“বেলাশেষে” একটা বাংলা ছায়াছবির নাম। অনেকবার দেখেছি ছবিটা। মন ছুয়ে যায় যেমন তেমন এই বয়সে এসে অনেক কিছুর হিসাবটাও মেলানো যায়। সুযোগ হলে দেখতে পারেন। সংক্ষিপ্ত কাহিনীটা এই রকম-
৬৫ বছরের স্বামী আর ৬০ বছরের স্ত্রীর গুরুতর এক সমস্যা নিয়ে তাদের নাতি-নাত্নি, মেয়ের জামাই, ছেলেরা মেয়েরা সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়েছেন। সমস্যাটা হল, স্বামী বলেছেন তিনি এই বয়সে এসে তার স্ত্রীর সঙ্গে পৃথক হতে চান এবং আরেকটি বিয়ে করতে চান। এই বুডো মানুষটির সিদ্ধান্তে পরিবারের অনেকেই হতবাক হলেও কেউ কেউ রাজি আবার কেউ কেউ রাজি নয়। যারা এই সিদ্ধান্তে রাজী না, তারা হতবাক হচ্ছেন, এই বয়সে কেন তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আবার তিনি বলছেনও না কেনো তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন, কারনটা অজানা। ফলে নায়নাতকুর, ছেলেমেয়ে, মেয়ের জামাই সবাই মিলে একটা পরিকল্পনা করলেনঃ ব্যাপারটার গোপন রহস্য জানতে হবে। তাই সবাই মিলে ঠিক করলেন এই দুই বুড়া বুড়িকে একান্তে কোথাও একঘরে কয়েকদিন রাখতে হবে। তারা একদিকে যেমন নিজেরা নিজেরাই আলাপ আলোচনা করতে পারবে, ভাবতে পারবে আবার অন্যান্যরাও গভীর গোপন কারনটা জানতে পারবে। দুজনে ভাবুক, দেখুক তারপর নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক কোনটা করা উচিৎ। বুড়া-বুড়িও সম্মতি দিলেন, ঝগড়াতো আর হয় নাই, স্বামী স্ত্রীই তো। তাদের জন্য আলাদা ঘর দেওয়া হলো, একদম নিরিবিলি পরিবেশ। কেউ তাদেরকে বিরক্ত করার নাই। এই বতসে হয়তো যৌবন কালের সেই উচ্ছল রোমান্টিকতা না থাকলেও যেটা থাকে তা হচ্ছে মায়া, বিশ্বাস আর ট্রাষ্টেড ভালোবাসা। এই দুই বুড়া বুড়ির অজান্তে সবাই একটা কাজ খুব গোপনে করে রাখলো। আর তা হচ্ছে তাদের রুমে গোপন একটা সিসি ক্যামেরা আর অন্য বাড়িতে মনিটর যাতে এই দুই বুড়া বুড়ি কি কথা বলে তা দেখার এবং শোনার জন্য। যখনই এই দুই বুড়া বুড়ি একা তাদের কথাবার্তা বলেন, তখনই দলবেধে অন্য বাড়িতে থাকা মনিটরে সবাই মিলে ভিডিওতে তা প্রত্যক্ষ করেন।
পঞ্চাশ বছরের বিয়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা, ভাল লাগার কথা, একসঙ্গে কষ্টের কথা, দুঃখের কথা, তাদের মিল অমিলের কথা, রাগের কথা, ভালোবাসার কথা একের পর এক তারা দুইজনে নিরিবিলি একত্রে বসে আলাপ করেন। আর সবাই তাদের এইসব অভিজ্ঞতার কথা শুনে কখনো কেউ হাসেন, কখনো চোখ মুছেন, কখনো অবাক হয়ে চুপ করে থাকেন। তারা সবাই একটা জিনিষ বুঝতে পারেন যে, সব স্বামীর কাছে তার সংসারটা এক রকমের, আর স্ত্রীর কাছে তার সংসারটা আরেক রকমের। কিন্তু কেউই যে ভুল নন তা ঠিক। স্বামীর কাছে দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসাটা এক রকমের আর স্ত্রীর কাছে স্বামী আর সংসারের জন্য ভালোবাসাটা আরেক রকমের। একজন মায়াবী স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন, তার অবর্তমানে তার আদরের স্ত্রীর যেনো কোনো কষ্ট না হয়, স্ত্রী যেনো কারো কাছে হেয়ালীর পাত্র না হন, তার আদুরী স্ত্রী যেনো কোনো অর্থকরী কিংবা সুন্দর জীবন চালানোর জন্য কারো কাছে হাত না পাতেন। সেই দিকটা খেয়াল করে এই ভরষাযুক্ত স্বামী সবসময় চান তার স্ত্রীকে সাবলম্বি করে তুলতে। ফলে স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন তার স্ত্রী এটা জানুক যে, তার স্বামী কোথায় কিভাবে কত রোজগার করেন, কত সঞ্চয় করেন, আর কিভাবে সেই কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে কিভাবে তিনি তার স্ত্রীর মংগলের জন্য কি করছেন এবং তার পুরুপুরী এই পরিকল্পনার অংশ হয়ে যেনো তার স্ত্রী এটা খেয়াল করে সে মোতাবেক প্রস্তুতি নেন এবং তার উপর পারদর্শী হন।
