শেষ বিদায়

আজকে সেই দিন যেদিন সবাই আমার কারনেই সবাই একত্রে মিলিত হয়েছে। মিলিত হয়েছে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে। কিন্তু এখন আমি সম্পূর্ণ স্থবির আর শান্ত। বাড়িঘর সব ভড়ে গেছে একের পর এক চেনা জানা এবং অচেনা অনেক লোকের ভীড়ে। উজ্জ্বল দিবালয়ে, অথবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে অশান্ত হৃদয়ে কেহ কেহ লাল নীল জামা পড়ে মাথায় টুপি পড়ে, কেহ আবার হাতে তসবিহ নিয়ে মুখে দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে হাহুতাশ করছে, কেউ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জ্ঞান হারাচ্ছে, কেউ আবার মনে মনে যার যার মিশ্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। কেহ কেহ আমাকে কোথায় দাফন করবে, কে বা কারা সে দাফনের নিমিত্তে কোথায় আমার কবরখানা রচিত হবে এই ব্যস্ততায় এদিক সেদিক ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ আমাকে পেয়ে হারালো, আবার কেউ আমাকে না পেয়েই হারালো। কেউ কেউ আবার অধিকার নিয়ে মনে মনে ছক কষে অশান্ত রুপ ধরিয়া বিলাপ করবে, কেউ আবার অধিকার পুনরুদ্ধার হবে এই আশঙ্কায় প্রহর গুনবে। কারো জন্য আমার এই প্রস্থান হবে মর্মান্তিক আবার কারো জন্য হবে অতীব সুখের।

এদিনে সমস্ত সিডিউল মোতাবেক সব ঠিক থাকলেও আমার জন্য আর কেউ অপেক্ষা করবে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ক্যালেন্ডারটি আর আগের মতো সরব হয়ে উঠবে না। ঘরির কাটায় কমবেশি হলেও তাতে কিছুই যাবে আসবে না আজ আমার, আজ আমার কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়াও থাকবে না। সারাবিশ্ব যেইভাবে চলতেছিলো ঠিক আগের মতোই এ জগতের সব কিছুই চলবে। এক মুহূর্তের জন্যও দিনের সময়কাল পরিবর্তিত হবে না, না চাঁদ তার উদিত হবার বা ডুবে যাবার কোনো ব্যতিক্রমী নিদর্শন প্রকাশ করবে। না নদীর জোয়ার ভাটার কোনো দিক বা গতি পরিবর্তন হবে। না সুর্য এক সেকেন্ড পরে বা আগে উত্থিত হবে। পাখিরা সময় মতোই নিজের নীড় হতে খাদ্যানেসে বের হয়ে যাবে, রাখালগন তাদের গরূ বাছুর নিয়ে ভাটিয়ালী গান গাইতে গাইতে কোনো এক মেঠো পথে হারিয়ে যাবে। এমনটিই তো হয়ে এসছে বরাবর প্রতিটি মানুষের জীবন সায়াহ্নে।

যে সম্পদ আমি আমার সারাজীবন ধরে আহরন করেছি, যা প্রতিনিয়ত রক্ষা করবার জন্য চারিপাশে সতর্ক দ্রিস্টি দিয়া পাহাড়া দিয়াছি, তা ওইদিন অন্য কারো হাতে চলে যাবে। সেটা নিয়ে বা কে নিলো, কেনো নিলো এই নিয়ে আমার কোনো কিছুই করবার থাকবে না। আমাকে যারা কখনোই ভালোবাসে নাই, যারা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্টে দেখার পায়তারা করত, তাদের উদ্ধত চাহনী কিংবা দ্রিস্টিভঙ্গি আমাকে আর কোনোভাবেই আজ আহত করবে না। না আমি তাদের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করবো। যে তর্কে জিতবার জন্য আমি খন্ড খন্ড যুক্তি প্রকাশ করে আত্মতৃপ্ত হয়ে হাসিমুখে চারিদিকে বীরের মতো চলমান থাকতাম, সেই তর্ক এখন আর আমার কোনো কিছুই আনন্দ দান করবে না। আমার প্রতিদিনের জরুরি মেইল কিংবা টেক্সট ম্যাসেজের প্রতি আমার আর কোনো তাড়াহুড়া থাকবে না। যাদের বিরুদ্ধে আমার কতইনা রিগ্রেটে ছিলো, জিদ ছিলো, প্রতিশোধের আগুনে যা আমি বহুকাল নিদ্রাবিহিন রাত কাটিয়ে দিয়েছি, সেটার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে না, না আমার মনের মধ্যে এইসবের কোন প্রভাব ফেলবে।

আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে, আমার ওজন বেড়ে যাবে এই ভেবে আমার রোজকার দিনের খাদ্যাভ্যাসে কোন পরিবর্তন কিংবা আমার সাদা চুলে কালো করবার বাসনা এসব কিছুর আর কোনো প্রয়োজন হবে না, না এসব আমাকে আর বিচলিত করবে। আমার ব্যবসা, আমার সম্মান, আমার প্রতিপত্তি যার জন্য আমি প্রতিনিয়ত ভাবিয়া ভাবিয়া, নিদ্রাবিহিন কষ্ট করেছি, কিংবা কিভাবে কি করলে আমার সব কলেবর বৃদ্ধি হবে ইত্যাদির জন্য প্রানপন চেষ্টায় লিপ্ত ছিলাম, সেই ব্যবসা, সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি আজ হতে রহিত হয়ে তা অন্যের হাত ধরেই চলতে থাকবে। ছোট কিংবা বড় যতো বড়ই অনুশোচনা হোক না কেনো, ক্লান্তি কিংবা কষ্ট যাই হোক না কেন, তাহা আজ আর কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। না আমাকে আর রাত জাগাইয়া তা নিয়া ভাববার কোন অবকাশ দিবে। জীবনের রহস্যময়তা, কিংবা মৃত্যুর উদাসিনতা যা আমার মন বহুবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তা আজ এক নিমিষের মধ্যেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। জীবন কি, মৃত্যু কি, জিবনের পরে মৃত্যুর কি গন্তব্য যা নিয়া আমি বহুবার তর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম, যুক্তি খুজেছিলাম, আজ সব কিছুর সঠিক তথ্য আমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। ঈশ্বর কি, ঈশ্বর আদৌ আছেন কিনা, ধর্ম কি, এ জগত কি, কিসের উপর এই বিশ্ব ভ্রমান্ড দাঁড়িয়ে আছে, কি তার রহস্য, কি তার পরিচালক, আমার জীবনের মুল কি উদ্দেশ্য ছিলো যার জন্য এই প্রিথিবীতে আসা, আজ সব কিছু আমার কাছে দিনের আলোর মতো ফকফকা হয়ে যাবে।

আমার অনেক অসমাপ্ত কাজ যা করবার জন্য আমি জল্পনাকল্পনা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, তা আজ সব কিছুর ইতি টানিয়া আমাকে নিয়ে যাবে কোনো এক সুদুর অজানা একস্থানে যা আমি এর আগে একবারের জন্যও বিচরন করি নাই।

আজ এই শান্ত শরীরে আমার চারিপাশের সবাইকে যেনো অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করতেছে কিন্তু আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়েছে, আমার কণ্ঠনালি রুদ্ধ হয়ে গেছে, আমার বাহু, আমার পা, আমার চোখ, আমার যাবতীয় ক্ষমতা আজ রহিত হয়ে একটি ছোট খাটিয়ায় আমি এমন করে পংগু বোবা হয়ে শুয়ে আছি যা অবশ্যই হবে বলে আমি একদা জানতাম কিন্তু ইহা যে আজই তা আমি কখনো মনে মনে কিংবা শারীরিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। অথচ আমার এই দিনের জন্য একবারের মতোও কি প্রস্তুতু নেয়া দরকার ছিল না? বা আমার কি কি করনীয় ছিলো সেই ব্যাপারে আমি কখনোই নিজেকে তৈরী করি নাই কেনো? যে সব সম্পত্তি, যশ, সম্পদ অথবা লোভ যাই বলি না কেনো, সেইসব  কারনে আজকের দিনের কোনো প্রুস্তুতি  আমার নেয়া হয় নাই, অথচ এইসব সম্পত্তি কিংবা সম্পদের বিনিময়েও আজ আমি এই পরিস্থিতি হইতে মুক্ত হতে পারছি না, পারবোও না।

যে ঘরটিতে একচ্ছত্র আমার অধিকার ছিলো, যার প্রতিটি কোনায় কোনায় আমার হাতের স্পর্শ, আমার পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিলো, তার থেকে আজ আমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আমি জুতা মাড়িয়ে, সিগারেট ফুকে পায়ে দলিয়া পিছনে ফেলে ফেলকনি খাটে বসে আরাম করে বসতাম, আজ সেই ফেলকনি খাট আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ওই জুতা মাড়ানো স্থানটিই আমার জন্য বরাদ্ধ হয়ে রয়েছে। আমি আমার নামটিও আজ হারিয়ে ফেলেছি। আমাকে আর কেহই আমার সেই প্রিয় নামটি ধরে, কিংবা আমার ছোট মেয়ের অতি আদরের ডাকটি ধরে আমাকে গলা জড়িয়ে সম্বোধন করবে না। আমি নিতান্তই একটি লাশের নামে পরিচিত হয়ে এই উজ্জ্বল নীলাকাশ সমৃদ্ধ প্রিথিবী হতে সবার আড়ালে চলে যাবো।

অফিসে যাবার প্রাক্কালে যে সুন্দরী বউটি বারবার জিজ্ঞাসা করত কখন আবার বাসায় ফিরবো, কিংবা আজ অফিস হতে ফিরতে দেরী হবে কিনা, অথবা বিদেশে যাত্রাকালে মেয়েদের এই আবদার, ওই আব্দারের লিস্ট সম্বলিত দাবীনামার মতো আজ আর কেহই আমাকে কিছুই জিজ্ঞেসা করবে না, কখন আবার বাসায় ফিরে আসবো, কিংবা কেহ আমার সাথে যাবার জন্যও বায়না ধরবে না। ইহা এমন এক যাত্রা যেথায় কেহই কাহারো সাথী হতে ইচ্ছুক নহে।

যারা আমাকে অনেক ভালোবেসেছে, আর যারা আমাকে ঘৃণা করেছে, তাদের উভয় পক্ষই আজ আমার এই শেষ যাত্রায় হয়ত শামিল হয়ে যার যার ভাবনায় লিপ্ত থাকবেন। পাড়া প্রতিবেশিরা অনেকেই বিলাপ করে, কেউ আবার ফিস ফিস করে কত অজানা তথ্য নিজ থেকে মনগড়া কাহিনী বলে আত্মতৃপ্তি পাবেন, যার প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমার আর থাকবে না। অনেক মনগড়া কাহিনী সুর আর তাল হয়ে বাতাসের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে আবার অনেক বীর বাহাদুরের মতো অনেক কল্পকাহিনীও তার সাথে মুখে মুখে প্রচারিত হবে, হয়ত তার কোনোটাই আমার প্রাপ্য নয়। মজার ব্যাপার হলো যে, দিনের আলো অন্যান্য দিনের মতোই সঠিক নিয়মে তার সিডিউল চলতে থাকবে, পাখিরা সন্ধ্যায় যার যার নীড়ে ফিরে আসবে, পথিক তার নিজ গন্তব্যে সঠিক সময়েই ঘরে ফিরে যাবে, শুধু আমার বেলায় আর কোনো কিছুই আগের মতো চলবে না। এক সময় সবাই আমাকে কাধে করে, ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে কোনো একস্থানে মাটির তলে পুতে এসে চা চক্রে লিপ্ত হবেন। এক সময় রাত ঘনিয়ে আসবে, চাঁদ উঠবে, হয়ত বৃষ্টিও হতে পারে। আমি বৃষ্টির পানিতে গলিয়া যাওয়া মাটির সাথে মিশিয়া একাকার হয়ে যাবো। তখন হয়ত কেউ টিভির সামনে বসে কোনো এক আনন্দঘন সিরিয়াল দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়বেন। আর আমি একা অন্ধকার একটি মাটির গর্তে সারা জীবিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকবো। সময়ের আবর্তে এক সময় আমি যে ছিলাম এই পৃথিবীতে সেটা সবার মন এবং মস্তিস্ক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এটাই যদি হয় জীবন, তাহলে কিসের নেশায় আমি এতো মসগুল? সব কিছুই ভুল এই পৃথিবীর। একাই এসেছি, একা যাওয়ার জন্যই এসেছি। মাঝে যাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, তারাও একাই এবং তারা আমার মতোই একদিন ভুলের ইতিহাসে বিলীন হয়ে যাবেন।  

আমি জানি আমি তোমাদেরকে আর কিছুই বলতে পারব না। যদি ইহাই হয়ে থাকে, তাহলে আজ আমার জীবনের শেষ বার্তাটুকু তোমাদের বলে যাই, আর ক্ষমা প্রার্থনা করি যে, যদি কারো মনে, অন্তরে, শরীরে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, স্বার্থের কারনে বা বিনা স্বার্থে আমার অগোচরে কোনদিন আঘাত করে থাকি, যদি আমার দ্বারা এমন কোনো কাজ হয়ে থাকে যা উচিত ছিলো না, যা অধিকার খর্ব হয়েছে বলে মনে হয়, কিংবা আমার দ্বারা জুলুম হয়েছে বলে মনে মনে অনেক অভিশাপ দিয়াছেন, আমাকে সবাই খাস হৃদয়ে অনুশোচনাপূর্বক ক্ষমা করে দিবেন। আমিও আপনাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি আমার দায়িত্ত কতটুকু পালন করতে পেরেছি,, সেই বিশ্লেষণ আমার উত্তরসুরী, আমার পরিবার, আমার সমাজের উপর। আমার পরিবার, আমার সমাজ আমাকে কতটুকু দিয়াছিলো সেই বিশ্লেষণ আমার কাছে আর নাই তবে আমি আপনাদের সহিত ভালো একটা সময় কাটিয়ে গেলাম এটাই আমার জন্য অনেক ছিলো। 

যুগে যুগে এই প্রিথিবীতে আমার মতো সব উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, রাজা বাদশা, হুজুর কামেল কিংবা দস্যু সবাই খালি হাতেই কেউ ভালবাসায় সিক্ত হয়ে কেউ আবার করুনার জল নিয়েই এই অসীম নীলাকাশ, গভীর সমুদ্র কিংবা পাহারের ঘন শ্যামল সুন্দর ছবি বুকেই নিয়া একাই সব ছেড়ে চলে গেছেন। এই শ্যামল ভালোবাসা, সম্পদ, সম্মান, কিংবা যশের জন্য কোনো রাজা, সম্রাট কিংবা শাসক কখনোই আর ফিরে আসে নাই। আমিও আর তোমাদের এই সমাজে ফিরবো না। তবে জায়গাটা ছেড়ে যেতে আজ আমার বড্ড মায়া আর কষ্ট হচ্ছে। ভালো থেকো তোমরা।

এটা কি শুধুই কলম বন্ধু?

WAS IT ONLY A PEN FRIENDSHIP?

Mandy and Ali had been sitting face to face without any talk for a quite long time as if both of them are thinking something very deeply about themselves connecting together. They might be calculating something. What they are thinking? They may think so many things, days, or many moments, or so many stories...

Mindy broke the silence.

-How is your conjugal life passing Ali! It might be very enjoyable, romantic and very emotional! It has to be. Carla also used to tell me like that and she was very much greedy for it.

-What Carla used to tell more? Ali wanted to know very reluctantly, as if he knows everything what Carla used to think but it will be very interesting to know from someone other than Carla. Ali had been looking to Mindy with a far eye. He has gone back to somewhere beyond Mandy's visual distance.

-Whose picture is this, Habib?

-My younger brother. Very nice a boy.

-What does he do now?

-Just going to school like you go.

-Can I write to him?

- You may try, Habib replied back.

And I am writing you now Ali.

This was her first introduction in her first letter. Ali was recollecting his memories. He took a big breath. He was only class nine then. An unbounded life, listening none and doing whatever wishes. Whenever getting time, trying to play in the field. Replying to Carla's letter was not a big issue, Ali thought. He dropped it aside. But next day when Ali was standing in the House line, enjoying the beauty of the nature, got second letter. This time it seemed to be a very weightfull one. Might have been full of photographs. And it was.

Ali, after his lunch, opened the letter and found variety types of photographs. Carla wrote, she was counting the days when she would be getting his reply. Ali looked at the pictures for quite long time one after another. Ali was very considerated. But to tell you frankly no pictures could wave him. Ali was not impressed. She was not looking that pretty. May be his choice was more higher than what she was. Ali kept all the pictures under his mattress and tried to sleep. But Carla was some kind of special character who did not lay herself in the mass believed concept of society. Rather had been waiting to choose someone as a personal choice. She kept on writing to Ali till reply reached to her. She was not sure about anything. So why to be puzzled unnecessarily.  Ali got the third letter. It was a very interesting one!

-Don't you get my letters Ali? She wrote. If you get, please write me even informing you won't write.

Ali, this time, became a little bit serious. Ali decided to write that he would be very busy and would not be able to write her.

When he was preparing to write like this. He got the next letter. Ali now could not track the number of the letters. She wrote a very interesting story.

She had a cousin named John. He was disturbing her a lot, telling that he loved her. But she did not like the proposal. Everyday she was been criticized by her schoolmates except Mindy. Carla did not hide anything from Mindy. Mindy used to know all about Carla and her stories. Others used to criticize because everybody used to go out with their girlfriends and boyfriends. But Carla did not go. She used to wait for the reply of her letters. Yesterday John had stolen her fifty-dollar from her bag. She felt bad but again got pleasure thinking it happened because she loved Ali.

Ali deeply was thinking about the matter. Should it be told through his bother, Habib that he was not thinking about Carla? Nothing he could decide nor could stand on his decision. He could not write that he would be busy and could not write to her.

Ali mailed a new letter expressing, he was very happy receiving her letter.

Ali thought let he continued for some time and one-day when opportunity would come he would just write it. It is not the right time to say No, then she would get very big hurt.

Carla's next letter surprised Ali more. Everyday and everyday Ali was getting letters. Some day he was getting more than one letter. America became local place for Ali. At least in the case of mail. She wrote -

She read his reply more than sixty times. She could tell the contents of the letter as it was without opening. She expressed her feelings very boldly that she knew reply would come. Her belief could not be wrong. She was created for only Ali and so on...

 Ali felt more sympathy for Carla. What would he reply to her! Would he tell that he would not continue or he should respond? Both of the options were dangerous. Ali, thinking about Carla's determination, could not say No.

Ali replied,

He was also waiting for her letter. In addition to give her feelings, Ali wrote he was interested to know about her habits, liking disliking, boyfriends, etc.

It continued for long time. Ali was then in class twelve. Going out from the college very soon. Ali's all higher secondary examinations were over and their batch was given farewell from the college. Ali came back from the college campus to their village house directly. Everyone he met enroute gave him the message about his elder brother, Habib, who recently came back from America after six years. He was surprised that only Ali did not know anything about his elder brother's return from America. Habib was Ali's elder brother who was doing Ph.D. in USA. Carla's father was in the same university where Habib was doing this research works. With this connection Habib and Carla's family had easy go in each other's house. One day Carla came to Habib's apartment and

saw Ali's picture. That very day Carla asked Habib the first question-Whose picture was this?

Ali reached to his house in the afternoon. The day was about to set to the west. All his sisters and other relatives were giving a shining look and smiling face. Every body was happy on Habib's arrival. Today they have filled up their joy after Ali's arrival. It became then hundred percent presence of all family members. But Ali noticed some abnormalities amongst his relatives. It seemed everyone was hiding some interesting news from Ali. What was the story? Ali questioned himself. Ali could not find out the hidden story.

Ali met his brother at night when he returned home from outside. It was a very happy moment. Very less they could talk. They were extremely happy. There was no language between them. After a long time they could meet together. When Ali was in grade seven, Habib left the country. Ali now passed higher secondary examination. It was time for him to go for the university now. Quite a long time. Both of them had long talk. Habib narrated lot of story about America, its beauty and the cultures of the society. Sometimes Ali had been asking few questions. Sometimes he had been laughing like a small boy hearing his brother's experiences.  They woke upto midnight. Before finally going back to sleep, Habib told Ali that he had left something very expensive at Dhaka Teachers' Students Center (TSC). Next day early in the morning Ali should see once how it was without anybody's supervision. Ali should take the key and check it before the sun rose.

Ali got up from the bed early in the morning and started for Dhaka, TSC. When Ali reached at Dhaka, there were none in the street. A very few birds and crows were found around. There was hardly anyone walking in the main street. It seemed everyone was still sleeping. A few old guys having heart problem and needed short walk, only these kinds of people were found mostly. And its numbers were also very few. There were some young boys found passing by who wanted to be a professional foot baller going for practice in the far field. One-day his dream might come true. Ali found some smart girls too walking with very ugly looking guys. May be she needed some money for herself. She gave a company to the man at night. The earth does not give always a good look at all the morning.

Ali entered inside TSC and turned left. He had something to check in room number six. Ali brought out the key handed over by his elder brother, Habib. He tried to open the door of number sixth room.

But what is this! The key could open the room but it seemed someone was inside it. How it was possible? The room was locked from outside and someone was inside! He might

be doing mistake. He again locked the door and checked for the next door, seven then five. But that key could open none of the doors. Ali this time opened the sixth number room and started pushing inside. Very politely but anxiously asked whether anyone was inside the room or not. A lady voice replied back.

-Please hold for a minute dear, I am coming.

Ali was waiting with quick heartbeats. He was hearing the sound of her footsteps inside and opening sound of the first door.  The lady opened the last door too.

Ali was not only surprised but it deemed that he was falling on the ground. What was he seeing in front of him? Why Habib did not tell him anything about her! Was it preplanned to surprise him? He was guessing things quickly and story became very clear what everybody was hiding from him!

Carla was shouting with top of her voice.

-Oh Jesus! At last you have come! I was just waiting for you whole night!

Ali could not say anything. First reason Ali was not at all prepared to see Carla. And second reason, Ali was not fluent in English, as Carla was being American. Carla did not know Bengali. Ali kept standing for few moments. Carla again shouted and held Ali's hand. Pulling him inside the room.

Carla was putting on sleeping gown. Very transparent. Did Carla decided  that deliberately? Ali set down in the chair. He was feeling very shy. With very poor English Ali informed Carla that he was not good at English. He only could catch slow speedy conversation. Carla understood him very closely. Carla smiled very nicely and looked at Ali.

- I am very sorry dear. I was extremely happy when I have seen you. Carla replied.

She pulled another chair and set in front of Ali. Keeping her two hands in her chicks, she just keep on looking at Ali.

-What a beautiful morning today, is not it Ali?

How are you, Carla? Ali inquired. Giving no reply to Carla's question.

Carla leaned against Ali thighs. Her beautiful white body was emanating beautiful light, her breasts were visible partially but it was not looking ugly.

-I don't know how I am now, but there is none who is more happier than me at this moment. Carla whispered.

Ali touched Carla. Carla was whipping and her eyes were full of tears.

Carla was not looking like those pictures he saw in the photographs. She was much better looking and beautiful. Carla was exactly like what Ali was thinking for. Ali kissed her head and hairs. Both of them became normal.  The language of love is not either

Bengali or English. It is something beyond the sound. There was very little tension, anxiety and unknowingness  amongst them.

-What you ate last night Carla? Asked Ali..

-Just nothing but mango. Habib stored some dry food for me and some seasonal fruits.

-What you like to have in breakfast? Ali asked.

-You would be coming early in the morning and Habib told you would be deciding what we should take in lunch and dinner. I think you have also not eaten anything in the morning! Carla inquired him and got up to bring some grapes.

Ali was looking at Carla. Ali seemed to be very happy to get Carla. He really loved Carla Dorain Wilson.   They had lots of talk. They talked about love, exchanged lots of feeling for each other. Carla stayed here for next twenty-two days.

During this long stay, both of them had been visiting many places. People also became very surprised and inquisitive to see both of us together. One Bengali boy was roaming around with one white girl holding the hands together. Naturally it was a rare scenario.

There was a study excursion arranged from her school. It was scheduled for Australia. But Carla gave the option for Bangladesh. Habib was coming back to Bangladesh to meet his family and in the same time he would be looking for getting married. Carla wanted to join Habib to visit Bangladesh to meet Ali during her study excursion. Habib did not inform this message to Ali at all to make a big surprise for him, his younger brother. Ali was really surprised.

The first night's story was very romantic.

 Whole day Ali was waiting for his brother, if he comes. But he did not turn up. It was evening. Ali was thinking time and again  that there was only one bed in the room. All the items given in the room were for single man. If he goes back at night, how she will be staying here alone? Will she allow Ali to go back leaving her? If she does not allow, than where he will be sleeping? Moreover, Ali was not interested to leave the company of Carla.

Even though Ali informed Carla that he would be right back in the next morning.

Carla looked at him astonishingly and said-

-What are you talking? You will be going back tonight? No baby, we will stay here together. Don't you know that I had been waiting since long!

-But there is no bed for two men. Ali said.

-Nothing worries! We will be sharing it together. Otherwise we will be sharing our lives together for whole life! Carla was very determined. She hugged Ali warmly.

None could sleep that night. Carla could not sleep because the day-night system in Bangladesh was absolutely reverse than that of America. Night in Bangladesh is the day

for America. It was a problem for Carla. But Ali could not sleep because Carla was awaking. Whole night passed without sleep. But Ali was not feeling any tiredness at all too. They shared one pillow together, shared one bed cover together, and what else they shared? They shared their life, they made a basement of the building, two men dream. A single dream which was dreamt together.

-It was very nice night I had ever in my life. Ali thought.

Was it called wedding night? They did not had any sex, did not had any violation anytime. But every time Ali thinks now, seemed to him that it was a wedding night for him.

-Several times we hugged together, I felt her warm hearts, beautiful breasts. But never ever I felt it to be touched. It was very pious relation, sacred love. Ali was thinking.

Next early in the morning, they both entered into the wet room, washed their hands and mouths though it was not necessary. Carla was laughing and telling Ali,

-How beautiful people you are!

-Why? Ali asked.

-It can not be thought that an American adult boy stayed night with an adult American girl and there was no sex between them. I can feel very much safe in the hands of man

like you people. I did not do the mistake Ali! I always wanted someone who will love me and care me. Only physical sex should not be the basis of love. Love should be such so that even when I will be an old lady having hundred years' ages, still my husband will love me as he used to do from the beginning. Carla stated.

- Can I kiss you on your forehead Ali? Carla asked Ali through the mirror.

Ali extended his hand towards Carla and hugged her. Both of them were looking through the mirror. A beautiful pair submerging together.

Carla was very depressed for last few days. Everyday it passed everyday she used to tell- she does not want to go back to America. She would not feel comfortable in USA. Ali used to give her consolation only that one-day they would meet together forever. But Ali knew there could nothing be more attractive consolation than that of saying, please do not go and stay with me.  Ali was also not feeling comfortable as the days had been passing very fast.

Night before her departure, both could not sleep for a single moment. All Ali's relatives intentionally did not disturbed them. Most probably they also had wanted Ali to make permanent friendship with Carla. Besides they had tremendous trust on him about his dealings with Carla. But Ali could not keep his trust to them.

-Why should I deprive my lady from her rights? Is religion the main bondage between two human being? I did not believe. Ali was questioning himself.

-We were lying together. Carla kept her head on my chest and kept mum. I hold her head and brought more close to my eyes. She was crying. Her eyes were shining with tears. The lights helped her tears to be more pathetic. I kissed Carla, my beloved lady. I don't want to leave you, I want you to stay here, I want to share my everything with you. No secret no religion no law is bigger than the love. He held her tightly.

Ali peeled off her gown. God created woman with special attention. Ali imagined. The creation was not simple. The art of the body of the woman is not geometric rather it is artistic. The eyes tells about love, the nose, the lips, the breast all that a woman has tell the music of immortal love. Ali touched her breast with his wild lips. Carla holds Ali's head with her two beautiful hands tempting his hairs.

Ali lied over Carla.

Carla was just breaking with my kisses, with my movements and my every touch. Her tip of the nipple was very hard. Her eyes were closed, mouth was shut but making the noise of the image of love. Her legs were moving apart from each other.

Did we talk anything then? I can not remember what was the subject we discussed. Was it love? Was it anything like science or literature? We had been crossing the ocean of love, may be interchanging the waves of new generation. I opened my two eyes. I saw my Carla's full nude body. How beautiful breast a lady can possess? Is it more beautiful than that of Carla? How beautiful a design of figure God can create? Was it more flawless? I do not have any idea. I have seen only Carla. Carla was the best.

After a long time, Carla got up and sat down nude. Ali marked himself, was he greedy for her sex anytime?  Ali thought.

After that visit, Carla used to be more aggressive on expressing love. Ali understood it by her last letters. Ali also became more aggressive. In every moment they remember each other.

Carla was mentally preparing to leave America and settle down with Ali. She was doing some small job. She added all the salary and one day bought an air ticket for Bangladesh. She wrote one letter too to mail Ali informing about her plan. She kept all these in her table and forgot to hide from other members of the family. Her father saw these two things. He was terribly shocked and equally sad. He took away her passport including the air ticket. Father charged her for doing so. She was warned by her father not to think like that anymore. If she does so she will be sent to the hostel at her own cost.

Carla agreed to the last proposal. She left the house. Her mother was also not favoring her. She was driving the car. It was a very foggy and snowing day. Carla thought she

should immediately inform Ali what she did. She requested her brother, Roy, to mail the letter that she wrote before.

Roy went to the post box and Carla was waiting in the car on. All on a sudden, a big lorry hit the car from the back. Carla with her car went out of the road. Both of them had a fall of fifty feet with number of summersaults. Carla lost her senses, got number of injuries, she was almost dead. Roy and others took her in the hospital.

-Is Carla dying, doctor? Daisy, Carla's mother, asked doctor.

-We are not yet sure about her condition but it is critical no doubt. Doctor replied.

After few hours, Carla could say something but not readable.  Out of all talks, she could only tell twice "Ali". The doctors were not also very much confident what was to be done.  Neither they could find out the meaning of this word "Ali".

Carla's mother thinking nothing but ultimately made a phone call to Ali in Bangladesh.

- Ali, can you come to USA right now? Carla got accident and she is in comma. She wants to see you. She is only uttering your name. Please arrange to come as quickly as possible. I promise you, I will honor Carla, if she survive this time.

Ali could not say anything. Because Ali knows that he can not afford to go to USA right now because of lots of factors. Money was the acute problem for Ali now. Moreover his office will not permit him to go to USA for this reason. What a nation.  One man is taking farewell forever but the law does not permit other to see her. Ali took breath deeply.

Carla died after nine days. In between this she did not wake for a single time. How can she talk? She was busy with me here. No body knew. I gave her my last minutes. She uttered number of times-

-I wanted an Indian husband. I got it but I could not enjoy it. If I could enjoy it I could tell you how beautiful these Indian husband! You will have full freedom of power in the family. You may have different views but husband will not deprive you from love. They will never say, go out of my house.

Ali, after eighteen days, received the letter written by Carla, mailed by Roy. In that she wrote,

She will be coming to me in the next summer. I should be prepared myself for receiving her in the airport. She will be putting on red skirt matching with blue magenta color headgear. She will have a very beautiful rose in her hand.  She will mind if I do not kiss her in open mass. So what this is not in our Bengali tradition but I have to do it for her.  I had visited numbers of time the airport. But I never found this combination with anyone. Ali loved Carla so much. Ali promised if anytime he meets Carla, he would hug Carla in mass and had a kiss in public. No matter who thinks what. There is lot of time the earth has rotated the full rotations. Every time summer came but Carla did not come.

Today Ali has come to USA for a visit. Since the year Carla died in 1981 and today, there is seventeen years gap. Everything might have changed. Ali could not differentiate. If Carla would remain beside him, he could ask Carla about it. Ali does not get any attraction in USA because Ali knows without Carla in USA it will have no meaning.

Ali made a phone call to Mindy. His brother Habib gave Ali the phone number of Mindy's house.  Mindy was very happy.

Today, the X-MAS day we all family members always want to meet together. I considered Carla was my family member. You are that man to whom my one of the best friend used to love so much, should I not invite you in my house! Mindy stated to Ali.

Ali taking a long breath replied Mindy.

-Mindy.

-Continue. Mindy replied.

-How many days a man can wait? Ali questioned Mindy.

- As long as someone can pull on alone? Mindy replied, you did not do wrong by getting married someone. If I would be in your position I would do the similar action too.

-I might get marry someone but I did not forget Carla at all .My lady Arundhuty is just like Carla. What I wanted from Carla, I am now getting it from Arundhuty too. Everyday I remember Carla by loving Arundhuty. Ali answered back very nicely to Mindy.

Mindy was also sitting the same way Carla used to sit in the table.

Mindy stated, Carla and Arundhuty both of them are lucky. I had also same mentality like Carla. I also wanted an Indian husband. Look if I would had an Indian husband, he would not leave me like this! We might have temporary emotions but not permanent separation.

Ali felt Mindy very deeply. Mindy is alone. She wants love. But what he can do for her? Mindy does not know that everybody may be Indian but everybody is not Ali. There is a big difference between these two.

After one-month stay, when Ali was leaving USA, Mindy requested Ali to stay at her residence. Mindy directly ensured Ali, she knows the customs of Bangladesh. Ali kept her request and went to her house. Mindy dressed her with Shari and blouse, sat in front of the mirror.

She said,

-Can I give you a kiss on your forehead, Ali?

Ali told nothing.

Logan airport. A big gathering of people. Everybody was busy either for clearing his or her goods or saying good-byes to his or her beloved man. Ali was boarding the plane. It was early in very morning. Mindy came upto the last place from where we can see together. I took my seat and looking at Mindy. Mindy kept on looking till the plane took off in the sky. Ali left USA forever. Mindy was kept on looking in the sky till the plane became very blurred. Her eyes might be full of tears. Johan, her only son five years old, pulled her hand and might inquire,

-Mom, will uncle come back soon!

Mindy could not reply back to Johan. She just holds him in her lap and hugged very tightly. Mindy did not wan to cry but her eyes could not control the wave of the tears.

 What Ali could do? Ali could do three things. What Ali did, he did the right thing. Or he could take her in Bangladesh along with him. Or Ali could stay back in USA with Mindy. But what would be for Carla and Arundhuty?

The plane was above fifty thousand feet in the sky. The sky was full of white cloud, there are many passengers trying to sleep and Ali was kept on looking towards white clouds outside. So many things Ali was passing by but many of them were not visible to him. Some were not correctly identified. Ali might be thinking about Carla, Arundhuty and Mindy together.

There are so many things happened in this earth. Many of them remain untold, hidden and unseen. Very few lucky or unlucky people might meet them en-route but hardly anyone cares them. Those who cares they don’t get it’s head or tail nor the start or end. Even some one runs agter the blind zone but God is always mysterious and keeps some mystery always hidden to open. Only God knows what is the mystery lied here. Ali saw the old passenger, a man of seventy years old, sitting beside him sleeping like a small baby.

বোদার গল্প

আলমাসের উপর দায়িত্ব পড়েছে বোদার

১৯৯১-৯২ সাল।

আলমাসের উপর দায়িত্ব পড়েছে বোদার। আলমাস সহজ সরল ছেলে। এখনো মুছ-দারি ভালমত গজায় নাই, তাঁর উপর ব্যাচলর। কোন কিছুই করার নাই, বোদার কাজ আলমাসের। আলমাস প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফৌজ সামন্ত, গাড়ি সব কিছু নিয়া আলমাস রেডি হচ্ছে বোদার কাজে।

গরম মৌসুম, চারিদিকে গরম হাওয়া। বোদায় নাকি বাতাস কম, যাও আছে তাও আবার যথেষ্ট পরিমান অক্সিজেন নাই, একবার যদি কেউ বোদার বাতাস নাকে নেয়, তাঁর নাক নাকি বাতাসের আর অন্য কোন গন্ধ বুঝে না।

আলমাস বোদাটা দেখল, এর একটা ম্যাপও একে ফেলল। জায়গায় জায়গায় গর্ত, কোন জায়গা দিয়ে কি করা যায়, সারারাত আলমাস ঐ বোদাকে নিয়াই থাকল। সব জায়গা দিয়ে সব কিছু নিয়া ঢোকা যাবে না বলে আলমাস বোদার কোথাও কোথাও টিপে টিপে, কখন বা পায়ে চাপ দিয়ে দিয়ে পরিক্ষা করে দেখে নিল বোদার কোন জায়গাটা শক্ত আর কোন জায়গাটা নরম। নরম জায়গায় সৈনিকদেরকে যেতে নিষেধ করে দিলেন আলমাস সাহেব। নরম জায়গায় কাজ করার আগে আলমাস সাহেবকে আগে থেকেই জানাতে হবে বলে আলমাস তাঁর সুবেদারকে বলে দিলেন।

আলমাসের ওসি হচ্ছেন মেজর ইকবাল সাহেব। নিতান্তই ভদ্রলোক। তিনি বিবাহিত। তাঁর একজন মেয়ে আছে। ওনি সব সময় মুচকি মুচকি হাসেন। কথা কম বলেন, কিন্তু আলমাসের সঙ্গে খুব খাতির। আলমাস ওসি সাহেবকে নতুন বোদা দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। ওসি সাহেব এর আগেও বোদা দেখেছেন কিন্তু বোদা দেখা আর বোদা সার্ভে করা এক জিনিষ নয়। তাই ওসি সাহেব নতুন উদ্যমে বোদা সার্ভের কাজ আলমাস কেমন করে করবে তাঁর পরিকল্পনা দেখার জন্য তিনিও বোদায় এলেন।

ওনি যখন বোদায় পা রাখলেন, তখন ভরদুপুর। বোদার বাতাস খুব গরম, খরখরা বোদার আশপাশ। জঙ্গল খুব একটা নাই, মনে হয় কে বা কারা যেন বোদাকে একেবারে ক্লিন শেভের মত পরিস্কার করে রেখেছে। মাঝে মাঝে দু একটা খালের মত আঁকাবাঁকা শুকনা কিছু দেখা যায় কিন্তু বহুদিন কেউ ওখানে পানি দেয় নাই বলে মরা জঙ্গলগুলু হলদে বা তামাটে রঙ ধারন করে আছে। ঐ হলদে বা তামাটে জায়গায় বসলে পাছার চামড়ায় চুলকানি লাগে।

ওসি সাহেব আলমাসকে নিয়ে বোদার চারিদিক দেখলেন। আলমাসের আকা বোদার ম্যাপে ওসি সাহেব তাঁর নিজের মত করে লাল ওএইচপি মার্কার দিয়ে আরও কিছু একেঝুকে দিলেন। বোদা নিমিষেই লাল হয়ে গেল। আর অনেক কাটাকুটিতে বোদার ওরিজিনাল চেহারা পালটে কি যেন হয়ে গেল।

যাক, সন্ধ্যে হয়ে গেল। আলমাস আর ওসি সাহেব বাংলোয় ফিরে এলেন। বোদার বাইরের বাতাস আর বোদার বাংলোর বাতাসে অনেক তফাত। বাংলোর ভিতরে বোদা অনেক ঠাণ্ডা, বেশ গোছালো, আবার বেশ পরিস্কার। অনেক নামি দামি লোকেরা এই বোদা দেখতে আসে। আলমাস আর তাঁর ওসি নামিদামি মানুসের মধ্যেও একজন, তাই বোদার এডিসি সাহেব এই দুইজনকে বোদার সবচেয়ে সুন্দর স্থানে জায়গা দিয়ে বললেন, “স্যার, বোদা দেখতে হলে এই জায়াগায় থাকেন। এখানে বোদার আসল মজা পাবেন। বোদার এখানকার পানি মিস্টি কারন পাশে চিনির কল আছে, বোদার বাতাস এখানে খুব সুইট কারন ডিসি সাহেব এইখানে বোদার এস্পেসাল সুগন্ধি গাছ লাগিয়েছেন। নাক পরিস্কার হয়ে যাবে বোদার গন্ধে। এখানে একটা ফল আছে যার নাম একেবারে ভিন্ন। নামটা হচ্ছে “কন্যাকুমারি”। আসলে বোদার পুরান নাম কিন্তু এই “কন্যা কুমারি”। তাঁর মানে হচ্ছে “কন্যাকুমারী” বোদার ফল। একবার বোদার ফল খেলে আপনার জিহবা বার বার বোদার ফল খেতে মন চাইবে। ইচ্ছে করলে আপনি কিছু বোদার ফল সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন, বন্ধুবান্ধব্দের দেবেন। তারাও বোদাকে মনে রাখবে। বোদা আমার বড় প্রিয় স্যার।” এই বলে এডিসি সাহেব আলমাস আর ওর ওসিকে বোদার খাস জায়গায় রাত কাটানোর জন্য রেখে গেলেন।

ওসি সাহেব আলমাসকে জিজ্ঞেস করলেন, আলমাস , বোদা তোমার কেমন লাগে? আলমাস সহজ সরল ভাবে উত্তর দেয়, স্যার বোদা আমার কাছে ভাল লাগে। ওসি সাহেব, মুচকি মুচকি হাসেন। ওসি সাহেব খুব মজার লোক। আবারও আলমাস কে জিজ্ঞেস করেন, বোদার কোন জায়গাটা তোমার খুব পছন্দ? আলমাস নিতান্তই সহজ সরল ছেলে, উত্তর আসে, স্যার বোদার সব জায়গায় পানি পাওয়া যায় না, যেখানে একটু ভিজা ভিজা থাকে ঐ জায়গায় আমার থাকতে ভাল লাগে, শরির ঠাণ্ডা হয়, মনভরে যায়। ওসি সাহেব, আবার মুচকি মুচকি হাসেন।

ওসি সাহেব কয়েকদিন বোদার আনন্দ শেষ করে তিনি ফিরে যান তাঁর নিজের কর্মস্থলে। আর এদিকে আলমাস প্রতিদিন বোদার প্রতিটি স্থানে পায়ে পায়ে চলে, কখন স্পিড বেশী থাকে আবার কখন একেবারে থিতিয়ে যায়। যেদিন আলমাস বোদার ফলটা বেশী খায়, সেদিন আলমাসের স্পিড ভাল থাকে। আলমাস দিনের পর দিন বোদায় থাকে। আলমাস বড় ভাল লোক। ও কখন বোদার ক্ষতি করে নাই। বোদা আলমাসকে আজিবন মনে রাখবে।

আলমাসের ঐতিহাসিক ভাষণ

যে কয়টি ভাষণ পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছে, যেমন, আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবারগের স্পিচ, কিংবা মুজিবের ৭ই মার্চ এর ভাষণ কিংবা ঐ কালো লোকটির “আই হেভ এ ড্রিম” ইত্যাদি। আলমাসের এই ভাষণটাও বিখ্যাত হয়ে থাকতে পারত কিন্তু এটা মিডিয়ার পাল্লায় পড়ে নাই বিধায় জগতজুরে আলমাসের এই বিখ্যাত ভাষণটি আর বিখ্যাত হয়ে উঠে নাই। তবে আমার ধারনা, অন্তত টাচ ১৩ ফোরামে এই ভাষণটি বিখ্যাত হয়ে থাকবে। অনেকেই আলমাসের সেই বিখ্যাত ভাষণটি শুনে নাই কিন্তু আমি সরাসরি ঐ ভাষণ যখন ইতিহাস সৃষ্টি করছিল আমি সেখানে ছিলাম। আমি তোমাদের জন্য আলমাসের সে ভাষণটির অনুলিপি তোমাদের জ্ঞ্যাতারথে জানাব।

তারিখঃ
লিঙ্গপুর স্কুল

উপস্থিত সুধিজন, ভাই, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীগন, আসসালামুয়ালাইকুম।

আপনারা জানেন যে, আমি প্রায় গত ছয় মাস যাবত আপনাদের বোদা নিয়া একাগ্র চিত্তে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি কিভাবে আপনাদের বোদার উন্নতি করা যায়। আমার বলতে দ্বিধা নাই আজ যে, আমি যেদিন প্রথম আপনাদের বোদাকে দেখি, তা ছিল সত্যি এক নোংরা, অপরিস্কার এবং দুরগন্ধময় এক বোদা। আপনাদের এই বোদার কোন ডিসিপ্লিন ছিল না, না এর রুপে, না এর গুনে। তারপরেও আমি দমে যাইনি। আমি আমার এই টিমকে নিয়ে রাত দিন আপনাদের বোদাকে নিয়া কাজ করার চেষ্টা করেছি।

আজ আপনারা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, কি সুন্দর হয়েছে আপানাদের এই বোদার চেহারা। বোদার সব কিছু এখন পরিস্কার, কোথাও পানি জমে নাই, আর যেখানে পানি থাকার কথা সেখানেই পানি আছে, অহেতুক এর চারিধারে স্যাঁতস্যাঁত হয়ে থাকে না। বোদার এবড়ো থেবড়ো স্থানগুলো আমার সোনার ছেলেরা নিজের হাতে সেগুলো ঠিক করে দিয়েছে। বোদার যত ময়লা আবর্জনা ছিল, তা আমরা নিজ হাতে পরিস্কার করে দিয়েছি।

আমরা আজ চলে যাচ্ছি। এখন দাতিত্ত আপনাদের। আপনাদের বোদা আপনারা পরিস্কার রাখবেন। বোদার যে কোন জায়গায় থুথু ফেলবেন না। বোদার যত্ন নিবেন। ভবিষ্যতে এই বোদা থেকে অনেক সোনার ছেলেরা বের হবে, এদের সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার জন্যই বোদার যত্ন নেওয়া একান্ত কর্তব্য। বোদার যাকে তাকে বোদার ব্যাপারে মাথা ঘামাতে দেবেন না। বোদার ক্ষতি হয় এমন অনেক লোক আছে। যাকে তাকে বোদায় ঢোকাবেন না। বিশেষ করে রাতে বোদার ব্যাপারে আরও অধিক সতর্ক থাকবেন। প্রয়োজন হলে বোদার প্রবেশ পথে লাঠি রাখবেন যেন প্রয়োজনে লাঠি ব্যবহার করতে পারেন।

ভাইসব, আপনাদের বোদার কথা আমার মনে থাকবে। আজ আমি যে বোদা রেখে যাচ্ছি, আশা করি, আমার পরবর্তী বংশধররা যদি কখন এই বোদা দেখতে আসে, আমি যেন বলতে পারি, বোদা বড় সুন্দর।

সাদ্দাম হোসেনের ছেলে উদয় এর সত্যি কাহিনী

কয়েকদিন আগে নেট জিওতে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলাম ইরাকের উপর, প্রোগ্রাম টার নাম হল Escape to Freedom. এটা মুলত সাদ্দামের ছেলে উদয় সাদ্দামের কার্যকলাপের উপর। লোমহর্ষক। সাদ্দামের পতনের পিছনে অনেক কারনের মধ্যে ওর পরিবারের অনেক ভুমিকা ছিল। সাধারন মানুষের যখন আর কোথাও কোন বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, এবং চারিদিকে সর্বত্র যখন অবিচার আর জুলুমের রাজত্ত কায়েম হয়ে যায়, তখন আল্লাহ যে কোন বিধর্মীর মুনাজাতও কবুল করেন যদি তা সত্য হয়, তখন তাঁর আবদার হয়ে উঠে সৃষ্টিকর্তা আর সৃষ্ট জিবের। ওখানে তখন আর ধর্ম কোন বড় ইস্যু হয়ে উঠে না। ধর্ম মানছি কি মানছি না এটা নিতান্তই ব্যক্তি এবং সৃষ্টিকর্তার মাঝে ফয়সালা। কিন্তু যখন সমাজকে গননা করা হবে তাঁর মধ্যে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন কালচার, ভিন্ন মতবাদ সব বিচার্য। সাদ্দামের ছেলে উদয় সাদ্দামের কাহিনি ঐ রকম একটা সমাজ বিরুদ্ধ। আমি শেষ পর্যন্ত প্রগ্রামটা দেখেছি এবং আমি উদয় সাদ্দমের শেষ পরিনতিটাও দেখলাম, আমার মধ্যে মনে হয়েছে ভগবান, আল্লাহ, ঈশ্বর বা রাম যাই বল না কেন, কেউ আছে।

১৯৮৭ সালে যখন ইরাক ইরান যুদ্ধ হচ্ছিল, তখন ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধে থাকা এক সৈনিকের কাছে সরাসরি চিঠি আসে, তাঁর নাম লতিফ। তাকে সাদ্দামের প্রাসাদে যেতে হবে, কেন যেতে হবে, কি কারনে যেতে হবে কেউ জানে না। লতিফ কিংবা যুদ্ধে থাকা কমান্ডার কিংবা লতিফের পরিবার কেউ আচ করতে পারছিল না কেন হটাত করে এই নিরিহ সৈনিকের কাছে সাদ্দাম হোসেন সরাসরি অফিসিয়ায়ল চিঠি পাঠিয়ে তাকে সাদ্দমের প্রাসাদে আসতে বলা হয়েছে।

সৈনিক ভয়ে ভয়ে প্রাসাদে গেলেন, সৈনিক লতিফ এর আগে কখন সাদ্দামের প্রাসাদ এত কাছে থেকে দেখার সুযোগ পায় নাই, অথচ আজ সৈনিক লতিফ সরাসরি সাদ্দামের প্রাসাদে ঢুকে, সাদ্দামের সাথে একত্রে বসে কথা বলবেন যেখানে সাদ্দাম ছাড়া আর কেউ নাই। ভীষণ ভয়ে আছে সৈনিক লতিফ। তাঁরপরেও তো সাদ্দামের তলব। না গেলে আগেই মরন, গেলে হয়ত মরলেও কিছুদিন পড়ে মরতে হবে। কি এক অজানা ভয়, গা শির শির করছে, কত বড় প্রাসাদ!!!! কি রঙিন কি সুন্দর, লতিফের কাছে এটা কোন বাড়ি, বা প্রাসাদ বা অন্য কিছু মনে হয় নাই, মনে হয়েছে এটা একটা স্বপ্ন যা ও কোনদিন ভাবে নাই, বা ভাবার শক্তিও রাখে নাই। এটা সাদ্দামের প্রাসাদ। চারিদিকে সুনশান, নিরাপত্তার বাহিনি, যেন মশারাও শঙ্কিত। গাছের পাতা বিবর্ণ হলে যেন গাছেরও শাস্তি হতে পারে এই ভয়ে কোন পাতাও তাঁর রং পরিবর্তন করে না। সবাই সাদ্দামকে মানে। এই মানার মধ্যে কোন আইন আছে তা কেউ জানে না, শুধু সবাই জানে ওরা আর কিছুদিন এই পৃথ্বীর চাঁদটা দেখতে চায়, সূর্য কখন কোথায় থাকে সেই দৃশ্যটা আরও কিছুদিন দেখতে চায়। সাদ্দাম বিশাল এক অবর্ণনীয় সুন্দর একটা সোনালী রঙের টেবিলে বসে আছে। তাঁর অবধি পৌছাতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ গজ মার্বেল খচিত ফ্লোর পারি দিতে হয়।

তিনি সাদ্দাম হোসেন, ঐ যে সাদ্দাম হোসেন বসে আছে। লতিফের মাথা ঠিক কাজ করছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না, বিমোহিত, শঙ্কিত, আশ্চর্য এক অনুভূতি। লতিফ কি তাকে সালাম করবে? নাকি স্যালুট করবে, নাকি পায়ে পড়ে যাবে? কি করবে সে এখন? কি করলে লতিফ ঠিক কাজটা করবে এটাই সে বুঝে উঠতে পারছে না। তাঁরপরও সে হেটে যাচ্ছে সাদ্দামের দিকে। এখন লতিফ আর তাঁর বুকের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছে না। হয়ত একটু পড়ে আর কখনই সে তাঁর বুকের স্পন্দন শুন্তেই পারবে না। কি অসহনিয় এক মুহূর্ত।

সাদ্দাম ঘার বাকিয়ে লতিফের দিকে তাকালেন। লতিফ আর হাটতে পারলেন না, কি কারনে থেমে গেল তা সে বুঝে উঠতে পারল না। এবার সাদ্দাম হাটছে লতিফের দিকে………

লতিফ, হতভাগা লতিফ এখন ঠিক সাদ্দামের সামনে দাড়িয়ে। চমৎকার গোঁফ, সুঠাম দেহ, পলিশড করা ইউনিফর্ম, বিশাল ঘরের মধ্যে বাতাসও প্রবেশ করে না, ঠাণ্ডা একটা শিতল আবহাওয়া, হয়তো নিঃশব্দ এসির পারফিউমড বাতাস। এই বাতাস ইরাক-ইরান যুদ্ধের খোলা বাতাসের মত নয়। বারুদের কোন গন্ধ নাই, মুহুর্মুহু আর্টিলারি শেলের বিকট শব্দ এর ভিতরে ঢুকে না। সাদ্দাম শান্ত পরিবেশে কাজ করতে পছন্দ করেন, দেশে যত অশান্ত পরিবেশই বিরাজ করুক না কেন। দেশের ইন্টারেস্ট আর সাদ্দামের ইন্টারেস্ট এক হতে হবে এই বিশ্বাস সাদ্দাম করবে কেন? সাদ্দাম কি একাই দেশ প্রেমিক হবেন? কেন পুরু ইরাক হবে না? তাই, দেশের লোককে প্রকৃত দেশ প্রেমিক বানানর জন্য তিনি ইরানের সঙ্গে এক কারনবিহীন যুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন যেখানে অধিকাংশ ইরাকি যানে না কেন তারা ফ্রন্ট লাইনে ইরানের সঙ্গে যুদ্দ করছে। যাক, সেটা দেশের নাগরিকরা বিবেচনা করবে। এখন লতিফের সামনে আমাদের সাদ্দাম দাড়িয়ে আছেন, এটাই বাস্তবতা।

সাদ্দাম তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তার বা হাত উচিয়ে লতিফের কাধে রাখলেন, সাদ্দামের চোখ লতিফের চোখে, লতিফ যেন সাদ্দামের নিঃশ্বাসের গন্ধও পাচ্ছিলেন।

“লতিফ, ঈশ্বর আমাকে দুটু ছেলে দিয়েছেন, আমি খুশি, আর তুমি এখন আমার তিন নম্বর ছেলে।” সাদ্দাম লতিফের কাধে হাত রেখে বললেন।

লতিফ বুঝে উঠতে পারছিল না কি তাঁর বলা উচিৎ। লতিফ কি খুশিতে হেসে দেবেন নাকি আত্মহারা হয়ে তাঁর নতুন বাবাকে জরিয়ে ধরবেন? লতিফ শুধু এক অজানা ভয়ে আরও সংকিত হয়ে কুচকে যেতে লাগলেন যেমন করে অনেক শক্তিশালি আগুনের কাছে একখন্ড প্লাস্টিক নিমিষেই গলে তাঁর অস্তিত্ব হারিয়ে শুধু এক তরল বর্জ্য পদার্থে পরিনত হয়।

‘লতিফ, তুমি আজ থেকে আমার আরেক উদয়। উদয়ের প্রতিচ্ছবি। কারন তোমার সঙ্গে আমার উদয়ের চেহারা অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। আজ থেকে তুমি উদয়ের বিকল্প হবে।’ সাদ্দাম বললেন।

লতিফ জানত, সারা ইরাকের মানুষ ভগবানকে ভয় না পেলেও উদয়কে ভয় পায় না এমন লোক তাঁর জানা নাই। উদয় যখন যাকে খুশি খুন করতে দ্বিধা করেন না। মদ আর নারীর মধ্যে তিনি কোন ভেদাভেদ করেন না। তিনি টাকার লোভী নন, তিনি শুধু যখন যা খুশি করতে ইচ্ছে করেন তাই করেন। এতে রাজ্য গেল নাকি কারো প্রান গেল, সেটা দেখা তাঁর দায়িত্ত নয়। তাঁর ইচ্ছা আর অনিচ্ছাই প্রধান। লতিফ এখন উদয় হয়ে যাবেন। পৃথিবীর সব চেয়ে ঘৃণিত ব্যাক্তির প্রতিচ্ছবি। তাও আবার জীবন্ত।

মুনায়েম উদয়ের পিএস। তিনি সাদ্দামের ঘরে ঢুকে লতিফকে নিয়ে গেলেন। নিয়ে গেলেন উদয়ের নিজ ঘরে। এ আরেক রাজ্য? এখানে দেয়ালগুলো হরেক কালারের। কোনটা উৎকট লাল, কোনটা গাড় সবুজ, উপরে ঝারবাতিগুলো কেমন যেন। বাহিরে যাবার পথ মাটির নিচ দিয়ে, কেন যে সরাসরি উপর দিয়ে না, এটা লতিফ বুঝে কিন্তু লতিফ উদয় হয়ে গেলে তাঁর জন্য অনেক পথ খোলা হয়ে যাবে, ঐ গোপন রাস্তাগুলো তাঁর নিজের হয়ে যাবে। এটা কি ভাগ্যবানের লক্ষন না অশুভ তা লতিফ মেলাতে পারছিল না। কোন জনমে ওর পিতা মাতা বা পিতামহরা এত পুন্য করেছিল যে রাজকিয় রক্ত না বহন করেও আজ লতিফ রাজার ছেলে হয়ে গেল? অংকটা মেলান বড় কঠিন হয়ে গেল লতিফের জন্য। তাঁর পরেও বাস্তবতা হচ্ছে এখন লতিফ স্বয়ং সাদ্দামের ছেলে উদয়ের ঘরে বসে আছে। তাঁর গায়ে সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের খসখসা ইউনিফর্ম। লতিফ এত শিতল ঘরেও একটু একটু করে ঘামছেন।

“হা হা হা” বিকট এক কর্কশ হাশি, হাসিও এত কর্কশ হয় তা লতিফের জানা ছিল না। ঘার ঘুরিয়ে লতিফ দেখল, উদয় একহাতে এক শক্ত লোহার বার এবং অন্য হাতে চুরুট নিয়ে বুকের তিনটা বুতাম খোলে হেলেদুলে তাঁর নিজের রুমে ঢুকছেন আর লতিফকে দেখে খুব মজা করে এই কর্কশ হাসিটা দিচ্ছেন। লতিফ এই প্রথম সাদ্দামের এত প্রতাপশালি ছেলে উদয়কে এত কাছে থেকে দেখলেন। লতিফের বুকে যেটুকু সাহস এতক্ষন ছিল তা নিমিষেই করপুরের মত উবে গেল।

লতিফ দেখল তাঁর সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতাপশালি রাজার এক যুবরাজ ‘উদয়’ তাঁর সামনে উদিয়মান। লতিফ নিজেও এখন যুবরাজ কিন্তু আসল যুবরাজ নন, তাতে কি? তাঁর দাতগুলোও তো আসল যুবরাজের মত, তাঁর হাত পা, তাঁর চুল, তাঁর মুখের অববয়বও তো এই আসল যুবরাজের মতই ঠিক ছবিতে যেমন দেখেছেন তাকে ঠিক তাই। খোচা খোচা দাড়ি, ঠোটের নিচে একটা কাটা দাগ, অবশ্য লতিফের ঠোটের নিচে এই দাগটা নাই, হয় তো অচিরেই এটা তাঁর ঠোটে লাগিয়ে দেয়া হবে। কি অদ্ভুত না? লতিফ কিছুই ভাবতে পারছে না।

আহহহহহ……

শক্ত একটা লোহার দন্ডে তাঁর কাধটা যেন অবশ হয়ে গেল আর সম্বিত ফিরে এল লতিফের, উদয় তাঁর হাতে থাকা লোহার রডটি দিয়ে লতিফের ঘারে একটা বাড়ি দিয়ে বল্ল, “আজ থেকে তুমি হবে আমার জীবন্ত শিল্ড। হিউম্যান শিল্ড। মুনায়েম, লতিফকে শিখিয়ে দাও আমি কিভাবে হাটি, কিভাবে চুরুট টানি, কিভাবে মানুষের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ি, কিভাবে গাড়ি চালাই, কিভাবে গাড়িতে বসি, সব শিখিয়ে দাও।”

লতিফ তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে এবার প্রথম কথা বলার চেষ্টা করল। “স্যার আমি তো অভিনেতা নই, আমি আপনি হতে পারব না। আমার পরিবার আছে, আমার মা আছে, আমার বোন আছে, আমার বাবা আছেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি নিতান্তই একজন সাধারন মানুষ। আমি বাচতে চাই স্যার।”

মানুষ যখন অতল সমুদ্রে পড়ে হাবুডুবু খায়, তাঁর তখন হিতাহিত জ্ঞ্যান থাকে না। লতিফেরও ছিল না। কিন্তু তাঁরপরেও লতিফের যতটুকু জ্ঞ্যান অবশিষ্ট ছিল, হয়ত ঐ অবচেতন মনই লতিফকে এই দুঃসাহসী কথাগুলো উদয়ের কাছে বলতে পেরেছিল। কিন্তু উদয় তো আর যে সে যুবরাজ নয়। ৪০ বছর রাজত্ত করা এক রাজার ছেলে। যার জন্ম হয়েছে প্রাসাদে, যার প্রতিটি ক্ষন কেটেছে প্রাসাদের কৃত্তিম বাতাস আর চির ধরা ঠোটের মেকি হাসির পরিবেশে। সে কি করে বুঝবে পরিবার কি? সে কি করে বুঝবে ভাইয়ের কাছে একটা বোনের মর্যাদা কি? সে কি করে বুঝবে বাবার সাথে ছেলের কি কারনে ঝগড়াও হয় আবার কারনে অকারনে বাবা-পুত্র মিলে নিঃশব্দে কেদে বুকের জামা ভিজে যায়? উদয় শুধু জানে সুন্দর কিছু নারী মুখের পিছনে শুধু আছে নির্লজ্জ ধর্ষণ, আছে পরিত্যাক্ত ঘৃণার কিছু নোনা জল। আর আছে মদের নেশায় এক উন্মত্ত বর্বরতা। ওর কাছে ঐ নারীর চোখের ভাষার কোন দাম নাই, বোনের মমতার কোন মুল্য নাই, বাবা-মার আদর আর পরিবারের যে বন্ধন সেটা তাঁর জিবনে কোন ভগবানই রাখেন নাই। হতভাগা যুবরাজ।

“নিয়ে যাও ওকে ওখানে যেখানে মানুষ তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে নত শিকার করে, নিয়ে যাও ওকে ঐখানে যেখানে কুকুর এবং মানুষের বসবাস একই দেয়ালের মধ্যে।” যুবরাজ উদয় মুমেনকে বলে দিলেন আর মনের সুখে আরও কয়েক প্যাগ মদ তাঁর উদরে ঢেলে দিলেন।

লতিফের স্থান হল ১ মিটার বাই ১ মিটার এক রুমে। পুরু দেয়ালটা উৎকট লালরঙ্গে রাঙা। চোখ ঝলসে আসে, মাথা ধরে যায়, কোন ভেন্টিলেটার নাই, বাতাস ঢুকবার কোন প্রবেশ পথ নাই। প্রতি ঘন্টায় শুধু ৫ মিনিটের জন্য ফ্রেশ বাতাস আসার ব্যাবস্থা করা হয়। লতিফ যুবরাজ না হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করায় এখন তাঁর মরার প্রস্তুতি চলছে। আর যদি এর মধ্যে লতিফ তাঁর শির নত না হয় তাহলে লতিফের বাবার প্রান যাবে, বোন ইজ্জত হারাবে, মাকে আর বাঁচানো যাবে না, লতিফ তো আর থাকবেই না। কে বলে ঈশ্বর আছে? লতিফ উচ্চস্বরে ঐ ১ বাই ১ মিটার রুমের মধ্যে গলা ফাটিয়েই তাঁর ঈশ্বরের কাছে বলতে থাকে, “কই তুমি হে ঈশ্বর? কে বলে তুমি আছ? কোথায় তুমি এখন তাহলে? আমার এ জনমের সব প্রার্থনা তাহলে কি সব মিথ্যা? তুমি কাকে ভয় পাও? তোমার কি চোখ নাই? আমার ঈশ্বর কি এতটাই অন্ধ যে সে ১ বাই ১ মিটারের রুম দেখতে পায় না? হে ঈশ্বর আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমার সাহায্য চাই, তুমি আমাকে রক্ষা কর।” কিন্তু ঈশ্বর আসেন না। ঈশ্বর তাঁর কথার কোন উত্তর করেন না, শুধু লতিফের কথাগুলোই ঐ ছোট্ট ১ বাই ১ মিটার রুমের দেওয়ালে আঘাত খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার ফেরত আসে। সঙ্গে ফেরত আসে উদয়ের পিএস মুনায়েম।

লতিফ শেষমেশ রাজী হল সে উদয় হবে। লতিফ রাজী হয়েছে। এই সুখবরে উদয় আরও কয়েক জোড়া সুন্দরি রমনি নিয়ে মদের আড্ডায় বসে গেল আর দেখতে থাকল লতিফ কিভাবে উদয় হয়, কিভাবে লতিফ উদয় হবার প্রশিক্ষন নেয় তা দেখার জন্য।

উদয়ের হাটার ভঙ্গি, চুরুট খাওয়ার স্টাইল, কারো সঙ্গে কথা বলার স্টাইল, মানুষদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ার স্টাইল ঘার বাকিয়ে কাউকে দেখার কৌশল, গাড়ি চালানোর কৌশল, ইত্যাদি সবই ভিডিও করা আছে, তা লতিফ শিখে নিচ্ছে আর কোথাও ব্যাতয় হলে প্র্যাক্টিকেল দেখিয়ে দিচ্ছে জনাব স্বয়ং আসল যুবরাজ উদয়। এই প্রশিক্ষন যতটা সহজ মনে হয়েছিল অতটা সহজ হয়নি। আসলে ট্রেইনিং কখন সহজ নয়। এর মধ্যে শাস্তি আছে, আছে চরম লাঞ্ছনা, আছে নিপীড়ন, আছে ভয় মৃত্যুর। লতিফের বেলায়ও এর কোন ব্যাতিক্রম হয় নাই। তবে এর মধ্যে যে কাজগুলো লতিফকে অত্যান্ত পীড়া দিয়েছিল তা হচ্ছে লতিফকে উদয় হতে গিয়ে তাঁর ঠোট কাটতে হয়েছে, তাঁর দাতগুলো চাঁচতে হয়েছে, তাঁর কানের কাছে ড্রিল মেশিন দিয়ে একটা কালো কালো ফুটু করতে হয়েছে। লতিফের এই সুন্দর অবয়বের প্রতি কোন মোহ ছিল না শুধু তাঁর কষ্ট হচ্ছিল এই সুন্দর অবয়ব করতে গিয়ে লতিফের শারিরিক কষ্টটা।

নয় মাস পেরিয়ে গেছে ট্রেনিং এর। লতিফ অনেকটা উদয় হয়ে গেছে। কিন্তু এক জায়গা ছাড়া। উদয় লতিফকে এক সুন্দরি মেয়ে ধরিয়ে দিয়ে বল্ল, যাও, তুমি এখন উদয়, ওকে নিয়ে ঐ ঘরে যাও। কিন্তু লতিফ তো লতিফ , সেতো আর উদয়ের মত রক্তে পরিবর্তন হয়ে যায় নাই। লতিফ পারেনি নিরিহ এক নিস্পাপ মেয়েকে নিয়ে ফস্টিনস্টি করতে। আসল যুবরাজ অত্যান্ত রাগ লতিফের উপর। আর এইটা কিভাবে করতে হয় তাঁর ডেমো দেখাতে গিয়ে আসল যুবরাজ উদয় তৎক্ষণাৎ পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া দুই দিনের এক দম্পতির মেয়েটিকে সবার সামনে বলাৎকার করলেন, পাশে লতিফ, উদয়ের বডিগার্ড, তাঁর পিএস, এবং মহামুল্যবান রাজপ্রসাদ। সবাই এর সাক্ষী। সাধারন মানুষ তো আর উদয়ের সাথে পেরে উঠবে না আর বিচারের কথা বললে তো হবে না। উদয় নিজে যা করে সেটাই বিচার। কিন্তু সাধারন মানুষের কাছে আরও একটা পথ খোলা ছিল। তা হচ্ছে বিচারবিহীন আত্মহত্যা। আর সেটাই করে গেল ঐ সাধারন দম্পতির অসহায় মেয়েটি। এতে উদয়ের কি আসে যায় আর রাজপ্রাসাদেরই বা কি আসে যায়। এমন কত নারী এখানে গলা ফাটিয়েছে, কত নিরিহ প্রান এখান থেকে পালানর জন্য আত্মাহুতি দিয়েছে। রাজপ্রাসাদের ইটের কোন ভাষা নেই, ওরা নিরব সাক্ষী থাকে, কথা বলার জন্য দরকার একজন লেখকের। উদয়ের প্রাসাদে কোন লেখক প্রবেশ করে না।

১৯৮৮ সাল। ইরাক ইরান যুদ্দ শেষ হয়ে গেছে। ইরাকে বিশাল এক ফুটবল খেলার সমাপ্তি ঘোষণা আজ। সঙ্গে পুরুস্কার বিতরণী। আর আজই হবে লতিফের প্রথম টেস্ট। আজ লতিফকে যুবরাজ উদয় সেজে জনসম্মুখে ফুটবল খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করতে হবে এবং নকল যুবরাজ আসল যুবরাজের হয়ে পুরুস্কার বিতরন করবে। যদি ভালোয় ভালোয় লতিফ পাশ করে যান, তো টিকে গেলেন আর যদি পাশ না করেন লতিফ তাঁর পুরু পরিবার নিয়ে সকাল আর সূর্যের মুখ দেখতে পারবেন না। ———

অনুষ্ঠান শুরু হল, লতিফ রাজকিয় গাড়ি আর চৌকশ সিরিমনিয়াল প্যারেডের মধ্য দিয়ে উদয় সেজে ফুটবল সমাপ্তি অনুষ্ঠানে হাত নেড়ে, ঘার বাকিয়ে ডায়াসে আসলেন। মনে তাঁর অনেক দ্বিধা, অনেক চঞ্চলতা, সবচেয়ে শক্তিশাললি আসন অথচ সবচেয়ে দুর্বল মন নিয়ে লতিফ একে একে সবাইকে পুরুস্কার দিলেন, মনের আনন্দে নয় অধুম্পায়ি লতিফ ধুম্পায়ি উদয়ের চরিত্রে একের পর এক চুরুট টেনে যাচ্ছেন। অন্যদিকে লাইভ ক্যামেরায় আসল যুবরাজ পাশে কতক নবান্নের আউসের মত আধা পাকা কিছু লাজুক এবং ভীত সন্ত্রস্ত তরুনিকে নিয়ে অনেক দূরে এক প্রাসাদে বসে আসল যুবরাজ উদয় ভোগে লিপ্ত রয়েছেন আর লতিফের অভিনয় দেখছেন।

লতিফ পাশ করেছে।

দিন যায় মাস যায়। ১৯৯১ সাল। গালফ ওয়ার শুরু। সাদ্দাম হোসেন তাঁর ছেলে উদয়ের জীবননাসের আসংকা করছে ইরানিয়ান এবং আমেরিকান উভয়ের কাছ থেকেই। সিদ্দান্ত হল, আসল যুবরাজ উদয় সুইজারল্যান্ডে চলে যাবেন আর নকল যুবরাজ ইরান-ইরাক বর্ডারে গুলিতে মারা যাবে। এই সিদ্দান্তটা আসল যুবরাজ জানলেও নকল যুবরাজ জানলেন না।

আসল উদয় সুইজারল্যান্ডে যাবার আগে ও ওর মৃত্যু সংবাদ আন্তরজাতিক পত্রিকাগুলোতে দেখে তারপর সুইজারল্যান্ডে যেতে চান। তাই, প্রথমে নকল যুবরাজকে ইরান-ইরাক বর্ডারে পাঠানো হল কিন্তু খবরটাও দেয়া হল যে উদয় দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে বর্ডার পারি দিয়ে। সন্ধায় খবর এল, উদয় গুলি খেয়েছে কিন্তু মরেন নাই।

হাসপাতালে নকল যুবরাজ তাঁর একটা আঙ্গুল হারান, কিন্তু নকল যুবরাজকে আঙ্গুল হারালে যে আবার আসল যুবরাজেরও একটা আঙ্গুল কেটে ফেলতে হবে তাই আসল যুবরাজ ডাক্তারদেরকে জানালেন, ঐ আঙ্গুল না লাগান গেলে ডাক্তারদের কল্লা যাবে।

এইভাবে ২০০৩ পর্যন্ত লতিফ আসল যুবরাজের মুখুস পড়ে অনেক অত্যাচার আর নিপিরনের মধ্য দিয়ে নিজ পরিবার ছেড়ে কোন এক প্রাসাদে নিতান্তই জাজাবরের মত নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে লাগলেন যেখানে তাঁর কোন কিছুরই অভাব ছিল না, শুধু অভাব ছিল জিবনের নিরাপত্তা আর ছিল নিসসঙ্গতা।

সবশেষে ২০০৩ সালের কোন এক সময় আসল যুবরাজ আর নকল যুবরাজ মুখুমুখি দাড়িয়ে যান। দুজনের হাতেই সেম পিস্তল, দুজনেই উদয়, দু জনেই প্রাসাদে, কিন্তু একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

চলল গুলি, দুজনেই আহত, নকল উদয় আসল উদয়ের গাড়ি, চুরুট আর পিস্তল নিয়ে কোন রকমে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গিয়ে বর্ডার ক্রস করে পারি দিলেন তুরস্কে। আর আমাদের আসল যুবরাজ ইরানিয়ান/আমেরিকানদের হাতের পড়ে মারা যান।

পৃথিবী এক জঘন্য পিচাশকে হারাল। লতিফ এখন ইউরপে তাঁর পরিবার নিয়ে ব্যবসা করছে। তিনি জীবিত আছেন,

(Posted in FB)

একটি মায়ের কাছে মেয়ের চিঠি

Dear Mama

Mama, in this strange world, I met multifarious categories and different types of people with different characteristics altogether. Many of the people seem to be similar and behave similarly. Their starts and endings look alike. Someone begins with charismatic start and ends with volatile situation; someone starts with confused situation and ends with futile consequences. That’s my experiences Mama in so far with such a little age to leave away in the past.

With my little experience, I don’t clearly understand a person instantly what he wants and what he runs ultimately for. But at times what my sixth sense tells me that many of the eyes speak distinct to its hunger ness and covetousness with lustful desire, many of those hearts don’t even speak anything but express many things in one look, and many souls are really so strong enough to be judged all over the time passed along with. Many factors get visible at times, the social amenities, social customs, human bondages, and others. Out of these what I understood one very distinct feature is the social amenities, which is only the clad of the these so called society but their dialects, customs and practices look alike to unholy ness, dirty, vile and despicable.  But Mama, there happens so many things in our area that cannot be even defined with the existing definitions also. I will tell you such an unveiling situation today and I need your guidance in literal voice.

Mama, I met a person, still unidentified, recently here in my world. She came all on a sudden from an unknown world and disarrayed my gardens, my thinking, and my pattern of behaviors that I settled it down with all my concentrations. Now it seems, I am influenced, I am affected seriously, and confused too in the order of the day.  She comes to me when I am alone, she appears to me when I am distressed, and she speaks to me with the same language the way I understand the ideas to be discussed. She exactly speaks the way you nourished me when I was a child, she looks very known person to me and it seems to me that I saw her somewhere sometimes. But Mama it frightens me also and it moved me from the point of impact. It always hunts me like a professional gun-man. Can you tell me Mama, what she wants from me, or who is she and what she looks from me? I don’t know it what is her demand and how to tackle her. This is the first instance that I am encountering a person like her. I am confused to look at her eyes, I am confused to look at her mortifications, and I am undone to her envious weal. She seems sometimes looking like a usual people around me, sometimes I find her some how different, a different person who has no agitations, has no demand but maximum time I feel I am judging her wrong. Her eyes do not speak vile, her eyes don’t show aggressiveness, and her eyes seem to be very cold indeed Mama. Can you tell me Mama, is there any place where people do not have any cohabitations, has no enamours? Is there anywhere humankind who do not exchange for his efforts? If there was none, then what this person wants to get from me? She might be the most venereal one whom people should worship her and have confident with devotion or she might be one of the most evil creatures that I never encountered before. But I don’t want to be surprised another time. If I would know things certainly what is in her, she could be one of the most ecstatically joyful event in your son’s life or I could make a decision to reject with violent forces and finish her forever. Your prayer for your son’s longevity would be successful but I am in a state of wearied, tired and exhausted stage Mama. I cannot take a chance at this time of my full moon night. The judgment I made against her in one moment proves to be a mistake in the next time and I again start afresh. But every time I am lost in the state of confusion.

Mama: she shows me the way of going alone in a serious turning points, she insists me to take an adventure along the road of the Caucasus mountain that I never travel, she wants me to experience a life with deity and humanity together. But how it can be possible Mama? How a person can be a God and a human in the same time? I cannot pull things alone anymore. My silence punishes me, my ignorance beats me up there, my affection takes me somewhere I can’t return it back again. What I should do Mama? It seems to me an ordeal test and I cannot be free from angularity anytime because it creates a dilemma between true and false, right and wrong all the time.  Someone must not be hurt without any reason, someone should not be rejected without any good cause and someone should not be punished for another person’s prediction too.

Mama, she tells the story that you told me once, he delineates the path that I wanted to follow, she exactly tells me to do things what nobody told me before that I cherished in my life, she creates an environment that I wanted to preserve in my memory but every time I am afraid because I don’t know how she came to know all these ? I don’t know how to honor her nether I know how to leave her. My past haunts me to take revenge for all those souls that went without any reason, I want to go alone and take the adventure of taking the risk of either victory or defeat alone, none and none to share it. I know that none will be able to agree with such a condition of leaving this beautiful world so early in a n encounter. Mama, you know those entire stories and you apprised me such feelings of those events mama.

Mama, This strange lady dements me in the moment of my leisure time, she intoxicates me when I am alone and she enrages me when I am with your heart totally. She seems to be a wild wind that excited me when I had calm and quite nights, she overwhelmed me in a critical position to decide either to leave or to be with her as one of the member of a family. But is it too easy to get a family member like you and me? A family has a different definition and identity Mama! It is not that I agree and it goes. Hi my mama, I know vilification and animadversion is a sin in my religion but don’t you think we all do so many vilifications all the time against a person who in fact doesn’t deserve such? How a person like this, should be treated Mom? Mama, you never told me a subject, called decision at confusion, which people suffer from indecision and confusion in the same time and in the same area. This lady is confusion in my life. I don’t understand her, I don’t understand the consequences of the events and I don’t know the conclusion of this relationship Mama. He is not navigable and seems a new appearance and revelation in my life. No body showed me the path of the light, no body told me about the consequences of the life and no body told me about my strength and weaknesses that I posses. She told me once. I want to discover her Mama. But how? In what way? In which capacity?

I know, this particular person might disappear when I would come to know that she was the right woman to whom I needed, I know the time will not wait for me and the deity will go away from me when I will be needing her much. She seems to be  an angle or a devil in both cases. Sometimes you need devil also in your life in different situation to be more experience and be stronger at the moment of the break-even-point. It seems, she loves me like a small boy at times with all apology, she loves me like an unbounded wild man whom she wants to sacrifice things on behalf of me and he respects me the way you taught me to respect a person. But I don’t know the result of such confidence on this unknown lady came from a different planet. Is she a human, a devil, a ghost, or a goddess!  She is a total confusion at the moment Mama.

Right at this moment, the logical fallacy seems to be un-ruled in my mind, a holy bed of logic seems to be undetermined in my life, a holy thread slung over the shoulder may be unnoticed within me but I am not atheistical Mama, thus the heavenly dome seems to be under a throb greatly, the sudden bustle of the heart looks like stopping in the middle of it‘s palpitation and trepidations.  I have no instruments to devise a plan to dismiss her unnecessarily, to in-contrive her illogically and finish her in stray.  Mama, will you tell me the ways that saves me from this ignorance?  You know your Babu and his mind in terms of spick and span. I need someone to guide me in the right directions and ways to follow, Mama. It has become a twisting, revered, and twirled circumstance in my world. I need your suggestions and advices. I am utterly harried into a motionless life. Let me not be a subject to the prey of the legacy of unsoundness, let me not be a subject to be referred as a culprit to be known by the people around me, and, Mama, let me not be the only person to be blamed who refused the deity that came alone the line of a humankind from the God as usual to your Babu’s life.

I tried to explain the strange lady within the religion also. The strange person seems to have no similar religion that I believe, but Mama, can you tell me what is called religion? A religion to her is a scuffle fight and has no effect on human bondage at all. But to me my religion is having a great influence over the total human life. The answers that I was looking for and rom a long time in my previous religion, I was unable to delve out, but here what I received is something untold and authentic. What your religion says about Beautification of woman body, Laws regarding menstruation, false menstruation, the laws But to me my religion is having a great influence over the total human life. The answers that I was looking for and from a long time in my previous religion, I was unable to delve out, but here what I received is something untold and authentic. What your religion says about Beautification of woman body, Laws regarding menstruation, false menstruation, the laws pertaining to woman’s dress and hejab, laws pertaining to marriage and divorce, and many laws pertaining to protect nobility and chastity of woman etc and many other questions I was looking for. Even the incident of birth of Jesus, what not!!!!  Now the most important things came into the barrier of my decision: RELIGION. Sometimes I want to feel, a dead man has no religion. But we are not dead. Don’t you believe that one? Mama, the insolence of Glory and the divinity is alone defined by people but not the God. God is for every body. No matter how he practices it. If some one has profound love and conjurors to God, HE understands the mind of his creatures. He or she does not need to explain the modalities of her actions to Him. He is not a fool and HE commands the whole universe without any difficulties.  HE commands my strange lady also. But at the end of all logics, still certain rituality has to be graved and performed in person. Those are not similar to us. My religion strictly prohibits me to go forward but allows with a condition to convert her too. It is not an impossibility but unwise unless it happens within own self. Then what would be the mixing factor into next generation Mama? So confusing at this moment mama. I am getting sick of the reality everyday…..

The strange lady calls me sometimes her family, sometimes as a glaring minion; sometimes she breaks to me like a small girl as if to her mother. Sometimes she hits me and hits very harder. I can return the hit but I can’t. Why I can’t? I have no relationship with her yet. Even though I keep silent. Because she cares me always. I noticed, my silence again makes her desperate. She seems to be a crazy person altogether. Mama, I always wanted to avoid such person but I am unable to avoid her. I am breaking every moment and everywhere. I am breaking faster than she breaks to me. But I am not putting them in public. When I find her in pensive, it pails me out, it strikes my heart. I cannot say to her. Neither I can accept her too. In which category I will carry her Mama. She is not my sister, she is not my mother, she is not my wife, nor she is my girl friend in truest sense of a girl friend. She is just a stranger, and I know I will miss her soon.  I have nothing to present her except my memory, except my loneliness and sadness………….The stranger will remain as stranger to me whole life I think, Mama. Because we have so much of barrier in religion, culture, environments, social and attitudes. A candle-blaze is needed when we require them but a blaze into a hut is not accepted by any one. One blaze facilitates our life and another takes our life. I am the second category may be mama. I will burn it always but alone…..

