এই লেখাটা আমার লিখা দরকার ছিলো আরো আগে। কিন্তু যে কোনো কারনেই সময়মত লিখাটা শুরু করতে পারিনি। লেখাটা আমার ব্যবসায়িক পার্টনার মুর্তজা ভাইকে নিয়ে।
আজ থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে আমি মুর্তজা ভাইয়ের সাথে রিভার সাইডের মাধ্যমে ব্যবসায়ীক পার্টনারশীপ শুরু করি। আমাকে পার্টনার হিসাবে ওনাদের নেয়ার কোনো কারন ছিলো না। কারন আমি ২০০৮ সাল অবধি যদিও গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ শুরু করেছি কিন্তু আক্ষরীক অর্থে আমি তখনো কোনো মুল্যবান বায়ার কিংবা এই জাতীয় মানুষদের সাথে যেমন ভালো রকমের বন্ধন তৈরী করতে পারিনি, তেমনি গার্মেন্টসের প্রোডাকশনের ব্যাপারেও খুব একটা মাষ্টারী আয়ত্ত করতে পারিনি। অন্যদিকে ২০০৮ সালেই মুর্তজা ভাই এবং তার সাথে আসা শ্রীলংকার প্রিয়ান্থা দুজনেই এই সেক্টরে বেশ জোরালো অভিজ্ঞতা নিয়েই বসে আছেন। তারপরেও কেনো তারা আমাকে কিছু অংশ দিয়েও পার্টনারশীপ করে রেখেছেন সে ব্যাপারটা ইতিমধ্যে আমি আমার পূর্বের লেখায় বিস্তারীত আলাপ করেছিলাম। ফলে আমি জানতাম আমার ভূমিকা আসলে ফ্যাক্টরীতে কি এবং কতটুকু। আমি ইচ্ছা করলে এই সেক্টরেও অনেক ভালো একজন অভিজ্ঞ মাষ্টারপিস এমডি হিসাবে নিজেকে তৈরী করতে পারতাম। কিন্তু কেনো জানি আমার এই ট্রেডের কোনো কিছুই নিজের কাছে ভালো লাগতো না। তাছাড়া যেহেতু মুর্তজা ভাই এবং প্রিয়ান্থা দুজনেই কাজগুলি বেশ ভালোভাবেই হ্যান্ডেল করছেন, সেখানে আমার আবার উপজাজক হয়ে নাক গলানোর কোনো কারন দেখি নাই। আমার কাজ ছিলো লোকাল প্রশাসন ঠিক রাখা, শ্রমিকদের ব্যাপারে নজর রাখা আর কমপ্লায়েন্স বিসয়ক কাজগুলি করা। এটাও অনেক বড় একটা কাজ। পেটি ক্যাশ, পারচেজ, এ সবই আমার দায়িত্তে ছিলো।
প্রিয়ান্থা মারা যাওয়ার পর আমার শেয়ার বেড়ে গিয়েছিলো, অন্যদিকে মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ারও বেড়ে গিয়ে আমাদের অনুপাতটা দাড়িয়েছিলো ৬৫/৩৫, বা ৩৫/৬৫। অর্থাৎ আমার ৩৫ আর মুর্তজা ভাইয়ের ৬৫। আমার এ ব্যাপারে আসলে কোনো চাহিদা বা বিড়ম্বনাও ছিলো না। একটা চাকুরী করে এসেছি প্রায় ২০ বছর। প্রাইভেট কোনো চাকুরী করতে চাই নাই। ফলে এখানে একটা সম্মানজনক পদবী নিয়ে (এমডি) নিজের মালিকানার ফ্যাক্টরিতে যাইই পাই, তাতেই আমি খুসি ছিলাম। অন্তত আমার একটা অফিস আছে, মাসে যে কয় টাকা অনারারিয়াম পাই তাতে আমার সংসারের সব খরচ পুষিয়ে যায়। আর তো কিছু আমার আসলে লাগেও না। আমি