











Pic for Slider0123jpg
Pic for Slider012
Pic for Slider011
Pic for Slider010
Pic for Slider009
Pic for Slider008
Pic for Slider007
Pic for Slider006
Pic for Slider005
Pic for Slider003
Pic for Slider002
Pic for Slider001
আমি আমার মাদবর বাড়ীর সব প্রকারের ঐতিজ্য নিয়ে সবসময় গর্ববোধ করি। একটা বাড়ি একটা সমাজ হতে পারে, মাদবর বাড়ি একটা তার প্রমান। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মাদবর বাড়ীর তথ্য, অজানা ইতিহাস ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে কে বা কারা এই পরিবারের সদস্য বা তারা কে কোথায় আছে, এর ইতিহাস আজনেকেই জানে না বিধয় মাদবর বাড়ীর সেই পুরানো বংশ আভিজাত্যের ধারা মুছে যেতে চলেছে।হয়ত একসময় এই মাদবর বাড়ি সদস্যগনই জানবে না তারা কে বা কারা। বাংলাদেশ আমেরিকা নয় যে, কোনো এক ওবামা, বা কোন এক ট্র্যাম্প পৃথিবীর কোনো একস্থান থেকে উদয় হয়ে আমেরিকার মতো বিশাল এক রাজকীয় পরিবেশে উড়ে এসে জুড়ে বসে একেবারে টপ পজিশন ধরে প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন। সেটা আমেরিকায় হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সব পরিচয় জেনেও কাউকে যদি হেয় করতে মন চায়, তাহলে তার কোনো কিছুই জানার প্রয়োজন হয় না, সে শুধু তার ইচ্ছেটাই প্রকাশ করবে। কিন্তু যদি কেউ আপনার আমার বংশ পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিয্য সব কিছু জানে, তাহলে যে যাই কিছু করুক বা বলুক, অন্তত এইটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে, অহেতুক আপনাকে কেউ হয়রানী হয়ত করবে না। কোনো মৃত ব্যাক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই যায় আসে না, কিন্তু তারপরেও মানুষ ইতিহাস পড়ে আর ইতিহাস লিখে। একমাত্র ইতিহাসটাই সত্য। আর যতো আগামি, বর্তমান, কিংবা সব “যদি” কোনোটাই শতভাগ সত্য নয়। তাই নিজের ইতিহাস টুকু তো জানুন। মনে নাই? আলেক্স হ্যালির সেই রুটস কাহিনীটি? সেটাই ইতিহাস।
আমাদের পরিবার “মাদবর” পরিবার হিসাবে পরিচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই এই পদবীটা কেনো জানি নামের পাশে ব্যবহার করতে একটু দ্বিধা বোধ করছি। যেমন আমি নিজেও আমার নামের পাশে মাদবর পদবীটা উল্লেখ করি না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, কেনো করছি না, আমার কাছে একটা যুক্তি তো অবশ্যই আছে। আর সেটা হচ্ছে-
আমি যখন গ্রামে থাকতাম, তখন দেখেছি যে, আমাদের গ্রামের অনেকেই অনেক প্রকারের মাদবর সেজে আছেন। কেউ বাচ্চু মাদবর, কেউ আজগর আলি মাদবর, কেউ আক্কাস আলি মাদবর ইত্যাদি। এই মাদবর গুলিকে দেখে আমার গা এক প্রকার রি রি করতো কারন তাদের না ছিলো কোনো ইথিক্স, না ছিলো কোনো গুনাগুন। অথচ শুনেছি, আমার বাবা যখন মাদবরি করতেন, তখন তিনি নাকি কারো বাড়িতে গিয়ে এক কাপ চাও খেতেন না। যদি কারো বিচারের বেলায় পক্ষপাতিত্ব হয়ে যায়, তাই! কিন্তু আমার বাবা, বা দাদা কি ধরনের মাদবর ছিলেন আর এখনকার মাদবরগন কি প্রকারের মাদবরি করছেন এই পার্থক্য টা আমার ঐ ছোট বয়সে যেমন বুঝবার ক্ষমতা ছিলো না, তাই আমার বংশের পদবীটা যে এতো মানসম্মানের, সেটা আমার আসলে বুঝার জ্ঞ্যানও ছিলো না। ফলে এই মাদবর উপাধিটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হইতো এবং কিছুটা নিম্নজাতীয় উপাধি বলিয়াও মনে হইতো, বিশেষ করিয়া শহুরে সমাজের কাছে। তাই আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার সমস্ত স্কুল কলেজের সার্টিফিকেট সমুহের এই নামের পাশের মাদবর পদবীটা একেবারে রহিত করিয়া দিয়াছি।
আমার বড় ভাই জনাব ডঃ মহাম্মাদ হাবিবুল্লাহও কেনো যে এই পদবীটা নিলেন না সেটা আমার বোধ গম্য নয়।
যাক সে কথা।
এবার আসি আমাদের বংশের সংক্ষিপ্ত একটু ইতিহাস নিয়ে।
হিসাব্দি মাদবর ছিলেন আমার দাদা। এই দাদার থেকেই আমার ইতিহাস আমি শুরু করিবো। তিনি ছিলেন অনেক বিচক্ষন একজন ব্যক্তি। তার আমলে তিনি অনেক সম্পদ এবং বুদ্ধির মালিক ছিলেন। আমার দাদির নাম আমি জানি না। জানতে ইচ্ছে করে। হয়ত আমার বড় ভাই জানবেন।
আমি আমার বাবাকে কখনো দেখিনি এবং তার চেহাড়া কেমন ছিলো, খাটো নাকি লম্বা, যুবক না বৃদ্ধ, ফর্সা নাকি কালো কোনো কিছুই আমার জানা নাই। তবে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে আমি আমার বাবার অনেক গল্প শুনাতেন যার থেকে আমি বাবার একটা কাল্পনিক চরিত্র মনে গেথে গেছে। আমার দাদার নাম ছিলো হিসাবদি মাদবর। আমরা মাদবর বংশের লোক।
বাবার সম্পর্কে আমি অনেক চমৎকার চমৎকার গল্প শুনেছি ভাইয়ার কাছে। তবে তার প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে জরুরী তথ্য হলো যে, আমার বাবার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আমার মাকে বিয়ে করেন। বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ঘরে মোট তিন জন ছেলে সন্তান আর তিনজন কন্যা সন্তান ছিলো। এই মোট ছয় সন্তান থাকার পরে আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। তখন আমার মায়ের বয়স ছিলো বেশ কম। আগের সব সন্তানেরাই আমার মায়ের থেকে বয়সে বড় ছিলো। কেউ কেউ আবার ইতিমধ্যে বিয়েও করে ফেলেছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমার মা যেমন একটু অসুবিধায় ছিলেন, তেমনি আমার বাবাও বেশ অসুবিধায় ছিলেন।
কিভাবে আমার বাবা এই দুমুখী অসুবিধাগুলি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাধান করেছিলেন, সেই গল্প গুলিও আমি হোসেন আলী মাদবরের পর্বসমুহে একে একে লিখবো।
তিনি আমার শাশুড়ি। মোট আট মেয়ে আর তিন ছেলের সার্থক মা। অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আমার কাছে তিনি আমার আপন মায়ের মতোই ছিলেন। আমার মাকে আর আমার এই শাশুড়িকে আমি কনোদিনই পার্থক্য করি নাই। তিনি আমাকে প্রতি ঈদে ১০ টাকার সালামি দিতেন। কি যে ভালো লাগতো ঊনার কাছ থেকে এই ১০টাকা সালামি নিতে।
চলবে…
তিনি আমার শ্বশুর।
আমি আমার শ্বশুর কেও জীবিত অবস্থায় দেখি নাই। আমার স্ত্রী যখন অষ্টম ক্লাসে পড়ে, তখন তার বাবা মারা যান। আমি যখন আমার স্ত্রীকে বিয়ে করি, তখন আমার স্ত্রী সবে মাত্র ইন্তারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির তোড়জোর করছেন। ফলে আমার বিয়ে হবার প্রায় ৪/৫ বছর আগে আমার শ্বশুর মারা যান। আমার শ্বশুরের প্রাথমিক তথ্য গুলি এ রকমেরঃ
নামঃ আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী
পিতাঃ সোনাম উদ্দিন চৌধুরী (সোনাম উদ্দিন চৌধুরীর পিতার নাম ছিল, ফাজেল আহম্মদ চৌধুরী)
স্ত্রীর নামঃ জেবুন্নেসা চৌধুরী
আমার শ্বশুরের ছিল আট কন্যা সন্তান এবং তিন পুত্র সন্তান।
আমার স্ত্রী ছিলো তাদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ।
তাদের ওয়ারিশ নামা যদি লিখি তাহলে দাঁড়ায় এ রকমেরঃ
তিনি আমার চাচা শশুড় ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের আপন ভাই। আমার শশুড়েরা ছিলেন তিন ভাই, (১) আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী (২) ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং (৩) নিজাম উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদকেও আমি দেখিনি কিন্তু যতটুকু আমি শুনেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি যে তিনি ছিলেন এ দেশের গোটা কিছু প্রোফেশনাল মানুষদের মধ্যে একজন। ডাক্তার হিসাবে যেমন তিনি খুব নামীদামী ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসাবেও ছিলেন খুব ভালো। তিনি সর্বশেষ জীবনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রোফেসর ছিলেন। তার একটি ছেলে (১) মকবুল আর একটি মেয়ে (নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।)। তার স্ত্রীর নাম ছিলো মেহেরুন্নেসা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নার্সের কাজ করতেন কিন্তু এই চাচার সাথে বিয়ে হবার পরে মেহেরুন্নেসা আর নার্সের জব করেন নাই। চাচী অত্যান্ত চালাক আর সার্থপর ছিলেন। তিনি চাচার বাড়ির কোনো মানুষকে তার বাসায় এলাউ করতেন না এবং এমনকি চাচার কথাও শুনতেন না। সারাক্ষন ঘরের মধ্যেই থাকতেন দরজা জানালা বন্ধ করে। এটা একটা রোগ। তার মেয়েটাকে বিয়ে দেয়ার পর মেয়েটা যেহেতু মায়ের স্বভাব পেয়েছিলো, ফলে তার ঘরে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হবার পরেই মায়ের মতো আচরন শুরু করে এবং সেখানে আর থাকতে পারে নাই। পরবর্তীতে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি তার মেয়েকে নিয়ে আজীবনকাল একটা টিনের ঘরের ভিতরে এমনভাবে বন্দি হয়ে রইলো যে, কখনো তাঁকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় না শুধুমাত্র কিছু খাবার দাবার কেনা কাটা ছাড়া। তার বাতিক হচ্ছে সে চাউলকে পাক করার আগেও সাবান দিয়ে ধোয়ে নিবে। এর মানে এই নয় যে, সে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। তার মেয়েটিকে আমরা ঘরের বাইরে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মেয়েটা সারাদিন ঘরের মধ্যে একটা অলিক ভাবনা নিয়ে কল্পনার রাজ্যে বসবাস করতে করতে এখন সেও প্রায় পংগু। তার যেহেতু কোনো আয় রোজগার নাই, ফলে সবাই জাকাত কিংবা দান করা টাকা দিয়েই তার জীবন চলে। তাতে তার কোনো আক্ষেপ নাই। মজার ব্যাপার হলো এই যে কেউ তাঁকে দান করছে বা টাকা দিচ্ছে, এতেও তার কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই। তাঁকে ডাকলেও ঘর থেকে বের করা সম্ভব না। ডাঃ কুতুব উদ্দিন মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা তার লাশ দেখতেও ঘর থেকে বের হন নাই। আমার ধারনা, চাচা এই মহিলাকে বিয়ে করে আজীবন অনুশোচনাই করেছেন সম্ভবত। শেষ জীবনে চাচা অত্যান্ত অসুখী জীবন জাপন করেছেন। প্রায় ৪ বছর আগে স্ত্রী মেহেরুন্নেসাও ইন্তেকাল করেছেন। ডাঃ কুতুব উদ্দিন চাচার ছেলে মকবুল নিজেও খুব একটা কাজের মানুষ না। সবকিছু রেডিমেট পেতে চায়। চৌধুরী বাড়ির ওয়ারিশদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সম্পদের ভাগ মকবুল পায়, যেহেতু ওয়ারিশ মাত্র ২ জন। চাচার বাবা সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফ-এ-আওলাদ করে গেছেন বলে কোনো সম্পত্তিই বিক্রি যোগ্য নয়। কিন্তু এর মাঝেও অনেক সম্পত্তি আছে যা ওয়াকফ-এ-আওলাদের বাইরে। আমি প্রায় ২ মাস নিজে কষ্ট করে সমস্ত জমি-জমার কাগজপত্র ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম জমিগুলির দেখভাল করতে আর কিছু জমি বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করতে। কিন্তু মকবুল সেটাও করতে নারাজ। সোনাম উদ্দিন চৌধুরী কোনো কারনে যখন আমার শশুরের উপর অহেতুক মেজাজ খারাপ করে প্রথমে তাঁকে ত্যাজ্য করার মতো একটা বুদ্ধি করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলো, এই কুতুব উদ্দিন চাচাই শেষ পর্যন্ত তার বাবা (সোনাম উদ্দিন চৌধুরী) কে বুঝিয়ে সুজিয়ে পরবর্তীতে প্রথম ওয়াকফ দলিল সংশোধন করে পুনরায় আলাউদ্দিন চৌধুরীকে তার সন্তানের প্রাপ্য অংশে বহাল রাখেন। আল্লাহ নিশ্চয়ই সব কিছুর খবরজান্তা। এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, এই সোনাম উদ্দিনের মতোই কিছুটা চরিত্র পেয়েছে হাসান আহমদ লিখন কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে- সোনাম উদ্দিন গেম প্লে করেছে তার নিজের সম্পদ আর সিদ্ধান্ত নিয়ে কিন্তু লিখন গেম প্লে করেছে পরের সম্পদের উপর অন্যায় করে মাদবরী করতে গিয়ে। এটা আরো জঘন্য।
ওর ডাক নাম লিখন। নূর আহমদ চৌধুরীর বড় ছেলে। ওরা মোট ৫ ভাই কিন্তু কোনো বোন নাই। প্রাতমিক জীবনে লিখন অনেক আর্থিক চাপে ছিলো বিশেষ করে ১৯৮৮-১৯৮৯ সালের দিকে। ওর সাথে আমার পরিচয় হয় বিয়ের পরেই। অনেক ইন্টিলিজেন্ট ছেলে কিন্তু মাঝে মাঝে ওর এই বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু ব্যাপারে কাজে লাগায় যা স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে। যেমন একটা উদাহরন দেই, চৌধুরী বাড়ির সব সম্পত্তি সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার জিবদ্দশায় ওয়াকফ-আওলাদ করে যাওয়ায় তাদের মানিক গঞ্জের বাড়িটাও সেই ওয়াকফ-আওলাদের অন্তর্ভুক্ত। ওখানে কেউ থাকেন না শুধু লিজি আপা (আমার আরেক জেঠস) থাকেন। তিনি শারীরিকভাবে একেবারেই পংগু। লিখনের বদবুদ্ধির কারনে লিখন চেয়েছিলো পুরু বাড়িটা যেভাবেই হোক সেটা আত্মসাৎ করা। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সব ভাইবোনেরা লিজি আপাকে অত্যান্ত স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তারা এটাই চেয়েছিলো যেনো লিজি আপা কোনো রকমে মানিক গঞ্জের ঐ দাদার বাড়িতে একটা ছোট জায়গায় একটা ঘর তোলে আজীবন থাকতে পারেন। কিন্তু লিখন এটা কোনোভাবেই চায় নাই। মজার ব্যাপার হলো যে, ঐ দাদার সম্পত্তিতে লিখনের পিতার ওয়ারিশ সুত্রে সে নিজে ২ কাঠার ৭ ভাগের এক অংশের মালিক। সে হিসাবে লিখন পায় ২ কাঠার মধ্যে ৭ ভাগের এক ভাগ। অথচ লিজি আপা নিজেই ঐ সম্পত্তির পিতার ওয়ারিশ সুত্রে ১ কাঠার বেশী মালিক। অর্থাৎ লিখনের থেকে ঢেড় বেশী। আর এই লিখন চায় না লিজি আপা ওখানে থাকুক। উদ্ভট ভাবনা। এখানে আরো একটা ব্যাপার কাজ করছিলো যে, চৌধুরী বাড়ির মানুষেরা পরোক্ষ ভাবে লিখনকে তাদের অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতো। ফলে তার একটা অলিখিত দাপট ছিলো। সম্ভবত সেই দাপটের কারনেই লিখন একচ্ছত্র এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার হিম্মত করেছিলো। পর্দার বাইরে থেকে আমি পুরু ব্যাপারটা এমনভাবে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করেছিলাম যেনো লিজি আপা তার ন্যায্য অংশ পায় এবং সেখানে তার যা খুসি করতে পারে। এখন ওখানে লিজি আপার জন্য ৬ তালা বিল্ডিং হয়েছে যা লিখনের নিজেরো নাই। এই ধরনের কাজ করাটা ওর কোনোভাবেই ঠিক হয় নাই। যাই হোক, লিখন লটারীর মাধ্যমে আমেরিকার একটা ইমিগ্রেশন পেয়েছিলো। সরকারী আইন মোতাবেক ওকে ওখানে ৫ বছর এক নাগাড়ে থাকতে হবে বিধায় আমেরিকার সরকার ওকে এবার আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে আটকে দিয়েছে যেনো সে আর দেশে ফিরতে না পারে। সব আল্লাহর ইচ্ছা। ওকে আমি সত্যিই একটা পজিটিভ বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে ভেবেছিলাম যা আসলে ওর মধ্যে বেশ ঘাটতি আছে। ভালো জব করতো আর্গন ফ্যাশনে, পারভেজ ভাইয়ের অধীনে। যাই হোক, ওর উপরে অনেকের ভরষাটা এখন প্রায় শুন্যের কোঠায়। ওর উপরে আমার কখনো রাগ ছিলো না। আমি ওর উকিল বাবাও বটে।
আমার বড় সমন্ধী অর্থাৎ আমার স্ত্রীর সবচেয়ে বড় ভাই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হাইকোর্টে স্ট্যাম্প রেকর্ডার হিসাবে কাজ করতেন। এই স্ট্যাম্প রেকর্ডার কি জিনিষ আমি জানি না। তবে ব্যক্তিগত জীবনে অনেক সৎ এবং ধইর্যশীল মানুষ ছিলেন। হাসমত আরা ছিলেন তার স্ত্রী। এই দম্পতির কোনো মেয়ে সন্তান ছিলো না। ছিলো ৫ ছেলে। হাসান আহমদ লিখন তার বড় ছেলে। হাসান আহমদ লিখনের ব্যাপারে বিস্তারীত আমি কিছু তথ্য লিখেছি ওর অধ্যায়ে। নূর ভাই আমার খুব প্রিয় মানুষদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করতাম, তিনিও আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। সহজ সরল মানুষ ছিলেন। সবাই বলে নূর আহমদ চৌধুরী নাকি তার বাবার মতো দায়িত্তশীল ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের মতো। আমি আমার শশুড়কে দেখি নাই ফলে তুলনাটা আমি করতে পারি নাই। বিয়ের আগে আমার তার একবারই দেখা হয়েছিলো বগুড়ায় কিন্তু বিয়ের পরে তার সাথে আমার অনেক শখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। তিনি তার সংসারের জন্য এবং চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার অবদান চৌধুরী বাড়ির সব সদস্যদের জন্য অনেক ছিলো। সব সময় তিনি চাইতেন যেনো সবাই ভালো থাকে। এই ভালো থাকার চাওয়ার কারনে তিনি একবার আমাকে একটা প্লট দেয়ার নামে তারই কোনো এক কলিগের পাল্লায় পরে আমার বেশ কিছু টাকা নষ্ট করলেও তার উপর আমার কখনো কোনো রাগ হয় নাই। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে তিনিও ঠকেছেন কাউকে বিশ্বাস করে। তার এক ছেলে মানিক গঞ্জে কোনো এক বন্ধুকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে খুন করে ফেলেছিলো। খুব সমস্যায় পড়েছিলেন। কোথাও লুকানোর জায়গা ছিলো না। আমি জানি এই খুনের ব্যাপারটা আমার সাপোর্ট করার কোনো কারন নাই কিন্তু শুধুমাত্র নূর ভাইয়ের কারনে আমি তাঁকে সহ তার সেই খুনী ছেলেকে প্রায় ২ মাস আমার বগুরার ক্যান্টনমেন্টে রাখতে হয়েছিলো কারন ক্যান্টনমেন্টে কোনো পুলিশ রেইড করে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে আজীবন আক্ষেপে থাকবো কারন আমি একটা অপরাধকে লুকানোর সাহাজ্য করেছিলাম। নূর আহমদ ভাই ২০১২ এর দিকে মারা যান। মানিকগঞ্জেই তার দাফন হয়েছিলো।
কার্লা ডরাইন উইলশন তার পুরু নাম। আমার এই ওয়েব সাইটের মধ্যে আমার সাথে এক মাত্র খুব অন্তরের সম্পর্ক ছিলো এই একটি মাত্র বিদেশী মানুষের। ওর সাথে আমার যখন পরিচয় হয়, তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র ১৪ কিংবা ১৫। আমি তখন ক্যাডেট কলেজে ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় আসলে আমাকে কেউ খুব একটা চিঠিপত্র লিখতো না, কেউ প্যারেন্টস ডে তেও আসতো না। কেউ ছিলো না আসলে। মা থাকতেন গ্রামে, অভাবী মানুষ, রাস্তা ঘাট চিনেন না, বোনেরাও সেই রকম কোনো অবস্থানে ছিলো না যে, ছোট ভাইয়ের জন্য তারা কিছু করবে, তাদের ও সাংসারিক অবস্থা তেমন ছিলো না। একদিন আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ আমাকে জানালেন যে, তার এক বন্ধুর মেয়ে নাম, কার্লা আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। চিঠি লিখলে যেনো আমি তার উত্তর দেই। সেই থেকে হটাত করে কার্লা আমাকে চিঠি লিখা শুরু করে। হাতের লেখা অত্যান্ত খারাপ, এক পৃষ্ঠা চিঠিতে মাত্র ৫/৬ লাইনেই পাতা ভরে যায় এমন এক অবস্থা, ফলে ওর চিঠির ভলিয়ম হতো কয়েক পাতা করে। একটা সময় এলো আমি প্রতিদিন ওর চিঠি পাওয়া শুরু করলাম। প্রথম প্রথম আমি বুঝতেই পারি নাই যে, কার্লা আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্রমেই ওর চিঠির মধ্যে ভালোবাসার কথা, ভালোবাসার সিম্বল, ইত্যাদি ফুটে উঠতে শুরু করলো। টিন এজার প্রেম। আমিও এক সময় যেনো ওর চিঠির প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম। ওর চিঠি না পেলে ভালো লাগতো না, আবার আমি চিঠি না লিখলেও ভালো লাগতো না। আমার সাথে সুত্র ধরেই কার্লা আমেরিকায় আমার ভাইয়ের সাথে, হাবীব ভাইয়ের বউ এর সাথে রীতিমত একটা সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছিলো। পাশাপাশি বাড়ি ছিলো কার্লাদের আমার ভাইয়ের বাড়ির লাগোয়া। ফলে হাবীব ভাইয়ের বউ কার্লাকে আমাদের দেশীয় কালচার, পোষাক আষাকের মধ্যেও ঢোকিয়ে দিয়েছিলো। কার্লা আমাকে এক সময় “হাসবেন্ড” হিসাবেই চিঠিতে সম্বোধন করা শুরু করলো। প্রতি চিঠিতেই আমি ওর প্রত্যাহিক জীবনের ঘটনা, তার ভাবনা, তার শখ, কিংবা কষ্টের কথা জানতে থাকলাম। প্রচুর ছবি পাঠাতো আমাকে। আজ আমার কাছে কার্লার কোনো ছবি নাই। কেনো নাই সেটাও বলি। আমি কারো কোনো কিছুই ফেলে দেই না। কার্লার চিঠি, ছবি সব কিছু আমি আলাদা করে একটা বাক্সে ভরে রাখতাম। আমার সেই বাক্সটা রেখেছিলাম বর্তমানে আমার এক জেঠষের বাসায় খুব যত্ন করে। কোনো একদিন আমি ঐ বাক্সটা আনতে গেলে শুনলাম, ওনারা ঐ বাক্সটা খুব জরুরী কোনো বিষয় না বলে তার ভিতরের সব কাগজ পত্র সহ ফেলে দিয়েছে। খুব কষ্ট লেগেছিলো, কিন্তু বলতে পারি নাই কি তারা ফেলেছিল। কার্লার এক বন্ধুর নাম ছিলো মিন্ডি। মিন্ডি সম্পর্কেও কার্লা অনেক কথা লিখতো। আমার এই ডায়েরিতে একটি মাত্র লেখা আছে যার নাম WAS IT PENFRIENDSHIP? এটা আসলে এই কার্লাকে নিয়েই লেখা। এই লেখাটা কোনো কাল্পনিক নয়। এটা নিছক একটা এমন লিখা যা বাস্তবে ঘটেছিলো। অনেক কিছুই লিখার ছিলো কিন্তু আজ যেহেতু সে কাছেও নাই, পাশেও নাই, সেটা রহস্য হয়েই থাকুক।
আগেই বলেছিলাম যে, আমার বাবার আগের একটা সংসার ছিলো। আমার প্রথম মা মারা যাওয়ার পরেই আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমার মায়ের বয়সের থেকেও আমার বাবার আগের সন্তানদের বয়স অনেকেরই বেশী ছিলো। আমার স্টেপ ব্রাদারদের সংখায় ছিলো তিন- নজর আলী ভাই, তাজির আলী ভাই আর মোহসীন ভাই। শোনা যায় যে, ইউনুস নামেও নাকি আমার আরেক স্টেপ ব্রাদার ছিলো কিন্তু সেটা সম্ভবত আমার মায়ের বিয়ের পর পরই তার মৃত্যু হয়। আত স্টেপ বোন ছিলো ৪ জন- জামিনা, লজ্জুতন, বেলাতন, আরাদন আর আরাফান আপা। তারা এখন আর কেউ বেচে নাই। আমার এই স্টেপ ভাই বোনদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশী যেই জনের সাথে আমার ব্যক্তিগত খাতির ছিলো সেটা নজর আলী ভাইয়ের সাথে। আর এর একটা কারনও ছিলো। নজর আলী ভাই আমাদের বাক্তার চর বাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার আর রবিবার কাচা বাজারের দোকান দিতেন। আর আমি যখন বাজারে যেতাম, তখন তার সাথে আমার সপ্তাহে দুইদিন দেখা হতোই। নজর আলী ভাইয়ের ছিলো দুই ছেলে-তালেব আর ঈমান আলী। মেয়ে ছিলো দুইজন, রাশেদা আর অন্য আরেক জন। এই মুহুর্তে নামটা মনে করতে পারছি না তবে তার একটা মেয়ে আছে যিনি নার্স শেফালী। তাজির আলী ভাইয়ের ব্যাপারে “আমার বাবার মাদবড়ি স্টাইলের” মধ্যে বিস্তারীত লেখা আছে। সেই তাজির আলীর অনেক গুলি সন্তান ছিলো। তার মধ্যে বর্তমানে মান্নানই এখন আমার সাথে অনেক বছর যাবত যুক্ত আছে। মোহসীন ভাইয়ের সন্তান্দের সাথে এক সময় কিছুটা যোগাযোগ ছিলো কিন্তু এখন কে যে কোথায় কিভাবে আছে আমার সে ব্যাপারে কোনো ধারনা নাই।
