১২/০৯/২০২৬-জীবনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে চাইলে একবার তিনটি জায়গায় যেও

জীবনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে চাইলে একবার তিনটি জায়গায় যেও—হাসপাতাল, কারাগার আর কবরস্থান। হাসপাতালে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ মানুষের দিকে তাকিয়ে থেকো। তখন বুঝবে—জীবনে আসলে কত কম জিনিসের প্রয়োজন। যে মানুষটি আজ কোটি টাকার মালিক, সেও হয়তো একটি স্বাভাবিক শ্বাসের জন্য ছটফট করছে। যে মানুষটি সারাজীবন আরও বেশি পাওয়ার জন্য ছুটেছে, সেও হয়তো আজ শুধু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে চায়। তখন বুঝবে—টাকা নয়, সম্পদ নয়, সম্মান নয়—সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় নিয়ামত।

তারপর একদিন কোনো কারাগারের সামনে দাঁড়িও। লোহার গরাদের ওপাশে বন্দী মানুষগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখো। তখন বুঝবে, আমরা কত বড় স্বাধীনতার মধ্যে থেকেও কত ছোট ছোট বিষয় নিয়ে অভিযোগ করি! নিজের ইচ্ছেমতো বাইরে বের হতে পারা, প্রিয় মানুষটির কাছে ছুটে যেতে পারা,
খোলা আকাশের নিচে হাঁটতে পারা—এসব যে কত বড় আশীর্বাদ, তা বোঝা যায় তখনই, যখন এগুলো করার অধিকারটুকুও থাকে না। স্বাধীনতা—আমরা প্রতিদিন নিঃশব্দে ভোগ করি, অথচ তার মূল্য খুব কমই বুঝি।

আর সবশেষে একদিন কবরস্থানে যেও। সেখানে কোনো অহংকার নেই। কোনো পদবি নেই। কোনো ক্ষমতা নেই। কোনো ব্যাংক ব্যালান্স নেই। কোনো পরিচয়ের জৌলুস নেই। শুধু সারি সারি কবর…আর প্রতিটি কবর যেন নীরবে বলে যায়—“একদিন আমিও তোমার মতোই ছিলাম। হেঁটেছি, স্বপ্ন দেখেছি, ভালোবেসেছি, রাগ করেছি, অভিমান করেছি, অনেক কিছু পাওয়ার জন্য ছুটেছি। তারপর একদিন সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছি এখানে।”

আজ যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা এত অহংকার করি, যে বাড়িটাকে নিজের বলে মনে করি, যে সম্পদকে আঁকড়ে ধরে জীবন পার করে দিই, যে মানুষটিকে হারানোর ভয়েও কখনো ভালোবাসার কথাটা বলা হয় না—একদিন সবকিছুই পেছনে পড়ে থাকবে। আজ যে মাটির ওপর আমরা হাঁটছি, কাল সেই মাটিই আমাদের মাথার ওপর ছাদ হয়ে যাবে। তাই যতদিন সময় আছে—মানুষকে ভালোবাসো। ক্ষমা করে দাও। অহংকারটা একটু কমাও। প্রিয় মানুষটাকে জড়িয়ে ধরো। মায়ের কণ্ঠটা মন দিয়ে শোনো। বাবার পাশে একটু বসো। বন্ধুকে বলো—“ভালো থাকিস।” আর যাকে ভালোবাসো, তাকে ভালোবাসার কথাটা বলতে দেরি করো না। কারণ জীবন কাউকে বলে যায় না— “এটাই তোমার শেষ সকাল।”

কোনো কোনো বিদায় আসে একেবারেই নিঃশব্দে। শেষ কথাটি হয়তো খুব সাধারণ একটি কথা, শেষ দেখাটি হয়তো খুব স্বাভাবিক একটি দেখা,শেষ আলিঙ্গনটি হয়তো আমরা বুঝতেই পারি না যে—এটাই শেষ। শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার গন্তব্য একই। তাই জীবনটা এমনভাবে বাঁচো, যেন চলে যাওয়ার দিন অন্তত নিজের কাছে বলতে পারো—“আমি অনেক কিছু পাইনি, কিন্তু যতদিন বেঁচেছিলাম, মন থেকে বেঁচেছিলাম…আর যাদের ভালোবাসার কথা ছিল,তাদের ভালোবেসেই বেঁচেছিলাম।”

১২/০৯/২০২৬-সময়—সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহারগুলোর একটি

সময়—সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহারগুলোর একটি। অথচ সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের হাতে আর কতটা সময় অবশিষ্ট আছে—তা আমরা কেউই জানি না। আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি, কাজে যাই, কথা বলি, অভিমান করি, রাগ করি, ভালোবাসি, আবার ভাবি—“কাল তো আছেই…” কিন্তু সবসময় কাল আসে না। সত্যি বলতে, আমাদের কারও কাছেই আগামীকাল বলে কোনো নিশ্চয়তা নেই। জীবন শেষ হওয়ার আগে কোনো চিঠি পাঠায় না। কোনো শেষ ঘণ্টা বাজে না। কেউ এসে বলে না—“প্রস্তুত হও, এটাই তোমার শেষ দিন।” সবকিছু খুব  স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে…আর হঠাৎ একদিন আমাদের গল্পটা থেমে যায়।

আজ যে মানুষটির সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তার কিংবা আমার সঙ্গে এটাই ছিল হয়তো আমাদের শেষ কথোপকথন। কিন্তু আমরা বুঝতে পারোনি। হয়তো আজ যে মানুষটিকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, সেটাই হয়তো ছিল শেষবার। হয়তো আর কোনোদিন সেই বুকের উষ্ণতায় ফিরে যাওয়া হবে না। হয়তো মায়ের কণ্ঠে শোনা কোনো সাধারণ ডাক, বাবার বলা কোনো পরিচিত কথা, প্রিয় মানুষের পাঠানো কোনো ছোট্ট মেসেজ—একদিন সেগুলোই হয়ে উঠবে হয়তো এমন স্মৃতি, যার কাছে ফিরে যেতে চাইলেও আমরা আর ফিরে যেতে পারবো না। হয়তো আজকের সূর্যাস্ত আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই দেখছি, আকাশের রঙ বদলাচ্ছে দেখছি, পাখিদের ঘরে ফেরা দেখছি, চারপাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হতে দেখছি। কিন্তু আমরা হয়তো জানতেই পারছি না,—এটাই ছিল আমাদের দেখা শেষ সূর্যাস্ত বা শেষ সকাল। হয়তো আজকের এই সন্ধ্যাটাই শেষ সন্ধ্যা। হয়তো এই কথাটাই শেষ কথা। হয়তো এই আলিঙ্গনটাই শেষ আলিঙ্গন।

বেঁচে থাকাটা শুধু নিঃশ্বাস নেওয়া নয়। বেঁচে থাকা মানে—কাউকে মন থেকে ভালোবাসা, কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া, কারও চোখের জল মুছে দেওয়া, কাউকে নিজের উপস্থিতির নিশ্চয়তা দেওয়া, আর ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে বুকের ভেতর যত্ন করে রেখে দেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা হয়তো পৃথিবীর বড় কোনো অর্জন সঙ্গে নিয়ে যাব না। কিন্তু কারও মনে থেকে যাবে আমাদের বলা একটি ভালো কথা, কারও হৃদয়ে থেকে যাবে আমাদের দেওয়া একটি আলিঙ্গন, কারও স্মৃতিতে থেকে যাবে আমাদের সঙ্গে কাটানো একটি সাধারণ বিকেল। আর হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায়, আমাদের না-থাকার পৃথিবীতে কেউ একজন হঠাৎ আমাদের কথা মনে করে চুপ হয়ে যাবে… চোখের কোণে পানি জমবে…আর খুব আস্তে করে বলবে—“মানুষটা থাকলে ভালো হতো…”. তাই কখনোই ধরে নিও না যে, আমাদের হাতে অগণিত আগামীকাল পড়ে আছে।

জীবন আসলে বড় বড় ঘটনার সমষ্টি নয়—জীবন গড়ে ওঠে এই ছোট ছোট সাধারণ মুহূর্তগুলো দিয়ে। তাই কৃতজ্ঞ থাকি। মন খুলে ভালোবাসি। যতটা সম্ভব সহজে ক্ষমা করি। প্রিয় মানুষগুলোর পাশে থাকি। আর প্রতিটি সাধারণ দিনকেও অসাধারণভাবে বাঁচি কারণ আজ যে মুহূর্তটাকে খুব সাধারণ ভেবে পেরিয়ে যেতে দেখছি, হয়তো কোনো একদিন সেই মুহূর্তটিই আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে ফিরে আসবে। আগামীকাল আসবে কি না, সেই প্রতিশ্রুতি সময় কখনো কাউকে দেয়নি।

১১/০৯/২০২৬-কেউ যখন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যেতে চায়

কেউ যখন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যেতে চায় বা আর থাকতে চায় না, তার এই সিদ্ধান্তটা কোনো হঠাৎ আবেগের ফল নয়। অনেক কিছু দেখেছে, ভেবেছে, সহ্য করেছে—তারপর বুঝেছে, কিছু জায়গা ছেড়ে আসাই কখনো কখনো নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কেউ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয় তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে কাজ করার জন্য। কারও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের হিসাব মেলানোর জন্য নয়। কোনো ব্যক্তির অহংকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয়। যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ককে বেশি মূল্য দেওয়া কোনো সংস্কৃতির অংশ হওয়ার জন্যও নয়। একজন কর্মী কঠিন সময় সামলাতে পারে। চাপের মধ্যে কাজ করতে পারে। ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধনও করতে পারে। প্রয়োজনে নিজের সীমার বাইরেও গিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দায়িত্ব নিতে পারে। কিন্তু একজন কর্মীর আত্মসম্মানও আছে। অবমূল্যায়ন, অন্যায় পক্ষপাত, অসম আচরণ কিংবা এমন এক নেতৃত্বের পরিবেশ—যেখানে প্রতিদিন কাজের চেয়ে মানুষের মেজাজ বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—এসবকে পেশাগত দায়িত্বের অংশ বলা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন, যন্ত্রপাতি কিংবা অর্থ নয়—তার যোগ্য ও সৎ  মানুষগুলো। আর যখন সেই মানুষগুলো একে একে চলে যেতে শুরু করে, তখন শুধু এটুকু জিজ্ঞেস করলেই হয় না—“মানুষগুলো কেন চলে যাচ্ছে?” বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত—“আমরা এমন কী তৈরি করেছি, যেখানে ভালো মানুষগুলো আর থাকতে চাইছে না?” একজন ভালো কর্মী যখন কোনো প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যায়, তখন সে শুধু একটি চাকরি ছেড়ে যায় না। সে সঙ্গে করে নিয়ে যায় তার অভিজ্ঞতা, নিষ্ঠা, আস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া অসংখ্য নির্ঘুম সময়। আর যদি একই ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে, তাহলে হয়তো প্রতিবার কর্মীদের দোষ খোঁজার আগে প্রতিষ্ঠানের নিজের আয়নায় তাকানো প্রয়োজন। কারণ প্রতিভাবান মানুষ সবসময় বেশি বেতনের জন্য চলে যায় না। অনেক সময় তারা চলে যায় এমন একটি পরিবেশ থেকে, যেখানে—যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, কাজের চেয়ে পক্ষপাতিত্ব শক্তিশালী, সত্য কথার চেয়ে তোষামোদ নিরাপদ, আর অবদানের চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের মূল্য বেশি।  কর্মক্ষেত্রে সম্মান কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি একজন মানুষের প্রাপ্য। তাই তারা সরে দাঁড়ায়, পরাজিত হয়ে নয়, অভিমান করে নয়, বরং নিজের পেশাগত মূল্যবোধ এবং আত্মসম্মানকে অক্ষুণ্ণ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে। কিছু দরজা বন্ধ হয়ে যায়—কারণ সামনে অন্য কোনো দরজা খোলার প্রয়োজন হয়। আর কখনো কখনো,একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে আসা মানে কোনো কিছু হারানো নয়; বরং নিজেকে হারিয়ে ফেলার আগেই নিজেকে ফিরে পাওয়া।

১০/০৯/২০২৬ -যে গ্রামটা আর নেই…

আজ থেকে প্রায় ৪৬ বছর আগের কথা।

এই বাড়িটাতেই কেটেছিল আমার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো। তখন গ্রামটা ছিল খুব ছোট। মানুষ ছিল হাতে গোনা। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির দূরত্ব হয়তো ছিল কয়েকটা উঠোন, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব ছিল শূন্য। কারও বাড়িতে আনন্দ হলে সবাই আনন্দ করতো, কারও বিপদ হলে পুরো গ্রাম ছুটে যেত। মানুষগুলো তখন খুব ধনী ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য—তাদের মনগুলো ছিল ধনী! সারা গ্রামে মাত্র দুটো টিউবওয়েল ছিল। বর্ষা এলে মনে হতো, পুরো গ্রামটাই যেন পানির ওপর ভেসে আছে। উঠোন থেকে বের হলেই হাঁটুপানি, আর সেই পানির মধ্যে ছোট ছোট মাছের ছুটোছুটি। কাদা-মাটির পথ, বৃষ্টিভেজা বিকেল, পুকুরপাড়, বিশাল গাছগুলোর ছায়া—সেই সরল পৃথিবীটাকে তখন বুঝিনি। বুঝিনি, একদিন এই ছোট্ট পৃথিবীটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে থাকবে।

১৯৭৭ সালে আমি গ্রাম ছেড়ে চলে যাই। তারপর ছুটিতে মাঝে মাঝে আসতাম। একটা টান ছিল। একটা অদৃশ্য বন্ধন ছিল এই মাটির সঙ্গে। কারণ মানুষ যত দূরেই যাক, তার শৈশব বোধহয় কোথাও যায় না। সে লুকিয়ে থাকে পুরোনো উঠোনে, গাছের ছায়ায়, পুকুরের জলে, কিংবা কোনো এক বিকেলের বাতাসে। কিন্তু ২০০৩ সালে আমার মা চলে যাওয়ার পর সবকিছু কেমন যেন বদলে গেল। মায়ের সঙ্গে যেন এই গ্রামের সঙ্গেও আমার একটা বড় সম্পর্কের মৃত্যু হলো।

আসা কমে গেল। তারপর একসময় এমন হলো—নিজের গ্রামেই এসে নিজেকে অতিথি মনে হতে লাগল।

কী অদ্ভুত!

যে গ্রামের প্রতিটি পথ একসময় আমার চেনা ছিল, সেই পথেই একদিন নিজেকে অপরিচিত মনে হলো। তখন গ্রামে কোনো বিল্ডিং ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না। শহরে যাওয়ার মতো ভালো কোনো গাড়ির পথ ছিল না। কিন্তু মানুষের মধ্যে একটা জিনিস ছিল—মায়া। সেই মায়ার কোনো দাম ছিল না, কিন্তু তার মূল্য ছিল অপরিসীম। এই গ্রামেরই কত ছেলেমেয়ে নিজেদের যোগ্যতায় দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেউ ডাক্তার, কেউ ব্যারিস্টার, কেউ অধ্যাপক, কেউ আর্মি অফিসার, কেউ ব্যবসায়ী। আমাদের তখন বড় বড় ভবন ছিল না, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না—কিন্তু ছিল এমন কিছু মানুষ, যাদের নিয়ে গর্ব করা যেত।

আজ ৪৬ বছর পর গ্রামটাকে দেখি—সবকিছু আছে। কাঁচা বাড়ি প্রায় নেই। বিদ্যুৎ আছে। পাকা রাস্তা আছে। গাড়ি আছে। দালানকোঠা আছে। বিদেশে থাকা মানুষের পাঠানো টাকায় অনেকের জীবন বদলে গেছে। শুধু কোথায় যেন গ্রামটাই নেই। বাড়িগুলো বড় হয়েছে, কিন্তু হৃদয়গুলো যেন ছোট হয়ে গেছে। আধুনিকতা এসেছে, কিন্তু তার সঙ্গে এসেছে কৃত্রিমতা। মানুষের ঘর সুন্দর হয়েছে, কিন্তু সম্পর্কগুলো কোথায় যেন বিবর্ণ হয়ে গেছে। পরিচ্ছন্ন মানুষ, সুন্দর ব্যক্তিত্ব আর নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ—এখন বড্ড কম মনে হয়।

মাইগ্রেশন গ্রামটাকে অনেক বদলে দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই গ্রামের মানুষের অর্থ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা আর সাফল্য তো গ্রামটাকে আরও সুন্দর করার কথা ছিল।

কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়—আমরা সবাই গ্রাম থেকে বেরিয়ে গেছি, অথচ গ্রামটাকে সঙ্গে করে কেউ বের করে আনিনি। কেউ যেন আর এই গ্রামটার দায়িত্ব নিতে চায় না। কেউ ভাবছে না—আমাদের পরের প্রজন্ম যখন ফিরে আসবে, তখন তারা কী দেখবে? তারপরও গ্রামের পুরোনো গাছগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। নীরবে। তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বস্ত। তারা দেখেছে আমার শৈশব। দেখেছে আমার মায়ের সংসার। দেখেছে আমাদের হাসি-কান্না। দেখেছে কত মানুষ এই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। দেখেছে কত মানুষ আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। তারা হয়তো এখনও আমাকে চিনতে পারে। আমি জানি না। কিন্তু কোনো এক পুরোনো গাছের নিচে দাঁড়ালে আজও মনে হয়—এই তো সেই জায়গা… এখানেই তো একদিন আমি ছোট ছিলাম। যে উঠোনে দৌড়াতাম, সেখানে এখন অন্য মানুষের চলাফেরা। যে পথে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটতাম, সেই পথ এখন গাড়িতে ভরে গেছে। যে গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই সবাই সবাইকে চিনতো, সেখানে এখন অনেক মুখই আমার অচেনা। সময় শুধু গ্রামটাকে বদলায়নি—আমাদেরও বদলে দিয়েছে। তবু আমার ভেতরে একটা গ্রাম আজও বেঁচে আছে। সেই গ্রামে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। সেই গ্রামে   এখনও পাকা রাস্তা হয়নি। সেই গ্রামে এখনও বর্ষার পানি উঠোন ছুঁয়ে যায়। সেই পানিতে এখনও ছোট ছোট মাছ ছুটে বেড়ায়। সন্ধ্যা হলে মানুষ এখনও একে অপরের বাড়িতে বসে গল্প করে। আর আমার মা এখনও যেন সেই বাড়ির কোথাও আছেন। সেই গ্রামটাকে আমি আজও খুঁজে বেড়াই।

বাস্তবের গ্রামে গিয়ে হয়তো তাকে আর খুঁজে পাই না। কারণ— গ্রামটা হয়তো এখনও আছে, বাড়িগুলোও আছে, গাছগুলোও আছে, মানুষও আছে। শুধু আমার সেই গ্রামটা আর নেই। আর সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো—সেই গ্রামটার সঙ্গে সঙ্গে আমার শৈশবটাও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

১০/০৯/২০২৬-আর্মির জীবনটা আমার কাছে শুধু একটা চাকরি ছিল না

আর্মির জীবনটা আমার কাছে শুধু একটা চাকরি ছিল না—এটা ছিল আমার জীবনের একটা আলাদা অধ্যায়। একটা men’s life—যেখানে পরিস্থিতি বলে আলাদা কিছু ছিল না। যা আসত, সেটাকেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যেতে হতো। ভয়, ক্লান্তি, বৃষ্টি, শীত, অন্ধকার কিংবা বিপদ—কোনোটার জন্যই জীবন থেমে থাকত না। অন্ধকার রাত—অপারেশন আছে, কোনো অসুবিধা নাই। আমার কাছে তখন অন্ধকার মানেই থেমে যাওয়া ছিল না। আলো নেই? সমস্যা নেই। মেঠো পথ, গহীন জঙ্গল, চারপাশে শুধু অন্ধকার—তবুও আমি হাঁটতাম। পিঠে আমার প্যাক, পায়ে বুট, সঙ্গে অস্ত্র। সামনে কতদূর পথ, কোথায় গিয়ে শেষ হবে—সেটা হয়তো জানতাম না। শুধু জানতাম, আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বৃষ্টি নামত। জুপজুপ করে বৃষ্টি পড়ত শরীরের ওপর। কাপড় ভিজে যেত, বুট ভিজে যেত, শরীর ক্লান্ত হয়ে আসত। কিন্তু হাঁটা থামত না। বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হতো—এই বৃষ্টিটাও যেন আমার জীবনেরই একটা অংশ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড শীতেও একই গল্প। চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। গায়ে একটা আর্মির জ্যাকেট, আর সেই জ্যাকেটটাকেই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে আপন জিনিস মনে হতো। শীতকালীন অনুশীলনে কখনো বনে, কখনো কবরস্থানে, কখনো পরিত্যক্ত স্যাঁতসেঁতে বাগানে তাবু টেনে রাত কাটিয়েছি। তখন মনে হতো, পৃথিবীর আরাম-আয়েশ থেকে আমরা যেন সম্পূর্ণ অন্য একটা জগতে বাস করছি। কিন্তু আজ, এত বছর পর, সেই স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ, তাবুর ভেতরের ঠান্ডা, ভোরের কুয়াশা—সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুত মায়ায় ভরে গেছে।

আর আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই গভীর রাতগুলো। যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকত, তখন আমার রাতটা হয়তো সবে শুরু হয়েছে। চারপাশের বাড়িগুলো নিস্তব্ধ। মানুষের কোনো শব্দ নেই। গাছের পাখিগুলোও সারাদিনের কিচিরমিচির শেষে ঘুমিয়ে গেছে। আর আমি—হয়তো একা কোনো মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছি। কখনো হাতে একটা সিগারেট জ্বলছে। চারপাশে শুধু অন্ধকার। নিজের বুটের শব্দ—খট… খট… খট… কখনো মনে হতো, এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে হয়তো আমি ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। উপরে তাকালে দেখা যেত চাঁদটা অনেকটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। মনে হতো, আর হয়তো ঘণ্টাখানেক পরেই ভোর হবে। মানুষগুলো ঘুম থেকে উঠবে, পাখিরা ডাকবে, বাড়ির উঠোনে মানুষের ব্যস্ততা শুরু হবে। পৃথিবীটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে রাতটা শুধু আমার। দূরে কোনো এক খোঁয়াড় থেকে একটা গাভী হঠাৎ লম্বা টানে ডেকে উঠত। কোনো বাড়ির মুরগির খামার থেকে কয়েকটা রাতজাগা মুরগি একসঙ্গে ডেকে উঠত। তারপর আবার সব চুপ।

আমি হাঁটতাম। কখনো ক্লান্ত শরীর নিয়ে, কখনো ঘুমজড়ানো চোখে, কখনো নিজের চিন্তার সঙ্গে লড়তে লড়তে। 

কিন্তু আর্মির জীবন শুধু এই দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জীবনের একটা সময় বিদেশের মাটিতেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আরও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল—অচেনা দেশ, অচেনা মানুষ, অচেনা ভাষা, অচেনা পরিবেশ। অথচ সেই অচেনা মাটিতেই কখনো কখনো এমন কিছু মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি, যাদের সঙ্গে হয়তো তার আগে কোনোদিন দেখা হয়নি। ভিন্ন দেশের আর্মির অফিসার, জওয়ান—কেউ আমার ভাষা জানে না, কেউ আমার সংস্কৃতি জানে না। তবুও বিপদের মুহূর্তে আমরা যেন একই পরিবারের মানুষ হয়ে যেতাম। সেখানে বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাও ছিল অন্যরকম। কে কোন দেশের, কে কোন ধর্মের, কে কোন ভাষায় কথা বলে—এসব তখন খুব ছোট হয়ে যেত। সামনে একটা দায়িত্ব থাকত, আর পাশে থাকত একজন সহযোদ্ধা। কখনো এমন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেছি, যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান। তখন নিজের জীবন নিয়ে ভাবারও সময় থাকত না। কখনো জানতাম না সামনে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার বন্ধু নাকি শত্রু। কখনো জানতাম না পরের মুহূর্তে কোথা থেকে বিপদ আসবে। অথচ আমার অস্ত্র সবসময় প্রস্তুত থাকত। চোখ-কান খোলা থাকত। মন থাকত সতর্ক। আর দায়িত্ব—সবকিছুর ওপরে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এমন কিছু মুহূর্তও এসেছে যখন অন্য দেশের মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্বে নিজেকে এমনভাবে ডুবিয়ে দিয়েছি যে নিজের পরিবার, স্ত্রী, সন্তান—কেউ যেন সেই মুহূর্তে মাথার ভেতরেই ছিল না। পরে যখন বিপদ কেটে গেছে, যখন একটু নিরাপদ জায়গায় ফিরে এসেছি, তখন হঠাৎ মনে পড়েছে—আমারও তো একটা পরিবার আছে। কেউ হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ হয়তো জানেই না আমি এই মুহূর্তে কোথায়, কী অবস্থায় আছি। কিন্তু দায়িত্বের সময় দায়িত্বই সবকিছু। আজ ভাবলে অবাক লাগে—কীভাবে পারতাম? কীভাবে এতটা নির্ভয়ে অচেনা মানুষের জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতাম? হয়তো তখন বয়স কম ছিল। শরীরে তারুণ্যের শক্তি ছিল। ভয় ছিল, কিন্তু ভয়কে প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না। আর তার চেয়েও বড় ছিল একটা বিশ্বাস—আমি একজন সৈনিক, আমার দায়িত্ব আমাকে শেষ পর্যন্ত পালন করতেই হবে।

সেই সময়ের অনেক মানুষের নাম আজ হয়তো মনে নেই। অনেক মুখও সময়ের কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মুহূর্ত এখনও খুব পরিষ্কার। কোনো অচেনা দেশের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে বিপদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা। কোনো জওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে নীরবে বুঝে নেওয়া—আমরা প্রস্তুত। কোনো অপারেশনের আগে কয়েক মুহূর্তের সেই অদ্ভুত নীরবতা। অন্ধকারের মধ্যে অস্ত্র হাতে অপেক্ষা করা। আর মনে মনে শুধু ভাবা—আজ রাতটা পার করতে হবে। সেই দিনগুলোতে মৃত্যু খুব কাছের একটা বাস্তবতা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে আমরা মৃত্যুকে নিয়ে খুব বেশি ভাবতাম না। কারণ সৈনিকের জীবনে মৃত্যুভয়কে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হয়। ভয় থাকবে, কিন্তু পা থামানো যাবে না।

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে বুঝি—ওই জীবন আমাকে শুধু সাহস শেখায়নি। আমাকে শিখিয়েছে মানুষকে চিনতে। শিখিয়েছে বন্ধুত্বের মূল্য। শিখিয়েছে দায়িত্ব কী। শিখিয়েছে—মানুষের পরিচয় অনেক সময় তার দেশের নাম দিয়ে নয়, বিপদের মুহূর্তে সে আপনার পাশে দাঁড়ায় কি না, সেটা দিয়ে হয়।

আর শিখিয়েছে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে। তখন হয়তো বুঝিনি—কিন্তু আজ বুঝি, ওই একাকী রাতগুলো, সেই বৃষ্টিভেজা পথ, কুয়াশায় ঢাকা সকাল, হাড় কাঁপানো শীত, অচেনা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া বিপদ—এসবই আসলে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে গেছে। আজ যখন আর সেই জীবনটা প্রতিদিনের বাস্তবতা নয়, তখন অদ্ভুতভাবে সেই কষ্টগুলোকেই মিস করি।

মিস করি সেই বুটের শব্দ। মিস করি পিঠের ভারী প্যাক। মিস করি বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটা। মিস করি কুয়াশায় ঢাকা ভোর। মিস করি হাড় কাঁপানো শীতের রাত।

মিস করি গভীর অন্ধকারের সেই মেঠো পথগুলো। মিস করি অপারেশনের আগের সেই নিস্তব্ধতা। মিস করি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অফিসার আর জওয়ানদের। মিস করি সেই অচেনা দেশের অচেনা সহযোদ্ধাদের—যাদের সঙ্গে হয়তো ভাষা এক ছিল না, দেশ এক ছিল না, জীবন এক ছিল না; কিন্তু বিপদের মুহূর্তে আমরা একই মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। সবচেয়ে বেশি মিস করি—যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকত, আর আমি একা জেগে থাকতাম।

সত্যি বলতে, তখন জীবনটা যতটা কঠিন মনে হতো, আজ দূর থেকে তাকালে ততটাই সুন্দর মনে হয়। জীবনের কিছু সময় আছে, যেগুলো বেঁচে থাকার সময় আমরা শুধু পার করে দিই। তখন কষ্টকে কষ্ট মনে হয়, ক্লান্তিকে ক্লান্তি মনে হয়, রাতকে শুধু রাতই মনে হয়। কিন্তু সময় চলে যায়। মানুষ বদলে যায়। বয়স বাড়ে। জীবন অন্যদিকে চলে যায়। তারপর একদিন হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে মনে হয়— ইশ! সেই দিনগুলো যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত!

হয়তো আবার সেই বুট জোড়া পায়ে দিতাম। পিঠে সেই ভারী প্যাকটা তুলে নিতাম। গায়ে সেই পুরোনো আর্মির জ্যাকেটটা পরতাম। আবার অফিসার-জওয়ানদের নিয়ে কোনো অচেনা পথে বেরিয়ে পড়তাম। আবার কোনো অন্ধকার রাতে মেঠো পথ ধরে হাঁটতাম। চারপাশে শুধু নীরবতা, মাথার ওপর চাঁদ, হাতে একটা সিগারেট, আর পায়ের নিচে বুটের সেই চেনা শব্দ— খট… খট… খট… হয়তো আবার কোনো অচেনা নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো—এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আমি ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। হয়তো আবার কোনো অচেনা দেশের একজন সহযোদ্ধা পাশে এসে দাঁড়াত। হয়তো আবার কোনো কঠিন মুহূর্তে অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াতাম। হয়তো আবার জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুঝতাম—জীবন আসলে কতটা মূল্যবান। আর হয়তো সেই মুহূর্তে আবার মনে পড়ত—এই তো আমার জীবন। এই তো আমার তারুণ্য। এই তো আমার সাহস। এই তো আমার পৃথিবী।

আজ সেই পৃথিবী আর নেই। মানুষগুলো ছড়িয়ে গেছে। কেউ হয়তো অবসর নিয়েছে, কেউ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, কেউ হয়তো আর এই পৃথিবীতেই নেই। অনেক মুখ ভুলে গেছি, অনেক নাম মনে নেই। কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনও কোথাও হারিয়ে যায়নি। কখনো গভীর রাতে হঠাৎ মনে হয়, আমি যেন আবার সেই পুরোনো পথে হাঁটছি। চারপাশে অন্ধকার। দূরে কোনো গাভীর ডাক। কোনো অচেনা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। হাতে জ্বলছে একটা সিগারেট। পায়ে সেই বুট। আর বুকের ভেতর সেই পুরোনো সাহস। তখন মনে হয়—সময় কি সত্যিই চলে যায়? নাকি আমাদের শরীরটা শুধু সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যায়, আর আমাদের একটা অংশ চিরকাল পড়ে থাকে সেই পুরোনো কোনো ক্যাম্পে, কোনো মেঠো পথে, কোনো বৃষ্টিভেজা রাতে, কোনো অচেনা দেশের মাটিতে?

জানি না। শুধু জানি— আর্মির সেই জীবনটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে— সেটাই ছিল আমার তারুণ্যের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। সেই জীবনে কষ্ট ছিল, ক্লান্তি ছিল, ঘাম ছিল, বৃষ্টি ছিল, শীত ছিল, অন্ধকার ছিল, ভয় ছিল, জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল। কিন্তু তার ভেতরেই ছিল আমার তারুণ্য। ছিল আমার সাহস। ছিল আমার একাকীত্ব। ছিল আমার স্বাধীনতা। ছিল বন্ধুত্বের সবচেয়ে নির্মল রূপ। ছিল দায়িত্ববোধের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। আর ছিল জীবনের কিছু সবচেয়ে সত্যিকারের মুহূর্ত।

তাই আজও মাঝেমধ্যে মনে হয়—যদি আর একবার সেই জীবনটায় ফিরে যেতে পারতাম! একবার শুধু সেই বুট জোড়া পায়ে দিতে পারতাম। একবার শুধু সেই প্যাকটা কাঁধে তুলতে পারতাম। একবার শুধু কোনো অন্ধকার রাতে, কোনো অচেনা পথে, পাশে আমার অফিসার আর জওয়ানদের নিয়ে হাঁটতে পারতাম। তাহলে হয়তো আবারও সেই পুরোনো মানুষটাকে খুঁজে পেতাম—যে মানুষটা ভয় পেত, কিন্তু ভয়কে কখনো নিজের পথের বাধা হতে দিত না।

আর্মির সেই জীবনটা খুব মিস করি। ভীষণ মিস করি। কারণ সেটা শুধু আমার চাকরি ছিল না—সেটা ছিল আমার জীবনের একটা অংশ।
আমার তারুণ্যের একটা অংশ।আমার অস্তিত্বের একটা অংশ
।

০৮/০৯/২০২৬-শেষ পর্যন্ত সত্যিই কে আপনার পাশে থাকবে?

আপনি কি জানেন, শেষ পর্যন্ত সত্যিই কে আপনার পাশে থাকবে? জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যগুলোর একটি হলো—যারা আপনাকে ভালোবাসে, তাদের সবাইকে আপনি সারাজীবন পাশে পাবেন না। জীবন মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। সময় মানুষের ভূমিকা বদলে দেয়। সম্পর্কগুলোও একসময় তাদের চেনা রূপ হারিয়ে ফেলে। আপনার বাবা-মা আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে বড় করবেন। আপনার জন্য সারাজীবন দুশ্চিন্তা করবেন, প্রার্থনা করবেন, নিজের সুখ বিসর্জন দেবেন। অথচ একদিন সময় তাদেরও আপনার কাছ থেকে নিয়ে যাবে। ভাই-বোনেরা একসময় আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল। একই ছাদের নিচে বড় হওয়া, একই স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া—সবই থাকবে। কিন্তু একসময় জীবনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব, সংসার আর নিজ নিজ পথ তাদের দূরে নিয়ে যাবে। ভালোবাসা হয়তো থাকবে, কিন্তু আগের মতো প্রতিদিনের উপস্থিতিটা আর থাকবে না।

আপনার সন্তানরাও একদিন বড় হয়ে যাবে। যাদের হাত ধরে আপনি হাঁটতে শিখিয়েছেন, একদিন তারাই নিজেদের স্বপ্নের পেছনে ছুটবে। তাদের নিজস্ব সংসার হবে, দায়িত্ব হবে, ব্যস্ততা হবে। তারা আপনাকে ভালোবাসবে, আপনার জন্য ভাববে—কিন্তু তাদের জীবন তাদের নিজের পথেই এগিয়ে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। এটাই জীবনের নিয়ম। তাহলে শেষ পর্যন্ত কে থাকে?

থাকে সেই মানুষটি, যে আপনার জীবনের প্রতিদিনের গল্পের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে। যে আপনার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তিটা বুঝতে পারে। যে আপনার না-বলা কথাগুলোও শুনতে পায়। যে দেখে আপনি কীভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছেন, অথচ কাউকে কিছু বলছেন না। যখন পৃথিবী আপনার সাফল্য দেখে হাততালি দেয়, সে তখনও আপনার পাশে থাকে। আর যখন ব্যর্থতার পর সবাই ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, তখনও সে আপনার পাশে বসে থাকে। আপনি যখন ক্লান্ত হয়ে বলেন, “আর পারছি না”—সে হয়তো কোনো সমাধান দিতে পারে না। কিন্তু চুপচাপ আপনার পাশে বসে থাকে। কারণ সে জানে, সব কষ্টের সমাধান শব্দে হয় না; কখনো কখনো একজন মানুষের পাশে থাকা-ই যথেষ্ট। সে আপনার বিজয়ে ঈর্ষা করে না, বরং আপনার আনন্দকে নিজের আনন্দ মনে করে। আপনার পরাজয়ে আপনাকে ছোট করে না, বরং আপনার ভেঙে যাওয়া আত্মবিশ্বাসটুকু আবার জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোতে অনেক মানুষ পাশে থাকে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোতে যারা থেকে যায়, তারাই আসলে আপনার মানুষ। একদিন হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা কমে যাবে। আড্ডা কমে যাবে। পরিচিত মুখগুলো একে একে দূরে সরে যাবে। উৎসবের আলো ম্লান হয়ে আসবে। জীবনের কোলাহল থেমে যাবে। একসময় আপনার পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে আসবে। আর তখন হয়তো আপনি বুঝবেন—সারাজীবন আপনি কত মানুষের ভিড়ের মধ্যে ছিলেন, অথচ শেষ পর্যন্ত আপনার পাশে ছিল মাত্র একজন। সেই একজন—যাকে আপনি জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তবে শুধু সঠিক মানুষকে খুঁজে পাওয়াই যথেষ্ট নয়। তাকে ধরে রাখতেও জানতে হয়। কারণ একটি গভীর সম্পর্ক হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় অসংখ্য ছোট ছোট ক্ষমা দিয়ে, অগণিত নীরব বোঝাপড়া দিয়ে, ধৈর্য দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে, অভিমান পেরিয়ে আবার কাছে ফিরে আসার ইচ্ছা দিয়ে। মনে রাখবেন— মানুষের জীবনে অনেক মানুষ আসে, কিন্তু সবাই থেকে যায় না।

কেউ আসে প্রয়োজনের সময়, কেউ আসে আনন্দের সময়, কেউ আসে কোনো একটি অধ্যায় হয়ে। কিন্তু যে মানুষটি আপনার ভালো দিন, খারাপ দিন, অসুস্থতা, ব্যর্থতা, নীরবতা, হতাশা—সবকিছুর মধ্যেও আপনার হাতটা ছেড়ে যায় না, তাকে কখনোই সাধারণভাবে নেবেন না। কারণ ভালোবাসা পাওয়া সৌভাগ্যের, কিন্তু বিশ্বস্ত একজন মানুষকে পাওয়া বিরল সৌভাগ্যের। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ বুঝতে পারে— বাড়ি কত বড় ছিল, ব্যাংকে কত টাকা ছিল, কত মানুষ তাকে চিনত—এসবের কোনোটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, যখন পৃথিবীটা ধীরে ধীরে আপনার চারপাশ থেকে সরে যাচ্ছিল, তখন আপনার পাশে কে বসে ছিল।

তাই যদি আপনার জীবনে এমন একজন মানুষ থেকে থাকে— যে আপনাকে বুঝেছে, আপনার অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিয়েছে, আপনার কঠিন সময়গুলো সহ্য করেছে, আপনার জন্য লড়েছে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আপনার হাত ছেড়ে যায়নি—তবে তাকে ভালোবাসুন। তাকে সম্মান করুন। তার যত্ন নিন। কারণ পৃথিবীতে ভালোবাসার মানুষ অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাশে থাকা মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়। আর জীবনের শেষ হিসাবটায়—চারপাশের ভিড় নয়, আপনার পাশে থাকা সেই একজন মানুষটিই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।

০৮/০৯/২০২৬-বিশ্বাস একটা আয়নার মতো

বিশ্বাস একটা আয়নার মতো—স্বচ্ছ, নীরব, অথচ ভীষণ ভঙ্গুর। একবার ভেঙে গেলে তাকে যতই জোড়া লাগানো হোক, দাগটা থেকে যায়। আর আশ্চর্যের বিষয়—যে মানুষটি সেই আয়নাটা ভাঙে, শেষ পর্যন্ত সে শুধু অন্যের প্রতিচ্ছবিই হারায় না,নিজের প্রতিচ্ছবিটাও হারিয়ে ফেলে। কারণ মানুষের বিশ্বাস হারানো মানে শুধু একটা সম্পর্ক হারানো নয়; কখনো কখনো এর অর্থ—একটি মানুষের আত্মার ভেতর থেকে ভালোবাসার একটি অংশ চিরতরে মরে যাওয়া।

বিশ্বাসঘাতকেরা তখন হয়তো ভাবে, সে শুধু একটা গোপন কথা লুকিয়েছে, একটা মিথ্যা বলেছে,অথবা সামান্য কোনো প্রতারণা করেছে। কিন্তু তারা বোঝে না—বিশ্বাস ভাঙার বিষ কখনো বাইরে থাকে না, তা ধীরে ধীরে ফিরে আসে ভাঙা মানুষের স্মৃতি হয়ে, অপরাধবোধ হয়ে, আর একদিন নিজের জীবনেই বিষ হয়ে। ভালোবাসা দিয়ে শুরু হওয়া কোনো সম্পর্ক যখন মিথ্যায় ভরে যায়,তখন সম্পর্কটা আর শুধু সম্পর্ক থাকে না—প্রতিটি নিঃশ্বাসে তখন একটা করে যন্ত্রণার গল্প জন্ম নেয়। বিশ্বাসঘাতকের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে কথা বলতে পারে, অথচ তোমার অজান্তেই তোমার পেছনে বিষ ছড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্বাস ভাঙার কোনো শব্দ হয় না। কোনো কাঁচ ভাঙার মতো আওয়াজ শোনা যায় না। শুধু একটা নীরবতা জন্ম নেয়—আর সেই নীরবতার প্রতিধ্বনি কখনো কখনো সারাজীবন কানে বাজতে থাকে। তাই যখন কেউ তোমার বিশ্বাস ভাঙে, মনে রেখো—সে তোমাকে হারায়নি, সে হারিয়েছে সেই মানুষটিকে, যে তাকে নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করেছিল। আর তার চেয়েও বড় সত্য হলো—বিশ্বাসঘাতকতা অন্যের মর্যাদা নষ্ট করে না; এটা বিশ্বাসঘাতকের নিজের চরিত্রের আয়নাটাকেই ভেঙে দেয়। তুমি হয়তো কষ্ট পাবে, কিছুদিন নিঃশব্দে কাঁদবে, কিছু সম্পর্ককে মনে মনে বিদায় দেবে। কিন্তু একদিন তুমি আবার উঠে দাঁড়াবে। আর যে মানুষটি তোমার বিশ্বাস ভেঙেছিল,সে হয়তো অনেক মানুষের ভিড়ে থেকেও একটা জিনিস আর কোনোদিন ফিরে পাবে না— তোমার চোখে তার হারিয়ে যাওয়া সেই প্রতিচ্ছবি।

৭/৯/২০২৬-কয়েকদিন আগে একজন পরিচিত মানুষের দাফনের সময় দাঁড়িয়ে ছিলাম।

কয়েকদিন আগে একজন পরিচিত মানুষের দাফনের সময় দাঁড়িয়ে ছিলাম। বৃষ্টিতে কবরের পাড় বারবার ভেঙে পড়ছিল। মাটি খুঁড়তেই নিচ থেকে গলগল করে পানি উঠে আসছিল। তিনটি কলাগাছ কবরের ভেতর রাখা হলো। তার ওপর শুইয়ে দেওয়া হলো মানুষটিকে। আমি শুধু দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। ভাবছিলাম—এই মানুষটিও তো একদিন কারও পৃথিবী ছিল। কারও বাবা। কারও স্বামী। কারও সন্তান। কারও সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। হয়তো তার জন্য কেউ রাত জেগেছে। কেউ তার অপেক্ষায় থেকেছে।

কেউ তার একটি ফোনকলের জন্য সারাদিন তাকিয়ে থেকেছে। অথচ আজ? আজ তাকে যত দ্রুত সম্ভব মাটির নিচে নামিয়ে দিতে পারলেই যেন সবার দায়িত্ব শেষ। তারপর সবাই বাড়ি ফিরে যাবে। কারও মিটিং আছে। কারও দাওয়াত আছে। কারও সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে হবে। দুপুরের মধ্যে দাফন হয়ে গেলে হয়তো সন্ধ্যার মিটিংটা করা যাবে। রাতের দাওয়াতটাতেও হয়তো যাওয়া যাবে। বৃষ্টি থামবে। চা বানানো হবে। রাত নামবে। কেউ ঘুমাবে। কেউ ফোনে কথা বলবে। কেউ হয়তো পরদিন আবার কাজে যাবে। কারও অফিস আছে। ভাবুন তো—একজন মানুষের পুরো জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পৃথিবীর ব্যস্ততা থেমে থাকে না। জীবন—আপনার জন্য এক মুহূর্তও থেমে থাকবে না। আমরা যাকে “আমার জীবন” বলে এত যত্নে সাজাই, সেটা আসলে আমাদের নয়। আমরা শুধু কিছুদিনের জন্য এখানে থাকি। কিছু মানুষকে ভালোবাসি। কিছু মানুষ আমাদের ভালোবাসে। কিছু স্বপ্ন দেখি। কিছু সম্পদ জমাই। কিছু হিসাব করি। কিছু অভিমান বুকে নিয়ে ঘুরি। তারপর একদিন—সব হিসাব বন্ধ। সব সম্পর্কের ঠিকানা বদলে যায়। আর আমাদের সমস্ত পরিচয় এসে থামে মাত্র কয়েক হাত মাটির নিচে।

তাই মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি ভুলেই গেছি—আমাকেও একদিন চলে যেতে হবে? হয়তো কোনো এক বর্ষার দুপুরে। হয়তো তখনও কবরের ভেতর পানি থাকবে। হয়তো মাটি কাদায় ভরে থাকবে। হয়তো তিনটি কলাগাছ আবারও কারও শেষ আশ্রয় হবে। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই—পৃথিবী আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। শুধু আমি থাকব না। থাকবে আমার নাম। কিছু ছবি। কিছু স্মৃতি। কিছু মানুষের মনে জমে থাকা কয়েকটি গল্প। তারপর সময় সেগুলোকেও ধীরে ধীরে মুছে দেবে। শেষ পর্যন্ত মানুষ আসলে কতটুকুই বা রেখে যায়? একটি নাম, কয়েকটি স্মৃতি, আর কয়েক হাত মাটি। তাই চলুন, বেঁচে থাকতেই ভালোবাসি। বেঁচে থাকতেই ক্ষমা করি। বেঁচে থাকতেই নিজের জন্য একটু বাঁচি। কারণ মৃত্যুর পরে আপনার জন্য পৃথিবী কাঁদবে হয়তো—কিন্তু পৃথিবী থেমে থাকবে না।

আর সবচেয়ে নির্মম সত্যটা হয়তো এটাই—একদিন যে মানুষটাকে ছাড়া পৃথিবী কল্পনাই করা যেত না, সেই মানুষটাকেই পৃথিবী একদিন খুব সহজে ছাড়া শিখে যায়।

০৬/০৯/২০২৬-কোনো মিথ্যাবাদী মানুষকে কখনো জিজ্ঞেস করো না—“তুমি মিথ্যা বলেছিলে কেন?”

কোনো মিথ্যাবাদী মানুষকে কখনো জিজ্ঞেস করো না—“তুমি মিথ্যা বলেছিলে কেন?” কারণ, প্রথম মিথ্যাটাকে ব্যাখ্যা করতে গেলেই তাকে আরেকটি মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। সেই দ্বিতীয় মিথ্যাটাকে সত্যি প্রমাণ করতে প্রয়োজন হবে তৃতীয় একটি মিথ্যার। তারপর সেই তৃতীয়টাকে রক্ষা করার জন্য জন্ম নেবে চতুর্থটি। এভাবেই একটি মিথ্যা কখনো একা থাকে না।ধীরে ধীরে মিথ্যাগুলো একে অপরের ওপর এমনভাবে স্তরে স্তরে জমতে থাকে যে, একসময় সত্যটা কোথায় ছিল—সেটাই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শুরুতে একজন মিথ্যাবাদী খুব ভালো করেই জানে—কোথায় সত্য শেষ হয়েছে এবং কোথা থেকে তার মিথ্যা শুরু হয়েছে। সে জানে আসলে কী ঘটেছিল, সে জানে কী বলেছিল, কী গোপন করেছিল এবং কেন সত্যকে আড়াল করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। একই মিথ্যা বারবার বলতে বলতে, বারবার ব্যাখ্যা করতে করতে, বারবার অন্যের সামনে সেটাকে প্রতিষ্ঠা করতে করতে—একসময় মানুষটি নিজেই তার তৈরি গল্পের কিছু অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করে।

প্রতিটি নতুন মিথ্যা তখন আগের মিথ্যাটার ওপর একটি পর্দা হয়ে দাঁড়ায়। আর প্রতিটি নতুন ব্যাখ্যা সত্যের আরও একটি অংশকে আড়াল করে দেয়। একসময় সে আর শুধু অন্য মানুষকে প্রতারণা করে না—সে নিজের তৈরি একটি বাস্তবতারও বন্দী হয়ে যায়। তাকে মনে রাখতে হয়—কাকে কী বলেছে, কার কাছে কী অস্বীকার করেছে, গতকাল কী বলেছিল, আজ কী বলছে, আর কাল কী বলতে হবে। পুরোনো মিথ্যাকে টিকিয়ে রাখতে তাকে নতুন নতুন গল্প তৈরি করতে হয়। একটি গল্পের সঙ্গে আরেকটি গল্পের মিল রাখতে হয়। নিজের কথার সঙ্গে নিজের কথার হিসাব মেলাতে হয়। আর এভাবেই একদিন আসে সেই মুহূর্ত—যখন সে নিজেই আর মনে করতে পারে না, সত্যটা ঠিক কোথায় শেষ হয়েছিল এবং মিথ্যাটা কোথা থেকে শুরু হয়েছিল। তখন আসল সত্যটি ধীরে ধীরে তার স্মৃতি থেকে মুছে যায়। আর প্রথম মিথ্যাটিও হারিয়ে যায় অসংখ্য ব্যাখ্যার ভিড়ে।

আর এতদিন ধরে বলা গল্পটাই শেষ পর্যন্ত তার কাছে সত্য বলে মনে হতে থাকে। এটাই মিথ্যার সবচেয়ে ভয়ংকর পরিণতি। একজন মিথ্যাবাদী হয়তো মনে করে সে অন্য সবাইকে বোকা বানিয়েছে। অথচ অনেক সময় শেষ পর্যন্ত সে নিজেই তার সবচেয়ে বড় মিথ্যার শিকার হয়ে যায়। তাই কোনো মিথ্যাবাদীকে বারবার জিজ্ঞেস করে লাভ নেই—“তুমি মিথ্যা বলেছিলে কেন?”কারণ তার কাছে হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কোনো সত্য অপেক্ষা করছে না। অপেক্ষা করছে শুধু—আরেকটি মিথ্যা। আর সেই মিথ্যাটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও একটি। শেষ পর্যন্ত এমন এক সময় আসে, যখন সত্য আর তার কাছে কোনো গল্প থাকে না—মিথ্যাটাই হয়ে যায় তার একমাত্র মনে থাকা গল্প।

১৪/০৮/২০২৬-পরিপূর্ণ সুখ কিংবা চূড়ান্ত খুশি বলে বোধহয় পৃথিবীতে কিছু নেই।

পরিপূর্ণ সুখ কিংবা চূড়ান্ত খুশি বলে বোধহয় পৃথিবীতে কিছু নেই। মানুষ স্বপ্ন দেখে, বড় হতে চায়, আরও অনেক কিছু অর্জন করতে চায়—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বপ্নের উচ্চতা কতটা হওয়া উচিত, তা অনেকটাই নির্ভর করে নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম এবং চারপাশের বাস্তবতার ওপর। অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো মানুষকে এমন এক দৌড়ের মধ্যে নিয়ে যায়, যার কোনো শেষ নেই। তখন যা অর্জন করেছে, সেটুকুর আনন্দও আর উপভোগ করা হয়ে ওঠে না। অপূর্ণতার বোধ, হতাশা এবং আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে জীবনের স্বাভাবিক সুখটুকুকেও ম্লান করে দিতে পারে। আমার কাছে পরিশুদ্ধ ও সুন্দর জীবনের সুখ অনেক সহজ কিছু। এর জন্য প্রয়োজন সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা এবং নিজের দায়িত্বের প্রতি একাগ্রতা। প্রয়োজন নিজের সীমাটা জানা—কোথায় আমার সামর্থ্যের শেষ, আর কোথায় আমার চাহিদার সীমা। আমি জানি, আমার পরিশ্রম আমাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে। আমি এটাও জানি, আমার জীবনে আসলে কতটুকু প্রয়োজন। তাই যা আমার আছে, যা অর্জন করতে পেরেছি এবং যাদের নিয়ে আমার জীবন—এসব নিয়েই আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট, সুখী এবং কৃতজ্ঞ।

আমার ছোট্ট পরিবারের প্রতিটি মানুষ ভালো আছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি। তারা ভবিষ্যতেও ভালো থাকুক, নিজেদের যোগ্যতা ও পরিশ্রম দিয়ে জীবনে যে জায়গায় পৌঁছানো তাদের প্রয়োজন, সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করুক—এটাও আমার দায়িত্বের অংশ বলে আমি মনে করি। আমি তাদের ভালো শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। প্রত্যেকের জন্য তাদের নিজস্ব একটি শক্ত ভিত্তি ও নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিতে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছি। এরপর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাদের। আলহামদুলিল্লাহ, তারাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করেছে এবং সেই পরিশ্রমের ফল পেয়েছে। সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এই নয় যে, তারা সন্তানকে কত সম্পদ দিয়ে যেতে পেরেছেন; বরং এই যে, তারা সন্তানকে এমনভাবে গড়ে দিতে পেরেছেন কি না, যাতে একদিন সে নিজের যোগ্যতায় নিজের পথ তৈরি করতে পারে। আমি সেই চেষ্টাটুকুই করেছি।

আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার জীবনে প্রাপ্তির চেয়ে কৃতজ্ঞ হওয়ার কারণই বেশি।

আমি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে ঋণী। তাঁর অশেষ দয়া, রহমত ও অনুগ্রহের জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। জীবনে যা পেয়েছি, যা হারিয়েছি, যা অর্জন করেছি কিংবা যা পাইনি—সবকিছুর মধ্যেই তাঁর কোনো না কোনো প্রজ্ঞা আছে, এই বিশ্বাসটুকু আমাকে শান্তি দেয়।

আর একটি বিষয় আমি খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করি—মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর একটি। আমরা একে অপরের পাশে থাকব, একে অপরকে সম্মান করব, ভালোবাসব এবং যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে অন্যের জীবনটুকু একটু সুন্দর করার চেষ্টা করব। শেষ পর্যন্ত জীবন তো খুব দীর্ঘ কোনো গল্প নয়। তাই যতদিন আছি, সততার সঙ্গে বাঁচতে চাই, নিজের দায়িত্ব পালন করতে চাই, আপনজনদের ভালো রাখতে চাই এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে চাই।

আমার কাছে এটাই সুখ। এটাই শান্তি। আর এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

15/08/2026-আমার মেয়ের শাশুড়িরা (ফেসবুকড)

পরিবারের পরিধি শুধু রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জীবনের পথে কিছু মানুষ এমনভাবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান, যাঁদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও ধীরে ধীরে এক ধরনের আপন সম্পর্ক তৈরি হয়। আমার দুই মেয়ের শাশুড়ি আমাদের পরিবারের তেমনই দুজন আপন মানুষ।

আমার বড় মেয়ের শাশুড়ি বাংলাদেশেরই মানুষ। একই সমাজ, একই সংস্কৃতি এবং একই মাটির সঙ্গে তাঁর আমাদের অনেক মিল। কিন্তু শুধু এই সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণেই তিনি আমাদের আপন নন; তাঁর আন্তরিকতা, মমতা এবং সহজ-স্বাভাবিক ব্যবহারের কারণেই তিনি আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটি আনুষ্ঠানিক আত্মীয়তার গণ্ডি পেরিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গায় পৌঁছেছে। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আমার মেয়েকে শুধু পুত্রবধূ হিসেবে নয়, নিজের পরিবারের একজন মানুষ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন—একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় আর কী হতে পারে!