আমার ফ্যাক্টরীর কাজগুলি করে প্রচুর বই পড়ি, লেখালেখি করি। সময়টা ভালোই কাটছে আমার। ফাইনান্সিয়াল বেশীর ভাগ সিদ্ধান্ত মুর্তজা ভাই যেটা নেন, তিনি আমাকে জানান এবং আমি প্রায় সময়ই সে সিদ্ধান্তে পজিটিভ বলে দেই। এভাবেই চলছে গত প্রায় ১২/১৩ বছর। আমরা ফ্যাক্টরীর কোনো প্রোফিট নেই না, কিন্তু যখন যার যা লাগে, ফ্যাক্টরী থেকে লোন হিসাবেই আমরা তা ড্র করি। বছর শেষে গিয়ে আমরা কে কত টাকা ড্র করি সেটা লিপিবদ্ধ থাকে। যেমন একটা উদাহরণ দেই-
ধরুন আমি সারা বছরে ড্র করেছি ৫ টাকা, আর মুর্তজা ভাইও ড্র করেছেন ৫ টাকা। ফলে সারা বছরে আমরা দুজনে ড্র করেছি মোট ১০ টাকা। অতঃপর আমরা এইভাবে কাউন্ট করতাম যে, এই ১০ টাকা মোট ড্র করার মধ্যে আমার করা উচিত ছিলো ৩৫% হিসাবে সাড়ে তিন টাকা আর মুর্তজা ভাইয়ের ড্র করা উচিত ছিলো ৬৫% হিসাবে সাড়ে ছয় টাকা। ফলে আমি যেহেতু ৫ টাকা ড্র করেছি, তাই আমি বেশী ড্র করেছি দেড় টাকা আর মুর্তজা ভাই ড্র কম করেছেন দেড় টাকা। সুতরাং আমি এই দেড় টাকা আসলে মুর্তজা ভাইয়ের কাছে পরোক্ষভাবে ঋণী।
কিন্তু হিসাবটা এভাবে হওয়া উচিত ছিলো না। উচিত ছিলো, সেই বছরে আমাদের ফ্যাক্টরী মোট কত টাকা লাভ বা প্রোফিট করেছিলো, তার থেকে ৩৫/৬৫ হিসাবে ড্র করা। তাতে হিসাবটা হতো পারফেক্ট। যাইই হোক, হয়তো আমরা আমাদের প্রোফিট সম্পুর্ন তুলে নিতাম না বলেই আমাদের ফ্যাক্টরীর এসেট বেড়েছে, মেশিন কিনে সেই লোন শোধ করতে পেরেছি ইত্যাদি। হিসাবটা এভাবেই চলছিলো প্রায় ১২ বছর। আমাদের চাহিদা খুব একটা বেশী ছিলো না। তাই আমাদেরকে অনেক টাকাও ড্র করতে হয় নাই। কিন্তু এক্সিটিং হিসাব মতে যখন আমরা হিসাব টান দিলাম, দেখলাম, আমি প্রায় ৮০ লাখ টাকা বেশী ড্র করে ফেলেছি আর মুর্তজা ভাই সেই একই পরিমান টাকা কম ড্র করেছেন।
এখানে আরো একটা কথা বলা দরকার যে, আমি ফ্যাক্টরীর অগ্রিম ভারার জামানত হিসাবে এক কোটি টাকা বিল্ডিং এর মালিককে দিয়ে রেখেছিলাম ২০১৪ সালে। সেই টাকাটার প্রতিমাসে ১ লক্ষ করে টাকা এডজাষ্ট করা হয়। কিন্তু আমি কখনো টাকাটা নেই নাই। কারন আমি জানি যে, যেহেতু কিছু টাকা আমি বেশী ড্র করেছি, এক সময় এই অতিরিক্ত ড্র এর সাথে ভাড়ার অগ্রিম টাকাটা আমি হয়তো এডজাষ্ট করে দেবো। অন্যদিকে ২০১৯ সালে যখন ফ্যাক্টরির ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসে পড়েছিলো, তখন মুর্তুজা ভাই নিজে আবার এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে লোন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আমার লোন দেয়া ছিলো ফ্যাক্টরিতে এক কোটি টাকা জামানত হিসাবে ২০১৪ সাল থেকে, আবার মুরতজা ভাইয়ের লোন দেয়া ছিলো এক কোটি আশি লাখ টাকা ২০১৯ সাল থেকে। অন্যদিকে আমি যা ড্র করেছি আর মুর্তজা ভাই যা ড্র করেছেন, তার ফারাক হলো প্রায় ৮০ লাখ টাকা।
