গত ১৪ তারিখে অর্থাৎ ১৪ মে ২০২৫ তারিখে ছোট মেয়ের কনভোকেশন উপলক্ষে আমি এবং আমার স্ত্রী আমেরিকার বাল্টিমোরে গিয়েছিলাম। প্রায় এক মাসের মতো ছুটি কাটিয়েছি ওখানে। এর আগে আমি একাই ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় গিয়েছিলাম কিন্তু তখন ব্যাপারটা ছিলো অন্য রকম। এবারের ভ্রমনটা শুধু ভ্রমনই ছিলো না, এর সাথে মিক্সড ছিলো হাজার পদের ইভেন্ট, চিন্তাভাবনা এবং পরিকল্পনা। তাই ভাবছি, ক্রমান্বয়ে এসব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে একটা ভ্রমন কাহিনী লিখবো। তারই সুচনায় আজকের প্রথম পর্ব।
ছোট ভাবী এবং তার বাসা
ছোট ভাবী মারা গিয়েছিলেন ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে। সময় কত দ্রুত চলে যায় ভাবাই যায় না। দেখতে দেখতে প্রায় ৪ বছরের বেশী পার হয়ে গেলো। ভাবীর সাথে আমার খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিল। খুব ভালো মানুষ ছিলেন ভাবি। দেখতেও সুন্দর ছিলেন। এবার আমেরিকায় গিয়ে ভাবীর বাসাটা দেখলাম যেখানে এখনো ছোটভাই একাই থাকেন।
বাসাটা দেখেই মনের ভিতর খুব ছট করে উঠেছিল এই ভেবে যে, এই বাড়িটার চারিদিকে একটা সময় এই মানুষটা হাটাচলা করেছেন। এখনো নিখুতভাবে পরীক্ষা করলে তার পায়ের চিহ্ন হয়তো পাওয়া যাবে। বাড়িটার দরজায় পরীক্ষা করলে হয়তো তার হাতের ছাপটাও পাওয়া যাবে। দেখলাম, বাড়িটার সামনে বেশ কিছু গাছ লাগানো, গাছগুলি এখন বড় হয়ে গেছে। ভাবি নিজেই লাগিয়েছিলেন গাছগুলি। মানুষটা নাই কিন্তু গাছগুলি এখনো রয়ে গেছে, আর তারা ধিরে ধীরে বড় হচ্ছে। দেখলাম, গাছের টবগুলিতে কিছু কিছু পাথর আর মাটির স্তুপ আছে। একটা পানির টেপও আছে। ইমোশনালি ভাবছিলাম যে, সময়টাকে যদি ব্যাকওয়ার্ড মুভ করে চার বছরের আগে যাই যখন ভাবী জীবিত ছিলেন, হয়তো দেখা যাবে, উনি বাড়ীটার চারিধারে ঘুরছেন, বিকাল বাড়ীটার সামনের সিড়িতে বসে চা খাচ্ছেন, কিংবা শান্ত দুপুরের পরে হাতে কয়েকটা গাছের চাড়া নিয়ে মনের আনন্দে টবগুলিতে গাছগুলি লাগাচ্ছেন। আশেপাশের বাড়ির কোনো প্রতিবেশি হয়তো তাকে দেখতে পেয়ে হাই-হ্যালোও করছেন। ভাবি হয়তো মুচকী হেসে তাকে সম্বোধন করছেন। অথচ আজকে সেই মানুষটা নাই। সবকিছুই আছে, বাড়িটা আছে, সিড়িটা আছে, গাছের টবগুলি আছে, গাছগুলিও আছে, কিন্তু উনি নেই। এটা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।
ছোটভাই নিজেও সেই সব দিনের কথা বলতে গিয়ে অনেকটা ইমোশনাল হয়ে উঠছিলেন। এই বাড়িটা কেনার আগে ভাবী নাকি প্রতিদিন এই এলাকায় এসে বাড়িটার সামনে গাড়িতে বসে থাকতেন। তার এই বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছিল। অবশেষে যেভাবেই হোক, ভাবীর সেই মনের ইচ্ছাটা ছোটভাই পুরন করেছিলেন বাড়িটা কিনে।
ছোটভাই একটা সিগারেট ধরিয়ে দূর পড়ন্ত বিকেলের দূর আকাশের প্রায় ডুবু ডুবু সূর্যের দিকে তাকিয়ে একমনে বলছিলেন-