অন্যদিকে, আমার ছোট মেয়ের শাশুড়ি একজন আমেরিকান। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সংস্কৃতি, ভিন্ন সামাজিক পরিবেশ এবং ভিন্ন জীবনযাপনের মধ্য থেকে তিনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু মানুষে মানুষে ভালোবাসার ভাষা যে আসলে কোনো দেশ, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না—তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তারই একটি সুন্দর উদাহরণ।

তিনি অত্যন্ত ভালো মনের, প্রাণবন্ত ও সহজ-সরল একজন মানুষ। বিশেষ করে আমার মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি আমাকে খুব আনন্দ দেয়। তাঁদের মধ্যে প্রচলিত শাশুড়ি-বউয়ের দূরত্বের চেয়ে বন্ধুত্বের স্বাভাবিকতা অনেক বেশি। আমার মেয়ে তাঁর সঙ্গে নিজের কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, মজা করতে পারে, নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিতে পারে। একজন বাবা হিসেবে মেয়ের জীবনে এমন একজন মানুষকে পাশে পাওয়া আমার কাছে নিঃসন্দেহে বড় একটি আশীর্বাদ।

দুজন দুই দেশের মানুষ—একজন বাংলাদেশের, অন্যজন আমেরিকার। তাঁদের সংস্কৃতি, জীবনযাপন কিংবা অভিজ্ঞতার মধ্যে হয়তো অনেক পার্থক্য আছে। কিন্তু ভালোবাসা, মমতা, আন্তরিকতা এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গায় কোনো পার্থক্য নেই। বরং তাঁদের দুজনকে আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখে আমার বারবার মনে হয়—মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব কমে গেলে দেশ ও সংস্কৃতির দূরত্ব আর বড় হয়ে থাকে না।

আমার মেয়েরা তাদের নিজ নিজ সংসারে শুধু ভালো জীবনসঙ্গীই পায়নি; এমন দুজন মানুষকেও পেয়েছে, যাঁরা তাঁদের জীবনে মায়ের মতো মমতা, বন্ধুর মতো সহজতা এবং পরিবারের মতো আপন করে নেওয়ার অনুভূতি দিয়েছেন।

এটাও আমার জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি।

তাই তাঁদের দুজনের প্রতিই আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। তাঁরা সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, তাঁদের সন্তানদের—আমাদের মেয়েদের—জীবনে তাঁদের এই ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব সবসময় অটুট থাকুক। আর আমাদের দুই পরিবারের এই সুন্দর সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও গভীর ও মধুর হোক—এটাই আমার আন্তরিক কামনা। ❤️

14/08/2026-আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—আমার পরিবার

পরিপূর্ণ সুখ কিংবা চূড়ান্ত খুশি বলে বোধহয় পৃথিবীতে কিছু নেই। মানুষ স্বপ্ন দেখে, বড় হতে চায়, আরও অনেক কিছু অর্জন করতে চায়—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বপ্নের উচ্চতা কতটা হওয়া উচিত, তা অনেকটাই নির্ভর করে নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম এবং চারপাশের বাস্তবতার ওপর। অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো মানুষকে এমন এক দৌড়ের মধ্যে নিয়ে যায়, যার কোনো শেষ নেই। তখন যা অর্জন করেছে, সেটুকুর আনন্দও আর উপভোগ করা হয়ে ওঠে না। আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতার বোধ কিংবা অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে করতে মানুষ কখন যে নিজের হাতে থাকা সুখটুকুও হারিয়ে ফেলে, সে নিজেই বুঝতে পারে না।

আমার কাছে পরিশুদ্ধ ও সুন্দর জীবনের সুখ অনেক সহজ কিছু। এর জন্য প্রয়োজন সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা এবং নিজের দায়িত্বের প্রতি একাগ্রতা। প্রয়োজন নিজের সীমাটা জানা—কোথায় আমার সামর্থ্যের শেষ, আর কোথায় আমার চাহিদার সীমা। আমি জানি, আমার পরিশ্রম আমাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে। আমি এটাও জানি, আমার জীবনে আসলে কতটুকু প্রয়োজন। তাই যা আমার আছে, যা অর্জন করতে পেরেছি এবং যাদের নিয়ে আমার জীবন—এসব নিয়েই আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট, সুখী এবং কৃতজ্ঞ।

একজন মানুষ জীবনে কী অর্জন করেছে—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে শুধু সম্পদ, ব্যবসা, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থানের কথা বললেই হয় না। আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—আমার পরিবারের মানুষগুলো নিজেদের যোগ্যতায় দাঁড়িয়েছে এবং তারা ভালো আছে, সুখে আছে। আমার জীবনসঙ্গী আমার স্ত্রী—তিনি একজন অধ্যাপক এবং বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বাংলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজের মেধা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে তাঁর অবস্থান তৈরি করেছেন। সংসার ও পরিবারকে সামলে নিজের পেশাগত জীবনেও তিনি যে সাফল্য অর্জন করেছেন, সেটি আমার জীবনের গর্বের একটি অংশ।

আমার বড় মেয়ে একজন চিকিৎসক। তার জীবনসঙ্গীও একজন চিকিৎসক। দুজনেই নিজেদের পেশায় নিষ্ঠা, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সেবা করার মতো একটি মহান পেশাকে তারা জীবনের অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছে—একজন বাবা হিসেবে এটি আমার জন্য সত্যিই গর্বের।

আমার ছোট মেয়েটিও নিজের যোগ্যতায় আমেরিকায় একটি ভালো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে Accounting-এর ক্ষেত্রে কাজ করছে। নিজের শিক্ষা, দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে সে সেখানে নিজের একটি সুন্দর পেশাগত অবস্থান তৈরি করেছে। তার জীবনসঙ্গী একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং NASA-তে কাজ করছেন। তাঁদের দুজনকে নিজেদের পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত এবং সুখী দেখতে পারাটা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের। তবে সন্তানদের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে আমি একটি বিষয় সবসময় মনে রাখি—আমি তাদের যতটুকু শিক্ষা, সুযোগ ও ভিত্তি তৈরি করে দিতে পেরেছি, সেটা ছিল আমার দায়িত্ব। কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার কৃতিত্ব তাদের নিজেদের। আমি তাদের নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়ার জন্য আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। তারা সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে, নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এগিয়েছে এবং আজ যার যার ক্ষেত্রে একটি ভালো অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।

সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এই নয় যে, তারা সন্তানকে কত সম্পদ দিয়ে যেতে পেরেছেন; বরং এই যে, তারা সন্তানকে এমনভাবে গড়ে দিতে পেরেছেন কি না, যাতে একদিন সে নিজের যোগ্যতায় নিজের পথ তৈরি করতে পারে। আমি সেই চেষ্টাটুকুই করেছি।

পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্ক দিয়ে তৈরি হয় না। জীবনের পথে কিছু মানুষ এমনভাবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান, যাঁদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও ধীরে ধীরে হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়। আমার দুই মেয়ের শাশুড়ি আমাদের পরিবারের তেমনই দুজন আপন মানুষ। আমার বড় মেয়ের শাশুড়ি বাংলাদেশেরই মানুষ। একই সমাজ, একই সংস্কৃতি ও একই মাটির সঙ্গে তাঁর আমাদের অনেক মিল। কিন্তু শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণেই তিনি আমাদের আপন নন; তাঁর আন্তরিকতা, মমতা এবং সহজ-স্বাভাবিক ব্যবহারের কারণেই তিনি আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছেন। আমার মেয়েকে তিনি শুধু পুত্রবধূ হিসেবে নয়, নিজের পরিবারের একজন মানুষ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন—একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় আর কী হতে পারে!

অন্যদিকে, আমার ছোট মেয়ের শাশুড়ি একজন আমেরিকান। সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন সামাজিক পরিবেশ এবং ভিন্ন জীবনযাপনের মধ্য থেকে তিনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব কমে গেলে দেশ ও সংস্কৃতির দূরত্ব আর বড় হয়ে থাকে না। তিনি অত্যন্ত ভালো মনের, প্রাণবন্ত ও সহজ-সরল একজন মানুষ। সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই আমার মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দেখে। তাঁদের মধ্যে প্রচলিত শাশুড়ি-বউয়ের দূরত্বের চেয়ে বন্ধুত্বের স্বাভাবিকতা অনেক বেশি। আমার মেয়ে তাঁর সঙ্গে নিজের কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, মজা করতে পারে, নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিতে পারে। একজন বাবা হিসেবে মেয়ের জীবনে এমন একজন মানুষকে পাশে পাওয়া আমার কাছে নিঃসন্দেহে বড় একটি আশীর্বাদ।

দুজন দুই দেশের মানুষ—একজন বাংলাদেশের, অন্যজন আমেরিকার। তাঁদের সংস্কৃতি, জীবনযাপন কিংবা অভিজ্ঞতার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু ভালোবাসা, মমতা, আন্তরিকতা এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গায় কোনো পার্থক্য নেই। আমার মেয়েরা তাদের নিজ নিজ সংসারে শুধু ভালো জীবনসঙ্গীই পায়নি; এমন দুজন মানুষকেও পেয়েছে, যাঁরা তাঁদের জীবনে মায়ের মতো মমতা, বন্ধুর মতো সহজতা এবং পরিবারের মতো আপন করে নেওয়ার অনুভূতি দিয়েছেন। এটাও আমার জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি। এই ছবির মানুষগুলো এই ছবিতে শুধু আমার দুই মেয়ে কিংবা তাদের নিজ নিজ পরিবার নেই। এখানে আছে আমাদের একটি বড় হয়ে ওঠা পরিবারের ছবি। এখানে আছে আমার স্ত্রী, আমার দুই মেয়ে, তাঁদের জীবনসঙ্গী, তাঁদের পরিবার এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া আরও কিছু আপন মানুষ।

ছবির দিকে তাকালে আমি শুধু কয়েকজন মানুষকে দেখি না। আমি দেখি বহু বছরের পথচলা, দায়িত্ব, পরিশ্রম, সম্পর্ক, ভালোবাসা, সাফল্য এবং অসংখ্য স্মৃতি। আমি দেখি—একটি পরিবার কীভাবে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। একসময় যে সন্তানদের হাত ধরে হাঁটতে শেখাতে হয়েছে, আজ তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন পরিচালনা করছে। যে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসময় চিন্তা করেছি, আজ তারা নিজেদের যোগ্যতায় নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করছে। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে আনন্দের দৃশ্য আর কী হতে পারে? তাহলে আর কী চাই?

কখনো কখনো আমরা জীবনে আরও বেশি পাওয়ার জন্য ছুটতে ছুটতে ভুলে যাই—আমাদের হাতে ইতিমধ্যেই কত কিছু আছে। আমি আজ একটু পেছনে ফিরে তাকাই।

আমার স্ত্রী তাঁর নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত।

আমার দুই মেয়ে নিজেদের পেশায় প্রতিষ্ঠিত।

তাঁদের জীবনসঙ্গীরাও নিজেদের ক্ষেত্রে সম্মানের সঙ্গে কাজ করছেন।

দুই পরিবারের মানুষদের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা আছে।

আমার সন্তানরা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ইনশাআল্লাহ ভালো আছে, সুখে আছে।

তাহলে একজন মানুষের আর কতটুকু চাওয়া থাকতে পারে? আমার চাওয়া খুব বেশি নয়। আমি চাই, আমার পরিবারের সবাই সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ধরে রাখুক। জীবনে যতটুকু অর্জন করবে, তার জন্য যেন অহংকার না আসে; আর যতটুকু না-পাবে, তার জন্য যেন অস্থিরতা না আসে। আমি চাই, তারা নিজেদের সন্তানদেরও এমনভাবে গড়ে তুলুক, যেন তারা একদিন নিজের যোগ্যতায় নিজেদের পথ তৈরি করতে পারে। সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা. আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার জীবনে প্রাপ্তির চেয়ে কৃতজ্ঞ হওয়ার কারণই বেশি। আমি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে ঋণী। তাঁর অশেষ দয়া, রহমত ও অনুগ্রহের জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

জীবনে যা পেয়েছি, যা হারিয়েছি, যা অর্জন করেছি কিংবা যা পাইনি—সবকিছুর মধ্যেই তাঁর কোনো না কোনো প্রজ্ঞা আছে, এই বিশ্বাসটুকু আমাকে শান্তি দেয়। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের সামর্থ্য সীমিত; কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা সীমাহীন। তাই নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করে বাকিটুকু তাঁর ওপর ছেড়ে দিতে পারাটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তি।

আর একটি বিষয় আমি খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করি—মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর একটি। আমরা একে অপরের পাশে থাকব, একে অপরকে সম্মান করব, ভালোবাসব এবং যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে অন্যের জীবনটুকু একটু সুন্দর করার চেষ্টা করব। পরিবারের সৌন্দর্য শুধু এই নয় যে সবাই একই ছাদের নিচে থাকে। পরিবারের সৌন্দর্য হলো—দূরে থেকেও মানুষ একে অপরের কথা ভাবে, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ায়, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হয় এবং অন্যের কষ্টে নিজের মতো করে কষ্ট পায়। আমার কাছে সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো, যেখানে সম্পর্কের পরিচয়টা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়, আর মানুষটাই বড় হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত জীবন তো খুব দীর্ঘ কোনো গল্প নয়। তাই যতদিন আছি, সততার সঙ্গে বাঁচতে চাই, নিজের দায়িত্ব পালন করতে চাই, আপনজনদের ভালো রাখতে চাই, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখতে চাই এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে চাই। আমার জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব যদি কখনো কেউ জানতে চায়, তাহলে হয়তো খুব সহজেই বলতে পারব—

আমি যতটা চেয়েছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি পেয়েছি।

কারণ আমার কাছে আমার স্ত্রী আছে, আমার সন্তানরা আছে, তাঁদের পরিবার আছে, আপন মানুষগুলো আছে, ভালোবাসা আছে, সম্মান আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁদের ভালো থাকার খবর আছে।

একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কী হতে পারে? আমার কাছে এটাই সুখ।
এটাই শান্তি। আর এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আলহামদুলিল্লাহ। ❤️

১৩/০৮/২০২৬-জীবনে পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্ক দিয়ে তৈরি হয় না।

জীবনে পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্ক দিয়ে তৈরি হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষ আমাদের জীবনে এমনভাবে যুক্ত হয়ে যান, যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রেও এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের উপস্থিতি আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুন্দর ও পূর্ণ করেছে।

আমার বড় মেয়ের শাশুড়ি এবং ছোট মেয়ের শাশুড়ি—দুজন দুই পরিবারের মানুষ, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁরা আমাদেরও আপনজন হয়ে উঠেছেন। তাঁদের দুজনের স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব আলাদা, কিন্তু একটি জায়গায় তাঁদের অসাধারণ মিল—দুজনেই অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ।

আমার বড় মেয়ের শাশুড়ির মধ্যে আমি একজন আন্তরিক, মমতাময়ী এবং পরিবারকে আপন করে নেওয়া একজন মানুষকে দেখি। সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে তিনি পরিবারের মানুষদের নিজের মতো করে গ্রহণ করতে জানেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও তাই শুধু ‘সম্বন্ধী’ হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার একটি সুন্দর সম্পর্ক।

আর আমার ছোট মেয়ের শাশুড়ির কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল, প্রাণবন্ত এবং উদার মনের একজন মানুষ। সবচেয়ে ভালো লাগে তাঁর সঙ্গে আমার মেয়েদের সম্পর্কটা দেখে। তাঁদের মধ্যে যেন শাশুড়ি-বউয়ের প্রচলিত দূরত্ব নেই; বরং অনেকটা বন্ধুর মতো সহজ, স্বাভাবিক এবং প্রাণখোলা সম্পর্ক। আমার মেয়েরা তাঁর সঙ্গে নিজেদের কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, মজা করতে পারে—এই স্বাভাবিক সম্পর্কটি একজন বাবা হিসেবে আমাকে সত্যিই আনন্দ দেয়।

আমি মনে করি, একটি পরিবারের শান্তি ও সৌন্দর্য শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। দুই পরিবারের মানুষগুলো একে অপরকে কীভাবে গ্রহণ করছে, কতটা সম্মান করছে এবং কতটা ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নিচ্ছে—সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমার মেয়েরা তাদের নিজ নিজ সংসারে এমন মানুষদের পেয়েছে, যাদের সঙ্গে তারা শুধু দায়িত্বের সম্পর্ক নয়, মমতা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে—এটাও আমার জীবনের একটি বড় স্বস্তি এবং আনন্দ।

আমার কাছে আত্মীয়তার সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো, যেখানে সম্পর্কের পরিচয়টা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়, আর মানুষটাই বড় হয়ে ওঠে।

এই দুজন মানুষ আমাদের পরিবারের সেই সুন্দর প্রাপ্তিগুলোরই অংশ। তাঁদের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা রইল। তাঁরা ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং আমাদের মেয়েদের জীবনে তাঁদের এই আন্তরিক উপস্থিতি ও ভালোবাসা সবসময় অটুট থাকুক—এই কামনাই করি।

১২/০৮/২০২৬-এই একটা বাক্য আপনার পার্সোনালিটি বদলে

এই একটা বাক্য আপনার পার্সোনালিটি বদলে দিতে পারে। কখনও খেয়াল করে দেখেছেন, সরি বলা সহজ কিন্তু আমি ভুল হতে পারি এই কথাটা শুনতেও কতটা অদ্ভুত লাগে? কারন আমরা নিজেরাও এটা বলি না, কাউকে বলতেও শুনি না। আর সোস্যাল মিডিয়ার যুগে তো ইম্পসিবল। কিন্তু বাক্যটা আপনাকে একজন ভালো মানুষে পরিনত করতে পারে। যেমন, ধরেন আপনি কোনো একটা কথা বললেন, আর কেউ একজন পুরুপুরি ডিজএগ্রি করলো। তখন কি হয় জানেন? আপনার ব্রেনে একটা সুইচ অন হয়। ইগোর সুইচ। এটার নাম ইগো প্রোটেকটিভ কগনিশন। আপনার ব্রেন আপনার সেলফ ইমেজকে প্রোটেক্ট করছে। ঠিক যেমন আমাদের ইম্মিউন সিস্টেম আমাদেরকে রোগ বালাই থেকে প্রোটেক্ট করে। আপনার ব্রেন সেভাবে “আমি ভুল” এই ফিলিংসটা থেকে আপনাকে প্রোটেক্ট করে। কিন্তু কেনো? ব্রেনের কাছে ভুল হয়ে যাওয়া মানে আমি তাহলে বোকা? আমি কি তাহলে জানি না? এই ফিলিংটা।

এটা একটা থ্রেটের মতো মনে হবে। পার্সোনাল থ্রেট। তাই আপনার ব্রেন অটোমেটিক্যালী ডিফেন্ড মুডে চলে যায়। আর কন্টিনিউয়াসলি কাউন্তার আর্গুমেন্ট খোজে। যখন কেউ আমাদের ভুল ধরে বা ভুল প্রমান করার চেষ্টা করে আমরা উলটা আমাদের ভুক বিশ্বাসে দৃঢ়ভাবে আটকে থাকি। এটাকে বলে The Backfire Effect. মজার ব্যাপার কি জানেন? আপনি যতটুকু বুদ্ধিমান, আপনার ব্রেন তত বেশী যুক্তি অথবা কুযুক্তি দিয়ে নিজেকে সঠক প্রমান করার চেষ্টা করবে। সোর্স লেজিট হোক অথবা চালাই দেন। এটা যে কোনো সোর্স ব্যবহার করবেই। এটাকে বলে কনফার্মেশন বায়াস। অর্থাৎ আমরা শুধু সেই তথ্য গুলি খুজি যা আমাদের আগের বিশ্বাসকে সাপোর্ট করে। আর বোকাসোকা মানুষ ভালো কিছু বলতে না পেরে হীনম্ন্যতায় ভোগে। Ragebait এর শিকার হয়ে উলটাপালটা বকে। আপনি বোকা হন বা চালাক, এই রি-এক্ট এন্ড ডিফেন্ড করার অভ্যাসটা মোটেই সাস্থকর না। এটা আপনার পার্সোনাল পিস নষ্ট করে। সবাই সুগার কোটিং করে ক্রিটিসাইজ করে না, এটাই স্বাভাবিক। Sometimes people are just mean and sometimes they are constructive, so lets discuss ক্রিটিসিজম কিভাবে নেবেন এবং কিভাবে ক্রিটিসিজমের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন। ক্রিটিসিজমকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে-(১) নয়েজ জাস্ট পিউর ঘেন্না। এবিউজিব কমেন্টস ইত্যাদি। কিছু মানুষ এম্নিতেই আরেকজঙ্কে ঘেন্না করে, কওনো কারন নাই। এটা তাদের চরিত্র। এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছুই নাই। জাস্ট তাদেরকে এড়িয়ে চলেন।

আপনার তথ্যে গ্যাপ আছে, অথবা আপনার কথাগুলি ইনকমপ্লিট, এই কথাগুলি যারা বলেন, তাদের কথায় একটা যুক্তি আছে, শুনতে তেতো লাগলেও এতাই আসল গিফট। যা পরে আপনার রাগ লাগে সেটাই নয়েজ আর যেটা পরে আপনার মনে হয় আচ্ছা আমি মনে হয় নতুন কিছু শিখলাম, সেটাই একটা সিগন্যাল। আপনার বিরুদ্ধে গেলেও সেটাই সিগ্ন্যাল। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা না, বরং এটাই সবচেয়ে Highest form of confidence. কারন এর মানে হলো আপনি আপনার বাইরে গিয়েও একটা সত্যকে শ্রদ্ধা করছেন। আর এতে একটা জিনিষ খোলে যায় যেখানে আপনি আরো ইম্প্রুভ মেন্ট করতে পারেন। আমরা সব সময়ই সঠিক হতে পারি না, কখনো কখনো আমরা ভুল করি। সেটা স্বীকার করে নিন, খোলাখিলি করতে না পারলেও মনে মনেই করেন। শান্তি লাগবে, কিছু শিখতে পারবেন। আর এটাই আপনাকে একজন পরিশুদ্ধ মানুষে পরিনত করবে। ইমোশনালী কাউকে ডিস এগ্রি করার কারনে সাথে সাথেই ডিফেন্সিভ মুডে না গয়ে ১০ সেকেন্ড রুল ফলো করেন, মানে ১০ সেকেন্ড অপেক্ষা করা। আপনার উত্তর পরিবর্তন হয়েও যেতে পারে।

৪।৮।২০২৬-জনপদের নীরব রূপান্তর-একটি সমাজ-পর্যবেক্ষণ

 

(এই লেখাটা আমার গ্রাম এবং সেই গ্রামের মানুষগুলিকে নিয়ে)

এই লেখাটি কোনো ব্যক্তি, কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। এটি কোনো অভিযোগপত্রও নয়। এটি আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ। আমি আমার নিজের জনপদকে ভালোবাসি এবং সেই জনপদের ধীর, নীরব পরিবর্তনকে কাছ থেকে যা দেখছি তার কাহিনী।

সমাজ কখনো এক দিনে বদলে যায় না। একটি জনপদের চরিত্রও রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না। পরিবর্তন আসে খুব ধীরে—বছরের পর বছর ধরে। অনেক সময় সেই পরিবর্তন আমরা চোখের সামনে ঘটতে দেখেও বুঝতে পারি না। যখন বুঝি, তখন হয়তো অনেক কিছুই বদলে গেছে। আমার বিশ্বাস, কোনো জনপদের উত্থান বা পতনের পেছনে একক কোনো ব্যক্তি বা কোনো বহিরাগত শক্তি একমাত্র কারণ নয়। একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার মানুষের শিক্ষা, সংগঠন, পারস্পরিক আস্থা, নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলার সক্ষমতা। যেখানে এই শক্তিগুলো বিকশিত হয়, সেখানে মানুষ এগিয়ে যায়। আর যেখানে এগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে শূন্যস্থান তৈরি হয়। ইতিহাস বলে, সেই শূন্যস্থান কখনো দীর্ঘদিন খালি থাকে না; কেউ না কেউ এসে তা পূরণ করে। এই ধারাবাহিকে আমি কোনো চূড়ান্ত সত্য ঘোষণা করছি না। আমি কেবল আমার দেখা কিছু বাস্তবতা, কিছু প্রশ্ন এবং কিছু আত্মসমালোচনার কথা তুলে ধরছি। আমার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সবাই একমত হবেন—এমন দাবি আমি করি না। বরং আমি চাই, এই লেখাগুলো পড়ে পাঠক নিজের সমাজ, নিজের এলাকা এবং নিজের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবুন। যদি এই লেখাগুলো কাউকে দোষারোপ না করে বরং আত্মসমালোচনার দিকে নিয়ে যায়, যদি কোনো তরুণকে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়, যদি কোনো অভিভাবককে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও সচেতন করে, কিংবা যদি কোনো জনপদকে নিজেদের সংগঠিত হওয়ার গুরুত্ব নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—তাহলেই এই লেখার উদ্দেশ্য পূরণ হবে।

ঢাকা: শুধু রাজধানী নয়, সুযোগের মহাকর্ষ

 

কেউ নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে চায় না। মানুষ সাধারণত তার পরিচিত আকাশ, পরিচিত পথ, পরিচিত মানুষ এবং শৈশবের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চায়। তবু বাস্তবতা এমন যে, জীবনের প্রয়োজন অনেক সময় মানুষকে নিজের মাটি ছেড়ে অন্য কোথাও নতুন করে শিকড় গাড়তে বাধ্য করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই নতুন ঠিকানার নাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঢাকা। ঢাকা শুধু একটি রাজধানী নয়; এটি সুযোগ, প্রতিযোগিতা, স্বপ্ন এবং সংগ্রামের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকে মানুষ এখানে আসে উচ্চশিক্ষার জন্য, চাকরির জন্য, ব্যবসার জন্য কিংবা শুধু একটি ভালো জীবনের আশায়। ফলে এই শহরটি প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের স্বপ্ন বহন করে, আবার একই সঙ্গে তাদের কঠিন বাস্তবতারও মুখোমুখি দাঁড় করায়।

এই বাস্তবতার একটি দিক আমাকে দীর্ঘদিন ধরে ভাবায়। যে তরুণটি নিজের জেলা ছেড়ে ঢাকায় আসে, সে প্রথম দিন থেকেই একটি বড় মানসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আসে। সে জানে—তার সামনে ফিরে যাওয়ার পথ খুব সহজ নয়। পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অচেনা শহরে এসে টিকে থাকার জন্য তাকে অন্যদের তুলনায় আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। এই উপলব্ধিই তাকে অনেক সময় দৃঢ় করে তোলে।

শুরুর দিনগুলোতে তার খুব বেশি পছন্দের সুযোগ থাকে না। যে কাজটি পায়, সেটিই গ্রহণ করে। ছোট্ট একটি ঘরে কয়েকজন মিলে থাকে। ব্যয় কমায়। সঞ্চয় করে। ধীরে ধীরে একটি ভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা করে। তারপর একসময় পরিবারের অন্য সদস্যদেরও নিয়ে আসে। তাদের পড়াশোনা, কর্মসংস্থান কিংবা নতুন জীবনের ব্যবস্থা করতে শুরু করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি কোনো এক দিনের ঘটনা নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে চলা এক ধরনের সামাজিক অভিযোজন। আমার পর্যবেক্ষণে, যারা নতুন পরিবেশে আসে, তাদের একটি বড় শক্তি হলো—তারা নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। একই এলাকার মানুষ একে অপরকে চাকরির খবর দেয়, বাসা খুঁজে দেয়, ব্যবসায় অংশীদার হয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায়। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ধীরে ধীরে একটি সামাজিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে।

যদি নতুন একটি শহরে এসে মানুষ সংগঠিত হতে পারে, তাহলে বহু প্রজন্ম ধরে একই এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা কেন অনেক সময় একই রকম সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়? আমার কাছে এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, কোনো এলাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে শুধু সেখানে কে এসে বসবাস করছে, তা নয়; বরং নির্ধারণ করে সেই এলাকার মানুষ নিজেরা কতটা শিক্ষিত, দক্ষ, সংগঠিত এবং দূরদর্শী। যে সমাজ নিজের সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করে এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলে, সেই সমাজ দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বও ধরে রাখতে পারে। অন্যদিকে, যে সমাজ বিভক্ত থাকে, ক্ষুদ্র স্বার্থে ব্যস্ত থাকে এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে না, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব হারাতে শুরু করে।

আমি এই লেখায় কাউকে দোষী বা নির্দোষ প্রমাণ করতে চাই না। বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করতে চাই—যেখানে পরিবর্তন ঘটে খুব ধীরে, কিন্তু তার প্রভাব পড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ওপর। হয়তো আমার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সবাই একমত হবেন না। সেটাই স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় নিয়ে আমরা নিশ্চয়ই একমত হতে পারি—কোনো সমাজের উন্নতির জন্য কেবল অন্যকে দোষারোপ করলেই চলবে না; নিজেদেরও আয়নায় দেখতে হবে। কারণ ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা থেকে, আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে নয়।

পর্ব–২ : আগন্তুকের মনস্তত্ত্ব — কেন সে পিছিয়ে পড়তে চায় না

"যে মানুষ নিজের পরিচিত আকাশ ছেড়ে অচেনা শহরের পথে হাঁটে, সে শুধু স্থান বদলায় না; বদলে যায় তার মানসিকতাও।"

পূর্ববর্তী পর্বে বলেছিলাম, ঢাকা কেবল একটি রাজধানী নয়; এটি সুযোগ, প্রতিযোগিতা এবং সংগ্রামের কেন্দ্র। আজ আমরা আরেকটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবব—কেন অনেক মানুষ নতুন একটি জায়গায় গিয়ে অসাধারণ দৃঢ়তা নিয়ে লড়াই করতে পারে? আমার পর্যবেক্ষণে, এর উত্তর শুধু অর্থনীতিতে নয়; মানুষের মনস্তত্ত্বেও লুকিয়ে আছে।

যে তরুণটি নিজের গ্রাম, শহর বা জেলা ছেড়ে নতুন একটি জায়গায় আসে, সে সাধারণত একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে জানে—ফিরে যাওয়া তার কাছে সাফল্যের প্রতীক নয়। তাই সে শুরু থেকেই নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোতে চেষ্টা করে। সে হয়তো প্রথমে খুব ছোট একটি চাকরি করে। হয়তো পাঁচজনের সঙ্গে একটি ঘর ভাগ করে থাকে। হয়তো প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাজে যায়। কিন্তু এই কষ্টগুলোকে সে সাময়িক বলে মেনে নেয়। কারণ তার চোখে থাকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। এই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাই তাকে আলাদা করে।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন নতুন আগন্তুক নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। যখন তিনি কিছুটা স্থিতিশীল হন, তখন পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সুযোগের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। সন্তানদের পড়াশোনা, ভাই-বোনের কর্মসংস্থান কিংবা আত্মীয়স্বজনকে সহায়তা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে একটি সামাজিক বৃত্ত তৈরি হয়।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের সাফল্য কখনোই শুধু ব্যক্তিগত পরিশ্রমের ফল নয়। তার চারপাশে যদি সহযোগিতার পরিবেশ থাকে, তাহলে সেই সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

আমরা প্রায়ই দেখি, একই এলাকা থেকে আসা মানুষ একে অপরকে বাসা খুঁজে দেয়, চাকরির খবর দেয়, ব্যবসার অংশীদার হয় কিংবা প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তাও করে। এই সম্পর্কগুলো সব সময় আনুষ্ঠানিক নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলোই একটি শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

এখানেই আমি একটি প্রশ্ন তুলতে চাই।

আমরা কি নিজের এলাকায় একই ধরনের সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছি? আমরা কি মেধাবী একজন তরুণকে এগিয়ে দিতে একসঙ্গে দাঁড়াই? আমরা কি কোনো নতুন উদ্যোক্তাকে উৎসাহ দিই? আমরা কি নিজেদের সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার কথা বলি, নাকি নেতৃত্ব, সততা, দক্ষতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মূল্যও শেখাই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। আমার মনে হয়, যে সমাজে পারস্পরিক আস্থা থাকে, সেখানে প্রতিযোগিতা মানুষকে বিভক্ত করে না; বরং আরও দক্ষ করে তোলে। আর যেখানে আস্থার সংকট তৈরি হয়, সেখানে একই এলাকার মানুষও একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করে। তখন সমস্যা বাইরের মানুষ নয়; সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ভেতরের ভাঙন। তাই আমি মনে করি, আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হওয়া উচিত—কে কোথা থেকে এসেছে, তা নয়; বরং আমরা নিজেরা কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলছি। যদি আমাদের সন্তানরা দক্ষ হয়, যদি আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়, যদি আমরা যোগ্য মানুষকে সামনে আনতে পারি, তাহলে প্রতিযোগিতা ভয়ের বিষয় নয়। বরং সেটাই উন্নতির পথ। একটি জনপদকে টিকিয়ে রাখে তার ভৌগোলিক সীমানা নয়; টিকিয়ে রাখে তার মানুষের মানসিকতা। আর সেই মানসিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সহযোগিতা, দূরদর্শিতা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পনা।

পর্ব–৩ : অদৃশ্য শক্তি — যে সমাজ একসঙ্গে হাঁটতে শেখে

 

"একজন মানুষের শক্তির সীমা আছে; কিন্তু একটি সংগঠিত সমাজের শক্তির সীমা নির্ধারণ করা কঠিন।"

একটি জনপদের ভবিষ্যৎ শুধু তার উর্বর জমি, বড় বড় ভবন কিংবা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। আরও একটি অদৃশ্য শক্তি আছে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু সমাজের গতিপথ নির্ধারণ করে। সেই শক্তির নাম—পারস্পরিক আস্থা ও সংগঠন। আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প শুনি। একজন ডাক্তার, একজন প্রকৌশলী, একজন ব্যবসায়ী কিংবা একজন সরকারি কর্মকর্তা—এসব পরিচয় আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি—একজন মানুষ সফল হওয়ার পেছনে সমাজের ভূমিকা কতটুকু?

আমার পর্যবেক্ষণে, দীর্ঘমেয়াদে যে সমাজ এগিয়ে যায়, তারা শুধু যোগ্য মানুষ তৈরি করে না; তারা এমন একটি পরিবেশও তৈরি করে, যেখানে একজন আরেকজনকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। একটি চাকরির খবর, একটি ব্যবসার পরামর্শ, একটি বাসার সন্ধান, একটি সুপারিশ, কিংবা বিপদের সময় নিঃস্বার্থ সহযোগিতা—এসব বিষয় আলাদা আলাদা ঘটনা মনে হলেও, এগুলো মিলেই একটি শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে।

এই ভিত্তিকে আমি বলি অদৃশ্য পুঁজি। এই পুঁজির কোনো ব্যাংক হিসাব নেই, কোনো দলিল নেই, কোনো বাজারমূল্যও নেই। কিন্তু অনেক সময় এই অদৃশ্য পুঁজির মূল্য কোটি টাকার সম্পদের চেয়েও বেশি। কারণ, একজন মানুষ যখন জানে—"আমি একা নই", তখন তার সাহস বেড়ে যায়। আর যখন একটি পরিবার জানে—"প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ আছে", তখন তারা বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ঠিক এখানেই একটি জনপদের ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আমরা অনেক সময় ব্যক্তিগত উন্নতিকে গুরুত্ব দিই, কিন্তু সমষ্টিগত উন্নতির কথা খুব কম ভাবি। একজন সফল হলে তাকে অভিনন্দন জানাই, কিন্তু সেই সাফল্য থেকে সমাজ কীভাবে উপকৃত হবে—সেই প্রশ্ন করি না। ফলে একজন একজন করে মানুষ এগিয়ে যায়, কিন্তু জনপদটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

অন্যদিকে, যে সমাজে সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, সেখানে একজনের সাফল্য আরেকজনের পথ খুলে দেয়। একজন শিক্ষক পরের প্রজন্মকে তৈরি করেন। একজন কর্মকর্তা নতুনদের পথ দেখান। একজন উদ্যোক্তা আরও কয়েকজনকে কর্মসংস্থান দেন। এভাবেই ব্যক্তিগত অর্জন ধীরে ধীরে সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়। এখানে আমি একটি আত্মসমালোচনার প্রশ্ন রাখতে চাই। আমরা কি আমাদের এলাকায় এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে একজন মেধাবী তরুণ জানবে—তার স্বপ্নের পথে সে একা নয়? নাকি আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে মানুষ এগিয়ে যাওয়ার আগে চারদিকে তাকিয়ে দেখে—কেউ তাকে টেনে নামাবে কি না? এই প্রশ্নের উত্তরই অনেক সময় একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। আমার মনে হয়, একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি তার ধনী মানুষের সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং তার মানুষের পারস্পরিক আস্থা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।

যে সমাজে আস্থা থাকে, সেখানে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যেখানে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, সেখানে নেতৃত্ব তৈরি হয়। আর যেখানে নেতৃত্ব তৈরি হয়, সেখানে ভবিষ্যৎও তৈরি হয়। কিন্তু যেখানে আস্থা ভেঙে যায়, সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। তখন সমাজ আর সমাজ থাকে না; বিচ্ছিন্ন মানুষের সমষ্টিতে পরিণত হয়। সম্ভবত একটি জনপদের নীরব রূপান্তর সেখান থেকেই শুরু হয়।

পর্ব–৪ : যখন একটি জনপদ নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে

"কোনো জনপদ তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ধীরে ধীরে অন্যের হাতে চলে যায়।"

একটি সমাজের শক্তি শুধু তার জনসংখ্যা, সম্পদ বা ইতিহাসে নয়। প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়। কোন বিদ্যালয়ের প্রধান কে হবেন, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হবে, কারা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে উঠে আসবেন, কারা সামাজিক নেতৃত্ব দেবেন, কোন তরুণকে সামনে আনা হবে, কার কথা মানুষ গুরুত্ব দিয়ে শুনবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। অনেকেই মনে করেন, এই পরিবর্তন হঠাৎ ঘটে।

আসলে তা নয়। এটি ঘটে খুব ধীরে। এতটাই ধীরে যে, পরিবর্তনের ভেতর বসবাসকারী মানুষও অনেক সময় তা বুঝতে পারেন না। প্রথমে একটি-দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মানুষ আসেন। পরে কিছু প্রতিষ্ঠানে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়। এরপর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। তারপর সামাজিক প্রভাবের কেন্দ্রও ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই স্বাভাবিক—যদি তা যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ঘটে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন তখনও থেকে যায়—

স্থানীয় সমাজ কি একই গতিতে নিজেদের যোগ্য মানুষ তৈরি করতে পেরেছে?

যদি উত্তর "না" হয়, তাহলে সমস্যার মূল সেখানেই। আমরা প্রায়ই ফলাফল দেখি, কিন্তু কারণ দেখি না।

আমরা দেখি—অমুক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে স্থানীয় কেউ নেই। আমরা দেখি—অমুক ব্যবসায় নতুন মানুষ এগিয়ে গেছেন। আমরা দেখি—কোনো একটি পেশায় আমাদের এলাকার প্রতিনিধিত্ব কমে গেছে।

কিন্তু খুব কমই আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি—গত বিশ বছরে আমরা কতজন শিক্ষক তৈরি করেছি? কতজন প্রশাসক? কতজন গবেষক? কতজন উদ্যোক্তা? কতজন এমন মানুষ তৈরি করেছি, যাদের ওপর সমাজ নির্ভর করতে পারে?

একটি জনপদের শক্তি তার স্লোগানে নয়; তার মানুষে। যদি একজন মেধাবী তরুণ নিজের এলাকায় কোনো দিকনির্দেশনা না পায়, যদি একজন সৎ মানুষ নেতৃত্বে আসার আগেই নিরুৎসাহিত হন, যদি যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বেশি মূল্য পায়, তাহলে ধীরে ধীরে একটি শূন্যতা তৈরি হয়।

আর ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—শূন্যস্থান কখনো দীর্ঘদিন খালি থাকে না। যেখানে নেতৃত্ব তৈরি হয় না, সেখানে নতুন নেতৃত্ব জন্ম নেয়। যেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, সেখানে অন্য কেউ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। যেখানে পরিকল্পনা অনুপস্থিত, সেখানে পরিকল্পনাকারীরাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

এটি কোনো ষড়যন্ত্রের গল্প নয়। এটি সমাজের স্বাভাবিক গতিবিদ্যা। তাই আজ আমি আরেকটি প্রশ্ন রাখতে চাই। আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলছি, যাতে তারা আগামী দিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হতে পারে? নাকি আমরা তাদের শুধু একটি চাকরির জন্য প্রস্তুত করছি? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। একজন চাকরিজীবী নিজের পরিবারকে বদলাতে পারেন। কিন্তু একজন সৎ শিক্ষক, একজন দক্ষ উদ্যোক্তা, একজন দূরদর্শী প্রশাসক কিংবা একজন নীতিবান জনপ্রতিনিধি—একটি জনপদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন। আমাদের সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা ভবিষ্যতের নেতা তৈরির চেয়ে বর্তমানের সুবিধা বেছে নিই। সেদিনই হয়তো একটি জনপদের নীরব রূপান্তর শুরু হয়ে যায়। কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কখনো একদিনে হারিয়ে যায় না। সেটি হারায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, ছোট ছোট অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং অপূর্ণ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে।

পর্ব–৫ : যখন একটি জনপদের মেধাবী সন্তানেরা আর ফিরে আসতে চায় না

"কোনো জনপদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখনই হয় না, যখন তার মানুষ চলে যায়; বরং তখন হয়, যখন তারা ফিরে আসার স্বপ্নটুকুও হারিয়ে ফেলে।"

একটি জনপদের ভবিষ্যৎ বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় কী? আমার কাছে উত্তরটি খুব সরল। সেই জনপদের মেধাবী তরুণদের দিকে তাকান। তারা কী স্বপ্ন দেখে? তারা কি মনে করে, নিজেদের এলাকাতেই একদিন ভালো শিক্ষক, উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, গবেষক, প্রশাসক কিংবা সমাজনেতা হিসেবে কাজ করতে পারবে? নাকি তারা ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস করতে শিখেছে—"এখানে কিছু হবে না; ভবিষ্যৎ অন্য কোথাও"? এই প্রশ্নের উত্তরই একটি জনপদের ভবিষ্যৎ বলে দেয়। অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনার জন্য অসীম ত্যাগ স্বীকার করে। তারা চায় সন্তান প্রতিষ্ঠিত হোক, সম্মান অর্জন করুক, পরিবারের ভাগ্য বদলাক। এই স্বপ্নে কোনো ভুল নেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সেই শিক্ষা আর সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে না; বরং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ধীরে ধীরে এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়—যে যত মেধাবী, সে তত দূরে চলে যাবে। ফলে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য জন্ম নেয়।

যারা সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনতে পারত, তারাই আর পরিবর্তনের অংশ থাকে না। আর যারা থেকে যায়, তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় সুযোগ, দিকনির্দেশনা কিংবা সহযোগিতা না পেয়ে সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে না। একটি সমাজের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে?

আমরা প্রায়ই বলি—"আমাদের এলাকায় সুযোগ নেই।" কিন্তু সুযোগ কি শুধু অপেক্ষা করে পাওয়া যায়?

নাকি সুযোগ তৈরি করতেও হয়? ইতিহাসে যত বড় জনপদ এগিয়েছে, তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষা করেনি; তারা নিজেরাই সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একজন শিক্ষক আরেকজন শিক্ষক তৈরি করেছেন। একজন উদ্যোক্তা নতুন উদ্যোক্তাকে সাহস দিয়েছেন। একজন কর্মকর্তা পরের প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছেন। একজন প্রবীণ একজন তরুণের কাঁধে হাত রেখে বলেছেন—"তুমি এগিয়ে যাও, আমরা আছি।" এই একটি বাক্য কখনো কখনো একটি জীবন বদলে দেয়। আমার মনে হয়, আমাদের সমাজে এই বাক্যটি ক্রমেই বিরল হয়ে যাচ্ছে। আমরা সন্তানকে সফল হতে বলি, কিন্তু তাকে সমাজের জন্য দায়িত্বশীল মানুষ হওয়ার কথাও কি সমান গুরুত্ব দিয়ে বলি? আমরা কি তাকে শেখাই—নিজে সফল হওয়ার পাশাপাশি আরেকজনকে সফল করার মধ্যেও সাফল্য আছে? একটি জনপদের পুনর্জাগরণ শুরু হয় তখনই, যখন তার সফল মানুষরা নিজেদের শিকড় ভুলে যায় না।

তারা হয়তো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি পৃথিবীর নানা দেশে কাজ করেন; কিন্তু সুযোগ পেলেই নিজের এলাকার বিদ্যালয়ে যান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, বৃত্তি দেন, একটি পাঠাগার গড়ে তোলেন, একজন মেধাবী ছাত্রের পাশে দাঁড়ান কিংবা নতুন উদ্যোক্তাকে উৎসাহ দেন। কারণ একটি জনপদকে শুধু সরকার বদলাতে পারে না। শুধু রাজনীতিও বদলাতে পারে না। একটি জনপদকে বদলায় তার মানুষ। বিশেষ করে তারা, যারা একদিন সেই জনপদের মাটিতে দাঁড়িয়ে বড় স্বপ্ন দেখেছিল। আমার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখানেই। যদি আমাদের মেধাবী তরুণেরা একে একে চলে যায়, আর যারা প্রতিষ্ঠিত হয় তারা আর ফিরে তাকাতে না চায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কাদের দেখে স্বপ্ন দেখবে? প্রতিটি শিশুর সামনে একজন জীবন্ত উদাহরণ দরকার। যদি সে নিজের এলাকায় এমন কাউকে না দেখে, তাহলে তার স্বপ্নও একদিন এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাবে। আর সেদিন একটি জনপদের নীরব রূপান্তর আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

পর্ব–৬ : পুনর্জাগরণের পথ — একটি জনপদ কি আবার উঠে দাঁড়াতে পারে?

"ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোনো সমাজের পতন চিরস্থায়ী নয়, যদি সেই সমাজ নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে প্রস্তুত থাকে।"

এই ধারাবাহিকের শুরু থেকে আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। কেন কিছু জনপদ সময়ের সঙ্গে নিজেদের প্রভাব হারিয়ে ফেলে? কেন কিছু সমাজ সংগঠিত হয়, আর কিছু সমাজ ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে? কেন কোথাও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, আর কোথাও মানুষ শুধু অতীতের গৌরবের গল্প বলেই সন্তুষ্ট থাকে? এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর নেই। তবে একটি বিষয় ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে—কোনো জনপদকে বাইরে থেকে এসে কেউ দুর্বল করে দিতে পারে না, যদি তার ভেতরের ভিত্তি শক্ত থাকে।

আবার কোনো জনপদকে বাইরের কেউ বাঁচিয়েও তুলতে পারে না, যদি সে নিজেই নিজের দায়িত্ব নিতে না শেখে।

তাহলে পথ কী?

আমার মনে হয়, পুনর্জাগরণ শুরু হয় পাঁচটি ছোট সিদ্ধান্ত থেকে। প্রথমত, শিক্ষাকে শুধু সনদ নয়, সক্ষমতা হিসেবে দেখা। আমরা এমন সন্তান চাই, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো করবে না; সমস্যা সমাধান করবে, নেতৃত্ব দেবে, সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে এবং সততার সঙ্গে সমাজের দায়িত্ব পালন করবে। দ্বিতীয়ত, যোগ্য মানুষকে এগিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। আমরা প্রায়ই পরিচিত মানুষকে সমর্থন করি, কিন্তু সব সময় যোগ্য মানুষকে করি না। যে সমাজ যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ককে বড় করে দেখে, সে সমাজ দীর্ঘমেয়াদে নিজেরই ক্ষতি করে। তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি থেকে বড় ভাবা। কোনো ব্যক্তি চিরকাল থাকবেন না। কিন্তু একটি ভালো বিদ্যালয়, একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার, একটি স্বচ্ছ সামাজিক সংগঠন কিংবা একটি দক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ তৈরি করে। তাই ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। চতুর্থত, সফল মানুষদের সঙ্গে জনপদের সম্পর্ক অটুট রাখা। যারা বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তারা যেন নিজেদের শিকড় ভুলে না যান।

একটি বিদ্যালয়ে বছরে একদিন ফিরে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা, একজন মেধাবী ছাত্রকে সহযোগিতা করা, একটি লাইব্রেরিতে বই দেওয়া কিংবা একজন তরুণ উদ্যোক্তাকে সাহস দেওয়া—এসব ছোট কাজই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। পঞ্চমত, আত্মসমালোচনাকে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা। যে সমাজ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, সেই সমাজই পরিবর্তনের সাহস রাখে। যে সমাজ শুধু অন্যকে দোষ দেয়, সে সমাজ নিজের পরিবর্তনের সুযোগ হারিয়ে ফেলে। আমরা যদি সত্যিই আমাদের জনপদকে ভালোবাসি, তাহলে প্রথম কাজ হবে নিজেদের দিকে তাকানো।

আমরা কী করছি? আমাদের সন্তানদের কী শেখাচ্ছি? আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন? আমরা কি যোগ্য মানুষ তৈরি করছি? আমরা কি একে অপরের সাফল্যে আনন্দিত হই, নাকি ঈর্ষান্বিত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ লিখবে।

আমি বিশ্বাস করি, কোনো জনপদের পুনর্জাগরণ শুরু হয় কোনো বড় প্রকল্প দিয়ে নয়। শুরু হয় একটি পরিবার থেকে। একজন শিক্ষক থেকে। একজন সৎ জনপ্রতিনিধি থেকে। একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা থেকে। একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক থেকে। আর শুরু হয় একজন তরুণের সেই সিদ্ধান্ত থেকে, যে বলে—"আমি শুধু নিজের জন্য নয়, আমার জনপদের জন্যও কাজ করব।"

এই ধারাবাহিকে আমি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিইনি। আমি শুধু কিছু প্রশ্ন তুলেছি। কারণ উত্তর একা একজন লেখকের কাছে নেই। উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে। হয়তো এই লেখাগুলো পড়ে কেউ দ্বিমত করবেন। কেউ সমালোচনা করবেন। কেউ হয়তো বলবেন, বাস্তবতা আরও জটিল। আমি তাদের সঙ্গেও একমত। কারণ সমাজকে এক রঙে আঁকা যায় না। তবু যদি এই লেখা একজন মানুষকেও নিজের জনপদ নিয়ে নতুন করে ভাবায়, একজন অভিভাবককে সন্তানের শিক্ষা নিয়ে আরও সচেতন করে, একজন তরুণকে নিজের এলাকায় ফিরে কিছু করার স্বপ্ন দেখায় কিংবা একটি সমাজকে নিজেদের শক্তি নতুন করে খুঁজে নিতে অনুপ্রাণিত করে— তাহলেই এই লেখার উদ্দেশ্য পূরণ হবে।

শেষ করার আগে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার ভাগ্য নয়; তার মানুষের সিদ্ধান্ত। আর সিদ্ধান্ত বদলাতে পারলে, ভবিষ্যৎও বদলানো যায়।

২০/০৭/২০২৬-একটি চিরন্তন প্রবাদ আছে

একটি চিরন্তন প্রবাদ আছে যে, কখনও কখনও কোনো কিছু পরিষ্কারভাবে দেখার জন্য নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে হয়। এটি আমাদের শেখায় যে, কোনো চিত্রকর্মের খুব কাছে দাঁড়ালে তা প্রায়শই শিল্পকর্মটি দেখতে আমাদের অন্ধ করে দেয়। পিছিয়ে আসুন। এ রকম সব বিষয়েই এই সুত্র অনুসরন করুন। অন্তত ক্ষতির কারন থাকবে না। কখনো কখনো দেখবেন, অতি মাত্রায় কাছে থাকার কারনে আপনার আবেগ আপনার যুক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আপনি এক্সাইটমেন্টে থাকেন,, কোলাহল করেন। উত্তরটি কোলাহলের মধ্যে নেই। এটি নীরবতার মধ্যে রয়েছে। এই নীরবতার জন্য একটু দূরত্ব বজায় রাখুন, দূরত্ব কোনো সমাপ্তি নয়, বরং সত্যকে খুঁজে পাওয়ার একটি পথ। নীরবতা মানুষকে অনেক কিছু শিখায়। সবকিছুরই জবাব দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, কিছু সত্য প্রকাশ পায় যখন কেউ কথা বলে না, কেউ নীরব থাকে।

২০/০৭/২০২৬-বৃষ্টি শেষ হলে, ছাতা সবার জন্য বোঝা

বৃষ্টি শেষ হলে, ছাতা সবার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। যেদিন একজন অন্ধ মানুষ দেখতে পায়, সে সবার আগে সেই লাঠিটি ফেলে দেয় যা তাকে সারাজীবন সাহায্য করেছে। যখন সূর্য ফিরে আসে, তারা সবার আগে সেই মোমবাতিটি নিভিয়ে দেয় যা তাদের অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখিয়েছে। এভাবেই বিশ্বস্ততা শেষ হয় যখন সুবিধা শেষ হয়ে যায়।

২০/০৭/২০২৬-যদি আপনি ভালোভাবে পোশাক পরেন

যদি আপনি ভালোভাবে পোশাক পরেন, লোকে ভাববে আপনি লোক দেখানো করছেন; যদি আপনি সাধারণ পোশাক পরেন, লোকে ভাববে আপনি দরিদ্র। যদি আপনি মোটা হন, লোকে ভাববে আপনি বেশি খান; যদি আপনি রোগা হন, লোকে ভাববে আপনি অসুস্থ। যদি আপনি ধনী হন, লোকে ভাববে আপনি অহংকারী; যদি আপনি কষ্টে থাকেন, লোকে ভাববে আপনি অলস। আপনি যা-ই করুন না কেন, লোকে সবসময় কিছু না কিছু বলবেই। নিজের জন্য বাঁচুন। অন্যের দ্বারা আপনার শান্তি নষ্ট হতে দেবেন না।

২০/০৭/২০২৬-যদি কেউ আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে

যদি কেউ আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে, তবে সম্ভবত আপনি যথেষ্ট উন্নতি করছেন না। কারণ যে মুহূর্তে আপনি এগিয়ে যেতে শুরু করবেন, দৃশ্যমান হবেন এবং অর্থপূর্ণ কিছু করবেন, মানুষের মতামত থাকবে। তারা আপনার সমালোচনা করবে, আপনার পেছনে কথা বলবে, আপনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবে এবং কখনও কখনও, আপনাকে না জেনেই তারা আপনাকে অপছন্দ করবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মানুষ সাধারণত এমন কাউকে দেখার জন্য সময় ব্যয় করে না যাকে তারা অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। আপনার সমালোচকরা প্রায়শই আপনার সমর্থকদের চেয়ে আপনাকে ঘনিষ্ঠভাবে অধ্যয়ন করে। তারা লক্ষ্য করে আপনি কী পোস্ট করেন, কী অর্জন করেন, কোথায় যান এবং আপনি পরবর্তীতে কী করছেন। এক অদ্ভুত উপায়ে, তারা আপনার সবচেয়ে ধারাবাহিক দর্শক হয়ে ওঠে। তাই আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলে এমন প্রত্যেককে চুপ করানোর চেষ্টা করে আপনার শক্তি নষ্ট করবেন না। বাড়তে থাকুন, উন্নতি করতে থাকুন, গড়ে তুলতে থাকুন। কারণ সমালোচনা মানে সবসময় এই নয় যে আপনি কিছু ভুল করছেন। কখনও কখনও এর মানে কেবল এই যে আপনি এমন কিছু করছেন যা লক্ষণীয়। তাদের দেখতে দিন, তাদের কথা বলতে দিন এবং তাদের এমন কিছু দিন যা নিয়ে কথা বলার মতো।

২০/০৭/২০২৬-আপনার স্বামী বা স্ত্রীই আপনার

আপনার স্বামী বা স্ত্রীই আপনার জীবনের একমাত্র ব্যক্তি যিনি আপনাকে ভালোবেসে বেছে নিয়েছেন। আপনার বাবা-মা আপনাকে ভালোবাসেন কারণ আপনি তাদের সন্তান, আপনার ভাই-বোনেরা আপনাকে ভালোবাসেন কারণ তারা আপনার রক্তের সম্পর্কের, আপনার সন্তানেরা আপনাকে ভালোবাসেন কারণ আপনি তাদের এই পৃথিবীতে এনেছেন। কিন্তু আপনার স্বামী বা আপনার স্ত্রী আপনাকে ভালোবাসতে বাধ্য ছিলেন না। তিনি আপনার জন্য নির্ধারিত ছিলেন না, তিনি থাকতে বাধ্য ছিলেন না। তিনি যাদের বেছে নিতে পারতেন তাদের মধ্যে থেকে, তিনি আপনাকে বেছে নিয়েছেন। তিনি আপনার সাথে জীবন গড়ার জন্য আপনাকে বেছে নিয়েছেন, তার সময়, তার প্রচেষ্টা, তার স্বপ্ন, তার সংগ্রাম এবং তার ভবিষ্যৎ ভাগ করে নেওয়ার জন্য। তাই আপনার উচিত কখনোই সেই ভালোবাসাকে এমনভাবে গ্রহণ না করা যেন তা নিশ্চিত ছিলো। পরিচিতির একটি বিপজ্জনক অভ্যাস আছে। এটি মানুষকে তাদের যা আছে তার মূল্য ভুলে যেতে বাধ্য করে। যে মানুষটি আপনাকে বেছে নিয়েছে, তারও নির্বাচিত বোধ করার প্রয়োজন। একবার নয়, বহু বছর আগে নয়, বরং আজ এবং আগামীকাল এবং তারপর প্রতিদিন, কারণ ভালোবাসা স্মৃতিতে টিকে থাকে না। এটি প্রশংসা, শ্রদ্ধা এবং প্রচেষ্টার উপর টিকে থাকে এবং এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে, একটি সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল হলো এটা ধরে নেওয়া যে, যে আপনাকে গতকাল বেছে নিয়েছে সে আগামীকাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যবান বোধ করবে। যে আপনাকে বেছে নিয়েছে, তাকে বেছে নেওয়া কখনোই বন্ধ করবেন না। এভাবেই ভালোবাসা টিকে থাকে।

২০/০৭/২০২৬-একটি প্রদীপ সকলকে আলো দেয়

একটি প্রদীপ সকলকে আলো দেয়। কিন্তু এটি পোকামাকড়কেও আকর্ষণ করে। তাই  প্রদীপের মতো আপনার দয়া, বৃদ্ধি বা সাফল্য যখন ইতিবাচক মানুষকে কাছে টানে তেমনি নেতিবাচক মানুষকেও আপনার কাছাকাছি নিয়ে আসে, তখন অবাক হবেন না। আপনার আলো যত উজ্জ্বল হবে, আপনি তত বেশি দৃশ্যমান হবেন। আপনার দয়া কৃতজ্ঞ অন্যদের হৃদয়কে আকর্ষণ করবে। কিন্তু এর সাথে ঈর্ষানিত নেতিবাচক অথবা যারা আপনার উদারতাকে দুর্বলতা মনে করে তাদেরও আকর্ষণ করতে পারে। এটাই দৃশ্যমান হওয়ার মূল্য। অনেকে যে ভুলটা করে তা হলো নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে তাদের আমুল পরিবর্তন হতে যাওয়া। তারা দয়ালু হওয়া বন্ধ করে দেয়। তারা সাহায্য করা বন্ধ করে দেয়। তারা অল্প কিছু মানুষের জন্য তাদের আলো নিভিয়ে দেয় যারা এর যোগ্য ছিল না। কিন্তু আপনার আলো সমস্যা নয়। কিছু মানুষ আপনার দয়া অপব্যবহার করে, এর মানে এই নয় যে দয়া একটি ভুল। আলো ছড়াতে থাকুন। ভালো মানুষ থাকুন। শুধু যারা আপনার আলোতে উষ্ণতা পায় এবং যারা কেবল এটি গ্রাস করতে চায় তাদের মধ্যে পার্থক্য শিখুন। কারণ যারা আপনার আলোর চারপাশে জড়ো হয় তাদের সবাই আপনার শক্তির সীমাহীন প্রবেশাধিকারের যোগ্য নয়। আপনার শান্তি রক্ষা করুন। আপনার হৃদয় রক্ষা করুন এবং তবুও আলো ছড়াতে থাকুন।

১৯/০৭/২০২৬-যখন আমরা শিশু ছিলাম

যখন আমরা শিশু ছিলাম, আমরা ভাবতাম সবাই আমাদের বন্ধু। আমাদের হৃদয় অনেক বড় থাকে। আমরা সহজেই বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের চারপাশের মানুষ সবসময় থাকবে। কিন্তু জীবন যত এগোতে থাকে, কিছু পরিবর্তন হয়। আপনি কঠিন মুহূর্ত, হতাশা, ব্যর্থতা, ক্ষতির সম্মুখীন হতে শুরু করেন। আর সেই কঠিন সময় যা মানুষের আসল রূপ প্রকাশ করে এবং ধীরে ধীরে আমাদের বৃত্ত ছোট হতে থাকে। আপনি শীতল হয়ে গেছেন বলে নয়। বরং আপনার একটু জ্ঞান হয়েছে বলে। আপনি উপলব্ধি করেন যে সবাই আপনার সব দাওয়াতী অনুষ্ঠানে আসবে। আসলে ব্যাপারটা সে রকমের নয়। ব্যাপারটায় একটা রেসিপি আছে, যখন আপনার সবকিছু উত্তেজনাপূর্ণ জীবন থাকে তখন আসলেই সবাই আসবে। যখন জীবন ভালো চলছে তখন সবাই টেবিলে একটি আসন চায়। কিন্তু যখন আপনি কষ্টে থাকেন তখন খুব কম লোকই  আপনার সেই দাওয়াতী অনুষ্ঠনে আসবে। যখন আপনি আপনার জীবনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকেন তখন খুব কম লোকই আপনার পাশে বসবে। তারাই আপনার আসল বন্ধু যারা কিছুই পাওয়ার নেই তখনও থাকে। যারা অন্য কেউ খোঁজ না নিলেও আপনার খোঁজ নেয়। যারা জীবন যখন ভারী হয়ে যায় তখন আপনার কিছু বোঝা বহন করে।

