











Pic for Slider0123jpg
Pic for Slider012
Pic for Slider011
Pic for Slider010
Pic for Slider009
Pic for Slider008
Pic for Slider007
Pic for Slider006
Pic for Slider005
Pic for Slider003
Pic for Slider002
Pic for Slider001

মোট জমির পরিমান নিম্নরুপঃ
| ক্রমিক | মালিকানার নাম | মৌজা | জমির পরিমান | |
| ১ | মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) | চর গলগলিয়া | ২২ শতাংশ | ১৭৩.৫ শতাংশ |
| ৮৭ শতাংশ | ||||
| ১৬ শতাংশ | ||||
| ২২.৫ শতাংশ | ||||
| ২৬ শতাংশ | ||||
| ২ | মর্তুজা আলি | চর গলগলিয়া | ৮৮.৫ শতাংশ | ২৫২.৫ শতাংশ |
| চর কুন্দুলিয়া | ৮০ শতাংশ | |||
| চর কুন্দুলিয়া | ৮৪ শতাংশ | |||
| ৩ | জজ মিয়া | চর কুন্দুলিয়া | ৮৫ শতাংশ | ৮৫ শতাংশ |
| ৪ | আব্দুল মান্নান + আক্কাস | চর কুন্দুলিয়া | ৫১ শতাংশ | ৫১ শতাংশ |
| ৫ | সেলিম গং | চর কুন্দুলিয়া | ১৮২ শতাংশ | ১৮২ শতাংশ |
| মোট জমির পরিমান | ৭৪৪ শতাংশ |
বিক্রিযোগ্য জমির বিবরনঃ
| ক্রমিক | মালিকানার নাম | মৌজা | পরিমান | মোট জমি | বিক্রিযোগ্য পরিমান | মন্তব্য |
| ১ | মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) | চর গলগলিয়া | ২২ শঃ | ১৭৩.৫ শতাংশ | ২২ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| ৮৭ শঃ | ৮৭ শতাংশ | আরএস খাস | ||||
| ১৬ শঃ | ১৬ শতাংশ | রেকর্ড জমি | ||||
| ২২.৫ শঃ | ২২.৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি | ||||
| ২৬ শঃ | ২৬ শতাংশ | রেকর্ড জমি | ||||
| ২ | মর্তুজা আলি | চর গলগলিয়া | ৮৮.৫ শঃ | ২৫২.৫ শতাংশ | ৮৮.৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| চর কুন্দুলিয়া | ৮০ শঃ | ৪৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি | |||
| চর কুন্দুলিয়া | ৮৪ শঃ | ৮৪ শতাংশ | রেকর্ড জমি | |||
| ৩ | জজ মিয়া | চর কুন্দুলিয়া | ৮৫ শঃ | ৮৫ শতাংশ | ৮৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| ৪ | আব্দুল মান্নান + আক্কাস | চর কুন্দুলিয়া | ৫১ শঃ | ৫১ শতাংশ | ৫১ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| ৫ | সেলিম গং | চর কুন্দুলিয়া | ১৮২ শঃ | ১৮২ শতাংশ | ১০৬ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| মোট জমির পরিমান | ৭৪৪ শতাংশ | ৬৩৩ শতাংশ | ||||
হাতে লিখিত খসড়া চুক্তির বরখেলাপের নমুনা সমুহঃ
হস্তলিখিত ড্রাফট বাতিলের কারন সমুহঃ
(১) এমওইউঃ হস্ত-লিখিত ১৭/০৪/২০২১ তারিখের ড্রাফট চুক্তির অনুচ্ছেদ (১৩) মোতাবেক ড্রাফট চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে চুড়ান্ত এমওইউ সম্পন্ন করার কথা, যদি ৩০ দিনের মধ্যে চুড়ান্ত এমওইউ না করা হয় তাহলে উক্ত হস্ত লিখিত চুক্তিটি বাতিল বলে গন্য করা হবে। কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান ৩০ দিন অতিবাহিত হলেও তিনি আর বিক্রেতার সাথে কোনো প্রকার চুড়ান্ত এমওইউ করেন নাই। বিধায় উক্ত হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তিটি ১৬/০৫/২০১৯ তারিখেই বাতিল বলিয়া গন্য হয়। যেহেতু চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায় ফলে উক্ত হস্ত লিখিত চুক্তির কোনো শর্তই আর কার্যকরী নহে। পরবর্তীতে যতো বেচা-কেনা সংঘটিত হয়, তা প্রকৃতপক্ষে কোনো চুক্তির অধীনে কিংবা কোনো শর্তের মধ্যে বেচা-কেনা সীমাবদ্ধ ছিলো না।
(২) বায়নানামাঃ ওই একই হস্ত লিখিত চুক্তির অনুচ্ছেদ (৬) এ উল্লেখিত ছিলো যে, ৩০ দিনের মধ্যে বায়না করতে হবে। অর্থাৎ এই বায়নাও বেচা-বিক্রির নিমিত্তে একটা চুক্তি যেখানে এমওইউ এর মতো উভয় পক্ষের সমঝোতা বিষয়ক বিস্তারীত তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে এবং স্বাক্ষরিত হয়। জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব ৩০ দিনের মধ্যে কোনো বায়নানামাও করেন নাই।
(৩) ক্রয়-বিক্রয় সময়সীমাঃ হস্ত লিখিত ড্রাফট দলিলের অনুচ্ছেদ (৮) মোতাবেক শর্ত ছিলো যে, ক্রেতা মোট ৬৩৩ শতাংশ জমি প্রতি শতাংশ জমির গড়মুল্য ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকা হারে মোট ৬ মাসের মধ্যে ক্রয় সম্পন্ন করবেন। অতিরিক্ত আরো ৩ মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ৯ মাসের মধ্যে সম্পুর্ন ৬৩৩ শতাংশ জমি বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রয় করবেন। কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব উক্ত ৯ মাসের মধ্যে মাত্র ১৬৭.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন এবং বাকী জমি আর ক্রয় করতে পারেন নাই। অর্থাৎ মাত্র ২৫% জমি ক্রয়ের পর ক্রেতা আর কোনো জমি গত ২ বছরেও কিনতে পারেন নাই। জমি কেনা বেচার সময় সীমা পার হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে উক্ত হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তিটি ২য় বারের মতো বৈধতা হারায়।
(৪) শরীকানা মালিকের জমি গোপনে ক্রয় করাঃ বিক্রেতা ৬৩৩ শতাংশ জমির মালিক তিনি একা ছিলেন না। মোট বিক্রেতা ছিলো ৫ জন মালিক। তাদের জমির পরিমান নিম্নে দেয়া হলোঃ
| ক্রমিক | মালিকানার নাম | মৌজা | পরিমান | মোট জমি | বিক্রিযোগ্য পরিমান | মন্তব্য |
| ১ | মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) | গলগলিয়া | ২২ শঃ | ১৭৩.৫ শতাংশ | ২২ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| ৮৭ শঃ | ৮৭ শতাংশ | আরএস খাস | ||||
| ১৬ শঃ | ১৬ শতাংশ | রেকর্ড জমি | ||||
| ২২.৫ শঃ | ২২.৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি | ||||
| ২৬ শঃ | ২৬ শতাংশ | রেকর্ড জমি | ||||
| ২ | মর্তুজা আলি | গলগলিয়া | ৮৮.৫ শঃ | ২৫২.৫ শতাংশ | ৮৮.৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| কুন্দুলিয়া | ৮০ শঃ | ৪৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি | |||
| কুন্দুলিয়া | ৮৪ শঃ | ৮৪ শতাংশ | রেকর্ড জমি | |||
| ৩ | জজ মিয়া | কুন্দুলিয়া | ৮৫ শঃ | ৮৫ শতাংশ | ৮৫ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| ৪ | আব্দুল মান্নান + আক্কাস | কুন্দুলিয়া | ৫১ শঃ | ৫১ শতাংশ | ৫১ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| ৫ | সেলিম গং | কুন্দুলিয়া | ১৮২ শঃ | ১৮২ শতাংশ | ১০৬ শতাংশ | রেকর্ড জমি |
| মোট জমির পরিমান | ৭৪৪ শতাংশ | ৬৩৩ শতাংশ |
উপরের টেবিলে ক্রমিক (৩) এবং ক্রমিক (৪) এর শরিকানা মালিকের যথাক্রমে ৮৫ শতাংশ এবং ৫১ শতাংশ জমি ক্রেতা গোপনে আতাত করে কম মুল্যে ক্রয় করেন। এর বাইরেও তিনি জজ মিয়া থেকে তাঁর বিবেচনায় IWT এর বাইরে পানির মধ্যে রেকর্ডিয় জমিও ক্রয় করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, চরকুন্দুলিয়া জমির মুল্য এবং চরগলগলিয়া জমির মুল্য সমান না থাকায়, এবং চরকুন্দুলিয়া মৌজার জমির দাম কম আর চরগলগলিয়া মৌজার দাম বেশী হওয়ায়, বিক্রেতা উভয় মৌজার দামের মধ্যে সমন্নয় করে গড়মুল্য নির্ধারন করেন প্রতি শতাংশ ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকা। যাতে চরকুন্দুলিয়া মৌজার বর্ধিত দাম থেকে চরগলগলিয়া মৌজার গড় মুল্যের মধ্যে অতিরিক্ত মুল্য যোগ করে তিনি চরগলগলিয়ার প্রকৃত জমিওয়ালাদেরকে ন্যায্য মুল্য দিতে পারেন। ফলে ক্রেতা যে কোনো মৌজা থেকেই জমি ক্রয় করেন না কেন, ক্রেতাকে প্রতি শতাংশ জমির মুল্য ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকাই দেওয়ার কথা। কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান খান সাহেব গোপনে উক্ত শরীকদের সাথে আতাত করে জনাব জজ মিয়া এবং আব্দুল মান্নান গংদের জমি হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তির বাইরে বিক্রেতার অগোচরে আলাদা এবং কমমুল্যে যথাক্রমে ৮৫ শতাংশ এবং ৫১ শতাংশ জমি খরিদ করেন। এর ফলে বিক্রেতা শুধু মাত্র জজ মিয়ার জমিতেই ১ কোটি ৩২ লক্ষ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মান্নান গং দের জমিতে বিক্রেতা প্রায় ৫৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হন। একুনে বিক্রেতা প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হন।
(৫) শর্ত মোতাবেক জমি না কেনার প্রস্তাবনাঃ ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব যখন ৬৩৩ শতাংশ জমির ব্যাপারে হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তি করেন, সেখানে মা ইন্ডাস্ট্রিজের জমি (৮৭ শতাংশ যাহা আরএস খাস), মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইস্টাবলিষ্টমেন্ট, মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইলেক্ট্রিক্যাল লাইনস সহ ক্রয় করবেন বলে হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তিতে বলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি উক্ত আরএস খাসজমি, মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইস্টাবলিষ্টমেন্ট, মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইলেক্ট্রিক্যাল লাইনস ইত্যাদি না কেনার সিদ্ধান্ত নেন। এ ছাড়া তিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজের সম্মুখে ২২ শতাংশ জমি যা ৬৩৩ শতাংশ জমির মধ্যে ছিলো, তিনি সেটাও না কেনার সিদ্ধান্ত নেন বরং তিনি উক্ত ২২ শতাংশ জমি থেকে শুধুমাত্র রাস্তার নিমিত্তে ১৬ ফুট পরিমান জমি ক্রয় করে বাকী জমি না কেনার সিদ্ধান্ত নেন। এ ছাড়াও ক্রেতা মুজিবুর রহমান সাহেব ৬৩৩ শতাংশ জমির ভিতরে জনাব মর্তুজা সাহেবের চরকুন্দুলিয়ার এক অংশে ৮৪ শতাংশ জায়গা আলাদা ছিলো, যা ক্রেতা পরবর্তীতে উহা আর কিনবেন না বলে জানান।
(৬) IWT সীমানাঃ হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির অনুচ্ছেদ (১২) মোতাবেক শর্ত ছিলো যে, ক্রেতা IWT সীমার বাইরের জমি ক্রয় করবেন। উক্ত এলাকায় সরকার কর্ত্রিক কোনো IWT সীমানা পিলার নাই বা সীমানা পিলার দিয়ে তা নির্ধারিত করা হয় নাই। কারন নদীর মধ্যেও ব্যক্তি মালিকানায় অনেক রেকর্ডিয় জমি রয়েছে। উক্ত ব্যক্তিগন সর্বদা উক্ত জমির ট্যাক্স, খাজনা ইত্যাদি নিয়মিত দিয়ে আসছেন। নদী দক্ষিন দিকে সরে যাওয়ার সাথে সাথে জমির মালিকগন তাদের রেকর্ডিয় জমিসমুহ ভোগ করতে থাকেন। ধরে নিলাম যে, শুষ্ক মৌসুমে সর্বশেষ নদীর পানি যেখানে থাকে সেটাই নদী শাসনের সীমানা। তাহলে ক্রেতা জনাব জজ মিয়ার জমি কেনার সময় তিনি নদীর ভিতরে তাঁর ব্যক্তি মালিকানায় থাকা জমি কিনলেন কেনো? সেটা কি IWT সীমার মধ্যে পড়ে না?
(৬) নতুন দামে একই জমির উপর আলাদা বায়না করাঃ ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব পুনরায় আলাদাভাবে জনাব মর্তুজা সাহেবের সাথে তাঁর চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়ার জায়গার দাম পুনর্বিন্যাশ করে চরকুন্দুলিয়া জমির প্রতি শতাংশ জমি ৪ লক্ষ টাকা এবং চরগলগলিয়া জমির প্রতি শতাংশ জমি ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ধার্য্য করে নতুন করে জনাব মর্তুজা সাহেবের সাথে বায়না করেন। কিন্তু উক্ত জায়গা হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির মধ্যে ছিলো। এতো বছর পর তিনি হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির বরাত দিয়ে তুনিই আবার সেই হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির বরাত দিয়ে নিজের সার্থে বিক্রেতাকে একটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে তাঁর নামে বদনাম করা হচ্ছে।
ক্রেতার বর্তমান দাবীসমুহ
(৭) বর্তমানে ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান এইমর্মে বারংবার বিক্রেতাকে চাপ দিচ্ছেন যে, তিনি হস্ত লিখিত চুক্তির অনুচ্ছেদ (১২) মোতাবেক IWT বহির্ভুত জমি বুঝিয়া নিতে চান। অর্থাৎ চরকুন্দুলিয়ার দক্ষিনে অবস্থিত ধলেশ্বরী নদীর পানি শুষ্ক মৌসুমে যেখানে গিয়ে স্থিত হয়, তাঁর থেকে আরো ১৫০ ফুট ছেড়ে টানের দিকের জমি তাঁর প্রাপ্য বলিয়া দাবী করেন।
(৮) ক্রেতা আরো উল্লেখ করেন যে, যেহেতু চরকুন্দুলিয়া আর চরগলগলিয়া মৌজার গড়মুল্যে তিনি জমি কিনেছেন, ফলে উভয় মৌজা থেকে সমান সমান পরিমান জমি তাঁর প্রাপ্য। তাই তিনি এখন চরকুন্দুলিয়া থেকে কিছু জমি বিক্রেতার রেজিষ্ট্রেশন খরচে চরগলগলিয়া মৌজায় সমপরিমান জমি চান।
ক্রেতার দাবীসমুহের বিপরীতে বিক্রেতার ব্যাখ্যা
(৯) ক্রেতার উপরোক্ত দাবী-বক্তব্যের আলোকে বিক্রেতার ব্যাখ্যা এই যে, ১৭/০৪/২০১৯ তারিখে হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তিটি প্রথমত ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত এমওইউ অথবা বায়নানামা না করার কারনে পুরুপুরী বাতিল হয়ে যাওয়ায় উক্ত চুক্তির কোনো শর্তই আর কার্যকরীতা থাকেনা। ফলে ক্রেতার দাবী অনুযায়ী হস্তলিখিত চুক্তির (১২) অনুচ্ছেদের কোনো কার্যকারীতাও থাকে না।
এখানে উল্লেখ থাকে যে, ৬৩৩ শতাংশ জমি কেনাবেচার লক্ষ্যে উক্ত চুড়ান্ত বায়নানামা কিংবা চূড়ান্ত এমওইউ তে বিস্তারীত তথ্য যেমন জমির মৌজা, তফশীল, জমির পরিমান, জমির প্রকার, জমির চৌহদ্দি, জমিরমুল্য, জমির আসল মালিকদের কার কতটুকু পরিমান কোন মৌজায় জমি, মা ইন্ডাস্ট্রিজ ইস্টাবলিসমেন্ট সমুহের বিবরন, সেখানে জমিতে গাছ গাছালীর বিবরন, সাবকবলা করার প্রক্রিয়া, কোন মৌজায় কখন কতটুকু কার মালিকানার জমি সাবকবলা করা হবে, জমির মুল্যশোধের পরিমান এবং প্রক্রিয়া তাঁর বিবরন ইত্যাদি চুড়ান্তভাবে উল্লেখ থাকার কথা। উক্ত বিষয়াদি বিস্তারীত উল্লেখ থাকলে বিক্রেতা যেমন শর্ত মোতাবেক জমি দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতো, তেমনি ক্রেতাও গোপনে বিক্রেতার কোনো শরীকানা থেকে জমি কিনতে পারতেন না।
(১০) ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব চুক্তির অনুচ্ছেদ (৮) মোতাবেক চুক্তিতে উল্লেখিত ৬৩৩ শতাংশ জমি মোট ৬ মাস এবং অতিরিক্ত ৩ মাস সর্বমোট ৯ মাসের মধ্যে ক্রয় করার কথা। তিনি সেই শর্ত মোতাবেক গত ২ বছরেও জমি ক্রয় করতে পারেন নাই। তিনি মাত্র ১৬৭.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। অর্থাৎ ২৫% জমি তিনি ক্রয় করতে পেরেছেন।
(১১) হস্তলিখিত ড্রাফট চুক্তির অনুচ্ছেদ (১১) মোতাবেক এই শর্ত ছিলো যে, বিক্রেতা যে সকল জমির কাগজাদি ক্রেতাকে সরবরাহ করবেন, ক্রেতা সেসব কাগজাদি তাঁর ল ইয়ার দিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে সঠিক পাওয়ার পর ‘লিগ্যাল ডকুমেন্টস’ অনুযায়ী হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির গড়মুল্যে তিনি উক্ত জমি ক্রয় করবেন। বিক্রেতা মোট ৬৩৩ শতাংশ জমির সম্পূর্ন লিগ্যাল ডকুমেন্টস একসাথে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করছেন। ক্রেতা তাঁর ইচ্ছেমতো চরকুন্দুলিয়ায় ১৫১.৫ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশ জমি সাবকবলা ক্রয় করেন। অতঃপর তিনি সেই জমির ডিসিআর কাটেন, নিজের নামে খাজনা দেন, তাঁর নিজের নামে নামজারী করেন এবং তাঁর ব্যাংকে উক্ত জমি মর্টগেজ দেন। এখন তিনি তাঁর জমি বুঝে পান নাই বলে যে দাবী করছেন, তা একটা অবৈধ দাবী।
(১২) গত ১৪ অগাষ্ট ২০২১ তারিখে ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব বিক্রেতার সাথে এক চুড়ান্ত বৈঠকে বসেন এবং সেখানে তিনি এইমর্মে তাঁর পরিবর্তীত সিদ্ধান্ত জানান যে,
(ক) তিনি হস্তলিখিত ড্রাফট চুক্তির বলে তাঁর বিবেচনায় IWT এরিয়া বহির্ভুত চরকুন্দুলিয়ার জমির বদলে তিনি চরগলগলিয়ায় আরো প্রায় ৮৬ শতাংশ জমি চান।
(খ) তিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আরএস খাস জমি কিনবেন না। কিন্তু তাঁর ভিতর দিয়ে ১৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তা চান।
(গ) তিনি পলাশপুর রাস্তা থেকে মা ইন্ডাস্ট্রিজের ভিতরে যেতে ২২ শতাংশ জমি না কিনে শুধুমাত্র তাঁর থেকে ১৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তা চান, যা কিনা আগের ড্রাফট হস্তলিখিত চুক্তিতে ক্রেতার কেনার কথা ছিলো। এখানে উল্লেখ থাকে যে, উক্ত ২২ শতাংশ জমির প্রস্থ মাত্র ৩৭ ফুট যার থেকে তিনি ১৬ ফুট প্রস্থের একটি রাস্তা চান এবং বাকী জায়গা তিনি কিনতে আগ্রহী নন। বাকী উক্ত ২১ ফুট প্রশস্ত জায়গা বিক্রেতার অধীনে রাখতে চান কারন উক্ত জায়গা তাঁর রাস্তায় ১৬ ফুট ব্যবহার করার পর এতো অল্প প্রশস্থের জায়গায় ক্রেতা অন্যকিছু করতে পারবেন না বলে তিনি সেই অংশ নিবেন না। কিন্তু বিক্রেতার কি হবে সেটা তিনি ভাবারও প্রয়োজন মনে করলেন না।
(ঘ) জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব (ক্রেতা) একই চরকুন্দুলিয়া মৌজায় অন্য দাগে আরো ৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেন, তিনি এখন সেই জমিও বিক্রেতার চরগলগলিয়া মৌজা থেকে বিনিময় চান।
(ঙ) শুধু তাইই নয়, ক্রেতা মুজিবুর রহমান সাহেব বিক্রেতার আরেক শরীকানা জনাব মুর্তজা আলী সাহেবের চরকুন্দুলিয়ার ডকইয়ার্ডের মধ্যে অবস্থিত ৮৪ শতাংশ জায়গাও এখন আর কিনতে আগ্রহী নন।
(১৩) কিন্তু তিনি এটা বলছেন না যে, তিনি যে বিক্রেতার শরীকানা মালিক থেকে আলাদা করে গোপনে জমি কিনলেন সেটা অন্যায়। সেইসাথে তিনি যে সেইসব শরীকানা থেকে তাঁর বিবেচনায় নেয়া IWT এর সীমানার বাইরে নদীর মধ্যে জমিও কিনলেন এটা তাঁর নীতি বহির্ভুত নয়। তিনি এটাও অন্যায় মনে করছেন না যে, বিক্রেতার প্রোপোজড ৬৩৩ শতাংশ জমির মধ্যে নিহিত মর্তুজা সাহেবের চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়া মৌজায় পৃথকভাবে নতুন করে গত জুলাই ২০২১ মাসে উচ্চ মুল্যে বায়না করা।
(১৪) বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতা যখন জুলাই ২০১৯ মাসে জমি ক্রয় শুরু করেন, তখন ক্রেতার সাথে বিক্রেতার মধ্যে কোনো প্রকারের লিখিত বা মৌখিক চুক্তি হয় নাই। কোনো শর্তাবলীও নাই। স্বাভাবিক নিয়মে বিক্রেতা লিগ্যাল ডকুমেন্টস ক্রেতাকে দিবেন, ক্রেতা সেইসব লিগ্যাল ডকুমেন্টস পরীক্ষা নীরিক্ষা করে নিজে সন্তুষ্ট হবার পরেই তা সাবকবলা করবেন, এবং ক্রেতা সেই মোতাবেকই বিক্রেতার কাছ থেকে মোট ১৬৭.৫ শতাংশ জমি সাবকবলা করেন, নামজারী করেন, ডিসিআর কাটেন, এবং ব্যাংকে মর্টগেজ করেন। এখানে IWT, নদীশাসন কিংবা কোন মৌজা (চরকুন্দুলিয়া নাকি চরগলগলিয়া) ইত্যাদির কোন প্রকারের বাধ্যবাধকতা ছিলো না এবং নাইও। ফলে ক্রেতা তাঁর চয়েজ মতো মৌজাভিত্তিক যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই সাবকবলা করার আয়োজন করেন। তাতে তিনি চরকুন্দুলিয়ায় ১৫১.৫ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশ জমি সাবকবলা করার জন্য প্রয়োজনীয় কমিশন করে সাবকবলা রেজিষ্ট্রেশন করেন। ফলে ক্রেতা এখন সেই পুরানো ১৭/০৪/২০১৯ তারিখের হস্তলিখিত ড্রাফট চুক্তির কোনো শর্তের উপরেই কোনো প্রকার চাপ বা দাবী করার ইখতিয়ার রাখেন না। এখানে আরো জোরালোভাবে উল্লেখ থাকে যে, ক্রেতা পুরানো সেই হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির মোট ১৪ টি শর্তের মধ্যে প্রায় ১৩ টি শর্ত নিজেই ভংগ করেছেন এবং নিজের সার্থেই তিনি এখন এসব করছেন যা আইনত একটি নীতি বহির্ভুত কাজ।
এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, অন্য একটি আলাদা দাগে যে ৪ শতাংশ জমি চরকুন্দুলিয়ায় ক্রয় করেছেন, তিনি উক্ত জমির নকশা এবং দাগ একাধিকবার তাঁর নিজের ল ইয়ার এবং ব্যাংকের ল ইয়ার দিয়েও পরীক্ষা নীরিক্ষা করিয়ে তারপর তিনি তা ক্রয় করার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
ফলে দিলল মোতাবেক ক্রেতা তাঁর জমি উপভোগ করবেন, এটাই নিয়ম। যদি এর বাইরে ক্রেতা মনে করেন যে, তিনি দলিল মোতাবেক তাঁর জমি ঘাটতি পেয়েছেন, নামজারী করতে পারেন নাই, বা ডি সি আর কাটতে পারেন নাই, খাজনা দিতে পারেন নাই, তাহলে তিনি বিক্রেতাকে ঘাটতি জমির জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারেন।
(১৫) এখানে আরো একটি তথ্য বলা বাঞ্চনীয় যে, ক্রেতা উক্ত ১৬৭.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করার সময় একটি তঞ্চকতা করেছেন যে, তিনি সাবকবলা করার সময় সম্পুন্ন ক্রয় করা জমির গড়মুল্যে বিক্রেতাকে টাকা ক্যাশ পরিশোধের কথা ছিলো কিন্তু বিক্রেতার সরলতার সুযোগ নিয়ে তিনি সাবকবলার দিন ক্যাশ টাকা হস্তান্তর না করে হটাত শুধু চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন। তিনি এইমর্মে জানান যে, সাবকবলার দিন কোনো এক অজ্ঞাত কারনে তিনি ক্যাশ টাকা সংগ্রহ করতে পারেন নাই, কিন্তু ততোক্ষনে জমি সাবকবলা করা হয়ে গিয়েছিলো কমিশনের মাধ্যমে। বিক্রেতা অতি দয়ালু প্রকৃতির এবং ক্রেতাকে বিশ্বাস করেছেন বলেই ক্রেতাকে সম্মান দেখিয়ে ২ কোটি ৬০ লক্ষ টাকার চেক নিয়ে উক্ত ১৬৭.৫ শতাংশ জমি সাবকবলা করে দেন। ক্রেতা উক্ত টাকা গত ২ বছরেও পরিশোধ করতে পারেন নাই। এখনো প্রায় ৫ লাখ টাকার উপরে চেকের টাকা বাকী আছে। এই ২ বছরে জমির মুল্য বেড়েছে কয়েক গুন যা ক্রেতা নিজেও জনাব মর্তুজা সাহেবের নতুন বায়নায় উল্লেখ করেছেন।
(১৬) একটি সাধারন হিসাবঃ
(ক) ক্রেতা যদি বিক্রেতার শরীকানা মালিক জনাব জজ মিয়া এবং মান্নান গংদের থেকে গোপনে আলাদা জমি না কিনতেন, তাহলে জজ মিয়া এবং মান্নান গংদের জমির পরিশোধিত মুল্য থেকে বিক্রেতা পাওয়ার কথাঃ
(কক) জজ মিয়ার জমির অতিরিক্ত টাকা (৮৫@ ১৫৫০০০/০০) = ১৩১৭৫০০০/০০ টাকা
(খখ) মান্নান গং দের জমির অতিরিক্ত টাকা (৫১@ ১০৫০০০/০০) = ৫৩৫৫০০০/০০ টাকা
———————————————————————————————————
বিক্রেতা আরো মোট টাকা পাওয়ার কথা =১৮৫৩০০০০/০০ টাকা
যদি প্রতি শতাংশ জমির গড়মুল্য ৩০৫০০০/০০ টাকা দিয়ে উক্ত টাকাকে ভাগ করা হয় তাহলে জমির পরিমান দাঁড়ায় ৬০.৭৫ শতাংশ।
অর্থাৎ ক্রেতা পরিশোধিত মুল্যে জজ মিয়া এবং মান্নান গংদের জমি পাওয়ার পরে তিনি বিক্রেতা জনাব মেজর আখতারের কাছ থেকে জমি পাওয়ার কথা (১৬৭.৫ মাইনাস ৬০.৭৫) = ১০৬.৭৫ শতাংশ
বর্তমানে তিনি পেয়েছেন (৯৫+১৬) = ১১১ শতাংশ জমি। উক্ত জমি পুরুটাই নদীর পানি থেকে আরো অনেক উপরে। অর্থাৎ যদি IWT এর কথাও বলি, তাতেও উক্ত জমি কোয়ালিফাই করে। বরং ক্রেতা অতিরিক্ত ৬০.৭৫ শতাংশ জমি বেশী পেয়েছেন যা তাঁর প্রাপ্য ছিলো না।
ক্রেতা যেভাবেই তাঁর দাবী পেশ করেন না কেনো, কিছুতেই তিনি নীতির মধ্যে তাঁর দাবী গ্রহনযোগ্য নহে। উক্ত দাবী একটা অনৈতিক এবং সার্থান্নেসি দাবী ছাড়া আর কিছুই না।
জমি ক্রয়ের বিবরনঃ
১ম দফায় জমি ক্রয়
পরবর্তীতে কোনো চুক্তি করা ছাড়াই ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান এবং বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) চর কুন্দুলিয়া এবং চর গল গলিয়া মৌজায় আগের মৌখিক গড়মুল্যে কতক শতক জমি ক্রয়-বিক্রয় করেন যার বিবরন নিম্নরুপঃ
(৭) হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির প্রায় ৩৬ দিন পর অর্থাৎ ২২/০৫/২০১৯ তারিখ অবধি দুই পর্বে ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেনকে মোট ৭৫ লক্ষ টাকা অগ্রীম প্রদান করেন।
(৮) অগ্রিম প্রদানের পর ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়ার জমির বৈধতা এবং কাগজ সঠিক আছে কিনা যাচাইয়ের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় কাগজাদির ফটোকপি চান এবং বিক্রেতা তা সরবরাহ করেন।
(৯) ২২/০৫/২০১৯ থেকে শুরু করে ১৮/০৬/২০১৯ পর্যন্ত ক্রেতা জমির সমস্ত কাগজাদি ভূমি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিস, নিজেদের ল-ইয়ারসহ ব্যাংকের ল-ইয়ারের মাধ্যমে সরেজমিনে জমির কাগজাদি যাচাই বাছাই করে এইমর্মে বিক্রেতা জনাব মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেনকে ১৯/০৬/২০১৯ তারিখে কমিশনের মাধ্যমে জমির সাবকবলা করবেন বলে চুড়ান্তভাবে জানান এবং ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান আরো ২৫ লক্ষ টাকাও প্রেরন করেন। উক্ত ২৫ লক্ষ টাকা সহকারে ১৮/০৬/২০১৯ পর্যন্ত বিক্রেতা মেজর আখতারকে ক্রেতা সর্বোমোট ১ কোটি টাকা প্রদান করেন। ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব এইমর্মে জানান যে, প্রথমে তিনি চরকুন্দুলিয়ায় ৫৩ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশ জমি সাবকবলা করবেন। এখানে উল্লেখ থাকে যে, চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়ার জমির দামের পার্থক্য থাকলেও ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই পূর্বের গড়মুল্য অর্থাৎ প্রতি শতাংশ জমি গড়ে ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকাই ধার্য থাকে। ফলে চরকুন্দুলিয়ায় ৫৩ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশের মুল্য দাঁড়ায়
= (৫৩+১৬) = ৬৯ @ ৩০৫০০০/০০ = ২১০৪৫০০০/০০ টাকা
অগ্রীম বাবদ দেয়া ছিলো = ১০০০০০০/০০ টাকা
—————————————————————————————
বাকী থাকে = ১১০৪৫০০০/০০ (এক কোটি দশ লাখ পয়তাল্লিশ হাজার)
উক্ত বাকী টাকা ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব কমিশনের মাধ্যমে সাব কবলা রেজিষত্রি করার সময়ে বিক্রেতার কাছে ক্যাশ হস্তান্তর করবেন বলে নিশ্চিত করেন।
(১০) কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব ১৯/০৬/২০১৯ তারিখে ৬৯ শতাংশ জমি কমিশনের মাধ্যমে সাব কবলা রেজিষ্ট্রি হয়ে যাওয়ার পর জানান যে, তাঁর সেই মুহুর্তে টাকার সমস্যা আছে এবং তিনি আপাতত বাকি ১ কোটি ১০ লাখ ৪৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করবেন। বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ সম্মানার্থে উক্ত চেকের টাকাতেই তিনি ৬৯ শতাংশ জমি জনাব মুজিবুর রহমান সাহেবকে সাক কবলা করে দেন। অতঃপর জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব জমি ক্রয়ের পরেরদিন অর্থাৎ ২০/০৬/২০১৯ তারিখে বাকী টাকা থেকে আরো ৮০ লক্ষ টাকা মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেনকে পরিশোধ করলে জনাব মুজিবুর রহমান সাহেন বিক্রেতার কাছে ৩০৪৫০০০/০০ (ত্রিশ লক্ষ পয়তাল্লিশ হাজার) টাকা ঋণী থাকেন।
(১১) জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব উক্ত জমি ক্রয়ের পর তাঁর নিজ নামে নামজারী জমাভাগ করাইয়া, নামজারী করান, খাজনা/ট্যাক্স জমা দেন, ডিসিআর কাটেন এবং পরবর্তীতে তিনি ব্যাংকে মর্টগেজ দেন।
২য় দফায় জমি ক্রয়ঃ
(১২) ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান পুনরায় জমির কাগজাদি ভূমি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিস এবং তাঁর নিজস্ব ল ইয়ার / ব্যাংকের ল ইয়ারের মাধ্যেম চর কুন্দুলিয়ার ৯৮৫ শতাংশ জমি ক্রয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত করেন এবং পূর্বের ৩০ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার নিমিত্তে এবং কিছু টাকা অগ্রীম প্রদানের নিমিত্তে ২৫/০৬/২০১৯ তারিখে ৭০ লক্ষ টাকা বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ আখতারকে প্রদান করেন। ফলে
২৫/০৬/২০১৯ তারিখে পুর্বের বকেয়া পরিশোধের নিমিত্তে = ৩০৪৫০০০/০০ টাকা
২৫/০৬/২০১৯ তারিখে নতুন জমি ক্রয়ের নিমিত্তে অগ্রীম প্রদান = ৩৯৫৫০০০/০০ টাকা
—————————————————————————————————–
২৫/০৬/২০১৯ তারিখে মোট প্রদান = ৭০০০০০০/০০ টাকা
(১৩) সমস্ত কাগজাদি যাচাই বাছাই করার পর ২৫/০৭/২০১৯ তারিখে জনাব মুজিবুর রহমান চরকুন্দুলিয়া মৌজায় ৯৮৫ শতাংশ জমি সাব কবলা করার জন্য কমিশন করেন।
৯৮৫ শতাংশ জমির মুল্য হয় = ৩০০৪২৫০০/০০ টাকা
অগ্রিম বাবদ পূর্বে প্রদান = ৩৯৫৫০০০/০০ টাকা
——————————————————————————————-
জমির মুল্য বাবদ পরিশোধ করার কথা = ২৬০৮৭৫০০/০০ টাকা
কমিশনের দিন অর্থাৎ ২৫/০৭/২০১৯ তারিখে ক্যাশ প্রদান = ৬০০০০০০/০০ টাকা
——————————————————————————————–
জমির মুল্য বাকী থাকে = ২০০৮৭৫০০/০০ টাকা
(১৪) উক্ত ২৬০৮৭৫০০/০০ টাকা কমিশনের দিন সাবকবলার সময়ে পরিশোধ করার জন্য কথা থাকলেও ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান মাত্র ৬০০০০০০/০০ টাকা প্রদান করেন এবং বাকী টাকা ব্যাংক চেকের মাধ্যমে অর্থাৎ ২০০৮৭৫০০/০০ টাকা বাকী রাখেন।
(১৫) উক্ত টাকা গত ২৫/০৭/২০১৯ তারিখ থেকে আরম্ভ করিয়া অদ্যাবদি ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সম্পুর্ন টাকা পরিশোধ করেন নাই। বর্তমানে বিক্রেতা আরো আট লাখ টাকার মতো পাওনা রিহিয়াছেন।
(১৬) এই উক্ত ২ বছরে জমির মুল্য প্রায় দিগুন হয়েছে এবং বিক্রেতা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।
খান সাহেবের এখন করনীয়
যদি খান সাহেব উক্ত এলাকায় তাঁর প্রোজেক্ট স্থানান্তর করতে চান, সেক্ষেত্রে তাঁর এক্সক্লুসিভলী পলাশপুর রাস্তা থেকে চরকুন্দুলিয়া পর্যন্ত রাস্তা লাগবে। এই একই সমস্যা জনাব মর্তুজা সাহেবের বেলাতেও প্রযোজ্য। মর্তুজা সাহেবের জমিতে যাওয়ার জন্যেও তাঁর এক্সক্লুসিভলী রাস্তা লাগবে যা তাঁর নাই। সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উপায়সমুহে তা সমাধান করা সম্ভবঃ

আজ মীরপুর ১ থেকে প্রায় নিউ মার্কেট পর্যন্ত দেখলাম কিছুক্ষন পর পরই ট্রাফিক পুলিশ বাস, প্রাইভেট কার এবং অন্যান্য যানবাহনকে একটা ডিসিপ্লিন ওয়েতে লেন করে চালানোর চেস্টা করছেন। এতে প্রায় কম করে হলেও পুরু এই রাস্তায় ৪০০ জন ট্রাফিক পুলিশ নিয়োজিত আছেন। তারা ভালো কাজ করছেন,সন্দেহ নাই। কিন্তু এইভাবে যদি সারা ঢাকায় ফিজিক্যাল হাজিরার মাধ্যমে ট্রাফিক লেন মেইন্টেইন করাইতে হয়, তাহলে কত পুলিশ দরকার?
অথচ তারা যদি কম্প্রোমাইজ না করে ড্রাইভার, পথচারী এবং অন্যান্য যানবাহন এর বিরুদ্ধে আইনমাফিক হার্ড লাইনে থাক্তো এবং ইন্সট্যান্ট জরিমানা, শাস্তি, পেনাল্টি, লাইসেন্স বাতিল, রুট পার্মিট বাতিল করতো তাহলে ২ দিনের মধ্যে ঢাকার এই বিস্রিংখলা ঠিক হয়ে যেতো।
যান পরিবহন একটা ব্যবসা। কেউ যদি স্ট্রাইক করতে চায়, তাকে করতে দিন। সিস্টেম ঠিক করার জন্য এক দুই মাস জনগন কস্ট করবে। Nation needs to be Civilized and disciplined first.
উম্মিকার ডাক্তার হওয়ার পারিবারিক অভিষেক অনুস্টানের পর্বটি একটা আনন্দঘন দিনে পরিনত হয়েছিলো। চৌধুরী বাড়ির লোক সংখ্যা এমনিতেই এতো যে, ডাক দিলেই হাতের কাছে গোটা ১০ জন পাওয়া যায়। তারমধ্যে আবার দাওয়াত, তাও আবার আমার বাসায়। এ যেনো মহা যজ্ঞ। সবাই নিজের বাড়ির মতো করে আনন্দ করে। সারা বাড়িতে গটা কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে যায়। ছোটরা হৈচৈ, বড়রা চিল্লাচিল্লী, মাঝারী গুলা তাস, কিংবা সেলফী, আর বুড়ারা গাল গল্পে।
উম্মিকার ডাক্তারী পরীক্ষার ফলাফলের পর পরই একটা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বিভিন্ন ঝামেলায় করা হচ্ছিলো না। উম্মিকার আম্মু আবার এসব বিষয়ে পিছিয়ে থাকার লোক না। সব বাড়ি থেকেই লোকজন এসেছিলো। উম্মিকা আঞ্জুমানদেরকে আসতে বলেছিলো। আঞ্জুমানরা এক সময় আমাদের বাসায় ভাড়া থাকতো, এখন সে ৪ সন্তানের মা। খুব ভালো একতা মেয়ে। মান্নারা, বাসাবো থেকে বুটী আপারা, মূটামুটি সবাই এসেছিলো। খুব সুন্দর একটা গেট টুগেদার হলো আজ।
বিকালে সবাই ছাদে গেলো, সন্ধ্যার পর আবার আরেকতা ভুড়িভোজ হলো। সব মিলিয়ে এক কথায় উপভোগ্য একটা দিন ছিলো। প্রায় ৫ বছর আগে যখন উম্মিকা ডাক্তারী পড়তে যায়, আমি কখনো ভাবি নাই যে, উম্মিকা একা একা সেই আরেকটা দূরের শহরে থাকতে পারবে। মেস লাইফ, কঠিন লাইফ। কিন্তু তারপরেও উম্মিকা এক চাঞ্চসেই আল্লাহর রহমতে ডাক্তারী পরীক্ষায় পাশ করে ফেলেছে, এটা ওর জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো। অনেক প্রতিকুলতার মধ্যে এবং মানষিক যন্ত্রনায় ওকে পরীক্ষা গুলি দিতে হয়েছে। উম্মিকা বরাবরই ভালো ছাত্রী ছিলো, ফাকীবাজ ছিলো না, ফলে সব গুলি টার্মেই উম্মিকা ভালো করায় একটা ডিস্টিঙ্কট নিয়ে পাশ করেছে। আমি সব সময় চেয়েছিলাম উম্মিকা ডাক্তার হোক, আজ সেটা উম্মিকা পুরন করেছে, মাশ আল্লাহ।
শেষ পর্বটি ইমনের আতশবাজী পোড়ানো ছিল এলাকায় একটি উৎসব মূখর পর্ব। আশেপাশের সব বাড়িগুলি থেকে অনেক মানুষ ইমনের এই আতশবাজী দেখার জন্য বাসার বাইরে দাড়িয়েছিলো। আমাদের সাথে সাথে পাড়াপ্রতিবেশীও ব্যাপারটা আনন্দ করেছে। ধন্যবাদ ইমন
গত ১২ মার্চ ২০১৯ তারিখে আমার বড় মেয়ের মেডিক্যাল ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। খুব টেনশনে ছিলো মেয়ে পাশ করে কিনা। প্রায়ই তার মেজাজ মর্জি খারাপ থাকতো এই টেনশনের কারনে। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়েছে সে এই পড়ার সময়। তার পরেও সে তার লক্ষ্য স্থির রেখেছে যেনো এক চান্সেই পড়াটা শেষ হয়। আল্লাহর অসীম রহমত যে, সে এক চান্সেই মেডিক্যাল পরীক্ষাটা পাশ করে এখন সে পূর্ন ডাক্তার হয়ে গেলো। আল্লাহর কাছে শুকরীয়ার শেষ নাই।
সেদিন আমি বাসায়ই ছিলাম। বেলা প্রায় একটার ও বেশী। বউ কলেজে ছিলো। আমরা বাসায় একত্রে খাবো বলে অপেক্ষা করছি। আমি কম্পিউটারে কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। দুই মেয়েও বাসায়। বড় মেয়ে উম্মিকা ড্রয়িং রুমে কিছু একটা করছিলো। হটাত করে “আব্বু” বলে বড় মেয়ে চিৎকার। আমি চমকে গেলাম, কি হলো মেয়ের। তাড়াতাড়ি কম্পিউটারের কাজ ফেলে ড্রয়িং রুমে যাচ্ছিলাম, দেখি মেয়েই এগিয়ে এসছে হাতে তার মোবাইল নিয়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদতে কাদতে বলছে, “আব্বু, আমাদী মেডিক্যালের ফলাফল দিয়েছে। আমি পাশ করেছি আব্বু”।
আমি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় চুমু খেতে খেতে বললাম, “কাদছিস কেনো তাহলে?”
মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে থর থর করে কাপছে আর আরো কাদছে। অনেক আদর করে বললাম, আল্লাহর কাছে হাজার শুকরীয়া যে, তুমি পাশ করে গেছো।
অনেক্ষন লাগলো আমার বড় মেয়ের স্থির হতে। ঠিক এমন সময় আমার বউ বাসায় ঢোকলো। আমার তখন মাথায় একটা দুস্টু বুদ্ধি এলো, ওর মাকে ভড়কে দেবার। বললাম, “দেখো, মেয়ের পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে, মেয়ে কান্নাকাটি করছে। মেয়েকে থামাও”।
লক্ষ্য করলাম, আমার বউএর মুখাবয়ব হটাত করে পরিবর্তন এবং টেনশনের ছায়া। হাতের ব্যাগ টা কোনো রকমে টেবিলের উপর রেখেই মেয়েকে শান্তনা দেবার জন্য জড়িয়ে ধরলো আর বল্লো, কি রেজাল্ট মা?
আমি হেসে দিয়ে বললাম, মেয়ে তো পাশ করেছে। যেই না বলেছি যে, পাশ করেছে, আর অমনি মা মেয়ের দুজনেই এখন কান্নার রোল। এতক্ষন তো ছিলো একজনের কান্না, এখন দেখি দুইজন। ঠেলা শামলাও এবার।
বেশ মজা পাইলাম মা মেয়ের এই রকম একটা আবেগ পুর্ন মুহূর্তের জন্য। সবই আল্লাহর ইচ্ছা এবং দয়া। আজ থেকে আমার বড় মেয়ের একটা ভালো আইডেন্টিটি হলো, “ডাক্তার” উম্মিকা।
ধন্যবাদ মা তোমাকে। আমি তোমার উজ্জল জীবনের জন্য দোয়া করি সব সময়।
জন্মসুত্রে আমরা যা পাই তা হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্ক। এটা আমরা অর্জন করি না। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে আমরা যা অন্যের কাছ থেকে যা পাই তা হচ্ছে বন্ধুত্ব। এটা আমরা অর্জন করি। আর এই বন্ধুত্তের পর্যায়কালগুলি যখন একে একে ধাপ পেরিয়ে শিশুকাল থেকে বাল্যকাল, বাল্যকাল থেকে কৈশোর, আর কৈশোরের পর থেকে ক্রমান্বয়ে যুবক থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়, এর প্রতিটি ধাপেই থাকে কিছু রোমাঞ্চকর স্মৃতি, ছোটখাটো খুনঠুসি। এই প্রতিটি ধাপই একটা সময়ের বেড়াজালের। এইসব বেড়াজালের স্মৃতিতে সবাই একেকটা আইকনিক নাম নিয়ে বন্ধুদের অন্তরে এমন করে বেড়ে উঠে যা শুধুমাত্র বন্ধুদের ঠোট আর কানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে ভালো মনের বন্ধুটিও হয়ত তার কালো চেহারার জন্য আদরের নাম হয়ে উঠে “কালা জাহাংগির” আবার সবচেয়ে মিস্টি চেহারার বন্ধুটি হয়তো “সুন্দুরি বা “মেডোনা” নামে বন্ধু আড্ডায় পরিচিত হয়ে উঠে। এইসব আসলে কেবলমাত্র বন্ধু সরোবরে একটি আইকনিক আদরে উচ্চারিত নাম বটে যা অন্য কোথাও প্রযোয্যও নয়, এবং তা গ্রহনযোগ্যও নয়। এসব কেবল ব্যক্তিগত আড্ডার একটা অতীব একান্ত গোপন রোমন্থন বটে। শিশুকালের একটা দন্তবিহীন শব্দ, কিংবা আঞ্চলিক ভাষার কারনে কোনো এক বাক্য হয়ে উঠে এই সব আইকনিক নামের মিস্টি ডাক। হতে পারে কৈশোরের একটি স্মৃতি বিজড়িত কথার সারাংশ, কিংবা যুবক বয়সের কোনো এক নেশাগ্রস্ত প্রেমিকের নামও কোনো এক বন্ধু বিশেষকে অন্য সব বন্ধুর কাছে যতোটা আপন আর আলোচিত করে থাকে সেটা হয়ত খুবই আপনার কিন্তু এইসব প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যবহার যোগ্য নয়। আবার একেবারেই ব্যবহারযোগ্য নয় এমনো নয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মেধায় তা যে কেউ সম্পর্ক অনুপাতে আনন্দের সহিত তা গ্রহনযোগ্য সাপেক্ষে ব্যবহার করা কোনো সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সেটা নিতান্তই দুইজন বন্ধুর ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাধনের উপর নির্ভর করে।
সন্তানেরা যখন সুউচ্চ মর্যাদায় উপনীত হয়, পিতামাতারাও তখন সেই সন্তানকে আর সেই ছোট বয়সের বিচিত্র নামে ডাকেন না। সন্তান যখন দেশের কর্নধার হন, পিতামাতাও তাকে মিস্টার প্রেসিডেন্ট বলেই সম্বোধন করেন। তাতে না পিতামাতার মান ক্ষুন্ন হয়, না সন্তানের। বরং উভয়েই এই বলে গর্বিত হন, তারা একে অপরের সাথে বহু বছর অতোপ্রোতভাবে এমনভাবে জড়িয়ে আছেন যে, সব সাফল্য তাদেরই। তারা উভয়েই গর্বিত।
টাচ-১৩ এমন একটি ফোরাম, যা আমরা দাবী করতে পারি, এটা আমাদের অর্জন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন এই টাচ-১৩ এর পত্তন হয়। এর ইতিহাস হয়তো অনেকেরই মনে নাই কিন্তু এর পিছনে যে সব বন্ধুরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাদের ভুমিকা নিয়ে আজ নতুন করে কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন মনে করি না কিন্তু এইসব বন্ধুদের সবারই একটা কমন উদ্দেশ্য ছিলো। আর তা হচ্ছে আমরন বন্ধুত্তের শিকলে একে অপরকে বেধে ফেলা। এই ফোরামে আমরা সবাইকে একই কাতারে রেখে (কাউকে ছোট বা কাউকে বড়, কাউকে ধনী, কাউকে কম ধনী, কাউকে অধিক শিক্ষিত, কাউকে কম শিক্ষিত, কেউ ছোট র্যাংকের বা কেউ বড় র্যাংকের, এই রকমের কোনো পার্টিজান করি নাই) আমরা ফোরামটাকে তৈরী করতে চেয়েছি। আমরা তথাকথিত সিভিলিয়ানদের মতো কারো কারো আর্থিক সচ্ছলতার কারনে সুবিধা যেমন নিতে পারতাম, আবার কারো কারো আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে তাকে এই ফোরামের অতি নগন্য সদস্য হিসাবেও স্থান দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা সেটা কখনোই মাথায়ও আনি নি। বরং কেউ যেনো ছোট কেউ যেনো বড় না ভাবি সেটাই মাথায় রেখে আমরা চেয়েছি সবাই সেই বন্ধু হতে যেনো বৃদ্ধ বয়সে অন্তত লাঠিতে ভর করে হেটে হেটে আরেক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে এক কাপ চা খাই আর গল্প করার পরিবেশ তা তৈরী হয়। বয়সের ভারে দন্তবিহীন দুইবন্ধু গল্প তো করতে পারবো কোনো এক সন্ধ্যায়। এটাই হলো টাচ-১৩ এর মুল উদ্দেশ্য। যখন আর কেউ আমাকে নাম ধরে ডাকবে না, তখন এই টাচ-১৩ এর কোনো একবৃদ্ধ বন্ধু হয়তো পিছন থেকে এসে বলবে, “কিরে বন্ধু, কি করস? কিংবা চল বন্ধু ঐখানে বসি”। আর তো কিছু চাওয়ার নাই। কিন্তু সময়ের পরাক্রমে, আমাদের এইসব বন্ধুরা কেউ দেশের কর্নধার, কেউ জাতীর ভরসা যখন হয়ে উঠেন, আমরাও সেই বন্ধুদের জন্য আপাদমস্তক গর্ববোধ করি। প্রকাশ্য দিবালোকে আমরা তাদেরকে সেই বাল্যকালের “করিম” কে “অই করিম্যা” কিংবা যুবক বয়সের “কুদ্দুস” কে অই “কুদ্দুস্যা” বলে ডাকি না, ডাকতেও পারি না, পারা উচিতও নয়।
বাল্যকালে কত কিছুই তো করেছি। না জেনে গাজাও খেয়েছি, আবার বিপদের সময় সবাই মিলে আল্লাহর দরবারে হাতও তুলেছি। বয়স হয়েছে, এখন তো কেউ বিনে পয়সায় গাজা কেনো রিফাইন্ড আফিম দিলেও সেবন করার কোনো মানসিকতা নাই। তাই বলে কি এখন এই বয়সে এসে “বাল্যকালে একবার আমি গাজা খেয়েছিলাম বলে কোনো ক্রেডিট নেবার স্কোপ আছে, না আছে কোনো গর্ব করার বিষয়? কিন্তু এর মানে আবার এই নয় যে, ব্যক্তিগত আড্ডায় তা আমরা বন্ধুদের কাছে লুকানোর কোনো চেস্টা করি। তখন অপরিপক্ক বয়সে এই ছাইপাস খেয়ে কে কি রকম রাজকীয় ডায়ালগ ছেড়েছে তা নিয়েও বিস্তর হাসাহাসি হয়। এটাই তো সেটা যা চেয়েছি। আবার ব্যক্তিগত আড্ডায় আমাদের সেই বন্ধুরা যারা তাদের নিজ নিজ স্থানে গর্ব করার মতো অবস্থানে আছেন তাদের বর্তমান পদকে অতিরিক্ত সমীহ করে বিস্তর গ্যাপ করে বন্ধুত্তটাও নষ্ট করার কোনো অবকাশ রাখতে দিতে চাই নাই। মধুর আড্ডায় এখানে সবাই জেনারেল, সবাই ব্যবসায়ী সবাই ভাই আবার সবাই এক। এই বন্ধু ফোরামে তখন বাল্যকালের জসিমই “ জইস্যা” বা ফর্সা চেহারার বন্ধুটি অই যে “সুন্দুরী”। তখন কুদ্দুস আমাদের কাছে কুদ্দুস্যাই, আর করিম আমাদের কাছে করিম্যাই। এই তফাতটা যদি আমরা এই বয়সে এসে না বুঝতে পারি, তাহলে না আমরা বন্ধুত্তকে সম্মান করছি, না সম্পর্কটাকে।
আমার বর্তমান পেশার এমনসব অনেক রাঘব মানুষদের সাথে আমার এমন অনেক সখ্যতা আছে যারা শুধু দেশের কর্নধারই নন, আন্তর্জাতীক মহলেও তাদের অনেক সুনাম আছে। টিপু মুন্সী ভাই, আতিকুল ভাই, আনিস ভাই (যিনি মারা গেছেন), মহিউদ্দিন ভাই, মীর গ্রুপের কর্নধার, কিংবা আজাদ ভাই আরো অনেক মানুষগুলি যখন আমরা এক ফোরামে বসি, অনেক সময় ফান করে মুন্সী ভাইকে হুজুর ডেকেও বলি ভাই মাথায় হাত রেখে একটু ফু দিয়া দেন বা এক গ্লাস পানি পরা দেন ইত্যাদি। হয়ত মুন্সী ভাইও ফান করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, এই নাও বাছাধন, প্রনাম করো পা ধরে। আবার তার থেকেও আরো কঠিন রশীকতা করে বলেন (থাক আর বললাম না) কিন্তু যখন মুন্সী ভাই দেশের একজন নীতিনির্ধারক, তাকে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত আড্ডায় যাই বলি না কেনো, প্রকাশ্যে আমরা তাদের ঐটুকু সম্মান করি যা তিনি প্রাপ্য এবং আমরা তখন সেটাই করি যাতে তিনি এবং আমরা উভয়েই একটা ক্লাশ রিপ্রেজেন্ট করি বলে অন্য সবাই বুঝে। এটা বুঝবার জন্য অনেক শিক্ষিত হবার দরকার নাই।
টাচ-১৩ কে এই পর্যায়ে আনার জন্য অনেক সদস্যের কিন্তু অনেক বেগ পেতে হয় নাই। গুটিকতক সদস্য জানে এর পিছনে কি পরিমান পরিশ্রম দিতে হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যখন আমরা ফাউন্ডিং প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, এবং ইসি মেম্বার ছিলাম, তাদের থেকে এখন পরিশ্রম অনেক অনেক বেশি। যারা এর সাথে জড়িত তারাই শুধু জানেন কি মুল্য দিতে হয় এই ফোরামকে সচল রাখার জন্য। একটা চায়নীজ চাদর যখন গ্রুপ থেকে কমন গিফট হিসাবে আমাদের হাতে আসে, এর পিছনের ইতিহাস যে কত পরিশ্রমের, সেটা জানে শুধু সে যে এই চাদর সুদুর চীন থেকে কিনে এয়ারপোর্ট পার হয়ে দেশে আনেন। মাঝে মাঝে পরিবারের সবাই এর সাথে জড়িত হয়ে যায়। তাঁর মানে আমি এই বলতে চাচ্ছি না যে, সবাই আরাম করে টাচ-১৩ উপভোগ করবে আর কেউ কেউ খেটে মরবে কেনো। সেটা না। যা বলতে চাচ্ছি, তা হলো, এই টাচ-১৩ আমাদের একটা স্বপ্ন, আমাদের একটা গর্ব। এর কোথাও একটু ফাটল মানে আমাদের গায়ের চামরায় আচড়ের মতো। আর যদি এই আচড় এমনভাবে লাগে যে, সেলাই দরকার, তাতে রক্তক্ষরন হয় তাদের বেশি যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে একে সবার ঈর্শা করার মতো একটা ফোরাম ইতিমধ্যে তৈরী করতে পেরেছেন।
গত কয়েকদিন আগে আমি এনবিআর এর একজন সচীবের সাথে আমাদের এই টাচ-১৩ এর পুরু ব্যবস্থাপনাটা নিয়ে আলাপ করছিলাম। সেখানে আরো কয়েকজন উচ্চ পদস্থ সচীব এবং এডিশনাল সচীবও ছিলেন। তাঁরা এতো অবাক হলেন জেনে যে, ১৩৭ জন বেসিক সদস্য নিয়ে (যা এখন প্রায় হাজারের কাছাকাছি উঠে গেছে বাল-বাচ্চা-নাতী নাতকোর নিয়ে) কিভাবে আমরা এতোদূর আসতে পারলাম যা তারা কয়েক ডজন সচীবও পারছেন না। আমার শুধু একটাই উত্তর ছিলো, আর তা হচ্ছে- বিশ্বাস এবং ইনসাফ। এর মানে এই যে, আমরা আমাদের বন্ধুদের, আমাদের ইসিদের, আমাদের উপদেষ্টাদের বিশ্বাস করি, এবং তারা (আমাদের বন্ধুরা, আমাদের ইসিগন, আমাদের উপদেষ্টাগন) আমাদের অন্য বন্ধুদের উপর সঠিক ইনসাফ করেন।
টাচ-১৩ আমাদের একটা স্বপ্ন, আমাদের একটা দাড়াবার স্থান। আর এইটা আমার ব্যক্তিগত জীবনে একটা সাফল্য। এটার ব্রেইন চাইল্ড আমরা গুটিকতক মানুষ যারা স্বপ্ন দেখেছিলো আর সেই স্বপ্ন সবাই একসাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আর সেই ব্রেইন চাইল্ডের মধ্যে আমি নিজে, ওয়াহিদ, সালাম, হুমায়ুন, মতিউর, জাকির এবং আরো অন্যান্যরা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম বলে মাঝে মাঝে যখন দেখি এর মাঝে কিছু ভাংগনের বাতাস বয়, আমার বড় কস্ট হয়। কেউ এই ফোরাম থেকে মনে কস্ট নিয়ে বেরিয়ে যাবেন আর আমরা তা জীবদসশায় দেখবো, সেটা আমি কখনো মান্তেও পারবো না, মানতে চাইও না। আমার ধারনা, আমার সাথে যারা এই স্বপ্ন দেখেছিলো, তারাও এটা মানতে পারবে না।
আমি পরিশেষ একটা কথা বলতে চাই, আমরা সবাই এক, আবার সবাই একই রকম নই। যাকে সম্মান দেয়া দরকার, যার সম্মান পাওয়ার দরকার, তাকে তা অকপটে দিতে হবে। আমি তো গর্ব করে বলি, আমার আছে অতোটা জেনারেল, অথচ এক সময় যেই জেনারেলদের ভয়ে তাঁর অফিসের ধারে কাছেও যাই নাই, আর আজ আমারই বন্ধুরা জেনারেল। এর থেকে আর কত সম্মান আমার দরকার? আমরা এই বন্ধু জেনারেলকে যেমন সম্মানীত করবো তেমনি সম্মান দেবো সেই সব বন্ধুদেরও যারা তাদের নীজ যোগ্যতায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে সম্মানীত। অতীত থাকবে, আড্ডা থাকবে, ফান থাকবে, কিন্তু প্রকাশ্য আর অপ্রকাশ্য আড্ডা একসাথে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। বন্ধুই তো বন্ধুকে সম্মান দেবে, গর্ববোধ করবে। আমরাই যদি তা না দেই তাহলে কোন ভরসায় আমরা একে অপরের জন্য শিল্ড হয়ে দাড়াবো? আমরা সবাইকে যার যার স্থানে সম্মান দেখানো আমাদের কর্তব্য। ভালোবাসা যদি দিতেই না পারি, তাহলে ভালোবাসা চাইবো কিভাবে? এখানে আরো একটা কথা না বললেই নয় যে, হয়তো ভালোবাসার বহির্প্রকাশ একেক জনের একেক রকমের। হয়তো আমরা অনেকেই না জেনে, না বুঝেই হয়তো অনেকে অনেক কিছু বলে ফেলি, এটা হয়তো ভালোবাসার আতিশয্যের আরেক টি প্রকাশ। তাঁর পরেও আমি বলবো, আমরা আমাদের কমন ভালোবাসার বাইরে এমন কিছু করতে চাই না যারা এই বয়সে এসে কিছুটা হলেও মনে কস্ট পাক। ভালোবেসে চুমু খেতে খেতে যদি আমার সন্তান দম বন্ধ হয়ে মরেই যায়, তাহলে এই চুমুটা আমার সনাতেনের জন্য ভালোবাসা নয়।
এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, আমাদের ইসি, উপদেস্টা, এবং কার্যকরী সদস্য যারা আছেন, তারা কিন্তু কেউ বেতনভোগী নন। আমরা আমাদের সবার কাজগুলি এইসব কিছু গুটিকতক বন্ধুদের উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত মনে আছি। তার একটাই কারন, We respect our friends, we trust our friends, and we do believe, no one is going to do any such activities where Touch-13 is even slightly harmed. এইসব বন্ধুরা টাচ-১৩ কে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কাজে লিপ্ত। তারা কোনো আইন আদালত নিয়ে কিন্তু বসেন নাই। বিচার শালিশি করা আমাদের ইসির কাজ নয়। কিন্তু কেউ যদি আমাদের যে কাউকে মনে কস্ট দেন, বা কারো জন্য আমাদের কেউ কস্ট পান বা মনে করেন যে, এই ফোরাম কারো উপর অবিচার করছে বা করেছে, তখন আমরা এই ১৩৭ জন বেসিক সদস্যই ইসি। এটা ইসি অফ ফ্রেন্ডশীপ। তবে ১৩৭ জন বিচারকের আসনে যেহেতু বসানো সম্ভব নয়, ফলে আমাদের সম্মানিত টাচ-১৩ এর ইসিরাই আমাদের ১৩৭ জনকে রিপ্রেজেন্ট করে। এর মানে এই নয় যে, এর বাইরে কেউ যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে পার্টিসিপেট করতে চান তাকে ভিজিটর হিসাবে অপারগতা দেখানো হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা- কেনো আমরা আমাদের জন্য বন্ধু ফোরামে নালিশ করতে হবে। কেনো আমরা সময়, স্থান এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে সব কিছু মুল্যায়ন করবো না! এটা মাথায় রাখলেই তো সব ঠিক।
একটা ছোট বাস্তব গল্প দিয়ে লেখাটা শেষ করি। আমার এক ব্যাংকার বন্ধু ( যিনি বর্তমানে একটি প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি) জাহাংগিরনগর ইউনিভার্সিটিতে নিজ উদ্যোগে মাসিক বুলেটিন বের করতেন। তিনি হটাত মাস্টার্স পরীক্ষার আগে পড়াশুনার ব্যস্ততার কারনে পরপর দুই মাস মাসিক পত্রিকাটি বের করতে পারেন নাই। তো অন্য এক বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করছেঃ কিরে দোস্ত, তোর মাসিক বন্ধ নাকি? তো বুলেটিন বন্ধু বলছেঃ হ্যারে দোস্ত, দুইমাস ধরে আমার মাসিকটা বন্ধ। এই হয়ে গেলো বুলেটিন বন্ধুর নাম “ মাসিক”। এখন সে একটা প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি। অনেক বড় পোস্ট। গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, বানিজ্যমন্ত্রী ইত্যাদি বড় বড় কর্নধারদের সাথে আমার এই বন্ধুর উঠাবসা। দেখা হলে হয়তো চুপে চুপে এখনো বলি- কি দোস্ত মাসিক ঠিক আছে তো? সেও খুব মজা পায়। হয়তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মজার মজার উত্তর দেয়। কিন্তু তাই বলে কি আমরা তাকে প্রকাশ্যে এই আইকনিক নামে আর ডাকতে পারি বা পারা উচিত?
( বিশেষ নোটঃ যাদের বাচ্চা কাচ্চারা অল্প সল্প গল্প ফোরামে বাবাদের পাশাপাশি তাদেরও এক্সেস আছে, তারা এই পোস্ট না পড়াই ভাল। আর যদি পড়, তাহলে এই লেখা থেকেও শিক্ষা নাও কি বলতে চেয়েছি। আমরা ও চাই তোমরা জন্মগতভাবে প্রাপ্য এই ফোরাম কে নিজের অর্জন মনে করে সবাই মিলে এক সাথে একটা পরিবারের মতো এগিয়ে নিয়ে যাও। তাহলেই সার্থক হবে আমাদের স্বপ্ন)
প্রকৃতি তাঁর নিজস্ব চরিত্র, চক্র বা সত্ত্বাকে কখনো বদলায় না। শীত বা বসন্ত কিংবা শরতের আগমন বা প্রস্থান আপাতদৃষ্টিতে আগেপিছে হইলেও ইহা প্রকৃতির বদলানোর কোন হেরফেরের বিষয় নয়। আমাদের প্রয়োজনে আমরা যেমন সময়কে একটা স্ট্রাকচারের মধ্যে বন্দি করিয়া সেই স্ট্রাকচার দিয়া বহমান প্রকৃতির আসা যাওয়াকে হিসাবে কষি, প্রকৃতি সেটারও ধার ধারে না। সে তাঁহার সময়ে গ্রীষ্ম দেয়, সে তাঁহার সময়ে শীতের আবির্ভাব ঘটায়। সে তাঁহার নির্দিস্ট চক্রেই তাঁহার যাবতীয় কর্মসম্পাদন করে। ফল পাকিবার বয়স, কিংবা ঝড় আসিবার কাল, অথবা মানুষ পরিপক্ক হইবার ক্ষন সবই এই প্রকৃতি তাঁহার ঠিক সময়ের অনুচক্রে পরিবর্তন ঘটাইয়া থাকে। প্রকৃতির এই চক্রকালের সহিত মানবকুলের সৃষ্টি সময়ের অনুচক্রে অনেক সময়ই গরমিল হয় বলিয়া যে সময়টাকে যাহার জন্য আমরা পরিপক্ক বলিয়া একটা আদর্শ মাপকাঠি ধরি, তাহা আসলে প্রকৃতির অনুচক্রে হয়তো তখনো তাহা অপ্রাপ্ত বা অপরিপক্ক হিসাবেই পরিগনিত হইয়া রহিয়াছে। এইরূপ দুইটি অসামঞ্জস্য চক্র যখন একই ঘটনায় খেলিতে থাকে, তখন কোথাও অধিক পরিপক্কতার কারনে, আবার কোথাও আমাদের মাপকাঠিতে অপরিপক্কতার নিদর্শনে গড়মিল হইয়া মানব সমাজে একটা অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলা কায়েম করে। ইহাতে মানবকুল ক্ষতিগ্রস্থ হয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাস দোলাচলে একে অপরের জন্য দুর্বিসহ পরিস্থিতির কারন ঘটাইয়া সমাজ আলোড়িত করে।
এই আলোড়িত সমাজে তখন কারো কারো জীবনে অসময়ে যেমন সাফল্য আসিতে দেখা যায়, তেমনি, সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও অনেক ক্ষেত্রে কারো কারো জীবনে শুধু ব্যর্থতাই চোখে পড়ে। আমরা তখন প্রকৃতির নিয়মটাকে অগ্রাহ্য করিয়া একে অপরের দোসারুপে মগ্ন থাকি। দর্শন তৈরী করি, উপদেশবানী প্রচারিত করি। সব উপদেশ বা দর্শন সর্বক্ষেত্রে আবার একই পরিনাম আনে না। ইহার কারন, প্রকাশ্যে ভালো মানুষের বেশ ধরে অনেকেই চলাচল করিলেও আড়ালে খারাপ কাজ করার লোকের অভাব নাই। এই খারাপ লোকদের হইতে সাবধান হইবার জন্য তখন আমরা আরো এক ধাপ আগাইয়া “লেসন” বা “শিক্ষনীয় নীতিবাক্য” জাহির করিয়া একে অপরের জন্য ভালো কিছু বলিয়া থাকি।
তবে একটি কথা ঠিক যে, জীবনে সাফল্য পাইতে হইলে অন্য কারো সহানুভুতির চেয়ে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস অনেক জোরালো থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কঠিন পরিশ্রম যদি হয় কোনো সাফল্যের মূলশক্তি, নিজের আত্মবিশ্বাস হইলো সেই শক্তির মুলচালিকা উপাদান। অতীতে কি হইয়াছে, কি কারনে ব্যর্থ হইয়াছেন, কি করিলে কি হইতে পারিতো এইসব বিস্লেশন করা আবশ্যক বটে, তবে তাহা একটি শিক্ষা হিসাবে ভবিষ্যতে কাজে লাগাইয়া সাফল্যের সকাল দেখিতে হইবে। একটা ব্যর্থতাই জীবনের সবকিছু নয়। যার জীবনে ব্যর্থতা নাই, তিনি সাফল্য পাইলে কি অনুভুতি হয় তাহা বুঝিতে পারিবেন না। এইজন্য, প্রতিটি কাজে নিজের বিবেচনা খাটাইতে হয়। সবাইকে সবসময় বিশ্বাস করিতে নাই। মনে রাখা দরকার যে, ইবলিশও এককালে ফেরেস্তা ছিল। তবে কাউকে তাহাঁর কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে বিশ্বাস করা উত্তম। কেননা, কথা মিথ্যা হইতে পারে কিন্তু কাজ মিথ্যা আর সত্যকে পৃথক করে। কোনো মানুষের সুন্দর্জ নির্ভর করে তাঁর সময়ের সাথে সাহসীকতা, তাহাঁর রুচি আর বেশীর ভাগ নির্ভর করে তাঁর পরিপক্ক জ্ঞানের উপর। আজকে কারো উপর আপনার নির্ভরতার মাত্রা যদি হ্রাস পায়, এটা আপনার দোষ নয়, বরং ইহা তাহাঁর দোষ যিনি আপনাকে নির্ভরতা দিতে পারে নাই। ভুল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে কারো সাথেই বন্ধুত্ব না করা শ্রেয়। ভুল মানুষ সাথী করার চেয়ে একা আগাইয়া যাওয়া অনেক বেশী আরামদায়ক। কখনো যদি মনে হয়, আপনি ভুল মানুষের সাথে হাটছেন, তাহাঁর থেকে অতিদ্রুত পৃথক হইয়া যাইবেন। এটা সেই নড়ে যাওয়া দাতের মতো, যতোক্ষন সাথে থাকিবে ততোক্ষন যন্ত্রনায় থাকিবেন। তখন একা নিজেই আগাইয়া যাইবেন। জীবনকে নিজের দুইটি পায়ের মতো করিয়া দেখিবেন। কোন পা আপনার সামনে গেলো আর কোন পা আপনার পিছনে রহিলো তাহাতে কিছুই যায় আসে না। কারন পাদ্বয় জানে তাহাদের অবস্থানের পরিবর্তন হইবেই আগাইয়া যাওয়ার পথে। আপনি তখন নিজেই নিজের সাথি। সাফল্য বা ব্যর্থতা সবই নিজের। এই পথ চলার মাঝে শুধু একটি বিশেষ উপদেশ সর্বদা মাথায় রাখিবেন, যে, যাহারা আপনার থেকে বৃদ্ধ, তাহাদেরকে সম্মান করিবেন, আর যাহারা আপনার থেকে অধিক দূর্বল, তাহাদেরকে সাহায্য করিবেন আর যদি ভুল করিয়া থাকেন তাহা অকপটে স্বীকার করিয়া লইবেন। ইহার একটি কারন আছে যে, আপনি নিজেও একদিন বৃদ্ধ হইবেন, প্রকৃতির কোনো না কোনো ভুলচক্রে পড়িয়া হয়তো আপনি নিজেও অনেকের থেকে দূর্বল হইয়া পড়িতে পারেন এবং আপনি নিজেও কোথাও কারো কাছে ভুল করিতে পারেন। আজকের দিনের এইসব মানবিক গুনাবলী আপনাকে আগামীতে অনেকের কাছে আরো গ্রহনযোগ্য করিয়া তুলিবে এবং আপনার জীবন আরো সহজ করিয়া রাখিবে। এরই মাঝে যদি কখনো মনে হয় আপনি সাফল্য পাইলেন না, মন ভারাক্রান্ত করিয়া চোখের দৃষ্টিকে ঝাপসা করিয়া রাখিবেন না, ইহাতে অনতিদূরে অপেক্ষামান আরো নতুন সাফল্য আপনাকে পাশ কাটাইয়া চলিয়া যাইবে। স্বপ্ন সার্থক করিবার লক্ষ্যে মনে কোনো সন্দেহ লইয়া কাজ করিবেন না। স্বপ্ন সার্থক হইবার পিছনে যতো না ব্যর্থতা কাজ করে, তাহাঁর অধিক ব্যর্থতা আনে যখন আপনি কোনো কিছু সন্দেহ লইয়া কাজ করিবেন। অবিচল থাকিবেন আপনার স্বপ্নের লক্ষ্যে। মনে রাখিবেন, আজকের দিনটি কিন্তু গতকাল আপনার কাছে আগামীকাল ছিলো যাহা নিয়ে আপনি গতকাল বিচলিত ছিলেন। বিচলিত থাকিবেন না। অনেক দূর যাইতে হইবে। যদি কখনো মনে হয় যে, দ্রুত যাইবেন, তাহা হইলে একা হাটুন, কিন্তু যদি মনে করেন, অনেক দূর যাইতে হবে, তাহা হইলে কাউকে সাথে নিন। আর এই সাথী নির্বাচনে দাপট, অবস্থান এবং শক্তির উৎস খুজিবেন না। কারন এইসব দাপট, অবস্থান আর শক্তি সারাক্ষন থাকে না। শুধু বিবেচনায় নিন, সাথী নিজে পরিশ্রমী কিনা, তাহাঁর ভিতরে মানবতা আছে কিনা, আর পরীক্ষা করুন তিনি লোভী কিনা। ইহার সাথে ইহাও পরীক্ষা করুন, তিনি সত্যকে জানিয়া, সত্যকে দেখিয়া মিথ্যার জালে বাস করছেন কিনা। যদি আপনি তাহাকে ভালোবাসিয়া সাথী করিয়া থাকেন, কিন্তু বুঝিতে পারেন তিনি আপনাকে ভালোবাসেন নাই, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে আপনি অ-জায়গায় অপাত্র লইয়া ঘুরিতেছেন। তাহাঁর সহিত আপনি কিছুদুর হাটিতে পারিবেন বটে কিন্তু বেশীদিন হাটিতে পারিবেন না। আপনি যদি মেয়ে মানুষ হইয়া থাকেন, যদি দেখেন কেহ আপনাকে একটি সুবিধা লইবার পায়তারা করিতেছে বা সুবিধা লইবার পাত্র বলিয়া বিবেচনা করিতেছে, তাহা হইলে তাহাকে অতি দ্রুত ছাড়িয়া দিন। কিন্তু যদি মনে মনে এই প্রমান পান যে, আপনি মেয়ে মানুষ হিসাবে আপনার সাথী আপনাকে একটি দায়িত্ব বলিয়া ভাবে, সে আপনার প্রকৃত সাথী হইবে নিশ্চিত থাকিবেন। কোনো পুরুষ যদি তাহাকে পুরুষ মনে করিয়া আপনার থেকে অধিক সুপেরিয়র ভাবিয়া থাকে, তাহা হইলেও তাহাকে ছাড়িয়া দিন। তিনি আপনার বন্ধু হইবার যোগ্য নহেন।
অনেকদিন পর আজ ডায়েরী লিখতে বসলাম। বছরের প্রায় শেষ দিন। তাঁরমধ্যে আজ দেশে সাধারন নির্বাচন হচ্ছে। আজকের লিখাটি সাধারন নির্বাচন নিয়ে। আমি কোনো প্রকারের রাজনীতির সাথে জড়িত নই। আজ পর্যন্ত মাত্র একটি সাধারন নির্বাচনে (২০০৮ সালের সাধারন নির্বাচন) আমি ভোট দিয়েছিলাম। ভোট দিলাম কিন্তু একান্তই নিজের ইচ্ছায়। এটাকে ফেয়ার ইলেকশন বলে না। আমাকে কেউ জোর করেনি ভোট চুরি করার জন্য কিন্তু যা দেখছিলাম, তাতে কিছুতেই ভালো লাগেনি।
এই ইলেকশনের ফলাফল মানুষ কে বিভ্রান্ত করবে। হয়ত দেখা যাবে ৯৯% ভোট ই পড়বে শাশক দলের জন্য। এটা জনগনের রায় হবে না। তবে একটা দুশ্চিন্তার কথা মাথায় আসে। ধরুন, কোনো কারনে শাসক দল ভোটে জয়ী হলেন না। তাহলে কি কি হতে পারে?
-হতে পারে একটা রায়ট। কারন, প্রায় ১২ বছর পর যখন জামাত জোট একটা শাসক দল হটাত ক্ষমতায় আসবে, তখন চিরাচরিত নিয়মেই হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে তাদের জোট প্রচুর পরিমানে রক্তক্ষয়ী এক্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি অমুলক নয়। যদি সেটা হয়, তাহলে বর্তমান শাসক দল একেবারেই অসংঘটিত বলা যাবে না, তারা যথেষ্ট পরিমানে সাংঘটনিক ভাবে ইতিমধ্যে শক্ত স্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদেরকে সহজেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়। ফলে পালটা একটা প্রতিঘাত অবশ্যাম্ভাবি।
প্রশাসন হচ্ছে মুলশক্তি বর্তমান শাসক দলের সমর্থক। এই অবস্থায় পুনরায় পুরু প্রশাসন নতুন করে সংঘটিত না করে, বর্তমান প্রশাসন দিয়ে কোনোভাবেই নতুন সরকারী দল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শক্তি রাখে না।
দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বর্তমান শাসক গোস্টির অন্তরালে রিষ্ট পুষ্ট, ফলে তাদেরকে হটাত করে টার্গেট করে রাজনীতির মতো কোনো ফায়দা নতুন শাসক দলের পক্ষে সম্ভব না।
এইসব কারনে, আমার মনে হয় কারচুপির ভোটে দেশের শান্তি বিরাজ করবে।
কিন্তু সমস্যা হতে পারে যদি কোনো বিরোধী দল না থাকে সংসদে।
একটা সময় আসে, যখন মানুষ একা থাকতে চায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ যখন একাকীত্বকে ভয় পায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ বুঝতেই পারে না সেকি একা থাকতে চায় নাকি মানুষের ভীড়ে থাকতে চায়? মানুষ তখন থাকে খুব ঘোরের মধ্যে। ঘোরের মধ্যে থাকা অবস্থাটা একটা বিপদজনক। এটা পশুদের বেলায় হয় না। তাদের পেট ভরা তো সব কাহিনী শেষ। সে তখন কোনো এক নির্জন জঙ্গলে গাছের নীচে একাই ঘুমিয়ে যায় যতোক্ষন তার পেট আবার ক্ষুধার ইঙ্গিত না দেয়। তাদের কাছে কৃষ্ণচূড়ার পাতার রঙ অথবা গোলাপের গন্ধ অথবা মরা জীবের কোনো অসহ্য ঘ্রান কোনো কিছুই বদল করে না। শীত এলে তারা গুহা খোজে, আশ্রয় চায়। বর্ষায় ওরা ভিজে ভিজে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পায়েপায়ে অনেক দূর চলে যায়। কোথা থেকে এলো আর কোথায় গিয়ে থামবে, এটা নিয়ে ওদের কোনো মাথা ব্যথা নাই।
কিন্তু মানুষের বেলায়, সে সমাজ চায়, সে মানববসতি চায়। সে নদীর কুল চায়, চায় নদীর সাথে সাথে সভ্যতাও। এই সভ্যতার রেস ধরে মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসার কথা বলে। একজন আরেকজনের থেকে সুখি, আর খুসি হতে চায়। প্রতিযোগিতা বাড়ে। পছন্দ অপছন্দের হরেক পদের বং বাহারের যুক্তি তুলে কত যে নাটক, সিরিয়াল করে, তার কোনো ইয়ত্তা নাই। সুন্দর থেকে সুন্দরতমের তপস্যা চলে এই মানুষদের। আর এই তপস্যার অন্তরজালে কত কিছুই যে ব্যতিক্রম হয়, কেনো হয় কিভাবে হয় সে রহস্য সন্ধানেও আমরা বেশীরভাগ সময়ে ব্যর্থ হই। প্রতিযোগিতায় সুন্দুরী মেয়েরা সুখের ঘর হারায়, আবার সবচেয়ে অসুন্দর কোনো এক পঙ্গু মহিলা দিব্যি সুখে সংসার করে বেড়ায়। অশিক্ষিত কোনো এক মায়ের কোল ঘেঁষে দুনিয়া কাপানো সন্তানের জন্ম হয়, আবার সবচেয়ে পরিকল্পিত শিক্ষিত মায়ের কোলেই হয়ত বেড়ে উঠে সমাজের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটি। কেউ ভালোবাসে, অনেক সপ্নের ভিতর ডুব দিয়ে দিঘির জলের ভেসে বেড়ায়। কেউ কেউ আবার ঐ দিঘির জলের নীল চ্ছটায় কল্পনাকে ভাসিয়ে দিয়ে আকাশের নীলাভ মেঘ দেখে হয়ত ভাবে, কেউ কি তার জন্য অনেকদিন বাচতে চায়? কিংবা এমন কি কেউ আছে যে, তার সমস্তটা দিয়ে নিজের করে ভালোবাসে? সবুজ ক্ষেতের ধারে বসে কোন এক কল্পনায় কোনো এক অপরিচিত রাজপুত্রের সাক্ষাতে কত কথাই না বলাবলি করে। কিন্তু তা নিছক কল্পনার রাজ্যেই থেকে যায়। হয়ত কাউকে রাজপুত্র ভেবে মিথ্যা কোন প্ররোচনায় আবদ্ধ হয়ে সারাটি জীবন মিথ্যার মধ্যেই বসবাস করে। জানে, মনে কষ্ট, জানে হেরে গেছে, জানে এই পথ থেকে বেড়িয়ে যাবার আর কোনো রাস্তা নাই, তারপরেও জীবন তো, চলতেই থাকবে। কিন্তু কোথায় সে রাজপুত্র আর কোথায় গিয়ে এর শেষ? জোছনা রাতের চকচকে আকাশের তারার মেলায় পাখা মেলে ঝি ঝি পোকার মতো করে একগুচ্ছ ঝিনঝিন আওয়াজের মতো কতই না সঙ্গিত রচনা হয়ে আছে বুকের পাজরের মাঝে। যত্ন করে ধরে আছে ভালোবাসা। কিন্তু ঐ ভালোবাসা তো এক তরফা। যন্ত্রনা শুধু বাড়েই। ওটাই কি শেষ? এই মিথ্যা ভালোবাসায় কোনো অংশিদারিত্ত নাই, কম্প্রোমাইজ আছে কিন্তু এডজাস্টমেন্ট নেই, কান্না আছে অনুতাপের কিন্তু শান্তনা নাই, ব্যথা আছে কিন্তু বলার লোক নাই, এই ভালোবাসা শুধু খুসি রাখা আর কিছুই নাই। এখানে ভালোবাসার নির্ঘাত ভালোবাসার পচন ধরেছে। আর এই পচন শুরু হয়ছে অন্তর থেকে, তারপর শরীরে। আর যেদিন থেকে এই পচন শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই অস্থিত্তের পচন ধরেছে। এখন নিজের বাড়িতে, নিজের সমাজে, নিজের গন্ডিতে কেউ তার সাথে থাকতে চায় না। পরাজয় হয় সারা জীবনের।
যে ভালোবাসায় জিততে চায়, তাকে ভালোবাসা দিতে জানতে হবে। আর যে ঘৃণাকে জিয়িয়ে রাখতে চায়, তাকে সাফল্য এনে সেই জায়গায় যেতে হবে যেখানে তাকে স্পর্শ করার আর কারো ক্ষমতাও নাই। দুটুই কঠিন কাজ। কিন্তু এমনো কেউ আছে, যে ভালবাসল, সে হয়ত ভালবাসায় জিততেই পারলো না। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, সে ভালোবাসায় হেরে গেলো। হয়ত সে ভুল জায়গায় ভুল জিনিসের সন্ধান করেছে। আজ কোনো এক ভাগ্যের গুনে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা ফেরত যায়, কাল সে ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়েই হারে। অথচ এমনো মানুষ আছে, কখনোই ভালোবাসা কি জিনিস নিজেও জানে না কিন্তু নিজের অজান্তেই সে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এমন করে স্থান নিয়ে আছে যে, চারিদিকে ভালোবাসা শুধু মৌ মৌ করে বেড়ায়। এরা এক সময় সমাজ নিয়ন্ত্রন করে, এরা এক সময় সবাইকে নিয়ন্ত্রন করে। আর যখন এটা কেউ মানতে নারাজ হয়, তখন মনে হয়, ঐ যে একবার চুপি চুপি ভালোবাসা এসেছিলো, সেটাই ছিলো জীবনের সবচেয়ে সস্থির সময় যা দেমাগ আর অশালীন ব্যবহারে মানুষ দূরে ঠেলে দিয়েছে। অনুতাপের আর শেষ থাকে না তখন।
আসলে এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নাই। আবার সব কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। কেউ কবি হতে চায়, কেউ বৈজ্ঞানিক হতে চায়, কেউ অনেক ধনী হতে চায়, কেউ রাজনীতিক হতে চায়। আসলে এইগুলি ইচ্ছের উপর কিছুই নিরভর করে না। আবার এইগুলি যে ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না, তাও ঠিক নয়। কারন কোথাও না কোথাও এর একটা রদ বদলের পালা আছে। কোথাও না কোথাও এই যোগসূত্রের একটা টার্ন আছে। যা কিছুদুর পর্যন্ত দেখা যায়, আর বড় অংশটাই আমাদের নজরের মধ্যে নাই। সবচেয়ে ট্যালেন্টেড ছাত্রটি আজ হয়ত কোথাও কোনো এক বড় অফিসের কেরানীর চাকুরী করে। অথচ যে সময়ে তাকে ট্যালেন্টেড ভাবা হয়েছিলো, সেটার গতিপথ পাল্টে আরেক দিকে টার্ন নেওয়ার কারনেই আজ সে সাফল্যের যে চূরায় উঠার কথা ছিলো তার থেকে অনেক দূরে। আবার এমনো হতে পারে, ব্যাকবেঞ্চে বসে থাকা সবচেয়ে নিরীহ ছাত্রটি আজ বিসসের কাছে এতোটাই সমাদৃত যে, কোনো সুত্রই মিলছে না। এই সুত্রটাই মিলাতে হবে। কারন কোন কিছুই হতাত করে হয়ে উঠে না। প্রকৃতি তার ধর্ম কখনোই পাল্টায় না। সেই একইভাবে, যে বালকটি একদিন কবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ সবচেয়ে বড় সমাজসেবি, যে একদিন সমাজসেবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ কারো কারো জন্যে ত্রাস। যা ঘটে তা সময়ের বিবর্তনের পালাক্রমে কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই ঘটে। আজ যে রুপের কারনে আমি আপনি অহংকারী, মনে হয় পৃথিবী বুঝি আমার চরনতলে আছড়ে পড়লো। শত শত হিরো, শত শত সুশ্রী মানবীগন না জানি কতদিন কতরাত তাদের ঘুম হারাম করে রাত জেগে জেগে আমার কথা ভাবছে। এটা ভাবা সহজ। হয়ত এমনো হতে পারে, আমাদের এই আজকের দিনের সম্ভাব্য সবকিছু দেখেই কারো চোখ, কারো বুক, কারো লালসার অন্তরালে এমনই ভালবাসার জাল বানিয়ে অক্টোপাসের মতো ঘিড়ে ফেলেছে, যে, কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা ছলনা, বুঝাই দায়। যাকে তোমার আরধ্য, হয়তো দেখা যাবে তোমার চেয়েও অতি কুৎসিত কোনো রমনী তোমার আরধ্য কোনো পুরুষ তার শয্যাশায়ী। ব্যাপারটা হারজিতের নয়, ব্যাপারটা মতবাদেরও নয়, ব্যাপারটা অনেকাংশেই বৈষয়িক, আর কিছুটা তপ্ত বাসনা। ব্যাপারটা পছন্দেরও না অনেকাংশে। যে জামাটি আমি অপছন্দ করে দোকানে রেখে দিয়েছি, হয়তো ওই জামাটাই আরেকজন হন্যে হয়ে খুজছেন।
আজকে যে ট্রেনটায় আপনি উঠেছেন, সে ট্রেনের যে ব্যক্তিটি আপনার হাত ধরে তুলে নিলো, হয়ত সেই ছিলো আপনার সেই আরধ্য মানুষ। আপনি তাকে দেখেছেন কিন্তু হয়তো চিনতে পারেন নাই। কাল যখন আবার ট্রেনে উঠবেন, আপনি সেই ব্যাক্তিকে হয়ত আর কখনোই খুজে পাবেন না। সে অনেক দূর চলে গেছে।
৪১ বছর আগের ঘটনা।
আজ হইতে প্রায় ৪১ বছর আগে এইদিনে আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার জন্য সকাল হইতেই প্রস্তুতি লইতেছিলাম। আজ আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার দিন, অর্থাৎ আমি ১৯ শে জুন ১৯৭৭ সালে ক্যাডেট কলেজে পদার্পণ করিয়াছিলাম।
অজ একটা পাড়াগ্রাম। স্বাভাবিক জীবন যাত্রার জন্য একটি জনপদের যে সব মৌলিক উপাদান কোন একটি জনগোষ্ঠীর প্রাপ্য সেইসব মৌলিক চাহিদা কোনো কিছুই এই অজ পাড়াগ্রামের কোথাও চোখে পড়ে না। বিদ্যুৎ নাই, রাস্তা ঘাট নাই, ভালো একটা মাধ্যমিক স্কুলও নাই। রাজধানী ঢাকা হইতে আমার গ্রাম এতো কাছের একটা জনপদ, তাহার পরেও কোনো পাকা রাস্তা নাই যাহাতে কেহ জরুরী ভিত্তিতেও রোগী লইয়া বা অন্য কোনো ইমারজেন্সি হইলে গাড়ি করিয়া সল্প সময়ে ঢাকার কোনো জায়গায় আসিতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ। মাত্র ৫/৬ বছর পার হইয়াছে ইহার স্বাধীনতার বয়স। মানুষ সবেমাত্র স্বাধীনতার স্বাদ পাইতে শুরু করিয়াছে, কিন্তু সবকিছুই নতুন। নতুন স্বাধীনতার একটা রুপ আছে। এই স্বাধীনতায় যে যেইভাবে পারে, সে সেইভাবেই তাহা উপভোগ করে। কেউ গায়ের জোরে, কেউ অস্ত্রের জোরে, কেউ সম্পত্তির জোরে, কেউ পারিবারিক প্রভাবের জোরে একজন আরেকজনের উপর, একগোত্র আরেক গোত্রের উপর কিংবা এক গ্রাম আরেক গ্রামের উপর প্রভাব খাটাইয়াই স্বাধীনতা উপভোগ করে। আর এই নব্য স্বাধীনতাই আমাদের প্রতিটি গ্রামে, গঞ্জে, আনাচে কানাচে পালিত হইতেছে। কেউ হটাত করিয়া বড়লোক হইয়া যাইতেছে, কেউ আবার সবকিছু হারাইয়া দেশান্তরী হইতেছে। মেলথাসের কোনো থিউরী, কিংবা নিউটনের ৫ম সুত্র কিংবা ডারউইনের নতুন কোনো সুত্র না হইলে যেনো আর রক্ষা নাই। কেউ নতুন সেটেলার হিসাবে নিজের পিতামহের আদি আবাসস্থল ছাড়িয়া অন্য কোনো নতুন জায়গায় তাহার আবাসস্থল গড়িয়া তোলার আপ্রান চেস্টা করিতেছে আবার কেহ কোথাও কোনো স্থান না পাইয়া এই ইহজগত হইতেই বিদায় লইতেছে। নিয়তি বলিয়া একটা কথা আছে, কেউ এটা মানুক আর নাই বা মানুক। সবাই নিয়তির দিকে তাকাইয়া সামনের দিকে চলিবার ভান করিতেছে। ঘরের পালিত পশু পাখিরাও যে কে কাহার, তাহারাও মাঝে মাঝে বিতর্কিত হইয়া কখনো এই মালিকের গোহালের থেকে অন্য মালিকের গোহালে স্থান পরিবর্তন করিতেছে। তাহারা তাহাদের মুখের ঘাস গুলিও চর্বণ করিবার সময় পাইতেছে না।
আমরা গ্রামে থাকি। গ্রামের বাড়ী যেই রকম হয়, আমাদের গ্রামের বাড়ীটিও সেই রকমের। মাটির উঠোন, চারিদিকে গাছ পালার সমারোহ, কাচা পায়খানা, পাশেই ক্ষেত, হরেক রকমের ফসলের শোভা দেখা যায়। সন্ধ্যা হইলেই বাবুই পাখী, চড়ুই পাখী এবং তাহাদের আবাসস্থলে বেড়াইতে আসা অনেক নাম না জানা অতিথি পাখিরা মিলে হরেক পদের সুরে এবং শব্দে মুখরীত করিয়া তোলে এলাকাটি। তাহারা একে অন্যকেকে লইয়া ঝগড়া ঝাটি করে না। তাহাদের স্বাধীনতা আমাদের মতো নয়। তাহারা জমি লইয়া, বাড়ি বা বাসা লইয়া ভাগ বাটোয়ারা লইয়া মারামারি করে না। উহারা শরত কালে যেমন একে অপরের বন্ধু, বৃষ্টির দিনেও একে অপরকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না। পাখীরা সবাই মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার বলিলে ভুল হইবে। আমাদের উপার্জনক্ষম সদস্য বলিতে একমাত্র আমার বড় ভাই যিনি সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসাবে যোগদান করিয়াছেন। প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয় এই ঢাকা ইউনিভার্সিটি। আমরা পাচ বোন আর দুই ভাই, সাথে আমার মা। সংসার ছোট নয়, কিন্তু সে তুলনায় আয়ের পরিমান আমাদের জন্য অনেক ছিলো না। এইটা তখনকার দিনের প্রায় অধিকাংশ পরিবারেরই হালচাল।
আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব একটা পরিকল্পনা ছিলো কিন্তু আমরা যাহারা ছোট ছোট ভাই বোন আছি, তাহাদের জন্য আমার ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় অনেক ব্যঘাত ঘটিতেছিলো। আর ইহার প্রধান কারন হইলো, তিনিই আমাদের মা, তিনিই আমাদের বাবা, তিনিই আমাদের দেখভাল করার জন্য একমাত্র ব্যক্তি। তাহার নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিতে গিয়া তিনি আমাদেরকে ছাড়িয়া একা কোথাও যাইতে পারেন না। ফলে আমাদের একটা গতি না করিয়া তিনিই বা কিভাবে তাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিবেন? আমি সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ি, আমার ইমিডিয়েট বড় বোন আমার সাথেই গ্রামে পড়াশুনা করে। আমার আরেক বোন আমার থেকে এক ক্লাস উপরে পড়ে আর তার বড়জন পড়ে মাত্র ক্লাস এইটে। সবার বড় দুই বোন এর মধ্যে একজন স্বামীর সাথে পৃথক হইয়া এখন আমাদের বাড়িতেই থাকেন। আমার দ্বিতীয় বড় বোনের তখনো বিয়েই হয় নাই। ফলে ধরিয়া নেওয়া যায়, পাচ বোনের কারোরই বিয়ে হয় নাই। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই সুস্থ নয়। মেয়েঘটিত অনেক প্রকারের অঘটন চারিদিকে ঘটিতেছে। আমরা আছি একটা বিপদের মধ্যে। আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নাই। দেশ স্বাধীন হইয়াছে বটে কিন্তু দেশের মানুষগুলি এখনো আতংকের মধ্যেই দিন কাটাইতেছে।
যাই হোক যাহা বলিতেছিলাম সেখানেই আসি। আমার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথা।
আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় যাহা ছিলো তাহা হইলো যে, আমাকে কোনো একটা ভালো আবাসিক স্কুল কিংবা কলেজে স্থায়ীভাবে ভর্তি করাইয়া দিতে পারিলে আমার ব্যাপারে তিনি দুশ্চিন্তা মুক্ত হন, আর আমার সবগুলি বোনকে বিয়া দিতে পারিলে পুরু পরিবারকে নিয়া তিনি শংকামুক্ত হন। আর এই শংকামুক্ত হইতে পারিলেই তিনি একান্ত নিশ্চিত হইয়া তাহার পিএইচডি করিবার লক্ষে বিদেশে স্কলারশীপ লইয়া বাইরে চলিয়া গিয়া নিজের ক্যারিয়ার তৈরী করিতে পারিবেন, অন্যথায় ব্যাপারটা সফল হইবে না। অনেক কঠিন কাজ এবং এই সবগুলি কাজে একের পর এক সাফল্য আসিলেই তিনি তাহার পরিকল্পনায় সার্থক হইবেন। কোনো একটা কাজে সাফল্য না আসিলে সেখানেই তাহার মহা পরিকল্পনা ভেস্তে যাইতে পারে এবং বড় ধরনের একটা হুমকী হইয়া দাড়াইবে।
ফলে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আমি। আমি গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করি। গ্রামের স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করিলেই যে কেউ খুব মেধাবী বলিয়া প্রমানিত হয়, তাহা কিন্তু মোটেও সত্য নয়। তবে আমি নাকি বেশ মেধাবী ছিলাম ইহা আমাদের স্যারেরা বলিতেন। আর এই মেধাবীত্ব প্রমানের লক্ষে মাঝে মাঝে আমার শিক্ষকগন আমাকে দিয়া আমার থেকে ছোট ক্লাসের তাহাদের ক্লাশ গুলি নেওইয়া লইতেন। তাহাতে স্যার দের দুইতী লাভ হইতো। অনায়াসেই স্যারেরা স্কুলে না আসয়া নিজের পরিবারের জন্য বাজারের দিন বাজার করিতে পারিতেন, কিংবা বৃষ্টির দিনে বাসায় বসিয়া ভুনা খিচুড়ি খাইতে পারিতেন।
একদিন ভাইয়া গ্রামে আসিয়া আমাকে কাছে টানিয়া বলিলেন, তোকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হইতে হইবে। আমার জীবনে এমনিতেই আমি আমার গ্রামের স্কুলের নাম ছাড়া অন্য কোনো স্কুল কলেজের নাম পর্যন্ত শুনি নাই, সেখানে ক্যাডেট কলেজ কি তাহাই তো জানি না। আমি আমার এই তথাকথিত মাথার অভ্যন্তরের সবগুলি প্রকোষ্ঠ খুজিয়া কোথাও ক্যাডেট কলেজের কোনো তথ্য আমার মাথার মধ্যে সন্ধান পাইলাম না। কি করিয়া জানিবো ক্যাডেট কলেজ জিনিসটা কি? আমরা সবাই ভাইয়াকে খুব ভয় পাইতাম, কিন্তু এই ভয়ের মাঝেও আমি একটু এরোগ্যান্ট ছিলাম বলিয়া বুঝিয়াই হোক আর না বুঝিয়াই হোক, একটু আধটু ঘাউরামীও করিতাম। আমার বড় ভাই আমার এই এরোগেন্সিটাকে কখনো বেশ করিয়া উপভোগ করিতেন আবার কখনো কখনো রাগে এমন শাসন করিতেন যে, গায়ে হাত দিতে একটুও কার্পণ্য করিতেন না। যেনো আমি তাহার নিজের কোনো সম্পদ, যখন যাহা খুশী তাহাই করিতে পারেন। কিন্তু অনেক পরে আমি বুঝিয়াছি, আমি শুধু তাহার সম্পদই ছিলাম না, আমি ছিলাম তাহার অন্তর। তাহার শাসনে আমি যতোটা না ব্যথা পাইতাম, আমার ভাই তাহা হইতে অধিক আঘাত পাইতেন বলিয়া আজ মনে হয়। আমি আমার বড় ভাইয়ের এই শাসনটা আজ খুব মিস করি। ভাইয়ার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথায় আজ এরোগ্যান্ট হইবার কোনো কারন আমি দেখিলাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম, ক্যাডেট কলেজ কি জিনিস ভাইয়া?