স্বামী যা ভাবছেন, করছেন কিন্তু তিনি অন্যদিকে স্ত্রীর বেলায় দেখছেন অন্যটা। তার স্ত্রী তার এইসব হিসাব নিকাশ, ভবিষ্যৎ জল্পনা কল্পনায় একেবারেই উদাসীন বরং স্ত্রী তাদের সংসারে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়ে, নাতি নাতকুর কিভাবে মানুষ হবে, কিভাবে আরামে থাকবে, কিভাবে নিরাপদ থাকবে ইত্যাদি নিয়েই বেশি নজর। স্বামীর কাছে ভালো লাগা ছিল বউকে নিয়া কোথাও রোমাঞ্চের উদ্দেশ্যে একা একা বেরিয়ে পড়া, কিন্তু স্ত্রীর কাছে যেনো সেই রোমাঞ্চের থেকে বেশী জরুরী ছিলো ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, তাদের কোচিং ক্লাস, তাদের স্বাস্থ্য, তার নিজের ঘরকন্নার কাজ, আত্মীয় সজনদের সেবা শশ্রুসা ইত্যাদির মধ্যে একটা বন্ধন স্রিস্টির লক্ষে সবাই মিলে পারিবারিক সময় কাটানো।
স্বামী চেয়েছেন স্ত্রীর কাছ থেকে অনেকটা সময় যে সময়টা তারা ভালোবাসার কথা বলবে, পুরানো দিনের কথা বলবে, কোনো একটা সিনেমা দেখতে দেখতে মন ভরে আনন্দ করবে, বিখ্যাত কোনো কবির কবিতা পড়ে পড়ে তার অন্তর্নিহিত ভাবধারায় সিঞ্চিত হবেন। কিন্তু স্ত্রী তার পরিবারের সবার দিকে একসঙ্গে খেয়াল রাখতে গিয়ে, ছেলেমেয়েদের পরাশুনার দেখভাল করতে গিয়ে, অসুস্থ শ্বশুর শাশুড়ির দিকে নজর দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়টাই চলে গেছে অকাহ্নে, স্বামীর জন্য অফুরন্ত সময়টা আর তিনি বের করতে পারেন না।
কেউ দুষী নন, কারো চাওয়ার মধ্যেই অতিরঞ্জিত ছিলো না। অথচ তারা যেনো কোথায় সুখি নন। তারপরেও তারা বহুকাল এই কম্প্রোমাইজের মধ্যেই একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের ভালোবাসাটা এক সময় অভ্যাসে পরিনত হয়, তখন অভ্যাসটাই যেনো ভালোবাসা। স্বামীর টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন স্ত্রীর কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, স্বামীর ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ মনে হয় না। অন্যদিকে স্ত্রীর ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্দ যখন কোনো একদিন এতোটাই অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধা ভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন স্বামীর নাক বুজে আসতো, সময়ের এতোটা পথ বেয়ে যখন সবগুলি ভালোবাসা একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায়, তখন স্ত্রীর সেই নাক ডাকা, আধাভেজা চুলের গন্ধ যেনো একটা সুখের পরশ মনের ভিতর প্রবাহিত হয়ে যায়। যেনো, এইতো সেতো কাছেই আছে।
৯০ বছরের কোনো এক প্রোড় বুড়ো, ৮৫ বছরের কোনো মহিলার সাথে যখন এক সাথে স্বামী স্ত্রী হিসাবে বসবাস করেন, তখন তাদের এই বয়সে এসে আর সেই যুবক যুবতীর মতো শরীরের চাহিদা, রুপের চাহিদা আর কাজ করে না। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসাটা একটা বিশাল আকার পাহাড়সম ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে সেখানে কি ফ্যাক্টরটা কাজ করে? কাজ করে নির্ভরতা, কাজ করে একে অপরের উপর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, মায়া আর মহব্বত। কাপা কাপা হাতে যখন ৮০ বছরের বুড়ি এক কাপ চা নিয়ে ৯০ বছরের তার স্বামীর কাছে কাপখানা হাতে দেন, কিংবা পানের বাটিতে পান আর সুপারী ছেচে যখন একখিলি পান স্বামী তার ৮০ বছরে সংগিনীর মুখে তুলে দেন, আসলে তিনি শুধু এক কাপ চা কিংবা এক খিলি পানই দেন না, দেন সারা জীবনের মহব্বত আর ভরষা যে, তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বড় বন্ধু নাই।
তুমি আমার ভরষা, তুমি আমার নিরাপত্তা, তুমি আমার স্বামী, কিংবা স্ত্রী, তুমি আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কাপে, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যায়। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে থাকা আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করো আমার অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার নাই।
বেলাশেষে তুমিই আমার আর আমি সেই তোমার।