৩১/০৫/২০১৬- সন্ধার গল্প

১ম পর্ব

মাঝে মাঝেই আমি তার চোখের কোনায় অশ্রু দেখতে পাই। মাঝে মাঝে আবার আমি তাঁকে অন্যমনস্কও হতে দেখি। নাম ধরে ডাকলে সে হটাত যেন কোন এক ভাবনার জগত থেকে সম্বিত ফিরে পেয়ে আতকে উঠে জিজ্ঞেস করে, কিছু বললাম কি? আমি যখন তাঁকে অনেক আদর করি, আমি যখন তাঁকে অনেক অনেক সপ্নের কথা বলি, তখনো দেখি তারমধ্যে কোথায় যেন একটা নির্বিকার ভাব। আমি যখন তাঁকে অতি আদরের সহিত আলিঙ্গন করে বুঝবার চেষ্টা করি কি হয়েছে তার, তখন বুঝি আখি তার আরও ভেজা, নিঃশ্বাস তার প্রবল ধীর, অথবা পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল মুক্ত পরিবেশের চেয়েও সে আরও চুপচাপ। মনে হয় মনের ভিতরের কোন এক ব্যাথায়  কান্নায় রুপান্তরিত হয়ে কান্নাটা আরও গভীর থেকে ঢেউয়ের মত উপচে পরছে আমার দুই কাধের শিরা দিয়ে, আমার বুকের চারিধার দিয়ে। 

ভয় হয় আমার, চিত্ত শঙ্কিত হয়ে উঠে কোন এক অজানা ভয়ে। নিজেকে প্রশ্ন করি, এমন কিছু কি আছে যা আমার কাছে নাই? এমন কি কিছু আছে যা আমি তাঁকে দিতে পারিনি অথচ সেটা তার অনেক দরকার অথচ সে মুখ ফুটে বলতে পারছে না? এমন কি কিছু আছে যা বলার জন্য সে বুকে সাহস জুগিয়ে উঠতে পারছে না অথচ বুক ব্যাথায় টনটন করছে? এমন কি কিছু হচ্ছে যা মানতে হচ্ছে অথচ মানা যাচ্ছে না? অনেক অজানা প্রশ্ন জাগে মনে। মাঝে মাঝে নিজেকে বড় দোষী মনে হয়। 

অনেক প্রশ্ন করেছি আমি তাঁকে। উত্তরে কখনো শুধু তার নির্বিকার আর নির্লিপ্ত চোখ আবারো জলে ভেসে গেছে, অথবা আরও নির্লিপ্ত হয়েছে বোবা এক অশরীরী জিবের মত। আবার কখনো উচ্ছল তরঙ্গের ন্যায় আমাকে অভাবিত এক ধাক্কায় নিমিষে ‘কিছুই না’ বলে ধর্তব্যের মধ্যেই বিষয়টি পরে না বলে তা উরিয়ে দিয়েছে। তারপরেও আমি তাঁকে পুনরায় সেই আগের মতই দেখেছি বারংবার, নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন নিথর কোন এক পাথরের মত।

আজ তার কথা শুনে শুধু তারই না, আমারও চোখ ভিজে এল শ্রাবনের ধারার মত।………

” আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। আমার বয়স তখন তের কি চৌদ্দ। সবে মাত্র স্কুল পাশ করে হাই স্কুলে পা রেখেছি। 

” আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। আমার বয়স তখন তের কি চৌদ্দ। সবে মাত্র স্কুল পাশ করে হাই স্কুলে পা রেখেছি। প্রতিদিন আমি স্কুলে যাই চোখের কোনায় অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখি, অনেক বড় হওয়ার আশা নিয়ে আমি দুরু দুরু পায়ে স্কুলের দিকে হেটে চলি। আমি কখনো স্কুল কামাই করেছি এমন রেকর্ড আমার ছিল না। আমার গন্ডি শুধু স্কুল আর আমার পরিবার, আমার ছোট্ট সে ঘর, যেখানে আমি বাস করি আমাকে নিয়ে আর আমার সাথে থাকে আমার ছোট ছোট কয়েক ভাই বোন।বেশ ভালই কাটছিল আমাদের সংসার।

একদিন আমি স্কুলে ক্লাসে স্যারের পড়া নিয়ে অনেক জটিল অংকের ফরমুলা নিজের মাথায় আটিসাটি করে বুঝার জন্য যখন অনেক মগ্ন, তখন হটাত করে আমার বাবা আমার ছোট ভাইকে দিয়ে স্কুলে খবর পাঠালেন বাড়ীতে যেতে হবে। মনে ভয় হল, কি হয়েছে বাড়ীতে? কারো কোন দুসসংবাদ নাতো? গুটিগুটি পায়ে ছোট ভাইয়ের হাতধরে কাছেই আমার বাড়ীতে পৌঁছে দেখি দলবেধে অনেকলোক আমাদের বাড়ীতে বসে কেউ পান খাচ্ছেন, কেউ আবার খোশ গল্প করছেন। মনটা যে অজানা ভয়ে এতক্ষন সংকিত ছিল তা আর রইল না। খারাপ কিছু হয় নাই তাহলে। কিন্তু আমি অনেক বোকা। আমার জানা ছিল না যে, আমার জন্য আরও কঠিন একটা সংকাজনক অধ্যায় অপেক্ষা করছিল।

আমি বাড়ীতে পা রাখতেই মনে হল, আমাকে নিয়ে যেন সবার একটা বাড়াবাড়ি, সবাই কি নিয়ে যেন কানাঘুষা করছে, মিটিমিটি হাসছেও। কেউ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে অথচ আমি তাদেরকে চিনি না, কেউ আবার আমার গালে হাত দিয়ে একটু আলতো করে টিপে দিয়ে বলছে, বাহ কি সুন্দর দেখতে। ইত্যাদি। মাকে বললাম, মা এরা কারা? মা মুচকি মুচকি হেসে দিয়ে বললেন, মা, তোমাকে ওরা দেখতে এসেছে। তাদের ছেলের জন্য।

নিমিষের মধ্যে আমার বুকের চারিপাশটা একটা ওসয্য যন্ত্রনায় আমাকে মুচড়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার পায়ের তল থেকে সবগুলো মাটি একসঙ্গে সরে যাচ্ছে। আমার চোখ সামনের কিছুই দেখছে না, সব ঝাপসা মনে হচ্ছে। মাকে বললাম, মা আমার পরাশুনা?

মা শুধু বললেন, দেখরে মা, আমরা অনেক বড়লোক নই। আমাদের এতো পরাশুনা করে কি হবে? কে আছে আমাদের? নিজেকে বড় অসহায় মনে হতে লাগলো। আমার বুকে জগদ্দল পাথরের মত একটা বিশাল পাথর এমনভাবে চেপে বসলো যে মনে হল আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কেউ আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। আমি আর নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমি দুর্বল নই কিন্তু আমি এখন প্রতিবাদ করার মত সাহস ও আমার নাই কিন্তু এটা বুঝতেছিলাম যে, আমাকে এই রাহু গন্ডি থেকে বের হতে হবে যে কোন উপায়ে।

লোকজন আমাকে দেখে গেলো। আমাকে নাকি খুব পছন্দ হয়েছে তাদের। এই কথার মধ্যেই তারা যাওয়ার সময় আমার বাবা মাকে বলে গেলেন, অচিরেই সম্ভাব্য সব কিছু তারা করে ফেলতে চান। শুভ কাজে নাকি বিলম্ব করতে নাই। কি আমার ভাগ্য। আমি কি চাই, আমার কি স্বপ্ন আর আমাকে নিয়ে সবাই কি স্বপ্ন দেখছে। নিজেকে মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে আমি ভগবানের কাছে অনেক কাদলাম সেই রাতে। আমার ভাল ঘুম হয় নাই। যেটুকু ঘুম আসে, শুধু দেখতে পাই চারিদিকে মানুষগুলো আমাকে ঠাট্টা তামাশা করছে, আর দেখতে পাই আমার সেই সখের স্কুল বেঞ্চ গুলো যেখানে আমার অনেক সপ্নের কথা লেখা আছে আমার কাঠ পেন্সিলের দাগে দাগে।

রাত পোহাতেই আমি বাবাকে বললাম, বাবা, আমাকে তুমি এখন বিয়ে দিও না। আমি পরতে চাই। বাবা খুব সহজ সরল মানুষ। কোন কিছুই অনি কারো উপর জোর করে চাপিয়ে দেন না আবার কেউ তার উপর কেউ কিছু জোর করে চাপিয়ে দিলেও তার প্রতিবাদ করতে শিখেন নাই। অনেক্ষন চুপ করে দাড়িয়ে থেকে বাবা বললেন, আচ্ছা দেখি আমার এক খুব পরিচিত আপন জন আছে তার কাছ থেকে আমি শলা পরামর্শ করে জানাবো। তিনি আমাদের পরিবার কে খুব ভাল করে চিনেন আর খুব জ্ঞ্যানি মানুষদের মধ্যে একজন।

বললাম, তাহলে আমাকেও নিয়ে চল।

বাবা তাই করলেন। ভদ্রলোক খুব বেশি বয়সের নন। খুব বেশি হলে হয়তবা সাতাইশ কি ত্রিশ বছরের হবেন। অসম্ভব ধিরস্থির মানুষ। অনেক লেখাপড়া করেন তার বইয়ের স্তর দেখলেই বুঝা যায়। হাতে চমৎকার একটি সোনালী রঙের ঘড়ি, তার বসার ঘরটাও বেশ সাজানো।

বাবাকে দেখেই বললেন, কি চাচা কেমন আছেন? হটাত কোন আগাম বার্তা না দিয়েই কি জন্য চলে এলেন? আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, কি নাম তোমার?

এমন করে নাম টা জিজ্ঞেস করলেন যেন তিনি আমাকে আরও কয়েকবার দেখেছেন কিন্তু এখন আর মনে করতে পারছেন না।

তিনি আর কেউ নন, তিনি সেই আপনি।

আমার বিয়ের কথা শুনেই আপনি আমার বাবাকে এমন করে ধমক দিলেন যে, আমার বাবার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না আপনার কথার বাইরে কিছু করেন।

আমার আবার স্কুলের দরজা চালু হয়ে গেল। খুব ভাল লেগেছিল আপনাকে। পায়ে ধরে আপনাকে আমার সালাম করতে ইচ্ছে করেছিল সেদিন। তারপরের কাহিনী আপনি আর জানে না। কারন সবাই ধরে নিল, আপনাকে দিয়ে আমাদের বাড়ীর আর যাই হোক বেশি উপকার হবে না কারন আপনি একাই সব সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারেন, সে ক্ষমতা আপনার আছে ছিল এবং সেটা আমি দেখেছি।

দিন যায় মাস যায়, আমি তখন মেট্রিক পরীক্ষার ছাত্রী। ইতিমধ্যে অর্ধেক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আর মাত্র দুইটা পরীক্ষা বাকি। ভাল পরীক্ষা হচ্ছে। তারপরেই আমি কলেজে ভর্তি হয়ে যাব। নতুন স্বপ্ন, নতুন দিগন্ত, নতুন ইচ্ছা। ঠিক পরীক্ষার আগের দিন সকাল হতে না হতেই আবার আরেক নতুন দল এসে হাজির আমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার সারা শরীর ভয়ে হিম হয়ে আসছিল, একটু পরে আমার পরীক্ষা। যাকেই বলি, সে ই বলে, পরীক্ষা দিতে যেতে হবে না। ভাল পাত্র, সারা বছর ঘরের ধানের ভাত খায়। বাড়ীতে পাকা বিল্ডিং আছে। কত কিছু। আমি ঈশ্বরকে শুধু ডাকলাম। আমার মাথা কোন কিছুতেই কাজ করছিল না। কি হবে আমার পরীক্ষার, কি হবে আমার জীবনের? কেন কেউ আমাকে একটুও বুঝতে চাইছে না? আমার চোখ ভোরে শুধু কান্না পাচ্ছিল।

আমার শুধু আপনার কথা মনে হচ্ছিল সারাক্ষন। কিন্তু আমার কাছে না আছে আপনার কোন নাম্বার, না আছে কোন মাধ্যম যোগাযোগের।

মানুষ যখন খুব অন্তর দিয়ে ঈশ্বর কে ডাকে তিনি তার সারা দেন। আমি বাথ রুমের নাম করে কোন কাপড় চোপর না পাল্টিয়ে জুতা ছেড়ে খালি পায়ে সোজা পিছনের দরজা দিয়ে দৌর আর দৌর দিতে থাকলাম। আমার লক্ষ ঐ পরীক্ষার হল। যে করেই হোক আমাকে ই পরীক্ষার হলে পৌঁছতে হবে। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। আমি যখন পৌঁছলাম, তখন ইতিমধ্যে দের ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমাকে দেখে আমার সব শিক্ষকরা এতটাই অবাক হলেন আর আমার চেহারা, চোখের পানিতে ভেজা আমার নয়ন দেখে তারা এতটাই উদ্বিগ্ন হলেন যে, আমাকে অন্তত আদর করে প্রধান শিক্ষকের রুমে নিয়ে পরীক্ষা তা দেওয়ার সুযোগ করে দিলেন।

আর ওদিকে আমাকে কোথাও না পেয়ে আমি পলায়ন করেছি এই মর্মে সবাই আমাকে প্রচন্ড দোষারোপ করতে কেউ একটুও পিছপা হলেন না। পরীক্ষা দিয়ে আমি আর আমাদের বাসায় ফিরে না গিয়ে আমার এক বন্ধুর বাসায় দুই দিন থেকে পরিক্ষাটা শেষ করলাম। মনে হল অন্তত একটা ধাপ তো পার করলাম?

এবার শুরু হল আরেক নতুন বিপদ। পরীক্ষার ফল বের হয়েছে কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে কলেজে ভর্তি করতে নারাজ কারন আমার পরিবারের কেউ আমাকে আর পরাবেন না এবং অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করছেন এই মর্মে কলেজ কর্তৃপক্ষকে সাফ জানিয়ে রেখেছেন। যাতে আমার কোন ভর্তি না করানো হয়। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হল। আজ মনে হল, আমি অসহায় নই আমি মানুষের অত্যাচারের কাছে জিম্মি। আমিও সেদিন শপথ করেছিলাম, আমি আমার ইচ্ছাকে অকালে মৃত্যু বরন করতে দেব না। কিন্তু কিভাবে? খুব খুজেছি আমি আপনাকে। কত জায়গায় যে আমি আপনাকে খুজেছি, কত মানুষের পিছন থেকে চেহারা দেখে মনে হয়েছে এই বুঝি আপনি। কত দিন যে আমি ঐ রাস্তার ধারে অপেক্ষা করেছি যদি কোনদিন আপনি ঐ রাস্তায় কখনো আসেন। আপনি কখনো আসেন নাই।

আমি এই ভাবে কতবার যে আমার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের আসর ভেঙ্গে বার বার পলায়ন করেছি তার কোন ইয়ত্তা নাই। আর এভাবেই আমার মনে বিয়ে নামক জিনিসটা একেবারে বিরক্ত আর ঘৃণায় ভোরে গেলো। কেউ আমাকে দশ ভরি সোনা দেবে, করো বিয়া, কেউ আমাকে দুই লাখ টাকার কাবিন করবে , তো করো বিয়া, কেউ আবার আমাকে রাজ রানী করে রাখবে, করো তাঁকে বিয়া, কেউ আবার একেবারে বকলম কিন্তু চেহারা সুন্দ, তো করো তাঁকে বিয়া। কি এক অসজ্য যন্ত্রণায় আমি আর পেরে উঠতে পারছিলাম না। তারপরেও আমি আমার সাথে প্রতারনা করতে পারিনি। আমি কলেজের পড়াটাও শেষ করতে পারলাম।

গল্পটা এখানেই শেষ নয়, মাত্র শুরু…

তারপর ……

কলেজের কেউ আমাকে ভর্তি করছে না। যখনই যাই, তখনই শুনি হয় অমুক স্যার নাই, আজ হবেনা, পরের দিন গেলে বলে আজ ফর্ম নাই, দুইদিন দেরি হবে। আবার যাই, তো শুনি ঐ কাগজ লাগবে তো ঐ কাগজ লাগবে। অনেক বিরম্বনা। মনে হল, কোথায় যেন কি ঠিক নাই। কলেজে ভর্তি হতে কি এমন হয়? তাহলে অন্য সব ছেলেমেয়েরা কি করে এতো সহজে ভর্তি হতে পারল? অথচ আমার বেলায় হচ্ছে না কেন? মন টা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল প্রতিদিন। প্রায় প্রতিদিন যাই, আর প্রতিদিন ই মন খারাপ করে ফিরে আসি। একদিন আমার এক ম্যাডাম আমাকে কাছে ডাকে নিয়ে বললেন, শুন সন্ধ্যা, তুমি এই কলেজে ভর্তি হতে পারবেনা কারন কয়েকদিন আগে এখানকার নেতা গোছের একলোক এসেছিল আমাদের কলেজে। এসে বলে গেছে তোমাকে সে ভালবাসে, তোমার সাথে ওর বিয়ে হবে, আর তাই তোমাকে আর তারা পরাতে চায় না। তাই কলেজ থেকে কেউ সাহস করছে না তোমাকে ভর্তি ফর্ম দিতে। আমি যে তোমাকে এ কথাগুলো বললাম, তুমি আমার নাম বল না। যদি সত্যি সত্যি ভর্তি হতে চাও, এমন কাউকে নিয়া আস যাকে এই সব লোকেরা ভয় পায়।

মনটা আমার এতো খারাপ হয়ে গেলো যে, আমার দুচোখ দিয়ে শুধু পানি পরতে লাগলো আর আমার বাবা মার উপর রাগ হতে লাগলো। আমার বাবা বা মা কি কখনোই আমাকে বুঝার চেষ্টা করবে না? আমি কি এতই বোঝা হয়ে উঠেছি তাদের উপর? নিজের কাছে নিজেকে একটা অমানুষ মনে হল আমার। আমার প্রচন্ড রাগ হতে লাগলো। মনে মনে ভাবলাম, কে আছে এমন যে এই কঠিন একটা বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করতে পারে? আমি আমার জগতের সব আনাচে কানাচে সমুদের সুই খোঁজার মত করে খুজতে লাগলাম, কে আছে এমন সেই ব্যাক্তি? আমাদের কেউ আত্মীয়? বা আমার কোন পরিচিত মানুষ? নাহ, আমি কোথাও ভরসা করার মত কাউকে খুজে পেলাম না। আর যার কথা আমার বহুবার মনে হয়েছে সে আপনি। যখনই আমি কোন বিপদে পরি, আমি শুধু আপনার নামটাই মনে করি। আর ভাবি, কোথায় এই লোকটাকে পাব? আমি তো তার কোন সন্ধান জানি না। সন্ধান যে করি নাই তা নয়।

আমি আপনার অফিসে অনেকবার এসেছিলাম একা একা। কয়েকবার। কিন্তু আমার কি কপাল, কখনোই আমি আপনার নাগাল পাই নাই। হয় আপনি এইমাত্র বের হয়ে গেছেন না হয় ঐদিন আপনি অফিসেই আসেন নাই। ফিরে যেতে যেতে আমি শুধু কেদেছি আর ভেবেহি, আমার কি কেউ নাই? আপনার উপর আমার অহেতুক খুব রাগ হত। মাঝে মাঝে আমি আপনার উপর খুব অভিমান করতাম। মাঝে মাঝে আমি আপনার কাছে মিথ্যা মিথ্যা চিঠি লিখতাম আবার ছিরে ফেলতাম। কেন জানি মনে হত, আপনাকে আমার খুব দরকার। কলেজের ভরতির দিন প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এমন সময় আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সবাইতো আপনাকে চিনে। আর সবাই আপনাকে যে মানে এটা আমি জানতাম। আমি কম্পিউটারে কম্পোজ করে প্রিন্সিপ্যালের নামে একটা চিঠি লিখলাম আপনার নাম দিয়ে। যেখানে বলা ছিল যে, একজন ছাত্রীকে পাঠালাম, আপনার কলেজে ভর্তি করিয়ে নেবেন। বিস্তারিত পরে আলাপ  ইতি আপনার নাম।  

মধুর ন্যায় চিঠিটা কাজে লাগলো। আমি তো অবাক। প্রিন্সিপ্যাল সাহেব শুধু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি আপনাকে কেমন করে চিনি। আমি বেশি কথা না বলে শুধু বললাম, আমি তার আত্মীয়। ঠিক ঐ মুহূর্তে আমি যেন তার কাছে অতি ভক্তির একজন লোক হয়ে গেলাম। আমার ভর্তি হয়ে গেলো। মনটা তৃপ্তিতে ভরে উঠল, আমাদের পরিবারের কেউ জানল না যে আমার কলেজে ভর্তির সব কিছু হয়ে গেছে।

এতদিন যে অভিমান তা আপনার উপর আমার ছিল আজ যেন তা এক ভালবাসায় রূপ নিল। আমার বড্ড ভাল কাটল দিনের বাকি অংশটা। একটা মানুষের মিথ্যা এক খানা চিঠি এতো কাজ করে, তা আমার জানা ছিল না। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করল না আসলেই এই চিঠি তার লেখা কিনা। হয়ত কারো মাথায় এটা আসেই না যে, কেউ তার নামে মিথ্যা একটা পত্র নিয়ে এমন জালিয়াতি করতে পারে। আর হতেও তো পারে চিঠিটি অনিই লিখেছে। জিজ্ঞেস করলে যদি আবার তিনি মনে কিছু করেন, তাই হয়ত কেউ জিজ্ঞেস করার সাহসই হয় নাই। কিন্তু ব্যাপারটা ঘটলো।

কলেজ শুরু হতে হতে কয়েক মাস বাকি। এরমধ্যে আমি কদিন পরপরই বিয়ের সাজে বসি আর আমার সাধ্যমত বিয়ে ঠেকাই। কখনো কান্নাকাটি করে, কখনো বাড়ি থেকে পালিয়ে, আবার কখনো অত্যন্ত বাজে ব্যবহার করে আবার কখনো বড় কে নাজেহাল করে। কি যে এক পরিস্থিতি আমার। এরই মধ্যে গ্রামে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। আমাদের বাড়ীর পাশে প্রিয়াংকা নামের একটি মেয়েকে জোর করে বিয়েতে রাজি করানোর কারনে রাতে কাউকে না বলে সে আত্মাহুতি দিয়ে লিখে গেলো, ……আমি পরতে চেয়েছিলাম, আর তোমরা আমাকে পরতে না দিয়ে বিয়ে দিতে চেয়েছিলে। আমিই যদি ভাল না থাকি তাহলে আমার বিয়ে দিয়ে তোমরা কি সুখে থাকবে? তাই আমি তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে একেবারে সবার থেকে দূরে চলে গেলাম। তোমরা ভাল থেক। তোমরা আমাকে কেউ ভালবাসনি।”

ঘটনাটা গ্রামের চারিদিকে এতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে, আমি এই ফাকে কিছুদিন যত পদের বিয়ের আয়োজন ছিল তা বন্ধ রইল। শুধু তাই নয়, গ্রামে একটার পর একটা যুবতি মেয়েদের সংসার শুধু ভাঙতে শুরু করল। কেউ স্বামীর অত্যাচারে, কেউ যৌতুকের অত্যাচারে, কেউ শ্বশুর বাড়ীর অত্যাচারে, কেউ অন্য কারনে। আমার ক্লাসে পরত এমন চেনা কয়েক জন স্বামীর ঘর ছেড়ে একেবারে বাপের আগের আস্তানায় ফিরে এল। কেউ সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে কেউ আবার একা। বাল্য বিবাহের অনেক দোষ। কনে জানে না কি করে সংসার রক্ষা করতে হয় আবার বরের পক্ষ জানে না এই নিষ্পাপ কনেকে কিভাবে নিজের বাড়ীতে নতুন একজন আদুরে সদস্য করে মানিয়ে নিতে হয়। কেউ ছাড় দেয় না।

আমি আমার কলেজের পরাশুনা চালাতে লাগলাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার শুরু হল, সেই পুরানো উপদ্রব। বিয়ে কর আর বিয়ে কর। আমি এই বিয়ে নামক ঘটনাটা আমার মাথায় একটা বিষ ফোড়ার মত ঘুরতে লাগলো। বিয়ে জিনিস টা আমার কাছে এখন আতঙ্কের মত মনে হতে লাগলো। কি হবে এ রকম বিয়ে করে যেখানে একটা মেয়ে তার নিজের কোন দাম নাই, তার নিজস্ব কোন সত্তা নাই? 

বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমি এইবার লাগামহীন ভাবে শক্ত হয়ে গেলাম। আমি বিয়ে করব না, আমি জীবনেও বিয়ে করব না এই প্রতিজ্ঞা সবাইকে জানিয়ে দিলাম। আর মনে মনে ভাবলাম, আমি আসলেই বিয়ে করব না।

পরীক্ষার ঠিক কয়েকদিন আগে আমার বড় জ্যাঠা আমাকে এইবার বিয়ে দিয়েই ছারবেন বলে মনঃস্থির করলেন। বাবাকে খুব অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করলেন। বাড়ীর অন্যান্য মানুষগুলো যেন শিকা ছিরে দই পরলে যেমন কুকুর আনন্দ করে ঠিক তার মত মনে হল। আমি ঠায় আমার রুমে দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম। আমি কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম ঠিক বুঝতে পারি নাই। হটাত একটা অদ্ভুত শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। দরজার খিল খুলতেই দেখি আমার জ্যাঠা, কাকি, মামি সবাই দরজার সামনে দাড়িয়ে। কাজি এসেছে, আজকেই আমার বিয়ে। আমার আর কোন কিছুই সয্য হচ্ছিল না। নিপীড়নের একটা সিমা থাকে। ওরা সবাই অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে।

কিছুই বললাম না। আমি জানি এখন আমার কথা কেউ শুনবে না। বাড়ীতে বিয়ের সরঞ্জামাদি চলতে থাকল, পান পাতা দিয়ে ঢালি সাজানো হল, মাছ, দাব, ফল মুল কত কিছু সব তৈরি করা হল। আমি জানি না কে আমার বড়, কোথায় আমার বিয়ে, ছেলে কি করে। আমাকে কোরবানির পশুর মত ঝাপ্টে ধরে গায়ে হলুদের জায়গায় নিয়ে বসান হল। আমার গায়ে হলুদ হয়ে গেলো। সারা শরীরে হলুদের গন্ধ। মনে হচ্ছে মরা মানুষের গায়ে থেকে যেমন গন্ধ আসে, আমার গায়ে হলুদের গন্দে যেন আমার তাই মনে হচ্ছিল। প্রতিটি মুহূর্তে আমি আমার জীবনের কি হতে যাচ্ছে তা কল্পনা করেও কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। আর ভাবছিলাম কি করে এখান থেকে পালানো যায়। আমি শান্ত হয়ে বসে ছিলাম কিন্তু ভিতরে আমার অশান্ত ঝড় চলছে। আমাকে শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে বাড়ীর সবাই মনে করল, আজ আমার কোন সমস্যা নাই। আমি সব কিছুতেই সহজ করে মেনে নিয়েছি। আর এই সুযোগ টাই আমি নিতে চেয়েছিলাম। আমি বিয়ের আসর থেকে পলাইলাম।

আমার কেউ নাই। কোথায় যাব, কার কাছে যাব। শেষ পর্যন্ত আমি আমার নানিদের বাসায় নানিকে আমার সমস্ত কষ্টের কথা বললাম। নানি আমাকে তাদের ছোট একটা জায়গায় সারাদিন বন্দি থাকতে বললেন আর আমিও তাই করলাম। ছেলেপক্ষ মেয়েকে না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, অনেক আজেবাজে অপবাদ দিয়ে, চরিত্রের সবগুলো কালিমা লেপন করে যা মনে আসে তাইই বলে একেবারে বিদায় নিলেন। আমি পনের দিন পর ঐ গোপন আস্তানা থেকে বের হলাম। কোথায় ছিলাম, কার সঙ্গে পালিয়েছি, কেমন করে পালিয়েছি তার অনেক বিস্তারিত ইতিহাস অনেকেই জানতে চাইলেও আমি আর ঐসব নিয়ে কথা বলার কোন রুচি মনে করি নাই।

কোন রকমে কলেজ পাশ করেছি। এইবার তো আমার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির পালা। কিন্তু এটা তো আর আমাদের গ্রামের কলেজের মত নয় যে আবারো আমি আপনার নাম ভাঙ্গিয়ে সরাসরি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাব। এটা আমার জন্য বিশাল পাহারের মত মনে হল। কাউকেই কিছু বলার অবকাশ নাই, কেউ যে আমাকে একটা উপদেশ দিবে সেই মানুষটিও নাই। অথচ আমার কাউকে খুব দরকার। তারপরেও মনে হল, আপনাকে আমি খুজে বের করবই। আপনিই পারবেন এখন আমাকে এই স্থূল এবং বিরাটকায় সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু কোথায় আপনি?

ভাগ্য যখন সুপ্রসন্ন হয়, ভাগ্যদেবি তখন ঘরে পদার্পণ করে। কি আশ্চর্য, গ্রামের চারিদিকে একটা খবর ব্রেকিং নিউজের মত ছরিয়ে পড়ল। আপনি গ্রামে আসবেন। গ্রামের কার কি লাভ হবে আমি জানি না, কিন্তু আমি ঈশ্বরকে এই বলে কত যে প্রনাম করলাম যে, এইবার আমি আপনার সঙ্গে দেখা হবেই।

আপনি আমাদের গ্রামে এলেন এবং খুব ঘটা করেই এলেন। চারিদিকে পোস্টার, চারিদিকে চিঠি বিলি, আপনি আসছেন। গ্রামের কত লোক যে আপনার আসার অপেক্ষায় আছে। কেউ অপেক্ষায় আছে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য, কেউ অপেক্ষায় আছে রাজনৈতিক লাভের জন্য, কেউ অপেক্ষায় আছে শুধু আপনাকে ভালবাসে বলে। আমিও তাদের মধ্যে একজন। মনে হল, আমি আপনাকে কত যুগ ধরে চিনি, কত কাছ থেকে চিনি অথচ আপনি আমাকে কখনো মনেও রাখেন নাই।

আপনি এলেন। সঙ্গে কত লোক আপনার। সারিসারি গাড়ি। কেউ নোট বই, কেউ ছাতা ধরা, কেউ আবার আপনার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য এক মুহূর্ত অপেক্ষা। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি ঐ সভাস্থলে। কখন আমি আপনাকে পাই।

আপনার কাজ শেষ। খাওয়া দাওয়া শেষ। আমার বুকের ভিতর কম্পন হচ্ছিল এই বুঝি আমি এতদিনের অপেক্ষার পালাটাকে হারিয়ে ফেলতেছি। আমার বুকে তখন দুরুদুরু কম্পন কিন্তু আমাকে যে পারতেই হবে। সাহস করে আমি আপনার একেবারে কাছে চলে এলাম। আপনি আমাকে দেখলেন। কাছে ডাকলেন। আমার বুক তখন ভুমি কম্পনের মত কাপছে।

আনার চোখে চোখে আমার চোখ পড়ল। আমি মুষড়ে যেতে থাকলাম। আপনি জান্তেও পারলেন না আমার ভিতরে কত বেগে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। আমার দিকে কিছুক্ষ তাকিয়ে থেকে নিজ থেকেই আমাকে ডেকে বললেন, কোথায় যেন আমি তোমাকে দেখেছিলাম?

আমার দুচোখ ভরে শুধু পানি শ্রাবনের ধারার মত ঝরতে লাগলো। আমি বললাম, আমি আপনার অমুক চাচার মেয়ে।

ও আচ্ছা, হ্যা তুমি তো একবার আমার কাছে গিয়েছিলে? কি করছ এখন? কোথায় পরাশুনা করছ? আর তুমি কাদছ কেন?

আমি শুধু কম্পিত গলায় এইটুকু বলতে পেরেছিলাম, আমি পরতে চাই, আমি বিয়ে করতে চাই না। অসংখ্য মানুষের ভিরে আমি কি বলেছি আর কি বলতে চেয়েছি, আমার মনে নাই। অনেক বার আমি বাড়ীতে একা একা কি বলব তা নিজে থেকে অনুশিলনও করেছিলাম কিন্তু সেই অনুশিলন কিছুই কাজে লাগে নাই আপনার সামনে এসে। সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। আমি মাথা নিচু করেছিলাম। বুদ্ধিমান মানুষদের সবকথা বলতে হয় না। আপনি এই দুই কথায় আমার অনেক কথার উত্তর যেন পেয়ে গেলেন। আপনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ঠিক আছে, আমি তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব। আপনি আমাকে আপনার ফোন নাম্বারটা দিলেন। কি অদ্ভুদ আমার শিহরন। আমার মনে হয়েছিল, আমাকে আজ পর্যন্ত এই ভাবে কেউ ছুয়ে দেয় নাই। আমাকে আজ অবধি কেউ বলে নাই, ঠিক আছে আমি তোমার কথা শুনব। আজ মনে হল, আপনি আমাকে ছুয়ে দিয়েছেন, আমাকে আদর করেছেন, আমাকে শুনবেন এই আশ্বাস দিয়েছেন। একটা ফোন নাম্বার আর কিছুই না। আমি আপনার ফোন নাম্বার টা যে কতবার লিখেছি, আপনার নাম টা যে আমি কতবার লিখেছি। আমি সেই রাতে ঘুমুতে পারি নাই। শুধু আমার কাছে ঐ যে শিহরন, ঐ যে স্পর্শ, ঐযে চোখের চাহনি, আমাকে অনেক অনেক রাত অবধি জাগিয়ে রেখেছিল। আমি কি আপনাকে ভালবাসি? আমি কি আপনাকে দেবতা বলে জানি? আমি কি কারনে আপনাকে এক মুহূর্তে জন্য ও ভুলতে পারছি না? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? আমি কি কোন অলিক কিছু ভাবছি? আমার বাবা মা, জ্যাঠা, গ্রামের অনেকেই আমার এই অসভ্যতা পছন্দ করে নাই। আমাকে টার জন্য অনেক যন্ত্রনা সজ্য করতে হয়েছে বেশ কয়েকদিন। গ্রামের মানুষ অন্য সব কিছু ফেলে দিয়ে যেন আমার এই ঘটনাতাই আলাপের বস্তু হয়ে দারিয়েছিল। আমি তাতে কিছুই মনে করি নাই। পৃথিবীতে এতো মানুষ, চারিদিকে এতো জন মুখর পরিবেশ, কিন্তু কাউকে কিছু বলবার মত মানুষ পাওয়া বড়ই দায়।

আমি আপনার ফোন নাম্বার পেয়েছি কিন্তু আমার কোন ফোন নাই। তাই আমি একদিন অনেক সাহস করে পাশে বাজারের এক ফনের দোকান থেকে আপনার নাম্বারে আমি ফোন দিলাম। আমি জানি না ঐ সময়ে আপনাকে ফোন দেওয়া ঠিক ছিল কিনা। অনেক্ষন রিং হল কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ আমার ফোনটা ধরল না। মনে মনে একটা কি ধরনের যেন ভয়-কম্পিত অনুভুতি কাজ করছিল আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু ফোনটা না ধরাতে আবার মনে হল, ভালই হয়েছে।

তারপরের দিন আবার আমি আপনাকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আপনি এবারও ফোন ধরলেন না। প্রথমদিন ফোন না ধরাতে বিশেষ কিছু মনে হয়নি কিন্তু দ্বিতীয় দিন ফোন না ধরাতে আমার কাছে ব্যাপারটায় একটু খটকা লেগেছিল। আমি আবারো ফোন দিয়েছিলাম। অনবরত রিং হচ্ছে কিন্তু পাশে কি কেউ নাই যে ফোনটা ধরে?

এইভাবে আমি আপনাকে দিনের পর দিন অন্তত প্রতিদিন একবার করে ফোন করতে লাগলাম আর বিফল মনোরথে বাড়ীতে ফিরে এলাম। বাজারের ফোনের দোকানদারও একটু বিরক্ত হতে শুরু করলেন। কাকে ফোন দিচ্ছেন যে ফোন ধরে না সে? আমি দোকানদারকে কিছুই বলতে চাইনি কাকে ফোন দিচ্ছি। কারন নাম বললেই দোকানদার তাঁকে চিন্তে পারবে।

এমন করে প্রায় দু সপ্তাহ পার হয়ে গেলো। একদিন দোকানদার আমাকে একটা পরামর্শ দিলেন।

‘দেখুন, এমনও হতে পারে যে তিনি অপরিচিত নাম্বার ধরেন না। তার থেকে একটা এসএমএস করে দিন। ধরলেও ধরতে পারে।

ব্যাপারটা খুব কাজে লাগলো। আমি সংক্ষিপ্ত একটা এসএমএস দিলাম, “আমি সন্ধ্যা, অমুক চাচার মেয়ে”।

ম্যাসেজটা বুলেটের মত কাজ করল। ঠিক কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনি আমাকে ফোন করলেন ঐ বাজারের নাম্বারে। আমি আপনার ফোন পেয়ে আত্তহারা হয়ে গেলাম। এই যে গত কয়েকদিন আমি আপনাকে চেষ্টা করেও পাচ্ছিলাম না, তার সবগুলো কষ্ট আমার এক নিমিষের মধ্যে শেষ হয়ে গেলো।

মনে হল আপনি ব্যাস্ত ছিলেন। আমাকে শুধু বললেন, আগামি অমুক দিন তুমি আমার অফিসে এতটার মধ্যে চলে আস। আমি থাকবো।

আমি আপনার অফিস চিনি। কিন্তু জানি নাই কখন আপনি অফিসে থাকেন। এবার আর মিস হবে না আমি জানি। আমার চিত্ত বিকশিত হয়ে উঠল। দোকানদারকে আমি অনেক অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ভাই, অনেক উপকার করলেন।

আমার আর দিন কাটে না, রাত কাটে না। কবে আসবে সেইদিন। আমি যাব আপনার কাছে। দেখা হবে আপনার সাথে। কথা হবে মুখুমুখি বসে। আমার যত কথা, সব বলব আপনাকে। পারবো তো? (চলবে)

নির্দিষ্ট দিনটি অবশেষে এলো। খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেছি। আকাশটা আমার মনের মতো ফুরফুরা নয়, একটু মেঘলা। যে কনো সময় ঝুপ করে বৃষ্টি হতে পারে। আমি আমার সব গুলি কাজ যথাসময়ে শেষ করে কাউকে কিছুই না বলে নিজের মতো করে সকাল সকালই বের হয়ে গেলাম। ছাতাটি সঙ্গে নিতে চেয়েছিলাম কিন্তু যখন পুনরায় মনে হলো, তখন আমি বাড়ী থেকে অনেক দূর হেটে চলে এসেছি। ফিরে গেলে হয়ত দেরী হয়ে যাবে এই আশঙ্কায় আর ছাতার জন্য ফেরা হল না।

প্রায় আধাঘন্টা ধরে আমি একটা রিক্সায় চড়ে আমি আপনার অফিসের সামনে এলাম। আজ আর আপনাকে না পাওয়ার আশংকা আমার ছিলো না। আমি আজ আপনাকে পাবো, সেটা আমার মন নিশ্চিত ছিলো। আমি আপনার অফিসের গেটে …………(চলবে)

৬/৫/২০১৬-রুনার গল্প 

সেদিন সমস্ত দিন বাহিরে ঝড় বৃষ্টি হইতেছিল। কিন্তু বিকালে আকাশ বড় পরিস্কার নীলদিগন্ত লইয়া, পৃথিবী তাহার সবুজ গাছপালার ঢালপালা সাজাইয়া খুব শান্ত হইয়া বসিয়াছিল। এই ঋতুতে কখন আকাশ মেঘলা হইয়া যায় আবার কখন ঝরঝর করিয়া আগাম কোন সংকেত না দিয়া অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়, তাহার কোন হদিস থাকে না যদিও আজ এই পরন্ত বিকালে কোন সংকেতবিহিন এইরূপ অঘটন ঘটিবে বলিয়া মনে হইতেছে না।   

এমনি এক বিকালে "সুখালয়" এর প্রকান্ড বাড়িটার সামনে সবুজ লনের মধ্যে মা শেলি আর তার অষ্টাদশী রুনা চুপচাপ বসিয়া আছে। কাহারো মুখে কোন কথা নাই। অনেক্ষন ধরিয়াই শেলি কোন কথা না বলিয়া দুরের আকাশের দিকে আনমনে তাকাইয়া কি যেন গভিরভাবে ভাবিতেছে তাহার মুখ দেখিয়া তাহা বুঝিবার উপায় নাই। তবে তাহার মনটা যে বড় বিষণ্ণ এ ব্যাপারে নিশ্চিত করিয়া বলা যায়। পাশেই একটা মেলামিনের কাপে গরম কিছু চা লইয়া তারই অষ্টাদশী চঞ্চলা রুনা মায়ের কথা শুনিবার জন্য বসিয়া আছে। তাহারও মন খুব একটা শান্ত কিংবা চঞ্চলা কিনা বুঝা যাইতেছে না। তবে দুইজনের মনের অবস্থা নিরিক্ষা করিয়া এইটুকুন উপলব্ধি করা যায় যে, কোন এক ঝড়ের পূর্বের থমথমে মেঘময় নীলিমার মত, অথবা ঝড়ের প্রাক্কালে বাতাসেরা যেমন তাহাদের পরবর্তী গতিপথের নিশানা ঠিক করিবার জন্য শল্য পরামর্শ করার তাগিদে একেবারে নিসচুপ হইয়া যায়, অথবা ভুতলের সব বৃক্ষরাজিরা ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার লক্ষে পূর্বপ্রস্তুতিমুলক যতসব কার্যপ্রণালী আছে তাহার ব্যাপক আয়োজন চালায়, ঠিক ঐ রকম একটা থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হইয়াছে।   

রুনা শেলির একমাত্র মেয়ে। বড় চঞ্চল এক চপলা কিশোরী। কিন্তু পিতার অভাবে বড় আদুরের রুনাকে শেলি কখনো কোন কষ্টের ভার নিতে দেয় নাই। এই সমাজ সংসারে যাহা কিছু সম্মান আর আনন্দের সহিত ভোগ করা যায়, তাহার কোনকিছুই শেলি রুনার জন্য কমতি রাখে নাই। একইসঙ্গে শেলি রুনার মা এবং বাবার দায়িত্ব পালনে কখনো ব্যর্থ হন নাই। ভাল স্কুল, দামী গাড়ি, প্রকান্ড বাড়ি, সুন্দর সুন্দর পোশাক-আসাকে শেলি রুনার জীবন একেবারে ভরিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু আজ শেলি রুনার কাছে বড় অসহায়। তাহার অষ্টাদশী রুনা আজ শেলিকে এমন কিছুর সামনে আনিয়া দাঁড় করাইয়াছে যেখানে শেলি না পারিতেছে তাহার অতীত জিবনের কাহিনী শুনাইতে, না পারিতেছে তাহার সেই অতীত কাহিনী কোনভাবে লুকাইতে। রুনা পন করিয়াছে, সে তাহার পূর্বপুরুষের ইতিহাস, বিশেষ করিয়া তাহার জন্মদাতা পিতা, পিতামহির কথা তাহাকে জানাইতেই হইবে। না জানিতে পারিলে তাহার এই সমাজে এই সংসারে থাকিবার মত আর কোন গতিও নাই, কাহারো কাছে তাহার মুখ দেখাইবার মত পরিস্থিতিও নাই। আর তাহা না হইলে অচিরেই হয়ত রুনা তাহার যাহা আছে সব কিছু ছারিয়া অন্য কোথাও মুখ লুকাইয়া বাচিয়া যাইবে। এমন একটা পরিবেশে শেলির কাছে সমস্ত মানবজীবন আর বিশ্বরচনা এক দুর্ভেদ্য বলিয়া মনে হইতে লাগিল। কি দিয়া কোথা হইতে কি শুরু করিবে আর কোথায় গিয়া তাহার এই দুর্ভেদ্য রচনা শেষ করিবে, তাহার আগাগোরা কিছুই শেলির মাথায় আসিতেছিল না। 

চায়ের কাপে চুমু দিতে দিতে রুনা মায়ের দিকে কয়েকবার আড় চোখে তাকাইল। মায়ের এই অতিব নিসচুপ বৈশিষ্ট রুনার কাছে আজ প্রথম নয়। মাকে যখন হইতে রুনা বুঝিতে শিখিয়াছে, তখন হইতেই সে দেখিয়াছে তিনি কোথাও বেড়াইতে যান না, তাহার কোন একান্ত বন্ধু বা বান্ধবি আছে তাহাও না, কাহারো সঙ্গে মা খুব একটা মিশেনও না। চাপরাশি, আর্দালি, পিয়ন সবাই যার যার কাজ করিয়া দিয়া যায়, এত বড় ব্যবসার কোথায় কি হইতেছে তাহার প্রতিদিনের হিসাব মা না রাখিলেও ব্যবসা যে ঠিকমতই চলিতেছে মা তাহার হিসাব হয়ত রাখেন। দিনের অধিকাংশ সময়ে মা ঘরেই থাকেন, শুধুমাত্র বিকালে একবার পারভিনের মাকে লইয়া ছাদের ঐ চিলে কোঠায় উঠিয়া বিশাল আকাশের দিকে তাকাইয়া শুধু সূর্যাস্ত দেখেন। এই সময় মায়ের সঙ্গে শুধু পারভিনের মা তাহার একান্ত সঙ্গিনী, আর কাউকেই মা তাহার কাছে রাখিতে পছন্দ করেন না। পারভিনের মা আমাদের বাড়ীতে অনেককাল ধরিয়া আছে, তখনো পারভিনের জন্ম হয় নাই। এখন পারভিন তাহার সংসার লইয়া অনেক দুরের এক শহরে স্বামীর সংসার করিতেছে। পারভিনের বাবাকেও আমি কখনো দেখি নাই। কোন এক অজ্ঞাত কারনে তিনি নিখোঁজ হইয়া রহিয়াছে। এইটুকুই আমি জানি। আমি আমার বাবাকেও দেখি নাই। যতবার মাকে জিজ্ঞসা করিয়াছি, মা কোন না কোনভাবে তাহা এরাইয়া গিয়াছেন। খুব বেশি পিড়াপীড়ি করিলে হয়ত তিনি "তোঁর বাবাকে আমি ..." এইটুকু বলিয়াই অন্য কোন এক প্রসঙ্গ টানিয়া আনিতেন। আমার বাবা কি জিবিত আছেন না মারা গিয়াছেন, তাহার কোন সদুত্তর আমার এখনো জানা নাই। মাকে আমি কখনো বিধবার মত শাড়ি পরিতে দেখি নাই, মাকে আমি বাবার কোন মৃত্যুবার্ষিকী পালন করিতেও দেখি নাই। আমি মাকে কখনো বাবার প্রসঙ্গে কোন কথা বলিতেও দেখি নাই। কি হইয়াছে তাহলে আমার বাবার? আমাদের সারা বাড়ীতে বাবার কিংবা দাদাদাদির কোন একটা ছবিও নাই। আমার মা সবার হইতে এমন আলাদা এক জগত লইয়া যেন বসবাস করিতেছেন। অথচ তিনি এই সমাজেরই একজন অতি গনমান্য মানুষদের মধ্যে একজন। অনেক মানুষের তিনি অসময়ের বন্ধুও বটে।  

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমার মা এত উদাসিন কেন? কি নাই তাহার? বাড়ি, গাড়ি, মানসম্মান, প্রতিপত্তি, যশ, টাকাপয়সা, ব্যবসা-বানিজ্য, সবই আছে তাহার। এই বয়সেও তিনি অনেক সুন্দরি মায়েদের থেকে অধিকতর সুন্দর।  অনেক দামী শাড়ি হয়ত পরেন না কিন্তু দামী শাড়ি পড়িবার জন্য তাহার আয়েরও কোন কমতি নাই। আজ আমি মাকে বড় ভয় পাইতেছি। কারন আমি মাকে এমন কিছু কথা শুনাইয়া দিয়াছি, হয় মা আমাকে ছারিবেন, না হয় আমি মাকে ছারিব। কিন্তু আমাকে আমার পরিবারের ইতিহাস শুনাইতেই হইবে। তাহা না হইলে আমি কি করিয়া ঐ অপূর্বের বাসায় আমার বংশপরিচয় দেব? আমি তো অপূর্বকে ভালবাসি। আমার বারংবার শুধু এই কথা মনে করিয়া ভয় হইতেছিল যে, মা কি আমাকে এমন কিছু বলিবার জন্য প্রস্তুত যাহা আমি শুনিবার জন্য প্রস্তুত নই? ভয় যখন মানুষের উপর ভর করে, তখন তাহার রক্তের শিরায় শিরায় এক অজানা শিহরন তোলে, মনে হয় বুকের ভিতর কি যেন নাই, বা কি যেন দ্রুত হারাইয়া যাইতেছে। মাথা ভনভন করিতে থাকে, স্বাভাবিক আচরন আর স্বাভাবিক মনে হয় না। 

মা নিরবতা ভাঙ্গিয়া আমার দিকে তাকাইয়া একটু মুচকি হাসিয়া আমার কাছে একটু আগাইয়া আসিয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন আর বলিলেন, 'তুমি অপূর্বকে ভালবাস?'

আমি বলিলাম, হ্যা, আমি অপূর্বকে ভালবাসি মা।

-অপূর্ব কি তোমাকে ভালবাসে?

আমিও মাকে জড়াইয়া ধরিয়া হাতের কাপটি মাটিতে রাখিয়া শুধুমাত্র ঘাড় নাড়াইয়া এই বলিয়া সংকেত দিলাম যে, মা যাহা জানিতে চাহিয়াছেন, তাহা সত্য এবং ইহার বাহিরে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। 

মা আমাকে এইবার তাহার বাহুবল হইতে ছাড়িয়া তাহার চেয়ারে হেলান দিয়া জিজ্ঞেস করিলেন, 'রুনা মা, তুমি আমার কাছ হইতে কি জানিতে চাও?'

বুঝিলাম, শতবার এরাইয়া যাওয়ার যে উত্তর আমি জানিতে চাহিয়াছিলাম, আজ মা তাহার সব উত্তর দিতে হয়ত নিজেকে প্রস্তুত করিয়া আমার সামনে হাজির হইয়াছেন। আজ হয়ত তিনি কোন কিছুই এরাইয়া যাইবেন না। হয়ত অন্যদিনের মত বলিবেন না যে, ;আমি তোঁর বাবা...' ইত্যাদি। 

-মা, আমি আমার পরিবারের ইতিহাস জানিতে চাই। আমি আমার পূর্বপুরুষের ইতিহাস জানিতে চাই, আমি আমার বাবার ইতিহাস জানিতে চাই। কথাগুলি বলিতে আমার বুক কাপিতেছিল, আমার হাত কাপিতেছিল, আমার গলা ধরিয়া আসিতেছিল। আমি স্বাভাবিক নই এখন আমার মায়ের সামনে। অথচ এই মা আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাহাকে আমি কোন কিছুই বলিতে সংকোচবোধ করি না। কিন্তু আজ আমার অনেক ভয় করিতে লাগিল। 

মা অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাহার দুইখানা হাত তাহার বিসন্ন মুখে একবার বুলাইয়া চোখের চশমাটা খুলিয়া শাড়ীর আচল দিয়া মুছিতে মুছিতে দূর আকাশের দিকে তাকাইয়া শুধু বলিলেন,-'মানুষের অনেক পুরানো ইতিহাস না জানাই বর্তমান সময়ের জন্য মঙ্গলকর, তারপরেও যদি কেহ তাহা জানিতে পন করিয়া বসে, তাহা হইলে তাহাকে তাহার অতীত জীবনের সত্যের মুখুমুখি দারাইবার যে জীবনীশক্তি দরকার, তাহা আছে কিনা জানা খুবই প্রয়োজন। তাহা না হইলে বর্তমানকে মানিয়া লইয়া বাচিয়া থাকিবার যে অনুশোচনা তৈরি হইবে তাহার থেকে পরিত্রান পাওয়া বড়ই দুস্কর। আমি তোমাকে এই উভয় সংকট পরিস্থিতে ফেলিতে চাহি নাই। তারপরেও যখন তুমি এতটাই পন করিয়া বসিয়া আছ, তোমার জীবনের কাহিনী তোমাকে আজ আমি শুনাইব। জানিতে পারা আর মানিয়া লইতে পারা সব তোমার উপর নির্ভর করে'। 

আমার বড় ভয় করিতে লাগিল। 

-আজ হইতে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমি তোমার মতই একজন চঞ্চলা যুবতি মেয়ে ছিলাম। কত হইবে আমার বয়স তখন? হয়তবা বাইশ কিংবা তেইশ। আমাদের গ্রামে তখনো বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল। অনেক চরাইউৎরাই পার হইয়া সেই অজপারাগায়ের সমস্ত বাল্যবিবাহের আইন কানুন ভাঙ্গিয়া আমি সবেমাত্র ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইয়াছি। গ্রামে আমার বাবা অতি ধনি না হইলেও আমরা দরিদ্র ছিলাম না। আমরা তিনবোন, একভাই আর মাকে লইয়া আমার বাবা বেশ ভালই জীবনযাপন করিতেছিলেন। স্কুলের গন্ডি হইতে শুরু করিয়া ঐ ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত আসিতে আমি অনেকবার বিবাহের সম্বন্ধ লইয়া অনেক পেরেশানিতে ভুগিয়াছি। দাদা দাদির ধমক হইতে শুরু করিয়া, জ্যাঠা জ্যাঠির, ফুফা ফুফির সবারই কম বেশি ধমক আর মানসিক নির্যাতন খাইয়াছি। কিন্তু আমার বাবা আমার মনের ইচ্ছার কথা জানিতেন। তাহার হয়ত অনেক সাহস ছিল না কিন্তু তিনি আমাদের সব ভাইবোনদের মধ্যে আমাকে বিশেষ নজরে দেখিতেন বলিয়া আমার ইচ্ছার বাহিরে কখনো মতামত দেন নাই। বিশেষ করিয়া আমার বিবাহের বেলায় তো কখনই জোরাজোরি করেন নাই। গ্রামের পঞ্চায়েত, মুরিব্বিগন, এমন কি আমার দাদা দাদিদের কাছেও আমার বাবাকে আমার এই বিবাহ লইয়া অনেক কঠোর কথা শুনিতে হইয়াছিল। তখন সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হইয়াছে, ফলে দেশে খুব একটা আইন শৃঙ্খলা নাই এবং একটা অরাজকতার বিশৃঙ্খলা বিরাজ করিতেছিল। যাহারা দেশ স্বাধীন করিয়া জীবিত ফিরিয়া আসিয়াছে, তাহাদের হইতেই এখন আমাদের সবচেয়ে বিপদের আশংকা বেশি মনে হইতেছিল। কোন এক অমাবশ্যার রাতে আমাদের গ্রামের নদীর ধারে আমার বাবার মৃত দেহখানি পাওয়া গেল।' কে বা কাহারা এই হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত ছিল তাহা আজো অবধি তাহার কোন কূলকিনারা হয় নাই।  

এই বলিয়া মা কিছুক্ষন চুপ করিয়া থাকিলেন। আমার এতক্ষন যে ভয়টা আমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়াছিল, তাহা আরও বেশি করিয়া চাপিয়া ধরিল। আমি কি কোন লোমহর্ষক ইতিহাস শুনিতে যাইতেছি? নাকি কোন এক রূপকথার গল্প শুনিতে যাইতেছি? ইহার পরে কি শুনিব যে আমার বাবাও আমার দাদার মত কোন এক অমাবশ্যার রাতে খুন হইয়া লাশ হইয়া গিয়াছিল? আমার শরীর হিম হইয়া আসিতে লাগিল। 

মা বলিতে শুরু করিলেন, 'জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হইল, সে একদিন মরিবেই। বিধাতাকে কেহ মানুক আর নাইবা মানুক, বিধাতা মানুষের জন্মের দ্বারা একটা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন, আর তাহা হইল, সে একদিন এই সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করিয়া, সমস্ত লোভ লালসা পিছনে রাখিয়া, সমস্ত ধন দৌলত হাত হইতে ছাড়িয়া দিয়া একা একা নিঃসঙ্গভাবে সবার চোখ হইতে চিরতরে আড়াল হইয়া যাইবেই। সময়টা হয়ত কারো শতবছর পর আবার কারো তারও আগে। কয়েকদিন অতি প্রিয়জনেরা তাহাকে লইয়া কান্নাকাটি করিবেন বটে কিন্তু সময়ের স্রোতে একদিন সব বিবর্ণ হইয়া কালের অতল গভীরে হারাইয়া যাইবে। তাহাকে আর কোথাও খুজিয়া পাওয়া যাইবে না। না তাহার উত্তরসূরিদের কণ্ঠে, না পূর্বসূরিদের। ইহাই এই জীবনের তথা পৃথিবীর সরল সমিকরন। বাবার মৃত্যুর পর আমাদের সংসারটায় যেন অকস্মাৎ ছাদ ভাঙ্গিয়া মাথায় পড়িল।  তিন বোন, এক ছোট ভাই আর মাকে লইয়া আমি যেন দেখিতে পাইলাম, এতদিন যাহারা বিনা দ্বিধায় আমাদের পরিবারে অন্নগ্রাস করিত, আজ তাহারা তাহাদের নিজ নিজ স্বার্থ লইয়া অতিশয় ব্যস্ত, দাদার সম্পত্তি লইয়া ভাগ বাটোয়ারা করিতে চারিদিকে পাঁয়তারাসমেত গোপনে একা কিংবা প্রকাশ্যে দল বাধিয়া শল্যপরামর্শ করিতেছে। পরিশেষে আমাদের ভাগ্যে যাহা জুটিল তাহা দিয়া আর যাহাই হোক, আমাদের লেখাপড়া, সংসার খরচ চলিতে পারে না। আমার মা হিমশিম খাইয়া দিশেহারা হইয়া দিক্বিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন। আর এরই মধ্যে আরও একটা নব্য উৎপাত শুরু হইল। আমার বিবাহের সম্বন্ধ পাকাপাকি করা। আমার দাদা দাদিরা, ফুফা ফুফিরা, সবাই শক্ত করিয়া আমাদের কি প্রকারে বিশেষ উপকার করা যায় তাহার বুদ্ধি বাহির করিতে লাগিল। ফলশ্রুতিতে যাহা দারাইল, তাহা হইল, সবাই এবার আমার মাকে ঝাঁকিয়া ধরিল যে, এত লেখাপড়া করাইয়া কে কবে কোন লাট সাহেবের বউ হইয়াছিল? ধীরে ধীরে একে একে আমাদের সবার বিবাহ সম্বন্ধ ঠিক করিবার জন্য দিনের পর দিন মানসিকভাবে চাপের মুখে পরিতে হইল। আমরা যেন আর অধিক চাপ বহন করিবার মত শক্তি পাইতেছিলাম না।  

কোন উপায়ন্তর না দেখিয়া একদিন আমি আমার মাকে বলিলাম, 'মা, শুনেছিলাম আমার বাবার এক অতি পরিচিত এক বাল্যবন্ধু আমাদের এই মহল্লায় বাস করত। তার অনেক ব্যবসা ছিল, অনেক দানখয়রাতও করতেন বলে তার সুনাম আজো এই মহল্লায় রয়েছে। তিনি যদিও আর এই মহল্লায় বাস করেন না কিন্তু শুনেছি তিনি নতুন রাস্তার পাশে বিরাট বাড়ি করে ওখানেই বসবাস করেন। খুজে পেতে খুব অসুবিধা হবে বলে তো আমার মনে হয় না। একবার কি তার সাথে দেখা করব?' 

যাহাদের পেটে ক্ষুধা, যাহাদের আশ্রয়স্থল বলিতে এক ভগবান ছাড়া আর কেহ থাকে না, যাহাদের চারিদিকে হায়েনাদের মত অসংখ্য পিশাচ বসবাস করে, যাহাদের সাহায্য করা উতিচ অথচ তাহারাই যদি অত্যাচারি হইয়া যায়, তখন মানুষকুলে যদি এমন কাহারো একবার ক্ষিন সন্ধানের ছিটেফোঁটাও থাকে, যাহাকে ধরিয়া একবার নিরাপদ আশ্রয় পাইতে পারে, তাহা হইলে চেষ্টা করিয়া দেখিতে আপত্তি কি? আমার মা কিছুক্ষন ভাবিয়া আমার হাত ধরিয়া বলিলেন, 'চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।' 

পরদিন আমি আর আমার মা সকাল সকাল ঐ নতুন রাস্তার ধারে আসিয়া হাজির হইলাম। আমাদের ইহাই প্রথম শহরে আসা নয় তারপরেও মনে হইতে লাগিল আজিকার আসা আর আগের বহুবার আসার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রহিয়াছে। শহরের রাস্তায় অসংখ্য মানুষের যাতায়ত, আমাদের গ্রামের দুই একজনের সহিতও আমাদের দেখা হইয়া গেলো। বিশেষ কোন কারন না দেখাইয়া আমরা তাহাদেরকে এক প্রকার এরাইয়াই গেলাম। অনেক খুঁজাখুঁজির পর বাড়িটির সন্ধান পাইলাম বটে কিন্তু তাহার সহিত দেখা করিবার যে তরীকা, তাহাতে আজ ফিরিয়া যাইতেই হইবে বলিয়া আমাদের আশংকা হইল। তিনি বাড়ি নাই বলিয়া গার্ডের সংক্ষিপ্ত উত্তরে আমাদের নতুন করিয়া আরেক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলিয়া দিল। দারোয়ান গেট বন্ধ করিয়া দিল, ভিতরে প্রবেশের কোন সুযোগ রইল না। 

বাড়ি ফিরিয়া যাইবার অপেক্ষায় মা আর আমি দাঁড়াইয়া আছি, এমন সময় কালো একখানা গাড়ি বাড়ীর সুম্মুখে আসিয়া কিঞ্চিত একটি হর্ন বাজাইয়া গেট খুলিবার অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া গেল। কালো গ্লাস দিয়া ঢাকা থাকায় ভিতরে কে বা কাহারা বসিয়া আছেন আমরা কিছুই দেখিতে পাইলাম না। দারোয়ান দ্রুত গেট খুলিতে গিয়া গেটের পাশে আমাদের দেখিয়া মনিবের সামনে অতি উচ্চকন্ঠে দূর দূর করিতে লাগিলেন। একটু অপমান বোধ হইতে লাগিল যেন আমরা কোন এক নমশূদ্রের দল এই ব্রাহ্মণ বাড়ীর গেটে আসিয়া দারায়াছি বলিয়া সমস্ত বাড়ীটি অপবিত্র হইয়া গেল। নিজের উপর নিজের খুব রাগ হইতে লাগিল।

     

মনের রাগ, আর অপমানে 'কেন আসিয়াছিলাম' এই অনুশোচনা লইয়া মা মেয়ে ধির পদক্ষেপে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হইয়াছি, এমন সময় দারোয়ান আবার হন্তদন্ত হইয়া পিছন হইতে আমাদের ডাকিয়া বলিলেন,-'এই যে শুনছেন? সাহেব আপনাদেরকে ডাকছেন'। এই কথা শুনিয়া মনের ভিতর যেমন একটা আশার সঞ্চার হইল, তেমনি আবার সংশয়েরও সৃষ্টি হইল। কি জানি আবার কোনো অপরাধ হইল কিনা, কিংবা সাহেব আবার কি বলিয়া আমাদের নতুন করিয়া অপমান করিবেন কিনা ইত্যাদি। 

এবার সাহেব নিজেই আগাইয়া আসিলেন এবং জিজ্ঞেস করিলেন, কোথা হইতে আমরা আসিয়াছি। মা তাহার ঘোমটাখানি সরাইবামাত্র মাকে দেখিয়াই সাহেব চিনিতে পারিলেন। অতি উচ্ছ্বসিত হইয়া মায়ের একেবারে কাছে আসিয়া সহাস্যে বলিলেন, 'আরে, এ যে আমাদের বৌদি? কি ব্যাপার এতদিন পর আমাদের মনে পড়ল?' 

আমি লোকটিকে আগে কোথাও দেখিয়াছি কিনা মনে পরিতেছে না কিন্তু কোথাও তাহাকে দেখিয়াছি তাহা আমি নিশ্চিত। তাহার বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ কি তাহার কাছাকাছি হইবে। সুঠাম দেহ, পরিপাটি চুল, সাদা চেকের উপর ফোঁটা ফোঁটা কালো রঙের চেকে পরিহিত একটা শার্ট, হাতে সোনালী রঙের একটি ঘড়ি, বেশ মানাইয়াছে। মাথা ভর্তি চুল। মুচকি হাসিলেও ভাল লাগে আবার অট্টহাসিতেও বেমানান লাগে না। দুই চোখের মাঝখানে একটা কাল তিলক। বেশ হাসিখুশি একজন মানুষ বলিয়া মনে হইল। সাহেব মাকে একরকম পিঠে হাত দিয়া তাহার সহিত তাহাদের অন্দরমহলে লইয়া গেলেন। আমি মাকে শুধু অনুসরন করিয়া আমিও পিছুপিছু অন্দর মহলে প্রবেশ করিলাম। সাহেব বলিলেন, 'তোমরা একটু বস, আমি কয়েক মিনিট পর এসে তোমাদের সাথে কথা বলব'। এই বলিয়া তিনি তাহার ঘরে চলিয়া গেলেন। 

আমরা তাহার ড্রইং রুমে বসিয়া আছি। বিশাল ঘর, চারিদিকে বিদেশী টাইলসের দেয়াল, সাজানো ঘরের মত আঙ্গিনা। পর্দাগুলি এসির বাতাসে ঝিরঝির হাওয়ায় অল্পঅল্প নরিতেছে, ঘরের একপাশে বিশাল একটা একুরিয়াম। রঙ বেরঙের মাছ তাহার ভিতরে খেলা করিতেছে। একুরিয়াম হইতে কখনো কখনো বুদবুদ উঠিতেছে, মনে হইতেছে মাছগুলি ডুবুরিদের মত নিঃশ্বাস ছারিতেছে। দেয়ালের এক কোনায় একটি মহিলার বিশালকায় একটি ছবি টাঙ্গানো আছে। শরীর ভর্তি গহনা। কানে গহনা, গলায় গহনা, নাকে গহনা, মাথার চুলের ঠিক মধ্যিখানে একটি মাথলা টিকি। মনে হইতেছে গহনাগুলি যেন ঠিক জায়গা মত বসিয়া মহিলার রূপ আরও শতগুনে বৃদ্ধি করিয়া দিয়াছে। 

-এটা পারুলের ছবি। মা বলিলেন। 

পারুল সাগর সাহেবের স্ত্রী। অনেক বছর আগে তিনি গত হইয়াছেন। পারুলের মৃত্যুর পর সাগর আর বিয়া করেন নাই। তাদের কোন সন্তানাদিও হয় নাই। পারুল যে বছর মারা গিয়াছে, তাহার পরের বছরই সাগর সাহেব আমাদের মহল্লা ত্যাগ করিয়া নতুন জায়গায় চলিয়া আসিয়াছেন। পারুল আমাদের গ্রামের মেয়ে ছিল। তবে পারুলের বয়স আমাদের হইতেও কম ছিল। 

-'কিভাবে মারা গিয়াছিল'? আমি মাকে প্রশ্ন করিতেই মা বলিলেন, পারুলের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় পারুল দেহত্যাগ করে। এই পারুলের নামেই পরবরতিতে সাগর সাহেব একখানা দাতব্যালয় দিয়াছিলেন আর ঐ দাতব্যালয় হইতেই তিনি অনেক দান খয়রাত করিতেন। কি কারনে কেন তিনি তার সেই দাতব্যালয় আর চালাইলেন না তাহা আমরা ভাল করিয়া বলিতে পারিব না। কিন্তু তিনি আর বিয়াথাও করেন নাই শুনিয়াছি।    

-'এই যে বৌদি, কি মনে করে আজ এত বছর পর আমাদের মনে পড়ল? তোমরা একা আসলে কেন? দেওয়ান ভাই আসে নাই যে?' 

বলিতে বলিতে আমাদের সামনের সোফায় আসন গ্রহন করিলেন। সাগর সাহেব ইতিমধ্যে তাহার একটু আগে পরিহিত জামা প্যান্ট পাল্টাইয়া একটা সাদা পাঞ্জাবির সঙ্গে মেরুন রঙের স্যালয়ার পড়িয়াছেন, হাতের ঘড়িটি এখন আর নাই। মনে হইল তিনি এইমাত্র স্নান করিয়া আসিয়াছেন। চুলগুলি এখনো ভিজা, গা হইতে একটা পারফিউমের গন্ধ আসিতেছে, তাহার আগমনে ঘরটি যেন সুগন্ধিতে ভরপুর হইয়া গেলো 

তাহার প্রশ্ন শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম, তিনি এখন আর আমাদের মহল্লার খবর রাখেন না। আমার বাবা দেওয়ান যে অপঘাতে মৃত্যুবরন করিয়াছে, সেই খবর তাহার জানা নাই। মা নিসচুপ হইয়া বসিয়া আছেন। ক্ষনিকপর মা তাহার জীবনের সমস্ত ঘটনা একে একে খুলিয়া বলিলেন। সাগর সাহেব অনেক্ষন ধরিয়া আমাদের সমস্ত ইতিহাস শুনিলেন। মাঝে মাঝে কিছু প্রস্ন করিলেন বটে কিন্তু তাহা নিতান্তই কিছু না। একসময় সাগর সাহেব আমার দিকে তাকাইয়া যা বলিলেন, তাহা এইরুপ- 

-'তোমার বাবা আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। আমরা ছোট বেলায় একসঙ্গে একই গ্রামে মানুষ হয়েছি। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে কোনও রকমে একমুঠো ভাত খেয়ে নদীতে গিয়ে ইচ্ছামতো ঐ ধলেশ্বরী নদীতে ডুব পারতাম, কখনো কখনো সন্ধ্যা নাগাদ মাছ ধরতাম। কোন কোন দিন নদীতে না যেয়ে একেবারে স্কুলের মাঠে গিয়ে ভররোদে মেন্ডা গাছের মেন্ডা দিয়ে ফুটবল বানিয়ে দুইজনে ফুটবল খেলতাম। কখনো আবার বড়দের সঙ্গে খেলায় অংশ নিতে গিয়ে আমরা দুজনে শুধুমাত্র গোল কিপার ছাড়া আর কোনখানেই খেলত পারতাম না। যদিও আমার থেকে তোমার বাবা প্রায় তিন চার বছরের বড় হবে কিন্তু তিনি ছিলেন আমার নিত্যদিনের একজন সঙ্গি। তোমার বাবার যখন বিবাহ হল তখন আমার বয়স হইবে বড়জোর চৌদ্দ কি পনের। তার কয়েক বছর পর আমি চলে আসি শহরের এক নামিদামী স্কুলে কিন্তু ছুটির দিনগুলুতে আমি গ্রামের ঐ আমাদের বাড়ীতে তোমার বাবার সঙ্গে সময়টা কাটাতে আমার বড় ভাল লাগত। তোমার বাবার আর পরাশুনা হল না। সারাদিন ক্ষেতের কাজ, খামারের কাজ, অনেক গরু পালত তোমার দাদা, তাদের নিত্যদিনের খাবার যোগার করা, নদীতে নিয়া গোসল করানো, বিকালে আবার তাদের খাবার খাওয়ানো, এসব নিয়ে তোমার বাবা এতটাই সময় কাটাত যে, আমিও একসময় আর ভাল করে সেই স্কুলের মাঠে খেলা করতে পারতাম না, ইচ্ছে করলেই আগের মত আর নদীতে গিয়ে অধিক সময় ধরে ডুবসাতার কাটতে পারতাম না। আস্তে আস্তে আমার কাছে গ্রামটা আর আগের মত মনে হচ্ছিল না। একদিন শুনলাম, আমার বন্ধু বাবা হয়েছে।' এই বলিয়া সাগর সাহেব মুচকি একটু হাসিয়া আমার দিলে আঙ্গুলি তুলিয়া বলিলেন, 'সেই বাচ্চাটি সম্ভবত তুমি। কি নাম তোমার? তোমার তো নাম জানাই আমার হল না।'

আমি এতক্ষন অবাক দৃষ্টিতে সাগর সাহেবের দিকেই তাকাইয়াছিলাম আর তাহার সেই ছোটবেলার আমার বাবার সাথে তাহার শৈশব কালের দিন গুলির কথা শুনিতেছিলাম।

আমার মনে পড়ে, আমি শুধু তাহাকে আমার নামটাই বলেছিলাম, - 'শেলি'।   

  

সাগর সাহেব আবারো তাহার সেই হারানো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন,

-'এত অল্প বয়সের বাবার কি দায়িত্ব, কি করতে হবে বাবা হিসাবে, তা সে হয়ত জানতই না। কত হবে তখন তার বয়স? হয়ত ষোল কিংবা সতের? তাহার আরও ব্যস্ততা বেড়ে গেলো। আমি গ্রামে গেলে আর আগের মত দিন কাটত না। যাক, সেসব কথা এখন বলে আর কি হবে? অনেক বছর পর আবার যখন তোমার বাবার সঙ্গে আমার দেখা হল, তখন আমি সবেমাত্র বিদেশ হতে পরাশুনা শেষ করে গ্রামে গিয়েছি। অনেক প্রতিবেশিকেই তখন আমি চিনি না। অনেকে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন, গ্রামটা আমুল পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল।'  

-আচ্ছা যাক সে ইতিহাস আজ আর না বলি। সাগর সাহেব আমাদের সবকথা শুনিয়া মাকে শুধু এইটুকু আশ্বাস দিলেন যে, তাহার অতিপ্রিয় বন্ধুর দেওয়ান পরিবারের জন্য তাহার যাবতীয় সাহায্য এবং সহযোগিতা যাহা কিছু লাগিবে, তিনি তাহার জন্য কোন কার্পণ্য করিবেন না। একে একে তিনি আমাদের সবার নাম জিজ্ঞাসা করিলেন, কে কোন ক্লাসে অধ্যায়ন করে, কিভাবে কখন কাহার কি লাগে সব আদ্যপান্ত জানিয়া লইলেন।  তিনি আরও বলিলেন যে, যেহেতু তিনি সব সময় নিজে হাজির থাকিয়া সব দেখভাল করিতে পারিবেন না, ফলে লোক মারফত যাহা লাগিবে, তাহা তাহাকে জানাইয়া দিলেই বাকি সব ব্যবস্থা তিনি করিতে পারিবেন। এ ব্যাপারে আর কোন সন্দিহান রহিল না। 

শেলী এই পর্যন্ত বলিয়া রুনার দিকে চাহিয়া এক্তা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, আমাদের কষ্টের দিনগুলির সমাপ্তি হইলো, আমাদেরকে সাহাজ্য করার একজন মানব উপস্থিত হইলেন, আর কোনো সমস্যা রইলনা। গল্পটা এইখানে শেষ হইয়া গেলেই ভালো হইতো। কিন্তু গল্পটা আসলে এইখান থেকেই শুরু। 

সাগর সাহেব আমার মাকে কিছু উপার্জনের রাস্তা বাহির করিয়া দিলেন। আমার মা হাতের কাজ জানিতেন বলিয়া কয়েকটি শেলাই মেশিন কিনিয়া দিলেন, বাড়িতে কয়েকটা গাভী কিনিয়া দিলেন যেনো আমরা সবাই মাঝে মাঝে দুধ খাইতে পারি। সবাই ছাত্র তাই তিনি ভাবিলেন আমাদের পুষ্টিকর খাবারের দরকার। আর প্রতি মাসে একটা অনুদানের ব্যবস্থাও করিয়া দিলেন। আমার মা অনুদানের ব্যবস্থাটা গ্রহন করিতে চাহিলেন না, কয়েকটা শেলাই মেশিন আর গাভীর ব্যাপারটাতেই আমাদের সংসার চালাইয়া নিতে পারিবেন বলিয়া আমার মায়ের ধারনা ছিলো কিন্তু সাগর সাহেবের মমতার কোনো কমতি ছিলো না, আর তার এই দানে কিছু কমিয়া যাইবে সেইটাও নয়। ফলে আমার মায়ের অগ্রাজ্য কোনো কাজে আসিলো না। 

আমি আমার ভাইবোনদের লইয়া, আমার মাকে লইয়া আমাদের পরাশুনা লইয়া নতুন এক উদ্যমে আবার নতুন করিয়া জীবনের স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম। ভাবিলাম, এইবার আর এই সুযোগ হারাইলে চলিবে না, সয়ং বিধাতা আমাদের একটা কুলে আনিয়া রাখিয়া গেলেন। শ্রদ্ধায়, বিনয়ে সাগর সাহেবকে আমার দেবতার মত মনে হইতে লাগিল। কচি মন, তার উপর দারিদ্র্যের উপদ্রপ, সব মিলিয়া মনে হইতে লাগিল, পৃথিবীতে ভালোলকের অভাব ঈশ্বর কম রাখেন নাই। তিনি তাহাদেরকে মাইলস্টোনের মতো এমন এমন জায়গায় রাখিয়া দিয়াছেন যেনো কেউ পথ হারাইয়া গেলে ওই মাইলস্টোন দেখিয়া আবার যাত্রা শুরু করা যায়। 

এই বলিয়া মা অনেকক্ষন নিরব হইয়া রহিলেন। পারভীনের মা আসিয়া আমার মায়ের নীরবতা ভাঙ্গিয়া জিজ্ঞেস করিল- দিদি, আজ চিলে কুঠিতে বেড়াইতে যাইবেন? এই সময়তায় মা আর পারভীনের মা যতো কাজ কর্মই থাকুক, মা আমাদের বাড়ির ছাদের উপর বসিয়া সন্ধ্যার আগের সূর্যাস্ত দেখেন। আমি আজো জানি না, ওই একই জিনিসের উপর মায়ের কি আকর্ষণ, কি সেই অমোঘ টান যে, আজ পর্যন্ত কখনো আমার মাকে অই সূর্যাস্ত দেখা হয় নাই এমন হইয়াছে। চিলে কোঠায় ছোট এক্তা বেলকনি আছে, তাহার উপর টিনের একটা চাল আছে, বৃষ্টিরদিনে ওই চিলে কোঠায় মা আর পারভিনের মা একা বসে বসে তখন হয়ত সূর্যাস্ত দেখেন না কিন্তু বৃষ্টির শব্দ শুনেন। মানুসের জীবনের অনেক রহস্য আছে যা তাহার একান্ত ব্যক্তিগত। হয়ত ইহা কাহারো কাজে লাগিবে কি লাগিবে না তাহার কিছুই যায় আসে না কিন্তু যাহার এই সম্পদ তিনি হয়ত বুঝিয়া থাকিবেন ইহার ভিতরে কি শান্তি আর কি মহিমা। ঈশ্বর মানুষকে অনেক রহস্য রাখিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। কাহারো সূর্য ভালো লাগে, কাহারো চন্দ্র ভালো লাগে, কেউ আবার চৈত্রের দুপুর ভালো লাগে আবার কারো শিতের সকাল।

(অসমাপ্ত)...

হোড়লে বাড়ি

অষ্টাদশ পার হইলে আমরা বলি আশি বা আশি পার হইয়া যাইতেছে এমন কিছু। কিন্তু যিনি নব্বই পার হইয়া শতায়ুর দিকে প্রতি মুহূর্তে একএক করিয়া প্রহর কাটাইয়া তাহার বয়স বিধাতা ক্রমাগত বাড়াইয়া চলিয়াছেন, তাহাকে আমরা আর যাহাই বলিয়া সম্বোধন করি না কেন, তাহার সঙ্গে ভালবাসিয়া মনের মাধুরী লাগাইয়া ছুটির দিন পরিত্যাগ করিয়া ঘটা করিয়া কোন এক শীতের সকাল কিংবা চৈত্রের কোন এক নির্জন দুপুর বরাদ্ধ করিয়া মনে আলপনা মাখিয়া কেহ তাহার সহিত গল্প করিতে ছুটিয়া আসিবেন তাহা হয়ত খুব স্বাভাবিক নয়। অথচ কোন একটা সময় ছিল, যখন এই শতায়ুর কাছাকাছি বৃদ্ধারও একটা যৌবন ছিল, তাহাকে দেখিবার জন্য কোন না কোন এক পুরুষের হৃদয়ে বসন্তের হাওয়া লাগিয়াছিল, তাহাকে নিয়া হয়ত অনেকেই কতই না অপ্রকাশিত প্রেমের কবিতা লিখিয়া যাইত, সহপাঠীদের মধ্যে হয়ত কেউ কেউ আবার তাহাকে অতি আপনজন মনে করিয়া কিংবা মনে মনে শুধুই আমার নিজের সম্পত্তি মনে করিয়া গুনগুন করিয়া গানের কলি গাহিত কে বা জানে। আমি আজ এমনি একজন অতি বৃদ্ধার সামনে হটাত করিয়া বসিয়া আছি। 

তাহার দেখিয়া বুঝা যায় অতি অল্পবয়সে তাহার গায়ের রঙ কাচা হলুদের মত ছিল, তাহার মুখের গড়ন, চোখের পাপড়ি, নাকের আকার দেখিয়া বুঝা যায় তাহার শৈশবকালে তাহার মাতাপিতা তাহাকে লোক চক্ষুর কুদৃষ্টির আড়াল হইতে বাচাইয়া রাখার জন্য কতই না প্রানান্ত চেষ্টা করিতেন হয়ত বা। এই শেষসময় আসিয়া প্রায় একশত বছরের আগের কোন এক রূপসীর মত দেখিতে ক্ষনসুন্দরের প্রতিক যুবার সহিত আমার দৈবাৎ দেখা হইয়া গেল। কিভাবে দেখা হইল সেটা আমি কিঞ্চিত খোলাসা করিয়া বলিতেও চাহি না। তবে ইহা নিতান্তই ঠিক যে, আমিও তাহাকে দেখিবার জন্য আমার মহামুল্যবান সময় নষ্ট করিয়া ছুটির দিন পরিত্যাগ করিয়া গাড়ি হাকাইয়া এতদূর অবধি আসি নাই।  কোন এক সন্ধ্যা বেলা বউ বাচ্চা নিয়া অলস কিছু সময় কাটাইবার জন্য আমি আমার বন্ধু আলালের সঙ্গে তাহাদের গ্রামের একটি গৃহস্থালি বাড়ীতে বেড়াইতে আসিয়াছিলাম। আর ওইখানেই আমার সঙ্গে এই প্রউরার দেখা।

আমি যাহার সঙ্গে ঐ গ্রামের বাড়ীতে গিয়াছিলাম, ঐ আলাল, তিনি তাহারই মা।  আলালও  বয়স্ক মানুষদের মধ্যে একজন। তাহারও মুখের দাঁড়ি পাকিতে শুরু করিয়াছে, তিনিও কম হলে ষাট বছর ধরিয়া এই পৃথিবীর আলো বাতাস গ্রহন করিতেছেন। এখন তাহাকেও আর যুবক বলিয়া কেহই গননা করিবে না।

তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। গ্রামের চারিদিকে ঘনকালো অন্ধকার। রাস্তায় আশেপাশে কয়েকটা বাতি জ্বলিতেছে বটে কিন্তু ঐ ক্ষীণকায় বাতির আলোতে এত সুবিশাল বৃক্ষরাজীর অন্ধকার আলোকিত করিতে পারে এমন সাধ্য তাহাদের নাই, ফলে বড় বড় কৃষ্ণকলি গাছগুলো আশেপাশের লতাগুল্মের অযাচিত ভালোবাসার জড়াজড়িতে আলো অন্ধকারের ন্যায় এক ভুতুরে পরিবেশ সৃষ্টি করিয়া রাখিয়াছে। এই অঞ্চলে খুব একটা জোনাকি পোকা দেখা যায় না, তাই জোনাকির ঝি ঝি শব্দটা কানে আসে না বলিলেই চলে, তবে আশেপাশের ছেলেমেয়েদের কিছু কিছু কলকাকলি শোনা যায় না এমন নয়।

এই আলো অন্ধকার ভুতুরে আবৃত গায়ের মেঠো পথ পার হইয়া আমরা আলালের বাড়ীতে পৌঁছাইলাম। বাড়িটা বেশ সুন্দর। প্রশস্ত উঠান, সেই মান্দাতা আমলের ধাঁচে করা সিঁড়ি সম্বলিত একটা স্কুল ঘরের মত পাকা বিল্ডিং। বিল্ডিং ঘরখানা পার হইয়া আরও একখান ছোট উঠান, সেই উঠান পার হইলেই চোখে পড়ে ঘোর কালো অন্ধকার। এই ঘোর অন্ধকার উঠানের চারপাশে কয়েকটি গাছ ঠায় অন্ধকারকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া আকাশের তারাগুলিকে নিশানা করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। হটাত করিয়া আলো হইতে আসিয়া যেন কালো অন্ধকার উঠানটিকে আরও কচকচে কালো রঙের মত সীমাহীন অন্ধকার বলিয়া মনে হইল, আর আমি ঠায় চোখে কিছু না দেখিতে পাইয়া দাঁড়াইয়া গেলাম। সামনে কিছুই দেখিতে পাইতেছিলাম না কিন্তু আমার বন্ধুটি অতি অনায়াশেই এই কালো অন্ধকার ভেদ করিয়া অতি সহজেই আরেকটি আধা পাকা বিল্ডিং এর দরজার সামনে আসিয়া হাজির হইয়া গেলেন। আমি কোন রকমে হামাগুড়ি দিবার মত ভঙ্গিতে পায়ে পায়ে টিপিয়া টিপিয়া এক কদম এক কদম করিয়া আগাইয়া আসিয়া তাহার কাছে পৌঁছলাম। বাড়ীর ভিতরে কেউ আছেন বলিয়া মনে হইল না। বারান্দায় একটি ছোট পাওয়ারের বাল্ব জ্বলিতেছে। গ্রিল দেওয়া একটি ঘর। ঘরটির কাছে আসিয়া আমার ঐ বন্ধু আলাল 'মা' বলিয়া দুইবার ডাকিলেন। চারিদিকে কোন সারাশব্দ নাই, বেশ গরম পড়িয়াছে, কোন বাতাসও বহিতেছে না। আমার বন্ধুটি আবারো শব্দ করিয়া 'মা' বলিয়া ডাকিলেন।

রাত্রির নিস্তব্দতা ভাঙ্গিয়া, ক্যাচ করিয়া লোহার একখান দরজার খিল খুলিলে যেই ধরনের শব্দ হয় তাহার মত শব্দ করিয়া কোন একজন তাহার দরজা খুলিলেন। দরজা খুলিতেই দেখিতে পাইলাম, অতি বয়স্ক একজন মহিলা তাহার শরিরের কাপড় গুছাইতে গুছাইতে শরিরের ভারসাম্য রক্ষা করার নিমিত্তে কাপিতে কাপিতে দরজার হেসবলটি খটাশ করিয়া খুলিয়া ফেলিলেন। খুলিয়াই বড় আদরের সহিত অস্ফুট স্বরে বলিলেন, ও তুই বাবা? এত রাতে কথা হইতে আইলি?