ভাইয়া বলিলেন, সমস্ত বাংলাদেশ হইতে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য ছেলেরা পরীক্ষা দেয়। হইতে পারে এক লাখ ক্যান্ডিডেট, হইতে পারে তাহার থেকেও বেশি, কিন্তু সবগুলি ক্যাডেট কলেজ মিলাইয়া ছাত্র ভর্তি করে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ জন প্রতি ক্যাডেট কলেজে। তখন দেশে মাত্র চারটি ক্যাডেট কলেজ ছিলো। মেয়েদের জন্য কোনো ক্যাডেট কলেজ ছিলো না। ৪০ বা ৫০ জন সাফল্যবান ছাত্র এক বা দুই লাখ ছাত্রের মধ্যে কত অনুপাত তাহা আমার জানা ছিলো না, কিংবা ইহা কতটা কঠিন কাজ তাহাও আমার বুদ্ধিতে নাই, ফলে ইহা লইয়া আমার কোনো মাথা ব্যথাও ছিলো না। ভাইয়ার একটা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, আমি যদি ইচ্ছা করি, এবং নিজে চেস্টা করি তাহা হইলে যে কোন কাজ আমার দ্বারা সাফল্য আসিবে। আমার উপর ভাইয়ার এই আত্মবিশ্বাসটা অনেক গভীরে পোতা ছিলো যা আমি নিজেও কোনোদিন জানিতাম না। তবে এইটা বুঝিতাম যে, আমি পারবো ইনশাল্লাহ। আমার আত্মবিশ্বাস আমার থেকে আমার উপর আমার বড় ভাইয়ের বেশী ছিলো।
আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য আমাকে কি কি করিতে হইবে? ভাইয়া অতি আদরের সহিত আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভর্তি পরীক্ষা হইবে, মেরিট লিস্ট অনুযায়ী ছাত্র ভর্তি করা হয়। যারা ভালো করিবে এবং পাশ করিবে এবং এই সীমিত সংখ্যক সিটের জন্য কোয়ালিফাই করিবে তাহারাই ভর্তি হইতে পারিবে। কোনো রিকুয়েস্ট বা তদবির চলে না এই ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হবার জন্য।
আমি ভাইয়াকে কি ওয়াদা করিয়াছিলাম, আমার আজো স্পষ্ট মনে আছে। বলিয়াছিলাম, ভাইয়া, যদি পরীক্ষা দিয়া ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়া যায়, তাহা হইলে আমি ভর্তি হইতে পারিবো। ভাইয়া বলিলেন, ইনশাল্লাহ বল। আমি বলিলাম, ইনশাল্লাহ। আমি ছোট, ইনশাল্লাহ বলিলে কতটুকু সাফল্য আসে, তাহা আমার জানা নাই, তবে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসেঅনেক কাজ তিনি সহজ করিয়া দেন, ইহাই আমার গুরুজনেরা আমাকে শিখাইয়া দিয়াছেন।
আসলে আমি কি কারনে এতো জোর দিয়া সাফল্যের কথা বলিয়াছিলাম, আমি আজো জানি না কিন্তু আমার মনে হইয়াছিলো, এইটা কোনো ব্যাপারই না। ভাইয়া শুধু আমার কথাতে খুশীই হইলেন না, তিনি জানিতেন, আমি পারবো। এখন শুধু আমাকে পারার জন্য সুযোগ করিয়া দিতে হইবে।
ভাইয়া আরো বলিলেন, দেখ, ভর্তি পরীক্ষার সময় আছে আর মাত্র ৩৯ দিন। বিশাল সিলেবাস, কোথা থেকে কি আসিবে পরীক্ষায় কেউ জানে না, কিন্তু এরই মধ্যে পাশ করিতে হইবে। এখানে পাশ করিবার কোনো নম্বরের লিমিট নাই। প্রথম হইতে মাত্র ৪০/৫০ জন। মেধা তালিকার এই একটা অসুবিধা।
আমার প্রস্তুতির মধ্যে প্রথম ধাপ শুরু হইলো আমার হাতের লেখার অনুশীলন দিয়া আর তাহার সাথে ক্লাস সিক্স, সেভেন এবং এইটের সব বই পড়িয়া ফেলা দিয়া। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম হইতে শুরু করিয়া রাস্ট্রপ্রধানদের নাম, মুদ্রার নাম, আরো অনেক কিছু। তাহার মানে সাধারন জ্ঞ্যান বলিতে যাহা বুঝায় তাহা আয়ত্ত করা। আমি আজো বুঝি না, এই বয়সে ঘিনির রাস্ট্রপ্রধান ইয়াসিন সাহেব না হইয়া আলিম সাহেব হইলেই বা কি আর লন্ডনের মুদ্রার নাম পাউন্ড না হইয়া টাকা হইলেই বা কি? তাহাতে ক্যাডেট কলেজের মেধার সহিত কি পার্থক্য হয়? তাহা হইতে যদি বলিতো, লও একটা ফুটবল, দেখি কত জোরে লাথি মারিয়া কত দূর নিয়া যাইতে পারো, অথবা একটা গাছে উঠিয়া চড়ুই পাখীর বাসা হইতে একটা আস্ত ডিম পারিয়া কত তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিতে পারো দেখাও দেখি? সেইটাই হোক তোমার পরীক্ষা। অথবা যদি বলিতো যে, দেখি দম বন্ধ করিয়া কে কতক্ষন থাকিতে পারো? কিংবা যদি বলিতো, বৃষ্টিতে কে কতোক্ষন ভিজিয়া চুপচাপ বসিয়া থাকিতে পারো, এইটাই তোমাদের পরীক্ষা। যাই হোক, ভর্তি পরীক্ষার গুরুজনগন আমাদের থেকে বেশি মেধাবি বলিয়া তাহারা ফুটবল খেলিতে পছন্দ করেন না, তাই ফুটবল ১০০ গজ গেলেই কি আর ৫০০ গজ গেলেই কি। অথবা তারা বয়স্ক হইয়া যাওয়াতে বৃষ্টিতে ভিজার নাম শুনিলেই তাহাদের যাহার কথা প্রথমে স্মরণ হয় তিনি হচ্ছেন ডাক্তার। অহেতুক এই মেধা পরীক্ষা লইতে গিয়া ডাক্তার বাবুদের টানিয়া আনা খুব সমিচীন বলিয়া মনে হয় না। ফলে এইসব বিষয় সিলেবাসে সংযোগ করিয়া নিজেদের ক্ষতি করিবার কোনো কারন তাহারা দেখেন না। যাক, সিলেবাসের মধ্যে এখানেই শেষ নয়। ইংরেজীতে কথা বলার অনুশীলন করা, ইহার সাথে প্রতিদিন সকালে শারীরিক ব্যায়াম করা এইগুলাও নাকি আছে। এতোসব তো আর গ্রামে বসিয়া করা সম্ভব নয়। তাই আমার ট্রান্সফার হইয়া গেলো গ্রাম হইতে শহরে, খোদ ঢাকা ইউনিভার্সিটির চত্তরে, শহিদুল্লাহ হলে। আমার ভাই শহিদুল্লাহ হলে থাকিতেন, সেখানে। ভাগ্যের কি পরিহাস, ক্যাডেট কলেজে পরীক্ষা দিতে গিয়া প্রথমেই ইউনিভার্সিটিতে পদার্পন।
আমি যেইখানে ভাইয়ার সাথে থাকিতাম, সেইখানে তখন আমার ভাইয়ের সব কলিগরা থাকিতেন। সেকুল ভাই (ঢাকা ইউনিভারসিটির এপ্লাইড ফিজিক্সের লেকচারার, আমি জানি না তিনি এখন কোথায় আছেন, আবু সুফিয়ান ভাই, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ম্যাথ লেকচারার সম্ভবত, তাহার সাথেও আর কখনো যোগাযোগ হয় নাই আমার, এবং আরো অনেকে)। পাশেই ফ্যামিলি কোয়ার্টারে থাকিতেন সেই বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন ভাই (রসায়নের লেকচারার) গুলতেকিন ভাবি সহ। সন্ধ্যা হইলেই এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির কিছু শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রী (তাহাদের মধ্যে সুবর্ণ মুস্তফা, কেমিলিয়া মুস্তফা, আফজাল ভাই এবং আরো অনেকেই আসিতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কিভাবে করিবেন তাহা আলাপ করার জন্য, আড্ডা দেওয়ার জন্য। আমিই হইলাম গিয়ে একমাত্র অসম বয়সী এক কিশোর যাহাকে সবাই খুব আদর করিয়া কেউ পিচ্চি, কেউ বালক, কেউ আবার নিজের দেওয়া যে কোনো মিস্টি নাম, কেউ আবার আমার নাম ধরিয়াই ডাকিতেন। আমাকে যে কেউ যে নামেই ডাকিতেন, আমি তাহাতেই উত্তর করিয়া সময়টাকে প্রানবন্ত করিয়া রাখিতাম।
আমার কোনো বন্ধু ছিলো না এই শহরে। আমি সকালে আলুর ভাজি দিয়া পরোটা খাই, তারপর পড়িতে বসি, আবার দুপুরের দিকে গোসল সারিয়া দুপুরের খাবার খাই, ঘুমাই, বিকালে সবার সাথে বোবা মানুষের মতো আড্ডা দেই, সন্ধ্যা হইলেই আবার পড়িতে বসি। এর মধ্যে বেগমের মা ই একমাত্র মহিলা যিনি সব লেকচারারদের জন্য তিন বেলা রান্না করিয়া দেয় আর আমার সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়। ঢাকা শহরের একমাত্র মহিলা যাহাকে আমি গ্রামের মানুষদের মতো করিয়া পাইয়াছিলাম। আরেকজন ছিলো মুন্সি নামে একজন পুরুষ যিনি চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী হইয়াও রাজনীতির অনেক খবর রাখিতেন এবং খুব ভালোভাবেই অংশ গ্রহন করিতেন। আজ এই মানুসগুলি কোথায় আছে আমার জানা নাই, কিন্তু মিস করি।
শহিদুল্লাহ হলে আমার পড়াশুনা খুব ভালোভাবে চলিতেছে। কিন্তু গ্রামের জন্য আমার খুব মন খারাপ হয়। বিছানায় শুইলেই আমি আমার সেই গ্রামের পথ দেখি, মায়ের জন্য মন খারাপ হয়, আমার বন্ধুদের জন্য মন খারাপ হয়, আর মনে হয় কাউকে না জানাইয়া গ্রামে পালাইয়া যাই। কিন্তু আমি এই শহরের কোনো রাস্তাঘাট আমি চিনি না, কাউকে চিনি না, হাতে কোনো টাকা তো দুরের কথা পয়সাও নাই। আর থাকিলেও কিভাবে কাকে কি বলিয়া আমাদের গ্রামে যাওয়া যায়, তাহার কোনো পথ লিঙ্ক আমার জানা নাই।
দিন যায়, রাত যায়, আমার আমার সব কাজ ঠিক ঠাক মতো চলছে। বিশেষ করে পড়াশুনা। শুধু পড়াশুনাই ভালোভাবে চলিতেছে বলিলে ভুল হইবে, পড়াশুনার পাশাপাশি সকাল হইলেই আমার বড় ভাই আমাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে পাঠাইয়া দেন। সেখানে সব সিনিয়র সিনিয়র ভাইয়েরা শরিরচর্চা করেন। আমিই একমাত্র সবচেয়ে কনিষ্ঠ অনুশীলনকারি যে এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে আসি। কেউ কিছু বলে না, মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমার গালে হাত দিয়া আদর করিয়া দেয়। আবার কেউ কেউ খুব খুশি হয় এই ভাবিয়া যে, এই অল্প বয়সেও আমি এতো সাস্থ সচেতন!! যখন জানিতে পারে আমি ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য চেস্টা করিতেছি, আর এই জিমে আসার পিছনে আমার সাস্থ সচেতনার থেকে সিলেবাস পুরা করাই মুখ্য, তখন অনেকেই আরো মিস্টি মিস্টি করিয়া আমার পড়াশুনার কতটুকু হইতেছে তাহা জানিতে আগ্রহী হয়। কয়েকদিনের মধ্যে অনেকের সাথে আমার অসম বয়সী বন্ধত্ত হইয়া উঠে। এখন আর খারাপ লাগে না। অনেকেই আমার পরিচিত।
দিন ঘনাইয়া আসে পরীক্ষার। আমার মধ্যে যতোটা না টেনসন তাহার থেকে বেশী টেনসন দেখিতে পাই আমি আমার বড় ভাইয়ের চোখেমুখে। একটা সময় আসে, আমার সব সিলেবাস শেষ হইয়া যায়, সবকটি রচনা বইয়ের যে কয়টি রচনা লেখা রহিয়াছে তাহা তোতা পাখির মতো মুখস্ত হইয়া যায়, তিন ক্লাস মিলিয়া যতো অংক আছে তাহা আমার নখ দর্পণে। সুত্র আমি ভালো বুঝি, নিজে নিজেই অনেক সুত্র যেন আবিস্কার করিয়া ফেলিতে পারি এমন একটা অবস্থা। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম আমার জানা। কোনো এক দেশের কোনো ছোট বালক হয়ত তাহার দেশের রাজধানীর নাম বলিতে না পারিলেও আমি তাহার দেশের রাজধানীর নাম অনায়াসেই বলিয়া দিতে পারি। সুরিনামের রাজধানী প্যারামারিবো এইটা হয়তো আজো অনেকেই জানে না। আর এই প্যারা দিয়া কেনো রাজধানীর নামকরন হইলো সেইটা লইয়া আমার কোনো কৈফিয়তও নাই। সুরিনামের রাজধানী “প্যারামারিবো” বা “পারা মারিবো” না হইয়া যদি “গুতা মারিবো” কিংবা “ঘুসি মারিবো”ও হইতো তাহাতেও আমার কোনো অসুবিধা হইতো না, আমি সেইটাও মুখস্ত করিতাম।
দিন যায়, পরীক্ষার তারিখ ঘনাইয়া আসে, আর আমার সিলেবাস শেষ হইতে থাকে। একদিন ভাইয়াকে বলিলাম, ভাইয়া, আমার তো সব পড়া শেষ। আর কোনো রচনাও বাকী নাই কোন বইয়ের। তাহা হইলে আমি এখন কি করিবো? ভাইয়া বলিলেন, তাহা হইলে এক কাজ কর, প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর পরে যে স্বপ্ন দেখিস, সেইটা সকালে উঠিয়া রচনা আকারে লিখিয়া ফেল। এইটাই তোর সিলেবাস। কি ভয়ংকর কথা। ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিচারদের মাথায় এতো বুদ্ধি? এখন আবার স্বপ্ন মনে রাখিতে হইবে? কিন্তু আমি তো শুধু একটাই সপ্ন দেখি, আর তাহা হইতেছে ওই যে, গ্রামের মেঠো পথ, ডাংগুলি খেলা, আমার বন্ধুদের লইয়া হইচই করিয়া মাঠে ফুটবল খেলা, সারাদিন চরকির মতো ঘুরিয়া বেড়ানো। কিন্তু তাহাতেও আমার রচনা শেষ হয় না। কখনো আমি আমার মাকে দেখি, দেখি আমাদের উঠোনে বাড়িয়া উঠা বরই গাছে ছোট ছোট বরই এর কলি আসিয়াছে, দেখি আকাশের শেষ প্রান্তে লাল সূর্য এক সময় সন্ধ্যা নামাইয়া সারা গ্রামকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করিয়া দিতাছে। আর ইহার সাথে রাতের তারা আর গোলাকার চাক্টির মতো চাদনী রাত উপহার দিতাছে। আমার রচনায় আমার মন খারাপের একটা পরিস্কার আভাস ফুটিয়া উঠিতেছে বুঝিয়া আমার ভাই মাঝে মাঝে আমাকে লইয়া পাশেই দোকানের গরম জিলাপি খাওয়ানোর চেস্টা করেন। মিস্টি জিলাপী খাওয়ার সাথে মন ভালো হইবার একটা যোগ সুত্র নিশ্চয়ই আছে। তাহা না হইলে, অন্তত ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন মেধাবী লেকচারার এই কাজটি করিতেন না।
সপ্ন হইতে রচনা লিখতে গেলে যেহেতু আমার মন খারাপের একটা আভাস তিনি পাইতেছিলেন, তাই এইবার আমার বড় ভাইয়ের মাথায় আরেক নতুন ফন্দি এলো। বিকালে যে সব বড় ভাইয়েরা আড্ডা দিতে আসেন, তাহাদের মধ্যে হুমায়ুন ভাই একজন উঠতি লেখক হিসাবে পরিচিত হইতেছিলেন। তিনি নন্দিত নরকের মতো একটা উপন্যাস ইতিমধ্যে লিখিয়া নাম করিয়া ফেলিয়াছেন। শঙ্খ নীল কারাগারও ইতিমধ্যে নাম করা হয়ে উঠিতেছে। ইহা আবার টিভিতে প্রচারিতও হইয়াছে। হুমায়ুন ভাই তাহার উপন্যাশের মুল কাহিনী লিখার আগে বা পরে তিনি তাহার লেখাগুলি এই আড্ডায় শেয়ার করিতেছেন। আমি ছোট একজন মানুষ এইসব বড় বড় মানুষদের কাছে বসিয়া শুধু হাই তুলিতেছি। আমি কি তাহাদের এই উপন্যাশের চরিত্রের বৈশিষ্ট খন্ডন করিয়া রচনা আকারে লিখিতে পারি? তাই, শহিদুল্লাহ হলের ডাইনিং হলের উপরের তালায় এক মাত্র সাদা কালো টিভির নাটক আর বিদেশি কিছু ইংরেজী সিরিয়াল দেখার অনুমতি আমার মিলিয়া গেলো। কিন্তু অসুবিধা হইলো আরেক জায়গায়। এতো ছাত্র এবং ছাত্রীরা এই সাদা কালো টিভির দর্শক ছিলেন, যে, তাহাদের গল্পের ডায়ালগ শুনিতে শুনিতে টিভির কোনো ডায়ালগই আমার কানে আসিত না।
এখানে আরো একটা কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। আমার হাতের লেখা অনুশীলন করিতে করিতে আমার হাতের লেখা মুক্তার মতো ঝকঝকে হইয়া গেলো। একেবারে কার্বন কপি আমার বড় ভাইয়ের হাতের লেখার সাথে। শুধু তাই নয়, আমি যে কোনো স্টাইলে হোক সেটা সোজা করিয়া, বাকা করিয়া, তেরা করিয়া, সব স্টাইলেই আমার হাতের লেখা এ ওয়ান।
অবশেষ ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষা আগামিকাল। সিট পড়েছে ঢাকা কলেজে। কি বিশাল সেই কলেজ। আমার জীবনেও এতো বড় কলেজ দেখি নাই। কতগুলি বিল্ডিং, কতগুলি রাস্তা, মাথা খারাপ হয়ে যায়। পরীক্ষার উত্তর প্রশ্নপত্রেই লিখিতে হইবে, ফলে খুব সাবধানে না লিখিলে উত্তরের জন্য অতিরিক্ত কাগজ লইবার কোনো অপশন নাই। আমার অবশ্য তাহাতে কোনো সমস্যা নাই কারন আমি অতি ছোট অক্ষরেও অলপ বিস্তর জায়গায় অতি সুন্দর করিয়া কাটাকাটি না করিয়া অনেক বেশী কিছু বেশ লিখিতে পারি।
প্রশ্নপত্র হাতে পেলাম। প্রথমেই কি রচনা আসিয়াছে সেইতা খোজ করিতে গিয়া আমার এতো হাসি পাইয়াছিলো যে, আজো আমার ঠোট হাসে। এত রচনা পড়িলাম, এতো রচনা স্বপ্ন দেখিয়া দেখিয়া নিজে রচনা তৈরী করিলাম, এতো বড় বড় সাহিত্যিকদের সাথে নাটক উপন্যাসের চরিত্র ব্যাখ্যা করিয়া আমি নিজেও একজন সেমি সাহিত্যিক হইয়া যাইবার উপক্রম হইলো, আর সেখানে কিনা রচনা আসিয়াছে “আমার জুতার ফিতা”, আর “আমার কলমের নিপ”? তাও আবার দশ লাইন। ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রকারীরা আসলে অন্য গ্রহে বাস করিতেন বলিয়া আমার বোধগম্য হইল, অথবা তাহার রচনা নির্বাচন করিবার জন্য হয়তো কিছু দুই বা তিন বছরের বাচ্চাদের লইয়া একটা বোর্ড গঠন করিয়াছিলেন, যাহারা জুতার ফিতা আর কলমের নিপ ছাড়া আর কিছুই তাহাদের জ্ঞ্যানে ছিলো না। যাক, আমি “কলমের নিপ” রচনাটাই লিখিলাম। আমিও কম চালাক নই। দশ লাইন লিখিতে হইবে, আমি দশ লাইন ই লিখিবো। লিখিলাম।
আমার একটি কলম আছে যাহার আগায় একটা নিপ আছে।
নিপটি শক্ত।
মনে হয় টিনের তৈরী।
নিপটি খোলা যায়।
আবার লাগানোও যায়।
মাঝে মাঝে নিপটি খুলিয়া ধুইতে হয়।
নিপ ভেংগে গেলে নতুন নিপ লাগানো যায়। ।
নিপের জন্য একটা ক্যাপও আছে।
নিপ কলমের মাথার মতো।
আমি নিপটিকে খুব ভালোবাসি।
আমি কখনো নিপটিকে এমন করিয়া ভালোবাসিয়াছি কিনা আজো জানি না। কিন্তু লিখিয়া তো দিয়াছি যে, আমি নিপটিকে ভালোবাসি। আসলে ভালোবাসার জন্য শুধু প্রান থাকিতে হইবে এমন বস্তুই নয়, প্রান নাই এমন সব বস্তুকেও আমরা অনেক ভালোবাসি। হয়ত এই নিপের জন্য কেউ এমন করিয়া এমন ভালোবাসা প্রদর্শন করিলো।
পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি একে একে সবগুলির উত্তর দিতে থাকিলাম। অংক, ইংরেজী আর সাধারন জ্ঞ্যান এর পরীক্ষা। বাংলা কি ছিলো কিনা এখন আর মনে করিতে পারিতেছি না। মনে হয় ছিলো না। আমি যখন পরীক্ষা দিতেছিলাম, লক্ষ্য করিলাম, একজন মোটা টিচার প্রায়ই আমার পাশে আসিয়া দারাইতেন। আর বলিতেন, তোমার হাতের লেখা তো খুব সুন্দর!! মাত্র এক ঘন্টার পরীক্ষা। এই এক ঘন্টায় নির্ধারিত হইয়া যাইবে কে বা কাহারা এইসব ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হইবে। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় ক্যাডেট কলেজের ছেলেগুলি কি ভাগ্যবান নাকি ছেলেগুলি ক্যাডেট কলেজকে ভাগ্যবান করিয়াছে? হয়ত দুইটুই সত্য।
পরীক্ষা সেসের ঘন্টা বাজিয়া গেলো। আমার পরীক্ষা খুব ভালো হইয়াছে। জানামতে কোন ভুল করি নাই। আমি তৃপ্ত পরীক্ষা দিয়া। খাতা লইয়া যাইতেছেন টিচাররা। আমার খাতা নিতে আসিলেন ওই মোটা টিচার। আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, পরীক্ষা কেমন হইয়াছে? আমি স্যারকে বলিলাম, স্যার যদি একজন চান্স পায়, তাহা হইলে আমি পাবো। এবার আর ইনশাল্লাহ বলিতে ভুল করি নাই। স্যার নিজেও সম্ভবত আমার উত্তরগুলি লিখার সময় পড়িয়াছিলেন। তাই হয়তো বুঝিয়াছিলেন, আমার কথায় একটা সত্যতা আছে। তিনি আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভাইভা পরীক্ষাটা ভালো করিয়া দিবা, দেখা হইবে কলেজে। পরে আমি কলেজে গিয়া এই স্যারের নাম জানিয়াছিলাম, মোহশীন স্যার, আমাদের বাইওলোজির টিচার।
লিখিত পরীক্ষা তো শেষ। এখন যাহারা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করিবে তাহাদের মধ্য হইতে আবার ভাইভা নেওয়া হইবে। ভাইবায় যাহারা মেধাবী হিসাবে প্রমান করিতে পারিবে, তাহারাই সেই গুটিকতক ভাগ্যবান যারা সপ্নের ক্যাডেট কলেজে পড়িতে যাইবে। বয়স মাত্র ১২, যেই সব পরীক্ষা দিতেছি, আমেরিকার প্রেসিডেন্টরাও মনে হয় এই বয়সে এমন পরীক্ষা দেয় নাই। এদিক হইতে আমরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হইতেও উত্তম।
পরীক্ষার পর যেনো আমার আর কোনো কাজ রহিলো না। কিন্তু আমার না হয় কাজ নাই, কিন্তু যিনি কাজ জোগাড় করিয়া দেওয়ার লোক আমার সেই ইউনিভার্সিটির ভাই, তাহার হাতে তো আমার জন্য অনেক কাজ জমা হইয়াই ছিলো। ভাইয়া ভাবলেন, কি জানি যদি ক্যাডেট কলেজে না চান্স পাই তাহাহলে কি হবে? ফলে বিকল্প হিসাবে তিনি আরো একটি কলেজের জন্য আমাকে প্রস্তুতি নিতে বলিলেন। আর সেইটা হইতেছে ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল। ক্যাডেট কলেজের প্রস্তুতি আমার এমন ছিলো যে, ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের জন্য ইহাই ছিলো ঢের। ফলে খুব অনায়াসেই আমি ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের ভরতি পরীক্ষায় টিকে গেলাম।
দিন যায় মাস যায়, ভাইয়া আমার ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন আর আমি অপেক্ষায় থাকি কবে গ্রামে যাবো, আবার বৃষ্টিতে ভিজবো, গ্রামের বন্ধুদের লইয়া আমি কবে আবার সেই আগের দিনের মতো হই হুল্লুর করিবো।
আমি রীতিমতো ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে ক্লাস শুরু করিয়া দিয়াছি। নতুন নতুন কিছু বন্ধু জুটিলো। ভালো লাগিতে শুরু করিলো আমার শহরের জীবন। আমি শহিদুল্লাহ হল হইতে হাটিয়া হাটিয়া সেই আজীম্পুর ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে যাই ক্লাস করিতে। ফিরিতে ফিরিতে বাজিয়া যায় প্রায় পাচটা।
হটাত একদিন সকাল বেলায় আমাকে আমার ভাই কাছে ডাকিলেন, পাশে বসাইলেন, আর আমার মাথায় হাত দিয়া বলিলেন, ‘তুই জানিস না তুই কি করেছিস। তুই ক্যাডেট কলেজের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিস। কত যে আমি খুশী হয়েছি তোকে বুঝাতে পারবো না’। আমি পাশ করেছি এই উপল্বধিটা আমার মধ্যে কোনো কিছুই পরিবর্তন করিলো না কিন্তু ভাইয়ার খুশী দেখিয়া আমার অনেক আনন্দ হইয়াছিলো। আমাকে ভাইয়া ওইদিন সন্ধ্যায় কোথায় যেনো লইয়া বেশ মজার মজার খাবার খাওইয়াছিলেন। ঢাকা শহর ঘুরাইয়া ছিলেন। আমি ভাইয়ার হাত ধরে এক রিক্সায় বেড়াইয়াছি। খাওয়া দাওয়ার পর ভাইয়া হুমায়ুন স্যারের বাসায় এই সুখবরটা দিতে আমাকে লইয়া গেলেন। রাতে হুমায়ুন স্যারের বাসায়ই খাওয়া দাওয়া করিলাম। গুলতেকিন ভাবি খুব ভালো মহিলা ছিলেন, আমাকে আদর করিয়া বলিলেন, এই যে মেধাবী ছেলে, আসো তোমাকে মিস্টি খাইয়ে দেই। এই বলে তিনি আমাকে এক বাটি পুডিং ধরিয়ে দিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি পুডিং খুবই অপছন্দ করি। বলিলাম, পেটে একটু জায়গাও নাই যে খাই। তারপরেও খাইলাম। ভালোবাসায় যে যাই কিছুই দিক, তাহাতে ভালোবাসার সাথে যাহা থাকে তাহা হচ্ছে স্নেহ আর মায়া। এই মায়ার কারনেই কেউ এই পৃথিবীকে ছাড়িতে চাহে না।
কিছুদিন পরই ভাইভার তারিখ পড়িয়া গেলো। আমি এই ভাইভাটাকে এতো ভয় পাই যে, মাঝে মাঝে আমি তোতলাতে থাকি যদি উত্তর না পারি। তারপরেও তো ভাইভা দিতে হইবে। আমার যেইদিন ভাইভা পরীক্ষা সেইদিন আমার সিরিয়াল পড়িলো একবারে শেষ ছাত্র হিসাবে। শেষ ছাত্রের ভাইভা দেওয়ার বিরম্বনার আর শেষ নাই। যেই পরীক্ষা দিয়া বের হয়, অমনি আমরা হুম্রী খাইয়া তাহাকে ঘিরিয়া প্রশ্ন করিতে থাকি, তাহাকে কি জিজ্ঞাসা করিয়াছে, আর সেইটার উত্তর কি দিয়াছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের প্রাননাশ। আর টেনসন তো আছেই। আমরা যাহারা তখনো পরীক্ষার সিরিয়ালে বসিয়া আছি, তাহারা ফাকে ফাকে অনেক প্রশ্ন নিয়ে আলাপ আলোচনাও আবার করিতেছি। একসময় (নাম বল্বো না আমার এক বন্ধু যে পরে আমার সাথেই ক্যাডেট কলেজে পড়েছে) এক ছাত্র আরেক ছাত্রকে প্রশ্ন করিলো, জানো, গাড়ি চলার সময় কয় চাক্কা সাম্নের দিকে ঘুরে? আমিও মনোযোগ সহকারে প্রশ্নটি শুনিলাম, কিন্তু যেহেতু কোনোদিন আমার পরিবার গাড়ির মালিক ছিলেন না, তাই আমি নিজেও জানি না আসলে কোন কোন চাক্কা গাড়ি চলার সময় সামনে যায় আর কোন চাক্কা পিছনের দিকে যায়। আমার প্রশ্নকারী বন্ধু খুব গম্ভীরভাবে উত্তর দিলো, গাড়ির সামনে চলার সময় তিন চাক্কা নাকি সামনে ঘুরে আর এক চাক্কা নাকি পিছনের দিকে ঘুরে। আমি বিশ্বাসও করিয়াছিলাম। হইতেও পারে, কারন ওরা তো গাড়িতেই ঘুড়াঘুড়ি করে। আমি এরপর অনেকবার পরিক্ষা করে দেখার চেস্টা করিয়াছি, আসলে কোন চাক্কাটা পিছনের দিকে ঘুরে? এইটা খুজিতে গিয়া বারবার আমার মাথাই খালি চক্কর দিয়াছে কিন্তু কোন চাক্কা পিছনে চক্কর দেয় সেটা আজো বুঝি নাই।
অবশেষে ভাইভার জন্য আমার ডাক পড়িলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা। শেষ ছাত্রের ভাইভার যেমন সারাদিন টেনসনের জন্য মাথা খারাপ থাকে, আবার শেষ ছাত্র হইলে একটু লাভও আছে। টিচাররা তখন বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির থাকেন, মোটামুটি প্রশ্ন করিয়াই ছাড়িয়া দেন। বাড়ী যাওয়ার তাড়া। আমার বেলায়ও তাহাই হইলো।
চল্লিশোর্ধ্ব বিজ্ঞ পাচ ছয়জন ব্যক্তিবর্গ মাত্র বারো বছরের বালকের মেধা যাচাই করিবার লক্ষে চারিদিকে এমন করিয়া বসিয়া আছেন যেনো গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ হইতেছে। একজন আমাকে প্রশ্ন করিলেন, তুমি কেনো ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাও? আমি বললাম, আমি পাশ করিয়াছি বলিয়া ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাই স্যার। সবাই আমার এই উত্তরে কেমন জানি যেনো হচকচিয়া গেলেন। একি কথা !! আরেকজন বলিলেন, তুমি কি আর্মি হইতে চাও? আমি বললাম, স্যার আর্মি কি? এবার আরো অবাক স্যারেরা। কি জানি কি বলাবলি শুরু করিলো ওনারা। আমি ভয় পাইয়া গেলাম। এইবার একজন আইনস্টাইনের মতো বুড়োলোক আমাকে একটা সাদা পাতা হাতে দিয়া একটা অংক করিতে বলিলেন। সময় দিলেন দুই মিনিট। আমি কয়েকবার অংকটা করে দেখিলাম। এক্স এর মান নির্ণয় করিতে হইবে। ইহা আমার জন্য পান্তা ভাতের মতো। কিন্তু বারবার অংক তা করিবার পরও দেখিলাম, ব্যাপারটা মিলিতেছে না। আমি খুব ভয়ে ভয়ে বলিলাম, স্যার অংকটা মিলছে না, এক্স এর মান কি ভুল আছে?
এইবার তাহারা আর অবাক হইলেন না। একেবারে আমার পিঠে একজন চাপড় মারিয়া বলিলেন, হ্যারে বাবা, এইটাই তো উত্তর!! যাও, তোমার পরীক্ষা শেষ। আমি তো অবাক। অংক স্যারের ভুল দিয়াছেন, আমি নাকি সঠিক উত্তর দিয়াছি। ক্যাডেট কলেজের স্যারেরা সব মনে হয় পাগল। মেধাবী ছেলেদের পড়াইতে পড়াইতে স্যারেরাও আধা মেধাবী থেকে পুরুটাই পাগল হইয়া যাইতেছেন। শুনেছি, বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরা নাকি পাগল হয়।
ভাইয়াকে সব আদোপান্ত বলিলাম। ভাইয়া আমার কথাগুলি দাড়ি কমা সহকারের গলদ করন করিতেছিলেন। যেনো আমি কোনো ভুতুরে গল্প বলিতেছি। সব শুনিবার পর ভাইয়া একটু কেমন জানি করিলেন। বাতাশ ভর্তি বেলুন হতাত করিয়া মুখ খুলিলে যেমন নিমিসের মধ্যেই তাহা আর পেট ফোলা মাছের মতো মনে হয় না, তেমনি আমার ভাইয়ার চোখ মুখ দেখিয়া আমার বড় ভয় হইতে লাগিলো। অনেক্ষন পর এক্তা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়া বলিলেন, বোকার মতো কেনো বলিতে গিয়াছিস যে, আর্মি কি তা জানিস না বা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেছি বলে ক্যাডেট কলেজে পড়তে চাই। বুদ্ধি করে অন্য কিছু বলতে পারলি না? বুঝলাম, আমি আসলে বোকাই।
যাই হোক, ভাইভা বোর্ডের সদস্যগন হয়ত আমাকে বোকা মনে করেন নাই, তাহারা হয়ত আমাকে বোকা না ভাবিয়া সহজ সরল ভাবিয়াছিলেন, তাই ফেল করাইয়া দেন নাই। আমি পাশ করিয়াছিলাম। সেই ৪১ বছর আগে সমস্ত পরীক্ষায় পাশ করার কারনে আজ ১৯ শে জুন এই দিনে কিছু অজানা মেধাবী ছেলেদের সাথে পড়াশুনা করিতে যাইতেছি আমি ক্যাডেট কলেজে। ঢাকা থেকে বহুদুর। সেই টাঙ্গাইল। ঢাকাই আমার কাছে সাত সমুদ্র তের নদীর পথ মনে হইতো আমার গ্রাম থেকে, আর আজ যাচ্ছি চৌদ্দ সমুদ্র ছাব্বিস নদীর দুরুত্তে।
সকাল সকাল ভাইয়া আমাকে কালো প্যান্ট আর সাদা ফুল শার্ট পড়াইয়া কোরবানীর গরুকে যেমন আদর করিয়া বাজারে দামী খদ্দেরের কাছে হাতছাড়া করিয়া দেন, ভাইয়াও আমাকে তেমনি সুদুর প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়া মির্জাপুরের কোনো এক বনবাসে ক্যাডেট কলেজ নামক বহুল আলোচিত এবং সপ্নের জগতে রাখিয়া আসিলেন। হাসের বাচ্চাদের মতো আমরা ৫৪ জন সমবয়সী কিশোর পিতামাতাহীন হইয়া মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে থাকিয়া গেলাম। প্রথম দিন একটা জেল খানা বলিয়া মনে হইল। আরো মনে হইলো যে, এতো কষ্ট করিয়া শেষ পর্যন্ত জেলে আসার জন্য ব্যতিব্যস্ত হইয়া ছিলাম?
মন খারাপ হইতেছিলো। এমন সময় পিছন হইতে কে জানি খুব আলতো করিয়া আমার ঘাড়ে হাত রাখিলো। তাকাইয়া দেখিলাম, ওই মোটা স্যার। খুব আপনজন মনে হইলো। আমার চোখ ছল ছল করিয়া উঠিলো। স্যার আমার চোখে চোখ রাখিয়া বলিলেন, মন খারাপ হইতেছে? আমরা আছি তো।
আজ এতো বছর পর মনে হইতেছে, হ্যা স্যার, আপ্নারা তো ছিলেন। আমার সেই প্রিয় ক্যাডেট কলেজ, বড় সুন্দর একটি স্থান আমার অন্তরে। আর সেই সব স্যার যাদেরকে আমি মিস করি নিঃশ্বাসের প্রতিটি ক্ষনে কারন তারা আমাদের শুধু স্যার ছিলেন না, ছিলেন কখনো ভাই, কখনো গুরুজন, কখনো পিতামাত আবার কখনো একেবারেই বন্ধু। আজো স্যার দের কে আমার পায়ে স্পর্শ করিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে ইচ্ছা করে, স্যার আমি আপনাদেরকে অনেক অনেক ভালোবাসি। আপ্নারা যে যেখানেই থাকুন, আমরা আপনাদের দোয়ায় বাচিয়া থাকিতে চাই।
বেচে থাকুক আমার ক্যাডেট কলেজ। বেচে থাকুক আমার পরবর্তী ভাইয়ের মতো বংশধর ছাত্রগন। আর বাচিয়া থাকুক আমার সেই প্রনাম ধন্য গুরুজনেরা।
(সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট) এ একদিন
আজ গিয়েছিলাম ব্রাক এর সিডিএম (সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট) এ। আমার জানা ছিলো না যে, এতো কাছে এতো সুন্দর একটা জায়গা। চারিদিকে সবুজ বনায়ন, এক পাশে মস্ত বড় একটা পুকুর। পুরু ক্যাম্পাসটা ওয়াল দিয়ে ঘেরা একটা সুরক্ষিত চত্তর। নামাজের জায়গা, থাকার জায়গা, খাওয়ার জায়গা, শরীরচর্চা, সবকিছুই একটা পরিকল্পনায় করা। কোনো কোলাহল নাই, পরিবার নিয়ে বেড়ানো যায় এমন জায়গায়ই এটা। খুবই ভালো লেগেছে। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ১৫ তম ব্যাচের কয়েকজন (আওলাদ ভাই, মুস্তাক আহমেদ রিজভী ভাই, আফরোজা আপা, রোজ, হাসান ভাই, নেসার) ভাইদের সাথে বড্ড একটা ভালো সময় কাটালাম।
আমি জাহাঙ্গীরনগরের কেউ না, কিন্তু আমার স্ত্রীর সুবাদে মূটামুটি তার সব বন্ধুদের সাথেই আমার একটা আলাদা বন্ধুত্ত তৈরী হয়ে গিয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা অনেক বছর পর কোনো অনুষ্ঠানে আসে আর আমাকে হতাত তাদের কোন অনুষ্ঠানে দেখে, প্রায়ই বলে শুনি, দোস্ত তোমার চেহারা আমার মনে নাই কেন? কি জানি তোমার নাম ছিলো ইউনিভার্সিটির লাইফে? আমি মুচকি মুচকি হেসে বলি, আমি তো ফিজিক্সে ছিলাম। আর অন্য বাকীরা যারা আমাকে চিনে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে। মন্দ লাগে না।
যাই হোক, আজকে খুব বেশী বন্ধু বান্ধব এই অনুষ্ঠানটায় আসে নাই। গোটা পাচ ছয় জনার একটা দল। সবার সাথে আমি খুব ফ্রি ভাবেই মেশার চেস্টা করি। চেস্টা করি যাতে কেউ না ভাবে যে, প্রথমত আমি একজন সামরীক বাহিনীর অফিসার, এবং দ্বিতীয়ত আমি একজন ব্যবসায়ী। আর ভালো মানুষদের সাথে ভালো থাকাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। জাহাঙ্গীরনগর এর অনেকেই ব্যবসায়ী, কেউ কেউ ব্যাংকার, কেউ কেউ আবার প্রোফেসর। সব সেক্টরেই আছে। এটা একটা ভালো মিশ্রনের গ্রুপ। প্রায়শ ই যেহেতু আমি এই সব বন্ধুদের সাথে বেড়াতে আসি বা তাদের নিজস্ব অনুষ্ঠান গুলিতে আমি পারটিসিপেট করি, ফলে ব্যক্তিগত অনেক ভিউজ এবং মতামত আদান প্রদান করা হয়। সে রকমই আজো তার ব্যতিক্রম হয় নাই।
আজকের দলটির মধ্যে বেশীরভাগ সময়ে কথাবার্তা হলো হাসান ভাইয়ের সাথে। হাসান ভাই ইঞ্জেক্সন মোল্ডিং এর ব্যবসা করেন। প্লাস্টিক লাইনে। তারও দুটি মেয়ে। একটির বিয়ে হয়েছে প্রায় এক বছর হলো। হাসান ভাইয়ের সাথে একান্ত সময়ে অনেক কথাবার্তা হলো। বেশ ভালো লেগেছিলো তার সাথে অনেক বিসয়ে কথা বলে। আমি যে জিনিসটা নিজে সাফার করে বুঝেছি বা কেউ বুঝে, হাসান ভাই সেটা আগে থেকেই সাফার না করে বুঝেছেন। খুব ইন্টারেস্টিং। কথা হল মেয়েদের নিয়ে, সংসার নিয়ে, ব্যবসা নিয়ে, বুড়ো বয়সের অভিজ্ঞতা নিয়ে, আত্মীয়তার প্রসঙ্গ নিয়ে। অনেক বাস্তবসম্মত চিন্তা ভাবনা হাসান ভাইয়ের। তার সাথে আমার অনেক কিছুই মিলে যাচ্ছিলো এবং আমার মনে হয়েছে তার কথাগুলির মধ্যে কোনো রকমের ভনিতার আশ্রয় নাই। আমাদের আলাপের কিছু চুম্বক অংশ আজ আমার ডায়েরীর পাতায় লিখে রাখার চেস্টা করছি।
তার বক্তব্যটা আমি তুলে ধরিঃ
মেয়ের জামাই (Son in Law) বা তাদের শশুড় বাড়ির প্রসংগে হাসান ভাইয়ের বক্তব্যঃ
…শুনেন আখতার ভাই, মেয়ের জামাই যাকে সান ইন ল (Son in Law) বলা হয়, সে কখনোই সান (Son) হতে পারে না। সে সান (Son) বাই (By) ল (Law)। আমার মা বলতেন, এক গাছের বাকল আরেক গাছে কখনোই লাগে না। এটা যেমন চিরন্তন সত্য, তেমনি সান এবং সান ইন ল কখনোই এক হতে পারে না, এটাও চিরন্তন সত্য। আমি আমার মেয়েদেরকে প্রায়ই বলে থাকি যে, শোন মা, আর যাই হোক, অন্তত আমি আমার কোনো ব্যবসায় আমার কোনো মেয়ের জামাইকে অংশীদার করবো না। না তার কাছে ব্যবসার কোনো কর্তৃত্ব ছেড়ে দেবো। আমার যদি ১০০টি বাড়িও থাকে তারপরও আমি আমার কোনো কিছুই আমি আমার সান ইন ল (Son in Law) কে দিবো না বা দিতে চাই না। আমার নামেই সব থাকবে, বা আমার অবর্তমানে আমার মেয়েদের নামে সব থাকবে। যদি আমার মেয়েরা সব নস্টও করে ফেলে, তারপরেও আমার একটা সান্তনা থাকবে যে, আমার মেয়েরাই নস্ট করেছে। যদি আমার আবার সামর্থ্য থাকে, আমি তাদের জন্য আবার গড়ে দিবো। কিন্তু আমার সান ইন ল (Son in Law) এরা কখনোই আমার তিলে তিলে গড়ে উঠা সম্পদের মাহাত্য বুঝবে না। কেনো বুঝবে না সেটার ব্যাখ্যাও তিনি দিতে ভুলে গেলেন না। আমি যে পরিশ্রম করে, আমার সমস্ত মেধা আর ইমেজ দিয়ে আমার ছোট ব্যবসা আজ একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছি, সেখানে হটাত করে বিনা পরিশ্রমে অন্য বাড়ির একজন অপরিপক্ক মানুষ না বুঝবে এর দরদ না বুঝবে এর বেড়ে ঊঠার ইতিহাস। ফলে চুন থেকে পান খসলেও ব্যবসার প্রয়োজনীয় কিছু কিছু ব্যক্তি বা এলিমেন্টকে তার নিজের ইগোর কারনে নিমিসের মধ্যেই বহিস্কার করতেও বুক কাপবে না। কাকে দরকার, কাকে দরকার নাই, কোন কাজ টি করলে ব্যবসার বা প্রতিষ্ঠানের মংগল হবে সে ধার বা বিচার তার কাছে থাকে না। ফলে পরের ধনে পোদ্দারীর মতো বা স্ত্রী কপালে ধন পাওয়ার কারনে এইসব সম্পত্তির উপর তার শুধু আরামের স্থানটি রচিত হয়, তাকে ধরে রাখার প্রবনতা খুব কম ছেলের থাকে। এক সময় যদি বেশী চালাক হয়, স্বার্থের কারনে নিজের নামে সব পাকাপোক্ত করার বাহানা খুজে। এতে সবচেয়ে যারা বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা হচ্ছে যার নিজের ব্যবসা তার এবং তার পরিবারের। ইতিহাস সেটাই বারবার প্রমান করেছে। ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। কিন্তু সেটাও খুব চোখে পড়ার মতো নয়।
আমিঃ আপনার অবর্তমানে তো মেয়েরাই তথা মেয়ের জামাইরাই মালিক। তাহলে ওদের দিতে অসুবিধা কই?
হাসান ভাইঃ সাথে সাথে তিনি একটা বাস্তব একটা উদাহরন দিলেন। নামটা এখানে গোপনীয়তা রক্ষা করার কারনেই উল্লেখ করছি না। ধরুন তার নাম মিস্টার এক্স। ভদ্রলোক বেশ নামীদামী ব্যবসায়ী। তার দুটি মেয়ে ছিলো। অতি আদর করে মিস্টার এক্স তার বড় মেয়েকে বিয়ে দিলেন এক সুন্দর রূপসী ছেলের সাথে। ছেলে নাই। আর তিনি নিজে দেশের প্রতিষ্ঠিত একজন মস্ত বড় ব্যবসায়ী হবার কারনে সম্পদের কোনো অভাব নাই। অন্য আরেক কথায় বলা চলে যে, তিনি দেশের অর্থনীতি কন্ট্রোল করে যারা তাদের মধ্যে একজন। ছেলে নাই, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে যেনো তিনি একজন ছেলে পেলেন। ভালোবাসায় তাকে এমন সিক্ত করলেন যে, শ্বশুরের অর্ধেক ব্যবসার মালিক হয়ে রীতিমত বড় বড় দৈনিক পত্রিকা গুলিতে নিউজ হয়ে গেলেন। শ্বশুর মহাশয় তার মুল ব্যবসার অর্ধেক মালিকানা হস্তান্তর করে নিজের সাথে যোগ করে দিলেন। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, চালাক ছেলে। ধীরে ধীরে ছেলেটি শ্বশুরের ব্যবসায় বসে বসে সুযোগটা কাজে লাগাতে শুরু করেন। মেয়ের জামাইও তার মেধা কাজে লাগিয়ে পৃথকভাবে আরো একটা ব্যবসা শুরু করলেন। শশুড়ের তাতে কোনো আপত্তি ছিলো না। তার মেয়ের জামাই আআরো বড় হোক সেটাও তিনি চান। সাথে শ্বশুরের সাথে তো অংশীদারিত্ত আছেই। মাস ঘুরে বছর যায়, দিন পালটাতে থাকে। টুকটাক ছোট খাটো খুনসুটি লাগতে থাকে স্বামী স্ত্রীর মাঝে। সময়ের স্রোতে এই খুন্সুটি আরো জোরালো পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মনমালিন্য থেকে এক সময় মুখ চাওয়া চাওয়ি পর্যন্ত দেখা বন্ধ হয়ে যায়। একটা সময় আসে যখন সম্পর্কটা যেনো আর টিকানোই যাচ্ছিলো না। এতো আদরের মেয়ের জামাইকে যেনো শশুড় আর চিন্তেই পারছেন না। তার ব্যবহার, আচরন, কথা বলার হাবভাব এতোটাই বেপরোয়া যে, তাকে আদর তো দুরের কথা সহ্যই করতে পারছিলেন না তার নিজের মেয়ে এবং শশুড়। এদিকে শুরু হয়েছে আরেক যন্ত্রনা যে, শশুড় তো ইতিমধ্যেই তার মেয়ের জামাইকে তার ব্যবসার অর্ধেক শেয়ার হস্তান্তর করে পাকাপোক্ত করে মালিক বানিয়ে দিয়েছেন, ফলে তার নিজের ব্যবসার মধ্যে সব সিদ্ধান্তে এখন তার মেয়ের জামাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে যেখানে তিনি একা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন না। ধীরে ধীরে তার ব্যবসার অধোপতন শুরু হতে লাগলো। অন্যদিকে মেয়ের জামাইয়ের নিজস্ব যে ব্যবসা তিনি ইতিমধ্যে বিস্তার করে ফেলেছেন, তা ধীরে ধীরে শশুড়ের টাকাতেই দেশের নামীদামি একটা প্রতিষ্ঠানে রুপ নিতে শুরু করেছে। এখন শশুড় মহাশয় না পারছেন জামাইয়ের কাছ থেকে তার দেওয়া শেয়ার ট্রান্সফার করে ফিরিয়ে আনতে না পারছেন জামাইকে বশে আনতে। বছর ঘুরতেই যা হবার তাই হলো। মেয়ের সাথে জামাইয়ের তালাক হয়ে গেলো। অথচ জামাই তখনো তার নিজের ব্যবসার একজন অংশীদার এবং জামাইয়ের নিজের ব্যবসাও রমরমা। না পারছেন জামাইকে নিয়ে একসাথে ব্যবসা করতে, না পারছেন তাকে তার থেকে আলাদা করতে। অতি আদরের জামাই তার চিরশত্রু হয়ে গেলো। এ যেনো নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরে নিজেকে ধংশ করে দেওয়ার মতো অবস্থা।
এই পর্যায়ে হাসান ভাই বললেন, দেখেন, যদি আদরের বশে শশুড় এই ব্যবসার অংশীদার না করতেন, তা হলে আজ শ্বশুরের এই অবস্থা হতো না। হ্যা, জামাইকে জামাইয়ের জায়গায় ভালোবাসেন, তাকে তার নিজের যোগ্যতা দিয়ে বড় হতে দিন। সাহায্য করবেন কিন্তু এই রকম নয় যে, শেষতক নিজের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানিতে পড়েন। জামাই আরেকটা বিয়ে করেছে, অথচ এখনো সে প্রাক্তন শশুড়ের সব ব্যবসায় সমান অংশীদার অথচ জামাইয়ের কোনো কিছুই এখানে ছিলো না। হাসান ভাই আরো বললেন, হ্যা এটা যদি নিজের ছেলে এমনটা করতো, তাহলে কোনো দুঃখ ছিলো না। নিজের ছেলেই তো। আর বাবার অনুপস্থিতিতে নিজের ছেলেই তো এইসব সম্পত্তির মালিক হতো। দুক্ষটা অনেক কম হতো।
হাসান ভাই বলতে থাক্লেন, এই ঘটনা থেকে তিনি শিখেছেন যে, পরের ছেলে কখনো নিজের ছেলে হয় না। আর শশুড় যতো ভালো মানুসই হোন না কেনো, জামাই তাকে নিজের বাবা মনে করে না। যদি কেউ এই সত্য অস্বীকার করে প্রকৃতির নিয়মের বাইরে যায়, তাদের পরিনতি এই রকমই হয়। হ্যা, এটা ঠিক, যে, কোন বাবা চায় না যে তার মেয়ে সুখি হোক? কোন পিতামাতা চায় না তার সন্তানের জন্য এই পৃথিবীকে আরামদায়ক হোক? আর এই কারনে জামাইদেরকে অতোটুকু দিতে হয় যতোটুকু সে প্রাপ্য। এর মানে এই নয় যে, শশুড় তাকে ভালোবাসবে না। জামাই জামাইয়ের জায়গায়, ব্যবসা ব্যবসার জায়গায়, মেয়ে মেয়ের জায়গায়। সব কিছুতে তার নিজের জায়গায় রাখতে হয়। লিমিট অতিক্রম করলেই প্রচন্ড রকমের একটা ভারসাম্যতা হারিয়ে যাবার ভয় থাকে। আর ভারসাম্যহীন যে কোনো জিনিসই খারাপের দিকে যায়।
আমিঃ (আমি হাসান ভাইয়ের কথাগুলি শুনছিলাম। তারপর আমি বললাম), হাসান ভাই, আমার জীবনেও আমি এমন একজন মেয়ের জামাইকে দেখেছি যিনি তার শশুড়কে নিজের বাবার চেয়েও বেশি মহব্বত করেন। শ্বশুরের অনেক সব এমন করে ধরে রেখেছে যেনো সব কিছু তার সম্পদ, আবার কোনো কিছুই তার নয়। ঢাকা শহরেই তার বাড়ি আছে এই রকম ৭/৮ টা, ব্যবসা আছে, উত্তরায় অনেক জমি আছে যার দাম কয়েক কোটি টাকা। তার একটা মাত্র মেয়ে। ছেলে ছিলো দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ছেলের দুইটা বাচ্চা আছে। মেয়ের জামাই পুরু পরিবারটাকে এক করে ধরে রেখেছে। আমি নিজে দেখেছি যে, এই জামাই তার শহুড়কে গোসল করিয়ে দেয়, খাইয়ে দেয়, সারাক্ষন সংগি দেয়। পেপারটা পড়ে পড়ে শুনায়। জামাইয়ের নিজস্ব ব্যবসা ছিলো, স সব কিছু ছেড়ে এই বুড়া বয়সে শশুড়কে দেখভাল করে। তাহলে এইগুলা কি মেকী?
হাসান ভাইঃ (হাসান ভাই এবার আরো বললেন), না আখতার ভাই, এইগুলা মেকী নয়। তবে এই ধরনের মানসিকতার জামাই লাখেও একটা পাবেন না। আর যেটা স্বাভাবিক নয়, সেটা উদাহরন হতে পারে না। হাসান ভাই বলতে থাকলেন,
…আখতার ভাই, আমি বা আপনি মেয়ের বাবা বলে এমন তো নয় যে, ছেলে বা জামাই বা শশুড় বাড়ির লোক এমন কোন পুন্য করে ফেলেছে যে, আমরা ছোট আর তারা আমাদের পুজনীয়। হ্যা, পুজনিয় হবে তাদের ব্যবহারের কারনে, মানসিকতার কারনে, এই কারনে নয় যে, ছেলের বাবা বা জামাই হবার কারনে। ঈদ পরবনে আমি মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে প্রথমেই গরুর রান টা পাঠাতে চাই না। অডেল গিফট আর পন্য নিয়ে তাদের খুশী করতে চাই না। আমি চাই এতা দুই পক্ষ থেকেই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী হোক। আর এই করার মধ্যে সবচেয়ে বেশী থাকতে হবে মানসিকতা আর রিস্পেক্ট। একটু এদিক সেদিক হলেই সতর্ক হওয়া খুব জরুরী। যদি সম্পরকটা লম্বা সময়ের জন্য টেনে নিতে হয়, সেখানে ধীরে ধীরে এগুনোই মংগল। আবেগের কোনো স্থান দেওয়া উচিত নয়। বেশী আবগে সম্পর্ক নষ্ট করার চেয়ে বাস্তব্বাদী হয়ে সুখে থাকা মংগলজনক। নিজের করপোরেট অফিসে মেয়ের জমাইকে ঘরে তোলার আগে সে করপোরেট কালচার শিখেছে কিনা তা যাচাই করা অনেক বেশী জরুরী। একটা করপোরেট কালচার এক্তা প্রতিষ্ঠানের স্তম্ভ। আর এই স্তম্ভকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য একটা মানুষই যথেষ্ট। যদি বেশী আবেগী হয়ে থাকেন, তাহলে সেই এক ই ব্যক্তিকে অন্য আরেক টি করপোরেট কালচারে অধিষ্ঠিত কনো অফিস থেকে তাকে শিখিয়ে নিন। কিন্তু কখনোই নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নয়। একবার ছাপ লেগে গেলে তার থেকে বের হয়ে আসা যায় না। বের হতে গেলেই পরিবারে, নিজের জিবনে এবং নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এমন ভাবে আচড় কাটবে যেখানে জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গনের রেখা দেখতে পাবেন। সৃষ্টি কর্তা যখন আপনাকে নিজের ছেলে দেন নাই, তাহলে নিজের ছেলে পাবার জন্য অন্য আরেকজনের কাছ থেকে ধারে নেওয়া ছেলেকে নিজের ছেলে বানিয়ে নিয়ে বিরম্বনায় পড়তে চান কেনো?
আমিঃ (ভাবিয়ে তোলেছে আমাকে। আমি খেয়াল করে দেখেছি, হাসান ভাই অনেক বাস্তব মানুষের মধ্যে একজন। আপাতদৃষ্টিতে হাসান ভাইয়ের কথাগুলি অত্যান্ত নিষ্ঠুর মনে হতে পারে কিন্তু এটাই বাস্তবতা।) তারপরেও আবার প্রশ্ন করলাম, আপনি ও তো কারো না কারো সান ইন ল, তাহলে সেক্ষেত্রে যদি আপ্নার শশুরের ও ঠিক আপনার মতো এই আইডিয়া থাকে বা এক ই পলিসি অনুসরন করেন, তাহলে জামাই হিসাবে আপনার কাছে খারাপ লাগবে না?
হাসান ভাইঃ না আখতার ভাই, আমার খারাপ লাগবে না কারন, আমিও যেহেতু সেই এক ই পলিসি সেই ছোট বেলা থেকে অনুসরন করছি, ফলে আমার খারাপ লাগার কোনো কারন আমি দেখি না। আমি আজ পর্যন্ত কখনো শশুর বাড়ির থেকে আমাকে কি দিলো বা কি দিলো না, বা কি দেওয়া উচিত ছিলো আর কি দেওয়া উচিত ছিলো না, অথবা কোনো পরবনে আমাকে তারা কি দিয়ে খুশী করলো বা করলো না, এই চিন্তাটা কখনো আসে নাই। আমি তাদের কোনো যৌতুক বা উপঢৌকন দিতে চাইলেও নিতে চাই নাই বা নেইও নাই। কারন আমি মনে করি, আমার সংসার আমি আর আমার স্ত্রী মিলে সাজাবো। এর প্রতিটি জিনিস হবে আমার এবং আমাদের। এতে আমার এক্তা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আছে। কেনো আমি ছট লোকের মতো আরেকজনে দেওয়া গাড়ী, বা ফ্রিজ, বা টিভি, বা অন্যান্য সামগ্রি নেবো? যদি নিজেই এইসব নিজে করতে না পারি, তাহলে আমার অইসব জিনিস উপভোগ করার মানসিকতা ত্যাগ করা উচিত। পরের ধনে বাহাদুরী যারা করে তারা আর যাই হোক পুরুস নয়। আমি পুরুসের মতো আচরনে বিশ্বাস করি।
আমিঃ তাহলে যদি কোনো শশুড় আদর করে তার নিজের মেয়ের জন্য এইসব জিনিস দিতে চায় যেনো তার নিজের মেয়ে একটু ভোগ করুক, তাহলে?
হাসান ভাইঃ আখতার ভাই, আমি যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি, সে যদি আমাকে ভালোবাসে, তাহলে সে আমাকে ছোট করা উচিত নয়। সে যদি মনে করে আমার পছন্দের চেয়ে তার বাবার বাড়ির জিনিস আমার সংসারে এনে উপভোগ করে সে সুখী থাকবে, তাহলে তো সে আমাকে আমার মতো করে সংসার সাজানোর সুযোগ দিলো না। সংসারে এক্তা না গাড়ি থাকা, এক্তা এসি না থাকা, বা ৪০/৭০ ইঞ্চি এল ই ডি টিভি না থাকার নাম অসুখী পরিবার নয়। অসুখী পরিবার হচ্ছে সেটা যেখানে নিজেদের পারস্পরিক সৌহার্দ না থাকে, পারস্পরিক রিস্পেক্ট না থাকে, এবং যেখানে শসুর বাড়ি থেকে কিছু পেলাম না কেনো অথবা নিজের স্ত্রীর আয় কেনো আমার হাত দিয়ে দেয় না এই সব মানসিকতার স্বামী বা তার পরিবারের মধ্যে যদি থাকে তাহলে বুঝবেন আপনি ভুল নৌকায় উঠে পড়েছেন। আর যদি আপনি নিজে কিছু দিতে চান, সেতাও হতে হবে তারা নিতে চায় কিনা তার সম্মতির উপর। আপনার আছে বলেই তারা কেনো নিবে? এটাই তো ব্যক্তিত্ব!! আমি অন্তত তাই মনে করি। আপনার মেয়েকেও এই একই প্রকার মানসিকতা থাকতে হবে যে, আমি আমার বাপের কোনো জিনিস নিয়ে কেনো শশুর বাড়ীর লোক গুলিকে ছোট করবো?
আমিঃ তাহলে আমি কখন আমার মেয়েদের সুখের জন্য আমার সম্পত্তির কিছু উপহার সুবিধা দিবো? যদি আমার কোনো সম্পত্তি বা আমার আছে সেসবের কোনো কিছুই আমার মেয়েদের কাজে না লাগেবা আমার আছে এমন জিনিসে ওদের উপভোগ ই না করে, সেক্ষেত্রে আমার এতো কিছু করে লাভ কি?
হাসান ভাইঃ আখতার ভাই, আপনি মনে হয় আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি কিন্তু মেয়েদেরকে বা মেয়েদের জামাইক দিতে না করি নাই। একটা জিনিস তো আপনি মানবেন যে, দাম্পত্য জীবন আসলে শুরু হয় বিয়ের পাচ ছয় বছর পর থেকে। যখন স্ত্রী পুরানো হয়ে যায়, তার দেহের প্রতি আর বিশেষ কোনো আকর্ষণ থাকে না। তখন ছোট খাটো জিনিস থেকেই কিন্তু বড় বড় মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। যখন এই সময়টা অবতীর্ণ হয়, তখন আপনি বুঝবেন আসম মানসিকতা গুলি কি। তখ টেস্ট হয় একচুয়ালি সম্পর্কটা কিভাবে এগোচ্ছিলো। আপনার সম্পদের উপর যদি এই সম্পরক গড়ে উঠে, তাহলে পাচ ছয় বছর ও যাবে না সম্পর্ক টা নস্ট হতে। এর আগেই আপনি টের পেয়ে যাবেন। ওয়েট করেন, দেখেন, বুঝেন, তারপর সব দিন। যেদিন দেখবেন, আপনার শরীর খারাপ হয়েছে, তারা দৌড়ে আপনার হাত ধরেছেন, যেদিন দেখবেন, আপনার বাড়ির মেহমান মানে তারা মনে করবে এটা তাদের বাড়ির মেহমান, যেদিন দেখবেন, আপনার দাওয়াতের অপেক্ষা না করে তারা আপনার বাড়িতে ডাল ভাত দিয়ে ভালো একটা সময় কাটাচ্ছে, যেদিন দেখবেন তারা সমস্যায় আছে জেনেও আপনার কাছ থেকে কোনো কিছু নিতে তাদের আত্মসম্মানে বাধছে, যেদিন দেখবেন যে আপনার কোনো ব্যক্তিগত আচরনে কষ্ট পেয়ে তারা তার প্রতিশোধ আপনার মেয়ের উপর নিচ্ছে না বা তাকে এমন কোনো কথা শুনাচ্ছে না যাতে মনে হবে যে, মেয়েটি শুধু আপনারই নয় , তাদের বউ এর আদলে তাদের নিজস্ব সদস্য, সেদিন বুঝবেন, এবার আপনার পালা তাদেরকে বুকে নিয়ে নিজের মানুষ বলে ধরে নেওয়া। ওই পর্যন্ত টেস্ট না করে যাই করবেন, হারবেন। আর একবার হেরেছেন তো আপ্নিই শুধু হারলেন, তারা নয়। আপনার দেওয়া সেই যে উদাহ র ন দিলেন, পরীক্ষা করে দেখেন যে, ওই ভদ্রলোক হয়ত এটাই করেছেন এবং শেষ তক এই টেস্টে তার একমাত্র মেয়ের জামাই এবং জামাইয়ের পরিবার টিক্তে পেরেছে বলেই আজ সেই জামাইয়ের সব নিজের হয়েছে। শশুর মহাশয় নিজেও মনে করেছে তার যোগ্য উত্তরসুরী সে পেয়েছে। আর এটাই ব্যতিক্রম আখতার ভাই।
বৃদ্ধ বয়সের আলোচনাঃ
সারাদিন আমরা একসাথে ছিলাম। খাওয়া দাওয়া করলাম। জীবন নিয়ে আরো অনেক কথাবার্তা হলো। বৃদ্ধ বয়সের কথাও আলাপ হলো।
হাসান ভাই বলতে থাকলেন, চারিদিকে যেভাবে আধুনিককালের সন্তানেরা তাদের বাবা মায়ের প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছ, তাতে এই দেশে একটা সময় আসবে, বয়স্ক মানুষের একমাত্র স্থান হবে বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রমে গেলে ওই বৃদ্ধ মানুসগুলির জীবনের কাহিনী শুনলে গা শিহরিয়া উঠে। তারা অনেকেই দেশের অত্যান্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন। কেউ সচীব, কেউ বড় বড় ব্যবসায়ী, কেউ বা আবার প্রোফেসর ইত্যাদি। তারা তাদের সন্তানদের মানুস করার জন্য আজীবন পরিশ্রম করেছেন, সম্পদ গড়েছেন, ভাগ করে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন, এখন আর সন্তানেরা তাদের জন্য কিছুই করেন না। ফলে শেষ আশ্রয়স্থল ওই যে বৃদ্ধাশ্রম।
হাসান ভাই এই বৃদ্ধ বয়সের পরিনতির রুখে দাড়ানোর একটা বেশ চমকপ্রদ কৌশল বললেন যেটা তিনি করছেন এবং করবেন। আর সে মোতাবেক তিনি তার কাজ অব্যাহত রাখছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কি সেই কৌশল?
হাসান ভাই বলতে লাগলেন,
-শোনেন আখতার ভাই, বৃদ্ধ বয়সে আপনার আসলে কি দরকার? আপনার দরকার কেউ আপনার খাবারটা সময়মত রান্না করে আপনার সামনে দিক, মেডিসিনগুলি সময়মত আপনাকে খাইয়ে দিক, বাইরে যেতে হলে একটা গাড়ি আর একজন ড্রাইভার থাকুক, রাতে শোবার সময় আপনার মশারীটা টাংগিয়ে দিক। ময়লা কাপড় চোপড়গুলি সময়মত ওয়াস করে দিক। আর এই কাজগুলি করার জন্য আপনার মাত্র গোটা তিনেক লোক হলেই হয়। একজন রান্নাকারী, একজন ড্রাইভার, একজন কাজের ছেলে যে আপনাকে সংগ দেবে সারাক্ষন। আর গোটা এই কয়জন মানুস রাখতে আপনার সর্বসাকুল্যে মাত্র হাজার বিসেক টাকা হলেই হয়। নিজের যদি একটা বাড়ি থাকে বা ফ্ল্যাট, তাহলে অনেক উত্তম। থাকার জন্য আর টেনশন করতে হয় না। এই রকম একটা আয়ের পথ খোলা রেখে অথবা তার থেকে বেশি কিছু সঞ্চয় রেখে অতঃপর সন্তানদের সম্পত্তি ভাগ করা যেতে পারে। তবে, হাসান ভাইয়ের পরিকল্পনা হচ্ছে, তিনি কোনো অবস্থাতেই তার সম্পদ তার জীবদ্দশায় তাদের সন্তানদের ভাগ করে তিনি নিঃস্ব হবেন না। তাতে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনার শামিল হবে। নিজে আয় করেছেন, নিজে ভোগ করবেন। নিজে ভোগ করার পর যদি অবশিষ্ট থাকে সেটা তার সন্তানরা তার অনুপস্থিতিতে এমনিতেই ভাগ করে নেবে। সন্তানদের উপর তিনি নির্ভরশীল হতে চান না। তার থেকে উত্তম কিছু কাজের মানুষের উপর নির্ভরশীল হওয়া। দিন কাল যা পড়েছে তাতে নিজের সন্তানদের উপর আর ভরসা করা যায় না। এই বুড়ো বয়সে এসে আপনার জীবনে সবচেয়ে ভালো বন্ধু যিনি তিনি হচ্ছেন আপনার স্ত্রী। ওই বুড়ো বয়সেও সে আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে। কারন সেও আপনার মতোই একা। আপনাকে ছাড়া তার যেমন কেউ তার পাশে নাই। সে ছাড়াও আপনার জীবনে আপনার আর কেউ নাই।
হাসান ভাইয়ের কৌশলটা আমার ভালো লেগেছে। হাসান ভাইয়ের এই কৌশলটা হয়তো অনেক মধ্যবয়সী মানুষকে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বাচিয়ে দেবে।
আমার কাছেও তাই মনে হয়েছে যে, (১) নিজের উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তানও পরের বাড়ির ছেলে যে মেয়ের জামাই হয়ে নিজের বাড়িতে আসে তার থেকে উত্তম। (২) নিজের কোনো সম্পত্তি নিজের জীবদ্দশায় ভাগ বাটোয়ারা না করাই উত্তম। (৩) আর যদি করাও হয় তাহলে এমন কিছু অংশ নিজের হাতে রাখা উচিত যা নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে। (৪) আর বৃদ্ধবয়সে একজনই সবচেয়ে কাছের বন্ধু হোক সে নিজের মতো বয়স্ক, আর সেটা হচ্ছে নিজের স্ত্রী। সেও নিজের মতোই অসহায়।
ধর্ম নিয়ে আলোচনাঃ
যেহেতু মুসলমান, ফলে আল্লাহকে বিশ্বাস করি, আর আখেরাতকেও বিশ্বাস করি। হাসান ভাই বলতে থাকলেন, আমাদের মরনের পরে আমাদের পরবর্তী জেনারেসন কিভাবে আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইবে, আদৌ চাইবে কিনা সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। আমাদের মরনের পর তারা আমাদের মনে না রাখলেও কোথায় কোথায় আমাদের সম্পত্তি আছে সেতা খুজে খুজে বের করবে। সেই সম্পদ দিয়ে হয়ত কেউ আমাদের নামে এক্তা মিলাদ ও পরাবেন কিনা তার কোনো গ্যারান্টি নাই। এই অবস্থায় সারাটি জীবন কস্ট করে সম্পদ উপার্জন করলাম, অথচ আমার নিজের জন্য আমি কিছুই নিতে পারলাম না, এটা বড় অন্যায়। তাই আমি ভাবছি-
এক্তা বৃদ্ধাশ্রম করবো যেখানে অসহায় কিছু বৃদ্ধ মানুষ বাস করবে কিন্তু তাদের খাওয়া দাওয়ার কোন কমতি থাকবে না। আরাম আয়েশের ব্যবস্থা থাকবে। নামাজ রোজা করবে, আল্লাহর কাছে তাদের প্রার্থনা করবে। আর পাশাপাশি যদি ছোট ছোট কিছু এতিম ছেলেমেয়ে থাকে যাদেরকে কোর আন হিফজু করানো হবে, হুজুর থাকবে, একটা মসজিদ থাকবে, তাতে বুড়ো মানুসগুলি ছোট ছোট বাচ্চা পাবে, আর ছোট ছোট বাচ্চাগুলি পাবে বয়স্ক মানুসগুলিকে। একটা পরিবার বনে যাবে। যেহেতু মসজিদ থাকবে, হিফজু করার সুযোগ থাকবে, ফলে ফোর ইন ওয়ান নামে একটা ভালো কাজের প্রতিস্টহান গড়ে উঠবে। এইখান থেকে যদি কোনো সওয়াব আল্লাহ দেন, তাহলে তার কিছু অংশ হলেও আমার মরনের পরে আমার কবরে যাবে। আমার সন্তান কিছু না করুক, এরাই হয়তো আমার জন্য দোয়া করবে। আর এই কাজটি করার জন্য খুব বেশি টাকা পয়সারও প্রয়োজন নাই। প্রায় লাখ পঞ্চাশেক টাকা কোনো একটা ব্যংকে ওয়াকফ করলেই ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এই কাজগুলি খুব দরদ দিয়ে আজীবনকাল করবে।
– আখতার ভাই, জীবনের অনেক তা সময় পার হয়ে গেছে। আনন্দ করার জন্য ভেবেছেন, হয়ত সময় আছে। আর এই সময় আছে করে করেই কিন্তু জীবনের প্রায় ৫০ বছর পার করে দিয়েছেন। এবার আর সময় আছে সময় আছে বলে সময় নস্ট করার কোনো অবকাশ নাই। বেরিয়ে যান নিজের বউকে নিয়ে। যেখানে খুশী। বিদেশ যেতে হবে এমন না। কোনো এক্তা গ্রামের পুকুরের পাড়ে বসে এক মুঠি বাদাম খেতে খেতে নীল আকাশ দেখুন, মাছের সাতার দেখুন। দেখবেন, বড্ড মিস্টি এই পৃথিবী। বৃষ্টিতে ভিজে গেলে সর্দি কাশি হয়ে যাবে এই বয়স আসার আগেই বৃষ্টিতে ভিজুন, দেখবেন, শরীর শীতল হয়ে আপনাকে ভালো ঘুম পাড়িয়ে দেবে।
বিকাল হয়ে এসেছে। দুজনেই ক্যাফেটেরিয়ায় নাস্তা করতে গেলাম। চারিদিকে কাচের দেওয়ালে ঘেরা একটি কাফেটেরিয়া। ভিতর থেকে সব দেখা যায়,কিন্তু বাইরের কোনো কিছুই ছোয়া যায় না। আমরা এখন একটা কাচের দেওয়াল দেওয়া ঘরে বসে দূরে নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ দেখছি। আমি ভাবছি, হাসান ভাই কোনো কথাই অযুক্তিক বলেন নাই। জিবনের মানে বুঝতে বুজতে আমরা এক সময় জীবন থেকেই হারিয়ে যাই। তখন জীবন টা কেমন করে গড়তে চেয়েছিলাম সেই অধ্যায়টা আর মনে থাকে না।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাসায় ফিরতে হবে। আমার এক্তা বাসা এখনো আছে যেখানে আমি নিজের মতো করে থাকি।
ধন্যবাদ হাসান ভাই।
মাকে নিয়ে অনেক লেখা হয়, মাকে নিয়ে হাজার হাজার কাহিনী এবং ইতিহাস রচিত হয়। পৃথিবীর সারা বুকে বিভিন্ন ভাষায় কতভাবে যে রচিত হয়েছে এই মায়ের উপর কাহিনী বা সত্য ভাষণ, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিটি ফিলিংস বা অনুভুতি একেকটা মোউলিক রচনাই বটে।
পৃথিবীর সব ভাষায় সব বাচ্চারা প্রথম যে শব্দটি শিখে তা হচ্ছে “মা” বা এর প্রতিস্থাপক কোনো শব্দ। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, সব ভাষায় এই “মা” শব্দটি প্রায় কাছাকাছি তার উচ্চারন। কোথাও মা, কোথাও মাম্মি, কোথাও আম্মু, কোথাও মাম এই রকমের। গত পরশু ছিলো “মা” দিবস। এতা একটা রুপক দিন। “মা” দিবসের কোনো দিন হয় না তার পরেও বছরেরেক্টি দিন “মা” এর জন্য উৎসর্গ করা একটি দিন। প্রানীকুলের মধ্যে সব “মা”ই এক রকমের। সেটা কোনো সিং হীর ই হোক, অথবা কোনো হরিনের কিংবা মানুষের। কোনো তফাত দেখা যায় না। কিভাবে ঈশ্বর এই মাতৃত্ব বোধ কে ঈশ্বর প্রতিটি মায়ের বুকে ছাপ মারিয়া একেবারে খাটি মা বানাইয়া দিয়াছেন তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কারো কাছে নাই।
তিনি আমার মা। মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এক ছেলের মা হয়ে বিধবা হন। খুব বড় লোকের মেয়ে নন বটে কিন্তু মাঝারী পরিবারের বনেদি ঘরের মহিলা। যেই সময়ের কথা বলছি, তখন ১৫ বছর অতিক্রম করলেই গ্রামের মধ্যে আই বুড়ি হয়ে আছে মেয়ে এই রকম একটা অপবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে যদি আবার নিয়তির কারনে কেউ এতো অল্প বয়সেই বিধবা হন, তার তো জীবনটাই যেনো কি রকম দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা জানে শুধু যে সাফার করে সে আর জানে সেই পরিবার যেই পরিবারে এটা ঘটছে।
আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। আমার মায়ের পরিবারের কাউকেই আমার মনে নাই। বরং বলতে পারেন, আমি কাউকেই দেখি নাই। আমার জন্মের আগেই সব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি না দেখেছি আমার দাদি, দাদা, নানা, বা নানি, কিংবা কোনো মামা, মামিকে। কি আজব, না? আসলেই আজব। এমন্তা কি কখনো হয়? কিন্তু হয়েছে।
আমার মা কে আমি দেখেছি যে, তিনি তার বড় বোন যার নাম সামিদা খাতুন, তাকে তিনি কতটা ভালোবাস্তেন। আর ওই খালাও আমার মাকে তার নিজের মেয়ের মতোই দেখতেন।
এতো ধৈর্য, এতো বুদ্ধিমতি আর এতো নিরহংকার মানুষ ছিলেন তিনি, যার কোন তুলনা হয় না। আমার মায়ের সারাটি জীবন কেটেছে কস্টের মধ্যে।যখন তিনি একটু সুখের মুখ দেখবেন বলে আশা করেছিলেন, তার আগেই তিনি ২০০২ সালে জান্নাত বাসি হয়েছেন।
আমার মায়ের জীবনের গল্পটা তাহলে বলিঃ
আমার বয়স যখন মাত্র দেড় কি দুই তখন আমার বাবা মারা যান। আমি আমার বাবাকে দেখি নাই, এমন কি আমাদের কারো কাছেই আমার বাবার কোনো ছবিও নাই। আমার মা যখন আমার বাবাকে বিয়ে করেন, তখন তার প্রথম পক্ষের ছেলে বিল্লাল হোসেন (ওরফে ডাঃ বেলায়েত হোসেন) কে আমাদেরই গ্রামের পাশের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পালক দিয়ে দেন। আমার মা আমার বাবার এমন একটা সংসারে পদার্পণ করেন যেখানে আমার বাবার আগের পক্ষেরই সন্তান ছিলো গোটা আট জন। তাদের সবার বয়স আমার মায়ের থেকে অধিক। এই সন্তানেরা আমার মাকে কোনদিনই আপন করে ভাবতে পারেন নাই।
আমার বাবা ছিলেন মাদবর যিনি সারাক্ষনই গ্রামের মাদবরি আর তার জমি জমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। (চলবে)
গতকাল আমার ছোট মেয়ের এসএসসি এর পরীক্ষার রেজাল্ট বাহির হইয়াছে। তো গত পরশুরাতে ওর মা খুব টেনশানে ছিলো কি ফলাফল করে মেয়ে সেটা ভাবিয়া ভাবিয়া। কিছু কিছু মানুষের টেনশন তাহার চেহারার মধ্যে একদম ফুটিয়া উঠে। তাহার মুখের অবয়ব দেখিয়া বুঝা যায় যে, শরীরের হরমুন ঠিক মতো কাজ করিতেছে না বলিয়া মুখে একটা ছাপ পড়ে। খাবার দাবারে অনীহা আসে, কথাবার্তায় খিটখিটে মেজাজ ফুটিয়া উঠে। ফোনে অধিক অধিক কথা বলে, কেউ কেউ আবার ফোন থেকেই বিরত থাকে। এইসব আর কি। আমার বউ সুন্দরী বলিয়া তাহার চোখ মুখ দেখিয়া বুঝিবার উপায় নাই সে টায়ার্ড কিনা কিন্তু সে যে টেনশনে আছে ইহা বুঝা যায়।
জিজ্ঞাসা করিলাম, খুব টেনশনে আছো নাকি? উত্তরে যা শুনিবার তাই শুনিলাম, “তোমার আবার টেনশন আছে নাকি? তোমার মতোই তো মেয়েগুলি হয়েছে। না আছে কোনো টেনশন, না আছে কোন আগ্রহ। ঐ যে বাপের মতন সব। এমতাবস্থায় আমার কি আর কিছু বলিবার আছে? এক কথাতেই তো শেষ- বাপের মতো সব অভ্যাস হইয়াছে মেয়েদের।
ঈশ্বর এইদিক দিয়া বউগুলোকে একদম নিস্পাপ করিয়া রাখিয়াছেন, সব বাচ্চাদের দোষ তো বাপের দোষ। আরে বাবা, বাচ্চাগুলিতো তার মায়েদের মতোও হইতে পারিতো, নাহ? যাক, সংসারে সুখ চাই, ঝগড়া চাই না। তারমধ্যে এখন তাহার টেনশনের মাত্রা মনে হইতেছে একটু বেশি। হাতে তসবিহ, মুখে বিড় বিড় করিয়া কোন এক দোয়া হয়তো সে পড়িতেছে। জিজ্ঞেস করিতে ভয় পাই কোন দোয়াটা পড়িতেছে। ব্যাঘাত ঘটিলে ভেজাল আছে। শান্ত থাকাই ভালো। কে খামাখা নীরব পুকুরে খামাখা ঢিল ছুড়িয়া সাপের লেজে আঘাত করে!! পরে দেখা যাইবে, শক্ত পরোটা খাইতে হইবে। এই মুহূর্তে দাত ব্যথা আছে। আমি দাতকে বেশী কস্ট দিতে চাই না। পড়ুক সে যে দোয়া পড়িলে টেনশন কমে সেটাই পড়ুক। কোনো কথা না বলে বললাম, হ্যা মেয়েগুলার আর কাজ পাইলো না। সব বাপের গুনগুলি পাইয়া বাপের সর্বনাশ করলো আর কি।
এই কথা বলিয়াও যে আমি তাহাকে খুব একটা খুশী করিতে পারিলাম সেটাও ওর মুখ দেখিয়া বুঝা গেলো না। মনে হইলো এই বুঝি নীরব আকাশ হটাত করিয়া কোন মেঘবৃষ্টি ছাড়াই গর্জন করিয়া উঠিবে। ভাগ্যিস ঈশ্বর প্রসন্ন হইয়া এই যাত্রায় আমাকে কোনো রকমে বাচাইয়া দিলেন। খুব বেশি ঝড় উঠিলো না। শুধু ঘাড় ঘুরাইয়া এমন একটা ভাব করিয়া গিন্নি অন্যরুমে পরোতা বানানোর জন্য চলিয়া গেলো তাতে বুঝিলাম, আমার শেষ কথাটিকে তিনি ব্যাঙ্গ ভাবিয়া একটু হুম করিয়াই ছাড়িয়া দিলেন। ঈশ্বর বড় রসিক। সাংসারিক জীবনে কিছু কিছু ছোট ছোট তর্ক-বিতর্ক এমন করিয়া লাগাইয়া রাখেন তাতে না ঝড় শুরু হয়, না অশান্তি। একটু ঘূর্ণিপাক খাইয়াই আবার পরিবেশ ঠান্ডা করিয়া দেন। যাই হোক, আমি গর্বিত যে, বাচ্চারা আমার জিদ, আমার সভাব পেয়েছে। আলসেমীটাও পেয়েছে ঠিক আমার মতোই।
তো মেয়েকে জিজ্ঞেস করিলাম, মা, তোমারো কি ফলাফলের জন্য টেনশন হচ্ছে? মেয়ের উত্তর- বাবা, আমার তো কিছুই মনে হচ্ছে না। আর টেনসন করে এখন কি আর কিছু করতে পারবো? বললাম, তাতো ঠিকই কিন্তু পরীক্ষার আগেও তুমি টেনশনে ছিলা না, এমন কি পরীক্ষা চলাকালীন সময়েও তো আমি বুঝি নাই যে, তুমি একজন পরীক্ষার্থী। মেয়ে মুচকি হাসি দিয়া বলিলো, চলো, ক্রাইম পেট্রোল দেখি। ও জানে আমি ক্রাইম পেট্রোল দেখিতে খুব পছন্দ করি। এই হলো আজকের দিনের যেনারেসন। এই সময়ের জেনারেশন কতটা ইন্টেলেকচুয়াল যাহারা তাহাদের হ্যান্ডেল করেনা, তাহাদের কোনো আইডিয়া নাই। তাহাদের কাছে কোনো পরামর্শ চাইলে তাহার আপনাকে দুই যুগ আগের কোনো এক পুরানো পরামর্শ দিয়া আপনাকে এমন এক ফন্দি দিয়া বিপদের মধ্যে ফেলিবে, যে, তখন না আপনি সমস্যা হইতে বাহির হইতে পারিবেন, না বুঝিতে পারিবেন আরো কোনো বিপদ ঘনাইয়া আসিলো কিনা। তাই যদি পরামর্শ নিতে হয়, আমার কাছ হইতে নিবেন। এই জাতীয় পরামর্শ আমি বিনা পয়সায় দিয়া থাকি। কাজ হইলে জানাইয়া দিবেন, কাজ না হইলে দিতিয়বার আর আসিবেন না।
যাক, ফলাফল দিলো। আমার বউই আমাকে প্রথম খবরটা দিলো যে, মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। ফোনে তার কথার সুরেই বুঝিতে পারিলাম, সে এক প্রশান্তিতে আছে। এই সকালেও যিনি আবহাওয়ার ১০ নম্বর বিপদ সংকেতের মতো রুপ ধারন করিয়াছিলেন, কোনো রুপ তান্ডব ছাড়াই মনে হইলো, হ্যা, আকাশ বড় পরিস্কার। সমস্ত ঝড় আর কালোমেঘ সব কোথায় কোন অঞ্চলে উড়িয়া চলিয়া গিয়াছে বুঝিতেই পারিলাম না। আমার বউ বড় খুশী। বলিলাম, খুব খুশী মনে হইতেছে তোমায়? এবার তার আরো চমকপ্রদ উত্তরে আমি ফোনের এপ্রান্তে বসিয়া হাসি। “তোমার তো কোনো সাধ আহ্লাদই নাই, মেয়ে এতো ভালো ফলাফল করিলো , কই তুমি মেয়েটাকে একটা ধন্যবাদ দিবা, তা না করিয়া ফোনে বকর বকর করিতেছো। আরে বাবা, আমি আবার কখন ফোনে বকর বকর করিলাম? মাত্রতো ফোন শুরু হইল!! বুঝলাম, এবার আর বাপের মতো হইয়াছে মেয়েগুলি এইটা অন্তত শুনিতে হইবে না। তাহার প্রশান্ত হাসিতেই আমার মন ভালো হইয়া গেলো। হাতের পাশে বেনসন সিগারেটের প্যাকেট হইতে একটা আস্ত সিগারেট লইয়া তার মাথায় আগুন ধরাইয়া নাসিকা ভর্তি ধোয়া ছাড়িয়া বউকে বলিলাম, দাও , মেয়েকে দাও। একটু কথা বলি।
মেয়ে মোট নম্বর পেয়েছে ১৩০০ মধ্যে ১১৭৪। কম না কিন্তু? প্রায় গড় নম্বর ৯০.৩১%। এই নম্বরে আমাদের সময় বোর্ডে স্ট্যান্ড করতো ছাত্র-ছাত্রীরা। তখন বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ছাত্রদেরকে পাড়ার লোকজন নিজেরাই মিষ্টি নিয়ে এসে গালে হাত বুলিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে যেতো। যারা পরবর্তী বছরের ছাত্রদের অভিভাবক, তারা হয়তো একটু বলেও যেতো, আমার বাচ্চাটাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেবো, একটু গাইড লাইন দিয়ে দিও কেমন করে ভালো ফলাফল করতে হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আজ আর এইসব নাই। আজকাল অভিভাবকগন খবর নেয়, কোথায় কোচিং করিয়েছেন, কোন স্যার কোচিং এ ভালো। কোচিং হয়ে গেছে এখন একটা লাভজনক ব্যবসা।
চলুন একটা কোচিং এর স্কুল দিয়া দুইটাই লাভ করি। নাম এবং অর্থ। কে বলিলো যে, এই দেশে ব্যবসা নাই? কোচিং এর থেকে ভালো ব্যবসা তাও আবার বিনা পুজিতে, আর একটাও নাই।
কেন জানি মাঝে মাঝে মনে হয় আমি শুধু ঠকি। ঠকাই যেনো আমার কাজ। আমি কেনো মানুষ কে ঠকাতে পারি না? আমি কেনো সবার মতো এতো কঠিন হতে পারি না? যেই কঠিন হতে চাই, তখনই মনে হয়, আহা, থাকনা, কি হবে যদি আমিই কিছু ছাড় দেই? আর এই ছাড় দেওয়াটাতেই মানুষ
আবারো চলে এলাম থানচিতে। এবার পরিবার নিয়ে নয়, আমি আর মুর্তজা ভাই। জানজটের শহরের ভ্রমনের সময় যেভাবে জানজটের কারনে সময় নষ্ট হয়, সেটা এবার হয় নাই। বিকেল সাড়ে চারতায় বাংলাদেশ বিমানে সোজা চলে এলাম শাহ আমানত ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। মাত্র ৩০/৩৫ মিনিট লাগলো। সন্ধ্যার আগেই চট্টগ্রাম।
আমাদের সাথে আরেক বন্ধু যোগ হয়েছিলো এয়ারপোরট থেকে। এই তিনজনে মিলে একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে সোজা চলে এলাম বান্দরবান। পথে হোটেল হিল ভিউ ম্যানেজারকে ফোন করে একটা রুম নিয়ে নিলাম। মোটামূটি রাত নটার আগেই হোটেলে ঢোকে গেলাম। তিনজন মিলে খাওয়া দাওয়া করে পায়ে হেটে আশেপাশের জায়গা গুলি দেখলাম। বড্ড সুন্দর রাতে বান্দরবান।
পরদিন আমরা সবাই আরেকটা প্রাইভেট কার নিয়ে সোজা চলে গেলাম নীলগিরিতে। এবার আমার দেখার সাধ ছিলো থানচি আর বড় পাথর এলাকা। নীলগিড়িতে আমরা সবাই মোটামুটি কয়েকঘন্টা সময় কাটালাম। মুর্তজা ভাইয়ের এটাই প্রথম আসা নীলগিড়িতে। ঊনিও খুব পছন্দ করছিলেন জায়গাগুলি। যেহেতু আমাদের গন্তব্য স্থান ছিলো থানচি, তাই বেশীক্ষন দেরী করার অবকাশ ছিলো না। দুপুরের আগেই আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম থানচির উদ্দেশ্যে।
পথে বলিপাড়া ক্যাম্প বা জোন যেটাই বলি না কেন, সেখানে কর্নেল হাবীবের সাথে একসাথে নাস্তা করলাম। শুক্রবার ছিলো বিধায় হাবীবের ব্যাতালিয়ানে জুম্মার নামাজটা পড়লাম। অতপর আবার থানচির উদ্ধেস্য যাত্রা।
থানচি পৌঁছলাম প্রায় বিকালের দিকে। বিজিবি অবকাশ রিসোর্ট। খুব সুন্দর। আমাদের জন্য কর্নেল হাবীব আগে থেকেই তার অধিনে বিজিবি অবকাশে আমাদের জন্য রুম রেখে দিয়েছিলো। অনেকদিন পর মেসে থাকা। বেশী দেরি করলাম না। ওখানকার হেডম্যান, কারবারিকে সাথে নিলাম। আশ্রাফ ভাই সাথে ছিলেন। সবাইকে ঊনি চিনেন এবং সবাইও ঊনাকে চিনে। দারুন মানুষ আশ্রাফ ভাই। চলে গেলাম ডিম পাহাড়ে, মুন পাহাড়ে। ভীসন উচু একটা পাহাড়। গাড়ি উঠতে বুঝা যায় কি পরিমান শক্তির দরকার এইসব ডিম পাহাড়ে উঠার জন্য। প্রায় সন্ধ্যার দিকে ফিরে এলাম। অনেক বৃষ্টি হলো। থানচিতে এই বছরে নাকি এটাই প্রথম বৃষ্টি।
পরের দিন খুব ভোরে আমরা সবাই বড় পাথর এলাকায় রওয়ানা হলাম। বিজিবির সৈনিকগন সাথে ছিলো। আমার জীবনে এতো বড় বড় পাথর আর কখনো দেখি নাই। কোনো কোনো পাথরকে আদিবাসিরা রাজা পাথর, কোনো কোনো পাথরকে তারা রানী পাথর হিসাবেও পুজা করে। বড় পাথর এলাকায় গিয়ে ওখানে এক আদিবাসির দোকানে গরম গরম ভাত, আর সাঙ্গু নদীর তাজা মাছের ঝোল দিয়ে নাস্তা করলাম।
গত ২৬ মার্চ ২০১৮ তারিখ থেকে আমি আমার পুরু পরিবার নিয়ে কক্সবাজার, হিমছড়ি, নাইক্ষংছড়ি, আলিকদম, ফসিয়াখালি, বান্দরবান, বে ওয়াচ বিচ, ইনানী বিচ, স্বর্ণ মন্দির, ১০০ ফুট বৌদ্ধ মূর্তি, সাঙ্গু নদি ভ্রমন, নীলগিরি, মেঘলা, নীলাচল, শইল্ল্যকুপা ঘুরে এলাম। প্রায় ২৮ বছর পর আমি আবার হিল ট্র্যাক্স এলাকায় গেলাম। আমার কাছে প্রতিটি জিনিষ নতুন মনে হচ্ছিলো।
একটা সময় নব্বই এর দশকে আমরা যখন হিলে চাকুরী করতাম, তখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হেটে হেটে পেট্রোলিং করে করে যেতাম। হোক সেটা ছুটির জন্য নেমে আসা, অথবা ছুটি থেকে আবার ক্যাম্পে যাওয়া, অথবা খাবারের রেশন আনা। এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যেতে সময় লাগতো প্রায় ছয় সাত দিন। ২০/২৫ জনের একটা পেট্রোল নিয়ে অস্ত্র হাতে অতি সন্তর্পণে প্রান বাচিয়ে বাচিয়ে ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যেতে হতো। একদিকে মশার কামড়, ম্যালেরিয়ার ভয়, আরেক দিকে শান্তি বাহিনীর অতর্কিত হামলার ভয়। খুব সহজ ছিলো না জীবন। অথচ আজ এবার গিয়ে দেখলাম, প্রতিটি জায়গায় গাড়ি যায়। স্থানে স্থানে বিশাল আকারের রিসোর্ট হয়ে গেছে। মানুষ এখন হিলে যায় সময় কাটাতে, আনন্দ করতে, ফুর্তি করতে। আর আমাদের সময় আমরা প্রতিদিন আতংকে কাটিয়েছি কখন শান্তি বাহিনীর সাথে আমাদের গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। কে কখন জীবন না নিয়ে ফিরে আসে এই ভয়ে।
সময় কি জিনিষ। সব কিছুর সাক্ষী। সময় পালটে দেয় যুগ, যুগ পালটে দেয় মানুষ, মানুষ পালটে দেয় সভ্যতা। আর সব কিছুই হচ্ছে ইতিহাস। আমি যেনো সেই আদিম কালের সভ্যতার সাথে বর্তমান কালের সভ্যতাটাকে তুলনা করছিলাম আর অবাক হচ্ছিলাম। যে পথ দিয়ে আমার শরীরের ঘাম ঝরেছে হেটে হেটে, সেই পথ এখন পিচ ঢালা। যে পথে যেতে আমি সর্বদা আমার ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে পার হয়েছি, কোনো লোকারন্য ছিলো না, মানুষ জনের চলাচল ছিলো না, সেখানে এখানে নতুন টেকনোলজি এসেছে, নতুন সভ্যতা এসেছে, মানুষের কোলাহলের সেস্নাই। এখানে জীবন আর আগের মতো নাই। এসি বাস চলে, বিদ্যুৎ আছে, নানা রকমের ফল মুল অনায়াসেই পাওয়া যায়, যখন তখন বের হওয়া যায়, কি অদ্ভুত পরিবর্তন। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগের তোলা ছবির সাথে আজকে তোলা ছবির কতইনা তফাত অথচ জায়গাটা এক, গাছগুলিও এক, পাহাড়গুলিও এক। যে ঝর্নাটা আজ থেকে ৩০ বছর আগেও যেভাবে পানির ধারা প্রবাহিত করতো, সেই একই ঝর্নাটা আগের মতোই পানির ফোয়ারা দিয়ে যাচ্ছে। যে মেঘ মালা পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে এক স্থান্থেকে উরে উরে আরেক পাহাড়ের গায়ে গিয়ে থমকে যেতো, সেই এক ই মেঘের ভেলা আজো সেই রকম করেই আক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে থমকে যাচ্ছে, কিন্তু আগে সেই নিঃশব্দে বহমান ঝর্নার পানি, অথবা মেঘের সেই অদ্ভুত পাগ লামী যার অপূর্ব শোভা দেখার কেউ ছিলো না, আজ হাজার হাজার দর্শনার্থী ঐ ঝর্নার পাশে, ঐ পাহাড়ের মেঘের সাথে কতইনা অঙ্গভঙ্গি করে স্মৃতি করে রাখছে। ঝরনার মধ্যেও যেনো একটা প্রান এসেছে। আজো মশারা আছে, হয়তো আমার মতো সেইসব জোয়ান মশারা আজকে বুড়ো হয়ে শেষ হয়ে গেছে, তাদের কাছেও হয়ত পাহাড় আর আগের মতো নাই। অনেক মানুষের গায়ে তারা তাদের ইতিহাস লিখে দিচ্ছে।
একটা সময় ছিলো, হাতে গোনা কিছু মানুষ এই অঞ্চলে ঘোরাফেরা করতো, তাও আবার সেনাবাহিনীর সহায়তায় যারা কাজ করতো তারা। অথচ এখন বড় বড় বিজনেসম্যান, চাকুরীজীবি, সবাই পরিবারসহ নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কত হোটেল হয়েছে, রিসোর্ট হয়েছে, রেস্টুরেন্ট হয়েছে, কত যে গাড়ি চলাচল করছে তার কোনো ইয়াত্তা নাই। আর এর মাঝখানে আমার বয়স পার হয়ে গেছে আরো ৩০ বছর। নতুন কমান্ডারগন এসেছে, নতুন জোয়ানরা এসেছে, তাদের হাতে এখন আর আগের দিনের অস্ত্র থাকে না, থাকে আধুনিক কালের টেকনোলজি। তারা তাদের আপন জনের কাছ থেকে দূরে নয়। নিমিষেই সবাই সবার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। অথচ আমরা আজ থেকে ৩০ বছর আগে কিছুই করতেপারতাম না। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে একদিনের লেখা চিঠি পনেরো দিন পরে হয়তো পেতাম। জরুরী কোনো ব্যাপারে যখন আমাদের কাছে আপনজনেরা চিঠি পাঠাত, তখন ইতিমধ্যে ব্যাপারটা তার জরুরীতা হারিয়ে ফেলেছে। তাতে কত লোকের যে প্রান হানী হয়েছে, কত সম্পদ যে হাত ছাড়া হয়ে গেছে, কত জীবন যে কত কষ্টে লালিত হয়েছে তার কোনো হিসাব নাই। এখানে এখন রাজনীতি ঢোকে গেছে, মানুষ অধিকারের কথা বলে, সাম্যের কথা বলে, একজন আরেক জনের কথা শুনে। এখানে এখন আদিবাসি, বা পাহাড়ি বা বাঙালি সব এক সমাজের। এখন আর এক সেনাবাহিনির কোন সদস্যকে দেখে কোনো পাহাড়ি যেমন ভয় পায় না, তেমনি কোন সেনাবাহিনীর সদস্য ও কোনো পাহাড়িকে দেখে আতংকের মধ্যে থাকে না। ভালো লেগেছে দেখে ব্যাপারটা। ইতিহাস যখন বদলায়, মানুষ তখন ইতিহাসের সাথেই বদলায়। আমি এতো বছর পর এসে ইতিহাস বদলের পালাটা দেখলাম। হয়ত অনেকেই বিশ্বাস করবে না আজ থেকে ৩০ বছর আগের সেই পরিস্থিতি, সেই ইতিহাস। আলম গীর টিলা কেনো নাম হলো, লুকু পাহার কেনো নাম দেওয়া হলো, এই ইতিহাস এখন শুধু ইতিহাস। কিন্তু আমরা যারা ঐ সময় ছিলাম, তখন হৃদয়ের অন্তরস্থল থেকে কি পরিমান রক্ত ঝরেছিলো তার সাক্ষী কেবল আমরা। দেশ স্বাধীন হয়, অধিকার আদায় হয়, কিন্তু যারা এই স্বাধীনতার জন্য প্রান দেয়, এই অধিকারের জন্য রক্ত দেয়, তারা শুধু দিয়েই যায়। তাদেরকে কেউ মনে রাখে না। হয়ত বার্ষিকী পুজা হয় কিন্তু তার অবদানের কথা কেউ মনে রেখে তার ফেলে যাওয়া পরিবারকে কেউ বুকে টেনে নেয় না। এটাই ইতিহাস। যাই হোক…
আমার মেয়েরা, আমার স্ত্রী পুরু ভ্রমনটা আনন্দ করেছে পাহাড়ের সুন্দরতম দৃশ্যগুলি দেখে দেখে। আর আমি আনন্দ করেছি সময়ের স্রোতে পেরিয়ে যাওয়া সময়ের সাথে বর্তমান হিলের সুন্দরতম দৃশ্যগুলি যা আগের মতোই হয়ত আছে কিন্তু এর যে সৌন্দর্যটা ছিলো যা কখনো আগে দেখার সুযোগ হয় নাই, সেটা দেখে দেখে। তুলনা করে করে। নস্টালজিক হয়ে যেতাম মাঝে মাঝে। যে মেঘ একবার আমাকে আলিঙ্গন করেছিলো আজ থেকে ৩০ বছর আগে, হয়ত সেই মেঘ এতোদিন পর তার সেই পুরানো বাসিন্দাকে পেয়ে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আমাকে ভিজিয়ে দিয়েছে। আমার চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে, আমার গায়ের গন্ধ শুকে নিয়েছে। যে পাহাড়ের পাশ দিয়ে আমি নিরবিক পথিকের মতো ধুরু ধুরু মন নিয়ে গোটা বিশেক জোয়ান নিয়ে রাতের কোনো এক আধারে হেটে গিয়েছি, ঘাম ঝরিয়েছি, হয়ত সেই ঝরানো ঘামের গন্ধে পাহাড় গুলি তার পুরানো সেই অতিথিকে চিনে নিতে পেরেছে। দুপাশের ভগ্ন পাহাড়ের পাথর গুলি হয়তো আমাকে স্থিত ভাবে দেখে দেখে চিৎকার করে বলেও থাকবে, “এতোদিন কোথায় ছিলেন”?।
বয়স হয়ে গেছে, তাই উঠতি বয়সের মেয়েদের সাথে আমার হাটাহাটি হয়ত অনেক ধীর গতি ছিলো কিন্তু চেষ্টা করেছি পুরু সময়টা ওদেরকে দিতে। ওরা কখনো এই পাহাড়তা বেশী সুন্দর, দৌড়ে চলে গেছে ক্যামেরা নিয়ে। ছবি তুল্বে। কখনো বলেছে, বাবা, দেখো, ঐ পাহাড়তা আরো সুন্দর। আমি শুধু হাসি। আর বলি, সব পাহাড় সুন্দর মা। সবগুলি পাহাড় আমার বন্ধুর মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে যার যার জায়গায়। আজ এতো বছর পর মনে হলো, পাহাড়্গুলি আমাকে দেখছে আর আনন্দে উদ্বেলিত হচ্ছে। অথচ এই পাহাড় গুলিই একদিন আমার কাছে কতই না বিরক্তিকর ছিলো। ভয়ানক আতংকের মতো ছিলো। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে, আমি ওদের অনেক আপন জন। পাহাড় আমাকে ডাকে, পাহাড় আমাকে শুভেচ্ছা দেয়। মেঘের আভায় আমার চোখ ভিজে যায়। কোনটা জল আর কোনটা অশ্রু, সব এক হয়ে যায়। ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ি কোনো এক পাহাড়ের ঢালুতে, বড় আপন মনে হয়।
আমার পরিবার বেশ আনন্দ করেছে। আর এই আনন্দের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিয়েছে আরো বেশী আমার খুব কাছের বন্ধু মেজর জেনারেল মাকসুদ। প্রথম দিন থেকেই মাকসুদ তার নিজের পাজেরো গাড়িটা আমাদের জন্য স্পেয়ার করে দিয়েছে যেনো যেখানে খুশী যেতে পারি, সাথে ছিলো সেনাবাহিনীর কিছু লোক। অসম্ভব আপ্যায়ন করেছে আমার দোস্ত। জেনারেল মাকসুদ বর্তমানে ১০ ডিভিশনের জিওসি। ওর এডিসি ক্যাপ্টেন গালিব খুব অমায়িক ছেলে। ভালো লেগেছে। মাক সুদের মতো জেনারেলের কাছে গালিবের অনেক কিছু শিখার যেমন আছে, তেমনি, গালিব একটা চৌকস জেনারেলের সাথে আছে বলে সে একটা গার্জিয়ানও পেয়েছে।
নীলগিরিতে গেলাম। ওখানে আকাশ আর পাহাড় এক সাথে খেলা করে। দিনের নীল গিড়ি আর রাতের নীল গিরি এক নয়। মেঘেরা শরীর ছুয়ে যায়, রঙ ধনুরা তার সব কটি রঙ মেলে ধরে ময়ুরের মতো পেখম মেলে অভিনন্দন জানায়। বড্ড মিষ্টি মনে হয় তখঞ্জীবন টাকে। মনে হয়, এতো অল্প সময় নিয়ে কেউ পৃথিবীতে আসে? নীল গিরিতে একদিকে আকাশ, আরেকদিকে দূরে সাগরের প্রবাহমান দৃশ্য, আর তার উপরে বিশাল আকাশ যেনো ছাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে। এক সময় এই নীল গিরিতে আসার কথা মনে হলে মনে আতংক আর শারীরিক পরিশ্রমের কাস্টে মাথা ব্যথা করতো, অথচ আজ হাজার হাজার মানুষ কয়েক ঘন্তার জন্য সেই বান্দরবান থেকে গাড়িতে করে এসে আবার ফিরেও যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার রাত্রিজাপন ও করছে নিমিষেই।
এই নীল গিরিতে এসে দেখা হয়েছে একজন চমৎকার মানুষের সাথে। তার নাম আশ্রাফ ভাই। অনেক আলাপ করলাম, মজা করলাম। তিনি আর্মির কন্সট্রাক্সন কাজগুলি করেন। খুব ক্রিয়েটিভ মানুষ এবং অনেক মিশুক মানুষ। সমাজ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হলো তার সাথে, সাথে সাথে এই হিলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলাপ হলো। আমাদের থাকার জায়গা ছিলো নীল গিরিতে, কিন্তু আল তাফ সাহেব যিনি অনেক পুরানো সৈনিক, কিছুতেই আমাকে অন্য কোনো রুমে থাকতে দেবেন না। খুব পরিস্কার মানুষ মনের দিক থেকে। এরাই সেনাবাহিনীর সেই প্রাথমিক সময়ের সব কিছুর সাক্ষী। তিনি আমাকে এবং আমার পরিবার কে ভি আই পি রুম, “মেঘদূত” বরাদ্দ করে দিলেন। অত্যান্ত ভালো একটা কটেজ। মাঝে মাঝে প্রধান মন্ত্রি, প্রেসিডেন্ট সাহেব এই কটেজে থাকেন। রাত ভরে পরিবারকে নিয়ে নীল গিরির সেই মেঘ, আলোছায়া, আর শীতল বাতাস আমাদের সবাইকে বড্ড আপন করে নিলো। আমার ছোত মেয়ের কত যে আবিস্কারের পালা। মেঘের মধ্যে তার ছায়া পড়া, লাইটের মধ্যে তার রঙ ধনুর মেলা, সব কিছুই যেনো তার কাছে নতুন নতুন আবিস্কার।
আমার পরিবারকে নিয়ে থানছি এবং ডিম পাহাড়, মুন পাহাড় দেখার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু সময়ের অভাবে আর ওইদিকে যাওয়া হলো না। থানচিতে জোন কমান্দার হিসাবে আছেন লেঃ কঃ হাবিব। থানচি শব্দের অর্থ হচ্ছে ডোন্ট গো। আর যেও না। অর্থাৎ এটাই বাংলাদেশের শেষ উপজেলা এবং শেষ গ্রাম। জোন কমান্দার লেঃ কঃ হাবীব আমাদের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছেলে। শেষমেস নীলগিরি থেকে ব্যাক করে বান্দরবানে এসে রাতের বেলায় সোজা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম।
আমি জানি যেদিন আমি বুড়ো হয়ে যাবো, আমি জানি সেদিন আমাকে একাই সব কাজ করতে হবে। সিড়ি বেয়ে অতি ধীরে ধীরে একাই আমাকে পায়ে পায়ে আমার ছোট সেই ঘরে এসে পৌঁছতে হবে। আমার যখন পানির পিপাসা লাগবে, তখন জানি আমাকেই হেটে হেটে খাওয়ার টেবিলে গিয়ে কাপা কাপা হাতে পানির জগ থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পান করতে হবে। অতি বয়সের কারনে এমনো হতে পারে হাতের গ্লাসটি নীচে পরে ভেঙ্গেও যেতে পারে। ভাঙ্গা কাচ পরিস্কার করার কোন লোকও হয়ত কাছে থাকবে না। আমাকেই রান্না ঘরের কোনো এক কোনা থেকে খুজে খুজে ঝাড়ুটি খুজে বের করে আস্তে আস্তে ঝাড়ু দিয়ে ভাঙ্গা কাচগুলি পরিস্কার করতে হবে।
আমি জানি, আমার সাথে গল্প করার কোন মানুষও হয়ত থাকবে না। কে বুড়ো মানুষদের সাথে বসে গল্প করে বলো? সরাজীবন যাদেরকে মানুষ করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছি, যাদের সুখের জন্য আমার সমস্ত সুখ, আমার সমস্ত আরাম আয়েশ বিসর্জন দিয়ে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন ব্যস্ত থেকেছি, তারাও আজকে আমার পাশে এসে একটু সময় ব্যয় করে বলবে না, চলো তোমার হাত ধরে ধরে তোমাকে শিশু পার্ক দেখিয়ে নিয়ে আসি, অথবা বলবে না, চলো কোথাও একটু ঘুরে আসি।
যদি আমি আমার সন্তানদের এই কথাগুলি বলতে পারতাম-
দেখো, বুড়ো হয়ে যাবার পর আমি যদি আর তোমাদের মতো করে চলতে না পারি, আমার উপর তোমরা একটু সদয় হইও। যদি বলতে পারতাম, কখনো যদি তোমরা আমাকে কয়েকবার ডাকাডাকি করার পরও শুনতে না পাই, আমার প্রতি তোমরা একটু সদয় হইও কারন আমার হয়ত শ্রবন শক্তি লোপ পেয়েছে।
আমি জানি, তোমরা আমাকে হয়তো উপহাস করছো না কিন্তু আমার তো আর সেই আগের মতো শক্তি নাই যাতে আমি তোমাদের মতো করে সব কিছু করতে পারবো। আমি যেদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঈশ্বরের দেখা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবো, তখন্তোম্রা আমার পাশে এক্তূ থেকো।
আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। আমি প্রথম এবং শেষবারের মতো যেদিন ঈশ্বরের সাথে দেখা করবো, সেদিন আমি ইসসরের কানে কানে এই কথাটিই বলবো যেনো ঈশ্বর তোমাদেরকে মঙ্গল করেন।
আমি আসলেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।
আমার ছোট মেয়ের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে। একটা জিনিষ আমি লক্ষ করছি যে, কনিকা কোনো কিছুতেই টেনশানে থাকে না। সবাই যেখানে পরীক্ষার টেনশানে বিভোর, কনিকা এখনো পড়তে বসলে তার টেবিলের চারিদিকে পুতুল, ছোট ছোট খেলনা, কিংবা তার আইপড অথবা নেইল কাটারের সেট অথবা ছোট কোন এক সুন্দর বোতলের ক্যাপ ইত্যাদি সাজিয়েই বসে। মনোযোগ দিয়ে পড়ে কিনা তাও আমি জানি না।
পরীক্ষার একদিন আগে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাল থেকে তো তোর মেট্রিক পরীক্ষা। সে মুচকী হেসে দিয়ে বল্লো, হুম, কিন্তু ২২ তারিখে তো শেষ। কি অবাক। সে শেষ কবে সেটা নিয়ে খুশী। এটাই হচ্ছে কনিকা। অথচ আমার বড় মেয়ে উম্মিকা, তার পরীক্ষার আগে বা সপ্তাহে ঘুম হারাম, খাওয়া দাওয়াও কমে যায়। সে এখন ডাক্তারী পড়ছে। এখনো সে পরীক্ষার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। মাশআল্লাহ সে ভালো করছে এটাই আমার প্রাপ্য।
একচুয়ালী আমার মেয়েদের থেকে সবচেয়ে বেশি টেনসনে থাকে ওদের মা। সারাক্ষন নামাজে থাকে, দোয়াদরুদ পড়ে। এবার দেখলাম, এক হুজুরকে ডেকে সে আমার ছোট মেয়ের কলমে দোয়া পরিয়ে দিচ্ছে। সারাদিন টেনসনে থাকে, মনে হয় পরীক্ষাটা ওই দিচ্ছে।
কনিকার জন্মের সময় আমি ওর ব্যাপারে একটা লেখা লিখেছিলাম আমার ডায়েরীতে। সেই মেয়েটা আজ পরীক্ষা দিচ্ছে এসএসসি। তাহলে, আজ আমি ওই ডায়েরীর পাতাটা এখানে যোগ করি কি লিখেছিলাম।
আমার ছোট মেয়ে, সানজিদা তাবাসসুম কনিকা। দেখতে দেখতেই বড় হয়ে গেলো মাশাল্লাহ। আজ ওর এসএসসি পরিক্ষার ১ম দিন। পরিক্ষার ব্যাপারে ওর কখনোই কোনো টেনশন ছিল না। কিন্ত গতকাল রাতেই দেখলাম যে, সে একটু টেনশনে আছে।
বললাম, কাল থেকে তোমার পরিক্ষা শুরু। ও হাসতে হাসতে বল্লো, ২২ তারিখে তো সেস। এই হল তার ফিলিংস।
বেশ কয়েকাস যাবত প্রতিনিয়ত খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একদিকে ব্যবসা একদম ভাল যাচ্ছেনা, অন্য দিকে বড় বড় লোনের চাপ, আবার একদিকে প্রায় প্রতিনিয়ত পরিচিত কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন এবং খারাপ খারাপ অসুস্থতার খবর পাচ্ছি।
গত ৮ ডিসেম্বর মারা গেলেন নুরজাহান আপা, তার একমাস পর মারা গেলেন বেলি আপা, গত শুক্রবারে মারা গেলো আমার আসার তিন তলার পাপ্পু স্যারের মা, এদিকে নাসির দুলাভাই ল্যানিটিস প্লাস্টিকায় ভুগছেন, যে কোনো সময় মারা যাবেন। আজ মারা গেলেন বদি ভাই।
কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বড় ভাই হাবিব ভাই ওপেন হারট সারজারি করিয়েছেন, দুই তিন মাস আগে আমি নিজে দুটু রিং পড়েছি ব্লকের কারনে।
সড়ক ও জনপথ আমাদের গার্মেন্টস এর বিল্ডিং ভাংগার কারনে বায়ারদের এবং একরডের কাছে খুব চাপে আছি। মুর্তজা ভাইয়ের শরিরও খুব ভাল না।
আমারো মরনের ভয় চেপে আছে মাথায় অথচ লোনের চাপ কমাতে পারছি না। যদি মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রি হয় জমিজমা সহ, মান্নানকে যে রেটটা দিয়েছি, সেটা যদি হয় তাহলে সব কিছু পরিশোধ করে আমার হাতে কিছু ক্যাশ টাকা থাকবে, ভাবছি, ইনশাল্লাহ মিতুলকে নিয়ে ওমরা করতে যাবো। আল্লাহর ঘরে গিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবো যে, আমাকে যেনো আর পরিক্ষার মধ্যে না ফেলেন। আমি পরিক্ষায় পাশ করার ক্ষমতা রাখি না।
মুর্তজা ভাই নিজেও চেষ্টা করছেন একা একা কোনো ব্যবসা করতে। আমি নিজেও জানিনা, মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রির পরে আর কোনো সাধিন ব্যবসা করতে পারবো কিনা। যদি করি এবার, এমন একটা ব্যবসা ধরতে হবে যেটা আমি নিজে তদারকি করে চালাতে পারি।
ভাবছি, শেয়ারের ব্যবসা করবো কিনা। কিন্তু এদেশে শেয়ারের ব্যবসাও বেশি ভাল নয়। আসলে এদেশে কোনো কিছুই ভাল নয়। তারপরেও হয়ত লাখ দশেক টাকায় যে ব্যবসা করা যায় সেটা একবার চেষ্টা করবো। গার্মেন্টস যতোদিন ইকুরিয়ায় আছে, ততোদিন হয়ত একটা অফিস থাকবে, তারপর আমি নিজেও জানিনা কি করবো। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।
বড্ড মন খারাপ হচ্ছে আজ। আমি সব সময় মানুষ চিনতে শুধু ভুলই করি। যাকেই আপন মনে করি, সেইই আমাকে ঠকিয়ে গেছে। সেটা মোহসিন থেকে শুরু করে তারিক, রানা, মুবীন, রউফ কিংবা আমার বর্তমান পার্টনার অবধি। আমি যদি একটু সতর্ক হতাম, তাহলে আমি যে টাকা পয়সা আয় করেছিলাম, সেটা ভুল পথে কিংবা অতি উদাশিন না হতাম, তাহলে আজ আমার হাতে কম করেও হলে কয়েক কোটি টাকা ক্যাশ থেকে যেতো। যাই হোক, এবার আর নয়, ব্যবসা যেটুকু আছে, এখন আমাকে সেখানেই থামা দরকার। কাউকেই আর বিসসাস করা মানে আমার হাত শুন্য হয়ে যাওয়া। এটা আর করা যাবে না। মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রি করে দিচ্ছি। এই সম্পদ থেকে যেটুকু পাবো, সেটা এবার হবে ক্যাশ ডিপোজিট। আর কোনো ব্যবসা নয়। আজ আমার আরেক প্রকারের অভিজ্ঞতার জন্ম হলো। মুর্তজা ভাই আমাকে বললেন যে, রিভার সাইডের সেকেন্ড ইউনিট করতে চান কিন্তু একা। অথচ আমি লোনের ভাগিদার অথচ শেয়ারের ভাগিদার নই। একটু অবাক হয়েছি। আমি অবশ্য ঊনাকে বলেছি যে, এটা কি যুক্তিযুক্ত কিনা। আমি বুঝতেছি যে, ঊনি আর আমার সাথে ব্যবসা করতে চাচ্ছেন না। আমিই হয়ত একটু ব্যতিক্রম। দেখি, আমি যদি মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রি করার পর যদি দেখি যে, হাবীব ভাইয়ের লোন, সোনালি ব্যাংকের লোন, রানাদের টাকা এবং অন্যান্য লোন সেস হয়ে যায়, তাহলে আমি ধীরে ধীরে রিভারসাইড থেকেও আস্তে আস্তে সরে যাবো। আমি জানি যে, যে মুহুরতে আমি রিভারসাইড থেকে সরে যাবো, ঠিক সেই মুহুরত থেকে এই হাস্নাবাদে অন্তত খুব ঠান্ডা পরিবেশে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। হতে পারে এই ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারছেন না। বেশি কিছু না, জাস্ট ব্যালেন্স এক কোটি টাকা আমার হাতে থাকলেই আমি একেবারে ঠান্ডা মাথায় সরে যাবো। ব্যাপারটা বুঝানো দরকার। ইজি নয় কারো জন্য। আমার নামের যে ইমেজটা আছে, এই ইমেজেই অনেকে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। এবার যুদ্ধ আমার সাথে আমার। অন্তত আমি চাই আমি নিজের জন্য বাচবো। ২৮/১/২০১৮
এইমাত্র মান্না, সাদি এবং মিটুলের কাছ থেকে ফোন পেলাম যে, বদি ভাই স্ট্রোক করেছেন এবং সবাই মিলে ওনাকে প্রথমে শ্যামলি ইবনে সিনায় নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু শ্যামলির ইবনে সিনা ওনাকে ওখান থেকে শিফট করে মোহাম্মাদপুর শাখায় নিতে বলেছে। বদি ভাইকে এখন আউ সি ইউ তে নেওয়া হচ্ছে। বদি ভাই বেশ অনেকদিন যাবত খুব অসুস্থ অবস্থায় আছেন। মাঝে মাঝে দেখতে গিয়েছি কিন্তু ঊনার শারিরীক অবস্থা উন্নত করার জন্য আমাদের কিছুই করার নাই। এক সময়কার খুব অনেস্ট সরকারি করমকরতা যিনি ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারতেন কিন্তু কখনো তা তিনি করেন নাই। অবসরের পরে শুধুমাত্র বাড়িভাড়ার উপর যা পেতেন সেটা দিয়েই নিজের ঊসধ এবং সংসার চালানোর চেষ্টা করেছেন।। ছেলেগুলি শহরে থেকেও নিজেদেরকে যোগ্য করে তুলতে পারে নাই।।অথচ ইচ্ছে করলে অনেক কিছুই হতে পারতো। ছেলেগুলির অবস্থা এই রকম যে, তারা নিজেদের সংসার চালাইতেই হিমশিম খাচ্ছে, বাবা মাকে আধুনিক চিকিতসা দেওয়ার সামর্থ্য কই। আমি এখন বসিলার রাস্তায় আছি, বেশ জ্যাম। রাত বাজে নয়টা বিশ। ভাইয়াকে দেখতে যেতে হবে কিন্তু কখন গিয়ে পউছতে পারি বুঝতে পারছি না। এই মুহুরতে ঊনার জন্য ফাইনানশিয়াল সাহাজ্য ও লাগবে। অথচ আমাদের ফ্যাক্টরিগুলির অবস্থাও খুব ভাল নয়। বেশ বড় বড় বিপদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এই লাস্ট কয়েক মাস যাবত। আল্লাহ যে কিসের পরীক্ষা নিচ্ছেন বুঝতে পারছি না। আমরা আল্লাহর কোনো পরীক্ষায়ই পাশ করার ক্ষমতা রাখি না যদি না তিনি আমাদেরকে রহমত না করেন। আল্লাহ আমাদেরকে সাহাজ্য করো।
হাসনাবাদ, কেরানিগঞ্জ, ঢাকা-১৩১১
এম ডি অফিস, দুপুর- ৩টা ২২ মিনিট-
এই কয়দিন যাবত আমার জীবনের হিসাবটাই পালটে গেছে। নুরজাহান আপা মারা গেলেন মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে। দুলাভাই এখনো আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসেন নাই। ঊনি এখন হয়ত আপার মৃত্যুর ধকলটা সামলে উঠতে পেরেছেন কিনা আমি জানি না। তবে যতো বয়সই হোক আর যত কম ভালোবাসাই বিদ্যমান থাকুক স্বামী স্ত্রির মধ্যে, একজনের অনুপস্থিতিতে আরেকজনের উপস্থিতি, যে মুল্যায়ন তা হয়ত বুঝা যায়। যাক যেটা বলছিলাম, আপার মৃত্যুর পর সপ্তাহ দুয়েক পার হতে না হতেই গতকাল শুনলাম আমার বউয়ের একটা আলাপ আলোচনা। যা আমাকে অনেক ব্যথিত করে তুলছে।
আপার ছেলেমেয়েরা তাদের বাড়ির অংশ ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে কেচাল শুরু করে দিয়েছে। কে কোন তালা নিবে, কিংবা কার কোন তালার উপর ইচ্ছা ইত্যাদি। হায়রে জগত, এটাই বাস্তবটা। কেউ আপার মৃত্যুর সময়টা মাসখানেকও পার হতে দিলো না। এর থেকে আমি শিক্ষাটা নিচ্ছি, তা হচ্ছে, ঠিক আমার বেলাতেও এটাই ঘটবে। আমার মেয়েরা হয়ত এটা নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে না কারন তাদেরকে আমি এই রকম করে বড় করি নাই। কিন্তু তাদের স্বামী বা শাসুড়িরা একটা সময় আমার মেয়েদেরকে ধীরে ধীরে পুশ করবেই যে, বাপের ওইটা নাও, ওইটা নাও ইত্যাদি। আমার জন্য কি করা উচিত বা কি করা উচিত না, বা আমার আত্তা মাগফেরাতের জন্য কোনো কছু করার দরকার হবে কিনা সেই বিষয়ে কেউ কথা বলবে না। কথা বলবে শুধু ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে।
এখানে আরেকটা জিনিস লক্ষনীয়। আপার বাড়ির বিপরীতে কিন্তু লোন আছে। এই লোন নিয়ে কেউ কথা বলছে না। তাদের দরকার ফ্লাট, লোনের টাকাতো শোধ করবে আপার স্বামী যিনি এখনো জীবিত আছেন। কোথা থেকে করবে কিভাবে করবে সেটা তাদের জানার দরকার নাই।
তাহলে তো আমার ব্যাপারটা আরো বেশি ভাবা দরকার। আমার ব্যবসায় লোন আছে, আমার ব্যক্তিগত লোন আছে। ওইসব লোনের মধ্যে আবার আমার স্ত্রীর সায় দেওয়া আছে যে, আমার অনুপস্থতিতে আমার স্ত্রী সেইসব লোনের জন্য দায়ি থাকবে। অথচ আমার বউ কিন্তু এর কোনো কিছুই জানে না বা জানলেও তারপক্ষে এইসব লোন শোধ করা সম্ভব নয়। সে সরকারী চাকুরী করে, আরো ১০ বছর বিনা বাধায় সরকারি চাকুরি করতে পারবে। চাকুরীর পর সে প্রায় তিন সারে তিন কোটি টাকা পেনসন পাবে। আমাদের বাড়ি ভাড়া থেকে টাকা আসে প্রায় লাখ টাকার উপর। বাসাবো থেকে আসে প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকা। ওর বেতন আসে প্রায় লাখ টাকার সমান। আমার কোনো ব্যবসা থেকে টাকা না পেলেও কিন্তু আমার পরিবার এখন যেভাবে চলছে ইনশাল্লাহ সেভাবেই চলতে পারবে। কিন্তু যদি আমার ব্যবসার লোন তাদের ঘাড়ের উপর চেপে বসে আমার অনুপস্থিতিতে, তাহলে না তারা তাদের জীবনকে উপভোগ করতে পারবে, না আরাম করতে পারবে। তাহলে, কেনো আমি এই লায়াবিলিটিজ বাড়িয়ে যাচ্ছি? হ্যা করতে পারতাম, যদি আমার প্ল্যান মোতাবেক রানা (আমার বড় মেয়ের এখন পর্যন্ত স্বামী) যদি লোভি না হতো, চালাক হতো, কর্মঠ হতো। আমার ব্যবসা ধরে রাখতে পারতো। কিন্তু সে নিজেই তো আমার ব্যবসার উপর হুমকি। তাহলে কার ভরসায়, কিসের জন্য, আর কার জন্য আমি আমার সাম্রাজ্য লোনের উপর দাড় করিয়ে যাবো?
তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিঃ
(১) কোন কিছুই রেখে যাবো না কারো জন্য। মেয়েদেরকে সুশিক্ষা দিয়েছি। তারা নিজেদের শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের জীবন গড়বে।
(২) নিজের বাড়ি আছে, সেখানে অন্তত মেয়েরা ঠাই করে বসবাস করতে পারবে। অন্য কোথাও থাকার জন্য টেনসন করতে হবে না।
(৩) কোনো লোন নাই মানে কোনো টেনসন ও নাই।
(৪) আমি আমার সব ব্যবসা গুটিয়ে দিয়ে সব লোন পরিশোধ করে দিয়ে আমার পরকালের জন্য কিছু ছদ্গায়ে জারিয়া তৈরী করে দিয়ে নিজের বউকে নিয়ে বাকী জীবনটা একটু আরাম করে কাটাতে চাই। তাতে আমার যতটুকু ব্যবসা রাখা দরকার, যতোটুকু জমি জমা থাকা দরকার সেই টুকুই রাখবো। আমার মৃত্যুর পর যেনো আমার সম্পত্তি লইয়া কেই ভাগ বাটোয়ারা করার জন্য আর কোনো মানসিকতা না থাকে। এটাই সত্য।
(৫) বর্তমানে রিভার সাইড সুয়েটারস লিমিটেডের নিজস্ব লোন আছে প্রায় ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকা। যা আমাদের পরিশোধ করতে হবে। এই বিশাল লোন খুব সহজ নয়। আমার ৩৫% শেয়ারের বিনিময়ে আমার ভাগে লোন দাড়ায় প্রায় ১৮ থেকে ১৯ কোটি টাকা। আমি এই টাকা পরিশোধ করতে পারবো না যদি কোনো কারনে রিভার সাইডের সমস্যা হয়। অন্য কোনো সোর্স কিন্তু নাই। মুর্তজা ভাইয়ের ৬৫% শেয়ারের বিপরিতে ওনার লোন দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ কোটি টাকা। ঊনি সাহস করতে পারছেন মনোবল আছে কিন্তু আমার মনোবল নাই। তাই আমি ভাবছি, আমার অন্তত ১৫% শেয়ার সম পরিমান শেয়ার আমি মুর্তজা ভাইকে দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে নেবো (যদিও টাকাটা রিভার সাইড থেকেই মুর্তজা ভাই দিবেন তার লভ্যাংশ থেকে, অসুবিধা নাই) এবং ওই নগদ টাকা আমি আমার অন্যান্য লোন পরিশোধ করে ফ্রি হয়ে যাবো। অন্তত ২০% শেয়ার দিয়ে আমি ব্যবসায় থাকবো তাতে মাসিক সেলারী এবং অন্যান্য খরচাদি চলবে। অন্যদিকে মা ইন্ডাস্ট্রিজ যদি লোন বিহিন অবস্থায় নিজেকে নিজে চালাতে পারে, তাতেও লাভ। মাঝে মাঝে ওই খান থেকে প্রয়োজনে আমি টাকা টান দিতে পারবো।
(৬) আমার কিছু জমি আছে, যা আপাত দৃষ্টিতে অনে হচ্ছে বেশ চমকপ্রদ। কিন্তু আমি জানি, এই সব জমি আমার অনুপস্থিতিতে আমার মেয়েরা কেনো আমার মেয়ের স্বামীরাও এটার ব্যাপারে কোনো প্রোটেক্সন দিবে না। বরং যা পাবে তাইই নিয়ে জমিজমা বিক্রি করে দেবে। যদি তাই হয়, তাহলে আমার জীবদ্দোশায় কেনো আমি তা করছি না? তাই, আমি ভাবছি, আমার যতো জমিজমা আছে, সেই জমিজমার মধ্যে মা ইন্ডাস্ট্রিজ বাদ দিয়ে বাকি জমি বিক্রি করে দিয়ে ক্যাশ করে ফেল্বো, তাতে যাই পাই। কারো জন্য কিচ্ছু রেখে যাওয়ার কোনো দরকার নাই। অন্তত আমি এসেট করেছি, আমি নিজে ভোগ করে যাবো।
পহেলা জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার, এমডি অফিস।
আজ বহুদিন পর মনে হইলো যে, আমি যাদের জন্য ভোর সকাল হইতে কস্ট করিয়া শারীরিক পরিশ্রম করিয়া প্রায় সারাদিন খাটিয়া রাতের অর্ধেক সময় পার করিয়া যখন বাসায় ফিরিয়া আসি, তখন আসলে আমি কি করিলাম আর কি করা উচিত ছিল এই হিসাবটাই মিলাতে পারিনা। তখন মনে হয় – কি লাভ করিতেছি?
আসলে আমি নিজে কোনো কিছুই লাভ করিতেছি না। গত বছর হইতে এই বছরের প্রান্তিক হিসাব করিয়া আমি দেখিয়াছি, আমার ব্যবসায় উন্নতি হইয়াছে বটে কিন্তু আমার সাস্থ্য খারাপ হইয়াছে। যে অনুপাতে আমার ব্যবসা উন্নতি হইয়াছে তার অধিক অনুপাতে আমার শরীর খারাপ হইয়াছে। আমার চারিদিকে আমার অনেক পরিচিত বন্ধু বান্ধব, আমার আত্মীয়সজন কিংবা আমার পরিচিত মানুষ অনেকেই না ফেরার দেশে চলিয়া গিয়াছে। কাহারো কাহারো বয়স আমার থেকেও কম কিন্তু তাহারা চলিয়া গিয়াছেন সবাইকে ছেরে। তাহারা জীবীত অবস্থায় কতই না হায় হুতাশ, কিংবা টেনসন করিয়া রাতের ঘুম হারাম করিয়াছিলেন, তাহারা আজ কাহারো জন্যই হা হুতাশ করিতেছেন না। এমন কি অধীক গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত থাকা অবস্থায়ও তাহারা এখন আর কোনো কর্ণপাত করিতেছেন না। তাহা হইলে কিসের মায়া আর কিসের জন্য কি?
আমার জীবদ্দশায় আমি দেখিয়া গেলাম, অধিকাংশ লোকেরা এমন কি আমার মেয়ের স্বামীরাও আমাকে ভালোবাসে আমার সম্পত্তিকে, তারা আমাকে না যতোটা ভালবাসিয়াছে, তাহার থেকে অধিক নজর আমার সম্পত্তির উপর। এটা শুধু মেয়েদের স্বামীর নজরই নয়, আমি লক্ষ করেছি, এটা আমার মেয়েদের শাশুড়িদেরও নজর এই সম্পত্তির উপর। লোভ জিনিসটা মারাত্তক খারাপ। ইহাতে সম্পর্ক নস্ট হয়, আপদ বাড়ে আর আপনজনার লিস্ট থেকে ক্রমে ক্রমে বহি স্কার হয়।
নতুন বছর শুরু হইয়াছে আজ। গত ২০১৭ বছরটি ছিলো আমার জীবনের নতুন কিছু অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে যোগ হয়েছিলো নতুন কিছু মানুষের। আমার ক্যাল্কুলেসন সাধারনত ভুল হয় না। আর যদি ভুল হয়ও তা এমনভাবে নয় যে, আমাকে ধুলিস্যাত করে নাস্তানাবুদ করে ফেলে। কিন্তু এবার কিছু হায়েনাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল আর আমি তাদেরকে মানুষ ভেবেছিলাম। আমার জিবনের যতো বিশ্বাস, যতো কনফিডেন্স, যতো সাবলম্বি জোর একেবারে হতাত করে ছদ্দবেশি কিছু মানুষ এমনভাবে অভিনয় করে কাছে এসেছিলো যে, আমার সকল ইন্দ্রিয় অবশ হইয়া তাহাদেরকে নিতান্তই আপন মনে করিয়া বুকের এতো কাছে আশ্রয় দিয়াছিলাম যে, এক সময় মাকড়শার পরবর্তী জেনারেসনের মতো আমার হৃদপিণ্ড খাইয়া পরিশেষে বাহির হইল।
শুভ সংবাদ এইটাই যে, অবশেষে আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম তাহারা আমার সাথে লম্বা রাস্তা পাড়ি দেওয়া জন্য যোগ্য নহে। আর এই অযোগ্য হায়েনা টাইপের মানুস রুপী প্রানিগুলিকে নিজের বলয় থেকে অবমুক্ত করিতে পারিয়াছি, ইহাই আমার সুখ। একটা সময় আসিবে যখন এই প্রানিগুলি তাদের নিজের বুক কিলাইয়া কিলাইয়া বিলাপ করিবে আর বলিবে কে আছো আমাকে উদ্ধার করো, আমি বড় ভুল করিয়াছি। তাহাদের কেউ কেউ কাদিবে উচ্চস্বরে আর কেউ কাদিবে গোপনে। কিন্তু কাদিবে। কাদিবে এই কারনে যে, ভাগ্যের কারনে যুগে যুগে ভগবান আমার মতো মানুষকে কারো কারো ভাগ্যে জোটায়, এটা আমার মন্তব্য নহে, ইহা তাহাদের মন্তব্য যাহারা আমার সান্নিধ্যে আসিয়াছে। হয়ত এই আপন করে নেওয়ার মানুষ গুলি বুঝতেই পারলো না, কি তাহার হারাইলো আর কি তাহারা পাইলো না।
মা কুল্পা মা কুল্পা, এটা কোনো এক দেশের বুলি যার অর্থ আমি ভুল করেছি আমি ভুল করেছি। এইটা তারা বলে আর বুক কিলায়।
প্রায় ৯৫ বছর বয়সী একজন অতি সাধারন কিন্তু অসামান্য ব্যক্তিত্তের অধিকারীনি বাঙালি মহিলা যিনি প্রতিক্ষনে শুধু ধন্যবাদ নন, সম্মানও প্রাপ্য। গত কয়েকদিন আগে তিনি হতাত করে শরীরের ব্যাল্যান্স ঠিক রাখতে না পেরে তার রুমে পা পিছলে পরে যান এবং মাথায় বেশ বড় ধরনের আঘাত পান। খবর পেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, তিনি আমার বাসার ঠিক উপরের তালায় থাকেন। ওনাকে দেখলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। অবিকল আমার মায়ের মতো চেহারা এবং ঠিক সেই রকমের ধৈর্য। অসম্ভব প্রকারের আত্মনির্ভরশীল এবং আদর পরায়ন। কেউ তার জন্য বিরক্ত হোক তিনি তা চান না। ফলে যতোটুকু সম্ভব এই বয়সে নিজের কাজটা, পরিবারের অনেক ছোটখাটো কাজ যা তিনি করতে পারেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করেন। যদিও ওনাকে কেউ কোনো কজ করতে দিতে চান না। বাসার সবাইকে নিয়ে তিনি অনেক ভালো একজন সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেন। এমন কি কাজের মেয়ের প্রতিও তিনি এতোটাই সহানুভুতিশীল যে, কাজের মেয়েও সে এই পরিবারের একজন মুল্যবান সদস্য হিসাবে মনে করে।
তার যোগ্যসন্তান পাপ্পু স্যার। আর আরেক যোগ্য বৌমা, পাপ্পু স্যারের স্ত্রী। মায়ের প্রতি ভালোবাসা কার নাই? কমবেশী সব সন্তানই মাকে ভালোবাসে কোনো শর্ত ছাড়া। আর এই ভালোবাসা দিনে দিনে স্থায়ীই হয় যদি মা তার নীতির মধ্যে তার সন্তানকে লালন করে থাকেন। পাপ্পু স্যার ওই ধরনের একজন সন্তান। যে মা সন্তানকে ভালোবাসেন, সে মা তার সন্তানের সংসারকেও ভালোবাসেন। সে মা তার সন্তানের স্ত্রীকেও ভালোবাসেন, পরের বাড়ির মেয়েকে সন্তানের স্ত্রী হিসাবে এনে নিজের মেয়ের মতো আদর করেন, তাকে তার কোলে মাথা রাখার অধিকার দেন। ছেলেকে মা যদি ভালোবাসেন, সেই মা তার ছেলের বউকেও ভালোবাসার কথা ঠিক তার ছেলেকে যেভাবে তিনি ভালোবাসেন সেইভাবে। ছেলেকে যদি মা ভালোবাসেন, ছেলের সন্তান, ছেলের স্ত্রী, ছেলের প্রতিটি সদস্যকে ভালোবাসেন ঠিক একই রকমভাবে যেভাবে তিনি ভালোবাসেন তার ছেলেকে। আর এখানেই রহস্যটা লুকিয়ে থাকে মা-সন্তানের সংসারের বন্ধনটা। ছেলে যদি একটা নেড়ী কুকুরকেও ভালোবাসে, তাহলে দেখা যাবে, সেই ভালো মা সেই নেড়ি কুকুরটাকে অতি আদরের সাথে যত করছেন। কারন তার ছেলে ওই নেড়ি কুকুরটাকেও ভালোবাসে। এই হলো প্রক্রিত মা। পাপ্পু স্যারের মা ঠিক এই রকমের একজন আদর্শ মা। এর মানে এই নয় যে, ছেলের অলসতাকে তিনি প্রশ্রয় দিয়ে, অথবা তার অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে নৈতিকতার বাইরে লালন করে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন। সেটাকে ভালোবাসা বলে না। পাপ্পু স্যা্রের মা ঠিক দায়িত্তটা তার ছেলের উপর পালন করেছেন বলেই পাপ্পু স্যার আজকে অনেকের কাছেই একজন আদর্শ টিচার এবং ব্যক্তিত্ত। সকালে উঠার অভ্যাস করিয়েছেন, সৃষ্টি কর্তার নাম দিয়ে দিনের কাজ শুরু করার শিক্ষা দিয়েছেন, কোথায় কি কার দায়িত্ব কিভাবে পালন করতে হবে সেই শিক্ষা দিয়েছেন। সময়কে কিভাবে কাজে লাগাইতে হবে তার পুরু দিক্ষা তিনি তার সন্তানকে দিয়েছেন। আদরের পাশাপাশি শাসন করেছেন। অন্ধ ভালোবাসা দিয়ে তার জীবন গড়িয়ে দেন নাই। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনো তাকে আদর্শের কাছে হেরে যেতে দেন নাই।
আমি পাপ্পু স্যারকে দেখেছি, মায়ের জন্য কি পরিমান পাগল। আমি এটাও দেখেছি, পাপ্পু স্যারের স্ত্রীও তার শাসুড়ির জন্য একই পরিমানে পাগল। আমি জানি না তিনি তার নিজের মাকে কতোটা তুষ্ট করেন, কিন্তু শাসুড়ির বেলায় পাপ্পু স্যারের স্ত্রী যতোটা হওয়া দরকার কখনো কখনো তার থেকেও বেশি করেন। তার শাশুড়ি তাকে যতোটা আদর করেন, তার থেকেও বেশী শাসুড়িকে তিনি সম্মানের সহিত লালন করেন। মিস্টি একটা বন্ধন। আর এই বন্ধন তৈরিতে কারিগড় হচ্ছেন পাপ্পু স্যারের মা নিজে। তিনি যেমনটি চেয়েছেন, একটি সুখি পরিবার, তিনি তেমনটি দিতে পেরেছেন বলেই আজ তিনিও তার ফলভোগ করছেন এই ৯৫ বছর বয়সে। এই রকমের একটি সন্তানই যথেষ্ট কোনো মা তার শেষ বয়সে শান্তিতে থাকার জন্য।
আমিও আমার মায়ের জন্য এমনই পাগল ছিলাম। পৃথিবী একদিকে, আর মা যেনো আরেক দিকে। আমি ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় মাইলের পর মাইল মাকে কোলে করে গ্রামের রাস্তায় মাকে না হাটিয়ে গ্রামে নিয়ে গেছি। আমার মনে হয়েছে, মায়ের কস্ট হবে হেটে যেতে। মাকে কোলে নিয়ে হাটার কারনে আমার কম্বেট ইউনিফর্ম আমার ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যেতো আর আমার মা আমার গলা ধরে আমার মুখের দিকে তাকিয়েই থাকতেন। কি জানি কি দেখতো আমার মা আমার মুখে এইভাবে তাকিয়ে থেকে? আমি মাঝে মাঝে মুচকি হেসে বলতাম, মা, কি দেখছো এইভাবে? মনে হতো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোনো জিনিস আমি বইয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমার একটুও ক্লান্তি লাগে নাই। আমার মা যতোদিন বেচে ছিলেন, আমি এমন কোনো রাত কাটাই নাই যেই রাতে মায়ের ঘরে মা কিভাবে আছেন, ঘুমিয়েছেন কিনা, বা মায়ের কিছু লাগবে কিনা তা দেখার জন্য গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠি নাই এবং মায়ের রুমে যাই নাই। যদি দেখতাম, মা কোনো কারনে ঘুমিয়ে নাই, মায়ের পাশে বসেই মায়ের সাথে অনেক কথা বলতাম। মায়ের সেই ছোট বেলার মজার মজার কাহিনি। মায়ের সাথে আমার বাবার প্রেমের কাহিনি। মায়ের সাথে আমাদের গ্রামের কাহিনি। মায়ের সাথে আমাদের পুরু পরিবারের কাহিনি। মা বলতেন, মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি আমাদের পরিবারে এসেছিলেন। কখনো মা তার কাহিনী বলতে বলতে খিল খিল করে হাসতেন, আবার কখনো কখনো কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে ঢোকরে ঢোকরে কাদতেন। আমি মায়ের অন্তরটায় পৌঁছে যেতাম সেই ছোট একটা বালকের মতো। মা আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে খুব আদর করতেন আর বলতেন, অনেক বড় হবি তুই। আমি তখন সেনাবাহিনীতে মাত্র মেজর। মাকে বলতাম, মা, আমার কেনো জানি মনে হয় আসলেই একদিন আমি অনেক বড় হবো, আমার অনেক টাকা হবে কিন্তু আমি সম্ভবত ওই দিন তোমাকে আর পাবো না। আমার লিমিটেড আয়ের মধ্যে আমি চেষ্টা করেছি মাকে সবচেয়ে ভালো জিনিসটা দিতে। আমি কখনো মনে পড়ে না যে, মাকে ছাড়া অফিস থেকে এসে একা লাঞ্চ করেছি। অনেক অনেক দিন আমি মাকে আমার নিজ হাতে খাইয়ে দিতাম। মা বড্ড মজা করে খেতো আমার হাতে। আজ মা নেই, কিন্তু আমি তার ভালোবাসা আজো অনুভব করি। পাপ্পু স্যারের মাকে দেখে আমার ঠিক সেই রকম একজন মহিয়সীর কথাই বারবার মনে পড়ে। আর পাপ্পু স্যারকেও আমি দোয়া করি তিনি যেনো ঠিক যা করছেন তাই করে যান মায়ের শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত।
পাপ্পু স্যারের স্ত্রীর শাশুড়ির প্রতি ব্যবহার দেখে আমার স্ত্রীর আমার মায়ের প্রতি ব্যবহারের কথাই মনে পড়ে বারবার। আমি যেদিন প্রথম মাকে আমার ভালোবাসার মেয়েটির কথা জানিয়েছিলাম, মা মেয়েটি কেমন, কই থাকে, তার বাবা মা কি করে, তাদের সাংসারিক অবস্থা কি রকম কিছুই জিজ্ঞেস করেন নাই। শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। কে আগে ভালোবেসেছি। আমি নাকি মেয়েটি। বলেছিলাম, মেয়েটি সম্ভবত। কারন আমিও ভালোবেসেছি কিন্তু প্রথম চিঠিটি এসেছিলো ওর কাছ থেকে। মা আর কিছুই জানতে চান নাই। শুধু বলেছিলেন, সুখি হবি। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিভাবে এতো কনফিডেন্টলি এই কথা মা আমাকে বলতে পারলেন? মা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন ব্যখ্যায়, যে তোমাকে ভালোবাসে, সে তোমাকে ছেড়ে যাবে না যদি তুমি না ছেড়ে যাও। সে তোমাকে ভালোবাসে।
অন্যদিকে, আমি আমার এই ছোট্ট জীবনে এমন মাকেও দেখেছি যে, তিনি ছেলেকে ভালোবাসেন, কিন্তু ছেলের বউকে হিংসা করেন, ছেলের সন্তানকে হিংসা করেন, তাদেরকে আদর করে কাছে টানেন না। ভাবেন, পরের বাড়ির মেয়ে, বেশী প্রশ্রয় দিলে যদি মাথায় উঠে যায়? ওইসব মায়েরা ভুলে যান তাদের অতিতের সেই দিনের কথা যেদিন তিনিও তার শশুড় বাড়িতে পরের বাড়ির মেয়ে হয়েই এসেছিলেন। এই সব মায়েরা ছেলে আর তার স্ত্রী, সন্তানের মধ্যে একটা ফারাক সৃষ্টি করে রাখতে পছন্দ করেন। আর শেষ বয়সে এসে এই সব মায়েরাই কোনো না কোনো ভাবে তার আদরের সন্তানদের কাছ থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়েন আর বলেন, তার সন্তানেরা মানুস হয়ে উঠে নাই।
আবার এমন মাকেও দেখেছি, ছেলেকে তারা মুলধন মনে করে ছেলের বিয়েটাকে একটা ইনভেস্টমেন্ট মনে করেন। মনে করেন যে, পরের বাড়ির মেয়েটা হচ্ছে একটা শিকার, আর নিজের ছেলেটা হচ্ছে একটা শিকারী, আর বিয়েটা হচ্ছে একটা হাতিয়ার। এই সব মায়েরা না জানেন ছেলেদেরকে সপ্ন দেখাতে, না পারেন নিজেরা সপ্ন বুনতে। তারা একটা সময় বালুচরে অট্টালিকা বানানোর দিবা স্বপ্নে দিনশেষে শুধু একটি জিনিসই দেখতে পান, আর তা হলো, উত্থাল ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাওয়া বালুর তট।
পাপ্পু স্যারকে আমি অনেক অনেক দোয়া করি যেনো এখন যা আছেন, তাই যেনো থাকেন। আর দোয়া করি তার মহিয়সি মাকে যিনি সংসারের লক্ষি বউমাকে পরের বাড়ি থেকে এনে নিজের মেয়ের আসনে বসিয়ে চমৎকার একটি সংসার উপহার দিয়েছেন তার সন্তানকে। এমন মায়ের পায়ের তলেই হচ্ছে আসল স্বর্গ। স্বর্গটা আসলে মরনের পরে নয়। মায়ের পায়ের তলে সন্তানের স্বর্গ শুরু হয় মায়ের জীবদ্দশায়।
একটা সময় ছিলো, ভাবতাম, আহা কবে বড় হবো? কবে নিজের ইচ্ছেমতো যা খুশী তাইই করবো? তখন আমার বয়স হয়ত ছিলো ১০ কি ১২।
আজ আমার বয়স ৫২ পেরিয়ে গেলো, ৫৩ তে পা রাখলাম। এখন আর ওই প্রশ্নটা করি না, কবে বড় হবো? কবে আমার সব থাকবে? টাকা পয়সা, গাড়ি বাড়ী সব। ভাবতাম, কবে আমি স্বাধীনভাবে যা আমার ইচ্ছে তাইই করতে পারব? সম্ভবত আজ থেকে কয়েক দশক আগে আজকের এই দিনের কথাটাই আমি ভেবেছিলাম।
আজ সেইদিন গুলি আমি অতিবাহিত করছি। কিন্তু!
আমি কি সব আমার ইচ্ছে মতো যা খুশী তাই করতে পারছি? আমার তো এখন আমি যা চেয়েছিলাম, সবই আছে। গাড়ী আছে, বাড়ী আছে, টাকাপয়সা যা আছে তাতে অন্তত আমার ইচ্ছেগুলি পুরন করার মতো সামর্থ্যও আমার আছে। তাঁরপরেও কি আমি স্বাধীন? আমি কি ইচ্ছে করলেই কয়েকদিন উধাও হয়ে যেখানে খুসী চলে যেতে পারি? আমি কি ইচ্ছে করলেই যা মন চায় করতে পারি?
আমি আজকে আরো পরাধীন। এই পরাধী এমন নয় যে, কেউ আমাকে বেধে রেখেছে। এমন নয় যে, আমি জেলখানার চার দেয়ালের মধ্যে বন্ধী হয়ে আছি। অথচ আমি বন্ধী আমার জাগ্রত বিবেকের কাছে, আমি বন্ধী আমার নীতির কাছে, আমি বন্ধী সমাজের নিয়ম কানুনের উপরে। এইখানে যখন যা খুশী সামর্থ্য থাকলেও করা যায় না।
আমি এখন আর বয়স্ক হতে চাই না। আমার ভয় লাগে। আজ যারা আমাকে ঘিরে নৃত্য করছে, যারা আমাকে নিয়ে তোষামোদি করছে, আজ যারা আমাকে স্বপ্নের সিড়ি হিসাবে ব্যবহার করে তাদের আখের গুছাচ্ছে, একদিন হয়ত তারাই আমাকে এমন একটা পরিস্থিতির সামনে দাড় করাবে, যখন মনে হবে, আজকের দিনের এইসব মানুষগুলির চেহারা আমার কাছে কোনোদিনই পরিচিত ছিলো না। তখন সময়টাশুধু আমার, আর আমার অতীতের।
আজ যাকে আমি হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছি, আজ যারা আমার কাধে ভড় করে পাহাড়ের ওই চুড়ায় উঠতে সহযোগিতা নিচ্ছে, আমি যদি আমার বয়সের ভারে আর ওই পাহাড়ের চুড়ায় আর উঠতে না পারি, আমি যত বড় অনুপ্রেরণার ব্যক্তিত্বই হই না কেনো, আমার স্থান আমি নিশ্চিত যে, পাহাড়ের ঢালেই হবে।
তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই পাহাড়ের চুড়ায় নয়, পাহাড়ের ঢালেই হোক আমার একাকিত্তের একটি ছোটনীড় যেখানে আর কেউ না থাকুক, কিছু অপরিচিত পথিক তো আশেপাশে থাকবে। হয়ত তারাই হবে আমার ওই সময়ের কিছু কথাবলার সাথী যারা ইতিহাস না জেনেই হয়ত আমাকে সঙ্গ দেবে।
সময় কাউকে ছাড় দেয় নাই এবং দেয়ও না। আর আগামিতে কখনো সে কাউকে ছাড় দিবেও না।
একটা শিশু বড় করতে একটা গ্রাম লাগে। কথাটা বলেছিলেন আমার বড় ভাই কোনো এক সময়। তখন কথাটার অর্থ ভালো মতো বুঝতে পারিনি। আজ প্রায় দেড় দশক পরে এসে মনে হলো, কথাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং এর অর্থ অনেক বিশাল। আমার একটা ব্যাখ্যা আছে। একটা ছোট ছেলে শিশুকে দিয়েই একটা উদাহরন টানি।
যেমন ধরুন, একদিন বয়সের একটা ছেলেশিশু সে কথা বলতে পারে না কিন্তু সে ভালো ব্যবহার, আদর, আপ্যায়ন, মুখের অভিব্যক্তি, রাগ ইত্যাদির ইঙ্গিত খুব ভালো করে বুঝে। ফলে দেখবেন, আপনি হাসলে সেও হাসে, আপনি রাগ করলে সেও ভয় পেয়ে যায় ইত্যাদি। কিছু বাচ্চা কয়েক মিনিটের মধ্যেই অপরিচিত এক লোকের কোলে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠে আবার কিছু কিছু লোকের কাছে যেতেই চায় না বা কান্নাকাটি করে। ওই অবুঝ বাচ্চাটির কাছে কোন যুক্তি খাটে না, কে কি ভাবলো সে তাঁর পরোয়া করে না, তাঁর গলা ফাটিয়ে চিতকারে সে লজ্জাও পায় না। সে একেবারে খাটি অনুভুতি প্রকাশ করে।
সেই বাচ্চাটি ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে মায়ের সাথে, ঘরের অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের মধ্যেই বেশীর ভাগ সময় অতিবাহিত করে বলে যেহেতু বাচ্চারা খুবই সংবেদনশীল এবং অনুকরনপ্রিয়, ফলে অনেক অভ্যাস, অনেকগুন, অনেক বদগুন এবং অন্যান্য অনেক গুণাবলী এই বাসার লোকজনের কাছ থেকেই পেয়ে থাকে। স্বার্থপরতা, লোভ, দয়াশীলতা, রাগ, অভিমান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতাও এই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই পায় বেশি। তারপরে সে যখন আস্তে আস্তে বাইরে যেতে থাকে, বন্ধুবান্ধব জোটে, ওই বন্ধুবান্ধবদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তাদের পরিবারের থেকে পাওয়া ওইসব বাচ্চাদের অনেক গুনাবলীও এই বাচ্চাটি কিছু আমদানি করে ফেলে, রপ্ত করে ফেলে।। ফলে নেশাখোর বন্ধুর সাথে মিশলে, নেশায় পড়ে যায়, আবার ভালো বন্ধুদের সাথে মেলামেশায় অনেক উন্নত চরিত্রের অধিকারী হয়।
এখানে আরেকটা বিসয় খুব লক্ষ করা দরকার যে, আলোচ্য শিশুটির পারিবারিক সচ্ছলতার কিছুটা টানাটানিতেও শিশুটির অবুঝ মনে তাঁর অনেক আশা এবং প্রাপ্তির ঘাটতি থেকে যায় বলে তাঁরমধ্যে অন্য শিশুদের চাহিদা এবং তাদের প্রাপ্তির সাথে তুলনা করে সে নিজে নিজেও কিছুটা হতাশ গুণাবলীতে পেচিয়ে যায়। কেনো অন্য বাচ্চাদের এইটা আছে আমার নাই, কেনো অন্য বাচ্চারা যা চাইবে তাই পাবে অথচ আমি কেনো পাবো না ইত্যাদি। তাঁর এই হতাশ গুনাবলী একসময় বাড়তে থাকে এবং সে অন্যান্য শিশুদের তাদের চাহিদা মোতাবেক প্রাপ্তিকে নিজের বা নিজেদের না পাওয়ার ক্ষমতাকে অন্য বাচ্চাদের উপর তাঁর এক ধরনের ক্ষোভ, জিদ, ঘৃণা, কিংবা অপছন্দের কারন হয়ে দাঁড়ায়। তাতে নিজেদের অক্ষমতাকে না বুঝে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবনতাও বাড়তে থাকে। সমাজের উপর তাঁর ক্ষোভ, বাবা মায়ের উপর তাঁর রাগ, অথবা অপছন্দ কিংবা অশ্রদ্ধাবোধও বলতে পারেন বাড়তে থাকে। ব্যাপারটা এই রকম যেনো, কেনো অন্যবাচ্চারা সব পাবে আর আমি পাবো না। কেনো তাদেরই সব থাকবে আর আমার থাকবে না। কেনো আমার পরিবার আমার চাহিদার মতো সব কিছু দিতে পারবে না যেখানে তাঁরই সমবয়সী আরেক বাচ্চার সব কিছু থাকবে। এটা একটা স্যাডিস্ট ভাবধারা এবং এটা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। হয়ত সে নিজেও জানে না যে, এটা একটা খারাপ লক্ষন।
সচ্ছল বন্ধু বান্ধব্দের সাথে মেলামেশার সময় তাঁর মধ্যে না পাওয়ার প্রতিনিয়ত এই গোপন একটা রহস্যময় জিদ, রাগ কিংবা আচরন এক অন্যরকম চরিত্রে রুপান্তরীত করে ফেলে। আর এটা খুব সুপ্ত অবস্থায় তাঁর ভিতরে প্রতিনিয়ত স্থায়ী হতে থাকে। ইনফেরিওর কমপ্লেক্সে ভোগতে থাকে। ইনফেরিওর কমপ্লেক্স একটা রোগ। তাঁর সবকিছু পাবার একটা সুপ্ত বাসনা সবসময়ই মনের ভিতরে লালিত হয়। যারা নিজের চেস্টায় এই সুপ্ত বাসনাকে বাস্তবে রুপ দেওয়ার চেস্টা করে, তারা হয় পরিশ্রমী, কর্মঠ, এবং খুব হিসেবী। অনেকে এই হিসেবী গুনটাকে কেউ কেউ কিপ্টে বলেও ধরে নেয়। যাই হোক, এই নিজ চেষ্টায় সাধ পুরনের মানুষগুলির প্রতিটি ধাপে লক্ষ্য থাকে কিভাবে এই ঘাটতি নিজের চেষ্টায় পূর্ণ করবে। একসময় তারা সমাজের অনেক বড় একটা জায়গায় নিজেরদের জায়গা করে নেয়। কারন, তাঁর এতোদিনের পরিশ্রমের নীতীটা ইতিমধ্যে অভ্যাসে পরিনিত হয়ে যায় বলে সবসময় সে একই প্রকার পরিশ্রম করতেই থাকে। তাকে আর আটকানো যায় না। সে উঠতেই থাকে। পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি এটাই সে আবারো প্রমান করে দেয়। আর যারা এই সপ্ন লালন করে কিন্তু নিজের মেধা, পরিশ্রম দিয়ে এই বাসনা পূর্ণ করতে অলসবোধ করে, তারা সবসময় শর্ট খাট রাস্তা খুজে বেড়ায়। বিকল্প টার্গেট খুজতে থাকে। তারাই এক সময় নীতির বাইরে গিয়ে কাজ করে। অল্প পরিশ্রমে কিভাবে কোথা থেকে কি করলে বাসনাও পূর্ণ হবে আবার কস্টও করতে হবে না এই জাতীয় একটা সুযোগ খুজতে থাকে। এদের কিছুটা লজ্জা কম থাকে, এরা যে কোনো সময়ে নিজেদের স্বার্থে আচার আচরন পাল্টে ফেলতে পারে, এরা স্ট্যাবল থাকে না। যখন সে সুযোগ পায় বা টার্গেট পেয়ে যায় বলে ধারনা করে, তখন যতটা পারা যায়, ততোটাই তাঁর সদব্যবহার করার প্রবনতা থাকে।
এই টার্গেট খোজার ব্যাপারে সবচেয়ে সহজ পন্থা হচ্ছে, সচ্ছল পরিবারে কোনো না কোনো ভাবে ঢোকে পড়া। অথবা কোনো না কোনোভাবে এমন একটা জবে ঢোকে পড়া যেখানে জবের দোহাই দিয়েই অন্যকে ব্যবহার করা যায়। যদি সচ্ছল পরিবারকে টার্গেট করে এই বাসনা পূর্ণ করার প্রয়াশ থাকে, তখন ব্যাপারটা দাঁড়ায় এই রকম যে, চাইনা কিন্তু না দিলে মেজাজ খারাপ থাকে, চাই না কিন্তু দিলে কি হতো? চাইবো না কিন্তু দিবেন না কেনো ইত্যাদি। আর যদি জবে ঢোকে, তাহলে তো ব্যাপারটা যেনো তাঁর মামার বাড়ির হাড়ি পাওয়ার মতো। অন্যকে জিম্মি করে ফেলা এবং তাঁর থেকে ফায়দা লুটা। এই সব ব্যক্তিত্তের সবচেয়ে প্রধান বাহ্যিকপ্রকাশ যে, তারা তাদের সামর্থ্যের বাইরে নিজেকে জাহির করে, রাগ করার যথেষ্ট কারন থাকা সত্তেও রাগ করে না (কারন রাগ করলে সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে একটা ভয় থাকে), খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারে, মিথ্যাটাকে সাবলিলভাবে উপস্থাপন করতে পারে যাতে মনে হবে সত্যি বলা হচ্ছে, স্বার্থের কারনে যুক্তির সাথে কথা বলতে পারে , বেশভুষা থাকে সুন্দর ফিটফাট, আর নিজের যা নাই, তাঁর থেকে বেশী দেখানোর প্রবনতা, সেটা যেভাবেই হোক। দেখা যায়, বাড়ির অনেক সমস্যা কিন্তু আইফোন চাই, সামর্থ্য নাই কিন্তু গাড়ি বাড়ি চাই। যোগ্যতা নাই কিন্তু সব পাবার আশা। এরা ধার করে হলেও অন্যকে আকৃষ্ট করার জন্য চাকচিক্য প্রদর্শন করে। এটা দরিদ্র আর ধনীর বাচ্চা বলে কথা নাই। এটা একটা ওরিয়েন্টেসনের অভাব। আর এই ওরিয়েন্টেসনটা প্রথমে আসে পরিবার থেকে। কিছুটা আসে সমাজের কিছু কিছু লোকের কাছ থেকে যাদের সাথে এই বাচ্চাটি ঘনঘন মেলামেশা করে। কিছুটা আসে পরিবেশ থেকে যে পরিবেশে সে চলাফেরা করে। আর এই পুরু ঘর থেকে শুরু করে অন্যান্য পরিবেশটাই আসলে একটা গ্রাম, একটা সমাজ।
এইসব মানুষগুলি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে মন থেকে শ্রদ্ধা করে না, কাউকে অন্তর থেকে সম্মান করে না, কাউকে আপন ভাবে না। এমন কি আজীবন কাল যে মাতাপিতা এদেরকে লালিত পালিত করেছে, তাদের প্রতিও এদের সম্মানবোধ থাকে না। তাদের কাছে প্রাপ্তিটাই বড়। সেটা যেখান থেকেই আসুক সেইই তাঁর কাছে প্রিয়, আর যখন দেখবে যে, কিছু পাবার আর আশা নাই, তখন তাদের চরিত্র আকস্মিকভাবে বদল দেখা যায়। তখন তাদেরকে আর আগের রুপে চেনা যায় না। এরা সব সময় সুযোগ খুজতেই থাকে। আর মজার ব্যাপার হলো, এরা সুযোগ পায়ও। কারন মানুষের অভিজ্ঞতা সবার একরকম থাকে না বলে বারবার কিছু মানুষ সবসময়ই এই জাতীয় লোভী মানুষের খপ্পরে পড়েই যায়।
আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না, আমরা মানুষের ভিতরের চরিত্রকে সরাসরি আয়নার মতো করে দেখতে পাই না। এমন কি আমরা নিজেরাও নিজেদের অনেক সময় চিনতে পারি না। আর এই কারনেই প্রতিবার আমরা প্রেডিকসন অর্থাৎ একটা স্যামপ্লিং এর উপর ভিত্তি করে বারবার সিদ্ধান্ত নেই। শতভাগ সাফল্য আসবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। আজকে যে বস্তুটি আপনার হাতে আসায় আপনি মনে করছেন, এটাই ঠিক যেটা আপনি চেয়েছেন, বা এটাই আপনি খুজছেন, সেটা সঠিক নাও হতে পারে। আর যদি সঠিক না হয় তখন সংস্কার বা এজাস্টমেন্ট দরকার হয়ে পড়ে। কখনো কখনো এই এডজাস্টমেন্ট এতো বড় যে, পুরু পরিকল্পনাটাই বদলাতে হয়। আর যারা এই পরিকল্পনাটা পাল্টানোর হিম্মত রাখেন, বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত রাখেন, তাদের জন্যই সুন্দর ভবিস্যত। সমাজ তারাই তৈরী করে, সমাজ তাদেরকেই কন্ডারী বলে। এডাপ্টেসন এর মুল থিউরী আসলে তাই। ডাইনোসোর এডাপ্টেসন করতে পারে নাই বলেই সে আজ পৃথিবীতে ইতিহাস কিন্তু তেলাপোকা সর্বত্র সব কিছুতেই এডজাস্ট করতে পারে বলেই এরা বেচে থাকে ৪৬ কোটি বছর। সম্ভবত এই তেলাপোকাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আয়ুধারী কোনো প্রানী। এরা ওদের বাল-বাচ্চা নিয়ে ওদের মতো করে বেচে থাকে। ভালোই থাকে।
আজকে আমি বা আপনাকে কেউ ভুল বুঝতেছি বলে যে অভিযোগ করে, এটা হয়ত ঠিক এই রকম নয়। হতে পারে এই রকম যে, এখন আমি বা আপনি ভুল বুঝতেছি না, সময়ের ব্যবধানে, স্যামপ্লিং ভুলের কারনে আগেরবার ভুল হয়েছিলো, কিন্তু অন্যান্য স্যামপ্লিং, চারিপাশের অবস্থা, বেশী ফ্যাক্টর সমন্নয়ে আমি বা আপনি বর্তমানটাই ঠিক বুঝতেছেন। ফলে যারা অভিযোগ করছে, তারা ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন না। আবার এমনো হতে পারে যিনি আমাকে বা আপনাকে “ভুল বুঝতেছি” বলে অভিযোগ করছেন, তার এক্সপেকটেশন অনুযায়ী সেও আমাকে বা আপনাকে আগেরবার ঠিক বুঝেছেন কিন্তু এখন তার এক্সপেক্টেসনের সাথে ক্যাল্কুলেসনে তারতম্যের কারনে আমরা বা আপ্নারা বদলে গেছি বা বদলে গেছেন এই চিন্তায় আমরা ভুল বুঝতেছি বলেই তাদের ডিডাক্সন তৈরী হচ্ছে।
কিন্তু যেটাই হোক, কে ভুল আর কে ঠিক, এই তর্ক, এই যুক্তি, এই ব্যাখ্যা করার সময় মানুষের হাতে খুব বেশি থাকে না। একটা সাব জেক্ট নিয়ে এতো গবেষণা করতে থাকলে, বাকী সাবজেক্ট এর জন্য তো সময় ই দেওয়া যাবে না। জীবনে সময় বড় সীমিত। হয় এডজাস্টমেন্ট করে বেচে যাবেন, নয় খপ্পর থেকে বেড়িয়ে যাবেন। দ্বিধার কোনো কারন থাকলে সবার প্রতিভা যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ক্ষতি হবে বিকাশের।
ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তে ভুল হলে যখনই মনে হবে এখনই সময় সিদ্ধান্ত পাল্টে জীবন সুন্দর করার, তাহলে “এখনি” সেটা। শুধু একটা জিনিষ মনে রাখা দরকার, ঈশ্বর সব ভুলের মধ্যে বড় সাফল্যের ফলাফল নির্ধারণ করেন। তিনি কারো সাথে মস্করা করেন না। তাঁর উপর ভরসা রাখুন। জয় আপনার। এটা দু পক্ষের জন্যই উপদেশ কারন, যার যার গন্ডি থেকে তাঁর তাঁর জন্য ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করেন। কেউ কারো সীমানা অতিক্রম করলেই এই বিপত্তি হবে। নদীর জলের মধ্যেও ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিঠা পানি এবং নোনা পানিও তাদের সীমা অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মিশার অনুমতি ঈশ্বর দেন নাই।
কোথায় যেনো একবার পড়েছিলাম, ছেলেকে চেনা যায় যখন সে বিয়ে করে, মেয়েকে চেনা যায় যখন সে যুবতী হয়, বউকে চেনা যায় যখন স্বামী দরিদ্র অবস্থায় পতিত হন, আর স্বামীকে চেনা যায় বউ যখন গুরুতর অসুস্থ হন। আর সন্তানকে চেনা যায় যখন আপনি বৃদ্ধ হবেন। কিন্তু এই চেনা জানা করতে করতে আমাদের জীবনে আর সময় বেশি বাকি থাকে না। সৌভাগ্যের কাঠি নিয়ে যারা এই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহন করে, তাদের বেশীর ভাগ মাতাপিতাই ধনী গোত্রের, কিন্তু সুখি জীবনের অধিকারী মানুষ গুলি সচরাচর মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ গুলিই ভোগ করে। এর কারন, তারা একে অপরের জন্য দুঃখ, ভালবাসা, হাসি, কান্না, অপেক্ষা, যন্ত্রনা, আনন্দ সব কিছু ভাগ করে নেয়।
অনেক মানুষকে বলতে শুনেছি, জীবনতো একটাই। একটা মানুষের একের অধিক গাড়ি থাকতে পারে, একের অধিক বাড়ি থাকতে পারে, একের অধিক ব্যাংকে টাকা পয়সা থাকতে পারে, এমন কি একের অধিক জীবন সাথীও থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন তো একটাই। আনন্দ করুন, মন যা চায় তাই করুন, তারপর মরুন। আমার তখন জানতে ইচ্ছে করে, আনন্দ কোনটা? রাত জেগে জেগে টিভির পর্দায় একা একা নাটক, সিনেমা দেখাই কি আনন্দ? কিংবা ডিজিটালের যুগে সারাদিন ফেসবুক, চ্যাট, ইমু, গেমস, ভাইবার ইত্যাদি নিয়ে বসে থাকাই কি আনন্দ? কিংবা এসি রুমে মন খারাপ করে একা একা বসে থাকাই কি আনন্দ? কিংবা এসি গাড়িতে বসে দুরের কোনো পার্কে অপরিচিত কোন এক যুবক কিংবা যুবতীর জন্য ডেটিং করাই কি আনন্দ? অথবা আনন্দ কি এমন যে, সারাদিন হাসতে হাসতে সময় কাটানো? আর সেটাই যদি হয়, কতক্ষন? আনন্দ কি এটা যে, অন্যায় করে ভুল পথে অনেক টাকা রোজগার করা? কিংবা ব্যাংকে অনেক টাকা আছে, তো যখন তখন বিদেশে গিয়ে কোথাও লাঞ্চ, কিংবা কোথাও ডিনার, অথবা অন্য কোনো দেশে রাত যাপন করা? অথবা আনন্দ কি এইটা যে, গরীব মানুষদের সাথে, কিংবা নিজেদের থেকে একটু নীচের ক্লাসের পাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের সাথে না মিশে শুধুমাত্র দেখে দেখে বড় লোকদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করা? আনন্দ কি এটা যে, ঈশ্বরকে মানলাম না, বিজাতীয় কালচারে যা খুশি করা? আনন্দ কি এইটা যে, পরিবারের কোনো সদস্যদের সাথে কম্প্রোমাইজ আর এডজাস্টমেন্ট না করে শুধু নিজের যা খুসি ইচ্ছে মতো করা? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। আসলে আনন্দটা কি? কোনো কিছু আমার মনের মত হল না, আমি মানতে পারলাম না, আর আমি মানতেও চাই না, আমার যা মনে ধরবে সেটা করতে পারাই কি আনন্দ তাহলে? এ অদ্ভুত এক হিসাব।
আমার কাছে আনন্দে থাকাটা ঐ রকমের কিছু মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়, যখন কোন এক দুঃস্থ পরিবার লজ্জায় কারো কাছেই হাত পাততে পারে না অথচ তার সমস্যার অন্ত নাই, তখন আমার কোনো একটা হাসি, কোনো একটা হাত বারানর সাহাজ্য, কিংবা তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তার দুঃসময়ের একটু সাথি হতে পারার মধ্যে যে আনন্দ, সেটাই আনন্দ। কিংবা অসচ্ছল কিংবা টেনেটুনে কোনো রকমে নিজের সৎ রোজগারের মধ্যে সীমিত আয়ের মধ্যে সবাইকে নিয়ে ভাগাভাগি করে একটা পর্ব পালন করার যে আনন্দ, সেটাই আনন্দ। অথবা হেটে হেটে রোদে ঘেমে, কিংবা ভিজে ভিজে দুই হাতে বাজার নিয়ে আপন জনের জন্য কিছু বহন করে বাসায় গিয়ে সবাই মিলে এক সাথে আনন্দ করে খাওয়ার যে ত্রিপ্তি সেটাই আনন্দ।
মানুষ কেনো কষ্ট পায়? টাকার অভাবে মানুষ কষ্ট পায়? কিংবা অনেক সম্পদ নাই, এইজন্য কি মানুষ কষ্ট পায়? অথবা কষ্টটা কি এই জন্য যে, সে যার যা খুশি সে মোতাবেক মনের আনন্দে কিছুই করতে পারে না? অথবা এমনকি যে, ঈদে, জন্ম বার্ষিকীতে, বিবাহ অনুষ্ঠানে, অথবা বড় বর শপিং সেন্টারে গিয়ে অনেক অংকের বাজার সদাই না করতে পারায় মনে কষ্ট? আমার কাছে এই রকম মনে হয় না। যদি তাই হতো, তাহলে যারা বিশ্ববিখ্যাত ধনি, যাদের অনেক টাকা আছে, সম্পত্তি আছে, যাদের এইগুলি বাস্তবায়ন করতে কোন বেগ পেতে হয় না, তারা সবাই সব সময় খুশি এবং সুখিই হতো। কিন্তু তারাও তো অনেক কষ্টে থাকে। কখনো পারিবারিক কষ্টে, কখনো শারীরিক কষ্টে, কখনো মনে আনন্দ নাই এই কষ্টে।
একটা সময় আসে, যখন মানুষ একা থাকতে চায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ যখন একাকীত্বকে ভয় পায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ বুঝতেই পারে না সেকি একা থাকতে চায় নাকি মানুষের ভীড়ে থাকতে চায়? মানুষ তখন থাকে খুব ঘোরের মধ্যে। ঘোরের মধ্যে থাকা অবস্থাটা একটা বিপদজনক। এটা পশুদের বেলায় হয় না। তাদের পেট ভরা তো সব কাহিনী শেষ। সে তখন কোনো এক নির্জন জঙ্গলে গাছের নীচে একাই ঘুমিয়ে যায় যতোক্ষন তার পেট আবার ক্ষুধার ইঙ্গিত না দেয়। তাদের কাছে কৃষ্ণচূড়ার পাতার রঙ অথবা গোলাপের গন্ধ অথবা মরা জীবের কোনো অসহ্য ঘ্রান কোনো কিছুই বদল করে না। শীত এলে তারা গুহা খোজে, আশ্রয় চায়। বর্ষায় ওরা ভিজে ভিজে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পায়েপায়ে অনেক দূর চলে যায়। কোথা থেকে এলো আর কোথায় গিয়ে থামবে, এটা নিয়ে ওদের কোনো মাথা ব্যথা নাই।
কিন্তু মানুষের বেলায়, সে সমাজ চায়, সে মানববসতি চায়। সে নদীর কুল চায়, চায় নদীর সাথে সাথে সভ্যতাও। এই সভ্যতার রেস ধরে মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসার কথা বলে। একজন আরেকজনের থেকে সুখি, আর খুসি হতে চায়। প্রতিযোগিতা বাড়ে। পছন্দ অপছন্দের হরেক পদের বং বাহারের যুক্তি তুলে কত যে নাটক, সিরিয়াল করে, তার কোনো ইয়ত্তা নাই। সুন্দর থেকে সুন্দরতমের তপস্যা চলে এই মানুষদের। আর এই তপস্যার অন্তরজালে কত কিছুই যে ব্যতিক্রম হয়, কেনো হয় কিভাবে হয় সে রহস্য সন্ধানেও আমরা বেশীরভাগ সময়ে ব্যর্থ হই। প্রতিযোগিতায় সুন্দুরী মেয়েরা সুখের ঘর হারায়, আবার সবচেয়ে অসুন্দর কোনো এক পঙ্গু মহিলা দিব্যি সুখে সংসার করে বেড়ায়। অশিক্ষিত কোনো এক মায়ের কোল ঘেঁষে দুনিয়া কাপানো সন্তানের জন্ম হয়, আবার সবচেয়ে পরিকল্পিত শিক্ষিত মায়ের কোলেই হয়ত বেড়ে উঠে সমাজের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটি। কেউ ভালোবাসে, অনেক সপ্নের ভিতর ডুব দিয়ে দিঘির জলের ভেসে বেড়ায়। কেউ কেউ আবার ঐ দিঘির জলের নীল চ্ছটায় কল্পনাকে ভাসিয়ে দিয়ে আকাশের নীলাভ মেঘ দেখে হয়ত ভাবে, কেউ কি তার জন্য অনেকদিন বাচতে চায়? কিংবা এমন কি কেউ আছে যে, তার সমস্তটা দিয়ে নিজের করে ভালোবাসে? সবুজ ক্ষেতের ধারে বসে কোন এক কল্পনায় কোনো এক অপরিচিত রাজপুত্রের সাক্ষাতে কত কথাই না বলাবলি করে। কিন্তু তা নিছক কল্পনার রাজ্যেই থেকে যায়। হয়ত কাউকে রাজপুত্র ভেবে মিথ্যা কোন প্ররোচনায় আবদ্ধ হয়ে সারাটি জীবন মিথ্যার মধ্যেই বসবাস করে। জানে, মনে কষ্ট, জানে হেরে গেছে, জানে এই পথ থেকে বেড়িয়ে যাবার আর কোনো রাস্তা নাই, তারপরেও জীবন তো, চলতেই থাকবে। কিন্তু কোথায় সে রাজপুত্র আর কোথায় গিয়ে এর শেষ? জোছনা রাতের চকচকে আকাশের তারার মেলায় পাখা মেলে ঝি ঝি পোকার মতো করে একগুচ্ছ ঝিনঝিন আওয়াজের মতো কতই না সঙ্গিত রচনা হয়ে আছে বুকের পাজরের মাঝে। যত্ন করে ধরে আছে ভালোবাসা। কিন্তু ঐ ভালোবাসা তো এক তরফা। যন্ত্রনা শুধু বাড়েই। ওটাই কি শেষ? এই মিথ্যা ভালোবাসায় কোনো অংশিদারিত্ত নাই, কম্প্রোমাইজ আছে কিন্তু এডজাস্টমেন্ট নেই, কান্না আছে অনুতাপের কিন্তু শান্তনা নাই, ব্যথা আছে কিন্তু বলার লোক নাই, এই ভালোবাসা শুধু খুসি রাখা আর কিছুই নাই। এখানে ভালোবাসার নির্ঘাত ভালোবাসার পচন ধরেছে। আর এই পচন শুরু হয়ছে অন্তর থেকে, তারপর শরীরে। আর যেদিন থেকে এই পচন শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই অস্থিত্তের পচন ধরেছে। এখন নিজের বাড়িতে, নিজের সমাজে, নিজের গন্ডিতে কেউ তার সাথে থাকতে চায় না। পরাজয় হয় সারা জীবনের।
যে ভালোবাসায় জিততে চায়, তাকে ভালোবাসা দিতে জানতে হবে। আর যে ঘৃণাকে জিয়িয়ে রাখতে চায়, তাকে সাফল্য এনে সেই জায়গায় যেতে হবে যেখানে তাকে স্পর্শ করার আর কারো ক্ষমতাও নাই। দুটুই কঠিন কাজ। কিন্তু এমনো কেউ আছে, যে ভালবাসল, সে হয়ত ভালবাসায় জিততেই পারলো না। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, সে ভালোবাসায় হেরে গেলো। হয়ত সে ভুল জায়গায় ভুল জিনিসের সন্ধান করেছে। আজ কোনো এক ভাগ্যের গুনে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা ফেরত যায়, কাল সে ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়েই হারে। অথচ এমনো মানুষ আছে, কখনোই ভালোবাসা কি জিনিস নিজেও জানে না কিন্তু নিজের অজান্তেই সে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এমন করে স্থান নিয়ে আছে যে, চারিদিকে ভালোবাসা শুধু মৌ মৌ করে বেড়ায়। এরা এক সময় সমাজ নিয়ন্ত্রন করে, এরা এক সময় সবাইকে নিয়ন্ত্রন করে। আর যখন এটা কেউ মানতে নারাজ হয়, তখন মনে হয়, ঐ যে একবার চুপি চুপি ভালোবাসা এসেছিলো, সেটাই ছিলো জীবনের সবচেয়ে সস্থির সময় যা দেমাগ আর অশালীন ব্যবহারে মানুষ দূরে ঠেলে দিয়েছে। অনুতাপের আর শেষ থাকে না তখন।
আসলে এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নাই। আবার সব কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। কেউ কবি হতে চায়, কেউ বৈজ্ঞানিক হতে চায়, কেউ অনেক ধনী হতে চায়, কেউ রাজনীতিক হতে চায়। আসলে এইগুলি ইচ্ছের উপর কিছুই নিরভর করে না। আবার এইগুলি যে ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না, তাও ঠিক নয়। কারন কোথাও না কোথাও এর একটা রদ বদলের পালা আছে। কোথাও না কোথাও এই যোগসূত্রের একটা টার্ন আছে। যা কিছুদুর পর্যন্ত দেখা যায়, আর বড় অংশটাই আমাদের নজরের মধ্যে নাই। সবচেয়ে ট্যালেন্টেড ছাত্রটি আজ হয়ত কোথাও কোনো এক বড় অফিসের কেরানীর চাকুরী করে। অথচ যে সময়ে তাকে ট্যালেন্টেড ভাবা হয়েছিলো, সেটার গতিপথ পাল্টে আরেক দিকে টার্ন নেওয়ার কারনেই আজ সে সাফল্যের যে চূরায় উঠার কথা ছিলো তার থেকে অনেক দূরে। আবার এমনো হতে পারে, ব্যাকবেঞ্চে বসে থাকা সবচেয়ে নিরীহ ছাত্রটি আজ বিসসের কাছে এতোটাই সমাদৃত যে, কোনো সুত্রই মিলছে না। এই সুত্রটাই মিলাতে হবে। কারন কোন কিছুই হতাত করে হয়ে উঠে না। প্রকৃতি তার ধর্ম কখনোই পাল্টায় না। সেই একইভাবে, যে বালকটি একদিন কবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ সবচেয়ে বড় সমাজসেবি, যে একদিন সমাজসেবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ কারো কারো জন্যে ত্রাস। যা ঘটে তা সময়ের বিবর্তনের পালাক্রমে কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই ঘটে। আজ যে রুপের কারনে আমি আপনি অহংকারী, মনে হয় পৃথিবী বুঝি আমার চরনতলে আছড়ে পড়লো। শত শত হিরো, শত শত সুশ্রী মানবীগন না জানি কতদিন কতরাত তাদের ঘুম হারাম করে রাত জেগে জেগে আমার কথা ভাবছে। এটা ভাবা সহজ। হয়ত এমনো হতে পারে, আমাদের এই আজকের দিনের সম্ভাব্য সবকিছু দেখেই কারো চোখ, কারো বুক, কারো লালসার অন্তরালে এমনই ভালবাসার জাল বানিয়ে অক্টোপাসের মতো ঘিড়ে ফেলেছে, যে, কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা ছলনা, বুঝাই দায়। যাকে তোমার আরধ্য, হয়তো দেখা যাবে তোমার চেয়েও অতি কুৎসিত কোনো রমনী তোমার আরধ্য কোনো পুরুষ তার শয্যাশায়ী। ব্যাপারটা হারজিতের নয়, ব্যাপারটা মতবাদেরও নয়, ব্যাপারটা অনেকাংশেই বৈষয়িক, আর কিছুটা তপ্ত বাসনা। ব্যাপারটা পছন্দেরও না অনেকাংশে । যে জামাটি আমি অপছন্দ করে দোকানে রেখে দিয়েছি, হয়তো ওই জামাটাই আরেকজন হন্যে হয়ে খুজছেন।
আজকে যে ট্রেনটায় আপনি উঠেছেন, সে ট্রেনের যে ব্যক্তিটি আপনার হাত ধরে তুলে নিলো, হয়ত সেই ছিলো আপনার সেই আরধ্য মানুষ। আপনি তাকে দেখেছেন কিন্তু হয়তো চিনতে পারেন নাই। কাল যখন আবার ট্রেনে উঠবেন, আপনি সেই ব্যাক্তিকে হয়ত আর কখনোই খুজে পাবেন না। সে অনেক দূর চলে গেছে।
পৃথিবীতে সকল সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক হচ্ছে সন্তানের সহিত বাবামায়ের। আবার কখনো কখনো এই সম্পর্কটাই সবচেয়ে বোরিং অথবা খুব বিপদজনক হয়ে যায়। বোরিং বা বিপদজনক হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে, তিলেতিলে গড়ে উঠা দিনের পর দিন এই সম্পর্কটা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, পিতামাতা না পারেন তার সন্তানকে বুঝতে না পারে সন্তান পিতামাতাকে বুঝতে। পিতামাতা কি চায়, আবার সন্তানও ঠিক কি করলে কি হবে সেটাও বুঝাতে পারে না। কিন্তু এটা ঠিক, এই অবস্থায় সন্তানরা তাদের প্রেক্ষাপট থেকে যেটা বুঝায়, তাতে অনেক ভয়ংকর এমন কিছু থাকে যা পিতামাতার সবধরনের আশঙ্কা শুধু বাড়তেই থাকে। তারা শিহরিত হন সমাজের মানুষগুলোর কাছে মাথা হেট হয়ে যাবে এই আশঙ্কায়, তারা অস্থির হয়ে যান সন্তানের অমঙ্গল হবে এই আশঙ্কায়, তারা ভাবনার চরম দুশ্চিন্তায় হামাগুড়ি দিয়ে শুধু ভাবতে থাকেন এই অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় কি ইত্যাদি।
এমন একটা পরিস্থিতিতে মাতাপিতা থাকেন একটা মানসিক কস্টের মধ্যে। একদিকে আদর করে কথা বললেও সন্তানের মেজাজের কাছে হেরে যান, আবার শাসন করে কথা বললেতো ব্যাপারটা আরো সিরিয়াস দিকে টার্ন নিতে থাকে। সম্পর্কে একটা উত্তেজনা তৈরী হয়। ধৈর্যহারা পিতামাতা যেমন সন্তানের উপর থেকে তাদের আদর, মহব্বত, স্নেহ তুলে নিতে পারেন না, আবার সন্তানের উপরও ভরসা করতে পারেন না। আবার অন্যদিকে তারা না পারেন তাদের উপর পিতামাতার দায়িত্ব পালনে বিরত থাকতে। সন্তানের একগুয়েমী যখন চরমে উঠে, তখন পিতামাতা এক সময় হাল ছেড়ে দেন। সম্পর্কটা ধীরে ধীরে এমন জায়গায় গিয়ে দাড়ায় যা ক্রমাগত দূর থেকে দুরেই যেতে থাকে।
যে সন্তানের জন্য পিতামাতা দিনের পর দিন অমানসিক, শারীরিক, দৈহিক সব ধরনের কষ্ট খুব হাসিমুখে সয্য করতে পেরেছেন, যে পিতামাতা নিজের আনন্দের জন্য কিছুই না রেখে সন্তানের জন্য সব অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন, বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সুন্দর সময়টা, সুন্দর ক্যারিয়ারটা। যে সন্তানের জন্য নিজে না খেয়ে, নিজের আহ্লাদ, স্বপ্ন কোনো কিছুই পূর্ণ না করে জমিয়ে রেখেছেন নিরাপদ সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, যখন এই পিতামাতাই দেখেন তার সন্তানেরা তাদের জন্য একবিন্দু পরিমান মহব্বত, ভালোবাসা তাদের অন্তরের মধ্যে নাই, তাদের কথাবার্তায় এমন কিছু ফুটে উঠে যা ভয়ঙ্করের চেয়ে আরো কষ্টের, তখন মনে হয় জীবন পরাজয় বরন করেছে। তখন পিছনের সব কষ্ট, ত্যাগ, আহ্লাদ, অপূর্ণ ইচ্ছেগুলি একসাথে চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়ে শুধু বলতে থাকে, তোমরা কোনো ইতিহাস থেকেই শিক্ষা গ্রহন করো না। তোমরা এই শিক্ষাটা ভুলে গেছো যে, মানুষ একা এই পৃথিবীতে এসেছে, এবং তাকে একা চলার জন্যই ঈশ্বর সেইভাবে গড়ে তোলছেন। তোমাদের এতো কিছুর ত্যাগের কোনো প্রয়োজন ছিলো না। গোস্যা হয় তখন নিজের কাছে, বুকের কোথায় যেনো চিনচিন করে ব্যথা হয় তখন। চোখ ভিজে আসে। কিন্তু কারো উপর রাগ হয় না, রাগ হয় শুধু নিজের উপর। কোথায় যেনো একবার পড়েছিলাম, ছেলেকে চেনা যায় যখন সে বিয়ে করে, মেয়েকে চেনা যায় যখন সে যুবতী হয়, বউকে চেনা যায় যখন স্বামী দরিদ্র অবস্থায় পতিত হন, আর স্বামীকে চেনা যায় বউ যখন গুরুতর অসুস্থ হন। আর সন্তানকে চেনা যায় যখন বাবা মা বৃদ্ধ হবেন। কিন্তু এই চেনা জানা করতে করতে আমাদের জীবনে আর সময় বেশি বাকি থাকে না। এই ধরনের একটা পরিস্থিতি প্রতিটি মানুষের জীবনে হয়ত কখনো কখনো আসেই। এটা একটা চক্রের মতো। কারন, দশ বছর বয়সী কোনো সন্তানকে যদি জিজ্ঞেস করেন, সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি কে? সে বলবে, মা বাবা। যখন তার বয়স চৌদ্দ, সেই বাবা মাই তার কাছে খুব বিরক্তিকর মনে হয়। যখন তার বয়স আঠারো, সে আর বাসার পরিবেশটাকেই আর সহ্য করতে পারেনা, বেরিয়ে যেতে চায়, স্বাধীন জীবনের আশায়। বয়স যখন পচিশ, তখন সে বুঝতে পারে, হয়ত বাবা মাই ঠিক ছিল। ত্রিশ বছর বয়সে এসে অন্তরে এইটা ধীরে ধীরে প্রোথিত হতে থাকে, আহা, আমার ভুলের জন্য যদি বাবা মাকে সরি বলতে পারতাম। পঞ্চাশ বছর বয়সে, বাবা মাকে হারাতে খুব ভয় করে সন্তানের। সত্তর বছর বয়সে এসে বাবা মাকে খুব মিস করে এই সন্তানেরা। কিন্তু তখন আর তারা কেহই এই পৃথিবীতে বেচে নেই। সন্তানের বয়স যতই হোকনা কেনো, কখনো কখনো মনে হয়, বাবা মাকে খুব প্রয়োজন। এটা শতবছর বয়সী কোনো সন্তানের জন্যও প্রযোজ্য। সন্তান বুড়ো হয়ে গেলেও সে বাবা মায়ের কাছে শিশুই থেকে যায়। একমাত্র সন্তানই বুঝতে পারে মায়ের অন্তরের ভিতরে তার অন্তর কিভাবে প্রতিক্রিয়া করে। কারন সে সেখানে অনেক গুলি সময় অতিবাহিত করেছে। জীবনে একটা সময় আসে যখন সন্তানেরা বাবা মায়ের উপদেশকে আর বেদবাক্য মনে করে না বরং বাবা মাই হয়ে যান তাদের জীবনের আদর্শ। সেই সময় অবধি তখন আর বাবা মা তাদের পাশে বেচে নেই।
মাঝে মাঝে ঐ কথাটা মনে পড়ে যে, সন্তানদেরকে ধনী হবার জন্য কোনো শিক্ষা দিতে নাই, সন্তানদেরকে শিক্ষা দেওয়া দরকার তারা যেনো বুঝে কোনটায় সুখি হওয়া যায়। আমরা এখানেই যেনো বারবার ভুল করি। আমরা সন্তানকে একাধারে কিভাবে ধনী হয়ে নিরাপদ জীবন পায় সেটাও দেখি আবার এটা দেখতে গিয়ে কিভাবে সুখি হওয়া যায় এই বিসয়টা অনেকাংশেই অবহেলা করি। আমাদের উচিত সন্তানদেরকে তাদের চেলেঞ্জগুলোকে মুখোমুখি হতে দেওয়া, তাদেরকে কোনো চেলেঞ্জ থেকে বের করে আনা কোনো মাতাপিতারই সঠিক সিদ্ধান্ত হয়ত নয়। পিতামাতারা তখনই নিজেদেরকে ধন্য মনে করবেন যখন তাদের হাত খালি থাকা সত্তেও তাদের সন্তানেরা দৌড়ে এসে তাদের বুকের মধ্যে আছড়ে পড়বে। এর থেকে আর কি ভালো হতে পারে কোনো পিতামাতার জন্য?
একজন মা সন্তান জন্ম দেওয়ার বহু আগেই তার সন্তান আসুক এই প্রত্যাশায় বুকভরে শ্বাস নেয়। আর যখন সে পেটে আসে, তখন থেকেই একজন নারী মা হয়ে যান আর ঐ মুহূর্ত থেকেই সে তার অনাগত সন্তানের প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকেন। আর সন্তান জন্ম নেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে সেই মা তার সন্তানের জন্য মরতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। আর এটাই হচ্ছে মা যিনি নয় মাস সন্তানকে পেটে ধরেছেন, তিন বছর তাকে তার বাহুতে রেখেছেন আর সারাজীবন তার অন্তরের ভিতরেই রাখেন। একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মা পৃথিবীর যে কোন গোয়েন্দা সংস্থার থেকেও সাফল্যবান কারন তিনি যা করেন সবটুকু কোনো শর্ত ছারাই তার সন্তানের জন্য করেন। তাতে কোনো খাদ নাই। যেদিন কোল ঘেসে সন্তান আসে, তখন তার নতুন আরেক নাম হয়। তার নাম হয় “মা”। মা ই একমাত্র মানুষ যে, সন্তানের কোনো না বলা কথা বলার আগেই বুঝে নেয়। একটা কৌতুক পড়েছিলাম, মায়েরা সবসময় চান, তার আদরের মেয়ে যেন তার থেকে ভালো স্বামী পায়, আর ছেলের বেলায় মা মনে করেন, ছেলে যেনো তার মতো একজন বউ পায়। এটা কৌতুক শুনালেও এর মাহাত্য একটাই, মা সব সময় সন্তানের সবচেয়ে মঙ্গলটাই চান। আমি বাবাকে উপেক্ষা করছি না। বাবা অন্যরকম এক চরিত্র। প্রতিটি বাবার কাছে তার মেয়েরা একজন প্রিন্সেস, আর ছেলে সন্তানেরা একেকজন প্রিন্স। একজন মেয়ে হয়ত তার জীবনে প্রিন্সেস পাবে কিন্তু বাবা আজীবন কাল তার কাছে রাজা হিসাবেই থাকেন। বাবা হচ্ছেন সন্তানের কাছে সেই ব্যাক্তি যার সুত্র ধরে অন্য কোন পুরুসকে মেয়ে বুঝতে পারে কতটা তফাত বা উন্নত। ছেলে সন্তানের কাছে বাবা হচ্ছেন একজন হিরো, আর মেয়ের কাছে প্রথম ভালোবাসা। আর এটাই হচ্ছে বাবা। একটা সময় হয়ত আসবে যখন “আয় তো মা, কাছে বস”, এই কথাটা শুনার জন্যও মন ব্যাকুল হয়ে কোনো কারন ছাড়াই চোখ বিনা দিধায় অশ্রু বিসর্জন দিবে। “লাভ এট ফার্স্ট সাইট” এই আদর্শ বানীটি একমাত্র প্রযোজ্য শুধুমাত্র বাবা মায়ের আর সন্তানের ক্ষেত্রে। পঙ্গু, কালো, নাক বোচা, বেটে বোবা যেমনই হোক না কেনো, বাবা মা ই একমাত্র ব্যক্তিত্ত যারা সন্তানের আগমনে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে। সন্তান জন্ম দেওয়া পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ, বাবা মা হওয়াও খুব সহজ কিন্তু সেই বাবা মা হওয়া খুব কঠিন যা সন্তানের জন্য প্রয়োজন। আজ হয়ত আমাদের সন্তানেরা এই ভালোবাসা উপলব্ধি করবে না, কিন্তু যখন করবে, তখন তারা ইতিমধ্যে পিতামাতা। প্রতিটি সাফল্যবান সন্তানের পিছনে আছেন প্রথমে তার মা, পরেরজন তার বাবা। আমাকে কোনো সন্তান যদি কখনো প্রশ্ন করত, কি করে আমি খুব ভাল একজন সন্তান হবো? আমি হয়ত বলতাম, এই প্রশ্নটা তুমি তোমার দাদা-দাদি অথবা নানা নানিকে করো। হয়ত তারা এই প্রশ্নের উত্তর আমার থেকে ভালো দিতে পারবেন।
লেখাটা একটা কৌতুক দিয়ে শেষ করিঃ
মা যখন রান্না ঘরে রাতের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত, এমন সময় তার ছোটছেলে এসে তাকে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিলো। তাতে লেখা ছিলোঃ
গতকাল বাগানে ঘাস কাটার জন্য পাওনা – ৫ টাকা
আমার রুম পরিস্কার করার জন্য পাওনা – ১ টাকা
পাশের দোকান থেকে মায়ের আদেশে ডিম কিনে আনার জন্য পাওনা – ১ টাকা
আমার ছোট বোনকে ১ ঘন্টার জন্য একা বাসায় পাহারা দেওয়ার জন্য পাওনা – ৫ টাকা
ময়লাওয়ালাকে ময়লা তুলে দেওয়ার জন্য পাওনা – ২ টাকা
স্কুলে ভালো মার্ক শীট পাওয়ার জন্য পাওনা – ৫ টাকা
টেবিল চেয়ার মুছে দেওয়ার জন্য পাওনা – ২ টাকা
সর্বমোট ২১ টাকা
মা চিড়কুটটি পড়ে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন এবং হাতমুছে একটা কলম নিয়ে লিখলেন
৯ মাস গর্ভে ধারন করার জন্য – নো চার্জ (ফ্রি)
সারারাত তোমার জর আর কাশির জন্য একা একা যখন জেগে থাকা – নো চার্জ (ফ্রি)
খাবার বানানো- নো চার্জ (ফ্রি)
খেলনা কিনে দেওয়া- নো চার্জ (ফ্রি)
নাক পরিস্কার করা, গোসল করান, পায়খানা প্রশ্রাব পরিস্কার করা ইত্যাদি- নো চার্জ (ফ্রি)
বিছানা ভিজিয়ে দেওয়ায় সারারাত নিজে ভিজা জায়গায় শুয়ে তোমাকে শুকনা জায়গায় রাখা – নো চার্জ (ফ্রি)
এ ছাড়া আমার ভালোবাসা – নো চার্জ (ফ্রি)
এই লিখে মা তার ছোট ছেলেটির হাতে চিড়কুটটি দিলেন। ছোট ছেলেটি যখন এই চিরকুটটি পড়ছিলো, তখন তার গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিলো। সে নিসচুপ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে একবার ভাষাহীন চোখে সরাসরি মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু এটাই বলতে পারলঃ
মা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।
এরপর সে একটা কলম নিয়ে চিড়কুটিতে লিখলোঃ
পেইড ইন ফুল।
ব্রাজিলের বিখ্যাত এবং বেস্টসেলার লেখক পাওলো কোয়েলহো তার বিখ্যাত why do we shout in anger? একটি লেখায় লিখেছিলেন, আমরা যখন রাগ করি, তখন এতো কাছাকাছি দুরুত্তে দাঁড়িয়ে থেকেও চেচিয়ে কথা বলি কেনো? তার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় তিনি একটা ব্যাখ্যা দাড় করিয়েছিলেন যদিও ব্যাপারটায় শারীরিক অনেক হরমুনাল ব্যাপার স্যাপার থাকতে পারে। আর ওইটাই সম্ভবত অনেকটা বৈজ্ঞানিক কারন কেনো আমরা উত্তেজিত হলে কেউ কাছাকাছি থাকলেও আমরা চেচিয়ে কথা বলি। কিন্তু লেখক আরেকটি যুক্তি দাড় করিয়েছেন, সেটাও খুব অযৌক্তিক বলে ফেলা যাবে না।
“দুটো মানুষ যখন একে অপরের উপর রেগে যায় তখন তারা একে অন্যের অন্তর থেকে দূরে সরে যায়। এই রাগ তাদের অন্তরের মাঝেও দুরত্ব সৃষ্টি করে। সেই দুরত্ব একটু একটু করে যত বাড়তে থাকে ততই তাদের রাগ বা ক্রোধ বেড়ে যায় এবং তখন তাদেরকে আরও চিৎকার করতে হয়, আরও জোরে তর্ক করতে হয়।”
-“আবার যদি আমরা ভেবে দেখি, দুজন মানুষ যখন একে অন্যের প্রেমে পড়ে বা ভালোবাসে তখন কী হয়? তখন ভালোবাসার বন্ধনে থাকা মানুষ দুজন একে অন্যের সাথে ধীরে ধীরে নরম স্বরে, আবেগ নিয়ে কথা বলে। কারণ যারা ভালোবাসে তারা একে অন্যের অন্তরের খুব কাছে থাকে। আর যারা অন্তরের কাছে থাকে তাদের কথা শুনতে হলে চিৎকার করার কোন প্রয়োজন পড়ে না। এমনকি শুধুমাত্র ফিস্ ফিস্ করেও তারা তখন কথা বলতে পারে।”
“যারা আরও বেশি গভীরভাবে একে অন্যকে অনুভব করতে পারে, ভালোবাসতে পারে তখন কী হয় তা কি আমরা জানি?”-“অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার হলো, তাদের তখন ফিস্ ফিস্ করেও কথা বলতে হয় না। তারা দুজন যখন একে অন্যের চোখের দিকে তাকায় তখনই অন্তরের অনুভূতি, কথা, শব্দমালা সব অনুভব করে ফেলতে পারে। কারণ তখন তাদের অন্তর তাদের কে এক করে ফেলে। তাদের কথা হয় তখন অন্তরে অন্তরে।”
এই বিংশ শতাব্দির আইটির দ্বারপ্রান্তে বসে যখন আমরা ডিজিটাল পৃথিবীর কথা বলছি, তখন আসলে আমরা এই ডিজিটাল বিশ্ব বলতে কি বুঝতেছি সেটা কি আদৌ কেউ সঠিকভাবে উপলব্দি করতে পারছি? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যানে যা মনে হয় তা হচ্ছে, এই পৃথিবী আইটির বদৌলতে অনেক এগিয়ে যাবে ঠিকই কিন্তু মানুষকে সেই আগের দিনের অনেক সিস্টেমে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আগেরদিন বলতে আমি বলতে চাচ্ছি, ঠিক ঐ আগের দিনের কৃষকের চরিত্রে। (আমি এই কৃষক চরিত্রটি বলছি রূপক অর্থে প্রোডাকসন ইউনিটের মালিক হিসাবে)। সম্ভবত সমাজ ঐ দিকেই ধাবিত হচ্ছে। এবং বর্তমান আইটি সেটাই সংকেত দিচ্ছে।
ব্যাপারটা একটা উদাহরন দিয়ে যদি আরো খোলাসা করে বলি।
ব্যাপারটা এইরকম যে, আগেকার দিনে একজন কৃষক তার জমিতে সব ধরনের ফসল ফলিয়ে তাদের অধীনে কর্মরত কিছু লোকবল দিয়ে সরাসসি তার প্রোডাক্ট মার্কেটে অন্য ভোক্তার কাছে বিক্রি করতো। ফলে এই প্রোডাকসন ইউনিট (অর্থাৎ কৃষক আর ভোক্তাবর্গ সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, কিছু কিছু মধ্যসত্ত্ব দালাল হয়ত এর মাঝে কাজ করেছে কিন্তু সেটা হয়ত একধাপ বা সর্বচ্চ দুইধাপ। অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যসত্ত দালালী একেবারেই থাকতো না।) এর ফলে কি হয়েছে যে, কৃষক তার আইটেমের ন্যায্য মুল্যের কিছুটা বেশি হলেই ভোক্তার কাছে সরাসরি তুলে দিতে পারতেন। যদি মধ্যসত্ত্ব দালাল যোগ হতোও, তাহলে ভোক্তাকে কিছুটা হলেও বেশি দাম দিতে হতো কিন্তু সেটা সহনীয় পর্যায়েই ছিলো। কিন্তু যখন দালাল, মধ্যসত্ত্বভোগী কিছু সিন্ডিকেট এর মাঝে জড়িয়ে পরলো, ধাপে ধাপে পন্যের মুল্যও বাড়তে থাকলো এবং যত বেশি মধ্যসত্ত্ব দালাল, কিংবা যতো বেশি ইন্টারমিডিয়ারী কর্মচারী এই কৃষক আর ভোক্তার মাঝে যোগ হতে থাকলো, প্রতিটি আইটেমের মুল্য ক্রমেই বেড়ে চললো। আর ভোক্তাও বেশি চড়া দামে তা কিনতে বাধ্য হলো। এইসব সিন্ডিকেটের ফলে কোথাও মজুত এবং তারপরে চড়া দাম ভোক্তাকে গুনতে হলো। এর ফাকে আবার কোথাও কর্পোরেট অফিস স্থাপিত হলো যেখানে পন্যের মুল্য কোনো না কোনোভাবে বাড়ানোর পায়তাড়া শুরু হলো। কর্পোরেট অফিসের কারনে কেনো পন্যের দাম আরো বেড়ে গেলো? কারন কর্পোরেট অফিসের স্টাফদের পোষা অনেক খরচ। আর এই খরচতো ঐ ভোক্তাদের কাছ থেকেই আদায় হয়। কোনো কিছুতেই এই সব জাল, সিন্ডিকেট, গ্রুপ, কর্পোরেট কনসেপ্ট থামানো যাচ্ছিলো না। এখনো না।
কর্পোরেট অফিসগুলি কিভাবে কাজ করে? তারা অতি এক্সপার্ট কিছু জানেওয়ালা স্টাফ নিয়োগ করেন ধাপে ধাপে বা স্তরে স্তরে। একজনের থেকে আরেকজন, আরেকজনের থেকে আরেকজনের ধাপ। শ্রমিককে কন্ট্রোল করার জন্য ম্যানেজার, ম্যানেজারকে কন্ট্রোল করার জন্য এজিএম, এজিএমকে কন্ট্রোল করার জন্য ডিজিএম, ডিজিএম এর উপর আবার ইডি, ইডির উপরে ডিএমডি, এছাড়া তো কমারশিয়াল, মার্কেটিং, হিউম্যান রিসোর্স, কমপ্লায়েন্স, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি আছেই। ফলে প্রতিটি ধাপের স্টাফদের ভরন পোষণ তো ঐ পন্যের মুল্য থেকেই আসে। ভোক্তা যখন পন্যটি হাতে পান তখন কৃষকের উদপাদন মুল্য কিংবা তার দ্বারা বিক্রিত মুল্যের অনেক বেশি পরিশোধ করতে হয় ভোক্তাকে। আমের বাগান থেকে শুরু করে কসমেটিক্স সব কিছুতেই এখন কর্পোরেট ফর্মুলা চালু রয়েছে। কোনো সরকারপ্রধান ইচ্ছে করলেও এই পুরু সিন্ডিকেটটিকে চাপের মধ্যে রাখতে পারছেন না। দামও কমাতে পারছেন না।
কিন্তু আইটির জগতে এই কাজটি একেবারে সহজভাবেই সমাধান হচ্ছে বলে আমার ধারনা। আর এই আইটি এই সিন্ডিকেটটিকে হাত কড়া পড়িয়ে তাদের একচ্ছত্র মনোপলি ব্যবসা থেকে বের করে দিতে পারছে বলে আমার ধারনা। যদিও ব্যাপারটা ঘটছে খুব ধিরে ধিরে কিন্তু প্রতিনিয়তই ঘটছে। এক সময় এটাই হবে সিস্টেম।
বর্তমানে আইটির কারনে এই প্রোডাকসন ইউনিটের মালিকগন সরাসরি ভোক্তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন যেটা এর আগে সম্ভব হচ্ছিলো না। মজার ব্যাপার হলো, যখনই প্রোডাকসন ইউনিটের মালিকগন সরাসরি ভোক্তার সাথে যোগাযোগ হয়, তখন প্রতিটি পন্যের মুল্য অবধারিত ভাবে কমে যায়। সেটা কিভাবে, আমি আরো সাধারন উদাহরন দিয়ে ব্যাপারটা বলি।
একটা সময় ছিলো(ছিলো বলছি কেনো, এখনো আছে), আমাদের সমাজে ট্যাক্সি ক্যাব চালানোর জন্য অনেক অনেক এজেন্ট নিয়োগ থাকতো যারা মানুষের ব্যবহারের জন্য ট্যাক্সি ক্যাবের ব্যবসা করতো। ভোক্তা একটি গাড়ী ভাড়া করবেন, তো প্রথমে ট্যাক্সি ক্যাবের এজেন্টের কাছে তাদের ডিম্যান্ড প্লেস করবেন। এজেন্ট কিছু গাড়িওয়ালাদেরকে একত্রি করে একটা এসোসিয়েসন করবেন, সেই এসোসিয়েসনের লোকেরা আবার তাদের দ্বারা নিয়োজিত কিছু কর্মচারী নিয়োগ দেবেন ইত্যাদি। ফলে যার ট্যাক্সি, তিনি যা পাবেন, তার থেকে আরো বেশি হয়তো পাবেন এই মধ্যসত্ত্ব দালা বাহিনি বা এজেন্টগন। কিন্তু পরিশেষে কিন্তু এই সার্ভিসের পুরু মুল্যটা জোগান দিচ্ছে ভোক্তা নিজে। কিন্তু এই আইটির যুগে এসে “ঊবার” একেবারে অনলাইনে এইসব ট্যাক্সি ক্যাবের কন্সেপ্ট বা ব্যবসায় নিদারুন ধশ নামিয়ে দিলো। উবার হচ্ছে আইটির বদৌলতে একটি অন লাইন ট্রান্সপোর্ট সরবরাহকারী সিস্টেম। উবারের মালিক নিজেও জানেন না কে বা কারা এই সব গাড়ির মালিক। কিন্তু তারা এক্তি সিস্টেম। পুরুটাই অনলাইন ভিত্তক। যারা উবার সম্পর্কে জানেন, তারা আজকাল আর কোন ট্যাক্সি ক্যাবের জন্য কোন ভোক্তা এজেন্ট খোজ করার চেষ্টা করছেন না। শুধু ঊবারের নাম্বারটা থাকলেই হলো। গাড়ীওয়ালা আর ব্যবহারকারী সরাসরি যোগাযোগ। মাঝখানে অনেক এজেন্ট না থাকায়, অনেক স্টাফ নিয়োজিত না থাকায় শুধুমাত্র ঊবার এর তৈরী একটা আইটি ভিত্তিক সিস্টেমের কারনে ভোক্তা সল্প একটা পারসেন্টেজ উবারকে দিয়ে অনেক সহজে এবং তাড়াতারি আগের থেকে অনেক কমমুল্যে গাড়ির প্রয়োজনীয়তা মিটিয়ে ফেলতে পারছেন। তাহলে এতো ঘটা করে শতশত স্টাফ নিয়োগ করে ট্যাক্সি ক্যাবের এজেন্টগুলি ব্যবসা চালাবে কেনো? ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ওইসব ট্যাক্সি ক্যাবের ব্যবসা। উবারের কারনে আজকাল সবাই যারা ট্যাক্সি চালান, সবাই ট্যাকিক্যব এজেন্ট।
আরো একটা উদাহরন দেই, আজকাল অনলাইন মার্কেটিং চালু হওয়াতে অনেক মানুষ আর দোকানে গিয়ে পিজা হাটের পিজাই হোক আর ঈদের জামাকাপর, কোরবানীর গরু মহিষ, কিংবা ব্রান্ডের গাড়ি, অথবা নিত্য নৈমিত্তিক বাজার সদাইও কিনতে যান না। অনলাইনে অর্ডার দিচ্ছেন, দোকানদার গুটি কতক নিম্নবেতনের কর্মচারী দ্বারা তা ক্রেতার বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে যেমন সময় বাচে, পরিশ্রম বাঁচে, বাঁচে মাঝখানের দালালীর খরচ। এতে দুই পক্ষেরই লাভ। আর লাভ বেশি ব্যবহারকারীর।
এখানে আরো একটা মজার ব্যাপার ঘটছে অহরহ। আগে মানুষের চাহিদা ছিলো এক রকম। এখন চাহিদা অন্যরকম। গাড়ীটা পুরানো হয়ে গেছে? তো নতুন মডেলের আরেকটা গাড়ি কিনার শখ। একটা জামা ছয় মাস পড়েছেন? তো আরেকটি জামা না হলেই নয়। ফলে কোয়ালিটির পাশাপাশি পরিবর্তনের চাহিদাটাও বেড়েছে। একটি পন্য বেশীদিন ভোক্তা ব্যবহারও করতে চান না। তিনি চান নতুনত্ব। তাই ভোক্তা চান, কমমুল্যে ভালো একটা পন্য। আগে একটি পন্যের দাম নির্ধারণ হতো এর প্রোডাকশন খরচের সাথে মালিকের কিছু লাভের পারসেন্টেজের যোগে। এইসব সিন্ডিকেট, কর্পোরেট সিস্টেমের কারনে প্রতিটি ধাপেই লাভ এবং খরচ যোগ হয়, ফলে কয়েক দফায় যেমন খরচ বাড়ে, তেমনি কয়েক দফায় লাভের হারও বাড়ে। ফলে বর্তমানে এই প্রক্রিয়ায় প্রোডাকসন খরচের উপর লভ্যাংশ ধরে এবং মধ্যসত্ত্ব দালাল, কর্পোরেট সিস্টেম ইত্যাদির বাড়তি খরচ যোগান দিতে গিয়ে কোনো পন্যের মুল্য নির্ধারণ অনেকাংশে খুব সহজ মনে হচ্ছে না বরং রিস্কের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। ফলে, বর্তমানে সরবরাহকারীগনও ক্রেতার পন্য ক্রয়ের ক্রয়ক্ষমতা এবং চাহিদার উপর মুল্য নির্ধারণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিভাবে? একদিকে কর্পোরেট সিস্টেমে দাম কমানো যাচ্ছে না তাদের ওভারহেড খরচ বেড়ে যাওয়াতে, আবার অন্যদিকে কোথাও কোথাও ভোক্তা এবং ক্রেতা সরাসরি সমন্নয় হবার কারনে একই পন্যের মুল্যে বেশ তারতম্য দেখা দিচ্ছে। যেখানে পন্যের মুল্য কম, ভোক্তা সেখানেই ঝোঁকে যাচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, যে পন্যটি বাংলাদেশের এক দোকানদার ভারত থেকে কিনে এনে এদেশের ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেন, তখন তার মুল্য বেড়ে দাড়ায় প্রায় তিন থেকে চার গুন। ভোক্তা যখন তার হিসাব কিতাব করে দেখেন যে, যদি ভোক্তা নিজেই ভারতে গিয়ে পন্যটি কিনেন তাহলে তার যাতায়ত ভাড়া, থাকা খাওয়ার সব খরচ বাদ দিয়েও লাভে থাকেন। তাহলে কেনো ভোক্তা এদেশে বসে এদেশের বিক্রেতার কাছ থেকে বেশি দামে পন্যটি কিনবেন? তিনি নিজেই পাড়ি দিবেন ভারতে। অথবা এই আইটির বদৌলতে যদি তথ্যটি ভোক্তা পান এবং অনলাইনে পন্যটি হাতে পাবার সুযোগ পান, তাহলে তো আর শারীরিক কষ্টও করতে হবে না। সরাসরি নিজের ঘরে পৌঁছে যাবে তার পন্যটি। যার ফলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের বিক্রেতা তার পন্যের মুল্য আগের তুলনায় কমাতে বাধ্য হবেন। কিন্তু কিভাবে কমাবেন? বিক্রেতা দাম কমানোর জন্যে মাঝখানের যেসব স্টাফ, দালাল, কিংবা ওই যে এক্সপার্ট লোকবলের ব্যয়ভার, সেখানে তিনি হাত দিবেন। আর যখনই ওখানে হাত দিবেন, সরাসরি কিছু ইন্টারমিডিয়ারী লোকবল, স্টাফের চাকুরী যাবে। তিনি পর্যায়ক্রমে ধাপ কমিয়ে দিবেন। দুইটা অফিসের জায়গায় যদি একটা অফিস দিয়েই ব্যবসা কিংবা অফিস চালানো যায়, কিংবা দশজনের জায়গায় যদি পাঁচজন দিয়ে কাজ চালানো যায়, কিংবা জোনাল অফিস, এরিয়া অফিস ইত্যাদি বাদ দিয়েও যদি খরচ কমানো যায়, তিনি তাই করবেন। কারন পন্যের দাম কমাতেই হবে। তাহলে এখানে প্রশ্ন আসে, এইসব ইন্টারমিডিয়ারী লোকবল ছাটাইয়ের কিংবা সেটআপ কমানোর ফলে শতভাগ কাজ চলবে কিভাবে? তাহলে কি এক্সপার্টদের আর প্রয়োজন নাই? না, এক্সপার্টদের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। এর বিকল্প হিসাবে হয়ত দেখা যাবে একজন অতি গুরুত্তপূর্ণ এক্সপার্ট দিয়েই অনেকগুলি কর্পোরেট অফিস চলবে। অথবা হয়তো এই এক্সপার্ট লোকজন ফ্রি ল্যান্স হিসাবে কাজ করবেন সাব কন্ট্রাক্ট হিসাবে অনেক গুলি লোকের জন্য এক সাথে। আর এদের সংখ্যা খুব বেশি হবে না। ফলে বর্তমানে নিয়োগকৃত নিজস্ব এক্সপার্টের আর প্রয়োজন রাখার যুক্তিযুক্ত মনে করবেন না কর্পোরেট অফিসগুলি।
এখানে আরো একটা উদাহরন দেই ব্যাপারটা সহজ করে বুঝানর জন্য।
একটা সময় হয়ত খুব বেশি দেরী নাই যখন মানুষজন আর মোবাইল ফোনের কোম্পানী গুলিকেও টাকা দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন না। কারন যে হারে ভাইবার, হোয়াটস আপ, স্কাইপ কিংবা অন্যান্য সোস্যাল মিডিয়া চালু হয়েছে এবং হচ্ছে সারা বিশ্বব্যাপি, তাতে আর মোবাইল ফোন অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন পড়বে না। যে কাজটি আমি ভাইবার দিয়ে, স্কাইপ দিয়ে, কিংবা ফেসবুকের সিস্টেম দিয়ে অথবা হোয়াটস আপ দিয়ে সমাধা করতে পারছি, কেনো আমি অযথা মোবাইল ফোনে টাকা খরচ করে সেই একই কাজটি করবো? কে তখন আর ইন্টারনেট কিনবেন, কিংবা মোবাইল ব্যালান্স কিনবেন, যেখানে একটা এমএমএস দিয়েই ভাইবার কিংবা হোয়াটস আপ কিংবা স্কাইপ দিয়ে সেই একই কাজটি করতে পারে! আপাতদৃষ্টিতে কিন্তু এর প্রভাব ইতিমধ্যে মোবাইল কোম্পানিগুলিতে পড়তে শুরু করেছে। একটার পর একটা মোবাইল কোম্পানি তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন, অথবা কয়েকটি মোবাইল কোম্পানি মিলে একসাথে মিলিত হয়ে, যুগ্ম এক্সপার্ট নিয়োগ করে তাদের ব্যবসায় অনেক স্তরের কর্মচারী ছাটাই করছেন বা গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের ব্যবস্থা করে লোকবল কমিয়ে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াবে যে, গ্রামীনফোনের এক্সপার্ট দিয়েই কম্বাইন্ডলি রবি মোবাইল চলবে, কিংবা একজন এক্সপার্টই দুই কোম্পানীর জন্য ফ্রিল্যান্সার হিসাবে কাজ করবেন। তখন আর ইন্টারমিডিয়ারী স্টাফ, ইঞ্জিনিয়ার, এডমিন কিংবা সিস্টেম ম্যানেজারের কোনো পদও থাকবে না। ফলে কর্পোরেট ইউনিটের মাঝখানের অধিকাংশ ইন্টেলেকচুয়ালস, বা এক্সপার্ট বর্গবৃন্দের সংখ্যাটা অনেক অংশে হ্রাস পাবে। কস্টিং মুল্য অনেক কমে যাবে। আজ যারা এসি রুমে বসে বুয়েট পাশ করে, কিংবা বিদেশী ডিগ্রী নিয়ে সাহেব হয়ে নামীদামী অফিসগুলোতে টাই পড়ে হাতের ইশারায় কিংবা নাক উচু করে পায়ের উপর পা তুলে কাজ করছেন, তখন ছাটাই করা এইসব লোকগুলি কোথায় যাবে? তারা তো আর কৃষকের মতো হাটে ঘাটে, এসি বিহীন রুমে কাজ করতে অভ্যস্থ নন। কিংবা তিনি যেই বিষয়ে ডিগ্রী নিয়েছেন, তার বাইরে তো আর কোন কাজও শিখেন নাই!! তাহলে তাদের গন্তব্য কি? আসলে, তাদেরকেও কোনো না কোন প্রক্রিয়ায় একটা সময় কোনো না কোনো প্রোডাক্টিভ ইউনিট খুজে বের করতে হবে যেখানে ওইসব ঘর্মাক্ত গন্ধের মানুষগুলির সমপর্যায়ে এসে দাড়া করাবে তাদের এবং এদেরকে প্রোডাকসন ইউনিটের সেইসব করমচারীর মর্যাদায় নামিয়ে দেবে যারা টাই পড়ে কাজ করেন না অথবা সকাল আত তায় অফিসে আসেন ঠিকই কিন্তু কখন বাসায় যাবেন তার সঠিক সময় তারা জানেন না। কারন ওটা প্রোডাকশন ইউনিট।
এই ব্যাপারটা সর্বত্র ঘটবে। ঘটবে কৃষি খাতে, ঘটবে শিল্প খাতে, ঘটবে সব জায়গায়।
এইভাবে আস্তে আস্তে মানুষের বিদেশ ভ্রমনও কমে যাবে। এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়ও অনেক প্রভাব পড়বে। যেমন ধরুন, যেই কাজটা করার জন্য আমাকে ব্যংকক, সিঙ্গাপুর যেতে হতো, সেটা আর না করে তথ্য আদান প্রদান, ফাইল চালাচালি, তার উপরেই সিদ্ধান্ত গ্রহন অনেক দ্রুত এবং সহজ হয়ে যাবে। তাহলে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে কেনো এয়ারলাইন্সের অফিসে লাইন দিয়ে লোকজন টিকেটের ধান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে? এরমানে এই নয় যে, সবকিছুই বন্ধ হয়ে যাবে। আমি বলতে চাচ্ছি যে, সিস্টেম পালটে যাবে। মধ্যসত্ত্ব স্তরের কর্মীবাহিনী অনেক অংশে হ্রাস পাবে। সবই থাকবে কিন্তু তখন সবাই হয় ভোক্তা আর না হয় সরবরাহকারী। আর এইসব সম্ভব হবে শুধুমাত্র ডিজিটাল যুগের যখন একচ্ছত্র লিডারশীপ চলবে। তখন কৃষক তার ধানবিক্রির জন্য আর মাঝখানের দালালদের সাহাজ্যের প্রয়োজন মনে করবে না সিন্ডিকেট থাকবে না, ইন্তারমিডিয়ারী লোকবলও থাকবে না। সে নিজেই মালিক, নিজেই জি এম, নিজেই কমার্শিয়াল, নিজেই মার্কেটিং অফিসার এবং তার সাথে কিছু হেল্পিং হ্যান্ডস। এতে যেমন উৎপাদনকারী তার ন্যাজ্য মুল্য পাবেন, আবার ভোক্তাও পন্যটি অনেক কমদামে ভোগ করতে পারবেন। আর ঠিক এটার মাধ্যমেই কস্টিং কমিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। এতে করে কি হবে সেই সব কর্পোরেট অফিশিয়ালদের? কি হবে জব মার্কেটের?
