











Pic for Slider0123jpg
Pic for Slider012
Pic for Slider011
Pic for Slider010
Pic for Slider009
Pic for Slider008
Pic for Slider007
Pic for Slider006
Pic for Slider005
Pic for Slider003
Pic for Slider002
Pic for Slider001
মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তার মধ্যে একটা হচ্ছে-তার জীবন নিরাপদ, নিশ্চিত এবং মৌলিক চাহিদা পুরন করা। এই কটা জিনিষ যেভাবেই আসুক, যেখান থেকেই আসুক, যখন নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন তার জীবন হয়ে উঠে চাকচিক্যময় এবং সুখি পরিবেশের মতো। তখন জীবনকে বড্ড ভালো লাগে, আকাশ ভালো লাগে, গাছপালা ভালো লাগে, আশেপাশের সব কিছুই ভালো লাগে। অল্পতেই পেট ভরে যায়, ছোট জিনিষেও হাসিতে জীবন পরিপুর্ন হয়ে উঠে, সব কিছু সুন্দর মনে হয়। কিন্তু যদি সেই সক্ষমতাকে মানুষ ধরে রাখতে না পারে, ভুল পরিকল্পনায় সব হাতছাড়া হয়ে যায় এবং হটাত যদি তার সামনে এটা দৃশ্যমান হয় যে, তার সেই নিরাপদ জীবন, নিশ্চিত জীবন কিংবা মৌলিক চাহিদার যোগানগুলি প্রায় অনিশ্চিত, তখন সেই মানুষটার থেকে অসহায় আর কেউ থাকে না। সারাক্ষন তার শরীর খারাপ হতে থাকে, তার প্রেসার বাড়তে থাকে, খাওয়া দাওয়ায় এতোটাই অনীহা আসে যে, ঘুম পর্যন্ত হয় না, কারো সাথে মিশতে ইচ্ছে করে না, কারো সান্নিধ্যই আর ভাল লাগে না। বারবার মনে হয়-কি যেন আর আগের মত নাই, কোথায় যেন কি ভুল হয়ে গেছে, অথবা মনে হয় বারবার যে, এখন কি হবে তার? কিংবা কি করলে আবার সেই আগের নিশ্চিত জীবনটা ফিরে পাবে? এসব চিন্তাধারায় একসময় সে চোখের সামনে অন্ধকার দেখতে থাকে, জিবনকে অসহ্য মনে হয়, ঈশ্বরকেও আর ডাকতে ইচ্ছে করে না। আর যদি ঈশ্বরের কাছে মাথা নতও করা হয়, তখন মনে হয়-ঈশ্বরই যেনো অপরাধী। তাকেই তখন বলতে ইচ্ছে করে-কেনো তুমি আমাকে এমন করে শাস্তি দিলে? তুমি কি পারতে না আমাকে আরো একটু সহজ করে দিতে সব? চোখে জল আসে, চোখ বন্ধ হয়ে আসে, কোথায় যেনো বুকের মধ্যে ব্যথা করে। উচ্চসরে কাদতে ইচ্ছে করে। তখন মনে হয় সব কিছু দ্রুত কেনো জানি নিজের কাছ থেকে সব অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। নিজের শরীর চলতে চায় না, গান ভালো লাগে না, বন্ধুবান্ধব ভালো লাগে না, একা থাকতে ভালো লাগলেও সেটাও এক সময় খুব অসহায় মনে হয়। নিজের খাটটায় শুয়ে বসেও যেনো আরাম পাওয়া যায় না। জানালার পাশে গিয়ে তখন বসি। দূরে গাড়ির ডাক শোনা যায়, কত মানুষ রাস্তায় হাটাচলা করে, সবাই ব্যস্ত। কেউ নাড়ির টানে, কেউ বাড়ির টানে, কেউ সংসারের টানে ঘরে ফিরছে। শুধু আমিই যেনো নির্জীব পাথরের মতো দূরের আকাশটাকে দেখি। আকাশটাকেও আর আগের মতো এতো রসীক মনে হয় না, রাস্তার ধারে গাছগুলিতে পাখীরা দূর দূরান্ত থেকে উড়ে উড়ে আসে, কিছুক্ষন বসে থাকে, অতপর আবার জানি কোথায় হারিয়ে যায়। যেমন হারিয়ে যায় সেই অসহায় মানুষের মনও। তখন কাছের আকাশে কি উড়ছে, দূরের আকাশে কি রঙ ধরেছে, আশেপাশের মানুষের কেনো এতো কোলাহল কিংবা কে কাকে কেনো ডাকছে কিছুই তার কানে প্রবেশ করেনা। মানুষ হয়ে জন্ম নেয়া যেমন ভারী আনন্দের, সৌভাগ্যের, তেমনি মানুষ হয়ে অসহায় জীবন যেনো একটা অভিশাপও বটে। অন্য কোনো প্রানীরা তাদের জীবনের জন্য হয়তো এতো কিছু ভাবেনা। কারন তাদের সমাজ নাই, সংসার নাই, তাদের ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের জন্য কোনো তাড়া নাই। তাদের জন্য বাড়িঘর লাগে না, ব্যাংক ব্যালেন্স লাগে না। সন্তান সন্ততির জন্যেও ওরা ভাবে না। শুধু মানুষ এর ব্যতিক্রম। এই পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই হচ্ছে মানুষের শত্রু। কিন্তু মানুষের মানুষবন্ধু ছাড়াও মানুষের সাথে সব প্রানিরাই বন্ধুত্ব করে। অথচ মানুষ যখন অসহায় হয়ে যায়, তখন তার বন্ধুরাও তাকে ছেড়ে অনেক দূর চলে যায়। তখন অতীতের সুন্দর সাবলম্বী জীবনের কথা ভেবে বারবার এটাই মনে হয়, শুধু বারবার এটাই মনে হয়, কেনো বোকামি গুলি করতে গেলাম? কেনো আমার নিজের ভালো একটা সম্ভাবনাময় জীবন এমনভাবে নষ্ট করলাম? তখন নিজের উপর খুব রাগ হয়, রাগ হয় সেই তাদের উপর যাদের উপর অতি বিশ্বাস করে আমার সর্বনাশার ঘুর্নিঝড় শুরু হয়ে সাজনো সেই জীবন, সংসার তছনছ হয়েছে। রাগ হয় সেই সব ঘটনার জন্য যার কারনে আমার ভুলগুলি হতে হতে একটা মহা তান্ডবের সৃষ্টি হয়ে আমাকে একেবারে সর্বহারা করে দিলো।