সবাই তাঁকে শায়েস্তা নামেই চিনতো। সে আমার বোনদের মধ্যে ছিলো ২য়। শায়েস্তার জীবন একটা দুখী মানুষের কাহিনী ছাড়া আর কিছুই না। তার গায়ের রং ছিলো বেশ কালো কিন্তু খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে ছিলো আমার এই বোন শায়েস্তা খাতুন। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহই আসলে পুরু ৫ বোন আর আমি সাথে মায়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে এতোটাই হিমশিম খাচ্ছিলেন যে, এতা ছিলো আমার ভাইয়ের জন্য অতিমাত্রায় একটা চাপ। তার উপর সবে মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে, চারিদিকে মানুষ যেমন বেকার তেমনি শুরু হয়েছে দূর্ভিক্ষ। এর মাঝেই আমার বড় ভাই যতোটা পেরেছে তার সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে আমরা কিছুটা হলেও ভালো থাকি। অভাবের সংসারে আসলে কোনো কিছুই নিজেদের নিয়ন্ত্রনে থাকে না। মায়ের উপর চাপ যেনো আরো বেশী ছিলো। ৫ টাই প্রায় বিবাহ যোগ্য মেয়ে, আমিই এক মাত্র ছোট। দেশের অবস্থ্যা শোচনীয়, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই। যখন তখন যে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। ফলে মা নিজেও চাচ্ছিলেন মেয়েগুলির তারাতাড়ি বিয়ে হয়ে যাক। ঠিক এই সময়ে বরিশাল বাড়ি একটা ছেলে শায়েস্তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়। নাম সুলতান আহমদ। মা শায়েস্তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। এই বিয়েতে হাবীব ভাই রাজী ছিলেন না। কেনো ছিলেন না, বা কেনো মা ই বা রাজী ছিলেন এই অংক আমার কাছে পরিষ্কার ছিলো না আর না আমার বুঝবার বয়স ছিলো। শায়েস্তার কোলে একটা কন্যা সন্তান আসে। ওর নাম রাখা হয় শেফালী। একদিন সুলতান তার নিজের বাড়ি বরিশাল যাওয়ার জন্য গেলে সুলতান আর কখনোই ফিরে আসে নাই। কি হয়েছিলো, কোথায় উধাও হয়ে গেলো, নাকি রাস্তায় মারাই গিয়েছিলো কিছুই আর জানা যায় নাই। আজ অবধি আমাদের কারোই জানা নাই এই সুলতান কি বেচে আছে নাকি মরে গেছে। দিন যায়, মাস যায়, বছর শেষ হয়ে যায়, শায়েস্তা সুলতানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক সময় আমরা ধরে নেই যে সুলতান হয়তো আর ফিরে আসবে না অথবা তার মৃত্যু হয়েছে। এমনি অবস্থায় ১৯৭৮ সালে আমার বড় ভাই আমেরিকায় স্কলারশীপ পান। কিন্তু তখন সবেমাত্র লায়লার বিয়ে হয়েছে, ফাতেমার ও বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো, সাফিয়া তো আর ছিলোই না। বাকী ছিলো শায়েস্তা আর মেহের। একদিন ঢাকা থেকে একটা বিয়ের সমন্ধ আসে শায়েস্তার জন্য, নাম আলি আহমদ। উর্দু রোডে থাকে, কুট্টি পরিবার না হলেও কুট্টিদের সাথে থাকতে থাকতে প্রায় কুট্টি দের মতোই আচরন ছিলো। বিগ হার্টেড ম্যান কিন্তু সামর্থের বাইরে খরচের অভ্যাষ। কিন্তু আলী আহমদের৪ স্ত্রী বিয়োগ হয়ে গিয়েছিলো। সেই ঘরে একটা মাত্র মেয়ে ছিলো নাম লায়লুন্নাহার। খুবই সুন্দর একটা মেয়ে ছিলো। প্রায় ১৫ বছর বয়সের। শায়েস্তার সাথে আলী আহমদের বিয়ে হবার পর শাতেস্তারা উর্দু রোডে চলে আসে। এই আলি আহমদের৪ ঘরেই শায়েস্তা ৪ টি সন্তান জন্ম দেয়- ফারুক, নুরুন্নাহার, লিয়াকত আর শওকাত। লিয়াকত আর শওকাত জমজ। লিয়াকত আর শ ওকাতের বয়স যখন মাত্র ৫ মাস, তখন শায়েস্তার মৃত্যু হয়। আর ওর মারা যাওয়ার কারনে আলী আহমদ সব বাচ্চাদেরেকে এক সাথে আমার মায়ের কাছে রেখে চলে আসে। একদিকে শেফালি ছিলো মায়ের ঘাড়ের উপর, অন্যদিকে শায়েস্তার আরো ৪ টি সন্তান গিয়ে পড়লো মায়ের উপরেই। অসহায় মার কিছুই করার ছিলো না। শুরু হলো মার আরেক স্ট্রাগলের অধ্যায়। আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দিয়েছিলো শায়েস্তার সব সন্তানরা।
সাফিয়া খাতুন আসলে আমাদের বোনদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে সাফিয়া খাতুন মারা যায়। সাফিয়া খাতুন প্রথমে একটা বিয়ে করার পর তার স্বামী মারা গেলে পরবর্তীতে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে। কিন্তু সেটাও বেশীদিন টিকে নাই কারন সাফিয়াই মারা গিয়েছিলো। আমি তখন সবে মাত্র ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজ থেকে ছুটিতে এসেছিলাম। বর্ষার দিন, ঝড়ও ছিলো। আমার যাওয়ার কথা ছিলো সাফিয়ার বাসায়। কিন্তু আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম বালুচর এলাকায়। ঝড়ের কারনে আমার আর গ্রামে ফেরা হয় নাই। সেদিন রাতেই সাফিয়ার শরীর খারাপ হয়ে যায় এবং রাতেই সাফিয়া মারা যায়। ছোট মেয়ে মাত্র, বয়স তিন মাস। সাফিয়ার চেহারা ছিলো খুব সুন্দর। সাফিয়া যখন মারা যায় তখন রাত প্রায় ১০ টা। ঝড়ের কারনে খবরটা আমাদের বাসায় আসতে আসতে সকাল হয়ে যায়। আমি বালুচর থেকে গ্রামে আসতে আসতেই ওর শশুড় বাড়ির লোকজন ওকে দাফন করে ফেলে। তারপর আমি গেলাম সাফিয়ার বাসায়। গিয়ে দেখলাম সাফিয়ার মেয়ে শান্ত ভাবে যেনো ঘুমিয়ে আছে। আমার মনটা খুবই খারাপ ছিলো। কোথায় কবর দেয়া হয়েছে সেটা দেখার জন্য আমি সাফিয়ার কবরের কাছে গেলাম। সারারাত বৃষ্টি আর ঝড় থাকলেও শিয়াল কুকুরের কাজ থেমে ছিলো না। এই সব প্রানীগুলি সাফিয়ার কবরে হানা দিয়েছিলো। কিন্তু যে কোনো কারনেই হোক সাফিয়ার লাশটা আস্ত অবিকল ছিলো। কবরের পাশে গিয়ে দেখলাম যে, কবরের মুখটা খোলা। বাশ আর চটি গুলি সরে গেছে। সাফিয়ার লাশের উপরের সাদা কাফনের কাপড়টা একদিকে একটু সরে গেছে আর ওর মুখটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চুল গুলি ছিলো একেবারেই অগোছালো। আমি মাথা নীচু করে যখন সাফিয়ার মুখটা দেখতে গেলাম, আমি ভীষন ভয় পেয়েছিলাম লাশ দেখে। কেনো ভইয় পাইলাম, আর কি হলো আমি কিছুই বুঝ্যি নাই কিন্তু বাড়িতে আসার পর আমার অনেক জ্বর হয়েছিলো। আমার কাছে সাফিয়ার কিংবা ওর মেয়ের কোনো ছবি নাই। পরবর্তীতে সাফিয়ার তিন মাসের বাচ্চাতাও মায়ের অভাবেই হোক আর অযত্নেই হোক সেও বাচে নাই। সাফিয়ার কোনো বংশধর এই পৃথিবীতে নাই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুক।
ফাতেমা বর্তমানে আমার জীবিত বোনদের মধ্যে ২য়। তার স্বামী মোঃ সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু মিয়া। দুদু মিয়ার ব্যাপারে এখানে আগেই বিস্তারীত বলা হয়েছে। ওর স্বামী মারা যাওয়ার পরে ওর বড় ছেলে ফরিদের সাথে জাপানেই আছে। ফাতেমার দুটু মেয়ে আর ৪ টি ছেলে। মেয়ের মধ্যে বড় হচ্ছে সালেহা। সালেহার স্বামী আইনুল মোটামুটি ভালো অবস্থাএই আছে। ঈটের ভাটার মালিক। কিন্তু ছোট মেয়ে খালেদার প্রেমের মাধ্যমে বিয়েটা খুব একটা ভালো পরিনতি হয় নাই। মিজান খালেদার স্বামী। ইনকাম ট্যাক্সের অফিসে চাকুরী করে। তার যেমন ঘুষের বাহার তেমনি নারিদের প্রতি চরম ভালোবাসা। ফলে নিজের স্ত্রীর প্রতি তার ততোটাই অনীহা। খালেদার বাসায় আজ পর্যন্ত আমি পানিটুকু পর্যন্ত খাই নাই কারন সবই অবৈধ রোজগার।
বর্তমানে যে কয়জন আমার বোন জীবিত আছেন, তাদের মধ্যে লায়লা সবার বড়। গ্রামেই থাকে। তার স্বামীর নাম মোঃ ইসমাইল হোসেন যিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। বয়স প্রায় এখন ৭০ এর কাছাকাছি। সর্বশেষ মুসলিম নগর প্রাইমারী স্কুল থেকে হেড মাষাটার হিসাবে রিটায়ার করার পর তিনি আমার সাথেই আছেন। আমি চেষ্টা করেছি এই দুলাভাইকে কোনো আর্থিক সাহাজ্য না করে কোনো কর্ম সংস্থানের মাধ্যমে সাহাজ্য করা যায় কিনা। তাতে তিনি একটু সুস্থ যেমন থাকবেন তেমনি আর্থিক ভাবে একটু সচ্ছলতাও থাকবে। দুলাভাই আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজেই আছেন প্রায় ১০ বছর যাবত। ফ্যাক্টরীটা বন্ধ করার পরেও আমি উনাকে ওখানেই রেখে দিয়েছি যাতে ফ্যাক্টরীর দেখভাল এবং নিজেও ভালো থাকেন। খুবই চরিত্রবান লোক এই দুলাভাই। লায়লার ৪ ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে মাহবুব একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং সরকারী চাকুরীজীবি। বর্তমানে মাহবুব কর্নফুলি পেপার মিলস এ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছে। লায়লার অন্য এক ছেলে জাপানে থাকে আর বাকী ২ জন দেশেই আছে। লায়লার মেয়ের নাম জেসমিন। অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছে। নিজেই নিজের সংসার চালায়। সারাজীবন কষ্টেই জীবন পার করেছে আমার এই সব বোনেরা। এখন যে সুখে আছে এমনটা নয়। ডায়াবেটিসে ভুগছে আমার বোন। বেশীরভাগ সময় অসুস্থই থাকে। খুব একটা যাওয়া হয় না আমার গ্রামে। তাই খুব একটা দেখাও হয় না। আমি চেষ্টা করি দুলাভাইকে কিছু টাকা বেশী দিয়ে ইন্ডাইরেক্টলী আর্থিকভাবে ওর সংসারে সাহাজ্য করতে। লায়লার যে ছেলে জাপানে থাকে তার নাম স্বপন। মাহবুবের মতো সেও ম্যারেড। আসলে লায়লার সব ছেলেমেয়েরাই ম্যারেড। কিন্তু এতোগুলি সন্তানের বয় থাকার পরেও লায়লাকে একাই নিজের দেখভাল করতে হয়। এটা খুব একটা সুখের খবর না। স্বপনের বিয়েটা হয়েছিলো “টেলিফোনে” জাপানে থেকে বাংলাদেশে। আমি সে বিয়েতে ছিলাম। মেয়েটা আমাদের হাসনাবাদ ইকুরিয়ার মেয়ে। সম্ভবত প্রেমের বিয়ে। আমি সপরিবারে ওর বিয়েতে ছিলাম কিন্তু বর স্বপন ছিলো জাপানে। এই জাতীয় বিয়ে আমার পছন্দ নয় যেখানে বর বাইরে আর কনে দেশে অথচ বিয়ে করতেই হবে। এটা আজকালকার দুনিয়ায় যেনো ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। লায়লা ছোটবেলায় ভীষন সুন্দুরী ছিলো আর ছিলো খুব ট্যালেন্ট। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর পড়াশুনা করতে পারে নাই। এর মধ্যেই ওকে বিয়ে করতে হয়েছিলো। মাওহবুব আর স্বপনের কয়েকটি ছবি এখানে আপলোড করা হলো। সাথে স্বপনের স্ত্রীর ছবিও। আমার কাছে এই মুহুর্তে লায়লার অন্যান্য সন্তানের কোনো ছবি নাই বিধায় আপলোড করতে পারলাম না। পরে আপডেট করা হবে।
সবচেয়ে বামের লোকটি হচ্ছেন লায়লার স্বামী ইসমাইল ভাই। এই ছবিটা প্রায় ৭/৮ বছর আগে তোলা। তিনি সপ্তাহের ৬ দিন পলাশপুরেই ফ্যাক্টরীতে থাকেন, আর একদিন গ্রামে যান। তবে যখনই দরকার হয়, তিনি যখন তখন বাড়িতে গেলেও আমার পক্ষ থেকে কখনো কোনো না ছিলো না। অত্যান্ত অমায়িক আর সহজ সরল মানুষ। আমাদের পরিবারের সেই ১৯৭৬ সাল থেকেই তিনি সাথে আছেন এবং সব সময় পাশেই পেয়েছি। তিনি আমার প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষকও ছিলেন। সৎ মানুষ এবং ঝামেলাবিহীন মানুষ। অল্পতেই তুষ্ঠ থাকেন।
এই ছবিটায় আমার মেয়ে উম্মিকার সাথে স্বপনের স্ত্রী যেদিন তার বিয়ে হয় সেদিন তোলা। মেয়েটার মধ্যে একটা জিনিষ লক্ষ করেছি যে, গরীব মানুষের মেয়ে বলে হয়তো একটু সাংসারীক চিন্তাভাবনা আছে। বাকী ভবিষ্যত বলবে আগামীকালের সময় আর তার ভাবনার মধ্যে।
এই ছবিটা লায়লার বড় ছেলে মাহবুবুর রহমানের। ৭ ই নভেম্বর ১৯৭৬ সালে ওর জন্ম। তখন দেশে প্রচন্ড দূর্ভিক্ষ চলছিলো। ওর বাড়তি দুধের ব্যবস্থা করতেই আমার দুলাভাই আর বোনের হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে। ঐ সময়ে শুধু লবনের দামই উঠেছিলো ১০০ টাকার উপর প্রতি কেজি। বর্তমানে মাহবুব তিন সন্তানের বাবা। আর সরকারী ভালো অফিসেই কাজ করে। মাহবুবের শশুড় মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মানুষ। কোনো রকমে বর্তমানে সংসার টিকে রেখেছেন আর্থিক দিক দিয়ে। মাঝখানে প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ চলাকালে তিনি আমার ফ্যাক্টরিতেও ইসমাইল ভাইয়ের সাথে কাজ করেছেন কিন্তু বয়সের ভাড়ে লোড নিতে পারছিলেন না বলে কাজটা ছেড়ে দিতে হয়েছিলো। মাহবুব তাদেরকে আর্থিকভাবে সাহাজ্য করে কিনা আমার জানা নাই।
এই ছবিটার মধ্যে যে মহিলাটি সর্ব ডানে গোলাপী ড্রেস পড়া, সেটা লায়লার একমাত্র মেয়ে জেসমীনের। জেসমিনের মেয়েরাও এই ছবিতে আছে। জেসমীনের স্বামীর নাম ছিলো খোকন। খুব একটা দায়িত্তশীল ছিলো না। কোনো এক সময়ে খোকন সাভারে কাজ করার সময় কাউকে না জানিয়ে আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করে। কোনো এক ঈদের দিন খোকন হার্ট ষ্ট্রোক করে মারা যায়। জেসমীনের স্বামী মারা যাওয়ার পরেও জেসমীন তার শশুড় বাড়িতেই বাচ্চাদের নিয়ে থেকে যায়। পিছনে দাঁড়ানো বাম থেকে ২য় মেয়েটি জেসমীনের মেয়ে।
উনি আমার বোন। আমার ৫ বোনের মধ্যে সেইই সবার ছোট কিন্তু আমার ইমিডিয়েট বড়। নাম-মেহেরুন্নেসা। তার স্বামীর নাম আব্দুর রশীদ। ইন্টার পর্যন্ত পাশ করেছিলো রশীদ ভাই। একবার বিদেশেও গিয়েছিলো কাজের খোজে কিন্তু বেশীদিন টিকতে পারে নাই। অতঃপর বহুদিন পোষ্ট মাষ্টার হিসাবে কাজ করেছেন। কোনো কিছুতেই খুব একটা সুবিধা করতে পারেন নাই। অতঃপর ব্যবসা শুরু করেন-ইটের ভাটার। সেটাতে মুটামুটি ভালো করেছেন। তার দুই ছেলেকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন, তারা এখন অবধি বিদেশেই আছেন। সচ্ছল অবস্থা এখন। কিন্তু আমার বোনের সুখের মুখ আসে নাই। সারাদিন কাজের মধ্যেই থাকে। আসলে লেখাপরা করার মতো সুযোগ তাদের ছিলো কিন্তু পরিস্থিতির কারনে সেটা হয় নাই। ১৯৭৭ সালে তার বিয়ে হয়। তারা জানতো তাদেরকে যেভাবেই হোক স্বামীর ঘর করতেই হবে ফলে যতো কষ্টই হোক তাদেরকে সেটা মেনেই চলতে হয়েছিলো। ভীষন পরিশ্রমী একজন মানুষ। একটাই মেয়ে আর সেও অবিকল মায়ের মতো দেখতে। তার বিয়ে হয়ে গেছে, ভালো আছে।
যখন আমি ছোট ছিলাম, এক সময় যে কোনো কারনেই হোক আমার এই বোন একবার আমার সাথে ঢাকায় কিছুদিন বদি ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করেছিলো। খুব একটা সুখকর পরিস্থিতি হয় নাই সে বাড়িতে। অবশেষে মেহেরুন্নেসা শেষ পর্যন্ত গ্রামেই ফিরে গিয়েছিলো। গরীব মানুষের আসলে বন্ধু থাকে না। তাদের থাকে মনীব। আমার এই বোনের চেহারা দেখলেই কিন্তু বুঝা যায় তার মনের ভিতরে কষ্ট আছে, যন্ত্রনা আছে কিন্তু যখন কোনো মেয়েদের বাবা থাকে না, তাদের কষ্টের কথাও বলার কোনো লোক থাকে না। আমি তাই সব সময় দোয়া করি ওরা যেনো অন্তত ভালো থাকে। ওরা আসলেই খুব ভালো মানুষ। মা যতোদিন বেচে ছিলো, প্রায় প্রতিদিনই মেহের মায়ের কাছে আসতো কিন্তু মা মারা যাওয়ার পরে সম্ভবত আর আসা হয়নি ওর।
আলাউদ্দিন চৌধুরী আমার শশুড়। আমি তাঁকে দেখিনি কারন তিনি আমার বিয়ের প্রায় ৫ বছর আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। আমার শশুড়ের আব্বার নাম চিলো সোনাম উদ্দিন চৌধুরী। অত্যান্ত এক রোখা মানুষ ছিলেন তিনি। তার মোট তিন পুত্র আর এক মেয়ে ছিলো। তিন পুত্রের নাম জনাব আলাউদ্দিন চৌধুরী, ডাঃ কুতুব উদ্দিন চৌধুরী এবং নিজাম উদ্দিন চৌধুরী।
আমার শশুড়ের তিন ছেলে আর আট জন মেয়ে ছিলো। তারা হচ্ছে জনাব নূর আহমদ চৌধুরী, সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, এবং মুস্তাক আহমদ চৌধুরী। মেয়েরা হচ্ছেন- মিসেস জায়েদা খাতুন, নূর জাহান, শেলিনা, সামসুন্নাহার, মিটুল চৌধুরী,
আলাউদ্দিন চৌধুরীর বংশের উপরে আমার এই ডায়েরীতে একটা রুপক গল্প আকারে লেখনী আছে যার নাম দিয়েছি- চৌধুরী বাড়ীর অসমাপ্ত গল্প”। গল্পটার শেষ আমি জানি না কিন্তু একটা ব্যাপার আমি বাস্তবে লক্ষ্য করেছিলাম যে, সোনাম উদ্দিনের মতো আরেক জন তার বংশধর এই যুগেও তৈরী হয়েই ছিলো, যার নাম হাসান আহমদ লিখন। অনেক গুনাবলী (বিশেষ করে আগ্রাসন নীতি এবং অন্যের হক নষ্টের নমুনা) তার মধ্যেও আমি দেখেছি।
আমি এই “ আলাউদ্দিন চৌধুরীর” অংশে চেষতা করেছি যতোটুকু বস্তুনিষ্ঠ ইনফর্মেশন দেয়া যায়, সেতা দেয়ার। মূল্যায়ন সব পাঠকের উপর। কাউকে ছোট করার কোনো অভিলাষ আমার কোনো কালেই ছিলো না, আর এ রকম করার কোনো কারনও আমার নাই। আমি শুধু সময়ের সাথে সাথে কি ঘটেছে সেগুলু লিখে রাখার চেষতা করেছি।
আমার শাশুড়ি মিসেস জেবুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। তিনি শেষ বয়সে এসে প্যারালাইসিস ছিলেন। খুড়ুয়ে খুড়িয়ে হাটতেন। আমার বাসাতেই তিনি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তার শেষ সময়টুকু আমার সাথেই আমার বাসায় কাটিয়েছেন। তিনি আমার বাসা থেকেই বেহেস্তবাসী হয়েছিলেন।
মানুষের জীবনের সব কিছুই খোলাশা নয়। কিছু কিছু ঘটনা আছে, কিংবা বিষয় আছে অথবা মুহুর্ত আছে যা শুধুমাত্র নিজের এবং আর কারো না। যদি এসব কাউকে বলতেও চাই, সেগুলি না বিশ্বাসযোগ্য, না বলার মতো বলে মনে হয় অথচ ঘটেই যায়। এটা সবার জীবনেই ঘটে, হোক সে যুবক কিংবা বৃদ্ধ। যদি যুবক বয়সে ঘটতে থাকে, তখন বৃদ্ধ বয়সে এসে তা জাবর কাটে, আর যদি বৃদ্ধ বয়সে ঘটতে থাকে, তখন অনেকেই এটাকে না মানতে চায়, বা মানাতে চায়। তখন এর নাম হয় ভীমরতি।
কিন্তু একটা কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, মানুষ যখন কষ্টে থাকে তখন তার দরকার পড়ে একজন সাথীর, আবার মানুষ যখন ফুর্তিতে থাকে, তখনো দরকার হয় তার সাথী, অথবা মানুষ যখন নিজে নিজে একা হয়ে যায়, তখনো দরকার হয় তার একজন সাথীর। একজন স্ত্রীর অথবা একজন স্বামীর জন্য স্বামী বা স্ত্রীই যে সর্বদা ম্যাচিং সাথী হবে এমনটা কখনোই না। সারাজীবন এক ছাদের তলায় বসবাস করেও একজন স্ত্রী হয়তো কোনো এক সময়ে এসে সে তার স্বামীকে হয়তো বুঝতেই পারে না, আবার যুগের পর যুগ একসাথে একই বিছানায় ঘুমিয়েও একজন স্বামী তার স্ত্রীকে হয়তো হারিয়েই ফেলে কোনো এক সময়ে। তখন না স্বামী, না স্ত্রী কেহই একে অপরের যোগ্য সাথী হয়।
অন্যদিকে, আজকের দিনে জয়েন্ট ফ্যামিলি যেনো অনেকটা সপ্নের মতই মনে হয়। অথচ একটা জয়েন্ট ফ্যামিলির কেউ না কেউ কারো না কারো সাথীর ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে তাদের শুন্যতাকে ভরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ আজকাল এতোটাই ব্যস্ততায় নিজেকে নিয়ে থাকে যে, নিজের অভাব পুরন করতে করতেই তার সময় শেষ হয়ে যায়, অন্যের জন্য খরচ করার সময় তার নাই। হয়তো এর মধ্যেই জুটে যায় অপরিচিত কোনো এক সত্তা যিনি হয়তো সাময়িকভাবে দিতে পারে দুদন্ড শান্তি সেই বনলতার মতো। এই বনলতারা হটাত করেই উদয় হয় একেবারে কোনো এক অজানা জায়গা থেকে। ওরা আসলে এই সমাজেই থাকে কিন্তু কখন যে এরা সবার আড়ালে বনলতা কিংবা পুরুষলতা হয়ে উঠে কেউ জানে না। একেবারে অতি সংগোপনে এরা একে অপরের সাথী হয়ে যায়। কনো ব্যারিয়ার থাকে না এদের মাঝে। শারিরিক, দৈহিক কিংবা আর চরম গোপনীয়তাও এদের মাঝে আর কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। অবশ্য বনলতারা সব সময় থাকেও না, একটা সময় আসে তারাও এক বৃক্ষ থেকে আরেক বৃক্ষে, এক সমতল থেকে আরেক মালভূমিতে কিংবা কোন এক জনপদ থেকে আরেক জনপদে তারা একেবারেই হারিয়ে নতুন কারো সাথে জোড়া বাধে। এই বনলতারা কেউ কাউকেই আঘাতে বিশ্বাস করে না আবার কেউ আজীবন তাদের জীবনটাকেই বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে।
আমার জীবনেও এমন কেউ এসেছিলো বা আসতে চেয়েছিলো। অরু, মেঘলা, সন্ধ্যারানি, রেনু কিংবা শারমিন অথবা সানা এরা এ সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রেস্ট্রিক্টেড প্রানী যাদের মুখাবয়ব সমাজে পুরুপুরি উম্মুক্ত নয় কিন্তু সবার সামনেই ওরা চলাচল করে। এরা সবাই কোথাও না কোথাও অসুখী মানুষ। আবার কেউ কেউ অসুখী কিনা সেটাও বুঝতে পারেনা, ভাবে ঠিকই তো আছে। ফলে এদের মধ্যেও একতা শ্রেনীভাগ আছে। কেউ সাহসী, কেউ একেবারেই ভীতু, কেউ ধর্ম ভীরু, কেঊ সমাজভীরু, কেউ ব্যক্তিভীরু আবার কেউ পরিবারের জন্য ভীতু। অরুরা ছিলো ডেস্পারেত, মেঘলারা ছিল মডারেত, সন্ধ্যারানীরা ছিলো আত্তগোপনের মতো কেউ, রেনুরা সমাজের কোথাও না কোথাও রাজত্ব করতে গিয়ে পারায় বড় আপু হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকাএ মানুষের মত, শারমিনেরা অদ্ভুত আচরনের ধারায় সবাইকে হতাশ করে আবার অন্যত্র বাসা বাধে। কিন্তু সানারা সুখী না হলেও কোনো রিস্ক নিতে ইচ্ছুক না। তাই এই সানারা সব সময় থাকে একা। তবে যাইই হোক, অনেক অসুখী মানুষেরা যখন একত্রে যাত্রা করে, তাদের আর অসুখী মানুষের দল হিসাবে ভাবা যায় না। তারা সবাই একটা মানের মধ্যে পরিপুর্ন। যেমন অরুর কথাই বলি-সে প্রথম জীবনে যা পেয়েছে, তার মধ্য জীবনে পেয়েছে গোলাভরা ধান আর মাঠ ভরা ফসলের মতো প্রচুর ধন সম্পদ। দুহাতে বিলিয়েও সেটা শেষ করা যায় নাই। আবার অরু যখন সেই পর্যাপ্ত সুখের জীবনে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলো, তখন তার কাছে সেই জীবনটাই আবার একঘেয়েমিতে ভরে উঠেছিলো। তার অন্তর সন্ধ্যান করতে চেয়েছিলো এমন এক সমতল যেখানে সে নিজেই একজন অপরিচিত মানুষ বা আগন্তক। কেউ তো ছিলো যে তাকে হাতছানী দিয়েছিলো কোনো এক অলৌকিক আনন্দের ভরষায়। অতঃপর সে দল ছেড়েছিলো। এরপর তার কি হয়েছিলো, সেটা আমার এ জীবনে জানা হয়নি।
যখন অরুলতা প্রস্থান করে, প্রকৃতির নিয়মে সেই স্থান দখলে চলে যায় ভীরুলতার কাছে, আর সেটা সানা নাম ধরে বিচরন করে সমাজে। কিন্তু ভীরুলতা সেই অরুলতার মতো এতো এগ্রেসিভ ছিলো না যে, তার স্থান দখল করলেও একই প্রভাব রাখতে পারেনি। এই দুই লতার, ভীরুলতা আর অরুলতার মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ধর্মালয়ের ন্যাচারীক রকম মনে হলেও একজন আরেকজনের প্রায় বিপরীত ছিলো। অথচ দুজনেই চেয়েছিলো অসীম কোন আনন্দের ফোয়ারা। পেয়েছিলো কি?