একদিন হটাত করে মুর্তজা ভাই আমাদের একাউন্ট অফিসারকে নির্দেশ দিলেন যে, আমাদের পুরু ফ্যাক্টরীর এসেট ভ্যালু বের করতে। অর্থাৎ মেশিনারিজ লোন, সান্ডে ক্রেডিটরস লোন, অন্যান্য আনুষঙ্গিক সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে একচুয়াল কত টাকার মালিক রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড। সালটা তখন ২০১৯। দেখা গেলো যে, আমাদের প্রতিটি শেয়ার ভ্যালু দাড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তেরো লক্ষ টাকা। অর্থাৎ ১০০ পার্সেন্ট ভ্যালু প্রায় সাড়ে তেরো কোটি টাকা। আমি অতো চালাক মানুষ নই, আর টাকা পয়সা আমার কাছে কখনোই খুব বড় একটা বিষয় হিসাবে ছিলো না। আমার যতটুকু লাগে, তা পেলেই আমি খুসী এবং সুখী। আর এর বাইরে কার কি থাকলো আর কি থাকলো না, আমি সে ব্যাপারে কখনো মাথা ঘামাই নাই। আর রিভার সাইড নিয়ে তো আমার ধারনা শতভাগ যে, মুর্তজা ভাই সব সময় সঠিক কাজটাই করেন। কিন্তু মুরতজা ভাই এর মাথায় সব সময় অসংখ্য বুদ্ধি কাজ করে আর খুব দ্রুত তিনি একটা জটিল জিনিষ বুঝে ফেলেন। আমি সেগুলি বুঝতে গিয়ে অযথা মাথা নষ্ট করার পক্ষে না।
যে কারনে আজকের এই লেখাটা সে ব্যাপারে এখন আসছি। গত এপ্রিল মাসে (২০২১) তারিখে হটাত করে মুর্তজা ভাই আমাকে বললেন যে, আমি যে ৮০ লাখ টাকা বেশী ড্র করেছি ফ্যাক্টরী থেকে, আর সেই একই পরিমান ৮০ লাখ টাকা যে মুর্তজা ভাই ড্র কম করেছেন, সে টাকাটা আমি যেনো প্রতি শেয়ার বাবদ সাড়ে তেরো লাখ টাকা হিসাবে ওনার স্ত্রীর নামে প্রায় ৬% শেয়ার দিয়ে দেই। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অপছন্দ হয়েছিলো দুটি কারনে- (ক) উনি কি চান না যে আমি শেয়ার হোল্ডার হিসাবে থাকি? কারন যদি এভাবে আমরা অতিরিক্ত টাকা ড্র করার কারনে একজন আরেকজনের কাছ থেকে শেয়ারের বিনিময়ে টাকা শোধ করতে থাকি, তাহলে তো এক সময় হয় আমি শেয়ারবিহীন হয়ে যাবো অথবা উনি শেয়ারবিহিন হয়ে যাবে। (খ) দ্বিতীয় কারন হলো- আমার কাছে টাকা পাবে রিভার সাইড আর উনি টাকা পাবে রিভার সাইড থেকে। তাহলে আমি সরাসরি আমার শেয়ার উনাকে দেবো কেনো?