মানুষের সবচেয়ে ভালো গুন যেমন সঠিক সময়ে বন্ধু চেনা, আবার সবচেয়ে বিপদ হলো সঠিক সময়ে বন্ধু না চেনা। যখন সঠিক সময়ে বন্ধু কিনা এটা না জেনেই বন্ধুত্ব হয় তখন চির শত্রু কিংবা সার্থপর মানুষেরা মানুষের বন্ধু হয়ে সব ছিনিয়ে নেয় আর সর্বশান্ত করে। আজকের দুনিয়ায় মানুষের অন্তরের খবত কেউ আগ থেকে কখনো বুঝতে পারেনা। মানুষ আজকের দুনিয়ায় এমন আচরন করে বেড়ায় যে, মনে হয় তার থেকে বিশ্বস্ত বন্ধু আমার কেউ নাই, এমনভাবে কাছে আসে যে, মনে হবে সে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমার জন্য হয়তো সে তার জীবনটাকেও বিসর্জন দিতে পারে। অথচ বাস্তব রুপটা সে কখনোই প্রকাশ করে না। এরা হায়েনার থেকেও ভয়ংকর। আরো একটা কঠিন জিনিশ হল-এই সব খারাপ বন্ধু গুলি বারবার কোনো না কোনো বেশ ধরে বারবার ফিরে আসতে চায়। বারবার তারা বিভিন্ন কায়দায় লুট করতে চায়। অথচ এরা কখনোই আমাদের বন্ধু না। মানুষ এখানেই জুয়া খেলার মতো বারবার হেরে যায়। কোনোবারই মানুষ এই হার থেকে শিক্ষা নেয় না। আর বারবার হারে। এক সময় হারতে হারতে মানুষ জীবনের উপর এতোটাই বিরক্ত হয়ে উঠে যে, তখন জীবনতাকেই আর ভালো লাগে না। অথচ পৃথিবী কর সুন্দর, এখানে বেচে থাকা আনন্দের, আকাশ দেখতে ভালো লাগে, পাহাড়ে চড়তে ভালো লাগে, কখনো কখনো চোখের জলে কাদতেও ভালো লাগে।
যখন এ জীবনটাকে আর ভালো লাগতে চায় না, মনে হয় অসহায়, যখন মনে হয় কি হবে আর বেচে থেকে? তখন মানুষ ভুলে যায় যে, সে আর কখনোই এই সুন্দর পৃথিবীতে ২য় বার আসার কোনো সুযোগ নাই। সে ইচ্ছে করলেই ব্রিষ্টিতে ভিজতে পারবে না, ইচ্ছে করলেই আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নীল শাড়িতা বা সবুক সেলোয়ারটা দেখার সুযোগ নাই। বাইরের কোলাহল শুনতে পাবে না, বাচ্চাদের কিচিরমিচির, পাখীদের উরে যাওয়া, সন্ধ্যার লাল সুর্যতা আর দেখতে পাবে না। তার যাত্রা তখন এমূকখী। ফিরে আসার কোনো পথ খোলা নাই। ফিরে আসতে চাইলেও আর আসার কোনো যানবাহন নাই, পথ নাই, কেউ টেনেও আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। অন্ধকার মাটির নীচে কার সাথে বসবাস, কার সাথে কি কথা হবে কেউ কখনো ওখান থেকে ফিরে এসে কাউকেই বলে যায় নাই। আমরাও কেউ জানি না। তাই আমি সেই অন্ধকার জীবনটাকে ভীষন ভয় পাই।
তাই আমি একাই বাচতে চাই, আমার কোনো সমাজ দরকার নাই, আমার কোনো সন্তান দরকার নাই, আমার কোন বন্ধু দরকার নাই। আমি শুধু এই পৃথিবীর রুপ আর সউন্দর্য নিয়ে মন ভরে বাচতে চাই। বাচতে চাই হাসিতে, বাচতে চাই মনের উল্লাশে। কারন আমি না চাইলেও একদিন আমাকে তো চলেই যেতে হবে। তাহলে নিজে থেকে আগেই চলে যেতে চাইবো কেনো? আমি আবার বাচতে চাই ঠিক সেভাবে যেভাবে আমি বাচতে চেয়েছিলাম। কাউকেই আমার কোনো দরকার নাই। এ জীবন অনেক সুন্দর আর মিষ্টি।
তাই, এবারের যুদ্ধটা আমার সাথে আমার। এবারের যুদ্ধটা আমি করতে চাই শুধু আমার জন্য, আর কারো জন্যই না। কেউ আমার না, আমিও কারো না। কারো উপর ভরসা করে আমি আর ব্যস্ত পথ পার হতে চাই না। আমি আমার জীবনটাকে আবার সেই চূরায় নিয়ে যেতে চাই, যেখান থেকে আকাশ দেখা যায়, রংগীন সব কিছু দেখা যায়। আমি সবার থেকে দামি জীবন নিয়ে বেচে থাকতে চাই। নো সমাজ, নো কিছু। শুধু আমি। আর এটাই আমার যুদ্ধ।
এই বিষাদ জানালা আমার জন্য নয়, এই অসহায় লাইফ আমার জন্য নয়। আমি এই রকম নই। আমি হাসতে জানি, আমি অট্টহাসিয়ে ঘরময় উচ্ছাসে পরিনত করতে পারি। মানুষ আমাকে দেখলে মাথা নত করে, আমি সেটাই। আমি আবারো বুক টান করে, সিনা উচু করে আগের জীবনতায় ফিরে যাবো। সেটাই আমার প্রতিজ্ঞা।
তুমি কি আমার এই যুদ্ধে পাশে থাকবে নীল? হ্যা, আমি জানি, কেউ থাকুক বা না থাকুক, নীল নামক একটা অস্পৃশ্য পুরুষ আমার জীবনে ছায়া হয়ে থাকবেই। ভগবান যেমন সত্য, এই নীলটাও সত্য।
ঈশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারতো না?
আমি ঈশ্বরকে আমাদের এই সম্পর্কে কোনরূপ দোষারুপ করতে নারাজ। ঈশ্বর ঠিক তোমার আমার মিলন লিখেছেন এবং এক করেছেন। কিন্তু আমাদের এই সমাজ সেটা মানতে অনীহা প্রকাশ করেছে। সেটাও সম্ভবত শতভাগ সঠিক নয় যে, সমাজ আমাদের এই সম্পর্ককে বাধা প্রদান করেছে। কারন এই সমাজে এখনো অনেকেই আমার তোমার মত সম্পর্ককে মেনে নিয়েছে। তাহলে আমি কেনো ঈশ্বর বা সমাজকে এক তরফা দোষারুপ করছি?
