











Pic for Slider0123jpg
Pic for Slider012
Pic for Slider011
Pic for Slider010
Pic for Slider009
Pic for Slider008
Pic for Slider007
Pic for Slider006
Pic for Slider005
Pic for Slider003
Pic for Slider002
Pic for Slider001
আমি আমার মাদবর বাড়ীর সব প্রকারের ঐতিজ্য নিয়ে সবসময় গর্ববোধ করি। একটা বাড়ি একটা সমাজ হতে পারে, মাদবর বাড়ি একটা তার প্রমান। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মাদবর বাড়ীর তথ্য, অজানা ইতিহাস ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে কে বা কারা এই পরিবারের সদস্য বা তারা কে কোথায় আছে, এর ইতিহাস আজনেকেই জানে না বিধয় মাদবর বাড়ীর সেই পুরানো বংশ আভিজাত্যের ধারা মুছে যেতে চলেছে।হয়ত একসময় এই মাদবর বাড়ি সদস্যগনই জানবে না তারা কে বা কারা। বাংলাদেশ আমেরিকা নয় যে, কোনো এক ওবামা, বা কোন এক ট্র্যাম্প পৃথিবীর কোনো একস্থান থেকে উদয় হয়ে আমেরিকার মতো বিশাল এক রাজকীয় পরিবেশে উড়ে এসে জুড়ে বসে একেবারে টপ পজিশন ধরে প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন। সেটা আমেরিকায় হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সব পরিচয় জেনেও কাউকে যদি হেয় করতে মন চায়, তাহলে তার কোনো কিছুই জানার প্রয়োজন হয় না, সে শুধু তার ইচ্ছেটাই প্রকাশ করবে। কিন্তু যদি কেউ আপনার আমার বংশ পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিয্য সব কিছু জানে, তাহলে যে যাই কিছু করুক বা বলুক, অন্তত এইটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে, অহেতুক আপনাকে কেউ হয়রানী হয়ত করবে না। কোনো মৃত ব্যাক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই যায় আসে না, কিন্তু তারপরেও মানুষ ইতিহাস পড়ে আর ইতিহাস লিখে। একমাত্র ইতিহাসটাই সত্য। আর যতো আগামি, বর্তমান, কিংবা সব “যদি” কোনোটাই শতভাগ সত্য নয়। তাই নিজের ইতিহাস টুকু তো জানুন। মনে নাই? আলেক্স হ্যালির সেই রুটস কাহিনীটি? সেটাই ইতিহাস।
আমাদের পরিবার “মাদবর” পরিবার হিসাবে পরিচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই এই পদবীটা কেনো জানি নামের পাশে ব্যবহার করতে একটু দ্বিধা বোধ করছি। যেমন আমি নিজেও আমার নামের পাশে মাদবর পদবীটা উল্লেখ করি না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, কেনো করছি না, আমার কাছে একটা যুক্তি তো অবশ্যই আছে। আর সেটা হচ্ছে-
আমি যখন গ্রামে থাকতাম, তখন দেখেছি যে, আমাদের গ্রামের অনেকেই অনেক প্রকারের মাদবর সেজে আছেন। কেউ বাচ্চু মাদবর, কেউ আজগর আলি মাদবর, কেউ আক্কাস আলি মাদবর ইত্যাদি। এই মাদবর গুলিকে দেখে আমার গা এক প্রকার রি রি করতো কারন তাদের না ছিলো কোনো ইথিক্স, না ছিলো কোনো গুনাগুন। অথচ শুনেছি, আমার বাবা যখন মাদবরি করতেন, তখন তিনি নাকি কারো বাড়িতে গিয়ে এক কাপ চাও খেতেন না। যদি কারো বিচারের বেলায় পক্ষপাতিত্ব হয়ে যায়, তাই! কিন্তু আমার বাবা, বা দাদা কি ধরনের মাদবর ছিলেন আর এখনকার মাদবরগন কি প্রকারের মাদবরি করছেন এই পার্থক্য টা আমার ঐ ছোট বয়সে যেমন বুঝবার ক্ষমতা ছিলো না, তাই আমার বংশের পদবীটা যে এতো মানসম্মানের, সেটা আমার আসলে বুঝার জ্ঞ্যানও ছিলো না। ফলে এই মাদবর উপাধিটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হইতো এবং কিছুটা নিম্নজাতীয় উপাধি বলিয়াও মনে হইতো, বিশেষ করিয়া শহুরে সমাজের কাছে। তাই আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার সমস্ত স্কুল কলেজের সার্টিফিকেট সমুহের এই নামের পাশের মাদবর পদবীটা একেবারে রহিত করিয়া দিয়াছি।
আমার বড় ভাই জনাব ডঃ মহাম্মাদ হাবিবুল্লাহও কেনো যে এই পদবীটা নিলেন না সেটা আমার বোধ গম্য নয়।
যাক সে কথা।
এবার আসি আমাদের বংশের সংক্ষিপ্ত একটু ইতিহাস নিয়ে।
হিসাব্দি মাদবর ছিলেন আমার দাদা। এই দাদার থেকেই আমার ইতিহাস আমি শুরু করিবো। তিনি ছিলেন অনেক বিচক্ষন একজন ব্যক্তি। তার আমলে তিনি অনেক সম্পদ এবং বুদ্ধির মালিক ছিলেন। আমার দাদির নাম আমি জানি না। জানতে ইচ্ছে করে। হয়ত আমার বড় ভাই জানবেন।
আমি আমার বাবাকে কখনো দেখিনি এবং তার চেহাড়া কেমন ছিলো, খাটো নাকি লম্বা, যুবক না বৃদ্ধ, ফর্সা নাকি কালো কোনো কিছুই আমার জানা নাই। তবে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে আমি আমার বাবার অনেক গল্প শুনাতেন যার থেকে আমি বাবার একটা কাল্পনিক চরিত্র মনে গেথে গেছে। আমার দাদার নাম ছিলো হিসাবদি মাদবর। আমরা মাদবর বংশের লোক।
বাবার সম্পর্কে আমি অনেক চমৎকার চমৎকার গল্প শুনেছি ভাইয়ার কাছে। তবে তার প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে জরুরী তথ্য হলো যে, আমার বাবার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আমার মাকে বিয়ে করেন। বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ঘরে মোট তিন জন ছেলে সন্তান আর তিনজন কন্যা সন্তান ছিলো। এই মোট ছয় সন্তান থাকার পরে আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। তখন আমার মায়ের বয়স ছিলো বেশ কম। আগের সব সন্তানেরাই আমার মায়ের থেকে বয়সে বড় ছিলো। কেউ কেউ আবার ইতিমধ্যে বিয়েও করে ফেলেছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমার মা যেমন একটু অসুবিধায় ছিলেন, তেমনি আমার বাবাও বেশ অসুবিধায় ছিলেন।
কিভাবে আমার বাবা এই দুমুখী অসুবিধাগুলি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাধান করেছিলেন, সেই গল্প গুলিও আমি হোসেন আলী মাদবরের পর্বসমুহে একে একে লিখবো।
তিনি আমার শাশুড়ি। মোট আট মেয়ে আর তিন ছেলের সার্থক মা। অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আমার কাছে তিনি আমার আপন মায়ের মতোই ছিলেন। আমার মাকে আর আমার এই শাশুড়িকে আমি কনোদিনই পার্থক্য করি নাই। তিনি আমাকে প্রতি ঈদে ১০ টাকার সালামি দিতেন। কি যে ভালো লাগতো ঊনার কাছ থেকে এই ১০টাকা সালামি নিতে।
চলবে…
তিনি আমার শ্বশুর।
আমি আমার শ্বশুর কেও জীবিত অবস্থায় দেখি নাই। আমার স্ত্রী যখন অষ্টম ক্লাসে পড়ে, তখন তার বাবা মারা যান। আমি যখন আমার স্ত্রীকে বিয়ে করি, তখন আমার স্ত্রী সবে মাত্র ইন্তারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির তোড়জোর করছেন। ফলে আমার বিয়ে হবার প্রায় ৪/৫ বছর আগে আমার শ্বশুর মারা যান। আমার শ্বশুরের প্রাথমিক তথ্য গুলি এ রকমেরঃ
নামঃ আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী
পিতাঃ সোনাম উদ্দিন চৌধুরী (সোনাম উদ্দিন চৌধুরীর পিতার নাম ছিল, ফাজেল আহম্মদ চৌধুরী)
স্ত্রীর নামঃ জেবুন্নেসা চৌধুরী
আমার শ্বশুরের ছিল আট কন্যা সন্তান এবং তিন পুত্র সন্তান।
আমার স্ত্রী ছিলো তাদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ।
তাদের ওয়ারিশ নামা যদি লিখি তাহলে দাঁড়ায় এ রকমেরঃ
তিনি আমার চাচা শশুড় ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের আপন ভাই। আমার শশুড়েরা ছিলেন তিন ভাই, (১) আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী (২) ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং (৩) নিজাম উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদকেও আমি দেখিনি কিন্তু যতটুকু আমি শুনেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি যে তিনি ছিলেন এ দেশের গোটা কিছু প্রোফেশনাল মানুষদের মধ্যে একজন। ডাক্তার হিসাবে যেমন তিনি খুব নামীদামী ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসাবেও ছিলেন খুব ভালো। তিনি সর্বশেষ জীবনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রোফেসর ছিলেন। তার একটি ছেলে (১) মকবুল আর একটি মেয়ে (নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।)। তার স্ত্রীর নাম ছিলো মেহেরুন্নেসা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নার্সের কাজ করতেন কিন্তু এই চাচার সাথে বিয়ে হবার পরে মেহেরুন্নেসা আর নার্সের জব করেন নাই। চাচী অত্যান্ত চালাক আর সার্থপর ছিলেন। তিনি চাচার বাড়ির কোনো মানুষকে তার বাসায় এলাউ করতেন না এবং এমনকি চাচার কথাও শুনতেন না। সারাক্ষন ঘরের মধ্যেই থাকতেন দরজা জানালা বন্ধ করে। এটা একটা রোগ। তার মেয়েটাকে বিয়ে দেয়ার পর মেয়েটা যেহেতু মায়ের স্বভাব পেয়েছিলো, ফলে তার ঘরে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হবার পরেই মায়ের মতো আচরন শুরু করে এবং সেখানে আর থাকতে পারে নাই। পরবর্তীতে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি তার মেয়েকে নিয়ে আজীবনকাল একটা টিনের ঘরের ভিতরে এমনভাবে বন্দি হয়ে রইলো যে, কখনো তাঁকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় না শুধুমাত্র কিছু খাবার দাবার কেনা কাটা ছাড়া। তার বাতিক হচ্ছে সে চাউলকে পাক করার আগেও সাবান দিয়ে ধোয়ে নিবে। এর মানে এই নয় যে, সে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। তার মেয়েটিকে আমরা ঘরের বাইরে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মেয়েটা সারাদিন ঘরের মধ্যে একটা অলিক ভাবনা নিয়ে কল্পনার রাজ্যে বসবাস করতে করতে এখন সেও প্রায় পংগু। তার যেহেতু কোনো আয় রোজগার নাই, ফলে সবাই জাকাত কিংবা দান করা টাকা দিয়েই তার জীবন চলে। তাতে তার কোনো আক্ষেপ নাই। মজার ব্যাপার হলো এই যে কেউ তাঁকে দান করছে বা টাকা দিচ্ছে, এতেও তার কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই। তাঁকে ডাকলেও ঘর থেকে বের করা সম্ভব না। ডাঃ কুতুব উদ্দিন মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা তার লাশ দেখতেও ঘর থেকে বের হন নাই। আমার ধারনা, চাচা এই মহিলাকে বিয়ে করে আজীবন অনুশোচনাই করেছেন সম্ভবত। শেষ জীবনে চাচা অত্যান্ত অসুখী জীবন জাপন করেছেন। প্রায় ৪ বছর আগে স্ত্রী মেহেরুন্নেসাও ইন্তেকাল করেছেন। ডাঃ কুতুব উদ্দিন চাচার ছেলে মকবুল নিজেও খুব একটা কাজের মানুষ না। সবকিছু রেডিমেট পেতে চায়। চৌধুরী বাড়ির ওয়ারিশদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সম্পদের ভাগ মকবুল পায়, যেহেতু ওয়ারিশ মাত্র ২ জন। চাচার বাবা সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফ-এ-আওলাদ করে গেছেন বলে কোনো সম্পত্তিই বিক্রি যোগ্য নয়। কিন্তু এর মাঝেও অনেক সম্পত্তি আছে যা ওয়াকফ-এ-আওলাদের বাইরে। আমি প্রায় ২ মাস নিজে কষ্ট করে সমস্ত জমি-জমার কাগজপত্র ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম জমিগুলির দেখভাল করতে আর কিছু জমি বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করতে। কিন্তু মকবুল সেটাও করতে নারাজ। সোনাম উদ্দিন চৌধুরী কোনো কারনে যখন আমার শশুরের উপর অহেতুক মেজাজ খারাপ করে প্রথমে তাঁকে ত্যাজ্য করার মতো একটা বুদ্ধি করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলো, এই কুতুব উদ্দিন চাচাই শেষ পর্যন্ত তার বাবা (সোনাম উদ্দিন চৌধুরী) কে বুঝিয়ে সুজিয়ে পরবর্তীতে প্রথম ওয়াকফ দলিল সংশোধন করে পুনরায় আলাউদ্দিন চৌধুরীকে তার সন্তানের প্রাপ্য অংশে বহাল রাখেন। আল্লাহ নিশ্চয়ই সব কিছুর খবরজান্তা। এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, এই সোনাম উদ্দিনের মতোই কিছুটা চরিত্র পেয়েছে হাসান আহমদ লিখন কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে- সোনাম উদ্দিন গেম প্লে করেছে তার নিজের সম্পদ আর সিদ্ধান্ত নিয়ে কিন্তু লিখন গেম প্লে করেছে পরের সম্পদের উপর অন্যায় করে মাদবরী করতে গিয়ে। এটা আরো জঘন্য।
