21/11/2023-ক্যাবিনেট সচীব মাহবুব ভাই

২০১৯ সালের দিকে যখন মাহবুব ভাই শিক্ষা সচীব ছিলেন, তখন একবার মাহবুব ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা হয়েছিল বটে কিন্তু শশরীরে দেখা করার সুযোগ এবং সময় কোনোটাই হয়ে উঠেনি। অদেখা কোন মানুশের সাথে টেলিফোনে কথা বলে তার গলার স্বর শুনে শ্রোতা নিশ্চয়ই কাল্পনিক একটা চেহারা সাজিয়ে নেন, যেমন তিনি কি মোটা হবেন নাকি চিকন, নাকি একটু বয়ষ্ক নাকি অনেক ইয়াং টাইপের।  টেলিফোনে মাহবুব ভাইয়ের গলার স্বর শুনে মাহবুব ভাইকে আমার যতোতা ইয়াং মনে হয়েছিলো, বাস্তবে তিনি আরো বেশী ইয়াং। আজ সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর সেনাকুঞ্জের দাওয়াতে হটাত করেই মাহবুব ভাইয়ের সাথে দেখা। মাহবুব ভাই এখন আর শিক্ষা সচীব নন, তিনি গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কেবিনেট সচীব হিসাবে অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। অনেক ধন্যবাদ মাহবুব ভাই।

২১/১১/২০২৩-সশস্ত্র বাহিনী দিবস

কিছু কিছু গেট টুগেদার আসলেই নতুন পুরান মুখগুলির সাথে অনেকদিন পর হলেও দেখা করিয়ে দেয়। অনেক অতীত তখন সামনে চলে আসে, অনেক সুখ-দুঃখের, কষ্টের কিংবা সফলতার কাহিনী সামনে আসে। নষ্টালজিক করে দেয় মন এবং অন্তর। আমরা যারা ডিফেন্স ফোর্সে ছিলাম, তাদের জন্য ২১ নভেম্বর শুধু একটা সশস্ত্র দিবসই না, এটা একটা মহামিলনের মতো যোগসুত্র। প্রায় ১৮/১৯ বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহন করলেও এই সময়টায় মনে হয় আবার ফিরে গেছি সেই সময়টায় যখন সময় চলমান ছিলো আমাদের। আজ তেমনি একটা দিন ছিলো। মাননীয়া প্রধান মন্ত্রীর দাওয়াতে আমরা সেনাকুঞ্জে সবাই মিলিত হয়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছে পুরান সেই সিনিয়ার জুনিয়ার অফিসারগুলির সাথে মিলিত হতে পেরে। তাদের সাথে বেসামরিক অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি বর্গের সাথেও দেখা হলো যারা আমার খুব প্রিয় মানুষগুলির মধ্যে অন্যতম। এইদিনের কিছু ছবি রেখে দিলাম টাইম লাইনে। হয়তো আবারো বেচে থাকলে বছর ঘুরে তাদের দেখা পাবো ইনশাল্লাহ।

০৪/১১/২০২৩-সময় সব সময় সবার কাছেই দামী। (রঙ্গে ভরা পাঠক)

সময় সব সময় সবার কাছেই দামী। কেউ সময়টাকে পয়সার সাথে তুলনা করে আর কেউ তুলনা করে সুখ দিয়ে। একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে-সবার কাছে কম বেশী পয়সা থাকেই। যে কোন কাজ করে না, যার কোনো সোর্স অফ ইনকাম নাই, তার কাছেও কিছু না কিছু পয়সা থাকে। পয়সা আসার এই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। কিভাবে আসে, কার কাছ থেকে কখন আসে, যার কাছে আসে, সেও মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না, কিভাবে এলো। কিন্তু আসে। দিন চলে যায়, আবার আরেকটা নতুন দিন আসে। এক সময় জীবনটাই চলে যায়, তখন আর পয়সার কোন প্রয়োজন পড়ে না। তখন মনে হয়, সময়টা থাকলেই হতো, আরো কিছুদিন এই পৃথিবীর আরো কিছু সুন্দর জিনিষ উপভোগ করা যেত।

মানুষের সবচেয়ে বড় দূর্ভাগ্য হচ্ছে-সে জানে না তার সময়ের লিমিটটা কথায়। এই লিমিটটা না জানার কারনে জীবনের শেষ দিনতক মানুষ শুধু এটার পিছনেই ঘুরে। একে একে পাহাড় সমান পয়সা জমা করে ফেলে, ভাবে এইতো আর কিছুদিন পর থেকে শুধু ভোগ করবো। অন্যদিকে, পতসা উপার্জনের জন্য সে তার লিমিটেড সময়টাকে এমন প্রান্তে নিয়ে যায় যে, সঞ্চিত পয়সা ভোগ করার জন্য যে সময়টা দরকার, সেটা তার কাছে থাকেই না। জীবনের লিমিটেড সময়টাকে সে ভাবতেই চায় না যে, কখন কতটুকু পয়সার প্রয়োজন তার সেই লিমিটেড পয়সাটাকে ব্যবহারের জন্য। ফলে যে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে সেটা হচ্ছে, হাতে জমা অনেক পয়সা রেখেই মানুষ ছেড়ে যায় তার সব সাম্রাজ্য আর সঞ্চয় করা পয়সাগুলি। তখন এগুলি অন্য কেউ ভোগ করে যা করার সপ্ন ছিলো যিনি পয়সা উপার্জনের জন্য এতোটা সময় নষ্ট করেছেন। এই যে চক্রটা, এটা সবাই জানেন, সবাই মানেন, কিন্তু কেউ এটাকে ফলো করেন না, করতেও চান না।

অদ্ভুত না ব্যাপারটা?

কিন্তু এটা অন্য কোনো পশু পাখীদের বেলায় হয় না। অতচ তাদের জীবনের মধ্যেও ভালোবাসা আছে, কষ্ট আছে, দুঃখ আছে, আছে আরো অনেক কিছু।

০৪/১১/২০২৩-অবসেসন বা অন্য অর্থে কোনো কিছুর

অবসেসন বা অন্যঅর্থে কোনো কিছুর উপর কারো একাগ্রচিত্তের মতো একটা এক তরফা ভাবনা বা বাতিক। এই অবশেসন একটা শাখের করাতের মতো। যদি অবসেসন কোনো ভালো জিনিষের উপর হয় তাহলে সেটা মানুষকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেয়ার রাস্তা তৈরী করে দেয় কিন্তু নেগেটিভ অবসেসন ভীষন বিপদ। বিপদ যেমন তার আশেপাশের মানুষদের জন্যে, তেমনি বিপদ সমাজের জন্য। আর এই অবশেসন সবচেয়ে বেশী বিপদ সেই মানুষটির জন্য যে ভুল জিনিষ নিয়ে অবসেসিস হচ্ছেন।

অনেক কারনে মানুষ এই অবশেসনে ভোগে। কখনো প্রেমের কারনে, কখনো অর্থের কারনে, কখনো নিজের অপারগতায় অন্যের উপর হিংসার কারনে, কখনো আবার এমনি এমনি। শেষেরটা হতে পারে নিছক কোনো পারিবারিক বা পরিবেশগত কারনে।

যারা অবশেসিসড, তারা কিন্তু অবুঝ নন, তারা অশিক্ষিতও নন, তারা যুক্তি মানেন, তারাও আশেপাশের সবার ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন। কিন্তু তারা অবসেসিসড হয়ে গেছেন, এটা তার আশেপাশের অনেকেই জানেন না। ফলে, এসব মানুষগুলি থেকে অন্যরা যে বিপদের আশংকা আছে, সেটা হয়তো বুঝেই উঠতে পারেন না।

এই নেগেটিভ অবসেসিসড মানুষ গুলিই ক্রমাগত মস্তিষ্ক বিকাসের কারনে এক সময় হয়ে উঠে সিরিয়াল কিলার, কিংবা জাগ্রত অদৃশ্য ধ্বংসাত্মক কোনো শ্রেনীর প্রতিনিধি। ফলে যখন আপনি কাউকে এমন দেখবেন যে, কোনো একটা কাজে তার নাছোরবান্দার মতো এটিচিউড, বা যুক্তির বাইরে গিয়েও কন কিছু না মেনে এক তরফা তার পিছনে লেগেই রয়েছে, সাবধান হোন। হতে পারে, আপনিই তার প্রথম টার্গেট।

আর যদি পজিটিভ মনোভাব ওয়ালা কোন অবসেসিড এর সাথে আপনার সাক্কাহত হয়, তাকে ধরে রাখতে পারেন, কিন্তু এটা সব সময় মনে রাখা দরকার, সে জেনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আপনাকে ব্যবহার না করে। তাহলে বুঝবেন, সেখানেও আপনি বলীর পাঠা।

তাই এরুপ কোন অবসেসিডের কাছ থেকে হোক সে নেগেতিভ বা পজিটিভ, একটু আলাদা থাকুন। হয়তো ফলাফল খারাপ হবে না।

০৩/১১/২০২৩-আমার প্রিম্যাচিউরড রিটায়ারমেন্ট

অনেকদিন পর আবারো আমার সেই পুরানো আর্মির কথা মনে পড়লো। যেনো ব্যাপারটা মাত্র সেদিনের ঘটনা। কিন্তু ঘটয়ান মাত্র সেদিনের নয়। ২০ বছর আগের সেই কথা।

প্রায় ২০ বছর সেনাবাহিনীতে চাকুরী করার পর যেদিন সেনাবাহিনী থেকে প্রিম্যাচিউড় বা অকালীন অবসর নিয়ে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসি, সেদিন কেউ আমাকে দেখুক বা না দেখুক, কেউ আমার ভিতরের কষ্টটা বুঝুক বা না বুঝুক, আমি বুঝেছিলাম কতটা বেদনা ভর্তি ছিলো আমার মনের ভিতরে। একনাগাড়ে যে ইউনিফর্মটা আমি সকালে উঠেই পড়তে খুব গর্ববোধ করতাম, যে অফিসটায় আমি বসে কত ধরনের মিলিটারী প্ল্যান, কাজকর্ম, কুশল বিনিময় করতাম, সেই ইউনিফর্মটা আমি নিজের ইচ্ছায় খুলে ফেলছি আজ। আমার আর কখনোই সেই অফিসে গিয়ে আমার চেয়ারটায় বসা হবে না। সেই কর্মস্থলটা আর আমার না। আমি এখন শুধু একজন রিটায়ার্ড সামরীক অফিসার। অথচ আমার আরো গোটা ১০/১২ বছর কাজ করার মতো সময় হাতে ছিলো।

নিজেকে অনেক প্রশ্ন করেছিলাম, আমার কি কোনো অন্যায় ছিলো? বা আমার কোনো গাফলতি? কিংবা আমি কি এমন কেউ যাকে আর এই সামরীক বাহিনির কোনো কাজে লাগবে না? আমি যতোগুলি মিলিটারি কোর্ষ একটা তুখুর আর্মি অফিসারের করা দরকার সবগুলি খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলাম। যেসব কোর্ষগুলি কমপিটিটিভ অর্থাৎ পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ন হয়ে করার যোগ্যতা লাগে, যেমন আর্মি ষ্টাফ কলেজ, আর্মি গানারি ষ্টাফ কোর্ষ ইত্যাদি সেসব কোর্ষগুলিও আমার করা ছিলো। এসব কোর্ষের জন্য অফিসাররা আপ্রান চেষ্টা করে যেখানে সফল হয় না, আমি সেসব কোর্ষগুলিও করেছিলাম। যদি বলি নিয়োগের বেলায়? তাতেও তো আমার কোনো কমতি ছিলো না। আর্টিলারি অফিসার হয়েও আমি পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল স্টাফ অফিসার (অপারেশন) যাকে জিএসও-২ (অপ্স) বলা হয়, সেটার দায়িত্বও আমি খুব সফল্ভাবে পালন করেছি। শুধু তাইই নয়, আমি খোদ আর্মি হেডকোয়ার্টারেও জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ (ট্রেনিং) হিসাবে কাজ করে অনেকগুলি আন্তর্জাতীকমানের ইভেন্ট সফল্ভাবে সম্পন্ন করেছিলাম। মাইনর ইউনিটের দায়িত্ব পালন করেছি, মেজর ইউনিটের উপঅধিনায়কের কাজ করেছি। কিন্তু সেগুলির কোন মুল্যায়ন আমার হয়নি। জাতীসংঘ মিশন করেছিলাম পরপর দুটু। একটি হাইতিতে এবং অন্যটি জর্জিয়া মিশনে। এসব মিশনে কাজ করার সময় লেটার অফ এপ্রিশিয়েশনেও ভুষিত হয়েছি স্বয়ং ফোর্স কমান্ডারদের কিংবা এসআরএসজি (স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ অফ সেক্রেটারী জেনারেল) কাছ থেকে।

কোনো কিছুতেই আমার কোনো কমতি ছিল না। আর্মিতে থাকতেই আমি মাস্টার্স অফ সায়েন্স (এমএসসি), মাষ্টার্স অফ বিজনেজ এডমিনিষ্ট্রেশন (এমবিএ), এবং মাষ্টার্স অফ ডিফেন্স স্টাডিস (এমডিএস) করেছি। অর্থাৎ সেনাবাহিনীতে থাকতেই আমি তিনটা মাষ্টার্স সম্পন্ন করেছি। জেনারেল অফিসার কমান্ডিং অর্থাৎ জিওসি এর কাছ থেকে আমি আউটস্ট্যন্ডিং এনুয়াল কনফেডেন্সিয়াল রিপোর্টও (এসিআর) পেয়েছি। এতো সব উপাধী, এতো সব শিক্ষা, এতো সব আউট স্ট্যান্ডিং পারফর্মেন্স ২০০৩/২০০৪ সালে আমার প্রোমোশনের সময় কোনো কাজেই লাগলো না? অবাক হয়েছিলাম। আমার কাছের যে সব সিনিয়ার অফিসারগন আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, যারা আমাকে চিনেন, তারাও আমার উপর এমন আচরনে হতাশ হয়েছিলেন। আমার জুনিয়ার অফিসাররা যারা আমাকে মডেল মনে করে আমার মত হতে চাইতো, তারাও এক প্রকার হতাশই হয়েছিলো। ইউনিটের সৈনিকগনের মধ্যে কেমন যেনো একটা বিষন্নভাব আমি দেখতে পেয়েছিলাম। তারাও আমার প্রোমোশন না হওয়াতে অনেক হতাশ ছিলো। কিন্তু এসবের কোনো মুল্যায়ন কিংবা যোগ্যতার জন্য আমার এসব কোন কিছুই যথেষ্ঠ ছিল না। পরবর্তীতে যেটা বুঝেছিলাম সেটা হলো, আমার দরকার ছিল একটা পলিটিক্যাল লিংকআপ যা আমি কখনোই তৈরী করার চেষ্টা করিনি। সেনাবাহিনির চাকুরিটা হচ্ছে একটা ভিন্ন প্রকৃতির জব। আমি সব সময় মনে প্রানে বিশ্বাস করেছি, এখানে শুধু আনুগত্য থাকবে আমার দেশের প্রতি, জনগনের প্রতি, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি থাকার কথা নয়। অথচ সেটাই কাল হয়ে দাড়িয়েছিল আমার জন্য।

এখানে আরো একটি অলিখিত ফ্যাক্টর আমাদের ১৩ বিএমএ লং কোর্ষের জন্য সামষ্টিক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছিল। আর সে হচ্ছে আমার কোর্ষমেট মেজর (বর্তমানে লেঃ জেনারেল) ওয়াকার। শেখ ওয়াকারুজ্জামান। ওয়াকার বংশগতভাবেই শেখ বংশের মানুষ, তার উপরে সে বিয়ে করেছিল তদানিন্তন আর্মির চীফ জেনারেল মুস্তাফিজের মেয়েকে। জেনারেল মুস্তাফিজ ছিলেন আওয়ামিলিগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আপন ফুফা। ওয়াকার একদিকে শেখ বংশের লোক, অন্যদিকে শেখ হাসিনার আপন ফুফাতো বোনের স্বামী। একটা কোর্ষের মধ্যে আওয়ামিলিগের বংশোদ্ভত এমন একজন অফিসার থাকা মানে বিরোধী দলের রাজনীতিকরা তো পুরু কোর্ষকে আওয়ামিলিগ ব্রান্ড করতেই পারে। যদিও ঢালাওভাবে এমন ধারনা পোষন করা কোনো পলিটিক্যাল পার্টিররই থাকা উচিত না। কিন্তু তারপরেও সেটাই হয়ে উঠেছিল আমাদের জন্য একটা অভিশাপ। আমরা কেউ রাজনিতি করি বা না করি, যেহেতু ওয়াকার আওয়ামিলীগের ঘরানার, ফলে আমাদের পুরুকোর্ষ যেনো হয়ে উঠেছিল আওয়ামিলীগের কোর্ষ। এ সময়ে দেশের সরকার হচ্ছে বিএনপি। ফলে ১৩ বিএমএ লং কোর্ষের বেশিরভাগ পোটেনশিয়াল অফিসারগনই পরবর্তী পদে উন্নীত হলেন না। আমিও না।

আমার বেলায় ব্যাপারটা আওয়ামি ঘরানার বাইরেও আরেকটা ব্যাপার ছিলো। তাহলে ব্যাপারটা বলি।

আর্মি স্টাফ কোর্ষের ফলাফলের নিয়ম হলো-যিনি প্রথম হন, তাকে আমেরিকায়, যিনি দ্বিতীয় হন তাকে মালয়েশিয়া আর যিনি তৃতীয় হন তাকে লন্ডনে সেকেন্ড স্টাফ কোর্ষে পাঠানো হয়। সবগুলিই গ্রাটিস কোর্ষ অর্থাৎ এক্সচেঞ্জেবল কোর্ষ। আমাদের অফিসার যাবে সে দেশে, সেই দেশের অফিসাররাও আমাদের দেশে আসবেন। খরচ আদান প্রদান। ওয়াকার আর্মি ষ্টাফ কোর্ষে হয়েছিলো তৃতীয়। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, সম্ভবত ঠিক এই সময়ে লন্ডনের সাথে আমাদের গ্রাটিস কোর্ষের আইনটা আর বহাল ছিল না। ফলে ওয়াকার লন্ডনে দ্বিতীয় ষ্টাফ কোর্ষ করতে যায় সম্পুর্ন বাংলাদেশ সরকারের ফান্ডে। এ সময় আর্মির চীফ ছিলেন জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান যিনি ওয়াকারের শশুর আর ক্ষমতায় ছিলো আওয়ামিলিগ। রাজনীতির পট পরিবর্তনের কারনে যখন বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং আর্মির চীফ হিসাবে মুস্তাফিজ সাহেবের পরিবর্তে জেনারেল হাসান মাসউদ স্থলাভিষিক্ত হন, তখন বাংলাদেশ আর্মি থেকে ওয়াকারের জন্য আর ফান্ড পাঠাচ্ছিল না। এটা বেসিক্যালী পলিটিক্যাল রিভেঞ্জের মতো। আমি তখন আর্মি হেডকোয়ার্টারে ট্রেনিং ডাইরেক্টরীতে কাজ করি। ব্যাপারটা আমি হ্যান্ডেল করছিলাম না। ওটা ফরেন কোর্ষের অধীনে মেজর শাহরিয়ার এবং মেজর তামিম দেখভাল করেন। আমাদের ডিএমটি (ডাইরেক্টর অফ মিলিটারী ট্রেনিং) ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুবীন (পরবর্তিতে তিনি আর্মির চীফ হন)। আমি মুবীন স্যারকে বললাম, ওয়াকারের এহেনো দূর্যগপুর্ন সময়ে লন্ডনে টাকা না পাঠালে ওয়াকার কোর্ষ শেষ করবে কিভাবে? এদিকে জিএসও-২ গনও চীফের নেগেটিভ মনোভাবের জন্য ওয়াকারের ফেভারে কোনো মিনিটস শিট লিখতে ভয় পাচ্ছেন। আমি মুবীন স্যারকে রিকুয়েস্ট করলাম, যেনো আমাকে ফরেন ট্রেনিং উইং এ পোস্টিং করেন। আমি সেখানে পোষ্টিং পেয়েই ওয়াকারকে টাকা পাঠানোর নিমিত্তে একটা মিনিটস শীট রেডি করি। অনেকবার চীফের অফিসে এ ব্যাপারে আমাকে তলব করা হয়েছিল যাতে আমি এ ব্যাপারে পজিটিভ কোনো সাযেশন না দেই। কিন্তু আমি সেটা করিনি। কোন রকমভাবে শেষপর্যন্ত ওয়াকার লন্ডনে কোর্ষ শেষ করে এসেছিল। কিন্তু ঢাকায় এসে ওয়াকার এতোটাই সমস্যায় পড়লো যে, ওর আর্মিতে টীকে থাকাই ওর জন্য দায়। আর্মি হেড কোয়ার্টারেও ওর প্রবেশ যেনো প্রায় নিষিদ্ধ ঘোষনার মত। ওয়াকারের পোস্টিং তখন কুমিল্লায়। যে কোনো কারনেই হোক, ওয়াকার ঢাকায় আর্মি হেডকোয়ার্টারে আসতে চেয়েছে বা এসেছে। আর্মি হেডকোয়ার্টারে ঢোকতে “পাশ” দিতে হয়। ওয়াকার আমাকে ওর জন্য একতা “পাশ” চাইলো। আমি ওয়াকারকে “পাশ” পাঠিয়ে দিলাম। ওয়াকার আমার রুমে এলো। তার ঠিক কিছুক্ষন পর ডাইরেক্টর অফ মিলিটারী ইন্টিলিজেন্স (ডিএমআই) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদ স্যার ইন্টারকমে আমাকে জানালেন, আমি কেনো ওয়াকারকে “পাশ” পাঠিয়ে আর্মি হেডকোয়ারর্টারে আসার অনুমতি দিলাম? ওয়াকার তখনো আমার রুমেই বসা। ওয়াকারকে আমি আমার রুমে বসিয়েই রেখে চলে গেলাম ডিএমআই এর অফিসে। গিয়ে আমি বললাম, স্যার, ওয়াকার কি পিএনজি? অর্থাৎ পার্সন্স নন গ্রাটা? বা নিষিদ্ধ? যদি ওকে পিএনজি ঘোষনা না করা হয়, তাহলে আমার “পাশ” দিতে আপত্তি কি? আর সেতো এখনো সার্ভিং আর্মিতে? আর সবচেয়ে বড় কথা, ওয়াকার আমার ব্যাচমেট, আমার কোর্ষমেট, সেতো অন্তত আমার অফিসে আমার সাথে দেখা করতে আসতেই পারে!! ব্রিগেডিয়ার মাহমুদ স্যার খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, দেখো আখতার, আমার তো কোনো সমস্যা নাই কিন্তু চীফের কানে গিয়েছে যে, ওয়াকার আর্মি হেডকোয়ার্টারে এসছে। তাকে আসতে দেয়া যাবে না আর। কোন কারন নাই, বারন নাই, অথচ এমন একটা অলিখিত আইনের মধ্যে ওয়াকারকে ফেলে দিলো গেরাকলে। আমি মাহমুদ স্যারের অফিস থেকে ফিরে এলাম। তখন প্রায় ছুটি (বেলা আড়াইটা) হয় হয় ভাব। আমি ওয়াকারকে নিয়ে আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে গেলাম। রাস্তায় যেতে যেতে শুধু আমি ওয়াকারকে একটা কথাই বলেছিলাম, “ওয়াকার, যত চাপই আসুক, চাকুরি থেকে নিজের ইচ্ছায় চলে যাবি না। ওরা চায় তুই চলে যা। এটা যেনো না হয়।“ ওয়াকার সবকিছুই বুঝতেছিল। আমাদের কোর্ষে ওয়াকারের মত এতো ভাল, ধার্মিক, সৎ এবং নীতিবান অফিসার খুব কম আছে। ওয়াকার সত্যিই একজন ভাল মানুষ এবং ভাল ছেলে। আমি ওয়াকারকে আর্মিতে আসার আগেই চিনতাম। সেটা আরেক ইতিহাস।

ভাগ্য যখন খারাপ থাকে, তখন অনেক কিছুই আর কাজে লাগে না। একদিকে আমাদের ১৩ বিএমএ লং কোর্ষ আওয়ামিলিগ ঘরানার হিসাবে গন্য, অন্যদিকে আমার ব্যাপারটা তখনো চীফ মাসউদ হাসানের মাথায় জ্যান্ত, সব মিলিয়ে খুব ভাল পজিটিভ সাইডে আমার ফাইল ফাইট করতে পারেনি। প্রথমবার সুপারসিডেড হয়ে গেলাম।

আমাকে পোষ্টিং করা হলো খোলাহাটি ৪ ফিল্ড রেজিমেন্টে। লেঃ কর্নেল ফেরদৌস আমার অধিনায়ক, আমি উপঅধিনায়ক। মিশন থেকে ফিরেছি বটে, কিন্তু খোলাহাটি আমার কাছে খুব বিরক্ত লাগছিল। তবে সুখের খরর ছিল যে, আমাদের ইউনিট খুব শীঘ্রই মীরপুর ট্রান্সফার হবে। আমার কেনো প্রোমোশন হলো না এটা আমি আমার তদানিন্তত রংপুরের জিওসি জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দারকে প্রশ্ন করেছিলাম। উনি খুব ডেশিং টাইপের মানুষ। আমার ইন্টারভিউতে জেনারেল শুধু একটা কথা জানালেন যে, আমার পক্ষে আমারই জাতি ভাইয়েরা বিশেষ করে আর্টিলারি জেনারেলরা খুব একটা সোচ্চার হয়নি। তার মধ্যে ছিলেন জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (যিনি এখন অস্ত্র মামলায় ফাসির আসামি), জেনারেল মোহাম্মাদ আলি, জেনারেল সিকদার, জেনারেল আমিনুল করিম ইত্যাদি।

প্রথমবার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি একটা জিনিষ বুঝে গিয়েছিলাম যে, খুব শিঘ্রই আমাকে এই আর্মির ট্র্যাক থেকে অন্য আরেকটা ট্র্যাকে পরিবর্তন করতে হতে পারে। আমার প্রিপারেশন নেয়া অতীব জরুরী।

মীরপুরে চলে এলাম। সুপারসিডেদ হলেও এখানকার ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ আমাকে উপ অধিনায়কের মতো দেখেন না। সব সি অ দের জন্য যেখানে চেয়ার পাতা হয়, কমান্ডার আমার জন্যেও সেখানে চেয়ার রাখেন। আমি ব্রিগেডের প্রুচুর ডিভিশনাল লেবেল যেমন, ষ্টাডি পিরিয়ড, আম্পায়ারগিরি, ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্টের সহযোগি ইত্যাদি রাখেন। লেঃ কর্নেল ফেরদৌসও আমাকে খুব একটা ঝামেলা করেন না। ভদ্র মানুষ।

সময় ঘুরে গেলো, আবারো প্রোমোশন বোর্ড। এবারেও আমার প্রোমোশনটা হলো না। উপরন্ত লেঃ কর্নেল ফেরদৌসকে অধিনায়ক থেকে পোষ্টিং দিয়ে আমার জুনিয়ার ১৪ লং কোর্ষের মেজর মজিদকে প্রোমোশন দিয়ে আমার অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। একদিকে আমি সুপারসিডেড অন্যদিকে জুনিয়ারের অধীনে উপঅধিনায়ক। বুঝতেই পারছেন, মনের ভিতরের অবস্থাটা কি। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু একটা কারনে সহ্য করতে হচ্ছিলো। আর সেটা হলো, আমার চাকুরীর বয়স যদি ন্যুনতম ১৮ না হয়, তাহলে সরকারী প্লট পাবো না। এতো কাছে এসে আমি আমার অন্তত এই সুযোগটা হারাতে চাই না।

মজিদ আমাকে অসম্মান করেনা কিন্তু যা হবার তো হয়েই গেছে। (চলবে……)

26/10/2023-Tbilisi and Daduna’s family

About 20 years ago, I was serving in Georgia as part of a United Nations mission from the Bangladesh Army. I spent a lot of time with many domestic and foreign military, civilian officials, many senior officials of the United Nations. I have seen their culture and traditions. It was all a new experience. But I will never forget one of these families in Georgia. I still remember them and wished to see them again. Today I am going to tell you about one such family.

I have taken a long leave of 21 days from the mission. As usual, everyone else comes to the country on vacation, I also wanted to come to the country, but I once thought that as sooner I would go to the country a few days later, so how about I take a little trip to Georgia this holiday !! Who knows when I would be back again or would even never come next !!!. I visited Tbilisi, the capital of Georgia, very less and I did not visit the capital or the surrounding cities. So I thought, let’s go for Tbilisi.

The quality of hotels in Tbilisi is not so good, while those that are high-quality, the cost is skyrocketing. Meanwhile, there is an interpreter in my sector, Sorena Gamchakhurdia, with whom I have to go on duty every day. She informed me that one of her aunts lives in Tbilisi, and I could stay with them for a few days if I wished to. They may not be rich, but they’re good-hearted people. If I agree, she can tell them about it.

If it were our country, we would not normally give such an offer to anyone. I am a foreigner, and I do not know anyone in whose house I am going to live, nor do they know me at all. But since I’ve lived in Georgia for about 8/9 months, I already understood their ethos very well. They offer their best to their guests at all circumstances. I agreed, thinking that it would be better for me to stay with a family than to stay in an isolated hotel.

On the appointed day I reached the airport of Tbilisi. According to Shorena, someone will come to pick me up from the airport. So I was waiting at the lobby of the airport. Then, waiting a little bit, I walked out of the airport and thought, it would be better if I buy a few packs of cigarettes. Just then, someone called me from behind in excellent English – and said, are you Major Akhtar? Looking back, a young girl of 23/24 years, absolutely blue eyed, bob cutting blonde hair, and is standing behind me. I replied: yes, I am. No further introduction right then. I took my bags and boarded in the car. While on the car, we talked a while. She said, ‘My name is Deduna Bukia.’ I am a journalist and sister of Shorena.

It took about 40/50 minutes to get from the airport to their home. It’s a big Condominium and located on a high ground. Nice place. From the apartment complex you can see the thick city, the blue sky, far away the Caucasus Mountains. Really good looking scenarios all around.

We got out of the car and went to the elevator. Apartment is next to the elevator. It was a family house with three or four rooms. Adjacent to the living room is a large kitchen and dining area. The other rooms are side by side. The room they have for me is the best room in the house. A new mattress, a new bed cover, new sandals and new towel ets. They did everything they could do for me. Felt very nice. They live with three sisters (Deduna Bukia, Tamara, and Salomi) and an aunt (mother). They are Shoren’s cousins. Aunty is probably involved in the work of an X-ray machine in a government hospital (I don’t remember the name of the department at the moment).   

Deduna is engaged in journalism. On arrival at home, I met with everyone at house and talked to everyone. Believe me, I felt like I knew them long before. I became part of their family. It’s an incredible family. They didn’t do anything that can hurt me, rather they did everything to make me feel better. Later in the evening, some of their other relatives came to meet me as well. Daduna’s other cousin, Russo, was a doctor. She came the next day. They were all unmarried. 

Every day we used to visit new places like park, restaurant, historical place, the market, sometimes to the beach, surrounding villages, Museums, archaeological sites, gardens, zoos, and many other places. There is no sea beach in Georgia but there is a very big bay where many tourists and locals go there and enjoys like Beach. We all as well visited such places, swims, cuddled, and walked a long way, basking sun on the beach, and played. It’s been an amazing time. I forgot totally that I was a guest here. There is a famous restaurant named ‘Eagle’, where we had candle light dinner for two consecutive nights. The Restaurant is named after a famous Singer Group EAGLE.

While staying at house, sometimes they would dance together at home with the rhythm of the karaoke broadcasted on TV. I’ve had an amazing time every day. Shorena joined us in Tbilisi four days later. After that, we all had a great time together. I will never forget their love, affection and respect shown to me. It cannot be forgotten.  

Deduna is now the mother of four children, Shorena is also the mother of two, and her other two sisters (Tamara and Salome) are also living very healthy life with their husband and children. I still keep in touch with them because of Facebook and it’s great when I see them living happily and peacefully. I always remember them. Auntie may no longer be alive. And I miss her.   

When I returned home from the mission, I had no heart-throbs leaving the mission, but it hurt to think that I might never see this wonderful family again. The day I left Deduna’s house, I was very upset, Auntie hugged me and said – if I have time, should I go to see her again. My eyes were wet, they had become like my family. It wasn’t just my eyes wet in tears but it was their eyes too.  

Today, when I look at those old pictures, I can see the memories of those past days in front of my eyes. When my children sit next to me and my grandchildren look at the pictures, they ask -who all are these people?  

With tears in my eyes, I might say with a smile -these are some of the people I’ve had some wonderful times with. Many of them may no longer exist. Ironically, we call these as “Pictures of the life”. My heart skipped a beat when I thought of some people from the past.

Sorena, Tamara, Deduna, Russo, all the best for all of you and let the God bless you all and keep you safe, healthy and protected always. Love you guys.

১২/১০/২০২৩-লেঃ কর্নেল মজিদের ইন্তেকাল

সকালে ফেসবুক ব্রাউজ করতেই হটাত একটা পোষ্ট নজরে এলো। পোষ্টটা নিম্নরূপঃ

প্রশ্ন হচ্ছে এ রকম আরো অনেক অফিসারেরই তো মৃত্যু সংবাদ পেয়েছি, কিন্তু এবার শুধু মজিদের মৃত্যু সংবাদে আমাকে কেনো আমার ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লিখতে হলো? এর একটা অতীত ইতিহাস আছে। সেটাই বলছি।

এটাই সে আর্মি অফিসার যার কারনে আমাকে সেনাবাহিনী থেকে অকালীন অবসর নিতে হয়েছিলো। আমি ১৩ লং কোর্ষের কিন্তু মজিদ ১৪ লং কোর্ষের। মেজর থেকে লেঃ কর্নেল প্রোমোশন বোর্ডে শুধুমাত্র মজিদকে আনুকল্য দেয়ার জন্য আমাকে প্রোমোশন থেকে বাদ দিয়ে এই অফিসারকে প্রোমোশন দেয়া হয়। পাশাপাশি যদি আমাদের দুইজনের কোয়ালিফিকেশনকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবোঃ

  আখতার (আমি) মজিদ
কোর্ষ সমুহের গ্রেডিং আমার সব আর্মির কোর্ষ গ্রেডিং কমপক্ষে বি প্লাস আবার কখনো কখনো আ ছিলো। শুধু কয়েকটি বেসিক কোর্ষে বি ছিলো। মজিদের সব গুলিই বি ছিলো। তাঁর ক্যারিয়ারে এ বা বি প্লাস গ্রেডিং প্রায় ছিলোই না।
ষ্টাফ কলেজ ষ্টাফ কলেজে সম্পন্ন করেছি মজিদ ষ্টাফ কলেজ করেনি
পদাতিক ডিভিশন এবং আর্মি হেড কোয়ার্টারে নিয়োগ আমি পদাতিক ডিভিশন এবং সেনাসদরে জি এস ও-২ (অপারেশন) , জি এস ও-(ট্রেনিং) উভয়েই কাজ করেছি। মজিদ এরুপ কোনো পদে কখনো কাজ করেনি।
স্বাস্থ্যগত বিবরন আমি ক্যাটেগরি এ ভুক্ত ছিলাম মজিদ ক্যাটেগরি সি ভুক্ত ছিলো। এবং ডায়াবেটিসের রোগী।
অভিজ্ঞতা আমি মাইনর ইউনিটে উপ অধিনায়ক/ অধিনায়ক এবং ্মেজর ইউনিটে উপ অধিনায়কের দায়িত্ত পালন করেছি। মজিদের এরুপ কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না।
মিশন আমি পর পর দুইটা ইউ এন মিশন সম্পন্ন করেছিলাম। মজিদ সম্ভবত একটা ইউ এন মিশন করেছে। ক্যাটেগরি সি হ ওয়াতে নাও করতে পারে। এ ব্যাপারটা আমি নিশ্চিত নই।
শিক্ষাগত যোগ্যতা আমি শিক্ষাগত যোগ্যতায় মাষতার্স, এম বি এ, এম এস সি, এবং ততকালীন ডক্টরেট করতে নিয়োজিত ছিলাম। মজিদ এম বি এ করেছিলো।

মজিদের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট ছিলো ওর বাবা। ওর বাবা ছিলো আমাদের তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাসার মালি অতবা কর্মচারী। আর এই সুবাদেই খালেদা জিয়া মজিদের বাবার অনুরোধে তিনি মজিদকে তাঁর এ ডি সি করেন। সমস্ত আইন ভেংগে, আর্মির রুলস ভেংগে তিনি এ কাজটি করেন। যা সবার কাছে গ্রহনযোগ্য ছিলো না।

সেই মজিদের এখন প্রোমোশন দরকার। তাই প্রোমোশন বোর্ডের তিন দিনের ফলাফলে আমার নাম চুড়ান্ত হবার পরেও শেষ দিনে এসে হটাত করে মজিদ উড়ে এসে জুড়ে বসলো, আর আমি ঝড়ে পড়ে গেলাম। মজিদের প্রোমোশন হলো আর আমার হলো না। আমি কখনো কারো কাছে আমার ব্যাপারে তদবির করতে পছন্দ করিনি। এবারো করলাম না। আমি সিনিয়ার হ ওয়া সত্তেও মজিদ আমার ৭ ফিল্ডের সি ও (অধিনায়ক) হয়ে গেলো। জুনিয়ারের অধীনে সিনিয়ারের কাজ করা জে কত দূর্বিসহ, এটা যারা করেছে তারা জানে। যদিও মজিদ কখনো আমার ফ্রিডম নষ্ট করেনি, আমার কোনো কাজে বাধা দেয়নি, অথবা আমার প্রতি তাঁর কোনো খারাপ আচরন করেনি, তারপরেও আমার প্রতিটি দিন কেটেছে মনের কষ্টে। কেনো আমাকেই বলি হতে হলো?

আমি শেষ পর্যন্ত আর্মি থেকে অকালীন অবসর গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেই। আর ঠিক তারই ধারাবাহিকতায় আমি ২০০৪ সালের নভেম্বরে আমি আর্মি থেকে ভলান্টিয়ারিলি অবসরে চলে আসি।

আর্মিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা যদি তুলনা করি, দেখা যাবে, ৫০ টি অফিসারের মধ্যে হয়তো আমি ১০ এর মধ্যে আছি। আমার কাজের প্রশংসা সব জেনারেকরাই করতো কিন্তু শেষ অবধি খালেদা জিয়ার ইচ্ছায় মজিদেরই জয় হয়েছিলো। প্রধান মন্ত্রী হিসাবে খালেদা জিয়ার এটা করা উচিত হয় নাই।

সেই মজিদ খালেদা জিয়ার পলিটিক্যাল দল খমতাচ্যুত হবার পর নিজেও আর্মি থেকে অবসরে যায়, বলতে পাতেন তাকে চাকুরীচ্যুত করা হয়। পুনরায় মজিদ সেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধান্মন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথেই সে ছিলো। কেউ বলে বডি গার্ড, কেউ বলে এমনিতেই।

আজ মজিদের ম্রিত্যুর সংবাদ পেলাম। রাগ ছিলো, গোস্যা ছিলো, অপছন্দ করতাম, কিন্তু আজ আর মজিদের উপর আমার কোনো ক্ষোভ নাই, রাগ নাই। সে কি করে গেছে, কি করা উচিত ছিলো, এর ফলাফল এখন নির্ধারিত।

আমি ভালো আছি। আর্মি থেকে বের হয়ে আর কোনো চাকুরীর সন্ধান করিনি। সরাসরি একটা গার্মেন্টস ব্যবসার সাথে জড়িত হয়েছিলাম। প্রথমে সেই গার্মেন্টস ছিলো একটা মৃত প্রতিষ্ঠান, আজ সে গার্মেন্টস বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে একটা মডেল নাম। রিভার সাইড সুয়েটার্স। প্রায় ২ হাজার লোক কাজ করে, বছরে টার্ন অভার প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। আল্লাহ যা করেন সব ভালোর জন্যই করেন।

মজিদের জন্য, খালেদা জিয়ার জন্য এবং সেই সব দূর্নীতি পরায়ন চাটুকার জেনারেলদের জন্য ও আমি দোয়া করি কিন্তু তারা আজ কেহই ভালো নেই। কেউ কারাগারে, কেউ ফাসির রায়ে দন্ডিত, কেউ পালিয়ে আছে আবার কেউ কেউ এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলেও গেছে।

০৮/১০/২০২৩-কোন দিকে যাচ্ছে অর্থনীতি

আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করে, আমাদের ব্যবসায়িক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা কি হতে যাচ্ছে। আমি কোনো অর্থনীতিবিদ নই। ফলে যেসব ফ্যাক্টর হিসাবের মধ্যে নিয়ে সার্বিক অর্থনীতির উপর মতামত দেয়া যেতে পারে তাঁর অনেক ফ্যাক্টরই আমার জানা নাই বা সেগুলি নিয়ে আমি কাজ করি না। কিন্তু দৃশ্যমান কিছু সিম্পটম বিবেচনা নিয়ে যে কোনো আমজনতাও অনেক কিছুর সঠিক একটা প্রেডিকশন দিতে পারে যা হয়তো খুব একটা অমুলিক নয়। সেই প্রেক্ষাপট থেকেই বলছি।

আমাদের অর্থনীতি মুলত কিছুটা কৃষিজ এবং অনেকাংশেই বৈদেশিক মুদ্রা (যেমন রেমিট্যান্স, রপ্তানী আয়, এফডিআই) ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। এই কয়েকটা ফ্যাক্টর যদি মামুলীভাবে আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখবো যে, খুব বেশী একটা ভালো প্রত্যাশা করার কিছু নাই।

রেমিট্যান্স বহুলাংশে কমে গেছে কারন যারা এই বৈদেশিক মুদ্রা দেশে রেমিট করবেন, তারাই বিদেশে প্রায় হয় বেকার অথবা আগের তুলনায় অনেক কম বেতনে চাকুরী করছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে ইউরোপের শিল্পবানিজ্যে প্রায় ধ্বস নেমে যাচ্ছে। প্রচুর ইন্ডাস্ট্রি শুধুমাত্র এনার্জি সংকটের কারনে বন্ধ এবং অনেকগুলি বন্ধের পথে। ফলে সেখানে কর্মী ছাটাই বা বিদেশীদের প্রাধান্য প্রায় নীচের দিকে। আমাদের দেশের শ্রমিকেরা খুব একটা স্কীল নয় বিধায় তাদের ডিমান্ডও বেশ কমে যাচ্ছে। মাইগ্রেশন এখন ইউরোপের একটা চরম সংকট। তারা যে কোনো মাইগ্রেশনের বিপক্ষে এখন। ইউরোপের অবস্থা দিনের পর দিন এখন খারাপের দিকে যাওয়ায় সেখানকার নাগরিকগনও কৃচ্ছতা অবলম্বন করছেন। তাদের পারচেজ পাওয়ার কমে যাচ্ছে। লাক্সারী লাইফের কথা এখন তারা মাথা থেকেই বের করে দিচ্ছে। জীবনধারনের জন্য যতটুকু দরকার সেটাতেই এখন তারা অভ্যস্থ হবার চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় রেমিট্যান্স ধীরে ধীরে কমবে।

অন্যদিকে ইউরোপ কিংবা পশ্চিমা দেশগুলিতে যেহেতু এখন নাগরিকদের পারচেজ পাওয়ার কমে যাচ্ছে, ফলে আগে যেখানে একজন একের অধিক পন্য কিনতেন, সেখানে তারা পন্য কেনার পরিমান কমিয়ে দিয়ে বাজেটের মধ্যে চলার চেষ্টা করছেন। তাতে যেটা হচ্ছে-আমাদের দেশ কিংবা অন্যান্য রপ্তানীকারকের রপ্তানী আদেশের পরিমানও কমে যাবে। যখনই রপ্তানী আদেশের পরিমান কমে যাবে, আমাদের দেশেও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রভাব পড়বে। অনেক মেশিনারিজ বন্ধ থাকবে, এতে কর্মী ছাটাইয়ের আশংকা হবে। শুধু তাইই নয়, এনার্জি সংকটের কারনে কিংবা জালানী সংকটের কারনে পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুৎ খাতেও ব্যয় বাড়বে। প্রডাকশন খরচ বাড়ার কারনে এবং রপ্তানী আদেশের পরিমান কমার কারনে আমাদের দেশের ছোট ছোট ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান গুলি অস্তিত্ত টিকিয়ে রাখার হুমকিতে পড়বে।

এখানে আরো একটা বিপদ ঘটার সম্ভাবনা আছে। সেটা হচ্ছে-ইউনিপোলারিটি থেকে মাল্টিপোলার ওয়ার্ডে আমাদের দেশ একটা সংকটের মধ্যে আছে। এই মুহুর্তে ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশগুলির সাথে আমাদেরও কিছুটা টানপোড়েনের চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিধায় কোনো কারনে যদি পশ্চিমারা নাখোশ হয়, তাহলে একইসুত্রে গাথা ইউরোপের বাজার আমাদের জন্য ছোট হয়ে আসবে। সেক্ষেত্রেও আমাদের রপ্তানী আদেশে তুমুল একটা নেগেটিভ প্রভাব ফেলবে।

এখানে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে-যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর লোনের বোঝা আছে, তারা সময়মতো লোন পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংকগুলিও যেমন তারল্য সংকটে পড়বে, তেমনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের ঋণ পরিশোধে চাপের কারনে মালিকপক্ষ হিমসিম খাবে। যখন মালিকপক্ষ এই লোনের কারনে চাপের মধ্যে থাকবে, তখন তারাও ধীরে ধীরে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন। দেখা যাবে যে, ফ্যাক্টরী আছে, মেশিনারিজ আছে, কিন্তু কর্মি নাই, রপ্তানীর আদেশ নাই, এবং মেশিনারিজ অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

এবার যদি কৃষিজ প্রেক্ষাপটে আসি, সেখানেও একই চিত্র ফুটে উঠবে। সার সংকটের কারনে, কিংবা পানি সেচের জন্য প্রয়োজনীয় এনার্জি সাপ্লাইয়ের সংকটের কারনে এবং এমন কি বীজের সংকটেও কৃষিজ সেক্টরে এর নেগেটিভ প্রভাব পড়বে। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ, বিভিন্ন দেশের উপর নিষেধাজ্ঞার কারনে সময়মতো এসব সার, বীজ কিংবা আনুষঙ্গিক আইটেম পাওয়া যাবে না। শুধু তাইই নয়, এই যুদ্ধ আগামী কয়েক বছরের খাদ্য সংকটও তীব্র হতে পারে বলে আমার ধারনা।

আবার, সরকারকে রাষ্ট্রীয় খরচ যোগানের লক্ষ্যে তাঁর ঋণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হোক সেটা লোকাল ব্যংকা থেকে কিংবা বাইরের কোনো অর্থলগ্নি সংস্থা থেকে। ফলে, এমনো হতে পারে জে, ব্যাংকে জন সাধারনের গচ্ছিত টাকাও সময় মতো সাধারন জনগন উঠিয়ে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থায় লগ্নি করতে পারে কিনা সেটারও একটা অনিশ্চয়তা থেকে যায়।

আজ ঠিক এই মুহুর্তের পরিস্থিতি দেখে অনেকটাই বুঝার উপায় নাই, আগামি এক বছর পরের পরিস্থিতি কত ভয়ানক হতে পারে। আমেরিকাকে প্রতিদিন ২৭৫ বিলিয়ন ডলার লোন করতে হচ্ছে, ইউরোপের প্রায় সব কটি দেশে আগের তুলনায় ব্যাংক সুদ বেড়েছে প্রায় ১০ গুন। কমোডিটির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩ গুন। কিন্তু সে তুলনায় সাধারন জনগনের আয় বাড়েনি।

এ অবস্থায় কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, আগামি কি হতে যাচ্ছে- কি করে বলা সম্ভব? এ অবস্থায় আমাদের মতো আমজনতার কিংবা ব্যবসায়ীর জন্য কি করনীয় হতে পারে?

আমিও জানি না আসলে কি হতে যাচ্ছে আগামীতে। তবে, আমার একটা কথা আছে, আমি ছোট মানুষ, বুঝি কম, তাও যেটা বুঝি সেটা হলো-যাদের ব্যাংক লোন বিদ্যমান, তাদের উচিত সেটা যতোটুকু সম্ভব কমিয়ে ফেলা, কারন মুল ক্যাপিটাল পরিশোধ না করা পর্যন্ত এর যে সুদ সেটা পরিশোধ করতেই যখন হিমশিম খেতে হবে, মুল ক্যাপিটাল দেয়াই হবে তখন চরম অসুবিধা। যাদের হাতে এখনো কিছু অর্থ আছে সেটাকে যতটুকু সম্ভব যৌক্তিক সেক্টরে ব্যবহার করা যাতে অন্তত মুল ক্যাপিটাল নষ্ট না হয়, এবং যতটুকু না হলেই নয় তাঁর মধ্যে বসবাস করা।

বাকীটা শুধু বলতে পারবে “সময়”।

১৫/১০/২০২৩-কেনো আমি আবির আর উম্মিকার বিয়েতে রাজী হইলাম

আমি যেদিন জানলাম যে, উম্মিকা একটা ছেলের সাথে এফেয়ার্সে জড়িয়েছে, আমি একেবারেই ব্যাপারটা নেগেটিভলী নেই নাই। কারন উম্মিকার বয়স হয়ে যাচ্ছে (প্রায় ৩০) আর যেখান থেকেই যতো ভালো ছেলে বা পরিবার থেকে উম্মিকার জন্য বিয়ের প্রোপোজাল আসুক না কেনো, উম্মিকা কোনোটাতেই সায় দিচ্ছিলো না। প্রথমবার আমি উম্মিকাকে মুটামুটি জোর করেই রানার সাথে বিয়েটা দিয়েছিলাম, যদিও সেই জোরের মধ্যে উম্মিকারও অনেক ভুল ছিলো। কিন্তু আলটিম্যাটলি যেটা হয়েছে, উম্মিকার তো জীবনে একটা দাগ লেগেই গিয়েছিলো। ভুল যারই হোক, সেটার আচ আমাদের পরিবার, উম্মিকার জীবনেও লেগেছে। তাই এবার আমি নিজ থেকে উম্মিকাকে বিয়ের জন্য কোনো জোর করতে চাইনি। পক্ষান্তরে আমি এটাও চেয়েছিলাম যেনো উম্মিকা ভালো থাকে, যার সাথেই তাঁর বিয়ে হোক। সেটা আমাদের চয়েজেই হোক বা উম্মিকার নিজের। তাতে আমার কোনো অসম্মতি ছিলো না।

উম্মিকা আবিরকে ভালোবাসে, আবিরও উম্মিকাকে ভালোবাসেই বলে উম্মিকা জানিয়েছে। ছেলেটি ডাক্তার। আমার খারাপ লাগার কথা ছিলো না। উম্মিকার জীবনে যেমন একটা স্কার আছে, ছেলেটার জীবনেও তেমনি একই প্রকার একটা স্কার আছে। অর্থাৎ ওদের প্রথম বিবাহ টিকে নাই। স্কার নিয়ে ভাবিনি, এগুলি আমার কাছে খুব বেশী নাড়া দেয়নি। তাই আমি ঘটনাটা জেনে তেমন নেগেটিভলি নেই নাই।

কিন্তু বাধ অথবা খটকা লেগেছে এক জায়গায়। আবিরের কিছু তথ্যে মারাত্মক ভুল ধরা পড়ায়। যেমন, প্রথম যেদিন উম্মিকার আম্মু অর্থাৎ আমার স্ত্রী আবিরকে রাতে ফোন করলো সেদিন। আমি পাশেই ডিনার করছিলাম, আমি শুধু ওদের কথাবার্তা শুনছিলাম, কোনো উত্তর বা প্রতিউত্তর আমি দেই নাই। আমি আসলে একজন ভালো লিসেনার। আগে শুনি, তারপর ভাবি, তারপর উত্তর দেই। আবিরের সাথে উম্মিকার আম্মুর কথোপথোনে যেটা বের হয়ে এসছিলো আর আবিরের দৃষ্টিতে উম্মিকার রিভিউ হলো-

  • উম্মিকা খুব অলস।
  • ওর ডিউটির জ্ঞান কম। আবিরই মাঝে মাঝে ওর বিভিন্ন হসপিটালে ডিউটি শেয়ার করে দিতে সাহাজ্য করে। মাঝে মাঝে যদি আলসেমীর কারনে ডিউটিতে যেতে না চায়, সেটাও আবির কোনো না কোনো ভাবে ম্যানেজ করে নেয় বা দেয়।
  • বড় লোকের মেয়ে বলে টেনশন কম, খায় দায়, ঘুমায় আর মোটা হচ্ছে।
  • উম্মিকা কোনো কিছুই দ্রুত বোল্ড সিদ্ধান্ত নিতে পারে না এবং কনফিউজড। ইত্যাদি ইত্যাদি

আবির মিথ্যা কথা বলে নাই। উম্মিকা প্রায় ওই রকমই। কিন্তু মায়ের কাছে মেয়ের এসব দোষ ত্রুটি বলাতে উম্মিকার মা ব্যাপারটাকে খুব একটা পজিটিভলী নেয় নাই, নেবার কথাও না। অতঃপর উম্মিকার মার পরবর্তী কথোপথোনে বেশ বিপরীত ভাষা লক্ষ্য করলাম। উম্মিকার আম্মু সরাসরি আবিরকে জিজ্ঞেস করলোঃ

  • “তুমি কি উম্মিকাকে ভালোবাসো? উত্তরে আবির পজিটিভলীই বল্লো যে, হ্যা আবির উম্মিকাকে ভালোবাসে।
  • উম্মিকার মা আবিরকে আবার জিজ্ঞেস করলো, তোমার আগের বউ (ওর আগের বউ এর নাম ছিলো ইতি) এর সাথে কবে ডিভোর্স হয়েছে? উত্তরে আবির জানালো যে, প্রায় বছর তিনেক আগে ওদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।
  • এবার উম্মিকার আম্মু সরাসরি আবিরকে প্রশ্ন রাখলো-তুমি কি উম্মিকাকে বিয়ে করতে চাও? আবির এখানে পুরুই অকৃতকার্য হলো। ভয়েই হোক, পরিস্থিতির কারনেই হোক, আবির উম্মিকার মাকে বল্লো-সে এই ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে নাই। অর্থাৎ উম্মিকাকে আবির ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু এটা বিয়ের লগন পর্যন্ত যাবে কিনা সেটা সে জানে না।

ফলাফল-আবিরের সাথে কথা বলার পর পুরু ব্যাপারটা উম্মিকার আম্মুর কাছে প্রায় নেগেটিভ হয়ে গেলো। আবিরকে সরাসরি উম্মিকার আম্মু জানিয়ে দিলো-সে যেনো আর কোনো অবস্থাতেই উম্মিকার সাথে যোগাযোগ না করে। উম্মিকাকেও বলা হলো উম্মিকা যেনো আবিরের সাথে আর কোনো যোগাযোগ না করে। ব্যাপারটা এখানেই উম্মিকার আম্মুর কাছে একটা সম্পর্কের নিহত হবার পরিনতি পেলো।

আমি তখনো ব্যাপারটা নিয়ে নেগেটিভ পর্যায়ে যাইনি। তবে আমিও উম্মিকার আম্মুর কথায় অনেকটা নেগেটিভ না হলেও খুব একটা পজিটিভ রইলাম না। একটু ভাটা পড়লো। কিন্তু পুরুপুরি নেগেটিভ হলাম না। তবে একটা খটকা থেকে গেলো একটা কারনে, আর সেটা হলো, আবিরের বাবার প্রোফেশন, আবিরদের পারিবারিক অবস্থান কিংবা ছেলের সামাজিক অবস্থানটা কোথায় সেটা সরাসরি জানা হলো না।

পরবর্তীতে জানা গেলো যে, আবিরের বাবা মুলত মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত। একটা লোক মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে, তাদের পরিবার হচ্ছে জেলে পরিবার, আর তাদের সাথে আমাদের খাপ খায় না।

মিটুল যেহেতু পুরুপুরী নেগেটিভ হয়ে গিয়েছিলো, ফলে, মিটুল আমাকে বল্লো, তুমি আবিরের বাবাকে একবার ফোন দিয়ে তাদের সাথে আমাদের খাপ খাবে না এবং আবির যেনো আর উম্মিকার ব্যাপারে কোনো ইন্টারেস্ট না দেখায় সেটা বলে দাও। আমি মুলত আবিরের বাবাকে কোনো ফোন করতে চাইছিলাম না। কিন্তু মিটুলের অবিরত চাপে একদিন সত্যিই আমি আবিরের বাবাকে ফোন করলাম। ফোনে কি আলাপ হলো সেটা রেকর্ড করা আছে, তাই রেকর্ডটা থেকে লিখছিঃ

আমিঃ হ্যালো, আপনি কি রাকিবের বাবা বলছেন?

আনিছঃ হ্যালো, জী,

আমিঃ আমি মেজর আখতার বলতেছিলাম। ডাক্তার আনিকার আব্বু।

আনিছঃ কোথা থেকে?

আমিঃ ঢাকা থেকে। আমার মেয়ে হচ্ছে ডাক্তার আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা। সম্ভবত আপনি নামটা জানেন। রাইট?

আনিছঃ হ্যা, বলেন, বলেন।

আমিঃ আপনি কি করেন এমনি?

আনিছঃ আমি (গলা খেকারী দিয়ে), আমি ব্যবসা করি মাছের। ১-/১২ টা পুকুর আছে, হ্যাচারী আছে। ওগুলা করি আর মাছের যে রেনু আছে সেগুলি উতপন্ন করি। এগুলি সিজনাল ব্যবসা।

আমিঃ আচ্ছা। রাকিব কি আপনাকে আমাদের সম্পর্কে বা আমার সম্পর্কে কিছু বলছে আপ্নাদেরকে?

আনিছঃ বলছে অবশ্য আমাকে। হালকা পাতলা বলছে। বলছে, একদিন আপনার পরিবারের সাথে রাকিবের কথা হইয়েছিলো। এখন ঘটনা হলো কি …

আমিঃ আমি যেটা প্রশ্ন করি সেটা বলেন। রাকিব আমার বা আমাদের সম্পর্কে কি বলছে?

আনিছঃ আসলে আপনাদের সম্পর্কে রাকিব কিছু বলে নাই, তবে ওই যে আপনার ওয়াইফের সম্পর্কে বল্লো যে, আনিকার মায়ের সাথে কথা হয়েছে আমার। বললাম, কি ধরনের কথা হইছে?

আমিঃ আচ্ছা, আমি আমার সম্পর্কে বলি।

আনিছঃ বলেন।

আমিঃ আমি কুমা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। আমার একটা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি আছে, একটা হাউজিং আছে, যদিও প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিটা এই মুহুর্তে সচল না আর হাউজিং টা চলমান, কয়েকটা গার্মেন্টস আছে। আমার মেয়েটা একটা স্টুপিড। মানে আমাএ মেয়েটা বলদ। ও নিজের পজিশন এবং স্ট্যাটাস বুঝে না। ওর জন্ম থেকে গাড়ি ছাড়া পায়ে হাটে নাই। মানুষ আমরা তিনজন, গাড়ি আছে চারটা। আমার কথা হচ্ছে, এগুলি বলে আমি কাউকে আন্ডারমাইন্ড করি না বা করতে চাই না। যার যার সামর্থ অনুযায়ী সে তাঁর তাঁর সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। আমি আপনার ছেলেকেও দোষ দেবো না কারন আমার মেয়েরই দোষ। কেনো তাঁর সাথে এফেয়ার্স করতে গেলো এবং তাঁর সাথে সম্পর্ক করতে গেলো। কারন সব কিছুরই কিন্তু একটা লেবেল আছে।

আনিছঃ অবশ্যই, অবশ্তই।

আমিঃ হ্যা সব কিছুর। যখন সে এই লেবেল ক্রস করে, তখন সে আর সাধারন মানুষ থাকে না। সে হয় বোকা, না হয় পাগল না হয় এবনরম্যাল। আর কেউ যদি এই সবের জন্য সপ্নও দেখে সেও মুর্খ। আমি অত্যান্ত ধইর্যিশীল মানুষ।

আনিছঃ কথাগুলি আপনি খুব গুরুত্ব পুর্ন বলছে। মানে অনেক দামী কথা বলছেন, তা বলার মতন না কিন্তু আমি তো …যদি মনে করেন …

আমিঃ আপনার ছেলেকে বলবেন, সে যেনো সরে যায়। আমি ওর ক্ষতি করতে পারবো কিন্তু আমি ওটা করবো না। আমি ওকে দেখিও নাই, চিনিও না। সেও আমারই সন্তানের মতো। তবে বাংলাদেশে, এই পৃথিবীতে যাদের শক্তি আছে, যাদের ক্ষমতা আছে, টাকা পয়সা আছে, তারা অনেক কিছু করে। কিন্তু বিচার হয় না। তারা অনেক সময়েই ধীর গতির বিচারের ফাক দিয়ে বড় বড় অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। এগুলি খারাপ। এগুলিতে আমি বিশ্বাস করিনা। আমি এগুলি করতে ইচ্ছুক না। কিন্তু যখন কারো গায়ে হাত লেগে যায়, আচড় লেগে যায়, যখন কারো অস্তিত্তের মধ্যে টোকা পরে, যখন সম্মানের উপর কেউ আঘাত করে, ইজ্জতের উপর হামলা করে, তখন তাকে কিকব্যাক করতে হয়। এটা আমি হয়তো করে ফেলবো। রাকিবকে বলবেন, ও যেনো কোনো অবস্থাতেই ভুলে হোক কিংবা আমার মেয়ের প্ররোচনায় হোক সে যেনো আর আমার মেয়ের সাথে যোগাযোগ না করে। আমার মেয়েও যদি যোগাযোগ করে, তাহলে রাকিব যেনো আমার মেয়েকে স্টুপিডভাবে জবাব দেয় যে, তোমার বাপ আমাদের মেলামেশা চায় না। তোমার বাপ না করছে এবং তোমরা আমাদের সমকক্ষ না।  তুমি আমাকে আর বিরক্ত করো না। আমি এখনো বলি, সবার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে, আমরা এই স্ট্যান্ডার্ডের নীচে নামতে পারবো না। আমি যদি এখন…আচ্ছা আপনার নামটা কি ভাইয়া?

আনিছঃ আমার নাম, আনিছুর রহমান।

আমিঃ আনিছুর রহমান ভাই, আপনি একবার চিন্তা করেন তো আমি যদি আপনার বাসার আজকে কিংবা কালকে বেড়াতে আসি, আপনাকে কিন্তু আমি আন্ডার মাইন্ড করছি না, আপনি অনেক কিছু করছেন, অনেক কিছু। একটা মানুষ তাঁর জীবনের সমস্ত চেষ্টা দিয়ে যতটুকু পারে ততটুকুই আগায়। আপ্নিও তাই করেছেন। কিন্তু সেই চেষতার মধ্যে যদি এমন একটা বস্তু মিক্সড করে ফেলেন যেখানে আপনার পক্ষে সামাল দেয়াই সম্ভব না এটা বোকামী। আজকে যদি আমার কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে আসি, সেই স্ট্যাটাস কি আপনি দিতে পারবেন? আমি আপনাকে আন্ডার মাইন্ড করছি না আনিছ ভাই, কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি এই সপ্নটা এবং ধারনাটা ভুল আপনার ছেলের।

আনিছঃ আসলে আমাদের আগের ছেলের বউ……

আমিঃ আপনাদের ছেলের বউ কি করেছে, কি করা উচিত ছিলো, কি না করলে কি হতো সেগুলি এন্টায়ারলি আপনাদের নিজেদের ব্যাপার। সেগুলি আমার জানার কোনো আগ্রহ নাই। আমি আপনাকে ফোন দিতে চাইনি, এটা সত্যি কথা। আমি আপনাকে চিনি না, প্রয়োজন ও ছিলো না। আমি কেনো আপনাকে ফোন দেবো? কোনো প্রয়োজন নাই তো। আপনার সাথে আমার জমি নিয়ে কোনো বিরোধ নাই, আপনার সাথে আমার কন ব্যবসা নিয়ে বিরোধ নাই, তাহলে কেনো আপনাকে আমার ফোন দেয়ার দরকার?

প্রতি বছরে আমার পাঁচ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। সেখানে এই স্টাটাসের মধ্যে কেউ যখন আঘাত করবে, সেই আঘাতের প্রতিঘাত কিন্তু অনেক বেশী কড়া। সহ্য করার মতো কিন্তু হবে না। আমি আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করি, আমি দেখিনি আপনাকে, আমার বয়স ৫৮, আমি জানি না আপনার বয়স কত

আনিছঃ আমার বয়স ৫২

আমিঃ এ জন্যই বলি, আপ্নিও এডাল্ট। আপনি বুঝেন। আপ্নিও কারো বাবা

আনিছঃ শোনেন, আপনি যেহেতু কথা গুলি বললেন……সবারই … সবারই একটা মান…।

আমিঃ না, আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি আপনার স্ট্যাটাস নিয়ে কোনো কোয়েশ্চেন করবো না। আমার স্ট্যাটাস নিয়ে অবশ্যই কোয়েসচেন করবো।

আনিছঃ অবশ্যই, অবশ্যই, আমিও আপনার কথাই বলতেছি…যার যার স্টাটাসে তাঁর তাঁর থাকতে হবে…।।

আমিঃ এক্সাটলী আমিও সেটাই বলার চেষ্টা করছি আপনাকে। এর বাইরে না।

আনিছঃ আমার কথা কি, ছেলেমেয়ে তো ভুলবনা করে। এই ভুলবনা করার পরেই তো বাবা মার কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। এমন কষ্ট হয় যা মাইনা নেয়া যায় না। আমার ছেলে ভুল করতেছে, আপনার মেয়েও ভুল করতেছে, এমন ভুলবনা তো মাইন্যা নেয়া যায় না।

আমিঃ না, সম্ভব না।

আনিছঃ কারন আমিও তো অনেক কষ্ট করে আমার একটাই ছেলে প্রাইভেট মেডিক্যালে অনেক টাকা দিয়াই পড়াইছি। কষ্ট তো আমারো লাগে। আমারো তো একটা আশা ছিলো। আমার ছেলেটা তো আমারেও কষ্ট দিচ্ছে।

আমিঃ আপনার ছেলের উচিত ছিলো যে, যেই বাবা, যেই মা নিজেরা না খাইয়া, না আনন্দ কইরা ছেলেকে মানুষ করছে, তাদের জন্য কিছু করা। কিন্তু সে সেটা করে নাই। সে তো নিমকহারাম। আমি আমার স্ট্যাটাসের জন্য, সামর্থের জন্য গর্ব ও করি না, অহংকার ও করি না। আমি মানুষের উপকার করার মানসিকতা আছে, পারলে করি, না পারলে তাঁর কোনো ক্ষতি করি না। আপনি আপনার জায়গায় ভালো আছেন, আমি আমার জায়গায় ভালো আছি। আর কিছু না। তাই আমি আপনাকে ষ্পষ্ট ভাবে বলে দিলাম যে, আপনি রাকিবকে বলে দেবেন যে, রাকিব, উম্মিকার আব্বু ফোন দিয়েছিলো এবং বলেছে যে, তাদের পরিবারের সাথে কোনো যোগাযোগ না করতে। আমি রাকিবকে ফোন দেবো না। আমার দরকার ও নাই। এর পরে যোগাযোগ ওর জন্য মংগল বয়ে আনবে না। রাকিব আমার বাচ্চার মতোই। ওর ক্ষতি আমি চাই না। ধন্যবাদ আনিছ ভাই। ভালো থাকবেন।

ব্যাপারটা এখানেই আমি আসলে শেষ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছে সব সময়ই মনে হয়েছে, উম্মিকা ছেলের সাথে যোগাযোগ নিজের থেকেই রাখছে এবং রাখবে। কিন্তু আমার আরেকটা ধারনা ছিলো যে, সম্ভবত এবার ছেলেটাই সরে যাবে। অথবা আমার মতো সাহসী হলে সরাসরি আমার সাথে দেখা করে কথা বলবে।

বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। এরপর উম্মিকার আম্মু আমাকে জানালো যে, রাকিবের বাবা ওকে ফোন করছে বারবার এবং তাঁর ছেলের বউ এর ব্যাপারে অনেক কথা বলতে চায় বা বলছে। এর মধ্যে জানা গেলো, রাকিবের সাথে রাকিরের স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি আসলে ৩ বছর আগে হয়নি, হয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে। তো, এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, উম্মিকার সাথে রাকিব এফেয়ার্সে জড়িয়েছে যখন রাকিবের বউ বর্তমান ছিলো। তাহলে তো বলাই যায় যে, এটা একটা এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার্স। এমনিতেই আমরা রাজী হচ্ছি না, এরমধ্যে আবার এসব গোলমালে ইনফর্মেশন। পরিবারটাকে খুব একটা ভালো মনে হচ্ছিলো না।

আমাদের পরিবার সচ্ছল, ব্যবসা বানিজ্য যা আছে, বিষয় সম্পত্তি যা আছে, এগুলি আসলে তো আমাদের মেয়েরাই পাওয়ার কথা। যেহেতু ছেলে নাই, ফলে মেয়ের মাধ্যমে মেয়েদের জামাইরাই ভোগ করবে। এটা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি কখনোই ছিলো না। কিন্তু আজকালের ছেলেরা নিজেরা কিছু করতে চায় না, তারা আরাম চায়, ভোগ বিলাস চায় কিন্তু সেটা হতে হবে শশুড়ের টাকায়। এই লোভ থেকেই রানা এসেছিলো, রানার পরিবার এসেছিলো। আরেকবার আমি আরেকটা রানা চাই না। আমি চেয়েছি এমন একটা ছেলে যে কিনা আমার মেয়েকে চায়, যে কিনা নিজের চেষতায় বড় হবে, কর্মশীল হবে, দায়িত্ববান হবে। যার উপরে আমিও ভরষা করতে পারি। এ ব্যাপারটা আমি রাকিবের মধ্যেও দেখতে পাচ্ছিলাম না, না ওদের পরিবারের মধ্যে। আমার বারবারই মনে হয়েছে-এখানে একটা লোভের কারন কাজ করছে। আর যদি এটা হয়, সেক্ষেত্রে আমি কখনোই কারো সাথে কোনো সম্পর্ক করবো না। আমার কাছে কেউ কিছু যৌতুক চাইলে বা লোভ করলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমি এগুলি ঘোর বিরুধী। যদি আমি নিজেই দেখি যে, আমার মেয়ের কিছু প্রয়োজন, সেটা তো আমি নিজেই দেবো, চাইতে হবে কেনো? রাকিবদেরকেও আমার সেরকম মনে হয়েছে।

কিন্তু আমরা যতোই নেগেটিভ হচ্ছি, উম্মিকা ততোই জিদ ধরছে যে, সে আবিরকেই বিয়ে করবে। আমি যখন কোনো উপায় দেখছিলাম না, তখন আমি উম্মিকাকেই বললাম যে, উম্মিকা আবিরকে বিয়ে করুক, তাতে আমার কোনো অসুবিধা নাই কিন্তু সেটা হতে হবে আমাদেরকে ছাড়া। অর্থাৎ আমরা উম্মিকার স্বামী বা তাঁর পরবর্তী বংশধরদের ব্যাপারে কোনো দায়ী তো নাইই, আমি আমার যতো ব্যবসা কিংবা এসেট আছে সব কিছু থেকে আমার জীবদ্দশায় ক্যাশ করে শুধুমাত্র কনিকা আর আমার জন্য ব্যবহার করবো। এটা এক ধরনের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তই নেয়া হচ্ছে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। উম্মিকাকে ঠেকানো যাচ্ছে না যেহেতু, ফলে তাঁর ইচ্ছায় সে যা কিছু করতে চায় করতে পারে। আমি উম্মিকার সাথে প্রায় কথা বলাই বন্ধ করে দিলাম।

উম্মিকা বাসায় খায় দায়, বাসায় থাকে, আমার সাথে ওর কোনো কথাবার্তাই হয় না। উম্মিকা নিজেও বাসায় খুব একটা যে কম্ফোরট্যাবল তা কিন্তু না। মাঝে মাঝে উম্মিকা নিজের থেকেই উপজাজক হয়ে কথা বলতে এলেও আমি হু হা করে উত্তর দেই। ধরা যায়, উম্মিকার সাথে আমার বিস্তর একটা গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে।

আমার এতোসব কঠিন ব্যবহারেও উম্মিকা তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে নারাজ। উম্মিকা আবিরের (রাকিব) সাথে যোগাযোগ রেখেই চলছে এবং চলমান। উম্মিকা অনেকবার আমার সাথে সহজেই মিশতে চেয়েছে কিন্তু আমার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার রিস্পন্স না পাওয়ায় উম্মিকা প্রায় একঘরেই হয়ে যাচ্ছে নিজের বাসায়। উম্মিকার আম্মু অনেকবার উম্মিকাকে বুঝানো চেষ্টা করলে খুব একটা লাভ হচ্ছিলো না। এভাবেই বেশ কয়েক মাস কেটে গেলো। আমি ধরেই নিয়েছি-উম্মিকা আর আমাদের মাঝে নেই। সে হয়তো আবিরকে (রাকিবকে) বিয়ে করবে, আর আমরা ওকে হারাচ্ছি, অর্থাৎ উম্মিকাও আমাদেরকে হারাচ্ছে।

আমি আরেকটা জিনিষ খুব ভালো করে বুঝে গেলাম যে, আমার অবর্তমানে আসলে আমার সম্পত্তি বিশেষ করে জায়গা জমিরাত, কিংবা অন্যান্য ব্যবসা কেউ চালাতে পারবে না। আমার মেয়ের জামাইরা এগুলি খুব অল্প সময়েই হয় বিক্রি করে দেবে, নতুবা ধংশ করবে। ফলে আমি এবার আরেকটা সিদ্ধান্তে অটল হয়ে গেলাম জে, আমার জীবদ্দশায় আমি আমার সব জমি জেরাত বিক্রি করে টাকায় ক্যাশ করে ফেলবো। শুধু রিভার সাইড গার্মেন্টস টা রাখবো। আমি হিসাব করে দেখলাম, আমার বৃদ্ধ বয়সে আসলে আমার দরকার টাকা যেখানে আমি প্রয়োজনে ৫/৬ টা কাজের লোক রেখে জীবনের সব শারীরিক কাজ গুলি সেরে নিতে পারবো। জমি জিরাত রেখে কোনো লাভ নাই। এর ফলে আমি ইতিমধ্যে চান্দের চরের জমিগুলি (যেখানে হাউজিং করার পরিকল্পনা করেছিলাম) বিক্রির খদ্দেরের সাথে পাকা করে ফেললাম। পলাশপুরের জমিগুলিও বিক্রি করা শুরু করলাম। আমি ধরে নিলাম, এই মুহুর্তে আমার শুধুমাত্র রিস্পন্সিবিলিটি হচ্ছে কনিকা আর আমার স্ত্রী। উম্মিকা আমার লিষ্ট থেকে বাদ হয়ে গেলো। আমি রাকিবের সাথে সম্পর্ক রাখার কারনে আমি উম্মিকার উপরে খুবই অসন্তুষ্ট এবং রাগ।

আমার আচরনে এবং ব্যবহারে আমার স্ত্রী মিটুল ও অনেকটা মন খারাপ করে থাকে। বুঝা যায়, সে প্রতিদিনই উম্মিকাকে মুটভেট করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমার সাথে কোনো প্রকার তথ্য শেয়ার করে না। এর মধ্যে আবিরের (রাকিবের) বাবা সম্ভবত আবারো মিটুলকে ফোন দিয়েছে যাতে অন্তত মিটুল তাঁর কথাগুলি শোনে। মিটুল কিছুতেই তাদের ব্যাপারে কোনো কথা শুনতে নারাজ, আবার অন্যদিকে উম্মিকাও তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে নারাজ।

তো এর মধ্যে রাকিবের বাবা আবার আমাকে ফোন দিলো। কিন্তু আমি প্রথমে ফোনটা ধরতে পারিনি, নামাজে ছিলাম। তাই নামাজ শেষে আমিই তাকে ফোন করলাম। ফোনের বিবরনটাও এখানে লিখিঃ

আমিঃ ভাই, আপনি কি আমাকে ফোন করেছিলেন?

আনিছঃ জী ভাই, আমি আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম। ভাই, সেদিন তো আপনি ফোন দিছিলেন কিন্তু আমি তো কোনো কথাই বলতে পারলাম না। যে কথা বললেন সেদিন, অন্যের কথা শুনে তো আর সব কিছু বিচার করা যায় না। আমার জায়গাতে তো আমি কষ্টেতে আছি, আমার ছেলে নিয়া, আমার ছেলের বউ নিয়া।

আমিঃ আপনার পয়েন্ট টা কি?

আনিছঃ আমার ছেলের বউ কি বল্লো আর কি না বল্লো……

আমিঃ না আমি তো আপনাকে সেদিন খারাপ কিছু বলিনি। আজকে আপনার পয়েন্ট টা কি? কি নিয়ে আপনি আমার সাথে আলাপ করতে চাচ্ছেন?

আনিছঃ না, এই যে আমার ছেলের প্রতি আপ্নারা যে বলতেছেন যে, আমার ছেলের দোষ, আমার…

আমিঃ আমি তো আপনার ছেলের কোনো দোষ দেই নাই। আমি তো বলছি যে, এটা আমার মেয়েরই দোষ। সে ভুল করেছে। এ জন্য আমি আপনাকে বলেছিলাম যে, আপনার ছেলেকে আমার মেয়ের থেকে বিরত থাকতে বলেন। কাহিনী শেষ। আবার কি বলতে চাচ্ছেন এখন আমাকে?

আনিছঃ আমি বলতে চাচ্ছি জে, ওই মেয়েটা যা যা বলছে…

আমিঃ কোন মেয়েটা?

আনিছঃ ওই যে আমার ছেলের বউ।

আমিঃ শোনের আনিস সাহেব, আপনার ছেলের বউ এর সাথে আমার কোনো কথা হয় নাই।

আনিছঃ আপনার সাথে হয় নাই, কিন্তু আপনার ওয়াইফের সাথে কথা হইছে, অনেক কিছু বলছে। তারপর আপনার ওয়াইফ আমাকে ফোন দিয়ে অনেক কথাই বল্লো। অনেক কথাই। বল্লো, আপনার ছেলের বউ থাকতে আপনার ছেলে আমার মেয়ের সাথে আবার সম্পর্ক গড়ছে……এতো বড় সাহস কোথায় পায়?

আমিঃ কি মনে হয় আপনার? আমার বউ কি কোনো কিছু ভুল বলছে? আপনার ছেলের একটা বউ থাকতে সে আবার আমার মেয়ের সাথে পরকীয়া করতেছে, এটা কি ঠিক হইছে?

আনিছঃ তা ঠিক আছে……

আমিঃ মানে? কি ঠিক আছে? কি ঠিক আছে? এটার মানে কি এটা যে, একটা বউ থাকবে, আরেকটা মেয়ের সাথে সে পরকীয়া করবে, এটা ঠিক আছে?

আনিছঃ না না সেটা ঠিক নাই। আমি তো বলতে চাচ্ছি যে, আমার ছেলেও ভুল করছে, আপনার মেয়েও ভুল করছে। আপনার মেয়েও জানে আমার ছেলের বউ বিদ্যমান।

আমিঃ না, উম্মিকা সেটা জানে না। আমাকে উম্মিকা সেটাই বলেছে যেটা সে জানে।

আনিছঃ না, জানে আপনার মেয়ে অবশ্যই জানে।

আমিঃ তাহলে এখন আপনি আমাকে কি বলতে চাচ্ছেন? আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে, এখন আপনার ছেলেকে দিয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করাইয়া দেই?

আনিছঃ না, সে রকম না।

আমিঃ তাহলে কেনো ফোন করেছেন আমাকে? বলেন না? কি চান আমার কাছ থেকে? আমি রাগ হচ্ছি এখন। কি চান আমার কাছ থেকে?

আনিছঃ আমি চাচ্ছি, আমার ছেলেকে যে হুমকি ধামকী দিচ্ছে আপনার ওয়াইফ। আমাকে বলে যে, আপনার ছেলে এই করেছে, সেই করেছে ……

আমিঃ শোনেন আনিছ সাহেব, আমি এবং আমার ওয়াইফ শুধু একটা কথা আপনার এবং আপনার ছেলেকে পরিষ্কার করে জানিয়েছি জে, আপনার ছেলে যেনো উম্মিকার সাথে কোনো যোগাযোগ না করে এবং আমার মেয়েও যদি আপনার ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে চায়, সে যেনো আর না করে। তা না হলে…

আনিছঃ আমি আমার ছেলেকে আপনাদের কথাগুলি বলে দিয়েছি।

আমিঃ জী, সেটাই বলবেন। আমি কারো কোনো ক্ষতি করতে চাই না। কিন্তু যখন এটা আমার গায়ে আসবে, ডেফিনিটলী আমি একশান নেবো, কোনো সন্দেহ নাই। আপনার ছেলের এটা একটা অবাস্তব চিন্তাভাবনা।

আনিছঃ আমিও এটাই বলেছি আমার ছেলেকে।

আমিঃ আনিছ ভাই, আমাকে শুধু একটা কথা বলেন, হাউ মাচ ইউ হেভ ব্যাংক ব্যালেন্স? টেল মি? কতটুকু ব্যাংক ব্যালেন্স আছে আপনার?

আনিছঃ কার আমার?

আমিঃ আপনাদের।

আনিছঃ আমাদের আর কত আর ব্যাংক ব্যালেন্স আছে?

আমিঃ শোনেন। নাম্বার টু, একটা ছেলে কিভাবে সব জেনেশুনে আমাদের মতো একটা অসম পরিবারের সাথে একটা সম্পর্কে জড়াইতে চায় যেটা একটা অবাস্তব? কেউ যদি তাকে প্রলোভন ও দেয়, তাঁর খুব কেয়ারফুল হ ওয়া উচিত ছিলো। এটা শুধু এবসার্ড না, এটা ইম্পসিবল পার্ট। কি করে সম্ভব হয়? আপনি কি আপনার বর্তমান স্ট্যাটাস নিয়ে আমার সামনে চেয়ারে বসতে পারবেন? আপনি আমার বাড়িতে এসে আমার সামনে বসতে পারবেন? ঠিক আছে আনিছ ভাই, আমি আপনার সাথে এ ব্যাপারে অনেক কথা বলতে চাই না। ঠিক আছে, আই ডোন্ট মিক্স আপ উইথ পিপল হু ইস নট ইকুয়াল টু মি!! আই এম গুড টু গুড পিপল বুত আই এম অলসো ব্যাড ফর ব্যাড পিপল। জাষ্ট রিমেম্বার ইট। থ্যাংক ইউ।

এরপরে আমি আর তাঁর সাথে কোনো কথা বলি নাই। বলার দরকারও মনে করি নাই। অতঃপর ঠিক পরেরদিন রাকিব (আবির) আমাকে একটা হোয়াটস আপ ম্যাসেজ করে। এই ম্যাসেজটা আমাকে আরো ক্ষিপ্ত এবং রাকিবের ব্যাপারে আরো নেগেটিভ করে তোলে। ম্যাসেজটা ছিলো এ রকমঃ

১১/৬/২০২৩

Sorry apnake WhatsApp e  txt korar jonno. Amar Baba ke call diye onek kotha bolechen. Apni to educated person tahole kono Kichur judge korte hoile dui pokkher kotha sune proper information jene then right or wrong judge korte hoy aita to janen. Apni Jodi kichu bolte chan tahole age proper information gula right place theke niye then judge korben asha kori.  Power status esob er gorom  na dekhiye sob kichur sothik information niye then kotha bolle valo hoy. Ak hate tali baje na. Amake Amar Baba ke na jene bhuje mon gora dosh diye kotha bolben aita kono educated person er porichoy na. Age Amar name akta bad report ber kore then amake wrong judge korben.jodi kono akta single bad report ber Korte paren amar name jekono sasti diben Ami Mene nibo .

আমি বাসায় এসে উম্মিকাকে এবং উম্মিকার মাকেও ব্যাপারটা পড়ে শোনাই। আর বলি- আমার সাথে ওর বাপের কি কথা হইছে সেটা আমাকে সে চার্জ করেছে। আমাকে দেখলো না, কথা হইলো না, কত স্টুপিড যে, সে আমাকে এমন একটা ম্যাসেজ লিখে যেখানে আমার শিক্ষা, আমার পজিশন, আমার স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশ্ন করে? এ তো রানার থেকেও খারাপ। রানা তো বিয়ে করার পর কিছুটা হলেও অধিকার পেয়ে আমাদেরকে উলটা পালটা ম্যাসেজ দিয়ে খুবই নোংরা কথা লিখতো। আর এই বেটা তো কোনো সম্পর্কই হয় নাই, তাতেই এখন এই অবস্থা। আর যদি সম্পর্ক হয়, তাহলে কোন লেবেলে যাবে? আমিও উম্মিকাকে আরো কঠিন করে শাসালাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো বলে মনে হলো না। আমি বারবার উম্মিকাকে এই ছেলে থেকে সরে আসতে বললাম। কিন্তু উম্মিকার আচরনে এই ছেলে থেকে সরে আসার কোনো লক্ষন দেখা গেলো না।

যাই হোক, রাকিবের ম্যাসেজের উত্তর আসলে আমি দিতে চাইনি। কিন্তু আমার মনে হলো, আমি তো ওর সাহে কোনো কথা বলি নি, অন্তত আমার মাইন্ড টা সে বুঝুক তাই একটা ম্যাসেজ দিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি ১৬/৬/২০২৩ তারিখে ওকে ম্যাসেজের উত্তর করেছিলামঃ

I wonder receiving such kinds of message again from your side where I clearly and explicitly told you that we are not interested about you even you are having 100% honesty, 100% best quality or even the BEST reputation at your end. I along with my family am not at all interested to know or search any kinds of information about you and your family on what was right and what was not. That belongs to yours and no way affects us anyway. What my daughter did was a childish move.  I wish, you would not dare enough again to communicate me with any kinds of such message in future as we have no connections in any way. Even, I would not expect you to reply me on this message. Hope you respect yourself and that’s very important for a person’s character. I don’t block people as it entails bad gradings.  An advise to you as an elder, be attentive with your carrier, build it on your own, you will be better rest of your life. Thanks. (Major (Retd) Akhtar Hossain, PhD, MSc, MBA, MDS, psc, G+,

উম্মিকা কিছুতেই রাকিবের কাছ থেকে সরে আসছিলো না। তারপর মনে হয় উম্মিকাই রাকিবকে আবার সরি আকারে একটা ম্যাসেজ দিতে বলেছে আমাকে। এটা আমার ধারনা। সেই ম্যাসেজটা ছিলোঃ

Assalamu  Owalaikum Baba.

Kmn achen apni ?Kalke apnar office theke asar por khub druto duty te chole jaoay  apnake r call dite pareni .Kalke night duty theke onek patient er pressure chilo .ajkeo saradin onek pressure giyeche. Tobe nana kajer besto tar majhe onek bar apnar kotha mone hoyeche . Call diye hoyto onek kichuei bolte parbo na tay sms kore bolte iccha korlo . Apnar sathe dekha hoar purbe moner moddhe hajar ta voy r dridha donde last koekdin onek beshi mental stress e chilam . Thik vabe ghum khaoa daoa kono kichuei korte pare ni ato ta beshi stress e chilam. Tobe apnar sathe  kalke jetuku time kotha hoyeche . Apnar proti ta kotha apnar protita motivation family nijer jibon niye notun vabe amake bachte sikhate asha jagiyeche. Amar jibone er sotti porom souvaggo ami apnar moto akjon manusher mentorship e notun vabe nijeke niye beche thakar sopno khuje peyechi . Amar kache mone hoyeche Anika jemon amar jibone thik joto ta blessing hoye eseche ,thik Apnar moto akjon baba jar proper guideline pele sotti Jibone onek dur egiye jaoa somvob. Amar kache mone hoyeche apnar moto akjon baba paoa sotti amar moto akta cheler jonno onek vagger bepar . Allah r kache shudu aituku chay samner din gulote apnader doa niye jeno agami te valo kichu kore dekhate pari. apnader kache nijeke akjon Apnader joggo sontan hisebe proman korte pari . Apnar sathe kotha bolar por amar onek beshi valo legeche . Hoyto apnake samna samni bolar sahos ta hoyni  Tay sms kore apnake janalam Baba.

ম্যাসেজ পড়ে তো আমি আরো হতাশ। সে আমাকে সরাসরি “বাবা” বলে সম্বোধন করে লম্বা একটা আকুতির ম্যাসেজ পাঠালো। আমি আর এই ম্যাসেজের উত্তর দেইনি। কারন, উত্তরে আরো উত্তর, তাঁর উত্তরে আবারো উত্তর। তাই আমিই উত্তর দেয়া বন্ধ করলাম।

উম্মিকা বুঝে গিয়েছিলো, আমি ওর একক সিদ্ধান্তেও রাজী নই। যদি সে বিয়ে করতেই চায় রাকিবকে, সেটা ওর ব্যাপার। তবে আমি উম্মিকাকে এই মর্মে একটা সতর্ক বানী শোনালাম যে, যদি আমার সিদ্ধান্তের বাইরে উম্মিকা রাকিবকে বিয়ে করে তাহলে সে আমার কোনো সম্পত্তি পাবে না, তাঁর ছেলেমেয়ে কিংবা পরবর্তী বংশ ধরেরাও আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে আমার মেয়ে হিসাবে শুধুমাত্র উম্মিকার আসা যাওয়ার অনুমতি থাকবে, অন্য কারো নয়। আমি এর মধ্যে একটা ড্রাফট ও করে ফেলেছিলামঃ

আমি নিম্নবর্নীত স্থাবর-অস্থাবর জমিজমা, সম্পত্তি এবং অন্যান্য বিষয় সম্পত্তি সত্তবান ও মালিকানা বিদ্যমান দখলদার আছি। আমার দুই মেয়ে এক স্ত্রী বিদ্যমান। আমার এখন শারিরীক অবস্থা খুব ভালো না বিধায় আমি আমার নিম্নবর্নীত বিষয়াদি আমার ছোট মেয়েকে (সানজিদা তাবাসসুম কনিকা) একচ্ছত্র মালিকানা করিয়া এই উইল করিলাম। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে যে, আমার বড় মেয়ে আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা তার নিজের ব্যক্তিগত সার্থের কারনে, তার পছন্দমত একজন বিবাহিত পুরুষের সাথে পরকীয়া করার কারনে, আমাদের কোনো সৎ পরামর্শ না শোনার কারনে এবং উপর্যপরী তার একক সিদ্ধান্তে অটল থাকার কারনে আমি এইমর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর বিষয়-সম্পত্তি তার কিংবা তার পছন্দ করা পুরুষের কিংবা তার পরবর্তী বংশধর, আওলাদ (উভয় ছেলে এবং মেয়ে আওলাদ) এর হাতে নিরাপদ নয়। আমার বড় মেয়ে এমন কিছু খারাপ মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে, এবং প্রায়ই সেই বন্ধুত্ব পরকীয়ায় রুপ নেয় যা আমাদের পরিবারের সাথে খাপ খায় না। তার মধ্যে পরিবারের ইজ্জত, মান সম্মান, কিংবা ঐতিহ্যের প্রতি কোনো প্রকার সম্মান নাই। ফলে দেখা যায় যে, আমার বড় মেয়ের এহেনো নীচ কাজের জন্য অনেক আজেবাজে লোভী পুরুষেরা তার সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে আমাদের এই সাজানো সংসার, আমাদের কষ্টার্জিত সম্পদের উপর লুলোপ দৃষ্টি দিয়ে আমার বড় মেয়েকে যে কোনোভাবে পটিয়ে তারা তাদের সার্থ হাসিল করতে চায়। অনেকবার আমার বড় মেয়েকে এ ব্যাপারে সাবধান করার পরেও সে বারবার একইরুপ ব্যবহার, আচরন প্রদর্শন করছে। সে নিজে একজন ডাক্তার কিন্তু তার মধ্যে এখনো পরিবার, পরিবারের মান সম্মান কিংবা আমাদের মান সম্মানের প্রতি কোনোরুপ তোয়াক্কা করেনা। আমার এই সম্পত্তি অনেক কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত বিধায় শুধুমাত্র আমার বড় মেয়ের খামখেয়ালীপনা, পরকীয়া এবং খারাপ মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করিয়া আমার ওয়ারিশ হওয়ার কারনে সে কিংবা তার পরকীয়া পুরুষ কিংবা তাদের ঔরসজাত সন্তানেরা, বংশধরেরা কিংবা তার ভবিষ্যৎ আওলাদ্গন আমার কোনো সম্পত্তির মালিক হইতে পারিবে না। আমি আমার এই উইলের মাধ্যমে এইমর্মে বিধান দিতেছি যে,

(ক)    আমি সজ্ঞানে, নিজের ইচ্ছায় এবং অন্যের কোনো প্রোরোচনা ব্যতিত আমি আমার বড় মেয়ে, তার স্বামী, তার বংশধর, তার আওলাদ (ছেলে কিংবা মেয়ে উভয়) এবং তার পরবর্তী যে কোনো বংশধর আমার সরবপ্রকার বিষয়াদি, স্থাবর-অস্থাবর, ব্যবসায়িক, ক্যাশ, জমিজমা, বাড়িঘর, কিংবা যে কোনো সামাজিক পজিশন থেকে বাতিল বলিয়া বিধান করিতেছি। অর্থাৎ আমার বড় মেয়ে আমার কোনো কিছুই প্রাপ্য হইবে না।

(খ)     আমার সাথে আমার বড় মেয়ের পিতৃত্ব, ওয়ারিশান কিংবা দেশের বা ধর্মের প্রচলিত যে কোনো আইনের ধারার বিনিময়ে সুযোগ নিয়ে আমার নিম্নবর্নীত জমি জমা, ঘর বাড়ি, বিষয়াদি, ব্যবসা বানিজ্যের কিংবা আমার পেনশনের অথবা যে কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে কোনো প্রকার ভাগ বা অংশীদার হবার কোনো সুযোগ নাই এবং রাখিলাম না। 

(গ)     এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, আমার ছোট মেয়ে আমার সমস্ত জমিজমা, ঘরবাড়ী, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্রাপ্য সম্পদের একচ্ছত্র মালিকানা হইবে।

(ঘ)     কোনো কারনে যদি আমার ছোট মেয়ে তার বড় বোনের উপর সদয় হইয়া আমার অনুপস্থিতিতে আমার বিষয়াদি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, কিংবা ব্যবসায়িক অংশ থেকে কোনো কিছু প্রদান করিতে চায়, সেটা আমার ছোট মেয়ে করতে পারবে না বলে আমি বিধান করিতেছি। এমনকি, আমার ছোট মেয়ে আমার কোনো সম্পত্তি কিংবা বাড়িঘর যে কোনো বিষয়াদি বিক্রি করিয়া সেই অর্থ তাহার (ছোট মেয়ের নামে) গচ্ছিত রাখিয়া উক্ত টাকা হইতে কোনো প্রকার অর্থ আমার ছোট মেয়ে আমার বড় মেয়েকে প্রদান করিতে পারিবে না। অর্থাৎ আমার যে কোনো সম্পত্তি হইতে পরোক্ষা বা প্রত্যক্ষভাবে আমার বড় মেয়ে কোনো কিছুই পাইবে না বলিয়া আমি বিধান করিতেছি। কোনো কারনে যদি আমার ছোট মেয়ে দয়া পরবশ হইয়া আমার সম্পত্তি, বাড়িঘর, জমি জমা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমার বড় মেয়েকে হস্তান্তর, দান, কিংবা সাহাজ্য করতে চায়, তাহলে আইনগতভাবে আমার ছোট মেয়েকে দোষী সাব্যস্থ্য করিয়া আমার এই বিধানের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে তাকেও শাস্তি প্রদান করিতে আমি ফার্স্ট ক্লাস মেজিষ্ট্রেট, এবং প্রশাশনকে ক্ষমতা প্রদান করিলাম।

(ঙ)     এই দলিলে উল্লেখা করা আমার জমাজমি, বাড়িঘর এবং স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি আমার ছোট মেয়ে, তার বংশধর, এবং পরবর্তী আওলাদেরা (উভয় ছেলে এবং মেয়ে) আজীবন ভোগ, বিক্রি কিংবা হেবা (আমার বড় মেয়েকে ব্যতিত), কট, মর্টগেজ করতে পারবে। তবে এখানে উল্লেখ থাকে যে, যে কোনো বিক্রি অবশ্যই ফার্স্ট ক্লাস মেজিষ্ট্রেটের অধীনে করতে হবে এবং কোন কারনে উক্ত জমিজমা, স্থাবর অস্থাবর বিক্রি কিংবা কট, মর্টগেজ করা হলো তার প্রকৃততথ্য এবং হিসাব দেয়ার পরেই শুধুমাত্র তা আমার ছোট মেয়ে, তার বংশধরেরা, আওলাদেরা তা করতে পারবে। কোনো অবস্থাতেই কোনো অংশ বা টাকা বা হেবা, দান কিংবা এই জাতীয় কোনো কর্ম আমার বড় মেয়ের জন্য বরাদ্ধ হইবে না এইমর্মে প্রশাসনকে হিসাব দিয়ে তারপর করতে পারবে বলে আমি বিধান করছি।

(চ)      এখানে উল্লেখ থাকে যে, আমি নিম্নবর্নীত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আমার জীবদ্দশায় যতটুকু সম্ভব বিক্রি করে অর্জিত টাকা আমি ক্যাশ ওয়াকফ করে যাওয়ার নিয়ত করিয়াছি। কোনো কারনে যদি আমার এই সপ্ন সফল হইবার আগেই আমার মৃত্যু হয়, সে কারনে আমার এই উইল করা। এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, আমার জীবদ্দশায় যতটুকু আমি বিক্রি করে শেষ করতে পারি, সেই টুকু আমার উইল থেকে বাদ যাবে এবং বাকী সম্পত্তিতে আমার পূর্বের সব শর্তাবলী নিবন্ধিত থাকবে।

(ছ)      এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, আমার বড় মেয়ে যদি তার ভুল বুঝে তা সংশোধন করে তার এসব খারাপ রুচীসম্মত কর্ম কান্ড থেকে বিরত থাকিয়া পুনরায় আমাদের পরিবারের মান সম্মান বজায় থাকে এমন কাজের বহির্প্রকাশ এবং তার চর্চা আমাকে দেখাইতে পারে, তাহলে আমি আমার জিবদ্ধশায় হয়তো পুনরায় এই উইল পরিবর্তন করতে পারি। কিন্তু আমার বড় মেয়ের এসব চারিত্রিক বৈশিষ্টের কোনো কিছুই পরিবর্তন না হয় এবং আমি তার উপর সন্তুষ্ট না হইয়া মৃত্যু বরন করি, তাহলে আমার এই উইলে যা যা শর্ত আমার বড় মেয়ে, তার ঔরসজাত সন্তান সন্তানাদি, আওলাদ (ছেলে বা মেয়ে) এর উপরে বয়ান করা হয়েছে, তা বলবত থাকবে।

এমন একটা পরিস্থিতিতে উম্মিকা আর রাকিব নিজেরাই এগিয়ে যাচ্ছিলো নিজেরা নিজেরা বিয়ে করে সংসার করার জন্য।

একদিন রাতে উম্মিকার মা, আমাকে খুব শান্ত গলায় কিছু কথা বলার চেষ্টা করলো। তাঁর কথার সারমর্ম এরুপ যে,

উম্মিকা আর রাকিব ডেল্টা মেডিক্যালের পাশেই বাসা ভাড়া নেয়ার চেষ্টা করছে। কিছু ফার্নিচার কিনেছে, আরো কিছু কিনবে। ওরা এই বছরের শেষের দিকে সম্ভবত নিজেরা নিজেরাই বিয়ে করবে। তাই বলছিলাম কি যে, একটা কাজ করো না, মেয়ে তো আমাদেরই, শেষ অবধি যদি ওরা বিয়েই করে ফেলে, তাহলে তো আমাদের কিছু করার থাকবে না। রাগারাগি হবে, মেয়ে বাসায় আসবে না্‌ আমরাও ওদেরকে মিস করবো। কেমন হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। তুমি একটু ভেবে দেখো না, হতেও তো পারে যে, ওরা আসলেই খারাপ না, ছেলেটা আসলেই লোভী না, বা আমরা যেমন ভাবছি হয়তো ওরা তেমন না।

কিছু বললাম না। কিন্তু কয়েকদিন সময় নিয়ে নিজে নিজেই ভাবলাম। কি করা যায়। আসলেই তো, উম্মিকা আর রাকিব যদি শেষ পর্যন্ত একা একাই বিয়ে করে, তাহলে আমাদের কি করার আছে? মেয়ে বড় হয়েছে, সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা হয়েছে। ভালো হোক আর খারাপ, শেষ পর্যন্ত যদি ওরা একা একাই বিয়ে করে, তাহলে আমাদের তো আসলেই কিছু করা যাবে না।

অতঃপর আমি উম্মিকার মাকে বললাম, উম্মিকাকে বলো, আমি রাকিবের বাবা মায়ের সাথে আমার অফিসে কথা বল্বো। সাথে আরো একটা সিডিউল দিয়ে দিলাম যে, ২৭ সেপ্টেম্বর আমি রাকিবের বাবা মায়ের সাথে একা অফিসে কথা বল্বো, ২৮ সেপ্টেম্বর উম্মিকা আর রাকিবের সাথে আমার অফিসে আমি একা কথা বল্বো, আর ২৯ সেপ্টেম্বর আমি মিটুল, উম্মিকা, রাকিব আর রাকিবের বাবা মাকে নিয়ে অফিসে কথা বল্বো। আমি এটাও বললাম যে, আমি রাকিবের মেডিক্যাল কলেজে ওর প্রাক্তন বন্ধুদের সাথে, ইতির পরিবারের সাথে, রাকিবের বর্তমান কর্মস্থলের কিছু বন্ধুদের সাথে কথা বল্বো।

এটা অবশ্যই একটা ব্রেকিং নিউজ সবার জন্য যে, আমি কথা বলতে রাজী হয়েছি। রাকিবের বাবা মা কিছুটা খুশী হলেও তারা খুব টেনশনে পড়ে গেলেন একটা অজানা ভয়ে, আমারকে ফেস করার ভয়ে। রাকিবও। কিন্তু রাকিবের বাবা মা বা রাকিব এটা ধরে নিলো যে, অন্তত তাদের কথাগুলি তো আমাকে ফেস টু ফেস বলতে পারবে। আমি সে মোতাবেক একটা হোমওয়ার্ক করি। কিছু পয়েন্ট নোট করি কি নিয়ে কোন পক্ষের সাথে আমি আলাপ করবো। পয়েন্টগুলি ছিলো এমনঃ

রাকিবের বাবা মা এর সাথে মিটিং  (২৭/০৯/২০২৩)

(১)        রাকিবের আগের বিয়ের ইতিহাস শোনা। কিভাবে বিয়েটা হয়েছিলো?

(ক)       কার কার সাথে রাকিব আর ইতিকে নিয়ে দেন দরবার করা হয়েছিলো?

(খ)       ইতির সাথে বিয়েটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো কিনা?

(গ)       ইতির বাবার ঠিকানা কি? ইতি কোথায় কাজ করে বা করতো?

(২)       উম্মিকার বিয়ের ঘটনা বলা

(ক)       কমিটমেন্ট উম্মিকাই করেছিলো, আমাকে কমিটমেন্ট করাইতে বাধ্য করেছিলো। আমি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরে আসা আমার চরিত্র নয়।

(৩)       উম্মিকার আগের শশুড়বাড়ির চেহাড়া এবং বিয়ের পরের চেহাড়ার একটা তুলনামুলক চিত্র দেয়া

(ক)       উম্মিকাকে ছোটখাটো গিফট করা, খাবার পাঠিয়ে দেয়া, মাঝে মাঝে ফোন করে তাকে ওদের কাছে টেনে নেয়া। এ সবই ছিলো বড় লোভের একটা ছোট অংশ।

(খ)       বিয়ের পরে এগুলির কোনো কিছুই আমি দেখিনি। 

(গ)       আমাদের বাড়িতে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকা কিংবা ওদের বাসার সামনেই আমাদের কর্তৃক একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে ওদের রাখা। এটা আমি মানতে পারিনি।

(৪)       রানার চরিত্র নিয়ে কথা বলাঃ 

(ক)       ভয়ানক লোভী ছিলোঃ শেয়ার চাওয়া, একাউন্ট হ্যান্ডিলিং এ সুযোগ দেয়া, গাড়ী চাওয়া, তাঁর টিউশন ফি চাও, বিজ্ঞাপনে টাকা চাওয়া, এসি, ল্যাপটপ, মোবাইল, ড্রেস, জুতা কিংবা ঘড়ি, ওদের বাড়িঘর রিনোভেশনে আমার খরচ দেয়া।

(খ)       উম্মিকার প্রতি দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা, কখনোই বগুড়ার না যাওয়া, বা ঢাকায় এলেও উম্মিকার সাথে যোগাযোগ না করা।

(গ)       কনিকার প্রতি হিংসা করা

(ঘ)       ফ্যাক্টরিতে সময় মতো না আসা। আসতে বললেই তাঁর মেজাজ চড়ে যাওয়া কিন্তু বেতনের বেলায় শতভাগ চেয়ে নেয়া।

(চ)        ওর মার কথামতো চলা এবং মা সব সময় ছেলেকে কুবুদ্ধি দিতো।

(ছ)       আমের ঘটনা।

(জ)      ষ্টাফদের সাথেই এমনভাবে মেলামেশা করা যে, ষ্টাফরাই চুরি করে আর সে সেটা সায় দেয়।

(ঝ)       উম্মিকাকে আমি যে টাকা দিতাম, সেটা দিয়েও রানা অনেক সময় ওর দাবীগুলি মেটাতো।

(ট)        কংকাল বিক্রি এবং টিভি কেনা।

(ঠ)       রানার ব্যবহার ছিলো পাশবিক। মেজাজ, আচরন কিংবা ভদ্রতা অস্বাভাবিক ছিলো। একেবারেই ম্যাচিউরড ছিলো না।

(৫)       আমার নিজের ভূমিকাঃ

(ক)       আমি নিজে ওদের ব্যাপারে কোনো খোজ খবর নেইনি। আমি নিজেও বুঝতে পারিনি যে, তারা আমাকে এই খোজখবর নেয়া থেকে খুব টেকনিক্যালি বিরত রেখেছিলোঃ যেমন, তারা কাউকে জানাতেই দিতে ইচ্ছুক ছিলো না যে, রানা বিয়ে করেছে।

তারা আমাকে ওদের অন্যান্য আত্মীয়সজনের সাথে দেখা করার জন্য কোনো প্রকার সাহাজ্যই করেনি। এক তরফা আমাকে ব্রেইনওয়াস করেছিলো।         

(খ)       আমি চেয়েছিলাম, একটা পরিবার। সেটা গরীব হোক আর অসচ্ছল তাতে আমার কোনো সমস্যা ছিলো না। কিন্তু আমি লোভী পরিবার চাইনি। তারা লোভী ছিলো। তারা চেয়েছিলো শুধু আমাকে আর আমার স্ত্রীকে। আমার সম্পদ, আমার স্ট্যাটাস, আমার ক্ষমতা ইত্যাদির ব্যবহার। কিন্তু ওরা না চেয়েছিলো আমার মেয়েকে, না ছোট মেয়েকে, না দায়িত্ব নিতে।

(গ)       জাহিদের পোষ্টিং (করাপশনের কারনে, ট্রাষ্ট ব্যংকের ঘটনা, জেনারেল মতির সাহাজ্য)

(ঘ)       ওদের জমি জমা নিয়ে বিরোধ মিটানো, অন্যান্য সহযোগীতা করা ইত্যাদি করেছি।

(৫)      বিয়ের পরে আমার মেয়েকে নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কি?