হয়তো পেয়েছিলো কিন্তু সেটা অন্তত আমার এই জীবনে জানা যায়নি। কিন্তু জানা হয়েছিলো কিছু “হ্যাপি” মানুশের কিংবা জ্যোৎস্না কাননের একচ্ছত্র মালিকের জীবনী থেকে যে, ওরা কোনো রকমে জীবনের সবগুলি অংশ পার হয়ে যেখানে থিতু হয়েছিলো সেটা এক রকমের বেচে থাকার মতো। ফলে ওরাও সুখের হাতছানীতে এমন কিছু বাস্তবিক কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলো এবং গিয়েছিলো যা প্রকাশের বহির্ভুত কিন্তু সেটাও বাস্তব। কোথায় যেনো জীবন শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো পরিস্থিতির কাছে পরাস্ত হয়ই। কেউ আসলে সুখী নয়, টাকাওয়ালা, স্বামীওয়ালা, স্ত্রীওয়ালা, সুন্দুরী, কিংবা রাজ্যের প্রতাপ্সহালী কেউ, কেউ সুখী নয়। আমরা যা দেখি সেটা ভুল। যা দেখি না, সেটাই সত্য কিন্তু রেস্ট্রিক্টেড ইভেন্টস। ভীরুলতাকে অনেক বার হাতছানিতে ডাকলেও সে ছিলো প্রান্তি চাষির মতো। সে কখনোই তার ক্ষেত থেকে বেরিয়ে আইলে উঠতে চায় নাই। কিন্তু ক্ষেতে বসেই আইলে গজানো মিষ্টি কলার সাধটা চেয়েছিল। কিন্তু কলা গাছের একটা বাহ্যিক বৈশিষ্ট ছিলো যে, সে যতোক্ষন না তার সাথে লেপ্টে থাকে, তার মিষ্টি কলার ভাগ সে কাউকে দিতে নারাজ। তাই ভীরুলতা যা পেতে চেয়েছিল-হটাতই সেটা হাতছাড়া হয়ে উঠে।
প্রতিটি মানুষের একটা ইতিহাস আছে। সে পাগল হলেও তার একটা ইতিহাস আছে। কেনো পাগল হল, কিসের কারনে সে পাগল, কিংবা কে তারে পাগল করলো অথবা তার পাগলামীর কি রহস্য অথবা অর্থ সেই সবকিছুর একটা ইতিহাস কোথাও না কোথাও তো আছেই।
একটা ব্যাপার আমার প্রায়ই মনে আসে, আমরা কেমন একটা যুগে বেচে আছি? উত্তর খুব কঠিন না। দূর্ভাগ্যবশত আমরা আসলে এমন একটা যুগে পদার্পন করে বেচে আছি যেখানে জঘন্যতম অপরাধও স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে আর গভীরতম সম্পর্কগুলি হয়ে যাচ্ছে মুল্যহীন। আর এসব চরমপন্থী যুগ আর বৈষম্য মুলক সমাজ ব্যবস্থায় আমরাও মানুষেরা নিজেদের আচরনে স্বাভাবিকতাকে ঝেড়ে ঝুড়ে এমন কিছু ঘটনায় আকড়ে যাচ্ছি যা আসলে অন্যের কাছে ভাগাভাগি করে নেয়া যায় না। অথচ ব্যাপারগুলি ঘটছে। কিছু কিছু ঘটনা থাকে যার কোনো প্রমান থাকে না, কোনো সাক্ষী নাই, কোন প্রত্যক্ষ মানুষের চোখে পড়ে নাই, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। এটা যদি ক্রাইম হয়, তাতেও পারফেক্ট ক্রাইম বলা যাবে না কারন পার্ফেক্ট ক্রাইম বলতে কিছুই নাই। হয়তো ইনভেষ্টিগেশন তাকে ছুতে পারেনি। এর মানে এটা আন্সল্ভড কেস নয়। আর যদি এসব কাহিনি হয়ে থাকে কোন যুগপদ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত চেষতায় তাহলে সেখানে ইনভেষ্টিগেশন খুব একটা পৌঁছায় না। আর এই গোপন ব্যাপারগুলিই মানুষের জীবনে কনো না কোনো সময় রেষ্ট্রিক্টেড ঘটনা হয়ে পড়ে থাকে একেবারেই আন্সল্ভড ফাইলের কেসের মত।
ব্যাপারটা অনেকটা মিসিং কেসের মতো। একজন মিসিং হলোকিন্তু কেউ মিসিং কেস করলোই না। হয়তো কেউ তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। অথবা কেউ জানেই না তাদের কেউ মিসিং হয়েছে। অথবা হয়তো জানে কিন্তু কেউ মিসিং কমপ্লেইন করলোই না। একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষ মাঝে মাঝে জিক্স পাজেলের মতো এদিক সেদিক ক্ষনে ক্ষনে ঘুরে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে, অথবা লোক চক্ষুর আড়ালে। তার আশেপাশের মানুষ এমন কি তার পরিবারের মানুষেরাও জানে না আসলে গল্পটা কি। তারা হয়তো জানেই না এই হারিয়ে যাওয়ার পিছনের গল্পটা কি এবং কোথায় শুরু।
একটা মানুষের ক্রমাগত উর্ধগতির উত্থান তার আশেপাশের সবাইকে প্রায় মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। তখন শহরের বিলবোর্ড, গ্রামের চায়ের দোকান, কিংবা ম্যাগাজিনের কাভার পোষ্টে সে উজ্জ্বল জলজ্যান্ত মহানায়কের মতো বিচরন করে বেড়ায়। চেনা জগতটার মধ্যে হাজার হাজার অচেনা বন্ধুদের ভীরে চেনা জগতটাই যেনো অচেনা হয়ে যায়। মনে হয় তখন দুনিয়ার স্বর্ণদুয়ার খুলে যায়। তার নাম সর্বত্র উচ্চারিত হতে থাকে প্রশংসায় আর ঈর্ষায়।
যখন কনো না কোনো কারনে এই মানুষটার দূর্দিন শুরু হয়, হোক সেটা যে কন কারনেই। হয়তো রোগভোগে, হয়তো কোনো কঠিন দূর্ঘটনায়, কিংবা কোন অকস্মাৎ অকল্পনীয় অঘটনে। তারপর সমস্ত কিছু পালটে যায়। তখন দেহ চুরমার হয়ে যায়, স্বপ্ন ভেংগে যায়, স্পটলাইট সরে যেতে থাকে, ক্যামেরার ক্লিক বন্ধ হতে থাকে, মোবাইলের রিংটোন কমতে থাকে, মনে হয় কেমন যেন নীরবতা। এই নিস্তব্দতা কান ফাটা হাততালির থেকেও যেন ভয়ংকর। কেমন যেন শরীর অবশ হতে থাকে, আয়ু কমতে থাকে, একই অনুপাতে পাশে দাড়ানর মানুষের সংখ্যাটাও কমতে থাকে।
বন্ধুরা সরে পড়ে, পরিচিত কিংবা অপরিচিত মানুষ গুলির আনাগোনা কমে যেতে থাকে, এমন কি পরিচিত মানুষগুলির ফোনও আনরিচেবল হয়ে যায়। একদা পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছবির পোজ নেয়ার জন্য অনুনয় করা মানুষগুলিও হাওয়া হয়ে যায়। যারা একান্ত বাধ্য হয় পাশে থাকতে, তারাও এক সময় বিরক্ত হয়ে উঠে। এই হৃদয় ভাংগা সময়ে, এতোসব মুখোশের ভীরে নীরবে তারপরেও কেউ না কেউ থাকে যারা আমাদের সেই উচ্ছল উজ্জ্বল সময়ে পাশে রাখা হয়নি। তখন সেই আলোকউজ্জল সময়ে আমরা ভুলে যাই-
এ দুনিয়া তোমাকে ততোক্ষনই ভালোবাসবে, যতোক্ষন তোমার সম্ভাবনা আছে কাউকে কিছু না কিছু দেয়ার এবং যে মুহুর্তে আমাদের পতন হবে, আশেপাশের কেওই আর থাকবে না।
সাফল্য দৃশ্যমান, কিন্তু অবহেলা অদৃশ্য। আলোর চারপাশে প্রচুর পোকামাকড় থাকে বটে, আলোটা নিভে যাওয়া মাত্রই ওগুলি অন্য আলোর সন্ধানে চলে যায়। তবুও সেই অন্ধকারের সময়ে কেউ না কেউ হয়তো থাকে। হোক সেটা কারো মা, বাবা বা খুব ভালো বন্ধু। সেই অন্ধকার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় –কে মুখোশ, কে মুখ, আর কে মায়াভরা মুখ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিছু গল্প আমাদেরকে ভেঙ্গেচূড়ে দেয়, কিছু গল্প আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, আর কিছু গল্প আমাদেরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যাকে আমরা বলি ঈশ্বর।
আমার জীবনের গল্পে সবগুলিই আছে। কিন্তু সবগুলি দৃশ্যমান নয়।
বিশ্বাস একটা আয়না, এটা ভাংলে আর জোড়া লাগে না। আর যিনি ভাংলেন আসলে তিনিই তার প্রতিচ্ছবি হারান। মানুষের বিশ্বাস হারানো মানে শুধু একটা সম্পর্ক হারানো নয়, এটা আত্তার একটা অংশ মরে যাওয়া। বিসশাসঘাতকেরা কখনোই বুঝতে পারে না-তারা যে বিশ্বাস নষ্ট করে সেটা আব্র তাদের জীবনেই বিষের মতো ফিরে আসে।
ভালোবাসা দিয়ে শুরু সম্পর্ক যখন মিথ্যায় ভরে যায়, তখন প্রতিটি নিঃশ্বাসই যন্ত্রনার গল্প বলে। বিশ্বাস ঘাতকের নিঃশ্বাস সবচেয়ে ভয়ংকর। কারন সে মিষ্টি কথা বলে, অথচ সে পিছনে বিষ ছড়ায়। বিশ্বাস ভাঙ্গার শব্দ কেউ শুনতে পায় না, কিন্তু সেই নীরবতার প্রতিদ্ধনী সারা জীবন কানে বাজে। যখন কেউ তোমার বিশ্বাস ভাংকে সে আসলে তোমাকে নয়, সে তার মর্যাদাকেই হত্যা করে।
প্রতি বছরই এই দিনটায় দাওয়াত পাই। এবার দাওয়াত পেলাম প্রধান উপদেষ্টা থেকে। যখন সেনাবাহিনীতে ছিলাম, পারতপক্ষে এই দিনটায় যাতে যেতে না হয় তাই ফাকী দিতাম বিভিন্ন অজুহাতে। ওটার একটা কারনও ছিলো। এসডি পড়ে যেতে হতো, মানে সিরিমুনিয়াল ড্রেস। খুব ভেজাল মনে হতো আমার কাছে। কিন্তু অবসর নেয়ার পর (যদি কোনো জরুরী ইভেন্টের কারনে যেতে না পারি সেটা ভিন্ন কথা, তা না হলে) যাওয়ার চেষ্টা করি এই কারনে যে, অনেক সিনিয়ার জুনিয়ার এবং গনমান্য ব্যক্তিদের সাথে দেখা হয়। ব্যাংকে গেলে, সিএমএইচ এ গেলে কিংবা সিএসডি তে গেলে ফাকফোকর দিয়ে সিনিয়ার জুনিয়ারদের সাথে যেমন দেখা হয়, তেমনি ২১ নভে,বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে মুটামুটি প্রায় সবার সাথেই একসাথে দেখা হয়। এই কারনেই আমি এখন এই দিনের দাওয়াতে মিস করতে চাই না।
এবারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে অনেক সিনিয়ারদের কিছু পরিচিত মুখ অনেকদিন পরে আবারো দেখা হলো। মেজর হাফিজ (বিএনপি) স্যারের সাথে প্রায় দেড় যুগ পর দেখা, হাফিজ স্যারের সাথে ছবি তোলার পরই বিএনপির আরেক পরিচিত মুখ মির্জা আব্বাস ভাই কাছেই ছিলেন, সাথে সাথে বললেন, ছবি তুলবা? স্মৃতিটা থাকলো। উনার সাথেও এই রকমই প্রায় দেড় যুগ পর দেখা হলো।
আমাদের বর্তমান উপদেষ্টা ফওজুল স্যারের সাথে আমার কখনো আগে দেখা হয়নি। আমি উনাকে খুব পছন্দ করি সৎ মানুষের কাতার থেকে। আমি নিজে গিয়েই ওনার সাথে ছবিটা রাখলাম আমার স্মৃতিতে।
এরপরে প্রচুর সিনিয়ারদের সাথে দেখা হলো। জেনারেল আনোয়ার স্যার (আমরা একই ইউনিটে চাকুরী করেছি কিন্তু আমি যখন জিএসও-২ (অপ্স), উনি তখন আবারো আমার সেই একই ইউনিটের সিও ছিলেন)। খুবই প্রফেশনাল একজন অফিসার। বিপদজনক সময়ে হিলট্র্যাক্সে একসাথে কাজ করেছি আমার আরেক সিও শেখ নুরুল আমিন স্যারের সাথে। ভাবীর সাথেও দেখা হল প্রায় ৩৩ বছর পর।
কোর্সমেট, জুনিয়র এবং আরো অনেক প্রিয় অফিসারদের মিলনমেলা যেন এই ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তিন বাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার (সেনাপ্রধান), এডমিরাল নাজমুল (নেভাল চীফ), এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ (এয়ার চীফ) হচ্ছে আমার ব্যাচমেট। এদের সাথেও আজকে আবার এক ঝলক দেখা হলো।
সময়টা খুব ভালো কাটলো।
কোথায় যেনো শুনেছিলাম যে, আমরা আত্মীয়তার জেরে দাদা, নানা, খালা ফুফু ভাই বোন পাই, কিন্তু সেটা আমরা তৈরী করি না, এই সম্পর্কের তৈরী ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ক্রেডিট নাই। আমরা এগুলি বংশ পরম্পরায় পাই। কিন্তু আমাদের জীবনে আসা বন্ধুদের আমরা নিজেরা তৈরী করি। একজন ভালো বন্ধু চকচকে আয়নার মতো, কখনো তারা নিজের গোপন সহচর, মনের খোরাকের মত। সুখে দুখে এই বন্ধুরা জীবনের সবচেয়ে বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে।
ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের মধ্যে বন্ধুত্বটা একটা অন্য রকমের ধাচে তৈরী হয় যেখানে ওরা জীবনের সবচেয়ে কাচা সময়টায় ২৪ ঘন্টাই একসাথে থাকে, খায়, খেলে, ঘুমায়, হাসে, কাদে। পরিবারের চেয়েও বেশী কাছে থাকে ওরা। ওদের বন্ধুত্বটা পারিবারিক শক্ত বন্ডের থেকে বেশী। শুধু এখানেই শেষ নয়, এক ক্যাডেট কলেজের সাথে আরেক ক্যাডেট কলেজের ব্যাচমেট বন্ধুরাও আজীবন না দেখে, না চিনে, নাম না জেনেও যেনো জন্ম জন্মান্তরের বন্ধু হয়েই থাকে। অদ্ভুত এই সর্গীয় বন্ধন। আমরা এই বন্ধুত্বকে আজীবন লালন করি।
আমাদেরই ব্যাচের আমাদের বন্ধু শাহরিয়ার গত ২/৩ দিন আগে সেই সূদুর কানাডা থেকে বাংলাদেশে এসেছে। মাত্র সপ্তাহ খানেক থাকবে ওর আব্বার সাথে। আমাকে ফোন করার পর আমি শাহরিয়ারকে ফোনেই বললাম, অনেকদিন ক্যাডেট বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না। তোমার এই আগমন উছিলায় চলো আমি একটা একটা আড্ডার ব্যবস্থা করি যেখানে সবার সাথে দেখা হবে, কথা হবে, আবার হারিয়ে যেতে পারবো আজ থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগের শৈশবের সেই অনুভুতিতে। শাহরিয়ার রাজী হলো।
আমার আরেক প্রিয় বন্ধু মাহমুদকে (বর্তমানে বিটিআরসি এর একজন উর্ধতন কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করছে) ব্যাপারটা বললাম যে, আমি স্পন্সর/হোষ্ট করবো, তুমি বাকী এরেঞ্জমেন্টটা করে দাও শেরাটনকে কেন্দ্র করে। সবাইকে দাওয়াত করো, হোটেল বুক করো। মাহমুদ এ ব্যাপারে আমাদের ব্যাচের মধ্যে সর্বদা একটা সচীবের দায়িত্ব পালন করে। মাশআল্লাহ, আমার ১৭ জন ক্যাডেট বন্ধু গল্পের ভান্ডার আর একরাশ মিষ্টি ভালোবাসার হাসি নিয়ে রাত ৮ টায় হাজির।
ভীষন মিষ্টি এবং চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটলো আমাদের সবার। রাশেদের অন্যত্র আরো দুইটা মিটিং ছিলো, তারপরেও সেগুলি একদিকে শিফট করে আড্ডায় হাজির হলো। বন্ধুদের আড্ডা মানে জীবনীশক্তি বেড়ে যাওয়া, শরীর আবার চঞ্চলতায় ভরে উঠা। দ্রুত সময়তা যেনো হাওয়া হয়ে গেলো গল্পে গল্পে। যারা আসতে পারেনি, তাদের অনেক মিস করেছি।
ধন্যবাদ আমার প্রিয় বন্ধুদের। সবাইকে অনেক ভালোবাসি। ধন্যবাদ শাহরিয়ারকে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে অর্থাৎ নভেম্বর ২০২৪ এ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের জন্য বি এম এ তে হল অফ ফেম অনুষ্ঠান হয়েছিলো। কিন্তু আমি হার্টের সমস্যার কারনে, মিটুল এবং কনিকা গিয়েছিলো, আমি যেতে পারিনি। এবার অর্থাৎ আজ ৩০ অক্টোবর ২০২৫ এ সেই একই প্রোগ্রামটা হলো নেভীর এবং এয়ার ফোর্সের প্রধান যথাক্রমে নাজমুল এবং হাসানের জন্য অনুষ্ঠানটা হলো। এবার অনুষ্ঠানে যেতে কোনো সমস্যা হয় নি।
যেহেতু তিন বাহিনীর অর্থাৎ আর্মির চীফ, নেভাল চীফ এবং এয়ার ফোর্সের চীফ, তিনজনেই আমার কোর্ষ্মেট, ফলে একদিকে যেমন এটা গর্বের বিষয়, অন্যদিকে এই অনুষ্ঠাটিতে তিন বাহিনীর চীফই তাদের পছন্দমতো কোর্ষ্মেটদেরকে সিলেক্ট করে কারা কারা এই অনুষ্ঠানে জয়েন করবে, সেদিক থেকে কোন ভাবেই ওরা আমাকে আউট অফ সিলেবাসে রাখে না এতেও নিজের কাছে ভালো লাগে। এই সিলেবাসে রাখা আর না রাখা নিয়ে অনেক মনোমালিন্য, অনেক গোস্যা কিংবা অনেক বিতর্ক আছে, সেদিকে আর যাচ্ছি না।
গত কয়েকদিন আগে ক্যাপ্টেন রাশের নামে এক আর্মি অফিসার আমার ফোনে ফোন করে জানালো যে, আগামি ৩০ অক্টোবর দুই চীফের হল অফ ফেম অনূষ্ঠান হবে, আমি পরিবার সহ যাবো কিনা। আমার যেতে কোন অসুবিধা ছিলো না বিধায় সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে মিটুলের নাম্বারটা দিয়ে দিলাম, যেনো যাবতীয় বাকী ফর্মালিটিজ গুলি ওর সাথেই করে। ক্যাপ্টেন রাশেদের কাজ ছিলো শুধু ইনভাইটেশন কার্ড গুলি বিতরন করা। অতঃপর আমাদের ২ জনের জন্য কন্ডাক্টিং অফিসার হিসাবে নিয়োজিত ছিলো ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। অত্যান্য অমায়িক ছেলে এবং দায়িত্তশীল অফিসার।
ওরাই এয়ার টিকেট পাঠিয়েছিলো, বাংলাদেশ বিমান। আমরা মাস্কাট গামি বাংলাদেশ বিমানে উঠেছিলাম সকাল সাড়ে আটটায়, চট্টগ্রাম হযরত শা আমানত বিমান বন্দর থেকে আমরা সরাসরি ভেন্যু পৌঁছে গিয়েছিলাম সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে। ১১ টায় প্রোগ্রাম শুরু হয়েছিলো। আর্মির চীফ ওয়াকার, নেভাল চীফ নাজমুল, এবং এয়ারফর্সের চীফ হাসান সঠিক সময়েই এসে উপস্থিত হলো, আমার কোর্সের ৩ বন্ধু, তাদের জন্য আমাদের এই ন্যাশনাল অনুষ্ঠান সেই জায়গাতে যেখানে আমরা ২ বছর একসাথে অত্যান্ত কঠিন ট্রেনিং লাইফ কাটিয়েছি। ভাবতেই ব্যাপারটায় অনেক নস্টালজিক মনে হচ্ছিলো।
একসাথে লান করলাম, ভালো লাগলো।
আমার এই পর্বে যেতা আমি আসলে লিখতে চেয়েছি সেটা হল-বিএমএ এর ট্রেনিং। আমরা যখন ট্রেনিং করেছি, তখনকার বি এম এ এর সেট আপ আর প্রায় ৪১ বছর পরের বি এম এ এর সেট আপের মধ্যে তুমুল তফাত। আমাদের সময়কার যেখানে যেখানে জি সি অফিস, বারবার শপ, কোম্পানী বিল্ডিং গুলি, ড্রিল গ্রাউন্ড, রগড়া প্যারেডের গ্রাউন্ড ছিলো সেগুলিও প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে কোনোটা অন্যত্র শিফট হয়ে গেছে, আবার কোনোতা ছোট হয়ে গেছে, আবার কোনোটা এতো বিশাল হয়ে গেছে যা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। অফিস গুলি খুবই অত্যাধুনিক্তায় ভরপুর, প্রচুর নতুন নতুন ভবন হয়েছে যেগুলি আসলেই দরকার ছিলো কিন্তু সেই প্রায় অর্দ শতাধিক আগে এগুলি বানানো কিংবা বাজেটে হয়তো কুলায় নি বলে বানানই হয় নাই। কিন্তু এখন ১০০ অফিসার মেস, সুইমিং পুল, ক্যাডেট ডমিটরীর পাশাপাশি আরো অনেক কারিকুলাম করা যায় এমন বিল্ডিং, কনভেনশন হল, মিটিং রুম, ক্যাফেটেরিয়া, ইনডোর খেলাধুলা করার প্রভিশন, জীম, আরো কত কিছু যে নতুন যোগ হয়েছে, বি এম এ এর সব জায়গা ঘুরলেই মনটা ভাল হয়ে যায়।
বি এম এ এর যে রাস্তাটা আজ থেকে ৪১ বছর আগে শুধু মাটির রাস্তা ছিলো, সেটা এখন বিশাল হাই ওয়ে হয়ে গেছে, সেখানে সানসেট পয়েন্ট, গলফ গ্রাউন্ড, আরো কতই না সুন্দর সুন্দর স্থাপনা তৈরী হয়েছে। বেশ ভালো লাগলো ব্যাপারটা।
আমাদের টার্ম কমান্দার ৯ডুজনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফিজ এবং ব্রিগেডিয়ার তালেব স্যার) এবাব্রের অনুষ্ঠানে আমাদের সাথে বন্ধুর মতো ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তালেব স্যার বেসিক্যালী আমাদের কোর্সের সাথে একেবারে প্তোপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন। সবার সব অনুষ্ঠানে তিনি আসেন।
মানুষ বড্ড অদ্ভুত প্রানী। অন্যান্য প্রানীদের মতো সে জন্ম নিয়েই দৌড়াতে বা সরাসরি হাটতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশের জন্য সাথে সাথে ভাষা জানে না, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ভয় কিংবা ভীতি কিংবা মনুষ্য রচিত কোনো আনন্দের ফোয়ারা তৈরী হলেও মানুষের অনুভুতিতে তার কোনোতাই জন্মের সাথে সাথে হয়ে উঠে না। মানুষ বড় হয়, হাটতে শিখে, কথা বলতে শিখে, অনুভুতির স্রিষ্টি হয়, এবং এ রকম আরো হাজারো ছোট বড় অভ্যাস গড়ে উঠে। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস হচ্ছে-কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস, এইটা সব অভ্যাসের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস। আর এই অভ্যাসটা হটাত করে দু একদিনের মধ্যে হয়ে উঠে না। নিয়ম করে, হাতে সময় নিয়ে রোজ একটু একটু করে কথা হয়। আর এই কথা হতে হতে আস্তে আস্তে একটা মায়ার জন্ম নেয়। এই মায়া জন্মাতে জন্মাতে এক সময় এটা নেশায় পরিনত হয়, আর ঠিক তখনই তা কেবল অভ্যাসে পরিনত হয়। এই যে কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস আমাদের অজান্তেই স্রিষ্টি হয়ে গেলো, তখন আমাদের ভালো থাকার সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রন আমরা হারিয়ে ফেলি তখন। একদিন কোথাও অন্যত্র কেউ চলে গেলে, শরীর কাহ্রাপ হতে থাকে, খাবারের রুচীতে ঘাটতি দেখা দেয়, অন্য কারো সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না, ভালো ঘুম হয় না, সময়টা যেনো থেমে থাকে। কথা হওয়ার মুহুর্তে হটাত কথা না হওয়া চরম ডিপ্রেশনে ফেলে দেয়। তখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কোনো কিছুই আর ভালো লাগতে চায় না, হটাত করে মন খারাপ হয়, একাকী পায়চারী করতে মন চায়। মনে হয়-কি যেনো ঠিক নাই। একা হয়ে যায় মানুষ।
তারমানে এই নয় যে, কথা বলা খারাপ অভ্যাস। কারো সাথে কারো কথা বলতে কখনো কখনো ভাল লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সেটা যদি নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিনত হয় এমনভাবে যে, হটাত কোনো কারনে কথা না বললে মন শরীর চিন্তা ভাবনা সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে, তাহলে কষ্মিঙ্কালেও আমাদের ভালো থাকা হয়ে উঠবে না।
কথায় মায়া বাড়ে, আর মায়ায় লেপ্টে থাকে যন্ত্রনা, একাকীত্ব, বিষাদ। যদি কখনো মনে হয়, এক তরফাভাবে আপনি ডুবে যাচ্ছে, তবে এখনই নিজে সংবরন করুন, থামান। নিজেকে ততটুকি নিয়ন্ত্রের মধ্যে রাখুন যতটুকু নিয়ন্ত্রন রাখলে হুট করে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলেও অন্তত নিজেকে নিঃস্ব মনে হবে না।
শরৎচন্দ্র বাবুর একটা উপন্যাসে তিনি লিখেছিলেন-“তাহাকে ধরিয়া রাখিতে চাহিলে হয়তো ধরিয়া রাখিতে পারিতাম। কিন্তু সেই চেষ্টা করিলাম না। সেও আর ফিরিয়া আসিলো না। আমারো যতক্ষন না ঘুম আসিলো, শুধু এ কথাই ভাবিতে লাগিলাম। জোর করিয়া রাখিয়া লাভ হইতো কি? আমার পক্ষ হইতে তো কোনোদিন জোরই ছিলো না। সমস্ত জোরই আসিয়াছিলো তাহার দিক হইতে। আজ সেইই যদি আমাকে বাধন থেকে মুক্তি দিয়া আপনাকে মুক্তি দিতে চায়, তাহা হইলে আমি ঠেকাইব কি করিয়া?”
কি অদ্ভুত হৃদয় ছেড়া অনুভুতি!! এই যে ছেড়ে দেয়া আর ছেড়ে যাওয়া-এর মধ্যে অনেক তফাত আছে, অনেক অনেক বিস্তর পার্থক্য আছে। ছেড়ে যাওয়া মানে-আমি তোমাকে আর চাই না। এক সময় কি ছিলাম, আর কি ছিলে, এসব কিছু মেপে, বুঝে শুনে অতএব সিদ্ধান্ত আসে-আমি ছেরে দিচ্ছি। এটা এক ধরনের প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশন। এর মানে তোমার আর আমার প্রয়োজন নাই। তোমার সব প্রয়োজন আমার কাছে ফুরিয়ে গেছে।
আর ছেড়ে দেয়া মানে আমি তোমাকে খুব করে পেতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমাকে আমি পাইলাম না। হাত বাড়ালেই যাকে পাও, সে হয়তো তোমার ভালোলাগা। আর খুব করে চেয়েও যাকে তুমি পাও না, তবুও তুমি যাকে চাও, বা মনে রাখো, হয়তো সেটাই ভালবাসা। ভালোবাসা মানেই সব সময় মানুষটাকে পাওয়া নয়। কখনো কখনো না পাওয়া, ছাড় দেয়া কিংবা অপেক্ষা করাও ভালোবাসা। হয়তো মানুষটাকে তুমি কখনোই পাবে না। অনেক আরাধনা করেও তুমি পাইলে না। হয়তো আরেকজন কোনো আরাধনা না করেই তাকে সে নিজের করে পেয়ে গেলো। তোমার তখন বড্ড কষ্ট হতে পারে, দুঃখ হতে পারে আর মনের মধ্যে বারবার নাম না জানা লেখকের সেই কথাগুলিই ঘুরে ফিরে আছড়ে পড়তে পারে যে, ………শেষ পর্যন্ত তোমারে যে পাইলো, তার লাইগা আমার আফসোসই লাগে। কারন সে জানলো না তোমারে হারাইলে কেমন লাগে। কেমন লাগে তুমি ছাড়া রাইত জাগনের যন্ত্রনা। সে জানলো না, ভাত খাইতে বইসা তোমার প্রিয় তরকারী দেখার পর গলা দিয়া ভাত না নামার বেদনা।
নাহ সে এটাও জানলো না, তোমাকে আরেকবার দেখতে চাওয়ার আকুতি কেমন হয়। সে জানলো না, তোমার সাথে স্মৃতিগুলি জড়াইয়া বাচার কষ্ট। সে জানলো না, তোমারে পাইয়া হারানোর পর দুনিয়া কেমনে ফাকা হইয়া যায়। সে জানলো না, তোমার স্পর্শ ফিরা পাওয়ার লাইগা পরান কেমন ছটফট করে। সে তোমারে পাইলো, কিন্তু তোমারে হারানোর ব্যথা পাইলো না। সে বিরহ চিনলো না, সে প্রেমের দুঃখ কেমন তা বুজলো না। সে জানলো না, একটা ছারখার হওয়া জীবন টানতে কেমন লাগে। সে সুখ ঠিকই পাইলো, কিন্তু তোমারে হারাইয়া শক্ত হইলো না। এই যে তোমারে হারাইয়া ফেলার পর কোনো কষ্টই আর আমার গায়ে লাগে না। সে তোমারে পাইয়া আমার মতন পাথর হইতে পারলো না।
অবশেষে যে তোমারে সারা জীবনের জন্য পাইলো, সে যেনো তোমারে আগলে রাখে অনেক যতনে। আমি ভাঙাচোরা মানুষ, তোমারে ছোয়ার সাধ্য আমার কখনোই ছিলো না। তবু সপ্ন দেইখা গেছিলাম তোমারে পাওয়ার জন্য। আমি হতভাগা এতই কমদামি সপ্ন কেনার দামদরেতে তোমারে হারাইয়া ফেলেছি। যে তোমারে জিতে নিলো, সে যেনো তোমারে ভালবাসার কমতি বুঝতে না দেয়। আমি চাই না ভালোবাসার কমতি পড়লে তুমি আমারে মনে করো। তুমি যখনই আমারে মনে করবা, তোমার দুঃখ হইবো আমার জন্যে। আমি চাই তুমি সুখী থাকো আজীবন। দুঃখ তোমারে মানায় না। যার কাছেই থাকো, ভালো থাইকো। কারন তুমি ভালো না থাকলে আমার এত বিসর্জন, আমার এত দীর্ঘশাস সব বিফলে যাইবো।
Lawful Command and Unlawful Command এর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য একটা পরিষ্কার সাংবিধানিক এবং বিচারিক ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কারন:
(১) পরাজিত শক্তির কাছে যেটা আন ল ফুল, বিজয়ী শক্তির কাছে হয়ত সেটাই ল ফুল কমান্ড। অথবা পরাজিত শক্তির কাছে যেটা ল ফুল কমান্ড, বিজয়ী শক্তির কাছে সেটা হয়ত আন ল ফুল কমান্ড বলে মনে হয়ে পারে।
(২) ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের ৭১ এর মত। ৭১ ছিলো আমাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তানের কাছে আমাদের মুক্তিবাহিনী ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠী। মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছিল ল ফুল কিন্ত পাকিস্তানের পক্ষে এটা ছিল আন ল ফুল।
(৩) এক দেশের একজন দেশপ্রেমিক অন্য আরেকটি দেশের জন্য সে স্পাই হিসাবে গন্য হয়। দেশপ্রেমিক একটা ল ফুল ব্যাপার। কিন্তু স্পাই? অবশ্যই ল ফুল নয়।
(৪) সামরিক বাহিনীতে এমবিএমএল এ যাইই লেখা থাকুক না কেনো, জুনিয়ার লেবেল অফিসারদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ল ফুল আর আন ল ফুল কমান্ড খাটে না। যদি খাটতো তাহলে, সামরিক বাহিনীতে ডিসিপ্লিন রাখা যেত না। প্রত্যেকটা ক্রিটিক্যাল অপারেশনে অফিসার, নন কমিশন্ড অফিসাররা একের পর এক কোনটা ল ফুল আর কোনটা আন ল ফুল কমান্ড এগুলি করতে করতেই অপারেশন ফেইল করতো। তবে সিনিয়ারদের বেলায় যারা কমান্ড লেবেলে থাকে, তাদের এটায় আর্গুমেন্ট করার অপশন থাকে।
(৫) গত ১৭ বছরে এবং তার আগে, এবং তারও আগের রিজিম গুলিতে এদেশে সামরিক এবং বেসামরিক স্তরে অসংখ্য আন ল ফুল কমান্ড জারী হয়েছে, আন ল ফুল কর্ম করতে দেখা গেছে সরকারি পৃষ্টপোষকতায়, কতজন মানুষ সে সবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো? এটাও একটা বড় প্রশ্ন। যদি সোচ্চার হত, তাহলে তার জীবন শেষ। আর যদি সোচ্চার না হয়, বলা হবে আন ল ফুল কমান্ডের দোসর। যাবেন কই? আর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তো আরো অসহায়। তারা কমান্ড মানতে বাধ্য।
আমি যখন এই স্কুলে পড়তাম, তখন সালটা ছিল ১৯৭৬। টিনের স্কুল, চারিদিকে মুলির বেড়া, আর এই মুলির বেড়ার বেশিরভাগ ছিল নীচ দিয়ে ভাঙ্গা। মুরগী, কুকুর, বিড়াল এমন কি চোরেরাও মুলির বেড়ার নীচ দিয়ে স্কুলের ক্লাশের ভিতরে ঢোকে যেতো। পরদিন আমরা যখন ক্লাশে আসতাম, এসে মুরগী ইয়াড়াইতাম, কুকুরকে তাড়াইতাম, বেঞ্চ আর চেয়ার গুলি ধুলোয় এমন হয়ে থাকতো যে, এগুলিকে মুছে পরিষ্কার করতেই সময় লাগত আধা ঘন্টা। ক্লাস রুমের দরজাগুলি এমন ছিল যে, কেউ জোরে ধাক্কা দিলেই খুলে যেতো, তালা লাগাওনর কনো ব্যবস্থাই ছিলো না। বৃষ্টির দিনে মাঠে বৃষ্টির পানি পরার আগে যেন ক্লাশ রুমে পড়তো আগে। এতোই ফুটাফাটা ছিলো টিনের চালগুলি। ছাত্ররা বা ছাত্রীরা আসতো তাদের নিজের উদ্যোগে, স্যারেরা আমাদের পরাতেন ঠিকই কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা আমাদের নিচের ক্লাসের ছাত্রদেরকে ক্লাস নিতাম। কারন সব ক্লাসে টিচার ছিলো না। আমি তো রেগুলার ক্লাস নিতাম। একটু একতু গর্বও হত যে, আমি না ছাত্র আবার না টিচার অথচ আমি কিন্তু ছাত্র।
এই স্কুলটা তখন ক্লাশ এইট বা অষ্টম পর্যন্তই ছিল অর্থাৎ হাইস্কুল। খুব যে ভাল স্কুল ছিলো সেটাও নয় কিন্তু এই এলাকায় এটাই ছিলো একমাত্র হাইস্কুল। আলাউদ্দিন ভাই আসতেন, আমাদেরকে খুব আদর করতেন। অসম্ভব অমায়িক মানুষ ছিলেন তিনি। এই স্কুল থেকেই আমরা ২ জন (আমি এবং ডাঃ শফিক ভাই, আলুকান্দার) ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম। এর পরে আরো অনেক মেধাবি ছাত্ররা দেশের বিভিন্ন সেক্তরে খুব ভাল ভাল জায়গায় কাজ করছেন এবং করেছেন। স্কুলটা ছিল তখন এলাকার প্রানকেন্দ্র। প্রায়ই বিকালে ফুটবলের প্রতিযোগীতা হত, গ্রামবাসিরা মাঠের চারিদিকে বসে যেনো ওয়ার্ল্ডকাপ খেলা হচ্ছে এমন একটা পরিবেশ হতো, মাঝে মাঝেই নাটক বা কালচারাল অনুষ্ঠান হত। ছেলেরাই মেয়ে সেজে নায়িকা হতো। কি যে একটা রমরমা সময় ছিল।
আজ এতো বছর প্পতে স্কুলটার চেহাড়া দেখলে মনে হয় কি সুন্দর। এতো বড় মাঠ, চার তলা করে অনেক গুলি বিল্ডিং। অনেক ছাত্র আর টিচার গন। রম রম করে পরিবেশ কিন্তু সবচেয়ে দুঃখ আর কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে-এই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে পাশের হার মাত্র ১০%। তাও আবার খুব লো গ্রেদিং দিয়ে পাশ। এটা কনো কথা?
