর সবাই বাড়ি ফিরে যাবে। কারও মিটিং আছে। কারও দাওয়াত আছে। কারও সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে হবে। দুপুরের মধ্যে দাফন হয়ে গেলে হয়তো সন্ধ্যার মিটিংটা করা যাবে। রাতের দাওয়াতটাতেও হয়তো যাওয়া যাবে। বৃষ্টি থামবে। চা বানানো হবে। রাত নামবে। কেউ ঘুমাবে। কেউ ফোনে কথা বলবে। কেউ হয়তো পরদিন আবার কাজে যাবে। কারও অফিস আছে। ভাবুন তো—একজন মানুষের পুরো জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পৃথিবীর ব্যস্ততা থেমে থাকে না। জীবন—আপনার জন্য এক মুহূর্তও থেমে থাকবে না। আমরা যাকে “আমার জীবন” বলে এত যত্নে সাজাই, সেটা আসলে আমাদের নয়। আমরা শুধু কিছুদিনের জন্য এখানে থাকি। কিছু মানুষকে ভালোবাসি। কিছু মানুষ আমাদের ভালোবাসে। কিছু স্বপ্ন দেখি। কিছু সম্পদ জমাই। কিছু হিসাব করি। কিছু অভিমান বুকে নিয়ে ঘুরি। তারপর একদিন—সব হিসাব বন্ধ। সব সম্পর্কের ঠিকানা বদলে যায়। আর আমাদের সমস্ত পরিচয় এসে থামে মাত্র কয়েক হাত মাটির নিচে।

তাই মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি ভুলেই গেছি—আমাকেও একদিন চলে যেতে হবে? হয়তো কোনো এক বর্ষার দুপুরে। হয়তো তখনও কবরের ভেতর পানি থাকবে। হয়তো মাটি কাদায় ভরে থাকবে। হয়তো তিনটি কলাগাছ আবারও কারও শেষ আশ্রয় হবে। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই—পৃথিবী আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। শুধু আমি থাকব না। থাকবে আমার নাম। কিছু ছবি। কিছু স্মৃতি। কিছু মানুষের মনে জমে থাকা কয়েকটি গল্প। তারপর সময় সেগুলোকেও ধীরে ধীরে মুছে দেবে। শেষ পর্যন্ত মানুষ আসলে কতটুকুই বা রেখে যায়? একটি নাম, কয়েকটি স্মৃতি, আর কয়েক হাত মাটি। তাই চলুন, বেঁচে থাকতেই ভালোবাসি। বেঁচে থাকতেই ক্ষমা করি। বেঁচে থাকতেই নিজের জন্য একটু বাঁচি। কারণ মৃত্যুর পরে আপনার জন্য পৃথিবী কাঁদবে হয়তো—কিন্তু পৃথিবী থেমে থাকবে না।

আর সবচেয়ে নির্মম সত্যটা হয়তো এটাই—একদিন যে মানুষটাকে ছাড়া পৃথিবী কল্পনাই করা যেত না, সেই মানুষটাকেই পৃথিবী একদিন খুব সহজে ছাড়া শিখে যায়।