আমি তখন আমার একাউন্ট অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা যে পদ্ধতিতে কে কত টাকা উত্তোলন করি, আর তার ভিত্তিতে যে কম বেশী ড্র এর কথা বলি, এটা কি ঠিক? আমরা তো ড্র করবো একটা সার্টেন প্রোফিট থেকে। আমরা যেটা দুইজনে ড্র করি, আসলে সেটা তো একচুয়াল প্রোফিট নয়!! তাহলে আমরা সেটাকেই ফাইনাল প্রোফিট ধরে কেনো কম বেশী বলছি? একাউন্ট অফিসার আমার সাথে একমত। কারন ড্রইংস এর ব্যাপারটা অবশ্যই কোনো একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট থেকে হতে হবে। যেমন বাৎসরিক প্রোফিট। যেমন-
উপরের উদাহরনটায় আবার আসি। আমি যদি ৫ টাকা ড্র করে থাকি আর মুর্তজা ভাইও যদি ৫ টাকা ড্র করে থাকেন। আর আমাদের সেই বছরে যদি ২০ টাকা লাভ হয়ে থাকে, তাহলে ৩৫% হিসাবে আমার ড্র করার কথা ৭ টাকা আর মুর্তজা ভাইয়ের ড্র করার কথা ১৩ টাকা। কিন্তু আমি ড্র করেছি ৫ টাকা আর মুর্তজা ভাই ড্র করেছেন ৫ টাকা। না আমি অতিরিক্ত ড্র করেছি, না মুর্তজা ভাই। আমরা দুজনেই ফ্যাক্টরি থেকে যথাক্রমে আরো ২ টাকা এবং উনি আরো ৮ টাকা ড্র করতে পারবেন। এটাই হবার কথা। আর এটাই আসল হিসাব। যদি এভাবে আমরা গত ১২ বছরের লস এন্ড প্রোফিট টান দেই, দেখা যাবে, আমরা আক্ষরীক অর্থে যে টাকা ড্র করেছি, তার থেকে আরো অনেক বেশী টাকা ড্র করতে পারতাম। আমরা কেউ ফ্যাক্টরীর কাছে লোনে তো থাকতামই না, বরং ফ্যাক্টরীর কাছ থেকে আমরা আরো টাকা নিতে পারি।
মুর্তজা ভাইয়ের এমন একটা প্রোপোজালের কারনে আমার মনে হলো যে, উনি সার্থপরের মতো কথা বলেছে যা আমার কাছে কখনোই ঠিক মনে হয় নাই। আমিও যদি মুর্তজা ভাইয়ের মতো এমনভাবে বুদ্ধি করতাম, তাহলে ২০১২ সালে যখন মুর্তজা ভাই তার পরিচালিত লাক্সমা ফ্যাশন নিয়ে ভীষন বিপদের মধ্যে পরেছিলো, আর লাক্সমার মালিক রানা শফিউল্লাহ্র কাছে প্রায় ৪/৫ কোটি টাকার একটা ঋণে পড়ে গিয়েছিলো, তখন আমিই সবসময় এই ফ্যাক্টরী থেকে অনেক অনেক টাকা আপাতত তার সমস্যা দূরীকরনের জন্য লোন নিতে বলেছিলাম। অথচ আমার তখন কোনো ড্রইংসই ছিলো না। আমিও কিন্তু তখন মুর্তজা ভাইকে বলতে পারতাম যে, অতিরিক্ত ড্রইংস এর কারনে তিনি যেনো আমাকে কিছু শেয়ার লিখে দেন। এটা তো আমার মাথাতেই আসে নাই। আর আসলেও আমি কখনোই এটা করতাম না। সবকিছু ভেবে আমার একটা জায়গায় আমার মাথা স্থির হয়ে গেলো যে, মুর্তজা ভাই আসলে আমাকে হয়তো তার সত্যিকারের পার্টনার হিসাবে কখনোই মন থেকে মেনেই নেন নাই। অথচ আমি সব সময় তাকে মনে করেছি একটা ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ আর আমার যদি কেউ থেকে থাকে মুর্তজা ভাই হচ্ছেন সে লোক। আমার ধারনাটা ভুল বলে প্রমানিত হলো আজ।