ওর ডাক নাম লিখন। নূর আহমদ চৌধুরীর বড় ছেলে। ওরা মোট ৫ ভাই কিন্তু কোনো বোন নাই। প্রাতমিক জীবনে লিখন অনেক আর্থিক চাপে ছিলো বিশেষ করে ১৯৮৮-১৯৮৯ সালের দিকে। ওর সাথে আমার পরিচয় হয় বিয়ের পরেই। অনেক ইন্টিলিজেন্ট ছেলে কিন্তু মাঝে মাঝে ওর এই বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু ব্যাপারে কাজে লাগায় যা স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে। যেমন একটা উদাহরন দেই, চৌধুরী বাড়ির সব সম্পত্তি সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার জিবদ্দশায় ওয়াকফ-আওলাদ করে যাওয়ায় তাদের মানিক গঞ্জের বাড়িটাও সেই ওয়াকফ-আওলাদের অন্তর্ভুক্ত। ওখানে কেউ থাকেন না শুধু লিজি আপা (আমার আরেক জেঠস) থাকেন। তিনি শারীরিকভাবে একেবারেই পংগু। লিখনের বদবুদ্ধির কারনে লিখন চেয়েছিলো পুরু বাড়িটা যেভাবেই হোক সেটা আত্মসাৎ করা। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সব ভাইবোনেরা লিজি আপাকে অত্যান্ত স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তারা এটাই চেয়েছিলো যেনো লিজি আপা কোনো রকমে মানিক গঞ্জের ঐ দাদার বাড়িতে একটা ছোট জায়গায় একটা ঘর তোলে আজীবন থাকতে পারেন। কিন্তু লিখন এটা কোনোভাবেই চায় নাই। মজার ব্যাপার হলো যে, ঐ দাদার সম্পত্তিতে লিখনের পিতার ওয়ারিশ সুত্রে সে নিজে ২ কাঠার ৭ ভাগের এক অংশের মালিক। সে হিসাবে লিখন পায় ২ কাঠার মধ্যে ৭ ভাগের এক ভাগ। অথচ লিজি আপা নিজেই ঐ সম্পত্তির পিতার ওয়ারিশ সুত্রে ১ কাঠার বেশী মালিক। অর্থাৎ লিখনের থেকে ঢেড় বেশী। আর এই লিখন চায় না লিজি আপা ওখানে থাকুক। উদ্ভট ভাবনা। এখানে আরো একটা ব্যাপার কাজ করছিলো যে, চৌধুরী বাড়ির মানুষেরা পরোক্ষ ভাবে লিখনকে তাদের অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতো। ফলে তার একটা অলিখিত দাপট ছিলো। সম্ভবত সেই দাপটের কারনেই লিখন একচ্ছত্র এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার হিম্মত করেছিলো। পর্দার বাইরে থেকে আমি পুরু ব্যাপারটা এমনভাবে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করেছিলাম যেনো লিজি আপা তার ন্যায্য অংশ পায় এবং সেখানে তার যা খুসি করতে পারে। এখন ওখানে লিজি আপার জন্য ৬ তালা বিল্ডিং হয়েছে যা লিখনের নিজেরো নাই। এই ধরনের কাজ করাটা ওর কোনোভাবেই ঠিক হয় নাই। যাই হোক, লিখন লটারীর মাধ্যমে আমেরিকার একটা ইমিগ্রেশন পেয়েছিলো। সরকারী আইন মোতাবেক ওকে ওখানে ৫ বছর এক নাগাড়ে থাকতে হবে বিধায় আমেরিকার সরকার ওকে এবার আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে আটকে দিয়েছে যেনো সে আর দেশে ফিরতে না পারে। সব আল্লাহর ইচ্ছা। ওকে আমি সত্যিই একটা পজিটিভ বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে ভেবেছিলাম যা আসলে ওর মধ্যে বেশ ঘাটতি আছে। ভালো জব করতো আর্গন ফ্যাশনে, পারভেজ ভাইয়ের অধীনে। যাই হোক, ওর উপরে অনেকের ভরষাটা এখন প্রায় শুন্যের কোঠায়। ওর উপরে আমার কখনো রাগ ছিলো না। আমি ওর উকিল বাবাও বটে।
আমার বড় সমন্ধী অর্থাৎ আমার স্ত্রীর সবচেয়ে বড় ভাই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হাইকোর্টে স্ট্যাম্প রেকর্ডার হিসাবে কাজ করতেন। এই স্ট্যাম্প রেকর্ডার কি জিনিষ আমি জানি না। তবে ব্যক্তিগত জীবনে অনেক সৎ এবং ধইর্যশীল মানুষ ছিলেন। হাসমত আরা ছিলেন তার স্ত্রী। এই দম্পতির কোনো মেয়ে সন্তান ছিলো না। ছিলো ৫ ছেলে। হাসান আহমদ লিখন তার বড় ছেলে। হাসান আহমদ লিখনের ব্যাপারে বিস্তারীত আমি কিছু তথ্য লিখেছি ওর অধ্যায়ে। নূর ভাই আমার খুব প্রিয় মানুষদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করতাম, তিনিও আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। সহজ সরল মানুষ ছিলেন। সবাই বলে নূর আহমদ চৌধুরী নাকি তার বাবার মতো দায়িত্তশীল ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের মতো। আমি আমার শশুড়কে দেখি নাই ফলে তুলনাটা আমি করতে পারি নাই। বিয়ের আগে আমার তার একবারই দেখা হয়েছিলো বগুড়ায় কিন্তু বিয়ের পরে তার সাথে আমার অনেক শখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। তিনি তার সংসারের জন্য এবং চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার অবদান চৌধুরী বাড়ির সব সদস্যদের জন্য অনেক ছিলো। সব সময় তিনি চাইতেন যেনো সবাই ভালো থাকে। এই ভালো থাকার চাওয়ার কারনে তিনি একবার আমাকে একটা প্লট দেয়ার নামে তারই কোনো এক কলিগের পাল্লায় পরে আমার বেশ কিছু টাকা নষ্ট করলেও তার উপর আমার কখনো কোনো রাগ হয় নাই। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে তিনিও ঠকেছেন কাউকে বিশ্বাস করে। তার এক ছেলে মানিক গঞ্জে কোনো এক বন্ধুকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে খুন করে ফেলেছিলো। খুব সমস্যায় পড়েছিলেন। কোথাও লুকানোর জায়গা ছিলো না। আমি জানি এই খুনের ব্যাপারটা আমার সাপোর্ট করার কোনো কারন নাই কিন্তু শুধুমাত্র নূর ভাইয়ের কারনে আমি তাঁকে সহ তার সেই খুনী ছেলেকে প্রায় ২ মাস আমার বগুরার ক্যান্টনমেন্টে রাখতে হয়েছিলো কারন ক্যান্টনমেন্টে কোনো পুলিশ রেইড করে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে আজীবন আক্ষেপে থাকবো কারন আমি একটা অপরাধকে লুকানোর সাহাজ্য করেছিলাম। নূর আহমদ ভাই ২০১২ এর দিকে মারা যান। মানিকগঞ্জেই তার দাফন হয়েছিলো।
কার্লা ডরাইন উইলশন তার পুরু নাম। আমার এই ওয়েব সাইটের মধ্যে আমার সাথে এক মাত্র খুব অন্তরের সম্পর্ক ছিলো এই একটি মাত্র বিদেশী মানুষের। ওর সাথে আমার যখন পরিচয় হয়, তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র ১৪ কিংবা ১৫। আমি তখন ক্যাডেট কলেজে ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় আসলে আমাকে কেউ খুব একটা চিঠিপত্র লিখতো না, কেউ প্যারেন্টস ডে তেও আসতো না। কেউ ছিলো না আসলে। মা থাকতেন গ্রামে, অভাবী মানুষ, রাস্তা ঘাট চিনেন না, বোনেরাও সেই রকম কোনো অবস্থানে ছিলো না যে, ছোট ভাইয়ের জন্য তারা কিছু করবে, তাদের ও সাংসারিক অবস্থা তেমন ছিলো না। একদিন আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ আমাকে জানালেন যে, তার এক বন্ধুর মেয়ে নাম, কার্লা আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। চিঠি লিখলে যেনো আমি তার উত্তর দেই। সেই থেকে হটাত করে কার্লা আমাকে চিঠি লিখা শুরু করে। হাতের লেখা অত্যান্ত খারাপ, এক পৃষ্ঠা চিঠিতে মাত্র ৫/৬ লাইনেই পাতা ভরে যায় এমন এক অবস্থা, ফলে ওর চিঠির ভলিয়ম হতো কয়েক পাতা করে। একটা সময় এলো আমি প্রতিদিন ওর চিঠি পাওয়া শুরু করলাম। প্রথম প্রথম আমি বুঝতেই পারি নাই যে, কার্লা আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্রমেই ওর চিঠির মধ্যে ভালোবাসার কথা, ভালোবাসার সিম্বল, ইত্যাদি ফুটে উঠতে শুরু করলো। টিন এজার প্রেম। আমিও এক সময় যেনো ওর চিঠির প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম। ওর চিঠি না পেলে ভালো লাগতো না, আবার আমি চিঠি না লিখলেও ভালো লাগতো না। আমার সাথে সুত্র ধরেই কার্লা আমেরিকায় আমার ভাইয়ের সাথে, হাবীব ভাইয়ের বউ এর সাথে রীতিমত একটা সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছিলো। পাশাপাশি বাড়ি ছিলো কার্লাদের আমার ভাইয়ের বাড়ির লাগোয়া। ফলে হাবীব ভাইয়ের বউ কার্লাকে আমাদের দেশীয় কালচার, পোষাক আষাকের মধ্যেও ঢোকিয়ে দিয়েছিলো। কার্লা আমাকে এক সময় “হাসবেন্ড” হিসাবেই চিঠিতে সম্বোধন করা শুরু করলো। প্রতি চিঠিতেই আমি ওর প্রত্যাহিক জীবনের ঘটনা, তার ভাবনা, তার শখ, কিংবা কষ্টের কথা জানতে থাকলাম। প্রচুর ছবি পাঠাতো আমাকে। আজ আমার কাছে কার্লার কোনো ছবি নাই। কেনো নাই সেটাও বলি। আমি কারো কোনো কিছুই ফেলে দেই না। কার্লার চিঠি, ছবি সব কিছু আমি আলাদা করে একটা বাক্সে ভরে রাখতাম। আমার সেই বাক্সটা রেখেছিলাম বর্তমানে আমার এক জেঠষের বাসায় খুব যত্ন করে। কোনো একদিন আমি ঐ বাক্সটা আনতে গেলে শুনলাম, ওনারা ঐ বাক্সটা খুব জরুরী কোনো বিষয় না বলে তার ভিতরের সব কাগজ পত্র সহ ফেলে দিয়েছে। খুব কষ্ট লেগেছিলো, কিন্তু বলতে পারি নাই কি তারা ফেলেছিল। কার্লার এক বন্ধুর নাম ছিলো মিন্ডি। মিন্ডি সম্পর্কেও কার্লা অনেক কথা লিখতো। আমার এই ডায়েরিতে একটি মাত্র লেখা আছে যার নাম WAS IT PENFRIENDSHIP? এটা আসলে এই কার্লাকে নিয়েই লেখা। এই লেখাটা কোনো কাল্পনিক নয়। এটা নিছক একটা এমন লিখা যা বাস্তবে ঘটেছিলো। অনেক কিছুই লিখার ছিলো কিন্তু আজ যেহেতু সে কাছেও নাই, পাশেও নাই, সেটা রহস্য হয়েই থাকুক।
আগেই বলেছিলাম যে, আমার বাবার আগের একটা সংসার ছিলো। আমার প্রথম মা মারা যাওয়ার পরেই আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমার মায়ের বয়সের থেকেও আমার বাবার আগের সন্তানদের বয়স অনেকেরই বেশী ছিলো। আমার স্টেপ ব্রাদারদের সংখায় ছিলো তিন- নজর আলী ভাই, তাজির আলী ভাই আর মোহসীন ভাই। শোনা যায় যে, ইউনুস নামেও নাকি আমার আরেক স্টেপ ব্রাদার ছিলো কিন্তু সেটা সম্ভবত আমার মায়ের বিয়ের পর পরই তার মৃত্যু হয়। আত স্টেপ বোন ছিলো ৪ জন- জামিনা, লজ্জুতন, বেলাতন, আরাদন আর আরাফান আপা। তারা এখন আর কেউ বেচে নাই। আমার এই স্টেপ ভাই বোনদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশী যেই জনের সাথে আমার ব্যক্তিগত খাতির ছিলো সেটা নজর আলী ভাইয়ের সাথে। আর এর একটা কারনও ছিলো। নজর আলী ভাই আমাদের বাক্তার চর বাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার আর রবিবার কাচা বাজারের দোকান দিতেন। আর আমি যখন বাজারে যেতাম, তখন তার সাথে আমার সপ্তাহে দুইদিন দেখা হতোই। নজর আলী ভাইয়ের ছিলো দুই ছেলে-তালেব আর ঈমান আলী। মেয়ে ছিলো দুইজন, রাশেদা আর অন্য আরেক জন। এই মুহুর্তে নামটা মনে করতে পারছি না তবে তার একটা মেয়ে আছে যিনি নার্স শেফালী। তাজির আলী ভাইয়ের ব্যাপারে “আমার বাবার মাদবড়ি স্টাইলের” মধ্যে বিস্তারীত লেখা আছে। সেই তাজির আলীর অনেক গুলি সন্তান ছিলো। তার মধ্যে বর্তমানে মান্নানই এখন আমার সাথে অনেক বছর যাবত যুক্ত আছে। মোহসীন ভাইয়ের সন্তান্দের সাথে এক সময় কিছুটা যোগাযোগ ছিলো কিন্তু এখন কে যে কোথায় কিভাবে আছে আমার সে ব্যাপারে কোনো ধারনা নাই।