দোষ আসলে আমার নিজের। আমি সাহসি নই, আমি ভীরু, আমি কিছু মানুষের কাছে জিম্মি। আমি পারিনি তোমাকে আমার নিজের করে প্রকাশ্যে পরিচয় করাতে। তোমার কন দোশ নেই, তুমি তো তোমার সর্বোচ্চটা দিয়েই আমাকে কাছে নিয়েছো। যতটুকু ব্যার্থতা তা সবটুকু আমার নিজের।
অথচ তুমি আছো আমার বুকে, আমার মনে, আমার মস্তিষ্কে, আমার সমস্ত চিন্তায়। তারপরেও আমি তোমাকে আমার সর্বোচ্চটা দিতে পারিনি। আমাদের সমাজ, আমাদের কিছু পরিস্থিতি, আমাদের কিছু ভাবনা, কিছু ভালোবাসা আর আমাদের কিছু মায়া এই সব নিয়ে আমরা মানুষ অনেক জটিল একটা সমাজে বাস করি। তোমার আমার মাঝের এই সম্পর্কটা ঠিক সে রকমের একটা জটিল পরিস্থিতি নিয়ে লেগে আছে। মন যা চায় সেটা কতটুকু গ্রহন যোগ্য, আর কতটুকু গ্রহন যোগ্য সেটা যখন মন মানতে চায় না, তখনই আমরা আরো অনেক জটিল সমস্যায় ভোগতে থাকি।
কতটুকু আর জীবন? অথচ এই জীবনে তুমি আমার অপ্রাকশ্যই থেকে যাবে। যেদিন আমি আর থাকব না, সেদিন তোমার কাছে মনে হবে, পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির জায়গাটা তুমি হারিয়ে ফেলেছো। গলা ফাটিয়ে কাদলেও তার অন্তর্নিহিত কারন তুমি কাউকে বলতে পারবে না, না তুমি আমাকে কাছে এসে একটু ছুয়ে ধরে বলতে পারবে-তুমি ভালো থেকো পরপারে।
আমার চলে যাওয়ার পরের দিনগুলি তোমার কেমন যাবে আমি জানি না। কিন্তু আমি তোমার অন্তর থেকে কখনোই যে মুছে যাবো না সেটা আমি নিশ্চিত। সকাল দশটা বাজলে তোমাকে কেউ আর ফোন করবে না, মিছিমিছি টাকা পাও এই বায়না আর কখনো তুমি কারো কাছে করতে পারবে না, অহেতুক কোনো কারন ছাড়া আজ যেমন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করো, তখন পুরু স্বাধীনতা থাকা সত্তেও আর বের হতে ইচ্ছে করবে না। কেমন যেনো সকাল, দুপুর বিকাল কিংবা রাত একই রকম মনে হবে। নতুন শাড়ি কিনে আর বারবার আয়নায় নিজেকে কেমন দেখা যায়, সেতা আর আগের মত মনে হবে না। তুমি আর আমার আসার অপেক্ষায়ও থাকার কোনো কারন পাবে না।
মানুষ বেচে থাকে, কখনো ইতিহাসে, কখনো খবরে, কখনো বিশ্বাস ভংগের কারনে, কখনো অন্য কারনে। কিন্তু আমি তোমার অন্তরে বেচে থাকব একেবারেই গোপনে চোখের জলে। কাউকে এটা বলেও নিজেকে শান্তনা পাবার কোনো সুযোগ নাই।
তোমার জন্যই আমাকে আরো অনেকদিন বাচতে ইচ্ছে করে। মনে হয় তুমি আমার সাথে আরো অনেকদিন বাচো। অতদিন বাচো যতদিন না তুমি বুড়ি হও, যতদিন না তুমি সাহসী হও, যতদিন পর্যন্ত না তুমি একা একা চল্লেও আর কখনো ভয় না পাও। আমি প্রতিদিন তোমার জন্য দোয়া করি, আমি প্রতিদিন চাই তুমি যেন ভালো থাকো, সুখে থাকো।
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে কিছু গুনাবলী নিয়েই এই পৃথিবীতে আসে। কেউ খুবই অস্থির প্রকৃতির, কেউ দোদুল্যমান, কেউ অতীব চঞ্চল, কেউ আবার সেই ছোটবেলা থেকেই চুপচাপ আবার কেউ তার বয়সী মানুষের থেকে চালাক। বয়স বাড়ে আর মানুষের অভিজ্ঞতার কারনে এসব জন্মগত গুনাবলীর এক্সপাংশনের সাথে সাথে আরো কিছু গুনাবলির সংযোজন ঘটে। তারমধ্যে হিংসা, পরোপোকারী, লোভ অথবা অবিশ্বাসী অথবা উদার মনের গুনাবলীগুলি অন্যতম। পরিস্থিতি অবশ্য এসব বাহ্যিক গুনাবলীর বড় একটা কারন।
কিন্তু সব কিছুর পরেও সবার একটা ইন্ডিভিজুয়াল পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন থাকে যেখান থেকে যতো কিছুই হোক, যতো খারাপ বা ভালো পরিস্থিতিই হোক সে আর ব্যাক করতে পারেনা। কোনো ব্যক্তি তার এই ইন্ডিভিজুয়াল পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন সম্পর্কে সে নিজেও বেশিরভাগ সময়ে জানে না। এটা হটাত করেই তার ব্যক্তি মনে এমনভাবে উদয় হয় যখন সে তার আশেপাশের কোনো পরিস্থিতিই আর আমলে নেয় না এবং হতাত করেই তার মধ্যে এই কঠিন মনোভাবটায় সে একেবারে এমনভাবে পতিত হয় যে, সে নিজেও সেই পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না। সেটা সে এক্সিকিউট করেই ফেলে।
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এ কারনেই মানুষ আত্মহত্যা, ডিভোর্স, ব্যবসায় থেকে বিচ্ছিন্ন, সম্পর্ক থেকে আলাদা ইত্যাদিতে নিপতিত হয়। ক্ষেত্র বিশেষে কারো কারো এই পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে বিশাল জনবহুল গোষ্টি, কর্পোরেট সংস্থা, পারিবারিক জীবন এতোটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয় যে, তার নিজের সাথে অন্যান্য সবাই আরো বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
কাউকে সেই পরিস্থিতিতে কখনোই ঠেলে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমারো সম্ভবত ব্যবসায়িক লাইনে এমন একটা পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন চলে এসছে।