মাষ্টারদের কাছে কেউ কৈফিয়ত চায় না গার্জিয়ানরা, গার্জিয়ানরা কেউ সপ্ন দেখে না তাদের সন্তানদের নিয়ে, কনো ছাত্র জানে না তার ভবিষ্যত কি। সে কি হতে চায়। কেউ তাদের মাথায় সপ্ন বুনন করে না। অথচ সব উপাদান আছে এই স্কুল এন্ড কলেজে। যারাই এই স্কুল এন্ড কলেজের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন, তারাই এতাকে নিয়ে হয় রাজনিতি করেছেন, অথবা এর থেকে ফায়দা লুটেছেন অথবা লাভ করেছেন। কেউ ছাত্রদের ভাল হক, ছাত্ররা নামকরা কেউ হক, এ অঞ্চলতাকে ছাত্ররা সমৃদ্ধ করুক কেউ চেষ্ঠা করেনি। চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা প্রশাসক এমন কি এম পি ও এর পিছনে কখনো কনো সময় দিয়ে এটাকে কিভাবে ভাল একতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা যায় তার জন্য চেষ্টা করেনি।
এখনো এখানকার যুবকেরা জানে না যে, অতি শীগ্রই ওরা এমন কিছু মানুষের অধীনে চলে যাবে যারা বেই এলাকার কেউ নন। …।।
কেউ কি তোমাকে ভালবেসেছিলো? কতটুকু কতক্ষন কি পরিমান কিভাবে কেনো ভালবেসেছিল সেটা কি কখনো অনুধাবন করে বিশ্লেষন করেছো? ভালোবাসাটা একটা চরম আবেগী জিনিষ, যে ভালবাসায় মজেছে, তার কাছে আর অন্য কোন কিছুই জরুরী নয়। আর যার ভালবাসায় সে মজেছে, সেটা যেমনই হোক, কারো সাথে কিংবা কোনো কিছুর সাথেই তার তুলনা করা যায় না। কালো, ধলা, ল্যাংড়া, কিংবা বিদেশি, বা অন্য কোন প্রানী সবার বেলাতেই ব্যাপারটা এমনই ঘটে। কিন্তু মজার ব্যাপার কিংবা কষ্টের ব্যাপার হল, এক সময় এই ভালোবাসায়অ ঘুন ধরে, যে কোনো কারনেই এর মিষ্টতা বা আবেগী মনটা স্তিমিত হয়ে আসতে পারে। তখন একটা নতুন জিনিষ শুরু হয়। আর তার নাম অবহেলা।
কাউকে অবহেলা করার সবচেয়ে উত্তম কৌশল হচ্ছে-ব্যস্ততা দেখানো। বাহ্যিকভাবে কেউ কতটা ব্যস্ত সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু কারো সাথে সম্পর্কের মধ্যে ঢীলা দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে-বহুবিধ কাজের বাহানায় ব্যস্ততা জড়িয়ে দেয়া। কিন্তু একটা সম্পর্কে ব্যস্ততার শব্দটার কোনো স্থান নাই আসলে। সত্যিকারের প্রিয় মানুষটার শত সহস্র ব্যস্ততার মাঝেও খোজ খবর নেয়া সম্ভব এবং নেয়ও। শুধু খোজ খবরই না, সে তোমাকে সময় দেবে। কি করছো, কখন কোথায় কি ভাবে তোমার সিডিউল যাচ্ছে, দুপুরে, সকালে, কিংবা খাওয়ার সময়ে তুমি খেয়েছো কিনা সব সময় না হলেও মাঝে মাঝেই সে খবরটা নিবে।
কেউ যদি বলে- কথা বলার সময় পাইনি, হতেই পারে। কিন্তু ‘আমি একটু ব্যস্ত আছি, সময় পেলে পরে কথা বলব। তুমি অন্যান্য কাজ সেরে ফেল’ কিংবা একটা ম্যাসেজ কিংবা পাচ সেকেন্ডের একটা ছোট কলও হতে পারে অনেক ব্যস্ততার মাঝে একটা যোগাযোগ। আর এই ছোট ম্যাসেজটা লিখতে রাস্তার ধারে বসে, একটা সিগারেট খাওয়ার সময়েও এই ছোট ম্যাসেজটা করা যায়। যখন এগুলির কোনোটাই হয়ে উঠে না, অথচ যদি কেউ বলেই থাকে যে, কথা বলার সুযোগ হয়নি, বা সময় পাইনি, তাহলে বুঝে নিও সে ঠিকই সময় পেয়েছিলো কিন্তু সে তোমার জন্য সময় নষ্ট করতে চায়নি, সে তোমাকে এভয়েড করেছে। তোমার মুল্য তার কাছে অনেক কমে গেছে। মানুষ কেবল সেটার জন্যই তার মুল্যবান সময় নষ্ট করে যেটা তার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট। তুমি হয়তো ইম্পর্টেন্সি হারিয়ে ফেলেছো। ভালোবাসাটা অনেক দূর চলে গেছে। একদিন সে আরো দূরে চলে যাবেই এবং কনো এক সময় সে তোমার কাছ থেকে হারিয়ে যাবেই। তুমি এই পরিস্থিতিটা বুঝো বা না বুঝো, যদি এটা এক তরফা আকড়ে থাকো, তাহলে আজিবন তুমি কষ্ট পাবে।
ব্যস্ততা কখনই ভালোবাসাকে থামাতে পারেনা। যে সত্যিই তোমাকে ভালবাসে, সে শত ব্যস্ততার মধ্যেও একবার হলেও মনে করবে। আর যদি সেই ভালোবাসাতা হয়ে থাকে নিছক কিছুর বিনিময়ে বা অন্য কোনো কারনে, সেখানে কখনোই ভালোবাসা ছিল না। ওটা ছিল অবহেলার ভালোবাসা।
সত্যিকারের ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যেটা না বলা কথাও অন্তরে যেনো পরিষ্কার অনর্গল কথা বলে যায়, ভালোবাসার মানুষটাকে কিভাবে ভালো রাখা যায়, কিভাবে তার মনকে প্রশান্ত করা যায়, তার ইচ্ছাগুলি, আবদার গুলি, আখাংকা গুলি নিজের সামর্থের মধ্যে লালন করা যায়। ভালোবাসায় ভাষার দরকার পড়ে না। এটা অনুভবের ব্যাপার। মন থেকে ভালোবাসলে মানুষটা ছাড়া একদমই থাকা যায় না। আর যারা দিনের পর দিন মানুষটা ছাড়া অনায়াসে থাকতে পারে, তারা কখনো ভালোবাসে না। I
ভালোবাসার মানুষকে মানুষ সব সময় মনে রাখে, মনে করে। এমন কি মৃত্যুর সময়ে বা আগে যে মানুষতারে মানুষ সবার অগোচরেই স্মরণ করতে চায় সেটা তার ভালোবাসার মানুষ। গভীর ঘুম থেকে ঘুম ভাঙ্গার পর যার কথা মনে পড়ে সেতা তার ভালবাসার মানুষ। এই ভালোবাসার মানুষটার কারনে সুখকে সুখী মনে হয়, তার কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে হয়। ভালোবাসার মানুষের শরীরের ঘামের গন্ধও মিষ্টি মনে হয়।
আমি যে কোনো অনুষ্ঠানে সাধারনত অনেক কারনেই যেতে ইচ্ছুক হই না। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে-অনুষ্ঠানের রিচ খাবার আমাকে আকর্ষন করে না এবং আমি সাধারনত সেই রিচ ফুডগুলি এভয়েড করি। কিন্তু যদি কোথাও যেতে চাই, আমি আগে থেকেই আমার খাবারের মেন্যুটা একটু সম্মানের সহিত তাদের জানিয়ে দেই যে, আমার জন্য একেবারে প্লেইন রাইস, ডাল এবং কিছু শব্জি হলে ভাল হয়। এখন অবশ্য প্রায় অনেকেই জানেন আমার খাবারের সাধারন মেন্যুটা, ফলে আর বলতে হয় না। কিন্তু আমার কিছু কিছু খুব কাছের মানুষ আছেন যারা দাওয়াত দিলে খাই বা না খাই আমি যাবোই এটা নিশ্চিত। গয়েসশর দাদা আমার সে রকমের একজন মানুষ।
আমি রাজনীতি করি না কিন্তু আমি গয়েসসর দাদার একজন কাছের মানুষ। উনি সর্বদা আমাকে কিছু কিছু উৎসবে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দেন। কখনো কখনো কার্ড পাঠিয়ে, আর বেশীরভাগ সময়ে টেলিফোনে। এবারের দূর্গা পুজাতেও উনি দাওয়াত দিয়েছেন এবং ঘোষকান্দায় তার নিজের বাড়িতে যাওয়ার সময়ে ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় আমি যেন অফিসের কাজ দ্রুত শেষ করে অনুষ্ঠানে যাই সেটাও নির্দেশনা দিইয়েছিলেন। খুবই ব্যস্ত ছিলাম মিটিং নিয়ে ফলে প্রায় দুপুর প্রায় একটা বেজে গিয়েছিলো ওনার বাসায় যেতে যেতে।
আমি যখন ওনার বাসায় গেলাম, উনি তখন প্রচুর লোককে নিয়ে মিটিং কিংবা আলাপে/গল্পে মত্ত ছিলেন, আমি যাওয়ার পরই দাদা আমাকে নিয়ে কোলাকুলি করে তার নিজস্ব কামরাতে এসে বসলেন। অনেক আলাপ হলো, চা সিগারেট খাওয়া হলো, ভালো লাগছিলো। চলে আসতে চাইলাম কারন ফ্যাক্টরীতে বায়ার চলে এসছিলো কিন্তু দাদার আমন্ত্রনে না খেয়ে আসা হলো না। খেতেই হলো।
দাদার সবচেয়ে আমার ভাল লাগার জিনিষটা হল-উনি নিজ হাতে আমাকে খাবার পরিবেশন করেন। সেই ছোটবেলা থেকেই উনি আমাকে চিনেন যখন আমার বয়স মাত্র ১০। আমার বড় ভাই (এখন তিনি আমেরিকায় বোষ্টনে প্রফেসর হিসাবে আছেন) ওনার খুব কাছের বন্ধু হওয়ায় ভাইয়ের সুবাদে আমার বড় ভাই, গয়েসশর দাদা, আলিমুল্লাহ কাকা, আলাউদ্দিন মাষ্টার ভাই, আনোয়ার ভাই (ঢাকা ইউনিভার্সিটি), রহমান ভাই, নসরুল হামিদ বিপুর আব্বা হামিদ ভাই এরা তখন একটা খুব শক্তিশালি বন্ধু সংঘটন ছিলেন আর আমি সেই ১০ বছরের ছোট একটা পিচ্চি এই ইয়াং বন্ধু মহলের মধ্যে জড়িত ছিলাম কোনো কারন ছাড়াই। ওনাদের সাথে ঘুরতাম (আমার ভাই আমাকে নিয়ে নিয়ে ঘুরতেন তাই আমিও তাদের সাথে থাকতাম)। আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার অনুপ্রেরনার পিছনে এইসব শক্তিশালি ব্যক্তিরাও অনেক অনুপ্রেরনা জুগিয়েছিলেন।
গত ২৯/৯/২০২৫ তারিখে দাদার বাসায় দূর্গা পুজা উপলক্ষ্যে দাদার সাথে কিছুক্ষন সময় কাটানর কিছু মুহুর্ত।
ধন্যবাদ দাদা।
এই শাখাটা আমরা চালাচ্ছি। মুলত আমি, কর্নেল মাহমুদ এর প্রধান উদ্যোক্তা। মাহমুদের মিসেস নুরজাহান ভাবী এর প্রিন্সিপ্যাল। যথেষ্ঠ কোয়ালিটি পুর্ন শিক্ষার মান এখানে দেয়া হয় বলে গার্জিয়ানরা প্রায়ই এই শাখাটাকে সাধীন ক্যাম্পাস হিসাবে দেখতে চান এবং মনে করেন এটাকে আবাসিক করা গেলে প্রচুর ছাত্র ছাত্রী এখানে ভর্তি হবে। কিন্তু আমি এখনো সাধীন ক্যাম্পাস করার জন্য কন পদক্ষেপ নেইনি। তবে অদূর ভবিষ্যতে এটা যে একতা হবে তাতে কন সন্দেহ নাই ইনশাল্লাহ।
মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাডেমি মুলত একটা ফ্রান্সাইজিং শাখা। কিন্তু এর অন্তরালে আমাদের নিজস্ব একটা স্কুল চালু আছে যার নাম Bangladesh International School of Excellency (BISE). কন্সেপ্টটা হচ্ছে, যারা ক্যাডেট কলেজে চান্স পাবে না, তারা আমাদের স্কুলেই পরবর্তী স্কুলিং চলমান রাখা। যাত্র ছাত্রদের কোনো সময় ক্ষেপন না হয়। স্কুল অফ প্যারাডাইস হচ্ছে আমাদের অরিজিনাল স্কুলের একটা সেক্টরাল শাখা। এ রকমের আরো সেক্টোরাল শকাহা রয়েছে এর মধ্যে।
অনেকদিন যাওয়া হচ্ছিল না মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাদেমিতে। প্রায় ৮/৯ মাস পর আজকে গেলাম। প্রিন্সিপ্যাল তার শিক্ষক বৃন্দকে নিয়ে স্কুলের মান এমন পর্যায়ের নিয়ে গেছেন, দেখে মনটাই ভরে গেলো। ছাত্ররা, অভিভাবকগন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট লোকাল যারাই আছেন সবাই খুব খুশি।
অনেক ধন্যবাদ মাননীয় প্রিন্সিপ্যাল এবং শিক্ষকবৃন্দ। আমার দোয়া এবং আশীর্বাদ রইলো।
পছন্দ আর ভালভাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। পছন্দ হলো রেডিমেড একটা ফুল গাছ থেকে একটা ফুল ছিড়ে নেয়ার মতো, আর ভালবাসা হচ্ছে সেই ফুলগাছটায় আপনি প্রতিদিন পানি দিয়ে তাকে সতেজ রাখার মতোন। পছন্দ জিনিষটা যখন প্রতিদিন চর্চা হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে সেই পছন্দ একদিন ভালোবাসায় রুপান্তর হয়। যখন ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে আরো গার হয়, তখন জন্ম নেয় মায়া। মায়া একটা মারাত্তক জিনিষ। একবার কেউ মায়ায় জড়িয়ে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া মানুষগুলি কখনোই কারো জীবন থেকে হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যেতে দেয়া হয় না।
যাইই হোক, কথাগুলি বললাম এ কারনে যে, বহুবছর আমার নাড়ির টানের বন্ধনের এলাকা, এই বাক্তার চর, নিয়মিতভাবে আসা হয়নি। কাজের জন্যই হোক আর ব্যস্ততার জন্যই হোক, আসা হয়ে উঠেনি। কিন্তু একটা টান অবশ্যই ছিল। ইদানিং এলাকার কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসাবে আমি ঘন ঘনই এলাকায় আসছি। গ্রাম এবং এলাকার প্রতি আমার মায়া সেই জন্মলগ্ন থেকেই সুপ্তিত ছিলো কিন্তু উদগীরিত হয়নি বা প্রকাশ পায়নি। যার কারনে অনেককেই এখন আর আমি ভালোভাবে চিন্তেও পারিনা। পুরানো জেনারেশনের মানুষগুলিকে যেমন বর্তমান চেহাড়া থেকে চেনার উপায় নাই আবার নতুন জেনারেশনের ইয়াং ছেলেমেয়েদেরকেও আমার ভালোভাবে জানা বা চেনা হয়নি। ওরা হয়তো আমাকে নামে চিনে কিন্তু ওদেরকে আমার ভালোভাবে বা ন্যুনতম্ভাবেও চেনা হয়ে উঠেনি। কিন্তু পুরানো সেই মায়া থেকে আমি ওদের উপরেও যেন কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছি দ্রুত। ওরাও যে আমাকে আমার থেকে দ্রুত কঠিন ভালবাসায় জড়িয়ে ফেলতেছে সেটা আমার ইন্দ্রিয় আমার বুঝবার চেয়েও দ্রুত উপলব্ধি করছে।
কদিন আগে কলেজে এক মিটিং এ হটাত মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল আমার জন্ম দিনের তারিখটা। তখন প্রায় সন্ধ্যা। কলেজের প্রিন্সিপ্যালের রুমে গুটিকতক জেন জি ইয়াং স্টারদের নিয়ে মিটিং করছিলাম। শেষ হতে না হতেই দেখি কোথা থেকে একটা কেক, কেক কাটার ছুড়ি এবং মোমবাতিসমেত হাজির। সব কিছু বুঝবার আগেই জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা ঘটা হয়ে গেল। বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া হলেও অন্তরে খেলছিল এক ভালোবাসার বসন্ত প্রবাহ। অনেক আনন্দিত হয়েছি।
ধন্যবাদ ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম, সানাউল্লাহ, কাইয়ুম, শাহীনুর, মুজিবুর কাকা, অধ্যক্ষ মহোদয় এবং অন্য সব আদরের ছেলেরা। অনেক দোয়া রইলো তোমাদের প্রতি এবং অবশ্যই তোমরা আমাকে অনেক খুশী করেছো। আমি আমার আন্তরীক ভালবাসা জানাই তোমাদের সবাইকে।ো
জীবনকে বদলে দেয়ার মতো ইন্সপিরেশনাল গল্প হাজার মানুষের কাছ থেকে হাজার রকমের গল্প হয়তো আপনি শুনবেন। কিন্তু আপনি কিভাবে আপনার জীবন বদলে দেবেন, সেই গল্পটা জরুরী। অন্যের ইন্সপিরেশনাল গল্প থেকে আপনি হয়তো মোটিভেশনাল সাহস নিতে পারেন, কিংবা প্রতিজ্ঞা করতে পারেন, কিন্তু যখন আপনি আপনার জীবনটাকে বদলাতে যাবেন, সেই কারো গল্পের সাথেই হয়তো আপনার গল্পটা মিলবে না। তবুও আপনার গল্পটাও কারো গল্পের থেকেও কম ইউনিক না। সবসময় একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, রাজাও একদিন প্রজা ছিলো, আবার সেই রাজাও কোনো একদিন আবার সেই পুরান দিনের প্রজার মতোই প্রজা হয়ে যান। তবে সেখানে একটা শুধু পার্থক্য থাকতে পারে যে, রাজা হবার আগে সেই রাজা প্রজা অবস্থায় হয়তো কারো কাছে হাত পাতলেও রাজা থেকে প্রজা হয়ে সাধারনত সে আর কারো কাছে হাত পাততে চায় না। ভিক্ষা তো করেই না। হয়তো না খেয়ে মরে যাবে কিন্তু অতটা নীচে সে নামে না। যেমন মানতে পারে না ঈগল পাখি। সে সারাদিন না খেয়ে থাকবে হয়ত কিন্তু পচা মৃতপ্রানির মাংশ সে খায় না। এটাকে হয়তো অনেকে ইগোতে নিয়ে যাবেন, এটা ইগো নয় আসলে এটা সম্ভবত আত্তসম্মানবোধ বা শক্ত মেন্টালিটির সাথে তার ব্যক্তিগত পার্সোনালিটির বহির্প্রকাশ। তাই জীবনকে পার্সোনালিটিতে রুপান্তরিত করুন, সময়কে সবচেয়ে বেশি মুল্যায়ন করুন, সুযোগকে সঠিক মত কাজে লাগান, সম্ভবত জীবন দ্রুত বদলে যাবে। পার্সনালিটিতে সবচেয়ে বড় নির্দেশনা হচ্ছে- মেপে কথা বলার সাথে মেপে চলা। শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা। সব সময় সব কিছুর উত্তর দেয়া জরুরী নয়, অনেক সময় শুধু শোনাই হচ্ছে সবচেয়ে একতা বড় শক্তি। মিনিমালিজমে অভ্যস্থ হয়ে কথা কম বলুন, কম ব্যাখ্যা দিন, কম অজুহাত দিন, অপ্রয়োজনীয় শব্দ, ব্যস্ততা্ এড়িয়ে যান। অযথা অধিক আগ্রহে মানুষের গুরুত্ত কমে যেতে পারে। আর কখনো যদি বুঝেন-আপ্নার গুরুত্ত কমে গেছে বা যাচ্ছে-সাহস করে সেখান থেকে সরে পড়ুন। নতুন করে দিগন্ত প্রসারিত করুন। নতুন করে আবারো সীমানা নির্ধারন করুন। নতুন সম্পর্কের মধ্যেও সীমানা নির্ধারন করে মেপে ধীরে ধীরে আগাবেন। ঈগল পাখী থেকে আমাদের নতুন করে অনেক কিছু শেখার আছে। এতো উচুতে উঠেও ঈগল তার মানসিক চাপকে সাভাবিক রাখে। প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যেও সে মনোবল না হারিয়ে বরং ঝড়ের শক্তিকে সে নিজের অনুকুলে নিয়ে আরো দ্রুত গতিতে ভেসে চলে। জীবনটাকে বদলাতে সবচেয়ে বড় দরকার-সংকল্প। পরিকল্পনা করার আগেও একটা প্রি-পরিকল্পনার দরকার হয়। যদি একা চলতে ভয় পান, তাহলে নিশ্চিত থাকুন যে, আপনি অর্ধেক হেরে বসে আছেন। কেউ আপনাকে জিতিয়ে দিতে এগিয়ে আসবে না কখনো। তাই, একা চলবার মানসিকতায় ভরষা করুন। যদি প্রচেষ্টার বনাম পারফেক্ট চাই, তাহলে লাগাতার না থেমে সমস্যার মোকাবেলা করুন। সমস্যার সামনে হাটু গেড়ে আত্তসম্পর্পন না করে সেগুলিকে ভিত্তি করে সমাধানের পথ খুজে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যান।
ছোট ছোট সাফল্যের দিকে হাটুন, প্রতিদিন সাফল্যের দিকে নজর রাখুন। হয়তো অনেকদিন কোনো ভালো খবর পাবেন না, মনে হবে থেমে গেছেন, মনে হবে কিছুই হচ্ছে না, তবুও হাল ছাড়বেন না। লেগে থাকুন। জট খুলবেই। আর একবার যখন জট খুলে যায়, পরপর সব জট খুলতে থাকে। বারবার ওপিনিয়ন পালটাবেন না। তাতে স্ট্যাবিলিটি থাকে না। একই সাথে কয়েকটা সেক্টরে মনোযোগী হবার দরকার নাই, তাতে কোনোটাই সাফল্যমন্ডিত হয় না। আগে একটাকে সফল করুন, হোক সেটা নিতান্তই কোনো ছোট ব্যবসা বা কর্ম। সব সময় সেভিংস মুডে থাকুন, আপনি লক্ষ্যে পৌছবেনই। যতটুকুতে আপ্নার চলা সম্ভব, ততটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুন। অযথা খরচ বাড়িয়ে অসমতা আনবেন না। প্রতিদিন লেগে থাকুন, লস বা লাভ যাইই হোক। কেনো লস হবে আর কেনো লাভ হচ্ছে, এর মধ্যে অবস্থার বিশ্লেষণ করুন।
আপনার উন্নতি হবেই। আর যখন একবার উন্নতি হওয়া শুরু করে, ছাড়বেন না, লেগে থাকুন আরো কঠিনভাবে। আপনার গল্প পরিবর্তন হওয়া শুরু করবেই। অতঃপর একদিন, গল্পটা আপনার শুধু।
অতীব সুখী মানুষও কখনো কখনো ডিপ্রেশনে ভোগে। ডিপ্রেশন ছাড়া কোনো মানুষ নেই। কেউ না কেউ কোনো না কোনো ধরনের ডিপ্রেশনে কোনো না কোনো সময় ভোগেই। কিন্তু কেনো এই ডিপ্রেশন?
পছন্দ আর ভালভাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। পছন্দ হলো রেডিমেড একটা ফুল গাছ থেকে একটা ফুল ছিড়ে নেয়ার মতো, আর ভালবাসা হচ্ছে সেই ফুলগাছটায় আপনি প্রতিদিন পানি দিয়ে তাকে সতেজ রাখার মতোন।
মানুষকে চেনা আর জানার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে. মানুষ চেনার সহজ উপায় হচ্ছে- তার মুল্যটা বুঝা। মানে পয়েন্ট অফ ইন্টারেস্ট বের করা।
কোনো কোনো ঘটনা মাঝে মাঝে মানুষ মনে করে-জীবনটা বুঝি বরবাদ হয়ে গেলো, জীবনটা মনে হয় তছনছ হয়ে গেলো। কিন্তু মানুষ কখনোই এটা ভাবে না যে, সামনের দিনগুলি হয়তো আরো কঠিন থাকতে পারে। ফলে কেউ কেউ আজকের দিনগুলিকে ইনভেষ্ট করে এমনভাবে যেনো সামনের দিনগুলিকে মোকাবেলা করতে পারে। যদি সত্যিই কঠিন হয়, তাহলে তো মোকাবেলা করলোই, আর যদি কঠিন সময় না আসে, লাইফ আরো সুন্দর, আরো বিচিত্রময়।
কেউ কখনোই মানুষকে এটা বলতে চায় না, “চিন্তা করো না, আমি আছি তো!!”। একটা মানুষের জীবনে গোপনে হোক, প্রকাশ্যে হোক, ” আমি আছি তো” এমন একটা বন্ধু যে কত জরুরী। এই জরুরী বন্ধুটার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে তখন যখন মানুষের আর কিছুই থাকে না। রুপ, যৌবন, কাম, ভালোবাসা, কিংবা লুকুচুরির ভালোবাসা আর তখন কিছুই এসেট বলে মনে হয় না। অথচ তখনই ওই মানুষটার প্রয়োজন।
স্বামী বা সন্তান, স্ত্রী বা মেয়ে/ছেলেই যে আজীবন পাশে থাকবে এতার কোনো গ্যারান্টি নাই। থাকেও না। এমন কেউ হয়তো হতে পারে, যার কাছে আমরা কখনো দায়বদ্ধ নই আবার দায় বদ্ধও বটে।
ধনী কিংবা গরীব, কোনো মেয়ের একবার যদি বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে সমাজ তার কাছ থেকে বাচ্চা হবার একটা সুখবর পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে যায়। স্বামী কিংবা স্ত্রী তাদের এই সময়ে সন্তান চাই বা না চাই সেটা যেনো কোনো মুখ্য ব্যাপার নয়। আর যাদের সন্তান হয় না তাদের কষ্টটা শুধু তারাই বুঝেন যাদের এই কষ্টটা হয়েছে। বিধাতারও এই রীতিটা এমনভাবে তিনি জাল পেতে রেখেছেন যে, মানব-মানবী না চাইলেও অনাগত মানব সন্তান (অন্য প্রানির বেলাতে আমি কিছু বলছি না) এই পৃথিবীতে আসবেই। তা না হলে জীবন চক্রটাই হয়তো একদিন থেমে যাবে। বিধাতা সেই চক্রকে কখনো থামাতে দেবেন না, এতাই তার রুলস।
কিন্তু এই সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয়, পিতা মাতা তাদের সমস্ত আদর, কলিজার সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রানপন চেষতা চালিয়ে যান যেনো তার সন্তান থাকে হেফাজতে, দুধে ভাতে এববগ গড়ে উঠে সমাজে একজন সেই মানুষ হিসাবে যা দেখে অন্যরা পুলকিত হয়, সমাজ আলকিত হত হয় আর ধরনী হয় বিকশিত। কিন্তু বাস্তবে সেটা সব সময় পরিলিক্ষিত হয় না।
এমনই একটা জীবন নিয়ে চলে গেছে জলীল মামা, এই কয়েকদিনের মধ্যে হয়তো চলে যাবেন তার স্ত্রী তাহেরা বেগমও। ১৮ জন সন্তানের বাবা মা তারা। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশী সন্তানরা থাকেন দেশের বাইরে, জিবিকার প্রয়োজনে। তাদের সেই জীবিকার প্রয়োজন কতটা মিটছে সেটা তারাই ভাল বলতে পারবেন কিন্তু যখ তাদের বৃদ্ধ বাবা মায়ের দেখভালের ব্যাপারটা সামনে আসে, তখন যে চিত্র ফুটে উঠে তাতে এটাই মনে হয় যে, তারা অন্যকে সাহাজ্য করবে কি তো দূরের কথা, তাদেরই এখন আরো বেশি সাহাজ্য লাগবে। তারা কোনোভাবেই তাদের বাবা মাকে সাহাজ্য করতে পারেন না। ফলে এই বৃদ্ধ বয়সে এসে জলীল মামা বা মামী কখনো অর্ধহারে, কখনো অনাহারেই দিন গুলি পার করেছেন। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে খাবারের কারনে ভাগাভাগি হয়েছে জীবন সন্তানদের কাছে। আজ ওর বাড়িতে বাবা, মার খাবার হয়তো অন্য ছেলের ঘরে। যখন অসুস্থ্য হয়, তখন জীবন হয়ে উঠে আরো দূর্বিসহ। কে কাকে কখন কোথায় নিয়ে যাবে, তার কনো ধরাবাধা নিয়ম নাই। মার চিকিৎসায় বেশী টাকা লাগবে বলে বাবার সমান চিকিতসার খরচে যতটুকু রোগ সারে সেতাই যেনো বাস্তবতা।
যদি এটাই হয়, তাহলে এতো আদর করে, এতো চাহিদার আক্ষেপে কেন সন্তান নেওয়া? এই সন্তানদের জন্য নিজেদের যৌবন নষ্ট করেছেন, এই সন্তানদেরকে সাবলম্বি করার জন্য নিজেদের সবটুকু চাহিদা বিসর্জন দিয়েছেন, অথচ আজ সেই সন্তানরা তাদের জন্য কিছুই করার দরকার মনে করে না? অসময়েই তারা চলে যায় এই দুনিয়া থেকে।
জীবন খুব ছোট। এটার দ্বিতীয়বার পাওয়ার আর কোনো প্রকারের সুযোগ নাই। এই ছোট একটা জীবনে মানুষ বেশিরভাগ আনন্দ, ইচ্ছাপুরন ছারাই বিদায় নেয়। একদিন নিশ্চয়ই আমি আনিন্দ করবো, একদিন নিশ্চয়ই আমি জীবন উপভোগ করবো, এই আশায় প্রতিদিন মানুষ বেচেছিলো বটে কিন্তু কখনই তার সেই কাংখিত আশা পুরন হয়নি। কিছু পুরন হয়নি টাকা পয়সার অভাবে, কিছু পুরন হয়নি সঠিক মানুষের অভাবে, কিছু পুরন হয়নি সঠিক পরিস্থিতির অভাবে। যার টাকা ছিল, তার সঠিক মানুষ হয়তো ছিলো না, যার সথিক মানুষ ছিল, তার হয়তো পরিস্থিতি অনুকুলে ছিলো না। এভাবেই সময়তা পার হয়ে গেছে।
ভুল পথে গিয়ে ফিরে আসারও একটা সময় থাকে। সেই সময়টাকে যদি কেউ গুরুত্ব না দেয়, আর তাতে কেউ যদি ভুল পথ থেকে ফিরেও না আসে, তাহলে পরিনতি ভয়াবহ খারাপ হয়। একটা ভুল পথে যাওয়া মানুষকে সমাজ, পরিবার কিংবা দেশ ভুল পথ থেকে ফিরে আসার কারনে অভিনন্দন জানিয়ে গ্রহন করলেও তাকে সর্বদা একটা নির্দিষ্ট সময়কাল অবধি আড়চোখে রাখতেই পারে। কেননা খুব সহজেই মানুষ আবারো সেই ভুল পথে ধাবিত হতেই পারে ভেবে মানুষ ভয় পায়।
সেই ১৯৭৭ সালের কথা। আমরা ১৯ শে জুন কতিপয় নাবালক কিছু বালক (৫৫ জন) মোমেমশাহি পরবর্তীতে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পদার্পণ করেছিলাম। এই ৫৫ জন বন্ধুরা হয়ে উঠেছিলাম যেনো একেকটা একেকজনের জন্য নিবেদিত প্রান। সময়ের স্রোতে আমরা প্রায় ৬ বছর একসাথে থাকার পর ১৯৮৩ সালে ক্যাডেট কলেজের শিক্ষাক্রম শেষ করে বৃহত্তর জীবনে বেরিয়ে গিয়েছিলাম দেশের আনাচে কানাচে। কেউ সামরীক বাহিনী তে কেউ মেডিক্যাল, কেউ বুয়েট, কেউ নেভী, কেউ বা ইউনিভার্সিটিতে। কখনো কখনো কারো সাথে দেখা হয়েছে আবার কখনো কখন দলবদ্ধভাবে আমরা নির্দিষ্ট দিনকাল ঠিক করে একত্রে আড্ডা দিয়েছি। আমাদের ব্যাচের প্রথম ক্যাডেট ছিলো আমজাদ। যথারীতি আমরা গুটিকতক ক্যাডেট মুটামুটি সব সাবজেক্টেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সেই মোতাবেক আমজাদ চান্স পেয়েছিলো মেডিক্যালে। আমিও পেয়েছিলাম কিন্তু পড়তে ইচ্ছে করে নাই বিধায় আর মেডিক্যাল পড়া হয় নাই। আমাদের ব্যাচ থেকে আমজাদ হোসেন (৭৯২, জাহিদ হোসেন (৭৯৩), বাহাদুর আলী (৭৯৪), আফজাল হোসে (৮১৪), হাসান আশরাফ মামুন (৮৩৬), মামুন (৮৩৮), সাইফুল ইসলাম (৮৩৯), মনজুর মাহমুদ (৮৪৪) এরা মেডিক্যালে পরাশুনা করা শুরু করে। আর বাকীরা বিভিন্ন ক্যাটেগরীতে বিভক্ত হয়ে যার যার ক্যারিয়ার তৈরী করে।
আজ আমাদের সেই প্রথম ক্যাডেট আমজাদ হোসেন ইন্তেকাল করলো।
আমজাদের সাথে আমার সেই ১৯৮৩ সালের পরে আর কখনো দেখা হয় নাই। ওর মৃত্যুর খবর যখন আমাদের হোয়াটসআপ গ্রুপে এলো, তখনই আমি আমজাদের লেটেষ্ট ছবিটা দেখলাম। অদ্ভুত পরিবর্তন আমজাদের। দেখেই ওকে রোগা মনে হচ্ছিলো। তাহলে আমজাদ কি ওর জীবনে সুখী ছিলো না? কিংবা আমজাদ কি কোন কারনে অসুখী ছিলো?