(ক)      কোথায় থাকবে, কিভাবে থাকবে?

(খ)       আমাকে কি করতে হবে? কি চাওয়া আমার কাছে?        

(৬)       আমার চাওয়াঃ

(ক)       নিরাপদ সংসার

(খ)       নিরাপদ প্রোফেশন।

(গ)       কাবিনের মাধ্যমে একটা বাইন্ডিংস।

(ঘ)       যদিও সঠিক না, তবুও একটা চুক্তি।

২৭ সেপ্টেম্বর আমি আমার গাড়ি (জীপ) ওর বাবা মার জন্য রেখে এলাম, আমি আমার নুয়া গাড়ি নিয়ে অফিসে এলাম। এর একটা প্রধান কারন হলো- ওরা আমার নিমন্ত্রনে আমার অফিসে আসতেছে। আমার উচিত তাদেরকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে যেদিন রাকিবের বাবা মা আমার অফিসে আসলেন, সেদিন আমার পরিকল্পনা ছিলো যেনো আমি কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে অসম্মান না করি, রাগারাগি না করি। তারা আমার গেষ্ট। আমি বিয়েতে রাজী কিনা বা অরাজী সেটা পরের ব্যাপার, কিন্তু কাউকে ডেকে এনে তাও আমার অফিসে, তাকে অসম্মান করার অভ্যাস আমার কখনো ছিলো না, এখনো নাই। কিন্তু যেদিন রাকিবের বাবা মা আমার অফিসে ঢোকেন, তারা এতোটাই ভয়ে জড়োসড়ো ছিলেন যে, এটা আমার জন্যই খারাপ লাগছিলো। আমি খুব হাসিমুখে তাদেরকে আমার অফিসে বসালাম। বারবার গ্রাম এবং রাকিবের কাছ থেকে ওর বাবার মোবাইলে ফোন আসতেছিলো। সবাই একটা আতংকের মধ্যেই ছিলো।  কিন্তু আমার অফিসে বসার ২ মিনিটের মধ্যে তারা এতোই শান্ত হয়ে গেলেন যে, যা ভেবেছেন আমাকে নিয়ে আমি সেটা না। রাকিবের মা ই প্রথম কথা বল্লো

ভাই, আমি গত চারদিন যাবত একেবারেই ঘুমাতে পারিনি কোনো একটা অজানা ভয়ে, চাপে। কখনো ঢাকায় আসিনি, গ্রামের মানুষ আমরা, আপনি ডেকেছেন, তাও আবার আপনার অফিসে, আমরা সবাই খুব ভয়ে ছিলাম। গ্রামে আর ফিরতে পারি কিনা সেটাও একটা ভয় ছিলো। কিন্তু এখন তো দেখছি- আপনি খারাপ মানুষ না। ভয়ংকর না। আমি তাদেরকে আরো সহজ করার জন্য খুব হাসি তামাশা করলাম। জুস খেলেন, চা খেলেন। ফলটল দেয়া ছিলো সবই খেলেন। অতঃপর আমি বলা শুরু করলাম আমার এজেন্ডা মোতাবেক আলোচনা।

আমি প্রথমে তাদের কথাগুলি শোনার চেষ্টা করলাম। তাদের ছেলের বউ এর সাথে কিভাবে বিয়ে হয়েছিলো, কেনো বিয়েটা ভেংগে গেলো, বিয়েটা রাখা যেত কিনা, সব। এখানে একটা নতুন বিষয় জানলাম যে, রাকিবের মা দুইজন। এটা নিয়েও কিছু হাসি তামাশা হলো। কিন্তু ব্যাপারটা আমি নেগেটিভলী নেই নাই। গ্রামে বড় ভাই বিয়ের অল্প সময়ের পর মারা গেলে অনেক সময় শশুড় বাড়ির লোকেরা মানবিক কারনেই তাঁর ছোট ছেলেকে দিয়ে বিধবা বড় ভাইয়ের বউকে আবার বিয়ে করিয়ে সেই বাড়িতেই রাখে। কিন্তু এখানে রাকিবের বাবার বউ থাকা সত্তেও রাকিবের দাদা রাকিবের বাবাকে তাঁর বড় ভাইয়ের বউকে বিয়ে করেছে। এটা হতেই পারে। রাকিবের মা নিতান্তই একজন সহজ সরল গ্রামের গৃহিণী, কোনো নালিশ নাই, কোনো অভিযোগ নাই। ভালোই আছে। শুধু মা হিসাবে ছেলের প্রতি সারাক্ষনই একটা টেনশন নিয়ে ঘুমায়। সব আলোচনা মিলে আমার কাছে ওদের খারাপ লাগেনি। আর খারাপ লাগলেও যেহেতু উম্মিকা রাকিবের সাথে ঘর সংসার করবেই, ফলে আমি এক প্রকার মেনেই নিয়েছিলাম ব্যাপারটা।

পরেরদিন আমি রাকিব আর উম্মিকাকে আমার অফিসে ডাকলাম। বাবার সামনে মেয়ের ইন্টারভিউ অনেক কঠিন। উম্মিকা নিজেও জানে তাঁর বাবা কতটা স্ট্রিট ফরোয়ার্ড এবং কঠিন। উম্মিকার সাথে রাকিব ও জানে এর মধ্যে যে, আমি একটু কঠিন মানুষ। দুজনেই ভয়ে ছিলো।

রাকিব এবং উম্মিকা সাথে আলোচনা করার আগে, আমি সেই একই টেকনিক রাকিবের বেলায় ব্যবহার করেছিলাম। যতোই হোক, কম বয়সী ছেলে। অন্তত আমাদের মতো মানুষদেরকে ফেস করা সহজ না। কিন্তু আমি রাকিবকে সহজ করে নিলাম। ওর ভয় বা টেনশন ভাংগার জন্য জা করতে হয় করলাম। রাকিব প্রায় আধা ঘন্টার পরে অনেকটা স্বাভাবিক হলো বলে মনে হলো।

এবার আমি ওদের সাথে প্রোফেশনাল ভাবে আলাপ করা শুরু করলাম। রাকিবকেই কথা বলতে দিলাম। আমি জানতে চেয়েছিলাম কিভাবে রাকিবের সাথে ইতির পরিচয়, প্রেম, বিয়ে এবং বিয়ে পরবর্তী সমস্যা। প্রায় একই রকমের তথ্য পেলাম জা গতকাল রাকিবের বাবা মা আমাকে বলেছিলো। খুব একটা হেরফের হয়নি।

অতঃপর আমি রাকিবকে বললাম, কখনো যদি কারো গায়ে দাগ লাগে সেটা যেমন কোনো মেডিক্যাল সার্জারী দিয়ে মুছা যায় না, তেমনি যখন কেউ সামাজিকভাবে অসম্মানীত হয়, এই লজ্জাও কোনো কাপড় দিয়ে ঢাকা যায় না। আমাদের দুই পরিবারেই এই দাগ এবং লজ্জার ঘটনা ঘটেছে। তাহলে আমি কি গ্যারান্টি পাবো যে, এই একই দাগ এবং লজ্জা আবারো দ্বিতীয়বার ঘটবে না? আমি শুধু সেই গ্যারান্টি চাই। আর এই গ্যারান্টি দিতে পারবা শুধু তোমরা দুইজন। দুইজনেই জানালো যে, তারা তো এই মুহুর্তে সে রকম গ্যারান্টি দেয়ার স্কোপ নাই কিন্তু আগামীতে তারা এটা প্রমান করবে যে, ওরা আমাদেরকে আর দাগ এবং লজ্জায় ফেলবে না।

আমি বললাম, আমি ওদের এই কথা আপাতত বিশ্বাস করলেও আগামী পাঁচ বছর অব্জার্ভ করবো। যদি আগামী ৫ বছরে কোনো সমস্যা না পাই, ধরে নেবো, ওরা ওদের কথা রেখেছে। আর এর জন্য যদি আমার কোনো সাহাজ্য লাগে, আমি দিতে তৈরী। কিন্তু লোভী মানুষদেরকে আমি ঘেন্না করি।

আমি রানার ব্যাপারে সব কিছু খোলা মেলা আলাপ করলাম, রাকিবকে উম্মিকা শুধু ওর সাথে ঘটা ঘটনার কিছু অংশ হয়তো বলেছে কিন্তু আমি রাকিবকে আদোপান্ত বলার পর রাকিব নিজেও বুঝেছে, আমাদের কি ভূমিকা ছিলো আর রানাদের কি অপরাধ ছিলো।

রাকিব তাঁর ১ম ম্যাসেজ নিয়ে অনেকবার দুঃখ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। আমি আসলে ওগুলি আর মনে রাখিনি।

পরবর্তী ২৯ সেপ্টেম্বরে আমরা আবার ৬ জন একত্রে বসেছিলাম। এখানে আমরা ৪ জন ছিলাম যেনো একটা গ্রুপ আর রাকিব উম্মিকা ছিলো আরেকটা গ্রুপ। অনেক বাধ্য বাদকতা ছিলো আমাদের কিছু শর্তের মধ্যে। যেমনঃ

আমি রাকিবকে এবং উম্মিকাকে বললাম, যেহেতু দুজনেই ক্লিনিক্যাল সাইডে উন্নতি করতে চায় এবং ধরে রাখতে চায়, তাতে উম্মিকার সাথে রাকিবের একটা দন্ধ তৈরী হবে। একটা মেয়েকে প্রোফেশনের বাইরে তাঁর সংসার, বাচ্চা কাচ্চা, স্বামী সব কিছু মেইন্টেইন করতে হয়। সেক্ষেত্রে উম্মিকার জন্য ক্লিনিক্যাল সাইডে থাকা বোকামী। অন্যদিকে রাকিব যদি ক্লিনিক্যাল সাইডেই থাকতে চায়, তাহলে উম্মিকাই বলবে, উম্মিকা দোষ করলো কি? এমন এক পরিস্থিতিতে প্রোফেশনাল ক্লেশ হওয়া কোনো ব্যাপার না। আবারো অশান্তি।

রাকিবই এর সমাধান দিলো যে, ক্লিনিক্যাল সাইডে থাকলে ভালো কিন্তু নাম করতে অনেক কাঠ খড় পোহাতে হয়। সময় অনেক বেশী লাগে। তাঁর থেকে যদি টাকা পয়সা কামাই আর পরিশ্রমের অনুপাত ধরা যায় দেখা যাবে ক্লিনিক্যালের থেকে অন্যান্য মেডিক্যালের সাইডে যাওয়া খারাপ না। ফলে, রাকিব এবং উম্মিকা দুজনেই নীতিগতভাবে আমাদেরকে জানালো, তারা ক্লিনিক্যাল সাইডে থাকবে না। তারা মেডিক্যালেরই অন্যান্য সেক্টরে তাদের ক্যারিয়ার পার্সু করবে। প্রয়োজনে তারা কানাডায় মাইগ্রেট করতেও অসুবিধা নাই।

বিস্তারীত আলাপ আলোচনায় সব পক্ষই এই বিয়েতে আমরা রাজী এটাই বেরিয়ে এলো। সন্ধ্যায় সবাই আমরা হাসিমুখে একসাথে ফ্যাক্টরী থেকে বেরিয়ে গেলাম।

এবার আসি, আমার কিছু ব্যক্তিগত মন্তব্যেঃ

(১)      আমার এজেন্ডায় আরো যেখানে যেখানে গিয়ে রাকিবদের পরিবার সম্পর্কে খোজ খবর নেয়ার কথা ছিলো, সেই সিডিউল বাদ দিলাম। কারন, আমি যদি খোজ খবর নিতে গিয়ে ওদের পরিবার সম্পর্কে ৯৯% নেগেটিভ কথাবার্তাও শুনি, তাতেও আমি রাকিব আর উম্মিকাকে এই বিয়ে থেকে বিরত রাখতে পারবো না। তাই, খোজ নেয়া আর না নেয়ার মধ্যে আমি কোনো তফাত দেখতে পেলাম না।

(২)     উম্মিকার ১ম বিয়েটা আমরা অনেকটা জোর করেই উম্মিকাকে রাজী করিয়েছিলাম রানার সাথে। উম্মিকা সে কারনে মাঝে মাঝেই আমাদের দোষারুপ করে। কিন্তু এইবার উম্মিকার নিজের চয়েজে রাকিবকে বিয়ের সিধান্ত নিয়েছে। ভালো মন্দ, সব উম্মিকার দায় দায়িত্তো। লাইফ উম্মিকার, ভালো থাকার ব্যাপারটা উম্মিকার। তাই, আমি উম্মিকাকে এবার জোর করে বিয়েতে না রাজী করার কোনো কারন দেখি না।

(৩)     আমরা প্রথম থেকে রাকিবদের উপরে জে মানসিক চাপের সৃষ্টি করেছি, বা যেভাবে জে কথাগুলি ওপেনলী বলেছি, তাতে অন্তত রাকিব এবং তাঁর পরিবার একটা জিনিষ খুব ভালো করে উপলব্ধি করেছে যে, আমাদের দ্বারা ওদের উপকার হবে যদি লোভ না করে, কিন্তু যদি লোভী হয়ে উলটা পালটা কিছু আশা করে সেটা আমি বা আমরা কিছুতেই পছন্দ করবো না। তাছাড়া, আমাদের এমন টাইট ব্যবহারে ওরাও অনেকটা সোজা হয়ে চলার কথা। রানার মায়ের মতো বা রানার বোনের বা ভাইয়ের মতো সার্থপরতার কোনো কাজ না করার কথা।

(৪)     উম্মিকার আগের স্বামী রানা ছিলো একটা স্টুডেন্ট বা বেকার। তাছাড়া ম্যাচিউরিটি ছিলো না। কিন্তু রাকিবের বেলায় তাঁর একটা আইডেন্টিটি আছে, ডাক্তার। যা বুঝেছি, দায়িত্তের সাথে কাজ করে এবং পরিবারকে সাপোর্ট করার জন্য আরো বেশী পরিশ্রম করে। রানাকে কোথাও পরিচয় করিয়ে দেবার মতো রানা কোনো যোগ্যতা অর্জনেও সক্ষম হয়নি।

(৫)     রাকিবের দুটূ বোন, যাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। রাকিবের আর কোনো ভাইও নাই। ফলে পরিবারটাকে আমার জটিল মনে হয় নাই। এ ছাড়া রাকিবের বাবার একটা ব্যবসা আছে যেটা রানার বাবার ছিলো না।

(৬)     রাকিবঅদের ঢাকায় কোনো থাকার জায়গা নাই, ফলে রাকিবের বাবা মা অনেকটাই আমাদের উপর নির্ভর করছে রাকিবের নিরাপত্তা, রাকিবের গার্জিয়ানশীপ ইত্যাদি। কিন্তু রানার ব্যাপারে রানার মা চেয়েছিলো ওরা আমাদেরকে কন্ট্রোল করুক। আর সেইটার টুলস হলো উম্মিকা। এখানে এই ব্যাপারটা আমি দেখি নাই।

(৭)     সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হচ্ছে- যদি উম্মিকা আর রাকিব শেষ পর্যন্ত তারা একা একাই বিয়ে করে ফেলে, তাহলে আমি তো আমার মেয়েকেই হারিয়ে ফেলছি। হতে পারে ইনশাল্লাহ ওরা ভালই থাকবে বা থাকছে, তখন কিন্তু আমিই আবার ওদেরকে কাছে টেনে নিতে বাধ্য হবো। কারন আমি ওটাই চেয়েছিলাম যে, উম্মিকারা ভালো থাকুক। যদি পরে গিয়ে ওদের সুখী দাম্পত্যর ফলাফলে আমি কাছেই টেনে নেই, সেটা বিয়ের আগে নয় কেনো? তাতে লাভ অনেক গুলিঃ

(ক)    আমার সিদ্ধান্তেই বিয়েটা হলো।

(খ)     উম্মিকার আম্মুর খুব শখ ছিলো উম্মিকার বিয়েতে সে অনেক ধুমধাম করবে, সেটাও হলো।

(গ)     আমার একটু সাহাজ্যে যদি রাকিবদের পরিবারেও একটু উপকার হয়, তাতে আমিও খুশী রইলাম।

(ঘ)     যদি দেখি, রাকিবের বাবার ব্যবসাটা একটা লাভ জনক ব্যবসা, আর আমার সাহাজ্যে যদি তাঁর ব্যবসাটা আরো ভালো করে, প্রয়োজনে আমিও তাঁর সাথে ব্যবসায় শরীক হতে পারবো। রাকিবের বাবাই চালাবে কিন্তু আমার কিছু ফাইন্যান্সের কারনে আমারো একটা নতুন সেক্টর ওপেন হলো।

তাই, আগামী ৩ জানুয়ারী ২০২৩ তারিখে সেনাকুঞ্জে উম্মিকার অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করা হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ এ ওর গায়ে হলুদ। এর মাঝে আমার ছোট মেয়ে কনিকা ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে ইনশাল্লাহ ঢাকায় ল্যান্ডিং।

৩০/০৯/২০২৩-বন্ধুর বাহুবলে শত্রুকে আক্রমণ

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কিভাবে কোথায় শেষ হবে এর আসলে কোনো দিক নির্দেশনা দেয়া বা বুঝা কঠিন। কারন যুদ্ধটা একপক্ষ (রাশিয়া) করছে তাঁর নিজ শক্তিতে আর অন্যপক্ষ (ইউক্রেন) করছে অন্যের বাহুবলে। ফলে খুব ধীরে ধীরে এর অন্তর্নীহিত একটা মুখোশ বেরিয়ে আসছে কথায় এবং কাজে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউক্রেনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এন্ড ডিফেন্স কাউন্সিলর আলেক্সি ডেনিলভ প্রকাশ্যে কিছু মন্তব্য করেছেন, আমি তাঁর কথাগুলি হুবহু তুলে ধরিঃ  

তিনি বলেছেন, “কালেক্টিভ ওয়েষ্ট এবং ইউরোপিয়ান প্রতিনিধিগন বারবার একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন যে, যতোদিন ইউক্রেনের সাহাজ্যের প্রয়োজন, ততোদিনই তারা সেটা দিয়ে যাবেন কিন্তু কেউ এটা বলছে না যে, ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে জয়ী না হওয়া অবধি আমরা সাহাজ্য দিয়ে যাবো। তারা বলছেন, আমরা ইউক্রেনবাসীরা জয়-পরাজয়ের কিংবা যে কোনো সিদ্ধান্ত নেবো। তাই আমি জানতে চাচ্ছি আমাদের ওয়েষ্টার্ন সাপোর্টারদের কাছ থেকে যে, আপ্নারা কি আমরা বিজয়ী হওয়া অবধি সাপোর্ট দিয়ে যাবেন নাকি এটা কিছুদিন পর নিঃশেষ হয়ে যাবে? আমার এই কথা বলার পিছনে যুক্তি হচ্ছে যে, আমাদের অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে জানিয়েছেন কালেক্টিভ ওয়েষ্ট এবং ইউরোপিয়ান দেশসমুহ ইতিমধ্যে তাদের ট্যাক্স-পেয়ারের টাকা আমাদের আর দিতে চান না। শুধু তাইই নয়, যেখানে প্রতিমাসে আমাদের প্রয়োজন ৫ বিলিয়ন ডলার সেখানে প্রবাহ হচ্ছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলার। জেলেনেস্কীও মনে করছেন যে, প্রতিদিন তাদের এই সাহাজ্য কমছে এবং দেশে দেশে ইউক্রেনকে সাপোর্ট করার ব্যাপারটা নেতিয়ে পড়ছে বড় একটা জনগনের মধ্যে। শুধু তাইই নয়, আমেরিকার নির্বাচনে যদি বর্তমান সরকার না আসে, সেক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য আর কোনো সাপোর্ট অবশিষ্ট থাকবে বলে মনে হয় না। যদি সেটাই হয়, তাহলে মনে রাখবেন, আমাদের যেসব রিফুজি আপনাদের দেশে দেশে অবস্থান করছে, তারা অবশ্যই আপনাদের উপর অখুশী হবে এবং এই অখুশীর একটা প্রভাব তো আছেই”।

মোরালঃ

নিজের শক্তির উপর ভিত্তি করে শত্রুকে আক্রমন করবেন। পাশে থাকা বন্ধুর বাহুবলকে পুজি করে যদি আপনি আপনার শত্রুকে আঘাত করেন তাহলে সময়মতো পাশে থাকা বন্ধুর বাহুবলকে আপনি নাও পেতে পারেন। ফলে আপনি অসুবিধায় পড়বেন।

৯/৯/২০২৩-আমার জন্মদিন

গত ৮ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন ছিলো। আমি আসলে ইদানিং আর জন্মদিন পালন করি না। ফলে মনেও ছিলো না।

প্রথম মনে করিয়ে দিলো আমার বউ। অবশ্য তিনিও মাঝে মাঝে আমার জন্মদিন মনে রাখতে পারেন না, কিন্তু যেভাবেই হোক, কষ্ট করে হলেও তিনি মনে রাখার চেষ্টা করেন, এবারো মনে রেখেছেন। তাঁর এই প্রথম সংবাদে বুঝলাম, ৮ সেপ্টেম্বর চলে এসছে। আমি অবশ্য আমার বউ এর জন্মদিন ভুলার সাহস করি না, কারন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, চুলা বন্ধ হয়ে বিছানাও আলাদা হয়ে যেতে পারে, তাই রিস্ক নেই না। মোবাইলে, কমপিউটারে, ফেসবুকে, সবখানে আগাম এলার্ম দিয়া রাখি যাতে আমি ভুলে না যাই। যেই মাত্র ওনারে “শুভ জন্মদিন কইয়া লাইছি, আবার এক বছর শান্তি”। মাঝে মাঝে ভুইল্যা যামু এই চিন্তায় সাতদিন আগেও কইয়া রাখি যে, শোনো আগামী অমুকদিন কিন্তু তোমার জন্মদিন, আবার ভুইল্যা যাইও না। আসলে আমি কিন্তু খুব গোপনে দায় সেরে ফেললাম। মহিলা মানুষ, পুরুষের চালাকী ধরতে পারেননা।

যাই হোক, এবারে যখন ফেসবুকের টাইমলাইন, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসআপ, মোবাইলের ম্যাসেজে শতশত “হ্যাপি বার্থ ডে” পাইলাম, তখন আরেকটা কথা আমার বুঝতে সুবিধা হইলো যে, আমার ফেসবুকে যারা মরার মতো কোনো কমেন্ট না কইরা আজিমপুর গোরস্থান মনে কইরা পইড়া থাকেন, আসলে তারা ওই রকম না। তারা পার্কে বসা একাকী দর্শকের মতো থাকেন, দেখেন, পড়েন, হাসেন, কাদেন কিন্তু কিছুই কন না। কিন্তু টাইম মতো আবার ঠিক সরব হন। যেমন আমার জন্মদিনে আমি এতো এতো হ্যাপি বার্থ ডে পাইছি, দোয়া পাইছি তাদের কাছ থেকেও যারা কোনোদিন আমার লেখায় কমেন্ট করে না, লাইক দেন না কিংবা সরব হন না। ভালোবাসাটা মনে হয় এ রকমই। দেখা যায় না, শুধু উপলব্ধি করা যায়। আমি এবার তাদের ভালোবাসাটা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি। ধন্যবাদ আপ্নাদেরকে।

কিছু খুব আদরের ছেলেরা আমার অনেক বিরল ছবি দিয়েও আমার টাইম লাইনে আমার “হ্যাপি বার্থ ডে” পোষ্ট করেছে। তাদের এই ভালোবাসা আমাকে নষ্টালজিক করে তুলে ফেলেছিলো। সেই সব বিরল ছবি দেখে আমার সময় যেনো  পিছিয়ে গেছে সেই দিনে যখন ছবিটা তোলা হয়েছিলো। আবেগিত হয়েছি অনেক। এসব ভালোবাসার মুল্য দেবার আমার ক্ষমতা নাই।

আসলে ওই যে একটা লেখা লিখেছিলাম, ভালোবাসা কোনো দোকানে, কোনো শপিং মলে কিংবা কোনো পাহাড় পর্বতের চূড়ায় অথবা কোনো এক রাজপ্রাসাদেও কেজি দরে কিনতে পাওয়া যায় না। এসব ভালোবাসা থাকে মানুষের অন্তরে, হৃদয়ে আর মনের ভিতরে। আপনাদের এসব ভালোবাসার মুল্য আমাকে চোখের জলেও হয়তো পরিশোধ হবে না।

আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ আপনাদের এই প্রান ঢালা ভালোবাসায়। বয়স হয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি জন্মদিন আমাকে আমার শেষ গন্তব্যের দিকে একটি একটি বছর করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো একদিন আর জন্মদিনের শুভেচ্ছার কোনো প্রয়োজন হবে না, তখন শুরু হবে আরেকটি পর্ব-মৃত্যু দিবসের দোয়া।

সবার কাছে দোয়া চাই, সবার কাছে ক্ষমা চাই যদি ভুল করে থাকি। আমিও সবার জন্য দোয়া করি। আর ক্ষমা? আমি কখনোই মনে করি না কেউ আমার কাছে কখনো ভুল করেছে।

সবাইকে ধন্যবাদ।

৯/৯/২০২৩-সাদাচুল কালোকরন (রঙ্গে ভরা পাঠক)

আমার বউকে বললাম, কি এক অবস্থা আমার চুলের! সব সাদা হইয়া যাইতেছে। একমাস পরপর কালো কলপ দিয়া কালী কইরা আর কত? ভাবছি, এবার কালো কলপ না দিয়া সাদা স্নোসেম মাইরা পুরাই সাদা কইরা ফালাই। কি বলো?

বউ আয়নায় কি জানি রূপচর্চা করিতেছিল। আয়নার দিকে তাকাইয়াই আমার উদ্দেশ্যে বলিলো-করো, অসুবিধা নাই, ভুতের মতন দেহা যাইবো তোমারে। যেই না চিকার মতো চেহাড়া, আবার সাদা চুল। ভুতের মতোন লাগবো।“

মনে মনে ভাবলাম, হায়রে আজ থেকে ৩৬ বছর আগের সেই চেহাড়া কোথায় গেলিরে বাপ? তখন তো এই মহিলাই আমারে নায়ক শাহরুখ খান ভাবতো। তাই আমারে ছাড়া আর কাউরে বিয়া করবো না কইয়া তিনদিন না খাইয়াও আছিলো। আমি নাকি সেই রাজপুত্তুর। বিশ্বে আমার থেকে নাকি এতো সুন্দর যুবক আর তাঁর চোখে পড়ে নাই। আর আজ? চিকা হইয়া গেলাম? কষ্টে কইলজার সাথে মাথার চুল পর্যন্ত পইড়া যায়যায় ভাব।

ঢেকুর তুলিয়া বলিলাম,

যাক, তাওতো ভালোই। সবাই তো ভুতেরেই ভয় পায়। অবশ্য ভুতের সাথে ঘর করিলে তোমার আর ভুতের ভয় থাকবে না। রাতে শোয়ার সময় হাতে তিনটা তালি দেয়া বন্ধ হবে। খাটের নীচে কোনো ভুত লুকাইয়া আছে কিনা সেইটা থেকেও নিস্তার পাইবা। চোরের জন্য জানালা দরজা বন্ধ করলেও ভুতের ডরে আর সেটা করতে হবে না। ভুত তো তোমার সাথে সাথেই আছে।

তবে লাভ তো কিছু আছেই। এই যেমন, রাস্তায় গাড়ির জ্যামে আমাকে দেখলেই সবাই ভয়ে রাস্তা ফাকা কইরা দিবো, জ্যাম শেষ। উগানাডার পুলিশও মনে হয় ভুতেরে ভয় পায়, পাওয়ার তো কথা। তারাও আর অযথা আমার গাড়ি চেকের ঝামেলা করবো না, যারা সুদটুদ খায়, তারাও নিশ্চয় আল্লাহরে ভয় না পাইলেও ভুতেরে তো অবশ্যই ভয় পায়। তারাও আর কেঊ টাকা পয়সা চাইবো না। ভুতের সাথে আর যাই হোক, লেনদেন করা বিপদজনক। অনেক বাটপার টাটপার আছে, টাকা ধার চায়, অন লাইনে আবার অনেকে কালা জাহাঙ্গীরের নাম কইরা টাকা পয়সাও চায়। তারাও ভুতের কারনে কাছেটাছে আইবো না, আর ধারও চাইবো না, সবাই আমারে ডরাইবো। অস্ত্র ছাড়া, হুমকী ছাড়া, ঘুষ বানিজ্য দেয়া ছাড়া সবাই আমারে ভুত মনে কইরা ডরাইবো। মন্দ কি? এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করা কি আমার ঠিক হইবে?

বঊ কিছু না কইয়া বল্লো- জাতিরে জানাও।

আমি জাতির কাছে জানাইলাম।

৭/৯/২০২৩-পূর্নিমার চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি  

আগের যে কোনো বছর থেকে ২০২২ সালের পরে ন্যাটো উল্লেখযোগ্যভাবে সবার নজরে এসছে এবং ন্যাটো নিয়ে অনেক আলোচনাও হচ্ছে। এই ন্যাটোটা আসলে কি?

ন্যাটো (NATO) মানে হচ্ছে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগ্যানাইজেশন।

এটি বর্তমানে ৩১টি দেশ (২৯ টি ইউরোপের এবং ২টি উত্তর আমেরিকান) নিয়ে গঠিত একটা আন্তঃসরকার  সামরীক জোট। বস্তুত স্নায়ুযুদ্ধের আগে তদানীন্তন সোভিয়েট ইউনিয়নের (USSR) ওয়ার্শো প্যাক্ট (Warsaw Pact) এর বিপরীতে USSR থেকে আগত যে কোনো আক্রমনাত্তক হুমকীকে মোকাবেলা করার জন্য এই ন্যাটো জোটের উদ্ভব। প্রথম মোট ১২টি দেশ (বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালী, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, পর্তুগাল, ব্রিটেন, এবং আমেরিকা) নিয়ে ন্যাটোর জন্ম। যদিও ন্যাটোর সম্প্রসারনের নিমিত্তে তদানিন্তত আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানীর রাষ্ট্র প্রধানদের মাধ্যমে এটাই কথা ছিলো যে, ভবিষ্যতে ন্যাটোর কোনো সম্প্রসারন হবে না এবং কাউকে আর সদস্য করাও হবে না।  কিন্তু পরবর্তীতে আরো ৯ বার এর সম্প্রসারন হয়েছে যা রাশিয়ার জন্য বিপদ সংকেত বলে রাশিয়া মনে করে। USSR এর অধীনে করা ওয়ারশো প্যাক্ট বাতিল হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু ন্যাটো রয়ে গেছে যা পরবর্তীতে USSR Bloc এর বাইরে বলকান, মধ্যপ্রাচ্যে, দক্ষিন এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যেমন কুয়েত, আফগানিস্থান, লিবিয়া, ইরাক, বসনিয়া-হার্জেগোবিনা, সিরিয়া, ইউগোস্লাব, কসোবো ইত্যাদি দেশে ন্যাটো মিলিটারী অপারেশন করেছে। ন্যাটোর প্রধান হেডকোয়ার্টার বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে এবং এর সামরিক সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩৫ লক্ষ (বস্তুত এই ৩১ দেশের সামরিক সদস্য যা, সেটাই ন্যাটোর সংখ্যা)। 

এ যাবতকাল রাশিয়া ন্যাটোর সম্প্রসারনের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আপত্তি তোলেনি। কিন্তু রাশিয়া সবসময় এটাই বলেছে যে, রাশিয়ার দোড়াগোড়ায় ন্যাটো তাঁর সামরিক জোট স্থাপনে সে কোনোভাবেই মেনে নেবে না মানে “রেড লাইন”। সর্বশেষ যখন ইউক্রেন ন্যাটোর সামরিক জোটে যোগদানের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করে, রাশিয়া তাঁর বিপক্ষে অবস্থান গ্রহন করে। এ ব্যাপারে ন্যাটো এবং তাঁর নেতৃবৃন্দকে রাশিয়া একটা পিসপ্ল্যান দিয়েছিলো। যার মধ্যে রাশিয়াকেও ন্যাটোতে নেয়া হোক এটা ছিলো। কিন্তু ২০২১ সালে সেটা অগ্রহনযোগ্য বলে আমেরিকা তা প্রত্যাখ্যান করে। দেখি পুটিন কি বলেছিলো আর এর উত্তরে ন্যাটোর প্রধান কি বলেছিলোঃ

Putin asked U.S. president Joe Biden for legal guarantees that NATO would not expand eastward or put “weapons systems that threaten us in close vicinity to Russian territory.”[134] NATO Secretary-General Jens Stoltenberg replied that “It’s only Ukraine and 30 NATO allies that decide when Ukraine is ready to join NATO. Russia has no veto, Russia has no say, and Russia has no right to establish a sphere of influence to try to control their neighbors.”[135][136]

গন্ডোগোলটা ঠিক এখানেই। ইউক্রেনকে ইউরোপিয়ান ব্লকে যোগদানে রাশিয়ার কোনো আপত্তি নাই, তাঁর আপত্তি শুধু সামরিক জোটের বিরুদ্ধে। ন্যাটোতে ইউক্রেন যোগ দিতে পারবে না এই অজুহাতেই রাশিয়া ইউক্রেনে স্পেশাল অপারেশন চালায়। সে ইতিহাসে আর গেলাম না।

এখন বড় প্রশ্নটা হচ্ছে-ইউক্রেনকে ন্যাটোর এই ৩১ টা দেশ একযোগে সামরিক, অর্থনইতিক এবং যাবতীয় মিলিটারী ইন্টিলিজেন্স দিয়ে সাহাজ্য করলেও সরাসরি তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অংশ গ্রহন করছে না কেনো? ব্যাপারটা জানা দরকার।

ন্যাটোর গঠনতন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শর্ত হচ্ছে-আর্টিক্যাল-৫। এর মাধ্যমে বলা হয় যে, ন্যাটোর যে কোনো একটি সদস্য দেশ যদি কারো দ্বারা মিলিটারিলি আক্রান্ত হয়, তাহলে ন্যাটোর অন্যান্য সমস্ত দেশ একযোগে তাঁর সাপোর্টে যুদ্ধ করবে। এই পরিচ্ছেদটা কাজে লাগিয়েই ৯/১১ এর পর আমেরিকা আফগানিস্থান আক্রমন করেছিলো। আর তাঁর ধারাবাহিকতায় লিবিয়া, সিরিয়াতে তাদের অপারেশন সম্প্রসারন করে। কিন্তু এবার ন্যাটো সেটা করতে পারছে না। কারন দুটু। (১) ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয়, তাকে কেউ আক্রমন করলেও ন্যাটোর সদস্যদেশ গুলি একযোগে ইউক্রেনের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করতে পারবে না (২) রাশিয়া সর্বোচ্চ নিউকধারী একটি দেশ। রাশিয়ার এক্সিস্ট্যান্ট যদি রাশিয়া থ্রেট মনে করে, তারা যে কোনো সময়ে তাদের নিউক ব্যবহার করার সাংবিধানিক আদেশ রয়েছে। এতে ৩য় বিশ্ব যুদ্ধ একেবারেই হাতের ট্রিগারের মধ্যে। এটা কেউ শুরু করতে চায় না।

ইউক্রেনের একক সামরিক শক্তিতে ইউক্রেনে যুদ্ধটা এতোদিন চলমান থাকার কথা নয়। এটা এতো সময় দীর্ঘায়ু পাচ্ছে কারন ন্যাটো এবং কালেক্টিভ ওয়েষ্টের ছায়া যুদ্ধের কারনে যেখানে তারা সরাসরি অংশ গ্রহন না করেও যাবতীয় সামরিক, অর্থনইতিক, ইন্টিলিজেন্সের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তারপরেও ইউক্রেন তেমন সাফল্য পাচ্ছে না। তাহলে ন্যাটোর কিংবা পশ্চিমাদের এই প্রক্সিওয়ার কি ইঙ্গিত দেয়?

ইঙ্গিত দেয় যে, ন্যাটো সদস্য দেশগুলি তাদের সর্বাত্তক সাহাজ্য সহযোগীতা করেও যখন তেমন কোনো সফলতা পাচ্ছে না, তাহলে আর্টিক্যাল-৫ এর বিনিময়েও ন্যাটো তাঁর সদস্য দেশ সমুহকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষমতা রাখেনা। এটা একটা পেপার টাইগার। ন্যাটোর জন্য আলাদা কোনো পার্লামেন্ট নাই, ন্যাটোর জন্য আলাদা কোনো আইন নাই, কোনো এনফোর্সমেন্ট নাই, এবং সদস্যদেশ সমুহের নাগরীক বা সইনিকদেরকে পুরুষ্কার বা শাস্তির কোনো বিধানও নাই। এগুলি কন্ট্রোলড হয় প্রতিটি ন্যাটোভুক্ত দেশের তাদের নিজস্ব আইনের দ্বারা। পুরুটাই যার যার তাঁর তাঁর। রিসোর্স যার যার দেশের তাঁর তাঁর অধীনে থাকে, হোক সেটা মিলিটারী, জনবল কিংবা সামরিক সরঞ্জাম। অস্থায়ীভাবে কোনো একটা অপারেশনের আগে সেগুলি সদস্যভুক্ত দেশ সমুহের রিসোর্স ন্যাটোর অধীনে শুধুমাত্র অপারেশন অর্ডারের জন্য স্থাপিত হয় বটে আবার যে কোনো সময় সেই সদস্যদেশ যখন খুশী তুলেও নিতে পারে। এমন একটা খাপ ছাড়া স্ট্রাকচারের মধ্যে ন্যাটো কমান্ডারগনও সাফল্যের মুখ দেখা খুবই কঠিন।

এই ইউক্রেন যুদ্ধে সব ন্যাটোর সদস্যরা যেভাবে তাদের মিলিটারী স্টকপাইল নিঃশেষ করেছে, এরফলে সদস্য দেশসমুহের বর্তমান অবস্থা এমন যে, তারা নিজেরাই নিজেদের ডিফেন্স মেকানিজমকে দূর্বল করে ফেলেছে। ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশই এখন নিজ শক্তিতে তাদের নিজস্ব হুমকী মোকাবেলায় সমর্থবান নয়। কারো এমুনেশন স্টকপাইল শেষ, কারো মিসাইল সিস্টেম অর্ধেক হয়ে গেছে, কারো এয়ার ফোর্সের যুদ্ধ বিমান শেষ, কারো ট্যাংক শেষ, কারো আবার রিজার্ভও শেষ।

অন্যদিকে হুজুকের বশে পড়ে, কিংবা কাউকে খুশী করার নিমিত্তে রাশিয়ার উপর তেল, গ্যাস, খাদ্যশস্য, ইউরেনিয়াম, ফার্টিলাইজার, লোহা, ডায়মন্ড, এবং আরো কমোডিটি নিষেধাজ্ঞায় দেয়ায় এখন প্রতিটি ইউরোপিয়ান এবং ন্যাটো অন্তর্ভুক্ত দেশসমুহের আর্থিক মন্দায় এতোটাই জর্জরীত যে, তারা না নিজেরা তাদের ঘাটতি পুরনে সক্ষম, না ঘাটতি ডিফেন্সিভ মেটারিয়েলস পুনরায় রিপ্লেস করতে সক্ষম। রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল এনার্জি সেক্টরের ঘাটতির কারনে ইউরোপের ইন্ডাস্ট্রিজগুলি প্রায় বন্ধের পথে (৪৫% ইন্ডাস্ট্রিজ এখন বন্দ শুধুমাত্র এনার্জি ঘাটতির কারনে)। আর যেগুলি চলমান তারাও বিশ্ব বাজারের কমপিটিশনে টিকতে পারছে না প্রোডাক্ট খরচ বাড়িতির কারনে। রাশিয়ার ফার্টিলাইজারের অভাবে কৃষিজ উৎপাদন প্রায় ঘাটতির দিকে ইত্যাদি। তাদের মুদ্রাস্ফিতি আকাশ চুম্বি, বেকারত্তের হার যে কোনো সময়ের থেকে প্রায় ২৫% বেশী।

এমন অবস্থায় প্রতিটি ইউরোপিয়ান কান্ট্রি (তথা ন্যাটোভুক্ত দেশসমুহ) এবার নিজেদের দেশের উপর ইন্ডিভিজুয়ালী নজর দিচ্ছে। তারা এই উপলব্দিতে আসা শুরু করেছে যে, রাশিয়ার সস্তা কমোডিটি ছাড়া, রাশিয়ার গ্যাস, তেল, ফার্টিলাইজার, লোহা, খাদ্যশস্য ছাড়া ইউরোপ অচল। তাদের রাশিয়াকে দরকার। ন্যাটোর চেয়ে আরো বেশী প্রয়োজন তাদের রাশিয়াকে। তাছাড়া রাশিয়া তো ইউরোপেরই একটা অংশ এবং প্রতিবেশী। তারা এবং তাদের জনগনেরা এটা বুঝা শুরু করেছে যে, রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দিতে গিয়ে তারা নিজেরাই এখন শীতে কাবু, খাদ্যে ঘাটতি, বেকারত্তে জর্জরীত, এবং তারা অসহায় হয়ে পড়ছে।

ঠিক এই পরিস্থিতিতে সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্তেও সেই ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলিই  যারা রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তারাই স্পেশাল অপারেশন শুরু আগে যে পরিমান আমদানী করতো, এখন সেটা বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০%।

এই কন্সেপ্ট থেকে আমার কাছে মনে হচ্ছে-ন্যাটো জোটের উপর ন্যাটোর দেশসমুহই দিনকে দিন কনফিডেন্স হারিয়ে ফেলছে, ধীরে ধীরে সাধারন জনগন ন্যাটোর বিরুদ্ধে এবং রাশিয়ার পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে। তাহলে কি এটা ভাবা খুব একটা অসমীচিন হবে যে, খুব দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই ন্যাটো কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সংঘবদ্ধ ক্লাব? অথবা থাকলেও রাশিয়ার সাথে এমন কোনো শর্তাবলীতে আসতে হবে যা ন্যাটোর প্রধান উদ্দেশ্য (রাশিয়াকে দমন) ব্যহত হবে। 

৬/৯/২০২৩-মনুষত্য যেখানে অমানবিক (ফারুক কাহিনী)

আজকের দিনটাকে ভেবে আগামীকালের দিনগুলি কেমন যাবে, ভালো না আরো ভালো নাকি খারাপ থেকে আরো খারাপ, সেটা বিচার করার বা উপলব্ধি করার কোনো বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা মানুষের কাছে নাই।  আজকের রবিবারে হয়তো আপনি খিল খিল করে হাসছেন, আগামী রবিবার হয়তো এমন হতে পারে আপনার চোখের পানি সংবরন করার ক্ষমতাও আপনার নাই। কিংবা আজকে শনিবার যতোটা আপনি পেরেসান হয়তো দেখা যাবে আগামী শনিবারটা আপান্র জন্য এতোই মধুর যা তাঁর আগের দিনেও ভাবেন নি। আর এ জন্য আমি একটা কথা সব সময় বিশ্বাস করি জে, ভগবান সব দিনেই আপনাকে হাসিতে যেমন রাখেন না, তেমনি সব দিনেই আপনি কষ্টেও রাখেন না। এটাই নিয়তির সাথে ভগবানের একটা অদৃশ্য খেলা।

মানুষের মাথার উপর যখন কেউ হাত রাখে, তখন সেই হাতটাকে অনেক বড় অবলম্বন মনে হয়। পাতুক বা না পারুক সমস্ত কিছুর সমাধান দিতে, তারপরেও মনে হবে কেউ তো আছে যার কাছে গিয়ে অন্তত চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষনের জন্যে হলেও কষ্টে কান্না করা যায়, অথবা মুচকী হাসা যায়। আর এই সেই ‘কেউ’ এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘কেউ’ হচ্ছে সন্তানের জন্য তাঁর পিতামাতা, স্ত্রীর জন্য দায়িত্বশীল তাঁর স্বামী কিংবা দায়িত্বশীল স্বামীর জন্য কোনো দায়িত্বশীল স্ত্রী কিংবা সন্তান সন্ততিরা।

আজকে এমনই একটা ঘটনার অবতারণা হলো আমার সামনে। ওর নাম ‘ফারুক’। আমারই আপন বোনের ছেলে।

ফারুকের মা আমার আপন বোন শায়েস্তা। বোনদের মধ্যে সে ছিলো দ্বিতীয়। ছোট বেলা থেকেই সে ছিলো খুব মেধাবী। গায়ের রঙ কালো আর খুব জিদ্ধি ছিলো এই শায়েস্তা। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের সংসারে বেশ টানাপোড়েন শুরু হয়। পাঁচ জন বোন, সাথে মা আর আমি এই সদস্যদের নিয়ে আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ মুটামুটি হিমশিম খাচ্ছে লালন পালনে। তাঁর অবদানের কথা আমরা কেহই অস্বীকার করতে পারবো না।

যাই হোক সেই অবস্থান টা এক সময় আমাদের পরিবর্তন হয়ে আবার কিছুটা থিতু হইলেও আমার বোন শায়েস্তার জীবনে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়।

১৬/০৮/২০২৩-আমার গিন্নির সংক্ষিপ্ত কথা  (রঙ্গে ভরা লেখক পাঠক)

আমার গিন্নী শিক্ষক, তাও আবার যেনো তেনো শিক্ষক নন, পুরা অর্থনীতির ডিপার্ট্মেন্টাল হেড। এখন তিনি ভাইস প্রিন্সিপ্যাল।

কোথায় যেনো কোন এক মনিষী বলিয়াছিলেন, কর্মক্ষেত্র অনুপাতে নাকি মানুষের অনেক কিছু জীনগত বেশ পরিবর্তন আসে। যেমন সব ডাক্তাররাই ভাবেন তাদের আশেপাশের সবাই রোগী, সব উকিলরা কাউকে পেলেই কিছু উকালতি বুদ্ধি দিয়া দেন, আবার কেউ পুলিশে চাকুরী করলে নাকি সবাইকে সন্দেহই করিতে থাকেন, হোক সেটা তাহাদের বউ কিংবা স্বামী অথবা পাড়াপ্রতিবেশী। তো শিক্ষক যাহারা তাহারাও ব্যতিক্রম নন। সবাইকে ছাত্রই মনে করেন। আমার বউ টিচার হিসাবে আমি ছাত্র হিসাবেই নিজেকে মনে করি। উপদেশ তিনি যাহাই আমাকে দেন, আমি শীরধার্য মনে করিয়া শান্তশিষ্ট সুবোধ বালকের মতো তা পালনে চেষ্টা করি। এতে লাভ দুইটা। সংসারে অশান্তি হয় না আবার আমার মাথাও ঠান্ডা থাকে।

কিন্তু টিচারদের বড় সমস্যা হচ্ছে-উনারা সংক্ষিপ্ত কথা সংক্ষিপ্ত আকারে বলিতে পারেন না। কথার মধ্যে ভূমিকা থাকিবে, যাহা বলিবেন তাহার ব্যাকগ্রাউন্ড ইতিহাস থাকিবে, তারপর মুলকথায় আসিলেও পথিমধ্যে আবার কোনো ইতিহাসের কথা আসিয়া পড়িলে সেইটাতেও ছাড় দিতে নারাজ। উদাহরণ দেই-

আমার গিন্নি কয়েকদিন আগে আমাকে বিমানের একটা টিকেট হোয়াটস আপে পাঠাইয়াছিলেন। পরে বিস্তারীত দেখিবো দেখিবো করিয়া আর সেইটা ভালোমত দেখা হয় নাই। তো গতকাল রাতে খাওয়ার সময় হটাত আমার গিন্নী বলিয়া উঠিল-আমি তো পরশু যাচ্ছি, জানোতো?

আকাশ হইতে পড়িলাম, মুখে পরোটা ছিলো, চিবাইতেছিলাম, তাহাও বন্ধ হইয়া গেলো, তাহার দিকে অসহায়ের মতো তাকাইয়া বলিলাম, কোথায় যাইতেছো?

তাহার মুখের অভিব্যক্তি দেখিয়া বুঝিলাম, কোথাও আমার এমন কোনো স্মৃতিশক্তি হারাইয়াছে যাহাতে এখুনি বুঝি ১৪ স্কেলের একটা ভূমিকম্প না হইলেও রুমকম্প হইবার সম্ভাবনা। বুঝিয়াই যেনো সব মনে পড়িয়াছে এরুপ ভান করিয়া বলিলাম, উহ হ্যা, তো কিভাবে যাচ্ছো?

বুঝিলাম, তাহাতেও আমার ডজ করিবার উপায় ঠিক ছিলো না। বাহানা করিলেই আমি ধরা খাই, এটা আবারো প্রমানিত। যাক, ভূমিকম্প বা রুমকম্প কিছুই হইলো না।

তিনি বলিতে থাকিলেন, তোমাকে না আমি টিকেটের কপি পাঠাইছিলাম!!

বলিলাম, ওরে, ভুলেই তো গেছিলাম। পড়েছিলাম তো……

তারপর তিনি বলিতে লাগিলেন, তাহার এক কলিগের মেয়ে কিংবা ছেলের বিয়া, তাহাকে নেমন্তন্ন করিয়াছে, যেতে হইবে সেই সুদুর বগুড়া। বিমানে যাইবেন তিনি। তো আমি আবার জিজ্ঞেস করিলাম, কবে আসিবা?

গিন্নীর সোজা উত্তর-তোমাকে না টিকেট পাঠাইছিলাম, টিকেটে লেখা ছিলো না?

বললাম, হ্যা তাই তো। টিকেটে তো লেখাই ছিলো। কি যে অবস্থা, আজকাল সব ভুলে যাই।

তারপর আবার আমার গিন্নীর কথা শুরু হইলো। তিনি কিন্তু কবে আসিবেন, সেইটার উত্তর দিচ্ছেন এখন……  

এই ধরো আগামীকাল বিকালে আমাদের ফ্লাইট। তাই কলেজ থেকে একটু আগেই ফিরিবো। এর আগে কলেজের সব কাজ সমাপ্ত করিবো। অনেক কাপড় চোপড় নেবো না, বাসায় এসে গোটা কিছু কাপড় নেবো। ড্রাইভারকে আসিতে বলিয়াছি একটু আগেভাগে যেনো এয়ারপোর্টে যাইতে আবার বিলম্ব না হয়। যেই জ্যাম আজকাল। কেনো যে এতো জ্যাম বুঝিতে পারি না। মানুষগুলি নিজেরা নিজেরাই জ্যাম বাধায়। কোনো আক্কেল নাই। হটাত করিয়া এদিক থেকে রিক্সা, ওদিক থেকে “পাঠাও”, আবার কেউ কেউ সিরিয়াল ভাংগিয়া ওভারটেক করিতে গিয়া রাস্তার মুখেই জ্যাম বাধাইয়া দেয়। বাজে সব ড্রাইভারের দল। যাক গে, বাসা থেকে রওয়ানা হইবো, আপাকেও বলিয়া রাখিয়াছি যেনো উনিও আগেভাগে রওয়ানা দেয়। তা না হলে ওনার জন্য আবার আমাদের সমস্যায় পড়িতে হইবে।

বলিলাম, “আরে ফিরবা কবে”?

গিন্নী বল্লো- এতো অধইর্য কেন তুমি? আগে তো যাইই। গেলামই তো না।

বললাম, তাই তো তুমি তো এখনো এয়ারপোর্টেই গেলা না। তারপর?

তারপর গিন্নী বল্লো-বিমানজার্নী প্রায় ১ ঘন্টা। সন্ধ্যার আগেই নামিয়া যাইবো। নেমেই ওখানে আপার হাজবেন্ড গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করিবেন। তোমাকে তো বলাই হয় নাই, আপার হাজবেন্ড অমুক জায়গায় চাকুরী করিতেন। ওরে বাবা, অনেক ভালো চাকুরী। তাঁর চাকুরীর সময় উনি অনেক মানুষের উপকার করিয়াছেন। খুব অমায়িক মানুষ, আপার সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক। খুব সংসারী মানুষ। তাঁকে তাহাদের গ্রামের মানুষ অনেক শ্রধ্যা করে। এখোনো উনি এই সেই করেন (আরো ছিলো, সংক্ষেপে বললাম আর কি)

বললাম, আরে ভাই, তুমি ফিরবা কবে সেটা তো বললে না।

উফ তোমার সাথে কথা বলতে গেলে এতো অধইর্য হইয়া যাও যে, আসল কথাই বলা হয় না।

বললাম- আরে আসল কথা তো জানতেই চাচ্ছি- ফিরবা কবে?

এদিকে হটাত করিয়া তাঁহার মোবাইলে কাহার যেনো কল বাজিয়া উঠিলো। তিনি কল ধরিলেন, সেই আপা যাহাদের বাসায় তাহার নেমন্তন্ন। এখন আপার সাথেই তিনি কথা বলিতেছেন। আমি বসেই রহিলাম কবে তিনি ফিরিবেন সেটা জানার জন্য।

আমি টেলিভিশনে রাতের খবর দেখি, ফলে খবরের টাইম প্রায় ছুইছুই। আমি খবর দেখিলাম, রাতে ঘুমাইলাম, পরের দিন অফিস করিলাম, এইমাত্র বাসায় ফিরিলাম। আমার গিন্নী আগামীকাল বগুড়ায় যাইবেন। একদিন পার হইয়ে গেলো, আমি এখনো অপেক্ষায় আছি তিনি কবে ফিরিবেন সেটা এখনো জানিতে পারি নাই।

১৩/০৮/২০২৩-আলোকিত সংবাদ

মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস অ্যাওয়ার্ড পেলেন সিরাজদিখানের কৃতিসন্তান মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ)

মোহাম্মদ রোমান হাওলাদার

ভারতের মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস অ্যাওয়ার্ড পেলেন সিরাজদিখানের কৃতিসন্তান মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ)। তিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড, আন-নূর ফ্যাশন্স লিমিটেড, এম এ ট্রেডার্স, ধলেশ্বরী গ্রীনভিলেজ প্রমুখ ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। গত ৯ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কলিকাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি রথীন্দ্র মঞ্চে “ভারত-বাংলাদেশ রবীন্দ্র-নজরুল বঙ্গ উৎসবে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) কে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মাননীয় মন্ত্রী, বিধায়ক, এমএলএ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিল্প সাহিত্য অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানবসেবায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) কে এই সম্মাননা প্রদান করেন।

ব্যবসায়ীক বিশেষ ব্যস্ততার কারনে উক্ত ৯ জুন ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) উপস্থিত থাকতে না পারায় তাঁরপক্ষে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল (বাংলাদেশ) এর সম্পাদক জনাব শাহ আলম চুন্নু ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের কার্যনির্বাহী পরিষদ, নির্বাহী পরিষদের সভাপতি জনাব শুভদীপ চক্রবর্তী (ভারত) থেকে সার্টিফিকেট এবং সম্মাননাটি গ্রহন করেন এবং গত ৯ আগষ্ট ২০২৩ তারিখে উক্ত সার্টিফিকেটসহ সম্মাননাটি জনাব শাহ আলম চুন্নু মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর অফিসে হস্তান্তর করেন।

মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের কয়রাখোলা গ্রামের মোহাম্মাদ হোসেন আলি মাদবরের পুত্র। তিনি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক কৃতিত্বের সাথে সম্পন্নের পর ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার পদে যোগ দেন। চাকুরীর সময়কালে তিনি ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কলেজসহ গানারী কোর্ষ এবং অন্যান্য প্রশিক্ষন সমাপ্ত করেন। জাতীসংঘের অধীনে তিনি রিপাবলিক অফ হাইতি এবং রিপাবলিক অফ জর্জিয়ায় যথাক্রমে ১৯৯৫ ও ২০০২ সালে শান্তিমিশনে সফলভাবে অংশ নেন। শান্তিরক্ষী মিশনে থাকাকালে তিনি আমেরিকার তদানীন্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল-গোর এবং তাঁর পরিবারের বিশেষ নিরাপত্তার অভূতপূর্ব কাজের জন্য ইউনাইটেড ন্যাশন্স মিশন ইন হাইতির ফোর্স কমান্ডার জেনারেল জোসেফ কিঞ্জারের কাছ থেকে সম্মাননা হিসাবে বিশেষ ‘লেটার অফ এপ্রিশিয়েশন” লাভ করেন। 

মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণের সুবাদে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে নৈতিক আদর্শে  বড় হয়েছেন। শিক্ষাগত ক্ষেত্রে তিনি মাষ্টার্স অফ ডিফেন্স, মাষ্টার্স অফ সায়েন্স, মাষ্টার্স অফ বিজনেজ এডমিনিষ্ট্রেশন সহ ডক্টরেট অফ ফিলোসোপি (পিএইচডি) সম্পন্ন করেন। মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) সহ মোট পাঁচ ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বড় ভাই ডঃ মোহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ বর্তমানে আমেরিকার নর্থ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটির একজন স্বনামধন্য প্রফেসর এবং অন্যান্য ভাইদের সকলে নিজ নিজ পেশায় সুনামের সাথে কর্মরত ছিলেন যারা ইতিমধ্যে বেহেস্তবাসী হয়েছেন। মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর সহধর্মিনী প্রফেসর মিসেস মিটুল চৌধুরী বর্তমানে মীরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের উপাধাক্ষ্য হিসাবে কর্মরত আছেন। তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ডাঃ আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা ডেলটা মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হসপিটালে কর্মরত এবং ছোট মেয়ে সানজিদা তাবাসসুম কনিকা আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড, বাল্টমোর কাউন্টিতে মাইক্রো ফাইন্যান্সে অনার্স করছেন।  

সিরাজদিখানের এই কৃতিসন্তান মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড সম্মানে ভূষিত হওয়ায় আত্নীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, স্থানীয় এলাকাবাসীসহ শুভাকাঙ্ক্ষী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জ্ঞাপন করছেন।

মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ডের ব্যাপারে মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর কাছে জানতে চাইলে তিনি  হাস্যজ্জ্বল কন্ঠে বলেন, পুরস্কার পেয়ে আমি আনন্দিত এবং সম্মানিত। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই বন্ধুপ্রতীম ভারতকে আমরা সবসময় পাশে পেয়েছি। আজ এই বিরল সম্মাননায় আমি মুগ্ধ এবং কৃতজ্ঞ। ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের মানবসেবার যে মুখ্য উদ্দেশ্য তা এই সম্মাননার প্রেক্ষিতে আমাকে ভবিষ্যতে আরো উজ্জীবিত এবং অনুপ্রেরনা জোগাবে।

১২/০৮/২০২৩-মিটুলের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল পোষ্টিং

আমার গিন্নী সরকারি বাঙলা কলেজ, মীরপুরে অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কর্মরত। গিন্নীরা চাকুরী করলে স্বামীদের কি হাল হয় সেটা যারা আমার মতো চাকুরীজীবি গিন্নীর স্বামী তারা বুঝতে পারবেন। মাঝে মাঝেই ব্যাচলর মনে হয় কারন ছুটির দিনের দুপুরের খাবারের সময়েও গিন্নীর কর্মস্থলের জরুরী কাজ নিয়ে তিনি মহাব্যস্ত থাকেন। একাই তখন খেতে হয়। আলসেমী করে সকালে একটু ঘুম থেকে দেরী করে উঠলে দেখবেন, গিন্নী নাই, অফিসে চলে গেছেন। আবার আমি অফিস থেকে একটু আগে এলেও দেখি গিন্নী তখনো কলেজের কাজেই ব্যস্ত। উপায় নাই। দেশের কল্যান বলে কথা। স্বামীর কল্যানের জন্য তো আর দেশের অমঙ্গল করা যাবেনা।

এরমধ্যে গিন্নী আবার বিভাগীয় প্রধানের কাজের বাইরে পর পর দুইবার বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক। কলিগরাও বে রশিক। স্বামীর কথা একবারো ভাবেন না। এতো ভোট দিয়ে তাকে জয়ী করাবেন তো স্বামীর কি হাল হয় সেটা কি একবারো ভাববে না? যাই হোক, পর পর দুইবারই তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদন্ধি থেকে ৪০% ভোটে এগিয়ে জয়ী হন। তো বুঝতেই পারেন, বেচারা স্বামীর কি অবস্থা। আমিও ভেবে নেই যে, জগত সংসারে স্বামীদের ছাড়াও এসব কালজয়ী গিন্নীদের আরো অনেক জরুরী কাজ আছে। সুতরাং হে স্বামীগণ, হয় নীরবে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখো, অথবা কৃষকের মতো বাগানে কাজ করো না হয় যদি জার্মান শেফার্ড থাকে তাকে নিয়ে একটু ব্যস্ত থাকো। অভিযোগ কইরা কোনো ফায়দা নাই। নারীরা এখন অনেক প্রতাপ্সহালী। বহু দেশের রাষ্ট্র প্রধান এখন মহিলা।

আমার গিন্নী এবার আবার কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এতো চাপা কষতের মধ্যে মনটা ভরে গেলো। সুখের খবর তো অবশ্যই। তবে এতে যে আমার আরো কিছু সময় ছাড় দিতে হবে সেটা তাই আর ধর্তব্যের মধ্যে নিচ্ছি না। আগে রাতের পরোটা খাইতাম ধরেন ৯ টায়, এখন না হয় খাবো ১০ টায়, এই তো। জীবনে ১ ঘন্টা আর কি আসে যায়। বিয়ের আগে তো এ রকম ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু তাহার চেহাড়া মোবারক দেখার জন্য রাস্তায়, ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে অযথাই সময় নষ্ট করেছি। তাঁর তুলনায় এই প্রতিদিন এক ঘন্টা লস তো কোন ব্যালেন্স শীটেই পড়ে না। অবশ্য সম্পর্কটা এখন মাঝে মাঝে ভাই বোনের মতই হইয়া গেছে। স্বামী হিসাবে রাগ না কইরা ভাই হিসাবেই না হয় ক্ষমা কইরা দিলাম। কি বলেন?

যাক গে, যা বলছিলাম, গিন্নী বাঙলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হিসাবে নিয়োগ পেয়েছে। খবরটা অনেক গর্বের যেমন, তেমনি আনন্দেরও। তাই সেই সুবাদে বাঙলা কলেজের বেশ কিছু গুনীজন, শিক্ষক এবং কলিগদের নিয়ে গত শুক্রবার একটা ট্রিট দিলেন আমার গিন্নী। (কানে কানে বলে রাখি-বিলটা আবার আমার কার্ডেই গেছে)। আমরাও তাঁর এই সাফল্যের জন্য অতি আনন্দের সাথে তাঁকে একটা সংবর্ধনা দেই। তারই কিছু বিশেষ মুহুর্তের ছবি।

ভালো থেকো আমার গিন্নী, তোমার সাফল্যে আমি সব সময় গর্বিত। তুমি নিশ্চয় আরো উন্নতি করবে এটাই আমার দোয়া।

১০/০৮/২০২৩-লোকাল এম পি মহোদয়ের বাসায়

আমি রাজনীতিবিমুখ একজন মানুষ। ফলে রাজনীতিবিদদের সাথে খুব একটা মেলামেশা হয়না বা করা হয়না। আমার অনেক রাজনীতিক বন্ধুদের বা কাছের মানুষকে আমি শুধুমাত্র বন্ধু, আত্তীয় কিংবা অভিভাবক ইত্যাদি হিসাবেই গন্য করি। আমার পাশেই আমাদের লোকাল এমপি মহোদয় জনাব বীর মুক্তিযীদ্ধা আগা খান মিন্টুও এমন একজন ব্যক্তিত্ব। থাকেন আমার বাসার অদূরেই। অত্যান্ত সজ্জন, মিশুক এবং সিম্পল একজন অভিভাবকসুলভ মানুষ। তিনি যতোটা না রাজনীতিক, তার থেকে অনেক বেশী ফাদারলি। তার আরেকটি পরিচয়- তিনি ছিলেন Active Freedom Fighter. ফলে অনেক না জানা ইতিহাসের তিনি এখনো চলমান বইয়ের মত।

কিছুদিন আগে মহোদয়ের সাথে চা খাওয়ার জন্য মহোদয়ের বাসায় দেখা করতে গেলে তার ফাদারলি এটিচুডের কারনেই তিনি অতিশয় আদর এবং সম্মানের সাথে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। আমি মহোদয়ের এমন আথিথেয়িতায় যারপর নাই কৃতজ্ঞ। দীর্ঘায়ু কামনা করি মহোদয়ের।

আমার সাথে ছিল আমারই বাল্যবন্ধু লোকাল কমিশনার মুজিব সারোয়ার মাসুম। আমার এই বাল্য বন্ধুটিও একজন ভাল মানুষ। সবার প্রতি আমার ভালোবাসা।

১০/০৮/২০২৩-মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ড-২০২৩

কোনো কিছুই আমি জানি না, হটাত আমার অফিসে একটা রেজিষ্টার্ড চিঠি নিয়ে এলো কুরিয়ার সার্ভিস। সাধারনত যে কোনো চিঠি আমার অফিসে আমার HR Division Head তা রিসিভ করে। কিন্তু এই কুরিয়ার সার্ভিসের লোক কোনো অবস্থাতেই আমাকে ছাড়া উক্ত চিঠিটা আমার HR Division Head এর কাছে দিতে নারাজ। আর সেটা আমাকেই রিসিভ করতে হবে বলে জানালো।

অতঃপর হেটে গেলাম আমার ডিসপাচ রাইডার ডেস্কে, চিঠিটা আমি নিজেই রিসিভ করলাম। চিঠিটি এসেছে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল থেকে। বলা যায় আমার জন্য এটা অপ্রত্যাশিত একটা চিঠি যার বিষয়বস্তু হচ্ছে-“মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ড-২০২৩”। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানবসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিসরূপ উক্ত “মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ড-২০২৩” এ ভূষিত করার জন্য সংগঠনটি আমাকে মনোনীত করেছে।

অনুষ্ঠানটি ৯ জুন ২০২৩ তারিখে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কলিকাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি রথীন্দ্র মঞ্চে “ভারত-বাংলাদেশ রবীন্দ্র-নজরুল বঙ্গ উৎসবে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হবে এবং  চুড়ান্ত মনোনীত ব্যক্তিদের সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলে তাদের প্রতিনিধিকে তারা উক্ত পুরুষ্কারটি প্রদান করবেন বলে জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মাননীয় মন্ত্রী, বিধায়ক, এমএলএ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিল্প সাহিত্য অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।

সংবাদটি আমাকে বিস্মিত করে এবং আমি নিজে  যাচাই বাচাই করার জন্য ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশের অফিসে যোগাযোগ করি। জানতে পারলাম যে, এর আগেও বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন বিশিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে তারা এ পুরুষ্কারে ভূষিত করেছেন। শিক্ষা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, শান্তি, সমাজ এবং মানবসেবা ইত্যাদি আরো অনেকগুলি সেক্টরে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল থেকে এসব পুরুষ্কার দেয়া হয়। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানবসেবায় এবার তারা আমাকে নির্বাচন করেছেন। আমি তাদের বিস্তারিত সার্ভের পদ্ধতিটা জেনে খুবই অবাক হয়েছিলাম কিভাবে তারা এসব ব্যক্তিবর্গকে নির্বাচন করে।

আমি উক্ত ৯ জুন ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে ব্যস্ততার কারনে উপস্থিত থাকতে পারিনি। ফলে বাংলাদেশ লোকাল অফিসের সম্পাদক শাহ আলম চুন্নু সাহেব আমার পুরুষ্কারটি গ্রহন করেন এবং গতকাল সেটা সার্টিফিকেট সহকারে পুরুষ্কারটি আমার অফিসে হস্তান্তর করেন।

আমাকে এহেনো সম্মানে ভূষিত করার জন্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের কার্যনির্বাহী পরিষদ, নির্বাহী পরিষদের সভাপতি শুভদীপ চক্রবর্তী (ভারত), ভারত-বাংলাদেশ রবীন্দ্র-নজরুল পরিষদের আহবাহক মোঃ আর কে রিপন, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের সম্পাদক (বাংলাদেশ) শাহ আলম চুন্নু ভাইকে আমার ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জানাই।

সম্মাননা পুরুষ্কারটি হাতে পাওয়ার পর আমার সংস্থার কর্মকর্তা, কর্মচারীবৃন্দ আমাকে অভিনন্দন জানায়।

আজ ১১ আগস্ট ২০২৩ তারিখে সরকারি বাংলা কলেজের সম্মানীত শিক্ষক মন্ডলীর উপস্থিতিতে  কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল প্রফেসর মিটুল চৌধুরী এবং আমার বড় মেয়ে ডাঃ আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা এই সম্মাননা উদযাপনের মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণীয় করেন। আমি সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। 

৬/০৮/২০২৩-উম্মিকা একটা ছেলেকে গভীরভাবে ভালোবাসে

উম্মিকা একটা ছেলেকে গভীরভাবে ভালোবাসে বলে জানিয়েছে কিছুদিন আগে। এখানে লেখাটা লিখার আগে আমার একটা বাস্তব কথা বলে রাখি যে, আমি কখনো কারো ভালোবাসার জায়গায় বাধা দেই না। কিন্তু সেটা হতে হবে একটা শুধু মার্জিত পরিবার। ধনী না হোক, সচ্ছল না হোক, কিন্তু নীতির মধ্যে সুস্থ্য পরিবার হলেই হলো। যেহেতু আমি আমার মেয়েদের শশুড় বাড়ির অবস্থার উপর নির্ভশীল না, ফলে আমার মেয়েদেরকে সুন্দর এবং সাবলীল একটা পরিস্থিতি তৈরী করে দিতে আমি প্রস্তুত। সেটা ছেলের পুরু পরিবার সহ। আমার হাত খোলা।

যাই হোক যেটা বলছিলাম। যখন উম্মিকা আমাকে বল্লো যে, সে একটা ডাক্তার ছেলেকে ভালোবাসে, কিন্তু ছেলেটা ডিভোর্সী, তাতেও আমার কোনো সমস্যা ছিলো না। কারন উম্মিকাও ডিভোর্সী। তাছাড়া উম্মিকা নিজে ডাক্তার, ছেলেও যদি ডাক্তার হয়, তো অসুবিধা কি? আমি খুবই পজিটিভ ছিলাম। আমার স্ত্রী অনেকটাই হাইপার, সে আদিপান্ত জানতে চায়, তার সব পরিস্থিতি না জানলে সে কিছুই সায় দেয় না। ফলে একদিন রাতে আমার স্ত্রী উম্মিকার কাছ থেকে ছেলেটার ফোন নাম্বার নিয়ে ওকে ফোন করলো।

০৪/০৮/২০২৩-মানুষ একাই ছিলো, একাই থাকবে

এক যুগের অধিক কোনো একটা স্থানেও যদি কেউ বসবাস করে, সেই জায়গার গাছপালা, রাস্তাঘাট, আশেপাশের চেনা পথচারী, বাড়িঘরকেও মানুষ ভালোবাসতে শুরু করে। হোক সেটা কোনো ভাড়াটে জায়গা বা কোনো বিদেশভূমি। আর কেউ যখন এক নাগাড়ে কারো সাথে যুগের অধিক মারামারি, কাটাকাটি করেও একসাথে এক ছাদের নীচে বসবাস করে, তাকে তো দূরে সরিয়ে দেয়া আরো সহজ হবার কথা নয়। আর যদি সেই যুগল বন্ধন হয়ে থাকে কোনো এক সময়ের উজ্জিবিত ভালোবাসার কারনে, তাহলে এই বিচ্ছেদে সেটাই হবার কথা যেনো নিজের অনিচ্ছায় নাড়ির ভিতর থেকে সমস্ত অনুভুতিকে টেনে হিচড়ে জীবন্ত কেটে ফেলার মতো। যদি এরুপ ঘটনা আপনার চোখের সামনে ঘটতে দেখেন, তাহলে বুঝতে হবে যে, হয় (ক) সম্পর্কটা কখনোই নিজের ছিলো না এবং এই সম্পর্কের মধ্যে পারষ্পরিক ভালোবাসা আর মহব্বতের পাশাপাশি এমন কোনো সার্থ ছিলো যা বৈষয়িক এবং অনেকটাই লোভের। সেই লোভ হতে পারে দৈহিক, হতে পারে কোনো সম্পদ বা সম্পত্তি, হতে পারে কোনো সিড়ি যা কিনা নিজের ব্যবহারের জন্য শুধু একটা অবলম্বন হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিলো। অথবা (খ) আরেকটা হতে পারে যে, সম্পর্কটাকে কেউ সম্মানই করেনি। তিলেতিলে গড়ে উঠা ছোট ছোট বিদ্বেষ, ছোট ছোট অবহেলা, কিংবা নির্যাতন পুরু সম্পর্কটাকে এমন স্থানে নিয়ে গেছে যেখানে কেউ কাছে আসার জন্য আর কেউ চেষ্টাই করে নাই। তারা সব সময় এক সাথে থেকেও আলাদাই ছিলো। অথবা আরেকটা হতে পারে (গ) এই সম্পর্কের মধ্যে এমন আরেকজন ঢোকে পড়েছে যা অতীতের সব মোহ, সব ভালোবাসা, সব আবেগকে মিথ্যা প্রমানিত করে বর্তমানের সাময়িক মোহ, অনুভুতি কিংবা তার পারিবারিক পরিস্থিতির উপর ভর করে বসেছে। সবচেয়ে করুন যেটা হতে পারে সেটা আমাদের কারো হাতের মধ্যে থাকে না। আর সেটা হলো (ঘ) সম্পর্কে জড়ানো কারো যদি হটাত অসময়ে ম্রিত্যুর মতো কোনো ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি বাদ দিয়ে অন্য যে কোনো পরিস্থিতির আলোকে বলছি- যদি এমন কোনো সম্পর্ক-বিচ্ছেদের মধ্যে কেউ আবর্তিত হয়েই যায়, মনে রাখা উচিত, নতুন সেই সম্পর্কটাও একদিন এমনভাবে ফিকে হয়ে যাবে, যা আজকের দিনের ফিকে হওয়ার চেয়েও খারাপ। তাই, একবার কখনো যদি কোনো সম্পর্কের মধ্যে কেউ ঘোলাজলের অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে, তাকে নতুন আরেকটা সম্পর্কে জড়ানোর আগে উভয়ের আদিপান্ত সব কিছু চুলচেরা বিশ্লেষন করে অতঃপর সম্পর্কে জড়ানো উচিত। বিশ্লেষন করা উচিত কিসের ভিত্তিতে আসলে নতুন এই সম্পর্কটা তৈরী হচ্ছে। সব সময় এর অন্তর্নিহীত কারন হয়তো বের করা সম্ভব হবে না কিন্তু যথেষ্ঠ পরিমানে সময় নিয়ে, আবেগের স্থানটুকু, মোহের কারনগুলি নিঃশেষ হতে দিন, তারপর নির্যাস টুকু বুঝার চেষ্টা করুন। হয়তো কিছুটা হলেও আচ করা সম্ভব। কেননা, উপরের যে তিনটা কারনের কথা বলছি, সেটা যে আপনার জীবনেও ঘটবে না, তা আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। হতে পারে, আপনার থেকেও তার মতে উত্তম আরো কেউ চলে আসবে এই সম্পর্কের ভিতর যেখানে আপনি তার কাছে, তার মোহের কাছে, তার লোভের কাছে, তার ভাবনার কাছে কিছুই না। হয়তো বা নতুন মানুষটি তাকে আবারো কোনো এক নতুন সপ্ন দিয়ে হাতছানী দিচ্ছে। হতে পারে আপনার কাছ থেকে যতটুকু সে আশা করেছিলো তার হয় প্রাপ্তি শেষ অথবা আর কিছু পাবার সম্ভাবনা নাই বা হতে পারে সেই পুরানো অভ্যাস, অবহেলা, কুরুচী ইত্যাদি আবার তার মধ্যে জাগ্রত হয়েছে যা আপনি কখনো ভাবেনই নাই।

এটা শুধু মানুষের বেলাতেই ঘটে। এরুপ ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে করতে মানুষ এক সময় এতোটাই অভিজ্ঞ হয়ে উঠে যে, তখন কাউকে শুধু উপদেশ দেয়া ছাড়া নিজের জন্য আর কোনো কিছুই করার থাকে না। মানুষ আবারো একাই হয়ে যায়।

মানুষ সবসময় একাই ছিলো। পারিপার্শিক দায়বদ্ধতার কারনে, নিজেদের একা থাকার বিপদজনক পরিস্থিতি থেকে রক্ষার কারনে আর কিছুটা মোহের কারনেই মানুষ দলবদ্ধ হয়, সংসারী হয়। পৃথিবীতে হাজার হাজার উদাহরন আছে যেখানে মানুষ লোকারন্যে থেকেও একাই জীবন যাপন করেছে এবং করছে। এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় এর সংখ্যা ধীরে ধীরে আরো বেড়ে যাবে, কেউ কারোই থাকবে না তখন।

২৬/০৭/২০২৩-ফেসবুক একটা বিনোদনের জায়গা

ফেসবুক একটা শুধু বিনোদনের জায়গায়ই নয়, এখানে অনেক মানুষকে ব্যবসা না করেও ব্যবসায়িক নিটিগিটি না বুঝেও অনেক দারুন দারুন ব্যবসায়িক তত্ত্ব দিতে দেখি, অনেক ইন্টেলেকচুয়াল রাজনীতির মারপ্যাচ না বুঝেও বেশ ধারালো বক্তব্য দিতে দেখি, ফরেন পলিসির সাথে দেশীয় পলিসির যোগ সুত্র না বুঝেও বেশ এমন এমন যুক্তি দেন যেনো ওনাদেরকে যদি বলি একটা পলিসি দেন, তখন আবার দিতে নারাজ। যদি ব্যবসা করতে বলি, সেটাও করতে নারাজ, যদি রাজনীতিতে এসে হাল ধরতে বলি, সেখানেও নারাজ।

রিজার্ভ কি, এলসি কি, ব্যাক টু ব্যাক কি, অফসোর ব্যাংকিং কি, ইউপাস এলসি, এপিআর, এপিওয়াই, ক্রেডিট রেটিং কেনো কিভাবে করা হয়, জিএসপি কি ইত্যাদি যদি জিজ্ঞেস করি, কেমন জানি এড়িয়ে যান। খুব সহজ কিছু যদি জিজ্ঞেস করি যে, প্রাইম রেট, ফিক্সড রেট, পিরিয়ডিক রেট, ইন্টারেষ্ট রেট, ইন্ডেক্সড রেট এদের মধ্যে তফাত কি কিংবা  মুলস্ফিতি কি, কেনো হয়, ইম্পোর্টে ফরেন কারেন্সীর ভূমিকা কি, এক্সপোর্টে ব্যবসায়ীদের কি করনীয় কিংবা ইম্পোর্টারের সাথে এক্সপোর্টারের এলসির মধ্যে কি ধরনের ইফেক্ট করে ফরেন কারেন্সী, যখন এগুলি নিয়ে একটু আলাপ করতে চাই, তখন জানি কেমন কেমন করে।

কাউকে অসম্মান করছি না, যে কোনো বিশয়ে একটু জ্ঞান আহরন করে যদি কেউ এতোটুকু পার্টিসিপেট করতে পারেন, তাহলে অনেক মন্তব্য পড়েও আমরা কিছু শিখতে পারতাম। অবশ্য এগুলিও বিনোদন। আমি সেভাবেই নেই। ওনারা না থাকলে ফেসবুক এতো আনন্দময় হতো না।

২৪/০৭/২০২৩-পৃথিবীটা শুধু মানুষের না

মানুষ সম্ভবত তার বিলুপ্তির সীমায় পদার্পন করেছে ইতিমধ্যে। ভয়ংকর কথা বলে মনে হলেও এটা প্রাকৃতিক নিয়মের একটা চলমান অংশ। এর আগেও এই বিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছে, আর সেটা একাবার নয়, পরপর পাচবার।

বিজ্ঞানীরা বলেন আমাদের এই পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চার বিলিয়নের মতো। এই সাড়ে চার বিলিয়ন বছরে পৃথিবীর প্রায় ৭৫% প্রানী সমুহের বিলুপ্ত হয়েছে বেশ কয়েকবার যাকে বলা হয় “মাস এক্সিঙ্কশন”। মাস এক্সিঙ্কশন তাকেই বলে যখন কোনো স্থান থেকে ৭৫% প্রজাতী (গাছপালা, জীবজন্তু, কিংবা অদৃশ্য কোনো প্রানীসকলসহ অনেক অনুজীব) মাস এক্সিঙ্কশন হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে। যার মধ্যে রয়েছে ডাইনোসর এবং আরো অনেক প্রানী।

এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার যে, ন্যাচারাল প্রক্রিয়ায় সমস্ত জীবজন্তু, গাছপালা, জীবানু, অনুজীব সবাই একটা জীবন মরনের মধ্যে থাকে। কিছু বিলুপ্ত হয়, আবার কিছু নতুন জন্ম হয়। এভাবেই ন্যাচারাল ব্যালেন্স হয়। কিন্তু গত ৪০/৫০ বছর যাবত এই বিলুপ্তির ঘাটতি যেমন ম্যামাল, ব্যাক্টেরিয়া, প্ল্যান্টস, অনুজীব ইত্যাদি ন্যাচারাল প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না, হচ্ছে আর্টিফিশিয়ালভাবে, আর সেটা হচ্ছে প্রায় দশ হাজার গুন গতিতে।

তাহলে এর কারন কি?

এর একটাই কারন। মানুষ।

মানুষ মনে করে এই পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য, অন্য কারো জন্যে নয়। কিন্তু এটা শতভাগ ভুল। পৃথিবীর মাটির গভীরে যে ব্যাক্টেরিয়া আছে তার থেকে শুরু করে আকাশে যারা ভেসে বেড়ায়, সমুদ্রের তলদেশে যেসব নাম না জানা প্রানীকুল অনুজীব ইত্যাদি আছে, সবার জন্য এই পৃথিবী। কিন্তু মানুষ সেটা ভাবে না। ফলে এই মুহুর্তে মানুষ একা পৃথিবীর ৭০% ল্যান্ড এবং ব্যবহারযোগ্য পানী ব্যবহার করছে। বাকী ৩০% ল্যান্ড আর ৩০% ফ্রেস পানি বাকী যতো গাছপালা, উদ্ভিদ, অন্যান্য প্রানীসকলসহ ব্যাক্টেরিয়া, জীবানু, নাম না জানা প্রানীদের জন্য রয়েছে যা নিতান্ততই অপ্রতুল।

আর এই ঘটনাটা ঘটতে শুরু করেছে ১৯৭০ সালের পর থেকে। ১৯৭০ সাল কেনো বলছি? কারন

১৯৭০ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে যে, আমাদের পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা ছিলো প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন। ফলে এই সাড়ে তিন বিলিয়ন মানুষের জন্য যে বসবাস যোগ্য ল্যান্ড এবং ফ্রেস পানি দরকার ছিলো তা ১৯৭০ সালেই তার কোটা পরিপুর্ন হয়ে যায়। ফলে ১৯৭০ সালের পর যে হারে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে তাতে ইউজেবল ল্যান্ড এবং ফ্রেস পানির দখলও মানুষের বেড়েছে, বেড়েছে আর্বানাইজেশন, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেন ইত্যাদি। অর্থাৎ অন্যান্য প্রানী, জীববজন্তু, গাছপালা এদের জন্য পর্যাপ্ত ল্যান্ড বা ফ্রেস পানির ভাগ কমে যাচ্ছে এবং গেছে। এই পপুলেশন বোম্ব এখন ধীরে ধীরে আরো বেড়েই চলছে বিধায় মানুষ ছাড়া অন্যান্য জীবকুলের একটা বিলুপ্তি চোখে ধরা পড়ছে। উদাহরন দেই- 

আগে মানুষ ন্যাচারাল পরিবেশ ভোগ করতো, তাদের বাড়ির পাশে গাছপালা থাকতো, সেই গাছপালায় অনেক পাখীর বাসা থাকতো, বাড়ির পাশে ঝোপ জংগলে হয়তো পিপড়া, সাপ, কিংবা মাটির নীচে অনেক কেচো, শামুক, জীবানু ব্যাক্টেরিয়া, আরো ইত্যাদির থাকার ব্যাপারটা চোখে পড়ত যা এখন কংক্রিটের কারনে, মানুষের আর্বানাইজেশনের কারনে, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের কারনে ধীরে ধীরে এসব জীবজন্তুর আর থাকার  কোনো জায়গা রইলো না। বাড়ির পাশে হয়তো ১০০ গজ দূরে যে সাপটা বাস করতো তার আর কোথাও থাকার জায়গা নাই, বংশবৃদ্ধির কোনো উপায় নাই, পাখীরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে এক সময় তারাও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, অনেক প্রজাতীকে এখন আর চোখেও দেখা যায় না। অনেক জলজ মাছের এখন শুধু নাম পাওয়া যায়, বাস্তবে তারা প্রায় উধাও হয়ে গেছে।

১৯৭০ সালে যেখানে মানুষ ছিলো সাড়ে তিন বিলিয়ন, এখন সেটা দাড়িয়েছে আট বিলিয়নে। অর্থাৎ প্রায় তিনগুন। হাজার হাজার বছরে যতোটা না এই বৃদ্ধির হার বেড়েছিলো, সেটা এই ১৯৭০ এর পর থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক গুন বেশী, প্রায় দশ হাজার গুনের থেকেও বেশী। এর ফলে যেমন বনের অনেক প্রকারের ভাল্লুক, সমুদ্রের স্যালমন ফিস, কিংবা ছোট ছোট প্রজাতী, বনের বহু প্রজাতীর গাছপালা এখন আর চোখে পড়ে না। তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুধুমাত্র একটা অঞ্চলের কথা বলি-ল্যাটিন আমেরিকার এমাজন ফরেষ্ট যাকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয়, সেখানে এখন ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের কারনে হাজার হাজার বনাঞ্চল, নদীপথ সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাহলে এই অঞ্চলের প্রজাতিগুলি গেলো কই? জলজ প্রানীগুলি গেলো কই? সেটা এখন আর ফুসফুস হিসাবে কাজ করছে না।

সমদ্রের কথা যদি বলি-দেখবেন পৃথিবীর ডাম্পিং এরিয়া এখন সমুদ্র। এই ডাম্পিং এর কারনে সেখানকার জলজ প্রানীদেরকে আমরা প্রায় গলা টীপে মেরে ফেলছি, তাদের বাসস্থানকে এতোটাই অসহনীয় করে ফেলছি যে, তাদের নিজেরা যেমন বেচে থাকতে পারছে না, নতুন প্রজন্মও আর জন্ম নিচ্ছে না। আগে যেখানে এক লক্ষ জলজ প্রানী নতুন প্রজন্ম এর জন্ম দিতো সেখানে হয়তো এখন দশ হাজার জলজ প্রানীর বসবাস এবং তাদের দ্বারা জন্মদানের প্রজন্মও কমে যাচ্ছে সেই একই হারে। আর এই নতুন প্রজন্মও আবার খুব দ্রুত পরিবেশ বিপর্য্যের কারনে আরেক প্রজন্ম দেয়ার আগেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এবং এক সময় সবাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

অথচ পৃথিবীটা ওদেরও। শুধু মানুষের জন্য এই পৃথিবীটা না। এই পৃথিবী অনুজীব থেকে শুরু করে সমস্ত জীব জন্তু, গাছ পালা, সবার। খুব বেশী সময় দূরে নয় যেখানে আমরা সবাই আমাদের কারনেই বিলুপ্ত হবো যাকে আমরা মাস এক্সিঙ্কশন বলছি।

০২/০৭/২০২৩-ব্যবসা পরবর্তী অবসর গ্রহনের পরিকল্পনা  

ধরি, আমি অন্যান্য সরকারী চাকুরীজীবিদের মতো অবসর গ্রহনের একটা পরিকল্পনায় যাই।

আমি সরকারী চাকুরীর আর্মির জীবন থেকে ২০০৫ সালে নিজের ইচ্ছায় অবসর গ্রহন করি আর সেই থেকে আমি গার্মেন্টস ব্যবসায় জড়িত। যদি অবসর গ্রহন না করতাম, তাহলে স্বাভাবিক নিয়মে আমি প্রায় ২০১৪ সালে বর্তমান পদবীতেই অর্থাৎ মেজর পদবীতেই অবসরে যেতে হতো। অর্থাৎ আজ থেকে আরো প্রায় ১০ বছর আগে। আর যদি প্রোমোশন পেতে থাকতাম, তাহলে আমার বেশ কিছু বন্ধু যেমন জেনারেল হুমায়ুন, জেনারেল মতি, জেনারেল শাহেদ, জেনারেল মাকসুদ, জেনারেল ইমদাদুল বারী, কিংবা জেনারেল আকবরের মতো আমাকে এই ২০২৩ বা ২০২৪ সালেই অবসর গ্রহন করতেই হতো। ঠিক এই সময়ে হয়তো আমি মাসে বেতন পেতাম ২ লাখ টাকা আর পেনশন পেতাম হয়তো ২ কোটি টাকা। এরপর এই সম্বল নিয়েই আমাকে বেসামরিক জীবনে পদার্পন করতে হতো। এর মাঝে হয়তো আমি একটা গাড়ির মালিক হতাম। সরকারী প্লট পেতাম। আমার বাড়ি থাকতো না।

আজ ঠিক এই সময়ে আমি যদি আমার বর্তমান অবস্থা দেখি, তাহলে দেখবো যে, আমি বর্তমানে মাসিক বেতন নেই সাড়ে তিন লাখ টাকা। আমার নিজের একটা ছয় তালা বাড়ি আছে, আমার ৩ টা গাড়ি আছে, দুইটা সাভার ডিওএইচএস এ তে ফ্ল্যাট আছে, আমার প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটা গার্মেন্টস আছে যার মধ্যে আমার মালিকানা ৩৫%, আমার চান্দের চরে ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ বিঘার মতো জমি হয়েছে, পলাশপুরে আমার যে জমিগুলি আছে সেটা বিক্রি করলে পাবো প্রায় ৪ কোটি টাকা, আমার এফডিআর আছে আরো ৩ কোটি টাকার। অর্থাৎ সবকিছু মিলিয়ে যদি ক্যাশ হিসাব করি তাহলে হয়তো এর ভ্যালু দাঁড়াবে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তাহলে আমি কি এটা বলতে পারি না যে, আমার আর্লি রিটায়রম্যান্ট ভালো ছিলো? আর ঠিক যদি এই সময়ে আমি আমার বর্তমান পেশা ব্যবসা থেকে শতভাগ অবসর গ্রহন করতে চাই, তাহলে দেখা যাবে আমি সরাসরি বাড়ি বাদ দিয়ে, গাড়ি বাদ দিয়ে আমি ক্যাশ ইনভেষ্টমেন্ট করতে পারি এফডিআর হিসাবে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। যদি সবচেয়ে খারাপ ইভালুয়েশন করেও মাপি তাহলে অন্তত ক্যাশ ১৫ কোটি টাকা ব্যাংকে রাখতে পারি। আমি হিসাব করে দেখেছি যে, যদি এই টাকাগুলি আমি ব্যাংকে এফডিআর করেও রাখি, তাহলে কমপক্ষে মাসে ১০ লাখ টাকা আমার আয় আসবে। কোনো কাজ করা ছাড়া, কোনো প্যারা নেয়া ছাড়া আমি প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকা আয় করতে পারি। আমার জীবদ্ধশায় আসলে এটা অনেক টাকা আয়।

তাই আমি খুব সিরিয়াসলী ভাবছি যে, বয়স থাকতে থাকতে আমি আবারো অবসর নেবো। ঠিক তার আগে আমাকে কয়েকটা কাজ করে ফেলতে হবে। এদের মধ্যে অরুকে সাবলম্বি করে দেয়া অর্থাৎ ওর জন্যে অন্তত ১ কোটি টাকা ছেড়ে দেয়া। অতঃপর যেখানে যেখানে আমার জমি জমাগুলি অগোছালো অবস্থায় আছে সেগুলিকে সম্পুর্নভাবে গুছিয়ে বিক্রি করে দেয়া। আমার পরকালের জন্য কমপক্ষে এক কোটি টাকার একটা ওয়াকফ করা।

এই কতগুলি কাজ করতে আমার যতোটুকু সময় লাগবে, সেই সময়টুকু নিয়ে অতঃপর রিটায়ারমেন্ট করা। ঘুরবো, দেশ ঘুরবো, বন্ধুদের বাসায় বাসায় গিয়ে সময় কাটাবো। হজ্জ করবো বারবার, ওমরায় যাবো বারবার। যদি অবসর সময়টা কাটতে না চায়, তাহলে জমিজমা বিক্রির অথবা ডেভেলপারের কাজে লিপ্ত হবো খুবই লিমিটেড স্কেলে। আর সেগুলি হবে শুধু ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় যেখানে বাইরের কোনো লোক ঝামেলা করতে না পারে। এতে হয়তো আমাকে ২ কোটি টাকার পুজি নিয়ে নামতে হবে। আমার ধারনা, সম্ভব।

০১/০৭/২০২৩-হাতে খুব সেকেন্ড জমা নাই

এই তো গত ২৯ জুন ২০২৩ তারিখে কুরবানীর ঈদ চলে গেলো। ছুটির দিনে আমি বাসাতেই থাকি, কোথাও ঘুরতে যাওয়া ভালো লাগে না। বাসায় আমার স্ত্রী তার নিজের পছন্দের মতো কাজ করে, শপিং করে, বাইরে যায়, আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করে, বেশ ভালোই তার সময় কাটে। আমারও সময় কাটে আমার মতো করে। ছোট মেয়ে আমেরিকায় থাকে, সেও ভালো আছে, বড় মেয়ে ডাক্তারী করে, সে ভালো নাই। বড় মেয়ে তার নিজের কারনেই ভালো নাই। তার মধ্যে বাস্তব জ্ঞান অনেক কম, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে সারাক্ষন, আমাদের ভালো সাজেশনের থেকে সে তার পচা কিছু বন্ধু বান্ধবদের কথা বেশী শুনে বিধায় একটা সেটব্যাক থেকে বের হতে না হতেই আরেকটা তার থেকেও খারাপ সিচুয়েশনে পা দিয়েছে যা আমাদের সাথে কোনোভাবেই যায় না। মানে সে একটা বিবাহিত ছেলের সাথে পরকীয়া করছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই বিবাহীত স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করেছে শুধুমাত্র ছেলেটা বড় মেয়ের সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে। ছেলেটা লোভী, মাছের পোনার ব্যবসা করে, তাও আবার সিজনাল। লেখাপড়া না জানা পরিবার, ছেলেটা শুধু প্রাইভেট মেডিক্যাল থেকে পাশ করা ডাক্তার। আমাদের পছন্দ না এবং আমাদের সাফ উত্তর-আমরা এখানে নেই। কিন্তু বড় মেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। হয়তো চেষ্টাও করছে না। আমাদের সাথে কথা বলা প্রায় বন্ধ।

আমি আমার জীবনের অনেক হিসাব কিতাব করছি প্রতিদিন। প্রায় ৬০ বছর বয়স তো হয়েই যাচ্ছে। এর বয়সের অনেক চেনা পরিজন না ফেরার দেশে চলে গেছে, কেউ যাচ্ছে এবং কেউ কেউ অপেক্ষায় আছে কবে তার শেষদিন চলে আসবে। কেউ উদাসীন ভাবে এখনো মনে করছে, অনেক বছর হয়তো বাকী আছে জীবনের, কেউ কেউ আবার এগুলি ভাবার প্রয়োজন ও মনে করে না কারন এর উপরে কারো হাত নাই। আবার কেউ কেউ এমনো ভাবছে, কিছুই তো করা হলো না নিজের জন্য, পরিবারের জন্য কিংবা বাচ্চা কাচ্চাদের জন্য, তাহলে এখন কি করা?

এসবই নিয়ে সমাজে মানুষের জীবন। কেউ পেয়ে হতাশ, কেউ না পেয়ে হতাশ, কেউ আবার পেতে পেতে আরো না পাওয়ার জন্য আপ্রান চেষ্টায় আরো বেশী হতাশ। কেউ যেনো সুখী নয়। কোনো মানুষ আজ পর্যন্ত শতভাগ সুখী কিংবা খুশী নিয়ে মৃত্যু বরন করে নাই। কেউ তাদের চাহিদা পুরন হয়েছে এটা মনে করে আর কোনো কিছুই প্রয়োজন নাই এটা ভেবে তাদের প্রতিদিনের আফসোস থেকে বিরত হয় নাই। আর এই ট্রেন্ড আদিকাল থেকে শুরু হয়েছে, কিয়ামতের শেষদিন অবধি এই আফসোস মানুষের থেকেই যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, দেখা যাবে সেও তার সম্পদের উপর খুশী নয়, সে আরো চায়। হিসাব করে যদি দেখা যায় যে, তার জীবদ্ধসায় সে যা কামিয়েছে, সেই সব প্রতিদিন খরচ করলেও তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সম্পদে বা টাকা পয়সার কমতি হবে না, তারপরেও তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুসচিন্তাগ্রস্থ। সম্ভবত এটাই মানুষের বেসিক ইন্সটিংক্ট। কেউ সুখী না।

কতদিন বাচবো আমরা?

খুব বেশী হলে ৮০ কিংবা ১০০ বছর? কারো কারো ৬০ (যা আমার প্রায় সমাগত), কারো কারো ৭০, কিংবা ৭৫ অথবা বেশীজোর ৮০। যদি মিনিট সেকেন্ডের হিসাব করি, প্রতিটা সেকেন্ড পার হওয়া মানে প্রতিটি সেকেন্ড জীবন থেকে শেষ হয়ে যাওয়া। নতুন করে এক সেকেন্ড যোগ করার কোনো যন্ত্র, বা সিস্টেম তৈরী হয় নাই। এটা ফিক্সড। আর প্রতিটি সেকেন্ড পার হয়ে যাওয়া মানে আমরা সবাই জীবনের ফিনিশিং লাইনের কাছাকাছি অগ্রসর হওয়া অথবা মৃত্যুর স্টার্টিং লাইনে পদার্পন করা। একটা সময় আসবে যখন সব সেকেন্ড শেষ হয়ে যাবে এবং আমরা আমাদের এই জীবনের যাত্রাপথ শেষ করে দেবো। কতটুকু আহরন করেছিলাম, কতটুকু রেখে গেলাম, কে আমার সেই আহরীত সম্পদ কিভাবে ভোগ করবে, কতজন প্রিয় মানুষ আমাদের জীবনে ছিলো কিংবা কতজনকে আমরা ঘেন্না করেছি, কে আমার শত্রু ছিলো, কে আমার মিত্র ছিলো, বা কাকে আমি প্রাধান্য দিয়েছি আর কাকে ঠকিয়েছি, এর সব কিছুর হিসাব সেদিন জমে থাকা সেকেন্ডের মান শুন্য হলে আর কোনো কিছুই আমার জন্য প্রযোজ্য নয়।  

হাজার বছর বাচতে পারলে না হয় হাতে থাকা সেকেন্ডকে অপচয় করার বদান্যতা থাকতো। সেটা তো আর নাই। তাহলে এতো অল্প সংখ্যক সেকেন্ডের ঝুড়ি নিয়ে মন খারাপ, মনে কষ্ট, কিংবা পচা ব্যাপার স্যাপের গুলিতে সময় নষ্ট করার কোনো সময় কি আসলেই আমাদের আছে? আর ঠিক এই কারনে আমি মাঝে মাঝে যেটা ভাবি-

সময় দিন সেসব ব্যাপারগুলিতে যেখানে আপনি সুখী থাকেন। সময় ব্যয় করুন সেসব কাজে যেখানে আপনার মন প্রফুল্ল থাকে। জানি একা চলতে পারা যায় না, তাই পরিবার, বন্ধু বান্ধবের জন্ম। যদি মনে হয় এগুলি আপনাকে উতফুল্ল রাখে, সেখানে সময় দিন। সবাই আপনাকে হয়তো বরন করে নেবে না, তাহলে সেগুলি ভুলে যান। প্রয়োজন নাই সেসব যেসব আপনাকে হতাশ করে। জীবন একটাই। অন্যের সুখী হাস্যমুখ দেখে আপনি এটা ভাববেন না যে, সে হয়তো অনেক খুসিতে আছে। তাদের মতো করে চল্বার আপনার কোনো প্রয়োজন নাই।

কেউ যদি আপনার পাশে না থাকে কিংবা যারা পাশে থাকার কথা তারা যদি আপনার কষ্টের কারন হয়ে থাকে, ভুলে যান তাদের। যেহেতু আপনার খাওয়া, থাকার কিংবা চিকিৎসার অর্থের অভাব নাই, ফলে দিনভরে আকাশ দেখুন, বৈ পড়ুন, টিভি দেখুন, ভোর বেলা সকালে শিশির ভেজা রাস্তায় ফসলের ক্ষেত দেখুন, বিকালে আকাশ দেখুন, মেঘলা বৃষ্টির বাতাস উপভোগ করুন, নদীর ঘাটে বসে নোউকার পাল তোলা মাঝির ভাটিয়ালী গান শুনুন, রাখালের কন্ঠ শুনুন, ভরা পুর্নিমাতে কিংবা পুর্ন অমাবশ্যায় তীব্র জোয়ারে ফুলে উঠা সাগরকে দেখুন, বেরিয়ে যান কোথাও একা কিংবা কাজের কোনো মানুষকে নিয়ে। যদি সাথী সেটা যেইই হোক, হোক স্ত্রী বা পরিবারের কেউ, সে যদি আপনার এই কন্সেপ্টে বিশ্বাস করে, তাকে নিয়ে বেরিয়ে যান। অবুঝ পশু, কুকুর, বিড়ালের সাথে সময় কাটান, যদি পারেন, অবুঝ শিশুর সাথে অনেক অনেক সময় কাটান। তাদের নিষ্পাপ মুখের হাসি আপনাকে উতফুল্ল করবে।

আর এসবের মাঝে কখনোই আপনার স্রষ্টাকে ভুলে যাবেন না। কারন সবশেষে আপনাকে তার কাছেই যেতে হবে। আপনি আস্তিক বা নাস্তিক যাইই হন না কেনো, সবশেষে কেউ না কেউ তো আপনার সমস্ত কাজের জবাব্দিহিতা করবে। যদি কোনো স্রষ্টা না থেকে থাকে, তাহলে তো বেচেই গেলেন, জীবন শেষ তো কোনো কৈফিয়ত নাই, কিন্তু যদি থেকে থাকে? আর সেই “যদি” ই আপনাকে আপনার এই জীবনের সব কৃতকর্মের জবাব্দিহিতায় আকড়ে ধরবে। তাই অপশন খোলা রাখুন, স্রষ্টাকে আপনার প্রাত্যাহিক সময়ে রাখুন। মন ভালো থাকবে, প্রশান্তিতে থাকবে।

আজ থেকে ১০০ বছর আগের যেমন কাউকে আপনি চিনেন না, নামও জানেন না, তাদের ব্যাপারে যেমন আপনার কোনো জানার আগ্রহও নাই, তেমনি আজ থেকে শতবছর পরে আপনার ব্যাপারেও কেউ জানার আগ্রহ প্রকাশ করবে না, আপনার নামও জানবে না। তাই সেই শত কিংবা সহস্র বছর পরে যদি সত্যিই কিছু আবার এই পৃথিবী থেকে পেতে চান, তাহলে দুহাতে দান করুন।

পৃথিবী সত্যিই সুন্দর যদি আপনি মনে করেন এটা সুন্দর। সমাজের কে কি ভাবলো, সন্তানদের মধ্যে কে আপনাকে কতটুকু মুল্যায়ন করলো, সেটা নিয়ে ভাবার কোনো সুযোগ নাই। পৃথিবীর শুরু থেকেই সমস্ত বাবা মায়েরা তাদের সন্তানের জন্য আপ্রান সব কিছু করে গেলেও সেইসব সন্তানেরা খুব অল্প সংখ্যক সন্তানেরাই তাদের বাবা মায়ের প্রতি ন্যায় বিচার করেছে।

তাই, নিজে আনন্দ করুন, নিজে পৃথিবীর সব কিছু আপনার সাধ্যের মধ্যে ভোগ করুন। হাতে খুব একটা সেকেন্ড জমা নাই।

২১/০৬/২০২৩-কোকোকে ছেড়ে দিতে হবে

অনেক শখ করে একটা জার্মান শেফার্ড এনেছিলাম। ওর বয়স যখন ৩ মাস, তখন থেকে কোকো আমার বাসায়। বাচ্চা বয়সে যা খেতে দিয়েছি, সেটাই খেয়েছে, বিশেষ করে নরম ভাত আর মুরগীর মাংশ। সাথে পেট ফুডস থাকতো, একটু দই দিলে মনে হতো অমৃত খাচ্ছে। নাক ডুবিয়ে খেতো।

মিটুলের কারনে বাসায় কোকোর প্রবেশ নিষেধ, তাই ওকে আমার মতো করে কোনো ট্রেনিংই  দিতে পারিনি। কেয়ারটেকার শাহনুরের কাছেই সারাক্ষন থাকে, ফলে আমার থেকে শাহনুরের প্রতিই ওর আনুগত্য বেশী। কিন্তু যখনই অফিসে যাই কিংবা অফিস থেকে আসি, উচ্ছল ঢেউয়ের মতো আমার গাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে করতে অপেক্ষা করে কখন আমি গাড়ি থেকে বের হবো। যেই না গাড়ি থেকে বের হয়েছি, মনে হয় ছোট বাচ্চার মতো আমার কোলে, পিঠে আছড়ে পড়ে। কি শার্ট পড়েছি, কি জামা পড়েছি সেটা তো ওর কাছে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, ওরা কাপড় নোংরা করে বটে কিন্তু আনুগত্যের চরম শিখরে ওদের ভালোবাসা। যারা কুকুর পালে না, তারা হয়তো বুঝবেই না কুকুরের আনুগত্য কি জিনিষ। কোকোকে খাওয়ানোর জন্য আমার কোনো বাজেট নাই। তারপরেও ওর পিছনে মাসে প্রায় হাজার দশেক খরচ তো পরেই।

তাহলে কোকোকে কেনো ছাড়তে হচ্ছে?