মাঝে মাঝেই দেখবেন কেনো যেন মনে হয়-কোথায় যেনো কি ঠিক নাই, কোথায় যেন কোনো কারনবিহীন একটা অসস্থিবোধ করছেন অথচ বলতে পারছেন না ব্যাপারটা আসলে কি। মনের আনাচে কানাচে অনেক কিছু খতিয়ে দেখেও কিছু পাওয়া যায় না যে, কেনো মনে হচ্ছে, কি যেনো ঠিক নেই। খাচ্ছেন, ঘুরছেন, ঘুমাচ্ছেন, সবার সাথে মেলামেশাও করছেন কিন্তু মাঝে মাঝেই আবার সেই চিন্তাটা মাথায় আসছে, কেন জানি অসস্থিবোধ করছেন। অথচ আপনি সেটার কারন বুঝতে পারছেন না। কাউকে জানাবেন? কিন্তু কি জানাবেন? সেটাও নির্দিষ্ঠ করে বলতে পারছেন না।
এমনি কিছু কিছু পরিস্থিতিতে আমাদের সবার সাবধান হওয়া উচিত। আমরা অনেক কিছু বুঝে উঠার আগে আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সম্ভবত কিছু একটা আঁচ করতে পারে কিন্তু তার কাছে কংক্রিট কোনো তথ্য নাই বা প্রমান নাই। সে কিছুর একটা আভাষ দেয়। তাই একটা কথা সবসময় মনে রাখা উচিত যে, বিপদের আভাষ পাওয়া মানেই সবসময় এটা ভুল নয়। এটাও তো হতে পারে যে, আপনি কারো বিকৃত মানসিকতাকে অলৌকিকভাবে অনুভব করছেন? আর এটা কোনো সন্দেহ নয়। এটাও তো হতে পারে যে, সত্যিই আপনার বিপদের আশংকা আছে!! যখন অবচেতন মন একটা অদ্ভুত কিছুর আশংকা করে, মনে হয় যেনো something is not right, বা Something is wrong somewhere, তাই এটা জরুরী যে, আপনি সবসময় সতর্ক থাকুন। তানা হলে বিপদ যখন একদম একদিন সত্যিই সামনে চলে আসবে তখন আর প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো সময় থাকে না। ভয়কে ম্যানেজ করা আমাদের জীবনে একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। যদি কোনো ছোট খাটো ভয় বারবার মনে আসে, তাহলে সেটাকেই বিশ্বাস করে একেবারে প্যানিক পর্যায়ে যাওয়া বুদ্ধিমত্তার কাজ নয় কিন্তু যদি সেই ভয়ের কারন আছে বলে মনে হয় তাহলে তাঁকে ভ্রম, বা হ্যালোসিনেসন কিংবা মায়াজাল মনে করে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়।
কারো জীবনের উন্নতি মাপার পদ্ধতি। জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রত্যেকটা মানুষ নিজের বেঞ্চমার্ক তৈরী করে। এই বেঞ্চমার্কটাই মানুষকে ভিতর থেকে অনুপ্রেরনা দেয়, সামনের দিকে পুষ করে। তাহলে এখন প্রশ্ন জাগে, এই বেঞ্চপার্কটা আসলে কি? এই বেঞ্চমার্কটা আসলে হচ্ছে একটা শক্তি, মনের শক্তি, যোগ্যতার শক্তি আর শক্তি ইচ্ছার। এটা কারো নিজের ভিতর থেকে উতগিরিত হয়। এটা অন্য কেঊ তৈরী করে দিতে পারে না। কিন্তু যখনই এই বেঞ্চমার্ক বা মাপদন্ড কারো জন্য অন্য কারো বেঞ্চমার্কের সাথে তুলনায় মাপদন্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন এই তুলনা করতে করতে আমরা এটা ভুলে যাই যে, আমরা কাউকে এতোটাই হতাশায় ফেলে দেই যার ফলে সেই ব্যক্তি নিজের অক্ষমতা আর যোগ্যতাকে একটা নিছক নিজের দূর্বলতা মনে করে একটা বড় ধরনের ভূল পদক্ষেপ নিয়ে বসে। আর সেই ভুল পদক্ষেপে হয় সে নিজের উপর নয় সেই তুলনাকার বেঞ্চমার্কের উপর প্রতিশোধের নেশায় মেতে উঠে। তাতে আর যাই হোক, হয় একজনের নতুবা দুজনের জীবনেই নেমে আসে সবচেয়ে সামাজিক অবক্ষয়, অপরাধ, অথবা খুন বা আত্মহত্যা।
দুজন মানুষের মাঝে তুলনা করা আর সেটা নিজের মধ্যে নিয়ে নেওয়া প্রত্যেক মানুসের জীবনের একটা অংশ আর তুলনা করা এই বিষয়টা প্রায়ই মানুসের জীবনে একটা বেড ইম্প্যাক্ট ফেলে। ছোট বেলায় পড়াশুনা, যৌবনে রোজগার, ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ে তুলনা যার দিকটা একটু দুর্বল হয়ে থাকে সে প্রত্যেকটা মুহুর্তেই একটা হীনমন্যতায় ভোগে। দুটু প্রজাপতি যেমন এক হতে পারে না, সেখানে দুজন মানুষ কি করে এক রকম হবে? ঈসশরই বলুন, আর প্রকৃতিই বলুন, বা নিয়তিই বলুন, তিনি প্রত্যাক মানুষকে আলাদা আলাদা উপহার দিয়েছেন। কেউ সে উপহারের র্যাপার আগে খুলে ফেলে, আবার কারো বা এই উপহারটা আছে এটাই বুঝতে সারা জীবন কেটে যায়। এই সময় যখন কোনো মানুশকে বলা হয় যে, তুমি ওর মতো হতে পারো না? ও তো এই কাজে তোমার থেকে এগিয়ে বা তুমি কেনো ওকে অক্ষরে অক্ষরে ফলো করো না? ওর মতো হবার চেষ্টা করো ইত্যাদি, তখনি আসলে ওই মানুষটা থেকে ঐ উপহারটা ছিনিয়ে নেয়া হয়। তার নিজেকে চেনার চেষ্টাটা কেড়ে নেয়া হয়। গুরুত্ত না দেয়া এই জখম, ভবিষ্যতে কোনো মারাত্তক ক্ষতির কারন হতে পারে।
