২৬/৬/২০২৫-বাংলা কলেজের পরীক্ষার্থী এবং আমার স্ত্রী

গত ২৪ জুন ২০২৫ তারিখে সারা দেশ ব্যাপি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বাঙলা কলেজে কেন্দ্র পড়েছে এমন একটি মেয়ে পরীক্ষা শুরু হবার প্রায় পৌনে দুই ঘন্টা পরে পরীক্ষা কেন্দ্রে এসে পরীক্ষা দেয়ার আবদার করে। স্বাভাবিক ভাবেই বাঙলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল যিনি আমার বউ, সে কনভাবেই আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পৌনে দুই ঘন্টার পর কাউকে পরীক্ষা দিতে সে পারে না। তাই মেয়েটির আর ১ম পরীক্ষা দেয়া হল না। কলেজের ভিতর অনেক সাংবাদিক, অনেক সুশীল জনতা সহ আরো অভিভাবকগন ছিলেন। মুহুর্তের মধ্যে মেয়েটির পরীক্ষা না দিতে পারায় সোস্যাল মিডিয়া ভাইরাল হয়ে যায়, সাথে আমার স্ত্রীও। অনেকের অনেক আবেগঘন স্ট্যাটাস, অনেক কথাবার্তা, অনেক কেচ্ছা কাহিনি আর মনতব্যে সোস্যাল মিডিয়া ভরে উঠে-কেনো একটু দয়া করা গেলো না, কেনো মেয়েকে পরীক্ষা হলে ঢোকতে দেয়া হল না, কি হতো যদি একটি মানবিক কারনেই তাকে পৌনে দুই ঘন্টা পড়েও পরীক্ষা দিতে দেয়া উচিত ছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ আইনটা জানে, কেউ জানে না। কেউ বেশি আবেগি, আবার কেউ বোকা। ফলে জেনে, না জেনে, আবেগে যাচ্ছেতাই মন্তব্য করেই যাচ্ছে যেন এটা কলেজ অথরিটি কোন মহা অন্যায় করেছে দেরী করে আসা মেয়েটিকে পরীক্ষা দিতে না দেয়ায়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই পোশট সোস্যাল মিডিয়ায়।

———————————  

আসলেই শিক্ষক বা কলেজের মানবিকতা দেখানোর কোনো সুযোগ নাই। @Myeen Uddin সাহেব লেখকের এই লেখার সাথে আমি আরো যোগ করতে চাই যে,

(১) যদি কলেজ অথরিটি পরীক্ষার দেড় ঘন্টা পরে আইনের তোয়াক্কা না করে পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার হলে ঢোকিয়ে পরীক্ষা নিলেন, তাহলে যে কয়টি প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন তা হলো:

(ক) কোন ক্ষমতার বলে অথরিটি এটা করলেন? তাদের কি সেই ক্ষমত ছিলো? সত্য কথা যে, তাদের সেই ক্ষমতা নাই। তাহলে নিলেন কিভাবে? এই প্রশ্ন কি আসতো না? এই সুশীল সমাজ এবং সাংবাদিকগনই আবার চোখে আংগুল দেখিয়ে প্রশ্ন করতেন।

(খ) তখন এই সুশীল মহল এবং সাংবাদিকগনই আবার এই প্রশ্নও তুলতেন যে,- নিশ্চয়ই এখানে বিপুল অংকের টাকায় প্রশ্ন পত্র ফাস বা ছাত্রির কাছ থেকে বিপুল কিছু গ্রহন করা হয়েছে।

(গ) যেহেতু প্রথম ৩০ মিনিটের মধ্যে MCQ পরীক্ষা শেষ হয়ে অই শেশনটাই ক্লোজ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে কলেজ অথরিটি একস্ট্রা প্রশ্ন পাবেন কোথায় পরীক্ষা নেয়ার জন্য?

এবার আসি ভিন্ন একটা এংগেলেঃ

(২) মেয়েটির মা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এইটাই বা কলেজ প্রমান করবে কিভাবে? হাসপাতালে তার মাকে ভর্তি করানোর অন্তত একটা ভর্তি স্লিপের স্ক্রিন শট কিংবা তার মায়ের ভর্তি অবস্থায় তোলা একটা ছবিও তো কলেজ অথরিটিকে দেখাতে পারতো।