বুকটা ধক করিয়া উঠিল যেন। আমার মাও থক এমন করিয়াই আমাকে সম্বোধন করিত। অনেক দিন হইয়াছে আমার মা প্রয়াত হইয়াছেন। মাকে মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। কিন্তু এই বয়সে আসিয়াও আমার মাকে আমি খুব কাছে থেকে মিস করি এই ভাবনা অনেকেই মানিয়া লইতে পারেন না। আমি মানিয়া লইয়াছি। কি মিষ্টি সেই সম্বোধন। মাকে নিয়া পৃথিবীতে এত বেশি গল্প রচিত হইয়াছে, এত গান, এত বায়স্কোপ, এত উপন্যাস রচিত হইয়াছে যে, তারপরেও মাকে নিয়া আরও হাজার হাজার কবিতা, হাজার হাজার উপন্যাশ রচনা করিবার অবকাশ রহিয়াছে। মায়ের কথার সুর আলাদা, তার চাহনি আলাদা, তাহার হাতের স্পর্শ আলাদা, তাহার শাসন আলাদা, তাহার আদরের ভাষা আলাদা। তাহার অনুপ্রেরনার শক্তি আলাদা, তাহার ভালোবাসার মহব্বত আলাদা। কোন কিছুই তাহার সহিত পারিয়া উঠিবে বলিয়া আমার মনে হয় না আর হইবেও না। আমার সামনে যিনি দাঁড়াইয়া আছেন, তিনি আলালের মা। আমারও মা।

আমাকে দেখিতে পাইয়াছে বলিয়া মনে হইল না। ঘরের বাতির আলো হইতে বাহির হইলে স্বাভাবিক কারনেই বাহিরের অন্ধকার আরও বেশি ঘুটঘুটে অন্ধকার হইয়া চোখে এমন ধাধার সৃষ্টি করে যে, বাহিরে কি আছে বা কাহারা আছে তাহা হটাত করিয়া চোখে না পড়ারই কথা। উম্মুক্ত দরজা ধরিয়া আমি আর আমার বন্ধু আলাল ঘরে ঢোকিলাম। বৃদ্ধা অনেক ধীরে ধীরে তাহার বিছানায় গিয়া উঠিয়া বসিলেন। আমরা তাহার পাশে অদুরে রক্ষিত দুইটা চেয়ার খরখর শব্দ করিয়া টানিয়া বসিলাম।

তাহার ঘরের মধ্যে অনেক আসবাবপত্র নাই তবে কমও নাই। একটা ড্রেসিং টেবিলের মত একটা টেবিল। তার কিয়ত অংশ জুরিয়া একটি ছোট আয়না। দেখিয়াই বুঝা যায় অনেক দিন এই আয়নায় কেউ দাঁড়াইয়া তাহার মুখখানা দেখিয়াছে কিনা সন্দেহ আছে। আয়নার ঠিক উপরে একখানা ছোট গামছা যার সারা শরীরব্যাপী অনেক ধুলা জমাইয়া ফ্যানের বাতাসে মনের আনন্দে একটু একটু ঘুরপাক খাইতেছে। বৃদ্ধার খাটখানা বেশ প্রশস্থ, তোষকের জাজিম, তাহার উপরে একখানা চাদর। মনে হইতেছে চাদরখানা বেশ কয়েকবার ব্যবহার করিবার কারনে কিছুটা দুমড়ে মোচরে আছে। খাটের পাশেই পরপর দুইখানা কাঠের আলমারি সটান হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। উপরে একটি ফ্যান চক্রাকারে ঘুরিতেছে। খাটের একদম লাগোয়া ছোট একটি টেবিল রহিয়াছে। তাহার উপরে এবং নিচে কয়েকটি অতি পুরাতন টিনের অথবা ম্যালামাইনের বাসন, বাসনগুলির উপর কয়েকটি গ্লাস উপুড় করিয়া রাখা আছে। সম্ভবত এইসব বাসন আর গ্লাস বৃদ্ধার খাবারের জন্য ব্যবহৃত হয়। ঘরের আলমারি, খাট, টেবিল চেয়ার সবগুলিতেই ভ্রাম্যমাণ ধুলাবালিতে এক প্রকার দাগ পরিয়া আছে। কেহ তাহা পরিস্কার করিয়া দিবার নাই। আর পরিস্কার করিলেও দায়সারা ভাবে যে পরিস্কার করিয়াছে তাহা স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে। দেয়ালের একপাশে একটি মশারি তাহার দুই কোনা লোহার দুইটি প্যারেকের মধ্যে গাঁথিত হইয়া নৌকার পালের মত ফ্যানের বাতাসে ক্রমাগত একবার এদিক একবার ওদিক হেলিতেছে।

বৃদ্ধার সঙ্গে আমার গল্প করিতে খুব ইচ্ছা হইতে লাগিল। কিন্তু তাহার কোমরে ব্যথা বলিয়া বারংবার উল্লেখ করিতেছেন বলিয়া আমারও এক প্রকার সংকোচ বোধ হইতে লাগিল। সংকোচবোধ হইতেছিল এই কারনে যে, আমরা কি এই অসময়ে আসিয়া বৃদ্ধার বিশ্রাম নষ্ট করিয়া দিলাম? আমি তারপরেও তাহাকে অতি আপনজনের মত প্রশ্ন করিলাম, কিছু খাইয়াছেন কি? আমরা আসিয়া কি আপনাকে বিরক্ত করিলাম কিনা ইত্যাদি।

তিনি অতি বিচক্ষন মহিলা বলিয়া আমার মনে হইল। তিনি বলিলেন, আমি এখনো বাচিয়া আছি বলিয়াই তো তোমরা আসিলা। কেউ আসিলে আমার খারাপ লাগে না। বরং কিছুটা সময় কিছু মানুষের সঙ্গে কাটিয়া যায় বলিয়া আমার সস্থি লাগে। এখন তো আর কাহারো সময় নাই আমাদের মত মানুষের সঙ্গে সময় কাটাইবার। আজকাল যুগের ছেলেমেয়েরা, তাহাদের পিতা মাতারা স্নতান সন্ততিরা কেহই আর আগের দিনের পিতামাতার মত নয়। অতি অল্পতেই তাহারা ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে, বিরক্ত হইয়া উঠে, কোন কিছুতেই তাহারা সন্তুষ্ট নহেন। আদব কায়দার ধার ধারে না। সত্য মিথ্যার ধার ধারে না। লাভের হিসাবটা যেখানে বেশি, তাহাকেই তাহারা নীতি বলিয়া মানিয়া লইয়া আপাতত লাভের আশায় যাহা কিছু করিতে হয় তাহাই তাহারা করিতে ইতস্তত বোধ করে না।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমরা কতই না আমাদের দাদা দাদিদের সঙ্গে গল্প করিতাম। ভুতের গল্প, সেই রাজরানির গল্প, পড়া ফাকি দিয়া কখন দাদুর কোলে মাথা রাখিয়া নাম না জানা পরীদের গল্প শুনিতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা ভুত আছে বলিয়া বিশ্বাস করে না কিন্তু ভুতের গল্প শুন্তেও ভয় পায়। আমাদের সময় আমরা পাশের বাড়ীর বরই গাছের আধাপাকা বরই, পেয়ারা, কচি কচি আম চুরি করিয়া আনিয়া দাদুর পানের বাটিতে লুকাইয়া রাখিতাম, আর এখনকার নাতি নাতকুরেরা দাদা দাদির পানের বাটি হইতে সুপারি পর্যন্ত না বলিয়া লইয়া যায়। ইহাকে চুরি বলে কিনা আমি বলিতে পারিব না কিন্তু যখন দেখি আমার আচলে রাখা কয়েকটা ছোট বড় নোট যখন কোথায় হাওয়া হইয়া অদৃশ্য হইয়া যায় তাহা যখন আর বুঝিতে পারি না, তখন মনে হয় সময়টা পাল্টাইয়া গিয়াছে, অথচ কাহাকেও কিছু বলিবার আমার যোগার নাই।

বুড়ি আরও গল্প করিতে লাগিলেন, যেন মনে হইল তিনি আস্তে আস্তে তাহার শৈশবকালে ফিরিয়া যাইতেছেন।

-আমি যেদিন এই বাড়ীতে বউ হইয়া আসি, তখন আমার কতইবা বয়স। হয়ত আট কিংবা নয়। স্বামী কি জিনিস, শাশুড়ি কি জিনিস, কিংবা ভাসুর, কিংবা শ্বশুর, কাহাকে কেমন করিয়া সামলাইতে হইবে আমরা কিছুই জানিতাম না। বাবার বাড়ীতে যে ছোট মেয়েটি সকাল অবধি ঘুমাইত, সেই ছোট বালিকাটি হটাত করিয়া শ্বশুর বাড়ীতে আসিয়া এক রাতের মধ্যে মহিলা হইয়া জন্মিল। যেন তিনি আর ছোট বালিকাটি নন। তাহার অনেক দায়িত্ত। স্বামীর দায়িত্ত, পরিবারের ঘর ঘুছানো , উঠোন পরিস্কার করা, গোয়াল ঘরে গরুর খাবারের জন্য গাদা গাদা পানি দেওয়া, শাশুড়ির জন্য শীতের দিনে ওজুর গরম পানি করে বদনা দিয়ে রাখা, কত কি। ঐ ছোট বয়সে আমার শরিরের থেকে দায়িত্তের পরিমান অনেক ঢের বেশিই ছিল, তারপরেও বাবাকে খুশি রাখিবার জন্য, মাকে আনন্দে রাখিবার জন্য আমার এই ছোট হাতগুলি দিয়া যতটুকুন পারিতাম সংসারের গুরু লঘু সব দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকিতাম। পাছে আমার শশুর কোন কাজ ঠিক মত হয় নাই, কিংবা কোন কাজ করিতে ভুল হইয়া গেছে এই লজ্জায় পড়ি, সেই ভয়ে নিজে দুপুরের খাওয়া, দিনের নাওয়া কোনকিছুই সময় মত করিতে পারিতাম না। দিনশেষে যখন একটু বিশ্রাম করিবার সময় হইত, আমার অতিপ্রিয় এই খাটের পাশে আসিয়া বসিতাম, তখন তোমাদের জামাই বাবুর মন জয় করিবার জন্য আমাকে আবার নতুন বউয়ের মত মুখে হাসি ফুটাইয়া, চোখে প্রেমের চাহনি দিয়া চাঁদনী রাতের আকাশের মত আমাকে রাঙ্গা বউ সাজিতে হইত। এভাবেই আমার দিনকাল কাটিয়া একদিন দেখিলাম আমি মা হইয়াছি। একে একে আলাল, জালাল, শাহিদা, রোকেয়া, সখিনা, সবাই আমার ঘর আলোকিত করিয়া আমার সংসার ভরিয়া তুলিল।

সংসার বড় কঠিন এক কর্মক্ষেত্র। স্বামীর মন যোগাইয়া, শাশুড়ির সব কাজ শেষ করিয়া, শ্বশুরের ঘর ঘুছাইয়া, দিনের কাজ সব শেষ করিয়া ছেলেপুলেদের সব হিসাব নিকাশ, আবদার মিটাইয়া যখন আমি প্রায় এক রকম অভ্যস্থ হইয়া দিনের কর্ম ব্যস্ততায় সময় কাটাইতেছি, তখন আমার বয়স গুনিয়া দেখিলাম, আমি নিজেও এখন শাশুড়ি হইবার সময় হইয়াছে। কিন্তু যাহার শশুর হইবার কথা তিনি সবাইকে তাক লাগাইয়া, গ্রামের সব প্রিয় বন্ধু বান্ধব্দের রাখিয়া আমাকে শ্রাবনের অজশ্র বারিধারার মত চোখের জ্বলে ভাসাইয়া তিনি এই পৃথিবীর সমস্ত বন্ধন শেষ করিয়া আমাদের হইতে অনেক দূরে চলিয়া গেলেন। কি তার অভিমান, কি তার কষ্ট, কি তার চাহিদা কিছুই আর অবশিষ্ট না রাখিয়া সংসারের সমস্ত দায়ভার আমার কাঁধে তুলিয়া দিয়া স্বার্থপরের মত আমাকে একা রাখিয়া বহুদুর চলিয়া গেলেন। আজ অনেকদিন পর মনে হইল, আমি শুধু এই বাড়ীর বউ হইয়াই আসি নাই, আজ মনে হইল, আমি আজ সংসারে মা আর তার উপর বাবার দায়িত্বও পালন করিতে এই সংসারে ঢুকিয়াছিলাম। শুধু তাই নয়, যে ননদিনীকে আমি আমার সই বলিয়া মনে করিতাম, আমি আজ তাহারও মা হইয়া বসিয়াছি। যে দেবরকে আমি আমার ছোট লক্ষি ভাই বলিয়া আদর করিয়া শাসন করিতাম, আজ আমি তাহার মা বলিয়া অনুভব হইতেছে। উহারা সবাই আমার অতিপ্রিয় সন্তানের মত আমাকে আরও নিবির করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিল। আমার আর কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা রহিল না। না বাপের বাড়ি, না পৃথিবীর মায়া কাটাইয়া আমার স্বামীর দেশে। আমি বাড়ীর প্রতিটি অংশ, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি প্রাণীর মা হইয়া গেলাম। চুলায় কখন আগুন ধরাইতে হইবে, কখন কাহাকে কোথায় পাঠাইতে হইবে, কখন ধান কাটার মৌসুম হইলে কোথা হইতে কতজন কামলা নিতে হইবে, মটরশুটি পাকিয়াছে কিনা, পাকিলে কখন কাটিতে হইবে, সব হিসাব আমাকেই রাখিতে হইত। বাড়ীর উঠোন কখন ঝারু দিতে হইবে, রাতে কাহাকে কখন কি ঔষধ খাওয়াইতে হইবে তার সবদিক আমাকে অতি সূক্ষ্মতার সহিত হিসাব করিয়া পালন করিতে হইতেছিল।

এই যে বাড়িটা দেখিতেছ? এখানে এত ঘর বাড়ি ছিল না। বড় একটা উঠান ছিল, পাশে হরেক রকমের গাছগাছালি ছিল। ঐ যে আমাদের দক্ষিন পাশটা আছে, সেখানে অতি মস্তবড় একখানা গাব গাছ ছিল। অতি গরমের সময় আমার স্বামী কড়া দুপুরে একখানা মাদুর বিছাইয়া হাতে একখানা তালপাতার পাখা লইয়া তাহার হরেক পদের ব্যবসার হিসাব লইয়া বসিত। আরও কত কি! তখন ক্যালকুলেটর ছিল না, বাঁশের কঞ্চিতে কালি মাখাইয়া দিস্তা কাগজের মোড়ায় একখানা খাতা লইয়া তাহার ব্যবসার লেনদেনের অনেক হিসাব কষিয়া লাভ ক্ষতির বিবরন লিখিয়া রাখিতেন। গাব গাছটার দিকে তাকাইলে আমার এখনো তাহার কথা মনে পড়ে। মনে হয়, এই বুঝি তিনি আসিয়া আমার কাছে পান আছে কিনা জিজ্ঞেসা করবেন। হয়তবা কোন এক পলকে আসিয়া বলিবেন, কই গো শুনছো, আমি একটু বাজার হইতে ঘুরিয়া আসি। কিছু আনিতে হইবে কি? আমি অপলক দৃষ্টিতে ঐ গাব গাছটির দিকে তাকাইয়া থাকি আর তাহার কথা মনে করি। গাছের কোথা বলিবার ভাষা নাই। থাকিলে হয়ত আমাকে প্রশ্ন করিত, কি গো তাহার কোথা মনে পরিতেছে? আমার ও তাহার কথা মনে পরিতেছে। মন তা খারাপ হইয়া যায়। সে আমাক্র কথা হয়ত ভাবে না, হয়ত বা ভাবেও।

আমি তাহার গল্পের বর্ণনা শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম, তিনি এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও তার ঐ সময়ের সব স্মৃতি দিনের আলোর মত ফকফকা হইয়া তাহার চোখে পরিতেছে আর তিনি ঐ দৃশ্য অনাবিল ভঙ্গিতে আজ এই ঘনকালো অন্ধকারের মধ্যে অকপটে বলিয়া যাইতেছেন। আমি যেন তাহার চোখের এই দিবাকালিন অতীত বর্তমানের বর্ণনা নিজের চোখে দেখিতে পাইতেছি।  তাহার গল্প শুনিতে আমার বড় ভাল লাগিতেছিল।

আমি বলিলাম, তারপর কি হইল?

তিনি আমার প্রশ্ন শুনিতে পাইলেন কিনা আমি বুঝিতে পারিলাম না, কিন্তু তিনি তাহার গল্পের কোন ছেদ না করিয়াই বলিতে লাগিলেন, এরই মধ্যে আমার এই আলালের বিয়া হইয়া গেল। আমাদের সংসারে কোন অভাব ছিল না কিন্তু আমার স্বামীর অন্তর্ধানের পর অনেক হিসাব কিতাবই আর আগের মত চলিতেছিল না। যাহাদের কাছে আমরা টাকা পয়সা পাইতাম, তাহারাও আর আগের মত বন্ধুসুলভ নাই, আবার যাহারা আমাদের কাছে টাকা পয়সা পাইত, তাহারও আমাদের দয়া করিয়া যে ছাড় দিবে তাহাও হইল না। ফলে একদিকে প্রাপ্য টাকা না পাইয়া হাত শুন্য হইয়া বসিয়া আছি, অন্যদিকে ঋণগ্রস্থ হইয়া আমাদের সংসারে একটু ভাটা পরিল বলিয়াই আমার মনে হইল। আলাল কোন রকমে একটা সরকারি চাকুরী সন্ধান করিয়া সংসারের হাল ধরিলবটে কিন্তু তাহাকে সোজা করিয়া দাড়া করাইয়া রাখা যেন কঠিন হইতে কঠিনতর হইয়া উঠিল। অনেক ঈদ পর্বন, অনেক মেলা, অনেক শখের আহ্লাদ আমাদের আর আগের মত করিয়া উৎযাপন করিতে পারি নাই। মনে হইয়াছে ছেলেমেয়েরা বড় হউক, একদিন আমার এই সব দুঃখের দিন শেষ হইবে। তখন নায় নাতকুর লইয়া আবার আমি আগের মত হই চই করিয়া বেড়াইব, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের লইয়া আনন্দে গ্রাম ঘুরিয়া বেড়াইব। কত কি? 

এই বলিয়া বুড়ি অনেক্ষন চুপ থাকিলেন। মনে হইল আজ এত বছর পর তাহার সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত কাহিনী তাহার মনের অতি গোপন স্থান হইতে উকি দিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ হইবার জন্য এক লম্বা লাইন ধরিয়া আছে। বৃদ্ধার গলা ধরিয়া আসিতেছিল, তাহার চোখের কোনা হয়ত ভিজিয়া আসিতেছিল, তিনি আর বেশিক্ষন আবেগ ধরিয়া রাখিতে পারিতেছেন না। আমার বন্ধু আলালের চোখেও একটু একটু অশ্রুর রেখা দেখা যাইতেছিল। রাতের এই ছোট পাওয়ারের আলোতে হয়ত আমি পুরু চোখ দেখিতে পাইতেছিলাম না তবে এইটুকু আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আলালের আধাপাকা দাঁড়ি গড়াইয়া তাহার চিবুক ঘেঁষিয়া হয়ত কয়েক ফোঁটা জল পরিয়া থাকিবে। বৃদ্ধার গল্প থামিবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল এখানে হটাত আলো থামিয়া গিয়াছে, এখানে ভাষা থমকে দাঁড়াইয়াছে, শুধু উপরে ফ্যান খানা নীরস যন্ত্রের মত চারিদিকে অসম্ভব দ্রুত গতিতে ঘোরপাক খাইতেছে।

আলালের বউ যখন আমাদের বাড়ীতে আসিল, আমার সেই ছোট বেলার বউ সাজিবার সবঘটনা মনে পরিতে লাগিল। লাল টুকটুকে শাড়ি, হাতে মেন্দি, মাথায় সব সময় বড় বড় ঘোমটা, আরও কত কি। আমি কোথায় কোথায় কি অসুবিধার মধ্যে পরিয়া কি কি কারনে মনে কষ্ট পাইতাম, কি করিয়া আমি আবার ঐ মনের কষ্ট দূর করিবার জন্য কি করিতাম, সব মনে পরিতে লাগিল। আলালের বউয়ের কার্যকলাপ দেখিয়া মাঝে মাঝে আমি খিল খিল করিয়া হাসিতাম, আবার মাঝে মাঝে খুব লক্ষির মত তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতাম, আমরা মেয়ের জাত, সংসার আমাদের ধর্ম, ইহাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া স্বামীর ভিটায় লাশ হইয়া বাহির হইতে পারিলেই আমাদের মেয়ে জীবন সার্থক। আর যদি ইহার কোথাও কোন ব্যত্যয় ঘটে, তখন আর কোন কাজেই আসিবে না। এইরূপ, এই যৌবন একদিন শেষ হইয়া যাইব। সংসার ছাড়া মেয়েদের আর কিছুই নাই। ইহাকে আপন করিয়া ধরিয়া রাখ।

আলালের বউকে পাইয়া আমি যেন আবার আমার সেই ছোট বেলার একজন সাথী পাইলাম এমন একজন মানুষ হইয়া গেলাম, আবার আমি তাহার শাশুড়ি এই কথাটাও ভুলিয়া গেলাম না। আলালের বউ যখন ভুল করিত, আমি তখন মনে মনে হাসিয়া ভাবিতাম, আহারে, আমিও কি তোমার মত এই ভুলগুলি করি নাই? করিয়াছি তো। কখনো কৃত্রিম রাগবর্ষণ করিয়া ভতরসনা করিতাম কিন্তু অধিক রাগ করিতাম না। ক্রমেক্রমে ও আমার একজন ভাল বন্ধু হইয়া উঠিল। সরকারী চাকুরী, আলালকে তাই কখনো অনেক দুরের শহরে থাকিতে হয়। আবার কখনো দুই একদিনের জন্য বাড়ীতে আসিতে হয়। নতুন বউ, আমি বুঝিতে পারিতাম তাহাদের মনের আকুতির কথা, তাদের মনের কথা। কিন্তু বাস্তব যখন ঘরের কাছে আসিয়া নিজের পেটের ক্ষুধার কথা স্মরণ করাইয়া দেয়, তখন প্রেমের কথা আর বেশি করিয়া মনে করিয়াও কোন লাভ হয় না। বিরহ তখন নিত্যদিনের সঙ্গি হিসাবে মানিয়াই নিতে হয়। এখনকার দিনের মত যুগ ছিল না তখন যে মন খারাপ হইয়াছে তো একখান মোবাইলে টিপ দিলেই মনের মানুষের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘণ্টা আলাপ করিয়া মনের কথা বলিয়া একটু সস্থি পাওয়া যাইবে। তখন পোস্ট অফিস ছিল, আবার হাতে লিখিয়া চিঠি পাঠাইতে গেলেও অনেক সময় লোক মারফত চিঠি পোস্ট করিবার লোক পাওয়া যাইত না, নিজে হাটিয়া গিয়াও চিঠিখানা পোস্ট করিবার উপায় ছিল না। তাই যোগাযোগটাও ছিল বেশ কঠিন আর যখন একবার দেখা হইত, তখন প্রেমের কথা বলিবার চেয়ে সংসারের সমস্যা সমাধানের জন্যই সময়টা কাটিয়া যাইত বেশি। যেদিন আলাল তাহার বউকে নিয়া তাহার কর্মস্থলে যাইত কিছুদিন থাকিবার জন্য, আমার বড্ড মন খারাপ হইত। একা একা বোধ হইত। মনে হইত কি যেন আমার সঙ্গে নাই, কে যেন আমার কাছ হইতে হারাইয়া গিয়াছে।

এইবার বৃদ্ধা নড়িয়া চড়িয়া বসিলেন। মাথা একটু উচু করিয়া আমাদের দিকে তাকাইয়া মুচকি হাসিয়া বলিলেন, একদিন আলাল মিষ্টি লইয়া বাড়ীতে আসিয়া আমার হাতে মিস্টির একটি প্যাকেট দিয়া বলিল, তোমার বৌমা অসুস্থ। আমি হচকচিয়ে উঠিলাম, একটু ভয়ও পাইলাম।  ওমা, কি রে কি হইয়াছে? লাজুক আমার আলাল কিছুই না বলিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়া উঠানের গাব গাছটির তলায় গিয়া সবার কাছ হইতে যেন পালাইয়া বাচিল। আলালের বউ সঙ্গে আসিয়াছিল। কাছে তানিয়া বুকে লইয়া জিজ্ঞাস করিলাম, কি হইয়াছে তোমার? শিক্ষিত নেয়ে, অবুঝ নয়, মুচকি হাসিয়া যাহা ইঙ্গিত করিল, বুঝিলাম, আমি দাদি হইতে চলিয়াছি। আমার চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। ঘরের প্রতিটি কাপ, গ্লাস, জানাল দরজা যেন খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। আমার উঠানের গাছগুলিও যেন বাতাসের দোলায় নাচিয়া বলিতে লাগিল, তুমি আরও এক ধাপ আগাইয়া জিবনের আরেক দায়িত্ব পালনে তৈরি হইয়া যাও। আমার বড় ভাল লাগিল।

সময় বড় নিষ্ঠুর, সে সবার সাথে চলিয়া বেড়ায় বটে কিন্তু কাহারো সঙ্গে সে সখ্যতা করে না। সে কাহারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাহার তারা নাই কিন্তু তাহার দেরি করার সময়ও নাই। সে কাহারো হাত ধরিয়া সামনে আগাইয়া চলে না, সে তাহার নিজ গতিতে বহমান। তাহাকে তুমি বশ করিতে পারিবে না। সে কাহাকেও বশ করে না। তাহার সহিত কেহ চলতে চাহিলে সে তাহার সহিত যুগযুগ ধরিয়া একত্রে চলিতে পারে আবার কেহ যদি তাহার সহিত চলিতে না পারে, তাহাতে তাহার কোন বিপত্তি হয় হয় না। সে একাই আপন গতিতে চলিতে থাকে। আর এই বহমান সময়ের স্রোত ধরিয়া আলালের ঘরে সোমা আসিল, রুবেল আসিল, জালালের ঘরে তিন্নি, মিন্নি সবাই আসিল, আর ঘর হইতে আমার সব প্রিয় মেয়েরা অন্য পুরুষের স্ত্রী হইয়া চোখের জ্বলে নিজেরা ভাসিয়া আর আমাকেও কাদাইয়া যে যার যার সংসারে চলিয়া গেল।

এখন তাহারা যার যার সংসার লইয়া, নিজেদের পরিকল্পনা লইয়া, শহর বন্দর খুজিয়া খুজিয়া নিজেদের আশ্রয়স্থল লইয়া নিজ নিজ সংসার পাতিয়া বসিয়াছে। একটি ঘর হইতে দুইটি, দুইটি হইতে চারটি, ঘর বাড়িয়াছে। বাড়ি বাড়াইতে গিয়া অনেক গাছ গাছালির জীবন দিতে হইয়াছে। আগের গোহাল ঘর সরাইয়া আরও দূরে লইয়া যাইতে হইয়াছে, এক বাড়ীর সীমানা আলাদা করিবার জন্য আরেক বাড়ীর সীমানা প্রাচির তৈরি হইয়াছে। ভাইয়ে ভাইয়ে আলাদা আলাদা প্রাচির ঘেরা বাড়ি বানাইয়া একে অপরের হইতে অনেক কিছু গোপন রাখিয়া দূরত্ব বজায় রাখিয়া চলিতেছে। তাহারা আর আগের মত এক সঙ্গে নদীর ধারে গলাগলি করিয়া গোসল করিতে যায় না, ঐ গাব গাছের তলে বসিয়া গল্প করে না। আগে এক হাঁড়িতে ভাত পাক করিলে সবাই মিলিয়া কাড়াকাড়ি করিয়া খাইয়া ফেলিত, কখনো তরকারীর জোগান কম হইয়া যাইত, আবার কখন মেহমান আসিলে শেষে যিনি খাইতে বসিতেন তাহার ভাগে কমই জুটিত। তারপরেও আনন্দ ছিল অঢেল, হাসি ছিল অফুরন্ত। এক ঘরে জায়গা না হইলে ছেলেরা মেয়েরা ভাগাভাগি করিয়া শুইয়া পরিত। নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুন্টুশি যে হইত না তাও নয়, কিন্তু তাহাও ছিল এক আনন্দের অফুরন্ত ভান্ডার। আজ সবার সংসার হইয়াছে, সবার হাঁড়িপাতিল আলাদা। কেহ মুরগীর তরকারি খাইয়া ঢেকোর তুলিতেছে, কেহ আবার নিছক শাকপাতা খাইয়া পেটের পীড়ায় ভুগিতেছে। একজনের সন্তান দেশ বিদেশ ঘুরিতেছে, আরেক জনের সন্তান মাঠে কঠিন রোদে পুড়িয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া সারা বছরের ফসল ফলাইবার জন্য প্রানান্ত চেষ্টা করিতেছে। বউদের যেমন সময় নাই, তাহাদের সন্তানদেরও সময় নাই। আমরা যারা আজ অনেক বুড়া হইয়া গিয়ছি, আমরা যখন আর আগের মত আর চলিতে পারি না, আমাদের দেখার জন্য তাহাদের হাতে ওত সময় কই?

আজ যখন দেখি সারা উঠোন গাছের মরা পাতায় এখানে সেখানে ছরাইয়া ছিতাইয়া এলোপাথাড়ি পড়িয়া আছে, হাটিবার রাস্তাটাও অনেক ময়লায় ভরিয়া আছে। তখন মনে হয়, আমার সংসার আলাদা হইয়া গিয়াছে, যার যার জায়গায় তারা শুধু গাছের পাতা, ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করিয়াই খালাস। আমার শাশুড়ি বলিতেন, সকাল বেলায় পরিবারের সদস্যরা ঘরের বাহির হইবার আগেই যে একবার ঘর বাড়ি উঠোন ঝাউ দিতে হয়, তা না হলে অলক্ষুণেরা ভর করে, সেই ভয়ে আজও আমি সকাল হলেই একটা ঝারু লইয়া সবার আগে ঘুম হইতে উঠিয়া সমস্ত বাড়ীটি কল্যাণময় করিয়া তুলি। এটা আমারই তো সংসার, তাহারা হয়ত নিজেদের জায়গা সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করিয়া আপন মনে করিয়া সাজাইয়া লয়াছে, কিন্তু এক সময় তো তাহারা সবাই একই হাঁড়ির ভাত খাইয়াছে, একই ছাদের তলায় গাদাগাদি করিয়া ঘুমাইয়াছে। তাহারা সবাই তো আমারই রক্তের মধ্য হইতে তিলে তিলে আজ এত বড় হইয়াছে। তাহার আমাকে মানুক আর নাই বা মানুক, তাহারা আমাকে যত্ন করুক আর নাই বা করুক। এটা তো আমার স্বামীর ভিটা। আমার দ্বিতীয় জন্মের বাড়ি। আমি তো আর তাহাদের আলাদা করিয়া ভাবিতে পারি না। আজকাল আমাদের নায়নাতকুরেরা আর আগের মত বড়দের সঙ্গে সম্মানের সহিত কথা বলে না, একে অপরের সহিত আদবের সহিত মন খুলিয়া কথা বলে না। কাহাকে আমি কি বলিব? আজ এত বছর পর আমার মনে হইতেছে, আমি এখানে আজ শুধু আমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করিয়া আছি। আমি অপেক্ষা করিয়া আছি কখন আমি আমার সেই প্রিয়তম স্বামীর সঙ্গে দেখা করিব। কখন আবার আমার সেই শাশুড়ি মা আমাকে জরিয়ায়া ধরিয়া বলিবে, হোরলে বাড়ি, আর পিরনে নারী। অর্থাৎ বাড়ি চিনিবে ঝারু দেওয়া দিয়া আর নারী চিনিবে তাহার পিরনের কাপড় দেখিয়া। তাই এখনো আমি এই বয়সে সবার মঙ্গলের কোথা ভাবিয়া সকালে সবার উঠার আগেই এক খানা ঝারু লইয়া আমার সব উঠোন পরিস্কার করিয়া লই, আর তাহাতেই আমার কোমর খানা প্রতিনিয়ত ব্যাথায় ভরিয়া উঠে। হয়ত আমাকে এই কাজ করিয়াই যাইতে হইবে আমার শেষ নিঃশ্বাস থাকা অবধি। এটা যে আমার বাড়ি, আমার স্বামীর বাড়ি। এখানে আমার শাশুড়ি শুইয়া আছেন, এখানে আমার শশুর ঘুমাইয়া আছেন। কি বলিব আমি যখন আমার সাথে তাহাদের দেখা হইবে? জানো তো একটা জিনিস, অনাদরে মানুষ বাচিলে তার একটা গুন আছে। আর তাহা হইল তাহাকে ব্যমোও ধরিতে আসে না। মরার সদর রাস্তা গুলি একেবারেই বন্ধ হইয়া যায়। সবার কাছেই তখন নিজেকে আপদ বলিয়াই মনে হয়। এই আমার আলাল তাহার সব টুকু শক্তি দিয়া আমাকে আগলাইয়া রাখিয়াছে বটে কিন্তু আর বাকি সব যে যাহার হিসাব লইয়া এত টাই ব্যস্ত হইয়া আছে যে তাহাদের ভবিষ্যৎ কি হইবে তাহারা আজ না বুঝিলেও হয়ত কোন একদিন আমার আজকের এই দিনের কষ্টটা হয়ত বুঝিবে। এই বলিয়া তিনি আলালের হাতটি ধরিয়া অনেক্কখন চুপ থাকিয়া বসিয়া রহিলেন।

অনেক রাত হইয়া গিয়াছে। বুড়ি আর কোন কথা বলিতে পারিতেছিলেন না। আমি তাহার আরও কাছে গিয়া বসিলাম। তাহার গায়ে হাত রাখিয়া তাহাকে জরাইয়ায়া ধরিবার আমার খুব ইচ্ছা হইল। মনে হইল তিনি ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাদিতেছেন। কেহই তাহাকে বকা দেয় নাই, আমারাও তাহাকে এমন কোন কথা বলি নাই যাহাতে তাহার মন খারাপ হইতে পারে, কিন্তু জিবনের সব পাওয়া যখন নিরাশায় পতিত হয়, যখন এত কষ্টের পরিশ্রমে গড়া নিজের সংসার আর নিজের আয়ত্তে থাকে না, যখন সেই সব ছেলেমেয়েদের লইয়া কোন একদিন ভবিষ্যতের সুখের জন্য আজিকার সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়া এতগুলি বছর পার করিয়া জিবনের বেলাশেষে হিসাব নিকাশ করিয়া কোন কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না বলিয়া মনে হয়, তখন চোখের জল ছাড়া প্রতিবাদ করার আর কোন ভাষা থাকে না। নিজের সংসার কে আর নিজের বলিয়া মনে হয় না। তাহা অন্য কেহ দখল করিয়া লইয়াছে। আমি সেখানে শুধু একজন প্রাণী যার জীবন আছে কিন্তু জিবনের কোন মুল্য আছে বলিয়া মনে হয় না। কেউ কেউ এখনো আঁকড়াইয়া ধরে বটে কিন্তু সমস্ত সংসারটা আর আগের মত মনে হয় না।

আজ হইতে হয়ত আরও অনেক বছর পর আবার যখন আমার এই বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা হইবে, আদৌ দেখা হয় কিনা আমি জানি না, তখন হয়ত আমার এই আজকের রাতটির কথা বারবার মনে পরিবে যে এইখানে একশত বছর পুরানো কোন এক কাহিনী আমি শুনিয়াছিলাম, যার ইতিহাস লিখার কোন প্রয়োজন নাই, আর সে ইতিহাস সমাজের, দেশের কিংবা রাষ্ট্রের কোন কাজেও আসিবে না। হয়তবা আজ হইতে আরও একশত বছর পর আজকের এই কান্নাজরিত সুর কোন একদিন আজ যারা নিরবিকার হইয়া বসিয়া প্রাচির দেওয়া দেয়ালের মধ্যে নিসচুপ হইয়া বসিয়া আছেন, তাহারাও অনুভব করিবেন কিন্তু তাহাদের ইতিহাস শুনিবার জন্য, তাহাদের অশ্রুভেজা চোখের পাতা দেখিবার জন্য আর কেহই অবশিষ্ট থাকিবে না।

খুব ভারাক্রান্ত মন লইয়া আমি আমার বউ বাচ্চাদের নিয়া বাসায় ফিরিলাম। বিকালে একটা অলস সময় কাটাইতে গিয়াছিলাম কিন্তু সময়টা ভাল কাটিলেও মনের ভিতরে কোথায় যেন একটি বেদনার কিন্তু কষ্টের অনুভুতি আমাকে বার বার তারা করিয়া বেড়াইতেছিল। রাতে কোন কিছু আর খাওয়া হইল না। ক্ষনে ক্ষনেই আমার বারংবার মনে হইতেহিল 'হোরলে বাড়ি, আর পিরনে নারী'।

০৩/০৭/২০২৩-মাধুরীর চিঠি-২

অনেক অনেক দিন পার হয়ে গেলো। না আমি আর তোমার সাথে কোনো যোগাযোগ করেছি, না তুমি। জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে এমনভাবে কোনো এক চক্রএর মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ায় সেটা বুঝা খুব সহজ না। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন মানেই কি পিছলে পড়া পথে হাটু গেড়ে বসে পড়া? নাকি সেই পিচ্ছিল পথ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে কোনো এক পাহাড়ের পাদদেশে এসে পতিত হয়ে আবার সেখান থেকে নতুন করে বেড়ে উঠা? হয়তো দুটুই ঠিক। কেউ পাহাড়ের চূড়ায় উথে নামার ভয়ে হাহাকার করে, আবার কেউ পাহাড়ে উঠতে না পেড়ে হাহাকার করে। কেউ কারো অবস্থানে সুখী নয়।

যাই হোক, এসব কথা আর না বলি। তবে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি এখনো খুব সহজে সব কিছু ভুলে যাও? কিংবা হাতের কাছে তোমার দরকারী কাগজটি না থাকলে কোথায় রেখেছো সেটার জন্য আমার নাম ধরে চেচামেচি করো? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। তখন হয়তো এরকমের চেচামেচি ভালো লাগতো না, কিন্তু আজকে মনে হয় তোমার সেই চেচামেচিকে আমি খুব মিস করি। মনে হয় খুজে খুজে তোমার ঠিকানাটা বের করে আরো একবার যদি তোমার সেই কন্ঠসরটা শুনতে পেতাম!! কিছু একটা খোজার বাহানা করে আমি সারাক্ষন মাঝে মাঝে আসলে হয়তো এখনো তোমাকেই এই আজব পৃথিবীর মানুষগুলির মধ্যে খুজি। আমি জানি না হটাত কখনো যদি তোমার সাথে আমার আবার দেখা হয়ে যায়, তখন আমি কি করবো। জড়িয়ে ধরবো? নাকি এড়িয়ে যাবো? নাকি দূর থেকে তোমার চলে যাওয়া দেখবো। আমি জানি, তুমি আমাকে ভুলে যেতে চেয়েছিলে, কিন্তু আমার জগতে তুমিই ছিলে একমাত্র মানুষ যাকে আমি কখনো ভুলতে চাই নি। আমি তোমাকে পাইনি বটে কিংবা তুমি আমাকে ছেড়েছো বটে কিন্তু পেরেছো কি? আমি পারিনি।

বৃষ্টি ভেজা রাতে নীরবে যখন আমি আমার বারান্দায় বসে অতীতের ভালো লাগা কোনো একটা গানের কলি শুনি, আমাকে নিয়ে যায় সেই রাতে যখন আমি তোমার হাতে হাত রেখে উচ্ছল ধরনীর শীতল মাটিতে নেচে বেড়াতাম। আমার ভেজা চুল বেয়ে বেয়ে জোনাকীর মতো পানির ফোটা ঝরে পড়তো, আর তুমি সেটা চিপে চিপে ধরে বলতে –আহা, কি সুন্দর, যেনো মুক্তার মত।  তোমার ছাদের কোনায় কি এখনো অই ছোট জবা ফুলের গাছটা আছে? আমি লাগিয়েছিলাম। তুমি কাটাজাতীয় ফুল পছন্দ করো না জেনেও আমি গাছটা লাগিয়েছিলাম। কতদিন জবা ফুল তুলতে গিয়ে হাতে কাটা বিধেছিলো আর তুমি বারবার আমার হাতে মলম লাগিয়ে বলতে কেনো কাটা গাছটাই রাখতে হবে ছাদে? অথচ তুমি গাছটা নিজেও কখনো কেটে ফেলোনি, বরং প্রতিদিন এর গোড়ায় পানি দিতে। কি আজব না? তোমার অপছন্দের একটা গাছ, তুমি কেটে দিলে না, পানি দাও, এটাকে বড় করো, যত্ন করো, অথচ তাকে তুমি পছন্দ করো না। আমাকে তুমি পছন্দ করতে, আদর করতে, আমার কষ্টে তোমার কষ্ট হতো, আমার আনন্দে তুমি আনন্দিত হতে, অথচ তুমি আমাকে চিরতরে কেটে দিলে। কাটতে পেরেছো? ওই জবা ফুলের গাছটার কাছে গেলে তোমার মন উদাসীন হয়ে উঠে না? হয়তো গাছটা আর নাই, অথবা আছেও। আমি তো আর জবা গাছ নই। আমার ভাষা ছিলো, অনুভুতি ছিলো, সব ছিলো, তাতেও তো আমি তোমাকে আমার ভিতরের অনুভুতি দিয়ে বুঝাতে পারিনি, কি ছিলে তুমি আমার। আর সেটা তো একটা ভাষাহীন জবা গাছ। সে তো তোমার কিছুই ছিলো না। আছে গাছটা? তাড়িয়ে দাও নি তো?

মাঝে মাঝে আমার খুব তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। কেনো দেখতে ইচ্ছে করে, সেই সঠিক উত্তর আমার জানা নাই। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, চিৎকার করে হাউমাউ করে কাদি। যদিও জানি, আজকালকের মানুষগুলির আবেগ, অনুভুতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এখন মানুষেরা আর হাউমাউ করে কাদে না, মানুষ কি ভাববে বলে। প্রান খুলে হাসে না, লোকে বোকা ভাববে বলে। এই চাপা হাসি আর বোবা কান্না মানুষ গুলি এতো অসহায়। তাই মানুষগুলি একা একাই বেচে থাকার মধ্যে প্রান খুজে বেড়ায়। আসলে আমরা সবাই একাই। এই একা জীবনে আড্ডা দেয়া যায়, গল্প করা যায়, কিন্তু সে পর্যন্তই। এর মানে যে, নিঃসঙ্গতা যে কাজ করে না এমন নয়। এই নিঃসঙ্গ জীবনের ও একটা মাধুর্যতা আছে। সেখানে আমিই সব। এর মানে এই নয় যে, আমি রক্তমাংশে গড়া কোনো আপনজনের অভাব অনুভব করিনা।

আমি এখনো মাঝে মাঝে ভাবি- আমি কি অন্য দশজন মেয়ের মতো জীবন সংগী বেছে নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারতাম না? হয়তো পারতাম। কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। কারন আমরা আমাদের জীবনসংগী বাছাই করি কথা শোনার জন্য, কথা বলার জন্য, যার সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগে, যার কথা শুনলে বছরের পর বছর সুখে দিন পার করা যায়। কিন্তু এটাও ঠিক যে, মাঝে মাঝে আমরা জীবনসাথী বাছাই করি তার রুপ, তার সউন্দর্য, তার অর্থবৈভব, তার সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি বিবেচনা করে। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে এটা ভুলেই যাই, সেই জীবনসাথী যাকে আমরা বাছাই করলাম, তার সাথে কারনে অকারনে, সময়ে অসময়ে আমার মনের কথাগুলি তাকে বলতে পারবো কিনা কিংবা সে আমার সেই সব ছোট ছোট অনুভুতি গুলির মুল্যায়ন করবে কিনা। যদি এর কোনো পরিবর্তন হয়, আর ঠিক তখন দেখা যায় যে, আমার বাছাই করা সাথী আমার কথাগুলি শুনতেই তার বিরক্ত লাগছে, কথায় কথায় ঝগড়া লেগে যাচ্ছে, আর তখন সম্পর্কগুলিতে মরচে ধরা শুরু করে। এটা একটা অনিশ্চিত পরীক্ষা। যাকে চিনিনা, যাকে কখনো অন্তরে রাখিনি, যে আমাকে জীবনের ৩০ বছর কোথাও জায়গা দেয় নি, হটাত করে তার সেই অন্দর মহলে আমি ঢোকে কতটা স্থান দখল করতে পারবো? সেখানে তো আরো হাজার হাজার ভাবনা, হাজার হাজার বিক্ষিপ্ত অনুভুতি, কিংবা অনেকের বসবাস রয়েছে। আমি কি হটাত করে এসেই তার সেই সব ভাবনা, অনুভুতি, আর অন্য মানুষদের পদরেখা ধুয়ে মুছে আমার নিজের করে দখল নিতে পারবো? হয়তো এটা কখনোই সম্ভব না। তাই আর আমার কোথাও যাওয়াওই হলো না। 

একটা জিনিষ জানো? লেখকের কোনো লেখা পড়ে যতোটা পাঠক মুগ্ধ হয়, তার থেকে বেশী মুগ্ধ হয় পাঠক যখন তার সাথে সামনে বসে কথা বলে।

০৭/০১/২০২২-দ্বৈত জীবন-৩

আমার জীবনেও এমন একটা অধ্যায় আছে, যেটা কেউ জানে না। আর আমি বেচে থাকাকালীন কেউ জানবে না। আমার মৃত্যুর পরেও কেউ সেটা জানতে পারবে না। এ রকমটাই আমি ভাবতাম। কখনো কখনো আমরা শুনি সেটা শুধু গল্পে হয়, বাস্তবে নয়। কখনো কখনো আমাদের চোখে যেটা দেখা যায় সেটা সব সময় সত্যি হয় না। এটাও হতে পারে সেটা সত্যি একটা প্রতিচ্ছবি। যখন নিঃসঙ্গতা কাউকে অনেক বেশী কুড়ে খায়, তখন দরকার হয় একজন সঙ্গীর। যখন ওই সঙ্গীর নেহায়েত প্রয়োজন হয় অথচ তাকে সংগী করা যায় না, তখন সে কিছু একটা তো করেই। আর সেটা যে কেউ শুনলেও কখনো বিশ্বাস করবে না, অথচ ব্যাপারটা সত্যি। আর যখন কেউ সেই সত্যিটা জেনেই যায়, তাহলেও আর সাফাই দেয়া উচিত নয়, অথবা তারপরেও যদি সাফাই দিতেই হয়, তাহলে সাফাইটা হবে ঠিক সেই ব্যক্তিদের মতো যারা পলিটিক্যাল কর্মী আর পলিটিক্যাল নেতার মতো। সবাই হয়তো জানেই না যে, পলিটিক্যাল কর্মী আর পলিটিশিয়ানের মধ্যে কত পার্থক্য থাকে। পলিটিক্যাল কর্মীরা স্রেফ কাজ করে থাকে, কিন্তু রাজনেতা রাজনীতি করে। যদি এর মধ্যে কেউ ফেসে যায়, তাহলে তারা যেনো কেউ কাউকে চিনেই না এমন একটা যোগ বিয়োগের খেলা চলে।

সবাই আসলে সব কিছু জানে না, জানার উপায়ও নাই। বেশীরভাগ সময়ে কোনো মানুষই তার নিজেকেও সে জানে না। তার ক্ষমতা, তার ব্যবহার, তার অন্যান্য বইশিষ্ঠ!! পরিস্থিতি আর সময় অনেক সময় সেটা এমন করে বদলে দেয় যে, যখন কোনো ঘটনা ঘটে যায়, তখন নিজেও বুঝতে পারে না এটা কি করে ঘটলো। কখন এর শুরু হয়েছিলো আর সেটা কিভাবে শেষ করতে হয়। এই পুরু পৃথিবীতে কেউ নিজেকে নিজেই সবটা জানে না। বিশেষ করে সেই মুহুর্ত গুলি যেখানে ঠিক আর বেঠিকের সীমানা, ন্যায় আর অন্যায়ের সীমানা, অথবা সত্য আর মিথ্যার সীমানা। মাঝে মধ্যে এই সীমান অতিক্রম করা হলো নাকি সীমার মধ্যেই আছে, সেটাই নির্ধারন করা সহজ হয় না। তাহলে অন্য কেউ জানবে কিভাবে? যখন শান্ত মনে অন্তর একদম শীতল থাকে, তখন শুধু এটাই মনে হয় যে, কি করছি, কি করছি না, কি করা উচিত আর কি করা উচিত না, এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন জীবনে হাজির হয়। যার সঠিক উত্তর মাঝে মাঝে পাওয়া যায় বটে কিন্তু পরক্ষনেই ওই যে আবার নিঃসঙ্গতা!! সেটা সব উলট পালট করে দেয়। তখন আর উত্তর গুলিকে আর নিজের মনে হয় না।

আমি মানুষকে বুঝতে পারি, কাউকে দেবী বা ডাইনী রুপে ভাবি না। সবচেয়ে কাছের মানুষেরাই নিজের মানুষকে ঠকায়। অপরিচিতরা কখনো ঠকাতে না পারে, না বেঈমানী করতে পারে। তারা হয়তো ক্ষনিকের জন্য কিছু সম্পদের লোভে প্রতারনা করতে পারে কিন্তু কাছের মানুষেরা করে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি যা না চোখে আগে থেকে দেখা যায়, না বুঝা যায়।

এই দ্বৈত জীবনের সবচেয়ে বড় গুন যে, ডান হাত জানে না বাম হাত কি করছে। একটা জীবনের দুটু আলাদা আলাদা অধ্যায়। একে অন্যের অপরিচিত এই অধ্যায় গুলি। এই দুটি জীবনের মধ্যে যখন একটা জীবন অতি দুঃখে কষ্টে ভরে উঠে, তখন এটা কখনোই সম্ভব নয় যে, অন্য জীবনের এর প্রভাব ফেলবে না।

এভাবেই চলে জীবনের সব ধারাগুলি।

২৭/১১/২০২১-পর্ব-২

গত লেখার শেষ ভাগে লিখেছিলাম-তাহলে আরেকটা অনেক বড় প্রশ্ন মনে জেগেই রইলো- আমার স্রিষ্টিকর্তা আমাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তাহলে এই বিশ্ব ভ্রমান্ডে পাঠিয়েছিল? What was the purpose of my life to be created by my Lord?

এই প্রশ্নের একদম সহজ এবং অতি পরিষ্কার করে স্রিষ্টিকর্তা পবিত্র কোর আনে বর্ন্না করেছেন- আমি মানব জাতী এবং জীন সৃষ্টি করিয়াছি আমাকে উপসানা করার জন্য।

মানবজাতী এবং জীন এই দুই সৃষ্টিকে আল্লাহ স্বাধীন সত্ত্বা হিসাবে সৃষ্টি করে তাদের ইচ্ছাশক্তিতে আল্লাহকে মানা আর না মানার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।  আর অন্য সমস্ত স্রিষ্টিকে তিনি শুধু আল্লাহর উপাসনা করার জন্যই বানিয়েছেন, তাদের ইচ্ছাশক্তির কোনো স্বাধীনতা নাই। ফলে পূর্ন স্বাধীনতা দেয়ার পরেও যখন কোনো মানব বা জীন আল্লাহকে মানেন, তার জন্য বেহেস্ত।

একটা ছোট ঘড়ি, কিংবা বড় কোনো মেশিন অথবা একটা দামী গার্মেন্টস যখন কেউ কিনেন, সেখানেও এর জন্য একটা ইন্সট্রাক শনাল ম্যানুয়েল থাকে যাতে ওই মেশিনগুলি কিভাবে রক্ষনাবেক্ষন করতে হবে, কিভাবে ব্যবহার করলে জিনিষটা ভালো থাকে। তাহলে প্রশ্ন একটা আসতেই পারে যে- মানুষ ও কিন্তু একটা যে কোনো জটিল মেশিনের থেকে জটিল। এর কোনো ম্যানুয়েল থাকার ক দরকার নাই? অবশ্যই আছে। আর সেটাই হচ্ছে পবিত্র কোরআন।

১৭/০৮/২০২১ রেহালাদের গল্প (রঙ্গে ভরা পাঠক)

(সত্য ঘটনার উপর একটি লিখা)

সাহস ছাড়া মানুষ স্বাধীন হতে পারে না, আর স্বাধীনতা ছাড়া মানুষ জীবিত নয়।

একদমই ভাবী নাই যে আজকে আমার অফিসে এমন কেউ আসবে যাকে আমি একসময় চিনতাম কিন্তু গত ৪০ বছরের মধ্যে আর কখনোই দেখা হয় নাই। ওর নাম ‘রেহালা (এটা একটা ছদ্দনাম, আসল নামটা উল্লেখ করলাম না’)। আমি আর রেহালা একই ক্লাশে পড়তাম সেই প্রাইমারী স্কুলসহ হাইস্কুলে। এরপর আমি হাইস্কুল ছেড়ে অন্য কলেজে চলে আসলাম, আর ওরা গ্রামেই রয়ে গেলো। এতো সুকন্ঠী ছিলো এই রেহালা যে, আমরা ওর গান শুনতাম যেখানে সেখানে, দলবেধে। স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানে কখনো কখনো রেহালার একক সঙ্গীত পর্যন্ত হতো। খালী কন্ঠেও যে গানের একটা মূর্ছনা আছে, সেটা রেহালার গান শুনলে বুঝা যেত। আর যদি রেহালার রূপের কথা বলি, সেটা আরেক বর্ননা। ওর গায়ের রঙ শ্যামলা, একদম ডায়মন্ডের মতো, চোখগুলি বড় বড়, ঠোটে সবসময় একটা হাসি লেগেই থাকতো। রেহালা হাসলে গালে একটা টোল পড়তো। সম্ভবত এই টোল পড়া গালের জন্যই রেহালার হাসিতে একটা আলাদা মাধুর্য ছিলো। বড্ড মিষ্টি ছিলো রেহালার হাসি। ছিমছাম শরীর, আমাদের সাথে গোল্লাছূট, দাড়িয়াবান্দা, মাঝে মাঝে কাবাডিও খেলতো রেহালা। রেহালাকে কাবাডি খেলায় কুকুপাত করলে ইচ্ছামতো মাথায় চুল ধরে ঝাকুনো মারতো। এক সাথে আমরা গ্রামে বড় হয়েছি, পাশাপাশি বাড়ি ছিলো আমাদের। নদীতে ঝাপ দিতাম এক সাথে, আর অন্যের গাছে উঠে পেয়ারা চুরির সময় রেহালা থাকতো লুক আউটম্যানের মতো। যেই না গাছের মালিকের আসার সময় হতো, রেহালা নিরুদ্দেশ, আর আমরা গাছের মধ্যে নিশ্চুপ। বড্ড মজার দিন ছিলো সে ছোটবেলাটা। সেই রেহালা আজ হটাত করেই আমার অফিসে এসে হাজির।

প্রথমে তো আমি রেহালাকে চিনতেই পারিনি। ওর শরীর অনেক মোটা হয়ে গেছে, রেহালা আগেই শ্যামলা ছিলো, আর এখন ওর চেহারা এতো কালো হয়ে গেছে যে, আগের আর সেই ডায়মন্ডের মতো চেহারাটা নাই। মাথায় চুলে পাক ধরেছে। কতই বা বয়স, তারপরেও মনে হচ্ছে বুড়ি হয়ে গেছে রেহালা। কিন্তু হাসলে ওর গালে এখনো টোল পড়ে। চোখ গুলি এখনো ডাগর ডাগর। কন্ঠে আর সেই সুর এখন নাই রেহালার। রেহালা আমার অফিসে একা আসে নাই। ওর সাথে ওর ছোট বোন এসেছে। ওর ছোট বোন কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বল্লো যে, বুজি (মানে আপা) কানে শুনে না। অনেক জোরে জোরে কথা বললে কিছুটা শুনতে পায়। যেহেতু কানে শুনে না, তাই, অন্যের কথাও বুজি ভালোমতো শুনতে না পাওয়ায় কি কথা বলছে কেউ বুঝতে পারে না। তাই সাহাজ্যকারী হিসাবে বুজি কোথাও গেলে আমিই সাথে যাই।

রেহালা আমার অফিসে বসেই কিছুক্ষন যেনো হাপিয়ে উঠেছিলো। রেহালার প্রথম কয়েক মিনিটের কথার অর্থ এমন ছিলো যে, এতোদিন পর রেহালা আমার সাথে দেখা হওয়ায় যেনো সেই ছোট বেলার রাজ্যের গল্পের পশরা নিয়ে হাজির হয়েছে। ওর বলার উচ্ছাস, মুখের অভিব্যক্তি আর অনর্গল কথার মধ্যেই আমি বুঝতে পারছিলাম রেহালা আজ অনেক অনেক খুসি যে, সে আমার সাথে দেখা হয়েছে। কখনো দুই হাত তুলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে, কখনো নিজের অজান্তেই কি যেনো দোয়া দরুদ পাঠ করছে আবার কোনো কারন ছাড়াই হেসে দিচ্ছে। ঝির ঝির বাতাসে তরু পল্লব কিংবা ক্ষেতের দন্ডায়মান ফসলরাজী যেমন হেলিয়া দুলিয়া এদের মনের সুখ প্রকাশ করে, নির্মল নীলাকাশ যেমন তার একখন্ড মেঘের ভেলাকে এদিক থেকে সেদিকে উড়াইয়া লইয়া যায়, রেহেলা তেমনি আমাকে এতো বছর পর পেয়ে যেনো তার সেই দশাই হলো।  রেহালা মাথার বোরখাটা খুলে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলো। রেহালার আগমনে আমার অফিসে কোনরূপ সমারোহ ছিলো না, কিন্তু আজিকার এই মুহুর্তে সমস্ত বিশ্ব ব্যাপারের সর্বাধিনায়িকা যেনো এই রেহালাই হয়ে দাড়াল। রেহালার এমন উচ্ছাসিত আচরনে আমার যেনো বিস্ময়ের কোনো শেষ ছিলো না।

এখানে আরো একটা ব্যাপার আমাকে রেহালা বিস্মিত করলো। রেহালা ছোটবেলায় আমাকে ‘তুই’ বলেই ডাকতো, কিন্তু আজকে খেয়াল করলাম, রেহালা আমাকে আর তুই; বলছে না, কাকা বলে ‘আপনি’ সম্মোধন করছে। গ্রামের সম্পর্কের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে রেহালার সাথে আমার কাকা ভাতিজারই সম্পর্ক। কিন্তু এই সম্পর্ক কিসের ভিত্তিতে সেটা আমার ছোট বেলায়ও জানা ছিলো না, আজ তো সেটা জানার কোনো ইচ্ছাও নাই। আমি রেহালার বাবাকে ‘ভাই’ বলেই ডাকতাম সেটা আমার মনে আছে। আমি রেহালাকে বললাম যে, সে যেনো আমাকে “তুই বা তুমি” করেই বলে।

আমি জানি রেহালার বাবা এবং অন্যান্য ভাই বোনেরা এখনো জীবিত আছে। আর তারা মাঝে মাঝেই আমার অফিসে কিছু না কিছু সাহাজ্য বা পরামর্শের জন্য আসে। কখনো তাদের সাথে আমার দেখা হয়, আবার কখনো কখনো দেখা হয়ও না। ফলে আমি রেহালাকে ওদের ব্যাপারে কোনো প্রশ্নও করতে চাইনি। একমাত্র রেহালার ব্যাপারেই আমার অনেক কিছু জানা ছিলো না। তাই প্রথমেই রেহালাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, রেহালা কেমন আছে। রেহালা কি শুনলো আর কি বুঝলো আমি জানি না কিন্তু রেহালা বলতে থাকে-

কাকা, তোমারে কতবার যে আমি দেখতে চাইছি মনে মনে, আর আফসোস করছি, ইশ যদি মরার আগে তোমার সাথে আমার একবার দেখা হতো। অনেকের কাছেই আমি তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছি, তুমি কই থাকো, কিংবা কোথায় গেলে তোমাকে পাওয়া যাবে ইত্যাদি কিন্তু কেউ আমাকে তোমার আসল ঠিকানাটা দিতে পারে নাই। শুধু এটুকু জানতাম যে, তুমি এই এলাকাতেই বড় ব্যবসা নাকি করো। একবার শুনেছিলাম, তুমি নাকি গ্রামে গেছো। আমি তখন গ্রামেই ছিলাম। কিন্তু আমি লজ্জায় তোমার সাথে দেখা করার সাহস করি নাই। সেটাও আজ থেকে প্রায় বারো বছর আগের কথা। তখন সবেমাত্র আমি আমার জামাইয়েরে নিজের ইচ্ছায় তালাক দিছি। গ্রামে একজন মহিলার সংসার ভেংগেছে, তালাক হয়েছে এটা যে কত বড় কেলেংকারী, সেটা মেয়ে না হলে আসলে কেউ বুঝতে পারে না। 

আমি রেহালাকে জিজ্ঞেস করলাম, স্বামীকে তালাক দিলি কেনো?

রেহালা সহজেই আমার প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছিলো। রেহেলা অনেকক্ষন মাথা নীচু করে কি যেনো ভাবলো। দেখলাম, রেহেলা কাদছে। তাঁর ফুপিয়ে কান্নার একটা শব্দ পেলাম। আমি রেহেলাকে কিছুই বললাম না। রেহেলাকে আমি সময় দিলাম, রেহেলা কাদছে। তারপর টেবিলে রাখা একটি গ্লাস থেকে কয়েক ঢোক পানি গিলে বলতে লাগলো-

কাকা, একটা কথা কি জানেন? বিয়ের সময় খুসি আর ভালোবাসায় এটা প্রমানিত হয় না যে, ভবিষ্যতে এই সুম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বা ঘৃণা আসবে না। মধুর ভালবাসা যেমন একদিন ঘৃণার বিষে রুপান্তরীত হতে পারে, আবার গভীর ঘৃণাও হয়তো সমস্ত বাধা কাটিয়ে পুনরায় চরম ভালোবাসায় পরিনত হতে পারে। কিন্তু কখনো যদি ভালোবাসার মধ্যে ঘৃণা ঢুকে পড়ে, তিক্ততার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে এখন এই সম্পর্ককে শেষ করা উচিত। বুঝে শুনে বেরিয়ে আসা উচিত। যাতে তার আগে কোনো মারাত্তক অঘটন না ঘটে। কিন্তু আফসোস, প্রায়ই তিক্ত সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনা। হোক সেটা সমাজের তথাকথিত লোক লজ্জার ভয়ে অথবা অভিভাবকের অতিরিক্ত চাপের কারনে। তখন এমন হয় যে, সেই দম্পতির যে একদিন ভালোবেসে যারা খুব কাছে এসেছিলো, তারা আজ সম্পর্কের তিক্ততায় একজন আরেকজনকে চাকু, বন্ধুক চালাতে পিছপা হয়না। তখন একজন আরেকজনের প্রান নিতেও দ্বিধাবোধ করেনা অথচ কোনো একদিন তারা তাদেরকে নিজেদের মানুষই ভাবতো। বিয়েটা হয়তো সত্যিই একটা কন্ট্রাক্ট। আর সেই কন্ট্রাক্টের মধ্যে নিহীত থাকে অনেক দায়িত্ব, অনেক কর্ম পরিধি। 

রাহেলার এমন জীবনভিত্তিক কথায় আমিও খুব অবাক হলাম। রাহেলা কি সুন্দর করে তাঁর জীবনের কিছু অভিজ্ঞতার কথা এক নিমিষে বলে গেলো। অনেক পড়াশুনা হয়তো রাহেল করে নাই কিন্তু ওর কথাবার্তা যেনো আমার অন্তরে তীরের মতো বিধে গেলো। আমি রাহেলার কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম।

 রাহেলা বলতে থাকলো-

সেদিন সম্ভবত গুড়িগুড়ি বৃষ্টির দিন ছিলো। আমার স্বামী আমারে বল্লো, চলো, নারায়নগঞ্জ আমার এক বন্ধুর বাসা থেকে বেড়িয়ে আসি। আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসে কিনা তা আমি কখনো বুঝি নাই। বিয়ের পর থেকে যে শ্বশুর বাড়িতে ঢূকেছি, সারাক্ষন স্বামী, সংসার, ছেলে মেয়ে ননদ ননদীনির দায়িত্ব পালন করতে করতেই আমার দিন পার হতো। আর এসব দায়িত্ব পালনে কোথাও কোনো ত্রুটি হলেই আমার উপরে চলতো খড়গের মতো আচরন। আমার স্বামী নেশা করতো। বিয়ের আগে নেশা করতো কিনা জানি না, কিন্তু বিয়ের কদিন পরেই বুঝলাম, সে প্রায় রাতেই নেশা করে ঘরে ফিরে। কি তাঁর দুঃখ, কি তাঁর কষ্ট কখনো সেটা আমি বুঝতে পারি নাই। ফলে, সুযোগ আর কোনো ব্যত্যয় কিংবা তাঁর নেশার জগতে একটু ভাটা পড়লেই কারনে অকারনে আমাকে মারধোর করতো। সেই মারধোরের কারনেই আমি আমার কান হারাই। মার খেতে খেতে কানটা একদিন অকেজোই হয়ে গেলো। গরীব বাবা মা, পয়সাকড়ি নাই, যৌতুক যা দেয়ার সেটা দেয়ার পরেও জামাইয়ের মন ভরে নাই। দিনের পর দিন এই অতিরিক্ত যৌতুক আর টাকার জন্য আমাকে মার খেতে হয়েছে। ঘরে ভালোমতো বাজার হয় না, অথচ কেনো ভালোমতো রান্না হয় না সেটা যেনো আমার অপরাধ। সহ্য করে থেকেছি। মুখ বন্ধ করা ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না। গরীব পিতামাতার সন্তানেরা নাকি “আগুনে পানি দিয়ে” সংসার করে। আমিও তাই করার চেষ্টা করেছি। যাই হোক, যখন আমার জামাই আমাকে বল্লো, চলো এক বন্ধুর বাসায় বেড়াইয়া আসি, ভাবলাম, হয়তো মনটা তাঁর পরিবর্তন হয়েছে। আমারো মনটা ভালো হয়ে গেলো। আনন্দিতই হয়েছিলাম। কারন যে কখনো আমাকে পাশের দোকানে নিয়ে একটা চকলেটও কিনে খাওয়ায় নাই। আজ তার এহেনো অনুরোধে বেশ পুলকিত বোধ করছিলাম। বললাম, চলেন যাই।

আমি আর আমার স্বামী বিকাল ৫টার পরে কাপড় চোপড় পড়ে নারায়নগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমাদের বাড়ি থেকে নারায়নগঞ্জ খুব বেশী দূরে না। ফলে সন্ধ্যার আগেই আমরা ওর বন্ধুর বাসায় চলে এলাম। রাতের খাবার খেয়ে হয়তো আমরা আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে আসবো এটাই ছিলো আমার জানা। আমি আমার ছোট ছেলেকে সাথে নিতে চাইলাম। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে নিতে বারন করলেন। ভাবলাম, ভালোই হবে, আমরা নীরিবিলি দুজনে একসাথে রিক্সায় ঘুরতে পারবো। পাশাপাশি বসে গল্প করতে পারবো। সময়টা ভালোই কাটবে। আমরা যখন তাঁর বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যার একটু আগে। তার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দেখি, বন্ধুর স্ত্রী বাসায় নাই। শুনলাম ছোট বাচ্চাকে নিয়ে নাকি সন্ধ্যার পর আসবে, হয়তো কোথাও কাজে গেছে। চা খেলাম, সাথে কিছু ফলমুলাদি। খারাপ লাগছিলো না। সন্ধার পর হটাত করে আমার স্বামী বাজার থেকে কি জানি আনতে বাইরে যাওয়ার কথা বলে আমাকে একা রেখে চলে গেলেন। একটু ভয় ভয় করছিলো কিন্তু খারাপ কিছু মাথায় আসে নাই। সময় যাচ্ছে, আবারো সময় যাচ্ছে, ঘন্টা, তারপর আরো এক ঘন্টা, কিন্তু আমার স্বামীর ফিরে আসার কোনো লক্ষন দেখলাম না। এদিকে রাত বেশী হয়ে যাচ্ছে, আমি বারবার ওর বন্ধুকে আমার স্বামীর কথা বল্লেও দেখলাম সে খুব একটা কথা আমলে নিচ্ছে না। আমি আমার স্বামীর এই বন্ধুকে আগে থেকে চিনতামও না। রাত প্রায় ১১টার উপরে বেজে গেলো, আমার স্বামীর ফিরে আসার কোনো নামগন্ধও নাই। এবার আমার খুব ভয় করছিলো। জীবনে কোনোদিন শহরেও আসি নাই। আর এখন পুরু একটা অপরিচিত লোকের বাসায় আমি একা। বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা রেখে এসছি। ওদের জন্য ভীষন দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো।

আমি চারিদিকে কান খারা করে সবকিছু খেয়াল করছিলাম। আমার খুব ভয় লাগছিলো। একটু পরে আমি খেয়াল করলাম, এই বাড়িতে কিছু অপরিচিত লোকের আনাগোনা যেনো বেড়ে গেছে। কেউ কেউ বাইরে ফিসফিস করে যেনো কি কি কথাও বলছে। কেউ কেউ আবার আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছেও। বুঝতে পারলাম, তারা হয়তো আমাকে নিয়ে কোনো আলাপ করছে কিন্তু কি আলাপ করছে বুঝতে পারছিলাম না। তখন রাত প্রায় বারোটা বেজে যাচ্ছিলো।

এক সময় ৩০/৩৫ বছর বয়সের একজন পুরুষ আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো- কি নাম তোমার? আসো ওই ঘরে যাই। এই বলে পাশে একটা ঘরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো।

আমি জিজ্ঞেস করলাম- কে আপনি ভাই? আর আমি ওই ঘরেই বা কেনো যাবো? আমার স্বামী কই? সে এখনো আসছে না কেনো? আমার বাড়ি যাওয়া দরকার। আমার বাচ্চারা একা বাসায়। ওরা হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমার কথা শুনে লোকটি পিছনে ফিরে এসে আমাকে সে যা বল্লো, সেটা শুনে তো আমার মাথা খারাপ। আমাকে নাকি আমার স্বামী এখানে দেহ ব্যবসার জন্য বিক্রি করে টাকা নিয়ে চলে গেছে। সে আর ফিরবে না। রাতটা এমনিতেই অন্ধকার ছিলো, লোকটার কথা শুনে এবার যেনো মহাঅন্ধকারের মধ্যে আমাকে আমি মৃত লাশের মতো শ্মশানের মধ্যে দেখতে পেলাম যেখানে আমাকে কিছু জীবন্ত শিয়াল কুকুর তাড়া করছে, অথচ আমার কোনো শক্তি নাই।

চিৎকার করতে লাগলাম, আর বলতে লাগলাম, এটা কি করে সম্ভব? তোমরা আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনো। আমি ওরকম মেয়ে নই যে, তোমরা আমার সাথে এমন আচরন করতে পারো। আমি ভয়ে আরো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে গেলে আমাকে কয়েকজন এসে এমনভাবে জাপটে ধরলো যে, না আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিলো, না আমি কোনোদিকে নড়াচড়া করতে পারছিলাম। কিন্তু আমার চোখ তো আর কোনো কিছুতে বাধা পড়েছিলো না। আমার বাচ্চাদের কথা মনে পড়লো, আমার ছোট ছেলেটা খুব মগা (বোকা), তার কথাই বেশী মনে পড়লো। তার মাত্র ৮ বছর বয়স। সে আমাকে ছাড়া কোথাও যেতে চায় না। ওকে একা ফেলে এসেছি। ছেলেটা মগা হলেও কখনো আমার হাতছাড়া করতো না। ওর মুখটা ভেসে উঠতেই আমার দুচোখ ঝাপ্সা হয়ে আসছিলো। আহা রে বাপ, দেখে যা তোর মা কত অসহায় একটা পরিস্থিতিতে ছটফট করছে। তোর অমানুষ বাবা আমাকে কোথায় ফেলে গেলোরে বাবা।

রেহালা কিছুক্ষন চোখ বুজে থাকল, তার দুচোখের পাশ দিয়ে জলের একটা রেখা যেনো অবিরত জল পড়তেই থাকলো। একটু পর আবার রেহালা বলতে থাকল-

জানো কাকা, কোনো কোনো সময় কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই নাটক তৈরী করা হয়। আমার স্বামীও আমার সাথে ঠিক এমনই একটা ভরষার স্থান তৈরী করেছিলো। আর সেটা ছিলো নিছক একটা নাটক যা আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি। আমি কি এটাই চেয়েছিলাম? আজ দুপুরে যখন সে আমাকে বেড়াতে নিয়ে আসবে বলে জানালো, আমি তো আমার সমস্ত বিশ্বাস নিয়েই তাঁর সাথে অজানা এক বন্ধুর বাড়িতে রওয়ানা হয়েছিলাম। বিকালটা কত সুন্দর ছিলো। চারিদিকের গাছপালা, আশ পাশের দোকানী, মানুষগুলিকে দেখে তো আমার মন অনেক পুলকিতই ছিলো। তাহলে এই হটাত কি গজব আমার উপর আছড়ে পড়লো? আমি কি কখনো আমার স্বামীকে একটিবারের জন্যেও ভালোবাসিনি? কখনো কি আমি ওর বেদনায় কাতর হই নাই? কখনোই কি ও আমাকে স্নেহ কিংবা ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরে নাই? আমি তো আমার জীবনের সবকিছু দিয়ে ওকে ভরষা করেই বাপ মায়ের বাড়ি ছেড়েছিলাম। তাহলে সে এমন নিষ্ঠুর কাজটি কেন আর কিভাবে করতে পারলো? আমি কি ওর বাচ্চার মা নই? আমাকে সে না ভালোবাসুক, ওর বাচ্চাগুলির জন্যেও কি সে আমাকে ছেড়ে দিতে পারতো না? মুখবাধা ঠোট দিয়ে সমস্ত বেদনাগুলি যেনো শুধু গোংগানীর মতোই মনে হচ্ছিলো আমার কাছে। অথচ এই গোংগানির মধ্যে কত যে অস্থিরতা, কত যে আক্ষেপ, কত যে ভালোবাসা আর কষ্ট লুকিয়ে ছিলো তা যেনো আমাকে ঝাপ্টে ধরে রাখা মানুষগুলির কানেই গেলো না।

আমার আল্লাহর কাছে আমি চোখ বন্ধ করে শুধু একটা কথাই প্রার্থনা করলাম, যদি আমি সতীনারী হয়ে থাকি, যদি আমি আমার এক ঈশ্বরকে কখনো কায়মনে ডেকে থাকি, যদি তিনিই হয়ে থাকেন আমার একমাত্র ত্রানকর্তা, যদি আমার প্রভুই হয়ে থাকে সমস্ত বিপদের উদ্ধারকারী, তাহলে আমি আমার সেই একচ্ছত্র প্রভুর কাছে দয়া ভিক্ষা করছি তিনি যেনো আমাকে তাঁর গায়েবী ক্ষমতা দিয়ে এই নরক থেকে বাচিয়ে দেন। হে ঈশ্বর, আমি তোমাকে কখনো দেখিনি, কিন্তু আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছি, তোমার দরবারে আমি প্রতিদিন মাথা নুইয়েছি, তুমি আমাকে বাচিয়ে দাও ঈশ্বর। লোকগুলি ইতিমধ্যে আমার চিৎকার চেচামেচিতে গন্ডোগোল হতে পারে ভেবে, কিংবা আশেপাশের লোকজন কিছু আচ করতে পারে জেনে আমাকে তাদের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলো। আমার চোখ বন্ধ ছিলো, আর আমি গোল হয়ে মাটিতে নিথর দেহে বসেছিলাম। আর আমার চোখ থেকে অনবরত অশ্রু ঝরছিলো।

তারপর কি হয়েছিলো আমি জানি না। কিন্তু ঐ ৩০/৩৫ বছর বয়সের যুবকটি আমাকে ডেকে বল্লো- এদিকে আসো আমার সাথে। কিন্তু কোনো কথা বলবে না। আমি যা বল্বো, সেটাই করবে। আমি বুঝতে পেরেছি তুমি একটা পিশাচের পাল্লায় পড়েছো। সে জানতে চাইলো, আমার সাথে কোনো টাকা পয়সা আছে কিনা। আমি লোকটির চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম, এটাও ভাবছিলাম, সে আমার সাথে এবার অন্য কোনো চাল চালছিলো কিনা। কাউকে বিশ্বাস করা কিন্তু ভুল নয়। তবে চোখ বন্ধ করে কাউকে বিশ্বাস করা একেবারেই ভুল। তাই আমাদের এটা জানা খুব দরকার যে, সামনের মানুষটাকে বিশ্বাস করবো নাকি করবো না।

তাঁর আচার ব্যবহারে আমার কাছে সে রকম মনে হলো না। মনে হলো আসলেই বুঝি তাঁর মাধ্যমে আমার ঈশ্বর আমাকে সাহাজ্য পাঠিয়েছেন। বললাম, আমার কাছে কোনো টাকা পয়সা নাই। সে আমার কানে কানে চুপিসারে শুধু একটা কথাই বল্লো- আসো, আমি তোমাকে এখান থেকে দ্রুত বের করে দেবো। আমি জানি তুমি খারাপ মেয়ে নও। আমিও তোমার কাছে কোনো শরীরের চাহিদায় আসি নাই। আমি এখানকার একজন এজেন্ট মাত্র। আমাকে আর এর বেশী কিছু জিজ্ঞেস করোনা। আর জিজ্ঞেস করলেও আমি সব কিছুই মিথ্যে বল্বো।

রাহেলা এবার একটু থামলো। সামনে রাখা গ্লাস থেকে সে আরো একবার এক ঢোক পানি পান করলো। রাহেলার চোখে মুখে যেনো এখনো সেই অতীতের ভয়টা স্পষ্ট ফুটে উঠছিলো। মাঝে মাঝে সে শিহরিত হয়ে উঠছিলো। বুঝতে পারছিলাম, রাহেলার সেই ভয়টা এখন আবার যেনো নতুন করে তাঁর সামনে জেগে উঠেছে। রাহেলা তাঁর বোরখার একটা আচল দিয়ে মুখটা মুছে নিলো। দেখলাম, রাহেলা একটু একটু ঘেমে গিয়েছে। আমি আমার রুমের এসিটা অন করে দিয়ে বললাম, তারপর?