একটি বড় বৃত্তের পেছনে ছুটবেন না। সেই অল্প কয়েকজন মানুষকে রক্ষা করুন যারা প্রমাণ করেছে যে তারা সত্যিই যত্নশীল। কারণ শেষ পর্যন্ত, এক মুঠো আসল বন্ধু এক ভিড় মেকি বন্ধুর চেয়ে বেশি মূল্যবান।

ছোট একটা ঘটনা আমার এই বিশ্বাস আরো চুড়ান্ত করেছে। ছোট একটা ছেলে তার বাবাকে বল্লো-বাবা, আজ আমার জন্মদিন। দয়া করে আমার সব বন্ধুদের ফোন করে তাদের জানিয়ে দাও এবং আমার জন্মদিন উদযাপন করো বাবা, ছোট ছেলেটি তার বাবার কাছে আবদার করলো। বাবা হেসে বললেন, অবশ্যই বাবা, আমি করব।

ছেলেটি স্কুলে গেল এবং সারাদিন ধরে পার্টির আমেজ নিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখলো ঘর প্রায় খালি এবং নীরব। শুধু তিনজন বাচ্চা বসার ঘরে বসে আছে। মাত্র তিনজন। তার সব বন্ধুদের মধ্যে মাত্র তিন জন হাজির হয়েছিলো। ছেলেটির ছোট্ট মুখটা মলিন হয়ে গেল এবং সে তার বাবার দিকে তাকালো। ছেলেটি বাবাকে জিজ্ঞেস করল, বাবা, তুমি কি সত্যিই আমার সব বন্ধুদের ফোন করেছিলে? বাবা বললেন, হ্যাঁ, আমি তোমার প্রত্যেক বন্ধুর কাছে ফোন করেছিলাম। ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, বাবা, তাহলে মাত্র তিনজন কেন এলো? বাবা ছেলেকে টেনে জড়িয়ে ধরলেন এবং এমন কিছু বললেন যা আমাকে স্তব্ধ করে দিল।

বাবা তার ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে তার মুখটি দুই হাত ধরে চেপে খুব আদরের সাথে বললেন, বাবা, আমি তোমার সব বন্ধুদেরকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু আমি তাদের বলিনি যে আজ তোমার জন্মদিন, আমি শুধু তাদের বলেছিলাম যে তুমি অসুস্থ এবং তোমার তাদের প্রয়োজন। আর এই তিনজন, তারা সবকিছু ছেড়ে ছুটে এসেছে। বাবা ফিসফিস করে বললেন, কেক আর পার্টির জন্য যে কেউ তোমার জন্য আসবে। কিন্তু আসল বন্ধুরা তখনই আসবে যখন তাদের জন্য কিছুই নেই, শুধু তুমি আছ, যখন তুমি অসুস্থ, যখন তুমি ভেঙে পড়েছ, তুমি একা এবং তোমার তাদের প্রয়োজন। তারাই তোমার যত্ন নেয় এবং তারাই তোমার আসল বন্ধু।

১৮/০৭/২০২৬-কোন কিছুই আকস্মিক নয়

কোন কিছুই আকস্মিক নয়। আপনার জীবনে আসা প্রতিটি আত্মাই আপনার ভাগ্যে লেখা আছে। কিছু মানুষকে পাঠানো হয় আপনাকে শেখাতে, কিছু মানুষকে পাঠানো হয় আপনাকে সুস্থ করতে, এবং কিছু মানুষকে পাঠানো হয় আপনাকে ভালোবাসতে। যখন আপনি সত্যিই এটি নিয়ে ভাববেন, তখন এটি ভিন্নভাবে অনুভূত হবে। প্রতিটি ব্যক্তি একটি ভূমিকা পালন করেছে। কেউ আপনার জীবনে এসেছিল এবং আপনাকে সত্যিই ভালোবেসেছিল, এবং কেউ আপনাকে ঠিক দেখিয়ে দিয়েছিল যে আপনি আর কখনো সহ্য করবেন না। কিছু মানুষ থাকেনি কিন্তু তারা আপনাকে পরিবর্তন করেছে। তারা আপনাকে বেড়ে উঠতে বাধ্য করেছে, জীবনকে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে, আরও শক্তিশালী হতে। আর এটাই সেই অংশ যা মানুষ খুব কমই বলে। প্রতিটি সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য নয়। কিন্তু প্রতিটি সম্পর্ক আপনাকে পরিবর্তন করার জন্য।

১৮।০৭।২০২৬-যদি আপনার ইচ্ছানুযায়ী কিছু না ঘটে

যদি আপনার ইচ্ছানুযায়ী কিছু না ঘটে, তবে বিশ্বাস রাখুন যে এটি আপনার কল্পনার চেয়েও ভালো উপায়ে ঘটবে। এবং সত্যি বলতে, এটাই ঈশ্বরের পরিকল্পনার সৌন্দর্য। কখনও কখনও আমরা বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজার জন্য কাঁদি কারণ আমরা কেবল যা হারিয়েছি তা দেখতে পাই, কিন্তু ঈশ্বর দেখতে পান যে সেই দরজা খোলা থাকলে আপনার কী ক্ষতি হতে পারত। হৃদয়ভঙ্গ, বিলম্ব, বিভ্রান্তি, দিক পরিবর্তন—এসব কিছুরই অর্থ পরে বোঝা যায়। কারণ কিছু প্রার্থনা উত্তর পায় দরজা বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে, আগমনের মাধ্যমে নয়। এবং আপনার জীবনে যা কিছু সেরা ঘটনা ঘটবে, তার কিছু শুরু হয় যখন জীবন আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

১৮।০৭।২০২৬-সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিশোধ হলো নিয়ন্ত্রণ

সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিশোধ হলো নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং যা কাউকে টেনে নামাতে চায় তার ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানো। এখানে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই শত্রুদের পরাজিত করা সহজ। আর সে অস্ত্রটা হলো-চুপ বা সাইলেন্ট থাকা। একজন ভালো মানুষ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে তর্ক করে সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নাই। নিজেই একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠুন, আপনার কথা নয়, আপনার জীবনই কথা বলুক। কখনো নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার দরকার নাই। শক্তিশালী মানুষেরা ব্যাখ্যা দেয় না। তারা কাজ করে এবং বাস্তবতাকে উত্তর দিতে দেয়। যাদের উপর আপনি প্রতিশোধ নিতে চান, তাদের থেকে সরে যান। আপনার অনুপস্থিতির চেয়ে বেশি আর কিছুই মানুষকে বিভ্রান্ত করে না। দূরত্বই শক্তি। কিন্তু তাদের সাথে সদয়ভাবে সাড়া দিন, কারণ তারা এর যোগ্য বলে নয়, বরং আপনি তাদের মতো হতে অস্বীকার করেন বলে। বড় অস্ত্র হলো-তাদেরকে ছাড়িয়ে যান। এত উঁচুতে উঠুন যে তারা আর আপনার নাগাল পাবে না। উন্নতিই হলো চূড়ান্ত বিচ্ছেদ। তাদের আক্রমণের মুখে শান্ত থাকুন। একটি শান্ত মন অস্পৃশ্য, আর তারা আপনাকে পুড়িয়ে মারলেও আপনি স্থির থাকুন সময়ই তাদের মুখোশ উন্মোচন করবে। সত্য তাড়াহুড়ো করে না, কিন্তু তা ঠিকই এসে পৌঁছায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, আপনি অন্যকে ধ্বংস করে জিততে পারবেন না। নিজেকে আয়ত্তে আনার মাধ্যমেই আপনি জয়ী হন, কারণ যে মুহূর্তে আপনি তাদের ঊর্ধ্বে ওঠেন, আপনার জগতে তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না

১৭।০৭।২০২৬-সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি

সচরাচর আমাদের দেখা সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি একাই প্রতিকূল অবস্থা থেকে সেরে উঠেছেন। বিপদজনক কেনো? সহিংসতার কারণে তিনি বিপজ্জনক নন, বিপজ্জনক এই কারণে যে, তিনি কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। জীবনের কোনো একটা সময় তিনি নিজেকে একেবারে তলানিতে দেখেছেন এবং কারো কোনো সাহাজ্য ছাড়াই সেখান থেকে আবার উঠেও এসেছেন। ফলে অন্যের মতামত তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কারণ তিনি ইতিমধ্যেই নিজের মনের সবচেয়ে খারাপ রূপটির মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি আর পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় পান না। তিনি ইতিমধ্যেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পতিত হয়ে তা থেকে একাই সফল হয়ে ফিরেছেন। তিনি আর অন্যের স্বীকৃতি খোঁজেন না। তিনি কারো অনুমোদন ছাড়াই শক্তভাবে দাঁড়াতে শিখেছেন। তিনি কারো পেছনে ছোটেন না; তিনি জানেন, যা থাকার তা থাকবেই, আর যা থাকার নয় সেটা থাকবেও না। তাকে প্রভাবিত করা যায় না, কারণ তিনি ইতিমধ্যেই নিজের ভেতরের অন্ধকার দিকগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি একাকীত্বকে ভয় পান না কারন তিনি নীরবতার সাথে শান্তি স্থাপন করেছেন এবং সেখানেই শক্তি খুঁজে পেয়েছেন। আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি যে, আপনি এমন কাউকে ভাঙতে পারবেন না যিনি ইতিমধ্যেই ভেঙে গিয়ে নিজেকে আরও শক্তিশালী করে নতুন করে গড়ে তুলেছেন।

১৬।০৭।২০২৬-আপনার ভবিষ্যৎ নীরবে আপনার আজকে

আপনার ভবিষ্যৎ নীরবে আপনার আজকের সিদ্ধান্তগুলো দেখছে। আপনার গড়ে তোলা প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি অজুহাত, প্রতিটি সুযোগ গ্রহণ—ইত্যাদি আপনার কার্যকলাপের দ্বারাই আপনার কাঙ্ক্ষিত জীবন রূপ পাচ্ছে। একটি সিদ্ধান্ত হয়তো রাতারাতি আপনার জীবন বদলে দেবে না, কিন্তু যে সিদ্ধান্তটি আপনি প্রতিদিন পুনরাবৃত্তি করেন, তা অবশেষে বদলে দেবে। কারণ আপনার ভবিষ্যৎ এমন কিছু নয় যার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, বরং এটি এমন কিছু যা আপনাকেই তৈরি করতে হয়।

১৩/০৭/২০২৬-‘হেডোনিক অ্যাডাপ্টেশন’

যদি আমরা সবাই একদিন মারাই যাবো, তাহলে এত কঠিন চেষ্টা করার আসল মানে কী? এটি কোনো অলঙ্কারিক প্রশ্ন নয়, এটি এমন একটি প্রশ্ন যা প্রায় কেউই পুরোপুরি জিজ্ঞাসা করার সাহস করে না কারণ সিস্টেমের আপনাকে ব্যস্ত রাখা প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই আপনাকে শেখানো হয়েছিল যে জীবনের অর্থ হচ্ছে পেশাগত সাফল্য, ​​পর্যাপ্ত অর্থ, নিখুঁত সম্পর্ক। তাই আপনি ভবিষ্যতের এমন একটি বিন্দুর দিকে দৌড়াতে শুরু করেন যেখানে সবকিছু অবশেষে অর্থপূর্ণ হবে। কিন্তু সেই বিন্দু সম্পর্কে এমন কিছু আছে যা কেউ আপনাকে সতর্ক করেনি, কারন সেটি কখনোই আসে না। আপনি পদোন্নতি চান, সেটা আপনি পান এবং উত্তেজনা কয়েক দিন স্থায়ী হয়। আপনি যে বাড়িটির স্বপ্ন দেখেছিলেন তা কিনে ফেলেছেন কিন্তু শীঘ্রই এটি আর যথেষ্ট মনে হয় না। আপনি যে টাকা চেয়েছিলেন তা সঞ্চয় করে ফেলেছেন কিন্তু  বুঝতে পারেন যে, কোনো  না কোনো কারনে আপনি তাতেও সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। ফলে বর্তমানের এই অবস্থায় সেটাও আপনি কাংখিতভাবে  উপভোগ করতে পারছেন না। একটা শুন্যতা রয়েই যায়। মনোবিজ্ঞানে এর একটি নাম আছে। এটিকে 'হেডোনিক অ্যাডাপ্টেশন' বলা হয়। আপনি যতই অর্জন করুন না কেন, আপনার মন সর্বদা একটি মৌলিক মানসিক অবস্থায় ফিরে আসে যেটা অস্বস্তিকর এবং দ্রিশ্যমান নয়। আসলে আপনাকে স্থায়ীভাবে পরিপূর্ণ করার জন্য বাহ্যিকভাবে কিছুই ডিজাইন করা হয়নি, আপনি যা দরকার তা সব কিছু পেয়ে অকৃতজ্ঞ বলে নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্ক এভাবেই কাজ করে এবং সিস্টেম এটি জানে। তাই এটি আপনাকে পরবর্তী লক্ষ্য বিক্রি করতে থাকে এবং এখানেই আসল ক্লান্তি শুরু হয়। কারণ আপনার বেশিরভাগ কষ্ট আপনার প্রকৃত জীবন থেকে আসে না। এটি দুটি অস্তিত্বহীন সময়ের মধ্যে আটকে থাকার জীবন থেকে আসে, একটা অতীত, আরেকটা ভবিষ্যৎ। যে সিদ্ধান্তগুলি আপনি আর পরিবর্তন করতে পারবেন না সেগুলির উপর কষ্ট, অর্থাৎ অতীতের ঘটনাবলী এবং ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করা জীবন যা আপনার হাতেও নাই, সেটা না পাওয়ার আক্ষেপ।  জীবন এ দুটু সময়ে কখনোই ছিলো না এবং একটা অংশে থাকলেও সেটা স্থির থাকেনি। জীবনটা কেবল স্থির থাকে “এখানে” “এই সেকেন্ডে” “এই শ্বাসে” “এই মুহূর্তে”। আপনি সাধারণত এই সময়টাকে উপেক্ষা করেন এবং তারপরে তুলনা উপস্থিত হয় আগত বা বিগত সময়ের মধ্যে, শুরু হয় একজনের সাথে আপনার কম্পেরিজন, যা একটা নীরব বিষ।

আপনার থেকে কেউ তরুণ, কেউ ধনী, কেউ বেশি প্রশংসিত বা কেউ বেশি সফল থাকবে এবং কিন্তু আমরা অন্য কারো জীবন ব্যবহার করে নিজের মূল্য পরিমাপ করি, কিন্তু আমরা আমাদের সামনে ঘটে যাওয়া জীবনকে উপেক্ষা করি। এটা একটা হতাশার গল্প। টাকা পয়সা, অর্থ কিংবা সাফল্য কখনও মর্যাদায় লুকানো ছিল না, এটি উপস্থিতিতে লুকানো ছিল। ধীরে ধীরে খাওয়া, সময় নিয়ে চিন্তা করা, আকাশের দিকে তাকানো, প্রিয়জনের সাথে গভীরভাবে হাস্যালাপ, এবং নিজকে প্রমাণ করার প্রয়োজন ছাড়াই জীবিত বোধ করা। এবং এখানে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে, আমরা যা স্থায়ী তার সাথে যা মূল্যবান তা গুলিয়ে ফেলি। একটি পাথর কিছুই অনুভব না করে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিদ্যমান থাকতে পারে, একটি ঝড় মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়, তবুও এটি শুষ্ক ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা রাখে। জীবন মূল্যবান নয় কারণ এটি চিরকাল স্থায়ী হয় না, এটি মূল্যবান কারণ এমন ছোট ছোট মুহূর্ত রয়েছে যা আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মুহূর্ত যা একটি পুরো জীবন পরিবর্তন করে দেয়। তাই এমন কোনো নিখুঁত ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করা বন্ধ করুন যেখানে সবকিছু অবশেষে অর্থপূর্ণ হবে। জীবনের অর্থ রাস্তার শেষে লুকানো নেই। এটি সাধারণ জীবনের ফটকে, ধীরে ধীরে খাবার উপভোগ করার মধ্যে, কারো সাথে কথা বলার সময় সত্যিই মনোযোগ দেওয়ার মধ্যে, একটি শিশুর সাথে খেলার মধ্যে, কোন রহস্যে একটা পাখী আকাশে নির্বিগ্নে ভেসে থাকে তার চিন্তায়, কিংবা কোনো এক অচেনা রাস্তার ধারে একটা অচেনা ফুলের বিকশিত হবার মনোমুগ্ধকর ভাবনার মধ্যে, বাতাস অনুভব করার মধ্যে, এমনকি যদি কেবল এক মুহূর্তের জন্য উপলব্ধি করার মধ্যে যে আপনি এখনও জীবিত আছেন।

১২/০৭/২০২৬-অনাগত আগত

বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি। গত দুদিন যাবত এক নাগাড়ে দিনে রাতে বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাচ্ছে, মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে, গাছপালাগুলি সূর্যের আলো পাচ্ছে না বলে হয়তো তাদের সালোক সংশ্লেশনে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, রাস্তার কুকুরগুলি নিরাপদ শুকনা আশ্রয়ের কারনে গলির পরিত্যক্ত কোনো ছাউনীতে বসে ঝিমুচ্ছে, বাচ্চারা স্কুলে যেতে হিমশিম খাচ্ছে, আরো অনেক।

ঠিক এই সময়ে আবার এই দুনিয়া ছেড়ে চলেও যাচ্ছেন, তাদের সমাহিত করার জন্য মানুষ ভিজে ভিজে তার কবর করছেন, কেউ আবার ঘরে বসে সেই চলে যাওয়া মানুষটির জন্য শোকাহত নেত্রে অশ্রু ফেলছেন, আবার এরই মধ্যে আবার নতুন উদ্দীপনায় নতুন মুখ এই পৃথিবীর খালী স্থান পূর্ন করছে, বাড়িতে বাড়িতে তার আগমনে সবাই খুশী এবং হাস্যোজ্জল নেত্রে কোলাকোলি করছেন। সুর্য উঠেনি, তাতে কি, রাত আরো গভীর তাতে কি, কোনো কাজই কারো থেমে নেই। বারে মদের আসর চলছে, বাসর ঘরে রোমান্স চলছে, হাসপাতালে রোগীর কান্না চলছে, কোথাও কোনো কিছুই থেমে নেই। আর এটাই এই পৃথিবী। কারো কোনো কিছুই কারো জন্যই সে থেমে থাকে না, থামিয়ে রাখে না।

আজ থেকে অনেক বছর আগে অরু এসেছিলো আমার জীবনে। এমনই কোনো বৃষ্টিভেজা দিনে মুখুমুখী বসেছিলো। তার চোখে ভবিষ্যতের অসহায় ভাব আমাকে বিচলিত করেছিলো। অথচ তার কোনো অপরাধ ছিলো না। পৃথিবীর অন্য সব সচ্চল মানুষের মতো তারও এই পৃথিবীর সব আনন্দ, সব আহলাদ, সব প্রয়োজনীয় ইচ্ছা পুর্ন হবার কথা ছিলো। কিন্তু সে ভুল সময়ে ভুল জায়গায় অবস্থা করেছিলো। সে আমার একটা প্রোজেক্ট হয়ে গিয়েছিলো। আজ এতো বছর পর, সেই দিনটার সাথে আজকের দিনের তুলনা করলে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, তার অবস্থান, আমার অবস্থান এবং পরিবর্তন। কেউ জানলো না, কেউ বুঝলো না, কোথায় এই দুটি মানুষ আজীবনের জন্য একটা সেতু বন্ধনে চিরস্থায়ী হয়ে গেলো। প্রকৃতি বড় রহস্যময়।

একদিন সে বড় হবে, তার জীবন পালটে যাবে, আমরা দুজনের কেউ হয়তো আর থাকবো না, কিন্তু আমাদের লিগ্যাসি সে জন্ম জন্মান্তরে এই পৃথিবীর বুকে চলমান রাখবে। একটা সময় আসবে, এর মুল অরিজিন, এর সকীয়তা কিংবা এর আসল পরিচয়ের আর কোনো খোজ থাকবে না। তখনো আজকের দিনের মতো হয়তো সারাদিন বৃষ্টি হবে, রাত ঘনিয়ে আরো বেশী কালো হবে, মানুষ ব্যস্ত থাকবে, কিন্তু ইতিহাস থাকবে তার নিজের আর্কাইভে। যেখানে আমরা কেহই বিচ্যুত নই।

Wisdomatic Talk

আপনার লক্ষ্য গোপন রাখুন। আপনি কী নিয়ে কাজ করছেন তা সবার জানার প্রয়োজন নেই। কিছু স্বপ্ন নীরবে আরও ভালোভাবে বিকশিত হয়; শান্ত থাকুন, শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকুন। প্রতিটি লক্ষ্যের দর্শক থাকার প্রয়োজন নেই। কখনও কখনও সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্য আপনার সাফল্য।

 

===============================================================================

আপনার স্বামীই আপনার জীবনের একমাত্র ব্যক্তি যিনি আপনাকে ভালোবেসে বেছে নিয়েছেন। আপনার বাবা-মা আপনাকে ভালোবাসেন কারণ আপনি তাদের সন্তান, আপনার ভাই-বোনেরা আপনাকে ভালোবাসেন কারণ তারা আপনার রক্তের সম্পর্কের, আপনার সন্তানেরা আপনাকে ভালোবাসেন কারণ আপনি তাদের এই পৃথিবীতে এনেছেন। কিন্তু আপনার স্বামী আপনাকে ভালোবাসতে বাধ্য ছিলেন না। তিনি আপনার জন্য নির্ধারিত ছিলেন না, তিনি থাকতে বাধ্য ছিলেন না। তিনি যাদের বেছে নিতে পারতেন তাদের মধ্যে থেকে, তিনি আপনাকে বেছে নিয়েছেন। তিনি আপনার সাথে জীবন গড়ার জন্য আপনাকে বেছে নিয়েছেন, তার সময়, তার প্রচেষ্টা, তার স্বপ্ন, তার সংগ্রাম এবং তার ভবিষ্যৎ ভাগ করে নেওয়ার জন্য। তাই আপনার উচিত কখনোই সেই ভালোবাসাকে এমনভাবে গ্রহণ না করা যেন তা নিশ্চিত। পরিচিতির একটি বিপজ্জনক অভ্যাস আছে। এটি মানুষকে তাদের যা আছে তার মূল্য ভুলে যেতে বাধ্য করে। যে মানুষটি আপনাকে বেছে নিয়েছে, তারও নির্বাচিত বোধ করার প্রয়োজন। একবার নয়, বহু বছর আগে নয়, বরং আজ এবং আগামীকাল এবং তারপর প্রতিদিন, কারণ ভালোবাসা স্মৃতিতে টিকে থাকে না। এটি প্রশংসা, শ্রদ্ধা এবং প্রচেষ্টার উপর টিকে থাকে এবং এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে, একটি সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল হলো এটা ধরে নেওয়া যে, যে আপনাকে গতকাল বেছে নিয়েছে সে আগামীকাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যবান বোধ করবে। যে আপনাকে বেছে নিয়েছে, তাকে বেছে নেওয়া কখনোই বন্ধ করবেন না। এভাবেই ভালোবাসা টিকে থাকে।

==================================================================================

 

 

যদি কেউ আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে, তবে সম্ভবত আপনি যথেষ্ট উন্নতি করছেন না। কারণ যে মুহূর্তে আপনি এগিয়ে যেতে শুরু করবেন, দৃশ্যমান হবেন এবং অর্থপূর্ণ কিছু করবেন, মানুষের মতামত থাকবে। তারা আপনার সমালোচনা করবে, আপনার পেছনে কথা বলবে, আপনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। এবং কখনও কখনও, আপনাকে না জেনেই তারা আপনাকে অপছন্দ করবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মানুষ সাধারণত এমন কাউকে দেখার জন্য সময় ব্যয় করে না যাকে তারা অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। আপনার সমালোচকরা প্রায়শই আপনার সমর্থকদের চেয়ে আপনাকে ঘনিষ্ঠভাবে অধ্যয়ন করে। তারা লক্ষ্য করে আপনি কী পোস্ট করেন, কী অর্জন করেন, কোথায় যান এবং আপনি পরবর্তীতে কী করছেন। এক অদ্ভুত উপায়ে, তারা আপনার সবচেয়ে ধারাবাহিক দর্শক হয়ে ওঠে। তাই আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলে এমন প্রত্যেককে চুপ করানোর চেষ্টা করে আপনার শক্তি নষ্ট করবেন না। বাড়তে থাকুন, উন্নতি করতে থাকুন, গড়ে তুলতে থাকুন। কারণ সমালোচনা মানে সবসময় এই নয় যে আপনি কিছু ভুল করছেন। কখনও কখনও এর মানে কেবল এই যে আপনি এমন কিছু করছেন যা লক্ষণীয়। তাদের দেখতে দিন, তাদের কথা বলতে দিন এবং তাদের এমন কিছু দিন যা নিয়ে কথা বলার মতো।

 

===========================================================

 

 

 

যদি কেউ আপনাকে শত্রু হিসেবে না দেখে, তার মানে আপনি গুরুত্বপূর্ণ নন; যদি কেউ আপনার পেছনে কথা না বলে, তার মানে আপনি প্রাসঙ্গিক নন। যদি কেউ আপনার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে, তার মানে আপনার মূল্য আছে। যদি কেউ আপনাকে ছোট করার চেষ্টা করে, তার মানে আপনি তাদের চেয়ে উপরে। প্রত্যেক সমালোচক, আপনার সম্পর্কে ফিসফিস করা প্রত্যেক ব্যক্তি, তারা আপনার শত্রু নয়; বরং, তারা আপনার সবচেয়ে বড় ভক্ত। কারণ সমালোচনা হলো প্রশংসারই একটি লুকানো রূপ।

================================================================================

 

 

যদি আপনি ভালোভাবে পোশাক পরেন, লোকে ভাববে আপনি লোক দেখানো করছেন; যদি আপনি সাধারণ পোশাক পরেন, লোকে ভাববে আপনি দরিদ্র। যদি আপনি মোটা হন, লোকে ভাববে আপনি বেশি খান; যদি আপনি রোগা হন, লোকে ভাববে আপনি অসুস্থ। যদি আপনি ধনী হন, লোকে ভাববে আপনি অহংকারী; যদি আপনি কষ্টে থাকেন, লোকে ভাববে আপনি অলস। আপনি যা-ই করুন না কেন, লোকে সবসময় কিছু না কিছু বলবেই। নিজের জন্য বাঁচুন। অন্যের দ্বারা আপনার শান্তি নষ্ট হতে দেবেন না।

==========================================================

 

বৃষ্টি শেষ হলে, ছাতা সবার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। যেদিন একজন অন্ধ মানুষ দেখতে পায়, সে সবার আগে সেই লাঠিটি ফেলে দেয় যা তাকে সারাজীবন সাহায্য করেছে। যখন সূর্য ফিরে আসে, তারা সবার আগে সেই মোমবাতিটি নিভিয়ে দেয় যা তাদের অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখিয়েছে। এভাবেই বিশ্বস্ততা শেষ হয় যখন সুবিধা শেষ হয়ে যায়।

==================================================================================

বেশিরভাগ মানুষ খুব দেরি না হওয়া পর্যন্ত ঘুম থেকে ওঠে না। তারা কোলাহল, অন্যদের খুশি করা এবং নীরবতা থেকে পালানোর পেছনে বছর নষ্ট করে।

১. সময় একটি একমুখী টিকিট। আপনি যে প্রতি মিনিট নষ্ট করেন তা চিরতরে চলে যায়।
২. আপনার কোনো কিছু পাওনা নেই। পৃথিবী আপনার জন্য চিন্তা করে না। নিজের স্থান অর্জন করুন।
৩. আরাম একটি নীরব ঘাতক।

৪. সবাই আপনার বন্ধু নয়; হাসি মিথ্যা। কথার চেয়ে আচরণ দেখুন।

৫. আপনার অজুহাত আপনাকে বাঁচাবে না, একদিন সেগুলোই আপনার ব্যর্থতার কারণ হবে।
৬. কেউ আপনাকে বাঁচাতে আসছে না, অপেক্ষা করা এক ধীর মৃত্যু। নিজেকে বাঁচান।
৭. সুখ খুঁজে পাওয়া যায় না; এটি তৈরি করতে হয়। শৃঙ্খলা এটি তৈরি করে। আরাম এটি ধ্বংস করে।
৮. অতীত ভারী; এটিকে যেতে দিন। পুরনো ব্যথা টেনে নিয়ে আপনি সামনে এগোতে পারবেন না।
৯. আপনি যদি আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রণ না করেন, তবে অন্য কেউ করবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন অথবা নিয়ন্ত্রিত হন।

১০. আপনি যেভাবেই থাকুন না কেন, তারা আপনাকে বিচার করবে, আপনি চুপ থাকুন বা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করুন। তারা কথা বলবে, তাই সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করুন।

১১. আপনার সময় ফুরিয়ে আসছে; আপনি ভাবেন আপনার কাছে আরও আছে; আপনি এখনই কাজ করছেন না।

১২. একটি অপচয়িত জীবন সবচেয়ে ভারী অনুশোচনা। জেগে উঠুন, কোলাহল বন্ধ করুন এবং এমন জীবন তৈরি করুন যা মনে রেখে মরতে আপনি গর্বিত হবেন।

২৭/৬/২০২৬-বিবাহ কোনো নিরবিচ্ছিন্ন বন্ধন নয়

ছোট ভাইয়ের সাথে অনেকক্ষন কথা হলো । ছোট ভাই অনেক বাস্তব ধর্মী কথা বলেন, তাতে কেউ মাইন্ড করুক বা না করুক। উনি ওনার কথা বলে দেন। ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো লাগে। কথা হচ্ছিলো কনিকার আমেরিকায় বাড়ি কেনার ব্যাপারে। কনিকা আর ব্রেডি আমেরিকায় একটা বাড়ি কিনতে চায়। একটা বাড়ি পছন্দ করেছেও। দাম প্রায় ৫ লাখ ডলার। কিন্তু ওদের অতো টাকা নাই বিধায় আমি ওদেরকে কিছু ডলার দান করছি। মেয়েই তো। আমি ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার দিয়েছি, আরো দেওয়ার জন্যই ছোট ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিলো। ছোট ভাই অনেক সময় বাংলাদেশে ডলার পাঠায়, আমি ওনাকে বলেছি যেনো বাংলাদেশে ডলার না পাঠিয়ে কনিকাকে দিয়ে দিতে আর আমি সেই পরিমান ডলারের বিপক্ষে ছোট ভাইকে বাংলাদেশ থেকে বাঙলা টাকা দিয়ে দেবো।  আমার পরিকল্পনা হলো, ওদেরকে আমি ২ লাখ ডলারের মতো দান করবো এবং টাইম টু টাইম যদি সুযোগ থাকে প্রতি বছর আরো কিছু কিছু করে ডলার পাঠাবো যাতে ওরা ৩০ বছরের মর্টগেজ না টেনে ৫ বছরের মধ্যেই সেটা শোধ হয়ে যায়।

ঠিক এখানেই ছোট ভাইয়ে সেই পরামর্শটা। উনি বললেন, আখতার সাহেব, আমেরিকায় বিয়ে কোনো নিবিচ্ছিন্ন বন্ধন নয়। ওরা খুবই ছোট বিশঢয় থেকে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর তখন ওদের জয়েন্ট নামে যে সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি আছে তা ৫০-৫০ তে ভাগ করে অতঃপর সেপারেট হয়। এখন কথা হচ্ছে-যখন আপনি ইতিমধ্যে ২ লাখ ডলার মেয়ের কারনে তাদেরকে বাড়ি কিনতে দিলেন, কোনো কারনে যদি তাদের বিবাহ বন্ধন অটুট না থাকে, তাহলে কিন্তু ব্রেডি ইতিমধ্যেই আপনাদের কাছ থেকে ১ লাখ ডলার ফাও পেয়ে গেলো। আর আমেরিকায় কারো কাছে যদি ১ লাখ ডলার ক্যাশ থাকে, সে কিন্তু মহারাজার মতো। আর যদি পুরু বাড়িটা মর্টগেজ ফ্রি হয়ে যায়, তাহলে ৫ লাখ টাকার বাড়ি কিবতু ব্রেডি নিজে আড়াই লাখ ডলারের ক্যাশ মালিক। খুবই বিপদজনক ব্যাপার। অনেক সময় দেখা যায় যে, এই আড়াই লাখ ডলারের কারনেই তাদের বিবাহ বন্ধনে একটা বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। কারো কারো পছন্দের মানুষ ওভার টাইম পরিবর্তন হতেই পারে। তখন লসটা করবেন আপ্নারা আর কনিকা।

উপদেশটা আমার পছন্দ হয়েছে আর সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি ভাবছি, আপাতত আর কোনো কন্ট্রিবিউশন করাটা আমার সম্ভবত উচিত হবে না।

২৪/৬/২০২৬-সোমার আব্বা জয়নাল দুলাভাই মারা গেলেন

আমাদের শেষ বিদায়ের দিনটা আমাদের সামনে রাখা ক্যালেন্ডারের মধ্যে কোথাও ঘাপ্টি মেরে বসে থাকে। কিন্তু আমরা তার কোনো হদিস পাই না। হটাত একদিন সেই তারিখটা সবার সামনে চলে আসে এবং আমরা সবার অজান্তে এমন কি আমাদের নিজেদের অজান্তেই বিদায় নিয়ে নেই। ব্যাপারটা অবাক করার বিষয় হলেও এটাই ঘটে বারবার সবার জীবনে।

অফিস করছিলাম, বেলা প্রায় তখন ২ টা। আমার স্ত্রী ফোন করে জানাইলো, জয়নাল দুলাভাই মারা গেছেন। চিরাচরিত নিয়মে ইন্না লিল্লাহ পড়লাম কিন্তু আবারো কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। সন্ধ্যা ৭ টায় ওনার জানাজা, এবং তারপরেই দাফন করা হবে। তাই আমি ঠিক সাড়ে পাচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে গেলাম যাতে জানাজাটা ধরতে পারি কিন্তু ঢাকার ব্যস্ত ট্রাফিক জ্যামে একেবারেই আটকে গিয়ে আমি শেষ পর্যন্ত জানাজাটা ধরতে পারিনি। কিন্তু দাফন কাজটা ধরতে পেরেছিলাম।

মীরপুর কবরস্থান অনেক বড়। ওখানে গিয়ে আমার মনটাই জানি কেমন হয়ে গেলো। কত ব্যস্ত লোক, ব্যবসায়ী লোক, পলিটিশিয়ান, মন্ত্রী মিনিষ্টার এই কবরে শুয়ে আছেন তার কোনো ইয়াত্তা নাই। পৃথিবীর এই পার্টে তাদের কাজ শেষ হয়ে তারা অন্যত্র চলে গেছেন। ওনারা আর এই পৃথিবীর কোনো কিছুতেই নাক গলান না, এর মধ্যে কোথায় কি হচ্ছে বা হবে এগুলি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নাই। ফ্যামিলি, বাচ্চা কাচ্চা, মায়ার সংসার এদের কাছে আর কোনো মুল্য নাই।

আজকে এই বিদায়ের দিনে জয়নাল দুলাভাইয়ের দাফলে গুটিকতক মানুষ জড়ো হয়েছে। মুলত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ মামা এবং তার আরেক ভাই, মুবীন, জামান দুলাভাই, আমরা আরো কিছু লোক। সব মিলিয়ে হয়তো গোটা ২০/২৫ জন হবে।

আমি ওনার লাশটা দেখি নাই তবে যখন তার লাশটা কবরে নামানো হচ্ছিলো, মনে হলো ১৪/১৫ বছরের কোনো শীর্নকায় যুবকের লাশ রাখা হচ্ছে কবরে। খুব ছোট হয়ে গিয়েছিলেন শেষের দিকে। খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেলেন দুলাভাই।

১৩/৬/২০২৬ ঢাকা, রাজধানী, হচ্ছে পুরু দেশের একটা কেন্দ্রীয় রিহেবিলেশন

ঢাকা, রাজধানী, হচ্ছে পুরু দেশের একটা কেন্দ্রীয় রিহেবিলেশন সেন্টারের মতো। সবাই, যুবক, বৃদ্ধ, মহিলা ঢাকা আসতে চায়। ফলে সবগুলি জেলার মানুষের সাথে ঢাকাবাসীদেরকে একাই প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে হয়। ঢাকাবাসীকে অন্য কোথাও রিহেবিলেটেশনের জন্য দৌড়াতে হয় না একমাত্র বিদেশ ছাড়া। অনুন্নত জেলার যে যুবকটি তার জেলা ছেড়ে ঢাকাগামী হয়, সে আসলে ঢাকাবাসী কোনো যুবকের থেকে একধাপ এগিয়ে থাকে। কারন সে জানে তার অবস্থা এবং অবস্থান। সে জানে যেভাবেই হোক তাকে উপরে উঠতে হবে। যখনই সে ঢাকাগামী হয়, তখন তার একটাই সপ্ন থাকে, সে কিভাবে এই রাজধানীর বুকে অন্য সবার চেয়ে দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে সেটেলড হবে। তাই সে এখানে এসে সে নিজে অথবা তার পরিবারের সিবলিং কে প্রথমে স্কুলে ভর্তি করায়, তারাও পড়াশুনায় মন দেয় এবং দিতে বলে, নিজের পায়ের মাটি শক্ত করার জন্য পরিবারের সবাই মিলে যে কোনো জব খুজতে থাকে যাতে কোনোরকমে সে শুধু ঢাকায় টিকে যেতে পারে। ইনিশিয়ালী এই জনগোষ্ঠীটা একা একা খুব অনিরাপদ মনে করায় তারা ঢাকাবাসীর কারো না কারো সাথে সখ্যতা তৈরী করে এবং খুব দ্রুত নিজেদের কিছু লোক নিয়ে লোকাল কোনো ইনফ্লুয়েনশিয়াল লোকের সংস্পর্শে এসে একটা অপ্রকাশিত দল তৈরী করে। আপাতত দেখে মনে হবে যে, তারা ঢাকাকেন্দ্রীক সেই লোকাল কমান্ডের উপর নিয়মিত লয়াল এবং সবকিছু মেনে নেয়ার একটা প্রবনতা প্রদর্শন কিন্তু তাদের সবার মনে একটাই বাসনা থাকে। একটা সুযোগ, মাত্র একটা সুযোগ, তারপর যখন একটু সাবলম্বী বোধ করে, ঠিক তখন তারা সেই ঢাকাবাসীর হাত ছেড়ে দেয়। নিজেরাই তখন কমান্ডে চলে আসে।

এই সময়ে ধীরে ধীরে তারা অত্র অঞ্চলে প্রথমে একটা সংঘটন তৈরী করে, তারপর কিছু লোক মিলে থাকার জন্য কম্বাইন্ড একটা জমি ক্রয় করে, অতঃপর ধীরলয়ে সঞ্চয়ে সঞ্চয়ে সেখানে বাড়িঘর তৈরী করে আবাসনের মাধ্যমে পরিবার সেটেল করে ফেলে। আর এটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তারা একটা ব্যাপার জানে যে, ভিলেজ পলিটিক্সই হোক বা কেন্দ্রীয়, তারা ধীরে ধীরে সেই বলয়ের মাঝে ঘেষতে হবে এবং এক সময় ঘেষেও যায়। আর এই ঘেষে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ঢাকাবাসীরাই তাদের সেই সুযোগটা করে দেয়। এভাবেই তারা একসময় মাইনোরিটি থেকে অবশেষে মেজরিটির দিকে পদার্পন করে। তারা তখন পলিটিক্যালী শক্ত অবস্থানে চলে যায়, সাপোর্টিভ মানুষের দল তৈরী হয়, এবং তারা তখন একচ্ছত্র আদিপত্য বিস্তার করে। ঢাকাবাসী এই ফেনোমেনাটাকে বুঝতে পারে না। ফলে তারাও মনে করে, তাদের সাথে কিছু বহিরাগত লোক সংঘটিত হয়ে তার দলকে তো ভারী এবং মজবুত করছে এবং তাদেরকে তো নেতা মানছেই। কিন্তু এই লোকাল লোকগুলি জানে না যে, এই মানাটা আসলে খুবই ক্ষনস্থায়ী। যখন ঐ গোষ্ঠীর সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন যাকে কেন্দ্র করে ওদের পা শক্ত হয়েছিলো, এক নিমিষেই তারা সেই অবলম্বনকে ধাক্কা দিয়ে এমন এক জায়গায় ছুড়ে ফেলে যে, সে আর এখানের কেউ থাকে না। তার পরিবর্তে স্রিষ্টি হয় নতুন নেতৃত্ত, নতুন কমান্ড। আর সেটা অন্য জেলার অধীনে। ঢাকাবাসীরাও তাদের অধীনে চলে আসে।

একটা বিবর্তন খেয়াল করলে খুব সহজেই চোখে পড়ার কথা যে, বহিরাগত এই মানুষগুলি প্রথমে খুব নীরিহ থাকে, পড়াশুনায় মন দেয়, কাজে মন দেয়, সবার সাথে খুব মিলেমিশে থাকে, তারা আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ায় যে কোনো উপায়ে। একসময় ছোট ছোট কাজ করেও প্রশাসনিক কাজে দক্ষতা অর্জন করে, ওদের দলমত সদস্যদের জন্য একে অপরকে সররাবত্তক সাহাজ্য সহযোগীতা করে এবং ওদের একটা আলাদা বলয় তখন তৈরী হয়ে যায়। সেখানে তাদের আলাদা নেত্রিত্তও থাকে। এক সময় ওরাই লুফে নেয় গ্রামের পদ, রাজনিতির পদ এবং গড়ে তোলে আলাদা একটা ব্যবস্থা। এই অবস্থার জন্য দায়ী গুটিকতক সার্থানেষী করাপ্টেড তথাকথিত শিক্ষিত ঢাকার লোকাল মাকরশা যারা না নিজেদের উপকার করতে পারে, না অঞ্চলের। এরা তখন কোথাও যাওয়ার বা উপদেশ নেয়ার মানুষও খুজে পায় না কারন তারা সেই জনবল তৈরী করে নাই। অন্যদিকে বহিরাগত মানুষগুলি একে একে এমন একটা সার্কেল তৈরী করে ফেলে যে, সর্বত্র তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়ে যায়। ওরা নেতা হয়, ওরা ধনী হয়, ওরা প্রাসাদ নির্মান করে, আর সেখানে এই অঞ্চলের মানুষগুলি দিনের পর দিন তাদের সেবা করে। অথচ হবার কথা উল্টাটা। লোকাল মানুষ গুলি নিজেরা নিজেদের উপযুক্ত করতে না পারায় সারাদিন হাড়কাপুনী পরিশ্রমেও ওদের উন্নতি হয় না। যখন লোকাল মানুষগুলি আর টিকে থাকতে পারে না, ঠিক এই সময়ে যেটা পরিলক্ষিত হয় যে, গ্রামের অভিভাবকগন তাদের পটেনশিয়াল যুবকদেরকে কোথাও কোনো গতি না করতে পেরে অচিরেই পাঠিয়ে দেয় দেশের বাইরে যেখানে সে একজন কামলা ছাড়া আর কিছুই না, আর মেয়েদেরকে বিবাহ দিয়ে দেয় যখন তার ক্যারিয়ার গড়ার কথা। এমন কি এটাও পরিলক্ষিত হয় যে, বহিরাগত এই জঙ্গোষ্ঠীটার মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে টাকাওয়ালা হয়ে উঠায় তাদের কাছেও এই অঞ্চলের লোকাল মানুষগুলি তাদের কাছে ধর্না দেয়। বহিরাগতরাও এই সুযোগটা লুফে নিয়ে লোকালদেরকে ঋণ দিয়ে আরো কাবু করে ফেলে। ব্যাপারটা লোকাল মানুষগুলি কখনোই ভাবে না কেনো এমনটা হলো। অত্র অঞ্চলের মেজোরিটি তখন মাইনোরিটি হয়ে আদিবাসীতে রুপান্তরীত হয়।

এই জনগোষ্ঠী থেকে যুবকেরা যে তাদের সাফল্য পায় না এমন না। যে সব অভিভাবকগন অধিক মাত্রায় নিজেরা নিজেরা সচেতন, তারা তাদের বাচ্চাদের প্রতি কেয়ারিং এবং সার্বোক্ষনিক মনিটরিং এ থাকেন, তাদের পরিবারের সন্তানরা ফাক ফোকর দিয়ে হয়তো কিছুটা সাফল্য পায় বটে কিন্তু তারা আর এই অঞ্চলে ফিরে আসে না। যারাই কখনো যদি ফিরে আসে, তখন আবারো সেই বহিরাগত সংঘটনটি ইসরাইলী ইহুদীদের মতো লোকাল কিছু তথাকথিত করাপ্টেড শিক্ষিত দস্যুদের নিয়ে নাড়ির টানে ফিরে আসা মানুষটাকে  কিভাবে নাজেহাল করে তাদের বলয় থেকে দূরে রাখা যায় সেটা করতে থাকে। আবারো এরজন্য কিছু দেশীয় পাতি নেতাদের অবদান কম নয়। অথচ পাতিনেতারা তখনো জানে না যে, ওদেরকে অন্যরা ব্যবহার করছে ওদের বিরুদ্ধেই। ফলে লোকাল জনপদ আবারো সেই পিছনেই যেতে থাকে। এদের কোনো গতি হয় না। এই লোকাল জনপদ সেই বহিরাগত নেতাদের পিছনেই বারবার ঘুরতে থাকে, কারন তারা এই অঞ্চলের বাইরের কারো সাথে কোনো যোগাযোগ নাই। অন্যদিকে, সেই বহিরাগতরাই এই অঞ্চলের মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা প্রশাসক, এমন কি কেন্দ্রীয় রাজনীতির মধ্যে এমনভাবে স্থান দখল করে নেয় যে, লোকাল কেউ তাদের বলয় থেকে বেরিয়ে যাবার কোনো পথ খোলা রাখে না। আর লোকালরা সেটা করতে পারবেও না কারন তারা কোনো কিছুতেই কোয়ালিফাই করে না।

সার্ভে করলে দেখা যায় যে, যে গ্রামে অসংখ্য ডাক্তার, অসংখ্য সিভিল অফিসার, অসংখ্য মিলিটারীম্যান, অসংখ্য উকিল কিংবা উর্ধতন কর্মকর্তা থাকার কথা কিন্তু সে অনুপাতে কিন্তু এর সংখ্যা অতীব নগন্য। অন্যদিকে খেয়াল করলে দেখবেন, এই বহিরাগত মানুষগুলির বাসস্থান আছে, তারা সবগুলি পদে পদায়িত এবং তাদের সন্তানেরা যেভাবেই হোক তর তর করে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। আধিপত্যের খেলা তখন শুরু হয় আরেক মাত্রায়।

আর এর জন্য দায়ী শুধুমাত্র গুটিকতক তথাকথিত লোভী কিছু লোকাল মানুষ যারা তাদের বর্তমান সার্থের জন্য পুরু ব্যবস্থাটা এবং বন্দোবস্তটাকে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে।

ঢাকার এতো কাছের একটা জনপদ অথচ এরা কোনো উন্নতি করতে পারছে না। উত্তর বংগের কোনো এক অপরিচিত যুবক এই অঞ্চলের স্কুল কলেজের অধ্যক্ষ হয়, টিচার হয়, সে সময়ে এই অঞ্চলের কোনো এক যুবক তখন ক্ষেত খামারে চাষে ব্যস্ত, কিংবা বহিরাগত কোনো এক পরিবারের সন্তান যখন এই অঞ্চলে মেজিষ্ট্রেট হয়ে আসে, তখন সেই এই অঞ্চলের কোনো এক যুবক নেশায় ধুম হয়ে পড়ে থাকে।

এর ভবিষ্যত আমি ধূসর দেখতে পাচ্ছি।  

29/5/2026- আমাদের বাংলাদেশের আয়তন হচ্ছে

29/5/2026- আমাদের বাংলাদেশের আয়তন হচ্ছে

আমাদের বাংলাদেশের আয়তন হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার। অথচ আমরা যে পৃথিবীটাতে বসবাস করি, তার আয়তন হচ্ছে ৫১ কোটি বর্গ কিলোমিটার। আর আমাদের পৃথিবীটা যে সূর্যের চারিদিকে ঘুরে, সেই সূর্যের আয়তন হচ্ছে আমাদের পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুন বড়। পৃথিবী আর সূর্যের মধতবর্তী দুরুত্ত প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। সূর্যটার একটা সৌরজগত আছে যেখানে পৃথিবী থেকেও বড় বড় গ্রহ উপগ্রহ বিদ্যমান। আমাদের পৃথিবীটা প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে। আর এই বেগেই আমাদের পৃথিবীটা এই সুর্যের চারিদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে এক বছর। পৃথিবী যেমন সৌর জগতের একটা অংশ, তেমনি আমাদের সুর্যও কারো না কারো অংশ। আর তার নাম হচ্ছে মিল্কীওয়ে। এটা একটা গ্যালাক্সি। সুর্যের মতো এই রকম সৌর জগত বিশিষ্ঠ আরো ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে আমাদের গ্যালাক্সি/মিল্কীওয়ে গঠিত। এই প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে গঠিত আমাদের গ্যালাক্সীকে আমাদের সৌর জগত ঘুরে আসতে সময় নেয় প্রায় ২০ কোটি বছর। এই যে এতো বিশাল বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র নিতে গঠিত গ্যালাক্সী/মিল্কীওয়ের কথা বলা হলো, এ রকমের আরো ২ ট্রলিয়ন গ্যালাক্সী নিয়ে আমরা যে দৃশ্যমান মহাবিশ্বটা দেখি তার আয়তন। আমাদের মিল্কিওয়ে যদি একটি শহর হয়, তাহলে IC 1101 হবে একটি মহাদেশ। মিল্কিওয়ে আকাশগঙ্গার ব্যাস প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি আমাদের নিকটতম বড় প্রতিবেশী, যার ব্যাস প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার আলোকবর্ষ এবং এটি আমাদের থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। কিন্তু IC 1101 এই দুটোকে অবলীলায় বামন বানিয়ে দেয়। Abell 2029 গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের কেন্দ্রে অবস্থিত এই উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিটির ব্যাস আনুমানিক ৪ থেকে ৬ মিলিয়ন আলোকবর্ষ, যা এটিকে পর্যবেক্ষণযোগ্য গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে বৃহত্তমদের একটি করে তোলে। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। Astrophysical Journal এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী IC 1101 এ আনুমানিক ১০০ ট্রিলিয়ন নক্ষত্র থাকতে পারে। মহাবিশ্বের স্কেল মানুষের ভাষার সীমানাকে বারবার অতিক্রম করে যায়।

একবার ভাবুন, চোখ বন্ধ করেও এর বিশাল আয়তন মাথায় আনা সম্ভব না আমাদের কারোরই। এই মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের পৃথিবীটার অবস্থানটা চিন্তা করলে আর সেই প্রিথিবীর অবস্থাকে বাস্তবতায় মাথায় নিয়ে আমার অবস্থানকে চিন্তা করলে এই ইউনিভার্সের মধ্যে একটা বিন্দুও না। এই এতো বড় মহাবিশ্বটার মধ্যে ঈশ্বর কি শুধু বিন্দুসম পৃথিবীকে নিয়েই তার সাম্রাজ্যের সব পরিকল্পনায় মত্ত? মোটেও না। আমরা হয়তো শুধু আমাদেরকেই দেখছি, আর এই দেখা প্রিথিবীতে আমরা সারাটা দিন রাত আমি এক করে ফেলছি কতই না কল্পনা, পরিকল্পনা আর জল্পনা নিয়ে। এই ছোট বিন্দুসমেত পৃথিবীতে একটি গোত্র আরেক গোত্রে বিরুদ্ধে, একটি দেশ আরেকটি দেশের বিপক্ষে, মানুষ তার মানুষের বিপরীতে লড়াই করেই চলছে, আর যা নিয়ে লড়াই করে চলছে, যার শেষ পরিনতি কিন্তু কেহই সাথে নিতে পারে না। এই ছোট একটা খাচার মধ্যেই কেউ প্রেমে হতাশ হয়ে নিজের জীবন নিয়ে নিচ্ছে, কেউ কারো সম্পত্তির লোভে হিংসা হানাহানি করেই চলছে, কেউ আবার নতুন করে বাচার জন্য তীব্র প্রতিযোগিটা করছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কেউ অসুখী জীবন নিয়ে কেউ আত্তাহুতি দিচ্ছে, কেউ আবার নতুন সংসার করছে, কেউ আবার নতুন করে জন্ম নিচ্ছে। কোথাও হয়তো সন্ধ্যা হচ্ছে, কোথাও আবার হচ্ছে ব্রিষ্টি কিংবা শরতের মতো আদর্শ কোনো শীতল বাতাশ। আবার এরই মধ্যে চলছে একে অপরকে নিধনের কতই না চেষ্টা। কিন্তু একদিন আর কেহই থাকছে না।  কেউ বোবা, তার আক্ষেপ কেনো সে কথা বলতে পারে না, কেউ কানা, তার আক্ষেপ কেনো সে চোখে দেখতে পারেনা। অথচ যিনি বোবা নন, কিংবা যিনি কানা নন, তার জন্যেও এমন কিছুই ঈশ্বর কমতি রাখেন নি যা অন্য একজন পায় তো সে পায় না। এরপরেও মানুষের না আছে সেই ঈসশরের প্রতি ক্রিতজ্ঞতা, না আছে শান্তি।

আসলে আমাদের গন্তব্যটা কোথায়? সম্পদে? সম্মানে, পজিশনে? নাকি কারো উপর পূর্ন আত্মসমর্পনে? হয়তো আমাদের এই জীবনের দৃশ্যমান গল্পটা এখানেই শেষ নয়। অন্য কোনো জগতে, অন্য কোনো ফর্মে।

৩১/৫/২০২৬-৩৮ তম বিবাহ বার্ষিকী

সেই ৩০ মে ১৯৮৮ সাল।

উত্তাল আবহাওয়া, উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গন, নিজ শহর থেকে বহুদূর অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই ছিন্ন, একদিকে রাজনৈতিক হরতাল, সাথে সরকারী কার্ফিউ, অন্যদিকে দেশে চলছে আবহাওয়ার মহা ১০ নম্বর সংকেত। এরই মধ্যেই আমার জীবনে নেমে এসেছিলো জীবনের ২০ তম বিপদজনক সংকেত। কোথা থেকে কোন প্রিন্স ঢাকায় এসে আমার মিটুলকে না ভালোবেসেই বিয়ে করে সুদূর আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার পায়তারা। বাংগালীও কি এক জিনিষ। যেই আমেরিকায় থাকে বর, একেবারে গদগদ। সবাই রাজী মিটুলকে বিয়ে দিয়ে দেয়ার, শুধু বীর বাহাদূর মিটুল ছাড়া। গো ধরে বসেছিল কখন আমি তাকে উদ্ধার করে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আবার ছিনিয়ে নিয়ে যাবো।

সেনাবাহিনীতে আমার বিয়ের বয়সের এখনো শর্ত পুরন হয় নাই, সবেমাত্র সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে লেফটেন্যান্ট হয়েছি। বিয়ে করার শর্তাবলীতে আমার আরো প্রায় ৪ বছর বাকি, অসময়ে বিয়ে করলেই কোর্ট মার্শাল। শুধু কোর্ট মার্শাল নয়, একেবারে ১৪ শিকের ভিতর। আবার চাকুরীও থাকবে না। কত কত গল্প পড়েছি যে, রাজ রাজারা নাকি তাদের সিংহাসন ছেড়ে দিয়েছেন প্রেমের কারনে। আর আমি ভাবলাম, আমার না আছে সিংহাসন, না আছে সাম্রাজ্য, একটা চাকুরীই তো। তবে বিয়ে করে কেউ ১৪ শিকের ভিতরে যায়, এটা আগে কখনো শুনিনি। কিন্তু তখনকার দিনে সেনাবাহিনীর নিয়মে যাইতো। কোর্ট মার্শাল, ১৪ শিক, চাকুরী হারানো সব কিছুই তখন আমার কাছে ঐ রাজ পুত্রের সিংহাসন হারানোর মতোই যেনো ছিলো।

এমন একটা পরিস্থিতিতে আমি সেই খুলনা গিলাতলা থেকে (আমি তখন গিলাতলা সেনাবাহিনীতে কোর্ষে ছিলাম) সব কিছু ঝেরেঝুরে ঠিকই ঢাকায় চলে এসছিলাম একেবারে শুন্যহাতে, মাত্র বাসভাড়া আর রিক্সা ভাড়া নিয়ে। অবশ্য বেতনই পাই মাসে ৮৫০ টাকা, পকেট আবার ভর্তি থাকে কিভাবে? যাই হোক, যাইই ছিলো, সেটা নিয়েই আর্মির কোর্ট মার্শালের ভয় কাটিয়ে, আবহাওয়ার ১০ নম্বর মহা সংকেত পেরিয়ে উত্তাল নদ নদীতে ছোট লঞ্চ দিয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে পদ্মানদী পার হয়েছিলাম। হরতাল থাকায় কোনো বাস চলছিলো না, তাই আমি কখনো ট্রাকে, কখনো রিক্সায় আবার কখনো পায়ে হেটে অঝোর ব্রিষ্টির মধ্যে শেষ নাগাদ ঠিকই এপারের আরিচার লঞ্চ ঘাটে পৌছাই। সেখান থেকে কোনো রকমে রিক্সায় বা ট্রাকে করে মানিকগঞ্জে পৌঁছাইলেও গো ধরে থাকা বীর বাহাদূর মিটুলকে আর পাওয়া গেলো না। আবার আরেক অপারেশন, আমি আসবো জেনে ওর পরিবার তাকে লুকিয়ে ফেলেছে ঢাকার এক এজিবি কলোনীতে। কোনো রকমে ছোট দুলাভাইকে নিয়ে মিটুলের লোকেশন বের করে সেখানে ওয়ানম্যান আর্মির মতো “বিবাহ অপারেশন-১৯৮৮”।

কেউ রাজী নন, কেউ আদর তো দূরের কথা ভালোমত কথাও বলছিলো না। আমি আর মিটুল, সাথে কয়েকজন শুভাকাংখী। ন্যাটর মতো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত, করেই ফেললাম বিয়ে। সেই ৩০ মে ১৯৮৮ তারিখে বিয়ে করে তারপরের দিনই ফিরে গিয়েছিলাম আবার সেই গিলাতলা, খুলনা ক্যান্টন্মেন্ট।

আজ তার ৩৯ তম বয়সে পড়লো। তখনো বাচ্চারা সাথে ছিলো না, আজো নাই। তখন ছিলো না কারন ওদের তো জন্মই হয় নাই। আর আজ ওরা একেকজন একেক দেশে। গতকাল ৩৯তম বছরে পড়েছিলো আমাদের বিবাহের কিন্তু আমার মিসেস বাংলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হওয়াতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া তাদের কলেজে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুবার্ষিকীর প্রোগ্রাম করতে আসায় মিটুলিকে কলেজে থাকতে হয়েছিলো। তাই গতকাল ৩০ মে তে আর আমরা আমাদের বিবাহ বার্ষিকী পালন করতে পারিনি, আজ আমি আর মিটুল দুজন মিলেই শেরাটনে দুপুরের সময়টা কাটালাম। উপ্লক্ষ্য-আমাদের ৩৮ তম বিবাহ বার্ষিকী। ৩৯ এ পদার্পন।