যাই হোক, আমি একাউন্ট অফিসারকে নির্দেশ দিলাম যে, গত ২০১২ সাল থেকে আমাদের প্রতি বছরের লস এন্ড প্রোফিট বের করো যাতে আমরা বুঝতে পারি আমরা কে কত টাকা ফ্যাক্টরী থেকে ড্র করতে পারি আর কত টাকা ড্র করেছি। সে অনুপাতে যদি আমি বেশী ড্র করে থাকি তাহলে আমি যে ১ কোটি টাকা ভাড়ার জামানত হিসাবে দিয়েছি সেটা থেকে সমন্নয় করো। আর যদি সমন্নয় করার পর মনে হয় আমি আরো অতিরিক্ত টাকা নিয়েছি, সেটা আমি ক্যাশ পে করে দেবো ফ্যাক্টরীকে, মর্তুজা ভাইকে নয়।
আমার এই ব্যাপারটা মুর্তজা ভাই কিছুতেই পজিটিভভাবে নিলেন না। উনি যে এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে লোন দিয়েছিলেন ২০১৯ সালে, সেটা তিনি আমার কাছে চেয়ে পাঠালেন। আমি একাউন্ট অফিসারের সাথে বসে আমার অগ্রিম টাকার সাথে আমার ড্রইংস ইত্যাদি মিলিয়ে দেখলাম যে, আমি আরো ৪ লাখ টাকা ফ্যাক্টরীর কাছ থেকে পাই। অতিরিক্ত তো নাইই। এখন শুধু থাকে মুর্তজা ভাইয়ের দেয়া এক কোটি আশি লাখ টাকার লোন। আমি আরো হিসাব করে দেখলাম, যে, মুর্তজা ভাই এর টাকা পুরুটাই ফ্যাক্টরী থেকে এককালীন দেয়া সম্ভব। আমি চেক কেটে দিয়েও দিলাম। ফলে, আমিও কোনো টাকা আর পাই না ফ্যাক্টরী থেকে, মুর্তজা ভাইও আর কোনো টাকা পান না ফ্যাক্টরী থেকে। আমাদের কারো কোনো লোনও নাই, আবার আমরা পাইও না।
কিন্তু বুদ্ধি যার অনেক, তার কাছে পথ অনেক খোলা। মুর্তজা ভাই একাউন্ট অফিসারকে জানালেন যে, উনি যে ২০১৯ সাল থেকে এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে দিয়ে রেখেছেন, এর লাভের অংশ কৈ? অন্তত উনি তার ইন্টারেষ্ট চান। মুর্তজা ভাইই ইন্টারেষ্ট হিসাব করে একাউন্ট অফিসারকে জানালেন যে, এক কোটি আশি লাখ টাকার এই কয়েক বছরে (২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত) মোট ৫৩ লক্ষ টাকা ইন্টারেষ্ট আসে। সেটা উনি চান। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এই কারনে যে, উনি তো ফ্যাক্টরীর মালিকও বটে। তাই বলে কি নিজের ফ্যাক্টরি থেকে নিজে সুদ নেয়া যায়? কিছুই বললাম না, আমি মেনে গেলাম আর মুর্তজা ভাইকেও আমি তার এক কোটি আশি লাখ টাকার ইন্টারেষ্ট হিসাবে আরো ৫৩ লাখ টাকার চেক কেটে সমুদয় হিসাব ক্লিয়ার করে দিলাম।
আমার একাউন্ট অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, স্যার আপনি যে এক কোটি টাকা ২০১৪ সাল থেকে ফ্যাক্টরীর জন্য জামানত হিসাবে দিলেন, সেটার সুদ আপনি নিবেন না? আমি বললাম, মুর্তজা ভাই নিতে পারে, কিন্তু আমি নেবো না। আমি যদি ইন্টারেষ্ট নেই, তাহলে ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল মোট ৮ বছরে ইন্টারেষ্ট আসবে আরো প্রায় দেড় কোটি টাকা। সেটা আমার দরকার নাই। আমি ফ্যাক্টরীর মালিক। যদিও মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ার আমার থেকে বেশী কিন্তু তার থেকে আমার কলিজা আরো বড়। আমার দরকার নাই কোনো লাভের বা সুদের।
এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়। মুর্তজা ভাই যখন তার ফ্ল্যাট কিনেন, তখন তিনি কোনো একটা ব্যাংক থেকে প্রায় কোটি টাকার লোন নিয়েছিলেন। সম্ভবত স্ট্যান্ডার্ড চেটার্ড ব্যাংক থেকে। যখন তিনি আমাকে জানালেন যে, অনেক টাকার সুদ দিতে হয়। তাই ফ্যাক্টরী থেকে উনি এককালীন ৯০ লক্ষ টাকার একটা ক্যাশ নিয়ে তার ফ্ল্যাটের টাকাটা পরিশোধ করতে চান। আমি সাথে সাথেই ইয়েস বলে দিয়েছিলাম। মুর্তজা ভাই কিন্তু ওই টাকাটা পরে আর ফেরত দিয়েছিলো কিনা সেটাও আমি যাচাই করি নাই। হয়তো দিয়ে থাকবেন। কিন্তু অবশ্যই ইন্টারেষ্টসহ তিনি আমাদেরকে ফেরত দেন নাই এটা সিউর। উনি আদৌ ওই টাকাটা ফেরত দিয়েছিলেন কিনা সেটাও আমি জানি না। কারন আমার জানার কোনো আগ্রহ ছিলো না। তবে যদি সুক্ষভাবে আমি পুরু হিসাব টান দেই, আমি শতভাগ না হলেও প্রায় নিশ্চিত যে, উনি টাকাটা দেন নাই। আজ এটা নিয়েও আমি কোনো কথা বলতে চাই না কারন এটা বলতে গেলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে আমাদের ফ্যাক্টরী।
আমি জানি আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজে একটা লোন আছে প্রায় সোয়া কোটির মতো। এটা যদি মুর্তজা ভাইয়ের হতো, তিনি ঠিকই ফ্যাক্টরী থেকে কোনো না কোনো কায়দায় হয়তো আমার কাছে এটা পাশ করিয়ে নিয়ে লোনটা শোধ করে দিতেন। আমি অনেকবার এই ব্যাপারটা নিয়ে ওনার সাথে কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমার ব্যাপারটা কিন্তু ফয়সালা হয় নাই। আসলে মুর্তজা ভাই আমার লোক নন এটা এখন আমার কাছে খুব ভালোভাবে ক্লিয়ার। উনি রিভার সাইডে ভালো ব্যবসা করতে পারছে আর সেটা অনেকটা আমার কারনে, সেই সুযোগটা তিনি শুধু কাজে লাগাচ্ছেন।
আমি বুঝে গেছি, আমার অবস্থানটা কোথায় মুর্তজা ভাইয়ের মনের ভিতর। এটা শুধুই পার্টনারশীপ। যদি সেটাই হয়, তাহলে আমার তো প্রতিটা বিশয়েই এখন থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যেমন হিসাব নেয়া দরকার, তেমনি মাসিক প্রোফিটটাও আমার তুলে নেয়া দরকার। আমার টাকা লাগুক বা না লাগুক, সেটা আমি এখন থেকে করবো। উনি তার টাকা তুলে নিক বা না নিক, সেটা তার ব্যাপার, কিন্তু আমি আমারটা তুলে নেবো। আরেকটা মজার বিষয় হলো, উনি মাঝে মাঝে দাইয়ু কিংবা সন্দীপ দাদা কিংবা নাইম ভাইয়ের জন্য লোন নেন। কিন্তু নিজের নামে নেন না। ফলে যখন ব্যক্তিগত ড্রইংস এর হিসাবটা আসে, তখন এসব লোন গুলি তার নামে আসে না অথচ লোন গুলি তিনিই নিচ্ছে তাদের নামে। অন্যদিকে আমি যখন মা ইন্ডাস্ট্রিজের নামে লোন নেই, তখন আমি ব্যক্তিগত ড্রইংস হিসাবেই উল্লেখ করি। ফলে একদিকে ওনার ব্যক্তিগত লোন বাড়ে না আবার আমার ব্যক্তিগত লোন বেড়ে যায়। তাই, আমি এবার থেকে মনস্থ করেছি যে, ওইসব ব্যক্তি কিংবা সংস্থা তো আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে কোনোভাবেই লোন নেয়ার ইখতিয়ার নাই। সেক্ষেত্রে ওইসব লোন আমি মুর্তজা ভাইয়ের নামেই দেখাবো। আর যতোদিন তারা লোন ব্যাক করতে না পারবে, ইন্টারেষ্ট উঠতেই থাকবে কারন শিক্ষাটা তো মুর্তজা ভাইই আমাকে শিখিয়েছেন। অন্তত ব্যাপারটা তো আমি তাকে মনে করিয়েই দেবো যাতে তিনিও বুঝেন যে, লাভ শুধু একদিকে নয়, লাভ দুই দিকের অংশেই কাউন্ট করা নীতিবানের কাজ।