কর্পোরেট অফিসগুলি এখন যেসব এক্সপার্ট ইন্টেলেকচুয়ালগুলি নিজস্ব অর্থায়নে লালন পালন করছেন, সেইসব ইন্টেলেকচুয়াল গুলির সাপোর্ট নেবার জন্য কর্পোরেট পলিসি করবেন। হয়ত দেখা যাবে কয়েকটা কোম্পানি মিলে একটি বিসেস এজেন্টের কাছ থেকে সাবকন্ট্রাক্ট বেসিস সাপোর্ট নেবেন। থার্ড পার্টি সোরসিং হবে বেশি বেশি। হাইলি কোয়ালিফাইড ব্যক্তি না হলে আজকাল কর্পোরেট অফিসগুলুতে যেসব এক্সপার্ট চাকুরি করছে তারা চাকুরী হারাবেন। আর এই চাকুরী হারানো ব্যক্তিগুলি তখন কি করবেন? তারা শেষমেস কোনো না কোনো প্রোডাক্টিভ ইউনিটেই কাজ নিতে বাধ্য থাকবেন যেখানে আজকের পরিবেশ আর পাওয়া যাবে না। হোক সেটা কোন মুজার কারখান, বা হোক সেটা কোন রুমালের কারখানা, কিংবা হক সেটা কোনো আম বাগানের আমের ফলনের ব্যবসা। যার ফলে এখন এইসব স্টাফদের উচিত শুধুমাত্র কর্পোরেট অফিসে এক্সপার্ট হিসাবে নিজেকে নিরাপদ মনে না করে বর্তমান কাজের পাশাপাশি এমন কিছু স্কিল তৈরী করা যাতে টাই না পড়ে একেবারে লেবার শ্রেনিতে গিয়ে কাজ করার ক্ষমতা রাখা। সবাইকে শ্রমিক হতে হবে। হাইলি কোয়ালিফাইড এবং সবচেয়ে ভালো র্যাংকে না থাকতে পারলে কেহই কাউকে কর্মসংস্থানে আপ্যায়ন করবেনা। তখন একমাত্র ভরসা শ্রমিক হিসাবে কাজ করার মানসিকতা। এই পর্বটি ঠিক এখনি বুঝা যাবেনা। হয়ত এটা ২০২০ সালের মধ্যে ঘটবেই। জব মার্কেট বলে কিছু আর থাকবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। আর যারা জবে থাকবেন, তারা হচ্ছেন এতোটাই কোয়ালিফাইড যে, তাদের ছাড়া এই তথ্যলাইনের কাজও হয়তো হবে না। আর তারা হচ্ছেন ভোক্তা এবং সরবরাহকারীগনের সমন্বয়ক এবং সিস্টেম চালু রাখার একমাত্র বাহক। তাদের লাগবেই। ওটা জব নয়, ওরা সিস্টেম।
একটা সময় হয়ত আসবে যে, পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রীধারী একজন মানুষ হয়ত নিজেই একটা গাড়ি কিনে ট্যাক্সি ক্যাবে চালকের ভুমিকায় আছেন, অথবা বুয়েট থেকে পাশ করে হয়ত দেখা যাবে তিনি তার ক্ষুদ্র কোনো একটি প্রোডাক্টিভ ইউনিট চালাচ্ছেন।
ওইসময় যা ঘটবেঃ
(১) ডিজিটাল যুগে প্রোডাক্টিভ ইউনিটগুলির মালিকগন হোক সেটা ধান চাষ করার কৃষক, অথবা অতি বড় মাপের কোনো গারমেন্টস ব্যবসায়ীই, তারা মার্কেটিং এ একই কাতারে চলে আসবেন। কোনো দ্বিতীয় মাধ্যম কাজ করবে না।
(২) ভোক্তা এবং সরবরাহকারী সরাসসি যোগাযোগের কারনে দালালবাহিনী বিলুপ্ত হবে। পন্যের দামও কমে আসবে।
(৩) আইটির কারনে অনেক কিছুর বিলুপ্ত হবে যেমন বিলুপ্ত হয়ে গেছে ডিভি, ফ্লপি, সিডি, ক্যাসেটপ্লেয়ার, ক্যামেরা, ইত্যাদি পন্য। আজকাল রেডিও একটা ইতিহাস, আজকাল হাতের ঘড়িও হয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের মতো। লাইব্রেরী হয়ে যাচ্ছে কম্পিউটার।
(৪) ইনফরমেসন একেবারে হাতের মুঠোয় সবসময় মজুত থাকায় মার্কেটিং কন্সেপ্ট আর লোকাল এলাকা ব্যপ্তি না হয়ে গ্লোবাল এরিয়াতে চলে যাবে। তখন চাঁদপুরের এক কৃষক নাইজেরিয়ার আরেক ধান আমদানী ব্যবসায়ির কাছে সরাসরি তার পন্য বিক্রিতে জড়িয়ে পড়বেন।
(৫) মধ্যসত্ত্বভোগী এজেন্ট বা দালাল কিংবা কর্পোরেট অফিসের বর্তমান কন্সেপ্ট পুরুপুরি বদলিয়ে আরেক ধাপে উন্নিত হবে। তখন যারা থাকবে তারা সবাই মালিকপক্ষের লোক আর তাদের সাহাজ্য করবে একদল থার্ড পার্টি।
(৬) বেকার লোকের সংখ্যা সাময়িক সময়ের জন্য বেড়ে যাবে বটে কিন্তু অচিরেই লোকজন এই সিস্টেমের সহিত খাপ খাওয়ানোর জন্য সবাই প্রোডাক্টিভ কন্সেপ্টে এডজাস্ট করবে। যারা এখনি শুরু করেছেন, তারা অনেক দূর এগিয়ে যাবেন, আর যারা শুরু করেন নাই বা ভাবছেন না, তারা অনেক চড়াই উতরাই দিয়ে পার হবেন।
(৭) ব্যাংকিং সেক্টরে অভুত পরিবর্তন আসবে। সেটা কিভাবে? সেটা হচ্ছে কারেন্সি কন্সেপ্ট। এই কারেন্সি কনসেপ্টে কারেন্সির পরিবরতে পন্য হয়ে উঠবে প্রধান আদান প্রদানের মাধ্যম। এক দেশের তেল দরকার, আরেক দেশের ধান দরকার। জাস্ট বিনিময় হয়ে যেতে পারে পন্যটি। মাঝখানে শুধু পন্য বিনিময়ের মুজুরীটুকু থাকতে পারে।
(৮) নারী পুরুসের ভেদাভেদে অনেক পার্থক্য কমে আসবে। কারন এখন যেমন ব্যবসা কিংবা এই জাতীয় কোন সেক্টরে পুরুষের আধিপত্য বেশি কারন সর্বত্র কোথাও না কোথাও নারীদের জন্য সবকিছু সহজ মনে হয় না। কিন্তু তখন এই কঠিন পরিবেশটি নারীদের জন্য সহজ হয়ে আসবে।
তাহলে কি করা উচিত?
(১) প্রতিটি মানুষের উচিত এখন জাপানের মতো প্রোডাক্টিভ ইউনিটে কাজ করা যায় সেই মোতাবেক শিক্ষা ব্যবস্থায় দেশের আইন তৈরী করা।
২) দেশ করুক বা না করুক, প্রতিটি পরিবারের উচিত তার সদস্যদেরকে এমন কিছু কিছু সেক্টরে প্রশিক্ষন দেওয়া যাতে ভবিস্যতে শুধু করপরেট সংস্থায় কাজ করার জন্য তৈরী না করে নিজেরা নিজেরা কিছু কিছু প্রোডাক্টিভ ইউনিটের ব্যবস্থা করা অথবা প্রোডাক্টিভ ইউনিটে কাজ করতে পারে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেদের সদস্যদের তৈরী করা।
(৩) একের অধিক লাইনে এবং পুরুপুরি ভিন্ন প্রকৃতির কাজের জন্য নিজেকে তৈরী করা। আজ কর্পোরেটে আছে, আগামিকাল শ্রমিক হতে তাতে কোনো বাধা থাকবে না এবং সেটা করতে পারার সক্ষমতা।
(৪) বর্তমানের কর্পোরেট অফিস গুলোর দিকে চাকুরীর জন্য না তাকিয়ে নিজেরা কিছু করা।
সত্যি সত্যি জব মার্কেট ছোট হয়ে আসছে। এর পরিবর্তন বুঝা যাবে আগামি কয়েক বছরের মধ্যেই।
আমার জীবনে এমন একটা সময় আসবে একদিন যেদিন আমার জন্যই সবাই একত্রে মিলিত হবে। মিলিত হবে আমাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে। কিন্তু আমি থাকবো সম্পূর্ণ স্থবির আর শান্ত। বাড়িঘর সব ভরে যাবে একের পর এক চেনা জানা এবং অচেনা অনেক লোকের ভীড়ে। উজ্জ্বল দিবালয়ে, অথবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে অশান্ত হৃদয়ে কেউ কেউ লাল নীল জামা পড়ে মাথায় টুপি পড়ে, কেউ আবার হাতে তসবিহ নিয়ে মুখে দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে হাহুতাশ করবে, কেউ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জ্ঞ্যান হারাবে, কেউ আবার মনে মনে যার যার মিশ্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ কেউ আমাকে কোথায় দাফন করবে, কে বা কারা সেই দাফনের নিমিত্তে কোথায় আমার কবরখানা রচিত হবে এই ব্যস্ততায় এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াবে। কেউ আমাকে পেয়ে হারাবে আবার কেউ আমাকে না পেয়েই হারাবে। কারো অধিকার নিয়া মনে মনে ছক কসিয়া অশান্ত রুপ ধরে বিলাপ করবে, কেউ আবার অধিকার পুনরুদ্ধার হবে এই আশঙ্কায় প্রহর গুনবে। কারো জন্য আমার এই প্রস্থান হবে মর্মান্তিক আবার কাহারো জন্য হবে অতীব সুখের।
এইদিনে আমার সমস্ত সিডিউল মোতাবেক আর কেউ অপেক্ষা করবে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ক্যালেন্ডারটি আর আগের মতো সরব হইয়ে উঠবে না। ঘড়ির কাটায় কমবেশি হলেও আমার তাতে কিছুই যাবে আসবে না, আর তাতে আমার কোনো তাড়াহুড়াও থাকবে না। সারাবিশ্ব যেইভাবে চলতেছিলো ঠিক আগের মতোই এই জগতের সব কিছুই চলবে। এক মুহূর্তের জন্যও দিনের সময়কাল পরিবর্তিত হবে না, না চাঁদ তার উদিত হবার বা ডুবে যাবার কোনো ব্যতিক্রমী নিদর্শন প্রকাশ করবে। এমনটিই তো হয়ে আসছে বরাবর প্রতিটি মানুষের জীবন সায়াহ্নে। আমি আমার সারাজীবন ধরে যা আহরন করেছি, যা প্রতিনিয়ত রক্ষা করবার জন্য চারিপাশে সতর্ক দ্রিস্টি দিয়া পাহাড়া দিয়াছি, তা ওইদিন অন্য কারো হাতে চলে যাবে। সেটা নিয়া আমার কোনো কিছুই করবার থাকবে না। আমাকে যারা কখনোই ভালোবাসে নাই, যারা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্টে দেখার পায়তারা করত, তাদের উদ্ধত চাহনী কিংবা দ্রিস্টিভঙ্গি আমাকে আর কোনোভাবেই আহত করবে না। না আমি তাদের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করবো। যে তর্কে জিতবার জন্য আমি খন্ড খন্ড যুক্তি প্রকাশ করে আত্মতৃপ্ত হয়ে হাসিমুখে চারিদিকে বীরের মতো চলমান থাকতাম, সেই তর্ক এখন আর আমার কোনো কিছুই আনন্দ দান করবে না। আমার প্রতিদিনের জরুরি মেইল কিংবা টেক্সট ম্যাসেজের প্রতি আমার আর কোনো তাড়াহুড়া থাকবে না। যাদের বিরুদ্ধে আমার কতইনা রিগ্রেটে যা আমি বহুকাল নিদ্রাবিহিন রাত কাটিয়ে দিয়েছি, সেটার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে না, না আমার মনের মধ্যে এই সবের কোন প্রভাব ফেলবে। কারন আমি স্থবির।
আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে, আমার ওজন বেড়ে যাবে, এই ভেবে আমার রোজকার দিনের খাদ্যাভ্যাসে কোন পরিবর্তন কিংবা আমার সাদা চুলে কালো করবার বাসনা এসব কিছুর আর কোনো প্রয়োজন হবে না, না এসব আমাকে আর বিচলিত করবে। আমার ব্যবসা, আমার সম্মান, আমার প্রতিপত্তি যার জন্য আমি প্রতিনিয়ত ভভেবে ভেবে, নিদ্রাবিহিন কষ্ট করেছি, কিংবা কিভাবে কি করলে আমার সব কলেবর বৃদ্ধি হবে ইত্যাদির জন্য প্রানপন চেষ্টায় লিপ্ত ছিলাম, সেই ব্যবসা, সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি আজ হতে রহিত হয়ে তা অন্যের হাত ধরে চলতে থাকবে। ছোট কিংবা বড় যতো বড়ই অনুশোচনা হোক না কেনো, ক্লান্তি কিংবা কষ্ট যাই হোক না কেন, তা আজ আর কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। না আমাকে আর রাত জাগাইয়া তা নিয়া ভাববার কোন অবকাশ দিবে। জীবনের রহস্যময়তা, কিংবা মৃত্যুর উদাসিনতা যা আমার মন বহুবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তা আজ এক নিমিষের মধ্যেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। জীবন কি, মৃত্যু কি, জীবনের পরে মৃত্যুর কি গন্তব্য যা নিয়া আমি বহুবার তর্কে লিপ্ত হইতাম বা হয়েছি, যুক্তি খুজেছি, সব কিছুর সঠিক তথ্য আজ আমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে।
আমার অনেক অসমাপ্ত কাজ যা করবার জন্য আমি জল্পনা কল্পনা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, তা আজ সব কিছুর ইতি টেনে আমাকে নিয়ে যাবে কোনো এক সুদুর অজানা একস্থানে যা আমি এর আগে একবারের জন্যও বিচরন করি নাই।
আজ এই শান্ত শরীরে আমার চারিপাশের সবাইকে যেনো অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করতেছে কিন্তু আমার শ্বাস রুদ্ধ করা হয়েছে, আমার কণ্ঠনালি রুদ্ধ করা হয়েছে, আমার বাহু, আমার পা, আমার চোখ, আমার যাবতীয় ক্ষমতা আজ রহিত হয়ে একটি ছোট খাটিয়ায় আমি এমন করে শুয়ে আছি যা অবশ্যই হবে বলে আমি একদা জানতাম কিন্তু ইহা যে আজই তা আমি কখনো মনে মনে কিংবা শারীরিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। অথচ আমার এই দিনের জন্য একবারের মতোও কি প্রস্তুতি নেয়া দরকার ছিল বা আমার কি কি করনীয় ছিলো সেই ব্যাপারে আমি কখনোই নিজেকে তৈরী করি নাই। আমার যতো সব সম্পত্তি, যশ, সম্পদ সমস্ত কিছুর বিনিময়েও আজ আমি এই পরিস্থিতি হইতে মুক্ত হতে পারবো না। আমার সর্বত্র এবং সবকিছুতেই খাচায় বন্দি করা হয়ে গেছে।
যে ঘরটিতে একচ্ছত্র আমার অধিকার ছিলো, যার প্রতিটি কোনায় কোনায় আমার হাতের স্পর্শ, আমার পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিলো, তা থেকে আজ আমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আমি মেজর সাহেব বীরদর্পে হেটে যেতাম, যে জায়গাটা জুতা মাড়িয়ে, সিগারেট ফুকিয়ে পায়ে দলিয়া পিছনে ফেলে ফেলকনি খাটে বসে আরাম করে বসতাম, আজ সেই ফেলকনি খাট আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ওই জুতা মাড়ানো স্থানটিই আমার জন্য বরাদ্ধ হয়ে রবে। আমি আমার নামটিও আজ হারিয়ে ফেলবো। আমাকে আর কেউই আমার সেই প্রিয় মেজর সাহেব নামটি ধরে, কিংবা আমার ছোট মেয়ের অতি আদরের ডাকটি ধরে আমাকে গলা জড়িয়ে সম্বোধন করবে না। আমি মেজর আখতার নিতান্তই একটি লাশের নামে পরিচিত হয়ে এই উজ্জ্বল নীলাকাশ সমৃদ্ধ পৃথিবী হতে সবার আড়ালে চলে যাবো।
অফিসে যাইবার প্রাক্কালে যেই সুন্দরী বউটি বারবার জিজ্ঞাসা করত কখন আবার বাসায় ফিরবো, কিংবা আজ অফিস হতে ফিরতে দেরী হবে কিনা, অথবা বিদেশে যাত্রাকালে মেয়েদের এই আবদার, ওই আব্দারের লিস্ট সম্বলিত দাবীনামার মতো আজ আর কেউই আমাকে কিছুই জিজ্ঞেসা করবে না, কখন আবার বাসায় আসবো, কিংবা কেহ আমার সাথে যাবার জন্যও বায়না ধরবে না। ইহা এমন এক যাত্রা যেথায় কেহই কাহারো সাথী হতে ইচ্ছুক নহে।
আমি জানি আমি তোমাদেরকে আর কিছুই বলতে পারব না। যদি এটাই হয়ে থাকে আমার জীবনের শেষ বার্তাটুকু তোমাদের জন্য, তাহলে আমি আজ তোমাদের কাছে এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করতেছি যে, যদি কারো মনে, অন্তরে, শরীরে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, স্বার্থের কারনে বা বিনা স্বার্থে আমার অগোচরে কোনদিন আঘাত করে থাকি, যদি আমার দ্বারা এমন কোনো কাজ হয়ে থাকে যা উচিত ছিলো না, যা কারো অধিকার খর্ব হয়েছে, কিংবা আমার দ্বারা জুলুম হয়েছে বলে মনে মনে অনেক অভিশাপ দিয়াছেন, আমাকে সবাই খাস হৃদয়ে অনুশোচনাপূর্বক ক্ষমা করে দিবেন। আমিও আপনাদের সবাইকে ক্ষমা করিয়া দিলাম। আমি আমার দায়িত্ত কতটুকু পালন করতে পেরেছিলাম, সেই বিশ্লেষণ আমার উত্তরসুরী, আমার পরিবার আর আমার সমাজের উপর। আমার পরিবার, আমার সমাজ আমাকে কতটুকু দিয়াছিলো সেই বিশ্লেষণ আমার কাছে আর নাই তবে আমি আপনাদের সহিত ভালো একটা সময় কাটিয়ে গেলাম এটাই আমার জন্য অনেক ছিলো।
সবার শেষে আমি তোমাদের জন্য এই কথাটাই বলতে চাই-
যদি আমি কখনো আমার জানা অজানায় তোমাদেরকে ইগনোর করে থাকি, আমি দুঃখিত।
যদি কখনো আমি তোমাদের খারাপ লাগার কারন হইয়া থাকি, আমি দুঃখিত।
যদি আমি কখনো তোমাদেরকে কারো কাছে অপদস্থ করে থাকি, আমি দুঃখিত।
যদি আমি কখনো দাম্ভিকতার পরিচয় দিয়ে আমি তোমাদের থেকেও উত্তম বা বড় ভেবে থাকি, আমি ক্ষমা প্রার্থী।
তোমরা কখনো এটা ভেবো না যে, আমি তোমাদের ভালোবাসি নাই, আমি তোমাদের সব সময় ভালোবাসিয়াছি।
যদি কখনো তোমরা ভাবো আমি তোমাদের দুঃসময়ে পাশে ছিলাম না, সেটা হয়তো আমারো ক্ষমতা ছিলো না, তারপরেও, আমি দুঃখিত।
যতো অপরাধ বা ভুল করিয়াছি, যাহার প্রতিই করিয়াছি, তোমরা আমাকে ক্ষমা করিয়া দিও।
কেনো আমি আজ তোমাদেরকে এই সব কথা বলিতেছি?
হতে পারে, আমার আর এইসব কথা বলার জন্যে আগামিকালটা আসবেই না।
হতেও তো পারে, আজকের পরে আমার জীবনে আর কোনো আগামীকালই নাই!!
এমনো তো হতে পারে, তোমাদের কাছে হাত জোর করে আমি তোমাদের কাছে আর ক্ষমা চাওয়ার দিনটাই আমি পাবো না!!
কোথায় যেনো একবার পড়িয়াছিলাম, All that Glory leads but to the grave……
অনেকদিন পর লিখতে বসেছি। মনটার চেয়ে শরীরটা আরো বেশি খারাপ বলে মনে হচ্ছে। অধিক পরিশ্রমের চেয়ে মানসিক টেনসনের কারনেই শরীরটা বেশি খারাপ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সারাদিনই ক্ষুধা থাকে, কিন্তু ভালো খেতে পারছিনা, সিগারেট খাওয়ার পরিমানটা অনেক অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
জীবনের এতোগুলো বছর চারি পার্শের সমস্ত কুরুক্ষেত্র জয় করে যখন একটা জায়গায় স্থির হয়েছি, ঠিক সেই সময়ে ইদানিং মাঝে মাঝে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে এমন কোনো জায়গায় হারিয়ে যাই, যেখানে আমাকে কেউ চিনবেনা, আমিকে, কোথা থেকে এসেছি, কেউ জানবে না আমার আসল পরিচয় কি। আমিও আমার আগের সব স্মৃতি, পজিসন, জীবনধারা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব ভুলে গিয়ে কোথাও একদম একা একা বাকি সময়টা কাটিয়ে দেই। না থাকুক আমার চাকুরি কিংবা ব্যবসা, না থাকুক আমার এসিরুম, না থাকুক আমার বসগিরি, কি যায় আসে? হয়ত কারো বাসায় দিন মজুর হিসাবে খেটে দেওয়ার বদলে তিনবেলা খাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেলেই হলো। অন্তত রাতে মানসিক যন্ত্রনা ছাড়া ঘুমাতে পারবো। নাহোক সেটা কোন খাট অথবা তোষকেমোড়ানরম বিছানা। হোক না সেটা পরিত্যক্ত কোনো গ্যারেজের অংশ। হয়ত মনিব জান্তেই পারবেনা, কি মানুষটি কি অবস্থায় কি কারনে কেনো এইভাবে দিনযাপনে জীবনটাকে বেছে নিয়েছেন। কোন দুঃখ নাই। কারন, কোনো দায়িত্ব নাই মনে করে আমি পরেরদিনের শুধু আকাশটাতো নিরিবিলিতে বিকালের কোন এক মেঘলা দিনে দেখতে পারবো। তৃতীয় নদীর ধারে বসে আমি অন্তত “নদীর তৃতীয় তীরের” ওপারের নীলদিগন্ত তো দেখতে পাবো। আমার কোনো কিছুই মনে পড়বেনা যে, কেউ আমার জন্য বসে আছে, কেউ আমাকে মিস করছে ইত্যাদি। এই ভাবনা থেকে আমি যখন অনেক দূরে বসে কচিকচি পাতার শিশির বিন্দুর ছোঁয়ায় পায়ের পাতা ভিজিয়ে দেবো, কিংবা উত্তরের হাওয়ায় ভেসে আসা ছাই রঙের মেঘ যখন আমার মুখাবয়ব ভিজিয়ে দিয়ে যাবে, আমার অতিতের কথা মনে করে গড়ে পড়া চোখের পাতার জল আর কারো চোখে পড়বে না। আমার দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, আমার কাছে মানুষের চাহিদা, আর ঐ চাহিদাপুরনে আমার ব্যর্থতার জল আমাকেও আর পীরা দিবেনা যে, কেনো আমি এতোকিছুর পরে হেরে গেলাম। মানুষ নিজের কারনেই শুধু হেরে যায় না, মাঝে মাঝে নিজের সামর্থ্য থাকাসত্তেও মানুষ হেরে যায়। আর তার এই হেরে যাওয়া যখন শুরু হয়, তখন নিজের চোখের সামনে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। এই অসহায়ত্ব একটা শাস্তি। নিজের কাছে নিজের শাস্তি। ছায়ার মতো সারাক্ষন লেগে থাকে। যার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া বড় কঠিন।
ইচ্ছে ছিলো, অনেক বড় হবো, ইচ্ছে ছিলো আমার চারপাশের আপনজনদেরকে নিয়ে হৈ হুল্লুর করে নেচে গেয়ে শ্রাবনের বৃষ্টিতে কাক ভেজায় ভিজবো, ইচ্ছে ছিলো শীতের কোন এক সকালে দল বেধে পিঠে ব্যাগ নিয়ে কোন এক পাহাড়ের চুড়ায় বসে প্রাকৃতিক বনজংগলে বসে গরম গরম পিঠা খাবো। এতা একটা স্বপ্ন। কিন্তু এই সপ্নটা একা সপ্ন দেখলেই হবেনা। এই সব সপ্ন দলবদ্ধ সপ্ন। এই সব স্বপ্ন একে অপরের সাথে একটা চেইনের মতোবাধা। কোথাও ছিড়ে গেলে এর আর কোনো বাস্তবায়ন থাকেনা। পুরুটাই শিশিরবিন্দুর মতো উবে যায়। তখন আর বুঝা যায় না এইখানে কোনো একজলের বিন্দু থেকে কখনো শিসির জমে ছিলো কিনা।
জীবনটা এতো ছোট যে, এক জিবনে মানুষ তার কোনো কিছুই শেষ করতে পারে না। কিন্তু মানুষ যখন হেরে যায়, তখন সে আরেকটি জীবনের জন্য আশা করেনা। উত্থানের থেকে পতনের গতি সবসময় বেশি। ফলে জীবনের অধিকাংশ সময় ধরে যখন কেউ শুধু উত্থানের দিকে যেতে থাকে, পতনের সময় তার তখন কোন কিছুতেই ভারসাম্য থাকে না। একদিকে ভারসাম্য রক্ষায় চেষ্টা তো, আরেক দিকে ভারসাম্য হারিয়ে যায়। ওইদিকে নজর দিলে, অন্যদিকে আবার ভারসাম্য হারিয়ে যায়। আর এভাবেই দ্রুত ভারসাম্য হারাতে হারাতে হটাত নিজেকে খাদের অনেক নীচে দাঁড়িয়ে আছি বলেই আবিস্কার করে। তখন আশেপাশে যারা থাকে, তারা হয় সবাই অচেনা, নয় প্রানিকুলের কেউনা। নিজের আপনজনদেরকেও তখন বড় অপরিচিত বলে মনে হয়। উত্থানের ভারসাম্য আর পতনের ভারসাম্য একনয়। তাদের মিলিত বিন্দু একজায়গায় নয়। তাদের ভারসাম্যের কেন্দবিন্দুও একনয়। উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু যদি হয় আকাশের চুরায়, পতনের কেন্দ্রবিন্দু হয় পাতালের নীচে।
মাঝে মাঝে আমি যখন একা থাকি, তখন ভাবি, কিভাবে এতোবড় সাগরের মতো সমস্যাগুলি আমি সামাল দিচ্ছি? কোনো সমস্যাই কারো থেকে কম ছোটনা। কিন্তু কনো না কনভাবে আমি সামাল দিচ্ছি। কোনো সমস্যা বিশাল টাকার, কোনো সমস্যা বিশাল ভাবে রাজনীতির, কোনো সমস্যা আবার নিছক ব্যক্তিগত। এতো সমস্যায় জর্জরিত থেকেও আমি একটা জিনিষ বুঝতে পেরেছি, আমার পাশে আসলে কেউ নাই। যে যাই কিছু বলুক, আমি আসলে একা। আমার পরিবার আমার সাথে আছে কিন্তু তারা কি আমার সমস্যায় চোখের জল ফেলাছাড়া আর কিছু করতে পারবে? আমি তাই মাঝে মাঝে ভাবি, আমার অনুপস্থিতিতে ওরা ভালো থাকবেতো? আমার সব কিছুর উপরে আমার পরিবার। এই জায়গায় আমি চরম স্বার্থপর। এখানে আমি কোনো ছাড় দিতে ইচ্ছুক নই।
আমি যেভাবে এগুচ্ছি, তার বেশীর ভাগ সাহসিকতার কারন আমার ইচ্ছাশক্তি আমাকে আমার পরিবারের জন্য কাজ করে। কখনো ওরা আমাকে ভুল বুঝে কিন্তু আমি জানি ওদের ঐ ভুল বুঝাবুঝির কারনে আমি ছেলেমানুষিকরলে ওরা সময়ের স্রোতে ভালো থাকবেনা। তাই সব রাগ, ঝগড়া, বিবাদ নিমিষেই অবুঝ বালকদের বাচ্চামি মনে করে ঝেড়ে ফেলে দেই আর সামনের দিকে এগুনোর চেষ্টা করি। আমি সফল হচ্ছি কিনা আমি জানি না তবে আমার উপর থেকে ধীরে ধীরে যে বিশাল বিশাল বোঝা নেমে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারি। আর এখানেই আমার সার্থকতা।
জীবন একটাই। সবাই জীবনে সুখী হতে চায়, আরাম আয়েস চায়, চায় সম্মান নিয়ে নিরাপদে সুখী পরিবার নিয়ে বেচে থাকার। আর এই সুখ, আরাম, সম্মান, নিরাপত্তা কোনোটাই সহজলভ্য ব্যাপার নয়। এর পিছনে থাকে হাড় ভাঙ্গা খাটুনী, অসহনীয় ধকলেরধাক্কা, আরো অনেক কিছু। তাতেই কি সব পাওয়া যায়? মোটেইনা। অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তিটা মোটেই আনুপাতিক নয়। ফলে মানুষ তার আখাংকার তীব্রতার কাছে ক্রমাগত হেরে যেতে থাকে, আর এই হার থেকে মানুষ অনেক সময়ই ভুলরাস্তা বেছে নেয়, সহজ পথ আঁকড়ে ধরে। যখনই এই ঘটনাটা ঘটতে থাকে, তখন ব্যক্তি আর ব্যক্তিত্বর মধ্যে একটা কনফ্লিক্ট তৈরী হয়। ব্যক্তিত্ব যদি হয় নীতির পরিমাপের একটা আদর্শ, ব্যক্তিত্ব যদি হয় ব্যক্তির সততার একটা মাপকাঠি, ব্যক্তিত্ব যদি হয় নিরপেক্ষতার একটি ইউনিট, তাহলে যখনই এই হারের ঘটনাটা ঘটতে শুরু করবে, তখন ব্যক্তির আখাংকার তীব্রতার কাছে এইসব ব্যক্তি আদর্শ, নীতী, নিরপেক্ষতা হারাতে থাকে। এই উপাদান গুলি আর তখন খুব জোরালো হয়ে কাজ করেনা। যে নীতিসমুহ একজন ব্যক্তিকে ভুলরাস্তা থেকে সরিয়ে নিতে পারতো, তখন সেই নীতিগুলোর অনুপস্থিতে নিমিষের মধ্যেই ব্যক্তি ভুল একটা রাস্তায় প্রবেশ করে ফেলে। আর এই নীতির অনুপস্থিতিটাই হচ্ছে দুর্নীতি। আর একবার যখন কেউ এই ভুল রাস্তায় প্রবেশ করে ফেলে, তখন তাকে আর ফেরানো যায়না। হোক সেটা প্রেমের বেলায়, হোক সেটা অর্থনীতির বেলায়, আর হোক সেটা কোনো সামাজিক কর্মকান্ডের বেলায়। ব্যক্তিটা তখন সবার বেলায় একই আচরন করে। বন্ধু পালটে যায়, সমাজের গন্ডি পালটে যায়, পালটে যায় তার দৃষ্টিভঙ্গির।
যখন কারো দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যায়, তখন তার কাছে অনেক কিছু আর স্বাভাবিক মনে হবে না। লাল কাচের ভিতরে রাখা সাদা গোলাপকে সে লাল রঙের গোলাপই মনে করবে, নীল আলোর চত্তরে সে সবুজ গাছের পাতাকে আর সবুজ দেখতে পাবে না। তখন তার স্বাভাবিক চোখ তার মেধার সঙ্গে একাকার হয়ে বাস্তব কিছু থেকে অনেক দূরে সরতে থাকবে। সরতে থাকা প্রেক্ষাপটে তখন অনেক কিছুই সাফল্য বলে মনে হয়। প্রাপ্তির অনুপাতটা মনে হয় শ্রমের থেকে একটু বেশি। দিন মাস, বছর ধরে যদি ক্রমাগত এই পরিবর্তন ঘটতে থাকে, তখন একসময় তার কাছে কোনো কিছুই আর অসম্ভব বলে মনে হয় না। সে হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। আর অপ্রতিরোধ্য চরিত্রগুলোই হচ্ছে অন্য সবার জন্য বড় একটা সমস্যা। এই সমস্যা হয়ে উঠে তখন সামাজিক ব্যধির মতো। কারন সে নিজে পালটেছে, সঙ্গে আরো কিছুকে পাল্টায়। এই পাল্টানোর হার যদি বাড়তেই থাকে, তখন পুরু সমাজটাই হয়ে উঠে বিসাক্ত। স্বাভাবিক কোনো কিছুরই আর তখন গ্যারান্টি থাকে না। নারী তখন অসহায় হয়ে উঠে। সব নারীরাই তখন শুধু নারী। মা, বোন স্ত্রী, মেয়ে, কিংবা দাদীর মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকে না। কিছু পুরুষ তখন হয়ে উঠে অত্যান্ত দুর্দান্ত, আর কিছু পুরুষ হয়ে উঠে নিতান্তই দুর্বল। আইন তখন নীরব থাকে, আইনের রক্ষকেরা তখন নিজেরাই বিভিন্ন চরিত্রে উপনীত হয়।
এখানে একটা জিনিষ খুব ভালোভাবে বুঝা দরকার যে, ভুল করে ভুল রাস্তা বেছে নেওয়ার ব্যক্তিকে ভুল থেকে শোধরানো যায় কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছে করে ভুল রাস্তার সন্ধান খুজে নেয়, তাকে সরানো কঠিন। আর সেই ভুল্টা হচ্ছে অন্যায়। ভুল করে ভুল করার পর হয় আফসোস কিন্তু অন্যায় করে ভুল করার কারনে মানুষ হয়ে উঠে মানসিকভাবে দুর্বল। ভুল রাস্তায় জীবন জাপন করে কেউ অধিক কাল বেচে থাকতে পারে নাই, এতে যার যতো সম্পদ, টাকাপয়সা কিংবা যশই থাকুক না কেনো। কারন প্রকৃতি তার নিজের নিয়ম ভেঙ্গে কখনো অন্য কোন নিয়মকে মেনে নেয় নি। ফলে এই সুন্দর পৃথিবীটাকে অধিককাল দেখার সৌভাগ্য হয় শুধু তাদেরই যারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে এক সঙ্গে চলতে পেরেছেন। তাহলে প্রকৃতির সেই প্রাকৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা কি? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে-পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি।
এর বিসদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
ছবি দেখিলেই যেনো বুক ধক করিয়া উঠে। অতীতের ছবি তো আরো ধকের মাত্রা বারাইয়া দেয়। অতীতে যে ছবিটা ভালো হয় নাই বলিয়া ছিড়িয়া ফেলিয়াছিলাম, আজ সেই অস্পৃশ্য, ঝাপসা স্যাতস্যাতে ছবীতা দেখিলেও ভালো লাগে। একাগ্রচিত্তে ছবিগুলি দেখিলে বারবার শুধু ইহাই মনে হয়, দিন ফুরাইয়া যাইতেছে। সময়ের ক্রমাগত টিকটিক শব্দে আমার দিনও টিকটিক করিয়াই ফুরাইয়া যাইতেছে। ইহাকে কোন বাধনেই আর থামাইয়া রাখা সম্ভব নয়, আর কেউ পারিয়াছে বলিয়াও আজ পর্যন্ত কোনো দলিল নাই, এবং আগামিতেও কেহ পারিবে ইহার স্বপক্ষে কোনো বিজ্ঞান কিংবা দর্শন আবিষ্কৃত হয় নাই। সময়ের এই টিকটিক শব্দ আমি আমার বুকের প্রতিটি ধুকধুক আওয়াজের মধ্যে, ঘুমের ঘোরে, নিশিথে কিংবা যখন একা থাকা হয় তখনো শুনিতে পাই। যখন একা থাকি, তখন “সময়” যেনো আমার কানে কানে ফিসফিস করিয়া বলিয়া যায়, পিছনে তাকাইয়া দেখিয়াছ কত বেলা পার করিয়া আসিয়াছো? তুমি তোমার জন্মেরক্ষন পাড় করিয়া আসিয়াছো, দুরন্ত শৈশব পার করিয়া আসিয়াছো, তোমার অনেক বেলা পার হইয়া গিয়াছে, এখন আর তোমার জন্য সকাল বলিয়া কোন কাল নাই, বিকালের রোদের আমেজ কি তুমি বুঝিতে পারিতেছো? যদি তুমি ইহা অনুধাবন করিতে না পারো, তাহা হইলে, আয়নার সামনে গিয়া দাঁড়াইয়া এক পলক তোমার চোখের নিচে তাকাইয়া দেখো, অথবা হাত পায়ের রক্ত প্রবাহের ধমনীগুলির দিকে তাকাইয়া দেখো। ইহারা অনেক সময় ধরিয়া অবিরাম কাজ করিতে করিতে প্রায় অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। তোমাকে দেখিয়া কি রাস্তার ঐ অবুঝ বালক আর “ভাই” বলিয়া সম্বোধন করে? না করেনা। এখন তোমাকে অনেকেই “চাচা” বা আংকেল” বলিয়া ডাকিতে পছন্দ করে। আর কয়েকদিন অতিবাহিত হোক, দেখিবে, তুমি এই “চাচা” কিংবা “আংকেল” উপাধিটাও ধরিয়া রাখিতে পারিবেনা। তখন কেউ তোমাকে দাদা কিংবা নানা বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিবে। তোমার এখন পা কাপিতেছে, হাত কাপিতেছে, চোখেও খুব ভালো করিয়া সব দেখিতে পাওনা। বৃহৎ অট্টালিকায় উঠিতে এখন তোমার সাহস আর আগের মতো কাজ করেনা, সমুদ্রে ঝাপ দেওয়ারও আর মন টানেনা। তুমি আস্তে আস্তে নির্জীব পদার্থের ন্যায় হইয়া যাইতেছো। এখন একটুতেই বর্ষার পানিতে সর্দিকাশি বাধিয়া বসে, শীত আসিলেই মনে হয়, এই বুঝি রাজ্যের সব ঠাণ্ডা তোমার সারা শরীরের উপর দিয়া বহিয়া যাইতেছে।
ছবি দেখিতে দেখিতে মনটাই খারাপ হইয়া যায়। মনে হয়, আমি কি সত্যি সত্যি একদিন এই নীল আকাশটা আর দেখিতে পারিবো না? এই ফুলগাছ, এই রাস্তার ধার, এই নদীর ঢেউ, এই শীতের হাড়কাঁপুনি ঝাঁকুনি, কিংবা বৃষ্টির শীতল জলেরচ্ছটা কোণো কিছুই কি আমি আর উপভোগ করিতে পারিবো না? সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর রাতে বাড়ি ফিরিবার আনন্দটা কি আর পাওয়া যাইবে না? অথবা পরিবারের সঙ্গে, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে চুটিয়ে ঝগড়া কিংবা হৈচৈ করার অবকাশ কি আর কখনোই আমার হইবে না? মন বড় বিষণ্ণ হইয়া উঠে। মনে হয় এই জনমটা কেনো হাজার বছরের জন্য হইলো না? ভগবান বড় নিষ্ঠুর। কেহ হয়ত ভগবান কে বিশ্বাস করিয়া ইহাই মানি নেন, আবার কেহ ভগমান আছে ইহাই বিশ্বাস করেন না। ভগমানকে অবিশ্বাস করিয়া যদি হাজার বছরের অধিক বাচিয়া থাকা যাইতো, তা না হইলে একটা যুক্তি থাকিত, কিন্তু ভগমান আছে বানাই, এই বিশ্বাসের উপর পৃথিবীতে অধিককাল বাচিয়া থাকিবার কোনো উপায়ও নাই।
শৈশবের উচ্ছল চঞ্চলতা, যৌবনের অদম্য বন্যতা আর এখনকার বৈষয়িক ব্যস্ততার মাঝে কখনোই মনে হয় নাই যে, একদিন আমার এই সাম্রাজ্য, আমার এই আধিপত্যতা, কিংবা এই বাহাদুরী, অহংকার একদিন কোনো একটা ছোট বিন্দুর মধ্যে আটকাইয়া যাইবে যেখানে আমার শ্বাস নীরব, আমার মস্তিষ্ক নীরব, আমার হাত নীরব, আমার শরীর নিথর। আমার সবকিছুই নীরব। আমার চারিধারের কোনো কিছুরই পরিবর্তন হইবে না। তখনো ঠিক সময়েই সূর্য উঠিবে, পাখীরা ঠিক সময়েই কিচিরমিচির করিয়া ভোরের আলোকে জাগাইয়া তুলিবে, প্রাত্যাহিক কাজে সবাই যার যার কাজে ঠিক সময়েই ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া আবার ঠিক সময়েই ঘরে ফিরিয়া আসিবে। ঠিক সময়েই সবাই তাহাদের প্রতিদিনের সকালে নাস্তা, দুপুরের খাবার, কিংবা পরিবার পরিজন লইয়া বিকালে শরতের কোন একসন্ধ্যায় বাহির হইয়া পড়িবে, শুধু আমি ছাড়া।
আজ হইতে শতবছর আগেও কেউ না কেউ হয়ত এইভাবেই তাহারা আজকের দিনটার কথা ভাবিয়া ভাবিয়া তাহাদের ঐ সময়ের ব্যথার কথা, এই পৃথিবী ছাড়িয়া যাওয়ার আক্ষেপের কথা, এই পৃথিবী ছাড়িয়া না যাওয়ার আকুতির কথা বলিয়াছিলেন। তাহাদের কেউ হয়ত এই পৃথিবীতে অনেক প্রতাপশালী রাজা ছিলেন, কেউ হয়ত ক্ষমতাশিল সেনাপতি ছিলেন, কেউ হয়ত কোটিপতি ধনকুবের ছিলেন, কিন্তু কেহই এই প্রস্থানের রাহু গ্রাস হইতে মুক্তি পায় নাই। আমার কোন পূর্বসুরী যেমন পায় নাই, আমিও পাইবো না আর আমার পরের কোনো উত্তরসুরীও পাইবে না। আজ যতো সুখ নিয়াই এই পৃথিবীতে বিচরন করি না কেনো, যত অভিযোগ নিয়াই বাচিয়া থাকি না কেনো, কিংবা যত কষ্ট নিয়াই দিন যাপন করিনা কেনো, যখন কেউ থাকে না, তখন তাহার প্রতি মুহূর্তের হাসি, উচ্ছ্বাস, মহব্বত, গালি কিংবা মেজাজের প্রতিধ্বনি শুনিতে পাওয়া যায়। এই প্রতিধ্বনি কখনো কাউকে কাদাইবে, কখনো কাউকে একা একাই হাসাইবে, আবার কাউকে এমন এক জায়গায় নিয়া দাড় করাইবে যেখানে মনে হইবে, হয়ত আমার বাচিয়া থাকাটা তাহাদের জন্য খুব প্রয়োজন ছিলো। হয়ত সব রাগ, অভিমান, অভিযোগ সত্তেও মনে হইবে আমার চলিয়া যাওয়ার কারনে এই শুন্যস্থানটা কেহই পুরন করিবার মতো নয়। তখনো এই ছবিগুলিই নীরবে কথা বলিবে।
কিন্তু তাহার পরেও সবচেয়ে সত্য উপলব্ধি হইতেছে, একদিন, সবাই আমরা একে অপরের হইতে আলাদা হইয়া যাইবো। কেউ আগে আর কেউ পড়ে। আমরা সবাই একদিন একজন আরেকজনকে হারাইয়া ফেলিবো, মিস করিবো। দিন, মাস, বছর কাটিয়া যাইবে, হয়ত কাহারো সাথে আর কাহারো কোনো যোগাযোগ থাকিবে না। একদিন হয়ত আমাদের সন্তানেরা, নাতি নাতিনিরা আমাদের অতিতের সব ছবি দেখিয়া কেহ কেহ তাহাদেরই সাথী লোকেদের প্রশ্ন করিবে, “কে এটা? কে ওটা?” তখন হয়ত অনেকেই চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু অশ্রুজলে অদৃশ্য কোনো এক মুচকি হাসি দিয়া বলিবে, “এরা ছিলো ওই সব লোকজন যাদের সঙ্গে আমি আমার সবচেয়ে ভালো কিছু সময় কাটিয়েছি। আজ ওরা কেউ নাই।” এরই নাম ছবি। কথা বলেনা কিন্তু সময়ের ইতিহাস হয়ে থাকে।
আমি কি কেবলই ছবি? তারা কি কেবলই ছবি যারা আজ থেকে শত বছর আগে এই পৃথিবীতে এসেছিলো এবং এখন যারা আর কোথাও নাই? কেউ কেউ তো আবার কোথাও ছবি হিসাবেও নাই? অথচ তারাও এক সময় আমার মতো এই পৃথিবীর আলো বাতাসে বড় হয়েছে, তাদের মধ্যেও প্রেম এসেছিলো, মহব্বত এসেছিলো। তারাও সংসার করেছে, জীবনের প্রয়োজনে এক জায়গা থেকে অন্যত্র সঞ্চালিত হয়েছে। তারাও নীল আকাশ দেখে, নদীর পানি দেখে, বসন্তের ফুল আর ফুলেল পরিবেশে কখনোকখনো কবিতাও লিখেছে। গ্ন গুন করে গান গেয়েছে। পাখির কোলাহলে তারাও কখনো কখনো আপ্লুত হয়েছে। তাদের সময়েও শীত বসন্ত, বর্ষা, সব ই এসেছে। তারাও কারো না কারো সাথে হাত হাত ধরে জীবনের অনেক পথ পড়ি দিয়েছে। এদের অনেকেই হয়ত আজিকার আমাদের থেকেও অনেক নামি দামী নামুসের মতো ছিলেন। আরো কত কি? কিন্তু ওই সব গুনীজনেরা, মানুষ গুলি আজ কোথাও নেই। কেউ হয়ত কারো কারো ড্রইং রুমে ছবি হয়ে আছে, কিন্তু তার দেহ পচতে পচতে মাটির সাথে মিশে দেহ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। যেই হাড় গুলি ছিলো, সেগুলিও এদিক সেদিক হতে হতে ও গুলো আর কোথাও খেজে পাওয়া যাবে না। যে কবরে একদিন তাদেরকে শুইয়ে হাজার হাজার লোক, আত্মীয় সজনেরা বিলাপ করেছিলো, সেই সব আত্তীয় সজনেরাও আজ কোথাওহয়ত নাই। ওই কবরেই হয়ত একে একে শুইয়ে আছেন। ওই কবরটাও কারো একচ্ছত্র নয়।
এই পরিসংখ্যানে আমি ও তাহলে নিছক একটা ছবি এবং কোনো এক সময় এই ছবি থেকেও আর কোথাও নাই। আমার ইতিহাস এই পৃথিবীর কেউ মনে রাখবে না। আমার আজকের দিনের এই রাজত্ব, আমার সাম্রাজ্য, আমার রেখে যাওয়া সব সম্পদ আর সম্পুতি হয়ত হাত বদলের মাধ্যমে আমার বংশ পরম্পরায় কারো হাতে সেটা পৌঁছেযাবে কিন্তু আমার নাম, আমার আজিকার দিনের পরিশ্রম, আমার আজিকার দিনের কোনো কিছুই তার কাছে পৌঁছে যাবে না। সে হয়ত জানবেই না, কার সিঙ্ঘাসনে বসে তিনি কার উপরে প্রতিনিধিত্ব করছেন। হয়ত তিনি জান্তেও চাইবেন না।
তাহলে কিসের জন্য? কার জন্য?
আজ যারা তোমরা আমার এই মন্তব্য গুলি পড়ছো আর ভাবছ, তাহলে কি আমরা সবাই হাত গুটিয়ে কোনো কিছুই ক্করবো না? হ্যা, করবো। শুধু নিজের জন্য আর নিজের আরামের জন্য।
তোম্রাও এক সময় আসবে, আমার মতোই চিন্তা করে আমাকে সালাম জানবেই।
চলো আমার ডায়েরীতে
পৃথিবীটা অদ্ভুত একটা অদৃশ্যমান সম্পর্কজনিত তত্ত্বে একে অপরের সাথে এমনভাবে জরিয়ে পেচিয়ে আছে, যা কোনো থিউরী বা সংজ্ঞা মেনে চলে না। প্রতিটি সম্পর্ক একেকটা একেক ধরনের। বৈশিষ্ট আলাদা, এর সাধ আলাদা, মাহাত্য আলাদা, সংজ্ঞা আলাদা, এবং তাদের যন্ত্রনাও আলাদা। মায়ের সাথে বাবার, বাবার সাথে ছেলেমেয়েদের, ছেলেমেয়েদের সাথে পরিবারের, স্বামীর সাথে স্ত্রীর, এক বাড়ির সাথে আরেক বাড়ির, এক পাড়ার সাথে আরেক পাড়ার, এক সমাজের সাথে আরেক সমাজের, দেশ থেকে দেশান্তরের, এমন কি মানুষের সাথে অন্য প্রানীকুলের, জীবিতদের সাথে মৃতদের, শত্রুর সাথে মিত্রের, কিংবা মিত্রের সাথে মিত্রেরও, আরো কতোই না সম্পর্ক। বিধাতার সাথে তার সৃষ্টির সম্পর্কও আরেক পদের। সব সম্পর্কের জন্য একই রুল হতে পারে না, এবং হবেও না। সময়ের পথ ধরে মানুষ এইসব সম্পর্কগুলো নিয়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের জন্য একেকবার একেক রকমের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে কেউ বানী দিয়েছেন, কেউ তত্ত্ব দিয়েছেন, কেউ বা আবার তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনেক থিউরীও দিয়ে গেছেন। সবার জ্ঞ্যান, বয়ান, অথবা থিউরী যে সবসময় কোনো একটা নির্দিষ্ট “সম্পর্কের” ক্ষেত্রে সঠিক, সেটাও যেমন শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না আবার একেবারে সঠিক নয়, এটাও বলা যায় না। যে পরিস্থিতিতে যে সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে কোনো এক ভোক্তভুগী আজ যে ব্যর্থতার মন্তব্য করে গেলেন, ঠিক সেই পরিস্থিতিতে সেই একই প্রকার সম্পর্কের উপর আরেক ভোক্তভুগী হয়ত সাফল্যের কথা বলে যাবেন। অথবা এমনো হতে পারে, আজ যে পরিস্থিতিতে কোনো এক সম্পর্কের মধ্যে ফাটল হয়েছে বলে বলা হলো, হয়তবা সেই ফাটল থেকে ভাঙ্গন-রক্ষার বিকল্প তরিকা আরোপ করে আরেকজন অনায়াশেই উতরে যেতে সক্ষম হন। তাহলে প্রশ্ন আসে, “রিলেসনশীপ রুলস” বলে কি কিছু আছে? কিসের উপর দাঁড়িয়ে একই প্রকার একটা সম্পর্ক সম্বন্ধে সাফল্যের কথা বলে আর কিসের উপর ভিত্তি করে আরেক জন ব্যর্থতার কথা বলে?
প্রত্যেকটি সম্পর্ক একটি স্বাধীন সত্ত্বার মধ্যে, নিজের কাল্পনিক গন্ডির মধ্যে বসবাস করে। মা হবার আগে, মেয়েদের মা হওয়ার কল্পনা আলাদা, বিয়ের আগে যুবতীদের তাদের স্বামীর সাথে কি রকম সম্পর্ক হবে তার ভাবনা আলাদা। কিংবা শাশুড়ি হবার আগে প্রতিটি মেয়েদের একটা নিজস্ব এই কাল্পনিক গন্ডির উপাদানগুলি প্রকৃতপক্ষে সবই অদৃশ্যমান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কল্পনার জগতের সাথে এই বাস্তবের সম্পর্কগুলির মিলমিশের মধ্যে অনেক ফারাক। আর এই ফারাক থেকেই শুরু হয় যতো অঘটন। যদি অন্যভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, দেখা যাবে, এর মধ্যে আছে প্রতিটি সত্ত্বার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ, আছে শালিন-অশালীনতার সীমাবদ্ধতা, আছে ইচ্ছা-অনিচ্ছার গ্রহনযোগ্যতার মাপকাঠি, আছে মেজাজ-মর্জির একটা রুপরেখা ইত্যাদি। যেমন, কেউ লাল রঙ পছন্দ করে, আবার তার সাথে এমন একজনের সম্পর্ক হয়েছে যিনি লাল পছন্দ করেন না, তিনি পছন্দ করেন নীল কিংবা সবুজ। কেউ ঝাল খেতে পছন্দ করেন কিন্তু তার সাথে এমন একজনের সম্পর্ক হয়েছে যিনি ঝাল তো পছন্দ করেনই না, হয়ত পছন্দ করেন কড়া মিষ্টি। সারাক্ষন ঘুরতে পছন্দ করা কোনো এক সুন্দরী রমনীর হয়তো স্বামী জুটেছে অলস এক কালো মানুষের যিনি সময় পেলেই হয়ত ঘুমাতে পছন্দ করেন। স্ত্রী ভেবেছিলেন তার স্বামী হবে এইরকম, কিন্তু হয়ে গেছে অন্যরকম, স্বামী ভেবেছিলেন, তার স্ত্রী হবে এই রকম, কিন্তু হয়ে গেছে দাপটে। দুই বন্ধু এক সঙ্গে কতই না দিন রাত এক সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন ছোটবেলায়, এখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর থেকে অনেক উচু স্তরের বাসিন্দা। এখন দেখা করতেও প্রোটোকল লাগে। মা ভেবেছিলেন, সন্তান বড় হয়ে তার সব দুঃখ ঘুচে দেবেন, কিন্তু ছেলে বড় হয়ে এখন আর মায়ের সেই গ্রামিন হাতে ভাত খেতেও পছন্দ করেন না, সঙ্গে জুটেছে আবার আধুনিকা বউ। বউ মনে করে, ঐ গ্রাম্য অশিক্ষিত মায়ের আবার এতো যত্নপাতি করার কি আছে? এই যে অসম চাওয়া এবং পাওয়া, এরই মধ্যে প্রকৃতপক্ষে লুকিয়ে আছে সম্পর্কের যত অঘটন। তাহলে এই অসমগুনের অধিকারী মানুষগুলির মধ্যে কি সব সম্পর্ক সব সময়ই ভেঙ্গে যাবে? তাইতো যাওয়ার কথা। ঘুমে নাক ডাকেন এমন স্ত্রীর স্বামী তো তাহলে কখনোই একসাথে নির্ভেজাল ঘুমে আচ্ছন্ন হতে পারবেন না। শিক্ষিত আধুনিকা বউ যেমন অশিক্ষিত গ্রাম্য শাশুড়িকে শামাল দিতে পারছেন না, তাহলে তো সব কিছুই ভেঙ্গে যাওয়ার কথা! ফলে কিছু কিছু সম্পর্ক ভেঙ্গেই যায় আবার কিছু কিছু সম্পর্ক টিকে থাকার জন্য লড়াই করে যায়। আবার এরই মধ্যে কিছু কিছু সম্পর্ক কোনো অঘটন ছাড়াই জীবনের শেষ অবধি টিকে যায়। তাদের এই এহেনো পরিস্থিতিতে তাদের কিছু অভিজ্ঞতার আলোকে এই সব সম্পর্কের জন্য “রিলেসনশীপ রুলস” নামে কিছু তত্ত্ব, তথ্য, থিউরী দিতেই পারেন। হোক সেটা সাফল্যের বা ব্যর্থতার। তাদের এইসব অভিজ্ঞতার থিউরী তাহলে কি আমরা সর্বত্র এই জাতীয় সম্পর্কের বেলায় শতভাগ কার্যকরী এবং নিয়ম বলেই মেনে নেবো?
যদি তাইই হতো, তাহলে নব্বই বছরের বৃদ্ধ মানুসটি কোন কারনে আশি বছরের থুড়থুড়ে মহিলার প্রেমে তখনো হাবুডুবু খাচ্ছেন? ঐ আশি বছরের মহিলার তো আর রূপ, যৌবন, প্রজনন ক্ষমতার কিছুই বাকী নাই। তার উপর তারও তো এমন অনেক কিছুই ছিলো যা তারসাথে এতো বছর ধরে ঘর করা মানুষটির অনেক কিছুই মিল ছিলো না। তাহলে কেনো টিকে গেলো ঐ সম্পর্ক? কিংবা এমন এক যুগল দম্পতির বন্ধন যেখানে স্ত্রী কিংবা স্বামী দিনের পর দিন পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন, অথচ ভালোবাসার মহব্বত দিয়ে স্বামী কিংবা তার স্ত্রী তাদের সংসার, পরিবার একত্রে ঐ অবস্থায়ই আগলে রেখেছেন। সেটা কিসের আশায়? নিশ্চয় এমন কিছু কারন থাকে যেখানে কম্প্রোমাইজ নামক বস্তুটি কিংবা এডাপ্টেসন নামক তত্ত্বটি খুব জরুরী। তা না হলে কানা এক কালো মহিলার সাথে বোবা এক স্বামীর ঘরতো কখনোই টিকে থাকার কথা নয়! অথবা যদি অন্যভাবে বলি, কি কারনে পঞ্চাশ বছর বৃদ্ধার সাথে ভাষাহীন এক বছরের কচি ছোট শিশুর কি কথা হয় যেখানে দুজনেই আনন্দে ফেটে পরেন? অথবা কোন রিলেসনশীপ রুলের আওতায় একটি বন্য প্রানির সাথে একজন মানুষের সখ্যতা হয়? প্রেম ভালোবাসা সবসময় একই ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে একজনের সাথে আরেকজনের সম্পর্ক গড়ে উঠে না। একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের মিলের থেকে অমিলটাই বেশি, তারপরেও বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে একে অপরের জন্য কোনো না কোনো একটা মাত্র ফ্যাক্টরের উপরও সম্পর্কটা টিকে রাখা যায়। যারা পারে না, তাদের ইতিহাস কেউ মনে রাখে না। আর যারা পারে, তারাই হন এই সমাজের একেকজন প্রতিনিধি যারা “রেলেসনশিপ রুল” শাসন করেন। যে ঘর একবার ভাঙ্গে, তা বারবার ভাঙ্গার প্রবনতার মধ্যে থাকে। যে সম্পর্কের ভীত একবার নড়ে যায়, তার ভীত বারবার নড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাহলে এখন বিশাল এক প্রশ্ন মানবকুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। আর তা হলো, তাহলে কি “রিলেশনশিপ রুলস” বলতে কিছুই নেই? অথবা রিলেশনশীপ রুলসটা কি? আমার মতে, এটা হচ্ছে নিজের সাথে নিজের সমঝোতা। এই সমঝোতার কথা বললে আরেক ধাঁধা সামনে আসে, কি সেই সমঝোতা?
কোনো এক লেখায় আমি একবার বলেছিলাম, “সময় পাল্টায়”, এখন বলছি, সময় পালটায় না, সময় চলে যায়। আর এই চলে যাওয়া সময়ের প্রেক্ষাপটে অনেক কিছু পাল্টায়। পাল্টায় মানসিকতা, পাল্টায় বোধ, পাল্টায় দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। আর এই পাল্টানোর মধ্যেই আমরা বলি, সময় পালটেছে বলে এটা হয়েছে। সময়ের প্রতিটি ক্ষনের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিচক্ষনতার পরিবর্তন হয়, ধৈর্যের পরিবর্তন হয়, সাথে সাথে নিজের আত্মম্ভরিতাও বদলে যায়। এই পরিবর্তনের জন্য সময়ের দরকার। কারন সময় মানুষকে নিয়ন্ত্রন করে ইমোশনালী, সময় মানুষকে বুঝতে শিখায় কোনটা বন্য, আর কোনটা অদম্য। সময়ের সাথে সাথে মেধার বিকাশ ঘটে। আর এই মেধাই হচ্ছে সমঝোতার প্রথম নিয়ন্ত্রিত রেখা যার মাধ্যমে অন্যান্য অনিয়ন্ত্রনযোগ্য উপাদানগুলিকে নিয়ন্ত্রন রেখে আপাতদৃষ্টির অনিয়ন্ত্রিত আরেকজনের অদম্য বন্য উচ্ছ্বাসকে মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে প্রতিকুল পরিবেশের বিরুদ্ধে পজিটিভ চিন্তাশীল মন তৈরী করে। আর এই চিন্তাশীল মন নিয়ে কারো জন্যই কখনো দ্বার রুদ্ধ না করে প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টার নামই হচ্ছে সমঝোতা। এখানে সবার দেওয়া উপদেশ বা বয়ান করা “রিলেশনশীপ রুলের” কথা শুনার দরকার আছে, বুঝতে হবে কিন্তু সব সময় তা মেনে নিয়ে ঐ মোতাবেক কাজ করতে হবে এমন যেন না হয়। একটা কথা সব সময় মনে রাখা দরকার, অন্যের দেওয়া থিউরী যে আপনার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে, অন্যের দেওয়া উপদেশটাই যে সঠিক উপদেশ সেটা আজ পর্যন্ত কেউ গ্যারান্টি দিতে পারে নাই আর পারবেও না। জীবন একটাই। আর এই জিবনে সব বন্ধুরুপী মানুসগুলিই আপনার সব সময়ের বন্ধু, তা ঠিক নয়। মনে রাখা দরকার যে, সপ্তাহের সবদিবসই আপনার জন্য হাসি নিয়ে আসার কথা নয়, সব ঋতুই আপনার জন্য নীল আকাশ নিয়ে আসার কথা নয়। এখানে যেমন কান্না থাকে, তেমনি থাকে হাসিও। কেউ কান্না নেবেন না, শুধু হাসিটুকুন নেবেন, তার জন্য ঐ হাসি সঠিক আনন্দের নাও হতে পারে।
পরাজিত কমান্ডারের অপারেসনাল প্ল্যান যতোই ভালো থাকুক, আর জয়ী কমান্ডারের পরিকল্পনা যতোই খারাপ হোক, পৃথিবী সবসময় জয়ী কমান্ডারের পক্ষেই ইতিহাস লিখে। আর সেটাই হয় বেস্ট প্ল্যান। পরাজিত মানুষের কথা কেউ শুনে না, সেটা আপনি যেভাবেই যাকেই বলুন না কেনো।
ফলে কখনো কোনো দ্বার রুদ্ধ করবেন না। খোলা রাখুন সব দ্বার। হতে পারে, এই খোলা দ্বারের মাধ্যমেই একদিন সেই আলো এবং বাতাস প্রবেশ করবে যা আপনি অনেকদিন আগে চেয়েছিলেন। আজকে যাকে আপনি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী বলে তার হাত ধরে বসে চোখের জল ফেলছেন, হয়ত সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে দেখবেন, সেই আসলে আপনার আজকের দিনের সব সম্পর্কের ছেদনের মুল হোতা। মানুষকে ঈশ্বর এমন করে বানিয়েছেন, মানুষ এবং অমানুষের সব কিছু দেখতে এক রকমের, শুধু বুঝার জন্য মেধার প্রয়োজন। আর এই মেধা আসে সময়ের পরিবর্তনের সাথে। অপেক্ষা করুন, সময় পাল্টাবে। কারন সময় পিছিনে ফিরে না, কিন্তু সম্পর্ক যেখান থেকে তাল কাটে, তার থেকে আবার পিছনে ফিরে আসতেই পারে। ধৈর্য ধরুন, পুরু ব্যাপারটা নিয়ে নিজে ভাবুন, অনেক জটলা খুলে যাবে। দর কষাকষির মতো নিজের সাথে সম্পর্ক টিকে রাখার জন্য যুক্তি চালাচালি করুন। নিজেকে উভয় পক্ষের লোক হিসাবে ভাবুন। দেখুন, যে ব্যাপারটা আপনি ছাড় দিচ্ছেন না, সেটা অন্য পক্ষে আপনি থাকলে ছাড় দিতেন কিনা। যাদের আপনি কখনো দেখেন নাই, এমন কিছু ভাল বয়স্ক মানুষের সাথে ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা বলুন। দেখবেন, কোথায় ছাড় দেওয়া যায়, আর কোথায় কম্প্রোমাইজ করা যায়। উদ্দেশ্য একটাই, লক্ষ ঠিক রাখুন যাতে একবার সম্পর্ক করে ফেলার পর ভাঙতে না হয়। প্রয়োজনে সম্পর্ক করার আগে সম্পর্ক ভাঙ্গার কারন গুলি সাব্যস্থ করুন যেনো সম্পর্কই তৈরী না হয়। আর একবার তৈরী হয়ে গেলে তাকে বাচানোর চেষ্টা করুন। কারন, আপনি সম্পর্ক ত্যাগ করলেও কেউ না কেউ তার সাথে আবার নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠবেই, আর যদি ঐ সম্পর্ক টিকে যায়, তবে বলতে হবে, আপনার মধ্যেই ভুল ছিলো।
তবে এখানে আরো একটা বিশেষ কথা না বললেই নয়। যখন এতো কিছুর পরও মনে হবে, না, এই সম্পর্কটা রাখা যাবে না। যেটুকু সময় অপচয় করলে সম্পর্কটা টেস্ট করা যেতো বলে সাব্যস্থ্য হচ্ছে, সেইটুকু সময় আপনার হাতে নাই। আর সেই সময়ের মধ্যে এটারও কোনো গ্যারন্টি নাই যে ব্যাপারটা সাফল্যের মধ্যেই সমাপ্ত হবে। অথবা এমন একটা আভাস থেকেই যায় যে, সম্পর্কটা বিফলেই যাবে, সেক্ষেত্রে যতো দ্রুত সম্ভব এই ব্যর্থ সম্পর্ক থেকে মুক্তির যতোগুলি পথ খোলা আছে, অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে সেগুলিকে বাস্তবায়ন করে এই ব্যর্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়া। তাতে মুক্ত পরিবেশে, মুক্তমনে নতুন করে চিন্তা করার অবকাশ থাকে। শুধু একটা নতুন পরিবেশে, ভেঙ্গে যাওয়া মানসিক পরিস্থিতিতে কাউকেই দোসারুপ না করে পুনরায় এই ভুল সম্পর্ক যেনো না হয় তার জন্য অনেক বেশি সতর্ক থাকা এবং চারিপাশ বিবেচনা করে পুনরায় নতুন কোনো আবেগী সম্পর্কে জড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। হুট করে কোনো আবেগী সম্পর্ক করা থেকে বিরত থাকা খুব জরুরী। এছাড়া আরো একটি বিষয়ে খুব সতর্ক থাকা জরুরী যে, ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক নিয়ে আর নতুন করে কোনো প্রকারের ভাবা উচিত না। “যদি” দিয়ে আর কোনো উপসংহার টানা উচিত হবে না। কে ঠকেছে আর কে জিতেছে এর কোনো তুলনা করা যাবে না। কোনো সম্পর্ক নষ্ট হলে দুই পক্ষই হারে বা ঠকে এটাই ফলাফল।
রিলেসনশীপ রুলস বলতে আসলে কিছু নাই। যেটা আছে, সেটা হচ্ছে আপনি কি চান। আর কিভাবে চান। যদি আপনার স্বাধীন চিন্তা করার শক্তি না থাকে, যদি এমন কোনো ব্যক্তির প্ররোচনায় আপনি আপনার সম্পর্ক কে মুল্যায়ন করেন, কিংবা যদি এমন হয়, আপনি কি করবেন, কিভাবে করবেন, কার সাথে কত টুকু করবেন, এই আশায় আপনার নিজের সম্পর্কের উপর অন্যের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন, তাহলে আপনি নিসচিত থাকুন, আপনার কোনো সম্পর্কই কখনো ভালো যাবে না। সেটা আপনার বন্ধুর বেলায়ই হোক, নিজের স্ত্রীর বেলায়ই হোক, অথবা মা বাবা ভাইবোনের বেলায়ই হোক। সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকে।
খোলা হাতে বেচে থাকার চেয়ে কারো হাত ধরে বেচে থাকার নাম হচ্ছে জীবন। ঝগড়া করার জন্য হলেও একজন মানুষ লাগে। একবার যদি সব শেষ করে দেওয়া হয়, হয়ত অনেকদিন পর নিজে কে নিজে প্রশ্ন করবেন, আহা “যদি” এমনটি না করে এমন টি করতাম, “যদি” আরেকটু নমনীয় হয়ে প্রকৃত জিনিষটা বুঝার জন্য সময় নিতাম, “যদি” এইটা না ভেবে ঐটা ভাবতাম, “যদি” ঐ লোকগুলি আমার জীবনে না এসে অন্য কেউ আমার জিবনে আসতো। অথবা “যদি” আমি ঐ সব লোক গুলিকে না শুনতাম ইত্যাদি।
কিন্তু তখন এই “যদি”র উত্তর আর কেউ দেবার জন্য বসে নাই। কিন্তু সেই ঝগড়া করার মানুসটি যদি আপনাকে প্রতি নিয়ত শুধু ঝগড়াই দিয়ে জীবন আরম্ভ করে আর ঝগড়া দিয়েই জীবন শেষ করে, তাহলে বুঝবেন, সম্পর্কটা ভুল। তখন শুধু একটা কথাই মনে হবে, আহা, যদি এই সম্পর্কটা নাহতো, যদি ওই মানুসটির সাথে কখনোই দেখা না হতো, আহা যদি আরো আগে সব বুঝতে পারতাম, তাহলে হয়তো সম্পর্কটাই করা হতো না। কিন্তু আম্রা দেবতা নই, আমরা ভুল করি, ভুল হাত ধরার চেয়ে ভুল হাত ছেড়ে দেওয়া অনেক উত্তম। আর ভুল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নামই হচ্ছে প্রানি।
আমার বন্ধু মেজর আসাদের একটা নতুন বই এই বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। “অন্য ভুবন”। বইটি আমি এখনো পরার সুযোগ হয় নাই তবে আমি না পড়েই বুঝতে পারছি, বইটা একটা চমৎকার লেখনীর প্রকাশ হবে। আমি আসাদের লেখার খুব ভক্ত। আমার এই বন্ধুর লেখা আমার আরেক বন্ধু প্রয়াত মেজর সাহেলকে উদ্দেশ্য করে তার একটা লেখা “নদীর তৃতীয় তীর” পড়তে পড়তে মন বড় আবেশিত হয়ে আছে এই কয়েকদিন যাবত। তারই লেখার কিছুচুম্বক লাইন এইরকম। … “মৃত্যু যখন এসে আমার এই শরীরটাকে স্পর্শ করবে তখন তোমরা সবাই আমার শরীরটাকে একটা ছোট্ট নৌকোয় করে ভাসিয়ে দিয়ো। জলস্রোতে ভেসে যাবে অনাদিকাল ধরে। নদীর নিঃসীম উপকূল ছাড়িয়ে আমি যাব, নদীর ভেতরে, নদী থেকে দূরে, নদীতে।” – (নদীর তৃতীয় তীর, হুয়াও হুইমারেস রোসা), বড় রহস্যভিত্তিক। দক্ষিণ আমেরিকার একজন বিখ্যাত ছোট গল্পকারের নাম হুয়াওহুইমারেস রোসা। ‘THE THIRD BANK OF THE RIVER’ (নদীর তৃতীয় তীর) নামে তাঁর লেখা একটা ছোটগল্প। এই গল্পে এক পরিবারের খুব দায়িত্বশীল একজন পিতা একদিন একটা ডিঙি নৌকা তৈরি করেন। ছোট ডিঙি। গলুইতে শুধুমাত্র এক চিলতে জায়গা। একজনের বেশি মানুষ সেখানে বসতে পারবেনা। বিশাল এবং সুগভীর একটা নদীর তীরে পরিবারের বসতি। নদীটা এতই বিশাল এবং প্রশস্ত যে, অন্য তীর দেখাই যায়না। অতঃপর একদিন তিনি নদী পারের বাড়িতে তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিশাল, সুগভীর নদীতে তার ডিঙি ভাসিয়ে দিলেন। কোন খাবার বা অন্য কোন রসদও সঙ্গে নিলেন না। এমনকি শেষ বারের মত পরিবারের কাউকে কোন উপদেশও দেবার চেষ্টা করলেন না। অদ্ভুত ব্যাপার হল তিনি আর কখনও ফিরে আসলেন না। কিন্তু আবার কোথাও চলেও গেলেন না! মাঝ–নদী বরাবর অনির্দিষ্টভাবে ঘোরাফেরা করতে লাগলেন। কখনও উজানে। কখনও বা ভাটিতে। কিছু কিছু সময়ে তিনি দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যান। কিন্তু কখনই এমন দূরে নয় যে তার উপস্থিতিটা পরিবারের সদস্যরা অনুভব করতে সক্ষম হবে না। … মৃত্যুই কি নদীর তৃতীয় তীর?
আসলে এই তীর কি, কোথায় তার অবস্থান, কিংবা এটা কি এমন কোনো নদী যার তীর সচরাচর গোচরীভুত হয় না, অথচ আছে? অথবা এই নদীর কি আরো তীর আছে যার নাম হয়ত চতুর্থ তীর? সবুজ গাছ-পালা, আকাবাকা মেঠোপথের শেষপ্রান্তে প্রাকৃতিক বড়সৌন্দর্য পরিবেষ্টিত বিশাল জলাধারের চলমান স্রোতের প্রাবাহমান যদি কোন নদী হয়, সেই নদীর তীর হয়তোবা কখনো এই বিশাল জনরাশির সবার কমন। এখানে সবার রোমাঞ্চ, আশা, বেদনা, সবার কাহিনীর এক মহাপুস্তকের মতো। হয়তোবা এটা কখনো সভ্যতার জীবনধারার বাহকরুপী কোনো সময়ের রাজত্ব হলেও হতে পারে কিংবা কখনো সেই দৃশ্যমান নদী অতীত বর্তমানের সুখ দুঃখের এই বিশ্বভ্রমান্ডের সাক্ষীর ধারকবাহক হলেও হতে পারে। আর সেটাকেই আমরা কখনো নদী, কখনো উপসাগর অথবা কখনো সাগর থেকে মহাসাগরের স্তরে বিন্যাস করে কতোই না উপমা করে থাকি। এই নদীর স্রষ্টা আছে, এর নিয়ন্ত্রণকারী আছে, আর তার উপর সমগ্র মানবকুল একটা মিশ্র বিশ্বাস নিয়েই কেউ এর স্রষ্টাকে পুজা করে, কেউ তাকে অস্বীকার করে আবার কখনো কখনো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মায়াজালে আশা-নিরাশার ভারদন্ড নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। হয়ত এরই নাম “জীবন”, হয়তবা এরই নাম “সভ্যতা”। এই নদীর কিনারা থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানে এই নয় যে, জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো, সভ্যতা থেকে হারিয়ে যাওয়া। এই বিশ্বভ্রমান্ডের কোথাও না কোথাও আরেক নদীর তীর আছে যেখানে তার কিনারা পাওয়া যায়। সেখানেও নতুন করে সভ্যতা, জীবন এবং নতুন কাহিনীর রচনা হতে পারে এবং হয়।
কিন্তু সমগ্র বিশ্ব থেকে যখন আমরা মানবকুল সবকিছু ছেড়ে ছোট একটা গন্ডি শুধুমাত্র গুটিকতক আপনজনের পরিসীমায় আবদ্ধ করে একটা মায়াজাল আবিষ্ট করি, তখন দিনের সবকাজ শেষ করে যখন নীড়ে ফিরে এসে হিসাব কষি, তখন সামনে এসে দাঁড়ায় আরেকটি নদী। হয়ত তাঁর নাম “মন-নদী’। এই নদীতে চলমান জলের প্রবাহ নেই, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার নেই, পাহাড় নেই, আকাশ নেই, কিন্তু তারও আছে অনেক তীর। যা কখনো শান্তির মহাখুশিতে জলের ধারা বইয়ে চিকচিক করে জানান দেয়, ‘যা চেয়েছি তাই পেয়েছি’। আবার কখনো কখনো দুঃখের সীমাহীন যন্ত্রনায় সেই একই নদী তার দুই তীর জলের ধারায় শিক্ত করে নীরবে বলে যায়, ‘বড় যন্ত্রনায় আছি’। হয়ত তখন আমরা বলি, দুই নয়নের ধারা। নিজস্ব গন্ডির এই পরিসীমায় এই নদীর একক ধারক বাহক শুধু কিছু আপনজন, নিজে আর ব্যক্তিসত্তার অজানা উপাদানের সব সমীকরন। এখানে ঈশ্বর বাস করেন ক্ষনেক্ষনে, আবার ঈশ্বর উধাওও হয়ে যান ক্ষনেক্ষনে। এখানে ছোট গন্ডির গুটিকতক আপনজনের সার্থকতা, ব্যর্থতা, ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা, নির্ভরতা সবকিছু একেবারেই নিজস্ব। সমগ্র মানবকুলের হিসাব কিতাবের সাথে, সুখ দুঃখের সাথে, চাওয়া পাওয়ার সাথে, লাভ লোকসানের সাথে সব কিছু মিশে থাকে।
এই নদীতে বাস করে “আমি”, আমার আমিত্ত আর আমার চারিধারের সব আমারত্ত। আর কেউ নেই। এখানে ঈশ্বর আমি, এখানে নিয়মের কোন বালাই নেই। এখানে আকাশের রঙ আমার নিজের মতো করে বানানো, আমার নদীর জল আমার ইচ্ছায় যখন যেভাবে খুশি প্রবাহিত হয়। এখানে আমার ইচ্ছাটাই সব। এখানে আমার ছোট ডিঙ্গী কখনো উজানে, কখনো ভাটিতে, কখনো নিরুদ্দেশে, কখনো জনসম্মুখে, কখনো কাছে কখনো দূরে যেথায় খুশী সেখানে আমার বিচরন। কাউকে আমার কিছু যেমন বলার নেই, কারো কোনো কিছুই আমার পরোয়া করারও কোন প্রয়োজন নেই। এখানে আমার কোন দায়িত্ববোধ নেই, আমার দায়িত্বও কারো উপর নেই। এখানে আমার সব নদীর উপস্থিতি যেমন আছে, তেমনি কোনো নদীর উপস্থিতিও আমাকে বিচলিত করে না। একদিক থেকে দেখলে এই নদীর কোন তীর নেই আবার আরেক দিক থেকে অনুধাবন করলে হয়ত দেখা যাবে এর আছে অজস্র তীর। কখনো উল্লাশের তীর, কখনো আনন্দের তীর, কখনো ব্যর্থতার তীর, কখনো সব হারিয়ে এক অবসন্ন জীবনের তীর। এখানে এই তীরে কেউ প্রবেশের অধিকারও নেই। এখানে আমার রশদের কোনো প্রয়োজন নেই, এখানে সর্বত্র আমি। আমি কি করতে পারতাম, কি করা উচিত ছিলো, কে কি করতে পারতো, কোথায় আমি ভুল করেছি, কোথায় আমার সার্থকতা ছিলো, কি আমার ভুমিকা হতে পারতো, কিংবা কি কারনে আমি আমার সবকিছু নিঃস্বার্থভাবে ছেড়ে আমি আমার তৃতীয় এই নদীতে একা পড়ে আছি, তার কোনো ব্যখ্যা আমি আর খুজতে চাই না। হয়ত কেউই এর কোনো উত্তর মেনেও নিবে না।
এখন আরেকটি প্রশ্ন মনে আসে। তা হলো, এই তৃতীয় নদীটি কোথায়? কারো কাছে এই তৃতীয় নদীটি হয়ত বাস্তবের কোনো এক বিশাল জল প্রবাহমান নদীর বুক, কারো কাছে হয়ত বা ঘন গাছপালায় পরিবেষ্টিত এক নির্জন জঙ্গল, কারো কাছে হয়ত বা এই বিশাল মানবকুলের ঘনবস্তির মধ্যেও একা কোনো জগত। কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক, এই নদী সবার আছে, কেউ তাকে গ্রহন করে, কেউ এর সন্ধান জানেও না। এই নদীতে ঝাপ দেওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। কারন এর যেমন কোনো দৃশ্যমান তীর নেই, আবার সব তীরের ঘাটও এক রকম নয়। এর জলের রঙ সবনদীর মতো নয়। এর কোনো ঋতু নেই, যখন তখন বৃষ্টি, ঝড়, উল্লাস, আনন্দ, কান্না, পরিহাস সবকিছু ঘটে। আর এর একচ্ছত্র অনুভুতি, আস্বাদ, ইতিহাস শুধু নিজের আর কারো নয়। এই তৃতীয় নদীর কিনারে বসে শতবর্সী বয়োবৃদ্ধা তাঁর বাল্যকালের স্বপ্ন দেখেন, আবার কারো কারো অজান্তেই এই নদীর বালুচরে হেটে হেটে কোনো এক উদাসীন কিশোর তাঁর কল্পনার জগত পেরিয়ে শত বর্স পেরিয়ে কোনো এক জন বসতীর সপ্নজাল বুনন করেন। কেউ ফিরে আসে, কেউ আর ফিরে না। এই নদীর তীরে বসা সবাই একা, সবাই সুখী, আবার সবাই বিরহীর মতো। অথচ এতো কাছাকাছি থেকেও এদের মধ্যে কেউ সখ্যতা করেন না, কেউ কাউকে সম্মোহনও করেন না। যেদিন এই মন-নদী অবশান হয়, সেদিন সব তীরের ধারা একসাথে মন-নদীর সাথে তিরোধান হয়। হয়ত তখন হুয়াও হুইমারেস রোসা্র লেখা “নদীর তৃতীয় তীর”টি আর কারো গোচরীতভুতও হয় না। সময়ের বিবর্তনে আমরা সবাই ঐ জেলের মতো হয়ত কোনো কোনো তীর থেকে খসে পড়ি। বৃন্তচ্যুত কলির তীরখসা জীবনের অজস্র তীরের যখন একচ্ছত্র ভিড় ঘনীভুত হয় মহামিলনে বা মহাবেদনায় অথবা মহাপ্রলয়ে, তখন চৈত্রমাসের তাপদাহের পর বৈশাখের কালো হিংস্র ঝড়ে তান্ডবের মতো আমরা শুধু সেটাই দেখি যা শ্রাবনের অঝরধারায় এই মাটির ধরায় সবার পায়ে, মনে, ঘরে বা মানসপটে ভেসে উঠে।
হুয়াও হুইমারেস রোসা্র লেখা নদীর তৃতীয় তীর, হয়ত সেই নদীর কথাই বলেছেন
“যদি” এমন একটি শব্দ যা অতীত, ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান এই তিনকালের সব কৈফিয়তের এক আওয়াজ। কোনটা কি করা হলে কি হতে পারতো, কোনটা কি না করা হলে কি না হতে পারতো, এটা না ওটা অথবা ওটা নয় এটা করা হলে ফলাফল কি দাড়াতো ইত্যাদির একটা হতাশার প্রয়াস মাত্র। এই “যদি”তে অতীত বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ কোনোকালের জন্যই বিশেষ কিছু পরিবর্তন আনেনা। তবে এই “যদি” থেকে কেউ যদি শিক্ষা নেয়, অন্য কেঊ উপকৃত হতে পারে তাতে অনেক কিছুর দ্বন্দ্ব মিটে যায়। আসলে “যদি” একটা অভিজ্ঞতার নাম, “যদি” একটা সময়ের নাম। “যদি” একটা অধ্যায়ের নাম। এই “যদি” থেকে অনেক কিছু শেখার যেমন আছে, তেমনি, এই “যদি” থেকে অনেক ভোগান্তিও আছে।
সময়ের স্রোত ধরে মানুষ যখন আজকের বর্তমানকে পেরিয়ে আগামীকালের বর্তমানে পদার্পণ করে, তখন এই “যদি” এসে সামনে দাঁড়ায়। সাফল্য আর ব্যর্থতার মাঝামাঝিতে দাঁড়িয়ে “যদি” শুধু এটাই বুঝাতে চায় যে, “যদি” এইটা এইভাবে না করে ঐভাবে করা হতো, “যদি” অমুকের সাথে ঐ সময় দেখা না হতো কিংবা “যদি” অমুকের সাথে দেখা না হয়ে অন্য কারো সাথে দেখা হতো? “যদি” আরেকটু সাবধান হওয়া যেতো? “যদি” আরো বেশী মনোযোগী হয়ে ঐ কাজটা না করে সেই কাজটা করা যেতো? “যদি” এটা না করে ওটা করা হতো ইত্যাদি ইত্যাদি তাহলে হয়ত আজকে যা ঘটছে বা ঘটেছে, সেটা থামানো যেতো কিংবা ফলাফল আরো ভালো হতো। এই “যদি” বড় কঠিন সেতু যাকে ভর করে আর কখনোই সামনে যাওয়া যায় না। অথচ এই “যদি” যদি ঐ সময় ভাবা হতো, তাহলে জীবনের অনেক কিছুই পালটে যেতো। আমরা সবাই এই “যদি”র কাছে সব সময় হেরে যাই।
আজকে মনের ইমোশনাল বিচারে যা করতে হয়েছে, বা করে ফেলা হয়েছে, তখন মনে হয়, আহা “যদি” ঐ সময় এই ইমোশনালটা না হতাম, যদি ঐ কাজটায় আমি বা আমরা আরো কিছু সময় দিয়ে একটা উপায় বের করতাম, যদি আরেকটু সহনশীল হয়ে এইটা না করে ওইটা করতাম, তাহলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। হয়তো এখন যা হয়েছে, তার আর কিছুই হতো না। হয়ত জীবনটাই পালটে যেতো। আজকে যাকে আমার একেবারেই সহ্য হচ্ছে না, যাকে নির্মুল করার জন্য আমি প্রানপনে চেষ্টা করছি, আহা, ‘যদি” ঐ সময়ে ঐ মানুষটির সাথে আমি আরো গভীরভাবে সবকিছু শেয়ার করে সব মিটিয়ে নিতাম, হয়তবা আরো কতই না ভালো হতো। আর এটাই হচ্ছে এই “যদি”র চরিত্র। “যদি”টা সব সময় “যদি”র মধ্যেই থাকে। যারা এই “যদি”কে কাজে লাগায়, তারা ভিন্ন ভিন্ন পথে এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অনেক নতুন নতুন পথের সন্ধান পায়।
“যদি” একটা কম্প্রোমাইজের নাম। “যদি” দ্বারা কেউ যদি কম্প্রোমাইজ করে, সেটা ভবিষ্যতের বড় হারের চেয়ে লাভজনক। “যদি” একটা বিকল্পের নাম। এই যদি দ্বারা অনেক কিছুই শামাল দেওয়া সম্ভব। আর শামালের আরেক নাম “সময়কে ঠেক দেওয়া”। সময় পাল্টায়, আর সময় যখন পালটে যায়, তখন এই অনেক কিছুই আর আগের মতো থাকে না। আজ যে পরিবেশটা অনেক অসহনীয় মনে হয়, সময়ের সাথে সাথে এই পরিবেশ অনেক সহনীয় হয়ে উঠে। আর সহনীয় সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। “যদি” থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষ ধৈর্যশীল হতে শিখে। আর ধৈর্যশীলরাই জয়ী হয়।
“যদি” যেমন একটা সাফল্যের নাম হতে পারে, এই “যদি” একটা ব্যর্থতার নামও হতে পারে। “যদি” শুধু অতীত কোনো ব্যাপার না, “যদি” একটা সম্ভাবনার নামও বটে। যে কোনো পরিকল্পনায়, কাজে কিংবা সিদ্ধান্তের আগে যদি আমরা এই “যদি”কে বেশী বেশি ভাবি, হয়তোবা কোনো না কোনো “যদি” আমাদের সাফল্যের পথ দেখাতে পারে। অতীতের “যদি” একটা শিক্ষা কিন্তু আগামির “যদি” একটা সম্ভাবনা।
ফাল্গুন মাসের কোনো মাহাত্য আমি আজো খুজে পাই নাই। কেনো এই ফাল্গুন মাসবাঙ্গালীর জীবনে অনেক অতিশায়ী আদরের একটা মাস, তাও আমার মনে কখনো জেগে উঠেনাই। ফলে ফাগুনের আগমনে আমার মন কখনো পুলকিত হয়ে জেগে উঠে নাই। কবিদের কথাআলাদা।
বাংলার অন্যান্য মাসের মতোই এই ফাল্গুন মাস আমার কাছে একটাস্বাভাবিক মাসের চেয়ে আর বেশী কিছু নয়। তবে যখন ছোট ছিলাম, বৈশাখ মাসটাকিছুটা হলেও আমার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতো, কারন এই বৈশাখ মাসেআমাদের গ্রামে মেলা হতো, মেলায় হরেকপদের জিনিসের কেনাবেচা হতো। পকেটে পয়সাথাকুক আর নাই বা থাকুক, দলবেধে অন্তত ঐ মেলায় গিয়ে কিছুটা সময় হলেও আনন্দকরতে পারতাম। অন্যদিকে কালবৈশাখী ঝড়ের কারনেও মাঝে মাঝে কালো আকাশের চেহারাদেখে নিজে আতংকিত না হলেও বড়দের চোখে ঝড়ের আতংক দেখে ভয় পেতাম। কখনো কখনোঝরের তান্ডবলীলায় কচিকচি আম কুড়াবার যে একটা হিরিক পরতো সেটা একেবারেনেহায়েত মন্দ না। হয়ত এইসব কারনেই বৈশাখ মাসটি আমার কাছে ফাল্গুনের থেকেওবেশি মনে পড়ে।
বর্ষাকালও ফাল্গুন মাসের থেকে আমার জীবনে অনেক বেশীমনে রাখার মতো অনেক কারন ছিলো। আমাদের নৌকা ছিলো না, স্কুলে যেতে হতো হাটুপানি ভেঙ্গে। কখনো কখনো পলিথিনের ভিতরে বইপত্র ঢোকিয়ে বৃষ্টির মধ্যে একগাদাকচিকচি পোলাপান মাইল কে মাইল ভিজে স্কুলে যেতে হতো। কখনো কখনো তুমুলবৃষ্টির মধ্যে নাড়ার আটি দিয়ে পেচিয়ে নকল ফুটবল বানিয়ে ইচ্ছেমতো ফুটবলখেলতাম। বকা খেয়েছি বড়দের, শাসন করেছে বারংবার এই বৃষ্টিতে ভিজে খেলার জন্যকিন্তু কে শুনে কার কথা। আর শীতকালের কথা তো সব সময়ই মনে পড়ে। এখনো মনে পড়ে।
এতোকিছুর পরেও আমি কখনো ফাল্গুন মাস যে একটা আলাদা কোন মাস এবংএটা যে একটা আলাদা কোন বিশিষ্ট আছে তা আমি খুব আলাদা করে কখনো বুঝি নাই।হতে পারে এই মাসে গ্রামের সেই চিরাচরিত সর্ষেফুলের বাহার, জংলীফুলেরসমাহার, কাশবনের সাদা ফুলের প্রাকৃতিক বাহার বড় সুন্দর কিন্তু এইগুলিতোছিলো গ্রামের নিত্যদিনের সৌন্দর্য। যা সবসময় চোখে পড়ে সেটা আর নতুন কি।কবিদের মন আলাদা। তারা বিড়াল দেখলে কবিতা লিখে, গ্রামের মেয়ে কলশী কাঁখেনদী থেকে পানি আনা দেখলেই কবিতা লিখে কিংবা টিনের চালে টাপুর টুপুর বৃষ্টিহলেই কবিতা লিখে। কিন্তু আমি কবি ছিলাম না। বৃষ্টির দিনে আমাদের টিনেরচালের সেই টাপুর টুপুর শব্দ তো আমার কানে লাগতোই না বরং আমাদের চালের কোনফুটা দিয়ে অনর্গল বৃষ্টির পানি ফোটায় ফোটায় পরে ঘরের মেঝ নষ্ট করে দিচ্ছে, কিংবা কাথা বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে বলে হাড়ি দিতেই দিতেই সময় কেটে যেতো। এদিকদিয়ে পানি পড়ে তো এইদিকে হাড়ি লাগাও, ওইদিক দিয়ে পানি পড়ে তো ওইদিকেও হাড়িলাগাও, হাড়ি নাই তো বদনা, বালতি যা আছে তাই লাগাও ইত্যাদি। একদিকে হাড়িদিলে আরেক দিকে হাড়ি দেওয়ার হাড়ি অবশিষ্ট থাকে না। এই অবস্থায় কি আরবৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দ কানে আসে? অথবা ঋতুর চাকচিক্য নিয়ে কি কবিতালিখার বা পুলকিত হবার কোনো কারন থাকে? ফলে আমারও ছিলো না, আবার কখনোউপলব্ধিও করি নাই।
এখন বয়স হয়েছে। গ্রামের সেই ফুটা টিনের বাড়িতেআর থাকা হয় না। ফলে বৃষ্টির দিনে বাড়ির সেই ফুটা দিয়ে পানি যে ঘরের খাট, বইয়ের তাক, মেঝের মাটি ভিজে যাবে সেই ভয়ও নাই, আর ভাঙ্গা হাড়ি ধরার আর কোনঅবকাশও নাই। টিনের চালের টাপুর টুপুর শব্দটা হয়ত এখন মনে নাই। তবে এইঅট্টালিকায় বসে কখনো মনে হয়, আহা, যদি আবার সেই কালবৈশাখী ঝড়টায় আরো কিছুকচি আম গাছের নীচে পড়ে থাকতো, আহা, যদি এমন হতো যে, সেই বৃষ্টির দিনেহাফপ্যান্ট ভিজিয়ে আবার যদি সেই কচি বেলার বন্ধুদের নিয়ে হাটু পানি ভেঙ্গেমাইল কে মাইল পার হতে পারতাম। যে ফাগুন মাসের সেই প্রাকৃতিক কাশবনেরসাদাফুল, জংলিবাহার কিংবা সর্ষেফুলের মনমাতানো হলুদ ক্ষেত কখনো ই আমার চোখেধাধা মিশায় নাই, সেই সৌন্দর্য যদি এখন আবার ফিরে আসতো!! হয়ত এখন তা আমারচোখে পড়তো।
মনে হয় যদি আবার সেই জগতে চলে যেতে পারতাম, হয়ত এখন আমিঅন্যমনস্ক হয়ে ভাবতাম, পরুক না হয় কিছু বৃষ্টির পানি, ভিজিয়ে দিক না আমারকাচা মাটির মেঝ। হয়তো আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে আমার সেইটিনের চালের ঢেউ দিয়ে গড়িয়ে পরা পানির সাথে আমার ভিজে আসা চোখের পানিও নাহয় আমার কাচা মাটির মেঝ একটু ভিজিয়ে দিয়ে যাক। আজ আমি শহরের কোনো একঅট্টালিকায় বসে সববয়সি মেয়েদের হলুদ শাড়ির বাহার দেখে বুঝতে পারি, আমাদেরগ্রামে এখন সর্ষেফুল চারিদিকে বাতাসে দোলা খাচ্ছে, আমাদের বাড়ির পাশে সেইজংলীফুল গুলিও বাতাসে নেড়ে চেড়ে উঠছে। হয়ত এখন সেখানে ফাগুন মাস। কিন্তুআমি নেই। তাই এই বিশাল পৃথিবীর অগনিত মানুষের থেকে একেবারে নেই হয়ে যাবারআগে কাল বৈশাখী ঝড়ের মাস, বৃষ্টির মাস, শিটের মাসের মতো আজ এই ফাগুন মাসকেওআমার বড় আপন মনে হলো।
স্বাগতম তোমায় হে ফাগুন মাস। তুমি আমারজিবনে প্রায় ৫০ বছর পর আবির্ভূত হতে পেরেছো। আজ মনে হয়, ফাগুন মাসটাও একটামাস, যাকে আমি কখনো দেখি নাই।
আচ্ছা, ফাগুন মাসে কি চোখ ভিজে? কি জানি, হয়ত ভিজে না। কারো কারো চোখ হয়ত এমনিতেই ভিজে।
আমি ঠিক জানি না ইমোশনাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে মন্তব্য করাটা কতটুকু যুক্তি আছে বা আদৌ কোন যোগ্যতা আমি রাখি কিনা। কিন্তু প্রতিদিন আমার চারিপাশে যা দেখছি, যা ঘটছে, যে ভাবে ঘটছে আর এর বিপরীতে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবার, তথা সামাজিকভাবে প্রতিটি স্তর যেভাবে সাফার করছে, তাতে মনে হয়, কোথাও কিছু অসঙ্গতিমুলক রীতি, নীতি এবং সর্বোপরি কিছু বাহ্যিক আচরন কাজ করছে। ফলে প্রতিনিয়ত যারা এর প্লেয়ার এবং যারা এর ভিক্টিম তারা উভয়ই নিজ নিজ চেষ্টায় পরিত্রান পাওয়ার আশা করলেও আশারুপ কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছেনা। আর এ কারনে প্রতিনিয়ত ছোট বালক থেকে শুরু করে প্রবীন বয়স্ক মানুষটিও ক্রমাগত অস্থিরতায় ভোগছেন, সংসারে শান্তি নষ্ট হচ্ছে, পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যাচ্ছে, আর বাড়ছে ক্রমাগত সামাজিক ক্রাইম এবং জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। এর থেকে কি পরিত্রানের কোনো উপায় নেই? এই আপদ কি তাহলে হুট করে সৃষ্টি হয়েছে? নাকি এই আপদ আগেও ছিলো, তবে তা নিয়ত্রনে ছিলো বিধায় চোখে পড়ে নাই? অথবা এমন কি কিছু যে আধুনিক সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি এটা ধ্বংসের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে?