হোটেল শেরাটনে স্নিগ্ধা সুলতানা আপাকে একটা রিজার্ভেশন করিয়েছিলাম। সাথে ছোট একটা কেক আর ফুলের তোড়া। সাধারনত হোটেল শেরাটন এগুলি করে না কিন্তু আপা চমৎকার মানুষ, নিজের উদ্যোগেই আমাকে সাহাজ্য করেছিলেন। আপাকে ধন্যবাদ।

বড় মেয়ে এবং বড় জামাই (দুজনেই ডাক্তার) খাওয়ার সময় বিদেশ থেকে ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছিলো শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। ছোট মেয়ের সময়ের সাথে আমাদের মিলছিলো না, তখন তার ওখানে রাত (আমেরিকা), ভিডিও কলেও যুক্ত হতে পারেনি। লাইফটা এই রকমই।

এক সময় সবাই থাকে, বাড়ি কিচির মিচির করে ভরপুর থাকে, আর আরেক সময় আবার শুন্য পড়ে থাকে। অনেকটা সময় পার হয়েই গেলো। ৩৯ বছর বিবাহিত জীবন। ভালো থাকুক সবাই।

 

২৬/০৫/২০২৬-সুর্য যদি আর না থাকে

ধরুন, কোনো একদিন সুর্যটা আর উদিত হলো না। সারাটা পৃথিবী একেবারেই অন্ধকার হয়ে যাবে, চাঁদও আর তার থেকে আলো দিতে পারবে না। স্বাভাবিক কৃত্রিম আলো দিয়ে হয়তো কিছুদিন টিকে থাকলেও খুব দ্রুতই মানুষ একেবারে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। খুব দ্রুত পৃথিবীর তাপমাত্রা কমতে থাকবে, জাষ্ট ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সমস্ত গাছপালা তাদের ফটোসিন্থেসিস প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। গাছপালাগুলি থেকে আমরা আর কোনো খাবার পাবো না। এক সপ্তাহের মধ্যে হয়তো পৃথিবীর তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে যাবে যে, চারিদিকে বরফে আচ্ছাদিত হয়ে উঠবে গোটা দুনিয়া। নদীনালা, সাগর মহাসাগরের পানি সবকিছু তখন বরফে পরিনত হবে। মাছ, জলজ প্রানীগুলি বরফের মধ্যে আটকা পড়ে মরতে থাকবে। কোনো বৃষ্টি হবে না, কারন পানি বাষ্প হয়ে উপরে উঠবে না, কোনো গাছ জন্মাবে না কোথাও। এক মাসের মধ্যে খাবার সংকট, জ্বালানী সংকট, অক্সিজেন সংকট, সব কিছুর সংকট তীব্র থেকে তীব্র হতে থাকবে। শুধু এটাই না, যখন সুর্যটা আর উঠবে না বা থাকবে না, তখন আমাদের এই পৃথিবীটা প্রতি সেকেন্ডে যে ৩০ কিমি বেগে সুর্যের চারিদিকে ঘুরে, সেটাও বন্ধ হয়ে সুর্‍্যের চারিদিকে না ঘুরে সরাসরি সোজা পথে চলতে থাকবে কোনো এক অজানা অনিয়মিত পথের দিকে। আর তখন যদি কোনো এক গ্রহ, উপগ্রহ কিংবা মহাকাশের সেলেশিয়াল কোনো বডির সাথে সংঘর্শ বাধে, নিমিষের মধ্যেই আমাদের এই পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে বিনাশ হয়ে যাবে। এমন একটা পরিস্থিতি কল্পনা করুন তো? তখন সবাই নিজেকে বাচানোর জন্য এতোটাই সার্থপর হয়ে উঠবে যেখানে আজকের দিনের সেই অট্টালিকা, সেই অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি কিছুই আর কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামাবে না। সবাই তখন ব্যস্ত থাকবে শুধু নিজেকে বাচানোর এক চরম সার্থপরতার দন্ধে। অথচ আমরা আজ কতই না গোত্র, ক্ষমতা কিংবা অহংকারের দাবানলে নিজেরা নিজেরাই একে অপরের উপর জুলুম করে চলছি।

ব্যাপারটা কিন্তু ভয়ংকর।

১৯/০৫/২০২৬- ভালো মানুষের ব্রেকিং পয়েন্ট

সবচেয়ে বিপজ্জনক রাগ আসে ভালো মনের মানুষের কাছ থেকে; যারা উচ্চকণ্ঠী বা আবেগপ্রবণ নয়, বরং শান্ত, ধৈর্যশীল এবং যাকে খুব বেশি উত্যক্ত করা হয়। তারা শান্ত থাকে, বারবার ক্ষমা করে দেয়। তারা বারবার ক্ষমা করে এ কারনে নয় যে, তারা দূর্বল বা অসহায় বরং তারা বারবার ক্ষমা করেন কারন তারা শান্তি বেছে নেন বলে। তারা সুযোগ দেয়, বোঝে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভার বহন করে। কিন্তু প্রত্যেক নীরব সহনশীলের একটি সীমা থাকে, প্রত্যেক শান্ত আত্মার একটি ভাঙনের মুহূর্ত থাকে। যখন সেই সীমা অতিক্রম করা হয়, তখন তা বিস্ফোরিত হয় না, বরং শেষ হয়ে যায়। কোনো তর্ক নেই, কোনো নাটক নেই, দ্বিতীয় কোনো সুযোগও তারা দেয় না, তারা তখন স্থায়ী দূরত্বে চলে যায়। আর সেটাই চূড়ান্ত। তাই দয়াকে দুর্বলতা বলে ভুল করবেন না। কারণ যে মুহূর্তে একটি ভালো হৃদয় শীতল হয়ে যায়, সেখান থেকে তারা আর ফেরে না।

১৯/০৫/২০২৬- নিজকে মুল্য দিতে

আমি একটা জিনিষ খুব সুক্ষভাবে উপল্বধি করেছি যে, যদি নিজকে মুল্য দিতে হয় তাহলে অবিলম্বে কতগুলি কাজ অভ্যাসে পরিনত করা দরকার। আর সেই অভ্যাশ গুলি

আমি অতীত নিয়ে কখনো অনুশোচনা করি না। যা হয়ে গেছে, তা তো হয়েই গেছে। আমি সেটাকে আবার নতুন করে লিখতে পারবো না। কিন্তু আমি সেই অতীত থেকে শিক্ষাটা গ্রহন করি এবং সামনের দিকে এগুতে থাকি। অনুশোচনা মানুষকে ফাদে ফেলে দেয় কিন্তু প্রজ্ঞা মানুষকে মুক্ত করে।

ভবিষ্যত নিয়েও আমি চিন্তা করি না। কারন জীবন এ পর্যন্ত আমার দিকে যা ছুড়ে দিয়েছে, আমি তার সব কিছুতেই টিকে গেছি। এরপর যা আসবে, তা সামলানোর জন্য নিজের শক্তির উপর আমি ভরষা রাখি। আমি ভয়কে প্রশ্রয় দেই না। ভয় সমস্যাকে কপ্লনা করে নিজের চিন্তার ভার বাড়িয়ে দেয় কিন্তু প্রজ্ঞা আমার সমস্যাকে সমাধান করে দেয়।

আমি কখনো অন্য মানুষের মধ্যে সুখ খুজি না। কারন কেউ আমার মধ্যে বা ভিতরে শান্তি বা সুখ স্থাপন করতে পারবে না। সত্যটা হচ্ছে-যদি আমি নিজেই আমার মধ্যে শান্তি খুজে না পাই, তাহলে আমাকে আজীবনকালই শান্তি খুজতেই থাকবো আর সেতা কখনোই পাওয়া যাবে না।

একটা সময় আমি নির্বিচারে সবার জন্য অনেক কিছুই করতে আগ্রহী হইতাম। কিন্তু একটা সময়ে এসে উপলব্ধি করেছি যে, সীমাহীন উদারতা আত্ম-বিশ্বাসঘাতকতায় পরিনিত হয় এবং যাদের জন্য এই অতিরিক্ত কিছু করার প্রবনতা আমার হৃদয়কে তাদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে। তাদের প্রত্যাশা বেড়ে যায়, আর সেখানেই ঘটে চরম ঘটনাটা। আমি যা দেই বা দিতে পারি সেটা দিয়ে আত্মসম্মান বাড়ায় না। বরং আমি যা সহ্য করতে অস্বীকার করি, সেতায় সম্ভবত আমার আত্মসম্মান বারায়। তাই আমি শুধু নিজেকে বেছে নিয়েছি এবং আমার জীবনের সব কিছু তখন থেকে আরো বেশী বদলে যাওয়া শুরু করেছে। 

২০/৫/২০২৬- উইজডমেটিক কথা

আপনি কি জানেন কে সত্যিই শেষ পর্যন্ত আপনার পাশে থাকবে? যারা আপনাকে ভালোবাসে, তাদের সবাই চিরকাল থাকে না। একটা পর্যবেক্ষন শিখায় যে, “জীবন” মানুষকে আলাদা করে দেয়, “সময়” মানুষের ভূমিকা বদলে দেয়। আপনার বাবা-মার যতই ভালোবাসা থাকুক না কেন, তারা একদিন চলেই যাবে। আপনার ভাইবোনও আপনার পাশে থাকবে না, কারণ সবাই একসময় নিজের নিজের পথেই চলে যায়, আর আপনার সন্তানরাও আপনার পাশে থাকবে না, তারা বড় হয়ে যায়, নিজেদের জীবন গড়ে তোলার জন্য সংগ্রাম সংগ্রাম শুরু করে এবং তাদের তো সেটাই করার কথা।

যে মানুষটি দিনের পর দিন সত্যিই আপনার পাশে থাকে, সে হলো আপনার সঙ্গী; যে আপনাকে ক্লান্ত দেখে, যে আপনাকে নীরবে সংগ্রাম করতে দেখে, যে ধৈর্য ধরে থাকে, যখন “জীবন” আপনার মনোবল ভেঙে দেয়। সে আপনার পাশে বসে থাকে যখন আর আপনার কথাও বের হয় না। সে ঈর্ষা ছাড়াই আপনার বিজয় উদযাপন করে এবং সে পাশে থাকে যখন সবকিছু ভেঙে পড়তে শুরু করে। শেষে যখন দেখা-সাক্ষাৎও বিরল হয়ে যায়, যখন কোলাহল হারিয়ে যায়, যখন উদযাপন ম্লান হয়ে যায়, আপনার পৃথিবী ছোট হয়ে আসে, তখনো সে আপনার পাশেই থাকে যদি আপনি সঠিক সংগী পছন্দ করে থাকেন, যদি আপনি নিজের অহংকারকে প্রশ্রয় না দিয়ে সম্পর্কটিকে রক্ষা করে থাকেন। সেই মানুষটি ভালো দিনে এবং কষ্টের দিনেও পাশে থাকবে। একারণেই আপনার সম্পর্ককে রক্ষা করা উচিত। অহংকার, মনোযোগের অভাব বা ক্ষণস্থায়ী আবেগের বশে কোনো মূল্যবান জিনিস নষ্ট করবেন না। মজবুত সম্পর্ক এমনি এমনি পাওয়া যায় না। এগুলো গড়ে ওঠে বিশ্বস্ততা, ধৈর্য এবং প্রতিদিনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে। আর এখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি, যদি আপনার এমন কেউ থাকে যে আপনার পাশে থাকে এবং আপনার জন্য লড়াই করে, জীবনের কঠিন সময়ে আপনাকে ছেড়ে না যায়, তবে তাকে গভীরভাবে মূল্য দিন, কারণ প্রকৃত বিশ্বস্ততা দুর্লভ এবং শেষ পর্যন্ত আপনার চারপাশের ভিড়ের চেয়ে আপনার পাশের মানুষটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২০/৫/২০২৬- উইজডমেটিক কথা

সচরাচর আমাদের দেখা সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তিটি কে জানেন? তিনি হলে সেই ব্যক্তি যিনি একাই প্রতিকূল অবস্থা থেকে সেরে উঠেছেন। সহিংসতার কারণে তিনি বিপজ্জনক নন, বিপজ্জনক এই কারণে যে, তিনি কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। জীবনের কোনো একটা সময় তিনি নিজেকে একেবারে তলানিতে দেখেছেন এবং কারো কোনো সাহাজ্য ছাড়াই সেখান থেকে আবার উঠে এসেছেন। ফলে অন্যের মতামত তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কারণ তিনি ইতিমধ্যেই নিজের মনের সবচেয়ে খারাপ রূপটির মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি আর পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় পান না। তিনি ইতিমধ্যেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পতিত হয়ে তা থেকে একাই সফল হয়ে ফিরেছেন। তিনি আর অন্যের স্বীকৃতি খোঁজেন না। তিনি কারো অনুমোদন ছাড়াই শক্তভাবে দাঁড়াতে শিখেছেন। তিনি কারো পেছনে ছোটেন না; তিনি জানেন, যা থাকার তা থাকবেই, আর যা থাকার নয় সেটা থাকবেও না। তাকে প্রভাবিত করা যায় না, কারণ তিনি ইতিমধ্যেই নিজের ভেতরের অন্ধকার দিকগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি একাকীত্বকে ভয় পান না কারন তিনি নীরবতার সাথে শান্তি স্থাপন করেছেন এবং সেখানেই শক্তি খুঁজে পেয়েছেন। আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি যে, আপনি এমন কাউকে ভাঙতে পারবেন না যিনি ইতিমধ্যেই ভেঙে গিয়ে নিজেকে আরও শক্তিশালী করে নতুন করে গড়ে তুলেছেন।

২০/৫/২০২৬- মির্জা গালিবের কথা

আমাকে কষ্ট দিয়ে খোদার কাছে সুখ চাও? খোদা কিন্তু আমারো। যাকে কষ্ট দিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা হয় স্রিষ্টিকর্তা কিন্তু তারও। যার হৃদয় ভাংগা হয়, তার দীর্ঘশাসও আকাশে পৌঁছে যায়। নীরবে ঝরে পড়া অশ্রুরও হিসাব থাকে অদৃশ্য খাতায়। কারো রাত অন্ধকার করে নিজের ভোর আলোকিত হয় না কখনো। কারো বিশ্বাস ভেংগে শান্তি কেনা যায় না কখনো। কারন বিচার শুধু মোনাজাতে নয়, বিচার লুকিয়ে থাকে প্রতিটি ভাংগা বিসশাহসে। স্রিষ্টিকর্তা কারোর একার নয়। প্রার্থনার শব্দের চেয়ে ভাংগা হৃদয়ের আর্তনাদকে স্রিষ্টিকর্তা আগে শোনেন।

24.5.2026- সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিশোধ আসলে

সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিশোধ আসলে কোনো প্রতিশোধই নয়। এটি হলো নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং যা আপনাকে টেনে নামাতে চায় তার ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানো। এখানে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই আপনার শত্রুদের পরাজিত সহজ। সেক্ষেত্রে চুপ বা সাইলেন্ট থাকুন। একজন ভালো মানুষ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে তর্ক করে সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নাই। আপনি নিজেই একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠুন, আপনার কথা নয়, আপনার জীবনই কথা বলুক। কখনো নিজেকে সঠিক প্রমাণ করবেন না। শক্তিশালী মানুষেরা ব্যাখ্যা দেয় না। তারা কাজ করে এবং বাস্তবতাকে উত্তর দিতে দেয়। যাদের উপর আপনি প্রতিশোধ নিতে চান, তাদের থেকে সরে যান। আপনার অনুপস্থিতির চেয়ে বেশি আর কিছুই মানুষকে বিভ্রান্ত করে না। দূরত্বই শক্তি। কিন্তু তাদের সাথে সদয়ভাবে সাড়া দিন, কারণ তারা এর যোগ্য বলে নয়, বরং আপনি তাদের মতো হতে অস্বীকার করেন বলে। বড় অস্ত্র হলো-তাদেরকে ছাড়িয়ে যান। এত উঁচুতে উঠুন যে তারা আর আপনার নাগাল পাবে না। উন্নতিই হলো চূড়ান্ত বিচ্ছেদ। তাদের আক্রমণের মুখে শান্ত থাকুন। একটি শান্ত মন অস্পৃশ্য, আর তারা আপনাকে পুড়িয়ে মারলেও আপনি স্থির থাকুন সময়ই তাদের মুখোশ উন্মোচন করবে। সত্য তাড়াহুড়ো করে না, কিন্তু তা ঠিকই এসে পৌঁছায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, আপনি অন্যকে ধ্বংস করে জিততে পারবেন না। নিজেকে আয়ত্তে আনার মাধ্যমেই আপনি জয়ী হন, কারণ যে মুহূর্তে আপনি তাদের ঊর্ধ্বে ওঠেন, আপনার জগতে তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

25.5.2026-এমন কাউকে বিয়ে করবেন না যার সাথে

এমন কাউকে বিয়ে করবেন না যার সাথে আপনি মজা করতে পারেন। তাকেই বিয়ে করুন যার সাথে আপনি কষ্ট ভাগ করে নিতে পারেন। জীবন যখন সহজ থাকে, যখন টাকা-পয়সা আসতে থাকে, যখন ঘর শান্তিতে থাকে, যখন সবকিছু হালকা মনে হয়, তখন যে কেউ আপনাকে ভালোবাসতে পারে। এই ধরনের ভালোবাসা সহজ। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা আরামে প্রকাশ পায় না। এটি প্রকাশ পায় যখন জীবন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, যখন বিল পরিশোধে দেরি হয়, যখন হাসপাতালের ঘরগুলো ঠান্ডা হয়ে যায়, যখন ভয় ঘরে ঢুকে পড়ে, যখন ভবিষ্যৎ আর নিরাপদ মনে হয় না। রোমান্স মানে ছুটি কাটানো নয়, ছবি তোলা নয়, নিখুঁত মুহূর্তও নয়। রোমান্স হলো সে, যে ভোর ৩টায় জরুরি বিভাগে আপনার পাশে বসে থাকে, যে আপনার ভয়ের মুহূর্তে আপনার হাত ধরে রাখে, যে আপনার ক্লান্ত, ভেঙে পড়া, কঠিন রূপটির দিকে তাকিয়েও থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়; সহজ বলে নয়, বরং তার ভালোবাসার শিকড় আছে বলে। আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি, এমন একজনকে বেছে নিন যে জীবন যখন সুন্দর থাকে না, তখন হারিয়ে যায় না। কারণ প্রকৃত ভালোবাসা হাসিতে নিজেকে প্রমাণ করে না, এটি নিজেকে প্রমাণ করে সেই মুহূর্তে, যখন চলে যাওয়াটা সহজতর মনে হয়।

25.5.2026-এটা শিখতে আমার ৬০ বছর লেগেছে।

পৃথিবী আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা বুঝতে সারাজীবন লেগে যায় যে এর বেশিরভাগই কোলাহল মাত্র। এইগুলো সেই সত্য যা শিখতে আমার সাধারণত ৬০ বছর সময় লেগেছে।

১. আত্মস্থ করুন এবং নেতৃত্ব দিন। সময় টাকা নয়। সময়ই জীবন। আপনি সবসময় আরও এক ডলার উপার্জন করতে পারেন কিন্তু একটি সেকেন্ডও ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। গুরুত্বহীন জিনিসের পেছনে আপনার জীবন ব্যয় করা বন্ধ করুন। রাজা যেমন তার ফটক পাহারা দেয়, তেমনি আপনার সময়কে পাহারা দিন। যদি এটি আপনার শান্তি বা উদ্দেশ্য যোগ না করে, তবে এটি আপনার সময় পাওয়ার যোগ্য নয়।

২. স্বাস্থ্য হলো একটি মুকুট যা কেবল অসুস্থরাই দেখতে পায়। আমরা সম্পদ অর্জনের জন্য আমাদের স্বাস্থ্য উৎসর্গ করি এবং সেই সম্পদ ব্যয় করি আমাদের স্বাস্থ্য ফিরে পেতে। পুনর্গঠন শুরু করার জন্য ভাঙনের অপেক্ষা করবেন না। আপনার শরীরই একমাত্র ঘর যেখানে আপনি থাকতে বাধ্য। মন্দিরের মতো একে সম্মান দিন।

৩. আপনার চরিত্রই আপনার প্রকৃত নিয়তি। খ্যাতি হলো মানুষ আপনার সম্পর্কে যা ভাবে, আর চরিত্র হলো আপনি তখন কে যখন কেউ আপনাকে দেখছে না। শেষ পর্যন্ত আপনি সমালোচকদের মনে রাখবেন না কিন্তু আপনাকে আয়নার মানুষটির সাথে বাঁচতে হবে। এমন এক অটল চরিত্র গড়ুন এবং এমন এক নাম রাখুন যার একটি অর্থ আছে।

৪. অনুশোচনার ওজন টন টন, আর শৃঙ্খলার ওজন আউন্স আউন্স। কঠোর পরিশ্রমের কষ্ট ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ‘যদি এমন হতো’ এই ভাবনা চিরস্থায়ী। আজ কঠিন কাজটি করুন, আগামীকাল আপনার ভবিষ্যৎ সত্তা আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে। দক্ষতা হলো বছরের পর বছর ধরে বারবার করা ছোট ছোট সুশৃঙ্খল সিদ্ধান্তের ফল।

৫. সম্পর্কই একমাত্র প্রকৃত সম্পদ। জীবনের শেষে আপনি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের দিকে তাকাবেন না, আপনি আপনার প্রিয়জনের হাত খুঁজবেন। ক্যারিয়ার গড়তে এতটাই ব্যস্ত হবেন না যে একটি ঘর গড়তে ভুলে যান। সাফল্য অর্থহীন যদি তা ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ না থাকে।

৬. ভয় মিথ্যাবাদী, কিন্তু অনুশোচনা হলো সত্য। আমরা যা ভয় পাই তার বেশিরভাগই কখনো ঘটে না। কিন্তু যে জিনিসগুলো চেষ্টা করতে আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম, সেগুলোই বৃদ্ধ বয়সে ভূতের মতো তাড়া করে ফেরে। ভয় কেবল একটি অনুভূতি, কিন্তু নিষ্ক্রিয়তা একটি সিদ্ধান্ত। ঝুঁকি নিন, মহাবিশ্ব সাহসীকে পুরস্কৃত করে, আরামপ্রিয়কে নয়।

৭. নীরবতাই প্রায়শই সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর। আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো প্রতিটি তর্কে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিপক্কতা হলো কোনো কিছু প্রমাণ করার তাগিদ ছাড়াই নাটকীয় পরিস্থিতি থেকে সরে আসতে শেখা। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন, নইলে আবেগই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

৮. জীবন নিজেকে খুঁজে বের করার বিষয় নয়, বরং নিজেকে তৈরি করার বিষয়। প্রতি সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়, কলমটি আপনার হাতেই থাকে।

25.5.2026-মানুষের সাথে আপনার আকস্মিকভাবে দেখা হয় না।

মানুষের সাথে আপনার আকস্মিকভাবে দেখা হয় না। প্রত্যেক ব্যক্তিই একটি উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার জীবনে আসে। কেউ থেকে যায়, কেউ চলে যায়, কিন্তু তাদের কেউই অর্থহীন নয়। আপনার জীবনে মানুষের আগমনের ৫টি কারণ নিচে দেওয়া হলো:

১. কেউ কেউ আসে কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা এবং হতাশার মাধ্যমে আপনাকে একটি শিক্ষা দিতে। আপনি সীমা, আত্মসম্মান এবং শক্তি অর্জন করতে শেখেন। মুহূর্তটি কষ্টদায়ক হলেও শিক্ষাটি থেকে যায়।

২. কেউ কেউ আসে আপনার আসল সত্তাকে প্রকাশ করতে। তারা আপনার ধৈর্য, ​​আপনার মূল্যবোধ, আপনার চরিত্র পরীক্ষা করে। তারা আপনার এমন কিছু দিক উন্মোচন করে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনি নিজেও জানতেন না।

৩. কেউ কেউ আসে আপনার যাত্রাপথে সমর্থন জানাতে। জীবন যখন কঠিন হয়ে ওঠে, তখন খুব কম মানুষই আপনার পাশে দাঁড়ায়। তারা আপনাকে মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বস্ততা এখনও বিদ্যমান।

৪. কেউ কেউ আসে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তারা একটি অধ্যায়ের সঙ্গী হয় এবং তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়। শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত থাকার জন্য সবাই আসে না।

৫. কেউ কেউ আসে আপনার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করতে। একটি কথোপকথন, একটি মুহূর্ত। আপনার পুরো পথ বদলে দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। আর এখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি, যারা চলে গেছে তাদের জন্য অনুশোচনা করবেন না, তারা আপনাকে যা শিখিয়েছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন, কারণ প্রত্যেক ব্যক্তিই হয় আপনার জীবনে নতুন কিছু যোগ করে অথবা আপনাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে। আসলে কোনো কিছুই দৈবচয়নের ফল নয়। জীবন মানুষকে শিক্ষক হিসেবে ব্যবহার করে।

25.5.2026-যে মুহূর্তে আমি পিছু ধাওয়া করা বন্ধ করলাম

যে মুহূর্তে আমি পিছু ধাওয়া করা বন্ধ করলাম, আমার জীবনটা সহজ হয়ে গেল। আর কোনো জোর করা নয়, আর কোনো অনুনয় নয়, একতরফা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিজেকে আর নিঃশেষ করা নয়। যদি সম্পর্কটা খাঁটি হয়, আমি তার সাথে তাল মেলাব। যদি দূরত্ব থাকে, আমি সেই দূরত্বকে সম্মান করব। তুমি আমার সাথে কথা বললে, আমিও তোমার সাথে কথা বলব। তুমি চুপ হয়ে গেলে, আমি পিছু ধাওয়া করব না। শান্তি মনোযোগের জন্য ভিক্ষা করে না। আমি নিজেকে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করা বন্ধ করে দিয়েছি। সঠিক মানুষেরা ধারাবাহিকতা বোঝে, ক্রমাগত কৈফিয়ত দেওয়া নয়। আমি আর জোর করে সম্পর্ক তৈরি করি না। সত্যিকারের আনুগত্য স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠে, জোর করে তৈরি করা যেকোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। আমি আমার ভাবমূর্তির চেয়ে আমার শান্তিকে বেশি রক্ষা করি। প্রতিটি বার্তার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রতিটি নীরবতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করার দরকার নেই। আমি মরা গাছে জল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। প্রচেষ্টাই আসল এবং একতরফা শক্তি সবসময় সত্যকে প্রকাশ করে দেয়। আমি আর দূরত্বকে ভয় পাই না, কিছু মানুষ হারিয়ে যায়, যাতে আপনার জীবন আরও শান্ত, স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী হতে পারে। আমি এখন শক্তিকে প্রতিফলিত করি। সম্মান সম্মান এনে দেয়, দূরত্ব দূরত্ব এনে দেয় এবং আনুগত্য আনুগত্য এনে দেয়। আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি, এটা অহংকার নয়, এটা শান্তি। যা আর স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হয় না, তাকে জোর করে টিকিয়ে রাখা বন্ধ করার মুহূর্তেই আপনার কষ্ট থেমে যায়।

11.5.2026 Zarif Files

This content is password-protected. To view it, please enter the password below.

আমার মা

মিসেস হামিদা খাতুন, স্বামীর নাম-মোঃ হোসেন আলি মাদবর, ঠিকানা-নতুন বাক্তার চর, থানা-দক্ষিন কেরানীগঞ্জ, ঢাকা। তিনি আমার মা। আমার মায়ের বংশ ধারাটা এই রকমের। জনাব আহাদুল এর ছেলে হাজি আসাদ উল্লাহর তিন পুত্র (১) জনাব উম্মেদ আলী মুন্সি (২) হাছান আলী মুন্সী (৩) ছলিম উদ্দিন মুন্সী। জনাব উম্মেদ আলীর ছিলো চার ছেলে সন্তান। তারা ছিলেন (১) কুদরত আলী (২) লস্কর আলী (৩) চেরাগ আলী (৪) কেরামত আলী। এই কেরামত আলী ছিলেন আমার নানা অর্থাৎ আমার মায়ের পিতা। উক্ত নানা কেরামত আলীর কোনো পুত্র সন্তান ছিলো না। তার মাত্র দুইজন কন্যা (১) আমার মা (২) আমার খালা সামিদা খাতুন।

মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এক ছেলের মা হয়ে বিধবা হন। খুব বড় লোকের মেয়ে নন বটে কিন্তু মাঝারী পরিবারের বনেদি ঘরের মহিলা। যেই সময়ের কথা বলছি, তখন ১৫ বছর অতিক্রম করলেই গ্রামের মধ্যে আইবুড়ি হয়ে আছে মেয়ে এই রকম একটা অপবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে যদি আবার নিয়তির কারনে কেউ এতো অল্প বয়সেই বিধবা হন, তার তো জীবনটাই যেনো কি রকম দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা জানে শুধু যে সাফার করে সে আর জানে সেই পরিবার যেই পরিবারে এটা ঘটছে। অতঃপর দ্বিতীয় বিয়ে হয় আমার বাবার সাথে। বিস্তর বয়সের তফাত ছিলো আমার বাবার সাথে আমার মায়ের। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় কি দুই তখন আমার বাবা মারা যান। আমি আমার বাবাকে দেখি নাই, এমন কি আমাদের কারো কাছেই আমার বাবার কোনো ছবিও নাই। আমার মা যখন আমার বাবাকে বিয়ে করেন, তখন তার প্রথম পক্ষের ছেলে বিল্লাল হোসেন কে আমাদের ই গ্রামের পাশের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পালক দিয়ে দেন। আমার মা আমার বাবার এমন একটা সংসারে পদার্পণ করেন যেখানে আমার বাবার আগের পক্ষেরই সন্তান ছিলো গোটা আট জন। তাদের সবার বয়স আমার মায়ের থেকে অধিক। এই সন্তানেরা আমার মাকে কোনদিনই আপন করে ভাবতে পারেন নাই। আমার বাবা ছিলেন মাদবর যিনি সারাক্ষনই গ্রামের মাদবরি আর তার জমিজমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এমনই এক সংসারে মা একটানা সংসার করেছেন। আমাদের এই ঘরে পরপর তিন ছেলে আর পাচ কন্যার জন্ম দেন আমার মা। সবার বড় আমার বোন, যার নাম সাফিয়া, তার ছোট শায়েস্তা, এর পরই জন্ম নেয় আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ, তারপর জন্ম নেয় আমার পর পর তিন বোন যথাক্রমে লায়লা, ফাতেমা আর মেহেরুন্নেসা। এতোগুলি মেয়ের পর আমার মার কোল জুড়ে আসে আরেক পুত্র সন্তান কিন্তু সে এই পৃথিবীতে বেশীদিন টিকে থাকতে পারে নাই। তারপরের মানুষটিই হচ্ছি আমি। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় বা দুই, তারপরে আমার বাবা জান্নাতবাসী হন। ফলে আমিই হলাম আমার পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। আমার মা আর বিয়ের সপ্ন দেখেননি। আমাদেরকে নিয়েই তিনি তার সমস্ত ধ্যান ধারনা আর সপ্ন লালিত করেছেন। আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। আমার মায়ের পরিবারের কাউকেই আমার মনে নাই। বরং বলতে পারেন, আমি কাউকেই দেখি নাই। আমার জন্মের আগেই সব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি না দেখেছি আমার দাদি, দাদা, নানা, বা নানি, কিংবা কোনো মামা, মামিকে। কি আজব, না? আসলেই আজব। এমনটা কি কখনো হয়? কিন্তু হয়েছে। আমাদের আদিবাড়ি আছে মুন্সীগঞ্জ জেলার কয়রাখোলায় যা বর্তমানে সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্গত। আমাদের ঐ বাড়িটি আসলে ছিলো আমার নানার প্রাপ্য জমিটাতে। কিভাবে আমার বাবা আমার নানার জমিতে এতো বড় বাড়ি করলো এবং কেনো উনি তার এতো সম্পদ থাকতেও নিজের সম্পত্তিতে কোনো বাড়ি করেন নাই সেটা আমার আজো জানা হয় নাই। পরবর্তীতে আমরা মাইগ্রেট করে কয়রাখোলা থেকে কেরানীগঞ্জ চলে আসি। ফলে আমাদের এখন দুটু গ্রামের বাড়ি- এক) কয়রাখোলা, ২) কেরানীগঞ্জ। 

রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড

রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড একটি ১০০% রপ্তানীমূলক সুয়েটার্স তৈরির প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সাথে আমি প্রথমে ২০০৫ সালে ৩০% শেয়ার নিয়ে জনাব নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে পার্টনারশীপ ব্যবসা শুরু করি, যদিও অত্র প্রতিষ্ঠান টি ২০০৩ সালে গঠিত হয়। অতঃপর ২০০৬ সালে নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে বাকী ৭০% শেয়ারও ক্রয় করিয়া জনাব নাজিমুদ্দিনকে অব্যাহতি দেই। এই সময়ে জনাব নাজিমুদ্দিনের সাথে আমার হাসনাবাদ সুপার মার্কেটের ভবনের যে স্থানে গার্মেন্টস অবস্থিত, তা ৩ বছরের মেয়াদে ভাড়ায় চুক্তিবদ্ধ একটা চুক্তি হয়। এবং তাহাকে বেশ কিছু বড় অংকের টাকা অগ্রিম প্রদান করি। অতঃপর, ১০০% শেয়ার নেওয়ার সময় আমি বিনা টাকায় জনাব মোহসীন শাহীন নামে এক ভদ্রলোককে আমার পার্টনারশীপ দেই, আর সেটার পরিমান ছিলো ৩০%। তাকে আমি এই ৩০% শেয়ার এই মর্মে বিনা টাকায় দিয়েছিলাম যাতে তিনি গার্মেন্টস ব্যবসাটি সুন্দরভাবে চালান এবং এর উন্নতি করেন। এখানে বলা বাহুল্য যে, জনাব মোহসীন আগে থেকেই এই সেক্টরে কাজ ছিলেন এবং অভিজ্ঞ ছিলেন।

কিন্তু আমার এক্সপেক্টেশনের সাথে জনাব মোহসীন সাহেব গার্মেন্টস এর উন্নতি করতে না পারায় আমি ধীরে ধীরে লস টানতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হবার উপক্রম হয়। একদিকে নিজের সব সঞ্চিত টাকা, স্ত্রীর যত সঞ্চিত টাকা, এবং অনেক আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ৫০/৬০ লক্ষ টাকার দেনার মধ্যে পড়ি। কোনো উপায়ন্তর না দেখে শেষ অবধি আমি ডিসিশন নেই যে, আমি আর অত্র রিভার সাইড ফ্যাক্টরীটি চালাবো না। এতে যেটা হবে তা হচ্ছে, আমি ব্যাংকের লোন টা (প্রায় ৩ কোটির মতো) আপাতত সামাল দিতে পারবো, কিন্তু আমি যে আমার আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছি, সেটা দিতে পারবো না। তার পরেও আমি এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। কারন, যদি আমি ফ্যাক্টরী চালাই, তাহলে প্রতিমাসে লস হচ্ছিলো প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো। আর যদি না চালাই, তাহলে এই লস টা থেকে বেচে যাই। আর আমার পক্ষে লস দিয়ে তাকার যোগা দেওয়া ও আর যাচ্ছিলো না। মোহসীন সাহেব যেহেতু কোনো কন্ট্রিবুসন করেন না বা করতে পারবেন ও না, ফলে তার কোনো চিন্তাও নাই আবার ফ্যাক্টরী বন্ধ হোক এটাও তিনি চাচ্ছেন না। কিন্তু আমি বুঝতেছিলাম, আমার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে।

এমন সময় মিষ্টার মূর্তজা এবং মিষ্টার প্রিয়ান্থা (শ্রীলংকার) এই দুইজন আমাদের ফ্যাক্টরি মাত্র ২ কোটি তাকার বিনিময়ে কিনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। শর্ত থাকে যে, তারা ব্যাংকের লোন রি-সিডিউলিং করে নেবেন, এবং কিস্তিতে তা পরিশোধ করবেন। আমাদের যতো আউট স্ট্যান্ডিং বকেয়া আছে (যেমন শ্রমিকদের বেতন, গ্যাস বিল, কারেন্ট বিল, এবং অন্যান্য) এর বিপরীতে প্রায় ৭০/৮০ লাখের মতো হবে তা দিয়ে দেবেন। আমার যেহেতু এই ফ্যাক্টরী চালানোর কোনো সক্ষমতা ছিলো না, আর চালাইতেও চাচ্ছিলাম না, ফলে যেই রকম ডিল ই হোক, তাতে আমি মেনেই গেলাম।

তারা ধীরে ধীরে ফ্যাক্টরীকে তাদের মতো করে সাজাতে শুরু করলেন, আমি মুটামুটি বেকার। বাসাতেই বেশীর ভাগ সময়কাটাই, কিংবা আশেপাশে ঘুরি। অনেক চিন্তায় ছিলাম, কি করা যায় এটা নিয়ে।

বাইবেলে রঙ এর ব্যাখ্যা

বাইবেলে সাদা, কালো, হলুদ এবং সম্ভবত মিক্সড এই কয়েকটি কালারের কথা বোলা আছে। অনেকদিন আগে আমি বাইবেলের প্রায় ৭টা ভার্সন পরেছিলাম। লুকের, মেথিউজ, আর্কের এবং অল্ড টেস্টামেন সহ নিউ টেস্টামেন্ট।

অল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্ট টা অনেকে হয়ত বুঝবে কিনা আমি জানি না তবে এটা জানা ভাল। তো আমি পড়ে এটা সম্পর্কে একটু ধারনা দেব যদি কেউ জানতে চায়।  

 তো বলি এবার, কালারের কথাগুলো।

বাইবেলের কোন এক জায়গায় লিখা আছে যে, "ইয়াহি অনেক দূর থেকে তোমাদের জন্য এক রাজ্য নিয়ে আসবে যে দেশের লোক হবে খুবই তড়িৎগতি সম্পুন্ন ইগলের মত, যাদের ভাষা তোমরা বুঝতে পারবে না এবং যারা হবে যুদ্ধ প্রিয় মানুষ। তারা বড়দের সম্মান করবে না, এবং ছোটদেরকেও এরা কোন ফেবার করবে না। তারা প্রুচুর মাংশভুজি হবে, তারা তোমাদের জন্য কোন শস্যক্ষেত খালি রাখবে না মদ তৈরির করার জন্য। এদেরকে বোলা হয়েছে হলুদ মানুষ। এখানে আরও একটা কথা বোলা দরকার যে, বাইবেল বলে যে, ঐ সময় জেসাস এসে তোমাদের সাহায্য করবেন এবং নতুন রাজ্য সৃষ্টি করবেন যার নাম হবে মিলেনিয়াম রাজ্য।  

বাইবেলের আরেক ভার্সনে বোলা আছে যে, "তোমার যত পূর্বে যাবে তত হলুদ বিপদের মানুষের সঙ্গে তোমাদের দেখা হবে"। ইন ফ্যাক্ট এই মিথ তাঁর অর্থ অনেক রকমের। কেউ মনে করে এই মিথ টা এসেছে " দি কিংস ফ্রম দি ইস্ট" কনসেপ্ট থেকে। এর মানে এই যে, ইউফ্রেটিস নদির পূর্ব তীরের মানুষ গুলোর কথা বোলা হয়েছে। এর মানে চীন। কিন্তু অনেকে আরও দূর ব্যাখ্যা দিয়ে বলে যে চীনের পর এবং পূর্বেও হচ্ছে আমেরিকা।আবার অনেকে মনে করে যে, ইউফ্রেটিসের পূর্বে বাগদাদ বা তেহরানও আছে যারা ইসলামিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে দিনে দিনে।

 এখানে বাইবেলের অন্যান কালারের ব্যাপারে আরও কিছু মজার মিথ প্রচলন আছে। যেমন, ঈশ্বর যখন প্রথম মানুষ তৈরি করেন, তখন তাঁর কালার খুবই কাল হয়ে গিয়েছিল। তখন তিনি আবার আরও একজন মানুষ তৈরি করেন, তখন সেটা হয়ে ছিল অনেক সাদা। তখন তিনি তৃতীয় বার চেস্টার পর যে মানুষটি তৈরি হল, সেতা না কাল  না সাদা। ওটা প্রায় এসিয়ান টাইপের। এটা অনেকে জোক মনে করেন কারন এই কনসেপ্টটা সব ভার্সনে পাওয়া যায় না।

 তবে অরিজিনাল বাইবেলে মাত্র ৪ বার হলুদ কালারটা ব্যবহার করা হয়েছে। ৩ বার ই ব্যবহার হয়েছে ধর্ম জাজকের দ্বারা রোগ নির্ণয় করার কারনে বা ব্যাপারে। আর ৪র্থ বার ব্যবহার করা হয়েছে ইয়েলো গোল্ড বুঝানোর জন্য।

কোন একটা ভার্সনে (আমার ঠিক মনে নাই এখন) বলা হয়েছে যে, Gold or Yellow: Symbolizes the Glory of God ; divine nature; holiness; eternal deity; the Godhead; Purification; majesty; righteousness; divine light; kingliness; trial by fire; mercy; power; His Deity; Glory. Yellow or Gold is also primary. It always speaks of trial and purging. "That trial of your faith, being much more precious than of gold that perishes, though it be tried with fire, might be found unto praise and honour and glory at the appearing of Jesus Christ"

 বাইবেলের বিশেষ করে লেভিক্টাসে কালারের কিছু মিনিগ সরাসরি বোলা হয়েছিল। যেমন ধরঃ কাল মানে পাপ, মৃত্যু, খোঁড়া, দুঃখ কিন্তু এখানে চুল কে ওর মধ্যে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

নিল কালারকে বোলা হয়েছে যে, পবিত্র জায়গায় যা যা রাখা হবে তাঁর কালার হতে হবে নীল। এটা ধনী ব্যাক্তির জন্য ও ব্যবহার করার রিতি আছে। এটা হচ্ছে হেভেনলি কালার।

সবুজ কালারকে জীবনের কালার বোলা হয় অর্থাৎ যা সবুজ তাতেই প্রান আছে বোলা হয়।

The color red in the Bible means love, forgiveness, or even blood sacrifice. Red in the Bible meant the chosen people whose doors were paintef red were to be kept alive and the doors that were not painted were killed

এবার আসি অল্ড টেস্টামেন্ট এবং নিউ টেস্টামেন্ট কি

একদম সবচেয়ে বিশাল পার্থক্য হচ্ছে অল্ড টেস্টামেন্টে জিশুর আবির্ভাব আর নিউ টেস্টামেন্টে এটার অভাব। The Old Testament provides the history of a people; the New Testament focus is on a Person. The Old Testament shows the wrath of God against sin (with glimpses of His grace); the New Testament shows the grace of God toward sinners (with glimpses of His wrath). The Old Testament predicts a Messiah (see Isaiah 53), and the New Testament reveals who the Messiah is (John 4:25–26). The Old Testament records the giving of God’s Law, and the New Testament shows how Jesus the Messiah fulfilled that Law (Matthew 5:17; Hebrews 10:9). In the Old Testament, God’s dealings are mainly with His chosen people, the Jews; in the New Testament, God’s dealings are mainly with His church (Matthew 16:18). Physical blessings promised under the Old Covenant (Deuteronomy 29:9) give way to spiritual blessings under the New Covenant (Ephesians 1:3). The Old Testament saw paradise lost for Adam; the New Testament shows how paradise is regained through the second Adam (Christ). The Old Testament declares that man was separated from God through sin (Genesis 3), and the New Testament declares that man can be restored in his relationship to God (Romans 3—6). The Old Testament predicted the Messiah’s life. The Gospels record Jesus’ life, and the Epistles interpret His life and how we are to respond to all He has done. In summary, the Old Testament lays the foundation for the coming of the Messiah who would sacrifice Himself for the sins of the world (1 John 2:2). The New Testament records the ministry of Jesus Christ and then looks back on what He did and how we are to respond. Both testaments reveal the same holy, merciful, and righteous God who condemns sin but desires to save sinners through an atoning sacrifice.

ফান্ডামেন্টালিজম এবং ওয়্যার এগেইনস্ট টেরর

ফান্ডামেন্টালিজম শব্দটি একটি প্রোটেস্টেন টার্ম। এটি "দি ফান্ডামেন্টালসঃ এ টেস্টিমনি টু দি ট্রুথ" নামক ১৯০৯ সালের একটা পাব্লিকেসন থেকে নেওয়া। আর এই টাইটেলটি বিশেষভাবে ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্টাইন ক্রিশ্চিয়ানদের জন্যই প্রযোজ্য। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের দিকে যখন বিভিন্ন স্পিরিচুয়াল ধর্মজাযকগন তাদের যোগপোযোগী মনগড়া আধ্যাত্মিক বিশ্বাসসমুহকে বাইবেলের মধ্যে একে একে অন্তর্গত করছিলেন, শুধু তাই নয়, ওই সময়ে ডারউইনের থিউরি, এবং তখনকার আধুনিক বিব্লিক্যাল মতবাদ এবং তারসঙ্গে স্পিরিচুয়াল ধর্মযাজকদের আরোপিত এবং রচিত মতবাদে বাইবেলের নিজস্ব স্বকীয়তা অনেকটাই ম্লান হতে বসেছিলো। তখন ক্রিশ্চিয়ানদের এই অংশটি ওইসব বাইবেলের উপর থেকে সরে এসে একটি গোত্র কিংবা অন্য কথায় সাব-কালচার তৈরি করেন আর এদেরকেই তখন "ফান্ডামেন্টাল" নামে মুল্যায়ন করা হয়। তাদের মতে, বাইবেল একটি পবিত্র গ্রন্থ, ঈশ্বরের বানী, তারমধ্যে কোনো কিছুই যোজন বা বিয়োজন করার অবকাশ নাই এবং এটা ভুল থেকে মুক্ত। 

খোদ আমেরিকার দুইভাই কার্টিস লি এবং মিল্টন স্টুয়ার্ড উভয়ে যৌথভাবে উক্ত ফান্ডামেন্টালিস্ট দলটিকে একত্রিভুত করেন। তাদের প্রথম এবং প্রাইমারী দায়িত্ব ছিলো পবিত্র বাইবেলের স্বকীয়তাকে বিকৃত হওয়া থেকে রক্ষা করা। অতঃপর ১৯৬০ সালে ভেটিকান-২ সম্মেলনে এই ক্রিশ্চিয়ানদেরকে স্থায়ীভাবে "ফান্ডামেন্টালিস্ট" হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই মূল শব্দটি অথবা অন্য কথায় যারা ফান্ডামেন্টালিস্ট, তাঁরা পাঁচটি ব্যসিক বিশ্বাসের উপর দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলো। সেগুলু হচ্ছেঃ (১) The Virgin Birth (2) The Physical Resurrection of Jesus (3) The Infallibility of the Scruptures (4) The Substitutional Atonement (5) The Physical Second Coming of Christ. ফান্ন্ডমেন্টালিস্টরা মনে করেন যে, ধর্মচ্যুত করা বা ধর্মচ্যুত হওয়া অন্যায় এবং তাদের ধর্মের বাইরে অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদ বিশ্বাস করাও অন্যায়। অন্য কথায় এরা গোঁড়া। 

এখন ক্রিশ্চিয়ান ধর্মাবলম্বীদের না হয় আমরা ফান্ডামেন্টালিস্ট নামে অভিহিত করলাম, অন্যধর্মে তাহলে কি এই জাতীয় রক্ষণশীল ধার্মিক গোত্র নাই? তাহলে তাদেরকে কি বলা হয়? তারাও কি "ফান্ডামেন্ডালিস্ট"? যেমন, হিন্দুদের বেলায় বলা হয় "হিন্দুৎভা" বা "হিন্দুইজম"। কিন্তু "হিন্দুৎভা" মতবাদে Hindutva is understood as a way of life or a state of mind and is not to be equated with or understood as religious Hindu fundamentalism তাদের "হিন্দুৎভা"র নিজস্ব স্বকীয়তা রক্ষার জন্য পৃথক কোনো রক্ষণশীল গোত্র সৃষ্টি হয় নাই। তাদের বেলায় যা হচ্ছে তা নিতান্তই ধর্মপালনকে একটা রীতিনীতির মধ্যে সিমাবদ্ধ। যেমন, কেউ যদি হিন্দুত্ব ছেড়ে অন্য কোনো ধর্মকে আলিঙ্গন করতেও চান, তাতে তাদের ধর্মের মধ্যে কোনো বড় ধরনের আইনগত বাধা নাই। কিংবা হিন্দুধর্মের একক কোনো ঈশ্বরও নাই। একেক বিষয়ে তাঁরা একেক জনকে প্রধান ঈশ্বর মেনে থাকেন। অন্যদিকে The importance of Hindu fundamentalism lies in its very contemporary and nationalistic scope, compared to other, more regional expressions 

ইহুদিদের বেলায় ধর্মের নামে এই রক্ষণশীল ফান্ডামেন্টালিজম এর সংজ্ঞা আবার ভিন্ন। ইহুদিরা বিশ্বাস করে যে, তাদের ধর্মবচন "টানাক" বা ট্রেডিসনালি যাকে আমরা "ওল্ড টেস্টামেন্ট" বলি তার অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা বা শিক্ষাই হচ্ছে মুখ্যবিষয়। অল্প কিছু ইহুদি (যেমন কেরাইটেস গোত্র) যারা তাওরাদ ধর্মগ্রন্থের বানীসমুহ সরাসরি "টানাক" ধর্মবচনের মত অবিকল ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী নয়। কেউ কেউ হয়ত ভাবেন যে, অর্থোডক্স বা হাছিডিক ইহুদিরা এক ধরনের ফান্ডামেন্টালিস্ট। তারপরেও তাঁরা ক্রিশ্চিয়ান ফান্ডামেন্টালিস্টদের মতো অতোটা গোঁড়া নয়। তাঁরা মনে করে, তাওরাতে মোট ৬১৩টি ভিন্ন পথের মাধ্যমে ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব বলে পথ বাৎলে দিয়েছে। আবার যারা ইহুদি ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাসী নয় তাঁরাও অন্যপথে ঈশ্বরকে খুজে পাবেন বলে বিশ্বাস করেন। ওদিকে বৌদ্ধধর্মের মধ্যে ধর্মের চেয়ে জাতিভিত্তিক বা গোত্র বা এলাকাভিত্তিক দলবদ্ধটাই বেশি চোখে পড়ে। তার অর্থ দাড়ায় তাদেরকে ধর্মের পরিপ্রেক্ষিতে ফান্ডামেন্টালিস্ট হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা সঠিক কাজ হবে না। এইটুকু আলোচনা থেকে কিন্তু আমরা এই ধারনা পাই যে, শুধুমাত্র ধর্মের পবিত্র গ্রন্থের স্বকীয়তাকে বজায় রাখার জন্যই শুধু ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি পৃথক রক্ষণশীল গোত্র তৈরি হয়েছিলো যারা ফান্ডামেন্টালিস্ট নামে পরিচিত এবং অন্য কোনো ধর্মে এই প্রবনতাটা ছিলো না।  

এবার যদি ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম সম্পর্কে বলি, তাহলে Fundamentalist Islam is simply the conservative wing of Islam, just as fundamentalist Christianity is the conservative wing of Christianity. এই দুইটি দলই কিছুটা ধার্মিক প্রকৃতির গোঁড়া। ক্রিশ্চিয়ানদের বেলায় যেমন উপরে উল্লেখিত পাঁচটি মূলস্তম্ভ অনুসরন করে, ইসলামের বেলায়ও এই রক্ষণশীল মুসলমানেরা এক আল্লাহকে বিশ্বাস করেন, হজরত মুহাম্মাদ (সঃ) কে নবী মানেন, তাঁকে অনুসরন করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য প্রতিনিয়ত মসজিদে যাতায়ত করেন, রোজা, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি মূলস্তম্ভ হিসাবে অপরিহার্য হিসাবে পালন করেন। কোরআন এবং নবী যা যা করতে বলছেন, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলার রীতিই হচ্ছে মুসলমানদের জন্য সঠিক ধর্মপালন। এই মুসলমান সম্প্রদায়টি তাদের পবিত্রগ্রন্থ আল কোরআন বিকৃতি হওয়ার বা একে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, কিংবা যোজন- বিয়োজন, পরিবর্ধন করার কোনো প্রকার চেষ্টা যেমন কখনো কেউ করার চেষ্টা করেন নাই বা করার প্রয়োজনও মনে করেন না। ব্যসিক মূলমন্ত্র গুলি পালনই হচ্ছে মুসলমানদের জন্য সত্য ধর্মপালনকারী। কেউ স্ট্রিক্টলি পালন করেন আবার কেউ ঢিলেঢালাভাবে। কিন্তু মূলমন্ত্র এক। তাহলে কেউ শুদ্ধভাবে এবং স্ট্রিক্টলি প্রতিনিয়ত মূলস্তম্ভ সমুহের পালনকারী ধার্মিক হলেই কি তাদেরকে ফান্ডামেন্টালিস্ট নামে অভিহিত করা হবে? ব্যাপারটা আসলে কখনোই এই রকম নয়। সঠিকভাবে ইসলামের সব আদব কায়দা পালনকারী মুসলমান কখনো ফান্ডামেন্টালিস্ট নন এবং তিনি গোঁড়াও নন। তাঁরা অন্য কারো ধর্ম নিয়েও বাধা নিষেধ দেন না। কারন খোদ ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতিনিধিকে যথারীতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনা দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রকৃত মুসলমান পূর্ববর্তী সব প্রধান ধর্মগ্রন্থসমুহকে না মানলে বরং তিনি সহিহ মুসলমান হিসাবে গন্য হবেন না এটাই ইসলাম শিক্ষা দেয়। তারমানে তাওরাদ, জবুর, ইঞ্জিল, এবং কোরআন সব আল্লাহর পবিত্রগ্রন্থ যা পূর্ববর্তী নবীসমুহের উপর অবতীর্ণ হয়েছে এটা সয়ং কোরআন নিজে সাক্ষী দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ওইসব পবিত্র গ্রন্থ গুলি এখন আর অরিজিনাল ভাবে নাই। অনেকাংশেই পরিবর্ধন, পরিবর্তন হয়ে গেছে।  

এখানে একটি সুক্ষ বিষয় মাথায় রাখা দরকার। বিশেষ করে মুসলমানদের বেলায়। প্রতিটি মুসলমান তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন এবং তৎসংলগ্ন পাঁচটি মূলমন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই মুলস্তম্ভের মধ্যে কোনো প্রকারের দ্বিধা নাই। তাহলে মুসলমানদের মধ্যেই এতো গোত্রের আবির্ভাব হল কেনো? আর এই গোত্রগুলিই বা কারা? যেহেতু পবিত্র কোরআন একটি বৈজ্ঞানিক এবং আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জন্য পুরনাংগো জীবন ব্যবস্থা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। (তাহলে প্রশ্ন আস তে পারে যে, পূর্ববর্তী আল্লাহ প্রদত্ত গ্রন্থ গুলি কি কোর আনের মতো মানুষের জন্য পুরনাংগ জীবন ব্যবস্থা ছিলো না? হয়ত ছিলো কিন্তু তা আর আমাদের কাছে অরিজিনাল হিসাবে না থাকায় তার সত্যতা নিরুপন সম্ভব নয়)। ফলে ব্যক্তি জীবনে, সমাজ ব্যবস্থায় তথা রাষ্ট্রীয় বিধি ব্যবস্থায় সর্বত্র এই রিলিজিয়াস আইনসমুহকেই (যাকে আমরা শারিয়াহ আইন বলি) মেনে চলার বিধান বলা হয়েছে, সেকুল্যার আইনকে নয়। আর এই শারিয়াহ আইন সমুহগুলি হচ্ছে ওই সময়ের যা আমাদের নবীজির আমলে বা তাঁর আমলে পালিত হওয়া বিধিমালা অর্থাৎ সালাফি নামে আমরা যা বুঝি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুর পর এই সালাফি আইনসমুহই কিছু কিছু রি-ফরম হয়েছে যার কারনে বিভিন্ন গোত্রের বা দলের সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাদের সবারই কিন্তু মূলমন্ত্র বা স্তম্ভসমুহ এক। অর্থাৎ এখানে সঠিক কিছু সালাফি আইনের ব্যাখ্যার কারনে বা পার্থক্যের কারনে ব্যক্তি, সমাজ ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় আইন কানুনের বিধি নিষেধের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদের সৃষ্টি হয়। যেমন, শিয়া, সুন্নি, কাদিয়ানী, ইত্যাদি। কিন্তু তাদের মূলস্তম্ভ ঠিক থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই পরিবর্তনগুলি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী শুধুমাত্র ইসলামপন্থীদের মধ্যেই সিমাবদ্ধ না, এই ট্রেন্ডস সব ধর্মের মধ্যেই ধীরে ধীরে অন্তরভুক্তি হতে শুরু করে এবং এখানে আরো মজার ব্যাপার হলো, এটা আবার আর শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নাই। প্রতিনিয়তই বিবর্তনের মতো সর্বত্র একটা পরিবর্তন আসতে থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্মের স্বকীয়তা রক্ষার নামেই নয়, ধর্মের বাইরে গিয়েও এই পরিবর্তনটা কেনো আসে, সেটা নিয়েও গবেষণা হয়।  

অবশেষে, The American Academy of Arts and Sciences সাড়া পৃথিবী থেকে অধিকস্তর বিশিষ্ট স্কলারদের সমন্নয়ে একটা গবেষণামুলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সেই গবেষণামুলক পরিক্ষায় তাঁরা তথাকথিত ফান্ডামেন্টালিজম এবং ফান্ডামেন্টালিজমের বাইরে পরিবর্তনের পক্ষে-বিপক্ষে যেসব তথ্য পেয়েছেন তাঁর সারমর্মে দেখা যায় যে, উক্ত ফান্ডামেন্টালিজম চিন্তাধারাটি শুধুমাত্র আর ধর্মের গোঁড়ামির উপর স্থায়ী হয়ে রয় নাই। তাদের মতে,  

(১) তাঁরা আধুনিক কালচারকে পছন্দ করেন না। কারন তারা মনে করেন ধর্ম দ্বারা যা পালিত হওয়ার কথা, অথবা যে রীতিনীতিগুলি ধর্মগ্রন্থ থেকে চালিত হওয়ার কথা তা না হয়ে স্যাকুলার কিছু মনগড়া বৈষম্যমুলক আইনের মাধ্যমে চালিত হচ্ছে বিধায় ধর্মের সঠিক কাজটি পালিত হচ্ছে না এবং এইভাবে একদিন ধর্মটাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই আশংকা করেন। তার উপর আধুনিক কালচারের সমাজ ব্যবস্থায় তাঁরা মনে করেন যে, একটা বৈষম্যমুলক সমাজ ব্যবস্থার প্রচলন হচ্ছে যেখানে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত, কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্নবিত্ত সমাজের মানুষেরা তাদের ন্যায্য মুল্যায়ন, অধিকার, সুযোগ, সুবিধা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।  

(২) এই মধ্যবিত্ত, কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের মানুষদের ন্যায্য মুল্যায়ন, অধিকার, সুযোগ, সুবিধা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হওয়ার চিন্তাধারায় রিলিজিয়াস আইডোলোজির পাশাপাশি তখন ব্যক্তিগত এবং কম্যুউনাল আইডেন্টিটিও কাজ করে। এই ব্যক্তিগত এবং কম্যুউনাল সত্ত্বা কাজ করার কারনে পলিটিক্যাল উচ্চাকাখাংকাও জড়িয়ে যায়। আর যখন এই পলিটিক্যাল উচ্চাকাখাংকা বেড়ে যায়, তখন দলভিত্তিক রাজনীতিকিকরনের কাজটি আরম্ভ হয়ে যায়, তখন শুরু হয় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের অনুপ্রবেশ যেখানে কমন কিছুর মিল থাকতে হয়, যেমন প্রথমে ধর্ম, পরে একই ধর্ম পালনকারী জাতী বা দেশ ইত্যাদি। এইগুলি তখন হয়ে উঠে একটা পারস্পরিক যোগাসুত্রের মাধ্যম কিন্তু উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতা বা প্রভাব খাটানোর একটা অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া। আর যখন ক্ষমতা বা প্রভাব খাটানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, তখন বিশ্বরাজনীতিতে একটা সক্রিয় ভুমিকা তৈরি হয় যেখানে প্রধান নিয়ামকের দায়িত্ব পালনে অনেক প্রভাবশালী দেশ, দল যুক্ত হয়ে যায়। তখন আর এটা রিলিজিয়াস ফান্ডামেন্টালিস্ট বা ফান্ডামেন্টালিজমের মধ্যে থাকে না। তখন এটা হয়ে যায় আন্তর্জাতিক একটা বহুমাত্রিক পরিকল্পনা। তখন ক্ষেত্রটা ভিন্ন। কিন্তু তাঁর এজেন্ডায় তখনো রিলিজিয়াস লেভাসটা থেকেই যায়। আর এই লেভাসের পিছনে যা থাকে তা হচ্ছে They are ‘reactive’, ‘they are dualist’, ‘they believe in Holy Book’, ‘they are selective’, and ‘they are millennialist’  

বর্তমানে এই ফান্ডামেন্টালিস্ট শব্দটি বহুলঅংশে ব্যবহৃত হয় ধর্মের নামে আধিপত্য বিস্তারের নিমিত্তে গোঁড়া কিছু স্প্লিনটার গ্রুপকে বুঝানোর জন্যই। কখনো এটা ইসলামিক টেরোরিস্ট, কখনো রিলিজিয়াস টেরোরিস্ট, কখনো রিভাইভালিস্ট (যখন বৌদ্ধ, মুসলিম, কিংবা হিন্দু সম্প্রদায়ের বেলায়) ইত্যাদি। কিন্তু পিছনের উদ্দেশ্য একেবারেই আলাদা, আর সেটা নিতান্তই প্রভাব বিস্তার।  

প্রাথমিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীসমুহ যারা উক্ত লেভাসের নাম দিয়ে কিছু ফায়দা লুটে নিতে চেয়েছিলেন, হয়ত তা পেয়েছেনও কিন্তু ইতিমধ্যে এই লেভাসে মোড়া শক্তিশালী টুলসটি অর্থাৎ গোষ্ঠীটি ইতিমধ্যে প্রাপ্ত শিক্ষা আর প্রশিক্ষনের দ্বারা তারাই এখন নিজের নিয়ন্তা হিসাবে এমনভাবে আবির্ভূত হয়েছেন যে, অন্যের জন্য নয় শুধু নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্তা হিসাবে কাজ করছে। এখানে ধর্মটাই এখন আর মুখ্যবিষয় নয়, মুখ্যবিষয় হয়ে দাড়িয়েছে প্রভাব খাটানো এবং আধিপত্য বিস্তারের। এদেরকে আর নিয়ন্ত্রন করবার জন্য অন্য কোনো অপসন পূর্ববর্তী চালকদের হাতে নাই। তাঁরা এখন টেরর। যে নামেই আমরা একে এখন ডাকি না কেনো। ফলে এখন যেটা দাড়িয়েছে তা হচ্ছে, ওয়্যার এগেইনস্ট টেরর।

একটাই পথ এখন ......