মাঝে মাঝে কোকো এখন সব খাবার খেতে চায় না, মাংশ দিলেও খেতে চায় না, মুরগী কিংবা গরুর গোস্ত যেনো তার এখন আর ভালো লাগে না। নরম ভাত, কিংবা পেট ফুডস। একেবারেই খেতে চায় না। আবার সব খাবার খায়ও না। ফলে আমার চিন্তা হয় প্রানীটাকে কোনো কষ্ট দিছি কিনা। ওরা কথা বলতে পারেনা, কিন্তু ক্ষুধার সময় অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে যেনো কি বলতে চায়। প্রচুর দৌড়াতে পারে, কিন্তু আমার সময় হয় না কোকোকে নিয়ে বের হবার। হয়তো এটাও একটা ব্যাপার ওর না খাওয়ার পিছনে।

ওর এই না খাওয়ার কারনে ইদানিং কোকো একটু কাহিল হয়ে গেছে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। কোনো অসুবিধা পান নাই। তারপরেও কয়েকটা ভিটামিন দিয়েছে। খাইয়েছি। কিন্তু খুব একটা লাভ হয় নাই। খাবারের প্রতি ওর অরুচিটা রয়েই গেছে মনে হয়। তাই ওর অসুবিধার কথা চিন্তা করে আমার বন্ধু মহলে, ফেসবুকে একটা সংবাদ দিয়েছি যে, কোকোকে যারা নিজের হাতে আদর করে সময় দিয়ে ভালোভাবে রাখতে পারবে, আমি তাদেরকে দত্তক দিয়ে দেবো। অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে, অনেকেই পারেনা আজই নিয়ে যায় এমন। কিন্তু আমি জানি জার্মান শেফার্ড পালা খুব সহজ কাজ না। তারপরেও হয়তো অনেকে পালতেও পারেন। যাকেই দেবো, তার বাড়িঘর, আর্থিক সামর্থ দেখেই আমি কোকোকে দত্তক দেবো এটা সিউর। আর যদি দেখি, ওর আরো কষ্ট হবে, তাহলে হয়তো দেবোই না। অন্তত আমি তো ওকে কিছুটা হলেও সময় দিতে পারবো।

আমি কিংবা মিটুল যখন আমাদের ঘরে ক্যাচিগেট খুলি আর যদি কোকো গ্যারেজে ছাড়া থাকে, দুই লাফে গ্যারেজ থেকে আমাদের ঘরের দরজার সামনে এসে হাজির। কিংবা কাউকে আমি বা মিটুল নাম ধরে জোরে ডাকতে গেলে কোকো আমাদের কণ্ঠস্বর চিনে, যদি ছাড়া থাকে এসে যাবে, আর যদি ওর ঘরে বন্দি থাকে, উচ্চস্বরে ডাকাডাকি শুরু করবে।

আমি জানি যদি কোকোকে দিয়েই দিতে হয়, কোকো হয়তো অন্য মালিকের অধীনে গিয়ে আমাদের মিস করবে। হয়তো খুজবে আমাকে সেই হাচির মতো যে কিনা তার মনিবের জন্য গোটা ১০ বছর জাপানের সেই রেলওয়ের প্লাটফর্মে অপেক্ষা করেছে কখন তার মনিব আবার ফিরে আসবে। অবশেষে হাচি ১০ বছর পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জাপান সরকার সেই হাচির স্মরণে তাকে সম্মান জানিয়ে সেই প্লাটফর্মেই একটা মনুমেন্ট তৈরী করেছে। হাচি নাই, কিন্তু আছে সবার মাঝে। এটাই কুকুর ভক্তি।

আমি নিশ্চিত দিয়ে বলতে পারি, একদিন কোকো নিজেও আমাকে মিস করবে। আমি তো মিস করবোই। এখন যে স্ত্রী কোকোকে রাখতে দিলো না, এক সময় হয়তো সেইই কোকোর মতো একটা জারমান শেফার্ড থাকলে হয়তো ভালো হতো এর অভাব সে বুঝবে। পরিবারে আমি অশান্তি চাই না, তাই কোকোকে ছেড়ে দিলাম। বা দিচ্ছি।

কোকো ভালো থাকুক আমি চাই, কিন্তু সে কতটা ভালো থাকবে সেটা আমি জানি না। কোকো আমার বাগান মিস করবে, কোকো তার ঘর মিস করবে, কোকো তার পরিচিত পরিবেশ মিস করবে। কোকো শাহ্নুরকে মিস করবে। কোকো হয়তো জানেই না যে, তাকে আমি ছেড়ে দিচ্ছি।

একটা সন্তান ছেড়ে দেয়ার মতো একটা কষ্ট।   

২১/০৫/২০২৩-পরিবার

কোনো মতবাদ কিংবা প্রচলিত প্রবাদের বাইরে গিয়েই বলছি- দেশের থেকে সম্ভবত সমাজ বড়, সমাজের থেকে পরিবার আর পরিবারের থেকে বড় নিজে। এটাই সত্য। যখন একাই এসেছি এই দুনিয়ায় তখন আমি দেশ নিয়ে আসিনি, আমি সমাজ নিয়ে আসিনি, না আমি পরিবার সাথে করে নিয়ে এসেছি। আমি সম্পুর্ন একা এবং কোনো কিছু ছাড়াই এই দুনিয়ায় এসেছি। এই দুনিয়ায় এসে আমি যা পেয়েছি- তা হলো, দেশ, সমাজ আর পরিবার। এটা সম্ভবত শুধু মানুষের বেলায়ই প্রযোজ্য।

তাকিয়ে দেখুন একটা বন্য প্রানীর দিকে। তার সমাজ থাকলেও সে সেই সমাজের কোনো আইনের মধ্যে নিবন্দিত নয়। যখন তার যা খুশী সেদিকেই তার বিচরন। ক্ষুধায় তাকে অন্য কোনো প্রানী খাদ্য জোগায় না, শীতে অন্য কোনো প্রানী তাকে গরমে আচ্ছাদিত করে না। সে মরে গেলেও কেউ আফসোস করে না। কিছু কিছু প্রানী হয়তো দল বেধে চলে বটে কিন্তু সেই দলের জন্য কেউ কোনো দায়িত্ত নিয়ে এটা করে না যে, সবাইকে বাচিয়ে নিজে বাচবো। তারা সবাই যার যার জীবন নিয়ে দলবদ্ধভাবে একাই চলে। তারা এটা করতে পারে কারন, তাদের চাহিদা শুধু খেয়ে বেচে থাকার। ওদের পেট ভরে গেলে অতিরিক্ত আর কিছুই সঞ্চয়ের চিন্তা থাকে না, তারা অট্টালিকা, গাড়ি বাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কিছুই রেখে যায় না। এ জন্যই ওরা সর্বদা সুখী। ওরা কারো আক্রমন মনে রাখে না, কাউকে আক্রমন করলেও সেটা নিয়ে আর ভাবে না। ব্যাপারটা সেখানেই মিটে যায় যেখানে শুরু এবং শেষ হয়েছিলো।

আমরা প্রত্যেকেই একা, আর এই একাকীত্ব আমরা বুঝতে পারি বয়সের ভাড়ে যখন আমরা নেতিয়ে যাই। সারাজীবন পরিবারের জন্য আমরন কষ্ট করেও আমরা সেই মানুষ গুলির নাগাল পাই না যাদের জন্য আমরা আমাদের সব সুখ জলাঞ্জলী দিয়ে ভেবেছিলাম-“একদিন আমি সুখী হবো”/ একদিন আমি সুখী হবো-এই মিথ মানুষের জীবনে কখনোই আসে না। আসবেও না। তাহলে কেনো এই মিথ? এটা একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই না।

আমি আজকের দিনের সমাজের কাছে কিংবা পরিবারের কাছে আমার এই মিথ প্রকাশ করা মানে আমি সবার কাছেই একটা নেগেটিভ মাইন্ডেড মানুষের পরিচয় বহন করবো, এটাই এই সমাজের মিথ। কিন্তু একবার ভাবুন তো? আমি সারাজীবন কষ্ট করে আমি একটা সাম্রাজ্য তৈরী করবো, আর সেই সাম্রাজ্যে আমার কিছু পরিবারের সদস্য আমার সমস্ত মিথ ধুলোয় নষ্ট করে দিতে একটু সময় ও কার্পন্য করবে না, তাহলে কেনো আমাকে এই মিথ বিশ্বাস করতে হবে? তাই আমি সব সময় আমার পরিবারের সদস্যদের বলি- আমার মতো করে চলতে না পারলে আমাকে নিয়ে টানাহেচড়া করো না। তোমরা তোমাদের ভাগ্যকে বদলে দাও। আমার ভাগ্যের কোনো কিছুই তোমাদেরকে পাল্টাতে হবে না। না তোমরা আমার ইজ্জতকে বিনা কারনে এতোটুকু নীচে নামিয়ে আনো যেখানে আমি কখনো যেতে চাই না। তোমাদের এই সমাজে আমি যতটুকু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি, আমাকে সেই ততটুকুতেই থাকতে দাও। তোমাদেরকে সাথে নিতে গিয়ে আমাকে যেনো সেই অর্জিত ইজ্জতটুকু আমাকে ক্ষয় করতে না হয় শুধু এটুকু রহম করো। আর যদি সেটাও করতে না পারো- তাহলে তুমি বা তোমরা যেইই হও, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি একা এসেছি, একাই থাকতে অভ্যস্থ হয়েছি।একাই থাকতে পারবো।

২৭/০৪/২০২৩-অসুস্থ্য সমাজ (FB)

বয়স হয়ে গেছে প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। অনেক লম্বা সময়।

সেই শিশুকাল, কিশোর কিংবা যৌবনের সময়টা এখনো যেনো খুব পরিষ্কার মনে পড়ে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে স্কুল মাঠ থেকে ঘর্মাক্ত শরীরে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা, কাধের উপর থরে থরে সাজানো বই নিয়ে স্কুলে যাওয়া, বৈশাখী মেলায় হরেক রকমের বাশি বাজিয়ে বাজিয়ে হই হুল্লুর করা, বৃষ্টির দিনে দুরন্ত কিছু বাল্যবন্ধুকে নিয়ে মাঠে ফুটবল খেলা, স্কুলে শিক্ষকদের পড়া না পাড়ার কারনে শাসিত হওয়া, আরো কত কি!! সবকিছু পরিষ্কার মনে আছে।

এই লম্বা সময়ে পরিবারের অনেকের সাথে, পাড়া পড়শী কিংবা জানা অজানা কত বন্ধুবান্ধবদের সাথে অনেকগুলি সময় কাটিয়েছি, কেউ কেউ এর মধ্যে জীবনের সব লেনদেন শেষ করে একে একে ওপারে চলে গেছে, আর সাথে নতুন জীবন নিয়ে আরো অনেক নতুন মুখ আমাদের সাথে যোগ হয়েছে। আমরা যারা আজো বেচে আছি, তারা সেই চলে যাওয়া মানুষগুলির সাথে আর নতুন মানুষদের যোগ হবার মধ্যে একটা সেতু বন্ধন করে আছি। আমরা সেই চলে যাওয়া মানুষগুলির কথা নতুনদের মাঝে আদান প্রদান করলেও তাদের সময়ের চিত্র আজকের দিনের মানুষগুলিকে শতভাগ বুঝানো হয়তো যায় না। কিন্তু আমাদের স্মৃতির পাতায় সেগুলি এখনো উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে। আমরাও একদিন তাদের মতো চলে যাবো, আর আজকের নতুন যোগ দেয়া মানুষগুলিও সেই একই সেতু বন্ধনের মতো কাজ করে আগত নতুন মুখগুলির সাথে একটা ব্রীজ তৈরী করবে। এভাবে ক্রমাগত একটা সাইকেল চলবে।

এরমধ্যে যুগ পালটে যাচ্ছে, এই যুগের মানুষগুলির সাথে সেই যুগের মানুষগুলির মধ্যে অনেক ফারাক হয়ে গেছে। সন্ধায় এখন আর আড্ডা বসে না, মাঠে আর বড়রা গোল হয়ে বসে তাস খেলে না, ছোট ছোট পোলাপানেরা এখন আর ডাংগুলি খেলে না, মেয়েরা এখন আর দলবেধে কলশী কাখে নিয়ে নদী থেকে ভিজা কাপড়ে জল তুলে আনে না, রাখালেরা এখন আর সেই ভাটিয়ালী গান গেয়ে গেয়ে বাড়ি ফেরে না। এখন সবাই সবাইকে নিয়ে একা একাই সময় কাটাতে পছন্দ করে। ফোনের ভিতরে চলে গেছে আজকের দিনের মানুষগুলির জীবন। যে জরুরী খবরটা মাসীকে দেয়ার জন্য, কিংবা জরুরী কাজের নিমিত্তে কাউকে হাট বাজার থেকে ডেকে আনার জন্য রোদ পেড়িয়ে মাইলের পর মেইল হেটে গিয়ে কাজটা করতে হতো, সেটা আর এখন দরকার পড়ে না। শুধু একটা মিসকল দিলেই কিংবা মেসেজ ঠুকে দিলেই সব যেনো হয়ে যাচ্ছে। এতো কিছু থাকতেও আমরা আজকে জেনারেশন থেকে জেনারসনে ডিসকানেক্টেড হয়ে যাচ্ছি। অথচ আরো বেশী কানেক্টেড থাকার কথা ছিলো।

সবাই ক্লান্ত এখন। সবাই অসুস্থ্য বোধ করে এখন। বড়রা ক্লান্ত, ছোটরা ক্লান্ত, মালিকেরা ক্লান্ত, শ্রমিকেরা ক্লান্ত, রোগীরা ক্লান্ত, ডাক্তাররা ক্লান্ত, ছাত্ররা ক্লান্ত, শিক্ষকরাও ক্লান্ত। ঘরে স্ত্রী ক্লান্ত, স্বামীও ক্লান্ত, কাজের বুয়া শুধু আজো ক্লান্ত নয়। হয়তো সেও কয়েকদিন পর ক্লান্ত হয়ে যাবে। পোষ্টম্যান বেকার, পোষ্টমাষ্টার বেকার, অথচ তাদের কারোরই সময় নাই হাতে। সবাই ব্যস্ত।  ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত, বাবা মায়েরাও ব্যস্ত, আত্তীয় স্বজনেরা ব্যস্ত, বন্ধুবান্ধবেরাও ব্যস্ত অথচ সারাদিন কিংবা বেশীরভাগ সময় তারা একই জায়গায় থাকে। ছাত্ররা প্রচুর পড়াশুনা করে কিন্তু বই পড়ে না। প্রচুর লেখালেখি করে কিন্তু বই আকারে প্রকাশ হয় না। সমাজ নিয়ে অনেক গবেষনা করে কিন্তু কোনো আবিষ্কার হাতে আসে না। 

একটা অসুস্থ্য সমাজ গড়ে উঠছে প্রতিদিন। মায়া মহব্বতবিহীন, দায়িত্ববিহীন এবং একাকীত্ব জীবন সমৃদ্ধ একটা সমাজ গড়ে উঠছে দ্রুত। আর এই অসুস্থ্য সমাজের মধ্যে আমরাও নেতিয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত কম্প্রোমাইজ আর এডজাষ্টমেন্ট করতে করতে।

এর শেষ কথায়?

২২/০৪/২০২৩-ঈদ-উল ফিতর

আজ ঈদ হয়ে গেলো। সাদামাটা একটা ঈদ। এই কয়দিন বেশ একাই ফ্যাক্টরীতে ছিলাম কারন আমার পার্টনার মূর্তজা ভাই গত মাস খানেক যাবত একবার ইতালী, একবার আমেরিকা এবং সবশেষে ওমরা করতে গেলেন। আজ তার ফেরার কথা। রোজা ছিলাম পুরুটাই, মাঝে একটা রোজা ভাংগা পড়েছে আর কারনটা সে।

যাই হোক, যেটা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছি আজ সেটা হলো, কিছু পরিকল্পনা।

অনেক কিছুই গুছিয়ে এসছি প্রায়। সোনালী ব্যাংকের লোনটা নাই, ফ্ল্যাট একটা মর্টগেজ করা ছিলো সেটাও ক্লিয়ার করে ফেলেছি এই গত বছরে। টাটায় আরেকটা লোন ছিলো, সেটাও শেষ করেছি। আমার এখন সত্যিই কোনো লোন কোথাও নাই, বরং কিছু কিছু মানুষের কাছে আমি বেশ কিছু অর্থ পাই সেটা আদৌ পাওয়া যাবে কিনা জানি না, তবে দাবী করতেই পারি কারন সেগুলি আমার থেকে তারা ক্যাশ নিয়েছে। যেমন আলমাস নিয়েছে ৫ লাখ, কামাল স্যার নিয়েছে ৫ লাখ, সাইফুল নিয়েছে ৬ লাখ ইত্যাদি। এর পরেও আমার কাছে যে বাজেটটা সঞ্চয় হিসাবে আছে, তাতে আমি কিছুটা হলেও সিকিউর ফিল করছি।

আগামী ২ বছরের মধ্যে (যদি ইনশাল্লাহ বেচে থাকি) আমাকে আরো অনেক কিছু গুছিয়ে ফেলতে হবে। আমি কোন চাপ নিয়ে বসবাস করতে চাই না। এর মধ্যে আছে সাউথ টাউনের ব্যাপারটা। আমি ধরে নিচ্ছি এটা আমি পাবো না। পলাশপুরের মা ইন্ডাস্ট্রিজের খাস জমিটা রেকর্ডে রুপান্তরীত করা, আমি আশা করছি ইনশাল্লাহ এটা হয়ে যাবে। শাহজাহানের কাছ থেকে ২৬ শতাংশ জমি আমার পাওনা, আমার ধারনা শাহজাহান পুরু জমিটা দিবে না, হয়তো ১০ থেকে ১২ শতাংশ জমি দিতে পারে। সেটা হলেও আমি নেবো এবং ঝামেলা শেষ করে দেবো।

ব্রিগেডিয়ার জাহেদের কাছ থেকেও জমিটা নিয়ে নেবো। এটাও খুব জরুরী। জাহেদের জমিটা নিলে দুজনের জন্য আমার দায়িত্ব শেষ হয়। একজন ফারুক আরেকজন সে। চান্দের চরের জমিগুলি মুটামুটি একটা পর্যায়ে নিয়ে এসছি। ওখানে আরো লাখ ৫০ টাকা ব্যয় করলে সেটাওএকতা ভালো পর্যায়ে চলে আসবে ইনশাল্লাহ।

চান্দের চরের জমিগুলি একটা দৃশ্যমান পর্যায়ে এলে আমি সেটা পরবর্তী সময়ে বিক্রি করে দেবো বলেই আশা করছি। কোনো প্রকার নতুন কোনো ইনভেষ্টমেন্টে যাওয়া আমার উচিত না। কারন যখনই কোনো নতুন ইনভেষ্টমেন্টে গিয়েছি, সেটা আমাকে কোনো লাভের পথ দেখায় নাই উলটা লস হয়েছে।

আমার এই সব কিছু গুছাতে কি পরিমান টাকা লাগতে পারে তার একটা হিসাব আজ করলাম। সেটা নিচে লিখে রাখিঃ

(ক)       জাহেদের জমিতে আমাকে আরো ৪ লাখের মতো ইনভেষ্টমেন্ট করতে হবে। তাতে ওর জন্য আমার পুরু জায়গাটা কেনা হয়ে যায় রেজিষ্ট্রি সহকারে। যদি সেটাই হয়, আমি ওকে ধীরে ধীরে সেখানে একটা বিল্ডিং করার পরিকল্পনা করে দেবো। ফাইন্যান্সটা আসবে মা ইন্ডাস্ট্রিজের ভাড়া থেকে। আগামী এই এপ্রিল মাস ২০২৪ এর মধ্যে পাইলিং এর কাজ করে ফেলতে পারবে। অতঃপর আরো ১ বছর পর বাড়ির কাজে কিছুটা হলেও হাত দিতে পারবে, অন্তত একতালা বিল্ডিং করার জন্য। সেটাও আসবে মা ইন্দাস্ট্রিজের ভাড়া থেকে। যদি সেটা হয়ে যায়, তাহলে ওর থাকার একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সে আমার সাথে থাকবে কি থাকবে না সেটা নিয়ে আমি ভাবি না। অন্তত সে ভালো থাকুক। সেটাই বড়।

(খ)       চান্দের চরের জমির টাকা আসবে প্রতিমাসের প্রোফিট থেকে। আগামী ৮ মাসে আমি প্রায় ৯০ লাখের মতো প্রোফিট নেবো। সেটা যথেষ্ট চান্দের চরের জমির জন্য।

(গ)       শাহজাহানের জমিটা আপাতত আমি বাউন্ডারী করে রাখবো। অতঃপর ধীরে ধীরে সেখানে একটা বাড়ি বানানোর চেষ্টা করবো। তার জন্য আমাকে পরবর্তী ২০২৪ সালের প্রোফিট থেকে টাকাটা নিতে হবে ইনশাল্লাহ। ২০২৪ সালে আমি প্রোফিট নেবো ইনশাল্লাহ প্রায় দেড় কোটি টাকা। এই টাকায় আমার ধারনা আমি শাহজাহানের প্লটটাতে একটা দৃশ্যমান কিছু করতে পারবো ইনশাল্লাহ।

(ঘ)       আমার সঞ্চয়ী টাকার যে প্রোফিট আমি পাবো, জাকাত দেয়ার পর সেই টাকাটা আমি ওয়াকফায়ে লিল্লাহ করে দেবো। তাতে দেখা যায় যে, ১ বছরে আমি যদি ১৮ লাখ টাকা প্রোফিট পাই, জাকাত হয় প্রায় ৭ লাখ টাকার মতো, বাকী ১১ লাখ টাকা দিয়ে আমি ওয়াকফায়ে লিল্লাহ এর একাউন্ট খুলে ফেলবো। যদি সঞ্চয়ী টাকায় হাত দিতে না হয়, তাহলে এর সঞ্চয় থেকেই আমি ওয়াকফায়ে লিল্লাহ্র বাজেট তৈরী করে ফেলতে পারবো ইনশাল্লাহ। আমার ইচ্ছা অন্তত ৫০ লাখ টাকার একটা ওয়াকফায়ে লিল্লাহ করি। বাকীটা আল্লাহ জানেন।

(চ)       এর মধ্যে যদি মাঝে মাঝে ফ্যাক্টরী থেকে কিছু টাকা পাই, তাহলে সেটাও ওর নামে দিয়ে দেবো যাতে ওর নিজের সঞ্চয়টা বাড়ে। আমার ইচ্ছা, ওকে মোট ৫০ এর মতো ক্যাশ সঞ্চয় করে ক্ষান্ত হবো। এতে সে প্রায় প্রতিমাসে কম করে হলেও ২৫ হাজার টাকা তুলতে পারবে সব কিছু কেটে কুটে। এতে সে খুব ভালোভাবেই চলতে পারবে বলে আমার ধারনা। আর এর মধ্যে তো আমার চেষ্টা থাকবেই আরো কিভাবে বাড়ানো যায়।

(ছ)      কনিকার খরচের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে, উম্মিকার বিয়ের খরচটাও মাথায় রাখতে হবে। এতে সম্ভবত আমাকে আমার সঞ্চয়ে হাত দিতে হতে পারে, কিন্তু সেটা আবার ২০২৫ সালের মধ্যে কাভার করা সম্ভব প্রোফিট থেকে ইনশাল্লাহ।

এর মানে হলো যে, আগামী ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ আমি চান্দের চর, শাহজাহান এবং ও সাথে কনিকা, উম্মিকার জন্য একটা দৃশ্যমান একটা ব্যবস্থা করতে পারবো। সাথে একটা ওয়াকফায়ের একাউন্ট। ২ বছর সময়। ইনশাল্লাহ পারবো যদি আল্লাহ সহায় হন।

২৩/০২/২০২৩-আমেরিকার ভিসা প্রাপ্তি

অনেকবার আমেরিকা যাওয়ার জন্য ভিসা পেয়েছিলাম কিন্তু যাওয়া হয়েছে মাত্র একবার। বাকী সম্ভবত আরো দুবার ভিসা ছিলো (দূটু মিলিয়ে প্রায় ৮ বছর মেয়াদিতে) কিন্তু যাওয়া হয় নাই। আমেরিকা আমাকে আসলেই টানে না। অনেকের কাছে এটাকে সর্গপুরী মনে করেন বটে কিন্তু আমার কাছে কোনো বিদেশই টানে না। আর সেটেল হবার তো কোনো প্রশ্নই জাগে না।

 এবার আমেরিকার ভিসা পাওয়ার ব্যাপারে আমার বেশ সন্দিহান ছিলো। তারা আবার নাক উচা। ভিসা দিয়েছে কিন্তু যাইনি, তাতে ওরা ইন্সাল্ট ফিল করে। এমতাবস্থায় আমাকে ৪র্থ বার ভিসা দেয় কিনা সেটা নিয়ে আমার পুরুই সন্দেহ ছিলো। তারপরেও ছোট মেয়ে আমেরিকা থাকে, মেয়ের মায়ের ভিসা হয়ে গেছে, আমার হয় নাই, আমার যাওয়া হবে না ইত্যাদির চাপে শেষ পর্যন্ত ভিসার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু মনে একটা কঠিন প্রত্যয় ছিলো যে, ভিসা দিলেই যেতে হবে কিংবা সুযোগ না থাকায় যেতে পারি নি এটা পরবর্তী ভিসা না পাওয়ার জন্য একটা ডিস ক্রেডিট হতে পারে না। যদি আমাকে ভিদা রিজেক্ট করে, আমি অবশ্যই এর কৈফিয়ত চাইবো তাদের কাছ থেকে কেনো এবং কোন কারনে আমার ভিসা রিজেক্ট করছে। আর যেহেতু আমার খুব একটা টান নাই, ফলে আমার ভিসা পাইলেই কি আর না পাইলেই কি। মিটুলের তো অন্তত ভিসা আছে, তাতেই চলবে। কোনো কারনে যদি কনিকার কাছে যেতে হয়, মিটুল একাই সামলে নিতে পারবে।

যথারীতি আমি ইন্টারভিউ এর জন্য দাড়ালাম। অবাক করার ব্যাপার হলো, আমার কোনো কাগজ পত্র তারা চেক করার প্রয়োজন মনে করলো না। আমি আর্মিতে ছিলাম এটা নিয়েই তাদের অনেক প্রশ্ন ছিলো। প্রশ্নগুলি আমাকে ধরার জন্য নয় বরং যা দেখলাম তারা আর্মির যে কোনো লোককে খুবই মুল্যায়ন করে। আর্মিতে আমি কোথায় কোথায় চাকুরী করেছি, সেটা তাদের জানার খুব শখ হচ্ছিলো। বলেছি জাতীসংঘের সাথে প্রায় আড়াই বছরের উপর হাইতি আর জর্জিয়ায় মিশনে ছিলাম, তখনই একবার আমেরিকায় বেড়াতে গিয়েছিলাম।

আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আমার মেয়ে তার পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে আসবে কিনা। আমি বলেছি- সেটা আমি জানি না তবে আমার যে ব্যবসা আছে সেটায় সে হাল ধরলে আমি খুব খুশী হবো। কি ব্যবসা আমার যখন জিজ্ঞেস করলো, আমি বললাম রপ্তানীমুলক গার্মেন্টস। প্রায় ২ হাজার কর্মচারী আছে শুনে আরো খুশী হলো। বাৎসরিক টার্ন ওভার জিজ্ঞেসের পর অফিসার একটু যেনো হচকচিয়ে গেলেন কারন টার্ন ওভার টা ঝুব কম নয়- ২২৫ থেকে  আড়াইশো কোটির মতো।

খুব খুশী হয়েছে তারা পুরু ব্যাপারটা জেনে। অবশ্য আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কেনো আমি আগের ভিসা গুলিতে আমেরিকায় যাইনি। আমি খুব সাবলিল ভাবেই বলেছিলাম যে, আসলে সেটা ইচ্ছে করে না যাওয়ার কোনো কারন নাই। আমি আমার নতুন ব্যবসাটা গুছিয়ে উঠতে সময় দিতে পারছিলাম না। তাই আর যাওয়া হয় নাই। কিন্তু এবার তো যাওয়া হবেই কারন মাঝে মাঝে আমার মেয়ের জন্য তো আমার মন ছুটেই যায় তাকে দেখার জন্য।

কোনো দ্বিমত করলেন না অফিসার। শুধু একতা কথাই বল্ল০ ইউ আর এ গুড ফাদার। অফ কোর্ষ, ইউ নিড টু গো।

বলে ভিসা দিয়ে ধন্যবাদ জানালো। ভালো লাগলো অফিসারের ব্যবহার। ফেরার পথে একটা স্যালুট দিলাম, আর একটু হাসলাম। 

২০/০২/২০২৩-পতেঙ্গা ভ্রমন

কথায় আছে, Defense Life is a man’s life and a soldier once is always a soldier. অন্য কারো বেলায় এটা কতটুকু সত্য সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু এই অকাট্য বাক্যটা আমার বেলায় শতভাগ প্রযোজ্য। ২০৪৪ সালে ভলান্টারিলি আর্মি থেকে অবসর নেয়ার পর থেকে আমি আজো মনে মনে শতভাগ যে ফৌজ সেটা আমি মনেপ্রানে উপলব্ধি করি। কোথাও কাউকে ইনুফর্ম পড়া দেখলে আজো আমি যেচে কথা বলি, ভালো লাগে। কেউ আমার এই আর্মি বা ডিফেন্স বাহিনীর ব্যাপারে কথা বললে এখনো আমার গায়ে লাগে। কেউ ভালো বললে আমি আজো এর কৃতিত্তের অংশটুকু যেনো নিজের সেটা উপলব্ধি করি।

প্রায় ৩০ বছর পর আমি আবারো আমাদের সেই ডিফেন্স ফোর্সের অধীন নৌ বাহিনীর বিভিন্ন স্থান সমুহে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আর এর পিছনে যার সবচেয়ে বেশী অবদান- সেটা হলো আমারই ছোট ভাই সমতুল্য রিয়ার এডমিরাল মামুন যে বর্তমানে ComChit (অর্থাৎ কমান্ডার চিটাগাং) হিসাবে দায়িত্বরত। মামুন সদ্য চট্টগ্রামে পোষ্টিং গিয়েছে, সম্ভবত মামুন ওখানে না থাকলে এবারো আমার যাওয়া হতো না। মামুনের আথিথেয়তার কোনো বর্ননা চলে না। ওর নিজের বাসায় আমার থাকার জায়গা করে দেয়া, অফিসার মেসে ভি আই পি রুমে আমাদের সবার জন্য ব্যবস্থা করা, সারাক্ষন গাড়ির ব্যবস্থা, বিভিন্ন নৌ জাহাজে আমাদেরকে অভিনন্দন দেয়া সব কিছু ছিল অত্যান্ত সাবলিল এবং চমৎকার।

খুবই অল্প একটা সময়ের জন্য ছিলাম, মাত্র এক রাত দুই দিন কিন্তু তারপরেও মনে হয়েছে অনেকদিন বেড়ালাম। একটা পরিপূর্ন ভ্রমন বলা যায়।

কাপ্তাইয়ে লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম ঘাটিতে চমৎকার একটা সময় কাটিয়েছি। লেঃ কমান্ডার ইফতেকার এবং তার টিমকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিএনএস বংগবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এর লেঃ কমান্ডার রাসেল, লেঃ কমান্ডার সাহেদ, মামুনের এডিসি লেঃ ফকরুল সহ সবাইকে আমার আন্তরিক ভালোবাসা দেয়া ছাড়া আসলে আমার হাতে কিছু ছিলো না। আমার পরিবার এবং আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম গত ৩০ বছর পর আবারো এমন একটা পরিবেশে কিছুক্ষন সময় কাটানোর জন্য।

আমরা যারা ডেফিন্সে কাজ করি, করতাম, এবং করেছেন, তাদের অবদান অসামান্য যদিও এর মুল্যায়ন সব সময় আমাদের সাধারন জনগন হয়তো অতোটা জানেন ও না। আমাদের পরিবার বর্গ যে কি পরিমান তাদের পারিবারিক জীবনকে উতসর্গ করেন আমাদের এই জীবনকে সার্থক আর দেশের জন্য তা শুধু তারাই জানেন যারা এই সব অফিসার, জোয়ান আর কর্মের সাথে জড়িত। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তাদেরকে পরিবারের বাইরেই দেশের জন্য সময় ব্যয় করতে গিয়ে নিজের জন্য বা পরিবারকে দেয়ার জন্য অবশিষ্ঠ কোনো সময়ই হাতে থাকে না। তারপরেও এই সব অফিসাররা হাসিমুখে সব সময় অন্যের সাথে সময় দেন।

পরিশেষে, আবারো আমি রিয়ার এডমিরাল মামুন এবং তার সকল টিমকে আমার প্রানঢালা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাই। 

১০/০১/২০২৩-আজ থেকে শত বছর পর আমার এই লেখা (Taken in 2nd Page)

আজ থেকে শত বছর পরে আমার এই লেখাটা যারা পড়বেন তাদের মধ্যে আজকের দিনের আর কেউ বেচে নেই। অথচ আজকের দিনের জীবিত মানুষগুলি কিংবা আমার আগের শতবছরের মানুষগুলি যে বিষয়গুলি নিয়ে একে অপরের সাথে পরস্পরে বিবাদ, মনোমালিন্য, যুদ্ধ, অভিমান, মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি করেছি, সেগুলি আর আমরা কেহই মনে রাখতে পারবো না, আমরা একেবারেই ভুলে যাবো। পুরুটাই ভুলে যাবো। এসবের আর কোনো মাহাত্য আমাদের কাছে কোনো কিছুই আর অবশিষ্ঠ থাকবে না। 

আমরা যদি আরো শতবছর আগে ফিরে যাই, ধরি সেটা ১৯২২ সাল। সেই দিনের পৃথিবী কেমন ছিলো আর সেই পৃথিবীর মানুষের মধ্যে কি নিয়ে ভয়, শংকা, মারামারি, হানাহানি নিয়ে তাদের মস্তিষ্কে কি ভাবনার খেলা চলছিলো, তাদের মুখের চাহনীতে কি চিত্র ফুটে উঠেছিলো সেই চিত্র কিন্তু আজকের দিনের কোনো মানুষের মাথায় বা মস্তিষ্কেও নাই। আর ইতিহাসের কল্পনায় থাকলেও সেই বাস্তবতার নিরিখে তার আসল চিত্রের ধারে কাছে আমরা তা আচ করতে পারি না।   

জাষ্ট একবার ভাবুন তো! সেই অতীত দিনের কোনো এক পরিবারের সদস্যগন হয়তো তাদের পারিবারিক জমাজমি, কিংবা সম্পদের রেষারেষিতে যখন এক ভাই আরেক ভাইকে, কিংবা এক বোন আরেক ভাই বা বোনের বিরুদ্ধে চরম রেষারেষিতে একে অপরকে খুন, জখম বা আঘাত করেছে, কিংবা নিজের লোভের কারনে অন্যের কোনো সম্পত্তি দখল করার জন্য চরম আঘাত করেছে কিংবা এক অংশীদার আরেক অংশীদারকে সমুলে বিনাশ করতে মরিয়া ছিলেন, সেই সম্পদ কিংবা সেই অর্থ এখন কার কাছে? আর সেই বা কোথায়? পাহাড় পরিমান সম্পদ গড়া হয়েছিলো, ব্যাংক ভর্তি টাকা, সোনাদানা হয়তো জমা করা হয়েছিলো, সেই হিসাবের খাতা এখন আর কোনো গোপন নাই, না আছে তাকে যক্ষের মতো ধরে রাখার কোনো আকুতি বা পেরেসানি। কারন আমি সেই জগতেই নাই। আমাদের গড়ে যাওয়া সম্পদ যেখানে, তার থেকে আমরা এত দূর যে, তাকে কোনো অবস্থাতেই আর স্পর্শ পর্যন্ত করার কোনো অলৌকিক শক্তিও নাই। এটাই মানুষের জীবন। সে যাইই কিছু আকড়ে ধরুক না কেনো, সময়ের কোনো এক স্তরে গিয়ে সে আর কোনো কিছুই নিজের জন্য আজীবন আগলে রাখতে পারে না। যদি বলি-সেগুলি পরিবার পাবে, পরিবারের পরিবার বংশ পরম্পরায় পাবে, সেটাও সঠিক নয় কারন পরিবার গঠন হয় অন্য পরিবারের মানুষ নিয়েই যারা পিউর পরিবার বলতে কিছুই থাকে না। এটা অনেকের কাছে শুনতে অবাক বা যুক্তিহীন মনে হলেও এটাই ঠিক যে, আত্মকেন্দ্রিক এই পৃথিবীতে নিজের সন্তানও নিজের মতো না, নিজের পরিবারও নিজের মতো না। আমাদের নিজের চিন্তাভাবনা নিজের সন্তানের চিন্তাভাবনা, বা নিজের পরিবারের চিন্তাভাবনা কখনোই একই সমান্তরালে বহমান নয়। আর ঠিক তাই, এক পরিবার আরেক পরিবারের সাথে মিশ্রন হতে হতে প্রাচীন পরিবারটিও একদিন তার নিজের সত্ত্বা হারিয়ে খান বংশের মানুষেরা, সৈয়দ বংশ, সৈয়দ বংশ বঙ্গানুক্রমে মাদবর কিংবা চৌধুরী বংশে রুপান্তরীত হয়ে যায়। আমাদের আমিত্ব পর্যন্ত আর কেউ রাখতে পারেনা।   

যাক যেটা বলছিলাম শত বছরের বিবর্তনের কথা।

ছোট একটা উদাহরন দেই। আজ থেকে সবেমাত্র ৩০/৪০ বছর আগের কথা যখন আমরা বা আমি ছোট ছিলাম, স্কুলে লেখাপড়া করতাম। তখনো স্কুলের ক্লাস ক্যাপ্টেন হবার জন্য কিংবা কলেজের ফুটবল টীমে নাম লিখার জন্য এক সহপাঠির সাথে আরেক সহপাঠির মধ্যে কতই না কোন্দল কিংবা বিরুপ সম্পর্কে পতিত হতাম, আজ প্রায় সেই ৩০/৪০ বছর পর সেই স্কুলের কেইবা মনে রেখেছে কে স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলো বা সেই দিনের সেই ফুটবল টীমের আমি একজন সদস্য ছিলাম? আজব ব্যাপার হচ্ছে-আমি যে সেই স্কুলের একজন দাপুটে এবং অতীব জনপ্রিয় ছাত্র ছিলাম, সেটাই বা কয়জন এখন আবিষ্কার করতে গিয়ে তাদের সময় অপচয় করছে কিংবা মনে রাখার চেষ্টা করছে? যদি সেটাই হয়, ভাবুন তো আজ থেকে শতবছর পর তাহলে আমার বা আমাদের অস্তিত্বটা কোথায়? কোথাও নাই। আর এই শতবছর পেরিয়ে যখন আরো শতবছর পেরিয়ে যাবে, তখন যেটা হবে সেটা হলো-আমি যে এই পৃথিবীতে ছিলাম, সেটাই বিলীন হয়ে যাবে। এখন আমরা যারা যাদেরকে এই পৃথিবীতে গর্ব করে মনে রাখি তারা হয়তো অতীব ব্যতিক্রম। তারা তাদের সময়ে সম্পদের কারনে নয়, কর্মের কারনে ‘সময়’টাকে আলাদা করে যুগে যুগে সেই কর্মের ফল ভোগ করতে পারে এমন কিছু কর্ম হয়তো পিছনে ফেলে গিয়েছেন বিধায় হয়তো শতবছর পরেও আমরা তাদের সেই কর্মফল ভোগকারীরা কিছুটা মনে রাখি। এটার হার অতীব এবং নিছক খুব বেশী না। আমরা সেই তাদের দলে পড়ি না। 

হয়তো অনেকেই বলবেন, আজকের দিনের ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা আমাদের আজকের দিনের সমস্ত মেমোরী সংরক্ষন করে রাখতে পারি যা যুগে যুগে আমাদের বংশ পরম্পরায় এর সংরক্ষন করে আমাদেরকে জীবিত রাখবেন। এটা কোনোভাবেই সত্য না। এ ব্যাপারে একটা আরো ছোট উদাহরন দেই- জগত বিখ্যাত সঙ্গীতরাজ মাইকেল জ্যাকসন যিনি ২০০৯ সালে মারা যান। খুব বেশীদিন নয়, এটা মাত্র ১৩ বছর আগের কথা। এই মাইকেল জ্যাকসন সারা দুনিয়ায় এমন কোনো জায়গা ছিলো না যে যুবসমাজ, কিংবা শিক্ষিত সমাজ তাকে না চিনতো। তার বিচরন ছিলো সর্বত্র। তার চলাফেরা, পোষাকাদি, তার অঙ্গভঙ্গিও তখনকার দিনের প্রতিটি যুবক যেনো মডেল হিসাবে নিয়ে নিজেরাও সে রকমের পোষাক, আচরন ভঙ্গীতে অনুসরন করতো। একবার ভাবুনতো, এ যুগের কতজন যুবক আজ সেই মাইকেল জ্যাকসনের নামটা পর্যন্ত জানে? তাহলে আজ থেকে শতবছর পরের চিত্রটা কি হবে? হতে পারে, এই মাইকেল জ্যাকসনের নামটা সারা সঙ্গীত শুধু নয়, আর কোথাও হয়তো প্রতিধ্বনিতে বেজে উঠবে না। অথচ এক সময় সেইই ছিলো ঐ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটা ইমেজ। আরো খুব কাছের একটা উদাহরন দেই।

প্রতিদিন আমরা অসংখ্য ছবি তুলছি, আমরা তা আমাদের ফেসবুক, সোস্যাল মীডিয়ায় তা প্রতিদিন পোষ্ট করছি। আমরাই গত পাচ বছরের আমাদের ছবিগুলিই পুনরায় রিভিউ করে দেখার সময় পাই না নতুন নতুন ইভেন্টের ছবির কারন। যা একবার তোলা হয়েছে, যা একবাএ দেখা হয়েছে, তার আর খুব একটা সংরক্ষন করে বারবার দেখার স্পৃহাই আমাদের নাই, তাহলে আমার এসব স্মৃতিময় ইভেন্টের সেই স্মৃতি অন্য আরেকজন রাখবে এটা ভাবা বোকামি। হতে পারে আমার বা আমাদের অন্তর্ধানে সাময়িকভাবে সেগুলি খুব কাছের কিছু লোক একবার দুইবার দেখে কিছু স্মৃতি রোমন্থন করবেন। আর ব্যাপারটা এখানেই শেষ।

আর এটাই জীবন। আমাদের এই ছোট আধুনিক জীবনে আমরা আসলে একে অপরের সাথে হয়তো কন্টাক্টে আছি, কিছু সেই কন্ট্যাক্ট মানে কিন্তু এটা নয় যে, আমরা একে অপরের সাথে কানেক্টেড। একই ঘরে বসবাস করে, কিংবা একই প্লাটফর্মে একসাথে থাকার নাম হয়তো কন্ট্যাক্ট, কিন্তু এর মানে কানেকশন নয়।  আমরা ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে কানেকশনবিহীন হয়ে পড়ছি। আর এমন একটা কানেকশনবিহীন সম্পর্কে কেনো আমরা একে অপরের সাথে বিদ্বেষ নিয়ে বেচে থাকছি?

এটাই যদি হয় আমাদের জীবনের চিত্র, তাহলে পরিশেষে চলুন আমরা আমাদের জীবনটাকে একটু অন্যরকম করে ভাবী। জীবনটাকে একেবারে সহজ করে ফেলি। কেউ এই পৃথিবী থেকে জীবন্ত ফিরে যেতে পারবো না। কেউ জীবন্ত ফিরে যেতে পারেও নাই, না আজীবনকাল এই প্রিথীবিতে থাকতে পেরেছে। আজকের দিনের যে গাড়িটা কিংবা অত্যাধুনিক ফোনটা আমরা ব্যবহার করছি সেটাও একদিন জাংক হিসাবেই শেষ হবে। কোনো কিছুই আর রিলেভেন্ট মনে হবে না। তাই যে সম্পদের জন্য আমরা আজ এতো হাহাকার করছি, একে অপরের উপর ক্ষিপ্ত হচ্ছি, এইসব কিছুই আসলে নিরর্থক, অকেজো। হ্যা, জীবনের চাহিদার অতিরিক্ত কোনো কিছুই আমাদের দরকার নাই। আমাদের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রন করা আবশ্যিক, একে অপরের ভালোবাসার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে তুলি, কারো উপর কারো বিদ্বেষ না রাখি, কারো সম্পত্তির উপর কিংবা কারো হকের উপর আমরা কেউ লোভ না করি। না কারো উপর কোনো জুলুম করি, না কাউকে নিজের সার্থের কারনে কোনো ক্ষতি করি। যতক্ষন আমরা অন্যের সাথে নিজের সাথে তুলনা না করি, ততোক্ষন পর্যন্ত সম্ভবত আমরা নিজের লোভের কাছে পরাভূত হবো না।

আমাদের সবার গন্তব্য স্থান পরিশেষে একটাই-কবর। কেউ হয়তো আগে কেউ হয়তো পরে। হোক সে মসলমান, হোক সে অন্য কোনো ধর্মের। কোনো কিছুই সাথে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। শতবছর পরে এমনিতেও আমরা হারিয়েই যাবো। যখন নিজেরাই হারিয়ে যাবো, তাহলে আমাদের অসাধু উপায়ে হানাহানি, মারামারি কিংবা জোর করে ছিনিয়ে নেয়া গড়ে তোলা সাম্রাজ্যই বা রাখবো কার জন্যে আর কেনো? কিছুই থাকবে না, রাখতেও পারবো না।

শতবছর পরেও এই আকাশ নীলই থাকবে, পাহাড় সবুজই থাকবে, সাগর সেই শতবছর আগের মতোই কখনো কখনো উত্তালই হবে। শুধু আমাদের নামের সম্পদগুলি অন্য আরেক নতুন নামে লিপিবদ্ধ হবে, আমার শখের সব কিছু অন্য আরেকজন তার নিজের মতো করে ব্যবহার করবে। আমার বলতে কিছুই নাই। আজ যে ক্ষমতার মসনদে বসে আমি হাতের ইশারায় জুলুম উপভোগ করছি, সেই ক্ষমতার মসন্দে বসেই হয়তো অন্য কোনো এক সময়ে আমারই বংশধর কারো দ্বারা শাসিত হচ্ছে, কে জানে। এর পার্থিব অনেক নমুনা আমরা দেখেছি মীর জাফরের বংশে, হিটলারের পতনে, কিংবা মুসুলিনি বা অনেক রাজার জীবনে। আজ তারা সবাই এক কাতারে।

এটা যেনো সেই বাল্ব গুলির মতো-কেউ শত ওয়াটের বাল্ব, কেউ হাজার পাওয়ারের বাল্ব, কেউবা কয়েক হাজার ওয়াটের বাল্ব কিন্তু ফিউজ হয়ে যাওয়ার পরে সবাই সেই ডাষ্টবিনে একসাথে। সেখানে কে শত ওয়াটের আর কে হাজার পাওয়ারের তাতে কিছুই যায় আসে না। না তাদেরকে আর কেউ খুজে দেখে।  

০৩/১২/ ২০২২-কোকো, আমাদের প্রথম জার্মান শেফার্ড

কুকুর পালার শখ আমার কখনোই ছিলো না। বরং মানুষ কেনো কুকুর পালে, সে ব্যাপারে আমার অনেক নেগেটিভ মতবাদ ছিলো। অথচ এখন আমি নিজেই কুকুর পালা শুরু করেছি। কেনো এমনটা হলো, সে ব্যাপারটাই এখন বলছি।

সম্ভবত গত বছরের প্রথম দিকে হটাত করে কোথা থেকে একটা কুকুর আমাদের বাসায় এসে হাজির। কথা নাই বার্তা নাই, সে আর কোথাও যেতেও চায় না। সারাদিন আমাদের বাসার সামনেই বসে থাকে, গেটে বসে থাকে, কোথাও যায় না। মাঝে মাঝে আমি বা আমার পরিবার ওকে কিছু খাবার দেয়া শুরু করে। খুব যে খায় তাও না। যতটুকু লাগে ততটুকুই খায়, আর কিছু খাবার রেখেও দেয়, পরবর্তী সময়ে আবার সেটা ক্ষুধা লাগলে খায়। ব্যাপারটা খুব অবাক লাগছিলো।

সারারাত বিশেষ করে রাত ১১ টার পর আমরা যখন মেইন গেট লাগিয়ে দেই, তাকে আমরা জোর করেই গ্যারেজের ভিতর থেকে বের করে দেই, কিন্তু খুব সকালে আবার এসে হাজির হয়। এভাবে প্রায় ৬/৭ মাস পার হবার পর একদিন শুনি ওর নাম রাখা হয়েছে ‘রকি”। সম্ভবত এই নামটা দেয়া হয়েছে আমার বড় মেয়ের দ্বারা। এখন সবাই ওকে ‘রকি’ নামেই ডাকে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, কুকুরটাও মনে করে আমরা ওর মালিক, আমাদের কথা শুনে, ডাকটাও সে রেস্পন্স করে। এখন ওকে আমরা সবাই একটা মায়ার মধ্যে বেধে ফেলেছি। অফিস থেকে বাসায় আসার পরই দেখি, আমার গাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ায়, সকালে গেট খুললেই মাথা দিয়ে গেট ধাক্কা দিতে শুরু করে কখন সে গ্যারেজে ঢোকবে।

এর মধ্যে আমার ফ্যাক্টরীর ছাদে হটাত দেখি জার্মান শেফার্ডের পাচটি বাচ্চা। পিচ্চি পিচ্ছি, চোখ ফুটে নাই। জরীফ নামে এক লোক যে আমাএ ফ্যাক্টরী বিল্ডিং এর ভাড়া নেয়। দেখে ভালো লেগেছে। মনে হলো, একটা বাচ্চা পালা যায়। সেই থেকে জার্মান শেফার্ড পালার শখ হয়েছে।

গত ১২ অক্টোবর ২০২২ থেকে আমি এই জার্মান শেফার্ডের বাচ্চাটা আমি নিয়ে এসেছি। ওর সেদিন বয়স হয়েছে একেবারে তিন মাস। আমি যখন ওকে গাড়িতে করে নিয়ে আসি, দেখেছিলাম, ওর শরীরের হাড্ডিগুলি পর্যন্ত দেখা যায়। আমি জানি না কিভাবে কুকুর পালতে হয়। কিন্তু অন লাইনে গিয়ে বা ইউটিউবে গিয়ে এ ব্যাপারে বেশ কিছু ধারনা পাওয়া গেলো।

পরেরদিন ওর একটা নাম দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম। আমার ছোট মেয়ে (যে আমেরিকায় থাকে) সে তো কুকুর পালবো এটা শুনেই আনন্দে আত্তহারা। বড় মেয়েও তাই। কিন্তু বউ একেবারে নারাজ। কিছুই যায় আসে না। কুকুরের জন্য ঘর বানিয়েছি ২টা। একটা গ্যারেজে আরেকটা ছাদে।

ওর নামটা দিলো আমার ছোট মেয়ে।

নাম কোকো।

এখন আমরা ওকে কোকো নামেই ডাকি। এই এক মাস হয় নাই, এর মধ্যে কোকোর ওজন বেড়েছে প্রায় ২ কেজি। প্রচুর খায়, মাশ আল্লাহ, খেলে, আমাদের ঘরে আসে। আমার কেয়ার টেকারের সাথে ওর বেশী শখ্যতা মনে হয়। কারন সারাদিন তো কোকো ওর সাথেই থাকে, খেলে, বেড়ায়।

আমাকে একটু ভয় পায় কারন মাঝখানে আমি ওকে কিছু কথা না শোনার কারনে লাঠি দিয়ে ভয় দেখিয়েছি। আমার মনে হয়েছে, কোকো কাউকে ভয় পাক এটাও দরকার আছে।

কোকোকে সব গুলি ভ্যাক্সিন দেয়া হয়েছে। ডি-ওয়ার্মিং করার জন্য একটা কৃমির ট্যাবলেট ও খাওয়ানো হয়েছে। আরেকটা খাওয়াতে হবে। আমি ওকে প্রতি শুক্রবারে সাবান শ্যাম্পু দিয়ে খুব ভালো করে গোসল করাই।

কুকুর পালা থেকেও অনেক কিছু শেখার আছে। একটা বোবা প্রানীকে বশ মানানো, কথা শোনানো সহজ ব্যাপার না। তবে কুকুর অত্যান্ত প্রভুভক্ত প্রানী। দেখা যাক কোকোর বেলায় কি হয়। এটাই কোকো।

০৯/১০/২০২২-দক্ষিন কোরিয়া এবং শ্রীলংকা ট্যুর

লম্বা একটা ট্যুর হলো। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে শুরু করে আজ ৯ অক্টোবর ২০২২ পর্যং বিশাল একটা সফর করা হলো। সফরটা আসলে ছিলো একটা বানিজ্য মেলাকে কেন্দ্র করে। দক্ষিন কোরিয়ায় ইন্টারন্যাশনাল সোর্সিং ফেয়ার নামে একটা মেলার আয়োজন করেছিলো আমাদের ইপিবি। সেখানে নতুন মার্কেট পাওয়ার জন্য আমরা একটা স্টল দিয়েছিলাম। আমাদের ফ্যাক্টরীর বয়সে এটা নিয়ে ২য় বার কোনো আন্তর্জাতিক মেলায় স্টল নিয়ে বানিজ্য মেলায় অংশ গ্রহন ছিলো। প্রথম বার যেমন ঠকেছিলাম, এবারো  এমনি হয়েছে। ইপিবি আমাদের ঠকয়েছে।

২৭/০৮/ ২০২২-নতুন আর পুরাতন প্রজন্ম (Taken in 2nd Page) রঙ্গে ভরা লেখক পাঠক

অনেকদিন পর আজ ডায়েরী লিখতে বসলাম।

প্রতিদিন আমাদের সবার জীবন খুব দ্রুত পালটে যাচ্ছে। কতটা দ্রুত সেটা আজ যারা ঠিক এই সময়ে বাস করছি, হয়তো তারা বলতে পারবেন। আমাদের সময়টাই মনে হচ্ছে সেই শেষ সময় যেখানে এখনো আমরা পুরানো বন্ধু বা চেনা লোকের সাথে দেখা হলে তিনি কেমন আছেন জিজ্ঞেস করি, একটু সময় ব্যয় করি, সুখ দুঃখের আলাপ করি। সমস্যার কথা বলে কিছু উপদেশ বিনিময়ও করি। আমরাই সম্ভবত সেই শেষ যুগের কিছু মানুষ যারা এখনো পরানো খবরের কাগজটা অন্তত কিছুদিন ঘরে রাখি, একই খবর হয়তো বারবার পড়ি। আমরা এখনো সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ভয় পাই, পাশের বাড়ির সাথে সুসম্পর্ক রাখি। আমাদের প্রাভেসী বলতে কিছু ছিলো না। যা ছিলো সবই খোলামেলা। আমরা সেই শরৎচন্দ্রের লেখা উপন্যাস পড়ে কখনো কেদেছি, কখনো হেসে গড়াগড়ি করেছি, রবী ঠাকুরের ‘বলাই’ আমাদের মনে দাগ কেটে যায়, কিংবা ‘পোষ্টমাষ্টার’ গল্পের ছোট বালিকার কথায় বড্ড কষ্ট লেগেছে। ‘দেবদাস’ এখনো আমাদের অনেক প্রিয় একটা গল্প বারবার পড়েছি, বারবার। এখনো এই দলটি কোনো ইনভাইটেশন ছাড়া একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যায়, বেড়াতে গেলে হয়তো কম দামী হলেও হাতে কিছু নিয়ে যায়। এখনো তারা বড়দের পা ছুয়ে সালাম করে। রাতের বা সকালের নাস্তা এখনো এরা একসাথে করার অভ্যাস রাখে। ছেলেমেয়ে, বউ পরিজন একসাথে নাস্তা করুক বা রাতের খাবার খাক, এটাই চায় তারা। ঈদের ছুটিতে তারা এখনো গ্রামের ভালোবাসার টানে সেই কাদাচে গ্রাম, সোদামাখা পরিবেশে ছুটে যেতে সব প্রকার কষ্ট করতেও আনন্দ পায়। আমাদের এই দলটি সম্ভবত খুব বেশীদিন আর নাই এই পৃথিবীতে। হয়তো আগামী ২০ বছরের পর আর কেউ থাকে কিনা কে জানে। এই দলটির মানুষগুলি সকালে উঠে নামাজের জন্য মসজিদে যায়, ঘরে এসে উচ্চস্বরে কোরআন তেলওয়াত করে, হাতে একটা প্লাষ্টিক ব্যাগ নিয়ে নিজে নিজে বাজার করে, হেটে হেটে সেই বাজার বহন করে আনে। বিকালে হয়তো কিছু মানুষ একত্রে বসে মাঠে বা কোনো দোকানের সামনে বসে গালগল্প করে। কোথাও একসাথে খেতে গেলে কে কার আগে রেষ্টুরেন্টের বিল পরিশোধ করবে তার প্রতিযোগিতা চলে। একজন বলে সে দিবে, আরেকজন বিল না দিতে পেরে আবারো হয়তো আরেকটা আড্ডার অগ্রীম দাওয়াত দিয়ে রাখে। এদেরকে আর খুব বেশী দেখা যাবে না একযুগ পরে।

তখন যাদের আনাগোনা হবে তারা সবাই আত্তকেন্দ্রিক একদল। যারা একে অপরের পাশে বসেও হাতের মোবাইলে কুশলাদি বিনিময় করবে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যেও বেশীর ভাগ গ্রিটিংস হবে শুধুমাত্র মোবাইলের মেসেজে মেসেজে। কেউ কারো বাড়িতে যেতেও আনন্দ পাবে না, না কেউ তাদের বাড়িতে এলেও খুশী হবে। সন্তানদের সাথে তাদের দুরুত্ত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে চলে আসবে যে, কে কখন কি করছে, কেউ তার জবাব্দিহি নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকবে না, না থাকতে চাইবে। বাজার হবে মোবাইলে, আনন্দ হবে মোবাইলে মোবাইলে, বন্ধুত্ত গুলির মধ্যে বেশীর ভাগ বন্ধুই কারো চেনা জানা হবে না অতচ বন্ধু বলে ধরা হবে। বড়রা যেমন ছোটদেরকে স্নেহ করার কায়দা জানবে না, ছোটরাও বড়দেরকে সম্মান করার আদব জানবে না। ঘরে ঘরে সবাই একাই থাকবে একজন থেকে আরেকজন। ধর্মের চর্চা ধীরে ধীরে কমে আসবে, কমে আসবে পারিবারিক, আর সামাজিক বন্ধুত্তের গন্ডি। প্রতিবেশীদের মধ্যে কারো সাথেই আজকের দিনের সখ্যতা আর হয়তো থাকবেই না। মুখ চেনা হয়তো থাকবে কিন্তু হয়তো নামটাও জানা হবে না একে অপরের। সন্তানরা বড় হবে মায়ের আদরে নয়, কাজের বুয়াদের নিয়ন্ত্রনে। বৈবাহিক সম্পর্কে চলে আসবে শুধুমাত্র একটা কাগুজে বন্ধনের মধ্যে। স্বামী স্ত্রীর আজীবন কালের ভালোবাসার সম্বন্ধ বা দায়িত্ববোধ হবে শুধুমাত্র দেয়া নেয়ার মধ্যে। ফলে না স্ত্রী স্বামীকে বা স্বামী স্ত্রীকে তার নিজের জীবনের একটা অবিবেচ্ছদ্য অংশ হিসাবে গন্য করবে। সন্তানদের মধ্যে মা বাবার ডিভিশনে তারাও একেবারেই একা হয়ে যাবে। কেউ আসলে কারোরই না। অথচ তারা একই ঘরের ছাদের নীচে বসবাস করবে। ওদের কাছে গ্রাম বলতে একটা অপরিষ্কার পরিবেশ, গ্রামের মানুষগুলিকে মনে হবে অন্য কোনো জাতের মানুষ বলে। এই নতুন প্রজন্মের কাছে মানুষের চেয়ে কুকুর বিড়াল হবে তাদের নিত্য দিনের বন্ধু। সংসার ভেংগে যাওয়ার যে কষ্ট, বা লজ্জা, কিংবা দুঃখের এই প্রজন্মের কাছে এটা খুব মামুলী একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আজ যে তাদের বন্ধু, কাল হয়তো সে তাকে চিনেই না। আজ যে কারো পাতানো বোন, কাল হয়তো সে হয়ে যাবে তার প্রিয় গার্ল ফ্রেন্ড। এদের অনেক টাকা পয়সা লাগবে, হয়তো থাকবেও। কিন্তু একসাথে কোথাও আড্ডায় খেতে গেলে যার যার বিল সে সেই দিতে থাকবে। এতে কারো কোনো কষ্ট নাই। এটাই যেনো এই প্রজন্মের আড্ডার নিয়ম। জিজ্ঞেসও করবে না হয়তো বিল কে দিবে বা কেউ দিবে কিনা।

এখানে সবচেয়ে বিপদজনক পরিস্থিতি হচ্ছে যে, এই আমাদের প্রজন্ম যখন প্রায় শেষের পথে আর নতুন প্রজন্ম যখন উদিয়মানের পথে, এই ট্রানজিট সময়ে সবচেয়ে বেশী সাফার করবে আমাদের প্রজন্ম। কারন তারা তাদের সব কিছু শেষ করে যখন নতুন প্রজন্মকে তৈরী করছে, তখন আমাদের প্রজন্মের মানুষেরা আসলে আর্থিকভাবে নিঃস্ব। নতুন প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মকে আর আমাদের সময়ের মতো করে দায় দায়িত্ব নিতে চায় না। অথচ এখনই পুরানো প্রজন্মের সবচেয়ে খারাপ সময় প্রবাহিত হচ্ছে। বড়রা মনে করছেন, আমাকে তো আমাদের সন্তানেরাই দেখভাল করবে, কিন্তু সন্তানেরা মনে করছেন এটা তাদের দায়িত্তের মধ্যেই পড়ে না। তাহলে শেষ ট্রানজিট সময়টা বড্ড বিপদজনক মনে হচ্ছে। এহেনো অবস্থায় আমাদের প্রজন্মের খুব সতর্ক থাকা দরকার। হতে পারে আমার এই কথায় অনেকেই বিরুপ মন্তব্য করবেন, হয়তো বলবেন, সন্তানদেরকে ধার্মীক জীবনজাপন না করায় কিংবা সঠিক পদ্ধতিতে মানুষ না করার কারনে আমরা এহেনো অবস্থায় পড়ছি। আমি এরসাথে একমত নই। আমরা আজকাল সন্তানদেরকে শুধুমাত্র পরিবার থেকে যথেষ্ঠ শিক্ষা দিলেই সব শিক্ষা তারা পায় না। স্কুলের নিয়ম পালটে গেছে, শিক্ষকের আচরন পালটে গেছে, ধার্মিক লোকদের অভ্যাসও পালটে গেছে, সমাজের নীতিনির্ধারন লোকের মানও কমে গেছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও আর সেই আগের আইনের মধ্যে নাই, বিচারের ন্যায্যতা কমে গেছে, রাজনীতির কারনে মানুষে মানুষে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লা মহল্লায় সম্পর্কের মধ্যে চীর ধরেছে। এখন শুধু পরিবারের শাসনের উপর কিংবা আইনের উপরেই সন্তানরা বড় হয়ে উঠছে না। নতুন প্রজন্ম আমাদের হাতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পুরানো প্রজন্মের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যেই অনেকটা সার্থপরের মতো হতে হবে। নিজের জন্য যথেষ্ঠ সঞ্চয় মজুত রাখুন যাতে কেউ আপনাকে দেখভাল করুক বা না করুক, কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, যাতে আপনি আপনার দেখভাল করতে পারেন। নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা (বেশিরভাগ) পুরাতন প্রজন্মকে বোঝাই মনে করে। মা ভাগ হয়ে যায় সন্তানদের মধ্যে ভরন পোষনের জন্য। বাবা ভাগ হয়ে যায় একই ভাবে। ফলে মা–বাবা একে অপরের থেকেও ভাগ হয়ে যান শুধুমাত্র বেচে থাকার কারনে।

বৃদ্ধ বয়সে এসে কারো উপরে নির্ভরশিল না হতে চাইলে, নিজের জন্য যথেষ্ঠ পরিমান অর্থ সঞ্চয় করুন। প্রয়োজনে নিজের এসেট বিক্রি করে হলেও তা করুন। কারন, একটা সময়ে এসে আপনি সেটাও বিক্রি করতে পারবেন না। হয়তো সন্তানেরাই বাধা দেবে অথবা তাদের অংশ দাবী করবে। আর আপনি সারাজীবন কষ্ট করেও শেষ জীবনে এসে সেই অবহেলিতই থাকবেন। হয়তো কারো কারো জায়গা হবে বৃদ্ধাশ্রমে। আর সেই বৃদ্ধাশ্রমে বসে আরেক পরাজিত বুড়ো মানুষের সাথে সারা জীবনের কষতের কথা ভাগাভাগি করবেন, কিন্তু আপনি আসলেই আর ভালো নাই।

১৫/০৭/২০২২-যখন বয়স ছিলো ১২ কি ১৩ (Taken in 2nd Page)

যখন বয়স ছিলো ১২ কি ১৩, তখন স্কুলে কিংবা বড়দের আড্ডায় প্রায়ই একটা ব্যাপারে আমাদের মতো ছোটরা ফেস করতাম-“ জীবনে কি হতে চাও? বা জীবনের লক্ষ্য কি অথবা what is your aim in life?” হয়তো তখন জানতামই না আসলে কি হলে ভালো হয়, কি হলে কি হয়। ফলে বড়দের শিখিয়ে দেয়া বা ইম্পোজ করে দেয়া বক্তব্যই হয়তো হয়ে যেতো আমাদের বক্তব্য। যেমন-ডাক্তার হবো মানুষের সেবা করবো, ইঞ্জিনিয়ার হবো দেশ গড়বো, কিংবা শিক্ষক হবো মহৎ কাজে ব্রত হবো বা সেনাকর্মকর্তা হবো দেশপ্রেমের জন্য ইত্যাদি। কেনো হতে চাই, কি কারনে হতে চাই, এসবের কোনো অন্তর্নিহিত তথ্য বা ভাবসম্প্রসারনের কোনো বালাই কিংবা মাহাত্য জানাও ছিলো না। যদি এই প্রশ্ন কোনো সমবয়সী বালিকাকে করা হতো, হয়তো তাঁর উত্তর একটু ব্যতিক্রম তো হতোই। পড়াশুনা করবে, বিয়ে হবে, ভালো স্বামী পাবে, তারপর সন্তান সন্ততী হবে, একসময় বুড়ো হবে, নায়নাতকোর হবে। জীবন আনন্দে কেটে যাবে। এই তো।

আজ ৪০ বছর পর আমি যখন পঞ্চাশোর্ধ এক মানুষ, এখন আর আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে না, আমার জীবনের লক্ষ্য কি। অথবা এটাও কেউ জিজ্ঞেস করে না, কি লক্ষ্য ছিলো, কি হতে পেরেছি আর এখন কোন দিকে যাচ্ছি। এখন সবাই যেটা দেখে, আমাদের গত ৫০ বছরের সাফল্যের ঝুড়ির ভিতরে বর্তমানে কি নিয়ে আমরা বেচে আছি। হোক সেটা বিত্ত, হোক সেটা পজিশন কিংবা হোক সেটা দারিদ্রতা। এই সর্বশেষ ম্যাট্রিক্সটাই হচ্ছে আমাদের জীবনের পাওয়া সাফল্য বা বিফলতা যদিও সেই ছোট বেলার “এইম ইন লাইফের” সাথে এর কোনো মিল নাই বা কিঞ্চিত থাকতেও পারে। স্কুল জীবনে কে কতটা ট্যালেন্ট ছিলো, কে কতটা স্মার্ট ছিলো, কিংবা কে কতটা ভালো রেজাল্ট নিয়ে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির গন্ডি পেরিয়েছে, সেটাই কারো জীবনের আসল সাফল্য না। সবচেয়ে পিছনের বেঞ্চে বসা কোনো এক অমনোযোগী ছাত্র হয়তো এখন এমন এক জায়গায় আছে যেখানে প্রথম সারির মনোযোগী কোনো এক ছাত্র তাঁর ধারে কাছেও না। এই ব্যাপারটা না হয় আরেকদিন লিখবো। এখন যে কারনে আমার লেখাটা, সেটা হচ্ছে-

যে যাইই কিছু করুক, সবার জীবনের একটাই সপ্ন। সবকিছু গুছিয়ে শেষ বয়সে এসে একটু শান্তিতে থাকা। এই যে শান্তি, এটা আসলে কোথায় বা এটা আসলে কি? (ধর্মীয় ব্যাপার এখানে টানতে চাই না, সেটা আরেক প্রকার শান্তি)। এই শান্তি হচ্ছে, আমার খাদ্য, বাসস্থান, সাস্থ্য, নীরাপত্তা আর সাধীনতা যেনো বজায় থাকে, একটু আরামে থাকতে পারি, কোনো টেনশন ছাড়া। কিন্তু আদৌতে কি সেই লক্ষ্যে আমরা পৌছাতে পারি সবাই? বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি- সেতার থেকে অনেক দূরে আমরা। প্রতিটি মানুষ আলাদা আলাদা সত্তা। কেউ কারোর জন্যই বেশীরভাগ সময়ে অপেক্ষা করে না, হোক সেটা নিজের সন্তান, নিজের আত্তীয় বা নিজের সংগী। অথচ, আজীবন সবার জন্য সবকিছু করতে করতে একটা মানুষ আসলেই নিঃস্ব হয়ে যায়, নিজের জন্য সে আসলেই আর কিছুই রাখে না। এটা সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে রাঘব বোয়ালদের বেলাতেও প্রযোজ্য। ফলে দেখা গেছে যে, শেষ বয়সে এসে যে সপ্নের জীবনের কথা ভেবে এ যাবতকাল শরীর, যৌবন, মেধা, সঞ্চয়, অকাতরে বিলিয়ে দেয়া হয়েছে, সেটাই কাল হয়ে যায় নিজের জন্য। অবহেলিত, নির্যাতিত এবং অনিরাপদ জীবন তখন তাঁর সংগী হয়ে যায়। পাশে যাদের থাকার কথা ছিলো, তারা বেশীরভাগ সময়েই আর পাশে থাকে না, আর নিজেরা তখন একেবারেই “একা” হয়ে যান। এই একা জীবনে নিজের নোংরা কাপড়টা ধোয়ার মানুষ থাকে না, খাবারটাও সঠিক সময়ে পরিবেশনের লোক থাকে না, পথ্য খাওয়ানোর কোনো মানুষ আর পাশে থাকে না, এমন কি নিজের যত্ন নিতে যে খরচ দরকার সেটাও আর হাতে থাকে না ইত্যাদি।

কে কিভাবে নিবে জানিনা, আমার মতে, সবার জীবনের সুরক্ষার জন্য সবসময় নিজের জন্য এমন একটা ব্যবস্থা করে রাখা দরকার যখন সব প্রকারের পেইড সার্ভিসে নিজেকে মানুষ সুরক্ষা দিতে পারে। আর সেই পেইড সার্ভিসের জন্য প্রয়োজন একটা ব্যালেন্স সঞ্চয়। এই পেইড সার্ভিসে সঠিক সময়ে পথ্য, কাপড় চোপড় ধোয়ার মানুষ, রান্না বান্নার দক্ষ লোক, যত্নাদি করা লোক সবই থাকতে পারে। যদিও তারা আপন কেউ না।

তাহলে যা দাড়ায়, তা হলো-জীবনের লক্ষ্য সেটাই হওয়া উচিত, “ব্যালেন্স সঞ্চয়” করা যাতে নিজের সব লোক আশেপাশে না থাকলেও সর্বপ্রকার পেইড সার্ভিস নিজেই ব্যবস্থা করতে পারেন এবং জীবন থাকে নিরাপদ। যারা এটা করতে পেরেছেন, তাদেরকে অনেকেই সার্থপর ভাবতে পারেন কিন্তু তারাই সঠিক কাজটি করেছেন বলে আমার বিশ্বাস। বৃদ্ধাশ্রম বলে আর কোনো অপশন আপনার জন্য প্রয়োজন পড়ে না।

নিজের জন্য করুন, নিজে বাচুন, তারপর অন্যের জন্য করুন। জীবন একটাই।

আজকে যাদের হাতে অনেক টাকাকড়ি নাই, কিন্তু হয়তো এসেট আছে। তাদের উচিত, আগে নিজের জন্য যথেষ্ঠ পরিমান ব্যালেন্স সঞ্চয় রেখে বাকীটা তাদের নিজের লোকদের জন্য রাখা। তাতে যেটা হবে, নিজে ভালোভাবে বাচতে পারবেন, কারো মুখাপেক্ষী হতে হবে না। একটা কথা তো ঠিক যে, নিজের অন্তর্ধানের পর এইসব এসেট, এইসব সম্পত্তির কোনো মুল্য আপনার জীবনে নেই। ঐসব তো করাই হয়েছে যাতে নিজে ভালো থাকা যায়, তাহলে দ্বিধা কেনো? কাজটা অনেক অনেক অনেক কঠিন।

একটা জিনিষ আমি সবসময়ই মনে করি যে, আমরা কোনো কিছুই আমাদের উত্তরসুড়িদের জন্য না রেখে গেলেও তারাই তাদের জীবন আলাদা করে গড়িয়ে নেবে, যেমন আমি আপনি গড়িয়ে নিয়েছি। তাদের ভবিষ্যতের চিন্তায় আজকে নিজেদের বর্তমানকে অবহেলা করে নিজেকে করুন জীবনে বসবাস বুদ্ধিমানের কাজ হয়তো নয়। তাতে সাহস কমে যায়, টেনশন বেড়ে যায়, আর এর কারনেই শরীর খারাপ হতে থাকে, আর শরীর খারাপ হতে থাকলেই আপনার সম্পত্তি বা এসেটের ভাগাভাগিতে উত্তরসুরীরা যতো দ্রুত সেটা নিজেদের করে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। আপনি আবারো আরেক দফায় একা হবেন। একমাত্র বয়ষ্ক ব্যক্তিরাই আরেক বয়ষ্ক ব্যক্তির ভালো বন্ধু হয়। জেনারেশন গ্যাপে নতুন পুরানো জেনারেশনের সাথে মিশে থাকা যায় বটে কিন্তু সেখানে প্রান থাকে না।

(বয়োবৃদ্ধ একজন অসহায় মানুষের গল্প শুনে এই লেখাটা, এটা কাউকে জ্ঞান কিংবা উপদেশ দেয়ার জন্য নয়। এই ফোরামে সম্ভবত এটাই আমার প্রথম লেখা, ভুল মার্জনীয় )

১২/০৭/২০২২-ওয়াকফ সম্পত্তি

ওয়াকফ সম্পত্তি কি এবং কার

বেশ কয়েকদিন যাবত একটা বিষয় নিয়ে লিখবো বলে ভাবছিলাম। কারন এই বিষয়টার ব্যাপারে আমরা হয়তো অনেকেই জানি কিন্তু না জানার মতো। আমি এই বিষয়টা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসকের সাথে বিস্তারীত কথা বলার পরে, এবং এ বিষয়ে বিস্তারীত আইন কানুন সম্পর্কে জানতে পেরে আমি নিজেও এই ওয়াকফ ব্যাপারটা নিয়ে খুবই সন্তুষ্ঠ।

ওয়াকফ হচ্ছে নিজের মালিকানাধীন সম্পদকে আল্লাহর মালিকানায় নিবেদিত করা। এর মাধ্যমে সম্পদের মালিকানা ব্যক্তির কাছ থেকে বিলুপ্ত হয়। অর্থাৎ ওয়াকফকৃত বস্তু কারো মালিকানায় প্রবেশ করা থেকে বেরিয়ে যাবে, শুধু বস্তুর উপকার যাদের জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে তাদের জন্য নির্ধারিত হবে।

ওয়াকফ দুই ধরনের হয়ঃ

(ক) ওয়াকফ ই লিল্লাহ

(খ) ওয়াকফ আল আওলাদ

ওয়াকফ-ই-লিল্লাহ জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত সম্পত্তি। এই সম্পদ থেকে তিনি বা তার বংশধর কোনো মুনাফা ফিরে পেতে পারে না। অন্যদিকে কোনো সম্পত্তির মালিক তার সম্পত্তি নির্দিষ্ট অংশ ধর্মীয়, সৎকাজ বা জনহিতকর কাজের জন্য ব্যয় করার উদ্দেশে দলিলের মাধ্যমে উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি দান করলে তাকে ওয়াকফ-আলাল-আওলাদ বলে।

ওয়াকফ সম্পত্তির মালিক ওয়াকফ প্রশাসক।

যিনি ওয়াকফ করলেন (যাকে বলা হয় ওয়াকিফ) তাঁর জিবদ্দশাতেও তিনি আর সেই ওয়াকফ করা সম্পত্তির মালিকনা থাকেন না। তিনিও আর ইচ্ছে করলে সেই ওয়াকফ করা সম্পত্তি কখনোই ফেরত নিতে পারেন না। একবার যদি কার্যকরীভাবে ওয়াকফ সম্পাদিত হয় তাহলে তা প্রত্যাহার কিংবা বাতিল করা যাবে না। উক্ত সম্পত্তির মালিক তখন ওয়াকফ প্রশাসক।

ওয়াকফ আল আওলাদের ব্যাপারে শুধুমাত্র যাদের জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে, তারা ওয়াকিফের জীবদ্ধশায় এবং ওয়াকিফের মৃত্যুর পরেও ওয়াকফ দলিল মোতাবেক সম্পত্তিতে উপকার পেতে পারেন। আর সেটাও নিশ্চিত করেন ওয়াকফ প্রশাসক।

ওয়াকফ প্রশাসকের তত্তাবধানে এবং ওয়াকফ দলিলে উল্লেখিত ওয়াকিফের শর্ত অনুযায়ী ওয়াকফ প্রশাসন ‘মুতোয়াল্লী” নিয়োগ করেন যিনি ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার জন্য নিযুক্ত। মুতাওয়ালি্ল কেবল সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আওলাদ হলেও সম্পত্তির মালিক নন। তিনি শুধু ওয়াকফ দলিলে উল্লেখিত তার জন্য নির্ধারিত অংশের ভোগকারী।

ওয়াকফকৃত সম্পত্তি কারো নিকট বিক্রয়, কিংবা একে হেবা বা মিরাসের (ওয়ারিশি) বিষয়বস্তু করা যায় না। তবে ওয়াকফ প্রশাসন যদি ক্ষেত্র বিশেষে এরুপ কোনো পদক্ষেপ নিতে চান, তা শুধুমাত্র ওয়াকফ প্রশাসক আইনের মধ্যে তা করতে পারেন।

ওয়াকফ আল আওলাদের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি ব্যাপার জানা অবশ্যই প্রয়োজনঃ

১.       ওয়াকফ দলিলে যে নিয়ম পদ্ধতি লেখা হয় তার কোনো প্রকার ব্যতিক্রম করা যাবে না।

২.       দলিলে সৎ কাজের জন্য যে অংশ নির্দিষ্ট আছে সে অংশ ঐ সব কাজে ব্যায় বা ব্যবহার করতে হবে।

৩.       শরীকদের বা আওলাদদের জন্য যেভাবে ভোগ দখলের নিয়ম উল্লেখ থাকবে শরীকগন/ আওলাদগন ঠিক সেভাবেই ভোগ দখলের অধিকারী হবে। কোনো আওলাদ কিংবা শরীক অন্য কোনো আওলাদ বা শরীকের ভোগ দখলে কোনো প্রকার বাধা দিতে পারবে না।

৪.       ওয়াকফ আল আওলাদের ওয়াকফ সম্পত্তির মধ্যে ওয়াকিফের আওলাদ কিংবা আওলাদের আওলাদগন শুধুমাত্র তাদের জন্য নির্ধারিত অংশেই ভোগ করার ক্ষমতা রাখেন। অন্য আওলাদ কিংবা আওলাদের আওলাদগন কোনো অংশেই অন্য কোনো আওলাদ বা তাদের আওলাদগনের ভোগ দখলের কোনো সুযোগ নাই।

৫.       ওয়াকফ আল আওলাদ সম্পত্তিতে ওয়াকিফ কর্তৃক যদি কোনো জেনারেশন উল্লেখ করে সীমাবদ্ধ না করেন (যেমন ৩য় জেনারেশন অবধি কিংবা ৪র্থ জেনারেশন অবধি ওয়াকফ আল আওলাদ করা হলো ইত্যাদি), তাহলে আওলাদের বংশধরগন বংশ পরম্পায় ভোগ দখলের জন্য উপযুক্ত থাকবেন।

৬.      সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য যেভাবে মোতাওয়াল্লী নিয়োগের বিধান রাখা হয় সেভাবে মোতাওয়াল্লী নিয়োগ হবে।

৭.       ওয়াক্ফ কমিশনারের অনুমতি সাপেক্ষে মোতাওয়ালী ওয়াকফ সম্পত্তির উন্নতির জন্য আংশিক হস্তান্তর করতে পারবেন। অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর হলে গ্রহীতার অনুকূলে স্বত্ত সৃষ্টি হবে না।

এখানে সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হচ্ছে- ওয়াকফ করা সম্পত্তিতে যে যাই কিছু করুক না কেনো, সেটা অবশ্যই ওয়াকফ প্রশাসনের অনুমতিতে করতে হবে। উদাহরন দেই-

ধরুন, ওয়াকফ আল আওলাদ হিসাবে কেউ তাদের অংশে বসবাসের জন্য যদিও অনুমোদিত কিন্তু তারাও ঐ সম্পদের উপর যে কোনো কিছু করার আগে ওয়াকফ প্রশাসনের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। যদি ওয়াকফ দলিলে আওলাদদের দ্বারা বিল্ডিং কিংবা ইমারত তৈরির অনুমতিও থাকে সেটাও ওয়াকফ প্রশাসকের অনুমতিসমেত করা আবশ্যক। অনুমতি ছাড়া যদি তারা ওখানে গাছ পালা বা বৃক্ষরাজী লাগান, কিংবা অস্থায়ী কোনো দেয়াল দেন, সেটা তারা দিতেই পারেন, কিন্তু সেটাও তখন ওয়াকফ প্রশাসনের সম্পত্তি বলে গন্য হবে। ফলে কেউ যদি সেই আরোপিত গাছ/বৃক্ষ কিংবা দেয়াল নিজেদের ইচ্ছায় কেটে ফেলতে বা ভাংতে চান, তাহলে ওয়াকফ প্রশাসনের অনুমতি বাধ্যতামুলক। কারন ওয়াকফ করা সম্পত্তি ওয়াকফ প্রশাসনের। মালিক তারা। আওলাদগন কোনো অবস্থাতেই মালিক নন, তারা শুধু ভোগকারী।

ব্যাপারটা এমন যে, কেউ রাস্তার ধারে কয়েক শত গাছ লাগালো , গাছগুলি বড় হলো, কিন্তু সেই ব্যক্তি সেই গাছগুলি আর নিজের ইচ্ছায় কাটতে পারে না, তখন রাস্তার ধারে লাগানো গাছগুলি সরকারের মালিকানায় চলে আসে। এটা যেইই লাগাক।

(চলবে)

09/07/2022-আপডেট (সাইফুল)

সাইফুলের বাসায় আমার যাওয়ার কথা ছিলো জুম্মা নামাজ পড়ে বাসা থেকে খাওয়া দাওয়া করে বিকেল ৪ টার মধ্যে। কিন্তু আমার স্ত্রীকে আমি নিয়ে যাবো (আমিই বলেছিলাম সে গেলে হয়তো ভাবীর পার্টটা জানার জন্য আমার সহায়ক হবে) বলে সেইই বল্লো যে, আমরা বিকেল ৫ টার পর রওয়ানা দিয়ে ওখানে গিয়ে মাগরেবের নামাজ পড়ে গল্প করতে পারবো। আর যেহেতু সাইফুলের বাসায় ডিনার করবো তাই সে মোতাবেক একটু দেরী করেই রওয়ানা হয়েছিলাম। মাগরেবের পর পরই আমরা সাইফুলের বাসায় গিয়ে হাজির হয়েছিলাম।

সাইফুল খুবই ভালো আছে আলহামদুলিল্লাহ। অনেক বছর পর ওর সাথে আমার আবার দেখা। সেই ক্যাডেট কলেজের পুরানো গল্প, আমি কিভাবে এক্ট্রোজেন হয়ে গেলাম সেই মজার মজার গল্প হলো। আমি আমার গল্প, আর সাইফুল সাইফুলের গল্পে সাথে ভাবীরা একেবারে দারুন একটা সন্ধ্যা কেটে গেলো আমাদের। কথার ফাক দিয়ে আমি আর সাইফুল আলাদা ওর নিজের রুমে বসে আরো কিছু ব্যক্তিগত কথা বললাম। সেখানে আসলে ওর চিকিতসা সংক্রান্ত বিশয়েই আলাপ হলো। যেহেতু সাইফুল এখনো সিগারেট খায় (যদিও খুব অল্প নিকোটিনযুক্ত) ফলে আমার কোনো অসুবিধা হয় নাই। আমাদের ব্যাচের প্রায় সবার খোজ খবর নিলো আমার কাছ থেকে। যতটুকু আমার কাছে ছিলো, সেটা ওর সাথে শেয়ার করেছি। মিজানের কথা, বাবলার কথা, কব্বর আলীর কথা, ফরিদ, ডন, বারী, লিংকন, সাগর, মাকসুদ, জুলু, ফিরোজ, সালু, জাহেদ, জাহিদ, এভাবে একে একে মুটামুটি ক্যাডেট নাম্বার ধরে ধরে সাইফুল সবার কথা জিজ্ঞেস করলো। মাহমুদের সাথে সাইফুলের প্রায়ই কথা হয় সেটাও জানালো। খুব ভালো একটা সময় কেটেছে। সাইফুল নিজেও সবাইকে মিস করছে বুঝতে পারলাম।

অনেক কথার মধ্যে আমার টার্গেট ছিলো সবসময় সাইফুলের সাস্থ্যগত ব্যাপারে গভীরভাবে জানা এবং সেটার ব্যাপারে ওর পরবর্তী পদক্ষেপগুলিকে পজিটিভভাবে উৎসাহ দেয়া। খুব ভালো লেগেছে যে, সাইফুল আগামী ঈদের পরে সে ইন্ডিয়া যেতে ইচ্ছুক (ইনশাল্লাহ)। আয়মানের স্কুলের সিডিউলটা জেনে হয়তো ঈদের পরে ইন্ডিয়ান এম্বেসী খুল্লেই সে ভিসার জন্য এপ্লাই করবে। আয়মানকে সাথে নিয়ে যাবে। আর যাবেন ভাবী। ক্লাস নাইনে পড়ুয়া আয়মান দারুন দায়িত্তশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। দেবী শেঠির কাছে সাইফুল ইনশাল্লাহ অপারেশন করাবে। আর এরজন্য সে মানসিকভাবে রাজী হয়েছে এবং প্রস্তুত হচ্ছে (আলহামদুলিল্লাহ)।

সংগত কারনেই সাইফুল মাঝে একটু বেশ মানসিকভাবে আপ্সেট ছিলো। এটা আমি হলেও হয়তো আপ্সেট থাকতাম। তাই ওকে বললাম, বন্ধুদের মাঝে থাকলে মন ভালো থাকে, সময়টা ভালো কাটে, আর এই বয়সে এসে বন্ধুরাই আসলে পরিবার। একটু ফান, একটু সিরিয়াস টক, সব কিছুই ভালো। ওকে যত দ্রুত সম্ভব এমসিসি ১৫ তে এড হতে বলেছি, সে রাজী হয়েছে। আমাদের এমসিসি ১৫ এর এডমিন কে বা কারা আমি জানি না। প্লিজ এড সাইফুল। আমিও ট্রাই করবো ওকে এড করতে। আমি সাইফুলকে সোস্যাল মিডিয়াতেও থাকতে বলেছি, কারন ফেসবুকে ওর একটা বিশাল ফেনগ্রুপ ছিলো, তারাও আমাকে অনেকবার নক করেছে সাইফুলের ব্যাপারে। তাই ওকে ফেসবুকেও আবার সাভাবিক থাকতে বলেছি। সাইফুল আবার আগের ফর্মে ব্যাক করবে ইনশাল্লাহ। সাইফুল অনেক ঝরঝরা আছে এখন মাশআল্লাহ। সাইফুল খুবই ভালো আছে এখন।

ওর সাথে সময়টা কাটাতে আমার যেমন ভালো লেগেছে, সাইফুলেরও অনেক ভালো একটা সময় কেটেছে। সাইফুল নিজের থেকেই ওর বাসায় দাওয়াত দিয়েছে সবাইকে। যে যখন পারো, সময় করে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে পারো, অথবা ওকে ফোনও দিতে পারো। ওর কাছে অনেকের ফোন নাম্বার এখন নাই। তাই হোয়াটসআপে এড করলে সাইফুল আবার সবার নাম্বারগুলি পেয়ে যাবে। তবে করোনা ওর জন্য বিপদজনক।  ফোনে ফোনে টাচে থাকাই এই মুহুর্তে নিরাপদ বলে আমি মনে করি।

ভাবী আমাদের জন্য চমৎকার চমৎকার রান্না করেছিলেন। আমরা সবাই একসাথে খেয়ে অনেক গল্প করেছি। ভাবীও খুব খুশী হয়েছেন। আমাদের এমসিসি বন্ধুরা ওর জন্য যে সবসময় দোয়া করছে এবং ওর ব্যাপারে জানার জন্য খোজ খবর নিচ্ছে, সে ব্যাপারে জানিয়েছি। বেশ অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম। তাই আর আপডেট দিতে পারিনি।

সাইফুল, ভাবীর আর আয়মানের সাথে কয়েকটি ছবি দিলাম।

(বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ আমার যাওয়া উপলক্ষ্যে নাকি সাইফুল একেবারে ক্লীন সেভ করেছিলো, তাই ওর খোচা খোচা দাড়ি নাই ছবিতে। চুলও নাকি কালো করতে চেয়েছিলো, আমি বললাম সাইফুলকে, চুল কালো না করলেও কিংবা ক্লীন সেভ না করলেও এমসিসির বন্ধুরা আজীবন ১২ আর ১৮ এর মধ্যেই আমাদের বয়স থাকবে, দারুন হাসাহাসি হয়েছিল ভাবীদের মধ্যে এটা নিয়ে, এটা একটা ফান নোট)

বন্ধুরা, তোমাদের সবার জন্য ঈদ মোবারক রইলো, সবাই ভালো থাকো ইনশাল্লাহ। Love you always.

১৪/০৫/২০২২-প্যারাডিম শিফট এবং ডমিনো ইফেক্ট

আজকে যে বিষয়টি নিয়ে আমি লিখতে চাচ্ছি- সেটার নাম প্যারাডাইম শিফট। এই প্যারাডাইম শিফটের সাথে ইউক্রেন, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদানের একটা সম্পর্ক আমি দেখতে পাই। তাহলে সংক্ষিপ্তভাবে জানা দরকার, এই প্যারাডাইম শিফটটা কি।

যখন সাভাবিক কোনো চিন্তাচেতনা কিংবা কার্যক্রম অন্য কোনো নতুন নিয়ম বা চিন্তা চেতনা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে দেখা যায়, তখন এই প্রতিস্থাপিত নতুন পরিবর্তিত চিন্তা চেতনাকেই প্যারাডাইম শিফট বলা হয়। অন্যঅর্থে যদি বলি-এটা হচ্ছে একটা মডেল, তত্ত্ব, বা দ্রিষ্টিভঙ্গি, ধারনা, কিংবা দৃষ্টান্ত যা প্রকৃত তত্ত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা মডেল থেকে ১৮০ ডিগ্রী উলটা। প্যারাডাইমটা আসলেই আসল জিনিষ না, এটা একটা মানষিক ভাবনার সাথে প্রকৃত সত্যের একটা শুধু কাল্পনিক ছবি। কোনো একটা জিনিষের ব্যাপারে আমরা যা ভাবছি, বা দেখছি এর সাথে সেই জিনিষটার যে রকম প্রকৃত বৈশিষ্ট , এই দুয়ের মাঝেই থাকে প্যারাডাইম তত্তটি। এই প্যারাডাইম দিয়ে মানুষ কোনো একটা ধারনা, চিন্তা চেতনা, কিংবা কোনো একটি জিনিষের ব্যাপারে একটা ধারনা পায়। যার প্যারাডাইম শিফট যত কম, সে ততো অরিজিনাল জিনিষের কাল্পনিক রুপ দেখতে পায়।

একটা উদাহরণ দেই- ধরুন আপনি একটা লোকের চেহাড়া দেখে ভাবলেন যে, সে একটা নিশ্চয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী। আপনার মন তাকে সেভাবেই ট্রিট করছে, সেভাবেই আপনি তাকে ওই খারাপ মানুষদের মধ্যে লিষ্ট করে ফেলেছেন। অনেকপরে যখন জানলেন যে, লোকটা ছিলো খুবই ভদ্র, ভালো ও খুবই অমায়িক এবং পরোপকারী। তখন আপনি অনেক মনোকষ্টে ভোগবেন। আফসোস হবে এই কারনে যে, আহ, সব কিছু না জেনে, না বুঝে কেনো আমি এমন একটা ভালো মানুষকে খুবই খারাপ ভেবেছি? এই যে নতুন ভাবনা আপনাকে আগের চিন্তাচেতনা থেকে হটাত করে ১৮০ ডিগ্রী উলটে গিয়ে আরেক নতুন ভাবনায় নিয়ে এলো, সেটাই প্যারাডাইম শিফট। থমাস কুন তার বিখ্যাত-“দি স্রাইাকচার অফ সায়েন্টিক রেভ্যুলেশন” বই এ প্রথম প্যারাডাইম শিফট শব্দটি চালু করেন। প্যারাডাইম যার যতো বেশি নিখুত, তার প্যারাডাইম শিফট ততো কম। আর যাদের এই প্যারাডাইম কোনো কিছুর ব্যাপারে প্রায় কাছাকাছি থাকে, তারা আসলেই জ্ঞানী এবং বাস্তববাদী। বর্তমান জগতে মানুষের প্যারাডাইম অনেক অনেক সত্যের থেকে বেশী দূরে বিধায়, আমাদের সমাজে ভুল সিদ্ধান্তে গন্ডোগোল বাড়ছে।

তাহলে এর সাথে ফিনল্যান্ড অথবা সুইডেনের বা ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগের সম্পর্ক কি?

কিছু খন্ড খন্ড ঘটনাকে খাতায় কষে বিশ্লেষন করলে দেখা যাবেঃ

(১)  ইউক্রেন CIS এর এসোসিয়েট মেম্বার। তারা প্রথম ইউরোপিয়ান দেশের সদস্য হবার জন্য অনুরোধ করে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বির মাসে। কিন্তু তাদের সেই অনুরোধ রক্ষা করা হয় নাই বিভিন্ন রাজনৈতিক বিবেচনায়, বিশেষ করে রাশিয়ার নাবোধক জবাবের কারনে।  শুধু তাইই নয়, এই আমেরিকাই ইউক্রেনে অবস্থিত নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডসহ পুরু নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করতে সাহাজ্য করেছিলো। তখন কিন্তু আমেরিকা বা পশ্চিমারা ইউক্রেনের প্রতি ততোটা ভালোবাসা প্রকাশ করে নাই। কারন তখন ইউক্রেনকে তাদের প্রয়োজন ছিলো না, প্রয়োজন ছিলো ওয়ার্শ জোট ভাংগার নিমিত্তে রাশিয়াকে খুশী করা। তাতে ইউক্রেনের পারমানিক ক্ষমতা বিলুপ্ত হলেও পশ্চিমাদের লোকসান নাই।

(২)        ইউক্রেন একটি সমৃদ্ধ শালী দেশ বিশেষ করে ভোজ্য তেল, খাদ্য কমোডিটি, স্টীল, সিরিয়াল, গম ভুট্টা, নিকেল, আয়রন ইত্যাদি। দিনে দিনে রাশিয়া তার ৯০ শতকের ধ্বস থেকে কাটিয়ে উঠে আবার আগের শক্তিতে ফিরে আসছে যা পশ্চিমাদের জন্য সুখকর নয়। তাই তাঁকে চেপে ধরার একটা এজেন্দা দরকার। ইউক্রেন একটা ভালো অপ্সন। কারন এটা রাশিয়ার একেবারেই গোড় দোরায়।

(৩)        আমি, আপনি হয়তো এতো গভীর স্তরে ভাবি না কিন্তু যারা আন্তর্জাতিক খেলোয়ার তারা ঠিকই খবর রাখে কোথায় কি হচ্ছে আর কেনো হচ্ছে। খেয়াল করে দেখলে দেখা যায়, ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করলো,  প্রো-ওয়েশটার্ন প্রেসিডেন্ট প্রোসেংকুকে আউট করে দিলো, জর্জয়ায় রাশিয়ার আগ্রাসন কে ঠেকালো না, ওসেটিয়ায়র অবস্থাও একই। চেচনিয়াও তাই। আমেরিকা কিছুই বল্লো না, না ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। একটা অতি জনপ্রিয় কমেডিয়ান এর আবির্ভাব হলো। প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলো যার কনো প্রকার পলিটিক্যাল অভিজ্ঞতাও নাই। কিন্তু সাহস ছিল। হটাত করেই জেলেনেস্কীর আগমন ঘটে নাই সিন গুলিতে। প্রোসেংকুকে আউট করার সময়ই এই আঘাতটা আসার কথা ছিলো কিন্তু তখন ব্যাপারটা ঘটে নাই কারন গ্লোবাল রিসেশনে পসচিমারাও কোন্ঠাসা। ইউরোপ তো আরো কোন্ঠাসা। They take time.