ঈশ্বর নাই কে বলে? ঈশ্বর আছেন, তিনি অদৃশ্য বটে কিন্তু মানবের সব অন্তরের কথা তিনি শোনেন। রাতজাগা ক্লান্ত পাখীর মতো ভেজা চোখের ক্রন্দনের আরাধনা ঈশ্বর শুনেছেন। আমি ফিরে পেয়েছি আমার সেই পুরানো ঘর, পুরানো জানালা। সেই জানালা দিয়ে আজো সেই আগের বাতাসের গন্ধ আমি পাই। ঘরে যে টিকটিকিটা একদিন দেখেছিলাম, আজ আমার পদচারনায় সেও যেনো অনেক খুশী। ছোট সেই টিকটিকিটা আজ বেশ বড় হয়ে উঠেছে। কতদিন ছিলাম না? মাত্র তো ২৪ টা দিন। কোনো কিছুই তেমন পরিবর্তন হয় নাই, আবার অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার মন পরিবর্তন হয়ে গেছে, আমার দেহ পরিবর্তন হয়ে গেছে, ছোট সেই টিকটিকিটাও বড় হয়ে গেছে। ঘরের কোনায় একটা মাকড়শা জাল বেধেছে। এটা আগে ছিলো না। বাথরুমের মেঝটা একটু ধুলায় কালো হয়ে গেছে। হয়তো অনেক ব্যকটেরিয়ারা তাদের মতো করে বাসা বেধে ফেলেছে। টেপটা ভালো মতো বন্ধ করা হয় নাই বিধায় অবিরত টপটপ করে ফোটায় ফোটায় পানি পড়ে জায়গাটা কালো হয়ে গেছে। রান্নাঘরের থালা ধোয়ার জায়গাটা শেওলা পড়ে সবুজ হয়ে গেছে। তারপরেও বড্ড আপন মনে হচ্ছে আমার সবকিছু। ঘরের দেয়ালে হাত দিয়ে আমি বুঝতে পারি ওরাও অনেক খুশি। আমি ফিরে এসেছি এই সেই ঘরে যেথায় আমি কতই না অভিমান করতাম, গুনগুন করে গান গাইতাম। ছোট ছোট পায়ে এঘর থেকে ওঘরে হাটাহাটি করতাম। কি শান্তি আর কি সুখ। আমার চোখ ভিজে যায় আনন্দে। আমার অন্তর বিকশিত হয়ে উঠে সুখে। কি অসাধারন আমার এই ছোট ঘরটি।
এই তো, এখানে বসেই তো আমি চুল আচড়িয়েছি কতদিন। এইতো এই টুলটায় বসে আমি কতদিন আকাশ দেখেছি। যেখানে তাকাই, সব আমার মনে হয় আজ। কত আপন মনে হচ্ছে আজ। যেদিন সকালে আমি এই ঘর থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলাম, বুকের ভিতরে একটা কষ্ট বেধেছিলো, চিনচিন করে ব্যথা লেগেছিলো। ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাওয়া যে কত কষ্টের, যে ঘর ছাড়ে নাই, সে কখনো বুঝবে না পরিচিত ঘর কিভাবে নিঃশব্দে কাদে। সেই কান্না আমিও শুনেছিলাম সেদিন। কিন্তু অভিমানের পাল্লা এতো বেশী ছিলো যে, ঘরের নিঃশব্দ কান্না আমার অন্তরের অভিমানের কাছে হেরে গিয়েছিলো। আজ আমি ফিরে এসেছি। সমস্ত ঘরটা যেনো ফিকফিক করে হেসে উঠলো। এটা আমার ঘর। এই ঘরের প্রতিটি বাতাসে মিশে আছে আমার নিঃশ্বাস, মিশে আছে আমার আকাশের পায়ের ধুলো। ওর শরীরের গন্ধ। আমি চোখ বুঝে নিঃশ্বাস নিলেই যেনো ওর গায়ের গন্ধ পাই। কি অদ্ভুদ না?
ছলনার ফল ভালো হয় না। কিন্তু আমি তো ছলনা করি নাই। যে আমার সাথে ছলনা করেছিলো, যে আমাকে ঘর ছাড়া করেছিলো, যে আমাকে আমার অতীব চেনা এই ঘর থেকে বের করেছিলো, আজ তার ঘর নাই। আজ সে নিজের ছলনায় নিজেই আটকে গেছে। স্ত্রী জাতীরাই আসলে স্ত্রীজাতীর চরম শত্রু। আর এ জন্যেই এক স্ত্রীর ঘর ভাংগে আরেক স্ত্রী জাতীর কারনে। পুরুষ সব সময়ই উদাসীন। তাকে ধরে রাখতে হয়। তার হাত ছাড়তে হয় না। আমি ওর হাত ছেড়ে বুঝেছিলাম, আরেকটা হাত আমার মনের মতো নাও হতে পারে। সেই হাত, সেই আংগুল, সেই হাতের ছোয়া আমার ফেলে যাওয়া হাতের মতো নাও হতে পারে। আমি এই উপলব্দিটা বুঝেছিলাম সেই রাতেই যেদিন আমি আমার আকাশ থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। সেদিন বুঝেছি যেদিন রাতে আমি ঘন কালো আকাশ দেখে ভয় পেয়েছিলাম। আমি তো এই কালো আকাশকে চাই নাই। আমি চেয়েছিলাম জোস্নাভরা নীল আকাশ।
আজ আমার ঘরের সেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের ওই নীল আকাশটাকে দেখছি। ফুরফুরা বাতাস আমার জানালায় ঢোকছে আর আমাকে শীতল করে দিচ্ছে। কতদিন এই নির্মল বাতাস আমার এই ঘরে যে প্রবেশ করে নাই কে জানে। আজ বাতাসেরাও আনন্দিত। অফুরন্ত বাতাস। বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়ার মধ্যে কত যে আনন্দ। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে আমার আকাশের পানে ওর ভালোবাসার গন্ধ পাচ্ছি।
ঈশ্বর আমাকে আবারো ফিরিয়ে এনেছে আমার সেই পরিচিত ঘরে যেখান থেকে আমি একবার ঝরে পড়েছিলাম, আজ আবারো আমার বাগানে আমি মালী হিসাবেই ফিরে এসেছি। দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দেয়ালকে বললাম, জানো দেয়াল, আমি আমার এই দূর্বল শরীর তোমার গায়ে হেলান দিয়ে আবার দাড়াতে চাই, তুমি আমাকে ধরে রেখো। আমি সেই টপটপ করে ফোটায় ফোটায় পানি পরা টেপটাকে বললাম, আমি আবার ফিরে এসেছি, এবার আর তোমাকে ফোটা ফোটা অশ্রু বিসর্জনে কাদতে দেবো না। তুমি আমাকে গরমে শীতল করো আর আমাকে পরিশুদ্ধ করো। আমি আমার সেই পরিচিত রান্নাঘরের চুলাটার কাছে গিয়ে বললাম, যে আগুনে আমি এতোদিন পূরেছি, আজ বুঝতে পারি, তুমি কতোটা আগুনে পূড়ে আমাকে অন্ন দাও, সুমিষ্ট খাবার দাও। আমি আবারো তোমাকে আমার আদরের হাত দিয়ে দিয়ে ভরে দেবো। খাটের কোনায় বসে আমি ভাবী আর ভাবী, এই পুরু সংসারটা আমার। এই সংসারে আছে টিকটিকি, আছে বাতাস, আছে জানালা, আছে রাতের জ্যোৎস্না। আর আছে আমার ভালোবাসা আকাশের জন্য।