কাকা, কিভাবে কি হয়ে গেলো আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। লোকটি আমাকে একশত টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বল্লো, শীঘ্রই এখান থেকে এই দরজা দিয়ে বের হয়ে যাও। আমি পাহারায় আছি। এই গোপন দরজাটা দিয়ে আমরা বিপদের সময় পালিয়ে যাই। এটাকে আমরা কোডে বলি- (রেহালা নামটা মনে করতে পারলো না।)

এতো অন্ধকার রাত, তারপর গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, অনিশ্চিত একটা পলায়নে আমি কোথায় যাচ্ছি সেটাও আমি জানি না। এটা কি গরম তেল থেকে লাফিয়ে উনুনে নাকি হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে বাচার তাগিদে নীচে পতন আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তারপরেও আমি সেই দরজা দিয়ে বের হয়েই পাগলের মতো ছুটছিলাম। কোথায় ছুটছিলাম, কোনদিকে ছুটছিলাম আমি নিজেও জানি না। অনেক রাত, রাস্তায় বেশী লোক ছিলো না। আধো আলয় ভরা শহরের রাস্তার কিছু লাইট পোষ্ট এমন করে রাস্তাকে আলকিত করেছিলো যেনো সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে কন এক ভুতুরে পল্লির মতো দেখাচ্ছে। এম্নিতেই মনে আকুন্ঠ ভয়, তারমধ্যে অজানা এক দুসচিন্তা, তার উপরে রাতের এতো ভয়ংকর রুপ। কিছু লোকজন এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখা যাচ্ছিলো বটে কিন্তু যারাই ছিলো তারা আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলো, হয়তো ওরা ভাবছিলো, এতো রাতে আমি দৌড়াচ্ছি কেনো, বা আমি কি পাগল কিনা, অথবা রাতের কোনো চোর কিনা ইত্যাদি। কে কি ভাবলো, আর কে কিভাবে আমার দিকে তাকালো সে ব্যাপারে আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। আমি শুধু দৌড়াচ্ছিলাম আর দৌড়াচ্ছিলাম।  অবশেষে আমি একটা পানবিড়ির দোকানে এসে থামলাম। কয়েকটা উঠতি বয়সের ছেলে ওখানে চা খাচ্ছিলো।

আমি হাপাতে হাপাতে বললাম-

বাবারে আমি খুব বিপদে আছি। আমার স্বামী আমাকে বেড়ানোর নাম করে নিয়ে এসে আমাকে খারাপ জায়গায় বিক্রি করে দিতে এসছিলো। আমি পালিয়ে এসছি। আমার বাড়ি, নগরঘাট (নামটা ছদ্দনাম)। আমি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, এই জায়গাটা আমি চিনিও না, আর এখান থেকে আমি আমার গ্রামের বাড়ি কিভাবে যাবো, তাও আমার জানা নাই। আমার ছোট ছোট বাচ্চারা হয়তো এখন আমার জন্য কান্নাকাটি করছে। তোমরা আমাকে একটু সাহাজ্য করো বাবারা। আমি ওদের এটাও বললাম, আমার কাছে একশত টাকা আছে। আমাকে সাহাজ্য করো তোমরা।

জানো কাকা, আসলে এই দুনিয়ায় নরপিশাচ যেমন আছে, তেমনি ভালো মানুষও আছে। সেদিন আমি বুঝেছিলাম, মানুষ কি আর নরপিশাচ কি। ছেলেগুলি আমার কথা শুনে খুব উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বল্লো- কে সে, কই সে। চলেন আমরা ওকে এখন ধরবো। আমি বললাম, কিছুই দরকার নাই বাবারা। তোমরা শুধু আমাকে আমার বাচ্চাদের কাছে দিয়ে চলো। আমি তোমাদের মায়ের মতো, আমি আজিবন তোমাদের জন্য আমার সেই পরম ঈশ্বরের কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে দোয়া করবো। আমাকে তোমরা আমার সন্তানের কাছে নিয়ে চলো বাবারা। বলেই আমি দোকানের সামনে ভেজা মাতিতে বসে পড়েছিলাম। আমার পায়ে কন শক্তি ছিলো না, আমার সারা গা বৃষ্টির পানিতে ভিজে গিয়েছিল, আমার দম প্রায় বন্দ হয়ে এসছিলো। তারপরেও আমার হৃৎপিণ্ড সচল ছিলো, আমার প্রানটা জীবিত ছিলো।  

ছেলেগুলি আমাকে টেনে তুলে দোকানের ঝাপের ভিতর নিয়ে গেলো। সব সন্তানের চেহাড়া মনে হয় একই। বিশেষ করে মায়েরদের জন্য। ওরা আমাকে এক কাপ গরম চা দিল, মাথা মুছার জন্য কয়েকটা পুরান পেপার দিলো। আমি যেনো একটু স্থির হচ্ছিলাম। ছেলেগুলির মধ্যে দুইজনের দুইটা হুন্ডা (বাইক) ছিলো। চা খাওয়ার পর, ওরা একটা হুন্ডায় আমাকে আর আরেকটা হুন্ডায় ওরা তিনজন উঠে আমার বাসার অতি নিকটে ছেড়ে গেলো। যেখানে ওরা আমাকে ছেড়ে গেলো, সেই জায়গাটা আমি চিনতাম। সেখান থেকে আমি অনায়াসেই আমার বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমি যখন আমার বাড়িতে আসি, তখন রাত বাজে প্রায় আড়াইটা। সব বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে শুধু আমার মগা ছেলেটা বারান্দায় বসে আছে। মশার কামড়ে সে জর্জরীত কিন্তু আমাকে না পেয়ে কখন আমি ফিরবো তারজন্যে একাই বাইরের বারান্দায় বসে আছে। বৃষ্টি হচ্ছিলো, ফোটা ফোটা বৃষ্টিতে ছেলেটার সারা শরীরই প্রায় ভেজা। আমি ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাদলাম। আমার ছেলেটা আমাকে এমন করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাদতে লাগলো যে, আশেপাশের মানুষগুলি যারা ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো তারাও সজাগ পেয়ে ছুটে এলো। আমি শুধু কাদছি, কিন্তু কেনো কাদছি, কিসের কষ্টে কাদছি, সেটা আর কাউকেই বলতে পারি নাই। কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট যে কষ্টের কোনো নাম নাই, যে কষ্টের রুপ কাউকে দেখানো যায় না। আমি শুধু কেদেই যাচ্ছিলাম। কষ্টটা ছিলো আমার মনের অনেক গভীরে।

অনেকেই অনেক প্রশ্ন করছিলো, এতো রাতে আমি কোথা থেকে এলাম, কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরও আমার দিতে ইচ্ছে করছিলো না। আমার স্বামী কই, কিংবা সেতো আমার সাথেই সন্ধ্যার দিকে বেরিয়েছিলো, তার হদিস অনেকেই জানতে চাইলেও আমার কোনো কিছুই বলার মতো অবকাশ তো ছিলোই না বলতেও ইচ্ছে করছিলো না। শুধু আমি আমার সেই এক এবং অদ্বিতীয় আল্লাহকে আকাশের দিকে হাত তুলে বললাম- মহান তুমি, তুমি আছো সর্বদা সবার সাথে, দূর্বলের সাথে, অসহায়ের সাথে। আর তুমি সত্যিই সব পারো মাবুদ। কে বলে ঈশ্বর নাই? যে বলে ঈশ্বর নাই, সে বোকা, আর যিনি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন সে জানে ঈশ্বর কোথায় কিভাবে তার হাত প্রসারিত করে। ঈশ্বর বসবাস করেন সর্বত্র। শ্মশানে, আকাশে, পাহাড়ে, জলে অন্তরীক্ষে, আর থাকেন মনের একেবারে অন্তস্থলে। কান্নায় আমার শুধু বুক ভেসে যাচ্ছিলো।

রাহেলার এমন একটা অতীত জীবনের ইতিহাস শুনে আমি হচকচিয়ে উঠেছিলাম। মহিলাদেরকে আমরা দেবীর সমান তুলনা করে থাকি। কখনো কখনো আমরা তাদেরকে মায়ের আসনে বসিয়ে পুজার বেদী রচনা করে থাকি। কিন্তু আফসোস যে, এটা শুধু মন্দির আর পুজার ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। মহিলাদের সাথে লাগাতার অন্যায় আর অপরাধ ঘটে যাওয়া এটাই প্রমান করে যে, আমাদের সমাজে আমরা যে মহিলাদেরকে দেবী বলি তারা এমন অনেক দানব দ্বারা ঘিরে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে নরক করে তুলেছে। প্রকাশ্যে কোনো মহিলাকে পুড়িয়ে মারা হয়, নির্যাতন করা হয়, ধর্ষন করা হয় অথচ কেউ এগিয়ে আসে না। এই সমাজে কেনো মানুষের রক্ত ততক্ষন পর্যন্ত গরম হয় না যতক্ষন না অবধি কোনো সমস্যা তাদের ঘরের ভিতরে চলে না আসে।  হিন্দু শাস্ত্রে নাকি একটা কথা আছে-ইয়ত্রা নারায়স্ত পুজায়ান্তে রামাতে তাপ্তা দেবতা অর্থাৎ  যেখানে নারির পুজো হয়, সেখানে দেবতা বসবাস করে। এটা আসলে শুধু কথার কথা সত্যিটা অন্যকিছু। কোথাও কখনো কোনো নারীর পুজা হয়নি। না হিন্দু শাস্ত্রে, না আমাদের ধর্মে, না অন্য কোথাও।

রেহালা আবারো বলা শুরু করল-

কাকা-সেই সারারাতে আমি একটুও ঘুমাতে পারি নাই ভয়ে। আমার শরীর ভেংগে গিয়েছিলো, অনেক জ্বর এসছিলো, মাথা ব্যথায় আমার মনে হচ্ছিলো মাথাটাই যেনো আমার সাথে নাই। আমার সেই মগা ছেলেটা সারারাত আমার মাথায় পানি ঢেলে আমার মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর খালী একটা কথাই বলে যাচ্ছিলো-মা আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেও না। তোমাকে ছাড়া আমি ভয় পাই। যতোবার সে আমাকে এই কথাগুলি বলছে, ততোবারই যেনো আমার ভিতরে কে যেনো এক কঠিন হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে আর বলছে- এই স্বাধীনতার মুল্য কি যেখানে খাচায় বন্দি আমি? এই জীবনের কি অর্থ আছে যেখানে আমি কলা, মুলা আর পন্যের মতো অন্যের ইচ্ছায় বিক্রি হয়ে যাই? এই দাম্পত্য জীবনের কি মাহাত্য যেখানে প্রতিদিন আমাকে শুধু অন্যের মন জোগানর জন্য নিজেকে সপে দিতে হয় পিশাচের কাছে? আমার ভিতরে তখন যেনো রাগ, ঘেন্না আর প্রতিশোধের ইচ্ছাতা বেরিয়ে আসছিলো। আমি হিংস্র হয়ে উঠছিলাম।  

রাহেলার এই কথাগুলির সাথে আমি একমত ছিলাম। সত্যি তো। গরীব হওয়া পাপ নয়, উচু সপ্ন দেখাও পাপ নয়, বড় হবার চেষ্টা করাও অপরাধ নয়, কিন্তু অন্য কারো জীবনকে এরুপ নষ্টের দিকে ঠেলে দিয়ে কিংবা অন্যের কোনো আত্মসম্ভরনকে বিকিয়ে দিয়ে কিংবা অন্যের জিনিষকে অন্যায়ভাবে নিজের সার্থের জন্য টাকা রোজগার করা চেষ্টা করা একটা অপরাধ। এই অপরাধের একটা খেসারত আছে। কেউ সাথে সাথে পায়, আর কেউ একটু দেরীতে। কিন্তু প্রাপ্যটা আসেই। লাইফটা কোনো ষ্টক মার্কেটের কোনো শেয়ার নয় যে প্রতিদিন এটার দাম উঠানামা করবে। এটা আসলে সেটা যা একবার উঠে গেলে আর পড়ে না, আবার পড়ে গেলে আর উঠে না।

রাহেলা বলতে থাকে তাঁর সেই রাতের বাকী কথাগুলি।

সকালে আমি উঠানে গেলাম, বসে রইলাম কখন আমার সেই নরপিশাচ স্বামী বাড়িতে আসে। সে হয়তো ইতিমধ্যে জেনে গেছে-আমি আর ঐ নারায়নগঞ্জে নাই। পালিয়েছি। কিছুই খেতে পারলাম না সারাদিন। আর খাওয়ার কিছু ছিলোও না। বমি বমি আসছিলো। দুপুরের দিকে একটু শুয়ে ছিলাম। কিন্তু ঘুমিয়ে ছিলাম না। সেই দুপুরের দিকে আমি ওর পায়ের আওয়াজের সাথে মুখের আওয়াজও শুনলাম। সে ঘরে ঢোকেই চোখ লাল লাল করে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করলো আর আমাকে মেরেই ফেলবে এমন হুংকার দিতে থাকলো। বড় বড় বিস্ফোরণের আগে ছোট ছোট ফুলকীর দিকে নজর দিতে নেই। তাতে বড় বিস্ফোরণের জন্য ব্যাঘাত হয়। আমি একটা শব্দও করলাম না, কোনো উত্তরও করলাম না। কোনো এক শক্তিশালী ঝড়ের আগে যেমন আকাশ থম্থমে হয়ে যায়, গাছপালারা স্থির ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, একটা পাতাও নড়ে না, খালী মাঝে মাঝে গুরুম গুরুম কিছু শুষ্ক ঠাটা পরার মতো আওয়াজ ভেসে আসে কোনো এক দূরবর্তী আকাশ থেকে, ঠিক এমন একটা পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো আমার ঘরে সাথে মনের ভিতরেও। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম এমন একটা সুযোগের জন্য যাতে আমি আমার বাড়ির পুতাটা দিয়ে ওর মাথায় একটা আঘাত করতে পারি। ওর উপর আমার কোনো প্রকার ভালোবাসা নাই, শ্রদ্ধাবোধ নাই। আমি ওকে যেনো আর চিনি না। কোনো এক সময় যে আমি অর বুকে শুয়েছিলাম সেটাও আমার মনে পড়ল না। সে যে আমার সন্তানের বাবা সেটাও আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে নাই। বারবার মনে হয়েছিলো, এদের বেচে থাকার কোনো মানে হয়না। এরা সর্বদা মানুষের শান্তির জন্য হুমকী, সমাজের জন্য হুমকী। পুতাটা আমি রেডিই করেই রেখেছিলাম আগে।

আমার সেই সুযোগটা এক সময় এলো। আমি একটু সময়ও নষ্ট করিনি। একটা আঘাতই আমি ওর মাথায় করেছিলাম। ও অজ্ঞান হয়ে গেলো। একবার ভাবলাম, ওর গলাটা কেটে দেই, আবার ভাবলাম, না, ওকে এমনভাবে মারবো যাতে সারাজীবন আর সোজা হয়ে দাড়াতে না পারে। আমি ইচ্ছে মতো ওর হাটু আর কোমড়ে পুতা দিয়ে আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে থেতলা করে দিয়েছিলাম। আমার কোনো দুঃখ হয় নাই।

আমি রাহেলাকে জিজ্ঞেস করলাম, ও কি মরে গিয়েছিলো?

না কাকা- এই পিচাশটাকে আমি প্রানে একেবারে মেরে ফেলতে চাইনি, আর ও মরেও নাই। কিন্তু ও বেচে গিয়েও আর বেচে থাকবে না এটা আমার বিশ্বাস। তার কয়েকদিন পর আমি ওকে তালাক দিয়ে ওখানেই ছেলেদের সাথে রয়ে গেলাম। কিন্তু বাপের বাড়ি ফিরি নাই। সে এখন পংগু। এটাই ওর বিচার। কিসের সমাজ, কিসের আদালত, কিসের হিউমেনিটি? আমার কোনো আফসোস নাই। একা জীবন অনেক ভালো এসব নরপিশাচের সাথে থাকার চেয়ে। ওকে এভাবে মারার কারনে কেউ আমাকে বাধা দেয় নাই। কারন সবাই জানতো ওর ব্যবহার, আর ওর চরিত্র। তার উপরে যখন সবাই জেনেই গিয়েছিলো গতকাল রাতে সে আমার সাথে কি করেছিলো, ফলে কেউ আমাকে একটু বাধাও দেয় নাই, কোনো থানা পুলিশও করে নাই। ওর নিজের ভাইবোনেরাও এগিয়ে আসে নাই। নরপিশাচেরাও অনেক সময় নরপিশাচের জন্য অনুভুতি প্রকাশ করে না। সে একটা নর পিশাচের থেকেও অধম। একটা কথা বলি কাকা- যে যেমন কর্ম করবে, সে তেমন ফল পাবে এটাই আসল কথা। যে বীজ তুমি আজ বুনবে, সেই বীজের ফল তোমাকেই খেতে হবে। আর সেটা যদি কোনো অপরাধের বীজ হয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে যে গাছে রুপান্তরীত হয়, তার নাম “প্রতিশোধ”। আর প্রতিশোধের গাছের কোনো না হয় আকার, না হয় ছায়া। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে যায় তখন তার পরিনতি তো এটাই হয়। আর ওর সেটাই হয়েছে।

আমি স্বাধীন হয়ে গেলাম। আমার আর কোনো পিছুটান রইলো না। আমার পরিবার ভেংগে গেলো। যখন কোনো পরিবার ভাংগে, তার সাথে ভাংগে সবকিছু যা পরিবারকে বেধে রাখে, আর সেগুলি হচ্ছে বিশ্বাস, আদর, আবেগ, মায়া, ভালোবাসা এবং সবকিছু। একটা পরিবার তৈরী করতে অনেক বছর লেগে যায়, পরিবার আমাদের বেচে থাকার কারন হয়ে দাঁড়ায়, যখন ভাংতে শুরু করে পরিবার তখন সেই পরিবারকে আমরা সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করতে থাকি। যে পরিবারের আনন্দ আমাদের বাচার রশদ হয়ে উঠে, রাগ এবং প্রতারনার যন্ত্রনা সেই পরিবারকে আঘাত দিতেই বাধ্য করে তোলে। মানুষ যখন আপনজনকেই ঘৃণা করতে থাকে। আমার সেই স্বামীর বাড়ির প্রতিটি মানুষকে আর কখনো আপন মনে করতে পারিনি। শুধু আমার সন্তানদের ছাড়া।

অপমান আর অবসাদে অবনত হয়ে একদিন আমি আমার স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করে বাপের বাড়িতে এসে পড়ি। আমার বাবা মা বিয়ের আগে যে পরিমান কাছের ছিলো, স্বামীর বাড়ি থেকে চলে আসার পর তাদেরকে আর আমি ততোটা কাছে পেয়েছি বলে মনে হলো না। আমি তাদেরকেও এ ব্যাপারে খুব একটা দোষারুপ করি না। তারাও দরিদ্র, আমিও। আমরা হয়তো একই বৃন্তে ঝুলে ছিলাম। সময়ের স্রোত ধরে এক সময় বুঝতে পারলাম, আমাকে একাই চলতে হবে। এখন একাই থাকি, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, নামাজ পড়ি, কোরআন পড়ি, তসবিহ গুনি আর ভাবি, জীবন বড় রহস্যময়। হয়তো আমি আজ থাকতাম এমন এক জীবনে বন্ধী যেখানে মানুষ আর মানুষ থাকে না।

ঠিক ওই সময়ে কাকা আপনি গ্রামে গিয়েছিলেন শুনেছিলাম। একবার ভেবেছিলাম, আপনার সাথে একবার দেখা করি, আবার ভাবলাম, আপনি কি না কি ভাবেন কে জানে। লজ্জা এমন এক জিনিষ, যাকে না লুকানো যায়, না কাউকে বুঝানো যায়। ভিতরটা কেউ দেখে না যদিও সত্যিটা ভিতরেই থাকে। একটা কথা আছে না কাকা- আয়নায় চেহারা দেখা যায় কিন্তু কষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু আমি আমার ভিতরের এই কষ্টটা কাউকেই বুঝাতে পারিনি। না আমার বাবাকে, না আমার মাকে, না আমার আশেপাশের কাউকে। কিন্তু ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কোনো ব্যক্তিত্ত বেশীদিন অসহায় থাকে না। আমি যতটুকুই লেখাপড়া করেছিলাম, সেটা দিয়েই কিছু করার চেষ্টা করছিলাম, বিশেষ করে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ানো। কিন্তু খুব একটা এগুতে পারিনি। পরে একটা সেলাই মেশিন নিয়ে মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কিছু কাপড় বানিয়ে নিজের সন্তানের ভরন পোষনের চেষ্টা করেছি। প্রায় এক যুগ পার হয়ে গেছে। আমার মগা ছেলেটা এখনো বিয়ে করে নাই। ভারায় গাড়ী চালায়, যা রোজগার করে তা দিয়াই আমাদের সংসার কোন রকমে চলে যায়।

এতোক্ষন ধরে আমি রেহালার সবগুলি কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। ওর কথার রেশ ধরে আমার সারা শরীর কখনো শিহরিত হয়ে উঠিছিলো, কখনো ভয়ে আবার কখনো রেহালার স্বামীর এহেনো পৈচাশিক কাজের উপর রাগে। সমুদ্রে ভাসমান কোনো নাবিকের কাছে দূরের কোনো তটভুমি যেমন একটা আকর্ষনের বিষয় হয়ে দাড়ায়, রেহালার জীবনে তেমন কোনো কিছুর উপর আকর্ষন আর বাকী আছে বলে আমার মনে হলো না। রেহালা আমার সম্মুক্ষে বসে আমার বিস্তর প্রকান্ড কাচের জানালা দিয়া দূরের নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বটে কিন্তু ওই নীল শান্ত আকাশের মতো রেহালার অন্তরে তেমন হয়তো শান্তির নীরবতা বিরাজ করছে না। হয়তো ওর মাথা, বুক আর অন্তর একসাথে এমন এক ঘূর্নীঝড়ের মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছিল যার আভাষ ওর চোখের নোনাজলেই বুঝা যাচ্ছে। আমি রেহালাকে আর কোন প্রশ্ন করলাম না। কিছুক্ষন পর রেহালা একটু শান্ত হলে আবার বলতে শুরু করলো-

কাকা-এখন অনেক বয়স হয়ে গেছে। আমার সারা শরীর যেনো রোগের একটা আবাসভুমিতে তৈরী হয়েছে। ডায়াবেটিস, প্রেসার, কানের, চোখের, হার্টে কোনো রোগের যেনো কমতি নাই। মগা ছেলেটা যা কামায়, তাতে হয়তো আমাদের দুজনের খাবার জুটে যায় কিন্তু আমার এই বাড়তি রোগের খরচ, কিংবা পর্বনের কোনো ব্যয়ভার চলে না। রোগটাকে এখন আমার নিত্যসংগী মনে করে কখনো সেই ঈশ্বরের কাছে রোগ মুক্তির দোয়া করি, আর যদি অতিরিক্ত খারাপের দিকে যাই, তখন এই আমার বোনেরা, কিংবা পাড়াপ্রতিবেশীরা হয়তো কিছু দান করে, তাঁর থেকেই কিছু পথ্য কিনে খাই। আগুনের ফুলকী যেমন কীট পতঙ্গকে দূরের আকাশের নক্ষত্র রাজীর লোভ দেখিয়ে আকর্ষন করে, অতঃপর তারা মৃত্যুবরন করে, আমি এখন অদৃশ্য ঈশ্বরের কাছে একটাই প্রার্থনা করি যেনো মরনের লোভ দেখিয়ে ঈশ্বর আমাকে দ্রুত এই জীবনের যবনীপাত করান। সেই ছোটবেলায় কত স্বপ্ন দেখেছি সংসার হবে, স্বপ্ন দেখেছি স্বামীর বুকে মাথা রেখে কত গান শুনাবো, বাচ্চাদের কলকাকলীতে আমার উঠোন ভরে উঠবে আরো কতকি? অথচ আজ শুধু এইটুকুই মনে হয়, জীবন বড্ড জটিল।  এখন শুধু মৃত্যুর ক্ষন ছাড়া আমার যেনো কোনো কিছুর জন্যই আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নাই। গভীর রাতে একা ঘুমহীন বিছানায় বসে মাঝে মাঝে জীবনের হিসাব মিলাতে চেষ্টা করি, আখাংকা আর কল্পনার রাজ্যে কত মায়াজাল তৈরী করিয়া কত মায়াপুরীর হিসাব করেছিলাম, কিন্তু আজ প্রায়ই মনে হয় যে, আমার জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত, জীবন যৌবন, সুখ দুঃখ, একাল সেকাল সবকিছুই মোমবাতির মতো পুড়িয়া শেষ প্রান্তে এসে হাজির হয়েছে। আমার এই ক্লান্তি, কষ্ট, গ্লানি কিংবা প্রানক্ষয়কর দাহ হয়তো আর বেশিদিন থাকবে না।

আমি রেহালার সাথে আর অনেক কথা বাড়াই না। আমি যাহা বুঝবার সব বুঝে গিয়েছিলাম। শুধু বারবার একটা কথাই ভাবতেছিলাম, আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে আমি আর রেহালা একসাথে একই স্কুলে পড়াশুনা করেছি। তখন রেহালা যে স্বপ্ন দেখেছিলো, তার ভবিষ্যৎ জীবনের, তার সংসার জীবনের, আজ এতো বছর পর এসে রেহালা দেখতে পেলো তার সেই সপ্নগুলি আসলে সব সপ্নই থেকে গেছে। খুব কষ্ট লাগতেছিলো আমার। আমাদের এই সমাজ, আমাদের নীতি নির্ধারকেরা আজো প্রতিটা মেয়েকে বোঝাই মনে করে। সবাই মনে করে-তাদের লেখাপড়ার দরকার নাই, তাদের প্রেমের কোনো মুল্য নাই, তাদের বাকস্বাধীনতা নাই, তাদের নিজস্ব কোনো পছন্দ অপছন্দও নাই। ওরা জন্মায় শুধু কাউকে নিজের অনিচ্ছায়ই হোক আর সেচ্ছাতেই হোক বিয়ে করা। আর সেই বিয়ে টিকার দায়িত্ব শুধু তাদের। ওরা জামাইয়ের মার খাবে, স্বামীরা ওদেরকে নিজের থালা-কলসীর মতো কিছুদিন ব্যবহার করে আবার অন্য কোথাও বিক্রি করে দিবে। অথবা কোনো দায়িত্ব না নিয়াই অন্য আরেকজনের সাথে ফষ্টিনষ্টি কিংবা ঘর করবে। আর মাঝখানের সময়টায় ওরা বছর বছর বাচ্চার জন্ম দিবে। এটাই যেনো ওদের একমাত্র কাজ। রেহালা আমার সামনে বসে আছে বটে কিন্তু ওর দৃষ্টি আমার জানালার বাইরে অনেক দূরের আকাশে। তার মনে কি চলতেছে আমি জানি না, তবে সেই দূরের আকাশে কোনো নতুন স্বপ্ন যে নাই, সেটা স্পষ্ট বুঝা যায়। সে তার এই জীবনের সুখ কিংবা আদর আর প্রত্যাশা করে না। শুধু সময় গুনছে কবে মৃত্যু তাকে লইয়া যাবে। আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই, আমরা আজীবন বাচতে চাই, কেউ এই দুনিয়া ছেড়ে মৃত্যুর মতো একটা অজানা জীবনে যেতে চায় না। অথচ রেহালার ভাষায়, সে প্রতিদিন নামাজ পড়ে সেই স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করে যেনো মৃত্যু এসে রেহালাকে নিয়ে যায়।

অনেকক্ষন আমার অফিসে একটা নীরবতা চলছিলো। রেহালার জীবনের কাহিনী বলবার পর যেন সে নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার ভাবনা ভুল প্রমান করে রেহালা আবারো বলিতে থাকে-

-কাকা, আজ অনেক কষ্টের কথা আপনাকে বলতে পেরে নিজেকে অনেক অনেক হালকা মনে হচ্ছে। আমি জানি না, কেনো আমাদের মতো মানুষের এই পৃথিবীতে জন্ম হয়। মা হিসাবে আমরা যেমন অসফল, স্ত্রী হিসাবেও তেমনি অসফল। এই সমাজ আমাদেরকে না কখনো মুল্যায়ন করে, না নিজের ঘরের পিতা মাতা আমাদেরকে বুকে আগলে ধরে রাখে। আমরা যেনো সমাজের সেই প্রানিগুলির মতো, যারা একবার জন্ম নিয়াছে বলে শুধু মৃত্যু না আসা অবধি দেহত্যাগ করে না আবার নিজেরাও নিজেকে শেষ করতে পারে না কারন আত্তহত্যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। অথচ দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অবহেলায় কচূরীপানার মতো আমরা এককুল হতে আরেককূলে শুধু ভেসেই যাই, না কেউ আমাদেরকে তুতুলে নেয়, না কেউ আশ্রয় দেয়। তারপরেও আমরা বেচে থাকি। এখন সত্যিই আর বাচতে ইচ্ছা করে না। আজ আপনার সাথে দেখা হলো-মনটা বড় ভালো লাগলো। মনেই হয় না এর মধ্যে ৪০ বছর পার করে দিয়েছি। মনে হচ্ছে, এই তো সেদিনের কথা। সেই শীতের দিনে জড়োসড়ো হয়ে গায়ের পথ ধরে হেটে বেড়াইতাম, স্কুলে গিয়া একসাথে কত মজা করতাম, বৃষ্টির দিনে ভিজতাম, আজ মনে হয়-আহা যদি আরো একবার আবার সেই পুরান দিনে ফিরে যেতে পারতাম। আহা যদি এই পিশাচের মতো কেউ আমার জীবনে না আসতো, আহা-যদি এমন কেউ আসতো যে আমার সেই গানগুলি শুনে শুনে পাশে বসে হাততালি দিতো। আসলে জীবন মনে হয় এমনই, আবার কেনো জানি মনে হয়, সব জীবন এমন নয়। তাহলে আমাদের জীবন এমন কেনো?

আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু রেহালাকে বললাম, পৃথিবীটা এমন নয় যা দেখছিস। এই পৃথিবী অনেক অনেক সুন্দর। হয়তো ভুল সময় ভুল মানুষের পাশে গিয়ে ভুলভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছিলি। আর সেই ভুল মানুষটাই তোকে ভুল পথের দিকে তোর নিজের অজান্তে নিয়ে গিয়েছিলো। ভুলে যা সব। বললাম, আজ থেকে বহু বছর আগের আমার গ্রামের একমাত্র মেয়ে খেলার সাথী তুই। তোকে দেখেও আমি অনেক খুশি হয়েছি রেহালা। আসিস যখন মন খারাপ হয়, যখন কোনো রাস্তা না দেখা যায়। আমি তোর কাকাই বলিস আর বন্ধুই বলিস, আসিস। রেহালা তার শাড়ির আচলটা টেনে চোখ দুটি মুছে বের হবার উপক্রম হলো। যাওয়ার সময় হটাতই রেহালা আমার পায়ে সালাম করার জন্য উদ্যত হলে আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, তুই আমার শুধু বন্ধু না রেহালা, তুই আমার বোনও। আমার কি হলো জানি না, আমার চোখটাও কেনো জানি ঝাপ্সা হয়ে গেলো।

রেহালা তার চোখ মুছতে মুছতে বের হয়ে গেলো। আমি শুধু ওর যাওয়াটা দেখলাম। আর ভাবিলাম,

প্রতিটা মেয়ে মানুষের উচিত নিজের পায়ের উপর দাঁড়ানো। যতোদিন তারা নিজেরা সাবলম্বি না হবে, তারা আজীবন ভুল সময়ে ভুল মানুষের কাছেই হস্তান্তর হতে থাকবে। হয়তো কতিপয় কিছু অধীক ভাগ্যবান মেয়েরা ছাড়া যাদের সংখ্যা অতীব নগন্য। দোয়া করি-রেহালারা ভালো থাকুক। আর দুঃখ হয় সেইসব বাবা মায়ের জন্য যারা নিজের মেয়ে সন্তানকে তাদের ছেলে সন্তানের মতো একই সাড়িতে ভাবেননা। অথচ দুটাই তাদের সন্তান। কে জানে, সেই বাবা মায়েরও কোনো একদিন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যখন এইসব মেয়েদের ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার পথ খোলা হয়তো থাকবে না।

আমি রাহেলার জন্য একটা টাকা প্রতিমাসের জন্য বরাদ্ধ করলাম যাতে অন্তত রাহেলা তার ঔষধগুলি কিনে খেতে পারে। রাহেলার জন্য হয়তো এটা একটা অনেক বড় সাহাজ্য হবে। রাহেলা এখন প্রায় প্রতিমাসেই আমার একাউন্ট অফিসারের কাছ হতে সেই টাকাটা নিতে আসে। কখনো ওর সাথে আমার দেখা হয়, কখনো দেখা হয় না। তারপরেও আমি শান্তি পাই যে, রেহালারা এখনো বেচে আছে।

রেহালার স্বামী এখন পুরুই পংগু। কোনো রকমে ভিক্ষা করে জীবন চালায়। তার পাশে এখন আর কোনো রেহালারা নাই, না আছে তার কোনো মগা সন্তান।

(লেখাটা সুফিয়ার নামে উতসর্গ করা)

২২/০৬/২০২১-দিমুখী জীবন

এই পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষই কোনো না কোনো সময়ে দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করে। কেউ জেনে করে, কেউ না জেনে। এই দিমুখী জীবনের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে এর কোনটা আগা আর কোনটা মাথা তার হদিস পাওয়া যায় না। কখনো এর শেষ থেকে শুরু আবার কখনো মাঝপথ থেকে। যাদের দ্বিমুখী জীবন জীবনের প্রারম্ভেই শুরু হয় তাদের বেলায় এটা বলা অনেক কঠিন তাদের আসল অবয়াবব টা কি। এই দ্বিমুখী জিবনের মানুষগুলি সর্বদা একটা বর্নচোরা রুপে এই সমাজে, এই সংসারে এমন করে বাস করেন যাদের মুখ এবং মুখোস কোনোটাই আলাদা করা যায় না। তাদের প্রতিটি দৃষ্টি ভংগীতে থাকে আবছা আবছা কিংবা পরিকল্পিত কোনো ছায়ার রুপ রেখা যেখানে সামনে থাকা মানুষগুলিকে তারা কখনোই সাধারন মানুষ হিসাবে দেখেন না। তারা যা দেখেন আর যা দেখান পুরুটাই একটা মাস্ক। যেদিন এই মাস্ক আলাদা করার মতো পরিস্থিতি আসে, তখন হাজারো রকমের প্রশ্ন মনে জেগে উঠে- কেনো, কিভাবে, কার জন্যে কিংবা কি প্রয়োজনে এই দ্বিমুখী জীবনের আবশ্যকতা। অনেকেই তখন মাস্ক পরিহিত মানুষটাকেই আসল মনে করে আসল মানুষটাকেই আর চিনতে পারেন না। পাশাপাশি কয়েক যুগ একত্রে বসবাস করার পরেও অনেক ক্ষেত্রেই এই দ্বিমুখী জীবনের সন্ধান পাওয়া যায় না অথচ ব্যাপারটা ঘটছে। ঘটছে প্রকাশ্যে, দিবালোকে আর সবার অজান্তেই। এটা যেনো সেই কচুরীপনা যা স্রোতের মধ্যে স্রোতের বিপরীতে চলমান। হতাত করে চোখে পড়ে না কিন্তু যখন নিজের অবস্থান থেকে সেই কচুরীপানা অনেক দূর অবধি চলে যায়, তখন হয়তো ব্যাপারটা দৃশ্যমান হয় বটে কিন্তু সেই কচুরীপানা আর হাতের বা দৃষ্টির মধ্যে থাকে না। সে চলতেই থাকে তার মতো। চলমান সমুদ্রে কিংবা ভরা নদীর বুকে ভেসে থাকলেও এই কচুরীপানা তার নিজের প্রয়োজনে এক পেট জল সর্বদা নিজের করে ধরে রাখে যা তার হয়তো প্রয়োজনই নাই। কিন্তু দ্বিমুখী জীবনের মানুষ গুলির এই প্রয়োজন আছে বলেই তারা কোনো সুযোগ নেয় না, তারা তাদের প্রয়োজনটাই আগে বিবেচনা করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। পিছনে কার কি হলো, তাতে তাদের ভাবার কোনো আবশ্যকতা মনে করে না। দ্বিমুখী জীবনের ভালোবাসায় প্রচুর খাদ থাকে কিন্তু এই খাদের উপরের চাকচিক্য এমনভাবে প্রতিফলিত হয় যা আসল সোনার রং টাকেই আরো আসল বানিয়ে চোখ ঝলসে দেয়, অন্যের মন আকর্ষন করে তাঁকে আরো কাছে আসার সুযোগ করে দেয়। আর এটাই সেটা যেখানে সমাজের মানুষ গুলি প্রতিদিন প্রতারিত হয়।

দ্বিমুখী জিবনের সত্তা দ্বিধা বিভক্ত। তাদের দুটুই পাশাপাসি বিচরন করে- ঘৃণা আর মাত্রাতিরিক্ত ভরষা, সত্যতা আর মিথ্যার বেশাত, কঠিনতা আর দূর্বলতা, মায়া এবং হিংসা। এই দ্বিমুখী জিবনের সময় আর অসময় বলে কিছু নাই। যখন প্রয়োজন তখন তারা উভয়ই ব্যবহার করতে কোনো দিধাবোধ করেন না। ফলে দেখা যায় যে, যাকে কেউ কোনোদিন এমন কোনো কাজ, এমন কোনো ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতে পারে বলে ভাবেন ও নাই, তারাই সেটা করে ফেলে। তখন তারা সবাইকে এমনভাবে তাক লাগিয়ে দেয় যে, সবার মনে এই প্রশ্ন জাগে এটা কিভাবে সম্ভব সেই তার দ্বারা যে কিনা একটা তেলাপোকা দেখলেও ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে থাকতো।

দ্বিমুখী জীবন শুধু গোপন আর প্রকাশ্যেই নয়, আসলে এই দ্বিমুখী সত্তা প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনেই মানুষ তথা অন্যান্য জীবেরাও বহন করে। যে মানুষটি ঘরের মধ্যে একজন খাব ভালো বাবা, কিংবা যে মা বাইরে অনেক সমাজ মুখীতা, যে বাচ্চাটা তার বন্ধুর কাছে সমানভাবে গৃহীত, সেই বাবাই অফিসে তার পুরুদস্তর চেহাড়া অন্য রকমের, সেই মা ই ঘরের ভিতরে আরেক সাজে থাকেন কিংবা সেই বাচ্চাটা হয়তো তার নিজের বাড়িতে এতোটাই চুপচাপ যা বাড়ীর লকের ধারনাই নাই সে কত টা সতষ্ফুর্ত তার বন্ধুদের মাঝে। একটি বাঘ যখন হরিন শিকার করে, তখন বাঘিনীর মধ্যে যে মাতৃত্ব বোধ, সেটা হরিনের বাচ্চাদের কাছে কোনো প্রমান নাই। অথচ এক বাঘিনী মা তার নিজের বাচ্চাদের জন্য আরেক হরিনী মাকে মেরে ফেলতে একটুও দিধাবোধ করে না। ভালোবাসার এই দ্বৈত রুপের নামই হচ্ছে কখনো কখনো দ্বিমুখী স্বভাব।

এখন প্রশ্ন জাগে, যদি সবাই তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময়ে এই দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করেই থাকেন, তাহলে দ্বিমুখী না কারা? আসলে এর উত্তর খুব কঠিন নয়। সবার দ্বিমুখী জীবনের সংগা এক নয়। কেউ কেউ অতি অল্প বিশয়েই তার দ্বিমুখী জীবনের শুরু আর শেষ আবার কারো কারো এই বৈশিষ্ট এমন যে, প্রতিটি বিশয়েই তারা দ্বিমুখী। কারো দ্বিমুখী জীবনের ধারা শুধু মাত্র বৈষয়িক, আবার কারো কারো দ্বিমুখী জীবন ব্যক্তিগত। কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষ্মুক্ত করেন, আবার কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষিত করেন। দুটু দ্বিমুখী জীবন একসাথেও চলতে পারে যদি তাদের সেই দ্বিমুখী জিবনের গতিপথ হয় একই রেলের উপর। যখন এই দ্বিমুখী জীবনের সাথে ভিন্ন ধারার দ্বিমুখী জীবনের সংযোগ হয়, তখন ভয়ংকর পরিনতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না।

দাম্পত্য জীবনেও এমন কিছু সময় আসে যখন মানুষ পরিস্থিতির কারনে কখনো কখনো দ্বিমুখী চরিত্রে ঢোকে যায়। যখন কোনো মহিলার স্বামী তার স্ত্রীর প্রয়োজনটা বুঝতে না পেরে বড় গাড়ি, বড় বাড়ি বড় বড় সপ্নে বিভোর হয়ে সার্বোক্ষন তার নিজের সংসার থেকে উদাসীন থাকে আর অন্যত্র ব্যতিব্যাস্ত হয় সময় কাটাতে থাকে, তাহলেই তার নিজের স্ত্রীর দ্বিমুখী জীবনে প্রবেশ করার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায় আর সেই মহিলাও দ্বিমুখী জীবনে তার নিজের অজান্তেই ঢোকে যায়। কারন, যখন একটা মেয়ে একা হয়ে যায়, নিজের ঘরে স্বামীর সংস্পর্শও ধীরে ধীরে অবহেলায় পরিনত হয়, যখন সারাদিন কাজকর্ম করার পর যখন মনে হয় কেউ শুধু হাতটা ধরুক। অথচ কেউ আর পাশে থাকে না, তখন তার একাকিত্ত বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন তার চলাফেরা, আচার আচরন, মনোভাব দেখে কারো সন্দেহ থাকে না যে, সে একা। এরপরেই শুরু হয় ভয়ংকরতা। সমাজ তাঁকে স্পর্শ করার জন্য মুখিয়ে থাকে। আর সে যতোদূর সম্ভব  সেই স্পর্শ তাঁকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা তাও একা একাই। একা থাকা একটি মেয়ে সমাজে সস্তায় পাওয়া লটারীর টিকেটের মত হয়। সবারই মনে তাঁকে পাওয়ার একবার ইচ্ছা হয়। কিন্তু যে পেয়ে যায় সেই রাজা। তাই প্রত্যেকেই সেই ভাগ্যটা একবার ছুয়ে দেখতে চায়। আর সেই ব্যক্তি তখনি রাজা বনে যায় যখন কোনো মহিলা সমস্তা চেষ্টা করার পরেও আর একাকিত্তে বসবাস না করতে পেরে দ্বিমুখী চরিত্রে প্রবেশ করে ফেলে।

এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই যে, আজকের এই সমাজে মহিলা এবং পুরুষদের সমান দ্রিষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু এই কথাটাও খুবই সত্যি যে, মহিলাদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টি ভংগীর পরিবর্তনের অনেকটা পথ বাকী রয়েছে। আজ কোনো পুরুষ তার অফিসে মহিলা বস এর আদেশ পালন করা অতোটা সমস্যার বিষয় মনে করে না কিন্তু নিজের ঘরে নিজের স্ত্রীকে নিজের সমান মর্যাদা দেয়া সে এখনো মানতে পারে না। 

বড় বড় গাড়ি, বড় বড় বাড়ির শখ খারাপ কিছু না কিন্তু যেটা নেই সেটা পাওয়ার জন্য যেটা আছে সেটা হারিয়ে ফেলা না বুদ্ধিমানের কাজ আর না সঠিক। সেজন্য ভালোবাসায় সময় দিন, ছোট ছোট খুশী গুলি পরিবারে ভাগ করে নিন, সময় দিন পরিবারকে। দাম্পত্য জীবনে কোনো মহিলার বা কোনো পুরুষের দ্বিমুখী চরিত্র স্রিষ্টির পিছনে আমরাই অনেকাংশে দায়ী থাকি।

২২/১১/২০২০-বুড়োবেলায় আমার সেই ছোটবেলা

ছোট বেলায় মনে করতাম, আহা, স্কুল ছুটি হবে, ক্লাশ থাকবে না, টিচারদের কাছে আর জ্ঞ্যানগর্ব লেকচার শুনতে হবে না, ইচ্ছেমতো নদীতে গিয়ে বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে লাফঝাপ মারবো, সারাদিন মাঠে গিয়ে যখন তখন খেলাধুলা করবো। সন্ধ্যা হলে আর পড়ার টেবিলে বসতে হবে না, সকাল সকাল আর ঘুম থেকে উঠতে হবে না, আরো চার আনা, আট আনা দিয়ে চালতার আচার যতো খুশী কিনে খাবো। কত কি!!

মাঝারী বেলায় মনে করতাম, আহা, অফিস ছুটি হলে সারাদিন বাসায় বসে টিভি দেখবো, ঘুমাবো, সন্ধ্যায় আড্ডা দেবো। বন্ধু বান্ধদের নিয়ে রাতভর গল্প করবো। লম্বা লম্বা ঈদের ছুটিতে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবো। কি মজা হবে। কোনো অফিস নাই, বসের আদেশ পালনের তাড়াহুড়া নাই। সকাল সকাল উঠে তাড়াহুড়া করে অফিসের জন্য রওয়ানা হতে হবে না। অনেক অনেক মজা করে সময়টা পার হবে। এই বয়সে এসেও মনে হয়, আহা এইবার ছুটিতে অনেক অনেক সময় পাওয়া যাবে। স্টাফদের ফোন আসবে না, সাপ্লাইয়াদের হিসাব কিতাব নিয়ে বসার দরকার হবে না। বাসায়, আত্মীয় স্বজনদেরকে সময় দিতে পারবো, বেশ জমজমাট একটা সময় পার হবে।

অথচ আজ এই ৫৫ বছর বয়সে আমার নিজের অফিস আছে, অফিসে দেরী করে গেলেও কেউ কৈফিয়ত চাবে না জানি, অফিসে না গেলেও কারো কাছে জবাব্দিহি করার নাই, যখন যেথায় খুশী যেতে চাইলেও কেউ আমাকে বাধা দেয়ার নাই। এই কয়দিন যাবত আমি ছুটিতেই আছি। কাজ নাই, অফিস নাই, তাড়াহুড়াও নাই। বড়দের চাপ নাই, শিক্ষকদের শাসন নাই, স্টাফদের ফোন কল নাই, সাপ্লাইয়াদের কোনো চাপ নাই, কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছে কি যেনো নাই। আচ্ছা, কি নাই? আমি তো ইচ্ছে করলে এখন পুরানো সেই বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে নদীতে যখন তখন ঝাপ দিতে পারি কারন শাসন করার কেউ নাই, ইচ্ছে করলেই সারাদিন টিভি দেখতে পারি, ইচ্ছে করলেই সারাদিন ঘুমাতেও পারি, ইচ্ছে করলেই হাড়ি হাড়ি চালতার আচার, কিংবা বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে রাত ভত আড্ডা, গল্প করতে পারি কিন্তু তারপরেও আমি তা করতে পারছি না বা করতে ইচ্ছে করছে না। কি অদ্ভুত না ব্যাপারটা!!

এখন মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু সময় আছে, সেই সময়ের সঙ্গে আমাদের ছুটির একটা বড় রকমের যোগসুত্র আছে। আজ এই ৫৫ বছর বয়সে আমি আর আগের সেই ১২ বছরের বালকের ন্যায় উচ্ছাস নদীতে তরঙ্গলম্ফ দিতে পারি না, ইচ্ছেও করে না। অথবা সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবলের অভাবে নারার-খেরের বল বানিয়ে গুটিকতক অদম্য পোলাপানের মতো গ্রামের সেই স্কুলের মাঠে বৃষ্টি বাদলের মধ্যেও হৈচৈ করে, ভরদুপুরে দৌড়াদৌড়িও করতে পারি না। অথবা পাশের বাড়ির পেয়ারা গাছের আধাপাকা পেয়ারাগুলি আর এখন আমাকে লোভ দেখায় না। বয়সটা পেড়িয়ে গেছে। আর তাই বড় আফসোস লাগে, আহা যদি আবার সেই বাল্যকালের শিক্ষকদের শাসনটা ফিরে আসতো! আহা, যদি আবার সেই পুরানো বন্ধু বান্ধবরা আগের রুপে ফিরে আসতো! মাঝে মাঝে আজ খুব হাসি আসে সেই বাচ্চা বয়সের কথা মনে করে। কতই না রাগ করেছি সবচেয়ে ভালো বন্ধুর সাথে। কত যে ঝগড়া করেছি ওদের সাথে। কখনো কারনে, কখনো অকারনে। কখনো আমি দোষ করেই উলটা রাগ করেছি, আবার কখনো ওদের দোষের কারনেও রাগ করেছি। এক মিনিট সময় লাগেনি তাকে বলতে যে, আমি তাকে ঘৃণা করি কারন সে আমাকে তার লাল পেন্সিলটা একদিন ব্যবহার করতে দেয় নাই, অথবা নদীতে আমার আগে সে লাফ দিলো কেনো এই কারনে আমি তার সাথে জিদ ধরে কয়েকদিন হয়ত কথাই বলিনি ইত্যাদি। জিদ ধরেছি একে অপরের সঙ্গে, কখনো কখনো আড়ি হয়েছে, কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে, আরো কত কি? ইশ, কি মিষ্টি ছিলো দিনগুলি!!

আজ বড় নস্টালজিক মনে হয়, আহা, এমন একটা বয়স যদি আবারো ফিরে আসতো! আমার সেই বন্ধুরাতো আজো আছে, আশেপাশেই আছে। কিন্তু বাল্যকালের সেই উচ্ছ্বাস, সেই অদম্য দুস্টুমিপনা, সেই আবেগ আর নাই। বয়স একধাপ থেকে উঠে আরেক ধাপে, আরেক ধাপ থেকে আরো আরেক ধাপে চলে গেছে। আগের ধাপের স্মৃতি ধরে রেখেছে কিন্তু কার্যপ্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কথা হয় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে, জীবনের উৎকণ্ঠা নিয়ে, পরিবারের ভালমন্দ নিয়ে, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংস্কৃতি নিয়ে। এখন আর বৈশাখী মেলায় মাটির ব্যাংক, বাঁশের বাঁশী, ভাজা বুট, চালতার আচার, নাগরদোলা, ফোটকা বেলুন, বাশের কঞ্চিতে বানানো বাশি ইত্যাদি নিয়ে কোনো আবেগ আসে না। অফুরন্ত সময় আছে, খেলার মাঠও সেখানেই আছে, নদীও আগের জায়গায়ই আছে, কিন্তু সেই ফেলে আসা বাল্যকালটা আর নাই। নদী দেখলে এখন মন চায় যদি ঝাপ দিতে পারতাম, কিন্তু দেওয়া হয় না। সবুজ ধানক্ষেত দেখলে ক্ষেতের আইল ধরে কচিকচি পায়ে দৌড় দিয়ে কোথাও হারিয়ে যেতে মন চায় কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হয় না। মন মনের জায়গায়ই আছে কিন্তু মনের সঙ্গে শরীর আর শরীরের সঙ্গে মনের মধ্যে এখন বিস্তর ব্যবধান বনে গেছে। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে “সময়” নামক এক বিশাল অদৃশ্য দেওয়াল। পাশে থাকা বাল্য বয়সের ছেলেমেয়েরা যখন তাদের ইচ্ছার কথাগুলি বলতে থাকে, আমি বুঝতে পারি ওরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে আর কি বলছে। বড্ড ভাল লাগে। মাঝে মাঝে ধমক দেই বটে, মাঝে মাঝে বারন করি, কখনো কখনো রাগও করি। আবার এও জানি, এটাই তো করার কথা ওদের। কিন্তু ওরাও একদিন এই সময়টা হারিয়ে ফেলবে। আজ ওদেরকে শাসন করি, একদিন আমাদেরকেও আমাদের অভিভাবকরা শাসন করতো। অভিভাবকদের ওই শাসনে কখনো মন খারাপ হয়েছে, অনেক আনন্দ মাটি করে ফেলেছি রাগে, দুঃখে মনের কষ্টে। জিদ ধরে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। সারাদিন না খেয়ে কষ্ট হচ্ছে দেখে হয়ত মাও খান নাই, বাবা ছেলের অহেতুক জিদে, মায়ের মনের কষ্টে তার সব শাসন ভুলে হয়ত আমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন, আর আমি সেটাই আমার বীরত্বই বলি, আর আমার জয়ই বলি, গর্বে আরো ঘাড় বেকে বসে থাকতাম খাবো না বলে। একদম অবুঝের মতো। আজ ওইগুলু মনে পড়লে বড্ড মন খারাপ হয়। আজ ঐ শাসনগুলি খুব মিস করছি। চোখের পাতা ভিজে আসে। কোথায় হারিয়ে গেলো ওইসব?

যখন ছোট ছিলাম, সবচেয়ে অপছন্দের চিঠি ছিল আমার অভিভাবকদের। সেই একই কথা। কোনো চিঠি না খুলেই বলে দিতে পারতাম, বাবা কি লিখেছে বা মা কি বলতে চেয়েছে। একদিন খুব দুস্টুমি করে আমি আমার অভিভাবককে বলেছিলাম, আচ্ছা, কস্ট করে বারবার একই চিঠি লেখার দরকার কি? একটা চিঠি ফটোকপি করে রাখলেই তো হয়। কদিন পরপর শুধু ওটা পোস্ট করে দিবা! কারন কথা তো একই থাকে। কেমন আছো তুমি, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করবে, সন্ধ্যা হওয়ার আগে ঘরে ফিরে আসবে, বেশী রাত জাগবে না, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে ভালোভাবে মিলেমিশে থাকবে, বড়দেরকে সম্মান করবে, আমাদের জন্য মন খারাপ করো না। এই তো? তাহলে আর বারবার লেখার দরকার কি? অথচ আজ এতো বছর পর মনে হচ্ছে, আমি ওই কথাগুলিই খুব মিস করছি। খুব করে মনে হয়, তোমরা আবারো আমাকে এই একই কথাগুলি লিখে পাঠাও না বাবা! আমি জানি, আজ আমার সন্তানেরাও ঠিক একই কথা বলবে। হয়ত কোনো একদিন আজকের এই দিনের মতো তারাও হয়ত আমার সেই একই কথা শুনার জন্য তাদের মন খারাপ করবে। সব বাবাদের কথা এক হয়, সব মায়েদের সন্তানের জন্য চিন্তা এক হয়। তোমরা যখন বাবা মা হবে, সেদিন হয়ত বুঝবে, আজ আমি কি বলতে চাচ্ছি।

যে বালকটি আজ থেকে ৫৫ বছর আগে উচ্ছল, চঞ্চল, দুরন্তপনা, অদম্য সময় কাটিয়েছিলো, ওই সময় যে তোমাদেরকে অনেক কঠিন দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে রাখতো, সময়-অসময় তোমাদের মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়াতো, আজ সেই একই বালক ৫৫ বছর পর শান্ত, ধীর এবং অভিভাবকরুপে রূপান্তরিত হয়ে শুধু একটা আবেগের কথাই বলতে চাই, ফিরে এসে দেখে যাও, সে আর আগের মতো দুস্টুমি করে না, হটাত বৃষ্টিতে তোমাদের অগোচরে ভিজে আর অসময়ে জ্বর বাধিয়ে ফেলে না, কিংবা তোমাদের না বলে হটাত করে কিছু দুষ্টু বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় না। তোমরা যে ছেলেকে সারাক্ষন ঘরের মধ্যে শান্ত হয়ে থাকতে বলতে। বলতে আর কতজল ফেলবি আমাদের চোখে? আর কত দুসচিন্তায় ফেলবি আমাদের? আজ এই বয়সে এসে আমি তোমাদের শুধু একটা কথাই বলতে পারি, এখন এসো আমার ঘরে, দেখে যাও, তার এখন অফুরন্ত সময় এবং সে এখন সত্যিই শান্ত একটি মিষ্টি ছেলে। এখন আর তোমাদেরকে আমি কোনো দুসচিন্তায় ফেলবো না। আজ আমার ছুটি। লম্বা ছুটি। আমি তোমাদের একজন লক্ষি ছেলে হয়েই ঘরে বসে আছি। কিন্তু তোমরা কই? তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাও? আমি তোমাদের খুব ভালবাসি।

২০/১১/২০২০-ভালোবাসি না

ভালোবাসা কি? ভালবাসা কি কোনো দ্রব্য বা কোনো পদার্থ যা চোখে দেখা যায়, ছোয়া যায় বা স্পর্শ করা যায় বা মাপা যায়? এটা কি এমন যে, ষোল ছটাকে এক কেজি ভালোবাসা হয় অথবা এটা কি এমন যে, চার আনা এক গন্ডায় এক শতাংশ ভালোবাসা হয়? অথবা এটা কি এমন যে, পাখীরা জেগে উঠলে, তাদের কিচির মিচির শব্দে কোনো এক সকালে বা সন্ধ্যায় সন্ধ্যতারা আকাশে উদিত হলে ভালোবাসার জন্ম হয়? কোথাও কি কোনো মহা মনিষী লিখে গেছেন, কি কি ভাব ভংগিতে, কোন কোন সুরে বা কোন কোন আবেগে ভালোবাসা প্রকাশ পায়? ৫৫ বছর বয়স পার হয়ে গেলো আমার, কিন্তু কোনো বিদ্যালয়, কোনো কলেজ, কোনো ধর্মালয় আমাকে কেঊ এই ভালোবাসার বিক্রয়কেন্দ্র অথবা বিনিময় স্থলের নাম দিতে পারলো না। আমি ভালোবাসাকে আজো চোখে দেখি নাই। অনেক দেশ ঘুরেছি আমি। সম্রাট শাহজাহানের গড়া তাজমহল দেখেছি, প্রিন্স আর্চ বিশপ ডাইট্রিচের প্রিন্সেসের সালোমির জন্য গড়া মার্বেল প্যালেস দেখেছি, উইলিয়াম কেলী স্মিথের প্রথম ছেলে সন্তানের জন্য গড়া “ক্যালী কেসেল” দেখেছি। কিন্তু আমি ওখানেও কোনো ভালোবাসার শপিং মল অথবা ভালোবাসা কিনতে পাওয়া যায় এমন কোনো দোকান দেখি নি। যারা ভালোবাসা বুঝে, কিংবা ভালো বাসে, তারা কিছু না কিছু দিয়েই তাদের সেই অদেখা, অচেনা ভালোবাসার সৌধ নির্মান করে কিছু না কিছু স্মৃতি রেখেই প্রমান করে গেছেন যে, তারা ভালোবেসেছে।

এতো বড় বড় অট্টালিকা, তাজমহল, ক্যাসেল, গার্ডেন বানানোর আমার কোনো সামর্থ নাই। আচ্ছা, ভালোবাসা কোথায় খুচরা কিনতে পাওয়া যায়? কোনো সুপার শপে? বা কোনো বড় মলে? অথবা কোনো কারখানায়? আমি তো অনেক মল, অনেক সুপার সপ কিংবা অনেক কারখানায় খুজেছি এই ভালোবাসাকে। অথচ আজো আমি কারো জন্যেই এক ছটাক, এক শতাংশ কিংবা এক পাউন্ড ভালোবাসা কিনে আনতে পারি নাই!! কোথাও পাইও নাই!! তাহলে আমি কি কখনো কাউকে ভালোবাসি নাই? হয়তো তাই। আমি কাউকেই ভালোবাসি নাই হয়তো।

অথচ, আমি কি অবুঝ বারবার। আমি ওদেরকে না ভালোবেসে, বারবার শুধু ওদের জন্য দুশ্চিন্তায় দিন কাটাই। সারাক্ষন ভাবি, ওরা যেনো ভালো থাকে, ওরা যেনো আনন্দে থাকে। ওরা যেনো নিরাপদে থাকে। আর এটা ভেবেই আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু ওদের জন্য ঈশ্বরের কাছে ওদের সুস্বাস্থ্যের দোয়া করি। সমগ্র বিসশে যেন ওরা মাথা উচু করে নিজের সম্মানে দাড়াতে পারে তার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করে রোজগার করি। আমার অবর্তমানে যেনো ওরা থাকে সাবলম্বি, তারজন্য আমার সারাটা দিন, সারাটা মাস আর সারাটা জীবন নিজের সকল আরাম, আয়েশ, আর সৌখিনতাকে ত্যাগ করে ওদের জন্য সঞ্চয় করি। নিজের অচল হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনটা, কিংবা খষে যাওয়া জুতার সোউলটা বারবার সেলাই করে, ওদের শখের ইচ্ছাগুলি পুরনে সদা চেষ্টা করি। খাবারের টেবিলে বড় সুসাধু চিংড়ি মাছটি নিজের খেতে ইচ্ছে করলেও সেটা আমি ওদেরকে দিতে পছন্দ করি। দূর থেকে কয়েকদিন বিরহের সময়টা কাটানোর পর যখন সন্তানেরা ঘরে ফিরে, গিন্নী যখন অসুস্থ্যতা থেকে সুস্থ্য হয়ে ঘরে ফিরে, আমি তখন আনন্দে ওদের বুকে জড়িয়ে ধরি আর বুক ভাসিয়ে দেই আমার অবাধ্য চোখের জলে। কোথাও ওদেরকে একা ছাড়তে ভয় পাই। সাতার না জানা আমার ছোট মেয়েটি বা অল্প সাতার জানা আমার বড় মেয়েটি যখন নদীর জলে নামতে চায়, তখন নিজের শরীরে জ্বর নিয়েও আমি ওদের সাথে পানিতে সঙ্গ দেই যেনো ওরা পানিতে ডুবে না যায়। নাইট কোচের কোনো গাড়িতে বসে আমি সারারাত না ঘুমিয়ে গাড়ি ঠিকমত নিরাপদে চলছে কিনা সেই পাহারায় ক্লান্ত শরীর নিয়েও সারাটা রাস্তা জেগেই থাকি। অথচ, ওদেরকে আমি ভালোবাসি কিনা সেটা সবাইকে দেখানোর জন্য আমি কোনো ইমারত তৈরী করতে পারিনা। কারন, আমার ভালোবাসা হয়তো ও রকমের সুউচ্চ ভবনের মতো নয়।

আচ্ছা, মানুষ ভালবেসে কি কখনো কাদে? অথবা মানুষ ভালোবেসে কি খিলখিল করে হাসে? এমন কি হয় যে, মানুষ ভালোবেসে কারো জন্যে মন খারাপ করে বসে থাকে? শুনেছি, ভালোবাসায় নাকি কান্না থাকে, হাসি থাকে, বেদনা থাকে, থাকে আরো অনেক কষ্ট, বিরহ, আবার থাকে আনন্দও। আমারো এ রকম হয়। যখন সে আমার কাছে থাকে না, যখন ওর শরীর খারাপ হয়, যখন ওর মন খারাপ হয়, যখন কোনো কিছুর জন্যে ওদের চোখে পানি আসে, আমারো মন খারাপ হয়, আমারো চোখেও পানি আসে। যখন আমার সন্তানেরা আমার থেকে দূরে থাকে, ওরা নিরাপদে আছে কিনা তারজন্যে আমার ভয় হয়। ওরা ঠিকমতো খেলো কিনা, ওরা ঠিকমতো ঘুমালো কিনা, ওরা ভাল আছে কিনা এই ভাবনায় আমি তখন ওদের জন্য ভিতরে ভিতরে কষ্ট পাই, ভয় পাই, চোখ ভিজে আসে কান্নায়। আমি ওদের মিস করি। যখন ভাবি, ওরা একদিন আমার থেকে দূরে চলে যাবে, ওদের সংসার হবে, আমি একা হয়ে যাবো, আমারো অনিশ্চিত বিরহে চোখে জল আসে।

এটা কি ভালোবাসা?

যদি এটাই হয় ভালোবাসা, তাহলে আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, তাজমহল নির্মান না করেও, কোনো ক্যাসেল তৈরী না করেও, কোনো অট্টালিকা, কোনো ব্যবিলনের মতো শুন্যদ্যান নির্মান না করেও, সবটুকু মহব্বত দিয়ে, আদর দিয়ে আমি তোমাদেরকে আজীবন শর্তবিহীন ভালোবাসি। যখন আমি তোমাদের উপর রাগ করি, সেটাও আমার ভালোবাসা। যখন আমি অভিমান করি, সেটাও আমার ভালোবাসা, যখন আমি গোস্যা করি সেটাও আমার ভালোবাসা। কারন, আমার সব রাগ বা অভিমানের সব কিছুতেই মিশে আছে কোনো না কোনো দুসচিন্তা, কোনো না কোনো ভয় আর মিশে আছে শতভাগ সেই শর্তহীন ভালোবাসা। আমার প্রতি আমার সেই বাবা মার এই ভালোবাসাটা বুঝতে আমি ৫৫ বছর পার করে বুঝেছি, ছোটবেলার তাদের সেই শাসনেও ভালোবাসা ছিলো, শৈশবের কোনো এক সাধ অপুরনে আমার পিতামাতার অন্তরের ভিতরের কষ্টেও ভালোবাসা ছিলো, স্কুলের পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট না করায় সেই রাগ অভিমানের মধ্যেও ভালোবাসাই ছিলো।

তারা আজ কেউ কোথাও নাই। অথচ, আমি আজ বুকভরা সেই ভালোবাসা নিয়ে বারবার ফিরে যেতে চাই সেই অজপাড়াগায়ে আমার সেই ভিটায় যেখানে কাদামাখা হাতে আমার মা একটা বেত নিয়ে দুরন্ত ছেলেটাকে নদী থেকে উঠে আসার মেকি রাগ মাখা চোখে অথচ সত্যিকারের ভালোবাসা নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো- আর বলতো—

“উঠে আয় বলছি? তা না হলে আয় একবার, এই বেতটা দিয়ে তোকে মারি”।

হয়তো তোমরাও একদিন……

বার বার ফিরে আসে যুগে যুগে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।

কি অদ্ভুত ভালোবাসা, তাই না?

(পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য উতসর্গ করা লেখাটি যাদের আমি ভালোবাসি কোনো শর্তছাড়া)

১৮/১১/২০২০-অডিট ঘর

আমি এখানে নতুন ভাড়াটিয়া অতিথি। আজই এসেছি। কারো সাথেই আমার এই এলাকার মানুষদের সাথে পরিচয় নাই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ঘর পাওয়া গেল। কি যে অবস্থা চারিদিকে। অনেকদিন হয়ত কেউ এখানে আসে নাই। বাড়ির মালিকও মনে হয় অনেকদিন পর্যন্ত এই জায়গাটার কোনো খোজ নেন নাই। চারিদিকে ঘাস জঙ্গল হয়ে একাকার। বাড়ির কেয়ারটেকারেরও যেনো জায়গাটা পরিস্কার করে রাখার জন্য খুব একটা খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। চারিদিকে দুর্গন্ধ, আবর্জনা, মশা, মাছি, সাপ, তেলাপোকা কোনটা নাই। সবই আছে।

আমি আগে যে এলাকায় থাকতাম, আমি এখানে আসার আগে, সেই এলাকার মানুষজন সবাই মিলে কিছুটা হলেও এই এলাকার ঘরটা পরিস্কার করে দিয়েছিলো। তারাও অনেক কষ্ট করেছে। মায়া মহব্বত আর অনেকদিন থাকার কারনে সবাই আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিলো। আকাশে বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব ছিলো, বৃষ্টি নামার আগেই তারা সবাই হাতাহাতি করে কোদাল, সাবল, খুন্তি দিয়ে যে যেভাবে পারে, ঘরটা পরিস্কার করে দিয়েছিলো। এতো হৈ চই হলো অথচ আশেপাশের কোনো ভাড়াটিয়ারা কেউ এলোই না। আশেপাশের ভাড়াটিয়াদের কারো কোন কৌতূহল আছে বলে মনে হচ্ছে না। সবাই যার যার ঘরে। কোন ছোট ছোট বাচ্চা কাচ্চাদেরও খুব একটা আনাগোনা নাই। বেশ নির্জন এলাকাটা।

আমি ঢোকে গেছি আমার ঘরে। মাটির ঘর অথচ মাটির দেয়াল ভেদ করে আমি যেনো আশেপাশের সবাইকে দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি আমার আগের এলাকার আকাশ, আকাশের তারা, গাছপালা আর সেই এলাকার মানুষজনদের যত্রতত্র চলাফেরা। তাদের সাথে আমার সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে।

একটু ঘাড় ঘুরাতেই দেখি, ও মা, একই! এখানে দেখি প্রায় সবার বাড়ির সামনে তাঁদের নাম লেখা!! আর এদের অনেকের সঙ্গেই তো আমার আগের এলাকায় মোটামুটি পরিচয় ছিল। ঐ যে, কাসেমের বাবার ঘর দেখা যাচ্ছে, তাঁর পরেই দেখি আমাদের মেয়রের বাসা। অনেকদিন দেখা হয় নাই কাসেমের বাবার সঙ্গে অথবা মেয়র জনাব আলমের সঙ্গে। আচ্ছা আলম সাহেবের সাথেতো সারাক্ষন সলিম উদ্দিন জোকের মতো লেগে থাকতো, সেই সলিম উদ্দিনকে দেখতে পাচ্ছি না কেনো? আরে, আলম সাহেবের শরীরের উপর কে ওটা? ওতো আমাদের সেই কালা রতন? কালা রতনের তো ফাসি হয়েছিলো জোরা খুনের দায়ে? কালা রতনও এখানে?

ইশ, কি অন্ধকার, আর চারিদিকে কি মশা, পিপড়া আর কি সব পোকামাকড়। ঘরের বাতিগুলি যে কোথায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সুইচের জায়গাটা খুজতে গিয়ে কোথাও পাওয়া গেলো না। ঘরটার কোথাও কোনো সুইচ নাই, কোথাও কোনো বাতিও নাই? দরজাটা একেবারে বন্ধ। কোনো জানালাও নাই? কি ব্যাপার, আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না কেনো?

উফ, হটাত করে শরিরটা ভিজে যাচ্ছে কেনো? একি? ছাদ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে!! মনে পরেছে কিছুক্ষন আগে বৃষ্টির লক্ষন দেখেছিলাম। এখন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ছাদের উপর থেকে ক্রমাগত পানি আমার ঘরে পড়ে ভরে যাচ্ছে। কি পোকা মাকর!! একদিকে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আবার অন্যদিকে এইসব পোকা মাকড় এলো কোথা থেকে? ভীষন ভয় লাগছে এখন আমার।

উচ্চস্বরে নাসিমার মাকে ডাকতে থাকি। কোথায় গেলে গো তোমরা? আরে, কেউ শুনছো না কেনো? আলোটা জালাও!! কেউ কি আমার ডাক শুনতে পাচ্ছো না? আরে, করিম, ওই সগীর, কই তোরা? আমার গলার ডাক উচ্চ থেকে আরো উচ্চস্বরে চারিদিকে কেপে কেপে উঠছে। আমার আকুতিতে পাশের এলাকার কুকুর গুলীও কি করুন সুরে কাদছে, অথচ আমার ঘরের কি কেউ শুনছে না? আমি আরো জোরে আমার বাড়ির গার্ড শাহিনুরকে ডাকি। গার্ড শাহিনুরও আজ আমার কোনো ডাক শুনতে পায় না? ওই শাহিনুর, আমি তো ভিজে চুপসে যাচ্ছি!! আমার বাকী কাপড় চোপড় কই? আমার সেই ইতালীর ছাতাটা কই? আমার জার্মানীর রেইন কোটটা কইরে শাহিনুর? তোরা সবাই কই?

হটাত বিকট এক শব্দে আমার যেন মাথা ঘুরে গেল। মনে হলো আকাশ ভেঙ্গে জ্যুতির্ময় অবয়বে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো চোখ ঝলসে যাওয়া শতকোটি আলোর চ্ছটার মতো চোখ নিয়ে বিকটকায় দেহধারী আমার এই বদ্ধঘরে প্রবেশ করলেন। আমি তাদের এর আগে কখনো দেখি নাই। আমি ভয়ে চিৎকার করতে গিয়েও আমার কন্ঠনালি থেকে এক ফোটা শব্দও যেনো বেরোলো না। আমি ঠায় শুয়েই রইলাম, সর্বশক্তি দিয়েও আমি উঠে বসতে পারলাম না। আগন্তক দুজন শুধু একটা কথাই বললেন, আপনি আজ থেকে এখানেই থাকবেন। এটাই আপনার চিরকালের ঘর। আমরা ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে এসেছি। আপনার ফাইলটা আমাদের কাছে আছে। আপ্নার যাবতীয় সব হিসাব কিতাব না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে এখানেই এই বদ্ধঘরে বাতিহীন, জানালাহীন, দরজাবিহীন, এই স্যাতস্যাতে ঘরের মধ্যেই থাকতে হবে। প্রাথমিক অডিট যদি সন্তোষজনক হয়, তাহলে আমাদের মালিকের আদেশে আপনাকে আপাতত অন্যত্র নিয়ে যাবো, নতুবা সব হিসাব এখানেই চুড়ান্ত করা হবে। আর ততোদিন আপনি এখানেই অনাহারে একা সময় কাটাবেন।

খুব ভয়ে ভয়ে অস্ফুট কন্ঠে আমি জিজ্ঞেস করলাম। ভাই, এ স্থানের নাম কি? আমার পরিবারের অন্যরা সবাই কোথায়? আমার পাজেরো গাড়িটা কই, আমার বারো তালা বাড়িটা কি এখান থেকে অনেকদূর? আমার আদরের মেয়ে নাসিমা কই? নাসিমার মা কোথায়? আমি এখানেই বা কেনো? ঘরটা বড় অন্ধকার, একটু আলো জ্বালিয়ে দিন না। কত যে মশা, মাকড়শা আর পোকা মাকড়, একটু এরোসোল দিন না।

কি যেনো ভাষায় আমাকে শুধু আগন্তক এটাই বলে গেলেন, এটা আপনার সাধের ড্রইংরুম কিংবা এসিওয়ালা অফিস ঘর নয়। না এটা কোনো আফগানিস্থা্ন, বা পাকিস্থান কিংবা কাজিকিস্থান কিংবা আমেরিকার কোনো বিলাশ বহুল রেস্তোরা। আর আপনি যেখানে শুয়ে আছেন, তার নাম অডিট ঘর। যদি আপনি প্রিপেইড কার্ডে বিদ্যুতের দাম আগেই দিয়ে থাকেন, যদি আপনি পেট্রোল অকটেন কিংবা গাড়ির জন্যে আগেই মুল্য পরিশোধ করে থাকেন, আপনার ফাইলটা চেক করে আমরা কিছুক্ষনের মধ্যেই সবকিছু, বাতি, গাড়ি, এসি কিংবা শোয়ার জন্যে খাট-পালঙ্গ সব কিছুর ব্যবস্থা করে দেবো। আর যদি আপনি যে এলাকায় আগে বসবাস করতেন, সেখান থেকে কিছুই ট্রান্সফার না করে থাকেন, তাহলে আমাদের পক্ষে আপনাকে কোনো কিছুই সরবরাহ করা সম্ভব নয়। এখানে কোনো কিছুই বিনিময় হয় না। এর নাম গোরস্থান। আর আপনার এই অডিট ঘরের আরেক নাম- “কবর”।

১৭/১০/২০২০-একদিন (One Day) (রঙ লেপা)

“একদিন”, অদ্ভুত একটা সময়।

সবসময় আমরা ভাবি, “একদিন” সবকিছু আমার মতো করে হবে, “একদিন” আমি সবকিছু নিজের মতো করে পাবো, “একদিন” আমি সবকিছু ছেড়ে নিজের মতো করে এই পৃথিবীকে দেখবো, দেখবো এর বিশালত্ব, এর সউন্দর্য, এর অপূর্ব রহস্যময়তা। সেদিন আমার সব ব্যস্ততা, কষ্ট, সব বেদনার দিন শেষ হবে। তখন শুধু আমি আনন্দ আর আনন্দই করবো। কিন্তু আমি জানি না কবে সেই আমার “একদিন”। আমি জানিও না আমার সেই “একদিন” আসলে কবে সেইদিন। আমি কিভাবে জানবো, সেই “একদিন”টা কবে আসবে আমার জীবনে?

