14/08/2026-আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—আমার পরিবার

পরিপূর্ণ সুখ কিংবা চূড়ান্ত খুশি বলে বোধহয় পৃথিবীতে কিছু নেই। মানুষ স্বপ্ন দেখে, বড় হতে চায়, আরও অনেক কিছু অর্জন করতে চায়—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বপ্নের উচ্চতা কতটা হওয়া উচিত, তা অনেকটাই নির্ভর করে নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম এবং চারপাশের বাস্তবতার ওপর। অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো মানুষকে এমন এক দৌড়ের মধ্যে নিয়ে যায়, যার কোনো শেষ নেই। তখন যা অর্জন করেছে, সেটুকুর আনন্দও আর উপভোগ করা হয়ে ওঠে না। আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতার বোধ কিংবা অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে করতে মানুষ কখন যে নিজের হাতে থাকা সুখটুকুও হারিয়ে ফেলে, সে নিজেই বুঝতে পারে না।

আমার কাছে পরিশুদ্ধ ও সুন্দর জীবনের সুখ অনেক সহজ কিছু। এর জন্য প্রয়োজন সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা এবং নিজের দায়িত্বের প্রতি একাগ্রতা। প্রয়োজন নিজের সীমাটা জানা—কোথায় আমার সামর্থ্যের শেষ, আর কোথায় আমার চাহিদার সীমা। আমি জানি, আমার পরিশ্রম আমাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে। আমি এটাও জানি, আমার জীবনে আসলে কতটুকু প্রয়োজন। তাই যা আমার আছে, যা অর্জন করতে পেরেছি এবং যাদের নিয়ে আমার জীবন—এসব নিয়েই আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট, সুখী এবং কৃতজ্ঞ।

একজন মানুষ জীবনে কী অর্জন করেছে—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে শুধু সম্পদ, ব্যবসা, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থানের কথা বললেই হয় না। আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—আমার পরিবারের মানুষগুলো নিজেদের যোগ্যতায় দাঁড়িয়েছে এবং তারা ভালো আছে, সুখে আছে। আমার জীবনসঙ্গী আমার স্ত্রী—তিনি একজন অধ্যাপক এবং বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বাংলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজের মেধা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে তাঁর অবস্থান তৈরি করেছেন। সংসার ও পরিবারকে সামলে নিজের পেশাগত জীবনেও তিনি যে সাফল্য অর্জন করেছেন, সেটি আমার জীবনের গর্বের একটি অংশ।

আমার বড় মেয়ে একজন চিকিৎসক। তার জীবনসঙ্গীও একজন চিকিৎসক। দুজনেই নিজেদের পেশায় নিষ্ঠা, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সেবা করার মতো একটি মহান পেশাকে তারা জীবনের অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছে—একজন বাবা হিসেবে এটি আমার জন্য সত্যিই গর্বের।

আমার ছোট মেয়েটিও নিজের যোগ্যতায় আমেরিকায় একটি ভালো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে Accounting-এর ক্ষেত্রে কাজ করছে। নিজের শিক্ষা, দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে সে সেখানে নিজের একটি সুন্দর পেশাগত অবস্থান তৈরি করেছে। তার জীবনসঙ্গী একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং NASA-তে কাজ করছেন। তাঁদের দুজনকে নিজেদের পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত এবং সুখী দেখতে পারাটা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের। তবে সন্তানদের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে আমি একটি বিষয় সবসময় মনে রাখি—আমি তাদের যতটুকু শিক্ষা, সুযোগ ও ভিত্তি তৈরি করে দিতে পেরেছি, সেটা ছিল আমার দায়িত্ব। কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার কৃতিত্ব তাদের নিজেদের। আমি তাদের নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়ার জন্য আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। তারা সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে, নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এগিয়েছে এবং আজ যার যার ক্ষেত্রে একটি ভালো অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।

সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এই নয় যে, তারা সন্তানকে কত সম্পদ দিয়ে যেতে পেরেছেন; বরং এই যে, তারা সন্তানকে এমনভাবে গড়ে দিতে পেরেছেন কি না, যাতে একদিন সে নিজের যোগ্যতায় নিজের পথ তৈরি করতে পারে। আমি সেই চেষ্টাটুকুই করেছি।

পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্ক দিয়ে তৈরি হয় না। জীবনের পথে কিছু মানুষ এমনভাবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান, যাঁদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও ধীরে ধীরে হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়। আমার দুই মেয়ের শাশুড়ি আমাদের পরিবারের তেমনই দুজন আপন মানুষ। আমার বড় মেয়ের শাশুড়ি বাংলাদেশেরই মানুষ। একই সমাজ, একই সংস্কৃতি ও একই মাটির সঙ্গে তাঁর আমাদের অনেক মিল। কিন্তু শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণেই তিনি আমাদের আপন নন; তাঁর আন্তরিকতা, মমতা এবং সহজ-স্বাভাবিক ব্যবহারের কারণেই তিনি আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছেন। আমার মেয়েকে তিনি শুধু পুত্রবধূ হিসেবে নয়, নিজের পরিবারের একজন মানুষ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন—একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় আর কী হতে পারে!

অন্যদিকে, আমার ছোট মেয়ের শাশুড়ি একজন আমেরিকান। সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন সামাজিক পরিবেশ এবং ভিন্ন জীবনযাপনের মধ্য থেকে তিনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব কমে গেলে দেশ ও সংস্কৃতির দূরত্ব আর বড় হয়ে থাকে না। তিনি অত্যন্ত ভালো মনের, প্রাণবন্ত ও সহজ-সরল একজন মানুষ। সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই আমার মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দেখে। তাঁদের মধ্যে প্রচলিত শাশুড়ি-বউয়ের দূরত্বের চেয়ে বন্ধুত্বের স্বাভাবিকতা অনেক বেশি। আমার মেয়ে তাঁর সঙ্গে নিজের কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, মজা করতে পারে, নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিতে পারে। একজন বাবা হিসেবে মেয়ের জীবনে এমন একজন মানুষকে পাশে পাওয়া আমার কাছে নিঃসন্দেহে বড় একটি আশীর্বাদ।

দুজন দুই দেশের মানুষ—একজন বাংলাদেশের, অন্যজন আমেরিকার। তাঁদের সংস্কৃতি, জীবনযাপন কিংবা অভিজ্ঞতার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু ভালোবাসা, মমতা, আন্তরিকতা এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গায় কোনো পার্থক্য নেই। আমার মেয়েরা তাদের নিজ নিজ সংসারে শুধু ভালো জীবনসঙ্গীই পায়নি; এমন দুজন মানুষকেও পেয়েছে, যাঁরা তাঁদের জীবনে মায়ের মতো মমতা, বন্ধুর মতো সহজতা এবং পরিবারের মতো আপন করে নেওয়ার অনুভূতি দিয়েছেন। এটাও আমার জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি। এই ছবির মানুষগুলো এই ছবিতে শুধু আমার দুই মেয়ে কিংবা তাদের নিজ নিজ পরিবার নেই। এখানে আছে আমাদের একটি বড় হয়ে ওঠা পরিবারের ছবি। এখানে আছে আমার স্ত্রী, আমার দুই মেয়ে, তাঁদের জীবনসঙ্গী, তাঁদের পরিবার এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া আরও কিছু আপন মানুষ।

ছবির দিকে তাকালে আমি শুধু কয়েকজন মানুষকে দেখি না। আমি দেখি বহু বছরের পথচলা, দায়িত্ব, পরিশ্রম, সম্পর্ক, ভালোবাসা, সাফল্য এবং অসংখ্য স্মৃতি। আমি দেখি—একটি পরিবার কীভাবে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। একসময় যে সন্তানদের হাত ধরে হাঁটতে শেখাতে হয়েছে, আজ তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন পরিচালনা করছে। যে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসময় চিন্তা করেছি, আজ তারা নিজেদের যোগ্যতায় নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করছে। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে আনন্দের দৃশ্য আর কী হতে পারে? তাহলে আর কী চাই?