আমি আর কখনো আকাশকে ছেরে কোথাও যাবো না।
কিছু কিছু অপেক্ষার প্রহর অনেক লম্বা। এই প্রহরগুলি কাটতে চায় না। মন উতালা করে, মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। আবার এই মনই নিজেকে শান্তনা দেয়। অদ্ভুত না এই “মন” বিষয়ক ব্য্যাপারটা?? কখনো কখনো হাজার বছর এক সাথে থেকেও কেউ কেউ আপন হয় না। আবার কেউ কেউ ক্ষনিকের মধ্যেই কেনো যেনো মনে হয়, আরে এই তো সে, কই ছিলো? কিন্তু এটাও হয়তো সত্য নয়। আবার সত্যও হতে পারে। মানুষের বাচার জন্য চাই একজন সুরক্ষাকারী বটবৃক্ষ। আর দরকার সেই বটবৃক্ষের তলায় হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার মতো কেউ একজন।
অনেক সাধ আমাদের জীবনে, কিন্তু সাধ্য না থাকায় মাঝে মাঝে মনে হয়, এমন কি কেউ নাই যে আমাকে একটা পথ বাতলে দেয় যে, এখানে এইটা করো, তবেই না পাবে তুমি তোমার মনের ইচ্ছা পুরনের চাবিটা!! শুধু খেয়ে পড়ে বেচে থাকার নামই জীবন না। এর বাইরেও কিছু থাকে। নতুন নতুন জায়গায় অনুসন্ধান করে জীবন শুধু পিছিয়্যেই পড়ে, সামনে যেনো আগাইতেই চায় না। জীবনে সম্ভবত স্থিতি আসা খুব জরুরী। হোক সেটা কোনো এক মান্দাতার আমলের আদলেই। তাই হয়তো পরান জায়গাতেই আসল সুখের সন্ধান রয়েই যায় যা প্রথম চোখে পড়ে নাই। সব সময় পরিস্কার আকাশই মানুষকে উদ্বেলিত করে না, কোনো কোনো সময় মেঘলা আকাশও মানুষকে উদ্বেলিত করে। কিন্তু আমি সবসময়ই ঝড়ো আকাশকে ভয় পাই। ভয় পাই এই কারনে যে, থাক……
আশ্বিন মাসের ভোরবেলায় অতি ঈষৎ নবিন শীতল বাতাশে নিদ্রোত্থিত দেহে তরুপল্লব যেমন শিহরিত হয়, ভরা গঙ্গার উপর শরত প্রভাতের কাচা সোনা রোদ যেভাবে চাপা ফুলের মত ফুটে উঠে, আজ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার দুরন্ত যৌবন জোয়ারের জলের মধ্যে রাজ হাসের মত ভেসে উঠেছে। আপনি এতদিন হয়ত দিনের আলো কিংবা রাত্রির ছায়ায়তা দেখতে পান নাই, কিন্তু আজিকার এই বর্ষণ আপনার পঞ্জরে পঞ্জরে ঘৃতকুমারি নৌকার মত চারিদিকে ঘুরপাক খেয়ে আপনার চারিগাছি মল অনবদ্য এক প্রেমের সুচনা করেছে। অপেক্ষা করুন সে আসবে, আর সে আপনার জন্যই আসবে। যখন সে আসবে, দেখবেন ঐ দুরের ঘাটে যে ফিঙেটি বাসা বেধেছে সে কোন এক ভোরে উসুখুসু করে জেগে মৎস্যপুচ্ছের ন্যায় তার জোড়াপুচ্ছ দুই চারিবার দ্রুত নাড়াইয়া শিস দিয়া আকাশে উড়িয়া যাইবে। অথবা পাশের বাসায় কোন এক কোকিল উচ্চস্বরে ডাকিয়া কুহু কুহু গানে কলরব করিবে। তখন আপনার এই ইচ্ছা, এই সাধ বৃষ্টিতে ভিজার জন্য আর অপূর্ণ থাকবে না।
এক যে ছিল রাজকুমার, আর এক যে ছিল রাজকুমারি। রাজকুমার রাজকুমারিকে আর রাজকুমারি রাজকুমারকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু হটাত করে কোন এক দিন রাজকুমার হারিয়ে যায়। দিন যায়, রাত যায়, মাস যায় বছর আসে, বর্ষা যায় শিত আসে, রাজকুমারি পথ চেয়ে বসে থাকে। কিন্তু রাজকুমারের কোন হদিস মেলে না। চোখের সবগুলো স্বপ্ন নিয়ে আর অশ্রুভরা নেত্রে রাজকুমারি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জস্না দেখে, চাদের পানে চেয়ে ঐ চাদের বুরির সঙ্গে একাই কথা বলে। কত রাজ কুমার এলো গেলো। কিন্তু রাজকুমারীর কোন রাজকুমারের প্রেমেই পরতে পারলেন না। তার রাজ্য চাই না, জহরত চাই না, সোনার পালঙ্ক চাই না। তিনি শুধু রাজকুমারের জন্য পথ চেয়ে থাকেন।
একদিন হটাত কোন এক বসন্তের সকালে মাথা ভর্তি এলো মেলো চুল নিয়ে, উসুখুসু খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে রাজকুমার এসে হাজির। রাজকুমারি তার জীবনের সব আনন্দ আর ভালবাসা দিয়ে রাজকুমারকে জরিয়ে ধরে শুধু বললেন, আমাকে একা ফেলে তুমি কোথায় গিয়েছিলে রাজকুমার? আমি তো তোমার পথ চেয়েই এতটা দিন, এতটা সময় পার করে দিয়েছি, একবারও কি মনে পরে নাই আমায়? তুমি কি আমার ভালোবাসার স্নিগ্ধ ঘ্রান কখনোই পাও নাই রাজকুমার? এই বুকে কান পেতে দেখ, কি উত্তাপ আর কি যন্ত্রনা নিয়ে আমি এই এতগুল বছর তোমার প্রতিক্ষায় অপেক্ষা করে আছি! আমাকে তুমি তোমার বুকের ভিতরে একটু জায়গা দাও রাজকুমার। আমি বড় ক্লান্ত, আমি আজ অনেক অবসন্ন। আমাকে জোর করে ধরে রাখ এবার। আমি তোমাকে আর কখনো হারাতে চাই না কুমার।