উত্তরসূরি নির্বাচন

জীবনের সব অধ্যায় এক রকম নয়। এটা আমার হয়ত বুঝতে দেরী হয়েছে কিন্তু এই সব তত্ত্বকথা মনিষীরা যুগে যুগে বলে গেছেন। মনিষীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক তত্ত্বকথাই বলে গেছেন বটে কিন্তু কেউ সে সব তত্ত্বকথা মানে না। হ্যা, মানে তখন যখন কারো জন্য সেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের জন্য প্রযোজ্য হয়। সেই সুবাদেই বলছি যে, আমি আপনি ততোক্ষন সবার কাছে যত্নশীল যতোক্ষন আপনি নিঃস্বার্থভাবে দিতে পারবেন কিন্তু পাওয়ার আশা না করবেন। আশা করলে আপনি হেরে যাবেন। এটা নিজের স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই সত্য।

এর থেকে যে শিক্ষাগুলি নেওয়া দরকার তা হচ্ছে, যা কিছু করবেন জীবনে, নিজের জন্য করুন, নিজে সুখী সময় কাটানোর জন্য আয় করুন এবং তা দুইহাত ভরে খরচ করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানগন কিভাবে চলবে কিংবা তারা কোথায় কিভাবে বাস করবে তা আপনার চিন্তা থাকতে পারে বটে কিন্তু তারজন্য অনেক কিছু আয় করে সঞ্চয় করে তাকে পঙ্গু করে রেখে যাওয়ার কোনো দরকার আমি মনে করি না। বরং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিন, তাতেই সে এই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে ঠাই করে নেবে। এই পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষের জন্য সুখের আবাস্থল। অলসদের জন্য এখানে সব কিছুই নাগালের বাইরে। পূর্ববর্তি জেনারেশনের আহরিত সম্পত্তি উত্তরসূরিদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক হলেও একটা সময় আসে, কোনো না কোনো উত্তরসুরীর মাধ্যমেই তা বিনাশ হয়। এই বিনাশটা হয়ত এক জেনারেশনের মধ্যে ঘটে না। কারো কারো বেলায় এক জেনারেশনেই শেষ হয়ে যায় আবার কারো কারো বেলায় এটা ক্ষয় হতে কয়েক জেনারেশন পার হয়। কিন্তু ক্ষয় হবেই। এর প্রধান কারন, যিনি সম্পদ করলেন, তার যে দরদ, আর যারা বিনা পরিশ্রমে পেলো তাদের যে দরদ তা কখনোই এক নয়।

আরেকটা কারনে নস্ট হয়। তারা হলেন যাদের বংশ ধরের মধ্যে ছেলে রি-প্রেজেন্টেটিভ নাই। ওইসব লোকের বেলায় তাদের কস্ট করা সম্পত্তি নিজের ছেলে সন্তানের পরিবর্তে চলে যায় অন্য বাড়ির আরেক ছেলের হাতে যিনি সম্পদের মালিকের নিছক মেয়ের স্বামী হবার কারনে। এরা দ্রুত সম্পদ হাত ছাড়া করে কারন তারা একদিকে এটাকে ফাও মনে করে, অন্যদিকে যতো দ্রুত সম্ভব সব সম্পত্তিকে নিজের নামে রুপান্তরিত করতে চান। এই মন্তব্য টা ঢালাও ভাবে করলে অনেক মেয়ের স্বামীরা হয়ত মনে আঘাত পেতে পারেন, কারন সবাই হয়ত এক নয়। তবে অভিজ্ঞতা আর পরীক্ষায় দেখা গেছে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই রকমটা হয়েছে। তারা স্ত্রী কপালে ধন পাওয়া মনে করেন। তাদের বেলায় বিনাশ হতে সময় লাগে অতি অল্প সময়। এই সব ছেলেদের কাছে কোনো সম্পদ এমন কি স্ত্রীও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। 

ফলে যেহেতু আপনি পরিশ্রম করছেন, সুখটা আপনিই করুন। যদি ভাবেন যে, আগে সঞ্চয় করে স্তূপ করি, বাড়ী গাড়ি করি, ব্যাংকে একটা মোটা টাকা সঞ্চয় হোক তাহলে আপনার হাতে একটু সময়ও নেই সকালের সূর্য দেখার অথবা রাতের জ্যোৎস্না দেখার। আপনার ভাগ্যে আছে শুধু বাদরের মতো এইস্থান থেকে অন্যস্থানে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় ফল পাওয়া যায় তার সন্ধান করা, অথবা পালের বলদের মতো সারাজীবন হাল চাষের মতো চাষির হাল বেয়ে যাওয়া যাতে চাষিই শুধু লাভবান হয়, আর নিজে শুধু জাবর কাটবেন।

এ কথাগুলি কেনো বলছি?

আমার চোখে দেখা এই ছোট্ট জীবনে অনেক ঘটনা। কস্ট করে সম্পত্তি বা এসেট রেখে গেছেন, কিংবা ব্যবসা রেখে গেছেন, জাস্ট তার মরনের পর ওই সব সম্পত্তি কত তাড়াতাড়ি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়া যায়, তার জন্য তর সয় না। অথচ ওই সব উত্তরসুরীরা একটিবারও আপনার রুহের মাগফিরাত বা ধর্মীয় কোনো উৎসবের মাধ্যমে একটুও পয়সা খরচ করবে না। তারা ঐ খরচ টাকেও অপচয় মনে করে নিজের জন্ময অ্রআনন্দ করবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারাও সেই একই ফাদে পা দিয়ে তাদের উত্তরসুরীদের জন্যই সঞ্চয় করে জমা করে যান এবং নিজেরা ভোগ করেন না।   

অপ্রিয় সত্যের মুখুমুখি দাঁড়ানো সাহসের প্রয়োজন

কখনো যদি তোমরা দেখো যে, তোমার অপ্রিয় সত্য কথায় কেউ কোনো উত্তর করছে না, কিন্তু তোমার অগোচরে মুখ ভেটকাচ্ছে, তাহলে বুঝবে যে, তোমার আশপাশ চাটুকারে ভরে গেছে। তুমি বিপদের মধ্যে আছো।  এ অবস্থায় তোমার যা করনীয়, তা হচ্ছে, তুমি একা চলার অভ্যাস করো। এই একা চলার মধ্যে যদি কাউকে রাখতে চাও সাথে, তাহলে এমন কিছু মানুষকে রাখো যারা প্রাইমারী স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক। তারা নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না আর হবেও না। তবে তাও নির্বাচন করার জন্য সময় নিও।

আর কোনো কিছুই যদি মনে হয় ঠিক নাই, তাহলে, নিজেই নিজের জন্য এমন কিছু করে যাও, যাতে তোমার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো ধাতব্য প্রতিষ্ঠান তোমার কাজগুলি তোমার ই আহরিত সম্পদের লভ্যাংশে করতে পারে। পরিচিত মানুষ গুলিই তোমার বিপদের কারন। সব সময় মনে রাখতে চেষ্টা করো যে, বেঈমান অপ্রিচিত লোক থেকে তৈরী হয় না, তারা সব পরিচিত মানুষের দল। 

আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না, আমরা মানুষের ভিতরের চরিত্রকে সরাসরি আয়নার মতো করে দেখতে পাই না। এমন কি আমরা নিজেরাও নিজেদের অনেক সময় চিনতে পারি না। আর এই কারনেই প্রতিবার আমরা প্রেডিকসন অর্থাৎ একটা স্যামপ্লিং এর উপর ভিত্তি করে বারবার সিদ্ধান্ত নেই। শতভাগ সাফল্য আসবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। আজকে যে বস্তুটি আপনার হাতে আসায় আপনি মনে করছেন, এটাই ঠিক যেটা আপনি চেয়েছেন, বা এটাই আপনি খুজছেন, সেটা সঠিক নাও হতে পারে।  আর যদি সঠিক না হয় তখন সংস্কার বা এজাস্টমেন্ট দরকার হয়ে পড়ে।  কখনো কখনো এই এডজাস্টমেন্ট এতো বড় যে, পুরু পরিকল্পনাটাই বদলাতে হয়। আর যারা এই পরিকল্পনাটা পাল্টানোর হিম্মত রাখেন, বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত রাখেন, তাদের জন্যই সুন্দর ভবিস্যত। সমাজ তারাই তৈরী করে, সমাজ তাদেরকেই কন্ডারী বলে। এডাপ্টেসন এর মুল থিউরী আসলে তাই। ডাইনোসোর এডাপ্টেসন করতে পারে নাই বলেই সে আজ পৃথিবীতে ইতিহাস কিন্তু তেলাপোকা সর্বত্র সব কিছুতেই এডজাস্ট করতে পারে বলেই এরা বেচে থাকে ৪৬ কোটি বছর। সম্ভবত এই তেলাপোকাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আয়ুধারী কোনো প্রানী। এরা ওদের বাল-বাচ্চা নিয়ে ওদের মতো করে বেচে থাকে। ভালোই থাকে।

আজকে আমি বা আপনাকে কেউ ভুল বুঝতেছি বলে যে অভিযোগ করে, এটা হয়ত ঠিক এই রকম নয়। হতে পারে এই রকম যে, এখন আমি বা আপনি ভুল বুঝতেছি না, সময়ের ব্যবধানে, স্যামপ্লিং ভুলের কারনে আগেরবার ভুল হয়েছিলো, কিন্তু অন্যান্য স্যামপ্লিং, চারিপাশের অবস্থা, বেশী ফ্যাক্টর সমন্নয়ে আমি বা আপনি বর্তমানটাই ঠিক বুঝতেছেন। ফলে যারা অভিযোগ করছে, তারা ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন না। আবার এমনো হতে পারে যিনি আমাকে বা আপনাকে "ভুল বুঝতেছি" বলে অভিযোগ করছেন, তার এক্সপেকটেশন অনুযায়ী সেও আমাকে বা আপনাকে আগেরবার ঠিক বুঝেছেন কিন্তু এখন তার এক্সপেক্টেসনের সাথে ক্যাল্কুলেসনে তারতম্যের কারনে আমরা বা আপ্নারা বদলে গেছি বা বদলে গেছেন এই চিন্তায় আমরা ভুল বুঝতেছি বলেই তাদের ডিডাক্সন তৈরী হচ্ছে।

কিন্তু যেটাই হোক, কে ভুল আর কে ঠিক, এই তর্ক, এই যুক্তি, এই ব্যাখ্যা করার সময় মানুষের হাতে খুব বেশি থাকে না। একটা সাব জেক্ট নিয়ে এতো গবেষণা করতে থাকলে, বাকী সাবজেক্ট এর জন্য তো সময় ই দেওয়া যাবে না। জীবনে সময় বড় সীমিত। হয় এডজাস্টমেন্ট করে বেচে যাবেন, নয় খপ্পর থেকে বেড়িয়ে যাবেন। দ্বিধার কোনো কারন থাকলে সবার প্রতিভা যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ক্ষতি হবে বিকাশের।

ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তে ভুল হলে যখনই মনে হবে এখনই সময় সিদ্ধান্ত পাল্টে জীবন সুন্দর করার, তাহলে "এখনি" সেটা। শুধু একটা জিনিষ মনে রাখা দরকার, ঈশ্বর সব ভুলের মধ্যে বড় সাফল্যের ফলাফল নির্ধারণ করেন। তিনি কারো সাথে মস্করা করেন না। তাঁর উপর ভরসা রাখুন। জয় আপনার। এটা দু পক্ষের জন্যই উপদেশ কারন, যার যার গন্ডি থেকে তাঁর তাঁর জন্য ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করেন। কেউ কারো সীমানা অতিক্রম করলেই এই বিপত্তি হবে। নদীর জলের মধ্যেও ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিঠা পানি এবং নোনা পানিও তাদের সীমা অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মিশার অনুমতি ঈশ্বর দেন নাই।

কি কারনে এই ডায়েরী?

আমার কোন ইচ্ছাই ছিল না এই চিঠিটি তোমাদেরকে লিখিবার জন্য। কোন দরকার ছিল কিনা  সেই ভাবনাটা ভাবিবার সময় অবশ্য এখন নয়। উহা তোমরা ভাবিয়া দেখিবে। সময়ের বিবর্তনে হয়তোবা ইহা তাহার জায়গা দখল করিয়া লইবে তাহার কতটা দরকার ছিল, আর কতটা দরকার ছিল না। তবুও আমার মনে হইল, মাঝে মাঝে বেশ কিছু অবসর সময় পাই, কিছুতো একটা করি। তাই উপন্যাস না লিখিয়া, গ্লোবাল ইস্যু সম্পর্কে না লিখিয়া কিংবা ধর্মীয় কোন বই না লিখিয়া নিজের পরিবারের সাথে যদি সময়টা কাটাই!! তাই, আমি সময় টুকুন ব্যয় করিতে চাহিলাম এমন কিছু বিষয়ের উপর যাহা আমাকে প্রতিনিয়ত মনে করাইয়া দিয়াছে, আহা যদি এমন কিছু কেহ আমার জন্য লিখিয়া যাইত, অথবা এমন কিছু যাহা আমি প্রায়শই জানিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু কোথাও উহার কোন অস্তিত্ত পাই নাই। তাহলে উহ কি এমন জিনিস যাহা আমার মধ্যে প্রায়শই মনে আসিত, খুজিতাম কিন্তু কোথাও তাহা আমি পাইয়াছি বলিয়া মনে হইতেছে না। আমি মাঝে মাঝেই ভাবিতাম, আমার পূর্বে যাহারা আমার বংশে আসিয়াছিলেন,তাদের অনেকেই হয় বা ছিলেন জমিদার, কেউ বা ছিলেন অনেক উচ্চ স্তরের ব্যক্তিকর্তা, হয়তা আবার কেউ এমনও থাকিতে পারেন যাহাদের জীবন লইয়া এখন অনেক বড় বড় লোমহর্ষক কাব্য লিখা যাইত অথবা এমন কেউ থাকিতে পারেন যাহাদের অতিষ্ঠে মানুস প্রতিনিয়ত কায়মনে তাহাদের মৃত্যু কামনাই করিতেন, আবার এমনও হইতে পারে যে, কাহারো কাহারো জীবননাশের কারনে কোন এক সমাজ ব্যবস্থা হয় ভাঙ্গিয়াই পড়িয়াছিল, কে যানে এই সব কথা বা কাহিনি?

মাঝে মাঝে আমার খুব জানিতে ইচ্ছে করিত, এইসব তাহার কেউ কি আমাদের কথা কখনও এমন করে ভাবিয়াছিলেন যে, কোন একদিন হয়তবা কেউ তাহাদের স্মরণ করিয়া তাহাদের ব্যাপারে আরও অধিক জানিবার জন্য আকুপাকু করিবেন? হয়ত কেহ কেহ করিয়াছিলেন, কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারনে তাহারা তাহাদের কোন কথাই আমাদের জন্য রাখিয়া যাইতে পারেন নাই, হয়তোবা আবার করেও নাই। বহুদিন আগে আমি একখানা ছায়াছবি দেখিয়াছিলাম, কালো মানুষের কাহিনী। সম্ভবত ছবিটির নাম ছিল “রুটস”। আলেক্স হেলির বানানো। তিনি অনেক বছর গবেষণা করিয়া করিয়া যতদুর সম্ভব তাহার পূর্বপুরুসের ইতিহাস লইয়া তাহার অই অনবদ্য কঠিন জিবনের কাহিনী পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। কিন্তু আমার আলেক্স হেলির মত অত ধৈর্য নাই যে আমি বছরের পর বছর আমার পূর্ব পুরুসের নাম গবেষণা করিয়া করিয়া এক একটা অধ্যায় লিখিব। সে সাধ্যও আমার নাই। কিন্তু আমি একটা কাজ করিতে পারি অনায়াসে। আর তাহা হইল, আজ হইতে হাজার বছর পরে যদি কেউ আমার কথা জানিতে চায়, আমার সম্পর্কে ভাবিতে চায়, কিংবা আজ এই বিংশ শতাব্দিতে বসে আমি কি ভাবিতেছি, কি ভাবিতেছি না, কিংবা আমি আজ থেকে আরও শত বছর পর, অন্তত এই ভাবনাগুলি তো আমি আমার ঐসব পরবর্তী বংশধরদের জন্য লিখিয়া যাইতেই পারি। তাহাতেই বা কম কিসের? তাই ভাবছি, আমি সারাদিন কি করি, কি ভাবি, কেমন করিয়া ভাবি, আমার কি ইচ্ছা আমার বংসধরদের লইয়া, যদি আমি এক টুকরো কাগজের মধ্যে লিখিয়া রাখি, হয়ত বা কোন একদিন আমারই কোন উদাসীন এক বংশধর এই লেখাটা পড়িয়া জানিতে পারিবে , তাঁহারও আগে কেউ একদিন কি করেছিল।

আমি আমার বাবাকে দেখি নাই। আমি যখন মাত্র দুই কি আড়াই বছরের, তখন তিনি জান্নাত বাসি হয়েছেন। ফলে ঊনার কোনো ছবি, কিংবা কোনো স্মৃতি আমার কাছে নাই। শুনতাম, তিনি ছিলেন অত্যান্ত নামীদামী মানুষ। মাদবর মানুস। অনেক সম্পত্তি ছিলো তার। ওই সময় যে কয়জন মানুষ ধনীদের কাতারে ছিলেন, তার মধ্যেয়ামার বাবা একজন। আমি যখন মাত্র ক্লাস ফাইভে বা সিক্সে পড়ি, তখন আমাদের বাড়িতে কোনো এক বাক্সে আমার বাবার হাতের লিখা কিছু পত্র দেখিয়াছিলাম। খুব সুন্দর হাতের লেখাছিলো। আমি তখন ছোত ছিলাম, বুঝি নাই এই সব স্ম্রিতিগুলি রক্ষনাবেক্ষন করা উচিত কিনা।আমি বা আমরা কেহই ওইসব হাতের লিখা চিঠিপত্র গুলিও সংরক্ষন করি নাই। আজ আমার কাছে মনে হচ্ছে ওই গুলি অনেক দামি বস্তু ছিলো।

আমাদের গ্রামের বাড়ি দুই জায়গায়। একটা মুন্সিগঞ্জের কয়রা খোলায়, আরেকটা হচ্ছে কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। ওই মুন্সিগঞ্জের বাড়িতে থাকেতো আমাদের আগের মায়ের সন্তানেরা আর আমরা থাকতাম কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। আমার বাবা কোনো এক সময় তার জীবদ্দশায় ভেবেছিলেন যে, আমরা কোনোভাবেই তার আগের সন্তানদের কাছে নিরাপদ নই এবং আমাদের জীবননাশ হবার সম্ভাবনা আছে। ফলে আমার বাবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসাবে তিনি আমাদেরকে মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানীগঞ্জ আমার আপন খালুদের এলাকায় রিহেবিলেট করার পরিকল্পনা করেন। আমার বাবার পরিকল্পনা একদম ঠিক ছিল বিধায় তিনি মারা যাবার আগে আমাদেরকে এই কেরানিগঞ্জের এলাকায় স্থানান্তর করে গিয়েছিলেন। আচ্ছা, আমার বাবার আর কি কি প্ল্যান ছিলো যা তিনি শেষ করে যেতে পারেন নাই? অথবা তার কি কি শখ ছিল যা আমাদের পরবরতী জেনারেশনের উচিত তার বাস্তবায়ন করা? কিছুই জানি না। আর এখানেই আমার দুঃখ। এখানে একটা গল্প (বাস্তব) না লিখলেই নয়। এটা আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা। আমার বাবা কিভাবে বুঝবেন যে, আসলেই তিনি যা ভাবছেন সেটা সঠিক কিনা। তার এই সিদ্ধন্ত কতটাঠিক তা যাচাইয়ের জন্য একদিন ঠিক করলেন, তিনি কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যাবেন। তার এই প্ল্যানটা  শুধুমাত্র জানালেন আমার বড় ভাইকে। আমার বড় ভাই তখন জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে কলেজে পড়ছেন। বাবা সবার অজান্তে হতাত করে নিখোজ হয়ে গেলেন, তিনি আর বাড়ি ফিরলেন না। একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিন দিন যায়। এক মাস, দুই মাস, এইভাবে প্রায় ছইয় মাস। সবাই ধরে নিলেন, বাবা হয়তো কোথাও দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিলো না যে কন্ট্যাক্ট করা যাবে। বাবাকিন্তু প্রতিদিন আমার বড় ভাইয়ের সাথে সদরঘাটের নব কুমার শরীর চর্চা কেন্দ্রের ঘাটে ভাইয়ের সাথে দেখা করতেন আর প্রতিদিনের ফিডব্যাক নিতেন কি হচ্ছে গ্রামে তার অনুপস্থিতিতে। ধীরে ধীরে বাবার আইডিয়াটাই যেনো সঠিক প্রমান হচ্ছিলো। আমাদের স্টেপ ব্রাদাররা, বোনেরা, স্বৈরাচারের মতো আমাদের উপর ব্যবহার করা শুরু করছিলো, জমিজমার সব ফসল একে একে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো, আমাদেরকে প্রাননাশের হুমকী দিচ্ছিলো। এমন কি আমাদের এই পক্ষের স্ব সদস্যদেরকে অত্যাচার আর নীপিড়নে মেরেই ফেলার চেষ্টা করছিলো। সবাই ধরেই নিয়েছিলো যে, হোসেন মাদবর মারা গেছে এবং তার থেকে আর ভয়ের কোনো কারন নাই। অত্যাচার যখন তুঙ্গে, তখন একদিন হতাত করে বাবা সশরীরে এসে হাজির। সবাই অবাক, কোথায় ছিলো এই হোসেন মাদবর? তিনি সত্যিটা লুকিয়ে শুধু বললেন, চট্টগ্রামে তার চোখের অপারেসন হয়েছিলো বলে কাউকে কোনো খবর দিতে পারেন নাই। আর শরীর ভালো না অবধি ডাক্তাররা তাকে ছাড়েনও নাই। তিনি বুঝে গেলেন, তার কি করা উচিত এবং তার সিদ্ধান্ত যে সঠিক সেটা তিনি পরীক্ষা করেই নিলেন। 

অতঃপর বাবা আমার খালুর সাথে অতি গোপনে পরামর্শ করলেন, কিভাবে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে এবং দ্রুত সেই মুন্সিগঞ্জ থেকে খালুর এলাকায় আমাদেরকে মাইগ্রেট করবেন। আমার খালু ছিলেন তার এলাকায় একজন অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী মানুষ। মাঘে মহিসে একসাথে জল খাওয়ার মতো। বাবা তার দিক থেকে প্রায় ৪০০ লোকের আয়োজন করলেন, আর খালু তার এলাকায় এই রকমের ই প্রায় ৪০০/৫০০ লোকের আয়োজন করলেন। মাঝে নদী থাকায় আরো কয়েক শত কলা গাছের ভেলা বানিয়ে নদীর উপর দিয়ে মুটামুটি একটা রাস্তা করে ফেললেন। মুন্সিগঞ্জের আমাদের বাড়িটা না ভেঙ্গে বাবা আস্ত বাড়িটাকে ঐ লোকজন দিয়ে মাথায় করে এইপাড়ে নদী পাড় করে দিলেন। আর খালু এই পারে তার লোক দিয়ে সেই আস্ত বাড়িটা এক রাতের মধ্যে বসিয়ে দিলেন। বাবা কাজটি এমন এক দিনে করলেন যেদিন আমাদের ঐ পক্ষের সদস্যরা কোনো এক অনুষ্ঠানের জন্য গ্রামের বাইরে কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলেন। ব্যাপারটা আলাদিনের চেরাগের গল্পের মতো ঘটে গেলো। আমরা মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানিগঞ্জে চলে এলাম চিরতরে। সব কিছু রয়ে গেলো ঐ মুন্সিগঞ্জে। নিজেদের স্মৃতি, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, ক্ষেত খামার সবকিছু।  

আমি এখানে শুধু আমার বাবার প্রসঙ্গ টাই তুলেছি কারন আমার কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় নাই আমার বাবার আগের জেনারেশনের কি অবস্থা ছিলো বা কে কি করতেন। আমার জানার কোনো ত্রুটি ছিলো না কিন্তু কেহই তাদের ব্যাপারে আমাকে কোনো তথ্য বিস্তারিত ভাবে দিতে পারেন নাই। যাই হোক, এবার তোমাদের পালা। তোমরা অন্তত একটা বেস হিসাবে আমার লেখাএই ডায়েরী বা এই ওয়েব সাইট পেয়েছো যেখানে আমাদের ফ্যামিলির কিছু তথ্য রেডিমেট পেয়েছো। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার মতো ইচ্ছুক হও, তাহলে আমার এই তথ্যাবলী সামনে রেখে আমাদের ফ্যামিলী ওয়েব সাইটটি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারো।

আর এটাই হবে আমার কাম্য। 

যদি তুমি কখনো মনে করো

যদি তুমি কখনো মনে করো যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি নাই, তুমি ঠিক। আবার যদি কখনো মনে করো যে, আমি তোমাকে খুব ভালোবেসেছি, আমি বলবো আবার যে, তুমি এবারো ঠিক। যদি তুমি মনে করো যে, আমি স্বার্থপরের মতো তোমার কাছ থেকে এমন কিছু চেয়েছি যা তোমার কাছে অত্যান্ত মূল্যবান, কিংবা সেটা দেওয়া তোমার জন্য অনেক ভয়ংকর, আমি বলবো  যে, তুমি ঠিক। যদি তুমি মনে করো, আমি তোমাকে ইগনোর করেছি, হ্যা আবারো তুমি ঠিক। তুমি যদি কখনো কনফিউজড হয়ে থাকো যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি কি বাসি না, সেটা তুমি বুঝতেই পারছো না, হ্যা, এবারো তুমি ঠিক। 

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সব গুলিই ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আসল সত্য কি? বা আসলে ঠিক কোনটা? আমি বলবো যে, উপরের সবগুলি ই ঠিক। কারন, সত্য ভালোবাসা এমনই যে, কখনো মনে হয় খুব ভালোবাসি,কখনো মনে হয় পুরু সম্পর্ক টাই ঘৃণার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কখনো কখনো খুব সন্দেহের মধ্যেই দিন কেটে যেতে থাকে। 

ঈশ্বর প্রত্যেক কেই স্পেশাল করেই বানিয়েছেন। কারো কারো মধ্যে অথবা প্রতি জনের মধ্যেই ঈশ্বর আলাদা আলাদা গুনাবলী দিয়েই পাঠিয়েছেন। এই ঈশ্বর এমন এক শক্তি যাকেয়াপ্নি, আমি সবাই সব কিছুতেই দায়ী করতেপারি। আবার তার কাছেইখুব গোপনে কাদতেও পারি। আর আমি এই জন্যই ঈসশরকে খুব ভালোবাসি যে, সেয়ামাকে তাকে সব কিছুর জন্য দায়ী করলেও সে কিছুই বলে না। আমি তাকে ঘ্রিনা করলেও সে আমাকে শেষ করে দেয় না। আমি যেমন্তার সাথে যুদ্ধ করতেপারি, তেমনি আমি তার কাছে পুরুপুরি সারেন্ডার ও করতে পারি।

আমাদের জীবনে সবচেয়ে যে জিনিষটা ভালো বা খারাপ হয়ে আসতে পারে তা হচ্ছে, ঈশ্বরের করুনা। আমি ব্যাপারটা যদি এইভাবে বলি যে, তিনি জানেন আমাদের জন্য সবচেয়ে কোনটি সবচেয়ে মঙ্গল। ফলে আজকে কোন কাজটি আমার জন্য দৃশ্যমান খারাপ মনে হলেও হতে  পারে কিন্তু বলা যায় না যে, হয়ত এই দৃশ্যমান খারাপটাই হয়ত ভবিষ্যতের কোন এক ভালোর জন্য। অথবা আজকের দিনের কোনো এক দৃশ্যমান মঙ্গল হতে পারে আগামিকালের কোনো এক ভয়ংকর বিপদের কারন। ফলে ঈশ্বরের করুনাটাই সবচেয়ে বড়। হতে পারে আজকে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি, এটাই ভালো আমাদের জন্য। আমি তোমাকে আর তুমি আমাকে মুক্ত মনে মুক্তি দিয়ে রাখো, দেখো ঈশ্বর কোথায় আমাদের নিয়ে যায়। যদি মন ফিরে আসে, যদি প্রান কাদে, তাহলে আবারো আমরা এই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তই থাকি না কেনো, আবারো আমরা এক সাথে হবো। হয়ত তখন আর এইভুল বুঝাবুঝি গুলি হবেনা।  

বদি ভাই-এখন তিনি ছবি

১৯৬৮ থেকে ২০১৮, মোট ৫০ বছর।

এই পঞ্চাশ বছরের আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের মধ্যে যে ব্যক্তিটি আমাদের পরিবারের কেউ না হয়েও পরিবারে সবচেয়ে বেশি ভুমিকা পালন করতে এক্যটু ও দ্নিবিধা করেন নাই, তিনি হচ্ছেন বদ্রুদ্দিন তালুকদার ওরফে বদি ভাই। আমার বয়স তখন মাত্র ১০ কি বারো যখন আমি প্রকৃত পক্ষে এই বদি ভাইকে জ্ঞ্যানের মাধ্যমে চিনি। কিন্তু তার আগে থেকেই এই বদি ভাই আমাদের পরিবারের সাথে যুক্ত ছিলেন।

আমার বাবা কবে কিভাবে কি কারনে মারা গেলেন তা আমার কোনো ধারনা নাই। আমার বয়স তখনহয়ত ২ কি আড়াই হয়ত হবে। আমার বাবা ছিলেন অনেক ধনি মানুস, মাদবর মানুস। সমাজে তার গ্রহনযোগ্যতা ছিল অনেক অনেক বেশি। কিন্তু তার শত্রুও ছিল অনেক। বিশেষ করে আমাদের পরিবারের ভিতরেই অনেক শত্রু ছিল। আর তারা হচ্যাছেন আমার সতালু ভাই বোনেরা। বিশেষ করে তাজির আলি নামে যে ভাইটি ছিলেন, সে ছিলো চারিত্রিকভাবে একজন খারাপ মানুষ।  যাই হোক। বাবা মারা যাবার পর আমাদের যাবতিয় জমিজমার আধিপত্যতা এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে ক্যাশ টাকা না থাকায় আমাদের পরিবার অনেক সমস্যার মধ্যে পরে। আমার বড় ভাই সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভারসিটিতে ভরতি হয়েছেন। ঢাকায় থাকার কোনো জায়গা নাই, মাথার উপর কোনো অভিভাবক নাই এবং তার মধ্যে পাচ বোন এক ভাই এর বোঝা তার উপর। কিভাবে সংসার চালাবেন, কোথা থেকে টাকা আসবে কিংবা নিজেই কিভাবে চলবেন এই চিন্তাই আমার ভাইকে অতিস্ট করে তুল্লো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ভাবছেন কি করা যায়, কিভাবে করা যায়।

এই সময় কোনো এক কাকতালিয় ভাবে দেখা হলো এই বদি ভাইয়ের সাথে। তার জীবনটাও এই একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেটেছে অথবা কাটছে। ওনাকে আর পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করে বেশি বুঝাতে হয় নাই। বদি ভাই চাকুরি করেন ওয়াব্দা অফিসে মাত্র সেক্সন অফিসার হিসাবে। অল্প আয়, বিয়ে করেন নাই। তিনিও একইভাবে তার ভাই বোন মাকে সাপোর্ট করছেন। থাকেন তিনি ১২৪ নং আগাসাদেক রোড। ছোট্ট একটা রুম, তাতে ইতিমধ্যে তিনজন গাদাগদি করে কোনো রকমে থাকেন আর এক বুয়া প্রতিদিন দুপুর আর রাতের জন্য যত সামান্য বেতনে তাদের ভাত তরকারি পাক করে দেন। বদি ভাই হাবিব ভাইকে ওই ১২৪ নং আগাসাদেক রোডে নিয়ে এলেন। সবাই বদি ভাইকে ভাই বলেন না, সম্মানের সহিত তাকে সবাই স্যার বলেন।

যারা এই রুমে থাকেন, তারাসবাই গ্রাজুয়েট এবং জীবন যুদ্ধে লিপ্ত। একে অপরের জন্য যত টুকু দরকার সাপোর্ট করেন। সবার রোজগার যেনো কম্বাইন্ড রোজগার। একসাথে থাকে সব টাকা, যার যখন যত টুকু দরকার সে ততো টুকুই নেন। কিন্তু হিসাব থাকে। আমার মনে আছে ওই একটা ছোট রুম থেকে বদি ভাইয়ের তত্তাবধানে প্রায় ১০/১২ জন গ্রাজুয়েট বের হয়েছেন যারা পরবর্তী সময়ে দেশের শিরশ স্থানে বসেছিলেন। কেউ ইউনিভারসিটির অধ্যাপক, ডিন, কেউ আরো বড়। দেশে এবং বিদেশে।

এভাবেই বদি ভাই হয়ে উঠেন এক কিংবদন্তি স্যার। সব প্রোটেনশিয়াল মেধাবি হেল্পলেস মানুসগুলিকে বুদ্ধি, যতসামান্য চাকুরির পয়সা দিয়েই এইসব মানুসগুলিকে সাহাজ্য করেছেন। বদি ভাই তার চাকুরি জিবনে ডেপুটি ডাইরেক্টর পর্যন্ত উঠেছিলেন। ওয়াব্দায় চাকুরি করলে দুই নম্বরি করলে ছোট কেরানিও কোটিপতি হয়ে যায় কিন্তু বদি ভাই তার জিবনে দুই নম্বরিতো করেনই নাই, তার দ্বারা দুই নম্বরি হবে এটাও তিনি করতে দেন নাই। ফলে একটা সময় এইসব চোর বাটপারদের আমলে চাকুরির পদবির সামনে এগুতে পারেন নাই। অবসর নিয়ে বাসাতেই ছিলেন।

গ্রাজুয়েট মানুষগুলি তাদের যোগ্যতা অনুসারে ধীরে ধীরে সবাই বেশ ভালো ভালো জায়গায় সেটেল হয়ে গেছেন। সবার সাথেই বদি ভাইয়ের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু কাজের চাপেই হোক আর ব্যস্ততার কারনেই হোক ধীরে ধীরে এইসব যোগাযোগও কমে আসে। কিন্তু আমার ভাইয়ের সাথে অন্য একটি কারনে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগটা ছিলই। আর সেটা হচ্ছে আমার মা। আমার ভাই যখন উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ গেলেন, তখন আমার মাকে দেখভাল করার কোনো লোকই ছিলো না। আর এর ই মধ্যে আমারো ক্যাডেট কলেজের সুযোগ হ ওয়ায় আমার পক্ষেও মাকে কোন অবস্থায় ই কিছুই করার সুযোগ ছিলো না। আমার মাকে বদি ভাই খুব ই ভালো বাস্তেন। নিজের মায়ের মতো করেই দেখতেন। আমার মায়ের জন্য কোনো কাজ করতে বদি ভাইয়ের কখনো ক্লান্ত হন নাই। 

আমি ধীরে ধীরে ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে ফেললাম, আর্মিতে গেলাম, আমি মাক্যের দায়িত্ত নিলাম। এই সময় বদি ভাই একটু অবসর পেলেন। ফলে এই দীর্ঘ প্রায় দেড় যোগ বদি ভাইয়ের সাথে আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তার কাছ থেকে আলাদা হতে পারি নাই। এমন নয় যে বদি ভাইয়ের এখানে কোন স্বার্থ কাজ করেছে। হ্যা, একটা স্বার্থ কাজ করেছে অবশ্য ই। আর সেটা হচ্ছে, বদি ভাই ও তার ভাইদের থেকে অনেক আলাদা ছিলেন। তার পাশে কেউ আসলে ছিলো না। ঊনি ভাবতেন, আমি বা হাবিব ভাই বা আমরা ই তার আপন জন এবং আপদে বিপদে আমরাই তার পাশে আছি। কথাটা ঠিক। কিন্তু পরবর্তীতে যত টুকু আমাদের পাশে থাকার দরকার ছিলো, আমরা আসলে ততো টুকু পাশে থাকতে পারি নাই। এর কারনও হচ্ছে আমাদের বুঝাপড়ার তফাত। হয়ত এটাই এই স্বার্থপর পৃথিবীর নিষ্ঠুর নিয়মের একটি। 

বদি ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম মনোমালিন্য টা হয় আমার বিয়ে নিয়ে। এটা মানতে মানতে আমাদের মধ্যে একটা বিস্তর গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো। কখনো নরমাল, কখনো আধা নরমাল, আবার কখনো মনে হয়েছে সব ঠিকই আছে। আরেকটা কারন ছিলো যে, হাবীব ভাইয়ের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল মানসিকতা। একবার এটা বলেন তো আরেকবার তার সিদ্ধান্ত বদলে অন্য আরেকটি বলা বা আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়া। এইরুপ একটা পরিস্থিতিতে বদি ভাইও আর হাবীব ভাইয়ের ইপর নির্ভর করতে পারছিলেন না। 

একটা সময় চলে এসেছিল যে, আমরা যে যার যার মতো করেই চলছিলাম। ব্যাপারটা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, সাভাবিক অন্য দশ জনের সাথে আমরা যেভাবে চলি, ঠিক সেভাবেই চলছিলাম। সম্পর্ক খারাপ নয় কিন্তু আমরা খুব ঘনিস্ট কেউ আমরা। হাবীব ভাই বদি ভাইকে সব সময় ই শ্রদ্ধা করতেন এবং শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধাই করতেন। কিন্তু বদি ভাইয়ের জন্য হাবীব ভাইয়ের আরো অনেক কিছুই করার ছিলো। সেটা হয়ত হয় নাই। 

আজ বদি ভাইয়ের মৃত্যুতে একটা বড় অধ্যায় শেষ হলো। আমি তাকে মিস করবো সব সময়। যত কষ্টেই তিনি থাকতেন না কেনো, আমি যখন বদি ভাইয়ের কাছে যেতাম, আমি দেখতাম, তার মধ্যে একটা জীবনী শক্তি ফিরে আসতো। অনেক কথা বলতেন। অতীতের কথা, তার সাফল্যের কথা, তার দুঃখের কথা। আমিও শুনতাম। আজ আর তিনি নেই। তাকে আল্লাহ বেহেস্ত নসীব করুন। 

আইন্ডেন্টিটি (পর্ব-১)

২৪ বছর পর মনিকা জানতে পারলো যাকে সে বাবা বলে চিনত, যাকে সে আদরের ছোট ভাই বলে জানতো, যাকে সে বোন, চাচা, দাদা, জেঠা ফুফু ইত্যাদ বলে জানতো, তারা আসলে মনিকার কেউ না। বাবা বাবা না, দাদা দাদা না, ভাই ভাই না, বোন বোন না, জেঠা, চাচা, এরা ওর কেউ দাদা, ভাই বা বোন কেউ না। অথচ কাকের বাসায় কোকিলের ছানার মতো তার জন্ম হয়েছে, শৈশব কেটেছে, বাল্যকাল কেটেছে, আর এখন সে একজন পুর্ন বয়ষ্ক যুবতী। তাহলে এই ২৪ বছর ধরে যে মনিকা তিলে তিলে তার অন্তর, আত্মা আর মানসিকতা দিয়ে কিসের বালুর এক প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলো যা আজ হটাত করে সমুদ্রের এক জলোচ্ছাসে নিমিষের মধ্যে তছনছ করে মিলিয়ে গেলো?

সব মিথ্যা। এ যাবত মনিকা যা পেয়েছে, যা দেখেছে, যা শুনেছে, আজ সব তার কাছে মিথ্যা বলে সামনে এসে সত্য হাজির হয়েছে। মনিকা কাকে এই প্রশ্নের উত্তর জানাতে বলবে? মিথ্যে হলো সেই জাল যা একটা মানুষ তার নিজের অজান্তেই সে নিজের জন্য বিছায়। কিন্তু মনিকা তো নিজে কোনো মিথ্যার জাল বুনে নাই!! তাহলে তার ব্যাপারে এমনতা হলো কেনো? কথায় বলে, মিথ্যাও কখনো কখনো সত্যি হয়ে যায়। মনিকা আজকের এই মিথ্যাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। কোন একটা মিথ্যাকে হাজার বার বললে নাকি মিথ্যাটা সত্য হয়ে যায়। কিন্তু মনিকা জানে, তার এই মিথ্যা বা সত্য যেটাই হোক হাজারবার কেনো আজীবন কাল ধরে আওড়ালেও আর সত্যিটা মিথ্যা আর মিথ্যাটা সত্যি হয়ে যাবে না। হয়তো মিথ্যাটা এ যাবত কাল পর্যন্ত যেভাবে চাপা পড়েছিলো, আজো হয়তো সেটা চাপা দিয়েই মিথ্যাটাকে সত্য বলে চাপিয়ে জীবন চালাতে হবে অথবা, সমস্ত জগত সংসার ছেড়ে আকাশের পানে চেয়ে কোনো এক নামহীন গন্তব্যে সারাজীবনের জন্য হারাইয়া যেতে হবে। কারন সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা সব সময় সহজ হয় না।

মনিকা তার পড়ার টেবিলে জল ছাড়া মাছের মতো ছটফট করছে আর বসে  শুধু একা নীরবে এটাই ভাবছিলো তার ভবিষ্যত কি আর তার বেচে থাকার অর্থই কি। ভালোবাসায় যেমন অনেক শক্তি থাকে, তেমনি বদনামেরও একটা ভয় থাকে। সকাল থেকে এই সন্ধ্যা অবধি মনিকা তার সারা জীবনের গল্পটা আর এখন যেনো মিলাতে পারছিলো না। বারংবার মনে হচ্ছিলো, মনিকা, তার বাবা, তার মা, তার পরিবার যেনো একটা মুখোশ পড়েই এই সংসারে চলমান ছিলো। আজ সেই মুখোশ খসে পড়েছে বটে, কিন্তু মনিকা এটাও বারবার ভেবে কোনো কুল কিনারা পাচ্ছিলো না যে, মুখ আর এই মুখোশ তার আলাদা করা কতটা  বুদ্ধিমানের কাজ হলো

মনিকার প্রতিনিয়ত এটাই মনে হচ্ছিলো, এইতো গতকাল রাত পর্যন্ত তো সবই ঠিক ছিলো। অথচ আজ এতোদিনের একটা সম্পর্ক একটা মাত্র 'হ্যা' বলার মধ্যে সব তছনছ হয়ে গেলো? জীবন দাঁড়িয়ে গেলো কোনো এক মুল্যহীন ঘাটের ধারে যেখানে না আছে পারের কোনো খেয়া, না আছে ঘাটের কোনো মাঝি!

এই মর্মান্তিক ঘটনা হটাত করে কেমন করে মনিকার জীবনে ঘটে গেলো? এটাও একটা রহস্যের ব্যাপার ছিলো। জীবনের অনেক কাহিনী আছে যা রহস্যে ঘেরা থাকে। যখন কেউ এই রহস্য ঘেড়া চাদর সরাতে যান, তখন এমন এমন কিছু প্রশ্নের উদয় হতে পারে যা সাভাবিক জীবনের ভিত নড়ে যেতে পারে। এইসব রহস্য ঘেরা প্রশ্ন জানলেও অসুবিধা আবার না জানলেও জীবন সাভাবিক হয়ে উঠে না। এক্ষেত্রে কি জানা উচিত আর কি জানা একেবারেই উচিত না, সেটাই নির্ভর করে পরবর্তী সুখী জীবনের জন্য। মনিকার প্রায়ই মনে হচ্ছিলো যে, অন্য আর ভাই বোনদের সাথে ওর বাবা মার আচরন, ব্যবহার আদর আপ্যায়ন অনেক কিছুই গড়মিল। আর্থিক সচ্চলতার সাথে পরিবারের এই জন্মগত ব্যবহারগুলির মধ্যে কোনো তারতম্য থাকার কথা না। কারন তারা একই গোত্রের, একই পরিবারের। কিন্তু মনিকার মধ্যে এই প্রশ্ন বহুবার মনে উদয় হয়েছিলো, আসলেই এ রকম তারতম্য কেনো? সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। কোনো একদিন মনিকার মনে হচ্ছিলো, মনের দুক্ষে অনেক কাদবে সে মার সাথে বাবার সাথে। সে রকমেরই একটা পরিস্থিতি গতকাল সৃষ্টি হয়েছিল। কথায় কথায় মনের দুক্ষে আর রাগে যখন মনিকা তার মাকে এই অদ্ভুদ প্রশ্নটি করেই ফেল্লো, "মা, আমি কি তোমাদের আসলেই আসল মেয়ে? নাকি আমাকে তোমরা কোথাও থেকে কুড়াইয়া এনেছো?"

মনিকার এমন প্রশ্নে মানসিকভাবে দূর্বল মা, একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলেন, আর তার মনের অজান্তেই সব সত্যি কথা বলে দিলেন। মনিকা তার বাবার আসল মেয়ে নয়।

ঝড়টার আভাষ অনেক আগেই ছিলো, কিন্তু এবার শুরু হয়ে গিয়েছিলো। আজ এতো বছর পর তাহলে মনিকা কে? আচমকা এই সত্যের মুখুমুখি দাঁড়িয়ে ক্ষনিকের জন্য হলেও মনিকার জ্ঞান হারিয়েছিলো বটে কিন্তু অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। আজ নিশ্চিত জানলো মনিকা যে, জীবনের যাত্রার শুরু থেকে শেষ অবধি মনিকার রাস্তাটা একটা অন্ধকারই ছিলো, ওর জীবনটা ছিলো একটা অন্ধকার টানেল, যেখানে মাঝে মাঝে আলো আসে বটে কিন্তু সে আলোয় কোনো কাজ হয় নাই।  আজ সত্যটা একদম নাকের ডগায় বসে মনিকাকে এমনভাবে চুরমার করে দিলো যে, টাইম টাকে মনে হলো সবচেয়ে বড় ভিলেন। মনিকা  সামনে যা দেখছিলো, তার থেকে অনেক বেশি ঘটনা লুকিয়ে ছিলো তার না দেখার পিছনে। মনিকা এখন এমন একটা বয়সের দ্বার প্রান্তে দাড়িয়েছিলো, যার নাম যৌবন। আর এই যৌবন হলো এমন এক প্রাকৃতিক উপাদান যার দ্বিতীয় নাম শক্তি কিন্তু বড় অসহায়।

কারো পরিবার যখন নিমিষের একটা তথ্যের সার্টিফিকেটে অপরিচিত হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে কাছে যে আসে, সে হলো বন্ধুত্তের শক্তি। বন্ধুত্ব আমাদের জীবনের একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। মনিকারও এমন একজন বন্ধু ছিলো, যার না ছিলো কোনো সামাজিক প্রতিপত্তির অভাব, না ছিলো কোনো যশের কমতি। এই গত কিছু বছর যাবত মনিকার সাথে এই প্রতিভাযশি বন্ধুত্বটা এমনভাবে তার জীবনে এসেছিল, মনিকার কখনো মনে হয়েছে সে তার মা, তার বাবা, আবার কখনো মনে হয়েছে সে তার প্রিয়তম। মনিকার কাছে তার এই বন্ধুটি যেনো কোনো এক শিল্প। প্রায়শই মনিকার কাছে এ প্রশ্ন কুরিকুরি অংকুরের মতো উদয় হতো, জীবন শিল্পকে নকল করে নাকি শিল্প জীবনকে নকল করে? ব্যাখার কোনো আর আজ প্রয়োজন পড়লো না। ভঙ্গুর চিত্তে, হতাশ মনিকা, কিছুক্ষন গলা ফাটিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে বাক্রুদ্ধ হয়ে বসে রইলো। মিথ্যে চোখের জল একটা সময় আর কাজে লাগে না।মনিকার কাছে আজকের দিনের চোখের জলকে পুরুই মিথ্যা মনে হতে লাগলো। যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, সে সব সময়ই চাবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুক্ষটা, কষ্টটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই কষ্টের ব্যাপারগুলি শেয়ার করার দরকার। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে।

অবশেষে মনিকার যার চেহারাটা প্রথম মনের মানস পটে ভেসে উঠেছিলো, সে আর কেউ নয়, আকাশ। যে আকাশকে একদিন মনিকা তার ঘরের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে পলায়ন করেছিলো, আজ যেনো মনে হলো, এই আকাশই যেনো তার সুরক্ষার ছাদ। ঘরের দরজা বন্ধ হবার সাথে সাথে সবসময় মনের দরজা যে বন্ধ হবে এমন কোনো কথা নাই। একটা ভরষা ছিল ক্ষীন। অবশেষে মনিকা আকাশকেই ফোন করে এটাই বলার চেষ্টা করলো যে, যে বিষয়টায় আশংকা ছিলো, ভয় ছিলো, দুশ্চিন্তা ছিলো সেটাই হয়ে গেলো আজ। মনিকা আজ এক নামবিহীন কোনো এক পরিচয়হীন বেওয়ারিশ মুন্ডুহীন জীবন্ত লাশ। এখন যদি তার কিছু অবশিষ্ঠ থেকে থাকে, তা হল একটা শরীর, কিছু মাংশ আর সমস্ত জীবনভর অনিশ্চয়তা।  মনিকার আর কোথাও যাবার দরজা নাই। মনিকার জীবন হাপিয়ে উঠেছে। কোথাও কেউ নাই। জীবন যেনো একটা নদী।

তারপরেও আবার বারবার মনিকার মনে হচ্ছে, আকাশ নদীটা কি তার জীবনের লক্ষ্য পার হবার জন্য সঠিক নদী? মনিকা বারবার একই প্রশ্ন নিজেকে করেছিলো, কিন্ত কোনো উত্তর আসছিলো না। কারন, আপনি একই নদীতে দুবার পা দিতে পারেন না, দেওয়া যায় না। কিন্তু মনিকার জীবন নদীতে এখন বান ডেকেছে। এই কয়টা মাস খালী জল জমতেই থেকেছে, জমতেই থেকেছে, আর এখন সে জল প্রায় মাথার উপর উঠে গেছে, এখন এই জলের বানেই হয়তো মনিকা ডোবে যাবে। মনিকা হাপিয়ে পড়েছিল। ভয় পেয়েছিলো। মনিকার বারবার এটাই মনে হচ্ছিলো, এখন দরকার তার একটা সেটেলমেন্ট। আকাশের উপর কিছু ঘৃণা জমেছিলো বটে, কিছু রাগ হয়েছিলো বটে কিন্তু আজ মনিকার মনে এটাই বারবার উদিত হচ্ছিলো, অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে তারা হয়তো ঠিক লোক। আকাশের ঠিকানাটা মনিকার জন্য এইমুহুর্ত শুধু নয়, আজীবনের জন্যই হয়ত ভুল, কিন্তু আকাশ ভুল ছিলো না। পরিত্যক্ত ঘুনে ধরা কিছু জরাজীর্ন অন্ধ ভালোবাসার থলিটা নিয়ে মনিকা বুকের পাজরে শক্ত করে ধরে আজকের পরিত্যক্ত নিজের পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে গেলো কোনো এক অজানা গন্তব্যের পথে যেখানে হয়তোবা আকাশ নীল রংগের চাদর বিছিয়ে কিছু মেঘমালা সাজিয়ে দিনের শেষে সুর্যের লাল আভায় তারই আরাধনায় ভজনে লিপ্ত। বারবার মনিকার মনে হয়েছে, এ লোকগুলি আমাকে একের পর এক ঠকিয়েছে। বারবার ঠকিয়েছে। এই ঘরে আমার সমস্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমি এদের আর কেউ নই।

কিন্তু আকাসই বা কেনো মনিকার জন্য এভাবে জজ্ঞ করবেন? আবার বিশ্বাস হয়েও ছিলো। অন্ধ বিশ্বাস এমন এক চোরাবালী, যার না আছে একুল, না আছে ওকুল। সেখানে হয়তো কোনো জ্ঞানের আলো পৌছতে পারে, কিন্তু কোনো তর্ক বিহীন আশ্বাস ভর্তি থাকে। মনিকার এবার একটা কথা মনে হলো, বিশ্বাসভাজন হবার জন্য দরকার সেক্রেফাইস, দরকার একনিষ্টতা। আর দরকার নিজের সাথে নিজের সৎ হওয়া। আজ যেখানে মনিকা হারিয়ে গেলো, সেখান থেকেই মনিকাকে আবার নতুন জীবন নিয়ে বেচে উঠতে হবে এই জগত সংসারে। প্রথমবার যখন সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিলো আকাশের সাথে, তখন প্রয়োজন ছিলো সাময়িক। কিন্তু এবার মনিকার কাছে মনে হলো, সম্পর্কটা জীবনে বাচার সাথে এই সম্পর্কটা জরুরী। ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দেয়। প্রথমবার যেটা মনে হয়েছিল। কিন্তু এটা আজ আর কোনো ভয়ংকর মনে হলো না। আজ এটাই বারবার প্রমান হচ্ছে যে, সময় নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। আকাশ আমার পরিবার।

সব কিছুরই প্রথমবার আছে। এটা যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রেও। আমি প্রথমবার অপরাধ করেছিলাম আকাশকে ছেড়ে দিয়ে, কিন্তু এই প্রথমবার মনিকার মনে হলো, মনিকা আকাশকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। প্রথমবার মনিকা আকাশের সাথে ক্লোজ হয়েছিল একটা দন্ধমুলক সার্থ নিয়ে। কিন্তু আজ ক্লোজ হয়েছে জীবনকে ভালোবেসে। ক্লোজ হওয়া আর এফেয়ার্স থাকার মধ্যে যথেষ্ঠ পার্থক্য আছে। এবার মনিকা আকাশের এতো কাছে চলে আসে যেখানে এফেরার্স এর জন্ম। আর এই এফেয়ার্স কখনোও খোলাখুলি, কখনো বন্ধ দরজার ভিতরে।

আকাশ অন্য দশজন মানুষের থেকে আলাদা। কারো অতিতকে ঘেটে বর্তমানকে বিচার করাই হয়তো ঠিক কাজ নয়, এটা আকাশ নিজে যেমন মানে, সে অন্যের বেলাতেও বিশ্বাস করে। কিন্তু ভরষা হলো এমন একটা কথা যা বর্তমান আর অতীতের মধ্যে মেলবন্ধন করে, ভবিষ্যতের দিকে অনুমান করে। কোন ব্যক্তি কি করেছিলো, কি করতে চলেছে, এটা নির্ভর করে সে ভবিষ্যতে কি করতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, যখন কারো সাথে সম্পর্ক হয়, ব্যবসায়িক বা নিজস্ব, অই ব্যক্তির সম্পুর্ন জীবন একটা দলিল হিসাবে সামনে আসে। তখন আমরাই বিচার করতে পারি যে, সম্পর্ক রাখা উচিত নাকি রাখা উচিত নয়। এটা কোনো চরিত্র বিশ্লেষনের ব্যাপার না, শুধু একটা সম্পর্ক জোড়ার লাভ এবং ক্ষতির প্রশ্ন। মনিকা কোনো কিছুই আর না ভেবে ফিরে এলো সেই পুরানো চৌকাঠের ভিতর যেখান থেকে একদিন আকাশকে না বলে ভোরের অন্ধকার পেরিয়ে সেই পরিবারের কাছে ফিরে গিয়েছিলো, যেটা তার কোনোকালেই ছিলো না, আর আজ তো একেবারেই নাই।

(চলবে)

ভিন্ন প্রসঙ্গ – সবার জন্য 

একটা জিনিষ ইদানিং খুব বেশী করে অনুভুত হয় যে, জীবনের সব অধ্যায় এক রকম নয়।  এটা আমার হয়ত বুঝতে দেরী হয়েছে কিন্তু এই সব তত্ত্বকথা মনিষীরা যুগে যুগে বলে গেছেন। মনিষীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক তত্ত্বকথাই বলে গেছেন বটে কিন্তু কেউ সে সব তত্ত্বকথা মানে না। হ্যা, মানে তখন যখন কারো জন্য সেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের জন্য প্রযোজ্য হয়। সেই সুবাদেই বলছি যে, আমি আপনি ততোক্ষন সবার কাছে যত্নশীল যতোক্ষন আপনি নিঃস্বার্থভাবে দিতে পারবেন কিন্তু পাওয়ার আশা করবেন না। আশা করলে আপনি হেরে যাবেন। এটা নিজের স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই সত্য।

এর থেকে যে শিক্ষাগুলি নেওয়া দরকার তা হচ্ছে,যা কিছু করবেন জীবনে, নিজের জন্য করুন, নিজে সুখী সময় কাটানোর জন্য আয় করুন এবং তা দুইহাত ভরে খরচ করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানগন কিভাবে চলবে কিংবা তারা কোথায় কিভাবে বাস করবে তা আপনার চিন্তা থাকতে পারে বটে কিন্তু তারজন্য অনেক কিছু আয় করে সঞ্চয় করে তাকে পঙ্গু করে রেখে যাওয়ার কোনো দরকার আমি মনে করি না। বরং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিন, তাতেই সে এই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে ঠাই করে নেবে। এই পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষের জন্য সুখের আবাস্থল। অলসদের জন্য এখানে সব কিছুই নাগালের বাইরে।  পূর্ব বর্তি জেনারেশনের আহরিত সম্পত্তি উত্তরসূরিদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক হলেও একটা সময় আসে, কোনো না কোনো উত্তরসুরীর মাধ্যমেই তা বিনাশ হয়। এই বিনাশ টা হয়ত এক জেনারেশনের মধ্যে ঘটে না। কারো কারো বেলায় এক জেনারেশনেই শেষ হয়ে যায় আবার কারো কারো বেলায় এটা ক্ষয় হতে কয়েক জেনারেশন পার হয়। কিন্তু ক্ষয় হবেই। এর প্রধান কারন, যিনি সম্পদ করলেন, তার যে দরদ, আর যারা বিনা পরিশ্রমে পেলো তাদের দরদ এক নয়। আরেক টা কারনে নস্ট হয়। তারা হলেন যাদের বংশ ধরের মধ্যে ছেলে রি-প্রেজেন্টেটিভ নাই। ওই সব লোকের বেলায় তাদের কস্ট করা সম্পত্তি নিজের ছেলে সন্তানের পরিবর্তে চলে যায় অন্য বাড়ির আরেক ছেলের হাতে যিন সম্পদের মালিকের নিছক মেয়ের স্বামী। এরা দ্রুত সম্পদ হাত ছাড়া করে কারন তারা একদিকে এতাকে ফাও মনে করে, অন্যদিকে যতো দ্রুত সম্ভব সব সম্পত্তিকে নিজের নামে রুপান্তরিত করতে চায়।

যেহেতু আপনি পরিশ্রম করছেন, সুখটা আপনিই করুন। যদি ভাবেন যে, আগে সঞ্চয় করে স্তূপ করি, বাড়ী গাড়ি করি, ব্যাংকে একটা মোটা টাকা সঞ্চয় হোক তাহলে আপনার হাতে একটু সময়ও নেই সকালের সূর্য দেখার অথবা রাতের জ্যোৎস্না দেখার। আপনার ভাগ্যে আছে শুধু বাদরের মতো এই স্থান থেকে অন্য স্থানে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় ফল পাওয়া যায় তার সন্ধান করা, অথবা পালের বলদের মতো সারাজীবন হাল চাষের মতো চাষির হাল বেয়ে যাওয়া যাতে চাষিই শুধু লাভবান হয়, আর নিজে শুধু জাবর কাটবেন।

এ কথাগুলি কেনো বলছি?