সবাই তাঁকে শায়েস্তা নামেই চিনতো। সে আমার বোনদের মধ্যে ছিলো ২য়। শায়েস্তার জীবন একটা দুখী মানুষের কাহিনী ছাড়া আর কিছুই না। তার গায়ের রং ছিলো বেশ কালো কিন্তু খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে ছিলো আমার এই বোন শায়েস্তা খাতুন। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহই আসলে পুরু ৫ বোন আর আমি সাথে মায়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে এতোটাই হিমশিম খাচ্ছিলেন যে, এতা ছিলো আমার ভাইয়ের জন্য অতিমাত্রায় একটা চাপ। তার উপর সবে মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে, চারিদিকে মানুষ যেমন বেকার তেমনি শুরু হয়েছে দূর্ভিক্ষ। এর মাঝেই আমার বড় ভাই যতোটা পেরেছে তার সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে আমরা কিছুটা হলেও ভালো থাকি। অভাবের সংসারে আসলে কোনো কিছুই নিজেদের নিয়ন্ত্রনে থাকে না। মায়ের উপর চাপ যেনো আরো বেশী ছিলো। ৫ টাই প্রায় বিবাহ যোগ্য মেয়ে, আমিই এক মাত্র ছোট। দেশের অবস্থ্যা শোচনীয়, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই। যখন তখন যে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। ফলে মা নিজেও চাচ্ছিলেন মেয়েগুলির তারাতাড়ি বিয়ে হয়ে যাক। ঠিক এই সময়ে বরিশাল বাড়ি একটা ছেলে শায়েস্তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়। নাম সুলতান আহমদ। মা শায়েস্তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। এই বিয়েতে হাবীব ভাই রাজী ছিলেন না। কেনো ছিলেন না, বা কেনো মা ই বা রাজী ছিলেন এই অংক আমার কাছে পরিষ্কার ছিলো না আর না আমার বুঝবার বয়স ছিলো। শায়েস্তার কোলে একটা কন্যা সন্তান আসে। ওর নাম রাখা হয় শেফালী। একদিন সুলতান তার নিজের বাড়ি বরিশাল যাওয়ার জন্য গেলে সুলতান আর কখনোই ফিরে আসে নাই। কি হয়েছিলো, কোথায় উধাও হয়ে গেলো, নাকি রাস্তায় মারাই গিয়েছিলো কিছুই আর জানা যায় নাই। আজ অবধি আমাদের কারোই জানা নাই এই সুলতান কি বেচে আছে নাকি মরে গেছে। দিন যায়, মাস যায়, বছর শেষ হয়ে যায়, শায়েস্তা সুলতানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক সময় আমরা ধরে নেই যে সুলতান হয়তো আর ফিরে আসবে না অথবা তার মৃত্যু হয়েছে। এমনি অবস্থায় ১৯৭৮ সালে আমার বড় ভাই আমেরিকায় স্কলারশীপ পান। কিন্তু তখন সবেমাত্র লায়লার বিয়ে হয়েছে, ফাতেমার ও বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো, সাফিয়া তো আর ছিলোই না। বাকী ছিলো শায়েস্তা আর মেহের। একদিন ঢাকা থেকে একটা বিয়ের সমন্ধ আসে শায়েস্তার জন্য, নাম আলি আহমদ। উর্দু রোডে থাকে, কুট্টি পরিবার না হলেও কুট্টিদের সাথে থাকতে থাকতে প্রায় কুট্টি দের মতোই আচরন ছিলো। বিগ হার্টেড ম্যান কিন্তু সামর্থের বাইরে খরচের অভ্যাষ। কিন্তু আলী আহমদের৪ স্ত্রী বিয়োগ হয়ে গিয়েছিলো। সেই ঘরে একটা মাত্র মেয়ে ছিলো নাম লায়লুন্নাহার। খুবই সুন্দর একটা মেয়ে ছিলো। প্রায় ১৫ বছর বয়সের। শায়েস্তার সাথে আলী আহমদের বিয়ে হবার পর শাতেস্তারা উর্দু রোডে চলে আসে। এই আলি আহমদের৪ ঘরেই শায়েস্তা ৪ টি সন্তান জন্ম দেয়- ফারুক, নুরুন্নাহার, লিয়াকত আর শওকাত। লিয়াকত আর শওকাত জমজ। লিয়াকত আর শ ওকাতের বয়স যখন মাত্র ৫ মাস, তখন শায়েস্তার মৃত্যু হয়। আর ওর মারা যাওয়ার কারনে আলী আহমদ সব বাচ্চাদেরেকে এক সাথে আমার মায়ের কাছে রেখে চলে আসে। একদিকে শেফালি ছিলো মায়ের ঘাড়ের উপর, অন্যদিকে শায়েস্তার আরো ৪ টি সন্তান গিয়ে পড়লো মায়ের উপরেই। অসহায় মার কিছুই করার ছিলো না। শুরু হলো মার আরেক স্ট্রাগলের অধ্যায়। আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দিয়েছিলো শায়েস্তার সব সন্তানরা।
সাফিয়া খাতুন আসলে আমাদের বোনদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে সাফিয়া খাতুন মারা যায়। সাফিয়া খাতুন প্রথমে একটা বিয়ে করার পর তার স্বামী মারা গেলে পরবর্তীতে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে। কিন্তু সেটাও বেশীদিন টিকে নাই কারন সাফিয়াই মারা গিয়েছিলো। আমি তখন সবে মাত্র ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজ থেকে ছুটিতে এসেছিলাম। বর্ষার দিন, ঝড়ও ছিলো। আমার যাওয়ার কথা ছিলো সাফিয়ার বাসায়। কিন্তু আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম বালুচর এলাকায়। ঝড়ের কারনে আমার আর গ্রামে ফেরা হয় নাই। সেদিন রাতেই সাফিয়ার শরীর খারাপ হয়ে যায় এবং রাতেই সাফিয়া মারা যায়। ছোট মেয়ে মাত্র, বয়স তিন মাস। সাফিয়ার চেহারা ছিলো খুব সুন্দর। সাফিয়া যখন মারা যায় তখন রাত প্রায় ১০ টা। ঝড়ের কারনে খবরটা আমাদের বাসায় আসতে আসতে সকাল হয়ে যায়। আমি বালুচর থেকে গ্রামে আসতে আসতেই ওর শশুড় বাড়ির লোকজন ওকে দাফন করে ফেলে। তারপর আমি গেলাম সাফিয়ার বাসায়। গিয়ে দেখলাম সাফিয়ার মেয়ে শান্ত ভাবে যেনো ঘুমিয়ে আছে। আমার মনটা খুবই খারাপ ছিলো। কোথায় কবর দেয়া হয়েছে সেটা দেখার জন্য আমি সাফিয়ার কবরের কাছে গেলাম। সারারাত বৃষ্টি আর ঝড় থাকলেও শিয়াল কুকুরের কাজ থেমে ছিলো না। এই সব প্রানীগুলি সাফিয়ার কবরে হানা দিয়েছিলো। কিন্তু যে কোনো কারনেই হোক সাফিয়ার লাশটা আস্ত অবিকল ছিলো। কবরের পাশে গিয়ে দেখলাম যে, কবরের মুখটা খোলা। বাশ আর চটি গুলি সরে গেছে। সাফিয়ার লাশের উপরের সাদা কাফনের কাপড়টা একদিকে একটু সরে গেছে আর ওর মুখটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চুল গুলি ছিলো একেবারেই অগোছালো। আমি মাথা নীচু করে যখন সাফিয়ার মুখটা দেখতে গেলাম, আমি ভীষন ভয় পেয়েছিলাম লাশ দেখে। কেনো ভইয় পাইলাম, আর কি হলো আমি কিছুই বুঝ্যি নাই কিন্তু বাড়িতে আসার পর আমার অনেক জ্বর হয়েছিলো। আমার কাছে সাফিয়ার কিংবা ওর মেয়ের কোনো ছবি নাই। পরবর্তীতে সাফিয়ার তিন মাসের বাচ্চাতাও মায়ের অভাবেই হোক আর অযত্নেই হোক সেও বাচে নাই। সাফিয়ার কোনো বংশধর এই পৃথিবীতে নাই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুক।
ফাতেমা বর্তমানে আমার জীবিত বোনদের মধ্যে ২য়। তার স্বামী মোঃ সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু মিয়া। দুদু মিয়ার ব্যাপারে এখানে আগেই বিস্তারীত বলা হয়েছে। ওর স্বামী মারা যাওয়ার পরে ওর বড় ছেলে ফরিদের সাথে জাপানেই আছে। ফাতেমার দুটু মেয়ে আর ৪ টি ছেলে। মেয়ের মধ্যে বড় হচ্ছে সালেহা। সালেহার স্বামী আইনুল মোটামুটি ভালো অবস্থাএই আছে। ঈটের ভাটার মালিক। কিন্তু ছোট মেয়ে খালেদার প্রেমের মাধ্যমে বিয়েটা খুব একটা ভালো পরিনতি হয় নাই। মিজান খালেদার স্বামী। ইনকাম ট্যাক্সের অফিসে চাকুরী করে। তার যেমন ঘুষের বাহার তেমনি নারিদের প্রতি চরম ভালোবাসা। ফলে নিজের স্ত্রীর প্রতি তার ততোটাই অনীহা। খালেদার বাসায় আজ পর্যন্ত আমি পানিটুকু পর্যন্ত খাই নাই কারন সবই অবৈধ রোজগার।
বর্তমানে যে কয়জন আমার বোন জীবিত আছেন, তাদের মধ্যে লায়লা সবার বড়। গ্রামেই থাকে। তার স্বামীর নাম মোঃ ইসমাইল হোসেন যিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। বয়স প্রায় এখন ৭০ এর কাছাকাছি। সর্বশেষ মুসলিম নগর প্রাইমারী স্কুল থেকে হেড মাষাটার হিসাবে রিটায়ার করার পর তিনি আমার সাথেই আছেন। আমি চেষ্টা করেছি এই দুলাভাইকে কোনো আর্থিক সাহাজ্য না করে কোনো কর্ম সংস্থানের মাধ্যমে সাহাজ্য করা যায় কিনা। তাতে তিনি একটু সুস্থ যেমন থাকবেন তেমনি আর্থিক ভাবে একটু সচ্ছলতাও থাকবে। দুলাভাই আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজেই আছেন প্রায় ১০ বছর যাবত। ফ্যাক্টরীটা বন্ধ করার পরেও আমি উনাকে ওখানেই রেখে দিয়েছি যাতে ফ্যাক্টরীর দেখভাল এবং নিজেও ভালো থাকেন। খুবই চরিত্রবান লোক এই দুলাভাই। লায়লার ৪ ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে মাহবুব একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং সরকারী চাকুরীজীবি। বর্তমানে মাহবুব কর্নফুলি পেপার মিলস এ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছে। লায়লার অন্য এক ছেলে জাপানে থাকে আর বাকী ২ জন দেশেই আছে। লায়লার মেয়ের নাম জেসমিন। অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছে। নিজেই নিজের সংসার চালায়। সারাজীবন কষ্টেই জীবন পার করেছে আমার এই সব বোনেরা। এখন যে সুখে আছে এমনটা নয়। ডায়াবেটিসে ভুগছে আমার বোন। বেশীরভাগ সময় অসুস্থই থাকে। খুব একটা যাওয়া হয় না আমার গ্রামে। তাই খুব একটা দেখাও হয় না। আমি চেষ্টা করি দুলাভাইকে কিছু টাকা বেশী দিয়ে ইন্ডাইরেক্টলী আর্থিকভাবে ওর সংসারে সাহাজ্য করতে। লায়লার যে ছেলে জাপানে থাকে তার নাম স্বপন। মাহবুবের মতো সেও ম্যারেড। আসলে লায়লার সব ছেলেমেয়েরাই ম্যারেড। কিন্তু এতোগুলি সন্তানের বয় থাকার পরেও লায়লাকে একাই নিজের দেখভাল করতে হয়। এটা খুব একটা সুখের খবর না। স্বপনের বিয়েটা হয়েছিলো “টেলিফোনে” জাপানে থেকে বাংলাদেশে। আমি সে বিয়েতে ছিলাম। মেয়েটা আমাদের হাসনাবাদ ইকুরিয়ার মেয়ে। সম্ভবত প্রেমের বিয়ে। আমি সপরিবারে ওর বিয়েতে ছিলাম কিন্তু বর স্বপন ছিলো জাপানে। এই জাতীয় বিয়ে আমার পছন্দ নয় যেখানে বর বাইরে আর কনে দেশে অথচ বিয়ে করতেই হবে। এটা আজকালকার দুনিয়ায় যেনো ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। লায়লা ছোটবেলায় ভীষন সুন্দুরী ছিলো আর ছিলো খুব ট্যালেন্ট। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর পড়াশুনা করতে পারে নাই। এর মধ্যেই ওকে বিয়ে করতে হয়েছিলো। মাওহবুব আর স্বপনের কয়েকটি ছবি এখানে আপলোড করা হলো। সাথে স্বপনের স্ত্রীর ছবিও। আমার কাছে এই মুহুর্তে লায়লার অন্যান্য সন্তানের কোনো ছবি নাই বিধায় আপলোড করতে পারলাম না। পরে আপডেট করা হবে।
সবচেয়ে বামের লোকটি হচ্ছেন লায়লার স্বামী ইসমাইল ভাই। এই ছবিটা প্রায় ৭/৮ বছর আগে তোলা। তিনি সপ্তাহের ৬ দিন পলাশপুরেই ফ্যাক্টরীতে থাকেন, আর একদিন গ্রামে যান। তবে যখনই দরকার হয়, তিনি যখন তখন বাড়িতে গেলেও আমার পক্ষ থেকে কখনো কোনো না ছিলো না। অত্যান্ত অমায়িক আর সহজ সরল মানুষ। আমাদের পরিবারের সেই ১৯৭৬ সাল থেকেই তিনি সাথে আছেন এবং সব সময় পাশেই পেয়েছি। তিনি আমার প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষকও ছিলেন। সৎ মানুষ এবং ঝামেলাবিহীন মানুষ। অল্পতেই তুষ্ঠ থাকেন।