রাজকুমার তার পকেট থেকে একটি ছোট ঘাস ফুল বের করে রাজকুমারির ঘন কালো চুলের খোঁপায় গুজে দিয়ে বললেন, এই হোক সাক্ষী আজ তোমার আর আমার প্রেমের আলিঙ্গনের। আমাদের সুতীব্র ভালোবাসার।
দিন যায়, রাত যায়, বড় ভাল জীবন কাটছিল রাজকুমারের আর রাজকুমারির। একদিন হটাত রাজকুমারের অন্তর্ধান হয়। রানী আবারো একা বসে থাকেন ঐ বেলকনির রেলিং ধরে। সন্ধায় চিল কাতুরের ডাকে তার মন ভারি হয়ে আসে। জোনাকির ডাকে তার সব অতিতের কথা মনে হয়। মনে হয় রাজকুমার তার পাশেই হাত ধরে বসে আছেন। কিন্তু না। সব আশা, আহ্লাদ, সব স্মৃতি মলিন করে দিয়ে তার গরভের অনাগত সন্তানের নড়াচড়ায় সম্বিত ফিরে আসে।
আজ নতুন রাজকুমার এসেছে তার জীবনে। হাটি হাটি পা পা করে ছোট রাজকুমার বড় হতে থাকে। একদিন সে কথা বলতে থাকে। ছোট রাজকুমার কে মা রাজকুমারি কতই ই না গল্প শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে দেন। কিন্তু রাজকুমারি সব সময় একই গল্প বলতে থাকে……… এক যে ছিল রাজা আর এক যে ছিল রানী। তাদের ছিল এক রাজপুত্তর। রাজপুত্রকে নিয়ে রাজা আর রানী বড় ভালবাসায় জীবন কাতাইতেছিলেন। একদিন হটাত করে রাজা হারিয়ে যান কোন এক গহিন জঙ্গলের ভিতর। রাজপুত্র ধীরে ধীরে বড় হয়। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, মা আমার বাবা কই? রানী চোখের জল মুছে ছোট রাজপুত্রের কপোলে চুমি খেয়ে বলেন, তোমার বাবা একদিন ঘোড়ায় চরে টকবক করে ঐ গহিন জঙ্গল থেকে আমাদের নিতে আসবেন। তুমি বড় হও। রাজা ফিরে না এলে আমরাই তাঁকে খুজে আনবো। ছোট রাজপুত্র ঐ গহিন জঙ্গলের রহস্য বুজে উঠতে পারেন না। শুধু মাকে জরিয়ে ধরে থাকে আর বলে, মা আমি তোমায় খুব ভালবাসি।
যেদিন দেখবেন আকাশের মেঘ মালা আপনার জগতের কাছে শেষ বর্ষণ হয়ে আপনার পায়ের কাছে টাপুর টুপুর করে লাফিয়ে পরছে, যেদিন দেখবেন ঐ পাশের জঙ্গলের ভিতর অবহেলায় কোন এক রজনি গন্ধার সুবাস আপনার নাশারন্দ্রে ভেসে আসছে, যেদিন দেখবেন চারিদিকের মানুষ গুলো আপনাকে দেখে কোন কারন ছারাই আর আপনাকে সেই আগের মত করে দেখছে না কিন্তু মিটি মিটি করে হাসছে আপনার নতুন ভালোবাসার অববয়বে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীতে আরও অনেক বছর বাচতে ইচ্ছে করবে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীর সব রঙ সুন্দর, যেদিন মনে হবে আপনার হাসতে ভাল লাগে, কাদতে ভাল লাগে, একাকী বসে জানালায় পাখি দেখতে ভাল লাগছে, অথবা যেদিন দেখবেন চোখের জলের মধ্যে অফুরন্ত কষ্টের মাঝেও মন বড় উতালা হয়ে আছে কোন এক অস্পৃশ্য মানুষের জন্য, যেদিন দেখবেন সোনালী রোদ আপনাকে উদ্ভাসিত করে, যেদিন দেখবেন জোড়া শালিক না দেখেও আপনার মনে হবে এই বুঝি আজকে ও আসবে, সেদিন আপনার এই অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে দেখবেন মাঘের পরে ঐ দিগন্তে দাড়িয়ে আছেন তিনি যাকে আপনি এতদিন ধরে খুজছেন। আপনার আর কোন কিছুর জন্যই কাউকে কিছুই বলার নাই। শুধু আপনি আর থাকবে বনলতা সেনের মত সেই মানুষটি, বলবেন তখন, ………এতদিন কোথায় ছিলেন?
বলুন না কোথায় তাঁকে দেখেছেন প্রথমবার?
অপেক্ষার অনেক নাম। কখনো কষ্ট, কখনো সুখ, কখনো উদাসীনতা আবার কখনো শুধুই ভালবাসা। আজ আপনার এই অপেক্ষার নাম কি সুখ আর ভালবাসা? সার্থক হোক সে মিলন, আর সার্থক হোক আপনার চিত্ত। অহংকারীরা দেখুক আপনার দিবসের মুখদ্ধকর সীমাহীন আনন্দের চ্ছটা আর নিন্দুকেরা জ্বলে পুড়ে মরুক নিজ দাবগাহনে। আপনার ইচ্ছাই আপনাকে নিয়ে যাবে স্বর্গের ঐ নীল জানালায় যেখানে বসে আপনি রাতের কালো আকাশে ধ্রুবতারা দেখবেন আর নিজেকে অস্পৃশ্য কোন এক মানুষের পাশে ঠায় দাড়িয়ে অরুন্ধতী হয়ে কাল পুরুষকে ছারিয়ে সকালের লাল সূর্যের দিগন্ত রেখা ছুয়ে দেবেন। আমার সকল শুভ কামনা রইল আপনার জন্য। আপনার সবার জন্য।
রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে মৃন্ময়ীর বাল্য আর যৌবনকাল কিভাবে দ্বিখণ্ডিত হইয়া গিয়াছিল তার চমৎকার একটা বর্ণনা করিয়াছিলেন ঠিক এইভাবে-” নিপুন অস্ত্রকার এমন সূক্ষ্ম তরবারি নির্মাণ করিতে পারে যে, তদ্বারা মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করিলেও সে জানিতে পারে না, অবশেষে নাড়া দিলে দুই অর্ধখন্ড ভিন্ন হইয়া যায়। বিধাতার তরবারি সেইরূপ সূক্ষ্ম, কখন তিনি মৃন্ময়ীর বাল্য ও যৌবনের মাঝখানে আঘাত করিয়াছিলেন সে জানিতে পারে নাই। আজ কেমন করিয়া নাড়া পাইয়া বাল্য- অংশ যৌবন হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িল এবং মৃন্ময়ী বিস্মিত হইয়া ব্যথিত হইয়া চাহিয়া রহিল।”