আমার চোখে দেখা এই ছোট্ট জীবনে অনেক ঘটনা। কস্ট করে সম্পত্তি বা এসেট রেখে গেছেন, কিংবা ব্যবসা রেখে গেছেন, জাস্ট তার মরনের পর ওই সব সম্পত্তি কত তাড়াতাড়ি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়া যায়, তার জন্য তর সয় না। অথচ ওই সব উত্তরসুরীরা এক্টিবার ও তার রুহের মাগ ফিরাত বা ধর্মীয় কোনো উৎসবের একটু ও পয়সা খরচ করতে চায় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারাও সেই এক ই ফাদে পা দিয়ে তাদের উত্তরসুরীদের জন্য ই সঞ্চয় করে জমা করে যান এবং নিজেরা ভোগ করেন না।

অপ্রিয় সত্যের মুখুমুখি দাঁড়ানো সাহসের প্রয়োজন

কখনো যদি তোমরা দেখো যে, তোমার অপ্রিয় সত্য কথায় কেউ কোনো উত্তর করছে না, কিন্তু তোমার অগোচরে মুখ ভেটকাচ্ছে, তাহলে বুঝবে যে, তোমার আশপাশ চাটুকারে ভরে গেছে। তুমি বিপদের মধ্যে আছো।  এ অবস্থায় তোমার যা করনীয়, তা হচ্ছে, তুমি একা চলার অভ্যাস করো। এই একা চলার মধ্যে যদি কাউকে রাখতে চাও সাথে, তাহলে এমন কিছু মানুষকে রাখো যারা প্রাইমারী স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক। তারা নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না আর হবেও না। 

আগামিকালটা কত দিনের?

অনেকেই বলেন, ঈশ্বর বড় উদাসীন। আসলেই কি তিনি উদাসিন? না, তিনি উদাসিন নন। তিনি তার কাজ ঠিক সময় মত করেন, তার কোন কিছুই ঊলট পালট নয়, ঊনি আমগাছে জাম ফল দেন না, কিংবা কাঁঠাল গাছে আনারস ফলান না। বৈশাখ মাসে তিনি কনকনে শীত প্রচলন করেন না, আবার কড়া ভর চৈত্র মাসে তিনি শীতের প্রবাহ করান না। তারপরেও আমরা তাকে অনেক সময় কোন কিছুই বিবেচনা না করে বলে থাকি, ঈশ্বর বড় উদাসিন, ওনি উদাসীন শুধু তাঁর বিশ্বকে নিয়ে। কিন্তু কখনো আমরা নিজেকে প্রশ্ন করি না, আমরা কি উদাসিন? আর আমরা উদাসীন আমাদের অতিত নিয়ে। কেউ অতিত নিয়ে ভাবতে চাইনা, ভাবি শুধু আগামিকালের কথা। কিন্তু এই আগামিকালটা কত দিনের?

গত সপ্তাহে আমি একটি পার্টিতে গিয়েছিলাম বেরাতে। অনেক নামিদামি মানুষজন এসেছিল। কেউ সচিব, কেউ পুলিশের বড় কর্মকর্তা, কেউ আবার ব্যবসায়ী, আবার কেউ সাধারন মানুসদের মধ্যে অনেকে। তাহলে এখন আবার প্রশ্ন করে বসবে, সাধারন মানুষ আর ঐ ক্লাসিফাইড ব্যক্তিগুলোর মধ্যে পার্থক্য কি? ব্যবসায়ী কি সাধারন মানুসের মধ্যে পরে না? কিংবা পুলিশের বড়কর্তা, সচিব ইত্যাদি মানুষগুলো কি সাধারন মানুষ নয়? আমার কাছে এর উত্তর একদম সহজ এবং সরল। না, ওরা সাধারন মানুসের মধ্যে পরে না। তাঁদের সমাজ আলাদা, কথাবার্তা আলাদা, লাইফ স্টাইল আলাদা। সাধারন মানুসের জীবন আর তাঁদের জীবন এক কাতারে পরে না। একজন সাধারন মানুষ তাঁর অপকর্মের কথা ফাস হয়ে গেলে তাঁর আর জীবনের মুল্য থাকে না। সে কোন অন্যায় কাজ করে ফেললে প্রতিনিয়ত তাঁর ভিতরে একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে, সে নিজে নিজে একা একা দহিত হতে থাকে, লোক লজ্জার ভয়ে কেমন যেন নিজের মধ্যে সুপ্ত হয়ে থাকে, আর তাতেই সে অসুস্থ হয়ে জীবননাস হতে পারে। কিন্তু ঐ ক্লাসিফাইড লোকগুলো খুব স্পস্টবাদি, তারা তাঁদের অনেক অপকর্ম প্রকাশ্যে একে অন্যের সঙ্গে খুব সহজেই শেয়ার করে। মাঝে মাঝে ঐ অপকর্মগুলো একটা গুনের বহিরপ্রকাশ হিসাবেও নিজেদের অহংকার হিসাবে ধরে নেয়। এই যেমন, একজন আইনজ্ঞ সাহেব সেদিন পার্টিতে খুব ফলাও করে বলছিলেন, তিনি প্রতিদিন প্রায় লক্ষ টাকার উপর আয় করেন। আমি তাকে খুব ভাল করে চিনি না। আমার একবন্ধু তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললেন, বন্ধু, ওনি হচ্ছেন ডিস্ট্রিক্ট জজ লুতফুল কবির। খুব মাই ডিয়ার লোক। অনেক পয়সার মালিক। ধান্মন্ডিতে দুটু বাড়ি আছে, সাভারে কয়েক একর জমি আছে, নিজের জন্য একটা গাড়ি, বউয়ের জন্য একখান গাড়ি। আশুলিয়ায় প্লট কিনেছেন দশটার উপরে। সব ক্যাশ টাকা দিয়ে। আল্লাহ তাকে তিনখান বাচ্চা দিয়েছেন। দুইজন তো খুব ভাল করছে পরাশুনায়। অনেক মানুষের উপকার করেন তিনি, সমাজে বেশ দান খয়রাত করেন, শুধু তাই নয়, তিনি আগামিতে এমপি ইলেকশনেও দাঁড়াবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝখানে ১/১১ তে খামাকা দুদক তাকে অনেক হয়রানি করেছিল। আয় বহির্ভূত নাকি অনেক আয়ের তিনি বৈধ না হওয়ায় প্রায় মাস খানেক এদিক সেদিক থাকতে হয়েছিল। আইনজীবী হয়েও আইনের পাল্লায় পরে গিয়েছিলেন। তবে ওটা বেশিদিন লুতফুল ভাই জিইয়ে রাখেন নাই। একেবারে মাল পানি ঢেলে বীজ উপড়ে ফেলেছেন। এখন একদম ক্লিন আমাদের এই লুতফুল ভাই।

শুনে আমার খুব ভাল লাগলো। পরিচয় হয়ে আমারও খুব ভাল লাগলো। তিনিও মনে হল আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে প্রীত হলেন। একসময় কফি খেতে খেতে বললাম, আইন ব্যবসা ছাড়া আর কোন ব্যবসা করেন নাকি লুতফল ভাই? তিনি অত্যন্ত মৃদু ভাষায় বললেন, না ভাই, এই একটার জন্য সময় দিতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছি, আবার অন্য ব্যবসা কেমন করে করি? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করল, তাহলে আপনি প্রতিদিন কি এমন করেন যে, প্রায় এক লাখ টাকার আয় হয়?

লুতফুল সাহেব ভাল মানুষ। ওনি কথা বলেন সরাসরি। কোন রাখঢাক নাই। বললেন, আমার কোর্টে আমি কাউকে জামিন দেই না। সে যেই মামলাই হোক। “বেলএব্যাল” কেস হলেও আমি জনা প্রতি বিশ হাজার আর হেভি টার্গেট হলে তো কথাই নাই। খাসা পাঁচ লাখ। মাসে সব মিলিয়ে গরপরতা ত্রিশ পয়ত্রিশ লাখ টাকা থাকে। ভাই, নিবই যখন, তখন আর রাখঢাক করে লাভ কি? মাঝে মাঝে কিছু মিথ্যা কেস কেউ কেউ নিয়া আসে। আমি বুঝতে পারি। ঐ কেসগুলোর জন্য পয়সা বেশী পাওয়া যায়। সবসময় ওগুলো পাওয়া যায় না, তবে একবার পেলে সোনারখনি হাতে পাওয়ার মত। ঝুলিয়ে রাখবেন, আবার পয়সা নিবেন। পয়সা দিবে না? কোন অসুবিধা নাই। অপোজিট পার্টিকে  হাত করে ফেলার একটা হুমকি দিয়ে রাখবেন। জানেন ভাই, মানুসের একটা দুর্বল পয়েন্ট আছে, তারা হুজুরদেরকে বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করে আর করে এই আইনজীবী লোকদেরকে। ডাক্তারকেও তারা এতটা বিশ্বাস করে না। আর এই দুর্বলতার সুযোগটাই আমরা অনেকে নেই। এটা তো আমার কাজ, তাই না ভাই? ঘুস তো আর খাই না, আমি মুজুরি নেই। কাজের মুজুরি। এতে তো আর দোষের কিছু নাই।

ঠিক কথা বলেছেন লুতফুল সাহেব। নেবেনই যখন, তখন আর রাখঢাক করে লাভ কি? আর ওনি তো কাজের মুজুরি নিচ্ছেন। আর সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের জায়গা তো একটাই, আদালত। আর এই আদালতেই তো তিনি কাজ করেন। অন্যায় যে করে আর সত্যের পথে যে আছে, তাঁদের মধ্যে বিবাদ হলে তো দু পক্ষেরই আইনজীবী লাগবে। লুতফুল সাহেব কেসটা না নিলে তো আরেকজন নিবেই। তাহলে ওনার নিতে অসুবিধা কই?

অনেক কথা হল লুতফুল ভাইয়ের সঙ্গে। আমার মনে হল, লুতফুল ভাই যে মানসিকতায় বেড়ে উঠছেন, আর যে উপলব্ধি থেকে সমাজে তিনি আজ অনেক বড় একজন বিত্তশালি হয়ে উঠছেন, তাঁর অনেক গলদ রয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর চারিপাশের কোন বন্ধু, বা আত্মীয়সজন, কিংবা সহকর্মী কিংবা তাঁর খুব কাছে কোন লোক কেউ তাকে শুধরানোর পথ বলে দিচ্ছেন না। একটা সময় আসে, যখন পয়সা মানুসের জিবনে সৎ উপদেশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। তখন শুধু চাটুকারদের দল কাছে ভিরে তাকে আরও গভির থেকে গভিরে নিয়ে যায় যেখান থেকে ফিরবার আর কোন পথ থাকে না। লুতফুল সাহেবের অবস্থা দেখে আমার তাই মনে হল।

পার্টি প্রায় শেষ। আরেক কাপ কফি খাচ্ছি আমরা সবাই মিলে। আমি লুতফুল ভাইকে কফি খেতে খেতে বললাম, লুতফুল ভাই, একটা প্রশ্ন করি?

ওনি মাই ডিয়ার লোক, বললেন, আরে ভাই, করেন না, করেন। যদি বলেন কি রঙের আন্ডারওয়ার পরে এসছি, সেটাও বলে দেব। খালি জিজ্ঞেস করে দেখেন না…… বড় মজার লোক।

বললাম, লুতফুল ভাই, আজ থেকে ৫০০ বছর আগের আপনার বংশের কারো নাম জানেন?

প্রশ্ন শুনে ওনি এমন করে হেসে উঠলেন যে তাঁর হাতে থাকা কফি কাপটা প্রায় আমার উপর পরতে যাচ্ছিল আর কি। হাসতে হাসতেই বললেন, কি করে সম্ভব আখতার ভাই যে ৫০০ বছর আগের বংশের কারো নাম মনে রাখা? আপনি কি বলতে পারবেন ৫০০ বছর আগের কারো নাম?

বললাম, আমার প্রশ্নটা শেষ হয় নাই লুতফুল ভাই। ওনি আমার কথার আওয়াজ শুনে গম্ভির হয়ে গিয়ে আবার প্রশ্ন শুনতে চাইলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, থাক, ৫০০ বছর দরকার নাই, ৪০০ বছর আগের কেউ? বা ৩০০ বছরের আগের কেউ, অথবা ২০০ বছর আগের কেউ? কারো কথা কি আপনার মনে আছে?

এবার তিনি হাসলেন না। বললেন, না আখতার ভাই, ঐ অতো বছর আগের ফ্যামিলির কারো নামই আমি জানি না। তবে আমার দাদার বাবার নাম আমার জানা আছে। ওনি প্রায় আজ থেকে ৬০ বছর আগে মারা গেছেন।

আমি কফিতে চুমু দিতে দিতে বললাম, তাঁর মানে প্রায় ৬০ বছর আগের ইতিহাস। কিছুটা এখনো জেগে আছে। আচ্ছা লুতফুল ভাই, আজ থেকে ২০০ বছর পরে তাহলে কেউ কি আপনার কথা মনে রাখবে? বা ৩০০ বছর পর? অথবা ৪০০ বছর পর? আজ আমি আপনে এবং সবাই যে এমন একটা চাঁদনী রাতে কি মজা করে কফি খাচ্ছি, কত সুন্দর টাই-স্যুট পরে এখানে সমাবেশ করছি, এই কি বিশাল সুন্দর বিল্ডিং করেছি, এসি গাড়িতে চরছি, এর কোন কথাই কেউ জানবে না বা মনে রাখবে না আজ থেকে ১০০ বছর পরে। লুতফুল সাহেব খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথাগুলো শুনছিলেন বটে কিন্তু ওনার যে মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারছিলাম।

আমি বলতে থাকলাম, “অথচ জানেন লুতফুল ভাই, আপনার আমার মরার ৫০০ বছর পরেও আমাদের রেখে যাওয়া এই সাভারের জমি, ধানমণ্ডির বাড়ি, আশুলিয়ার প্লট এইসব নিয়ে আমাদের সব পর্যায়ের জেনারেশনরা একে একে দাবিদার হয়ে মারামারিও করতে পারে। কিন্তু কেউ ঐ সম্পত্তি বিক্রি করে বা তাঁর একটা আয় থেকে কখনও আমাদের আত্তার মাগফেরাত কামনা করে একবেলা মিলাদ পরাবে কিনা সন্দেহ আছে। আয় করে যাবেন আপনি, এর সব দায়দায়িত্ব (ন্যায় পথে অথবা অন্যায় পথে আয় যাই হোক না কেন) আপনার, অথচ, আপনার কোন কাজেই তা লাগবে না। তাহলে এই সম্পত্তির কি ভ্যালু আছে? কার জন্যে রেখে যাচ্ছেন এই দায় দায়িত্ব?

লুতফুল ভাই এতক্ষন চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলেন। মনে হল তিনি এখন কিছুটা অসস্থিবোধ করছেন। ওনার হাতে ধরা কফির কাপটায় যে কফিগুলো এতক্ষন গরম একটা সুগন্ধি ছরাচ্ছিল, এখন তা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

আমি আমার কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম।

এই দেখেন লুতফুল ভাই, সামান্য এক কড়া শাসক নামে পরিচিত ১/১১ এর সরকার। তাঁর কাছেই আমরা আমাদের সম্পদের হিসাব সম্পূর্ণ তুলে ধরতে না পারার কারনে কতই না এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়ানো। হয়ত ঘুষ পয়সা দিয়ে আপাতত ম্যানেজ করা গেছে। সামান্য এক কেয়ার টেকার সরকারের কাছেই আমরা আমাদের সত্যকারের হিসাবটা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। আর এই বিশাল জগতের যিনি মালিক, যার আওতার বাইরে যাওয়ার আমাদের কোন শক্তি নাই, যিনি কোন টাকা-পয়সা, ক্ষমতা বা এই জাতিয় কিছুই পরোয়া করেন না, তাঁর কাছ থেকে আমাদের এই অঢেল দুই নম্বরি সম্পত্তির হিসাব কিভাবে দেব? আর এই সম্পত্তির হিসাব শুধু আমাকে আপনাকেই দিতে হবে। এর জন্য আমার কোন উত্তরসুরি, আমার কোন প্রিয় মানুষ তাঁর উত্তরের জন্য বা জবাব্দিহিতার জন্য দায়ি নন। যদি তাইই হয়, তাহলে কি আমার আজকের এই বাহাদুরি করে করা সম্পদ আমার জন্য কোন সুখের বিষয়? আমি তো এগুলোর এক কানাকড়িও সঙ্গে নিতে পারব না!! প্লট পরে থাকবে আশুলিয়ায়, জমি পরে থাকবে সাভারে, ধান্মন্ডির বাসায় আমার লাশটা শুধু গ্যারেজের মধ্যে একদিন রেখেই পুতে দেওয়া হবে ঐ জঙ্গলটায় যেখানে আমি এখন ভুলেও পা রাখি না।

লুতফুল ভাই কোন কিছুই বললেন না। রাত অনেক হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে হবে। আমরা যার যার কাছে বলে কয়ে যার যার বাড়ি ফিরে এলাম। লুতফুল ভাই আমার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে আমার সাথে হাত মেলালেন। কোন কথা বললেন না। শুধু বললেন, আমার ছোট মেয়েটার জন্য দোয়া করবেন। ও ক্যান্সারে ভুগছে।

তাঁর এই ছোট মেয়ের ক্যান্সারের কথা তা আমি আগে জানতে পারিনি। আমার বন্ধুটিও বলে নাই। আর জানলেও হয়ত এটা নিয়ে আমি কোন কথা বলতাম না। কিন্তু, আমার কেন যেনো মনে হল লুতফুল ভাই যদি আজ সৎ মনে সৎ রোজগারে সৎ পথে ঈশ্বরকে ডেকে বলতে পারতেন, হে ঈশ্বর, আমি তো তোমার কোন আদেশ অমান্য করি না, আমি তো তোমার দেওয়া হালাল রিজিক খাই, আমি তো কোন অন্যায় পথে আমার রিজিক উপার্জন করি না, আমি তোমার সব আদেশ, নিষেধ যেভাবে পালন করতে বলেছ, সেভাবেই করছি, তাহলে তুমি আমার এই ছোট মেয়ের ক্যান্সার দিয়ে আমার মনকে এতটা উতলা করে দিলে কেন? কেন তুমি আমার নিস্পাপ এই ছোট আদরের মেয়েটিকে তুমি এমনভাবে কষ্ট দিচ্ছ যার ভার আমি বহন করতে পারছি না? তুমি তো সবচেয়ে বড় ইন্সাফ কর্তা, তুমি তো সবচেয়ে বেশী আছানদাতা, তাহলে তুমি আমাকে কেন এই রকম একটা কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছ?

কিন্তু আজ লুতফুল ভাই হয়ত সেই ঈশ্বরের কাছে কিছুই বলতে পারবেন না। কারন ঈশ্বর তাকে যা যা করতে বলেছেন, তাঁর অনেক ন্যায় কাজই লুতফুল সাহেব করেননি। ঈশ্বরের সাথে তর্ক করবার সাহস আজ লুতফুল সাহেব হারিয়েছেন। তারপরেও হয়ত আমি বলতে পারতাম, লুতফুল ভাই, হয়তোবা সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আপনি ঈশ্বরের কাছে দেখা করুন। তাঁর দেখা পাওয়ার রাস্তা তিনি বাতলে দিয়েছেন অনেক আগেই। লুতফুল সাহেবের জন্য সময় এখনো হাতে আছে যদি তিনি তাঁর ঈশ্বরের কাছে আবার নতজানু হয়ে সব অবৈধ সম্পদ ত্যাগ করে পুনরায় ঈশ্বরকে সাহায্য করতে বলেন, হয়তা তাঁর ঈশ্বর তাকে ক্ষমা করে দিয়ে সব শান্তির মত আরামদায়ক করে দেবেন। কতটা আরামদায়ক করবেন, সেটা নির্ভর করে এখন লুতফুল সাহেব কতটা আত্মসমর্পণ করেন ঈশ্বরের কাছে তাঁর উপর। ঈশ্বর খুবই দয়াশিল এবং ক্ষমাশিল। তিনি উদাসীন নন।

ভারত বর্ষের জনাব আগন্তক

আমি খুব খুশি হয়েছি যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কোন এক বাদশার পাশে আপনি এসে কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলেন এবং আপনি আমাকে অনেক গুলো প্রশ্নও করে গেছেন। আমি জানি না কিভাবে আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর গুলো দেব কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন আপনার কাছে ছিল।

আমি কিভাবে দেশ চালিয়েছি সেটা আপনার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল বলে আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জনাব, আমি কি আপনাকে উল্টো একটা প্রশ্ন করতে পারি? এখন আপনাদের সময়ে দেশ কিভাবে চলে সেটা কি আপনি জানেন? আমাদের সময় গনতন্ত্র বলতে কিছু ছিল না, সংবিধান বলতে কিছু ছিল না সেটা আমি মানি। বরং আমি যা বলতাম তাই ছিল সংবিধান। হয়ত এটা ছিল অটক্রাটিক একটা সময়। সেটা তো ঐ সময়ের নীতিই ছিল এটা। তাই বলে কি আমরা একটুও মানবাধিকারের কোন কাজ করি নাই? আমার সময়ে রাজত্ব ছিল বিশাল, মোবাইল ফোন ছিল না। বিশ্বাস ঘাতকের দল ছিল আরও বেশি শক্তিশালি। যে কোন সময় যে কোন রাজা দেশের যে কোন অংশ দখল করে নিয়ে নিতে পারত। আমরা তো তার প্রতিরক্ষা দিয়েছি। কই তার পরেও তো আমাদের সময় ব্যবসায়িরা আপনাদের সময়ের মত এত অসৎ ছিল না। এখন এক জন ব্যবসায়ী নিজেই রাজ্য চালাতে চান পর্দার আড়াল থেকে। আমাদের সময় ক্ষমতা ছিল আমার হাতে, আর এখন? আপনাদের সময় তো ক্ষমতা কার হাতে তাও তো জানেন না। 

আমি খুব খুশি হয়েছি যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কোন এক বাদশার পাশে আপনি এসে কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলেন এবং আপনি আমাকে অনেক গুলো প্রশ্নও করে গেছেন। আমি জানি না কিভাবে আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর গুলো দেব কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন আপনার কাছে ছিল।

আমি কিভাবে দেশ চালিয়েছি সেটা আপনার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল বলে আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জনাব, আমি কি আপনাকে উল্টো একটা প্রশ্ন করতে পারি? এখন আপনাদের সময়ে দেশ কিভাবে চলে সেটা কি আপনি জানেন? আমাদের সময় গনতন্ত্র বলতে কিছু ছিল না, সংবিধান বলতে কিছু ছিল না সেটা আমি মানি। বরং আমি যা বলতাম তাই ছিল সংবিধান। হয়ত এটা ছিল অটক্রাটিক একটা সময়। সেটা তো ঐ সময়ের নীতিই ছিল এটা। তাই বলে কি আমরা একটুও মানবাধিকারের কোন কাজ করি নাই? আমার সময়ে রাজত্ব ছিল বিশাল, মোবাইল ফোন ছিল না। বিশ্বাস ঘাতকের দল ছিল আরও বেশি শক্তিশালি। যে কোন সময় যে কোন রাজা দেশের যে কোন অংশ দখল করে নিয়ে নিতে পারত। আমরা তো তার প্রতিরক্ষা দিয়েছি। কই তার পরেও তো আমাদের সময় ব্যবসায়িরা আপনাদের সময়ের মত এত অসৎ ছিল না। এখন এক জন ব্যবসায়ী নিজেই রাজ্য চালাতে চান পর্দার আড়াল থেকে। আমাদের সময় ক্ষমতা ছিল আমার হাতে, আর এখন? আপনাদের সময় তো ক্ষমতা কার হাতে তাও তো জানেন না। 

কোর্সম্যাট জাহাঙ্গীর এর জন্য

জাহাঙ্গীর, আমি তোমার আর বকসী ভাইয়ের চ্যাট গুলো পরছিলাম। তোমার দৈন্যদশার কথা তুমি অকপটে স্বীকার করেছ। এটা স্বীকার করতে হয়ত সবাই পারে না। আর বাস্তব তাকে মেনে স্বীকার করাটা হচ্ছে একটা সাংঘাতিক গুনের পরিচয়। আমি জানি না তোমার আয়ের উৎস কি বা তুমি এখনো ইউএন এর ভাতা পাও কিনা। একটা সময় ছিল আমি তোমার ব্যাপারে অনেক বেশি জানতে ইন্টারেস্টেড ছিলাম যখন তুমি ইসলামিক আদল থেকে ক্রমাগত একটা ভুল দর্শনের দিকে ধাবিত হচ্ছিলে। তোমার তিন খন্ডে ধারন করা একটা ভিডিও সিডি আমার কাছে এখনো আছে। হয়ত খুজলে পাওয়া যাবে আমার স্টকে।

তোমার উপরে আমার কিছু রাগও ছিল এই জন্য যে, আমি তোমার ট্যালেন্টের ভক্ত ছিলাম এবং এই ট্যালেন্টের কিছু কাজ আমি বাস্তবে হোক সেটা আমি সত্যই চেয়েছিলাম। আমার অনেক ফোরামে আর্মি অফিসারদের কে নিয়ে কথা উঠলে অথবা ট্যালেন্ট কি জিনিস তাঁর সম্পর্কে কথা উঠলে অথবা আমি অফিসারদের যোগ্যতা নিয়ে কথা উঠলে আমি তোমার রেফারেন্স টানতাম। কিন্তু ঐ আশাটা সম্ভবত তুমি ঠিক জায়গা থেকে পালন করতে পার নাই। একটা ট্যালেন্ট মানুষের দ্বারা সমাজের অনেক কিছু পরিবর্তন সম্ভব। আমার ধারনা ছিল যে, তুমি ইচ্ছে করলেই সমাজের বা সংস্থার কিছু কিছু ইস্যু এড্রেস করতে পারতে তোমার ট্যালেন্টের দ্বারা। তুমি কত টুকু করেছ বা করতে পারতে তা তুমি ভাল জান কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে তুমি পুরু জিনিষটাই সাংঘাতিকভাবে মিস হ্যান্ডেল্ড করে ফেলেছিলা। এ ব্যাপারেও এখন আর তোমার উপর আমার কোন রাগ বা গোস্যা নেই। যেটা হয়েছে, সেটা তুমি দেরি করে হলেও বুঝেছ যে, কিছু কিছু জায়গায় তোমার ভুল ছিল। এই যে ভুল ছিল এবং তুমি বুঝতে পেরেছ, এটা ছিল তোমার ভাল দিক এবং তুমি তা সংশোধন করে ঠিক জায়গায় থাকতে পেরেছ। তুমি জাহাঙ্গীরই আছ, শুধু পালটেছে তোমার মতবাদটা। ভুল থেকে সঠিক পথে। এই জায়গা থেকে তোমার একটা বিশাল শিক্ষণীয় ব্যাপার ছিল। যা তুমি করতে পারতে কিন্তু সব কিছু তুমি হ্যান্ডেল করার ক্ষমতা রাখতে পারনি। কারন তোমার ধৈর্যটা ছিল সরু পথের আইলের মত। গ্রামের সরু পথের আইল দিয়ে কখনো হেটেছ? দেখবা, আইল্টা সোজা কিন্তু হাটতে গেলে পা এদিক ওদিক সরে যাচ্ছে এবং দেখবে তুমি মাঝে মাঝে আইল থেকে ক্ষেতে পরে যাচ্ছ। এটা আইলের দোষ না, এটা তোমার পা কে তুমি ঠিক কন্ট্রোল করতে না পাড়া কারনে।

আমি তোমার ইনিসিয়াল লাইফ স্টাইলটা দেখেছি। আমি তোমার ১ম স্ত্রিকে খুব ভাল করে চিনতাম। তোমাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন কম ছিল না। আমি জানি না সে এখন বিয়ে টিয়ে করেছে কিনা। সেই প্রসঙ্গে আমি যাব না। আমার কাছে একটা বিষয় খুব অবাক লাগে, সমাজের প্রতিটি ইস্যু আসলে প্রতিটি পরিবারের ইস্যুর সমষ্টিমাত্র। তাঁরমানে এই যে, যে ব্যাক্তি পরিবারের ইস্যুটাকে সঠিক ভাবে এড্রেস করতে পারছে, সে অন্য পরিবারগুলর ইস্যুও এড্রেস করার ক্ষমতা রাখে। একটা পরিবারে দাম্পত্য কলহ হতে পারে, একটা পরিবারে উছশৃঙ্খল সন্তান থাকতে পারে, একটা পরিবারে আর্থিক সমস্যা থাকতে পারে, আর এইসব সমস্যাগুলো কিন্তু বিগার পারস্পেক্টিভে একটা সমাজ। আমি অনেক অভিজ্ঞতা সমপন্ন লোক নই কিন্তু আমার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যানে বলে যে, এই সমস্যাগুলো দুই ধরনের লোক দুইভাবে সমাধান করে। (১) সমস্যা হয়েছে, তো এটাকে ছেটে ফেল। এটা হচ্ছে স্মার্ট মুভ কিন্তু এরোগ্যান্ট মুভ। আরেকটা হচ্ছে (২) সমস্যার একদম রুটে গিয়ে রুট থেকে টেনে নিয়ে এসে তাকে রেইলে নিয়ে আসা। সেটা হচ্ছে লংটার্ম সলিউসন। এই দুই নম্বর পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি লাগে ধৈর্য। আবার লাভটাও বেশি। কারনটা হল, কোন সাব্জেক্টই তাঁর স্থান পরিবর্তন করে না কিন্তু চরিত্র পাল্টায়। পরিবার পরিবার হিসাবেই টিকে যায়, শুধু মানুষগুলো তাঁর ব্যবহার পাল্টায় সামস্টিক ভাবে।

আমি অনেক সময় বাজারে একটা শার্ট পছন্দ করতে গিয়ে দেখেছি, দোকানদার এমন কিছু শার্ট আমাকে দেখাচ্ছে, যেটার কালার আর ডিজাইন আমার কাছে অত্যন্ত অপ্রিয়। মনে হয়ছে এগুলো কি কেউ কখনো কিনে? কিন্তু তারপরেই আবার মনে হয়েছে, হয়ত ঐ শার্ট টাই বা ঐ কালার টাই আরেক জোন কিনার জন্য হন্যে হয়ে খুজছে। এটা দেখবার বিষয় আর ভাব বার বিষয়। পৃথিবীতে ঈশ্বর সব মানুষকে কোন না কোন ভাল গুন দিয়ে তাকে ইউনিক করে পাঠিয়েছেন। আমরা তাদের ঐ ইউনিক গুনগুলো আবিস্কার করতে মাঝে মাঝে ব্যর্থ হই বলে কখন কখন জাস্ট যেটা পেতে চেয়েছি সেটা পেয়েও হারিয়ে ফেলছি। রবিন্দ্র নাথের গল্প গুচ্ছের কোন এক ছোট গল্পের মতন যে, বংশে নতুন অথিতির আগমনের জন্য সাড়া গ্রাম শুদ্ধ বড় কর্তা যেফতখানা করছেন, কিন্তু তারই এক বংশ ধর বড়কর্তার না জানার কারনে সে অবহেলিত হয়ে যেফতখানার খাঁবারের থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। 

আজকে তোমার আগের স্ত্রীর প্রতি তোমার হয়ত খুব একটা এট্রাক্সন নাও থাকতে পারে কিন্তু প্রায় অনেক বছরের একত্রে বাস করার ফলে যে মিশ্রিত একটা সময় তোমরা নিজেরা বুনেছিলে, সেটা কি আদৌ কখনো জিরো করে দেয়া সম্ভব? তোমার সন্তানদের কাছে কিন্তু তোমাদের এই ভাগাভাগির ইতিহাস কোনভাবেই সুখের নয়। তোমার বেলায় যদি এটা তোমার পূর্বপুরুষেরা বিশেষ করে তোমার শ্রদ্ধেয় বাবা এই একই কাজটা করতেন তোমার মাকে নিয়ে বা তোমাকে নিয়ে, তোমার বর্তমান জগতের সঙ্গে কি কখনো এটা সাংঘরসিক (অন্তত একটু হলেও কি প্রভাব ফেলত না) হত না? কখনো কি ঐ পারস্পেক্টিভ থেকে দেখেছ? আমাদের পরিবারে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে ৪৫ বছর আগে। আমি যখন ছোট ছিলাম এবং এই ঘটনাটা জানতে পারলাম, সম্ভবত আমরাই প্রথম যারা এমন একটা সম্পর্ক কে অত্যন্ত সাভাবক ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এমন একটা পরিবার সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম যে, অবশেষে সে মেয়ে মানুষ বলে হয়ত ইমোশনাল অবস্থাটা তুমি দেখেছ তাঁর চোখের জল দিয়ে। কিন্তু আমিও হলফ করে বলতে পারি, তোমার চোখে জল না এলেও অন্তত ক্ষনিক সময়ের জন্য তোমার চিন্তায় কখন ব্যাঘাত হয়েছেই। আর তোমার ঐ ঘোরের সন্তানেরা এই ব্যাঘাত টাতে অভ্যস্থ হচ্ছে প্রতি নিয়ত। আর এই জায়গাটাই হচ্ছে আমার এত কথা বলার কারন। উপরে বলা (১) নং পদ্ধতিতে নতুন করে সব কিছুই শুরু করা যায় কিন্তু তাতে মানুষ শধু পিছিয়েই যায়। কারন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিনিশিং পয়েন্টে আসতে হলে ঐ একই সময় বরাদ্ধ নিয়ে বারবার নতুন করে কোন কিছু শুরু করা বারবারই বকামি। এতে টিমের সবার ক্ষতি হয়।

তখন টিম লিডার হিসাবে নিজকে বড় অসহায় মনে হওয়া ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আর একবার যদি টিম লিডারের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়, তখন ঐ টিম টা কোথায় কিভাবে যে ডি-রেইল্ড হওয়া শুরু করে, তাঁর রক্ষক শুদু সয়ং সৃষ্টি কর্তা। কথাগুলো তোমাকে বললাম বলে কি তুমি মাইন্ড করলা? এটা আমার জন্য ও প্রযোজ্য জাহাঙ্গীর, যদি আমি টিম লিডার হয়ে থাকি। তুমি বুদ্ধিমান, তোমার কথাগুলো বুজবার কথা।

বন্ধু সাকুদা কে চিঠি

সাকুদা

সাকিরের চিঠিটি পরে বেশ মজা তো পেলামই তার সঙ্গে আমারও যেন আজ হইতে বহু বছর আগের কোন এক উচ্ছল এবং অফলদায়ক কর্মদীপ্ত সময়কার কথা মনে পরিতেছিল। সেই ১৯৮৩ সালের কথা সম্ভবত।

পরিবারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে পরিক্ষা দিয়া ১২ লং কোর্সে সিলেক্ট হইয়া ২৭ শে জুলাই ১৯৮৩ তে সবার সঙ্গে বিএমএ তে যোগ না দিয়া বর্ষার ঝমঝম বৃষ্টির অসাধারণ একটি দিনে সবুজে ঘেরা এবং অগোছালো গাছপালার সাড়ির মধ্যে গরে উঠা ঢাকা ইউনিভার্সিটির শহিদুল্লাহ হলের সেই টিচার্স কোয়ার্টারে অত্যন্ত মন খারাপ করে একা রবি ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ বইটা নিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। কখনো কয়েক ফোটা এলোপাথাড়ি বৃষ্টির ছটা জানালা ভেদ করে আমার রবিঠাকুরের গল্পগুচ্ছ আবার কখনো আমার মুখের উপর আছড়ে পড়ছিল। আমার মন খারাপ কিনা কিংবা আমার ভিতরের কষ্টের শেষ অভিব্যাক্তি চোখের জলে বেরিয়ে যাইতেছিল কিনা তা নীরস বৃষ্টির ফোঁটার কারনে কারোরই বুঝবার অবকাশ হইতেছিল না। আজকের দিনের ডিজিটাল কোন যন্ত্রের কেরামতি থাকিলে হয়ত বুঝা যাইত যে, ঐ রোমান্টিক একটি বৃষ্টির দিনে কতটা অ-রমান্টিক পরিস্থিতি আমার ভিতরে খেলিয়া যাইতেছিল। আর আমার কষ্টের একটাই কারন ছিল যে, আমি সেনাবাহিনীতে আমার অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে ১২ লং কোর্সে যোগদান করিতে পারি নাই। কারন আমার পরিবার আমার জন্য স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় ইতিমধ্যে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করিবার জন্য কোন এক সনামধন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যবস্থা করিয়া ফেলিয়াছেন।

পরবর্তীতে পরিবারের উপর রাগ করিয়া আর কোন ভর্তি পরিক্ষা না দিয়াই আমি পরের কোর্স ১৩ বিএমএ তে যোগদানের গোপন কাগজখানা যোগাড় করিয়া ফেলিলাম। বলা যাইতে পারে সবার অজান্তে আমি যেন সেনাবাহিনীকে রেজিস্ট্রি মেরেজ করিয়া বসিলাম। কাউকেই আমার এই গোপন অভিসারের মত “সেনাবাহিনি-প্রেমের সাদির” কথা অথবা কাবিননামার মত “যোগদানের পত্রখানার” কথা কাউকেই বলিলাম না। শুধু দিন গুনিতেছিলাম কবে “শ্বশুর বাড়ীর মত” এক আস্তানা সেনাবাহিনির কোলে গিয়া নিশ্চিত হইব। কাউকেই কিছু বলছি না, ফুরফুরা মেজাজ আমার এখন, মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর কিছু নজরে আসিলে মনে হইত এইটা আমার, কিংবা মাঝে মাঝে আবার এও মনে হইত আমি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিখ্যাত লোক কিংবা আকাশচুম্বী অনেক আষাঢ়ে গল্পের কাহিনির মত ইত্যাদি। কিন্তু সব কিছু চলছিল অতি গোপনীয়ভাবে। এই অভিসারের সময়ের মধ্যে আমি বেশ কিছু ব্যক্তির সঙ্গে (ব্যক্তি বলা ভুল হইবে কারন তখনও তারা ব্যক্তির পর্যায়ে পরে বলিয়া মনে হয় না, তারা সবাই ১৯ কি ২০ বছরের বালক)।  পরিচয় ঘটিল। আকবর (বর্তমানে মেজর জেনারেল আকবর), হুমায়ূন (মেজর জেনারেল), মুক্তার (ইঞ্জিনিয়ার) এবং আমাদের সাকুদা। কি কারনে বা কোন উপলক্ষে বা কার অন্বেষণে  তারা ঐ শহিদুল্লাহ হলের ভিতর দিয়া যাইতেছিল তা আজ হয়ত তাদের জিজ্ঞেস করিলেও তাহাদের মনে পরিবে কিনা আমার সন্দেহ আছে।

সাকুদার সঙ্গে আমার এই প্রথম পরিচয় কিন্তু ঘনিষ্ঠ পরিচয় বলা যাইবে না। তারপরের কাহিনী তো বিএমএর ভিতরের। ওটা যে শ্বশুরবারি নয় আদৌ, সেটা প্রথম দিনেই আমি বুঝিয়া ফেলিলাম। মনে হইল শত সতিনের সংসার, কেউ কাউকে ছাড়িয়া দিবার নহে। সে এক আরেক রাজপরিবারের মত বটে কিন্তু সেখানে গুটিকতক নারায়ণের বাস আর বাকি সবাই অ্যালেক্স হ্যালির কুন্টাকিন্তির মত।

সাকুদার সঙ্গে আমার অনেক জায়গায় অনেক পরিস্থিতিতে দেখা হইয়াছে, কখনো কোন এক সভায়, কখনো সেনাবাহিনীর কোর্স করার জন্য, কখনো বন্ধু ফোরামে, আবার কখনো হটাত অসময়ে।  আমি সাকুদা সম্পর্কে নতুন কিছু বলিতে চাই না কারন সাকির যা বলিয়াছে তা নিতান্তই বাড়াইয়া কিছু বলে নাই। বরং সাকুদা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু বলার পরিধি আছে বৈকি। আমি আর সাকুদা একসঙ্গে একত্রে কখনো কোন গ্যারিসনে কাজ করিবার অবকাশ হয় নাই। তারপরেও আমি সাকুদার একজন ভক্ত। ভক্ত এই কারনে যে, সাকুদা যখন বালক ছিল তখন সে গ্রামে ছিল। আর সেটা এমন এক গ্রাম যা আমার গ্রামের মত মিষ্টি, বন্ধুসুলভ যেখানে বৃষ্টির দিনে ৮-১০ বছরের যুবক শিশুরাও  উলঙ্গ হয়ে বৃষ্টির জলে নাচিয়া বেড়ায়, পাশের বাড়ীর বিজয়া নিজের বোন না হইয়াও বোনের অধিকার হইতে কম যায় না, নিজের সহপাঠির সঙ্গে সারাদিন মারামারি করিয়াও পরের দিন তাহার সঙ্গে দেখা না হইলে মন খারাপ হইয়া যায়। সাকুদার জীবন বারিয়া উঠিয়াছে ঠিক এমন একটি গ্রামে। সাকুদার সঙ্গে এই খানে আমার অনেক মিল রহিয়াছে বৈ কি। সাকুদা যখন শৈশব পার করিয়া যুবক হইল, তখন সে রাষ্ট্রের অনেকের চেয়ে অনেক উপরে পদার্পণ করিল বটে কিন্তু সাকুদা হটাত করিয়া ভারসাম্যহীন হইয়া পরে নাই, কৌতূহল বারিয়াছে বটে কিন্তু সীমানা অতিক্রম করিয়া জলে ভাসিয়া যায় নাই। কিন্তু সাকুদা তাহার এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও পরিবর্তন হইতে পারিত। কিন্তু সাকুদা তার ঐ বালক বয়সের চরিত্রটুকুন ধরিয়া রাখিয়াছিল। রবি ঠাকুরের মত বলিলে বলিতে হয় যে, একেবারে পাকা আম্রের মধ্যেই যে পতঙ্গ জন্মলাভ করিয়াছে যাহাকে কোন কালে রস অন্বেষণ করিতে হয় নাই, অল্পে অল্পে রসাস্বাদ করিতে হয় নাই, তাহাকে একবার বসন্ত কালের বিকশিত পুস্পবনের মধ্যে ছাড়িয়া দেওয়া হউক দেখি- বিকচোন্নুখ গোলাপের আধখোলা মুখটির কাছে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহার কি আগ্রহ।  সাকুদা যেন ঠিক এই জায়গায় একই ভাবে রহিয়াছে। এক যে ছিল রাজা, বলিয়া গল্প শুরু করিলে কোন দেশের রাজা আর কোন রাজা, সেটা সাকুদার জানার কোন কালেই আগ্রহ ছিল না এবং এখনও তাহার ঐ অনাবশ্যক খবরদারীতে আগ্রহ নাই। সাকুদা আগে যেমন ছিল, বয়সের তারতম্যে তাহার মধ্যে কোন ঘাটতি হইয়াছে বলিয়া আমার মনে হয় নাই। সেই হাসি, সেই অস্থিরতা, আবার সেই স্থিরতা কিংবা সে মায়াবিনী লক্ষি পেচার মত লক্ষ্মী বালকের চরিত্রে তার কোন পরিবর্তন হয় নাই। আর এটাই হচ্ছে সাকুদার সবচেয়ে বর একটা গুন যেখানে আমি তার চরম ভক্ত।

আজ সাকুদা সত্যি অর্থেই  অনেকের কাছে “দা”। তার মুখাবয়ব বয়সের ভারে আধাপাকা দাঁড়ি, চিন্তার ভারে মাথার চুল খালিপ্রায়, আর কর্ম পরিসরের কঠিন পরিশ্রমের পর তার এখন অবসরের সময়। তিনি গতকাল তার চিরাচরিত কর্মস্থল হইতে ছুটি পাইয়াছেন। হয়ত বা তাহার কিছুটা মন খারাপ হইয়া থাকিবে তার সেই চেনা পরিচিত টেবিলে আর কখনো আগের মত বসিতে পারিবেন না এই ভাবিয়া, কিংবা সকালে অফিসের ব্যস্ততা থাকিবে না এই ভাবিয়া। কিন্তু জগত সংসার এমনই এক পরিসর যেখানে বেকার মানুসেরা আরও অধিক ব্যস্ত, আর ব্যস্ত মানুসেরা আরও  বেশি অবসর কাটান। এ এক গোলক ধাঁধাঁর মত বৃত্ত।

আমি সাকুদাকে আমার অন্তর হইতে অভিনন্দন জানাই আমাদের এই গোলক ধাঁধাঁর মত বৃত্তে পুনরায় প্রবেশ করিবার জন্য। আবারো বলি, ১৯৮৩ সালে যেদিন রাগ করিয়া আমার নিজের পরিবারের সমস্ত সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করিয়া যেই সেনাবাহিনীতে আমার আশ্রয় করিয়া নিয়াছিলাম, আবার সেই আমি পুনরায় ২০০৪ সালে সেনাবাহিনীর উপর রাগ করিয়া আমি আমার পূর্বের জগতে ফিরিয়া আসিয়া দেখিয়াছি, যত তারাতারি নিজের ঘরে ফেরা যায় ততই মঙ্গল। এই জগত টা আমার, আমার পরিবারের এবং এই জগতটা আমার পূর্বসুরিদেরও ছিল। এই জগতে ভয়ের অনেক কিছু আছে কিন্তু সেই ভয়ংকর পরিবেশে যারা পাশে আছে তারা সবাই আমাদের কেউ বন্ধু, কেউ আত্মীয়, কেউ বা আবার কেউনা কিন্তু তারা অনেকেই আমাদের মঙ্গল কামনা করে। শুধু একটাই অনুরোধ, মগজ আর “দিল” এক সঙ্গে একই কাজে লাগাইতে হইবে, সাফল্য তাহলে নিজের।

আমরা তোমার পাশে আছি সাকুদা। পাশে আছি অনেক ভালবাসা নিয়া, পাশে আছি তোমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য যখন তোমার মন খারাপ হইবে, পাশে আছি যখন তুমি মনে করিবে তোমার কাউকে প্রয়োজন।

ভাল থাকিও

মেজর আখতার (অবঃ)

তোমার বন্ধু 

আমার খালা

সামিদা খাতুন

স্বামীঃ আব্দুল গনি মাদবর

তিনি আমার একমাত্র আপন ফার্স্ট জেনারেশন খালা। আমার মায়ের একমাত্র আপন বোন যাকে আমার মা বোন মনে করেন নাই, করেছেন নিজের মায়ের মতো। আমার খালার সাথে কারো কোন বিবাদ হয়েছে এই রেকর্ড সারা গ্রামের মধ্যে নাই। তিনি অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী গনি মাদবরের স্ত্রী। এখানে বলা দরকার যে, গনি মাদবরকে ভয় পায় না এমন কন লক আমাদের গ্রামের মধ্যে ছিলো না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তিনি সন্ত্রাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যান্ত ন্যা পরায়ন একজন মাদবর। খুব বুদ্ধিমান। অত্যান্ত অহংকারী এবং একটা ইগো নিয়ে চলতেন। 

আমার খালা শেষ বয়সে কুজো হয়ে হাটতেন। যখন ই শুনেছেন যে, আমি শহর থেকে গ্রামে গিয়েছি, তখনি তিনি কস্ট হলেও খুব সকালে আমাকে দেখার জন্য আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন। আমার খালা ও কোন ছবি নাই কিন্তু কোন একদিন আমার ছোট ক্যামেরা দিয়ে একটি মাত্র ছবি তুলেছিলাম যা আমার কাছে একটা অমুল্য রতনের মতো মনে হয় এখন। 

আমার খালা যেদিন মারা যান, আমি এই খবরটা জানতেও পারি নাই। অনেকদিন পর যখন আমি গ্রামের বাড়িতে গেছি, খালার সম্পরকে জানতে চেয়েছি, শুনলাম যে, আমার খালা মারা গেছেন। আমার খুব আফসোস লেগেছিলো। 

আমার খালার ভাগ্য ভালো যে, ঊনি অনেক কস্টে পরার আগেই জান্নাতবাসী হয়েছেন। আমি মাঝে মাঝে খালাকে গোপনে কিছু টাকা দিতাম কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে কোনো কিছু কিনতে পারতেন না, ফলে ঊনি টাকা দিয়েও তার মনের মতো কোন কিছু কিনে খেতে পারতেন না। এর আগেই তার অন্যান্য নাতি পুতেরা তার হাতের টাকাগুলি কোনো না কোনো ভাবে ছিনিয়ে নিতেন। বড্ড নিরীহ মানুষ বলে কারো উপর তার কমপ্লেইনও ছিলো না। খুব নামাজি মানুষ ছিলেন আমার খালা। তার কোন ছেলেরাই তাকে ঠিক মতো ভরন পোষণ করার দায়িত্ত নেন নাই। এক সময়ের প্রতাপ্সহালি মাদবরের স্ত্রী শেষ জীবনে কস্টের মধ্যেই জীবন তা অতিবাহিত করছিলেন কিন্তু আমাদের কিছু সাহাজ্য আর তার নিজের স্বামীর যেটুকু আয় ছিলো তার উপর নির্ভর করেই শেষ জীবন তা অতিবাহিত করেছেন। 

আমার স্ত্রী–মিটুল চৌধুরী আসমা

মিটুল চৌধুরী আসমা তার নাম। তার মুল জন্মস্থান মানিকগঞ্জ। জন্ম ৩১সে ডিসেম্বর ১৯৬৮। মিটুলের বাবার নাম- আলাউদ্দিন চৌধুরী, মায়ের নাম- জেবুন্নেসা চৌধুরী। তারা আট বোন এবং তিনভাই। সে সবার ছোট ভাইবোনদের মধ্যে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে র্অথনীতিতে অনার্স পাশ করে মাস্টার্স করে পরবর্তীতে ১৪বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে জয়েন করেন। প্রথমে তিনি মাইমেন্সিং এর মোমেনুন্নেসা মহিলা কলেজে জয়েন করেন, অতঃপর ঘিউর সরকারী কলেজ, অতঃপর ঢাকা কমার্শিয়াল কলেজ থেকে রাজবাড়ি কলেজ , মাদারীপুর কলেজ ইত্যাদি হয়ে এনসিটিবি এবং তারপর সরকারী বাঙলা কলেজে চাকুরী করেছেন। তিনি বর্তমানে প্রোফেসর  এবং ডিপার্ট মেন্টাল হেড হিসাবে বাঙলা কলেজ, মীরপুরেই কর্মরত আছেন। 

দুই মেয়ের মা। বড় মেয়ে আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা বগুড়া (শহিদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজে) মেডিক্যাল থেকে এম বি বি এস পাশ করেছে। ছোট মেয়ে সাঞ্জিদা তাবাসসুম কনিকা এবার শহীদ আনোয়ারা গার্লস কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ইউ এম বি সি (ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি) তে ভর্তি হয়েছে, তার ক্লাশ আগামী আগষ্ট মাস ২০২১ থেকে শুরু হবে। মিটুলের স্বামী সেনাবাহিনীর অফিসার ছিলেন। মেজর হবার পর স্বইচ্ছায় অবসর নেন এবং নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। তাদের দুটু এক্সপোর্ট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী (সুয়েটার্স ইউনিট) আছে, ওয়ান টাইমের একটা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি আছে, আন-নূর কন্সট্রাকশন নামে একটি কন্সট্রাকশন কোম্পানী আছে। মানিকগঞ্জে আল-আব রার মেডিক্যাল ডায়গনোসিস সেন্টার নামে একটি মেডিক্যাল ইউনিটে পার্টনারশীপ ব্যবসা আছে।   

মিটুল চৌধুরী তার নিজস্ব বাড়ি মীরপুরে থাকেন। এ ছাড়া তাদের বাসাবোতেও কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে। এই গত এক বছরে মিটুল চৌধুরী তার আরো দুই বোনের সাথে জয়েন্ট পার্টনারশীপে তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি মানিকগঞ্জে ৬ তালা একটি বিল্ডিং করেছে। আমি জানি সেটায় ওরা কেউ থাকবে না, তার পরেও বড় একটা ইনভেষ্টমেন্ট।

মিটুল চউধুরীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইতিহাসটা হচ্ছে তার বিয়ের ঘটনা। আর এই বিয়ের ঘটনাটা বিস্তারীত বর্ননা আছে Diary 2 March 2021 datewise.docx#৩০/০৫/১৯৮৮- বিবাহ

অধ্যায়ে।

(চলবে)  

হোসেন আলী মাদবর

আমি আমার মাদবর বাড়ীর সব প্রকারের ঐতিজ্য নিয়ে সবসময় গর্ববোধ করি। একটা বাড়ি একটা সমাজ হতে পারে, মাদবর বাড়ি একটা তার প্রমান। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মাদবর বাড়ীর তথ্য, অজানা ইতিহাস ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে কে বা কারা এই পরিবারের সদস্য বা তারা কে কোথায় আছে, এর ইতিহাস আজনেকেই জানে না বিধয় মাদবর বাড়ীর সেই পুরানো বংশ আভিজাত্যের ধারা মুছে যেতে চলেছে।হয়ত একসময় এই মাদবর বাড়ি সদস্যগনই জানবে না তারা কে বা কারা। বাংলাদেশ  আমেরিকা নয় যে, কোনো এক ওবামা, বা কোন এক ট্র্যাম্প পৃথিবীর কোনো একস্থান থেকে উদয় হয়ে আমেরিকার মতো বিশাল এক রাজকীয় পরিবেশে উড়ে এসে জুড়ে বসে একেবারে টপ পজিশন ধরে প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন। সেটা আমেরিকায় হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সব পরিচয় জেনেও কাউকে যদি হেয় করতে মন চায়, তাহলে তার কোনো কিছুই জানার প্রয়োজন হয় না, সে শুধু তার ইচ্ছেটাই প্রকাশ করবে। কিন্তু যদি কেউ আপনার আমার বংশ পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিয্য সব কিছু জানে, তাহলে যে যাই কিছু করুক বা বলুক, অন্তত এইটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে, অহেতুক আপনাকে কেউ হয়রানী হয়ত করবে না। কোনো মৃত ব্যাক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই যায় আসে না, কিন্তু তারপরেও মানুষ ইতিহাস পড়ে আর ইতিহাস লিখে। একমাত্র ইতিহাসটাই সত্য। আর যতো আগামি, বর্তমান, কিংবা সব “যদি” কোনোটাই শতভাগ সত্য নয়। তাই নিজের ইতিহাস টুকু তো জানুন। মনে নাই? আলেক্স হ্যালির সেই রুটস কাহিনীটি? সেটাই ইতিহাস।