-জানেন, যখন শিমুলকে নিয়ে আমি আমেরিকায় আসলাম, সাথে দুটু ছেলেমেয়ে। আমাদের খুব অল্প আয় ছিলো। আমার একার আয়ে সংসার চলছিলো না। বাচ্চারাও বেশ ছোট, পরাশুনার খরচ, সংসারের খরচ, নিজেদের খরচ সব মিলিয়ে হাত সব সময় টানাপোড়েনই ছিলো। আজকের দিনের মতো আমার আর্থিক অবস্থা তখন ছিলো না। কোনো উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত শিমুল একটা রেস্টুরেন্টে ক্লিনারের চাকুরি নিয়েছিলো। রেস্টুরেন্টের ফ্লোর, বাথরুম বেসিন ইত্যাদি তাকে ক্লিন করতে হয়েছে। খুব মায়া লাগত আমার। যে মহিলাকে আমি কখনো নিজের বাথরুমটাও ক্লিন করতে দেইনি বাংলাদেশে, সেই মহিলাটা আমাদের সুখের জন্য, একটু আর্থিক অবস্থা ভাল করার জন্য আমেরিকায় এসে পরের ব্যবসার বাথরুম বেসিন ফ্লোর পর্যন্ত ক্লিন করতে হয়েছে। কিন্তু ওর মন খারাপ হতো না। ভালো ইংরেজী বলতে পারত না বলে ভালো কোনো জবেও দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। আজ আমাদের আর্থিক অবস্থার কতই না উন্নতি, কোন ভাবনা নাই এখন টাকা পয়সার, অথচ শিমুল নাই। এখন আমাদের শপেই কত কর্মচারী কাজ করে। বড় আফসোস লাগে মাঝে মাঝে। তার এখনই চলে যাওয়ার সময় ছিলো না আসলে। তার এই বয়সে চিরতরে চলে যাবার কোন কথাই না। কেউ জানতে পারলাম না, সে চলে যাচ্ছে। শিমুল নিজেও কখনো ভাবেনি, তাকে এভাবে অসময়ে চলে যেতে হবে। ওর সবচেয়ে দুশ্চিন্তা ছিল ওর ছেলেকে নিয়ে যে কিনা কোভিডে ভোগছিল। অথচ সিমুল নিজেও করোনায় আক্রান্ত ছিলো। ছেলে লাইফ সাপোর্টে থাকলেও শিমুল নিজেই চলে গেলো সবার আগে।
সবচেয়ে কস্টের ব্যাপারটা হল, আমরা কেহই শিমুলের দাফনের সময় কাছেই ছিলাম না। এটা যে কত বড় ডিপ্রাইভেশন বুঝানো যাবে না। তার ছেলে ফয়সাল করোনায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে লাইফ সাপোর্টে, মেয়ে স্বামী সন্তানসহ আরেক স্টেটে, আমি নিজেও অসুস্থ্য থাকায় সিমুলের কাছে যেতেই পারলাম না। সিমুল পরিবারের কারো সাথেই দাফনের সময় সান্নিধ্য পেলো না। শিমুল কি আমাদের উপর এজন্য খুব রেগেছিল? আমি জানি না। তবে আমি এখন একা একা ভাবি শিমুলের জন্য।
ছোট ভাই আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বাড়ীর সিড়িটার উপর বসে তখনো কথা বলে যাচ্ছিল, আর আমি শুনছিলাম-
-জানেন শিমুল মারা যাওয়ায় আমার পরে সবচেয়ে কার বেশি ক্ষতি হয়েছে?-না, আমি বলতে পারব না, আমি বললাম ছোট ভাইকে।
-শিমুল মারা যাওয়ায় আমার পরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছে জান্নার মেয়ের, তারপর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শিমুলের মায়ের। কারন শিমুল তখন ছোট খাটো কাজ করত যেখান থেকে শিমুল কিছু হলেও টাকা কামাইত। আর সেই কামানো টাকাগুলি শিমুল ওর মাকে পাঠাতো দেশে। আমি যখন শিমুলের টাকাটা ওর মাকে পাঠাইতাম, আমিও ওর অগোচরে কিছু টাকা যোগ করে একটু বেশি এমাউন্টই পাঠাতাম। শিমুল কখনোই ওর মাকে টাকা পাঠাইতে ভুল করতো না। শিমুল মারা যাওয়ার পর শিমুলের মায়ের এই রোজগারটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি মাঝে মাঝে টাকা পাঠাই কিন্তু উনি টাকাগুলি নিজের জন্য খরচ না করে তার ছোট ছেলের জন্য খরচ করে ফেলেন, অথচ তার ছোট ছেলে ইচ্ছে করলে ভাল চাকুরী করে অনেক টাকা কামাইতে পারে। লন্ডন থাকে কিন্তু বড্ড আলসে এবং খাম খেয়ালি জীবন। তাই আমিও আর এখন টাকা পাঠাই না।
জান্নার মেয়েটা শিমুলের সাথে এতোটাই জড়িত ছিলো যে, সে তার বাবা মা ছাড়াই থাকতে পারতো শিমুলের কাছে। জান্নার ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর জান্নার মেয়েটা শিমুলের কাছেই ছিলো। সময়টা ভালই কেটে যাচ্ছিলো। এখন তো জান্নারও একটা বিয়ের দরকার। জান্নার মেয়ের কারনে জান্নারও ভাল বিয়ে হচ্ছে না। অথচ শিমুল থাকলে জান্নার বিয়েটা অনেক আগেই হয়ে যেতো। একটা সময় আসবে-জান্নার মেয়েটার আরো ভোগান্তি বাড়বে। কিন্তু শিমুল থাকলে কোনো ভোগান্তিই হতো না।