এই ছবিটায় আমার মেয়ে উম্মিকার সাথে স্বপনের স্ত্রী যেদিন তার বিয়ে হয় সেদিন তোলা। মেয়েটার মধ্যে একটা জিনিষ লক্ষ করেছি যে, গরীব মানুষের মেয়ে বলে হয়তো একটু সাংসারীক চিন্তাভাবনা আছে। বাকী ভবিষ্যত বলবে আগামীকালের সময় আর তার ভাবনার মধ্যে।
এই ছবিটা লায়লার বড় ছেলে মাহবুবুর রহমানের। ৭ ই নভেম্বর ১৯৭৬ সালে ওর জন্ম। তখন দেশে প্রচন্ড দূর্ভিক্ষ চলছিলো। ওর বাড়তি দুধের ব্যবস্থা করতেই আমার দুলাভাই আর বোনের হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে। ঐ সময়ে শুধু লবনের দামই উঠেছিলো ১০০ টাকার উপর প্রতি কেজি। বর্তমানে মাহবুব তিন সন্তানের বাবা। আর সরকারী ভালো অফিসেই কাজ করে। মাহবুবের শশুড় মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মানুষ। কোনো রকমে বর্তমানে সংসার টিকে রেখেছেন আর্থিক দিক দিয়ে। মাঝখানে প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ চলাকালে তিনি আমার ফ্যাক্টরিতেও ইসমাইল ভাইয়ের সাথে কাজ করেছেন কিন্তু বয়সের ভাড়ে লোড নিতে পারছিলেন না বলে কাজটা ছেড়ে দিতে হয়েছিলো। মাহবুব তাদেরকে আর্থিকভাবে সাহাজ্য করে কিনা আমার জানা নাই।
এই ছবিটার মধ্যে যে মহিলাটি সর্ব ডানে গোলাপী ড্রেস পড়া, সেটা লায়লার একমাত্র মেয়ে জেসমীনের। জেসমিনের মেয়েরাও এই ছবিতে আছে। জেসমীনের স্বামীর নাম ছিলো খোকন। খুব একটা দায়িত্তশীল ছিলো না। কোনো এক সময়ে খোকন সাভারে কাজ করার সময় কাউকে না জানিয়ে আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করে। কোনো এক ঈদের দিন খোকন হার্ট ষ্ট্রোক করে মারা যায়। জেসমীনের স্বামী মারা যাওয়ার পরেও জেসমীন তার শশুড় বাড়িতেই বাচ্চাদের নিয়ে থেকে যায়। পিছনে দাঁড়ানো বাম থেকে ২য় মেয়েটি জেসমীনের মেয়ে।
উনি আমার বোন। আমার ৫ বোনের মধ্যে সেইই সবার ছোট কিন্তু আমার ইমিডিয়েট বড়। নাম-মেহেরুন্নেসা। তার স্বামীর নাম আব্দুর রশীদ। ইন্টার পর্যন্ত পাশ করেছিলো রশীদ ভাই। একবার বিদেশেও গিয়েছিলো কাজের খোজে কিন্তু বেশীদিন টিকতে পারে নাই। অতঃপর বহুদিন পোষ্ট মাষ্টার হিসাবে কাজ করেছেন। কোনো কিছুতেই খুব একটা সুবিধা করতে পারেন নাই। অতঃপর ব্যবসা শুরু করেন-ইটের ভাটার। সেটাতে মুটামুটি ভালো করেছেন। তার দুই ছেলেকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন, তারা এখন অবধি বিদেশেই আছেন। সচ্ছল অবস্থা এখন। কিন্তু আমার বোনের সুখের মুখ আসে নাই। সারাদিন কাজের মধ্যেই থাকে। আসলে লেখাপরা করার মতো সুযোগ তাদের ছিলো কিন্তু পরিস্থিতির কারনে সেটা হয় নাই। ১৯৭৭ সালে তার বিয়ে হয়। তারা জানতো তাদেরকে যেভাবেই হোক স্বামীর ঘর করতেই হবে ফলে যতো কষ্টই হোক তাদেরকে সেটা মেনেই চলতে হয়েছিলো। ভীষন পরিশ্রমী একজন মানুষ। একটাই মেয়ে আর সেও অবিকল মায়ের মতো দেখতে। তার বিয়ে হয়ে গেছে, ভালো আছে।
যখন আমি ছোট ছিলাম, এক সময় যে কোনো কারনেই হোক আমার এই বোন একবার আমার সাথে ঢাকায় কিছুদিন বদি ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করেছিলো। খুব একটা সুখকর পরিস্থিতি হয় নাই সে বাড়িতে। অবশেষে মেহেরুন্নেসা শেষ পর্যন্ত গ্রামেই ফিরে গিয়েছিলো। গরীব মানুষের আসলে বন্ধু থাকে না। তাদের থাকে মনীব। আমার এই বোনের চেহারা দেখলেই কিন্তু বুঝা যায় তার মনের ভিতরে কষ্ট আছে, যন্ত্রনা আছে কিন্তু যখন কোনো মেয়েদের বাবা থাকে না, তাদের কষ্টের কথাও বলার কোনো লোক থাকে না। আমি তাই সব সময় দোয়া করি ওরা যেনো অন্তত ভালো থাকে। ওরা আসলেই খুব ভালো মানুষ। মা যতোদিন বেচে ছিলো, প্রায় প্রতিদিনই মেহের মায়ের কাছে আসতো কিন্তু মা মারা যাওয়ার পরে সম্ভবত আর আসা হয়নি ওর।
আলাউদ্দিন চৌধুরী আমার শশুড়। আমি তাঁকে দেখিনি কারন তিনি আমার বিয়ের প্রায় ৫ বছর আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। আমার শশুড়ের আব্বার নাম চিলো সোনাম উদ্দিন চৌধুরী। অত্যান্ত এক রোখা মানুষ ছিলেন তিনি। তার মোট তিন পুত্র আর এক মেয়ে ছিলো। তিন পুত্রের নাম জনাব আলাউদ্দিন চৌধুরী, ডাঃ কুতুব উদ্দিন চৌধুরী এবং নিজাম উদ্দিন চৌধুরী।
আমার শশুড়ের তিন ছেলে আর আট জন মেয়ে ছিলো। তারা হচ্ছে জনাব নূর আহমদ চৌধুরী, সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, এবং মুস্তাক আহমদ চৌধুরী। মেয়েরা হচ্ছেন- মিসেস জায়েদা খাতুন, নূর জাহান, শেলিনা, সামসুন্নাহার, মিটুল চৌধুরী,
আলাউদ্দিন চৌধুরীর বংশের উপরে আমার এই ডায়েরীতে একটা রুপক গল্প আকারে লেখনী আছে যার নাম দিয়েছি- চৌধুরী বাড়ীর অসমাপ্ত গল্প”। গল্পটার শেষ আমি জানি না কিন্তু একটা ব্যাপার আমি বাস্তবে লক্ষ্য করেছিলাম যে, সোনাম উদ্দিনের মতো আরেক জন তার বংশধর এই যুগেও তৈরী হয়েই ছিলো, যার নাম হাসান আহমদ লিখন। অনেক গুনাবলী (বিশেষ করে আগ্রাসন নীতি এবং অন্যের হক নষ্টের নমুনা) তার মধ্যেও আমি দেখেছি।
আমি এই “ আলাউদ্দিন চৌধুরীর” অংশে চেষতা করেছি যতোটুকু বস্তুনিষ্ঠ ইনফর্মেশন দেয়া যায়, সেতা দেয়ার। মূল্যায়ন সব পাঠকের উপর। কাউকে ছোট করার কোনো অভিলাষ আমার কোনো কালেই ছিলো না, আর এ রকম করার কোনো কারনও আমার নাই। আমি শুধু সময়ের সাথে সাথে কি ঘটেছে সেগুলু লিখে রাখার চেষতা করেছি।
আমার শাশুড়ি মিসেস জেবুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। তিনি শেষ বয়সে এসে প্যারালাইসিস ছিলেন। খুড়ুয়ে খুড়িয়ে হাটতেন। আমার বাসাতেই তিনি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তার শেষ সময়টুকু আমার সাথেই আমার বাসায় কাটিয়েছেন। তিনি আমার বাসা থেকেই বেহেস্তবাসী হয়েছিলেন।
মানুষের জীবনের সব কিছুই খোলাশা নয়। কিছু কিছু ঘটনা আছে, কিংবা বিষয় আছে অথবা মুহুর্ত আছে যা শুধুমাত্র নিজের এবং আর কারো না। যদি এসব কাউকে বলতেও চাই, সেগুলি না বিশ্বাসযোগ্য, না বলার মতো বলে মনে হয় অথচ ঘটেই যায়। এটা সবার জীবনেই ঘটে, হোক সে যুবক কিংবা বৃদ্ধ। যদি যুবক বয়সে ঘটতে থাকে, তখন বৃদ্ধ বয়সে এসে তা জাবর কাটে, আর যদি বৃদ্ধ বয়সে ঘটতে থাকে, তখন অনেকেই এটাকে না মানতে চায়, বা মানাতে চায়। তখন এর নাম হয় ভীমরতি।
কিন্তু একটা কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, মানুষ যখন কষ্টে থাকে তখন তার দরকার পড়ে একজন সাথীর, আবার মানুষ যখন ফুর্তিতে থাকে, তখনো দরকার হয় তার সাথী, অথবা মানুষ যখন নিজে নিজে একা হয়ে যায়, তখনো দরকার হয় তার একজন সাথীর। একজন স্ত্রীর অথবা একজন স্বামীর জন্য স্বামী বা স্ত্রীই যে সর্বদা ম্যাচিং সাথী হবে এমনটা কখনোই না। সারাজীবন এক ছাদের তলায় বসবাস করেও একজন স্ত্রী হয়তো কোনো এক সময়ে এসে সে তার স্বামীকে হয়তো বুঝতেই পারে না, আবার যুগের পর যুগ একসাথে একই বিছানায় ঘুমিয়েও একজন স্বামী তার স্ত্রীকে হয়তো হারিয়েই ফেলে কোনো এক সময়ে। তখন না স্বামী, না স্ত্রী কেহই একে অপরের যোগ্য সাথী হয়।
অন্যদিকে, আজকের দিনে জয়েন্ট ফ্যামিলি যেনো অনেকটা সপ্নের মতই মনে হয়। অথচ একটা জয়েন্ট ফ্যামিলির কেউ না কেউ কারো না কারো সাথীর ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে তাদের শুন্যতাকে ভরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ আজকাল এতোটাই ব্যস্ততায় নিজেকে নিয়ে থাকে যে, নিজের অভাব পুরন করতে করতেই তার সময় শেষ হয়ে যায়, অন্যের জন্য খরচ করার সময় তার নাই। হয়তো এর মধ্যেই জুটে যায় অপরিচিত কোনো এক সত্তা যিনি হয়তো সাময়িকভাবে দিতে পারে দুদন্ড শান্তি সেই বনলতার মতো। এই বনলতারা হটাত করেই উদয় হয় একেবারে কোনো এক অজানা জায়গা থেকে। ওরা আসলে এই সমাজেই থাকে কিন্তু কখন যে এরা সবার আড়ালে বনলতা কিংবা পুরুষলতা হয়ে উঠে কেউ জানে না। একেবারে অতি সংগোপনে এরা একে অপরের সাথী হয়ে যায়। কনো ব্যারিয়ার থাকে না এদের মাঝে। শারিরিক, দৈহিক কিংবা আর চরম গোপনীয়তাও এদের মাঝে আর কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। অবশ্য বনলতারা সব সময় থাকেও না, একটা সময় আসে তারাও এক বৃক্ষ থেকে আরেক বৃক্ষে, এক সমতল থেকে আরেক মালভূমিতে কিংবা কোন এক জনপদ থেকে আরেক জনপদে তারা একেবারেই হারিয়ে নতুন কারো সাথে জোড়া বাধে। এই বনলতারা কেউ কাউকেই আঘাতে বিশ্বাস করে না আবার কেউ আজীবন তাদের জীবনটাকেই বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে।
আমার জীবনেও এমন কেউ এসেছিলো বা আসতে চেয়েছিলো। অরু, মেঘলা, সন্ধ্যারানি, রেনু কিংবা শারমিন অথবা সানা এরা এ সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রেস্ট্রিক্টেড প্রানী যাদের মুখাবয়ব সমাজে পুরুপুরি উম্মুক্ত নয় কিন্তু সবার সামনেই ওরা চলাচল করে। এরা সবাই কোথাও না কোথাও অসুখী মানুষ। আবার কেউ কেউ অসুখী কিনা সেটাও বুঝতে পারেনা, ভাবে ঠিকই তো আছে। ফলে এদের মধ্যেও একতা শ্রেনীভাগ আছে। কেউ সাহসী, কেউ একেবারেই ভীতু, কেউ ধর্ম ভীরু, কেঊ সমাজভীরু, কেউ ব্যক্তিভীরু আবার কেউ পরিবারের জন্য ভীতু। অরুরা ছিলো ডেস্পারেত, মেঘলারা ছিল মডারেত, সন্ধ্যারানীরা ছিলো আত্তগোপনের মতো কেউ, রেনুরা সমাজের কোথাও না কোথাও রাজত্ব করতে গিয়ে পারায় বড় আপু হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকাএ মানুষের মত, শারমিনেরা অদ্ভুত আচরনের ধারায় সবাইকে হতাশ করে আবার অন্যত্র বাসা বাধে। কিন্তু সানারা সুখী না হলেও কোনো রিস্ক নিতে ইচ্ছুক না। তাই এই সানারা সব সময় থাকে একা। তবে যাইই হোক, অনেক অসুখী মানুষেরা যখন একত্রে যাত্রা করে, তাদের আর অসুখী মানুষের দল হিসাবে ভাবা যায় না। তারা সবাই একটা মানের মধ্যে পরিপুর্ন। যেমন অরুর কথাই বলি-সে প্রথম জীবনে যা পেয়েছে, তার মধ্য জীবনে পেয়েছে গোলাভরা ধান আর মাঠ ভরা ফসলের মতো প্রচুর ধন সম্পদ। দুহাতে বিলিয়েও সেটা শেষ করা যায় নাই। আবার অরু যখন সেই পর্যাপ্ত সুখের জীবনে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলো, তখন তার কাছে সেই জীবনটাই আবার একঘেয়েমিতে ভরে উঠেছিলো। তার অন্তর সন্ধ্যান করতে চেয়েছিলো এমন এক সমতল যেখানে সে নিজেই একজন অপরিচিত মানুষ বা আগন্তক। কেউ তো ছিলো যে তাকে হাতছানী দিয়েছিলো কোনো এক অলৌকিক আনন্দের ভরষায়। অতঃপর সে দল ছেড়েছিলো। এরপর তার কি হয়েছিলো, সেটা আমার এ জীবনে জানা হয়নি।
যখন অরুলতা প্রস্থান করে, প্রকৃতির নিয়মে সেই স্থান দখলে চলে যায় ভীরুলতার কাছে, আর সেটা সানা নাম ধরে বিচরন করে সমাজে। কিন্তু ভীরুলতা সেই অরুলতার মতো এতো এগ্রেসিভ ছিলো না যে, তার স্থান দখল করলেও একই প্রভাব রাখতে পারেনি। এই দুই লতার, ভীরুলতা আর অরুলতার মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ধর্মালয়ের ন্যাচারীক রকম মনে হলেও একজন আরেকজনের প্রায় বিপরীত ছিলো। অথচ দুজনেই চেয়েছিলো অসীম কোন আনন্দের ফোয়ারা। পেয়েছিলো কি?