আমজাদ বরাবরই খুব চাপা স্বভাবের ছিলো। কলেজেও খুব একটা কথাবার্তা বলতো না। খুব বেশী একটা এম্বিশনওয়ালা মানুষ ছিলো না আমজাদ। শুনেছি ওর দুটু সন্তান আছে। একজন মেয়ে আর আরেকজন ছেলে। আমি আজই প্রথম জানতে পারলাম আমজাদের ছেলে একজন ইঞ্জিনিয়ার আএ মেয়েও টেকশটাইল ইঞ্জিনিয়ার। ওর মেয়ের নাম কনা আর ছেলের নামটা আমি এখনো জানি না। আমজাদ নাকি কদিন যাবত বুকে ব্যথা নিয়ে ছিলো। নিজে ডাক্তার, তাই আজই সে হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি হয়েছিলো বুকে ব্যথা নিয়ে কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
আমাদের ব্যাচের মোট ৫৫ জন ছাত্রের মধ্যে আমজাদকে সহ ইতিমধ্যে মোট ৫ জন ক্যাডেট বন্ধু এই দুনিয়া ত্যাগ করেছে। আর এরা হলো
আমজাদ, আফজাল, লুতফর, সাহেল এবং শাহিন।
সর্ব প্রথম ইন্তেকাল করে শাহি, আমেরিকায়, তারপর ইন্তেকাল করে আফজাল, অতঃপর ইন্তেকাল করে সাহেল, লুতফর মারা যায় বিডিআর কিলিং এ, আর এখন মারা গেল আমজাদ। এভাবেই আমরা একে একে এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলে যাব। আর ফিরে আসা হবে না।
আমেরিকায় বেরাতে গিয়ে ভার্জিনিয়ায় ফরিদ ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম আর সেই কাহিনীর কিছু অংশ ৪/৭/২০২৫ তারিখে আমার ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করেছিলাম। সেই ফরিদ ভাই গতকাল বাংলাদেশ টাইম সন্ধ্যা ৫ টায় আর আমেরিকার টাইম ভোর ৪ টায় মারা গেছেন (ইন্না নিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহির রাজেউন)। বাংলাদেশে তিনি আমার প্রতিবেশী ছিলেন। এটাই মানুষের জীবন। সবার চেয়ে সত্য যে, মানুষ একদিন এই পৃথিবী ছাড়বেই। সে যেইই হোক, যত ক্ষমতশীলই হোক আর যত প্রতিপত্তী থাকুক তার, কোনো কিছুর বিনিময়েও সে এই দুনিয়ায় থাকতে পারবে না। নির্ধারীত সময়ে তাকে চলে যেতেই হবে।
মানুষ কত অসহায়। ভূমিষ্ঠ হবার পর যেমন মানুষ অসহায় থাকে, কোনো কিছুই করার তার ক্ষমতা থাকে না। গরু ছাগলের বাচ্চারা তবু ভূমিষ্ঠ হবার পর পরই নিজের পায়ে দারাতে পারে, মায়ের দুধের বোটা গুলি কই খুজে বের করতে পারে, কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকলে একাই দৌড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে পারে কিন্তু মানুষের সন্তান কন কিছুই বুঝে না, করতে পারে না। সে এতোতাই অসহায়। সেই মানুষগুলিই আবার সময়ের স্রোত পার করে করে শিশু থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যুবক এবং অতঃপর ক্ষমতাধর মানুষে পরিনত হয়। অথচ আবারো সময়ের স্রোত ধরেই সে একদিন এমন একটা সময়ে এসে হাজির হয় যে, তখনো সে একেবারেই অসহায় বনে যায়। কাইট্টা লামু, মাইরা লামু, দেইখ্যা লমু কিংবা কাউকে ঠকিয়ে বিশাল প্রতিপত্তওয়ালা হলেও সেই অসহায় সময়টায় মানুষ একেবারে একা। কোনো সম্পদ, কোনো পতিপত্তি কিছুই আর কাজে লাগে না। মানুষ অবশেষে সব ছেড়ে চলেই যায়। এটার থেকে এতো কষ্টের কাহিনী আর কিছুই নাই।
ফরিদ ভাইয়ের পরিবারটা অনেক ভালো মানুষ ছিলো। আমার সবচেয়ে কাছে প্রতিবেশি ওনারা। ফরিদ ভাই, মিজানুর রাহমান ভাই, ভাবীরা, তাদের বাচ্চারা অত্যন্ত ভাল একটা পরিবার। ফরিদ ভাই সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন।
কখন আমরাও চলে যাই তার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। আল্লাহ ফরিদ ভাইকে জান্নাতবাসী করুন।
প্রায় ২ বছর আগ থেকে আমি প্রিপারেশন নিচ্ছি, গুছাচ্ছি। আমার এই বয়সের অনেকেই, এমন কি আমার থেকেও অনেক কম বয়সী মানুষেরা, বন্ধু বান্ধবেরা কিংবা চেনা পরিচিত লোকেরা এই দুনিয়ার মায়া চিরতরে ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন। তাদের কতটুকু প্রিপারেশন ছিলো আমার জানা নাই, তবে যেটা মনে হয় সেটা হলো তারা হয়তো বেশীরভাগ মানুষেরাই সুস্থ্য পরিকল্পনামাফিক কোনো গুছানোর কাজগুলি করে যেতে পারেন নাই। আমি গুছানো বলতে যেটা বুঝাচ্ছি সেটা হল-
(ক) আমি চলে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম আমার সাথে জড়িত মানুষগুলি, যেমন আমার পরিবার, পরিবারের সদস্যগুলির জন্য আমি কি সেইসব কাজগুলি করে গেলাম কিনা যাতে ওরা আমার অনুপস্থিতিতেও কারো কাছে হাত না পাতে, অসহায় ফিল না করে, মানুষের কাছে অসম্মান না হয়? বা এমন কোনো লায়াবিলিটিজ কি রেখে গেলাম যাতে ওরা আমার কারনে সমাজে হেয় হয় কিংবা আমার বোঝা তাদের উপর পড়ে? আমি এগুলি নিয়েই সর্বপ্রথম প্রিপারেশ নিয়েছি। আমি প্রিপারেশন নিয়েছি যাতে আমার কারনে কিংবা আমার ব্যবসার কারনে কিংবা ওদেরকে সাবলম্বি করতে গিয়ে ওদের উপর কোনো প্রকার বোঝা না দিয়ে যাই বা বোঝা না পড়ে, ওরা যেনো একদিকে সাবলম্বি হয়, আবার অন্যদিকে ওরা যেনো আমার অনুপস্থিতিতেও ঠিক থাকে ঠিক সে রকম যে রকম আমি ওদেরকে আমার জিবদ্দশায় রেখেছিলাম। ইতিমধ্যে আমি সব কিছু হিসাব করে দেখেছি যে, ব্যাপারটা আমি প্রায় ইনশাল্লাহ গুছিয়ে ফেলেছি।
কিভাবে গুছিয়ে ফেলেছি বা ফেলছি সেটা হল-
(ক) উম্মিকার শশুড় বাড়ির তাদের নিজেদের সবগুলি লোন ক্লিয়ার করে দিয়ে মাছের ব্যবসাটায় একটা বড় ধরনের মুলধন জোগান দেয়া হয়েছে, যা দিয়ে উম্মিকার শশুড় বাড়ির মানুষেরা ভালোভাবে চলতে পারবে। তাছাড়া ওদের বাড়িটারও কিছু কাজ করে দেয়া হয়েছে যতটুকু ওদের দরকার। এতে উম্মিকার শশুড় বাড়ির সবাই নিরাপদ একতা সোর্স অফ ইনকামের মধ্যে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।
(খ) আবিরের জন্য আর উম্মুকার জন্য দুটু হাসপাতালের শেয়ার নেয়া হয়েছে। লাল্মাটিয়া শিশু হাসপাতাল এবং শ্যামলিতে বেবী কেয়ার ইউনিট। আপাতত জবের পাশাপাশি ওরা এই দুটি হাস্পাতাল নিয়ে ভালই চালাচ্ছে। সাভার ডিওএইচএস এ ২টি ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে দুই মেয়ের নামে। যদি কোন কারনে ওদের এক্সট্রা টাকা পয়সাও লাগে, নিজেদের বাড়ি (গোলারটেকের) বাইরে ওই ২টি ফ্ল্যাট ইচ্ছে করলে বিক্রি করে লিকুইড মানি করতে পারবে। এ রকম আরো আছে যেমন ফ্যাক্টরী শেয়ার, এম্ব্রয়েডারীর আলাদা ব্যবসা, মা লিমিটেডের ভাড়া, চান্দের চরের জমি, মোহাম্মাদপুরের শহীদ ক্যাডেট একাডেমি ইত্যাদি সবই এসেট হিসাবে থাকলো। আমার মেয়েদের এবং স্ত্রী কোনো অসুবিধা হবার কথা নয় ইনশাল্লাহ।
(গ) কনিকার ব্যাপারে আমি যেটা করেছি সেতা হলো ওকে আমেরিকায় ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করিয়েছি। ইতিমধ্যে কনিকা একটা জব করছেভ আমেরিকায়। বেতন ভালই পায়। এখন সমস্যা হচ্ছে-কনিকা আমেরিকায় পার্মানেন্টলী থাকতে পারবে কিনা। এটা একটা আন্সার্টেন বিশয় কিন্তু সে যদি জব বেজড ভিসা পেয়ে যায় তাহলে থাকা নিয়ে কোনো ঝামেলা নাই। আর যদি জব বেজড ভিসা না পায় তাহলে কনিকাকে বিয়ে করে থাকতে হতে পারে। জব বেজড ভিসার জন্য আমি ছোট ভাইকে সররপ্রকার ডলার জোগান দিয়েছি যাতে ছোট ভাই তার দোকানের মারফত কনিকাকে জব বেজড ভিসার ব্যবস্থা করতে পারে। ব্যাপারটা প্রক্রিধীন আছে। জানিনা ট্রাম প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কোথায় কোন পলিসি কিভাবে বাস্তবায়ন করে। দ্বিতীয় বিকল্প বিষয়টা হচ্ছে-কনিকা একটা ছেলেকে পছন্দ করে। আমেরিকান কিন্তু ক্রিষ্ঠান। নাম ব্রেডি স্মিথ। ছেলেটার সাথে, ওর মা রবার্থার সাথে আমেরিকায় যাওয়ার পর কয়েকবার একসাথে কথা হয়েছে, খাবারও খেয়েছি। খারাপ লাগেনি। যতগুলি শর্ত দিয়েছি, সব গুলি শর্তই ওরা মেনে নিয়েছে। মুসলমান হতে হবে এটাও মেনে নিয়েছে (আলহামদুলিল্লাহ)। যদি ব্রেডির সাথে কনিকার বিয়ে হয়, তাহলে কনিকা আমেরিকায় থেকে যেতে পারবে ইনশাল্লাহ। সেক্ষেত্রে কনিকার জন্য আমার একতা কাজ থাকবে, তা হলো-কিনিকার বাড়ি কেনার জন্য একটা এমাউন্ট ডলার দেয়া। এর মধ্যে কনিকার কাছে আমার ৪০ হাজার ডলার দেয়া আছে, আমি আরো ৬০ হাজার ডলার দিতে চাই কনিকাকে। যদি সেতা হয়ে যায় ইনশাল্লাহ, তাহলে কনিকার ব্যাপারটাও আমার আর চিন্তা করার কোনো দরকার পড়বে না। আমার কাছে ওই পরিমান টাকা এখনই আছে যা আমি কনিকাকে দিতে পারি। যেহেতু কনিকার বিয়ে হয় নাই, তাই বিয়ের খরচ এবং কনিকার জন্য বরাদ্ধ টাকা আমি কনিকার বিয়ের পরেই দিতে চাই ইনশাল্লাহ।
মিটুলের জন্য আমার অতিরিক্ত কিছু করার দরকার নাই আপাতত। মিটুলের নিজের কাছে বেশ কিছু টাকা জমানো আছে, তাছাড়া ওর পেনসনের পর বিশাল একটা টাকা সে পাবে। বাড়ি আছে, ভাড়া পাবে, মিটুল ইনশাল্লাহ ভালোভাবেই চলতে পারবে, কোনো অসুবিধা হবে না।
আমার কোথাও কোনো ঋণ নাই, কোথাও কোনো লায়াবিলিটিজ নাই। বরং আমার কাছে অনেকেই ঋণী হয়ে আছে। যদি তারা সেসব ঋণ আমার পরিবারের কাছে পরিশোধ করে, সেটা উত্তম। আর যদি না করে, আমি দাবী ছাড়ছি না, এটা তাদেরকে পরকালে সুদে আসলে আমাকে পে করতে হবে।
(খ) দ্বিতীয় প্রিপারেশনটা হচ্ছে, আমার ম্রিত্যুর পর আমি জানি হয়তো কিছুদিন কিছু সংখ্যক মানুষ, আত্মীয়স্বজন কিংবা খুবই কাছে কেউ আমার জন্য হয়তো দোয়া করবে, আমার নামে আল্লাহর কাছে সদ্গায়ে জারিয়া হিসাবে বছরে ভরে কিছু দান খয়রাত কিংবা মিলাদ মাহফিল করবেন। এই ব্যবস্থাটা খুব শক্তিশালী নয়, কারন এটা খুব অচীরেই এক সময় ম্লান হয়ে যাবে এবং তার কিছুসময় পরে একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। একটা সময় আসবে, যে, আমি যে এই পৃথিবীতে ছিলাম, এই কথাটাই মানুষ ভুলে যাবে। আর ভুলে যাওয়া মানুশের জন্য অন্যরা কেউ কিছু করেনা। এটা মানুষের দোষ না। আমিইবা আমার পরিবারের শতবর্ষের আগের কোন মহিয়সীকে মনে রেখেছি? আমি তো তাদের কারো নামই জানি না। আমি কি তাদের কারো নামে স্পেশাল জোর দিয়ে কোনো মিলাদ, দোয়া মাহফিল করেছি? করি নাই। তাহলে আমি কিসের জোরে বা কিসের কারনে এটা আশা করতে পারি যে, শতবর্ষ পরে আমার কনো জেনারেশন আমার জন্য এ রকমের মিলাদ মাহফিল কিংবা দোয়া দরুদ পড়বে? পড়বে না। অথচ আমার কিয়ামাত আসার আগ পর্যন্ত আমার নেকী চাই। কিন্তু আমার মৃত্যুর পরে তো আমার নেকী কামানোর সিস্টেমই বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে আমার মৃত্যুর পর আমি অতিরিক্ত নেকী পাব কই? আর ঠিক এ কারনেই আমি মনোস্থির করেছিলাম যে, আমি এমন একটা এমাউন্ট টাকা ওয়াকফা করবো যেখান থেকে প্রতিমাসে একটা লাভ আসে এবং সেই লাভ গুলি বিভিন্ন মাদ্রসা, এতিমখানা, কিংবা জন কল্যানে ব্যয় হয়। আর এই কাজটা আমাদের পরিবারের কেউ করার সময় তারা পাবে না। এজন্য আমি ভেবেছি এটা করবো কোন ব্যাংক মারফত। তাতে আজীবনকাল এই লাভ গুলি নির্দিষ্ঠ জায়গা মতো চলে যাবে আমার মৃত্যুর পরেও।
আমি এখন যেভাবে কাজ করে যাচ্ছি-যেমন রিভার সাইডে, সমস্ত কার্যকলাপ আমি শতভাগ মনিটর করি। আগে যেটা আমার পার্টনার মূর্তজা সাহেব করতেন, সেটা এখন আমি করছি। আসলে মূর্তজা সাহেব আমাকে সম্ভবত কখনোই বিশ্বাস করতেন না, আর তিনি ভাবতেন, আমি কিছুতেই ফ্যাক্টরী চালাইতে পারবো না। ফলে একচ্ছত্র একটা ক্ষমতার পাওয়ার হাইউজ মনে করতেন তিনি। আর এই পাওয়ার হাউজ থেকে তিনি ভাবতেন-যা খুশী করা যায়, আর সেটাই উনি করেছেন। তার মধ্যে সব সময় একটা খাই খাই ভাব ছিল। পুরু রিভার সাইড ফ্যাক্টরীটা উনারা মনে করতেন যে, এটা ওনাদের বাপের সম্পত্তি। মিযান ব্যবসা করতো এক্সেসরিজের আর লাভ করতো বছরে এক কোটির উপরে। যেটা আমিও পেতাম না। তার মামাতো ভাই লাদেন (মামুন) এক নাগাড়ে অযথাই টাকা নিতো ফ্যাক্টরী থেকে ভুয়া একতা লিংকিং ইউনিট সাজাইয়া এবং লেফট ওভারের ব্যবসা করে। তার দুলাভাই আরো একটা ব্যবসা করতো যেটার কোনো কন্ট্রোল ছিলো না। তার বড় ভাই মোস্তফা দাদা আমাদের ফ্যাক্তরিতে ক্যামিকেল সাপ্লাই দিতো যা শুধু পানিই ছিলো অথচ প্রতিমাসে সে লাভ নিতো প্রায় ৬ লাখ টাকা। তার চাচা শশুর সাঈদ কাকু একজন সার্জেন্ট পদমর্যাদার। ফ্যাক্টরিতে জিএম পদে কাজ করে জাষ্ট নামেমাত্র। বেতন পায় প্রায় ৮০ হাজার। তার শ্যালক একটা ছত খাটো লিংকিং ফ্যাক্তরী দিয়ে নন কোয়ালিটি কাজ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তার স্কুল শিক্ষকের ছেলে নাহিদকে পারচেজ অফিসার হিসাবে নিয়গ দিয়ে ফ্যাক্টরিতে একটা সিন্দিকেট বানিয়ে ফেলেছে। শুধু তাইই না, তার প্রতিবন্ধী শ্যালক এজেড এ কাজ করে ঊন্ডিং এ, তার আপন ভাইগ্না মারজান কাজ করে মার্চেন্দাইজার হিসাবে, তার আরেক রিলেটিব দিদার কাজ করে এডমিনে, প্রোগ্রামিং সেকসনে কাজ করে ওনার চাচা শশুরের ভাতিজা। এ রকম আরো অনেক আত্মীয় সজনে ভর্তি এই ফ্যাক্তরি। আবার নিজের শেয়ার থেকে ১৫% শেয়ার তার স্ত্রীকে দিয়ে স্ত্রী অফিসে আসবে না, তারপরেও তাকে মাসে ৩ লাখ টাকা করে বেতন নিতেছিলো। এ জেড এ তার কিছুই নাই এখন, এক সময় সেই এ জেড তার কিছু ম্যানুয়েল মেশিনারিজ দিয়ে আমাদের রিভার সাইডের সাথে মার্জ করেছিলো বিধায় প্রতি মাসে আরাই লাখ করে লাভ নিতো। পরবর্তীতে এ জেডে সব অটোমেটিক মেশিনারিজ দিয়ে সাজানো হলে উনি ওনার সব পুরানো মেশিনারিজ বিক্রি করে দেন। তখনো উনি সেই আড়াই লাখ করে প্রোফিট নিতেই থাকেন। কি একটা অবস্থা। শুধু তাইই না, ঊনার ফ্ল্যাট কেনা বাবদ রিভার সাইড এক কালিন ৬০ লাখ টাকা পে করেছিল, সেই টাকাটাও আজ অবধি উনি পে ব্যাক করেনি। পলাশ পুরে উনি জমি কিনেছিলেন, সেই টাকাটাও উনি রিভার সাইদ থেকে নিয়েছিলেন। সেটাও পে ব্যাক করেন নি। লাক্সমা ফ্যাশনে আমরা রিভার সাইড থেলে অনেক টাকা পে করেছিলাম, আমার মনে নাই উনি সেই টাকাগুলু আজো হয়তো পে ব্যাক করেন নাই। তবুও তার ক্রিতজ্ঞতা নাই। সে নিজেও বেনামিতে সে কিছু ব্যবসা করা শুরু করেছিল, যেমন ২২ ফ্রেশ, স্তায়ল্টেক্সের সাথে কমিশন বানিজ্য ইত্যাদি।
এই সব কিছু বন্ধ করে দিয়েছি শুধু ফ্ল্যাট আর পলাশপুর জমির টাকাটা এখনো পে ব্যাক করাইতে পারিনি। এগুলি থাক হাতে, গুছিয়ে ফেলবো ইনশাল্লাহ।
গত জুন ২০২৫ মাসে আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পর আমি আমার গত ২০ বছরের প্রাত্যাহিক জীবনের অনেকগুলি রুটিন একেবারেই পরিবর্তন করে ফেলেছি। জীবনের মুল্যবোধ, জীবনের চাহিদা, আশা আখাংকার মধ্যে একটা ব্যারিয়ার তৈরী করে এতে নতুন কিছু শর্তাবলী যোগ করে ফেলেছি। আমার এখন সবচেয়ে বড় চাহিদাটা হচ্ছে-একটা সার্টেন এমাউন্ট অফ টাকার ব্যালেন্স এমনভাবে তৈরী করা যাতে ব্যবসা, কিংবা অন্য কোনো সোর্স থেকেও যদি টাকা না আসে, তারপরেও আমার সেই সার্টেন এমাউন্ট অফ টাকার লভ্যাংশ থেকে এমন কিছু টাকা আসবে যেটা দিয়ে আমার সবকিছু খুব সহজে সামাল দেয়া সম্ভব। এ ব্যাপারে অনেকটাই সাফল্য চলে আসছে ইনশাল্লাহ আমার। হয়তো এই বছরের শেষের দিকে আমার এই পরিকল্পনার ৬০% সমাপ্ত হয়ে যাবে।
ছোট মেয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্তটা যেহেতু ফাইনাল করেই ফেলেছি যে, ব্রেডির সাথে ওর বিয়ে দেবো, সেক্ষেত্রে এখন পরবর্তী পরিকল্পনাটা হচ্ছে-আগামি ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ব্রেডির সাথে কনিকার বিয়েটা সম্পন্ন করা। এতে যে খরচটা হবে সেটা প্রায় ৫০% আগানো আছে। ডিসেম্বরের আগেই আমি ভাবছি পুরু ফাইন্যান্সটা আমি ইনশাল্লাহ জোগাড় করে কনিকার একাউন্টে পাঠিয়ে দিতে পারবো।
উম্মিকার বেলায়ো মুটামুটি ঠিক পথেই চলছে। ওদের ইন্ডিয়ায় ট্রিটমেন্টের জন্য প্রায় সবকিছুই চুড়ান্ত। এখন আল্লাহর রহমতে ওদের ঘরে একটা সুস্থ্য বাচ্চা হলেই আমার মনের সব নিয়ত আপাতত পুরা হয়। বাকিটা আল্লাহ জানেন। আবির আর উম্মিকার জন্য আপাতত বড় ধরনের কোনো বাজেটের দরকার নাই। মেডিক্যাল ইউনিট গুলি চলছে, মনে হয় আবির ভালো করবে। আবিরের বাবাও মাছের খামার নিয়ে আপাতত টেনশন ফ্রিতে আছে, ওদের বাড়িটাও করা হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে কেউ অশান্তিতে নাই (আলহামদুলিল্লাহ)।
ফ্যাক্টরীতে আমার কন্ট্রোল এখন শতভাগ। মুর্তজা ভাই সম্ভবত আমাকে এবং তার সাথে ফ্যাক্টরীর অনেক স্টাফ (যেমন মার্চেন্ডাইজার, একাউন্টস, প্রোডাকশন স্টাফ ইত্যাদি) রা মনে করতো যে, আমি নাকি শুধু যাই আর আসি। কোনো কাজই সম্ভবত আমার নজরে নাই কিংবা বুঝি না। গত এক বছরে এই ফ্যাক্টরীতে যেসব পদ্ধতিগত পরিবর্তন এনেছি, সেটা মুর্তজা ভাই গত ২০ বছরেও আনতে সক্ষম হয় নাই।
এ যুগের ছেলেমেয়েরা একেবারেই অন্যরকম। বুড়ো বাবা মায়ের পক্ষে এ যুগের সন্তানের উপর খুব একটা ভরষা করার মতো সুযোগ নাই। ওরা কখনো অতীব হিসেবী, কখনো অনেক চালাক কিংবা বোকা তো নয়ই। যখন ওরা দেশে থাকে, তখন ওরা বিদেশ যাবার জন্য অস্থির থাকে। যখন বিদেশ যায়, তখন ওরা আরেকটা দেশে ২য় শ্রেনীর সিটিজেন হয়ে বসবাস করতেও তাদের কোনো সমস্যা হয় না কিন্তু তারপরেও ওরা সুখে থাকে না। দেশে যখন থাকে, তখন এক গ্লাস পানিও ঢেলে খেতে চায় না। সব কিছু রেডিমেড চায়। কিন্তু যখন বিদেশে যায়, তখন তারা অন্যের কিচেনও পরিষ্কারে কোন আপত্তি নাই কারন সেটা না করতে পারলে মাসের খরচটাও হয়ত উঠবে না, তাই বাধ্য হয়ে করতেই হয়। যখন সংসার করে, তখন আবার আরেক বোঝাপড়া। বয়ষ্ক বাবা মাকে বিদেশে নিতে আগ্রহী হয় কেউ কেউ, সবাই না। যারা নিতে আগ্রহী হয়, তারা নিছক আসলে ঘরের কাজ কিংবা বাচ্চার দেখভাল করার জন্যই নিতে চায়। বাবা মাকে অধীর ভালোবেসে আসলে সেটা ঘটে না। কিন্তু তখন আবার আরেক সমস্যা সামনে আসে। নিজের সংসারের জন্য তাদের দরকার কারন বিনে পয়সায় পাওয়া খুবই ট্রাস্টেড মানুষ। কিন্তু তারাও তো বয়ষ্ক মানুষ। ফলে, বাবা মাকে বিদেশে নিয়ে রাখবে কিভাবে? তাদের তো এত সময় নাই হাতে। এতো সময় কই তাদের? আবার অন্যদিকে বাবা মা ভাবে, নিজেরা তো বুড়ো হয়ে গেছে। যদি তার ছেলেমেয়েরা তাদের সাথে থাকতো কিংবা যদি ছেলেমেয়েদের সাথেই ওনারা একসাথে থাকতে পারতেন, হয়তো শেষ বয়সের বিরম্বনা বা ভয় কিংবা হতাশাটা একটু কমতো!! কিন্তু বাচ্চারা যেমন অনেকেই দেশে থাকে না আবার যারা বিদেশে থাকে, তাদের সাথে বাবা মায়েরাও থাকতে পারেন না। আসলে বুড়ো বয়সে নিজেদের বলতে কেঊ থাকে না আর। এরা শুধু বেচে থাকে একা একা। তাই বুড়ো বয়স্টা খুব ভয়ের।
কম বয়স আর বেশী বয়সটার অনেক তফাত। কম বয়সে মনে হয় সব পারি, সব পারবো। কিন্তু বয়স যখন বেড়ে যায়, তখন বুঝা যায়, একা কিছুই করা যায় না। এমন কি একা থাকাই যায় না। ছেলেমেয়েদের উপর নির্ভর করতে ইচ্ছে করে, কি রকম একটা হেল্পলেস লাগে। যখন রাতে শুতে যায় কেউ, তখন যেনো একটা ভয় নিয়ে বিছানায় ঢোকে। যদি ঘুমের মধ্যে মাঝরাতে কোনো একটা অঘটন ঘটে যায়!! সব বুড়োরা যখন নিজেদের সময় কাটানোর জন্য কখনো হাটার ছলে বাইরে বের হয়, তখন প্রায় কিছুদিন পর পরই তাদের সংখ্যাটা কমতে থাকে। কেউ কেউ আবার বৃদ্ধাশ্রমেও চলে যায় ভগবানের কাছে যাবার আগে। কেনো জানি মাঝে মাঝে মনে হয়, পুরূ প্রিথিবীটাই একদিন ব্রিদ্ধাস্রম হয়ে যাবে।
কি অদ্ভুত আমাদের জীবন। আমরা সবাই জানি-একদিন আমি আর থাকবো না। এটা এতো ধ্রুব সত্য যে, এটাকে কেউ কোনো ক্যারিশমা দিয়ে, কোনো মন্ত্র দিয়ে, কোনো ক্ষমতা দিয়ে বা কোনো বৈজ্ঞানিক থিউরী দিয়েও থামানো সম্ভব না। যেতেই হবে। আমাদের এই শেষ যাত্রাতা কিভাবে হবে এটার রুপ কেউ বলতে পারেনা। কেউ একেবারেই সাভাবিকভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে, কেউ নিঃশ্বাস শেষ হয়ে যাচ্ছে এটা বুঝার আগেই শেশ হয়ে যাবে, কেউ পানিতে, কেউ আকাশে, কেউ ঘরে, কেউ ঘুমের মধ্যে আবার কেউ বা চলাচল করতে করতেই বেরিয়ে যাবে এই দুনিয়া থেকে। কেউ পরিপক্ক হবার আগে, কেউ জীবনের শেষ সময় বেচে থাকার পরে, কেউ অর্ধ জীবনে চলে যাবে। কেউ কখনোই বলতে পারে না ঠিক কোন সময়টা সে আর নাই। তাই এখন আমার খুব ভয় লাগে। হয়তো আসলেই আর বেশি সময় নাই আমিও।
তাই কারো সাথেই আর রাগ করতে চাই না, কেউ রাগ করলেও আর খুব একটা মাথা ঘামাই না, কাউকে নিয়ে আর অযথা চিন্তা করি না। কারন এখন না হয় আমি দুসচিন্তা করছি, ভাবছি, কিংবা কার অবস্থার কথা ভেবে একটু মন খারাপ করছি, কিন্তু আমি যখন থাকবো না, তখনো তো তাদের অবস্থা এমনই বা এর থেকেও খারাপ হতে পারে, তখন তো আর আমার পক্ষে কোনো প্রকার চিন্তা, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি করার কোনো সুযোগ নাই। তাহলে আমার জীবদ্দশায় এত চিন্তা করার কি দরকার? যে যেভাবে পারে এক ভাবে না এক ভাবে বেচেই থাকবে। শুধু একটা জিনিষ আমার করার থাকে আর সেটা হলো-আমার সামর্থের মধ্যে কাউকে যতটুকু পারা যায় তাকে সাহাজ্য করা। এতে যতটুকু উপকার হয়, ততোটুকুই আমার ক্ষমতা।
আমার ভয় লাগে আরেকটা কারনে। এখন যতো কষ্টেই থাকিনা কেনো, অন্তত একটা বিছানায় ঘুমাই, ক্ষুধা লাগলে খাই, গরম লাগলে ফ্যান চালাই, শীত করলে লেপ কিংবা কম্বল গায়ে দেই। ঝড় ব্রিষ্টিতে ছাদের তলে আশ্রয় নেই, রোগ হলে মেডিসিন খাই, ক্ষতিকর প্রানী দেখলে লাঠি দিয়ে সরাইয়া দেই কিন্তু যেদিন আমাকে মাটির নিচে রেখে আসবে সেদিন আমি কিভাবে সেই অঝোর ধারার বৃষ্টির পানিকে আমি কবরের মধ্যে ঠেক দেবো? শীতে আমার হাড় কাপুনী ঠান্ডা লাগলেও আমি কিভাবে সেটা নিবারন করবো, গরমের কারনে অসংখ্য পোকামাকড় আমার গায়ে উঠে আমাকে কামড়াইতে থাকলেও আমি কিভাবে সেগুলিকে তাড়াবো? আমার আশেপাশেও তো কেউ থাকবে না যাতে আমি চিৎকার দিয়ে বলতে পারি-ভাই আমাকে একটু সাহাজ্য করো!! হেল এন্ড হেভেন তো অনেক পরের কথা। কিন্তু ঠিক সেদিনের অবস্থাটাই আমার কি হবে যেদিন আমি জাষ্ট আমার ঘর থেকে মাটির নিচে অবস্থান করব? খুব ভয় লাগে।
এবার আমেরিকায় এসে আমি একটা সিডিউল বানাতে বলেছিলাম আমার ছোট মেয়েকে। আমার ছোট মেয়ের কাজ অনেক সুক্ষ এবং বাস্তবভিত্তিক। সে ক্রমান্বয়ে আমাদের সব আত্মীয়স্বজনের বাসা কাভার করেই একটা আইটেনারি বানিয়েছিল। আমরা ঠিক সেই মোতাবেক একের পর এক বাসায় সবার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সব ক্ষেত্রেই আমাদের একমাত্র ড্রাইভার ছিলো আমার ছোট মেয়ে। খুব ভালো গাড়ি চালায়। আজকের গল্প লুসির আব্বা জয়নাল দুলাভাইয়ের বাসার।
সকালের দিকেই আমরা দুলাভাইদের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। সকাল থেকেই একটু একটু শীত অনুভব করছিলাম। যদিও আবহাওয়াতা আমেরিকায় এখন গরমকাল কিন্তু ইদানিং প্রায়ই বৃষ্টি হচ্ছে আর সুর্যের দেখাই মিলছে না, ফলে বেশ বাতাস আর ঠান্দাও পড়েছে। দুলাভাই সম্পর্কে কিছু না বললে অনেক প্রেক্ষাপট ভালোমত বুঝা যাবে না। তাই দুলাভাই সম্পর্কে একটু প্রিলিউড না দিলেই নয়।
জয়নাল দুলাভাই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিভাগে কাজ করতেন। খুব সৎ মানুষ ছিলেন। তার পরিবারের ভাই বোনেরা অনেক বড় বর লেবেলে কাজ করতেন এক সময়, তার বড় ভাই বিশ্বব্যাংকেও কাজ করেছে এবং বর্তমানে তিনি আমেরিকাতেই সেটেল্ড। দুলাভাইয়ের আর্থিক সচ্ছলতাও খারাপ না। ঢাকায় তার পাচ তালা একতা বাড়ি ছিল, সাভারে কিছু জমি ছিল, তিনি সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান কারন তার একমাত্র মেয়ে লুসি আমেরিকায় তার স্বামীর সাথে বসবাস করে। লুসিও খুবই ভাল একতা মেয়ে, ভাল বললে লুসির সম্পর্কে খুব কম বলা হবে, তার প্রশংসা সবাই করে এবং তার শশুড় শাশুড়িরা এতোটাই খুশী এবং সুখী যে, সবার কাছে এক বাক্যে একটা কথাই তারা বলেন যে, লুসি তাদের নিজের মেয়েদের থেকেও ভাল।
যাই হক-দুলাভাই এই লুসীর জন্যই আসলে দেশ ছেড়েন। লুসীর স্বামী যেহেতু আমেরিকার সিটিজেন, তারি লুসিঅ দ্রুত আমেরিকার সিটিজেন হয়ে গিয়েছিল। আর সেই সুবাদে দুলাভাই এবং আপাও আমেরিকার সিটিজেন হয়ে গিয়েছেন দ্রুত। লুসীর মা নূরজাহান আপা আমার স্ত্রীর পরিবারের এখন সবার বড় বোন। এই বোনদের মধ্যে ওদের এতোটাই বন্ধন যে, মিটুল যে প্রায় ৫০ এর উপর তার বয়স, এখনো আপারা অকে কাছে পাইলে নিজের হাতে ভাত খাইয়ে দেয়। ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লাগে। আপা এই মুহুর্তে ম্যামোরী লসে ভুগছেন কিছুটা। অনেক কিছগুই মনে রাখতে পারেন না। আগের মতো এতো কথাও বলেন না।