আমাদের পরিবার “মাদবর” পরিবার হিসাবে পরিচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই এই পদবীটা কেনো জানি নামের পাশে ব্যবহার করতে একটু দ্বিধা বোধ করছি। যেমন আমি নিজেও আমার নামের পাশে মাদবর পদবীটা উল্লেখ করি না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, কেনো করছি না, আমার কাছে একটা যুক্তি তো অবশ্যই আছে। আর সেটা হচ্ছে-

আমি যখন গ্রামে থাকতাম, তখন দেখেছি যে, আমাদের গ্রামের অনেকেই অনেক প্রকারের মাদবর সেজে আছেন। কেউ বাচ্চু মাদবর, কেউ আজগর আলি মাদবর, কেউ আক্কাস আলি মাদবর ইত্যাদি। এই মাদবর গুলিকে দেখে আমার গা এক প্রকার রি রি করতো কারন তাদের না ছিলো কোনো ইথিক্স, না ছিলো কোনো গুনাগুন। অথচ শুনেছি, আমার বাবা যখন মাদবরি করতেন, তখন তিনি নাকি কারো বাড়িতে গিয়ে এক কাপ চাও খেতেন না। যদি কারো বিচারের বেলায় পক্ষপাতিত্ব হয়ে যায়, তাই! কিন্তু আমার বাবা, বা দাদা কি ধরনের মাদবর ছিলেন আর এখনকার মাদবরগন কি প্রকারের মাদবরি করছেন এই পার্থক্য টা আমার ঐ ছোট বয়সে যেমন বুঝবার ক্ষমতা ছিলো না, তাই আমার বংশের পদবীটা যে এতো মানসম্মানের, সেটা আমার আসলে বুঝার জ্ঞ্যানও ছিলো না। ফলে এই মাদবর উপাধিটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হইতো এবং কিছুটা নিম্নজাতীয় উপাধি বলিয়াও মনে হইতো, বিশেষ করিয়া শহুরে সমাজের কাছে। তাই আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার সমস্ত স্কুল কলেজের সার্টিফিকেট সমুহের এই নামের পাশের মাদবর পদবীটা একেবারে রহিত করিয়া দিয়াছি।

আমার বড় ভাই জনাব ডঃ মহাম্মাদ হাবিবুল্লাহও কেনো যে এই পদবীটা নিলেন না সেটা আমার বোধ গম্য নয়।

যাক সে কথা।

এবার আসি আমাদের বংশের সংক্ষিপ্ত একটু ইতিহাস নিয়ে।

হিসাব্দি মাদবর ছিলেন আমার দাদা। এই দাদার থেকেই আমার ইতিহাস আমি শুরু করিবো। তিনি ছিলেন অনেক বিচক্ষন একজন ব্যক্তি। তার আমলে তিনি অনেক সম্পদ এবং বুদ্ধির মালিক ছিলেন। আমার দাদির নাম আমি জানি না। জানতে ইচ্ছে করে। হয়ত আমার বড় ভাই জানবেন।

আমি আমার বাবাকে কখনো দেখিনি এবং তার চেহাড়া কেমন ছিলো, খাটো নাকি লম্বা, যুবক না বৃদ্ধ, ফর্সা নাকি কালো কোনো কিছুই আমার জানা নাই। তবে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে আমি আমার বাবার অনেক গল্প শুনাতেন যার থেকে আমি বাবার একটা কাল্পনিক চরিত্র মনে গেথে গেছে। আমার দাদার নাম ছিলো হিসাবদি মাদবর। আমরা মাদবর বংশের লোক।

বাবার সম্পর্কে আমি অনেক চমৎকার চমৎকার গল্প শুনেছি ভাইয়ার কাছে। তবে তার প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে জরুরী তথ্য হলো যে, আমার বাবার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আমার মাকে বিয়ে করেন। বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ঘরে মোট তিন জন ছেলে সন্তান আর তিনজন কন্যা সন্তান ছিলো। এই মোট ছয় সন্তান থাকার পরে আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। তখন আমার মায়ের বয়স ছিলো বেশ কম। আগের সব সন্তানেরাই আমার মায়ের থেকে বয়সে বড় ছিলো। কেউ কেউ আবার ইতিমধ্যে বিয়েও করে ফেলেছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমার মা যেমন একটু অসুবিধায় ছিলেন, তেমনি আমার বাবাও বেশ অসুবিধায় ছিলেন।

কিভাবে আমার বাবা এই দুমুখী অসুবিধাগুলি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাধান করেছিলেন, সেই গল্প গুলিও আমি হোসেন আলী মাদবরের পর্বসমুহে একে একে লিখবো।

জেবুন্নেসা চৌধুরী (আমার শাসুড়ী)

তিনি আমার শাশুড়ি। মোট আট মেয়ে আর তিন ছেলের সার্থক মা। অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আমার কাছে তিনি আমার আপন মায়ের মতোই ছিলেন। আমার মাকে আর আমার এই শাশুড়িকে আমি কনোদিনই পার্থক্য করি নাই। তিনি আমাকে প্রতি ঈদে ১০ টাকার সালামি দিতেন। কি যে ভালো লাগতো ঊনার কাছ থেকে এই ১০টাকা সালামি নিতে।

চলবে…

আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী

তিনি আমার শ্বশুর।

আমি আমার শ্বশুর কেও জীবিত অবস্থায় দেখি নাই। আমার স্ত্রী যখন অষ্টম ক্লাসে পড়ে, তখন তার বাবা মারা যান। আমি যখন আমার স্ত্রীকে বিয়ে করি, তখন আমার স্ত্রী সবে মাত্র ইন্তারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির তোড়জোর করছেন। ফলে আমার বিয়ে হবার প্রায় ৪/৫ বছর আগে আমার শ্বশুর মারা যান। আমার শ্বশুরের প্রাথমিক তথ্য গুলি এ রকমেরঃ

নামঃ আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী

পিতাঃ সোনাম উদ্দিন চৌধুরী (সোনাম উদ্দিন চৌধুরীর পিতার নাম ছিল, ফাজেল আহম্মদ চৌধুরী)

স্ত্রীর নামঃ জেবুন্নেসা চৌধুরী

আমার শ্বশুরের ছিল আট কন্যা সন্তান এবং তিন পুত্র সন্তান।

আমার স্ত্রী ছিলো তাদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ।

তাদের ওয়ারিশ নামা যদি লিখি তাহলে দাঁড়ায় এ রকমেরঃ

ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী

তিনি আমার চাচা শশুড় ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের আপন ভাই। আমার শশুড়েরা ছিলেন তিন ভাই, (১) আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী (২) ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং (৩) নিজাম উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদকেও আমি দেখিনি কিন্তু যতটুকু আমি শুনেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি যে তিনি ছিলেন এ দেশের গোটা কিছু প্রোফেশনাল মানুষদের মধ্যে একজন। ডাক্তার হিসাবে যেমন তিনি খুব নামীদামী ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসাবেও ছিলেন খুব ভালো। তিনি সর্বশেষ জীবনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রোফেসর ছিলেন। তার একটি ছেলে (১) মকবুল আর একটি মেয়ে (নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।)। তার স্ত্রীর নাম ছিলো মেহেরুন্নেসা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নার্সের কাজ করতেন কিন্তু এই চাচার সাথে বিয়ে হবার পরে মেহেরুন্নেসা আর নার্সের জব করেন নাই। চাচী অত্যান্ত চালাক আর সার্থপর ছিলেন। তিনি চাচার বাড়ির কোনো মানুষকে তার বাসায় এলাউ করতেন না এবং এমনকি চাচার কথাও শুনতেন না। সারাক্ষন ঘরের মধ্যেই থাকতেন দরজা জানালা বন্ধ করে। এটা একটা রোগ। তার মেয়েটাকে বিয়ে দেয়ার পর মেয়েটা যেহেতু মায়ের স্বভাব পেয়েছিলো, ফলে তার ঘরে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হবার পরেই মায়ের মতো আচরন শুরু করে এবং সেখানে আর থাকতে পারে নাই। পরবর্তীতে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি তার মেয়েকে নিয়ে আজীবনকাল একটা টিনের ঘরের ভিতরে এমনভাবে বন্দি হয়ে রইলো যে, কখনো তাঁকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় না শুধুমাত্র কিছু খাবার দাবার কেনা কাটা ছাড়া। তার বাতিক হচ্ছে সে চাউলকে পাক করার আগেও সাবান দিয়ে ধোয়ে নিবে। এর মানে এই নয় যে, সে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। তার মেয়েটিকে আমরা ঘরের বাইরে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মেয়েটা সারাদিন ঘরের মধ্যে একটা অলিক ভাবনা নিয়ে কল্পনার রাজ্যে বসবাস করতে করতে এখন সেও প্রায় পংগু। তার যেহেতু কোনো আয় রোজগার নাই, ফলে সবাই জাকাত কিংবা দান করা টাকা দিয়েই তার জীবন চলে। তাতে তার কোনো আক্ষেপ নাই। মজার ব্যাপার হলো এই যে কেউ তাঁকে দান করছে বা টাকা দিচ্ছে, এতেও তার কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই। তাঁকে ডাকলেও ঘর থেকে বের করা সম্ভব না। ডাঃ কুতুব উদ্দিন মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা তার লাশ দেখতেও ঘর থেকে বের হন নাই। আমার ধারনা, চাচা এই মহিলাকে বিয়ে করে আজীবন অনুশোচনাই করেছেন সম্ভবত। শেষ জীবনে চাচা অত্যান্ত অসুখী জীবন জাপন করেছেন। প্রায় ৪ বছর আগে স্ত্রী মেহেরুন্নেসাও ইন্তেকাল করেছেন। ডাঃ কুতুব উদ্দিন চাচার ছেলে মকবুল নিজেও খুব একটা কাজের মানুষ না। সবকিছু রেডিমেট পেতে চায়। চৌধুরী বাড়ির ওয়ারিশদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সম্পদের ভাগ মকবুল পায়, যেহেতু ওয়ারিশ মাত্র ২ জন। চাচার বাবা সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফ-এ-আওলাদ করে গেছেন বলে কোনো সম্পত্তিই বিক্রি যোগ্য নয়। কিন্তু এর মাঝেও অনেক সম্পত্তি আছে যা ওয়াকফ-এ-আওলাদের বাইরে। আমি প্রায় ২ মাস নিজে কষ্ট করে সমস্ত জমি-জমার কাগজপত্র ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম জমিগুলির দেখভাল করতে আর কিছু জমি বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করতে। কিন্তু মকবুল সেটাও করতে নারাজ। সোনাম উদ্দিন চৌধুরী কোনো কারনে যখন আমার শশুরের উপর অহেতুক মেজাজ খারাপ করে প্রথমে তাঁকে ত্যাজ্য করার মতো একটা বুদ্ধি করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলো, এই কুতুব উদ্দিন চাচাই শেষ পর্যন্ত তার বাবা (সোনাম উদ্দিন চৌধুরী) কে বুঝিয়ে সুজিয়ে পরবর্তীতে প্রথম ওয়াকফ দলিল সংশোধন করে পুনরায় আলাউদ্দিন চৌধুরীকে তার সন্তানের প্রাপ্য অংশে বহাল রাখেন। আল্লাহ নিশ্চয়ই সব কিছুর খবরজান্তা। এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, এই সোনাম উদ্দিনের মতোই কিছুটা চরিত্র পেয়েছে হাসান আহমদ লিখন কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে- সোনাম উদ্দিন গেম প্লে করেছে তার নিজের সম্পদ আর সিদ্ধান্ত নিয়ে কিন্তু লিখন গেম প্লে করেছে পরের সম্পদের উপর অন্যায় করে মাদবরী করতে গিয়ে। এটা আরো জঘন্য।

হাসান আহমদ চৌধুরী

ওর ডাক নাম লিখন। নূর আহমদ চৌধুরীর বড় ছেলে। ওরা মোট ৫ ভাই কিন্তু কোনো বোন নাই। প্রাতমিক জীবনে লিখন অনেক আর্থিক চাপে ছিলো বিশেষ করে ১৯৮৮-১৯৮৯ সালের দিকে। ওর সাথে আমার পরিচয় হয় বিয়ের পরেই। অনেক ইন্টিলিজেন্ট ছেলে কিন্তু মাঝে মাঝে ওর এই বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু ব্যাপারে কাজে লাগায় যা স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে। যেমন একটা উদাহরন দেই, চৌধুরী বাড়ির সব সম্পত্তি সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার জিবদ্দশায় ওয়াকফ-আওলাদ করে যাওয়ায় তাদের মানিক গঞ্জের বাড়িটাও সেই ওয়াকফ-আওলাদের অন্তর্ভুক্ত। ওখানে কেউ থাকেন না শুধু লিজি আপা (আমার আরেক জেঠস) থাকেন। তিনি শারীরিকভাবে একেবারেই পংগু। লিখনের বদবুদ্ধির কারনে লিখন চেয়েছিলো পুরু বাড়িটা যেভাবেই হোক সেটা আত্মসাৎ করা। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সব ভাইবোনেরা লিজি আপাকে অত্যান্ত স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তারা এটাই চেয়েছিলো যেনো লিজি আপা কোনো রকমে মানিক গঞ্জের ঐ দাদার বাড়িতে একটা ছোট জায়গায় একটা ঘর তোলে আজীবন থাকতে পারেন। কিন্তু লিখন এটা কোনোভাবেই চায় নাই। মজার ব্যাপার হলো যে, ঐ দাদার সম্পত্তিতে লিখনের পিতার ওয়ারিশ সুত্রে সে নিজে ২ কাঠার ৭ ভাগের এক অংশের মালিক। সে হিসাবে লিখন পায় ২ কাঠার মধ্যে ৭ ভাগের এক ভাগ। অথচ লিজি আপা নিজেই ঐ সম্পত্তির পিতার ওয়ারিশ সুত্রে ১ কাঠার বেশী মালিক। অর্থাৎ লিখনের থেকে ঢেড় বেশী। আর এই লিখন চায় না লিজি আপা ওখানে থাকুক। উদ্ভট ভাবনা। এখানে আরো একটা ব্যাপার কাজ করছিলো যে, চৌধুরী বাড়ির মানুষেরা পরোক্ষ ভাবে লিখনকে তাদের অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতো। ফলে তার একটা অলিখিত দাপট ছিলো। সম্ভবত সেই দাপটের কারনেই লিখন একচ্ছত্র এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার হিম্মত করেছিলো। পর্দার বাইরে থেকে আমি পুরু ব্যাপারটা এমনভাবে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করেছিলাম যেনো লিজি আপা তার ন্যায্য অংশ পায় এবং সেখানে তার যা খুসি করতে পারে। এখন ওখানে লিজি আপার জন্য ৬ তালা বিল্ডিং হয়েছে যা লিখনের নিজেরো নাই। এই ধরনের কাজ করাটা ওর কোনোভাবেই ঠিক হয় নাই। যাই হোক, লিখন লটারীর মাধ্যমে আমেরিকার একটা ইমিগ্রেশন পেয়েছিলো। সরকারী আইন মোতাবেক ওকে ওখানে ৫ বছর এক নাগাড়ে থাকতে হবে বিধায় আমেরিকার সরকার ওকে এবার আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে আটকে দিয়েছে যেনো সে আর দেশে ফিরতে না পারে। সব আল্লাহর ইচ্ছা। ওকে আমি সত্যিই একটা পজিটিভ বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে ভেবেছিলাম যা আসলে ওর মধ্যে বেশ ঘাটতি আছে। ভালো জব করতো আর্গন ফ্যাশনে, পারভেজ ভাইয়ের অধীনে। যাই হোক, ওর উপরে অনেকের ভরষাটা এখন প্রায় শুন্যের কোঠায়। ওর উপরে আমার কখনো রাগ ছিলো না। আমি ওর উকিল বাবাও বটে।

নূর আহমদ চৌধুরী

আমার বড় সমন্ধী অর্থাৎ আমার স্ত্রীর সবচেয়ে বড় ভাই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হাইকোর্টে স্ট্যাম্প রেকর্ডার হিসাবে কাজ করতেন। এই স্ট্যাম্প রেকর্ডার কি জিনিষ আমি জানি না। তবে ব্যক্তিগত জীবনে অনেক সৎ এবং ধইর্যশীল মানুষ ছিলেন। হাসমত আরা ছিলেন তার স্ত্রী। এই দম্পতির কোনো মেয়ে সন্তান ছিলো না। ছিলো ৫ ছেলে। হাসান আহমদ লিখন তার বড় ছেলে। হাসান আহমদ লিখনের ব্যাপারে বিস্তারীত আমি কিছু তথ্য লিখেছি ওর অধ্যায়ে। নূর ভাই আমার খুব প্রিয় মানুষদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করতাম, তিনিও আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। সহজ সরল মানুষ ছিলেন। সবাই বলে নূর আহমদ চৌধুরী নাকি তার বাবার মতো দায়িত্তশীল ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের মতো। আমি আমার শশুড়কে দেখি নাই ফলে তুলনাটা আমি করতে পারি নাই। বিয়ের আগে আমার তার একবারই দেখা হয়েছিলো বগুড়ায় কিন্তু বিয়ের পরে তার সাথে আমার অনেক শখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। তিনি তার সংসারের জন্য এবং চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার অবদান চৌধুরী বাড়ির সব সদস্যদের জন্য অনেক ছিলো। সব সময় তিনি চাইতেন যেনো সবাই ভালো থাকে। এই ভালো থাকার চাওয়ার কারনে তিনি একবার আমাকে একটা প্লট দেয়ার নামে তারই কোনো এক কলিগের পাল্লায় পরে আমার বেশ কিছু টাকা নষ্ট করলেও তার উপর আমার কখনো কোনো রাগ হয় নাই। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে তিনিও ঠকেছেন কাউকে বিশ্বাস করে। তার এক ছেলে মানিক গঞ্জে কোনো এক বন্ধুকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে খুন করে ফেলেছিলো। খুব সমস্যায় পড়েছিলেন। কোথাও লুকানোর জায়গা ছিলো না। আমি জানি এই খুনের ব্যাপারটা আমার সাপোর্ট করার কোনো কারন নাই কিন্তু শুধুমাত্র নূর ভাইয়ের কারনে আমি তাঁকে সহ তার সেই খুনী ছেলেকে প্রায় ২ মাস আমার বগুরার ক্যান্টনমেন্টে রাখতে হয়েছিলো কারন ক্যান্টনমেন্টে কোনো পুলিশ রেইড করে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে আজীবন আক্ষেপে থাকবো কারন আমি একটা অপরাধকে লুকানোর সাহাজ্য করেছিলাম। নূর আহমদ ভাই ২০১২ এর দিকে মারা যান। মানিকগঞ্জেই তার দাফন হয়েছিলো।

কার্লা ডরাইন উইলশন

কার্লা ডরাইন উইলশন তার পুরু নাম। আমার এই ওয়েব সাইটের মধ্যে আমার সাথে এক মাত্র খুব অন্তরের সম্পর্ক ছিলো এই একটি মাত্র বিদেশী মানুষের। ওর সাথে আমার যখন পরিচয় হয়, তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র ১৪ কিংবা ১৫। আমি তখন ক্যাডেট কলেজে ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় আসলে আমাকে কেউ খুব একটা চিঠিপত্র লিখতো না, কেউ প্যারেন্টস ডে তেও আসতো না। কেউ ছিলো না আসলে। মা থাকতেন গ্রামে, অভাবী মানুষ, রাস্তা ঘাট চিনেন না, বোনেরাও সেই রকম কোনো অবস্থানে ছিলো না যে, ছোট ভাইয়ের জন্য তারা কিছু করবে, তাদের ও সাংসারিক অবস্থা তেমন ছিলো না। একদিন আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ আমাকে জানালেন যে, তার এক বন্ধুর মেয়ে নাম, কার্লা আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। চিঠি লিখলে যেনো আমি তার উত্তর দেই। সেই থেকে হটাত করে কার্লা আমাকে চিঠি লিখা শুরু করে। হাতের লেখা অত্যান্ত খারাপ, এক পৃষ্ঠা চিঠিতে মাত্র ৫/৬ লাইনেই পাতা ভরে যায় এমন এক অবস্থা, ফলে ওর চিঠির ভলিয়ম হতো কয়েক পাতা করে। একটা সময় এলো আমি প্রতিদিন ওর চিঠি পাওয়া শুরু করলাম। প্রথম প্রথম আমি বুঝতেই পারি নাই যে, কার্লা আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্রমেই ওর চিঠির মধ্যে ভালোবাসার কথা, ভালোবাসার সিম্বল, ইত্যাদি ফুটে উঠতে শুরু করলো। টিন এজার প্রেম। আমিও এক সময় যেনো ওর চিঠির প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম। ওর চিঠি না পেলে ভালো লাগতো না, আবার আমি চিঠি না লিখলেও ভালো লাগতো না। আমার সাথে সুত্র ধরেই কার্লা আমেরিকায় আমার ভাইয়ের সাথে, হাবীব ভাইয়ের বউ এর সাথে রীতিমত একটা সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছিলো। পাশাপাশি বাড়ি ছিলো কার্লাদের আমার ভাইয়ের বাড়ির লাগোয়া। ফলে হাবীব ভাইয়ের বউ কার্লাকে আমাদের দেশীয় কালচার, পোষাক আষাকের মধ্যেও ঢোকিয়ে দিয়েছিলো। কার্লা আমাকে এক সময় “হাসবেন্ড” হিসাবেই চিঠিতে সম্বোধন করা শুরু করলো। প্রতি চিঠিতেই আমি ওর প্রত্যাহিক জীবনের ঘটনা, তার ভাবনা, তার শখ, কিংবা কষ্টের কথা জানতে থাকলাম। প্রচুর ছবি পাঠাতো আমাকে। আজ আমার কাছে কার্লার কোনো ছবি নাই। কেনো নাই সেটাও বলি। আমি কারো কোনো কিছুই ফেলে দেই না। কার্লার চিঠি, ছবি সব কিছু আমি আলাদা করে একটা বাক্সে ভরে রাখতাম। আমার সেই বাক্সটা রেখেছিলাম বর্তমানে আমার এক জেঠষের বাসায় খুব যত্ন করে। কোনো একদিন আমি ঐ বাক্সটা আনতে গেলে শুনলাম, ওনারা ঐ বাক্সটা খুব জরুরী কোনো বিষয় না বলে তার ভিতরের সব কাগজ পত্র সহ ফেলে দিয়েছে। খুব কষ্ট লেগেছিলো, কিন্তু বলতে পারি নাই কি তারা ফেলেছিল। কার্লার এক বন্ধুর নাম ছিলো মিন্ডি। মিন্ডি সম্পর্কেও কার্লা অনেক কথা লিখতো। আমার এই ডায়েরিতে একটি মাত্র লেখা আছে যার নাম WAS IT PENFRIENDSHIP?  এটা আসলে এই কার্লাকে নিয়েই লেখা। এই লেখাটা কোনো কাল্পনিক নয়। এটা নিছক একটা এমন লিখা যা বাস্তবে ঘটেছিলো। অনেক কিছুই লিখার ছিলো কিন্তু আজ যেহেতু সে কাছেও নাই, পাশেও নাই, সেটা রহস্য হয়েই থাকুক। 

আমার স্টেপ ভাইবোনগন

আগেই বলেছিলাম যে, আমার বাবার আগের একটা সংসার ছিলো। আমার প্রথম মা মারা যাওয়ার পরেই আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমার মায়ের বয়সের থেকেও আমার বাবার আগের সন্তানদের বয়স অনেকেরই বেশী ছিলো। আমার স্টেপ ব্রাদারদের সংখায় ছিলো তিন- নজর আলী ভাই, তাজির আলী ভাই আর মোহসীন ভাই। শোনা যায় যে, ইউনুস নামেও নাকি আমার আরেক স্টেপ ব্রাদার ছিলো কিন্তু সেটা সম্ভবত আমার মায়ের বিয়ের পর পরই তার মৃত্যু হয়। আত স্টেপ বোন ছিলো ৪ জন- জামিনা, লজ্জুতন, বেলাতন, আরাদন আর আরাফান আপা। তারা এখন আর কেউ বেচে নাই। আমার এই স্টেপ ভাই বোনদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশী যেই জনের সাথে আমার ব্যক্তিগত খাতির ছিলো সেটা নজর আলী ভাইয়ের সাথে। আর এর একটা কারনও ছিলো। নজর আলী ভাই আমাদের বাক্তার চর বাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার আর রবিবার কাচা বাজারের দোকান দিতেন। আর আমি যখন বাজারে যেতাম, তখন তার সাথে আমার সপ্তাহে দুইদিন দেখা হতোই। নজর আলী ভাইয়ের ছিলো দুই ছেলে-তালেব আর ঈমান আলী। মেয়ে ছিলো দুইজন, রাশেদা আর অন্য আরেক জন। এই মুহুর্তে নামটা মনে করতে পারছি না তবে তার একটা মেয়ে আছে যিনি নার্স শেফালী। তাজির আলী ভাইয়ের ব্যাপারে “আমার বাবার মাদবড়ি স্টাইলের” মধ্যে বিস্তারীত লেখা আছে। সেই তাজির আলীর অনেক গুলি সন্তান ছিলো। তার মধ্যে বর্তমানে মান্নানই এখন আমার সাথে অনেক বছর যাবত যুক্ত আছে। মোহসীন ভাইয়ের সন্তান্দের সাথে এক সময় কিছুটা যোগাযোগ ছিলো কিন্তু এখন কে যে কোথায় কিভাবে আছে আমার সে ব্যাপারে কোনো ধারনা নাই। 

শায়েস্তা খাতুন

সবাই তাঁকে শায়েস্তা নামেই চিনতো। সে আমার বোনদের মধ্যে ছিলো ২য়। শায়েস্তার জীবন একটা দুখী মানুষের কাহিনী ছাড়া আর কিছুই না। তার গায়ের রং ছিলো বেশ কালো কিন্তু খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে ছিলো আমার এই বোন শায়েস্তা খাতুন। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহই আসলে পুরু ৫ বোন আর আমি সাথে মায়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে এতোটাই হিমশিম খাচ্ছিলেন যে, এতা ছিলো আমার ভাইয়ের জন্য অতিমাত্রায় একটা চাপ। তার উপর সবে মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে, চারিদিকে মানুষ যেমন বেকার তেমনি শুরু হয়েছে দূর্ভিক্ষ। এর মাঝেই আমার বড় ভাই যতোটা পেরেছে তার সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে আমরা কিছুটা হলেও ভালো থাকি। অভাবের সংসারে আসলে কোনো কিছুই নিজেদের নিয়ন্ত্রনে থাকে না। মায়ের উপর চাপ যেনো আরো বেশী ছিলো। ৫ টাই প্রায় বিবাহ যোগ্য মেয়ে, আমিই এক মাত্র ছোট। দেশের অবস্থ্যা শোচনীয়, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই। যখন তখন যে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। ফলে মা নিজেও চাচ্ছিলেন মেয়েগুলির তারাতাড়ি বিয়ে হয়ে যাক। ঠিক এই সময়ে বরিশাল বাড়ি একটা ছেলে শায়েস্তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়। নাম সুলতান আহমদ। মা শায়েস্তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। এই বিয়েতে হাবীব ভাই রাজী ছিলেন না। কেনো ছিলেন না, বা কেনো মা ই বা রাজী ছিলেন এই অংক আমার কাছে পরিষ্কার ছিলো না আর না আমার বুঝবার বয়স ছিলো। শায়েস্তার কোলে একটা কন্যা সন্তান আসে। ওর নাম রাখা হয় শেফালী। একদিন সুলতান তার নিজের বাড়ি বরিশাল যাওয়ার জন্য গেলে সুলতান আর কখনোই ফিরে আসে নাই। কি হয়েছিলো, কোথায় উধাও হয়ে গেলো, নাকি রাস্তায় মারাই গিয়েছিলো কিছুই আর জানা যায় নাই। আজ অবধি আমাদের কারোই জানা নাই এই সুলতান কি বেচে আছে নাকি মরে গেছে। দিন যায়, মাস যায়, বছর শেষ হয়ে যায়, শায়েস্তা সুলতানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক সময় আমরা ধরে নেই যে সুলতান হয়তো আর ফিরে আসবে না অথবা তার মৃত্যু হয়েছে। এমনি অবস্থায় ১৯৭৮ সালে আমার বড় ভাই আমেরিকায় স্কলারশীপ পান। কিন্তু তখন সবেমাত্র লায়লার বিয়ে হয়েছে, ফাতেমার ও বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো, সাফিয়া তো আর ছিলোই না। বাকী ছিলো শায়েস্তা আর মেহের। একদিন ঢাকা থেকে একটা বিয়ের সমন্ধ আসে শায়েস্তার জন্য, নাম আলি আহমদ। উর্দু রোডে থাকে, কুট্টি পরিবার না হলেও কুট্টিদের সাথে থাকতে থাকতে প্রায় কুট্টি দের মতোই আচরন ছিলো। বিগ হার্টেড ম্যান কিন্তু সামর্থের বাইরে খরচের অভ্যাষ। কিন্তু আলী আহমদের৪ স্ত্রী বিয়োগ হয়ে গিয়েছিলো। সেই ঘরে একটা মাত্র মেয়ে ছিলো নাম লায়লুন্নাহার। খুবই সুন্দর একটা মেয়ে ছিলো। প্রায় ১৫ বছর বয়সের। শায়েস্তার সাথে আলী আহমদের বিয়ে হবার পর শাতেস্তারা উর্দু রোডে চলে আসে। এই আলি আহমদের৪ ঘরেই শায়েস্তা ৪ টি সন্তান জন্ম দেয়- ফারুক, নুরুন্নাহার, লিয়াকত আর শওকাত। লিয়াকত আর শওকাত জমজ।  লিয়াকত আর শ ওকাতের বয়স যখন মাত্র ৫ মাস, তখন শায়েস্তার মৃত্যু হয়। আর ওর মারা যাওয়ার কারনে আলী আহমদ সব বাচ্চাদেরেকে  এক সাথে আমার মায়ের কাছে রেখে চলে আসে। একদিকে শেফালি ছিলো মায়ের ঘাড়ের উপর, অন্যদিকে শায়েস্তার আরো ৪ টি সন্তান গিয়ে পড়লো মায়ের উপরেই। অসহায় মার কিছুই করার ছিলো না। শুরু হলো মার আরেক স্ট্রাগলের অধ্যায়। আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দিয়েছিলো শায়েস্তার সব সন্তানরা। 

সাফিয়া খাতুন

সাফিয়া খাতুন আসলে আমাদের বোনদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে সাফিয়া খাতুন মারা যায়। সাফিয়া খাতুন প্রথমে একটা বিয়ে করার পর তার স্বামী মারা গেলে পরবর্তীতে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে। কিন্তু সেটাও বেশীদিন টিকে নাই কারন সাফিয়াই মারা গিয়েছিলো। আমি তখন সবে মাত্র ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজ থেকে ছুটিতে এসেছিলাম। বর্ষার দিন, ঝড়ও ছিলো। আমার যাওয়ার কথা ছিলো সাফিয়ার বাসায়। কিন্তু আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম বালুচর এলাকায়। ঝড়ের কারনে আমার আর গ্রামে ফেরা হয় নাই। সেদিন রাতেই সাফিয়ার শরীর খারাপ হয়ে যায় এবং রাতেই সাফিয়া মারা যায়। ছোট মেয়ে মাত্র, বয়স তিন মাস। সাফিয়ার চেহারা ছিলো খুব সুন্দর। সাফিয়া যখন মারা যায় তখন রাত প্রায় ১০ টা। ঝড়ের কারনে খবরটা আমাদের বাসায় আসতে আসতে সকাল হয়ে যায়। আমি বালুচর থেকে গ্রামে আসতে আসতেই ওর শশুড় বাড়ির লোকজন ওকে দাফন করে ফেলে। তারপর আমি গেলাম সাফিয়ার বাসায়। গিয়ে দেখলাম সাফিয়ার মেয়ে শান্ত ভাবে যেনো ঘুমিয়ে আছে। আমার মনটা খুবই খারাপ ছিলো। কোথায় কবর দেয়া হয়েছে সেটা দেখার জন্য আমি সাফিয়ার কবরের কাছে গেলাম। সারারাত বৃষ্টি আর ঝড় থাকলেও শিয়াল কুকুরের কাজ থেমে ছিলো না। এই সব প্রানীগুলি সাফিয়ার কবরে হানা দিয়েছিলো। কিন্তু যে কোনো কারনেই হোক সাফিয়ার লাশটা আস্ত অবিকল ছিলো। কবরের পাশে গিয়ে দেখলাম যে, কবরের মুখটা খোলা। বাশ আর চটি গুলি সরে গেছে। সাফিয়ার লাশের উপরের সাদা কাফনের কাপড়টা একদিকে একটু সরে গেছে আর ওর মুখটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চুল গুলি ছিলো একেবারেই অগোছালো। আমি মাথা নীচু করে যখন সাফিয়ার মুখটা দেখতে গেলাম, আমি ভীষন ভয় পেয়েছিলাম লাশ দেখে। কেনো ভইয় পাইলাম, আর কি হলো আমি কিছুই বুঝ্যি নাই কিন্তু বাড়িতে আসার পর আমার অনেক জ্বর হয়েছিলো। আমার কাছে সাফিয়ার কিংবা ওর মেয়ের কোনো ছবি নাই। পরবর্তীতে সাফিয়ার তিন মাসের বাচ্চাতাও মায়ের অভাবেই হোক আর অযত্নেই হোক সেও বাচে নাই। সাফিয়ার কোনো বংশধর এই পৃথিবীতে নাই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুক। 

ফাতেমা

ফাতেমা বর্তমানে আমার জীবিত বোনদের মধ্যে ২য়। তার স্বামী মোঃ সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু মিয়া। দুদু মিয়ার ব্যাপারে এখানে আগেই বিস্তারীত বলা হয়েছে। ওর স্বামী মারা যাওয়ার পরে ওর বড় ছেলে ফরিদের সাথে জাপানেই আছে। ফাতেমার দুটু মেয়ে আর ৪ টি ছেলে। মেয়ের মধ্যে বড় হচ্ছে সালেহা। সালেহার স্বামী আইনুল মোটামুটি ভালো অবস্থাএই আছে। ঈটের ভাটার মালিক। কিন্তু ছোট মেয়ে খালেদার প্রেমের মাধ্যমে বিয়েটা খুব একটা ভালো পরিনতি হয় নাই। মিজান খালেদার স্বামী। ইনকাম ট্যাক্সের অফিসে চাকুরী করে। তার যেমন ঘুষের বাহার তেমনি নারিদের প্রতি চরম ভালোবাসা। ফলে নিজের স্ত্রীর প্রতি তার ততোটাই অনীহা। খালেদার বাসায় আজ পর্যন্ত আমি পানিটুকু পর্যন্ত খাই নাই কারন সবই অবৈধ রোজগার। 

লায়লা

বর্তমানে যে কয়জন আমার বোন জীবিত আছেন, তাদের মধ্যে লায়লা সবার বড়। গ্রামেই থাকে। তার স্বামীর নাম মোঃ ইসমাইল হোসেন যিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। বয়স প্রায় এখন ৭০ এর কাছাকাছি। সর্বশেষ মুসলিম নগর প্রাইমারী স্কুল থেকে হেড মাষাটার হিসাবে রিটায়ার করার পর তিনি আমার সাথেই আছেন। আমি চেষ্টা করেছি এই দুলাভাইকে কোনো আর্থিক সাহাজ্য না করে কোনো কর্ম সংস্থানের মাধ্যমে সাহাজ্য করা যায় কিনা। তাতে তিনি একটু সুস্থ যেমন থাকবেন তেমনি আর্থিক ভাবে একটু সচ্ছলতাও থাকবে। দুলাভাই আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজেই আছেন প্রায় ১০ বছর যাবত। ফ্যাক্টরীটা বন্ধ করার পরেও আমি উনাকে ওখানেই রেখে দিয়েছি যাতে ফ্যাক্টরীর দেখভাল এবং নিজেও ভালো থাকেন। খুবই চরিত্রবান লোক এই দুলাভাই। লায়লার ৪ ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে মাহবুব একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং সরকারী চাকুরীজীবি। বর্তমানে মাহবুব কর্নফুলি পেপার মিলস এ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছে। লায়লার অন্য এক ছেলে জাপানে থাকে আর বাকী ২ জন দেশেই আছে। লায়লার মেয়ের নাম জেসমিন। অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছে। নিজেই নিজের সংসার চালায়। সারাজীবন কষ্টেই জীবন পার করেছে আমার এই সব বোনেরা। এখন যে সুখে আছে এমনটা নয়। ডায়াবেটিসে ভুগছে আমার বোন। বেশীরভাগ সময় অসুস্থই থাকে। খুব একটা যাওয়া হয় না আমার গ্রামে। তাই খুব একটা দেখাও হয় না। আমি চেষ্টা করি দুলাভাইকে কিছু টাকা বেশী দিয়ে ইন্ডাইরেক্টলী আর্থিকভাবে ওর সংসারে সাহাজ্য করতে। লায়লার যে ছেলে জাপানে থাকে তার নাম স্বপন। মাহবুবের মতো সেও ম্যারেড। আসলে লায়লার সব ছেলেমেয়েরাই ম্যারেড। কিন্তু এতোগুলি সন্তানের বয় থাকার পরেও লায়লাকে একাই নিজের দেখভাল করতে হয়। এটা খুব একটা সুখের খবর না। স্বপনের বিয়েটা হয়েছিলো “টেলিফোনে” জাপানে থেকে বাংলাদেশে। আমি সে বিয়েতে ছিলাম। মেয়েটা আমাদের হাসনাবাদ ইকুরিয়ার মেয়ে। সম্ভবত প্রেমের বিয়ে। আমি সপরিবারে ওর বিয়েতে ছিলাম কিন্তু বর স্বপন ছিলো জাপানে। এই জাতীয় বিয়ে আমার পছন্দ নয় যেখানে বর বাইরে আর কনে দেশে অথচ বিয়ে করতেই হবে। এটা আজকালকার দুনিয়ায় যেনো ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। লায়লা ছোটবেলায় ভীষন সুন্দুরী ছিলো আর ছিলো খুব ট্যালেন্ট। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর পড়াশুনা করতে পারে নাই। এর মধ্যেই ওকে বিয়ে করতে হয়েছিলো। মাওহবুব আর স্বপনের কয়েকটি ছবি এখানে আপলোড করা হলো। সাথে স্বপনের স্ত্রীর ছবিও। আমার কাছে এই মুহুর্তে লায়লার অন্যান্য সন্তানের কোনো ছবি নাই বিধায় আপলোড করতে পারলাম না। পরে আপডেট করা হবে। 

সবচেয়ে বামের লোকটি হচ্ছেন লায়লার স্বামী ইসমাইল ভাই। এই ছবিটা প্রায় ৭/৮ বছর আগে তোলা। তিনি সপ্তাহের ৬ দিন পলাশপুরেই ফ্যাক্টরীতে থাকেন, আর একদিন গ্রামে যান। তবে যখনই দরকার হয়, তিনি যখন তখন বাড়িতে গেলেও আমার পক্ষ থেকে কখনো কোনো না ছিলো না। অত্যান্ত অমায়িক আর সহজ সরল মানুষ। আমাদের পরিবারের সেই ১৯৭৬ সাল থেকেই তিনি সাথে আছেন এবং সব সময় পাশেই পেয়েছি। তিনি আমার প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষকও ছিলেন। সৎ মানুষ এবং ঝামেলাবিহীন মানুষ। অল্পতেই তুষ্ঠ থাকেন। 

এই ছবিটায় আমার মেয়ে উম্মিকার সাথে স্বপনের স্ত্রী যেদিন তার বিয়ে হয় সেদিন তোলা। মেয়েটার মধ্যে একটা জিনিষ লক্ষ করেছি যে, গরীব মানুষের মেয়ে বলে হয়তো একটু সাংসারীক চিন্তাভাবনা আছে। বাকী ভবিষ্যত বলবে আগামীকালের সময় আর তার ভাবনার মধ্যে। 

এই ছবিটা লায়লার বড় ছেলে মাহবুবুর রহমানের। ৭ ই নভেম্বর ১৯৭৬ সালে ওর জন্ম। তখন দেশে প্রচন্ড দূর্ভিক্ষ চলছিলো। ওর বাড়তি দুধের ব্যবস্থা করতেই আমার দুলাভাই আর বোনের হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে। ঐ সময়ে শুধু লবনের দামই উঠেছিলো ১০০ টাকার উপর প্রতি কেজি। বর্তমানে মাহবুব তিন সন্তানের বাবা। আর সরকারী ভালো অফিসেই কাজ করে। মাহবুবের শশুড় মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মানুষ। কোনো রকমে বর্তমানে সংসার টিকে রেখেছেন আর্থিক দিক দিয়ে। মাঝখানে প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ চলাকালে তিনি আমার ফ্যাক্টরিতেও ইসমাইল ভাইয়ের সাথে কাজ করেছেন কিন্তু বয়সের ভাড়ে লোড নিতে পারছিলেন না বলে কাজটা ছেড়ে দিতে হয়েছিলো। মাহবুব তাদেরকে আর্থিকভাবে সাহাজ্য করে কিনা আমার জানা নাই। 

এই ছবিটার মধ্যে যে মহিলাটি সর্ব ডানে গোলাপী ড্রেস পড়া, সেটা লায়লার একমাত্র মেয়ে জেসমীনের। জেসমিনের মেয়েরাও এই ছবিতে আছে। জেসমীনের স্বামীর নাম ছিলো খোকন। খুব একটা দায়িত্তশীল ছিলো না। কোনো এক সময়ে খোকন সাভারে কাজ করার সময় কাউকে না জানিয়ে আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করে। কোনো এক ঈদের দিন খোকন হার্ট ষ্ট্রোক করে মারা যায়। জেসমীনের স্বামী মারা যাওয়ার পরেও জেসমীন তার শশুড় বাড়িতেই বাচ্চাদের নিয়ে থেকে যায়। পিছনে দাঁড়ানো বাম থেকে ২য় মেয়েটি জেসমীনের মেয়ে। 

মেহেরুন্নেসা

উনি আমার বোন। আমার ৫ বোনের মধ্যে সেইই সবার ছোট কিন্তু আমার ইমিডিয়েট বড়। নাম-মেহেরুন্নেসা। তার স্বামীর নাম আব্দুর রশীদ। ইন্টার পর্যন্ত পাশ করেছিলো রশীদ ভাই। একবার বিদেশেও গিয়েছিলো কাজের খোজে কিন্তু বেশীদিন টিকতে পারে নাই। অতঃপর বহুদিন পোষ্ট মাষ্টার হিসাবে কাজ করেছেন। কোনো কিছুতেই খুব একটা সুবিধা করতে পারেন নাই। অতঃপর ব্যবসা শুরু করেন-ইটের ভাটার। সেটাতে মুটামুটি ভালো করেছেন। তার দুই ছেলেকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন, তারা এখন অবধি বিদেশেই আছেন। সচ্ছল অবস্থা এখন। কিন্তু আমার বোনের সুখের মুখ আসে নাই। সারাদিন কাজের মধ্যেই থাকে। আসলে লেখাপরা করার মতো সুযোগ তাদের ছিলো কিন্তু পরিস্থিতির কারনে সেটা হয় নাই। ১৯৭৭ সালে তার বিয়ে হয়। তারা জানতো তাদেরকে যেভাবেই হোক স্বামীর ঘর করতেই হবে ফলে যতো কষ্টই হোক তাদেরকে সেটা মেনেই চলতে হয়েছিলো। ভীষন পরিশ্রমী একজন মানুষ। একটাই মেয়ে আর সেও অবিকল মায়ের মতো দেখতে। তার বিয়ে হয়ে গেছে, ভালো আছে। 

যখন আমি ছোট ছিলাম, এক সময় যে কোনো কারনেই হোক আমার এই বোন একবার আমার সাথে ঢাকায় কিছুদিন বদি ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করেছিলো। খুব একটা সুখকর পরিস্থিতি হয় নাই সে বাড়িতে। অবশেষে মেহেরুন্নেসা শেষ পর্যন্ত গ্রামেই ফিরে গিয়েছিলো। গরীব মানুষের আসলে বন্ধু থাকে না। তাদের থাকে মনীব। আমার এই বোনের চেহারা দেখলেই কিন্তু বুঝা যায় তার মনের ভিতরে কষ্ট আছে, যন্ত্রনা আছে কিন্তু যখন কোনো মেয়েদের বাবা থাকে না, তাদের কষ্টের কথাও বলার কোনো লোক থাকে না। আমি তাই সব সময় দোয়া করি ওরা যেনো অন্তত ভালো থাকে। ওরা আসলেই খুব ভালো মানুষ। মা যতোদিন বেচে ছিলো, প্রায় প্রতিদিনই মেহের মায়ের কাছে আসতো কিন্তু মা মারা যাওয়ার পরে সম্ভবত আর আসা হয়নি ওর। 

আলাউদ্দিন চৌধুরী

আলাউদ্দিন চৌধুরী আমার শশুড়। আমি তাঁকে দেখিনি কারন তিনি আমার বিয়ের প্রায় ৫ বছর আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। আমার শশুড়ের আব্বার নাম চিলো সোনাম উদ্দিন চৌধুরী। অত্যান্ত এক রোখা মানুষ ছিলেন তিনি। তার মোট তিন পুত্র আর এক মেয়ে ছিলো। তিন পুত্রের  নাম জনাব আলাউদ্দিন চৌধুরী, ডাঃ কুতুব উদ্দিন চৌধুরী এবং নিজাম উদ্দিন চৌধুরী।

আমার শশুড়ের তিন ছেলে আর আট জন মেয়ে ছিলো। তারা হচ্ছে জনাব নূর আহমদ চৌধুরী, সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, এবং মুস্তাক আহমদ চৌধুরী। মেয়েরা হচ্ছেন- মিসেস জায়েদা খাতুন, নূর জাহান, শেলিনা, সামসুন্নাহার, মিটুল চৌধুরী,

আলাউদ্দিন চৌধুরীর বংশের উপরে আমার এই ডায়েরীতে একটা রুপক গল্প আকারে লেখনী আছে যার নাম দিয়েছি- চৌধুরী বাড়ীর অসমাপ্ত গল্প”। গল্পটার শেষ আমি জানি না কিন্তু একটা ব্যাপার আমি বাস্তবে লক্ষ্য করেছিলাম যে, সোনাম উদ্দিনের মতো আরেক জন তার বংশধর এই যুগেও তৈরী হয়েই ছিলো, যার নাম হাসান আহমদ লিখন। অনেক গুনাবলী (বিশেষ করে আগ্রাসন নীতি এবং অন্যের হক নষ্টের নমুনা) তার মধ্যেও আমি দেখেছি।

আমি এই “ আলাউদ্দিন চৌধুরীর” অংশে চেষতা করেছি যতোটুকু বস্তুনিষ্ঠ ইনফর্মেশন দেয়া যায়, সেতা দেয়ার। মূল্যায়ন সব পাঠকের উপর। কাউকে ছোট করার কোনো অভিলাষ আমার কোনো কালেই ছিলো না, আর এ রকম করার কোনো কারনও আমার নাই। আমি শুধু সময়ের সাথে সাথে কি ঘটেছে সেগুলু লিখে রাখার চেষতা করেছি।

আমার শাশুড়ি মিসেস জেবুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। তিনি শেষ বয়সে এসে প্যারালাইসিস ছিলেন। খুড়ুয়ে খুড়িয়ে হাটতেন। আমার বাসাতেই তিনি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তার শেষ সময়টুকু আমার সাথেই আমার বাসায় কাটিয়েছেন। তিনি আমার বাসা থেকেই বেহেস্তবাসী হয়েছিলেন।

প্রোটেক্টেড ডকুমেন্টস ভূমিকা

মানুষের জীবনের সব কিছুই খোলাশা নয়। কিছু কিছু ঘটনা আছে, কিংবা বিষয় আছে অথবা মুহুর্ত আছে যা শুধুমাত্র নিজের এবং আর কারো না। যদি এসব কাউকে বলতেও চাই, সেগুলি না বিশ্বাসযোগ্য, না বলার মতো বলে মনে হয় অথচ ঘটেই যায়। এটা সবার জীবনেই ঘটে, হোক সে যুবক কিংবা বৃদ্ধ। যদি যুবক বয়সে ঘটতে থাকে, তখন বৃদ্ধ বয়সে এসে তা জাবর কাটে, আর যদি বৃদ্ধ বয়সে ঘটতে থাকে, তখন অনেকেই এটাকে না মানতে চায়, বা মানাতে চায়। তখন এর নাম হয় ভীমরতি।

কিন্তু একটা কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, মানুষ যখন কষ্টে থাকে তখন তার দরকার পড়ে একজন সাথীর, আবার মানুষ যখন ফুর্তিতে থাকে, তখনো দরকার হয় তার সাথী, অথবা মানুষ যখন নিজে নিজে একা হয়ে যায়, তখনো দরকার হয় তার একজন সাথীর। একজন স্ত্রীর অথবা একজন স্বামীর জন্য স্বামী বা স্ত্রীই যে সর্বদা ম্যাচিং সাথী হবে এমনটা কখনোই না। সারাজীবন এক ছাদের তলায় বসবাস করেও একজন স্ত্রী হয়তো কোনো এক সময়ে এসে সে তার স্বামীকে হয়তো বুঝতেই পারে না, আবার যুগের পর যুগ একসাথে একই বিছানায় ঘুমিয়েও একজন স্বামী তার স্ত্রীকে হয়তো হারিয়েই ফেলে কোনো এক সময়ে। তখন না স্বামী, না স্ত্রী কেহই একে অপরের যোগ্য সাথী হয়।

অন্যদিকে, আজকের দিনে জয়েন্ট ফ্যামিলি যেনো অনেকটা সপ্নের মতই মনে হয়। অথচ একটা জয়েন্ট ফ্যামিলির কেউ না কেউ কারো না কারো সাথীর ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে তাদের শুন্যতাকে ভরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ আজকাল এতোটাই ব্যস্ততায় নিজেকে নিয়ে থাকে যে, নিজের অভাব পুরন করতে করতেই তার সময় শেষ হয়ে যায়, অন্যের জন্য খরচ করার সময় তার নাই। হয়তো এর মধ্যেই জুটে যায় অপরিচিত কোনো এক সত্তা যিনি হয়তো সাময়িকভাবে দিতে পারে দুদন্ড শান্তি সেই বনলতার মতো। এই বনলতারা হটাত করেই উদয় হয় একেবারে কোনো এক অজানা জায়গা থেকে। ওরা আসলে এই সমাজেই থাকে কিন্তু কখন যে এরা সবার আড়ালে বনলতা কিংবা পুরুষলতা হয়ে উঠে কেউ জানে না। একেবারে অতি সংগোপনে এরা একে অপরের সাথী হয়ে যায়। কনো ব্যারিয়ার থাকে না এদের মাঝে। শারিরিক, দৈহিক কিংবা আর চরম গোপনীয়তাও এদের মাঝে আর কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। অবশ্য বনলতারা সব সময় থাকেও না, একটা সময় আসে তারাও এক বৃক্ষ থেকে আরেক বৃক্ষে, এক সমতল থেকে আরেক মালভূমিতে কিংবা কোন এক জনপদ থেকে আরেক জনপদে তারা একেবারেই হারিয়ে নতুন কারো সাথে জোড়া বাধে। এই বনলতারা কেউ কাউকেই আঘাতে বিশ্বাস করে না আবার কেউ আজীবন তাদের জীবনটাকেই বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে।

আমার জীবনেও এমন কেউ এসেছিলো বা আসতে চেয়েছিলো। অরু, মেঘলা, সন্ধ্যারানি, রেনু কিংবা শারমিন অথবা সানা এরা এ সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রেস্ট্রিক্টেড প্রানী যাদের মুখাবয়ব সমাজে পুরুপুরি উম্মুক্ত নয় কিন্তু সবার সামনেই ওরা চলাচল করে। এরা সবাই কোথাও না কোথাও অসুখী মানুষ। আবার কেউ কেউ অসুখী কিনা সেটাও বুঝতে পারেনা, ভাবে ঠিকই তো আছে। ফলে এদের মধ্যেও একতা শ্রেনীভাগ আছে। কেউ সাহসী, কেউ একেবারেই ভীতু, কেউ ধর্ম ভীরু, কেঊ সমাজভীরু, কেউ ব্যক্তিভীরু আবার কেউ পরিবারের জন্য ভীতু। অরুরা ছিলো ডেস্পারেত, মেঘলারা ছিল মডারেত, সন্ধ্যারানীরা ছিলো আত্তগোপনের মতো কেউ, রেনুরা সমাজের কোথাও না কোথাও রাজত্ব করতে গিয়ে পারায় বড় আপু হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকাএ মানুষের মত, শারমিনেরা অদ্ভুত আচরনের ধারায় সবাইকে হতাশ করে আবার অন্যত্র বাসা বাধে। কিন্তু সানারা সুখী না হলেও কোনো রিস্ক নিতে ইচ্ছুক না। তাই এই সানারা সব সময় থাকে একা। তবে যাইই হোক, অনেক অসুখী মানুষেরা যখন একত্রে যাত্রা করে, তাদের আর অসুখী মানুষের দল হিসাবে ভাবা যায় না। তারা সবাই একটা মানের মধ্যে পরিপুর্ন। যেমন অরুর কথাই বলি-সে প্রথম জীবনে যা পেয়েছে, তার মধ্য জীবনে পেয়েছে গোলাভরা ধান আর মাঠ ভরা ফসলের মতো প্রচুর ধন সম্পদ। দুহাতে বিলিয়েও সেটা শেষ করা যায় নাই। আবার অরু যখন সেই পর্যাপ্ত সুখের জীবনে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলো, তখন তার কাছে সেই জীবনটাই আবার একঘেয়েমিতে ভরে উঠেছিলো। তার অন্তর সন্ধ্যান করতে চেয়েছিলো এমন এক সমতল যেখানে সে নিজেই একজন অপরিচিত মানুষ বা আগন্তক। কেউ তো ছিলো যে তাকে হাতছানী দিয়েছিলো কোনো এক অলৌকিক আনন্দের ভরষায়। অতঃপর সে দল ছেড়েছিলো। এরপর তার কি হয়েছিলো, সেটা আমার এ জীবনে জানা হয়নি।

যখন অরুলতা প্রস্থান করে, প্রকৃতির নিয়মে সেই স্থান দখলে চলে যায় ভীরুলতার কাছে, আর সেটা সানা নাম ধরে বিচরন করে সমাজে। কিন্তু ভীরুলতা সেই অরুলতার মতো এতো এগ্রেসিভ ছিলো না যে, তার স্থান দখল করলেও একই প্রভাব রাখতে পারেনি। এই দুই লতার, ভীরুলতা আর অরুলতার মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ধর্মালয়ের ন্যাচারীক রকম মনে হলেও একজন আরেকজনের প্রায় বিপরীত ছিলো। অথচ দুজনেই চেয়েছিলো অসীম কোন আনন্দের ফোয়ারা। পেয়েছিলো কি?