বিষয়টি আলোকপাত করার আগে আমি “ইমোশনাল” অনুভুতিটি নিয়ে একটু সংক্ষিপ্ত ভাবতে চাই। এই “ইমোশনাল” বিষয়টি আসলে কি? সবাই মাঝে মাঝে কথায় কথায় কাউকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুনা যায়, বলেন যে, লোকটি “ইমোশনালি বায়াসড” কিংবা ছেলেটি একটু বেশী “ইমোশনাল”। এটা কি এমন যে, নদী দেখলেই উদাসীন হয়ে যাওয়া, কিংবা সবুজ ঘাসের মাঠ দেখলেই অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া, কিংবা এটা কি এমন যে, বাবা তার কোন সন্তানের জন্য একটা উপহার নিয়ে আসলেন তো আরেকজনের জন্য আনতে পারলেন না বলে, যে পেলো না সে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে মন খারাপ করে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকা? অথবা এটা কি এমন কিছু যে, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করার কারনে মন খারাপ করে আত্তহত্যা করা? অথবা এটা কি এমন কিছু যে, আমার ভালো লাগলো না বলে আমি অন্য কারো মতামতের তোয়াক্কা না করেই উলটা পালটা ব্যবহার করা?
ব্যাপারটা মনে হয় ঠিক এই রকম নয়। আমি ব্যাপারটাকে যেভাবে দেখি সেটা হচ্ছে, “ইমোশনালী বায়াসড” বলতে যেটা বুঝি তা হচ্ছে, যেই বয়সে যে মানুষটি যেভাবে কোনো একটা বিষয় যতটুকু বাস্তবতার সাথে তার বুদ্ধি বিবেচনায় বুঝে তা মেনে নেওয়া দরকার বলে একটা মানদণ্ড থাকে কিংবা সেই মানদণ্ড মোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে সবাই মনে করেন, সেটা না করে কেউ যদি যুক্তির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তার স্বার্থের জন্য, লোভের জন্য, আনন্দের জন্য, কিংবা যে কোনো মুল্যেই হোক সেটা তার পেতে হবেই বলে ঘাট বেধে বসে থাকেন, তাহলেই আমি ধরে নেবো সে ইমোশনালী বায়াসড হয়ে আছেন। মানতে চাইছে না, শুনতে চাইছে না, কিংবা বাস্তবতা বুঝতে চাইছে না। তার মানে কি দাড়ালো? এটা কোন বয়সের মধ্যে পড়ে না। এটা যে কারো ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে। হতে পারে পাচ বছরের বাচ্চার ক্ষেত্রে, হতে পারে বারো বয়সের কোন উঠতি বয়সের যুবক- যুবতীর ব্যাপারে, হতে পারে প্রবীন কোনো বয়স্ক লোকের ব্যাপারেও। স্থান কাল পাত্র ভেদে এবং বিষয়ের উপাদানের উপর বিভিন্ন বয়সের মানুষদের জন্য এই ইমোশনাল শব্দটি খাটে।
একটা উদাহরন দেই। ধরুন, আপনি একজন মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ। মাসের উপার্জন আপনি প্রতিটি বিষয়ে এমনভাবে হিসাব করে করতে হয় যে, কোন কারনে যদি কখনো তার বাইরে কোন ইভেন্ট চলে আসে, তাহলে আপনার পুরু সংসারের হিসাবে একটা আমুল পরিবর্তন করতে হয়। পরিকল্পনা করেছিলেন, আপনার বারো বছরের ছোট বাচ্চার এ মাসে জন্মদিনের পার্টিটা কিছু খরচ করে কিছু লোক দাওয়াত করে নিজের বাড়িতে খাওয়াবেন। হয়ত একটা নতুন উপহারও দিবেন ভেবে রেখেছেন। এটা আপনার ছোট বাচ্চাটিও হয়ত জানে এবং সে সে মোতাবেক মনে মনে খুশীতেই আছে। কিন্তু হটাত করে আপনার পরিবারে এমন কিছু ঘটনার আবির্ভাব হলো যেখানে আপনার ছোট বাচ্চার জন্মদিনের বাজেটটাই হয়ত সেই অনাখাঙ্গিত খাতে খরচ করতে হতে পারে এবং ওই মাসে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান আর পালন করা হয়ত সম্ভবই নয়। এ ক্ষেত্রে কি কি হতে পারে?
হতে পারে-
(১) আপনার ছোট বাচ্চাটি খুব মন খারাপ করবে। আর মন খারাপ করে এমন গো ধরবে যে, তাকে শান্ত করাই খুব কঠিন কাজ। সে হয়ত ঠিকমতো কারো সঙ্গেই ভালো ব্যবহার করবে না, নাওয়া খাওয়া করবে না, পড়াশুনা করবে না, কারো সঙ্গে ভালো ব্যবহারও হয়ত করবে না। সারাক্ষন তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকবে ইত্যাদি।
(২) আপনার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও এমন একটা পরিকল্পনায় ব্যাঘাত হওয়ায় মন খারাপ করতে পারে। একদিকে নিজেদের মন খারাপ, অন্য দিকে আদরের কনিষ্ঠ সদস্যের মন খারাপ হওয়ার কারনে আরো অধিক মন ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে। তারা হয়ত আপনার ফাইনান্সিয়াল ক্ষমতার পরিধি জানেন বলে হয়ত বাস্তবতা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করবেন বা করার চেষ্টা করছেন। আদরের ছোট মানুষটিকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন ইত্যাদি।
(৩) আপনার নিজেরও কিন্তু বড্ড মন খারাপ হচ্ছে আপনার আদরের ছোট বাচ্চাটির জন্মদিনটা আপনার সামর্থ্যের মধ্যে করতে না পারার কারনে। কিন্তু বাস্তবতা এইরকম যে, জন্মদিন করতে গেলে ওই আকস্মিকভাবে আবির্ভূত ঘটনা সামাল দেওয়া সম্ভব নয় আবার ওই আকস্মিক ঘটনা সামাল না দিলেও অনেক বড় ক্ষতির সম্ভাবনা। এই অবস্থায় আপনি ভাবছেন, আপাতত আকস্মিক ঘটনাটাকেই প্রথমে সামাল দেওয়া অতিব জরুরী, তাই আপাতত জন্মদিন পালন সাময়িকভাবে বন্ধ কিন্তু মনে মনে আছে, যেভাবেই হোক, অতিদ্রুত অন্য কোনো উপায়ে কিংবা অন্য কোন পরিকল্পনায় কাটছাট করে অচিরেই জন্মদিনটা পালন করার চেষ্টা করবেন।
এইপুরু পরিস্থিতিটা যদি আপামোর সব সদস্যরা (আপনার ছোট বাচ্চা, অন্যান্য সদস্যরা) সবাই খুব পজিটিভলী নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে থাকেন, তাহলে আমি বলবো, খুবই আউটস্ট্যান্ডিং একটি পরিবার। ইমোসন আছে কিন্তু বাস্তবতার নিরীখে সবাই সবার লেবেলে যথেষ্ট পরিপক্ক।
কিন্তু যদি উল্টোটা হয়? কেউ মানতেই চাইছে না, অস্বাভাবিক ঘটনা কিভাবে টেক্যাল দিবেন আর কিভাবে দিবেন না, সেটা আপনার ব্যাপার, বাচ্চার জন্মদিন পালন করাই চাই। তাহলে বলবো, আপনি অনেক গুলি ইমোশনাল বায়াসড কিছু সদস্যদের নিয়ে বসবাস করছেন।
ইমোশনাল বায়াসড পরিবারের লোকজন একে অপরের যুক্তি অযুক্তির পন্থায় মানতে থাকেন। পাশের বাড়ির ঐশ্বর্যকে নিজেদের না থাকার সামর্থ্যকে ছোট করে দেখেন, বিশ্বাসের ঘাটতির সৃষ্টি হয়, কখনো কখনো তা সমাজের নীতির বিরুদ্ধেও কাজ করে। আকাশ দেখে ইমোশনাল হওয়া আর মেঘ দেখে ইমোশনাল হওয়া অথবা কোন একটি সিনেমা দেখে ইমোসনাল হওয়ার মধ্যে হয়ত কোনো বড় রকমের দোষ নাই কিন্তু এই অভ্যাস টা ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যখন ব্যক্তিত্ব আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের একটা কনফ্লিক্ট কাজ করে।
“সময়” এমন একটি জিনিষ যে এটি প্রতিটি মানুষ, বস্তু, এবং প্রতিটি ইভেন্টের সঙ্গে প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনে সে জড়িত, কিন্তু সে কারোরই বন্ধু নয়। সে টিক টিক করে সবার সঙ্গে বয়ে বেড়ায় কিন্তু সে কারো সঙ্গেই সখ্যতা গড়ে তোলেনা। সে সবার সঙ্গে আছে আবার অন্যদিকে সে কারো সঙ্গেই নাই। সে যেমন কারো জন্যই অপেক্ষা করে না, আবার কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে বলে সে তড়িঘড়িও করে সামনে এগিয়ে আসেনা। বাজারের পন্যের মতো তাকে কোথাও কম বা বেশী দরে কিনে যেমন সঞ্চয় করা যায় না, তেমনি, অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের কারনে সেই অপচয় করা “সময়”টি আর ফিরেও পাওয়া যায়না। সময়ের কোন বিকল্প নাই। কারো কাছ থেকে ধার করেও এই “সময়” নামক জিনিষটি কখনো পাওয়াও যায়না। এটা এমন এক জিনিষ যে, কেউ তার নিজের তহবিল থেকে ধারও দিতে পারে না। তার গতি সর্বদা সামনের দিকে, কারো জন্যই সে পিছনে ফিরে আসেনা। আজকের সূর্যাস্ত যদি আপনি না দেখে থাকেন, আর কখনোই আজকের চলে যাওয়া সূর্যাস্ত আপনি আর দেখতে পাবেন না। আপনি হয়ত কোনো একটি “সময়ের” ফ্রেম ক্যামেরায় বন্ধি করে রাখতে পারবেন, কিন্তু ওই সময়ের ওইপরিবেশ, ওই আমেজ, ওই আস্বাদন, ওই অনুভুতি সেটা আপনি কখনোই ফিরে পাবেননা। এটা যেনো সেই জলবিন্দু মতো, যে একবার কোন একস্থান বয়ে সামনে চলে গেছে, সে আর দ্বিতীয়বার ওই স্থানে ফিরে আসার সম্ভাবনা নাই, আর আসেও না। Same drop of water never passes twice through a same bridge.
সময় এমন একটা জিনিষ, যাকে সর্ব পরিস্থিতির মহৌষধও বলা যায়। যার ফলে ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে, Time is the panacea of all situations. কেউ কেউ আবার একে অন্যভাবেও বলে যে, Time is the panacea of all diseases. কথাটা সত্য। যেমন ধরুন, আজকে অতি আদরের কেউ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কারনে মাঝে মাঝে কারো কাছে মনে হবে, সব বুঝি শেষ। দুঃখের আর শেষ নাই, কিংবা কারো এই অসময়ের প্রস্থানে অনেকেই ভেঙ্গে পড়েন, অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিংবা এমন হয় যে, আজকে যে অশান্তি পরিবেশ মানুষকে কাবু করে ফেলেছে, হয়ত সময়ের অবগাহনে সে আবার সব ভুলে, সব কিছু আবার নতুন করে ধীরে ধিরে সাজিয়ে তোলেছে। সময়ের ব্যবধানে শান্ত হয়ে আসে পরিবেশ, শান্ত হয়ে আসে জীবনের অনেক কিছুই। এই “সময়”ই মানুষকে সাবলম্বি করে তোলে, আরোগ্য করে তোলে। “সময়ের” স্রোতে মানুষ আবার ঠিক হয়ে যায়। ক্ষন যায়, দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, মানুষ “সময়ের” স্রোতে আবার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠে। হারিয়ে যাওয়া বেদনার কথা ভুলে যায়, ব্যথার কথা ভুলে যায়, চোখের জল মুছে যায়। আর এজন্যই হয়ত বলা হয় “সময়” মানুষকে বদলে দেয়।
“সময়” মানুষকে অভিজ্ঞ করে তোলে। একই সমস্যা, একই ব্যক্তি, বিভিন্ন সময়ের ব্যবধানে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমাধান করেন। আর এর কারন একটাই, আর সেটা হচ্ছে, “অভিজ্ঞতা”। যে সমস্যাটা আজ আপনি একভাবে সমাধান করেছেন, সেই একই সমস্যা আগামিকাল একই পদ্ধতিতে আপনি সমাধান নাও করতে পারেন। অথবা সময়ের ব্যবধানে অভিজ্ঞতার কারনে আপনি নিজেও হয়ত সেই একই সমস্যা ওই একই পদ্ধতিতে সমাধান করতে চাইবেন না। আর এটাই হচ্ছে পরিপক্কতার লক্ষন।
“সময়” সবকিছু পালটে দেয়। পালটে দেয় পরিস্থিতি, পালটে দেয় মানসিকতা, পালটে দেয় ব্যবহার, অভ্যাস। এমনকি পালটে দেয় মানুষের পছন্দ, অপছন্দ, এমনকি পালটে দেয় সম্পর্ক পর্যন্ত। আজ আপনি যে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন, হোক সেটা সুখের বা কষ্টের, সময়ের ব্যবধানে সেটা পালটে যেতে পারে। আজ আপনার যে মানসিকতা, “সময়ের” ব্যবধানে আপনার মানসিকতা পুরুটাই পালটে যেতে পারে। যে বয়সে আপনি অনেক দুরন্তপনা করেছেন, কিংবা যে “সময়ে” আপনি আবেগের বশে অনেক কঠিন কঠিন শপথ করে কালবৈশাখী ঝড় মাথায় নিয়ে একা সাহস করে অনেক কিছু মোকাবেলা করেছেন, জীবনের কোনো এক সময়ে এসে মনে হবে, হয়ত সেটা করাই ঠিক হয় নাই, আবার মনে হতে পারে আজ এই বয়সে ওই একই পরিস্থিতিতে আপনি ওই রকম কোনো কিছুই হয়ত করবেননা। হয়ত আপনিই উপদেশ দিবেন, ধৈর্য ধরতে। কারন, আপনি এখন জানেন, আবেগের বশে অনেক কিছু করা যেতে পারে বটে কিন্তু সবশেষে যা অপেক্ষা করছে তার পরিনতি ঠিক যা আশা করছেন তা হয় নাই বা হয়না। তাই উপদেশ হবে হয়ত “ধৈর্য” ধরুন। আর একেই বলে “অভিজ্ঞতা”। অভিজ্ঞতার সঙ্গে “সময়” একটা যোজন। “সময়” যত পেরুবে, অভিজ্ঞতা তত ভারি হবে। আর অভিজ্ঞতা যত ভারি হবে, আপনি তত শান্ত হয়ে যাবেন। বয়স্ক সবচেয়ে বোকামানুষটিও অল্পবয়সের কোন তথা কথিত চালাক মানুষের থেকে বেশি অভিজ্ঞ। আর তার এই অভিজ্ঞতার কারনে এই বোকামানুষটিও ওই অল্প বয়স্ক মানুষটির থেকে ঢের বেশি জ্ঞ্যান রাখেন। এটা অনেকেই হয়ত মানবেন না কিন্তু এটাই সত্য কথা।
“সময়ের” ব্যবধানে বন্ধু পর্যন্ত পালটে যায়। কখনো কখনো বন্ধু পালটে শত্রু হয়ে যায়, আবার “সময়ের” প্রেক্ষাপটে বাব্যবধানে শত্রু একদিন মিত্র হয়ে যায়। আজ যাকে আপনি আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ বলে মনে করছেন, হয়ত “সময়ের” ব্যবধানে কাল সে আপনার অনেক দুরের বলে মনে হবে। কিংবা আজ যাকে আপনি সবচেয়ে দুরের কাউকে মনে করছেন, “সময়ের” ব্যবধানে হয়ত সেইই আবার সবচেয়ে কাছে মানুষদের মধ্যে একজন বনে যেতে পারে। আর এটাই বাস্তবতা। তাই আজকের “সময়”টাই শেষ কথা নয়। অপসন খোলা রাখুন যেন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে শত্রুকে মিত্র, আর মিত্র থেকে সতর্ক থাকার ক্ষেত্র খোলা থাকে। আজ যে আপনার কষ্টে আপাতদৃষ্টিতে বুক ভাসিয়ে চোখের জল ফেলছে, কাল হয়ত এই চরিত্রটিই আপনার সর্বনাশের জাল বুনছে। আজ যাকে আপনি হৃদয়ের সবটুকু অবিশ্বাস দিয়ে যোজন মাইল দূরে সরিয়ে রাখতে সাচ্ছন্দ বোধ করছেন, হয়ত আগামীকাল মনে হবে, তার কোনো বিকল্পই নাই।
“সময়” বড্ড বেরশিক জিনিষ। সে কাউকে আপন মনে করে না, সে কাউকে পরও মনে করেনা। আসলে “সময়” কারো সঙ্গেই তার সম্পর্ক রাখেনা। সে একা, সবাই তার সঙ্গেই চলার চেষ্টা করে। যে পিছিয়ে যায়, সে পিছিয়েই থাকে, আর যে তার সঙ্গে চলতে চায়, “সময়” তার সঙ্গেই কাধে কাধ মিলিয়ে সামনে এগিয়ে চলে। আপনি আজ হেরে গেছেন? এমনও হতে পারে আগামি কাল আবার আপনি জিতে যাবেন। শুধু “সময়ের” ব্যবধান। “আজ” আর “আগামিকাল”। “সময়ের” ব্যবধানে একদিন হেরেছেন আর আরেকদিন জিতে গেছেন।
আজ থেকে শত বছর আগেও এটাই ঘটেছে, আজো এটাই ঘটছে, এবং আগামি শতকের পর শতক অবধিতাই ঘটবে। এটাই সময়ের নিতি। সে কখনই তার নিতি পরিবর্তন করেনা। সে শুধু তার চারিপাশে যারা আছে, শুধু তাদের পরিবর্তন করে দিয়ে চলে যায়।
“সময়” দুর্বলকে সবল করে, সবলকে দুর্বল করে, শক্তিশালীকে পরাভূত করে, নিষ্পেষিতকে শাসক বানায়। “সময়” এমন এক জিনিষ যে, সে গরীবকে ধনী বানায়, ধনীকে গরীবের কাতারে দাড় করিয়ে দেয়। “সময়’ এমন এক অপ্রতিরোধ্য জিনিষ যে, সে ভালোবাসাকে ঘৃণার স্তরে নিয়ে আসতে পারে, আবার ঘৃণার স্তর থেকে ভালোবাসায় পরিবর্তন করাতে পারে। “সময়” কচি খোকাকে পুরুষে পরিনত করে, ছোট্ট ফুটফুটে একটি মেয়েকে জটিল সংসারের হাল ধরতে শিখায়। “সময়” মানুষের সব কিছু পালটে দিয়ে এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে দাড়া করাতে পারে যেখান থেকে বের হয়ে আসার মতো কোন পথও খোলা না রাখতে পারে। আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি অন্যের পরিস্থিতি উপভোগ করছেন, হয়ত আগামিকাল ঠিক সেখানে দাড়িয়েই অন্য একজন আপনার পরিস্থিতি উপভোগ করবে। “সময়” কখন কার সঙ্গে থাকে, কেউ জানে না।
কোনো একসময় “সময়” চলেছিলো রোমের জন্য, রোম শেষ হয়েছে। তারপর “সময়” চলেছে স্পেনের জন্য, স্পেন শেষ হয়েছে। তারপর “সময়” চলেছে রাশিয়ার জন্য। এখন “সময়” চলছে আমেরিকার জন্য। হয়ত একদিন, এই “সময়”টাও শেষ হয়ে যাবে, হয়ত অন্য কারো জন্য সে আবার চলবে।
আমরা কথায় কথায় একটা উপদেশের বানী বলে থাকি, “ধৈর্য ধরুন” কিন্তু কেউ বলছি না, কিভাবে “ধৈর্য” ধরতে হবে। কিংবা “ধৈর্য” ধরার প্রক্রিয়াটা কি। এটা কি এই রকম যে, চুপচাপ বসে থাকার নাম “ধৈর্য”? নাকি এমন কিছু যে, প্রতিবাদ না করার নাম “ধৈর্য”? অথবা এমন কিছু যে, শুধু সব কিছু মেনে নেওয়ার নাম “ধৈর্য”? প্রকৃতপক্ষে এগুলোর হয়ত কোনোটাই না আবার অন্যদিকে এইসবগুলোই হয়ত একত্রে “ধৈর্যের” উপাদান। “ধৈর্য” ধরার প্রক্রিয়াটাও “সময়” বলে দেয় কিভাবে তার শুরু আর কিভাবে তার শেষ। তবে এইটা ঠিক যে, ধৈর্যের সাথে “সময়” নামক জিনিষটা জড়িত। সমাধান পাচ্ছেননা, তো, ধৈর্য ধরুন। কিভাবে? অপেক্ষা করুন, মানে “সময়” নিন। যুক্তির সাথে পরিবেশ ব্যখ্যা করুন, নিরপেক্ষ বিচারে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করুন, সবার কথা শুনুন, কিন্তু সবার কথা মানতে হবে এমন চিন্তা থেকে বিরত থাকুন। সম্ভাব্য সমাধানে পজিটিভ চিন্তা করুন। সম্ভাব্য সমাধানের পরবর্তী প্রতিটি কার্যকলাপের বিপরীতে তার সম্ভাব্য ফলাফলের কতটা আপনার ভালো হয় বা কতটা আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন তার পূর্ণ একটা চিত্র নিজে নিজে ভাবুন। আর ভাবুন, কে আপনার জন্য আর কে আপনার জন্য নয়। সময়ের সাথে সাথে মানুষের যেহেতু আচার আচরন পরিবর্তন হয়, প্রতিটি মানুষের ভুমিকা বিচার করুন। হতে পারে আপনি ভুল মানুষকে বেশি মুল্যায়ন করছেন অথচ যাকে আপনার মুল্যায়ন করার দরকার সবচেয়ে বেশি, তাকেই আপনি দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। প্রি-কন্সিভ আইডিয়া থেকে সরে আসুন, প্রো-একটিভ কাজ থেকে বিরত থাকুন। নিজের সাথে অন্যের আইডিয়ার মধ্যে কোথায় কি কারনে ব্যবধান হচ্ছে, তার সম্ভাব্য কারন গুলি সনাক্ত করার চেষ্টা করুন। হতে পারে আপনি কিছু মিস করে যাচ্ছেন। আর এই মিসিং জায়গাগুলি পূর্ণ করার জন্য “সময়” নিন। অযথা খাম খেয়ালী করেও কোনো মন্তব্য না করাই মঙ্গল। কারন, “ধৈর্যের” মধ্যে এই সহিষ্ণতাও একটা উপাদান। আমি এভাবেই ব্যাপারগুলি চিন্তা করি। এটাই যে একমাত্র পদ্ধতি সেটাও হয়ত সঠিক নয়, হয়ত আপনার কাছে আরো অন্য ভালো কোন পদ্ধতি থাকতে পারে। সেটা নিয়ে স্টেজ বাই স্টেজ বিশ্লেষণ করুন। ধাপগুলি নিয়ে ভাবুন। কার পরে কি হচ্ছে, কোন কোন পদক্ষেপে কি কি ফলাফল হতে পারে, সব কিছু মিলিয়ে একটা ডিসিসন মেকিং পদ্ধতিতে এগিয়ে যান, দেখবেন, যথেষ্ট স্বচ্ছ একটা চিত্র আপনার কাছে ভেসে উঠছে। এটা একটা পথের মতো। পুরু পথটা দেখার চেষ্টা করুন। আপনার থেকে ভাল বিচারক অন্য একজন নয়। এটা ভাবুন।
সকাল বেলায় অনেকগুলি এসএমএস দেখে নিজেই খুব মনে মনে হাসছিলাম। কোন এক পল্লিগ্রামে আজ থেকে প্রায় ৫১ বছর আগে আমি আমার এক গ্রাম্য মায়ের কোল জুড়ে নাকি মানিকসোনা হয়ে জন্ম নিয়ে সবার মনে হাসি ফুটিয়েছিলাম। আমি কত জোরে কেদেছিলাম, আর কে কত জোরে হেসেছিল, সেটা আমার কস্মিনকালেও মনে নাই, কিন্তু যারা তখন অনেক অনেক খুশীতে খুশিতে আটখানা হয়ে পুরু গ্রাম, সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলেছিলেন, তাদের অনুভুতি আজ এতো বছর পরে এসে আমার বুঝতে একটুও বাকি নাই। ওই যে বিখ্যাত মানুষ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম সাহেব বলেছিলেন, “যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল, সেইদিনই নাকি তোমার মা তোমার কান্নায় শুধু হেসেছিলেন”। মায়েরা সন্তানের কান্নায় কখনো হাসেন না, কিন্তু সন্তানের জন্মেরদিন সন্তানের কান্নায় নাকি মায়েরা আনন্দে হাসেন। কি অদ্ভুদ কথা। তাদেরকে আমি আমার অন্তর থেকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাই। দোয়া করি যেনো তারা স্বর্গীয় হন।
তাদের অনেকেই আজ এই মিস্টি পৃথিবীতে নাই, কিন্তু আমার সেইদিনের জন্ম নেওয়াক্ষনটিকে আমার উত্তর সুরীরা, আশে পাশের বন্ধুবান্ধবরা, আমার অনুজ, আমার সন্তান, বা সন্তান তুল্য মিস্টি মিস্টি দুষ্টু পোলাপান গুলু বড় মজা করে পালনের নিমিত্তে কেউ গোচরে, কেউ অগোচরে, কেউ এসএমএস দিয়ে, কেউ কেক নিয়ে বসে থেকে আমার অখ্যাত এইজন্মদিনটাকে এমন করে সাজিয়ে দিল যে, বড় আনন্দ হল। আনন্দ করার জন্য কোনো উপলক্ষ লাগে না, আনন্দ পাওয়ার জন্য অনেক পয়সাও খরচ করতে হয়না। কিন্তু একটা নিছক উপলক্ষ থাকলে মানুষগুলুকে কাছে পেতে সুবিধা হয়। আজ সেটাই হল।
আমি যখন বাসায় ফিরেছিলাম, তখন জন্ম তারিখটা পার হয়ে পরের দিনের তারিখ চলে এসেছিলো। কাজের চাপ ছিলো অনেক। জন্মদিন পালনের চেয়ে বাস্তব কাজের চাপে সারাদিন আর মনেই ছিলো না ব্যাপারটা। অত্যন্ত ক্লান্ত শরিরে, ঘুম ঘুম চোখে যখন রাত সারে বারোটায় বাসায় পৌঁছলাম, দরজা খুলতেই হতাত করে একগুচ্ছ মিস্টি কচিকণ্ঠে সুর বেজে উঠলো, “হ্যাপি বার্থ ডে বাবা”। আমার মেয়েরা আর মেয়ের জামাই। সারপ্রাইজ দেওয়ার চোখের মধ্যে চিক চিক করা একটা ভাব থাকে। আমি সেটাই দেখলাম এই পিচ্চিগুলির মধ্যে। মানুষ যখন একটা ধাপ পার হয়ে অন্য ধাপে বিচরন করে, তখন সেই ছোট বেলায় ঘুড্ডি, লজেন্স, চকলেট, কিংবা ফেলে দেওয়া কোনো নিছক পাথর খন্ড অথবা নিজের জন্ম দিন যা এক সময় নিজের কাছে সম্পদ মনে হত, নিজের কাছে একটা বিশাল আবেগের অনুষ্ঠান মনে হত, সেটা আর মাথায়ও থাকে না। কিন্তু সেই এক ই অনুভুতির যখন পুনরাবৃত্তি ফিরে আসে আমাদের উত্তরসুরী প্রজন্ম থেকে, তা দেখে মনে হয়, আমিও তোমাদের মতো একদিন এই রকম উচ্ছল, আবেগতাড়িত বয়স তা পার করে এসেছি। ভাবতে বড্ড ভালো লাগে। ওরা আজ তাই করলো।
আর রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার বউ, মিটমিট করা চোখে, মোনালিসার হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে বল্লো, “হ্যাপি বার্থডে মনি।” কিছুই না কিন্তু। কিন্তু মনে হলো, বাহ, কি আনন্দ, কি প্রশান্তি।
ক্লান্ত শরীর, চোখ ভর্তি ঘুম, রাত অনেক, পেটে ভীষণ ক্ষুধা, কিন্তু তারপরও মনে হলো, মন ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। এটাই আসলে “পরিবার”। “পরিবার” মানুষের জীবনে বড় একটা আশ্রয়স্থল এবং শান্তির প্রয়াশ।
এই ক্লান্ত শরীরেও ওদের আনন্দটাকে ধরে রাখতে চাইলাম। কেক কাটলাম, কেক পাঠিয়েছেন আমার মেয়ের শাশুড়ি। ব্যাপারটা দেখলে কিচ্ছু মনে হবে না, আবার ভাবলে অনেক কিছু। কোনো বড় কিছু আয়োজন নাই, অনেক মানুষের ভিড়ও নাই, মাত্র দুইমেয়ে, মেয়ের জামাই আর আমার বউ। তাতেই মনে হলো, একটা আয়োজন।
পরেরদিন শুক্রবার। জন্মদিন পেরিয়ে একদিন চলে গেছে। মনে হলো, আরো কিছু মানুষ তো আছে, যাদেরকে নিয়ে এই ছোট আনন্দটা বড় করা যায়। সোমা এসেছে শুনলাম, রাজুও এসেছে। মেয়েটা দেশের বাইরে থাকে। ও আমার মেয়ের ননদিনী আর ননদিনীর স্বামী। আমার পরিবারের একটা অংশ এবং আমার ভাল লাগার মানুষগুলুর মধ্যে একজন। খুব শীঘ্রই ওরা আবার বাইরে চলে যাবে। সুতরাং ওদের সঙ্গে ঘরোয়া পরিবেশে দেখা হওয়ার সুযোগ কম। ভাবলাম, হয়ে যাক না একটা ছোট খাটো গেট টুগেদার। সেই গেট টুগেদারের অংশই হচ্ছে আজকের এই ছবিগুলুর ইতিহাস। এটা আমার জন্মদিনের পার্টি কিনা আমি জানি না, কিন্তু এটা একটা ফ্যামিলি গেট টুগেদার বললেই আমি অভিহিত করতে চাই। দিনটা বেশ কেটেছে।
ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে, আর ধন্যবাদ ওই দুইজন মানুষকে, (আমার বিয়াই আর বিয়াইন) যারা সবসময় আমাকে খুশীতে অনেক আনন্দিত হন। সবাইকে আমার প্রাণঢালা ভালোবাসা। অনেক অনেক ভাল রাখুক আমার এই অনবদ্য, ছোট পরিবারের সব সদস্য গুলিকে। আমি তোমাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি।
উত্তর থেকে দক্ষিন, পূর্ব থেকে পশ্চিম, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য কিংবা গ্রিস থেকে অন্য কোথাও, ছোট কিংবা বৃহৎ যেদিকেই তাকাবেন কিংবা যেখানেই যাবেন, সর্বত্র একটা লিখিত-অলিখিত শ্লোগান দেখবেন কিংবা শুনবেনঃ পৃথিবীকে বদলে দাও। অথবা চা স্টলে বসলে আলাপ আলোচনায় শুনবেন, “আচ্ছা, মানুষ গুলি বদলাচ্ছে না কেনো?” ইত্যাদি।
আমি মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করিঃ কি বদলাতে হবে? কি পরিবর্তন হয়েছে যা বদলানো দরকার? এই পরিবর্তন কি আগের কোনো এক জমানায় ফিরে যাওয়ার আকুতি? নাকি ভবিষ্যতের কোনো এক নাম না জানা টেকনোলোজির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি?
যদি বলি, আগের জামানাই অনেক ভালো ছিলো, যেখানে সব সম্প্রদায় একই জনগোষ্ঠীর আওতায় একে অপরের সঙ্গে মিলে মিশে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলেছিলেন এবং সৌহার্দমুলক এক সমাজে বাস করতেন। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে কুশল বিনিময় করতেন, ভালো মন্দ যা কিছু আছে তার খোজখবর নিতেন, এক বাড়ির মেয়ে আরেক বাড়িতে গিয়ে কোন এক বিয়ের আসরে বসে গ্রাম্য নৃত্যর সাথে নাচানাচি করতেন। হিন্দু মুসলমান, খ্রিষ্টান কিংবা যে যেই ধর্মেরই হোক না কেনো, তাদের মধ্যে একটা সৌহার্দপূর্ণ সদ্ভাব ছিলো। সত্যকে মিথ্যার সাথে, কিংবা আরালে আবডালে একে অন্যের সমালোচনা না করার মানসিকতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশির একটা বন্ধুত্তপূর্ণ অনুভুতি ইত্যাদি দেখা যেত। আমরা কি সেটার কথা বলছি? তাহলে তো বলবো, তখনো তো পাথরযুগও ছিলো যেখানে জীবন্ত মানুষকে মানুষ মেরে ফেলতো, কিংবা মোঘল সম্রাটদের আমলে তো মানবাধিকারের কোনো বালাইই ছিল না অথবা নীল চাষদের আমলে তো মানুষ আরো খারাপ অবস্থায় না খেয়ে খেয়ে ছিলো। তাহলে কি সেই আগের জমানায় ফিরে যাওয়াই কি বদল হওয়ার কথা বলছি? অথবা এমন কিছু নতুন নতুন টেকনোলোজি যা আগামি প্রজন্মের জন্য ধীরে ধীরে উদ্ভাবিত হচ্ছে যেখানে পুরানোদের নতুনদের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত?
আসলে ব্যাপারটা সম্ভবত এই রকম নয়। অনেক জটিল, শুধু জটিল নয়, সময় সাপেক্ষও বটে।
জটিল কতটুকু সেটা না হয় পড়ে ভাবা যাবে কিন্তু সময় সাপেক্ষ ব্যাপারে বলতে পারি যে, আমার এই অল্প আয়ুর জীবনের মধ্যে দেখেছি, আমরাই এক সময় শীতের মৌসুমে ঈদ পর্ব পালন করেছি আবার বর্ষার সময়ও ঈদ পালন করেছি। কারন, ঋতুর পরিবর্তনের ফল, সময়ের তারতম্যের কারনেই এই পরিবর্তনটা হয়। আর এই পরিবর্তন নিছক এক বছর বা দুই বছরের মধ্যেই ঘটে যায় না। তারজন্য যুগের পর যুগ কেটে যায়। ছোট এই উদাহরন দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি যে, পরিবেশ বদল হতেও যুগের পর যুগ লেগে যায়। আর মানুষের সভ্যতা তো আরো সময়ের ব্যাপার। এতে জেনারেশন থেকে জেনারেশন পার হয়ে যায়। ফলে বদল বা পরিবর্তন জিনিসটা একা একটা ফ্যাক্টর নয়। এরসঙ্গে জড়িত সময়, মানুষ, সভ্যতা, মানুষের শিক্ষা, উদ্ভাবনীর সাফল্য, নতুনত্তকে গ্রহন করার মানসিকতা ইত্যাদি। আর পরিবর্তনের জন্য এইসব ফ্যাক্টরগুলি একসঙ্গে হতে হবে। সময়ের সঙ্গে মানুষ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সভ্যতা, সভ্যতার সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে উদ্ভাবনির আবির্ভাব, আর সেই উদ্ভাবনীর সঙ্গে পুরানো রীতিনীতি ছেরে মানুষের নতুন কিছু গ্রহনের আন্তরিকতা ইত্যাদি মিলে আসে এই বদল। এর কোনো একটায় যদি বাধ সাধে, তাহলেই বাধাগ্রস্থ হয় বদল হওয়ার প্রক্রিয়া। আর যখন বদল হওয়ার মানসিকতা তৈরি না হয়, শুরু হয় বদলা নেওয়ার প্রক্রিয়া। সেটাও এক প্রকার বদল কিন্তু তা আমরা কখনোই চাই না।
প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ এই বদল হওয়ার শ্লোগান দিয়ে আসছে। বদল যে হয় নাই তা কিন্তু না। পাথর যুগের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ্য, মোঘল সম্রাটদের একচেটিয়া শাসনতন্ত্র, ইংরেজদের দস্যিপনা, বর্গিদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে “বদল” হওয়ার নিমিত্তে সব আমলেই কিছু না কিছু সাহসী মানুষ কিংবা গোত্র আন্দোলন করেছিলো এবং তার সুফল যে হয় নাই তা নয়। সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়েছে, সহমরন প্রথা বন্ধ হয়েছে, জীবিত কন্যা সন্তান হত্যা করা বন্ধ হয়েছে, বাকস্বাধীনতার উন্নতি হয়েছে, ন্যায়নীতির আইন প্রনয়ন হয়েছে, সামাজিক মুল্যবোধের পরিবর্তন হয়েছে, আরো অনেক কিছু। এগুলু হচ্ছে বৈশ্বয়ীক পরিবর্তনের বড় বড় আলোচনা। কিন্তু এই বড় বড় বৈশ্বয়ীক পরিবর্তনের সুচনা প্রকৃতপক্ষে আরম্ভ হতে হয় একেবারে ছোট ছোট পরিবার থেকে, প্রতিটি মানুষের ব্যবহার থেকে, অথবা অন্য অর্থে যদি বলি, এই পরিবর্তনগুলির প্রারম্ভিক ভিত্তি হচ্ছে প্রতিটি মানুষ। আমরা এই প্রারম্ভিক ভিত্তিতে “বদল” চাই। তাহলেই প্রকারান্তে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বয়ীক পরিবর্তন বা “বদল” কার্যকরী হবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোঃ এই প্রারম্ভিক ভিত্তি অর্থাৎ মানুষের পরিবর্তন কিভাবে হবে সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়।
রিক্সায় উঠেছেন? দেখবেন, গল্পের ছলে হয়ত রিকশাওয়ালা বলছে, স্যার দেশটার কি কোনো পরিবর্তন হবে না? চা স্টলে বসেছেন? শুনবেন, তুমুল কথাবার্তা হচ্ছে, সমাজটা কি অধঃপতনে চলে যাচ্ছে? স্কুল কলেজে, মিটিং সেমিনারে বসেছেন? দেখবেন, একদল শিক্ষিত লোক দেশের আইন-শৃঙ্গলা, শিক্ষা-ব্যবস্থা, ছাত্র-ছাত্রদের, শিক্ষক-শিক্ষিকার আদর্শ, যোগ্যতা, ইত্যাদি নিয়ে কথা বলছেন। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে সর্বচ্চ আদালত প্রাঙ্গনে বসেছেন? শুনবেন, ন্যায় নীতির পদস্খলনের অনুতাপ। কোনো বাড়িতে বেড়াতে গেছেন? দেখবেন, প্রতিটি অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়ে বিব্রতবোধ করছেন। কেউ অভিযোগ করছেন, তাদের সন্তানগন কথা শুনছে না, কেউ কথা রাখছে না, কেউ আদব-কায়দা শিখছে না, কেউ কেউ আবার তাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝার চেষ্টা না করে বিপথে চলে যাচ্ছে, ইত্যাদি। কারো অভিযোগ স্কুল কলেজের বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ সমাজের বিরুদ্ধে, আবার কারো অভিযোগ নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে। আর এই অভিযোগকারীগন সবাইকে আমরা চিনি। যিনি অভিযোগ করছেন এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, সবাই কোনো না কোনভাবে আমরাই। আমার সবাই অভিযুক্ত। আবার অন্যদিকে, আমরাই আবার এই অভিযোগগুলির সমাধান, পরিবর্তন চাই। সবাই চাচ্ছি পরিবর্তন, সবাই চাচ্ছি সস্থি, সবাই চাচ্ছি একটা “বদল”। তাহলে পরিবর্তনটা আসছে না কেনো? কোন জায়গাটায় সমস্যা তাহলে?
সমস্যা আসলে শুধু এক জায়গায়। আমরা সবাই বলছি, সব ভালো হয়ে যাক, সবাই বলছি পরিবর্তন হোক, সবাই বলছি “বদল” হোক, শুধু “আমি ছাড়া”। প্রকৃত সমাধান আসলে এই “আমি”র মধ্যে।
যখন কোনো বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কোনো এক শাশুড়ির এই কথা শুনবেন যে, আমার মেয়ের স্বামীটা অনেক ভালো, সে আমার মেয়ে যা বলে, যা আবদার করে, আমার মেয়ের স্বামী সবকিছু শুনে এবং মেনে চলে। কি লক্ষি মেয়ের স্বামী। কিন্তু আমার নিজের ছেলেটা এতো খারাপ যে, সে বউয়ের কথায় নাচে, উঠে আর বসে। তাহলে আপনি এই শাশুড়ির কাছ থেকে কিভাবে “বদল” চাইবেন? কোনো একটা বিয়ের আসরে গেছেন? পুরানো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সে কোনো এক স্কুল কিংবা কলেজে চাকুরী করেন, কিন্তু তার সন্তান তার স্কুলে বা কলেজে পড়েন না। কারন সেখানে খুব ভালো পড়াশুনা নাকি হয় না। তাই তিনি তাদেরকে স্কুল বা কলেজে নিজের সন্তানকে পড়ান না। কিন্তু তিনি অন্যের সন্তানদেরকে ওখানে পড়ান। অন্যের সন্তানকে নিয়ে তার চিন্তা নাই, একরকম করে দিন কাটিয়ে দিলেই হল। তিনি তার সন্তানদের পড়াচ্ছেন এমন এক স্কুল বা কলেজে যেখানে ওই স্কুল কলেজের মাসিক বেতনই হাজার হাজার টাকা। ফলে এই অতিরিক্ত টাকা আয় করার জন্য তো তাঁকে বিকল্প পথ বের করতেই হবে। আর এই বিকল্প পথে টাকা আয় করার জন্য তো তাঁকে তার চাকুরীর সময় থেকেই নিতে হবে। তার সময় কই তার অধীনে অধ্যায়নরত ছাত্রকে সময় নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার? আবার তিনিই “বদল” চান এই সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার। তাহলে আপনি কিভাবে কার “বদল” চাইবেন?
পাশের বাড়ির মেধাবী সন্তান জিপিএ-৫ পেয়েছে, সরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং, সরকারী মেডিক্যাল কিংবা ভালো ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু ফাঁকি দিয়ে লেখাপড়া না করা আমার সন্তান ভালো ফলাফল করতে না পারায় হয়ত নামকরা কোনো ইন্সটিটিউটে ভর্তি হতে পারছে না, তাতে কি? প্রাইভেট ইন্সটিটিউট তো আছে? শুধু টাকা হলেই সম্ভব। কোথা থেকে আসবে এই অতিরিক্ত টাকা? আমাকে তো ভিন্ন পথে যেতেই হবে, হোক সেটা ন্যায় কিংবা অন্যায়। আমার সন্তান কে তো আর যেই সেই ইন্সটিটিউটে পড়ালে চলবে না। আমার এই অতিরিক্ত টাকার সংস্থান করতে আমাকে অন্যায় কিছু করতেই হবে, হোক সেটা ঘুষ কিংবা অন্য কিছু। আবার এই আমিই ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলছি। তাহলে পরিবর্তনটা আসবে কিভাবে? বৃদ্ধ বাবা বা মাকে নিয়ে বাসে উঠেছেন? সিট খালি নাই। পাশে এক তরুন সিট দখল করে বসে আছেন। কোনো মায়া মমতা, কোনো আদব কায়দা, কিংবা কোনো দয়া দাক্ষিন্যতা দেখিয়েও এই বৃদ্ধ মানুষটির দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টের কথা চিন্তা করেও তরুন তার নিজের সিটটা ছেড়ে দিতে নারাজ। কিন্তু এই তরুনই যখন তার নিজের বৃদ্ধ বাবা বা মাকে কোনো একদিন ওইরকম এক পরিস্থিতির সম্মুক্ষিন হবেন, তিনি আক্ষেপ করে বলবেন, দেশটা যাচ্ছে কই? কোনো আদব কায়দা কি কিছুই নাই? এবার আসি পরিবারের ভিতরে। আমি রিপাবলিকান দল করি, কেনো আমার স্ত্রী বা ছেলেমেয়ে রিপাবলিকান দল করবে না? আমারটা খাবে, আমারটা পড়বে, অথচ আমার দল করবে না, তাতো হবে না। আমার দলের বিরুদ্ধে কথা বলবে, এটাতো হবেই না। ছেলে ভালো আর্ট করতে পারে, কিংবা খুব ভালো অংক বুঝে, তাতে কি? আমার খুব শখ আমার সন্তান ডাক্তার হবে। কেনো আমার ছেলের কথায় আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং বানাতে হবে তাঁকে? আপনি কোনো এলাকায় নাম করেছেন, হোক সেটা গ্রাম্য বিচারের বেলায়, কিংবা সালিশীর বেলায়। আপনার গ্রামে করিমুদ্দিনও আপনার মতো আরেক নামীদামী গ্রাম্য বিচারক। করিমুদ্দিন কোনো বিচারে গেলে সেখানে আপনার না যাওয়াই শ্রেয় মনে করছেন কারন দুই নামীদামী বাঘ একসঙ্গে থাকে কিভাবে? কিংবা যদি রায়ের এদিক সেদিকে আপনার মতামতের মুল্যায়ন না থাকে সেই ভয়ে আপনি ন্যায় কিংবা অন্যায় যাই হোক না কেনো, আপনি পুরু বিচার কাজটাকেই অস্বীকার করে ফেললেন। তাহলে পরিবর্তনটা আসবে কিভাবে? আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আপনার মতাদর্শের কোন এক কর্মীকে অন্যায় কাজের জন্য ধরে নিয়ে গেছে? কোনো ব্যাপার না। আপনি সরকারী দল করেন, সব কিছুর উর্ধে আপনি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনিকে প্রলুব্ধ করে ছারিয়ে নিয়ে এলেন কয়েক ঘন্টার মধ্যে। আবার যখন আপনার বিরোধী দল সরকারী দল হয়ে যাবে, আপনি যখন সেই একই প্রক্রিয়ায় নিষ্পেষিত হবেন, সেই আপনিই বলবেন, দেশে কি কোনো আইনকানুন নাই? তাহলে পরিবর্তনটা হবে কিভাবে? আজ আমি “বদল” হচ্ছি না অথচ কাল আমি সবাইকে “বদল” হতে বলছি। লাভের আশায় আপনি খাদ্যে ভেজাল মিশাবেন, ফরমালিন দেবেন, মরা মুরগী রেস্টুরেন্টে সাপ্লাই দেবেন? দিন। কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু আগামিকাল আপনার সন্তান সেই ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে কিডনী নষ্ট করবে, মরা মুরগির রোষ্ট খেয়ে লিভার নষ্ট করবে। তার শরির খারাপ করবে, অসুস্থ হবে, যাবেন ডাক্তারের কাছে, গিয়ে দেখবেন, প্রশ্নপত্র ফাস করে পাশ করা ডাক্তার, ভেজাল ঔষধ সব আপনার সামনে একত্রে হাজির। অসুখ নিরাময় হবে না। একদিন আপনার আদরের সন্তান আপনার চোখের সামনে মারা যাবে। আর এভাবেই আমরা সবাই ঠকছি। কাকে আসলে ঠকাচ্ছি?
একজন চোরও আরেকজন চোরকে পছন্দ করে না, একজন ঘুষখোরও আরেকজন ঘুষখোরকে পছন্দ করে না। মেয়ে বিয়ে দেবেন, ভালো বংশ চান, ছেলে বিয়ে করাবেন? ভালো মেয়ে এবং ভালো পরিবার চান। আমরা সবাই তাই চাই। কিন্তু আমি আমার নিজের পরিবারকে ভালো একটি পরিবার হিসাবে গড়ে তূলতে পারছি না। আমি আমার সন্তানকে ভালো নীতির শিক্ষা দিচ্ছি না। তাহলে আমি কাকে বলছি, “বদল” হউন? ঘরে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরন করবো অথচ সামাজিক সেমিনারে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলবো, নিজে বন্ধুবান্ধব্দের নিয়ে নেশা করবো কিন্তু নিজের সন্তানকে নেশা করতে বারন করবো, নিজে ঘুস নেবো কিন্তু অন্যের বেলায় প্রতিক্রিয়া দেখাবো, তাতে তো “বদল” হবে না কিছুই। আমি কারো ফেলে যাওয়া কলার খোসায় পা পিছলে তার গুষ্ঠি উদ্ধার করবো কিন্তু আমি কলা খেয়ে একটু দূরে ডাস্টবিনে না ফেলে রাস্তায় তা ফেলে যাবো, তাতে তো “বদল” কিছুই হলো না। আমি নিশ্চিত জেনেও যখন কোন অন্যায়কারীর পক্ষে ওকালতি করবো, নিশ্চিত জানবেন, অন্য কেউ আমার উপর অন্যায় করলেও আরো ভুঁড়ি ভুড়ি আইনসেবক পাওয়া যাবে যারা আমার ন্যায়কে অন্যায়ভাবে একই প্রক্রিয়ায় রায় ঘুরিয়ে দিয়ে আমাকে পরাজিত করবে। বৃষ্টির দিনে এসি গাড়ির ভিতরে বসে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে পাশে পায়ে হাটা এক পথচারীর জামা কাপর ভিজিয়ে দেবো, অথচ তারজন্য আমি অনুতপ্তও বোধ করবো না, বরং তার দিকে তাকিয়ে মুচকি তাচ্ছিলের হাসি দিয়ে অথবা “ছোট লোকের দল” বলে গাড়ী হাকিয়ে চলে যাবো, তাহলে তো কোনোদিনই “বদল” বলে কিছু আসবে না।
তাহলে এখন আরো একটি প্রশ্ন আসে। আমরা এখন সত্যি সত্যিই “বদল” হতে চাই। কিভাবে? সহজ পথ। আমরা সবাই সেটা জানি। এক কথায় যদি বলি। তাহলে সেটা দাড়ায় “ইনসাফ”। নিজের প্রতি নিজের ইনসাফ। আর এটাই করতে বলেছে ধর্ম। সেটা যার ধর্মই হোক। কোনো ধর্মই বে-ইনসাফি কাজ করতে আদেশ দেয় নাই। কোনো ধর্মই অন্যায় কাজকে প্রলুব্ধ করে নাই। কোনো ধর্মই মানুষের অধিকারকে হরন করতে বলে নাই। সব ধর্মের নিগুড় উপদেশঃ হত্যা, নিপীড়ন, ঘুষ, সুদ, অপহরণ, অন্যায়, গিবত, অহংকার, মারামারি, লোভ, অশ্লীলতা, নেশা, চুরি ডাকাতি, ভেজাল, ঠকবাজী, হটকারিতা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। আর মানুষের মঙ্গল হয় এমন কাজ করুন। আপনি করুন, মানুষ উপকৃত হবে, মানুষ করবে, আপনি উপকৃত হবেন। এই অভ্যাস এবং কাজগুলি একদিনে হয়ে উঠবে না। আবার আপনি করছেন, কিন্তু অন্য এক জন করছে না দেখে আপ্নিও বিরক্ত হবেন, কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি আপনারটা করুন। একদিন এই সংখ্যাটা বাড়বেই। প্রতিদিন এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। A smile can be a charity. তাই দিয়েই শুরু করুন।
কেউ কেউ হয়ত আবার প্রশ্ন করবেন, আমরা তো ধর্মকে পালন করছি। আমরা তো জানি ধর্ম কি কি বলেছে। তাহলে এর পরেও বদল হচ্ছে না কেনো? এর বিকল্প কি? এর উত্তর একটাই।
জানার নাম ঈমান নয়, মানার নাম হচ্ছে ঈমান। যদি জানার নাম ঈমান হতো তাহলে ইবলিশই হতো সবচেয়ে বেশী ইমানদার। ইবলিশ জানতো অনেক কিছু, সে মানে নাই, কিন্তু আদম অনেক কিছুই জানতেন না, তিনি মেনেছেন। আমরা ধর্ম মানছি, আমরা ধর্মের সব কিছু পালন করছি না।
সময় শেষ হয়ে যায় নাই। “বদল” সম্ভব। আজ থেকেই সম্ভব।
শুনলাম, আজ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে। সবাই (ছেলেমেয়ে, পিতামাতা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যগন) একযোগে টেনসনে আছেন। যার পরীক্ষা ভালো হয়েছে, সেও টেনসনে আছে, যার পরীক্ষা একটু মনপুত হয় নাই, সেও টেনসনে আছে। আর এটাই হবার কথা। তাই তোমাদের এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমিও কিছু মুরুব্বিপনা করতে চাই, হয়ত ভালো লাগতেও পারে।
আজ থেকে প্রায় ৩৩ বছর আগে আমি তোমাদের মতই একজন পরীক্ষার্থী ছিলাম। তখন এই যুগের মত জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন-৫ নামক কোনো কিছু ছিলো না। তখন ছিল “স্টার মার্ক” আর বোর্ডে “স্ট্যান্ড” করার মাত্র ২০ জনের তালিকা। কে বা কারা এই দুর্লভ ফলাফলের অধিকারী হন, তাদের অনেককেই অনেকে চিনেন না। কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে, তখনকার সময়ে ঢাকা বোর্ডে যে ২০ জন তালিকাভুক্ত মেধাবী ছাত্র ছিলো তাদের ১৮ জনই ছিল আমাদের ক্লাসমেট এবং আমাদের কলেজের। পরবর্তীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এই ১৮ জনই আবার ঘুরে ফিরে মেধা তালিকার মধ্যে বা তার আশেপাশে ছিলো। কেউ বা ডাবল স্ট্যান্ড আবার কেউ একটা। আমি তার কোনোটার মধ্যেই ছিলাম না।
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর আমরা ক্যাডেট কলেজ থেকে বিভিন্ন সেক্টরে যে যেখানে যোগ্যতা মতো চান্স পেয়েছি ঢোকে গেছি, কেউ মেডিক্যাল, কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং, কেউ বা আর্মিতে, কেউ বা মেরিনে, কেউ ইউনিভার্সিটিতে ইত্যাদি। তখনো ক্যারিয়ার গড়ার জন্য লেখাপরার মধ্যেই ছিলাম। কে কোনটায় ভর্তি হয়েছি, কিংবা কে কোনটায় গিয়ে কতটুকুন লাভ হয়েছে, তার হিসাব বা পরিসংখ্যান নেবার মতো তখন আমাদের যেমন পরিপক্কতা ছিলো না আবার যাচাই করার সুযোগও ছিলো না। কিন্তু আমরা আমাদের সুযোগ কাজে লাগানোর চেস্টা করেছি যার যার লেবেল থেকে। আজ এই বয়সে এসে কেউ আমাকে Aim in Life রচনা লিখতে বলবে না। বা বলার কারনও নাই। আজ সেগুলো ইতিহাসের মতো। চাকুরী নেবার জন্য আজ আমাকে আর কোথাও ইন্টারভিউ দেওয়ার দরকার পরে না বলে হয়ত কেউ আমাকে আমার লেখাপড়ার যোগ্যাতা নিয়েও প্রশ্ন করবে না। তারপরেও আমরা আমাদের লেখাপড়ার উচ্চতা বাড়ানোর চেষ্টা সব সময়ই করেছি। ওটাও একটা নেশার মতো। যাই হোক।
আজ প্রায় ৩৩ বছর পর যখন পিছনে তাকাই, তখন একটা মুল্যায়নের কথাই সামনে ভেসে আসে। ৩৩ বছর আগে যারা খুব ভালো করেছিলো তারা যেমন বর্তমানে ভালো জায়গায় আছেন, ভালো চাকুরী করেন, সম্মানের সহিত আছেন, আবার যারা তুলনামূলকভাবে একটু কম ভালো ফলাফল করেছিল (মানে স্ট্যান্ড বা স্টার মার্ক পায় নাই), তারাও খারাপ অবস্থায় নাই। এই দ্বিতীয় দলের অনেকেই আবার প্রোফেসনাল লাইফে হয়ত আরো অনেক বেশি সাফল্য লাভ করেছে প্রথম দলের থেকে বেশী যদিও তারা ওই সময় বোর্ডে স্ট্যান্ড করে নাই কিংবা স্টার মার্ক পায় নাই। আবার এমনও দেখা গেছে যে, অনেক ভালো ফলাফল করেও মধ্যম গোছের যে ছাত্রটি যে কাজে আজকে অধিষ্ঠিত আছেন, সেই একই জায়গায় ওই সময়ে তুলনামুলকভাবে খারাপ ফলাফল করেও সেই ছাত্রটি আজ একই স্তরে অধিষ্ঠিত আছেন। তারমানে এই যে, স্কুল কলেজের ক্যারিয়ার আর প্রোফেসনাল লাইফের ক্যারিয়ার দুটি একেবারে ভিন্ন জিনিষ। প্রোফেসনাল লাইফের ক্যারিয়ারের সাফল্য একমাত্র শুধু পড়াশুনার ফলাফলের উপরই নির্ভর করে না। তারসঙ্গে সুযোগ, পরিস্থিতি, পারিবারিক প্রচেষ্ঠা, নিজের বুদ্ধিমত্তা, ম্যাচিউরিটি, আর তারসঙ্গে লাগে লেখাপড়ার মিনিমাম যোগ্যতা। আজ যারা জিপিএ-৫ বা গল্ডেন-৫ পেয়েছো তারা তো অবশ্যই ভালো একটা যোগ্যতা অর্জন করেছো তাতে কোনো সন্দেহ নাই, তারজন্য তোমাদেরকে সাধুবাদ না জানালে কৃপণতাই হবে, কিন্তু যারা চেষ্টা করেছো কিন্তু জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন-৫ পাও নাই, তাদেরও কোনো রকম মন খারাপ করার অবকাশ নাই। কারন প্রোফেসনাল লাইফে সাফল্য পাওয়ার জন্য মিনিমাম যে যোগ্যতাটা দরকার তা ইতিমধ্যে তোমরা অর্জন করেছো অবশ্যই। এমনও অনেক উদাহরন আছে, যে, মিনিমাম কোয়ালিফিকেসন (অর্থাৎ ফলাফলের দিক দিয়ে) ধারি কোনো এক ছাত্র অনেক মেধাবী ছাত্রকে টপকিয়েও সমাজের অনেক উচূ স্তরের সিড়িতে আসীন আছেন। প্রোফেসনাল ক্যারিয়ার একটা বহুমাত্রিক যোগ্যাত্র বহিরপ্রকাশ। সেখানে নিজের মেধার সাথে নিজের চরিত্র, চালচলন, আচার ব্যবহার, বুদ্ধি বিবেচনা, পরিস্থিত সামাল দেওয়ার ক্ষমতা, ইনোভেটিভ আইডিয়া ইত্যাদির সংমিশ্রণ থাকে। পড়াশুনার মেধার সাথে যখন এই আনুষঙ্গিক মেধাগুলি মিলিত হয়, তখন সে হয়ে উঠে একজন অতি উচ্চমানের প্রোফেসনাল। কিন্তু যারা শুধু পরাশুনার মেধাটাই প্রাধান্য দিয়ে অন্যান্য মেধাগুলিকে চর্চা না করেন, তাদের বেলায় সর্বদা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য নাও আসতে পারে। আবার এই তথ্যটাই সব সময় যে ঠিক তাও নয়। কারন, পরিস্থিতি এবং সুযোগও অন্যান্য মেধাবলির সাথে ম্যাচ করতে হবে। সুযোগ এলো না, পরিস্থিতি ও অনুকুলে নাই, এই অবস্থায় অনেক মেধাবী ছাত্রও ক্যারিয়ার নির্মাণে হেরে যান। আর এইজন্য দরকার স্রষ্টার কাছে সর্বদা সাহাজ্য প্রার্থনা করাও। পৃথিবীর নাম করা নাম করা অনেক মানুষের জীবনী অধ্যায়ন করলে যা দেখা যায় যে, সাফল্য আসে পরিশ্রমের হাত ধরে। পরিশ্রমই আসলে সুযোগ তৈরী করে দেয়। অলস মানুষের জন্য সুযোগ সবসময় আসে না। তারা মিস করে।
আজ যারা জিপিএ-৫ পাও নাই অথচ আশা করেছিলে, অথবা আজ যারা একটুর জন্য জিপিএ-৫ মিস করেছো, তাদের জন্য বলছি সেই কথাটা যা আমি একবার কোথায় যেনো পড়েছিলাম যে, “জীবনে তুমি কতবার ফেল করেছো সেটা দিয়ে সাফল্য নির্ভর করে না, সাফল্য নির্ভর করে তুমি কতবার ওই ফেল করা পরিস্থিতি থেকে সাফল্যের সহিত বের হয়ে আসতে পেরেছো তার উপর।”
১১ বছরের একটি ছেলে তার আইনিস্টানিক আইকিউ এর মতো বুদ্ধিমত্তার কারনে সব স্কুল কলেজ বাদ দিয়ে সরাসরি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো। বাচ্চা ছেলে, মা অনেক চিন্তিত ছেলেকে নিয়ে। দূরদেশ, কিভাবে থাকবে, কিভাবে খাবে, কিভাবে নিজের যত্ন নিবে, সবভেবে মা অনেক পেরেশানি।
মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মা অতি যত্ন করে ছেলের কোটের পকেটের ভিতরের দিকে একটা ২৫ সেন্টের মুদ্রা সেলাই করে দিয়ে বললেন, “বাবা, যদি ঐখানে গিয়ে তোমার ভালো না লাগে, মন খারাপ থাকে কিংবা তোমার আর পড়তে ইচ্ছে না হয়, আমার কথা মনে হয়, তাহলে এই ২৫ সেন্ট মুদ্রাটা বের করে ট্রেন ভাড়া দিয়ে আমার কাছে চলে এসো”। ট্রেনভারা ২৫ সেন্টই লাগে বলে মা ২৫ সেন্টই গোপন পকেটে সেলাই করে ছেলের জন্য দিয়ে দিলেন যাতে কোনো কারনে ছেলের মন খারাপ, কিংবা মায়ের কাছে আসতে চাইছে কিন্তু তার কাছে ভাড়া নাই, তাই তিনি ট্রেন ভাড়া হিসাবে অগ্রিম ২৫ সেন্ট গুজে দিলেন তার কোটের পকেটের ভিতরে।
কোনো এক শীতের মৌসুমে ছেলেটি ইউনিভার্সিটিতে চলে এলো। সবাই তাঁকে অনেক অনেক আদর করে, অতি কনিষ্ঠ একজন ছাত্র কিন্তু খুবই মেধাবী। সব শিক্ষকরাও তাঁকে পেয়ে অনেক খুশী এবং তারা সবাই ছেলেটিকে অনেক আদর করেন। তার কথা অনেকেই মনোযগ সহকারে শুনেন। তিনি অনেক কঠিন কঠিন সমস্যার অল্প সময়েই উত্তম সমাধান দিয়ে দিতে পারেন। এমনই মেধাবী সে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো এক স্যারের বেলায়। সে তার ক্লাস টিচার।
তার ক্লাশ টিচার তারসাথে এমনভাব করেন যে, এই ছাত্রটি তার ক্লাশের সবচেয়ে অপ্রিয় একজন ছাত্র এবং তার মতো আহাম্মক আর একটাও নাই, তার কোনো মেধাও নাই। যেই এসাইন্মেন্টই দেওয়া হোক না কেনো, সে যদি সবচেয়ে ভালোও লিখে, তাতেও ক্লাশ টিচারের মন ভড়ে না, গলেও না, তার মেজাজ যেনো সব সময় ছাত্রটির উপর চড়া। কখনো ক্লাশ টিচার তার খাতাপত্র ছিড়ে ফেলেন রাগে, কখনো আবার এসাইন্মেন্ট না পড়েই “কি লিখেছো এসব” বলে সবার সামনে ছুড়ে ফেলে দেন ইত্যাদি।
ক্লাশ টিচারের এইরকম একটা আচরনের কোনো কারন কেউ খুজে পান না। আবার ক্লাশ টিচারের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করবেন, তার সাহসও কারো নাই। ক্রমে ক্রমে দিনে দিনে এই নাবালক ছাত্রটি ইউনিভার্সিটির পড়াকে একটা দুঃসহ জীবনের অভিজ্ঞতার মতো মনে করতে লাগলো। তার মন খারাপ হতে থাকে, শরির খারাপ হতে থাকে, পড়াশুনার উপর তার বিতৃষ্ণা গড়ে উঠতে থাকে।
একরাতে, তার খুব মন খারাপ হয়, মায়ের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মায়ের দেওয়া ওই ২৫ সেন্টের কথা। বাচ্চা ছেলে, হয়ত আইকিউ বেশি কিন্তু পরিপক্কতা তো আসে নাই। সে তার সব কাপর চোপড় গুছাতে থাকে, বইপত্র ব্যাগে ঢোকাতে থাকে। আজ রাতেই ট্রেন। ট্রেনে করে মায়ের কাছে চলে যাবে। আর ফিরবে না। কাউকেই সে এ কথা বল্লো না। সব গুছানো শেষ। এবার ট্রেনের উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হবার পালা।
যেই না ছেলেটি তার ব্যাগসমেত রুম থেকে বের হবে, ঠিক ওই মুহূর্তে তার ক্লাশ টিচার তার রুমের সামনে এসে হাজির। ক্লাশ টিচারকে দেখে তো ছেলেটির অন্তরাত্মা চমকে উঠলো। গায়ের রক্ত যেনো হিম হয়ে আসতে লাগলো। শীতের ওই রাতেও ছেলেটির মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করতে লাগলো। ভয়ে তার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছিলো না।
-“কি চলে যাচ্ছো নাকি? কোথায় যাচ্ছো? মায়ের কাছে?” ক্লাশ টিচার খুব সহজ করে প্রশ্ন করলেন ছেলেটিকে।
কোনো উত্তর না দিয়ে ছেলেটি শুধু কিছুটা ভয়ে, কিছুটা আবেগে শুধু মাথা নেড়ে “হ্যা সুচক” উত্তর দিলো।
-“চলো, ভিতরে চলো। তোমার সঙ্গে গল্প করি”। বলে ক্লাশ টিচার ছেলেটিকে অতি আদরের সহিত বুকে জড়িয়ে রুমে বসালেন। তারপর বল্লেনঃ
-তোমার কি খুব মন খারাপ? আমার উপর তোমার খুব রাগ? কিন্তু আমি তো তোমার উপর কখনো রাগ করি নাই। তাহলে শুন।
-আজ থেকে বহু বছর আগে, তোমার থেকেও ছোট একটা বয়সে আমি একটা নামীদামী ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার আইকিউও তোমার থেকে বেশি ছিলো। আমিও তোমার মতো সব সমস্যা অনেক দ্রুত এবং সঠিকভাবে সমাধান করতে পারতাম। আমার ক্লাশ টিচার, আমার সহপাঠী সববন্ধুরা, আমার পরিবার, আমার আশেপাশে যারা ছিলেন, তারা আমাকে এতোটাই সমিহ করতেন যে, আমার ভিতরে একটা জড়তার মতো শক্তি কাজ করতে থাকলো। আমার যত ইনোভেটিভ আইডিয়া, আমার যতো মেধা এবং যতোটুকু আমার আরো দেবার দরকার ছিলো তাতে আলসেমির একটা ভাব চলে আসে। মনে হতো, আমি তো সবই জানি, সবই করতে পারি। ফলে আমার চিন্তাশক্তি, চিন্তার মননশীল প্রবাহ স্লথ হয়ে আসে। যতোটুকুন আমি এগিয়ে যেতে পারতাম, তার থেকে আমি অনেক গুন কম অগ্রসর হতে পেরেছি কারন আমার পাশে শুধু চাটুকারের মতো অবুঝ লোকজনই বেশি ছিলো। আমি যখন এটা বুঝতে পারি, তখন নিজের কাছে আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়েছে এই কারনে যে, আমি আমার মেধার যথেষ্ট প্রতিফলন ঘটাতে পারি নাই, আমার মেধার চর্চা হয় নাই। এই সব লোকদের অহেতুক ভালোবাসা আর নির্বোধ স্নেহের কারনে আমি ধীরে ধীরে সাধারন একটা মানুষের সাড়িতে দাড়িয়ে ছিলাম। আজ যখন আমি তোমার দিকে তাকাই, তখন আমার কাছে মনে হয়েছে, তুমি নিজেও ওই সব চাটুকারদের ফাদে আটকে যাচ্ছো যেখান থেকে তুমি তোমার পুরু মেধার ফলাফল পাবে না। আমি ওইসব লোকদের কারনে ঠকেছি কিন্তু আমি তোমাকে ঠকতে দিতে চাই নাই। তাই আমি সবসময় আরো বেশী চাই, আরো বেশী করে তুমি তোমার মেধার শক্তি প্রয়োগ করো সেটাই চেয়েছি। ফলে আমি তোমাকে সবার মত তোমার কৃতকর্মের ফলাফলে তোষামোদি না করে, অহেতুক বাহবা না দিয়ে তোমার ভিতরের মেধাশীল আত্মাটাকে আরো নেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমি আমার ওই ব্যবহারের মাধ্যমে এটা বুঝাতে চাই নাই যে, আমি তোমাকে স্নেহ করি না, ভালোবাসিনা কিংবা আমি তোমার উপর বিরক্ত। আমি তোমাকে সবার থেকে বেশী ভালোবাসি, এটা আমি তোমাকে বুঝতে দিতে চাই নাই। আমি চাই নাই, আমার অতি আদরের মতো একটা শিশু যে অসামান্য মেধা নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছে , সে অন্যসব লোকদের তোষামোদিতে গা ভাসিয়ে দিয়ে মেধার বিকাশ থামিয়ে দিক। আমি যা হতে পারি নাই, আমি তোমার মত একজন অসামান্য সন্তানের কাছ থেকে সেটাই পেতে চেয়েছি। এইটুকু বলে ক্লাশ টিচার থামলেন।
তারপর তিনি আবারো বলতে লাগলেন,
-আজ তোমাকে একটা বাস্তব উপদেশের কথা বলি। যা তুমি বাস্তবে দেখছো, তা তুমি সত্যি দেখছো না সবসময়। যে আজ তোমাকে নিয়ে অনেক গল্প করে, সেই কোনো একদিন তুমি খসে গেলে অন্য রকমের গল্প করবে। যে আজ তোমার অনেক কাছের বন্ধু বলে মনে হবে, সে আসলে তোমার বন্ধু নয়। এর মধ্যে অনেকে আছে যারা তোমার সত্যিকারের বন্ধু বটে কিন্তু তোমার মেধাকে জাগ্রত করতে তাদের মেধা নেই। হয়ত তারা তোমার কোনো ক্ষতি চায় না। কিন্তু তাদের অহেতুক বাহবা কিংবা তোমার মেধা যে বিকশিত হচ্ছে না এটাই হয়ত তারা বুঝতে পারে না। ফলে তাদের অতিরিক্ত স্নেহশীলতা, অতিরিক্ত ভালোবাসা তোমার মেধাশীল চিত্তের ক্ষতি নিশ্চয়ই হবে যা তারা নিজেরাও জানেন না। অন্যদিকে, যাকে তুমি আজ মনে মনে অপছন্দ করছো, হয়তবা সেই তোমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু যাকে তুমি চিনতে পারছো না। চোখ সবসময় সঠিক জিনিষ দেখে না, আর সঠিক জিনিষ না দেখার কারনে মুল্যায়নটাও সঠিক হবে না। তোমাকে আমার মত করে বড় করার জন্য কখনো তোমাকে আগুনের তাপের মত কষ্ট, আমার রাগের মত হিংস্রতা, আমার নির্দয় ব্যবহারের মত মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হবে। যদি সহ্য করতে না পারো, তাহলে আমার দেখানো পথে তুমি কিভাবে আরো বড় হবে? তাহলে আমি আমার এই জ্ঞ্যানের সাম্রাজ্য কিভাবে তোমার কাধে দিয়ে যাবো? ওস্তাদের কাজ শাগরেদ গড়ে তোলা, আর সাগরেদের কাজ ওস্তাদের সব কিছুকে পজিটিভভাবে নেওয়া। ব্রুসলী একদিনে তৈরি হয় নাই, নবাব সিরাজ একদিনে সৃষ্টি হয় নাই, অলিম্পিকের একটা গোল্ড মেডাল একবার দৌর দিয়েই পাওয়া যায় না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস তাঁকে চর্চা করতে হয়েছে ঘাম, পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে। সাফল্য চুপে চুপে এসেছে এই তথ্য কেউ কখনো দিতে পারবে না। তারজন্য অনেক ধৈর্য আর সঠিক গুরুর দরকার। এতো অল্পতেই হেরে গেলে চলবে? আমি তো আছি তোমার পাশে।
এই বলে ক্লাস টিচার ছেলেটিকে বুকে নিয়ে কিছুক্ষন ধরে থাকলেন, তিনি শুনতে পেলেন, তার বুকে মাথা রাখা এক অবুঝ কিন্তু অসামান্য মেধাশীল বালকের ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তার জামা ভিজে যাচ্ছে বালকের অশ্রুসিক্ত জলে। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, এই অসামান্য মেধাশীল বালককে আর নতুন করে কিছুই বলার নাই। মেধাই তাঁকে সব অজানা না বলা কথা তার অন্তরে অন্তরে গেথে দিচ্ছে।
ক্লাশ টিচার বালককে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে বুকে আগলে ধরে রাখলেন চরম মমতা দিয়ে। হয়ত তারও এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ছিল বালকের ক্ষুদ্র কেশবি মাথায়। রাতের ক্ষিন আলোছায়ায় হয়ত তার কিছুই দেখা গেলো না।
সিনেমাটা এখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
মোরালঃ মেধাশীল হলেই সাফল্য পাওয়া যাবে তা সঠিক নয়। মেধাশীলদের মেধা চাটুকারদের কিংবা অবুঝদের ফাদে পড়ে সাফল্য বাধাগ্রস্থ হয়, সেটাই সঠিক। কিন্তু যোগ্যব্যক্তির সব ব্যবহার বুঝতে না পাড়লেও কিংবা পছন্দ না হলেও তার আশেপাশে থাকাই হচ্ছে সাফল্যের সোপান। দেখুন, শিখুন এবং বুঝুন কোন ব্যবহার কি কারনে সাফল্যধারি মেধাশীল ব্যক্তি করেন। আর এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে অভিজ্ঞতার ভান্ডার। নিতে পারলে ভালো, আর না নিতে পারলে ক্ষতি তার, যে নিতে পারে নাই।
(এইরুপ একটা জ্ঞ্যানি ব্যক্তি কে তার কাহিনি আমাদের পবিত্রগ্রন্থ “আহজাবে কাহাফ” (সম্ভবত) নামক সুরায়ও বর্ণিত আছে সেখানে হযরত মুসা (আঃ) অবলোকন করেছেন কোনো এক জ্ঞ্যানি ব্যক্তির অনেকগুলি ব্যবহার দেখে, যেখান থেকে তিনি পরবর্তীতে বুঝেছিলেন যে, ওই জ্ঞ্যানি ব্যাক্তি সবগুলি কাজ ভালো নিয়তেই করেছিলেন কিন্তু হযরত মুসা তার মেধার ভিত্তিতে বুঝতে পারেন নাই। পরবর্তীতে তিনি অধৈর্য হয়ে যাওয়াতে ওই জ্ঞ্যানি লোকের সহচর্জ ছাড়তে হয়েছিলো তাঁকে)
৯/১১ এর আসল হোতা কে বা কারা, এই তথ্যটা আজো পর্যন্ত জানা না গেলেও বিশ্ববাসী জানে যে, এটার পিছনে মুল পরিকল্পনাকারি যিনি তিনি একজন মুসলমান নামধারি ব্যক্তি। ফলে, ৯/১১ এর পরে হতাৎ করে সারাবিশ্ব মুসলমানদের প্রতি একটা খারাপ ধারনা করে নেয়। কেউ এটাকে কিছু বিচ্যুত ধার্মিক লোকের কাজ বলে মনে করেন, কেউ আবার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এটাই ইসলাম সমর্থন করে বলে মনে করেন ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, ৯/১১ এ যারা প্রান দিয়েছেন, তারা আর যাই হোক, তারা নিরীহ এবং শান্তিপ্রিয় মানুষ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তারা তাদের নিজের ধর্ম নিজের মত করেই পালন করতেন, সেখানে কারো সঙ্গে কারো বিরোধ ছিলোনা। ওইসব নিরীহ মানুষগুলুর অসময়ের প্রানত্যাগ আমাদের সবাইকে অনেক অনেক ব্যথিত করে তুলেছিল এবং এখনো ব্যথিত করে। যারা ওইসব মানুগুলুর নিকটাত্মীয় ছিলেন, বন্ধু বান্ধব ছিলেন, যাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিলো তাদের কাছে ওইসব মানুসগুলুর প্রানত্যাগ তো কোনোভাবেই সহ্য করার মত ছিলো না। ফলে কারো মনে ঘৃণা, জিদ, আক্রোশ যে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর এই আক্রোশ, ঘৃণা, কিংবা জিদ যাইই বলি না কেনো, তার থেকেই ঘটনা পরবর্তী অনেক কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন, মার্ক স্ট্রুম্যানের কিলিং মিশন।
৯/১১ এর ১০ দিন পর, রাইস ভুইয়া মার্ক স্ট্রুম্যানের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন এবং মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে থাকেন। এখানে রাইস ভুইয়া সম্পরকে কিছু না বললে ভুল হবে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন নাগরিক। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে বাংলাদেশ এয়ার ফোরসেও যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কম্পিউটার টেকনোলোজি পড়ার জন্য আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। প্রথমে তিনি নিউইয়র্ক পরে তুলনামূলকভাবে কম খরচের স্ট্যাট ডালাসে চলে যান এবং সেখানে তিনি তার এক বন্ধুর গ্যাস স্ট্যাসনে পার্টনারশিপ ব্যবসায় যোগ দেন।
এবার আসি, মার্ক স্ট্রুম্যান সম্পরকে কিছু কথা। মার্ক স্ট্রুম্যান একজন দৈনিক শ্রমিকের কাজ করতেন ওই ডালাস শহরেই। ৯/১১ ঘটনার পরে মার্ক স্ট্রুম্যান এতোটাই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন মুসলমানদের উপর যে, তিনি আরব বংসোউদ্ভুত কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, কিংবা মুসলমান যে কোনো দেশের অধিবাশিই হোক, তাদেরকে খুন করাই ছিলো তার নিশানা।
এই কিলিং মিশন এর এজেন্ডা হিসাবে মার্ক স্ট্রুম্যান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে ডালাসের এক শব্জি দোকানে ওয়াকার নামে এক পাকিস্থানিকে এবং তার ৬ দিন পর রাইস ভুইয়াকে সরাসরি গুলি করেন। ভাগ্য চরম ভালো যে, জনাব রাইস ভুইয়া প্রানে মারা যান নাই কিন্তু তার ডান চোখের দৃষ্টি হারিয়ে যায় এবং এখনো তার দেহে প্রায় ৩৫টি প্যালেট বিদ্যমান যা অস্ত্রপ্রচারেও বের করা সম্ভব হয় নাই। অবশেষে মার্ক স্ট্রুম্যানকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং বিচারের সম্মুখীন করে।
সবশেষে মার্ক স্ট্রুম্যান এর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু জনাব রাইস ভুইয়া এই মৃত্যুদণ্ডের বিপরিতে আপীল করেন যাতে মার্ক স্ট্রুম্যানকে হত্যা না করা হয়। জনাব রাইস ভুইয়া টেক্সাস এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর ডেথ পেনাল্টি আবোলিসন ক্যাম্পেইন এর মাধ্যমে, কোর্টের মাধ্যমে, এমনকি নিজে সশরীরে আদালত প্রাঙ্গনে হাজির হয়ে মার্ক স্ট্রুম্যানের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করানোর জন্য দাঁরে দাঁরে ঘুরেছেন। এইভাবে প্রায় ১০ বছর পার হয়ে গেছে মার্ক স্ট্রুম্যানের বিচার কার্যকরী করতে।
বিশ্বের সবাই অবাক হয়ে শুধু একটা প্রশ্নই জনাব রাইস ভুইয়াকে করেছেন, কেনো তিনি তার ঘাতককে ক্ষমা করে দিচ্ছেন, শুধু ক্ষমাই না, তাকে মুক্তজীবন দান করতে চাচ্ছেন? জনাব রাইস ভুইয়া যা বলেছেন তা আমি হুবহু লিখছি যাতে কোনো কিছু ব্যত্যয় না ঘটে।
Q: Mr. Stroman has admitted trying to kill you. Why are you trying to save his life?
A: I was raised very well by my parents and teachers. They raised me with good morals and strong faith. They taught me to put yourself in others’ shoes. Even if they hurt you, don’t take revenge. Forgive them. Move on. It will bring something good to you and them. My Islamic faith teaches me this too. He said he did this as an act of war and a lot of Americans wanted to do it but he had the courage to do it — to shoot Muslims. After it happened I was just simply struggling to survive in this country. I decided that forgiveness was not enough. That what he did was out of ignorance. I decided I had to do something to save this person’s life. That killing someone in Dallas is not an answer for what happened on Sept. 11.
প্রশ্ন ছিলোঃ মার্ক স্ট্রুম্যান স্বীকার করেছেন যে তিনি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনি কেনো তাকে বাচাতে চাইছেন?
জনাব রাইস ভুইয়ার উত্তর ছিলো; আমি আমার পিতামাতা এবং শিক্ষকদের দ্বারা অতি উত্তম শিক্ষায় মানুষ হয়েছি। তারা আমাকে নীতির মধ্যে এবং শক্ত বিশ্বাসের উপর মানুষ করেছেন। তারা আমাকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে তাদের দিকটা বিবেচনা করার শিক্ষা দিয়েছেন। তারা আমাকে শিখিয়েছেন, কেউ যদি তোমাকে দুঃখ দেয়, প্রতিশোধ নেওয়ার দরকার নাই, এবং নিও না। তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। সামনে এগিয়ে চলো। এতে তোমার এবং অন্যের উভয়ের মঙ্গল হবে। আমার ধর্ম ইসলামও তাই শিক্ষা দেয়। মার্ক স্ট্রুম্যান যা করেছে, তা একটা যুদ্ধের পরিস্থিতির মতো মনোভাব এবং এই মনোভাবটা অনেক আমেরিকানরাই মনে মনে পোষণ করে যা স্ট্রুম্যান করেছে। হয়ত তারা (আমেরিকানরা) করার সাহস পাচ্ছিলো না কিন্তু মার্ক স্ট্রুম্যান করার সাহস পেয়েছিলো। এই ঘটনা ঘটার পর আমি শুধু নিজেকে এই দেশে বেচে থাকার জন্য সামলে নিয়েছি, অনেক কস্ট করেছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, শুধু তাকে ক্ষমা করাই একমাত্র সমাধান নয়, মার্ক স্ট্রুম্যান যা করেছে তা সে তার নির্বুদ্ধিতার কারনে করেছে, সে বুঝে নাই। এখন আমার কাজ তাকে বাঁচানো। ডালাসে বসে কাউকে খুন করাই সেপ্টেম্বর ১১ তে কি হয়েছে তার সমাধান হবে না।
শেষ পর্যন্ত আদালত মার্ক স্ট্রুম্যানের পূর্বের রেকর্ড, তার চরিত্রের বৈশিষ্ট সবকিছু চুলচেরা বিস্লেসন করে মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখেন এবং ২১ জুন ২০১১ তে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করেন। মৃত্যুর আগে মার্ক স্ট্রুম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিলোঃ
Q: How are you doing, Mr. Stroman?
A: “I ’ve only 25 days left until Texas Straps me to a gurney and pumps me full of toxic bug juice, But then again, we all face an ending at some time or another. All is well, Spirits are high, I sit here with a cup of coffee and some good ole classic rock playing on my radio, how Ironic, the song ‘Free Bird’ by Lynyrd Skynyrd…”
Q: What do you think of Rais Bhuiyan’s efforts to keep you from being executed? A: “Yes, Mr Rais Bhuiyan, what an inspiring soul…for him to come forward after what I’ve done speaks volume’s…and has really touched my heart and the heart of many others World Wide…especially since for the last 10 years all we have heard about is how evil the Islamic faith can be…its proof that all are Not bad nor evil.”
Q: Tell me what you are thinking now, a few weeks before your scheduled execution.
A: “Not only do I have all my friends and supporters trying to save my life, but now I have The Islamic Community Joining in…Spearheaded by one very remarkable man named Rais Bhuiyan, who is a survivor of my hate. His deep Islamic beliefs have gave him the strength to forgive the un-forgiveable…that is truly Inspiring to me, and should be an example for us all. The Hate, has to stop, we are all in this world together. My jesus faith & Texas Roots have deepened my understanding as well. Its almost been 10 years since the world stopped turning, and we as a nation will never be able to forget what we felt that day, I surely wont, but I can tell you what im feeling today, and that’s very grateful for Rais Bhuiyan’s efforts to save my life after I tried to end his. A lot of people out there are still hurt and full of hate, and as I sit here on Texas Death watch counting down to my own death, I have been given the chance to openly express whats inside this Texas mind and heart, and hopefully that something good will come of this. We need more forgiveness and understanding and less hate.” Mr. Stroman signed off, “Texas Loud & Texas proud…TRUE AMERICAN…. Living to Die – Dying to Live.”
বাংলায় অর্থঃ
মৃত্যু পথযাত্রি মার্ক স্ট্রুম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো,
(১) আপনি এখন কেমন আছেন?
উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “টেক্সাস আদালতের রায় অনুযায়ী বিষ প্রয়োগ করে আমাকে মেরে ফেলার আর মাত্র ২৫ দিন বাকি আছে। সবাই মরবে, আজ অথবা কাল। সব কিছুই ভাল, বিধাতাও ভালো। আমি এখন এখানে এক কাপ কফি আর কিছু খেলার সরঞ্জামাদিসমেত কিছু কিছু রক মিউজিক শুনছি রেডিওতে। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে একটা গানের কলি শুনি, আর তা হচ্ছে, পাখিকে মুক্ত করে দাও……”
(২) মার্ক স্ট্রুম্যানকে ২য় প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, আপনাকে বাচিয়ে রাখার জনাব রাইস ভুইয়ার আপ্রান চেস্টা আপনাকে কি মনে করিয়ে দেয়? বা আপনি কিভাবে ভাবছেন জিনিষটা?
উত্তরে মার্ক স্ট্রুম্যান বলেছে, “হ্যা, সত্যি কি স্পিরিচুয়াল (আধ্যাত্মিক) একজন মানুষ। আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা তিনি জেনেও কি অবাক যে তিনি আমাকে বাচানোর জন্য আপ্রান চেস্টা করে যাচ্ছেন যা আমাকে এবং আমার মত অনেক আমেরিকানদের তথা বিশ্বাসীর হৃদয় পর্যন্ত ছুয়ে যাচ্ছে। এই গত দশ বছরে আমরা যত খারাপ খবর কিংবা মিথ্যা দর্শন শুনেছি ইসলাম সম্পরকে এবং ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের সম্পরকে, তা আসলেই সঠিক নয়। এখন এটাই প্রমান হয় যে, সবাই খারাপ না, সবাই শয়তান নয়।
মার্ক স্ট্রুম্যানকে ৩য় প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, তিনি মৃত্যুর এই কয়েক সপ্তাহ আগে কি ভাবছেন?
উত্তরে মার্ক স্ট্রুম্যান বলেছিলেন, ” এখন শুধু আমার আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধু বান্ধবই আমাকে বাচানোর চেস্টা করছে না, বরং আমার ঘৃণার কারনে আমার দ্বারা গুলিবিদ্ধ এবং গুলিবিদ্ধ মৃত্যু থেকে বেচে আসা জনাব রাইস ভুইয়ার মাধ্যমে পুরু ইস্লামিক কমিউনিটিকে সঙ্গে পাচ্ছি যেনো আমি আমার জীবন আবার ফিরে পাই। তার(জনাব রাইস ভুইয়ার) ধর্মের পরম যে শিক্ষা যে, ক্ষমা করো এমন কি তাকেও যে ক্ষমার জন্যও যোগ্য নয়, তার এই বিশ্বাস আমাকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছে এবং এটা পৃথিবীর কাছে একটা উদাহরন হয়ে থাকবে। এখন আর ঘৃণা নয়, এটাকে থামাতে হবে। আমরা সবাই একই পৃথিবীর লোক। যীশুর এবং টেক্সাস রুটের উপর আমার বিশ্বাস আরো গভির হয়েছে। আজ থেকে ১০ বছর আগে যা ঘটেছিলো তা আমি এবং আমার দেশ কেহই হয়ত কখনো ভুলে যাবে না। এটাও ঠিক যে, ওই সময় আমরা নাগরিক হিসাবে কি ভেবেছি তা এই মুহূর্তেও বলা কঠিন কিন্তু এটা ঠিক যে, আজ এই মুহূর্তে আমি জনাব রাইস ভুইয়ার কাছে কৃতজ্ঞ যাকে আমি ঘৃণার কারনে মারতে চেয়েছিলাম। আমি এটাও জানি যে, আজো অনেক দেশবাসীর মনে কষ্ট আছে, দুক্ষ আছে, যন্ত্রনা আছে, ঘৃণাও আছে। কিন্তু এই ঘৃণা কমাতে হবে, আমাদের আরো সহনশীল হতে হবে। আমি খুব ভাগ্যবান যে, আমি মৃত্যুর আগে অন্তত আমার মনের কথাগুলি এই টেক্সাসবাসিকে বলতে পারলাম। আমি চলে যাচ্ছি। Living to Die – Dying to Live.”
জনাব রাইস ভুইয়ার সঙ্গে আমার কয়েকবার ফেসবুকে কথা হয়েছে। খুব ভালো লেগেছে তার এই মনোভাবের জন্য। তিনি একটা ওয়েব পোর্টাল খুলেছেন, নামটাও সুন্দর, WORLD WITHOUT HATE. আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার ওই ওয়েবপোর্টালের পাচ আঙুলের আইকন দিয়ে তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন। মিনিংটা আরো সুন্দর। আমি অবশ্য এখন তার ওয়েব পোর্টালের একজন সদস্য বটে। সবশেষে তিনি গত রোজায় ওভাল অফিসে দাওয়াত খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামার দাওয়াতে। বিশেষ ইফতারির আয়োজন করা হয়েছিলো জনাব রাইস ভুইয়ার সম্মানে। শুনেছি এখন তাঁকে নিয়ে এই প্রেক্ষাপটে একটা বিশ্বব্যাপি ম্যাসেজ দেওয়ার জন্য ছবি বানানো হবে যেখানে আমাদের রাইস ভুইয়া নিজেই থাকবেন। আমি তার একজন প্রাক্তন সিনিওর ক্যাডেট ভাই হিসাবে নয়, বাংলাদেশী হিসাবে বড় গর্ববোধ করি। আমি তার সুস্বাস্থ্য কামনা করি।
(নোটঃ রাইস ভুইয়াকে বলছি, তোমার অনুমতি ছাড়াই আমি এই কথাগুলি আমার ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। আশা করি অপরাধ মার্জনীয়। আর তুমি এটাই করো)।
ছোট বেলায় মনে করতাম, আহা, স্কুল ছুটি হবে, ক্লাশ থাকবে না, টিচারদের কাছে আর জ্ঞ্যানগর্ব লেকচার শুনতে হবে না, ইচ্ছেমতো নদীতে গিয়ে বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে লাফঝাপ মারবো, সারাদিন মাঠে গিয়ে যখন তখন খেলাধুলা করবো। সন্ধ্যা হলে আর পড়ার টেবিলে বসতে হবে না, সকাল সকাল আর ঘুম থেকে উঠতে হবে না, আরো কত কি!! মাঝারী বেলায় মনে করতাম, আহা, অফিস ছুটি হলে সারাদিন বাসায় বসে টিভি দেখবো, ঘুমাবো, সন্ধ্যায় আড্ডা দেবো। কি মজা হবে। কোনো অফিস নাই, বসের আদেশ পালনের তারাহুড়া নাই। সকাল সকাল উঠে তাড়াহুরা করে অফিসের জন্য রওয়ানা হতে হবে না। অনেক অনেক মজা করে সময়টা পার হবে। এই বয়সে এসেও মনে হয়, আহা এইবার ছুটিতে অনেক অনেক সময় পাওয়া যাবে। স্টাফদের ফোন আসবে না, সাপ্লাইয়াদের হিসাব কিতাব নিয়ে বসার দরকার হবে না। বাসায়, আত্মীয় স্বজনদেরকে সময় দিতে পারবো, বেশ জমজমাট একটা সময় পার হবে।
অথচ আজ কয়েকদিন যাবত আমি ছুটিতে আছি। কাজ নাই, অফিস নাই, তাড়াহুড়াও নাই। বড়দের চাপ নাই, শিক্ষকদের শাসন নাই, স্টাফদের ফোন কল নাই, সাপ্লাইয়াদের কোনো চাপ নাই, কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছে কি যেনো নাই। আচ্ছা, কি নাই? আমি তো ইচ্ছে করলে এখন পুরানো সেই বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে নদীতে যখন তখন ঝাপ দিতে পারি কারন শাসন করার কেউ নাই, ইচ্ছে করলেই সারাদিন টিভি দেখতে পারি, ইচ্ছে করলেই সারাদিন ঘুমাতেও পারি, কিন্তু তারপরেও আমি তা করতে পারছি না। কি অদ্ভুত!!
এখন মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু সময় আছে, সেই সময়ের সঙ্গে আমাদের ছুটির একটা বড় রকমের যোগসুত্র আছে। আজ এই ৫০ বছর বয়সে আমি আর আগের সেই ১২ বছরের বালকের ন্যায় উচ্ছাস নদীতে তরঙ্গলম্ফ দিতে পারি না, ইচ্ছেও করে না। অথবা সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবলের অভাবে নারার-খেরের বল বানিয়ে গুটিকতক অদম্য পোলাপানের মতো গ্রামের সেই স্কুলের মাঠে হৈচৈ করে ভরদুপুরে দৌড়াদৌড়িও করতে পারি না। হয়ত মানায় না। অথবা পাশের বাড়ির পেয়ারা গাছের আধাপাকা পেয়ারাগুলি আর এখন আমাকে লোভ দেখায় না। বয়সটা পেড়িয়ে গেছে। আর তাই বড় আফসোস লাগে, আহা যদি আবার সেই বাল্যকালের শিক্ষকদের শাসনটা ফিরে আসতো! আহা, যদি আবার সেই পুরানো বন্ধু বান্ধবরা আগের রুপে ফিরে আসতো! মাঝে মাঝে আজ খুব হাসি আসে সেই বাচ্চা বয়সের কথা মনে করে। কতই না রাগ করেছি সবচেয়ে ভালো বন্ধুর সাথে। কত যে ঝগড়া করেছি ওদের সাথে। কখনো কারনে, কখনো অকারনে। কখনো আমি দোষ করেই উলটা আমি রাগ করেছি, আবার কখন ওদের দোষের কারনেও রাগ করেছি। এক মিনিট সময় লাগেনি তাকে বলতে যে, আমি তাকে ঘৃণা করি কারন সে আমাকে তার লাল পেন্সিলটা একদিন ব্যবহার করতে দেয় নাই, অথবা নদীতে আমার আগে সে লাফ দিলো কেনো এই কারনে আমি তার সাথে জিদ ধরে কয়েকদিন হয়ত কথাই বলিনি ইত্যাদি। জিদ ধরেছি একে অপরের সঙ্গে, কখনো কখনো আড়ি হয়েছে, কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে, আরো কত কি?
আজ বড় নস্টালজিক মনে হয়, আহা, এমন একটা বয়স যদি আবারো ফিরে আসতো! আমার সেই বন্ধুরাতো আজো আছে, আশেপাশেই আছে। কিন্তু বাল্যকালের সেই উচ্ছ্বাস, সেই অদম্য দুস্টুমিপনা, সেই আবেগ আর নাই। বয়স একধাপ থেকে উঠে আরেক ধাপে চলে গেছে। আগের ধাপের স্মৃতি ধরে রেখেছে কিন্তু কার্যপ্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কথা হয় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে, জিবনের উৎকণ্ঠা নিয়ে, পরিবারের ভালমন্দ নিয়ে, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংস্কৃতি নিয়ে। এখন আর বৈশাখী মেলায় মাটির ব্যাংক, বাঁশের বাঁশী, ভাজা বুট, চালতার আচার, ইত্যাদি নিয়ে কোনো আবেগ আসে না। অফুরন্ত সময় আছে, খেলার মাঠও সেখানেই আছে, নদীও আগের জায়গায়ই আছে, কিন্তু সেই ফেলে আসা বাল্যকালটা নাই। নদি দেখলে এখন মন চায় যদি ঝাপ দিতে পারতাম, কিন্তু দেওয়া হয় না। সবুজ ধানক্ষেত দেখলে ক্ষেতের আইল ধরে কচিকচি পায়ে দৌর দিয়ে কোথাও হারিয়ে যেতে মন চায় কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হয় না। মন মনের জায়গায়ই আছে কিন্তু মনের সঙ্গে শরীর আর শরীরের সঙ্গে মনের মধ্যে এখন বিস্তর ব্যবধান বনে গেছে। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে “সময়” নামক এক বিশাল অদৃশ্য দেওয়াল। পাশে থাকা বাল্য বয়সের ছেলেমেয়েরা যখন তাদের ইচ্ছার কথাগুলি বলতে থাকে, আমি বুঝতে পারি ওরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে আর কি বলছে। বড্ড ভাল লাগে। মাঝে মাঝে ধমক দেই, মাঝে মাঝে বারন করি, কখনো কখনো রাগও করি। আবার এও জানি, এটাই তো করার কথা ওদের। কিন্তু ওরাও একদিন এই সময়টা হারিয়ে ফেলবে। আজ ওদেরকে শাসন করি, একদিন আমাদেরকেও আমাদের অভিভাবকরা শাশন করতো। অভিভাবকদের ওই শাসনে কখনো মন খারাপ হয়েছে, অনেক আনন্দ মাটি করে ফেলেছি রাগে, দুঃখে মনের কস্টে। জিদ ধরে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। সারাদিন না খেয়ে কষ্ট হচ্ছে দেখে হয়ত মাও খান নাই, বাবা ছেলের অহেতুক জিদে, মায়ের মনের কষ্টে তার সব শাসন ভুলে হয়ত আমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন, আর আমি সেটাই আমার বীরত্বই বলি, আর আমার জয়ই বলি, গর্বে আরো ঘাড় বেকে বসে থাকতাম খাবো না বলে। একদম অবুঝের মতো। আজ ওইগুলু মনে পড়লে বড্ড মন খারাপ হয়। আজ ঐ শাসনগুলি খুব মিস করছি। চোখের পাতা ভিজে আসে। কোথায় হারিয়ে গেলো ওইসব?
