সবাই তাঁকে শায়েস্তা নামেই চিনতো। সে আমার বোনদের মধ্যে ছিলো ২য়। শায়েস্তার জীবন একটা দুখী মানুষের কাহিনী ছাড়া আর কিছুই না। তার গায়ের রং ছিলো বেশ কালো কিন্তু খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে ছিলো আমার এই বোন শায়েস্তা খাতুন। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহই আসলে পুরু ৫ বোন আর আমি সাথে মায়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে এতোটাই হিমশিম খাচ্ছিলেন যে, এতা ছিলো আমার ভাইয়ের জন্য অতিমাত্রায় একটা চাপ। তার উপর সবে মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে, চারিদিকে মানুষ যেমন বেকার তেমনি শুরু হয়েছে দূর্ভিক্ষ। এর মাঝেই আমার বড় ভাই যতোটা পেরেছে তার সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে আমরা কিছুটা হলেও ভালো থাকি। অভাবের সংসারে আসলে কোনো কিছুই নিজেদের নিয়ন্ত্রনে থাকে না। মায়ের উপর চাপ যেনো আরো বেশী ছিলো। ৫ টাই প্রায় বিবাহ যোগ্য মেয়ে, আমিই এক মাত্র ছোট। দেশের অবস্থ্যা শোচনীয়, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই। যখন তখন যে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। ফলে মা নিজেও চাচ্ছিলেন মেয়েগুলির তারাতাড়ি বিয়ে হয়ে যাক। ঠিক এই সময়ে বরিশাল বাড়ি একটা ছেলে শায়েস্তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়। নাম সুলতান আহমদ। মা শায়েস্তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। এই বিয়েতে হাবীব ভাই রাজী ছিলেন না। কেনো ছিলেন না, বা কেনো মা ই বা রাজী ছিলেন এই অংক আমার কাছে পরিষ্কার ছিলো না আর না আমার বুঝবার বয়স ছিলো। শায়েস্তার কোলে একটা কন্যা সন্তান আসে। ওর নাম রাখা হয় শেফালী। একদিন সুলতান তার নিজের বাড়ি বরিশাল যাওয়ার জন্য গেলে সুলতান আর কখনোই ফিরে আসে নাই। কি হয়েছিলো, কোথায় উধাও হয়ে গেলো, নাকি রাস্তায় মারাই গিয়েছিলো কিছুই আর জানা যায় নাই। আজ অবধি আমাদের কারোই জানা নাই এই সুলতান কি বেচে আছে নাকি মরে গেছে। দিন যায়, মাস যায়, বছর শেষ হয়ে যায়, শায়েস্তা সুলতানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক সময় আমরা ধরে নেই যে সুলতান হয়তো আর ফিরে আসবে না অথবা তার মৃত্যু হয়েছে। এমনি অবস্থায় ১৯৭৮ সালে আমার বড় ভাই আমেরিকায় স্কলারশীপ পান। কিন্তু তখন সবেমাত্র লায়লার বিয়ে হয়েছে, ফাতেমার ও বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো, সাফিয়া তো আর ছিলোই না। বাকী ছিলো শায়েস্তা আর মেহের। একদিন ঢাকা থেকে একটা বিয়ের সমন্ধ আসে শায়েস্তার জন্য, নাম আলি আহমদ। উর্দু রোডে থাকে, কুট্টি পরিবার না হলেও কুট্টিদের সাথে থাকতে থাকতে প্রায় কুট্টি দের মতোই আচরন ছিলো। বিগ হার্টেড ম্যান কিন্তু সামর্থের বাইরে খরচের অভ্যাষ। কিন্তু আলী আহমদের৪ স্ত্রী বিয়োগ হয়ে গিয়েছিলো। সেই ঘরে একটা মাত্র মেয়ে ছিলো নাম লায়লুন্নাহার। খুবই সুন্দর একটা মেয়ে ছিলো। প্রায় ১৫ বছর বয়সের। শায়েস্তার সাথে আলী আহমদের বিয়ে হবার পর শাতেস্তারা উর্দু রোডে চলে আসে। এই আলি আহমদের৪ ঘরেই শায়েস্তা ৪ টি সন্তান জন্ম দেয়- ফারুক, নুরুন্নাহার, লিয়াকত আর শওকাত। লিয়াকত আর শওকাত জমজ। লিয়াকত আর শ ওকাতের বয়স যখন মাত্র ৫ মাস, তখন শায়েস্তার মৃত্যু হয়। আর ওর মারা যাওয়ার কারনে আলী আহমদ সব বাচ্চাদেরেকে এক সাথে আমার মায়ের কাছে রেখে চলে আসে। একদিকে শেফালি ছিলো মায়ের ঘাড়ের উপর, অন্যদিকে শায়েস্তার আরো ৪ টি সন্তান গিয়ে পড়লো মায়ের উপরেই। অসহায় মার কিছুই করার ছিলো না। শুরু হলো মার আরেক স্ট্রাগলের অধ্যায়। আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দিয়েছিলো শায়েস্তার সব সন্তানরা।