(৪) ইউক্রেনকে ভালোবেসে পশ্চিমারা গদগদ হয়ে এতো সাপোর্ট করছে এটা ভাওব্লে ভুল হবে। নিজদের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন লোন মাথায় রেখে কোনো দেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অন্য কোথাও ইনভেষ্ট করতে যায় না। এর পিছনে লাভ অবশ্যই থাকা দরকার। আর সেটার নাম জিরো-সাম গেম। Zero-sum games occur whenever the aggregate gain between winners and losers totals zero. আরেকটু পরিষ্কার করে বলি- জিরো-সাম গেমের সংগা হচ্ছে-নেট জিরো। আমি ধনী কারন আপনি গরীব, আমি গরীব কারন আপনি ধনী। আমি জিতেছি কারন আপনি হেরেছেন, আমি হেরেছি কারন আপনি জিতেছেন, ব্যাপারটা ঠিক এই রকমের। এরমানে এই যে, কোনো একটা ১০০% ভান্ডার থেকে আমি যখন ৫০% নিয়ে নেবো, আপনি আর কখনোই ওই ভান্ডার থেকে ইচ্ছে করলেও ১০০% নিতে পারবেন না। আমি যদি ওই ভান্ডার থেকে পুরু ১০০% নিয়ে নিতে পারি, আপনি পুরু ১০০% ই লস করবেন। আর এই কন্সেপ্টের কারনে পশ্চিমারা কখনো গনতন্ত্রের নামে, কখনো মানবাধীরকার নামে, কখনো বন্ধুপ্রতীম দেশ হিসাবে, কখনো কাউকে আগ্রাসীর বদনামে নিজেরা পাশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু মুল লক্ষ্য থাকে সেই সাহাজ্যার্থীর টোটাল ধন সম্পদের উপর অথবা তাঁকে সাহাজ্য করার নামে নিজেদের চিহ্নিত শত্রুকে নিঃশেষ করে দেয়া। ফলে যদি দেখেন ইরাক, আফগানিস্থান, বা লিবিয়া, প্যালেষ্টাইন, ইত্যাদির ঘটনাগুলি, সেখানে নিরাপত্তার নামে, সুষ্ঠ গন্তন্ত্রের নামে কিংবা সাধীন জীবনের প্রতিশ্রুতির নামে তাদের জীবনমান, সোস্যাল ফেব্রিক্স, লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। তাদের ধন সম্পদ লুট করা হয়েছে, এসেট বলতে সব কিছুই লুট করা হয়েছে। লাভ হয়েছে একজনের, সম পরিমান লস হয়েছে ওই দেশ গুলির। ওদের মেরুদন্ড ভেংগে দেয়া হয়েছে, কমান্ড ভেংগে দেয়া হয়েছে। ওখানে এখন কোনো কিছুই আর আগের মতো নাই। এটাই লাভ। আর ততটাই লসে হয়েছে সে সব দেশের যারা জিরো সাম গেমটা বুঝে নাই।

(৫) একবার খেয়াল করে দেখলে দেখা যাবে যে, যে পরিমান হাই লেবেলের রাষ্ট্র প্রধান, সিনেটর, ফার্ষ্ট লেডি, স্পিকার, মিনিষ্টার, সেক্রেটারি এত ঘন ঘন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সাথে বিপদজনক এক্টিভ যুদ্ধক্ষেত্রে শশরীরে দেখা করেছেন, এর কারন কি? এর কারন একটাই, তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দেয়া বা তাঁকে বলা যুদ্ধের জন্য শান্তিচুক্তি করা যাবে না। আমরা আছি তোমার পাশে। কোনো সমঝোতা করা যাবে না। তাই না কনো জাতিসংঘের কেউ, না কোনো ডিপ্লোমেট, না কোন পশ্চিমা নায়ক যুদ্ধ বন্ধের কোনো উদ্যোগ নিলেন। তারা যুদ্ধে কোনো সমঝোতা না করার পরামর্শ দিতেই এতো রিস্ক নিয়ে শশরীরে সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে এসেছেন।

(৬) বোকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সেই ফাদেই পা দিয়ে নিজের দেশের বেশ ক্ষতি করা শুরু করলেন। যত নিষেধাজ্ঞাই দিক, যত মিষ্টি কথাই বলুক, যত মহড়াই আশেপাশের দেশে কসরত করুক, কেউ কিন্তু ইউক্রেনের মাঠে নামলেন না। ৩০ টা দেশ, ৩০ টা আর্মি, ৩০ টা দেশের প্রধান সব মিলিয়ে তো একটা শক্তি অবশ্যই। যেখানে ন্যাটো তার আন্তর্জাতিক নিয়ম ভেংগে তার সদস্য সংগ্রহ করতে পারে, যেখানে কোনো আইন মানার ব্যাপারে তাদের কোনো পরোয়া নাই, এতো এতো মিউনিস্ক চুক্তি, এতো এতো শান্তি চুক্তি থাকা সত্তেও ন্যাটো বা ইউরোপিয়ানরা তাদের নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে,  অথচ ইউক্রেনের যুদ্ধকে কেউ সহজ করে দিলো না। কেউ মাঠে নামলো না। দুনিয়া এদিক সেদিক করে ফেলবে এমন কথাও বললেন তারা,  অস্ত্র দিলেন, টাকার পর টাকা দিলেন, আশ্বাস আর শান্তনার বানীর কোনো কমতি নাই। যে কোনো পরিস্থিতিতেই তারা ইউক্রেনের পাশে থাকবেই। কিন্তু একটা ‘নো ফ্লাই জোন করতে পারলেন না, না যুদ্ধ বিমান দিয়ে ইউক্রেনকে সাহাজ্য করা হলো। দিন তারিখ ফিক্সড করে দুনিয়ার সব রিকুয়েষ্ট অগ্রাহ্য করে আফগানিস্থান এটাক করা যায়, ইরাকে বোমার পর বোমা ফেলা যায় অথচ আধুনিক কিছু মিজাইল আর ভাড়াটিয়া এক্সপার্ট দিয়া ইউক্রেনকে সাপোর্ট দিয়ে রাশিয়ার ভিতরে কিংবা রাশিয়ার ইন্টারেষ্টেড স্থানে এটাক করা গেল না। যুদ্ধ যুদ্ধই। করতে পারতো। কিন্তু করা হয় নাই। জেলেনেস্কী বারবার আশাহত হয়েছে। তার ভাবনার সাথে সত্যিটা মিলছিলো না, এখনো মিলছে না। জেলেনেস্কীর জন্য- কি ভেবেছি আর কি হইলো?  এটাই প্যারাডাইম শিফট।

(৭)        আমি একটা লেখায় লিখেছিলাম যে, তেল গ্যাসের উপর ইউরোপিয়ানরা নিষেধাজ্ঞা দিলো বটে অথচ সেই নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইউক্রেন তো ইচ্ছে করলে ১ম দিন থেকে তাদের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গ্যাস বা তেলের পাইপ নিজেরাই বন্ধ করে দিতে পারতো। কিন্তু সেটা কিন্তু করে নাই। না ইউক্রেন করেছে, না ইউরোপিয়ানরা ইউক্রেনকে করতে বলেছে। ইউরোপিয়ানরা সেটা বন্ধ করতে বলে নাই কারন সেটা তাদের দরকার। নিষেধাজ্ঞা থাকবে কিন্তু তারা সেটা নিবেন। তাহলে নিষেধাজ্ঞা কিসের? প্রেসিডেন্ট কি এতো বোকা যে সে তার দেশের উপর দিয়ে যাওয়া পাইপ লাইন বন্ধ করতে পারতো না? তাঁকে আসলে সেটা করতে দেয়া হয় নাই। যুদ্ধের প্রায় ৫৬ দিন পর ইউক্রেন নিজের থেকে তাদের ডোনেস্ক এর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পাইপ লাইন বন্ধ করেছে। তাও আবার কাউকে না বলেই। অনেকটা জিদ্দে। কেউ কি মনে করেন তাতে ইউরোপিয়ানরা জেলেনেস্কীর উপরে খুব খুশী হয়েছে? একেবারেই নয়।

(৮) তাহলে জেলেনেস্কী এটা করলো কেনো? সে না প্রকাশ্যে বলতে পারছে অনেক গোপন কথা, না সে স্বাধীনভাবে নিতে পারছে নিজের সিদ্ধান্ত। ফলে সে একটা জিনিষ খুব ভালো করে বুঝে গেছে যে, যুদ্ধ যতোদিন বেশী চলবে, এই যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিজের দেশের জন্য তার কি করার ছিলো এটা যুদ্ধ শেষে তর্জমা হবেই। আর তখন বেরিয়ে আসবে কেনো সে বা তার কেবিনেট একক সিদ্ধান্ত নিতে পারে নাই, অন্তত সেই সব সাধারন নাগরিকদের জীবনের কথা চিন্তা করে যে, অনেক আগেই একটা আপোষের মাধ্যমে দেশটাকে পুরুপুরী ধংশের হাত থেকে বাচানো যেতো। তাই মাঝে মাঝে দেখা যায়, জেলেনেস্কী ইচ্ছামত জাতী সংঘকে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে তাদের অপারগতার কথা বর্ননা করে গালাগালীও করছে। এটাই আসলে প্যারাডাইম শিফট। কিন্তু তার এই প্যারাডিম শিফট আসতে সময় লেগেছে প্রায় দুই মাসের বেশী যে, সে যা ভেবেছিলো, আসলে সেটা সত্যি ছিলো না।  

এখন যেটা সুইডেন আর ফিনল্যান্ড ভাবছে, যে, তারা ন্যাটোতে জয়েন করলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তাদেরকে কেউ আঘাত করলে ন্যাটো ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের সব অস্ত্রপাতী নিয়া সুইডেন আর ফিন ল্যান্ডের জন্য ঝাপাইয়া পড়বে ইত্যাদি কিন্তু যেদিন ওরা দেখবে যে, আইনের মার প্যাচে, আর্টিকেল ৫, আর আর্টিক্যাল ১০ এর দোহাই দিয়ে ন্যাটো বলবে, এই আর্টিক্যাল গুলির বাধ্যবাধকতায় তো তারা বাধা, কিভাবে এটম বোম্ব দিয়ে রাশিয়াকে ঘায়েল করবে? তার থেকে নাও ১০০ বিলিয়ন ডলার লোন, কিংবা এই নাও সফিশটিকেটেড রাশিয়ার এন্টি ট্যাংক মিজাইল, মারো রাশিয়াকে, আমরা পাশের দেশে আমাদের আধুনিক যত্রপাতি লইয়া কসরত করিতেছি যেনো রাশিয়া ভয় পায়, কিন্তু রাশিয়া যেহেতু অস্তিত্ব সংকটে আছে, ফলে Do or Die ফর্মুলায় এই দুইদেশকে ক্রমাগত অনেকভাবে বিরক্ত করতেই থাকবে। তখন এই দুইটা দেশের মনে হবে, নাহ নিউট্রাল থাকাই সবচেয়ে ভালো ছিলো। ন্যাটোতে যোগ দেয়া ঠিক হয় নাই। মাঝখান দিয়ে একটা ডেস্পারেট রাশিয়ার রোষানলে নিজের সাজানো দেশটার শুধু ক্ষতিই করলাম।  সময় মতো ঐ সব প্রতিশ্রুতদেওয়া দলগুলি একই কাজ করবে যেটা তারা করেছে ইউক্রেনের জন্য। এটাই হবে সুইডেন আর ফিন ল্যান্দের জন্য প্যারাডাইম শিফট।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বা ন্যাটোর এই আন্তরীক আহবানে অভিভুত হয়ে তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা থেকে এতোটাই দূরে সরে গিয়েছে যে, মনে হয়েছে ওরাই ঠিক। আর এই ডমিনো ইফেক্টই সুইডেন আর ফিনল্যান্ড এখন ন্যাটোতে যোগদানের করে একটা বিপদের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।

রাশিয়া হয়তো এই মুহুর্তে সরাসরি তাদেরকে আক্রমন নাও করতে পারে কিন্তু পারষ্পরিক বাই লেটারাল সহযোগীতা, তেক গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই, কমোডিটি, পোর্ট ফ্যাসিলিটি, ইত্যাদি তো নষ্ট হবেই, ২৬০০ কিলোমিটার কমন বর্ডার কখনোই শান্ত থাকবে না। 

13/5/2022-সম্ভাবনা

প্রতিনিয়ত কারেন্সীর মান কমে গেলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকিং সেক্টরে সুদের হার বাড়ানো ছাড়া অনেক দেশের আর কোনো ইমিডিয়েট বিকল্প থাকে না। সেই প্রেক্ষাপট থেকে বলছি- হয়তো আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরেও এটা ঘটতে পারে।

অন্যদিকে গত কয়েকদিন আগে দেখলাম আমাদের দেশে গোল্ডের দাম কমেছে। গোল্ড যেহেতু কারেন্সীর ভ্যালু নির্নায়ক, ফলে ডলারের দাম বাড়ার সাথে গোল্ডের দাম কমার কোনো যুক্তি খুজে পাইনি। হতে পারে এটা ইনফ্লেশন থামানোর একটা সাময়িক কৌশল।

৩য় মহাযুদ্ধটা আসলে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। সেটা ইকোনোমিক্যাল ওয়ার। কোনো অস্ত্র ছাড়া দেশে দেশে এই গন্ডোগোল পাকাবে, আর এর সুযোগে একটা বিশাল পোলারাইজেশনের সৃষ্টি হবে।

ইউক্রেনের যুদ্ধটা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। একটা সুপার পাওয়ার গত ২২ বছর হোম ওয়ার্ক করে প্রস্তুতি নিয়েছে, সংগী বাছাই করে বলয় তৈরী করেছে, আরেক পক্ষ হুট করে কোনো হোম ওয়ার্ক না করে যখন যা ইচ্ছে সেটাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে। একটা অসম পরিকল্পনা মনে হচ্ছে।

একজন খুব ক্যালকুলেশন করে হম্বি তম্বি না করে কাজ করেই যাছে যেনো একটা সিনেমার দৃশ্য থেকে আরেকটা দৃশ্য সাজানো। অন্যজন এক গাদা সভা পরিষদ নিয়ে তাল মাতাল অবস্থা। বেশি ধরতে গিয়ে সব যেনো হাত থেকে সরে যাচ্ছে।

একটা প্রবাদ পড়েছিলাম A bird in hand is more worthy than that of two in the bush.

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দিন।

১৩/৫/২০২২-রকি কাহিনী

আমাদের বাসায় কুকুর পালন কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু গত কয়েকমাস আগে হটাত করে কোথা থেকে এক লোকাল কুকুর আমাদের বাসার সামনে এসে হাজির। সারাদিন বাসার সামনেই থাকে, পারলে গ্যারেজের মধ্যে নিজে থেকেই যেনো সেলফ ডিক্লেয়ারড পাহারায় থাকছে। তাঁকে নরম্যাল খাবার দিলে ছুয়েও দেখে না। কয়েকদিন চেষ্টা করেছি, ভাত, রুটি, কিংবা এই জাতীয় জিনিষ খেতে দিতে কিন্তু তার এমন একটা ভাব যেনো, ধুর!! কি দিছো এগুলি?

তারপর মাংস দিয়ে লবন দিয়ে মেখে একটা পরিষ্কার পাত্রে সাথে এক বাটি পানি দিলে উনি ধীরে ধীরে খেতে আসেন। তাও আবার পুরুটা তিনি খান না। একটু পেট ভরে গেলেই বাকী খাবারটা তিনি রেখে অন্যখানে গিয়ে পেট টানটান করে শুয়ে পড়েন। অনেক গবেষনা করছি এটা কোথা থেকে এলো, আর উদ্দেশ্যটা কি? আগেই বা কই ছিলো? শুনলাম পাশেই নাকি কোনো এক বাসায় থাকতো, ওখান থেকে তিনি রাগ করে এই যে এসেছে, ওদিকে সে আর ভুলেও যায় না।

এই কুকুরের আচরনে ইদানিং দেখি আমার বউ ওনার জন্যই শুধু মাংশ পাক করে। নাম রেখেছে আবার ‘রকি’। রকি বলে ডাক দিলেও আবার ফিরে তাকায়। আমার ডাক্তার মেয়ে আবার ওর জন্য মাঝে মাঝে খাবারও কিনে নিয়ে আসে। আর আমিও বাদ যাই নি। কয়েকদিন নিউ মার্কেটের “৬৫ টাকায় বিরিয়ানীর দোকান” থেকে বিরিয়ানিও কিনে এনেছিলাম। ফলে আমি যখন বাসায় গিয়া হাজির হই, ব্যাপারটা এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে, গাড়ি থেকে নামলেই একেবারে পায়ের কাছে ঘুর ঘুর করে আর যেনো বলতে থাকে- ‘আমার বিরিয়ানির প্যাকেট কই?’

তো গতকাল অনেক বৃষ্টি ছিলো। রকি সারাদিন গ্যারেজেই চার পা চার দিকে ছড়াইয়া নাক ডেকে মনে হয় ঘুমাচ্ছিলো। আমি বাসায় যাওয়ার পর, সে কোনো চোখ না খুলেই খালি লেজ নাড়ছিলো। ধমক দিলাম বটে কিন্তু তিনি এক চোখ খুলে দেখলো আমাকে আর লেজটা আরো একটু বেশী করে নাড়াইলো। ভাবখানা এই রকম, আরে বস, ডিস্টার্ব করো না।

গার্ডকে দিয়ে ওনার জন্য মুরগীর তরকারী আর এক প্লেট ভাত এনে খাওয়ানোর পর দেখি হটাত তার এই শারীরিক কসরত

7/5/2022-ফেসবুকে মিটুলের লেখা ৭ ই মে

আজ ৭মে আমার ও আখতারের জীবনের একটি বিশেষ দিন।বিবাহ বার্ষিকী নয়। তার চেয়েও অনেক মূল্যবান একটি দিন।

আমাদের লাভ ডে আজ।লিখতে চেয়েছিলাম না। কিন্তু না লিখে পারলাম না। কেননা আমি আজ সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি বন্ধুদের সাথে। মনে কিন্তু ঠিকই আছে!! এ কি ভোলার মত বিষয় আপনারাই বলেন!!

আমি অনেক ভালো আছি তাঁর সাথে, বর্ণনা করে বোঝাতে পারবো না।আমিও চেষ্টা করি আমার মানুষটিকে ভালো রাখবার। আসলে আমরা একে অপরকে রেসপেক্ট করি ও বোঝার চেষ্টা করি, যা মনের সুখের খোরাক জোগায় এবং খুবই দরকার।

তবে আমার চেয়ে আখতারই বেশি মূল্যায়ন করে আমাকে। আমার আনন্দ গুলো যেমন অন্তর দিয়ে উপভোগ করে, তেমনি আমার মন খারাপ বা কষ্ট কোনটাই তাঁর যেন ভালো লাগে না।অনেক স্বাধীনভাবে জীবন যাপণ করছি। তাই বলে আমি কখনও অবিশ্বাসের কোন কিছু করেছি বলে মনে পড়ছে না।আমাকে সব রকম পরামর্শ দেয় সব সময়, সেটা আর্থিক বা বৈষয়িক যে কোন বিষয়ে।

আমার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গাটি আখতার।আলহামদুলিল্লাহ।

আজ এই দূরে বসে সিলেটের লালা খালে তোলা বেশ কিছু ছবি আখতারের জন্য পোস্ট দিলাম।আজকের এই আনন্দগুলোও তাঁর জন্য পেয়েছি।বান্ধবীরা সিলেট যাচ্ছে বলতেই তিনি বলে বসলো-তুমিও যাও!!!

অ নে ক বড় মনের মানুষ আখতার।মহান আল্লাহ ওকে সুস্থ শরীরে মান সম্মানের সাথে দীর্ঘজীবি করুন এবং জানমালের নিরাপত্তা দিন সে দোয়া করি।

ফটো ক্রেডিট: আমার প্রাণের ১৫ জাবি বন্ধুরা।

সবাই আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন প্লিজ প্লিজ।

০২/০৫/২০২২-আজ রোজার শেষ দিন, কাল ঈদ

আজ এ বছরের রমজান মোবারক শেষ হয়ে যাবে। বয়স বাড়ছে, আর জীবনের উপর ভয়ও বাড়ছে, বাড়ছে দুসচিন্তা, কমছে শরীরের শক্তি, তার সাথে কমে যাচ্ছে নিজের উপর কনফিডেন্স। যেভাবেই হোক আর যখনই হোক, একটা সময় তো আসবেই যেদিন আমি আর থাকবো না। খুব মন খারাপ হয় যখন এটা ভাবি, অন্যের জন্য কতটা মন খারাপ হয় সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু নিজের উপরেই বেশী মন খারাপ হয় যে, ইশ, এতো সুন্দর একটা দুনিয়া ছেড়ে শেষ অবধি আমাকে চলেই যেতে হবে এমন একটা গন্তব্যে যার আমি কিছুই জানি না, দেখি নাই, এবং পুরুই খালী হাতে!! আর সবচেয়ে মন খারাপের দিকটা হচ্ছে- কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি আর আমার এই পুরানো স্থানে একটি মুহুর্তের জন্য ও ফিরে আসতে পারবো না, কোনো কিছুই আর আমি কারো কাছে দাবীও করতে পারবো না, এমন কি আমার তৈরী করা অট্টালিকা, আমার রেখে যাওয়া ব্যাংক ব্যালেন্স, আমার নিজের সব কিছুর কিছুই না। যখন জীবিত ছিলাম, তখন এগুলির সত্তাধীকারী আমি ছিলাম, কিন্তু যে মুহুর্তে আমি চলে যাবো, এর কোন কিছুই আর আমারটাই আমার না। এমন একটা জীবন ঈশ্বর আমাকে কেন দিলেন? শুধু কি পরীক্ষার জন্যই? আমি তো তার এই পরীক্ষায় কোনোদিনই পাশ করতে পারবো না যদি তিনি সঠিক নিয়য়ে আমার দলিল পত্র দেখতে থাকে। যদি পুরুই হয় আমার পাশের নাম্বার তার অনুগ্রহের উপর, তাহলে তিনি আমাকে আরো লম্বা, আরো লম্বা, তার থেকেও লম্বা একটা জীবন দিলেন না কেনো?

কি জানি? হয়তো এই জীবনের পরে আরেক যে জীবন আমার ঈশ্বর বরাদ্ধ রেখেছেন, সেটা হয়তো আরেক অধ্যায় যা আমাদের কারোই জানা নাই। পরীক্ষার তো অনেক গুলি ধাপ থাকে। হয়তো এই জীবনের শেষ যেই মৃত্যু দিয়ে, হতে পারে সেখান থেকে আরো একটা ধাপ শুরু। কেউ তো আর এ যাবত সেই ধাপ থেকে ফিরে এসে বলে নাই, তার কার্যপ্রনালী কি, কি সেই ধাপের নমুনা।

যাই হোক, যেটা বলছিলাম, খুব সুস্থ্য ভাবে ৩০ টি রোজা করার শক্তি আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আমি প্রতিবছর নিজের বাসায় দুইটা হাফেজ কে দিয়ে কোরান খতম তারাবি করি। কিন্তু গত দুই বছর করোনার কারনে সেটা পালন করা যায় নাই। আমি করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার স্ত্রী মিটুল তাতে বাধ সেধেছিলো ভয়ে। এবার আর কোনো কথা শুনতে চাইনি। হাফেজ ইসমাইল এবং হাফেজ মেহেদী নামে দুইটি বাচ্চা ছেলে আমাদের তারাবী লীড করেছিলো। ২০ রোজায় আমরা পুরু কোরান খতম করেছি (আলহামদুলিল্লাহ)

দোয়া কবুলের নমুনাঃ

আমার মাথায় আছে, আল্লাহ বলেছিলেন, আমি প্রতিদিন আমার রোজদার বান্দার ইফতারীর সমত যে কোনো ২ টি পজিটিভ ইচ্ছা বা দোয়া কবুল করতে প্রতিশ্রুত বদ্ধ। আমি এটা সব সময় মনে প্রানে বিশ্বাস করি এবং রোজার প্রথম দিন থেকেই আমি মোট ৬০ টি চাওয়া লিখে নেই। আমি জানি আমার জীবনে এই রকম ৬০ টি চাওয়া আসলে নাই। দেখা যায়, হয়তো ঘুরে ফিরে গোটা ১০ টি চাওয়াই থাকে। এ যাবত আমি আমার রবের কাছে কি কি চেয়েছিলাম, সেটা আর এখন বলছি না। তবে আমি স্পষ্ট দেখেছি, আমার প্রায় সব গুলি ইচ্ছা আল্লাহ পুরুন করেছেন। তিনি আমাকে চাকুরীর পর ব্যবসা করতে দিয়েছেন, কারো কাছেই আমার হাত পাততে হয় নাই, আমার সন্তানদেরকে তিনি সুস্থ্য রেখেছেন, মানুষের কাছে তিনি আমাকে সম্মানের সহিত রেখেছেন। অনেক কিছু করেছে আমার রব।  

গত বছর আমি খুব মনে প্রানে প্রায় প্রতিটি রোজায় আল্লাহর কাছে এই দোয়াটি করেছিলাম যেনো আমাকে তিনি ঋণ গ্রস্থ জীবন থেকে উদ্ধার করেন। কারন আমি আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজে জন্য বেশ কিছু লোনে জর্জ্রীত হয়ে গিয়েছিলাম। এই বছরে রোজার আগেই আল্লাহ আমাকে সম্পুর্ন লোন থেকে মুক্ত করেছে। এবারই প্রথম আমি লোন মুক্ত জীবনে পা দিয়ে একটা বড় সঞ্চয়ের পথে আছি। আমার ছোট মেয়েকে আমি আগামী ২ বছরের অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছি আমেরিকায় পরার জন্য। বড় মেয়ের জন্যেও একটা সঞ্চয় আমি করতে পেরেছি। আমার নিজের জন্যেও করতে পেরেছি। এর থেকে আর কত সুখী রাখবেন আমার রব আমাকে? আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।

এবার রোজায় আমি শুধু আমার মৃত আত্তীয় স্বজনের জন্য, আমার মেয়েদের জন্য, আমার স্ত্রীদের জন্য, আর আমার ব্যবসার জন্য প্রতিদিন দোয়া করেছি। আর আমি মনে প্রানে চেয়েছি যে, আমি যেনো সম্পুর্ন হোম ওয়ার্ক করে তারপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। আমি আমার সেই হোম ওয়ার্কের মধ্যেই এখন আছি। আমি সেই হোম ওয়ার্কের সময়কাল ধরেছি আরো ৬ বছর। ৬৩ বছর আয়ুষ্কাল পর্যন্ত যেহেতু আমাদের নবী ৬৩ বছরের বেশী বেচে ছিলেন না, তাই আমিও ধরে নিয়েছি আমারো ৬৩ বছরের বেশী বেচে থাকার ইচ্ছা করা উচিত না।

গত ঈদে আমার ছোট মেয়ে আমাদের সাথে ছিলো, এবার সে আমাদের সাথে নাই। সে এখন আমেরিকায়। আগামিতে আবার কে কার সাথে থাকবে না, কে জানে? উম্মিকার একটা বিয়ে হ ওয়া দরকার। উম্মিকাকে নিয়ে একবার একটা মারাত্তক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বিয়েটা টিকে নাই। তাই এবার আর আমি ওর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই দিবো না। এতে যখন ওর বিয়ে হয় হোক। এবার আমি প্রদিন উম্মিকার জন্য ওর বিয়ের জন্য, একটা ভালো পাত্রের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি।

২০/০৪/২০২২-আমার মৃত্যুর তারিখ (ফুটার) (রঙ লেপা পাঠক)

এ দুনিয়ায় যত রহস্য আছে, তার সবচেয়ে বড় রহস্য কে কবে এই দুনিয়া ত্যাগ করবে তার দিনক্ষন না জানা। আজো পর্যন্ত কোন বিজ্ঞান, কোনো দার্শন, কোন মনিষী কিংবা কোনো ধর্মজাজক কেউ জীবন থেকে চিরতরে চলে যাওয়ার দিনক্ষন বলতে পারেনি। ঈশ্বর সে ক্ষমতা কাউকে দেননি। কেনো দেননি?

কেনো দেন নাই এ প্রশ্ন যদি করি তাহলে ব্যাপারটা অনেক কিছুর সমাধান চলে আসে। মানুষ লোভী হতে পারতো না, মানুষ স্বাধীনভাবে যা খুশী করতে পারতো না। অন্যায় করতে পারতো না, সারাক্ষন সে শুধু ঈশ্বরের আরাধনাতেই মগ্ন থাকতো, ঘুষ বানিজ্য, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সব কিছুতেই তার হোমওয়ার্ক হিসাবে সীমারেখা টেনে ফেলতো। যা হয়তো বিধাতা দিতে চান নাই। বিধাতা চেয়েছেন, মৃত্যুর এই তারিখের রহস্য নিজের হাতে রেখে মানুষের ইচ্ছার লাগামকে মানুষের হাতে ছেড়ে দিতে কিন্তু তারপরেও আমার মাঝে মাঝে এই প্রশ্নটা আসে, আসলেই কি আমাদেরকে সেই ক্ষমতা বিধাতা দেন নাই নাকি আমরা জানি কিন্তু বুঝতে চাই না?

এই প্রশ্নটা আমি কাউকে কখনো করি নাই কারন আমি জানি এর উত্তর কারো কাছেই নাই। কিন্তু আমাকে আমি এই প্রশ্নটা অনেকবার করেছি, করেছি শুধু জানতে, কোথায় এর আসল রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন বিধাতা? ধরে নেই, আমি এর উত্তর জানি। তাহলে এর ব্যাখ্যা কি? এই ব্যাখ্যায় যারা বিশ্বাস করবেন, তাদের জন্য শুধু এই লেখা। আর এটা শুধুই আমার মতামত।

আমি একজন মুসলমান, তাই আমি আল্লাহর বানী, আল্লাহর রাসুল এবং রাসুলের সমস্ত কথা মনে প্রানে কোনো প্রশ্ন ব্যতিরেকে বিশ্বাস করি। সেই বিশ্বাস থেকেই বলছি যে-

আল্লাহ বলেছেন, তিনি এই দুনিয়া সৃষ্টি করতেন না, যদি না তিনি তাঁর হাবীব আমাদের রাসুলকে সৃষ্টি না করতেন। আবার এটাও তিনি সমস্ত মানব জাতীকে বলেছেন-কুল ইন কুন্তুম তুহিব্বুন আল্লাহ, ফাত্তা বিউনি ইউহাবীব কুমুল্লাহ। মানে যদি তোমরা আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আমার হাবীবকে ভালোবাসো। আমার হাবিবকে অনুসরন করো। এর মানে কিন্তু একটা। আর সেটা হলো আমাদের রাসুলের সমস্ত জীবন আমাদের মডেল। তাঁর আচার, আচরন, ব্যবহার, কথাবার্তা, চলাফেরা, আরাধনা, নীতি, বৈশিষ্ঠ, সব কিছুকেই অনুসরন করা।

আমাদের রাসুলের থেকে প্রিয় বান্দা আল্লাহর কাছে আর কেউ নাই এবং ছিলোও না। আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন, আমাদের রাসুলকে তিনি আজীবন বা হাজার বছর পর্যন্ত বাচিয়ে রাখতে পারতেন। কিন্তু তার এতো প্রিয় বান্দাকে তিনি সেটাও করেন নাই। তাকে তিনি একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তার কাছে নিয়ে গেছেন। যাকে তিনি এতো ভালোবাসেন, যার জন্য তার এতো সব আয়োজন, যাকে ঘিরে তিনি পুরু বিশ্বকে সাজিয়েছেন, আর কাউকে না হোক যাকে তিনি জীবদ্দশায় তাঁর সেই আরশ মোবারক, সমস্ত আসমান জমীন, কুরসি সহ সমস্ত অদেখা, অজানা বিশ্বকে ভিআইপির মর্যাদায় নিজে বোরাক পাঠিয়ে দেখালেন, দেখা করলেন, সেই তাঁকেই তিনি এই পৃথিবীতে জীবিত রেখেছিলেন মাত্র ৬৩ বছর!!

আর সেই আমি তো তাঁর কাছে কিছুইনা। তাহলে আমার আল্লাহ আমাকে ৬৩ বছরে বেশী কেনো জীবিত রাখবেন? রাখতেও পারেন, তবে সেটা তাঁর ইচ্ছে। আবার তার আগেই তিনি আমাকে উঠিয়েও নিতে পারেন, সেটাও তাঁর ইচ্ছে। কিন্তু আমি যেহেতু জানি না আমার সময়কালটা কতদিনের, তাই আপাতদৃষ্টিতে আমি ধরেই নেই, আমিও ৬৩ বছরের বেশী এই নশ্বর দুনিয়াতে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নাই। এই সময়ের সীমারেখা ধরেই আমার সমস্ত হোমওয়ার্ক, আমার সমস্ত প্ল্যানিং করা উচিত। যদি এর থেকে বেশীদিন আল্লাহ আমাকে রাখেন, সেটা হবে আমার জন্য বোনাস। আর যদি এর থেকে কম সময়ের মধ্যে আমার ডাক পড়ে সেটাও আমার বিধাতার ইচ্ছা। আমি তার ইচ্ছার বাইরে এক সেকেন্ডও থাকার অধিকার রাখি না। এমনো তো হতে পারে যে, ৬৩ বছরের পরের সময়টায় আমাকে অন্য কিছু, অন্য কোনো এসাইনমেন্টের জন্যই রাখা হয়েছে!!

যদি এই হিসাব ঠিক রাখি, তাহলে আমিও আর এই দুনিয়াতে খুব বেশিদিন নাই। আমি একেবারে দিঙ্কখন বলে দিতে পারি, আমি কবে আপ্নাদেরকে অফিশিয়ালি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তাই আমি সেই দিন তারিখ মাথায় রেখে আমার প্রতিদিনের হোম ওয়ার্ক করি, সিডিউল বানাই এবং যাবতীয় সব কিছু গুছাই। কোথাও বেড়াতে গেলেও তো আমি আমার একটা ব্যাগ গুছাই, টিকেট নেই, সময় ধরে যাত্রা করি। আমি ঠিক সেটাই করছি। আমি এটাও জানি আজ থেকে কয়েক যুগ পরে আমার নামটা যেমন মুছে যাবে, আমার জন্য দোয়া করার মানুষও আর থাকবে না। তাই আমি চেষ্টা করি, আমার জন্য যেনো সদ্গায়ে জারিয়া হিসাবে আমিই এমন কিছু করে যাই যেখানে কেউ আমার জন্য দোয়া করুক বা না করুক, আমার কষ্টার্জিত সম্পদ যেন সেই সদ্গায়ে জারিয়ার কাজ করে। কারন তখন আমার সেটাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

এরপরে কে আমাকে মনে রাখবে, কে আমার জন্য দোয়া করবে, আমার স্থান কোথায় হবে, আমার কর্মফলের কারনে কে কোথায় কিভাবে আমাকে মুল্যায়ন করবে তার দায়ীত্ত আমার আসলেই নাই। আমি আসলে সদা প্রস্তুত। বাকীটা তিনি জানেন।

২৬/০২/২০২২-আল-আবরার হাসপাতাল এন্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার, মানিকগঞ্জ

সৎ এবং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির নিমিত্তে এবং মানব জাতীর কল্যানে যে কোনো কাজেই আল্লাহ মানুষকে সফলতা দিবেন এই আশায় আমরা গুটিকতক মানুষ মহিলাদের চিকিৎসা শুধুমাত্র মহিলা ডাক্তার এবং পুরুষদের চিকিৎসা শুধুমাত্র পুরুষ ডাক্তারদের দ্বারা শরিয়া ভিত্তিতে করার নিয়তে আল আবরার হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মানিকগঞ্জ সিটি সেন্টারে দুটু ফ্লোর নিয়ে গত এপ্রিল ২০২১ এ কাজ শুরু করেছি। এতোদিন সিটি সেন্টারের দুটু তলা নিয়ে আল আবরার হাসপাতালের সমস্ত কার্যক্রম ভাড়ায় পরিচালিত হতো। আজ সব শেয়ারহোল্ডারদের সমন্নয়ে সেই দুটু ফ্লোর সবার সহযোগীতায় ক্রয় করার প্রস্তাব গ্রহন করেছি (আল হামদুলিল্লাহ)। এখানে আমরা গরীব দুস্থদেরকে বিনে পয়সায় এবং অন্যান্য রোগীদেরকে ন্যনুতম ব্যয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করি। সবাই দোয়া করবেন যেনো আল্লাহ এটাকে কবুল করেন। 

20/02/2022-গেট টুগেদার এম সি সি

গত ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২২ তারিখে আমার আরেক বন্ধু প্রোফেসর শাহরিয়ার বহুদিন পরে ঢাকায় এসেছিলো কানাডা থেকে। কানাডাতেই সেটেল্ড সে। অনেকদিন দেখা হয় নাই ওর সাথে। তাই আমি আমার সব বন্ধুদেরকে শাহরিয়ারের আগমনে ওয়েষ্টিনে একটা দাওয়াত করেছিলাম। আমাদের মির্জাপুর ক্যাডেট ১৫ তম ব্যাচের ৫৩ জন ক্লাশমেটের মধ্যে ঢাকায় থাকে এমন ১৪ জন মিলিত হয়েছিলাম। জম্পেশ আড্ডা হয়েছিলো। উক্ত গেদারিং এ উপস্থিত ছিলাম- ফিরোজ মাহমুদ (মাইক্রোসফটের কান্ট্রি ডাইরেক্টর) , মেজর আখতারুজ্জামান (বিটিভির ইংরেজী খবর পাঠক), ব্রিগেডিয়ার জাহেদ (ওয়েষ্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং), মেজর আসাদ (বিখ্যাত লেখক), ডাঃ মনজুর মাহমুদ (প্রোফেসর পিজি), আব্দুল্লাহ হেল কাফি (মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এন্ড মেরিন ক্যাপ্টেন), আরেক মনজুরুল আলম (স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যংক), রিজওয়ানুল আলম (বিখ্যাত সাংবাদিক এবং প্রোফেসর অন জার্নালিজম), মোর্শেদ এনাম (ইঞ্জিনিয়ার এবং বিখ্যাত লেখক, দাবারু আবুল মনসুরে সাহেবের বড় নাতী) এবং আমার আরেক বন্ধু ফয়সাল। দারুন উপভোগ করেছি সবার সান্নিধ্য।

এদিন আরেকটা ভীষন ভালো একটা ব্যাপার ঘটে গেলো। সেটা একটা অনুবাদ।

তাঁর আগে একটা কথা বলে নেই যে, কোনো বিখ্যাত লেখকের বই অনুবাদ করতে গেলে প্রথমে যেটা প্রয়োজন সেটা হলো, অরিজিনাল লেখক কখন কোন শব্দ বা লাইন বা উক্তি দিয়ে কি বলতে চাইছেন সেটা লেখকের মতো করে বুঝতে শেখা এবং সে মোতাবেক হুবহু ভাষান্তর পাঠকের জন্য তা অনুবাদ করা। যদি এর মধ্যে কোনো ব্যত্যয় ঘটে তাহলে হয় অনুবাদকের নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা অরিজিনাল লেখকের মুল বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। শুধুমাত্র আক্ষরীক শব্দকে অন্য ভাষায় রুপান্তরীত করলেই অনুবাদক হওয়া যায় না। জনাব মাহমুদ (আমার মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের বন্ধু এবং খুব প্রিয় আমার একজন মানুষ) একটা কঠিন কাজ হাতে নিয়েছেন। ডঃ ইয়াসির কাদিরের ভিডিও বক্তব্য এবং তাঁর কিছু লিখিত সংস্করণের উপর ভিত্তি করে আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সঃ) উপর তিন খন্ডের মধ্যে ১ম খন্ডটি সমাপ্ত করেছেন। বইটির নাম “মহানবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবন ও সময়” আমি অনেক অনুবাদ পড়েছি, অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত বই এর বাঙলা কিংবা ইংরেজী অনুবাদ পড়েছি, মাহমুদের এই বইটি একটি অসাধারন অনুবাদ হয়েছে। আমি অন লাইনে ডঃ ইয়াসির কাদির বক্তব্য শুনেছি এবং শুনি। আমার বন্ধু মাহমুদের এই উক্ত অনুবাদটি একদম ডঃ ইয়াসির যা যেভাবে বলতে চেয়েছেন, মাহমুদ সেটা পুনহখানুপুঙ্খ ভাবেই তুলে ধরেছেন।

আমি প্রচূর বই পড়ি, বই পড়া আমার একটা নেশার মতো। আমি মাহমুদের এই বইটার প্রায় ৩০% পড়ে ফেলেছি। নেশার মতো পড়ে যাচ্ছি। অতীব সাবলীলভাবে মাহমুদ অনুবাদটি করেছে। পড়তে খুব ভালো লাগছে।

অনেক ধন্যবাদ তোদের সবাইকে।

আপ্নারা যারা আমাদের মহানবী হজ রত মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবনী এবং তাঁর সময়কালটা আক্ষরীক অর্থে বোধ গম্য ভাষায় জানতে চান, কিনতে পারেন। এটা Worth Buying Good Book.

ধন্যবাদ মাহমুদ তোকে আর ধন্যবাদ শাহরিয়ারকে যার কারনে একটা চমৎকার গুড গেদারিং হয়েছে। আর ধন্যবাদ আমার সব বন্ধুদের যারা সময়টাকে নিয়ে গিয়েছিলো প্রায় ৪৪ বছর আগে। আর মাহমুদের বইটা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলো প্রায় ১৪০০ বছর আগে।

আমি তোদের সবাইকে খুব ভালোবাসি।

১৯/০২/২০২২-স্বাস্থ্যসচীব লোকমান ভাই একদিন অফিসে

হটাত করে ফোন করলেন আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের স্বাস্থ্যসচীব লোকমান ভাই (Senior Secretary, at Ministry of Health & Family Welfare-MOHFW, Bangladesh)। অনেকবার দাওয়াত করার পরেও ভীষন ব্যস্ততার কারনে গত দুই বছরের মধ্যে আসতে পারেন নাই। সম্ভবত একবার এসেছিলেন ২০১৪ কিংবা ২০১৫ সালের মাঝামাঝি। আজ এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন কোনো এক কাজে। সুযোগটা মিস করেন নাই। ভীশন খুশী হয়েছি লোকমান ভাইকে অফিসে পেয়ে। তখন একটা মিটিং করছিলাম, কিন্তু লোকমান ভাইকে সময় দেয়াটা আমার কাছে প্রাইয়োরিটি মনে হচ্ছিলো। একসাথে লাঞ্চ করলাম, প্রায় দুই ঘন্টার মতো বেশ ভালো একটা সময় কাটিয়েছি।

২০১৯ সালে করোনার আগে উনি যখন খুলনার ডিভিশনাল কমিশানার ছিলেন, তখন ওই এলাকার প্রায় সবগুলি ডিষ্ট্রিক্ট আমি ভিজিট করেছিলাম উনার এডমিন সাপোর্টে। ময়মনসিংহ এ যখন ডিসি ছিলেন, তখনো বেড়াতে গিয়েছিলাম পরিবারসহ। অসম্ভব একজন মিশুক মানুষ।

লোকমান ভাইয়ের সবচেয়ে চমৎকার গুনের মধ্যে একটি হচ্ছে- He is the son of his soil of Gournodi. একজন মানুষ যখন আল্লাহর রহমতে উত্তোরোত্তর ভালো পজিশনে উঠে, তখন অনেকেই (সবাই না) আর সেই নাড়ির টান অনুভব করেন না কিন্তু লোকমান ভাই একজন সম্পুর্ন আলাদা মানুষ। তিনি তাঁর গ্রামকে ভুলে যান নাই, তাঁর সেই চেনা-অচেনা গ্রামের মানুষগুলিকে ভুলে থাকেন না, বিপদে আপদের সার্বোক্ষনিক পাশে থাকেন, সরকার সেই এলাকার উন্নতি তাঁর গতিতে করলেও লোকমান ভাই, তাঁর নিজের চেষ্টায় সবাইকে অকাতরে ন্যায়ের মধ্যে থেকে সাহাজ্য করেন। শীতে শীতার্ত কাপড়, বেকার ছেলেদের কর্মসংস্থান, গরীব পরিবারের সন্তানদের পড়াশুনার সাহাজ্য, কোনটায় তাঁর হাত পড়ে নাই? অত্যান্ত সৎ এবং সজ্জন ব্যক্তি এই লোকমান ভাই। তাঁর প্রোফেশনাল এফিসিয়েন্সীর কথা না হয় নাইই বললাম, বর্তমান সময়ে দেশের এতো টীকার প্রোকিউরমেন্ট কিংবা অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তাঁর চমৎকার প্রোফেশনালিজম।

লোকমান ভাইয়ের সাথে উনার আরেক বন্ধু এসেছিলেন, তাঁর নাম জিন্নাত ভাই। খুব ভালো একটা সময় কাটালাম আমার অফিসে বহুদিন পর। ধন্যবাদ লোকমান ভাই।

১৮/০২/২০২২-আমার বাগানের আলু

বাগান করিতে গিয়া একবার মিষ্টি আলুর কয়েকটা ডগা লাগাইয়াছিলাম। যত্ন করি নাই, পরিচর্যাও তেমন করা হয় নাই। ধীরে ধীরে কবে কখন চোখের আড়ালে মাটির নীচে তিনি এত বড় হইয়া উঠিয়াছে জানিতেও পারি নাই। বাগান আলু পাতায় ভরিয়া উঠিতেছে ভাবিয়া উহা সমুলে নির্মুল করিতে গিয়া এই আলুখানা চোখে পড়িলো। কখন কিভাবে যে এত অনাদরেও সবার অলক্ষ্যে সে এত বড় হইয়া উঠিয়াছে কেহই জানিতে পারে নাই। এখন তাহাদের বংশ সহ জীবন ধংসের মুখে। কেমন যেনো মনে হইতেছিলো। তখন মনে বড্ড কষ্ট হইতে লাগিলো এই ভাবিয়া যে, আহা এই ক্ষুদ্র বোবা উদ্ভিদ তৃনলতার মতো মেরুদন্ডহীন লতাটাকে বাগানে রাখিয়া দিলেও পারিতাম। কারন এরাও ফল দেয়, আর এই ফল মুল্যহীন নয়। বাগানে কেহই অনর্থক বা মুল্যহীন নয়।

চোখ বুজিয়া আমি যেনো আমাদের সমাজের বৃহত বাগানের চিত্রটি দেখিতে পাইলাম। অনেক কিছুই ফুটিয়া উঠিলো। এখানে সবাই কোনো না কোনো সময়ে নিজের আপন চেষ্টায়, গোপনে সবার অলক্ষ্যে বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সে যত অবহেলিতই হোক, কিংবা অনাদর। মালি কিংবা মালিক কারো কোনো পরিচর্যা ছাড়াও কোনো কোনো প্রজাতি এই ধরায় অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রান যুদ্ধ করেই পতবর্তী প্রজন্মের জন্য ফল দেয়। কেউ ফেলনা নয়। এটা হয়তো ফিলোসোফির একটা দিক বা মুদ্রার।

কেউ কেউ আবার এই বড় মিষ্টি আলুটির চেহাড়া সুরুত আর সাইজ দেখিয়া ইহাও বলিতে পারেন, এই বেটা একটা আলুই শুধু এতো মোটা আর বড় হইলো কেনো? অন্যগুলি না কেনো? সেই ফিলোসোফি যদি বলি- হতে পারে যে, এই একটা আলুই বাগানের যাবতিয় সুখ আর খাদ্য একাই খাইয়া এতো বড় হইয়াছে যাহার ফলে অন্য আলুগুলির ভাগ্য রোহিংগাদের মতো। এই বড় আলুটি শুধু নিজের কথাই ভাবিয়াছে আর ভাবিয়াছে, এই পৃথিবীতে কে কাহার? আগে নিজে বড় হই, তারপর দেখা যাবে। কিন্তু যখন কোনো গোত্রের মধ্যে বিপদ আসিয়া হাজির হয়, তখন কে কত বড় আর কে কত ছোট তাহা ভাবিয়া বিপদ আসে না। তখন ছোটবড় সবাই একত্রে মরিতে হয়। অথবা যিনি সবচেয়ে বড় তাহাকেই আগে কতল করা হয়।

তাই গোত্রের সবাইকে নিয়া একত্রে বড় হওয়া একটা নিরাপত্তার ব্যাপার থাকে। নতুবা এই ছোট আলুগুলির থেকে বেশী নজর থাকে সবার বড় আলুর দিকে। ইহাকেই আমরা আজ প্রথম সিদ্ধ করিবো। বাকিগুলি হয়তো আবার কোনো না কোনো বন-জংগলে ফেলিয়া দেবো, কারন তাহাদের প্রতি আমাদের মতো মালি বা মালিকের খুব বেশী ইন্টারেস্ট নাই। ফলে, এই কারনে কোনো একদিন তাহারাই আবার বংশ বিস্তার করিয়া তাহাদের অস্থিত্ত বজায় রাখিবে।

আরেক দল আবার ভিন্ন একখানা মতবাদ লইয়া এই আলুর উপর কিছু দোষ চাপাইয়া নিজেরা পার পাইতে চেষ্টা করেন। কারো কারো ব্যক্তিগত দোষের কারন কেনো বা কি মনে করিয়া এই নীরিহ বোবা একটা আলুকে দোষারুপ করেন তাহা আমি আজো বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। কিছু হইলেই মানুষ ‘আলুর দোষ’ বলিয়া চালাইয়া দেন। অথচ এই বোবা আলুটি সারাজীবন সবার অলক্ষ্যেই বসবাস করে। হইতে পারে, গোপনভাবে থাকার এই বইশিষ্ঠই মানুষের আলুর সাথে মিল থাকার সব দোষ এই নন্দ ঘোষের উপর পড়ে।

মোরাল অফ আলুঃ

একাই শুধু খাইয়া বড় হইয়েন না, বিপদ আছে তাহলে।

আলুর প্রতি এতো ঝুকে যাইয়েন না, তাহলেও বিপদ হইতে পারে।

আলুর যত্ন নিন। আলুকে ভালোবাসুন।

১৩/০১/২০২২-বেলায়েত ভাই Meeting Fourth Generation

“কিছু কথা আছে যা বলতে চাই নাই কিন্তু বলা হয়ে যায়, কিছু কথা ছিলো, বলতে চেয়েছি, অথচ বলা যায় নাই, কিছু সপ্ন ছিলো যা দেখতেই চাই নাই কিন্তু দেখতে হয়েছে আবার কিছু এমন সপ্ন ছিলো সব সময় দেখতে চেয়েছি কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় নাই এমন কিছু শখ ছিলো সারাজীবন লালন করেছি কিন্তু জীবনের শেষ তীরে এসেও সেটা ধরা দেয় নাই আবার এমন কিছু ভয় ছিলো যা একেবারেই কাম্য নয় অথচ তা আমি এড়িয়েই যেতে পারিনি কী কারনে আবার এই কিছু কথা না বলতে চেয়েও বলতে হয়েছে, কিছু সপ্ন আমাকে দেখতেই হয়েছিলো অথচ সেটা আমার কাম্য ছিলো না, আবার কিছু স্বপনের ধারে কাছেও আমি যেতে পারিনিএটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস আমি এই আফসোসের ব্যাপারটা নিয়ে বহুবার গবেষনা করেছি কিন্তু জীবনের কাছে রাখা সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। ফলে কোনোই আমি সেইসব প্রশ্নের উত্তর পাই নি, না আমার কাছে, না যাদের কাছ থেকে উত্তর পাওয়া দরকার ছিলো তাদের কাছ থেকে। আর উত্তর না পেতে পেতে একসময় আমি কোনো উত্তরের আর আশাও করিনি। কিন্তু একটা ব্যাপার আমার কাছে শতভাগ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, আমার এই অপারগতার কারন না আমি নিজে, না আমার সাথে যারা জড়িত ছিলো তারা না এটা আমার দোষ, না ছিলো তাদের আমি যদি আরো গভীরে গিয়ে এর আনুবীক্ষনিক পর্যালোচনা করি, তাহলে হয়তো আমার আরেকটা আফসোসের কথা প্রকাশ না করলেই নয় যে, আমার সেই অপারগতা কিংবা ঘাটতির কিছুটা হলেও কেউ না কেউ সহজেই হয়তো পুরন করতে পারতো, যা ‘সেই কেউ’রা হয়তো চেষ্টাই করে নাই

উপরের এই কথাগুলি আমার নয়, কথাগুলি একজন এমন মানুষের যাকে আমি আমার মতো করে চিনতে শুরু করেছিলাম আজ থেকে প্রায় ২৪ বছর আগে যখন আমার বয়স প্রায় ২২। কতটুকু আমি তাকে বুঝতে পেরেছিলাম, সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু কেনো জানি আমার খুব মায়া হতো, আর এই মায়ায় মাঝে মাঝে আমি নিজেকে তার ভূমিকায় প্রতিস্থাপিত করে দেখতাম কি হয় ভাবাবেগে অথবা মানসপটে। এই সময়টায় আমি খুব ভাবাগেবিত হয়ে যেতাম। ভাবাবেগিত হতাম এটা ভেবে যে, কি পরিমান চাপ কিংবা কষ্ট নিজের বুকের ভিতরে লুকিয়ে রাখা সম্ভব? তখন আরো বেশী মায়া হতো একজনের জন্য নয়, দুজন নিসংগ মানুষের জন্য যাদের উভয়ের বুকেই ছিলো সমান যন্ত্রনা আর ভাগ্যের আক্ষেপ। একজন যেনো পরাজিত, আর অন্যজন সেই পরাজয়ের কারন। এদের একজন আমার “মা” আর আরেকজন ‘বিল্লাল ভাই’ যাকে সবাই ডাঃ বেলায়েত নামেই চিনতো। আমি আজ সেই তাদের কথাই হয়তো বলবো।

আমার ‘মা’র সম্পর্কে আমি অনেকগুলি লেখা ইতিমধ্যে লিখলেও তার সবচেয়ে বড় দূর্বল বিষয়টি আমি কখনো আমার লেখায় আনিনি। আমি জানতাম এবং অনুভব করতাম আমার মায়ের সেই দূর্বলতা। আমার মায়ের এই দূর্বলতা তার নিজের সৃষ্টি যেমন নয়, আবার তিনি ইচ্ছে করলেও তার সেই অপারগতাকে তিনি অনায়াসেই দুহাত দিয়ে এক পাশে সরিয়ে দিতে পারতেন না। এই দূর্বলতা সমাজ সৃষ্টি করেছে, আর সেই সমাজ আজকের দিনের দুটি মানুষকে বিজন বিজন দূরে ঠেলে দিয়ে দুজনকেই অসুখী একটা বলয়ে জীবিত কবর দিয়েছিলো। আমার মায়ের সেই বড় দূর্বলতা ছিলো এই ‘বিল্লাল’ ভাই। পরবর্তিতে প্রায় তিন যুগ পরে যেদিন আমি আমার মায়ের সর্বশেষ ভিডিওটি করি, তখন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু সে প্রশ্নগুলির উত্তর আমাকে আরো ব্যথিত করে দিয়েছিলো। সেই প্রশ্নের উত্তর আমাকে প্রতিটিবার চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিলো, আমার অন্তরের কোথায় যেনো ছট ফট করছিলো কোনো এক অয়াশান্ত অনুভুতিতে। আর যিনি উত্তর দিচ্ছিলেন, আমার মা, তার দ্রিষ্টি কখনো সেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে নির্লিপ্ত হয়ে ভাষাহীন কিছু শব্দ তেই শেষ হচ্ছিলো যার সাহিত্যিক নাম- আহা, কিংবা উহু। এসব বেদনার রাজত্তে যিনি ছিলেন, সে আর কেউ নয়, বিল্লাল ভাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কে এই বিল্লাল ভাই? যদি এর উত্তর খুজতে চাই, তাহলে ফিরে যেতে হবে আজ থেকে বহু বছর আগে যখন আমারও জন্ম হয় নাই। ফলে আমি যা জেনেছি, শুনেছি, তা পুরুই হয় আমার মার কাছ থেকে, কিংবা আমার অগ্রজ ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে বা স্বয়ং বিল্লাল ভাইয়ের কাছ থেকে জানা কিছু তথ্য। কিন্তু আমার কাছে সব ব্যাপারটাই যেনো মনে হয়েছে,  এটা ছিলো একটা ভাগ্য আর সময়ের খেলা।

কেনো ‘ভাগ্য’ আর ‘সময়’ বললাম তারও একটা ব্যাখ্যা আছে। অনেক সময় এমন দেখা যায় যে, “ভাগ্য” আর “সময়” দুটুই কারো জীবনে একসাথে আসে, কিন্তু “ভাগ্য” আর “সময়” ওরা কখনোই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ না। সঠিক ব্যবহারে ভাগ্য পালটাতে পারে বটে কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ভাগ্যও পালটে যায়। কিন্তু এই ‘সঠিক’ ব্যবহার আবার সবাই সবসময় হয়তো পায়ই না যাতে সেই সঠিক ব্যবহারে তার ভাগ্য পাল্টাতে পারে। কেউ কেউ পারে, আবার কেউ কেউ পারে না। আবার কারো কার ব্যাপারে সুযোগটাই আসেনা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কোনো ব্যক্তিত্ত সময়ের স্রোতে আবার বেশীদিন অসহায়ও থাকে না। একসময় না একসময় সে ঘুরে দাড়ায়ই যদি তার দৈবক্রম ভাগ্য আবার সেই ঈশ্বর কোনো এক যাদুর কাঠিতে হাল ঘুরিয়ে দেন। শুধু হাল ঘুরিয়ে দিলেই হয়তো তার সেই নির্যাতিত ভাগ্য দৈবক্রম ভাগ্য সঠিক নিশানায় পৌছায় না যদি তার চোখে না থাকে সপ্ন আর প্রবল একটা ইচ্ছাশক্তি। আজকের লেখার প্রধান চরিত্র এই ‘বিল্লাল’ ভাইয়ের ব্যাপারেও সেই দুটু শব্দ প্রায় একই সুরে খেটে যায়। ভাগ্য তাকে সুপ্রস্নন করে নাই, আবার করেছেও। ‘সময়’ তাকে একটা বলয় থেকে ছিটকে ফেলেছিলো বটে কিন্তু আবার সেই ‘সময়’টাই বদলে দিয়েছে তার সব জন্মগত বৈশিষ্ট।

বিল্লাল ভাইয়ের এই ইতিহাস নাতিদীর্ঘ নয়। এই ইতিহাস একটা পূর্ন জীবনের। আর সেই জীবনের বয়স কাল নেহায়েত কমও নয়, প্রায় ৫৫ বছর। এই ৫৫ বছরে পৃথিবী তার অক্ষে ৫৫ বার প্রদক্ষিন করে কত যে ঋতু আর কাল প্রশব করেছে তার কোনো হিসাব নাই। তাই বিল্লাল ভাইয়ের এই ইতিহাস বলার আগে সেই মানুষটির ইতিহাস বলা প্রয়োজন যার জন্য আরেক অধ্যা তৈরী হয়েছিলো বিল্লাল ভাইয়ের। আর তিনিই হচ্ছেন- আমার মা, আর জন্মধাত্রী বিল্লাল ভাইয়ের।

আমার মায়ের পুরু নাম ‘মোসাম্মাত হামিদা খাতুন’। নামটা আমি এভাবেই সবসময় লিখে এসেছি আমার ব্যক্তিগত তথ্যাবলীর মধ্যে। আমার মায়েরা ছিলেন দুই বোন এবং তার কোনো ভাই ছিলো না। আমার মায়ের আরেক বোনের নাম ছিলো ‘মোসাম্মাদ সামিদা খাতুন’। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গ্রাম্য ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ারিশান সার্টিফিকেটে তাদের দুজনের নামই লিখা হয় যথাক্রমে ‘হামিরন নেছা’ এবং ‘ছামিরন নেছা’। যাই হোক, নাম বিভ্রাটের কারনে আজকাল হয়তো ব্যংকে একাউন্ট করতে জটিলতা থাকতে পারে, কিংবা ক্রেডিট কার্ডে ঝামেলা হতে পারে, কিন্তু এই নামের বিভ্রাটের কারনে আমাদের মুল চরিত্রের মানুষ গুলির জীবনের ইতিহাসে কোনো প্রকার ব্যত্যয় হয় নাই। আর আমার এই লেখাতেও এটা অনেক বড় সমস্যা নয়। আমার নানা অর্থাৎ আমার মায়ের বাবার নাম ছিলো ‘কেরামত আলি’। আজকাল এই নাম গুলি আর কেউ রাখে না। হয়তো ভাবে যে, নাম গুলি আধুনিক নয়। কিন্তু এই নামের মানুষ গুলি ছিলে ভালোবাসার আর ভরষার ভান্ডার। যাই হোক, যদি আরেকটু আগের জেনারেশনে যাই, তাহলে আমরা সেই ‘কেরামত আলি’র বাবার নাম পাবো ‘উম্মেদ আলী মুন্সী’। এই উম্মেদ আলীর বাবা জনাব হাজী আসাদুল্লাহ (পিতা-আহাদুল) এর শাখা প্রশাখা বিশ্লেষন করলে এমন এমন কিছু বর্তমান আত্মীয় সজনের নাম চলে আসবে যা না আমরা অনেকেই মানতে চাইবো, না আমরা তা গ্রহন করবো। তার কারন একটাই-সমাজের স্তরভিত্তিক কেউ এমন জায়গায় আর কেউ এমন স্তরে যা না মিশে বংশে, না মিশ খায় পরিবারে। কিন্তু বাস্তবতাটাই যে অনেক কঠিন এটা মানা আর না মানাতে কিছুই যায় আসে না। না মানার মধ্যে হয়তো থাকতে পারে একটা বড় অহংকার বা সম্পর্ক ছিন্নকারীদের মধ্যে সামিল, কিন্তু বাস্তবতা পালটায় না তাতে। যাই হোক, সেই ৫/৬ জেনারেশন আগে না হয় নাইবা গেলাম।

আমার মায়ের বয়স যখন সবেমাত্র বারো কি তেরো, তখন সমাজের রীতি অনুযায়ী আমার নানা কেরামত আলি বিবাহযোগ্য মেয়ের বোঝায় চাপ অনুভব করে তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। আজ থেকে সেই প্রায় সত্তর বছর আগে যেটা হয়তো ছিলো সমাজের একটা রীতি, আজ তা বাল্যবিবাহের নামে সমাজ তাকে অপরাধের কারন বলে উল্লেখ করে। যেটাই হোক, সমাজের রীতি অনুযায়ী আমার মা, খালাদের বিয়ে ওই বারো তেরো বছর বয়সেই হয়েছিলো। আমার মায়ের সেই স্বামীর নাম ছিলো আব্দুল জলিল (সম্ভবত)। সম্ভবত বলছি এই কারনে যে, নামটা এই মুহূর্তে সঠিক লিখলাম কিনা সিউর হতে পারছি না। তবে সঠিক হবার সম্ভাবনা ৭৫%। ১২ বছরের একজন প্রায় নাবালিকা বিয়ের পর এখন অন্য বাড়ির বউ হয়ে গেলো। এই নববধূর পড়নের কাপড়টাই হয়তো তার থেকে প্রায় তিন গুন লম্বা, সবে মাত্র হায় প্যান্ট ত্যাগ করা বালিকাটি এখন নাকে নোলক, হাতে মেহেদী সমেত চূড়ি, কানে দূল, আর মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে কিছু বুঝে উঠার আগেই পরিচিত সব মানুষ গুলি থেকে আলাদা হয়ে অন্য এক সংসারে একটা আলাদা পরিচয় নিয়ে বাপের বাড়ি ছেড়ে গেলো। তার শখের পুতুল, ছেড়া বই কিংবা সখীদের অনেক গোপন কিছু মজার স্মৃতি সব ছেড়ে কেদে কেদে নিজের সেই খেলার আংগিনা, কাথা বালিশ আর বাড়ির উঠোনের মায়া ত্যাগ করে অন্য কোথাও যেতেই হলো। এ যেনো পালের একটা পোষাপ্রানী যে কিনা এখনো তার মায়ের দুগ্ধপানও ছাড়ে নাই। এই বয়সের একজন অপরিপক্ক নাবালিকা কি সংসার করছে বা করেছে সেটা আমি আজো বুঝে উঠতে পারিনা কিন্তু বিধাতার সিস্টেমে আমার মা গর্ভবতী হলেন। আর সেই গর্ভধারনের পরে সঠিক সময়ে তিনি সুস্থ্য একটি পুত্র সন্তানও দান করেন তার শ্বশুরালয়ে। এই পুত্রটির নামই হচ্ছে- বিল্লাল হোসেন বা বেলায়েত হোসেন। সবকিছুই ঠিকঠাক মতোই চলছিলো। স্বামী, সংসার, পুত্রযত্ন সবকিছু। নবাগত পুত্র সন্তানের আদরের কোনো কমতি নাই, নব নাম ধারী হামিদা এখন শুধু হামিদাই নয়, সে এখন ‘মা’ও বটে। তার নতুন নাম ’মা’। চারিদিকেই একটা নন্দ যেনো বাতাসের প্রবাহের মতো সারাটা বাড়ি দোলায়িত হচ্ছে, কেউ পুতুল নিয়ে দেখতে আসে, কেউ দোয়া দিতে আসে, কেউবা আবার আসে এম্নিতেই। সব কিছুই ঠিক যেভাবে চলার কথা সেভাবেই চলছিলো। কেরামত আলী তার মেয়ের জন্য গর্বিত, পাড়ার লোকেরাও। কিন্তু বিধাতার পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার থেকে অনেক বেশী যেমন রহস্যময়ী, তেমনি অনেক কঠিনও। তিনি কাকে কি দিয়ে সুখবর দিবেন আর কাকে কি দিয়ে দুঃখের অতল গভীরে নিয়ে যাবেন, তার হিসাব কিংবা ছক আমাদের কারোরই বুঝার কথা নয়। আর সে অধিকার ঈশ্বর কাউকে দেন ও নাই। তিনি একাই খেলেন, একাই গড়েন, আবার একাই ভাঙ্গেন। কেনো গড়েন, কেনো ভাজ্ঞেন এর ব্যাখ্যা চাওয়ারও আমাদের কোনো উপায় নাই। ফলে দেখা যায়, একই খবর কারো কাছে যেমন শুভ হয় আবার কারো কাছে তেমনি অশুভও হয়। একই জায়গায় মিলিত হওয়া মানুষের রাস্তা যেমন তিনি আলাদা আলাদা করে দেন, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন রাস্তায় চলাচলকারী অনেক মানুষের রাস্তাও তিনি এক জায়গায় এনে মিলন ঘটান। একই পরিস্থিতিতে যেমন একজন জীবনকে তিনি এগিয়ে নিয়ে যান, আবার সেই একই পরিস্থিতিতে তিনি আরেকজন জীবনকে অসহায় অবস্থার সাথে বোঝাপড়া করতে ব্যস্ত করে তোলেন। আমার মায়ের বেলাতেও ঠিক এমন একটা পরিস্থিতি হাজির করলেন বিধাতা। আমার মায়ের স্বামী আব্দুল জলিলকে তিনি এই নশ্বর পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন। যে নাটাইটায় একটা গুড়ি নিজের আনন্দে নীল আকাশের হাওয়ায় ভেসে একবার এদিক, আরেকবার ওদিক দোল খাচ্ছিলো, হটাত নাটাইটা বিচ্ছিন্ন করে দিলো ফানুশের মতো উরে থাকা রংগিন ঘুড়িটা। ছন্দে ভরা কতগুলি জীবন এক সাথে যেনো ছন্দ পতনের ধাক্কায় চারিদিক বেশামাল হয়ে গেলো। আমার মা হামিদা ভয়ে আতংগকে আর বিষন্নতায় বোবা হয়ে গেলেন, হামিদার বাবা কেরামত আলী মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনায় মুর্ছা যেতে লাগলেন। আর হামিদার সদ্য জন্মানো পুত্র বিল্লাল কিছুই না বুঝে মায়ের দুধের জন্য বিকট চিতকারে বাড়ি, ঘরময় যেনো আলোড়িত করে দিলো। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আমার মা হামিদা খাতুন বিধবার তকমা গলায় পড়ে হাহাকার ঘরে যেনো নির্বাক হয়ে গেলেন।

কোনো নারীর অধিকার তার স্বামীর বাড়িতে স্বামীর বর্তমানে যেমন থাকে, সেই নারীর সেই অধিকার স্বামীর অবর্তমানে আর তেমন থাকে না। হামিদার স্বামীর ইন্তেকালের কয়েকদিন পর বাড়ির অন্যান্য সবাই যখন হামিদার স্বামীর শোকের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে থাকে, ততোই যেনো হামিদার উপর অন্যান্যদের খোটার ভার বাড়তে থাকে। এই বয়সে স্বামীকে বুঝার আগেই যখন কেউ স্বামী হারা হয়, তার নিজের মনের অবস্থার কথা কেউ তো ভাবেই না, বরং সব দোষ যেনো সেই অপয়া হামিদারই। পৃথিবীর কেউ এই নাবালিকা বিধবার মনের ভিতরের কষ্ট কিংবা বেদনার অনুভুতি না বুঝলেও হামিদার বাবা কেরামত আলী ঠিক বুঝতে পারছিলেন কি চলছিলো হামিদার ভিতরে। তিনি কোনো কিছুই চিন্তা না করে দুই অবুঝ, এক হামিদা এবং তার পুত্রকে নিয়ে চলে এলেন নিজের বাড়িতে। হামিদা এখন আবার তার পিত্রালয়ে সেই চেনা পরিবেশে ফিরে এলো। আজকের এই চেনা পরিবেশ যেনো আর আগের সেই পরিবেশ নাই, তার খেলার অনেক সাথীরাই অন্যের বধু। এখন আর দলবেধে কাউকে নিয়ে সেই চেনা পরিচিত নদীতে হৈ হুল্লুর করে জল্কেলীর কোনো সুযোগ নাই। কোথায় যেনো বীনার তার গুলি ছিড়ে গেছে। আর সাথে তো আছেই পুত্র বিল্লাল, যার কাছে দাদা বাড়িই কি, আর নানা বাড়িই কি কোনো কিছুরই কোনো পার্থক্য নাই। শুধু মনের অজান্তে চোখের পানি ঝরছে হামিদার আর তার সাথে অসহায় বিধবা কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা কেরামত আলির। জখম যেনো কিছুতেই ক্ষরন বন্ধের নয়।  

শরীরের কোনো কাটাছেড়া, কোনো বাহ্যিক জখম হয়তো চোখে দেখা যায়, ক্ষুধা হলে খাবারের অভাবে ক্ষুধায় হয়তো পেট গুরগুর করে, কিংবা জ্বর সর্দি, কাশি কিংবা মাথা ব্যথা হলে তার সিম্পটম অনায়াসেই বুঝা যায় কিন্তু অন্তরের জখম কি কখনো চোখে পড়ে? অন্তরে কি কখনো জখম হয় আদৌ? আর এই অন্তরটাই বা শরীরের কোন অংগ? এটা কি এমন কোনো জিনিষ যা মাংশ বা হাড় কিংবা এমন কিছু দিয়ে এর গঠন কাঠামো? অথচ এই জখম অনুভুত হয়, এই কষ্ট নিজেকে প্রতিটি ক্ষনে মনকে বিষন্ন করে দেয়। সেই অদেখা অন্তরে রক্তক্ষরন হয়। এই অন্তর্জালা, রক্তক্ষরন আর কষ্টে মাত্র ১৪/১৫ বছর বয়সের এই অবুঝ বালিকা আরেকটি সদ্যজাত নবাগতকে নিয়ে পৃথিবীর সব মানুষের চোখে যেনো একজন অপরাধি সেজে জীবিত অবস্থায় মৃত হয়ে রইলেন। স্বামীর ম্রিত্যু যেনো তারই অপরাধ। তার এই ঘটনার জন্য যেনো তিনিই দায়ী। একদিকে অবুঝ মন, অন্যদিকে সাথে আরেকটি অবুঝ সন্তান, সব মিলিয়ে চারিদিকে এক মহাশুন্যতা। মেয়ের এমন একটি দুঃসহ শুন্যতা নিজে পিতা হয়ে কেরামত আলী কি করবেন? দিন গড়ায়, রাত যায়, শুন্যতা আরো চেপে বসে হামিদার। তার যে বয়স, সে বয়সে তিনি হয়তো বিয়ের মাহাত্তটাই বুঝে উঠতে পারেন নাই, কিন্তু তাকে এখন বিধমার তকমাটাও বুঝতে হচ্ছে, বুঝতে হচ্ছে একজন অবুঝ সন্তানের মা হিসাবে তার অকাল পরিপক্ক দায়িত্ব।

যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, তাহলে সে সবসময়ই চাইবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুঃখটা, কষ্টটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই কষ্টের ব্যাপারগুলি শেয়ার করা দরকার। আর হামিদার এই কষ্টের ভাগীদার কিংবা শ্রোতা হয়ে রইলো শুধু একজন-সেই নাবালক পুত্র ‘বিল্লাল’। চোখ ভিজে আসে তার, মন ভেংগে আসে যন্ত্রনায়, আর মনে হয়-কেনো? কেনো বিধাতা তাকেই এর অংশ করলেন? অন্য কেউ নয় কেনো? সেই অবুঝ পুত্র বিল্লালের কাছে ‘হামিদা’র হয়তো শুধুই একটা জিজ্ঞাসা। নাবালক বিল্লাল হয়তো এর কিছুই বুঝে না, কোনো এক ভিনদেশী ভাষায় হয়তো কিছুক্ষন অদ্ভুত শব্দ করলেও মায়ের সেই কান্নায় ভীত হয়ে নিজের অজান্তেই কেদে দেয় বিকট এক শব্দে যা হয়তো বিধাতার কাছেই তার মায়ের কষ্টের ফরিয়াদ। হয়তো মা ছেলের এই অসহায় কান্নায় বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের চোখের জলে কাপা কাপা গলায় বলতে থাকেন- আমি তো আছি তোর পাশে। ভয় নাই। মা আছে। পৃথিবীর কেউ তোর পাশে থাকুক বা না থাকুক, আমি তো আছি। এভাবেই কাটতে থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এবং এক সময় কয়েক বছর।

জীবন যেখানে যেমন। যে শিশুটি আজ জন্ম নিলো কেউ জানে না তার জন্য এই পৃথিবী কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা এই প্রিথিবীকে সে কি দিয়ে যাবে। বিধাতা চাইলে যে কোনো কিছুই হতে পারে। হতে পারে আজকে এই শিশুটি হয়তো এই পৃথিবীকে কোনো একসময় কাপিয়েও যেমন দিতে পারে আবার এই পৃথিবী তাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। এই বিশ্বভ্রমান্ডে এমন অনেক শিশুই জন্ম নেয় যারা অনেকেই অনেক ভুমিকা রাখে আবার কেউ কেউ কিছুই রাখে না, না পৃথিবীও তাদেরকে মনে রাখে। এমন মানুষের সংখ্যাই হয়তো নেহায়েত যেমন কম না, তেমনি ভুমিকা রাখে এমন শিশুও কম না। যুগে যুগে তারপরেও অনেক শিশু গোপনে পৃথিবীতে আসে, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় আর একদিন সবকিছু ফেলে সবার থেকে আলাদা হয়ে আবার কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঝখানের এই সময়টায় খুব গুটিকতক মানুষ হয়তো নিজের মতো করে কাউকে কাউকে মনে রাখে কিন্তু তাও একসময় মনের স্মৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। কিন্তু ‘বিল্লালের বেলাতে এটা ঘটে নাই। তিনি প্রকাশ্যে দিবালোকে এই সমাজে বৈধভাবে পদার্পন করেছিলেন, তার যোগ্য অভিভাবক ছিলো, তার পরিচয় ছিলো, আর ছিলো পাশে থাকা অনেক মানুষ যারা তাকে নিয়ে ভেবেছে, তার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করেছে। কিন্তু বিধাতা তো আর মানুষের মত নন। তার পরিকল্পনা, তার ইচ্ছা, তার কার্যকারিতা সবকিছুই তার মত। বিল্লালের যখন মাত্র দুই থেকে হয়তো একটু বেশী, তখন হামিদাকে ছাড়তে হলো তারই ঔরসে জন্ম নেয়া তার পুত্র বিল্লালকে। সমাজ বড্ড বেরসিক, সমাজের আইনকানুনগুলিও একপেশে। এই আইন মানতে গিয়ে কে কাকে ছেড়ে যাবে, আর কার জীবন কোন আইনের পদাঘাতে পিষ্ঠ হবে সেটা যেনো সমাজের কোনো দায়বদ্ধতা নাই। আর এর সবচেয়ে বেশী আহত হয় সমাজের নারীরা। নারী বা মহিলাদেরকে এই সমাজে সেই প্রাচীনকালের মতো আজো দেবীর সমান তুলনা করে থাকে কিন্তু আফসোস যে, এটা শুধু মন্দির আর পুজার ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। মহিলাদের সাথে আজো লাগাতার অন্যায়, নীপিড়ন, শোষন, অধিকারহীনতা আর অপরাধ ঘটে যাওয়া এটাই প্রমান করে যে, আমাদের সমাজে আমরা যে মহিলাদেরকে দেবী বলি তারা এখনো অনেক দানব দ্বারা ঘিরে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে নরক করে তুলেছে। আর এই দানবের প্রথম নাম ‘সমাজ’ আর তার আইন কিংবা ‘মনোভাব’। যে সমাজ ১৩/১৪ বছরের বালিকাকে বিধাতার ইচ্ছায় তারই সংগীকে বিচ্ছেদের কারনে একজন অপয়া কিংবা এই দোষে দোষারুপ করা হয়, সেই সমাজ প্রকৃত কোনো ভরষার স্থান হতে পারে না। সে সমাজে প্রকাশ্যে কোনো মহিলাকে পুড়িয়ে মারা, নির্যাতন করা কিংবা ধর্ষন করা হলেও আজো কেউ হয়তো এগিয়েই আসে না। হামিদা হয়তো সে রকমের একটা অদৃশ্য আগুনে প্রতিদিন পুড়ে অংগার হচ্ছিলেন।

সমাজের এই মনোবৃত্তি আর যাতনায় এবং কন্যাদায়গ্রস্থ কেরামত আলি শেষ পর্যন্ত ১৫ বছরের বিধবা হামিদাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ার আয়োজন শুরু করেন। হামিদার রুপের কোনো কমতি ছিলো না, আর সবে মাত্র সে কিশোরী। এক সন্তানের মা হলেও বুঝার কোনো উপায় নাই যে, তার অন্য কোথাও একবার বিয়ে হয়েছিলো। ফলে, খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয় নাই কেরামত আলিকে। পুরুষ শাসিত সমাজে সব আইন পুরুষেরাই তাদের নিজের সুবিধার কারনে বানায়। এখানে ১৫ বছরের কিশোরীর সাথে ৪০ বছরের বৃদ্ধার বিয়েও কোনো দৃষ্টিকটু নয়। কিংবা কোনো এক প্রতাপশালি ধনী ব্যক্তির পক্ষেও একের অধিক কুমারী কিংবা বিধবা কিশোরীকে বিয়ে করাও কোনো দৃষ্টিকটু নয়। আর সেই প্রতাপ শালী কোন ধনী ব্যক্তি যদি সধবা হন, তাহলে তো তার যেনো বিয়ে করা একটা বৈধ লাইসেন্সের মতোই। হামিদার জীবনে এমনই এক সুপুরুষ-হোসেন আলী মাদবর প্রবেশ করলেন। এই হোসেন আলী মাদবর কোনো কাল বিলম্ব না করে অনেক ঘটা করে বিধবা হামিদাকে বধু হিসাবে নিয়ে আসে তারই সংসারে যেখানে রয়েছে হামিদার থেকেও বয়সে বড় আরো তিনটি পুত্র সন্তান আর চারটি কন্যা সন্তান। কেউ কেউ হামিদার থেকে বয়সে এতো বড় যে, কারো কারো আবার বিয়ে হয়ে তাদের ও সন্তান জন্ম নিয়েছে। তবে একটা ভালো সংবাদ হামিদার জন্য ছিলো যে, তাকে সতীনের ঘর করতে হয় নাই। কারন হোসেন আলি মাদবর ছিলেন সধবা। হোসেন আলী মাদবরের আগের স্ত্রী গত হয়েছেন প্রায় বছর খানেক আগে।

হামিদার যখন প্রথম বার বিয়ে হয়েছিলো, তখন সে পিছনে ফেলে গিয়েছিলো তার খেলার সাথী, খেলার পুতুল আর শৈশবের স্মৃতি। কিন্তু এবার হামিদা ফেলে গেলো একজন অবুঝ পুত্র যে জীবনের কোনো কিছুই বুঝে না। হয়তো সে মা কি জিনিষ তাইই বুঝে না আর বিচ্ছেদ কি জিনিষ সেটা তো তার বুঝবারই কথা নয়। বিল্লাল রয়ে গেলো কেরামত আলীর তত্তাবধানে। বিল্লালের বয়স সবেমাত্র তিনও পূর্ন হয় নাই।  এখন বিল্লাল পুরুই অনাথ, শুধু তার চারিপাশে রইলো কেরামত আলী, আর তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু এই অনাথ ‘বিল্লাল’ নামক পুত্রের এখন কি হবে? সে তো আগেই তার পিতাকে হারিয়েছে, আর আজ হারালো তার মাকে, যদিও তার মা জীবিত। মায়ের নতুন সংসারে তার জায়গা নেই।

ওই যে বললাম, স্রিষ্টিকর্তা বড়ই রহস্যময়। হামিদার বাড়ির আলুকান্দার কাছেই ছিলো আরেক গ্রাম, তার নাম ঘোষকান্দা। সেখানেই স্রিষ্টিকর্তা আরেক ধনাঢ্য এক পরিবারকে রেখেছেন অতীব মানসিক কষ্টে। তাকে ঈশ্বর সম্পদের পাহাড় দিয়েছেন, তাকে সুসাস্থ্য দিয়েছেন, আর দিয়েছেন সমাজে প্রতিপত্তিদের মধ্যে সম্মান আর যোগ্যস্থান। কিন্তু তাকে ঈশ্বর যা দেন নাই সেটা হলো কোনো উত্তরাধীকারী। সন্তানহীনা অবস্থায় মানসিকভাবে এই দম্পতি এতোটাই কষ্টে ছিলেন যে, তাদের না আছে কোনো সন্তানসন্ততী, না আছে কোনো উত্তরসুরী। এই ধনাঢ্য পরিবারের হর্তাকর্তার নাম ‘ইদ্রিস আলী’। তিনি কিংবা তার স্ত্রী সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিলেন কিনা কেউ জানে না, কিন্তু ঈশ্বর হয়তো অন্য কোনো নেশায় তাদের এই ঘর পরিপূর্ন খালী রেখেছিলেন এমন একজন অসহায় মানবের জন্য যার বিপক্ষে দোষারুপ করার কোনো ওজরের কমতি ছিলো না। তাদের অন্তরে ঈশ্বর সব ভালোবাসা রচিত করেছিলেন ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য, লালিত করেছিলেন এক অদম্য স্পৃহা কিন্তু সেই ভালোবাসা আর স্পৃহা বারংবার শুন্য ঘরেই বাতাসের মধ্যে হারিয়ে যেত সকাল সন্ধ্যায় কিংবা অলস দুপুর কিংবা বর্ষার কোনো ঋতুতে। কষ্ট ছিলো, আখাংকা ছিলো কিন্তু সন্তান লাভ এমন নয় যে, বাজারে গেলেন, দোকান খুজলেন আর পছন্দমত একজন সন্তান কিনে এনে তাকে বড় করতে শুরু করলেন। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে এটা দেখা যায় যে, কারো কাছে কোনো মানুষ হয়তো খুবই অপাংতেয়, বোঝা, উপদ্রব, কেউ হয়তো তার দিকে এক নজর নাও তাকাতে পারে। হতে পারে সেই মানুষটা এক পরিবারের জন্য বোঝা, কিন্তু পৃথিবীর অন্য কোথাও কেউ হয়তো ওই অপাংতেয় মানুষটির জন্যই অধীর চিত্তে অপেক্ষা করছে কখন তার আগমন ঘটবে। তাকে পাওয়াই যেনো সমস্ত সুখ আর শান্তির উৎস খুজে পাওয়া। ঈশ্বর এই দুটো ঘটনাই পাশাপাশি ঘটাচ্ছিলেন বিল্লালকে কেন্দ্র করে।

হামিদা চলে যাওয়ার পর হামিদা যেমন মনের ভিতরে সন্তান বিচ্ছেদে কাতর ছিলেন, তেমনি হামিদার বাবা কেরামত আলীও এই অবুঝ বালককে নিয়ে শেষ পর্যন্ত কি করা যায় সেই চিন্তায় কাতর ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কেরামত আলী তার ভায়রা গনি মাদবরের সাথে পরামর্শ করে বিল্লালকে পালক দেয়ার কথা চিন্তা করলেন। আর এতেই যেনো ইদ্রিস আলীর পরিবারে নেমে আসে সেই কাংখিত শুভ সংবাদ যিনি তাকে দত্তক নিতে আগ্রহী। কালক্ষেপন না করে ইদ্রিস আলীর পরিবার যেনো সর্গ থেকে নেমে আসা এক ফুটফুটে পুত্রসন্তান লাভ করে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে করলেন আর নিয়ে গেলেন হামিদার বুকের সবচেয়ে আদরের ধন ‘বিল্লাল’কে। হামিদার দ্বিতীয় বিয়ের কারনে হামিদার পুত্র বিল্লালকে ইদ্রিস পরিবার যেনো অযাচিত এক ধনের সন্ধান পেলেন। নিজেদের বংশমর্যাদা আর পিতৃপরিচয়ে বিল্লালকে আগাগোড়া মুড়ে দিলেন ইদ্রিস আলী পরিবার। কোনো কিছুর কমতি রাখলেন না তারা তাদের এই হাতে পাওয়া সন্তানের জন্য। কিন্তু মা তো মা-ই। সমস্ত কাজের ফাকে, নিজের অবসর সময়ে বারবারই তো মনে পড়ে হামিদার সেই নাড়িছেড়া সন্তানের জন্য। কিন্তু কি ক্ষমতা আছে তার? না সে সমাজের বিপক্ষে কিছু করতে পারে, না সে সমাজের আইনকে থোরাই কেয়ার করতে পারে। হতাশাগ্রস্থ নেশাখোরের মত ক্ষনেক্ষনেই মা হামিদা নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়তেন বিল্লালের জন্য। কখনো একাই কাদেন, কখনো একাই ভাবেন, আবার কখনবো এইকথা মনে করে শান্তি পান যে, অন্তত তার নাড়িছেড়া ধন কারো জিম্মায় ভালো আছে যারা তার এখন পিতামাতা।

হামিদার নতুন সংসারে সময়ের রেষ ধরে আমাদের জন্ম হতে থাকে একের পর এক সন্তান। আগের স্ত্রীর ঔরসে জন্ম নেয়া পুত্র-কন্যাদের পাশাপাশি হামিদার ঔরসে ক্রমেক্রমে আরো পাচ কন্যা আর দুই পুত্রের আগমন হয়। কেরামত আলী হামিদার নতুন সংসারের যেমন খোজ রাখেন, তেমনি খোজ রাখেন ইদ্রিস আলির পরিবারে দত্তক নেয়া বিল্লালেরও। হামিদা যখন বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে, তখন হামিদার সৌভাগ্য হয় তার ছেলে বিল্লালকে চোখে দেখার। মা ছেলের এই মিলন বড় সুখের বটে কিন্তু বেদনারও। ফিরে যাওয়ার দিন হামিদার চুমু খাওয়া বিল্লাল হয়তো কিছুই বুঝতে পারে না কি কারনে এই মহিলার চোখে জল আসে। বুঝতে পারে না কেনো বিল্লালের মা কিংবা তার বাবা ইদ্রিস আলী এই মহিলার কাছে এতো ঋণী। শুধু এটুকু বুঝতে পারে মহিলাটা এমন কেউ যাকে পেলে বিল্লালও খুশী হয়। হামিদা বিল্লালকে নিজের হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দেয়, গোসল করিয়ে সুন্দর জামা পড়িয়ে দেয়, আর খুব মিষ্টি করে মাথার চুল আচড়ে দিয়ে কখনো কখনো তার বুকে মাথা রাখতে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। হয়তো এই আদরগুলি বিল্লালকে বারবার মহিলার প্রতি বিল্লালের আকর্ষন বাড়িয়ে দেয়। যেদিন হামিদা আবার তার সংসারে চলে যায়, বিল্লালেরও খুব মন খারাপ হয়।

আমার মা যখন তার মায়ের বাড়িতে আসেন, তখন মাঝে মাঝে বিল্লাল ভাইকে নিয়ে আসেন ইদ্রিস সাহেব আমার মাকে দেখানোর জন্য। যে কষ্ট লাঘব করার জন্য ছেড়ে যাওয়া সন্তানকে দেখতে চাইতেন, দিন শেষে কষ্টটা যেনো আরো বেড়ে যেত খুব গোপনে, একদম নিজের ভিতরে। ইদ্রিস সাহেব কোনো কিছুই গোপন করেন নাই তার এই পালক পুত্রের কাছে। বিল্লাল ভাইও জানলেন, এই হামিদা তার কি হয় আর কিভাবে কি হয়েছিলো। দুজনের দূর্বার টান থাকলেও সমাজের এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে কাছে থেকেও তারা সব সময় অনেক দূরেই ছিলো। বিল্লাল ভাই আমার কি হন, কিভাবে ভাই হন, এই সত্যটা আমি উপলব্ধি করি তখন আমার বয়স সবেমাত্র ১৪।

১৯৬৯-৭০ সালে কোনো এক পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে আমার বাবা বাধ্য হয়ে মাইগ্রেট করেছিলেন সিরাজদিখান থেকে বাক্তার চরে। আমার খালুর কাছাকাছি। কিন্তু তিনি বেশীদিন আর বাচেন নাই। বাক্তার চর আসার হয়তো কিছুদিন পরেই তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। বাবার মৃত্যুর পর আমাদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। বিশেষ করে আর্থিক অবস্থা। তারমধ্যে সবেমাত্র একটা যুদ্ধ শেষ হয়েছে। চারিদিকে দূর্ভিক্ষ। সবাই গরীব। বাবার মৃত্যুর পরে আমরা পাচ বোন আর আমি শুধুমাত্র আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ টিউশনি রোজগারে চলি। কিভাবে তিনি চালান, একমাত্র জানেন আমার মা আর আমার ভাই। এসব বুঝার আমার তখনো বয়সই হয় নাই। সবাইকেই ভয় পাই। সবাই আমার বড়। ততোদিনে বিল্লাল ভাই অনেক বড় হয়ে গেছেন বয়সের দিক দিয়ে। ডাক্তারী পড়ছেন। বিয়েও করে ফেলেছেন সম্ভবত। এই দূর্ভিক্ষের মধ্যেও ইদ্রিস আলী সাহেবরা সবার থেকে ভালো অবস্থানে ছিলেন। দূর্ভিক্ষ তাদেরকে স্পর্শ করতে পেরেছিলো কিনা আমার জানা নাই কিন্তু এটা মনে আছে যে, মাঝে মাঝে বিল্লাল ভাই আমাদেরকে বৈ, খাতা কলম কিনে দিতেন। এখানে একটা কথা বলা আবশ্যক। বিল্লাল ভাইয়ের বয়স আর হাবীবুল্লাহ ভাইয়ের বয়সের মধ্যে পার্থক্য খুব বেশী ছিলো না, হয়তো ছয় থেকে আট বছরের। 

৬/০১/২০২২-কনিকা এবং হাবীব ভাই

গত ১১ আগষ্ট ২০২১ তারিখে আমার ছোট মেয়ে কনিকা ইউ এম বি সি তে হায়ার এজুকেশনের জন্য আমেরিকায় গিয়েছে। আজ প্রায় ৫ মাসেরও বেশী পার হয়ে গেছে। একটা ব্যাপার আমি খুব করে ভাবি যে, শেষ মুহুর্তে কনিকার স্টেট সিলেকশনে আমি একটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলাম। প্রথমে আমি আমার বড় ভাই যেখানে থাকেন, বোষ্টন, সেখানকার সব গুলি ইউনিভার্সিটিতে কনিকাকে এপ্লাই করতে উপদেশ দিয়েছিলাম এই ভেবে যে, ওখানে আমার বড় ভাই থাকেন এবং তিনি নর্থ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটির খুবই নামকরা টিচার এবং প্রফেসর। আমার ভাবনা ছিলো যে, ওখানে যেহেতু আমার বড় ভাই আছেন, ভাবী আছেন, সেক্ষেত্রে কনিকার কোনো সমস্যা হলে বা প্রয়োজনে সর্বদা কনিকা ওর চাচাকে পাবে। হতাত একদিন মিটুল, আমার স্ত্রী, বল্লো, আচ্ছা যদি এমন হয় যে, হাবীব ভাই এসব করতে না পারলো কিংবা কনিকা একটা উটকো ঝামেলায় পরিনত হয় ভাইয়ার কাছে, তখন তো একটা বিপদ হবে। ব্যাপারটা আমি মোটেই সহজ ভাবে নেই নাই বরং ব্যাপারটা নিয়ে আমি সিরিয়াসলি ভেবেছি। এর একটা কারন ছিলো। কারনটা হলো, হাবীব ভাই কোনো কিছুর মধ্যেই বেশীদিন স্থির থাকতে পারেন না। যখন কোনো বিষয় নিয়া উনি একবার মাতেন, সেটা প্রথম কয়েকদিন খুব ব্যস্ত থাকেন এবং এক সময় সেটায় তিনি আর ইন্টারেষ্ট পান না এবং সেটা অচিরেই পরিত্যাগ করেন। এতে কার কি হলো আর কি হলো না তাতে তার কিছুই যায় আসে না। ভরষা করার মতো লোক না তিনি।

আমি ততক্ষনাত কনিকাকে বললাম, বাল্টিমোর এরিয়ায় ইউনিভার্সিটি সিলেক্ট করো কারন ওখানে মিটুলের প্রায় শতাধিক মানুষ বাস করে। কেউ না কেউ কোনো না কোনো ইয়পায়ে কনিকাকে কোনো কিছুর জন্যে সাহাজ্য করতেই পারবে। এটা যে কি একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আজ সেটা ভাবতেই ভালো লাগে।

এই পাচ মাসে হাবীব ভাই কনিকাকে একটা ফোন পর্যন্ত করেন নাই। যে লোক কনিকা কেমন আছে, কি করছে, কোনো অসুবিধা আছে কিনা এটা নিয়ে একবারো ভাবেন নাই বা ভাবার সময় পান নাই, সে কি করে আমার মেয়ে কনিকার দেখভাল করবেন বা করতেন? কনিকার গাড়ি কেনার সময় ছোট ভাই যে সাহাজ্যটা করেছেন, এটা হাবীব ভাই কোনোদিন করতেন কিনা আমি জানি না, যদিও আমিই টাকা দিতাম, তারপরেও করতেন কিনা আমার জানা নাই। আল্লাহ সব কিছুর নিয়ন্তা এবং মালিক।

অন্যদিকে, আমার আরেক ভাই, বেলায়েত হোসেন, যিনি আজ থেকে অনেক বছর আগে পরলোক গমন করেছেন, তার ছেলে সেলিম এবং সেলিমের মা বাই দি বাই জেনেছে যে, কনিকা আমেরিকায় গেছে। এটা শুনে অস্থির হয়ে গেছে কখন কনিকাকে তাদের বাসায় নিয়ে যাবে। আমিও কনিকাকে ওদের বাসায়, নেভাদা, তে যেতে বলেছি। কনিকা ১০ দিনের ছুটি কাটাবে সেলিমদের বাসায়। এখন কনিকা সেলিমদের বাসাতেই আছে।

হাবীব ভাই আজ পর্যন্ত যত গুলি মানুষের জন্য ট্রাই করেছেন, সব গুলি ট্রাই ছিলো ‘ফেক’। মানুষদেরকে লোভ দেখিয়েছেন, আশা দিয়েছেন, পরে আশাহত করেছেন। যাদেরকে তিনি আশা দেন, তারা এটাকে অমুল্য অফার হিসাবে নিলেও হাবীব ভাই জানেন ঠিক কোন সময়টায় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। আর এটাই হয়েছে খালেদা, লিজা, লাকী, লিয়াকত, সালমা, এবং আরো কিছু মানুষের ভাগ্যে। উনি এমনটা কেনো করেন? আমি বহুবার এর উত্তর খোজার চেষ্টা করেছি। বার বার মনে হয়েছে আমার কাছে যে, এটা একটা নেশা। প্রথম প্রথম নেশাটা খুবই মাত্রাতিরিক্ত হয়, পরে ধীরে ধীরে সেই নেশা কেটে গেলে জাষ্ট পরিসমাপ্তি।

১৩/১২/২০২১-ইতিহাস থেকে যারা (Taken in Page ফেসবুক)

ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না, তাদের পতন বারবার ইতিহাসের সেই একই ধারায় হয়। ঘসেটি বেগমের কারনে, কিংবা মীর জাফরের কারনে, অথবা সেই মায়মুনা কুটনীর কারনেই এই পৃথিবীর অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর জীবনমান অনেক কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে গিয়েছিলো। তাদের লোভ, তাদের লালসার জিব্বা এতো বড় ছিলো যে, তারা সারাটা দুনিয়া হা করে গিলে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের পেট এতো বড় ছিলো না যে, গোটা বিশ্ব সেই পেটে ধারন করে। ফলে অধিক ভূজনের রসাতলে ন্যয্যভাবে হাতে আসা সব সম্পদ, ক্ষমতা আয়েস করার আগেই তাদের এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে অকালেই প্রান দিতে হয়েছে, অথবা মানুষের হৃদয় থেকে। আর যারা বেচে থাকে তারা ওইসব হায়েনাদের কারো কারো নামের আগে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য যোগ করে দেয়, “নিমকহারামের দেউড়ি”, কিংবা “কুটনা বুড়ী আস্তনা” অথবা “হারামখোরের আস্তানা”। আজো তারা এইসব নামেই পরিচিত। কখনো দেখবেন না যে, মীর বংশের কোন বাচ্চার নাম জাফর রাখা হয়েছে। যদিও জাফর বড্ড সুন্দর একটা নাম। কিন্তু মীরজাফর একটা কুলাংগারের নাম। ওর বংশধরেরা আজো তার নামে কলংকিত বোধ করে।

অথচ যুগে যুগে ভিন্ন রুপে এখনো মীরজাফরের থেকেও খারাপ মানুষ এই সমাজে আছে, ঘসেটি বেগমের থেকেও ষড়যন্ত্রকারিনী এখনো অনেক ঘরেই আছে, মায়মুনা কুটনীর মতো মোনাফেক এখনো আমাদের চারিধারে বিধ্যমান। ওদের চেনা কঠিন কারন এইসব মানুষেরা বর্নচোরার মতো আমাদের চারিদিকে একটা আবরন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ভাল মানুষের মতো। সুযোগ পেলেই ছোবল দেবে এবং দেয়, আর এদের এক ছোবলে ধংশ হয়ে যেতে পারে আমার আপনার বহুদিনের বন্ধন, বহুদিনের সম্পর্ক।

১৩/১২/২০২১-একই খবর কারো কাছে শুভ (Taken in Page)

একই খবর কারো কাছে শুভ আবার কারো কাছে অশুভ হতে পারে। একই জায়গায় মিলিত হওয়া মানুষের রাস্তা আলাদা আলাদা হতে পারে। একই পরিস্থিতিতে একজন জীবনে এগিয়ে চলে, আবার আরেকজন জীবনের অসহায় অবস্থার সাথে বোঝাপড়া করে। কেউ কেউ বিন্দু বিন্দু অর্থ সঞ্চয় করে নিজের সপ্ন পুরন করে, অন্যজন তার গড়া সপ্ন বিন্দু বিন্দু ভুলের কারনে নিরুপায় অবস্থায় জন্য তার সপ্ন ভাংতে শুরু করে।  

কোনো অপরাধই রাতারাতি জন্ম নেয় না। যখন কোনো অপরাধ হয়, তখন আমরা শুধু তার উপরের রুপটাই দেখতে পাই। কিন্তু তার শিকড় অন্য কোথাও অনেক গভীরে হয়। আর শিকড়ের সন্ধ্যান হয় পুলিশ করে অথবা কোনো সচেতন মানুষ। পুলিশ যখন তদন্ত করে তখন প্রতিটি মানুষকে সে যেভাবে দেখে তা হল, সবাই মুখোশ পড়া ক্রিমিনাল। আর তাই সে যখন আসল জিনিষ বের করতে চায়, সে কাউকেই কোনো প্রকার ছাড় দিতে নারাজ। আর এ কারনেই হয়তো অনেকেই বলে- বাঘে ছুলে ১৮ ঘা আর পুলিশ ছুলে ৭০ ঘা!!

বিদ্বেষ হিংসা ভালোবাসা আর ঘৃণা এগুলি এমন কিছু আবেগ যা প্রতিটি মানুষের মাঝে পাওয়া যায়। সুযোগ সন্ধানী হওয়াও একটা আবেগ। সুযোগ সন্ধানী হওয়া কোনো খারাপ বিষয় নয়, কিন্তু তার জন্য কিছু সীমা থাকে, কিছু নীতি থাকে। কারো ক্ষতি করে, কারো অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে মানুষ কখনো সামনের দিকে এগুতে পারে না। বাবলা গাছ লাগিয়ে যদি কেউ ভাবে তাতে ফুল ফুটবে, সেটা কোনো পাগলামোর থেকে কম নয়। অবৈধ কোনো শুরু থেকে কোনো সম্পর্ক কখনো বৈধ হতে পারে না, না পারে সেখানে কোনো বৈধ কোনো ফলাফলের আশা। খারাপ পরিস্থিতি, খারাপ মানুষ আর খারাপ ফল এগুলি থেকে পার্থক্য করা শিখতে হবে যে কোনটা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় আর কোন বিশয়টা ব্যক্তিগত বিষয় থেকে আইনের দরজায় নিয়ে যেতে পারে। যখন কোনো মানুষের পরিস্থিতি ঠিক এটাই হয়, তখন অন্যান্য দিনের মতো সকালটা আর তেমন থাকে না যেমন ছিলো আগের কোনো সকালের মতো, না তার সন্ধ্যাটাও আগের মত পরিচিত মনে হয়। পুলিশের প্রথম কাজ হয় ‘এক শান রিপ্লে তৈরী করা’। যেখানে তারা একে একে ক্রিমিনালের সম্ভাব্য সব ক্রিমিনাল পলিসি বিরুদ্ধে পুলিশের করনীয়। ফলে পুলিশ খুব সহজেই ক্রিমিনাল প্লানের একটু এগিয়েই থাকে।

নিজেদের মধ্যে যখন কেউ হিংসা হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন আসলে সেটাই হয় যা রক্তের সাথে রক্তের পাল্লা। ক্ষতি হয় শুধু নিজেদের রক্তের। তাহলে এই খেলায় কে জিতে? কেউ না।

মহিলাদেরকে আমরা দেবীর সমান তুলনা করে থাকি কিন্তু আফসোস যে, এটা শুধু মন্দির আর পুজার ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। মহিলাদের সাথে লাগাতার অন্যায় আর অপরাধ ঘটে যাওয়া এটাই প্রমান করে যে, আমাদের সমাজে আমরা যে মহিলাদেরকে দেবী বলি তারা এমন অনেক দানব দ্বারা ঘিরে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে নরক করে তুলেছে। প্রকাশ্যে কোনো মিহিলাকে পুড়িয়ে মারা হয়, নির্যাতন করা হয়, ধর্ষন করা হয় অথচ কেউ এগিয়ে আসে না।

আমাদের এ গ্রামে কতজন পুরুষ আর কতজন মহিলা আছে কিংবা কতজন ছেলে আর কতজন মেয়ে আছে এটা কি কোনো প্রশাসন বলতে পারবে? যদি ছেলে আর মেয়ের এই অনুপাত জানা যায়, তাহলে আমাদেরকে নজর দেয়া উচিত সেই জায়গায় যেখানে কতটুকু উন্নতি করা দরকার।

২/১২/২০২১-পায়ের নীচে পাথরহীন

জীবনের কাছে রাখা সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমার জীবনেও এমন একটা সময় এসেছিলো। আমার সব প্রশ্নের উত্তর হয়তোবা কারো জীবনের নাশ হবার সম্ভাবনাই ছিলো, ফলে উত্তরদাতা হিসাবে আমি কোনো উত্তরই দেওয়ার চেষ্টা করিনি। চুপ হয়ে থাকাই যেনো মনে হয়েছিলো-সর্বোত্তম উত্তর। আমি সেই “চুপ থাকা” উত্তরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে এমন পরিবেশটাই তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলাম যেনো “কিছুই না ব্যাপারটা”। কিন্তু “ব্যাপারটা” যতো না সত্য ছিলো তার থেকেও বেশী ছিলো “চাপ” আর এই “চাপ” তৈরী করার পিছনে যারা কাজ করেছিলো তারা আর কেহই নয়, আমার দ্বারা পালিত সেই সব মানুষগুলি যাদেরকে আমি ভেবেছিলাম, তারা আমার সব “ওয়েল উইশার্স”। কিন্তু আমার আরো কিছু মানুষ ছিলো যারা আমার জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে এমন করে জড়িয়েছিলো যারা আমার হাড় আর মাংশের মতো। আলাদা করা দুরুহ। সেই হাড় আর মাংশের মতো একত্রে মিলিত মানুষগুলি একটা সময়ে সেইসব তথাকথিত “ওয়েল উইশার্স”দের চক্রান্তে তাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে বিগড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের “সন্দেহ” টাই যেনো এক সময় তাদের অবচেতন মনে “বিশ্বাসে” পরিনত হয়। আর এই মিথ্যা “বিশ্বাসে” তাদের চারিপাশের শান্ত বাতাসগুলিও যেনো প্রচন্ড ঝড়ের চেহাড়া নিয়ে একটা কাল বৈশাখীতে রুপ নিয়েছিলো। কেউ বুঝতেই চাইতেছিলো না যে, এর শেষ পরিনতি বড়ই ভয়ংকর।

তবে আমি জানতাম সত্যিটা কি। কিন্তু ওইসব পরিস্থিতিতে আমার সব সত্য জানাটাই সঠিক এটা কাউকে যেমন বিসশাস করানো যায় নাই, তেমনি আমিও তাদেরকে বিশ্বাস করাতে চাইওনি। শুধু অপেক্ষা করেছিলাম-কখন ঝড় থামবে, কখন আকাশ পরিষ্কার হবে, আর দিবালোকের মতো সত্যটা বেরিয়ে আসবে। “সময়” পার হয়েছে, ধীরে ধীরে মেঘ কেটে গেছে, আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। গুছিয়েও ফেলেছি সেইসব ক্ষত বিক্ষত আচড়গুলি। কিন্তু আমি এই অযাচিত ঘটনায় একটা জিনিষ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম যে, মনুষ্য জীবনে আসলে কেউ কারোই নয়। আমরা বাস করি শুধু আমাদের জন্য। একা থাকা যায় না, তাই সমাজ, একা থাকা যায় না, তাই পরিবার। একা অনেক অনিরাপদ, তাই সংসার। কিন্তু এই সমাজ, এই সংসার কিংবা এই পরিবার কোনো না কোন সময় ছাড়তেই হয়, আর সেটা একাই। এই মিথ্যে সমাজ, পরিবার আর সংসারের নামে আমরা যা করি তা নিছক একটা নাটক। জংগলে বাস করলে একদিন সেই জংগল ছাড়তেও কষ্ট হয়। এরমানে এই নয়, আমি জংগলকেই ভালোবাসি। কথায় বলে-ভালোবাসা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর অনুভুতি, আর এটা যদি বেচে থাকে তাহলে হিংসা, বিদ্বেষ থেকে মানুষ হয়তো মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যারা এই সমাজ নামে, পরিবার নামে, কিংবা সংসার নামে চিহ্নিত করে ভালোবাসার জাল বুনে থাকি সেটা আসলে কোনো ভালোবাসাই নয়। সেখানে থাকে প্রতিনিয়ত নিজের সার্থের সাথে অন্যের লড়াই। অন্যঅর্থে সেটা একটা পাগলামী, লালসা কিংবা একা বাচতে চাওয়ার অনিরাপদের একটা অধ্যায় মাত্র। অথচ আমরা প্রত্যেক মুহুর্তে আমাদের এই নিজের পরিবারকে নিরাপদে রাখার জন্য অনেক অপবাদ, অনেক ভয়ংকর বাধা আর মৃত্যুর মতো রিস্ককে বরন করে থাকি। এ সবই আসলে নিজের সার্থে।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, আমার সেই ফেলে আসা অভিজ্ঞতার আলোকে আমি ধীরে ধীরে সে সব “ওয়েল উইশার্স” দেরকে নিজের বেষ্টনী থেকে দূরে রাখার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছি। আমি একটা মুহুর্তেও সেই সব দিনের ক্ষত বিক্ষত হবার বেদনার কথা ভুলি নাই। যখনই সেই ব্যথার কথা মনে হয়েছে- আমি বারবার আরো শক্ত হয়েছি। আমি জানি কন এক সময় আবারো তাদের আমার প্রয়োজন হবে, আবারো তারা আমাকে আকড়ে ধরার চেষতা করবে, আবারো তারা তাদের মিথ্যা চোখের পানি ফেলে আমাকে আবেশিত করার চেষ্টা করবে। আমি ততোবার নিজেকে বারন করেছি-আর যেনো সেই একই ফাদে পা না বাড়াই। তাহলে সেটা হবে আমার জীবনের জন্য কালো আধ্যায়।

ওরাও হয়তো ভেবেছিলো- কোনো প্রয়োজন নাই আর আমাকে। আমি কোন দুঃখ পাইনি। শুধু ভেবেছি, খুব ভালো যে, তারাই গুটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এই প্রিথিবীর সবচেয়ে বড় বিপত্তি এই যে, বড় বট বৃক্ষের প্রয়োজন কখনো কোনোদিন কোনো কালেই ফুরিয়ে যায় না। হোক সেটা হাজার বছরের পুরানো কোনো বৃক্ষ।

আজ সেই দিনটা এসেছে। অথচ আজ আমার সব দরজা এমন করে খিল দিয়ে আটকানো যে, না আমি খুলতে চাই, না খোলার প্রয়োজন মনে করি। পৃথিবীতে নিমক হারামের চেয়ে বড় পাপ অথবা বড় বিশ্বাসঘাতকরা আর নাই। যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কেউ আকাশ দেখে, সেই পাথকে যত্ন করে রাখতে হয়। যদি অযত্নে সেই পাথর কোথাও হারিয়ে যায় বা ব্যবহারের আর উপযোগি না হয়, তাহলে আকাশ যতো সুন্দরই হোক না কেনো, তাকে দেখার ভাগ্য আর হয় না। যদি কেউ আজিবন আকাসের জ্যোৎস্না, আকাসের তারা আর নীল আকাশের মধ্যে তারার মেলা দেখার ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাথকে অতোতাই যত্ন করা দরকার যতোটা মনে হবে তার মনের শখের দরকার। তা না হলে চোখের জলে বুক ভাসবে ঠিক কিন্তু কেউ তার নিজের পাথর দিয়ে তার আকাশ দেখা বন্ধ করে অন্যকে পাথর দিয়ে সাহাজ্য করে না। এতাই নিয়ম।

আজ তারা সেই পাথরটাকে হারিয়ে ফেলেছে বন্ধ দরজার অন্ধকার ঘরে। যেখানে না যায় দরজা খোলা, না যায় পাথরে পা রাখা। তোমাদের জন্য নতুন আরেক অধ্যায় শুরু। এবার এই দুনিয়াটাকে বড্ড অসহায় মনে হবে তোমাদের। তোমাদের প্রতিন মনে হবে- তোমরা কোথায় কি পরিমান ক্ষতি নিজেদের করেছো যার সমাধান কখনোই তোমাদের হাতে ছিলো না। তোমরা ভেবেছিলে- তোমাদের জন্য মায়ের চেয়ে মাসির দরদ সম্ভবত অনেক বেশী। কিন্তু এই দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত মায়ের চেয়ে মাসির দরদ কখনোই বেশী ছিল বলে এটা কেউ যেমন প্রমান করতে পারে নাই, আর এতা সত্যও নয়। যদি সেটাই তোমরা মনে করে থাকো- তাহলে আজ তোমাদের সেই মাসির কাছেই তোমাদের সমস্ত কিছু আবদার, চাহিদা, কিংবা সাহাজ্য চাওয়া উচিত যাকে তোমরা বিনাবাক্যে মনে করেছো, লিডার অফ দি রিং। দেখো, সেই লিডার অফ দি রিং তোমাদের জন্য কোনো সাহাজ্য পাঠায় কিনা। আমার দরজা তোমাদের জন্য আর কখনোই খোলা হবে না। আমি শুধু দেখতে চাই, আসলেই তোমরা কাকে চেয়েছিলে? কার উপরে তোমাদের এতো নির্ভরশীলতা ছিলো আর কার গলায় পা রেখে শ্বাস রোধ করেছিলে। আমি তো সেদিনই মরে গেছি যেদিন তোমরা আমাকে আমার অজান্তে পিছন থেকে চিমটি নয় ছুড়ি মেরেছিলে। আহত লোকের কাছে কোনো সাহাজ্য প্রার্থনা করা উচিত না। এটাই তোমাদের শিক্ষা।

২৬/১১/২০২১-মুর্তজা ভাইয়ের নীতি ও আদর্শ (ফলো আপ পর্ব-২)

আমার আগের লেখাটায় একটা কথা লিখেছিলাম যে, কোনো এক সময় হয়তো এমন হতে পারে যে, আমার থেকেও বেশী পরিমান টাকার প্রয়োজনে হয়তো মর্তুজা ভাই আমাদের ফ্যাক্টরী রিভার সাইড থেকে টাকা টান দিতে পারে যখন আমার কোনো টাকাই হয়তো লাগবে না কিন্তু ওনার লাগবে। এ কথাটা আমি মাত্র মাস তিনেক আগে লিখেছিলাম আমার আগের লেখাটায়। অথচ এই মাসেই সেটা প্রমানিত হলো। মর্তুজা ভাই তার সঞ্চিত টাকা অন্য এমন এক জায়গায় ইনভেষ্ট করে ফেলেছেন যে, উনি ওখান থেকে এই মুহুর্তে টাকাগুলি ব্যাক করতে পারছেন না। আবার তার ইচ্ছা যে, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে প্রায় ৪ কাঠার সম পরিমান একটা ল্যান্ড কিনতে ইচ্ছুক। ফলে উনার প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার খুবই প্রয়োজন। এই সাড়ে ৪ কোটি টাকা যদি উনি টান দেন, তাহলে আমিও আমার অনুপাতে পাই প্রায় ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আমার এই মুহুর্তে কোনো টাকার প্রয়োজন নাই। ফলে, আমি যদি এখন মর্তুজা ভাইকে বলি যে, এই সাড়ে ৪ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি আমাকে শেয়ার লিখে দিক, তাহলে আমি কিন্তু মর্তুজা ভাইয়ের থিউরী অনুযায়ী ডিমান্ড করতেই পারি। কিন্তু আমি সেটা করবো না।

মর্তুজা ভাই তার এই সাড়ে ৪ কোটি টাকা দুই পর্বে ফ্যাক্টরী থেকে নিতে চান। প্রথম পর্বে দেড় কোটি টাকা আর ৯০ দিন পরে বাকী টাকা।

আমি পুরু জিনিষটা অব্জার্ভ করছি। আমি আর আগের মতো নাই। এখন প্রতিটা ব্যাপার নিয়ে আমি মাথা ঘামাই যা আগে কখনোই করি নাই। এটা মর্তুজা ভাইও বুঝে গেছেন। তিনিও খুব চালাক মানুষ, ফলে ব্যাপারটা তিনিও খুব সন্তর্পনে হ্যান্ডেল করছে,

গত ২৩ তারিখে তার ১ম পর্বের টাকাটার কথা আমাকে জানালেন। আগে হলে আমি হয়তো এ রকম কোনো ফর্মালিটিজ করতাম না, একবারেই বলে দিতাম যে, আপনি টাকাটা নিয়ে ড্রইংস এর মধ্যে লিখে রাখেন। কিন্তু এবার আমি অন্য পথ অবলম্বন করেছি। আর সেটা কি তার প্রক্রিয়াটা এখানে দিলাম। আমি প্রথমে একাউন্ট অফিসারকে একটা নোট শীট লিখতে বলেছি। তারপর ওই টাকার সম পরিমান আমার কত আসে সেটাও নোট শীটে লিখতে বলেছি। আর এটাকে একটা আলাদা ট্রাঞ্জেকশন হিসাবে দেখতে বলেছি। তারপর বলেছি- আমার এবং মর্তুজা ভাইয়ের নামে মোট কত টাকা হয় সেটা কোন ফান্ড বা সোর্স থেকে দেয়া যেতে পারে একাউন্ট অফিসার যেনো ক্লিয়ারলী উল্লেখ করে। আর সেটা আমরা দুজনেই যদি এক সাথে ড্রইংস করি তাতে ফ্যাক্টরীর কোনো অসুবিধা হবে কিনা সেটাও লিখতে বলেছি। আমি আগের নিয়মে গেলে হয়তো আমার ভাগের টাকাটা আমি এখনই নিতাম না, কিন্তু এবার আমি সেটা করছি না। যেহেতু উনি নিবেন, তাই আমার টাকা লাগুক বা না লাগুক, আমিও নেবো। আগে উনি নিক, তারপর আমি আমারটা নেবো। ফলে একটা অফিশিয়াল নোট শীট করতে বলায় মর্তুজা ভাই যেনো আকাশ থেকে পড়লো। উনি এটা ভাবেন নাই। একটু নার্ভাস ছিলো, আবার মনে মনে রাগের বশে উত্তেজিতও ছিলো। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। ছাড় দিতে ইচ্ছে করছিলো না। আর এটা তো মর্তুজা ভাইই আমাকে শিখিয়েছেন। আমি নিজের থেকে কোনো নিয়ম ও করি নাই, বানাইও নাই। আমি শুধু উনার করা প্রাক্টিস গুলিই ফলো করছি, ফলে উনি আমাকে জোর করেও কিছু বলতে পারবে না। উনি দেড় কোটি টাকা নিলে আমিও নিতে পারি প্রায় ৮১ লাখ টাকা। প্রয়োজনে আমি আমার টাকা তুলে নিয়ে এফডিআর করে রাখবো, অসুবিধা কোথায়? অবশ্য আমি টাকাগুলি পরেও নিতে পারতাম, আর এটাই মর্তুজা ভাই ভেবেছিলেন। কিন্তু এবার আমি সেটা করতে নারাজ। উনি বুঝুক যে, পার্টনারশীপ ব্যবসায় পার্টনার যদি শক্ত হয়, তাহলে আরেক পার্টনার অনেক মজা নিতে পারে না যেটা উনি এতোদিন নিতেন। নোটশীটটা দেখলে বুঝা যাবে, বেশ কঠিন সিচুয়েশন। 

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মর্তুজা ভাই উত্তরা ৪ নং সেক্টরে প্রায় পৌনে চার কাঠা জমিতে চার তলা বিল্ডিং সহ একটা জায়গা কিনার নিমিত্তে তার প্রায় ৬ কোটি টাকার প্রয়োজন। আর সেটার তিনি প্রায় ৫ কোটি টাকা তিনি ফ্যাক্টরী থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্বে দেড় কোটি টাকা নিচ্ছেন, পরবর্তী ৩ মাস পরে ২য় পর্বে বাকী টাকা নিবেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমিও পার্টনারশীপ অংশীদারিত্তে ৩৫% হিসাবে সম পরিমান টাকা নেওয়ার ভাগীদার। আগের নিয়মে থাকলে আমি হয়তো আমার অংশের টাকাটা এখন আমি নিতামই না। এটাই এতোদিন মুর্তুজা ভাই এঞ্জয় করেছে। অনেক সময় আমার মনেও থাকতো না, আমার কত নেয়া উচিত ছিলো, আর সেটা নেয়া হয়েছে কিনা। কিন্তু এখন সেই পলিসিতে আমি আর নাই।

২২/১১/২০২১-এসআইবিএল এর ২৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী (ফেসবুক)

আমার ব্যবসার জন্মলগ্ন থেকেই একটি মাত্র ব্যাংকেই আমি সমস্ত ব্যবসায়ীক লেনদেন করে এসছি। আর সেটা হলো এসআইবিএল ব্যাংক। আমি অবশ্য এসআইবিএল এর প্রধান কার্যালয়ের সাথে ব্যবসায়ীক লেনদেন করলেও হাসনাবাদ সুপার মার্কেটের এসআইবিএল শাখার সাথে আমাদের ফ্যাক্টরীর সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার সাথে আত্মার মতো। ডোর টু ডোর প্রতিষ্ঠান। আমার প্রায় প্রতিটি ষ্টাফ এই ব্যাংকের গ্রাহক।

আজ এই ব্যাংকের ২৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ছিলো। গতকালই আমার খুবই প্রিয় একজন মানুষ  ব্যাংকের ম্যানেজার নিজাম ভাই নিজে এসে আমাকে দাওয়াত করে গিয়েছিলেন যেনো আজকের দিনটায় অন্যান্য দিনের চেয়ে অফিসে একটু আগে এসে তাদের এই মহান দিনটির সাথে আমি শরীক হই।

অনেক চমৎকার একটা বিশাল কেক কেটে এই মহান দিনটাকে এসআইবিএল ব্যাংক স্মরণ করেছে। আমি নিজেও গর্বিত এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যবসায়ীক কার্যক্রম পরিচালনা করায়।

ধন্যবাদ নিজাম ভাই, ধন্যবাদ সব কলিগ ভাইদের।

১৯/১১/২০২১-“পুরুষ মানুষ হলো খেজুর গাছের মতো

“পুরুষ মানুষ হলো খেজুর গাছের মতো। আদর পায় না, যত্ন পায় না, কেউ পানি দেয় না, সার দেয় না, গোঁড়ায় কেউ মাটি দেয় না, আরো বলে নিজের পায়ের তলার মাটি নিজে শক্ত করো! অযত্নে অবহেলায় বেড়ে উঠে! বেড়ে উঠার পর কিন্তু তার কাছে প্রত্যাশা অনেক!