হয়তো পেয়েছিলো কিন্তু সেটা অন্তত আমার এই জীবনে জানা যায়নি। কিন্তু জানা হয়েছিলো কিছু “হ্যাপি” মানুশের কিংবা জ্যোৎস্না কাননের একচ্ছত্র মালিকের জীবনী থেকে যে, ওরা কোনো রকমে জীবনের সবগুলি অংশ পার হয়ে যেখানে থিতু হয়েছিলো সেটা এক রকমের বেচে থাকার মতো। ফলে ওরাও সুখের হাতছানীতে এমন কিছু বাস্তবিক কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলো এবং গিয়েছিলো যা প্রকাশের বহির্ভুত কিন্তু সেটাও বাস্তব। কোথায় যেনো জীবন শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো পরিস্থিতির কাছে পরাস্ত হয়ই। কেউ আসলে সুখী নয়, টাকাওয়ালা, স্বামীওয়ালা, স্ত্রীওয়ালা, সুন্দুরী, কিংবা রাজ্যের প্রতাপ্সহালী কেউ, কেউ সুখী নয়। আমরা যা দেখি সেটা ভুল। যা দেখি না, সেটাই সত্য কিন্তু রেস্ট্রিক্টেড ইভেন্টস। ভীরুলতাকে অনেক বার হাতছানিতে ডাকলেও সে ছিলো প্রান্তি চাষির মতো। সে কখনোই তার ক্ষেত থেকে বেরিয়ে আইলে উঠতে চায় নাই। কিন্তু ক্ষেতে বসেই আইলে গজানো মিষ্টি কলার সাধটা চেয়েছিল। কিন্তু কলা গাছের একটা বাহ্যিক বৈশিষ্ট ছিলো যে, সে যতোক্ষন না তার সাথে লেপ্টে থাকে, তার মিষ্টি কলার ভাগ সে কাউকে দিতে নারাজ। তাই ভীরুলতা যা পেতে চেয়েছিল-হটাতই সেটা হাতছাড়া হয়ে উঠে।
প্রতিটি মানুষের একটা ইতিহাস আছে। সে পাগল হলেও তার একটা ইতিহাস আছে। কেনো পাগল হল, কিসের কারনে সে পাগল, কিংবা কে তারে পাগল করলো অথবা তার পাগলামীর কি রহস্য অথবা অর্থ সেই সবকিছুর একটা ইতিহাস কোথাও না কোথাও তো আছেই।
একটা ব্যাপার আমার প্রায়ই মনে আসে, আমরা কেমন একটা যুগে বেচে আছি? উত্তর খুব কঠিন না। দূর্ভাগ্যবশত আমরা আসলে এমন একটা যুগে পদার্পন করে বেচে আছি যেখানে জঘন্যতম অপরাধও স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে আর গভীরতম সম্পর্কগুলি হয়ে যাচ্ছে মুল্যহীন। আর এসব চরমপন্থী যুগ আর বৈষম্য মুলক সমাজ ব্যবস্থায় আমরাও মানুষেরা নিজেদের আচরনে স্বাভাবিকতাকে ঝেড়ে ঝুড়ে এমন কিছু ঘটনায় আকড়ে যাচ্ছি যা আসলে অন্যের কাছে ভাগাভাগি করে নেয়া যায় না। অথচ ব্যাপারগুলি ঘটছে। কিছু কিছু ঘটনা থাকে যার কোনো প্রমান থাকে না, কোনো সাক্ষী নাই, কোন প্রত্যক্ষ মানুষের চোখে পড়ে নাই, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। এটা যদি ক্রাইম হয়, তাতেও পারফেক্ট ক্রাইম বলা যাবে না কারন পার্ফেক্ট ক্রাইম বলতে কিছুই নাই। হয়তো ইনভেষ্টিগেশন তাকে ছুতে পারেনি। এর মানে এটা আন্সল্ভড কেস নয়। আর যদি এসব কাহিনি হয়ে থাকে কোন যুগপদ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত চেষতায় তাহলে সেখানে ইনভেষ্টিগেশন খুব একটা পৌঁছায় না। আর এই গোপন ব্যাপারগুলিই মানুষের জীবনে কনো না কোনো সময় রেষ্ট্রিক্টেড ঘটনা হয়ে পড়ে থাকে একেবারেই আন্সল্ভড ফাইলের কেসের মত।
ব্যাপারটা অনেকটা মিসিং কেসের মতো। একজন মিসিং হলোকিন্তু কেউ মিসিং কেস করলোই না। হয়তো কেউ তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। অথবা কেউ জানেই না তাদের কেউ মিসিং হয়েছে। অথবা হয়তো জানে কিন্তু কেউ মিসিং কমপ্লেইন করলোই না। একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষ মাঝে মাঝে জিক্স পাজেলের মতো এদিক সেদিক ক্ষনে ক্ষনে ঘুরে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে, অথবা লোক চক্ষুর আড়ালে। তার আশেপাশের মানুষ এমন কি তার পরিবারের মানুষেরাও জানে না আসলে গল্পটা কি। তারা হয়তো জানেই না এই হারিয়ে যাওয়ার পিছনের গল্পটা কি এবং কোথায় শুরু।
একটা মানুষের ক্রমাগত উর্ধগতির উত্থান তার আশেপাশের সবাইকে প্রায় মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। তখন শহরের বিলবোর্ড, গ্রামের চায়ের দোকান, কিংবা ম্যাগাজিনের কাভার পোষ্টে সে উজ্জ্বল জলজ্যান্ত মহানায়কের মতো বিচরন করে বেড়ায়। চেনা জগতটার মধ্যে হাজার হাজার অচেনা বন্ধুদের ভীরে চেনা জগতটাই যেনো অচেনা হয়ে যায়। মনে হয় তখন দুনিয়ার স্বর্ণদুয়ার খুলে যায়। তার নাম সর্বত্র উচ্চারিত হতে থাকে প্রশংসায় আর ঈর্ষায়।
যখন কনো না কোনো কারনে এই মানুষটার দূর্দিন শুরু হয়, হোক সেটা যে কন কারনেই। হয়তো রোগভোগে, হয়তো কোনো কঠিন দূর্ঘটনায়, কিংবা কোন অকস্মাৎ অকল্পনীয় অঘটনে। তারপর সমস্ত কিছু পালটে যায়। তখন দেহ চুরমার হয়ে যায়, স্বপ্ন ভেংগে যায়, স্পটলাইট সরে যেতে থাকে, ক্যামেরার ক্লিক বন্ধ হতে থাকে, মোবাইলের রিংটোন কমতে থাকে, মনে হয় কেমন যেন নীরবতা। এই নিস্তব্দতা কান ফাটা হাততালির থেকেও যেন ভয়ংকর। কেমন যেন শরীর অবশ হতে থাকে, আয়ু কমতে থাকে, একই অনুপাতে পাশে দাড়ানর মানুষের সংখ্যাটাও কমতে থাকে।
বন্ধুরা সরে পড়ে, পরিচিত কিংবা অপরিচিত মানুষ গুলির আনাগোনা কমে যেতে থাকে, এমন কি পরিচিত মানুষগুলির ফোনও আনরিচেবল হয়ে যায়। একদা পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছবির পোজ নেয়ার জন্য অনুনয় করা মানুষগুলিও হাওয়া হয়ে যায়। যারা একান্ত বাধ্য হয় পাশে থাকতে, তারাও এক সময় বিরক্ত হয়ে উঠে। এই হৃদয় ভাংগা সময়ে, এতোসব মুখোশের ভীরে নীরবে তারপরেও কেউ না কেউ থাকে যারা আমাদের সেই উচ্ছল উজ্জ্বল সময়ে পাশে রাখা হয়নি। তখন সেই আলোকউজ্জল সময়ে আমরা ভুলে যাই-
এ দুনিয়া তোমাকে ততোক্ষনই ভালোবাসবে, যতোক্ষন তোমার সম্ভাবনা আছে কাউকে কিছু না কিছু দেয়ার এবং যে মুহুর্তে আমাদের পতন হবে, আশেপাশের কেওই আর থাকবে না।
সাফল্য দৃশ্যমান, কিন্তু অবহেলা অদৃশ্য। আলোর চারপাশে প্রচুর পোকামাকড় থাকে বটে, আলোটা নিভে যাওয়া মাত্রই ওগুলি অন্য আলোর সন্ধানে চলে যায়। তবুও সেই অন্ধকারের সময়ে কেউ না কেউ হয়তো থাকে। হোক সেটা কারো মা, বাবা বা খুব ভালো বন্ধু। সেই অন্ধকার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় –কে মুখোশ, কে মুখ, আর কে মায়াভরা মুখ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিছু গল্প আমাদেরকে ভেঙ্গেচূড়ে দেয়, কিছু গল্প আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, আর কিছু গল্প আমাদেরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যাকে আমরা বলি ঈশ্বর।
আমার জীবনের গল্পে সবগুলিই আছে। কিন্তু সবগুলি দৃশ্যমান নয়।
বিশ্বাস একটা আয়না, এটা ভাংলে আর জোড়া লাগে না। আর যিনি ভাংলেন আসলে তিনিই তার প্রতিচ্ছবি হারান। মানুষের বিশ্বাস হারানো মানে শুধু একটা সম্পর্ক হারানো নয়, এটা আত্তার একটা অংশ মরে যাওয়া। বিসশাসঘাতকেরা কখনোই বুঝতে পারে না-তারা যে বিশ্বাস নষ্ট করে সেটা আব্র তাদের জীবনেই বিষের মতো ফিরে আসে।
ভালোবাসা দিয়ে শুরু সম্পর্ক যখন মিথ্যায় ভরে যায়, তখন প্রতিটি নিঃশ্বাসই যন্ত্রনার গল্প বলে। বিশ্বাস ঘাতকের নিঃশ্বাস সবচেয়ে ভয়ংকর। কারন সে মিষ্টি কথা বলে, অথচ সে পিছনে বিষ ছড়ায়। বিশ্বাস ভাঙ্গার শব্দ কেউ শুনতে পায় না, কিন্তু সেই নীরবতার প্রতিদ্ধনী সারা জীবন কানে বাজে। যখন কেউ তোমার বিশ্বাস ভাংকে সে আসলে তোমাকে নয়, সে তার মর্যাদাকেই হত্যা করে।
প্রতি বছরই এই দিনটায় দাওয়াত পাই। এবার দাওয়াত পেলাম প্রধান উপদেষ্টা থেকে। যখন সেনাবাহিনীতে ছিলাম, পারতপক্ষে এই দিনটায় যাতে যেতে না হয় তাই ফাকী দিতাম বিভিন্ন অজুহাতে। ওটার একটা কারনও ছিলো। এসডি পড়ে যেতে হতো, মানে সিরিমুনিয়াল ড্রেস। খুব ভেজাল মনে হতো আমার কাছে। কিন্তু অবসর নেয়ার পর (যদি কোনো জরুরী ইভেন্টের কারনে যেতে না পারি সেটা ভিন্ন কথা, তা না হলে) যাওয়ার চেষ্টা করি এই কারনে যে, অনেক সিনিয়ার জুনিয়ার এবং গনমান্য ব্যক্তিদের সাথে দেখা হয়। ব্যাংকে গেলে, সিএমএইচ এ গেলে কিংবা সিএসডি তে গেলে ফাকফোকর দিয়ে সিনিয়ার জুনিয়ারদের সাথে যেমন দেখা হয়, তেমনি ২১ নভে,বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে মুটামুটি প্রায় সবার সাথেই একসাথে দেখা হয়। এই কারনেই আমি এখন এই দিনের দাওয়াতে মিস করতে চাই না।
এবারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে অনেক সিনিয়ারদের কিছু পরিচিত মুখ অনেকদিন পরে আবারো দেখা হলো। মেজর হাফিজ (বিএনপি) স্যারের সাথে প্রায় দেড় যুগ পর দেখা, হাফিজ স্যারের সাথে ছবি তোলার পরই বিএনপির আরেক পরিচিত মুখ মির্জা আব্বাস ভাই কাছেই ছিলেন, সাথে সাথে বললেন, ছবি তুলবা? স্মৃতিটা থাকলো। উনার সাথেও এই রকমই প্রায় দেড় যুগ পর দেখা হলো।
আমাদের বর্তমান উপদেষ্টা ফওজুল স্যারের সাথে আমার কখনো আগে দেখা হয়নি। আমি উনাকে খুব পছন্দ করি সৎ মানুষের কাতার থেকে। আমি নিজে গিয়েই ওনার সাথে ছবিটা রাখলাম আমার স্মৃতিতে।
এরপরে প্রচুর সিনিয়ারদের সাথে দেখা হলো। জেনারেল আনোয়ার স্যার (আমরা একই ইউনিটে চাকুরী করেছি কিন্তু আমি যখন জিএসও-২ (অপ্স), উনি তখন আবারো আমার সেই একই ইউনিটের সিও ছিলেন)। খুবই প্রফেশনাল একজন অফিসার। বিপদজনক সময়ে হিলট্র্যাক্সে একসাথে কাজ করেছি আমার আরেক সিও শেখ নুরুল আমিন স্যারের সাথে। ভাবীর সাথেও দেখা হল প্রায় ৩৩ বছর পর।
কোর্সমেট, জুনিয়র এবং আরো অনেক প্রিয় অফিসারদের মিলনমেলা যেন এই ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তিন বাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার (সেনাপ্রধান), এডমিরাল নাজমুল (নেভাল চীফ), এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ (এয়ার চীফ) হচ্ছে আমার ব্যাচমেট। এদের সাথেও আজকে আবার এক ঝলক দেখা হলো।
সময়টা খুব ভালো কাটলো।
কোথায় যেনো শুনেছিলাম যে, আমরা আত্মীয়তার জেরে দাদা, নানা, খালা ফুফু ভাই বোন পাই, কিন্তু সেটা আমরা তৈরী করি না, এই সম্পর্কের তৈরী ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ক্রেডিট নাই। আমরা এগুলি বংশ পরম্পরায় পাই। কিন্তু আমাদের জীবনে আসা বন্ধুদের আমরা নিজেরা তৈরী করি। একজন ভালো বন্ধু চকচকে আয়নার মতো, কখনো তারা নিজের গোপন সহচর, মনের খোরাকের মত। সুখে দুখে এই বন্ধুরা জীবনের সবচেয়ে বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে।
ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের মধ্যে বন্ধুত্বটা একটা অন্য রকমের ধাচে তৈরী হয় যেখানে ওরা জীবনের সবচেয়ে কাচা সময়টায় ২৪ ঘন্টাই একসাথে থাকে, খায়, খেলে, ঘুমায়, হাসে, কাদে। পরিবারের চেয়েও বেশী কাছে থাকে ওরা। ওদের বন্ধুত্বটা পারিবারিক শক্ত বন্ডের থেকে বেশী। শুধু এখানেই শেষ নয়, এক ক্যাডেট কলেজের সাথে আরেক ক্যাডেট কলেজের ব্যাচমেট বন্ধুরাও আজীবন না দেখে, না চিনে, নাম না জেনেও যেনো জন্ম জন্মান্তরের বন্ধু হয়েই থাকে। অদ্ভুত এই সর্গীয় বন্ধন। আমরা এই বন্ধুত্বকে আজীবন লালন করি।
আমাদেরই ব্যাচের আমাদের বন্ধু শাহরিয়ার গত ২/৩ দিন আগে সেই সূদুর কানাডা থেকে বাংলাদেশে এসেছে। মাত্র সপ্তাহ খানেক থাকবে ওর আব্বার সাথে। আমাকে ফোন করার পর আমি শাহরিয়ারকে ফোনেই বললাম, অনেকদিন ক্যাডেট বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না। তোমার এই আগমন উছিলায় চলো আমি একটা একটা আড্ডার ব্যবস্থা করি যেখানে সবার সাথে দেখা হবে, কথা হবে, আবার হারিয়ে যেতে পারবো আজ থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগের শৈশবের সেই অনুভুতিতে। শাহরিয়ার রাজী হলো।
আমার আরেক প্রিয় বন্ধু মাহমুদকে (বর্তমানে বিটিআরসি এর একজন উর্ধতন কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করছে) ব্যাপারটা বললাম যে, আমি স্পন্সর/হোষ্ট করবো, তুমি বাকী এরেঞ্জমেন্টটা করে দাও শেরাটনকে কেন্দ্র করে। সবাইকে দাওয়াত করো, হোটেল বুক করো। মাহমুদ এ ব্যাপারে আমাদের ব্যাচের মধ্যে সর্বদা একটা সচীবের দায়িত্ব পালন করে। মাশআল্লাহ, আমার ১৭ জন ক্যাডেট বন্ধু গল্পের ভান্ডার আর একরাশ মিষ্টি ভালোবাসার হাসি নিয়ে রাত ৮ টায় হাজির।
ভীষন মিষ্টি এবং চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটলো আমাদের সবার। রাশেদের অন্যত্র আরো দুইটা মিটিং ছিলো, তারপরেও সেগুলি একদিকে শিফট করে আড্ডায় হাজির হলো। বন্ধুদের আড্ডা মানে জীবনীশক্তি বেড়ে যাওয়া, শরীর আবার চঞ্চলতায় ভরে উঠা। দ্রুত সময়তা যেনো হাওয়া হয়ে গেলো গল্পে গল্পে। যারা আসতে পারেনি, তাদের অনেক মিস করেছি।
ধন্যবাদ আমার প্রিয় বন্ধুদের। সবাইকে অনেক ভালোবাসি। ধন্যবাদ শাহরিয়ারকে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে অর্থাৎ নভেম্বর ২০২৪ এ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের জন্য বি এম এ তে হল অফ ফেম অনুষ্ঠান হয়েছিলো। কিন্তু আমি হার্টের সমস্যার কারনে, মিটুল এবং কনিকা গিয়েছিলো, আমি যেতে পারিনি। এবার অর্থাৎ আজ ৩০ অক্টোবর ২০২৫ এ সেই একই প্রোগ্রামটা হলো নেভীর এবং এয়ার ফোর্সের প্রধান যথাক্রমে নাজমুল এবং হাসানের জন্য অনুষ্ঠানটা হলো। এবার অনুষ্ঠানে যেতে কোনো সমস্যা হয় নি।
যেহেতু তিন বাহিনীর অর্থাৎ আর্মির চীফ, নেভাল চীফ এবং এয়ার ফোর্সের চীফ, তিনজনেই আমার কোর্ষ্মেট, ফলে একদিকে যেমন এটা গর্বের বিষয়, অন্যদিকে এই অনুষ্ঠাটিতে তিন বাহিনীর চীফই তাদের পছন্দমতো কোর্ষ্মেটদেরকে সিলেক্ট করে কারা কারা এই অনুষ্ঠানে জয়েন করবে, সেদিক থেকে কোন ভাবেই ওরা আমাকে আউট অফ সিলেবাসে রাখে না এতেও নিজের কাছে ভালো লাগে। এই সিলেবাসে রাখা আর না রাখা নিয়ে অনেক মনোমালিন্য, অনেক গোস্যা কিংবা অনেক বিতর্ক আছে, সেদিকে আর যাচ্ছি না।
গত কয়েকদিন আগে ক্যাপ্টেন রাশের নামে এক আর্মি অফিসার আমার ফোনে ফোন করে জানালো যে, আগামি ৩০ অক্টোবর দুই চীফের হল অফ ফেম অনূষ্ঠান হবে, আমি পরিবার সহ যাবো কিনা। আমার যেতে কোন অসুবিধা ছিলো না বিধায় সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে মিটুলের নাম্বারটা দিয়ে দিলাম, যেনো যাবতীয় বাকী ফর্মালিটিজ গুলি ওর সাথেই করে। ক্যাপ্টেন রাশেদের কাজ ছিলো শুধু ইনভাইটেশন কার্ড গুলি বিতরন করা। অতঃপর আমাদের ২ জনের জন্য কন্ডাক্টিং অফিসার হিসাবে নিয়োজিত ছিলো ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। অত্যান্য অমায়িক ছেলে এবং দায়িত্তশীল অফিসার।
ওরাই এয়ার টিকেট পাঠিয়েছিলো, বাংলাদেশ বিমান। আমরা মাস্কাট গামি বাংলাদেশ বিমানে উঠেছিলাম সকাল সাড়ে আটটায়, চট্টগ্রাম হযরত শা আমানত বিমান বন্দর থেকে আমরা সরাসরি ভেন্যু পৌঁছে গিয়েছিলাম সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে। ১১ টায় প্রোগ্রাম শুরু হয়েছিলো। আর্মির চীফ ওয়াকার, নেভাল চীফ নাজমুল, এবং এয়ারফর্সের চীফ হাসান সঠিক সময়েই এসে উপস্থিত হলো, আমার কোর্সের ৩ বন্ধু, তাদের জন্য আমাদের এই ন্যাশনাল অনুষ্ঠান সেই জায়গাতে যেখানে আমরা ২ বছর একসাথে অত্যান্ত কঠিন ট্রেনিং লাইফ কাটিয়েছি। ভাবতেই ব্যাপারটায় অনেক নস্টালজিক মনে হচ্ছিলো।
একসাথে লান করলাম, ভালো লাগলো।
আমার এই পর্বে যেতা আমি আসলে লিখতে চেয়েছি সেটা হল-বিএমএ এর ট্রেনিং। আমরা যখন ট্রেনিং করেছি, তখনকার বি এম এ এর সেট আপ আর প্রায় ৪১ বছর পরের বি এম এ এর সেট আপের মধ্যে তুমুল তফাত। আমাদের সময়কার যেখানে যেখানে জি সি অফিস, বারবার শপ, কোম্পানী বিল্ডিং গুলি, ড্রিল গ্রাউন্ড, রগড়া প্যারেডের গ্রাউন্ড ছিলো সেগুলিও প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে কোনোটা অন্যত্র শিফট হয়ে গেছে, আবার কোনোতা ছোট হয়ে গেছে, আবার কোনোটা এতো বিশাল হয়ে গেছে যা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। অফিস গুলি খুবই অত্যাধুনিক্তায় ভরপুর, প্রচুর নতুন নতুন ভবন হয়েছে যেগুলি আসলেই দরকার ছিলো কিন্তু সেই প্রায় অর্দ শতাধিক আগে এগুলি বানানো কিংবা বাজেটে হয়তো কুলায় নি বলে বানানই হয় নাই। কিন্তু এখন ১০০ অফিসার মেস, সুইমিং পুল, ক্যাডেট ডমিটরীর পাশাপাশি আরো অনেক কারিকুলাম করা যায় এমন বিল্ডিং, কনভেনশন হল, মিটিং রুম, ক্যাফেটেরিয়া, ইনডোর খেলাধুলা করার প্রভিশন, জীম, আরো কত কিছু যে নতুন যোগ হয়েছে, বি এম এ এর সব জায়গা ঘুরলেই মনটা ভাল হয়ে যায়।
বি এম এ এর যে রাস্তাটা আজ থেকে ৪১ বছর আগে শুধু মাটির রাস্তা ছিলো, সেটা এখন বিশাল হাই ওয়ে হয়ে গেছে, সেখানে সানসেট পয়েন্ট, গলফ গ্রাউন্ড, আরো কতই না সুন্দর সুন্দর স্থাপনা তৈরী হয়েছে। বেশ ভালো লাগলো ব্যাপারটা।
আমাদের টার্ম কমান্দার ৯ডুজনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফিজ এবং ব্রিগেডিয়ার তালেব স্যার) এবাব্রের অনুষ্ঠানে আমাদের সাথে বন্ধুর মতো ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তালেব স্যার বেসিক্যালী আমাদের কোর্সের সাথে একেবারে প্তোপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন। সবার সব অনুষ্ঠানে তিনি আসেন।
মানুষ বড্ড অদ্ভুত প্রানী। অন্যান্য প্রানীদের মতো সে জন্ম নিয়েই দৌড়াতে বা সরাসরি হাটতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশের জন্য সাথে সাথে ভাষা জানে না, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ভয় কিংবা ভীতি কিংবা মনুষ্য রচিত কোনো আনন্দের ফোয়ারা তৈরী হলেও মানুষের অনুভুতিতে তার কোনোতাই জন্মের সাথে সাথে হয়ে উঠে না। মানুষ বড় হয়, হাটতে শিখে, কথা বলতে শিখে, অনুভুতির স্রিষ্টি হয়, এবং এ রকম আরো হাজারো ছোট বড় অভ্যাস গড়ে উঠে। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস হচ্ছে-কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস, এইটা সব অভ্যাসের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস। আর এই অভ্যাসটা হটাত করে দু একদিনের মধ্যে হয়ে উঠে না। নিয়ম করে, হাতে সময় নিয়ে রোজ একটু একটু করে কথা হয়। আর এই কথা হতে হতে আস্তে আস্তে একটা মায়ার জন্ম নেয়। এই মায়া জন্মাতে জন্মাতে এক সময় এটা নেশায় পরিনত হয়, আর ঠিক তখনই তা কেবল অভ্যাসে পরিনত হয়। এই যে কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস আমাদের অজান্তেই স্রিষ্টি হয়ে গেলো, তখন আমাদের ভালো থাকার সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রন আমরা হারিয়ে ফেলি তখন। একদিন কোথাও অন্যত্র কেউ চলে গেলে, শরীর কাহ্রাপ হতে থাকে, খাবারের রুচীতে ঘাটতি দেখা দেয়, অন্য কারো সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না, ভালো ঘুম হয় না, সময়টা যেনো থেমে থাকে। কথা হওয়ার মুহুর্তে হটাত কথা না হওয়া চরম ডিপ্রেশনে ফেলে দেয়। তখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কোনো কিছুই আর ভালো লাগতে চায় না, হটাত করে মন খারাপ হয়, একাকী পায়চারী করতে মন চায়। মনে হয়-কি যেনো ঠিক নাই। একা হয়ে যায় মানুষ।
তারমানে এই নয় যে, কথা বলা খারাপ অভ্যাস। কারো সাথে কারো কথা বলতে কখনো কখনো ভাল লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সেটা যদি নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিনত হয় এমনভাবে যে, হটাত কোনো কারনে কথা না বললে মন শরীর চিন্তা ভাবনা সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে, তাহলে কষ্মিঙ্কালেও আমাদের ভালো থাকা হয়ে উঠবে না।
কথায় মায়া বাড়ে, আর মায়ায় লেপ্টে থাকে যন্ত্রনা, একাকীত্ব, বিষাদ। যদি কখনো মনে হয়, এক তরফাভাবে আপনি ডুবে যাচ্ছে, তবে এখনই নিজে সংবরন করুন, থামান। নিজেকে ততটুকি নিয়ন্ত্রের মধ্যে রাখুন যতটুকু নিয়ন্ত্রন রাখলে হুট করে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলেও অন্তত নিজেকে নিঃস্ব মনে হবে না।
শরৎচন্দ্র বাবুর একটা উপন্যাসে তিনি লিখেছিলেন-“তাহাকে ধরিয়া রাখিতে চাহিলে হয়তো ধরিয়া রাখিতে পারিতাম। কিন্তু সেই চেষ্টা করিলাম না। সেও আর ফিরিয়া আসিলো না। আমারো যতক্ষন না ঘুম আসিলো, শুধু এ কথাই ভাবিতে লাগিলাম। জোর করিয়া রাখিয়া লাভ হইতো কি? আমার পক্ষ হইতে তো কোনোদিন জোরই ছিলো না। সমস্ত জোরই আসিয়াছিলো তাহার দিক হইতে। আজ সেইই যদি আমাকে বাধন থেকে মুক্তি দিয়া আপনাকে মুক্তি দিতে চায়, তাহা হইলে আমি ঠেকাইব কি করিয়া?”