যখন ছোট ছিলাম, সবচেয়ে অপছন্দের চিঠি ছিল আমার অভিভাবকদের। সেই একই কথা। কোনো চিঠি না খুলেই বলে দিতে পারতাম, বাবা কি লিখেছে বা মা কি বলতে চেয়েছে। একদিন খুব দুস্টুমি করে আমি আমার অভিভাবককে বলেছিলাম, আচ্ছা, কস্ট করে বারবার একই চিঠি লেখার দরকার কি? একটা চিঠি ফটোকপি করে রাখলেই তো হয়। কদিন পরপর শুধু ওটা পোস্ট করে দিবা! কারন কথা তো একই থাকে। কেমন আছো তুমি, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করবে, সন্ধ্যা হওয়ার আগে ঘরে ফিরে আসবে, বেশী রাত জাগবে না, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে ভালোভাবে মিলেমিশে থাকবে, বড়দেরকে সম্মান করবে, আমাদের জন্য মন খারাপ করো না। এই তো? তাহলে আর বারবার লেখার দরকার কি? অথচ আজ এতো বছর পর মনে হচ্ছে, আমি ওই কথাগুলিই খুব মিস করছি। খুব করে মনে হয়, তোমরা আবারো আমাকে এই একই কথাগুলি লিখে পাঠাও না বাবা! আমি জানি, আজ আমার সন্তানেরাও ঠিক একই কথা বলবে। হয়ত কোনো একদিন আজকের এই দিনের মতো তারাও হয়ত আমার সেই একই কথা শুনার জন্য তাদের মন খারাপ করবে। সব বাবাদের কথা এক হয়, সব মায়েদের সন্তানের জন্য চিন্তা এক হয়। তোমরা যখন বাবা মা হবে, সেদিন হয়ত বুঝবে, আজ আমি কি বলতে চাচ্ছি।
আমি বাসায় আজ একা। আমার মেয়েরা তার মাকে নিয়ে নানি বাড়ি বেড়াতে গেছে। আজই চলে আসার কথা ছিলো কিন্তু রাতে নাকি বারবিকিউ করবে। আমি সবসময় ওদের সঙ্গে যাই কিন্তু আজ যাওয়া হল না। যেতে ইচ্ছে করলো না। না যাওয়ার অনেক ব্যাখ্যা আছে, নাইবা বললাম। যেতে ভালো লাগছিলো না। ওদেরকে মিস করছি। বাসায় থাকলে যে বউ ছেলেমের সঙ্গে অনেক গল্প হয়, কিংবা সারাক্ষন বসে আড্ডা দেই, কিংবা সময় কাটাচ্ছি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু ওরা বাসায় নাই বলে মনে হচ্ছে পুরু বাসাটা খালি, কথা বলার লোকজন নাই। উচ্ছল একটা পরিবেশ নাই। আমার শাশুড়ি যখন বেচে ছিলেন, তখন সেখানে যাওয়ার জন্য আমার একটা টান ছিলো। অনেক বয়স্ক একজন মহিলা ছিলেন। আমার ভালো লাগা মানুসগুলুর মধ্যে ওনি একজন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমার বাসায় ছিলেন, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিলো। আমি জানতাম, একসময় আমি এই চমৎকার মানুসগুলুকে খুব মিস করবো, তাই আমার সাধ্যির মধ্যে যতটুকু সম্ভব ছিলো করার চেষ্টা করেছি, আর যেটুকু পারি নাই, সেটুকু করেছি আমার ভালোবাসা দিয়ে। ঈদ চলে গেছে একদিন হলো। এই ঈদ পর্বগুলুতে আমি শুধু একজনের কাছ থেকেই ঈদের সালামি পেতাম, তাও আবার ১০ টাকা। আর সেটা সবসময় আমার এই শাসুড়ির কাছ থেকে। আমি এমনিতেই তাদেরকে সালাম করতাম, কারনে-অকারনে সালাম করতাম কিন্তু ঈদের দিনে আমি তাকে সালাম করতাম আর ভাবতাম, কোনো একদিন এই ১০ টাকার সালামিটা বন্ধ হয়ে যাবে। আজ সত্যি সত্যি সেই সালামিটা আমি মিস করি। সালামিটা নেওয়ার সময় তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, তারপর তিনি আমার কপালে চুমু খেতেন। বড্ড মিষ্টি একটা চুমু। তিনি জান্নাতবাসী হয়েছেন কিন্তু প্রতি ঈদে আমি তাকে আমার অন্তর থেকে স্মরণ করি। তিনিও আমার মা ছিলেন। সালাম করতে ইচ্ছে করে আজ। আস্তে আস্তে আমার সালামের মানুষগুলিও কমে যাচ্ছে। একদিন আমাকে আর “তুই” বলে সম্বোধন করার লোকও কমে যাবে এবং যাচ্ছেও। কিংবা আমার সালামের জায়গাগুলি একেবারে শুন্য হয়ে যাচ্ছে। আমি জানিনা তার সন্তানেরা তাকে প্রতিদিন মনে করেন কিনা কিন্তু আমি তার কথা প্রতিদিন মনে করি। এর একটা প্রধান কারন আছে। কারনটা বলতে চাইনা কিন্তু আমার কাছে এমন একটা জিনিষ তিনি রেখে গেছেন যেটা তিনি ব্যবহার করতেন কিন্তু আমি এখন সেটা ব্যবহার করি। আর এই বস্তুটিই আমাকে তার কথা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়।
যে বালকটি আজ থেকে ৪০ বছর আগে উচ্ছল, চঞ্চল, দুরন্তপনা, অদম্য সময় কাটিয়েছিলো, ওই সময় যে তোমাদেরকে অনেক কঠিন দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে রাখতো, সময়-অসময় তোমাদের মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়াতো, আজ সেই একই বালক ৪০ বছর পর শান্ত, ধীর এবং অভিভাবকরুপে রূপান্তরিত হয়ে শুধু একটা আবেগের কথাই বলতে চাই, ফিরে এসে দেখে যাও, সে আর আগের মতো দুস্টুমি করে না, হতাত বৃষ্টিতে তোমাদের অগোচরে ভিজে আর অসময়ে জ্বর বাধিয়ে ফেলে না, কিংবা তোমাদের না বলে হতাত করে কিছু দুষ্টু বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় না। তোমরা যে ছেলেকে সারাক্ষন ঘরের মধ্যে শান্ত হয়ে থাকতে বলতে। বলতে আর কতজল ফেলবি আমাদের চোখে? আর কত দুসচিন্তায় ফেলবি আমাদের? আজ এই বয়সে এসে আমি তোমাদের শুধু একটা কথাই বলতে পারি, এখন এসো আমার ঘরে, দেখে যাও, তার এখন অফুরন্ত সময় এবং সে এখন সত্যিই শান্ত একটি মিষ্টি ছেলে। এখন আর তোমাদেরকে আমি কোনো দুসচিন্তায় ফেলবো না। আজ আমার ছুটি। লম্বা ছুটি। আমি তোমাদের একজন লক্ষি ছেলে হয়েই ঘরে বসে আছি। কিন্তু তোমরা কই? তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাও? আমি তোমাদের খুব ভালবাসি।
গত পরশুদিন অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখেই আমাদের কুরবানীর গরুটি কেনা হয়েছিলো। আমার মেয়ের জামাই গরু দামদর করা থেকে বাসায় আনা পর্যন্ত এই কঠিন কাজটি আমার জন্য সহজ করে দিয়েছিলো। খুব একটা সময় পাই নাই ফ্যাক্টরির কাজের জন্য। অবশেষে গতকাল রাত ১০টার পর কুরবানির গরুটাকে নিরিবিলি দেখার সুযোগ হলো।
বেশ সুন্দর একটি গরু। মধ্যবয়সী। বুঝাই যায়, অতি যত্ন করে গরুর মালিক একে বড় করেছেন। পালা গরু। দেশের অনৈতিক প্রচলন হিসাবে গরুর মালিক নিজে কোন অনৈতিক ঔষধ দিয়ে গরুটাকে বড় করেন নি। বেশ মিশুক। মিশুক কথাটা মানুষের জন্যই শুধু প্রযোজ্য নয়, এটা যে কোনো প্রানির জন্যই প্রযোজ্য। আমি কাছে গিয়ে গরুটার মাথায় একটু আলতো করে হাত বুলাতেই সে বুঝতে পারলো, আমি ওকে আদর করছি এবং আমি ওর ক্ষতিকারক কেউ নই। সব প্রানীই ভালোবাসা বুঝে, আসলে ভালোবাসার ভাষা সবার জন্য এক। ভালোবাসা বহিরপ্রকাশের জন্য কোনো ভাষা লাগে না। হোক সেটা মানুষ, হোক সেটা কোনো ভাষাহীন প্রানি।
গরুটি আমার হাতের পরশে তার শিং আর মাথার তালু দিয়ে আমার হাতটাকেও এমনভাবে স্পর্শ দিচ্ছিলো যে, আমার মনের ভিতরে তারজন্য একটা মহব্বত, একটা স্নেহ, একটা অনুভুতির পরশ বইয়ে যাচ্ছিলো। কিছু ধানের খের দিতেই দেখলাম, অতি আনন্দের সহিত তা খাওয়া শুরু করলো। মনে হলো ওর ক্ষুধা লেগেছে। আমি কয়েক কেজি ভুষি, পানিতে লবন মেখে একটা বালতিতে রাখলাম। মনে হলো, অনেক দিন পর যেন সে তার চেনা পরিচিত একটা খাবার পেলো। ফলে খের খাওয়ার পাশাপাশি ভুষিগুলুও খেতে থাকলো। ওর খাওয়া দেখে আমারই বড্ড ভালো লাগলো।
রাত প্রায় ১১টা। সবাই প্রায় ঘুমের আয়োজন করছে, আশেপাশের মানুষজনও নিস্তব্ধ। আমি গরুটার পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছি। গরুটা কি পরিবেশে বড় হয়েছে, কতগুলু গরু একসঙ্গে বড় হয়েছে, কি তাকে খেতে দেওয়া হত, কিভাবে তাকে খেতে দিলে ও সবচেয়ে বেশী আনন্দ করে খেতো, খাওয়ানোর সময় ওর মালিক কিভাবে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো কিংবা আদৌ পাশে থাকতো কিনা, তার কোনো কিছুই আমার জানা নাই। কিন্তু এই মুহূর্তে এই ভাষাহীন একেলা নিঃসঙ্গ প্রানিটির পাশে আমি আছি। আমি তার শরীরে, মাথায়, গলায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আর ওর ভুষি, খের খাওয়া দেখছি। মাঝে মাঝে ও আমাকে আলতো করে আমার হাতের তালুতে গুতা দিচ্ছে, কিন্তু ব্যাথা দিচ্ছে না। বুঝতে পারছি, আমি ওর বন্ধু হয়ে গেছি।
অনেক সময়ধরে গরুটি অনেক ভুষি আর খের খেলো। তারপর ধীরে ধীরে একটা জায়গায় গিয়ে পিছনের দুই পা সামনের দিকে ভাজ করে আর সামনের দুই পা পিছনের দিকে ভাজ করে ঠিক আমাকে দেখা যায় এমনভাবে শুয়ে পড়লো। জাবর কাটছে গরুটি আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটা চেয়ার নিয়ে খুব কাছেই বসেছিলাম। আমাদের ভাষা ভিন্ন, আমরা আমাদের ভাষায় ওকে কোন কথা বললেও তার বুঝার কোনো ক্ষমতা নেই। মাঝে মাঝে আমি ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আর ও তার মাথা আর শিং দিয়ে এমনভাবে সারা দিচ্ছিলো যেনো আমরা কথা বলছি।
এইভাবে কতক্ষন বসে ছিলাম, আমার মনে নাই, কিন্তু এই বসে থাকা অবস্থায় আমি ভাবছি, আগামিকাল সকালে এর জীবননাশ হয়ে যাবে, একে আমি কুরবানী দিবো। এটা ভাবতেই এখন আমার কষ্ট লাগছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার সান্নিধ্য, তাতেই ওর প্রতি আমার একটা মহব্বত, একটা মায়া জন্মেছে। কাল থেকে আর ওকে আমি দেখতে পাবো না কিংবা ও আর এই প্রিথিবীর আলো বাতাশ দেখতে পাবে না, এটা ভাবতেই আমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমার বিধাতার নির্দেশ, সক্ষম ব্যক্তিদের কুরবানী ওয়াজিব। এখানে আমার মহব্বত কত গভীর, আর আমার কষ্ট কতো প্রকট, সেই আবেগের কোনো স্থান নেই।
একটা সিগারেট ধরিয়ে গরুটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিলাম, আজ থেকে অনেক বছর আগে আল্লাহ ইব্রাহিম (আঃ) কে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিষ, তার ছেলে, ইসমাইল (আঃ) কে কুরবানি করতে বলেছিলেন। তখনো ইসমাইল (আঃ) একজন অপরিনত সুন্দর, নিস্পাপ এবং কচি একটি শিশু। পিতা নিজের আদরের সন্তানকে তার গলায় ছুড়ি দিয়ে জিবন্ত কুরবানী দিবেন, এটাই ছিলো আল্লাহর নির্দেশ। অনেক অনেক কঠিন একটা নির্দেশ। আল্লাহর প্রতি ইব্রাহিম (আঃ) এর ভালোবাসা কতটা গভীর তার প্রমান হিসাবেই আল্লাহ তাকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমন একটা পরীক্ষার কথা ভাবতেই তো গা শিউরে উঠে। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ, অমান্য করার কোন অবকাশ নাই। কিন্তু মানুষের হৃদয় বলে তো একটা জায়গা আছে। মানতে পারা আর মেনে কাজটা করা যেমন দুরূহ, তেমনি সুযোগ্যও হতে হবে। আর এই কাজটাই আল্লাহ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মাধ্যমে আমাদের বাধ্য-অবাধ্যতার পরীক্ষায় ফেলে দিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তার ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সঙ্গে তার কচি নিস্পাপ ছেলে হযরত ইসমাইলও (আঃ)।
গরুটার দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, আল্লাহ কত মহান, তার কি অদ্ভুত পরিকল্পনা, আর কি উদার তিনি যে, তিনি তার রহমত দিয়ে ঐদিন ইব্রাহিম (আঃ) কে তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তানটিকে কুরবানী দিতে নির্দেশ দিলেও মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আঃ) এর অগোচরে ইসমাইল (আঃ) এর পরিবর্তে একটি পশু প্রতিস্থাপন করে কুরবানীকে গ্রহন করেছিলেন এবং প্রতিকী হিসাবে ওই একই কাজ আল্লাহ আমাদেরকে করার নির্দেশ দিয়েছেন। আজ যদি মহান আল্লাহ এই প্রতিকী কুরবানী না জারি রাখতেন, তাহলে আজ আমরা যারা লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে পশু কিনছি, তার আর কোনো প্রয়োজন হতো না। কারন নির্দেশমাফিক, আমাদের পরিবারের সন্তানদেরকে একে একে প্রতি বছর কুরবানী করতে হতো। কতই না কষ্টের কাজটি আমাদের করতে হতো। কুরবানীর ঈদ মানে হয়ে যেতো তখন পরিবারের জন্য একটা ভয়ংকর শোকের দিন, হাহাকারের দিন। সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে শোনা যেতো আজ কান্নার চিৎকার। আমার সামনে বসে থাকা ভাসাহীন গরুটিকে দেখছি আর ভাবছি, এই কিছু অল্প সময়ের মধ্যেই এই বোবা প্রানিটির সঙ্গে আমার কতই না খাতির হয়ে গেলো, মায়া জন্মে গেলো। অথচ এই মায়ার বন্ধন, মহব্বতের বন্ধন, আবেগের বন্ধন ছিন্ন করে হলেও আগামিকাল আমি ওকে কুরবানী করবো। ওকে আমি ওর জন্ম থেকে আদর দিয়ে বড় করিনি, ওর কোনো কিছুই আমি জানি না। কখন ওর অসুখ হয়েছে, কখন ও কার ক্ষেতে ফসল খেয়ে কোথায় কতদিন খোয়ারে আটক খেয়েছে, কিংবা কতগুলু চটির আঘাত সে সহ্য করেছে। এ সবের আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু কিছু টাকা খরচ করে ওই পালক মালিকের কাছ থেকে নগদ কিনে নিয়ে চলে এসছি মাত্র। ওকে প্রতিটি ক্ষনেক্ষনে যে লোকটি ঘাস খাইয়ে, ভুষি খাইয়ে, পানি খাইয়ে, যতন করে গোসল করিয়ে দিনের পর দিন বড় করেছে, এই ভাষাহীন প্রানিটিও তার কাছে তার সন্তানের মতোই। আমি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য ওকে কাছে পেয়েছি। তাতেই আমার ভিতর অজানা এক মায়ার উদ্রেক হয়েছে। এই সামান্য আবেগেই ওকে কুরবানী দিতে আমার মনে কেমন যেনো একটা কষ্ট অনুভুতি লাগছে। আমি আরো ভাবছি, আজ যদি এটা ভাসাহীন প্রাণী, গরু কিংবা ছাগল কিংবা কোনো দুম্বা না হয়ে আমার আদরের সন্তানটি হতো, তাহলে কি আমি পারতাম ঠিক এভাবে এতো নীরবে, আগামিকালের কুরবানীর নির্দেশটি পালন করতে? পারতে তো হতোই। এটাই তো পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়ত আজ আমাদের পরিবারে এতোক্ষন কান্নার রোল পড়ে যেতো, সমাজে প্রতিটি ঘরে ঘরে আজ হতো সবচেয়ে দুক্ষের দিন হতো। আর যিনি কুরবানি হবেন, তারই বা কি হতো মনের অবস্থাটা? আমার ভাবতেই সারা শরীর শিউরে উঠছে।
অনেক রাত হয়ে গেছে। বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়ার মত। কিন্তু আমি একা বসে আছি গরুটার পাশে। ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। এমন নয় যে, গরুটি কোন জ্বালাতন করছে কিংবা ডাকাডাকি করছে কিংবা অজানা কোন ভয়ে সে অস্থির। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। জাবর কাটছে প্রতিদিনকার মত। ও হয়ত জানেই না যে, আজ রাতটাই হচ্ছে ওর জীবনের শেষ রাত। ও আর কখনোই এই পৃথিবীর আলো বাতাস উপলব্ধি করতে পারবে না। কারন কাল ওকে আমি সবার সামনে, জোর করে আস্টেপিস্টে বেধে গলায় ছুড়ি দিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য কুরবানি করে ফেলবো। কত টাকায় আমি আমার এই ভালোবাসাটা কিনেছি, তার জন্য আমার আল্লাহ বসে নাই, তিনি শুধু বসে আছেন এইটা দেখার জন্য যে, আমি আমার ভিতরের ভালোবাসাটা, আমার অতি আদরের সন্তানের পরিবর্তে প্রতিকী এই প্রানীটিকে কতটা মহব্বত করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে এবং তার আদেশ পালন করে তারজন্য কুরবানী করতে প্রস্তুত আছি কিনা। এই গরুটি হচ্ছে আমার সন্তানের বিকল্প একটি প্রাণী। শয়তান আমাকে ধোকা দিচ্ছে বারবার, ধোকা দিচ্ছে অনেকভাবে। কখনো লোক দেখানো, কখনো ধনে-মানে পয়সায় আমি কত বড় তা মানুষের কাছে জাহির করার নিমিত্তে, কখনো অহংকারের নেশায়। অথচ আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে হাসিল করার জন্য যে ওয়াদা, সেটা আজ প্রায় ভুলতেই বসেছি আমরা সবাই।
সকালে নামাজ পড়ে এসেই অনেক্ষন গরুটার কাছে ছিলাম। আদর করেছি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে, শিংগুলুতে হাতের পরশ বুলিয়ে। আবারো খের ভুষি খাওয়ানোর চেষ্টা করলাম। খুব বেশী খেতে চাইলো না কিন্তু তারপরও সে আমাকে নিরাশ করেনি। আমার শরীর পবিত্র, মাত্র নামাজ পড়ে এসেছি। গরুটাকে আমি ওর গলায় জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষন থাকলাম। গরুটাও মনে হলো আমার এই আলিঙ্গন খুব আদর করে অনুভব করছে। হুজুর চলে এসেছে। এখনই কুরবানী হবে। মনটা বড্ড নাড়া দিচ্ছিলো। আশেপাশের অনেক উৎসুক জনতা কেউ গরুটার চামড়া কত দিয়ে বিক্রি করা হবে তার খবরে অস্থির, কেউ কত টাকায় গরুটা কিনেছিলাম, তার দাম দস্তর জিজ্ঞেস করতে অস্থির, কেউ আবার কিভাবে গরুটা জবাই করা হবে সেটা দেখার জন্য ভিড় করে আছে। কিন্তু আমার ভিতরে প্রচন্ড একটা ব্যথা অনুভব করছি। আমি আবারো গরুটাকে একটু আদর করার জন্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম, মনে হচ্ছে যেনো আমার অতি আপন একজন কেউ আমার থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। আমার চোখের পাতা ভিজে আসছিলো, গরুটার মুখের দিকে তাকাতেই আমার মনে হলো, আমার শরীরের সঙ্গে এটে থাকা এই ভাষাহীন প্রানিটিরও চোখের পাতা ভিজে এসেছে। ডাগর ডাগর দুটি চোখ আমার দিকে তাকিয়েই থাকলো।
জেনারেশন গ্যাপ কেনো হচ্ছে এটা জানতে পারলে আমাদের সমাজের সব শ্রেনির বাবা মায়েরা অন্তত তাদের কি করা উচিত সে ব্যাপারে একটু সচেতন হতে পারতেন। আমরা যারা বারবার বলছি যে, পরিবারে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, তাহলে সেই কিসের উপর সচেতনতা বাড়াতে হবে জানা দরকার, তাহলেই সচেতনতাটা বাড়বে। চলুন দেখি তাহলে জেনারেশন গ্যাপ কি কি কারনে হচ্ছে সেটা আগে খুজে বের করি। তারপর এর বিপরিতে আমাদের কি করা উচিত, সেটা বের করা যাবে, হোক সেটা পরিবারের জন্য, হোক সেটা সামাজিকভাবে আর হোক সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে। সেই কার্যপ্রণালী বের করা কঠিন হবে না।
প্রকৃতপক্ষে মোদ্দা কথায় যদি বলি, তাহলে ব্যাপারটা আর কিছুই না, মানুষের পৃথক পৃথক ইন্টারেস্টের কারনে, তাদের নিজস্ব ভ্যালু বিশ্লেষণের কারনে, বয়সের তারতম্য, বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার প্রসার, লাইফ স্টাইল, এস্পিরেসন, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাব্যবস্থা, সাইকোলোজিক্যাল ডেভেলপম্যান্ট, ফিজিক্যাল পরিবর্তন, ইত্যাদি সবের কারনেই এই জেনারেশন গ্যাপটা তৈরি হয়। আর এইটা একদিনে বা এক সপ্তাহে বা এক মাসের মধ্যেই ঘটে না। এটা ঘটে ধিরে ধিরে, সামস্টিকভাবে, লম্বা সময় ধরে।
ব্যাপারটা আরো সহজ করে যদি বলি, যেমন ধরুন, ৪০ কিংবা ৬০ এর দশকে এমন কি ৭০ কিংবা ৮০ এর দশকেও শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন ছিলো যেখানে চরিত্র গঠন, ডিসিপ্লিন এবং ইউনিফর্মিটি ছিল মুখ্য বিষয়। মুখস্থবিদ্যা দিয়ে অনেকে না বুঝেই অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছেন। তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা বিকশিত হতে হতে ইতিমধ্যে তারা একটা এডাল্ট মানুসের রূপ নিয়ে নিয়েছেন। যে সময়টায় এখন ইয়াং জেনারেশন বিপথগামিতে হাটছেন, ওই সময় তারা এই কঠিন ডিসিপ্লিন, নিয়মানুবর্তিতার কারনে সময়টাই পার করে দিয়েছেন। কিন্তু আজকাল শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র গঠনের কিংবা ডিসিপ্লিন তথা ইউনিফর্মিটির ব্যাপারটা আর মুখ্য নাই। এখানে মুক্তচিন্তা ধারায় এক ধরনের বিশ্লেষণধর্মী স্বাধীনতা এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আদলে সে নিজে যা সেন্সিব্যাল মনে করে সেটাই শেষ কথা। ফলে সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে আগের যুগের মানুষের থেকে বর্তমান যুগের ইয়াং জেনারেশনের কাছে মেথডটাই আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ইয়াং জেনারেশনের ভিসন আর ওল্ড জেনারেশনের ওই একই বয়সের তুলনায় ভিসনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বনে যাচ্ছে। এটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ত্রুটি বলতে হবে। এই ব্যাপারে হয়ত আমরা রাষ্ট্রীয় সচেতনতার কথা মাথায় আনবো পরবর্তী পর্বে।
আরেক দিক দিয়ে বলি, ধরুন, ওয়ার্ক প্যাটার্নে ওল্ডার জেনারেশন তাদের সময়ে জব সল্পতার কারনেই হোক আর কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই হোক, তাদের জবটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন এবং সততার সহিত দিনের পর দিন অফিস সমুহের যাবতীয় আইনকানুন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও মেনে শেষতক চালিয়ে গেছেন যা আজকালকের ইয়াং জেনারেশন এটার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। ফলে আইনের বাধায় তারা খুব একটা বিদ্ধ হতে চায় না। তারা স্বাধীন, ইচ্ছে হলো কাজ করবেন, ভালো লাগলো তো থাকবেন, আর পছন্দ হয় নাই, কিচ্ছু যায় আসে না, পরের দিনই জব ছেড়ে দিলেন। এই যে একটা খামখেয়ালীপনার মতো স্বাধীনতা, একটা ছিঁড়া ছিঁড়া ভাব, তাতে অনেক কিছুই আর সংঘবদ্ধ থাকে না। না কর্মক্ষেত্রে না বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে না পারিবারিক দায়িত্ববোধে। ধিরে ধিরে এই কোহেসিভনেসটা কমতে থাকে। বন্ধন কমতে থাকে। এর মধ্যে আবার যোগ হয়েছে হাই-টেক। এই হাই-টেকের জন্য ইন্টার-পারসোন্যাল রিলেসনটা হিউম্যান এলিম্যান্ট থেকে আরো দূরে চলে গেছে। এতে বড়দের সাথে গ্যাপটা আরো বেশি বেড়েছে। পরামর্শের জায়গাটা কিংবা মতাদর্শের আদান-প্রদান গুলি আস্তে আস্তে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এই সচেতনতার বিরুদ্ধে হয়ত আমরা পরবর্তীতে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে সচেতনতার কথা বলবো।
আরেকটা বিষয় না বললেই না। আর সেটা হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়ার মাধ্যমে যদিও আজকালকের ইয়াং জেনারেশনকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়ে মার্কেটে কম্পিটিটিভ করে তুলছে কিন্তু অন্যদিকে তাকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে আনপ্লিজেন্টও করে তুলছে। ইয়াং জেনারেশন সবাইকে এই মিডিয়া এক কাতারে নিয়ে এসে প্যারেন্টাল গাইডেন্সের থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়ে একই সমসাময়িক বয়সের গাইডেন্সে আবেশিত করে দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। ফলে ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে ইয়াং জেনারেশন গ্লোবাল হাইপোথিসিসে বা কন্সেপ্টে বেশি করে ঝুকে পড়ছে। আর যখনই ইয়ং জেনারেশন তাদের ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখনই হচ্ছে বেশি করে বিপত্তি। কালচার, সামাজিক আস্থা, পারিবারিক অবস্থান, নিজস্ব ক্যাপাবিলিটি ইত্যাদির উপর তার তখন নিয়ন্ত্রণ লোপ পেতে থাকে। আর এই লোপ ধিরে ধিরে তাকে তার অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরিয়ে প্রতিনিয়ত বিপথগামি অথবা অবাস্তব একটা কোহেলিকার দিকে ঠেলে দেয় যা সে নিজেও বুঝে না।
এর মধ্যে যোগ হয় আবার পরিবারের ইরেসনাল এক্সপেকটেশন। আর এই ইরেসনাল পারিবারিক এক্সপেক্টেসনটা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে জেনারেশন গ্যাপের বেলায়। আর এটা শুরু হয় একেবারে ছোট বয়স থেকেই। যেমন ধরুন, পিতামাতার স্বপ্নের চাহিদা তারা তাদের সন্তানের ইচ্ছা বা খুশির বিনিময়ে হলেও তা তাদের উপর চাপিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেন না। সন্তানের চাহিদার থেকে অভিভাবকের চাহিদা পুরুন করতেই ইয়াং জেনারেশনের জীবন হিমসিম খেতে হচ্ছে। তার ইচ্ছা থাকুক আর নাই বা থাকুক, সে পারুক আর নাই বা পারুক। তার ভাল লাগুক আর নাই বা ভালো লাগুক। সন্তান আর্ট করতে ভালবাসেন, তাকে ডাক্তারি পড়তেই হবে, সন্তান গান শিখতে ভালোবাসেন, তাকে জিওগ্রাফী নিয়ে পড়তেই হবে। পিতামাতারা ভুলেই যান যে, তাদের সন্তানের একটা এস্পিরেসন আছে, তার একটা ভাল লাগার ব্যাপার আছে কিংবা তার নিজস্ব একটা পরিমন্ডল আছে। আর যখনই কোন ইয়াং জেনারেশন তাদের ইচ্ছার এই প্রতিফলনের জন্য বেকে বসবে, তখনই শুরু হবে দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট। গ্যাপ তো তখনই সৃষ্টি হয়ে গেলো। এই গ্যাপ থেকে তৈরি হয় আরো গ্যাপের। যেমন, পিতামাতা মনে করেন যে, তারা এই বয়সে তাদের বাবা মায়ের সঙ্গে কিভাবে আচরন করেছেন তার তুলনা, তারা এই বয়সে ঐ সময়ে কি ধরনের কাপড় পরিধান করেছেন তার তুলনা, তারা কি কি স্বাধীনতা পেয়েছেন তার একটা খতিয়ান, কিংবা সপ্তাহান্তে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে যেয়ে রাত্রি যাপনের অনুমতি দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে তুলনা, এমন কি কি ধরনের হেয়ার কাট নিতেন আমাদের ওল্ডার জেনারেশন ইত্যাদি যখন পিতামাতা দিতে শুরু করেন, তখন এই দুই জেনারেশন এমন একটা অবস্থায় দাড়ায় যে, মনে হয় একে অপরের বিপরিতে অবস্থান নিয়েছেন, মনে হয় তারা একে অপরের ভাষাই বুঝতে পারছেন না। ফলে পরিবারে সমঝোতা নষ্ট হচ্ছে, শান্তি নষ্ট হচ্ছে আর বেড়ে চলছে একে অপরের থেকে দুরত্ত।
সামাজিক ক্লাস বিভক্তিও কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে গ্যাপ তৈরির একটা ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। একটা সময় ছিলো যে, আমাদের দেশে বিখ্যাত গায়িকা রুনা লায়লা আর সাবিনা ইয়াসমিন কখনো একসঙ্গে এক স্টেজে গান করতেন না। কারন কে কার থেকে বড় সেটা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে? ঠিক এমনিভাবে, নিম্নক্লাসের বা গরিব মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে উচ্চবিত্ত ক্লাসের সঙ্গে একটা ক্ল্যাশ সবসময়ই ছিলো। কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই ক্লাসভিত্তিক শ্রেনিবিন্যাশ এর প্রবনতাটা অনেকটাই কম। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একজন ছাত্র যদি ভাল ফলাফল করে বা একজন ভাল গীটার বাজাতে পারে তাকে গানের দলের মধ্যে নেওয়ার মধ্যে কোণ দ্বিধাবোধ করে না। কারন ওল্ডার জেনারেশনের মতো ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত সংস্কারে তাদেরকে কোন নেগেটিভ অনুভুতির খোরাক জোগায় না। এই জায়গাটা থেকে ওল্ডার জেনারেশন এখনো সরে আসতে পারে নাই। ফলে ছেলেমেয়ের প্রেম ঘটিত এফেয়ারস নিয়ে, বন্ধুত্ত তৈরি করতে গিয়ে কিংবা একই টেবিলে তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়া নিয়ে পরিবারে ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে তার ওল্ডার জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট তো বাধতেই পারে আর বাধেও।
এই রকম হাজারো হাজারো উদাহরণ টানা যাবে যেখানে খুব সুক্ষ কিন্তু গ্যাপ তৈরির জন্য ঐগুলু যথেষ্ট ভুমিকা রাখে। ধরলাম যে, এই গ্যাপগুলু দুই জেনারেশনের মধ্যে তৈরি হলো। তাতে কি হয়েছে? দেশ নষ্ট হয়ে যাবে? পরিবার নষ্ট হয়ে যাবে? কিংবা সমাজ? কি হবে যদি দুই জেনারেশন আলাদা আলাদা বাস করে? কেউ তো কাউকে ডিস্টার্ব করছে না। তাহলে কি দরকার দুই জেনারেশনের মধ্যে জোর করে আবার মিল করার? ওল্ডার জেনারেসন মরে গেলে তো আর কোনো কনফ্লিক্ট থাকে না। তখন তো শুধু ইয়াং জেনারেশনই থাকলো। তাহলে এতো কথা কেনো?
আছে, কথা আছে। কারন এই গ্যাপের কারনে কি কি ইমপ্যাক্ট হয় তাতো সার্বজনীন। সুদূরপ্রসারী। আর ওখানেই তো সব বিপত্তি। চলুন, আমরা সবাই এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলু ধিরে ধিরে বের করি। সবাই কন্ট্রিবিউট করি আমাদের প্রয়োজনে। আমরা এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলি বের করতে পারলেই আমরা সহজে বের করতে পারবো আমাদের কোথায় কোথায় সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং কাকে কাকে এই কাজে অংশ গ্রহন আবশ্যক।
……… (চলবে পরবর্তী ইমপ্যাক্ট অনুসন্ধানে, আপনিও কন্ট্রিবিউট করুন মতামত দিয়ে)
আমি একটা জার্নালে একবার একটা আরটিক্যাল লিখেছিলাম, “জেনারেশন গ্যাপ” এর উপর। আজ মনে হচ্ছে, এই জেনারেশন গ্যাপটা আমাদের অনেকদূর নিয়ে যাচ্ছে এবং খুব দ্রুত। আমি আমার সেই আরটিক্যালটার কিছু চুম্বক অংশ আজ আমাদের বন্ধু ফোরামে তুলে ধরতে চাই।
…… জেনারেশন গ্যাপটা আসলে হচ্ছে আধুনিক সময়ের ইয়াং বয়সের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের ওল্ড জেনারেসনের মানুষগুলুর মধ্যে চিন্তাধারা, জীবনযাত্রা, অভ্যাস, এবং দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্যগুলি। এই জেনারেশন গ্যাপ থাকবেই, আগেও ছিল এবং এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু ভয়ংকর বিষয়টি হয়ে দাড়ায় যখন এই জেনারেশন গ্যাপটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, কালচার, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, এবং সাধারন দৃষ্টিভঙ্গিটায় একটা বিস্তর জাম্প করে। তখন যেটা হয় তা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যুবক বয়সের জেনারেসনের সাথে ওল্ড জেনারেশনের মধ্যে মিসম্যাচ, এডজাস্টম্যান্ট, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইত্যাদির সবকিছুতেই কনফ্লিক্ট করে। অতিতে এই গ্যাপটা ছিলো এবং মাঝে মাঝে যে বিস্তর জাম্প করে নাই তা কিন্তু নয়। সেই পরিস্থিতিতেও জেনারেশন গ্যাপটা কোনো না কোনোভাবে সহনীয় পর্যায়ে সামাল দেওয়া গেছে কারন তখন দুইপক্ষই একটা জায়গায় এসে এডজাস্টমেন্টের মধ্যে সহঅবস্থান করতে চেয়েছিলো এবং পেরেছিল।
এখানে আরো একটা তথ্য সহজ করে বলা ভাল যে, এই জেনারেশন গ্যাপটার মানে কি দাদাদের বয়সের সঙ্গে নাতীদের বয়সের যুগের পার্থক্য? অথবা এইটা কি ৩০ বছর সময়ের কোনো পার্থক্য? কিংবা ৫০ বা ৭০ বছরের সময়ের? আসলে তা না। এটা পিতামাতার এবং সন্তানের তাতক্ষনিক সময়ের মধ্যেও হতে পারে আবার দাদাদের বয়সের সঙ্গে নায়-নাতকুরের বয়সের ফারাকের মধ্যেও হতে পারে। এটা একটা স্পেসিফিক জেনারেশন থেকে আরেকটা স্পেসিফিক জেনারেশনের মধ্যেও হতে পারে।
যেমন উদাহরনসরুপ যদি বলি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পরে এবং রিপাবলিক অব জর্জিয়া যখন স্বাধীনতা পেলো, তখন সোভিয়েত আমলের বাবামায়ের সঙ্গে তাদের ঘরের সন্তানদের মধ্যে বিশাল একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর তফাত সৃষ্টি হলো। জর্জিয়ার উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা পুরুটাই পাশ্চাত্য ধাঁচের আদলে বদল হয়ে গেলো কিন্তু তাদেরই পিতামাতারা আগের দিনের সোভিয়েত কালচার, সভ্যতা নিয়ে ধরে থাকলো। এদের মধ্যে সময়ের পার্থক্যটা ছিলো মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধান। হয়ত ৫ থেকে ১০ বছরের। অথচ কিন্তু এতো অল্প সময়ের ব্যবধানের দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা বিস্তর জেনারেশন গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে গেলো। এবং দেখা গেলো, একই পরিবারের মধ্যেই এই ঘটনাটা ঘটে গেলো। এই দুই জেনারেশনের মধ্যে তাদের চিন্তাধারা, জীবনযাত্রার দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাদীক্ষার লেবেল, আচরন, ভবিষ্যৎ চিন্তাধারা, আর্থসামাজিক ভাবধারা সবকিছুই আমুল পালটে গেলো। বর্তমান জেনারেশনের জীবন যাত্রায় চলে এলো মুক্তধারার স্বাধীনতার শক্তি, স্বাধীন চলাফেরা, নাইট ক্লাব, ইন্টারনেট, কম্পিউটার গ্যাম, বিনোদন, মুক্ত-রাজনীতির চর্চা এমন কি বিয়ে সাদির ব্যাপারেও আধুনিক কালের যুবকদের চিন্তাধারা অনেক পার্থক্য। তাদের চাকুরী পছন্দের বিষয়ে, চাকুরি ছাড়ার বিষয়ে, এমন কি অবসর প্লানের বিষয়ে কোনো কিছুই ঘরের পিতামাতাদের সহিত মিলছে না। অন্যদিকে পুরানো দিনের অভ্যাসে গড়া বাবা মায়েরা ধরে থাকলেন ট্র্যাডিসনাল সমাজ ব্যবস্থা। তারা বর্তমান যুগের ছেলেমেয়েদের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গেই একমত হতে পারছে না, তাদেরকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে চাইছেন না কিংবা দিতে চাইছেন না বলে বললে ভুল হবে, তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, তাদের সন্তানেরা ঠিক হ্যান্ডেল করতে পারবেন কিনা, কিংবা শেষতক আবার তাদের সন্তানেরা দিশেহারা হয়ে যায় কিনা ইত্যাদি।
এর ফলশ্রুতিতে যা হচ্ছে তা হলো বিশাল এক গ্যাপ। আর এই গ্যাপের কারনেই একই পরিবারের মধ্যে যুবক এবং মধ্যবয়সী সদস্যদের মধ্যে বিশাল গ্যাপের সৃষ্টি হচ্ছে। আর সৃষ্টি হচ্ছে ফাটল, সৃষ্টি হচ্ছে সন্দেহ, তিক্ততা ইত্যাদি। ফলে কিছুতেই সুতা এক জায়গায় আবদ্ধ হয়ে নতুন জাল তৈরি না করে শুধু নৈরাজ্যসরুপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবারে কোনো কিছুই অভাব নাই আবার কোনো কিছুতেই ইয়াং বয়সের সদস্যদের মন টানছে না। তারা সস্থিতে নাই। তারা বিসন্ন। যাদের কাছ থেকে সহযোগিতার হাত পাওয়ার কথা তাদের সাথেই তাদের বিরোধ। যাদের কাছে তারা অসহায় মনের ভাব শেয়ার করবে, তারাই তার অসহয়ের কারন। সে কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? ফলে একই মানসিকতার বন্ধু, বান্ধবি, কিংবা তাকে বুঝতে চেস্টা করছে এমন কেউ, সেখানেই সে পায়ে পায়ে হেটে চলে যাচ্ছে তার অভাবহিন ঘর ছেড়ে, তার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে কোনো একটা জায়গায় যেখানে সে আর কিছুই না পাক, পাচ্ছে মানসিক শান্তি। সেটা ভুল না ভালো না শুদ্ধ, তা তার জানার অপেক্ষা করছে না। আমরা বারবার বলছি পরিবারের সচেতনার কথা, বারবার বলছি কিছু একটা করা দরকার, বারবার বলছি সরকার কেনো দেখছে না, বারবার বলছি কেনো এই রকম এয়াবনরমাল অবক্ষয় হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটার ভিতরে কেউ প্রবেশ করছি না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, সমস্যাটা আসলে কোনো রাজনৈতিক কিংবা পার্শ্ববর্তি দেশ, কিংবা কোনো একটা বিশেষ মতবাদের উপর দোষ চাপিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। কিংবা চাপিয়ে দিয়েও কোনো লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না যতক্ষন না পর্যন্ত এই সুক্ষ কিন্তু বিস্তর গ্যাপটা সমাধান হচ্ছে।
আমার মনে হচ্ছে এই জেনারেশন গ্যাপটাই এখন আমাদের অত্যান্ত বুদ্ধিমানের সহিত হ্যান্ডেল করে পরিস্থতি আয়ত্তে আনা সম্ভব। এখন কথা হচ্ছে কি কারনে এই জেনারেশন গ্যাপটা হচ্ছে আর কিভাবে এই দুই জেনারেশনের গ্যাপ কমিয়ে এনে সার্বজনীন মতাদর্শ, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, ইত্যাদি একটা প্লাটফর্মে আনা যায় তার হিসাব করা। বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা আসলে আমাদের পরিবার থেকে শুরু করে যার যার আওতায় বাধতে হবে। কিছু পরিবারের পক্ষে, কিছু সরকারের, কিছু সমাজের কিছু আমাদের চারিপাশের জনগনের। কেউ দায়িত্ব এরাইয়া যাওয়ার কোনো স্কোপ নাই। (চলবে…)
আমার একটা জায়গায় কিছুতেই ক্যাল্কুলেসন মিলছে না। মনে হচ্ছে, কোথায় যেনো একটা ভুল হচ্ছে। তার আগে একটা গল্প বলি। বহুদিন আগে আমি একটা সিনেমা দেখেছিলাম, সম্ভবত পোলিশ সিনেমা। এটা প্রায় ৯০ দশকের দিকে। সিনেমাটার কাহিনি এই রকম যে,
সিনেমাটায় মোট ১২ জন লোক খুন হয়। ১২তম ব্যক্তি খুন হয় ১১তম ব্যক্তির দ্বারা, ১১তম ব্যাক্তি খুন হয় ১০তম ব্যক্তির দ্বারা, ১০তম ব্যক্তি খুন হয় ৯ম ব্যক্তির দ্বারা এবং এইভাবেই খুনগুলু চলতে থাকে এবং সর্বশেষ ২য় ব্যক্তিটি খুন হয় ১ম ব্যক্তির দ্বারা। অথচ এই ১২ জনই ছিলো একটা সংস্থার অধীনে এবং কেউ আড়াল থেকে এই ১২ জনকেই পৃথক পৃথক ভাবে নির্দেশনা দিত। মজার ব্যাপার হলো এই ১২ জনের মধ্যে কেউ কাউকে কখনোই চিনতো না। আর খুন গুলু হয়েছে বিভিন্ন বিভিন্ন কারনে। কোনো খুন কোণ খুনের কারনের সঙ্গে এক ছিলো না। যখন ১২ থেকে খুন হতে হতে ১ম ব্যক্তিটি খুন হয়ে যায় তখন স্ক্রিনটা একেবারে ব্ল্যাক হয়ে যায়। ভাবলাম, মনে হয় স্ক্রিনে কোনো সমস্যা হয়েছে বা সিনেমার রিলে কোন সমস্যা হয়েছে। কিন্তু না, একটু পরে দেখা গেলো, স্ক্রিনে একটা মেসেজ এসেছে, Cycle will continue and The End. জানা গেলো না, কে সেই অদৃশ্য নির্দেশনাকারী। ওরা অনেক বড় এবং অদের ব্যাপারে কেউ কখনো জানতেও পারবে না।
আজকে বিশ্ব ব্যাপি যে সমস্ত খুন, টেরোরিস্ট এটাক, কিংবা ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, কখনো কারন হিসাবে দেখছি ধর্ম, কখনো দেখছি পাওয়ার পলিটিক্স, কখনো দেখছি বিশ্বায়ন, কখনো দেখছি গনতন্ত্র, রাজতন্ত্র আরো অনেক বিষয়। আসলে হচ্ছেটা কি? এটা যুদ্ধ নয় আবার যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। পূর্বে একদেশ আরেকদেশ দখল করার জন্য সৈন্যসামন্ত, হাতি ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিমান বাহিনি, নৌ বাহিনি, স্থল বাহিনি সব নিয়ে একে অপরকে এটাক করতো, কিন্তু এই কয়েক বছর যাবত দেখছি, কোন দেশ নয়, কিছু ইন্ডিভিজুয়াল চরিত্র একা একাই পুরু পৃথিবীর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। যেমন লাদেন একাই যেনো একটা সংস্থা, কিংবা আইএস, ইত্যাদি। এখন কোনো ইন্সটিটিউশন দরকার পরছে না, জাস্ট নিছক ব্যক্তি পর্যায়ের মধ্যে যুদ্ধটা চলে এসেছে। একটা লোকই এনাফ একটা চরম আকারের কেওয়াস তৈরি করার জন্য। এইটাকে সামাল দেওয়া খুব সহজ বলে মনে হচ্ছে না। আজকে আমরা যখন আমাদের দেশে আক্রান্ত হচ্ছি, কেউ কেউ পাশের দেশকে ব্লেম করছি বা আমাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছি, আবার যখন পাশের দেশ আক্রান্ত হচ্ছে অথবা আমাদের প্রতিপক্ষ আক্রান্ত হচ্ছে, তখন তারা আরেক দেশকেবা তাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছে, আবার ওই দেশও যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তারা তাদের পাশের কোন দেশ বা গোত্রকে ব্লেম করছে, ঠিক যেনো ওই সিনেমার মত। কিন্তু আসলে এইসব কিছুর নেপথ্যে কে বা কারা? খুব গভিরভাবে ভাবা দরকার। সবার শেষ কি ওই ব্ল্যাক স্ক্রিন যা আমরা কখনো জানতে পারবো না বা জানা সম্ভব না?
আরেকটা বিষয় চোখে পড়ছে। ইন্সট্রাকশনটা যেনো এমন নয় যে, Do or Die, ইন্সট্রাকশনটা যেনো এই রকম যে, Do and Die.
খুব আতংকের ব্যাপার আসলে।
কোন একটা কারনে আমি আজ একটু মর্মাহত। মর্মাহত এই জন্য যে, আমি একটা সরলরেখার হিসাব বুঝতে পারি নাই। আমি বুঝতে পারি নাই যে, আমি একটা অবিভক্ত সরলরেখার অংশ যাকে ভাঙবার চেষ্টা চলছে। আমি বুঝতে পারি নাই যে, শত্রু বন্ধুর মত ব্যবহার করলেই সে বন্ধু হয়ে যায় না। বুঝতে পারি নাই যে, শত্রুর শত্রুরাও একসময় তাদের বড় শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য একজোটে বন্ধু হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি নাই যে, নিজের ইচ্ছাগুলো, শখগুলো রক্ষা করার জন্য কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয়। আমি এখন বিছানায় শুয়ে আছি আর ভাবছি। মনে হচ্ছে আমি কষ্টে আছি, যত না শারীরিক কষ্ট, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট মনের ভিতরে। নিজের কাছে নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে এইজন্য যে, কেন আমি এতোটা অবুঝ ছিলাম, কেন আমি ঐ হায়েনাটাকে এতোটাই কাছের লোক বলে মনে করেছিলাম, কেন মনে হয় নাই, সে ওঁত পেতে আছে। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে আজ, নিজের কাছে লজ্জাবোধও কম মনে হচ্ছে না। এই পৃথিবীতে আমি আজ অন্তত একটা মানুষরূপী হায়েনাকে তো চিনতে পারলাম যে আমারই আস্তানার কাছে ঘুপ্টি মেরে বাস করে, সাধু হয়ে চলাচল করে অথচ সে হায়েনার চরিত্র লুকিয়ে রাখে। জীবনের মানে বুঝবার জন্য অনেক দূর যাওয়ার প্রয়োজন নাই। এই হায়েনাটাকে দেখলেই সব বুঝা যাবে। এই হায়েনারা বন্ধু হয়ে অন্তরের ভিতরে কোকিলের কণ্ঠের মত সুর নিয়ে প্রবেশ করে, সে আসলে সুর নিয়ে নয়, সে জহর নিয়ে প্রবেশ করে। এদেরকে বুঝবার জন্য একটু গভীরে যাওয়া দরকার। তা হলে জীবনের মানে কি তার হিসাব বুঝা যাবে। জন্মের পর যাদের আস্তানার কোন হিসাব ছিল না এবং এখনো নাই, কে বা কারা তার অভিভাবক কিংবা কি নিয়ে তারা পরিচিত হতে হবে এই জনসম্যখ পৃথিবীতে, তাই যখন তাদের নাই। বস্তির ঐ অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে যাদের শ্বাসপ্রশ্বাস চলে, জীবনের মুললক্ষ্য ঠিক করার জন্য অপরের সাহায্য লাগে, পেট পুরে খেতে না পেরে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে জীবন চলে, রাত নামলেই কোথায় একটু ঘুমানো যাবে সেই ভরসায় পরিচিত কারো বাড়ীর পরিত্যাক্ত ঘরে, বা বারান্দায়, কিংবা ঝুল বারান্দায় থাকতে পারলেই নিজেকে বড্ড সুখি মনে করে, তাদের আবার স্তর কি? ল্যাবেল কি? স্ট্যাটাস কি? তারা আর যাই হোক, কারো বন্ধু হতে পারে না। আর বন্ধু হলেও তাদের বন্ধু তাদের স্তরেরই। আমাদের স্তরের তো নয়ই। এদের প্রতিটি চিন্তায়, প্রতিটি অনুভবে, আর সমগ্র ভাবনায় থাকে কিভাবে কোথায় কি ফায়দা লুটা যায়। তাই তারা কখনো চোখের জলে মানুষকে দেখিয়ে একটা সহানুভুতি, কখনো অতি বন্ধুভাবাপন্ন চরিত্রের রূপধরে মনের খুব কাছাকাছি আসার আকুতি, আবার কখনো সাধু সন্নাসির মত গোবেচারা সেজে মানুষের মনের ভিতরে ঢোকার প্রাণান্ত চেষ্টা, এটাই এদের চিরাচরিত অভ্যাস। এরা ভিক্ষা করে না কিন্তু ভিক্ষার টাকায় চলে, যাকাতের টাকায় চলে, এরা পরিত্যাক্ত কিন্তু ভাবে ভাবে চলে, এরা নামহীন, বংশহীন, গোত্রহীন, কিন্তু এরা বড়বড় নামের লোকের দোহাই দিয়ে চলে, অথচ যাদের নামে ওরা চলে, সেই ওরা এই বংশহীন, নামহীন, গোত্রহীন উচ্ছিষ্ট মানুসগুলকে হয়ত চিনেই না। হয়ত বাপের নামটা পর্যন্তই এরা জানে তাদের আদি এবং শেষ পরিচয় হিসাবে। পিতৃকুলের না আছে কেউ, মাত্রিকুলের না আছে কেউ। এদের রূপ যাই হোক না কেন, এদের অন্তরের ভিতর থাকে সর্বদা জহর। এই জাতীয় মেরুদণ্ডহীন হায়েনারা রাগের চেয়ে হাস্যুজ্জল থাকার চেষ্টা করে থাকে বেশি, অপমানেও ওদের দাতকপাটি বন্ধ হয় না, অপমানিত বোধ না থাকায় নির্লজ্জ তোষামোদি লক্ষণীয়। আর অন্তরের ঐ জহরেই অন্যের সব কিছু নস্ট করে মানসিক শান্তিতে থাকতে চায় এই বিকৃতি মানুষগুলো।
আমিও আজ এমনি একটা বন্ধুরুপে পাশে থাকা হায়েনার জহরসমেত দংশনের জর্জরিত ব্যথায় কাতরাচ্ছি। আমি বুঝতে পারি নাই আমার পাশে দাড়িয়ে থাকা এই হায়েনাকে। এরা সবাই হায়েনার বংশধর। ছেলে হোক মেয়ে হোক, হোক ওদের পরবর্তী বংশধর, সবাই মানুষের অববয়ব কিন্তু হায়েনার আদর্শ ছাড়া কিছুই নাই তাদের মধ্যে। এটা আমার জন্য একটা শিক্ষা হয়ে রইল। তবে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমি কেন আমার অবিভক্ত সরলরেখার ঐ প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা আমার প্রানপ্রিয় শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে এই নিয়ে আলাপ করি নাই? আমি সেটাও বুঝতে পারি নাই। কি চক্রাকার বিপদের সঙ্গে আমি বসবাস করছিলাম। তবে শান্তিরবার্তা এই যে, কিছুটা রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিছুটা আঁচর তো লেগেছেই, কিন্তু আজ অন্তত কিছুটা হলেও জীবনের সাথে জীবনের কোথায় অমিল, সেটা বুঝতে পেরেছি। ফারা কেটে যাবে, আবার বর্ষা আসবে, আবার শরত আসবে, শুধু আসবে না হায়েনাদের জন্য সুজুগের সংবাদ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হিসাব থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি। আমাকে শিক্ষা নিতে হয়েছে, যদি শিক্ষা না নেই, তাহলে জীবনের আরও অনেক পর্ব আসবে, যেখানে মনে হবে ঐ পথ আরও কঠিন এবং উত্তরনযোগ্য নয়। পতন নির্ঘাত নিশ্চিত।
আজ যারা আমার সঙ্গে অসঙ্গতিমুলক আচরন করেছে, তারা ভাল কি মন্দ এই বিচার হবে সময়ের পথ ধরে ভবিষ্যতে। আমি তৈরি হচ্ছি। আপনারাও তৈরি হউন। আর ঐ হায়েনাটাকে বলছি, তুমিও তৈরি হও। তুমি আর যাই কিছু করো না কেন, তোমার রক্তের পরিচয়, বংশ, সেটা আর নতুন করে গজিয়ে তুলতে পারবে না। তুমি এর চেয়ে ভাল কিছু করে দেখাতেও পারবে না তোমার পরবর্তী হায়েনাদের কাছে। হায়েনা হায়েনাই। আর তৈরি হও ঐদিনের জন্য, যেদিন তুমি তোমার চোখের জলের সব ভান্ডার ঢেলে দিয়েও আমার রোষানল থেকে বেচে যাবার কোন সম্ভাবনাই নাই, আর সমস্ত সুরালয়, কিংবা জরালয় দিয়েও প্রমান করতে পারবে না যে, তুমি হায়েনার বংশধর নও। তুমি আমার কাছে বিষধর সাপের চেয়েও খারাপ।
বহুদিন পর হটাত করে আজ ওর সঙ্গে আমার দেখা। বুকটা আঁতকে উঠল ওকে দেখেই। আমাকে ও প্রথম দেখতে পায় নাই, ও খুব দ্রুত চলে যাচ্ছিল। আমি ওর পিছন থেকে এক নজর দেখেই চিনতে পেরেছিলাম, কারন ওর একটা পরিচয় বহঙ্কারি কোড নাম্বারটা আমার আজীবন কালের চেনা। আমি ওকে ধরার জন্য ওর পিছন পিছন ছুটছিলাম। দেখলাম আমি যেদিকে যাচ্ছি, ও ঐ দিকেই থামল। আমি ওর কাছে গেলাম, দেখলাম ওর কোলে ভীষণ সুন্দর একটি ফুটফুটে বাচ্চা বসে আছে। পাশে একজন মধ্য বয়সী যুবক। বাচ্চা মেয়েটি সম্ভবত ঐলোকটারই হবে। অবিকল বাবার চেহারা পেয়েছে। মেয়েটিকে ওর কোল থেকে নিয়ে লোকটি পাশের এক বইয়ের দোকানে ঢুকে গেল।
আমি এই ফাকে একটি সিগারেট ধরিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। ও মুচকি হেসে দিয়ে বলল, এখনো সিগারেট ছাড়নি? তোমার এই সিগারেটের গন্ধটা আমার খুব পরিচিত। আজও মনে পড়ে তুমি যখন আমার কাছে বসতে, তোমার মন ভাল থাকলেও তুমি একটার পর একটা সিগারেট টানতে আবার মন খারাপ থাকলেও তুমি একটার পর একটা সিগারেট ফুকতে। তাঁরপরেও আমি তোমার এই সিগারেটের গন্ধটা অপছন্দ করতাম না। আফটার অল তুমি আমার জিবনে প্রথম পুরুষ। তুমি কি এখনো আগের মত করে অনেক রাতে বাড়ি ফির? নাকি অভ্যাস টা কিছু পরিবর্তন হয়েছে?
নাহ, আমার যে ব্যস্ততা, তাতে মনে হয়না যে অচিরেই আমার এই রাতে বাড়ি ফিরার অভ্যাসটা পরিবর্তন হবে। তবে ছুটির দিনে এখন আর কোথাও যেতে মন চায় না। বললাম, তুমি যখন আমার কাছে ছিলে, তখন ছুটির দিনেও তোমাকে নিয়ে কোন কারন ছাড়া আমি বহুবার বহুদিন এখানে সেখানে ঘুরেছি বটে তবে এখন নতুন সঙ্গী থাকলেও আর যাওয়া হয় না।
“আমার কথা মনে পড়ে?” জিজ্ঞ্যেস করল ও ।
“কি মনে হয় তোমার?” আমি উত্তর করি।
কি জানি, হয়ত মনে পড়ে হয়তবা না। এখন তো তোমার নতুন সঙ্গী হয়েছে আমার থেকেও সুন্দর, আমার থেকেও অনেক বড়। কি জানি মনে নাও পরতে পারে। তবে আমি তোমার কথা সব সময় মনে করি। সবচেয়ে বেশি মনে হয় আমার সঙ্গী যখন তোমাদের ঐ ক্যান্টনমেন্টের পথ দিয়ে কখনো আসা যাওয়া করে। তোমার সঙ্গে থাকার সময় আমি কখনো সাধারন পাবলিকের রাস্তায় ঢোকতে হত না। তুমি সঙ্গে আছ আর সাই সাই করে ক্যান্টনমেন্টের লেন ধরে তুমি হাত নাড়িয়ে পরিচয় দিলেই কর্তব্যরত এম পি সাহেব কড়া একটা স্যালুট দিয়ে সসম্মানে চলে দিতে দিত। আমি কত সাহেব, কত ভ আইপি পাবলিকের গাড়ির পিছনে এসেও শুধু তোমার কারনে সবার আগে তা টা বাই বাই দিয়ে চলে যেতাম। নিজকে সাংঘাতিক ভগ্যবান মনে হত। আর এখন? ঘন্টার পর ঘন্টা ঐ সব রিক্সা, ঠেলাগাড়ি, কি সব গাড়ীঘোড়া সবার পিছনে জ্যামের মত ঐ এম পি সাহেবের ক্লিয়ারেন্সের জন্য বসে থাকতে থাকতে আমার আর জান সয় না। আমাকে যেন ঐ এমপি সাহেবও আর চিনতে পারে না। তোমার নতুন সঙ্গী নিশ্চয় এখন এই মজাটা পায়, আমি সেটা জানি।
আমি ওর কথায় হাসি।
“আচ্ছা তোমার চোখের কোনায় এই কাল দাগটা কিসের গো?” আমি ওকে প্রশ্ন করতেই ও চুপ হয়ে গেল।
“কিছু হয়েছে নাকি ওখানে?”
“আর বল না। আমার নতুন সাহেব একদিন খুব মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফিরছিল। রস্তা ঘাট ফাকাই ছিল। হটাত কি হল তাঁর, আল্লাহ ই জানে, ঘ্যাঁট করে এমন করে সে টার্ন নিল যে, পাশের এক ইলেকট্রিক খাম্বার সঙ্গে দিল লাগিয়ে। আর যায় কোথায়। তখন আমার বাম চোখের পাশে আমি এই ধাক্কাটা খাই, হাসপাতালে যাওয়ার সময় নাই, কারন আঘাতটা গুরুতর বলে মনে হয় নাই বলে আমার সাহেবের ধারনা। সেই থেকে এই ক্ষত নিয়েই চলছি সবার মাঝে।
“তোমার নতুন সঙ্গির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে না?” বলে যেন সে খিল খিল করে হাসতে থাকল। কি অদ্ভুত লাগলো আমার কাছে।
আমি বললাম, “নিশ্চয় পরিচয় করিয়ে দেব”। তবে আজ নয়। ওরা আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে নিউ মার্কেটের এক তা রেস্টুরেন্টে গেছে।
তোমার সাহেব কি করে? বলতেই আরেকবার চুপ হয়ে গেল বলে মনে হল।
সে আমার উত্তর না দিয়ে আমাকে উল্টো প্রশ্ন করে বসে। “আচ্ছা, তুমি কি আমাকে না ছারলেই কি পারতে না? অন্তত সেই লক্ষি বড় মেয়েটির জন্য!!?” ও কতদিন আমার কোলে বসে সুন্দর সুন্দর গান শুনত। কি মিস্টি মেয়ে। লক্ষি মেয়ে বটে। কি করে এখন ও? শুনেছি ও নাকি এখন মেডিক্যাল কলেজে পড়ছে। অনেক বড় হয়ে গেছে না? আমার কথা কি ওর মনে পড়ে?
আমি বললাম, হ্যা, ও এখন ডাক্তারি পড়ছে। আমাদের কাছে থাকে না। মাঝে মাঝে আমি নতুন সঙ্গিকে নিয়ে ওর ওখানে যাই। আমার বড় মেয়ে প্রায়ই তোমার কথা বলে।
এমন সময় দেখা গেল তাঁর সঙ্গী আবার সেই ফুটফুটে মেয়েটিকে নিয়ে চলে এসেছে। আমারও প্রায় সিগারেট খাওয়া প্রায় শেষ। কোন ফুরসুত না দিয়ে তিনি আমার এই সেই পুরান বন্ধুটিকে নিয়ে চলে গেলেন। আমার আর তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেয়া হল না।
দেখলাম, সেই পুরান চেহারায় লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ির রঙে রাঙ্গানো আমার সেই ১০৮৬ সিসির পিকান্ত গাড়িটি ধুলা উড়িয়ে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি ওর ঠিকানাটা আবারও হারিয়ে ফেললাম। আমার প্রথম জীবনের সঙ্গী সে। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে আমি ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে তাকিয়ে মনে মনে শধু বললাম, I loved you always and I will always love you.
আমার একবার এক বিশ্ব রাজনিতিক এর সাথে খুব কাছ থেকে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তিনি এই বিশ্ব রাজনীতির সব সমস্যা, সব পলিসি, রাজনৈতিক লীলাখেলার সবগুলুর সঙ্গেই কোন না কোনভাবে জরিত থাকেনই। কোন এক অবসর মুহূর্তে আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কখনো কষ্টে থাকেন কিনা। আমার এই প্রশ্ন করার কারন ছিল। তার কোন কিছুর অভাব নাই, তার সম্পদের অভাব নাই, তার মানসম্মানের কোন কমতি নাই, তাকে অন্যান্য বিশ্ব রাজনীতিবিদরা কাছে পেলে তাদের নিজের জীবনও ধন্য হয়ে যায় এমন একটা ব্যাপার। তারজন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নামিদামী ডাক্তাররা সবসময় স্ট্যান্ডবাই থাকেন, এমনকি এয়ারফোর্স ওয়ানের মত বিমানও স্ট্যান্ডবাই থাকে। তারজন্য তো কোন কষ্ট থাকার কথা নয়।
তিনি বড্ড রসিকলোক কিন্তু খুব জ্ঞ্যানি লোকও বটে। অনেক্কখন ভেবে চিন্তে এক কাপ কফি নিজের হাতে বানিয়ে আর আরেক কাপ কফি আমার জন্য নিজেই বানিয়ে নিয়ে বললেন-তুমি কি কষ্টে আছো? বললাম, না, ওতটা কষ্টে নাই তবে আজকাল অনেক এই যুগের ছেলেমেয়েদের কথা শুনে মনে হয় তারা অনেক কষ্টে আছে। আপনি তো এই যুগেই এখন বাস করেন, আপনি কোন কারনে কষ্টে আছে কিনা।
একটু মুচকি হেসে বললেন, কয়টা যুদ্ধ দেখেছ জীবনে? আফগানিস্থান দেখেছ, ইরাক দেখেছ, কসভ দেখেছ, কিন্তু কখনো কি নিজের ঘরের পাশে ঐ বস্তির ছেরা কাপড় পড়া এতিম কোন বাচ্চার অথবা পিতামাতার বিচ্ছেদজনিত কারনে কোন শিশুর একাকীত্ব অথবা নিছক পয়সাকরির অভাবে সামাজিক দুর্বল কোন পরিবারে বেড়ে উঠা মানুষদের ভিতরের অনুভুতি দেখেছ? সেটা কোনো যুদ্ধের থেকে কম নয়।
আজ থেকে বহু বছর আগে আমি এই এমন একটা পরিস্থিতিতে তিলে তিলে বড় হয়েছি। কখনো মনে হয়েছে আমার কেউ নাই, কখনো মনে হয়েছে যারা আছে তারা আমাকে কিছুই বুঝে না। একবেলা খাবারের জন্য আমাকে যেমন নিজে উপার্জন করতে হয়েছে কখনো মুটে হয়ে, আবার কখনো পাশের বাড়ীর কোন ফরমায়েশ খেটে। আবার জীবনে বড় হতে হবে এই আখাংখায় আমি স্কুলেও অনুপস্থিত না থাকার চেষ্টা করেছি প্রতিনিয়ত। আমি যাদের সঙ্গে স্কুলে যেতাম, আমি তাদের সৌখিন কাপড় চোপর পড়া দেখে নিজেকে কখনো মনে হয়েছে, আমার এই জন্মের জন্য তো আমি দায়ি নই, অথবা আমার এই দৈন্যের জন্য তো আমি দায়ি নই। আমিও তো হতে পারতাম তাদের কোন এক ধনাঢ্য পিতার একমাত্র সন্তান। কিন্তু না, আমি কোন ধনাড্য বাবার সন্তান ও নই, আবার আমার কোন ধনি আত্মীয়ও নাই। আমাকে দেশ ছারতে হয়েছে কপাল ফেরানোর আশায়। আমি পরভূমে বড় হয়েছি অনেকের ছত্রছায়ায়। এমন কি আমি আমার ধর্মটাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে কোন এক উচু ধাপের সিরিতে উঠার আশায়।
প্রেম কি জিনিস, একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের যে প্রেমের অনমদনা তা যে আমার ছিল না তা নয় কিন্তু আমার সেই সাধ্য করার মত পরিস্থিতিও ছিল না। মনে হয়েছে সত্যি কষ্টে আছি।
আজ আমার সব হয়েছে। কোন কিছুর কমতি নেই আমার। আমি যা চাই না, তাও আমি পাই। এর থেকে বেশি কেউ পায় তা আমার জানা নাই। কিন্তু হ্যা, এই যে বললে, আমি কখনো কষ্টে থাকি কিনা? আমি যখন কোন এক পল্লিগ্রামে যাই, আমি যখন কোন এক এতিমখানার বস্তিতে যাই, আমি যখন কোন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় যাই, আমার তখন ঐ যে ফেলে আসা আমার অতীত জীবনের যে কষ্ট, যে অনুভুতি আমার এই সারা জীবনের স্মৃতির মধ্যে জমা হয়ে আছে, তারা আবার উঁকি দেয়, আমি তখন সত্য সত্যি কষ্টে থাকি। কিন্তু এ অনুভুতি আমার প্রকাশের কোন ভাষা নাই শুধু কিছু সাহায্যের হাত বারিয়ে দেয়া ছাড়া।
তোমরা এখন কষ্টে থাক এই কারনে যে, হয়ত কোন এক ছেলে কোন এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, হয়ত কষ্টে থাক পিতামাতার অনুশাসনের কারনে, হয়ত তোমরা কষ্টে আছো পরিশ্রম করতে না চাওয়ার ইচ্ছায় অথচ কোন পরিশ্রমের কষ্টের কারনে, হয়তবা কষ্টে আছো তোমরা বেশি ইমোশনাল ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারছ না বলে। তোমরা অভিমানি, তোমরা অভিমান করতে পার তাই কষ্টে আছো। স্বাধীনতা কি হয়ত তোমরা জানো না বলে আমি স্বাধীন নই এই মনে করে কষ্টে আছো। একটা গান তোমাদের কষ্টকে বারিয়ে দিতে পারে, একটা মুভি তোমাদের মনকে কয়েকদিন আবেগের বশে কষ্টে রাখতে পারে, একটা পরীক্ষার খারাপ ফলাফল তোমাদের মনকে কষ্টে রাখতে পারে। তোমার ছোটভাই কিংবা বোনের সাথে তোমার বনিবনা হচ্ছে ভেবেও তোমরা আজ অনেক কষ্টে আছো বলে মনে হতে পারে। এগুলু আসলে কোন কষ্টই না। তোমরা অবাধ স্বাধীনতার নামে নিজেদের সতীত্বকে অকালে বিসর্জন দিয়ে কষ্টে থাক, তোমরা সময়ের কাজ না করার কারনে তোমাদের পিতামাতারা তোমাদেরকে একঘরে করে রাখছে বলে কষ্টে আছো। তুমি অঢেল পয়সা খরচ করতে পারছ না বলে হয়ত কষ্টে আছো। তোমার পাশের বন্ধুর দামী জামা দেখে তোমার মন খারাপ হয় বলে তোমরা কষ্টে আছো। কখনো মেঘলা আকাশ দেখলে কষ্টে থাক, আবার ভরা পূর্ণিমায়ও তোমরা কষ্টে থাক। বন্ধুদের সঙ্গ না পেলে কষ্টে থাক আবার বন্ধুদের সঙ্গ পেলেও কষ্টে থাক। কাউকে ভালবেসে কষ্টে থাক আবার ভালবাসা না পেলেও কষ্টে থাক। কোন কিছুতেই তোমরা সুখি নও। সব কিছুতেই তোমরা কষ্টে আছো। কষ্টে আছো এতা বলতেই যেন তোমরা ভাল মনে করো।
কিন্তু কখনো কি একবারও ভেবেছ যে, কি করা উচিৎ ছিল আর কি করা হচ্ছে? তাহলে এই কষ্টে থাকার জন্য তো তুমি অন্য কাউকেই দায়ি করতে পার না। তোমার এই কষ্ট একটা আধুনিক কালের হতাশা ছাড়া আর কিছুই না। অথচ জীবনে কষ্ট লাঘব করার জন্য তুমি কিছুই করছ না।
তোমার এই কষ্টের জন্য আমি একটুও অনুশোচনা করি না। শুধু আমার কষ্ট হয় তোমরা তোমাদের কষ্টের লাঘবের কোন প্রতিশ্রুতির কথা বল না বলে। আমি অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকলাম তার এই ভাবনার জন্য। কত উচুতে বসে তিনি কত নিচু স্তরের ভাবনার কথা গুলো বলছেন।
আমার আর কিছুই বলার ছিল না।
মীরপুর গোলারটেক, ঢাকা
শহরের পহেলা বৈশাখ আমার কাছে ভাল লাগুক আর নাই বা লাগুক, যখন দেখি আমার সন্তানেরা তাদের ভাই বোনদের নিয়ে, কাজিনদের নিয়ে কিংবা ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এক আনন্দের পরিবেশে হৈচৈ করছে, মনে হয় পহেলা বৈশাখই হোক আর চৈত্র মাসের গরমের অনুষ্ঠানই হোক অথবা কারো জন্ম-বিবাহ কিংবা ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করার উপলক্ষই হোক, খারাপ কি? অন্তত পরিবারের মানুষগুলো তো আনন্দ করছে। সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। মন ভাল হয়ে যায়, যাই রান্না হোক তৃপ্তির সাথে ভাগাভাগি করে হৈহুল্লুর করে সময়টা কেটে যায়। অনেক ব্যস্ততার মধ্যে সবাই কিছুক্ষন সময়ের জন্য হলেও একসঙ্গে থাকা যায়।
আমাদের এই ব্যস্ত সময়ের মধ্যে তিন চার বছরের বাচ্চাটাও তার লেভেলে ব্যস্ত। অংক কোচিং, বাংলা কোচিং, ইংরেজি কোচিং, ক্লাস পরিক্ষা, ফাইনাল পরীক্ষা, পরাশুনা, রুটিন ক্লাস, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, আহ আরও যে কত কিছু। সবাই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মাঝে তবুও তো ভেলেন্টাইন্স ডে এর নামে, ফাদারস ডে নামে, মাদারস ডে নামে, যেই নামেই হোক না কেন, কিছু তো সময় পরিবারের মানুষগুলো একটা সময় বেছে নেয় যেন পরিবারের সবার সঙ্গে একসাথে একটা সময় কাটানোর উপলক্ষ নিয়ে ছুটে চলে আসে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, দেশ থেকে অন্য দেশে, নিজের মানুষদের দেশে, নিজের পরিবারের দেশে। আগে তো আমরা বড়দের সালাম করতাম আর সালামের জন্য মনে একটা বাসনা থাকতো সালামি পাব, আদর পাব, আদরটা তখন খুব বেশি বুঝতাম না, সালামিটাই ছিল মুখ্য বিষয়। আজ আমি সালামি কেউ না চাইলেও সালামি দিতে পছন্দ করি। আমি আমার সেই ছোট বেলার অনুভুতি গুলোকে মনে করে বিষণ্ণ হলেও মনে এক আনন্দ পাই।
আজকে আমাকে ‘তুই’ বা ‘তুমি’ করে বলার লোকজনও কমে যাচ্ছে, এক সময় হয়ত আসবে ‘তুই’ করে বলার লোকগুলো আর কাছাকাছি থাকবেই না। হয়ত এই ইলিশওয়ালা পহেলা বৈশাখের জন্যই হোক আর যে কোন ডে এর উপলক্ষেই হোক, এইসব আপনজনগুলো তো একটা সময় করে কাছে আসে। আর এই কারনেই কোন ডে এর বিপক্ষে আমি না। নির্মল আনন্দটাই আমি খুজে নিতে চাই এইসব উপলক্ষগুলোর মধ্য থেকে। কোনটা ক্রিস্টিয়ান আর কোনটা এরাবিক কিংবা কোনটা হিন্দুয়ানী আর কোনটা বাঙ্গালির সেভাবে আমি দেখতে চাই না। আমি চাই এই ছবিগুলোর মধ্যে সবার মনে যে আনন্দ, যে ভালবাসা আর যে তৃপ্তির চেহারা ফুটে উঠেছে, সেটাই সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান আমার কাছে। এরা কেউ বিদেশ থেকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য সময় বেছে নিয়েছে, কেউ পরাশুনা আগে থেকেই শেষ করে নিরঝলা আনন্দের জন্য ভাইবোন, শ্বশুর শাশুড়ি, খালা, খালু, ননদ ননদিনী, দুলাভাই, শ্যালক, সব বয়সের এক অপরূপ পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে ছুটে এসেছে। এর থেকে আর বড় কি অনুষ্ঠান হতে পারে? হোক সেটা পান্তা ইলিশের পহেলা বৈশাখ অথবা হোক সেটা ভ্যালেন্টাইন্স ডে। বেলা শেষে এই আনন্দটুকুই দরকার। সবার জন্য আমার ভালবাসা।
৬৮/৬, মীরপুর গোলারটেক, ঢাকা-১২১৬
আজকাল পহেলা বৈশাখ আমাকে খুব বেশি পুলকিত করে না। কিংবা পহেলা বৈশাখের জন্য আগের দিন বাজার ঘুরে ঘুরে দেশি বা বিদেশী ইলিশ কিনে এনে পরের দিন পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত খেতে হবে এই অনুভুতিতে আমার মনে খুব আনন্দের শিহরন জাগায় না। কিংবা লাল বা হলুদ পাড়ের শাড়ীর অপরূপ সৌন্দর্যে শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা রমণীদের দলবেঁধে হাটাহাটি, পার্কে ময়দানে মেলায় ঘুরাঘুরি আমার মনকে যে পুলকিত করে তাও না। এর মানে এই নয় যে পহেলা বৈশাখ আমি মানি না বা কেউ মানলে সেটা আমার পছন্দের নয়। কিন্তু আমি যা মিস করি তা হচ্ছে-পহেলা বৈশাখের দিনে আমার সেই ছোট বেলার আনন্দের মেলার অনুভুতি, মেলার সকালের আয়োজন আর হৈচৈয়ের মুহূর্ত গুলো। হতে পারে এই কারনে যে, এখন বয়স হয়ে গেছে, আমাদের সেই পহেলা বৈশাখের মেলার অনুভুতি এখন আর সেই অনুভুতি নাই কিংবা মেলার ধরন পালটে গেছে এই কারনে।
সকাল থেকে মেলার জায়গায় হরেক রকমের দোলা, কাছের নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন, হাটে হাটে মাঠে ময়দানে মাটির তৈরি পুতুল, বাঁশি, খেলনা, আরও যে কত কিছুর আয়োজন দেখেছি তার কোন পরিসীমা নাই। সকাল হতেই আমরা যারা ছোট ছিলাম, মেলায় যাব এই আনন্দে নদীতে গিয়ে কেউ উলঙ্গ হয়ে কেউ বা আবার কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে কিছুক্ষন কি যে লাফালাফি করতাম এখন ভাবলে সত্যি হাসি পায়। আমার মনে পরে না পহেলা বৈশাখের জন্য আমরা বাসায় ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা খেয়েছিলাম কিনা। জীবনের অনেকগুলো বছর আমি আমার গ্রামে কাটিয়েছি কিন্তু কোনদিন দেখি নাই ইলিশ মাছ পহেলা বৈশাখের একটা প্রধান উপকরন হয়েছিল। বরং পুটি মাছের শুটকি দিয়ে মা ঝাল ভর্তা বানাতেন, গরম গরম দেশি চালের ভাত রাঁধতেন, আলু ভর্তা কিংবা ঘরের চালে, গাছের ঢালের ফলন্ত কিছু সবজি কেটে গরম গরম ভাজি দিয়ে মা আমাদের নাস্তা করিয়ে দিতেন। সারাদিন কোথায় থাকি কি খাই, কখন খাই, এই চিন্তায় মা আমাদেরকে পেট পুরে খাওয়াইয়া দিতেন যাতে আনন্দের ছলে কোথাও কিছু না খেলেও ক্ষুধা না লাগে। পান্তা ভাত তো সব সময়ই খাই, এটা কোন বিশেষ উপকরন নয় যে, ঘটা করে পান্তা পেতে রাখতে হবে আর সেই ভাত পহেলা বৈশাখে খেয়ে মেলায় যেতে হবে। চাইনিজ নববর্ষে যেমন চাইনিজরা চাইনিজ তৈরি করে পহেলা চাইনিজ পালন করে না, ইংরেজি নববর্ষে যেমন ইংরেজরা ইংলিশ খাবার তৈরি করে পহেলা জানুয়ারি পালন করে না, তেমনি বাংলাদেশের মুল ধারার বাঙালিরাও পান্তা ভাত খেয়ে পহেলা বৈশাখ পালন করতে আমি দেখি নাই।
এই দিনে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পন্য নিয়ে আমাদেরই গ্রামের চেনাজানা লোকেরা মাথায় বেতের ঝুরি নিয়ে হরেক রকমের মাটির খেলনা, বেতের খেলনা, প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে মেলার মাঠে চলে আসতেন। দেখা যেত আমাদেরই ক্লাসে পরে কোন এক বন্ধু তার বাবার সঙ্গে অই সব সামগ্রী নিয়ে দোকানে বসে গেছে। আমরাও তার সঙ্গে ক্রেতা বিক্রেতা হয়ে যেতাম। বাড়ীর গিন্নীদের বাড়িতে তৈরি গাছের বিভিন্ন ফল মুলাদি দিয়ে বানানো মিস্টি আচার, তেঁতো আচার, কিংবা ঝাল ধরনের আচার বানিয়ে মহিলারাও কেউ কেউ মেলায় নিয়ে আসতেন। আমাদের পকেটের বাজেট হয়ত বা চার আনা, আট আনা, কিংবা বেশি হলে এক টাকা দু টাকাই থাকতো। সেতা আবার পহেলা বৈশাখের অনেক আগে থেকেই বরদের কাছ থেকে চেয়ে কিংবা মায়েদের কাছ থেকে অনুনয় বিনয় করে নিতে হত। নাগরদোলায় উঠার জন্য কত যে লাইন ধরে থাকার অপেক্ষা। পরিচিত কোন এক বড়রা হয়ত আদর করে কাউকে কাউকে বিনা পয়সায়ই দু একবার নাগর দলায় আমাদেরকে সুযোগ করে দিতেন। কোন পয়সা নিতেন না।
চারিদিকে বাঁশীর উচ্ছৃঙ্খল শব্দ, যার যার মত করে যা খুশি বাজিয়েই চলছে, হৈচৈ এর শেষ নাই। যে বাচ্চাটি এক বছরেরও বয়স, পহেলা বৈশাখ না বুঝলেও সেও হয়ত তার বাবা, মা কিংবা বোনের ভাইয়ের কোলে চরে মেলায় চলে এসেছে। হারিয়ে যাওয়ার ভয় নাই, বাড়ীতে ফেরার জন্য পরিচিত লোকের কোন অভাব নাই, চুরি ডাকাতির বালাই নাই, ছিনতাইয়ের কোন মনোভাব নাই, এক অনাবিল আনন্দ আর মেলা।
মেলাশেষে ঘরে ফেরার আরেক রূপ। দলবেধে পাশাপাশি গ্রামের আইল ধরে বাড়ি ফেরা। হাতে হাতে বাঁশি, পুতুল কিংবা অতি নগন্য অথচ মনে হয় অতি প্রিয় কিছু খেলনা হাতে নিয়ে নিয়ে গ্রামের মেঠো পথ ধরে দিনের শেষ বিকালে কিংবা সন্ধার আবছা আলোছায়ায় ঘরে ফেরা, ঘরে ফিরে একে অপরের নব্য কেনা সরঞ্জামাদি দেখাদেখি করে কখনো মন খারাপ করার মত অনুভুতি, যেন, আহা আমি কেন ঐ জিনিসটা কিনতে পারি নাই, কিংবা আহা আমি কেন দেরি করে মেলায় গেলাম যে আমার বন্ধু রহিমের কেনা বাশিটা আমি কেনার আগেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
বোনদের কেনাকাটা একরকম, আমাদের ছেলেদের কেনাকাটা ছিল অন্য রকমের। বোনেরা কেউ লিপিস্টিক, মাথার ফিতা, তিব্বত ব্রান্ডের স্নো পাওডার, আলতাও মিস যায় নাই। কেউ কেউ আবার কাছে হরেক রকমের চুড়ি, পায়ে পরার অদ্ভুত ডিজাইনের পায়রা কত কিছুই না কিনত আমাদের বোনেরা। আমার মনে পরে মেলা থেকে কেনা সরঞ্জামাদি আমরা কেউ কেউ ঘুমানোর সময় পাশে বালিশের কাছেই রেখে ঘুমাতাম যেন কতই না মুল্যবান সম্পদ। আবেগটাই আলাদা।
বড়রা কেউ কেউ পাঞ্জাবি পরে একে অপরের সঙ্গে চা বিড়ি টানতে টানতে দিনের অনেকটা সময় পার করে দিয়েছেন। দিনশেষে তারাই হয়তা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেনা কাটার সামগ্রীর আনন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামের কিছু জোয়ান ছেলেপেলের দ্বারা আয়োজিত কোন এক গানের আসর কিংবা মল্লযুদ্ধের অনুষ্ঠান করতেন। নৌকা বাইচের শেষে উঠতি বয়সের ছেলেরা পাড়ার মুরুব্বিদের সঙ্গে জিতে আনা পুরুস্কারের সঙ্গে বীর বীর অনুভুতির একটা ভাব থাকতো। এ এক মেলা যার মাধ্যমে এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের ভাবের সৃষ্টি হত, বন্ধন মজবুত হত, নতুন নতুন সম্পর্কের হাল ধরে আরেক বছরের হালখাতা তৈরি হত। হালখাতা তৈরি হত ব্যবসার, হালখাতা তৈরি হত নতুন নতুন সম্পর্কের। এভাবেই আমি আমার সেই ছেলে বেলার বৈশাখী মেলার আনন্দটা উপভোগ করেছিলাম।
আজ আমি সেটা খুব মিস করি।
সাফল্যের পথ কখনোই ইস্পাতের মতো এতো নিখুত নয়। এই সাফল্যের দরজায় যেতে হলে অনেক কঠিন দূর্গম পথ বেয়ে বেয়েই উপরে উঠতে হয়। আর এটা একদিনেই হয়ে যাবে এটা আশা করা শুধু বোকামিই নয়, এটা একটা মূর্খতাও। সাফল্যের শেষ প্রান্তে যেতে যেতে পথে কত যে কুকুর, কত যে হিংস্র পশু, কত যে দাবানলের মতো অগ্নিজলা বন, আর প্রাকৃতিক ঝড় পেরুতে হয়, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। যারা আজ বড় হয়েছে, তাদের প্রতিটি জীবনের কাহিনী কোথাও না কোথাও এক। সাফল্যের এই গন্তব্যপথে যেতে যেতে একটা কথা মনে রাখা অতীব বাঞ্চনীয় যে, কেউ বন্ধু হয়ে শত্রুর আচরন করতে পারে আবার কেউ শত্রু হয়েও শত্রুর মতো আচরন নাও করতে পারে। অনেক কুকুররুপী মানব, কিংবা অনেক মানরুপী কুকুরও সারাক্ষন ঘেউ ঘেউ করতেই পারে, কিন্তু এসব কুকুরদেরকে, হায়েনাদেরকে প্রতিটি ক্ষেত্রে পাথর মেরে মেরে যদি সামনে এগুতে হয়, তাহলে সাফল্যের গন্তব্যপথের নিশানা ভুলে যাবার সম্ভাবনা থাকে। থাকে দিক নির্দেশনা হারিয়েও যাওয়ারও। তাই, কুকুর থাকবে, কুকুরের ঘেউ ঘেউ থাকবে, তার মানে এ নয় যে, প্রতিটি কুকুর, আর প্রতিটি বাধাকে মনোযোগ দিতে হবে। জানতে হবে ঠিক সথিকভাবে, কোন বাধাকে সরাতে হয়, আর কোন বাধাকে কোনো মনোযোগ দেবার কোনই প্রয়োজন নাই।
সাফল্যের এই চাবিকাঠির আরেকটা প্রধান দিকনির্দেশনা হচ্ছে, নিজের মুখকে নিয়ন্ত্রন করা। মুখ এবং এর দ্বারা ছুড়ে দেয়া ভাষা এমন এক অস্ত্র যা একবার ছোড়া হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। আর এর ফলে টার্গেটে কতটা ক্ষতি হলো তার থেকে বেশি ক্ষতি হয়ে আসে নিজের ফলাফল। যে কোন পরিস্থিতিতেই কেউ যখন এমন এক অবাধ্য যন্ত্রের মতো মুখের বুলি বুলেটের মতো কেউ ছুরে দিয়ে ভাবে, সে অনেক ভাল কাজ করে ফেলেছে, এটা হয়তো মনের শান্তনার জন্য যথেষ্ট কিন্তু সাফল্যের বড় অন্তরায়। ফিরিয়ে নেয়ার কোনো পথা খোলা থাকে না বলে হয় তার জন্য ক্ষমা চাওয়া নতুবা ব্যর্থতার গ্লানি মাথায় নেয়ার সামিল হয়ে উঠে। শুধু তাইই নয়, এটা চিন্তা করাও বোকামি যে, সবাই ছুড়ে দেয়া পরিত্যক্ত বানীর বিপরীতে ক্ষমা মেনে নেবে বা ক্ষমা করে দেবে। এ চিন্তাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই এই সুলভে পাওয়া যন্ত্র দ্বারা অসুভ কোন নির্মম কথাও আমাদের চিরদিনের স্বপ্নের উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে অনেক ভেবে চিনতে এর প্রয়োগ করা উচিত।
সাফল্যের পথে যতো বেশী পরিমান বিশ্বস্ততা অর্জন করা যায়, ততো সহজ হয়ে উঠে দূর্গম গিরিপথের সেই সাফল্য ভ্রমন। আর এই বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশী যা কার্যকরী ভুমিকা রাখে তা হল, প্রতিনিয়ত সত্যকে আকড়ে ধরে থাকা। একটা মিথ্যা বা একটা অর্ধ মিথ্যাই যথেষ্ট সব বিশ্বস্ততা হারিয়ে ফেলার জন্য। আর একবার যদি এই মিথ্যার জালে কেউ বাধা পড়ে, তখন আর যাইই হোক সাফল্যের দেখা পাওয়া অনেক আওহজ হয়ে উঠে না।
আরো একটা অদৃশ্য শক্তি সবার অগোচরে প্রতিনিয়ত কাজ করে। আর সেই মহাশক্তিধর গোপন শক্তিটি হচ্ছে, নিগূড় ভালবাসার বহিরপ্রকাশ। ভালোবাসা হচ্ছে একটা আংটির মতো। এর যে কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ কেউ বলতে পারে না কিন্তু এর উপস্থিতি সার্বোক্ষনিক উপলব্দি করা যায়। ভালোবাসার বহিরপ্রকাশ যতো বেশী প্রখর, বিশ্বস্ততা অর্জন ততো সহজ, বিশ্বস্ততা যতো বেশী সহজ অনিয়ন্ত্রিত ভাষা ততো নিয়ন্ত্রিত। আর এই ভাষা যতো নিয়ন্ত্রিত, ভালো বন্ধুর সংখ্যা ততো বেশী। ভালো বন্ধুর সংখ্যা যতো বেশী, দূর্গম গিরিপথে সহচর ততো বেশি। দূর্গম পথে যতো বেশি ভাল সহচর, পথ ততো সহজ। আর এখানেই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তবে একটা ভয়ের মতো উপসর্গ থেকেই যায় এখানে। কেউ কেউ ভাল বন্ধু হতে পারে বটে কিন্তু সবাই ভাল ভ্রমনসংগী হয় না। এই সংগী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ক্রাইটেরিয়া জানা থাকা বড্ড বেশী জরুরী। যেমন, সৌন্দর্য এবং সুন্দর চেহারার সব মানুষই ভাল হবে এই কথাটা ঠিক নয় কিন্তু সব ভাল মানুষই সুন্দর মনের।
সাফল্য যখন ধীরে ধীরে কাছে আসতে থাকে, এর একটা রুপ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। আর সেটা হচ্ছে ক্ষমতা। সাফল্যের ওজন যতো বেশী, ক্ষমতার ভার ততো বেশী। তাই, যখন ক্ষমতার ধার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রন যদি ততোতা না রাখা যায়, এক সময় অনিয়ন্ত্রীত ভারে তা চুরান্ত রুপ পাবার আগেই ভুমিতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য সবসময় মনের মধ্যে এই ভাবনা থাকা খুব জরুরী যে, ক্ষমতা শুধু মানুষকে ক্ষমতাই দেয় না, এটা দিয়ে মানুষকে ক্ষতিও করা যায়। তাই ক্ষমতার সাথে ভালবাসার শক্তিকে বেধে ফেলা অনেক দরকার। কারন ভালবাসা দিয়ে কোনো মানুষের কখনো ক্ষতি হয়েছে এমন নিদর্শন ইতিহাসে নাই। তাই শুধু ক্ষমতা নয়, ভালবাসার ক্ষমতা প্রয়োগ হচ্ছে সাফল্যের সেই গোপনশক্তি যার দ্বারা জগত সুন্দর হয়। এর দ্বারা সুখী আর আরামদায়ক ফলাফল হাতের মূঠোয় আসে। তাতে আনন্দের সাথে আসে সুখ। সুখী হতে গেলে তাই জীবনে এমন অনেক অপ্রয়োজনিয় জিনিষ ভুলে যেতে হয়।
আমি সব সময় সক্রেটিসের সেই কথাটার সাথে একমত হতে পারি নাঃ যার কাছে টাকা আছে তার কাছে আইন খোলা আকাশের মত আর যার কাছে টাকা নাই তার কাছে আইন মাকড়শার জালের মত। এটা হয়তো কিছু সাময়িক সময়ের জন্য ঠিক কিন্তু লম্বা ইতিহাসে এর সত্যতা অনেকাংশেই বিলুপ্ত হয়েছে। এমন কি সক্রেটিসের বেলায়ও।
আমার প্রিয় মা জননীর দল,
আমি জানিনা যখন তোমরা আমার এই পত্রখানা পড়িবে তখন তোমাদের কত বয়স হইবে কিংবা আদৌ তোমরা এই পত্রখানা পরিতে পারিবে কিনা কিংবা পড়িলেও কখনো এর মর্মার্থ তোমরা বুঝিতে পারিবে কিনা। আর বুঝিতে পারিলেও কিভাবে এর অর্থ বুঝিবে তাও আমি জানি না। তবুও আজ মনে হইল তোমাদের উদ্দেশে আমার কিছু কথা বলা দরকার যাহা আমার মা আমাকে প্রায় দুই যোগ আগে বলিয়াছিলেন। আমি আমার “উচ্ছিষ্ট সময়ের ডায়েরি” নামক ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এই মুহূর্ত গুলি লিখিয়াছিলাম। তাহা আমি আজ তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করিতে চাই।
“…………আজ হইতে প্রায় দুইযুগ আগে আমি যখন আমার মাকে আমার প্রথম ভালবাসার মেয়ের কথা জানাইয়াছিলাম, তখন তিনি মুচকি হাসিয়া আমাকে বলিয়াছিলেন, কে কাহাকে কত বেশি ভালবাসে তাহা কি তুমি ভাবিয়াছ? তুমি কি তাহাকে বিবাহ করিতে চাও? নাকি শুধু মনের আবেগে তোমার একাকীত্বকে দূর করিবার আখাংকায় তাহার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাইতে চাও? মজার ব্যাপার হইল, আমার মা মেয়েটি কতখানি সুন্দর, তাহার বাবার কি পরিমান সম্পদ বা সম্পত্তি আছে, তাহারা কয় ভাইবোন কিংবা তাহার পারিবারিক আর কোন তথ্য উপাত্ত কিছুই জানিবার জন্য আমাকে প্রশ্ন করিলেন না। শুধু বলিলেন, এ ব্যাপারে আমি কাল তোমার সঙ্গে আবার কথা বলিব এবং তোমার মনোভাব জানিব।
আমার মায়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল এবং আমি তাহার সঙ্গে সব কথাই অকপটে বলিতে পারিতাম। মা ঐ কথাগুলি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলিয়া আমাকে আমার মত করিয়া ভাবিবার সময় দিলেন আমার মা। আমার মা শিক্ষিত নন। তিনি হয়ত তাহার জীবনে প্রাইমারী স্কুল পার করিয়াছেন কিনা তাহাও আমার জানা নাই। কারন তাহার বিয়ে হইয়াছিল যখন তাহার মাত্র ১০ বছর বয়স। নিতান্তই একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে। কিন্তু তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমতী এবং প্রাক্টিক্যাল একজন মা। আমার বড় প্রিয় মানুষ তিনি।
পরেরদিন আমি আর আমার মা আমাদের বাড়ির আঙিনায় বসিয়া আছি। বিকালের রোদ অনেকটাই কমিয়া গিয়াছে। সন্ধ্যা হইতে আরও কিছু বাকি। আমাদের বাড়ির বড় বরই গাছের মাথায় অনেক পাখির বাসা আছে। পাখিদের কিচির মিচির শব্দ হইতেছে অহরহ। কিচির মিচির করিয়া পাখিদল যে কি কথা কাহাকে বলিতেছে তাহা বুঝিবার ভাষা বা ক্ষমতা আমাদের কাহারো নাই। এইদিক সেইদিক উরাউরি করিতেছে আর যার যার বাসায় তাদের স্থান করিয়া নিতেছে। দূরে গাছ গাছালিগুলি আস্তে আস্তে সন্ধ্যার ক্ষিন আলোতে ধুসর থেকে আরও কালো বর্ণের রঙ ধারন করিতেছে, বাড়ির গৃহস্থালিরা তাহাদের নিজ নিজ গরু ছাগল ভেড়া লইয়া গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিতেছে। কেউ কেউ আবার মনের আনন্দে সেই আব্দুল আলিমের ভাটিয়ালী কিছু গানের সুরে গানও গাইতেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠ হইতে খেলা ছারিয়া কেউ জোড়ায় জোড়ায় আবার কেউ দল বাধিয়া বাড়ির অভিমুখে হারাইয়া যাইতেছে। কিছু বয়স্ক মানুষ মাথায় কিছু মাল সামানা লইয়া হয়ত বা শহর কিংবা কাছের বাজার হইতে সদাই করিয়া তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়া যাইতেছে। দিনের শেষলগ্নে গ্রামের কিছু উঠতি বয়সের বধুরা অদুরে আমাদের ধলেশ্বরী নদী হইতে কাঁখে জল তুলিয়া কলসি ভরতি পানি লইয়া, ভিজা কাপড়ে হেলিয়া দুলিয়া মুচকি মুচকি হাসিতে আবার কখনো কখনো উচ্চস্বর আওয়াজে নিজেদের ঘরে আগমন করিতেছে। অদুরে কোন এক সদ্য প্রসব করা গাভি তাহার অবুঝ বাছুরটির সন্ধান না পাইয়া অবিরত হাম্বা হাম্বা করিতেছে। এমন একটি পরিবেশে আমি আর আমার মা মুখুমুখি বসিয়া আছি। বেশ সময় কাটিতেছে আমার।
মা সর্বদা পান খান, মায়ের পানের বাটি যেন তাহার দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মত একটি অংশ। যেখানে যাইবেন, সেখানেই তিনি তার এই অতিব প্রয়োজনীয় সম্পদটি সঙ্গে রাখিবেন। পানের বাটিটি ব্যতিত যেন মায়ের কোন কিছুই আর এত মুল্যবান সম্পদ আমাদের ঘরের মধ্যে নাই। পানের বাটিতে মা তাহার ছোট পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষিতেছেন, যেন অনেক যত্নের সহিত তিনি একটি খাদ্য রিসিপি বানাইতেছেন। পানের বাটির সঙ্গে পিতলের ডান্ডাটি ঠক ঠক আওয়াজে এক রকম টুং টাং শব্দ হইতেছে। এই রকম একটি পরিবেশে মা আমার দিকে না চাহিয়াই প্রশ্ন করিলেন, “কে আগে ভালবাসার কথা বলিয়াছিল? তুমি না সে?” মা আমাকে নিতান্ত সহজ সুরে যেন কিছুই হয় নাই এমন ভাব করিয়া প্রশ্নটি করিলেন। আমি বলিলাম, “কে আগে ভালবাসার কথা বলল, এতে কি আসে যায় মা? আমরা দুজন দুজনকেই তো ভালবাসি? সে আমাকে ভালবাসে আর আমিও তাকে ভালবাসি”। মা বলিলেন, আমার উপর ভরসা রাখ। আমি তোমাদের দুইজনকেই ভালবাসি যদিও আমি তাহাকে দেখি নাই কিন্তু তুমি তাহাকে ভালবাস। আর তুমি তাহাকে ভালবাস বলিয়াই আমি তাহাকেও ভালবাসি। কিন্তু তুমি তো আমার প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাইতেছ বলিয়া আমার মনে হইল।”
আমি বললাম, “না মা। আমি তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি না। তবে আমি প্রথম তার কাছ থেকে পত্র পাইয়াছিলাম সেইটা বলিতে আমার কোন দ্বিধা নাই। আমি পত্র পাইয়া বুঝিয়াছিলাম, যে, আমি ওকে ভালবাসি কিন্তু আমি বলিতে পারি নাই। সে বলিতে পারিয়াছিল। তাহার মানে এই নয় যে, আমি তাহাকে কম ভালবাসি বা আমি তাহাকে ভালবাসি নাই।”
মা আমার মাথায় হাত বুলাইয়া, আমার পিঠে তাহার একটি হাত চালাইয়া আমার নাকের ডগায় আলতো করিয়া টীপ দিয়া বলিলেন, “তুমি তোমার জায়গায় ঠিক আছ তো? যদি ঠিক থাক, আমি চাই তুমি তাহাকে শাদি কর। তুমি সুখী হইবে”।
আমি অবাক বিস্ময়ে আমার মায়ের দিকে তাকাইলাম, সন্ধ্যার অল্প অল্প আলোতে আমি তাহার চোখে মুখে যেন এক প্রশান্তির ছায়া দেখিতে পাইলাম, তিনি একদিকে তাহার ঘাড় বাকা করিয়া পানের বাটি হইতে পান লইয়া কিছু পিষিত পান নিজের মুখে পুড়িয়া আর বাকি কিছু পান আমার গালে পুড়িয়া দিয়া বলিলেন, “নে পান খা, ভাল লাগিবে। মায়ের দোয়ায় সন্তান সুখী হয়, তুইও জীবনে সুখী হইবি।”
আমি পান মুখে লইয়া অবাক দৃষ্টিতে মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, তুমি কিভাবে আমার পছন্দের মেয়েকে না দেখিয়া, তাহার পরিবারের কারো কোন তথ্য না শুনিয়া, তাহার পরিবারের কোন ইতিহাস না জানিয়া এই সন্ধ্যায় এক নিমিষে জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিয়া আমাকে সুখী হইবে বলিয়া আশীর্বাদ করিলে?”