তার ফল খুব মিষ্টি, তার রসের জন্য হাহাকার, তার রসের গুড় চিনির চেয়ে কয়েকগুন বেশি উপকারী। তাকে বছরের পর বছর ক্ষতবিক্ষত করা হয়! যতদিন বেঁচে থাকে তাকে কাটা হয়, তার রস এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে নিগড়ে নেওয়া হয়! রস নেওয়া শেষ হয়ে গেলে আর তার কোন কদর থাকে না, পথে ধারে একাকী অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকে!

তারপরও খেজুর গাছ কোন অভিযোগ করে না, কিছু প্রত্যাশা করে না, ভালোবাসা চায় না। শুধু ফল দিয়ে যায়, রস দিয়ে যায় আর মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকে নিঃস্বার্থভাবে আপনার পরিবারের পুরুষ মানুষটির মতো!” কালেক্টেড

১১-১৫/১১/২০২১ Visit to India

মুলত ব্যবসার কাজেই এবার ইন্ডিয়া আসা। কিন্তু সাথে কোনো ল্যাপ টপ নেই নাই। কোনো ভারী লাগেজ ও নেই নাই। ইচ্ছে ছিলো-একেবারে নিরিবিলি সময় কাটানো। সাথে মুর্তজা ভাই ছিলেন। হোটেল তাজ বেংগলে উঠেছি। খুব সুন্দর একটা হোটেল। অবশ্য খুব এক্সপেন্সিভ ও বটে। তারপরেও সহ্য হচ্ছিলো। কি হবে এতো টাকা পয়সা জমিয়ে?

১১ তারিখ সকাল ১১ টার মধ্যে কলিকাতা পৌঁছে গেলাম। এয়ারপোর্ট থেকেই আমরা চলে গেলাম “আদিত্য বিরলা গ্রুপ” এর উদ্দেশ্যে। মিঃ অর্নব, নভো মন্ডল এবং আরো ষ্টাফরা ছিলো আমাদের জন্য অপেক্ষায়। ভীষন ভালো একটা মিটিং হলো। ওরাই লাঞ্চ হোষ্ট করলো, কিছুক্ষন রেষ্টের জন্য ওরাই ওদের আদিত্য বিরলার এরিয়ায় রেষ্ট হাউজে বেশ সুন্দর একটা রুম দিলেন। আমরা ফ্রেস হয়ে নামাজ পড়ে আবার বিকালে প্রায় ৫ টার দিকে কলিকাতা তাজ হোটেলের জন্য বেরিয়ে গেলাম।

১৫ বছর এক নাগারে (১৯০৬ থেকে ১৯২১) রানী ভিক্টোরিয়ার স্মরণে লর্ড কার্জন এই  হুগলী নদীর ধারে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গড়ে তুলেছিলেন। আসলে এই মেমোরিয়াল তৈরী শুরু হয় রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর প্রায় ৬ বছর পর থেকে। ১৮৪০ সালে ভিক্টোরিয়া প্রিন্স এলবার্টকে বিয়ে করেন। কিন্তু প্রিন্স এলবার্ট টাইফয়েড জরে ১৮৬১ সালে মারা যাওয়ার পর রানী আর কাউকেই বিয়ে করেন নি।  পরবর্তীতে রানী ভিক্টোরিয়া মারা যান ১৯০১ সালে সেরেব্রাল হেমোরেজে। তার মৃত্যুর পর রাজা ৭ম এডওয়ার্ড (তার ডাকনাম ছিলো বার্টি) ক্ষমতা গ্রহন করেন। 

মোট ২৫টি গ্যালারী আছে এর মধ্যে। তার মধ্যে ‘রয়েল গ্যালারী’, জাতীয় নেতাদের গ্যালারী, সেন্টারল হল, আর্মস এন্ড আর্মারী হল ইত্যাদি। সব গুলি গ্যালারীতে সবার প্রবেশের সুযোগ নাই। তবে নীচ তালায় পুরু মিউজিয়াম ভর্তি সুভাস চন্দ্রের তার লাইফ টাইমের বিভিন্ন তথ্য, চিত্র এবং ছবি দিয়ে ভরা।

তারপরেও এখানে বেশ কিছু দূর্লভ ছবি এবং মুল্যবান ভাষ্কর্য আছে যা ইতিহাসের পাতায় বেশ নামিদামী হয়ে আছে। যেমন, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তারা যে মার্চেন্ট শীপে ভারত বর্ষে এসেছিলেন, তার একটা অরিজিনাল রেপ্লিকা আছে। রানী ভিক্টোরিয়া তার ১০ বছর বয়সে তার চাচা ৪র্থ রাজা উইলিয়াম থেকে পেয়েছিলেন সেটা আছে। টিপু সুলতানের গিল্ডেড ডেগার, কর্ন ওয়ালিসের মুর্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজ হাতে লেখা মেনুস্ক্রিপ্ট, পলাশীর যুদ্ধে যে ক্যনন বল ব্যবহৃত হয়েছিল তার একটা নিদর্শন আছে, লর্ড কার্জনের একটা মুর্তি আছে। 

ঘুরার জন্য মন্দ না।

গংগা

জাকারিয়া মসজিদ

সল্ট লেক

১০/১১/২০২১-বিদেশ যামু, খালী কইলেই যাওয়া যায় না। (ফেস বুক)

বিদেশ যামু, খালী কইলেই যাওয়া যায় না। ভিসা পাওয়ার পরে কভিডের কারনে যা ফর্মালিটিজ, তাতেই বিদেশ যাওয়ার খায়েস মিটে যায়। যাই হোক, যেতে তো হবেই, তাই একটা স্বনামধন্য হাসপাতালে কভিড-১৯ টেষ্টে গেলাম, ফর্ম পুরন করলাম, লাইন ধরলাম, টাকা জমা দিলাম, এবার গেলাম স্যাম্পল দেয়ার রুমে। একজন মধ্য বয়সী ভদ্রলোক আর নিম্ন মধ্য বয়সী ভদ্র মহিলা কাচের ওপারে বসে স্যাম্পল নেয়ার জন্য বসে আছেন। আমার জন্য চেয়ার কাচের এপাশে। কোনো অসুবিধা নাই। সম্ভাব্য কভিড কিনা এমন লোকের চেয়ার দূরে থাকাই মংগল। একটু পরে ভদ্রলোক ধীরে ধীরে দুইটা কাঠি বাইর করলেন যার মাথায় স্যাম্পল নেয়ার জন্য তুলার একটা মাথা আছে।

আমি তো কাঠির সাইজ দেইখাই ভয় পাইয়া গেলাম। তিনি আমার গলায় একটা কাঠি ঢোকাইয়া গলা থেকে স্যাম্পল নিলেন। আরেকখান নাকের ভিতর ঢোকাইয়া দিয়া সেখান থেকেও নিলেন। নেওয়ার পর আমি ঊনাকে বললাম-

ভাই, কাঠিটা আরো একটু বড় হইলেই তো একেবারে স্যাম্পল নেয়ার সাথে এন্ডোষ্কোপিকটাও হইয়া যাইতো। ভদ্রলোক হেসে দিয়ে বললেন- ক্যান ভাই, বেশী ভিতরে চলে গেছে? ব্যথা পাইছেন নাকি?

আমিও হেসেই বললাম, নারে ভাই, মজাই লাগছে।

আমি আবার ঊনাকে বললাম- ভাই এখানে তো অনেকেই আসে, যাদের কভিড-১৯ থাকতেও পারে। আপনার কাঠিটা ৬ ফুট লম্বা হইলে কিন্তু এক কামে তিন কাম হইয়া যাইতোঃ (১) এন্ডোষ্কোপি (২) স্যাম্পল নেয়া (৩) আপ্নিও ৬ ফুট দুরুত্তে থেকে নিরাপদে থাকা।

পাশে থাকা ভদ্রমহিলা মনে হয় একট চায়ে চুমুক দিছিলেন। হাসি আর আটকে রাখতে না পেরে মুখে যতুটুকু চা ছিলো, তা বহির্বিসশে চলে এলো।

এর পরের কাহিনীটা আর বললাম না।

৬/১১/২০২১-সেনাকুঞ্জে একটি ভালো মুহুর্ত (ফবু)

অনেকদিন পর ঘরোয়া একটা পরিবেশে আমার ছোটকালের বন্ধু এবং সেনাবাহিনীতে কোর্ষমেট লেঃ জেনারেল ওয়াকার এবং ওর স্ত্রীর সাথে সেনাকুঞ্জে দেখা। নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল শাহীন ইকবাল স্যার এবং প্রাক্তন সেনাপ্রধান লেঃ জেনারেল হারুন অর রশীদ স্যারও এসেছিলেন। অনেক বছর পর তাদের সাথে দেখা। গল্পে গল্পেই কেটে গেছে সময়টা। আমার খুব প্রিয় একজন নেভীর ঊর্ধ্বতন অফিসার (কমোডোর মামুন) এর মেয়ের বিবাহ অনুষ্ঠান ছিলো এদিন। সেনাকুঞ্জে অনেকের অনেক দাওয়াত পেলেও ব্যস্ততার কারনে যাওয়া হচ্ছিলো না অনেকগুলি অনুষ্ঠানে। আজ সময়টা ভালই কেটে গেলো।

ব্যাস্ততা থাকেই। বহুদিন পর আজ সেনাকুঞ্জে কমোডোর মামুনের মেয়ের বিয়েতে দাওয়াতে গিয়ে অনেক পুরানো মুখ গুলির সাথে আবারো দেখা হলো। এই করোনা পরিস্থিতিতে কত যে প্রিয় সিনিয়ার এবং জুনিয়ার মুখগুলিকে হারিয়ে ফেলেছি, ভাবলেও কষ্ট হয় আর নিজের জন্যেও ভাবনা হয়। করোনা অন্তত আমার পুরু জীবনের অনেক পরিকল্পনা উলটে দিয়েছে, প্রাইওরিটি বদলে ফেলেছে, সিডিউলেও অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যাই হোক, যেটা বলছিলাম- এই প্রিয় মুখগুলিকে আল্লাহ এখনো দেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন, বড় আপন মনে হয় দেখলে।

২০০২ সালে আমি যখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে জি এস ও-২ হিসাবে এমটি ডাইরেক্টরেটে কাজ করতাম, তখন আর্মির চীফ ছিলে লেঃ জেনারেল হারুন অর রশীদ স্যার। ২০০২ সালের পরে স্যারের সাথে আর কখনো কোথাও দেখা হয় নাই।

৫/১১/২০২১-প্যারাডাইম শিফট

যখন সাভাবিক কোনো চিন্তাচেতনা কিংবা কার্যক্রম অন্য কোনো নতুন নিয়ম বা চিন্তা চেতনা দ্বারা সম্পন্ন হতে দেখা যায়, তখন এই প্রতিস্থাপিত নতুন পরিবর্তিত চিন্তা চেতনাকেই প্যারাডাইম শিফট বলা যেতে পারে। অন্যঅর্থে যদি বলি- এটা হচ্ছে একটা মডেল, তত্ত্ব, বা দ্রিষ্টিভঙ্গি, ধারনা, কিংবা দৃষ্টান্ত যা প্রকৃত তত্ত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা মডেল থেকে আলাদা। প্যারাডাইমটা আসলেই আসল জিনিষ না, এটা একটা মানষিক ভাবনার সাথে প্রকৃত সত্যের একটা শুধু ছবি। কোনো একটা জিনিষের ব্যাপারে আমরা যা ভাবছি, বা দেখছি এর সাথে সেই জিনিষটার যে রকম প্রকৃত বৈশিষ্ট , এই দুয়ের মাঝেই থাকে প্যারাডাইম তত্তটি। এই প্যারাডাইম দিয়ে মানুষ কোনো একটা ধারনা, চিন্তা চেতনা, কিংবা কোনো একটি জিনিষের ব্যাপারে একটা ধারনা পায়।

কিন্তু প্যারাডাইম শিফট অনেক বড় জটিল। প্যারাডাইম শিফটের মাধ্যমে কোনো একটা তত্ত্ব, চিন্তাচেতনা বা দ্রিষ্টিভঙ্গি পুরুটাই পালটে যায়। একটা উদাহরণ দেই- ধরুন আপনি একটা লোকের চেহাড়া দেখে ভাবলেন যে, সে একটা নিশ্চয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী। আপনার মন তাকে সেভাবেই ট্রিট করছে, সেভাবেই আপনি তাকে ওই খারাপ মানুষদের মধ্যে লিষ্ট করে ফেলেছেন। অনেকপরে যখন জানলেন যে, লোকটা ছিলো খুবই ভদ্র, ভালো ও খুবই অমায়িক এবং পরোপকারী। তখন আপনি অনেক মনোকষ্টে ভোগবেন। আফসোস হবে। এই যে নতুন ভাবনা আপনাকে আগের চিন্তাচেতনা থেকে হটাত করে ১৮০ ডিগ্রী উলটে গিয়ে আরেক নতুন প্যারাডাইমে নিয়ে আসছে, এটাই হলো প্যারাডাইম শিফট।

থমাস কুন তার বিখ্যাত-“দি স্রাইাকচার অফ সায়েন্টিক রেভ্যুলেশন” বই এ প্রথম প্যারাডাইম শিফট শব্দটি চালু করেন। প্যারাডাইম যার যতো বেশি নিখুত, তার প্যারাডাইম শিফট ততো কম। আর যাদের এই প্যারাডাইম কোনো কিছুর ব্যাপারে প্রায় কাছাকাছি থাকে, তারা আসলেই জ্ঞানী এবং বাস্তববাদী। বর্তমান জগতে মানুষের প্যারাডাইম অনেক অনেক সত্যের থেকে বেশী দূরে বিধায়, আমাদের সমাজে গন্ডোগোল বাড়ছে।

আমাদের জন্মের সময়ে আমাদের ব্রেন কিন্তু একদম ফাঁকা থাকে। তারপর আমাদের মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয় স্বজন আমাদের মনের ভেতর (বা পড়ুন ব্রেনের ভেতর) তাদের বিশ্বাস, ভালো লাগা-মন্দ লাগা এইসব ধীরে ধীরে ঢুকাতে থাকেন। একটু বড় হলে স্কুলের শিক্ষকেরা আমাদের ব্রেনের ভেতর নতুন নতুন তথ্য ঢুকাতে থাকেন, সাথে আমাদের আশে পাশের মানুষজনের আচার আচরণ বা ভাবনা, বই পত্রের তথ্য এইসব আমাদের ব্রেনে ঢুকতে থাকে। চারিদিক থেকে আহরণ করা এইসব বিভিন্ন তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকে একরকম ছাপ ফেলে যায়। আমরা আসলে আমাদের আশেপাশের থেকে বিভিন্ন ইনফরমেশন নিয়ে তারপর আমার মতো করে সাজিয়ে আমার ব্রেনে স্থাপন করছি। এইসব ছাপ দিয়েই পরবর্তিতে আমরা লোকভেদে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ডিসিশন নেব।

সাইকোলজিস্টরা এই ছাপকে বলেন ‘প্যারাডাইম’। এই প্যারাডাইমের কি ‘শিফট’ বা পরিবর্তন করানো যায়? বা কখনো সখনো পরিবর্তন করা কি উচিত? 

আপনি যখন আপনার বাসার কাজের মেয়ের বিচার করছেন, আপনি কি তার ‘দৃষ্টিকোণ’ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখেছেন? অথবা আপনার ছেলে বা মেয়ে হঠাৎ করে কেমন খাপছাড়া আচরণ করছে, আপনি কি তার মনের ভেতরটা দেখে নিয়েছেন? আপনারা স্বামী বা স্ত্রী আজকাল এমন আচরণ করছেন কেন? আপনি কি তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা ভেবে দেখেছেন? আপনার বন্ধু আপনাকে আজকাল এভয়েড করছে, কেন করছে তা কি তার মতো করে ভেবে দেখেছেন? আপনি যে লোকটাকে প্রচণ্ড খারাপ বলে মনে করছেন, আসলেও কি সে তা-ই? 

সাইকোলজিস্টরা বলেন, হ্যাঁ, এই প্যারাডাইম শিফট করা যায়, আপনি যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছু বিচার করতে চান, তবে তা পরিবর্তন করাই উচিত। 

প্যারাডাইম শিফটের পরের অবস্থা: অনেক সময়ে মনে হয় যেন ডিমের খোলস ভেঙে মাত্র দুনিয়া দেখছি

The mind that opens to a new idea never returns to its original size.

Albert Einstein

সং গ্রিহীত

পরিচিত এক বড় ভাই বুয়েটে পড়া অবস্থায় ইন্টারে পড়ুয়া এক মেয়েকে টিউশনি করাতো..

ভাই দেখতে হ্যান্ডস্যাম। পড়তো কম্পিউটার সাইন্সে। ছাত্রী তখন তার রঙিন বয়সটা পার করছে। সুতরাং যা হবার তাই হলো।

সে ইনিয়ে বিনিয়ে ভাইকে প্রেম প্রস্তাব দিয়ে বসলো। ভাই এই প্রস্তাবের জবাবে শুধু একটা কথাই বলেছিলো “তুমি সবে মাত্র ইন্টারে পড়। কম্পিউটারটা ঠিকমত চালাতে পারো না। তবুও তোমার একটা লেটেস্ট ল্যাপটপ আর একটা ডেক্সটপ আছে। আমার দুইটা সেমিস্টার পার হয়ে গেল। বাবাকে বলেছি কম্পিউটার সাইন্সে পড়ি। একটা কম্পিউটার দরকার। বাবা দিতে পারেন নাই। বাকিটা তুমি বুঝে নিও। কাল থেকে আর পড়াতে আসবো না” এরপর সেই ছাত্রীর কি হয়েছিলো জানি না।

তবে ভাই আজ বেশ সফল একজন মানুষ।

সেদিন এক বন্ধুর হাতের রান্না খেলাম। খুব সুন্দর রান্না করে। মাংশতে এত ঝাল দিছে যে আমার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছিলো। বন্ধুকে বললাম, ‘এত ঝাল খাস কেন?

“ছোট বেলায় খুব অভাব ছিলো। প্রায়ই শুধু মরিচ দিয়ে ভাত খেতাম। সেই থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে”।

বন্ধুর জবাবটা এমনই ছিলো। আমি চমকে তাকালাম!

অভাব আর পাওয়া না পাওয়ার গল্পগুলো সবাই বুঝতে পারে না; আর বর্তমান জেনারেশনের বেশির ভাগই সব পেয়েছির দল। তাই তাদের কাছে এই কচকচানি বিরক্তিকর মনে হতেই পারে। তবে শুধু এইটুকু বলি- “জীবনটাতে অভাব, টানাপোড়ন, স্ট্রাগল-সংগ্রাম এই জিনিস গুলো বড্ড প্রয়োজন।”

না আমি কারো সামর্থ্য থাকাকে দোষ দিচ্ছি না। সেটা অবশ্যই শুকরিয়া করার বিষয়। তবে কেউ কেউ চাওয়া মাত্র সব পেয়ে জীবনটাকে বিভিন্ন রং এর সাথে গুলিয়ে ফেলে। তাদের কাছে জীবন মানে একটা সেলফি, চেকইন, ডিজে পার্টি, হ্যাং আউট, বারবিকিউ, কিংবা ভার্চুয়াল কিছু অনূভুতি।

তারা কি জানে বাস্তবটা অত সোজা না? যেখানে একটা স্ট্যাটাস কিংবা দুইটা সেলফি দিয়ে সবকিছু আপডেট রাখা যায় না।

বাস্তব জীবনটাকে আপডেট রাখতে হলে ছুটতে হয়। ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়। হোঁচট খেয়ে ব্যাথা পেলে চোখে জল আসে। সেই চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটতে হয়।

-সংগৃহীত

০৯/০৯/২০২১-১০০ বছর পর আগামীকাল

(Purpose of my Life-1)

আজ থেকে ১০০ বছর পর ঠিক এই সময়ে আমাদের যুগের বেশীরভাগ মানুষ আর এই পৃথিবীতেই হয়তো থাকবে না। হয়তো খুবই নগন্য কিছু সৌভাগ্যবান অথবা অন্যঅর্থে দূর্ভাগ্যবানও বলা যেতে পারে, তারা বার্ধক্যের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্ষীনদৃষ্টি আর দূর্বল শরীরে এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে যা কখনোই তারা চায় নাই। যার নাম ‘মৃত্যু’।

এই শতবর্ষে ক্যালেন্ডারের পাতা প্রতিদিন পালটে যাবে, তাঁর সাথে সাথে পালটে যাবে তারিখ, মাস, বছর এবং অতঃপর যুগ। কেউ এটাকে আমরা থামাতে পারিনি, পারবোও না, আর কেউ পারেও নাই। এটাই প্রকৃতি আর এটাই তার সতসিদ্ধ নিয়ম।

এই মুহুর্তে যারা পথেঘাটে আমার পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে, তাদের বেশীর ভাগ মানুষকেই আমি চিনি না। এদের কেউ হয়তো কোটটাই পড়া, কেউ হয়তো ফুটপাতে নোংরা চুলে বসা, আবার কেউ হয়তো আমার মতোই চলমান বা স্থবির। সময়ের পথ ধরে আমরা সবাই পূর্ব পুরুষদের পথ ধরে মহাশ্মশানের সারিসারি পাথরে লুকিয়ে যাবো ঠিক সেইস্থানে যার কথা আমরা আজ ভাবতেও পারি না। সেখানে না আছে কোনো কোট টাই পড়া আধুনিক পোষাক, আর না আছে কোনো আলখেল্লা। অনেকের বেলায় হয়তো সেই নামফলকটাও থাকবে না। কোথায় আছেন তারা, কার জায়গায় আছেন তাঁরও কোনো হদিস পাওয়া যাবে না। আজ যে শরীরটাকে প্রতিদিন নোংরা মনে করে দেশী বিদেশী সাবান শ্যাম্পু দিয়ে সুগন্ধী মাখছি, তখন এই শরীরের মধ্যে হাজারো পোকা মাকড়, কর্দমাক্ত মাটি, নোনা জল, অপরিষ্কার জলের সাথে ভেসে আসা দূর্গন্ধময় আবর্জনায় সারাটা শরীর ভেসে গেলেও তাকে আর সুগন্ধী কেনো, উম্মুক্ত হাত দিয়ে সরানোর মতোও আমাদের কোনো শক্তি থাকবে না। শরীরে মাংশ পচেগলে মিশে যাবে মাটির সাথে। হয়তো কোনো এক কুকুর কিংবা শিয়াল আমাদের শরীরের অবশিষ্ঠ হাড্ডিটি নিয়ে দূরে কোথাও পচে যাওয়া মাংশটুকু খাওয়ার জন্য দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। কার সেই কংকাল, কার সেই হাড্ডি, এই পৃথিবীর কোনো জীবন্ত মানুষের কাছে এর কোনো মুল্য নাই।

যে ঘরটায় আমি সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অবসাদ শরীর নিয়ে মুলায়েম বিছানায় গা হেলিয়ে দিতাম, সেই ঘরটা হয়তো থাকবে অন্য কারো দখলে। কে তারা, কি তার পরিচয়, সেটাও হয়তো আমার জানা হবেনা। যে বাগানটায় আমি প্রায়ই পায়চারী করে আকাশ দেখতাম, গাছগাছালীর মধ্যে উড়ে আসা ভ্রমর কিংবা পোকামাকড় দেখতাম, সেই বাগানের দখল এখন কার দখলে কে জানে। বাগানের গাছগাছালীর পরিচর্যার নামে যে পোকামাকড়গুলিকে আমি বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করতাম, আমি আজ তাদেরই দখলে। যে বাচ্চাদের মুখরীত কোলাহলে আমার ঘর ভরে থাকতো, যাদের আগমনে আমার মন পুলকিত হতো, আজ সেখানে অন্য কেউ মুখরীত হচ্ছে।অথচ  কতই না সাবধানতায় আগলে রেখেছিলাম আমার সেইঘর, সেই লন, কিংবা আমার যতো আয়েশী জিনিষ, আজ সেগুলি আমার কিছুই নয়। আমার সুন্দুরী স্ত্রী যখন তাঁর লাল শাড়িটা পড়ার পর কিংবা আমিই যখন নতুন কোনো একটা ড্রেস পড়ে বারবার আয়নার সামনে গিয়ে কতবার দেখতে চেয়েছি-কেমন লাগে আমাকে দেখতে, আজ সেই আমি বা আমার সেই সুন্দুরী স্ত্রী তাঁর চেহাড়া কেমন দেখায় কাফনের সেই ধবল পোষাকে সেটা দেখার কোনো পায়তারাও আমার নাই। আমি সেই ধবল পোষাকে এতোটাই শংকিত, যা আমি কাউকে বলতেও পারছি না। এখন সেই বৃহৎ আয়নাটার আর কোনো মুল্য নাই আমার কাছে। হয়তো সেখানে অন্য কেউ এখন তাঁর চেহাড়া দেখছে, হয়তো লাল শাড়ির পরিবর্তে নীল বা লাল টাইকোট পড়া কোনো এক পুরুষ একটা ভেষ্ট পড়া ব্যাকব্রাস চুলের মহড়া দিচ্ছে। যে গাড়িটা প্রতিদিন আমাকে মাইলকে মাইল ঠান্ডা কিংবা শীততাপ হাওয়ায় বসিয়ে, মিষ্টি মিষ্টি গান শুনিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে, সেটা আর আমার কোনো প্রয়োজন নাই। না সে আমাকে আর খোজে।

কখন কোথায় কাকে নিয়ে কবে কোথায় কি আনন্দে মেতেছিলাম, সেই ইতিহাস আর কেউ কখনো মনে রাখবে না। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কতটা পথ হেটেছিলাম, আর সেই হাটাপথে আমি কতটুকু ঘাম ঝরিয়ে চূড়ায় উঠে কি তৃপ্তি পেয়ে কি আনন্দে কতটুকু আত্তহারা হয়েছিলাম, সেই তথ্য না কেউ জানবে, না কেউ জানার কোনো আগ্রহ দেখাবে। কার সাথে কি নিয়ে আমার মনোমালিন্য হয়েছিলো, বা কে আমাকে কতটুকু ভালোবেসে কি অবদান রেখেছিলো অথবা কার কোন আগ্রহে আমি কোথায় কি করেছিলাম, কার কারনে আমার অন্তরে জালা উঠেছিলো আর কার কারনে আমার দিন আর রাত একহয়ে গিয়েছিলো, সেই ইতিহাসের কোনো মুল্য আজ বেচে থাকা মানুষগুলির কাছে কোনো অর্থ বহন করেনা। না তাদের কাছেও যাদের জন্য এসব অন্তর্জালা ঘটেছে। নতুন প্রজন্ম নতুন পরিবেশ, নতুন সব কাহিনীতে ভরে থাকবে বর্তমান আর আগামীর প্রজন্ম। সেই পুরাতন পরিবেশের কোনো স্থান থাকবেনা আজকের এই পরিবর্তীত পরিবেশে। হয়তো কোনো এক ছোট বালিকা আমাদের কথা শুনে, অথবা ভালোবেসে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে আমাদের সেই সমাধিতে দাঁড়িয়ে একটু অন্যমনষ্ক হয়ে পুষ্পস্তবক দিতেও পারে কিন্তু সেটা নিছক একটা মুহুর্তের ইমোশনাল কারনে। সবার বেলায় এটা আবার নাও হতে পারে। কিংবা জন্ম জন্মান্তরের শেষে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শেষে আমি এমন করে বিলীন হয়ে যাবো যে, সেই অবুঝ বালিকার পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর একটা বাশী ফুলও নিয়ে আমার সেই সমাধিতে দাঁড়াবে না। কারন আমি তাদের কোনো ইতিহাসের মধ্যেই নাই। চিরতরেই বিলীন।

আজ যে সেলফীটা অনেক যত্ন করে তোলা হয়েছে, হাসিমাখা মুখ, চুলের বাহার, পোষাকের পরিপাটিতা, সবকিছু ধীরে ধীরে সেই শতবর্ষ পরে এমন করে মলিন হয়ে যাবে, হয়তো দেখা যাবে, সেই ছবিটাই পরে আছে এমন এক কোনায় যেখানে থাকে পরিত্যাক্ত কোনো কাগজ বা ময়লার বাক্স। কোনো একদিন সেটা হয়তো অপ্রয়োজনীয় হয়েই বেরিয়ে যাবে আমার সেই শখের ঘরের দরজা পেরিয়ে। আমার প্রতিদিনের নেশা সেই সোস্যাল মিডিয়া, হোয়াটসাপ, ইত্যাদি সবকিছু এক নিঃশ্বাসে বন্ধ হয়ে যাবে আমার সারাদিনের আপডেট আর কাহিনি। যে অর্থের জন্য আমি প্রতিদিন সারাটা সময় শুধু পরিশ্রমই করে গেছি, সেই অর্থ আজ আমার কোনো কাজেই আসবে না। শতবছর পরে তো আমার অর্থে গড়া কোনো এক ইমারতের কোনো একটা ইটের মধ্যেও আমার কোনো নাম বা অস্তিত্ব থাকবে না। হোক সেটা আমার পরিশ্রমে গড়া কিংবা আমার নিজের। সেখানে হাত বদলে বদলে আমার অস্তিত্তের শেষ পেরেগটুকু মেরে সেখানে হয়তো কোনো এক লোকের নাম লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যেটা আজ আমার নামে পরিচিত, শত বছর পর সেটা আমার আর নাই, না সেটা আমার নামেও অহংকার করে।

কি অদ্ভুত না?

শত বছরের হিসাবে যেমন আমি আর নাই, হাজার বছরের হিসাবে তো আমি কখনোই নাই। তারপরেও আজ আমি অনেক ব্যস্ততায় দিন কাটাই আগামিকালের জন্য, প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যের ধন প্রকাশ্যে অথবা গোপনে চুরি করে বিত্তবান হবার পার্থিব জগতে সুখী হবার নিমিত্তে আগামীকালের শান্তির জন্য মগ্ন আমি। অথচ আগামিকালটাই আমার না। এই পৃথিবী আমাকে কখনোই মনে রাখবে না। কারন সে আমাকে ভালোই বাসে নাই। অথচ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম আমার জীবনের থেকেও বেশী। আর এটাই এই পৃথিবী। আমার থেকেও অনেক নামীদামী রাজা, মহারথী সময়ের পথ ধরে বিশ্বকে দাপিয়ে গেছেন, তাদেরকেও এই পৃথিবী মনে রাখে নাই। আসলে এই পৃথিবীর কোনো বর্ষাই আমার না, কোনো শরতই আমার না। এর গাছপালা, এর নীলাকাশ, এর সুগভীর সমুদ্র কিংবা ঘনসবুজ পাহাড় কোনো কিছুই আমার না। আমার ঘরটাও না।

শতবছর পরে, আমি এক অচেনা, নামহীন, অস্তিত্বহীন মানুষ যে আজকের দিনে বহু ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটিয়ে কিছুটা সময় এই নীল আকাশ, ঘন সবুজ পাহাড় অথবা পাখীদের কিচির মিচির শুনেছিলাম। অথচ এই সময়ে এসে কোনো এক সন্ধ্যায় খুব জানতে ইচ্ছে করে-আজ থেকে শত বছর আগে কি ঠিক এখানে কেউ বসেছিলো যেখানে আমি বসে আছি? খুব জানতে ইচ্ছে করে-কে সেই ভাগ্যবান যুবক আজ থেকে ঠিক শতবর্ষ পরে এখানে বসে চা কিংবা কফি পান করছে? হয়তো দেখা হবে সবার সাথে কোনো এক নাম না জানা ময়দানে যার নাম The Final Day.  

এতো কিছুর পরে আজ এই সায়াহ্নে এসে বারবার একটা প্রশ্ন জেগেই রইলো-স্রিষ্টিকর্তা আমাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিশ্ব ভ্রমান্ডে পাঠিয়েছিল?

২০/০৮/২০২১- কফি সরদার ১-আফগানিস্থানের অবস্থা দেখলে যেটা

আফগানিস্থানের অবস্থা দেখলে যেটা মনে হয় সেটা একটা আতংক। নারীরা আতংকে আছে, শিশুরা আতংকে আছে, আতংকে আছে যারা বুড়ো হয়ে গেছেন তারাও। তাহলে আতংকে নাই কারা?

যদি পুরু সিচুয়েশনটা খুব কাছ থেকে দেখা যায়, বুঝা যাবে, যারা গত ২০ বছর যাবত একটা ভিন্ন আদর্শে গড়ে উঠে এক তরফা যে স্বপ্ন দেখেছে ক্ষমতার, তারা আতংকে নাই। কারন আজ তাদের স্বপ্ন সফল হয়েছে। এই যে তরুন যিনি এখন মনের আনন্দে সুখে আছেন, সেইই কি একমাত্র বেচে থাকা তরুন যে স্বপ্নটা দেখেছিলো? নাকি আরো এমন অনেক তরুন ছিলো যারা আজকের এই স্বপ্ন পুরনের পিছনেও ছুটেছিলো?

এক কথায় যদি বলি- আরো অনেক জীবন জড়িত ছিলো যারা প্রতিনিয়ত আজকের দিনের সাফল্যের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু তারা আজ কোথায়? তাদের পরিবার আজ কোথায়? খুব কম মানুষই তাদেরকে মনে রেখেছে। তারা আসলে ছিলো একটা গুটি। এটাও একটা বড় রাজনীতির খেলা। এই রাজনীতির খেলায় কেউ না কেউ এই সব ঝরে যাওয়া তরুনের উপর ভর করেই আজ তারা ক্ষমতার মসন্দে বসেছে। তাদের জন্য হয়তো কিছুক্ষন ‘নীরবতা পালনের” মাধ্যমে কিছুক্ষন গনহারে মনে করা হবে। কিন্তু বেশীরভাগ তরুনেরই কারো নাম মনে রাখার দরকার নাই আজকের শাশকদের। ঠিক এটাই ঘটে যুগে যুগে।

আজকে যে সব রাজনীতিবিদদেরকে কেন্দ্র করে তরুনেরা তাদের শিক্ষা জীবন জলাঞ্জলি দেয়, সময় নষ্ট করে, কিছু ছোট ছোট পদ পাবার জন্য একে অপরের সাথে হানাহানী করে, একটা সময় এরা খুব সহজেই ঝরে যায়। ওদের কেউ মনেও রাখে না।

অথচ যদি সেই হারিয়ে যাওয়া তরুন তাঁর নিজের যোগ্যতায় জ্ঞানে আর শিক্ষায় যদি বড় হতে পারতো, আজ হয়তো সেই তরুনকেই আজকের দিনের রাজনীতিবিদ, কিংবা জনগন খুজে বের করে কোনো না কোনো বড় স্থানে মুল্যায়ন করতো। তাই, নিজেকে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নাই।

আর এটাই হচ্ছে সেই স্বপ্ন যা পুরন করার জন্য দরকার শিক্ষা আর পরিশ্রম। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ বড় কিন্তু সেই দেশকে গড়ে তোলার জন্য আর দলকে সম্রদ্ধ করার জন্য আগে দরকার ভিত্তিকে শক্ত করা। আর সেই ভিত্তি হচ্ছে- ব্যাক্তি। সে যেমন নিজের জন্য শক্তি তেমনি দল বা দেশের জন্য শক্তি।

১২/০৮/২০২১-মেধা পাচার নাকি মেধা বিদায়?

গতকাল আমার ছোট মেয়েকে বিদায় জানাতে গিয়েছিলাম এয়ারপোর্টে। কভিডের কারনে এয়ারপোর্টে ঢোকা প্রায় নিষিদ্ধের মতো কিন্তু মেয়ে একা যাচ্ছে, অনেক দূর, ভয় পাচ্ছিলাম, ফলে যেভাবেই হোক পুরু পরিবারের জন্য প্রায় বেশ অনেকগুলি”পাস” জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমি ওইসব বন্ধু আর সহযোগীদেরকে আন্তরীক ধন্যবাদ জানাই যারা আমাকে আর আমার পরিবারকে এয়ারপোর্টে প্রবেশের জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন।

এয়ারপোর্টে যাওয়ার পর আমি যে জিনিষটা খুবই খেয়াল করলাম হলো, প্রায় ৮০% পেসেঞ্জারদের বয়স ১৬ থেকে ২২ এর মধ্যে। খুব কম লোক দেখেছি যারা একটু বয়স্ক। আমি কয়েকজন ইয়াং পেসেঞ্জারের সাথে খুব নিরিবিলি কথা বলেছি- তাদের প্রত্যেকেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, কেউ চাকুরী নিয়ে, কেউ স্কলারশীপ নিয়ে কোনো ইউনিভার্সিটিতে, কেউ আবার ১০০% স্কলারশীপে, কেউ আবার নিজেদের খরচে। তাদের সবার ভাষ্যই যেনো একটা- ভয়ংকর দিন সামনে আমাদের জন্য। এ দেশে কোনো ভবিষ্যৎ নাই। এর থেকে যে কোনো ভিন্ন দেশে অন্তত কিছু একটা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। তাই আগেই চলে যাচ্ছি। 

ব্যাপারটা আতংকের। দেশ কি তাহলে মেধাশুন্য হয়ে যাচ্ছে? কারা আমাদের ভবিষ্যৎ তাহলে? যারা এদেরকে পাবে, তারা কি লোড নিচ্ছে নাকি আমরা এদেরকে ছেড়ে দিয়ে লোডমুক্ত হচ্ছি? যারা ওদেরকে সুযোগ দিয়ে এই করোনাকালেও নিয়ে যাচ্ছে, তাদের কি মনে হয় এরা তাদের দেশের জন্য বাড়িতি লোড নিচ্ছে আর আমরা মনে করছি, যাক হাফ ছেড়ে বাচা গেলো!!

আজ টিভির একটা  টক শোতে দেখলাম, ৯৬% ছেলেমেয়েরা দেশের ভিতর অনিশ্চয়তার কারনে দেশ ছাড়ছে। আসলেই একটা ভয়ানক ভাববার বিষয়।

১১/ ০৮/২০২১-রক্তক্ষরন

শরীরের কোনো কাটাছেড়া, কোনো বাহ্যিক জখম চোখে দেখা যায়, ক্ষুধা হলে খাবারের অভাবে পেট গুর গুর করে, কিংবা জ্বর সর্দি, কাশি কিংবা মাথা ব্যথা হলে তার সিম্পটম অনায়াসেই বুঝা যায় কিন্তু অন্তরের জখম কি কখনো চোখে পড়ে? অন্তরে কি কখনো জখম হয় আদৌ? আর এই অন্তরটাই বা শরীরের কোন অংগ? এটা কি এমন কোনো জিনিষ যা মাংশ বা হাড় কিংবা এমন কিছু দিয়ে এর গঠন কাঠামো?

সমস্তটা হৃদপিণ্ড তার স্টকে থাকা রক্ত যখন শরীরের সর্বত্র তার নিয়মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সেটাকে বলে সুস্থ্যতা। কিন্তু সেই একই রক্ত যখন তার নিয়মের বাইরে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে সেটাকে হয়তো বলে দূর্ঘটনা। কিন্তু একই ধমনী, একই শিরায় যখন সেই একই রক্ত একই নিয়মে প্রবাহ হয়, তারপরেও মনে হয় কোথায় যেনো একটা ক্ষরন হচ্ছে, তাহলে এটাকে কি বলে? হয়তো সাহিত্যিকরা বলবেন- এটাকে বলে কষ্ট, এটা হয়তো বেদনা কিংবা হয়তো কেউ বলবেন এটা একটা খারাপ অনুভুতি। তাহলে এই রক্তক্ষরন হয় কোথায়? শিরায়? ধমনীতে? শরীরের কোনো অংগে? আর এই ক্ষরণ হলে কি হয়? আসলে রক্তক্ষরনটা হয় অনুভুতির ভিতরে, ওই সেই অন্তরে যার উপস্থিতি আজো কেউ খুজে পায়নি, বা হাত দিয়ে ধরে দেখেনি। একেবারে ভিতরে, অদৃশ্য। অথচ অনুভুতির এই ভিতরটা কেউ দেখে না। বাইরের চোখে যা দেখা যায়, সেটা ভিতরের অবস্থা না। সত্যটা সবসময় থাকে ভিতরে। আর এই সত্যকে মানুষের কোনো অংগ, না তার হাত, না তার পা, না তার শরীর প্রকাশ করে। এই অদেখা রক্তক্ষরনে হাত অবশ হয়ে যায় না, পা নিস্তব্ধ হয়ে উঠেনা বা কান বধির হয় না। শুধু চোখ সেটাকে লুকাতে পারে না বলে অনবরত সেই নোনা জল দিয়েই হয়তো বলতে থাকে, কোথাও কিছু জ্বলছে, কোথাও কিছু পুড়ছে, কোথাও কিছু ক্ষরন হচ্ছে। না ঠান্দা জল, না কোনো বেদনানাশক ঔষধ না কোনো থেরাপি এই ক্ষরনকে থামাতে পারে। কিন্তু যার চোখ নাই, তারও কি এই ক্ষরন হয়? হ্যা, হয়। তারও এই রক্তক্ষরন হয়। হয়তো তার ভাষা একটু ভিন্ন, স্থিরচিত্তে ক্রয়াগত নীরবতা। তাহলে এই রক্তক্ষরনের সময়কালটা কত? বা কখন এর জন্ম আর কখন তার ইতি? বলা বড্ড মুষ্কিল।

যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আরো বেশী করে দুশ্চিন্তায় ভোগায় যখন এটা জানা যায় যে, যে মানুষটি চলে গেছে সে সবদিক থেকে অশান্তিতেই ছিলো। এমন অবস্থায় এমনটাই বারবার মনে প্রশ্ন আসে, যে, জীবনের কাছে হেরে যাওয়া মানুষটি আবার মনের কষ্টে কোনো ভুল পদক্ষেপ না নিয়ে বসে। শুরু হয় রক্ত ক্ষরনের প্রক্রিয়া। এই ক্ষরণ অজানা আতংকের।

আবার যখন কোনো মানুষ সবার সামনে থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে চিরতরে ভিন্ন জগতে চলে যায়, তখন দুসচিন্তার প্রকারটা হয়তো অন্য রকমের কিন্তু তারপরেও রক্তক্ষরন হয়। আর সেই ক্ষরণ কখনো ভরষার অভাবের অনুভুতি কিংবা মাথার উপরে থাকা কোনো বট বৃক্ষের অথবা কখনো এটা হয় নিঃসঙ্গতার।

কিন্তু জেনে শুনে, প্রকাশ্যে সবার সামনে দিয়ে যখন বড় কোনো সাফল্যের উদ্দেশ্যে নিজের অতীব প্রিয়জন জীবন্ত চলে যায়, হাসিখুশির অন্তরালে তখন যেনো চলতে থাকে মেঘ-বৃষ্টির খেলা। চলতে থাকে দোদুল্যমান এক অনুভুতি। হাসিখুশি চোখের পাতায়ও তখন দেখা যায় সেই রক্তক্ষরনের এক বেদনাময় কষ্টের অনুভুতি। এই রক্তক্ষরনের প্রধান কারন হয়তো শুন্যতা। তখন যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন, সব কিছু ঠিক আগের মতোই আছে, শুধু নাই সেখানে যে বিচরন করতো সেই মানুষটা। তার ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, ওই তো মানুষতা গতকাল ও ওখানে বসেছিল, ওই যে কাপড় টা বাতাসে ঝুলছে, সেটা এখনো সেখানেই ঝুলছে, অথচ সেই মানুষতা আজ ঠিক ওইখানে নাই। আছে অন্য কোথাও, চোখের দৃষ্টির অনেক বাইরে। আর এই দোদুল্যমান অনুভুতি নিয়েই আমি বিদায় জানাতে এসেছি আমার অতীব আদরের ছোট মেয়েকে আজ। বুঝতে পারছি, কোথায় যেনো পূরছে আমার অন্তর, কোথায় যেনো জ্বলছে আমার অনুভুতির সমস্ত স্নায়ুগুলি।

আমি যুদ্ধ দেখেছি, যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছি, আগুনে পূড়ে যাওয়া নগরী দেখেছি, ঘনকালো নির্জন রাতে কোনো পাহাড়ি রাস্তা ধরে একা একা হেটে পার হয়েছি। ভয় আমাকে কাবু করেনি। অথচ আজকে আমি এই শান্ত সুষ্ঠ পরিবেশে নির্মল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে যখন আমার ছোট মেয়েকে সুদুর আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে বিদায় জানাচ্ছি, তখন সারাক্ষন রক্তক্ষরনের পাশাপাশি একটা ভয়, একটা আতংক, একটা শুন্যতার অনুভুতিতে ভোগছি। কেনো জানি মনে হয়, আমার ভয় লাগছে। অথচ আমার শরীর সুস্থ্য, আমার ক্ষুধা নাই, তারপরেও কেনো জানি মনে হচ্ছে- কি যেনো আমি ভালো নাই।

আমার মেয়েটা চলে গেলো আজ। বায়না ধরেছিলো-আমেরিকা ছাড়া সে আর কোথাও পড়াশুনা করবে না। সন্তানরা যখন বায়না করে, জেদ ধরে, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা বাবা সেটাকে পুর্ন করার জন্য দায়িত্ত পালন করেন। আমিও সেই বায়নাটা হয়তো পুরন করছি আজ। কিন্তু সেই জিদ বা বায়না আদৌ ঠিক কিনা বা বায়নাটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা অনেক ক্ষেত্রে আমরা মা বাবা সেটা বিচার করি না। সন্তান কষ্টে থাকুক বা দুঃখ নিয়ে বড় হোক অথবা তার নির্দিষ্ট পথ থেকে হারিয়ে যাক, তাতে মা বাবা এক মুহুর্ত পর্যন্তও শান্তিতে থাকে না। মা বাবা সবসময় তার সন্তানদেরকে সবচেয়ে ভালোটাই দেয়ার স্বপ্ন দেখে। আসলে সন্তান যতো বড়ই হোক আর বৃদ্ধ, মা বাবার ভুমিকা থেকে আজ অবধি কোনো মা বাবা অবসর গ্রহন করেন নাই। কিন্তু তাদেরও কিছু আশা থাকে, স্বপ্ন থাকে এই সন্তানদের কাছে। আমরা বাবা মায়েরা সন্তানদের কাধে শুধু স্কুল ব্যাগ নয়, বরং মা বাবার অনেক আশা ইচ্ছাও ঝুলিয়ে দেই। হয়তো এটাও সেই রকমের একটা বায়না থেকে আমার দায়িত্ব পালনের পর্ব যেখানে একটা সফল, উজ্জ্বল আর সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য আমি অন্তরের রক্তক্ষরনের মতো বেদনাটাও ধারন করছি। আমি জানি, সব সাফল্যের একটা মুল্য থাকে যেটা কাছের মানুষকেই জোগাতে হয়। আর হয়তো এটা সেটাই।

তবে একটা কথা ঠিক যে, আজকের এই অদেখা কষ্টের রক্তক্ষরনের ইতি বা যবনিকা হয় তখন যখন যে মানুষটির জন্য রক্তক্ষরনের জন্ম, সে যখন জীবনের পাহাড় বেয়ে জয় করে সামনে দাঁড়ায়। তখন আজকের দিনের রক্তক্ষরনের সাথে মিশ্রিত হাসিটায় শুধু ভেসে থাকে হাসিটাই। যেমন পানি আর তেলের মিশ্রনে শুধু ভেসে থাকে পানির চেয়ে দামী সেই তেল। তখনো এই চোখ জলে ভিজে উঠে হয়তো কিন্তু তখন চোখ এটা জানান দেয় না, কোথায় যেনো কি পূরছে, কি যেনো জ্বলছে বরং প্রতিটি উচ্ছল হাসিতে ভরে উঠে আনন্দ ধারা।

আমি সেই প্রত্যাশা নিয়েই আজকের এই রক্ত ক্ষরনের অধ্যায় যাকে আমি যেই নামেই ডাকি না কেনো, বেদনা, শুন্যতা কিংবা আতংক তা শুধু নীরবে মেনে নিয়েই রক্ত ক্ষরনের সেই পোড়া যন্ত্রনাকে বরন করছি। তোমরা সব সময় ঈশ্বরকে মনে রেখো, নীতির পথে থেকে আর মানবতার থেকে বড় কোনো সম্পদ নাই এটা জেনে সর্বদা সেই মানবিক গুনেই যেনো থাকো, এই দোয়া রইলো।

শরতচন্দ্রের সেই বিখ্যাত উক্তিটাই আজ তোমাদেরকে বলি- ভালোবাসা শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। ‘যেতে নাহি দিবো’ মন বল্লেও বাধা দেয়ার কোনো শক্তি তখন থাকে না, না বাধা দিতে কোনো পথ আগলে রাখি, বরং মনের ভিতরের ‘যেতে নাহি দেবো জেনেও যাওয়ার সব পথ খুলে দেই সেই সাফল্যের জন্য, যা আমার চোখের মনির ভিতরে খেলা করে সারাক্ষন।

কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। হয়তো অচিরেই আমিও সেই পরিবর্তনের মধ্যে নিজেকে সামলে নেবো।

ওর ব্যাপারেও এই পরিবর্তন হতে পারে, ওদের ও হয়তো অনেক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু যা হারিয়ে গেছে, সেটা তো আর ফিরে আসবে না। সবাই তখন (যারা দায়িত্তের ব্যাপারেও উদাসীন ছিলো) সবাই কাজেই মন দেয়। অথচ এই মন দেওয়াটা দরকার ছিলো তখন যখন হারিয়ে যায় নাই কিছুই। কি করত্রব্য, কি দায়িত্ত, তখন বুঝা যায় কি করা হয় নাই বা কি করা উচিত ছিলো।

জীবনের পাহাড় কারো পক্ষেই জয় করা সহজ কাজ নয়। গোটা পরিবারের দায়িত্ত, সবার ভবিষ্যতের প্ল্যানিং, নিজের বয়সকালের জন্য সঞ্চয়, এইসব করার পর একজন বয়স্ক মানুষ কি চায়? শান্তি, সুরক্ষা আর সুখ। সন্তানের সুখের জন্য আমরা আমাদের অনেক কিছু ত্যাগ স্বীকার করি।

পৃথিবীতে বাস করলে পৃথিবীটাকে চিন্তেও শিখতে হয়।

বাপের বাড়ি বাপের বাড়িই হয়, আর সেটা আজীবন তোমার নিজেরেই বাড়ি। সেই বাড়িটার সব কিছু তোমার, তোমাদের। এটা জন্মগত অধিকার, দেশের কোনো আইন বা আদালত সেই অধিকার থেকে তোমাদেরকে বঞ্চিত করতে পারবে না, পারেও নাই।

আনন্দ, মনের আনন্দ। নেশার আনন্দ, মন এমন এক জায়গায় চলে যায় যেখানে কোনো বাধা নাই। যেনো সুধু সাধীনতা।  বড় শহরের অনেক অন্ধকার গলিতে প্রতি রাতে একটা নেশার জগত গড়ে উঠে। সেখানে সমাজের অনেক শ্রেনী থেকে অনেক যুবকরা এসে থাকে।  যারা সবাই নিজেদের আত্মীয়স্বজন ছেড়ে নিজেদের নেশায় ভেসে থাকে। সভ্য সমাজ এদের দেখেও উপএক্ষা করে যায়। খুব বেশী হলে হাইউজিং কমিটির মিটিং এ সামান্য বিরোধিতা, কিন্তু এদেরকে আটকানো বা শোধ্রানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এই নীরবতা অপরাধকে আমন্ত্রন জানায়। এই নীরবতার সাথে সাথে আমরা একতা সত্যিকেও উপেক্ষা করে যাই, যে, একতা অপরাধ বেড়ে উঠছে। এমন একটা অপরাধ যে, এই নেশয় আধমরা হয়ে থাকা যুবকদের সাথে অন্যান্য সাধারন মানুষের ও প্রান চলে যেতে পারে।

ব্যবসার ক্ষেত্রেও তাই। বিষেশ করে পার্টনারশীপ ব্যবসায় তো এটার মুল্য আরো অনেক বেশী। ব্যবসায় লাভ লোকসান হবেই, এটা ব্যবসায়ীরা জানে আর জেনেই ব্যবসায় আসে। কিন্তু যখন এই ব্যবসায়ীক পার্টনারশীপে একবার বিশ্বাস আর ভরষা উঠে যায়, তখন আর কাউকেই পার্টনার হিসাবে নেয়া সহজ হয় না। এ জন্য বিশ্বাসকে “টেকেন ফর গ্যারান্টেড” ভাবাই যাবে না। যুগের পর যুগ ব্যবসা করেও এই কথা সত্য যে, বিশ্বাস যে কোনো মুহুর্তে অবিশ্বাসে পরিনত হতে পারে।

গরীব হওয়া পাপ নয়, উচু সপ্ন দেখাও পাপ নয়, বড় হবার চেষ্টা করাও অপরাধ নয়, কিন্তু অন্য কারো জিনিষকে অন্যায়ভাবে নিজের করার চেষ্টা করা অপরাধ। এই অপরাধের একটা খেসারত আছে। কেউ সাথে সাথে পায়, আর কেউ একটু দেরীতে। কিন্তু প্রাপ্যটা আসেই। লাইফটা কোনো ষ্টক মার্কেটের কোনো শেয়ার নয় যে প্রতিদিন এটার দাম উঠানামা করবে। এটা আসলে সেটা যা একবার উঠে গেলে আর পড়ে না, আবার পড়ে গেলে আর উঠে না।

জীবন একটা নদী। আপনি একই নদীতে দুবার পা দেওয়া যায় না।

বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ তৈরী করা কোনো ব্ল্যাক মেইল নয়।

একটা বাবা মা যখন সন্তানের জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এটা বুঝতে না পারে, তাহলে সেই পরিবারে সেই সন্তান একটা অসুস্থ্য পরিবেশেই বড় হতে থাকে। আর অসুস্থ্য পরিবেশ শুধু সাস্থ্যইকেই ক্ষতি করে না, মনকেও। নিজের মনের আওয়াজ শুনুন।

বেশীর ভাগ মানুশের সব সময় একটা সফল, উজ্জ্বল আর সুরক্ষিত ভবিষ্যতের খোজে থাকে। তারা বংশানুক্রমে একটা জীবন মন্ত্র পায় নিজের বর্তমানকে বলীদান করলে ভবিষ্যতে সর্গ পাবে। আজ যদি প্রশ্রম করো, কাল নিসচয়ই সাফল্য আসবে কিন্তু যদি কেউ এই খোজা আর বুঝার তলে চাপা পড়ে এইটা মানতে থাকে যে সুন্দর ভবিষ্যত শুধুই একটা মিথ্যে তাহলে একটা বদ্ধ খাচার মধ্যে তা চিরতরে হারিয়ে যায়।

০৯/০৮/২০২১-পরিকল্পনার ডেবিট-ক্রেডিট

জীবনকে যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছিলাম, যখন থেকে এটা বুঝেছিলাম যে, পরিবারের সবার জন্য এমন একজন মানুষ থাকে যার কাছে প্রয়োজনেই হোক, অপ্রয়োজনেই হোক, কিংবা আবদারের আবেগেই হোক অথবা বিনা কারনেই হোক তার কাছে সবকিছু চাওয়া যায়। সে দিতে পারুক বা না পারুক সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু মনের চাহিদার কথা তো কাউকে জানানো যায়। আর তার নাম ‘বাবা’। আমি আমার বাবাকে দেখেছিলাম কিন্তু তার কোনো স্মৃতি আমার কিছুই মনে নাই। না তার চেহারা, না তার রঙ, না তার কোনো আচরন। কারন আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র ছিলো দেড় কি দুই। ফলে ‘বাবা’ নামক সেই মানুষটি আমার বেলায় প্রজোজ্য না। আমার বেলায় যা ছিলো সেটা আমার বড় ভাই। ‘বাবা’ আর ‘ভাই’ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক। ফলে সেই ছোটবেলা থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, যখন মন যা চায়, সেটাই আমার পাওয়ার কথা না। তাই নিজের চাহিদার ব্যাপারে আমি সবসময়ই ছিলাম অতিমাত্রায় কন্ট্রোল্ড। অর্থাৎ যা না হলেই নয়, হয়তো সেটাও যদি কোনোভাবে ম্যানেজ করা যায়, তাহলে আর কারো কাছে এটা নিয়ে আর হাত পাতার দরকার মনে করতাম না। এরই ফলশ্রুতিতে আমি যেটা আমার মধ্যে দেখেছি সেটা হচ্ছে, নিজের চাহিদার ভারসাম্যতার সাথে পাওয়ার নির্ভরতা। কোনো কিছুর উপরেই আমার কখনো লোভ, সাধ আহলাদ কিংবা চাহিদা খুব একটা ছিলো না, এমনকি খাবার দাবারের বেলাতেও আমি ছিলাম অতিমাত্রায় অতীব সাধারান। কোনো কিছুই আমাকে আকর্ষন করতো না। এতা খেতে ভালো লাগে না, ওইটা চাই, কিংবা ওইটা খেতে পারছি না বলে অন্য আরেকটা খাবার না দিলেই নয়, এমন কখনোই ছিলো না।

মাত্র ১২ বছর বয়সেই আমি বাড়িছাড়া হই। আর সেটা হয়েছিলো একটা খুব ভালো অরগ্যানাইজেশনের কারনে। তার নাম ‘ক্যাডেট কলেজ’। ক্যাডেট কলেজে যারাই ভর্তি হয় অন্যান্য ছাত্ররা, তার বেশীর ভাগ ছাত্ররাই সবাই বেশ বড় বড় পরিবারের সন্তান। তাদের আচার আচরন, তাদের চাহিদা, তাদের কথাবার্তার সাথে আমার অনেক পার্থক্য ছিলো। আমি কাউকেই চিনি না, কেউ আমার খুব কাছের বন্ধু হবে এটাও ভাবি নাই, কারন ওদের মধ্যে ওদেরই সখ্যতা বেশী। ওদের আচরনে বুঝতাম, ওরা অনেকেই অনেককে চিনে আগে থেকে। গুটিকতক আমরা ছিলাম নিতান্তই অজপাড়াগা থেকে উঠে আসা কিছু ছাত্র। এই গুটিকতক আমরাও আসলে আমাদের কাউকে চিনি না। গ্রামের ছাত্রদের একটা ব্যাপার হলো, তারা খুব ছোট গন্ডি থেকে আসে বলে নিজের থেকেও কেউ মন খোলে একে অপরের সাথে কথাও বলে না, বা বলতে সংকোচ বোধ করে। আমাদের এই গুটি কতক গ্রাম্য ছাত্রদের ও বেলায় এই ঘটনাটা ঘোতে গেলো। আমরাও উপযাযক হয়ে কেউ কারো সাথে খুব একটা ঘনিষ্ঠ হবার পথ খুজে বের করি নাই। যার ফলে একাকীত্তের কারনে মন খারাপ হওয়া শুরু করতো মাঝে মাঝে। বয়স মাত্র ১২ আমার, কিই বা বুঝি জীবন সম্পর্কে? খালী মায়ের কথা মনে পড়তো, গ্রামের কথা মনে পড়তো, গ্রামের বন্ধু বান্ধবদের কথা মনে পড়তো আর নিদ্রাবিহীন সকাল হয়ে যেতো আমার। আমি জানতাম, আমার মা, আমার সেই পাড়াগা, আমার সেই অজপাড়াগায়ের বন্ধুদের কথা মনে পড়লেও তারা যে আমার মনের কোনো কষ্ট, বেদনা কিংবা হতাশা লাঘব করতে পারবে সেটা কখনোই হবে না কিন্তু একাকী জীবনে অবুঝ কোনো শিশু অথবা বোবা কোনো প্রানী যার সাথে মনের কোথায় যেনো একটা সখ্যতা আছে তাদের সান্নিধ্য কিংবা মনের ভিতরের কল্পনার সেই বিচরন হয়তো ক্ষনিকের জন্যে হলেও মন ভালো হয়ে যেতো। মনে হয়- আছে তো ওরা। এমন একটা পরিবেশে কিছুতেই আমার এই সখের ক্যাডেট কলেজ আর ভালো লাগছিলো না। আসলে ক্যাডেট কলেজে পড়ার আমার কোনো শখ ও ছিলো না। আমি তো এর নামই জানতাম না। এটা ছিলো আমার বড় ভাইয়ের জন্য একটা আশির্বাদ যাতে তিনি আমাকে কোনো একটা সেফ জায়গায় রেখে স্কলারশীপে কানাডায় যেতে পারেন, তার একটা বিকল্প ব্যবস্থা। আমার এই একাকীত্ব আর মন খারাপের কথা বলে আমার বড় ভাইকে আমি একটা চিঠি লিখলাম। কিন্তু চিঠিটা পোষ্ট করা হয় নাই আমার। কেনো করি নাই সেটাও আমার মনে আছে। কারন, আমি তখনো জানতেই পারি নাই কিভাবে ক্যাডেট কলেজ থেকে কার মাধ্যমে কোথায় চিঠি পাঠালে চিঠি যায়। ফলে ওই চিঠিটা আজো আমার কাছে রয়ে গেছে। আজ আমি এখানে সেই চিঠিটার কিছু অংশ লিখছি-

ভাইয়া, কিছুই ভালো লাগছে না আমার। না পড়াশুনা, না খাবার, না খেলাধুলা। বারবার গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি আপনাকে ভয় পাই সব কিছু বলতে কিন্তু আপনাকে না বলা ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ও নাই। এখানের সিনিয়ার ভাইয়েরা বড় নির্দয় এবং শাসক শ্রেনীর। কারনে অকারনে চোখ রাঙ্গায়, মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হয় যেনো জেল খানার কোনো কয়েদি আমি। কলেজের স্যারেরা ভালো কিন্তু তাদের কাছে কোনো কথা বলার মতো এতটুকু সাহস আমি আজো সঞ্চয় করতে পারিনি। বন্ধুবান্ধব যারা আছে, তারা সবাই যেনো কোনো এক গ্রহ থেকে এসছে। ওরা ওরাই কথা বলে, হাসে, খেলে আড্ডা দেয় কিন্তু আমি ওদের সাথেও খুব ভালো করে মিশতে পারি না। আমার কথার সুরে গ্রামের টান আছে, অনেকেই এটা নিয়ে হাসে। আমি বুঝতে পারি না, কোথায় আমার সমস্যা। এতো সব সমস্যা নিয়ে আমার পড়াশুনাতেও আমি খুব ভালো করছি বলে মনে হয় না। একটা রুমে মোট দশ জন ছাত্র থাকি, সবাই যার যার বিছানায় থাকি বটে কিন্তু মনে হয় আমিই এক মাত্র যে কিনা রুমে শুয়েও রুমে নাই। আমাএ সেই গ্রামের স্কুলই ভালো ছিলো। অন্তত বন্ধু বান্ধব দের সাথে স্কুলে হৈ হুল্লুর করে আর পড়াশুনা করে সময় কেটে যেতো। খুব ভোরে উঠতে হয়, মাঝে মাঝে বাথ রুমের সল্পতার কারনে অথবা অন্যান্য ছাত্রদের আধিপত্যতার কারনে আমি সব সময় বাথ রুমে গিয়েও পিছিয়ে যাই। কেনো জানি মনে হয়, আমি শুধু আমার স্যারদেরকেই ভয় পাই না, আমি সম্ভবত এই শহুরে ছাত্রদেরকেও কিছুটা ভয় পাই।

………… মার কথা মনে পড়ে, আপনার কথা মনে পড়ে, বোনদের কথা মনে পড়ে, আর সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে স্কুল শেষে স্কুলের মাঠে খেলার কথা, রাতের বেলায় উচ্চস্বরে বই পড়া আর তালে তাল দিয়ে কবিতা মুখস্থ করা। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের হেড স্যার অনেক রাগী হলেও তার মধ্যে একটা আদরের ভাব ছিলো। কিন্তু এখানে স্যাররা আমাদের আদর করেন কিনা সেটা আমি বুঝতে পারি না।

………… আপনি আমাকে ৫০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। তার থেকে আমি ৫ টাকা খরচ করে ফেলেছি।  

আমার বড় ভাই একটা ব্যাপার খেয়াল রাখার চেষ্টা করতেন যদিও সেই যুগটা আজকালের মতো ছিলো না। মোবাইল ছিলো না, সহজেই এক জায়গা থেকে সল্প সময়ে অন্য জায়গায় যাওয়া যেত না। এরপরেও আমি কেমন আছি, আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, সেটার ব্যাপারে আমার বড় ভাই তার এক বন্ধুর মাধ্যমে খবর নেয়ার চেষ্টা করতেন, তার নাম ছিলো-রফিক কায়সার। রফিক কায়সার আমাদের বাংলা টিচার ছিলেন আর আমার বড় ভাইয়ের ক্লাশমেট ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। ক্যাডেট কলেজে তিনি ছিলেন আমার হাউজের হাউজ টিউটর। বিল্ডিং এর একদম উপরে চিলে কোঠায় থাকতেন একা। অবিবাহীত মানুষ। একদিন তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন জানার জন্য আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। সবসময় খুব ভয়ের মধ্যেই থাকতাম। আমি রফিক স্যারকে বললাম, আমার ক্যাডেট কলেজে থাকতে ইচ্ছে করছে না। আমি চলে যেতে চাই। উনি হেসে দিয়ে বললেন- ঠিক আছে, কয়দিন পর চলে যেও। আপাতত এই টার্মটা যাক। আমি খুশী হয়েছিলাম, কিন্তু এটা বুঝি নাই যে, ‘এই টার্মটা যাক’ মানে আমি যে ধীরে ধীরে এডাপ্টেশনে চলে যাবো এটা তিনি জানতেন। তখন হয়তো আমি ‘চলে যেতে চাই’ এই কথাটাই আর বল্বো না। আর হয়েছিলোও তাই।  

তারপর যখন আরো একটু বড় হলাম, (এই বড় হওয়া মানে আমি যখন কলেজ পাশ করলাম তখনকার কথা বলছি, সেটা ১৯৮৩ সাল) তখন আরো একটা কঠিন বাস্তবতা আমার সামনে এসে হাজির হয়েছিলো। এই কলেজ অবধি ‘কঠিন বাস্তবতার’ ব্যাপারটা আমার মনে কখনো জাগ্রত হয় নাই কারন, ক্যাডেট কলেজের আর্থিক যোগান এতোটাই কম লাগতো যে, এটা হয়তো আমার বড় ভাইয়ের উপর কোনো চাপ পড়তো না। মাত্র ১৫০ টাকা মাস। তাতেই খাবার, পোষাক, বইপত্র, থাকা, এবং সব কিছু। আমার বড় ভাই আমেরিকা থাকতেন, ফলে এই ১৫০ টাকা প্রতিমাসে দেয়া খুব একটা চাপের বিষয় ছিলো না। কিন্তু আমি যখন কলেজ পেড়িয়ে সবেমাত্র এই বিশাল উম্মুক্ত দুনিয়ার জগতে পা রাখলাম, তখন যেটা আমার চোখের সামনে এসে ভর করেছিলো সেটা হচ্ছে, আমার ব্যক্তিগত আর্থিক সচ্ছলতার ব্যাপারটা। এতোদিন তো কলেজের মধ্যে সরকারী খরচে ছিলাম, এখন আর সেই সুযোগ নাই। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে হবে, নিজের খরচ, ইউন ইভার্সিটির খরচ ইত্যাদি সব এখন আমার নিজের। বড় ভাই এর পক্ষে এতো খরচ বহন করা সংগত হবে কিনা, তিনি করবেন কিনা সব যেনো এখন একটা শংকা হয়ে উঠলো।  ইউনিভার্সিটির খরচ, ঢাকায় থাকার খরচ, খাওয়া দাওয়ার খরচ আর তার সাথে বইপত্র, কাপড় চোপড় এবং হাত খরচের ব্যাপারটা আমাকে প্রায় বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলো। নেহায়েত এটা কম ছিলো না। যার ফলে সবদিক ভেবেচিন্তে আমার কাছে আর্থিক সমস্যাটা একটা জটিল আর ভারী মনে হচ্ছিলো। সম্ভবত এটাই ছিলো আমার প্রথম কারন যার জন্যে আমাকে আবারো সমস্ত ধ্যান ধারনা আর সক্ষমতাকে  বারবার হতাশ করছিলো।

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সব শাখায় আমি ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেও সম্ভবত এই আর্থিক সচ্ছলতার ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম যে, সম্ভবত আর্মিতে যাওয়াই হচ্ছে আমার বেষ্ট অপশন। আমি দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে আর্মিতে আসি নাই। কিংবা আমি দেশের জন্য প্রান উতসর্গ করে দেবো এই ব্রত নিয়েও আর্মিতে যোগ দিতে চাই নাই। সম্ভবত এ রকম অনেকেই থাকবে যারা আজীবন লালন করেছে আর্মিতে আসার কিন্তু আমি এটা ধারন করি নাই। অনেকে পড়াশুনা করতে হবে না আর এই রকম চিন্তাধারায়ও ছেলেমেয়েরা আর্মিতে আসে। সেটা হয়তো আমার ছিলো না। পড়াশুনা নিয়ে আমার কোন সমস্যা ছিলো না। তাহলে ব্যাপারটা এমনই দাড়িয়েছিলো যে, আমি আমার কাছেই একটা আর্থিক বোঝা হয়ে দাড়িয়েছিলাম। লজ্জা, বেদনা, কষ্ট কিংবা অপমান এসবের কোনো ইরেজার নাই। কিংবা এগুলি কোন কিছু দিয়েই দূর করা যায় না। আমার কোনো ব্যাকওয়ার্ড ইন্ট্রিগেশন ছিলো না। ফলে আমার ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই ক্যাপাসিটির মধ্যে অনেক ফারাক ছিলো। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হবার পর নিজকে খুব একা আর ভিতর থেকে শুন্যতায় ভুগছিলাম। কিন্তু তারপরেও আমার কারো উপর রাগ কিংবা অভিমান ছিলো না। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম কিভাবে কি করা যায় আর সেটা নিজের ক্যাপাসিটিতে এবং সৎ ভাবে। সব কিছু ভেবে চিনতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার খুব তাড়াতাড়ি একটা জব দরকার। ডাক্তারী পড়তে গেলে কম পক্ষে ৫/৬ বছর লাগবে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলেও ব্যাপারটা প্রায় একই। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার পর কোথায় চাকুরী পাবো আর কাকে বল্বো সে পথ ও আমার খুব একটা জানা নাই। এর ফলে যেটা হলো- শেষমেশ আমি আর্মিতেই ভর্তি হয়ে গেলাম। দু বছরের ট্রেনিং, ট্রেনিং এর সময় সরকার একটা হাত খরচ দেবে আর আমার ভরন পোষন তো সরকারের দায়িত্ব। এর থেকে সেফ কোনো উপায় আমার কাছে ছিলো না। আর্মিতে গিয়ে আমার যেটা লাভ হয়েছিলো সেটা হলো যে, আমি আমাকে চালাতে পারছিলাম, কারো উপরে আমার নির্ভরতার দরকার ছিলো না। যদিও সেই আর্থিক জোগানটা ছিলো হ্যান্ডস টু মাউথ অবধি। তারপরেও আমি কারো উপরে নির্ভর করতে চাই নাই। আর তেমন কেউ ছিলোও না নির্ভর করার মতো। আমার ভাই ভাইয়ের মতো, তার হিসাব কিতাব তার মতো। আর সেই বা কেনো আমার জন্যে কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করবে? সে হিসাবে আমি মনে মনে হলেও একটা সাধীনতায় ভোগতাম। কিন্তু আর্মিটা আমার জীবনের চয়েজ ছিল না।

ক্যাডেট কলেজে থাকাকালীন এই ৬ বছরে আমার মোট ৪৫ জন বন্ধুওই ছিলো। তারা সবাই আবার আমার যে খুব কাছের তাও না। তবে খারাপ বন্ধু ছিলো না ওরা। বাইরে এসে তো আমার আরো বন্ধু কমে গেলো। যারা ছিলো তারা বেশীরভাগ আমার ‘মেট’। কেউ ‘ক্লাশমেট’, কেউ ‘কোর্ষমেট’, কেউ ‘ইয়ারমেট’। হাতেগোনা কয়েকজন ছিলো আমার হয়তো কাছের ‘মেট’ যাদের সাথে হয়তো আমার মনের কিছু আবেগ, কিছু কথা বলতাম। কিন্তু আমার মনে পড়ে না আমি কারো কাছে আমার কষ্টের কথা, বেদনার কথা বলেছি। কেনো বলতাম না, বা কেনো বলা হয় নাই, এটা কোনো পরিকল্পনা করে করা নয়। আসলে হয়তো শেয়ার করার প্রবনতাই ছিলো না। কিন্তু মনের ভিতরে একটা বাস্তবতা আমার সারাক্ষন জাগ্রত ছিলো-আমি একা, আমাকে সাপোর্ট দেয়ার মতো কোনো মানুষ নাই। অন্তত আর্থিক সাপোর্ট।

আর্মির দু বছর ট্রেনিং করার পর ২ লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন পেলাম। এটা একটা জব। যদিও বেতন মাত্রে সারে আট শত টাকার বেসিক স্কেল। সব মিলিয়ে হয়তো পাই ১৪/১৫ শত টাকা। মেসের খরচাদি দিয়ে সিগারেট বিড়ি খেয়ে মুটামুটি চলে যায় কিন্তু মাকে হাত খরচ দেবার মতো আমার সাধ্য ছিলো না। মাকে আমার বড় ভাইই চালাতেন। প্রতিমাসে ১২০০ টাকা দিতেন। মায়ের ও যে খুব ভালো চলছিলো তাও না। তবে মা ম্যানেজ করে নিতেন। আমার মাঝে মাঝে খুব আফসোস হতো, ইশ যদি অনেক টাকার চাকুরী করতাম, তাহলে আমিই মাকে সব খরচ দিতে পারতাম। এই কষ্টটা থেকেই সম্ভবত আমি যখন ছুটি পেতাম, আমি মাকে যতটুকু পারতাম, ভালো মন্দ করতাম। বাজার করতাম, ফল মুল আনতাম, মা খুশী হতেন। কিন্তু মার খুব একটা আফসোস ছিলো আমার বড় ভাইয়ের উপর যে, তার বড় ছেলে আমেরিকায় কম পয়সা কামাচ্ছে না, তারপরেও মায়ের মাসিক টাকার পরিমানটা কখনো বাড়ে নাই।

আমি যখন সবেমাত্র লেফটেন্যান্ট, মিটুলের সাথে আমার পরিচয়। ওর সাথে যখন আমার সখ্যতা হয়, সম্ভবত আমি এটাই ধরে নিয়েছিলাম, কেউ কিংবা কারো সাথে যদি আমার অপারগতার কথা, আমার ব্যক্তিগত কোনো কথা কিংবা এমন কিছু যা একজন আরেক বন্ধুকে শেয়ার করে সে রকমের ব্যাপার শুধু ওর সাথেই করা যায়। আসলে ঐ আমার জীবনের প্রথম বন্ধু। ওর ব্যাপারটাও প্রায় আমার মতোই ছিলো। অষ্টম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় মিটুল ওর বাবাকে হারিয়েছে। ৮ জন বোন আর ৩টা ভাইয়ের সংসার খুব যে একটা শক্তিশালী সেটাও নয়। ফলে ওর মানসিক, আর্থিক কিংবা অন্যান্য চাহিদার রশি মিটুল নিজেই টেনে ধরেছিলো। প্রায় আমার মতো একই মানষিকতায় মিটুলও গড়ে উঠছিলো। অল্পবিত্ত মানুষের একটা গুন থাকে-আর সেটা হলো, অল্পতেই তারা সবকিছুতে মানিয়ে নেয়। আশেপাশের অনেক লোভনীয় কিছু থাকলেও চোখ সেটা দেখেও না দেখার ভান করে। আর এর প্রধান কারন-সেসব তো না যায় ধরা, না যায় ছোয়া। তাহলে আর সেগুলি নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই। তবে হ্যা, একটা বিশ্বাস তো থাকেই যে, কোনো একদিন, হয়তো আমার সেগুলি আসবে, আর তারজন্যে দরকার নিজেকে তৈরী করা। আর এই তৈরী করাই হলো সেই স্বপ্ন যা তাদেরকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়। ওরা পারে। 

মিটুলের সাথে পরিচয় হবার পর, মাত্র এক বছরের মাথায় ওকে আমার বিয়ে করতে হয়। সেটা ছিলো একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি। মিটুলের তখনো ইউনিভার্সিটির কোনো ডিগ্রী শেষ হয় নাই। মাত্র ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়ে। এর মধ্যে যখন ওর আমেরিকা প্রবাসী একজন ভদ্রলোক ওকে দেখে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্থাব দিলো, ওর পরিবার সেই প্রবাসীকে হাতছাড়া করতে চাইছিলো না। কিন্তু আমার আর মিটুলের সম্পর্ক ভাঙবার ছিলো না। কিন্তু এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য আমাকে বিয়েই করতে হয়েছিলো। প্রচন্ড রিস্ক নিয়েছিলাম কারন আর্মিতে আর্লি ম্যারেজের একটা শাস্তি আছে। সেটা জেনেও আমি পিছপা হইনি। বিয়ে করে ফেলি। এমনিতেই আমাকে আমি খুব সচ্ছল্ভাবে চালাইতে পারছিলাম না, এর মধ্যে ঢোকে গেলো আমার নব বিবাহিতা মিটুল। আমি কোনোভাবেই চাইনি যে, আমার বউ এর পড়াশুনার খরচ ওর পরিবার দিক কিংবা ওকে বিয়ে দেবার পরেও মিটুল ওদের পরিবারের আর্থিক সাহাজ্যে চলুক। আমার রোজগারের প্রতিটি টাকার হিসাব আমি করতাম। কোনো ভাবেই আমি বেহিসাবী ছিলাম না। এমন একটা পরিস্থিতি কাউকে বুঝতে দিতেও চাইনি। না আমি কারো উপজাজক হয়ে সাহাজ্য পেয়েছি। ফলে যখন আমি বিয়ে করি, তখন যেটা আমার মাথায় সর্বোপ্রথম সর্বদা জেগেছিলো যে, আমার পরিবারের আমাকে ছাড়া অন্য কারো উপরে তাদের নির্ভর করার উপায় নাই। আমার এই ধারনাটাই আমার অনুপস্থিতিতে ওরা কেমন থাকবে, কিভাবে চলবে, কৈ গিয়ে দাঁড়াবে, এসব আমি সবসময় মনে রাখতাম। আর এর সহজ সমাধান ছিলো একটাই। আর সেটা হলো ওদেরকে সাবলম্বি করে তোলা। তাহলে কিভাবে সেই সাবলম্বি করা যায়? আমি এটা ভাবতাম আর ভাবতাম। এই ভাবনা থেকেই আমি কিছু হোম ওয়ার্ক করি। তারমধ্যে সর্বো প্রথম যেটা আমার মাথায় এসেছিলো সেটা হলো-ওদের থাকার জায়গাটা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় ভাবনাটা ছিলো যে, আমার অনুপস্থিতিতে ওদের প্রতিমাসে সচ্ছল্ভাবে চলার জন্য যে টাকা লাগবে সেটা সর্বদা একটা স্থায়ী উৎস থেকে ওদের হাতে আসা। তৃতীয় ভাবনাটা ছিলো-আমার জীবদ্ধশায় আমার সন্তান এবং আমার স্ত্রীকে নিজের পায়ে দাড় করানো। এটাই ছিলো আমার একমাত্র এবং শুধুমাত্র ভাবনা। আমি আমার এই ভাবনাটা থেকে কখনো কোনোদিন এক মূহুর্তের জন্যেও পিছিয়ে যাই নাই।  

ক্যাডেট কলেজ ছাড়ার পর প্রায় ৩৭ বছর পর এসে আমি আমার সেই ভাবনার প্রতিফলনটা যদি বলি, তাহলে আমি অনায়াসেই আমার ব্যালান্স শীট কি সেটা বুঝতে পারি। আজকে আসলে আমি লিখতে বসেছি আমার সেই ভাবনার ব্যালান্স শীট নিয়ে যে আমি আসলে এ ব্যাপারে কতটুকু করতে পেরেছি। আমার এই লেখা অন্য কারো জন্য নয়, এটা নিতান্তই একটা সেলফ অডিটের মতো। কেউ জানুক আর নাইবা জানুক, আমি তো নিজেকে বলতে পারবো-আমার সাফল্য আর ব্যর্থতা কি ছিলো আর কি পাই না।

এবার যদি আরো একটু বিস্তারীত বলি তাহলে কথাগুলি হয়তো এ রকমের হবে যে,

খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলাম, মাত্র ২২ বছর বয়সে, আর চাকুরীটাও ছিলো খুব অল্প বেতনের। মাত্র সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, বেতন ৮৫০ টাকা। মিটুলকে আমি সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সময় একটা কথাই বলেছিলাম, নিজের পায়ের উপরে দাড়াতে হবে। মিটুল সেটা করেছে। ইউনিভার্সিটি পাশ করে বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকুরীতে জয়েন দিয়েছে। আজ সে ফুল প্রোফেসর। তার মাসিক একটা ইনকাম আছে, আবার পেনশনের পরেও একটা থোক টাকা পাবে। ঠিক এই মুহুর্তে মিটুলের মাসিক বেতন প্রায় ১ লক্ষ টাকা। এই টাকাটা থেকে আমি কখনো হাত দেই নাই। এখনো না। ওর টাকা বিশেষ বিশেষ জরুরী টান দেয়া ছাড়া প্রায় সব টাকাই সঞ্চিত থাকে। ফলে ওর একটা ক্যাশ ব্যালেন্স আছে। সেটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটা একটা সাপোর্ট অবশ্যই।

আমার বড় মেয়ে ইতিমধ্যে ডাক্তারী পাশ করেছে। বর্তমানে সে ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতালে চাকুরী করে। বেতন যদিও সামান্য, মাত্র ২৮ হাজার টাকা, কিন্তু ওর যে প্রোফেশন তাতে অন্তত সে তার নিজের সংসার চালানোর মতো ক্যাপাসিটি আছে। এ ছাড়া ওর নামেও প্রায় লাখ ত্রিশের টাকার একটা সঞ্চয় করা আছে যা বিপদের সময় ওকে সাহাজ্য করতে পারবে।

ছোট মেয়ে আমেরিকায় চলে গেছে পড়াশুনার জন্য। ওর আগামী এক বছরের সমস্ত খরচ আমার অগ্রীম দেয়া আছে। ফলে আগামী বছরে গিয়ে ওর আবার টাকা লাগবে। এর মধ্যে কনিকা আমেরিকার লাইফ বুঝে যাবে, হয়তো সে নিজেই নিজের খরচটা জুগিয়ে ফেলতে পারবে।

চমৎকার পরিবেশে থাকার জন্য আমার একটা বাড়ি করা আছে। যার দোতালায় ওরা আজীবন নিজের বাড়িতে থাকতে পারবে। আর বাকী ফ্ল্যাটগুলি থেকেও প্রতিমাসে অন্তত ৬০/৭০ হাজার টাকা ভাড়া আসে। বাসাবোতে আমার একটা ফ্ল্যাট রয়েছে যেখান থেকেও একটা প্রায় ১৫ হাজার টাকার মতো ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া মিটুল কিছুদিন আগে নিজেদের অন্যান্য সঞ্চয় দিয়ে তিনবোন মিলে নিজদের বাপের বাড়িতে একটা বিল্ডিং করেছে যার মধ্যে তার নিজের আছে ৭টি ফ্ল্যাট। এখনো ভাড়া শুরু হয় নাই কিন্তু যখন এই ফ্ল্যাটগুলি ভাড়া শুরু হবে, তখন কম করে হলেও প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া আসবে।

এখন যদি আমি হিসাব করে দেখি, দেখা যাবে যে, মিটুলের মাসিক বেতন, আমার বাড়ির থেকে ভাড়ার আয়, বাসাবো থেকে বাড়ি ভাড়া আর মানিকগঞ্জের বাসা থেকে আয় মিলে প্রায় দুই লাখের উপরে টাকার জোগান হয়ই। এ ছাড়া নিজেদের থাকার জন্য কোনো বাসা লাগছে না কারন মীরপুরের বাসায় আমরা দোতালার পুরুটাই থাকি। যদি কখনো ক্যাশ টাকার দরকার হয়, মিটুল, উম্মিকার আর কনিকার যে সঞ্চয়পত্রগুলি কেনা আছে তাতে প্রায় এক কোটির উপরে সেভিংস আছে। নিজেদের তিনটা গাড়ি আছে। আমার অনুপস্থিতিতে ওদের হয়তো তিনটা গাড়ির দরকার হবে না। আমার জীপ গাড়িটা হলেই হবে। আর নিদেনপক্ষে যদি দুটু গাড়িও ওরা রাখতে চায়, তাতেও কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। সেক্ষেত্রে তিন নম্বর গাড়িটা বিক্রি করে দিলেও কিছু ক্যাশ টাকা হাতে আসবে।

আমি বর্তমানে ব্যবসা করছি। আর্মির চাকুরীটা ছেড়ে দিয়েছিলাম আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে। এই ১৬ বছরে আমার ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান আল্লাহর রহমতে প্রায় ৫০/৬০ কোটি টাকার মুল ধনে পৌঁছেছে। এর ৩৫% শেয়ার আমার নিজের। প্রতিমাসে অনারারিয়াম হিসাবে ২০২২ সাল অবধি আমি নিজেই নিচ্ছি তিন লাখের উপর। গাড়ির খরচ, ড্রাইভারের খরচ ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান থেকেই আসে। আমার একজন ব্যবসায়ীক পার্টনার আছে যার শেয়ার ৬৫%। ব্যবসায় ভবিষ্যত কি হয় সেটা আগে থেকে বুঝা যায় না। তবে যেভাবে চালাচ্ছেন আল্লাহ, ভালো যাচ্ছে। তারপরেও আমি আমার অনুপস্থিতিতে ব্যবসায়িক লাইনের উপর কোনো নির্ভরতা করি না। আমার ব্যবসায়ীক লাইন থেকে যদি কখনো কোনো টাকা নাও পায় আমার পরিবার, আজ যেভাবে তারা লাইফ লিড করছে, আমার ধারনা ইনশাল্লাহ ওরা কারো কাছে আর হাত না পেতেই ঠিক এভাবেই ওরা তাদের লাইফ লিড করতে পারবে ইনশাল্লাহ। আর আমি ঠিক এটাই চেয়েছিলাম। আর যদি আমার অনুপস্থিতিতে আমার পার্টনার আমার শেয়ার বিলুপ্ত করে আমার পরিবারকে বিদায় করতে চান, তারপরেও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান থেকে শেয়াএর অনুপাতে কম করে হলেও আমার পরিবার ১০/১৫ কোটি টাকা নগদ পাবে। সেই টাকা যদি আমার পরিবার শুধু ব্যাংকেই রেখে দেয়, তারপরেও প্রতিমাসে তারা নুন্যতম হলেও ৬/৭ লাখ টাকা পাবে। আমাদের পারিবারিক সঞ্চয় আর ব্যবসায়ীক টাকার লাভ মিলে আমার পরিবার প্রায় ৭/৮ লাখ টাকা প্রতিমাসে পাওয়ার কথা। আর এই পরিমান টাকায় যে কোনো পরিবার খুব ভালোভাবেই চলতে পারবে ইনশাল্লাহ।

আল্লাহ যদি আমাকে বাচিয়ে রাখেন, তাহলে এর মধ্যে আমি চিন্তা করছি যে, আমার যে সব জায়গা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সবগুলি বিক্রি করে দেবো। কারন আমার সেসব সম্পত্তি আসলেই আমার স্ত্রী বা মেয়েরা কখনোই খুজে বের করে তার তদারকী করবে না বা করতে পারবেও না। ফলে তাদের জামাইয়েরা যখন দেখবে অনেক জায়গায় জমিজমা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তখন ওরা যা করবে সেটা হচ্ছে ৫ টাকার মাল ২ টাকায় বিক্রি। যদি সেটাই হয়, তাহলে আমিইবা কেনো ৫ টাকার জিনিষ এই মুহুর্তে ৩ টাকায় বিক্রি করি না? তাই ওই সব জমিজমা আমি ভেবেছি বিক্রি করে দিয়ে ক্যাশ করে ফেলবো। তাতে দেখা যায় যে, আমার হাতেও প্রায় দুই তিন কোটি টাকা ক্যাশ থাকবে যা একটা এসেটের মতো। রিভার সাইড সুয়েটার্স ব্যবসাটা তো আছেই। তাহলে আমি কি এটা বলতে পারি না যে, আজ থেকে ৪৫ বছর আগে যে দুঃস্বপ্নটা আমি দেখেছিলাম, আজ সেই খারাপ অনুভুতিটা আমার অনেকাংশেই কমে গেছে? অর্থাৎ আমি ঠিক পথেই ছিলাম আমার পুরু পরিকল্পনাটা নিয়ে।

মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমি চালাতে পারিনি। এটা ব্যবসায়ীক সাফল্য দেখেনি। উপরন্ত মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমার অনেক লাভ, অনেক সঞ্চয় কেড়ে নিয়েছে। আমি আমার চেষ্টার কোনো প্রকার ত্রুটি করিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজকে রক্ষা করার জন্য কিন্তু যেভাবেই হোক যে কারনেই হোক, মা ইন্ডাস্ট্রিজ বারবার ভুল মানুষের হাতেই পড়েছে আর বারবার শুধু ক্ষতির সম্মুক্ষিণই হয়েছে। অবশেষ আমি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে, আর কখনোই এই মা ইন্ডাস্ট্রিজকে সচল করে চালানোর দরকার নাই। সেই ২০১০ সাল থেকে মা ইন্ডাস্ট্রিজ চালানোর পর কম করে হলেও ৪/৫ কোটী টাকা আমি লস করেছি। কিন্তু মা ইন্ডাস্ট্রিজ এক জায়গায় আমাকে সেটা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। আর সেটা হচ্ছে জমির ভ্যালু।

মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জায়গায় আমার মোট জমি আছে (২২ + ৪৬ + ২২.৫ +২৬ ) শতাংশ। আমি ২২ শতাংশ জমি বিক্রি করে দিয়ে মা ইন্ডাস্ট্রিজের লোন অবমুক্ত করার পরেও আমার কাছে বাকী জমিগুলি রয়ে গেলো। যার দাম নেহায়েত কম নয়। সব মিলিয়ে কম করে হলেও এর দাম প্রায় ৩ কোটী টাকা। সাউথ টাউনের প্রায় ৪১ শতাংশ জমি এখনো ডিস্পিউট অবস্থায় আছে। পেলে ভালো, আর পেলেও আফসোস করবো না। তবে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। আর ধলেশ্বরী গ্রীন ভিলেজে আমার নিজের সম্পত্তি আছে প্রায় ২৮ বিঘার মতো। এতো কিছু সব তো আমিই করেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

আজ প্রায়ই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। আজ যদি আমার মা বেচে থাকতেন, যেটা আমি করতাম সেটা হলো- মাকে ইচ্ছে মতো যত খুশী টাকা দিতাম আর বলতাম, যা খুশী করেন। যদি টাকা পূড়িয়েও আনন্দ পান, তাহলে টাকাও পুড়িয়ে দেন। হয়তো সেটাই আমার হতো আনন্দ যে, মা আনন্দ পাচ্ছেন। কিন্তু তিনি আজ বেচে নেই।

০৮/০৮/২০২১-What If I were not Born

মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহন করার থেকে এতো সম্মান নাকি ঈশ্বর তার পাপমুক্ত ফেরেস্তাদেরকেও দেন নাই। সৃষ্টির সেরা জীবদের মধ্যে এই মানুষই নাকি সেরা। এই মানুষের জন্যই ঈশ্বর আকাশ তৈরী করেছেন, সেই আকাশ থেকে তিনি জল-বৃষ্টি বর্ষন করেন, জমির নির্মল গাছ গাছালীকে তিনি সবুজ সতেজ করে রাখেন। তিনি এই মানুষের জন্যই পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, দিন আর রাতের তফাত করেছেন, ভালোবাসার মতো সংগী তৈরী করেছেন, অতঃপর তিনি জীবিনের বিভিন্ন স্তরে স্তরে নানাবিধ উপলব্দির জন্য সন্তান, নাতি নাতকোরের মতো মিষ্টি মিষ্টি ফুলের সংসারও তৈরী করেছেন। কি অদ্ভুত ঈশ্বরের সব সাজানো এই পরিকল্পনা। নীল আকাসের দিকে তাকিয়ে কখনো সাদা ফেনার মতো ভেসে যাওয়া মেঘ, কখনো উত্তাল মেঘের অবিরাম বৃষ্টিবরন, হেমন্তে বা শরতের দিনে বাহারী ফুলের সমাহার, পাখীদের কিচির মিচির, শিল্পির গানের মূর্ছনা, সবকিছু যেনো বিমোহিত করার মতো একটা সময়। অথচ এসব কিছু কোনো না কোনো একদিন ছেড়ে আমাদের সবাইকে চলেই যেতে হয়।

আবার অন্যদিকে যদি দেখি, দেখা যায়, এই বাহারী জীবনের সব সুখ আর আস্বাদন ছাড়াও আমাদের এই জীবনে ছেকে বসে দুঃখ বেদনা, হতাশা আর কষ্ট। জীবনের গাড়ি আমাদের জীবন-যানবহনের চাকার উপর টানতে টানতে এক সময় অনেকেই আমরা হাপিয়ে উঠি। বেদনায় ভরে উঠে কষ্টে, দুঃখে ভেসে যায় চোখের জল অথবা রাগে, অভিমানে একে অপরের হয়ে উঠি চরম থেকে চরম শত্রুতায় যেনো ভালোবাসা কোনোকালেই ছিলো না, হোক সেটা বিবাহ বন্ধনের মতো কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে, অথবা ব্যবসায়ীক কোনো অংশীদারিত্তে অথবা ক্ষমতার লড়াইয়ের কোনো যুদ্ধমাঠে।

অনেক সময় আমাদের মুখ দেখে এটা বুঝা যায় না কে সুখের বা কষ্টের কোন স্তরে আছি। ভিতরের সুখ কিংবা যন্ত্রনার উপলব্ধিকে আমরা একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করলেও সঠিক স্তরটা কখনোই প্রকাশ করা যায় না। পাখীদের বেলায় কিংবা অন্য কোনো প্রানীদের বেলায় এটা কতটুকু, সেটা আমরা না কখনো ভেবে দেখেছি, না কখনো উপলব্ধি করেছি। ওরা দিনের শুরুতে আহারের খোজে বেরিয়ে যায়, পেট ভরে গেলে কোনো এক গাছের ডালে বা পাহাড়ের কোনো এক ছোট সুড়ঙ্গে রাত কাটিয়ে দেয়। তাদের অট্টালিকার দরকার পড়ে না, ওরা ওরা কেউ কারো শত্রুতা করে না, কোন পর্বনে বিশেষ কোনো কিছুর আয়োজনেরও দরকার মনে করেনা। কবে ছুটির দিন, কবে ঈদের দিন কিংবা করে কোন মহাযুদ্ধ লেগেছিলো সে খবরেও ওদের কিছুই যায় আসে না। ওদেরও সন্তান হয়, ওরাও দলবেধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, ওদের কোনো ভিসা বা ইমিগ্রেশনেরও দরকার পড়ে না। টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী ওদের জন্য কোনোদিন দরকার পড়ে নাই, আগামীতেও দরকার পড়বে না। ওরাও কষ্টে কিছুক্ষন হয়তো ঘেউ ঘেউ করে, কিংবা চিন্তিত হয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়, কিন্তু তাকে আকড়ে ধরে বসে থাকে না। ওদের সারাদিনের কর্মকান্ডের জন্য না কারো কাছে জবাব্দিহি করতে হয়, না কারো কাছে ধর্না দিতে হয়, এমনকি ওরা ঈশ্বরের কাছেও তাদের অপকর্মের কিংবা ভালোকর্মের কোনো জবাব্দিহিতা করতে হয় না। কোনো ট্যাক্স ফাইল নাই, কোনো ভ্যাট ফাইল নাই, না আছে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, না দরকার তাদের গাড়িঘোড়ার। তাহলে তো ওরাই আসলে শান্তিতে থাকে, মানুষের থেকে অধিক।

মানুষ ছাড়া অন্য সব প্রানীকুল প্রত্যেকেই নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস রাখে কিন্তু মানুষ তার নিজের একক ক্ষমতার উপর কখনোই সে বিশ্বাস রাখে না বা থাকে না। তার দল লাগে, তার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড লাগে, তার আরো বিস্তর আয়োজন লাগে। এতো কিছুর উপরে তার আস্থা রাখতে গিয়ে মাঝে মাঝে সে নিজের উপরেও আস্থা হারিয়ে ফেলে। অথচ সে একা বাস করতে পারে না, না আবার সবাইকে নিয়েও বাস করতে চায়। অদ্ভুত এই মনুষ্যকূলের মধ্যে আমি জন্মে দেখেছি- এতো কিছুর বিনিময়ে অথচ কোনো কিছুই আমার না, এই শর্তে জন্ম নেয়াই যেনো একটা কষ্টের ব্যাপার। যদি কেউ এই পৃথিবীতেই না আসতো, তাহলে হয়তো বিধাতার কাছে এই ক্ষনিক সময়ে এতো কিছুর মাঝে পরিবেষ্ঠিত থেকে আবার চলে যাওয়া, কইফিয়ত দেয়া, ইত্যাদির দরকার হতো না, ক্ষমতার লড়াইয়ে হানাহানি, কারো বিয়োগে মন এতো উতালাও হতো না।

আজ থেকে বহু শতাব্দি আগে কিংবা অদুর অতীতে যারা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে, তারা আসলে আমাদেরই লোক ছিলো। তারা চলে গিয়েছে চিরতরে। কোথায় গেছেন, আর কি অবস্থায় আছেন সে সম্পর্কে আজো কেউ কোনো সম্যখ ধারনা কারো কাছেই নাই। অথচ যখন বেচে ছিলেন, প্রতিটি মুহুর্তে তারা ছিলেন সময়ের থেকেও অধিক ব্যস্ততায়। যখন তারা চলে যান, তারা আমাদের কাছে এমন কোনো ওয়াদাও করে যায়নি যে, তাদের ফেলে যাওয়া সব সম্পত্তির জন্য আবার ফিরে আসবেন, কিংবা এমনো নয় যে, তারা তা আর কখনো দাবী করবেন। এটা না হয় চিরতরে চলে যাওয়ার ব্যাপার হলো। কিন্তু এই জীবনে তো এমনো বিচ্ছেদ হয় যেখানে তারা আছেন কিন্তু আবার নাইও। জীবনের প্রয়োজনে ভউগুলিক বাউন্ডারীর অন্য প্রান্তে যখন কেউ অনেক দিনের জন্য চলে যান, আর তার ফিরে আসার ওয়াদা ভেংগে যায়, তখন আর তার উপরেও আস্থা রাখা যায়না। এমনি কষ্টে মানুষ ভোগের সমস্ত আয়োজনের উপরে থেকেও সেই আপনজনদের জন্য প্রতিনিয়ত হাহুতাশ করতে থাকেন। মনের কোথায় যেনো কি একটা সারাক্ষন খসখস করতেই থাকে। সেই যন্ত্রনায় তখন এমন মনে হয় যেনো- একটা দিনও ঠিকঠাক মতো কাটে না, এমন কি একটা রাতও না। তখন জেগে থাকে শুধু কিছু সদ্য জন্মানো কান্না। আর কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট। আর সেই কষ্টের কোনো নাম থাকে না, না থাকে তার কোনো বর্ননা বা রুপ। আর এই ভিতরের যন্ত্রনাটা কাউকেই দেখানো যায় না অথচ সত্যিটা থাকে এই ভিতরেই। আসলে পৃথিবীতে সম্পর্কের চেয়ে বড় কোনো সম্পত্তি নাই। এতো সুখের জীবনেও যখন এমন অনেক কষ্টের আর বেদনার নীল ছড়িয়েই থাকে, তাহলে কি দরকার জন্মের?