(৩) মেয়েটির এমনিতেই দেড় ঘন্টা দেরি হয়ে গেছে। তার পেরেন্ট কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে একেবারেই কাছে ছিলো। সেতো তার পেরেন্ট কলেজের যে কোনো একজন শিক্ষককে সাথে নিয়েও আসতে পারতো যাতে শিক্ষক টু শিক্ষক ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করা যায়। মেয়েটি সেটা করতেনি। হয়তো অনেকে বল্বেন-মায়ের এই অবস্থায় তার মাথা ঠিক ছিলো না, বা বুদ্ধিতে আসে নাই। কিন্তু মেয়েটি ঠিকই তার এক খালাকে সাথে নিয়ে এসছেন। সেটাই যে তার খালা সেটাও কিন্তু কলেজ অথরিটির পক্ষে প্রমান করা সম্ভব না।

অনেকেই মানবতা, দয়া কিংবা অধিকারের কথা বলে ফেসবুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন। পরীক্ষার ফি জমা দিয়েছে তো দেরী করে এলেও তার অধিকার আছে হলে বসার ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলি কোনো যুক্তি না। প্লেনের টিকেট কেটে টাইমমত এয়ারপোর্টে যাইয়েন না, দেইখেন প্লেন আপনার জন্য অপেক্ষা করে কিনা আর করলে কতোক্ষন। সব কিছুর একটা নিয়ম আছে।

হ্যা, মেয়েটির এখনো বাকি পরীক্ষা গুলি দেবার সুযোগ আছে। এর মধ্যে সে যদি তার মায়ের এই অকাল এক্সিডেন্টের কথা উল্লেখ করে শিক্ষা বোর্ডের কাছে একটা পরীক্ষার জন্য রি-এপ্লাই করে, সরকার হয়তোবা আরো অন্যান্য ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীর সাথে তারটাও গ্রহন করে সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু কলেজ শিক্ষকগন কিংবা কলেজ অথরিটির পক্ষে কোনো কালেও সম্ভব না।

Mayeen Uddin: এর লেখা

আজ মেয়েটির ছবি ভাইরাল।

মা স্ট্রোক করায় হাসপাতালে পৌঁছে দিতে গিয়ে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দেরি হয়। সে জন্য তাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ভিডিওতে মেয়েটির চোখের জল দেখে আমারও বুক ভেঙে যাচ্ছে। অনেকে পরীক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকদের কঠোর সমালোচনা করছেন, কেউ কেউ গালাগালিও করছেন। অনেকেই বলছেন, “মাত্র এক ঘণ্টা তো! মানবিক কারণে পরীক্ষা দিতে দেওয়া উচিত ছিল।” কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা শিক্ষকরা অনেক সময় ‘অমানবিক’ হতে বাধ্য হই, কারণ আমরা আসলে অক্ষম।

আমাদের এই অক্ষমতার পেছনে রয়েছে —সরকারের নীতিমালা, শিক্ষা বোর্ডের বিধি আর পাবলিক পরীক্ষার কঠোর আইন। এই আইন আমাদের এমনভাবে বেঁধে রেখেছে যে, মানবিকতা দেখানোর ক্ষমতাটুকুও আমাদের হাতে নেই। পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের পরে কাউকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া যায় না — এটা আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা।

যেমন এইচএসসি পরীক্ষায় দুটি অংশ থাকে — MCQ ও CQ। MCQ অংশ চলে প্রথম ৩০ মিনিট। এরপর সেই উত্তরপত্র উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং CQ পরীক্ষার শুরু হয়। এই নির্ধারিত সময়ের পরে কেউ কেন্দ্রে এলে শিক্ষক কীভাবে তাকে নতুন করে MCQ প্রশ্ন দেবে?

শিক্ষকের হাতে সে ক্ষমতা নেই।

তাহলে প্রশ্ন হলো — মানবিকতার জায়গাটা কে দেখবে?

সেই দায়িত্ব কি শিক্ষা বোর্ড বা সরকারের নয়? সরকার চাইলে এই মেয়েটির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় তার বিষয়ে ‘অটোপাশ’ দিতে পারে। আমাদের হাতে সেই সিদ্ধান্ত নেই।

আমি একবার একজন ব্যাংকারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

“একজন মুমূর্ষু রোগীর অপারেশন করতে আজই ১০ লাখ টাকা দরকার। আপনি জানেন, সে পরদিন টাকা ফেরত দেবে। আপনার ক্যাশে কোটি কোটি টাকা আছে — আপনি কি তাকে মানবিক কারণে এই টাকা দিয়ে দিতে পারবেন?”

উত্তর ছিল, “না, নিয়মে নেই, সম্ভব না।”

এই যেমন একটা প্রাণের প্রশ্ন, তেমনই পরীক্ষা নিয়েও নিয়মের বাঁধনে আমাদের হাতে কিছুই থাকে না। কিন্তু তবুও বলি —

পরীক্ষা মাত্র এক বছরের, আর জীবন একটাই।

মানবিকতার জায়গাটুকু যেন আইনের বাইরে না পড়ে — এই হোক আমাদের প্রার্থনা।