হয়তো পেয়েছিলো কিন্তু সেটা অন্তত আমার এই জীবনে জানা যায়নি। কিন্তু জানা হয়েছিলো কিছু “হ্যাপি” মানুশের কিংবা জ্যোৎস্না কাননের একচ্ছত্র মালিকের জীবনী থেকে যে, ওরা কোনো রকমে জীবনের সবগুলি অংশ পার হয়ে যেখানে থিতু হয়েছিলো সেটা এক রকমের বেচে থাকার মতো। ফলে ওরাও সুখের হাতছানীতে এমন কিছু বাস্তবিক কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলো এবং গিয়েছিলো যা প্রকাশের বহির্ভুত কিন্তু সেটাও বাস্তব। কোথায় যেনো জীবন শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো পরিস্থিতির কাছে পরাস্ত হয়ই। কেউ আসলে সুখী নয়, টাকাওয়ালা, স্বামীওয়ালা, স্ত্রীওয়ালা, সুন্দুরী, কিংবা রাজ্যের প্রতাপ্সহালী কেউ, কেউ সুখী নয়। আমরা যা দেখি সেটা ভুল। যা দেখি না, সেটাই সত্য কিন্তু রেস্ট্রিক্টেড ইভেন্টস। ভীরুলতাকে অনেক বার হাতছানিতে ডাকলেও সে ছিলো প্রান্তি চাষির মতো। সে কখনোই তার ক্ষেত থেকে বেরিয়ে আইলে উঠতে চায় নাই। কিন্তু ক্ষেতে বসেই আইলে গজানো মিষ্টি কলার সাধটা চেয়েছিল। কিন্তু কলা গাছের একটা বাহ্যিক বৈশিষ্ট ছিলো যে, সে যতোক্ষন না তার সাথে লেপ্টে থাকে, তার মিষ্টি কলার ভাগ সে কাউকে দিতে নারাজ। তাই ভীরুলতা যা পেতে চেয়েছিল-হটাতই সেটা হাতছাড়া হয়ে উঠে। 

প্রতিটি মানুষের একটা ইতিহাস আছে। সে পাগল হলেও তার একটা ইতিহাস আছে। কেনো পাগল হল, কিসের কারনে সে পাগল, কিংবা কে তারে পাগল করলো অথবা তার পাগলামীর কি রহস্য অথবা অর্থ সেই সবকিছুর একটা ইতিহাস কোথাও না কোথাও তো আছেই।

একটা ব্যাপার আমার প্রায়ই মনে আসে, আমরা কেমন একটা যুগে বেচে আছি? উত্তর খুব কঠিন না। দূর্ভাগ্যবশত আমরা আসলে এমন একটা যুগে পদার্পন করে বেচে আছি যেখানে জঘন্যতম অপরাধও স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে আর গভীরতম সম্পর্কগুলি হয়ে যাচ্ছে মুল্যহীন। আর এসব চরমপন্থী যুগ আর বৈষম্য মুলক সমাজ ব্যবস্থায় আমরাও মানুষেরা নিজেদের আচরনে স্বাভাবিকতাকে ঝেড়ে ঝুড়ে এমন কিছু ঘটনায় আকড়ে যাচ্ছি যা আসলে অন্যের কাছে ভাগাভাগি করে নেয়া যায় না। অথচ ব্যাপারগুলি ঘটছে। কিছু কিছু ঘটনা থাকে যার কোনো প্রমান থাকে না, কোনো সাক্ষী নাই, কোন প্রত্যক্ষ মানুষের চোখে পড়ে নাই, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। এটা যদি ক্রাইম হয়, তাতেও পারফেক্ট ক্রাইম বলা যাবে না কারন পার্ফেক্ট ক্রাইম বলতে কিছুই নাই। হয়তো ইনভেষ্টিগেশন তাকে ছুতে পারেনি। এর মানে এটা আন্সল্ভড কেস নয়। আর যদি এসব কাহিনি হয়ে থাকে কোন যুগপদ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত চেষতায় তাহলে সেখানে ইনভেষ্টিগেশন খুব একটা পৌঁছায় না। আর এই গোপন ব্যাপারগুলিই মানুষের জীবনে কনো না কোনো সময় রেষ্ট্রিক্টেড ঘটনা হয়ে পড়ে থাকে একেবারেই আন্সল্ভড ফাইলের কেসের মত।

ব্যাপারটা অনেকটা মিসিং কেসের মতো। একজন মিসিং হলোকিন্তু কেউ মিসিং কেস করলোই না। হয়তো কেউ তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। অথবা কেউ জানেই না তাদের কেউ মিসিং হয়েছে। অথবা হয়তো জানে কিন্তু কেউ মিসিং কমপ্লেইন করলোই না। একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষ মাঝে মাঝে জিক্স পাজেলের মতো এদিক সেদিক ক্ষনে ক্ষনে ঘুরে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে, অথবা লোক চক্ষুর আড়ালে। তার আশেপাশের মানুষ এমন কি তার পরিবারের মানুষেরাও জানে না আসলে গল্পটা কি। তারা হয়তো জানেই না এই হারিয়ে যাওয়ার পিছনের গল্পটা কি এবং কোথায় শুরু।

ইদানিং খুব বেশী বেশী মন খারাপ হয়

ইদানিং খুব বেশী বেশী মন খারাপ হয়। প্রায়শই ম্যাসেজ আসছে আমারই সমবয়সী কোনো না কোনো এক অফিসার বা চেনা জানা  কেউ আগাম সিম্পটম ছাড়াই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে। অথবা এমন সিম্পটম যা বিসশাস করা যায় না যে, সেই মামুলী সিম্পটমের কারনে তারা আর নাই এই দুনিয়ায়। ম্যাসেজটা পড়ি, বারবার পড়ি আর ভাবী, আহা, এই গতকালও তো মানুষটি সবার সাথে ছিল। আকাশ দেখেছে, নদী দেখেছে, সূর্য উঠা দেখেছে, রাত দেখেছে, সবার সাথে আড্ডা দিয়েছে, অথচ মানুষটি আজ নাই। আর কখনো ইচ্ছে করলেও ছুটে আসতে পারবে না। ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেট এক্টিভেট হয়ে গেছে। ভাবতেই যেনো বুকটা মুচড়ে আসে। সবার হাতেই একটা করে ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেট রয়েছে, এটা শুধু মেয়াদ উত্তীর্ন হতে বাকী শুধু। যে কোনো সময়ে আমিও আর এইসব প্রকৃতি, আকাশ, বাতাস, নদ নদী, মানুষের কোলাহল, গাড়ির প্রতিযোগীতা, মানুষের সাথে মানুষের বিভেদ, ভালবাসা, পাখিদের কিচির মিচির, কাজের ব্যস্ততা সব ছেড়ে হুট করে ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেটের এক্টিভেশনে পড়ে যাবো, আমিও তখন হুট করে নাই হয়ে যাব। আমার আর দেখা হবে না আগামিকালের সকাল, কিংবা আজকের কোনো সন্ধ্যা বা জ্যোৎস্না রাত। কি ভয়ানক নিস্তব্দতায় আমি হয়তো ছুটে চলবো কোনো এক অজানা দুনিয়ায় আমি নিজেও জানি না। সাথে কেউ নাই, একেবারে একা, ভীষন একা। খুব ভয় লাগে ভাবতে। সব কিছু ছেড়ে, অফিস, বাড়ী, নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সব ছেড়ে নিমিষেই আমি হারিয়ে যাবো সেখানে যেখানে কেউ আমার সাথে যেতে রাজী নয়। সেদিনও তোমাদের এই পৃথিবীতে সুর্য উঠবে, আকাশ আলোকিত হবে, সকালের ভোরের আজান চারিদিকে প্রতিদ্ধনিত হবে, সবাই শুনতে পাবে সেই আজানের সুর, অথচ আমি সেই আজানের শব্দ হয়তো শুনবো না। আমি থাকবো একদম মাটির নীচে অন্ধকারে। সবাই তাদের নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবে, হাসবে, খেলবে, আর আমি শুয়ে থাকবো একদম একা চুপচাপ।

এই দিনটায় তোমরা এবেলা হয়তো অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলছো। হয়তো আমার অনুপস্থিতি অনুভব করবে, হয়তো আমার সবগুলি স্মৃতি বিজড়িত সয় সম্পদ তোমাদেরকে আরো বিষন্ন করবে। সদ্য বিভাজিত এই জীবনের সাথে আমরা হয়তো সবাই আবার খুব দ্রুতই কোলাহলে মেতে উঠবো শুধু আমি ছাড়া।আমার কাপড়তা হয়তো তখন অন্য কেউ ভাগাভাগি করে পরবে, আমার ঘরটা অন্য কেউ নতুন করে সাজাবে। দিনের সকালটা কারো জন্যই যেহেতু অপেক্ষা করে না, রাতের চাঁদও যেহেতু কারো জন্যই আর থেমে নেই, ফলে সবার সব উৎসব যথারীতি চলবে শুধু আমার পুঞ্জতালিকা ছাড়া। কি অদ্ভুত না? এই কালের বিবর্তনে এবেলার সবার কান্নাটা ওবেলায় গিয়ে কোনো একদিন থেমে যাবে। মাঝে মাঝে মন উতালা হলেও, কিংবা মাঝে মাঝে কখনো অনুভবে আমার স্মৃতি চোখের বা মনের সামনে হাজির হলেও আবার পরক্ষনেই তা ম্লান হতে বেশি সময় লাগবে না। তারপর একদিন, আর কেউ মনে রাখবে না, কারো মনেও থাকবে না যে, কোন এক সময়ের স্তরে আমি ছিলাম, তোমাদের সাথে, অনেক যতনে আর ভালোবাসায়।

আমি হীনা তোমরা কতটা কষ্টে থাকবে, সেটা আমি জানি না, আর জানলেও অসীম কোন যোজন যোজন দূর থেকে তোমাদের প্রতি আমার ভালবাসার টানে আমার কখনো ফেরা হবে না। আমি কতটা বেদনা নিয়ে কোথায় আছি, কিংবা কতটা আনন্দ নিয়ে কতটা সুখে আছি সেই গোপন রহস্যে ঘেরা তথ্য আমি কোনোকালেই তোমাদের জানাতে পারবো না।

খুব আফসোস হয় মাঝে মাঝে, জীবনটা এতো ছোট কেনো? আমার অনেক অনেক দিন বাচতে ইচ্ছে করে প্রতিদিন। আমি থাকবো না এই প্রিথিবীতে, এটা ভাবলেই আমার সব কিছুর প্রতি আকর্ষন থেমে যায়। থেমে যায় অভিসার, থেমে যায় সব সুখের অনুভুতি, মনের কোথায় যেন একরাশ বেদনা পুঞ্জিভুত হয়ে আমাকে ভিজিয়ে দেয় দুঃখের এক নোনাজলে। আমি প্রতিদিন খুব আনন্দে থাকি এবং আনন্দে থাকতে চাই এ কারনে যে, দুঃখ আমাকে স্পর্শ না করুক, হতাশা আমাকে না ঘিরে ফেলিক, যা পাইনি সেটা নিয়ে কোনো প্রকার আফসোস নাই আমার, আর যা পেয়েছি সেটা দিয়েই সর্বাত্তক আনন্দে থাকতে চেয়েছি আমি। আমি জানি আমি তো আর বেশীদিন নাইই, তাহলে কার সাথে কি নিয়ে কতটুকু ঝগড়া, বিবাদ কিংবা জুলুম করবো? এই প্রিথিবীর কোন কারনে আমি দুঃখিত থাকবো!! এই ভাবনায় যাকেই দেখ, তাকেই আমার বন্ধু মনে হয়, মনে হয়, কি জানি যদি ওর সাথে আবার দেখা না হয়!! তাই আমার হাত প্রসারিত হয়ে যায় সব সময় সবার জন্য। শুধু বেচে থাকতে ইচ্ছে করে মরে যাবার পরেও মানুষের অন্তরে। হয়তো আমি দেখবো না, কিন্তু কেউ তো আছে যারা আমাকে মিস করবে, কেউ তো আছে হয়তো কোনো এক অবসরে আমার কথা ভেবে একটা দীর্ঘশাস নিয়ে বল্বে-আহা, উনি আমার জিবনে একটা প্রদীপ হয়ে এসেছিলেন। এটাই বা কম কিসের?  

৩/১২/২০২৫-দুনিয়া তোমাকে কতক্ষন মনে রাখবে?

একটা মানুষের ক্রমাগত উর্ধগতির উত্থান তার আশেপাশের সবাইকে প্রায় মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। তখন শহরের বিলবোর্ড, গ্রামের চায়ের দোকান, কিংবা ম্যাগাজিনের কাভার পোষ্টে সে উজ্জ্বল জলজ্যান্ত মহানায়কের মতো বিচরন করে বেড়ায়। চেনা জগতটার মধ্যে হাজার হাজার অচেনা বন্ধুদের ভীরে চেনা জগতটাই যেনো অচেনা হয়ে যায়। মনে হয় তখন দুনিয়ার স্বর্ণদুয়ার খুলে যায়। তার নাম সর্বত্র উচ্চারিত হতে থাকে প্রশংসায় আর ঈর্ষায়।

যখন কনো না কোনো কারনে এই মানুষটার দূর্দিন শুরু হয়, হোক সেটা যে কন কারনেই। হয়তো রোগভোগে, হয়তো কোনো কঠিন দূর্ঘটনায়, কিংবা কোন অকস্মাৎ অকল্পনীয় অঘটনে। তারপর সমস্ত কিছু পালটে যায়। তখন দেহ চুরমার হয়ে যায়, স্বপ্ন ভেংগে যায়, স্পটলাইট সরে যেতে থাকে, ক্যামেরার ক্লিক বন্ধ হতে থাকে, মোবাইলের রিংটোন কমতে থাকে, মনে হয় কেমন যেন নীরবতা। এই নিস্তব্দতা কান ফাটা হাততালির থেকেও যেন ভয়ংকর। কেমন যেন শরীর অবশ হতে থাকে, আয়ু কমতে থাকে, একই অনুপাতে পাশে দাড়ানর মানুষের সংখ্যাটাও কমতে থাকে।

বন্ধুরা সরে পড়ে, পরিচিত কিংবা অপরিচিত মানুষ গুলির আনাগোনা কমে যেতে থাকে, এমন কি পরিচিত মানুষগুলির ফোনও আনরিচেবল হয়ে যায়। একদা পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছবির পোজ নেয়ার জন্য অনুনয় করা মানুষগুলিও হাওয়া হয়ে যায়। যারা একান্ত বাধ্য হয় পাশে থাকতে, তারাও এক সময় বিরক্ত হয়ে উঠে। এই হৃদয় ভাংগা সময়ে, এতোসব মুখোশের ভীরে নীরবে তারপরেও কেউ না কেউ থাকে যারা আমাদের সেই উচ্ছল উজ্জ্বল সময়ে পাশে রাখা হয়নি। তখন সেই আলোকউজ্জল সময়ে আমরা ভুলে যাই-

এ দুনিয়া তোমাকে ততোক্ষনই ভালোবাসবে, যতোক্ষন তোমার সম্ভাবনা আছে কাউকে কিছু না কিছু দেয়ার এবং যে মুহুর্তে আমাদের পতন হবে, আশেপাশের কেওই আর থাকবে না।

সাফল্য দৃশ্যমান, কিন্তু অবহেলা অদৃশ্য। আলোর চারপাশে প্রচুর পোকামাকড় থাকে বটে, আলোটা নিভে যাওয়া মাত্রই ওগুলি অন্য আলোর সন্ধানে চলে যায়। তবুও সেই অন্ধকারের সময়ে কেউ না কেউ হয়তো থাকে। হোক সেটা কারো মা, বাবা বা খুব ভালো বন্ধু। সেই অন্ধকার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় –কে মুখোশ, কে মুখ, আর কে মায়াভরা মুখ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

কিছু গল্প আমাদেরকে ভেঙ্গেচূড়ে দেয়, কিছু গল্প আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, আর কিছু গল্প আমাদেরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যাকে আমরা বলি ঈশ্বর।

আমার জীবনের গল্পে সবগুলিই আছে। কিন্তু সবগুলি দৃশ্যমান নয়।

২২/১১/২০২৫-বিশ্বাস

বিশ্বাস একটা আয়না, এটা ভাংলে আর জোড়া লাগে না। আর যিনি ভাংলেন আসলে তিনিই তার প্রতিচ্ছবি হারান। মানুষের বিশ্বাস হারানো মানে শুধু একটা সম্পর্ক হারানো নয়, এটা আত্তার একটা অংশ মরে যাওয়া। বিসশাসঘাতকেরা কখনোই বুঝতে পারে না-তারা যে বিশ্বাস নষ্ট করে সেটা আব্র তাদের জীবনেই বিষের মতো ফিরে আসে।

ভালোবাসা দিয়ে শুরু সম্পর্ক যখন মিথ্যায় ভরে যায়, তখন প্রতিটি নিঃশ্বাসই যন্ত্রনার গল্প বলে। বিশ্বাস ঘাতকের নিঃশ্বাস সবচেয়ে ভয়ংকর। কারন সে মিষ্টি কথা বলে, অথচ সে পিছনে বিষ ছড়ায়। বিশ্বাস ভাঙ্গার শব্দ কেউ শুনতে পায় না, কিন্তু সেই নীরবতার প্রতিদ্ধনী সারা জীবন কানে বাজে। যখন কেউ তোমার বিশ্বাস ভাংকে সে আসলে তোমাকে নয়, সে তার মর্যাদাকেই হত্যা করে।

২১/১১/২০২৫-সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০২৫

প্রতি বছরই এই দিনটায় দাওয়াত পাই। এবার দাওয়াত পেলাম প্রধান উপদেষ্টা থেকে। যখন সেনাবাহিনীতে ছিলাম, পারতপক্ষে এই দিনটায় যাতে যেতে না হয় তাই ফাকী দিতাম বিভিন্ন অজুহাতে। ওটার একটা কারনও ছিলো। এসডি পড়ে যেতে হতো, মানে সিরিমুনিয়াল ড্রেস। খুব ভেজাল মনে হতো আমার কাছে। কিন্তু অবসর নেয়ার পর (যদি কোনো জরুরী ইভেন্টের কারনে যেতে না পারি সেটা ভিন্ন কথা, তা না হলে) যাওয়ার চেষ্টা করি এই কারনে যে, অনেক সিনিয়ার জুনিয়ার এবং গনমান্য ব্যক্তিদের সাথে দেখা হয়। ব্যাংকে গেলে, সিএমএইচ এ গেলে কিংবা সিএসডি তে গেলে ফাকফোকর দিয়ে সিনিয়ার জুনিয়ারদের সাথে যেমন দেখা হয়, তেমনি ২১ নভে,বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে মুটামুটি প্রায় সবার সাথেই একসাথে দেখা হয়। এই কারনেই আমি এখন এই দিনের দাওয়াতে মিস করতে চাই না।

এবারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে অনেক সিনিয়ারদের কিছু পরিচিত মুখ অনেকদিন পরে আবারো দেখা হলো। মেজর হাফিজ (বিএনপি)  স্যারের সাথে প্রায়  দেড় যুগ পর দেখা, হাফিজ স্যারের সাথে ছবি তোলার পরই বিএনপির আরেক পরিচিত মুখ মির্জা আব্বাস ভাই কাছেই ছিলেন, সাথে সাথে বললেন, ছবি তুলবা? স্মৃতিটা থাকলো। উনার সাথেও এই রকমই প্রায় দেড় যুগ পর দেখা হলো।

আমাদের বর্তমান উপদেষ্টা ফওজুল স্যারের সাথে আমার কখনো আগে দেখা হয়নি। আমি উনাকে খুব পছন্দ করি সৎ মানুষের কাতার থেকে। আমি নিজে গিয়েই ওনার সাথে ছবিটা রাখলাম আমার স্মৃতিতে।

এরপরে প্রচুর সিনিয়ারদের সাথে দেখা হলো। জেনারেল আনোয়ার স্যার (আমরা একই ইউনিটে চাকুরী করেছি কিন্তু আমি যখন জিএসও-২ (অপ্স), উনি তখন আবারো আমার সেই একই ইউনিটের সিও ছিলেন)। খুবই প্রফেশনাল একজন অফিসার। বিপদজনক সময়ে হিলট্র্যাক্সে একসাথে কাজ করেছি আমার আরেক সিও শেখ নুরুল আমিন স্যারের সাথে। ভাবীর সাথেও দেখা হল প্রায় ৩৩ বছর পর।

কোর্সমেট, জুনিয়র এবং আরো অনেক প্রিয় অফিসারদের মিলনমেলা যেন এই ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তিন বাহিনীর প্রধান  জেনারেল ওয়াকার (সেনাপ্রধান), এডমিরাল নাজমুল (নেভাল চীফ), এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ (এয়ার চীফ) হচ্ছে আমার ব্যাচমেট। এদের সাথেও আজকে আবার এক ঝলক দেখা হলো।

সময়টা খুব ভালো কাটলো।

০৯/১১/২০২৫-শাহরিয়ারের আগমনে আমি দাওয়াত করা শেরাটনে

কোথায় যেনো শুনেছিলাম যে, আমরা আত্মীয়তার জেরে দাদা, নানা, খালা ফুফু ভাই বোন পাই, কিন্তু সেটা আমরা তৈরী করি না, এই সম্পর্কের তৈরী ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ক্রেডিট নাই। আমরা এগুলি বংশ পরম্পরায় পাই। কিন্তু আমাদের জীবনে আসা বন্ধুদের আমরা নিজেরা তৈরী করি। একজন ভালো বন্ধু চকচকে আয়নার মতো, কখনো তারা নিজের গোপন সহচর, মনের খোরাকের মত। সুখে দুখে এই বন্ধুরা জীবনের সবচেয়ে বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে।

ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের মধ্যে বন্ধুত্বটা একটা অন্য রকমের ধাচে তৈরী হয় যেখানে ওরা জীবনের সবচেয়ে কাচা সময়টায় ২৪ ঘন্টাই একসাথে থাকে, খায়, খেলে, ঘুমায়, হাসে, কাদে। পরিবারের চেয়েও বেশী কাছে থাকে ওরা। ওদের বন্ধুত্বটা পারিবারিক শক্ত বন্ডের থেকে বেশী। শুধু এখানেই শেষ নয়, এক ক্যাডেট কলেজের সাথে আরেক ক্যাডেট কলেজের ব্যাচমেট বন্ধুরাও আজীবন না দেখে, না চিনে, নাম না জেনেও যেনো জন্ম জন্মান্তরের বন্ধু হয়েই থাকে। অদ্ভুত এই সর্গীয় বন্ধন। আমরা এই বন্ধুত্বকে আজীবন লালন করি।

আমাদেরই ব্যাচের আমাদের বন্ধু শাহরিয়ার গত ২/৩ দিন আগে সেই সূদুর কানাডা থেকে বাংলাদেশে এসেছে। মাত্র সপ্তাহ খানেক থাকবে ওর আব্বার সাথে। আমাকে ফোন করার পর আমি শাহরিয়ারকে ফোনেই বললাম, অনেকদিন ক্যাডেট বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না। তোমার এই আগমন উছিলায় চলো আমি একটা একটা আড্ডার ব্যবস্থা করি যেখানে সবার সাথে দেখা হবে, কথা হবে, আবার হারিয়ে যেতে পারবো আজ থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগের শৈশবের সেই অনুভুতিতে। শাহরিয়ার রাজী হলো।

আমার আরেক প্রিয় বন্ধু মাহমুদকে (বর্তমানে বিটিআরসি এর একজন উর্ধতন কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করছে) ব্যাপারটা বললাম যে, আমি স্পন্সর/হোষ্ট করবো, তুমি বাকী এরেঞ্জমেন্টটা করে দাও শেরাটনকে কেন্দ্র করে। সবাইকে দাওয়াত করো, হোটেল বুক করো। মাহমুদ এ ব্যাপারে আমাদের ব্যাচের মধ্যে সর্বদা একটা সচীবের দায়িত্ব পালন করে। মাশআল্লাহ, আমার ১৭ জন ক্যাডেট বন্ধু গল্পের ভান্ডার আর একরাশ মিষ্টি ভালোবাসার হাসি নিয়ে রাত ৮ টায় হাজির।

ভীষন মিষ্টি এবং চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটলো আমাদের সবার। রাশেদের অন্যত্র আরো দুইটা মিটিং ছিলো, তারপরেও সেগুলি একদিকে শিফট করে আড্ডায় হাজির হলো। বন্ধুদের আড্ডা মানে জীবনীশক্তি বেড়ে যাওয়া, শরীর আবার চঞ্চলতায় ভরে উঠা। দ্রুত সময়তা যেনো হাওয়া হয়ে গেলো গল্পে গল্পে। যারা আসতে পারেনি, তাদের অনেক মিস করেছি।

ধন্যবাদ আমার প্রিয় বন্ধুদের। সবাইকে অনেক ভালোবাসি। ধন্যবাদ শাহরিয়ারকে।

৩০/১০/২০২৫-হল অফ ফেম, CNS, COAS

গত বছরের নভেম্বর মাসে অর্থাৎ নভেম্বর ২০২৪ এ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের জন্য বি এম এ তে হল অফ ফেম অনুষ্ঠান হয়েছিলো। কিন্তু আমি হার্টের সমস্যার কারনে, মিটুল এবং কনিকা গিয়েছিলো, আমি যেতে পারিনি। এবার অর্থাৎ আজ ৩০ অক্টোবর ২০২৫ এ সেই একই প্রোগ্রামটা হলো নেভীর এবং এয়ার ফোর্সের প্রধান যথাক্রমে নাজমুল এবং হাসানের জন্য অনুষ্ঠানটা হলো। এবার অনুষ্ঠানে যেতে কোনো সমস্যা হয় নি।

যেহেতু তিন বাহিনীর অর্থাৎ আর্মির চীফ, নেভাল চীফ এবং এয়ার ফোর্সের চীফ, তিনজনেই আমার কোর্ষ্মেট, ফলে একদিকে যেমন এটা গর্বের বিষয়, অন্যদিকে এই অনুষ্ঠাটিতে তিন বাহিনীর চীফই তাদের পছন্দমতো কোর্ষ্মেটদেরকে সিলেক্ট করে কারা কারা এই অনুষ্ঠানে জয়েন করবে, সেদিক থেকে কোন ভাবেই ওরা আমাকে আউট অফ সিলেবাসে রাখে না এতেও নিজের কাছে ভালো লাগে। এই সিলেবাসে রাখা আর না রাখা নিয়ে অনেক মনোমালিন্য, অনেক গোস্যা কিংবা অনেক বিতর্ক আছে, সেদিকে আর যাচ্ছি না।

গত কয়েকদিন আগে ক্যাপ্টেন রাশের নামে এক আর্মি অফিসার আমার ফোনে ফোন করে জানালো যে, আগামি ৩০ অক্টোবর দুই চীফের হল অফ ফেম অনূষ্ঠান হবে, আমি পরিবার সহ যাবো কিনা। আমার যেতে কোন অসুবিধা ছিলো না বিধায় সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে মিটুলের নাম্বারটা দিয়ে দিলাম, যেনো যাবতীয় বাকী ফর্মালিটিজ গুলি ওর সাথেই করে। ক্যাপ্টেন রাশেদের কাজ ছিলো শুধু ইনভাইটেশন কার্ড গুলি বিতরন করা। অতঃপর আমাদের ২ জনের জন্য কন্ডাক্টিং অফিসার হিসাবে নিয়োজিত ছিলো ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। অত্যান্য অমায়িক ছেলে এবং দায়িত্তশীল অফিসার।

ওরাই এয়ার টিকেট পাঠিয়েছিলো, বাংলাদেশ বিমান। আমরা মাস্কাট গামি বাংলাদেশ বিমানে উঠেছিলাম সকাল সাড়ে আটটায়, চট্টগ্রাম হযরত শা আমানত বিমান বন্দর থেকে আমরা সরাসরি ভেন্যু পৌঁছে গিয়েছিলাম সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে। ১১ টায় প্রোগ্রাম শুরু হয়েছিলো।  আর্মির চীফ ওয়াকার, নেভাল চীফ নাজমুল, এবং এয়ারফর্সের চীফ হাসান সঠিক সময়েই এসে উপস্থিত হলো, আমার কোর্সের ৩ বন্ধু, তাদের জন্য আমাদের এই ন্যাশনাল অনুষ্ঠান সেই জায়গাতে যেখানে আমরা ২ বছর একসাথে অত্যান্ত কঠিন ট্রেনিং লাইফ কাটিয়েছি। ভাবতেই ব্যাপারটায় অনেক নস্টালজিক মনে হচ্ছিলো।

একসাথে লান করলাম, ভালো লাগলো।

আমার এই পর্বে যেতা আমি আসলে লিখতে চেয়েছি সেটা হল-বিএমএ এর ট্রেনিং। আমরা যখন ট্রেনিং করেছি, তখনকার বি এম এ এর সেট আপ আর প্রায় ৪১ বছর পরের বি এম এ এর সেট আপের মধ্যে তুমুল তফাত। আমাদের সময়কার যেখানে যেখানে জি সি অফিস, বারবার শপ, কোম্পানী বিল্ডিং গুলি, ড্রিল গ্রাউন্ড, রগড়া প্যারেডের গ্রাউন্ড ছিলো সেগুলিও প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে কোনোটা অন্যত্র শিফট হয়ে গেছে, আবার কোনোতা ছোট হয়ে গেছে, আবার কোনোটা এতো বিশাল হয়ে গেছে যা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। অফিস গুলি খুবই অত্যাধুনিক্তায় ভরপুর, প্রচুর নতুন নতুন ভবন হয়েছে যেগুলি আসলেই দরকার ছিলো কিন্তু সেই প্রায় অর্দ শতাধিক আগে এগুলি বানানো কিংবা বাজেটে হয়তো কুলায় নি বলে বানানই হয় নাই। কিন্তু এখন ১০০ অফিসার মেস, সুইমিং পুল, ক্যাডেট ডমিটরীর পাশাপাশি আরো অনেক কারিকুলাম করা যায় এমন বিল্ডিং, কনভেনশন হল, মিটিং রুম, ক্যাফেটেরিয়া, ইনডোর খেলাধুলা করার প্রভিশন, জীম, আরো কত কিছু যে নতুন যোগ হয়েছে, বি এম এ এর সব জায়গা ঘুরলেই মনটা ভাল হয়ে যায়।

বি এম এ এর যে রাস্তাটা আজ থেকে ৪১ বছর আগে শুধু মাটির রাস্তা ছিলো, সেটা এখন বিশাল হাই ওয়ে হয়ে গেছে, সেখানে সানসেট পয়েন্ট, গলফ গ্রাউন্ড, আরো কতই না সুন্দর সুন্দর স্থাপনা তৈরী হয়েছে। বেশ ভালো লাগলো ব্যাপারটা।

আমাদের টার্ম কমান্দার ৯ডুজনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফিজ এবং ব্রিগেডিয়ার তালেব স্যার) এবাব্রের অনুষ্ঠানে আমাদের সাথে বন্ধুর মতো ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তালেব স্যার বেসিক্যালী আমাদের কোর্সের সাথে একেবারে প্তোপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন। সবার সব অনুষ্ঠানে তিনি আসেন।

২৭/১০/২০২৫-কথা একটা মারাত্তক অভ্যাস

মানুষ বড্ড অদ্ভুত প্রানী। অন্যান্য প্রানীদের মতো সে জন্ম নিয়েই দৌড়াতে বা সরাসরি হাটতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশের জন্য সাথে সাথে ভাষা জানে না, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ভয় কিংবা ভীতি কিংবা মনুষ্য রচিত কোনো আনন্দের ফোয়ারা তৈরী হলেও মানুষের অনুভুতিতে তার কোনোতাই জন্মের সাথে সাথে হয়ে উঠে না। মানুষ বড় হয়, হাটতে শিখে, কথা বলতে শিখে, অনুভুতির স্রিষ্টি হয়, এবং এ রকম আরো হাজারো ছোট বড় অভ্যাস গড়ে উঠে। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস হচ্ছে-কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস, এইটা সব অভ্যাসের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস। আর এই অভ্যাসটা হটাত করে দু একদিনের মধ্যে হয়ে উঠে না। নিয়ম করে, হাতে সময় নিয়ে রোজ একটু একটু করে কথা হয়। আর এই কথা হতে হতে আস্তে আস্তে একটা মায়ার জন্ম নেয়। এই মায়া জন্মাতে জন্মাতে এক সময় এটা নেশায় পরিনত হয়, আর ঠিক তখনই তা কেবল অভ্যাসে পরিনত হয়। এই যে কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস আমাদের অজান্তেই স্রিষ্টি হয়ে গেলো, তখন আমাদের ভালো থাকার সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রন আমরা হারিয়ে ফেলি তখন। একদিন কোথাও অন্যত্র কেউ চলে গেলে, শরীর কাহ্রাপ হতে থাকে, খাবারের রুচীতে ঘাটতি দেখা দেয়, অন্য কারো সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না, ভালো ঘুম হয় না, সময়টা যেনো থেমে থাকে। কথা হওয়ার মুহুর্তে হটাত কথা না হওয়া চরম ডিপ্রেশনে ফেলে দেয়। তখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কোনো কিছুই আর ভালো লাগতে চায় না, হটাত করে মন খারাপ হয়, একাকী পায়চারী করতে মন চায়। মনে হয়-কি যেনো ঠিক নাই। একা হয়ে যায় মানুষ।

তারমানে এই নয় যে, কথা বলা খারাপ অভ্যাস। কারো সাথে কারো কথা বলতে কখনো কখনো ভাল লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সেটা যদি নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিনত হয় এমনভাবে যে, হটাত কোনো কারনে কথা না বললে মন শরীর চিন্তা ভাবনা সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে, তাহলে কষ্মিঙ্কালেও আমাদের ভালো থাকা হয়ে উঠবে না।

কথায় মায়া বাড়ে, আর মায়ায় লেপ্টে থাকে যন্ত্রনা, একাকীত্ব, বিষাদ। যদি কখনো মনে হয়, এক তরফাভাবে আপনি ডুবে যাচ্ছে, তবে এখনই নিজে সংবরন করুন, থামান। নিজেকে ততটুকি নিয়ন্ত্রের মধ্যে রাখুন যতটুকু নিয়ন্ত্রন রাখলে হুট করে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলেও অন্তত নিজেকে নিঃস্ব মনে হবে না।

২৭/১০/২০২৫-তোমারে যে পাইলো

শরৎচন্দ্র বাবুর একটা উপন্যাসে তিনি লিখেছিলেন-“তাহাকে ধরিয়া রাখিতে চাহিলে হয়তো ধরিয়া রাখিতে পারিতাম। কিন্তু সেই চেষ্টা করিলাম না। সেও আর ফিরিয়া আসিলো না। আমারো যতক্ষন না ঘুম আসিলো, শুধু এ কথাই ভাবিতে লাগিলাম। জোর করিয়া রাখিয়া লাভ হইতো কি? আমার পক্ষ হইতে তো কোনোদিন জোরই ছিলো না। সমস্ত জোরই আসিয়াছিলো তাহার দিক হইতে। আজ সেইই যদি আমাকে বাধন থেকে মুক্তি দিয়া আপনাকে মুক্তি দিতে চায়, তাহা হইলে আমি ঠেকাইব কি করিয়া?”

কি অদ্ভুত হৃদয় ছেড়া অনুভুতি!! এই যে ছেড়ে দেয়া আর ছেড়ে যাওয়া-এর মধ্যে অনেক তফাত আছে, অনেক অনেক বিস্তর পার্থক্য আছে। ছেড়ে যাওয়া মানে-আমি তোমাকে আর চাই না। এক সময় কি ছিলাম, আর কি ছিলে, এসব কিছু মেপে, বুঝে শুনে অতএব সিদ্ধান্ত আসে-আমি ছেরে দিচ্ছি। এটা এক ধরনের প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশন। এর মানে তোমার আর আমার প্রয়োজন নাই। তোমার সব প্রয়োজন আমার কাছে ফুরিয়ে গেছে।

আর ছেড়ে দেয়া মানে আমি তোমাকে খুব করে পেতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমাকে আমি পাইলাম না। হাত বাড়ালেই যাকে পাও, সে হয়তো তোমার ভালোলাগা। আর খুব করে চেয়েও যাকে তুমি পাও না, তবুও তুমি যাকে চাও, বা মনে রাখো, হয়তো সেটাই ভালবাসা। ভালোবাসা মানেই সব সময় মানুষটাকে পাওয়া নয়। কখনো কখনো না পাওয়া, ছাড় দেয়া কিংবা অপেক্ষা করাও ভালোবাসা। হয়তো মানুষটাকে তুমি কখনোই পাবে না। অনেক আরাধনা করেও তুমি পাইলে না। হয়তো আরেকজন কোনো আরাধনা না করেই তাকে সে নিজের করে পেয়ে গেলো। তোমার তখন বড্ড কষ্ট হতে পারে, দুঃখ হতে পারে আর মনের মধ্যে বারবার নাম না জানা লেখকের সেই কথাগুলিই ঘুরে ফিরে আছড়ে পড়তে পারে যে, ………শেষ পর্যন্ত তোমারে যে পাইলো, তার লাইগা আমার আফসোসই লাগে। কারন সে জানলো না তোমারে হারাইলে কেমন লাগে।  কেমন লাগে তুমি ছাড়া রাইত জাগনের যন্ত্রনা। সে জানলো না, ভাত খাইতে বইসা তোমার প্রিয় তরকারী দেখার পর গলা দিয়া ভাত না নামার বেদনা।

 নাহ সে এটাও জানলো না, তোমাকে আরেকবার দেখতে চাওয়ার আকুতি কেমন হয়। সে জানলো না, তোমার সাথে স্মৃতিগুলি জড়াইয়া বাচার কষ্ট। সে জানলো না, তোমারে পাইয়া হারানোর পর দুনিয়া কেমনে ফাকা হইয়া যায়। সে জানলো না, তোমার স্পর্শ ফিরা পাওয়ার লাইগা পরান কেমন ছটফট করে। সে তোমারে পাইলো, কিন্তু তোমারে হারানোর ব্যথা পাইলো না। সে বিরহ চিনলো না, সে প্রেমের দুঃখ কেমন তা বুজলো না। সে জানলো না, একটা ছারখার হওয়া জীবন টানতে কেমন লাগে। সে সুখ ঠিকই পাইলো, কিন্তু তোমারে হারাইয়া  শক্ত হইলো না। এই যে তোমারে হারাইয়া ফেলার পর কোনো কষ্টই আর আমার গায়ে লাগে না। সে তোমারে পাইয়া আমার মতন পাথর হইতে পারলো না।

 অবশেষে যে তোমারে সারা জীবনের জন্য পাইলো, সে যেনো তোমারে আগলে রাখে অনেক যতনে। আমি ভাঙাচোরা মানুষ, তোমারে ছোয়ার সাধ্য আমার কখনোই ছিলো না। তবু সপ্ন দেইখা গেছিলাম তোমারে পাওয়ার জন্য। আমি হতভাগা এতই কমদামি সপ্ন কেনার দামদরেতে তোমারে হারাইয়া ফেলেছি। যে তোমারে জিতে নিলো, সে যেনো তোমারে ভালবাসার কমতি বুঝতে না দেয়। আমি চাই না ভালোবাসার কমতি পড়লে তুমি আমারে মনে করো। তুমি যখনই আমারে মনে করবা, তোমার দুঃখ হইবো আমার জন্যে। আমি চাই তুমি সুখী থাকো আজীবন। দুঃখ তোমারে মানায় না। যার কাছেই থাকো, ভালো থাইকো। কারন তুমি ভালো না থাকলে আমার এত বিসর্জন, আমার এত দীর্ঘশাস সব বিফলে যাইবো।

১২/১০/২০২৫-Lawful Command and Unlawful Command

Lawful Command and Unlawful Command এর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য একটা পরিষ্কার সাংবিধানিক এবং বিচারিক ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কারন:

(১) পরাজিত শক্তির কাছে যেটা আন ল ফুল, বিজয়ী শক্তির কাছে হয়ত সেটাই ল ফুল কমান্ড। অথবা পরাজিত শক্তির কাছে যেটা ল ফুল কমান্ড, বিজয়ী শক্তির কাছে সেটা হয়ত আন ল ফুল কমান্ড বলে মনে হয়ে পারে।

(২) ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের ৭১ এর মত। ৭১ ছিলো আমাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তানের কাছে আমাদের মুক্তিবাহিনী ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠী। মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছিল ল ফুল কিন্ত পাকিস্তানের পক্ষে এটা ছিল আন ল ফুল।

(৩) এক দেশের একজন দেশপ্রেমিক অন্য আরেকটি দেশের জন্য সে স্পাই হিসাবে গন্য হয়। দেশপ্রেমিক একটা ল ফুল ব্যাপার। কিন্তু স্পাই? অবশ্যই ল ফুল নয়।

(৪) সামরিক বাহিনীতে এমবিএমএল এ যাইই লেখা থাকুক না কেনো, জুনিয়ার লেবেল অফিসারদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ল ফুল আর আন ল ফুল কমান্ড খাটে না। যদি খাটতো তাহলে, সামরিক বাহিনীতে ডিসিপ্লিন রাখা যেত না। প্রত্যেকটা ক্রিটিক্যাল অপারেশনে অফিসার, নন কমিশন্ড অফিসাররা একের পর এক কোনটা ল ফুল আর কোনটা আন ল ফুল কমান্ড এগুলি করতে করতেই অপারেশন ফেইল করতো। তবে সিনিয়ারদের বেলায় যারা কমান্ড লেবেলে থাকে, তাদের এটায় আর্গুমেন্ট করার অপশন থাকে।

(৫) গত ১৭ বছরে এবং তার আগে, এবং তারও আগের রিজিম গুলিতে এদেশে সামরিক এবং বেসামরিক স্তরে অসংখ্য আন ল ফুল কমান্ড জারী হয়েছে, আন ল ফুল কর্ম করতে দেখা গেছে সরকারি পৃষ্টপোষকতায়, কতজন মানুষ সে সবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো? এটাও একটা বড় প্রশ্ন। যদি সোচ্চার হত, তাহলে তার জীবন শেষ। আর যদি সোচ্চার না হয়, বলা হবে আন ল ফুল কমান্ডের দোসর। যাবেন কই? আর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তো আরো অসহায়। তারা কমান্ড মানতে বাধ্য।

০১/১০/২০২৫-অধ্যাপক হামিদুর রহমান স্কুল এন্ড কলেজ

আমি যখন এই স্কুলে পড়তাম, তখন সালটা ছিল ১৯৭৬। টিনের স্কুল, চারিদিকে মুলির বেড়া, আর এই মুলির বেড়ার বেশিরভাগ ছিল নীচ দিয়ে ভাঙ্গা। মুরগী, কুকুর, বিড়াল এমন কি চোরেরাও মুলির বেড়ার নীচ দিয়ে স্কুলের ক্লাশের ভিতরে ঢোকে যেতো। পরদিন আমরা যখন ক্লাশে আসতাম, এসে মুরগী ইয়াড়াইতাম, কুকুরকে তাড়াইতাম, বেঞ্চ আর চেয়ার গুলি ধুলোয় এমন হয়ে থাকতো যে, এগুলিকে মুছে পরিষ্কার করতেই সময় লাগত আধা ঘন্টা। ক্লাস রুমের দরজাগুলি এমন ছিল যে, কেউ জোরে ধাক্কা দিলেই খুলে যেতো, তালা লাগাওনর কনো ব্যবস্থাই ছিলো না। বৃষ্টির দিনে মাঠে বৃষ্টির পানি পরার আগে যেন ক্লাশ রুমে পড়তো আগে। এতোই ফুটাফাটা ছিলো টিনের চালগুলি। ছাত্ররা বা ছাত্রীরা আসতো তাদের নিজের উদ্যোগে, স্যারেরা আমাদের পরাতেন ঠিকই কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা আমাদের নিচের ক্লাসের ছাত্রদেরকে ক্লাস নিতাম। কারন সব ক্লাসে টিচার ছিলো না। আমি তো রেগুলার ক্লাস নিতাম। একটু একতু গর্বও হত যে, আমি না ছাত্র আবার না টিচার অথচ আমি কিন্তু ছাত্র।

এই স্কুলটা তখন ক্লাশ এইট বা অষ্টম পর্যন্তই ছিল অর্থাৎ হাইস্কুল। খুব যে ভাল স্কুল ছিলো সেটাও নয় কিন্তু এই এলাকায় এটাই ছিলো একমাত্র হাইস্কুল। আলাউদ্দিন ভাই আসতেন, আমাদেরকে খুব আদর করতেন। অসম্ভব অমায়িক মানুষ ছিলেন তিনি। এই স্কুল থেকেই আমরা ২ জন (আমি এবং ডাঃ শফিক ভাই, আলুকান্দার) ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম। এর পরে আরো অনেক মেধাবি ছাত্ররা দেশের বিভিন্ন সেক্তরে খুব ভাল ভাল জায়গায় কাজ করছেন এবং করেছেন। স্কুলটা ছিল তখন এলাকার প্রানকেন্দ্র। প্রায়ই বিকালে ফুটবলের প্রতিযোগীতা হত, গ্রামবাসিরা মাঠের চারিদিকে বসে যেনো ওয়ার্ল্ডকাপ খেলা হচ্ছে এমন একটা পরিবেশ হতো, মাঝে মাঝেই নাটক বা কালচারাল অনুষ্ঠান হত। ছেলেরাই মেয়ে সেজে নায়িকা হতো। কি যে একটা রমরমা সময় ছিল।

আজ এতো বছর প্পতে স্কুলটার চেহাড়া দেখলে মনে হয় কি সুন্দর। এতো বড় মাঠ, চার তলা করে অনেক গুলি বিল্ডিং। অনেক ছাত্র আর টিচার গন। রম রম করে পরিবেশ কিন্তু সবচেয়ে দুঃখ আর কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে-এই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে পাশের হার মাত্র ১০%। তাও আবার খুব লো গ্রেদিং দিয়ে পাশ। এটা কনো কথা?

মাষ্টারদের কাছে কেউ কৈফিয়ত চায় না গার্জিয়ানরা, গার্জিয়ানরা কেউ সপ্ন দেখে না তাদের সন্তানদের নিয়ে, কনো ছাত্র জানে না তার ভবিষ্যত কি। সে কি হতে চায়। কেউ তাদের মাথায় সপ্ন বুনন করে না। অথচ সব উপাদান আছে এই স্কুল এন্ড কলেজে। যারাই এই স্কুল এন্ড কলেজের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন, তারাই এতাকে নিয়ে হয় রাজনিতি করেছেন, অথবা এর থেকে ফায়দা লুটেছেন অথবা লাভ করেছেন। কেউ ছাত্রদের ভাল হক, ছাত্ররা নামকরা কেউ হক, এ অঞ্চলতাকে ছাত্ররা সমৃদ্ধ করুক কেউ চেষ্ঠা করেনি। চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা প্রশাসক এমন কি এম পি ও এর পিছনে কখনো কনো সময় দিয়ে এটাকে কিভাবে ভাল একতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা যায় তার জন্য চেষ্টা করেনি।

এখনো এখানকার যুবকেরা জানে না যে, অতি শীগ্রই ওরা এমন কিছু মানুষের অধীনে চলে যাবে যারা বেই এলাকার কেউ নন। …।।

৩০/০৯/২০২৫-অবহেলা

কেউ কি তোমাকে ভালবেসেছিলো? কতটুকু কতক্ষন কি পরিমান কিভাবে কেনো ভালবেসেছিল সেটা কি কখনো অনুধাবন করে বিশ্লেষন করেছো? ভালোবাসাটা একটা চরম আবেগী জিনিষ, যে ভালবাসায় মজেছে, তার কাছে আর অন্য কোন কিছুই জরুরী নয়। আর যার ভালবাসায় সে মজেছে, সেটা যেমনই হোক, কারো সাথে কিংবা কোনো কিছুর সাথেই তার তুলনা করা যায় না। কালো, ধলা, ল্যাংড়া, কিংবা বিদেশি, বা অন্য কোন প্রানী সবার বেলাতেই ব্যাপারটা এমনই ঘটে। কিন্তু মজার ব্যাপার কিংবা কষ্টের ব্যাপার হল, এক সময় এই ভালোবাসায়অ ঘুন ধরে, যে কোনো কারনেই এর মিষ্টতা বা আবেগী মনটা স্তিমিত হয়ে আসতে পারে। তখন একটা নতুন জিনিষ শুরু হয়। আর তার নাম অবহেলা।

কাউকে অবহেলা করার সবচেয়ে উত্তম কৌশল হচ্ছে-ব্যস্ততা দেখানো। বাহ্যিকভাবে কেউ কতটা ব্যস্ত সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু কারো সাথে সম্পর্কের মধ্যে ঢীলা দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে-বহুবিধ কাজের বাহানায় ব্যস্ততা জড়িয়ে দেয়া। কিন্তু একটা সম্পর্কে ব্যস্ততার শব্দটার কোনো স্থান নাই আসলে। সত্যিকারের প্রিয় মানুষটার শত সহস্র ব্যস্ততার মাঝেও খোজ খবর নেয়া সম্ভব এবং নেয়ও। শুধু খোজ খবরই না, সে তোমাকে সময় দেবে। কি করছো, কখন কোথায় কি ভাবে তোমার সিডিউল যাচ্ছে, দুপুরে, সকালে, কিংবা খাওয়ার সময়ে তুমি খেয়েছো কিনা সব সময় না হলেও মাঝে মাঝেই সে খবরটা নিবে।

কেউ যদি বলে- কথা বলার সময় পাইনি, হতেই পারে। কিন্তু ‘আমি একটু ব্যস্ত আছি, সময় পেলে পরে কথা বলব। তুমি অন্যান্য কাজ সেরে ফেল’ কিংবা একটা ম্যাসেজ কিংবা পাচ সেকেন্ডের একটা ছোট কলও হতে পারে অনেক ব্যস্ততার মাঝে একটা যোগাযোগ। আর এই ছোট ম্যাসেজটা লিখতে রাস্তার ধারে বসে, একটা সিগারেট খাওয়ার সময়েও এই ছোট ম্যাসেজটা করা যায়। যখন এগুলির কোনোটাই হয়ে উঠে না, অথচ যদি কেউ বলেই থাকে যে, কথা বলার সুযোগ হয়নি, বা সময় পাইনি, তাহলে বুঝে নিও সে ঠিকই সময় পেয়েছিলো কিন্তু সে তোমার জন্য সময় নষ্ট করতে চায়নি, সে তোমাকে এভয়েড করেছে। তোমার মুল্য তার কাছে অনেক কমে গেছে। মানুষ কেবল সেটার জন্যই তার মুল্যবান সময় নষ্ট করে যেটা তার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট। তুমি হয়তো ইম্পর্টেন্সি হারিয়ে ফেলেছো। ভালোবাসাটা অনেক দূর চলে গেছে। একদিন সে আরো দূরে চলে যাবেই এবং কনো এক সময় সে তোমার কাছ থেকে হারিয়ে যাবেই। তুমি এই পরিস্থিতিটা বুঝো বা না বুঝো, যদি এটা এক তরফা আকড়ে থাকো, তাহলে আজিবন তুমি কষ্ট পাবে।

ব্যস্ততা কখনই ভালোবাসাকে থামাতে পারেনা। যে সত্যিই তোমাকে ভালবাসে, সে শত ব্যস্ততার মধ্যেও একবার হলেও মনে করবে। আর যদি সেই ভালোবাসাতা হয়ে থাকে নিছক কিছুর বিনিময়ে বা অন্য কোনো কারনে, সেখানে কখনোই ভালোবাসা ছিল না। ওটা ছিল অবহেলার ভালোবাসা।

সত্যিকারের ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যেটা না বলা কথাও অন্তরে যেনো পরিষ্কার অনর্গল কথা বলে যায়, ভালোবাসার মানুষটাকে কিভাবে ভালো রাখা যায়, কিভাবে তার মনকে প্রশান্ত করা যায়, তার ইচ্ছাগুলি, আবদার গুলি, আখাংকা গুলি নিজের সামর্থের মধ্যে লালন করা যায়। ভালোবাসায় ভাষার দরকার পড়ে না। এটা অনুভবের ব্যাপার। মন থেকে ভালোবাসলে মানুষটা ছাড়া একদমই থাকা যায় না। আর যারা দিনের পর দিন মানুষটা ছাড়া অনায়াসে থাকতে পারে, তারা কখনো ভালোবাসে না। I

ভালোবাসার মানুষকে মানুষ সব সময় মনে রাখে, মনে করে। এমন কি মৃত্যুর সময়ে বা আগে যে মানুষতারে মানুষ সবার অগোচরেই স্মরণ করতে চায় সেটা তার ভালোবাসার মানুষ। গভীর ঘুম থেকে ঘুম ভাঙ্গার পর যার কথা মনে পড়ে সেতা তার ভালবাসার মানুষ। এই ভালোবাসার মানুষটার কারনে সুখকে সুখী মনে হয়, তার কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে হয়। ভালোবাসার মানুষের শরীরের ঘামের গন্ধও মিষ্টি মনে হয়।

২৯/৯/২০২৫-দূর্গা পুজা

আমি যে কোনো অনুষ্ঠানে সাধারনত অনেক কারনেই যেতে ইচ্ছুক হই না। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে-অনুষ্ঠানের রিচ খাবার আমাকে আকর্ষন করে না এবং আমি সাধারনত সেই রিচ ফুডগুলি এভয়েড করি। কিন্তু যদি কোথাও যেতে চাই, আমি আগে থেকেই আমার খাবারের মেন্যুটা একটু সম্মানের সহিত তাদের জানিয়ে দেই যে, আমার জন্য একেবারে প্লেইন রাইস, ডাল এবং কিছু শব্জি হলে ভাল হয়। এখন অবশ্য প্রায় অনেকেই জানেন আমার খাবারের সাধারন মেন্যুটা, ফলে আর বলতে হয় না। কিন্তু আমার কিছু কিছু খুব কাছের মানুষ আছেন যারা দাওয়াত দিলে খাই বা না খাই আমি যাবোই এটা নিশ্চিত। গয়েসশর দাদা আমার সে রকমের একজন মানুষ।

আমি রাজনীতি করি না কিন্তু আমি গয়েসসর দাদার একজন কাছের মানুষ। উনি সর্বদা আমাকে কিছু কিছু উৎসবে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দেন। কখনো কখনো কার্ড পাঠিয়ে, আর বেশীরভাগ সময়ে টেলিফোনে। এবারের দূর্গা পুজাতেও উনি দাওয়াত দিয়েছেন এবং ঘোষকান্দায় তার নিজের বাড়িতে যাওয়ার সময়ে ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় আমি যেন অফিসের কাজ দ্রুত শেষ করে অনুষ্ঠানে যাই সেটাও নির্দেশনা দিইয়েছিলেন। খুবই ব্যস্ত ছিলাম মিটিং নিয়ে ফলে প্রায় দুপুর প্রায় একটা বেজে গিয়েছিলো ওনার বাসায় যেতে যেতে।

আমি যখন ওনার বাসায় গেলাম, উনি তখন প্রচুর লোককে নিয়ে মিটিং কিংবা আলাপে/গল্পে মত্ত ছিলেন, আমি যাওয়ার পরই দাদা আমাকে নিয়ে কোলাকুলি করে তার নিজস্ব কামরাতে এসে বসলেন। অনেক আলাপ হলো, চা সিগারেট খাওয়া হলো, ভালো লাগছিলো। চলে আসতে চাইলাম কারন ফ্যাক্টরীতে বায়ার চলে এসছিলো কিন্তু দাদার আমন্ত্রনে না খেয়ে আসা হলো না। খেতেই হলো।

দাদার সবচেয়ে আমার ভাল লাগার জিনিষটা হল-উনি নিজ হাতে আমাকে খাবার পরিবেশন করেন। সেই ছোটবেলা থেকেই উনি আমাকে চিনেন যখন আমার বয়স মাত্র ১০। আমার বড় ভাই (এখন তিনি আমেরিকায় বোষ্টনে প্রফেসর হিসাবে আছেন) ওনার খুব কাছের বন্ধু হওয়ায় ভাইয়ের সুবাদে আমার বড় ভাই, গয়েসশর দাদা, আলিমুল্লাহ কাকা, আলাউদ্দিন মাষ্টার ভাই, আনোয়ার ভাই (ঢাকা ইউনিভার্সিটি), রহমান ভাই, নসরুল হামিদ বিপুর আব্বা হামিদ ভাই এরা তখন একটা খুব শক্তিশালি বন্ধু সংঘটন ছিলেন আর আমি সেই ১০ বছরের ছোট একটা পিচ্চি এই ইয়াং বন্ধু মহলের মধ্যে জড়িত ছিলাম কোনো কারন ছাড়াই। ওনাদের সাথে ঘুরতাম (আমার ভাই আমাকে নিয়ে নিয়ে ঘুরতেন তাই আমিও তাদের সাথে থাকতাম)। আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার অনুপ্রেরনার পিছনে এইসব শক্তিশালি ব্যক্তিরাও অনেক অনুপ্রেরনা জুগিয়েছিলেন।

গত ২৯/৯/২০২৫ তারিখে দাদার বাসায় দূর্গা পুজা উপলক্ষ্যে দাদার সাথে কিছুক্ষন সময় কাটানর কিছু মুহুর্ত।

ধন্যবাদ দাদা।

২৫/৯/২০২৫-মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাডেমি

এই শাখাটা আমরা চালাচ্ছি। মুলত আমি, কর্নেল মাহমুদ এর প্রধান উদ্যোক্তা। মাহমুদের মিসেস নুরজাহান ভাবী এর প্রিন্সিপ্যাল। যথেষ্ঠ কোয়ালিটি পুর্ন শিক্ষার মান এখানে দেয়া হয় বলে গার্জিয়ানরা প্রায়ই এই শাখাটাকে সাধীন ক্যাম্পাস হিসাবে দেখতে চান এবং মনে করেন এটাকে আবাসিক করা গেলে প্রচুর ছাত্র ছাত্রী এখানে ভর্তি হবে। কিন্তু আমি এখনো সাধীন ক্যাম্পাস করার জন্য কন পদক্ষেপ নেইনি। তবে অদূর ভবিষ্যতে এটা যে একতা হবে তাতে কন সন্দেহ নাই ইনশাল্লাহ।

মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাডেমি মুলত একটা ফ্রান্সাইজিং শাখা। কিন্তু এর অন্তরালে আমাদের নিজস্ব একটা স্কুল চালু আছে যার নাম Bangladesh International School of Excellency (BISE). কন্সেপ্টটা হচ্ছে, যারা ক্যাডেট কলেজে চান্স পাবে না, তারা আমাদের স্কুলেই পরবর্তী স্কুলিং চলমান রাখা। যাত্র ছাত্রদের কোনো সময় ক্ষেপন না হয়। স্কুল অফ প্যারাডাইস হচ্ছে আমাদের অরিজিনাল স্কুলের একটা সেক্টরাল শাখা। এ রকমের আরো সেক্টোরাল শকাহা রয়েছে এর মধ্যে।

অনেকদিন যাওয়া হচ্ছিল না মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাদেমিতে। প্রায় ৮/৯ মাস পর আজকে গেলাম। প্রিন্সিপ্যাল তার শিক্ষক বৃন্দকে নিয়ে স্কুলের মান এমন পর্যায়ের নিয়ে গেছেন, দেখে মনটাই ভরে গেলো। ছাত্ররা, অভিভাবকগন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট লোকাল যারাই আছেন সবাই খুব খুশি।

অনেক ধন্যবাদ মাননীয় প্রিন্সিপ্যাল এবং শিক্ষকবৃন্দ। আমার দোয়া এবং আশীর্বাদ রইলো।

৮/৯/২০২৫-জন্মদিন

পছন্দ আর ভালভাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। পছন্দ হলো রেডিমেড একটা ফুল গাছ থেকে একটা ফুল ছিড়ে নেয়ার মতো, আর ভালবাসা হচ্ছে সেই ফুলগাছটায় আপনি প্রতিদিন পানি দিয়ে তাকে সতেজ রাখার মতোন। পছন্দ জিনিষটা যখন প্রতিদিন চর্চা হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে সেই পছন্দ একদিন ভালোবাসায় রুপান্তর হয়। যখন ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে আরো গার হয়, তখন জন্ম নেয় মায়া। মায়া একটা মারাত্তক জিনিষ। একবার কেউ মায়ায় জড়িয়ে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া মানুষগুলি কখনোই কারো জীবন থেকে হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যেতে দেয়া হয় না।

যাইই হোক, কথাগুলি বললাম এ কারনে যে, বহুবছর আমার নাড়ির টানের বন্ধনের এলাকা, এই বাক্তার চর, নিয়মিতভাবে আসা হয়নি। কাজের জন্যই হোক আর ব্যস্ততার জন্যই হোক, আসা হয়ে উঠেনি। কিন্তু একটা টান অবশ্যই ছিল। ইদানিং এলাকার কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসাবে আমি ঘন ঘনই এলাকায় আসছি। গ্রাম এবং এলাকার প্রতি আমার মায়া সেই জন্মলগ্ন থেকেই সুপ্তিত ছিলো কিন্তু উদগীরিত হয়নি বা প্রকাশ পায়নি। যার কারনে অনেককেই এখন আর আমি ভালোভাবে চিন্তেও পারিনা। পুরানো জেনারেশনের মানুষগুলিকে যেমন বর্তমান চেহাড়া থেকে চেনার উপায় নাই আবার নতুন জেনারেশনের ইয়াং ছেলেমেয়েদেরকেও আমার ভালোভাবে জানা বা চেনা হয়নি। ওরা হয়তো আমাকে নামে চিনে কিন্তু ওদেরকে আমার ভালোভাবে বা ন্যুনতম্ভাবেও চেনা হয়ে উঠেনি। কিন্তু পুরানো সেই মায়া থেকে আমি ওদের উপরেও যেন কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছি দ্রুত। ওরাও যে আমাকে আমার থেকে দ্রুত কঠিন ভালবাসায় জড়িয়ে ফেলতেছে সেটা আমার ইন্দ্রিয় আমার বুঝবার চেয়েও দ্রুত উপলব্ধি করছে।

কদিন আগে কলেজে এক মিটিং এ হটাত মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল আমার জন্ম দিনের তারিখটা। তখন প্রায় সন্ধ্যা। কলেজের প্রিন্সিপ্যালের রুমে গুটিকতক জেন জি ইয়াং স্টারদের নিয়ে মিটিং করছিলাম। শেষ হতে না হতেই দেখি কোথা থেকে একটা কেক, কেক কাটার ছুড়ি এবং মোমবাতিসমেত হাজির। সব কিছু বুঝবার আগেই জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা ঘটা হয়ে গেল। বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া হলেও অন্তরে খেলছিল এক ভালোবাসার বসন্ত প্রবাহ। অনেক আনন্দিত হয়েছি।

ধন্যবাদ ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম, সানাউল্লাহ, কাইয়ুম, শাহীনুর, মুজিবুর কাকা, অধ্যক্ষ মহোদয় এবং অন্য সব আদরের ছেলেরা। অনেক দোয়া রইলো তোমাদের প্রতি এবং অবশ্যই তোমরা আমাকে অনেক খুশী করেছো। আমি আমার আন্তরীক ভালবাসা জানাই তোমাদের সবাইকে।ো