তারপরেও আমরা মানুষ হয়ে সৃষ্টির সেরা জীব হয়েই জন্ম নেই, নিয়েছি যেখানে অবারিত সবুজ ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার দোলা আমাদের মুখে পরশ জোগায় আবার তেমনি কখনো বিচ্ছেদের মতো যন্ত্রনা, মৃত্যুর মতো বেদনা, আবার কখনো অনিশ্চিত যাত্রার মতো দুশ্চিন্তা নিয়েই আমাদেরকে বাচতে হয়। কেউ যখন চিরতরে জীবনের নিঃশ্বাসকে স্তব্ধ করে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন, তারজন্য যতোটা না দুশ্চিন্তা আমাদেরকে গ্রাস করে, তার থেকে যখন কোনো প্রিয়জন হটাত করে সেই চেনা পরিচিত আবাসস্থল থেকে কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে যান আর ফিরে না আসেন, তারজন্য আরো বেশী দুশ্চিন্তা আর অমঙ্গল চিন্তা মাথা ভনভন করতে থাকে। কিন্তু এরই মতো যখন কোনো প্রিয়জন জেনেশুনে জীবনের প্রয়োজনে অথবা বড় সাফল্যের আশায় একে অপরের থেকে এমন একটা বিচ্ছেদে আপোষ করেন যেখানে টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী আমাদেরকে প্রায় স্থায়ী বিচ্ছেদের স্তরে নিয়ে যায়, তখন আমাদের হাসির অন্তরালে যে বেদনা লুকিয়ে থাকে, তা তুষের অনলের মতো সারাক্ষন তাপদাহে অন্তরে প্রজ্জলিত হতেই থাকে। আশা আর সাফল্যের মতো জল হয়তো সাময়ীকভাবে তা নিবারন করে কিন্তু এই ছোট ক্ষনস্থায়ী জীবনে বারবার এটাই মনে হয়- কি দরকার ছিলো এসবের? তাকে কি আটকানো যেতো না? নাকি আটকানো হয় নাই? আসলে কোনো কিছুই দরকার ছিলো না যদি না আমার জন্মই না হতো এই মানুষ হিসাবে। তখন না দরকার হতো এই বিচ্ছেদের, না প্রয়োজন হতো এই দিনরাতের কষ্টের অথবা না দরকার পড়তো অন্তর জালার তাপদাহের অনুভবতার। তখন কেনো জানি বারেবারেই মনে হয়- What If I were not born? 

করোনার প্রাদূর্ভাবে চেনা পরিচিত সব মানুষ যেনো ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে একে একে যেনো বিনা নোটিশে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। এই সেদিন যার সাথে এক টেবিলে বসে হাসাহাসি, আড্ডা, কথা কাটাকাটি, অথবা দল বেধে গায়ের কোনো মেঠো পথে বাচ্চাদের মতো হাটাহাটি করেছি, তার কিছু মুহুর্তের পরই সংবাদ আসে, আর নেই। চলে গেছে। ব্যাংকের টাকা, বিশাল ব্যবসা, কিংবা গাড়ি বহরের সব যাত্রা কোনো কিছুই যেনো তার সামনে দাড়াতে পারছে না। অথচ তাকে না দেখা যায়, না ছোয়া যায়। কখন সে কার সাথে একান্তে বাস করা শুরু করে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আতংকে আছে মন, অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে শরীর, ভাবনায় ভরে যাচ্ছে সারাটা মাথা। অথচ দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, মনের আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে পাখীরা, শুধু বন্দি হয়ে আছি আমি “মানুষ”। বারবার মনে হচ্ছে- কোথায় যেনো কি ঠিক নেই, কি যেনো কোথায় একটা গড়মিল হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে না। কেনো এমনটা হচ্ছে বারবার?

আসলে কোন কবি যেনো একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন- মানুষ হয়ে জন্মই যেনো আমার আজীবনের পাপ। তাই আমারো মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে- What If I were not even born!!

০৮/০৮/২০২১-সন্ধ্যা ৮ টা ৩২-খুব ভালো একটা খবর পেলাম আজ

খুব ভালো একটা খবর পেলাম আজ। আমার বন্ধু উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছিলাম, যেভাবেই হোক এয়ারপোর্টের জন্য আমাকে যেনো কয়েকটা ‘পাশ’ এর বন্দোবস্ত করে দেয়। কভিডের কারনে প্যাসেঞ্জার ছাড়া অন্য কোনো দর্শ্নার্থীকে এয়ারপোর্টের ভিতরে প্রবেশ করতেই দেয় না। কনিকার সাথে যাওয়ার জন্যে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ইউএস এম্বেসী সব ধরনের ভিসা (শুধু মাত্র স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়া) বন্ধ রেখেছে, ফলে আমরা কনিকার সাথে যেতে পারছি না। এদিকে আবার কভিডের কারনে এয়ারপোর্টের ভিতরেও প্রবেশের সুযোগ নাই। যাক, শেষ পর্যন্ত আজকে আমার দোস্ত মাসুদ আমাকে ফোন করে জানালো যে, এভিয়েশনের সিকিউরিটি ডাইরেক্টর আরেক উইং কমান্ডার আজমকে বলা আছে সে আমাদের জন্য ‘পাশ’ এর ব্যবস্থা করবে। আজমের সাথে কথা বললাম, আজম খুব সমীহ করেই জানালো যে, আগামী ১০ তারিখের রাত ৯ টায় যেনো আমি ওকে ফোন দিয়ে একটা কন্ট্যাক্ট নাম্বার সংগ্রহ করি যে কিনা আমাদেরকে এয়ারপোর্টে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। এই মুহুর্তে এর থেকে আর ভালো খবর আমার কাছে কিছুই নাই। খুব ভালো লাগলো যে, কনিকাকে আমি আর আমার স্ত্রী (উম্মিকাসহ) এয়ারপোর্টে সি-অফ করতে পারবো, ওর লাগেজ পত্রগুলি ঠিকমতো বুকিং করে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারবো। মেয়েটা আমেরিকায় চলে যাচ্ছে ৫ বছরের জন্য, পড়াশুনার খাতিরে। ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টিমোর কাউন্টি) তে যাচ্ছে।

আমার মনে পড়ছে যে, আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগেও আমার ভর্তি হয়েছিলো কার্স্কভাইল ইউনিভার্সিটিতে যেখানে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ চেয়েছিলেন আমি আমেরিকায় গিয়ে পড়াশুনা করি। কিন্তু যে কোনো কারনে হোক, আমার আর যাওয়া হয় নাই, আমি চলে গিয়েছিলাম আর্মিতে। আমার যে আমেরিকায় যাওয়া হয় নাই এটা বল্বো না, আমি তারপরে ১৯৯৫/৯৬ সালে হাইতির জাতিসঙ্ঘ মিশন থেকে একমাসের জন্য আমেরিকায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। তারপরে পর পর দুবার ভিসা পেয়েছিলাম মোট ৬ বছরের জন্য কিন্তু আমাকে আমেরিকা টানে নাই। আগামী ১১ তারিখে আমার ছোট মেয়ে চলে যাচ্ছে সেই সুদুর আমেরিকায়। একটু খারাপ লাগছে কিন্তু সন্তানদের সাফল্যের জন্য তাদেরকে ঘর থেকে ছেড়েই দিতে হয়, এটাই নিয়ম।

কনিকা যাতে কোনো প্রকারের আর্থিক সমস্যায় না থাকে সেজন্য আমি অগ্রিম ওর এক বছরে সমস্ত খরচ (বাড়ি ভাড়া, খাওয়া দাওয়ার খরচ, ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি, হাত খরচ, যাতায়ত খরচ, ইন্স্যুরেন্স খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে ৩৫ হাজার ডলার দিয়ে দিলাম যাতে আমিও আর এই এক বছর ওকে নিয়ে চিন্তা করতে না হয়। সাথে সিটি ব্যাংকের একটা এমেক্স কার্ড ও দিয়ে দিচ্ছি ২ হাজার ডলারের মতো যাতে খুবই জরুরী সময়ে সে এটা খরচ করতে পারে। আগামীকাল কনিকার কভিড-১৯ টেষ্ট করাতে হবে। ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে কভিড টেষ্ট করে ফ্লাইটে উঠতে হয়। পজিটিভ এলে ফ্লাই করতে পারবে না। দোয়া করছি, আল্লাহ যেনো সব কিছু সহী সালামতে এটাও ইনশাল্লাহ নেগেটিভ করে দেন।

বড় মেয়েকেও ইন্সিস্ট করছি সে যেনো কনিকার মতো দেশের বাইরে (পারলে একই ইউনিভার্সিটি, ইউএমবিসি) আমেরিকায় চলে যায়। কিন্তু কোথায় যেনো উম্মিকার একটা পিছুটান অনুভব করছি। তার শখ লন্ডনে যাওয়া। যদি তাও হয়, তাতেও আমি রাজী। ওরা ভালো থাকুক, সেটাই আমি চাই।

আমি জানি একটা সময় আসবে, আমি আসলেই একা হয়ে যাবো। এমন কি আমি মিটুলকেও ধরে রাখতে পারবো কিনা আজানি না। কারন যখন দুই মেয়ে দেশের বাইরে থাকবে, আমার ধারনা, মিতুলও প্রায়ই দেশের বাইরে থাকবে তার মেয়েদের সাথে। যদি দুইটা আলাদা আলাদা দেশ হয়, তাতে ওর বাইরে থাকার সময়টা বেড়ে যাবে, আর যদি একই দেশে হয়, তাহলে এক ছুটিতেই দুই মেয়ের সাথে হয়তো সময়টা কাটাবে। আমি ব্যবসা করি, আমাকে দেশেই থাকতে হবে, আর আমি দেশে থাকতেই বেশী পছন্দ করি।

বাকীটা আল্লাহ জানেন।  

০৭/০৮/২০২১-কনিকার আর মাত্র ৩ দিন বাকী

প্রায় সবগুলি কাজ শেষ। ভিসা আগেই হয়ে গিয়েছিলো, টিকেটও কেনা আছে, টিউশন ফি গতকাল পাঠিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। ভ্যাক্সিনেশন যা যা নেয়া দরকার ছিলো, সবই সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যাগপত্র, মালামাল সব কিছুই প্যাকড হয়ে গেছে, আগামী এক বছরের আর্থিক জোগানও শেষ, এখন বাকী শুধু করোনা টেষ্ট আর ফ্লাইটে উঠা। আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত অর্থাৎ ১১ আগষ্ট এর ভোর বেলায় কনিকার ফ্লাইট। মাত্র তিনদিন বাকী। কনিকার চলে যাওয়ার শুন্যতাটা এখন মাঝে মাঝে অনুভব করছি, উম্মিকা রীতিমত প্রায় প্রতিদিনই কান্নাকাটি করছে কনিকা চলে যাবে বলে। কনিকা এখনো খুব একটা মন খারাপ করছেনা তবে বুঝা যায় সে একটা দুদোল্যমান অনুভুতিতে ভোগছে। কারন একদিকে কনিকা আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারে বেশ খুসী, অন্যদিকে বাড়ি ছাড়ার কষ্ট। মিটুলের অবস্থাটাও প্রায় ওই একই রকমের। আর আমার? আমার শুধু একটাই ভয়, ওরা যেনো ভালো থাকে যেখানেই থাকুক। মন তো খারাপ হচ্ছেই। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। আমি মেনে নিয়েছি বাস্তবতা।

বাড়িটায় সারাক্ষন কনিকাই মাতিয়ে রাখতো, বাসায় যতো কথাবার্তা, যতো হইচই কনিকাই করতো। এই পরিবেশটা মিস করবো আমরা। অফিস থেকে আমি বাসায় আসার পর প্রথমেই আমি ঢোকি সাধারনত কনিকার রুমে আর তার সাথে উম্মিকার রুমে। ইদানিং উম্মিকা ডেল্টা মেডিক্যালে জব করে বলে, প্রায়ই আমি খবর নেই মেয়েটা লাঞ্চে খাবার খেয়েছে কিনা বা রাত সাড়ে আটটা বাজলেই মনে করিয়ে দেই, উম্মিকাকে আনতে গাড়ি গেছে কিনা।

আমি জানি, কনিকা যেদিন আমেরিকার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হবে ইনশাল্লাহ, সেদিন আমার ভিতরে কি কি ঘটবে কিন্তু মনকে সক্ত করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। যতোক্ষন না কনিকা তার ডেস্টিনেশনে গিয়ে পৌছায় ততোক্ষন আমি জানি ওর ফ্লাইট মনিটর করতে থাকবো। যখন আল্লাহর রহমতে কনিকা আমেরিকায় ওর ডেস্টিনেশনে পৌঁছাবে, হয়তো তখন একটু ভালো লাগবে যে, ওখানেও অনেক আত্তীয় স্বজনেরা আছেন যারা কনিকাকেও অনেক ভালোবাসে, তারা দেখভাল করবে।

কনিকা অনেক খুতখুতে। কিন্তু গোছালো। ওর কোনো কিছুই অগোছালো থাকে না। কোন একটা জিনিষ এদিক সেদিক হলেই ওর সেটা ভালো লাগে না। মেজাজ খারাপ করে। ফলে ভয় পাচ্ছি, নতুন পরিবেশে কতটা দ্রুত কনিকা এডজাষ্ট করতে পারে। ওখানে কনিকাকে সব কিছুই নিজের হাতে করতে হবে। পারবে কিনা জানি না। তবে প্রথম প্রথম কনিকা হোমসিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। এটা কাটিয়ে উঠতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

আমি কনিকা যেনো আমেরিকায় অন্তত টাকা পয়সা নিয়ে কোনো রুপ সমস্যায় না পরে, সেইটা শতভাগ নিশ্চিত করেছি (আলহামদুলিল্লাহ)। আসলে আমি ইদানিং আমার জীবনের মুল পলিসিটাই বদল করে ফেলেছি। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। যাতে আমি না থাকলেও আমার সন্তানেরা কোথাও কোন সমস্যায় না পড়ে, বাকীটা আল্লাহ ভালো জানেন। আমার জমি জমা, টাকা পয়সার এসেটের থেকে বড় এসেট আমার মেয়েরা। এদের জন্য পয়সা খরচে আমার কোনো কার্পন্য নাই। যতোটুকু আমার সক্ষমতা আছে, আমি ওদেরকে ততোটাই দিতে চাই।

গতকাল রাতে প্রথম দেখলাম, উম্মিকা কনিকা দুজনেই বেশ ইমোশনাল ছিলো। ব্যাপারটা ঘটছে কারন সময়টা খুব কাছাকাছি কনিকার চলে যাওয়ার। ফলে উম্মিকাও অনেকটা খুব বেশী মন খারাপ করে আছে। চৈতী এসছে কনিকার যাওয়ার কারনে। ওরা সবাই খুব কাছাকাছি ছিলো সব সময়। ওদের বয়সের তারতম্য থাকলেও কনিকাই ছিলো যেনো ওদের সবার মধ্যে নেতা। ওর আবদার কেউই ফেলতো না।

বিমানবন্দর ঢোকার জন্য পাশ এর অবস্থা এখন খুব কড়াকড়ি। কোথাও থেকে কোনো পাশ পাচ্ছি না। ব্যাপারটা একটু হতাশার। অনেককেই বলেছি কিন্তু সব জায়গা থেকেই নেগেটিভ ফলাফল আসায় একটু আরো ভয়ে আছি। আমার দোস্ত উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছি যে, সিভিল এভিয়েশন আসোশিয়েসন অফ বাংলাদেশ থেকে অন্তত কয়েকটা পাশ জোগাড় করতে। ওই সংস্থার চেয়ারম্যান হচ্ছে এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান। সে আমাদের থেকে এক কোর্ষ সিনিয়ার কিন্তু আমার সাথে কখনো পরিচয় হয় নাই। যেহেতু মাসুদ এয়ার ফোর্সের, তাই একটা ভরষা মাসুদ দিয়েছে যে, সে পাশ জোগাড় করতে পারবে। কিন্তু ব্যাপারটা আমি এখনো সিউর হতে পারছি না আসলেই মাসুদ পাশ জোগাড় করতে পারবে কিনা।

কনিকা হয়তো ওর বাড়ি ছাড়ার অনুভুতিটা ঠিক এই মুহুর্তে ততোটা উপলব্ধি করতে পারছে না। কিন্তু যেদিন কনিকা স্টেপ আউট করবে, আমি জানি, ওর সবচেয়ে বেশী মন খারাপ থাকবে। যদি এমন হয় যে, পাশ একটাও পাওয়া গেলো না, তাহলে কনিকাকে একাই সব সামাল দিতে হবে। লাগেজ বুকিং, বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ, চেক ইন, ইত্যাদি।  আর যদি একটা পাশও পাই তাহলে শুধু মাত্র আমি ভাবছি মিটুলকে দিয়ে দেবো যাতে মিটুল সবকিছু ম্যানেজ করে মেয়েকে যতোদূর পারে উঠিয়ে দিতে। আর যদি দুটু পাই, তাহলে সাথে উম্মিকাকে দিয়ে দেবো। আর যদি বেশী ভাগ্যবান হই, আমিও পাই, তাহলে তো আল্লাহর রহমত, আমরা অকে সবাই এক সাথে বিমানে তুলে দিতে পারবো। কনিকা কাতার এয়ার ওয়েজে যাচ্ছে ইনশাল্লাহ।

আজ শুক্রবার। ভেবেছিলাম, বাইরে কোথাও যাবো। কিন্তু কনিকাকে এই মুহুর্তে বাইরে বের করতে চাই না। চারিদিকে করোনার প্রভাব খুব বেশী। কনিকার করোনা টেষ্ট করাতে হবে ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে। তাই খুব একটা বের করতে চাই না কনিকাকে। তাই সবাই চিন্তা করছি- আমাদের ছাদের উপরে ঘরোয়া একটা পার্টি করবো যেখানে শুধুমাত্র আমরাই থাকবো। জাষ্ট একটা আউটিং এর মতো আর কি।

একটা সময় আসবে যেদিন আজকের এই অনুভুতিটা হয়তো আমি আগামী ৪ বছর পর যখন পড়বো, তখন আমার অনুভুতি হয়তো হবে পুরুই ভিন্ন। সফলতার গল্পে আমি হয়তো অনেক গল্প করবো এই কনিকাকে নিয়ে। আমি সব সময় উম্মিকাকেও বলে যাচ্ছি, সেও চলে যাক আমেরিকায়। তাহলে দুই বোন এক সাথে থাকলে আমিও কিছুটা ভরষা পাই। কিন্তু উম্মিকার যাওয়ার ব্যাপারটা খুব ধীর। সে মনে হয় বাইরে মাইগ্রেশন করতে চায় না।

দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোথায় আমাদেরকে নিয়ে যায়। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদেরকে ভালোবাসেন।

০৫/০৮/২০২১-অদ্ভুত একটা স্বপ্ন

সকালে ঘুম ভাংগার সাথে সাথে রাতের একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। কি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম যার মানেটা আমি বুঝার চেষ্টা করেছি বটে কিন্তু এর কোনো কুল কিনারা পাই নাই। মাঝে মাঝে আমি খুব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি- কিছু স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমি অনেক অনেক বছর পর মিলিয়ে দেখলে কিছুটা বাস্তবে মিল পাই, অধিকাংশ স্বপ্নের কথা আমার আর মনে থাকে না বটে কিন্তু মনের ভিতরে কিছু একটা খস খস করতে থাকে। আমি প্রায় ভোর রাতের দিকে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তার কিছুক্ষন পরেই আমার ঘুম ভেংগে যায়। স্বপ্নটা ছিলো এ রকম-

আমার পার্টনারের মেয়ে আনিকা বিদেশ থাকে, সে কি কারনে অথবা কোনো উদ্দেশ্যে কাউকে সে খুন করে ফেলে। খবরটা আমার কাছে যখন আসে, তখন আমি খুব চমকে চাই যে, মেয়েটা খুবই শান্ত শিষ্ট যাকে দিয়ে এমন একটা কাজ কখনোই সম্ভব না। তারপরেও ব্যাপারটা ঘটেছে। সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমার পার্টনার এই বিষয়টা নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন বলে মনে হলো না, না তার মেয়ে। সে দেশে ফিরে এসেছিলো ঘটনাটা ঘটার পর পরই। আমিও আর ওকে জিজ্ঞেস করি নাই, আসলে ঘটনাটা জানার পর ওর সাথে আমার আর দেখাও হয় নাই। এর মধ্যেই আমার ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো। আমি একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছিলাম যে, ব্যাপারটা অন্য কারো সাথে ঘটেছে বলে আমিও যেনো একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম না এই ভেবে যে, এটা তো আমার পরিবারের বা আমার কোনো সমস্যা না। যাদের সমস্যা তারাই এটা নিয়ে সামাল দেবে।

আমার ঘুম ভাংগার পরেই আমি ব্যাপারটা নিয়ে বেশ অনেক ক্ষন ভেবেছি যে, এমন একটা স্বপ্ন তো আমার দেখার কন কারনই নাই। তাহলে কেনো এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম? বারবার মনে পড়ছিলো যে, আমার ছোট মেয়ে কনিকা আগামী ১১ তারিখে আমেরিকা যাচ্ছে। এমন কোনো সংকেত না তো যা আমাকে স্বপ্নের মধ্যে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হলো? আল্লাহর কাছে আমি এমন কোন খবর কাউকেই পেতে দিতে চাই না, হোক সেটা আমার বা আমার পরিচিত কোনো লোকের। আল্লাহ আমাদের সমস্ত বালা মুসিবত দূর করে দিক, এই দোয়া করছি।

কনিকার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি আমেরিকায় চলে যাওয়ার। ব্যাপারটা এখনো উপলব্ধিতে আসে নাই যে, সে অনেক বছরের জন্য আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। আমি জানি, যেদিন সত্যি সত্যিই কনিকা চলে যাবে আমেরিকায়, সেদিন আমার স্ত্রী, উম্মিকা বা ওর সাথে যারা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত, তাদের সবার মন খারাপ হবে, কান্নাকাটি করবে। কনিকা নিজেও মন খারাপ করবে। কিন্তু নিয়তির এটা একটা চক্র যে, সন্তানেরা বড় হলে পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সাথে পিতামাতার সম্পর্ক থাকে বৈ কি কিন্তু তারা তাদের কাছে খুব কমই থাকে। কনিকা যেখানেই থাকুক, বা উম্মিকা, তারা যেনো ভালো থাকে আমি সব সময় এই দোয়াই করি।

০২/০৮/২০২১-কফিনের আয়না

সবার মুখে সব সময় আমি একটা কথা শুনি- কেনো পৃথিবীটা এ রকম করে বদলে যাচ্ছে? কেনো সবাই ভালো হয়ে যায় না? কবে ভালো হবে আমাদের মানুষের স্বভাব চরিত্র? কেনো কোনো কিছুই ঠিক নাই চারিদিকে?

আসলে এই প্রশ্ন গুলি আমারো।

আমিও অনেক সময় ভেবে দেখেছি- আসলেই কোথায় গন্ডোগোলটা?

তাই আমি একবার একটা এক্সপেরিমেন্ট চালালাম। বেশ অনেক গুলি লোককে ডেকে বললাম-আপ্নারা কি দেখতে চান কাদের কারনে আমাদের এই সমাজ টা বদল করা যাচ্ছে না। কারা এই পুরু সমাজের অধোপতনের জন্য দায়ী?

সবাই এক কথায় সেই সব লোকদের চেহাড়া দেখার জন্য উৎসুক হয়ে উঠলো।

আমি যাদেরকে ডেকেছিলাম, তাদের মধ্যে কেউ ছিলো যুবক, কেউ ছিলো পুলিশের কিছু লোক, অনেকে ছিলেন সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা আবার কেউ ছিলেন বেশ নীচু স্তরের কিছু শ্রমিক বৃন্দ।

আমি বললাম, আপ্নারা যদি সবাই তাদের দেখতে চান তাহলে আমার রুমে টেবিলের উপর যে ল্যাপ টপ টা আছে, সেখানে একে একে ওই সব লোকদের দেখতে পাবেন কিন্তু যেহেতু ব্যাপারটা বেশ স্পর্শ কাতর, তাই আমি সবাইকে এক সাথে দেখাতে চাই না। এক জন একজন করে আমার রুমে এসে দেখতে পারেন।

আমি আসলে যে কাজটা করেছিলাম সেটা হচ্ছে- ল্যাপ টপের আদলে আমি আমার টেবিলের উপর একটা আয়না ফিট করে রেখেছিলাম। যখনই কেউ দায়ী লোকদের দেখার জন্য ওই ল্যাটপের দিকে তাকান, তখন সে আসলে তার নিজের ছবিটাই দেখতে পাচ্ছিলেন।

(চলবে)

০১/০৮/২০২১-মুর্তজা ভাইয়ের নীতি ও আদর্শ

এই লেখাটা আমার লিখা দরকার ছিলো আরো আগে। কিন্তু যে কোনো কারনেই সময়মত লিখাটা শুরু করতে পারিনি। লেখাটা আমার ব্যবসায়িক পার্টনার মুর্তজা ভাইকে নিয়ে।

আজ থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে আমি মুর্তজা ভাইয়ের সাথে রিভার সাইডের মাধ্যমে ব্যবসায়ীক পার্টনারশীপ শুরু করি। আমাকে পার্টনার হিসাবে ওনাদের নেয়ার কোনো কারন ছিলো না। কারন আমি ২০০৮ সাল অবধি যদিও গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ শুরু করেছি কিন্তু আক্ষরীক অর্থে আমি তখনো কোনো মুল্যবান বায়ার কিংবা এই জাতীয় মানুষদের সাথে যেমন ভালো রকমের বন্ধন তৈরী করতে পারিনি, তেমনি গার্মেন্টসের প্রোডাকশনের ব্যাপারেও খুব একটা মাষ্টারী আয়ত্ত করতে পারিনি। অন্যদিকে ২০০৮ সালেই মুর্তজা ভাই এবং তার সাথে আসা শ্রীলংকার প্রিয়ান্থা দুজনেই এই সেক্টরে বেশ জোরালো অভিজ্ঞতা নিয়েই বসে আছেন। তারপরেও কেনো তারা আমাকে কিছু অংশ দিয়েও পার্টনারশীপ করে রেখেছেন সে ব্যাপারটা ইতিমধ্যে আমি আমার পূর্বের লেখায় বিস্তারীত আলাপ করেছিলাম। ফলে আমি জানতাম আমার ভূমিকা আসলে ফ্যাক্টরীতে কি এবং কতটুকু। আমি ইচ্ছা করলে এই সেক্টরেও অনেক ভালো একজন অভিজ্ঞ মাষ্টারপিস এমডি হিসাবে নিজেকে তৈরী করতে পারতাম। কিন্তু কেনো জানি আমার এই ট্রেডের কোনো কিছুই নিজের কাছে ভালো লাগতো না। তাছাড়া যেহেতু মুর্তজা ভাই এবং প্রিয়ান্থা দুজনেই কাজগুলি বেশ ভালোভাবেই হ্যান্ডেল করছেন, সেখানে আমার আবার উপজাজক হয়ে নাক গলানোর কোনো কারন দেখি নাই। আমার কাজ ছিলো লোকাল প্রশাসন ঠিক রাখা, শ্রমিকদের ব্যাপারে নজর রাখা আর কমপ্লায়েন্স বিসয়ক কাজগুলি করা। এটাও অনেক বড় একটা কাজ। পেটি ক্যাশ, পারচেজ, এ সবই আমার দায়িত্তে ছিলো।

প্রিয়ান্থা মারা যাওয়ার পর আমার শেয়ার বেড়ে গিয়েছিলো, অন্যদিকে মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ারও বেড়ে গিয়ে আমাদের অনুপাতটা দাড়িয়েছিলো ৬৫/৩৫, বা ৩৫/৬৫। অর্থাৎ আমার ৩৫ আর মুর্তজা ভাইয়ের ৬৫। আমার এ ব্যাপারে আসলে কোনো চাহিদা বা বিড়ম্বনাও ছিলো না। একটা চাকুরী করে এসেছি প্রায় ২০ বছর। প্রাইভেট কোনো চাকুরী করতে চাই নাই। ফলে এখানে একটা সম্মানজনক পদবী নিয়ে (এমডি) নিজের মালিকানার ফ্যাক্টরিতে যাইই পাই, তাতেই আমি খুসি ছিলাম। অন্তত আমার একটা অফিস আছে, মাসে যে কয় টাকা অনারারিয়াম পাই তাতে আমার সংসারের সব খরচ পুষিয়ে যায়। আর তো কিছু আমার আসলে লাগেও না। আমি আমার ফ্যাক্টরীর কাজগুলি করে প্রচুর বই পড়ি, লেখালেখি করি। সময়টা ভালোই কাটছে আমার। ফাইনান্সিয়াল বেশীর ভাগ সিদ্ধান্ত মুর্তজা ভাই যেটা নেন, তিনি আমাকে জানান এবং আমি প্রায় সময়ই সে সিদ্ধান্তে পজিটিভ বলে দেই। এভাবেই চলছে গত প্রায় ১২/১৩ বছর। আমরা ফ্যাক্টরীর কোনো প্রোফিট নেই না, কিন্তু যখন যার যা লাগে, ফ্যাক্টরী থেকে লোন হিসাবেই আমরা তা ড্র করি। বছর শেষে গিয়ে আমরা কে কত টাকা ড্র করি সেটা লিপিবদ্ধ থাকে। যেমন একটা উদাহরণ দেই-

ধরুন আমি সারা বছরে ড্র করেছি ৫ টাকা, আর মুর্তজা ভাইও ড্র করেছেন ৫ টাকা। ফলে সারা বছরে আমরা দুজনে ড্র করেছি মোট ১০ টাকা। অতঃপর আমরা এইভাবে কাউন্ট করতাম যে, এই ১০ টাকা মোট ড্র করার মধ্যে আমার করা উচিত ছিলো ৩৫% হিসাবে সাড়ে তিন টাকা আর মুর্তজা ভাইয়ের ড্র করা উচিত ছিলো ৬৫% হিসাবে সাড়ে ছয় টাকা। ফলে আমি যেহেতু ৫ টাকা ড্র করেছি, তাই আমি বেশী ড্র করেছি দেড় টাকা আর মুর্তজা ভাই ড্র কম করেছেন দেড় টাকা। সুতরাং আমি এই দেড় টাকা আসলে মুর্তজা ভাইয়ের কাছে পরোক্ষভাবে ঋণী।

কিন্তু হিসাবটা এভাবে হওয়া উচিত ছিলো না। উচিত ছিলো, সেই বছরে আমাদের ফ্যাক্টরী মোট কত টাকা লাভ বা প্রোফিট করেছিলো, তার থেকে ৩৫/৬৫ হিসাবে ড্র করা। তাতে হিসাবটা হতো পারফেক্ট। যাইই হোক, হয়তো আমরা আমাদের প্রোফিট সম্পুর্ন তুলে নিতাম না বলেই আমাদের ফ্যাক্টরীর এসেট বেড়েছে, মেশিন কিনে সেই লোন শোধ করতে পেরেছি ইত্যাদি। হিসাবটা এভাবেই চলছিলো প্রায় ১২ বছর। আমাদের চাহিদা খুব একটা বেশী ছিলো না। তাই আমাদেরকে অনেক টাকাও ড্র করতে হয় নাই। কিন্তু এক্সিটিং হিসাব মতে যখন আমরা হিসাব টান দিলাম, দেখলাম, আমি প্রায় ৮০ লাখ টাকা বেশী ড্র করে ফেলেছি আর মুর্তজা ভাই সেই একই পরিমান টাকা কম ড্র করেছেন।

এখানে আরো একটা কথা বলা দরকার যে, আমি ফ্যাক্টরীর অগ্রিম ভারার জামানত হিসাবে এক কোটি টাকা বিল্ডিং এর মালিককে দিয়ে রেখেছিলাম ২০১৪ সালে। সেই টাকাটার প্রতিমাসে ১ লক্ষ করে টাকা এডজাষ্ট করা হয়। কিন্তু আমি কখনো টাকাটা নেই নাই। কারন আমি জানি যে, যেহেতু কিছু টাকা আমি বেশী ড্র করেছি, এক সময় এই অতিরিক্ত ড্র এর সাথে ভাড়ার অগ্রিম টাকাটা আমি হয়তো এডজাষ্ট করে দেবো। অন্যদিকে ২০১৯ সালে যখন ফ্যাক্টরির ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসে পড়েছিলো, তখন মুর্তুজা ভাই নিজে আবার এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে লোন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আমার লোন দেয়া ছিলো ফ্যাক্টরিতে এক কোটি টাকা জামানত হিসাবে ২০১৪ সাল থেকে, আবার মুরতজা ভাইয়ের লোন দেয়া ছিলো এক কোটি আশি লাখ টাকা ২০১৯ সাল থেকে। অন্যদিকে আমি যা ড্র করেছি আর মুর্তজা ভাই যা ড্র করেছেন, তার ফারাক হলো প্রায় ৮০ লাখ টাকা।

একদিন হটাত করে মুর্তজা ভাই আমাদের একাউন্ট অফিসারকে নির্দেশ দিলেন যে, আমাদের পুরু ফ্যাক্টরীর এসেট ভ্যালু বের করতে। অর্থাৎ মেশিনারিজ লোন, সান্ডে ক্রেডিটরস লোন, অন্যান্য আনুষঙ্গিক সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে একচুয়াল কত টাকার মালিক রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড। সালটা তখন ২০১৯। দেখা গেলো যে, আমাদের প্রতিটি শেয়ার ভ্যালু দাড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তেরো লক্ষ টাকা। অর্থাৎ ১০০ পার্সেন্ট ভ্যালু প্রায় সাড়ে তেরো কোটি টাকা। আমি অতো চালাক মানুষ নই, আর টাকা পয়সা আমার কাছে কখনোই খুব বড় একটা বিষয় হিসাবে ছিলো না। আমার যতটুকু লাগে, তা পেলেই আমি খুসী এবং সুখী। আর এর বাইরে কার কি থাকলো আর কি থাকলো না, আমি সে ব্যাপারে কখনো মাথা ঘামাই নাই। আর রিভার সাইড নিয়ে তো আমার ধারনা শতভাগ যে, মুর্তজা ভাই সব সময় সঠিক কাজটাই করেন। কিন্তু মুরতজা ভাই এর মাথায় সব সময় অসংখ্য বুদ্ধি কাজ করে আর খুব দ্রুত তিনি একটা জটিল জিনিষ বুঝে ফেলেন। আমি সেগুলি বুঝতে গিয়ে অযথা মাথা নষ্ট করার পক্ষে না।

যে কারনে আজকের এই লেখাটা সে ব্যাপারে এখন আসছি। গত এপ্রিল মাসে (২০২১) তারিখে হটাত করে মুর্তজা ভাই আমাকে বললেন যে, আমি যে ৮০ লাখ টাকা বেশী ড্র করেছি ফ্যাক্টরী থেকে, আর সেই একই পরিমান ৮০ লাখ টাকা যে মুর্তজা ভাই ড্র কম করেছেন, সে টাকাটা আমি যেনো প্রতি শেয়ার বাবদ সাড়ে তেরো লাখ টাকা হিসাবে ওনার স্ত্রীর নামে প্রায় ৬% শেয়ার দিয়ে দেই। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অপছন্দ হয়েছিলো দুটি কারনে- (ক) উনি কি চান না যে আমি শেয়ার হোল্ডার হিসাবে থাকি? কারন যদি এভাবে আমরা অতিরিক্ত টাকা ড্র করার কারনে একজন আরেকজনের কাছ থেকে শেয়ারের বিনিময়ে টাকা শোধ করতে থাকি, তাহলে তো এক সময় হয় আমি শেয়ারবিহীন হয়ে যাবো অথবা উনি শেয়ারবিহিন হয়ে যাবে। (খ) দ্বিতীয় কারন হলো- আমার কাছে টাকা পাবে রিভার সাইড আর উনি টাকা পাবে রিভার সাইড থেকে। তাহলে আমি সরাসরি আমার শেয়ার উনাকে দেবো কেনো?

আমি তখন আমার একাউন্ট অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা যে পদ্ধতিতে কে কত টাকা উত্তোলন করি, আর তার ভিত্তিতে যে কম বেশী ড্র এর কথা বলি, এটা কি ঠিক? আমরা তো ড্র করবো একটা সার্টেন প্রোফিট থেকে। আমরা যেটা দুইজনে ড্র করি, আসলে সেটা তো একচুয়াল প্রোফিট নয়!! তাহলে আমরা সেটাকেই ফাইনাল প্রোফিট ধরে কেনো কম বেশী বলছি? একাউন্ট অফিসার আমার সাথে একমত। কারন ড্রইংস এর ব্যাপারটা অবশ্যই কোনো একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট থেকে হতে হবে। যেমন বাৎসরিক প্রোফিট। যেমন-

উপরের উদাহরনটায় আবার আসি। আমি যদি ৫ টাকা ড্র করে থাকি আর মুর্তজা ভাইও যদি ৫ টাকা ড্র করে থাকেন। আর আমাদের সেই বছরে যদি ২০ টাকা লাভ হয়ে থাকে, তাহলে ৩৫% হিসাবে আমার ড্র করার কথা ৭ টাকা আর মুর্তজা ভাইয়ের ড্র করার কথা ১৩ টাকা। কিন্তু আমি ড্র করেছি ৫ টাকা আর মুর্তজা ভাই ড্র করেছেন ৫ টাকা। না আমি অতিরিক্ত ড্র করেছি, না মুর্তজা ভাই। আমরা দুজনেই ফ্যাক্টরি থেকে যথাক্রমে আরো ২ টাকা এবং উনি আরো ৮ টাকা ড্র করতে পারবেন। এটাই হবার কথা। আর এটাই আসল হিসাব। যদি এভাবে আমরা গত ১২ বছরের লস এন্ড প্রোফিট টান দেই, দেখা যাবে, আমরা আক্ষরীক অর্থে যে টাকা ড্র করেছি, তার থেকে আরো অনেক বেশী টাকা ড্র করতে পারতাম। আমরা কেউ ফ্যাক্টরীর কাছে লোনে তো থাকতামই না, বরং ফ্যাক্টরীর কাছ থেকে আমরা আরো টাকা নিতে পারি।

মুর্তজা ভাইয়ের এমন একটা প্রোপোজালের কারনে আমার মনে হলো যে, উনি সার্থপরের মতো কথা বলেছে যা আমার কাছে কখনোই ঠিক মনে হয় নাই। আমিও যদি মুর্তজা ভাইয়ের মতো এমনভাবে বুদ্ধি করতাম, তাহলে ২০১২ সালে যখন মুর্তজা ভাই তার পরিচালিত লাক্সমা ফ্যাশন নিয়ে ভীষন বিপদের মধ্যে পরেছিলো, আর লাক্সমার মালিক রানা শফিউল্লাহ্র কাছে প্রায় ৪/৫ কোটি টাকার একটা ঋণে পড়ে গিয়েছিলো, তখন আমিই সবসময় এই ফ্যাক্টরী থেকে অনেক অনেক টাকা আপাতত তার সমস্যা দূরীকরনের জন্য লোন নিতে বলেছিলাম। অথচ আমার তখন কোনো ড্রইংসই ছিলো না। আমিও কিন্তু তখন মুর্তজা ভাইকে বলতে পারতাম যে, অতিরিক্ত ড্রইংস এর কারনে তিনি যেনো আমাকে কিছু শেয়ার লিখে দেন। এটা তো আমার মাথাতেই আসে নাই। আর আসলেও আমি কখনোই এটা করতাম না। সবকিছু ভেবে আমার একটা জায়গায় আমার মাথা স্থির হয়ে গেলো যে, মুর্তজা ভাই আসলে আমাকে হয়তো তার সত্যিকারের পার্টনার হিসাবে কখনোই মন থেকে মেনেই নেন নাই। অথচ আমি সব সময় তাকে মনে করেছি একটা ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ আর আমার যদি কেউ থেকে থাকে মুর্তজা ভাই হচ্ছেন সে লোক। আমার ধারনাটা ভুল বলে প্রমানিত হলো আজ।

যাই হোক, আমি একাউন্ট অফিসারকে নির্দেশ দিলাম যে, গত ২০১২ সাল থেকে আমাদের প্রতি বছরের লস এন্ড প্রোফিট বের করো যাতে আমরা বুঝতে পারি আমরা কে কত টাকা ফ্যাক্টরী থেকে ড্র করতে পারি আর কত টাকা ড্র করেছি। সে অনুপাতে যদি আমি বেশী ড্র করে থাকি তাহলে আমি যে ১ কোটি টাকা ভাড়ার জামানত হিসাবে দিয়েছি সেটা থেকে সমন্নয় করো। আর যদি সমন্নয় করার পর মনে হয় আমি আরো অতিরিক্ত টাকা নিয়েছি, সেটা আমি ক্যাশ পে করে দেবো ফ্যাক্টরীকে, মর্তুজা ভাইকে নয়।

আমার এই ব্যাপারটা মুর্তজা ভাই কিছুতেই পজিটিভভাবে নিলেন না। উনি যে এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে লোন দিয়েছিলেন ২০১৯ সালে, সেটা তিনি আমার কাছে চেয়ে পাঠালেন। আমি একাউন্ট অফিসারের সাথে বসে আমার অগ্রিম টাকার সাথে আমার ড্রইংস ইত্যাদি মিলিয়ে দেখলাম যে, আমি আরো ৪ লাখ টাকা ফ্যাক্টরীর কাছ থেকে পাই। অতিরিক্ত তো নাইই। এখন শুধু থাকে মুর্তজা ভাইয়ের দেয়া এক কোটি আশি লাখ টাকার লোন। আমি আরো হিসাব করে দেখলাম, যে, মুর্তজা ভাই এর টাকা পুরুটাই ফ্যাক্টরী থেকে এককালীন দেয়া সম্ভব। আমি চেক কেটে দিয়েও দিলাম। ফলে, আমিও কোনো টাকা আর পাই না ফ্যাক্টরী থেকে, মুর্তজা ভাইও আর কোনো টাকা পান না ফ্যাক্টরী থেকে। আমাদের কারো কোনো লোনও নাই, আবার আমরা পাইও না।

কিন্তু বুদ্ধি যার অনেক, তার কাছে পথ অনেক খোলা। মুর্তজা ভাই একাউন্ট অফিসারকে জানালেন যে, উনি যে ২০১৯ সাল থেকে এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে দিয়ে রেখেছেন, এর লাভের অংশ কৈ? অন্তত উনি তার ইন্টারেষ্ট চান। মুর্তজা ভাইই ইন্টারেষ্ট হিসাব করে একাউন্ট অফিসারকে জানালেন যে, এক কোটি আশি লাখ টাকার এই কয়েক বছরে (২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত) মোট ৫৩ লক্ষ টাকা ইন্টারেষ্ট আসে। সেটা উনি চান। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এই কারনে যে, উনি তো ফ্যাক্টরীর মালিকও বটে। তাই বলে কি নিজের ফ্যাক্টরি থেকে নিজে সুদ নেয়া যায়? কিছুই বললাম না, আমি মেনে গেলাম আর মুর্তজা ভাইকেও আমি তার এক কোটি আশি লাখ টাকার ইন্টারেষ্ট হিসাবে আরো ৫৩ লাখ টাকার চেক কেটে সমুদয় হিসাব ক্লিয়ার করে দিলাম।

আমার একাউন্ট অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, স্যার আপনি যে এক কোটি টাকা ২০১৪ সাল থেকে ফ্যাক্টরীর জন্য জামানত হিসাবে দিলেন, সেটার সুদ আপনি নিবেন না? আমি বললাম, মুর্তজা ভাই নিতে পারে, কিন্তু আমি নেবো না। আমি যদি ইন্টারেষ্ট নেই, তাহলে ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল মোট ৮ বছরে ইন্টারেষ্ট আসবে আরো প্রায় দেড় কোটি টাকা। সেটা আমার দরকার নাই। আমি ফ্যাক্টরীর মালিক। যদিও মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ার আমার থেকে বেশী কিন্তু তার থেকে আমার কলিজা আরো বড়। আমার দরকার নাই কোনো লাভের বা সুদের।

এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়। মুর্তজা ভাই যখন তার ফ্ল্যাট কিনেন, তখন তিনি কোনো একটা ব্যাংক থেকে প্রায় কোটি টাকার লোন নিয়েছিলেন। সম্ভবত স্ট্যান্ডার্ড চেটার্ড ব্যাংক থেকে। যখন তিনি আমাকে জানালেন যে, অনেক টাকার সুদ দিতে হয়। তাই ফ্যাক্টরী থেকে উনি এককালীন ৯০ লক্ষ টাকার একটা ক্যাশ নিয়ে তার ফ্ল্যাটের টাকাটা পরিশোধ করতে চান। আমি সাথে সাথেই ইয়েস বলে দিয়েছিলাম। মুর্তজা ভাই কিন্তু ওই টাকাটা পরে আর ফেরত দিয়েছিলো কিনা সেটাও আমি যাচাই করি নাই। হয়তো দিয়ে থাকবেন। কিন্তু অবশ্যই ইন্টারেষ্টসহ তিনি আমাদেরকে ফেরত দেন নাই এটা সিউর। উনি আদৌ ওই টাকাটা ফেরত দিয়েছিলেন কিনা সেটাও আমি জানি না। কারন আমার জানার কোনো আগ্রহ ছিলো না। তবে যদি সুক্ষভাবে আমি পুরু হিসাব টান দেই, আমি শতভাগ না হলেও প্রায় নিশ্চিত যে, উনি টাকাটা দেন নাই। আজ এটা নিয়েও আমি কোনো কথা বলতে চাই না কারন এটা বলতে গেলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে আমাদের ফ্যাক্টরী।

আমি জানি আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজে একটা লোন আছে প্রায় সোয়া কোটির মতো। এটা যদি মুর্তজা ভাইয়ের হতো, তিনি ঠিকই ফ্যাক্টরী থেকে কোনো না কোনো কায়দায় হয়তো আমার কাছে এটা পাশ করিয়ে নিয়ে লোনটা শোধ করে দিতেন। আমি অনেকবার এই ব্যাপারটা নিয়ে ওনার সাথে কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমার ব্যাপারটা কিন্তু ফয়সালা হয় নাই। আসলে মুর্তজা ভাই আমার লোক নন এটা এখন আমার কাছে খুব ভালোভাবে ক্লিয়ার। উনি রিভার সাইডে ভালো ব্যবসা করতে পারছে আর সেটা অনেকটা আমার কারনে, সেই সুযোগটা তিনি শুধু কাজে লাগাচ্ছেন।

আমি বুঝে গেছি, আমার অবস্থানটা কোথায় মুর্তজা ভাইয়ের মনের ভিতর। এটা শুধুই পার্টনারশীপ। যদি সেটাই হয়, তাহলে আমার তো প্রতিটা বিশয়েই এখন থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যেমন হিসাব নেয়া দরকার, তেমনি মাসিক প্রোফিটটাও আমার তুলে নেয়া দরকার। আমার টাকা লাগুক বা না লাগুক, সেটা আমি এখন থেকে করবো। উনি তার টাকা তুলে নিক বা না নিক, সেটা তার ব্যাপার, কিন্তু আমি আমারটা তুলে নেবো। আরেকটা  মজার বিষয় হলো, উনি মাঝে মাঝে দাইয়ু কিংবা সন্দীপ দাদা কিংবা নাইম ভাইয়ের জন্য লোন নেন। কিন্তু নিজের নামে নেন না। ফলে যখন ব্যক্তিগত ড্রইংস এর হিসাবটা আসে, তখন এসব লোন গুলি তার নামে আসে না অথচ লোন গুলি তিনিই নিচ্ছে তাদের নামে। অন্যদিকে আমি যখন মা ইন্ডাস্ট্রিজের নামে লোন নেই, তখন আমি ব্যক্তিগত ড্রইংস হিসাবেই উল্লেখ করি। ফলে একদিকে ওনার ব্যক্তিগত লোন বাড়ে না আবার আমার ব্যক্তিগত লোন বেড়ে যায়। তাই, আমি এবার থেকে মনস্থ করেছি যে, ওইসব ব্যক্তি কিংবা সংস্থা তো আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে কোনোভাবেই লোন নেয়ার ইখতিয়ার নাই। সেক্ষেত্রে ওইসব লোন আমি মুর্তজা ভাইয়ের নামেই দেখাবো। আর যতোদিন তারা লোন ব্যাক করতে না পারবে, ইন্টারেষ্ট উঠতেই থাকবে কারন শিক্ষাটা তো মুর্তজা ভাইই আমাকে শিখিয়েছেন। অন্তত ব্যাপারটা তো আমি তাকে মনে করিয়েই দেবো যাতে তিনিও বুঝেন যে, লাভ শুধু একদিকে নয়, লাভ দুই দিকের অংশেই কাউন্ট করা নীতিবানের কাজ।

এই সব ব্যাপার গুলি নিয়ে মুর্তজা ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা আগের মতো আর নাই। আমি এটা কখনো ভাবিই নাই যে, এমন একটা পরিস্থিতি মুর্তজা ভাই তৈরী করবেন নিজের সার্থে আর নিজের লাভে। যে আইন তা আজ তিনি আমার কাছে এপ্লাই করলেন, বা যে নিয়মে মুর্তজা ভাই ফ্যাক্টরী থেকে ইন্টারেষ্ট সহকারে আদায় করলেন, কিংবা অতিরিক্ত টাকা ড্রইংস করলে যে শেয়ার দিয়ে দিতে হয়, এইসব যদি কোনো একদিন মুর্তজা ভাইয়ের জীবনে ওই লাক্সমার মতো পরিস্থিতিতে উনি পড়েন, আমি সব কিছু মনে করিয়ে দেবো একদিন। সেদিন শুধু দেখবো ওনার চোখে কোন ব্লিক পড়ে কিনা। 

মুর্তজা ভাইয়ের আরো কিছু  নীতির কথা আমি এই মুহুর্তে বলতে চাচ্ছিও না কারন তার নীতি তার কাছে আর আমারটা আমার কাছে।

(ক)    পলাশ পুরের তার ভাইয়ের জমির ব্যাপারটা

পলাশপুরে মর্তুজা ভাইকে আমি কিছু জমি কিনে দিয়েছিলাম। তার সাথে তার বড় ভাই এবং এক বন্ধু ও উক্ত জমি কিনেছিলেন। বহুদিন যাবত আমরা ওই পলাশ পুরের জমি গুলি বিক্রি করার চেষ্টা করেও পারছিলাম না। অবশেষে খান মুজিবুর রহমান নামে এক ভদ্রলোক জমি গুলি তার ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের জন্য কিনতে রাজী হলেন। খান মুজিবুর রহমান সাহেন শেষ পর্যন্ত প্রতি শতাংশের দাম নির্ধারন করলেন সাড়ে পাচ লাখ টাকা করে শতাংশ। একটা সময় ছিলো যখন মর্তুজা ভাইয়ের বড় ভাই জনাব মোস্তফা সাহেব ও তার টাকার প্রয়োজনে তার অংশ বিক্রি করতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। তখন দাম উঠেছিলো দুই লাকগ ৪০ হাজার করে শতাংশ। এখন যখন নতুন দাম নির্ধারিত হলো খান সাহেবের সাথে (সাড়ে পাচ লাখ টাকা প্রতি শতাংশ) তখন মর্তুজা ভাই ভাবলেন যে, যদি তিনি নিজে তার ভাইকে আগের দুই লাখ ৪০ হাজার করে দিয়ে পুরু তার বড় ভাইয়ের জমিটা কিনে নেন, তাহলে মর্তুজা ভাই খুব সহজেই এখন খান সাহেবের কাছে আরো বেশী দামে বিক্রি করে লাভ করতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা শুধু জানি আমি আর উনি। এমতাবস্থায় মর্তুজা ভাই তার বড় ভাইকে সত্যি সত্যিই মাত্র ২ লাখ ৪০ হাজার দরে ২৭ শতাংশ জমি ক্যাশ টাকায় কিনে নিলেন। অথচ তখনই যদি মর্তুজা ভাই সত্যিকারের ভালো লোক হতেন, তাহলে তার বড় ভাইকে তিনি প্রতি শতাংশ জমি খান সাহেবের ফিক্সড করা সাড়ে পাচ লাখ টাকা করেই দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করেন নাই।

(খ)       ফ্ল্যাট এর টাকাটা উনি পরিশোধ করেছিলেন কিনা আমার জানা নাই। দেখতে হবে। লোনের ড্রিংস এর খাতায়ও সেটা উঠানো হয় নাই। কেনো উঠানো হয় নাই সেটাও আমি কখনো চেক করি নাই। আমি এতোটাই বোকা।

(গ)       এ যেড ফ্যাসনের নিমিত্তে প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকার যে প্রোফীটটা উনি নেন, এখন নেয়াটা কতটা যুক্তি সংগত, সেটা আমার মাথায় আসে না। ব্যাখ্যাটা এ রকম যে,  মর্তুজা ভাই এক সময় নিজের ব্যবসা আলাদা করার জন্যই হোক কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যেই হোক এ জেড নামে একটা ফ্যাক্টরী লাইসেন্স করিয়েছিলেন। তখন ম্যানুয়েল মেশিনের যুগ ছিলো। একদিন মর্তুজা ভাই আমাকে জানালেন যে, আমরা যদি এ জেড কে আমাদের রিভার সাইডের সাথে আত্তীকরন করি, তাহলে এ জেড আমাদের হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এ জেড শুধুমাত্র আমাদের কাজই করবে। কিন্তু বিনিময়ে আমরা রিভার সাইড এ জেডের সমস্ত সেলারী, কারেন্ট বিল, এবং অন্যান্য সমস্ত খরচাদি বহন করবো। শুধু মর্তুজা ভাই এর বিনিময়ে প্রতিমাসে আড়াই লাখ টাকা প্রোফিট নিবেন। যেহেতু মেশিন তার, ভাড়া তার, এবং সবই তার ছিলো, আর আমারো কোনো অসুবিধা ফিল করি নাই, সে ক্ষেত্রে আমিও এ ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনাই। আমি তাকে অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলাম। পরবর্তিতে ২০১৮/২০১৯ সালে এসে যখন আমরা সমস্ত ম্যানুয়েল মেশিন গুলি বাদ দিয়ে জ্যাকার্ড মেশিন নিয়ে এলাম, তখন এ জেডের সব মেশিন তিনি বিক্রি করে দিলেন। জেনারেটর আমাদের রিভার সাইড থেকে দেয়া হয়, কারেন্ট বিল দেয়া হয়, বেতন দেয়া হয়, পেটি ক্যাশ, নাইট বিল, এবং অন্যান্য সব খরচই আমরা রিভার সাইড থেকে দেই। কিন্তু আগের নিয়ম অনুসারে মর্তুজা ভাই এখনো প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা করে প্রোফিট নেয়া অব্যাহত রাখেন যদিও ওই এ জেড ফ্যাশনে এখন তার কিছুই অবশিষ্ট নাই। এটা আমার জানা আছে, আমিও তাকে দেই। কিন্তু এটাও জানি যে, এটা তাকে দেয়া আমার উচিত না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে- আমি জেনেশুনে কেনো তাকে এই লাভটা দিচ্ছি। এর প্রধান কারন হলো- আমি এখনো পুরুপুরি বিপদ মুক্ত না। আমার লোন আছে মা ইন্ডাস্ট্রিজে, আমার অন্য কোথাও আর চাকুরী করতে ইচ্ছে নেই, আর আমি চাইও না। এখন যদি এগুলি নিয়ে আমি বেশী নাড়াচাড়া দেই, তখন দেখা যাবে- মর্তুজা ভাই আবার অন্যভাবে এমন কিছু করে ফেলবে যে, শেষে গিয়ে হয়তো রিভার সাইডটাই টিকবে না। উনি হউয়তো অন্য কোথাও কারো সাথে টাই আপ করে ঠিকই গার্মেন্টস ব্যবসা করবে, মাঝখান থেকে আমি ছিটকে পড়বো। যা আমার জন্য ভালো নয়। তার থেকে উনাকে এই মুহুর্তে নারাচাড়া না দেয়াই ভালো। উনি যে টাকাটা নিচ্ছে সেটাও যে ঠিক না এটা মর্তুজা ভাই জানেন। কোনো একদিন হয়তো এটা  নিয়েও আমি কথা বল্বো।

২১/০৭/২০২১-ঈদুল আজহা

আজ পালিত হলো ঈদুল আজহা।

এই দিনটা এলে সবচেয়ে আগে যার কথা আমার বেশী মনে পড়ে তিনি হচ্ছেন-আমার মা। মা বেচে থাকাকালীন আমি কখনো শহরে ঈদ করিনি কারন মাও ঈদের সময় গ্রাম ছাড়া ঈদ করতেন না। মা যেহেতু ঈদে গ্রামে থাকতেন, আমিও গ্রামেই ঈদ করতাম। আমি সব সময় ভাবতাম-একটা সময় আসবে, মাকে ছাড়াই আমার ঈদ করতে হবে জীবনে, তাই যে কতগুলি সুযোগ পাওয়া যায়, মায়ের সাথে ঈদ করাটা ছিলো আমার সুযোগের মতো। বাড়িতেই কুরবানী করতাম। ঈদের আগে আমি ইসমাইল ভাই অথবা রশীদ ভাইকে টাকা পাঠিয়ে দিতাম যাতে আগেই গরু কিনে রাখেন। ফাতেমার স্বামী সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু ভাইকে আমি কখনোই কুরবানীর গরু কেনার দায়িত্তটা আমি দিতাম না কারন তার উপরে আমার টাকা পয়সা নিয়ে আস্থা ছিলো না। কেনো তার উপরে আস্থা ছিলো না, সে কাহিনী বিস্তর, আজ না হয় এখানে নাইবা বললাম। গরু কেনার ব্যাপারে আমার একটা পলিসি ছিলো যে, মেহেরুন্নেসা (অর্থাৎ আমার ইমিডিয়েট বড় বোন সব সময় গরু পালতো। আমি ইচ্ছে করেই রশীদ ভাইকে বলতাম যাতে ওর গরুটাই আমার জন্যে রেখে দেয়। আমি কখনোই সেটার দাম করতাম না। এই কারনে করতাম না, মেহের যে কয় টাকায় বিক্রি করলে খুশী হয় সেটাই হোক আমার আরেকটা সাহাজ্য। মেহের খুব ভালো একটা মেয়ে।

আজ সেই কুরবানীর দিনটা চলে গেলো। শুনেছিলাম, একটা গরু মোট সাত জনের নামে কুরবানী দেয়া যায়। ফলে আমি সব সময় এই সু্যোগে যে কাজটা করি, তা হলো- এক ভাগ দেই আমি আমার প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মাদ (সঃ) এর নামে, আর বাকী ৬ ভাগ দেই-আমার, মিটুল, আমার ২ মেয়ে, আমার বাবা আর আমার মায়ের নামে। এটাই আমার কুরবানী দেয়ার পলিসি। আজো তাইই করলাম। গরু জবাই, মাংশ কাটাকাটি আর বিলানোর কাজটা আমি নিজ হাতে করি। ৩ টা ভাগ করি, একটা ভাগ নীচেই বিলিয়ে দেই, বাকী ২ ভাগের এক ভাগ আমি রাখি আলাদা করে সমস্ত আত্তীয় সজন আর পাড়া পড়শীর জন্য, আর এক ভাগ থাকে আমার পরিবারের জন্য।

এই কুরবানী এলে আমার আরো একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সেই ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা। আমাদের তখন কুরবানী দেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিলো না। আমি মাত্র ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ি, আমাদের বাড়িতে ৫ বোন আর মা আর আমি। আমার বড় ভাই তখন সবেমাত্র আমেরিকা গেছেন। আমাদের সব ভরন পোষনের দায়িত্ত আমার বড় ভাইই করেন। কিন্তু শেয়ারে কুরবানী দেয়া কিংবা আলাদা কুরবানী দেয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিলো না। ফলে এই কুরবানীর দিন আমার খুব অসস্থি হতো। অসস্থি হতো এই কারনে যে, আমরা না কারো কাছ থেকে মাংশ চেয়ে আনতে পারতাম, না আমাদের সামর্থ ছিলো কুরবানী দেয়ার। ফলে দিনের শেষে যখন সবাই যার যার বাড়িতে গরুর মাংশ পাকে ব্যস্ত, খাওয়ায় ব্যস্ত, আনন্দে ব্যস্ত, তখন হয়তো আমাদের বাড়িতে ঠিক তেমনটা নাও হতে পারে। আমি এই ঈদের দিনের দুপুরের পর আর কোথাও যেতাম না, কারন আমার কেম্ন জানি নিজের কাছে খুব ছোট মনে হতো। কুরবানী দেয়াটা ধর্মের দিক দিয়ে কি, আর কি না, সেটা আমার কাছে হয়তো অনেক বড় মাহাত্য ছিলো না, কিন্তু আমি যখন দেখতাম, আমার বন্ধুদের বাড়িতে সবাই কুরবানীর গরু নিয়ে কাটাকাটিতে ব্যস্ত, বিকালে মাংশ বিলানোতে ব্যস্ত, আমার তখন মনে হতো, আমিই ব্যস্ত না। গরীব হয়ে জন্ম নেয়াটা একটা অসস্থিকর ব্যাপার।

তারপরেও অনেকেই আমাদের বাড়িতে কুরবানীর পর মাংশ পাঠাইতো। বিকালে বা সন্ধ্যায় দুদু ভাই, ইসমাইল ভাই, আমাদের খালাদের বাড়ি থেকে, কিংবা জলিল মামাদের বাড়ি থেকে অথবা পাশের কোনো বারি থেকে অনেকেই মাংশ পাঠাইতো যেটা আমার কাছে একটু খারাপ লাগলেও মা নিতেন। কুরবানী বলে কথা। সবাই মাংশ খাবে, আমাদের বাড়ির মানুষেরা একেবারেই কিছু খাবে না, মা হয়তো এটা ভেবেই মাংশ গুলি রাখতেন। দিনটা চলে যেতো, আমার অসস্থির ভাবটাও ধীরে ধীরে কেটে যেতো। আবার এক বছর পর হয়তো এই অসস্থিটা আসবে।

যেদিন আমার ক্ষমতা হলো কুরবানী দেয়ার, আমি সব সময় গ্রামেই কুরবানী দিয়েছি। আর সব সময়ই আমার সেই দিনগুলির কথা মনে করেছি। আমাদের দিন পাল্টেছে, আমাদের পজিসন পাল্টেছে। মা যখন জীবিত ছিলেন, এমনো হয়েছে মাঝে মাঝে আমি দুটু কুরবানীও করেছি একা।

আজ মা নাই, আমার গ্রামে যাওয়া হয় না। কুরবানী নিয়ে এখন আমার তেমন কোনো আগ্রহও নাই। তবে সবসময় ঢাকাতেই আমি কুরবানী দেই, একা। যদি আমি কখনো কুরবানী নাও দেই, কেউ আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করবে না কারন সবাই জানে আমার একটা না, অনেকগুলি কুরবানী দেয়ার সক্ষমতাও আছে। হয়তো কোনো কারনে আমি ইচ্ছে করেই কুরবানী হয়তো দেই নাই। কেউ এটা ভাববে না যে, আমার টাকা নাই তাই কুরবানী দেই নাই। “সময়” এমন জিনিষ। সব কিছু পালটে দেয়।

১৯/০৭/২০২১-ঈদুল আজহার ২দিন আগে

এই কয়েকমাসে এতো বেশী অভিজ্ঞতা হলো যা আমার জীবনের অনেক প্রাক্টিস আর বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যাদেরকে আমি মনে করি সবাই আমার মতো। অথবা আর যার সাথে আমরা যাইই করি না কেনো, অন্তত আমরা আমাদের সাথে সেই একই প্রাক্টিস গুলি কখনো করতে পারি না। কিন্তু আমার এই ধারনা সমুলে আঘাত খেয়েছে অনেক গুলি কারনে। তাহলে একা একা বলিঃ

(১) মান্নানের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়েঃ মান্নান যে আমার সাথে লুকুচুড়ি করে সেটা আমি জানি। অনেক সময় ভাবি যে, হয়তো সে একটু ভালো থাকতে চায়, তাই একটু আধটু লুকুচুরি করে। আমার অনেক ক্ষতি না হলেও অর্থের দিক দিয়ে একটু তো লাগেই। কিন্তু যেহেতু আমি সামলে নিতে পারি, তাই অনেক সময় কিছু বলি না বা বলতে চাইও না।

আমি যখনই কোনো জমি কিনেছি, মান্নান সেখানে জমির দামটা এমন করে বাড়িয়ে বলতো যাতে আমার টাকা দিয়েই মান্নান ও কিছু জমি সেখান থেকে কিনতে পারে। আমি সেটা বুঝি কিন্তু কিছু হয়তো বলি না। এভাবে মান্নান অনেক জমি শুধু হয়তো আমার টাকা দিয়েই কিনেছে আর সেটা আমার ক্রয় করা জমির সাথেই। কিন্তু এবার যেটা করেছে সেটা মারাত্তক।

মুজিবুর রহমান খান নামে এক ভদ্রলোক আমাদের পলাসপুরের জমিটা কিনতে আগ্রহী হলে আমিও বিক্রি করতে তৈরী ছিলাম। আমার জমির সাথে আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের জমি আছে। ফলে আমার জমি আর মুর্তুজা ভাইয়ের জমি সহ একটা রফাদফা হয়েছিলো। এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, মুজিবুর রহমান খান সাহেবের আরো জমি দরকার যা সেলিম নামে এক জন লোকের জমি আমাদের জমির পাশেই আছে কিন্তু ওর জমিতে যাওয়ার রাস্তা না থাকায় যদি আমাদের জমির সাথে টাই আপ করে খান সাহেবের কাছে বিক্রি করি তাতে আমাদের লাভ হবে। কারন সেলিকমে জমির মুল্য দিতে হবে খান সাহেবের দেয়া জমির দামের অর্ধেক প্রায়। সেলিমদের মোট জমি ছিলো ৩২০ শতাংশ।

এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, আমরা সেলিমদের জমি থেকে পানি ব্যতিত মোট ১৫১ শতাংশ জমি খান সাহেবকে দিতে পারবো। বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি আসলে নদীর পানির মধ্যে যদিও জমিটা রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত। আমি যখন সেলিমদের জমিটা বিনা পরীক্ষায়, বিনা নীরিক্ষায় খান সাহেবকে রেজিষ্ট্রি করে দিলাম, পরে জমি মাপ্তে গিয়ে দেখি যে, মাত্র ৯৮ শতাংশ জমি আছে যা নদীর মধ্যে না। অনেক রাগারাগি আর চাপাচাপির মধ্যে আমি যখন সেলিমদের ধরলাম, শুনলাম আরেক বিরাট ইতিহাস। মান্নান, সেলিম এবং সেলিমের এক চাচাতো ভাই মিলে মোট ৩২০ শতাংশ জমিই কিনে নিয়েছে সেলিমদের আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে অই টাকায় যে টাকা হয় ১৫১ শতাংশের দাম। খান সাহেবকে ১৫১ শতাংশ জমি দেয়ার পর বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি ধান্দা করে মান্নানের নামে আর সেলিমের নামে একা পাওয়া অফ এটর্নী নিয়েছে। এর মানে হলো, আমি কোনো লাভ করি নি , লাভ করছিলো মান্নান। যদি অদুর ভবিষ্যতে পানি শুকিয়ে চর জাগে, তাহলে মান্নান এই জমি গুলি চড়া দামে বিক্রি করতে পারবে। অথচ টাকাগুলি খান সাহেবের এবং আমার। খান সাহেব যখন নদীর মধ্যে কোনো জমি নিতে নারাজ হলেন, তখন আমার চর গল্গলিয়া মৌজা থেকে এই বাকী ৫৩ শতাংশ জমি পুরা করে দিতে হবে যার দাম প্রায় তিন কোটি টাকা। এটা কোনোভাবেই আমার সম্ভব হচ্ছিলো না। আমি কেনো এতো গুলি জমি খান সাহেবকে লিখে দেবো যার দাম তিন কোটি টাকার উপরে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখেই দিতে হবে জেনে আমি পলাশপুরের আক্কাসকে ধরে মান্নান আর সেলিমের কাছ থেকে পরবর্তীতে ওই ১৬৯ শতাংশ জমি ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার নিজের নামে নিয়ে নিলাম। জানি আমার ক্ষতি পুরন হবে না যতোক্ষন পর্যন্ত ওই নদীর জমি শুকিয়ে আসল চেহারায় জমি ভেসে না উঠে। আমি মান্নানকে বারবার এই অ বিশ্বাসের কাজটা কেনো করেছে জিজ্ঞেস করলে তার একটাই উত্তর- ভুল হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই ভুল হতে পারে না। আমি কখনো ভচাবি নাই যে, মান্নান ও আমাকে এভাবে এতো ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।

পলাশপুরে আমার আরো একতা জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া ছিলো। আর যেহেতু ওই লিজটা আনতে হয় কোনো দুস্ত মানুষের নামে, তাই আমি মান্নানের ভাই নাসিরের নামেই ১০০ শতাংশ জমি আমার টাকায় লিজ নিয়ে এসেছিলাম। মান্নান আমাকে না জানিয়ে হালিম নামে এক লোকের কাছে ২০ লাখ টাকায় জমিটা গোপনে টাকা নিয়ে নিলো। এটা একটা অসম্ভব ঘটনা বলে আমার কাছে মনে হয়েছিলো। কিন্তু মান্নান কাজটা করেছে আমাকে একটু ও জানতে দেয় নাই। যখ ওরে আমি প্রশ্ন করেছি- মান্নানের একটাই উত্তর যে, আমার নাতির অসুখ ছিলো, টাকার দরকার ছিলো, তাই আমি বিক্রি করে দিয়েছি। আমাকে জানানোর কোনো বাধ্য বাধকতা মনে করলো না।

খান ভাই আমাদের পলাশ পুরের জমিটা কিনার সময়ে মোট ৬৩১ শতাংশ জমির বায়না করেছিলো যার মধ্যে মান্নানের ছিলো ৫১ শতাংশ। আমি খান ভাইকে বারবার বলেছিলাম, কখনো আমাকে ছাড়া টাকা পয়সার লেন দেন করবেন না। কিন্তু ওই যে বললাম, সবাই লাভ চায়!! খান সাহেব মান্নানকে মাঝে মাঝে আমাকে না জানিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হ্যান্ড ওভার করে। একদিন খান সাহেব আমাকে জানালো যে, মান্নান জমিটা কাগজে কলমে কোনো বায়নাও করছে না আবার টাকাও চায়। আমি যখন ব্যাপারটার ভিতরে প্রবেশ করলাম, দেখলাম, ওই খানে মান্নানের জমি আছে মাত্র ৪ শতাঙ্ঘস, আর ওর বোন আর ভাই মিলে আছে আরো ৫ শতাংশ, মোট ৯ শতাংশ। বাকী জায়গাটা আক্কাস নামে ওর এক আত্তিয়ের। কিন্তু আক্কাসকে মান্নান উক্ত ৩৫ লাখ টাকা থেকে কখনো ১ টাকাও দেয় নাই, না মান্নান ওনার কাছ থেকে কোনো পাওয়ার অফ এটর্নী কিংবা অগ্রিম কোনো বায়নাপত্র করেছে। আক্কাস সাহেব যখন জানলো যে, মান্নান ইতিমধ্যে ৩৫ লক্ষ টাকা নিয়ে ফেলেছে, সে তখন (৫১ মানাস ৯) ৪২ শতান্সগ জমির বায়না করে ফেল্লো উক্ত খান সাহেবের সাথে। অর্থাৎ মান্নান জানেই না যে, উক্ত জমি মান্নান আর কখনোই খান সাহেবের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। আমি যখন আজকে মান্নানকে বললাম, খান সাহেবকে ৫১ শতাংশ জমি লিখে দিচ্ছিস না কেনো? তার অনেক উচা গলায় বল্লো, সে আগামীকালই জমিটা লিখে দিতে পারে। যখন বললাম যে, আক্কাস জমিটা অন্য খানে বিক্রি করে দিয়েছে- তখন দেখলাম ওর মুখের ভাব অনেক রক্তিম। কিন্তু লজ্জায় পড়লো কিনা জানি না। ওর আসলে এগুলিতে কোনো খারাপ লাগে না মনে হয়। টাকাটাই ওর কাছে সবচেয়ে বড় মনে হয়। ভাগ্যিস আমি এই ৫১ শতাংশের ব্যাপারে কাহ্নের সাথে কোনো প্রকার কথা বলি নাই। তাহলে এই ৫১ শতাংশ নিয়েও খান আমাকে চাপ দিতো।

মান্নানের এখন টাকা প্রাপ্তির প্রায় সব গুলি রাস্তাই বন্ধ। কোটি কোটি টাকা আমি ওর হাত দিয়ে খরচ করিয়েছি। বারবার বলেছি, অন্য কোনো একটা সোর্স কর যাতে বিপদের সময় একটা ইন কাম আসে। কখনো ব্যাপারটা আমলে নেয় নাই। এবার মনে হয় খুব হারে হারে টের পাচ্ছে যে, ওর টাকার সব গুলি সোর্স প্রায় একেবারেই বন্ধ। দেখা যাক কি করে। আমার কাছে অনেক গুলি কারন দেখিয়ে কিছু টাকা খসানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু এবার আমি অনেক টাইট হয়ে গেছি। কোনো কিছুতেই কোনোভাবেই আর টাকা দেয়া যাবে না। মান্নানের পিঠ প্রায় দেয়ালের মধ্যে ঠেকে যাচ্ছে। তবে এখান থেকে কিছুটা উত্তোরন হয়তো হবে যদি ধলেশ্বরী গ্রীন ভিলেজ প্রোজেক্ট শুরু হয়। কারন ওখানে আমি ওকে ইন করিয়েছি। কিন্তু ওটার ইন কাম বড্ড স্লো।

এবার আসি আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের কাছ থেকে আম্নার তিক্ত অভিজ্ঞতার ব্যাপারটাঃ

৯/৭/২০২১-কনিকার আগাম জন্মদিন এবং দাওয়াত পার্টি

পড়াশুনার জন্য কনিকার বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি ধীরে ধীরে প্রায় সমাপ্তির দিকে। ভিসা হয়ে গেছে, টিকেট হয়ে গেছে, ইউএমবিসি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে সব ফরমালিটিজ শেষ হয়ে ভর্তিও হয়ে গেছে, ওর জন্য এক বছরের আগাম টিউশন এর নিমিত্তে ১৪ হাজার ডলারের মধ্যে ১৩ হাজার ডলার ফিও আমি ছোট ভাই (মোস্তাক আহমেদ) এর কাছে রেখে দিয়েছি, ভ্যাক সিনেশনের সব কটা টীকাও প্রায় নেয়া শেষ। যাওয়ার সময় যে কতগুলি ডলার ওর হাতে দিয়ে দেবো সেটার ও প্রায় ব্যবস্থা করে রেখেছি। এখন শুধু আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত মানে ১১ অগাষ্ট ২০২১ তারিখে ভোর ৪ টায় ওর কাতার এয়ার ওয়েজে উঠা বাকী ইনশাল্লাহ। একাই যাবে কারন এই করোনাকালীন সময়ে আমরা কেহই ভিসা পাচ্ছি না বিশেষ করে ভিজিটিং ভিসা আবার ব্যবসায়ীক ভিসার জন্য যিনি আমাকে আমেরিকা থেকে ইনভাইটেশন পাঠাবেন, তাদের পক্ষেও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বিধায় কনিকাকে একাই যেতে হবে।

কনিকার জন্ম দিন আসলে এই সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে হবার কথা। কনিকার আফসোস থাকবে যে, ওর এ বছরের জন্মদিন টা সে আমেরিকায় থাকায় সবার সাথে পালন করা সম্ভব না। মন খারাপ করবে, তাই আমরা ওর আগাম জন্মদিন এবং ওর বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে সবাইকে একবার দাওয়ার করে খাওয়ানোর জন্য যে অনুষ্ঠান টা করার প্ল্যান করেছিলাম, সেটা এক সাথেই করলাম আজ। প্রায় ৫০/৫৫ জন্য গেষ্ট এসেছিলো, আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার মুর্তজা ভাই এবং তার স্ত্রীও এসেছিলেন। সময়টা ভালোই কেটেছে।

চৈতীর কয়েকদিন আগে বিয়ে হয়েছিলো। তার জামাই, ননদ, দেবরও এসেছিলো। মান্নাদেরকে আমি সব সময়ই আমাদের যে কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেই। এবারো তার ব্যতিক্রম হয় নাই। মান্নার জামাই বাবু খুব ভালো একটা ছেলে। আগে সিটি ব্যাংক এন এ তে চাকুরী করতো, কাল শুনলাম, হাবীব ব্যাংকে নতুন চাকুরী নিয়েছে। অত্যান্ত ম্যাচিউরড একটা ছেলে। ওর বিয়েটা আমিই দিয়েছিলাম মান্নার সাথে। ওর বিয়ে নিয়ে চমৎকার একটা উপাখ্যান তৈরী হয়েছিলো, সেটা আরেকদিন লিখবো।

সাজ্জাদ সোমা ওর বাচ্চারা আর সনি এবং তার জামাই সহহ বাচ্চারা সব সময়ই আমাদের বাসায় আসতে পছন্দ করে, ওরাও বাদ যায় নাই। কনিকার জন্য ভালো একটা সময় কেটেছে সবার। এমন ঘটা করে হয়তো আগামী ৫ বছর আর ওর জন্মদিন পালন করা হয়তো সম্ভব হবে কিনা জানি না।

কভিড-১৯ এর প্রভাব হতাত করে দেশে মহামারীর লক্ষন দেখা দিচ্ছে বলে সরকার কঠিন লক ডাউন দিয়েছে। যদিও আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য এটা বাধ্যতামূলক নয়, তারপরেও আমি ইচ্ছে করেই এই কয়দিন ফ্যাক্টরীতে যাচ্ছি না। বাসায় বসে ডায়েরী লিখি আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ব্যাপারে অনেক পড়াশুনা করছি। সাথে ইউ টিউব থেকে সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভিডিও ফুটেজ গুলিও দেখার চেষ্টা করে ঐ সময়টাকে বুঝবার চেষ্টা করছি। আনার ডায়েরীর উপর একটা মুভি হয়েছে, সেটাও দেখলাম। আইখ ম্যানের উপর প্রায় শতাধিক ট্রায়াল হয়েছে, সেগুলিও দেখলাম। খুব কঠিন সময় ছিলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়টা।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, কনিকার পর্ব। কনিকা তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে প্রায় লাখ খানেক টাকার ক্যাশ গিফট পেয়েছে। আমি চাই নাই কেউ ওকে গিফট করুক কারন এসব গিফট আসলে কনিকার জন্য এখন আর খুব একটা প্রযোজ্য নয়, সে এগুলি বিদেশ নিতেও পারবে না আর আমরাও এগুলি আগামী সময়ে সংরক্ষন করতে পারবো না। তাই গেষ্ট যারা এসেছিলো, তারা সবাই কনিকাকে ক্যাশ টাকাই গিফট করেছে। আর এ কারনেই ওর গিফট এর টাকা এতো বেশী উঠেছিলো।

কনিকা খুব ফুরফুরা মেজাজে আছে। কারন ও যা যা চেয়েছে যেমন দেশের বাইরে ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার, সেটা সে একাই ম্যানেজ করেছে, কোনো কিছুতেই কোনো বাধার সৃষ্টি হয়নি, এটা আল্লাহর রহমত, বাকীটা ভালোয় ভালোয় সব হলেই আলহামদুলিল্লাহ।

৮/৭/২০২১-জীবনে হতাশ হওয়ার

জীবনে হতাশ হওয়ার কোনো কারন নাই। একদিন নিজেকে নিজেই বলেছিলাম যে, ভগবান মানুষের জন্য প্রতিটি দিন একই রকম করে কাটাতে দেন না। আজ যে রবিবার আপনি হাসছেন, আগামী রবিবার আপনি নাও হাসতে পারেন, হয়তো সেদিন আপনি হাসিতে আপনার প্রতিটি মুহুর্ত ভরে থাকবে। এই সপ্তাহটা হয়তো আপনার জন্য ভয়ানক অস্থির যাচ্ছে, কে জানে আগামী সপ্তাহটা হয়তো হবে একেবারেই সুন্দর। তাই হতাশ হবার কোনো কারন নাই। প্রতিটি ঝড় কিংবা বিপদের মাঝেও কিছু না কিছু সুসংবাদ থাকে, কিছু না কিছু ভালো জিনিষ আসে। একটা মৃত ঘড়ির দিকে তাকান, দেখবেন নষ্ট ঘড়িটাও দিনে দুবার একদম সঠিক সময় প্রকাশ করে। অপরিষ্কার জল খাবারের অনুপোযোগী হলেও সেটা আগুন নেভানোর কাজে লাগে। বোবা কিংবা বোকা বন্ধুও আপনার অন্ধ জীবনে রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারে।

তারপরেও একটা সময় আসে যখন শুধু নিজের জন্যেই নিজেকে বাচতে হয়। অন্য কারো জন্যে নয়। আমরা সামাজিক কিংবা পারিবারিক জীবনের কথা বলি। ওটা একটা শুধু কন্সেপ্ট যেখানে মানুষ একা থাকতে পারে না বলে সে এই দলবদ্ধ জীবন বা পারিবারিক জীবনটাতে থাকতে চায়। কিন্তু একটা সময়ে সবাই এই জীবনেও হাপিয়ে উঠে। সন্তান, স্ত্রী কিংবা আশেপাশের সবাই যেনো তখন এক ঘেয়েমীতে ভরে যায়। তখন কেউ কারো আদর্শ কিংবা অভিজ্ঞতাকে আর কাজে লাগাতেও চায় না, বরং যেটা নিজেরা ভাবে সেতাই যেনো পরিশুদ্ধ, আর সেটাই করতে চায় সবাই। সন্তানেরা যখন বড় হয়ে যায়, তখন তাদেরকে তাদের মতো করেই ছেড়ে দেয়া উচিত। তাদের চিন্তা ধারা, তাদের পছন্দ কিংবা আশা নিরাশা সবন কিছু তাদের মতো। তাই, আমরা যারা বড়রা তাদের জন্যে দুশ্চিন্তা করি, এটা হয়তো আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবি যে, ওরা ভুল করছে বা যা করছে সেটা ঠিক নয়। আর এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা আমাদের কিছু কন্সেপ্ট বা ধারনা বা উপদেশ ওদের উপর চালাতে চাই যা অহরহই ওরা মানতে চায় না। যখন এমন একটা কনফ্লিক্ট সামনে আসে, তখন আমাদের উচিত আর না এগোনো। সবাইকে যার যার পথে চলতে দিয়ে ঠিক ঐ জায়গাটায় দাড় করানো উচিত যাতে ওরা বুঝতে পারে, আমাদের উপদেশ ঠিক ছিলো কিংবা আমরাই ঠিক ছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ঐ সময় কোনো কিছুই আর পিছনে গিয়ে সঠিকটা করা যায় না বলে মনে কষ্ট লাগে বা খারাপ লাগে। কিন্তু ওটা ছাড়া তো আর কিছুই করার নাই। চেয়ে চেয়ে ধ্বংস দেখা ছাড়া যদিও কোনো উপায় নাই, তারপরেও সেটাই করতে দেয়া উচিত যাতে ওরা এটা বুঝতে পারে যে, বড়দের অভিজ্ঞতার দাম ছিলো, উপদেশ গ্রহন করা উচিত ছিলো। তাহলে হয়তো আজকের দিনের এই অধোপতন কিংবা ছেড়াবেড়া জীবনে পড়তে হতো না।

লাইফটায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছি আমি নিজেও। নিজের ঘরে যখন কেউ একাকিত্ত বোধ করে সেখানে সময় একেবারেই স্থবির। সেখানে যেটা চলে সেটা হচ্ছে- সময় মত খাওয়া, আর নিজেকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখা। এটা একটা সময়ে সবার জীবনেই আসে। আমি যদি বলি, এটা ইতিমধ্যে আমার জীবনেও শুরু হয়ে গেছে, ভুল বলা হবে না।

কেনো বললাম কথাটা। এর নিশ্চয় কোনো কারন তো আছে। আজকের যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা আমার কাছে কাম্য নয়। না আমি আশা করেছি। আমার সন্তানদের জন্য আমার থেকে বেশী কেউ ভাবে এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু সেই সন্তানেরা যদি কখনো বলে, যে, আমরা তাদের জন্য অভিশাপ, এর থেকে বড় পরাজয় আর কিছু হতে পারে না। তবে আমি জানি, জীবনে এ রকমের অনুভুতি সবারই আসে। যখন এই অনুভুতি ভুল প্রমানিত হয়, তখন বেলা এতোটাই বেড়ে যায় যে, কারো কারো জীবনের রাত শেষ হয়ে আরো গভীর রাতে অন্য কোনো জগতে সে চলে যায়।

৩/৭/২০২১-বাগান

বাগান বড় অদ্ভুত। চারিদিকে প্রানের ছড়াছড়ি। কেউ কোনো কথা বলে না কিন্তু তাদের নীরব একটা ভাষা আছে। খুব কাছ থেকে দেখলে আর শুনলে এদের সব ভাষা পরিষ্কার বুঝা যায়। মুক, বধির কোনো মানব সন্তান যেমন তার শান্তি-অশান্তির কথা ব্যক্ত করলে মায়ের বুঝার কোনোই অসুবিধা হয় না, তেমনি বাগানের যিনি প্রকৃত পরিচর্যাকারী তার ও এই বধির এবং মুক ভাষাহীন উদ্ভিদের শান্তি-অশান্তির ব্যাপারগুলি বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। ভালো পরিচর্যায় এসব গাছগুলি সব সময় ফল দেয়, সময় কাটানোর জন্য সংগ দেয় আর দেয় প্রচুর পরিমানে অক্সিজেন। অক্সিজেন যখন দেয় কিংবা সংগ, তার ছবি থাকে দেহে, আত্তায় আর অন্তরে। শুধু ফলটা দেখা যায়।

আমাদের বাসার ছাদের মধ্যে আমার এই ছোট একটা বাগান। তাদের নিত্য সহচর চড়ুই, শালিক আর কাকের জন্য কোনো বীজই চারায় রুপান্তর করা সহজ হয় না। সারাদিন টবগুলির পাশেই বসে থাকে কখন একটা অংকুর ফুটবে আর অমনি টুপ করে খেয়ে ফেলবে। নেট দিয়েছি যাতে আর এই দুস্টুমীটা করতে না পারে। আমি এদেরকে কোনো বকা দেই না। ওরাও ব্যাপারটা বুঝে গেছে। আমি দেখেছি, বাগানে আমি এলেই যেনো এদের ভীড় বেড়ে যায়। ভালোই লাগে। বাগানে সময় কাটানো মানে কিছু জীবন্ত প্রজাতীর সাথে থাকা। Trees are so friendly and someone can spend time as much as he wants. আমার খুব শখের এই বাগান আমাকে সত্যিই সংগ দেয়।

আমার মত যারা ছাদে বাগান করেন, তারা হয়তো বাগানের ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। বীজ লাগানো, পানি দেওয়া,পাখীর উতপাত থেকে বাচার জন্য নেট দেয়া, বৃষ্টি থেকে ছোট চারা গুলিকে বাচানোর জন্য পলিথিন দেইয়া, পোকা মাকড় থেকে রক্ষার জন্য কীটনাশক দেয়া একটা নেশা। প্রতিদিন পিচ্চি পিচ্চি চারাগুলি একদিন ডাল পালা ছড়িয়ে গাছ হয়ে উঠা দেখুন। বাতাসে ওদের পাতার হেলাদোলা দেখুন। ওরা মানুষের সাথে বন্ধুত্ত করে, রাগ করে না, ডিস্টার্ব করে না। কিন্তু সিজনের শেষে আপনাকে হরেক রকমের ফল মুলাদি উপহার দিবে। ওরা আপনাকে ফ্রেস অক্সিজেন দিয়ে শরীর চাংগা করে দেয়, শিশির কিংবা বৃষ্টির ফোটায় ভেজা পাতা আপনাকে প্রশান্তি দিবে। এর থেকে ভাল কিছু আমি পাই নাই। বড় নেশা এই বৃক্ষ প্রেম। যিনি করেন নাই, তিনি এর কিছুই বুঝবেন না। মনে হবে- অযথা। কিন্তু এটাই সত্য।

০২/০৭/২০২১-বজলু

কম্পিউটার সার্ফ করছিলাম। হার্ড ডিস্ক ক্লিন করার সময় হটাত করে একটা অনেক পুরানো ছবির সন্ধান পেলাম। অনেকক্ষন তাকিয়ে ছিলাম ছবিটার দিকে। মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। একটা ছবি অনেক কথা বলে। একটা ছবি একটা সময়ের ইতিহাস বলে। একটা ছবি না বলা অনেক স্মৃতি মানষ্পটে জাগিয়ে তোলে। আজকের এই ছবিটাও তেমনি একটি ছবি।

আজ থেকে প্রায় ৪০/৪১ বছর আগের কথা আমি যখন গ্রামে ছিলাম সেদিনের কথাগুলি যেনো একে একে স্পষ্ট জেগে উঠতে থাকলো আমার স্মৃতির পাতায়। আমরা কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক ক্লিন করি, তারমধ্যে আবার নতুন কোনো তথ্য লোড করি, পুরানো তথ্যগুলি অনেক সময় আর খুজে পাওয়া যায় না। হয়তো বিশেষ কায়দায় কোনো ছায়া-মেমোরি থাকলেও থাকতে পারে যা থেকে হয়তো আবার সেই ডিলিটেড কোনো তথ্য বিশেষ কায়দায় ডিস্টর্টেড অবস্থায় কিছু পাওয়া গেলে যেতেও পারে কিন্তু আমাদের ব্রেনের মধ্যে সেই শিশুকাল থেকে যতো স্মৃতি এই মেঘা হার্ডডিস্কে লোড হয়েছে, সেটা কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে আবার জেগে উঠে অবিকল ঠিক সেই বিন্যাসে যা ক্রমান্নয়ে ঘটেছে বা ঘটেছিলো। এমনি একটা স্মৃতির পাতা আজ আমার মন আর ব্রেনের কোনে ঠিক জাগ্রত হয়ে জীবন্ত আমার দৃষ্টির মধ্যে চলে এলো- বজলু, আমার সেই ছোট বেলার অনেক প্রিয় একজন বন্ধু।

বজলু আমার খুব ভালো একজন বন্ধু ছিলো। আমাদের গ্রামের প্রায় শেষ পশ্চিম প্রান্তে ওদের বাড়ি। একই ক্লাসে পড়তাম, এক সাথে মাঠে খেলাধুলা করতাম। ওরা তিন ভাই ছিলো, বজলুই ছিলো সবার বড়। ওর বাবা ছিলো ধনী কৃষক। ওদের সামাজিক অবস্থা গ্রামের অন্যান্যদের থেকে বেশ ভালো। বজলুর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো যে, ও খুবই তোতলা ছিলো কিন্তু আমার কাছে এটা কোনো ব্যাপার ছিলো না। মজার ব্যাপার হলো, বজলু আমার সাথে যখন থাকতো, আর কথা বলতো, সে প্রায় তোতলামী করতোই না। কিন্তু যেই না অন্য কারো সাথে কথা বলতো, তার তোতলামীটা বেড়ে যেত। আমার সাথে বজলু স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতো। ও খুব ভালো গান গাইতো। লেখাপড়ার প্রতি টান থাকলেও কেনো জানি বেশী দূর এগুতে পারে নাই। এমন না যে টাকা পয়সা টানাটানির কারনে বা অভাবের সংসারে ওকে হাল ধরতে হয়েছিলো যার কারনে লেখাপড়া করতে পারে নাই। আমাদের গ্রামের মানুষগুলির বড় সমস্যা হচ্ছে-তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠায়, কিন্তু খবর নেয় না তারা স্কুলে কি পড়ছে, কেমন করছে, কিংবা সন্তানদের কোনো গাইড লাইন দেয়ার দরকার আছে কিনা।

আমার মনে আছে যে, আমি আর বজলু ওদের বাসায় একসাথে পড়াশুনা করতাম। ওর মা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অনেক সময় দুপুরে খাওয়া দাওয়াও করাতেন। আসলে পৃথিবীর সব মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য সব কিছু করতে পারে। তারা সব সন্তানদেরকে একই রকম করে ভাবেন। আমি বজলুকে অংক শিখাতাম কারন বজলু অংকে আর ইংরেজীতে কাচা ছিলো। ১৯৭৭ সালে আমি ক্লাস সেভেন থেকেই গ্রাম ছাড়ি। তার কারন আমি ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে বজলুর সাথে আর আমার স্কুলে পড়া হয় নাই। ক্যাডেট কলেজে বাধাধরা নিয়ম, মাঝে মাঝে ছুটি পাই, তখন বেশীরভাগ সময় আমি গ্রামেই কাটাতাম। বজলু তখনো স্কুলেই পড়ে। ছুটিতে আমার কোনো কাজ থাকতো না, কিন্তু বজলুর থাকতো। ক্ষেতে কাজ করতো, গরুগুলিকে নদীতে নিয়ে গোসল করাতে হতো। ওর বাবাকে সাহাজ্য করতে হতো, ক্ষেতে আলু কিংবা অন্যান্য শশ্য লাগাতে হতো। আমিও ওদের সাথে ওইখানে বসেই আড্ডা দিতাম। কারন গ্রামে আমার বন্ধুর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিলো।

রাতেও আমি ওদের বাসায় অনেকদিন আড্ডা দিতাম। তোতলা হলেও গান গাওয়ার সময় বজলু কখনো তোতলামী করতো না। প্রচন্ড মায়া ছিলো ওর অন্তরে সবার জন্য। কারো সাথে ঝগড়া করেছে এমনটা দেখি নাই। পড়াশুনার চাপে আর ক্যাডেটে থাকার কারনে ধীরে ধীরে আমার এসব বন্ধুদের থেকে যোগাযোগটা আমার কমে গিয়েছিলো। প্রায় বছর তিনেক পরে আমি যখন একবার ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জ যাবো বলে গুলিস্তান থেকে একটা বাসে উঠেছি, হটাত কে যেনো আমার নাম ধরে ডাক দিলো। ড্রাইভার সিটে বসা একজন লোক। তাকিয়ে দেখি-বজলু। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম বজলুকে দেখে। বল্লাম-কিরে তুই ড্রাইভারি করিস নাকি?  বজলু আমার হাত টেনে ধরে বল্লো, আমার পাশে বস। নারায়নগঞ্জ যাবি? বল্লাম-হ্যা। খুব ভালোই হলো। তোর সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। আমার জীবনে এইই প্রথম আমার কোনো খুব কাছের মানুষ ড্রাইভার। খুব আপন মনে হচ্ছিলো। বজলু বলতে থাকলো-

তোরা সব চলে যাবার পর আমার আর পড়াশুনা হয় নাই। গ্রামে আসলে পড়াশুনার পরিবেশও নাই। বাড়ি থেকে বারবার চাপ আসছিলো কিছু একটা করার। গ্রামের বেশীরভাগ ছেলেরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছিলো। আমিও সেই লাইনেই ছিলাম। বিদেশ চলে যাবো। তাই ড্রাইভারি শিখতে হলো। লাইসেন্স পেয়েছি। ঘরে বসে না থেকে হাত পাকা করছি আবার কিছু পয়সাও কামাচ্ছি। পড়াশুনা তো আর হলোই না।

সম্ভবত সেটাই ছিলো বজলুর সাথে আমার সর্বশেষ একান্তে কথা বলা। পরে শুনেছি বজলু জাপান চলে গেছে। সেখানে অনেক বছর চাকুরী করে আবার গ্রামে এসেছিলো। আমাদের গ্রামে আমাদের সাথে পড়তো সুফিয়া নামে একটি মেয়ে ছিলো। ওর বোন সাহিদাকেই বজলু বিয়ে করেছে। তিনটা মেয়ে আছে ওর। আমার সাথে ওদের কারো কোনো যোগাযোগ ছিলো না। মাঝে মাঝে গ্রামে যেতাম ঠিকই কিন্তু ওরা দেশে না থাকায় কারো সাথেই আমার যোগাযোগ হতো না। মা যতোদিন বেচে ছিলেন, গ্রামে যাওয়া হতো কিন্তু মা ইন্তেকাল করার পর গ্রামে যাওয়াটা আমার প্রায় শুন্যের কোটায় পরিনত হয়।

২০১৮ সালে হটাত একদিন আমার ফোনে একটা ফোন এলো। আমি অপরিচিত নাম্বার সাধারনত ধরি না। কিন্তু কি কারনে হটাত করে আমি সেই ফোনটা ধরেছিলাম। অন্য প্রান্ত থেকে দেখি বজলুর কন্ঠ।

কিরে দোস্ত, কেমন আছিস? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-বজলু?খুব ভালো লাগলো ওর কন্ঠ শুনে এতো বছর পর। বজলু বল্লো, সে দেশে এসেছে। বেশ কয়েকদিন থাকবে। তারপরেও বছর খানেক তো থাকবেই। বজলু ওর পরিবারের অনেক খবর দিলো। ওর স্ত্রী সাহিদা আমাদের প্রাইমারী স্কুলে মাষ্টারী করে। তিনটা মেয়ে, সম্ভবত মেয়েদের বিয়ের আয়োজন করছে। ওর শরীরটা নাকি ইদানিং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। অনেক কথা মনে পড়লো-

সেই প্রায় ৪০/৪১ বছর আগে এক সাথে মাঠে খেলা করতাম, এক সাথে নদীতে গোসল করতাম, বাজারে যেতাম, মাছ ধরতাম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চলে যেতাম, রাত হলে কখনো স্কুলের মাঠেই জ্যোৎস্না রাতে আমরা অনেকে মিলে গান গাইতাম, বজলুই ছিলো প্রধান ভোকালিষ্ট। ওর একটা জাপানিজ গিটার ছিলো, একটা সিন্থেসাইজার ছিলো, জাপান থেকে এনেছিলো। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, আমিই ওদের বাড়িতে থেকে যেতাম ঘুমানোর জন্য। একটা ভীষন মিষ্টি সময় কেটেছে।

বজলু বল্লো- আমি আগামি কয়েকদিন পর তোর অফিসে আসবো। চুটিয়ে গল্প করবো। তোর সাথে খাবো। সারাদিন থাকবো আমি তোর অফিসে। এনামুল, ওয়ালী, মুসা সবাইকে নিয়ে আসবো। সেদিন আমরা সবাই তোর অফিসেই খাবো। খুব ভালো লাগলো ওর কথায়। আমি এখন বড় একটা ব্যবসায়ী, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, আমার কোনো তাড়া নাই, কোনো চাপ নাই। ভালই হবে ওরা এলে। কিন্তু বজলু কোনো তারিখ দেয় নাই কবে আসবে।

বজলুর সাথে কথা বলার পর আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, বজলু আমার অফিসে আসবে কিন্তু কবে কিংবা কখন সেটা আমার মাথাতেই ছিলো না। মনে হয়েছিলো, আসবেই তো। আমি তো অফিসে প্রতিদিনই আসি। আর আমার গ্রাম কিংবা ওরা যেখানে থাকে সেখান থেকে আমার অফিসে আসতে লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। ওরা যে কোনো সময় নিজের সময়ে এলেই আমাকে পাবে।

এমনি এক অবস্থায় আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আমাকে কথায় কথায় ফোনে জানালো যে, বজলু নাকি অসুস্থ্য। হাসপাতালে ভর্তি। ছোট খাটো ব্যাপার মনে করতে আমিও আর ওকে দেখতে যাইনি। ভেবেছিলাম, কয়দিন পর তো দেখাই হবে। তখন জেনে নেবো ওর কি হয়েছিলো। কিন্তু তার ৩/৪ দিন পর আমার কাছে এমন একটা ব্রেকিং এবং হার্ট টাচিং নিউজ এলো যা আমি কল্পনাও করতে পারি নাই। বজলু নাকি মারা গেছে।

এই সংবাদটা আমাকে এতোটাই মর্মাহত করেছিলো যে, কেউ যেনো আমার দরজার একদম কাছে এসেও আমার সাথে দেখা করতে পারলো না। অথবা এমন একটা পীড়া যা আমাকে এমনভাবে নাড়া দিলো যা কিনা আমার নজরেই ছিলো না। বজলুকে আমি যেমন ভালোবাসতাম, তেমনি বজলু সর্বদা আমাকে মনে রাখতো। বন্ধুরা কেনো জানি ধিরে ধীরে সব হারিয়ে যাচ্ছে।

২৯/০৬/২০২১-সফুরা খালা

জীবন যেখানে যেমন। জে শিশুটি আজ জন্ম নিলো কেউ জানে না তার জন্য এই পৃথিবী কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা এই প্রিথিবীকে সে কি দিয়ে যাবে। হতে পারে আজকে এই শিশুটি হয়তো এই পৃথিবীকে কোনো এক সময় নাড়িয়েও দিতে পারে বা এই পৃথিবী তাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু এমন অনেক শিশুই এই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় না তারা কোনো ভূমিকা রাখে, না পৃথিবী তাদেরকে মনে রাখে। এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। যুগে যুগে তার পরেও অনেক শিশু গোপনে পৃথিবীতে আসে, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় আর একদিন সব কিছু ফেলে সবার থেকে আলাদা হয়ে আবার কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঝখানের এই সময়টায় খুব গুটুকতক মানুষ হয়তো নিজের মতো করে কাউকে কাউকে মনে রাখে কিন্তু তাও এক সময় মনের স্মৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। আমার সফুরা খালা, সামিদা খালা কিংবা আমার শায়েস্তা বুজি, বা সাফিয়া বুজিরা সম্ভবত এই রকমের কিছু মানুষ যারা সেই বহু বছর আগে শিশু হয়ে জন্ম নিলেও কোনো লাভ হয় নি কারো। তারা আজীবন যেনো এই দুনিয়ার বুকে একটা বোঝা হয়েই ছিলো। অতচ তারা হাজারো মানুষের থেকে অনেক ভালো মানুষ ছিলেন।

প্রায় দু বছর আগে আমি আমার পরিবার নিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে বেশ দূরে একতা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বেশীক্ষন দেরী করি নাই কারন পরিবেশটা ঐ রকমের ছিলো না। কোনো রকমে আনুষ্টানিকতা শেষ করে ভাবলাম, যেহেতু গ্রামের পথেই আছি, যাই আমাদের গ্রামের বাড়িটা ঘুরেই যাই। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, আলো বেশ কমে গিয়েছিলো। অনেকেই আমাকে চিনে না যদিও আমি এই গ্রামেরই একজন পুরানো বাসিন্দা। কিন্তু সময়ের সাথে আমার অনুপস্থিতি আমাকে আজ এই গ্রামে একজন নবাগত অতিথির মতোই মনে হচ্ছিলো। যারা আমার সম বয়সী ছিলো, তারাও অনেক বুড়ো হয়ে গেছে, অনেকেই চিনতেও ভুল করছিলো, আমি তো ওদের কাউকেই এখন চিনি না। ওদের চেহারা সুরুতে এমন বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে জে, জোয়ান কালে আমি যাদেরকে দেখেছি, তারা এখন দাদা নানার পর্যায়ে। না চেনারই কথা। তারপরেও কাউকে কাউকে আমি চিনতে পারছিলাম। গ্রামের বাড়িতা খা খা করে, কেউ থাকে না এখানে। আগে মা থাকতেন, এখন থাকে আমার এক ভাগ্নে জে সারাদিন গাজা খায়।

ভাবলাম, আমার এক খালা ছিলো। নাম সফুরা বেগম। উনি কি জীবিত আছেন নাকি আর জীবিত নাই সেই খবরটাও আমার জানা নাই। তাঁকে খুব দেখতে মন চাইলো। মিটুলকে বললাম, চলো একটা বাড়িতে যাই। যদি উনি বেচে থাকেন, তাহলে মায়ের অভাবটা কিছুটা হয়তো পুরন হবে। আর যদি জীবিত না থাকেন, অন্তত জানতে পারবো, কবে থেকে আর তিনি এই পৃথিবীতে নাই।

আলুকান্দা তার বাড়ি। অনেক খোজাখুজির পর শেষ অবধি সফুরা খালার বাসায় যেতে পারলাম। তিনি অসুস্থ্য। জর। একটা কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। চার পাঁচ দিন নাকি তিনি কিছুই খাচ্ছেন না। অনেক বয়স হয়ে গেছে। আমার মা যখন বেচে ছিলেন, তখন আমার এই খালা প্রায়ই আমার মায়ের সাথে দেখা করতেন, গল্প করতেন। আমাকে খুব আদর ও করতেন। আসলে আমার মা, আমার সামিদা খালা আর এই সফুরা খালা এতোটাই ভালো আর নীরিহ মানুষ ছিলেন জে, তাদের ব্যাপারে আজ অবধি কেউ কোনো অভিযোগ করেছে সে ঘটনা ঘটে নাই। খালাকে ডাকা হলো। উনি ভালো মতো চোখে দেখেন না। এম্নিতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, তার মধ্যে আবার আকাসগ ছিলো খুব মেঘাচ্ছন্ন। বিদ্যুৎ ছিলো না। কোন রকমে খালাদের বাসায় যাওয়ার পর, আমি খালার বিছানায় গিয়ে বসলাম। খালাকে তার পুত্র বধুরা ডেকে তোলার চেষ্টা করলেন। আমাই যাওয়াতে সবাই অনেক খুশী হয়েছে। কি থেকে কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না।

খালাকে যখন আমি বললাম, আমি মেজর আখতার এসছি। খালা এম্নিতেই কানে কম শুনে মনে হয়, তার মধ্যে আমার নাম শুনে যেনো একটা অদ্ভুত মিথ্যা কথা শুনলেন এমন হলো। বল্লো-

কে? হামিদার ছেলে?