মা পানের পিক ফালাইতে ফালাইতে আমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন, ” ভালোবাসার স্থায়িত্ব তাহার উপর নির্ভর করেনা, যাহাকে সে ভালবাসে, নির্ভর করে তাহাকে যে ভালবাসে তাহার উপর। সে তোমাকে ভালবাসিয়াছে প্রথম, তোমাকে ছাড়িয়া যাওয়ার কোন কারন না থাকিলে সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিবে এইটাই হওয়ার কথা। তুমি যাহাকে ভালবাস তাহাকে নয়, তোমাকে যে ভালবাসে তাহাকে তুমি তোমার জীবন সঙ্গিনী কর। তাহা হইলেই তুমি সুখী হইবে। আর ইহাই হইতেছে দাম্পত্য জীবনের সত্যিকারের রূপরেখা।’
আমি আমার মায়ের এত বড় দর্শন শুনিয়া খুব অবাক হইয়াছি। কি অদ্ভুত দর্শন।
মা বলিতে থাকিলেন, কাউকে কখনো তুমি তোমাকে ভালবাসার জন্য জোর করিবে না, বরং তোমাকে কেউ ত্যাগ করুক সেই ব্যাপারে কাউকে জোর করিতে পার। যখন জোর করিয়াও তাহাকে তুমি ত্যাগ করাইতে পারিবে না, নিশ্চিত থাকিবে যে, সে তোমাকে সত্যি ভালবাসে। তাহাকে তুমি তখন আরও বেশি করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিবে কারন সে তোমাকে ভালবাসে। যে তোমাকে সত্যিকার ভাবে ভালবাসে, শত কারন থাকা সত্তেও সে তোমাকে কোনদিন ছাড়িয়া যাইবে না। বরং সে একটিমাত্র কারন খুজিবে যে কারনের দ্বারা সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিতে পারে, ত্যাগ করিবার জন্য নয়। আর ইহাই হইতেছে প্রকৃত ভালবাসার দুর্বলতা। তুমি তাহার সঙ্গে জীবনে সুখী হইবে।
আজ এত বছর পর আমি উপলব্দি করিতে পারিতেছি যে, আজ হইতে প্রায় দুই যুগ আগে আমার সেই অশিক্ষিত মা যে দর্শন শুনাইয়াছিলেন, তাহা কতখানি সত্য এবং খাটি। আজ আমি আমার জীবনে এক অদ্ভুত সুখ আর আনন্দ লইয়া প্রতিটি দিন অতিবাহিত করি। কারন আমার সঙ্গে আছে সেই মানুষটি যে আমাকে ভালবাসিয়াছিল এবং আমিও তাহাকে ভালবাসিয়াছিলাম। কিন্তু সে আমাকে প্রথম ভালবাসার কথাটি বলিয়াছিল।
মা আরও একটি আস্ত পান তাহার অতি প্রিয় পানের বাটিতে সুপারি আর মশলা দিয়া পিষিতে লাগিলেন। আমার দিকে না তাকাইয়াই তিনি বলিতে থাকিলেন, তুমি নিশ্চয় জানো, একটা ব্রিজ বানাইবার জন্য যা যা লাগে আর একটা দেওয়াল বানাইবার জন্য যা যা লাগে তা একই উপকরন। কিন্তু একটি ব্রিজ দুইটি প্রান্তকে সংযোগ করে আর একটি দেওয়াল দুইটা প্রান্তকে পৃথক করিয়া দেয়। তোমাদের এই যুগলমিলন হইতে হইবে একটি ব্রিজের সমতুল্য। দেওয়াল নয়। এখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হইবে তুমি কোনটা চাও এবং কিভাবে চাও আর কখন চাও। দাম্পত্য জীবনে এমন কিছু সময় আসিবে যখন তোমার কাছে মনে হইবে, সবাই ভুল আর তুমি ঠিক। হয়ত বা তুমিই ঠিক আবার তুমি ঠিক নাও হতে পার। তোমারও ভুল হইতে পারে। মা পানের বাটিতে তাহার পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষানো একটু সময়ের জন্য থামাইয়া আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, একটা হাদিসের কথা বলি, ‘যে ভুল করে সে মানুষ, আর যে ভুল করিয়া তাহার উপর স্থির থাকে সে শয়তান, আর যে ভুল করিয়া আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে মুমিন। ফলে অন্যের কোন কথা শুনিবামাত্রই তাহার উপর উত্তেজিত হইয়া কোন কিছু করিতে যাইও না। কারন, তাহার কথার সত্যতা যাচাই করা তোমার কাজ। তোমার জানা উচিৎ সে তোমাকে ঠিক কথাটিই বলিয়াছে কিনা। সে তোমাকে প্ররোচিতও করিতে পারে। কোন কিছুই বিচার বিবেচনা না করিয়া কোন মন্তব্য করা হইতে সবসময় বিরত থাকিবে। মনে রাখিবা, একবার একটা কথা কিংবা মন্তব্য বলিয়া ফেলিলে উহা আর ফেরত নেওয়ার কোন অবকাশ নাই। তখন শুধু হয় নিজেকে অপরাধী হিসাবে ক্ষমা চাইতে হইবে আর অন্যজন তোমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখিবে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ। নিজের শক্তিকে বিশ্বাস কর। নিজের মানুষদের উপর বিশ্বাস রাখ। বিশ্বাস কর যে, তুমি পার এবং তুমি যা পার তা অনেকেই পারে না। আর অনেকেই যা পারে তুমিও তা পার।
আমার মায়ের কথাগুলি আমার কাছে এক অসামান্য দর্শনের মত মনে হইতেছিল। এত কথা মা কোথা হইতে জানিল, বা কে তাহাকে এইসব দর্শনের কথা বলিল আমি আজও ভাবিয়া কুল পাই না।
অনেক্ষন হইল সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। কিন্তু পশ্চিমের আকাশে এখনো লাল আভা দেখা যাইতেছে। খোলা উঠানে বসিয়া আছি বলিয়া চারিদিকের অনেক মশারাও তাহাদের উপস্থিতির কথা জানাইয়া দিতাছে। আমার মা তাহার দ্বিতীয় পানটি মুখে লইয়া কিছুক্ষন চাবাইয়া লইলেন। এবং তাহার চর্ব্য পান হইতে একটু পান বাহির করিয়া আমার মুখে গুজিয়া দিলেন। আমার মায়ের চাবানো পান আমার বড় প্রিয়।
মা আজ অনেক কথা বলিতেছেন যা আমার কাছে এক নতুন অধ্যায়।
মা বলিতে থাকিলেন, শোন বাবা, জীবনে বড় হইতে হইলে জীবনের সব কয়টি কুরুক্ষেত্রকে তোমার মুখুমুখি হইতে হইবে। তুমি তো অনেক বড় বড় মানুষের জিবনি পড়িয়াছ, তাহাদের দর্শন তথ্য পড়িয়াছ। আজ তাহলে তোমাকে একটা গল্প বলি। একদিন এক ঈদের দিনে আমার বাবা আমাকে একটা নতুন ফ্রক কিনিয়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি তা আমাকে আর দিতে পারেন নাই। হয়ত তাকা পয়সা ছিল না। তাই। আমার খুব মন খারাপ হইয়াছিল। সারাদিন আমার মন আর ভাল হইতেছিলনা। আমার মন খারাপ হইয়াছে দেখিয়া আমার বাবারও মন খারাপ হইয়াছিল। হয়ত তাহারও আমার মত ভিতরে ভিতরে একটা কষ্ট হইতেছিল তাহার এত আদরের মেয়ের মন খারাপ বলিয়া। কি জানি কি হইল আমি জানি না, আমার বাবার এক বন্ধু বিকাল বেলায় আমাদের বাসায় বেড়াইতে আসিলেন। হয়ত বাবাই নিমন্তন্ন করিয়াছিলেন। তিনি আমার বাবার খুব কাছের মানুষের মধ্যে একজন। হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি আমাকে অনেক আদর করিলেন, কেন আমার মন খারাপ তাহা জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি মুচকি হাসিয়া এক বিখ্যাত লেখকের উদ্দ্রিতি দিয়া আমাকে বলিলেন, “আমরা অনেক সময় একজোড়া জুতা না পাওয়ার বেদনায় চোখের পানি ফেলি কিন্তু কখনো কি একবার ভেবে দেখেছ যে, অনেকের তো পা ই নেই?” বলিয়া তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া খুব আদর করিয়া দিলেন। বলিলেন, কালই তিনি আমার জন্য নতুন একটি ফ্রক কিনিয়া দিবেন। তিনি এমন করিয়া আমাকে এই কথাটি বলিলেন, যে, আমি যেন ঐ পা বিহিন মানুষটির চেহারা দেখিতে পাইলাম। তাই তো, কথাটা আমার খুব মনে ধরিয়াছিল। আমার আর মন খারাপ হয় নাই। আমি আর নতুন ফ্রকের জন্য কখনো মন খারাপ করি নাই। আমি বুঝিতে পারিলাম আমার নিজের অবস্থানটা নিয়ে সন্তুষ্ট না হইলে পৃথিবীর কোন কিছুই আমাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না। আমি আমার বাবাকে জরাইয়া ধরিয়া অনেক কাদিয়াছিলাম। দুঃখে নয়, এতক্ষন যে বেদনাটা আমাকে খুব কষ্ট দিতেছিল, সেইটা যে বাবার বাবার বুকের ভিতরে গিয়া বাবাকেও কষ্ট দিতেছিল এই মনে করিয়া আমার চোখ আরও আবেগপ্রবন হইয়া উঠিতেছিল। আমার ছোট্ট বালিকা হৃদয়ের এই অফুরন্ত নিস্পাপ সাবলিল ভালবাসার চোখের জলে আমি আমার বাবাকেও কাদিতে দেখিয়াছিলাম। তাহার কান্নাও কোন কষ্ট হইতে নয়। নিছক ভালবাসার। এইটার নামই পরিবার। এইটার নামই হচ্ছে ভালোবাসা। নিজকে লইয়া সন্তুষ্ট থাক। ইহাতে সুখের পরিমান বাড়িবে। সবসময় একটা উপদেশ মনে রাখিবা যে, নিশ্চয় তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে কোন উদ্দেশ্যবিহিন এই পৃথিবীতে প্রেরন করেন নাই। তার উদ্দেশ্য আমাদের স্বপ্নের চেয়ে অনেক উত্তম এবং তাহার রহমত আমার হতাশার থেকেও অনেক বেশি। ঈশ্বরকে বিশ্বাস কর। তিনি তোমাকে কোন কিছুই না থেকে অনেক কিছু পাইয়ে দেবেন, যা আমার তোমার চিন্তা জগতেরও বাইরে। আর কাউকেই অবহেলা কর না। তোমার অবহেলা করার একটাই অর্থ দাঁড়াইবে, আর সেটা হচ্ছে তুমি তাহাকে তোমাকে ছাড়া চলিতে পারার অভ্যস্থ করিয়া তুলিতেছ। সবাই তোমার মতবাদ পছন্দ নাও করিতে পারে, সবাই তোমার মত করিয়া ভাবিতে নাও পারে। তুমি যে শার্টটা পছন্দ কর, সেই শার্টটা অন্য একজনের পছন্দ নাও হইতে পারে। এই পৃথিবীতে কিছু কিছু লোক তোমার জীবনে আসিবে আশীর্বাদ হইয়া, আবার কিছু লোক আসিবে শিক্ষণীয় হইয়া। আর এইটাই জীবন। তুমি আমাকে কিছুক্ষন আগে একটা প্রশ্ন করিয়াছিলে না যে, আমি তোমার পছন্দের মেয়েটির কোন কিছুই না জানিয়া, তাহার পরিবারের কি আছে আর কি নাই এই সব কিছুই না জানিয়া কিভাবে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিলাম? জীবনে শুধু টাকা পয়সা দিয়াই সব কিছুর মাপকাঠি হয় না। টাকা পয়সা সব কিছু কিনিতে পারে না। টাকায় তুমি আচরন কিনিতে পারিবে না, টাকায় তুমি সম্মান কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি চরিত্র কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি বিশ্বাস, ধৈর্য, শ্রদ্ধা, বিনয় এইগুল কিছুই কিনিতে পারিবা না। টাকা দিয়া তুমি ভালবাসাও কিনিতে পারিবা না। আর এইসব গুণাবলীগুলো তো আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের সবচেয়ে জরুরী বিষয়। যে ভালবাসিতে জানে, তাহার টাকার দরকার হয় না। আধামুঠো অন্ন খাইয়াই তাহার মন ভাল থাকে, তাহার দেহ ঠিক থাকে, তাহার আত্মা তৃপ্ত থাকে। ইহার পরেও আরও কথা থাকে। তোমার এই তৃপ্ত জীবনে তোমার পথে অনেক ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মত মানুষজনও পাবে। জীবনে যদি বড় হইতে চাও, এই সব চরিত্র হইতে সাবধান থাকিতে হইবে। কারন সব কুকুরকে তোমার মনোযোগ দেওয়ার সময় তোমার নাই। এরা শুধু তোমার মনোযোগই নষ্ট করিবে না, তোমার বড় হওয়ার পথে এরা সবচেয়ে বড় বাধা হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে। ইহাদের মধ্যে অনেকেই এই সমাজের কেউ কর্ণধার বলিয়া মনে হইবে, কাউকে আবার সমাজের বিবেচক বলিয়া মান্য করিবে, কেউ আবার প্রথম সারির লোক বলিয়াও গর্ব করিয়া এইদিক সেইদিক প্রচারনা করিয়া বেড়াইবে। উহারা কেউই তোমার শুভাকাঙ্ঘি নহে। শুভাকাঙ্ক্ষী শুধু তোমার একান্ত পরিবার যাহারা তোমার ব্যথায় ব্যথিত হয়, তোমার আনন্দে আনন্দিত হয়, আর তুমি যখন দিশেহারা হইয়া সঠিক সিদ্ধান্ত লইতে অপারগ হওঁ, তখনো তাহারা তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না।
তোমাদের জন্য রইল আমার অফুরন্ত ভালোবাসা আর দোয়া।
বগুড়া যাওয়ার পথে
দুরন্ত গতিতে কখনো আমাদের গাড়ি ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত বেগে চলছে, আবার কখনো কখনো অধিক গাড়ির জটিলতায় একেবারে থেমেই যাচ্ছে। থেমে গেলেও খারাপ লাগছে না। কারন আমি রাস্তার দুই ধারে গ্রামের কি এক অপূর্ব সবুজের রাজত্ব, অনেক দূরে গ্রামের কিনারা দিয়ে বয়ে যাওয়া চিকন চিকন খালের ধারে হরেক রঙের গরু ছাগল, ভেড়া, কচি কচি ঘাস খাওয়ায় মগ্ন, ঐ খালের নোংরা জলে কিছু দুর্দান্ত বালক বালিকা কেউ কাপড় পরে আবার কেউ একেবারে দিগম্বর হয়ে খালের কিনারা থেকে লাফ দিয়ে তাদের বীরত্ব দেখানোর তাগিদে কে কত টুকু দূরে লাফিয়ে পরতে পারে তার প্রাণপণ চেষ্টা করছে ইত্যাদি দৃশ্য আমার মনে এক আনন্দের জয়ার দিচ্ছে। আমি দেখছি, ঐ সব ছোট ছোট বালক বালিকাদের মধ্যে মাঝে মাঝে মধ্য বয়সী কোন অভিভাবক সন্তানের অনিষ্ট না হয় এমন লাফের পায়তারা থেকে উচ্চস্বরে ধমকও দিচ্ছেন। কিন্তু কে কার কথাই বা শুনে। এদের যে বয়স, তাতে দুরন্তপনাই হচ্ছে মূললক্ষ। আমি অনেকক্ষন ধরেই এই অভাবিত দৃশ্য গুলো দেখছি আর আমার সেই শৈশবকালের একই প্রকৃতির দুরন্তপনাগুলো মনে করছি। আহ কি সুন্দর ছিল সেই সব দিনগুলো।
আমার সঙ্গে আমার মেয়েরা আছে। ওরা আধুনিককালের প্রজন্ম। এরা এই সব দৃশ্যের আনন্দের মুহূর্তগুলো বুঝে না। ওরা গাছের সবুজের নিচের আলো বাতাসের খবর রাখে না। ওরা চৈত্রের দুপুরে হেটে হেটে স্কুল থেকে এসে পান্তা ভাতের স্বাদ বুঝে না। ওরা কালবৈশাখী ঝড়ের দিনে আধাপাকা আম কুড়ানোর মজাটা বুঝে না। কিংবা শিলা বৃষ্টির মধ্যে অযথা ছোটখাট বরফের মত শিলা কুড়ানোর মজাটা বুঝে না। ওরা সারাক্ষন ট্যাব আর মোবাইল ফোন নিয়ে রক মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত কিংবা কম্পিউটারে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে গ্রামের কিছু কিছু অতি সুন্দর পোট্রেট দেখেই মুগ্ধ। কিন্তু সত্যিকারের গ্রামের গা থেকে সোঁদা মাটির যে গন্ধ, পচা বাঁশ পাতার যে একটা টক টক ঘ্রান, কিংবা সন্ধ্যায় শিয়ালের যে ডাক, তারা ওগুলোর কোন স্বাদ বুঝে না। গ্রামের রাস্তা ধরে ক্ষেতের আইল ভেঙ্গে হাটার যে এক অদ্ভুদ রোমান্স, আধাকালো সন্ধ্যায় ভয় ভয় হৃদয়ে শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়ার যে অনুভূতি তার কোন কিছুই এদের ইন্দ্রিয় বুঝে না। ওরা সুকান্তকে চিনে না, ওরা রবিন্দ্রনাথকে চিনে না, ওরা নজরুলের প্রেমের কবিতা পরেনা। ওরা অনেক কিছুই জানে না। ওরা টাইটানিক দেখে অভিভুত হয় কিন্তু ওরা জ্যাকের ঐ ঐতিহাসিক কথাগুলো বুঝে না যখন সে বলে, “পার্টি? পার্টি যদি মজা করতে হয় তাহলে আস আমার সঙ্গে আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর কামরায়, দেখ কিভাবে পার্টির স্বাদ গ্রহন করতে হয়।” রোজ বুঝেছিল কিন্তু আজকের দিনের “রোজেরা” এটা বুঝে না, বুঝতেও চায় না।
যাই হোক, আমরা চলছি আর আমি দেখছি দুই প্রজন্মের মধ্যে কত ফারাক হয়ে যাচ্ছে এই পৃথিবী। আমার কাছে এখনো ঢেঁকি ছাটা চাল খেতে মন উতলা হয়ে উঠে, আমার এখনো বরই গাছের নিছে এবড়ো থেবড়োভাবে পরে থাকা আধাপাকা বরই একদম একটু লবন দিয়ে আবার লবন পাওয়া না গেলে খালি খালিই খেতে মন চায়, আমার কাছে কয়েক টুকরা ধনিয়া পাতা হাত দিয়ে মুচড়ে কাচা মরিচ দিয়ে এক প্লেট পান্তা ভাতের আনন্দ এখনো পেতে ইচ্ছে করে। কি সব দিনগুলো আমি হারিয়ে ফেলেছি, ভাবতেই আমার মন যেন একেবারে ব্যথায় মুচড় দিয়ে উঠে। আমি কি বলি আমার সন্তানেরা বুঝে না, আমার সন্তানেরা কি বলে আমার বুঝতে ভাল লাগে না। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা এখন আর আজকের দিনের ছেলেমেয়েদের কাছে কোন কাব্যই মনে হয় না। রক্তকরবি দেখে ওদের মনে হয় কি সব আবোল তাবোল লেখা লিখে রবিন্দ্রনাথ এত বিখ্যাত হয়ে গেলেন? নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ যেন এক কাল্পনিক কথা, এর কোন রোমান্স আজকের দিনের প্রজন্মের কাছে কোন স্বপ্নই মনে হয় না। ম্যাক্সিম গোরকির “মা” উপন্যাশটি পরার জন্য আমি কতবার পরিক্ষার পড়ায় ছেদ দিয়েছি তার কোন ইয়ত্যা নেই, অথচ আজ যখন আমি আমি আমার প্রজন্মের কাছে এই সব উপন্যাশের কথা বলতে চাই, তারা ম্যক্সিম গরকিকে তাই জানে না।
গান বাজছে আধুনিক। কি সব কথাবার্তা, কোন ভাব গম্ভীরতা নাই, সুর আছে ড্রাম পিটানোর মত, বুকে লাগে এর প্রতিটি আছাড়। কিন্তু হৃদয় ছুয়ে যায় না। (…চলবে)
বগুড়া যাওয়ার পথে (২য় পর্ব)
বগুড়া শহরে এই আমার প্রথম আসা নয়। কর্মস্থল হিসাবে আমি এই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ বছর কাটিয়েছি। গ্রামের অধিকাংশ অলি গলি, আনাচে কানাচে ঘুরেছি, কখনো দায়িত্ব পালনের জন্য রাত অবধি জেগে থেকেছি। কখনো আবার নিছক মনের তাগিদে ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য আহরণের জন্য দিকবিদিক ঘুরেছি। কখনো আমি গভির রাতে, কখনো রাতের শেষ প্রহর জেগে থেকে শুক্ল পক্ষের চাঁদ দেখেছি। কখনো আমি দেখেছি অমাবশ্যায় আকাশ তার কি রূপে পৃথিবীর কাছে প্রেম নিবেদন করে। কখনো আবার ঘোর বৃষ্টির রাতে যখন সব মানুসেরা তাদের নিজ নিজ আস্তানায় ফিরে গভির ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, যখন পাখীরাও আর কিচির মিচির করে না, আমি তখনও চাঁদহীন মেঘলা আকাশের মুসলধারে বৃষ্টির চ্ছটায় বারান্দায় বসে দেখেছি গাছগুলো কিভাবে বৃষ্টির জলে একা একা খেলা করে, কিভাবে হেলেদুলে একে অপরের আরও কাছে চলে আসে। কোন কথা নাই, নিঃশব্দে নিরবে অবিরত বৃষ্টি এই ঘুমন্ত ধরাকে কিভাবে স্নিগ্ধ চুম্বনে আলিঙ্গন করে। আকাশ মাটি আর বৃষ্টির এই প্রেমের লীলা এক অদ্ভুত রহস্য ঈশ্বরের। শরৎচন্দ্রের সেই বিখ্যাত শ্রীকান্ত উপন্যাসের কিছু অভিব্যাক্তি আমার মনে পরে। ……”অন্ধকারেরও রূপ আছে” । আসলেই আছে। মানুষ দিনের আলোয় যা দেখে না, অন্ধকারে সে টা উপলব্ধি করে, মানুষ দিনের আলোয় যা বিশ্বাস করে না, অন্ধকারের ঘোর নিশানায় সে সেটা বিশ্বাস করে। এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। গাড়ির আলোতে আমি সামনের রাস্তা দেখছি কিন্তু পাশে ফেলে যাওয়া অনেক কিছুই এখন আর আমার নজরে পরছে না অথচ এই ফেলে যাওয়া রাস্তার ধারেও কতই না সৌন্দর্য পরে আছে। মাঝে মাঝে লাইট পোস্টের কিছু আলোতে কিছু কিছু লোকালয়ের বস্তি চোখে পরে। ওখানেও অনেক অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের অনেক কাহিনি লুকিয়ে আছে যার ইতি বৃত্ত আমাদের অনেকেরই জানা নাই।
অনেক দূর চলে এসছি আমরা। বগুড়া শহর আর বেশি দূরে নাই। গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেছে প্রায়, তেল নিতে একটি তেল পাম্পে ঢোকতেই হচ্ছে। ইচ্ছা না থাকা সত্তেও গাড়ি থামাতে হল। আমি নেমেই একটা সিগারেট ধরালাম। একটি ৬-৭ বছরের বাচ্চা সহ একজন মহিলা আমার কাছে এসে বল্ল, স্যার আমার এই ছেলেটার একটা চোখ অন্ধ, আর একটা হাত অবশ। দিন না আমাকে কিছু। বড় মায়া হল। মা তার অন্ধ এবং পঙ্গু ছেলের জন্য কোথায় না ঘুরছে? আমার মায়ের কথা মনে পড়ল। মনে হল কতকাল আমার মা আমাকে আর আদর করে না, কতকাল আমার মা আমাকে আর খোকা বলে ডাকে না। আমাকে আর শাসনও করে না। অথচ আমি জানি আমার মা আমার কাছে আছেন, আমাকে দেখছেন। আজ আমি বাবা, আমার মেয়েরা আস্তে আস্তে তাদের আরেক জীবনে প্রবেশ করছে। হয়তবা আমিও আর ওদেরকে আর আগের মত শাসন করতে পারবনা, আমি আর আগের মত বুকে জরিয়ে ধরে বলতে পারব না, মা তোমার কি মন খারাপ? হয়ত বা তার সত্যি মন খারাপ, হয়তবা সেও কোথাও বসে কোন এক অমাবস্যার রাতে বৃষ্টির ঘন চ্ছটায় আমাদের কথা মনে করছে, অথচ আমি তার পাশে নাই। তাই মাঝে মাঝে অদেরকে মিস করব বলে আজ এই দিনে অনেক অগোছালো আব্দার আমি মেনেই নিচ্ছি।
যাই হোক, ছেলেটার জন্য প্রচন্ড মায়া হল। মায়ের জন্য আমার বুকটা কোথায় যেন একটু ব্যাথা অনুভব করলাম। বললাম, এটা কি তোমার একমাত্র সন্তান? মা সময় অপচয় না করে বিনা দ্বিধায় উত্তর দিল, “হ্যা গো স্যার, হামাক একটাই পোলা, হামাক বড় আদরের পোলা গো স্যার।” একটা মা, জাস্ট একজন মা। তার পরিচয়, মা। মাকে নিয়ে অনেক কবিতা পড়েছি, মাকে নিয়ে অনেক ইতিহাস রচিত হয়েছে। মাকে নিয়ে ধর্মগ্রন্থেও অনেক বানি রয়েছে। আমি নিজেও মাকে নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছি যদিও আমি কবি নই। আমার কবিতা কোথাও ছাপা হোক সেটাও আমি চাইনি। তারপরেও মনের আবেগে আমি মাকে নিয়ে অনেক কবিতাও লিখেছি। আজ মনে হচ্ছে মাকে খুব মিস করছি। কোন এক সময় মাকে মিস করে একটা কবিতাও লিখেছিলাম…
আমি এক দস্যুরানীর প্রেমিক
কি এক অদ্ভুদ তার চাহনি, কখন মায়াবতী
কখন বা কঠোর স্পাত কঠিন ভিতি
কি অবাক এক জীবনীযোগে
অতন্দ্র ঘোর অন্ধকারে আমার পানে চাহিয়া সে আলেয়ারে খোঁজে
আবার কখনো টকটকে রৌদ্র স্নানে
কোন এক অজানা ভয়ে কম্পিত হয় শিহরনে
কখনো ভালবাসায় আমাকে ছুরে দেয় অসীম আকাশের দিকে
আবার যদি হারিয়ে যাই এই ভয়ে ঢেকে রাখে তার শারির আচলে
কি অদ্ভুদ সে।
কখনো গাল ভরে চুমু
আবার কখনো ইশা খার মত করা শাসনের ঝুমু
সকাল সন্ধ্যা দিন রাত আমার কোন স্বাধীনতা নাই
আবার আমার কোন কাজে তার কোন বাধাও নাই
মাঝে মাঝে আমার বড় রাগ হয়
আর সে খিলখিলিয়ে হাসে,
আমি যখন হাসি, সে তখন অপরূপ দৃষ্টিতে অশ্রু নয়নে ভাসে
আর বলে, আমি নাকি পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর।
অথচ আমার একটা চোখ নাই, আমি দেখতেও ফর্সা নই।
একদিন অনেক রাতে সেই অমাবশ্যার অন্ধকারে চুপি চুপি আমি তারে প্রশ্ন করেছিলাম
কে গো তুমি আসলে?
সিক্ত নয়নে আমার কাধে হাত রেখে বলেছিল
“তুমি যখন এই পৃথিবীতে প্রথম আস
তখন আমার নতুন পরিচয় হয়েছিল
আমার নতুন নাম হয়েছিল, “মা”
(…… হয়ত চলবে)
অনেক অনেক দিন পর বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে এলাম। প্রায় ১২ বছর পর। অনেক পরিবর্তন হয়েছে এর চেহারা। শুধু বগুড়া ক্যান্ট এর চেহারা কেন, পুরু বগুড়া শহরের চেহারাই পরিবর্তন হয়েছে অনেক। কোন কিছুরই প্রতিদিনের পরিবর্তন চোখে পরে না কিন্তু কেউ হটাত করে দেখলে পুরু পরিবর্তনটা এক নিমিষেই বলা যায়। আমার কাছে তাই পুরু পরিবর্তনটাই ধরা পরল।
বগুড়া শহরে আসার আমার একটি মাত্র কারন ছিল- আমার মেয়েকে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজে রেখে যাওয়া। সদ্য বিবাহিতা আমার মেয়ে তার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাসুর, ভাসুরের বউ, এবং আমাদের পরিবার সবাই একসঙ্গে এসেছি। অত্যান্ত চমৎকার একটা সময় কাটাচ্ছি সবার সঙ্গে। গতকাল গিয়েছিলাম আমার মেয়ের মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে। চারিদিকে সব ডাক্তার, কেউ এক বছরের অভিজ্ঞতার ডাক্তার, কেউ দুই বছরের, কেউ বা বা আবার এক প্রফের অভিজ্ঞ ডাক্তার, কেউ আবার দুই হয় নাই তবে প্রায় দুই প্রফের সমান অভিজ্ঞ ডাক্তার। আমার মেয়ের ব্যাচের সবাই এখন প্রায় পৌনে দুই প্রফের অভিজ্ঞ সব ডাক্তার। আমি আমার মেয়ের মেসে এসেছি পুরু পরিবার নিয়ে। আমার মেয়ের বিয়ের মিষ্টি নিয়ে।
ছেলেদের মেসের পরিবেশ আমার জানা আছে কারন প্রায় দেড় যুগের বেশি আমি মেস লাইফ কাটিয়েছি। কখনো কোন মেস মেম্বার মেসের খাবার খেয়ে খুশি হয়েছে কিংবা মেসের খাবারের উপর মন খারাপ করে নাই, এই ইতিহাস মোঘল আমল থেকে খুজলেও কোন বরাত পাওয়া যাবে না। মেসের আমার মেয়ের বান্ধবিদেরও সেই একই অবস্থা। তাদেরও মেসের খাবারের উপর অনেক অভিযোগ আছে, আছে কতই না কষ্টের মনোভাব। সব কিছুই ভাল এখানে শুধু মেসের খাবার নিয়ে যত কষ্ট। তারপরেও আমি জানি একদিন ওরা এই মেস লাইফটা মিস করবে। আর আজকের দিনের এই মেসের খাবারের কষ্টের বিষয়টিই ভবিষ্যতের মজার কাহিনি গুলর মধ্যে একটা হয়ে উঠবে। কারন আমার এই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি যে, ঐ মেস লাইফটা খুব মিস করছি।
পিচ্চি পিচ্চি আমার সব মেয়েরা সবাই ডাক্তারি পরছে, দেখেই শান্তি লাগে। এক গুচ্ছ ডাক্তার চারিদিকে। হৈ চৈ কিচির মিচির আনন্দের উল্লাস এই সব উঠতি ডাক্তারদের কণ্ঠে। বড় ভাল লাগে এদের বাচ্চামি, এদের চালচলন। একদিন ওরাই দেশের সব স্বনামধন্য ডাক্তারদের সাড়িতে দারিয়ে থাকবে, কারো হাত দিয়ে অনেক মানুষের জীবনের পাল পরিবর্তন হয়ে যাবে, অনেক মানুষের ভরসার স্থান হবে এরা। এতগুলো ডাক্তারদের পেয়ে আমারও খুব ভাল লাগছিল। এদের মাথায় এখন সব এনাটমি, ইত্যাদি সব কঠিন কঠিন সাব্জেক্ট মাথায় ঢোকে যাচ্ছে। খাটের নিচে রাখা ট্রাঙ্ক ভরতি সব বই এর লেখা খাটের নিচ থেকে উবে গিয়ে একেবারে মাথার ব্রেনে চলে যাচ্ছে, বইগুল আবার কদিন পর খাটের নিচেই জমা হয়ে যাচ্ছে।
তোমরা সবাই খুব ভাল। ভাল থেক তোমরা। জীবনে তোমরা সবাই সফল হবে।
গত দুইদিন যাবত আমি আমার বড় মেয়ের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটানোর চেষ্টা করছি। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে। এখনো ছেলেমেয়ের মধ্যে কোন রাত যাপনের সুযোগ আমরা দেই নাই যদিও এটা আমাদের ধর্মের রীতির মধ্যে পরে না কিন্তু আমি খুব বিস্ময়ের সহিত লক্ষ করছি আমাদের এই দুইজন সন্তানও কোন প্রকারের দাবি তুলে নাই তাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করছি বলে। ওরা নিষ্পাপ মানুষগুলোর মধ্যে একজন।
কিন্তু আমি একটা জিনিস লক্ষ করছি আমার মধ্যে যে, আমার বুকের ভিতর কোথায় যেন একটা ফাকা ফাঁকা ঠেকছে। অথচ কোন কিছুই আমি হারাই নাই। বরং আমি আরও একজন নতুন মানুষ পেয়েছি, আমি আরও একজন সুসন্তান পেয়েছি, অন্যভাবে বলতে হয় যে, আমার যে একজন ছেলে সন্তানের অভাব ছিল আজ মনে হয় যেন আমি একজন ছেলে সন্তান পেয়েছি। কখনো কোনদিন কোনভাবেই আমার অগোচরেও আমার মনে আমার একজন ছেলে সন্তান দরকার এই ভাবনাটা আসে নাই। আজ আমার মেয়ের জামাইকে পেয়ে মনে হল, আমি যেন আজ নতুন করে বাবা হয়েছি। একজন ছেলের বাবা। যে অভিজ্ঞতাটা আমার কখনো ছিল না। কিন্তু তারপরেও প্রতিনিয়ত আমার কাছে মনে হচ্ছে আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। কি সেই পরিবর্তনটা? কাজের ফাকে কারনটা খুজতে চেষ্টা করেছি, অবসরে খুজতে চেষ্টা করেছি, একাএকা ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি, চোখ বুঝে ভাবার চেষ্টা করেছি, চোখ খুলে দিনের আলোয় বুঝার চেস্তা করেছি, আমার কোথাও কোন কোন হারায় নাই। অথচ ব্যাপারটা ঘটছে আমার মাথার ভিতর, আর ব্যাথাটা পাচ্ছি অন্তরের ভিতর। এরই মধ্যে আমার মেয়ের বিয়ের কারনে আমার যেন নতুন করে একটা আনন্দ হচ্ছে আমার সর্বত্র। তাহলে কি হয়েছে আমার? ইন্ডাস্ট্রি চলছে আগের মত, ব্যবসা চলছে ঠিক আগের মত, আমি অফিসে যাচ্ছি ঠিক সময়মত, আমার কোন কাজেই আমার কোন হেরফের হচ্ছে না। তারপরেও একটা অনুভূতি কাজ করছে। সেই অনুভুতিটা আজ যেন আমার কাছে কিছুটা স্পষ্ট হল। সম্ভবত এই কারনে যে, একদিন কোন এক শরতের সন্ধ্যায় কিংবা বর্ষার এক ঘনমেঘের দিনে আমার এই মেয়ে আমাকে অঝোর অশ্রু জলে ভাসিয়ে আমারই চোখের সামনে পরিবারের অতিতের সমস্ত আদর আপ্যায়ন ভালোবাসা রাগ গোস্যা, অভিমান, ঝগড়া সব ছেড়ে তার দুই নয়ন ভাসিয়ে আমার হাত ছেড়ে আজকের এই নতুন ছেলের হাত ধরে অন্য কোথাও বাসা বাঁধবে। আমার সব অধিকার থাকা সত্তেও, আমার সব ভালোবাসা ঠিক আগের জায়গায় রেখেই আমার মেয়ে তার আরেক নতুন পৃথিবী তৈরি করবে অন্য এক স্থানে। এই ভাবনা আসতেই যেন আমার চোখের পাতা ভিজে আসে কখনো আনন্দে আবার কখনো মিস করার এক কষ্টে। আমার বুকে একটা সুখের অনুভুতির সঙ্গে আবার একটা অন্য রকম কষ্টের অনুভূতিও অনুভব হয়। এটা আসলে কষ্ট নয়, এটাও একটা সুখের কষ্ট। ঐ যে ঐ রকম একটা অনুভুতির মত “তোমার মা তার জীবনে তোমাকে কাদতে দেখে একবারই হেসেছিল, যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল।” কি দারুন কথা না!!
আজ আমার মনে হচ্ছে আমিও হয়ত তোমার চলে যাওয়ার সময় তোমার কান্না দেখে আমি অশ্রুজলে হেসে হেসে আমার অন্তরের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে বলব, তুমি সব সময় ভাল থাকবে আমার এই নবাগত ছেলের হাত ধরে। তাকে তুমি শক্ত করে ধরে রেখ মা, আমিও ওর হাত ধরে রেখেছি যেন ও কোথাও হারিয়ে না যায়। আমার কাছে তো আলো আছে মা। আমি তোমাদের জন্য এক বাসযোগ্য পৃথিবীর আবাসস্থল গড়ে দিয়ে যাব, এই আমার প্রতিজ্ঞা ঈশ্বরের কাছে।
আজ তোমার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যা একজন মেয়ের জীবনের বাকি সব পরিচয় সম্পন্ন করার লক্ষে সামাজিক এক প্রত্যায়ন পত্র আর ধর্মীয় রীতিতে মহান আল্লাহতালার আদেশ পালনের মহাজ্ঞা। আর এই প্রত্যায়ন পত্রের মাধ্যমে তুমি আজ সাধারন এক বাবার মেয়ে থেকে অন্য এক পুরুষের স্ত্রী হয়েছ, একটি পরিবারের বউ হয়েছ, কারো ভাবী, কারো ননদিনী এবং আরও অনেক নতুন সম্পর্কের সৃষ্টি করেছ। সময়ের পরিবর্তনে আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন তুমি মা হবে, তারপর ক্রমান্বয়ে শাশুড়ি থেকে দাদী এবং তারপরে হয়ত বড়মা ইত্যাদি। আর এইসব সার্থক জীবনের জন্য যা প্রয়োজন তারমাত্র একটি সিঁড়ি তুমি আজ পার করলে। বাকি অধ্যায়গুলো পাওয়ার জন্য তোমাকে আরও অনেক কঠিন কঠিন দিন, সময় এবং ক্ষন পার করে এক অনবদ্য এবং নিরবিচ্ছিন্ন জীবন পার করতে হবে এবং তা পার করতে পারলেই কেবল সার্থক মা, সার্থক শাশুড়ি, সার্থক দাদী কিংবা সার্থক বড়মা হওয়ার যোগ্যতা তুমি অর্জন করতে পারবে। আর তার সঙ্গে তুমি পাবে সামাজিক এক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান এবং হয়ে উঠবে সবার কাছে এক দৃষ্টান্তমুলক ব্যক্তিত্ব।
এখন যে প্রশ্নটা আসে, এই অনবদ্য এবং নিরবিচ্ছিন্ন জীবন বলতে কি বুঝায়? অনবদ্য জীবন মানেই সমস্যাবিহিন জীবন নয়। বরঞ্চ সমস্যা নিরসনকল্পে কিভাবে কখন কোথায় কেমন করে তা সমাধান করা যায় তার হিসাব। এই জীবনে অনেক সমস্যা আসবে, আর এই সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক চেনা-অচেনা মানুষের ভীর তোমার আশেপাশে দেখতে পাবে। কাউকে মনে হবে তোমার অতি পরিচিত এক বন্ধু, কেউ আসবে তোমার জীবনে এমন বেশ ধরে যে মনে হবে তোমার দুঃখে সে অতি দুঃখিত, কেউ আবার এমন করে তার অনুভুতি তোমার কাছে মেলে ধরবে যেন ঠিক এটাই তুমি চাচ্ছ। এই দলটি প্রথমে তোমাকে ভালবাসার কথা শুনাবে, ভাললাগার কথা বলবে, কাজ না হলে নিজেদের চোখের জলে তোমাকে দুর্বল করার চেষ্টা করবে, এমনও হতে পারে তারা তাদের অসহায়ত্তের কথা বলে তোমার কোমল হৃদয়ে জায়গা করার চেষ্টা করবে, আর কিছুতেই কিছু না হলে তখন তোমার মন কিভাবে পিশিয়ে উঠবে সে চেষ্টা করবে। এই দলটি কখনো বালকসুলভ ভদ্র আচরনে আবার কখনো সে অত্যাচারির রুপে তোমাকে দেখা দেবে, এবং তোমাকে বিপথে নিয়ে যাবে। সাবধান থেক এদের থেকে। মনে প্রানে বিশ্বাস রেখ যে, এরা আসলে কেউ তোমার প্রকৃত বন্ধু নয়। একজনও না। আর এটাই এই অদ্ভুত এই পৃথিবীর আচরন। যখনই তুমি এদের সাথে তোমার জীবনের ব্যক্তিগত সমস্যাবলী শেয়ার করেছ, ঠিক তখনি তুমি সমস্যার আরও জটিল গহব্বরে আটকে যাবে। তোমার সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তোমার সমস্যা আরও গভির থেকে গভিরে নিয়ে যাবে এবং এক সময় তোমার জীবনটা এরা কুপরামর্শ দিয়ে এতটাই অতিষ্ঠ করে তোলবে যে, আজ যারা তোমার সত্যিকারের বন্ধু, যারা তোমার জিবনটা সুন্দর হয়ে উঠুক বলে প্রতিনিয়ত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, তাদেরকে তোমার কাউকেই আর বন্ধু মনে হবে না। যেদিন তোমার কাছে এই সব শুভাকাঙ্ক্ষী লোকজনকে আর তোমার আপনজন বলে মনে হবে না, সেদিন তোমাকে মনে রাখতে হবে যে চাটুকারের দল তোমাকে ঘিরে ফেলেছে এবং তোমার জীবনের সব সাধ-আহ্লাদ ধ্বংসের পথে। তোমার আর ঐসব পর্ব, সার্থক মা, সার্থক শাশুড়ি কিংবা সার্থক দাদী হওয়ার পথে এক বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। ঐসব বিপথগামী মানুষরূপী শয়তান গুলো এইটাই চেয়েছে। এর মানে এই যে, তোমাকে প্রতিনিয়ত ঐসব চাটুকার, ঐসব হায়েনা, ঐসব বন্ধুতুল্য অপরিচ্ছন্ন মানুষরূপি খারাপ মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। দূরে থাকতে হবে তোমার নিজের ভাল থাকার জন্য, দূরে থাকতে হবে সামাজিক সম্মান আর পরিচ্ছন্ন জীবনের জন্য। আর ঐসব হায়েনাদের কাছ থেকে দূরে থাকার একটাই পথ, আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজের মানুষদের উপর বিশ্বাস রেখে নিজেকে সঠিক পথে এবং নিজের আত্মবিশ্বাসকে বিশ্বাস করে। তোমার যা আছে, তাতেই তোমাকে সন্তুষ্ট হয়ে থাকতে হবে। তোমার থেকেও অনেক মানুষের অনেক কিছু নাই, কারো হাত নাই, কারো পা নাই, কারো বাবা মা নাই, কারো থাকার ঘর নাই, কারো আবার কিছুই নাই। তোমার তো অন্তত আমরা আছি, তোমার স্বামী আছে, তোমার খুব ভাল শশুর শাশুড়ি আছে, তোমার উকিল বাবা আছে, তোমার জা, ননদিনী, ভাসুর সবাই আছে। তোমার সুন্দর ঘর আছে, তোমার কি নাই? আল্লাহ তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসে বলেই আজ তোমাকে এই রকম একজন সুন্দর মানুষের হাত ধরতে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যাকে তুমি নিজে ভালবেসেছ এবং তুমি তাকেই পেয়েছ। তোমার জন্য এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত ঈশ্বরের কাছে দোয়া করে, তোমার ভাল চায়। তাদের ভালবাসার মুল্য শুধু একটাই, তোমরা সুখে থাক, তোমরা ভাল থাক। আর কিছুই চায় না এই স্বার্থহীন মানুষগুলো। নিজের স্বামীর কাছে তুমি কতটুকু গ্রহনযোগ্য তা নির্ভর করবে তুমি নিজের কাছে কতটুকুন সৎ এবং তুমি কতটুকুন নিজেকে ভালবাস তার উপর।
মনে রেখ ভয়, ঘৃণা এবং লোভ কখনো মরে না। এটাকে প্রথম থেকে দূরে রাখতে হবে। আর এর প্রধান উপায় হচ্ছে যখনই কোন ভয়ের উদ্রেক হবে, যখনই কোন ঘৃণার কারন সামনে এসে দারাবে, যখনই কোন লোভের বশবর্তী হবে, ঠিক যার কারনে এইসব ভয়, ঘৃণা এবং লোভের উদ্রেক হবে তা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং তার সঠিক ব্যাখ্যা ঠিক লোকের কাছ থেকে সরাসরি জেনে মন পরিস্কার করে নিতে হবে। তাতেই তুমি জয়ি হবে। আর যদি তা না কর, নিশ্চিত জেনো তোমার পরাজয় নিশ্চিত। আর এটাই চেয়েছে ঐসব বন্ধুসুলভ তোমার হায়েনার দল। তুমি যদি জয়ি হওঁ, তবেই তুমি পাবে নিরবিচ্ছিন্ন জীবনের স্বাদ আর তারপরেই পাবে তুমি জীবনের ঐ সব পর্যায়ের সব কিছু। অর্থাৎ সার্থক একজন মা, সার্থক একজন স্ত্রী, সার্থক একজন শাশুড়ি কিংবা দাদির পরিচয়।
আজ তোমাকে একটি সত্য কথা বলি। তোমার মা আমার জীবনে এক আশীর্বাদ। এটা তুমি নিজেও জানো। এর মানে এই নয় যে তোমার মা একমাত্র সবচেয়ে গুণী ব্যক্তি, তোমার মা একমাত্র সুন্দরী মহিলা। তার মধ্যেও অনেক গুনাবলির অভাব রয়েছে, তার মধ্যেও অনেক দোষ রয়েছে, তার সঙ্গে আমারও অনেক সময় কারনে অকারনে এবং খুব তুচ্ছ জিনিস নিয়েও মনের অমিল হয়। অন্য দিকে আমিও একমাত্র আদর্শবান ব্যক্তি নই, আমারও ১০০% গুনের সমাহার নাই, আমার অনেক ব্যবহারেও তোমার মায়ের রাগ হয়। কিন্তু তারপরের অধ্যায় হচ্ছে যে, আমরা অনেক কিছু কম্প্রোমাইজ করি, আমরা স্বাভাবিক জীবন জাপনের জন্য আমরা উভয়ে কোথায় কোন কারনে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে, কি কারনে আমাদের মনের ভিতরে কষ্ট হচ্ছে তা মিলেমিশে কথা বলে নিজের মন পরিস্কার করি বলেই আজ তোমরা আমাদেরকে এই পর্যায়ে দেখতে পাচ্ছ। আমরা সুখী পরিবাবের অংশ। আমি ও চাই তোমরা সুখী হওঁ এবং সার্থক জীবন পার কর।
নিজেদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছাড়া দুইজনের মাঝে তৃতীয় পক্ষ যে আসবে সে আর কেউ না, সে হচ্ছে শয়তান। আর শয়তান কখনোই আমার তোমার বন্ধু নয়। সে শুধু ধোঁকা দেয়। সে কখনো আসে বন্ধু হিসাবে, কখনো আসে ঠিক তোমার মন যা চায় সে কথাগুলো নিয়ে, সে আসে এক চতুর বুদ্ধি নিয়ে, যা তোমার আর তোমার পরিবারের শুধু ধ্বংসই চায়, মঙ্গল নয়। তোমার আজকের এই পবিত্র দিনটি মঙ্গলময় হোক, তোমার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক এটাই আমার সব সময়ের জন্য প্রার্থনা। আমরা তোমাকে ভালবাসি। চাঁদ সূর্যের প্রতিস্থাপক নয়, শিশির বৃষ্টির প্রতিস্থাপক নয়, পুকুরের ঘোলা জল নদী বা সাগরের প্রিতিস্থাপক নয়। তোমার স্বামী তোমার কাছে সূর্য, তোমার পরিবার তোমার কাছে সাগর, আর তোমার প্রতি তোমার পরিবারের অফুরন্ত ভালবাসা হচ্ছে তোমার উপর ভালবাসার বৃষ্টি।এদের কোন প্রতিস্থাপিক হওঁয় না।
শতানের দলমাঝে মাঝে তোমাকে চাদের কথা বলে, শিশিরের কাব্য দিয়ে অথবা কর্দমাক্ত পুকুরের ঘোলা জল দিয়েই বিপথগামী করে দিতে পারে। আমি তোমাদের জন্য ঐসব হায়েনাদের কাছে থেকে আমার ইসসর তোমাদের রক্ষা করুক সেটাই দোয়া করি।
You were not an accidental baby in my life, you are my wanted girl from the Almighty and I prayed for you for almost 5 long years before you were born and then I was blessed with you from HIM. I always wanted a girl, you are that girl in my life. I love you all the time and with all my breath. May Almighty Allah listen to my prayer for your happiness and prosperity in your life.
আমি তোমার উপর রাগ এখনো করি নাই।
কিন্তু আমার জানা ছিল না যে, আমাকে কোন এক সময় তোমার সঙ্গে এইভাবে হিসাব করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমি তোমার জন্য কি করেছি আর আমি কি করি নাই। একটা জিনিস সর্বদা মনে রাখবা যে, ব্রান্ড নামের একটা মুল্য আছে। আমি তোমার জীবনে একটা ব্রান্ড নাম। এটা তোমার বুঝার ক্ষমতা আছে কিনা আমি জানি না। তবে বুঝাটা উচিৎ। মান্নান আমার জীবনে কোন ব্রান্ড নাম নয়। এটা নিশ্চয় তুমি বুঝতে পারবা। আমার জীবনে হাবিবুল্লাহ কিংবা হোসেন মাদবর একটা ব্রান্ড নাম।
আমি খুব অবাক হয়েছি যে, ইদানিং জেল থেকে ফেরত আসার পর তোমার মধ্যে অনেক অবাস্তব চিন্তার উদ্ভব হয়েছে যা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় নাই। এর অনেকগুলো কারন থাকতে পারে, কিন্তু আমার ধারনা ঐ সমস্ত প্রধান কারনের মধ্যে একটা কারন হতে পারে তোমার মেয়ে মাহিদা (সম্ভবত)। তুমি কতটা ভাল বাবা বা কতটা ভাল স্বামী সেটা তুমি ভাল বলতে পারবে, আমি সেটা নিয়ে কখনো তোমাকে সাজেসনও দেব না। কিন্তু তোমার মেয়ে মাহিদা তোমার জন্য কতটা ভাল মেয়ে সেটা আমি জানি কারন মাহিদা আমাকে তোমার ব্যাপারে কি কি বলেছে সেটা আমি তোমাকে কখনোই বলতে চাই নাই। কারন তোমার মন খারাপ হয়ে যাবে। তোমার সম্পরকে তোমার মেয়ের ধারনা খুব যে ভাল তা আমি বলব না, বরং তার ধারনা যে সম্পূর্ণ ভুল সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু মাহিমা অত্যন্ত একটা ভাল মেয়ে এবং এই কারনেই সব কিছুর পরেও আমি চেয়েছিলাম মাহিমার একটা ভাল ঘরে বিয়ে হোক এবং তোমাদের বলয় থেকে ও বের হয়ে যাক। আর তার জন্যই আমি মাহিমার বিয়েতে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা দিয়ে আমি ওর জীবনটাকে উপহার দিতে চেয়েছিলাম এবং দিয়েছিও। আমি এর আগেও মাহিমার ১ম বিয়েতে গিয়েছিলাম এবং এবার তো আমার যাওয়ার অনেক প্রয়োজন ছিল অবশ্যই। কিন্তু তুমি আমার কিংবা আমার পরিবারের যাওয়ার পথ এমন করে বন্ধ করে দিলে যে আমার সঙ্গে আর যে সব গনমান্য ব্যাক্তিবর্গ যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল আমার না যাওয়ার কারনে সম্ভবত তারাও আর যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে নাই। আমি অবশ্য কাউকে কিছু বলিও নাই। হয়ত কেউ গেছে হয়ত অনেকেই যায় নাই। আমি আর সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই নাই।
মান্নান, একটা কথা মনে রাখা খুব দরকার যে, পরিবারের বা বংশের লোকদের থেকে আপন কেউ কখনো হয় না। হ্যা, হয়ত পরিবারের মধ্যে অন্তরকলহ থাকে কিন্তু সেটা আবার সমঝোতাও হয়ে যায়। আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি যে, তুমি জেলে থাকার সময় থেকে যে কোন কারনেই হোক (সেটা তোমার অনুপস্থিতির কারনেই হোক আর তাদের সাহসের কারনেই হোক) আমাদের সমস্ত বংশের লোকজন সরাসরি আমার এবং হাবিব ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে এবং তার মধ্যে অনেকেই সান্নিধ্যেও আসতে পেরেছে। এতে আমি দেখেছি যে, আমাদের বংশের অনেকেই তোমার উপর ঠিক যথোপযুক্ত সন্তুষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গটা এখন টানছি না, এটা তোমার বা আমাদের নিতান্তই ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যাপার ধরে নিতে পার।
মান্নান, আমি অসৎ নই এটা তুমিও জান। “আমি অসৎ এবং আল্লাহ আমাকে কখনো সাহায্য করবে না আর তোমার কারনেই আজ আমি এতদুর পর্যন্ত আসতে পেরেছি ইত্যাদি ইত্যাদি” তোমার এই কথাটা আমার কোনভাবেই ভাল লাগে নাই। আর আমি কারো উপর নির্ভর করে এই পর্যন্ত আসি নাই। এটা আল্লাহ আমাকে করেছেন। এটা নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। আমার সমাজ আলাদা, তোমার সমাজ আলাদা, আমার জগত আলাদা তোমার জগত আলাদা। কে কাকে কিভাবে মুল্যায়ন করবে সেটা যার যার জগতের ব্যাপার। তোমার এসএমএস এর এই ভাবনাটা ভুল। আমি তোমাকে এই ভুল ভাবনা থেকে সরাতেও চাই না, সেটা তোমার হিসাব কিংবা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর তোমার কাছে এটা সত্য বলে মনে হয়েছে বলেই হয়ত তুমি বলতে পেরেছ। এটা নিয়ে আমি তোমাকে আর কৈফিয়তও দিতে চাই না। সৎ এবং অসৎ ব্যাপারটা নিতান্তই নিজস্ব ব্যাপার।
আমি জানি আমার কি প্ল্যান ছিল তোমাকে নিয়ে আর আমি আমার পুরু প্ল্যানটা আমি তোমাকে বিস্তারিত বলেছিলামও। আমি এটাও বলেছিলাম যে, অচিরেই কোন একটা ছোটখাট ব্যবসা শুরু করতে যেখানে আমি তোমাকে সাহায্য করব আমার সাধ্যমত। আবার এটাও বলেছিলাম যে, যতদিন তোমার কোন গতি না হচ্ছে, আমি মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে তোমাকে দেব যাতে তোমার সংসার চলে।
একটা জিনিস মনে রাখবা মান্নান, কোন কালেই আমার জমির উপর লোভ ছিল না এবং এখনো নাই। তুমি যদি মনে কর যে, কিছু জমিজমা পেয়েই আমি অনেক কিছু হয়ে গেছি সেটা একদম ভুল ধারনা। তুমি কি বলতে পার, আজ পর্যন্ত কোন জমিটা আমার ব্যক্তি জীবনে কাজে লেগেছে? বলতে পার কোন জমিটার উপর ভরসা করে আমি ব্যবসা করছি? একটাও না। আর ভবিষ্যতে ওগুলো কোন কাজে আসবে কিনা তাও আমার জানা নাই। বরঞ্চ আমি তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম যে, একদিন যে মাদবর বাড়ি ম্লান হয়ে গেছে সেই মাদবর বারিটা আমি আবার অমলদের জমির উপর স্থাপন করে তোমাকেই ওখানে স্থাপন করে দিয়ে যাব। আমার যেহেতু কোন ছেলে নাই, আমি সবসময় মনে করেছি তোমরাই আমার ছেলে আর তোমরাই আমার সব ব্যবসা বানিজ্যের তদারকি করবে। কিন্তু ওটা হয়ত হয় নাই আর হবে কিনা ভবিষ্যতে আমার জানা নাই। যাই হোক, তুমি যদি মনে করে থাক যে, আমি শুধুমাত্র কিছু জমি জমার কারনে তোমাকে আমি আমার কাছে টেনে নিয়েছি, সেটা মারাত্মক ভুল ধারনা। আর এই ভুল ধারনাটা তোমার কাছেই থাকুক। আমি তোমার ভুল ধারনাটা ভাঙ্গাতে চাইও না। তোমার যদি এখনো মনে হয় তুমি আমাকে জমি জমা দিয়ে অনেক সাহায্য করে ফেলেছ, তাহলে বিক্রি করে দাও এবং আমার টাকাগুলো প্লিজ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা কর, আমি বরং তোমাকে অনুরোধই করছি। I want to get out of everything in future.
তোমার ধারনা আমি তোমাকে অবিশ্বাস করা শুরু করেছি কিনা। এই ধারনাটা তোমার কেন এসেছে আমি জানি না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে মাহিমার বিয়ের টাকা নেওয়ার আগে ফ্যাক্টরি কর্তৃক মানি ভাউচারে তোমাকে সাইন করতে বলেছে বলে তোমার এই ধারনাটা হয়েছে। আমি অবাক হয়েছি এই জন্য যে, এতদিন যখন তোমাকে আমি টাকা দিয়েছি (সেটা যে কারনেই হোক না কেন), আমি তোমার পক্ষে সাইন করেছি কিন্তু আমাদের সর্বশেষ ফ্যাক্টরি পলিসি মোতাবেক, আমাদের অবর্তমানে যিনি টাকা নিচ্ছেন এখন থেকে উক্ত ব্যক্তিই ফ্যাক্টরি মানি রিসিপ্টে সাইন করে টাকা নিতে হবে, আর এই কারনেই তোমাকে সাইন করতে বলেছে। তাছাড়া তখন আবার অডিট চলতেছিল বলে কোন অবস্থায়ই মানি রিসিপ্ট সাইন করা ছাড়া ফ্যাক্টরি টাকা দিতেও পারতো না। আমার অবাকই লেগেছে যে, মুর্তজা সাহেব যদি টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারে, আমি যদি টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারি, তুমি মুরতুজা ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সময় যদি সাইন করতে পার, তাহলে তুমি কেন টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারবে না? আর সাইন করতে গিয়েই যদি তুমি মনে কর যে, আমি তোমাকে অবিশ্বাস করছি, তাহলে ত আমার কোন কথা থাকে না।
তুমি DBBL ব্যাংক থেকে ৬০ লক্ষ টাকা লোণ নিয়ে ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ। আমি সত্যি সত্যি খুশি হয়েছি যে তুমি একটা ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ এবং নিজের উদ্যোগে তুমি নিজের ফাইন্যন্স দিয়ে ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ, এটা খুবই ভাল পদক্ষেপ। তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে ব্যাংকের লোণ প্রতি মাসে পে করতে পার। আর পদ্মা ব্রিজের বালুর সরবরাহ পাচ্ছ যেনে আমি আরও খুশি হয়েছি যে অন্তত একটা ভাল কাজের অফার পেয়েছ। আমি তোমার জন্য দোয়া করি তুমি নিজের উদ্যগে ভাল থাক। এবং মানুস তোমাকে তোমার নিজের নামে চিনুক। তোমার এসএমএস টাই ঠিক যে একটা পাখি তার নিজের ডানার শক্তিতে বেচে থাকার নামই স্বাধীনতা, গাছের ঢালের উপর নয়। আর তুমি আরও লিখেছ যে, এখন থেকে তুমি আর মেজরের সঙ্গে নাই। আমি কিছু মাইন্ড করি নাই তাতে। এটা নিতান্তই তোমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং অভিলাষ।
আমি জানি তুমি তোমার কথার বরখেলাপ কর না। আর এই জন্যই আমি কখনো তোমাকে নিয়ে কখনো অবিশ্বাস করার কোন কারনও দেখি নাই। তোমার হয়ত মনে হতে পারে যে আমি এমসিসির জমি নিয়ে চিন্তিত কিনা কিংবা হাবিব ভাইয়ের ৪৭ শতাংশ জমি নিয়ে চিন্তিত কিনা ইত্যাদি। হ্যা, আমি এমসিসির ৩৫ শতাংশ জমি নিয়ে চিন্তিত এই কারনে যে, এই ইজিএম এ যদি কোন কারনে পুরু বোর্ড পরিবরতন হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে একটা নতুন করে ঝামেলা হতেই পারে কিন্তু যারা পাওয়ার অফ এটর্নি দিয়েছে সবাই যেহেতু আমার বন্ধু, সেক্ষেত্রে হয়ত অনেক অসুবিধা হবে না। আর তুমি তোমার দায়িত্ব সম্পর্কে যথেস্ট পরিমানে ওয়াকিবহাল। সেটা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলার অবকাশ রাখে না। তবে আমি বুঝতে পারি নাই যে, ঐদিন তোমার আন্টির সামনে তুমি এমন একটা ব্যবহার করবে। শেষ পর্যন্ত আমি তোমার আন্টির কাছে অপদস্থই হয়েছি এই কারনে যে, সে হাস্পাতাল থেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজটা করতে এসেছিল, আর যখন কাজটাই হল না, সে আমাকে চার্জ করতেই পারে। এটা নিয়েও আমি তোমাকে আর বিব্রত করব না। তুমি সৎ, তুমি মানুষের বিচার কর, সমাজ তোমাকে অনেক আদর্শবান ব্যক্তি হিসাবে দেখে, তুমি ন্যায্য বিচার কর বলেই তুমি আমাকে এগুলি জানিয়ে এসছো এবং আমিও তাই জানি। কিন্তু তুমি ঐদিন কতটা ন্যায্য করেছ, কিংবা কতটা বিচারিক হিসাবে কাজটি করেছ তা তোমার কাছেই থাকুক।
যাই হোক মান্নান, আমি যে কাজটা কখনো করতে চাই নাই, কখনোই চাই নাই, তুমি আমাকে সেই কাজটাই করতে বাধ্য করেছ। আর সেটা হচ্ছে তোমার রাখা হিসাব অনুযায়িই আমি একটা ক্যাল্কুলেসন করেছি। আমি তোমার ব্যাপারে অনেক হিসাব অনেক সময় লিখে রাখি না কিন্তু আমার ফ্যাক্টরি রাখত, আর তার উপরে বেজ করেই একটা হিসাব আমি তোমাকে পাঠাচ্ছি। সব হিসাবের বিপক্ষে বিস্তারিত এক্সকেল শিট আছে, রেজিস্ট্রি খাতা আছে, তুমি যদি চাও, আমি সেগুল ফটকপি করে দিতে পারব। এর মানে এই নয় যে, আমি তোমার কাছে কোন টাকা পয়সা চাচ্ছি পাওনা হিসাবে। এটা শুধু তোমার জানার জন্য দেওয়া। এই হিসাব দিয়ে আমি তোমার কাছ থেকে কোন কিছুই প্রত্যাশা করছি না। কোন টাকা পয়সাও দাবি করছি না। শুধু তোমাকে জানানোর জন্য এই হিসাব পাঠানো। তুমি মাইন্ড করতে পার কিন্তু যেহেতু তুমি বিচার সাল্লিশি কর, তোমার মধ্যে অন্তত একটা বিচারিক ক্ষমতা আছে বলে আমার ধারনা এবং তোমার মাইন্ড করার কথা নয়। অন্তত সত্যি জিনিসটা তোমার জানা থাকল। তোমাকে কিছু দিতে হবে না আমাকে, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাক। আর আমি আমার এই চিঠির উপর কোন মন্তব্য ও আশা করি না। যদি ক্যালকুলেসনে ভুল থাকে শুধু ওটা আমি তোমাকে নিয়ে বসতে পারি, তাছাড়া আমার অন্য কোন মন্তব্যে আমি কোন মন্তব্য আশা করি না।
আর একটা ব্যাপার আমার কাছে অবাক লাগছে যে, তুমি আমার এই দুঃসময়েও শুধু নিজের ব্যাপারটাই দেখছ, তোমার কি একটা ফ্রেন্ড ও নাই, একটা কলিগ ও নাই, কিংবা একজন আত্তিয়ও নাই যে তোমাকে কিছু আর্থিক সাহায্য দিয়েও সাহায্য করতে পারে? এই অবস্থাটা ভাল নয়। সব মানুষের বিপদের সময় কেউ না কেউ এগিয়ে আসার জন্য কিছু ফ্রেন্ড, কলিগ, আত্মীয়সজন তৈরি করে রাখতে হয় যারা বিপদের সময় কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে। আমার কাছে মনে হচ্ছে তোমার এই সার্কেলটা তুমি তৈরি করতে পারন নাই। যাই হোক।
ভাল থেক। চিঠিটা লম্বা করলাম না। দরকার হলে পরে আবার লিখব। রিভার সাইডের লসের ব্যাপারটা নিয়ে আমরা অনেক চিন্তিত এবং এটা নিয়ে আমরা অনেক অসুবিধায় আছি সন্দেহ নাই। তারপরেও আল্লাহ আছেন। ধন্যবাদ। নিচে একটা সামারি করে দিলাম হিসাব নিকাশের। তুমি তোমার অবসর সময়ে দেখে নিও। আমি জানি তুমি বিচার কাজ কর এবং নিরপেক্ষ কাজ কর। নিজের বিরুদ্ধে কোন ইনফরমেশন গেলেও যে তা মেনে নেয় তাকে বলা হয় নিরপেক্ষতা। এটা তোমাকে আমার শিখানোর দরকার মনে করি না। তুমি আমার থেকেও বুদ্ধিমান, সেটা তুমি নিজেই বলেছ। এবং আমারও তাই ধারনা যে, তুমি আমার থেকে বেশি বুদ্ধিমান।
আখতার
| মা ইন্ডাস্ট্রিজে প্রতিদিনের কালেকশন আকারে টাকা জমা হয়েছে মোট (Collection) | 48231540 |
| মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে মান্নান পেটি ক্যাশ আকারে নিয়েছে (Loan to Mannan) | 10004618 |
| মান্নান মা ইন্ডাস্ট্রিজকে ফেরত দিয়েছে (Loan Refunded by Mannan) | 5328531 |
| মান্নানের কাছে মা ইন্ডাস্ট্রিজ পাবে | 4676087 |
| মেজর আখতার কর্তৃক মান্নানকে রিভার সাইড/ব্যাংক থেকে জমি এবং ব্যক্তিগত খরচের জন্য প্রদান করা হয় | 2039919 |
| হাবিব ভাইয়ের ২৪৪ এবং ৫৮ শতাংশ, তানির ২৬ শতাংশ, শওকতের ১ বিঘা জমির মোট মুল্য সমন্নয় পূর্বক মান্নান অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে | 438900 |
| ১৭/১/২০০৮ থেকে ১৮/১২/২০১২ পর্যন্ত (৬/২/২০০৯ ৯/৬/২০১২ তারিখের হিসাব ছাড়া) মান্নানকে মেজর আখতার বিভিন্ন সময়ে অমলদের জমি, ইদ্রিসের জমি, বেলা বুয়ার জমি, এবং অন্যান্য বাবদ ক্যাশ প্রদান করেন | 4241500 |
| নভেম্বর ২০১৫ জেলে যাওয়ার সময় থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত (মাহিমার বিয়ে, মান্নানের স্ত্রীদের জমি রেজিস্ট্রেসন সহ) ইত্যাদি বাবদমেজর আখতার মান্নানের জন্য খরচ করেন | 2024000 |
| নোট-১ এখানে উল্লেখ থাকে যে, ফ্যাক্টরির সর্বশেষ বিদ্যুৎ বিল মোট ১৫ লক্ষ টাকা (বিদ্যুৎ লাইন কাটার পর চেকের মাধ্যমে ১১ লক্ষ টাকা এবং জানুয়ারি ২০১৩ মাসের বিদ্যুৎ বিল ৪৪১০০০ টাকা), ফ্যাক্টরির বকেয়া বেতন ২ লক্ষ টাকা, আবু বকরের দানার বকেয়া বাবদ ৩ লক্ষ টাকা (যা এখনো প্রি মাসে দিচ্ছি), ফ্যাক্টরিতে রক্ষিত সর্বশেষ ফিনিসড মালের দাম সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), মার্কেটে বাকি ৫ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), ক্রাশ মাল এর দাম ২ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), কাইউমের লোহা লক্কর বিক্রির প্রায় ১ লক্ষ টাকা, আল্লার দান দোকানে বাকি ৩০ হাজার টাকা, ফজল সাহেবের বাকি প্রায় ৪৫ হাজার টাকা, সর্ব সাকুল্যে সোয়া ৩৬ লক্ষ টাকা হয়। | 3625000 |
| বর্তমানে মেজর আখতার মান্নানের কাছে পাবে | 17045406 |
| নোট-২: মান্নান যদি বর্তমানে আমিরদের জমি ২০৪ শতাংশ, বেলা বুয়ার জমি ২৯ শতাংশ, মান্নানের নিজস্ব জমি ৫৪ শতাংশ, এবং ইদ্রিসদের জমি ৬৬ শতাংশ যা মেজরের নামে কেনা হয়েছে, অমলদের ৪০০ শতাংশ মোট প্রায় ৭০০ শতাংশ জমির মুল্য বাবদ হিসাব করে উক্ত পাওনা সমন্নয় করেও তাতে প্রতি বিঘার জমির মুল্য দাড়ায় | 803569.14 |
| এখানে উল্লেখ থাকে যে, এক্সেল শিটে কখন কোন জমির জন্য কত টাকা দেওয়া হয়েছে তা বিশদ ভাবে বিবরন দেওয়া আছে। | |
| অন্যান্য হিসাব | |
| মেসার্স রাবেতা থেকে ২৯ কিস্তিতে মান্নান মোট অগ্রিম এবং মালের সমন্নয় পূর্বক টাকা নিয়েছে (রাবেতার কাছ থেকে অগ্রিম ১০ লক্ষ টাকা নেওয়ার কোন হিসাব মা ইন্ডাস্ট্রিজের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ নাই) | 305900 |
| মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে ৭ কিস্তিতে মান্নান নতুন পিকআপ এর ইন্সটলমেন্ট দিয়েছে | 360000 |
| মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে মাহিদার জন্য ক্যাম্ব্রিয়ান কলেজের জন্য খরচ করা হয়েছে | 347000 |
| দুলালের বিদেশ যাওয়ার জন্য মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে | 463000 |
| মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে আলি ভাইকে টাকা দেওয়া হয়েছে | 60000 |
| মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে কন্সট্রাকসন কাজের জন্য ফজল ভাইকে টাকা দেওয়া হয়েছে | 76100 |
খুব হাপিয়ে উঠেছিল আমার পরিবারের সদস্যরা। কোথাও বেড়াতে চাচ্ছিল সবাই এক সঙ্গে। বিশেষ করে আমার বড় মেয়ে ডাক্তারি বই পড়তে পড়তে তার আর ভাল লাগছিল না। সব বই, প্র্যাক্টিকেল ক্লাস, আর পরীক্ষা টরিক্ষা এক পাশে ঠেলে রেখে একদম নিরিবিলি কোথাও বেরিয়ে আসার জন্য প্ল্যান করতে চাইলে আমার বউ বলল ” চল মালয়েশিয়ায় যাই, ওখানে আমি যেহেতু অনেকদিন ছিলাম, অনেক জায়গা আমার চেনা, গেলে খারাপ লাগবে না”। কোন দেশে যাব, এটাতে আমার কোন বাড়তি চয়েস ছিল না, কোথাও যাওয়াটাই ছিল আমার কাছে মুখ্য ব্যাপার। আমার অনেকগুলু সমস্যা হাতে ছিল যদিও, (আমার বড় ভাই অনেক বছর পর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসবেন ২৬ ডিসেম্বর, আমার ভাইয়ের বউ বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আছেন এবং ২৩ ডিসেম্বর তারিখে আবার চলেও যাবেন, আমি মালয়েশিয়া গেলে ২৩ তারিখে, সেক্ষেত্রে আমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না তার যাওয়ার দিন, আমার মেয়ের দুইটা কার্ড পরীক্ষা মিস হবে, আমার ফ্যাক্টরির উদ্দেশ্যে বায়ার আসবে আমার অবর্তমানে ইত্যাদি ইত্যাদি)। তারপরেও আমি ব্যাপারটা এড়িয়ে প্ল্যানটা জারি রেখেছিলাম কারন, সর্বদা সমস্যা থাকবে আর এই সমস্যা নিয়েই আমাকে কোন না কোন দিন সময় যোগাড় করতেই হবে, আমি অনেক ভেবেচিন্তে ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সে টিকেট কনফার্ম করে ফেললাম।
আমার ছোট মেয়ে কখনো প্ল্যানে উঠেনি, তার যেমন একটা প্ল্যানে উঠার কৌতূহল ছিল আবার কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন মিসিং হওয়ার কারনে সে একটা ভীষণ ভয়ের মধ্যেও ছিল। কি হয় কি হয় না, সে ভীষণ ভয়ের মধ্যে প্লেনে উঠেছিল। তার চিত্তের ভিতরে কতটা ভয় কাজ করছিল সেটা আমি বুঝতে পারলাম যখন আমরা সবাই প্লেনে উঠলাম। আমার ছোট মেয়ে কোন এক অজানা ভয়ে একদম চুপসে যাচ্ছিল, তার বিদেশ যাওয়ার খায়েশ যেন আর থাকছিল না। সে বারবার তার মাকে শক্ত করে ধরেছিল, আমাকেও তার পাশে বসিয়ে আমার কোট আর হাত এমন করে ধরেছিল যেন সে কোন এক উচু পাহারের একদম ধারে গিয়ে দারিয়ে কোন মানুষ যা করে সে তাই করছিল। আমার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা কোন লজিক তার ভয়ের উপশমের লাঘবের উপাথ্য হয়ে কাজ করছিল না। তার চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পরছিল আর মুখটা এতটাই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল যে, আমার বড় মায়া হল। ১৩ বছরের একটা ছোট মেয়েকে আমি কি বললে যে তার চিত্ত ঠাণ্ডা হবে বা ভয় কেটে যাবে তার কোন কিছুই আমার জানা ছিল না। এই ব্যাপারটা যাওয়ার সময়ই শুধু হয়নি, বরং ব্যাপারটা আরও কঠিনরুপ ধারন করল যখন এয়ার এশিয়ার একটি প্লেন ২৫ তারিখে ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে হারিয়ে গেল। আমি আমার পরিবারের সময় বাঁচানোর জন্য যেখানে বাসে বা ট্রেনে গেলেও চলে, তার পরিবর্তে আমি সেখানে প্লেনের টিকেট আগেই করে ফেলেছিলাম। যেমন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউই, লঙ্কাউই থেকে পেনাং, আবার পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর, এই পুরু ভ্রমণগুলোতে আমি বাস বা রিভার ক্রুজ বা ট্রেন বাদ দিয়ে সব স্থান থেকে এয়ারে টিকেট করেছিলাম। এরমধ্যে আবার একটা পরেছে এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট। তো বুঝতে আমার অসুবিধা হল না নেক্সট ভ্রমনগুল আমার ছোট মেয়ের জন্য আনন্দের না হয়ে মোটামুটি কষ্টের সময় পার হবে। ভয় এমন একটা জিনিস যাকে একবার ধরে বসে, সে বুঝতে পারে তার ভিতরে কি হয়। এটা বাইরের কেউ তার পরিধি আঁচ করবার উপায় থাকে না। যাক, তারপরেও আমি সিডিউলগুল প্লেনেই ঠিক রাখার চেস্টা করেছিলাম একমাত্র পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর ছাড়া। শেষ অবধি পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর পর্যন্ত প্লেন বাদ দিয়ে বাসে আসতে হয়েছিল। সেটাও আরেক অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার যাওয়ার প্রথম দিনের ঘটনাটা বলি।
সকাল ১১ টায় ফ্লাইট। সম্ভবত আমরাই সবার শেষে ফ্লাইটে উঠলাম। কুয়ালালামপুর পৌঁছলাম লোকাল টাইমে প্রায় তিনটার দিকে। কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে লোক ছিল। ফলে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। কোন অসুবিধা হয় নাই। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় আমাদের সবার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল একটা কারনে। আমাদের ঠিক সামনে একজন বাঙালি ছিল যে কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়ায় এসে ইমিগ্রেসন থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারনে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে জানে না কেন তাকে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেসন থেকে মালয়েশিয়ায় ঢোকতে না দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছিল। ফলে সে ১৫ দিনের তফাতেই আবারো একটা এটেম্পট নিয়েছিল মালয়েশিয়ায় ঢোকার জন্য। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম এবারো তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। নেহায়েত গরিব মানুষ, গ্রাম থেকে বোধহয় মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে। আমি ইমিগ্রেসন অফিসারে সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম এই জন্যে যে কি কারনে তাকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে তা সঠিক তথ্যটা জানার জন্য। ইমিগ্রেসন অফিসার আমাকে জানালেন যে, কিছু সমস্যা আছে, সিকিউরিটির ব্যাপার। আগেরবার তাকে ওই কারনেই ফেরত পাঠানো হয়েছিল, এবারো তাই। লোকটা ভালভাবে তার অবস্থাটা ব্যাখ্যা করতে পারছিল না ভাষার কারনে। বুঝাই যাচ্ছিল যে সে বড় অসহায়। আমাকে দেখে যেন তার আত্মায় পানি এল। বলল, স্যার, আমাকে একটু সাহায্য করেন। অরা কি বলে আমি ঠিক বুঝতে পারি না আর কি বলতে কি উত্তর দিচ্ছি তাও ভাল মত বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমার এই সাহায্যটা ওনার কাজে লাগলো না ইমিগ্রেসন অফিসারের কারনে। অফিসার আমাকে শুধু প্রশ্ন করল, ওই ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গের কিনা। আমি সত্যি কথাই বললাম যে, সে আমাদের সঙ্গের কেউ না। ফলে ইমিগ্রেসন অফিসার আমাকে রিকুয়েস্ট করলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু না বলার জন্য। আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম, তাকে পুনরায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে কিনা এবং কেন। সে আমাকে জানাল যে, তাকে ফেরত পাঠানো ছাড়া কোন বিকল্প নাই। তার সিকিউরিটির সমস্যা আছে। আমরা চলে এলাম কিন্তু আমাদের সবার মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে, নেহায়েত একটা গ্রামের গরিব মানুষ কি কারনে মালয়েশিয়ার কোন নিরাপত্তার হুমকি হয়ে গেল সে নিজেও জানে না অথচ সে হয়ত তার সব কিছু বিক্রি করে তার স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় এসেছে কিন্তু ওই স্বপ্নের দেশে সে ঢোকতে পারছে না। দেশে গিয়ে এখন সে কি করবে বা কি করবে না এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমার মেয়েরা আমাকে করেছিল কিন্তু সে উত্তরগুলু আমার জানা ছিল না। লেখাপড়া করাটা যে কত জরুরি, অন্তত নিজের কথাগুলু অন্যকে বুঝানো এবং অন্যের কথাগুলো সঠিকভাবে বুঝা যে কত জরুরি সেটা তখনই সম্ভব যখন কেউ অন্তত ওই টুকুন লেখাপড়া করা দরকার। হয়ত ইমিগ্রেসন অফিসার এমন কোন প্রশ্ন তাকে করেছিল যার প্রশ্ন সে না বুঝেই হ্যা বলেছে আর সে হ্যা উত্তরটাই তার কাল হয়ে দারিয়েছে। বড় দুঃখের ব্যাপার। আমাদের কিছুই করার ছিল না।
এয়ারপোর্ট থেকে আমরা বেরিয়ে গেলাম। বড্ড সুন্দর একটা দেশ। খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, অনেক ফ্লাই ওভার, অনেক রাস্তাঘাট, সুন্দর সুন্দর দালান কোঠা। অনেক দূর থেকে টুইন টাওয়ার চোখে পরে। যে কোন উন্নত দেশের সঙ্গে মালয়েশিয়াকে এখন তুলনা করা চলে। কোন রিক্সা নাই, বাসও চলে না দিনের বেলায়। চারিদিকে ট্যাক্সি আর প্রাইভেট কারের সমারোহ। কোন হর্ন বাজে না। জ্যাম থাকলেও সেটা সাময়িক। বড় ডিসিপ্লিনড দেশ। রাস্তার পাশের বনজঙ্গল গুলুও বেশ গুছানো। নাপিতের ক্ষুরে যেমন মানুসের অতিরিক্ত চুল ছেটে সুন্দর করে রাখা হয়, মালয়েশিয়ার রাস্তার পাশের ঘাসগুলুও যেন সেভাবে সাজানো। অনেক ক্লিনার কাজ করছে, যার যার কাজ সে সে করছে। তাদের উপর কোন তদারকি করছে না কেউ। খুব গুছানো একটা শহর। প্রায় ৩০ মিনিট গাড়িতে থাকার পর হোটেলে এলাম। খুব বেশি খরচ না। থ্রি স্টার স্ট্যান্ডার্ড। প্রতিটি রুম মাত্র ২০০ রিঙ্গিত এর মধ্যে বা তার থেকে একটু বেশি। আমরা দুই ফ্যামিলি তিনটা রুম নিলাম, মাঝখানে কানেক্টেড। আমার ছোট মেয়ের ভয়টা এখন আর নাই, তার চোখে মুখে হাসি আছে, আর আমার বড় মেয়ে কতক্ষণে মোবাইল সিম কিনবে, ফেসবুক ব্রাউজ করবে, তার মালয়েশিয়ার ভ্রমনের ছবি সম্বলিত ম্যাসেজ ট্যাগ করবে, সেই ভাবনায় বারবার কোথায় মবাইলের সিম পাওয়া যায় তার জন্য অস্থির করে ফেলছে। রাত নয়টায় খেতে বের হয়েছি। আমাদের সঙ্গে ড্রাইভার আছে, গাড়িও আছে। একটা পাকিস্তানি হোটেলে খেতে ঢোকলাম। প্রায় বাঙালি খাবার। আমি স্রেফ ভাত ডাল আর সবজি খেয়েই তৃপ্ত বোধ করলাম। মেয়েরা আধুনিক মানুসের ডিজিটাল ধাচের। মুরগি আর বিরিয়ানি ছাড়া তারা কিছুই পছন্দ করে না। সুতরাং তারা ঐটাই খেল আর আমি আমার মেনু। খাওয়ার পর একটু আশে পাশের মার্কেটে ঘোরাফেরা করলাম, কিছু কেনাকাটাও করলাম। একটা জিনিস খেয়াল করলাম যে, আমার মেয়েরা যা যা জিনিসের প্রতি কেনার খেয়াল তা হচ্ছে সব গিফট, কোন বন্ধুরে কোন গিফট দেয়া যায় সেটা নিয়ে মহা জল্পনা কল্পনা। আমার মেয়ে এবং বউ সিম কিনতে ভুল করল না। অনেক পদের সিম কার্ড। অফারের ছড়াছড়ি। রাত প্রায় ১ টায় আমাদের হোটেলে পৌঁছলাম। সারাদিন ফ্লাইট আর ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে এসে বড্ড ক্লান্ত মনে হল। বিছানায় যেতেই ঘুমিয়ে পরলাম।
পরদিন ২৪ ডিসেম্বর।
সকালে নামাজ পরে নাস্তা করে বেরিয়ে গেলাম কতগুলো বিশেষ স্থান দেখার জন্য। তার মধ্যে প্রথম ছিল গেন্টিং আইল্যান্ড। গেন্টিং আইল্যান্ড সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২০০০ মিটার উঁচুতে। জায়গাটা সুন্দর। পাহারি এলাকা, তার এক জায়গায় স্ট্রবেরি চাষ হয়। বড্ড সুন্দর। হরেক রকমের স্ট্রবেরি। সবুজ, লাল, মেরুন সাদা আরও কত প্রকারের যে স্ট্র বেরির রঙ। এটাকে একটা স্ট্রবেরির মিউজিয়াম বলা চলে আর কি। ওখানে অনেক বাঙালি ছেলেরা কাজ করে। একটা জিনিস খেয়াল করার মত যে, যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই কোন না কোন বাঙালি লোক পেয়েছি, তাও আবার একজন করে নয়, অনেক বাঙালি। স্ট্রবেরির মিউজিয়ামটা দেখার জন্য আগে থেকে কোন প্ল্যান ছিল না। এটা দেখা হয়েছে গেন্টিং আইল্যান্ডে যাওয়ার কারনে। সারাদিন মেঘে ভরা থাকে জায়গাটা। অনেক দূর থেকে পাহারের কোল ঘেসে মেঘ বলে মনে হলেও কাছে গেলে ওটা কুয়াশাই হয়ে যায়। অত্যন্ত ঘন কুয়াশায় জায়গাটা সারাক্ষন ভিজাই থাকে। খুব সাবধানে গারি চালাতে হয়। এমনিতেই পাহারি এলাকা, আর তার উপর আবার ভিজা রাস্তা ঘাট। সবার হাতে ছাতি। শুধু আমাদের হাতে কারো কোন ছাতি নাই।
স্ট্রবেরি দেখে পাশেই স্কাই রেল। দারুন জিনিস। শুন্যে ভেসে ভেসে প্রায় কয়েক কিলোমিটার রাস্তা ক্যাবল কার দিয়ে পাহারের উপর দিয়ে উরে যাওয়ার মত। এটাকে ওদের ভাষায় বলে গেন্টিং স্কাই ড্রাইভ। এটাকে আবার “গন্ডলা লিফট”ও বলে। প্রায় ৪ কিলোমিটার লম্বা পথ। এই জায়গাটার নাম করন করা হয় কোন এক প্রাইভেট কম্পানির নামে। ঐ কম্পানির নাম ছিল “গেন্টিং হাই ল্যান্ডস বারহ্যাড” ১৯৬৫ সালে। উক্ত কোম্পানিকে তখন মোট ১৪০০০ হাজার একর জমি ১০০ বছরের জন্য লিজ দিয়েছিল। বেশ মজার একটা ব্যাপার। যাদের হার্টের সমস্যা আছে, বা হাইট ফুবিয়া আছে তাদের না যাওয়াই ভাল, তবে যারা একটু থ্রিল পছন্দ করে, তারা স্কাই ক্যাবলটা আনন্দ পাবে। এই ক্যাবল কারটাকে বর্তমানে “World’s Fastest Mono Cable Car System” নামেও পরিচিত with a maximum speed of 21.6 kilometres per hour (13.4 mph) and the “Longest Cable Car in Malaysia and Southeast Asia maybe”. এখানে 20th Century Fox World কোম্পানির বর্তমানে লোকেশনের কাজ চলছে যা ২০১৬ তে শেষ হবে। তখন দেখা যাবে আরেক চমক। চারিদিকে ঘন জঙ্গল, অনেক উঁচুতে এক একটা ক্যাবল কারে সর্ব মোট চারজন করে করে পাহারের উপর দিয়ে ভেসে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে চলে যাওয়ার যে একটা মজার অনুভুতি, মন্দ না। আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে আবারো একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যাওয়ার সময় সে কিছুতেই চোখ খুলছিল না, কিন্তু আসার সময় মনে হল, একটু সাহস সঞ্চয় করে চোখ খুলে কিছুটা হলেও পাহাড়ের দৃশ্যটা দেখেছে আর কি। কিন্তু কেউ একটু নড়লেই তার চিৎকার শোনা যায়। “এই বাবা, তুমি নরাচরা করছ কেন? কিংবা ঐ আপি তুমি ছবি তোলার জন্য নরাচরা করছ কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি”। অসংখ্য ছবি আর ছবি তুলেছে আমার বড় মেয়ে, সঙ্গে তাদের মা। ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরাফেরার মধ্যে একটা মজা আলাদা। আমি অনেকবার বিদেশ গিয়েছি কিন্তু তা নিতান্তই ব্যবসার কাজে অথবা চাকুরির কাজে। এবারই প্রথম আমার সপরিবারে সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়া। মেয়েদের উচ্ছ্বাস দেখে আমার বেশ ভাল লাগছিল। অনেকবার সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার প্লান করলেও কারো না কারো স্কুল বা কলেজের বা পরিক্ষার কারনে আমাদের যাওয়া হয় নাই।
ঐ ক্যাবলকার দেখে আমরা সবাই আবার চলে গেলাম পুত্রজায়া দেখার জন্য। পুত্রজায়া জায়গাটা দেখার মত একটা জায়গা। পুত্র জায়ার প্রধান কনসেপ্টটা হচ্ছে যে, “City in the garden and Intellegent City” পুত্র জায়ায় এখন সরকারি সব অফিস আদালত ট্র্যান্সফার করা হয়েছে (একমাত্র Ministry of International Trade and Industry, Ministry of Defence and Ministry of Works ছাড়া)। কুয়ালালামপুরে জ্যামের কারনে পুরু প্রশাসনিক অফিসগুলো সব এখন এখানে অবস্থিত। ডঃ মহাতিরের মাথায় প্রথম এই কনসেপ্টটা আসে যে, কুয়ালালামপুর থেকে সর ধরনের অফিস এই পুত্রজায়ায় স্থানান্তর করা হয়। মালয়েশিয়ান ভাষায় পুত্র মানে “প্রিন্স” আর জায়া মানে “সাকসেস”। অর্থাৎ প্রিন্সের সাকসেস বা ভিক্টরিই হচ্ছে পুত্রজায়ার অর্থ। ইন্টেলিজেন্স সিটি বলতে বুঝায় যে, এটা একটা ডিজিটাল সিটি। এখানে বলা বাহুল্য যে, ডিজিটাল সিটি বা স্মার্ট সিটিগুলোর মধ্যে Chicago, Boston, Barcelona and Stockholm রয়েছে। As of 2010 Census the population of Putrajaya is 97.4% Muslim, 1.0% Hindu, 0.9% Christian, 0.4% Buddhist, and 0.3% other or non-religious
পুত্র জায়ায় নিম্ন বর্ণিত অফিসগুলো রয়েছেঃ
পারদানা পুত্র অর্থাৎ office of the Prime Minister
সেরি পারদানা বা official residence of the Prime Minister
শ্রী সাত্রিয়া বা official residence of the Deputy Prime Minister
প্যালেস অফ জাস্টিস
পুত্র জায়া মিনিস্ট্রি অফ ফাইন্যান্স
অইস্মা পুত্র বা Malaysian Ministry of Foreign Affairs.
ম্যালাওাতি জাতীয় প্যালেস
Putrajaya Convention Centre
Perdana Leadership Foundation
Selera Putra
Souq Putrajaya
Pusat Kejiranan Presint 9
Pusat Kejiranan Presint 16
Putra Mosque
Tuanku Mizan Zainal Abidin Mosque (Iron Mosque (Masjid Besi))
এখানে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক কনভেনশনাল সেন্টার অবস্থিত। লোকেশনটা সত্যি দেখার মত। যেমন সুন্দর তেমনি মনোরম। এখানে অনেক রাজকীয় জায়গা আছে, আছে চমৎকার একটা মসজিদ, আছে লেক, আছে বিশাল বিশাল বিল্ডিং, আর আছে অনেক বিদেশি পর্যটক। প্রতিটি লাইট পোস্ট, প্রতিটি গাছপালা, প্রতিটি বিল্ডিং ডিজাইন, এমন কি প্রতিটি টাইলস প্ল্যান করে সাজানো। যে বা যারাই এর পিছনে কাজ করুক না কেন, তাদের জবাবদিহিতা ছিল এর সৌন্দর্য এবং সমাপ্তির লক্ষে। কোন একটা জায়গা খামাখা ব্যবহার করা হয় নাই, কোন না কোন লক্ষ্য নিয়ে এর নির্মাণ কাজ হয়েছে, আবার যে জায়গাগুলো ব্যবহার করা হয় নাই, সেগুলোও অত্যান্ত প্লান মাফিক খালি রাখা হয়েছে। যত্রতত্র কোন কিছুই করা হয় নাই। স্পেসের সুষম বন্টন, আর রিসোর্সের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার চোখে পরার মত। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে, আমাদের দেশের অনেক নামি দামি মন্ত্রি, মিনিস্টার, অনেক হাই অফিসিয়ায়ালগন কত বার না এদেশ ভ্রমন করেছে কিন্তু ওদের কি ইচ্ছে করে না আমাদের দেশটাকে এইভাবে সাজানোর? খুব অবাক হয়েছি আমাদের দেশের নেতাদের ইচ্ছা শক্তি আর রুচির অভাব দেখে।
পুত্রজায়ায় নামাজ পরে কিছু খাবার খেয়ে আবারো আমরা কুয়ালালামপুরে হোটেলে চলে এলাম। রাতে খাবার খেয়ে কিছু শপিং করে রাতে আবারো কিছুক্ষনের জন্য বিশ্রাম। পরদিন যেতে হবে লঙ্কাউই আইল্যান্ডে। লংকাউই আইল্যান্ডে যাওয়ার আগে আমরা টুইন টাওয়ার দেখে যাবার প্ল্যান, তাই সকাল সকাল খেয়ে দেয়ে ব্যাগ পাট্টা গুছিয়ে প্লেনের টিকিট পকেটে করে টুইন টাওয়ারের চলে গেলাম। কোন টিকিট নাই আগামি ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে টুইন টাওয়ারে উঠতে পারলাম না, বাইরে থেকেই দেখে আর ছবি টবি তুলে বেরিয়ে গেলাম লংকাউই এর উদ্দেশে এয়ারপোর্ট। যাবার আগে ৩০ ডিসেম্বর তারিখের টিকিটটা কিনে নিয়ে গেলাম যেন লঙ্গাকাউই থেকে ফিরে টুইন টাওয়ারের ভিতর ঢুকতে পারি। এখানে একটা জিনিস বলতে ভুলে গেছি যে, এর আগের দিন পুত্রজায়ায় যাওয়ার আগে আমরা বার্ডস মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। এটা একটা চিরিয়াখানার মত। কিন্তু শুধু পাখিদের। এই জু তে ছোট বুলবুলি পাখি থেকে শুরু করে প্যাচা, ইগল, বক কাক, আরও অনেক নাম না জানা পাখির সমারোহ। পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য বটে। ওরা সুখেই আছে, খাওয়া দাওয়ার চিন্তা নাই, সময়মত খাবার পাচ্ছে, উড়ে বেড়ানোর যথেষ্ট জায়গাও আছে, আর সবচেয়ে যেটা আছে তা হচ্ছে এরা নিরাপদ। হেটে হেটে দেখতে হয়, পা ব্যাথা হয়ে যাচ্ছিল আমার। টুইন টাওয়ার সম্পর্কে কিছু বলি।
টুইন টাওয়ারকে বেসিক্যালি পেট্রনাস টাওয়ার বা পেট্রনাস টুইন টাওয়ার বলা হয়। মালয়েসিয়ান ভাষায় একে বলা হয় মিনারা পেট্রনাস। এটা ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার হওয়ার আগ পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বচ্চ টাওয়ার ছিল। সাত বছর লেগেছিল এটা তৈরি করতে। পুরুটাই রেইনফরসড কনক্রিটে করা। পরে এর বাহিরের দিকে ষ্টীল এবং গ্লাস দিয়ে মোড়া হয়। প্রায় ৬ লক্ষ স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়ে এই টুইন টাওয়ার। ৪১ এবং ৪২তম টাওয়ার দ্বারা দুইটা মিনার এক সঙ্গে যুক্ত। আর এইটাও বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কানেক্টেড ব্রিজ কোন টুইন বিল্ডিং এর মধ্যে। প্রতিদিন ১০০০ জন লোককে এই টুইন টাওয়ার দেখার জন্য টিকেট বিক্রি করা হয়। দর্শকগন এই ৪১/৪২ এবং ৮৬ তলায় শুধু যেতে পারে, আর অন্য গুলোতে যাওয়ার অনুমতি নাই। এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, টুইন টাওয়ারটা কি কারনে করা হয়েছিল। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আম্পাং (যেখানে বর্তমানে টুইন টাওয়ারটা অবস্থিত) থেকে সেলানগর টার্ফ ক্লাব (এখন যেটা কেএল সিটি নামে পরিচিত) পর্যন্ত এতটাই ট্রাফিক জ্যাম হত যে, ঘন্টার পর ঘন্টা কোন গাড়ীঘোরা চলতে পারত না। এই অচলবস্থা নিরসন কল্পে মালয়েশিয়ার ৪র্থ প্রেসিডেন্ট ডঃ মহাতির এই প্রজেক্ট হাতে নেন। সেলানগর টার্ফ ক্লাবটা ছিল একটা রেসিং ক্লাব যা ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল এমেচার রেসিং হিসাবে চালু করেন। এক পর্যায়ে এই রেসিং ক্লাব থেকে মালয়েশিয়া হাজার হাজার মিলিওন ডলার আয় করতে শুরু করে বেদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে। পর্যায়ক্রমে এই সিলানগর টার্ফ ক্লাব হয়ে উঠে রেসিং কাম স্পোর্টস সেন্টার। এমনকি এটা পরবর্তীতে কমনওয়েলথ স্পোর্টস ক্লাব হিসাবে রানি এলিজাবেথ-২ এর সময় চালু হয়। কিন্তু শুধুমাত্র জ্যামের কারনে অনেক অসুবিধা হচ্ছিল এর আয়ের উৎসে। ১৯৯৪ সালে এটা (সেলানগর টার্ফ ক্লাবকে) অফিসিয়াল স্পোর্টস ক্লাব হিসাবে মর্যাদা দেয়া হয় যা এখন বিদ্যমান।
The entire master plan for KLCC project development around freehold prime property (KLCC: 40.5 hectares – Petronas Twin Towers & Retail: 5.8 hectares with 18,000 m2 each tower – 994,000 m2 total Petronas complex) was focused into seven main sections. i.e. Office Buildings, Hotels, Retails, Convention Centre, Residential, Recreational facilities and Infrastructure. The conceptual redevelopment project was to covert site of the former Selangor Turf Club, a 100-acre horse race track located in the center of Kuala Lumpur’s “Golden Triangle, into an integrated, self-contained modern city as well as creating a new landscape for the capital city of Malaysia
The reallocation of the Turf Club was also occurred back in 1992/3.
Today, Petronas has evolved into a turnover of $25.7 billion with a pretax profit of $9.9 billion for the financial year ended on March 31, 2004 – and it was one of the respectful top Fortune 500 company. Four of its subsidiaries are listed on the Malaysian Stock Exchange (renamed as Bursa Saham Malaysia in 2005).
এই গেল টুইন টাওয়ারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
এখানে একটা জিনিস আমার চোখে পড়ল ভীষণভাবে। সব গুল এক্সিট শেষ হয় গিফট দোকান ঘুরে ঘুরে। কেউ কিনুক আর নাই বা কিনুক, তাকে ঐ সব দোকান দিয়েই বের হতে হবে। এটা একটা বিজনেস চালাকি। ছোট ছোট বাচ্চারা সঙ্গে থাকে, সুতরাং কিছু না কিছু কেনা কাটা তো হয়ই। আর এই সব জায়গায় দাম একটু চরা থাকে।
যেটা বলছিলাম। আমরা টুইন টাওয়ার বাইরে থেকে দেখে লংকাউই দেখার উদ্দেশ্যে এয়ারপোর্ট চলে এলাম। এটাও একটা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। বড় সুন্দর। আমার ছোট মেয়ের আবার দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। কারন তাকে আবার প্লেনে চরতে হবে। তবে এবার বেশিক্ষন সময়ের জন্য নয়। মাত্র ৪০/৪৫ মিনিট সময়। দেখতে দেখতেই পার হয়ে গেল। আমরা লঙ্গাউইতে পৌঁছলাম যখন তখন রাত ১০টারও বেশি। এখানে যে কোন লোক যারা গাড়ী চালাতে পারে তারা যে কোন দিনের জন্য গাড়ী ভারা নিতে পারে এবং সেলফ-ড্রাইভিং করতে পারে। সস্তাও বেশ। আমরা দুই দিনের জন্য একটা প্রাইভেট গাড়ী ভারা নিয়ে নিলাম। বেশ ভাল। লংকাউই এর একটা সুন্দর নামকরনের ব্যাখ্যা আছে। কেউ কেউ বলে যে, লঙ্কা অর্থ হচ্ছে “সুন্দর” আর “উই” এর অর্থ হচ্ছে “অফুরন্ত”। এর মানে এই যে, লংকাউই মানে “অফুরন্ত সুন্দরের অধিকারি”। আবার কেউ কেউ বলে যে, এটা প্রাচিন থাইল্যান্ডের কেদাহ সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস ছিল যারা লাঙ্কাসু প্রভিন্সের বাসিন্দা। এই লংকাসু হচ্ছে প্রাচিন থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার আন্তসংযোগ স্থল। বর্তমানে এটা মালয়েশিয়ার অংশ। আবার অনেকে বলে যে, “লাংক” মানে ইগল এবং “উই” মানে মার্বেল। এর মানে হচ্ছে এই লংকাউই তে প্রুচুর পরিমানে ইগল এবং মার্বেল পাওয়া যায়। এখানে লোকমুখে আরও একটা মিথ চালু আছে। আর সেটা হচ্ছে About 200 years ago, according to the folklore, a young woman, name Mahsuri, was accused of adultery and was executed by the people in spite of her earnest innocence. Just before her death, Mahsuri laid a curse on the island that it will remain barren for seven generations.
এই এলাকায় থাই ভাষা মোটামুটি সবাই বলতে পারে। আসলে কোণটা যে কি তা আমার জানার দরকার নাই, আমি আসলে জায়গাটার সুন্দরের কারনে বিমোহিত।
লংকাউই তে আমরা এবি হোটেল নামে একটা হোটেলে উঠলাম। আগে থেকেই বুক করা ছিল। গিয়ে দেখলাম, আমাদের রুমটা একদম বীচের সঙ্গে লাগানো। খুব ভাল লাগলো। প্রায় অর্ধরাত অবধি আমরা ঐ প্রাইভেট কারে করে প্রায় আশেপাশের এলাকাটা ঘুরলাম। কিন্তু আমাদের জানা ছিল না যে, রাত ১১ তার পর সব খাবার হোটেল বন্ধ হয়ে যায়। “টমেটো” নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, সারারাত খোলা থাকে, প্রায় রাত ১২ টার পরে গিয়ে মোটামুটি আমাদের পছন্দের খাবারগুল খেতে পারলাম। এই টমেটো হোটেলে বাংলাদেশের অনেক লোক কাজ করে, দাম ও প্রায় রিজন্যাবল। প্রথমে মনে হয়েছিল শহরতা মনে হয় ছোট্ট একটা দ্বীপের মত, যেমন আমাদের সেন্ট মারটিন দ্বীপ। ভুলটা ভাঙল তার পরেরদিন।
সকাল থেকে আমরা সারাদিন (অর্থাৎ বিকাল ৩ টা পর্যন্ত) বীচে অনেক আইটেম করলাম, প্যারাসুট দিয়ে এক পাহার থেকে আরেক পাহাড়ে গেলাম, স্পিড বোটে করে রিভার ক্রুজ করলাম, সাতার কাটলাম, সবাই মিলে সত্য দারুন কাটল বীচের সময়টা। বেশ এক্সপেন্সিভ সব আইটেম। বীচের বালুগুলো এত মসৃণ যে মনে হয় সারাক্ষন হাতে নিয়ে পাউডারের মত পিসাপিসি করি। বালুর রঙ খুব সুন্দর।
এখানে একটা মজার কান্ড ঘটলো। আমরা সবাই ব্যানানা বোটে উঠেছিলাম এক সঙ্গে। এটা বেসিক্যালি একটা স্পিড বোট দিয়ে অনেক স্পিডে টেনে আরেকটা ব্যানানা সাইজের ভেলাকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনে। কলার শেপে বানান একটা বোট, প্রায় ৬ জন একসঙ্গে বসতে পারে। আমরা খুব ভাল করে ব্যানানা ট্যুরটা শেষ করেছি মাত্র, পাড়ে এসে নেমে পড়ব পড়ব ভাব। কিন্তু ঠিক শেষ পয়েন্টে এসে হটাত করে সামনের স্পিড বোটটা এমন করে বেঁকিয়ে টান দিল যেন ব্যানানা বোটে যারা থাকে সবাই এক ঝটকায় পানিতে পরে যায়। আমরাও পরে গেলাম। আমার ছোট মেয়ে সাতার জানে না, বড় মেয়ে কিছুটা জানে। কিন্তু সবার লাইফ জ্যাকেট পরা ছিল। এটা আমাদের জানা ছিল না যে ওরা এই এমন একটা কাজ করবে। ওরা অবশ্য এমন একটা জায়গায় এই কাজটা করে যেখানে সাতারের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু হটাত করে ঝটকা দিয়ে ফেলে দেয়ায় সবাই একটা আতঙ্কে পরে যায়। ব্যাপারটা আমিও জানতাম না। আমাদের বেলায় এই কাজতা হওয়াতে আমার ছোট এবং বড় মেয়ে সঙ্গে আমার বউ এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, মনে হয়েছিল এই বুঝি সবাই ডুবে মরছি। কিন্তু ২০-৩০ সেকেন্ড পর যখন পায়ের তলায় মাটি ঠেকে তখন ব্যাপারটা একটা মজার ঘটনায় পরিনত হয়। হটাত আতংক, আবার হটাতই সস্তি।
বিকালের দিকে খেয়ে দেয়ে আমরা “আন্ডার ওয়ার্ল্ড সি” তে গেলাম। এটাও একটা মিউজিয়াম কিন্তু শুধু মাছের। কি নাই এখানে। সব পদের মাছ, গুল্ম, হাঙ্গর, আরও কত কি!! আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এগুলো সব জীবিত। খুবই সুন্দর একটা জায়গা। দেখার মত। এখানে প্রায় ৫০০০ হাজার পদের মাছের প্রজাতি আছে। ১৯৯৫ সালে এটা তৈরি করা হয়েছিল। The concept and theme of Underwater World Langkawi are geared towards Knowledge, Education and Entertainment. It is built to raise awareness on the importance of conserving our precious aquatic life forms, thus creating understanding of the deep and inseparable bond between man and nature.
প্রতিদিন এই একুরিউয়ামের মত জলাধারগুলোতে ৫ লাখ পরিমান পানি ঢালা হয় ফ্রেশ। এখানে ফটো গ্যালারী আছে, বন্য প্রাণীর গ্যালারী আছে, আর আছে মাছের প্রজাতিদের হরেক রকমের গ্যালারী। হেটে হেটে দেখতে হয়। প্রায় ১৫ মিটার চওরা হাটার পথ। খুব সুন্দর। দেখতে দেখতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল, আমরা সময় করে উঠতে পারছিলাম না সবগুলো আইটেম দেখার জন্য। তার মধ্যে আবার শুরু হয়েছে বৃষ্টি। মালয়েশিয়ায় প্রায়ই বৃষ্টি হয়। তবে আবহাওয়াটা শিতের নয়। এটা সামারের মত একটা সময়।
এই আন্ডার ওয়ার্ল্ড সি শেষ করে আমাদের প্ল্যান ছিল ইগল স্কয়ারে যাওয়ার। এই ইগল স্কয়ারটা কুয়া জেলায় অবস্থিত। লংকাউইটা কত বড় এটা ঐ ইগল স্কয়ারে না গেলে হয়ত বুঝতাম না। এটা প্রথম দিন মনে হয়েছিল আমাদের সেন্ট মারটিন দ্বীপের মত, কিন্তু ইগল আইল্যান্ডের জন্য যেতে গিয়ে বুঝলাম এটা নিতান্তই একটা বড় শহরের সমান। প্রায় ১ ঘন্টা গাড়িতে জার্নি করে ইগল স্কয়ারে পৌঁছলাম। দেখার মত একটা স্কয়ার। ওখানে অনেক বড় আকারের (প্রায় ১২ মিটার) একটা ইগলের ভাস্কর্য করা। খুবই সুন্দর। ইগলের ছবিটা দেখলে মনে হবে ঈগলটা উড়ে যাওয়ার জন্য টেক অফ করছে প্রায়। ঐ যে আগেই বলেছিলাম যে, লোক মুখে একটা মিথ চালু আছে যে, এই লঙ্কাউই একটা অভিশাপের রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত আছে কোন এক মহিলার দ্বারা। ডঃ মহাতির এই কন্সেপ্টটাকে ঢেকে দেওয়ার জন্য আর এই শহরটাকে পর্যটকসমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে এই ইগল ভাস্কর্য এবং অন্যান্য সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করে ফেলেন। চারিদিকে বিশাল খোলা জায়গা। আশেপাশে একটা জেটি আছে। এটা জেটি পয়েন্ট নামে পরিচিত। বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু তারপরেও বের হয়ে গেলাম স্কয়ারটা দেখার জন্য। বেশ সুন্দর। আসলে মালয়েশিয়ায় সব কিছু অত্যন্ত প্ল্যান করে সব কিছু করা হয়েছে আর এটা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। কোন কিছুর কমতি নাই। অনেক রাত হয়ে গেল ফিরতে ফিরতে। আগামিকাল আবার যেতে হবে পেনাং আইল্যান্ডে। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি আমরা বিছানায় যেতে চাইলেও পারা গেল না। কারন আবারো মার্কেটিং। অনেক রাত অবধি কেনা কাটায় ব্যাস্ত হয়ে গেল আমার পরিবার। অনেক পদের গিফট আইটেমের মার্কেটিং। ভাগ্যিস সঙ্গে ভিসা কার্ড ছিল। তা না হলে যে কি হত আল্লাহ মালুম। আমার পরিবার তো ধরেই নিয়েছে বিশ্বব্যাংক সঙ্গে আছে, মার্কেটিং এ কোন সমস্যা নাই। আমার কাছে তাই মনে হচ্ছিল আর কি। রাত ২ টা পর্যন্ত যে যেভাবে পারে তাদের পছন্দ মত মার্কেটিং করল, আর আমার পায়ের অবস্থাটা এমন মনে হচ্ছিল যে, “আর পারছি না ভাই, এবারের মত মাফ কর” অবস্থা। সঙ্গে সিগারেট ছিল বলে রক্ষা, অন্তত সিগারেট খেয়ে হলেও কিছুটা সময় কাটাতে পারছিলাম আর আমার পরিবারের পিছন পিছন ওদের মার্কেটিং দেখছিলাম।
পরের দিন সকাল, পেনাং বিমান বন্দর। খুব সুন্দর একটা বিমান বন্দর। বেশ গোছালো। গাড়ীখানা হ্যান্ডওভার করে আমরা আবারও পেনাং আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে বিমানে উঠে গেলাম। পেনাং শহরটির নামকরন আসলে হয়েছে সম্ভবত পেং লাং উ থেকে যার অর্থ হচ্ছে সুপারির আইল্যান্ড। এটা এক সময় যখন ব্রিটিশরা ইন্ডিয়ায় রাজত্ব করছিল, তখন এটা তাদের অধিনে ছিল। পরবর্তীতে এটা সরাসরি ব্রিটিশদের অধিনে চলে যায়। সেথেকে ব্রিটিশরা চলে যাবার পরও এরা সায়ত্তশাসিতই থেকে যায় যদিও এটা এখন মালয়েশিয়ার অধিনে। এই অঞ্চলটা আসলে টিন এবং রাবারের জন্য বিখ্যাত। ১ম এবং ২য় বিশ্ব যুদ্ধে এই পেনাং এর উপর অনেক বড় বড় অপারেশন হয়েছে। জাপান যখন যুদ্ধে জরিয়ে পরেছিল, তখন তারা এই পেনাং এর পোতাশ্রয়গুলো অনেক ব্যবহার করত। আর এই কারনে ব্রিটিশ বাহিনি বারবারই এই পেনাং পোতাশ্রয়ে ঘনঘন আক্রমন চালায়। জাপানিজরা এই অঞ্চল ত্যাগ করার সময় তা ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। পেনাং জেটি হল সেই বিখ্যাত পোতাশ্রয়। ব্রিটিশরা চলে যাবার পর এটা মালয়েশিয়ার অঙ্গরাজ্য হয়ে যায়। যাক ইতিহাস বলে লাভ নেই। আমার ভ্রমন এর অন্যান্য দিকগুলো বলি।
আমার ছোট মেয়ে সব জায়গায়তেই আনন্দ করছিল কিন্তু একমাত্র বিমান জার্নি ছাড়া। প্লেনে উঠতে হবে এই কথা মনে হলেই তার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরেও সে চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু তার মুখ, চোখ দেখে বুঝা যায় সে প্লেন জার্নিতে মজা পাচ্ছে না। আমরা প্রায় সকাল ১১ তার দিকে পেনাং আইল্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। অদ্ভুত সুন্দর একটা শহর। চারিদিকে পাহাড়, আর সাগরের পাশ দিয়ে রাস্তাগুলো সাংঘাতিক সুন্দর একে বেকে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। খুবই এক্সপেন্সিভ একটা শহর। তারপরেও দেখার মত। এই শহরটা স্বায়ত্তশাসিত। মালয়েশিয়াতে দুইটা শহর স্বায়ত্ত শাসিত। এক পেনাং আরেকটা হচ্ছে মেলাক্কা।
এখানে দেখার মত অনেক কিছু আছে। তার মধ্যে পেনাং-হিল হচ্ছে একটা। এই পেনাং হিলে উঠতে প্রায় কিছু কিছু জায়গায় একেবারে ৯০ ডিগ্রি খাঁড়া উঠতে হয়। কোথাও কোথাও ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত বাক আছে। ১৯০৬ থেকে ১৯২৩ সাল লেগেছে এই সিস্টেমটা চালু করতে। আর তারপর ১৯২৩ সাল থেকে এই পেনাং হিলে উঠার প্রচলন রয়েছে। ট্রেনের মাধ্যমে উঠতে হয়। দেখার মত একটা ব্যাপার। প্রায় এক হাজার মিটার এর চেয়েও বেশি উচু। উঠতে মোট ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে। একটি ট্রেনে প্রায় ১০০ জন লোক উঠতে পারে। আমার খুব কৌতূহল হয়েছিল কি করে এই কাজটা তারা করল? এত খাঁড়া এবং এত উচু একটা ট্রেন কিসের বলে উঠে যাচ্ছে আসলে? পরে জানলাম যে এটা একটা সায়েন্টিফিক ফর্মুলা। যাকে বলে “ফানিকুলার ট্রেন”। ফানিকুলার ট্রেনটা আসলে কি তাহলে?
The basic idea of funicular operation is that two cars are always attached to each other by a cable, which runs through a pulley at the top of the slope. Counterbalancing of the two cars, with one going up and one going down, minimizes the energy needed to lift the car going up. Winching is normally done by an electric drive that turns the pulley. Sheave wheels guide the cable to and from the drive mechanism and the slope cars.