ওনারা সিনিয়ার সিটিজেন হিসাবে সরকারের কাছ থেকে ছোট একটা বাসা পেয়েছেন, সরকারের কাছ থেকেই ওনারা ভরন পষন, চিকিতসার সব খরচ পান। দুলাভাই কিডনির সমস্যায় ভগছে। প্রতি একদিন পর পর ডায়ালসিস করতে হয়। লুসী মাত্র ৩০/৪০ মিনিট (গারির দুরুত্ত) দুরুত্তে থাকে। প্রায় প্রতিদিন আসতে না পারলেও সপ্তাহে ৩/৪ বার লুসি এসে ওর মায়ের আর বাবার সব কাজ, রান্নাবান্না, কাপড় চপ্র ধোয়া, ইত্যাদি করে দিয়ে যায়। দেখলাম একটা মুভেবল সিসি ক্যামেরা লাগান আছে যাতে লুসি তার নিজের বাসা থেকে জানতে পারে বা দেখতে পারে ওর বাবা মাকে। কখন মেডিসিন খেতে হবে এটাও লুসি টাইমমত এই সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে বলে দেয়। ওনারা আসলে বুড়ো হয়ে হয়েছেন বিধায় কোনো কিছুই আর মনে রাখতে পারেন না।
দুলাভাই অনেক অনেক কথা বলতে পছন্দ করেন, এখনো অনেক কথা বলেন। শ্রোতা যিনি আছেন, তিনি তার এই কথা বলাটা কতটুকু পছন্দ করছেন বা বিরক্ত হচ্ছেন এটা তার কাছে মুখ্য বিষয় নয়, উনি কথা বলেই যান। যেহেতু আমি ব্যাপারটা জানি, ফলে উনি কথা বলে যান ঠিকই আমি যে সব কিছু আবার শুনি তাও না। শনার ভান করতে তো আর অসুবিধা নাই। উনিও খুশি থাকলেন, আমার তো ক্ষতি নাই। তবে উনি বেশিরভাগ সময়ে অন্যের গিবত বলেন বিধায় অনেক সময় আমি হু হা করেই ক্ষান্ত থাকি।
ছোট একটা বাসা। লুসি ছিলো না সেদিন দুলাভাইদের বাসায়। আমি, মিটুল, কনিকা, দুলাভাই আর আপাই ছিলাম বাসায়। ঊনারা যেখানে থাকেন এটা প্রায় একটা কলোনি টাইপের বাসা। সরকারী বাসা। সামনে পিছনে সবুজ ঘাসের লন আছে। আর সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে-ঊনার বাসার পাশেই চমৎকার একটা লেক আছে যেটা মেইন নদীর সাথে সম্পৃক্ত। ফলে প্রচুর মাছের আনাগোনাও আছে। আর এই কলোনিতে যারা বাস করেন, তারাই শুধু মাছ ধরার অনুমতি আছে। তাও আবার শুধু মাত্র বর্শী দিয়ে। জাল দিয়ে নয়।
দুপুরের দিকে আমরা এক সাথে খাওয়া দাওয়া করলাম। অনেক যত্ন করেছেন আমাদের দুলাভাই আর আপা। আসার সময় দুলাভাই আবার আমাদেরকে ৫০ ডলার করে গিফটও করলেন। জানি না দুলাভাই এবং আপার সাথে আবার কবে দেখা হবে। বুড়ো মানুষের আসলে সাথী থাকে না। আর যনি থাকেন তিনিও সেই হয় স্ত্রী বা স্বামী অথবা এমন কেউ যিনি নিজেও বুড়ো। দোয়া করি তাদের জন্য, তারা ভালো থাকুক।
পৃথিবী একটাই আর এখানে আগমন একবারই। যিনি চলে যান, তার আর ফেরার কোন সুযোগ নাই। তাই পৃথিবীর সব মানুষ ভালো থাকুক সেই দোয়া করি। বিকালের দিকে আমরা ওনাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার চলে আসলাম।
আবার কবে দেখা হয় কে জানে।
আমার সিডিউলের মধ্যে সর্বপ্রথম (অনাত্তীয়দের মধ্যে) যাদের বাসায় যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল সেটা হল বাংলাদেশে আমার বাড়ির পাশের প্রতিবেশী ফরিদ ভাইদের বাসায় যাওয়া। আর সেটা হয়েছিলো ২২ মে ২০২৫।
বাংলাদেশে আমার বাসার লাগোয়া প্রতিবেশি ফরিদ ভাই এবং মুন্না ভাইয়েরা। অনেক হাসিখুশি, জলি মাইন্ডেড এবং স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ফরিদ ভাই। প্রতিদিন ব্যায়াম করতেন। এখন উনারা আমেরিকার ভার্জিনিয়াতে থাকেন। খুব সুখী পরিবার। আমি আমেরিকায় আসার আগে শুনেছিলাম ফরিদ ভাই অসুস্থ্য কিন্তু কতটা অসুস্থ্য বুঝতে পারিনি। ফলে আমেরিকায় এসে আমি ম্যারিল্যান্ড থেকে প্রায় ঘন্টা তিনেক ড্রাইভ করে ভার্জিনিয়াতে দেখতে গিয়েছিলাম ফরিদ ভাইকে। আমি যাবো শুনে ফরিদ ভাই অনেক খুশি হয়েছেন বটে কিন্ত ফরিদ ভাইয়ের বাসায় গিয়ে মনটা আমার খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ফরিদ ভাই আমার ধারনার বাইরে অসুস্থ্য।
যখন ঊনারা বাংলাদেশে ছিলেন, আমাদের মধ্যে প্রতিদিন দেখা হতো, এক বাসা থেকে আরেক বাসায় খাবারের আদান প্রদান হতো। বড্ড ভালো একটা প্রতিবেশি ঊনারা। এখন বাংলাদেশের সেই বাসাটায় কেউ থাকেন না, শুধু থাকে ভারাটিয়ারা।
আগের রাতে মিটুল ফরিদ ভাবীর সাথে কথা বলে রেখেছিলো যে, আমরা যাবো ভাইকে দেখতে। যখন আমরা ফরিদ ভাইয়ের বাসায় পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় ১১ টা বাজে। সুন্দর একটা আবহাওয়া। গরম নাই আবার একটু একটু ঠান্ডাও আছে।
ফরিদা ভাইদের বাসায় গিয়ে দেখলাম ফরিদ ভাই শুয়ে আছেন একটা মেডিকেটেড বিছানায়। আমার কল্পনাতেও ছিল না ফরিদ ভাইয়ের বর্তমান চেহাড়ার অবস্থা। আমি আসলে জানতাম ফরিদ ভাই অসুস্থ্য কিন্তু কতোটা সেটা আমি সত্যিই অনুমান করতে পারিনি। ঊনার মেয়ে দিবা বাসায় ছিলো, ভাবির সাথে একান্তে কথা বলে বুঝলাম যে, ফরিদ ভাইয়ের লিভারের সমস্যার সাথে ওনার নিউরোজনিত সমস্যাও আছে। ফরিদ ভাই শুকিতে কাঠ হয়ে গেছেন। চোখগুলি দেখলে মনে হয়-একটা কংকালের মধ্যে যদি চামড়া থাকতো আর সেই কংকালের যে চোখ ঠিক যেনো তেমন। আহা রে কত কস্ট যে ঊনার। খুব মায়া লাগলো ফরিদ ভাইকে দেখে। খুব সুন্দর সাস্থ্য ছিলো, প্রতিদিন ব্যায়াম করতেন, একমাত্র সিগারেট ছাড়া আর কোনো নেশা ছিলো না। তাও সারাদিনে হয়তো ৪/৫ তা সিগারেট খেতো। এই মানুষটার এই অবস্থা আমার কল্পনারও বাইরে।
ফরিদ ভাইয়ের চিকিতসা আমেরিকার সরকারই বহন করে। সারাক্ষন দেখভাল করার জন্য সরকার একটা পাকিস্থানি মেয়েকে এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছে। যতোক্ষন ভাবি এবং তার মেয়েরা বাসায় থাকেন, তারা এই পাকিস্থানী মেয়েটার সাথে ফরিদ ভাইকে দেখভাল করেন। দিবার বয়সের সমান অথবা আর ছোট হতে পারে পাকিস্থানী মেয়েটার। বেশ ভদ্র এবং ভালই মনে হল। শুনলাম মেয়েটার নাকি ইতিমধ্যে ৩টা বাচ্চাও রয়েছে। খুব ছোট বেলায় বিয়ে হয়ে গিয়েছিল মনে হয়। ফরিদ ভাবী আমাদের জন্য অনেক পদের রান্না করেছিল। মুরগী, গরু, মাছ, শব্জী, ভর্তা, ডাল, ইত্যাদি। পোলাও করতে চেয়েছিল কিন্তু আমি পোলাও খাই না বলে সাদা ভাতই করেছিলেন। চমৎকার রান্না বান্না ফরিদ ভাবীর। ফরিদ ভাই প্রায় ৮ মাস পরে আমাদের সাথে ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া দাওয়া করলেন। বেশ কয়েক পিস মুরগীও খেলেন। ভাতও খাইলেন। ভাব আর দিবা বলছিল, কি সুখের কথা যে, ফরিদ ভাই প্রায় ৮/৯ মাস পর ডাইনিং টেবিলে বসে সবার সাথে দুপুরের খাবার খাইলেন।
এটাই মনে হয় জীবনের রুপান্তর। মানুষ বেশীদিন বাচে না। কেনো আমরা তাহলে এতো আশা করি? ওনারা ভালোই তো ছিলেন সেই ঢাকায়। বন্ধু বান্ধব ছিলো, লোকালয় ছিলো চেনা, হৈচৈ ছিলো প্রতিদিন, রিক্সার ঝুঞ্ঝুনানী, গাড়ির বিকট হর্নের শব্দ, আজানের সুর আর পাবলিকের কোলাহলের সাথে বড় বড় সাউন্ড বক্সের উত্তাল গানের মাতোয়ারা। ভালোই তো ছিলো ওগুলি।
একটু পর মুন্না ভাই এলেন। ফরিদ ভাইয়ের থেকে বড় উনি। বাংলাদেশে উনি অডিট ডিভিশনে সম্ভবত অথবা ব্যাংকে কাজ করতেন। খুব ভালো মানুষ।
সবার সাথে অনেক আলাপ, কথাবার্তা হল। ফরিদ ভাই একেবারে দেশে ফিরে আসতে চান, আগের সেই ক্লাব, বন্ধুবান্ধব, আত্তিয় সজন, পারাপ্রতিবেশীদের আবার সান্নিধ্য চান কিন্তু উনি তার সাস্থগত কারনে আর কখনোই বাংলাদেশে ব্যাক করতে পারবেন না। খুব আফসস করে বললেন- একটা সময় ভেবেছিলাম, আমেরিকায় গিয়ে কতই না সুখে শান্তিতে আরামে বাস করতে পারবো। কিন্তু আমার এই লাইফের চেয়ে বাংলাদেশের সেই জ্যাম, কোলাহল, হরতাল, রিক্সাওয়ালার ঝুঞ্ঝুনি, লোকার শব্জিওয়ালার হাকানিই অনেক মিস্টি আর সুখের। ছেলেমেয়েরা এখানে থাকতে চায়, এই আমেরিকা শুধু ইয়াং জেনারেশনের জন্য। আমাদের জন্য নয়। যদি কার কন সমস্যা না থাকে, সে যেন আমেরিকায় বা বিদেশে সেটেল্ড না হয়। এটা একতা বিরক্তিকর লাইফ। এখানকার রাস্তাঘাট খুব সুন্দর, বাড়িঘর সুন্দর, আইন কানুন সুন্দর, প্রিবেশ সুন্দর, চাকুরী যখন তখন পাওয়া যায় কিন্তু এই দেশ একতা রবোটিক দেশ। কেউ কার বন্ধু নয়, কেউ কার প্রতিবেশ হয়েও প্রতিবেশ নয়।
আমরা প্রায় ঘন্টা তিন বা চার ফরিদ ভাইয়ের বাসায় ছিলাম। পুরু বাড়িটা ঘুরে ঘুড়ে দেখলাম, সুন্দর বাড়ি। অনেক সপ্নের একটা বাড়ি ফরিদ ভাইয়ের। যার জন্যে তিনি একদিন বাংলাদেশের ৫ তালা বাড়ি ত্যাগ করে, নিজের সমাজকে ছেড়ে, বন্ধু বান্ধব্দের ছেড়ে সেই সুদূর আমেরিকায় চলে গিয়ে একটা বাড়ি কিনলেন, সেই বাড়িটা এখন তার কাছে হাসপাতালের বিছানা ছাড়া যেনো আর কিছুই না। বল্লেন-খুব ক্লাবে গিয়ে সবার সাথে হইচই করতে মন চায়, গোলারটেকের সেই গলিটায় দাঁড়িয়ে পুরান কলিগ আর বন্ধুদের সাথে গল্প করতে মন চায়, বুদ্ধিজীবি শহিদ মিনারের সেই বিশালকায় মাঠের দ্রিশ্য চোখে ভাসে, দেশে চলে আসতে খুব মন চায়, কিন্তু আজ সেই আমেরিকায় বসে একটা মেডিকেটেড খাটের মধ্যে শুয়ে চোখ বন্ধ করে শুধু স্ম্রিতিকে মনে করা ছাড়া আর কনো উপায় নাই। এখন তাদের আর টাকা পয়সার দরকার নাই, ছেলেরা অন্য স্টেটে চাকুরী করে, এক মেয়ে অন্য স্টেটে স্বামীকে নিয়ে বসবাস করে। দিবাও চলে যাবে দ্রুত। শুধু ভাবিই থাকবেন কাছে। এটাই যদি জীবন হয়, তাহলে নিজের সেই পুরান ঘর কি দষ করেছিল?
এক সময় মুন্না ভাই আমাদের থেকে বিদায় নিতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কই যাবেন? মুন্না ভাই বল্ল-ভাই রে এখানে ঘরে আপনি কতোক্ষন একা একা পেপার আর টিভি দেখে সময় কাতাবেন? তার থেকে একটা অফিসে পার্ত টাইম জব নিয়েছি, সেখানে সান্ধ্যকালিন একতা জব করছি, সময়টা কেটে যাচ্ছে আর সাথে কিছু ইনকামও হচ্ছে। অথচ তাদের কনো কাজ করারও কন প্রয়োজন ছিলো না দেশে।
আমি কখনোই আমেরিকায় বা অন্য কনো দেশে হাজার প্রলভনেও মাইগ্রেট করতে নারাজ। আমার দেশ যতোই করাপ্টেদ হক, যতই জ্যামের দেশ হোক, কিংবা নোংরা হক, আমি এ দেশেই থাকতে চাই।
ফরিদ ভাইয়ের বাসা থেকে বিদায় নেবার সময় দেখলাম, ফরিদ ভাই ঘুমিয়ে গেছেন, দেখে খুবই মায়া হলো। অত্যান্ত অসুস্থ্য আসলে ফরিদ ভাই। অনেক দোয়া করি যেনো ফরিদ ভাই সুস্থ্য হয়ে উঠেন। যত দিনই বাচুন না কেন, তিনি যেন ভালভাবে বাচতে পারেন।
বিদেশের জীবন নিয়ে আসে অনেক চ্যালেঞ্জ, অনেক মানসিক বা শারিরীক সংঘর্ষ। আর মানুষ এই সংঘর্শের মধ্যে খুজে নেয় তার পরিবারের মানুষদের জন্য কিছু আনন্দ, কিছু সুখের বার্তা। এই সুখ দুক্ষের পরিবেশে খুব কম মানুষকেই পাওয়া যায় যারা অকপটে নিজের থেকে সামনে এসে বলে-“আমরা আপনার পাশে আছি, কোনো প্রয়োজনে অবশ্যই জানাবেন”। আর এটাই বিদেশ। এখানে কেউ কারো না, কোনো প্রতিবেশিই প্রতিবেশী না, কেউ কাউকে যেন চিনে না, আর চিনলেও কারো কোন দায়িত্তও নাই। এতাই দেখছি প্রতিদিন এখানে এই আমেরিকায়।
চলে আসার সময় ফরিদ ভাবী আবার কি কি যেনো উপহার হাতে তুলে দিলেন। কয়দিন পর আবার দেশে চলে যাব, কে জানে আবার ফরিদ ভাইয়ের সাথে দেখা হয় কিনা। আল্লাহ ঊনাকে সুস্থতা দান করুক।
গত ১৪ তারিখে অর্থাৎ ১৪ মে ২০২৫ তারিখে ছোট মেয়ের কনভোকেশন উপলক্ষে আমি এবং আমার স্ত্রী আমেরিকার বাল্টিমোরে গিয়েছিলাম। প্রায় এক মাসের মতো ছুটি কাটিয়েছি ওখানে। এর আগে আমি একাই ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় গিয়েছিলাম কিন্তু তখন ব্যাপারটা ছিলো অন্য রকম। এবারের ভ্রমনটা শুধু ভ্রমনই ছিলো না, এর সাথে মিক্সড ছিলো হাজার পদের ইভেন্ট, চিন্তাভাবনা এবং পরিকল্পনা। তাই ভাবছি, ক্রমান্বয়ে এসব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে একটা ভ্রমন কাহিনী লিখবো। তারই সুচনায় আজকের প্রথম পর্ব।
ছোট ভাবী মারা গিয়েছিলেন ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে। সময় কত দ্রুত চলে যায় ভাবাই যায় না। দেখতে দেখতে প্রায় ৪ বছরের বেশী পার হয়ে গেলো। ভাবীর সাথে আমার খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিল। খুব ভালো মানুষ ছিলেন ভাবি। দেখতেও সুন্দর ছিলেন। এবার আমেরিকায় গিয়ে ভাবীর বাসাটা দেখলাম যেখানে এখনো ছোটভাই একাই থাকেন।
বাসাটা দেখেই মনের ভিতর খুব ছট করে উঠেছিল এই ভেবে যে, এই বাড়িটার চারিদিকে একটা সময় এই মানুষটা হাটাচলা করেছেন। এখনো নিখুতভাবে পরীক্ষা করলে তার পায়ের চিহ্ন হয়তো পাওয়া যাবে। বাড়িটার দরজায় পরীক্ষা করলে হয়তো তার হাতের ছাপটাও পাওয়া যাবে। দেখলাম, বাড়িটার সামনে বেশ কিছু গাছ লাগানো, গাছগুলি এখন বড় হয়ে গেছে। ভাবি নিজেই লাগিয়েছিলেন গাছগুলি। মানুষটা নাই কিন্তু গাছগুলি এখনো রয়ে গেছে, আর তারা ধিরে ধীরে বড় হচ্ছে। দেখলাম, গাছের টবগুলিতে কিছু কিছু পাথর আর মাটির স্তুপ আছে। একটা পানির টেপও আছে। ইমোশনালি ভাবছিলাম যে, সময়টাকে যদি ব্যাকওয়ার্ড মুভ করে চার বছরের আগে যাই যখন ভাবী জীবিত ছিলেন, হয়তো দেখা যাবে, উনি বাড়ীটার চারিধারে ঘুরছেন, বিকাল বাড়ীটার সামনের সিড়িতে বসে চা খাচ্ছেন, কিংবা শান্ত দুপুরের পরে হাতে কয়েকটা গাছের চাড়া নিয়ে মনের আনন্দে টবগুলিতে গাছগুলি লাগাচ্ছেন। আশেপাশের বাড়ির কোনো প্রতিবেশি হয়তো তাকে দেখতে পেয়ে হাই-হ্যালোও করছেন। ভাবি হয়তো মুচকী হেসে তাকে সম্বোধন করছেন। অথচ আজকে সেই মানুষটা নাই। সবকিছুই আছে, বাড়িটা আছে, সিড়িটা আছে, গাছের টবগুলি আছে, গাছগুলিও আছে, কিন্তু উনি নেই। এটা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।
ছোটভাই নিজেও সেই সব দিনের কথা বলতে গিয়ে অনেকটা ইমোশনাল হয়ে উঠছিলেন। এই বাড়িটা কেনার আগে ভাবী নাকি প্রতিদিন এই এলাকায় এসে বাড়িটার সামনে গাড়িতে বসে থাকতেন। তার এই বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছিল। অবশেষে যেভাবেই হোক, ভাবীর সেই মনের ইচ্ছাটা ছোটভাই পুরন করেছিলেন বাড়িটা কিনে।
ছোটভাই একটা সিগারেট ধরিয়ে দূর পড়ন্ত বিকেলের দূর আকাশের প্রায় ডুবু ডুবু সূর্যের দিকে তাকিয়ে একমনে বলছিলেন-
-জানেন, যখন শিমুলকে নিয়ে আমি আমেরিকায় আসলাম, সাথে দুটু ছেলেমেয়ে। আমাদের খুব অল্প আয় ছিলো। আমার একার আয়ে সংসার চলছিলো না। বাচ্চারাও বেশ ছোট, পরাশুনার খরচ, সংসারের খরচ, নিজেদের খরচ সব মিলিয়ে হাত সব সময় টানাপোড়েনই ছিলো। আজকের দিনের মতো আমার আর্থিক অবস্থা তখন ছিলো না। কোনো উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত শিমুল একটা রেস্টুরেন্টে ক্লিনারের চাকুরি নিয়েছিলো। রেস্টুরেন্টের ফ্লোর, বাথরুম বেসিন ইত্যাদি তাকে ক্লিন করতে হয়েছে। খুব মায়া লাগত আমার। যে মহিলাকে আমি কখনো নিজের বাথরুমটাও ক্লিন করতে দেইনি বাংলাদেশে, সেই মহিলাটা আমাদের সুখের জন্য, একটু আর্থিক অবস্থা ভাল করার জন্য আমেরিকায় এসে পরের ব্যবসার বাথরুম বেসিন ফ্লোর পর্যন্ত ক্লিন করতে হয়েছে। কিন্তু ওর মন খারাপ হতো না। ভালো ইংরেজী বলতে পারত না বলে ভালো কোনো জবেও দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। আজ আমাদের আর্থিক অবস্থার কতই না উন্নতি, কোন ভাবনা নাই এখন টাকা পয়সার, অথচ শিমুল নাই। এখন আমাদের শপেই কত কর্মচারী কাজ করে। বড় আফসোস লাগে মাঝে মাঝে। তার এখনই চলে যাওয়ার সময় ছিলো না আসলে। তার এই বয়সে চিরতরে চলে যাবার কোন কথাই না। কেউ জানতে পারলাম না, সে চলে যাচ্ছে। শিমুল নিজেও কখনো ভাবেনি, তাকে এভাবে অসময়ে চলে যেতে হবে। ওর সবচেয়ে দুশ্চিন্তা ছিল ওর ছেলেকে নিয়ে যে কিনা কোভিডে ভোগছিল। অথচ সিমুল নিজেও করোনায় আক্রান্ত ছিলো। ছেলে লাইফ সাপোর্টে থাকলেও শিমুল নিজেই চলে গেলো সবার আগে।
সবচেয়ে কস্টের ব্যাপারটা হল, আমরা কেহই শিমুলের দাফনের সময় কাছেই ছিলাম না। এটা যে কত বড় ডিপ্রাইভেশন বুঝানো যাবে না। তার ছেলে ফয়সাল করোনায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে লাইফ সাপোর্টে, মেয়ে স্বামী সন্তানসহ আরেক স্টেটে, আমি নিজেও অসুস্থ্য থাকায় সিমুলের কাছে যেতেই পারলাম না। সিমুল পরিবারের কারো সাথেই দাফনের সময় সান্নিধ্য পেলো না। শিমুল কি আমাদের উপর এজন্য খুব রেগেছিল? আমি জানি না। তবে আমি এখন একা একা ভাবি শিমুলের জন্য।
ছোট ভাই আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বাড়ীর সিড়িটার উপর বসে তখনো কথা বলে যাচ্ছিল, আর আমি শুনছিলাম-
-জানেন শিমুল মারা যাওয়ায় আমার পরে সবচেয়ে কার বেশি ক্ষতি হয়েছে?-না, আমি বলতে পারব না, আমি বললাম ছোট ভাইকে।
-শিমুল মারা যাওয়ায় আমার পরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছে জান্নার মেয়ের, তারপর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শিমুলের মায়ের। কারন শিমুল তখন ছোট খাটো কাজ করত যেখান থেকে শিমুল কিছু হলেও টাকা কামাইত। আর সেই কামানো টাকাগুলি শিমুল ওর মাকে পাঠাতো দেশে। আমি যখন শিমুলের টাকাটা ওর মাকে পাঠাইতাম, আমিও ওর অগোচরে কিছু টাকা যোগ করে একটু বেশি এমাউন্টই পাঠাতাম। শিমুল কখনোই ওর মাকে টাকা পাঠাইতে ভুল করতো না। শিমুল মারা যাওয়ার পর শিমুলের মায়ের এই রোজগারটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি মাঝে মাঝে টাকা পাঠাই কিন্তু উনি টাকাগুলি নিজের জন্য খরচ না করে তার ছোট ছেলের জন্য খরচ করে ফেলেন, অথচ তার ছোট ছেলে ইচ্ছে করলে ভাল চাকুরী করে অনেক টাকা কামাইতে পারে। লন্ডন থাকে কিন্তু বড্ড আলসে এবং খাম খেয়ালি জীবন। তাই আমিও আর এখন টাকা পাঠাই না।
জান্নার মেয়েটা শিমুলের সাথে এতোটাই জড়িত ছিলো যে, সে তার বাবা মা ছাড়াই থাকতে পারতো শিমুলের কাছে। জান্নার ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর জান্নার মেয়েটা শিমুলের কাছেই ছিলো। সময়টা ভালই কেটে যাচ্ছিলো। এখন তো জান্নারও একটা বিয়ের দরকার। জান্নার মেয়ের কারনে জান্নারও ভাল বিয়ে হচ্ছে না। অথচ শিমুল থাকলে জান্নার বিয়েটা অনেক আগেই হয়ে যেতো। একটা সময় আসবে-জান্নার মেয়েটার আরো ভোগান্তি বাড়বে। কিন্তু শিমুল থাকলে কোনো ভোগান্তিই হতো না।
কে জানে কার ভাগ্যে কি আছে, বলে ছোট ভাই একটা দীর্ঘশাস ছাড়লেন।
আমি ওনাকে কিছুই বললাম না। শুধু বাড়িটার বাইরের চারিদিকেই কয়েকটা ছবি তুল্লাম। বাড়িটার ভিতরে যেতে ইচ্ছে করে নাই, তাই ভিতরে গেলামই না। অথচ প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাড়িটার সামনে বসে কাটিয়ে গেলাম। ছোট ভাবি ভাল থাকুক, জান্নাতি হন, সে দোয়া করি।
ছোট ভাই তার এই বাসাটায় আমাদের আনার আগে প্রায় ঘন্টা দুয়েক বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরাফেরা করেছিলাম। ছোটভাই যখন প্রথম আমেরিকায় এলেন, কই থাকতেন তিনি সেই বাসাটায়ও নিয়ে গেলেন। এখন সেটা তার নয়, আরেকজন বাড়িটা কিনে বসবাস করে। অদ্ভুত এক জঙ্গলের মতো জায়গা। একটু সস্তা ছিল বাসাটা। আশেপাশে কোনো বসতি নাই।
আসলে ছোট ভাই এখন একেবারে একা। তার জীবনের উপর মনে হয় কোনো দরদ নাই। যখন কিছু জিজ্ঞেস করি, বিয়ে করে অন্তত একাকীত্বকে ঘুচান, কিন্তু উনি সেটা করতে চান না। বয়স তার প্রায় ৬৭ এর কাছাকাছি, এখন এই সময়ে এসে আর সংসারি হইতে চান না। উনি নিজেই বলেন যে, উনার ছেলে আর মেয়ে দুটু খুব ভাল হলেও তার অনুপস্থিতি তাদেরকে একেবারে অসহায় করে ফেলবে। এ জন্য তার বাচতে চাওয়া কিন্তু নিজের জন্য ওনার কিছুই চাওয়া নাই।
সারাদিন দোকানে কাজ করেন, নিজের দোকান। কর্মচারী আছে, তার নিজের ছেলেও দোকানে কাজ করে। দোকানটা মন্দ না। বেশীরভাগ সময় দোকানেই খায়, কখনো বাসি খাবার, কখনো ছেলেমেয়েরা রান্না করে দোকানে নিয়ে আসে, সেগুলিই খান। কন আফসস নাই মনে হয় দেখে। রাতে বাসায় এসে একাই ঘুমান। ছেলে আলাদা থাকে, মেয়েও আলাদা থাকে, আর উনি সেই বাড়িটায় থাকে যেখানে ছোটভাবী থাকতেন।
সময় পান না বলে ওনার গাড়িতে করেই প্রায় ঘন্টা চারেক ঘুরলাম এদিক সেদিক। গাড়িতে বসেই অনেক আলাপ হচ্ছিল। পথিমধ্যে কয়েকটা জায়গায় হল্ট করেছিলাম। তার মধ্যে একটা হলো ডানকিন রেস্টুরেন্ট, পোর্ট এলাকা আর তার বাসা।
পোর্ট এলাকাটা ভীষন সুন্দর। ওখানে প্রায় আধাঘন্টা কাটিয়েছিলাম। এখানকার মানুষগুলি বেশ আনন্দে আছে। বিশাল একটা পোর্ট, লোকাল পোর্ট, পাশেই সি বীচের মতো অনেক রেস্টুরেন্ট, ভ্রাম্যমান খাবারের জায়গা ইত্যাদি।
পোর্ট এলাকাটা একটা অভিজাত আবাসিক এলাকার মতো। এখানকার মানুষ গুলি খুব নিরিবিলিতে বীচের আমেজ অনুভব করেন, ফিশিং করেন, বিকালে পাশের রেষ্টুরেন্ট গুলিতে হয়তো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দেন, বাচ্চারাও পাশের খেলার একটা জায়গা আছে সেখানে আড্ডা দেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এখানের প্রতিটি বাড়িই যেনো রিজোর্ট। আমি জানি না আসলেই এগুলি রিজোর্ট হিসাবে কেউ ভাড়া নেয় কিনা, তবে বাড়িগুলির বারান্দার এরেঞ্জমেন্ট দেখে মনে হয়েছে, হতে পারে।
ছোটভাই আমাদেরকে কোনো গিফট কিনে দিতে পারেন নাই বিধায় আমার জন্য, মেয়ের জন্য, আবিরের জন্য আর মিটুলের জন্য এক হাজার ডলার গিফট করলে। টাকাটা নিতে চাইতে মন চাচ্ছিলো না। কারন আমার আসলেই দরকার নাই। কিন্তু ছোটভাই একজন ভাল মানুষ, হয়তো এটাতে উনার একটা আনন্দ আছে। তাই নিলাম।
ছোট ভাই আসলে একজন অতি সাধারনভাবে চলাফেরা করা মানুশ। ভালো মানুষ।
গত ২৪ জুন ২০২৫ তারিখে সারা দেশ ব্যাপি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বাঙলা কলেজে কেন্দ্র পড়েছে এমন একটি মেয়ে পরীক্ষা শুরু হবার প্রায় পৌনে দুই ঘন্টা পরে পরীক্ষা কেন্দ্রে এসে পরীক্ষা দেয়ার আবদার করে। স্বাভাবিক ভাবেই বাঙলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল যিনি আমার বউ, সে কনভাবেই আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পৌনে দুই ঘন্টার পর কাউকে পরীক্ষা দিতে সে পারে না। তাই মেয়েটির আর ১ম পরীক্ষা দেয়া হল না। কলেজের ভিতর অনেক সাংবাদিক, অনেক সুশীল জনতা সহ আরো অভিভাবকগন ছিলেন। মুহুর্তের মধ্যে মেয়েটির পরীক্ষা না দিতে পারায় সোস্যাল মিডিয়া ভাইরাল হয়ে যায়, সাথে আমার স্ত্রীও। অনেকের অনেক আবেগঘন স্ট্যাটাস, অনেক কথাবার্তা, অনেক কেচ্ছা কাহিনি আর মনতব্যে সোস্যাল মিডিয়া ভরে উঠে-কেনো একটু দয়া করা গেলো না, কেনো মেয়েকে পরীক্ষা হলে ঢোকতে দেয়া হল না, কি হতো যদি একটি মানবিক কারনেই তাকে পৌনে দুই ঘন্টা পড়েও পরীক্ষা দিতে দেয়া উচিত ছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ আইনটা জানে, কেউ জানে না। কেউ বেশি আবেগি, আবার কেউ বোকা। ফলে জেনে, না জেনে, আবেগে যাচ্ছেতাই মন্তব্য করেই যাচ্ছে যেন এটা কলেজ অথরিটি কোন মহা অন্যায় করেছে দেরী করে আসা মেয়েটিকে পরীক্ষা দিতে না দেয়ায়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই পোশট সোস্যাল মিডিয়ায়।
———————————
আসলেই শিক্ষক বা কলেজের মানবিকতা দেখানোর কোনো সুযোগ নাই। @Myeen Uddin সাহেব লেখকের এই লেখার সাথে আমি আরো যোগ করতে চাই যে,
(১) যদি কলেজ অথরিটি পরীক্ষার দেড় ঘন্টা পরে আইনের তোয়াক্কা না করে পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার হলে ঢোকিয়ে পরীক্ষা নিলেন, তাহলে যে কয়টি প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন তা হলো:
(ক) কোন ক্ষমতার বলে অথরিটি এটা করলেন? তাদের কি সেই ক্ষমত ছিলো? সত্য কথা যে, তাদের সেই ক্ষমতা নাই। তাহলে নিলেন কিভাবে? এই প্রশ্ন কি আসতো না? এই সুশীল সমাজ এবং সাংবাদিকগনই আবার চোখে আংগুল দেখিয়ে প্রশ্ন করতেন।
(খ) তখন এই সুশীল মহল এবং সাংবাদিকগনই আবার এই প্রশ্নও তুলতেন যে,- নিশ্চয়ই এখানে বিপুল অংকের টাকায় প্রশ্ন পত্র ফাস বা ছাত্রির কাছ থেকে বিপুল কিছু গ্রহন করা হয়েছে।
(গ) যেহেতু প্রথম ৩০ মিনিটের মধ্যে MCQ পরীক্ষা শেষ হয়ে অই শেশনটাই ক্লোজ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে কলেজ অথরিটি একস্ট্রা প্রশ্ন পাবেন কোথায় পরীক্ষা নেয়ার জন্য?