কে জানে কার ভাগ্যে কি আছে, বলে ছোট ভাই একটা দীর্ঘশাস ছাড়লেন।
আমি ওনাকে কিছুই বললাম না। শুধু বাড়িটার বাইরের চারিদিকেই কয়েকটা ছবি তুল্লাম। বাড়িটার ভিতরে যেতে ইচ্ছে করে নাই, তাই ভিতরে গেলামই না। অথচ প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাড়িটার সামনে বসে কাটিয়ে গেলাম। ছোট ভাবি ভাল থাকুক, জান্নাতি হন, সে দোয়া করি।
ছোট ভাই তার এই বাসাটায় আমাদের আনার আগে প্রায় ঘন্টা দুয়েক বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরাফেরা করেছিলাম। ছোটভাই যখন প্রথম আমেরিকায় এলেন, কই থাকতেন তিনি সেই বাসাটায়ও নিয়ে গেলেন। এখন সেটা তার নয়, আরেকজন বাড়িটা কিনে বসবাস করে। অদ্ভুত এক জঙ্গলের মতো জায়গা। একটু সস্তা ছিল বাসাটা। আশেপাশে কোনো বসতি নাই।
আসলে ছোট ভাই এখন একেবারে একা। তার জীবনের উপর মনে হয় কোনো দরদ নাই। যখন কিছু জিজ্ঞেস করি, বিয়ে করে অন্তত একাকীত্বকে ঘুচান, কিন্তু উনি সেটা করতে চান না। বয়স তার প্রায় ৬৭ এর কাছাকাছি, এখন এই সময়ে এসে আর সংসারি হইতে চান না। উনি নিজেই বলেন যে, উনার ছেলে আর মেয়ে দুটু খুব ভাল হলেও তার অনুপস্থিতি তাদেরকে একেবারে অসহায় করে ফেলবে। এ জন্য তার বাচতে চাওয়া কিন্তু নিজের জন্য ওনার কিছুই চাওয়া নাই।
সারাদিন দোকানে কাজ করেন, নিজের দোকান। কর্মচারী আছে, তার নিজের ছেলেও দোকানে কাজ করে। দোকানটা মন্দ না। বেশীরভাগ সময় দোকানেই খায়, কখনো বাসি খাবার, কখনো ছেলেমেয়েরা রান্না করে দোকানে নিয়ে আসে, সেগুলিই খান। কন আফসস নাই মনে হয় দেখে। রাতে বাসায় এসে একাই ঘুমান। ছেলে আলাদা থাকে, মেয়েও আলাদা থাকে, আর উনি সেই বাড়িটায় থাকে যেখানে ছোটভাবী থাকতেন।
সময় পান না বলে ওনার গাড়িতে করেই প্রায় ঘন্টা চারেক ঘুরলাম এদিক সেদিক। গাড়িতে বসেই অনেক আলাপ হচ্ছিল। পথিমধ্যে কয়েকটা জায়গায় হল্ট করেছিলাম। তার মধ্যে একটা হলো ডানকিন রেস্টুরেন্ট, পোর্ট এলাকা আর তার বাসা।
পোর্ট এলাকাটা ভীষন সুন্দর। ওখানে প্রায় আধাঘন্টা কাটিয়েছিলাম। এখানকার মানুষগুলি বেশ আনন্দে আছে। বিশাল একটা পোর্ট, লোকাল পোর্ট, পাশেই সি বীচের মতো অনেক রেস্টুরেন্ট, ভ্রাম্যমান খাবারের জায়গা ইত্যাদি।
পোর্ট এলাকাটা একটা অভিজাত আবাসিক এলাকার মতো। এখানকার মানুষ গুলি খুব নিরিবিলিতে বীচের আমেজ অনুভব করেন, ফিশিং করেন, বিকালে পাশের রেষ্টুরেন্ট গুলিতে হয়তো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দেন, বাচ্চারাও পাশের খেলার একটা জায়গা আছে সেখানে আড্ডা দেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এখানের প্রতিটি বাড়িই যেনো রিজোর্ট। আমি জানি না আসলেই এগুলি রিজোর্ট হিসাবে কেউ ভাড়া নেয় কিনা, তবে বাড়িগুলির বারান্দার এরেঞ্জমেন্ট দেখে মনে হয়েছে, হতে পারে।
ছোটভাই আমাদেরকে কোনো গিফট কিনে দিতে পারেন নাই বিধায় আমার জন্য, মেয়ের জন্য, আবিরের জন্য আর মিটুলের জন্য এক হাজার ডলার গিফট করলে। টাকাটা নিতে চাইতে মন চাচ্ছিলো না। কারন আমার আসলেই দরকার নাই। কিন্তু ছোটভাই একজন ভাল মানুষ, হয়তো এটাতে উনার একটা আনন্দ আছে। তাই নিলাম।
ছোট ভাই আসলে একজন অতি সাধারনভাবে চলাফেরা করা মানুশ। ভালো মানুষ।