এই সব ব্যাপার গুলি নিয়ে মুর্তজা ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা আগের মতো আর নাই। আমি এটা কখনো ভাবিই নাই যে, এমন একটা পরিস্থিতি মুর্তজা ভাই তৈরী করবেন নিজের সার্থে আর নিজের লাভে। যে আইন তা আজ তিনি আমার কাছে এপ্লাই করলেন, বা যে নিয়মে মুর্তজা ভাই ফ্যাক্টরী থেকে ইন্টারেষ্ট সহকারে আদায় করলেন, কিংবা অতিরিক্ত টাকা ড্রইংস করলে যে শেয়ার দিয়ে দিতে হয়, এইসব যদি কোনো একদিন মুর্তজা ভাইয়ের জীবনে ওই লাক্সমার মতো পরিস্থিতিতে উনি পড়েন, আমি সব কিছু মনে করিয়ে দেবো একদিন। সেদিন শুধু দেখবো ওনার চোখে কোন ব্লিক পড়ে কিনা।
মুর্তজা ভাইয়ের আরো কিছু নীতির কথা আমি এই মুহুর্তে বলতে চাচ্ছিও না কারন তার নীতি তার কাছে আর আমারটা আমার কাছে।
(ক) পলাশ পুরের তার ভাইয়ের জমির ব্যাপারটা
পলাশপুরে মর্তুজা ভাইকে আমি কিছু জমি কিনে দিয়েছিলাম। তার সাথে তার বড় ভাই এবং এক বন্ধু ও উক্ত জমি কিনেছিলেন। বহুদিন যাবত আমরা ওই পলাশ পুরের জমি গুলি বিক্রি করার চেষ্টা করেও পারছিলাম না। অবশেষে খান মুজিবুর রহমান নামে এক ভদ্রলোক জমি গুলি তার ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের জন্য কিনতে রাজী হলেন। খান মুজিবুর রহমান সাহেন শেষ পর্যন্ত প্রতি শতাংশের দাম নির্ধারন করলেন সাড়ে পাচ লাখ টাকা করে শতাংশ। একটা সময় ছিলো যখন মর্তুজা ভাইয়ের বড় ভাই জনাব মোস্তফা সাহেব ও তার টাকার প্রয়োজনে তার অংশ বিক্রি করতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। তখন দাম উঠেছিলো দুই লাকগ ৪০ হাজার করে শতাংশ। এখন যখন নতুন দাম নির্ধারিত হলো খান সাহেবের সাথে (সাড়ে পাচ লাখ টাকা প্রতি শতাংশ) তখন মর্তুজা ভাই ভাবলেন যে, যদি তিনি নিজে তার ভাইকে আগের দুই লাখ ৪০ হাজার করে দিয়ে পুরু তার বড় ভাইয়ের জমিটা কিনে নেন, তাহলে মর্তুজা ভাই খুব সহজেই এখন খান সাহেবের কাছে আরো বেশী দামে বিক্রি করে লাভ করতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা শুধু জানি আমি আর উনি। এমতাবস্থায় মর্তুজা ভাই তার বড় ভাইকে সত্যি সত্যিই মাত্র ২ লাখ ৪০ হাজার দরে ২৭ শতাংশ জমি ক্যাশ টাকায় কিনে নিলেন। অথচ তখনই যদি মর্তুজা ভাই সত্যিকারের ভালো লোক হতেন, তাহলে তার বড় ভাইকে তিনি প্রতি শতাংশ জমি খান সাহেবের ফিক্সড করা সাড়ে পাচ লাখ টাকা করেই দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করেন নাই।