ছোট এই সমাজে যেখানে আমরা দৈনিন্দিন সবাইকে নিয়ে বসবাস করি, আমরা সেখানে চাইলেই সবকিছু করতে পারি না।  শিশুকাল থেকে কৈশোর পার করা অবধি আমরা সবাই ওই “একদিন” এর অপেক্ষায়ই থাকি যেদিন আমার সব ইচ্ছা পূরন হবে, আমি মুক্ত পাখীর মতো এই বিশাল আকাশে হাওয়ায় উড়ে উড়ে মেঘ দেখবো, নীচের সবুজ গাছপালা দেখবো, সাগর দেখবো, পাহাড় দেখবো। কিন্তু ক্রমেই যতো বয়স বাড়ে, আমরা একেকটা স্তর পার করে যখন আরেকটা স্তরে পা রাখি, ততোই সামনে চলে আসে কোনো না কোন দায়িত্ব, কোনো না কোনো নতুন আরেকটা চ্যালেঞ্জ। সেটাকে মোকাবেলা করতে করতেই জীবনের বেশ কয়েকটি স্তর, ধাপ পার হয়ে যায়। দাদা ভেবেছেন ছেলেকে মানুষ করা হয়ে গেলে, মেয়েকে ভাল বাড়িতে বিয়ে দিয়ে দিলে আমাদের সব কষ্টের দিন শেষ হয়ে যাবে। বাবাকে, ফুফিকে পার করতে করতে দাদা বৃদ্ধ হয়ে যান, বাবা তার সন্তানদের মানুষ করতে করতে দাদার প্রস্থান ঘটে বাবাও দাদার মতো একই সিড়িতে পা রাখেন। আমরাও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কিংবা তাদের প্রজন্মকে লালন করতে গিয়ে আমরাও একের পর এক ধাপ অতিক্রম করে ভাবি- এইতো, আর কিছুদিন, তারপর সব ঝামেলা, সব কষ্ট, শেষ হয়ে যাবে। তখন শুধু আনন্দ আর আনন্দ। অথচ আবার এর মধ্যে হাজির হয় নায়নাতকুর, তাদেরকে দেখতে গিয়েও আমাদের সেই “একদিন” আবারো পিছিয়ে যায়। আসলে আমাদের কারোই সেই “একদিন” সময়টা যেনো আর আসে না। আজ আমরা নিজের সংসারের জন্য বাচি, কাল আমরা স্বামী বা স্ত্রীর জন্য বাচি, তারপর হয়তো সন্তানের জন্য বাচি, তারপর আবার নায় নাতকুরের জন্য,  আর এভাবেই সামাজিক, পারিবারিক ইত্যাদির দায়বদ্ধতা আর জীবনের তাগিদে আমরা ক্রমশই জীবন নামক নদীতে শুধু ক্লান্ত হয়ে ভাসতেই থাকি। তারপরেও আবার ভাবী, নিশ্চয় “একদিন” আমার সব চ্যালেঞ্জ, সব ক্লান্তি কিংবা সব ঝামেলা শেষ হবে, আর তারপর “একদিন” আমার আর কোনো ঝামেলা, সমস্যা কিংবা আমার সুখের নিমিত্তে কোনো বাধা থাকবে না। সেই “একদিন” নিশ্চয় আমি আমার মতো করে সারা দেশ ঘুরতে পারবো, পার্টিতে নাচতে পারবো, পাখীর মতো যেদিকে খুশী মনের আনন্দে উড়ে বেড়াতে পারবো। কিন্তু আমার সেই “একদিন” যেনো সোনার হরিনের মতো একটু একটু করে পিছিয়েই যায়, কখনোই আসে না। বারবার কোনো না কোনো বাধা এসেই দাঁড়ায়।

আসলে এই “একদিন” কখনোই আমাদের জীবনে আসে না। কারো জীবনে আসেও নাই। বৃদ্ধ বয়সে এসে যখন পেরিয়ে যাওয়া জীবনের সেই দিন গুলির দিকে ফিরে তাকাই, কেনো যেনো চোখ ভিজে আসে, সেই ছেলেবেলার জোলাভাতিতে এক মুঠো চাল, আর একটা করে ডিম নিয়ে গ্রামের গাছতলায় বসে বনভোজনের মতো আনন্দ, শীতের দুপুরে একদল দুরন্ত পোলাপান আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে নদীর ঘাটে কাদায় পিচ্ছিল খাওয়া, কোনো এক ঝড়ের দিনে পাশের বাড়ির আম গাছের তলায় ছোট ছোট আম গুলি কতই না পরশে কোচর ভর্তি করা, শিলা বৃষ্টিতে শখের ধনের মতো বরফ কুড়িয়ে রাখা, আহা কি সুন্দর সেই জীবনটাকে অনেক মিস করি। এখন কেনো যেনো বার বার সেই ছোট বেলার দিন গুলিতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে অথচ আমার এই অবেলায় সেই দীর্ঘ পথে যাওয়া আর সম্ভব না। তখনো ভেবেছি, “একদিন” আমি বড় হবো, অনেক বড় হবো, অন্য সবার মতো আমিও অনেক আনন্দ করবো, আমিও ছুটে বেরাব পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। “একদিন” আমি অনেক আনন্দ করবো সবার সাথে। কিন্তু যদি জীবনের সবসুত্র, সব মায়াজাল, সব জটিল সমীকরন ছিন্ন করে প্রকৃতির সাথে চলমান ধারাবাহিকতায় সার্থপরের মতো দেখি, তাহলে এটাই চোখে পড়বে যে, আসলে, “একদিন” হচ্ছে আজকের এইদিন, আজই। এই আজকের দিনটাই আসলে আমার সেই “একদিন”। আজকের দিনটার জন্যই আমি বাচি। আজকের দিনের পর হয়তো আমার জীবনে আরো একটি দিন আসে কিনা কেইবা বলতে পারে? তাহলে সেই আগামীর একদিনের জন্য আমি কেনো আজকের দিনটাকে বিসর্জন দেই? হয়তো আরো “একদিন” আর কখনোই আমার জীবনেই আসবে না। আমার কাছে শুধু “একদিন”ই বাকী-আর সেটা আজ। যদি আমার সারাটা ক্যালেন্ডারেকে একটা একটা করে দিন ভাগ করে সিডিউল বানাই, দেখা যাবে, আজকের দিনটাই আমার বাস্তবতা। আর এই আজকের দিনটাই সেই “একদিন”। আর বাকী দিনগুলি আমার হাতেও নাই, আর যেগুলি চলে গেছে তাদের আমি কখনো ফিরিয়েও আনতে পারবো না। যেটা আছে আমার কাছে, সেটা আজ- আর এটাই সেই “একদিন”। তাই আমি শুধু আজকের দিনটার জন্যই বাচতে চাই। হাসতে চাই, খেলতে চাই, আকাশটা দেখতে চাই, বৃষ্টিতে ভিজতে চাই, পৃথিবীর সব গাছপালা, সব পাহাড় পর্বত, নীল আকাশ, সবকিছু দেখে প্রানভরে বাচতে চাই। আমি শুধু আমার জন্যই আজ বাচতে চাই। কালটা থাকুক আর সবার জন্য।

৩১/০৫/২০২০-চৌধুরী বাড়ি-একটি অসমাপ্ত গল্প

ইহা কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, শুধু চরিত্রের নামগুলি কাল্পনিক

চৌধুরী বাড়ির মেয়ে অনন্যা। আর অনন্যা আমার স্ত্রী। আমি যখন প্রথম ওকে দেখি, কতটুকু ভালো লাগিয়াছিল সেটা আমি আজ এই মুহুর্তে বলিতে পারিব না, কিন্তু আমার ভালো না লাগিলে বিবাহের দিন আমি এতদূর পাগলের মত পথ পারি দিয়া, বলা যায় সাত সমুদ্র তেরো নদী আর ঝড় জান্ডা পারি দিয়া অনন্যাকে একা একাই বিয়ে করিতে আসিতাম না। যাই হোক, যখন আমি অনন্যাদের সাথে পরিচিত হই, তখন খুব যতসামান্যই ওদের পরিবার সম্পর্কে জানিতাম। আর ওদের পরিবার সম্পর্কে আমার জানারো কোনো আগ্রহ তেমন ছিলো না। আমি শুধু অনন্যাকে চাহিয়াছিলাম, আর কিছুই না। ওদের জগত কি রকম, ওদের পরিবার কি রকম, ওদের আত্তিয় সজনের মধ্যে কার কি রকম সম্পর্ক, ভালো না খারাপ, তা আমার কাছে কোনো মুল বিষয় ছিলো না, আজো নাই। কিন্তু আজ অনন্যার সাথে আমার ৩২ বছর দাম্পত্য জীবন পার হইলো। এই ৩২ বছরে আমি না জানিতে চাহিলেও কোনো কিছুই আর জানার বাকী রয় নাই। ফলে আজ কেনো জানি মনে হইলো, আজকের এইদিনে অনন্যাদের পরিবারের কিছু ইতিহাস তুলে ধরি, যা হয়তো পরবর্তী কোনো জেনারেশনের জন্য জানিতে ভালোই লাগিবে হয়তো। আর যদি কেউ নাও জানিতে চান, তাহাতেও কিছুই যায় আসে না।

এনাম উদ্দিন ছিলেন অনন্যার দাদা চিলেন। তার তিনপুত্র, সালাউদ্দিন চৌধুরী, আজিমুদ্দিন চৌধুরী এবং ডাঃ লতুব উদ্দিন চৌধুরী। সালাউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সবার বড়, আজিমুদ্দিন সাহেব ২য়। লতুবউদ্দিন সাহেব ছিলেন তদানিন্তন ইষ্ট পাকিস্থানের খুব নামকড়া সরকারী ডাক্তার। এনাম উদ্দিনের সব সন্তানেরা মোটামুটি ভালোভাবেই যার যার সংসার নিয়া আনন্দের সাথেই একান্নবর্তী পরিবার হিসাবে বসবাস করিতেছিলেন। এনামুদ্দিন সাহেব ছিলেন অনেক রাগী একজন মানুষ, বুদ্ধিমান এবং বৈষয়িক। তাহার এই তিন ছেলেরাও রুপগঞ্জে, তাহাদের পৈত্রিক জন্মস্থানে বেশ সুপরিচিত মানুষ। দেশ স্বাধীনের কালে সবাই অনেক ভুমিকা রাখিয়াছেন। তাহারা প্রকৃতপক্ষেই ভালো মানুষ হিসাবে বেশ পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এই ভালো মানুষগুলির শান্তি বেশীদিন টিকিলো না। আর ইহার প্রধান কারন এনাম উদ্দিন চৌধুরীর দ্বিতীয় ছেলে আজিম উদ্দিনের কয়েক বছর আগে বিবাহিত রমনীর কারনে।

গল্পটার পটভূমিকা যদি আরম্ভ করি, তাহা হইলে এইরুপ দাড়ায়ঃ

এনাম উদ্দিনের তিন ছেলেই বিবাহিত। তবে সালাউদ্দিন চৌধুরীর বিয়ে হয়েছে অনেক বছর আগে। সালাউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী জয়তুন্নেসা চৌধুরীকে অতি স্নেহ করিয়া এবং আট দশটা সুন্দুরী মেয়ের থকে বাছাই করিয়া এনাম উদ্দিন চৌধুরী সালাউদ্দিন চৌধুরীর ধুমধাম করে বিয়া করাইয়াছিলেন। এই সংসারের প্রানবন্ত যে সদস্যটি ছিলেন, জয়তুন্নেসা চৌধুরীকে বলা হইলে কোনো ভুল হইবে না। কোরবানীর গরুটা কেমন কেনা হইয়াছে, কিংবা হাটে গিয়া আজ কাহার জন্য কি কিনিলে কে কতটুকু খুশী হইবে, এমন এমন অনেক বিশয়ে জয়তুন্নেসা চৌধুরীর মতামত না লইলে যেনো কাজটা সঠিক হইয়াছে কিনা এনাম উদ্দিন চৌধুরীর যেনো মন ভরে না। জয়তুন্নেসা চৌধুরীর গর্ভের সন্তানগুলিও যেনো এনাম উদ্দিনের প্রিয়তমা মানুষগুলির মধ্যে অন্যতম।

আজিম উদ্দিনের বিয়াও এনাম উদ্দিন চৌধুরী নিজের ইচ্ছামতোই তাহার পছন্দসই মেয়ে খুজিয়া বাহির করিলেন। আজিম উদ্দিনের বিয়া হইয়া গেলো। ধরি আজিম উদ্দিন চৌধুরীর সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর নাম জাহুরুন্নেসা। অন্যদিকে অতি স্বনামধন্য ডাক্তার লতুব উদ্দিন চৌধুরীর বিয়াটা অবশ্য এনামউদ্দিনের ইচ্ছাতে হইলো না। লতুবউদ্দিন তাহার কর্মস্থলে তাহার অধীনেই কর্মরত এক নার্সকে বিয়া করিয়া স্ত্রী করিয়া বসিলেন। সেই গল্প আরেকদিন করিবো। আজ সালাউদ্দিন চৌধুরীর গল্প করিতে বসিয়াছি, তোমাদেরকে তাহার গল্পটাই বলি।

দিন যায়, রাত যায়, মাস যায় বছর যায়। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে এনাম উদ্দিনের পরিবারেও ঋতু পরিবর্তনের মতো কিছু কিছু পরিবর্তন আসিতে দেখা গেলো। এই বিশ্বভ্রমান্ডে কালের বিবর্তনে যেমন নেতা পরিবর্তন হইয়াছে, তেমনি পরিবর্তন হইয়াছে নেতাদের চিন্তাধারা, রুচী এবং তাহাদের পাশে উপবিষ্ট উপদেষ্টাদেরও। আর এই পরিবর্তনের মাঝে যা যা পরিবর্তিত হয় তাহা অনেকের চোখে হটাত করিয়া ধরা না পড়িলেও এনাম উদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের কিছু পরিবর্তন কারো চোখকেই এরাইয়া যাইতে পারে নাই। যে পরিবারে কখনো কেহ হটাত করিয়া তাহার মতামত ব্যক্ত করিবার সাহস করিতে পারিত না, কেহ তাহার পছন্দ অপছন্দ প্রকাশ করিবার ক্ষমতা দেখাইতে পারিত না, সেই পরিবারেই সবার অলক্ষে কোনো এক প্রবক্তা যেনো হটাত করিয়া মাথাচারা দিয়া উঠিয়াছিলো। ক্ষমতার পরিবর্তনের ধারা এই পৃথিবীতে সবসময়ই একটা মীরজাফরীর ছলচাতুরির মধ্য দিয়া হইয়াছে, হোক সেটা প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে, কিন্তু ইহাই সত্য যে, এইরুপই ঘটিয়া থাকে। যতোক্ষন ইহার প্রভাব কাহারো উপর সুর্যালোকের রশ্মির ন্যায় সরাসরি মাথায় পতিত না হয়, ততোক্ষন ব্যাপারটা কাহারো নজরে হয়তো পড়ে না, কিন্তু যখন নজরে পড়ে, তখন ইহার উতপত্তি কখন আর কোথা হইতে হইলো ইহার ইতিহাস খুজিতে গেলে দেখা যাইবে, ইহার বীজ বপন হইয়াছিলো অনেককাল আগে। হয়তো কারো নজরে ইহার ধীরে ধীরে বাড়িয়া উঠার গল্পটা চোখে পড়ে নাই। এই গল্পেরও সেইরুপ একটা ইতিহাস রচিত হইয়াছিলো যেদিন এনাম উদ্দিনের দ্বিতীয় পুত্রের বিবাহ হইয়াছিলো সেইদিন থেকে। জাহুরুন্নেসা যেদিন এনাম উদ্দিনের সংসারে পদার্পন করিয়াছিলো, জাহুরুন্নেসা তাহার চোখ কান খোলা রাখিয়া ইহা বুঝিতে একটুও কষ্ট হয় নাই যে, যদিও সালাউদ্দিন চৌধুরী আর আজিম উদ্দিন চৌধুরী দুই পিঠাপিঠি সহোদর ভাই, কিন্তু কোনো না কোনো কারনে তাহার শশুড়ের কাছে সালাউদ্দিন চৌধুরীর উপর তাহার শশুড়ের ভরষা কিংবা নির্ভরতা যেনো তাহার স্বামী আজিম উদ্দিনের থেকে ঢেড় বেশী। ইহার আরেকটি কারন হইলো যে, আজিম উদ্দিন সংসারের অনেক কিছুরই দায়ভাড় তাহার কাধে তুলিয়া নিতে রাজী ছিলেন না। আরাম আয়েশের জীবন থাকিতে কে বা কারা অযথা সংসারের গ্লানী টানিতে চায়? আজিম উদ্দিন ছিলেন ওই রকমের একজন ব্যক্তিত্ত। কিন্তু আজিম উদ্দিনের স্ত্রী মোটেই তেমন প্রকৃতির ছিলো না। তাহার উদ্দিপনা আর ছলচারুরিতা ছিলো সবার থেকে একটু আলাদা। সালাউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী যদি এনাম উদ্দিন চৌধুরীর সংসারের সব হালকাঠি নাড়িতে পারেন, তাহা হইলে জহুরুন্নেসার কি এমন গুনের অভাব ছিলো যে, তিনি তাহা করিতে পারিবেন না? মনে মনে এই সংকল্প করিয়াই তিনি তাহার গুন আর দক্ষতার পরিচয় দিয়া ধীরে ধীরে শসুড় এনাম উদ্দিনের মন কিভাবে আরো বেশী জয় করা যায়, তাহার দিকে নজর দিলেন। আর ইহার প্রভাব যেনো দ্রুত কোনো ভ্যাক্সিনের মতো তাহার কার্যকারিতা প্রদর্শন করিতে লাগিলো।

সকালে নাস্তা খাইবার আগে কখন এনাম উদ্দিনের চা পানের তৃষা পাইলো, আর জহুরুন্নেসা কখন তাহার জা এর আগে এনাম উদ্দিন সাহেবকে উক্ত চা বানাইয়া জেবুন্নেসার আগে তাহার সম্মুখে পৌঁছাইয়া দিবেন ইহার সময়কাল অতি নিখুতভাবে পরিকল্পনা করিয়া কর্মটি করিয়া জহুরুন্নেসা একটা একটা করে সম্মুখ পয়েন্টে আগাইয়া রহিলেন বলিয়া ভাবিলেন। এইরুপে দুপুরে খাইবার পূর্বে শসুড়ের গোসলের পানি, দুপুরে খাইবার পর তাহার পানের বাটি কিংবা কোথাও বাহির হইবার আয়োজনে তাহার পাঞ্জাবীখানা ভালো মতো ইস্ত্রি করিয়া পরিপাটি করিয়া রাখিয়া শসূর এনাম উদ্দিনের একের পর এক মর্মিতা আদায় করিয়া নিতে লাগিলেন। অন্যদিকে জহুরুন্নেসা আসায় আর শশুড়ের দিকে একটু অধিক খাতির যত্ন করাতে জেবুন্নেসাও যেন ইহাকে ভালো রুপ মনে করিয়াই জহুরুন্নেসাকে তাহার প্রাপ্য ধন্যবাদটুকু দিতে ভুলিলেন না। কিন্তু জয়তুন্নেসা ইহার গুড় রহস্য আর পরিনতি সম্পর্কে কিছুই অবহিত ছিলেন না। আগে যেমন খাইবার আগে শসুড় মহোদয় জেবুন্নেসাকে ছাড়া খাইতে বসিতেন না, কোথাও যাইতে হইলে যেনো তাহাকে না বলিয়া গেলে যেনো যাওয়াটাই সার্থক হইবে না ইত্যাদির একটা রেশ মনে মনে খসখস করিত, ইদানিং ইহাতে বেশ ভাটা পড়িয়াছে বলিয়া মনে হইলো। বরং উক্ত স্থানটি ক্রমশই জয়তুন্নেসা হারাইতে লাগিলো আর জহুরুন্নেসা যেনো ইহার উত্তরাধিকারী প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন। এই ক্ষমতার পালাবদলে যাহা হইলো তাহা বড় নিদারুন। এখানে একটা কথা না বলিলেই চলে না যে, এনাম উদ্দিনের সবচেয়ে খারাপ গুনের মধ্যে একটি ছিল, তিনি কানকথা শুনিতেন। আর এই কানকথার সত্যতা অসত্যতা কোনো কিছুই যাচাই বাচাই না করিয়া কান ভারী হইয়া গেলে যাহা হয়, তিনি তাহাই করেন। জুহুরুন্নেসাও তাহার শশুড়ের এই বদগুন টির সদ্ব্যবহার করিয়া শশূরের কাছাকাছি যাইবার জন্য শশুড়ের কর্নে যাহা যাহা গর্ভপাত করিলে উত্তম ফল পাওয়া যাইবে, তাহা জহুরুন্নেসা প্রয়োগ করিতে বিন্দুমাত্র কার্পন্য করিলেন না। যাহা সত্য তাহাও ঢালিলেন, যাহা সত্যের কাছাকাছিও নহে, তাহাও ঢালিলেন। ইহাতে বসন্তের সুবাতাসের মতো জহুরুন্নেসার জন্য আশীর্বাদ হইয়া আসিলেও জয়তুন্নেসার জন্য চৈত্রের হাহাকার মম কু-বাতাশই চারিদিকে বহিয়া আনিয়া মাঠ, ঘাট আর সংসারের উত্তাপ ছরাইতে লাগিলো। একটা সময় আসিলো যখন এনাম উদ্দিন যেনো আর জয়তুন্নেসার ছায়া পর্যন্ত মারাইতে চাহিতেন না। জয়তুন্নেসা ক্রমশই এনাম উদ্দিন চৌধুরীর কাছে একটা বিষময় চরিত্রে আর জহুরুন্নেসা যেনো একটা অমৃত শরবতে পরিনত হইতে লাগিলেন। এই জহর আর অমৃতের খেলায় শেষ পরিনতি যেদিকে যাইতেছিলো তাহা বড় বিপদজনক। কারন এনাম উদ্দিন এখন আর না জয়তুন্নেসাকে সহ্য করিতে পারেন, না সালাউদ্দিন চৌধুরীকে সহ্য করিতে পারিতেছেন। ইহার রেশে সালাউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান্দাদি যাহারা এনাম উদ্দিনের বুকের পরম ধন হইয়া কিছুদিন আগেও আছাড় খাইয়া আসিয়া বুকে পড়িত তাহারা এখন তাহাদের দাদার সামনে উপস্থিত হইলেও তিনি দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দেন। আর এই অবুঝ বাচ্চাগুলিও ধুরু ধুরু বুকে তাহাদের দাদার নিকট হইতে কয়েক পলক দূরে গিয়া ইহাই ভাবিতে থাকে, কি হইলো দাদার? আর কি কারনেই বা তাহাদের আর তিনি ভালবাসেন না? এই প্রশ্নের উত্তর তাহারা তাহাদের পিতামাতাকে শতবার জিজ্ঞাসা করিয়াও কোনো ভালো জবাব পান নাই। অন্যদিকে সালাউদ্দিনের সন্তানদের স্থলাভিষিক্ত হইয়া জহুরুন্নেসার সন্তানগন কচ্ছপ গতিতে নয়, বরং উড়ন্ত কোনো ধুমকেতুর ন্যায় সেই কোনো অজানা মহা বিশ্ব থেকে হাজার মাইল বেগে উল্কা পিন্ডের মতো ধপাস করিয়া এনাম উদিন চৌধুরীর বুকে আসন গ্রহন করিতে কোনো বেগ পাইতে হইতেছে না। আর এই মহা উতসবে যেনো জউরুন্নেসার সন্তান গন পেটুক কোনো ঈগল পাখীর মতো গরম গরম খরগোসের নরম নরম দেহভোজন করিতেছে, আবার কেহ কেহ এইমাত্র নামানো গামলা থেকে ময়রার মিষ্টি ভান্ডার হইতে মিষ্টি নামাইয়া রসগোল্লা ভক্ষন করিতেছে। কেউ আবার আপেল চিবাইয়া রসাসসাধন করিতেছেন।

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন হইয়া দাড়াইলো যে, এনাম উদ্দিন তাহার দুই ছেলে ব্যতিত যেনো বড় ছেলে সালাউদ্দিন চৌধুরীকে ছেলে বলিয়াই আর মানিয়া নিতে পারিতেছিলেন না। অথচ সালাউদ্দিন চৌধুরী কিংবা জয়তুন্নেসা চৌধুরী কিংবা তাহাদের সন্তানেরা ইহার পিছনে কোন মহাবিপর্যয় বা কোন মহামারী কাজ করিতেছে ইহার আভাষ পর্যন্ত বুঝিতে পারিলেন না। এতো কাছ হইতে যে জহুরুন্নেসা নামক একটি প্রলয়ংকারী ঘুর্নীঝড় এতো দ্রুত বেগে তাহাদের সবার অলক্ষে ধাবিত হইতেছিলো ইহার বিন্দুমাত্র আভাষ না সালাউদ্দিন চৌধুরী, না আজিম উদ্দিন কিংবা না এতো নামকরা চিকিৎসক লতুব উদ্দিন কেহই বুঝিতে পারিলেন। তাহাদের সবার সম্পর্কটা যেনো এখন অনেক দূরের কেউ। এনাম উদ্দিন চৌধুরী কারনে অকারনে, যেখানে সেখানে, যার তার কাছে যখন খুশী যেভাবে খুশী এক তরফা সালাউদ্দিন চৌধুরীকে সর্বত্র, সব বিষয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিলো করিয়া তেনোভাবে অপমান করিয়া যেমন মনের সাধ মিটাইয়া মজা পাইতেছিলেন, অন্যদিকে সালাউদ্দিন চৌধুরী এবং তাহার স্ত্রী পরিজন সন্তান সন্ততীরা শংকিত হইয়া ঘরকুনো ব্যাংগের মতো দিনানিপাত করিয়া এই ভরষায় সময় পার করিতেছিলেন, কখন এনাম উদ্দিন চৌধুরীর রাগ আর জিদ কমিয়া আসে। কিন্তু এনাম উদ্দিন চৌধুরীর রাগ বা জিদ কিংবা ঘৃণা কোনোটাই কমিবার লক্ষন নাই। মহাসমুদ্রের গহীন অঞ্চল হইতে উত্থাপিত ঘুর্নিঝড় সাত প্যাচে পেচাইয়া যখন ইহা মহাপ্রলয়ংকের রুপ ধারন করিয়া জলভুবন ছাড়িয়া স্থলে প্রবেশ করে, তখন তাহা নিজ আবাসস্থল হারানোর কারনে যেনো সমস্ত রাগ আর জিদ সাথে অভিমানের আক্রোশ লইয়া তাহার চলমান রাস্তায় যাহাই পরুক না কেনো কেউ যেমন ইহার প্রলয়কারী ধ্বংসযজ্ঞ হইতে রেহাই পায় না, তেমনি এনাম উদ্দিন চৌধুরীর মনের ভিতর হইতে উত্থিত রাগ আর জিদ যেনো ক্রমশই বাড়িতে বাড়িতে এমন এক চূরায় উত্তির্ন হইয়াছিলো যে, ইহার ফলশ্রুতিতে সালাউদ্দিন চৌধুরীর রান্না ঘর পর্যন্ত আলাদা হইয়া গেলো, শোবার ঘর আলাদা হইয়া গেলো, তাহার বাল বাচ্চাদের মুখরীয় পদচারনা সীমিত হইতে আরো সিমিত হইয়া শুধুমাত্র একটা ছোট ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হইয়া গেলো। একসময় এমন হইয়া গেলো যে, এনাম উদ্দিন চৌধুরী তাহাদের সাথে কথা বলাও বন্ধ করিয়া দিলেন। যদিও এনাম উদ্দিন ঘরের মধ্যে কথা বলা বন্ধ করিলেন কিন্তু ঘরের বাহিরে তাহাদের সম্পর্কে বিস্তর কথা বলিতে লাগিলেন। সমাজের যাহারা সালাউদ্দিন চৌধুরীকে চিনিতেন, তাহারা ব্যথিত হইতে লাগিলেন, আর যাহারা এনাম উদ্দিনকে চিনিতেন, তাহারা এনাম উদ্দিনের এইরুপ আচরনে যার পর নাই বিব্রত বোধ করিয়া কেহ কেহ তাহার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন না করিতেও দিধাবোধ করিলেন না। আর যাহাদের সহিত এনাম উদ্দিন চৌধুরীর সম্পর্ক বজায় রহিলো, তাহা নাম মাত্র চোখের ইশারা কিংবা কদাচিত দেখা হইলে ‘কেমন আছেন,’ বা ‘কোথায় যাওয়া হইতেছে’ ইত্যদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হইয়া রহিলো। 

এনাম উদ্দিন বনাম সালাউদ্দিন চৌধুরীর বাপ-বেটার এইরুপ তিক্ত সম্পর্ক মধুর না হোক, অন্তত কোনো রকমের একটা সুসম্পর্ক বজায় থাকুক এই চিন্তায় সমাজের অনেক গনমান্য ব্যক্তি, এনাম উদ্দিন চৌধুরীর শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুবান্ধব এবং তাহার অতি নিকটস্থ আত্মীয়স্বজনগন কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো গোপনে ডাকিয়া এনাম উদ্দিন চৌধুরীকে জ্ঞান দিতে চেষ্টা করিয়ায়াও খুব একটা সফল তো হইলেনই না বরং উলটা ফল হইলো। এনাম উদ্দিন এবার সালাউদ্দিন চৌধুরী এবং তাহার সব বাল-বাচ্চাদেরকে তাহার ঘরভিটা হইতে উচ্ছেদের হুকুম করিলেন।

চারিদিকে বর্ষাকাল, যখন তখন আকাশ ভর্তি মেঘের ভেলা ভাসিয়া বেড়ায়, কখনো কখনো অগ্রিম কোনো সংকেত না দিয়াই মেঘের ভারে আকাশ তাহার গর্ভ থেকে অবিরত বৃষ্টির জলে এই ধরাকে প্লাবিত করিয়া পরবর্তী ভেলার টানে গুড় গুড় করিতেই থাকে। এমন অবস্থায় সালাউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে অন্য কোথাও তাহার পরিবার লইয়া স্থানান্তর করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি ইহা একটি মানবিক সিদ্ধান্তও হইতে পারে না। সালাউদ্দিন চৌধুরী এতোদিন তাহার বাবার এইরুপ উতপাত কিংবা কঠোর ভতর্সনা কিংবা সত্য মিথ্যার ইতিহাস লইয়া কোনো মাথা ঘামান নাই। ভাবিয়াছিলেন, পিতার বয়স হইয়াছে, মাঝে মাঝে ছোট অবুঝ বাচ্চাদের মতো হয়তো সীমার অতিরিক্ত রাগ করিতেছেন, কিংবা অযথা পাগলামি করিতেছেন, কোন একসময় আবার হয়তো ঠিক হইয়া তাহাকে এবং তাহার পরিবারকে আগের মতো বুকে টানিয়া লইবেন। কিন্তু ইদানিংকালের ঘরবাড়ি হইতে উচ্ছেদের যে আদেশ এনাম উদ্দিন সালাউদ্দিন চৌধুরীকে দিলেন, আর ইহার অগ্রগতির জন্য যেইরুপ চাপের লক্ষন দেখা গেল তাহাতে তিনি শংকিত হইয়া তাহার সহোদর দুইভাই আজিম উদ্দিন এবং ডাঃ লতুব উদ্দিনের সাথে শলা পরামর্শ করিলেন। তাহার দুই সহোদর ভাইয়েরাও তাহাদের পিতার এহেনো অমানিবিক কার্যকলাপে খুশি ছিলেন না। তাই, তাহারা এই ভাবনা হইতে সিদ্ধান্ত নিলেন, তাহারা তাহার পিতাকে বুঝাইবেন এবং তাহাদের বড় ভাই সালাউদ্দদিন চৌধুরীর উপর এইরুপ অহেতুক নির্যাতন বন্ধের অনুরোধ জানাইবেন।

সকল ভ্রাতারা মিলিয়া তাহাদের পিতাকে সবিনয় অনুরোধ করিলেও কোনো কাজ হইলো না। বরং অবস্থার আরো অবনতিই ঘটিলো। এনামউদ্দিন চৌধুরী তাহার দুই ছেলে আজিম উদ্দিন চৌধুরী আর ডাঃ লতুব উদ্দিন চৌধুরীর সম্মুক্ষেই এই বলিয়া আরো অধিক আইন শুনাইয়া দিলেন যে, আগামি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে যদি সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহার ভিটা ছাড়িয়া অন্যত্র চলিয়া যায়, তাহা হইলে তিনি আইনের দারস্থ হইবেন এবং আইনের সাহাজ্যেই তিনি তাহাকে ঘর মাটি হইতে বিতাড়িত করিবেন।

পিতার এহেনো সিদ্ধান্তে বাড়ির সবাই এমন মর্মাহত হইলেন যে, কাহারো মনে না আছে শান্তি , না আছে কোনো উচ্ছাস। জয়তুন্নেসা চৌধুরী সকল কিছু ভাবিয়াও কোনো কুল কিনারা পাইলো ন যে, কি কারনে বা কোন অপরাধে আজ তাহাদেরকে এইরুপ একটা অমানবিক শাস্তির মোকাবেলা করা হইতেছে। এমন কোনো ব্যবহার, এমন কোনো অনৈতিক আবদার কিংবা এমন কোনো আচরন কি তিনি বা তাহার স্বামী সালাউদ্দিন তাহাদের গোচড়ে বা অগোচড়ে করিয়াছেন যাহাতে তাহার পিতৃতুল্য শ্বশুর মনে আঘাত পাইয়াছেন বা কষ্ট পাইয়াছেন? অদূর অতীতের সমস্ত দিন কাল ক্ষন কিংবা কাল ক্ষনে ক্ষনে খুজিয়াও এমন কোনো কিছুই পাইলেন না যাহাতে তাহাদের উপর তাহার শ্বশুর মহাশয় এতটাই অমানবিক হইতে পারেন। বরং যেদিন হইতে তাহার শ্বশুর তাহাদের সহিত এই রুপ বিরুপ আচরন করিতে শুরু করিলেন, সেই সময় হইতে তাহারা আরো অধিক ভাল আচরন, কিংবা কি করিলে শশূরের মন মেজাজ ভালো থাকিবে সেই প্রচেষ্টাই করিতেছিলেন। এখানে একটা কথা না বলিলেই নয় যে, সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহার অন্যান্য ভ্রাতাদের হইতে অনেক বেশী তিনি তাহার পিতার প্রতি যত্নশীল। তাহার পিতার জর হইয়াছে? তো সালাউদ্দিন চৌধুরী রাত নাই দিন নাই, যেখান হইতে পারেন ডাক্তার আনিয়া আগে পিতার সেবা করিয়াছেন। পিতার প্রতি অন্য দুই ভ্রাতা যতোটা না সংবেদনশীল, যত্নশীল, তাহা হইতে অধিক গুন বেশী সংবেদনশীল এবং যত্নবান সালাউদ্দিন সাহেব। এই কয়েক মাস ধরিয়া এনাম উদ্দিন চৌধুরী যতভাবেই সালাউদ্দিন সাহেবকে মানুষের কাছে হেয় করিবার কিংবা তাহাকে ছোট করিবার নিমিত্তে যতোভাবেই অপমান করিবার চেষ্টা করিয়াছেন, সালাউদ্দিন সাহেব কখনোই ইহার প্রতিবাদ তো দূরের কথা, একবার ইহা লইয়া কাহারো সাথে আলাপ অ করেন নাই এবং কেউ যদি কোনো বিরুপ মন্তব্য করিবার প্রয়াস করিয়াছেন, ততক্ষনাত সালাউদ্দিন সাহেব উহার প্রতিবাদ করিয়া পিতাকে কেহ হেয় করিবে ইহা হইতে দেন নাই। আজো তিনি তাহার সেই সভাবের কনো ব্যতিক্রম করিলেন না। বরং অতিশয় বিনয়ের সহিত তিনি তাহার পিতার সামনে গিয়া দুই হাত জোর করিয়া ইহাই প্রার্থনা করিলেন যে, তাহার ছোট ছোত ছেলেমেয়রা পিতার এই বাড়িছারার আদেশে সংকিত হইয়া কেউ কেউ পীড়িত হইয়া গিয়াছে। সালাউদ্দিন সাহেব আরো মিনতি করিলেন যে, তাহারা তো তাহার পিতারই বংশধর, নায় নাতকুর। কোথায় যাইবে তাহারা এই বাড়ি ছাড়িয়া? এমতাবস্থায় যেনো পিতা তাহাকে কোনো ভুল ত্রুটি হইলে ক্ষমা করিয়া তাহার সমস্ত রাগ, গোস্যা, অভিমান ভুলিয়া গিয়া আবারো এই চির পরিচিত ভিতায় থাকিবার দয়া করেন।

কিন্তু এনাম সাহেবের রাগের কোনো সীমা ছিলো না। তিনি এতোটাই উত্তেজনা লইয়া রাগান্বিত স্বরে কম্পিত গলায় সালাউদ্দিন চৌধুরীকে এমনরুপে হুংকার দিলেন যে, চৌধুরী বাড়ির অজস্র ঘুমন্ত গাছপালা, পানির কুয়া আর টিনের চালেও ইহার মর্মরধ্বনি প্রতিধ্বনি হইয়া চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলো। যাহারা অন্য মনষ্ক ছিলেন, তাহারাও এই আওয়াজ শুনিতে পাইলেন। একটা প্রচন্ড তীব্র বেগ লইয়া অল্প সময়ের জন্য মনে হইলো একটা চৌধুরী বাড়ির সমস্ত ভিটায় ভুমিকম্প ঘটিয়া গেলো। যাহাদের আত্তায় পানি ছিলো তাহা শুকাইয়া গেলো, আর যাহারা আগেই শুষ্ক ছিলেন, তাহাদের অবস্থা যেনো মৃগী রোগীর মতো ছটফট করিতে লাগিলো। শুধুমাত্র বাড়ির কোনো একটি ঘরে জয়তুন্নেসা মনে মনে শান্তি লইয়া একখিলি পান চিবাইয়া ফুরুত করিয়া একমুখ পানের রস চৌধুরী বাড়ির মস্ত বড় উঠানে ফেলিয়া মৃদু আনন্দ পাইলেন যাহার খবর একমাত্র বিধাতা ছাড়া আর কাহারো গোচরে আসিলো না। এনাম সাহেবের তখনো রাগের পরিসীমা উর্ধমুখী এবং তিনি চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন- আজ হইতে সালাউদ্দিন চৌধুরী নামে আমার কনো সন্তান এই পৃথিবীতে ছিলো না, আর নাইও। আজ আমি তাহাকে ত্যাজ্য বলিয়া ঘোষনা করিলাম। আমি কালই ভোরে এই মর্মে আদালতে বয়ান দিবো যে, আমি আমার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি হইতে সালাউদ্দিন নামক কোনো কু-পুত্রকে বঞ্চিত করিয়া ইতিহাস করিয়া যাইবো।

সালাউদ্দিন চৌধুরী পিতার রাগ আরো বাড়িয়া যাইবে এই ভাবিয়া কোনো উত্তর না করিয়া নীরবে মাথা নীচু করিয়া পিতার সম্মুখ হইতে প্রস্থান করিলেন বটে কিন্তু এই কয়দিনের যতো অপমান, যতো অপবাদ তাহার পিতা তাহাকে দিয়াছে, আজ যেনো সব কিছুকে ছাড়িয়া এমন এক স্তরে গিয়া ঠেকিলো যে, সালাউদ্দিন চৌধুরীর সমস্ত বুক চিড়িয়া উচ্চস্বরে চিৎকার করিতে ইচ্ছা হইলো। কিন্তু তিনি তাহার কিছুই করিলেন না। শুধু চোখের দুইধারে কষ্টের একটা পাহাড় লইয়া অশ্রু ফেলিতে ফেলিতে নিজ ঘরে ফিরিয়া আসিলেন। মনে হইলো পৃথিবীর তাবত মানবকুল আজ সালাউদ্দিন সাহেবের দিকে কটাক্ষ দ্রিষ্টিতে তাকাইয়া অট্টহাসি হাসিতেছে। তাহার নিজ ঘরে আজ যেনো তিনি এক পরাভুত কোন ক্ষত বিক্ষত সৈনিক যাহার যুদ্ধ করিবার শেষ অস্ত্রটুকুও আজ কেউ যেনো কাড়িয়া লইয়াছে।

পরদিন সকাল বেলায় প্রত্যুষে ডাঃ লতুব উদ্দিন তাহার কর্মস্থলে ফিরিয়া যাইবার সময় বড় ভাই সালাউদ্দিনকে এইমর্মে একটি শলাপরামর্শ দিয়া গেলেন যে, যেহেতু তাহাদের পিতা কাহারো কোনো কথা বা উপদেশ শুনিতেছেন না, তুমি বরং কোনো এক উকিলের সাথে সমস্ত বিষয়াদি লইয়া আলাপ করো। হয়তো বা কোনো একটা সুরাহা হইতেও পারে। এই বলিয়া ভারাক্রান্ত মনে লতুব উদ্দিন চৌধুরীও বড় ভাইয়ের গলায় জড়াইয়া ধরিয়া একত্রে কিছুক্ষন অশ্রুপাত করিয়া একে অপরের হইতে বিদায় লইলেন।

শুনিয়াছি, এই পৃথিবীর আদি লগ্ন হইতেই সম্পদ আর নারী বিষয়ক ঘটনা লইয়া ভাইয়ে ভাইয়ে, বা আপন জনের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়, কিন্তু চৌধুরী বাড়ির সন্তানদের মধ্যে কোনো সম্পদ লইয়া না ভাইয়ে ভাইয়ে, না বোনে বোনে এমন কোনো বিদ্বেষ সৃষ্টি হইয়াছে। কিন্তু তাহার পরেও কেনো, কি নিয়া এতো বিদ্বেষ সৃষ্টি হইলো ইহার কোনো গোড়াপত্তন বা ইতিহাস কাহারো জানা নাই। যে রোগের কোনো ঔষধ নাই, তাহার জন্য এক মাত্র ঈশ্বরই ভরষা। এখন সবাই যেনো সেই ঈসশরের কৃপার উপরই নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখিতে পাইলেন না।

সালাউদ্দিন চৌধুরীর একটা সুনাম অত্র অঞ্চলে সব সময়ই ছিলো। এলাকার জজ ব্যারিস্টার, উকিল মুক্তার সবাই একনামে সালাউদ্দিন চৌধুরীকে চিনিত। যে কোনো জনকল্যাণকর কাজে যেমন সালাউদ্দিন সাহেবকে সবাই কাছে পাইত, তেমনি তাহার দ্বারা কিংবা তাহার ব্যবহারে কেউ কখনো মনে কষ্ট পাইয়াছেন কিংবা ব্যথিত হইয়াছেন এমন কোনো ইতিহাসও কেহ বলিতে পারিবে না। ভাইয়ের এহেনো পরামর্শে সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহার অতি পরিচিত গঞ্জের এক ব্যারিস্টারের কাছে শলাপরামর্শ করিতে গিয়া সালাউদ্দিন চৌধুরী আরো একটা খবরে তাহার চিত্ত ভাংগিয়া পড়িলো। তিনি জানিতে পারিলেন যে, গত কয়েকদিন আগে তাহার পিতা এনাম উদ্দিন চৌধুরী কোর্টে আসিয়া একখানা ওয়াকফা দলিল করিয়াছেন। আর সেই ওয়াকফা দলিলে তাহার সমস্ত আওলাদদেরকে বংশ পরাম্পরায় মোতায়াল্লী নিযুক্ত করিলেও উক্ত ওয়াকফা দলিলে সালাউদ্দিন চৌধুরীকে চিরতরে বাদ দিয়া এমন কি সালাউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে-পুলে নায়নাতকুর এবং তাদের যে কোনো স্তরের প্রজন্মকেই এনাম চৌধুরীর বংশের বাহিরে রাখিয়া তিনি দলিল সম্পন্ন করিয়াছেন। ইহার নিগুড় অর্থ দাড়াইলো যে, পক্ষান্তরে এনাম চৌধুরী আক্ষরীক অর্থেই সালাউদ্দিন চৌধুরী এবং তাহার বংশধরদেরকে ত্যাজ্য বলিয়া ঘোষনা করিলেন। এনাম চৌধুরীর কোর্ট কাছারির সংবাদ এখানেই শেষ ছিলো না। তিনি কোর্টের কাছে এইমর্মে আরো একটি নোটিশ দিয়াছেন যে, আগামি একমাসের মধ্যে যেন সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহার ভিটাবাড়ি ত্যাগ করিয়া খালি করিয়া দেয়, অন্যথায় এনাম চৌধুরী আইনের আওতায় সালাউদ্দিন চৌধুরীর বিপক্ষে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করিতে পারিবেন।

এতো কিছু শোনার পরেও সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহার সেই পরিচিত ব্যারিষ্টার বন্ধুকে কি করা যাইতে পারে তাহার ব্যাপারে একটা বুদ্ধি চাহিলেন।  ব্যারিস্টার বন্ধু সালাউদ্দিন সাহেবকে শুধু এই মর্মে পরামর্শ দিলেন যে, এনাম চৌধুরী যাহা করিতেছেন, তাহা কোনোভাবেই ঠিক কাজ করিতেছেন না। কিন্তু যেহেতু আইনে ত্যাজ্য করিবার একটা বিধান রহিয়াছে, ফলে মানবিক দিক দিয়া সমস্ত আচরন গর্হিত হইলেও আইন তাহাকে বাধা দিতে পারেন না। তারপরেও ব্যারিস্টার বন্ধু আইনের কাছে আরো কিছু সময় চাহিয়া একটা প্রার্থনা করিবার অনুরোধ করিতেই পারেন। হইতে পারে এনাম চৌধুরীর এক মাসের আইনী নোটিশ কোর্ট মানবতার দিক চিন্তা করিয়া সময়টা বাড়াইয়া দিতে পারেন।

সালাউদ্দিন চৌধুরী মন ভারাক্রান্ত লইয়া সন্ধ্যার একটু আগে বাড়িতে ফিরিয়া আসিলেন। আকাশ বেশ মেঘাচ্ছন্ন, মাঝে মাঝে আকাসে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে। বাতাস যেনো থানিয়া আছে। হয়তো বা অচিরেই ঘন কোনো বৃষ্টির দলা অবিশ্রান্ত মুষলধারে বহিবার নিমিত্তে আকাশ আরো কিছু রশদ জোগার করিতেছে। চৌধুরী বাড়ির গাছে গাছে এখনো কিছু পাখীর কিচির মিচির শোনা যাইতেছে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা যার যার পরার টেবিলে পরা লইয়া বসিবার জন্য বাতি হারিকেন জালাইয়া পরার বইপত্র গুছাইতেছে। চারিদিকে একতা থম্থমে ভাব। সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহার ছোট ভাই আজিম উদ্দিনের কাছে বসিয়া নীরবে চুপ হইয়া আছে।

আজিম উদ্দিন নীরবতা ভাঙ্গিয়া সালাউদ্দিন চৌধুরীকে কি যেনো বলিতে গিয়াও আবার বলিতে পারিলেন না। শুধু আমতা আমতা করিয়া কি যেনো বিড়বির করিয়া একটা সিগারেট ধরাইয়া আবারো চুপ করিয়া গেলেন। পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্য চারিদিকে চাদরের মতো এমন করিয়া সুপ্ত অবস্থায় থাকে যাহা হইতে কোনো অনিষ্ট হইতে পারে বলিয়া কখনোই কেহ ভাবিতে পারে না, অথচ সেই তাহার সাথেই আমাদের অনেকের বসবাস। উহা এমন এক দূর্ভেদ্য চাদর যাহার অন্তরালে অতি কাছেই অনিষ্ট লুকাইয়া থাকে বটে কিন্তু যাহার দ্বারা সেই অনিষ্ট হইবে তাহাকে কেহই ধরিতে পারে না। আর ইহার মধ্যে যখন এই তথ্য কোনোভাবে ফাস হইয়া কিছুটা আংশিক সত্য প্রকাশ পায়, যিনি জানেন আর যাহাকে যিনি জানিলেন তাহাদের মধ্যে যদি এমন এক বন্ধন তৈয়ারি হইয়া থাকে যাহা না ভাংগা যায়, না রাখা যায় আবার না অন্য কাহারো সাথে তাহা ভাগাভাগি করিয়া উহা বিনাশ করা যায়। বিনাশ করিতে গেলে হয় সম্পূর্ন ভীত নড়িয়া উঠে, আর যদি ভীত ঠিক রাখিয়া কোনোভাবে বিনাশের চেষ্টা করা হয় উহা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়া আসে না। উহা নড়বড়ে সেই দাতের মতো যাহা এককালে শক্ত পাথর পর্যন্ত ভাঙ্গিয়া ফেলিতে সক্ষম হইলেও ইহা এখন একটু নারাচারায় এমন তীব্র ব্যথা অনুভুত হয় যে, জীবন আর মরনের মধ্যে ফারাক খুব সামান্য বলিয়া মনে হয়। আজিম উদ্দিন যেনো আজ সেই রকমের একটা তীব্র ব্যথা লইয়া শুধু বিরি ফুকিতে লাগিলেন। তিনি যে তাহার এই বিড়ি পান করিয়া কোনো এক অসীম দুসচিন্তায় মগ্ন, তাহা অন্য কেহ বুঝিতে না পারিলেও বিষণ্ণ আকাশের বুঝিতে কনই কষ্ট হইলো না। অঝোর ধারায় ব্রিষ্টি আসিয়া দুই ভাইকে যেনো অকস্মাৎ ভিজাইয়া দিয়া গেলো।

রাত অনেক হইয়াছে। সবাই যার যার ঘরে যার যার চিন্তায় মগ্ন হইয়া কেউ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, কেউ ঘুম না আসিবার ফলে বিছানার বালিশ লইয়া এপাশ ওপাশ করিতেছে। আবার কেউ অঝোর ধারার বৃষ্টির ফোটায় টিনের চালের রিমঝিম সুর উপভোগ করিতেছে। সালাউদ্দিন চৌধুরীর দুইচোখে যেনো আজকের কালো রজনী হইতে আর কোনো রজনী ইতিপুর্বে আসিয়াছিলো কিনা তাহার মনে পড়ে না। ঘরের বাহিরের জলের ধারার সাথে সালাউদ্দিন চৌধুরীর নয়নের ধারার মধ্যে আজ যেন কোনো পার্থক্য তিনি বুঝিতে পারিলেন না। বাহিরের বৃষ্টির জল উত্তপ্ত ভুমিকে শীতল করিতে পারিলেও সালাউদ্দিন চৌধুরীর নয়নের জল তাহার অন্তরকে শীতল করিতে পারিতেছে বলিয়া মনে হইলো না।

ঠিক এমনই এক মুহুর্তে, হটাত ঘরে জোরে জোরে করা নাড়ার শব্দে সালাউদ্দিন চৌধুরীর ধ্যান ভাঙ্গিয়া গেলো। তিনি জাগিয়াই ছিলেন। দরজা খুলিতেই তিনি তাহার বৃদ্ধ মাকে হাতে একখানা কুপি লইয়া দরজার ওপাড়ে দাড়াইয়া থাকিতে দেখিলেন। কুপির আলোতে খুব ভালো করে স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন, তাহার মা সমস্ত কিছুর জন্য হয়তো একটু আগেও চোখের জলে বুক ভাসাইয়া আসিয়াছেন। কিন্তু বাংগালি মায়েদের যতোটা ভালোবাসার জোর অন্তরে আছে, সন্তানদের বিপদের সময় তাহাদের হাত ততোটাই শক্তিশালি নয় বিধায় তাহারা শুধু চোখের জলেই ঈশ্বরের কাছে এই বলিয়া শুধু প্রার্থনা করিয়া সন্তানের মংগল কামনা করেন যে, হে ঈশ্বর, তুমি আমার আদরের সন্তানদেরকে ভালো রাখো, আর ভালো রাখো তাদের জীবনধারাকে।। ইহা ছাড়া আর কিছুই করিবার থাকে না এই মমতাময়ি মায়েদের। মায়ের হাতের কুপিটা নিজের হাতে লইয়া সালাউদ্দিন সাহেব তাহার মাকে জড়াইয়া ধরিয়া রহিলেন আর বলিলেন, ‘মা, তুমি আমাকে মাফ করিয়া দিও। আমি অতিসত্তরই এই বাড়ি ছাড়িয়া অন্যত্র চলিয়া যাইবো। তুমি বাবাকে দেখিয়া রাইখো। বাবা অনেক একাকী একজন মানুষ। তুমি ছাড়া হয়তো বাবার আর কেহই নাই। তবে যেখানেই থাকি না কেনো মা, যে কোনো প্রয়োজনে, তোমার বা আমার বাবার জন্য আমি আজিবন আমার জীবন উতসর্গ করিয়া যাইবো। আমি কখনো ভাবি নাই যে, আমার দ্বারা এমন কোনো কাজ হইবে যাহাতে আমার প্রানপ্রিয় পিতা বা ভাইয়েরা কোনো কষ্ট পাইবে। অথচ আমি আজ জানিতেই পারিলাম না, কি আমার দোষ বা কি আমার অপরাধ’। মা হু হু করিয়া কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িলেন। সন্তানের কষ্টে মা আজ এতোটাই আপ্লুত যে, না তিনি তাহার স্বামীকে মানাইতে পারিতেছেন, না তিনি সন্তানকে ছাড়িয়া দিতে পারিতেছেন। মমতাময়ী মায়েদের সবচেয়ে বড় কষ্ট যখন একদিকে সন্তান আর অন্যদিকে থাকে তাহার নিজের স্বামী। ইহা যেনো সেই আদালতের দোয়া চয়েজ, তুমি কি ফাসিতে মরিতে চাও নাকি বিষ পানে? মরিতে তোমাকে হইবেই, হোক সিতা ফাসি অথবা বিষপান। কোনটা রেখে মা কোনটা ফেলবেন তিনি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারেন না। উভয় পরিস্থিতি তাহার জন্য একই। সংকটাপন্ন। না তিনি মরিতে চাহেন, না তিনি বাচিয়া রহিলেন।

সালাউদ্দিনের মাতা বুক ভরা ব্যাথা নিয়া কেনো এতো রাতে ছেলে সালাউদ্দিনের ঘরে আসিলেন তাহাঁর কারনটা ব্যক্ত করিলেন যে, তিনি তাহার স্বামীর মনোভাব বুঝিতে পারিয়াছেন। আগামীকাল ভোর হইলেই তাহার স্বামী পুত্র সালাউদ্দিন এবং তাহার সব সন্তান সান্ততীদেরকেসহ একটি ফৌজদারি মামলা করিতে যাইবেন বলিয়া মনোস্থির করিয়াছেন। তাহাতে যাহা হইতে পারে যে, যদি কোনো কারনে আদালত মামলায় জামিন না মুঞ্জুর করেন তাহা হইলে এই ছোট ছোট নায়নাতকুরগুলির কি অবস্থা হইবে? সালাউদ্দিনের মা এই গহীন রাতে আরো একবার তাহার পিতার কাছে যে কোনোভাবেই হোক, পায়ে ধরিয়া, কান্না করিয়া আগামিকালের মামলা করা হইতে বিরত রাখিতে হইবে বলিয়া সালাউদ্দিনকে তাহার পিতার ঘরে যাওয়ার অনুরোধ করিলেন। কিন্তু সালাউদ্দিন জানিতেন, যদি তিনি পুনরায় তাহার পিতার সম্মুক্ষিন হনও, তাহা হইলে হতে আরো বিপরীত হইবার সম্ভাবনাই রহিয়াছে। ঈশ্বরের উপর ভরষা করিবার জন্য মাকে আরেক তরফা বুঝাইয়া সালাউদ্দিন তাহার মাকে পিতার ঘরে পাঠাইয়া দিলেন।

ঈশ্বর বোকা নন, বোবাও নন, কানাও নন, কালাও নন। তাহাঁর কাছে এই জগতের সব রহস্যা সর্বদা উম্মুচিত। গোপন কোনো কিছুই তাহাঁর কাছে নাই। তিনি অতি ক্ষুদ্র পিপিলিকার জন্য যেমন ন্যায় বিচার করেন, তেমনি বৃহৎ হস্তীসমুহের বেলায়ও কোনো পার্থক্য করেন না। জগতের কোন বৃক্ষরাজি পানির অভাবে শুষ হইয়া যাইতেছে, আর সেখানে কিভাবে তিনি জলপতন করাইয়া সেই শুষ্ক মর্মর পাতাকে আবার জীবন্ত করিয়া তুলিবেন, এই নৈপুণ্যতা ঈশ্বরের কাছে কোনো হেয়ালী বিশয় যেমন নয়, তেমনি কঠিন ব্যাপারও নয়। গহীন অরন্যে কোথায় কোন মেষশাবক তাহাঁর দল হইতে দলচ্যুত হইয়া পথা হারাইয়া ফেলিয়াছে, আর তাহাকে কি প্রকারে আবার পথ দেখাইয়া নিজের আস্তানায় ফিরাইয়া লইতে হইবে ইহার বৈজ্ঞানিক দিকদর্শন ওই মেষশাবকের কাছে না থাকিলেও ঈশ্বর কোনো না কোনোভাবে তাহাকে পথ দেখাইয়া ঠিক নিজের পরিচিত গন্তব্যে লইয়া যাইবেনই। ইহাই ঈশ্বর। তাবত জগতের অধিপতি। কারো উপরই তিনি জুলুম বা মশকরা করেন না। ঠিক এমনি একটা ঘটনা ঈশ্বর পরদিন সকাল বেলায় সবার অগোচরে ঘটাইয়া দিলেন।

অতি প্রত্যুষে এনাম উদ্দিন চৌধুরীর বুক ব্যথা হইতে উপসর্গটা আরম্ভ হইয়া কিছুক্ষনের মধ্যে প্রায় দম বন্ধ হইয়া যাইবার উপক্রম হইলো। তিনি তাহাঁর বিছানা ছাড়িয়া যেনো উঠিবার শক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছেন। বাড়িশুদ্ধ মানুষের মধ্যে নানান রকমের গুঞ্জন আরম্ভ হইয়াছে। কেহ কেহ তাহাঁর শাস্তি শুরু হইয়াছে বলিয়া মনে মনে প্রীত হইতেছেন, কেহ কেহ আবার এনাম চৌধুরীর শেষ নিঃশ্বাস শেষ হইবার পূর্বেই সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা কিভাবে হইলে কাহার কত লাভ হইবে সেই হিসাব কষিতেছেন, কেউ আবার নির্লিপ্ত হইয়া দেখি কি হয়, কোন ঘাটের জল কোথায় গিয়া পড়ে এই ভাবিয়া দাত কেলাইতেছেন। হন্তদন্ত হইয়া কেউ আবার এনাম উদ্দিন চৌধুরীর ডাক্তার ছেলে লতুব উদ্দিন চৌধুরীকে কোনো একলোক মারফত কিভাবে খবরটা পৌঁছানো যায় সে ভাবনায় অস্থির হইয়া পায়চারী করিতেছেন। এনাম উদ্দিন চৌধুরী নিথর দেহে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় তাহাঁর বিছানায় যেনো একজন মৃত মানুষের মতো পড়িয়া আছেন। তাহাঁর আজ মোকদ্দমায় যাওয়ার কথা ছিলো। সেই অভিলাষ এনাম চৌধুরীর এখন মনে আছে কিনা বুঝা যাইতেছে না। তবে ইহা স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে যে, তিনি অমানসিক যন্ত্রনার মধ্যে আছেন।

সালাউদ্দিন চৌধুরী ভোরেই নামাজ পড়িয়া অডুরে নদীর ধারে সকালের মুক্ত বাতাসে একটু হাওয়া খাইতে গিয়াছিলেন। তাহাঁর মন মেজাজ সস্তির হইয়াছিলো সারারাত। ঘাটের কেউ তাহাকে সবেমাত্র একতা খবর দিলো যে, তাহাদের বাড়িতে কেউ নাকি খুবই গুরুতর অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছেন, আর সিটা সম্ভবত তাহাঁর বাবা। খবর পাইয়া দ্রুত সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহাদের বাড়ির আংগিনায় আসিয়া দেখিলেন, বেশ মানুষের উপস্থিতি। এম্ননিতেই বুকে বল ছিলো না, সারারাত প্রায় জাগিয়াই ছিলেন, তাই শরীরটাও খুব মজবুত নয়। বাড়িতে কাহার কি হইয়াছে জিজ্ঞাসা করিতেই জয়তুন্নেসা এনাম চৌধুরীর অসুস্থের কথা জানাইলেন। সালাউদ্দিন চৌধুরী সরাসরি তাহাঁর পিতার মাথার কাছে গিয়া দেখিতে পাইলেন, নিথর শরীর লইয়া তাহাঁর বাবা বিছানায় পড়িয়া আছেন। তিনি পিতার মুখখানা তাহাঁর হাতে ধরিয়া কয়েকবার ‘বাবা, বাবা, বলিয়া ডাকিলেন বটে কিন্তু এনাম উদ্দিন চৌধুরী না সালাউদ্দিন চৌধুরীর ডাকে কোনো সাড়া দিলেন, না তিনি চোখ খুলিয়া জগতে এই মুহুর্তে কি ঘটিতেছে তাহা বুঝিবার জন্য নেত্র উম্মোচন করিলেন। বাবাকে বুকের কাছে জড়াইয়া ধরিয়া সালাউদ্দিন চৌধুরী যেনো অঝোর ধারায় কাদিতে লাগিলেন। পাশে সালাউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রি জয়তুন্নেসা তালপাতার একটা পাখা লইয়া ঘনঘন বাতাস আর সাথে ভিজা একখানা গামছা দিয়া শশুড়ের মুখখানি বারংবার মুছিয়া দিতে দিতে চোখের জল ফেলিতে লাগিলেন। জহুরুন্নেসা তাহাঁর প্রত্যাহিক কর্মের একটি, খাচার পালিত কবুতরগুলিকে মুঠিমুঠি খুদের চাল বিলি করিয়া খাওয়াইতে খাওয়াইতে যেনো মনে মনে কি ভাবিতে লাগিলেন। আজিম উদ্দিন বাবার পাশে আসিয়া বসিয়াছিলেন বটে কিন্তু তাহাঁর কোনো কর্ম নাই বিধায় অধিক্ষন এখানে আর বসিয়া থাকিতে পারিলেন না। তিনিও উঠোনের পাশে পানির কুয়ায় বসিয়া জহুরুন্নেসার কবুতরের সেবা দেখিতে লাগিলেন। অন্যদিকে সালাউদ্দিন চৌধুরী বাবার এইরুপ শারীরিক অসুস্থতায় গভীর আশংকা বোধ করিয়া তিনি দ্রুত গঞ্জের সদর হাসপাতালে লইয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করিলেন।

যখন সদর হাস্পাতালে পৌঁছিলেন, ডাক্তারবাবু দ্রুত এনাম উদ্দিন চৌধুরীর হাত পা চোখ মুখ, জিব্বা চেক করিয়া বুঝিলেন যে, তিনি হার্টের একটা কঠিন অস্বাভাবিক চক্করের মধ্যে পড়িয়া গিয়াছেন। এখানে তাহাঁর কোনো চিকিৎসা নাই। দেরী হইলে আরো সমস্যা হইতে পারে বলিয়া দ্রুত উন্নত কোথাও লইয়া না গেলে অচিরেই অবস্থার আরো অবনতি হইতে পারে বলিয়া জানাইয়া দিলেন। গঞ্জ হইতে শহরের দুরুত্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার। এতো দূর রাস্তা যাইতে যাইতে পথেই কোনো অঘটন ঘটিয়া যায় কিনা এই আশংকায় সালাউদ্দিন সাহেবও কি করিবেন বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিলেন না। বাড়ির সব বউঝিরা নতুন কোনো আশংকায় সবাই চিন্তিত হইয়া কিংকর্তব্য বিমুখ হইয়া যেনো ভাষাহীন হইয়া সময় পার করিতেছিলেন। সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহাঁর সহোদর ভাই ডাঃ লতুব উদ্দিনের আগমনের অপেক্ষায় রহিলেন।

বিকালের দিকে এনাম উদ্দিন চৌধুরীর অবস্থার আরো অবনতি দেখা দিল এবং তাহাঁর জবান প্রায় বন্ধই হইয়া গেলো। রাত নাগাদ ডাঃ লতুব উদ্দিন হাসপাতালে আসিয়া বাবাকে দেখিয়া তাহাঁর বুঝিতে একটুও কষ্ট হইলো না যে, তিনি হার্ট এটাক করিয়াছিলেন এবং তিনি এখন প্রায় প্যারালাইসিসের দিকে যাইতেছেন।

এনাম উদ্দিন চৌধুরী সত্যি সত্যিই প্যারালাইসিস হয়ে গেলেন। তিনি আর আগের মতো তাহাঁর ডান হাত এবং ডান পা কিছুতেই নাড়াইতে পারেন না। তাহাঁর বাক রুদ্ধ হইয়া তিনি বোবা হইয়া গেলেন। ঘাড় কিংবা শরীর ও ভালোমতো নিয়ন্ত্রন করিতে পারেন না।

প্রায় একমাস কাল এইরুপে গঞ্জের সদর হাসপাতালে চিকিতসার পর এনাম উদ্দিন চৌধুরীকে ওই প্যারালিসিস অবস্থাতেই বাড়িতে নিয়া আসা হইলো। এখন এনাম উদ্দিন চৌধুরী আর নিজের থেকে কিছুই করিতে পারেন না। তাহাকে কেহ উঠাইয়া দিলে বিছানায় বসিতে পারেন, কেহ খাবার খাওয়াইয়া দিলে খাইতে পারেন, কেহ তাহাকে গোসল করাইয়া দিলে তিনি গোসল করিতে পারেন, পায়খানা প্রস্রাবটুকু শুধু এনাম উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী করাইয়া থাকেন। সবল এবং সচল একজন মানুষ যতটা সংসারের জন্য শক্তি, অবলা এবং অচল সেই একজন মানুষ যে কতটা নিজের জন্য নিজে অসহায় এবং পরিবারের জন্য কতটা বোঝা, তাহা এই এনাম উদ্দিন চৌধুরীকে না দেখিলে হয়তো চৌধুরীর বাড়ির কোনো সদস্যই বুঝিয়া উঠিতে পারিতো না।

অসুস্থ হইবার পর প্রথম প্রথম পরিবারের সবাই যার যার জায়গা হইতে এনাম উদ্দিন চৌধুরীর যত্ন্যাদির কোনো কমতি ছিলো না। কিন্তু অসুস্থতা যখন লম্বা সময়ের জন্য শরীরে ভর করে, আর কবে নাগাদ ইহার পরিসমাপ্তি হইবে বলিয়া কাহারো কোনো ধারনা থাকে না। তখন সেই যত্ন্যাদিতে ধীরে ধীরে ভাটা পড়বেই এবং এটাই ঘটিতে লাগিলো এনাম উদ্দিন চৌধুরীর বেলায়। তাহাঁর বিছানার পাশে এখন আর আগের মতো দল বাধিয়া লোকজন বসিয়া থাকে না, তাহাঁর প্রাত্যাহিক অনেক কার্যে আগের মতো আর সঠিক নিয়মাবলী স্থির রহিলো না। সকালের গোসলের সময় গড়াইয়া দুপুর হইয়া যায়, দুপুরের খাবার খাইতে খাইতে এখন বিকাল হইয়া যায়, রাতের সব আয়োজন এখন প্রায়ই বিরতিতে পড়িয়া যায়। কিন্তু সালাউদ্দিন চৌধুরী এবং তাহাঁর স্ত্রীর খাটাখাটনীর মধ্যে আগে যেমন ছিলো এখনো তেমনি রহিলো। সালাউদ্দিন চৌধুরী তাহাঁর অবর্তমানে বাবারদিকে যেনো সারাক্ষন কেউ না কেউ নজর রাখে তাহাঁর জন্য তিনি তাহাঁর স্ত্রী এবং ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে তাহাদের দাদার পাশে বসিয়াই পড়াশুনা কিংবা মেয়েরা পুতুল খেলা করুক এই নির্দেশ দিয়া দিলেন। জহুরুন্নেসা, আজিম উদ্দিন কিংবা তাহাদের সন্তানেরা আগেও যেমন দূরে দুরেই থাকিতো, এখনো সেইরুপ অবস্থানেই আছে। তবে এইখানে একটা জিনিষ খুব করিয়া চোখে পড়িলো যে, যেহেতু এনাম উদ্দিন চৌধুরী সালাউদ্দিন চৌধুরীকে তাহাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিতে ত্যাজ্য করিয়া আইনের মাধ্যমে উইল করিয়াছিলেন, এবং তাহাঁর দ্বিতীয় পুত্র আজিম উদ্দিনকেই এনাম উদ্দিন চৌধুরীর অক্ষমতায় মোতো ওয়াল্লি নিযুক্ত করিয়াছিলেন, ফলে আজিম উদ্দিনের স্ত্রী জহুরুন্নেসাই এখন একচ্ছত্র কর্ত্রী হিসাবে চৌধুরীর বাড়ির জমি জমা, এবং অন্যান্য স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির দেখভাল করেন। কখন কাহাকে কোন জমি বর্গা দিতে হইবে, কখন কোন বর্গাদার কত টাকা জমা রাখিল ইহার সমস্ত হিসাব এখন জহুরুন্নেসাই করিয়া থাকেন।

আজ প্রায় পনেরো বছর পার হইয়া গেলো এনাম উদ্দিন চৌধুরী প্যারালাইসিস অবস্থাতেই বিছানায় পড়িয়া আছেন। বয়স এবং রোগ দুইটাই বাড়িয়া চলিতেছে বিধায় এনাম উদ্দিন চৌধুরীর আর সুস্থ্য হইয়া উঠিবার কোনো লক্ষন দেখা দিতেছিলো না। সালাউদ্দিন চৌধুরীর মাতা গত হইয়াছেন প্রায় দুই বছর হইলো। সালাউদ্দিন চৌধুরীর ছোট ছোট বাচ্চারা এখন বেশ বড় হইয়া কয়েক মেয়ের বিয়া পর্যন্ত হইয়া গেছে, আর ছেলেরা অনেকেই পড়াশুনা শেষ করিয়া কেহ সরকারী আবার কেউ প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরী লইয়া বিয়া সাদী করিয়া ভালই আছে। আজিম উদ্দিন, এবং লতুব উদ্দিনের মধ্যে বাবার পাওয়া সম্পত্তির অংশ সমান দুইভাগে ভাগাভাগি করিয়া লইয়া তাহাদের সীমানা গাড়িয়া দিয়াছেন। তাহাদের সংসার এখন সম্পুর্নই আলাদা। যে যার জায়গায় সংসার পাতিয়া বহাল তবিয়তে আছেন। শুধুমাত্র সালাউদ্দিন চৌধুরী কোন অংশ না পাইয়াও তিনি এবং তাহাঁর পরিবার এনাম উদ্দিন চৌধুরীর পুরানো সেই ঘরে থাকিয়া বাবার সেবা চালাইয়া যাইতেছেন। যদিও অনেকবার ডাঃ লতুব উদ্দিন তাহাঁর বাবার উইল খানাকে পরিবর্তন করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন যাহাতে তাহাঁর বড় ভাই সালাউদ্দিন চৌধুরীও অন্যান্যদের মতো পিতার সম্পত্তির ভাগীদার হইতে পারেন। কিন্তু যেহেতু এনাম উদ্দিন চৌধুরীর বাক রুদ্ধ হইয়াছিলো এবং তিনি কোনো কিছুই পরিবর্তনের পর্যায়ে ছিলেন না, বিধায় আজ থেকে পনেরো বছর আগে করা উইল খানীও পরিবর্তন করা সম্ভব হইতেছিলো না। আজিম উদ্দিন চৌধুরীর যদিও এই পরিবর্তনে কোন অভিযোগ ছিলো না কিন্তু জহুরুন্নেসা মনে মনে ইহা না হোক সেই ইচ্ছাই বারবার ইনিয়ে বিনিয়ে প্রকাশ করিবার বহু ইংগিত দিয়া থাকেন।  

ইদানিং এনাম উদ্দিন চৌধুরীর শরীর খুব ভাল যাইতেছে না। প্রায়ই তার চোখের কোনায় পানি ছলছল করিয়া পড়িতে দেখা যায় কিন্তু বাকরুদ্ধ এই দাপুটে মানুষটি কোনো কথা বলিতে পারেন না, কোনো কিছু লিখিয়াও বুঝাইতে পারেন না, তাহাঁর হাত আর পা যেনো সবসময় থর থর করিয়া কাপিতেই থাকে। যেদিন হইতে এনাম উদ্দিন প্যারালাইসিস হইয়া বাকরুদ্ধ হইয়াছেন, সেদিন হইতেই হয় সালাউদ্দিন চৌধুরী অথবা তাহাঁর স্ত্রী জয়তুন্নেসা চৌধুরী নিজ হাতে এনাম উদ্দিন চৌধুরীকে খাওয়াইয়া দিতেন, মুখ মুছাইয়া দিতেন। ইদানিং সালাউদ্দিন চৌধুরী লক্ষ্য করিলেন, তাহাঁর বাবার খাবারে বেশ অনিহা, জোর করিলেও বেশী খাইতে চাহেন না। বাবাকে দেখিলে তাহাঁর বড় মায়া হয়। এই বাবা যে তাহাকে কত কষ্ট দিয়াছে, অপমান করিয়াছে, ঘর ছাড়া করিতে চাহিয়াছিলো, তাহাঁর সন্তানদের কতই না অপমান করিয়া দুরদুর করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছিলো, সেই কারনেও আজ সালাউদ্দিন চৌধুরীর কোনো অভিযোগ নাই। তিনি তো তাহাঁর বাবা। বাবার দিকে তাকাইয়া সালাউদ্দিন চৌধুরীর বড় মায়া হয়, কষ্ট লাগে। বাবাকে জড়াইয়া ধরেন সালাউদ্দিন সাহেব। অনেক্ষন জড়াইয়া ধরিয়া বারবার যেনো একই কথা বলিতে থাকেন, ‘বাবা তুমি আমাকে মাফ করিয়া দিও। তোমার কোন সম্পত্তি, কোন ঘর, কোনো ভিটা আমার দরকার নাই। আমি তোমার হাত ধরিয়া প্রথম যখন হাটিতে শিখিয়াছি, সেইদিন থেকে আমি তোমাকে নিজের মনের অনেক গভীরে একমাত্র আরাধনার পুজনিয় ব্যক্তি বলিয়াই মানিয়াছি। আমি তোমার কাছে অনেক হয়তো অপরাধ করিয়াছি, কিন্তু কি অপরাধ করিয়াছি, কখন করিয়াছি, আমি জানি না, কিন্তু সেই অজানা অপরাধের কারনে তুমি আমাকে অন্তত তোমার সন্তানের মহব্বত হইতে বঞ্চিত করিও না। আমি তোমাকে সবসময় ভালবাসিয়াছিলাম, আজো অনেক ভালোবাসি’। চোখের জল টপটপ করিয়া হয়তো এনাম উদ্দিন চৌধুরীর টাক মাথায় পড়ে। এনাম সাহেব বুঝিতে পারেন। তিনি তাহাঁর একটি হাত বহু কষ্টে উপরে তুলিতে চাহেন, কিন্তু হাতের জোর যেনো সালাউদ্দিন চৌধুরীর মুখ পর্যন্ত উঠিয়া তাহাকে একটু স্পর্শ করিবে সেই শক্তি আর নাই। এনাম উদ্দিন চৌধুরীর চোখের জলও হয়ত তাহাঁর বালিশ ভিজিয়া যায়।

ইদানিং এনাম উদ্দিন চৌধুরী কি জানি বলিতে চাহেন, বিড়বিড় করেন। তাহাঁর সব কথা ভালোমত বুঝাও যায় না। তবে একটা জিনিষ ইদানিং দেখা গেল, তিনি তাহাঁর বাম হাত নারানোর চেষ্টা করেন, কিছু লিখার চেষ্টা করেন, কিন্তু সবকিছু লেখা বুঝাও যায় না। এম্নিতেই তিনি কখনো বাম হাতে লিখেন নাই, আর এবার কিছু লেখা বাম হাতে লিখিবার চেষ্টায় সব বুঝা না গেলেও ইহার কিছু অর্থ উদ্ধার করা যায়।

এইভাবেই আরো তিন বছর পার হইয়া যায়। এনাম চৌধুরী আগের থেকে অনেক সুস্থ। তিনি বিড় বিড় করিয়া কথা বলিলেও কিছু কিছু লেখা লিখে বুঝাইতে পারেন। ঈশ্বরের খেলা বড় রহস্যময়। কখন তিনি কাকে কি দিয়া শাস্তি দেন আর কি কারনে কোথায় কার জন্য কি বরাদ্ধ রাখেন কেহই বলিতে পারে না। কোনো এক বিকালে তিনি তাহাঁর সেই উকিল বন্ধুকে খবর দিতে বলিলেন যিনি আজ হইতে আঠারো বছর আগে এক তরফা একটা উইল করে তাহাঁর অতি আদরের সালাউদ্দিন চৌধুরীকে তাহাঁর সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিতে হইতে বঞ্চিত করিয়াছিলেন, যদিও আজ আর সালাউদ্দিন চৌধুরীর কোনো কিছুরই প্রয়োজন নাই। তাহাঁর শুধু সবিনয় প্রার্থনা যেনো তাহাঁর বাবা সুস্থ হইয়া আবার তাহাকে বুকে জরাইয়া ধরিতে পারেন। সুস্থ বাবার কাছে তিনি আবারো সেই ছত সালাউদ্দিন সাজিয়া কায়মনে ক্ষমা চাহিতে পারেন।

বন্ধু উকিল আসিলেন। এনাম সাহেব তাহাঁর হাতের ইশারা ঘরের দরজা বন্ধ করিতে বলিলেন। উকিল বাবু সবাইকে ঘর হইতে বাহির করিয়া ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া এনাম সাহেবের পাশে আসিয়া বসিলেন। এনাম সাহেব তাহাঁর তোষকের নীচ হইতে একখানা খাতা বাহির করিয়া উকিল বন্ধুর হাতে দিলেন, যেখানে প্রথমে খুব কাপা কাপা বাকা অক্ষরে, কোথাও কোথাও অষ্পষ্ট ভাবে হলেও তাহাঁর অর্থ যাহা দারায় তাহা ছিল এইরুপঃ 

‘আমি আমার পূর্বের উইল পরিবর্তন করিয়া এই নতুন উইলটি করিতে চাই, তুমি আমার জীবদ্দশায় ইহা পরিবর্তন করিয়া অন্তত আমার এই বিগত বছরের কষ্টের প্রায়শ্চিত্ত করিতে চাই।’

উকিল বাবু, কাগজটি পড়িলেন,

আমি আমার পূর্বের ওয়াকফ দলিলে আমি অন্যের প্ররোচনায় পড়িয়া আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র সালাউদ্দিন ও তাহাঁর সন্তান সন্ততীদেরকে অতিশয় নির্দয় ভাবে আমার সমস্ত সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিয়াছি। এক্ষনে আমার সমস্ত ভুল ভাংগিয়াছে। আমি একটি জিনিষ খুব ভালো করিয়া বুঝিয়াছি যে, আমি যখন অর্ধাংগ অবস্থায় মরনাপন্ন হইয়া বিছানায় পড়িয়াছিলাম, তখন হইতে অদ্যাবধি বুঝিয়াছি যে, আমার জ্যেষ্ঠপুত্র এবং তাহাঁর স্ত্রী সন্তানেরা নিসশার্থভাবে দিবা রাত্রী সেবাযত্ন করিয়া যেভাবে আমার প্রান রক্ষা করিয়াছে এবং এখনো করিতেছে তাহাঁর উদাহরণ বিরল। আমি তাহাদের মানবিকতায় অতিশয় মুগ্ধ হইয়াছি এবং তাহাদিগকে আমার স্বউপার্জিত সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করার জন্য হৃদয়ে অনেক আঘাত পাইয়াছি। আমি আমার এই শারীরিক অক্ষমতার সময় স্পষ্ট বুঝিয়াছি কে বা কাহারা আমাকে ভালোবাসিয়াছে আর কে বা কাহারা আমার সম্পদকে ভালবাসিয়াছে। আমার হয়তো আর বেশি সময় হাতে বাকী নাই। আমি কাউকেই আমার সম্পত্তি হইতে আর বঞ্চিত করিতে চাহি না। যদিও অনেকেই আমার প্রতি তাহাদের দায়িত্ত পালন করে নাই। তাই এক্ষনে পিতা হিসাবে আমি আর কাউকেই কোন কিছু হইতে বঞ্চিত করিবো না। আমার উক্ত দলিল পরিবর্তন করিয়া আমার বড় সন্তান সালাউদ্দিন এবং তাহাঁর সন্তান সন্ততিদের সবার জন্য যার যার হিস্যায় সবাইকে হকদার করিয়া দিলাম। আর এক্ষনে আমি আমার বড় সন্তান সালাউদ্দিনের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি যে, আমার দ্বারা যে অশান্তি আমি তাহাকে দিয়াছি, তাহাঁর জন্য পিতা হিসাবে পুত্রের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

  উকিল বাবু কাগজখানি পড়িয়া এনাম সাহেবের হাত ধরিয়া শুধু একটা কথাই বলিলেন, আমাকে শুধু মাত্র একটি দিন সময় দিন। আপনার এহেনো সিদ্ধান্তে আপনার পরিবারের থেকেও বেশী খুশী আমি হইয়াছি যে, এতোদিন আমিও একতা মানসিক অশান্তিতে ভোগিয়াছিলাম যে, এমন একতা উইল কেনো আমার দ্বারা আজ হইতে বিগত আঠারো বছর আগে করিতে গিয়াছিলাম। আমি কায় মনে সর্বদা এই দোয়াটাই করিতাম, কখনো যদি আবারো এইদিন তা আসে যে, আমার দারাই আবার আপনার উক্ত দল্লটা পরিবর্তন হইয়া ন্যায় একতা দলিল হোক। আমি কালই ইহার ব্যবস্থা করিতেছি।

পরেরদিন উকিল বাবু সমস্ত দলিল পরিবর্তন করিয়া যখন ইহার সপ্তাহ খানেক পরে সরকারী স্ট্যাম্প লাগাইয়া কোর্ট কর্ত্রিক সত্যায়িত করিয়া আনিলেন, তখন সালাউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারে যেমন সুখের জল পড়িলো তেমনি জহুরুন্নেসার বুক ভাসিয়া গেলো তাহাঁর চোখের জলে। তাহারা কিছুতেই যেনো এই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে পারিলেন না। তাহারা বারবার এই কথাই প্রচার করিতে লাগিলেন যে, সেবার নাম করিয়া সালাউদ্দিন চৌধুরী এবং তাহাঁর পরিবার এনাম উদ্দিন চৌধুরীর কাছ হইতে পুনরায় সব কিছু ভাগাভাগি করিয়া লইলেন, যেনো তাহা তাহাদের কোনো কালেই প্রাপ্য ছিলো না।  গোপনে গোপনে এই জহ্রুন্নেসা এবং তাহাঁর পরিবার সালাউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের আজীবিন বিপক্ষ হইয়াই রহিলেন

৩/০৩/২০২০-সম্পর্ক বিচার করলে মাধুরীর সাথে আকাশের ভালোবাসা

সম্পর্ক বিচার করলে মাধুরীর সাথে আকাশের ভালোবাসা কিংবা প্রেমের কাহিনী রচিত হতে পারে না। তাদের মধ্যে না আছে ধর্মের সাথে মিল, না আছে বয়সের কোনো মিল অথবা না আছে সামাজিকভাবে কোনো আত্মীয়তার কাছাকাছি বন্ধন। কিন্তু প্রকৃতি অনেক সময় এমন কিছু কাজ করিয়া বসে যাহার মাঝে না আছে কোনো বইজ্ঞানিক সুত্রতা, না আছে ফিলোসোফির কোনো ফর্মুলা। মানব আর মানবীর চরিত্র ধরিয়াই একেকতা সম্পর্ক গোপনে, কিংবা অজান্তে এমন কিছুর মধ্যে আটকে যায়, যাহা কোনো না মানে আইন, না মানে সুত্র বা ফর্মুলা। মাধুরী আর আকাশ সমস্ত কিছু নিয়ম ভাঙ্গিয়া একে অপরের এতো কাছাকাছি চলিয়া আসিয়াছিলো যে, তাহারা আর দুইটি প্রানির একটি আত্তায় রুপান্তরীত হইয়া পড়িল।

আকাশে প্রচন্ড বৃষ্টি, দমকা হাওয়ায় চারিদিকে আকাশের মেঘমালা অস্থির হইয়া দিক বিদিক ভাবে হন্যে হইয়া যে যেখানে খুশী উড়িয়া যাইতেছে, পথে ঘাটে মানুষেরা ভয়ে সন্তস্ত্র হইয়া যাহারা ঘরের বাহির হইয়া ছিলো তাহার ঘরে কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ে যাইবার পায়তারা করিতেছে, আর যাহারা ঘরে বসিয়া বাহিরে যাইবার পায়তারা করিতেছিলো তাহারা নুরুপায় হইয়া নিজের মনে অশান্ত চিত্তে কখন আকাশ স্থির হইবে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। গাড়ি ঘোরা নিরাপদ স্থানে পার্ক খুজিতেছে, এর মাঝেই চঞ্চল আকাশ ক্ষনে ক্ষনে বিদ্যুৎ চমকাইয়া পৃথিবীর সকল প্রানি কুল এবং জন্তু জানোয়ারদেরকে চোখ রাংগাইয়া আরো তান্ডব চলিতে পারে বলিয়া সংকেত দিয়াই যাইতেছে। অথচ ইহারই মধ্যে আমাদের এই দুই প্রানি মাধুরী আর আকাশের মধ্যে আকাশ সমস্ত বিপদ সংকুল সংকেত অমান্য করিয়া দূর্যোগ পূর্ন রাস্তায় একে অপরের সাথে দেখা করিবার অস্থির নেশায় বাহির হইয়া গেলো।

কোথাও কোনো যান বাহনের লেশ দেখা যাইতেছে না। যখনই কোনো যান বাহন হতাত করিয়া আসিয়া পরে, ততক্ষনাত হুড়মুড় করিয়া একের অধিক যাত্রী ‘ইহা আমাকে পাইতেই হইবে” এই সংকল্পে উহার চারিদিকে জড়ো হইয়া দাম হাকাইতে থাকে। দূর্যোগ পূর্ন সময়ে এইসব যানবাহনের চালক গন, সুযোগ বুঝিয়া মধ্য প্রাচ্যের তেলের মতো তাহাদের ভারা এমন করিয়া বারাইতেই থাকে যেনো, উহা একটি দায়মন্দের খনি। তাহারা যেনো হীরার মুকুট লইয়া কোনো এক ভগবানের মুখ দর্সন করিয়া পথে বাহির হইয়াছেন। আর ভাবিতে থাকেন, যেভাবেই হোক, আজ তাহার কটিপতি হইয়া যাইবেন। কিন্তু সাধারন মানুষ গনের পকেটের অবস্থার কথাও তো ভাবিতে হইবে!! ফলে যাহারা এতোক্ষন এই উচ্চ মুল্যের যানবাহনের চারিধারে জড়ো হইয়াছিলেন, তাহারা তাহাদের পকেটের দুর্দশার কথা ভাবিয়া আরো একটি যানবাহনের আশায় অপেক্ষা করিতে থাকেন। এই সুযোগতাই আমাদের আকাশ বাবু কাজে লাগাইয়া বিনা বাক্যে চালকের কথায় উঠিয়া গেলেন। তাহার যেনো তর সইতেছিলো না। আকাশ যতোই বিপদ সংকেত দিক, তাহাতে তাহার কিছুই যায় আসে বলিয়া মনে হইতেছে না। তাহার গন্তব্য মাধুরীর আস্তানায়।

গাড়িতে উঠতে না উঠতেই চারিদিকে যেনো আকাশ ভাংগা জল কলসি ভর্তি করিয়া যেমন গংগায় পানি ধালিবার মতো জল পড়িতে লাগিলো। বাতাস ছিলো, পথ ঘাট ছিলো প্রায় মানুষ শুন্য। হুড় হুড় করিয়া চালক আকাশকে লইয়া ছুটিতে লাগিলো। সবে মাত্র সকাল হইয়াছে কিন্তু আকাশ দেখিয়া কিছুতেই বুঝিবার উপায় নাই, ইহা কি সন্ধ্যা নাকি সকাল। চারিদিকে কালো করিয়া আসিতেছে।

প্রায় ঘন্তা খানেক পর আকাশ তাহার গন্তব্যে আসিয়া পায়ে পায়ে সিড়ি পারাইয়া ঘরের অতি কাছে দাড়াইয়া একটি মাত্র টোকা দিতেই যেনো যিনি ঘরে কাতর হইয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন, সাথে সাথে কপাট দরজা খুলিয়া দিয়া আকাশকে বরন করিয়া লইলেন। তিনি, মাধুরী। দারাইয়াই ছিল ঘরের কপাটে মাথা লাগাইয়া।

আকাশ ঘরে ঢোকিলো। তাহার মাথায় ব্রিষ্টির পানিতে ভেজা চুল, জামার অনেকাংশেই ছোপ ছোপ পানির হালকা ভেজা বস্ত্র। পরনের জুতা পাটি আর শুশক তো নাইই। কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করিয়াই আকাশ মাধুরীকে জরাইয়া ধরিলো। যেনো কোন এক মহা সমুদ্র পার হইয়া যুদ্ধা আকাশ মাধুরীকে গহীন জংগল হইতে উদ্ধার করা গিয়াছে। বুকের পাজরে তাহারা এমন করিয়া আবদ্ধ হইয়া রইলেন যেনো তাহারা কতদিন একে অপরের জন্য উদাসীন হইয়া বিরহ জীবন পালন করিতেছিলেন।

গেড়য়া রংগের শাড়ি, হাতে সোনার চুড়ি, পায়ে আলতা আর নাকে নাকফুল সাথে কানের দুল পড়িয়া মাধুরী বউ সাজিয়া বসিয়া ছিলেন। বাহিরের এই রুপ প্রাকৃতিক দূর্যোগের বিরম্বনার মধ্যে এই দুই প্রানীর মনের সুখের সাথে কোনো মিল খুজিয়া পাওয়া যাইতেছে না। তাহারা একে অপরের সাথে বুকে বুক মিলাইয়া অধিক ক্ষন শুধু অন্তরের ধুকধুকানী শান্ত করিতেই ব্যস্ত।

আকাশ মাধুরীকে বুক থেকে সরাইয়া তাহার দুই হাত দিয়া মাধুরীর মুখাবয়ব এমন করিয়া ধরিলেন, যেনো একটি ভরা দুধের বাটি তাহার হাতে, যে কোন সময় একটু অসতর্ক ভাবে নাড়িলেই দুধ সব মাটিতে পড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা। এমনি করিয়াই আকাশ সব সময় মাধুরীকে অপলক চোখে দেখিতে থাকে, আজো তাহার কোনো ব্যতিক্রম হইলো না। মাধুরী তাহার চোখ বন্ধ করিয়া শান্ত বিরালের মতো নির্বিকার দারাইয়াই থাকে আর আকাশের চোখের বেষ্টনীতে আবেশিত হইয়া জড় পদার্থের মতো ভালবাসার সাধ গ্রহন করে।

আকাশ মাধুরীর চোখে, নাকে, মুখে, গ্রিবায় অবিরত চুম্বন আর আলিংগনে আবদ্ধ করিয়া একে একে মাধুরীর শহরনে ব্যতিব্যস্ত করিয়া ন্তোলে।

সময় যেনো স্তম্বিত সমুদ্রের মতো একেবারে থামিয়া গেছে মাধুরী কটে। শুন্যতায় ভরা মাধুরী কটে এখন যেনো পরিপুর্ন ভালোবাসায় ঘরের চারিদিক চিক চিক করিতেছে। সামনের আয়নায় আকাশ মাধুরীকে দেখে আর ভাবে, আহা, বিধাতা কতই না মনোযোগ দিয়া তাহার মাধুরীকে সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহার রুপ আর যৌবনের মধ্যে বিধাতা এমন একটি সরল্রেখা টানিয়া দিয়াছেন যে, একতাকে বাদ দিয়া আরেকতা অসম্পুর্ন।

আকাশ মাধুরীর দুই হাত ধরিয়া দুই দিকে প্রসারিত করিয়া বুকের মাঝ খানে মুখ লুকাইয়া তাহার যৌবনের উচ্ছৃঙ্খল স্তনের ভাজে নাক ঘশিতে ঘষিতে মাধুরীকে মেয়েলী অনুভুতিতে নাড়িয়া দিলেন। আকাশের হার মাধুরীর বুকের উপর, তাহার মুখ মাধুরীর ঘাড়ের ভাজে আর মুখের জিব্বার সব টুকু অংশ মাধুরীর কানের পাতায় লেহনে লেহনে মাধুরীর শরীর অবশ করিয়া তুলিলো।

গেড়োয়া রঙের যে শাড়িটি এতোক্ষন মাধুরীর রুপ আবৃত করিয়া রাখিয়াছিল, আকাশের তপ্ত হাতের তান্ডবে উহা আর মাধুরী গোপন রুপ লুকাইয়া রাখিবার কোনো উপায় না পাইয়া নিজেই মাধুরীর শরীর হইতে মাটিতে লুতাইয়া পরিলো। মাধুরীর প্রতিটি চামড়ার ভাজ অদ্ভুত। কোথাও কোন দাগ নাই, কোথাও কোন খুত নাই। যেখানেই হাত দিক, উহার মধ্যেই যেনো প্রান লুকাইয়া আছে। আকাশ মাধুরীর দুধের কালো বোতায় বিজ্ঞানিক কিছু আবিশকার না করিতে পারিলেও ঊহাতে যে যৌবনের অনেক রস রহিয়াছে তাহা আবিশকার করিতে একটু ও সময় ক্ষেপন করলো না। চুমুতে চুমুতে মাধুরীর সারা শরীর বাহিরের প্রক্রিতির মতো অস্থির করিয়া তুলিলো।

আকাশ মাধুরীর কপাল থেকে শুরু করিয়া নাক, ঠোট, গ্রিবা, আর তাহার সরল রেখা ধরিয়া স্তনের বোতা আর নাভীর নীচ দিয়া মাধুরীর ত্রিভজাক্রিতির কেশ সমৃদ্ধ যৌবনের সবচেয়ে কোমল অমৃত কে বারবার নিজের সবটুকু অনুভুতি দিয়া লেহন করিতে লাগিলেন। যেনো কোন এক দুষ্প্রাপ্য খনিতে ঢোকিয়া আকাশ এমন কিছু খুজিতেছে কিন্তু তাহার আরো হয়তো মগভীরে যাওয়ার পায়তারা করার অস্থির চেষতা। মাধুরীর চোখ বন্ধ করিয়া দুই পা ফাক করিয়া মাধুরী নিজেও আকাশকে সর্বাত্তক সাহায্য করিতে ব্যস্ত যাহাতে আকাশ মাধুরীর যতো গোপন কিছু আছে, তাহা খুজিয়া বাইহির করুক মাধুরী তাহাই চায়। ইহাই আকাশের মাধুরীর শরীর আবিষ্কারের প্রথম নয়। ইহার আগেও বহুবার আকাশ মাধুরীর এই রুপের নেশায়, মায়ার বাধনে জরাইয়া কতই না জল্কেলীর মতো খেলা করিয়াছে। প্রতিবারই মনে হইয়াছে, আজই প্রথম।

মাধুরীর শরীর যেনো একতি খেলনা, জীবন্ত খেলার পুতুল। আকাশ উহাকে কখন হাতে লইয়া, কখনো পাজরে নিয়া, কখনো দুই পায়ের মাঝখানে রাখিয়া, আবার কখন চারপায়ী বেড়ালের মতো নিজের বুকের নীচে রাখিয়া এমনভাবে সংগম করেন যেনো দেখিয়া মনে হইবে আকাস যেন কোন এক চারুকলার শিল্প তৈরী করিতেছে আর মাধুরী সব ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া চুড়িয়া আবার নতুন মাধুরী হইতেছে।