বললাম, হ্যা খালা।

উনার জর ছিলো প্রায় ১০৩ ডিগ্রী। আমার কথা শুনে তিনি বিছানা থেকে উঠে বসলেন। খালা প্রায় গত চার পাঁচ দিন বিছানায় উঠে বসতে পারেন না। কিন্তু আজ যেনো কোন অলৌকিক শক্তিতে তিনি একাই বিছানায় উঠে বসে পড়লেন। আমি খালাকে জড়িয়ে ধরলাম, খালাও আমাকে এমন করে জড়িয়ে ধরে কাদতে পাগলেন যেনো এই মাত্র বাইরের আকাশটা ঘন কালো মেঘ বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিলো সারাটা উঠান।

কতটা আদর? কিভাবে আদর করলে ভালোবাসা হয়মায়েদের? আমার সেটা জানা ছিলো। আমার মা ও ঠিক এভাবেই আমাকে আদর করতেন। মুখে দুই হাত দিয়ে একদম চোখের কাছে আমার মুখটা নিয়ে পান ভর্তি মুখে ভিজা ভিজা চোখে ফিক করে হেসে দিয়ে বলতেন, অনেক বড় হ বাবা। আমার দোয়া আর দোয়া রইলো। সফুরা খালার ভাষাও এক। কি অদ্ভুদ। আমি তাঁকে কতোক্ষন জড়িয়ে ধরেছিলাম, আমার জানা নাই। সারাটা শরীর হাড্ডি, মাংশ বলতে কিছুই নাই। গরীব ছেলে পেলেরা যতোটা পারে তাদের মায়ের যত্ন নেয় বটে কিন্তু অন্তরের ভালোবাসায় হয়তো অনেক ঘাটতি আছে। তারপরেও তিনি বেচে আছেন যেটুক পান সেটা নিয়েই।

আমার মায়ের বাবার নাম ছিলো কেরামত আলী। আমার মায়ের কোনো ভাই ছিলো না। মাত্র দুই বোন- হামিদা খাতুন আমার মা আর সামিদা খাতুন আমার আপন খালা। কিন্তু সফুরা খালার বাবার নাম ছিলো চেরাগ আলি। তার ও কোনো ভাই অথবা কোনো বোন ছিলো না। তিনি একাই এক মাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন চেরাগ আলীর। এই চেরাগ আলি এবং কেরামত আলি (মানে আমার নানারা) ছিলেন চার ভাই। অন্যান্য আর দুই ভাই ছিলেন সাবেদ আলি এবং লষ্কর আলী। উম্মেদ আলী ছিলেন এই চার ভাইয়ের বাবা। অর্থাৎ আমার মা খালাদের নানা।

আজ তারা কেহই বেচে নাই। শুধুমাত্র আমার সফুরা খালাই বেচে আছেন কালের সাক্ষী হয়ে।

খুব ভালোবাসি আমি তোমাদের।

নোটঃ

আজ আবার গেলাম খালার কাছে। ওনার বয়স ১১০। সবচেয়ে সিনিয়ার মানুষ আমাদের পরিবার আর বংশের মধ্যে।

২৯/০৬/২০২১-আমার গ্রাম

অফিসেই ছিলাম। কেনো জানি হটাত করে খুব গ্রামে যেতে ইচ্ছে করলো লায়লা আর সফুরা খালাকে দেখার জন্য। বহুদিন গ্রামে যাই না। প্রায় এক যুগ অথচ মাত্র ১৫ মিনিট লাগে গ্রামে যেতে। মা যখন বেচে ছিলেন, তখন গ্রাম আমাকে চুম্বকের মতো টানতো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার হলেই আমি গ্রামে ছুটতাম মাকে দেখার জন্য যখন মা গ্রামে থাকতেন। কোনো ঈদই আমি শহরে করতাম না। মাকে দেখার সুবাদে আমার গ্রামের সেই পরিচিত মানুষগুলির সাথে আমার দেখা হতো। মানুষগুলি আমাকে বুক ভরা শ্রদ্ধ্যা আর মোহনীয় একটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ করতো। আমি যখন গ্রামে যেতাম, মায়ের সাথে বসে গল্প করতাম, বাড়িটার অবস্থা কি সেটা ভালো করে পরীক্ষা করতাম যাতে ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে মায়ের কোনো ভয় না থাকে। মা ঝড়কে খুব ভয় পেতেন। আকাশে ঝড়ের আভাষ দেখলে প্রথমেই আমার মনে পড়তো মায়ের কথা। মা বোধ হয় এখন ভয় পাচ্ছে। সেই ২০০২ সালের কথা। এখন ২০২১ সাল। এর মাঝে দু একবার গ্রামে গিয়েছি নিতান্তই একটা অতিথির মতো। এখন গ্রামে গেলে লায়লার বাসা পর্যন্ত গিয়ে ওর সাথে কথাবার্তা বলেই মনে হয় আমার গ্রামের ভ্রমন শেষ। অনেকবারই একেবারে বাড়ির আস্তানা থেকে ফিরে এসেছি, হয়তো বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছেও হয় নাই। এখন বাড়িটাতে থাকে আমার এক অবিবাহিত ভাগ্নে যে সারাদিন শুধু গাজা খায়। গাজায় কি সুখ সেটা আমি জানি, তবে বেশীদিন গাজা খেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে তখন নিজেই গাজায় পরিনত হয়। যেতে ভালো লাগে না। চুরি ওর অভ্যাস, গাজা ওর খাবার আর মথ্যা কথা বলা ওর স্বভাব। ফলে ওখানে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, যেতে ইচ্ছে করে না।

আজ হটাত করেই আবার ইচ্ছে করে গ্রামে আসলাম। গ্রামটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। অসংখ্য বাড়িঘর যত্রতত্র এখানে সেখানে উঠে গেছে। পায়ে চলার রাস্তাটাও আর আগের মতো নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ১৯৭৮/৭৮ সালের আমার গ্রামের বিন্যাশ। গ্রামের একেবারে পুর্ব পাশে ছিলো দৌলত মেম্বারদের বাড়ি যেখানে একটা গুচ্ছ পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই ছিলো ওহাবদের বাড়ি। পরে শুনেছি এই ওহাব নাকি মেম্বার হয়েছিলো তাই ওদের বাড়ির নাম এখন ওহাব মেম্বারদের বাড়ি বললেই সবাই চিনে।  ওহাবদের বাড়ি পার হয়ে আরো পশ্চিমে এলে পড়ে সেকান্দরদের বাড়ি। সেকান্দরকে আমি মামু বলে ডাকতাম। এই সেকান্দর মামু এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সবার সাথেই তিনি মিশতে পারতেন। বেশ গরীব হলেও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না। প্রতিদিন আমরা স্কুলের মাঠে খেলতে গেলে, তাঁকে সেখানে পাওয়া যেতো। স্কুলের মাঠ ছিলো বড়দের তাশ খেলার আড্ডা আর ছোটদের বল খেলার প্রতিযোগিতা। সরগরম হয়ে উঠতো স্কুলের মাঠ। যারা খেলতেন না, তারাও কেউ কেউ হুক্কা বিড়ি নিয়ে মাঠের চারিদিকে খেলা দেখতো যেনো প্রতিদিনই ম্যারাডনার আর মেসির খেলা হচ্ছে। এই ফুটবল খেলায় আমি আর মুসা একটা ট্রিক্স সব সময় করতাম যাতে আমি আর মুসা সব সময় একই টিমে থাকি। সেটা পরে বলি। যেই না মাগরেবের আজান পড়লো, সবাই যার যার বাড়িতে যাওয়া। অদ্ভুত একটা সময় পার হয়েছে তখন।

সেকান্দর মামুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো আরজুদের বাড়ি। আরজুদের পেশা ছিলো মাছ বিক্রি করা। আরজুরা আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ মানুষেরই পেশা ছিলো মাছ ধরা আর মাছ বিক্রি করা। কিন্তু কোনোভাবেই এটা জেলেপাড়ার মতো না। আরজুদের বাড়ির উঠোন ছিলো অনেক বড় আর এই উঠোনের চারিদিকে ছিলো ওদের অন্যান্য পারিবারিক বাড়িঘর। আরজু মাঝে মাঝে এমন করে মদ খেতো যে, বাড়ির বড়রা ওকে অনেক মারলেও আরজু বেহুশ অবস্থায় উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজতো। সবাই ভাবতো মদ খেয়ে বেহুস হলে উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় মনে হয়। আরজু তখনো বিয়ে করে নাই। আরজুদের বাড়িকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন দিকে একটু এগুলেই নতুন একটা বাড়ি উঠেছিলো। ওরা আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সবেমাত্র এই গ্রামে এসেছে। সে পেশায় ছিলো গ্রাম্য ডাক্তার, নাম নুরু ডাক্তার। বর্তমানে সেই নুরু ডাক্তারের বাসা রাজেন্দ্রপুর এবং তার এক ছেলে শাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে রাজনীতি করে। যাই হোক, আরজুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো ফুল্মতি আপারদের বাড়ি। ফুল্মতি আপা আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িটা ফজলুদের বাড়ি নামে পরচিত ছিলো। ফজলুরা তিন ভাই ছিলো। এখন তারা আর কেউ বেচে নাই। তাদেরও পেশা ছিলো মাছ বিক্রি তবে কৃষি কাজও করতো ওরা। ফুল মতি আপার জামাই এর একটা নেশা ছিলো। মাঝে মাঝেই অন্য মাইয়া লোক নিয়া মসকরা করতো। খারাপ জায়গায় ও মনে হয় যেতো। সবাই ওকে একটু অন্য নজরেই দেখতো বলে আমার ধারনা। ফজলু ভাইদের বাড়ির পশ্চিমে বেশ কিছুটা জায়গা খালি ছিলো। হেটে হেটে এলে প্রথমেই পড়তো জামাল, শাখাওয়াতদের বাড়ি। জামালকে আমি খুব বেশী দেখি নাই। জামাল ১৯৭২ সালের পরে আমাদের গ্রামে আর দেখা যায় নাই। জামাল ছিলো আসল মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে জামাল যুদ্ধে গিয়েছিলো। সম্মুখ সমরে সে অংশ নিয়েছিলো। দেখতে খুব সুন্দর ছিলো জামাল। আর স্বাস্থ্য ছিলো একদম সঠিক যুবকের মতো। অনেকে বলে যে, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছে অথবা জামাল ইচ্ছে করেই আর এই গ্রামে ফিরতে চায় নাই। আমার ধারনা, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছিলো কারন ১৯৭২ সালে তাঁকে এক পরদেশী মেয়ের সাথে একবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গিয়েছিলো। জামালের ভাই শাখাওয়াত, করিম (ডাক নাম বাছন), রুপচান এরা গ্রামেই থাকতো। বর্তমানে রুপচান বিদেশ থাকে, শাখাওয়াত মারা গেছে। করিম )বাছন)ও মারা গেছে। করিমকে সবাই বাছন বলেই ডাকতো। তিনি আমাদের থেকে অনেক বইয়সে বড় ছিলো। বাছনকে আমি কাকা বলে ডাক্তাম। আমি যখন আর্মিতে চাকুরী করি কমিশনডঃ অফিসার হিসাবে, হটাত একদিন দেখলাম বাছন কাকা ক্যান্টনমেন্ট কর্পোরেট ব্রাঞ্চে সিকিউরিটির কাজ করেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলো যে, তারই এক পরিচিত মানুষ আর্মিতে অফিসার এবং সেই সেনানীবাসেই তার চাকুরী। খুবই সমীহ করতেন আমাকে। আমিও কাকা বলতাম, উনিও আমাকে কাকা বলতেন।

এই জামালদের বাড়ির উত্তর দিকে জরাজীর্ন একটা বাড়ি ছিলো জামালদেরই এক আত্তীয়ের, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে। সম্ভবত শাখাওয়াতদের বাড়ি ছিলো ওটা। খুব গরীব ছিলো শাখাওয়াতরা। জামালদের বাড়ি আর ঐ শাখাওয়াতদের বাড়ির মাঝখান দিয়েই গ্রামের হেটে চলা রাস্তাটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। জামালদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো রফিক মাষ্টারদের বাড়ি। রফিক মাষ্টারকে আমি ভাইও বলতাম আবার স্যারও বলতাম। কারন তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমসাময়ীক আবার আমার প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একটু তোতলা ছিলেন কিন্তু খুব ভালো মানূশ ছিলেন। তার একটা ছেলে ছিলো নাম, কাজল, আর একটা মেয়ে ছিলো। রিফিক ভাইয়ের স্ত্রী খুব মিষ্টি চেহাড়ার ছিলেন। বর্তমানে কাজল একটা দূর্ঘটনায় পড়ে প্রায় প্যারালাইসিস। হামদর্দে চাকুরী করতো। রফিক ভাই চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। অনেক বয়ষ্ক মানুষ, আমার অফিসে প্রায়ই আসেন এবং গল্প হয়, ভালো লাগে। রফিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো আরদশ আলীদের বাড়ি। ওরা চার ভাই এবং কোনো বোন নাই ওদের। রফিক ভাইদের বাড়ি থেকে শুরু হয় “বড় বাড়ি”। এই আরদশ আলীর অন্যান্য ভাইয়েরা হলো সার্থক আলী, মোনজর আলী, সুন্দর আলী আর একজন, নামটা মনে পড়ছে না। এই বাড়ির সব বউরা প্রায় আসর নামাজের পর ধান বারা বানতো। ওরা বেশ সচ্ছল ছিলো। এদের বাড়ির দুই ধার দিয়া উত্তর দিকে যাওয়া যেতো। রফিক ভাইদের বাড়ি আর আরদশ আলীদের বাড়ির মাঝে দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেত আবার আরদশ আলীদের বাড়ির পশ্চিম ধার দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেতো। এই দুই ধারের যে কোনো রাস্তা দিয়েই উত্তর দিকে প্রায় ২০০ গজ হেটে গেলে দুটু বাড়ি পড়তো। একটা আমাদের বাড়ি আর তার সাথে আম্বর আলী কাকাদের বাড়ি। এই দুটু বাড়ি আসলে গ্রাম থেকে একটু আলাদা থাকায় সবাই “টেক্কা বাড়ি” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে তাকাইলে গ্রামের পুব পাশ থেকে শুরু করে পশ্চিম পাশের বাড়ি পর্যন্ত সব দেখা যেতো। যাই হোক, এই আরদশ আলিদের বাড়ির উঠোন ছিলো বেশ বড়। আমরা ওখানে “কুতকুত” খেলতাম। আর উঠোনের ঠিক দক্ষিনে একটা দোকান ছিলো। এই দোকানে কেউ চা খেতে বসতো, ক্রেউ বিড়ি খাইতো, আর আমি মাঝে মাঝে শুধু মানুষদেরকে লক্ষ্য করার জন্য বসে থাকতাম কারন কোন মানুষ কি কারনে বসে থাকে, বসে বসে কি কথা বলে, কেনো বলে, কার বাড়িতে কি সমস্যা, কার সাথে কার ঝগড়া, কার সাথে কে কি মজা মারতাছে, কোথায় কার কি পরিকল্পনা সব জানা যেত। আমি বেশ ছোট ছিলাম বলে আমাকে একটা বোকা বা আহাম্মক মনে করে আমার সামনেই সবাই সব কথা বলতে পারতো। আমি মনে মনে এসব ভাবতাম আর মানুষ গুলিকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। এটা আমার এক প্রকারের নেশাই ছিলো বলা যায়।  দোকানটার লাগোয়াই হলো পায়ে চলা গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে চলা পথ। রফিক ভাইদের বাড়ির দক্ষিনে গেলে পড়তো বাহারউদ্দিনদের বাড়ি। বাহার উদ্দিন আমার ক্লাসে পড়তো। ওর বাবারা তিন ভাই ছিলো। আক্কেল আলী, বাহারের বাবা আর আলমাস। আক্কেল আলীর পেশা ছিলো “চুরি” করা, আলমাসের পেশা ছিলো “চুরি”র সাথে মাছ ধরাও। শুধু বাহারের বাবাই ছিলো ভালো মানুষ। শুনেছি আক্কেল আলীর সব ছেলেরাই নাকি এখন চুরিই করে। তার মধ্যে হাতিম আলি একজন। আলমাস, আক্কেল আলী এবং বাহারের বাবা কেউ এখন আর বেচে নাই। ওরা রফিক ভাইয়ের চাচাতো ভাই।

আরদস আলীদের বাড়ির পশ্চিম লাগোয়া যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ির দিকে সেই রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো অরিজিনাল “বড় বাড়ি”। অর্থাৎ গনি মাদবরের বাড়ি। বেশ বড় পরিবার। গনি মাদবরেরাই আসলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রন করতো। জমিদার স্টাইলে। গনি মাদবরেরা মোট চার ভাই ছিলো। গনি মাদবর, সিদ্দিকের বাবা (নামটা মনে নাই) হাকিমের বাবা (নামটা মনে নাই), সাত্তারের বাবা (নামটা মনে নাই), ল্যাংরা রফিকের বাবা আর কাদেরের বাবা আজিজ খালু। আজিজ খালু মসজিদে মাঝে মাঝে ইমামতি করতেন। কিন্তু তার ঘরেই সব ছিলো জালিমের মতো সন্তান। কাদের, ইনসান, কুতুব, আরো একজন (নাম মনে নাই) এরা ছিলো আজিজ খালুর পোলা। এই বড় বাড়িটা ছিলো জোয়ান ছেলে দিয়ে ভর্তি। এদের মধ্যে যিনি কাদের নামে পরিচিত ছিলো, সে ছিলো বেশ শ্যামলা কিন্তু ভীষন সুইট চেহারার লোক। সরাসরি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ছিলো। আমি সাধীনতার পরেও দেখেছি তাঁকে হাতে অস্র নিয়ে ঘুরতে। খুবই সাহসী ছেলে ছিলো। এই কাদের ভাই, সামসু ভাই, রফিক (ল্যাংরা রফিক), মাষ্টার রফিক, এরা সবাই সমসাময়িক ছিলো। সাধীনতার ঠিক পর পরই কাদের ভাই একটা ডাকাতী দল গঠন করে ফেলেছিলো। ওরা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অস্র দিয়ে ডাকাতি করা শুরু করেছিলো। ওদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। আমার ভাই হাবীবুল্লাহ সব সময়ই ওদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতো এবং তিনি কখনো এসব কাজকে সাপোর্ট করতেন না। তখন দেশে একটা দূর্ভিক্ষ চলছিলো কিন্তু বড় বাড়ির কখনো দূর্ভিক্ষে সাফার করতে হয় নাই বরং ওদের কাছে সব কিছুই থাকতো সারপ্লাস। এই আজিজ খালু আবার বিয়ে করেছিলো গ্রামের পুর্ব প্রান্তে বসবাসকারী দৌলত মেম্বারের বোন। দৌলত মেম্বারের সাথে এই “বড় বাড়ির” সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো সাপে নেউলের মতো। একটা শক্তি আরেকটা শক্তিকে কখনোই মূল্যায়ন করতো না বরং যখনই সুযোগ পায় তখনই এক পরিবার অন্য পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করতো। এই রেষারেষির ফলে দৌলত মেম্বারের ইমিডিয়েট আপন ছোট ভাই অর্থাৎ মুসার বাবা আর মুসার ছোট ভাই মাসুদকে প্রান দিতে হয়েছিলো। মানে হত্যা। মুসার ভাই মাসুদ ছিলো আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। একদিন কোনো এক বর্ষাকালে মাসুদকে কুকুরে কামড়ে দিয়েছিলো। ঐ সময় খুব নামকরা ডাক্তার ছিলো একজন হিন্দু লোক, যাকে সবাই “বগা” ডাক্তার নামে চিনতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই বগা ডাক্তারকে। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কিন্তু উনি বাস করতেন বিবির বাজার এলাকায়। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩/৪ কিলমিটার দূরে। তখন বিবির বাজার ছিলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। রবিবার আর বৃহস্পতিবার বসতো বাজার। মাসুদকে কুকুরে কামড়ানোর কারনে মাসুদের বাবা মাসুদকে নিয়ে বিবির বাজারের দিকে একটা ছোট কোষা নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বর্ষা। পথের মধ্যে হটাত করে বড় বাড়ির সামসু, কাদের আর ল্যাংরা রফিকের সাথে দেখা। ওরাও অন্য নৌকায় ছিলো। তখন সকাল প্রায় ১০ টা। প্রকাশ্য দিবালোক। এই প্রকাশ্য দিবালোকে হটাত করে নদীর মধ্যে সামুসু ভাই এর লিডারশীপে মাসুদের বাবাকে জবাই করা হয় আর মাসুদকে পানিতে আছাড় মারতে মারতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে ওদেরকে রক্ষা করতে গিয়েও আর পারে নাই। এর মধ্যেই এরা পালিয়ে যায়। এবার “বড় বাড়ি”র সাথে দৌলত মেম্বারদের বাড়িত শত্রুতাটা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে তীব্র আকার ধারন করে। এর ফলশ্রুতিতে মামলা হয়, কেস হয়, বড়রা গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে বাস করতে শুরু করে, আরো অনেক প্রানহানী হয়, সেই সাথে কাদেরও খুন হয়। কাদেরের খুন এখনো একটা রহস্যজনক অবস্থায় আছে। কিভাবে কাদের খুন হলো সেটা পরে বল্বো। এই “বড় বাড়ী’তে তাদের নিজস্ব মসজিদ এবং নিজস্ব করবস্থান ছিলো যা এখন মসজিদটা আরো বড় হয়েছে বটে কিন্তু কবরস্থানটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বিলীন। ঐ কবরস্থানেই শুয়ে আছেন আমার মা আর আমার খালা। এটা সিদ্দিকদের বাড়ির একেবারেই লাগোয়া আর আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০/৬০ গজ দূরে।

সিদ্দিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই লাগোয়া ছিলো পিয়ার আলী নামে ওদের বাড়ি। লম্বা মানুষ, কোনোদিন শার্ট পরেছে কিনা আমার চোখে পড়ে না। মাছ বিক্রি করতো। গ্রামের মধ্যে যে কয়জন গরীব হালের মানুষ ছিলো, পিয়ার আলিরা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো রকমে বেচে ছিলো। ঘরটাও খুব জরাজীর্ন ছিলো। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলো অত্যান্ত ভালো। খুব সকালে দেখতাম পিয়ার আলী, মাথায় মাছের খাড়ি নিয়ে খালী গায়ে মাছ নিয়ে সদরঘাট বা শ্যামবাজারে যেতো। আমাদের গ্রামে আসলে যে কয়জন খুব সকালে দল বেধে মাছের খাড়ি নিয়ে হু হু করে খালী গায়ে ছুটতো শ্যমবাজারের দিকে তারা সবাই আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতো। আম্বর আলী কাকা, পিয়ার আলী, আরজু, আরদস আলীর বড় ভাই, আরো অনেকে। ওরা ফিরে আসতো প্রায় দুপুরের দিকে। তারপর আর ওদের কোনো কাজ থাকতো না। ফলে এই দলটা মাঝে মাঝেই বাঙলা মদ খেতো।

এই পিয়ার আলীদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো মংগল মাদবরের বাড়ি। খুব সুশ্রী একজন সুন্দর মানুষ। তার কোনো সন্তান ছিলো না। বড় বউ ছিলেন বাঞ্জা, তাই তিনি সন্তানের আশায় মংগল মাদবর আরেকবার বিয়ে করেন। দুটু বউই ছিলো অসধারান সুন্দুরী। দুই বউ ই পান খেতো। সুন্দুরী মেয়েরা পান খেলে আরো সুন্দর লাগে। গ্রামে যে কয়টা টিউব ওয়েল ছিলো গ্রামের মানুষের পানি নেয়ার জন্য, এই মংগল মাদবরের বাড়িতে ছিলো একটা। আমরা সবসময় এই বাড়ি থেকেই মাটির কলসীতে করে পানি আনতাম। বড় বউ তার সন্তান হবে না জানার পর একটি পালক ছেলে নিয়েছিলেন, যার নাম ছিলো শহীদ। শহীদ আমার ক্লাসেই পড়তো। মংগল মাদবর একবার মেম্বার পদে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু তিনি পাশ করেন নাই। মংগল মাদবরের নির্বাচনী ক্যাম্পাসে আমরা শহিদ সহ স্লোগান দিতাম টিনের চোঙ্গায় করে। তখন শহীদ নিজেও বলতো- আমার ভাই তোমার ভাই, মংগল ভাই মংগল ভাই। আমরা শহীদকে বলতাম, ঐ মংগল মাদবর না তোর বাপ? ও বলতো, হ আমার বাপই তো। এতো বোকা একতা ছেলে ছিলো যে অনেক মায়া হয় এখন ওর জন্য। কার যে ছেলে ছিলো শহীদ আমরা জানতেই পারতাম না। যাইই হোক, মেম্বার পদে মংগল মাদবর পাশ করে নাই কিন্তু পাশ করেছিলো খুনের চরের লালচান ভাই যিনি পরে লালচান মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। মংগল মাদবর নিজেও একজন সচেতন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। ছোট বউ এর ঘরে পর পর চার জন মেয়ে হয়েছিলো, পরীর মতো সুন্দুরি মেয়েগুলি। তারমধ্যে নাজমা, সালমা অন্যতম। আজ ওরা কোথায় আমি জানি না। নাজমা আমার থেকে প্রায় ৩/৪ বছরের ছোট ছিলো। মংগল মাদবর আর বাহারের বাবা, রফিক মাষ্টার, আক্কেল আলী, আলমাস, বাছন, জামাল, এরা এক বংশের লোক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মংগল মাদবর ঐ সব লোকদের থেকে একটু দূরে বাড়ি বানিয়েছিলেন (প্রায় ২০/২৫টা বাড়ির পরে পশ্চিম দিকে)। ফলে বেশীরভাগ সময়ে তাদের বংশের সাথে মংগল মাদবরের অনেক কিছুই বনিবনা ছিলো না। শুনেছি, শহীদ মারা গিয়েছিলো হার্টের কারনে। সে বিয়ে করেছিলো কিনা আমার আজ মনে নাই। কারন আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম সেই ১৯৭৭ সালে যখন আমি ক্যাডেটে ভর্তি হই। এর পরে অনেকের সাথেই আমার আর যোগাযোগ ছিলো না

অফিসেই ছিলাম। কেনো জানি হটাত করে খুব গ্রামে যেতে ইচ্ছে করলো লায়লা আর সফুরা খালাকে দেখার জন্য। বহুদিন গ্রামে যাই না। প্রায় এক যুগ অথচ মাত্র ১৫ মিনিট লাগে গ্রামে যেতে। মা যখন বেচে ছিলেন, তখন গ্রাম আমাকে চুম্বকের মতো টানতো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার হলেই আমি গ্রামে ছুটতাম মাকে দেখার জন্য যখন মা গ্রামে থাকতেন। কোনো ঈদই আমি শহরে করতাম না। মাকে দেখার সুবাদে আমার গ্রামের সেই পরিচিত মানুষগুলির সাথে আমার দেখা হতো। মানুষগুলি আমাকে বুক ভরা শ্রদ্ধ্যা আর মোহনীয় একটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ করতো। আমি যখন গ্রামে যেতাম, মায়ের সাথে বসে গল্প করতাম, বাড়িটার অবস্থা কি সেটা ভালো করে পরীক্ষা করতাম যাতে ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে মায়ের কোনো ভয় না থাকে। মা ঝড়কে খুব ভয় পেতেন। আকাশে ঝড়ের আভাষ দেখলে প্রথমেই আমার মনে পড়তো মায়ের কথা। মা বোধ হয় এখন ভয় পাচ্ছে। সেই ২০০২ সালের কথা। এখন ২০২১ সাল। এর মাঝে দু একবার গ্রামে গিয়েছি নিতান্তই একটা অতিথির মতো। এখন গ্রামে গেলে লায়লার বাসা পর্যন্ত গিয়ে ওর সাথে কথাবার্তা বলেই মনে হয় আমার গ্রামের ভ্রমন শেষ। অনেকবারই একেবারে বাড়ির আস্তানা থেকে ফিরে এসেছি, হয়তো বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছেও হয় নাই। এখন বাড়িটাতে থাকে আমার এক অবিবাহিত ভাগ্নে যে সারাদিন শুধু গাজা খায়। গাজায় কি সুখ সেটা আমি জানি, তবে বেশীদিন গাজা খেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে তখন নিজেই গাজায় পরিনত হয়। যেতে ভালো লাগে না। চুরি ওর অভ্যাস, গাজা ওর খাবার আর মথ্যা কথা বলা ওর স্বভাব। ফলে ওখানে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, যেতে ইচ্ছে করে না।

আজ হটাত করেই আবার ইচ্ছে করে গ্রামে আসলাম। গ্রামটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। অসংখ্য বাড়িঘর যত্রতত্র এখানে সেখানে উঠে গেছে। পায়ে চলার রাস্তাটাও আর আগের মতো নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ১৯৭৮/৭৮ সালের আমার গ্রামের বিন্যাশ। গ্রামের একেবারে পুর্ব পাশে ছিলো দৌলত মেম্বারদের বাড়ি যেখানে একটা গুচ্ছ পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই ছিলো ওহাবদের বাড়ি। পরে শুনেছি এই ওহাব নাকি মেম্বার হয়েছিলো তাই ওদের বাড়ির নাম এখন ওহাব মেম্বারদের বাড়ি বললেই সবাই চিনে।  ওহাবদের বাড়ি পার হয়ে আরো পশ্চিমে এলে পড়ে সেকান্দরদের বাড়ি। সেকান্দরকে আমি মামু বলে ডাকতাম। এই সেকান্দর মামু এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সবার সাথেই তিনি মিশতে পারতেন। বেশ গরীব হলেও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না। প্রতিদিন আমরা স্কুলের মাঠে খেলতে গেলে, তাঁকে সেখানে পাওয়া যেতো। স্কুলের মাঠ ছিলো বড়দের তাশ খেলার আড্ডা আর ছোটদের বল খেলার প্রতিযোগিতা। সরগরম হয়ে উঠতো স্কুলের মাঠ। যারা খেলতেন না, তারাও কেউ কেউ হুক্কা বিড়ি নিয়ে মাঠের চারিদিকে খেলা দেখতো যেনো প্রতিদিনই ম্যারাডনার আর মেসির খেলা হচ্ছে। এই ফুটবল খেলায় আমি আর মুসা একটা ট্রিক্স সব সময় করতাম যাতে আমি আর মুসা সব সময় একই টিমে থাকি। সেটা পরে বলি। যেই না মাগরেবের আজান পড়লো, সবাই যার যার বাড়িতে যাওয়া। অদ্ভুত একটা সময় পার হয়েছে তখন।

সেকান্দর মামুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো আরজুদের বাড়ি। আরজুদের পেশা ছিলো মাছ বিক্রি করা। আরজুরা আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ মানুষেরই পেশা ছিলো মাছ ধরা আর মাছ বিক্রি করা। কিন্তু কোনোভাবেই এটা জেলেপাড়ার মতো না। আরজুদের বাড়ির উঠোন ছিলো অনেক বড় আর এই উঠোনের চারিদিকে ছিলো ওদের অন্যান্য পারিবারিক বাড়িঘর। আরজু মাঝে মাঝে এমন করে মদ খেতো যে, বাড়ির বড়রা ওকে অনেক মারলেও আরজু বেহুশ অবস্থায় উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজতো। সবাই ভাবতো মদ খেয়ে বেহুস হলে উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় মনে হয়। আরজু তখনো বিয়ে করে নাই। আরজুদের বাড়িকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন দিকে একটু এগুলেই নতুন একটা বাড়ি উঠেছিলো। ওরা আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সবেমাত্র এই গ্রামে এসেছে। সে পেশায় ছিলো গ্রাম্য ডাক্তার, নাম নুরু ডাক্তার। বর্তমানে সেই নুরু ডাক্তারের বাসা রাজেন্দ্রপুর এবং তার এক ছেলে শাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে রাজনীতি করে। যাই হোক, আরজুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো ফুল্মতি আপারদের বাড়ি। ফুল্মতি আপা আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িটা ফজলুদের বাড়ি নামে পরচিত ছিলো। ফজলুরা তিন ভাই ছিলো। এখন তারা আর কেউ বেচে নাই। তাদেরও পেশা ছিলো মাছ বিক্রি তবে কৃষি কাজও করতো ওরা। ফুল মতি আপার জামাই এর একটা নেশা ছিলো। মাঝে মাঝেই অন্য মাইয়া লোক নিয়া মসকরা করতো। খারাপ জায়গায় ও মনে হয় যেতো। সবাই ওকে একটু অন্য নজরেই দেখতো বলে আমার ধারনা। ফজলু ভাইদের বাড়ির পশ্চিমে বেশ কিছুটা জায়গা খালি ছিলো। হেটে হেটে এলে প্রথমেই পড়তো জামাল, শাখাওয়াতদের বাড়ি। জামালকে আমি খুব বেশী দেখি নাই। জামাল ১৯৭২ সালের পরে আমাদের গ্রামে আর দেখা যায় নাই। জামাল ছিলো আসল মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে জামাল যুদ্ধে গিয়েছিলো। সম্মুখ সমরে সে অংশ নিয়েছিলো। দেখতে খুব সুন্দর ছিলো জামাল। আর স্বাস্থ্য ছিলো একদম সঠিক যুবকের মতো। অনেকে বলে যে, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছে অথবা জামাল ইচ্ছে করেই আর এই গ্রামে ফিরতে চায় নাই। আমার ধারনা, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছিলো কারন ১৯৭২ সালে তাঁকে এক পরদেশী মেয়ের সাথে একবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গিয়েছিলো। জামালের ভাই শাখাওয়াত, করিম (ডাক নাম বাছন), রুপচান এরা গ্রামেই থাকতো। বর্তমানে রুপচান বিদেশ থাকে, শাখাওয়াত মারা গেছে। করিম )বাছন)ও মারা গেছে। করিমকে সবাই বাছন বলেই ডাকতো। তিনি আমাদের থেকে অনেক বইয়সে বড় ছিলো। বাছনকে আমি কাকা বলে ডাক্তাম। আমি যখন আর্মিতে চাকুরী করি কমিশনডঃ অফিসার হিসাবে, হটাত একদিন দেখলাম বাছন কাকা ক্যান্টনমেন্ট কর্পোরেট ব্রাঞ্চে সিকিউরিটির কাজ করেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলো যে, তারই এক পরিচিত মানুষ আর্মিতে অফিসার এবং সেই সেনানীবাসেই তার চাকুরী। খুবই সমীহ করতেন আমাকে। আমিও কাকা বলতাম, উনিও আমাকে কাকা বলতেন।

এই জামালদের বাড়ির উত্তর দিকে জরাজীর্ন একটা বাড়ি ছিলো জামালদেরই এক আত্তীয়ের, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে। সম্ভবত শাখাওয়াতদের বাড়ি ছিলো ওটা। খুব গরীব ছিলো শাখাওয়াতরা। জামালদের বাড়ি আর ঐ শাখাওয়াতদের বাড়ির মাঝখান দিয়েই গ্রামের হেটে চলা রাস্তাটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। জামালদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো রফিক মাষ্টারদের বাড়ি। রফিক মাষ্টারকে আমি ভাইও বলতাম আবার স্যারও বলতাম। কারন তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমসাময়ীক আবার আমার প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একটু তোতলা ছিলেন কিন্তু খুব ভালো মানূশ ছিলেন। তার একটা ছেলে ছিলো নাম, কাজল, আর একটা মেয়ে ছিলো। রিফিক ভাইয়ের স্ত্রী খুব মিষ্টি চেহাড়ার ছিলেন। বর্তমানে কাজল একটা দূর্ঘটনায় পড়ে প্রায় প্যারালাইসিস। হামদর্দে চাকুরী করতো। রফিক ভাই চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। অনেক বয়ষ্ক মানুষ, আমার অফিসে প্রায়ই আসেন এবং গল্প হয়, ভালো লাগে। রফিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো আরদশ আলীদের বাড়ি। ওরা চার ভাই এবং কোনো বোন নাই ওদের। রফিক ভাইদের বাড়ি থেকে শুরু হয় “বড় বাড়ি”। এই আরদশ আলীর অন্যান্য ভাইয়েরা হলো সার্থক আলী, মোনজর আলী, সুন্দর আলী আর একজন, নামটা মনে পড়ছে না। এই বাড়ির সব বউরা প্রায় আসর নামাজের পর ধান বারা বানতো। ওরা বেশ সচ্ছল ছিলো। এদের বাড়ির দুই ধার দিয়া উত্তর দিকে যাওয়া যেতো। রফিক ভাইদের বাড়ি আর আরদশ আলীদের বাড়ির মাঝে দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেত আবার আরদশ আলীদের বাড়ির পশ্চিম ধার দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেতো। এই দুই ধারের যে কোনো রাস্তা দিয়েই উত্তর দিকে প্রায় ২০০ গজ হেটে গেলে দুটু বাড়ি পড়তো। একটা আমাদের বাড়ি আর তার সাথে আম্বর আলী কাকাদের বাড়ি। এই দুটু বাড়ি আসলে গ্রাম থেকে একটু আলাদা থাকায় সবাই “টেক্কা বাড়ি” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে তাকাইলে গ্রামের পুব পাশ থেকে শুরু করে পশ্চিম পাশের বাড়ি পর্যন্ত সব দেখা যেতো। যাই হোক, এই আরদশ আলিদের বাড়ির উঠোন ছিলো বেশ বড়। আমরা ওখানে “কুতকুত” খেলতাম। আর উঠোনের ঠিক দক্ষিনে একটা দোকান ছিলো। এই দোকানে কেউ চা খেতে বসতো, ক্রেউ বিড়ি খাইতো, আর আমি মাঝে মাঝে শুধু মানুষদেরকে লক্ষ্য করার জন্য বসে থাকতাম কারন কোন মানুষ কি কারনে বসে থাকে, বসে বসে কি কথা বলে, কেনো বলে, কার বাড়িতে কি সমস্যা, কার সাথে কার ঝগড়া, কার সাথে কে কি মজা মারতাছে, কোথায় কার কি পরিকল্পনা সব জানা যেত। আমি বেশ ছোট ছিলাম বলে আমাকে একটা বোকা বা আহাম্মক মনে করে আমার সামনেই সবাই সব কথা বলতে পারতো। আমি মনে মনে এসব ভাবতাম আর মানুষ গুলিকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। এটা আমার এক প্রকারের নেশাই ছিলো বলা যায়।  দোকানটার লাগোয়াই হলো পায়ে চলা গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে চলা পথ। রফিক ভাইদের বাড়ির দক্ষিনে গেলে পড়তো বাহারউদ্দিনদের বাড়ি। বাহার উদ্দিন আমার ক্লাসে পড়তো। ওর বাবারা তিন ভাই ছিলো। আক্কেল আলী, বাহারের বাবা আর আলমাস। আক্কেল আলীর পেশা ছিলো “চুরি” করা, আলমাসের পেশা ছিলো “চুরি”র সাথে মাছ ধরাও। শুধু বাহারের বাবাই ছিলো ভালো মানুষ। শুনেছি আক্কেল আলীর সব ছেলেরাই নাকি এখন চুরিই করে। তার মধ্যে হাতিম আলি একজন। আলমাস, আক্কেল আলী এবং বাহারের বাবা কেউ এখন আর বেচে নাই। ওরা রফিক ভাইয়ের চাচাতো ভাই।

আরদস আলীদের বাড়ির পশ্চিম লাগোয়া যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ির দিকে সেই রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো অরিজিনাল “বড় বাড়ি”। অর্থাৎ গনি মাদবরের বাড়ি। বেশ বড় পরিবার। গনি মাদবরেরাই আসলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রন করতো। জমিদার স্টাইলে। গনি মাদবরেরা মোট চার ভাই ছিলো। গনি মাদবর, সিদ্দিকের বাবা (নামটা মনে নাই) হাকিমের বাবা (নামটা মনে নাই), সাত্তারের বাবা (নামটা মনে নাই), ল্যাংরা রফিকের বাবা আর কাদেরের বাবা আজিজ খালু। আজিজ খালু মসজিদে মাঝে মাঝে ইমামতি করতেন। কিন্তু তার ঘরেই সব ছিলো জালিমের মতো সন্তান। কাদের, ইনসান, কুতুব, আরো একজন (নাম মনে নাই) এরা ছিলো আজিজ খালুর পোলা। এই বড় বাড়িটা ছিলো জোয়ান ছেলে দিয়ে ভর্তি। এদের মধ্যে যিনি কাদের নামে পরিচিত ছিলো, সে ছিলো বেশ শ্যামলা কিন্তু ভীষন সুইট চেহারার লোক। সরাসরি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ছিলো। আমি সাধীনতার পরেও দেখেছি তাঁকে হাতে অস্র নিয়ে ঘুরতে। খুবই সাহসী ছেলে ছিলো। এই কাদের ভাই, সামসু ভাই, রফিক (ল্যাংরা রফিক), মাষ্টার রফিক, এরা সবাই সমসাময়িক ছিলো। সাধীনতার ঠিক পর পরই কাদের ভাই একটা ডাকাতী দল গঠন করে ফেলেছিলো। ওরা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অস্র দিয়ে ডাকাতি করা শুরু করেছিলো। ওদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। আমার ভাই হাবীবুল্লাহ সব সময়ই ওদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতো এবং তিনি কখনো এসব কাজকে সাপোর্ট করতেন না। তখন দেশে একটা দূর্ভিক্ষ চলছিলো কিন্তু বড় বাড়ির কখনো দূর্ভিক্ষে সাফার করতে হয় নাই বরং ওদের কাছে সব কিছুই থাকতো সারপ্লাস। এই আজিজ খালু আবার বিয়ে করেছিলো গ্রামের পুর্ব প্রান্তে বসবাসকারী দৌলত মেম্বারের বোন। দৌলত মেম্বারের সাথে এই “বড় বাড়ির” সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো সাপে নেউলের মতো। একটা শক্তি আরেকটা শক্তিকে কখনোই মূল্যায়ন করতো না বরং যখনই সুযোগ পায় তখনই এক পরিবার অন্য পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করতো। এই রেষারেষির ফলে দৌলত মেম্বারের ইমিডিয়েট আপন ছোট ভাই অর্থাৎ মুসার বাবা আর মুসার ছোট ভাই মাসুদকে প্রান দিতে হয়েছিলো। মানে হত্যা। মুসার ভাই মাসুদ ছিলো আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। একদিন কোনো এক বর্ষাকালে মাসুদকে কুকুরে কামড়ে দিয়েছিলো। ঐ সময় খুব নামকরা ডাক্তার ছিলো একজন হিন্দু লোক, যাকে সবাই “বগা” ডাক্তার নামে চিনতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই বগা ডাক্তারকে। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কিন্তু উনি বাস করতেন বিবির বাজার এলাকায়। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩/৪ কিলমিটার দূরে। তখন বিবির বাজার ছিলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। রবিবার আর বৃহস্পতিবার বসতো বাজার। মাসুদকে কুকুরে কামড়ানোর কারনে মাসুদের বাবা মাসুদকে নিয়ে বিবির বাজারের দিকে একটা ছোট কোষা নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বর্ষা। পথের মধ্যে হটাত করে বড় বাড়ির সামসু, কাদের আর ল্যাংরা রফিকের সাথে দেখা। ওরাও অন্য নৌকায় ছিলো। তখন সকাল প্রায় ১০ টা। প্রকাশ্য দিবালোক। এই প্রকাশ্য দিবালোকে হটাত করে নদীর মধ্যে সামুসু ভাই এর লিডারশীপে মাসুদের বাবাকে জবাই করা হয় আর মাসুদকে পানিতে আছাড় মারতে মারতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে ওদেরকে রক্ষা করতে গিয়েও আর পারে নাই। এর মধ্যেই এরা পালিয়ে যায়। এবার “বড় বাড়ি”র সাথে দৌলত মেম্বারদের বাড়িত শত্রুতাটা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে তীব্র আকার ধারন করে। এর ফলশ্রুতিতে মামলা হয়, কেস হয়, বড়রা গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে বাস করতে শুরু করে, আরো অনেক প্রানহানী হয়, সেই সাথে কাদেরও খুন হয়। কাদেরের খুন এখনো একটা রহস্যজনক অবস্থায় আছে। কিভাবে কাদের খুন হলো সেটা পরে বল্বো। এই “বড় বাড়ী’তে তাদের নিজস্ব মসজিদ এবং নিজস্ব করবস্থান ছিলো যা এখন মসজিদটা আরো বড় হয়েছে বটে কিন্তু কবরস্থানটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বিলীন। ঐ কবরস্থানেই শুয়ে আছেন আমার মা আর আমার খালা। এটা সিদ্দিকদের বাড়ির একেবারেই লাগোয়া আর আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০/৬০ গজ দূরে।

সিদ্দিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই লাগোয়া ছিলো পিয়ার আলী নামে ওদের বাড়ি। লম্বা মানুষ, কোনোদিন শার্ট পরেছে কিনা আমার চোখে পড়ে না। মাছ বিক্রি করতো। গ্রামের মধ্যে যে কয়জন গরীব হালের মানুষ ছিলো, পিয়ার আলিরা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো রকমে বেচে ছিলো। ঘরটাও খুব জরাজীর্ন ছিলো। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলো অত্যান্ত ভালো। খুব সকালে দেখতাম পিয়ার আলী, মাথায় মাছের খাড়ি নিয়ে খালী গায়ে মাছ নিয়ে সদরঘাট বা শ্যামবাজারে যেতো। আমাদের গ্রামে আসলে যে কয়জন খুব সকালে দল বেধে মাছের খাড়ি নিয়ে হু হু করে খালী গায়ে ছুটতো শ্যমবাজারের দিকে তারা সবাই আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতো। আম্বর আলী কাকা, পিয়ার আলী, আরজু, আরদস আলীর বড় ভাই, আরো অনেকে। ওরা ফিরে আসতো প্রায় দুপুরের দিকে। তারপর আর ওদের কোনো কাজ থাকতো না। ফলে এই দলটা মাঝে মাঝেই বাঙলা মদ খেতো।

এই পিয়ার আলীদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো মংগল মাদবরের বাড়ি। খুব সুশ্রী একজন সুন্দর মানুষ। তার কোনো সন্তান ছিলো না। বড় বউ ছিলেন বাঞ্জা, তাই তিনি সন্তানের আশায় মংগল মাদবর আরেকবার বিয়ে করেন। দুটু বউই ছিলো অসধারান সুন্দুরী। দুই বউ ই পান খেতো। সুন্দুরী মেয়েরা পান খেলে আরো সুন্দর লাগে। গ্রামে যে কয়টা টিউব ওয়েল ছিলো গ্রামের মানুষের পানি নেয়ার জন্য, এই মংগল মাদবরের বাড়িতে ছিলো একটা। আমরা সবসময় এই বাড়ি থেকেই মাটির কলসীতে করে পানি আনতাম। বড় বউ তার সন্তান হবে না জানার পর একটি পালক ছেলে নিয়েছিলেন, যার নাম ছিলো শহীদ। শহীদ আমার ক্লাসেই পড়তো। মংগল মাদবর একবার মেম্বার পদে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু তিনি পাশ করেন নাই। মংগল মাদবরের নির্বাচনী ক্যাম্পাসে আমরা শহিদ সহ স্লোগান দিতাম টিনের চোঙ্গায় করে। তখন শহীদ নিজেও বলতো- আমার ভাই তোমার ভাই, মংগল ভাই মংগল ভাই। আমরা শহীদকে বলতাম, ঐ মংগল মাদবর না তোর বাপ? ও বলতো, হ আমার বাপই তো। এতো বোকা একতা ছেলে ছিলো যে অনেক মায়া হয় এখন ওর জন্য। কার যে ছেলে ছিলো শহীদ আমরা জানতেই পারতাম না। যাইই হোক, মেম্বার পদে মংগল মাদবর পাশ করে নাই কিন্তু পাশ করেছিলো খুনের চরের লালচান ভাই যিনি পরে লালচান মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। মংগল মাদবর নিজেও একজন সচেতন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। ছোট বউ এর ঘরে পর পর চার জন মেয়ে হয়েছিলো, পরীর মতো সুন্দুরি মেয়েগুলি। তারমধ্যে নাজমা, সালমা অন্যতম। আজ ওরা কোথায় আমি জানি না। নাজমা আমার থেকে প্রায় ৩/৪ বছরের ছোট ছিলো। মংগল মাদবর আর বাহারের বাবা, রফিক মাষ্টার, আক্কেল আলী, আলমাস, বাছন, জামাল, এরা এক বংশের লোক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মংগল মাদবর ঐ সব লোকদের থেকে একটু দূরে বাড়ি বানিয়েছিলেন (প্রায় ২০/২৫টা বাড়ির পরে পশ্চিম দিকে)। ফলে বেশীরভাগ সময়ে তাদের বংশের সাথে মংগল মাদবরের অনেক কিছুই বনিবনা ছিলো না। শুনেছি, শহীদ মারা গিয়েছিলো হার্টের কারনে। সে বিয়ে করেছিলো কিনা আমার আজ মনে নাই। কারন আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম সেই ১৯৭৭ সালে যখন আমি ক্যাডেটে ভর্তি হই। এর পরে অনেকের সাথেই আমার আর যোগাযোগ ছিলো না।

২১/০৬/২০২১- মৃত্যু

মৃত্যুকে মানুষ আধারের সাথে তুলনা করে থাকে। কিন্তু এই আধার কোনো কালো রাত কিংবা অমাবশ্যার নিশি বা দিনের আলোর অভাবে নয়। যা চোখে দেখা যায় না, যার ব্যাপারে আমাদের মন এবং মস্তিষ্ক কোনো ধারনা করতে পারে না, আমাদের কাছে সেটাই একটা আধারের মতো। এই আধার কিন্তু অন্ধকার নয়, এটা এমন একটা আধার যার কোনো রং নাই, যার কোনো বর্ননা আজো কেউ দিতে পারে নাই। মানুষের হাজারো শখ থাকে। বেচে থাকার শখ, সম্পদশালী হবার শখ, অনেক ক্ষমতাধর হবার শখ, কিন্তু আজো পর্যন্ত কেউ এটা শখ করে নাই যে, সে মরতে চায়। যারা আত্তহত্যা করে, তারা ইমোশনাল, তারা শখের বশে মরনকে বরন করে না। মৃত্যু কোনো ইচ্ছে নয় যে, পুরন হবে কি হবে না, মৃত্যু তো একটা সত্য, একটা লক্ষ্য যেখানে সবাইকে যে কোনো মুল্যেই পৌছাতে হবে। আর ওখানকার সমন, গাড়ি অথবা বাহক কখন আসবে, সেটা তো কেহই বলতে পারে না। এই মৃত্যু অনেক সম্পর্ক ছেদ করে আবার এই মৃত্যুই অনেক নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কখনো কখনো মৃত্যুটাই যেনো অনেক সমস্যার সমাধান নিয়ে আসে। যদিও যার বেলায় ঘটে সে সমস্যা ছিলো না।

মৃত্যুর কারনে এমনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যেখানে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয় অথবা মেনে নিতে শিখতে হয়। হোক সেটা ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আরো বেশী করে দুশ্চিন্তায় ভোগায় যখন এটা জানা যায় যে, যে মানুষটি চলে গেছে সে সব দিক থেকে অশান্তিতেই ছিলো।

কিন্তু কোনো মানুষ যখন কাউকে না বলে চিরতরে আমাদের জীবন থেকে চোখের সামনে মৃত্যুর থাবায় হারিয়ে যায়, আর আমরা তাকে চোখের জলে ভিজিয়ে বিদায় জ্ঞাপন করি, তখন হয়তো তার দ্বারা কোনো ভুল পদক্ষেপের দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করে না, কিন্তু তার চলে যাওয়ায় যারা বেচে থাকেন তাদের জীবনে আমুল পরিবর্তন নেমে আসে বলে মাঝে মাঝে মনে হয় রাস্তাটা অন্ধকার, জীবনটা ভয়ংকর এবং আমরা সর্বত্রই একা। তখন একটা দিনও যেনো আমাদের ঠিকঠাক কাটতে চায় না। এমন কি একটা রাতও না। এই সময়ে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। অন্যদিকে দিনের আলোতে এই পার্থিব জগতে বসে মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো ধারনাই করা সম্ভব হয় না আমাদের অথচ মৃত ব্যক্তির যাত্রার শুরু থেকে শেষ অবধি রাস্তাটা তার কাছে হয়তো আমাদের থেকেও ভয়ংকর আর বিভীষিকাময়আরো অন্ধকার। এটা যেনো তার কাছে ঠিক একটা অন্ধকার টানেল, যেখানে মাঝে মাঝে আলো আসে হয়তো কিন্তু সে আলোয় কোনো কাজ হয় কিনা জানা যায় নাই।

এমন অনেক মিথ্যে মৃত্যু আসে কারো কারো জীবনে যেখানে তারা এই পার্থিব জীবনের সাথে সাময়িক সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আরেক কোনো এক অচেনা জগতে বিচরন করতে থাকে। তখন তার আশেপাশে কি হচ্ছে, কারা কি করছে, কিছুই আর তার কাছে পৌছায় না অথচ তার দেহ, তার শরীর পুরুটাই রয়েছে এই পার্থিব জগতে। এই প্রকারের মৃত্যু থেকে ফিরে আসাকে হয়তো বলা যায় কোনো মতে বাচা, হয়তো বা বলা যেতে পারে জীবনের কাছে নিশ্চিত মৃত্যুর পরাজয়, অথবা বলা যেতে পারে যে, জীবনের বেচে থাকার সময়টা এখনো শেষ হয় নাই। যখন এমনটা হয় তখন আমরা কি বলতে পারি যে, সাক্ষাত ম্রতুকে আমরা দেখতে পেয়েছি? এমন অনেক প্রশ্ন থাকতেই পারে কিন্তু আসল মৃত্যু আর মিথ্যা মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চয় এমন কোনো ব্যতিক্রম আছে যা প্রকারান্তে একটা মায়াজালের কিংবা মেঘলা আকাশের পিছনে আবছা নীল আকাসের মতো। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারে, যদি অন্তরের দৃষ্টি খুলে যায় তখন জীবিত অবস্থায় মৃত্যুকে দেখা যায়। এটা অনেক বড় স্তরের একটা ধ্যান কিংবা আরাধনা। যারা এটাকে লালন করতে পারেন, তারা স্বাভাবিক মানুষ নন। জীবনটা কিভাবে বাচবে সেটা আমাদের হাতে, আমরা জীবনটাকে দেখতে পাই, কিন্তু এটা কিভাবে দেখবো যে, মৃত্যু কখন আর কিভাবে আসবে? সেটা আজ অবধি কেউ বলতে পারে নাই।

অফিসে যাওয়ার সময় যে মানুষটার উপর নির্ভর করে আমার সকাল হতো, রাতে ঘুমানোর আগে যে মানুষগুলির উপর ভরষা করে আমার ভালো ঘুম হতো। কারনে অকারনে যখন তখন আমাদের মেজাজ কখনো ক্ষিপ্ত কিংবা বিক্ষিপ্ত অথবা উদবেলিত হতো, যখন সে আর কাছে থাকে না, তখন অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ে। অনেক মায়া লাগে। মনে হয়, সব কিছু থাকা সত্তেও যেনো কোনো কিছুই নাই। এই মায়া, এই ভরষা কিংবা এই বিক্ষিপ্ত চঞ্চলতার আর কোনো মুক্যই থাকে না সেই ব্যক্তির কাছে যে এই মাত্র সবার গোচরেই উধাও হয়ে গেলো চিরতরে। এই পরিবর্তনশীল সময়ে, অনেকেই হয়তো কথায় কথা বলে তারা ভালো আছেন, আমরা ভালো আছি কিন্তু তারা কিংবা আমরা জানিই না যে, আমাদের সময়টাই যে খারাপ যাচ্ছে। খুব মায়া হয় তখন। কিন্তু কেনো মায়া হয়, তার উত্তর আজো জানি না। যা হাতের মুঠোয় নাই, যা চিরতরে হারিয়ে যায়, অথচ একদিন হাতের কাছেই ছিলো, সেটার জন্য কেনো মায়া হয়, কেনো কষ্ট হয়, কেনো আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে হয়, তার ব্যাখ্যা নাই আমাদের কাছে। এর কিছু ব্যাখ্যা হয়তো দাড় করানো যায় যে, হয়তো পুরানো অভ্যাসে বন্দি মন বারবার আবার সেই পুরানো খাচায়ই ফিরে আসতে চায়।  অথবা এমনো হতে পারে যে, কেউ যখন আর কাছে থাকে না, তখন হয়তো এটা পরিষ্কার বুঝা যায় নিজের কতগুলি স্বকীয়তা, অভ্যাস আর পছন্দ কতো নিঃশব্দে সেই চলে যাওয়া মানুষটি নিয়ে অন্তর্ধান হয়ে গেলো, সাথে নিয়ে গেলো তার থেকে ধারে নিয়ে বেচে থাকার আমাদের অনেক পরনির্ভরশীলতার অভ্যাসগুলিও। আর সেটা যখন পরিষ্কার হয় তখন অভাবগুলির সংকট দেখা দেয়। আমরা বিচলিত হই, ভয় পাই, কষ্টে থাকি আর তখনই তার অভাবে আমরা তার উপর মায়ায় চোখ ভিজিয়ে দেই।

 তবে আজীবন একটা সত্য বচন এই যে, জীবন মানেই যাত্রা, আর এই যাত্রার শেষ প্রান্তেই থাকে মৃত্যু। অর্থাৎ জীবনের অবসানেই মৃত্যুর যাত্রা শুরু। এই নতুন পর্বের যাত্রা কখন কার কোন সময় শুরু হবে, এটা কোনো বিজ্ঞান, কোনো ডাক্তার, কোনো ধর্ম পুস্তক কিংবা কোনো ধ্যান কখনোই বলতে পারে না।

১৪/৬/২০২১-কনিকার আমেরিকার যাওয়ার ভিসা এপ্রোভড

অনেক জল্পনা কল্পনা আর প্রচেষ্টার পর আজ কনিকার ইন্টারভিউ ছিলো আমেরিকান এম্বেসী অফিসে ভিসার জন্য। খুব সকালে উঠেছি কারন সকাল ৮ টার মধ্যে ওর ভিসা অফিসে রিপোর্ট করার করহা। সাথে মিটুল ছিলো। মিটুল এম্নিতেই খুব তাড়াতাড়ি অস্থির হয়ে যায়। কিন্তু কনিকা কোনো কিছুতেই অস্থির প্রকৃতির নয়। আমার ভরষা ছিলো ইন্টারভিউতে কনিকা ভালো করবে।

আমরা ওকে এম্বেসী অফিসে সামনে নামিয়ে দিয়ে পাশেই গাড়ি পার্ক করে অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু মিটুলের যেনো এম্বেসী অফিসের গেটেই অপেক্ষা করতে বেশী সাচ্ছব্দ্য বোধ করছিলো। ফলে মিটুলকে আমি ওখানে নামিয়ে দিয়ে আমি আবারো পার্কিং লাইনে চলে এসছিলাম। বেশ কিছুক্ষন পর দেখালাম কনিকা চলে এসছে কিন্তু একা।

১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকা চুরি-২

আমরা যখন জীবিত অর্থাৎ যখন জীবন আছে আমাদের, তখন আমাদের কাছে জীবন এমনভাবে চলতে থাকে যেনো আমাদের জীবনের সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্কই নাই। কিন্তু যখন মৃত্যু একেবারেই কাছে চলে আসে, তখন এ রকম মনে হয় যেন জীবনের কোনো গুরুত্বই নাই। এক নিমিষে, চোখের পলকে সব শেষ হয়ে যায়। এই মৃত্যু না সময় দেখে আসে, না জায়গা দেখে। যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থানে সে চলেই আসে। তখন আশেপাশের সবাইকেই চমকে তো দেয়ই উপরন্ত আশেপাশের সবাইকে নাড়িয়েও দেয়। আর এর রহস্যও কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু যখন মৃত্যু নিজে আসে না, তাকে ডেকে আনা হয়, তখন তার সময়, জায়গা এবং কারন এই তিনটাই মানুষ ঠিক করে দেয়। আজ আমি এমনি একটা ট্র্যাজেডির কথা বলবো যা ঘটেছিল রস্তম নামে এক লোকের সাথে।

রুস্তম আমার ড্রাইভার ছিলো। প্রায় বছর পাচ বা তারও বেশী একনাগাড়ে রুস্তম আমার ব্যক্তিগত গাড়ী ড্রাইভিং করতো। তাহলে এখানে রোস্তমের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরি।

রুস্তম ড্রাইভার হিসাবে ততোটা অশিক্ষিত ছিলো না যা সচরাচর ড্রাইভারেরা হয়ে থাকে। পুরানো দিনের সাহিত্যিকদের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস ছিলো তার। একটু আধটু ডায়েরীও নাকি লিখতো। ভাল পল্লীগীতি গাইতে পারতো রোস্তম। গলার সুরও ভালই ছিলো। মাঝে মাঝেই আমি ওকে গারি চালানর সময় রেডিও না শুনে ওর নিজের গলায় গান শুনতাম। বিবাহিত ছিলো বটে কিন্তু মাঝে মাঝে নেশা করার কারনে রোস্তমের প্রথম স্ত্রী তাকে একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা রেখে লন্ডনে চলে যায়। রোস্তম কখনোই তার স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করতো না। সে খুব মিস করতো তার স্ত্রীকে। গাড়ী চালাতে চালাতে রোস্তম প্রায়ই সে তার স্ত্রীর কথা বলতো। বলতে বলতে কখনো সে খিলখিল করে হেসে উঠত, কখনো কখনো খুব উদাসিন হয়ে যেতো আবার কখনো কখনো চুপ থেকে চোখের জলও ফেলতো। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একবার আমি রোস্তমকে দ্বিতীয় বিয়ের তাগিদ দিলে সে আমার কথা মেনে বিয়েও করেছিল। কিন্তু এবার স্ত্রীটাই খারাপ ছিল। বিয়েটা টিকে নাই। রুস্তম খুব বিশ্বস্ত ছিলো। চুরি চামারীর কোন অভ্যাস ছিলো না। তবে মাঝে মাঝেই রোস্তম দরকারে আমার কাছে এমনভাবে টাকা চাইতো যে, আমি কখনো ওকে না করতে পারিনি। দিতাম। রোস্তম ছিলো খুবই বিশ্বস্ত ছিলো। এমনি বিশ্বস্ত ছিলো যে, মাঝে মাঝে এমনো হতো, শুধু ওকে একা গাড়ি পাঠিয়েই আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে অন্য ফ্যাক্টরীতে কোটি টাকাও পাঠিয়েছি। আর রুস্তম সেটা জানতো। কখনোই সে এদিক সেদিক করে নাই।

কিন্তু একদিন………

একদিন রুস্তম আমার অন্য আরেকটি ফ্যাক্টরির মাত্র তিন লাখ টাকার শ্রমিকদের সেলারি নিয়ে গাড়ী রেখে কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেলো। বিকেল থেকে রাত অবধি কোথাও খুজে না পেয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, রুস্তম তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। ওর মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিলো। টাকাটা চুরি করে রুস্তম পালিয়েছে এই কষ্টে যতোটা না কষ্ট পেয়েছি, তার থেকে বেশী কষ্ট লেগেছে রুস্তমের কাছ থেকে এটা আমি কখনোই আশা করিনি। রুস্তমকে আমি সেলারীর বাইরেও যে কতটাকা দিতাম সেটা আমি কখনো হিসাব করিনি। ওকে আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সব খরচপাতিও দিয়েছি;লাম। রুস্তম গাড়ি চালালে আমি নিশ্চিন্তে মনে গাড়িতে ঘুমাতে পারতাম। কারন জানি, রুস্তম যেমন ভালো ড্রাইভার ছিলো তেমনি আমি ঘুমিয়ে পড়েছি দেখে আমার শরির যেনো ঝাকুনি না খায় এবং ঘুম ভেংগে না যায় সেটাও সে নজরে রাখতো।

রুস্তম আমাদের এলাকায় প্রায় ৩০ বছর যাবত বাস করতো। চুরির পরে রুস্তম সেই পুরাতন জায়গায় আর কখনো ফিরে আসেনি। আমি অনেক খুজতাম ওকে, আশেপাশের লোকজন এমনিতেই জেনে গিয়েছিল যে, রস্তম আমার কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। ফলে আমি জানতাম, কেউ ওকে কোথাও দেখলে খবরটা আমার কাছে আসবেই। কিন্তু সে রকমের কোন খবর আমি আর কখনো পাইনি।

অনেকদিন পর, প্রায় মাস চারেক হবে। হটাত করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে আমার কাছে একটা চিঠি আসে। বেশ বড় একটা চিঠি। প্রায় ২২ পাতার। চিঠিটি খুলেই আমি কে লিখেছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য চিঠির শেষে কার নাম লেখা পড়তে গিয়েই আমি থমকে গিয়েছিলাম। রুস্তমের চিঠি। হটাত করে বুকটা আতকে উঠেছিলো। রুস্তমের চেহারাটা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার ভেসে উঠলো। মুখ ভর্তি পান, কালো ঠোট, বেটে মানুষ, মাথায় হালকা চুল, মুখে হাসি। এটাই রুস্তম ছিলো। ওর পুরু চিঠিটা এখানে লিখলাম না কিন্তু ওর কিছু চুম্বকঅংশ এই রকম ছিলোঃ (বিশেষ দ্রষ্টব্য যে, রুস্তম বেশ গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারতো, আর যুক্তির কথাও বলতো)।

আমার প্রিয় স্যার,

…………………… জীবনে সে সব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিঃস্বার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাদের সাথে আমাদের করা এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দাড়ায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা আজীবন দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে কেউ ঘৃণা করতে শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুৎসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোনো সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের তিরোধানে সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।

আমার প্রিয় মেজর স্যার,

আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা সময় পার করছি। আমি আপনার কাছ থেকে যে তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছিলাম, টাকাগুলি আমার কোনো কাজেই লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না।

(রোস্তমের চিঠির ১৩ তম পাতার কিছু অংশ)…………

জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার, সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, একসময় দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।

৯১৬ তম পাতার কিছু অংশ……………)

আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না। খুব বেকুফ মনে হয়েছে আমাকে।

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। রোস্তমের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিলো। আমি আসলে রোস্তমকে খুব স্নেহই করতাম। যাই হোক, অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-

আমার স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কোনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন-বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না-সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে-কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষপান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনারও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না। কিন্তু আমি জানি, আপনার সাথে আমার আর কখনো দেখা হবে না। আমার জিবনে সত্যি বলতে আপনি ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আপনি গাড়িতে ঘুমালে আমি আয়নায় দেখতাম, কি অসম্ভব একটা রাগী মানুষ কত নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ঘুমুচ্ছেন, খুব মায়া হতো আমার। আমার উপরে ভরষা করে আপনি ঘুমুচ্ছেন ভেবে আপনার ঘুম ভেংগে যাবে এই ভয়ে আমি গাড়ির স্পীডকে রিক্সার পিছনেও চালিয়ে নিতাম। আমি আপনাকে অনেক মায়া করি, ভালবাসি। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়েন।

ইতি- আপনার স্নেহের অপরাধি রোস্তম।

চিঠিটা পাওয়ার পর আমি রোস্তমের ব্যাপারে তারই এক আত্তীয়ের কাছে (যিনি ভাড়া থাকেন আমার মহল্লায়) জানতে পেরেছি যে, রোস্তম পথের ধারে কাটা তারের বেড়া থেকে তার কেটে গলায় পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মৃত্যুর তারিখটা জেনে আরো খারাপ লেগেছিলো। রস্তম তার মৃত্যুর চারদিন আগে সে আমাকে এই চিঠিটা পোষ্ট করেছিল।

খবরটা শুনে মনের ভিতরে অসম্ভব ব্যথা অনুভুত হয়েছিলো। খুব করে ভাবলাম, ইশ যদি রোস্তম একবার সাহস করে আবার আমার সামনে আসতো, ইশ যদি রোস্তমকে আমি আবারো খুজে পেতাম, আমি আবার ওকে আমার ড্রাইভার হিসাবেই রাখতাম। রোস্তম আমার বাসা চিনতো, আমার অফিস চিনতো, সে আমাকেও চিনতো। অথচ মনের ভিতরের সাহসটাকে সে একত্রিত করে আমার সামনে আসার মনোবলটা ছিলো না। আমি আজো মাঝে মাঝে রোস্তমের কথা ভাবি। আর ভাবি, কতটা যন্ত্রনা নিয়ে রোস্তম কাটাতার পেছিয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর কতোটা যন্ত্রনায় সে মারা গেছে। খুব ভাবি যে, কাটাতারে যখন রোস্তম মারা যাচ্ছিল, তখন কি সে আবারো বাচতে চেয়েছিল?

সম্ভবত, বাচতে চেয়েছিল কিন্তু তখন মৃত্যু তার এতোটাই কাছে ডেকে আনা হয়েছে যে, তার আর ফিরে যাবে কোন অবকাশ ছিলো না। রস্তমকে নিয়েই যমদূত এই দুনিয়া থেকে চলে গেছে।

১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকাচুরি-২

আমরা যখন জীবিত অর্থাৎ যখন জীবন আছে আমাদের, তখন আমাদের কাছে জীবন এমনভাবে চলতে থাকে যেনো আমাদের জীবনের সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্কই নাই। কিন্তু যখন মৃত্যু একেবারেই কাছে চলে আসে, তখন এ রকম মনে হয় যেন জীবনের কোনো গুরুত্বই নাই। এক নিমিষে, চোখের পলকে সব শেষ হয়ে যায়। এই মৃত্যু না সময় দেখে আসে, না জায়গা দেখে। যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থানে সে চলেই আসে। তখন আশেপাশের সবাইকেই চমকে তো দেয়ই উপরন্ত আশেপাশের সবাইকে নাড়িয়েও দেয়। আর এর রহস্যও কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু যখন মৃত্যু নিজে আসে না, তাকে ডেকে আনা হয়, তখন তার সময়, জায়গা এবং কারন এই তিনটাই মানুষ ঠিক করে দেয়। আজ আমি এমনি একটা ট্র্যাজেডির কথা বলবো যা ঘটেছিল রস্তম নামে এক লোকের সাথে।

রুস্তম আমার ড্রাইভার ছিলো। প্রায় বছর পাচ বা তারও বেশী একনাগাড়ে রুস্তম আমার ব্যক্তিগত গাড়ী ড্রাইভিং করতো। তাহলে এখানে রোস্তমের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরি।

রুস্তম ড্রাইভার হিসাবে ততোটা অশিক্ষিত ছিলো না যা সচরাচর ড্রাইভারেরা হয়ে থাকে। পুরানো দিনের সাহিত্যিকদের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস ছিলো তার। একটু আধটু ডায়েরীও নাকি লিখতো। ভাল পল্লীগীতি গাইতে পারতো রোস্তম। গলার সুরও ভালই ছিলো। মাঝে মাঝেই আমি ওকে গারি চালানর সময় রেডিও না শুনে ওর নিজের গলায় গান শুনতাম। বিবাহিত ছিলো বটে কিন্তু মাঝে মাঝে নেশা করার কারনে রোস্তমের প্রথম স্ত্রী তাকে একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা রেখে লন্ডনে চলে যায়। রোস্তম কখনোই তার স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করতো না। সে খুব মিস করতো তার স্ত্রীকে। গাড়ী চালাতে চালাতে রোস্তম প্রায়ই সে তার স্ত্রীর কথা বলতো। বলতে বলতে কখনো সে খিলখিল করে হেসে উঠত, কখনো কখনো খুব উদাসিন হয়ে যেতো আবার কখনো কখনো চুপ থেকে চোখের জলও ফেলতো। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একবার আমি রোস্তমকে দ্বিতীয় বিয়ের তাগিদ দিলে সে আমার কথা মেনে বিয়েও করেছিল। কিন্তু এবার স্ত্রীটাই খারাপ ছিল। বিয়েটা টিকে নাই। রুস্তম খুব বিশ্বস্ত ছিলো। চুরি চামারীর কোন অভ্যাস ছিলো না। তবে মাঝে মাঝেই রোস্তম দরকারে আমার কাছে এমনভাবে টাকা চাইতো যে, আমি কখনো ওকে না করতে পারিনি। দিতাম। রোস্তম ছিলো খুবই বিশ্বস্ত ছিলো। এমনি বিশ্বস্ত ছিলো যে, মাঝে মাঝে এমনো হতো, শুধু ওকে একা গাড়ি পাঠিয়েই আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে অন্য ফ্যাক্টরীতে কোটি টাকাও পাঠিয়েছি। আর রুস্তম সেটা জানতো। কখনোই সে এদিক সেদিক করে নাই।

কিন্তু একদিন………

একদিন রুস্তম আমার অন্য আরেকটি ফ্যাক্টরির মাত্র তিন লাখ টাকার শ্রমিকদের সেলারি নিয়ে গাড়ী রেখে কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেলো। বিকেল থেকে রাত অবধি কোথাও খুজে না পেয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, রুস্তম তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। ওর মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিলো। টাকাটা চুরি করে রুস্তম পালিয়েছে এই কষ্টে যতোটা না কষ্ট পেয়েছি, তার থেকে বেশী কষ্ট লেগেছে রুস্তমের কাছ থেকে এটা আমি কখনোই আশা করিনি। রুস্তমকে আমি সেলারীর বাইরেও যে কতটাকা দিতাম সেটা আমি কখনো হিসাব করিনি। ওকে আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সব খরচপাতিও দিয়েছি;লাম। রুস্তম গাড়ি চালালে আমি নিশ্চিন্তে মনে গাড়িতে ঘুমাতে পারতাম। কারন জানি, রুস্তম যেমন ভালো ড্রাইভার ছিলো তেমনি আমি ঘুমিয়ে পড়েছি দেখে আমার শরির যেনো ঝাকুনি না খায় এবং ঘুম ভেংগে না যায় সেটাও সে নজরে রাখতো।

রুস্তম আমাদের এলাকায় প্রায় ৩০ বছর যাবত বাস করতো। চুরির পরে রুস্তম সেই পুরাতন জায়গায় আর কখনো ফিরে আসেনি। আমি অনেক খুজতাম ওকে, আশেপাশের লোকজন এমনিতেই জেনে গিয়েছিল যে, রস্তম আমার কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। ফলে আমি জানতাম, কেউ ওকে কোথাও দেখলে খবরটা আমার কাছে আসবেই। কিন্তু সে রকমের কোন খবর আমি আর কখনো পাইনি।

অনেকদিন পর, প্রায় মাস চারেক হবে। হটাত করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে আমার কাছে একটা চিঠি আসে। বেশ বড় একটা চিঠি। প্রায় ২২ পাতার। চিঠিটি খুলেই আমি কে লিখেছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য চিঠির শেষে কার নাম লেখা পড়তে গিয়েই আমি থমকে গিয়েছিলাম। রুস্তমের চিঠি। হটাত করে বুকটা আতকে উঠেছিলো। রুস্তমের চেহারাটা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার ভেসে উঠলো। মুখ ভর্তি পান, কালো ঠোট, বেটে মানুষ, মাথায় হালকা চুল, মুখে হাসি। এটাই রুস্তম ছিলো। ওর পুরু চিঠিটা এখানে লিখলাম না কিন্তু ওর কিছু চুম্বকঅংশ এই রকম ছিলোঃ (বিশেষ দ্রষ্টব্য যে, রুস্তম বেশ গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারতো, আর যুক্তির কথাও বলতো)।

আমার প্রিয় স্যার,

…………………… জীবনে সে সব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিঃস্বার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাদের সাথে আমাদের করা এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দাড়ায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা আজীবন দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে কেউ ঘৃণা করতে শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুৎসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোনো সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের তিরোধানে সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।

আমার প্রিয় মেজর স্যার,

আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা সময় পার করছি। আমি আপনার কাছ থেকে যে তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছিলাম, টাকাগুলি আমার কোনো কাজেই লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না।

(রোস্তমের চিঠির ১৩ তম পাতার কিছু অংশ)…………

জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার, সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, একসময় দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।

৯১৬ তম পাতার কিছু অংশ……………)

আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না। খুব বেকুফ মনে হয়েছে আমাকে।

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। রোস্তমের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিলো। আমি আসলে রোস্তমকে খুব স্নেহই করতাম। যাই হোক, অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-

আমার স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কোনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন-বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না-সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে-কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষপান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনারও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না। কিন্তু আমি জানি, আপনার সাথে আমার আর কখনো দেখা হবে না। আমার জিবনে সত্যি বলতে আপনি ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আপনি গাড়িতে ঘুমালে আমি আয়নায় দেখতাম, কি অসম্ভব একটা রাগী মানুষ কত নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ঘুমুচ্ছেন, খুব মায়া হতো আমার। আমার উপরে ভরষা করে আপনি ঘুমুচ্ছেন ভেবে আপনার ঘুম ভেংগে যাবে এই ভয়ে আমি গাড়ির স্পীডকে রিক্সার পিছনেও চালিয়ে নিতাম। আমি আপনাকে অনেক মায়া করি, ভালবাসি। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়েন।

ইতি- আপনার স্নেহের অপরাধি রোস্তম।

চিঠিটা পাওয়ার পর আমি রোস্তমের ব্যাপারে তারই এক আত্তীয়ের কাছে (যিনি ভাড়া থাকেন আমার মহল্লায়) জানতে পেরেছি যে, রোস্তম পথের ধারে কাটা তারের বেড়া থেকে তার কেটে গলায় পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মৃত্যুর তারিখটা জেনে আরো খারাপ লেগেছিলো। রস্তম তার মৃত্যুর চারদিন আগে সে আমাকে এই চিঠিটা পোষ্ট করেছিল।

খবরটা শুনে মনের ভিতরে অসম্ভব ব্যথা অনুভুত হয়েছিলো। খুব করে ভাবলাম, ইশ যদি রোস্তম একবার সাহস করে আবার আমার সামনে আসতো, ইশ যদি রোস্তমকে আমি আবারো খুজে পেতাম, আমি আবার ওকে আমার ড্রাইভার হিসাবেই রাখতাম। রোস্তম আমার বাসা চিনতো, আমার অফিস চিনতো, সে আমাকেও চিনতো। অথচ মনের ভিতরের সাহসটাকে সে একত্রিত করে আমার সামনে আসার মনোবলটা ছিলো না। আমি আজো মাঝে মাঝে রোস্তমের কথা ভাবি। আর ভাবি, কতটা যন্ত্রনা নিয়ে রোস্তম কাটাতার পেছিয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর কতোটা যন্ত্রনায় সে মারা গেছে। খুব ভাবি যে, কাটাতারে যখন রোস্তম মারা যাচ্ছিল, তখন কি সে আবারো বাচতে চেয়েছিল?

সম্ভবত, বাচতে চেয়েছিল কিন্তু তখন মৃত্যু তার এতোটাই কাছে ডেকে আনা হয়েছে যে, তার আর ফিরে যাবে কোন অবকাশ ছিলো না। রস্তমকে নিয়েই যমদূত এই দুনিয়া থেকে চলে গেছে।

১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকা চুরি-১

আমার ড্রাইভার ছিলো রুস্তম। একবার রুস্তম আমারে বল্লো যে, ওর কাছে যদি ৩ লাখ টাকা থাকে তাহলে ওর জীবন নাকি সে বদলিয়ে ফেলবে। খুব ভালো কথা। বললাম, ৩ লাখ টাকা যদি পাস, তাহলে কি করবি? রুস্তম বল্লো যে, সে ২টা পুরানো সিএনজি কিনবে। একটা নিজে চালাবে আরেকটা ভাড়ায় চালাবে। তাতে প্রতিদি সে পাবে ১২০০ টাকা। তারমানে মাসে ৩৬ হাজার টাকা। ওর খরচ লাগে মাসে ১৬ হাজার টাকা। তারমানে মাসে সে ২০ হাজার সেভ হবে। বছরে সেভ হবে আড়াই লাখ টাকা। সেই আড়াই লাখ টাকা দিয়া সে আরেকটা পুরানো সিএনজি কিনবে। এভাবে ২/৩ বছর পর সে গাড়ি কিনবে। যদি গাড়ি কিনে, তাহলে ওর প্রতিদিন লাভ হবে ২ হাজার টাকা। এভাবে সে হিসাব করে দেখলো যে, ৫ বছর পর তার হাতে আসবে প্রায় ২০ লাখ টাকা, ৩ টা সিএনজি আর একটা গাড়ি। হিসাবটা একদম ঠিকঠাক ছিলো। কিন্তু শুধু একটা জায়গায় হিসাবটা শুরু করা যাচ্ছিলো না। প্রাথমিক ৩ লাখ টাকা সে পাবে কোথায়?

রুস্তম আমার অনেক দিনের ড্রাইভার। প্রায় ৭ বছর। এই বছর গুলিতে আমি এমনো হয়েছে যে, ব্যবসার জন্য কোটি কোটি টাকাও ওকে দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠিয়েছি। ফ্যাক্টরীর সেলারী আনার সময় কিংবা সাব কন্ট্রাক্ট ফ্যাক্টরীতে ইমারজেন্সী ভাবে টাকা অয়াঠানোর জন্য। কোনোদিন রুস্তমের মধ্যে কোনো গড়বড় দেখি নাই। কিন্তু একদিন-সে আমার ব্যাগ থেকে ৩ লাখ টাকা চুরি করে পালালো।

 চুরি করার পর এক মাস পালিয়ে পালিয়ে থাকলো। অনেক খুজাখুজি করেছি, ওর গ্রামের বাড়ি, ওর বর্তমান শশুর বাড়ি, কিংবা ওর প্রাক্তন শশুড় বাড়িতেও। কিন্তু রুস্তমের কোনো হদিস পাওয়া যায় নাই। অগত্যা মনের রাগ মিটানোর জন্য ওর নামে একটা চুরির মামলাও করেছিলাম। কোথাও না পেয়ে আমি ওকে খোজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম এই কারনে যে, রুস্তম যদি ঐ ৩ লাখ টাকা কাজে লাগিয়ে কিছু করতে পারে, তাহলে করুক। ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর কোনো আক্ষেপ বা রাগ রাখতে চাইনি।

 

 অতঃপর প্রায় ৫ মাস পরে একদিন আমি একটা বিশাল চিঠি পেলাম। ২২ পাতার চিঠি। চিঠিটা আমি পড়তে চাইনি কিন্তু চিঠিটার প্রথম লাইনেই যে কথাটা লিখা ছিলো, তার জন্যই আমি পুরু চিঠিটা পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। আর সে লাইনটা ছিলো- “যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন”।

 যেদিন আমি চিঠিটা পাই, তার প্রায় ৪ দিন আগে রুস্তম তারের কাটা গলায় ফাসি দিয়ে আত্তহত্যা করেছিলো। আমার প্রায়ই ওর কথা মনে পড়ে। আমি ভাবি যে, যদি রুস্তম সাহস করে আবার আমার কাছে আসতো, আমি ওকে আবার রাখতাম আমার ড্রাইভার হিসাবে। আমি ওরে ক্ষমা করে দিছি। আমিও ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার ভালোবাসা ওকে ঠেকাতে পারে নাই। এটা আমার ব্যর্থ তা নাকি ওর ভীরুতা আজো আমি বুঝতে পারি নাই। কিন্তু এটা ওরও ব্যর্থতা।

 রুস্তম মাঝে মাঝে খুব ভালো কবিতা লিখতো। আর ড্রাইভিং করার সময় আমাকে মুখস্ত ওর লেখা কবিতা শুনাতো। আমি অবাক হতাম, রুস্তম খুব ভালো কবিতা লিখে। প্রথম প্রথম ভাবতাম, সম্ভবত রুস্তম কারো কবিতা চুরি করে, কিন্তু পরে বুঝেছি- রুস্তম আসলেই লিখে।

 রুস্তমের লেখা ২২ পাতার চিঠির কিছু চুম্বক অংশ আমি তুলে ধরি।

 জীবনে সেসব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিসসার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাহাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাহাদের সাথে এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দারায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় যা হয়, তা হচ্ছে, হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তাহার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুসচিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর নিজেকে ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে নিজে ঘৃণা করতে কেউ শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুতসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোন সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের জন্য সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।

স্যার, আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা কাল পার করছি। টাকাগুলি আমার কোনো কাজে লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না। আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না।

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-

স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন- বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না- সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংগকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে- কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষ পান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনার ও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না।

আমি রুস্তমের চিঠিটা পড়ছি, আর খুব ভয় পাচ্ছিলাম। রুস্তম তার চিঠির ২১ পাতায় লিখেছে-

জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার,  সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, এক সময় দেহ দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।

————————————————————————————

চোখ দিয়ে কখন যে পানি পড়ছিলো, বুঝি নাই। আমিও রুস্তমকে স্নেহ করতাম, ভালোবাসতাম। কিন্তু ওকি একবার সাহস করে আবার ফিরে আসতে পারতো না? আমি ওর শেষ ঠিকানাটা জানলে হয়তো নিজেই ডেকে নিতাম। ভুল তো মানুষ করেই। কিন্তু সেটা জীবন দিয়ে মাশুল দেয়ার মতো শাস্তিতে নয়।

 (আমি রুস্তমের চিঠিটা ছিড়ে ফেলিনি। আজ আমার সব পরিত্যাক্ত কাগজপত্র ড্রয়ার থেকে পরিষ্কার করতে গিয়ে রুস্তমের সেই ২২ পাতার চিঠিটাও পেলাম। সেটা আজ আমি ছিড়ে ফেললাম।)

১১/৬/২০২১-কালো

কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু এমন কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? আসলে কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। কিন্তু এই কালোই যখন কোনো মানুষের গায়ের রং হয় তখন এটা সবচেয়ে বিড়ম্বনার একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কালো মানুষের গল্পের কাহিনী যদি কেউ শোনেন, দেখা যাবে গায়ের রং এর কালো মানুষের গল্পটা সবার থেকে আলাদা বিশেষ করে সেই ব্যক্তিটি হয় কোনো মেয়ে মানুষের গল্প। কালো মেয়েদের অনেক কথা তাদের মনেই রয়ে যায়। কাউকে তারা বলতেও পারে না। কে শুনবে তাদের কথা? মেয়েরা কালো হলে সেই ছোট বেলা থেকেই সমাজের সবার আকার- ইংগিতের ভাষায় তারা এটাই মনে করতে থাকে যে, কালো মুখ একটা অপয়ার ছায়া যেনো। আর এই অপবাদ থেকেই তাদের মনে এবং মস্তিষ্কে হীন মন্যতা বাসা বাধে। তাদের নিজের উপর নিজেদের কনফিডেন্স কমতে থাকে। অথচ এই কালো হয়ে জন্মানোর পিছনে তাদের না আছে কোনো হাত, না আছে তাঁকে পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা। কালো রং, বা শ্যামলা রং যদি অভিশাপই হতো তাহলে “কৃষ্ণের” কালো রং কোনো অভিশাপ নয় কেনো? এই কালো ক্রিষনকে তো তার সমস্ত কালো রং নিয়েও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তাঁকে সম্মান করে, ভালোবাসে, পুজা করে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার এটাই যে, কৃষ্ণ ছাড়া পৃথিবীর তাবদ মেয়ে মানুষকে এই কালো রং কে মানুষ তাদের ঘাটতি হিসাবেই দেখা হয়। ফলে নিজের কালো রং এর কারনে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে সমাজের সবার কাছেই তাচ্ছিল্যের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এমনো ধারনা করা হয় যে, ফর্সা মানে সুন্দর আর কালো মানে কুৎসিত। ছেলে সে যতোই কুৎসিত হোক না কেনো তার ও ফর্সা মেয়ে চাই, আর যদি কোনো মেয়ের গায়ের রং হয় কালো, তার তো এম্নিতেই হাজার সমস্যা, তার আবার কালো আর ধলা ছেলে পাওয়ার কোনো স্প্রিহাই তো নাই।

কালো পোষাক পড়লে আমরা নিজেকে সুন্দর মনে করি, কালো টিপকে আমরা শুভ বলে মানি। কথায় আছে কালো টিপ কুনজর থেকে বাচায়। মুখের উপর কালো তিলে আমাদেরকে সুন্দর দেখায়। কিন্তু কোনো মানুষের গায়ের রং যদি কালো হয় তাহলে তাঁকে আমরা কুৎসিত বলতে দ্বিতীয়বার ভাবি না। খুবই আসচর্জ চিন্তাধারা।

সউন্দর্জ আসলে কোনো রং নয়। অথচ এই সউন্দর্জ যেনো সব নির্ভর করে কালো ছাড়া অন্য আর সব রং এর উপরে। কেনো? এর উত্তর একটাই- আমরা কালো আর সুন্দর্জের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না। যখন চোখ শরীর থেকে মনের ভিতরে যায়, তখন মানুষের মনের ভিতরের সউন্দর্য দেখা যায়। আমাদের এই ক্ষমতা সবার থাকে না কিভাবে আমাদের চোখ শরীর থেকে মনের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। আমাদের নিজের এই গুনের অভাবেই আমরা কোনো কালো মেয়ের ভিতরের রুপ দেখতে পাই না আবার এটাও পাই না যে, কোনো ফর্সা মেয়ের মনের ভিতরে কতটা কুৎসিত চরিত্র রয়েছে। আর দেখতে পাই না বলেই কোনো কালো মেয়ে কারো জীবনে অন্ধকার মনে হয় আর কারো কাছে সে আলোর দুনিয়ার মতো একেবারে পরিষ্কার। আসলে গায়ের রং নয়, যার কর্মকান্ড কালো, সেইই কালো। কালো গায়ের রং কোনোভাবেই দুনিয়ায় অশুভ হতে পারে না।

এটা খুবই জরুরী যে, আমরা এই রং বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসি, নিজের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসি যাতে প্রকৃতির তৈরী সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি মানুষ তাঁকে দেখতে যেমনি হোক না কেনো তাঁকে সম্মান করি।

১০/৬/২০২১-কনিকার জন্য লিখা

নতুন জায়গায় নতুন দেশের নতুন নিয়মে তুমি সম্পুর্ন আলাদা পরিবেশে একটা নতুন জীবন ধারায় নতুন ক্যারিয়ার তৈরী করার জন্য দেশ ছেড়ে সুদূর আমেরিকায় যাচ্ছো। তুমি এদেশের কোন চাপ, কোনো বিরহ নিয়ে ওখানে বাস করবে না, না কোনো কারনে মন খারাপ করবে। একদম ফ্রেস মাইন্ডে যাবে আর ফ্রেস করে শুরু করবে সব। মন দিয়ে নিজের সপ্ন পুরু করার চেষ্টা করবে কিন্তু সব সময় শরীরের দিকে যত্ন নিতে হবে। আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ।

গল্পটা তোমার, সপ্নটা তোমার। এই আজ থেকে তুমি একটা জার্নি শুরু করলে যার একমাত্র যাত্রী তুমি নিজে। জীবনের মজাটা হচ্ছে- কিছু কিছু জিনিষ এমন হয় যেটা অবিশ্বাস্য লাগে কিন্তু তুমি বুঝতে পার- হ্যা এটা হয়েছে। তখন নিজের থেকেই বিশ্বাস হয়ে যায়।

নতুন কাজ, নতুন পরিবেশ, কিন্তু নিজেকে বদলে ফেলো না। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। তুমি চলে যাবার পর হয়তো আমাদের এখানে অনেক কিছুই পালটে যাবে। পালটে যাবে কোনো এক সন্ধ্যায় পিজা খাওয়ার কিছু আনন্দঘন মুহুর্ত, পালটে যাবে কোনো এক ছুটির দিনে দল্বেধে বাইরে গিয়ে খেতে যাওয়ার আসর কিংবা পালটে যেতে পারে আমাদের অনেক দইনিন্দিন কিছু কর্ম কান্ড ও। আমাদের এই পরিবর্তন কোনো নতুন কিছু হয়তো নয়, এটা একটা এডজাষ্টমেন্ট, যা তোমার অনুপস্থিতিতে আমাদের আনন্দের সাথে বেচে থাকার নিমিত্তে। কিন্তু তোমার বদলে যাওয়া অন্য রকম। তুমি বদলাবে সেটা যাতে তোমার ভালোটা হয়।

আমি তোমাকে কোনো কিছুতেই কখনো আটকাই নাই, না কখনো আটকাবো। কিন্তু তুমি আমার নিজের মেয়ে, আমার বহু আদরের সন্তান। যদি এমন কখনো হয় যে, আমি তোমাদের কারনে দুশ্চিন্তায় থাকি, তখন হয়তো সমস্ত আবেগ, মায়া আর ভালোবাসা উপেক্ষা করেই হয়তো আমি তোমাকে আটকাবো। সেটা যেনো আমাকে করতে না হয়। প্রাইওরিটি ঠিক করতে হবে জীবনে। সব সময় আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবে। জীবনে ব্যস্ততা থাকবে কিন্তু এতোটা না যাতে ফ্যামিলি ডিপ্রাইভড হয়। তুমি যদি ভালো ফলাফল করতে না পারো, এর মানে এই নয় যে, আমার ভালোবাসা তোমার উপর কমে যাবে। তুমি যদি তোমার ডিজায়ার্ড রেজাল্ট না করতে পারো শত চেষ্টা করার পরেও, আমি তোমাকে কখনোই দোষারুপ করবো না। বরং আমি তোমাকে সারাক্ষন সাহস দেবো, সহযোগীতা করবো কিভাবে তুমি সবার থেকে ভালো ফলাফল করতে পারো। আর ওটাই তোমার বাবা।

একটা জিনিষ সারাজীবন মনে রাখবা যে, সোস্যাল মিডিয়া একটা মেনিপুলেটেড মিডিয়া। এর বেজ মোটেই সত্য নয়। বরং এটা সাজানো সত্যি। কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। এই সোস্যাল মিডিয়ায় সেটাই তারা জানাতে চায় যেটা তারা তোমাকে জানাতে চায় কিন্তু তোমার উচিত সেটা জানা যেটা আসল সত্যি। কারন অনেক বড় অপরাধের শিকর অনেক গভীরে থাকে। এই সোস্যাল মিডিয়ার ব্যক্তিত্তরা সবাই মেনিপুলেটেড চরিত্র। এরা ডিটেইল্ড মিথ্যা কাহিনী খুব নিখুতভবে বানায়। তাই কোনো কিছুর ফেস ভ্যালুতে না গিয়ে ডাবল ভেরিফিকেশন জরুরী। জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিজের চারিদিকে সবসময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এই কথাটা খুব জরুরী মনে রাখা যে, প্রকৃতির ইশারার প্রতি সর্বদা সেনসিটিভ থাকা। যেদিন সুনামী হয়, তার আগের দিন জংগলের সমস্ত প্রানিকুল সবাই জাত নির্বিশেসে উচু জায়গায় স্থান নিয়েছিলো, কারন তারা প্রকৃতির সেন্সটা বুঝতে পেরেছিলো। যা মানুষ বুঝতে পারে নাই। ফলে সুনামীতে বন্য প্রানীদের মধ্যে যতো না ক্ষতি হয়েছিলো তার থেকে শতগুন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো মানুষ। ঠিক এই কারনেই  সব সময় মনে রাখা দরকার যে, অপরাধের সুনামী একটা নয়, অনেক সংকেত দেয়, হওয়ার আগে এবং অপরাধ হওয়ার সময়। শুধু সেটা ধরতে হয়।

মানুষের শরীরে একটা জিনিষ থাকে যা পোষ্টমর্টেম করেও পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো সাফল্যে সব থেকে জরুরী হয় সেই জিনিষটার। সেটা “কনফিডেন্স”। এই কনফিডেন্স মানুষকে তৈরী যেমন করতে পারে, তেমনি ভেংগেও দিতে পারে। যখন এটা ভেংগে যায় বা হারিয়ে যায়, তারপরে আর কিছু কাজ করে না। তখন যেটা হয়, তুমি ঠিক করছো নাকি ভুল করছো কিছুই বুঝতে পারবে না। আর যখন কনফিডেন্স চলে যায় বা হারিয়ে যায়, সেই জায়গাটা দখল করে নেয় “কমপ্লেক্স”। এই কমপ্লেক্স যখন গেথে বসে যায় কারো জীবনে, তখন সিম্পল একটা ছবি তুলতেও খারাপ লাগে। কারন কে আপনাকে নিয়ে মজা করবে, কে লেগ পুলিং করবে এই সব ভেবে।

জিবনে এমন কোনো অধ্যায় তোমার থাকা উচিত নয় যা তুমি আর অন্য কেউ শুধু জানো অথচ আমরা জানি না। আমাদের মান, সম্মান, পজিশন, সমাজে মাথা উচু করে বেচে থাকার জন্য শুধু আমাদের গুনাবলীইই যথেষ্ঠ নয়, সেখানে তোমরাও আমাদের সেই জীবনের সাথে জড়িত। ফলে, যেটাই হোক সবকিছুতেই আমাদের কথা মাথায় রাখবে। বাবা মায়ের থেকে বড় ভরষা আর কিছু নাই। আমরা যদি আগে থেকেই জানতে পারতাম আমাদের কর্মফলে কি ফলাফল হয়, তবে কতই না ভালো হতো। কিন্তু সেটা আমাদের স্রিষ্টিকর্তা সুযোগ দেন নাই। তাই সতর্ক থাকাটা খুব দরকার। সতর্ক হওয়া মানে এই নয় যে আমরা শুধু মাত্র পরিনতির বিষয় ভাববো, সতর্ক থাকার অর্থ হলো সঠিক সময়ে নেয়া সেই পদক্ষেপ যা আগামী সমস্যাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। বিশেষত এটা জানা সত্তেও যে আমাদের আগামী কর্মফল খারাপ।

মনে রাখবা এক বন্ধুই আরেক বন্ধুর ক্ষতি করে। তাতে তোমাকে সাহাজ্য করতে আমাদের অনেক অসুবিধা হবে। তুমি শুধু ফোকাস করবে তোমার ক্যারিয়ারে আর সপ্ন পুরনে। তোমাদেরকে নিয়ে আমার সারাটা জীবন অন্য রকমের একটা সপ্ন আছে। আরেকটা কথা মনে রাখবে- ভালোবাসায় অনেক শক্তি থাকে। যদি হতাতই মনের অনিয়ন্ত্রনের কারনে কাউকে ভালোই লেগে যায়, সেখানে নিজের সাথে নিজের বুঝাপড়া করো। সব ভালোবাসার রুপ এক নয়। কেউ ভালোবাসে তোমার শরীরকে, কেউ ভালোবাসে তোমার দূর্বলতাকে, কেউ ভালোবাসে তোমার মেধাকে, আবার কেউ ভালোবাসে তোমার তথা তোমার পরিবারের সম্পদ কিংবা তোমার অস্তিত্বকে। কে তোমাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোবাসলো, এই দৃষ্টিকোণ টা খুব ভালো করে বুঝা তোমার দায়িত্ব। কেউ যদি তোমাকে আসল রুপে ভালোবাসে, কখনো সে তোমাকে জোর করবে না কারন সে জানে যদি তুমি তার হও, তুমি যেভাবেই হোক সেটা বুজতে পারবে আর তুমি তার কাছে বিলম্ব হলেও ফিরে যাবে অথবা সে দেরী করে হলেও তোমার কাছেই ফিরে আসবে। যদি সে ফিরে আসে বা তুমি ফিরে যাও, তাহলে বুঝবে এটা সত্যি ছিলো। নতুবা কিছুই সত্য ছিলো না। যা ছিলো সেটা হলো একটা মোহ। মোহ আর ভালোবাসা এক নয়। একটা বাস্তব আর আরেকটা মিথ্যা। এই মিথ্যা ভালোবাসায় পতিত হয় হয়তো মনে অনেক কষ্ট জমা হতে পারে। কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। এটা অনেক জরুরী একটা ব্যাপার। সব কিছুরই প্রথমবার আছে। এটা যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রেও। যৌবন হলো অসহায় এবং শক্তির দ্বিতীয় নাম। অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার হয় কিন্তু যৌবনের ভালোবাসার প্রতারনায় নিজের অসহায়ত্তের বিচার নিজেকে করতে হয়। তখন নিজের বিরুদ্ধে রায় দেয়া সহজ হয় না। তাই আমি সব সময় একটা কথা বলি- টাইম হচ্ছে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভিলেন। তার কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। আবার এই টাইমই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বন্ধু। তুমি এই টাইমকে কিভাবে ব্যবহার করবে সেটা তোমার বিবেচনা। একবার মনে কালো দাগ পড়ে গেলে তা আজীবন নিজেকে কষ্ট দেয়। ব্ল্যাক কফি, ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেক, ডার্ক চকোলেট, ঘন জংগল অন্ধকার রাত, সবই কালো কিন্তু সে কালো কোনো কষ্টের নয়। কিছু কালো জীবনের অভিশাপ। কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? বিশেষ করে সেই কালো যা জীবনের ধারাবাহিকতায় অভিশাপের মতো রুপ নিয়েছে? তাই, আমি প্রতি নিয়ত তোমাকে নিজের হাতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে ছেড়ে দিতে ভয় করলেও তোমার উপর আমার আলাদা একটা ভরষা আছে- তুমি পারবে ঠিক সে রকম করে চলতে যা আমি তোমার জন্য করতে চেয়েছিলাম। এই ভরষায় আমি তোমাকে অনেক দূরে পাঠাতেও দ্বিধা করছি না।

আমার আশা, তোমার মায়ের সপ্ন আর আমাদের পরিবারের সব সম্মান তোমার হাতে দিয়ে এটাই বলতে চাই- আমরা তোমাদের পরিচয়ে সমাজে আরেকবার সম্মানীত হতে চাই। বাকীটা আল্লাহ মালিক জানেন।

২৬/০৪/২০২১-কভিড-১৯ এর টীকা গ্রহন

কভিড-১৯ মহামারী যদিও এই বিসশে প্রথম পদার্পন করে ডিসেম্বর ২০১৯ এ কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রথম সনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০। পৃথিবীর তাবদ মানুষ যেখানে এই কভিড-১৯ কে নিয়ে জল্পনা, কল্পনা আর হিমশিম খেতে খেতে শ্মশানে চলে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের পলিসি মেকাররা যেনো বড়ই উদাসীন। মুজিববর্ষ পালনে কোনো দিধা নেই, হাসপাতালের যতটুকু বেশী প্রয়োজনীয়তা তার থেকে সবার যেনো এর উছিলায় টাকা কামানোর ধান্দাই বেশী। এটা আগেও যেমন লক্ষ্য করা গেছে, এই মহামারিতে যেনো আরো কাড়াকাড়ি আর লুটের ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। সারাটা দুনিয়া যেখানে মৃত্যুর সাথে কিভাবে জয় হওয়া যায় সেই ভাবনায় মগ্ন আর সেখানে আমার দেশ কিভাবে রাজনীতিতে আরো শক্ত গিট বাধা যায় সেটা নিয়ে ব্যস্ত।

রাস্তায় পুলিশের দৌরাত্ব, অফিসে কর্মচারীদের থাবা, বাজারে ব্যবসায়ীদের মরন কামড়, কোথাও এই কভিডের জন্য কারো কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আমরাও সেই তালের সাথে ড্রাম পিটিয়ে একাত্ততা ঘোষনা করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। আমি হয়তো জুলুম করছি না কিন্তু জুলুমের শিকার তো হচ্ছিই। এই এতো শত কষ্টের মাঝেও আজ আমি আর আমার স্ত্রী মিটুল চৌধুরী কভিডের জন্য ২য় ডোজের টিকাটা গ্রহন করতে সক্ষম হয়েছি। অফিসে চলে গিয়েছিলাম। মাত্র অফিসের কাজে মনোযোগ দিয়েছি, এমন সময় মিটুল আমাকে ফোন দিয়ে জানালো যে, তার মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা এসছে আজ সকালে যে, আজই আমাদেরকে টিকার ২য় ডোজ নিতে বলা হয়েছে। বাচতে কে না চায়?