কি অদ্ভুত হৃদয় ছেড়া অনুভুতি!! এই যে ছেড়ে দেয়া আর ছেড়ে যাওয়া-এর মধ্যে অনেক তফাত আছে, অনেক অনেক বিস্তর পার্থক্য আছে। ছেড়ে যাওয়া মানে-আমি তোমাকে আর চাই না। এক সময় কি ছিলাম, আর কি ছিলে, এসব কিছু মেপে, বুঝে শুনে অতএব সিদ্ধান্ত আসে-আমি ছেরে দিচ্ছি। এটা এক ধরনের প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশন। এর মানে তোমার আর আমার প্রয়োজন নাই। তোমার সব প্রয়োজন আমার কাছে ফুরিয়ে গেছে।
আর ছেড়ে দেয়া মানে আমি তোমাকে খুব করে পেতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমাকে আমি পাইলাম না। হাত বাড়ালেই যাকে পাও, সে হয়তো তোমার ভালোলাগা। আর খুব করে চেয়েও যাকে তুমি পাও না, তবুও তুমি যাকে চাও, বা মনে রাখো, হয়তো সেটাই ভালবাসা। ভালোবাসা মানেই সব সময় মানুষটাকে পাওয়া নয়। কখনো কখনো না পাওয়া, ছাড় দেয়া কিংবা অপেক্ষা করাও ভালোবাসা। হয়তো মানুষটাকে তুমি কখনোই পাবে না। অনেক আরাধনা করেও তুমি পাইলে না। হয়তো আরেকজন কোনো আরাধনা না করেই তাকে সে নিজের করে পেয়ে গেলো। তোমার তখন বড্ড কষ্ট হতে পারে, দুঃখ হতে পারে আর মনের মধ্যে বারবার নাম না জানা লেখকের সেই কথাগুলিই ঘুরে ফিরে আছড়ে পড়তে পারে যে, ………শেষ পর্যন্ত তোমারে যে পাইলো, তার লাইগা আমার আফসোসই লাগে। কারন সে জানলো না তোমারে হারাইলে কেমন লাগে। কেমন লাগে তুমি ছাড়া রাইত জাগনের যন্ত্রনা। সে জানলো না, ভাত খাইতে বইসা তোমার প্রিয় তরকারী দেখার পর গলা দিয়া ভাত না নামার বেদনা।
নাহ সে এটাও জানলো না, তোমাকে আরেকবার দেখতে চাওয়ার আকুতি কেমন হয়। সে জানলো না, তোমার সাথে স্মৃতিগুলি জড়াইয়া বাচার কষ্ট। সে জানলো না, তোমারে পাইয়া হারানোর পর দুনিয়া কেমনে ফাকা হইয়া যায়। সে জানলো না, তোমার স্পর্শ ফিরা পাওয়ার লাইগা পরান কেমন ছটফট করে। সে তোমারে পাইলো, কিন্তু তোমারে হারানোর ব্যথা পাইলো না। সে বিরহ চিনলো না, সে প্রেমের দুঃখ কেমন তা বুজলো না। সে জানলো না, একটা ছারখার হওয়া জীবন টানতে কেমন লাগে। সে সুখ ঠিকই পাইলো, কিন্তু তোমারে হারাইয়া শক্ত হইলো না। এই যে তোমারে হারাইয়া ফেলার পর কোনো কষ্টই আর আমার গায়ে লাগে না। সে তোমারে পাইয়া আমার মতন পাথর হইতে পারলো না।
অবশেষে যে তোমারে সারা জীবনের জন্য পাইলো, সে যেনো তোমারে আগলে রাখে অনেক যতনে। আমি ভাঙাচোরা মানুষ, তোমারে ছোয়ার সাধ্য আমার কখনোই ছিলো না। তবু সপ্ন দেইখা গেছিলাম তোমারে পাওয়ার জন্য। আমি হতভাগা এতই কমদামি সপ্ন কেনার দামদরেতে তোমারে হারাইয়া ফেলেছি। যে তোমারে জিতে নিলো, সে যেনো তোমারে ভালবাসার কমতি বুঝতে না দেয়। আমি চাই না ভালোবাসার কমতি পড়লে তুমি আমারে মনে করো। তুমি যখনই আমারে মনে করবা, তোমার দুঃখ হইবো আমার জন্যে। আমি চাই তুমি সুখী থাকো আজীবন। দুঃখ তোমারে মানায় না। যার কাছেই থাকো, ভালো থাইকো। কারন তুমি ভালো না থাকলে আমার এত বিসর্জন, আমার এত দীর্ঘশাস সব বিফলে যাইবো।
Lawful Command and Unlawful Command এর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য একটা পরিষ্কার সাংবিধানিক এবং বিচারিক ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কারন:
(১) পরাজিত শক্তির কাছে যেটা আন ল ফুল, বিজয়ী শক্তির কাছে হয়ত সেটাই ল ফুল কমান্ড। অথবা পরাজিত শক্তির কাছে যেটা ল ফুল কমান্ড, বিজয়ী শক্তির কাছে সেটা হয়ত আন ল ফুল কমান্ড বলে মনে হয়ে পারে।
(২) ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের ৭১ এর মত। ৭১ ছিলো আমাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তানের কাছে আমাদের মুক্তিবাহিনী ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠী। মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছিল ল ফুল কিন্ত পাকিস্তানের পক্ষে এটা ছিল আন ল ফুল।
(৩) এক দেশের একজন দেশপ্রেমিক অন্য আরেকটি দেশের জন্য সে স্পাই হিসাবে গন্য হয়। দেশপ্রেমিক একটা ল ফুল ব্যাপার। কিন্তু স্পাই? অবশ্যই ল ফুল নয়।
(৪) সামরিক বাহিনীতে এমবিএমএল এ যাইই লেখা থাকুক না কেনো, জুনিয়ার লেবেল অফিসারদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ল ফুল আর আন ল ফুল কমান্ড খাটে না। যদি খাটতো তাহলে, সামরিক বাহিনীতে ডিসিপ্লিন রাখা যেত না। প্রত্যেকটা ক্রিটিক্যাল অপারেশনে অফিসার, নন কমিশন্ড অফিসাররা একের পর এক কোনটা ল ফুল আর কোনটা আন ল ফুল কমান্ড এগুলি করতে করতেই অপারেশন ফেইল করতো। তবে সিনিয়ারদের বেলায় যারা কমান্ড লেবেলে থাকে, তাদের এটায় আর্গুমেন্ট করার অপশন থাকে।
(৫) গত ১৭ বছরে এবং তার আগে, এবং তারও আগের রিজিম গুলিতে এদেশে সামরিক এবং বেসামরিক স্তরে অসংখ্য আন ল ফুল কমান্ড জারী হয়েছে, আন ল ফুল কর্ম করতে দেখা গেছে সরকারি পৃষ্টপোষকতায়, কতজন মানুষ সে সবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো? এটাও একটা বড় প্রশ্ন। যদি সোচ্চার হত, তাহলে তার জীবন শেষ। আর যদি সোচ্চার না হয়, বলা হবে আন ল ফুল কমান্ডের দোসর। যাবেন কই? আর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তো আরো অসহায়। তারা কমান্ড মানতে বাধ্য।
আমি যখন এই স্কুলে পড়তাম, তখন সালটা ছিল ১৯৭৬। টিনের স্কুল, চারিদিকে মুলির বেড়া, আর এই মুলির বেড়ার বেশিরভাগ ছিল নীচ দিয়ে ভাঙ্গা। মুরগী, কুকুর, বিড়াল এমন কি চোরেরাও মুলির বেড়ার নীচ দিয়ে স্কুলের ক্লাশের ভিতরে ঢোকে যেতো। পরদিন আমরা যখন ক্লাশে আসতাম, এসে মুরগী ইয়াড়াইতাম, কুকুরকে তাড়াইতাম, বেঞ্চ আর চেয়ার গুলি ধুলোয় এমন হয়ে থাকতো যে, এগুলিকে মুছে পরিষ্কার করতেই সময় লাগত আধা ঘন্টা। ক্লাস রুমের দরজাগুলি এমন ছিল যে, কেউ জোরে ধাক্কা দিলেই খুলে যেতো, তালা লাগাওনর কনো ব্যবস্থাই ছিলো না। বৃষ্টির দিনে মাঠে বৃষ্টির পানি পরার আগে যেন ক্লাশ রুমে পড়তো আগে। এতোই ফুটাফাটা ছিলো টিনের চালগুলি। ছাত্ররা বা ছাত্রীরা আসতো তাদের নিজের উদ্যোগে, স্যারেরা আমাদের পরাতেন ঠিকই কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা আমাদের নিচের ক্লাসের ছাত্রদেরকে ক্লাস নিতাম। কারন সব ক্লাসে টিচার ছিলো না। আমি তো রেগুলার ক্লাস নিতাম। একটু একতু গর্বও হত যে, আমি না ছাত্র আবার না টিচার অথচ আমি কিন্তু ছাত্র।
এই স্কুলটা তখন ক্লাশ এইট বা অষ্টম পর্যন্তই ছিল অর্থাৎ হাইস্কুল। খুব যে ভাল স্কুল ছিলো সেটাও নয় কিন্তু এই এলাকায় এটাই ছিলো একমাত্র হাইস্কুল। আলাউদ্দিন ভাই আসতেন, আমাদেরকে খুব আদর করতেন। অসম্ভব অমায়িক মানুষ ছিলেন তিনি। এই স্কুল থেকেই আমরা ২ জন (আমি এবং ডাঃ শফিক ভাই, আলুকান্দার) ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম। এর পরে আরো অনেক মেধাবি ছাত্ররা দেশের বিভিন্ন সেক্তরে খুব ভাল ভাল জায়গায় কাজ করছেন এবং করেছেন। স্কুলটা ছিল তখন এলাকার প্রানকেন্দ্র। প্রায়ই বিকালে ফুটবলের প্রতিযোগীতা হত, গ্রামবাসিরা মাঠের চারিদিকে বসে যেনো ওয়ার্ল্ডকাপ খেলা হচ্ছে এমন একটা পরিবেশ হতো, মাঝে মাঝেই নাটক বা কালচারাল অনুষ্ঠান হত। ছেলেরাই মেয়ে সেজে নায়িকা হতো। কি যে একটা রমরমা সময় ছিল।
আজ এতো বছর প্পতে স্কুলটার চেহাড়া দেখলে মনে হয় কি সুন্দর। এতো বড় মাঠ, চার তলা করে অনেক গুলি বিল্ডিং। অনেক ছাত্র আর টিচার গন। রম রম করে পরিবেশ কিন্তু সবচেয়ে দুঃখ আর কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে-এই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে পাশের হার মাত্র ১০%। তাও আবার খুব লো গ্রেদিং দিয়ে পাশ। এটা কনো কথা?