মাধুরিও কখনো কখনো বজ্র মুষ্টি করিয়া আকাশের সব কলা কৌশল আয়ত্তে আনিয়া নিজেও আম্র কাননের কলির মতো নিমিষেই ফুটিয়া ফুটিয়া আকাশের চারিদিকে এমন করিয়া বিচরন ক্ষেত্র তৈরী করিতেছে যেনো তাহার রুপের কোনো শেষ নাই, তাহার আক্রিতির কোনো সিমা নাই, তাহার স্ত্রী অংগ কাপিয়া কাপিয়া সব কিছু উজার করিয়া বইশখের ঝরের মতো অকালেই সব ছাড়িয়া দিতেছে। কখনো তাহার যোনিপথ ভিজিয়া একাকার, কখনো তাহার বুকের দুধ ফুলিয়া ফাপিয়া উঠিতেছে, কখনো ঘন ঘন নিঃশ্বাসে সদ্য উপড়ে উঠা কেচোর মতো আকাবাকা হইয়া যাইতেছে।

রমনী মন্থন, যোনী মন্থন, পুরুষাঙ্গ মন্তনের মতো নেশা আর কিছু নাই। তান্দব ঝরের গতির থেকে এর তীব্রতা আরো বেশী। সমস্ত শরীর তার দেহের সাথে মিশিয়া একাকার হইয়া একে একে সংগমের সাধ গ্রহন বড়ই নেশা। মাধুরী আর আকাশ আজ সেই নেশায় মগ্ন।

অবশেষে, ঘর্মাক্ত শড়ির দিয়া দুইটি মানুষ নিস্তব্ধ হইয়া একে অপরের উপর এমনভাবে শাত্নত হইয়া রইল যেনো তাহারা বুঝিতে পারে নাই, এই একটি ঘন্তায় বাহিরের প্রিথিবীতে কি কি ঘটিয়া গিয়াছে।

মাধুরী, আকাশ তোমাকে সব কিছুর বিনিময়ে স্নেহ করে, আদর করে, ভালবাসে। কে তোমাকে কিভাবে এই প্রিথিবীতে আনিয়াছিলো সেই প্রশ্নে কোন কৈফিয়ত নাই, নাই কোনো জিজ্ঞাসা। আকাশ শুধু এইতুকুই জানিতে চাহিয়াছিল, মাধুরী আকাশের। এই আকাশে কোনো ধর্ম নাই, কোনো বর্ন নাই, কনো জাত নাই, নাই কোন প্রকারের অভিযোগ কিংবা হতাশা। যদি কোনোদিন এই মাধুরী অন্য কোথাও হারিয়ে যায়, কিংবা আর মাধুরীকে কথাও খুজিয়া পাওয়া না যায়, তখন আকাশ এই রকমের দূর্যোগ মোকাবেলা করিয়াও মাধুরীকে খজুইয়া বাহির করিবে, কারন মাধুরীর জন্ম শুধু আকাশের জন্যই। মাধুরীর পরিচয় শুধু আকাশ। যাহারা তোমাকে এই আকাসের ধরনিতলে বর করিয়াছে, তাহারা শুধু এই টুকুর ধন্যবাদ প্রাপ্য যে, তাহারা এতোদিন আকাশের মাধুরীকে নিঃশ্বাস টুকু নিতে সাহায্য করিয়াছে। আকাশ তাকাহে জীবন দান করিয়া আবার নিজের করিয়াই গড়িয়া তুলিয়াছে। আর বাকি জীবনের সব টুকু আদর আর ভালবাসা দিয়া মাধুরীকে এই সমাজে এমন এক স্তরে তুলিয়া লইবে যেখানে মাধুরীর কাছে গগন বড্ড নীচু।

তুমি ভালো থাক মাধুরী।

২৩/০১/২০১৯-সে আমার অলিখিত ভগবান।

এক বছর আগের আজকের এই দিনটা অর্থাৎ ২৩/০১/২০১৮ তারিখটা আমার জীবনে যেমন খুবই একটা স্পর্শকাতরের দিন, আবার অন্যদিকে আমার জীবনকে এই মানুষশাসিত নারীর প্রতি একতরফা ভারসাম্যহীন সমাজে টিকিয়ে রাখার জন্যেও আমার জীবন বলি দেয়ার একটা দিন। আবার যদি বলি, এটা এমনো একটা দিন ছিলো যা কিনা কখনোই আমি হয়তো চাইনি। অথচ আমাকে এই দিনে সেই কাজটাই করতে হয়েছিলো যা আমি নিজের ইচ্ছায় করতেই চাই নাই। কারন আমি ইতিমধ্যে এই সমাজের মুখোসের আড়ালে যে মুখাবয়ব দেখেছিলাম যা এক কথায় যদি বলি সেটা হচ্ছে- মেয়েরা আজো আমাদের এই সমাজে একটা অলিখিত বোঝা।

অনেকেকেই কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন তারা ভালো আছেন, কিন্তু তারা জানেন তাদের সময়টাই ভালো যাচ্ছে না। সত্যি কথাটা বলার জন্যে সাহস থাকলেও সেটা আসলে পুরুপুরি কাউকে যে বুঝাবেন, সেটা মুখের কথায় বুঝানো যায় না। আয়নায় চেহারা দেখা যায় কিন্তু কষ্ট দেখা যায় না। ভিতরটা কেউ দেখে না যদিও সত্যিটা ভিতরেই থাকে। সেই কষ্টে ভরা সুর শুধ্য নিজের কান থেকে নিজের অন্তরেই ঘুরাঘুরি করে প্রতিধ্বনি করতে থাকে। অন্য কারো অন্তর কিংবা হৃদয়ে সেটা কোনোভাবেই পুশ করা যায় না। আসলে একটা কথা আছে-কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট যে কষ্টের কোনো নাম নাই, যে কষ্টের রুপ কাউকে দেখানো যায় না।

আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে কোনো এক সিড়ি থেকে পিছলে পড়ে আমি এমন একটায় জায়গায় পতিত হয়েছিলাম যেখান থেকে না আমি নিজে বা না আমার পরিবার অথবা আমার কেউ সজ্জন টেনে আবার সেই রাস্তাটায় তুলে দিতে পারে। আর সেই সখমতা তাদের কারো ছিলোও না।  অনেক সময় কারো মুখ দেখে কারো ভিতরের যন্ত্রনাকে উপলব্দি হয়তো করা যায়। তখন কারো হয়তো মন চায় যে তার কাছে যেতে, তার মনের কথা জানতে, কিন্তু আমাদের সমাজটা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে সচেতন মানুষের মন বলে উঠে “মাথা ঘামিও না, যদি কোনো সমস্যায় পড়তে হয়!! বিপদে জড়িয়ে পড়লে?” উপলব্ধি সবাই করে। সবার মনকেই ছুয়ে যায়। কেউ কেউ ঝাপিয়েও পড়ে। মনুষ্যত্তের অবনমন যেমন আছে, মনুষত্যের উত্তোরনও তেমন আছে। এমনটি হতেও পারে যে আপনি কোনো মানুষকে দেখে বুঝতে পারলেন সে সমস্যায় রয়েছে। তার মুখে লুকিয়ে থাকা কষ্টকে বুঝলেন আর জানতে পারলেন যে তার পিছনে অত্যাচারের এক ঘৃণ্য কাহিনী বা অন্য কোনো কাহিনী লুকিয়ে আছে। সন্দেহের বশে অসুবিধায় রয়েছে এমন মানুষকে দেখে কোনো প্রশ্ন করা মোটেই অহেতুক হস্তক্ষেপ নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই সব সচেতন মানুষ সামাজিক লাঞ্ছনার ভয়ে সেই কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাড়াতে ভয় পায়। আমার বেলাতেও ঠিক সে রকম একটা পরিস্থিতির স্রিষ্টি হয়েছিলো। আমার মুখ দেখে স্পষ্ট বুঝা হয়তো গিয়েছিলো, আমি ভালো নেই, কষ্টে আছি কিন্তু পর নির্ভর আমার এই পরিবারের কোনো সদস্যদের এইটুকু ক্ষমতা ছিলো না যে, তথাকথিত আমাদের এই সমাজের ভাবধারাকে এড়িয়ে কেউ আমার জীবনে এসে দাঁড়ায়। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমাদের অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। আমিও সেটাই করতে বাধ্য হয়েছিলাম- আমার বিয়ে হয়ে গেলো এমন এক মানুষের সাথে যাকে আমি চিনতাম আমার জন্ম লগ্ন থেকেই। তার সাথে আমার কখনোই এমন কোনো সম্পর্ক ছিলো না যাকে আমরা বলি- ভালোবাসা বা নির্ভরতা। হয়তো তার উদারতা কিংবা আমার রুপের মুগ্ধতায় সে আমাকে বরন করতে চেয়েছিলো। কোনো অবস্থাতেই তার সাথে আমার যায় না, অন্তত বিয়ে করে সংসার করার মতো ব্যাপারে তো নাইই।

ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই হোক আর সামাজিকতা রক্ষার জন্যই হোক, আমি তার সাথে শেষ পর্যন্ত বিয়ে নামক সম্পর্ককে মেনেই নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আর যাইই হোক, আমার এই মেনে নেয়ার সিদ্ধান্তে আমার পরিবার বেচে যাবে একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে, আমি বেচে যাবো একটা অপয়া অপবাদ থেকে, কারন আমি সমাজকে ভয় পাই। কিন্তু তখনো আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারি নাই যে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর পরিবেশের জন্ম দেয়। অনেক সময় প্রতিবেশি বা সমাজের সম্মান বাচানোর জন্য অনেক সময় এই ইচ্ছের বিরুদ্ধে সম্পর্ক গড়ে তোলতে হয় বটে কিন্তু সময়ের পাল্লায় এই সম্পর্ক একটা বোঝা হয়েই দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে আজো এমন অনেক বিয়ে হয়ে থাকে যা শুধু পরিবারকে খুশি করার জন্য। যাকে অন্যের বাড়িতে পাঠানোর জন্য আমরা অনেক কিছু করতে পারি। আমরা তখন হাসিখুশী অববয়ব নিয়ে বিয়ের সব ফরমালিটিজ করে সুখী হবার ভান করি। কিন্তু আরো একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা উচিত যা আমি দেখেছি চাক্ষুষ নিজের বেলায়। বিয়ের সময় দেখানো খুসি আর ভালোবাসার অভিনয়ে এটা প্রমানিত হয় না যে, ভবিষ্যতে এই সুম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বা ঘৃণা আসবে না। একসময় দেখা যায়, এই দেখানো ভালবাসা প্রকাশ্য ঘৃণার বিষে রুপান্তরীত হয়। এই বিষে যখন ঘৃণা ঢোকে পড়ে, তিক্ততার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে এখন এই সম্পর্ককে শেষ করা উচিত। বুঝে শুনে বেরিয়ে আসা উচিত। যাতে তার আগে কোনো মারাত্তক অঘটন না ঘটে। কেননা প্রায়ই তিক্ত সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে বুদ্ধির জায়গায় হিংসা ঢোকে পড়ে, আর তখন কিসের সমাজ আর কিসের জীবন সেটার পরাজয় ঘটে। নিজেকে শেষ করে দেয়া বা নিজের ঘৃণার মানুষতাকে শেষ করে দেয়াই যেনো মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এমন অনেক কিছু হয় যে, সেই দম্পতি যে একদিন ভালোবেসে কিংবা উদার মন নিয়ে খুব কাছে এসেছিলো, তারাই সম্পর্কের তিক্ততায় একজন আরেকজনকে চাকু, বন্ধুক চালাতে পিছপা হয় না। আমি সেটা পর্যন্ত আমার এই অসম দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নিতে চাই নাই। কিন্তু আমার বাবা মা কখনোই আমার এই মনের ভিতরের আবেগতা বুঝতে চায় নাই। একটা বাবা মা যখন সন্তানের জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এটা বুঝতে না পারে, তাহলে সেই পরিবারে সেই সন্তান একটা অসুস্থ্য পরিবেশেই বড় হতে থাকে। আর অসুস্থ্য পরিবেশ শুধু সাস্থ্যইকেই ক্ষতি করে না, মনকেও। আমি আমার নিজের মনের আওয়াজ শুনোট পেয়েছিলাম। এই জীবনে শুধুমাত্র একটা থাকার জায়গা হলেই হয় না, জীবনে বাচার জন্য নিঃশ্বাস ফেলার একটা জায়গাও লাগে। ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কোনো ব্যক্তিত্ত বেশীদিন অসহায় থাকে না। আমার কাছেও সেতাই একদিন চরমভাবে মনে হয়েছিলো যে, কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। আমার জীবনের প্রতিটি দিন যেনো চলছিলো ঠিক এরকম যে, এক শিফটে উনুন, আর আরেক শিফটে বিছানাইয় কারো জন্যে অপেক্ষা করা যে কখনোই না আমার ছিলো, না আমি তার ছিলাম। এটাই কি গরিবের লাইফ। আমার এই যৌবনের দাম, আমার এই জীবনের দাম যদি শুধু শরীর দিয়েই হয়, তাহলে আমি কেনো এমন জীবন বেছে নেই না যেখানে আমি অন্তত আমার মতো করে বেচে যেতে পারি? আর সেই বাচায় যদি কেউ আমাকে নিঃশ্বাস ফেলার একতা অবকাশ ও করে দেয়? কে চায় না তার জীবন আরো ভালো থাকুক?

আমি বদ্ধপরিকরভাবে এক তরফা এবার নিজের জন্যেই নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম- যে জীবনকে সমাজ প্রোটেকশন দেয় না, যে সমাজ ব্যবস্থা আমার মতো কোনো নারীর দায়ভার গ্রহন করে না, যে সমাজে আমি নারী হয়ে একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই না, সে সমাজের কোনো আইন কিংবা নীতি আমার জন্যে না। আমার জীবন আমারই। আমি যদি বেচে থাকি, তাহলে সমাজ আছে, যদি আষ্টেপিষ্ঠে আমি প্রতিনিয়ত আমার সমস্ত অধিকার থেকে নিপীড়িত মানুষের মতো একটা পাশবিক বন্ধি জীবনই এই সমাজের নিতীর কারনে মেনে নিয়ে সামনে এগুতে হয়, আমার সে জীবনের কোনো প্রয়োজন নাই, না সেটা আমার জীবন। আমার এ রকম সিদ্ধান্তের কারনে বারংবার বড় ছোট সবার কাছ থেকেই হরেক রকমের উপদেশ আর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়েছিলাম। কিন্তু সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমি আমার এই সম্পর্কের শেষ পরিনতি ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছিলাম যে, সমাজের চাপের কারনে নেয়া আমার সেই সম্পর্ক একদিন আমাকে অনেক চড়া মুল্য দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। তখনো এই সমাজ আমার পাশে দাঁড়াবে না। তাই সব কিছু আমি অনেক ভেবে চিন্তেই আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।

এমনিতেই প্রত্যেকটা মানুষ নিজের মতো করে বাচতে চায়। আর এই বাচার জন্য হয়তো অনেক আর্থিক ক্ষমতা না থাকলেও মানুষ যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটার উপরেই ভরষা করে নিজের মতো করে নিজে বাচতে চায়। কিন্তু কিছু মানুষের মধ্যে কর্তৃত্ব করার প্রবনতা এমন বেশী থাকে যে, এই ধরনের প্রবৃত্তির কারনে অন্য কিছু মানুষ ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে থাকে। এক সময় তারা একাই হয়ে যায়। আমিও এক সময় মনে হলো- একাই আমি। আমি যদি আসলে একাই হই, তাহলে পরাজয়ের গ্লানী টানবো কেনো?

দুটু মানুষকে জুড়ে দিয়ে একটা নতুন জীবন দেয়ার এই প্রথার নাম বিয়ে। বিয়েও কিন্তু একটা কন্ট্রাক্ট, দায়িত্তের কন্ট্রাক্ট, সরকারী অনুমোদিত একটা কন্ট্রাক্ট। হতে পারে এই কন্ট্রাক্টের মাধ্যমেই দুটু পরিচিত বা অপরিচিত মানুষ একজন আরেকজনের হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শপথ করে। কিন্তু কারো হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু উন্নতির দিকে যাওয়া সেটা কিন্তু নয়। আগে খুব জানা দরকার, হাত ধরা মানুষটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। সাফল্যের সপ্ন, জীবনের আশা আর পরিশ্রমের পথ যিদি  যাত্রার পথ একদিকে না হয়, তাহলে আর যাই হোক, সাফল্যকে হাতে পাওয়া যায় না। আই লাভ ইউ বললেই শুধু ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসার বহির্প্রকাশ হয় তার কাজে আর বাস্তবে। অনেকে হয়তো আই লাভ ইউ বললেই ভাবে ভালোবাসা হয়ে গেলো, কিন্তু সেটা কি অন্তরের না শরীরে তা যাচাই করার কোনো দরকার মনে করে না। ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যা কাছে থাকলে এর প্রয়োজন অনুভব করা যায় না, মনে হয় আছেই তো। কিন্তু যখনই চোখের আড়ালে যায়, মন শুধু আনচান করে আর প্রতীক্ষায় থাকে, কখন কাছে আসবে। ভালোবাসা, কোনো ড্রেস বা জুতা তো নয় যে ফিটিং হলো না আর শপিংমলে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবো। একটুখানি ময়লা হলো বা ফেটে গেলো তো আলমারীর ভিতর লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু ওই ড্রেস বা জুতু যদি ফিটই না হয় তো তাহলে আমরা কি করবো? আমরা তো সেটা পড়তেই পারবো না। আর যদি পড়তেই না পারি আবার ফেলতেও না পারি তাহলে তো আলমারী ছাড়া আর কোথায় রাখবো? তখন হয়ত অন্যদের মতো আমরা আরেকটা শার্ট বা ড্রেস কিনে পড়ে নেবো যা একদম ফিটিং। কিন্তু যেদিন আমি সমস্ত কিছু একপাশে রেখে ওর সাথে জীবন বেধেছিলাম, সেদিন থেকেই আমি পন করেছিলাম, যাইই হোক, আমি থাকবো। সেদিন থেকে আমি তো অন্য কারো কাছে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি নাই। কারো চোখে তাকানোর কথা ভাবতেই পারি নাই। অন্যের সাথে থাকা, অন্যের হাসি, অন্যের জন্য আমি তো কোনো সপ্নই দেখতে পারি নাই। কিন্তু পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে আমার ভাগিকে নিয়ে দাড় করিয়েছিলো যে, আমি হয়তো ওর হাতটা আজীবন ধরেই রাখতে পারতাম, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে, সেক্ষেত্রে আমার হাতটাই হয়তো কাটা যাবে।

আমি বারবার আমার সেই ফেলে আসা কয়েকটা বছরের প্রতিটি মুহুর্ত বিচার আর বিশ্লেষন করে দেখছিলাম। আমার সেই পুরানো বন্ধু যার কারনে আজ আমার এই সমাজে এতো নাজেহাল অবস্থা। কিন্তু সেই নাজেহাল হবার কারনটায় তার কোনো ভুমিকা ছিলো না। সে তো চেয়েইছিলো আমি কিভাবে ভালো থাকি। যা হয়েছে তা শুধু এক তরফা আমার ভুলের কারনে। আমি আজো সেই দিন গুলির কথা ভাবি আর মনকে এটা বুঝাতে সক্ষম হই, জীবন আমার, সমাজ আমার নয়, জীবনের সব দুঃখ আমার আর সেটা আমি সমাজ থেকে পেতে চাই না, জীবনের সুখ আমার আর সেই সুখ আমি নিজের জন্য তৈরী করবো, সমাজের কোনো নিয়মের মধ্যে নয়। কোনো এক ঝড়ের সময় আমার উপড়ে যাওয়া ঘর যখন ঝড়ের শেষে বিলীন হয়ে যায়, সমাজের প্রতিটি মানুষ পাশে এসে শুধু মুখে আর ঠোটেই আহাজারী করে, কিন্তু পুনরায় মেরামত করে যে, একটুখানী সহায়তা করবে সেটা আমার এই সমাজ নয়। বরং আমার সেই অসহায়ত্তকে কেন্দ্র করে আমাকে লুটে পুটে খাওয়ার একতা প্লট তৈরী করবে। যদি সেটাই হয়, তাহলে তো আমার সেটাই করা উচিত যা আমার সেই বন্ধুটি আমাকে সম্মানের সাথে বাচাতে চেয়েছিলো। প্রতিদান একটা মনুষত্যের ব্যাপার, আমার যা আছে তার বিনিময়ে সে যদি সত্যিকারভাবেই আমাকে সমাজের বাইরে গিয়ে এমন একটা জীবন দান করে যেখানে এই সমাজেই আমি একজন প্রগতিশীল মানুষ, শুধু নারীই নই, আমি একজন নীতিনির্ধারক ও বটে, অথবা এমন একটা জীবন যেখানে সমাজের সব আইন আর কানুন আমার পায়ের নীচে পদায়িত, তাহলে কেনো আমি শুকনো রুটি দিয়ে গলা ফাসাবো? আর জল চাই, আমার ভালো পরিবেশ চাই। জীবন তো একটাই। সেতো আমাকে এতাই বলেছিলো যে, “আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ।“ আমি যেনো সম্বিত ফিরে পেয়েছিলাম।

সময় নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। আবার “সময়” পুরানো সম্পর্ককে নতুন করে সাজিয়েও দেয়। তখন ওই সম্পর্ক যে আকার আর যে রুপ নিয়ে ফিরে আসে, সেখানে থাকে আগের করা সব ভুল আর মানসিকতা বিবর্জিত। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। সে আমার প্রকৃত পরিবার ছিলো। আমি ফিরে তাকাতে চেয়েছিলাম এবার নতুন আংগিকে। যখন ফিরে তাকালাম, দেখলাম, গাছটা কেটে দিয়েছিলো কিন্তু শিকরটা কেউ কাটতে পারে নাই। সেই শিকর থেকে আবারো নতুন ঢাল পালা আর নতুন পাতার জন্ম নিচ্ছিলো। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া মানে জীবনটাই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। একটা রোমান্টিক সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া নাতো মানুষকে কাপুরষ বানিয়ে দেয়, আর না ছোট করে। একটা ব্রেক আপ শুধুমাত্র একটা ইংগিত যে, জীবনে রোমান্স ছাড়াও আরো অনেক সুন্দর উপহার আছে। যেগুলিকে আমাদের চিনতে হবে, খুলতে হবে, আর পুরু উপভোগ করতে হবে। আমার জীবনে সে ছিলো ঠিক সে রকমের একতা ব্যক্তিত্ত। আমি নারী, আমার মুল্য কারো কাছে হয়তো ঠিক ততোটা যতোটা আমি সক্ষম অবস্থায় দিতে পারবো। কিন্তু তার কাছে “নারী” ছিলো একটা দায়িত্ত, একটা অপরুপ মায়ার ভান্ডার। কতোটা আমি দিতে চাই, অথবা দিতে ইচ্ছুক সেটা তার কাছে জরুরী ছিলো না, তার কাছে জরুরী ছিলো সেটা যেতা আম্র দরকার। একটা সম্মানীত জীবন। সমাজের কাছে আমার মাথা উচু করে দারাবার সিড়ি। কিন্তু আমি জানি আমার কি দেবার ক্ষমতা ছিলো। আসলে আমার কাছে কিছুই দেবার ছিলো না তার জন্যে। যা দিতে পারি সেটা তার হাতের কাছেই সারাদিন গড়াগড়ি যায়।

জীবনে কাকে কতটা জায়গা দেবো সেটা ঠিক করে ফেলতে পারলে জীবনে আর কোনো সমস্যাই থাকে না। আর কার সাথে কি কমিটমেন্ট করা দরকার তার যদি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তখন জীবনের স্রোত সব সময় একই থাকে। পিছুটানের আর ভয় থাকে না। আর যখন পিছুটানের ভয় থাকে না, তার সামনে দ্রুত গতির শক্তিটাও ধীর গতি হয় না। যতোক্ষন যেটা ভালো লাগবে, ততোক্ষন সেটা চালিয়ে নাও। আর যদি কখনো তাতে কোনো উলতা স্রোতের আবাষ পাওয়া যায়, হয় তাকে সমাধান করতে হবে, নতুবা নিজের পায়ের শকিতে জোরদার করতে হবে। কখনো কখনো বিয়েটা শেষ হয়ে যায়, সম্পর্ক নয়। তখন বেচে থাকে একটা বন্ধুত্তের অভ্যাস, মায়া। তখন যেটা হয়, একজন আরেক জনের কষ্টে বা বিপদে অন্য জন ততোটাই কষ্ট আর বিপদে থাকে যতোতা সে থাকে। অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে তারা হয়তো ঠিক লোক। আর এটাই সেই ঠিকানা যেটা ভুল কিন্তু সেখানে যিনি আসেন বা থাকেন, তিনি আমার জীবনের জন্য সঠিক। ভুল ঠিকানায় আমার সমস্ত জীবনের সঠিক মানুষটি বাস করে।

সামাজিক রীতির মাধ্যমে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ আমরা দুজন মানুষের মধ্যে কোনো একদিন আমি তার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে আমি সমাজের রীতির বাইরে গিয়ে এমন এক সম্পর্কে নিজে চিরদিনের মতো আবদ্ধ হয়ে গেলাম, যেখানে আমি আছি আমার মতো করে। অতীত ভুলে যাওয়া যায় না বটে কিন্তু সেই অতীত আমাকে যেনো আর কখনো দুক্ষে ভারাক্রান্ত না করতে পারে সেই বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আজকের দিনের মানুষটি আমাকে সম্মানের সাথে গলায় পড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারপরেও অতীতের সেই তারিখটা যখন বারবার বছরান্তে ফিরে আসে, আমি হয়তো কখনো সেই মানুষটার জন্য দয়া অনুভব করি, কখনো ঘৃণা অনুভব করি, আর ভাবি, কতোটা পরাজয়ে মানুষ কতোটা ভালো থাকে। এখন শুধু তার সেই অযাচিত ব্যবহার, সমাজের অপনীতি আজ আমাকে শুধু মুচকী হাসিতে ভড়িয়ে দেয়। আমি সুখে আছি। আজ সমাজ আমাকে ঘিরে নিতির ব্যাপারে পরামর্শ করতে চাইলেও আমি এই সমাজকে পরিবর্তনের কোনো উপদেশ দেই না কারন এই সমাজ কারো কোনো উপদেশ শুনে না। আজ সেই তারিখটা আরো এক বছরের জন্য কালের গর্ভে হারিয়ে গেলো কিন্তু মনে করিয়ে দিয়ে গেলো আমার অতীতের অনেক কষ্টের কথা আর আজকের দিনের সুখের মাত্রাটা। অসহায় মানুষ একদিন কারো না কারো হাত ধরে ঘুরে দাড়ায়ই।

সে আমার অলিখিত ভগবান।

১৯/০১/২০১৯-আমি আর ও খুব ভালো বন্ধু ছিলাম (চলবে)

While I was cleaning my drawer, I went over a pile of letters in my box. Letters that I wrote and received..I wanted to share this to you what I have written in the past…This is what i wrote…

আমি আর ও খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। অনেক সময় ধরে আমি আর সে খুব কাছাকাছিই ছিলাম। আমার জীবনের ম্যাক্সিমাম কিছুই ওকে ঘিরেই চলছিলো। এক সময় আমরা  সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমরা আরো ঘনিষ্ঠ হতে চাই। ফলে আমার পরিবার আর ওর পরিবার ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ আলোচনা করে নীতিগতভাবে একটা সিদ্ধান্ত নিলো যে, আমাদের উভয়ের সিদ্ধান্তই সম্মান করা হবে। পরিবার থেকে যখন ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশী কোনো আপত্তি না থাকায় আমরা বেশ ভালোই সময় কাটাচ্ছিলাম। আমি যাই ওর বাসায়, ওর পরিবারের সবাই আমাকেও বরন করেই নিয়েছে বলে মনে হলো। আর আমাদের পরিবার আমার সিদ্ধান্তকে যথোপযোক্ত সম্মান দিয়েই ওদের পরিবারটাকেও আপন করেই নিয়েছিলো। দিন যায় সপ্তাহ যায়, মাস যায়, আমি বুঝতে পারতেছিলাম না, আসলে আমাদের সম্পর্কটা আসলেই কতটুকু শক্ত। অনেক কিছুই আমার কাছে ধীরে ধীরে অস্পষ্ঠ মনে হচ্ছিলো। কিন্তু আমিও নিশ্চিত নই কোথায় গড়মিলটা হচ্ছে। এক সময় আমিও ধীরে ধীরে পুরু ব্যাপারটা বুঝার চেষ্ঠা করি। আমার পরিবার অনেক সচ্ছল, এবং বাবার ব্যবসা, মায়ের অধ্যাপনা, রাজধানীর বুকে নিজেদের বাড়ি, গাড়ি সব কিছুই আছে আমাদের। অন্যদিকে ওর পরিবারের অবস্থাটা অতোটা সচ্ছল নয় যা আমাদের পরিবারের সাথে ম্যাচ করে। তারপরেও আমার পরিবার অতোসতো চিন্তা মাথায় নেন নাই। তারা আমার সুখ এবং আমার মতামতটাই প্রাধান্য দিয়েছেন। পারিবারিক অংশীদার হিসাবে আমরা দুইবোন যা পাবো, তাতে আমাদের নিজের এবং আমাদের পরবর্তী বংশধরগণ অনায়াসেই সচ্ছল অবস্থায় চলতে পারার কথা।

এই বয়সে দুটো নর নারী যে পরিমান ভালোবাসা থাকা দরকার, যে পরিমান একে অপরের প্রতি টান অনুভব করার দরকার, আমি যেনো সেই আকর্ষনের মধ্যে, সেই টানের মধ্যে একটা ঘাটতি অনুভব করতে শুরু করলাম। যেমন, আমি যখন অন্য শহরে থাকি (পড়াশুনার তাগিদেই থাকতে হয়), সে আমাকে দেখার দেখার জন্য অস্থির থাকে না। আমি যখন ছুটিতে নিজ শহরে আসি, তখনো সে আমার জন্য সব ফেলে ছুড়ে আমাকে বাস স্ট্যান্ড থেকে রিসিভ করতে আসে না। যখন ছুটিতে আসি, অদম্য ইচ্ছা নিয়েও আমার সাথে দেখা করার জন্য পাগল থাকে না। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আমি আমলেই নেই নাই। কিন্তু যখন আমার কাছে মনে হলো যে, আমার যে মনের টান, আমার যে অনুভুতি, তার থেকে ওর মনের টান অনেক কম, আকর্ষন অনেক কম, তখন ব্যাপারটা আমকে ভাবিয়ে তুলেছে। 

অনেক কিছু ভেবেচিন্তে আমি ধীরে ধীরে ওর কাছ থেকে একটু দূরে সরে যেতে চাইছিলাম, কারন অনেক কিছুই যেনো আমার কাছে মানান সই মনে হচ্ছিলো না। বিশেষ করে মানষিক চিন্তাধারা, পজিটিভনেস, কিংবা কোনো বিষয়ে একটা পরিপক্কতার অভাব মনে হচ্ছিলো।

আমার এই মনোভাব এক সময় ওদের গোচরীভুত হয়। সম্ভবত ব্যাপারটা নিয়ে ও ওর পরিবারের সাথেও কথা বলে। আমি এইসব ব্যাপারগুলি নিয়ে কখনোই আমার পরিবারের বাবা মায়ের সাথে আলাপ করি নাই। ফলে আমাদের মধ্যে যে দুরুত্ত সৃষ্টি হচ্ছে সে ব্যাপারেও তারা ওয়াকিবহাল নন। তারা সব কিছুই ঠিক আছে মনে করে স্বাভাবিক আচরনই করতে থাকেন।

হতাত একদিন ওর পরিবার আমাদের যুগল বন্ধনে বন্দি করার জন্য ওর বাবা মা আমাদের পরিবারে চলে আসেন। যুগল বন্ধনে বন্ধি হবার জন্য কিংবা ওকে আমার আর পাওয়ার জন্য মন আনচান করে না। ফলে ব্যাপারটা তখন আমার কাছে খুব অসস্থিকর মনে হচ্ছিলো। আমি আমার আগের সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে আমার নতুন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম যে, আমি ওর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। আমার মনে হয়েছে, সে আমার যোগ্য নয় বা আমার পরিবারের জন্য যোগ্য নয়। কিন্তু আমি কোনোভাবেই আমার বাবা মাকে এই সত্য অনুভুতিটা বুঝাতে সক্ষম হই নাই। আমার বাবা মা এক কথার মানুষ। একবার যখন আগে সিদ্ধান্ত দিয়েই দিয়েছেন, এখানে সম্পর্ক করবেন, আর এরই মধ্যে তারা ছেলেতার মধ্যে কোনরূপ অস্বাভাবিক কিছু পান নাই, ফলে তারা আগের সিদ্ধান্ত থেকে নড়তে চাইলেন না। মোটামুটি আমার অমতেই জোর করে আমাদের বিয়েটা দিয়ে দিলেন।

কিন্তু বিয়েটা হয়ার পর পরিস্থিতি যেনো আরো খারাপের দিকে যেতে থাকলো। আমার বাবার সম্পত্তির উপর, আমার বাবার টাকা পয়সার উপর, আমার বাবার ব্যবসার উপর ওর এবং ওদের নজর পড়ে গেলো। কখনো বাবার ব্যবসার শেয়ার নিতে, কখনো তার ব্যবসার খুটিনাটি দেখার চেয়ে তার গাড়ির, এসি কিংবা অন্যান্য সুবিধা আদায়ে আমার উপরেক রকম টর্চারই শুরু হলো। আমার বাবা শুন্য থেকে খেটে এই পর্জন্ত এসেছেন। ফলে তিনি জানেন কিভাবে মানুষ খাটলে বড় হ ওয়া যায়। কিন্তু সে সেটার ধারে কাছেও আছে বলে মনে না হ ওয়ায় বাবা প্রথমে তাকে আমার বাবার ব্যবসায় পেইড ডাইরেক্টর হিসাবে মোটা অংকের বেতনে কাজে লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু অবস্থার আরো অবনিত হতে থাকলো। আর আমার বাবাও এমনি এমনি তেই কাউকে ছাড় দিতে ইচ্ছুক নন। তার কাছে কাজ এবং প্রোফেশন আর প্রতিষ্ঠান একদিকে আর সেই একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিজের লোকের ও ইভালুয়েশ অন্য দিকে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, সে এটা বুঝতেই চাইলো না যে, হেড অফ দি অরগেনাইজেসন আর ফাদার ইন ল যদিও এক জন কিন্তু ব্যাপারটা ভিন্ন।

অবস্থা এক সময় এমন হলো যে, 

২০/০৯/২০১৭ অগ্নিশর্মা বাবু

অগ্নিশর্মা বাবু সুদুর আফ্রিকার জঙ্গলে ভ্রমন করিতে গিয়া অনেক সুন্দর একখানা ফলের চারা দেখিয়া সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিলেন। ভাবিলেন, আহা, আমার বাগানে ইহা লালন পালন করিয়া আরো সুন্দর করিয়া তুলিবো। জঙ্গলে অপরিচর্যায়ই যখন এতো সুন্দর করিয়া উহা বাড়িয়া উঠে, পরিচর্যা পাইলে না জানি আরো কতো সুন্দর করিয়া আপনার বাগানকে আরো সৌন্দর্য বর্ধন করিবে। কতলোক দেখিতে আসিবে, কতলোক ইহার কাহিনী শুনিয়া তাহাকে পাইতে স্বপ্নে বিভোর হইয়া থাকিবে। কিন্তু উহা আর কারো কাছেই নাই শুধু তাহার বাগান ছাড়া। ইহাই যেনো অগ্নিশর্মা বাবুর একটি অতীব শান্তি।

-আনিলেন।
-লাগাইলেন
-শখের চারা। মালির পরিবর্তে তিনি নিজেই উহার পরিচর্যার ভার নিলেন

-প্রতিদিন উহার বাড়িয়া উঠার সব রকমের উপকরন রীতিমতো দিতে থাকিলেন। কখনো দুস্টু লোকের হাতছানীর হাত হইতে রক্ষার জন্য খাচা বানাইয়া, কখনো বৃষ্টির কবল হইতে বাচাইবার জন্য ছাউনী দিয়া, কখনো আবার উলুপোকার উপদ্রব হইতে বাচাইবার জন্য চারার গায়ে সুই ফুটাইয়া ঔষধ লাগাইয়া দিলেন।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, অগ্নিশর্মা বাবু দেখিলেন, উহা বাড়তির দিকে না যাইয়া শুধু অধোপতনের দিকে যাইতে লাগিলো। তিনি চিন্তিত হইয়া গেলেন। তাহার ঘুম নষ্ট হইতে লাগিলো, ঘুম নষ্ট হইবার সাথে সাথে সপ্নও ভাঙিতে লাগিলো। তাহার বাগানের অন্যান্য অনেক সুন্দুরী ফলের গাছ, ফুলের চারার উপর অগ্নিশর্মা বাবুর মনোযোগ ক্রমশ কমিতে লাগিলো। তাহার এই অমনোযোগের কারনে বাগানের শ্রী যেনো ধীরে ধীরে আরো খারাপ হইতে লাগিলো। সাজানো বাগানে যেনো ইদুর মরার গন্ধ বাহির হইতে লাগিলো। মরা গাছের ঢাল ক্রমেই বাড়িতে লাগিলো। কি সর্বনাশ!! এই এক আফ্রিকার চারার জন্য অগ্নিশর্মা বাবুর এতো দিনের বাগানের হাল কি হইতে কি হইয়া গেলো?

তাহার পরেও মন বলিয়া কথা। অনেক উচ্ছাস আর আবেগ লইয়া যে চারাটি অগ্নিশর্মা বাবু রোপন করিয়াছিলেন।  উহার এমন অকাল মৃত্যু হইতেছে ইহা তিনি কখনো ভাবিতে পারেন নাই। এমন নয় যে, চাড়াটিতে তিনি কম জল ঢালিয়াছেন, কিংবা তাহার তাহার যত্ন কম নিয়াছেন, কিংবা এমন নয় যে, সময়ের সাথে সাথে উহার কোনো পরিচর্যার অভাব হইয়াছিলো তবুও চারাটি মরিতে শুরু করিয়াছে। কি হইতে পারে উহার এই রকমের পতনের কারন? মনের এই খুতখুতি হইতে রেহাই পাইবার জন্য অগ্নিশর্মা বাবু অনেক গবেষণাও করিলেন।

কি কারনে ইহার অধোপতন হইতে পারে তাহার সবরকমের সম্ভাব্য কারন লইয়া ভাবিতে লাগিলেন। টব পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর টবের মধ্যে তিনি তাহা রাখিয়াছিলেন। সুতরাং টব উহার মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়। মালী যত্ন নেয় নাই এইরূপ দোসারূপ তিনি করিতে পারিবেন না কারন মালী তিনি নিজেই ছিলেন। তদারকীর কোনো গাফিলতি ছিলো না। বিজ্ঞ নার্সারির একদল বিশিষ্ট গবেষকের দ্বারা পরীক্ষা করাইয়া দেখিলেন, উহা যেই জাতের চারা, তাহার সব কিছুই ঠিক আছে বলিয়া মন্তব্য করিলেন। তবে তাহার মন্তব্যের নীচে একটি ছোট নোট লিখিতে ভুলিয়া যান নাইঃ

“অধিককাল উহা স্বাভাবিক আলো–

বাতাস বিবর্জিত এমন এক স্যতস্যাতে গোমট ছায়াতল পরিবেশে বড় হইয়াছে, ফলে ঊহার ভিতরের শিরা উপশিরা, জীবন প্রনালীর ধারা স্বাভাবিক ধারা হইতে পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। ফলে চারাটি আর বর্তমান সুস্থ পরিবেশের সহিত খাপ খাওয়াইয়া চলিতে অপারগ। ইহার বনজ গুনাবলী পুরুপুরি পরিবর্তিত হইয়া বন্য গুনাবলিতে রুপান্তরীত হইয়া গিয়াছে বিধায় সার্বক্ষণিকপরিচর্যায়ও আর কোনো লাভ হইবে বলিয়া মনে হয় না। উহার সমগোত্রীয় চারার জন্য যে আদর্শিক পরিবেশ দরকার তাহা উক্ত চারাটির জন্য প্রযোজ্য হইবে না। তবে যদি পুনরায় উহাকে আলো–বাতাস বিবর্জিত, স্যাতস্যাতে গোমটযুক্ত পূর্বেকার পরিবেশে ফেলিয়া রাখা যায়, উহা অতি তাড়াতাড়ি বাড়িয়া উঠিবে। ইহার জন্য স্বাভাবিক বাগানের পরিবেশ প্রযোজ্য নহে।

 তবে সেক্ষেত্রে ইহার উপর কোনো ভার, কিংবা কোন কোন লতাপতার ভর দেওয়া যাইবে না কারন উহা এইরূপ কোন ভাড় নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে নাই। “

–মন্তব্য পড়িয়া অগ্নিশর্মা বাবু বুঝিলেন, চারাটিকে আর তাহার বাগানের অন্যান্য ফল, ফুলাদি কিংবা অন্যান্য চারাদের সাথে রাখা সম্ভব হইবে না। আর শুধুমাত্র এই চারাটিকে বাচাইয়া রাখার জন্য বাকী সব চারাদের মুল উৎপাটন করা তাহার পক্ষে সম্ভব হইবে না। রাগে দুঃখে টব সমেত অগ্নিশর্মা বাবু অগ্নিরূপ ধারন করিয়া সেই সুদুর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা দেখিতে সুন্দর কিন্তু বিষাক্ত চারাটিকে তিনি বাগানের বহুদূরে নিক্ষেপ করিয়া রাগ সামাল দিলেন। একবার ফিরিয়া তাকাইবার ইচ্ছা হইতেছিলো বটে কিন্তু উহাকে আর দেখিতেও মন চাহিলো না। উহার আফ্রিকার জঙ্গল হইতে আনিবার পর এই বাগানের চত্তরের ইতিহাস চিরতরে নির্মূল করিয়া মালিকে উচ্চস্বরে আদেশ করিলেন, আর বলিলেন, বাগানের প্রবেশ পথে ” আফ্রিকার যতো সুন্দর গাছ কিংবা চারা, কিংবা ফল অথবা ফুলের যে কোনো চারাই হোক না কেনো, ইহা এই বাগানে প্রবেশ নিষিদ্ধ” লিখিয়া দাও।

মালি কোনো কথা না বলিয়া শুধু অবাক হইয়া অগ্নিশর্মা বাবুর দিকে তাকাইয়া তাহার প্রস্থানের দৃশ্য অবলোকন করিলেন। বাবু যাওয়ার পর মালি একটু পরে হাতের কাছে জলের বালতি লইয়া অন্যান্য গাছের গোড়ায় জল ঢালিতে লাগিলেন আর ভাবিতে লাগিলেন, আফ্রিকার জঙ্গলটি কোথায়? জঙ্গলে কি বাগান চাষ হয়?  

০৬/০৬/২০১৬-কবর

নতুন ভাড়াটিয়া

অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে ভাড়ার জন্য একটা ঘর পাওয়া গেল। কি অবস্থা চারিদিকে। অনেক দিন হয়ত কেউ এখানে আসে নাই। বারির মালিকও মনে হয় অনেকদিন পর্যন্ত এই জায়গাটায় আসে নাই। চারিদিকে ঘাস জঙ্গল হয়ে একাকার। বারির কেয়ার টেকারেরও যেন জায়গাটা পরিস্কার করে রাখার জন্য  খুব একটা খেয়াল আছে বলে মনে হয় আন। চারিদিকে দুর্গন্ধ, মশা, মাছি, সাপ, তেলাপোকা কোনটা নাই। সবই আছে।

কাল বিকালে নতুন ভারাটিয়া আসবে, তাই কিছুটা হলেও ঘরটা পরিস্কার করা দরকার। সকাল থেকেই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু আকাসে বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব আছে, বৃষ্টি নামার আগেই ঘরটা পরিস্কার করে ফেলতে হবে, তানাহলে আবার ব্রিস্টির মধ্যে ঘরে পানি ঢোকে যেতে পারে। আসেপাশের ভাড়াটিয়াদের কারো কোন কৌতূহল আছে বলে মনে হচ্ছে না। সবাই যার যার ঘরে যেন ঝিমুচ্ছে। কোন ছোট ছোট বাচ্চা কাচ্চাদেরও খুব একটা আনাগোনা মনে হচ্ছে না। বেশ নির্জন এলাকাটা।

ও মা, একই! এখানে দেখি প্রায় সবার বারির সামনে তাঁদের নাম লেখা!! আর এদের অনেকের সঙ্গেই তো তাঁর মোটামুটি পরিচয় ছিল। ঐ যে, কাসেমের বাবার ঘর দেখা যাচ্ছে, তাঁর পরেই দেখি আমাদের মেয়রের বাসাটা। অনেক দিন দেখা হয় নাই কাসেমের বাবার সঙ্গে অথবা মেয়র জনাব আলমের সঙ্গে। ভালই হল, একই এলাকায় থাকা যাবে।

একে একে সবাই চলে গেল। বাসাটা খুব বেশি বড় মনে হচ্ছে না। একটু হয়ত গুছিয়ে নিতে হবে। দিনের আলোয় ব্যাপারটা বুঝা যায়নি। এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। যাক, বাতিটা জ্বালিয়ে ঘরটা গুছান দরকার।

কই, বাতির সুইচটা জানি কোথায়? একই!! কোন বাতি নাই? সুইচ? দরজাটা আবার বন্ধ করল কে? কি ব্যাপার, আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না ক্যান? হটাত করে শরির টা ভিজে গেল কেন? ছাদ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। মনে পরেছে কিছুক্ষন আগে বৃষ্টির লক্ষন দেখেছিলাম। এখন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ছাদের উপর থেকে ক্রমাগত পানি আমার ঘরে পড়ে ভরে যাচ্ছে। কি পোকা মাকর!! একদিকে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আবার অন্য দিকে এই সব পোকা মাকর এল কোথ্যেকে? কি বড় বড় মশা রে ভাই।

উচ্চস্বরে নাসিমার মাকে ডাকতে থাকি। কোথায় গেলে গো তোমরা। কি ব্যাপার কেউ আলোটাও জালালে না, ডাকও কেউ শুনছো না, এদিকে আমি ভিজে চুপসে যাচ্ছি, আমার আর কাপর চোপড় কই?

হটাত বিকট এক শব্দে আমার যেন মাথা ঘুরে গেল। দেখলাম আমার সামনে দুইজন দৈত্যের মত বিরাটকায়  কেউ দাড়িয়ে। শুধু বলল, আপনি কি এখানে নতুন ভাড়াটিয়া? আমরা ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে এসেছি। আপনার ফাইল্টা আমাদের কাছে। আপনার সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত কথা বলা দরকার।

০৫/০৬/২০১৬-বেলাশেষে

“বেলাশেষে” একটা বাংলা ছায়াছবির নাম। অনেকবার দেখেছি ছবিটা। মন ছুয়ে যায় যেমন তেমন এই বয়সে এসে অনেক কিছুর হিসাবটাও মেলানো যায়। সুযোগ হলে দেখতে পারেন। সংক্ষিপ্ত কাহিনীটা এই রকম-

৬৫ বছরের স্বামী আর ৬০ বছরের স্ত্রীর গুরুতর এক সমস্যা নিয়ে তাদের নাতি-নাত্নি, মেয়ের জামাই, ছেলেরা মেয়েরা সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়েছেন। সমস্যাটা হল, স্বামী বলেছেন তিনি এই বয়সে এসে তার স্ত্রীর সঙ্গে পৃথক হতে চান এবং আরেকটি বিয়ে করতে চান। এই বুডো মানুষটির সিদ্ধান্তে পরিবারের অনেকেই হতবাক হলেও কেউ কেউ রাজি আবার কেউ কেউ রাজি নয়। যারা এই সিদ্ধান্তে রাজী না, তারা হতবাক হচ্ছেন, এই বয়সে কেন তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আবার তিনি বলছেনও না কেনো তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন, কারনটা অজানা। ফলে নায়নাতকুর, ছেলেমেয়ে, মেয়ের জামাই সবাই মিলে একটা পরিকল্পনা করলেনঃ ব্যাপারটার গোপন রহস্য জানতে হবে। তাই সবাই মিলে ঠিক করলেন এই দুই বুড়া বুড়িকে একান্তে কোথাও একঘরে কয়েকদিন রাখতে হবে। তারা একদিকে যেমন নিজেরা নিজেরাই আলাপ আলোচনা করতে পারবে, ভাবতে পারবে আবার অন্যান্যরাও গভীর গোপন কারনটা জানতে পারবে। দুজনে ভাবুক, দেখুক তারপর নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক কোনটা করা উচিৎ। বুড়া-বুড়িও সম্মতি দিলেন, ঝগড়াতো আর হয় নাই, স্বামী স্ত্রীই তো। তাদের জন্য আলাদা ঘর দেওয়া হলো, একদম নিরিবিলি পরিবেশ। কেউ তাদেরকে বিরক্ত করার নাই। এই বতসে হয়তো যৌবন কালের সেই উচ্ছল রোমান্টিকতা না থাকলেও যেটা থাকে তা হচ্ছে মায়া, বিশ্বাস আর ট্রাষ্টেড ভালোবাসা।  এই দুই বুড়া বুড়ির অজান্তে সবাই একটা কাজ খুব গোপনে করে রাখলো। আর তা হচ্ছে তাদের রুমে গোপন একটা সিসি ক্যামেরা আর অন্য বাড়িতে মনিটর যাতে এই দুই বুড়া বুড়ি কি কথা বলে তা দেখার এবং শোনার জন্য। যখনই এই দুই বুড়া বুড়ি একা তাদের কথাবার্তা বলেন, তখনই দলবেধে অন্য বাড়িতে থাকা মনিটরে সবাই মিলে ভিডিওতে তা প্রত্যক্ষ করেন।

পঞ্চাশ বছরের বিয়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা, ভাল লাগার কথা, একসঙ্গে কষ্টের কথা, দুঃখের কথা, তাদের মিল অমিলের কথা, রাগের কথা, ভালোবাসার কথা একের পর এক তারা দুইজনে নিরিবিলি একত্রে বসে আলাপ করেন। আর সবাই তাদের এইসব অভিজ্ঞতার কথা শুনে কখনো কেউ হাসেন, কখনো চোখ মুছেন, কখনো অবাক হয়ে চুপ করে থাকেন। তারা সবাই একটা জিনিষ বুঝতে পারেন যে, সব স্বামীর কাছে তার সংসারটা এক রকমের, আর স্ত্রীর কাছে তার সংসারটা আরেক রকমের। কিন্তু কেউই যে ভুল নন তা ঠিক। স্বামীর কাছে দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসাটা এক রকমের আর স্ত্রীর কাছে স্বামী আর সংসারের জন্য ভালোবাসাটা আরেক রকমের। একজন মায়াবী স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন, তার অবর্তমানে তার আদরের স্ত্রীর যেনো কোনো কষ্ট না হয়, স্ত্রী যেনো কারো কাছে হেয়ালীর পাত্র না হন, তার আদুরী স্ত্রী যেনো কোনো অর্থকরী কিংবা সুন্দর জীবন চালানোর জন্য কারো কাছে হাত না পাতেন। সেই দিকটা খেয়াল করে এই ভরষাযুক্ত স্বামী সবসময় চান তার স্ত্রীকে সাবলম্বি করে তুলতে। ফলে স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন তার স্ত্রী এটা জানুক যে, তার স্বামী কোথায় কিভাবে কত রোজগার করেন, কত সঞ্চয় করেন, আর কিভাবে সেই কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে কিভাবে তিনি তার স্ত্রীর মংগলের জন্য কি করছেন এবং তার পুরুপুরী এই পরিকল্পনার অংশ হয়ে যেনো তার স্ত্রী এটা খেয়াল করে সে মোতাবেক প্রস্তুতি নেন এবং তার উপর পারদর্শী হন।

স্বামী যা ভাবছেন, করছেন কিন্তু তিনি অন্যদিকে স্ত্রীর বেলায় দেখছেন অন্যটা। তার স্ত্রী তার এইসব হিসাব নিকাশ, ভবিষ্যৎ জল্পনা কল্পনায় একেবারেই উদাসীন বরং স্ত্রী তাদের সংসারে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়ে, নাতি নাতকুর কিভাবে মানুষ হবে, কিভাবে আরামে থাকবে, কিভাবে নিরাপদ থাকবে ইত্যাদি নিয়েই বেশি নজর। স্বামীর কাছে ভালো লাগা ছিল বউকে নিয়া কোথাও রোমাঞ্চের উদ্দেশ্যে একা একা বেরিয়ে পড়া, কিন্তু স্ত্রীর কাছে যেনো সেই রোমাঞ্চের থেকে বেশী জরুরী ছিলো ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, তাদের কোচিং ক্লাস, তাদের স্বাস্থ্য, তার নিজের ঘরকন্নার কাজ, আত্মীয় সজনদের সেবা শশ্রুসা ইত্যাদির মধ্যে একটা বন্ধন স্রিস্টির লক্ষে সবাই মিলে পারিবারিক সময় কাটানো।

স্বামী চেয়েছেন স্ত্রীর কাছ থেকে অনেকটা সময় যে সময়টা তারা ভালোবাসার কথা বলবে, পুরানো দিনের কথা বলবে, কোনো একটা সিনেমা দেখতে দেখতে মন ভরে আনন্দ করবে, বিখ্যাত কোনো কবির কবিতা পড়ে পড়ে তার অন্তর্নিহিত ভাবধারায় সিঞ্চিত হবেন। কিন্তু স্ত্রী তার পরিবারের সবার দিকে একসঙ্গে খেয়াল রাখতে গিয়ে, ছেলেমেয়েদের পরাশুনার দেখভাল করতে গিয়ে, অসুস্থ শ্বশুর শাশুড়ির দিকে নজর দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়টাই চলে গেছে অকাহ্নে, স্বামীর জন্য অফুরন্ত সময়টা আর তিনি বের করতে পারেন না।

কেউ দুষী নন, কারো চাওয়ার মধ্যেই অতিরঞ্জিত ছিলো না। অথচ তারা যেনো কোথায় সুখি নন। তারপরেও তারা বহুকাল এই কম্প্রোমাইজের মধ্যেই একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের ভালোবাসাটা এক সময় অভ্যাসে পরিনত হয়, তখন অভ্যাসটাই যেনো ভালোবাসা। স্বামীর টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন স্ত্রীর কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, স্বামীর ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ মনে হয় না। অন্যদিকে স্ত্রীর ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্দ যখন কোনো একদিন এতোটাই অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধা ভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন স্বামীর নাক বুজে আসতো, সময়ের এতোটা পথ বেয়ে যখন সবগুলি ভালোবাসা একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায়, তখন স্ত্রীর সেই নাক ডাকা, আধাভেজা চুলের গন্ধ যেনো একটা সুখের পরশ মনের ভিতর প্রবাহিত হয়ে যায়। যেনো, এইতো সেতো কাছেই আছে।

৯০ বছরের কোনো এক প্রোড় বুড়ো, ৮৫ বছরের কোনো মহিলার সাথে যখন এক সাথে স্বামী স্ত্রী হিসাবে বসবাস করেন, তখন তাদের এই বয়সে এসে আর সেই যুবক যুবতীর মতো শরীরের চাহিদা, রুপের চাহিদা আর কাজ করে না। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসাটা একটা বিশাল আকার পাহাড়সম ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে সেখানে কি ফ্যাক্টরটা কাজ করে? কাজ করে নির্ভরতা, কাজ করে একে অপরের উপর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, মায়া আর মহব্বত। কাপা কাপা হাতে যখন ৮০ বছরের বুড়ি এক কাপ চা নিয়ে ৯০ বছরের তার স্বামীর কাছে কাপখানা হাতে দেন, কিংবা পানের বাটিতে পান আর সুপারী ছেচে যখন একখিলি পান স্বামী তার ৮০ বছরে সংগিনীর মুখে তুলে দেন, আসলে তিনি শুধু এক কাপ চা কিংবা এক খিলি পানই দেন না, দেন সারা জীবনের মহব্বত আর ভরষা যে, তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বড় বন্ধু নাই।

তুমি আমার ভরষা, তুমি আমার নিরাপত্তা, তুমি আমার স্বামী, কিংবা স্ত্রী, তুমি আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কাপে, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যায়। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে থাকা আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করো আমার  অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার নাই।

বেলাশেষে তুমিই আমার আর আমি সেই তোমার।

০৪/০৬/২০১৬-ভিক্ষুকের পাল্লায় আরেক দিন

আমি জুরাইন রেলগেটের কাছে ট্রেন পাশ দেয়ার জন্য গাড়ীতে বসে আছি। অনেক গাড়ি থেমে আছে, কেউ কেউ আমার ও অনেক আগে থেকেই থেমে আছে। আমার লাইন অনেক পরে। আমি ঠিক যেখানে গারিতে বসে আছি, তার ডান দিকে গুটি কতক হাত দূরে রাস্তার আইল। অখানে এক আখ বিক্রেতা তার চিকন চিকন আঁখগুলো অনেক যত্ন করে খোসা ছারাচ্ছে, তারপর কচি কচি কঞ্চির মত করে একটা তিনের পাতায় এক এক করে সারি দিচ্ছে। তার পাশে ছোট একটা মেয়ে হাপ প্যান্ট পরা অবস্থায় বাবার আখ কাটা দেখছে। তার হাতেও একটা আখের কঞ্চি। আখ বিক্রেতার পাশে এসে এক ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতাও বসে আছে। ওর সব মিলিয়ে দুটু সম্বল, একটা সম্ভবত ফ্লাক্স আর আরেক্তি বিস্কুতের একটি জার। এটা দিয়েই হয়ত ওর সারাদিনের রোজগার, সংসার চলে।

আমার বা পাশ দিয়ে খুব ব্যাস্ত একটি সাইকেল আরোহী উল্টো পথ ধরে পার হবার চেষ্টা করছে, কোন তাড়া আছে হয়ত কিন্তু ওর বয়স আর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে না যে ট্রাফিক আইন ভেঙ্গে অন্যান্য গাড়ি গুলো বিপদজনক ভাবে টপকিয়ে এভাবে যাওয়ার মানুষ, তারপরে তিনি করছে, অল্প বয়স, বয়সের একটা গরম আছে। পিছন থেকে অযথা একটি গাড়ি হর্ন বাজিয়ে উঠল যেন বিরক্ত কারো উপর। আমার ড্রাইভার নিজে নিজেই অনেক কথা বলে ফেলছে, ‘কেন কোন সেন্স নাই এত আগে রেল গেত ক্লোজ করে সবাইকে দাড় করাইয়া রাখবে, কি হয় ঠিক টেন আসার আগে দাড় করাইলে? দেশ তারে কেউ ভালবাসে না, কেউ তাদের ডিউটি ঠিক মত করে না। কি হবে এদেশের? বুঝলাম এবার আমার ড্রাইভার দেশ প্রেমিক হয় উঠেছে। অথচ আমার এই ড্রাইভারকেই রঙ সাইড দিয়ে না যাওয়ার জন্য আমাকে অনেক বার বকাও দিতে হয়। সুযোগ পেলেই আমার ড্রাইভার চান্স নেয়।

বাইরে বেশ গরম, বুঝা যাচ্ছে। ঐ অদুরে সারি সারি দোকানে দোকানদার কেউ কেউ হাত পাখা নিয়ে নিজেকে বাতাস করার চেষ্টা করছে, বুঝলাম এলাকায় বিদ্যুৎ নাই। তা না হলে হাত পাখার ব্যবহার হত না এখন। এরই মধ্যে বাস আসার অপেক্ষায় কিছু সাধারন যাত্রি প্রচন্ড খরার মত রৌদ্রে দাড়িয়ে আছে কখন তাদের বাস আসবে। যারা একটু যুবক, তাড়া আবার কেউ কেউ হাতে সিগারেট ধরিয়ে সময়টা কাটানোর চেষ্টা করছে। আমার ড্রাইভার গাড়ির রেডিও তা অন করতেই কোন এক জকির ম্যাকি সুরে কত কথা শুনা গেল।

ঠিক এমন সময় একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে আমার গাড়ীর সামনে এল এবং ভিক্ষা চাইল। আজকাল অনেক পদের ভিক্ষুকের সমাহার এদেশে। কেউ খুরিয়ে খুরিয়ে হাটে, কেউ আবার কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে, পয়সার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে এই সার্টিফিকেট নিয়ে রাস্তায় নামে তার টাকা জোগাড়ের জন্য। কেউ আবার পুরু শরীর উদম করে আসে কোথায় তার ক্ষত আর কোথায় তার শারিরিক সমস্যা মুখে না বলে যেন যিনি ভিক্ষা দেবেন তিনি তাকে দেখেই বুঝে ফেলতে পারেন তার ভিক্ষা চাই। কেউ আবার অনেক প্যান্ট শার্ট পরে খুব ভদ্র ভাবে সামনে এসে চুপি চুপি বলবে যে, তার সব খুইয়ে এখন এমন অচেনা শহরে একা, তার বাড়ীতে যাওয়ার পয়সা নাই কিন্তু তিনি ভিক্ষুক নন। নতুন কৌশল।

যাক গে, আমার সামনে এই মুহূর্তে যে ভিক্ষক টি দাড়িয়ে তাকে দেখেই আমার ভিক্ষা দেয়ার ইচ্ছে হল না। কারন তার যে বয়স, তাতে সে অনেক বাসায় কাজ করতে পারে, কিংবা গার্মেন্টসেও কাজ করতে পারে কিংবা অন্য যে কোন পরিশ্রমের কাজ তার দ্বারা করা সম্ভব। তার ভিক্ষা করার প্রয়োজন হয় না আসলে।কিন্তু নাছোড়বান্দা। বারবার আমার গাড়ীর কাচে নক করছিল। বিরক্ত হয়ে বললাম, প্লিজ মাফ কর। আমার বিরক্তে তার কিহু যায় আসে না। সেও বিরক্ত। এত দেরি করে কেন কাচ খুললাম এই জন্য।

মহিলা রেগে গিয়ে বল্ল, এতক্ষন না করলেন না ক্যান, আমারে খামাখা দাড় করাইয়া রাখলেন? আগে বললেই তো পারতেন?

অবাক হইলাম তার রাগের কারনে। আমি তার সময় নষ্ট করে দিয়েছি বলে। তো, আবার ডাকলাম, ভাব্লাম কিছু কথা বলি।

বললাম, কোলের বাচ্চাটা কে বা কার? অনেকে আবার বাচ্চা ভাড়া করে নিয়ে আসে এবং ভিক্ষা করে। এতে হয়ত অনেক মানুষের একটু বেশি সিম্পেথি পাওয়া যায়, আর ভিক্ষাটাও জমে উঠে হাতে পায়সার ভারে।

মহিলা বল্ল, আমার বাচ্চা। বুঝলাম, তার রাগ কমে নাই, সব ভিক্ষুকেরা সাধারনত স্যার বলে সম্বোধন করে। হয়ত সেও করে কিন্তু সে আমার উপর রাগ।

বললাম, কাজ করোনা কেন?

উত্তরে সে যা বলল সে এক লম্বা ফিরিস্তি। নাই বা বললাম।

আমি আবার বললাম, কয় টাকা পাও প্রতিদিন ভিক্ষা করে? এবার মনে হল, সে আমার কোথায় একটু হলেও রাগ কমেছে অথবা চিন্তা করছে যে সাহেব মনে হয় কিছু বেশি সাহাজ্য করতে পারে ইত্যাদি। ভিক্ষুকরাও কিন্তু সাহেব্দের সাইকোলজি বিশ্লেষণ করে।

সে আমতা আমতা করে বল্ল, হয় স্যার প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পাই প্রতিদিন। এবার সে আমাকে স্যার বলে সম্বোধন করল। বুঝলাম, অনেক্তাই রাগ কমেছে আমার উপর।

আমি আবার বললাম, গতকাল কত টাকা পেয়েছ?

সে বল্ল, স্যার গতকাল প্রায় ২০০ টাকার মত পাইছি।

আমি বললাম, তাহলে তোমার মাসিক ইনকাম প্রায় ৬০০০ টাকা। তোমার তো মাসে ৬০০০ টাকা লাগে না। কয় টাকা হলে তোমার সংসার চলে?

সে কিহুক্ষন চুপ থেকে একবার আকাশের দিকে, একবার আমার দিকে, আবার একটু নিরব থেকে, হাতের কড়া গুনে গুনে বল্ল, স্যার, মোটামোটি হাজার ৫ হলেই আমাদের ছোট সংসার চলে যায়। 

আমি বললাম, ধরো, আমি যদি তোমাকে আজকে ৫০০০ টাকা দেই, তাহলে কি তুমি এখন বাড়ি চলে যাবা? যদি বল, যে, তুমি বাড়ি চলে যাবা, এবং তুমি আর এই মাসে ভিক্ষা করবা না, তাহলে আমি তোমাকে এখনই ৫০০০ টাকা দেব। কিন্তু আমি তোমার উপর লক্ষ রাখব তুমি ভিক্ষা করছ কিনা। সে নিসচুপ হয়ে কিছুক্ষন দারিয়ে থেকে আমার গাড়ীর সামনে থেকে চলে গেল। মনে হল তার এই আয়ে পোষাবে না। তার মানে এই যে, সে ভিক্ষাটা ছারবে না। অথবা এমনও হতে পারে যে, সংখ্যাটা কম বলে ফেলেছে।

………… তার বেশ কয়েক মাস পর,

আমি আবার গুলিস্থানের জিপিও এর সামনে গাড়ীর জ্যামের মধ্যে বসে আছি। হটাত দেখলাম, ঐ সেই একই মহিলা। কোলে একটা বাচ্চা, তবে আজকে ছেলে বাচ্চা নয়, মেয়ে বাচ্চা। আমি মহিলাকে দেখেই চিনতে পেরেছি। কিন্তু মহিলা আমকে দেখে চিনতে পারে নাই। আমার গাড়ীর সামনে এসে সেই একই ভঙ্গিতে ভিক্ষা চাইল। আমি এবার আবারো সেই একই প্রশ্ন গুলো করলাম।

আমি বললাম, তোমার কয় বাচ্চা?

সে বল্ল, স্যার, এই একটাই। বুঝলাম, সে মিথ্যা বলছে। এটা আসলে ওর ভাড়া করা বাচ্চা মনে হয়।

 তারপর আমি শুরু করলাম আমার সে আগের প্রশ্নগুলো।কয় টাকা পায়, কয় টাকা লাগে প্রতিমাসে। কেন কাজ করতে চায় না ইত্যাদি।

এবার মহিলা কিন্তু কম করে ফিগারটা বলে নাই। সে বল্ল, স্যার আমার মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা লাগে। স্বামী অসুস্থ ঘরে। আমার বোনের এক বাচ্চা স্কুলে পরে, তাকেও আমার টানতে হয়, নিজেও অসুস্থ, সঙ্গে শ্বশুর শাশুড়িকেও টানতে হয়ইত্যাদি। বুঝলাম, ১৫ হাজারের হিসাবটা তার আগে থেকেই করা।

আমি এবার অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, তোমার সঙ্গে একবার আমার দেখা হয়েছিল জুরাইন রেলগেটে। তখন আমি তোমাকে এই প্রশ্নগুলো করেছিলাম এবং তুমি মাসে ৫০০০ টাকা হলে তোমার হয়ে যায় বলেছিলে, আজ আবার তা ১৫০০০ হাজার টাকা হয়ে গেল ক্যান?

মহিলাটি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমারে এক ঝারি দিয়ে বল্ল, ধুত মরার, খালি আপনার লগেই আমার দেহা হয় ক্যান? অন্য রাস্তা দিয়া যাইতে পারেন না? তারপরযত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার গাড়ী পার হয়ে আরেক জনের কাছে চলে গেল।

মনে হইল, ভিক্ষা যার পেশা, ভিক্ষা তার নেশাও বটে। নেশা আর পেশা যখন এক হয়ে যায়, তখন আর তাকে ঐ কাজ থেকে সরিয়ে নেয়া সম্ভব না। একজন ভিক্ষুক যত ধনিই হোক না ক্যান, স্বয়ং বিধাতা তাকে সবার সামনে প্রকাশ্যে ফকির বানিয়ে রেখেছে, তাকে বিধাতা দিনের সূর্যের প্রখর তাপে শাস্তি দিচ্ছেন, আবার শীতে কষ্ট দিচ্ছেন, বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখছেন, অথচ হয়ত তার একটা সুন্দর বাড়ি আছে, তাকে বৃষ্টিতে ভিজতে হত না, শীতে কাঁপতে হত না যদি ভিক্ষা না করতে হত। কিন্তু সে তো ভিক্ষা করবেই। এটা তো পেশা। ভিক্ষুক হয়ত আনন্দ পায় তার সঞ্চিত টাকার সংখ্যা দেখেই। তার ভোগ করার সময় কই? সেটা তো বিধাতা দেবেন না। তার কাছে পূর্ণিমার রাত যা, অমাবস্যার রাতও তা, ওর কাছে বৃষ্টির ঝন ঝন শব্দ কানে ভাসে না, ওর শুধু নজর কখন একটা গাড়ী আসবে আর তার সামনে গিয়ে সে কাতর হয়ে মুখের সবটা যন্ত্রনার অভিব্যক্তির অভিনয়টা করে একটা হাত পেতে বলবে, দেন গো স্যার, আমারে কিছু দেন, দুইদিন কিছু খাই নাই। হয়ত পুরুটাই মিথ্যা কথা।

আর এইসব ভিক্ষুকের জন্য যারা সত্যি ভিক্ষা করে একটু সস্থি পেতে চায়, তাদের কপাল পুড়ে। শুনেছি, ভিক্ষুকদের এসোসিয়েশন আছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট আছে, সেক্রেটারি আছে, সেখানে লাখ লাখ টাকা দিয়ে ইলেক্সন হয়, এবং একদিন তারা আবার এমপি মিনিস্টার পদেও কন্টেস্ট করে।

তখন আমরা তাদের স্যার বলি।  তারপরের কাহিনী অন্য রকম।

০৪/০৬/২০১৬-ভিক্ষুকের পাল্লায়

প্রতিদিন এই পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার হিসাব সবসময় কেউ রাখে না আর রাখাও দরকার আছে বলিয়া কেউ মনে করেনা।অনেক সময় অনেক অতিকায় বৃহৎ জিনিস নজর এড়াইয়া যায় আবার অনেক সময় অতিকায় তুচ্ছ জিনিসও আমাদের চোখ না এড়াইয়া উহা এমন আবেগের সৃষ্টি করে যা মন এবং হৃদয় উভয়কেই প্রভাবিত করে। আজ এমনই কয়েকটা দৃশ্যের কথা বলছি।

পরিবার নিয়েগ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। দুইদিন পর সবাইকে নিয়া আবার ঢাকায় ফিরছিলাম। আগে গ্রামে যাইতে হইলে বৃষ্টিতে ভিজিয়া, রোদে পুড়িয়া, কিছু দূর হাটিয়া, আবার কিছুদূর কোন এক বটবৃক্ষের তলে জিরাইয়া, পথ হইতে সঙ্গি পাওয়া কিছু হরেক পদের বন্ধু পথচারী লইয়া ঘন্তার পর ঘন্টা হাটিয়া বাড়ি যাইতে হইত। শহর হইতে যদিও খুব দূরে নয় এই আমাদের গ্রামের বাড়ি কিন্তু তাতেই তিন হইতে চার ঘন্টা লাগিয়া যাইত। যখন গ্রামে পৌঁছাইতাম, তখন অনেক দিনের বন্ধু বান্ধব, পারা প্রতিবেশি, এমন করিয়া প্রশ্ন করিত যেন শহরের একজন অতি উচ্চ দরের বাসিন্দা গ্রামে আসিয়াছে। আমাদের সময় শহর ছিল এক ধরনের বিদেশের মত। যেন বিদেশ হইতে আসিয়াছি। আমার মেয়েরা এই শহর আর গ্রামের যে বিস্তর একটা পার্থক্য তাহা তাহারা কখনো বুঝিবে না আর আমিও অনেকবার গ্রামের কথা বলিতে গিয়া দেখিয়াছি, তাহাদের গ্রামের কথা শুনিবার মানসিকতা খুব একটা নাইও। এখন আমি গ্রামে যাই গারিতে চরিয়া, সঙ্গে ড্রাইভার থাকে, আমি অনেক বড় সাহেব। এখন যদিও সেই চেনা পরিচিত লোকগুলো শহরকে আর বিদেশ বলিয়া মনে করে না, তারাও এখন আমি গ্রামে গেলে অতিব খুশি হয়। কারো কারো অনেক অভিযোগ আছে আমার বেশি বেশি গ্রামে না আসার কারনে, কেউ আবার আমার অফিসে দেখা করাই সম্ভব হয় না, দিনের পর দিন অপেক্ষা করিয়াও তাহারা আমার দর্শন পায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। সব অভিযোগ যে মিথ্যা তা আমি বলব না কিন্তু অনেক অভিযোগ আছে যা আমার কখনো শুনিতেও ভাল লাগে আবার কিছু কিছু অভিযোগ আছে যাহা সত্যিই সত্য নয়। কিন্তু তাহাতে আমার কিছু যায় আসে বলিয়া আমার মনে হয় নাই। 

এতক্ষন গাড়ী ভালই চলিতেছিল, কোথাও কোন জ্যাম বা রাস্তায় দাঁড়াইতে হয় নাই কিন্তু শাহবাগে আসিয়া দেখি লম্বা এক গাড়ীর সারি। কতক্ষন যে লাগিবে এই জ্যাম শেষ হইতে তা অনুমান করিতে পারতেছিলাম না। রাস্তার জ্যামে সবচেয়ে বড় অসুবিধা যেটা হয় তাহা হইল, কিছুক্ষন পর পর হরেক পদের গল্প লইয়া অতিশয় ক্ষুদ্র বয়স হইতে থুরথুরে বুড়িও আসিয়া গাড়ীর কাঁচ নক করিতে থাকে। নিজের বিরক্ত হইলে তারাও আরও বেশি করিয়া বিরক্ত হয় এবং কখনো কখনো এমন মন্তব্য করিয়া মুখ ভেংচি কাটিয়া চলিয়া যাইবে যেন আমি ই অপরাধ করিয়াছি তাহাকে কোন ভিক্ষা না দিয়া। আজও তার ব্যতিক্রম হইল না। একজন ৪০ কিংবা ৪৫ বয়সের মহিলা আমাদের গাড়ীর সামনে আসিয়া দারাইল। রবি ঠাকুরের মত লিখিলে বলিতে হয় যে, “অতি কাতরতার সহিত তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করিয়া “কিছু দেন স্যার গো” বলিয়া এমন একখান মুখাবয়ব করিল যেন পৃথিবীতে তাহার হইতে আর কোন মানুষ অসহায় নাই আর আমি ছাড়া তাহাকে উদ্ধার করিবার ও যেন আর কেহ নাই।”

আমি সাধারণত সবাইকে ভিক্ষা দেই না। ভিক্ষুকের শারিরিক অবস্থা, মানসিক বিকাস, বয়স কিংবা তার কাজ করিবার ক্ষমতা-অক্ষমতা অনেক কিছু বিবেচনা করিয়াই আমি ভিক্ষা দিতে পছন্দ করি। অনেকে হয়ত বলিবেন, দিবেন তো এক টাকা বা দুই টাকা, তারপরে আবার এত সব কাহিনী বিবেচনা করিয়া ভিক্ষা দিতে হইবে? আসলে ব্যাপারটা ঐ রকম নয়। আমি ভিখা বৃত্তিকে সমর্থন করি না। তারপরেও অনেক ভিক্ষুককে আমি ভিক্ষা দেই। তাতে যে সব সময় আমার ঐ বিবেচনা গুলি থাকে তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো আমার মানসিক অবস্থা, আমার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি, কিংবা আমার ভাবের উপরও আমি অনেক অযোগ্য ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেই। “ভিক্ষুকের আবার যোগ্যতা”, এই কথা অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করিতে পারেন, কিন্তু সত্যি ভিক্ষা করিবার জন্যও কিন্তু যোগ্যতা লাগে। সবাই ভিক্ষুক হইতে পারে না। শুনেছি, অনেক ভিক্ষুক নাকি অনেক বড় লোক, তারাঅত্যাধুনিক গাড়ী চালায়, বিশাল অট্টালিকায় তাহারা শীততাপ বাড়ীতে ঘুমায়। তাহাদের সেবা করিবার জন্য দাস, চাকরানী সবাই আছে। শুধুমাত্র ভিক্ষা করিবার নিমিত্তে তাহার তাহাদের নির্দিষ্ট এলাকায় গিয়া আবারো সেই পুরানো পোশাক পরিয়া মুখের হাবভাব পরিবর্তন করিয়া মানুষকে ধোঁকা এবং বোকা বানাইয়া সেই একই ভিক্ষা ব্রিতিতে সামিল হন। দিনশেষে আবার তাহারা তাহাদের ঐ বৃহৎ অট্টালিকায় সাহেব বেশে ফিরিয়া আসেন। ইহা একটা ইনভেস্টমেন্ট বিহীন লাভজনক ব্যবসা। যাই হোক, কে ভিক্ষা বৃত্তি করে কত টাকা লাভ করিল বা কে সত্যি সত্যিই ভিক্ষুক এবং জিবিকা নির্বাহের জন্য যে তাহার ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কোন গতি আছে কিনা, এই সব তাত্তিক বা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার জন্য আমি এই লেখাটি লিখছি না।

আমি এখন শাহবাগে জ্যামের মধ্যে গাড়ীতে বসিয়া আছি এবং ঐ ৪০-৫০ বয়সের মহিলা ভিক্ষুকের দিকে তাকাইয়া আছি। আমার ছোট মেয়ে তার অতি প্রিয় আই প্যাডে এক নজরে কি যেন করিতেছে আর আমার বড় মেয়ে তার কানে হেড ফোন লাগাইয়া কোন দেশের কোন সঙ্গিত শুনিতেছে, তা আমার বা আমাদের গাড়ীতে যাহারা বসিয়া আছি কেহই শুনিতে পাইতেছি না। শুধু মাত্র মেয়ের মাথা নারা দেখিয়া বুঝিতেছি যে আমার বড় মেয়ে সঙ্গিত শুনিয়া সঙ্গিতের জগতে ডুবিয়া আছে। পাশের ভিক্ষুক, আর জ্যামের জন্য তাহার কোন কাজে ব্যঘাত হইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে না। আমার প্রিয়তমা পত্নী একটু একটু তন্দ্রা আবার একটু একটু জাগ্রত ভাবে বসিয়া আছে। ড্রাইভার সাহেব অতি সুক্ষ মনোযোগের সহিত কোন ফাক ফোঁকর পাওয়া যায় কিনা এই চিন্তায় গাড়ির স্টেয়ারিং ধরিয়া বসিয়া আছে। আশেপাশের অন্যান্য গারি গুলির অবস্থাও আমার মত।

আমি নরিয়া চরিয়া বসিলাম, আর আমার মানি ব্যাগে হাত দিয়া ঐ মহিলা ভিক্ষুককে কিছু টাকা দিতে উদ্যত হইলাম। আমার এই নড়াচড়ায় আমার ছোট মেয়ে তাহার আই প্যাড হইতে নজর ফিরাইয়া আমার দিকে তাকাইল, আমার বড় মেয়ের এতক্ষন বুঝা চোখ একটু খানি আড় চোখ হইল, আমার পত্নিও একটু নরিয়া বসিল। তাহার সবাই হয়ত এই ভাবিল যে, আমি তো সাধারনত সব ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেই না, এমন কি হইল আজ যে, অতি কর্মক্ষম একজন মহিলা, যাহার কাজ করিবার ক্ষমতা আছে তবুও আমি ভিখা দিতে উদ্যত হইলাম?   

আমি মেয়েদের মনভাব বুঝিতে পারিলাম। বলিলাম,  দেখ , আমি একটা সাইকোলজিক্যাল কাজ করিবার চেষ্টা করিতেছি এইবার। বলিয়াই আমি আমার মানি ব্যাগ হইতে নতুন একটা পাচশত টাকার নোট বাহির করিয়া ঐ মহিলা ভিক্ষুকটির হাতে এমন ভাবে দিলাম যেন, এটা কিছুই না। মহিলা ভিক্ষুকটি প্রথমে টাকাটা হাতে লইল, এবং পরক্ষনেই আমার দিকে তাকাইল। পরক্ষনেই আবার সে তাহার হাতে দেওয়া নোটটির দিকে তাকাইল আবার আমার দিকেও তাকাইল। আমি শুধু তাহার মুখের ভাবটা পরিবর্তনের ব্যাপারটা লক্ষ করিতেছিলাম। হটাত কয়েক মুহূর্তের পর মহিলা ভিক্ষুকটি পিছন ফিরিয়া সোজা দৌর দিল।  যেহেতু সব গারি গুলি জ্যামের মধ্যে দারাইয়া ছিল, ফলে অল্প সময়ের মধ্যে সে বেশ খানিক টা পথ কোন বাধা ছারাই পার হইয়া গেল আড় ইতিমধ্যে সে রাস্তার ঐ পাড়ের ফুটাপাতে পৌঁছাইয়া গেল। ফুতপাতে পৌঁছাইয়া ও সে দৌড়াইতে লাগিল কিন্তু একবার সে আমার দিকে পরক্ষনেই সামনের দিকে দৌড়াইতেছিল। এক সময় মহিলা ভিক্ষুকটি আমাদের চোখের আড়াল হইয়া হাজার মানুষের ভিরে হারাইয়া গেল। 

এতক্ষন আমার ছোট মেয়ে, বড় মেয়ে কেহই কোন কথা বলিতেছিল না। এইবার আমার ছোট মেয়ে আমার দিকে তাকাইয়া আমাকে প্রশ্ন করিল, বাবা, মহিলাটা এমন করিয়া দৌড় দিল ক্যান? ওকি ভয় পাইয়াছে?