তাই অফিসের সব কাজ ফেলে আমি আবার রওয়ানা হয়ে গেলাম বাসার উদ্দেশ্যে। টীকা নিতে হবে। আমি সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, তাই সিএমএইচ আমার জন্য ফ্রি এবং নির্ধারিত। সকাল ১২ টার দিকে আমাদের টীকা নেয়া শেষ হলো। আমার কোনো পার্শ প্রতিক্রিয়া আগেরবারও হয় নাই, এবারো হলো না। কিন্তু মিটুলের উভয়বারেই পার্শ প্রতিক্রিয়ায় ভুগছে।

কভিড মহামারী সব কিছুকে পালটে দিয়েছে। পালটে দিয়েছে পরিবারের ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা, আর পরিবর্তন করে দিয়েছে পুরু দুনিয়াকে যেখানে মানুষ শুধু একটা জিনিষ নিয়েই ভাবে- ধর্ম নিয়ে বারাবারি, কিংবা জাত অথবা ঈশ্বর, কোনোটাই স্থায়ী নয়। তাই যার যার চিন্তায় সে সে মশগুল।

কভিড আমাদের দেশে এখনো অনেক হারে ছড়ায়নি বলে মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে এখনো অনেক উদাসিন। কিন্তু কভিডের সংক্রমন গানিতিক হারে না হয়ে এটা জ্যামিতিক হারে বাড়বে কোনো একদিন। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার, চার থেকে আট, আর আট থেকে ষোল এভাবেই বাড়তে বাড়তে কভিড সবার ঘরে ঘরে গিয়ে হাজির হবে একদিন। এর মধ্যে যখন সারা দুনিয়া উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে, আমরা তখন আষ্টেপিষ্টে ধরা খাবো। ব্যবসা বন্ধ হবে, আন্তর্জাতিক মহলে ব্ল্যাক লিষ্টেড হবে, পন্য কেউ কিনতে চাবে না। আমরা একঘরে হয়ে যাবো। আর এর জন্য দায়ী সব সময় সাধারন নাগরিককেই দেয়া যাবে না। একবার ভাবুন তো-যে দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুরী হয়, যেখানে দূর্নীতি চরম আকারে ধারন করেছে, যেখানে উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষের পকেটে চলে যাচ্ছে সেখানে সরকার যদি আমাদের এই ষোল কোটি মানুষকে এক মাসের জন্য শুধু খাবার আর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সমুহ নিশ্চিত করতে পারতো, ভিয়েত্নাম বা ভুটানের মতো দেহের অবস্থা আমরাও ভোগ করতে পারতাম অর্থাৎ কভিড ফ্রি দেশ। এই ষোল কোটি মানুষের এক মাসের জন্য শুধু ২০০ কোটি টাকার বাজেটই যথেষ্ট ছিলো। সরকার যে চেষ্টা করে নাই তা নয় কিন্তু তার অধিনে যতো কাউন্সেলর, কমিশনার কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গরা রয়েছেন, সাধারন জনগনের নামে দেয়া এসব প্রনোদনা গেছে সব তাদের পকেটে। ফলে মানুষ করোনায় বেচে থাকার চেয়ে অথবা করোনায় মরে যাওয়ার চেয়ে না খেয়ে মরতে চায় নি, তাই তাদের গন্তব্য সব সময় ছিলো ঘরের বাইরের মুখী। আর এই বাহির মুখী মানুষের ঢল যতোদিন ঠেকানো না যায়, এদেশের করোনা পরিস্থিতি কোনোদিনই উন্নতি হবে না। একটা সময় আসবে যখন প্রতিটি ঘরে ঘরে, গ্রামে গঞ্জে, শহরে, বাড়িতে বাড়িতে করোনার উপস্থিতি থাকবে। পরিচিত মানুষের মৃত্যুয় সংবাদে ফেসবুক ভরে উঠবে, কান্নার আহাজারি শোনা যাবে চারিদিক থেকে।

এর থেকে আপাতত বাচার প্রথম শর্ত হচ্ছে সাস্থ্য সচেতনতা আর টীকা। সেই টীকার কর্মসূচীর আওতায় আজ আমরা দুজনেই টীকার প্রোগ্রাম শেষ করলাম। এখন বাকী শুধু সচেতনতা। যেটা শুধুই আমাদের হাতে।

২১/০৪/২০২১-রাত

সময়ের স্রোতে যখন দিনের আলো নিভে যায়, মানুষ দ্রুত নিস্তেজ হয়ে দ্রুত ঘরে ফেরার তাগিদ অনুভব করে, পাখীরা যখন আর কোথাও ঘুরতে চায় না, গাছেরা যখন নতুন খাবারের আস্বাদনে কার্বনের পরিবর্তে অক্সিজেনের জন্য উম্মুখ হয়ে থাকে, ঠিক সে সময়েই ধীরে ধীরে দিনের আলোকে নিভিয়ে রাতের প্রবেশ। যেমন ঈশ্বর বলেন, “আমি দিনকে সরিয়ে নেই, রাতকে আনার জন্যে”। তাহলে কি আছে এই রাতের অধীনে?

এই রাত সবাইকে পরিবর্তন করে দেয়। কেউ হতাশার রাজ্যে ভেসে যায়, কেউ সুখের রাজ্যে হামাগুড়ি দিয়ে নির্ঘুম জেগে থাকে, কেউ নিশাচর পাখীর মতো নিশাচরদের সাথে দিকবিদিক এদিক সেদিক ঘুরতে থাকে, কেউ পররবর্তী দিনের আলোর অপেক্ষায় বসে থাকে, কেউ আবার পরম ঈসশরকে নিকটে পাওয়ার জন্য অঘোর ঝরে চোখ ভাসিয়ে প্রার্থনা করে। যে দিনের আলোকে সহ্য করতে পারে না বলে দিনে বের হয় নাই, সে রাতের অন্ধকারে মাথা উচু করে দুনিয়াটাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবার যারা দিনের আলোতে ভীতু হয়ে চুপসে গিয়ে লুকিয়ে ছিলো, সে প্রানের স্পন্দনে সবার অলক্ষ্যে রাতের অন্ধকারকেই বেছে নিয়ে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দেয়। রাত নিস্তব্দতার প্রতিক, রাত কালোর প্রতিক, রাত এই দুনিয়ার আরেক রুপের প্রতিক যা দিনের বেলায় কোনভাবেই দেখা যায় না। রাত  অদ্ভুত একটা অধ্যায়।

এই রাতের সাথে মহাশ্মশানের কোথায় যেনো একটা মিল আছে। সবাই পাশাপাশি থেকেও সবাই একা। সবাই চুপ কিন্তু সবাই সরব। তাদের কারো কোনো কিছুর চাওয়া নাই, আবদার নাই, কারো কোনো অভিযোগ নাই, না আছে কোনো পার্থিব কোনো অহংকার বা লালসা। রাতের অন্ধকারে জোনাকীর আলোই যেন মহাপ্রদীপের মতো কাজ করে, আর অমাবশ্যা হলেও কোনো ক্ষতি নাই। অমবশ্যার রাতই হোক কিংবা অন্ধকার রাতই হোক, সব কিছুর এই রুপ আলাদা আলাদা।

রাতকে কি “কালো” বলা যায়? ব্ল্যাক কফি, ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেক, ডার্ক চকোলেট, ঘন জংগল অন্ধকার রাত এদের প্রত্যেকের একটা নিজস্ব রুপ আছে। আর সেটা “কালো”। কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? যদি অন্যভাবে দেখা যায় বা ভাবা যায়, দেখা যাবে যে, কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। এই আলোটা সবাই দেখতে পায় না। তখনি সে শুধু দেখে অন্ধকার, দেখে অমাবশায়র রাত। সেই সুদূর জোজন দূরের কোনো নক্ষত্রের মীটমীটে আলোও তখন আর চোখে পড়ে না। রাতের এই কালোকে মানুষ কখনো কখনো ভয় পায় অথচ “কালো” কোনো ভয়ংকর রুপ নয়। মানুষ যা দেখে না, যা দেখতে পায় না, তখনই মানুষ তাঁকে কালো বলে আর কালো হয়ে উঠে মনের ভিতরে এক আতংকের নাম।

১৭/০৪/২০২১-ধনী-গরীবের সৃষ্টি কেনো

সারা দুনিয়া রীতিমত কেপে উঠেছে গত প্রায় এক বছরের বেশী। অথচ যিনি কাপাচ্ছেন, তাঁকে কেউ আজো দেখেনি। প্রতিটা দেশ, মহাদেশ, গরীব কিংবা ধনী কেহই রেহাই পাচ্ছে না তার কবল থেকে। সে কোনো সম্পদ দখল করতে আসে নাই, না এসেছে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে উৎখাত করতে। তার কোনো মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি নাই, তার কোনো লাভ লস নাই, তার কোনো শ্রেনীভেদে কোনো টার্গেটও নাই। তার একটাই লক্ষ্য–যতো পারো লাশ সংগ্রহ করো। আর এই অচেনা, অজানা এবং অদৃশ্য শত্রুর নাম “কভিড-১৯” যাকে সবাই করোনা নামে চিনে।

এই করোনা ধনীর গদি নাড়িয়ে দিয়েছে, আর গরীবকে আরো গরীব করে দিয়েছে। সারা দুনিয়ার সরকারগন লক ডাউন কিংবা আইসোলেশন পদ্ধতি অবলম্বন করেও একে কিছুতেই ঠেকাতে পারছে না। আবার লক ডাউনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেও অর্থনীতির চাকা ক্রমশই এমন দূর্বল হতে চলছে যে, কলকারখানা এই মৃত্যু ঝুকির মধ্যেও খোলা রাখতে হচ্ছে। আর এই কলকারখানা খোলা নিয়ে এবং তার পাশাপাশি সাধারন কর্মী জীবনকে প্রতিহত করে মাঝে মাঝে লক ডাউনের কারনে বিভিন্ন পেশার মানুষ জন এমনভাবে সোস্যাল মিডিয়াতে মন্তব্য করছেন যার অর্থ এই রকম যে, ধনীরা ধনী হয়ে যেনো পাপ করেছে অথবা অপরাধ। এই মনতব্য কারীদের সাথে আমি প্রায়ই ভিন্ন মতের কারনে আমিও টার্গেট হচ্ছি অনেক সমালোচনার।

আমি একটা জিনিষ ক্লিয়ারলী বুঝতে পারছি কেনো স্বয়ং স্রিষ্টিকর্তা তার পুরু জগতে একটা ধনী গরীবের সমাজ সৃষ্টি করেছেন। যদি তিনি এই পার্থক্যটা সৃষ্টি না করতেন, তাহলে পুরু জগত কয়েক দিনের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতো, জীবন থেমে যেতো আর অরাজকতার সৃষ্টি হতো। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বলি তাহলে-

ধরুন সবার কাছে সমপরিমান সম্পদ রয়েছে। সবচেয়ে বড় লোকের কাছে যদি ৫ কোটি টাকা থাকে, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে গরীব লোকের কাছেও তাহলে ৫ কোটি টাকাই রয়েছে। যদি এটাই হয় তাহলে কি কি দাঁড়াবে, আসুন সেটা দেখিঃ

ক।      যে কৃষক সারা বছরের জীবিকার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে মাঠে ধান কিংবা অন্যান্য ফসল ফলাতেন এবং নিজেরা একটু ভালো থাকার জন্য আরো কিছু বাড়তি রোজগারের জন্য কাজ করতেন, সেই কৃষক আর পরিশ্রম করবেন না। কারন তার কাছে অঢেল টাকা আছে।

খ।       যে পরিবহন কোম্পানী তার আরো টাকা আয় করার জন্য দিনরাত অনেক লেবার, গাড়ি এবং সরঞ্জাম নিয়ে প্রতিনিয়ত সাধারন পাবলিক নিয়ে ব্যবসা করতেন, লাভের আশায় আরো বেশী মুলধন খাটিয়ে একটার পর একটা পরিবহন তার ষ্টকে যোগ করতেন, তিনি আর এই কাজটি করবেন না। কারন তার কাছে অঢেল টাকা আছে।

গ।       হোটেল রেস্তোরায় যারা ব্যবসা করেন, তারাও আর ওই ব্যবসাটা করবেন না, কারন তার ব্যবসা করে লাভের কোনো দরকার নাই। তার কাছেও অঢেল টাকা আছে।

ঘ।       কোনো ইয়াং জেনারেশন কখনো কোনো চাকুরী করার মনোবৃত্তি থাকবে না, জবও খুজবে না, কারন তার কাছেও অঢেল টাকা আছে।

চ।        খুচরা বিক্রেতা যেমন সব্জীওয়ালা, ফুস্কাওয়ালা, মুড়িওয়ালা, আলু বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতাও আর ফেরি করে করে দ্বারে দ্বারে সেইসব সব্জী, মাছ কিংবা তরিতরকারী নিয়ে ফেরীও করবেনা। কারন তার কাছে অঢেল টাকা আছে।

চ।        মেডিসিন কোম্পানীগুলি মেডিসিন তৈরী এবং বিক্রি করে মুনাফার জন্য তারাও আর কোনো প্রকার গবেষনা কিংবা বড় বড় কোম্পানী তৈরী করবে না। কারন তাদের কাছেও অঢেল টাকা আছে।

জ।      গার্মেন্টস শিল্পরা যেমন কোনো কর্মচারী পাবেন না, তেমনি লাভের জন্য তারাও আর কোনো গার্মেন্টস তৈরী করবেন না, কারন তাদের কাছেও অঢেল টাকা আছে।

ট।        স্কুল কলেজ, ইউনিভার্সিটি কিছুই নাই, কারন যারা এসব করবেন, আর মুনাফা করবেন, তাদের হাতেও অঢেল টাকা আছে।

ফলে ব্যাপারটা কি দাড়াবে? দাঁড়াবে এই যে, বাজার নাই, ফসল নাই, উতপাদন নাই, হোটেল রেস্তোরা নাই, পরিবহন চলবে না, গার্মেন্টস কোম্পানী নাই, মেডিসিন কোম্পানী নাই, ব্যাংক নাই, জেলে নাই, স্কুল কলেজ নাই, কিছুই নাই। অথচ সবার কাছে আছে অঢেল টাকা আর টাকা। কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদার জন্য যা দরকার, সেগুলিও নাই। খাবার নাই, মেডিসিন নাই, কাপড় চোপড় নাই, থাকার জায়গা নাই, অথচ টাকার কোনো অভাবও নাই। তাহলে মানুষ কি বেচে থাকতে পারবে? কিভাবে বাচবে এই জনগোষ্টী? কৃষক মাঠে যায় না, ফসল ফলায় না, ফসল তুলে না, ফলে মানুষ না খেয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বে। মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়বে, কোথাও কোনো হাসপাতাল নাই, ডাক্তার নাই, না আছে কোনো নার্স। স্কুল কলেজ না থাকায় কেউ পড়তেও যাবে না, আর পড়বেই বা কেনো? সবার হাতে তো অঢেল টাকা আছে। ফলে ডাক্তার, নার্স কিংবা হাসপাতাল ছাড়া অসুস্থ মানুষেরা কোথায় যাবে? নিসচিত মরন।

শিশুরা দুধের ক্ষুধায় মরবে, অন্যরা খাবার না থাকার কারনে মরবে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্যে পরিবহন না থাকায় কোথাও যেতে পারবে না। পুরু প্রিথিবী একটা সময় সম্পুর্ন স্থবির হয়ে একটা নির্জীব শ্মশানে পরিনত হবে।

এটাই কি আমরা সবাই চেয়েছিলাম?

না, আমরা এটা কখনো চাইনি। আর ঠিক তাই দুনিয়াকে সচল করার জন্য, চলমান রাখার জন্যে সমাজে একটা ধনী গরীবের ব্যবধান রাখতে হবে যেখানে কেউ জীবিকার জন্য লড়বে, আর কেউ মুনাফার জন্য টাকা ইনভেষ্ট করবে।

বিধাতার নিয়ম এতো সহজ নয়। এটা তারই একটা পলিসি যেখানে ব্যবধান থাকতে হবে, রাখতে হবে, আর সব কিছু চলমান রাখতে হবে। আর ধনী-গরীবের ব্যবধানটা এই সমস্যার একমাত্র উপায়।

==========================================

সংগ্রিহীত

মোবাইলে একটা SMS এলো। তাকিয়ে দেখি..

“সরকারের তরফ থেকে আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে” আমার মন খুশিতে ভরে গেল। ঘর থেকে বের হলাম আর চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে বলছি…. “সবাই শোনো, দিন বদলে গেছে, আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা এসে গেছে”। রুম থেকে বউ বেরিয়ে বললো, “অত খুশির কি আছে, আমার এ্যাকাউন্টেও ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে। এই যে মেসেজ দেখ।”

একটু অবাক হলাম, ভাবলাম আশেপাশে সবাইকে গিয়ে বলি। বাড়ির পাশের লোক আমায় বলছে, “বেশি উত্তেজিত হয়ো না, আমাদের এ্যাকাউন্টেও ৫০ লাখ জমা হয়েছে।” আমার খুশি সব উড়ে গেল। ভাবলাম যাই, বাজার থেকে কিছু মিষ্টি নিয়ে আসি। বাজারে গিয়ে দেখলাম, দোকান বন্ধ। পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “ও ভাই এই মিষ্টির দোকান বন্ধ কেন?” সে বললো, “মিষ্টি দোকানদারের আর দোকানদারি করার কি দরকার। তার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ এসে গেছে।” তাই ভাবলাম একটু নিউ মার্কেটে যাই, সেখান থেকে কিছু নিয়ে আসি। সেকি! কোনো দোকান পাট খোলা নেই। ওনাদের এ্যাকাউন্টেও নাকি ৫০ লাখ এসে গেছে…..। প্রচন্ড খিদে পেয়েছে ভাবলাম এখানে তো দোকান পাট বন্ধ। সামনের দিকে যাই, ভালো কোন হোটেলে তৃপ্তি করে খাওয়া যাবে।

সামনে যতই যাই সবই দেখি ফাঁকা। হোটেলের বাইরে দাড়িয়ে থাকা স্বাগত জানানোর সেই লোকও নেই, যে কাস্টমার দেখলেই সালাম ঠুকে ওয়েলকাম করেন, শপিং মলের সিকিউরিটিও নেই। সবার এ্যাকাউন্টেই ৫০ লাখ এসে গেছে। মার্কেটে কেউ নেই। সবজি ওয়ালা, চা ওয়ালা, সরবতওয়ালা ফাস্টফুড ওয়ালা কেউ নেই। সব কিছুই বন্ধ। সকলের ঠিকানা এখন ব্যাঙ্কে ৫০ লাখ টাকা তোলার জন্যে। কেননা এখন আর কারো কাজ করার দরকার নেই, সবার কাছেই ৫০ লাখ আছে। আমার এক বন্ধু ফোন করে বললো, “আমি জব ছেড়ে দিয়েছি, আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা আছে” আমার এক বড় ভাই ফোন করে বললো, “আমার আর্ট স্কুল অফ করে দিয়েছি” “আমার আশেপাশের ছোট বোন আর স্কুলে যাচ্ছে না” “আমার এক বন্ধু টিউশন পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে” “নিপা নামের মেয়েটিও আর কলেজে যায় না” “ইভান আর জব খু্ঁজে না” ‘শ্রমিকরা আর কারখানায় যায় না, কলকারখানা সব বন্ধ”।

সবার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা জমা আছে। সবাই এখন বড়লোক। সবাই সুর তুলছে, গান করছে, নৃত্য করছে….. বিকেলে হাটতে হাটতে মাঠের দিকে গেলাম, কৃষকরা সবাই কাজ ছেড়ে বাড়িতে। কেউ নেই জমিতে। এখন তাদের রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করার আর দরকার নেই। তারা সবাই বড়লোক হয়ে গেছে। সবার এ্যাকাউন্টেই ৫০ লাখ টাকা। 

৭ দিন পর দেখা গেল খিদের জ্বালায় লোক কাঁদছে। কেননা, জমি থেকে কেউ ফসল তুলছে না, সমস্ত দোকানপাট বন্ধ, হোটেল, মেডিক্যাল সব বন্ধ। অসুস্থ হয়ে মানুষ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কেননা, খাবার নেই, ডাক্তার নেই। পশুরাও না খেতে পেয়ে মরছে। জমিতে সবুজ ঘাস নেই, সোনালী ফসল নেই। শিশুরা খিদের জ্বালায় কাঁদছে, গোয়ালা দুধ দিচ্ছে না বলে। মানুষ এখন ছুটছে মুঠো মুঠো টাকা নিয়ে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে পকেটে টাকা নিয়ে।

কাঁদছে মানুষ লক্ষ টাকা হাতে নিয়ে আর বলছে, “এই ভাই নাও ১০ হাজার টাকা, আমাকে ২০০ গ্রাম দুধ দাও। দুদিন বাচ্চাটা না খেয়ে আছে।

১০ দিন বাদে মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে। কিছু কিছু লোক টাকার ব্যাগ নিয়ে ঘুরছে রাস্তায়। এই নাও ভাই ৫ লাখ টাকা, “আমাকে ৫ কেজি চাল দাও। ১০ দিন থেকে না খেয়ে আছি।” সব বাজার হাট বন্ধ হয়ে গেছে। শাক সবজি খাবার দাবার কারো কাছেই নেই। সবদিকে শুধু মৃত্যুর ছবি দেখা যাচ্ছে।

আমিও আমার ৫০ লাখ টাকা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি, নাও ভাই নাও ৫০ লাখ নিয়ে নাও, তবুও কিছু খাবার দাও”। কে কার টাকা নেবে, খাবার কারো কাছেই নেই। মানুষ মানুষের দিকে তেড়ে আসছে হিংস্র সিংহের মত। মনে হচ্ছে, মানুষ মানুষকে খাবে। অচেনা একলোক তাড়া করেছে আমাকে, চিবিয়ে খাবে বলে।

ছুটছি আমি। আমি ক্ষুধার্ত মানুষ, কতটা আর ছুটব? পড়ে গেলাম হোঁচট খেয়ে. ..মা গো করে চিৎকার করে উঠলাম….. বউ তখন ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে “কি হলো তোমার ? সকাল হয়ে গেছে, ঘুম থেকে উঠো, চোখে মুখে পানি দিয়ে আসো। এই তুমি বাচাঁও বাঁচাও বলে চেঁচাচ্ছিলে কেন? কোন খারাপ স্বপ্ন দেখছিলে নাকি ?” আমি বললাম, “না, খারাপ নয়, ভালো দিনের স্বপ্ন। “

গরিব আমরা, কিন্তু ঘরে “দুমুঠো খাবার তো আছে” “তৃষ্ণার পানি তো আছে” “শিশুরা খেলছে” “পশুরা মাঠে ঘাস খাচ্ছে” “দোকানে ভিড় আছে” “যানবাহন চলছে তো চলছে” “মানুষের সমাগম চলছে” “বাগানে ফুল ফুটছে” প্রকৃতি হাসছে…..

অনেকে ভাবে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কেন ধনী গরীব সুষ্টি করছে ? সবাইকেতো চাইলে ধন সম্পদ দিতে পারতো।সবাইকে সুখ শান্তি দিতে পারতো।

বাস্তবতা হল ধনী গরীব বৈশম্য আছে বিধায়

১৫/০৪/২০২১-মিথ্যা

কথায় বলে- মিথ্যাও নাকি কখনো কখনো সত্যি হয়ে যায়। কোনো একটা মিথ্যাকে হাজার বার বললে নাকি মিথ্যাটা ফ্যাকাশে হতে হতে এক সময় মিথ্যাটাই সত্যি হয়ে যায়। পরিপূর্নি সত্যিতে পরিনত না হলেও আসল সত্যটা অনেকাংশেই ঢাকা পড়তে পড়তে মরচে ধরে যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ একটা মিথ্যা বারবার এতোবার বলে যে, মিথ্যেটাই সত্যি হয়ে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে এমন একটা মিথ্যে যা ব্যথা লুকুনোর জন্য বলা হচ্ছে।

ব্যাপারটা আসলে কখনোই এ রকম না। অনেক সময় সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হয় না বটে কিন্তু ভিত্তিহীন আর অকারন গুরুত্বহীন কথা প্রথমবার শুনেই বুঝে ফেলা সেটা একটা বিশেষ গুন। যা সতর্ক থেকে আর নিজের চেতনাকে বাচিয়ে রেখে অর্জন করা যেতে পারে।  কিন্তু যদি মিথ্যের বোঝা বুদ্ধিমত্তার উপর চেপে বসে তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে চোরাবালির বাকে আটকে পড়ে। যেখানে আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

মিথ্যে যে বলে সে নিজের সাথেই সে ছলনা করে থাকে। সে ভাবে যেই মানুষটাকে সে ঠকাচ্ছে বা মিথ্যের জালে ফাসিয়ে দিচ্ছে, তারা হয়তো বোকা, কিংবস সহজ সরল যাদেরকে সহজেই বোকা বানানো যায়। কিন্তু মিথ্যাবাদী কখনোই ভাবতে চায় না যে, মিথ্যে হলো সেই জাল যা একটা মানুষ তার নিজের অজান্তেই সে নিজের জন্য বিছায়। যখন মানুস নিজের কিছু লুকায় তখনই তাকে সতর্ক হওয়া উচিত। কারন যখন সত্যির সীমানা পার হয়ে যায়, তখনই মিথ্যার জাল বিছানো হয়। যাকে ভাগ্য তাকে নির্দয় ভাবে ফাসিয়ে দেয়।

কোনো কোনো সময় কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই এই সমস্ত নাটক তৈরী করা হয়। আর এই সব ভরষার জায়গায় এমন এমন কিছু মিথ্যা চরিত্রও তৈরী হয় যারা আজীবন কাল হয় “মুখেস” না হয় “স্যার” হিসাবে পরিচিত হন। এরা অর্থাৎ নাম সর্বসশ অস্তিত্তহীন এই সব মেকি চরিত্রগুলি একটা ভরষার স্থান তৈরী করেন। সময়ের স্রোতে কিংবা তদন্তের খপ্পরে যখন এই মেকি মিথ্যা ভরষার স্থান উম্মোচিত হয়ে চোখের সামনে ভয়ংকর এবং আসল চেহাড়া টা বেরিয়ে আসে, তখন নিজের কাছে নিজকে বড় বোকা মনে হয়। আর এর প্রধান কারন এই যে, মিথ্যা ভরষায় ভর করে কেউ যখন নিজের ইচ্ছায় সেই জায়গায় চলে আসে যেখান থেকে আর কেউ ফিরে যেতে পারে না।

সত্যকে যেমন বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না, তেমনি মিথ্যাকেও বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। মিথ্যাকে লুকাতে বহু পরিশ্রমের দরকার। আর সেই পরিশ্রম কখনোই কাজে দেয় না। কারন সত্যের একটাই চেষ্টা থাকে-বাইরে এসে আলোয় দারানো, আর মিথ্যারও একটা চেষ্টা থাকে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার। মিথ্যের রাত যতো লম্বাই হোক না কেনো, সত্যের সুর্জ ঠিক উঠবেই।

এখানে আরো একটা ব্যাপার বুঝা খুব দরকার যে, মিথ্যা, লুকুচুরি কিংবা বিভ্রান্ত করা এই গুটি কতক জিনিষের মধ্যে পার্থক্য আছে। লুকানো এক জিনিষ, আর বিভ্রান্ত করা আরেক জিনিষ। সত্যিটাকে যেমন লুকানো যায় না, তেমনি একে বেশীক্ষন বিভ্রান্তির মধ্যেও রাখা যায় না। কারন সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না, আবার কোনো কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব।  আর ঠিক এ কারনেই ট্রাষ্টের উপর কোনো ইনভেষ্টিগেশন হয় না, ইনভেষ্টিগেশন হয় ডাউটের উপর।

সত্যিটা যখন কেউ জেনেই যায়, তখন মিথ্যার গল্পটা বলে তখন শুধু সময়ই নষ্ট হয় কিন্তু কোনো কাজে আসে না।

০৮/০৪/২০২১-তোমাকে ছাড়া আমি  (ছোট ভাবী আর ছোট ভাইকে উতসর্গ করা লেখাটা)

যেদিন প্রথম আমি তোমার সাথে জীবন বেঁধেছিলাম, সেদিন বুঝি নাই আমার কতটা নিয়ে গেলে তুমি। একাই এসেছিলাম যেমন কেউ পালিয়ে যায় তার সেই চেনা শিশুকাল, চেনা শৈশব, আর চেনা সব ভালোবাসার জগত ছেড়ে। আমার সেই নতুন জগতে তোমাকে জুড়েই আমার সময় পেরিয়ে গেছে দিনগুলি একটা একটা মুহুর্ত করে, পেরিয়ে গেছে মাস একটা একটা সপ্তাহ শেষে। এরপর বছর পেরিয়ে গেছে মাস শেষে, আর যুগ পেরিয়ে গেছে বছরান্তে। তোমাকে কেন্দ্র করেই আমার জীবনের অনেক অভ্যাস, অনেক শখ আমুল বদলে গেছে চিরতরে, আমি বুঝতেই পারিনি কখন কবে কোন ক্ষন থেকে আমার প্রিয় সবুজ রংটা থেকে তোমার প্রিয় নীল রংটা আমার প্রিয় হয়ে গেছে। এভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে আমার অনেক অভ্যাস যা কখনোই আমার ছিলো না, ছিলো শুধু তোমার নিজের। আমি দিনে ঘুমাতে পছন্দ করতাম, আমি ঝাল খেতে পছন্দ করতাম, আমি মিষ্টি একেবারেই খেতে চাইতাম না, অবিরত টেলিভিশনের সামনে আমার পছন্দের সিরিয়ালগুলি দেখতেই থাকতাম। অথচ সেই আমি কত বদলে গিয়েছিলাম তোমার সংসারে এসে। আমাকে আর সেই ঝাল আর নেশা ধরায় না, টিভির সেই সিরিয়ালগুলি আমাকে হয়তো খুব মিস করে, দিনের শখের ঘুমটা যে কবে বিদায় নিয়েছে তার দিনক্ষনও আমার আর আজ মনে না। কবে যে তোমার মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসটা আমার ঝাল খাওয়ার নেশাকে অতিক্রম করে আমাকেও মিষ্টি খাওয়ার নেশায় বদল করে ফেলেছে, আমি নিজেও জানি না। শীতের সকালে কাকডাকা ভোরে গরম আমেজের বিছানা ছেড়ে সেই কখন থেকে যে আমি অধীর আগ্রহে সেই পিঠাটাই বানাতে শুরু করেছিলাম যেটা তুমি খেতে ভালোবাসতে। আর এভাবেই পার হয়ে গেছে আমার সবকটি ঋতু। আমার সব আগ্রহ আর অভ্যাস যেনো গড়ে উঠেছিলো তোমাকে ঘিরেই।

আজ এতো বছর পর, আজ কেনো সব উলট পালট হয়ে গেলো? সূর্য ঠিক সময়মত উঠে আজও তো সকাল হয়েছে। মনেও পড়েছিলো তুমি অফিসে যাবে। কিন্তু আজ আমার কেনো তাড়া নাই তোমার জন্য নাস্তা বানানোর? সকালের হকার তো সেই আগের মতো পত্রিকাটাও দিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো তো পত্রিকার ভাজটা পর্যন্ত খোলা হলো না! চকলেটের সিরিয়ালটা তো টেবিলের উপরেই আছে, অথচ আমি কেনো ব্যস্ত হই নাই গরম দুধে তোমার খাবারের জন্য সিরিয়ালতা বানানোর জন্য? অফিসে যাওয়ার আগে হাত মুখ ধুতে যাবার আগে কতবার শুনেছি তোমার ওই কন্ঠটা- ওই, রেডি হচ্ছি, নাস্তাটা বানাও, কিংবা বলতে ‘ড্রাইভারকে বলো ব্যাগটা নিয়ে যেতে’। খুব ধাক্কা দেয় বুকে। তুমি ছাড়া সকালটা কত আলাদা। রুমভর্তি তোমার সিগারেটের গন্ধটাও আজ নাই। রান্নাঘরের দিকে যেতেই তোমার ঘরটা চোখে পড়ে, ইশ, ওই খানে তুমি বসে থাকতে, পেপারটা পড়তে, সিগারেট টানতে, খালী পেটে কফি খেতে। কি অবাক। সেই সোফাটা আজো আছে, এস্ট্রেটা আগের জায়গাতেই আছে, শুধু তুমি ওখানে নাই। তুমি আজ নাই। আমি তোমাকে আজ ইচ্ছা করলেই সেই আগের মতো স্পর্শ করতে পারছি না।

অফিস শেষে সন্ধ্যায় বা রাতে ঘরে ঢোকে আমাকে না দেখতে পেলে সারাটা বাড়িতে তুমি আমাকে খুজতে। আর মেয়েদের জিজ্ঞেস করতে-আরে তোর মা কই? যেনো আমি হারিয়ে গেছি। রান্নাঘরে কাজে থাকলে তুমি রান্নাঘর পর্যন্ত চলে যেতে। বলতে-কি করো? হয়তো এটুকুই। অথচ আজ তুমিই হারিয়ে গেলে। আজ আর আমাকে কেউ বলে না-আরে কোথায় গেলা বা কি করো? রান্নাঘরে তোমার পছন্দের খুব ছোট স্টীলের পাতিলটা আজ আর কফির পানির জন্য গরম করার দরকার হয় না, ছোট কাপটাও আজ একেবারেই শুষ্ক। ওগুলি হাতে নিলেই খুব ভারী মনে হয়, মাটিতে বসে যাই, বুকের ভিতর কি যেনো কঠিন একটা চাপা ব্যথা অনুভব হয়।  

ছুটির দিনটা এতো লম্বা মনে হয় আজ। ছুটির দিনে তোমার পান্তা ভাত আর ডিম ভাজীর কথা মনে হলেই চোখ ভিজে আসে। তোমার বাগান আজ তোমাকে খুব মিস করে। বাগানের প্রতিটা গাছ যেনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তোমার অপেক্ষায়। ওরা হয়তো কথা বলতে পারে না কিন্তু ওদের হেলে দুলে ভালোবাসার প্রকাশটা যেনো আজ আর নাই। কি অদ্ভুত নিরবতা চারিদিকে।

আমি জানতাম, জীবনের কোনো না কোনো সময় এমন একটা সময় আসবেই। একমাত্র সহমরন আর দূর্ভাগ্যক্রমে কোনো দূর্ঘটনা ছাড়া কেউ কেউ সেই ভাগ্যবান হয় যখন একসাথে পৃথিবী-বিচ্ছেদ হয়। কি অদ্ভুত একটা জীবন, তাই না? একা বেচে থাকা যেমন কষ্টের, আবার  তেমনি সাথী নিয়ে বেচে থাকার পর আবার একা হয়ে যাওয়া আরো অনেক বেদনাদায়ক। কেউ চলে যাবার পর বুঝা যায় সব কিছু আমার ছিলো না।

এতোটা বছর ধরে একসাথে চলার মধ্যে কখনো একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের নিঃশব্দে  ভালোবাসাটাই একসময় মায়ায় পরিনত হয়ে গিয়েছিলো আমাদের। তখন এই মায়াটাই ছিলো আমাদের পূর্ন ভালোবাসা। ভাবতেই পারি না, তোমার টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন আমার কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, তোমার ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ তো মনে হয় নাই আমার, বরং বড্ড মায়ায় যেনো ঘামে ভিজা গন্ধতা আরো জড়িয়ে ধরতাম। খুব মায়া লাগতো, আহা, কত কষ্ট করো, ঘামে শরীর ভিজে যেতো, তার সেই সাক্ষী এই গন্ধওয়ালা গেঞ্জীটা। অনবরত মমতায় আমি সেটা ভালোবাসায় ধুয়ে দিতাম।

আমি জানি, আমার ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্ধ যখন তোমার কাছে একদিন অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধাভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন তোমার নাক বুঝে আসতো, সময়ের এতোটা পথ পেরিয়ে কোনো একদিন তুমিও সেই নাকডাকা, সেই তেলেভেজা চুলের সোদা গন্ধ তোমারও ভালোবাসার একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো। যেমন আমার অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো তোমার রাগ, তোমার অভিমান। আজ এইক্ষনে তোমার সেইসব রাগ অভিমান আমাকে কাদায়, আজ কেনো জানি মনে হয়, খুব মিস করছি সেই রাগ, অভিমান, আর মমতা। বড্ড একা লাগে এখন। সবাই চারিপাশেই আছে অথচ কি ভয়ংকর শুন্যতায় আমি দিন কাটাই যেনো আমি শক্তিহীন এক নির্জীব প্রানী। সবাই তোমাকে মিস করে, কাদে, কষ্ট পায়, কিন্তু আমি আমার কষ্টটা কাউকে বুঝাতে পারি না। চোখের জলের রঙ এক হলেও এই জলে ভেসে থাকা  কষ্ট, ব্যাথা, বেদনা আর হাহাকারের রঙ হয়তো সবার এক নয়। আমার কষ্টের রঙ হয়তো আরো নীল।

আজ তোমা বিনে এই একটা কথাই বারবার মনে জাগে- তুমি ছিলে আমার ভরষা, ছিলে আমার নিরাপত্তা, আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই ছিলে আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কেপে উঠতো, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যেতো। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে ছিলে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে। নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করতে আমার  অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার ছিলো না। অথচ দেখো, সেই তুমি কি অবলীলায় কোনো কিছু না বলেই আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গেলে।

সেই কোনো এক সময় জেনেছিলাম, মানুষ ভালবেসে নাকি খিলখিল করে হাসে, মেঘলা আকাশ দেখে নীল আকাশের কথা ভাবে, কবিতা লিখে। আজ এই একা জীবনে এসে বুঝলাম, ভালোবাসায় অনেক বেদনাও থাকে, থাকে চাপা কান্না আর বিরহের অসহায়ত্ত। শরীর খারাপ হলে এখন বড্ড তোমার কথা মনে পড়ে, মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে গেলে তোমার কথা মনে পড়ে, সন্ধ্যা হলেই তোমার বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে। ছুটির দিনে কেমন যেনো পুরু ঘরটাই ফাকা লাগে। অদ্ভুত না জীবন? স্মৃতিগুলি আরো ভয়ংকর মনে হয় এখন।

আমি জানি, এ জীবনে আর কেউ আমাকে তোমার মতো আদর, ভালোবাসা, অভিমান কিংবা মমতা দিয়ে না মন ভরাতে পারবে, না ভরষা দিতে পারবে, না পারবে সেই যাদুকরী কথায় আমার অভিমানগুলি কোনো এক তপ্ত ললাশীর মতো হাস্যোজ্জল করাতে। আসলে যেদিন প্রথম আমি তোমার কাছে এসেছিলাম, তখন আমি ছিলাম একজন উচ্ছল মায়াবতী সবেমাত্র পা রাখা এক কুমারী আর তুমি ছিলে কিশোর থেকে পা দিয়ে সবেমাত্র যৌবনে পা রাখা টকবকে এক যুবক। সেই বয়সটা পার করে অর্ধ শত বছর পার করেও আমি যেনো সেই ষোড়শী যুবতীর মতই আর তুমি সেই টকবগে যুবকের মতোই সময়টা কাটিয়েছি। যেনো দিনগুলি শুধু রাত আর দিনের মধ্যেই পার হয়ে, মনের দিক থেকে নয়। আমি তো সারাটা জীবন তোমার সাথেই থাকতে এসেছিলাম। আমি কল্পনার কোনো রাজকুমারী ছিলাম না, তেমনি তুমিও আমার কাছে কোনো কল্পনার পুরুষ ছিলে না। যতোক্ষন অবধি একটা কাল্পনিক নাম অন্য কারো সাথে যুক্ত হয়, ততোক্ষন সেটা হয়তো হাওয়াই থাকে। কিন্তু তুমি আমার জীবনে কোনো কাল্পনিক নাম ছিলে না। আমি তোমাকে স্পর্শ করেছি, ভালোবেসেছি, সবই ছিলো প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য আর জাগতিক। অথচ আজ তুমি আমার সামনে দিয়ে এতো জোরে দৌড়ে চলে গেলে, আমি আর তোমাকে নাগালই পেলাম না। মনে হচ্ছে আজ, তুমি আমার কল্পনার কোনো সুপুরুষ আর আমি কল্পনার কোনো রাজমুকারী। জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা দেখে কখনো বুঝা যায় না বা মন বুঝতে চায় না কোনটা সত্যি আর কোনটা সত্যি নয়। আমাকে এই একা ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনাটা আমার কাছে যদি মিথ্যা হতো, যদি এটা নিছক একটা সপ্ন হতো! কিন্তু এটাই সত্যি যে, ঘটনাটা সত্যি। তুমি নাই এই মিথ্যার পর্দাটা যখন আমি খুলে দেই, তখন তুমি আছো এটাই সত্যি হয়ে চারিদিকে প্রকাশিত হও আমার রক্ত নালির প্রতিটি ফোটায়, আমার নিশ্বাসের প্রতিটি শ্বাসে, আমার বিশ্বাসের প্রতিটি বিন্দুকনায়। তুমি আজ আসলেই আমার সামনে আর নাই। কিন্তু অন্তর, আত্তা আর মনে কোথাও তোমার অনুপস্থিতি আমি দেখি না। তুমি ছিলে, তুমি আছো আর সারা জীবন থাকবে আমার। তুমি মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাইনি। হয়তো আমি জামিনের মতো একটা মুক্ত জীবন ভোগ করছি যেখানে প্রতিনিয়ত আমাকে তাড়া করে তোমার সেই আদর আর মমতা। এখন আমাকে শুধু কিছু অভ্যাস পাল্টাতে হবে যা তুমি আমাকে দিয়েছিলে।

আসলে এটার নামই জীবন যার উপলব্ধি শুরু হয় মৃত্যুর মতো কোনো এক অফেরতযোগ্য বিচ্ছেদের শুরুতে। আর শেষ হয় নিজের বিচ্ছেদের মুহুর্তে। আমি এখন বেচে আছি সেই মুহুর্তটির জন্য যার নাম ‘জীবন-বিচ্ছেদ’। আর সেটা শুধুই আমার জন্য বিচ্ছেদ।  

(ছোট ভাবী আর ছোট ভাইকে উতসর্গ করা লেখাটা)

৪/৪/২০২১-রিভার সাইডের ইতিকথা

সনটা ছিলো ২০০৪। 

তখন মীরপুর সেনানীবাসে ৪ ফিন্ড আর্টিলারিতে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কর্মরত আছি।  আমার প্রমোশন হবার কথা মেজর থেকে লেফটেনেন্ট কর্নেল পদে। কিন্তু মামুলি একটা কারন দেখিয়ে তারা আমাকে প্রমোশন দিলো না। স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, ডিভ লেভেলে জিএসও -২ (অপারেসন) হিসাবে কাজ করেছি, আর্মি হেড কোয়ার্টারে ও জি এস ও-২ হিসাবে কাজ করেছি। প্রমোশনের জন্য কোনো প্রকার কমতি আমার নাই। কিন্তু তারপরেও আমাকে প্রমোশন না দিয়ে আমার জুনিয়র ১৪ লং কোর্সের মেজর মজিস, যে কিনা ক্যাটেগরি-সি , স্টাফ কলেজ ও করে নাই, গানারী স্টাফ ও করে নাই, সে আমার বদলে প্রমোশন পেয়ে ৪ ফিল্ডে পোস্টিং এসেছে। এটা শুধু মাত্র সে খালেদা জিয়ার সাথে কোনো না কোন ভাবে পরিচিত। শোনা যায় যে, মজিদের বাবা খালেদা জিয়ার বাসায় নাকি মালীর কাজ করতো। আর সে সুবাদেই এই নেপোটিজম। এর কোনো মানে হয়? সিদ্ধান্ত নিলাম, এপেন্ডিক্স-জে (ইচ্ছেকৃতভাবে অবসর নেওয়া) দিয়ে আর্মি থেকে চলে যাবো।  সাথে সাথে এটাও ভাব লাম যে, বাইরে গিয়ে কোনো চাকুরী ও করবো না। কিন্তু কি ব্যবসা করবো সেটা তো কখনো শিখি নাই। একচুয়ালি, আর্মির অফিসার গন, সারাজীবন তাদের ডেডিকেসন থাকে আর্মির যাবতীয় কাজে, সে আর কোনো বিকল্প কাজ শিখেও না। ফলে আমারো তাই হয়েছে। অনেক ভাবছিলাম, কি করা যায়। কিন্তু কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। 

ঠিক এই সময় একটা ঘটনা ঘটে গেলো। কোনো এক কাকতালীয় ভাবে একদিন আমার সাথে  নাজিমুদ্দিনের পরিচয় হয় মীরপুর সেনানীবাসে। আমিই তাকে মীরপুর সেনানিবাসে দাওয়াত করেছিলাম কারন সে আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো। আমি কখনোই নাজিমুদ্দিনকে সামনাসামনি দেখিও নাই, কথাও বলি নাই যদিও সে আমাদেরই এলাকার লোক। নাজিমুদ্দিন এলাকায় একজন খুব প্রতাপশালী খারাপ মানুষের মধ্যে একজন ছিলো। ধর্মের কোনো বালাই ছিলো না, সারাদিন মদের উপর থাক্তো, আর নারী ছিলো তার প্রিয় ভোগের মধ্যে একটি। সিনেমার জগত থেকে শুরু করে, সঙ্গীত রাজ্যের সব নারীদের এবং সাধারন মেয়েরা কেউ তার হাত থেকে রেহাই পায় নাই। তার টাকা ছিলো, ফলে টাকার জন্য ই সব ক্লাসের অর্থলোভী মেয়েগুলি তাকে দিনে আর রাতে সঙ্গ দিতো। সে বসুন্ধরার প্রোজেক্ট সমুহে মাটি সাপ্লাই দেওয়ার বৃহৎ একচ্ছত্র সাপ্লাইয়ার ছিলো। জমি দখল, অবৈধ ভাবে মাটি কাটা, অন্য মানুষের জমি কম দামে ক্রয় করে বসুন্ধরাকে দেওয়া, এই ছিলো তার কাজ। কিন্তু তার একটি জায়গায় সে কখনো ই বুদ্ধিমান ছিলো না। সে সব সময় পাওয়ার অফ এটর্নি বা আম মোক্তার নিয়ে জমি ক্রয় করত। সেই রকম ভাবে আমাদের গার্মেন্টস বিল্ডিংটা যে জমির উপর অবস্থিত, সেটা জনাব আব্দুল বারেক এবং তার পরিবারের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলো। হয়ত কিছু টাকা বাকী থাকতে পারে। কিন্তু সে জমিটা রেজিস্ট্রি করে নেয় নাই। পরিবর্তে সে বারেক সাহেব এবং তার পরিবারের কাছ থেকে পাওয়ার অফ এটর্নি নিয়ে এখানে দশ তালা ফাউন্ডেসন দিয়ে হাসনাবাদ সুপার মার্কেট নামে আপাতত তিন তালা বিল্ডিং (সাথে একটি বেসমেন্ট) তৈরী করে। 

প্রাথমিকভাবে সে নিজেই একটা গার্মেন্টস দিয়েছিল এবং এর নাম রেখেছিলো “রিভার সাইড সুয়েটারস লিমিটেড”, বেশ সুন্দর নাম। নাজিমুদ্দিন সাহেব গার্মেন্টস চালানোর জন্য যে জ্ঞ্যান, যে বিদ্যা থাকা দরকার সেটা তার কিছুই ছিলো না। কিন্তু তার অনেক টাকা ছিলো। ফলে গার্মেন্টস এর জন্য তিনি যাদেরকে অংশীদারী দিয়েছেন, তারা সবাই ছিলো নিজেদের আখের গোছানোর ধান্দায়। ফলে ধীরে ধীরে অত্র গার্মেন্টস শুধু লোক্সানের দিকেই যাচ্ছিলো। এই লোক্সান এক সময় নাজিমুদ্দিনের কাছে খুব বিরক্তিকর মনে হচ্ছিলো বটে কিন্তু সে অন্য দিকে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীটা রাখতেও চাচ্ছিলো। 

অনেক কথাবার্তার পর, নাজিমুদ্দিন আমাকে একটা অফার দিলো যে, যদি আমি চাই তাহলে আমি তার রিভার সাইড সুয়েতারস ফ্যাক্টরী টা চালাইতে পারি। তিনি আমাকে ৩০% শেয়ার দিবেন আর তিনি ৭০% শেয়ার নিজে রাখবেন। এদিকে আমি কোনো কিছুই বুঝি না কিভাবে কোথা থেকে গার্মেন্টস এর অর্ডার নিতে হয়, কিভাবে ব্যাংকিং করতে হয়, কোনো কিছুই না। কিন্তু সাহস ছিলো অনেক। পরের দিন আমি রিভার সাইড সুয়েতারস দেখতে গেলাম। প্রায় বন্ধ অবস্থায় আছে ফ্যাক্টরীটা। মাত্র ১৮ জন অপারেটর কাজ করছে। কারেন্ট লাইন বন্ধ কারন প্রায় ৪ মাসের অধিক কারেন্ট বিল বাকী আছে। গ্যাস লাইন ও বন্ধবিল পরিশোধ না করার কারনে। ব্যাংকে প্রায় তিন কোটি টাকা লোনা আছে। ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ না করার কারনে কোন এল সি করা যায় না, সি সি হাইপোর কোনো সুযোগ নাই। এর মানে ফ্যাক্টরীটা একেবারেই লোকসানের প্রোজেক্ট। ব্যাংক ম্যানেজার ছিলেন তখন মিস্তার তাহির সাহেব এবং সোস্যাল ইস লামী ব্যাংকের এম ডি ছিলেন তখন মিস্তার আসাদ সাহেব। ঊনারা দুজনেই একটা উপদেশ দিলেন যে, যদি আমি নিতে চাই, তাহলে ব্যাংক রি সিডিউলিং করতে হবে। ব্যাংক রিসিডিউলিং কি জিনিষ তাও আমি জানি না। যাই হোক, শেষ অবধি আমি রিস্ক নেওয়ার একটা প্ল্যান করলাম। 

ফ্যাক্টরীটা তখন চালাচ্ছিলো জনাব লুতফর রহমান নামে এক ভদ্রলোক। এরও স্বভাবের মধ্যে অনেক খারাপ কিছু ছিলো। সে রীতিমতো জুয়া এবং নারীঘটিত ব্যাপারে খুব আসক্ত ছিলো। সাবকন্ট্রাক্ট করে যে টাকা পেতো, সেটা শ্রমিকদের মুজুরী না দিয়ে জুয়ার আসরেই বসে হেরে আসতো। ফলে প্রতিনিয়ত শ্রমিকগন সবশেষে সেই আবারো নাজিমুদ্দিনের বাসার সামনে গিয়েই বেতনের জন্য আন্দোলন করা ছাড়া কখনো বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা থাক্নতো না। নাজিমুদ্দিন এতোটাই বিরক্ত ছিলো যে, কোনোভাবে এটা অন্য কারো হাতে দিতে পারলে সেও যেনো বেচে যায়।

ব্যাংক রিসিডিউলিং করার জন্য মোট ৪০ লাখ টাকার প্রয়োজন। আমার কাছে এতো টাকা ছিলোও না। ফলে আমি আমার পরিচিত কিছু সিনিয়র আর্মি অফিসারদের সাথেও কথা বললাম যারা খুব তাড়াতাড়ি আর্মির চাকুরী ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু সবাই লাভ চায়, আনসারটেনিটিতে কেউ ইনভেস্ট করতে চায় না। ফলে আমার পরিচিত আর্মি অফিসার গন ক্রমে ক্রমে পিছু হটে গেলেন।

কোন উপায়ন্তর না দেখে আমি আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ যিনি আমেরিকায় থাকেন, তার কাছ থেকে তখন ৪০ লাখ টাকা ধার নিলাম এবং বাকী সব রি সিডিউলিং করে নিলাম। সাথে ৩০% শেয়ারের সমান টাকা আমি নাজিমুদ্দিন কেও দিয়ে দিলাম (কিছু জমি দিয়ে আর কিছু ক্যাশ দিয়ে)।

এতে আরেকটি সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিলো। আমি ছিলাম রিভার সাইড সুয়েতারস এর চেয়ারম্যান আর নাজিমুদ্দিন ৭০% নিয়ে থাক্লেন এম ডি হিসাবে। কিন্তু নাজিম ভাই অফিশিয়াল কোনো কাজেই ইনভল্ব হলেন না। তার দস্তখত লাগ্লেও তাকে কোথাও খুজেই পাওয়া যায় না। তাছাড়া রুগ্ন এই ফ্যাক্টরিতে অনেক প্রয়োজনেই টাকাও লাগতোকিন্তু নাজিমুদিইন ভাই তার কোন ভাগ ই নিতেন না। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে সার্বক্ষণিক টাকা ধার করে করে চালাইতে শুরু করলাম বটে কিন্তু একটা সময় আমার পক্ষে আর চালানো সম্ভব হচ্ছিলো না।

উপান্তর না দেখে একদিন আমি নাজিমুদ্দিন ভাইকে বললাম যে, হয় আমার ৩০% শেয়ার আবার তিনি নিয়ে আমার ইনভেস্টমেন্ট ফেরত দিক অথবা বাকী ৭০% শেয়ার একেবারে আমার নামে ট্রান্সফার করে দিক যেনো আমি আমার মতো করে চালাইতে পারি। তখনো ব্যাংকে প্রায় তিন কোটি টাকার মতো বাকী। কিস্তি দিতে পারছি না। এল সি করতে পারছি না। শুধু নিজের পকেট থেকেই টাকা খরচ হচ্ছে। নাজিম ভাই চালাক মানুষ। তিনি সব লোন আমার নামে ট্রান্সফার করে আর কিছু টাকা ক্যাশ নিয়ে পুরু ৭০% শেয়ার বিক্রি করতে রাজী হয়ে গেলেন। ফ্যাক্টরীর এসেট, লায়াবিলিটিজ হিসাব কিতাব করে শেষ পর্যন্ত আমি বাকী ৭০% শেয়ার নিয়ে আরেকবার রিস্ক নেওয়ার সাহস করলাম। আমার সাথে নতুন লোক মিস্তার মোহসীন (যিনি এক সময় এই ফ্যাক্টরীর ডি এম ডি হিসাবে কাজ করতেন) যোগ হলেন। তাকে আমি খুজে বের করেছি এই কারনে যে, তিনি গার্মেন্টস লাইনে বেশ পাকা, বায়ার দের সাথে তার পরিচয় আছে, ব্যাংকিং বুঝে। আমি তাকে বিনে পয়সায় ৩০% শেয়ার লিখে দিয়ে তাকে চেয়ারম্যান করলাম আর আমি এম ডি হয়ে গেলাম।

নতুন করে আবার ইনভেস্টমেন্ট এর পালা। আমি আমার আত্মীয় জনাব মুস্তাক আহ মেদ (আমার স্ত্রীর ছোট ভাই, যিনি আমেরিকায় থাকে) কে গার্মেন্টস এর শেয়ার চায় কিনা জানালে তিনি ২৫% শেয়ার নেওয়ার একটা ইন্টারেস্ট দেখান এবং তিনি প্রায় ৪৫ লাখ টাকা যোগান দেন। এইভাবে আমি আরো অনেক স্থান থেকে ফান্ড যোগার করে করে ফ্যাক্টরীটি চালানোর চেষ্টা করছিলাম। প্রচুর সময় দিচ্ছি, রাত ফ্যাক্টরীতেই কাটাই প্রায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, ফ্যাক্টরিটা ঘুরে দারাচ্ছিলো না। এক সময় আমার মনে হলো, মোহ সীন সাহেব নিজেই ফ্যাক্টরীর উন্নতির জন্য মন দিয়ে খাটছেন না। তিনি যেহেতু নিজে কোনো টাকা ইনভেস্ট করে নাই, ফলে তার সিন্সিয়ারিটি আমার কাছে একটা প্রশ্নের উদ্রেক করলো। সেলারীর সময় তিনি ট্যাব লিকে চলে যান, খুব কম রেটে অর্ডার নেন, কস্টিং প্রাইসের চেয়েও কম রেট। ফলে আমি লোনে ডুবে যাচ্ছিলাম। কিছুতেই আর সামাল দিতে পারছিলাম না। 

অবশেষে ২০০৭ এর শেষে আমি ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিলাম যে, যা লস হবার হয়ে গেছে, এবার আর লস দিতে চাই না। আমি ফ্যাক্টরী বিক্রি করে দেবো এবং ব্যাংকের টাকা শোধ করতে পারলেই হবে। কারন ব্যাংক লোন তো এখন আমার উপরেই একা। যদিও মোহসীন সাহেন ৩০% এর মালিক কিন্তু তার কোনো টাকা নাই এবং তিনি এই ব্যাপারে কোনো সংকিতও নন। আমি মোহসীন ভাইকে বললাম যে, আমি ফ্যাক্টরী বিক্রি করতে চাই। তিনি একজন গ্রাহক আনলেন, নাম মিস্টার মুরতুজা আর শ্রীলংকান এক ভদ্রলোক নাম প্রিয়ান্থা। ঊনারা এমন একটা প্রপোজাল দিলেন, আমি হিসেব করে দেখলাম যে, আমি লোন থেকে বেরিয়ে যেতে পারি।

মিস্টার মুরতুজা এবং মিস্টার প্রিয়ান্থা দুজনেই গার্মেন্টস লাইনে বেশ পাকা এবং তারা প্রফেসনাল। তারা নতুন করে ফ্যাক্টরীটা আবার তাদের মতো করে সাজিয়ে ব্যবসা করবেন এবং এটা সম্ভব।

মুর্তজা ভাই এবং মিস্টার প্রিয়ান্থা ধীরে ধীরে এলাকা সম্পর্কে জানতে জানতে একটা জিনিষ বুঝলেন যে, এই এলাকাটি সভ্য কোনো জায়গা নয় এবং এখানে ব্যবসা করতে গেলে লোকাল সাপোর্ট ছাড়া কোনোভাবেই ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এই ফিডব্যাকটা তারা লোকাল এলাকা, বিভিন্ন বন্ধুবান্ধব, এবং স্টাফদের ছাড়াও ব্যাংক থেকে পেলেন যে, হয় মিস্টার নাজিমুদ্দিন অথবা মেজর আখতারকে সাথে না নিলে নিরাপদে এখানে ব্যবসা করা সম্ভব না। এই এলাকাটি আবার আমার নিজের। সবাই আমাকে চিনে। তারমধ্যে আমি একজন আর্মি অফিসার হওয়াতে সবাই আমাকে একটু ভয়েও থাকে।

হতাত করে একদিন মুরতুজা ভাই এবং প্রিয়ান্থা আমার মিরপুরের বাসায় রাত ১১ টায় এসে হাজির। তারা আমাকে এইমর্মে জানালেন যে, তারা ১০০% শেয়ার কিনবেন না। ৯০% শেয়ার কিনবেন এবং ১০% শেয়ার আমাকে রাখতেই হবে। আমি আমার সময়মতো ফ্যাক্টরীতে আসতে পারবো এবং আমি আমার এমডি পোস্টেই থাকবো। সম্মানি হিসাবে আমি তাদের সমান সম্মানিই পাবো। ব্যাপারটা আমি সবশেষে মেনেই গেলাম। অর্থাৎ আমি ১০%, মুরতুজা ভাই ৪৫% আর প্রিয়ান্থা ৪৫% শেয়ার নিয়ে আবার ফ্যাক্টরী রান করতে শুরু করলো। এবার এটা প্রান ফিরে পেলো।

২০১০ সালে প্রিয়ান্থা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৪১ বছর বয়সে মারা যান। ইতিমধ্যে মুরতুজা ভাই আমি কেমন লোক, কেমন চরিত্রের মানুষ, সেটা বুঝে গিয়েছিলেন। আমি আসলে মাত্র ১০% শেয়ার নিয়ে কোনো হস্তক্ষেপই করছিলাম না। কারন ঊনারা ৯০% এর মালিক, সেখানে আমার  মন্তব্য কিংবা আমার কোনো সাজেশন খুব একটা মুল্যায়ন করা হবে কি হবে না সেটা নিয়ে আমি একটু তো সন্দিহান ছিলামই। ফলে আমি জাস্ট নামেমাত্র এমডি হিসাবেই ছিলাম আর লোকাল কোনো সমস্যা হলে সেটা আমি সামাল দিতাম। কোথায় কোন বায়ারের অর্ডার, কিংবা কবে কোন শিপমেন্ট এগুলো নিয়ে আমি কখনো মাথা ঘামাইতাম না।

আমার যখন এই রকম এক্টা অবস্থা, আমি তখন নিজে নিজে কিছু করা যায় কিনা সেটাও ভাবছিলাম। ফলে ডেভেলপারের কাজেও একটা চেষ্টা করছিলাম, যার ফল হচ্ছে বাসাবোতে একটা প্রোজেক্ট। সেটার ইতিহাস অন্য রকম। এটা না হয় পরেই বলবো।

প্রিয়ান্থা মারা যাবার পর, মুরতুজা ভাই প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ারের মধ্যে তিনি নিলেন ২০% আর আমি নিলাম ২৫%। এতে আমার শেয়ার দাড়ালো ৩৫% আর মুরতুজা ভাইয়ের শেয়ার দাড়ালো ৬৫%। ২৫% শেয়ার নেবার জন্য আমি মুরতুজা ভাইকে ৫৮ শতাংশ জমি লিখে দিতে হলো। এভাবেই বর্তমান পর্যন্ত চলছে। ফ্যাক্টরি ধীরে ধীরে বেশ উন্নত করতে লাগলো। কিন্তু আমার ভিতরে একটা আনসারটেনিটি সবসময় কাজ করতো যে, একটা সময় আসবে যে, মুরতুজা ভাই কোনো না কোনো সময় এর বিকল্প হিসাবে অন্যত্র বেরিয়ে যাবেনই। ফলে আমি নিজেও রিভার সাইড সুয়েটারস এর পাশাপাশি আরো কোনো ব্যবসা করা যায় কিনা আমি একটা বিকল্প খুজছিলাম। হয়ত তার ই একটা বিকল্প প্রোডাক্ট ব্যবসা হিসাবে মা ইন্ডাস্ট্রিজের  জন্ম। ওটাও আরেক ইতিহাস। এটাও পরে বলবো। 

গত ৮ জানুয়ারী মাসে সড়ক ও জনপথ আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীটির কিছু অংশ ভেঙ্গে দিয়ে যায় কারন আমাদের ফ্যাক্টরী বিল্ডিংটি বিল্ডিং এর মালিক জনাব নাজিমুদ্দিন সাহেব গায়ের জোরে সরকারী জায়গায় কিছুটা অংশ বাড়তি তৈরী করেছিলেন। বর্তমানে পদ্মা সেতু বানানোর কারনে সরকার তার নিজের জায়গা দখল করতে গিয়ে আমাদের বিল্ডিং ভেঙ্গে দিয়ে গেলো। তাতে আমাদের কোন সমস্যা ছিলো না। সমস্যাটা হয়েছে গার্মেন্টস বায়ারদের আসোসিয়েসন একরড আমাদের বিল্ডিংটা আন্সেফ করিয়ে দিলে আর কোনো বায়ার এখানে অর্ডার প্লেস করবেনা। তাতে আমাদের ব্যবসা লাটে উঠবে। আমরা এখানেই পথে নেমে যেতে হবে।

যেদিন সড়ক ও জনপথ আমাদের ফ্যাক্টরী বিল্ডিংটা ভেঙ্গে দিয়ে যায়, সেদিন ছিলো আমাদের জন্য একটা মারাত্মক বিপর্যয়। একদিকে উক্ত বিল্ডিং এবং জমির মালিকানা নিয়ে কয়েকটি দলের সাথে কোন্দল, মামলা, মারামারি এবং সন্ত্রাসী হুমকী ইত্যাদি, অন্যদিকে সড়ক ও জনপথের নিজস্ব জায়গাউদ্ধারের কারনে ভাঙ্গাভাঙ্গি, ফলে মাঝখানে আমরা যারা অনেক টাকা এই বিল্ডিং এ ব্যবসার কারনে ইনভেস্ট করে ফেলেছি সেটা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। 

যেদিন থেকে জনাব নাজিমুদ্দিন মারা গেলো, তার পরের থেকেই একের পর এক বাহিনী এই জমি এবং বিল্ডিং দখল করে ফেলার জন্য পায়তারা করছে। জনাব বারেক আমাকে উকিল নোটিশ দিয়েছে যেনো তাকে ভাড়া দেওয়া হয়, আবার নাজিমুদ্দিনের তিন বউ সরাসরি ভাড়া চায়, অন্যদিকে জরীফ নামে আরেক লোক পুরু জমি এবং বিল্ডিং এর মালিকানা দাবী করছে। আমার এইখানে এডভান্স দেওয়া আছে প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। ফলে আমার এই অগ্রিমের টাকাকে ফেরত দেবে তার কোনো দায়ভার কেউ নিতে চাইছে না। তাহলে আমার এতোগুলি টাকার কি হবে? আমি কাউকেই আর ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নই। আজ প্রায় ৩৮ মাস হয়ে গেছে আমি কোনো ভাড়া দিচ্ছি না। 

জমি এবং বিল্ডিং নিয়ে নাজিমুদ্দিনের তিন বউ আরেক বাহিনী জনাব বারেক সাহেবের সাথে কখনোই সমঝোতায় পৌছতে পারছিলো না। মিস্টার বারেক, নাজিমুদ্দিনের পরিবার কিংবা বারেকের অন্যান্য পরিবারের সদস্যরা ও আমাকে অফার করেছে যদি আমি কিছু টাকা দিয়ে উক্ত বিল্ডিং এবং জমি বারেক সাহেব্দের কাছ থেকে কিনে নেই কিংবা নাজিমুদ্দিনের পরিবার ও আমাকে এক ই ধরনের অফারকরেছিল।  কিন্তু আমি কোনো ভাবেই প্ররোচিত হইনাই। এর বদলে, আমি চেষ্টা করছিলাম যে, কোনোভাবে মিস্টার বারেক এবং নাজিমুদ্দিনের পরিবারের মধ্যেকোনো ভাবেই সমঝোতা করা যায় কিনা। কেউ ইসমঝোতার কাছাকাছি ছিলেন না। ফলে এটা এভাবেই স্ট্যাল্মেট অবস্থায় চলছিলো, আমিও কোন ভাড়া দিচ্ছিলাম না। কারন আমার অগ্রিম টাকা শোধ করতেই হবে। অনেক টাকা , প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। 

প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে এইওবস্থার। হতাত করে শুনলাম যে, সাইফুল ইসলাম নামে চাদপুরের কোনো এক ৬৯ বছরের মানুষ গত ২০০৭ সালে নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে এই জমি এবং এই বিল্ডিং কিনে নিয়েছিলো। এটা একটা অবাস্তব ঘটনা। কারন আমি গত ২০০৬ থেকে এই ফ্যাক্টরিতে আছি। কখনো বারেক সাহেব কিংবা ওই সাইফুল ইসলাম কখনো এখানে আসে নাই। আর আমার সাথে সর্বশেষ ফ্যাক্টরী চুক্তি হয়েছিলো ২০০৯ সালে। তাহলে নাজিমুদ্দিন কিভাবে ২০০৭ সালে বিক্রি করে? আর আমি তো ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ফ্যাক্টরীর ভাড়া দিয়ে আসছিলাম। তাহলে এতোদিন সাইফুল ইসলাম সাহেব কেনো  ভাড়া নিতে এলেন না? 

মামলা হয়েছে, বারেক সাহেব করেছে, আবার এদিকে সাইফুল ইসলাম সাহেবের দেওয়া পাওয়া অফ এটর্নি পেয়েছে সোহাগ গ্রুপের সাথে জড়িত মালিবাগের জাহাঙ্গীর হাসান মানিক। আর ঊনার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছে এলাকার জরীফ নামে এক লোক। সে আমাদের প্রতিনিয়ত খুব ডিস্টার্ব করছিলো এই বলে যে, সে এবং জাহাঙ্গীর হাসান মানিক যেহেতু নতুন মালিক, ফলে তাকে ভাড়া দিতে হবে , তা না হলে এখানে খুবই অসুবিধা। আজকে পানির লাইন বন্ধ করে দেয় তো কাল কারেন্টের লাইন নিয়ে ঝামেলা করে। অথচ আমি জানি সত্যটা কি। কিচ্ছু করার নাই। আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই কে বা কারা মালিক এই বিল্ডিং বা জমির। আমার ইন্টারেস্ট হলো আমার ব্যবসা, আমার অগ্রিম টাকা এবং পিস্ফুল সমাধান। 

আমি এবং মুরতুজা ভাই মেন্টালি খুব ডিস্টারবড হচ্ছিলাম। কিছুতেই ভালো একটা সমাধান করতে পারছিলাম না। 

ঠিক এই সময় সড়ক ও জনপথের অফিসাররা পদ্মা সেতুর কারনে আমাদের ফ্যাক্টরীর প্রায় ১৫-২০ ফুট ভাঙ্গার জন্য বুল ডোজার নিয়ে হাজির। আমরা কেহই ফ্যাক্টরীতে ছিলাম না। আমি যখন এলাম, তখন ইতিমধ্যে প্রায় ৫ থেকে ৭ ফুট ভেঙ্গে ফেলেছে। খুবই ভয়ংকর একটা অবস্থা। আমাদের ফ্যাক্টরীটা একরড সারটিফায়েড। এখন যদি কোনো কারনে একরড জানতে পারে যে, আমাদের ফ্যাক্টরীতে ভাঙ্গা পড়েছে, কোনোভাবেই আমরা একরডের সারটিফিকেট রিটেইন করতে পারবো না। আর যদি সারটিফিকেট রিটেইন করতে না পারি, তাহলে কোনো অবস্থায়ই  আমাদের বায়াররা আমাদের অর্ডার প্লেস করবে না। 

সড়ক ও জনপথের অফিসারদেরকে অনুরোধ করা হলে তারা মালিকপক্ষ ছাড়া কোন কথাই বলবেন না বলে ভাংতেই থাক্লেন। বারেক সাহেবকে ফোনে জানালে ঊনি এমন একটা ভাব করলেন যে, ভাংতে থাকুক। যেটুকু থাকে সেটুকু নিয়েই ঊনি পরবর্তীতে জড়িফের সাথে ফাইট করবেন। জরীফের সাথে কথা বলা হলো, সে মালিকের পক্ষে যেভাবেই হোক একটা প্রক্সি দিলো। বারেক সাহেব অনেক পরে যদিও স্পটে এলেন কিন্তু তিনি জরীফের ভয়েই হোক আর তার অনিহার কারনেই হোক কারো সাথেই আলাপ করলেন না, আবার সড়ক ও জনপথের ম্যাজিস্ট্রেট এর সাথেও কোনো কথা বললেন না। 

আমি বুঝতে পারলাম, এখন ব্যবসা করতে গেলে আমাকে জরীফের লোকজনকেই মালিক বলে মেনে নেওয়া উচিত। মামলার ফলাফল দিবে আদালত। যদি জরীফ গং মামলায় জিতে আসে তাতে আমার কোনো সমস্যা নাই, আবার বারেক জিতে আসে তাতেও আমার কোনো সমস্যা নাই। আমি শেষ পর্যন্ত জরীফের দলের সাথে একটা চুক্তি করেই ফেললাম। অন্তত তারা আমার অগ্রিম টাকাটার একটা দায়িত্ত নিয়েছেন। যদিও পুরুটার নয়। আমার প্রায় ২৫/৩০ লাখ টাকার লস হবে। 

(চলবে)

০৪/০৪/২০২১- অনলাইন দুনিয়া\

অনলাইন দুনিয়া এখন মানুষের জীবনে একটা অভিন্ন অংশ হয়ে গেছে। এই দুনিয়া কখনো কখনো একদম অপরিচিত দুজন মানুষকে খুব কাছে নিয়ে আসে, বন্ধু বানায়। যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, একাকিত্ত বোধ করে, কিংবা খুব খুশীতে থাকে, সে অন্য কারো সাথে তার এই অনুভুতিগুলি শেয়ার করতেই চায়। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই কষ্টের ব্যাপারগুলি শেয়ার করার খুব দরকার মনে করে। তখন দরকার হয় এমন কেউ যারা খুব কাছের বন্ধু কিংবা তার থেকেও কাছের কেউ। এই বন্ধুত্ব আমাদের জীবনের একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। আমরা আমাদের ভাল বা খারাপ সময়ের সময় আমরা এই বন্ধুগুলির মাঝেই থাকি। কিন্তু এই বন্ধুত্ব যদি এই অনলাইন দুনিয়ার কারনে কোনো ভুল মানুষের সাথে হয়ে যায়, তাহলে আমরা বিপদে মধ্যেও পড়তে পারি। কারন খারাপ সঙ্গের ফল খারাপই হয়।

অনেকের জীবনের অনেক কাহিনী আছে যা রহস্যে ঘেরা থাকে। যখন কেউ এই রহস্য ঘেড়া চাদর সরাতে যান, তখন এমন এমন কিছু প্রশ্নের উদয় হতে পারে যা সাভাবিক জীবনের ভীত নড়ে যেতে পারে। এইসব রহস্য ঘেরা প্রশ্ন জানলেও অসুবিধা আবার না জানলেও জীবন সাভাবিক হয়ে উঠে না। এক্ষেত্রে কি জানা উচিত আর কি জানা একেবারেই উচিত না, সেটাই নির্ভর করে পরবর্তী সুখী জীবনের জন্য। তাই এই অনলাইন দুনিয়ার অপরিচিত মানুষগুলির কতটা কাছে যেতে হবে, কতটা তথ্য শেয়ার করতে হবে, কাকে কতটা জায়গা দিতে হবে এটা খুব জরুরী। কাউকে নিজের সম্পকে কতটা জানাতে হবে এই সিদ্ধান্ত হুজুগের বশে নয় ঠান্ডা মাথায় নেয়া উচিত। ইন্টারনেটে কোনো অচেনা মানুষের সাথে বন্দধুত্ত করতে হলে সবার আগে সবচেয়ে যেটা করা উচিত তা হলো নিজের সুরক্ষা। আর বিপদের আচ পাওয়ার সাথে সাথেই  নিজেকে বাচানোর জন্য তৈরী থাকা। ইন্টারনেটের আরেকটি নাম হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব, একে ওয়েব এই জন্য বলে, কারন এটা মানুষকে, কিছু ইনফর্মেশনকে একটা ওয়েবের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়। কিন্তু এই ওয়েবও একটা ফাদ হতে পারে। একটা জাল, একটা ট্র্যাপ।

এই অনলাইন দুনিয়ায় বেশীরভাগ বিশ্বাস আসে একটা অন্ধ বিশ্বাস থেকে। কোনো কিছু না জানা থেকে। আর এই অন্ধ বিশ্বাস এমন এক চোরাবালী, যার না আছে একুল, না আছে ওকুল। সেখানে না কোনো জ্ঞানের আলো পৌছতে পারে, না সেখানে তর্কের কোনো জায়গা আছে। এখানে অনেক মিথ্যা বারবার উচ্চারন হয়। ভরষার স্থান তৈরী করা হয়। মজার বিষয় হলো- একটা মিথ্যাকে যখন কেউ বারবার মিথ্যে বলা হয়, তাহলে সত্যিটা কিছুটা হলেও ফেকাশে হয়ে যায়। বাস্তব জীবনে আমরা যেমন সিরিয়াল কিলারের সন্ধান পাই, তেমনি এই অনলাইন দুনিয়ায় সিরিয়াল ঠকবাজও হয়। এরা নিজেদের নেশায় এতোটাই মশগুল হয়ে থাকে যে, ও শিকারের আওয়াজটা শুনতেই পায় না। সে কতটা ক্ষতি বা আঘাত করছে সামনের মানুষটাকে, সে সেটা দেখতেই পায় না। কিন্তু যে আঘাত পায় সে প্রত্যেকটা জিনিষ দেখতে পায় আর শুনতেও পায়। আর মনেও রাখে। ফলে এই অনলাইন দুনিয়ার সব কাহিনীর সামনে যা দেখা যায়, তার থেকে অনেক বেশি ঘটনা লুকিয়ে থাকে না দেখার পিছনে।

কারো অতিতকে ঘেটে বর্তমানকে বিচার করাই হয়তো ঠিক কাজ নয়, কিন্তু ভরষা হলো এমন একটা কথা যা বর্তমান আর অতীতের মধ্যে মেল বন্ধন করে, ভবিষ্যতের দিকে অনুমান করে। কোন ব্যক্তি কি করেছিলো, কি করতে চলেছে, এটা নির্ভর করে সে ভবিষ্যতে কি করতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে , যখন কারো সাথে কোনো সম্পর্ক হয়, হোক ব্যবসায়িক বা নিজস্ব, ঐ ব্যক্তির সম্পুর্ন জীবন একটা দলিল হিসাবে সামনে আসে। তখন বিচার বিশ্লেষন করে আমরা বিচার করতে পারি যে, সম্পর্ক রাখা উচিত নাকি রাখা উচিত নয়। এটা কোনো চরিত্র বিশ্লেষনের ব্যাপার না, শুধু একটা সম্পর্ক জোড়ার লাভ এবং ক্ষতির প্রশ্ন। ঠিক সেভাবে যেভাবে মানুষের অতীতের প্রশ্ন উঠে, তবে তাকে এই ব্যাপারটা বুঝতেই হবে আজকে সম্পন্ন হওয়া ভুল কাজ, আগামি দিন উম্মোচিত হবে সেটাই নিশ্চিত। অপরাধ কোনো ফল দেয় না, আর যদিও দেয়, সেই ফল একটা বিষাক্ত ফল।

তাই জীবিনকে তর্ক, জ্ঞান আর বিবেকের মাধ্যমেই চালানো উচিত, অন্ধ বিশ্বাসে না।

৪/৪/২০২১-বিকাল ৫টা, ছোটভাবী মারা গেলেন

বিকেল ৩ টায় মিটুল আমাকে ফোন করে জানালো যে, ছোট ভাবী হটাত করে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন এবং এইমাত্র ওনাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। মাত্র ২ ঘন্টার ব্যবধানে আরেকটা খবর পেলাম যে, ছোট ভাবী ক্লিনিক্যালি ডেড। ঠিক সাড়ে ৫ টায় জানলাম, ছোট ভাবী আর নাই।

বড্ড আফসোস হচ্ছিলো ছোট ভাবীর জন্য। মানুষটা যতোটা না চালাক ছিলো, তার থেকে বেশী ছিলো সহজ এবং বোকা। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান ছিলো না যা তিনি প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে এমন কিছু হতে পারতেন যা একটা মহিলার জীবনের জন্য অপুরনীয় পাওয়া। তার সবচেয়ে বড় যে গুনটা আমি দেখেছি, তিনি যাকে পছন্দ করতেন, তার ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন নাই। সে একেবারে অনেক ঊর্ধে রাখেন তাঁকে।

ছোট ভাবীর সাথে আমার অনেক ভালো একটা সম্পর্ক ছিলো যা হয়তো এই পৃথিবীর অনেক মানুষের ছিলো অজানা। তিনি এখন আর এই দুনিয়ায় নাই, তাই তাঁকে আমি আমার অন্তর থেকে ভালোবেসে মন থেকে জান্নাতের সুপারিশ করে বিদায় দিলাম। যদি কখনো আমার কারনে আপনার কোনো বিচারের সুম্মুক্ষিন হতে হয়, আমি সেদিন কোনো প্রশ্ন ছাড়া এই সুপারিশ হয়তো করবো মহান আল্লাহর কাছে-তাকে মুক্তি দিন। একটা নিস্তব্ধ অপরাধ অথবা  যাইই বলি সেটা তো হয়েছেই।

০২/০৪/২০২১-কামুক সিরিয়াল কিলার

একটা ইংরেজী মুভি দেখছিলাম। মুভিটা ছিলো একটা কামুক সিরিয়াল কিলারের উপর। আমি এই জাতীয় মুভি খুব একটা দেখি না। কিন্তু ট্রেইল দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলাম, পরে পুরু ছবিটাই দেখলাম। ছবিটা দেখে কিছু লিখতে ইচ্ছে করলো। তাঁরই উপর ভিত্তি করে আজকে আমার এই লেখাটা।

কামুক সিরিয়াল কিলারের লোকগুলি এক ধরনের পাগল, খানিকটা অবসেসড। এদেরকে কোনোভাবেই এবনরম্যাল ভাবা যায় না। এরা সমাজে সব খানে খুব স্বাভাবিক গতিতে এবং নীতিতে সবার সাথে বসবাস করে। ওদের দেখে পাশের কোনো ব্যক্তি কখনোই বুঝতে পারবে না, তার মনের ভিতরে কি চলছে আর তার পরবর্তী মুহুর্তে কি পরিকল্পনা। এরা সারাক্ষন ওদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্যই বাচে। এদের নির্দিষ্ট একটা প্যাটার্ন থাকে। খুব যত্ন করে এরা নিখুত কাজ করে। ওদের পরিকল্পনায় একটা ধরন হচ্ছে, এরা সব সময় চায় প্রোটেক্টেড সাইট, যেমন নিরাপদ কিলিং জোন, কিংবা সেক্সের সময় নিরাপদ থাকার নিমিত্তে কন্ডোম ব্যবহার। ওদের টার্গেটেও বিশেষ ধরনের প্যাটার্ন থাকে। ওরা একটা নির্দিষ্ট প্রোফাইলের টার্গেটকে বেছে নেয়। ওদের টার্গেট করারও একটা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে। এইসব বৈশিষ্টগুলি কেউ খুব সুক্ষভাবে পর্যালোচনা না করলে তাদের এবনরমালিটিগুলি চোখেই পড়ে না। তাই সিরিয়াল কিলারদের ব্যাপারে ছোট একটা লিড থাকলেও তা গুরুত্তের সাথে বিবেচনা  করা উচিত।  

এই সিরিয়াল কিলাররা বা কামুক সিরিয়াল কিলাররা কিছু কিছু ড্রাগের ব্যাপারে খুব নলেজে রাখে। যেটা ওরা সব টার্গেটের উপর ইউজ করে। আর বারবার ওরা একই ড্রাগস ইউজ করে। খুব কদাচিত তারা তাদের এই ড্রাগস পরিবর্তন করে। আবার এই ড্রাগসটা পরিবর্তনের নিমিত্তে কিছু নীতিও ফলো করে, যেমন, যখন পরিচিত ড্রাগসটা আর তার কাছে থাকে না বা পাওয়া যায় না বা তার হাতে টার্গেটকে খতম করার সময় খুব কম থাকে, তখন ঐ একই কাজ করে এমন কিছু নতুন ড্রাগস সে ব্যবহার করে।  

সিরিয়াল কিলাররা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় চিন্তা করে। তাই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ওরা টার্গেটকে খতম করে দেয় বটে কিন্তু এটাও দেখা গেছে যে, সবসময় এরা সব টার্গেটকে মেরে ফেলে না। যদি সরিয়াল কিলার অতিরিক্ত কামুক হয়, তাহলে খুনটা হয় শুধু ওর বেচে যাওয়ার জন্য একটা পন্থা। কিন্তু এই কামুক সিরিয়াল কিলারের অব্জেক্টিভ থাকে শুধু সেক্স। এটা তো সার্বোজনীন যে, সেক্সের চাহিদা একটা বদ অভ্যাস, বিশেষ করে যখন অনঅনুমোদিত সেক্সের উৎস হয়। আর এটাই ওদের অবসেসন। এটা একটা লাগামহীন ঘোড়ার মত। কিন্তু এখানেই ওদের চাহিদাটা মিটে না। ইনভেষ্টিগেশনকে বিভ্রান্ত করার জন্যেও ওদের একটা প্যাটার্ন থাকে। ওরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আশেপাশের লোকগুলিকেও বিভ্রান্ত করার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এই সিরিয়াল কিলারকে কোথায় কোথায় খুজবে সেটা তারা আগে থেকেই জানে বা সেই মোতাবেক পরিকল্পনা করে রাখে।

এটা একটা নিশ্চিত যে, এরা নির্দিষ্ট কোনো পরিচয় নিয়ে থাকে না। তারা নাম বদল করে, তারা পোষাক বদল করে, তারা পেশা বদল করে। এরা একটা স্প্লিট পারসোনালিটি। এরা সব সময় আইডেন্টিটি লুকিয়ে রাখে প্রতিটি টার্গেটের কাছে। ফলে কোনো একটা টার্গেট যদি বেচেও যায়, সেই টার্গেটের বর্ননা দিয়ে খুব সহজেই এই সব কামুক সিরিয়াল কিলারের পর্যন্ত সহজে পৌঁছানো যায় না।

ওরা যখন সেক্স করে, ওরা এই জন্য কন্ডোম পরে না যে, পুলিশ তার সিমেন ট্রেস করতে পারে। সে আসলে সচেতন থাকে যাতে কোনো ছোয়াচে রোগে সে না ভোগে। এরা পরিষ্কার থাকার একটা অবসেসন থাকে। এরা ততোটাই নিজের খেয়াল রাখে যতোটা ভিক্টিমের। ওরা ক্রাইম সিনে কোনো প্রমান রাখতে চায় না বরং কিছু প্রমান ইচ্ছে করে রেখে যায় যা সবাইকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

সিরিয়াল কিলাররা পরিকল্পনাটা এমন নিখুতভাবে করার চেষ্টা করে যেখানে কোনদিন, কোন জায়গায়, বা কখন কাজটা করবে তার পুরু পরিকল্পনাটা মাথায় রাখে। এমন কি ওরা যে জায়গায় ঘটনাটা ঘটাবে, সে পুরু এলাকাটা ভালো করে স্টাডি করে। মজার ব্যাপার হলো, ওরা একই শহরে বা এলাকায় একটার বেশী টার্গেট চয়েজ করে না। বিভিন্ন শহর বা এলাকায় তারা এটা করে থাকে। ওদের প্রমান যা ভিক্টিমের পাশে রাখতে হবে এসব দ্রব্যাদি সংগ্রহের জন্য ওরা পরিকল্পনা করে চুরিও করে। ওরা যদি চুরিও করে, সেখানেও একটা প্যাটার্ন ইউজ করে। সে আলাদা আলাদা জায়গায় চুরি করে। ফলে তারা শুধু খুন করার জন্যই ট্রাভেল করে না। এরা চুরি করার জন্যেও ট্রাভেল করে। এরা অনেক দূর দূর পর্যন্ত যায় এই চুরির উদ্দেশ্যে। চুরি করার টার্গেটকেও এরা অনেক জেনে বুঝে বাছাই করে। যাদেরকে সে চুরি করবে তাদের সাথে ওরা ভাব করে, বন্ধুত্ব করে, তারপর চুরি করে। তারা এটা নিশ্চিত করে যে, ঐ সব লোকেরা যাদের কাছে কিছু চুরি করবে, ওইসব লোকগুলি ঐ এলাকায় যাচ্ছে না বা থাকে না যেখানে সে কাউকে খুন করবে বা ভিক্টিম চয়েজ করবে। এখানে আরো একটা মজার ব্যাপার হলো যে, এই সিরিয়াল কিলাররা সবসময় ভিক্টিমের সব কিছু চুরি করে না। তারা সেইসব জিনিষগুলিই ভিক্টমের কাছ থেকে চুরি করে যার দ্বারা সে ডিজিটালী ধরা পড়বে না। যেমন ফোন, ল্যাপটপ, কিংবা এই জাতীয় জিনিষ তারা সাথে করে নিয়ে যায় না। অর্থাৎ ট্রেস হতে পারে এমন সব জিনিষ সে সাথে করে নিয়ে যায় না।

তারা টার্গেট সিলেক্ট করার সময় এমনসব টার্গেট সিলেক্ট করে যাদের আসলে খুব বেশী দূর পর্যন্ত যাওয়ার সম্ভাবনা নাই কিংবা একাই থাকে বা ছিন্নমুল মানুষ অথবা পরিবার থেকে আলাদা থাকে। কামুক সিরিয়ালদের চরিত্রের একটা লক্ষনীয় ব্যাপার হলো, তাদের ব্যবহারে, আচার আচরনে এমন একটা প্রকাশ থাকে যেখানে মহিলারা ওর সাথে কম্ফোর্টেবল ফিল করায়। বা ফাসায়। তারপরেও হয়তো অনেক মহিলারা তাদের নিজস্ব চারিত্রিক কারনে অন্তত সেক্সুয়াল এফেয়ার্স থেকে দূরে থাকে। আবার কেউ কেউ সহজেই এসব সিরিয়াল কামুক দের কাছে সহজে ধরা দেয়। ঘটনার বিবরনে দেখা যায় যে, এই কামুক সিরিয়াল কিলাররা ওদের সেক্সুয়াল ডিজায়ারটা সরাসরি বলতে পারে না বা ইঙ্গিত না বুঝার কারনে হয়তো অনেক মহিলারা চট করে সপর্পন করে না। এই সব মহিলাদের জন্যই তারা বেশীরভাগ সময়ে ড্রাগস ইউজ করে, সেক্স করে তারপর মেরে ফেলে।

এদের সেক্সুয়াল নিড গুলি নরম্যাল নয়। এরা রেড লাইট এরিয়ায় যায় কারন রেড লাইট এরিয়ায় টাকার বিনিময়েই ওরা সেক্সটা পেয়ে যায়। ফলে ওদের ওখানে ওরা কাউকে খুন করার মানসিকতাই দেখায় না। এরা রোল প্লে করায়, এর মানে এমন হয় যে, এমন কিছু মহিলার প্রতি আসক্ত যাদের জন্য ওরা খুব ছটফট করে, কিন্তু হাতের নাগালের বাইরে। তাই ওরা ওইসব জায়গায় গিয়ে ওইসব আসক্তিওয়ালা মহিলার রোল প্লে করায় যেনো সেই সেক্স ওয়ার্কারই তার আসক্তির সেই মহিলা। এসব কামুক সিরিয়াল কিলাররা ঐসব রোল প্লে করা মহিলাদেরকে সেই আসক্তওয়ালা মহিলার নামেই মাঝে মাঝে সম্মোধন করে। ওদের ফ্যান্টাসিগুলি অবসেসড মাইন্ডে সেক্স ওয়ার্কারদের দিয়ে পুরন করায়।

এসব কামুক সিরিয়াল কিলাররা দেখতে অনেক ভয়ংকর হয় না। এরা মার্জিত, পরিশোধিত এবং ভদ্রভাবে চলাফেরা করে। যাতে মহিলারা দেখে ভয় পায় না বরং কাছে আসে। ধীরে ধীরে সে অনেকের মধ্যে হয়তো একটা দুইটা মহিলাকে টার্গেট করে। একই জায়গায় আবার এরা একটার বেশী মহিলাকে টার্গেট করে না।

কিছু মহিলাদেরকে ওরা মেরে ফেলে আর কিছু মহিলাদেরকে ওরা ছেড়ে দেয়। কেনো? গবেষনায় দেখা গেছে যে, তারা ঐসব মহিলাদেরকেই মেরে ফেলে যারা সিরিয়াল কিলারের কাছে সারেন্ডার করে না। হয়তো সেক্সের বদলে ওরা একটা সম্পর্ক চায়। কিন্তু এরা কোনো সম্পর্কে জড়াতেই চায় না। যদিও জড়ায়, খুব বেশীদিন একসাথে থাকে না।  ওরা কোনো ইমোশনাল রিলেশন চায়ই না। আর এর প্রধান কারন হলো, একবার শারীরিক সম্পর্ক হয়ে গেলে ঐ মহিলা আর তাদের কাছে কোনো গুরুত্তই রাখে না। সেটা তাদের কাছে একেবারেই বর্জ।

মাঝে মাঝে আবার এসব সিরিয়াল কিলাররা কোনো কোনো ভিক্টিমকে সেক্স না করেই মেরে ফেলে। এর ও একটা কারন আছে। এরা মহিলাদেরকে একটা জেতার বস্তু মনে করে। যদি একবার জিতে যায়, তাহলে আরো এগিয়ে যায়। আর ঠিক এ কারনেই তারা সেক্স ওয়ার্কারদেরকে খুন করে না। কারন টাকা দিয়েই তারা তাদেরকে পেয়ে যায়। কোনো চেলেঞ্জ থাকে না। কিন্তু যাদেরকে টাকা দিয়েও পায় না, এক সময় তারাই হয়ে উঠে এসব কামুক সিরিয়াল কিলারের প্রধান লক্ষ্যবস্তু যেখানে আর সেক্স নয়, ঐ মহিলাদের উপর জিতবার নেশা।

এসব কামুক সিরিয়াল কিলারদেরকে যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ট্রেক করে, আসলে তখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এইসব সিরিয়াল কিলারদের এই উপরোক্ত ভাবনাগুলিকে ট্রেক করে ইনভেষ্টিগেশনে আগায়। অনেক কঠিন একতা কাজ। শেষ মেষ যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এদের কাউকে ধরতেও পারে, ওরা সব কিছু অকপটে স্বীকার করে। এদের মরবার বা শাস্তির ভয় অনেক কম।

এই পৃথিবীতে ঈশ্বর কত প্রকারের মানুষ যে সৃষ্টি করেছেন তার কোনো ইয়াত্তা নাই। আমরা মানুষ রুপী হায়েনাদের সাথেও বাস করি, আবার ঈশ্বরের ভয়ে প্রকম্পিত অনেক ভালো মানুষের পাশেও বাস করি। কার মনে কি পরিকল্পনা রয়েছে, তা আমাদের কখনোই জানা সম্ভব নয়। তাই, আমাদের উচিত, প্রতিটি মুহুর্তে কোন কিছুই উপেক্ষা না করা আর সেটা যতো ছোতই হোক বা তুচ্ছ। মানুষের থেকে ভয়ংকর কোনো প্রানি ঈশ্বর তৈরী করেন নাই।

১/৪/২০২১-সত্য মিথ্যা ষড়যন্ত্র আর প্রতারনা

কথায় বলে, মিথ্যাও কখনো কখনো সত্যি হয়ে যায়। কোন একটা মিথ্যাকে হাজার বার বললে নাকি মিথ্যাটা সত্য হয়ে যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ একটা মিথ্যা বারবার এতোবার বলে যে, মিথ্যেটাই সত্যি হয়ে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে এমন একটা মিথ্যে যা সত্য লুকুনোর জন্য বলা হচ্ছে। কিন্তু কথাটা কোনো কালেই সত্য নয়। যদিও সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা সবসময় সহজ হয় না। মিথ্যা হচ্ছে এক প্রকার ছলনা, মিথ্যে যে বলে সে নিজের সাথেই ছলনা করে থাকে। মিথ্যে হলো সেই জাল যা একটা মানুষ তার নিজের অজান্তেই সে নিজের জন্য বিছায়। কিন্তু সে ভাবে যে, সে সামনের মানুষটাকে ঠকাচ্ছে, বা বোকা বানাচ্ছে। যখন মানুস নিজের কিছু লুকায় তখনই তার সতর্ক হওয়া উচিত। কারন যখন সত্যির সীমানা পার হয়ে যায়, তখনই মিথ্যার জাল বিছানো হয়। সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না। আর কোনো  কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব। মেকী চোখের জল ফেলেও সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। একটা সময় আসে, মিথ্যে চোখের জল আর কাজে লাগে না। সে সময় যেটা হয় সেতা হচ্ছে, মিথ্যা প্রকাশের ব্যক্তিকে মানুষ গিরগিটির চরিত্রের মতো বিশ্লেষন করে, বিচার করে। গিরগিটির উপর কেউ দয়া দেখায় না। সত্য লুকিয়ে মিথ্যাকে স্থাপন করার চেষ্টায় কারো বিশ্বাসের খুন যখন হয়, তখন শারীরিক খুনের আর কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

মিথ্যা একটা প্রতারনাও। আর এই প্রতারনা- এটা মানুষের প্রকৃতি। কিন্তু এটা একজন মানুষ একা করতে পারে না। এই প্রতারনার সাথে অনেক কিছু জড়িয়ে থাকে, থাকে পূর্ব প্রস্তুতি, থাকে দলবদ্ধ একাত্ততা আর এক যোগে কার্যসম্পাদনের হিসাব নিকাশ। কোনো কোনো সময় এই প্রতারনার নিমিত্তে কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই নাটক তৈরী করা হয়। যখন এই কৃত্রিম ভরসার স্থান উম্মোচিত হয়ে চোখের সামনে বড্ড ভয়ংকর এবং আসল চেহাড়াটা বেরিয়ে আসে, তখন নিজের কাছে নিজকে বড় বোকা মনে হয়। কারন মিথ্যে ভরসায় ভর করে কেউ যখন নিজের ইচ্ছায় সেই জায়গায় চলে আসে যেখান থেকে আর কেউ ফিরে না, তখন, বাকী ইতিহাস শুধু নীরব ইতিহাসই হয়ে থাকে। কখনো তা বাইরে আসে না।

এসব পরিস্থিতি আমাদের জীবনে প্রায়ই ঘটে থাকে। আমরা সত্য আর মিথ্যাকে অনেক সময় আলাদা করতে পারি না। ভিত্তিহীন আর অকারন গুরুত্তহীন কথা শুনবার সময়ে যদি নিজের বিবেচনায় সেটা বুঝে ফেলা যায়, তাহলে বুঝতে হবে তারা একটা গুনের অধিকারী তাদেরকে সতর্ক করে দেয় আর নিজের চেতনাকে বাচিয়ে দেয়। কিন্তু যদি মিথ্যের বোঝা বুদ্ধিমত্তার উপর চেপে বসে তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে চোরাবালির বাকে আটকে পড়ে। সেখান থেকে সময় মত আর বেরিয়ে আসতে পারে না। তখন আফসোস ছাড়া আর কিছুই থাকে না। ঠিক এসময়েই ভোক্তভোগী মনে করে এটা তার জন্য ছিলো একটা ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্র প্রতারনার চাইতেও ভয়াবহ আঘাত।

ষড়যন্ত্র যখন শুরু হয়, তখন এর ডান দিক, বাম দিক, সামনে পিছে সব জায়গা থেকেই কিছুটা নোংড়া গন্ধ আসতে থাকে। যারা এই দূর্গন্ধ সম্পর্কে একটু খেয়াল করেন তারা হয়তো ষড়যন্ত্রের আভাষটা বুঝতে পারেন। অনেক সময় এই গন্ধ কোনো বড় নাটকের ছোট অংশের আভাষ দেয়। অনেক সময় এই ষড়যন্ত্র হয় লোভের, ক্ষিদের, রাজনীতির অথবা অন্য কিছু। তখন দাবার গুটির মতো চেকমেটকেও চেকমেট করা হয়। এখানে তখন ইদুর বিড়ালের খেলাও বলা চলে। যদিও এই ইদূর বিডালের খেলায় অন্য রাঘব জানোয়ারগনও জড়িয়ে থাকে। ষড় যন্ত্রের এই অধ্যায়ে সবচেয়ে বেশী নজর থাকা উচিত নিজের নিরাপত্তার উপর। কারন, যখন কেউ প্রথমবার আঘাত করে, তখন সে অনেক পরে বুঝতে পারে যে, যাকে আঘাত করা হয়েছিলো, পালটা আঘাতটা সেও করবে। যন্ত্রনার বদলায় যন্ত্রনা, আঘাতের বদলায় আঘাত। এতদূর অবধি যদি কেউ না সতে চায়, তাহলে তাকে সবচেয়ে বেশী সতর্ক থাকতে হবে সেই সব জিনিশ থেকে যার নাম লুজ টক, কিংবা ভিত্তিহীন আড্ডার রাজত্ব। লুজ টক, গল্প সল্প, বা গুজব এসব চলতেই থাকবে, কিন্তু যে শুনে তাকে তার বুদ্ধি আর বিবেচনার মাধ্যমে সেই সব কথা এক কান দিয়ে শুনে অপর কান দিয়ে বের করে ফেলাই হচ্ছে সমাধান।

৩০/০৩/২০২১-মানুষের মন

মানুষের মন দূর অনন্ত ছড়ানো এক অদ্ভুত দুনিয়া। এই মন কখনো কখনো আমাদেরকে ভুল পথে চালিত করে, ভুলকে ঠিক আর ঠিক কে ভুল বলে দেখায়। মনে লালিত বন্ধু আর বাস্তবে চোখের সামনের বন্ধুকে কখনো কখনো সে প্রতিসরনের অংকের মতো প্রতিফলন করে। চোখ যা দেখে মন তা দেখে না, মন যা দেখাতে চায়, চোখ তাকে চিনতে পারে না। আমরা প্রতিনিয়ত বা কখনো কখনো এ কারনে দ্বিমুখী স্বত্বায় দোদুল্যমানে ভাসি। নিজের ভিতরে প্যারাডিম শিফট তৈরী হয়। আর এই প্যারাডিম শিফটের প্রভাব থেকে মন যখন বিলুপ্ত হয়, তখন চোখ এবং মন দুটুই ব্যার্থতার গ্লানী নিয়ে অসহায় হয়ে আমাদের অস্তিত্তের সামনে এসে দাঁড়ায় এই কারনে যে, এতোদিন যা দেখে এসেছি, আর এখন যা বুঝে পাচ্ছি তার মধ্যে এক বিস্তর ফারাক। আমরা তখন নিজেরা সত্যিই বেসামাল হয়ে উঠি। অনেক “যদি”র মাঝে আটকে পড়ি। এই দোদুল্যমান উঠা-নামা ভারসাম্যের দন্ডে মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া একটা দূর্ঘটনা তার নিজের জীবনের সাথে সাথে বাকী সবার জীবন পালটে দেয়, সপ্ন তছনছ করে দেয়। কোনো বেপরোয়া ঘটনায় অন্য সবার জীবন বিধ্বস্ত হয়ে যায়। মানুষ চরম অসহায় হয়ে যায়। গতকাল যে সময়টায় আনন্দ ছিল, তারপরের দিন সেই সময়টায় মানুষ চোখের জলে ভাসতে থাকে। সেই জলে ভাসতে থাকা কঠিন সময়টা পার করতে করতে আরো অনেক কঠিন পথ সামনে এসে হাজির হয়। তখন শুধু মনে হয় কি যেনো ঠিক নাই, কোথায় যেনো ভুল হয়েছে। তখন কেউ আর কোনো উপায় খুজে দিতে চায়ও না, পারেও না। ব্যাপারটা তখন এমন দাঁড়ায় যে, যে বাড়িতে সবাই একজনকে মেরে ফেলতে চায়, সে বাড়িতে কাউকেই কিছু বলে লাভ হয়না। যে সমাজে সবাই অনৈতিক কাজে অভ্যস্থ, সে সমাজে নীতির কথা বলে কোনো লাভ হয় না। যে দেশ আকুন্ঠ বর্বরতায় নিমজ্জিত, সেখানে বিচার বিভাগ, আইন শৃঙ্খলা বাহিনি কিংবা উপদেশদাতা কেহই দূর্নীতির বাইরে গিয়ে কোনো সঠিক কাজ করার উপায় থাকে না। কেউ তখন কারো কথা শুনে না। কোনো আওয়াজও বাইরে যায় না। ঘুরে ঘুরে সেই আওয়াজ আবার নিজের কাছেই ফিরে আসে। একে প্রতিধ্বনি বলে না, একে বলে মৃত্যুর অগ্রিম বার্তা।

এমন অবস্থায় আমাদের জ্ঞান আর বিবেক আমাদের সবচেয়ে কাছের সংগী। তারা আমাদের এটাই পরামর্শ যে, মনের কথা শুনুন কিন্তু মাথার রাস্তায় চলুন। তা না হলে খারাপ পরিস্থিতি অনির্বার্য।