কখনো কখনো আমরা জীবনে আরও বেশি পাওয়ার জন্য ছুটতে ছুটতে ভুলে যাই—আমাদের হাতে ইতিমধ্যেই কত কিছু আছে। আমি আজ একটু পেছনে ফিরে তাকাই।

আমার স্ত্রী তাঁর নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত।

আমার দুই মেয়ে নিজেদের পেশায় প্রতিষ্ঠিত।

তাঁদের জীবনসঙ্গীরাও নিজেদের ক্ষেত্রে সম্মানের সঙ্গে কাজ করছেন।

দুই পরিবারের মানুষদের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা আছে।

আমার সন্তানরা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ইনশাআল্লাহ ভালো আছে, সুখে আছে।

তাহলে একজন মানুষের আর কতটুকু চাওয়া থাকতে পারে? আমার চাওয়া খুব বেশি নয়। আমি চাই, আমার পরিবারের সবাই সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ধরে রাখুক। জীবনে যতটুকু অর্জন করবে, তার জন্য যেন অহংকার না আসে; আর যতটুকু না-পাবে, তার জন্য যেন অস্থিরতা না আসে। আমি চাই, তারা নিজেদের সন্তানদেরও এমনভাবে গড়ে তুলুক, যেন তারা একদিন নিজের যোগ্যতায় নিজেদের পথ তৈরি করতে পারে। সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা. আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার জীবনে প্রাপ্তির চেয়ে কৃতজ্ঞ হওয়ার কারণই বেশি। আমি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে ঋণী। তাঁর অশেষ দয়া, রহমত ও অনুগ্রহের জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

জীবনে যা পেয়েছি, যা হারিয়েছি, যা অর্জন করেছি কিংবা যা পাইনি—সবকিছুর মধ্যেই তাঁর কোনো না কোনো প্রজ্ঞা আছে, এই বিশ্বাসটুকু আমাকে শান্তি দেয়। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের সামর্থ্য সীমিত; কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা সীমাহীন। তাই নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করে বাকিটুকু তাঁর ওপর ছেড়ে দিতে পারাটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তি।

আর একটি বিষয় আমি খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করি—মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর একটি। আমরা একে অপরের পাশে থাকব, একে অপরকে সম্মান করব, ভালোবাসব এবং যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে অন্যের জীবনটুকু একটু সুন্দর করার চেষ্টা করব। পরিবারের সৌন্দর্য শুধু এই নয় যে সবাই একই ছাদের নিচে থাকে। পরিবারের সৌন্দর্য হলো—দূরে থেকেও মানুষ একে অপরের কথা ভাবে, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ায়, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হয় এবং অন্যের কষ্টে নিজের মতো করে কষ্ট পায়। আমার কাছে সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো, যেখানে সম্পর্কের পরিচয়টা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়, আর মানুষটাই বড় হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত জীবন তো খুব দীর্ঘ কোনো গল্প নয়। তাই যতদিন আছি, সততার সঙ্গে বাঁচতে চাই, নিজের দায়িত্ব পালন করতে চাই, আপনজনদের ভালো রাখতে চাই, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখতে চাই এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে চাই। আমার জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব যদি কখনো কেউ জানতে চায়, তাহলে হয়তো খুব সহজেই বলতে পারব—

আমি যতটা চেয়েছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি পেয়েছি।

কারণ আমার কাছে আমার স্ত্রী আছে, আমার সন্তানরা আছে, তাঁদের পরিবার আছে, আপন মানুষগুলো আছে, ভালোবাসা আছে, সম্মান আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁদের ভালো থাকার খবর আছে।

একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কী হতে পারে? আমার কাছে এটাই সুখ।
এটাই শান্তি। আর এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আলহামদুলিল্লাহ। ❤️