এবার আসি ভিন্ন একটা এংগেলেঃ
(২) মেয়েটির মা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এইটাই বা কলেজ প্রমান করবে কিভাবে? হাসপাতালে তার মাকে ভর্তি করানোর অন্তত একটা ভর্তি স্লিপের স্ক্রিন শট কিংবা তার মায়ের ভর্তি অবস্থায় তোলা একটা ছবিও তো কলেজ অথরিটিকে দেখাতে পারতো।
(৩) মেয়েটির এমনিতেই দেড় ঘন্টা দেরি হয়ে গেছে। তার পেরেন্ট কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে একেবারেই কাছে ছিলো। সেতো তার পেরেন্ট কলেজের যে কোনো একজন শিক্ষককে সাথে নিয়েও আসতে পারতো যাতে শিক্ষক টু শিক্ষক ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করা যায়। মেয়েটি সেটা করতেনি। হয়তো অনেকে বল্বেন-মায়ের এই অবস্থায় তার মাথা ঠিক ছিলো না, বা বুদ্ধিতে আসে নাই। কিন্তু মেয়েটি ঠিকই তার এক খালাকে সাথে নিয়ে এসছেন। সেটাই যে তার খালা সেটাও কিন্তু কলেজ অথরিটির পক্ষে প্রমান করা সম্ভব না।
অনেকেই মানবতা, দয়া কিংবা অধিকারের কথা বলে ফেসবুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন। পরীক্ষার ফি জমা দিয়েছে তো দেরী করে এলেও তার অধিকার আছে হলে বসার ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলি কোনো যুক্তি না। প্লেনের টিকেট কেটে টাইমমত এয়ারপোর্টে যাইয়েন না, দেইখেন প্লেন আপনার জন্য অপেক্ষা করে কিনা আর করলে কতোক্ষন। সব কিছুর একটা নিয়ম আছে।
হ্যা, মেয়েটির এখনো বাকি পরীক্ষা গুলি দেবার সুযোগ আছে। এর মধ্যে সে যদি তার মায়ের এই অকাল এক্সিডেন্টের কথা উল্লেখ করে শিক্ষা বোর্ডের কাছে একটা পরীক্ষার জন্য রি-এপ্লাই করে, সরকার হয়তোবা আরো অন্যান্য ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীর সাথে তারটাও গ্রহন করে সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু কলেজ শিক্ষকগন কিংবা কলেজ অথরিটির পক্ষে কোনো কালেও সম্ভব না।
Mayeen Uddin: এর লেখা
আজ মেয়েটির ছবি ভাইরাল।
মা স্ট্রোক করায় হাসপাতালে পৌঁছে দিতে গিয়ে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দেরি হয়। সে জন্য তাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ভিডিওতে মেয়েটির চোখের জল দেখে আমারও বুক ভেঙে যাচ্ছে। অনেকে পরীক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকদের কঠোর সমালোচনা করছেন, কেউ কেউ গালাগালিও করছেন। অনেকেই বলছেন, “মাত্র এক ঘণ্টা তো! মানবিক কারণে পরীক্ষা দিতে দেওয়া উচিত ছিল।” কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা শিক্ষকরা অনেক সময় ‘অমানবিক’ হতে বাধ্য হই, কারণ আমরা আসলে অক্ষম।
আমাদের এই অক্ষমতার পেছনে রয়েছে —সরকারের নীতিমালা, শিক্ষা বোর্ডের বিধি আর পাবলিক পরীক্ষার কঠোর আইন। এই আইন আমাদের এমনভাবে বেঁধে রেখেছে যে, মানবিকতা দেখানোর ক্ষমতাটুকুও আমাদের হাতে নেই। পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের পরে কাউকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া যায় না — এটা আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা।
যেমন এইচএসসি পরীক্ষায় দুটি অংশ থাকে — MCQ ও CQ। MCQ অংশ চলে প্রথম ৩০ মিনিট। এরপর সেই উত্তরপত্র উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং CQ পরীক্ষার শুরু হয়। এই নির্ধারিত সময়ের পরে কেউ কেন্দ্রে এলে শিক্ষক কীভাবে তাকে নতুন করে MCQ প্রশ্ন দেবে?
শিক্ষকের হাতে সে ক্ষমতা নেই।
তাহলে প্রশ্ন হলো — মানবিকতার জায়গাটা কে দেখবে?
সেই দায়িত্ব কি শিক্ষা বোর্ড বা সরকারের নয়? সরকার চাইলে এই মেয়েটির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় তার বিষয়ে ‘অটোপাশ’ দিতে পারে। আমাদের হাতে সেই সিদ্ধান্ত নেই।
আমি একবার একজন ব্যাংকারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“একজন মুমূর্ষু রোগীর অপারেশন করতে আজই ১০ লাখ টাকা দরকার। আপনি জানেন, সে পরদিন টাকা ফেরত দেবে। আপনার ক্যাশে কোটি কোটি টাকা আছে — আপনি কি তাকে মানবিক কারণে এই টাকা দিয়ে দিতে পারবেন?”
উত্তর ছিল, “না, নিয়মে নেই, সম্ভব না।”
এই যেমন একটা প্রাণের প্রশ্ন, তেমনই পরীক্ষা নিয়েও নিয়মের বাঁধনে আমাদের হাতে কিছুই থাকে না। কিন্তু তবুও বলি —
পরীক্ষা মাত্র এক বছরের, আর জীবন একটাই।
মানবিকতার জায়গাটুকু যেন আইনের বাইরে না পড়ে — এই হোক আমাদের প্রার্থনা।
গতকাল ১২/৬/২০২৫ তারিখ বিকাল সাড়ে চারটায় বিমান বন্দরে ল্যান্ড করেছি আমেরিকা থেকে। বাসায় আসতে আসতে প্রায় ৭ টা বেজে গিয়েছিলো। অতঃপর গোসল করে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। গত এক মাসের একটা ভ্রমন ফিরিস্থি লিখবো লিখবো করে সময় করে উঠতে পারছি না। ভাবলাম, প্রতিদিন একটু একটু করে আমার এবারের আমেরিকা ভিজিটের অভিজ্ঞতাটা লিখবো।
পর্ব-১ঃ
গত মে মাসের ১৪ তারিখে আমার ছোট মেয়ে সানজিদা তাবাসসুম কনিকার অনার্স শেষে কনভোকেশনের অনুষ্ঠানে আমেরিকায় গিয়েছিলাম। গতকাল অর্থাৎ ১১ জুন ২০২৫ তারিখে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম।
প্রায় এক মাস আগে….
এসেছিলাম ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টিমোর কাউন্টি (UMBC) তে ছোট মেয়ের অনার্স শেষে কনভোকেশন অনুষ্ঠানে। সবকিছু খুব দ্রুত পেরিয়ে গেলো। ছোট মেয়ে সানজিদার অতুলনীয় সার্ভিস না থাকলে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে (নায়েগ্রা, লাসভেগাস, রিনু, নেভাদা, পেন্সিলভিয়া, ভার্জিনিয়া, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, এবং আরো অনেক দর্শনীয় স্থান) ঘুরাই হতো না। ধন্যবাদ মা আমার।
আজ ফিরে যাচ্ছি দেশে। মনটা কষ্ট এবং আনন্দের দোলাচালে কেমন যেনো অস্থির। ছোট মেয়েকে আবারো ফেলে যাচ্ছি একা আমেরিকায়। ইউনিভার্সিটির অনার্স শেষেই অনেক ভাল একটা জবে ঢোকেছে। তাকে থাকতেই হচ্ছে। অনেক কষ্ট লাগছে ভিতরে। সন্তান বড় প্রিয় জিনিষ। এয়ারপোর্ট থেকে মেয়েকে বিদায় দিতে চোখের অশ্রু তাকে দেখাতে চাইনি বলে জড়িয়ে ধরে শুধু বলেছিলাম-ভালোবাসি ততটুকু মা যতটুকু একজন পিতা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারে তার আদরের সন্তানকে। অন্যদিকে দেশে ফিরে যাচ্ছি এতেই মনটা আবার ভালোও লাগছে। এমনই একটা দোলাচলে ছিলাম আজ থেকে ৪৮ বছর আগে যেদিন গ্রাম থেকে ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম। একদিকে গ্রাম ছাড়ার কষ্ট, অন্যদিকে ক্যাডেট কলেজে পদার্পনের আনন্দে। অশ্রুসিক্ত নয়ন, মেকী হাসির ঠোটের অন্তরালে অন্তরের কষ্টের যে অনুভুতি তা কি আনন্দের আকি বিষাদের সেটা বর্ননা করা কঠিন।
বড় মেয়েও তার স্বামীকে নিয়ে এই ফাকে সিংগাপুর- মালয়েশিয়ায় ঘুরছে। প্রতিদিন কথা হচ্ছিলো ওদের সাথেও কিন্তু কোথায় যেনো সেখানেও একটা দোলাচালে ছিলাম। কথা হয়, ভিডিওতে দেখা হয় অথচ এক টেবিলে বসে খাওয়া হয় না, আড্ডা হয় না। জীবনটা মনে হয় এমনই। বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, ওদের আবদার, ওদের দুষ্টুমি, ওদের জালাতন একদিন ধীরে ধীরে কমতে কমতে এমন জায়গায় নেমে আসে যেনো আমরাই ওদের কাছে বাচ্চা মানুষ। একদিন যে ছোট ছোট বাচ্চাগুলিকে সবকিছু থেকে আড়াল করে রাখতাম, এখন এই বয়সে এসে দেখলাম, ওরাই হাত ধরে রাখছে আমাদের। এ যেনো কি স্বর্গীয় এক অনুভুতি। এই বুড়ো বয়সে এসে সন্তানদের কাছে নিজেরা বাচ্চাদের মতো হয়ে যেতে মন্দ লাগে না। আমরা আসলেই এই বয়সে আগের মত আর সেই শক্তি, মনোযোগ আর সাহস থাকে না। সন্তানের হাত ধরে হাটা যে কত নিরাপদ তা খুব অনুভব করি। তাই মনের এবং অন্তরের অন্তস্থল থেকে দোয়া বেরিয়ে আসে প্রতিটি ক্ষনে যেনো ওরা থাকে সর্বদা নিরাপদ, সুসাস্থ্যে এবং সুখীতে।
বাংলাদেশ থেকে আসার টিকিট ছিল ইকোনোমি ক্লাশে। বুঝতে পারিনি এক নাগাড়ে ২২/২৩ ঘন্টা ফ্লাইটের অস্বস্থি এবং অস্থিরতা। ছোট মেয়ে সম্ভবত ব্যাপারটা উপলব্ধি করেছিল। আজ যখন এয়ারপোর্টে চেক ইন করি, টিকেট চেক করে দেখি-কখন কবে কিভাবে যে সেটা বিজনেজ/প্লাটিনাম হয়ে রয়েছে। মেয়েকে জিজ্ঞেস করতেই মুচকি হেসে বল্লো-তোমাদের এত বড় জার্নিটায় তোমাদের আসার সময় নিশ্চয় কষ্ট হয়েছিল, আমার সেটা ভাল লাগেনি আব্বু। তাই তোমাদেরকে এই সারপ্রাইজটা দেয়া।
মেয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু মুচকী হাসলাম। টিকেটটা চেঞ্জ করাই মুখ্য ব্যাপার নয়, আমাদের এই বুড়ো বাবা মায়ের আনকম্ফোর্ট বিবেচনা করে মেয়ে আমাদেরকে কম্ফোর্ট দেয়ার জন্য কিছুই না জানিয়ে হাফ মিলিয়ন টাকা খরচ করতেও দিধা করেনি। এটাই হয়ত সন্তানের ভালোবাসা।
আমি তোমাদের ভালোবাসি মা।
তারপরেও মানুষের জীবন চলেই যায়। কেউ একা একাই চলে যায় এবং কাউকে কনো প্রভাব বিস্তার না করেই চলে যায় নীরবে, নিঃশব্দে। আবার কেউ এতোটাই শোরগোল করে যায় যে, তার টালমাটাল পরিস্থিতিতে যারা বেচে থাকেন, তাদের জীবনকে অনেকটাই নাড়িয়ে দিয়ে যায়। যেনো সেই ঢেউয়ের মতো যা সৃষ্টি করেছিলো অজানা গন্তব্যে চলে যাওয়া কনো স্টীমার আর পিছনে ফেলে গেছে পানির উপর তৈরী করা ঢেঊ যা কিনা সেই স্টীমারের চলে যাওয়ার পরেই নদীর তীরে এসে তীরকে কাপিয়ে তোলে।
যারা একবার চলে যায়, তারা সামিয়ীক সময়ের জন্য সবাইকে একটু নারা দিয়ে গেলেও সময়ের আবর্তে ঠিক যখন সময় থিতু হয়ে আসে, তখন যিনি চলে গেলো তাকে নিয়ে আর কোন কিছুই কেপে উঠে না। সে এই অদ্ভুত প্রিথিবীতে ছিলো কিনা এটাই আর প্রমান করা যায় না। মৃতদের ভীরে সে এক খন্ড কদাকার মাটির মতো আনাচে কানাচে কিংবা নদীর ঘোলাটে পানির মধ্যে মশে একাকার হয়ে কোথায় যে হারিয়ে যায়, তা এ জগতের কেহই আর তার অস্তিত্ব খুজে পায় না। গুটিকতক নামকরা ব্যক্তিত্ব ছাড়া আর কেহউ স্মরণীয় হয়ে থাকে না। এক সময় সেই স্মরণীয় ব্যক্তিত্বরাও কালের সুগর্ভে একেবারে হারিয়ে যায়। কোথাও আর কেউ থাকে না। ফলে আজকের অরু, সৌম্য, আকাশ, মাধুরী এরা শুধু বর্তমানকে ঘিরেই যতো ইমোশন, প্রেম, হিংসা, দুসচিন্তা কিংবা পরিকল্পনায় নিমজ্জিত থাকে। আর এদের এইসব ইতিহাস প্রোথিত থাকে প্রতিটি এফেক্টেড চরিত্রের ডিএনএ তে। বড্ড আফসোস হয় আমার এজন্য। এতো সুন্দর একটা প্রিথিবীতে কেউ বেশীদিন এর নীলাকাস, এর ঝড়ো হাওয়া, এর সবুজ বনায়ন কিংবা জোস্নার মৃদুমন্দ আলোছায়ার অভিব্যক্তি বেশীদিন উপভোগ করার আগেই চলে যেতে হয়। পারতো না কি সেই অদৃশ্য স্রিষ্টিকর্তা আমাকে বা তাদেরকে আরো হাজার বছর জীবিত রেখে এই জীবনের পুর্ন সাধ উপভোগ করাইতে? পারতো। কিন্তু সেটাও তার এক লীলাখেলা।
কি জানি হতে পারে এ সবই কোনো বৃহৎ খেলার একটা পর্বে আমরা বিচরন করছি। আর এই পর্বের পরে হয়তো আরো কোন পর্ব তো আমাদের জন্য রয়েছেই যার কনো তথ্য আমাদের কাছে নাই। সেই পর্বে কি কখনো আমার সাথে এসব মানুষের সাথে আবার দেখা হবে? দেখা হবে কি অরুর সাথে, সানার সাথে কিংবা এখন যারা আমার আশেপাশে আছে তাদের সাথে?
বুঝিনি কখন কবে হার্ট এটাক হয়েছিলো অথচ বারবার একই রকমের উপসর্গ আমি উপভোগ করেছি বহুবার। এটা যে আমার জীবনে এতোবড় একটা সর্বনাশী এবং ভয়ংকর কিছু বাসা বেধেছে, সেটা আমি বুঝিনি। কিন্তু যখন বুঝেছি, আমি শুধু মুচকী হেসেছিলাম। ভয় তো পাইইনি বরং মনে হয়েছে-বাহ, এটা কি সেটাই যেটা মানুষ বারবার ভয়ংকর ভাষায় তার বর্ননা দেয়?
বড় মেয়ের শসগুড় বাড়ী বেড়াতে যাওয়ার ঠিক প্রাক্কালেই আমি গাড়িতে বসে এতোটাই অসস্থি বোধ করছিলাম যে, পুরু ভ্রমনটাই আমার সুখের ছিলো না। পথিমধ্যে কয়েক জায়গায় থেমে চা সিগারেট খেয়েছি। আর ঘন ঘন প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করে ইরেগুলার ওসারটিল নামে একটা প্রেসারের মেডিসিন খেয়েই চলেছি। কিন্তু ভিতরের যন্ত্রনা বা একটা জলন্তীভাব আমার কিছুতেই কাটছিলো না। সিরাজগঞ্জ গিয়ে প্রেসার মেপেও খুব একটা সুরাহা যে করতে পেরেছি সেরকমও হয় নাই। মেয়ে ডাক্তার, মেয়ের জামাই আবির ডাক্তার, তারাও যে খুব একটা অভিজ্ঞ মতামত দিতে পেরেছে তেমনটা নয়। ওখানে যাওয়ার পর একতার পর একটা সিগারেটও খেয়েছি। তিন দিন ছিলাম ওখানে, এই তিনদিন মোটেও আমি সুস্থ্য ছিলাম না কিন্তু কাউকে বলারও প্রয়োজন মনে করিনি। অতঃপর ব্যাপারটা এমনি এম্নিই যেন ঠিক হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু গত অক্টোবরে সকাল বেলায় হটাত করে আমার ঘুম ভেংগে যায় প্রচন্ড একটা অসস্থি অনুভবে। মনে হচ্ছিল-বুকের কোথায় যেন জ্বলছে কিন্তু কোন ব্যথা নাই। ভাবলাম, হয়ত অন্য কোনো কারন। টাইলসের মধ্যে পেট উপুর করে দিয়ে শুয়ে জ্বলা জ্বলা ভাবটায় একটু শিতল করার চেষতায় বুক উপুর করে শুয়ে ছিলাম, লাভ হয়নি। ঠান্ডা পানি দিয়ে বুক ভিজিয়েছি যাতে বাইরের ঠান্ডা পানিতে যদি একটা ভাল লাগে, সেটাও খুব একটা লাভ হয়নি। চা, কফি খেয়ে একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিলো, ওই সেদিন যেদিন সিরাজ গঞ্জ গেলাম, যেমন একটা অনুভুতি হয়েছিল, আজকের অনুভুতিটাও প্রায় সে রকমের। ভয় পাই নি কিন্তু ভালো লাগছিলো না। মাঝে মাঝেই প্রেসার মাপছি, কিন্তু প্রেসারের যে খুব একটা হেরফের তাও না। ওসারটিল খাচ্ছি বারবার। খেলে একটু ভালো লাগে, আবার একটু পরেই কেমন যেন আগের জায়গাতেই চলে আসি। এভাবে টাইম চলতে থাকে। সকালে নাস্তা করি, গোসল করি, আবারো সব কাজ নরম্যালই করতে থাকি। অফিসের জন্য বেরিয়ে যাই। তখন সকাল প্রায় ৯ টা।
অফিসে যাওয়ার রাস্তার একদিকে সেনানীবাস, আরেক দিকে আমার অফিসে যাওয়ার সরাসরি রাস্তা। আর সেই জায়গাটার নাম “র্যাংক্স”। ওখানে এসে মনে হলো-একটু ডাক্তার দেখাইয়াই যাই সিএমএইচ থেকে। যেই না আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম (লেঃ কর্নেল আমিন) সে আমাকে দেখেই বল্লো-স্যার আপনি কি অসুস্থ? কোনো দেরী না করে আমিন আমাকে সাথে সাথে নিয়ে গেল ইমার্জেন্সীতে। অতঃপর সিসিইউ এবং অতঃপর অপারেশন থিয়েটার। শোনা গেল যে, আমার হার্ট এটাক হচ্ছিলো। হার্ট এটাকের ট্রপিনিয়ন এর কাট অফ রেঞ্জ থাকার কথা ৪৭ আর সেখানে আমার ট্রপিনিয়ন ছিল ২২০০০। ডাক্তার আমাকে প্রশ্ন করেছিলো-আমার কি এর আগেও এটা অনুভুত হয়েছিলো? বুঝলাম-ওই যে সেদিন সিরাজগঞ্জ যাওয়ার সময় যে জলন্তীটা হয়েছিলো, সেটা আসলে ছিলো আরেকটা হার্ট এটাক।
এই যে উপরের গাছটা দেখছি, এটা একটা নির্জন জলঘেরা ছোট টিলার উপরে দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকে জল, আশেপাশে কোথাও কনো বাড়িঘর নাই। অথচ এমন নয় যে, এই গাছটার নীচে কেউ পদার্পন করেনি, কেউ এর ছায়ার তলে বসে নি। কে কখন বসেছে এর হিসাব আমার আপনার কাছে না থাকলেও হয়তো এই গাছটার কাছে আছে কিন্তু তাদের কথা ওর মনে রাখারও দরকার নাই। কখনো যদি আবার সেই পুরানো পথিক আরেকবার এসে তার নীচে বসে, হয়তো নিঃশব্দে নীরবে মুচকী হেসে দিয়ে বলতেও পারে-অনেকদিন পরে এলে। আমিও একবারই এখানে এসেছিলাম। আবার কখনো সেখানে যাওয়া হয় কিনা কে জানে?