আমিও যেদিন এই অস্পৃশ্য পুরুষটাকে প্রথম আমার অন্তরদৃষ্টি দিয়া দেখিয়াছিলাম, তখন আমিও ব্যথিত হৃদয়ে বুঝিতে পারিলাম, আমার আর বাল্যকাল বলিয়া কিছুই অবশিষ্ট নাই। আমার বাল্যকাল আমার অজান্তেই আমা হইতে কবে বিদায় নিয়া চলিয়া গিয়াছে, আমি বর্ষার কিংবা শরতের অথবা শীতের কোন ঋতুতেই তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যখন বুঝিতে পারিলাম, তখন আমার শুধু এইটুকু মনে হইল আম্র কাননের শুভিত কোন পুস্পের জন্য যখন মৌমাছিরা দূর দূরান্ত হইতে উড়িয়া আসে, আমিও তাই। কিন্তু আমার ভ্রম কাটিতে বেশি সময় লাগিল না। আমি যাহাকে পুস্প বলিয়া এতদূর উড়িয়া আসিয়াছি, উহা আসলে অন্য কাহারো বাগানের মৌমাছিমাত্র। সেই বাগানে পুস্প আছে, তাহার সহিত মৌমাছির সঙ্গে তাহার দলবলও আছে। বাগানের মালিও আছে, মালিকও আছে। আমি উহাতে বিচরন করিতে পারি কিন্তু উহা আমার নয়। আমি তাহাকে দূর হইতে আপন ভাবিতে পারি কিন্তু কাছে গিয়া বলিতে পারি না, ইহা আমার। আমি ইহাকে অনুভব করিতে পারি কিন্তু জড়াইয়া ধরিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে পারি না, এই পৃথিবীতে আমি আসিয়াছি শুধুমাত্র ইহার পাজর হইয়া।
আমি যাহা দেখিতে পাইতেছি জগতে তাহা হইতে আরও অধিক সৌন্দর্যের আর অধিক আকর্ষণীয় হয়ত কিছু আছে কিন্তু যাহাকে একবার মনে ধরিয়াছে, তাহা হইতে আরও কোন দামী, আকর্ষণীয় অথবা মূল্যবান হাতের কাছে আনিয়া দিলেও মনে হইবে, আমি উহা চাই নাই। আমি চাহিয়াছি শুধু উহা যাহা আমার কাছে এখন অস্পৃশ্যই। তারপরেও সে আমার। মনের ভিতরের যে জগত সেখানে তো আর এই বায্যিক পৃথিবীর কোন আইন বা আদালতের অস্তিত্ব নাই। তাই নীলিমার আকাশের দিকে তাকাইলেও আমি তাহাকে দেখি আবার ঘন বর্ষার বৃষ্টির ছায়াতলেও আমি তাহাকে দেখি। কখনো সে আমাকে জলের মত ভাসাইয়া লইয়া যায় অতল সমুদ্রের গহিনতলে আবার কখনো সে আমাকে জলের স্রোতে ভাসাইয়া দেয় আমার দুই নয়নের ধারা।
আজ থেকে বহু বছর আগে যখন তোমার এই পৃথিবীতে আগমন হইয়াছিল, তারও অনেককাল পরে আমি এই পৃথিবীর নীল আকাশ দেখিয়াছিলাম, লাল সূর্য দেখিয়াছিলাম, বাতাসের গন্ধ শুকিয়াছিলাম। কিন্তু তখন আমার কাছে ঐ নীল আকাশ শুধু নীলই ছিল, সূর্য তখন একটা জলন্ত অগ্নিপদার্থ হিসাবেই ছিল, বাতাসের গন্ধ আমি ভাল করে মনেও করিতে পারি নাই। কিন্তু যেদিন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হইয়াছিল, আমি নীল আকাশের মাঝে নীলমেঘ দেখিয়াছিলাম, ঐ মেঘেরা কিভাবে একস্থান হইতে ভাসিয়া ভাসিয়া অন্যত্র চলিয়া যায় তাহা দেখিয়াছিলাম, ঐ প্রখর সূর্যের আলো আমার অপেক্ষার পালাকেও যন্ত্রনা দিতে পারে নাই, বাতাসের গন্ধের সঙ্গে আমি আরও একটা গন্ধ শুকিয়াছিলাম। আর সেটা তোমার গায়ের গন্ধ, তোমার সুগন্ধির গন্ধ, তোমার ক্লান্তির ঘর্মাক্ত শরীরে গন্ধ।
আজ অনেক বছর হইয়া গেলো, আমি এখনো সূর্যকে দেখি, আমি ঐ নীলাকাশ দেখি, ঐ নীলাকাশের নীল মেঘগুলি দেখি, দক্ষিনা বাতাসের গন্ধও শুকি। সবকিছু আগের মতই আছে বলিয়া মনে হয়। শুধু মনে হয় ঐ বাতাসের সাথে তোমার গায়ের গন্ধটা নাই, তোমার সুগন্ধির গন্ধটা নাই, তোমার গায়ের সেই ক্লান্তির ঘর্মাক্ত গায়ের গন্ধটাও নাই।
আমি অনেক খুজেছি তোমায়, ” শিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে…… “
আচ্ছা তুমি কি কোথাও নাই?
কোন একরাতে হটাত যদি বাইরের আকাশের মুষলধারার বৃষ্টির শব্দে কখনো ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি আমার বেলকনিতে এসে দারাই। উম্মুক্ত সেই বেলকনি, বৃষ্টিরচ্ছটা আমার মুখের চারিদিকে এসে আমাকে ভিজিয়ে দেয়। চোখের চশমাটা ঝাপ্সা হয়ে আসে। আমি মুছতে চাইনা সেই কাচের চশমাটা। আকাশের বিদ্যুৎ ঝলকানিতে আমি অন্ধকারে গাছের ঢালগুলি দেখি, পাতাগুলি দেখি, ভিজে ওরা শিতল হচ্ছে ধরণির তটে। গাছের মগঢালে বাবুই পাখির বাসাগুলি অনবরত এদিক সেদিক হেলেদুলে ঢুলছে। পাখিরা নিশ্চিতে হয়ত জেগে আছে তাদের ছোট ছোট কচি কচি বাচ্চাদের নিয়ে। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হয়ত এখন বৃষ্টি নাই, আবার কোথাও না কোথাও হয়ত আরও অঝোর ধারায় ঘূর্ণিপাক হচ্ছে। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি আমার এই ছোট্ট বেলকনির একেবারে কার্নিশের কাছে। সব মানুষেরা এখন ঘুমিয়ে আছে। আমি জেগে আছি। মনে পরছে আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কোন একদিন তোমার সঙ্গে আমিও এমন একরাতে ঘনকালো আকাশের এই বৃষ্টির ধারা দেখেছিলাম। তখন তুমি ছিলে আমার পাশে আমাকে জরিয়ে ধরে বলেছিলে, আমি সব সময় থাকবো ঠিক এমন করে এই জলের ধারার সঙ্গে।
আজ আমি কিন্তু একা।
…………… তুমি কি আছো এখানে?