(খ) ফ্ল্যাট এর টাকাটা উনি পরিশোধ করেছিলেন কিনা আমার জানা নাই। দেখতে হবে। লোনের ড্রিংস এর খাতায়ও সেটা উঠানো হয় নাই। কেনো উঠানো হয় নাই সেটাও আমি কখনো চেক করি নাই। আমি এতোটাই বোকা।
(গ) এ যেড ফ্যাসনের নিমিত্তে প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকার যে প্রোফীটটা উনি নেন, এখন নেয়াটা কতটা যুক্তি সংগত, সেটা আমার মাথায় আসে না। ব্যাখ্যাটা এ রকম যে, মর্তুজা ভাই এক সময় নিজের ব্যবসা আলাদা করার জন্যই হোক কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যেই হোক এ জেড নামে একটা ফ্যাক্টরী লাইসেন্স করিয়েছিলেন। তখন ম্যানুয়েল মেশিনের যুগ ছিলো। একদিন মর্তুজা ভাই আমাকে জানালেন যে, আমরা যদি এ জেড কে আমাদের রিভার সাইডের সাথে আত্তীকরন করি, তাহলে এ জেড আমাদের হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এ জেড শুধুমাত্র আমাদের কাজই করবে। কিন্তু বিনিময়ে আমরা রিভার সাইড এ জেডের সমস্ত সেলারী, কারেন্ট বিল, এবং অন্যান্য সমস্ত খরচাদি বহন করবো। শুধু মর্তুজা ভাই এর বিনিময়ে প্রতিমাসে আড়াই লাখ টাকা প্রোফিট নিবেন। যেহেতু মেশিন তার, ভাড়া তার, এবং সবই তার ছিলো, আর আমারো কোনো অসুবিধা ফিল করি নাই, সে ক্ষেত্রে আমিও এ ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনাই। আমি তাকে অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলাম। পরবর্তিতে ২০১৮/২০১৯ সালে এসে যখন আমরা সমস্ত ম্যানুয়েল মেশিন গুলি বাদ দিয়ে জ্যাকার্ড মেশিন নিয়ে এলাম, তখন এ জেডের সব মেশিন তিনি বিক্রি করে দিলেন। জেনারেটর আমাদের রিভার সাইড থেকে দেয়া হয়, কারেন্ট বিল দেয়া হয়, বেতন দেয়া হয়, পেটি ক্যাশ, নাইট বিল, এবং অন্যান্য সব খরচই আমরা রিভার সাইড থেকে দেই। কিন্তু আগের নিয়ম অনুসারে মর্তুজা ভাই এখনো প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা করে প্রোফিট নেয়া অব্যাহত রাখেন যদিও ওই এ জেড ফ্যাশনে এখন তার কিছুই অবশিষ্ট নাই। এটা আমার জানা আছে, আমিও তাকে দেই। কিন্তু এটাও জানি যে, এটা তাকে দেয়া আমার উচিত না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে- আমি জেনেশুনে কেনো তাকে এই লাভটা দিচ্ছি। এর প্রধান কারন হলো- আমি এখনো পুরুপুরি বিপদ মুক্ত না। আমার লোন আছে মা ইন্ডাস্ট্রিজে, আমার অন্য কোথাও আর চাকুরী করতে ইচ্ছে নেই, আর আমি চাইও না। এখন যদি এগুলি নিয়ে আমি বেশী নাড়াচাড়া দেই, তখন দেখা যাবে- মর্তুজা ভাই আবার অন্যভাবে এমন কিছু করে ফেলবে যে, শেষে গিয়ে হয়তো রিভার সাইডটাই টিকবে না। উনি হউয়তো অন্য কোথাও কারো সাথে টাই আপ করে ঠিকই গার্মেন্টস ব্যবসা করবে, মাঝখান থেকে আমি ছিটকে পড়বো। যা আমার জন্য ভালো নয়। তার থেকে উনাকে এই মুহুর্তে নারাচাড়া না দেয়াই ভালো। উনি যে টাকাটা নিচ্ছে সেটাও যে ঠিক না এটা মর্তুজা ভাই জানেন। কোনো একদিন হয়তো এটা নিয়েও আমি কথা বল্বো।