এ রকম অনেক কথা আমার মনে হয় আর আমি বারবার ব্যথিত হই। এতো অল্প একটা সময় নিয়ে কেনো আমাকে আমার ঈশ্বর এখানে পাঠালো? আমি যে ঘরটায় থাকি, এখানে এক সময় বিশাল গর্ত ছিলো, সেই গর্তে অনেক পানি ছিলো, পানিতে অনেক মাছ, শ্যাওলা, কচুরীপনা, অনেক পোকামাকড়ও ছিলো। আজ এখানে কোন জল নাই, কোনো মাছ নাই, কোনো পোকামাকড়ও নাই। আমি আছি বিশাল একটা সাততলা অট্টালিকা বানিয়ে। এমনো তো হতে পারে, আমি যখন থাকবো না, তখন এটা অন্য কারো দখলে অন্য কারো আবাসস্থলে পরিবর্তন হবে। আমি যেখানে খাট পেতে ঘুমাই, হতে পারতে সেখানে আরেকজন, আমি যাকে চিনি না, সে ঘুমুচ্ছে। এমনত হতে পারে সে আমার বংশের কেহই নয় অথচ এই বাড়িটা আমি করেছি, আমার হাতের শতভাগ ছোয়ায় প্রতিটি ইট দাঁড়িয়ে আছে।
আবার এমনো তো হতে পারে, কন এক সময়ের বিবর্তনে আবার সেই মাছেরা, সেই জলের ধারা, আবার সেই পোকামাকড়ের বংশ ধরেরা ফিরে এসছে আমার এই স্থাপনার উপরে!! জীবন কতটা বৈচিত্র্যময় নাহ? যে ঘরটায় বসে, শুয়ে আমি কল্পনার রাজ্যে ভেসে যেতাম, সেখানে আমার আগে হয়তো যেমন কোনো প্রানি রাজত্ব করেছে, মাঝে আমি করেছি, আমার পরে হয়তো কেউ করবে। আমরা আসি, যাই, কেউ আবার এর জায়গা দখল করে, তারাও চলে যায়, আবার নতুন কেউ আসে।
কি অদ্ভুত জীবনের চক্র।
একই বংশে জন্ম গ্রহন না করেও, বৈবাহিক কোনো সম্পর্কের দ্বারা কেউ কোনো বংশীয় আত্মীয়তা না করেও এই সমাজে এবং এই জগতে এমন কিছু মানুষ অন্য কারো সাথে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যেনো তারা জনম জনম ধরে একই সূত্রে গাথা, যেনো বংশের চেয়েও শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ। আবার এমনো দেখা যায় যে, একই বংশ, একই পরিবার হওয়া সত্তেও সময়ের আবর্তনে এবং যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারনে কেউ কেউ নিজের বংশ থেকেও আউট হয়ে গিয়ে অপরিচিত মানুষে রুপ নেয়। আবার এমন কেউ কেউ আছে দেশ স্থানান্তরের কারনে, কালচারাল বিবর্তনের কারনে কেউ কেউ আজীবিনের জন্য বংশের ট্রি থেকেই হারিয়ে যায়। ফলে কেউ কেউ ফ্যামিল হয়েও ফ্যামিলির কেউ থাকেন না, আবার কেউ কেউ ফ্যামিলির কিছুই না হয়েও যেনো ফ্যামিলির থেকে অনেক বেশী শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ থাকে বংস পরম্পরায়।
আমার বংশের মধ্যেও ঠিক এমনটা হতে দেখছি এবং দেখেছি। আমি যে গ্রামে থাকতাম, সেখানে আমি কাউকে কাউকে মামা, খালা, চাচা কিংবা কোনো না কোনো সম্বোধনে ডাকি। কিন্তু আসলেই তারা আমার মামা কিনা, চাচা কিনা, কিংবা খালা কিনা আর হলেও সেটা কিসের ভিত্তিতে সেটা আমার জানাও নাই। যদি পুরু জিনিষটার ব্যাকওয়ার্ড বাটনে টীপ দিয়ে পিছনে যাওয়া যায়, হয়তো দেখা যাবে-সেই অতীতে আমারই বংশের খুব কাছের কেউ কেউ এরা ছিলো। সেই ধাবাহিকতায় শত বর্ষ পরে তাদের সম্পর্কের রেশ ধরে আজিকার এই খালা কিংবা চাচা কিংবা মামার সম্পর্কটায় দাড়িয়েছে। আমরা হয়তো এটা জানিইনা যে, ওরা আমাদের এমনি এমনি ডাকা চাচা, খালু, মামা নয়। এই চাচা, মামা খালা ডাকার পিছনে সেই অতীতে আমাদের পূর্ব পুরুষদের মধ্যেই কাছের সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। কিছু একটা ভীত তো আছেই।
আমি যখন এই ভীতগুলির পিছনে খোজ খবর নিতে থাকি, তখন এমনি এমনি ডাকা চাচা, খালু, মামাদের আমার বংশের আসল বন্ধন গুলির ভীত দেখে এতোটাই চমকে উঠেছিলাম যে, সেই এমনি এমনি ডাকা সম্পর্কগুলি আমার কাছে নতুন করে এসে আবার আরো কাছে কিছু মানুষে পরিনত হয়েছিলো। তখন শুধু একটা কথাই মনে হয়েছে-আহা, এরা আমার সেই দাদার নানির দাদার বংশের লোক!! কতই না কাছের। অথচ আমরা তা জানিই না।
আমার সময়কাল থেকে শুরু করে আরো ৫০ বা ১০০ বছর পরেও এই সাইক্যালের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, কেউ আমার বংশ থেকে হারিয়ে যাবে, কেউ নতুন করে যোগ হবে। আজকের ভাই, বোন কিংবা চাচা, খালুর বংশ ধরেরা যখন একে একে শাখা প্রশাকাহ বিস্তার করতে করতে দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে যাবে, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ভিত্ত গাড়বে, আর এই সম্পর্কের ধারায় যখন আমরা একে একে চাচাতো ভাই, তো খালাতো বোন কিংবা এ ধরনের ধ্রাবাহিকতায় সম্বোধন করতে থাকবো, কোনো এক সময় কিংবা যুগের পর যুদ, শত বছরের পরেও আমরা সেই সম্পর্কের জের ধরে কেউ কেউ না জেনেই কাউকে খালু, চাচা, ভাই, দাদা নানা বা খালা হিসাবে সম্বোধন করবো, সেই সময়ে আমরা হয়তো জানবোই না কেন আমরা কাউকে খালা বলছি, বা নানা বলছি বা চাচা বা মামা। আসলে এরা কোনো না কোনো সময়ে সেই প্রাচীন আমলে হয়তো আমাদের আপন জনের কেউ ছিল। এখন যা আমরা আর মনে রাখিনি।
(বিএনপি নির্বাচনের ৬ মাস পরেই ক্ষমতা হারাবে)
গত বছরে উগান্ডা সরকারের পতন হইছে। সরকার প্রধান পালাইয়া গেছে পার্শবর্তী দেশ ভুগান্ধায়। তাদের এবং ভুগান্দার আশ্রয়ে থাকা নায়িকা সহ তাদের চেলাপেলারা অনেক চেষ্টা তদবীর চলছে যাতে উগান্ডায় একটা পলিটিক্যাল অস্থিরতা চালাতে পারে কিন্তু উগান্ডার দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, উগান্ডার দেশপ্রেমিক জনগন এবং উগান্ডার একমাত্র বিশ্ববরেন্য নোবেলজয়ী ক্ষমতায় থাকায় পতিত সরকার খুব একটা খারাপ কিছু করতে পারেনি। তবে তাদের চেষ্টা অব্যহত আছে। কিন্তু একটা জিনিষ একেবারেই দৃশ্যমান যে, এই কঠিন প্রতিকূল অবস্থাতেও পতিত সরকার তাদের দলকে উজ্জীবিত করার বা শরব হবার হাল ছাড়েনি। অন্যদিকে ঠিক এই সময়ে ভুত ভবিষ্যত চিন্তা না করে গত দেড় যুগ আমলে নিবু নিবু একটা রাজনৈতিক দল (বিনুপিন্ডি) এমন আচরন করছে যেনো ওরা না জানি কত হেডামওয়ালা দল, তারা সারাক্ষন উলটাপালটা কথাবার্তা বলে পানি ঘোলা করছে।
কেয়ারটেকার সরকার ইতিমধ্যে উগান্ডার জনগনের মনে এমন একটা স্থান করে নিয়েছে যে, মানুষ আর কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা করে না, তারা চায় এরাই থাকুক আরো কয়েক যুগ, মানুষ ভালো আছে, বিনিয়োগ আসতেছে, সুযোগ তৈরী হচ্ছে প্রতিদিন যা মানুষের চাওয়া ছিলো তারা মুটামুটি সেটা পাচ্ছে। রিজার্ভ বাড়ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে, সিন্ডিকেট কমছে, মারামারি ইত্যাদি কমছে এবং উগান্ডার সাধারন মানুষের মনে একটা সস্থি এসছে। আর ঠিক এমতাবস্থায় বর্তমানের বিনুপিন্ড দলটি বারংবার কেয়ারটেকার সরকারের কার্যকলাপে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে, সংস্কারে আপত্তি, এবং দ্রুত নির্বাচন দেয়ার এমন তাগিত সহ হুমকী ধামকী দিচ্ছে যে, মনে হচ্ছে, না জানি কত ক্ষমতাশীল ছিলো এই বিনুপইন্ডি এতো বছর। অথচ তারা ক্ষনিকের জন্যেও গত দেড় যুগ মাঠে তো নামতেই পারেনি, অথবা সাহস করেনি, বরং চোরের মতো, ইন্দুরের মতো গর্তের ভিতর ঢোকে ছিলো কালো চাদর আর ঘোমটা গায়ে দিয়ে। যেই না গত সরকার পতিত হয়েছে, তারা এখন যেনো বাঘ বনে গেছে। আর সারাক্ষন নির্বাচনের আগেই চাদাবাজি, দখল বানিজ্য, টেন্ডারবাজি, লুটতরাজ ইত্যাদিতে তাদের আসল মুখোস খুলে দিচ্ছে। জনসদাহারনের ফেসবুকের কমেন্ট গুলি শুনলে লজ্জা লাগে কিন্তু তাদের যেনো কোনো লজ্জা শরম নাই।
আমার যেটা ধারনা যে, যখনই উগান্দায় একটা নির্বাচন হবে, এই বিনুপিন্ডি রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতায় আসবে, ঠিক তখন পতিত সরকারের দলের মানুষগুলি এক নাগাড়ে এমন জটিল পরিবেশ তৈরী করে ফেলবে যে, বিনুপিন্ডির দ্বারা সরকার গঠনের ৬ মাসের মাথায় বিনুপিন্ডি সরকারের পতন হবে। এই বিনুপিন্ডি দলটি যে পতিত সরকারি দলের কাছে শিশুও না, এটা তারা বুঝলেও স্বীকার করতে চায় না। বর্তমান কঠিন জাতাকলে, আর্মির পরোক্ষ সাপোর্টে, জনগনের একাত্তবোধের কারনে জটিল বাধায় পড়েও যখন পতিত সরকারের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এমন এমন হেডাম দেখিয়ে মাঝে মাঝে বর্তমান সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে, তাতেই আমার ধারনা যে, যখন দেশপ্রেমিক আর্মি থাকবে না, জনগন আর আগের মতো এক হয়ে রেজিষ্ট করতে আসবে না, তখন পতিত সরকারি কর্মীরা বর্তমান বিনুপিন্ডি দলকে এমন নাকামি চুবানি খাওয়াইবো যে, আগে তো গর্তে গেছিলো এবার ক্ষমতায় থেকেও কিছু করতে পারে কিনা আমার সন্দেহ আছে। ওই অবস্থায় হয় জনগন আরেকটা বিপ্লব এমনভাবে করবে যে, বিনুপিন্ডির বিরুদ্ধে যেখানে পতিত সরকারকে যেভাবে একবার পালাইয়া যাইতে বাধ্য করেছে,বিনুপিন্ডির নব নির্বাচিত সরকারী দলকেও পালাইতে জনগন বাধ্য করবে কারন তারা বর্তমান কোয়ালিফাইড এবং দক্ষ কেয়ারটেকার সরকারকে সময় দিচ্ছে না দেশ গড়ার জন্য, সংস্কার করার জন্য বা সংস্কার করলেও তারা সেই সংস্কার আবার ডিলীট করে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করতে চাইবে বলে।
পিপিলিকার পাখা উঠে মরিবার তবে-এই কথাটা তখন তাদের কাছে একটা বেধবাক্যের মতো মনে হবে। এম্নিতেই উগান্ডার জনগন বর্তমান উদিয়মান বিনুপিন্ডি রাজনৈতিক দলকে তাদের বর্তমান চাদাবাজি, দখলদারিত্ত অনুশীলন, মারামারি, কাতাকাটি ইত্যাদির কারনে পছন্দ করছে না, তখন গত পতিত সরকারি দলের দ্বারা যখন চারিকদিকে জালাও পোড়াও, মারামারি, লাগাতার হরতাল, ভাংচুর, শুরু করবে এবং ক্ষমতার চেয়ারে বসে যখন এরা কিছুই করতে পারবে না, তখন নির্বাচিত সরকারের এবং দলের চুড়ান্ত মরনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হবে।
উগান্ডা আর ভালো হইলো না।
আমার মায়ের পক্ষের এই জলিল মামা মারা গেলেন গত সপ্তাহে। অনেক ভালো একটা মানুষ ছিলেন উনি। আমি যখন সে ছোট বেলেয়ায় গ্রামে থাকতাম, তখন বেশীর ভাগ সময় আমি এই জলিল মামার বাসাতেই দিনটা পার করতাম। কারন তার এক ছেলে মোতালেব আমার দোস্ত ছিলো। মোতালেব শেষ পর্যন্ত লেখাপরায় আর আগায় নাই, এখন সে মুদি দোকান করে। তারই মেয়েরা হচ্ছে এই অরু, হ্যাপি যারা আমার পরবর্তী জীবনেও ভিন্নভাবে এসেছিলো। মোতালেবের স্ত্রী জ্যোৎস্না বেগমও আমার জীবনে একটা প্রভাব রেখে গেছে। যাই হোক, জলিল মামা মারা যাওয়ার পর একবার ভেবেছিলাম, জানাজায় যাই। সময়ও ছিল কিন্তু যাওয়া হয় নাই। উনার স্ত্রী তাহেরা মামি এখনো জীবিত। ভীষন সুন্দুরী একটা মহিলা ছিলেন। এখনো প্রায় ৮০ বছরের মহিলাকে দেখলে মনে হয়, প্রচন্ড সুন্দুরী। অত্যান্ত ভাল একজন মানুষ বটে। উনি মোট ১৭ জন বাচ্চার মা হয়েছিলেন। কিন্তু দুক্ষের বিষয় হচ্ছে-এই ১৭ জন বাচ্চা তাদের কোনো সুখের কারন হয় নাই তাদের বুড়া বয়সে । তারা যেনো বাচ্চাদের কাধে একটা বোঝা হয়েই ছিলো।
পৃথিবী ঘুরলে বুঝা যায় যে, সত্যিই এই পৃথিবী একদিন চরম অশ্লীলতায় ছেয়ে যাবে, মানুষের মধ্যে কোনো হায়া, লজ্জা কিংবা একে অপরের প্রতি সম্মানবোধটুকু সম্ভবত আর রাখতে পারবে না। আজ থেকে ২৫ বছর আগেও মানুষের এতো অধোপতন ছিলো না এখন যতটুকু দ্রুত অধোপতনের দিকে যাচ্ছে। কথাগুলি কেনো বললাম? নিতান্তই নিজের রিসেন্ট অভিজ্ঞতা থেকে।
পরিবার নিয়ে (অর্থাৎ আমি, আমার স্ত্রী, উম্মিকা এবং উম্মিকার স্বামী আবির) এই কয়জন মিলে একটা ব্রেক নেবার জন্য থাইল্যান্ড ঘুরতে গিয়েছিলাম গত ৯ জানুয়ারী থেকে ১৬ জানুয়ারী পর্যন্ত।
প্রথমেই আমরা সুবর্নভুমি এয়ারপোর্টে নেমে সেখান থেকে আরেকটা কানেক্টিং ফ্লিয়াটে চলে গিয়েছিলাম ফুকেত। বেষ্ট ওয়েষ্টার্ন হোটেলে আমরা উঠেছিলাম। ১৯০ প্যাংমুয়েং সাই গর রোডে এটার অবস্থান। একেবারেই ফুকেট বীচের পাশে। আমার পায়ে ব্যথার কারনে খুব বেশী হাটাহাটি করতে [পারি না তাই আমি খুব বেশি ঘুরাঘুরীও করি না। বাইরে খাওয়ার জন্য বা আশেপাশে টুকটাক কোথাও যাওয়ার জন্য আমি আমার পরিবারের সাথে বাইরে যাই। বেশীর ভাগ সময় ওরাই বাইরে বাইরে শপিং কিংবা ঘুরাঘুরি করে।
১ম দিন শহরটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ২য় দিন ফুকেত থেকে ফিফি আইল্যান্ডে রিভার ক্রুজ করতে গেলাম। বেশ দূর। ফিফি আইল্যান্ডটা হচ্ছে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যেতে হয়। এটা মালাকাত দ্বীপ এবং কোকোট দ্বীপের মাঝে অবস্থিত। খুব চমৎকার লোকেশন এবং যেতেও বেশ আরামদায়ক। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে-এখানে প্রচুর ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশের নাগরিকগন ভ্রমনে আসেন। তাদের ড্রেস এতোটাই নগ্ন যে, মাঝে মাঝে আমার ঘেন্নাও হচ্ছিলো না। প্রায় শতভাগ কোন নগ্ন রমনী গলা ছোলা মুরগীর মতো দুই ঠ্যাং প্রসারিত করে আমার পাশে সান-বাথে বসে যায়, তখন মনে হয় শিপে মাছি থাকলে তারাও উরে যেতো।
যাই হোক, ফিফি তে গিয়ে বীচে গয়ে কিছুক্ষন বসে থেকে আর আমার পরিবারের সবাই বীচে নেমে কিছু ছবি টবি তুলে আমরা চলে এলাম ফিফি আইল্যান্ডের হোটেলে লাঞ্চের জন্য।লাঞ্চ করেই আবার ব্যাক করলাম ফুকেটে।
সন্ধ্যার ফুকেট বড্ড নোংরা। বিশেষ করে বীচ এলাকা। এটা কোনো সভ্য জগতের মানুষের রুচীর মধ্যে পড়ে না। ওরা নগ্ন উদোম গায়ে যেনো বন্য শুয়রের দল। যাই হোক, পরেরদিন গেলাম টাইগার পার্কে। জায়গাটা সালং মুএং এ অবস্থিত। ওখানে গিয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। প্রতায় ৮/৯ টা বাঘ আছে যেগুলি সারাদিন মাটিতে শুয়ে ঘুমুচ্ছে। নেশার মতো ঘুমুচ্ছে ওরা। আর কিছু পর্যটক ওদের লেজ ধরে, গায়ে হাত বুলিয়ে পাশে বসে বাঘের সাথে ছবি তুলছে। আমার স্ত্রী সাথে সাথেই আমাকে বল্লো-বাঘগুলিকে শক্তিধর কোনো নেশার ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম না পারালে এভাবে একতা বাঘ মাটিতে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। ঘটনাটা আসলেই তাই। এতা ভাবতেই মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। বাঘকে এভাবে দিনের পর দিন নেশাজাতীয় মেডিসিন দিয়ে জিম্মি করে খাচায় বন্ধি করে একটা ব্যবসা করা অপরাধ যেমন, তেমনি পাপও। এরা নীরিহ না হোক, এদের সুস্থ্যভাবে বেচে থাকার অধিকার আছে। আমার আর খাচার ভিতরে গিয়ে ওদের সাথে ছবি তুলতে ইচ্ছে করলো না। মনতাই আমার খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।
২ রাত ফুকেটে থেকে আমরা চলে এসেছিলাম পাতায়ায়। থাইল্যান্ড পর্যটকের দেশ। প্রচুর পরিমান দেশী বিদেশী পর্যটক। আমরা সেখানে গোল্ডেন বীচ হোটেলে উঠেছিলাম। একেবারেই বীচের পাশে। হাটা ডিসট্যান্স। এখানে আবহাওয়া বেশ চমৎকার। কিন্তু ওই একই পরিস্থিতি বীচের। এই পাতায়ায় প্রচুর পরিমানে ইন্ডিয়ান আসে, আর লোকাল লকজনের মধ্যে প্রচুর পরিমান সাউথ ইন্ডিয়ান এবং বার্মিজ কাজ করে। চারিদিকে ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্ট আর বাজার। থাইল্যান্ডের রাস্তাঘাট পরিষ্কার, নোংরা নয়। পাতায়ায় আমরা ডলফিন শো দেখতে গেলাম। সুন্দর একতা সময় কেটেছিল সেখানে। পাতায়া ডলফিনারিয়াম।
গ্রান্ড প্যালেস, বৌদ্ধ মন্দির, রিভার ক্রুক টার্মিনাল ২১
১৬ তারিখে ব্যাক।
চলবে……।।
বিপুল সংখ্যক আধুনিক জেন-জি যারা সামগ্রিক আন্দোলনে শামিল হয়ে কোনো এক ক্ষনে রাষ্টের আবর্তন স্থির করেছিলো, সেই আবর্তন সময়ের আবর্তনে ধীরে ধীরে বুর্জোয়া পরিবেশে স্টেপ-ইন হয়ে আন্দোলনটা যেনো বিতর্কে এবং সমালোচনার পরিধীতে পতিত হয়ে যাচ্ছে। অধিকারের চেতনায় ধর্মোন্মদনা এবং আত্নোতসর্গের প্রেরনা যেনো এই আন্দোলন থেকে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে উঠছে। সেই আগের জায়গায় যেনো এর সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে যা এমন যে, দেশে যা কিছু হচ্ছে এটাকেই মেনে নেয়া এবং কঠিন সমস্যাগুলিকে এক কোনে ঠেলে দেয়া। এটা তো হবার ছিলো না।
এই আন্দোলনের জন্য যারা স্টেক হোল্ডার ছিলো বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেখানে একটা পেরেগ গাথার দরকার ছিল। কেননা এটা গুটিকতক স্টেক হোল্ডার এর মালিকানায় আন্দোলনকে ভুল পথে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা কখনোই এমন ছিলো না। বরং তারা ছিলো ব্রিজ-হেড। যারাই এ আন্দলনের অগ্রভাগে ব্রিজ-হেড হিসাবে ছিল, তাদের উচিত ছিলো তাদের এই আন্দোলন সাফল্যের কারনে অনুগামির দল বিশাল জনগোষ্ঠী বা জনসাধারনের মধ্য থেকে অদম্য ও অজেয় সাহসের এবং আত্নোতসর্গের প্রেরনা সমৃদ্ধ কিছু নতুন প্রজন্মকে সামনে নিয়ে আসা। এসব ক্ষেত্রে ষাড়কে শিং ধরে জোর করে বলপুর্বক বশ মানাতে হয়। ক্রূদ্ধশক্তি হয়তো বা আক্রমনকারীকে বারবার মাটিতে আছড়ে ফেলতে চাইবে, তবু বলিষ্ঠ মনের জোরে তাকে বারবারই উঠে দাড়াতে হবে। এটা না করার কারনে পুরু আন্দোলনটা অনেকটা বুর্জোয়া তথাকথিত ব্যক্তিবর্গ এবং বন্দোবস্তীদের হাতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে। একবার ফলাফলে নেতিবাচক হয়ে উঠলে শারীরিক শক্তির সাথে সাথে মানসিক শক্তির লোপ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দারায়। তখন যা দরকার তা হলো জনসাধারনের মধ্যে মহৎ সন্তান। তারা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও পিছপা হবে না।
সময় লাগবে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে চোখ খোলা রেখে সামনে এগুতে হবে। নতুবা, সেটাই হবে যেটা বারবার ইতিপুর্বে ঘটেছে।
শুনেছি মানুষের হার্ট এটাক হলে বুকে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভুত হয়, অনেকে ব্যথা সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যায়, মল মুত্র পর্যন্ত ত্যাগ করে ফেলে। সারা শরীর ঘেমে যায়, আরো অনেক কিছু। আমার এ ধরনের কোনো সিম্পটম্পই ছিলো না। কিন্তু প্রায়ই আমি মাঝে মাঝে অফিসে কিংবা সিরাজ গঞ্জ যাওয়ার পথে প্রচুর অস্থির বোধ করতাম, প্রেসার হুট করে ভীষন বেড়ে যেতো, মনে হতো ঘাড় ব্যাথা করছে আর বুকের মাঝখানে কেমন যেনো জলা জলা অনুভুতি হতো। ব্যাপার গুলিকে আমি খুব একটা আমলেই নিচ্ছিলাম না। যখনই এমন হতো, একতার জায়গায় ২/৩ টা অসারটিল প্রেসারের মেডিসিন কেয়ে নিতাম। মাঝে মাঝে ভালোই কাজ করতো, আবার মাঝে মাঝে অনেক সময় পরে এমনিতেই ঠিক হয়ে যেতো বটে কিন্তু শরীর প্রচুর দূর্বল হয়ে যেতো।
কিন্তু গত ৪ নভেম্বর ২০২৪ তারিখের সকাল ৫ টার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার প্রচন্ড বুক জলছিলো বলে মনে হচ্ছিলো। মাথা ব্যথা করছিলো, চোয়ালেও ব্যথা করছিলো, ঘাড়ে এবং হাতে বেশ ব্যথা অনুভব করছিলাম। আমি একবার তাইলস করা ফ্লোরে শুইলে মনে হয় ভালো লাগবে এতা ভেবে তাইলের উপর শুইতেছিলাম, আবার সেটাও আরাম দায়ক মনে হচ্ছিলো না বিধায় বিছানায় শুয়ে থাকতে চাইছিলাম কিন্তু সেখানেও এতো অসস্থি বোধ করছিলাম যে, কি করলে যে ভালো লাগবে বুঝতেছিলাম না। প্রেসার মাপার যন্ত্রটাও তখন খুজে পাচ্ছিলাম না। অনেক খোজাখুজির পর যখন পেলাম , প্রেসার মেপে দেখি প্রায় ১৬৫ প্লাস। সাথে সাথে ৩ টা ওসারটিল খাইলাম, কিন্তু কোনো কাজ হলো বলে মনে হলো না। পানি খেলাম, একটু চাও মনে খেলাম কিন্তু কোনো সিগারেট খেলাম না।
উম্মিকা, আবির দুজনেই ডাক্তার, তারা বাসাতেই ছিলো। কিন্তু ওদেরকে কিছু জানালাম না। আমি নিজেই ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম আসলে ঘটছে কি আমার সাথে। কামড় খেয়ে শুয়ে থাকলাম প্রায় ঘন্টা খানেক। অতপর একটু ভালো লাগছিলো। সকাল ৯ তার দিকে পান্তা ভাত খেলাম, তার আগে গসল করলাম। অফিসে যাবো। রেডি হয়ে গাড়িতে উঠলাম। একটা সিগারেটও খেলাম।
আমি অফিসের জন্যই আসলে রওয়ানা হয়েছিলাম কিন্তু র্যাংক্স পর্যন্ত যেতে যেতে আমার একবার মনে হলো, অফিসে যাওয়ার আগে একবার স্তাফ সার্জনের সাথে দেখা করে যাই। গাড়ি ঘুরিয়ে সি এম এইচ এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ওখানে স্তাফ সার্জন লেঃ কর্নেল আল আমিন বসা ছিলো। আমি সিরিয়াল নিলাম। প্রায় ৪০ মিনিট পর সিরিয়াল পেলাম বটে কিন্তু আমার বুক তখন বেশ ভালো ধড়ফড় করছিলো। স্তাফ সার্জনের কাছে যাওয়ার আগে প্রেসার মাপালাম, একেবারে সুন্দর প্রেসার কিন্তু আমার বুকে ভীষন ধরফড় করছে। আমার ধারনা ছিলো যে, প্রেসারের হেরফের হলেই হয়তো বুক ধড়ফড় করে। কিন্তু স্তাফ সার্জনের কথায় বুঝলাম, প্রেসারের সাথে ধড়ফরের কোনো সম্পর্ক নাই আবার আছেও।
যাই হোক, আমার সকালের অনুভুতি, অবস্থা এবং বর্তমান কন্ডিশন আল আমিনকে বলার পর সে, খুব সহজেই ব্যাপারটা যেনো বুঝে গেলো। সে আমাকে দ্রুত নীচ তলায় ইমারজেন্সিতে রিপোর্ট করার জন্য পাঠিয়ে দেয়।
ওখানে যাওয়ার পর পরি আমার ইসিজি, ইকো এবং প্রেসার ইত্যাদি নেয়া হলো। আর সাথে সাথে একতা ব্লাড স্যাম্পল পাঠান হলো ল্যাবে। ট্রপিরন মাপার জন্য। প্রায় ২ ঘন্টা পর আমার ট্রপিরন পেলাম। রেঞ্জ ভীষন খারাপ। কাট অফ রেঞ্জ থাকার কথা ৪৭, আর আমার রেঞ্জ ২১০০০। একজন মহিলা মেজর ডাক্তার আমাকে বল্লেন-স্যার আপনি কি জানেন যে, আপনি এখনো হার্ট এতাকের মধ্যেই আছেন? আমি এতো ডিলে করে হাসপাতালে কেনো এলেন? আপনার তো অবস্থা খুবই খারাপ। ইসিজি ভাল না, ইকোঅ ভালো না, আবার এদিকে আপনার ট্রপিরন এতো হাই, এই রেঞ্জে তো মানুষই বাচে না।
আমাকে দ্রুত ক্যাথ ল্যাবে পাঠান হল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মালেক, মেজর সানোয়ার, মেজর সর্না এবং আরো এখন মেজর আমাকে দ্রুত ক্যাথ ল্যাবে নিয়ে এনজিওগ্রাম করতে শুরু করলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, আমার তিনটা আর্টারিতেই সিরিয়াস ব্লক। এলএডি তে ১০০%, বাকী অন্য দুটুতে ৯০% এবং ৮০%।
ব্রিগেডিয়ার মালেক খুব অবাক হয়ে বল্লেন-কিভাবে আপনি বেচে আছেন স্যার? আপনি তো এর আগেও কয়েকবার হার্ট এটাকে পড়েছেন। কিন্তু আপনি কি কিছুই বুঝেন নাই? আজকের হার্ট এটাক টা তো খুবই সিভিয়ার। আপনাকে এখনই অন্তত একটা রিং পরাতে হবে।
আমি বললাম, তুমি ডাক্তার, আর সি এম এইচ আমার সংস্থা, এটাকে আমি বিশ্বাস না করলে আর কে বিশ্বাস করবে? তুমি যা করতে হয় করো।
তখনো মিটুল আসে নাই হাসপাতালে, আবির আর উম্মিকা দ্রুত চলে এসেছিলো আমি হাসপাতালের ইমারজেন্সীতে ভর্তি হয়েছি শুনে। আবির “নো রিস্ক বন্ড”করে দিলো। আমার রিং পড়ানো শুরু হলো।
আমি এম্নিতেই একটু শক্ত মনের মানুষ। গত ২০১৭ সালে পায়ে রিং পড়ানর সময়েও ডাক্তারদের সাথে আমি অনেক মজা করেছিলাম অপারেশনের সময়। এবার ব্যাপারটা আমি ঠিক সেভাবে নিচ্ছিলাম। ভয় হচ্ছিলো না। ফলে ব্রিগেডিয়ার মালেককে বললাম, মালেক, তোমাদের ভিডিও ক্যামেরাটায় আমাকেও একটু দেখাইতে পারো, আমিও একটু মজা নেই।
মালেক ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে এমন করে তাকিয়ে একটা মন্তয় করলো যে, ‘স্যার আমরা আছি আপনার লাইফ এন্ড ডেথ নিয়ে চিন্তিত আর আপনি এটাকে মজা নেয়ার কথা বলছেন?”
বুঝলাম, তাহলে খুব সিরিয়াস ব্যাপার হয়তো।
প্রায় আরাই ঘন্টা পর তারা আমার একটা রিং পড়াইতে সফল হলো।
অতপর সিসিইউ।
একটি বিপ্লব সব সময়ই বড় কনো পরিবর্তন নিয়ে আসে। কিন্তু কখনো কি কারো মনে এই প্রশ্ন জেগেছে যে, এক সপ্তাহ, এক মাস কিংবা এক বছর ধরে চলা একটা বিপ্লব কি করে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের আগাগোড়া বদলে দেয়? আপাতদ্রিষ্টিতে কোন বিপ্লবের স্থায়ীত্তকাল যতোই হোক না কেনো, এর পিছনে থাকে শত বছরের পুরানো পটভূমি। একটু একটু করে জমতে থাকা মজলুম জনতার কষ্টের হাজারো কাহিনী।
ইতিহাসের দিকে নজর দিলে এটাই দেখা যায় যে, রুশ বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব, ফ্রান্স রেভুলিউশন, এদের প্রত্যেকের একেকটা রুপ ছিলো। রুশ বিপ্লবে জারদের অমানুসিক শাসন ব্যবস্থা, ভুমি দস্যুতা, নিম্নগামী জীবন ব্যবস্থা ইত্যাদির কারনে রাশিয়ার মানুষ গুলি জারদের বিরুদ্ধে এক সময় আন্দোলনে নামে।
যদি শিল্প বিপ্লবের দিকে তাকাই, শিল্প বিপ্লবে মানুষের জীবন মাত্রায় কিছুটা উন্নতি হলেও শাসন ব্যবস্থায় ছিলো চরম নিষ্ঠুরতা। মানুষ যখন কোনো শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, তখন সেই শাসকদের সবার একটাই পথ, সাধারন মানুষকে তোপের মুখে, বন্দুকের মুখে নিবারন করা। আর এই তোপের মধ্যে বসবাস করতে করতে সাধারন জনগন ধীরে ধীরে আরো ফুসতে থাকে। মানুষ যখন ভিতরে ভিতরে ফুসে যেতে থাকে, তখন তারা একে অপরের কাছে চলে আসে, তখন ধর্ম, রাজনিতির মত পার্থক্য, বর্ন, জেন্ডার কিংবা শিক্ষিত অশিক্ষিতের মধ্যে কোনো তফাত থাকে না, তাদের মধ্যে একটা আনবিক বন্ধন তৈরী হয়। এই আনবিক বন্ধন থেকে আঞ্চলিক, সগোত্রীয় কিংবা ক্লাসভিত্তিক একটা নিউক্লিয়াসের মতো শক্ত বন্ধন ধীরে ধীরে এমনভাবে তৈরী হয় যেখানে যে কোনো একটি বন্ধনে যদি কেউ ওই পরিমান আঘাত হানতে সমর্থ হয়, যেখানে মাত্র একটা স্ফুলিঙ্গের কারন হতে পারে। তাহলেই বিপ্লব হতে বাধ্য। সেই ক্ষনিকের স্ফুলিংগটাই আসলে দরকার পড়ে পুরু ফুসতে থাকা অগ্নি গর্ভে বিস্ফোরন ঘটানোর জন্য।
বাংলাদেশেও ৫ ই আগষ্টের বিপ্লবটারও একতা বৈ শিষ্ঠ আছে। এটা বাহ্যিক চোখে যাইই দেখা যাক না কেনো, এটা আসলে শুধুমাত্র বৈষম্যমুলক কোটা আন্দোলের একচ্ছত্র ফসল ছিলো না। এই কোটা আন্দোলন ছিলো ওই যে বললাম, একটা নিউক্লিয়াসের কোন একটা স্তরে আঘাত হানার জন্য ছোট একটা অঙ্গিস্ফুলিংগ। আর সেই স্ফুলিজ্ঞের স্পার্ক বিদ্যুৎগতিতে অন্য স্তরের ফুসে থাকা সমস্ত রাগ, অপশাসনের কারনে মানুশের দূর্ভোগের বহির্প্রকাশের একটা জন সমষ্টিগত যাগরন এবং প্রতিরোধ।
এরমানে আমরা এই বিপ্লবকে এভাবে সংগায়িত করতে পারি না যে, গুটিকয়েক ছাত্র, বা গুটিকতক রাজনৈতিক পরিচয়ধারী মানুষ কিংবা কিছু সংখ্যক মজলুমের কারনে সারা দেশব্যাপি আন্দোলন হয়েছে এবং তাদের কারনেই এটা সফল হয়েছে। এটা কখনই কারো একার কৃতীত্তের দাবিদার নন। এখানে কোন মাস্টারমাইন্ডও ছিল না। মাস্টারমাইন্ড থাকে যখন কোনো ক্যু হয়, গনবিপ্লবে কোনো মাষ্টার মাইন্ড থাকে না। এটা হয় সব মানুষের বিভিন্ন ক্ষোভ, অপশাসন আর পুঞ্জিভুত নির্যাতনের একসাথে বহিঃপ্রকাশের কারনে। বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে ৫০% এর উপরে জনগনের কোটা নিয়ে আন্দোলন করার কোনো যৌক্তিক কারন ছিলো না, কিন্তু সেই ৫০% জনগনের উপর পরিচালিত জুলুমের কারনে তারা সোচ্চার হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৩৫% মানুষের রাজনইতিউক কোন কারন নাই যার কারনে তারা বিপ্লব করতে যাবেন কিন্তু সেই ৩৫% মানুষ সরকারের অপরাজনইতিকতার কারনে অসহ্য ছিলো। বাংলাদেশের মানুষের প্রায় ৭০% মানুষ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তারা সেই অধিকারের পুনরোদ্ধারের জন্য আন্দোলনে গেছেন। বাংলাদেশের মানুষ বিচার বিভাগীয়, আইন বিভাগিয় সেকটর গুলি থেকে শুধু অন্যায় আর জুলুমই দেখেছেন, তারা সেই অন্যায়কে সমুলে উৎখাত করতে মাঠে নেমেছিলেন। এখানে কোনো মাস্টার মাইন্ড বলতে কিছু নাই।
শেষ পর্যন্ত ৬০ এর ঘরে পা দিয়েই দিলাম।
এই ছোট জীবনে কত কি যে আল্লাহ দেখালেন তার কোনো ইয়াত্তা নাই। যুদ্ধ দেখেছি, যুদ্ধের পরে শান্তি দেখেছি, প্রাকৃতিক দূর্জয় দেখেছি, সেই দূর্জয়ের পর মানুষ সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়েও আবার ঘুরে দারানোর মতো শক্তি দেখেছি। এই ছোট জীবনে অনেকের সাফল্য দেখেছি, কারো কারো বিপর্জয়ও দেখেছি। এতো এতো উত্থান পতনের পরেও মানুষের অনন্ত কাল বেচে থাকার ইচ্ছাও দেখেছি। কারনএই পৃথিবীকে ঈশ্বর এমন একটা মোহ, এমন একটা অপরুপ রঙ আর তুলি দিয়ে সাজিয়েছেন যেখানে নীল আকাশের নীচে নীল সাগরের পানি, সবুজ গাছ পালায় ভরা পাহাড় জংগল আর তার সাথে আকাশের মেঘমালার চিত্তাকর্ষক রুপে ভরে রাখেন। কেউ এই পৃথিবী ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। তারপরেও একদিন সময় ঘনিয়ে আসে, ফুরিয়ে যায় মানুষের সময়কাল, আয়ুষ্কাল।
এমন করে আমিও একদিন সেই শেষ দিনটায় পৌঁছে যাব, ইচ্ছে করলেই আর থাকা যাবে না এখানে। কারন-
আমাদের একমাত্র জন্মটাই আমাদের মৃত্যুকে নিশ্চিত করেছে।
বন্যা, ছাত্র-জনতা আন্দোলন, সরকার পতন, গার্মেন্টস সেক্টরে অরাজকতা, যুবদলের তান্ডব সব মিলিয়ে গত এক মাস এমন ভাবে পর্যুদস্ত আছি যে, আজকে আমার ৫৯ তম জন্মদিন পেরিয়ে ষাটের ঘরে পা দিলাম এটাই মনে নাই। উম্মিকা, আবির আর মিটুলের ফোন কলে সকাল ১০টায় মনে পড়লো আজ ৮ সেপ্টেম্বর। বয়সটা বাড়ছে, অভিজ্ঞতাও বাড়ছে কিন্তু দেশ বিদেশের জটিল রাজনীতিতে মানুষের মনের শান্তি আর ঘরের শান্তির কোনোটাই পরিবর্তন হচ্ছে না।
তুমুল আন্দোলনের মধ্যে ১৫ বছর অপকর্মের শাশক শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালালেও এখন আরেকটি দল মনে করছে, এবার তাদের পালা। কোনো লাভ হবে কিনা এদেশের জনগনের সেটা এখনো বুঝা যাচ্ছে না। আগে খাইতো আওয়ামীলীগ এবং শুন্য হাতে আর খালি পেটে নেমেছে বি এন পি। চারিদিকে চাদাবাজি, দখল আর ঘুষের বানিজ্য। কোনো পরিবর্তন দেখছি না।
আবির আর উম্মিকা আমার ব্যবসায়ীক কাজে একটু মনোযোগ দেওয়ায়র চেষ্টা করছে বলে মনে হলো। আসলে আমি অনেকদিন যাবত আমার রিপ্লেসমেন্ট তৈরীতে অনেক মনোযোগী হলেও আমি সব সময় এই রিপ্লেসমেন্টের জায়গায় ব্যর্থ হয়েছি। রানাকে দিতে ট্রাই করেছিলাম, রউফকে দিয়ে ট্রাই করেছিলাম, সাকি, মান্নান সবাই ফেল করেছে। মুবীন তো আমাকে অনেক লস করিয়ে দিয়েই শেষ পর্যন্ত আমার সাথে টিকতেই পারেনি। ফলে আমি আর রিপ্লেসমেন্টের কথা মন থেকে বাদ দিয়েছিলাম।
যেহেতু আবির একটু মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছে, ভাবছি ওকে দিয়ে একটু ট্রাই করা যেতে পারে।