মাষ্টারদের কাছে কেউ কৈফিয়ত চায় না গার্জিয়ানরা, গার্জিয়ানরা কেউ সপ্ন দেখে না তাদের সন্তানদের নিয়ে, কনো ছাত্র জানে না তার ভবিষ্যত কি। সে কি হতে চায়। কেউ তাদের মাথায় সপ্ন বুনন করে না। অথচ সব উপাদান আছে এই স্কুল এন্ড কলেজে। যারাই এই স্কুল এন্ড কলেজের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন, তারাই এতাকে নিয়ে হয় রাজনিতি করেছেন, অথবা এর থেকে ফায়দা লুটেছেন অথবা লাভ করেছেন। কেউ ছাত্রদের ভাল হক, ছাত্ররা নামকরা কেউ হক, এ অঞ্চলতাকে ছাত্ররা সমৃদ্ধ করুক কেউ চেষ্ঠা করেনি। চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা প্রশাসক এমন কি এম পি ও এর পিছনে কখনো কনো সময় দিয়ে এটাকে কিভাবে ভাল একতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা যায় তার জন্য চেষ্টা করেনি।
এখনো এখানকার যুবকেরা জানে না যে, অতি শীগ্রই ওরা এমন কিছু মানুষের অধীনে চলে যাবে যারা বেই এলাকার কেউ নন। …।।
কেউ কি তোমাকে ভালবেসেছিলো? কতটুকু কতক্ষন কি পরিমান কিভাবে কেনো ভালবেসেছিল সেটা কি কখনো অনুধাবন করে বিশ্লেষন করেছো? ভালোবাসাটা একটা চরম আবেগী জিনিষ, যে ভালবাসায় মজেছে, তার কাছে আর অন্য কোন কিছুই জরুরী নয়। আর যার ভালবাসায় সে মজেছে, সেটা যেমনই হোক, কারো সাথে কিংবা কোনো কিছুর সাথেই তার তুলনা করা যায় না। কালো, ধলা, ল্যাংড়া, কিংবা বিদেশি, বা অন্য কোন প্রানী সবার বেলাতেই ব্যাপারটা এমনই ঘটে। কিন্তু মজার ব্যাপার কিংবা কষ্টের ব্যাপার হল, এক সময় এই ভালোবাসায়অ ঘুন ধরে, যে কোনো কারনেই এর মিষ্টতা বা আবেগী মনটা স্তিমিত হয়ে আসতে পারে। তখন একটা নতুন জিনিষ শুরু হয়। আর তার নাম অবহেলা।
কাউকে অবহেলা করার সবচেয়ে উত্তম কৌশল হচ্ছে-ব্যস্ততা দেখানো। বাহ্যিকভাবে কেউ কতটা ব্যস্ত সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু কারো সাথে সম্পর্কের মধ্যে ঢীলা দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে-বহুবিধ কাজের বাহানায় ব্যস্ততা জড়িয়ে দেয়া। কিন্তু একটা সম্পর্কে ব্যস্ততার শব্দটার কোনো স্থান নাই আসলে। সত্যিকারের প্রিয় মানুষটার শত সহস্র ব্যস্ততার মাঝেও খোজ খবর নেয়া সম্ভব এবং নেয়ও। শুধু খোজ খবরই না, সে তোমাকে সময় দেবে। কি করছো, কখন কোথায় কি ভাবে তোমার সিডিউল যাচ্ছে, দুপুরে, সকালে, কিংবা খাওয়ার সময়ে তুমি খেয়েছো কিনা সব সময় না হলেও মাঝে মাঝেই সে খবরটা নিবে।
কেউ যদি বলে- কথা বলার সময় পাইনি, হতেই পারে। কিন্তু ‘আমি একটু ব্যস্ত আছি, সময় পেলে পরে কথা বলব। তুমি অন্যান্য কাজ সেরে ফেল’ কিংবা একটা ম্যাসেজ কিংবা পাচ সেকেন্ডের একটা ছোট কলও হতে পারে অনেক ব্যস্ততার মাঝে একটা যোগাযোগ। আর এই ছোট ম্যাসেজটা লিখতে রাস্তার ধারে বসে, একটা সিগারেট খাওয়ার সময়েও এই ছোট ম্যাসেজটা করা যায়। যখন এগুলির কোনোটাই হয়ে উঠে না, অথচ যদি কেউ বলেই থাকে যে, কথা বলার সুযোগ হয়নি, বা সময় পাইনি, তাহলে বুঝে নিও সে ঠিকই সময় পেয়েছিলো কিন্তু সে তোমার জন্য সময় নষ্ট করতে চায়নি, সে তোমাকে এভয়েড করেছে। তোমার মুল্য তার কাছে অনেক কমে গেছে। মানুষ কেবল সেটার জন্যই তার মুল্যবান সময় নষ্ট করে যেটা তার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট। তুমি হয়তো ইম্পর্টেন্সি হারিয়ে ফেলেছো। ভালোবাসাটা অনেক দূর চলে গেছে। একদিন সে আরো দূরে চলে যাবেই এবং কনো এক সময় সে তোমার কাছ থেকে হারিয়ে যাবেই। তুমি এই পরিস্থিতিটা বুঝো বা না বুঝো, যদি এটা এক তরফা আকড়ে থাকো, তাহলে আজিবন তুমি কষ্ট পাবে।
ব্যস্ততা কখনই ভালোবাসাকে থামাতে পারেনা। যে সত্যিই তোমাকে ভালবাসে, সে শত ব্যস্ততার মধ্যেও একবার হলেও মনে করবে। আর যদি সেই ভালোবাসাতা হয়ে থাকে নিছক কিছুর বিনিময়ে বা অন্য কোনো কারনে, সেখানে কখনোই ভালোবাসা ছিল না। ওটা ছিল অবহেলার ভালোবাসা।
সত্যিকারের ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যেটা না বলা কথাও অন্তরে যেনো পরিষ্কার অনর্গল কথা বলে যায়, ভালোবাসার মানুষটাকে কিভাবে ভালো রাখা যায়, কিভাবে তার মনকে প্রশান্ত করা যায়, তার ইচ্ছাগুলি, আবদার গুলি, আখাংকা গুলি নিজের সামর্থের মধ্যে লালন করা যায়। ভালোবাসায় ভাষার দরকার পড়ে না। এটা অনুভবের ব্যাপার। মন থেকে ভালোবাসলে মানুষটা ছাড়া একদমই থাকা যায় না। আর যারা দিনের পর দিন মানুষটা ছাড়া অনায়াসে থাকতে পারে, তারা কখনো ভালোবাসে না। I
ভালোবাসার মানুষকে মানুষ সব সময় মনে রাখে, মনে করে। এমন কি মৃত্যুর সময়ে বা আগে যে মানুষতারে মানুষ সবার অগোচরেই স্মরণ করতে চায় সেটা তার ভালোবাসার মানুষ। গভীর ঘুম থেকে ঘুম ভাঙ্গার পর যার কথা মনে পড়ে সেতা তার ভালবাসার মানুষ। এই ভালোবাসার মানুষটার কারনে সুখকে সুখী মনে হয়, তার কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে হয়। ভালোবাসার মানুষের শরীরের ঘামের গন্ধও মিষ্টি মনে হয়।
আমি যে কোনো অনুষ্ঠানে সাধারনত অনেক কারনেই যেতে ইচ্ছুক হই না। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে-অনুষ্ঠানের রিচ খাবার আমাকে আকর্ষন করে না এবং আমি সাধারনত সেই রিচ ফুডগুলি এভয়েড করি। কিন্তু যদি কোথাও যেতে চাই, আমি আগে থেকেই আমার খাবারের মেন্যুটা একটু সম্মানের সহিত তাদের জানিয়ে দেই যে, আমার জন্য একেবারে প্লেইন রাইস, ডাল এবং কিছু শব্জি হলে ভাল হয়। এখন অবশ্য প্রায় অনেকেই জানেন আমার খাবারের সাধারন মেন্যুটা, ফলে আর বলতে হয় না। কিন্তু আমার কিছু কিছু খুব কাছের মানুষ আছেন যারা দাওয়াত দিলে খাই বা না খাই আমি যাবোই এটা নিশ্চিত। গয়েসশর দাদা আমার সে রকমের একজন মানুষ।
আমি রাজনীতি করি না কিন্তু আমি গয়েসসর দাদার একজন কাছের মানুষ। উনি সর্বদা আমাকে কিছু কিছু উৎসবে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দেন। কখনো কখনো কার্ড পাঠিয়ে, আর বেশীরভাগ সময়ে টেলিফোনে। এবারের দূর্গা পুজাতেও উনি দাওয়াত দিয়েছেন এবং ঘোষকান্দায় তার নিজের বাড়িতে যাওয়ার সময়ে ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় আমি যেন অফিসের কাজ দ্রুত শেষ করে অনুষ্ঠানে যাই সেটাও নির্দেশনা দিইয়েছিলেন। খুবই ব্যস্ত ছিলাম মিটিং নিয়ে ফলে প্রায় দুপুর প্রায় একটা বেজে গিয়েছিলো ওনার বাসায় যেতে যেতে।
আমি যখন ওনার বাসায় গেলাম, উনি তখন প্রচুর লোককে নিয়ে মিটিং কিংবা আলাপে/গল্পে মত্ত ছিলেন, আমি যাওয়ার পরই দাদা আমাকে নিয়ে কোলাকুলি করে তার নিজস্ব কামরাতে এসে বসলেন। অনেক আলাপ হলো, চা সিগারেট খাওয়া হলো, ভালো লাগছিলো। চলে আসতে চাইলাম কারন ফ্যাক্টরীতে বায়ার চলে এসছিলো কিন্তু দাদার আমন্ত্রনে না খেয়ে আসা হলো না। খেতেই হলো।
দাদার সবচেয়ে আমার ভাল লাগার জিনিষটা হল-উনি নিজ হাতে আমাকে খাবার পরিবেশন করেন। সেই ছোটবেলা থেকেই উনি আমাকে চিনেন যখন আমার বয়স মাত্র ১০। আমার বড় ভাই (এখন তিনি আমেরিকায় বোষ্টনে প্রফেসর হিসাবে আছেন) ওনার খুব কাছের বন্ধু হওয়ায় ভাইয়ের সুবাদে আমার বড় ভাই, গয়েসশর দাদা, আলিমুল্লাহ কাকা, আলাউদ্দিন মাষ্টার ভাই, আনোয়ার ভাই (ঢাকা ইউনিভার্সিটি), রহমান ভাই, নসরুল হামিদ বিপুর আব্বা হামিদ ভাই এরা তখন একটা খুব শক্তিশালি বন্ধু সংঘটন ছিলেন আর আমি সেই ১০ বছরের ছোট একটা পিচ্চি এই ইয়াং বন্ধু মহলের মধ্যে জড়িত ছিলাম কোনো কারন ছাড়াই। ওনাদের সাথে ঘুরতাম (আমার ভাই আমাকে নিয়ে নিয়ে ঘুরতেন তাই আমিও তাদের সাথে থাকতাম)। আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার অনুপ্রেরনার পিছনে এইসব শক্তিশালি ব্যক্তিরাও অনেক অনুপ্রেরনা জুগিয়েছিলেন।
গত ২৯/৯/২০২৫ তারিখে দাদার বাসায় দূর্গা পুজা উপলক্ষ্যে দাদার সাথে কিছুক্ষন সময় কাটানর কিছু মুহুর্ত।
ধন্যবাদ দাদা।
এই শাখাটা আমরা চালাচ্ছি। মুলত আমি, কর্নেল মাহমুদ এর প্রধান উদ্যোক্তা। মাহমুদের মিসেস নুরজাহান ভাবী এর প্রিন্সিপ্যাল। যথেষ্ঠ কোয়ালিটি পুর্ন শিক্ষার মান এখানে দেয়া হয় বলে গার্জিয়ানরা প্রায়ই এই শাখাটাকে সাধীন ক্যাম্পাস হিসাবে দেখতে চান এবং মনে করেন এটাকে আবাসিক করা গেলে প্রচুর ছাত্র ছাত্রী এখানে ভর্তি হবে। কিন্তু আমি এখনো সাধীন ক্যাম্পাস করার জন্য কন পদক্ষেপ নেইনি। তবে অদূর ভবিষ্যতে এটা যে একতা হবে তাতে কন সন্দেহ নাই ইনশাল্লাহ।
মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাডেমি মুলত একটা ফ্রান্সাইজিং শাখা। কিন্তু এর অন্তরালে আমাদের নিজস্ব একটা স্কুল চালু আছে যার নাম Bangladesh International School of Excellency (BISE). কন্সেপ্টটা হচ্ছে, যারা ক্যাডেট কলেজে চান্স পাবে না, তারা আমাদের স্কুলেই পরবর্তী স্কুলিং চলমান রাখা। যাত্র ছাত্রদের কোনো সময় ক্ষেপন না হয়। স্কুল অফ প্যারাডাইস হচ্ছে আমাদের অরিজিনাল স্কুলের একটা সেক্টরাল শাখা। এ রকমের আরো সেক্টোরাল শকাহা রয়েছে এর মধ্যে।
অনেকদিন যাওয়া হচ্ছিল না মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাদেমিতে। প্রায় ৮/৯ মাস পর আজকে গেলাম। প্রিন্সিপ্যাল তার শিক্ষক বৃন্দকে নিয়ে স্কুলের মান এমন পর্যায়ের নিয়ে গেছেন, দেখে মনটাই ভরে গেলো। ছাত্ররা, অভিভাবকগন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট লোকাল যারাই আছেন সবাই খুব খুশি।
অনেক ধন্যবাদ মাননীয় প্রিন্সিপ্যাল এবং শিক্ষকবৃন্দ। আমার দোয়া এবং আশীর্বাদ রইলো।
পছন্দ আর ভালভাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। পছন্দ হলো রেডিমেড একটা ফুল গাছ থেকে একটা ফুল ছিড়ে নেয়ার মতো, আর ভালবাসা হচ্ছে সেই ফুলগাছটায় আপনি প্রতিদিন পানি দিয়ে তাকে সতেজ রাখার মতোন। পছন্দ জিনিষটা যখন প্রতিদিন চর্চা হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে সেই পছন্দ একদিন ভালোবাসায় রুপান্তর হয়। যখন ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে আরো গার হয়, তখন জন্ম নেয় মায়া। মায়া একটা মারাত্তক জিনিষ। একবার কেউ মায়ায় জড়িয়ে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া মানুষগুলি কখনোই কারো জীবন থেকে হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যেতে দেয়া হয় না।
যাইই হোক, কথাগুলি বললাম এ কারনে যে, বহুবছর আমার নাড়ির টানের বন্ধনের এলাকা, এই বাক্তার চর, নিয়মিতভাবে আসা হয়নি। কাজের জন্যই হোক আর ব্যস্ততার জন্যই হোক, আসা হয়ে উঠেনি। কিন্তু একটা টান অবশ্যই ছিল। ইদানিং এলাকার কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসাবে আমি ঘন ঘনই এলাকায় আসছি। গ্রাম এবং এলাকার প্রতি আমার মায়া সেই জন্মলগ্ন থেকেই সুপ্তিত ছিলো কিন্তু উদগীরিত হয়নি বা প্রকাশ পায়নি। যার কারনে অনেককেই এখন আর আমি ভালোভাবে চিন্তেও পারিনা। পুরানো জেনারেশনের মানুষগুলিকে যেমন বর্তমান চেহাড়া থেকে চেনার উপায় নাই আবার নতুন জেনারেশনের ইয়াং ছেলেমেয়েদেরকেও আমার ভালোভাবে জানা বা চেনা হয়নি। ওরা হয়তো আমাকে নামে চিনে কিন্তু ওদেরকে আমার ভালোভাবে বা ন্যুনতম্ভাবেও চেনা হয়ে উঠেনি। কিন্তু পুরানো সেই মায়া থেকে আমি ওদের উপরেও যেন কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছি দ্রুত। ওরাও যে আমাকে আমার থেকে দ্রুত কঠিন ভালবাসায় জড়িয়ে ফেলতেছে সেটা আমার ইন্দ্রিয় আমার বুঝবার চেয়েও দ্রুত উপলব্ধি করছে।
কদিন আগে কলেজে এক মিটিং এ হটাত মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল আমার জন্ম দিনের তারিখটা। তখন প্রায় সন্ধ্যা। কলেজের প্রিন্সিপ্যালের রুমে গুটিকতক জেন জি ইয়াং স্টারদের নিয়ে মিটিং করছিলাম। শেষ হতে না হতেই দেখি কোথা থেকে একটা কেক, কেক কাটার ছুড়ি এবং মোমবাতিসমেত হাজির। সব কিছু বুঝবার আগেই জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা ঘটা হয়ে গেল। বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া হলেও অন্তরে খেলছিল এক ভালোবাসার বসন্ত প্রবাহ। অনেক আনন্দিত হয়েছি।
ধন্যবাদ ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম, সানাউল্লাহ, কাইয়ুম, শাহীনুর, মুজিবুর কাকা, অধ্যক্ষ মহোদয় এবং অন্য সব আদরের ছেলেরা। অনেক দোয়া রইলো তোমাদের প্রতি এবং অবশ্যই তোমরা আমাকে অনেক খুশী করেছো। আমি আমার আন্তরীক ভালবাসা জানাই তোমাদের সবাইকে।ো