আমি বলিলাম, না মা, ও ভয় পায় নাই। এতক্ষন তুমি যাহা যাহা দেখিলে, সেটা একটা সাইকোলজিক্যাল গেম ছিল। সাইকোলজিটা কি তুমি বিঝিতে পার নাই? আমি ব্যাপারটা আমার ছোট মেয়েকে বুঝাইয়া বলার শুরু করিলাম।

মহিলা ভিক্ষুকটি যখন ৫০০ টাকার নোটটা হাতে পাইল, সে তখন বুঝিতে পারে নাই যে, কেউ তাকে ৫০০ টাকার নোট দিয়া ভিক্ষা দিতে পারে। (যদিও অনেকে দেয়, কেউ দেয় না এমন নয় কিন্তু তাহা একটা ব্যতিক্রম ধর্মী ব্যাপার)। কেউ হয়ত দেয় ৫ টাকা, ১০ টাকা, ৫০ টাকা কিংবা ১০০ টাকা কিন্তু একবারে ৫০০ টাকা হয়ত সে কখনই ভিক্ষা পায় নাই। ফলে সে প্রথমে মনে করিয়াছিল যে, আমি ভুল করিয় ৫০০ টাকার একটা নোট দিয়াছি। তাই সে বারবার একবার আমার দিকে আরেকবার ৫০০ টাকার নোটের দিকে তাকাইতেছিল। সে ভাবিতেছিল, সাহেব কি ভুল করিয়া ছোট নোট মনে করিয়া তাহাকে ৫০০ টাকার নোটটি দিয়া দিল নাকি আসলেই সাহেব তাহাকে ৫০০ টাকার নোটটাই ভিক্ষা দিল? এটা কি ভুল নাকি আসল। ভিক্ষুক তাহার নিজের ভিতরে ডিসিসন ম্যাকিং প্রসেসে খুব দ্রুত কি করিবে আড় কি করিবে না এই নিয়া দোলায় ছিল। সে হয়ত ভাবিতেছিল, আমি কি খুব তাড়াতাড়ি আমার ভুলটা বুঝিয়া আবার না ঐ ৫০০ টাকার নোটটা মহিলার কাছ হইতে চাহিয়া লই। অথবা ভাবিতেছিল যে, মহিলা নিজেই কি আমাকে জানাইবে যে, আমি ৫০০ টাকাই দিতে চাহিয়াছি কিনা। তাহার ভিতরে তখন একটা সাইকোলজিক্যাল যুদ্ধ চলিতেছিল এই রকম যে, সে এই ৫০০ টাকার ভিক্ষার ব্যাপারটা যদি নিজে থেকে ক্লিয়ার করে তাহা হইলে সে হয়ত ৫০০ টাকা থেকে বঞ্চিত হইবে। আবার যদি না জানায় তাহলে ব্যাপারটা ঠিক হইতেছে কিনা ইত্যাদি। তাই সে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিল না কি করিবে। তাহার এই কিঞ্চিত দুরাবস্থার ইঙ্গিত টা যদিও আমি বুঝিতে পারিতেছিলাম কিন্তু আমি তাহাকে আমার মানসিকতার কোন পরিবর্তন না করিয়া যেন আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না বা আমি ইচ্ছা করিয়া কোন ভুল করি নাই বা করিলেও আমাই তখন ব্যাপারটা বুঝিতে পারিতেছি না। আমার মুখের ভাবের মধ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন না দেখিয়া সে আমি বুঝিতে পারিয়াছি কিনা তাহা সে বুঝিতে পারিতেছিল না। লাভ আড় লোকসানের হিসাব করা তাহার ইতিমধ্যে শেষ হইয়াছে, তাই আর কোন রিস্ক না নিয়া নতুন কোন খদ্দরের কাছে আড় কোন ভিক্ষা না চাহিয়া সে যত তাড়াতাড়ি পারিল  আমার কাছ হইতে ছুটে দৌড় দিল যাহাতে আমি আর তাহাকে নাগাল না পাই। সে দৌড়াইতেছিল বটে বটেকিন্তু তখনও সে নিশ্চিত হইতে পারিতেছিল না, যদি আবার আমি তাহাকে ডাক দেই!! টাই সে একবার সামনের দিকে আবার পরক্ষনেই আমার দিকে তাকাইতেছিল।

কিন্তু আমি জানি আমি তাহাকে ৫০০ টাকাই দিয়াছি।  আমার মধ্যে কোন সন্দেহ ছিল না, আমি শুধু দেখিতে চাহিতেছিলাম, ৫০০ টাকা একসঙ্গে পাইলে একজন ভিক্ষুক কি করে। প্রতিদিন হয়ত ও ৫০০ টাকার চেয়েও বেশি কামাই করে কিন্তু একবারে কারো কাছ হইতে ৫০০ টাকা হয়ত ও জিবনে কখনই পায় নাই। ফলে ওর ভিতরে নানা প্রকার সাইকোলজিক্যাল কেল্কুলেসন খেলিতেছিল।  মানুসের মন বড় বিচিত্র। সে যেই হোক। ৫০০ টাকা দিয়া আমার ভালই লাগিয়াছিল এই ভাবিয়া যে, আজ যদি সারাদিন সে অন্য কাহারো কাছ হইতে ভিক্ষা নাও পায়, তাহাতেও ওর কয়েকদিন চলিয়া যাইবে।

দেখিলাম, আমার ছোট মেয়ে অতি দ্রুত ইহারই মধ্যে ভিক্ষুক সমাচার লইয়া একটা ফেসবুকে স্ট্যেটাস দিয়া ফেলিল। ইতিমধ্যে জ্যাম ছুটিএ শুরু করিয়াছে। ড্রাইভার গাড়ি আঁকাবাঁকা করিয়া ফাক ফোঁকর দিয়া কিভাবে আরও দ্রুত চালানো যায় সেইদিকে মনযোগী হইয়া গেল, আমার বড় মেয়ে কোন কিছু না ভাবিয়া আবারো গানের কলি শুনিতে লাগিল। আমি শুধু এই ভিক্ষুকের ঘটনাটা মনে মনে ভাবিতে লাগিলাম।

মানুষ বড় বিচিত্র।

০৩/০৬/২০১৬ আকাশের চিঠি

প্রিয় মাধুরী 

শরতের শিশিরাপ্লুত বৃন্তচ্যুত কোন শেফালীর গল্প তোমার জানা আছে মাধুরী? ঐ ফুল দেবতার পূজার কোন কাজে লাগে না, কাজে লাগে না কোন বাসরঘরের ফুলশয্যার শোভাবর্ধনেও। অথচ ঐ শেফালি ফুলেরও এককালে অনেক কদর ছিল, তার গন্ধ ছিল, ছিল একটা সম্ভাবনাময়য় প্রস্ফুটিত আগামিদিন। রবিঠাকুর বেঁচে থাকলে অকালে বৃন্তচ্যুত এই শেফালী ফুলের অসময়ের পতনের উপর হয়ত একটা বিখ্যাত কবিতা বা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন অথবা এই পরিত্যক্ত ফুলের একটা যৌবনময় ছোটগল্পও লিখে ফেলতে পারতেন কিন্তু আমি তো আর রবিঠাকুর নই যে, আমি নিজের আবেগ দিয়ে পার্বতী নদির মত বেগবান কোন এক স্রোতধারার মত হর্ষবোধক, লোমহর্ষক অথবা উচ্ছ্বাসময় কাব্য লিখে ফেলব। জীবনের সঙ্গে গল্পের এই এক জায়গায় বিস্তর ব্যবধান। লেখকগন চুপি চুপি তার অক্ষরসমৃদ্ধ লেখনীতে যত না আবেগ আর কষ্ট দিয়ে ভালবাসার কাহিনী রচনা করেন, বাস্তবে ঐ চরিত্রগুলুর আবেগ, কষ্ট আর ভালবাসা তারথেকেও অনেক বেশি গভীরের এবং মর্মস্পর্শী। লেখনীর কলমের অমোচনীয় কালীর অবগাহনে চরিত্রগুলুর কষ্টের চোখের অশ্রু হয়ত শুস্ক পাতার গল্পের লাইন ভেদ করে গড়িয়ে পরে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না কিন্তু বাস্তবে ঐ চোখের পাতা যথার্থই অস্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টিগোচরীভূত হয়। কারো চোখে এরা ধরা পরে আবার শতব্যস্ত পারিপার্শ্বিক অসামঞ্জ্যস্যতায় তা আবার কারো কারো চোখ এড়িয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এদের পরিসংখ্যান নিতান্তই কম নয়।

তুমি মেয়ে হয়ে জন্মেছ বলে তোমার অন্দর মহল আর আমার অন্দর মহলের গল্প এক নয়। কিন্তু তোমার জন্য আমার অন্দর মহিল যেমন অরক্ষিত ছিল না তেমনি আমার জন্য তোমার অন্দর মহলে প্রবেশের সুযোগও তেমন রক্ষিত ছিল বলে আমি মনে করি না। তার মধ্যে তুমি ছিলে আমার ধর্মীয় অনুশাসনের দিক থেকে আলাদা আরেক মানবী।

হ্যা,  আমার স্পষ্ট মনে পরে ঐ দিনের কথা, ২৯ শে বৈশাখ। তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হইয়াছিল। তুমি বিদেশ পাড়ি দেবার কোন এক অজানা সুখানুভূতিতেই হোক অথবা নির্মলা শান্তির খোঁজেই হোক, বেনি দুলাইয়া, চোখের পাতা অশ্রুসিক্ত করিয়া কোন প্রকার ঘটা না করিয়া আমাদের উঠানের সুবিস্তৃত শ্যাম চিত্রপটটি দিনের আলোকউজ্জ্বল স্পর্শে তোমার বিদায় ঘন্টায় ধূসর শ্যামল পাণ্ডুবর্ণ করিয়া একটি ক্ষুদ্র জীবন নাট্যের ইতি টানিয়া সবাইকে ফাকি দিয়া কোন এক নাম না জানা ঠিকানায় হারিয়ে গেলে। আমি জানি না আমার কি অপরাধ ছিল অথবা আমার কি করিলে কি হইতে পারিত। তোমার চলিয়া যাইবার পর আমি অনেক কিছুই বুঝিতে পারিলাম বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও বুঝিলাম যে, আমার স্বর্গীয় মা তার ছেলের সুখের খোঁজে আমাদেরই ঐ পাকা ঘরের তক্তপোষে বসিয়া কোন এক অজানা কুমারী সুন্দুরির মুখখানা মনে ছাপিয়া কোন কোন অলঙ্কার পরিলে তাকে পরিদের মত দেখাইবে বা কোন রঙের শারি পরিলে তাকে গ্রামের আর দশটি গৃহবধু থেকে অতুলনীয় দেখা যাইবে তার হিসাব নিকাস করিতে ব্যস্ত। অথচ তিনি একবারের জন্যও বুঝিতে চাইলেন না, এইমাত্র বৃষ্টিশেষে ক্ষান্তবর্ষণ প্রাতকালের ম্লান রৌদ্র আর খন্ড মেঘের আড়াল করিয়া যে মানুষটি চিরতরে হারিয়ে গেল তার কাছ থেকে আরও নতুন কোন সুখের সন্ধান পাওয়া যাইত কিনা। সুখ বড় রহস্য ঘেরা সোনার হরিন, যিনি পান তিনি জানেন না কেমন করে পাইলেন আর যিনি পান নাই, তিনি জানেন না কোথায় এর প্রাপ্তিস্থান। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল, হরিনেরা কখনো কোন সোনারখনির সন্ধান দিতে পারিয়াছিল কিনা আমি জানি না, তবে এই সোনার হরিনের সঙ্গে বাস্তবের নিরিহ এই প্রানিকুল হরিনের কোন মিল নেই। এরা নিজেরাও কোন বংশের সঙ্গে যুক্ত নয়।

মানুষ যখন প্রতিশোধ নিতে না পারে, তখন সেই প্রতিশোধ অপমান আকারে এমন বৃহৎ আকারে আবির্ভূত হয় যে, হয় সে নিজের কাছে নিজেই দুরূহ হইয়া পরে অথবা জরাজীর্ণ ইষ্টক প্রাচীরের মত শত খন্ডে বিধ্বস্ত হইয়া নেহাত মাটির ঘরের মত অব্যবহারযোগ্য হইয়া পরে। আমি তোমার বেলায় এর কোনটাই দেখি নাই। শুধু মনে হইয়াছে, হয়ত বা আমার আর যাই থাকুক না কেন, তোমাকে ঠেকাইবার মত শক্তি বা ক্ষমতা অন্তত ঐ সময়ে আমার ছিল। সেটা আমি করিতে পাড়ি নাই। কারন আমি অন্ধ ছিলাম। রবি ঠাকুরের কথাই ঠিক, অন্ধের কাছে অভিমানের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা অতিব দুরূহ।

সবেমাত্র এমন একটা কঠিন অসুস্থতা হইতে পরিত্রান পাওয়া আমার মা হটাত করে নিজকে অতিশয় সুস্থ এবং সবল মনে করিয়া যারপর নাই অনেকগুলু গুরুতর কাজের ভার নিয়া সামলাইতে না পারিয়া পরদিন আবারো অসুস্থ হইয়া পুনরায় আগের ক্যাবিনেই ভর্তি হইয়া গেলেন। এ যাত্রায় আমি কোন মুখে যে তোমাকে আনিতে যাইব, সে ভরসা আর সাহস আমার এই ক্ষুদ্র হৃদয় শক্তি সঞ্চার করিতে পারে নাই। অগত্যা বাড়ির কাজের বুয়া আর গ্রামের দুঃসম্পর্কের নানির উপরই ভরসা করতে হইল। কিন্তু এবার যমদূত আমার স্বর্গীয় মাকে সঙ্গে না নিয়া একা যাইতে চাননি, ফলে একটানা এক মাসের অধিক সময় বাড়ির সবাইকে সময় অসময় অধিক পরিমান নিপীড়ন করিয়া, গ্রাম শুদ্ধ হইচৈ করাইয়া, সমস্ত ডাক্তারি বিদ্যা মিথ্যা প্রমান করিয়া পৃথিবীর সব সুখ, আলো বাতাস, বাড়ির প্রকান্ড মায়া মহব্বত ছিন্ন করিয়া আমার মা স্বর্গীয় দেবতার কাছে এক নিশ্বাসে হাজির হইয়া গেলেন আর আমাদের সবাইকে চোখের জলে ভাসাইয়া পুরু বাড়িটাকে একটা অরক্ষিত জলাধারে রূপান্তরিত করিয়া নিরব করিয়া দিলেন। আমার আর সুখের ঘর করা হইল না। স্বপ্নের মাধুরী স্বপ্নেই রইয়া গেল, তার আর আমাদের চৌকাঠ পার হইয়া আমাদের সংসারে আসা হয় নাই। তখন মনে হইল আমার যে কয়জন অতি প্রিয়জন ছিল, যারা আমাকে কারনে অকারনে জবাবদিহিতা করিত, যাদের অতিশয় আপ্যায়নে আমার মাঝে মাঝে নিজেকে খুব বিরক্ত মনে হইত, তাদের কেউ আজ আর আমার আশেপাশে রইল না, সেটা আজ নিঃশেষ হইয়া শুন্যে পরিনত হইল। একবার মনে হইয়াছিল যে, তোমার ইউনিভার্সিটিতে গিয়া তোমার খোঁজ করিলেই আমি তোমার ঠিকানাটা পাইব, কিন্তু পরে আবার কি মনে করিয়া আর খোঁজ নেয়া হইল না। আর এই খোঁজ না নিতে নিতেই তো প্রায় ত্রিশ বছর পার হইয়া গেল। আজ এই পঞ্চাশ বছর পর হটাত করিয়া তোমার কথা বারবারই মনে পরিতে লাগিল। তুমি কি আশেপাশে কোথাও আছ? আর থাকিলে কিভাবে আছ? নিশ্চয় এখন তোমার জীব পরিবেশে অনেক শেফালির আরাধনা হয়, নিশ্চয় এখন আর তোমার সেই চিরাচিত কোলাহল নাই, কোমল কোমল শিশুদের আনন্দে তোমার চারিপাশ ভরপুর। আজ আমার অনেক কথা মনে পড়ে। থাক সে কথা। কখনো যদি আবার তোমার সন্ধান পাই, না হয় আবারো আমার এই হারানো বা ক্ষয়ে যাওয়া ত্রিশ বছরের না বলা কাহিনীগুলু তোমাকে বলব। তবে, তোমার ভাল লাগা রবিঠাকুরের সেই “মেঘ ও রৌদ্রের” কিছু কথা লিখে আমার আজকের এই ডায়েরিটা শেষ করবঃ

“………………আকাশে মেঘ রৌদ্রের খেলা যেমন সামান্য, ধরাপ্রান্তে এই দুটি প্রাণীর খেলাও তেমনি সামান্য, তেমনি ক্ষণস্থায়ী। আবার আকাশে মেঘ রৌদ্রের খেলা যেমন সামান্য নহে এবং খেলা নহে, কিন্তু খেলার মত দেখিতে মাত্র। তেমনি এই দুই অখ্যাত্নামা মনুস্যের একটি কর্মহীন বর্ষা দিনের ক্ষুদ্র ইতিহাস সংসারের শত শত ঘটনার মধ্যে তুচ্ছ বলিয়া প্রতিয়মান হইতে পারে কিন্তু ইহা তুচ্ছ নহে………………”

(চলবে……)  

০২/০৬/২০১৬ মাধুরীর চিঠি

তোমাকে কি নামে যে সম্বোধন করি তাই বুঝে উঠতে পারছি না এখন। কি লিখব তোমায়? প্রিয় বন্ধু নাকি শুধু প্রিয়? অথবা শুধু তোমার নাম অথবা কিছুই না !! তোমাকে আমি যেই নামেই ডাকি না কেন, তুমি আমার একান্ত প্রিয়জন। কে জানি বলেছিল, বন্ধুর নাম ভুলে গেলেও সমস্যা নেই, কিন্তু শত্রুর নাম ভুলে যাওয়া যাবে না। তোমার বেলায় আমার এই নীতিটা হয়ত সঠিক নয়। আমি তোমার নাম ভুলে গেলে আমার আর কোন কিছুই হয়ত অবশিষ্ট থাকবে না। যাক, তোমাকে আমি কোন সম্বোধন ছাড়াই চিঠিটি লিখছি।

অনেকদিন ভেবেছিলাম তোমার সাথে আমি আর কখনো যোগাযোগ করব না। আর যোগাযোগ করে কি ই বা হবে বল? তোমার হয়ত এখন সংসার হয়েছে, বাচ্চাকাচ্চা আছে, অনেক উচু স্তরের মানুষদের মধ্যে এখন তুমি একজন। তুমি ভালই আছ।

তোমার এই শরতবেলার বেলাভুমির প্রাতভ্রমনে আমি হটাত করে সেই পুরানো দিনের কোন এক বর্ষার কাকভেজা বৃষ্টির সন্ধ্যাকালীন শ্বাসরুদ্ধকর রোমাঞ্চের কথা নিয়ে যদি আমি হাজির হই, কি ই বা লাভ হবে, তুমিই বল? মাঝখানে হয়ত যেটুকু তুমি আমাকে করুনা করে হলেও মনে রেখেছ, তাও হয়ত আমার ভাগ্যে আর থাকবে না, অকারনে সেটাও হয়ত হারাতে পারি। অনেক কিছু হারিয়ে যদিও এখন হারাবার ভয় আমি করি না কিন্তু স্মৃতির পাতা ধরে স্থান কাল সময় গুনে গুনে যে কয়টা জিনিস আমি এখনো হারাতে চাইনি তার মধ্যে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় একটা। ভেবনা আমি আজ তোমাকে এই পত্র দিয়ে আবার নতুন করে কোন এক সম্ভাবনাময়কে জাগিয়ে তুলছি কিনা। অন্তত আমি তাঁর কোন সম্ভাবনা দেখছি না।

আমি জানি পাহারের নিচে দাড়িয়ে যত জোরেই কেউ তাঁর কথা বলুক না কেন, সেই একই সুর, একই শব্দ, সেই একই বানী পাহারের চারিদিকে বাতাসে বাতাসে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে আবারও নিজের কাছে তা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। অবুঝেরা এটাকে বিধাতার উত্তর হিসাবে ধরে নেয়, আর যারা অবুঝ নয়, তারা জানে প্রকৃতির অবজ্ঞা করে এই সব কিছু ফিরিয়ে দেওয়া কত বড় নির্মম সত্য। এটা কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক, অন্তত আজ এতটা বছর পর নতুন করে হিসাব করার প্রয়োজন বলে মনে করছি না। আর যখন ঐ নিষ্ফল প্রতিদ্ধনির আওয়াজ ফিরে আসে, তখন যেন তা আরও শতগুনে কঠিন এবং করুন করে কানে বাজে।

কেউ কারো কোন কথা রাখে না, মনে হয় কেউ কারো জন্য কখন অপেক্ষাও করে না। এর মানে আমি তোমাকে এই বলে যুক্তিও দেখাচ্ছি না যে, আমি কি বলতে চেয়েছিলাম, আর আমি তাঁর প্রতিধ্বনিতে কি পেয়েছি। সময় এমন এক জিনিস, সে সবার সঙ্গে আছে, সবার সঙ্গে থাকে অথচ সে কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না। কেউ তাঁর সঙ্গে থাকুক আর নাই বা থাকুক, সে তাঁর নিজ গতিতে নিজ আবেশে তাঁর ঠিক গন্তব্যে সবাইকে ছেরে একা একাই চলতে থাকে। কোথাও তাঁর বিন্দুমাত্র অলসতা হয় না, কোথাও তাঁর কোন গড়মিল হয় না। পৃথিবীর সব চাইতে সস্তা যেমন সময়, তেমনি সবচেয়ে দামিও বটে। ইচ্ছে করলেই একে হেলাফেলা করে যেখানে সেখানে খরচ করা যায় আবার ইচ্ছে করলেই আবার এক আনা দুই আনা দিয়ে কেনাও যায় না। প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা সময়, আর সেই সময়ের চাওয়া-পাওয়ার সাথে হিসাব নিকাশের দেনা পাওনাটাও এই খরচের বিচারয্য বুদ্ধিচনায় পরে। চৈত্রের গরমের জন্য কেউ হেমন্তের দুপুরকে দায়ি করে না, কিংবা বর্ষার একটানা বৃষ্টির জন্য কেউ শীতের কনকনে সকালকে দায়ি করে না।

এই চিঠি পরে তোমার হয়ত মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমি কেন তাহলে আমার সেই পূর্বেকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তোমাকে আবার আজকে লিখতে বসলাম। আমার আসলে আর কোথাও কেউ নেই, কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই, যেটুকু আছে তা শুধু তুমি। এত বিশাল পৃথিবীর মাঝে কত মানুষ যে কতভাবে অসহায়, আমি নিজেকে দেখে তা বুঝতে পেরেছি।

প্রথম যেদিন আমি তোমাকে দেখেছিলাম, মনে পরে তোমার সেই দিনের কথা?  আমি জানি না আমাকে দেখে তোমার কি মনে হয়েছিল, কিন্তু আমার কাছে সমুদ্রের গভীরতার চেয়ে তোমার চোখের ভাষা আরও বেশি দুর্গম মনে হয়েছে, অথচ আমার কেবলই মনে হয়েছে ঐ আখির ভাষা আমার পরিচিত। তোমার কোমল কঠিন দেহখানি আমার কাছে পাহাড়ের শিলাভুমির প্রস্তরখন্ড থেকেও কঠিন মনে হয়েছিল কিন্তু তাঁরপরেও আমার কেবলই মনে হয়েছে কোথায় যেন আমি তোমাকে দেখেছি।

আমি আর পাঁচটি মেয়ের মত নই, সেটা তুমিও জান, আমিও জানি। নীল আকাশের ছায়াপরা কোন এক চকচকে পুকুরের মাঝখানে নীলপদ্ম দেখলেই আমি সবার মত উল্লসিত হয়ে চারিদিক চমকিয়ে দেই না হয়ত কিন্তু আমার ভিতরে যে কোন সাড়াশব্দ হয় না তা নয়। আমার অনেক রাত কেটেছে কোন কিছু ভাবা ছাড়াই, আমার অনেক দিন হয়ত নাওয়াও হয় নাই শুধুমাত্র এই ভেবে, কে তুমি? যেদিন বুঝেছি তুমি কে, সেদিন উপলব্ধি করেছি, আমি স্রোতের বিপরিতে নৌকার গুন টানছি, বুঝতে পেরেছি আমি উল্টো পথে রথে উঠেছি। তারপরেও আমি রয়ে গেছি, আর রয়ে গেছি তোমাকে পাবার জন্য নয়, তুমি আমার কাছাকাছি আছ, এই ভরসায়। এটাই বা কম কিসের? এতসব অপরিচিত মানুষদের মাঝে অন্তত আমি তো একজনকে হলেও চিনি, তোমাকে চিনি, তুমি আছ। তুমি কি কখনো জানতে পেরেছ যে, পৃথিবীর সমস্ত মানবকুলের মধ্যে আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইতাম, এর মানে এই নয় যে তুমি ভয়ংকর। আমার ভয়ের কারন একটাই। তোমার নির্লিপ্ততা। তোমার কোন কষ্টের কারন যেন আমি কখনো না হই সেই ভয়ে আমি সর্বদা ভীত থেকেছি। অথচ আজ আমার ভিতরে কোন প্রকার ভয় নেই, কারন তুমি আমার পাশে কোথাও নেই। আর কোথায় আছ তাও আমি সঠিকভাবে আন্দাজ করতে পারি না। জীবনের এই সায়াহ্নে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তোমাকে। মনে হয়েছে যদি একদিন বা কোথাও একবার আবার তোমার চোখে চোখ রেখে বলতে পারতাম, আমি হারিয়ে যাইনি, অথবা আমি হারিয়ে যেতে চাইনি, আমার কুরেঘরের সদর দরজার মেঠো পথ তোমার জন্য সব সময় খোলা ছিল এবং এখনো আছে। যদি কখনো দৈবাৎক্রমে আমার এই জলেশিক্ত লেখাটা তোমার হাতে পরে আর যদি তখনো আমার এই দেহে টিমটিম করে হলেও একটু প্রানশক্তি থাকে, তবে জেনে রেখ, আমি তোমাকে হয়ত বলতে চেয়েছি, তুমি এস একবার যদি কখন তোমার ভিতরটায় শুন্যতায় ভোরে গিয়ে হাপিয়ে উঠো। এসে একবার আমার চোখের জলের সাথে তোমার সেই বেদনাবিধুর চোখের অসমাপ্ত কান্নাগুলো দিয়ে বল, তুমি ভাল আছ। আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমার সেই ক্লান্ত আঁখির শিশিরের টিপ টিপ করা ব্যাথাকনাগুলো বয়ে নিয়ে আখি বন্ধ করে দেব। তুমি এক ফোটা জলও দেখতে পাবে না।

আজ এই অবেলায় তোমাকে কত কথা লিখতে ইচ্ছে করছে যেন।

মনে পরে তোমার সেই কাকডাকা ভোরে একবার আমি আর তুমি হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই শাওতালদের গ্রামে? ট্রেন আটকা পড়েছে কোন এক বনের ধারে। ট্রেন আবার কখন চলা শুরু করবে কেউ বলতে পারছে না। একেক জনের কাছ থেকে একেক ধরনের খবর পাচ্ছি ট্রেন নষ্ট হবার কারন জানতে গিয়ে। আসলে কেউ বলতে পারছিল না কি কারনে ট্রেন এই মাঝপথে হটাত করে এতগুলো যাত্রি নিয়ে অজানা সময়ের জন্য বিশ্রামে গেল। অনেক যাত্রি ট্রেন থেকে নেমে এদিক সেদিক ঘোরাঘরি করছে। আমরাও এক সময় সবার দেখাদেখি ট্রেন থেকে নেমে ঘুরতে বেরিয়ে গেলাম। গল্প আর গল্পে কখন যে কোন রাস্তায় হাঁটছিলাম, আমরাও তাঁর রেখাপথ মনে রাখিনি।

শেষমেশ এক শাওতালদের গ্রামে গিয়ে হাজির হয়ে গেলাম। কি অদ্ভুদ এক সমাজ। সবাই সবার আপনজন। সবাই যেন সবার জন্য। সবাই যেন এক পরিবার। গ্রামটা ঘুরতে ঘুরতে কোথাও এক কাপ চা খাওয়ার জন্য একটা দোকান পর্যন্ত পেলাম না। আসলে সাওতালদের কোন পৃথক দোকান নেই ঐ গ্রামে। গ্রামের সরু পথ দিয়ে আমরা দুজনে হাঁটছি, সব ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঘর দুয়ার, এলোপাথারিভাবে সাজানো বাড়িঘর। গরু ছাগল গুলোও যেন স্বাধীন। কোনটাই খোয়ারে বাঁধা নেই। কুকুর, গরু ছাগল, হাস মুরগি মানুষ সব স্বাধীন। গাছ গাছালি ভর্তি পুরু গ্রামটা। কোথাও কাদা পেরিয়ে এই বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি যেতে হয়। পানির মটকা গুলো একদম উদোম। কয়েকটা পাখী বসে আছে মটকা গুলোর উপর। পাখীগুলোও জানে এখানে কোন সমস্যা নাই। ওরা বরং আমাদের দেখে একটু শঙ্কিত হয়ে এদিক সেদিক উড়াল দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে মোরগগুলো উচ্চ স্বরে অন্যদেরকে জানান দিচ্ছিল এখানে আগন্তক এসেছে, যেনো মোটিভ বুঝা যাচ্ছে না বোধহয়। কয়েকটা বাচ্চাওয়ালা মুরগি তরিঘরি করে বাশঝাড়ে লুকিয়ে গেল। আমরা এদের কারো কাছে পরিচিত নই। প্রকৃতির প্রতিটি বস্তু তাঁদের স্বকীয়তায় ব্যতিক্রম পছন্দ করে না। বড় ভাল লাগছিল ব্যাপারটা উপভোগ করতে। কতক্ষন কেটে গিয়েছিল আমরা বুঝতেই পারিনি, হটাত অল্প দূর অপেক্ষামান ট্রেনের সচল হবার সংকেত দিয়ে আমাদের চারিদিকে ছরিয়ে থাকা যাত্রিদেরকে মনে করিয়ে দিল আমরা ট্রেনে ছিলাম এবং এখন আবার সেখানে যেতে হবে। তা না হলে ঐ যে বললাম, সময়ের সাথে সাথে এবার ট্রেন হাত জুটি বেধে পুনরায় তাঁর সেই গন্তব্যের দিকে ছুটে যাবে। যারা তাঁর সাথে নেই, তারা থেকে যাবে যেখানে সে আছে সেখানেই।

ফিরতে গিয়ে আমরা বুঝলাম, আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। কোন রাস্তায় এই শাওতাল গ্রামে ডুকেছিলাম, এখন আর সেই আগের রাস্তাটা পরিচিত মনে হচ্ছেনা, মনে হচ্ছে ভুল পথে ট্রেনের দিকে যাচ্ছি, আদৌ ট্রেনের দিকে যাচ্চি কিনা তাও বুঝতে পারছি না। ট্রেনের হুইসেলটা মনে হচ্ছে আরও দূর থেকে কানে আসছে। দ্রুত হাটতে হবে, তা নাহলে নির্ঘাত ট্রেন মিস করব। আর ট্রেন মিস করলে এর পরের অধ্যায়টা আমার অন্তত জানা নাই। তুমি দ্রুত হাঁটছ, আমি তোমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অত দ্রুতও হাটতে পারছি না। রাস্তাটা আমার কাছে অমসৃণ গিরিপথের মত মনে হতে লাগলো। আমার সাড়া শরীর ঘামে যেন ভিজে আসছিল। চুলের ভিতর থেকে কেমন একটা গরম আভা বের হচ্ছিল। আমার কপাল দিয়ে শিশিরের ফোটার মত করে একটু একটু ঘাম বেরিয়ে চোখের জলের ফোটার মত আমার কানের পাশ দিয়ে বুকের ওড়নায় পড়ছিল। আমি যেন আর হাটতে পারছিলাম না। তুমি আমার হাত ধরলে।

এই প্রথম তুমি আমার হাত ধরলে। আমি তোমার হাতের অনুভুতিটা তখন কিছুই বুঝতে পারিনি, শুধু মনে হয়েছে, আমি যেন একটা অবলম্বন পেয়েছিলাম শক্ত করে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। অনেক ক্লান্ত অবশ দেহ আর ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে কোন রকমে যখন আমরা ট্রেনের ধারে ফিরে এলাম, তখন ট্রেন প্রায় ছাড়ি ছাড়ি ভাব। ট্রেনের সিটে বসে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে আমার ক্লান্ত শরিরের সমস্ত পরিশ্রম যখন বিশ্রামে নিমগ্ন, তখন বুঝলাম, একটু আগে তোমার হাতের যে পরশটা আমার শরিরের বাহুতে লেগেছিল, তা এখন আমার অনুভুতিতে আরেক স্বর্গীয় ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। আমার আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল, শাওতাল গ্রামের ঐ মানুষগুলোর সঙ্গে হারিয়ে গেলেই তো ভাল ছিল। প্রতিনিয়ত আমার মনে হচ্ছিল, ট্রেন চলছে, আমার মন চলছে না। বাইরে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। বহুদুরের ঐ গ্রামগুলো কতই না গতিতে আমার দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে নিমিষে। এখন আর সবুজ গ্রাম ভাল লাগছে না, নীল আকাশের খন্ড খন্ড মেঘ গুলোও আর আমার কাছে কাব্যিক মনে হচ্ছে না। অথচ একটু আগে এর সবকিছুই ছিল আমার কাছে আমার অনন্তময়ি প্রেমের এক আবেদনের মত। ঐ যে বহু দূর অবধি দেখা যায় আকাশ যেখানে আকাশ আর মাটি দুজনে এক হয়ে গেছে, অথবা এই যে ট্রেনের দুই সমান্তরাল সারি যারা একে অপরের পাশে অনন্ত কাল ধরে পাশাপাশি বয়ে যাচ্ছে অথচ কখনই তারা একে অপরের নয়, এমন একটা সম্পর্ক যার ঠিকানা কারো জানা নাই। হয়ত তুমি আর আমি ঠিক তাই। আমরা একই ট্রেনের যাত্রি অথচ গন্তব্য এক নয়, আমরা একই আকাশের নিচে চলছি কিন্তু আমার দিগন্ত আর তোমার ভেজা মেঘ এক নয়। মনটা ভারি হয়ে উঠেছিল সারাটা রাস্তা।

আজ কত কথা মনে পড়ছে আমার। তোমার কি মনে পরে আরও একদিনের কথা?

সেদিন ছিল বর্ষার প্রথম সপ্তাহ। চারিদিকের আকাশ মেঘে ভরা, গুরগুর মেঘের আওয়াজ। থেকে থেকে হাল্কা বৃষ্টি আবার ক্ষনেক্ষনে রোদ। হুমড়ি ধুমড়ি খেয়ে যেন তুমি উচ্ছল হরিন শাবকের মত মেঘলা সেই দুপুরে অস্থির চিত্তে ঘন ঘন দরজার করা আর কলিং বেল টিপে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করলে যেন, আর কয়েক সেকেন্ড দেরি করে দরজা খুললে না জানি কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে, অথবা কোন এক রাজ্যের রামায়ন তাঁর অপ্রতিরোধ্য মেঘবদের যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। তোমার সাড়া শরীর ভেজা, চুলগুলো মনে হল কতকাল চিরুনি পরেনি, তারপরেও তোমাকে বড্ড সুন্দর দেখাচ্ছিল। যতবার আমি তোমাকে দেখেছি, আমি ততবারই যেন কোন এক নতুন মানুষকে দেখেছি। সকালের তুমি বিকালের মত নও, বিকালের তুমি আর পরেরদিনের তুমি সম্পূর্ণ আলাদা এক মানুষ। কখনো তুমি হিমালয়ের মত স্থবির, আবার কখনো তুমি উস্রিংখল ডাহুকের মত জ্বালাময়ী, কখনো তোমাকে দেখেছি আমি এতটাই নির্লিপ্ত যেন পানকুড়ির মাছধরার ধ্যানের মত স্থির। কখনো দেখেছি আমি অতিশয় ক্ষুদ্র বিষয়ে তুমি অতটাই উত্তেজিত অথচ অতিকায় হস্তিসমেত বিষয়ে তোমার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ভগবান মানুষকে দিয়ে কি পরীক্ষা করান তা আমার জানা নাই তবে তোমার বেলায় ভগবান সর্বদা কৃপাশীল ছিলেন অনেকের চেয়ে বেশি। ভালবাসার হৃদয় ভগবান তোমাকে দিয়েছেন কিনা আমার জানা নাই, তবে তোমাকে ভালবাসবে এই এমন কিছু একটা ভগবান তোমার মধ্যে সে চিরস্থায়ী প্রথা হিসাবে নিশ্চয় দান করেছেন। তোমার ভেজা চুলেও যেমন মাদকতা আছে, চিরুনির আচরনে শুকনা চুলেও মাদকতা আ ছে। য়ব যেমন মনকে উতালা করে দিতে পারে, তেমনি তোমার অবসন্ন দেহ ও মনকে  ভেঙ্গে খান খান করে দিতে পারে। তোমাকে এই প্রথম আমি যেন আরেক তোমাকে আবিস্কার করলাম। তুমি অতিশয় অস্থির, তোমার কথাবার্তায় কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব। অধিক কথা বলার যেন সময় নেই। কোথায় কি কারনে যেন তুমি আর তোমার মধ্যে নেই। অবশ্য ব্যাপারটা একটুপরেইবুঝতে আমার আর বাকি ছিলনা।তোমার মা অসুস্থ।

আমি তোমার একটা জিনিষ সেই প্রথম দিন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। পৃথিবীর যাবতীয় উচ্ছ্বাস, সুখ, দুঃখ, আর আবেগ যদি হয় একদিকে, তোমার মার জন্য তোমার এই উচ্ছ্বাস, সুখ, দুঃখ, আবেগ অথবা যাই কিছু থাকুক না কেন, তিনি আরেকদিকে। তোমার মায়ের জন্য তুমি সত্যকে মিথ্যা, বা মিথ্যাকে সত্য অথবা ন্যায়কে অন্যায়, বা অন্যায়কে ন্যায়ের দিকে নিয়েও যদি মনে হয় তোমার মা তাতে খুশি, হয়তবা তুমি তাই করার জন্য শারীরিক এবং মানসিকভাবে সর্বদা, সর্বত্র সব কিছুর বিনিময়েও করতে তোমার কোন প্রকার দ্বিধা হবে না। এ এক ব্যাতিক্রমি চরিত্র আমি তোমার মধ্যে প্রকটভাবে দেখেছি। কোন কিছুর সঙ্গেই তাঁর কোন তুলনা তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর আমার এখানেই সবচেয়ে বেশি ভয় হত যদি কখনো কোন কারনে আমি তোমার এই সবচেয়ে দুর্বল স্থানে একটু হলেও ছোঁয়ার কারনে আমার সমস্ত আরাধনা, আমার ভাললাগার ব্যাক্তিত্ত তোমার কাছে আমি এক নিমিসেই অপরিচিত হয়ে যাই। তোমার সেই মা অসুস্থ। তুমি ঠিক নাই বুঝতেই আমার মনের গভিরে এক চরম উৎকণ্ঠা বোধ হতে লাগলো। দুর্ঘটনা আভাস দিয়ে আসে বটে, কিন্তু সুভাগ্য কোন আগাম সংকেত দিয়ে আসে না। তোমার এই দুর্ভাগ্যে যেন আমার সুভাগ্য খুলে গেল। তোমার মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে থাকার মত নির্ভরশীল কোন মানুষ তুমি তোমার জগতের চারিপাশে খুজে পেলে না, প্রথম যার কথা মনে হয়েছিল তোমার, সে আমি। আমি ভাগ্যবতী। তুমি আমাকে কোন সময় না দিয়ে, কোন রকমে কোন প্রকার প্রস্তুতি হওয়ার সময় না দিয়ে এক প্রকার বিদ্যুৎ গতিতেই বের করে নিয়ে হাজির করলে সেই অসামান্য মানুষটির কাছে যার সমতুল্য এই পৃথিবীতে তুমি আর কাউকেই জানোনি।

তুমি চলে গেলে আমাকে রেখে। নিস্তব এক ক্যাবিন। ডাক্তাররা আসছে ঘন ঘন, নার্স, আয়া, সবাই ব্যাস্ত এই ঘুমন্ত শিশুর মত মানুষটির যত্নে। আমি কে, কি তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তারা অনেকেই জিগ্যেস করলেও আমার বলতে কোন অসুবিধা হয় নাই, কারন তিনি আমার মায়ের মতই একজন মানুষ। আমি তাকে আমার মায়ের সঙ্গেই মিল রেখে পরিচয়টা দিয়েছিলাম যে, আমি তাঁর মেয়ের মতই। আমি এছাড়া আর কি বলতে পারতাম বল? কি অদ্ভুত এক ব্যাপার। তোমার সাথে তোমার মায়ের কোথাও কোন গড়মিল নেই। সেই ঠোঁট, সেই নাক, সে মুখাবয়ব, চোখের ভ্রুটা পর্যন্ত একদম মিল। আমি বসে আছি তাঁর পাশে। প্রতিনিয়ত আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন তমাকেই দেখছি। এত কাছ থেকে এত নিরিবিলিতে আমি কখনো তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকিনি। আজ যেন মনে হচ্ছিল আমার সেই না দেখা তোমাকে এত কাছে থেকে দেখছি। কখনো আমি তাঁর হাত দুটো ধরছি, কখনো তাঁর ভ্রুটা, আবার কখনো তাঁর কানের কাছে গিয়ে তাঁর মসৃণ চুলের গন্ধ শুকছিলাম। কখন কিভাবে কি মনে করে জানি না, দেখেছিলাম আমার দুচোখ বেয়ে কয়েক ফোটা জল আমার নিজের অজান্তেই এই ঘুমন্ত মানুষটির বুকের উপর পরেছিল। আমি কি কেদেছিলাম? কোন কিছু ভেবে কি আমার মনে কোন কস্টের উদ্রেক হয়েছিল? না, আমার তা মনে নেই। শুধু মনে হয়েছিল, একবার বুক ভোরে যদি আমি এই মানুষটির বুকে পরে অনেক্ষন কাদতে পারতাম, হয়ত আমি আরও শান্ত হয়ে কিছু তা দিন কাটাতে পারতাম। আমি আমার মায়ের অনেক স্মৃতি মনে নেই। একজন মা একজন সন্তানের জন্য কি করে আমার জানা নাই। তবে আমি জানি একজন সন্তান তাঁর মায়ের অভাবে কি কি মিস করে। তোমার কথা মনে হল। আমি আমার ঈশ্বরের কাছে প্রান ভোরে আরাধনা করলাম, হে ভগবান, তুমি যাকে ভাগ্যবান করে রেখেছ, তাকে আবার হতভাগা কেন করবে? কি নেই তোমার যে, সামান্য একজন মানুষের অনুপস্থিতি দিয়ে তোমার আরেক প্রিয় একজন আদমকে চোখের জলে ভাসাতে চাও? তোমার হিসাব-কিতাব, তোমার চাওয়া-পাওয়ার মাঝে আমার কোন কৈফিয়ত চাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই কিন্তু আমার আরাধনা যদি কখনো মঞ্জুর কর, তাহলে আজ এই দিনে তুমি এই ঘুমন্ত মানুষটিকে তোমার মত করে আরোগ্য করে দাও। আজ এই প্রথম আমার মনে হল, ঈশ্বর আছেন, ঈশ্বরের কাছে বলার অনেক কিছু আছে। আজ কেন যেন মনে হল, আমি ঈশ্বরকে ভালবাসি কারন ঈশ্বর আমাকে তাকে ভালবাসবার এবং তাঁর সাথে রাগ করার ইচ্ছাশক্তি আমাকে দিয়েছে। তোমার ঐ কথাটিই আজ আমার কাছে বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল যেতা তুমি প্রায়ই বলতে, “আই লাভ গড বিকজ হি হ্যাজ গিভেন মি দি পাওয়ার টু হেট হিম”। কি অদ্ভুত তোমার বলার সাহস আর দাপটতা। তুমি তোমার ধর্মের উপর কিভাবে বিশ্বাস রেখেছ তা আমার বিশদ জ্ঞ্যান হয়ত নাই কিন্তু আজ আমি হাসপাতালের এই নিরব ক্যাবিনে একজন ঘুমন্ত মানুষের সামনে বসে বুঝতে পারছিলাম, ভগবান যেই ধর্মেরই হোক, তিনি সবার জন্য সমান। এই বিশ্বভ্রমান্ডে যা কিছু আছে সব তাঁর। এর রূপ, গন্ধ, এর প্রকৃতির সৌন্দর্য, এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট সবকিছু তিনি তাঁর নিজের মত করে সাজিয়েছ। এর থেকে আরও সুন্দর কিছু হতে হয়ত পারে না। গোলাপের রং শুধু গোলাপিই নয়, এর স্থান কাল তাপমাত্রা ভেদে সে তাকে আরও অনেক রূপে আকার দান করেছে। আকাশ শুধু নীলই হয় নাই, এ কখনো কাল, কখন সাদা, আবার কখনো কতই না রঙে তিনি সাজিয়েছেন। কি দরকার ছিল ঐ আফ্রিকার জঙ্গলে অত সুন্দর একটা লাল গোলাপ ফুটিয়ে রাখবার? কার জন্য কেউ জানে না অথচ তা আছে, বাস্তবেই আছে। কি প্রয়োজন ছিল এরিজোনা নদীর তিরে কোন এক ইউকেলিপ্টাস গাছে চুরায় সুন্দর সবুজ টিয়ার বাসা করে দেয়ার? কি প্রয়োজন ছিল ঐ গহিন সমুদ্রে পানির শতশত ফুট নিচে লাল নীল, বিভিন্ন রঙের সারি সারি দুবলা গাছ সৃষ্টি করবার? সবই রহস্য। তাঁর এই রহস্য সন্ধানে আমার শক্তি নাই। আরেক জলজ্যান্ত রহস্য তো এখন আমার সামনে। তিনি তোমার মা। সারাটি বিকাল আমার কেটে গেল কোন এক ঘোরের ভিতর। তুমি এলে সন্ধ্যার পর। ধুপ জ্বালাবার কোন কায়দা নেই এখানে, প্রভুর কাছে রিতি মোতাবেক প্রার্থনা করবার কোন প্রসাদ নাই এখানে। এখানে যার যার ভগবান তাঁর তাঁর অন্তরের একান্ত ভিতরে। এখানে জীবনের আরাধনা চলে, হোক সেটা মৃত্যুর অথবা জন্মের। কেউ হাসিমুখে বাড়ি ফেরে আবার কেউ অশ্রুসিক্ত নয়নে। কি অবাক না!! চোখের জলের ভাষা দুটুইঃ আনন্দের অথবা কষ্টের।

-মাধুরী, মা কি কোন সাড়া শব্দ করেছিল এরই মধ্যে? তোমার তো আজকের দিনটা এখানে মায়ের সঙ্গে থাকতে হবে, আমি তোমার হোস্টেল সুপারকে খবরটা দিয়ে এসেছি যে তুমি আজ আসছ না। আমি তোমার বন্ধুদেরকেও খবরটা দিতে বলেছি। তুমি দুশ্চিন্তা কর না। আমি হয়ত কাল থেকে মায়ের সঙ্গে থাকতে পারব। আমার পরিবর্তে আমার এক খালা আসবে কাল গ্রাম থেকে। তখন তুমি আবার তোমার হোস্টেলে চলে যেতে পারবে।

কথাগুলো তুমি এমন করে বললে যেন, আমি আজকের দিনের জন্যই শুধু প্রয়োজন, কাল থেকে আমার কোন দরকার হবে না। তোমার মন খারাপ হবে ভেবে আমি তোমাকে কিছুই না বলে শুধু বলেছিলাম, আমাকে নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা। যতদিন মা এখানে থাকবে, আমি থাকতে পারব। শুধু আমার কিছু পরিধেয় কাপড়চোপড় বাসা থেকে নিয়ে আসতে হবে। আমি আসলে এই অসামান্য মানুষটির পাশে থাকতে চেয়েছিলাম।

অনেক রাত অবধি তুমি ছিলে ওখানে। যাওয়ার সময় মনে হল, তুমি যেন শরীরটা নিয়ে বাসায় যাচ্ছ আর মনটা দিয়ে গেলে আমার হাতে। তোমাকে আমার বড্ড মায়া করতে ইচ্ছে করেছিল। আজকের তুমি কত ভিন্ন। আমি তোমার এই রূপটা কখনো দেখি নাই। কখনো দেখেছি তোমার গলা ধরে এসেছে মায়ের কথা বলতে বলতে, কখনো দেখেছি তোমার চোখের পাপড়ি গুলো ভিজে যাচ্ছে চোখের অসংবরিত নোনা জলে, আবার কখনো দেখেছি তুমি কতটা উদার আমার প্রতি যাতে সব কিছুর বিনিময়ে হলেও যেন আমি তোমার মায়ের সমস্ত দেখভালটা করি। কখনো মনে হয়েছে তুমি কতটা স্বার্থপর। শুধু তুমি তোমাকে নিয়েই ভাব। একবারও ভাব নাই যে আমিও তো এখানে তোমার মায়ের কষ্টে ব্যথাতুর হয়ে আছি।

তুমি চলে গেলে। আমি একা বসে আছি মায়ের পাশে। দেয়ালে থাকা ফ্লরসেন্ট বাতিটা নিভিয়ে দিয়েছি। টেবিল ল্যাম্পটা জলছে আধোআধো ভাবে। হটাত দেখলাম, মা নরতে শুরু করেছেন। মনে হল তিনি জেগে উঠছেন। যতই তিনি নড়াচড়া করছেন, আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন ততই কেঁপে কেঁপে উঠছে। কখনো মনের আনন্দে, আবার কখনো অজানা এক ভয়ে। আনন্দ এই কারনে, তাঁর নড়াচড়া আরোগ্য লাভের জন্য ভাল লক্ষন, কিন্তু ভয় এই কারনে তিনি কখন আমাকে দেখেন নাই। আমি মায়ের ডান হাতটি আলতো করে চেপে ধরলাম। মনে হল একটা অবলম্বন ধরেছি। উত্তাল সমুদ্রে যখন প্রকান্ড জাহাজটি ভেঙ্গেচূরে খান খান হয়ে আশ্রয়ের সমস্ত ভরসা উবে যায়, কেউ যখন আর কোন আশ্রয়ের অবলম্বন না পেয়ে প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর ভয়ে আতংকিত হয় উঠে, তখন কোন অজানা দূর থেকে ভেসে আসা হয়ত ঐ জাহাজেরই ছোট্ট একটা কাষ্ঠ খন্ডও আতঙ্কের নিরাময় হয়ে স্বস্থির আভাষ হয়ে উঠে। মায়ের হাত ধরাটাও যেন আমার কাছে তাই মনে হল। 

মা বেশ কিছুক্ষন পর যেন তাঁর অসম্ভব ক্লান্তি ছাড়িয়ে চোখ মেললেন। তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। অপলক দৃষ্টিতে তিনি আমাকে দেখছেন। আমিও। কি সুন্দর তাঁর চোখ। কি অদ্ভুত তাঁর চাহনি। আমার ভিতরে কাল বৈশাখী ঝরের মত দিক বিদিক শুন্য এক তান্ডব বয়ে যাচ্ছিল। আমি শুধু তাকিয়েই ছিলাম মায়ের দিকে। মা শুধু অপলক পলখিন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার হাতে ধরা তাঁর হাতটি আরও শক্ত করে ধরে থাকলেন। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, আমি আর তাকে ভাল ভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কখন যে আমি তাঁর বুকে মাথাটা রেখে জরিয়ে ধরেছিলাম আমার কোন কিছুই মনে পরে না। শুধু মনে পরে, কর্তব্যরত নার্স এসে আমাকে বললেন, আপা, আপনি ইচ্ছে করলে পাশে বিছানায়ও কিছুক্ষন বিস্রাম করতে পারেন। আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আমি আর তাকে এটা বলার কোন প্রয়োজন মনে করলাম না যে, আমি ক্লান্ত নৈ, আমি ভাল আছি, কারন মা ভাল আছে। আর মা ভাল থাকলে তুমি ভাল থাকবে। ভগবান বড় রসিক। তাঁর রসিকতায় চোখের জল আর মনের আনন্দ সব একাকার হয়ে যায়।

যে কয়টা দিন আমি মায়ের সঙ্গে থেকেছিলাম, আমার জীবনে ওটা ছিল শ্রেষ্ঠ সময়। আমি জানিনা মা আমাকে কতটা আপন করে নিয়েছিলেন, কিন্তু আমার কাছে মা ছিল একটা শ্রেষ্ঠ উপহার। তুমি ঠিকই বলতে, তোমার মা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম একজন মা। তাঁর তুলনা তিনি নিজে। সকালে উঠে তিনি প্রতিদিন আমাকে বুকে জরিয়ে চুমু খেয়েছেন। রাতে শোবার সময় বলতেন, আমাকে জড়িয়ে ঘুমাবে। আমার কাদতে ইচ্ছে করত এইভেবে যে, এই একান্ত সময়টা আমার খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। মা আমাকে কখনো কিছু জিজ্ঞ্যেস করতেন না কে আমি বা কি বা আমার সম্পর্ক তোমার সাথে। শুধু প্রথম দিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার পরিবারের কথা। হয়তবা আমার মা স্বর্গীয় হয়েছেন, বাবা তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সুখে আছেন, আমি একটা মহিলা হোস্টেলে থাকি, এই জেনে আর কিছুই তাঁর জানার প্রয়োজন ছিল না। তোমার মা আমাকে আদর করে কি এক অদ্ভুত নামে ডাকতেন যার অর্থ আমি কখনই হয়ত জানব না কিন্তু আমার তাঁর এই দেয়া নামতায় কোন আপত্তি ছিল না বরং আমার খুব মনে ধরেছিল। তোমাকে আজ ঐ নামটা মনে করিয়ে দিতে চাই না কারন তুমি সেটা যে ভুলে যাও নি তা আমি জানি।

মা সেরে উঠলেন চারদিন পর। আমি এই কয়দিনে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি হোস্টেলে থাকি, আমাকে আবার হোস্টেলে ফিরতে হবে। মা আমাকে তোমাদের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। মা আমাকে জোর করেন নি, আমাকে যেতে হবে মায়ের সঙ্গে তোমাদের বাসায়, এই কথাটা এমন করে বলেছিলেন যে, আমার সাত জনমেরও সাধ্যি ছিল না এর কোন ব্যাতিক্রম হয়। হাসপাতালের আয়া থেকে শুরু করে নার্স, পাশের ক্যাবিনের রোগীরাও মায়ের এই প্রত্যাবর্তনে যতটা না খুশি হয়েছিল তাঁর থেকে বেশি যেন কষ্ট পেয়েছিল এই ভেবে যে, তারা সবাই মাকে মিস করবে। মাকে দেখে বুঝলাম, মানুষকে আপন করে নেওয়ার জন্য অধিক সময়ের দরকার হয় না। দরকার শুধু মানবিকতা আর নিঃস্বার্থ ভালবাসা।

মাকে নিয়ে তুমি তোমাদের বাসায় এলে। সঙ্গে আমি। এই প্রথম আমি তোমাদের বাসায় এলাম। রবিন্দ্রনাথের জমিদার বাড়ির মত না হলেও দেখলাম বাড়িটা অনেক বড়। তোমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে একটা পুকুর ঘাট আছে। পুকুর ঘাটের সামনের রাস্তাটা তোমাদের বাড়ির সদর দরজার ঠিক উল্টো দিকে গিয়ে মিশেছে। কেউ রাতে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও অসুবিধা নাই, পুকুর ঘাট থেকে সোজা বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছতে পারবে। মাঝে দুইটা সেই পুরানো মডেলের রাজা বাদশার আদলে বাতি আছে। মোটা মুটি তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট উচ্চতা। পুকুরের চারিধারে বসবার জন্য কয়েকটি আধা পাকা বেঞ্চের মত করে দেওয়া আছে। প্রতিটি বেঞ্চই কোন না কোন একটা গাছে নিচে। বাড়ির সামনে একটা ছোট বাগান। অনেকদিন এই বাগানে মালির হাত পরেনি বুঝা যাচ্ছে। তাঁর মধ্যে বৃষ্টির সিজন। বর্ষার পানি আর যথেষ্ট পরিমান আলো বাতাস পেয়ে বাগানের আগাছাগুলো লিক লিক করে সবার অন্তরালে অল্প সময়ের মধ্যে যার যার স্থান করে নিয়েছে। বুঝা যায়, বাগানে অনেক অতিথি পোকাদের আনাগোনা হয়েছে। এরাও এই জায়গাটাকে প্রান মুখর করে রেখেছে। বাড়ীটার উত্তর ধারে আছে প্রকান্ড একটা জাম গাছ। এখন ফলের সিজন শুরু হয় নাই কিন্তু পাপড়ি, কুড়ি গজানোর সময়। তাই জাম গাছেও থোকায় থোকায় কিছু নতুন কুড়ি এসেছে। আর এদের সঙ্গে চিরাচরিত পরকিয়া প্রেমিকের মত কিছু মধু আহরণকারী পোকা মাকরের সর্বদা ভীর রয়েছে। জাম গাছটিও আর একা নয়। তাঁর উপরের মগ ডালে নিতান্তই সাধু বাবার মত, ভদ্র পরিবেশ বানিয়ে কয়েক জোড়া বাবুই পাখী তাঁর সুনিপুণ কৌশলে বানান ঝুলন্ত কয়েকটি বাসা মোটা মুটি পাকা পোক্ত করেই যেন চিরস্থায়ি বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। এক পাশে অনেক পুরানো দিনের পরিত্যাক্ত একটা ডোবা। বুঝা যাচ্ছে এই ডোবাতে কেউ নামে না। এলোপাথাড়ি কচুরিপানা, কিছু গাছের মরা ঢাল, বর্জ্য পদার্থ, অনেক কিছুই চোখে আসে। আর এই ডোবাটার ঠিক আশেপাশে কিছু দস্যুপনা পাখির সারক্ষন আনাগোনা থাকে কখন ছোট্ট একটা নলা মাছ, বা কচি প্রানের একটা ব্যাঙের ছানা যেই না উকি মারে অমনি ছো মেরে ঘপ করে মুখে পুরে নেয়। পুরু বাড়িটার মধ্যে একটা প্রানের লক্ষন আছে। সবচেয়ে বেশি লক্ষ করলাম, বাড়িটা নীরবতায় পরিপূর্ণ কিন্তু নিরব নয়। দুদিন থাকতে হল।

আমার কোন বাড়ি নাই। আমার পৈত্রিক বাড়িতে আমার বিশেষ কোন কদর ছিল কিনা আমি জানি না কিন্তু আমার ঐ পৈত্রিক বাড়িটায় আমার কোন নিজস্ব নেশাও জন্মে নি। সেই ছোট বেলায় আমি যখন শেষ বার গিয়েছিলাম, তাঁর স্মৃতি আমি আজও ভুলি নাই। সেটা ছিল এক দুঃসহ এবং ভয়ংকর অনুভুতি। আমরা সবাই সন্ধ্যা পূজায় বসেছি মাত্র। এমন সময় গ্রামের কিছু লোক আর তাঁদের সঙ্গে কিছু বিশ পঁচিশ বছরের যুবক আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। লোকগুলোকে দেখে বেশ উত্তেজিত বলে মনে হল। আমার মা পুজা ছেড়ে সদর দরজার কাছে এসে একজনকে তাঁদের আগমনের কথা জিজ্ঞ্যেস করতেই পিছন থেকে এক যুবক উত্তেজিত কোথায় মাকে গালিগালাজ করতে লাগলেন। যেন ব্যাপারটা এই রকম , মা কোন অন্যায় করেছেন, তাঁর বিচার চাওয়া হচ্ছে। মা কোন প্রতিবাদ  না করে আগত এক বৃদ্ধ মুরুব্বীকে খুবই   বিনিত স্বরে কিযেন বললেন। কিন্তু ব্যাপারটা তাতেই মিটে গেল বলে মনে হলনা। হটাত হট্টগোল শুরু হয়ে গেল, আগত যুবকদের মধ্যে একঅল্প বয়েসি তরুন আমাদের বাসার দরজা আর জানালা উদ্দেশ্য করে এলোপাথাড়ি ঢিল ছুরতে আরম্ভ করল। আমার মা যথেষ্ট পরিমানে আহত হলেন, আমরা এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, পুজামন্ডপ ছেড়ে আমরা সবাই আমাদের ঘরের এককোনে ঝুপটি মেরে বসেছিলাম। অনেকরাতে বাবা বাড়ি ফিরলেন। আমার মা বাবার সঙ্গে কোন কথাই বলার প্রয়োজন মনে করলেন না। আসলে কি জন্য কি হয়েছিল আমরা কেউ কিছুই জানতে পারলাম না। শধু পরের দিন মা বললেন, আমরা সবাই নানু বাড়ি যাচ্ছি। নানু বাড়ি যাচ্ছি শুনে আমার খুব ভাল লাগছিল কিন্তু আমার মায়ের খুব মন খারাপ, ব্যাপারটা আমাকে দোটানায় রেখেছিল, একদিকে নানু বাড়ি যাওয়ার আনন্দ আবার আরেল দিকে মায়ের মনের অবস্থা। ঐ যে শেষ বারের মত আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে গিয়েছিলাম, আর যাওয়া হয় নাই। আমার বাবাও আর নানুর বাড়িতে কখনো আসেন নাই। আমরা বাবাকে খুব ভয় পেতাম, তাই কি কারনে বাবা আসেন না, তাও আমরা কেউ জানতে পারিনি। মাকে জিজ্ঞ্যেস করলে মা শুধু অন্য প্রসঙ্গে এরিয়ে যেতেন। অনেক বছর জেনেছিলাম, বাবা অন্য এক নারির সঙ্গে ঘর বেধেছেন।

তোমাদের বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। সকালের রোদ যেমন অকাতরে তোমাদের পূর্ব উঠোনে এসে আছড়ে পরে, তেমনি বিকালের পড়ন্ত রোদেরও কোন কমতি নেই পশ্চিমের পুকুরঘাট থেকে শুরু করে সদর দরজার আঙ্গিনা পর্যন্ত।

যে কয়টা দিন আমি তোমাদের বাসায় থেকেছিলাম, ঐ কয়দিনের মধ্যেই শুধু তোমাদের বাড়ি নয়, আশেপাশে লোকজনের সঙ্গেও তোমার মা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সামনে পরীক্ষা, তাই কয়েকদিন পরই আমি চলে এলাম। বলতে পার তুমি, আমি কি বিদায় নিয়ে এসেছিলাম? আমার মনে পরে না এখন। সেদিন আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, আমি ঐ বাড়িটার প্রতিটি মুহূর্ত মিস করব। আমি সকালের রোদটা মিস করব, পুকুরঘাট, ঐ ডোবা, বাগান, কাকাতুয়া, বাবুই পাখী, ব্যাঙের ছানার অকি মারা, কিংবা সদ্য প্রস্ফুটিত হওয়া জামের কুড়ি সবই মিস করব। আর এগুলো কে জড়িয়ে যার সংসার, তোমার মা, তাকে আমি মিস করব আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে। আমার বুক ভরে কান্না আসছিল। তোমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে এই প্রথম তাঁর ডাকা নামতায় আজ আর ডাকলেন না, শুধু বুকে চেপে ধরে আমাকে বললেন, “তুমি আবার এসো মা,”। এতক্ষন কান্নাটা চেপে রাখতে পেরেছিলাম, এখন তোমার মায়ের মুখে আমাকে “মা” সম্বোধন তা আমার বুকে কষ্টে জমিয়ে রাখা ব্যাথাটা ভেঙ্গে শ্রাবনের বারিধারার মত আখির  অজস্র নোনাজলে এর বহিরপ্রকাশ ঘটল।

আমি যতক্ষন প্রশমিত হইনি, তোমার মা আমাকে অতক্ষনই তাঁর বুকে জড়িয়ে রাখলেন। অনি কেদেছিলেন কিনা আমাই জানি না, কিন্তু আমি যখন তাঁর বুক থেকে মাথা সরিয়ে মাকে তাকালাম, দেখলাম তাঁর মিষ্টি একটা হাসি। প্রান্টা যেন এবার সত্য জুরিয়ে গেল। বুকের ভিতরের ব্যাথাটা এখন অনেক হাল্কা লাগছে, আমি মায়ের পা ছুয়ে আশীর্বাদ নিলাম,। তারপর আমি আমার সেই চিরচরিত হোস্টেলে চলে এলাম। আবারও সেই অগোছালো এক বসবাস, একই ধাঁচের সেই নিয়মের বাড়াবাড়ি। কিন্তু কোন উপায় নেই। জীবনের অনেক কিছুই আমাদের ভাল লাগবে না , তাই বলে এই নিয়মগুলো কেটে বের হয়ে যাওয়ারও কোন উপায় নাই, যারা নিয়মগুলো বানায়, তারা নিয়মগুলো হয়ত মানার দরকার নাই বলে এর সংস্কার করারও কোন প্রয়োজন মনে করে না। কে কার জন্য কি পালটাবে বল?

তোমার সাথে আমার যথারীতি দেখা হয়, কথা হয়, তোমার মায়ের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করি, বেশ চলে যাচ্ছে আমার সেই নিঃসঙ্গ একাকী জীবনের কিছুটা সময়। বন্ধুবান্ধব ছিল কিন্তু তারা সব বন্ধুর গন্ডিতেই ছিল। অনেকে আরও গভীর ভাবে আমাকে জানতে চেয়েছিল হয়ত, আমি কেন যেন কোন কিছুই বুঝতে চাই নি। আমার সহপাঠী অনেক মেয়েবন্ধুরা এরই মধ্যে বিয়েথা করে সংসার পেতে ফেলেছে, কখনো কারো সুখের কাহিনি শুনে মুগ্ধ হয়েছি আবার কখনো কারো করুন কাহিনি শুনে বড্ড অসহায় মনে হয়েছে। আমরা মেয়ে মানুষ, পুরুসের মন জুগিয়ে চলাই আমাদের প্রধান কাজ। শুধু পুরুষ কেন, তাঁর সঙ্গে শ্বশুর, শাশুড়ি, আয়া, জায়া, দেবর ননদ সব। এমন কি বাড়ির কাজের মানুষগুলোও অনেক সময় যা পারে আমরা বউরা ঐ কিঞ্চিত ছাড় পাওয়ার আশা করাও অনেক সময় দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। এ দেশের মায়েরা আর শাশুড়িরা এক বংশের নয়। মায়েরা মনে করে, তাঁদের মেয়েটা শ্বশুর বাড়িতে জামাইকে নিয়ে খুব ভাল আছে কারন তাঁর মেয়ে যা আদেশ করে বা বায়না করে তাঁর স্বামী সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। কিন্তু তাঁর ছেলেটা একেবারে উল্টো। বউ যা আদেশ করে বা বায়না ধরে তা সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। কেন বাবা, পরের মেয়ের এত আবদার, এত কথা কেন শুনতে হবে? যেন তাঁর চেলেটা উচ্ছন্নে গেছে অথচ তাঁর মেয়ের জামাইটা কি সুবোধ বালকের মত। যা আদেশ করা হবে সব সে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। এই হচ্ছে আমাদের সমাজ। যেখানে আমরা পরিবর্তনের কথা বলি সবাইকে কিন্তু নিজে পরিবর্তন হই না। আমরা প্রত্যেককেই বলি, কেন সবাই পরিবর্তন হয় না? শধু বলি না, কেন আমি পরিবর্তন হচ্ছি না। যাক, হয় ত এটাই সামাজিক রীতি। কেউ বদল করে কেউ বদল হয়। আমারও কিছু জিনিসের বদল হল। শেষ করে ফেললাম আমার শিক্ষার জীবন। হোস্টেল জীবন বদল হয়ে গেল ছাত্রি হিসাবে। আমি জানি না কোথায় এখন আবার আবার নতুন জায়গা হবে। তুমিও কোনদিন আমাকে এই প্রশ্নটা করনি এর পর কি আমার প্ল্যান, বা কি করলে কি হবে। ছাত্রি থাকা অবস্থায় একবার ফ্রান্সে স্কলারশিপের আবেদন করেছিলাম, এর কি অবস্থা একটু খুটিয়ে দেখার ইচ্ছে হল। আমি জানি এটা আমার হবে না। আমার জাঁদরেল কোন মামা নেই, আমার বাবার এমন কোন বন্ধু নেই যার কাছে আমি গিয়ে বলতে পারি আমার সাহায্যের প্রয়োজন। অথবা আমার এমন কোন ব্যাক্তির সঙ্গে সখ্যতা নেই যাকে ধরে আমি আমার এই অবৈতনিক ধূসর গণ্ডী পার হতে পারি। তাঁর পরেও একবার খোঁজ নিতে গেলাম ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার অফিসে যদি কোন কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়। আমি আশাবাদি নৈ কিন্তু একেবারে অবসর, তাই কিছু একটা করা আর কি। একটা পানির বোতল সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম রেজিস্টারের অফিসের উদ্দেশে।

ভগবান যখন রশিকতা করেন, তাঁর রসিকতায় একটা অদ্ভুত আবেগময়ি স্পর্শ থাকে। আমার বেলায়ও হয়ত তাই হল। কি করে কি হল? আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে শুনলাম, গতকালই নাকি আমার ফ্রান্সে যাবার স্কলারশিপটা মঞ্জুর করেছে। আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না এই খবরটায়। মোট জনাদশেক আবেদন করেছিল, তাঁর মধ্যে শুধুমাত্র আমাদের দুজন এই স্কলারশিপটা পেয়েছে। তাঁর মধ্যে আমি একজন। আনন্দে আত্মহারায় আমার শরীর কাপছিল, আমি কাকে এই খবরটা দেব? কি বলব? কিভাবে বলব? এটা কি আদৌ কোন বড় খবর নাকি কোন খবরই না? আমি আমার পানির বোতলের সবটুকুন পানি খেয়েও যেন আমার তৃষ্ণা মিটছিল না। সত্যি ভগবান বড় রশিক। যখন কারো আর কোন পরিকল্পনা জানা থাকে না, তাঁরজন্য হয়ত ভগবান বিশেষ কিছু করে থাকেন যা সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে এবং সঠিক ব্যাক্তিকে তিনি দান করে আশ্বস্ত করেন। আমার এই অপরিকল্পিত জীবনে এই প্রথম মনে হল, “কোথাও কেউ নেই” এই কথাটা সত্য নয়। অন্তত ভগবান আছেন। তিনি সবাইকে তাঁর অফুরন্ত আলো বাতাসের ভান্ডার দিয়ে, এই বিশাল জলরাশির আধার দিয়ে, কোন না কোন অসহায় জীবকে নিজের পরম মমতায় অতি যত্নে সোহাগ করে তুলে নেন আর এমন স্থানে তাকে জায়গা করে দেন যা অতিশয় আরামদায়ক এবং সৌভাগ্যের। হয়ত ভগবান তাঁর নজর আমার কাছ থেকে এখনো সরিয়ে নেন নাই।

আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি, তুমি ছাড়া আর এখন তোমার পরিবার ছাড়া আমার আর কেউ নাই। আমার পৃথিবীর গোটা অঞ্চল ভাগ করলে সেই অঞ্চলে শুধু তোমাদের বাড়িটা ছাড়া আর কোন অঞ্চল এই অংশে দেখা যাবে না। আর সম্ভতবত এই কারনেই খবরটা নিয়ে আমি প্রথম যেখানে দৌরে গিয়েছিলাম, সেটা তোমার বাসায়। জীবনের মুহূর্তগুলো কিভাবে বদলে যায়, জীবনের আগমুহূর্তটা তাঁর পরের মুহূর্তের মত নয়। প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর নিজ নিজ স্বকীয়তায় পূর্ণ। একটু আগেও আমি ছিলাম ধিরস্থির, আমার কোন নিশানা ছিল না, আমার গন্তব্যের কোন আবাস স্থল ছিল না, অথচ এই মুহূর্তে আমি আর আগের মুহূর্তের মত নৈ। এখন আমি এক চঞ্চলা। মনে মনে গুন গুন করে গান গেতে ইচ্ছে করছে। কোন বিষণ্ণ ধরনের গান নয়। মনে হচ্ছে আমি নিজেই একটা গান নিজের সুরে গাইতে থাকি, “আমি যেন আজ আমি নেই, কোন এক বিশাল জগতের অম্পরা সরীসৃপ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষ কত অদ্ভুত। হয়ত এই কারনেই ভগবান তাঁর অদ্ভুত আচরনে মুচকি মুচকি হাসেন আর তাঁর রসিকতার মজা নেন।

বিকাল চারটার দিকে আমি তোমাদের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। আমি জানি এই সময় তুমি বাসায় থাক না। তোমার মা হয়ত এই সময় দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নেন। কিন্তু আমার সময় কাটছিল না। আমি হাজির হয়ে গেলাম তোমাদের বাসায়।   

অবাক হলাম মাকে দেখে। মা অন্য দিনের মত আজ দুপুরের পর খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম নেন নি। কি যেন নিয়ে খুব ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আমি ঢোকতেই একটা সুন্দর মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “এস মা এস, ভালই হল, তুমি এসেছ”। আমি মাকে প্রনাম করে তাঁর পাশে গিয়ে বসতেই আমাকে একটা এ্যালবাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখত মা, মেয়েটা কি রকম দেখতে?” ধক করে উঠল যেন আমার বুকটা। আমার এতবড় একটা আনন্দের দিনে, মনভরা এতটা সুখি বুকে হটাত করে যেন পিছন থেকে শতটনি একটা গাড়ী আমার পাজরের সব গুলো হাড় চুরমুর করে বাকিয়ে দিচ্ছে। বুঝতেই পারলাম না কোথা থেকে কখন ঐ শত সহস্র ওজনের একটা দানব আমার অজান্তে আমার এত কাছে এসে কত বত ধাক্কাটা দিয়ে গেল। সামলাতে একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেও ব্যাপারটা নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখতে পারলাম। “আকাশের জন্য মেয়ে দেখছি, এগুলো ঐ মেয়েটারই ছবি। দেখত মেয়েটা কেমন দেখতে?” আমি ছবি গুলো দেখতে দেখতে মা কথাগুলো বলছিলেন। বড্ড সুন্দর একটা মেয়ে। ঠোটে লাল লিপিস্টিক এর পাশ দিয়ে চমৎকার লাইনার টানা। মনে হয় কোন আর্টিস্ট যেন খুব সন্তর্পণে তাঁর ঠোঁটের ঐ লিপিস্টিকগুল অতিশয় যত্নের সহিত একে দিয়েছেন। মাথার চুলগুলো পরিপাটী করে সাজানো। ক্যামেরার আলো প্রতিফলিত হয়ে চুলের এক অংশে একটা আলোর ঝলকানির সৃষ্টি করেছে। কানের দুলটি গ্রীবার পাশ পর্যন্ত ঠেকে আছে। তাঁর মধ্যে অসংখ্য যাদুকরী কারুকার্য। চোখ দুটো নিরব চাহনি দিয়ে তাঁর মাদকতার রূপ জাহির করছে। অদ্ভুত সুন্দর সে চাহনি। মিস্টি মুখের একটা ছাচ। গোলগাল কিন্তু অপূর্ব মায়াবতী। যে কারোরই পছন্দ হবে মেয়েটিকে। কয়েকটি ছবি পূর্ণ অবয়বে তোলা। বেশ লম্বা বুঝা যায়। আকাশের সঙ্গে মানাবে। একটা ছবিতে একটা ছোট গাছের আড়ালে দাড়িয়ে। আরাল করে দারালেও তাঁর রুপের কোন অংশই লুকানো সম্ভব হয় নাই। পিছনের সবুজ ঘাসের সঙ্গে আর অপরূপ কিছু রঙ্গিন পাতাগাছের পাশে তাঁর সবুজাভাব শাড়ির অদ্ভুত একটা মিল রয়েছে। নারীরা আসলে সুন্দরের প্রতিক। ভগবান এদের বানিয়েছেন অতি আদর করে , মায়াবতী রূপ দিয়ে। কেউ এদের নোনাজলে ভাসিয়ে কর্দমাক্ত করে দিলেও তাঁর অন্তরের রুপ্টা হয়ত একেবারে বিলিন হয়ে যায় না। এর শ্মশানের মত পাসান নয়, আবার মমের থেকেও নরম। এদের গলিয়ে আরেক রূপ দেওয়া যায় আবার শুকিয়ে গেলে বর্জ্য ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

বললাম, “মেয়েটি দারুন দেখতে। আকাশের সঙ্গে মানাবে।”

তোমার মা আমাকে চুমু খেয়ে বললেন, “দেখিস, তোর আকাশ সুখি হবে।”

আমার চোখ ভিজে এল মায়ের কথায়। “আমার আকাশ”। হ্যা, তাই তো, তুমি তো আমারই আকাশ। ঐ আকাশেই তো আমার সর্বদা বিচরন। আমি যখন খুশি উরতে পারি, আবার আমার যখন মন খারাপ থাকে, ঐ আকাশ থেকেই তো বৃষ্টি আসে। আবার কখনো কখনো ঐ আকাশের মাঝে জলন্ত সূর্যটাই তো আমাকে পুরিয়ে ছারখার করে দেয়। অনেকক্ষন মায়ের সঙ্গে কাটালাম। আমি আমার খবরটা তখনো মাকে দেই নাই। কি বলব মাকে? আমি চলে যাচ্ছি? আমি কোথায় যাব?

সন্ধে হয়ে এল। হোস্টেলে ফিরতে হবে। অনেক কাজ হয়ত বাকি। রেজিস্ট্রার সাহেব আমাকে একখানা ফর্দ হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। অনেক কাগজপত্র যোগার করতে হবে। আমি ফিরার পথে মাকে বললা, “মামা, আমারহয়েছে  স্কলারশিপ আমার  ফ্রান্সে। খুব  খুব শিগ্রই  হয়ত যেতে হবে। তুমি দোয়া কোর।”

“সে কিরে? আকাশের বিয়েতে তুই থাকবি না?” মা আমার এই খবরটায় যতটা না খুশি হলেন, মনে হল তাঁর থেকে বেশি বিচলিত হলেন আমার চলে যাবার কারনে হয়ত আকাশের বিয়েতে আমার ভুমিকা নিয়ে।

আর যাই হোক মা তো। মায়েরা নিজের সন্তানের অন্তর যত টা বুঝে তারা অন্য সন্তানের অন্তর অতটা হয়ত বুঝেন না। ওনি তো আকাশের মা।

আমি চলে এলাম আমার হোস্টেলে। মনটা আজ নানা কারনে এতটাই আলোড়িত ছিল যে কখনো উত্তপ্ত টাইফুনের মত আবার কখনো ধুম্রজাল নাটকের মত খসখসে, আবার কখনো বৈশাখীর পড়ন্ত বিকালের আমেজের মত, কখন জানি কেমন বুঝা যাচ্ছে না। আমার স্কলারশিপ আমাকে অতিশয় আবেশিত করে ফেলেছিল, আবার আকাশের বিয়ের পাত্রি দেখে আমার মন যেন কোথায় স্থির হয়ে গিয়েছিল। টিভি অন করে মনটা বদলের চেষ্টা করলাম। প্রথমেই একটা গানের কলি শুনে মনটা আরও বিষণ্ণ হয়ে গেল, নজরুলের ঐ বিখ্যাত গান, “আমার যাবার সময় হল, দাও বিদায়…” পৃথিবীর কোন একটা মুহূর্ত আরেকটি মুহূর্তের মত কখনই নয়। এরা সবায় যার যার বেদনায় বা উল্লাশে ভরপুর। খেতে ভাল লাগছিল না। না খেয়েই শুয়ে পড়লাম।

একটানা এগার দিন আর আমি তোমার সঙ্গে অথবা তোমাদের বাড়ির সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখিনি। সত্যি আমি আমার স্কলারশিপের যাবতীয় কাগজাদির জন্য হন্যে হয়ে এক প্রান্ত ঠেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেরিয়েছি। মনে হয়েছে শধু আমার হাতে সময় অনেক কম, কেন জানি মনে হয়েছে আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। যে করেই হোক আমি তোমার বিয়ের আগে এই সমাজ, এই দেশ, এই রীতিনিতি, এই শাশনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাব। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

আমার স্পষ্ট মনে আছে। দিন্টি ছিল ইংরেজির ১৮ তারিখ আর বাংলায় ২৯ শে বৈশাখ। আমার সব কিছু ঠিক হয়ে গেল। আমি চলে যাচ্ছি সেই সুদুর অপরিচিত কোন এক মহলে যেখানে আমি কারো ভাষা বুঝি না, আমার কেউ পরিচিত নাই, আমি ইচ্ছে করলেই মন খারাপ থাকলে তোমার মায়ের মত এমন একজন মানুষের কাছে আমি ছুটে যেতে পারব না। তারপরেও আমি সস্থি পাচ্ছি এই ভেবে, আমার নতুন জীবনে কেউ আমাকেও চিনে না। আমি শেষ বারের মত তোমার কাছে এসেছিলাম তোমাদের বাসায়।

মাকে প্রনাম করলাম, বড্ড কান্না পাচ্ছিল। মা আমাকে কত কথা বললেন। খুব আদরে আদরে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

তোমাদের বাসা থেকে বের হবার সময় তোমাকে একবার প্রনাম করতে খুব মন চাইছিল। মন যা চাইল, আমি তাই করলাম, এই প্রথম আমি তোমাকে প্রনাম করতে গেলে তুমি আমাকে বারন করতে গিগে জড়িয়ে ধরলে। আমি অবশ শরিরে শুধু কান্নাই করে যাচ্ছিলাম। তুমি আমাকে কখনই এই ভাবে জড়িয়ে ধর নাই। তুমি আমার আকাশ, এই প্রথম আমি আমার আকাশকে এত কাছ থেকে বুকের মাঝে ধারন করতে পারলাম। তুমি কি আমার ভিতিরের কোন কম্পন অনুভব করনি? তুমি কি কখনই বুঝতে পারনি যে আমার ভিতরের মাধুরী আজ তোমার আকাশ থেকে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? হয়ত বা পেরেছ, হয়ত বা পারনি।

বিশাল এয়ারপোর্ট। আমি কখনো এই এয়ারপোর্টে আসি নি। আসার দরকার হয় নাই। কত লোক এই এয়ারপোর্ট দিয়ে তাঁদের গন্তব্য পরিবর্তন করে, আমিও আজ আমার জীবনের আরেক গন্তব্যের উদ্দেশে নিজে দেশ ছেড়ে, নিজের সমস্ত স্মৃতি পিছনে ফেলে, যত মায়া মহব্বত, ঘৃণা, আক্রোশ, ক্রোধ, অবিচার, অন্যায়, কিংবা ভাল বাসা, আবেগ, অথবা মনের সব জালা জন্ত্রনা ছেড়ে আমি পারি দিচ্ছি অন্য আরেক অপরিচিত দেশে যেখানে আমার কেউ নেই।

প্ল্যান টেক অফ করেছে। দ্রুত স্থান পরিবর্তন হচ্ছে, ঘাস, গাছ পালা, বিশাল অট্টালিকাগুলো নিমিসের মধ্যেই আমার থেকে পিছনে পরে যাচ্ছে। আমার মনটা একেবারে শান্ত, কিন্তু কোথায় যেন চিন চিন করে ব্যাথা অনুভুত হচ্ছে। আমার পাশে বসা একজন ষাট বছরের বৃদ্ধা তাঁর সিটে আরাম করে বসবার জন্য ঘন ঘন নারাচরা করছেন। আমরা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের মাটি ছেড়ে অনেক উপ্রে উঠে গেছি। আমি এখন আকাশে। এই আকাশ আর শে আকাশ এক নয়। আমি ইচ্ছে করলেই এই আকাশে ঝাপ দিয়ে বুকে পরতে পারি না, তারপরেও এর নাম আকাশ। আকাশ কত বিশাল, চারিদিকে শুধু সাদা মেঘের আভা। মনে হয় যেন সাদা মাটির এক দেশ। কেউ কোথাও নেই, শুধু সাদা মাটি। 

২১/০৪/২০১৬-নবাবের কবরের সামনে কল্পনায় একদিন

হ্যালো নবাব

তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। তুমি যখন এই পৃথিবীতে জন্মেছিলে তখন আমার পূর্ব পুরুষেরাও হয়ত জন্মগ্রহন করে নাই। কি করে তাহলে তোমার সাথে আমার দেখা হত? তারপরেও আজ আমার সঙ্গে তোমার দেখা হল। আমি দাড়িয়ে আছি ঠিক তোমার কবরের পাশে, তুমি শুয়ে আছ একদম একা। তোমাকে একা পাব এবং তোমার মত মানুষের সাথে একা দেখা করা যায় এটা আমার কেন এই ভারতবর্ষের কোন জনগনই তো বিশ্বাস করবে না। তোমার রানী(দের) যেখানে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুমতি লাগতো সেখানে আমরা কোন ছাড়! কিন্তু দেখ, অদৃশ্য বিধাতার কি ক্ষমতা, তিনি সব পারেন।  তাও আবার প্রায় চারশত বছর পর আমার সঙ্গে তোমার দেখা। আমি জিবিত আর তুমি মৃত।

যেহেতু তোমার সঙ্গে আমার আজ দেখাই হয়ে গেলো, আমার কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল তোমাকে নবাব। তোমাকে সব কিছুর উত্তর দিতে হবে এমন কোন কারন নাই, কারন তুমি নবাব, অনেক কিছু তুমি আমাদের মত সাধারন মানুষকে নাও জানাতে পার। তবুও যদি সম্ভব হয় শুনতে পারলে হয়ত ভাল লাগবে।

আমি তোমাদের উপমহাদেশের রাজনীতি বুঝি না, আমি কিভাবে দেশ চালাতে হয়, তাও আবার এই উপমহাদেশের মত একটি সাম্রাজ্য, তারও কোন আইডিয়া আমার নাই। তারপরেও আমি খুব অবাক হই কি করে তুমি এতবড় একটা উপমহাদেশ কন্ট্রোল করেছ? তুমি কি কোন ক্যাডার বা রাজনৈতিক দলের মত কোন দল করতে যারা তোমার এইসবে সাহাজ্য করত? তোমার কোন বিরুধি দল ছিল না নবাব? তোমার সম্পদের হিসাব আমি জানি না কিন্তু শুনেছি তোমার নাকি অনেক সম্পদ ছিল। তুমি কি কোন ব্যবসা করতে নবাব? তুমি কি কখনো কোন বেতন নিয়েছ? আর নিলে কত টাকা করে নিতে নবাব? আচ্ছা নবাব, তোমার কি কোন ব্যাংক একাউন্ট ছিল? সুইস ব্যাংক বা বিদেশী কোন ব্যাংক? নাকি ‘নবাব’ এইটাই তোমার ব্যবসা বলে চালিয়ে দিয়েছ? প্রজারা কি তোমাকে খুব ভালবাসত? তোমাকে কি কেউ ঘৃণা করত কখনো? আর কেউ যদি তোমাকে কখনো ঘৃণা করত তাহলে তুমি তাকে কি করতে নবাব? তোমাদের সময় কি কোন টক শো হত? নাকি সভাসদ পরিষদে তুমিই শুধু একা কথা বলতে? তুমি কি কখনো ভেবেছিলে তুমি একদিন এই পৃথিবীতে থাকবে না? কখনো কি তোমার এই উপলব্দি হয়েছিল যে তোমার মরনের পর তোমাকে নিয়ে জনগন সমালোচনা করবে? কখনো কি ভেবেছিলে যে, তোমার গড়া এই অট্টালিকা, এই সাম্রাজ্য, তোমার চেয়ার, তোমার খাট, তোমার সবকিছু অন্য একজন ব্যবহার করবে আর তুমি অন্য সবার মত এই ভিজা মাটির নিচে স্যতস্যতে জায়গায় কোন এক অন্ধকার পরিবেশে শুয়ে থাকবে? কখনো কি তোমার জীবদ্দশায় এই উপলব্ধিটা হয়েছিল যে, তুমি আর কখনই এই পৃথিবীর আলো বাতাস, গাছ, ফল মুলাদি, আতর সুগন্ধি, রানী রমণী, সোনা দানা, ক্ষমতা, কোন কিছুই উপভোগ করতে পারবে না? এমন কি তুমি আর ফিরেও আসতে পারবে না? এমন কখনো কি তুমি একবারের জন্যও কি ভেবেছিলে?

তুমি কি এখনও আগের মত দেশি বিদেশী অনেক পানীয়, রাজ্যের সব সুন্দরীদের সমন্নয়ে বাইজীর আসর, শ্বেত পাথরের কিংবা কষ্টি পাথরে গড়া মোজাইক ফ্লোর, সোনার পালঙ্ক, অনেক মহামুল্যবান হিরের আংটি, জহরতের মালা, আর্দালি, পাইক পেয়াদা যে সব তোমার এখানে একসময় ছিল, তা পাও ওখানে নবাব? তোমার আশেপাশে কি তোমার অতি প্রিয় সেনাপতি, মন্ত্রী মহোদয়, উজির নাজির আছে নবাব? তোমার একা থাকতে এখন কষ্ট হয় না? তোমার কি আবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে তোমার সেই রাজকীয় প্যালেসে কিংবা ঘুমাতে ইচ্ছে করে ঐ সোনার খাটে যা তুমি পারস্য রাজ্য থেকে ছিনিয়ে এনেছিলে একদিন? আমাত খুব জানতে ইচ্ছে করে নবাব।

জানো নবাব, আমার মাঝে মাঝে তোমাকে বেশ বোকা বোকা বলে মনে হয়। তুমি এত কিছু বুঝতে পেরেছিলে, উপমহাদেশ কিভাবে চালাইতে হয় সেটা বুখতে পেরেছিলে, কিভাবে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্য দখল করতে হয় সেটা বুঝতে পেরেছিলে, কেমন করে বিনা ব্যবসায় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিজের করে নিতে হয় সেতাও বুঝতে পেরেছিলে, অমর হয়ে থাকার জন্য কত বিশাল বিশাল প্যালেস বানাতে হয়, তুমি তাও করেছিলে কিন্তু তোমার মরনের পর তোমাকে কে দেখভাল করবে, তোমার এই সিংহাসনে যেন কেউ না বসতে পারে, শুধু তোমার আদেশই যেন আজিবন চলে, সেই ব্যবস্থাটা কেন করে যেতে পারলে না নবাব? বিধাতার দেওয়া ধর্ম পাল্টে তুমি ‘দ্বীনে এলাহি’ও করে ফেললে, কোন পরোয়া করলে না। তার সমকক্ষ ভাবতে পারলে, অতচ তুমি তার সঙ্গে আরও একটু সমঝোতা করলেই কিন্তু তুমি অনেক কিছু করতে পারতে।

ন্যায় অন্যায়, সৎ অসতের ব্যবধান করলে না, মানবাধিকার, ভদ্রতা, সৌজন্যতা, বিচার-অবিচারের মধ্যে তুমি কিছুই ফারাক করলে না, তোমার যা ইচ্ছে তাই তুমি করতে পারলে কিন্তু তুমি কি একবারও ঐ অদৃশ্য বিধাতে কিছু ঘুস দিয়ে তুমি অমরত্ব নিতে পারলে না নবাব? তোমার তো কোন কিছুর কমতি ছিল না। কি হত যদি উপমহাদেশের কিছু জায়গা, জমি, অথবা সোনা দানা, জহরত, হিরা, সুন্দরি কিছু রমণী দিয়ে ঐ অদৃশ্য ভগবানকে বশ করতে? তাহলেই তো তুমি আজও বেচে থাকতে পারতে, তোমার সঙ্গে আজ আমার সরাসরি জীবন্ত শরীরে দেখা হত।

আচ্ছা নবাব, তুমি তো প্রায় চারশত বছর আগে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছ। তুমি দেখতে কি এখনো আগের মত আছ? তোমার গলায়, তোমার হাতে যেসব সোনা দানা হীরা জহরত ছিল সেগুল কি তোমার সেনাপতিরা, তোমার উপদেষ্টারা তোমার সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিল? তুমি কি ওগুলো এখনো হাতে গলায় মাথায় পড়ে থাক? নাকি খুলে রেখেছ? কোথায় রেখেছ এখন এগুলো? তুমি কি আরও বৃদ্ধ হয়েছ? নাকি যেহেতু কোন টেনশন নাই, ফলে তুমি আরও সুন্দর হয়েছ? তোমার সেনাপতিরা, তোমার সুন্দুরি রমণীরা তোমার অসংখ্য ছেলেপুলেরা, নাতি নাতকুরেয়াও আজ অনেকেই এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে যাদেরকে তুমি খুব ভালবাসতে। তোমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে?

জানো নবাব, আমি মাঝে মাঝে খুব অবাক হই এই ভেবে যে, তোমার অনেক বংশধরেরা কিন্তু এখনো এই পৃথিবীতে বেচে আছে। কিন্তু কে কোথায় কিভাবে বেচে আছে তাদের কোন হিসাবও আমরা জানি না। আর তারাও যে কেন বলে না যে তারা তোমার নবাবের বংশের লোক! কেন নবাব? কি জানি হয়ত তোমার বংশের লোক বলে জানাজানি হয় গেলে না জানি আবার কি বিপদ হতে পারে এই ভেবে হয়ত বলে না। হয়ত এমনও হতে পারে, তুমি জনগনের উপর টর্চার করেছ বলে তারা এখন তোমার বংশের উপর খুব রাগান্বিত, হয়ত এমনও হতে পারে যে তোমার অবিচার, অন্যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন, তোমার বেহিসাবি খরচের তালিকা ইত্যাদির কৈফিয়ত তারা দিতে পারবে না বলেই এখন নিসচুপ জীবন বেছে নিয়েছে। আবার এমনও হতে পারে তোমার অন্তর্ধানের পর তোমার এই বিশাল সাম্রাজ্য ধরে না রাখার কারনে হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধিন হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় অগোচরে থাকাই ভাল এই যুক্তিতে প্রকাশিত হয় না, আবার এমনও হতে পারে আসলেই কেউ আর বেচে নেই তারা। বড় অবাক লাগে যে, এক কালের এত প্রতাপশালী নবাবেরা এভাবেই বংশসহ হারিয়ে যায় এই পৃথিবীর বুক থেকে। ওদের শুধু ইতিহাস বেচে থাকে কিন্তু বংশ বেচে থাকে না। অথচ তোমার আশেপাশে যারা ছিল তাদের অনেকের বংশধরেরা এখন অনেক বড় লোক, কেউ আবার রাজনীতি করে, কেউ বড় বড় ব্যবসায়ী, ওদের অনেক টাকা, সুইস ব্যাংকে, বিদেশী ব্যাংকে, আরও অনেক দেশের ব্যাংকে। ওরা এক দেশের সরকারের আরেক দেশের সরকারের সঙ্গে বসে গল্প করে, তাস খেলে, মদ খায়, ফুর্তি করে, আরও কত কিছু? কিন্তু তোমার বংশের কোন লোককেই আমি চিনি না নামও জানি না আদৌ অরা কেউ আছে না নাই।

যাক, নবাব, আমাকে এখানে অনেক সময় থাকতে দিবে না কারন তুমি নবাব, তোমার পাশে অনেক্ষন দাড়াতেও আমাকে দিবে না। আবার কখনো যদি তোমার এখানে আমার আসা হয়, তোমার সঙ্গে আমার আবার কথা হবে, যদি পার আমাকে একটু জবাব গুলো দিও নবাব।

তুমি ভাল থাক নবাব।      

০৭/০৪/২০১৬ -ফাঁসি

রাত প্রায় বারোটা। ঘরের কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলিতেই দেখিলাম ১৭-১৮ বয়সের একটি মেয়ে, কাঁধে একটা ঝুলানো ব্যাগ লইয়া দরজার সামনে দাঁড়াইয়া আছে। তাহাকে আমি চিনি না কিন্তু কোথায় যেন তাহাকে দেখিয়াছি আমার ঠিক মনে পরিতেছে না, আবার তাহাকে আমার অপরিচিত বলিয়াও  মনে হইল না। বাসায় কেউ নাই, আমার মেয়েরা তাহাদের খালার বাসায় মানিকগঞ্জে বেড়াইতে গিয়াছে, সঙ্গে তাহাদের মাও আছেন, আমার অফিসে অনেক কাজ জমা হইয়া গিয়াছিল বলিয়া রাত জাগিয়া জাগিয়া গুটিকতক কাজ শেষ করিতে হইতেছে। তাই আমার পরিবারের সঙ্গে আমার আর বেড়াইতে যাওয়া হয় নাই। ছেলেপুলে আর ঘিন্নি ছাড়া আমার কোন কিছুই চলেনা। তাহাদের অবর্তমানে আমার এই সময়টা আমি হারে হারে টের পাই। আমি অলস মানুষের মধ্যে একজন। একগ্লাস পানি খাইতেও তাহাদের প্রয়োজন পড়ে। ঘরের মধ্যে যখন ওরা থাকে তখন তাহাদের উপস্থিতি টের পাইনা কিন্তু তাহারা যখন থাকেনা তখন তাহাদের অনুপস্থিতি খুব নজরে আসে বইকি। বাসায় কেহ আসিলে সাধারনত আমার গিন্নিই দরজা খোলার কাজটি করিয়া থাকেন। বাসায় যতো কর্মীবাহিনী আসে, কেহ তাহার রান্নার বুয়া, কেহ আবার পাশের বাসার গিন্নি, কেহ আবার আমাদের ভারাটিয়ার মধ্যে একজন। হয়ত সময়মতো ভাড়া পরিশোধ করিতে পারিবেন না বলিয়া একটু আবদার, কেহ আবার দান দক্ষিনার জন্য আসে, এইসব। ফলে আমি সবাইকে চিনিও না আর তাহা জানার আমার কোন প্রয়োজনও মনে করি না। আজ তাহারা কেহ বাসায় নাই, তাই আমাকেই এই কর্মটি করিতে হইতেছে।

রাত এগারোটা বাজিলেই আমার গিন্নি ঘরের সব দরজা বন্ধ করিয়া, জানালার পর্দাসমুহ একেবারে আঁটসাঁট করিয়া লাগাইয়া দিয়া, ঘরের যাবতীয় ছিটকানি বন্ধ করিয়া তাহার পর কি দোয়া পড়িয়া হাতে তিনখান হাততালি দিয়া সম্পূর্ণ ঘরটাকে নিরাপদ করিয়া তাহার পর শুইতে যায়। গিন্নি না থাকিলে আমাকে অবশ্য দোয়াদরূদ পড়িতে বলেনা কিন্তু ঘরের ছিটকানীসমুহ ভালো করিয়া লাগাইয়া যেনো ঘুমাইতে যাই, সেই নির্দেশাবলী দিতে কখনই ভুলিয়া যায়না। আর যদি ছিটকানি লাগাইতে ভুলিয়া যাই, সেইজন্য আগেভাগেই ঘরের স্বয়ংক্রিয় তালাখানা যেনো লাগাইতে ভুলিয়া না যাই তাহা নিশ্চিত করিয়া তারপর ফোন রাখেন। সে জানে আমি অলস মানুষ, তাই মাঝে মাঝে মনে করাইয়াও দেয়। কারন ভুলিয়া যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অন্তত এইদিক দিয়া আমার উপর তাহার আত্মবিশ্বাস একেবারেই নাই।

দরজা খুলিয়া অপরিচিত এই অল্প বয়সের মেয়েটিকে দেখিয়া দরজার পাশে দাঁড়াইয়াই জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কাকে চাই?’

আমি প্রশ্ন করিলেও মেয়েটি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়া ঘটঘট করিয়া খোলা দরজা দিয়া আমার ঘরে প্রবেশ করিল। আমি অগত্যা কিছু না বলিয়া অদুরে ডাইনিং চেয়ারটা টানিয়া দিয়া বলিলাম, তুমি কি আমাদেরকে চিন বা আমি তোমাকে চিনি?

মেয়েটি হ্যাঁ বা না কোন উত্তর না দিয়া আমাদের ঘরের চারিদিকে যে কয়টা ছবি ফ্রেমে টাঙ্গানো আছে তা দেখিতে থাকিল। আমি তাহার ছবি দেখার ভঙ্গি দেখিয়া কিছু প্রশ্নের আশা করিতেছিলাম বটে কিন্তু সে ইহার কোন কিছুই বলিল না। ছবি দেখা হইয়া গেলে, বেশ খানিক্ষন পর মেয়েটি নিজেই ডাইনিং চেয়ারে আসিয়া বসিল এবং টেবিলের উপর রাখা এক যগ পানি হইতে এক গ্লাস পানি ঢালিয়া লইয়া ঢকঢক করিয়া পান করিয়া ঠাস করিয়া হাতের গ্লাসখানি টেবিলে শব্দ করিয়া নামাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস এমন করিয়া ছাড়িলো যেনো পানি খাইতে গিয়া তাহার অনেক পরিশ্রম হইয়াছে অথবা কতজনম ধরিয়া যেনো পানির আশায় বুক ধরফর করিতেছিলো।

– না, আমি আপনাকে চিনি না, কিন্তু আপনি হয়তবা আমাকে চিনিতে পারেন। আসলে আমাকে এখন অনেকেই চিনে, পুরু কাহিনি বলিলে হয়ত আপনিও আমাকে চিনিতে পারিবেন। এই পথ দিয়া যাইতেছিলাম, অনেকরাত, কোথাও কেহ জাগিয়া নাই, দেখিলাম আপনার ঘরে আলো জ্বলিতেছে, তাই এখানে আসা। আমি আপনার কোন ডিস্টার্ব করিবার মতলবে আসি নাই। কিংবা আপনার কোন ক্ষতিও করিতে আসি নাই। আপনি বিরক্ত হইতেছেন কি? আর ডিস্টার্ব হইলেইবা কি, এখন তো ভিতরে চলিয়াই আসিয়াছি। একনাগাড়ে এতগুলি কথা বলিয়া মেয়েটি আবার আরেক গ্লাস পানি ঢগঢগ করিয়া পান করিয়া লইল।

কি তাজ্জব ব্যাপার। চিনি না, জানি না, কি কারনে আসিলো, তাও আবার এতোরাতে। আমি একটু নড়িয়া চড়িয়া বসিলাম আর বলিলাম, পুরু কাহিনীটা কি তাহলে? আমিও জানার জন্য উৎসুক হইয়া বলিলাম। আর এতোরাতেই বা তুমি কাহার সাথে কি কারনে বাহির হইলে, আর তোমার পিতামাতাই বা কি রকম যে, এইরকম একটা যুবতীমেয়ে কে রাত গভীরে ঘর হইতে বাহির হইবার দয়া করিলেন?

-আরে সাহেব, ভয় পাইতেছেন নাকি? ভয়ের কোনো কারন নাই। আমার নাম শিমা। নিশ্চয় এই নামটা আপনার শুনিবার কথা। ঐ যে মেয়েটি,যে তাহার বাবামাকে রাতের আধারে একসঙ্গে খুন করিয়াছিল? পরেরদিন বড়বড় করিয়া দেশের সব কয়টা পত্রিকায় তাহার লোমহর্ষক গল্প লিখিয়া নাম প্রকাশ হইয়াছিল। আপনি পড়েন নাই সে খবর? যাইহোক, আমি আপনাকে খুন করিতে আসি নাই।

নামটা শুনিয়াই যেনো আমার গলা পর্যন্ত শুকাইয়া গেল। শরিরের শিরায় শিরায় যেন বিদ্যুতের মত এক অনুভূতি খেলিয়া গেল আর পশমের যে কয়জায়গায় অনুভূতি আঘাত করিতে পারিল না, সব কয়টাই যেন খারা হইয়া আমাকে এই সংবাদ দিয়া গেল, কেন তুমি না জানিয়া এমন একটি মেয়েকে তোমার ঘরে ঢুকিতে দিলে? তুমি তো আর পুলিশের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চে কাজ করোনা যে, এখন একটা ফোন করিলেই তোমার সাহায্যের জন্য গোটাবিশেক পুলিশ আসিয়া তোমাকে উদ্ধার করিবে। নিজেকে একটু আহাম্মক বলিয়া মনে হইতে লাগিল। কিন্তু পরক্ষনেই আবার মনে হইল, আচ্ছা ও তো আর পিস্তল, ছুরি লইয়া আসে নাই যে, আমাকে খুন করিয়া ফেলিবে, আমার সঙ্গে ও জোরেও পারিবেনা, আবার আমার আশেপাশে আরও লোকজন তো আছে, বিপদ দেখিলে গলা ফাটাইয়া চিৎকার দিলেইতো আর কোন অসুবিধা নাই। পুলিশ না আসুক, অন্তত কিছু মানুষ জন তো আসিবেই ।মনে একটু বল সঞ্চার হইল।

-তোমার না ফাঁসির আদেশ হইয়াছে? তাহা হইলে তুমি এই ভাবে এত রাতে কেমন করিয়া ঘোরাফেরা করিতে পারিতেছ? তুমি কি জেল হইতে পালাইয়া আসিয়াছ? দেখ শিমা, তুমি এখানে আসিয়া আমাকে কোন বিপদের মধ্যে ফেলিবার কোন পরিকল্পনা করিতেছ না তো?

মেয়েটি, যেন মজার একটা কথা বলিলাম, এইভাব করিয়া অট্টহাসিতে লুটাইয়া পরিবার উপক্রম হইল। ঘরের ভিতর তখন রবিন্দ্রসঙ্গিত বাজিতেছিল… মম চিত্তে … কেযে নাচে তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ… কিন্তু তাহার অট্টহাসিতে রবীঠাকুরের গানের কলিগুলি যেনো গুরুম গুরুম শব্দে কি এক অদ্ভুত আওয়াজে ঘরের চারিদিকে বিহব্বল বাতাশের মতো ঘূর্ণিপাক খাইয়া প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করিলো। তাহাতে আর যাই হোক, চিত্ত নাচিবার কোনো কারন দেখিতেছি না। বরং এক অজানা ভয়ে চিত্ত শুকাইতেছিলো। ইহার পরে আবার আরেক অজানা ভয় ঢোকিতেছিলো যে, এতোরাতে আমার ঘরে একজন মেয়েলী কণ্ঠে হাসির তামাশা আমাকে আরো শঙ্কায় ফেলিয়া দিলো। আমি ভদ্রমানুষ, সমাজে আমার নামডাক আছে, আমি সমাজের একজন ক্লিন মানুষের মধ্যে একজন। এই এতো রাতে আমার বাসায় কোনো এক অপরিচিত যুবতি মেয়ের প্রবেশ কোনোভাবেই আমি ব্যখ্যা করিতে পারিবো না। অন্তত আমার বউ, আমার পরিবার-পরিজন বিশ্বাস করিলেও অন্যকেউ ইহা সহজে বিশ্বাস করিবে তাহার কোন যুক্তি আমি খুজিয়া পাইতেছিলাম না। শঙ্কায় পরিয়া আমি মেয়েটিকে একটু শান্ত হইয়া বসিয়া তাহার যাহা বলিবার তাহা যেনো কণ্ঠ সংযত করিয়া বলিতে অনুরোধ করিলাম। এতো অট্টহাসি হাসিতে আমার ঘরের লক্ষ্মী পরিবেশকে সংকিত করিতে মানা করিয়া বলিলাম। অনেকটা আদরের সহিতই বলিলাম,  “মা তুমি আমার মেয়ের বয়সের সমান, আমি অপদস্থ হই, এমন কোনো প্রতিক্রিয়া করিও না।”

-আরেনা বাপু, এতো অস্থির হইবার কোনো কারন নাই। আর আমাকে কেউ জেলখানা হইতে বাহির হইতে দেখেও নাই আবার সকাল না হইতেই আমি আবার আমার কন্ডেমসেলে ঢুকিয়া পরিব। তোমার কোন ভয় নাই। আমি মাঝে মাঝেই এই রকম রাতে বাহির হইয়া থাকি। আজই প্রথম নয়। কয়দিনই বা আর এই পৃথিবীতে বাঁচিব বল, এত ভয় করিবার তো কোন কারন দেখিনা। জেলেই তো আছি, জেলের আবার ভয় কিসের? তবে আমার ফাঁসি হওয়াতে আমার মনের অনেক কষ্ট লাঘব হইয়াছে বলিয়া আমি মাঝে মাঝে মনের আনন্দে ঘুরিয়া বেড়াইতে পারিতেছি। অন্তত একটা সুরাহা তো হইয়াছে। পাপীর তো শাস্তি হইয়াছে।

মেয়েটি আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন না করিয়া  সরাসরি ‘তুমি’ এবং এমন ভাবে ‘বাপু’ শব্দটি উচ্চারন করিল যেনো হটাত করিয়া আমার বুকের কোনো এক জায়গায় একটি মানবিক সম্পর্ক টানিয়া আনিয়া জোড়া লাগাইয়া দিলো। মনে হইলো, আমি বুঝি সত্যিই তাহার ‘বাপু’। অন্তরে একটা শীতলপরশ একঝলকের জন্য বিদ্যুতের ন্যায় আচমকা একটা সাড়া দিয়া নড়িয়া উঠিল। আমি মেয়েটির দিকে অনেক্ষন চাহিয়া থাকিলাম, যেনো কোনো এক সুদূর অচেনা এক দেশ হইতে মেঘের ভেলায় ভাসিয়া আসিয়া আমাকে এক খন্ড শিক্ত জলে ভিজাইয়া দিলো। তাহাকে এখন আর আমার আগের মুহূর্তের মতো ভয়ঙ্কর এবং অস্বাভাবিক মনে হইলো না।মনে হইল মেয়েটি আমার পরিবারের যেনো কেহ।

-তোমার ফাঁসি হইয়াছে এই খবরে তুমি এত আনন্দিত কেন?

শিমা এইবার আর হাসিল না। অনেকক্ষন চুপচাপ থাকিয়া তাহার ছোট গালের দুইপাশে তাহার দুইহাত ঠেস দিয়া কাধের ব্যাগখানি টেবিলের উপর রাখিয়া আমার চোখের দিকে তাকাইয়া প্রশ্ন করিলঃ তুমি কি কখনো কোন ফাঁসির আসামীর সঙ্গে ফাঁসীর আগের রাতে গল্প করিয়াছো?

-আমি বলিলাম, না, সে সুযোগ আমার আসে নাই। তবে জানিতে অনেকবার মন চাহিয়াছিল তাহাদের মনের অবস্থা কি, জীবন সম্পর্কে তাহাদের উপলব্ধি কি, কিংবা তাহার ওই সময়ের ভাবনা কি, কি নিয়ে তাহারা কিভাবে কি ভাবে বা কাউকে কি কোন কিছু বলিয়া যাইতে ইচ্ছা করে কিনা ইত্যাদি। অথবা এমন কোনো ভাবনা কি আসে, আহা যদি আরেকবার সুযোগ আর স্বাধীনতা পাইতাম, তাহা হইলে ফাসি হয় এমন কোনো কাজ আমি করিবো না, অথবা, আহা এমন কি কোন জায়গা আছে, যেখানে আমি লুকাইয়া গেলে আমাকে আর কেহই খুজিয়া পাইবে না? 

– তাহা তো ঠিকই। যুগেযুগে প্রতিদিনই তো আর ফাঁসির কাজটা হয়না যে, আজকে সুযোগ পাইলাম না বলিয়া আগামিকালের ফাঁসিটায় তা উপভোগ করা যাইবে। এইটাতো আর পুকুরপাড়ে গিয়া বরশি দিয়া মাছ ধরিবার মতো ঘটনা না যে, আজ পাইলাম না তো কাল পাইয়াই যাইবো। আর পাইয়া গেলে ওই ধরাশায়ী মাছকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লইবো, সে পানির ভিতরে কিভাবে সাতার কাটিতে কাটিতে হতাত করিয়া মানবের বরশির ফাঁদে পা দিয়া তাহার অনবদ্য জলীয় জীবন হইতে এক নিমিসে স্থলের মুক্ত বাতাসে আসিয়া প্রানবিনাস করিয়া পগারপার হইয়া গেলো। মৎস্যদের সাহিত্যক কেহ থাকিলে হয়ত তাহার কোন এক কাব্যগ্রন্থে লিখিত, “স্থলের মুক্ত বাতাস শুধু প্রানের জিবনীশক্তিই জোগায় না, ইহা কখনো কখনো কিছু কিছু প্রানীর প্রানের নাশের কারনও হইয়া দাড়ায়”।

মেয়েটি অনেক সুন্দর করিয়া গুছাইয়া কথা বলিতে পারে বুঝিতে পারিলাম। “স্থলের মুক্তবাতাস শুধু প্রানের জীবনিশক্তিই জোগায় না, ইহা কখনো কখনো প্রাননাশের কারনও হইয়া থাকে” কথাটা আমার খুব মনে ধরিলো। সে কি মনে করিয়া এই রকম একটা তত্ত্ব কথা বলিল তা আমার বোধগম্য হইলো না তবে বাচিয়া থাকিবার জন্য যাহার যেখানে যাহা প্রয়োজন, সে তাহাই সম্ভবত বুঝাইয়া দিলো। আমি এতোক্ষন অফিসের জটিল একটা একাউন্টিং নিয়া কাজ করিতেছিলাম কিন্তু এই মেয়েটি আসিয়া এখন আমাকে আরো জটিল সময়ের মধ্যে ফেলিয়া দিলো বলিয়া আমার মনে হইতে লাগিলো। কিন্তু খারাপ লাগিতেছিলো না। তাই, অফিসের কাজ একপাশে রাখিয়া তাহার সাথে গল্প করিতেই মন চাইলো।

আমি এইবার তাহাকে কিছু খাইবে কিনা জিজ্ঞাসা করিতেই বলিয়া উঠিল যে, “জেলখানায় না গেলে সে বুঝিতে পারিতো না, চার দেওয়ালের ভিতরেও কতো ধরনের নীতি আর কত আকারের দুর্নীতি রহিয়াছে। যাহাদের টাকা আছে, তাহাদের জন্য নীতি এক রকমের, যাহারা বিখ্যাত, তাহাদের জন্য পলিসি আরেক রকমের, যাহাদের কেউ নাই, তাহারা তো কোনো প্রানিকুলের মধ্যেই গন্য হয়না। যাকগে সেইসব কথা, তোমরা থাকিবে এই পৃথিবীতে, যেইভাবে তোমরা আরাম আয়েশ করিতে চাও, সেইভাবেই পলিসি করো কিংবা নিতী পাল্টাও তাহাতে আমারই কি আর আমি বা কে তাহার বিরুদ্ধে নালিশ করিবার?আমি ভালো খাইতে পারিতেছি, আমার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা আছে, ইহাতেই আমি খুশি। এই যেমন, আজ আমি খাইয়াছি ইলিশের তরকারী, ঘনডালের চর্চরী, সঙ্গে ডিমের হালুয়া ছিল। খাওয়ার পর আবার আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলো, আমি আরো কিছু খাইতে চাহি কিনা। আমি আইসক্রিম খাইতে খুব পছন্দ করি, বলিতেই দেখি, একটু পরে খুব মজার আইসক্রিম চলিয়া আসিলো। আমি তো ভালোই আছি। একটা জিনিস জানো? কোরবানীর পশুকে তাহাদের মালিক কোরবানী করিবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত অনেক আদর যত্ন করিয়া, ভালো ভালো খাবার খাওয়াইয়া, গোসলপাতি করাইয়া ঠিক সময়মত তাহাকে হুজুর কিংবা পাগড়ীপরা মুসুল্লী দিয়া গলায় ছুরি দিয়া একনিমিসে কতল করিয়া দেয়। আমি হয়তবা সেই রকমের একজন কোরবানীর পশুর গননায় আছি। কোরবানীর পশুকে জবাই করিতে কাহারো হৃদয়ে কোন কম্পন সৃষ্টি হয়না। বরং দল বাধিয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েসহ সব মুরুব্বীরা ঈশ্বরের নাম জপিতে জপিতে তাহাকে প্রানে মারিয়া ফেলে।

আমি একটা সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিলাম, তুমি কি সিগারেট খাও?

-দাও একটা। খাওয়ার অভ্যাস তো ছিলোই, জেলে যাওয়ার পর আর খাইতে পারি নাই। আমি বুঝি না, জেলের মানুসগুলি যাহা চাই, তাহাই আমাকে দেয় কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাকে একটা সিগারেটও দিলো না। অথচ নেশার জগতের সবচেয়ে বড় আভাসভুমি হচ্ছে জেলখানা। দল বাধিয়া সবাই নেশা করে। ঐখানে নেশা করিবার কারনে পুলিশ কখনো কাউকে গ্রেফতার করে না। অবশ্য আমি কখনো সিগারেট চাইও নাই।

শিমা আমার সিগারেটের প্যাকেট হইতে একটা সিগারেট লইয়া আগুন ধরাইয়া একমুখ ধোয়া পুরা রুমের ভিতর ছড়াইয়া দিয়া একটা হাসি দিয়া বলিল- আহ কতোদিন পর এমন করিয়া সিগারেট ফুকি নাই। হয়ত এই সিগারেটের জন্যই তোমাকে আমার মনে থাকিবে। আমার আর মনে থাকিবে কি, আমি তো মরিয়াই যাইবো, বরং মনে থাকিবে তোমার। ওই একই হইলো। তুমি আমাকে মনে রাখিবে না আমি তোমাকে মনে রাখিবো, ইহাতে কোনো কিছুই পরিবর্তন হইবে না। না পরিবর্তন হইবে তোমার অফিসের কাজের, না সমাজের, না অন্য কাহারো। এই পরিবরতনের সাথে আমাদের প্রিথিবী অনেক পরিচিত। ইহাকে আমাদের এই পৃথিবী সাধারন ঘটনার মধ্যে গন্য করিয়াই তাহার মনুস্যকুলকে এক প্রজন্ম হইতে আরেক প্রজন্মে লইয়া যায়। ইহাকেই হয়ত আমরা ইতিহাস বলিয়া চালাইয়া দেই।

এতোক্ষন আমি যেই ভয়টা পাইতেছিলাম, সেই ভয়টা এখন আর নাই। মনে হইতেছিলো শিমা আমার পরিচিত কেউ। বলিলাম, তোমার জেলের ভিতরের অভিজ্ঞতা, ফাঁসির খবরে তোমার প্রতিক্রিয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি বলো তো দেখি শুনি।

-আচ্ছা, তোমার বাসায় কি কফি আছে? খুব কফি খাইতে ইচ্ছা করিতেছে। এই বলিয়া শিমা নিজেই আমাদের রান্না ঘরের ভিতরে ঢূকিয়া গ্যাসের চুলা জ্বালাইয়া দুইকাপ ব্ল্যাক কফি বানাইয়া এককাপ আমাকে আর এককাপ সে নিজের জন্য রাখিয়া গল্প করিতে আরম্ভ করিলো।

-গল্পটা শুরু কবে হইতে শুরু হইয়াছিলো তাহা আমার জানা নাই। তবে আমার জীবনে আদর আর আহ্লাদের কোন কমতি ছিলো না। যখন যাহা চাহিয়াছি, তখনই তাহা আমি আমার মতো করিয়া পাইয়াছি। সুখেই দিনগুলি কাটিতেছিলো। সচ্ছল পরিবার, ছোট পরিবার। খুব একটা বিড়ম্বনা নাই। বন্ধুবান্ধব যাহারা ছিলো, তাহারাও আমার অবস্থা বুঝিয়া মানিয়া চলিতো। লেখাপরা করিতেছিলাম কিন্তু খুব ভালো লাগিতেছিলো না। বাবা সরকারী চাকুরী করেন কিন্তু সময় যতোটা পাইতেন, তাহা হইতে বেশি বাহিরে থাকিতে পছন্দ করিতেন। মা গৃহিণী মানুষ, অতো চালাক চতুর নহেন, সামান্যতেই তিনি সুখি। আমাদের যত্ন আদিতে তাহার কোন কমতি ছিল না। তারপরেও আমার মাকে মনে হইতো তিনি সংসারে একা। কখনো কখনো মা বাবার সাথে কথা কাটাকাটি করিতো বটে কিন্তু মা ইচ্ছা করিয়াই হারিয়া যাইতেন। সংসারের শান্তি থাকুক এই ভাবিয়াই চুপ থাকিতেন। তাহার সাধ আহ্লাদের মধ্যে যাহা ছিলো তা নিতান্তই কয়েকটা টিভি সিরিয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মাকে আমি খুব ভালোবাসিতাম কিন্তু মায়ের এই কম্প্রোমাইজের গুনটি আমি কখনোই মানিয়া লইতে পারিতাম না। ফলে, বাবার সাথে আমার প্রায়ই খিটখিটে ঝগড়া লাগিয়া থাকিতো। বাবাও আমাকে ভালোবাসিতেন বটে কিন্তু আমার পরাশুনা লইয়া, আমার আচার আচরনে তিনি মাঝে মাঝে এতোই বাড়াবারি করিতেন যে, মনে হইতো এই লোকটি আমার অপছন্দের তালিকায় শীর্ষে রহিয়াছেন কিন্তু তাহাকে তাহা আমি বুঝাইতে চাহি নাই।

এইভাবেই আমার দিনগুলি কাটিয়া যাইতেছিলো। মাঝে মাঝে বন্ধুদের বাসায় বিশেষ বিশেষ উৎসবের বাহানায় আমি বাসার বাহিরে থাকিতে পছন্দ করিতাম, নাইট ক্লাবে ঘুরিতাম, অনেকরাত পর্যন্ত আড্ডা দিতাম। আমার মা কিছু বুঝিতে পারিলেও খুব একটা উচ্চবাচ্য করিতেন না। করিলে আবার খামাখা সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয় এইভয়ে বাবাকেও মা খুব একটা কানে দিতেন না। বিশেষ করে আমার নেশা করিবার ব্যাপারটা তো তিনি বেমালুম চাপিয়া থাকিতেন। মা আমার অনেকদিন অনেকভাবে একা গায়ে হাত বুলাইয়া, আদর করিয়া, মা-সোনা বলিয়া নেশা না করিবার জন্য অনেক জ্ঞ্যানদান করিতেন কিন্তু নেশা এমন এক জিনিস, একবার শুরু করিলে, শেষে নেশাই তোমাকে টানিয়া লইয়া যাইবে। ঐখান হইতে আর বাহির হইবার জোগার থাকে না। আমারো ঠিক তাহাই হইয়াছিলো। আমি প্রায় প্রতিদিন নেশা করিতাম। আমি যে একটা মেয়ে, আমার যে অনেক কিছু লুকাইবার আছে, এইগুলি আমাকে কখনই বাধা দেয় নাই, না আমার বিবেক না আমার বন্ধুবান্ধব। মায়ের বাধা আমার কাছে কোনো বাধাই মনে হইতো না। ফলে নেশারই জয় হইয়াছিলো।

আমি অনেক্ষন ধরিয়া শিমার কথাগুলি শুনিতেছিলাম। এইবার আমি তাহাকে প্রশ্ন করিলাম, ‘আচ্ছা কে তোমাকে এইরুপ সঙ্গ দিতো?’

– অসৎ সঙ্গ দেওয়ার জন্য মানুষের অভাব হয় না। শুধু টাকা হইলেই চলে। দেখিবে, তোমার আশেপাশে এমনসব মানুষের ভীড় জমিয়া গিয়াছে যাহা তোমার মাথাটাকে, তোমার আত্মসম্মানবোধটাকে ভূলুণ্ঠিত করিতে একটু সময়ও অপচয় হয় না। নেশার রেশ ধরিয়া প্রথমে একঘর হইতে আরেকঘর, তাহার পর একবাড়ি হইতে আরেকবাড়ি, এবং ধিরে ধীরে ধিরে একপাড়া হইতে আরেকপাড়ায় এই বদনাম ছড়াইতেই থাকিবে। আর যদি একবার এই বদনাম ছরাইতে থাকে আর মন তাহা গ্রাহ্য না করিয়া আরো অদম্য গতিতে তাহার শাখা প্রশাখা বাড়াইতে থাকে তখন বিনাশ ছাড়া আর কিছুই নিজের জন্য বহিয়া আনে না। তখন শুধু চাহিয়া চাহিয়া নিজের সর্বনাশ অবলোকন করা ছাড়া আর কিছুই করিবার থাকে না। আমারো তাহাই হইয়াছিলো। আমি আমার জীবনে যাহা করিয়াছি, এখন ভাবিলে আমার নিজেরও মনে হয়, আমি ইহা কিভাবে করিতে পারিলাম? ইহা করা আমার কখনোই উচিত হয় নাই। কিন্তু যে সাপ একবার তাহার বিষদাত ফুটাইয়া তাহার সমস্ত বিষনালী খালি করিয়া সর্বনাশের কামড় মারিয়া দিয়াছে, তাহা হইতে পরিত্রান পাওয়ার জন্য সাপের হইতে সাপে যাহাকে কামড় দিয়াছে তাহার চিকিৎসা অনেক জরুরী হইয়া ওঝার প্রয়োজন হইয়া পরে। আমি ওঝার সাহায্য নিতে হইবে ইহাও বুঝিতে পারি নাই। 

এইভাবে আমি যেনো আস্তে আস্তে কোন এক অন্ধকার জীবনের শহরে ঢোকিয়া গেলাম। অন্ধকার আর কালোর মধ্যে একটা তফাত আছে। কালোর একটা রঙ আছে কিন্তু অন্ধকারের কোনো রঙ নাই, আছে অনিশ্চয়তা আর প্রতিনিয়ত বিপদের হাতছানি। কিন্তু বয়স বলে একটা কথা আছে। এই বয়সে তাহার মন আর যুক্তি বাস্তবের সাথে কতটা যে ফারাক, তাহাতে আর যাই হোক তাহার আত্মার শান্তি হয় না। আত্মা, মন, আর যুক্তি যখন একই সুতায় থাকে না, তখন প্রতিনিয়ত শুরু হয় অন্তর্দাহ, আর এই অন্তর্দাহ হইতে শুরু হয় কলহ। আর একবার যদি কলহ বাধিয়া যায়, তাহা আর  নিভিবার উপায় থাকে না। অন্তর্দাহ নিভাইবার জন্য জলভর্তি কলশী কিংবা তীরভর্তি নদীর প্রয়োজন নাই, প্রয়োজন সময়ের সাথে পরিবর্তনের ইচ্ছা। ইহা আমার ছিলো না। ফলে অন্তর্দাহ যেমন নিভিতেছিল না, তেমনি বাতাসের স্পর্শ পাইয়া উহা আরো তীব্র দাবদাহে পরিনত হইতেছিলো। আমাদের পরিবারেও তাহাই ঘটিতে লাগিলো।

প্রতিদিন সকাল হইলেই আমি কেনো দেরি করিয়া ঘুম হইতে উঠি, কেনো আমার ক্লাশের ফলাফল ভালো নয়, কেনো আমাকে প্রতিদিন বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় যাইতে হইবে, আর তাহাদের সঙ্গে আড্ডায় যাইয়া কেনো রাত অবধি থাকিয়া বাসায় ফিরিতে হইবে, এইসব ব্যাপারে কথা শুনিতে হইতো। বাবার সব কথায় আমি প্রতিবাদ করিতাম না কারন আমি জানিতাম, আমার প্রতিবাদে বাবার কাছ হইতে আমার সাহাজ্য বন্ধ হইয়া যাইবে, আর আমার মায়ের এমন কোনো গুপ্ত তহবিলও ছিলো না যেখান হইতে বাবার সাহাজ্য ছাড়াই আমি আমার যাবতিয় শখের মনোবাঞ্চনা পুরুন করিতে পারিবো। তাই মাঝে মাঝে আমি বাবার অকথ্য গালিগালাজের ব্যাপারটা অনেকটা উপেক্ষা করিয়াই আমি বাবার সাথে এমন ব্যবহার করিতাম যেনো, বাবা ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে আর কাউকে আমি বেশী ভালোবাসিনা। আর আমার বাবা হইতে আরো ভালো বাবা এই পৃথিবীতে আর একটাও সৃষ্টি হয় নাই। তিনিই যেনো সর্বশ্রেষ্ঠ বাবাদের মধ্যে একজন। ইহা ছিলো একটা নকল ভালোবাসা। হইতে পারে, বাবারা বা মায়েরা নকল ভালোবাসা বুঝিতে পারেন না। তাহাদের ভালোবাসায় কোনো খাদ নাই।

এইভাবেই আমার দিন চলিতেছিলো। আমার রুপের কথা যদি তোমাকে বলিতে যাই, সেই টা মনে হয় আর দরকার নাই। আমিতো তোমার সামনেই এখন বসিয়া আছি। আমি দেখিতে কেমন, কেমন আমার চোখ, নাক, গাল কিংবা আমার মুখমন্ডল, ইহা তোমাকে আর বিশেষণ দিয়া বুঝাইতে হইবেনা। অনেক ছেলেবন্ধুরা আমার এই চেহারার প্রতি অনেক আকৃষ্ট হইয়া হয়ত অনেকে অনেক কবিতা, গল্প লিখিয়া থাকিতে পারে, তাহা আমার জানা নাই। তবে অনেকের রাতের ঘুম যে অনেকাংশেই বিঘ্নিত হইতো সেটা আমি জানিতাম। আমাকে নিয়া ছেলে মহলে অনেকের  সঙ্গে অনেকের দুই একবার অনেক যুদ্ধও যে হয় নাই তাহা নয়। কিন্তু আমি প্রকৃতভাবেই কাউকে এমন করিয়া ভালোবাসি নাই যাহাকে তোমরা আধুনিক কালের ছেলে মেয়েদের মধ্যে ভালোবাসার সীমানা টানিয়া থাকো। তবে এইটা ঠিক যে, মনুষ্যকুলে আমি যাহাকে সবচেয়ে বেশী আদর করিতাম তাহা হইলো আমার ছোটভাই। বড় মিস্টি করিয়া আমাকে আপু বলিয়া ডাকে, বড্ড দুস্টুমী করিয়া আমার পাশে আসিয়া তাহার যতো আবদার আছে সব খুলিয়া বলে। আমি তাহাকে কখনো গাল টিপিয়া, কখনো বুকে চাপিয়া ধরিয়া, কখনো আবার মিথ্যা ভয় দেখাইয়া বলিতাম, আমি তোমাকে ছাড়িয়া অনেক দূর চলিয়া যাইবো, তখন দেখিবো তুমি কাহাকে এতো কস্ট দাও। আসলে আমার ভাইটি আমাকে কখনো কষ্ট ও দেয় নাই। নিছক মজা করিবার জন্য তাহাকে আমি মিথ্যা ভয় দেখাইতাম। বুঝিতে চাহিতাম, আমার অই কথায় সে কতটুকু বিচলিত কিংবা মন খারাপ করে। অনেকদিন হইলো আমি আমার সেই ছোট ভাইটিকে দেখিতে পাই না।

এই বলিয়া শিমা একটু থামিলো বটে কিন্তু পরক্ষনেই বুঝিলাম, সে ফুপিয়া ফুপিয়া কাদিতেছে। নিঝুমরাতে এই অসম বয়সী দুই মনুষ্য যুগলের মধ্যে কোনো ভাষার আদান প্রদান হইতেছিলোনা বটে কিন্তু দুইজনের অন্তরের ভিতরে যাহা ঘটিয়া যাইতেছিলো তাহা অদৃশ্য ঈশ্বরের অজানা ছিলনা। চিনি না, জানি না, কখনো দেখি নাই, এমন একজন মানুষের গল্প শুনিয়া আমার মনের ভিতরেই বা কেনো ব্যথায় একটু মোচর দিয়া উঠিতেছে? আমি তাহার ভাইয়ের ভালোবাসার কথা মনে করিয়া আমি যেনো তাহার ওই ছোট ভাইটিকেও চোখে দেখিতে পাইতেছি। মনে হইতেছিলো, আহা, আমারও যদি এমন একটা ছোট ভাই থাকিতো? সিমার ছোট ভাইয়ের প্রতি এতো ভালোবাসার অনুভুতি দেখিয়া আমার দুই মেয়ের ছবি ভাসিয়া উঠিল। কি অদ্ভুদ এই ভাইবোনের সম্পর্ক। কখনো ঝগড়া, কখনো হাতাহাতি, কখনো খুব ক্ষুদ্র একটা জিনিষ লইয়া তাহাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি আবার কখনো একসঙ্গে এক টেবিলে বসিয়া রাজ্যের হাসাহাসি, আরো কতো কি? ভালোবাসার মানুষ যখন কাছে থাকে, তখন তাহাকে যতটা না আপন মনে হয়, যখন সে কাছে থাকে না, তখন তাহার জন্য প্রান বড় আনচান করে। মনে হয়, একবার যদি আবার কাছে পাইতাম, তাহা হইলে অনেক আদর করিয়া সব ব্যাথা বেদনার জল তাহার কাছে সমর্পণ করিয়া আরেক বার ক্ষমা চাহিয়া বলিতাম, তোমাকে ছাড়া আমার চলিবেনা। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি।

রাত অনেক হইয়াছে। কেহ জাগিয়া আছে বলিয়া আমার মনে হয়না। মাঝে মাঝে ঐ দূরে নাইট গার্ডের চিৎকার শুনা যায়, কিংবা অনেক রাতের বিমান যাত্রিদের নিয়া কিছু কিছু বিমান নিশাচরের মতো আমাদের এলাকা দিয়া উড়িয়া যাইবার সময় বিকট একটা শব্দ করিয়া কোনো এক অজানা অন্ধকারের রাস্তা ধরিয়া একদেশ হইতে আরেক দেশে মিশিয়া যায়, সেই চেনা শব্দ দূর হইতে ভাসিয়া আসিতেছে। কিন্তু ইহাতে আমাদের মধ্যে কোন বিরক্তবোধ হইতেছে না। দেখিলাম, সিমার চোখে একটু একটু জলের আভা ঘরের আলোতে চিক চিক করিতেছে। চোখের জল যখন পরি পরি করিয়াও পরিতেছে না, তখন তাহা চোখের পাপড়ির সঙ্গে এক হইয়া এমন একটা বিন্দুর সৃষ্টি করে যে, মনে হইবে চোখের দুই ধারে যেনো একটা স্বচ্ছ হিরার খন্ড ঈশ্বর বসাইয়া দিয়াছেন। সিমার চোখের কোনায় তাহার দুঃখের বহিরপ্রকাশ যেনো এমন করিয়াই ঐ একখন্ড হিরার জল চিকচিক করিয়া ফুটিয়া উঠিতেছিল। 

সিমা তাহার চোখের জল আমার কাছ হইতে লুকাইবার কোনো চেষ্টাই করিলো না।আমার দিকে ছলছল নেত্রে তাকাইয়া, দুই হাত দিয়া চোখের জল মুছিয়া অতি সাধারন ভঙ্গিতে বলিল,

– আরেক কাপ কফি খাই? তুমিও কি কফি খাবে?

আমি কফি খাইবো কি খাইবো না, ইহার প্রতি উত্তোরের জন্য কোন অপেক্ষা না করিয়াই সিমা চেয়ার ছাড়িয়া নিজেই আমাদের রান্নাঘরে কফি বানাইতে চলিয়া গেলো। সিমা একটা নীল ওড়নার সহিত হলুদের কামিজ পড়িয়াছে। কম্বিনেসন করিয়া হয়ত সাদা স্যালয়ার পরিয়াছে কিন্তু খারাপ লাগিতে ছিলো না। আর জেলখানায় তো নিজের আলমারী থাকে না, হয়ত এইকয়টা জামাই তাহার কাছে রহিয়াছে। কতই বা বয়স তাহার। আমার মনটা বড্ড কেমন কেমন যেনো করিতেছিলো। আঘাত করিলেই শুধু অন্তরে ব্যথা হয় এমন নয়। আমাদের চারিদিকে অহরহ এমন কত কিছু ঘটিতেছে যাহার ইতিহাস শুনিলে আঘাত যিনি পাইয়াছেন, তাহার হইতেও আঘাত বেশী প্রতিয়মান হয় যিনি ঐ ইতিহাস শুনিতেছেন। আমারও তাহাই হইতেছিল। আমিও যেনো কোথায় বিনা কারনে আঘাতপ্রাপ্ত হইতেছিলাম।

অনেক্ষন হইয়া গিয়াছে সিমা কফি বানাইতে গিয়াছে, এতক্ষনে কফি বানানো হইবার কথা। দেরী দেখিয়া আমিও রান্নাঘরে ঢুকিলাম। দেখিলাম, এক হাতে সিমা একটি ছোট চামচ লইয়া কফির কাপের মধ্যে কফি শুধু নাড়াচাড়াই করিতেছে, অথচ আর নাড়িবার প্রয়োজন নাই। বুঝিলাম তাহার মনোযোগ ঐ কফির কাপের মধ্যে নাই। সে যেনো কোথায় হারাইয়া গিয়াছে। সে যে একটা অপরিচিত বাসায় এতো রাতে কাহাকেও না বলিয়া আসিয়াছে, তাহার যে অতি তারাতাড়ি এইখান হইতে আবার চলিয়া যাইবার তাড়া থাকিবার দরকার, আমি তাহার চোখে মুখে, চেহাড়ায় ইহার কোনো চঞ্চলতা দেখিতে পাইলাম না।

আমার উপস্থিতি টের পাইয়া সিমা যেনো সম্বিত ফিরিয়া পাইলো। বুঝিলাম, এতোক্ষন সময়টা সিমার কাছে থামিয়াই ছিলো। একটু লজ্জা পাইলো বটে কিন্তু মুচকী হাসিতেও হাসিলো না। কফি বানানো হইয়াছে। আমরা যার যার কফি হাতে নিয়া আবারো আমাদের ডাইনিং চেয়ারে বসিলাম।

আরো একটা সিগারেট ধরাইয়া আমি সিমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম

-সিমা, শুধু কি বাবা মার প্রতি রাগের কারনেই তুমি তাহাদের খুন করিলে? কিভাবে খুন করিলে? খুন করিবার সময় কি তোমার মন একটুও বিচলিতবোধ করে নাই? তোমার মধ্যে কি একবারের জন্যও মায়া, মহব্বত, তাহাদের আদর, কিংবা এমন কিছু মনে পড়ে নাই যাহাতে তুমি চিরতরে তাহাদের খুন না করিয়া তাহাদের ক্ষমা করিয়া দিয়া অন্তত প্রানে বাচাইয়া দিতে পারিতে? অথবা খুন করিবার পর তোমার মনের অবস্থা কেমন হইয়াছিলো? তুমি কি একটু সময়ের জন্যও কাদিয়াছিলে? অথবা এমন কিছু কি ভাবিয়াছো যে, আহা, আমি ইহা কি করিলাম ইত্যাদি?

সিমা আমার সিগারেটের প্যাকেট হইতে আরো একটি সিগারেট লইয়া ম্যাচের কাঠি কয়েকবার চেষ্টা করিয়া জালাইতে না পারিয়া আমার জলন্ত সিগারেটের আগুন হইতে তাহার সিগারেটখানা ধরাইয়া একগাল ধুয়া ছাড়িয়া বলিতে লাগিলো,

– মানুষ যখন নেশায় থাকে তখন তাহার অবস্থা এক, আর যখন নেশা কাটিয়া যায়, তখন তাহার অবস্থা থাকে অন্য রকম। তুমি কি কখনো নেশা করিয়াছো? নেশা মানুষকে শুধু স্বার্থপরই বানায় না, তাহাকে নেশা এমন করিয়া চাপিয়া ধরে যে, তখন তাহার কাছে অন্য আর কিছুই বাস্তব বলিয়া মনে হয় না। সে হয়ে উঠে এক অদম্য অপ্রক্রিস্থিত প্রানি যাহার না আছে কোনো সমাজ, না আছে কোনো বন্ধন, না আছে কোন মহব্বত, না আছে কোনো সংসার। হয়ত বা আমিও সেই রকম একটা ঘোরের ঘরেই ছিলাম। তাহাদেরকে আমার আপনজন বলিয়া একটুও মনে হয় নাই। আমার ছোট ভাইটিও তাহাদের পাশেই ছিলো, আমি একবারের জন্যও মনে করিতে পারি নাই যে, আমি না হয় তাহাদের হারাইবো, কিন্তু আমার ছোটভাই যাহাকে আমি আমার প্রানের চেয়েও বেশী ভালোবাসি, সে কেনো তাহার বাবা মাকে হারাইবে? আমার শুধু মনে হইতেছিল যে, তোমরা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়াছো, আজ তাহার পরিনাম ভোগ করিবে। এই পরিনাম তাহাদের অপরাধের তুলনায় কত বড় শাস্তি, কিংবা এই পরিনাম আদৌ শাস্তি কিনা অথবা এই পরিনাম প্রকারান্তে আমি আমাকেই আরো অধিক শাস্তি দিতেছি কিনা তাহা আমার মনের অজান্তেও আবির্ভাব হয় নাই। ঈশ্বর যখন কাউকে শাস্তি দিতে চাহেন, তখন তাহার দ্বারাই তাহার শাস্তির পথ প্রসারিত করিয়া দেন। ঈশ্বর সব সময়ই নির্দোষ থাকেন।

-কিভাবে তুমি এমন কাজটি এতো সহজে করিলে? আমি সিমাকে প্রশ্ন করিলে, এইবার সিমা আমার দিকে একটু রাগের সহিতই আচরন করিলো।

-আমার আর এই প্রসঙ্গে কোনো কথা বলিতে ভালো লাগিতেছে না। অন্য কথা বলো।

বুঝিলাম, সিমা বিরক্ত হইতেছে। ওকে আমার বিরক্ত করিবার কোন ইচ্ছাই নাই। শুধু জানিতে মন চাহিতেছিলো, তাই জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। এখন আমার জানিলেও যাহা হইবার তাহাতে কোনো রুপ পরিবর্তন হইবে না, আর না জানিলেও ঘটনার কোনো ব্যতয় হইবে না।

– আচ্ছা, আচ্ছা সিমা, তোমাকে আর আমি এই ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করিবো না। তবে তোমার যাহা বলিবার ইচ্ছা হয় তাহাই আমাকে বলো। তোমার কথা শুনিতে আমার ভাল লাগিতেছে।

সিমা এইবার আপন মনে বলিতে লাগিলো-

– জেলখানায় বসিয়া আমি অনেকবার অনেক কিছু ভাবিয়াছি। মায়ের কথা ভাবিয়াছি, বাবার কথা ভাবিয়াছি, আমার ছোট ভাইয়ের কথা ভাবিয়াছি, আমার বন্ধু বান্ধব্দের কথা ভাবিয়াছি, আরো ভাবিয়াছি আমার আত্মীয়স্বজনের কথা। বারবার শুধু এইটুকুই মনে হইয়াছে, আমি যাহাদেরকে শাস্তি দিবার জন্য এতোসব পন করিয়াছিলাম, আসলে তাহারা কেহই শাস্তি পান নাই, শাস্তি পাইয়াছি আমি নিজে। আমি জানি, আমাকে আজ মুক্ত পৃথিবীর আলোবাতাসে ছাড়িয়া দিলেও আমি আর আগের অবস্থানে ফিরিয়া যাইতে পারিব না। যাহারা আমার জীবনের সব আনন্দ, সব সমস্যা সমাধানের জন্য তাহাদের প্রানের ঝুকি পর্যন্ত নিতে প্রস্তুত ছিলেন, আমি তাহাদেরকে নিজহাতে চিরতরে বিদায় করিয়া দিয়াছি। এখন কেনো জানি বারবার সকাল হইলেই মনে হয়, আহা যদি বাবা আমাকে আবার বকা দিতে আসিতো, আহা যদি মা এসে বলিতো, ‘সিমা এবার বিছানা ছাড়ো, উঠো, অনেক বেলা হইয়াছে, নাস্তা খাবে’। কিংবা আমার ছোট ভাইটি যদি আমার ওরনা টানাটানি করিয়া আমাকে জালাতন করিয়া অতিষ্ঠ করিয়া তুলিত? কিন্তু আমি জানি, আজ আর কেহই নাই। চোখে জল আসে, কিন্তু মুছিয়া দিবার মানুষ নাই। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অসহায় বলিয়া মনে হয়, কিন্তু আদর করিয়া কাছে টানিয়া ভরসার কথা শুনাইবার কোন মানুষ নাই। জেলখানায় বসিয়া যখন পূর্ণিমার আকাশ দেখি, অথবা ঘোর বৃষ্টি নামা দেখি, তখন আমার বাড়ির কথা মনে হয়। মনে হয়, কতদিন নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়াইয়া আকাশ দেখা হয় নাই, কতদিন দাদুর বাড়ির টিনের চালে টিপটিপ বৃষ্টির ঝনঝন শব্দ শুনা হয় নাই। কষ্ট হয় না বলিলে মিথ্যা বলা হইবে কিন্তু কি আরো এক অদ্ভুত কারনে জানি দুই চোখ ভিজে আসে। এখন আর নেশা করিতে ইচ্ছা করে না। নেশার প্রতি আর আমার কোন আকর্ষণও নাই। তাহার পরেও মনে হয়, মায়ের বকুনির জন্য আমি আজ নেশাগ্রস্থ, বাবার ধমকের জন্য আজ আমি নেশাগ্রস্থ। জানো? যা হারাইয়া যায়, আর যাহার সব কিছু হারাইয়া যায়, সে জানে কি হারাইয়া গিয়াছে আর কাকে হারাইয়া নিঃস্ব হইয়া গেছে।

আজ শুধু মনে হয়, যদি আমি উহা না করিতাম, যদি এমন কিছু করিতাম যাহা আবার ফিরিয়া পাইতাম, অথবা এমন কিছু যাহা আবার ফিরিয়া আসে। তাহা হইলে আজ শরতের সকাল, শিতের পিঠা, মায়ের অযথা বকুনী, ভাইয়ের অযাচিত আবদার, সেই দাদু বাড়ির আঙ্গিনায় বসিয়া একগুচ্ছ দুরন্ত বালক বালিকার সঙ্গে হৈচৈ, কোনো কিছুই জীবন হইতে হারাইয়া যাইতো না। তোমরা বাচিয়া থাকিবে, হয়ত একদিন সময়ের রেশ ধরিয়া তোমরাও আমার মত এই পৃথিবী হইতে বিদায় লইবে। অনেকেই তোমাদের জন্য কাদিবে, কেউ চিৎকার করিয়া বলিবে, তোমাকে ছাড়িয়া যাইতে আমার বড় কষ্ট। কিন্তু আমি যেদিন বিদায় হইবো, তখন সারা পৃথিবীর মানুষ জানিবে, আমি কোনো এক জঘন্য পাপ কাজ করিয়া এই পৃথিবী হইতে বিদায় নিলাম। আমার জন্য কাদিবার কোনো লোক খুজিয়া পাওয়া যাইবে না। আসলে এই পৃথিবী আমার জন্য নয় বিধায় আমাকে তাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। বড় বড় অক্ষরে তাহার পরের দিন প্রতিটি খবরের কাগজে তোমরা পড়িবে, “বাবা মাকে একসঙ্গে জোড়া খুনের দায়ে আমার ফাসি হইয়াছে”। কেহ কেহ আমাকে ঘৃণা করিবে, কেহ আবার ‘মাফ করিয়া দিলেই পারিত’ বলিয়া মন্তব্য করিবে। আর আমার ছোট ভাইটি যেদিন বুঝিতে পারিবে, তাহার পিতামাতা তাহার বোনের কারনে মৃত্যুবরন করিতে হইয়াছে, সেদিন হয়ত সেও আমাকে আর ক্ষমা করিবে না। অপরাধ একখন্ড জমি নয় যে, কাহারো নামে লিখিয়া দেওয়া যায়। রক্ত চোখের জলের থেকেও বেশী ঘন, তাহার পরেও চোখের জলের বেদনা রক্ত ঝরার থেকেও কষ্টের। আমি তাহাদের রক্ত ঝরাইয়াছি বটে কিন্তু কষ্টটা রহিয়া গিয়াছে আমার চোখের জলে।

আমি যেদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় লইবো, জল্লাদ যখন আমাকে আমার শেষ ইচ্ছার কথা জানিতে চাহিবে, জানো আমি কি বলিতে চাইবো? হয়ত মুচকি হাসি দিয়া বলিবো, “আমি পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়া মরিতে চাহি না, আমি এই পৃথিবীর কোনো আলো বাতাস লইয়া কথা বলিতে চাহি না, আমি জীবনের চরম সুখ বা দুঃখের কথা বলিয়াও কাউকে চমক দিতে চাহিবো না। আমি শুধু একটিবার সবার সামনে উচ্চস্বরে চোখের জল ভাসাইয়া বলিতে চাইবো, “মা আমি তোমাকে ভালোবাসি। বাবা, এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে আর কোনো এমন বাবার জন্ম হইবে কিনা আমি জানি না, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ বাবাদের মধ্যে একজন। আমি তোমাদের কাছে চলিয়া আসিতেছি। আমার ফাঁসির দড়িটা একটু তাড়াতাড়ি বাধিয়া দাও”।

এই বলিয়া সিমা তাহার মাথাটা নুয়াইয়া টেবিলের উপর রাখিয়া ফুপিয়া ফুপিয়া কাদিতে লাগিলো। আমি নিরন্তর কোনো ভাষাবিহীন এক শ্রোতার মতো শুধু সিমার কথাগুলি শুনিতেছিলাম। আমার চোখের পাতাও ভিজিয়া আসিতেছিল। মনে হইতেছিলো, এই ছোট মেয়েটি যেন তাহার বাবার সামনে বসিয়া তাহার জীবনের সমস্ত কস্তের কথাগুলি বলিয়া বাবাকে আরেকবার ভিজাইয়া দিয়া অস্থির করিয়া তুলিতেছে।

-এই যে শুনছো, এইভাবে টেবিলের উপর ঘুমাইতেছো কেন? কোনো এক হটাত শারীরিক ধাক্কায় আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেলো। দেখিলাম, অনেক বেলা হইয়াছে। আমার গিন্নি তাহার দল লইয়া মানিকগঞ্জ হইতে সকাল সকাল রওয়ানা হইয়া ইতিমধ্যে বাসায় চলিয়া আসিয়াছে। তাহার সহিত ঘরের চাবি ছিলো, অনেক্ষন কলিং বেল টিপার পরেও যখন আমার ঘুম ভাঙ্গাইতে পারে নাই, তখন তাহার ভ্যানিটি ব্যাগে রক্ষিত আরেক গোছা চাবি দিয়া ঘরের দরজা খুলিয়া ঘরে প্রবেশ করিয়াছে। আমি আশেপাশে কি যেনো খুজিতে লাগিলাম। সিমা কি এখনো আছে নাকি চলিয়া গিয়াছে? যদি মেয়েটি আসিয়াই থাকে তাহলে ঘরের চাবি লাগাইয়া আবার কিভাবে চলিয়া গেলো? তাহার কাছে তো কোনো চাবি ছিলো না? তাহলে কি কেহই রাতে আমার সঙ্গে গল্প করে নাই? আমার টেবিলের উপর তো এখনো দেখিতেছি দুইটা কাপ রহিয়াছে। তাহলে কি সিমা আসিয়াছিলো?

আমার গিন্নি, আমি কি খুজিতেছি জিজ্ঞাসা করিতেই বলিলাম, “সিমা……”

আর শেষ করিতে পারিলাম না। গিন্নি বলিয়া উঠিল, জানো? আজকের পত্রিকায় প্রথম পাতায় ঐ যে মেয়েটি যে তার বাবা মাকে খুন করিয়াছিলো, সিমা, তাহার ব্যাপারে বড় বড় করে সংবাদ আসিয়াছে যে, গতকাল রাত বারোটার পর সিমার ফাসি কার্যকর হইয়াছে”।

বুকটা ধক করিয়া উঠিল।

পত্রিকাটি হাতে লইয়া অনেক্ষন ধরিয়া খবরটি পড়িলাম। কিছুতেই মিলাইতে পারিতেছিলাম না। পত্রিকার সংবাদে সিমার শেষ ইচ্ছা জানিতে চাহিলে সিমা নাকি বলিয়াছিলো, “আমার কোনো কিছুই আর কাহারো কাছ হইতে চাহিবার নাই, শুধু আমার ফাঁসির দড়িটা একটু তাড়াতাড়ি বাধিয়া দাও। আমি আমার বাবা মায়ের কাছে যাইবো। তখন নাকি সিমা অতি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করিয়া বলিতেছিলো, “মা আমি তোমাকে ভালোবাসি। বাবা, এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে আর কোনো এমন বাবার জন্ম হইবে কিনা আমি জানি না, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ বাবাদের মধ্যে একজন। আমি তোমাদের কাছে চলিয়া আসিতেছি। আমার ফাঁসির দড়িটা একটু তাড়াতাড়ি বাধিয়া দাও।”

(আজ দুপুরে খাওয়ার সময় প্লেটের নিচে যে পত্রিকাটি দেওয়া হয়েছিলো, তাতে একটি জোড়া খুনের খবর ছিলো। খেতে খেতেই খবরটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম সংবাদটা নিয়ে। বাসায় যাচ্ছি, গাড়িতে আছি, অনেক সময় লাগবে, তাই কল্পনায় একটা গল্প লিখে ফেললাম। এই গল্পের সাথে কারো কোনো মিল নাই, এটা নিছক একটা গল্প।)

২৪/০২/২০০৩-স্ট্যালিন ঢাছা   

আবখাজিয়ার রিটসা লেকের ধারের সেই “স্ট্যালিন ঢাছা”- একটি মর্মান্তিক ইতিহাস

আবখাজিয়ায় আমার নতুন পোষ্টিং বেশ মাস খানেক হলো। আসার পর অনেকবার যেতে চেয়েছিলাম “গোরি”তে যেখানে স্ট্যালিন জন্ম গ্রহন করেছে। এখন জায়গাটা আর আগের মতো নাই। এটা এখন মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। গিয়েছিলাম কয়েকদিন আগে। কিন্তু আরেকটা জায়গা দেখার খুব শখ হচ্ছিলো- স্ট্যালিন ঢাছা।

স্ট্যালিনের শিশু জীবন কেটেছে খুবই অনিরাপদ এবং গরীব এক পরিবারে। এই অনিরাপদ পরিবেশে তিন ভাই বোনের মধ্যে স্ট্যালিনই একমাত্র বেচেছিলো। তার পিতা ছিলো একজন জুতা মেরামতকারী কিন্তু প্রচন্ড মদ্যপানকারী বদরাগী মানুষ যে প্রতিদিন সে তার সন্তান স্ট্যালিনিকে কারনে অকারনে মারধোর করতেন। স্ট্যালিনের বয়স যখন ১০, তখন তার পিতা মারা যায়। তার মা ছিলো হাউজ ওয়াইফ। তার মা স্ট্যালিনের বুদ্ধিমত্তা দেখে তিনি তাকে এক সেমিনারীতে ভর্তি করে দেন এবং তিনি চেয়েছিলেন স্ট্যালিন প্রিস্ট হিসাবে বড় হোক।

স্ট্যালিন খুব মেধাবী ছাত্র ছিলো এবং প্রায় ৮ বছর পড়াশুনা করে স্ট্যালিন তার ভিন্ন মার্ক্সিজমের মতাদর্শের কারনে স্কুল তাকে বহিষ্কার করে দেয়। এরপর স্ট্যালিন একটি রেভুলুসনারী গ্রুপে তদানীন্তন জারের বিরুদ্ধে জয়েন করেন এবং রেভুলিউশনারী গ্রুপের হয়ে স্ট্যালিন নিজ হাতে তার মতের বাইরের লোকদেরকে একের পর এক হত্যা করতে শুরু করেন। এরপর বলসেভিক গ্রুপ। স্ট্যালিনের একচেটিয়া মনোভাব আর হত্যার মতো দুধর্ষ কাজের মাধ্যমে তিনি বলসেভিক গ্যাং এর খুব প্রতাপশালী নেতা হয়ে উঠেন। শুরু হয় ব্যাংক ডাকাতি, গ্রামে আগুন লাগানো, লোকদেরকে হত্যা করা ইত্যাদি।  

যখন বলসেভিক ক্ষমতায় এলো, তখন  বলসেভিক পার্টির নেতা লিউনার্দো তাকে বলসেভিক পার্টির অন্যতম একজন নেতার পদ দেন। কিন্তু লিউনার্দো পরবর্তিতে তার মৃত্যুর আগে এটা বুঝে গিয়েছিলেন যে, স্ট্যালিনকে আর বেশী ক্ষমতা দেয়া যাবে না কারন সে ডেস্ট্রাকটিভ এবং অত্যান্ত উগ্রপন্থির মানুষ এবং এতোটাই যে, তাকে সর্বনয় ক্ষমতায় তিনি তাকে দেখতে চাননি। কিন্তু তারপরেও সেটা হয়েছিলো।

রাশিয়ান রেভুলিউশনের সময় “স্ট্যালিন” এই নামটি নিজেই গ্রহন করেন যার অর্থ স্টিলম্যান বা ম্যান অফ স্টিল। তার আসল নাম ছিলো ভিসারিউনভিচ। স্ট্যালিন চেয়েছিলো আল্টিম্যাট টোটালেরিয়ান ডিকটেটর হিসাবে পরিচিত হতে এবং সেটা কমিউনিজমের মাধ্যমে। তার ধারনা ছিলো কমিউনিজমের মাধ্যে সে তার দেশের সমস্ত মানুষকে ডিসিপ্লিন্ড, শক্তিশালী , ওবিডিয়েন্ট এবং সভ্য মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা আর তার আদেশ অন্ধভাবে পালন করা। এই প্রোজেক্ট সফল করার জন্য স্ট্যালিনকে যা যা করা দরকার সেটাই সে একচ্ছত্রভাবে এগিয়ে গিয়েছিলো যেখানে পুরানো সব ভিন্ন মতাদর্শকে সমুলে খতম এবং তার মতাদর্শকে আরোপ করা। সে মনে করতো তার এই প্রোজেক্ট সফল করার জন্য যদি দেশের অর্ধেক মানুষকেও হত্যা করতে হয়, তাতেও তার করতে হবে এটাই ছিলো তার একমাত্র সপ্ন। স্ট্যালিন এই প্রোসেসকে সফল করার জন্য প্রায় দেড় বছর এক নাগাড়ে নীরবে এবং গোপনে একটা ‘গ্রেট পার্জ’ নামে সায়েন্টিফিক এবং মেটিকুলাস মেথড ব্যবহার করেছেন। ‘গ্রেট পার্জ” এর জন্য তার প্রয়োজন ছিলো এমন একজন লোক যিনি স্ট্যালিনের সমস্ত আদেশ অন্ধভাবে বিসশাস করবে, পালন করবে এবং তা পালন হয়েছে কিনা নিশ্চিত করবে। আর এর জন্য তিনি বেছে নেন নিকোলাই ইয়েজভ নামে একজন তিন ক্লাশ পর্যন্ত পড়ুয়া মানুষকে। যাকে পরবর্তিতে মানুষ চিনতো “ব্লাডি ডয়ার্ফ” নামে। এই নিকোলাই ইয়েজভ ছিলো স্ট্যালিনের সিক্রেট পুলিশের চীফ। সে নিজে সাত লক্ষ সত্তুর হাজার নীরীহ এবং ভিন্ন মতালম্বী মানুষকে স্ট্যালিনের “গ্রেট পার্জ” এর আওতায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

জুলাই ১৯৩৭ থেকে নভেম্বর ১৯৩৮ এর মাঝখানে স্ট্যালিন প্রায় ৮ লক্ষ মানুষকে এভাবে হত্যা করেন। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৫০০ মানুষ অথবা প্রতি ৫৭ সেকেন্ডে একজন। আর এভাবেই স্ট্যালিন নভেম্বর ১৯৩৮ এর শেষের দিকে মনে করেন তার আর কোনো কাল্পনিক বা দৃশ্যমান কোনো প্রতিদন্ধি থাকলো না এবং “এবসিউলুট পাওয়ার” এর অধিকারী হন স্ট্যালিন। আগেই বলেছিলাম, স্ট্যালিন ছিলো অত্যান্ত মেধাবী এবং হিসাবী। তিনি তার এই হত্যার কৃত কর্মের ভার কখনোই নিজের ঘাড়ে নিতে চান নাই। তার সেটাও পরিকল্পনায় ছিলো। এ ব্যাপারে একটু পরেই আমরা আলোচনা করবো।

স্ট্যালিনের ১ম স্ত্রী ছিলেন একাতেরিনা যিনি অসুস্থতার কারনেই যুবতী অবস্থায় মারা যান। তার ২য় স্ত্রী ছিলো নাদিয়া। ১৩ বছর স্ট্যালিনের সাথে সংসার করার পর ১৯৩২ সালে নাদিয়া নিজে আত্তহত্যা করেন। স্ট্যালিনের সাথে ১৩ বছর সংসার করার পর নাদিয়া একটা জিনিষ বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্ট্যালিন একজন স্বাভাবিক মানুষ নন যা তিনি বিয়ের সময় ভেবেছিলেন। কারন নাদিয়া দেখতে পাচ্ছিলো যে, স্ট্যালিন নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য নিজের আপন মানুষদেরকেও তার হত্যা করতে কোনো দিধাবোধ নাই। এরই ধারাবাহিকতায় নাদিয়া দেখছিলেন, তার সমস্ত আত্তীয়স্বজন, তার স্বামীর বাড়ির আত্তীয় স্বজনেরা একে একে কোথায় যেনো গুম হয়ে যাচ্ছে আর কেউ ফিরে আসছে না। নাদিয়ার বোন এভগেনিয়ার স্বামীকে স্ট্যালিন বিষপানে, এভগেনিয়াকে এবং তার আরেক বোন মারিয়াকে স্ট্যালিন সাইবেরিয়ার “গুলা” তে ডিপোর্টেশনে পাঠান। “গুলা”র তাপমাত্রা শীতকালে যা থাকে মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মতো। শুধু তাইই নয়, স্ট্যালিন নাদিয়ার ছোট ভাই পাভেলকে ২ নভেম্বর ১৯৩৮ সালে বিষপানে হত্যা করেন। এভগেনিয়ার মেয়ে “কিরা”, তার বড় বোন আনাকেও স্ট্যালিন “গুলা”তে নির্বাসনে পাঠান। এভাবেই ‘আনা’র স্বামী স্ট্যানিস্লাভ, ১ম স্ত্রীর ভাই আলেক্সজান্ডারকেও স্ট্যালিন গুলি করে হত্যা করেন। নাদিয়া এসবের চাপ আর নিতে পারছিলেন না। ফলে সে স্বামীর আনুগত্য হারিয়ে ফেলে। নাদিয়া তার গর্ভের তিন বাচ্চা, ছেলে ইয়াকভ, মেয়ে ভ্যাসিলি আর এসভেটলানাক পিছনে রেখে আত্তহত্যা করেন। আত্তহত্যার পুর্বে নাদিয়া তার এক ভাইকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলো যে, সে কেনো আত্তহত্যা করতে যাচ্ছে। কারন নাদিয়ার পালানোর কোনো জায়গা ছিলো না। নাদিয়া পালিয়ে অন্য কোথাও গেলেও স্ট্যালিন তাকে যেভাবেই হোক খুজে বের করে আনতে সক্ষম। আত্তহত্যাই ছিলো তার মুক্তির একমাত্র পথ। স্ট্যালিনকে বাইরে থেকে মানুষ যা দেখে চোখের অন্তরালে স্ট্যালিন আরেক মানুষ যা মানুষ দেখে না। তাই, নাদিয়া নিজে নিজে তার পথ বেছে নেয়।

নাদিয়ার মৃত্যুর পর স্ট্যালিন আরো নিষ্ঠুর হয়ে উঠে কিন্তু স্ট্যালিন সবার থেকে একেবারে আলাদা হয়ে যান। সবসময় সবার থেকে আলাদা হয়ে একা বসবাস করার পরিকল্পনা করেন। স্ট্যালিন দক্ষন মস্কোর কয়েক কিলোমিটার দূরে এক বিশাল গহীন জংগলের ভিতর রাজ প্রাসাদ বানান যার নাম দেন “স্ট্যালিন ডাচা”। এই স্ট্যালিন ডাচা সুরক্ষার জন্য এক কোম্পানী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং ৩০০ এর অধীক সৈনিক মোতায়েন থাকতো। ‘শট্যালিন ডাচা’য় স্ট্যালিনের নিজের অনুমতি ছাড়া অন্য কারো প্রবেশের অনুমতি ছিলো না। তিনি শুধু একাই সেখানে থাকতেন। আর থাকতো তার গভর্নেস “ভ্যেলেন্টিনা”। ভেলেন্টিনাই স্ট্যালিনের সমস্ত কাজ করতো, খাওয়া দাওয়া, দেখভাল, কুরিয়ারের কাজ এমন কি তার সাথে রাতের সংগী হিসাবে। ভেলেন্টিনাকে স্ট্যালিন সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস করতেন। ভ্যালেন্টিনাই শুধু ক্রেমলিন থেকে আসা কাগজপত্রগুলি গ্রহন করতেন এবং ভোর বেলায় তা স্ট্যালিনকে হস্তান্তর করতেন। স্ট্যালিন সারা রাত কাজ করতেন এবং তার ঘুমের সময় হতো সকাল ৭ টা থেকে সকাল ১০ পর্যন্ত।

সারারাত স্ট্যালিন একটা কাজ একেবারে নিজের হাতে করতেন কারো কোনো পরামর্শ ছাড়া। আর সেটা হচ্ছে তার কাল্পনিক এবং দৃশ্যমান শত্রুদেরকে ডেথ সেন্টেন্স দেয়ার অনুমতি। তিনি সারারাত বাছাই করতেন কাকে কখন মারা হবে অথবা সাইবেরিয়ায় বা গুলাতে ডিপোর্টেশনে পাঠানো হবে। কাজটা খুব সহজ ছিলো না। কিন্তু স্ট্যালিন এই কাজটা খুব মনোযোগের সাথে করতেন এবং নামের পাশে একের পর এক টিক দিতেন কার ভাগ্যে মৃত্যু আর কার ভাগ্যে ডিপোর্টেশন। স্ট্যালিন যখন কোনো মানুষকে মেরে ফেলার জন্য আদেশ দিতেন, তখন তার সাথে তার গোটা পরিবারকেও তিনি খতম করে দিতেন।  ৬০ বছর বয়সে স্ট্যালিন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হন যেখানে তার আর কোনো বিপক্ষের লোক ছিলো না। স্ট্যালিন মাঝে মাঝে ‘স্ট্যালিন ডাচা” থেকে বেরিয়ে এসে ক্রেমলিনেও অফিস করতেন যেখানে তার চার জন মহিলা সেক্রেটারী ছিলো। কিন্তু এই সেক্রেটারীদেরকেও স্ট্যালিন কখনো বিশ্বাস করতো না। শুধুমাত্র একজন সেক্রেটারী (একাতেরিনাও তার নাম) ছাড়া সবাই স্ট্যালিনের রোষানলে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু স্ট্যালিন তার এই মহা হত্যার জজ্ঞ নিজের ঘাড়ে যেহেতু নিতে চান নাই আর তার কাজ প্রায় শেষের পথে। তাই তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৮ তারিখে তার সর্বশেষ নিধন লিষ্ট অনুমোদন দেন।

আজ সেই ঐতিহাসিক ২৪ ফেব্রুয়ারী আবারো ফিরে এসছে ১৯৩৮ থেকে ২০০৩ এ। এদিন অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৮ তারিখে স্ট্যালিন  তার “গ্রেট পার্জ” এ নিধন হত্যার সর্বশেষ লিষ্ট অনুমোদনে তার অন্যায় এমন এক লোকের উপর অর্পিত করেন, যার নাম “ব্লাডি ডয়ার্ফ” বা সিক্রেট পুলিশ চীফ নিকোলাই ইয়েজভ। এই নিকোলাই লুবিয়াংকা জেল খানায় সে নিজেই প্রায় লক্ষাধিক মানুষকে গন হত্যা করেছেন।

স্ট্যালিন সকাল সাড়ে সাতটায় নিকোলাইকে তার ‘স্ট্যালিন ডাচ’য় ডেকে পাঠান। আজকের দিনে স্ট্যালিন সেই তাকেই সবার কাছে কালার করে প্রচার করে দিলেন যে, সব গন হত্যার পিছনে ছিলো এই চীফ এবংতিনি জাপানিজ, ব্রিটিস এবং আমেরিকান স্পাই হিসাবেও কাজ করছেন। তাকে মরতেই হবে। আর নিকোলাই জানতেন এর থেকে কোনো পরিত্রান নাই। তার ভাগ্য ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। সে শুধু তার একমাত্র ১০ বছরের মেয়ের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলেন যার নাম নাতালিয়া। নাতালিয়াকে স্ট্যালিন শেষ পর্যন্ত মারেননি একশর্তে যে নাতালিয়া আর কখনো তার বাবার নামের “ইয়েজভ” উপাধিটি ব্যবহার করতে পারবেন না। নিকোলাই ইতিহাসের পাতায় একজন ক্রিমিনাল হয়েই বেচে রইলেন।

নোটঃ ১লা মার্চ ১৯৫৩ তারিখে স্ট্যালিন সারাদিন কারো সাথেই কোনো কথা বলেন নাই, কোথাও বেরও হন নাই। আর তাকে কেঊ ডাকবে, কিংবা তিনি কি করছেন এটা দেখার মতো কারো সাহসও নাই। অবশেষে যখন ক্রেমলিন কুরিয়ার তার অফিসে ঢোকলেন, তখন দেখা গেলো স্ট্যালিন হার্ট স্ট্রোক করে মেঝেতে পড়ে আছেন। তখন তার বয়স ৭৫।

স্ট্যালিন যেভাবে রাজ্য পরিচালনা করতেন তিনি ঠিক সেভাবেই মারা গেলেন। ২০ মিলিয়ন মানুষকে তিনি তার শাসনামলে হত্যা করেছিলেন।  প্রায় ৩০ বছর এককভাবে রাজত্ত করেছেন স্ট্যালিন। স্ট্যালিন ৩০ বছর ইউএসএসআর পরিচালনা করেছেন যেখানে ১৫ টি ছিলো রিপাব্লিক। পৃথিবীর ৬ ভাগের এক ভাগ ছিলো এই ইউএসএস আর। সে সময়ে মোট ১১টি টাইম জোন ছিলো। Biggest Empire of all times.