চুরায় উঠে আমার মনটাই ভরে গেল। ওখানে একটা মসজিদ আছে, মন্দির আছে, অনেক লোকজন ওখানে বসবাস করে। ওদের কোন এসি লাগে না, ফ্যানও লাগে না। পুরু মালয়েশিয়া দেখা যায় ঐ পেনাং হিল থেকে। পেনাং হিলটা “এয়ার আইটাম (Air Itam) এলাকায় অবস্থিত। Air Itam মানে হল কাল পানি। কেন এটার নাম কাল পানি হল তা আমি জানার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু লোকাল লোকজন খুব একটা বলতে পারেনি।
চুরায় উঠে আমি এক ইন্ডিয়ান মালয়কে পেলাম যিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করে। দুই রিঙ্গিত দাম এক একটা কোন/কাপ আইস্ক্রিমের। বেশ স্মার্ট ছেলে। তার একটা ছেলে আছে, স্কুলে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, কিভাবে ওরা স্কুলে যায়? ওদের জন্য সরকার একটা ভাল ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই ফানিকুলার ট্রেন দিয়ে বাচ্চারা কাছের একটাই স্কুল, সেখানে যেতে পারে, এতে মাসিক একটা ভারা বলে দেওয়া আছে। আর অন্যান্য কাজের জন্য ওরা সরু একটা কংক্রিটের রাস্তা আছে, ওটা দিয়ে শুধুমাত্র গুটিকয়েক রেসিডেন্ট যারা ওখানে বসবাস করে তারাই আসা যাওয়া করতে পারে, কোন টুরিস্ট ঐ রাস্তা ব্যবহার করতে পারে না। ঐ রাস্তা তৈরির আরও একটা কারন আমি মনে করি তা হল, কোন কারনে যদি ইমারজেন্সি যাতায়ত করতে হয়, তাহলে সরকার বাহিনির রেস্কিউ পার্টি ঐ পথ ব্যবহার করতে পারবে।
পেনাং হিল থেকে বেরিয়ে গেলাম এবং হোটেলে চলে এলাম। আসতে আসতে দেখলাম আমাদের হোটেলের ঠিক সামনে অসংখ্য দোকান বসেছে যারা রাত ১ টা পর্যন্ত থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এদের অধিকাংশ ই হচ্ছে বাঙালি। অনেক কথা হল বাঙালি ভাইদের সাথে। অনেক কষ্টের কথা আবার অনেকের সাফল্যের কথা। আমরা সবাই মিলে প্রায় রাত ১ টা পর্যন্তই ওখানে বিভিন্ন প্রকারের শপিং করলাম। শপিং শেষে হোটেলে ফিরে এসে আবারো ব্যাগ গুছায়ে সবাই শুয়ে পরলাম, কারন পরদিন আবার কুয়ালালামপুর যেতে হবে। এবার আর প্লেনে নয়। আমার মেয়ে এয়ার এশিয়া হারিয়ে যাবার পর থেকে সে আর প্লেনেই উঠতে চাচ্ছিল না। অগত্যা আমরা প্লেন টিকিট বাতিল করে বাসে আসার প্ল্যান করলাম। ডাবল ডেকার বাস। বাস ছাড়ার কথা সকাল ১১৩০ মিনিটে আর সেই বাস ছাড়ল গিয়ে দুপুর ২ টায়। সবচেয়ে বিশ্রী ব্যাপার হল, যার যার মাল সে সে লোড করতে হয় এবং কোন টিকিট (লাগেজ টিকিট) দেয়া হয় না। কুয়ালালামপুর পৌঁছানোর কথা বিকাল ৫ টার মধ্যে আর সেই বাস পৌঁছল গিয়ে রাত ১০টায়। মাঝে আবার কোন খাবারের বিরতিও নাই। বাস জার্নিটা ভাল হয় নাই আসলে। বিরক্তি লাগছিল এত লম্বা একটা সময় বসে থাকতে।
ঐ দিন আর আমরা কোথাও বের হই নাই। কারন এক দিকে বৃষ্টি হচ্ছিল আবার রাতও হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং পরেরদিন ২৯ তারিখ ছিল গিয়ে আমাদের আসম শপিং এর দিন। সারাদিন আমার পরিবার এই মার্কেট, ঐ মার্কেট ঘুরে ঘুরে হরেক রকমের গিফট আইটেম কিনছে। ব্যাপারটা এমন যেন আমরা অন্য কারো জন্য মার্কেটিং করতে এসেছি। আমার ছোট মেয়ের আগে থেকেই বায়না ছিল সে একটা ট্যাবলেট কিনবে। এবং কোন কনফিগারেশনের ট্যাবলেট কিনবে তাও সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল। সারাদিন ঘুরলাম, এর পরেরদিন ছিল ৩০ ডিসেম্বর। মানে আমাদের টুইন টাওয়ার ভিজিটের দিন। ডঃ মহাতির তার ২২ বছরের শাসনামলে সে মালয়েশিয়ার জন্য যা করে গেছে, এই অকল্পনীয় কাজ আর কেউ করতে পারবে কিনা আমার জানা নাই। সম্ভবত এই টুইন টাওয়ারের জন্যই সারা বিশ্ব বারবার মালয়েসিয়াকে স্মরণ করবে। ১৯৮১ থেকে মালয়েশিয়া নতুন এক মালয়েশিয়া হিসাবে ২০০৩ পূর্ণ সুন্দররুপ পেয়েছে। ব্যাক্তি মহাতির তার পারিবারিক জিবনে কত টুকুন সার্থক টা আমার জানা নাই তবে দেশের একজন নেতা হিসাবে তাকে আজিবন স্যালুট না করে কোন মালয়েসিয়ানকে উপায় নেই। কোন একটা কাজও সে অপূর্ণ রাখে নাই। সব কিছু করে দিয়ে তারপর সে নিজ ইচ্ছায় প্রধান মন্ত্রী থেকে বিদায় নিয়েছে। সারা বিশ্ব তার এই ক্ষমতা হস্তান্তরের পালা টা দেখেছে। যে দেশে এই মহাতিররা জন্ম নেয়, সেদেশ ধন্য।
এবার এই ভদ্র লোক সম্পর্কে আমি কিছু বলি। আমার দুইজন বিশিষ্ট পছন্দের ব্যাক্তিদের মধ্যে মহাতির একজন। তিনি আসলে জন্ম গ্রহন করেছিলেন কেদাহ শহরের আলোর সেতার নামে এক গ্রামে ১৯২৫ সালে। তিনি মালয়েশিয়ার ৪র্থ প্রেসিডেন্ট। মোট ২২ বছর তিনি রাজত্ব করে সেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে বের হয়ে যান যার ক্ষমতা হস্তান্তর লাইভ টেলিকাস্ট করেছিল সমস্ত বিশ্ব ২০০৩ সালে। তার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষিক। তিনি বাস্তব জিবনে ছিলেন ডাক্তার এবং আর্মির ডাক্তার। ওনার প্রথম জিবনে তিনি যখন রাজনিতিতে প্রবেশ করেন, তখন কয়েকটা বই লিখে সাং ঘাতিক বিতর্কিত হয়ে যান এবং তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান তার সব গুলো বই ব্যান্ড করে দিয়ে রাজনিতিতে তাকে নিষিদ্ধ ঘসনা করেন। ১৯৭০ সালে মিঃ রাজ্জাক প্রধান মন্ত্রী হলে পুন্রায় তিনি মহাতির কে পার্টি তে নিয়ে নেন। এর পর সম্ভবত ১৯৮১ সালে থেকে তিনি কোন প্রতিযোগিতা ছারাই পর পর ৫ বার প্রেসিডেন্ট নিরবাচিত হয়েছিলেন যেটা একটা ইতিহাস। তার প্রথম ইলেকসনে তিনি তদানিন্তর প্রেসিডেন্ট হোসেন কে মাত্র ৫০ ভোটের ও কমে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট হন। প্রকৃত পক্ষে এই বিজয়টা কোর্ট করত্রিক ফয়সালা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট হবার পর, তার ৯ম দিনে একটা দারুন কাজ করে ফেললেন। নতুন একটা পার্টি ফর্ম করে ফেললেন যার কোন ম্যান্ডেট পাব্লিকের কাছ থেকে ছিল না। তার নতুন পার্টি র নাম হল, ইউএনএমও (বারু)। তার প্রথম কয়েকটা কাজের মধ্যে একটা ছিল, সব সরকারি সংস্থা গুলোকে তিনি প্রাইভেট সেক্টরে হস্তান্তর করেন এবং এতে দারুন ফলাফল আসে। ১৯৯০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ার পার ক্যাপিটা ইনকাম প্রায় ডাবল হয়ে যায়। মহাতির কে প্রধানত আমেরিকা এবং ব্রিটিশ রা একেবারেই পছন্দ করছিল না, ফলে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রকায় তার নামে অনেক নেগেটিভ মন্তব্য করার কারনে তিনি সারা দেশে এই দুইট পত্রিকা সারা জিবনের জন্য ব্যান্ড করে দেন। তার ভিসন-২০২০ এর মধ্যে প্রথম তিনটা ফরমুলার কথা বলি।
(১) মহাতির তার প্রথম ক্ষমতার সময় যত সংখ্যক লোক তিনি পেরেছিলেন, বাইরে পাঠিয়েছেন উচ্ছ শিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে এই সর্তে যে, ঐ লোকগুলো পরবর্তীতে মালয়েশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে লোকাল মালয়েসিয়ান্দেরকে পরাবেন এবং ফারদার কোন লোক আর বিদেশ পাঠানো হবে না। ফলে যদি তোমরা খেয়াল কর দেখবা, ১৯৯০ দসকে অনেক মালয়েসিন রা আমাদের দেশেও এসেছিল উচ্চ শিক্ষা নিতে যেটা এখন অনেক কম রেসিও তে আছে এখন।
(২) তার এই প্ল্যানের পাশাপাশি তিনি যে কাজটা করলেন তা হল, দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার কাজ। তিনি মালয়েশিয়ার প্রতিটি আনাচে কানাচে, দোকানে, মাঠে ঘাটে, বাজারে, স্যালুনে, বাসে, ট্রেনে, বাসার অয়ালে অয়ালে, সর্বত্র একটা শ্লোগান লিখে রাখতে হবে যে, “আমি মালয়েশিয়ান, আমি মালয়েশিয়ান”। এটা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার জন্য প্রযোজ্য যে যে যেই ধর্মেরই হক, সে শুধু মালয়েশিয়ান। সবার কানে কানে, মনে প্রানে, দিলে হৃদয়ে শুধু “আমি মালয়েশিয়ান” এই কথাটা মনে রাখতে বললেন।
একে বলে জিকিরের মত দেশ প্রেমের ছবক। ঐ সময় ই অনি বললেন, দেশের অর্ধেক লোক বিশেষ করে মহিলারা কাজ না করার কারনে ওরা বাকি অর্ধেক লকের রোজগারের উপর নির্ভরশীল এবং এটা তিনি বুঝাতে সক্ষম হলেন যে মহিলারা কাজ করলে সংসার এবং ব্যাক্তিগত জিবনে ও সচ্ছলতা আসবে। ফলে সর্বত্র যেমন অপারেটর হিসাবে, দোকানি হিসাবে বা সেলস গার্ল হিসাবে, গ্যাস ষ্টেশনে, ক্লিনার, মানে যেখানে যেখানে মেয়েরা কাজ করতে পারে সর্বত্র ওদের অগ্রাধিকার দেয়া হল। একটা রেভুলিসনের মত শুরু হয়ে গেল পুরু ব্যাপারটা। মালয়েশিয়ানরা ও পছন্দ করলেন।
(৩) কিন্তু তিনি আরেকটা জিনিষ নিশ্চিত করতে চাইলেন যে, প্রতিটি হোটেল, দোকান, বাস, বাজার সর্বত্র আরেক টা শ্লোগান লিখার জন্য বাধ্য করলে, ” We will not talk about three things in public place: Woman, Politics and Religion” যে কেউ এই গুলো নিয়ে আলাপ করবে পাব লিক প্লেসে, তার শাস্তি হবে।
বাইরে থেকে যত পদের ইনভেস্টর আছে সবার জন্য দ্বার উম্মুক্ত করে দিলেন।
মহাতির মোহাম্মাদ মালয়েশিয়ার যত পদের করাপসন ছিল সেগুলোর মধ্যে থেকেই তিনি নিজে ডেভেলপ মেন্টের কাজগুলো করিয়ে নিয়েছেন। তার নামে যে খালি ভাল ভাল খবর আছে তা কিন্তু নয়। তার নামে অনেক বিপদ জনক তথ্যও আছে। যেমন, সবাই মনে করে তার পরিবারের কাছে ৩ বিলিওন রিঙ্গিত পরিমান সম্পদ গচ্ছিত আছে। তার তিন ছেলে প্রায় ২০০ টি কোম্পানির মালিক যেখান থেকে তারা প্রায় বছরে কয়েক বিলিওন রিঙ্গিত কামাই করে। তার ২য় ছেলে একাই প্রায় আরাই বিলিওন রিঙ্গিতের মালিক।
শুধু এখানেই শেষ ছিল না। তার প্রথম ৯ দিনের মাথায় তিনি যে পার্টি টা ফর্ম করেছিলেন, সেটা কোর্টের কাছে তার পক্ষে রায় টা হয়ত যাচ্ছিল না। মহাতির এই একটা জায়গায় দারুল বোল্ড এক সনে গেলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচার পতিকে এবং পুরান সব জাদ্রেল রাজিনিতি বিদ যারা তার পার্টিতে ছিল সব গুলোকে বহিস্কার করে দিলেন। বিতর্কিত হয়ে গেলেন মহাতির। কিন্তু দমে জায় নাই ব্যাটা। তার সবচেয়ে ট্রাম কার্ড টা ছিল, ১৯৯৭ সালে যখন এশিয়ায় অর্থনৈতিক মন্দার সুচনা হল, মহাতির তখন এমন একখান চাল দিলে যে, মালয়েশিয়ার অর্থনিতিতে এশিয়ার কোন মন্দা ভাব পরল না। তিনি যে কাজটা করেছিলেন তা হচ্ছে ডলার রেট ফ্লাকচুয়েট করা যাবে না, স্থিতি থাকতে হবে। আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক এটাকে নিন্দা করলেও পরে তারা বুঝেছিল মহাতির ঠিক ছিল। মালয়েশিয়া ঠিক এই সময়টায় ই উত্থান করল। পাব লিক তাকে তার সব প্লান কে ধরে নিল মহাতির যা করছে ঠিক করছে।
এর পরেও অনেক স্ক্যান্ডেল আছে মহাতির সম্পর্কে, যা শুনলে অনেকের ই ভাল লাগবে না। সে যত টা ভাল মানুসের মত কাজ করেছে, তার ভিতরে ও অনেক সেলফিস ইচ্ছা টা ও ছিল। বিশেষ করে তার ডেপুটি আনোয়ার এর ব্যাপারে। তাকে নারি কেলেংকারিতে পাওয়ার থেকে নামান হয়েছিল যা প্রকৃত পক্ষে সত্য ছিল না। এটা ইন্দনেশিরার সুহার্থ কে দেখে তার এই ভয় টা আসলে হয়েছিল যে ডেপুটি তাকে হয়ত তার পাওয়ার থেকে বিতারিত করতে পারে, তাই আনয়ারকেই বিতারিত হতে হয়েছিল।
তার শেষ টেনিউরটা আরও ১৮ মাস ছিল, ওনি ইচ্ছে করলে থাকে পারতেন কিন্তু তিনি তা আর করতে চান নাই। কেউ কেউ বলে যে, এটাও একটা রাজনিতির দর্শন। For many younger voters, Mahathir was like a voice from another generation. For many non-Malays, he was the leader of the right-wing brigade and a reminder of all the excesses of the Mahathir era.
যাক এ নিয়ে পরে আরও বিস্তারিত আলাপ করা যাবে।
অনেকক্ষণ বসে ছিলাম এই টুইন টাওয়ারের পাশে। বড় ভাল লাগছিল।
আজ ৩০ তারিখেই আবার ব্যাক করতে হবে। এখন ও আমার দোস্ত নওরোজের বাসায় যাওয়া হয় নাই। বিকাল ৭ টায় ফ্লাইট। এখন বাজে প্রায় বিকাল ২ টা। নওরোজের বাসা সেন্টুলে, যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্সট্রাকশন নওরোজ ফোনে আমাকে দিয়ে দিয়েছে এবং আরও সহজ করার জন্য মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের আগেই কিভাবে বোর্ডিং করে নিতে হয় এয়ারপোর্টে না গিয়ে, সেই বুদ্ধিটাও ও আমাকে দিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক কাজ সহজ হয়ে গিয়েছে।
আমরা বিকালের মধ্যেই আমাদের সব লাগেজ পত্র মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সে দিয়ে নওরোজের বাসায় গেলাম। নওরোজই আমাদেরকে কেএলসিটি থেকে নিয়ে গেল।
আমি নওরোজের অপেক্ষায় কে এল সিটির লবিতে অপেক্ষা করছিলাম। আর দেখছিলাম কখন আমার বন্ধুটি আসে। নও রোজ ও মনে হয় আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য একটু ক্যামুফ্লাজ করার চেষ্টা করেছিল এবং খুব সন্তর্পণে লোকদের ভিরের মধ্যে দিয়ে আমার পিছন থেকে আমাকে “হাই” বলার জন্য আসতেছিল। কিন্তু নও রোজ তা আর পারে নাই কারন এর আগাএই আমি অকে দেখে ফেলেছিলাম।
নওরোজের সঙ্গে আমার আর্মির জিবনে খুব বেশি ঘনিস্টতা হয়ত বেশি ছিল না কারন ও ছিল ইনফ্যান্ট্রি তে আর আমি ছিলাম আর্টিলারিতে। তারপরেও কোর্সম্যাট হিসাবে ওর সঙ্গে আমার অন্যান্য ইনফ্যান্ট্রি বন্ধুদের থেকে অনেক বেশি ঘনিস্টতা ছিল। আমি ওকে দেখে মনে হল কত দিন পর যে একজন আপনজনকে দেখলাম। মনে হল পথ হারা শিশুর মাকে খুজে পাওয়ার মত আর কি। আমি কবি নই, বা সাহিত্যক ও নই। কিন্তু মানুষ মাঝে মাঝে ঐ ধরনের কোন একটা ভাবের মধ্যে চলে আসে। আমার ও মনে হয়েছিল, If I were a poet, I woiuld write a poem standing on the platform of KLCC regarding a feelings of meeting someone who has the same pulse and nurves of my mind and heart. অনেক বাঙালি দেখেছি, অনেক বন্ধুদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কিন্তু নও রোজের বাসায় যাওয়ার জন্য আমি আসলেই উদগ্রীব ছিলাম।
কিন্তু কবিতাটা লিখা হল অনেকক্ষণ কোলাকোলির ভাষায়। পরে ওকে নিয়ে ওর বাসার দিকে রয়ানা হলাম। কমুতার ট্রেন। নওরোজের বাসায় যাওয়ার উছিলায় কমুটার ট্রেনেও চড়া হল। সাংঘাতিক সময় মেইন্টেইন করে চলে এই কমুটার ট্রেন অথচ ভারা মাত্র ১ রিঙ্গিত। কাটায় কাটায় আমরা প্রায় ২৫ মিনিট থাকতে পেড়েছিলাম নওরোজের বাসায়। খুব সুন্দর একটা বাসা। আধুনিক এবং চমৎকার। বাচ্চাদের জন্য প্রিথক প্রিথক রুম, সুন্দর। খুব নিরাপদ, সব কিছুই আছে ওখানে। দেখলাম গার্ড আমার বন্ধুকে খুব ভাল করেই স্যালুত করে আমাদের সবাইকে সাদন সম্ভাসন জানাও। খুব ভাল একটা সময় কেটেছে নওরোজের বাসায়। অদ্ভুত একটা ফিলিংস হয়েছিল আমার। অনেক বছরের বন্ধুত্ব। খুব কাছের না হয়ে কি পারে? অনেক দিন পর বাংলাদেশি স্টাইলে ডাল খেলাম, ভাত খেলা, দেশি মুরগি খেলাম, অদ্ভুত পাক করেছিল নওরোজ ভাবি। আর সবচেয়ে ভাল লাগছিল এই জন্যে যে, ওরা খুব ভাল আছে মালয়েশিয়ায়। যে কারনে দেশ ছেড়ে এত দূর যাওয়া, সেটাই যদি না হয় তাহলে কষ্টের আর সীমা থাকে না। ওদের বেলায় এটা ঘটে নাই, ওরা ভাল আছে এটাই সবচেয়ে ভাল লাগলো। নওরোজ ভাবি আর নওরোজ আমাদেরকে কে এল সিটি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। মনে হল খুব একজন আপনজনকে ছেড়ে যাচ্ছি। আমার প্রায়ই ঐ পোস্টমাস্টার গল্পটা মনে পরছিল, আমরা কমুটার ট্রেনে উঠে গেছি, নওরোজ আর নওরোজ ভাবি কে এল সিটি তে একা বসে আছে, মনে হল আরও একদিন থেকে যাই। অনেক গল্প করতে পারব, একটু আড্ডা মারতে পারব। কিন্তু আমার তো টিকেট করা হয়ে গেয়েছে। চেঞ্জ করার সময়ও পেরিয়ে গেছে। দেখলাম, আমাদের কমুটার ট্রেনটা অনেক স্পিডে সামনের দিকে শত শত যাত্রি নিয়ে কুয়ালালামপুর এয়ার পোর্টের দিকে দ্রুত গতিতে চলছে। তার সময় মত পৌছাতে হবে, তা না হলে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সের অনেক যাত্রি ও আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। কারন আমাদের বোর্ডিং পাশ তো আমাদের হাতে। আমরা না গেলে তো প্লেনটাও ছারতে পারবে না। আর অনেক বেশি দেরি হয়ে গেলে হয়ত আমরাও প্লেনে করে দেশে ফিরে আসতে পারব না। সময় বড় আজব জিনিষ। সময় কারো জন্য কখনো অপেক্ষা করে না, সে তমার সঙ্গে থাকবে অতক্ষণ যতক্ষন তুমি তার সঙ্গে আছ। টা না হলে সে একাই চলতে থাকে, তার কোন সঙ্গির প্রয়োজন নাই।
ওর ছেলেমেয়রা অনেক বাস্তববাদি হয়ে উঠেছে। নিজেদের কাজ ওরা নিজেরাই করে এবং সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে যে, ওরা এখন বুঝতে পারে পরিবার কি জিনিষ। এই জিনিসটা আমরা এখনও আমাদের বাচ্চাদেরকে শিখাতে পারি নাই যা ওরা শুধুমাত্র বিদেশে থাকার কারনে জানে, কোনটা নিজেদের কাজ আর কোন কাজটায় বাবা মা কে সাহায্য করার দরকার। ওরা খুব ভাল ভাবে গরে উঠছে। কত টাকার মাইনে পাবে কিংবা কোথায় কত বড় অফিসার হবে সে ভবিষ্যৎ আমাদের কারোই জানা নাই কিন্তু যারা বাস্তবকে চিন্তে শিখছে তাদের কোথাও কোন সমস্যা হবার কথা নয়। ওর বাচ্চারা ঠিক সেভাবেই বড় হচ্ছে। ওরা আসলে একদিন অনেক বড় হবে ইনশাল্লাহ। আমি কুয়ালালামপুর এসে নামাজ পরে সবার জন্য দোয়া করেছি এবং বাই নেম আমি অর পরিবারের জন্য এবং যারা ঐ কুয়ালালামপুরে আছে, সবার জন্য আল্লার কাছে দোয়া করেছি। আল্লাহ আমার দয়া নিশ্চয় কবুল করবেন।
তারপরের কাহিনি তো বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট। এতা আর নাই বা বললাম। যেখানে সর এয়ারপোর্টে আমরা পৌছার আগেই বেল্টে মাল চলে এসেছিল, সেখানে আমরা বাংলাদেশ এয়ারপোর্টে এসে প্রায় আড়াই ঘন্টা অপেক্ষার পর ও বেল্টে মাল পাই নাই। কাকে বলব এই ব্যর্থতার কাহিনি? এটা আমার জন্মভুমি বাংলাদেশ। এখানে মানুষ আছে, মনুষ্যত্ব নেই, অফিসার আছে, দায়িত্ত জ্ঞ্যান নেই, স কিছু আছে এখানে, কিন্তু নাই শুধু ভাল হবার লক্ষন। আমরা সবাই বলি, ক্যান দেশটা ভাল হচ্ছে না? কিন্তু আমি ভাল হতে হবে এই কথাটাই কেউ বলে না।তারপরেও এই দেশ টা আমার এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের।
কাস্টম অফিসার প্যাসেঞ্জার দেখলে তার পকেট চুল্কায়, পুলিস অফিসারের দায়িত্ত যেন অনেক বেরে যায় যাতে বেশি বেশি তার ইউনিফরমের পকেত ফুলে উঠে। কিন্তু ওরা জানে না কোন একদিন এই সব অপকরমের হিসাব দিতে হবে নিজকে একা। ডুবন্ত টাইটানিকের পাশে দারিয়ে যে লোক ঘুস খেতে চায়, ও ঐ ডলার নিয়ে মরে কিন্তু ঐ ডলারে কোন কাজ আর হয় না।
আমার কোন ইচ্ছাই ছিল না এই চিঠিটি তোমাদেরকে লিখিবার জন্য। কোন দরকার ছিল কিনা সেই ভাবনাটা ভাবিবার সময় অবশ্য এখন নয়। উহা তোমরা ভাবিয়া দেখিবে। সময়ের বিবর্তনে হয়তোবা ইহা তাহার জায়গা দখল করিয়া লইবে তাহার কতটা দরকার ছিল, আর কতটা দরকার ছিল না। তবুও আমার মনে হইল, মাঝে মাঝে বেশ কিছু অবসর সময় পাই, কিছুতো একটা করি। তাই উপন্যাস না লিখিয়া, গ্লোবাল ইস্যু সম্পর্কে না লিখিয়া কিংবা ধর্মীয় কোন বই না লিখিয়া নিজের পরিবারের সাথে যদি সময়টা কাটাই!! তাই, আমি সময় টুকুন ব্যয় করিতে চাহিলাম এমন কিছু বিষয়ের উপর যাহা আমাকে প্রতিনিয়ত মনে করাইয়া দিয়াছে, আহা যদি এমন কিছু কেহ আমার জন্য লিখিয়া যাইত, অথবা এমন কিছু যাহা আমি প্রায়শই জানিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু কোথাও উহার কোন অস্তিত্ত পাই নাই। তাহলে উহ কি এমন জিনিস যাহা আমার মধ্যে প্রায়শই মনে আসিত, খুজিতাম কিন্তু কোথাও তাহা আমি পাইয়াছি বলিয়া মনে হইতেছে না। আমি মাঝে মাঝেই ভাবিতাম, আমার পূর্বে যাহারা আমার বংশে আসিয়াছিলেন,তাদের অনেকেই হয় বা ছিলেন জমিদার, কেউ বা ছিলেন অনেক উচ্চ স্তরের ব্যক্তিকর্তা, হয়তা আবার কেউ এমনও থাকিতে পারেন যাহাদের জীবন লইয়া এখন অনেক বড় বড় লোমহর্ষক কাব্য লিখা যাইত অথবা এমন কেউ থাকিতে পারেন যাহাদের অতিষ্ঠে মানুস প্রতিনিয়ত কায়মনে তাহাদের মৃত্যু কামনাই করিতেন, আবার এমনও হইতে পারে যে, কাহারো কাহারো জীবননাশের কারনে কোন এক সমাজ ব্যবস্থা হয় ভাঙ্গিয়াই পড়িয়াছিল, কে যানে এই সব কথা বা কাহিনি?
মাঝে মাঝে আমার খুব জানিতে ইচ্ছে করিত, এইসব তাহার কেউ কি আমাদের কথা কখনও এমন করে ভাবিয়াছিলেন যে, কোন একদিন হয়তবা কেউ তাহাদের স্মরণ করিয়া তাহাদের ব্যাপারে আরও অধিক জানিবার জন্য আকুপাকু করিবেন? হয়ত কেহ কেহ করিয়াছিলেন, কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারনে তাহারা তাহাদের কোন কথাই আমাদের জন্য রাখিয়া যাইতে পারেন নাই, হয়তোবা আবার করেও নাই। বহুদিন আগে আমি একখানা ছায়াছবি দেখিয়াছিলাম, কালো মানুষের কাহিনী। সম্ভবত ছবিটির নাম ছিল “রুটস”। আলেক্স হেলির বানানো। তিনি অনেক বছর গবেষণা করিয়া করিয়া যতদুর সম্ভব তাহার পূর্বপুরুসের ইতিহাস লইয়া তাহার অই অনবদ্য কঠিন জিবনের কাহিনী পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। কিন্তু আমার আলেক্স হেলির মত অত ধৈর্য নাই যে আমি বছরের পর বছর আমার পূর্ব পুরুসের নাম গবেষণা করিয়া করিয়া এক একটা অধ্যায় লিখিব। সে সাধ্যও আমার নাই। কিন্তু আমি একটা কাজ করিতে পারি অনায়াসে। আর তাহা হইল, আজ হইতে হাজার বছর পরে যদি কেউ আমার কথা জানিতে চায়, আমার সম্পর্কে ভাবিতে চায়, কিংবা আজ এই বিংশ শতাব্দিতে বসে আমি কি ভাবিতেছি, কি ভাবিতেছি না, কিংবা আমি আজ থেকে আরও শত বছর পর, অন্তত এই ভাবনাগুলি তো আমি আমার ঐসব পরবর্তী বংশধরদের জন্য লিখিয়া যাইতেই পারি। তাহাতেই বা কম কিসের? তাই ভাবছি, আমি সারাদিন কি করি, কি ভাবি, কেমন করিয়া ভাবি, আমার কি ইচ্ছা আমার বংসধরদের লইয়া, যদি আমি এক টুকরো কাগজের মধ্যে লিখিয়া রাখি, হয়ত বা কোন একদিন আমারই কোন উদাসীন এক বংশধর এই লেখাটা পড়িয়া জানিতে পারিবে , তাঁহারও আগে কেউ একদিন কি করেছিল।
আমি আমার বাবাকে দেখি নাই। আমি যখন মাত্র দুই কি আড়াই বছরের, তখন তিনি জান্নাত বাসি হয়েছেন। ফলে ঊনার কোনো ছবি, কিংবা কোনো স্মৃতি আমার কাছে নাই। শুনতাম, তিনি ছিলেন অত্যান্ত নামীদামী মানুষ। মাদবর মানুস। অনেক সম্পত্তি ছিলো তার। ওই সময় যে কয়জন মানুষ ধনীদের কাতারে ছিলেন, তার মধ্যেয়ামার বাবা একজন। আমি যখন মাত্র ক্লাস ফাইভে বা সিক্সে পড়ি, তখন আমাদের বাড়িতে কোনো এক বাক্সে আমার বাবার হাতের লিখা কিছু পত্র দেখিয়াছিলাম। খুব সুন্দর হাতের লেখাছিলো। আমি তখন ছোত ছিলাম, বুঝি নাই এই সব স্ম্রিতিগুলি রক্ষনাবেক্ষন করা উচিত কিনা।আমি বা আমরা কেহই ওইসব হাতের লিখা চিঠিপত্র গুলিও সংরক্ষন করি নাই। আজ আমার কাছে মনে হচ্ছে ওই গুলি অনেক দামি বস্তু ছিলো।
আমাদের গ্রামের বাড়ি দুই জায়গায়। একটা মুন্সিগঞ্জের কয়রা খোলায়, আরেকটা হচ্ছে কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। ওই মুন্সিগঞ্জের বাড়িতে থাকেতো আমাদের আগের মায়ের সন্তানেরা আর আমরা থাকতাম কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। আমার বাবা কোনো এক সময় তার জীবদ্দশায় ভীছিলেন যে, আমরা কোনো ভাবেই তার আগের সন্তানদের কাছে নিরাপদ নই এবং আমাদের জীবন নাশ হবার সম্ভাবনা আছে। ফলে আমার বাবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসাবে তিনি আমাদেরকে মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানীগঞ্জ আমার আপন খালুদের এলাকায় রিহেবিলেট করার পরিকল্পনা করেন। আমার বাবার পরিকল্পনা একদম ঠিক ছিল বিধায় তিনি মারা যাবার আগে আমাদেরকে এই কেরানিগঞ্জের এলাকায় স্থানান্তর করে গিয়েছিলেন। আচ্ছা, আমার বাবার আর কি কি প্ল্যান ছিলো যা তিনি শেষ করে যেতে পারেন নাই? অথবা তার কি কি শখ ছিল যা আমাদের পরবরতী জেনারেশনের উচিত তার বাস্তবায়ন করা? কিছুই জানি না। আর এখানেই আমার দুঃখ।
আমি এখানে শুধু আমার বাবার প্রসঙ্গ টাই তুলেছি কারন আমার কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় নাই আমার বাবার আগের জেনারেশনের কি অবস্থা ছিলো বা কে কি করতেন। আমার জানার কোনো ত্রুটি ছিলো না কিন্তু কেহই তাদের ব্যাপারে আমাকে কোনো তথ্য বিস্তারিত ভাবে দিতে পারেন নাই। যাই হোক, এবার তোমাদের পালা। তোমরা অন্তত একটা বেস হিসাবে আমার লেখাএই ডায়েরী বা এই ওয়েব সাইট পেয়েছো যেখানে আমাদের ফ্যামিলির কিছু তথ্য রেডিমেট পেয়েছো। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার মতো ইচ্ছুক হও, তাহলে আমার এই তথ্যাবলী সামনে রেখে আমাদের ফ্যামিলী ওয়েব সাইটটি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারো।
আর এটাই হবে আমার কাম্য।
গত ২৬ মার্চ ২০১৫ তারিখে আল্লাহর নাম নিয়ে আমি আর আমার স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করার জন্য সরাসরি প্রথমে মদিনা এবং পড়ে মক্কা শরিফের উদ্দেশ্যের ওয়ানা হয়েছিলাম। যদিও আনি ২০০৬ সালে যখন হজ্জ করেছিলাম, তখন প্রথমবার হজ্জ করার কারনে অনেক কিছু দেখার সুযোগ হয় নাই কারন হজ্জের অনেক ফরমালিটিজ থাকে যা পালন করতে গিয়ে ইসলামের অনেক আনুষঙ্গিক ব্যাপার গুলো দেখার বা মনোসংযোগ করার সময় থাকে না বা আমি নিজে পাইনি। এবার নিয়ত করেছিলাম যে, আমি ওমরার পাশাপাশি আরও বেশি কিছু দেখবো এবং ওগুলো নিয়ে পরাশুনা করব।আল্লাহ অনেক সহায়তা করেছেন এবং মন ভরে তা করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ।
নবী করিম (সঃ) এর নামে দরূদ শরিফ পড়লে কি হয় তা আমি জানতাম। যেমন, আবু বকর (রাঃ) বলেছেন যে, দরূদ শরীফ পড়লে পানি যেমন আগুনকে ক্রমাগত দুর্বল করতে করতে এক সময় আগুনকে নিভিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি, দরূদ শরীফ পড়লে আমাদের পাপেরও তা ক্রমাগত মুছন শুরু হয়। যতবার এই দরূদ শরীফ পড়া হবে ততবার আমাদের পাপের বিরুদ্ধে এই দরূদ শরীফ পাপ মুছনের কাজ করতে থাকে। তাই বেশি বেশি করে দরূদ শরীফ পরতে হবে। এটা একটা দাসকে মুক্ত করার চেয়েও বেশি সম্মানিত আল্লাহর কাছে। আরেকটা হাদিসে আছে যে, শুক্রবার দিন দরূদ শরীফ পড়ার আরও কিছু বেশি লাভ আছে। আর তা হচ্ছে, বেহেশত থেকে কিছু ফেরেশতার উপর এই নির্দেশ দেয়া আছে যে, যারা যারা আমাদের নবীর নামে দরূদ শরীফ পরবেন, তাদের নাম সোনার কলমে সিলভারের কাগজের উপর তারা লিখে রাখবেন এবং তা আল্লাহর কাছে পেশ করবেন। আমি আমাদের নবীর রওজা মোবারক দর্শন করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্রমাগত দরূদ শরীফ পড়ে যাচ্ছিলাম। অবশেষে আমাদের নবীর রওজায় এসে পৌঁছলাম। মদিনায় তখন সন্ধ্যা। মাগ্রেবের আজান চলছে।
নবীর রওজা মোবারক
আমাদের নবীকে মা আয়েশা (আঃ) এর ঘরেই শায়িত করানো হয়েছে। ওটা ছিল মা আয়েশার ঘর। এবার এটার কিছু তথ্য বলি।
আমাদের নবী যখন ওফাত হলেন, তখন অনেকেই তাঁকে জান্নাতুল বাঁকিতে কবর দেওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু আবু বকর (রাঃ) বললেন যে, তিনি আমাদের নবীর কাছে শুনেছিলেন, রাসুলগন যেখানে ওফাত হন, তাঁদেরকে সেখানেই কবর দেওয়ার নির্দেশ। ফলে মা আয়েশার ঘরেই তার কবর দেওয়া হয়।নবীর ওফাত হওয়ার ২ বছর পর (সম্ভবত) আবু বকর (রাঃ) মারা যান এবং তিনি তখন তার মেয়ে আয়েশাকে অনুরোধ করেন যেন তাঁকে নবীর পাশে কবর দেওয়া হয়। মা আয়েশা তার অনুরোধ রেখেছিলেন।মা আয়েশার ইচ্ছে ছিল যে আমাদের নবীর কবরের পাশে যেন তার কবর হয় এবং সে মোতাবেক তিনি তার কবরের স্থান নির্ধারণ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওমর (রাঃ) যখন এক ক্রিস্টিয়ান দ্বারা তার নাম ছিল ফিরোজ, (আবু লুলু) স্টেবড হন তার ঠিক মৃত্যুর আগে তিনি তার ছেলে আবদুল্লাহকে পাঠান মা আয়েশার কাছে এই বলে যে তাঁকে যেন আমাদের নবীর পাশে কবর দেওয়া হয়। ওমরের এই অনুরোধ তিনি রেখেছিলেন মা আয়েশার নির্ধারিত কবরটা তার জন্য ছেরে দিয়ে। তিনি মোহররমের ১ তারিখে মারা যান। ঠিক তার পরপরই মা আয়েশা তার ঘরের সঙ্গে সব কবরের মাঝে একটা পারটিশান দেন। কারন ওমর তার কাছে গায়েরে মোহররম ছিলেন।
এখানে একটা ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আবশ্যক। আমাদের নবী প্রতিদিন আসর নামাজের পর সব স্ত্রীদের কাছে তাঁদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য যেতেন। কিন্তু তার ৪র্থ স্ত্রী মা জয়নবের কাছে গেলে মা জয়নব তাঁকে তার প্রিয় মধু খেতে দিতেন। ফলে কিছুটা সময় বেশি কাটাতেন তিনি তার ঘরে। এই ব্যাপারটা মা আয়েশা এবং মা হাফসা পছন্দ করতেন না। ফলে তারা একদিন পরামর্শ করলেন যে, নবী যখন মা হাফসার ঘর থেকে তাঁদের ঘরে আসবেন, তখন তারা বলবেন যে, তার (আমাদের নবীর) মুখ থেকে ভাল গন্ধ আসছে না। এই কথা শুনে নবী বুঝতে পেরেছিলেন তাদের মনের ইচ্ছা এবং প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি আর মধু খাবেন না। এটা আল্লাহ তালাহ পছন্দ করেন নি। তার ঠিক এর ফলে কোরআনে এক আয়াত নাজিল হয়েছিল যার অর্থ এই রকমঃ
O Prophet! Why holdest thou to be forbidden that which Allah has made lawful to thee? Thou seekest to please thy consorts. But Allah is Oft-Forgiving, Most Merciful.
Allah has already ordained for you, (O men), the dissolution of your oaths (in some cases): and Allah is your
Protector, and He is Full of Knowledge and Wisdom.
—Quran, surah 66 (At-Tahrim), ayat 1-2[51]
Word spread to the small Muslim community that Muhammad’s wives were speaking sharply to him and conspiring against him. Muhammad, saddened and upset, separated from his wives for a month. ‘Umar, Hafsa’s father, scolded his daughter and also spoke to Muhammad of the matter. By the end of this time, his wives were humbled; they agreed to “speak correct and courteous words”[52] and to focus on the afterlife.[53]
চার নম্বর কবরটি এখন খালি আছে, এবং বলা হয় যে, ওখানে ইশা (আঃ) কে কবর দেওয়া হবে।
আমার দেখা এবারের কিছু জায়গার বর্ণনা দেই।
মদিনায় আমি মোট পাঁচ ছয় জায়গায় ভিজিট করেছি। তারমধ্যে ওহুদের পাহাড় যেখানে হামজা (রাঃ) শহিদ হয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ঐ যুদ্ধে মোট ৬৯ জন সাহাবা শহিদ হয়েছিলেন এবং হামজার কলিজা খেয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ। মোট ৬৭ সাহাবারগন কবর এক জায়গায় এবং মাত্র ২ জনের কবর (একজন হামজা এবং অন্য জন আরেক সাহাবা) একটু দূরে।পুরু জায়গাটি চারিদিকে ওয়াল দিয়ে ঘেরাও করা এবং কবরগুলো শুধুমাত্র কয়েকটি পাথর দিয়ে মার্ক করা। এটা ঠিক যেখানে যুদ্ধটা হয়েছিল ওহুদের সময়, সেই জায়গায় করা হয়েছে। স্থান পরিবর্তন না করে। জায়গাটা দেখলে মন কম্পিত হয়ে উঠে। পরবর্তীতে কিন্তু আবু সুফিয়ান এবং তার স্ত্রী হিন্দ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন কিন্তু আমাদের নবীর একটা অনু রোধ ছিল হিন্দের প্রতি যে, কখন যেন হিন্দ তার জীবদ্দশায় আমাদের নবীর সামনে না আসেন। কারন হিন্দকে দেখলে আমাদের নবীর কষ্ট হত তার চাচা হামজার কলিজা খাওয়ার ঘটনা মনে করে।
ওইখান থেকে আরও ২০-২৫ মেইল দূরে গেলে একটা জায়গা পাওয়া যায় যার নাম হচ্ছে ওয়াদি-ই-জীন। বলা হয় যে, ঐ এলাকাটা জীনদের বসত করার জায়গা হিসাবে পরিচিত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, ওখানে গেলে গাড়ি কোন পাওয়ার ছাড়া এবং কোন গিয়ার ছাড়া ব্রেক ছেরে দিলে প্রায় ৯০-১২০ কিমি স্পীডে পাহাড়ের আপহিলেও গাড়ি চলে। ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না। অনেকভাবে পরিক্ষা করে দেখেছি যে ব্যাপারটা সত্য। প্রায় ৭ কিমি কিংবা আরও বেশি মেইল এই ব্যাপারটা ঘটে। ওটা শুধু একদিকে ঘটে, অন্যদিকে হয় না। তাও আবার আফিলের দিকে হয়।ব্যাপারটার মধ্যে বৈজ্ঞানিক কোন থিওরি কাজ করে কিনা আমি জানি না। তবে ব্যাপারটা নিয়ে আমি সারাক্ষনই ভেবেছি। ব্যাপারটা কি আসলেই মিরাক্যাল? সম্ভবত না। এখানে কোন বিজ্ঞানভিত্তিক কোন লজিক থাকতে হবে। সবাই বলে, জীন গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যায়। আমি যেহেতু ব্যাপারটা সুরাহা করতে পারি নাই, তাই কোন মন্তব্যও করছি না। তবে আমি দেখেছি যে, কোন পাওয়ার ছাড়া এবং গাড়ি একদম অফ করে দিয়ে নিউট্রালে রেখে গাড়ি প্রায় ৯০ থেকে ১২০ কিমি স্পীডে চলছে। এবং এটা আপহিলেই শুধু যাচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু এখন আমি জানি কেন এটা হয়। এটা আসলে আপহিল নয়, আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় এটা আপহিল, কিন্তু আসলে এটা প্রায় ১১ ডিগ্রি ডাউনহিল। আর এ কারনেই আপাতত দৃষ্টিতে যেটা আপফিল মনে করা হচ্ছে সেটা আসলে ৭ কিমি পরিধি নিয়ে ১১ ডিগ্রি ডাউন হিল। আর এ কারনেই গাড়ি, পানির বোতল কিংবা পানি সব আপহিলে যায় বলে মনে হয়। বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য পড়ে আলাপ করা যাবে। আমি এইটার পুরু ব্যাখ্যা এখন জানি। এটা কোন জিনের কাজ নয়।
ঐখান থেকে আমরা খন্দক পাহাড়, এবং মক্কায় এসে আমাদের নবী প্রথম যেখানে মসজিদ করেন তার স্থানটি দেখলাম। ওটার নাম “তুবা” মসজিদ। ৩৫০ কিমি পথ আমাদের নবী শুধুমাত্র রাতে রাতে ভ্রমন করে মাত্র ৮ দিনে মদিনায় পৌঁছেন। এর মধ্যে আরও একটা জায়গা আমি দেখতে গিয়েছিলাম। সেটা হচ্ছে, মক্কার উদ্দেশ্যে অপারেশন করার পূর্ব মুহূর্তে আমাদের নবী কর্তৃক ব্যবহৃত অপারেশন ব্রিফিং রুমের স্থানটি। এই স্থানটি আগে আবিষ্কৃত হয়নি কিন্তু মিনায় নতুন করে স্থাপনা করতে গিয়ে পাহাড় কাটার সময় এটা আবিষ্কৃত হয়। ঘরটির কোন ছাদ নাই বর্তমানে এবং শুধু ঐতিহাসিক কারনে এটা এখন একইভাবে সংরক্ষন করা হয়েছে। এক তলা একটি বাড়ীর সাইজ। এটা এখন open-roofed mosque in Muzdalifah নামেপরিচিত।প্রকৃতনাম Masharul Haram (the Sacred Grove).
খন্দকের যুদ্ধটা কেন হয়েছিল তা আমরা অনেকেই জানি। এট লিস্ট প্রমোশন পরিক্ষার আগে এই ব্যাপারে অনেকেই আমরা পরাশুনা করতে হয়েছে। তবু একটু হিন্টস দেই। বলব?
খন্দকের যুদ্ধটাকে বলা হয় সবচেয়ে বেশি ট্যাক্টিক্স সমৃদ্ধ যুদ্ধ। এখানে ডিপ্লোম্যাসি, রিউমার, এবং ফলস তথ্য দ্বারা যুদ্ধ জয় হবার ন্যায় সঙ্গতা রয়েছে। যুদ্ধটা হয়েছিল ত্রিপক্ষ বেসিস। মানে হল এই যে, আমাদের নবী যখন ইহুদী বংশের নেতাদেরকে (বনু নাদির গোত্র) মদিনা থেকে খায়বারে বিতাড়িত করেন তখন এই নেতাগন (তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সালাম বিন আবু হুকায়েক, সালাম বিন মিশকাম, কিন্নাহ বিন আর রাবি) মক্কায় কুরাইশ বংশের বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে হাত মিলান নবীকে পরাস্ত করার জন্য।একই ভাবে এই ইহুদীগন গাতাফান ট্রাইবদের কাছেও তাঁদের সাপোর্ট এর কথা জানিয়ে আমাদের নবীর বিরুদ্ধে প্রলুব্ধ করেন। তারা সবাই এক হয়ে যায়। আবু সুফিয়ান এই যুদ্ধে লিড দেন। সালমান আল ফার্সি এই প্ল্যানের (অর্থাৎ ট্রেঞ্চ) উদ্যক্তা। মদিনাকে পূর্ব পাশ থেকে ডিচের মাধ্যমে আইসোলেট করা হয়, ডিচের মাধ্যমে শত্রু পক্ষের পানির সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মদিনা তখন মহিলাদের দ্বারা নিরাপত্তা দেওয়া হয়। যুদ্ধে যারা অংশ নেয় তারা হচ্ছেন, বনু নাদির, বনু ঘাতাফান, বনু সুলাইমান, বনু মোররা, বনু সুজা, বনু খোজা ইত্যাদি। বনু কোরায়জা যদিও শত্রু পক্ষের লোক ছিল কিন্তু তারা ইসলামের প্রতি কিছুটা ঝোঁক ছিল বিধায় তারা আমাদের নবীকে সাপোর্ট করেছিলেন। তাছারা বনু কোরায়জার সাথে আমাদের নবীর একটা গোপন প্যাক্টও হয়েছিল যে তারা আমাদের নবীকে সাপোর্ট দেবেন। আর এই দলটি ছিল মদিনার ভিতরে একেবারে ডিফেন্সিভ লাইনের ভিতরে। মদিনার রক্ষার জন্য এরাও একটা অংশ পাহারা দিচ্ছিল।
এখানে আমাদের নবী আগে থেকেই একটা জিনিষ আল্লাহ তাঁকে জ্ঞ্যান দিয়েছিলেন যে, মদিনায় যে সময় শস্য হয় তার আগেই তিনি লাগিয়েছিলেন যেন, শত্রু পক্ষ মদিনায় এসে কোন খাবার না পায়। সব শস্য ইতিমধ্যে মদিনাবাসি ঘরে তুলে ফেলেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে কোরায়েশরা যখন তাঁদের ঘোড়ার কোন খাবার যোগাড় করতে পারছিলেন না এবং ঘোড়াগুলো খাবার না পেয়ে দুর্বল হয়ে পরছিল, তখন এই ডিচ কোরায়েশ বংশের আমর বিন উদ (যাকে একাই ১০০ সৈনিকের শক্তির সমান মনে করা হত) এক মাত্র কোনভাবে ঐ খন্দক অতিক্রম করেন কিন্তু তিনি ল্যান্ড করেন জলাভুমির মত এক জায়গায় যার নাম ছিল “সালা” পাহাড়ের পাদদেশ। যেহেতু তিনি গুটি কতক সইনিক নিয়ে ঐ খন্দক অতিক্রম করেন, ফলে আমাদের নবীর বাহিনির সঙ্গে যুদ্ধ করার অবকাশ ছিল না। তাই, আমর বিন উদ মল্য যুদ্ধ্যের আহ্বান করেন। তখন আমাদের নবী আলিকে মল্য যুদ্ধে পাঠানোর মনঃস্থির করেন। যখন মল্য যুদ্ধ শুরু হয়, তখন এক বিশাল ধুলি ঝড়ের আবির্ভাব ঘটে এবং কে যুধ্যে জিতছেন আর কে হারছেন বুঝা যাচ্ছিল না। হতাত করে যখন “আল্লাহু আকবার” শব্দ আসে তখন দেখা গেল হযরত আলি আমর বিন উদকে পরাস্ত করেন। আর ঠিক এই ধ্বনিতে শত্রু বাহিনী পিছু হটে যায়।
এবার শত্রু পক্ষের নজর চলে যায় এই বনু কোরায়জার দিকে যাআরা মদিনার ভিতরে নিরাপত্তায় লিপ্ত ছিল।। কোনভাবে যদি বনু কোরায়জাকে কনভিন্স করা যায় যে তারা আর আমাদের নবীর পক্ষে কাজ করবে না, তাহলে আবার শত্রু পক্ষ জিতে যাবে। এই ধারনা থেকে খায়বারিয়ান নেতা এবং বনু নাদিরের গোত্রের হুয়ায় ইবনে আখতাব কোরায়জার কাছে আসেন। রিউমার ছড়ানো হয় যে কোরায়জা বংশ এখন আমাদের নবীর পক্ষে নাই আর। আসলেও তারা নবীর বিপক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছিল মদিনার ভিতরে। এই খবরে আমাদের নবী শঙ্গিত হয়ে উঠেন। তার কারন হল তিনি তাঁদের উপর নির্ভর করে ঐ অংশে কোন প্রকার ডিফেন্সিভ পেরিমিটার গরে তুলেন নাই। চারিদিকে রিউমার ছড়িয়ে পড়ে যে, কোরায়জারারা মদিনায় আমাদের নবীর বিপক্ষে কাজ শুরু করেছেন এবং এতে মদিনাবাসি খুব বিপদের মধ্যে পড়ে যায়। এর বিপক্ষে আমাদের নবী ১০০ সাধারন আনসার এবং ৩০০ ঘোড়াবিহিন আনসার মোট ৪০০ জন আনসার মদিনায় মোতায়েন করেন যারা রাত্রে বেলায় অতি উচ্স্বরে নামাজ পরতেন যাতে এটা প্রমানিত হয় যে অনেক অনেক আনসার ইতিমধ্যে মদিনায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু সত্য বলতে কি আমাদের আনসারগন ইতিমধ্যে তাঁদের শারীরিক কার্যক্ষমতা অনেকটা হারিয়ে ফেলছিলেন ক্রমাগত যুধ্যের কারনে। আমাদের নবী তখন ঘাতাফানকে এই মর্মে একটা চুক্তিতে আহবান করেন যে, তারা যদি মদিনা থেকে চলে যায়, তবে মদিনায় যে পরিমান খেজুর উৎপন্ন হবে তার তিন ভাগের এক ভাগ তাদেরকে ক্ষতিপুরন দেয়া হবে। কিন্তু মদিনার নেতারা আমাদের নবীর এই শর্ত মানতে রাজি হলেন না এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অটল থাকলেন। এই সময় এক অভুতপূর্ব ঘটনা ঘটে গেল।
আরবের একজন নেতা যাকে সবাই খুব সমিহ করতেন এবং মানতেন তার নাম নয়াম ইবনে মাসুদ। তিনি গোপনে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে যা কেউ জানত না শত্রুপক্ষ। সাবার কাছে তিনি একজন গ্রহনযোগ্য মানুষ ছিলেন। তিনি প্রথমে গেলেন বনু কোরায়জার কাছে এবং বললেন, শত্রুপক্ষ (অর্থাৎ যারা আমাদের নবীর বিপক্ষে যুদ্ধ করছেন তারা), যদি কোন কারনে হেরে যায় তাহলে বনু কোরায়জাকে মোহাম্মাদের (সঃ) কাছে ফেলে রেখেই চলে যাবে এবং সেক্ষেত্রে সব কিছু যা মোহাম্মাদ (সঃ) বলবেন তাই হবে। তখন মদিনাবাসি শুধু বনু কোরায়জাকেই শাস্তি প্রদান করবে। সুতরাং বনী কোরায়জার উচিৎ অন্যান্য বংশের নেতাদেরকে এখন বনী কোরায়জার কাছে হস্টেজ হিসাবে রাখা যাতে যদি কোন কারনে তারা হেরে যায়, ঐ গোত্ররা বনী কোরায়জার লোকদের বিপদে ফেলে চলে যেতে না পারে। একই ভাবে তিনি শত্রু পক্ষের লোকদেরকেও এই বলে খবর দিলেন যে, বনী কোরায়জার লোকজন তাঁদের কিছু গোত্র নেতাদেরকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হস্টেজ হিসাবে চাইতে পারে এবং না দিলে তারা মদিনার সাপোর্ট হিসাবেই থাকবে। এই তথ্য কাজে লাগল, যদিও কোন তথ্যই সত্য নয়। এই দিকে আমাদের আনসারগন ধিরে ধিরে বনু কোরায়জার দলকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলল। ইতিহাস বলে যে, বনু কোরায়জাকে আমাদের দল প্রায় ২৫ দিন ঘিরে রেখেছিল এবং শেষমেশ তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং শত্রুপক্ষের জন্য আর কাজ করে নাই। কিন্তু চুক্তি ভাঙ্গার কারনে বনু কোরায়েজের নেতাদেরকে হত্যা করা হয় এবং মহিলা ও শিশুদেরকে দাস হিসাবে গ্রহন করা হয়।
যাক সে ইতিহাস। সবাই আমরা তা জানি। এখন আর নাই বা বললাম আর।
তারপর আরাফায় গিয়েছিলাম। অবাক হওয়ার মত ব্যাপার যে, আমাদের নবী যেখান থেকে তার বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটা একটা উচ্চ পাহাড় আর নাম হচ্ছে জাবালে রাহমাহ। অর্থাৎ রহমতের পাহাড়। প্রথমবার হজ্জের সময় আমার এই জায়গাটা দেখার সুযোগ হয় নাই কারন অনেক ভীর ছিল এবং আমি আরাফার দিন যেখানে ছিলাম তার থেকে এই জাবালে রাহমাহ অনেক দুরেও ছিল। এবার হেটে হেটে ঐ জাবালে রাহমাতে উঠলাম। শরির শিউরে উঠে ঐ সময়কার কথা মনে করলে। কারন আমাদের নবী ঠিক যে জায়গাটায় দারিয়ে এই মানব উদ্দেশ্যে তার শেষ বিদায়ি ভাষণ দিয়েছিলেন তার স্থান দেখা এবং ঐ ভাষণ সম্পর্কে ভাবা একটা অদ্ভুত শিহরণ জাগে মনে। জানা যায় যে, প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল ঐ ভাসনের সময় অথচ কোন মাইক ছিল না, এরপরেও সবাই আমাদের নবীর প্রতিটি কথা স্পষ্টভাবে শুনেছিলেন। এবার ওখানে গিয়ে আরও নতুন একটা তথ্য জানলাম। নবী করিম (সঃ) এর আগমনের বহু পূর্বে প্রায় হাজার বছর পূর্বে বাদশাহ হারুনের স্ত্রী একবার এই আরাফার ময়দানে এসেছিলেন কোন এক ধর্মীয় কারনে। তখন ঐ অঞ্চলে পানির খুব অভাব ছিল। বাদশাহ হারুনের স্ত্রী যখন এই পাহারে এলেন তখন ঐ এলাকার বাসিন্দারা তাঁকে পানির ব্যবস্থার কথা জানালে তিনি তার স্বামী বাদশাহ হারুনকে পানির ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বাদশা হারুন তার স্ত্রির এই অনুরোধ রক্ষার জন্য সুদুর ইরাক থেকে পানির লাইন টেনে এনে এই এলাকায় পানির ব্যবস্থা করেন যা এখন অবধি লাইনটা রয়ে গেছে। ওটা ছিল এক বিশাল কাজ কিন্তু বাদশাহ কাজটি করেছিলেন। বিকল্প পানির ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই পানির সাপ্লাই জারি ছিল এবং বর্তমানে ইরাক থেকে পানি আসছে না বটে কিন্তু ঐ একই পানির লাইন সউদি সরকার ব্যবহার করে সউদি থেকেই পানির সরবরাহ করে থাকে। বলা হয় যে, এই আরাফার ময়দান নাকি হাশরের ময়দানের সঙ্গে যুক্ত একটা ময়দান। হজ্জের সময় আরাফার ময়দানে থাকা ফরজ এবং মাগ্রেব পর্যন্ত এখানে অবস্থান করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু মাগরেব নামাজ এখানে পোড়া নিষেধ। এই মাগ্রেব নামাজ পরতে হয় মুজদালেফায় এশার নামাজের সঙ্গে একত্রে। আমি আমর পুরান এক মেইলে হজ্জের বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখেছিলাম কেন কোন রিচুয়াল কিভাবে করা হয়। এখন আর এগুলো এখন লিখছি না।
জাবালে রাহমাহ থেকে আমরা চলে গেলাম মিনায়। যেখানে শয়তানের উদ্ধেস্যে পাথর মারা হয়। আমি জায়গাটা আগেই দেখেছিলাম হজ্জের সময় কিন্তু এবার যে দুইটা জায়গা নতুন করে দেখলাম তা হচ্ছে আবাবিল পাখির দ্বারা পাথর মারার স্থানটি। আবাবিল পাখির ঘটনাটি নিশ্চয়ই আমরা সবাই জানি। তারপরেও আমি একটু পিছনের কাহিনি টানতে চাই সবার মেমোরি ফ্রেশ করার জন্য। ঘটনাটির অবতারনা ঘটে এইভাবে। বলব?
আমরা জানি আবু তালিব যদিও শেষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন নাই কিন্তু তিনি ইসলামের অন্যতম একজন প্রটেক্টর ছিলেন। তিনি আমাদের নবীকে সর্বত্র সাহায্য করেছেন এই ইসলাম সম্প্রসারণের জন্য। একদিন তিনি তার এই ভাতিজাকে বললেন, হে ভাতিজা, তুমি কি শুধুমাত্র আমাদের কুরাইশ বংশের জন্য প্রেরিত হয়েছ নাকি সমগ্র মানব জাতির জন্য? আমাদের নবী বললেন, আমি সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছি হোক সে সাদা, বা কালো, বলুক সে আরবি ভাষা অথবা অন্য কোন ভাষা, থাকুক সে পাহারে বা সমুদ্রের নিচে, হোক সে বিধর্মী বা না কোন ধর্মের, হোক সে ধনী বা গরিব, আমি সবার জন্য প্রেরিত হয়েছি। এই কথা শুনে কুরাইশ এক সদস্য আবু তালিবকে বললেন, শুনেছ তোমার ভাতিজার কথা? যদি এখন পার্সিয়ান বা রোমের লোকজন এই কথা শুনে তাহলে তো এখনই তারা আমাদের সবকিছু ধংশ করে নিয়ে নিবে এবং তারা আমাদের এই কাবা ঘর যাকে উদ্দেশ্য করে আমাদের ব্যবসা পরিচালিত হয় তারা তা ভেঙ্গে দিবে। তখন এই সুরার আবির্ভাব হয় এবং তার ইতিহাস জানানো হয়।ইতিহাসটাএইরকমঃ
আমাদের নবীর জন্মের কিছুদিন আগে এই হাতি এবং আবাবিল পাখীর ঘটনাটি ঘটে।
ইয়েমেনের আশেপাশের এক রাজা যার নাম ছিল ঢু-নয়াজ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বদমেজাজি এক রাজা এবং জুলুমকারী। তিনি ছিলেন ইহুদী ধর্মের। তিনি চেয়েছিলেন যে, তার রাজ্যে সব অধিবাসী যেন ইহুদী ধর্মে দিক্ষিত হয়। আর যারা দিক্ষিত না হবে, তাদেরকে তিনি বিখন্ডিত করেন। এর মধ্যে ছোট এক বালক যার বাড়ি ছিল ইয়েমেনেরই দেশে নাজরান প্রদেশে। পিতামাতা তাঁকে যাদুবিদ্যা শিখার জন্য এই ছোট বালককে নাজরান থেকে ইয়েমেনের শহরে পাঠাতেন প্রতিদিন। পথিমধ্যে এই বালক ক্রিস্টিয়ান এক বৃদ্ধের দেখা পান যিনি খুব ভাল যাদুবিদ্যা জানতেন এবং সব ধরনের রোগ মুক্তির মন্ত্র জানতেন। ফলে ঐ বালকটি গোপনে ঐ বৃদ্ধার কাছে যাদুমন্ত্র এবং রোগমুক্তির বিদ্যা অর্জনে ক্রিস্টিয়ানিটিতে দিক্ষিত হওয়া শুরু করে। এই খবর দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যায়, ফলে রাজা ঢু নুঅয়াজ অতি দ্রুত ঐ বৃদ্ধাকে বিখন্ডিত করেন এবং এই ছোট বালকটিকেও বিখন্ডিত করার আয়োজন করেন। বালকটিকে বাঁধা হয় এবং তীরন্দাজ দ্বারা তাঁকে তির মারা শুরু হয় কিন্তু কোন তীরই তাঁকে স্পর্শ করতে পারছিল না। ওখানে যতলোক জড় হয়েছিল, এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেল, সঙ্গে রাজা নিজেও।তখন বালকটিকে জিগ্যেস করা হল, কেন তাঁকে তীর দিয়ে মারা যাচ্ছে না। বালকটি তখন উত্তর করেছিল যে, তাঁকে মারা একমাত্র সম্ভব যদি ক্রিস্টিয়ান লর্ডের নাম ধরে তাঁকে মারা হয় এবং রাজ্যের অধিকাংশ লোক যদি তার এই তীর মারার দৃশ্য অবলোকন করে তাহলেই তাঁকে মারা সম্ভব।তার এই নির্দেশনা মোতাবেক প্রায় ২০ হাজার লোক অবলোকন করে এবং যারা যারা এই দৃশ্য অবলোকন করে তারা প্রায় সবাই এক সঙ্গে বালকটির নতুন ধর্ম ক্রিস্টিয়ানিটিতে রূপান্তরিত হয়। রাজা ঢু নুঅয়াজ ক্ষিপ্ত হয়ে ঐসব ২০ হাজার মানুষকেই একসঙ্গে গর্ত করে মেরে ফেলেন। কোরআনে এই “People of the Ditch” উপাখ্যানেএকটিআয়াতআছে।এই সময় একলোক ঐ স্থান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং সে রোমের রাজার কাছে আশ্রয় চান। রোমের রাজা ছিলেন ক্রিস্টিয়ান। তিনি এই তথ্য জেনে খুব রাগান্বিত হন এই জন্য যে, শুধুমাত্র ক্রিস্টিয়ান ধর্মে দিক্ষিত হওয়ার কারনে রাজা ঢু নুঅয়াজ এতগুলো লোককে মাটিতে পুতে মেরে ফেললেন?তিনি আবিসিনিয়ার রাজাকে চিঠি (তিনিও ক্রিস্টিয়ান ছিলেন) লিখেন যাতে তিনি রোমের সঙ্গে এক হয়ে ইয়েমেনকে আক্রমন করে প্রতিশোধ নেয়। তাই হল। আবিসিনিয়ার রাজা (আবিসিনিয়া বর্তমানে ইথিওপিয়া নামে পরিচিত) নাজাশি এবং রোমের রাজা একত্রে ইয়েমেন আক্রমন করার পরিকল্পনা করেন। এই কম্বাইন্ড যুদ্ধের জেনারেল ছিলেন রোমের জেনারেল আরিয়াত। আক্রমণ ঠেকাতে না পেরে ইয়েমেন হেরে যায় এবং রাজা ঢু নুঅয়াজ নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন।জেনারেল আরিয়াতের (রোম জেনারেল) দখলে চলে আসে ইয়েমেন। রোমের এই জেনারেল ছিল অত্যন্ত কঠিন লোক এবং তিনি ইয়েমেনের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলেন। কিন্তু আবিসিনিয়ার আরেক জেনারেল যিনি এই যুদ্ধে রোমের জেনারেল আরিয়াতের সঙ্গে যুদ্দ করেছেন তিনি জেনারেল আরিয়াতের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয়ে উঠেন, তার নাম আব্রাহা। তিনি রাজা নাজাশির লোক। পুরু সেনাবাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং প্রায় আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই আত্মঘাতী পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য জেনারেল আরিয়াত এবং জেনারেল আব্রাহা মল্য যুদ্ধে রাজি হন। শেষ পর্যন্ত আব্রাহা জয়ী হয়। কিন্তু রাজা নাজাশি তার জেনারেল আব্রাহার এই কর্মে খুশি হননি এবং নিজে আরও বেশি সেনাবাহিনী নিয়ে জেনারেল আব্রাহা উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।রাজা নাজাশি বার্তা পাঠালেন যে, যখন তিনি জেনারেল আব্রাহার সঙ্গে দেখা হবে, তখন তিনি তার মাথার চুল ছেটে দেবেন এবং ইয়েমেনের রাজা হওয়ার শখ তিনি মিটিয়ে দেবেন ইয়েমেনের মাটিতে তার মাথা পুতে। জেনারেল আব্রাহা ছিল খুব বুদ্ধিমান। তিনি এই খবর শুনে তিনি নিজেই আগে ভাগে তার মাথার চুল ছেটে ইয়েমেনের মাটি তার মাথায় মেখে একটি ছোট বার্তা পাঠালেন যে তিনি সব সময় রাজা নাজাশির অনুগত আছেন এবং তিনি যা বলবেন সেটাই চূড়ান্ত।এই বার্তায় রাজা নাজাশি খুব খুশি হলেন এবং রাজা নাজাশি জেনারেল আব্রাহাকে ইয়েমেনের শাসক বানিয়ে দিলেন। রাজা নাজাশিকে জেনারেল আব্রাহা খুশি করার জন্য নতুন শাসক জেনারেল আব্রাহা ঘোষণা করলেন যে, তিনি ইয়েমেনে রাজা নাজাশির নামে এক নতুন কাবা ঘর তৈরি করবেন (বহু বছর যাবত আমাদের এই কাবা ঘর ছিল সব ধর্মের কেন্দ্রস্থল এবং ব্যবসার কেন্দ্র)। ইয়েমেনের নতুন রাজা জেনারেল আব্রাহা নতুন এক কাবা ঘর তৈরি করলেন এবং সব ধর্মের লোকদেরকে এই নতুন কাবা ঘরের মধ্যে তাদের উপাসনালয় স্থাপন করে দিলেন এবং এটা হয়ে উঠল ব্যবসার আরেক কেন্দ্রস্থল। এতে আরববাসি খুব খুশি হলেন না।
এই অখুশির জের ধরে এক আরব একদিন ঐ নতুন চার্চের ভিতরে পায়খানা করে তার প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করলেন। রাজা আব্রাহা এতে এতটাই ক্ষিপ্ত হলেন যে, তিনি আরবের পুরাতন কাবা ঘর ভেঙ্গে দেবার পরিকল্পনা করলেন। তিনি বিরাটকায় হাতিসমেত (এই হাতিগুলোর নাম ছিল “মামুদ”) পুরাতন কাবা শরীফ ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে মক্কায় রওয়ানা হলেন এবং কোন শক্তিই তাঁকে থামাতে পারছিল না। কিন্তু কাবা এলাকার কাছাকাছি এসে তিনি কাবাবাসির কাছ থেকে কোন প্রকার সাহায্য পেলেন না। এবং তিনি কাবার প্রকৃত লোকেশনও জানতেন না। শেষে তাইফের এক বাসিন্দার সাহায্য নিয়ে তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাইফের এই বাসিন্দার নাম ছিল আবু রজাল। তাঁকে নিয়ে যখন আব্রাহা মক্কার দিকে আসছিলেন, পথিমধ্যে আবু রজাল মারা যায় এবং তাঁকে মক্কা ও তাইফের মাঝামাঝি জায়গায় কবর দেয়া হয়। বর্তমানে যে কোন লোক যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে আবু রজালের ভাই বলে আরবে সম্বোধন করা হয়। আমাদের মিরজাফরের নামের মত।
যে কোন ভাবেই হোক, আব্রাহা মক্কার কাছাকাছি চলে আসেন এবং প্রায় ৬-৭ কিমি দূরে তিনি তার ক্যাম্প স্থাপন করেন রাত্রি যাপনের জন্য। এবং তিনি আদেশ দেন যে, তাদের খাবার মজুত করার জন্য মক্কার আশেপাশের যত হাস মুরগি, উঠ, গরু, ছাগল আছে তা হস্তগত কর। এই হস্তগত অপারেশনের জেরে আমাদের নবীর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ২০০ উঠও আব্রাহার বাহিনী ক্যাপচার করেন। আব্দুল মুত্তালিব তার ২০০ উঠ ফিরে পাবার জন্য আব্রাহার ক্যাম্পে যান।আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন দেখতে খুব সুন্দর, লম্বা এবং ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক। তাঁকে দেখে আব্রাহার মধ্যে একটা সম্মান দেখানোর মনোভাব তৈরি হল এবং আব্রাহা তার রাজ আসন থেকে নেমে এসে মাটিতে বসে আব্দুল মুত্তালিবের সঙ্গে কথা বললেন। আব্রহা জানতে চাইলেন কি কারনে আব্দুল মুত্তালিব তার কাছে এসেছে।আব্দুল মুত্তালিব বললেন যে, আব্রহার লোকজন তার ২০০ উঠ নিয়ে এসেছে, সেটা তিনি ফেরত চান। এটা শুনে আব্রহা খুবই অবাক হলে এই কারনে যে, এত ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে আব্দুল মুত্তালিব তার কাছে এসেছে? যেখানে এতলোক কাবাঘর রক্ষার প্রানপন চেষ্টা করছে আর সেখানে আব্দুল মুত্তালিব কাবা ঘর নিয়ে কোন প্রকার অনুরোধ বা সংশয় প্রকাশ না করে শুধুমাত্র তার ২০০ উঠের জন্য অনুরোধ করছে? আব্রহা আব্দুল মুত্তালিবকে বললেন, আমি খুব অবাক হচ্ছি যে, সবাই যেখানে কাবাঘর রক্ষায় মারা যাচ্ছে, সেখানে আব্দুল মুত্তালিব কাবাঘর রক্ষার কোন অনুরোধ করলেন না কেন? আব্দুল মুত্তালিব বললেন, আমি ২০০ উঠের মালিক, ঐ ২০০ উঠের নিরাপত্তা আমার উপর বর্তায়। আর কাবাঘরের মালিক “লর্ড” নিজে। লর্ড যদি তার কাবাঘর রক্ষা করতে না পারেন, আমার কি করার আছে? আব্রহা তার ২০০ উঠ ফেরত দিলেন এবং বললেন যে, সবাইকে বলে দিন, আগামিকাল আমি কাবা ঘর গুরিয়ে দেব, কেউ যেন আশেপাশে না থাকে।
আব্দুল মুত্তালিব তার ২০০ উঠ নিয়ে ফিরে এলেন এবং সবাইকে আব্রাহার ঘোষণা শুনিয়ে নিকটবর্তী পাহারে আশ্রয় নিলেন পরদিন কি হয় দেখার জন্য। পরদিন আব্রাহা তার হাতিগুলোকে কাবাঘরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন কিন্তু হাতি সামনের দিকে এক কদমও এগুলো না। সবদিকে হাতি যেতে পারছে কিন্তু কাবার দিকে অগ্রসর হতে চাইছিল না। অনেক চেষ্টা করার পরও যখন হাতি নরছিল না। তখন হাতিগুলোকে আব্রাহা পাথর দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল, তাতেও কোন কাজ হচ্ছিল না।দুপুরের দিকে হতাত করে আবাবিল পাখি মেঘের মত উরে এল, সবার দুই পায়ে দুইটা এবং ঠোটে একটা করে মাটির ঢিলা। এই তিনটা করে মাটির ঢিলায় সমস্ত হাতি এবং সৈন্য সামন্ত পরজদুস্থ হয়ে উঠল। শুধু তাই নয়, তারপর শুরু হল বৃষ্টি। মাটি গলে গিয়ে সবাই কাদামাটিতে পুতে গেল এবং তারা আর ওইখান থেকে ফিরে আসতে পারেনি। আব্রাহাসহ সব বাহিনী মারা যায়। আমাদের নবী যখন মাতৃগর্ভে দুই মাসের বয়স, তখন এই ঘটনা ঘটে।
বর্তমানে মিনায় যাওয়ার পথে এই জায়গাটা পড়ে এবং একে অভিশপ্ত জায়গা বলে উল্লেখ করা হয়। সাধারনত কেউ ঐ জায়গা দিয়ে যাতায়ত করতে চায় না। আর অগত্যা করলেও খুব ভয়ে এবং ঘৃণায় যায়। ঠিক এর পরেই ইয়ামেনকে দখল করে পার্সিয়ানরা।
মদিনা থেকে ৩০ তারিখে আমরা মক্কায় চলে গেলাম। ঐ রাতেই আমি ওমরা শেষ করেছি। মদিনা থেকে এহরাম বেঁধে নিয়েছিলাম। আমি খুব ভাগ্যবান যে আমার হোটেলটি ছিল, সেটা মক্কার সঙ্গে একদম লাগোয়া। মানে আমার রুম থেকেও মক্কার জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা যায়। হোটেল জমজম। আমার রুম থেকে কাবার ঘর সরাসরি দেখা যেত। এরজন্য আমাকে একটু বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমি খুব আনন্দে ছিলাম এই জন্য যে, হারাম ভিউ পেয়ে।খুব বেশি নড়াচড়া করিনি, সবগুলো নামাজ মক্কা শরিফে গিয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। মোট পাঁচ বার ওমরা করেছি এই সময়ে। আর প্রতিদিন কয়েকবার করে তাওয়াফ করেছি পবিত্র কাবাঘরকে। মন ভরে এবাদত করেছি যতক্ষন মন চেয়েছে। সবার জন্য দোয়া করেছি।
একদিন শুধু বের হয়েছিলাম মক্কায় বিখ্যাত ইসলামিক জায়গাগুলো দেখার জন্য। তার মধ্যে ছিল আরাফার ময়দান, মুজদালিফা, মিনা, তায়েফ শহর, হেরা গুহা। ইত্যাদি। তায়েফ শহরে গিয়ে আমি ঐ জায়গাগুলো দেখার চেষ্টা করেছি যেখানে ঐ বুড়ি যিনি আমাদের নবীর পথে কাটা বিছিয়ে রাখতেন, ঐ মসজিদ যেখানে আমাদের নবীকে আহত হতে হয়েছিল।
তায়েফের ঘটনা আমরা সবাই হয়ত জানি। সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন আমাদের নবী এই তায়েফ শহরে ইসলামকে প্রচার করতে গিয়ে। তার সঙ্গে তার পালক পুত্র জাইদ (রাঃ) ছিলেন তায়েফে ইসলাম প্রচারের জন্য। তায়েফের লোকজন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিলেন আমাদের নবীকে। তার সাড়া শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, তার দন্ত মোবারক শহিদ হয়েছিল এই তায়েফে। তার কষ্ট দেখে জিব্রাইল (আঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি শুধু প্রকাশ করেন এবং অনুমতি দিন, আমি আল্লাহর কাছ থেকে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছি, আপনার অনুমতি পেলে আমি নিমিষের মধ্যে এই তায়েফের লোকজনসহ তায়েফ নগরীকে ধ্বংস করে দেই। তখন আমাদের নবী জিব্রাইলকে বলেছিলেন, যদি সব মানুষদেরকে ধংশই করে দেই, তাহলে আল্লাহকে এবাদত করবে কে? একদিন এই তায়েফ নগরির সব মানুষ ইসলাম গ্রহন করবে। তায়েফ শহরটি খুব সুন্দর এবং সত্যি দেখার মত। পাহাড়ের উপরে একটা চমৎকার শহর।
মক্কায় অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া (কবর স্থান) দেখলাম। হজ্জের সময় খুব ভাল করে দেখার সুযোগ হয় নাই। এখন বর্তমানে অনেক কিছু পরিবর্তন এসেছে। মহিলাদের যাওয়ার সুযোগ নাই। কবর গুলোর ব্যাপারে কিছু বলি।
এখানে যাদের কবর দেওয়া হয় তাদের জন্য আগে থেকেই ইটের কবর বানানো আছে। প্রতি ওয়াক্তেই দাফন করার কাজ চলে। আমি যেটা শুনেছি যে, এক তা কবর প্রায় এক বছর পর্যন্ত ইন ট্যাক্ট অবস্থায় রাখা হয়। পরের বছর ঐ কবরটা আবার খোলা হয়। যদি কোন লাশ অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তাহলে ঐ কবরটা একেবারে শিল্ড করে দেওয়া হয়, ঐ কবরের মধ্যে আর কোন লাশ দাফন করা হয় না। ধরে নেওয়া হয় তিনি শহিদ বা তাঁকে আর কোন ডিস্টারবড করা যাবে না। আর যেগুলো তে লাশ পচে যায়, শুধু সেগুলো তে আবার নতুন লাশ দাফন করা হয়। এই ভাবে অনেক কবর এক দম বন্ধ করে দেওয়া হয়ে গেছে। আমি কয়েক্তা ছবি দেখাই। তাহলে বুঝতে পারবে। কোন কবরের কোন প্রকার ডেকোরেশন নাই।
৮ তারিখে আমরা ঢাকায় ফিরে আসার জন্য জেদ্দায় রওয়ানা হলাম। দুপুরের দিকে জেদ্দায় আমার এক বন্ধুর বাড়িতে উঠলাম। সে খুব সাদরে আমাদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখাল তার গাড়ি দিয়ে। তাঁকে আমি আগে থেকে চিনতাম না। ঢাকার উত্তরার মসজিদের খতীব জনাব মামুন সাহেবের পরিচিত। আমাদেরকে ঐ ভদ্র লোক তার নিজের গাড়ি পাঠিয়ে মক্কা থেকে নিয়ে গেলেন। তিনি বিন লাদেন কোম্পানির একজন এনলিস্টেড কনট্রাক্টর ইঞ্জিনিয়ার।অনেক জায়গা দেখালেন। শেষমেশ নিয়ে গেলেন মা হাওয়ার কবর স্থানে। বিশাল একটা কবরস্থান।খুব ভাল লাগলো দেখে। জেদ্দায় যেখানে শিরচ্ছেদ করা হয় কোন আসামির, সেই মসজিদে নিয়ে গেলেন এবং যেখানে শিরচ্ছেদ করানো হয় সেই জায়গাটা দেখালেন। ভয় লাগছিল ভাবতে। প্রতি শুক্রবারে এই স্থানে কোন আসামিদের শিরচ্ছেদ করার রেওয়াজ আছে এখানে এবং প্রকাশ্যে।
রাত ৩;৪৫ মিনিটে আমরা এয়ারপোর্ট আসলাম এবং তারপর ঢাকায়। আলহামদুলিল্লাহ।
বৃহস্পতিবার, গোলারটেক, মিরপুর
গত তিন চার দিন আগে আমার ক্যাডেট কলেজের এক বন্ধুর জন্মদিন ছিল। ওর নাম লুতফর রহমান। আজকাল মেইল থাকার কারনে কেউ আর জন্মদিনের কার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানায় না, মেইল বা এসএমএস দিয়েই কাজটা শেষ করে ফেলে। অত্যাধুনিক সিস্টেম। কুলজাত দুটুই রক্ষা হয়। কুলজাত দুটুই রক্ষা হলেও বন্ধুত্তের মাঝে এই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে আগের মত আর আবেগের স্থানটুকু থাকে না। কেউ ফিরতি একই ম্যাসেজ দিয়ে দায়িত্তটা পালন করে বড় একখান থ্যাংস জানিয়ে এমন একটা ভাব প্রকাশ করে যেন না জানি কত খুশি হয়েছি। যাক সে কথা, যুগ পাল্টেছে, যুগ আরও পাল্টাবে, ভবিষ্যতে আরও কি হবে তা আর গবেষণার প্রয়োজন বোধ করি না আমার এই লিখার ভিতরে। কিন্তু লুতফরের জন্মদিনে ওকে মেইল করলেও ও আর এগুলোর ধার ধারে না। ও মেইল খুলে না, মেইল পাঠায় না, মেইল পরেও না। ও আর জন্মদিনই পালন করে না। ও পালন করে মৃত্যু দিন। ও হয়ত তাও করে না।
বিডিয়ারের সেই ভয়াবহ এক নৃশংস হত্যাকান্ডে ওর মধ্যবয়সী জীবনটা বলি দিতে হয়েছে। সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখ ২০০৯ সাল। আমি যথারীতি অন্যান্য দিনের মত মাত্র ফ্যাক্টরিতে এসেছি। অন্যান্য দিনের মত আমার পিওন এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে বলল, “স্যার, আজকে কি আপনার মেহমান দুপুরে খাবে নাকি সন্ধ্যায় নাস্তা খাবে, কোনটা?” আমি কিছুটা কনফার্ম না করেই বললাম, “দুটুই মাথায় রাখ” আসলে মেজর হায়দার আমার এখানে আসবে, আজ ওদের দরবার আছে, দরবার শেষ করেই হয়ত আমার এখানে আসার কথা।
সকাল নয়টার দিকে আমার আরেক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানতে চাইল পিলখানায় বিডিআর হেডকোয়ার্টসের ভিতর কিছু হচ্ছে নাকি? ব্যাপারটা আমারও জানা ছিল না। আমি জেনে জানাচ্ছি বলে ফোন কেটে দিয়ে অনেককেই ফোন করলাম। কিন্তু কারো কোন ফোনের মধ্যে ঢোকতে পারছিলাম না। লুতফরকে ফোন করলাম, আবতাবকে ফোন করলাম, না পেয়ে ১৯ লং কোর্সের মেজর হায়দারকেই ফোন করলাম, কারো ফোনই খোলা নাই। একটু অবাক হচ্ছিলা, আবার একটু শঙ্কিতও হচ্ছিলাম। কাউকে না পেয়ে আবার আমি আমার ঐ বন্ধুকেই ফোন করলাম যে একটু আগে আমাকে ফোন করেছিল। ওকেই জিগ্যেস করলাম, আসলে কি শুনেছে ও। ও যা বলল, তাতে আমার একটুও ভাল লাগলো না বরং একটা সাংঘাতিক শঙ্কায় পরে গেলাম। বিডিআর পিলখানায় নাকি সৈনিক আর অফিসারদের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। একি কথা!! কি করে সম্ভব এটা? মাঝে মাঝে যে কি হয় মানুষগুলোর, কি কারনে যে হটাত করে সব ভেঙ্গেচুরে তছনছ করে একে অপরের উপর এমন আচরন করে যে, গতকাল যে মানুষটির সঙ্গে এক সাথে চা খাওয়া হয়েছিল, যার সঙ্গে এক বিছানায় বসে গল্প করা হয়েছিল, যে তাঁর নিজের সুখের বা দুঃখের কতই না কথা একে অপরের কাছে অকপটে ভাগীদার করেছিল, সে আজ কেন বা কি কারনে একেবারে অচেনা হয়ে হিংস্র বাঘের মত, উম্মাদ সিংহির ন্যায় উম্মত্ত আচরনে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়ে একে অপরের প্রান নিতেও অনুশচনা করছে না। মানুষ এমনি এক প্রানি যার পাশে একটা মাত্র “অ” যোগ করলেই তাঁর আমুল সব চরিত্র বদল হয়ে যায়। সে আর মানুষ থাকে না, হয়ে উঠে “অমানুষ” যার সংজ্ঞা প্রানিকুলের কারো কাছেই নাই।
বিডিআর এর হেডকোয়ার্টার এর ভিতর সৈনিক বনাম অফিসারের মধ্যে প্রানঘাতি সংঘাত হচ্ছে বলে টিভির স্ক্রলে দেখাচ্ছে কিন্তু কি হচ্ছে, কার কি অবস্থা, তাঁর কেউ সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারছে না। সবাই তো স্বসস্ত্র, সবাই তো ট্রেনিংপ্রাপ্ত। আমার খুব টেন্সন হতে লাগলো। এই তো গত ২৩ তারিখে আমি বিডিআর এর ভিতরে গিয়েছিলাম। দেখা হয়েছে লুতফরের সঙ্গে। ওর অফিসে চা খেলাম, গল্প করলাম। আমি গরম গরম পুড়ি পছন্দ করি, তাই কোথা থেকে যে ঐ অবেলায় পুড়ি নিয়ে এলো, ভাবাই যায় না। লুতফরের ভবিষ্যতের কত প্ল্যান শুনলাম। সঙ্গে মেজর হায়দার ছিল। এই ছেলেটি কখনো আমাকে স্যার বলত না। বলত “বড়দা”। এক সঙ্গে ৭ ফিল্ড রেজিমেন্টে কাজ করেছি প্রায় দুই বছরের বেশি। সাভারে থাকাকালীন আমি ৬ ফিল্ডে আর হায়দার ১৫ ফিল্ডে। সিনিয়রদের সঙ্গে ন্যায় অন্যায় নিয়ে তর্কের কোন শেষ ছিল না তাঁর। কিন্তু জুনিয়রদের বেলায় ঠিক আমার মতই উদার, সেই উদারতার কোন শেষ লিমিট ছিল বলে আমার জানা ছিল না। গল্পের টেবিলে হায়দার আমাকে বলল, “বড়দা, এই পাসিং আউট প্যারেড শেষ হলেই আমার চাকুরির জীবন ইতি করবো, অফিসে আমার জন্য একখান চেয়ার রাখবেন।” আমি এই ছেলেটাকে যা বলতাম, কোন প্রশ্ন ছাড়া, কোন তর্ক ছাড়া, কোন লজিক ছাড়া মানতে কখনো দিধাবোধ করত না। আমার বড় প্রিয় একজন অফিসার ছিল এই হায়দার। আমাদের আর্ট টিচার শুজা হায়দার স্যারের ছেলে।
সারাদিন খুব টেনশনে থাকছি আর ক্ষনেক্ষনে এখানে সেখানে ফোন করছি জানার জন্য কোথায় কি হচ্ছে। শুনলাম, বিডিআর এর ভিতর সৈনিকেরা অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। অনেক অফিসারদেরকে নাকি জিম্মি করে তাঁদের পরিবারের উপর নির্যাতন করছে। কোন কিছুই ভাল লাগছিল না। দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পেলাম। মেজর হায়দারের ফোন থেকে। ”স্যার, মাফ কইরা দিয়েন”। আমার সারা শরীর একটা কাপুনি দিয়ে উঠল। আমি যেন কিছুই পরতে পারলাম না। কি লিখেছে হায়দার? ও কি বলতে চেয়েছে? আমি ফোনব্যাক করলাম। কোন রিস্পন্স পেলাম না, ফোনটা বন্ধ আবারও। বড় অসহায় মনে হল আমাকে। কোথায় যেন একটা ভীষণ ব্যাথা অনুভব করছি। কাকে বলব? কি বলব? কেউ তো কিছুই বলতে পারছে না। এই টেনশনের মধ্যেই আমি আমার অফিসিয়াল কাজের জন্য সেই গাজীপুর আছি। প্রায় রাত হতে যাচ্ছে। কোন খবর পাচ্ছি না।
হায়দারের প্রসংগটা পরে আসি। যা বলছিলাম তা হচ্ছে লুতফরের জন্মদিনের মেইল। আমার এক বন্ধু তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে একটা মেইল করেছে, “লুতফর, আমি জানি তুমি ভাল আছ, ঈশ্বরের কাছে আছ, তারপরেও আজ তোমার এই জন্মদিনে তোমাকে জানাই একরাশ শুভেচ্ছা। ভাল থেক। আমরা সবাই ভাল আছি।” লুতফর আদৌ এই মেইলটা পরার আর কোন সুযোগ বা অবকাশ আছে কিনা আমার জানা নাই তবে ওর জন্মদিনে আমারও খুব ওকে শুভেচ্ছা জানাতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু সেটা হবে নিতান্তই একটা লেখা, ও ওটা পরার কোন অবকাশ আর নাই।
জীবন যখন বিদ্রোহি মৃত্যুর কাছে পরাজয় বরন করে, তখন স্বপ্ন গুলি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠে না। তাদের কবর রচিত হয় সেই অপ মৃত্যুর সাথে যা কেউ কখনো ভাবে নাই, বা কোনো হোমওয়ার্কও করে নাই। আমরা সবসময় হোম ওয়ার্ক ছাড়াই দিন শুরু করি।
অনেকদিন পর আবার একটু ডায়েরি লিখতে ইচ্ছে হল। এই অভ্যাসটা আমার এক কালে ছিল এবং প্রায়ই ডায়েরি লিখতাম। কিন্তু ইদানিং কাজের চাপে, কম্পিউটার যুগে আর ঘটা করে ডায়েরি লিখা হয় না।
আজ সারাদিন মোটামোটি বেকারের মত দিনটা কাটাচ্ছি। কাজ আছে কিন্তু ঐ রকম প্রেসার নেই। খবরের কাগজ বাসায় ও পরেছি আবার অফিসে এসে অন্য একটি খবরের কাগজও পড়লাম। সামনে অডিট, অনেকগুলো অডিট। কুয়ালিটি অডিট, ACCORD এর অডিট, আবার SGS অডিট। কোনটাই কারো থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আজ মুর্তজা ভাই অফিসে আসেন নাই। ওনি এলে কথাবার্তা বলা যায়, আবার অনেক কাজও হয়। একা একা আসলে কাজে মন জুড়ে না। মুর্তজা ভাই ইদানিং শারীরিক ভাবে একটু অসুস্থ থাকছেন প্রায়ই। এটা ভাল লক্ষন নয়। তবে খুব গুরুতর কিছু না মনে হয় ইনশাল্লাহ, ঠিক হয়ে যাবে।
লাক্সমা নিয়ে একটু ঝামেলায় আছেন, আমরা আবার রিভার সাইড নিয়েও বেশ ঝামেলায় আছি। আমার সবচেয়ে বেশী চিন্তা হয় লাক্সমাকে নিয়ে। মুর্তজা ভাই যাদের কে নিয়ে লাক্সমায় ব্যবসা করেছিলেন, তিনি হয়ত তাদেরকে পূর্বে ভাল করে স্টাডি করতে পারেন নি, এখন টার বুঝার কোন বাকী নেই কখন একজন মানুষ হটাত করে অমানুষ হয়ে যেতে পারে। আমি সর্বাত্মক চেস্টা করছি যেন, মুর্তজা ভাই এই অনাকাঙ্ঘিত সমস্যা থেকে দ্রুত রেহাই পান।
Dear Masud and Rimona
It was indeed a great time for me and my family to have you within us even for a short time. We thank Almighty that we had the blessings to have kid like you in our family who gave us peace in mind with your good gestures and attitudes. Definitely it was a nice and remarkable tour that you presented us. In fact, after all this hassle and many disturbances in your present tour in Bangladesh, I will like to address it as a big lessons both for you and us. Let this mail be read by your great mom and Dad whom I always wanted as part of my souls and in deed they are.
Masud, this mail is very important to let you know about yourself from me and as well as from my family though I didn’t talk to other members while writing this mail on behalf of them. But I know if they read my mail, they will never accuse me about what I posses inside me. Before I write you anything, let me write something about my own experiences in my life.
I told you that after I married your aunty, literally I broke up with whole of my family and it was the most crucial event in my life because in one side I was loving them and in another side I was unable to let your aunty go away from my life. It was a state of anxiety both in mental and physical. I didn’t know if I am taking the right decision. I wasn’t sure if I was in the right path. Constantly I was monitoring myself both from a perspective of Major Akhtar and from the perspective of non-Major Akhtar.
I clearly understood that many people love me for many reasons, and not only for beauty or anything. Some loved me fearing God, someone loved me as I was a good person, someone loved me because I help them, and some one loved me because I was a loveable person. All these loves were no meaning to me except the love I always wanted from your Dad and from my family. Still I had the prayer for them to God that I get back the love from them. It took almost 25 years time to understand that they truly loved me even they never expressed it open. I have no confusion now about their loves and sympathy. But within these time frame, I learnt something. , my life had changed; I learnt growing experience for me. It posed as opportunity for learning and growing coz I learned to do things by myself. I learned to have fun by myself. I discovered things I like doing and ways I could be of help to others. And I had been able to distinguish my priorities. The most wonderful thing that happened was that I learned how to be a whole person. I was able to find meaning in life. I learned my lessons well and I believed that when we’ve learned our lessons well, we moved on to higher or more advanced stages of development. Those events lead me to where I am now. But I was never a complete man without a family where there is a brother for whom I am here, there are sisters for whom I grew well, there is a village from where I stood up. After all this, I felt truly alone. Even many are beside me but still I was alone. A surge of fear gripped me. I was scared to be alone because I was used always to of having them around me all the way, in dreams, in thoughts, in imagination and what not. I didn’t know how I would be able to cope life without them. I didn’t know what life would be without them especially my mother and your dad and his family where you were also a part, Yusuf is also a part. I felt like something had been torn from me, like I was no longer whole because I always found my other half when I was with my family. I was hurting so bad. But I had faced the reality knowing that I will, possibly, never again share a joke with them, ask a question only that they can answer, talk to then, be with them or even make loving smile with them. I had faced those things in order to survive and cope life even if it was utterly heart-wrenching.
Through that event, I realized that life is unstable. That life is unsure because I never thought I would be able to survive and cope. I never thought I would be able to overcome that crisis. I never thought that it would lead me to where I am now. It made me aware that I am not in control of all the situations in life. It made me realized that I am capable of being hurt. I was able to understand that life does not totally consist of happiness and unhappiness. Life is unfair as they say because I realized that the more I try to be happy, the more it eludes me. I realized that life is really uncertain; we’ll never know what will happen next. It leads me to a realization to the confrontation of fundamental problem of human existence in a way that I had been able to survive the crisis in the event of my life. I had been able to surpass the critical points because I was determined, strong-willed and had strong faith in God to re-direct my life. I had been able to confront the need of power to defend my life’s purposes because I was able to change my life. It brought new meaning to my life. I realized that there was more meaning to it than just a mere experience of hurt and pain.
You know Masud? The ultimate measure of a man is not where he stands in moments of comfort and convenience, but where he stands at times of challenge and controversy. It’s easy to say sorry for what we have done. It’s also easy to forgive and forget, but one thing will never be easy, is to trust again after the disappointment. I learnt that happiness comes to those who give love freely and who don’t demand that others love them first. It’s like the sun that is just generous which shine without asking first whether people deserve their warmth or not. I got it from your dad and Mom. They are like Sun and give people lights the way they gave you everything you and me needed even we didn’t know their hearts and their pains but they did their parts.
The definition of love is so varieties and so much big in horizon that many things can be derived from single word “LOVE”. Great love can make a weak man strong. True love can make a brave man fall to his knees. But if I like to define its opposite side, it has tremendous set back also. Failure in Great Love can make strong man weak and brave man as apathy in life. No one is important to him then. In such dismissal courses I learnt Masud that LIFE in this world is the hardest course we could ever take and we need someone or bunches of people who loves us unconditionally without any returns. Its hard to judge them always but they are there. Its our responsibility to find them in right time. And most sad part is that to judge and find them is not easy when we are emotional or outraged. But it is always there. Frankly speaking Masud, it could only be taken once. No review, no masteral, no doctorate. We don’t have any other DEAN or GOD to find them but heart and soul. And once we have graduated from this school, we are done and gone. Only eternity can tell our rating: PASSED or FAILED. So I will advice you to judge them correctly and also advice you to live each day as if it’s your baccalaureate service, because in this course we’ll never know the exact date of our closing ceremony. There were hundreds of YESTERDAYS that passed and more TOMORROWS still to come but there’s only one TODAY to enjoy. I always live for TODAY Masud and I will advice you to live for only TODAY with whom you are always missing out. You must figure it out whom we miss constantly and truly. I always miss your dad though he is the only person with whom I can be an arrogant and also submissive. I am thankful to Almighty to have your Dad and Mom in my life.
You know Masud? Any relationship apart from what God had planned for us is like the beautiful horizon. It may appear that the sea and the sky meet at some point but we know they are not. You think you are meant for each other only to find out that you are not and you will never be. It is nothing but a mere appearance of an illusion–beautiful yet deceiving… That’s how now I take this relationship Masud. Its like if you paint a good painting, others will enjoy looking at it, but you in painting it, will have learned how to paint. I am just painting everything in my imagination and I have all the choices how I wanna see them and paint. Everything is a trial where a trial can be a success or a failure both. But remember Masud, trials are not reasons to give up or live with, but a challenge to improvement or rejects. Life at times are like a mountain. You know Masud? Mountains aren’t easy to climb, but the view from the top is usually the best. I am not mountain or you but within our altitudes of attitudes, we both are like a mountain. A mountain never climbs another mountain, they stay side by side and never meet unless someone bridges them in between. May be your Dad is that bridge where we are both connected. I always consider and ponder to see as a fresh beginning for everthing. Why go on thinking about what had happened, or about what we did yesterday? Life is a river, flowing constantly onward. No drop of it will ever pass the same bridge twice. Now is your chance to do things in new ways, better than ever before. I am doing my best. We always look at our scars as ugly marks. But sometimes, let’s try to consider it as a nice thing, as a symbol that something painful in the past had been healed. Do you understand what I meant all through Masud? To be more clear about what I want to mean is that always remember that two things we define our successful life, the way we manage when we have nothing and the way we behave when we have everything. I appreciate your dad when he managed everything well when he had nothing but its your or my turn to manage things well when we have everything ready-made.
Let me cut a joke at the end to flare a smile in your lips, eyes and motions.
There were two friends from Philippines and China. But the Philippines man never speaks Chinese and the Chinese man never speaks English or tagalong. But they were very good friends indeed. With their body language, they could express many feelings. At one time, the Chinese friend got sick and the Phil man went to see him. When the Phil man saw the Chinese friend, he found his condition was really bad with oxygen tube in his nose, many needles in his body and with life support. The Phil friend sat beside the Chinese friend when the Chinese friend was in hospital with such a disastrous condition of health. Suddenly the Chinese friend told him, “ “Li kay wang ki guan” and died. The Phil friend didn’t understand what the Chinese friend meant. So the Phil friend tried to find out actually what his best friend Chinese man wanted to mean. After many years, the Phil friend found another Chinese man and wanted to know what his BEST friend told him before he died. The new Chinese man translated that his friend told him, “Please you are seating on my oxygen tube and I cant breath, Remove yourself from the tube.”
So let we understand our minds and body languages of the family where we all are the BEST friends of everyone. I miss you Masud and I felt truly sad when you left Bangladesh. I am not your biological father but I know you are just like my son masud. My family thinks you are my next kin and you have lots of responsibilities to perform in absence of me and your dad. You are our boy no matter who loves you more but we love you more than anything and without any conditions Masud.
Keep always link and make two steps forward towards the bed where you had lots of memories you left that you will never remember because you were so small to remember those times.
Akhtar
প্রিয় মাসুদ এবং রিমুনা
এটা আমার জন্য খুব ই ভালো সময় ছিল যখন থেকে তোমরা অল্প সময়ের জন্য হলেও বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলে এবং আমাদের সাথে সময় কাটিয়েছো। মহান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যে তিনি তোমাদের মতো বাচ্চাদেরকে আমাদের পরিবারে ব্লেসিং হিসাবে দিয়েছেন। তোমার এই অল্প সময়ের সান্নিধ্য টা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ছিলো। তবে, এই অল্প সময়ের ভ্রমনের উপর ভিত্তি করেই আজকে …
(চলবে)
“এ জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা“।
তাহলে আমার জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা লিখে ফেলি. এই মাত্র পাসপোর্ট অফিস ক্রস করলাম, খুব একটা জ্যাম মনে হচ্ছে না। রাস্তা ফাকা ফাকা মনে হচ্ছে। রাস্তা ফাকা ফাকা দেখলে আবার মাঝে মাঝে ভয় করে, এমন ফাকা ক্যান? হরতাল মরতাল নাই তো? অথবা সামনে কোন অঘটন>?ফৌজি মানুষ তো!! বেশি ভয় পাই। সাধারন পাবলিকের একটা ভুল ধারনা আছে, সবাই ফৌজকে খুব সাহসি মনে করলেও আসলে ফৌজ কিন্তু খুব ভিতু। এই গোপন রহস্যটা জানে খালি ফৌজ নিজে আর কেউ না। যাক, এখন একটু জ্যাম দেখতে পাচ্ছি, মনে শান্তি লাগলো, কোন হরতাল মরতাল নাই মনে হয়। গুড। অন্তত হরতালের থেকে জ্যাম ভাল। আমার পাশে একটা ছোট এক্স করলা গাড়ী দারিয়ে আছে। জ্যাম সবাইকে দারাতেই হবে। ভিতরে একটা অবুঝ এক দেড় বছরের বাচ্চা। একটু একটু দারাতে পারে মনে হয়। গারির বাইরে উকি ঝুকি দিচ্ছে।খুব সুন্দর তার আচরন। মনে হয় সব কিছুতেই তার চিত্তাকর্ষণ। কিছুই বুঝে না। আর কি যে বুঝতে চাচ্ছে তাও বুঝে না। ওর মা মাঝে মাঝে কোন কারন ছারাই একটা করে চুমু দিচ্ছে। ব্যাপারটা মজার। একটু হাত নাড়বো নাকি? বাহ, ভালই তো। হেসে দিল। একখান দাতও উঠে নাই। ছোট বাচ্চাদের দন্ত বিহিন হাসি খুব মজার কিন্তু বুড়াদের দন্ত বিহিন হাসি অন্য রকম। বাহ বাচ্চাটা আমার হাত নারাতে মনে হয় একটা খেলনা পেয়ে গেল, ও কিন্তু আমারে চিনে না। কিন্তু ভাবখানা এই রকম, আমি আরও অনেক দিনের চেনা। কেন যে আমরা বাচ্চাদের মত হই না। আহারে জ্যামটা কেটে গেল। একটানে চলে এলাম র্যাংস। আমি প্রাইম মিনিস্টার অফিসের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাব কারন এই রেংসের ভিরটা অনেকক্ষন ধরে রাখে পুলিস। পুলিশ তো আর মানুষ না। ওরা বুঝে না কোনটা মানুষের গাড়ী আর কোনটা প্রাইম মিনিস্টারের গাড়ী। ওরা খালি বুঝে প্রাইম মিনিস্টারের পথ ক্লিয়ার রাখতে হবে সে যেই যাক। আমার সামনে একটা লেগুনা। প্রায় সবগুলো পুরুষ মানুষ, একজনকে দেখা যাচ্ছে মহিলা। বেচারির অনেক অসুবিধা হচ্ছে বলে আমার ধারনা, আর সব পুরুষ গুলো কিন্তু সবাই এখন মনে মনে নিজেকে রুমিও ভাবতাছে। এই মুহূর্তে কোন গারমেন্টের কর্মীকে রাস্তায় পাওয়া যাবে না। এটা তোমার ভুল।
তুমি সময় মত অফিস কর আর না কর, প্রাইম মিনিস্টার সময় মত অফিস করুক আর নাই করুক, ওরা সময় মত অফিসে যায়।পার হয়ে গেলাম সে বিখ্যাত রেংস। আমি এখন ফার্ম গেটের পুলিস ফারির সামনে। সমরেশ পুলিস আমার পাশে ডিউটি করছে ট্রাফিকের। চোখে একটা নকল রেবনের সানগ্লাস। এখন আমি আনন্দ সিনেমার বরাবর। আসতে আসতে গাড়ীর গতি থেমে গেল। সামনে অনেক হাইলাক্স, পাজেরো, নুহা গাড়ী। আমি এখন ঠিক তেজগাও সরকার বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে।ডানে একটা মিল্ক ভিটার জরুরি শিশু খাদ্য নিয়ে বিপাকে পরেছে মনে হয়। কারন ড্রাইভার ঘন ঘন বিরি ফুকছে। তার ঠিক পিছনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ী। নিশ্চয়ই চারিদিকে গন্ধ ছরাচ্ছে। আশপাশে লোক জনের নাকে ধরা দেখে মনে হয় তাই। অসুবিধা নাই, আমরা এই গন্ধে অভ্যস্ত। গন্ধের শহর ঢাকা শহর। ঢাকা শহরের অনেক বৈশিষ্ট আছে যেমন, গন্ধের শহর ঢাকা শহর, রিক্সার শহর ঢাকা শহর, জ্যামের শহর ঢাকা শহর, ইয়াবার শহর ঢাকা শহর। ১০০% স্বাধীনতার সহর ঢাকা শহর (এখানে যার যা খুশি করতে পারে, কোন আইন মানার দরকার নাই, বাম লেন বন্ধ করলে ট্রাফিক পুলিস ধরে না, উলটা পথ দিয়ে গাড়ী এলে কেউ কিছু বলে না ইত্যাদি)। ঢাকা শহরে অনেক ভবন আছে যারা এক কালে প্রাচ্যর সভ্যতার মত সভ্য কালচার গুলোর যেমন সাক্ষী আবার এই যুগে এসে আধুনিক আইন না মানা যুগেরও সাক্ষী। ভবনের ইটেরা কথা বলে না। তাই অনেক ইতিহাস আমাদের জানা হয় না। যেমন ধর, হোটেল সুপার স্টার (যার পাশে আমি এখন দারিয়ে আছি) ৫০ বছর আগে নিশ্চয়ই এখানে এই হোটেলটা ছিল না। হয়ত বা ডাহুকের পদচরন ছিল এখানে। সেই ডাহুকের হয়তা বা মৃত্যু হয়েছে আরও ৪০ বছর আগে, তার সন্তান সন্ততিরা ইচ্ছে করলেই আর তাদের দাদা নানা দেড় এই জায়গায় পুনর্মিলনের কোন সুযুগ নাই, কারন এখানে এখন কপোত কপোতীর মত জুগল মানব বসে সুপার স্টার হোটেলে সময় কাটাচ্ছে।কিংবা ধর, TK ভবন (যার পাশে এখন আমি দারিয়ে) এটা নিশ্চয়ই ১০০ বছর আগে ছিল না। অথবা আজ থেকে আরও ২০০ বছর পর এটা থাকবেও না। সময় শুধু বয়ে যায়, কি থাকবে আর কি থাকবে না, সময় শুধু বলে দেবে। সময়টা এমন এক অদ্ভুত জিনিস কোথায় যেন পরেছিলাম যে, এটা সবার সঙ্গে হাটে কিন্তু সে কারো বন্ধু নয়। সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না, তুমি তার সঙ্গে যাবে কি যাবে না, তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সময়ের পিতার নাম সময়, মাতার নাম সময়, সন্তানের নাম ও সময়। এ এক অদ্ভুত পরিবার। তার কোন দিক জ্ঞ্যান নাই, তার কোন বংশ পরিচয় নাই, তার না আছে ক্লান্তি, না আছে অবসর, সে শুধু চলেই যায়, শুধু রেখে যায় কিছু ফুট প্রিন্ট। কেউ তার থেকে কিছু শিখে আবার কেউ এর তোয়াক্কাও করা না। যেমন এই মুহূর্তে আমি কিছু ফুট প্রিন্ট রেখে গেলাম।
আমি এহন হোটেল সোনারগাঁও। এর কত যে ইতিহাস আছে ভিতরে ভিতরে কে জানে। কত মানুষের আশা, হতাশা, সম্ভ্রম, কষ্ট, কত কিছুই না এর ভিতরে জমা হয়ে আছে কে জানে!! কারো কারো ইতিহাস এখান থেকে হয়ত রচনা হয়েছে আবার কারো কারো ইতিহাস এখানেই শেষ হয়ে গেছে। কেউ হয়ত এর পাশ দিয়ে যাবার সময় মুচকি মুচকি হাসে আবার কেউ হয়ত চোখের পানি ফেলে। কিন্তু এই ভবন যে নামেই ডাকা হোক, সাক্ষী সে রয়েই যাবে।আমি এখন প্রধান বিচাপতির বাস ভবনের সামনে । একে বাসভবন না বলে সরাইখানা বললেই যেন ভাল হত।কত বিচারপতি এখানে থেকেছেন, কত বিচারপতিগন আবার এখানে থাকবেন, তার কোন ইয়ত্তা নাই। এই সরাইখানা এমন জিনিস যখন যে আসে সবাই একে নিজের মনে করলে ও এটা তার নয়। তাকে একদিন না একদিন ছেরে যেতেই হবে। কেউ সেটিছফেক সন নিয়ে বের হয় আবার কেউ বের হয় নেক্কার জনক ভাবে। বিচার পতিদের কে নাকি আল্লাহ দুই বার বিচার করবে, আল্লাহ কি করবেন এটা অবশ্য বিচার পতিরা ভাবেন না। তারা ভাবেন, প্রাইম মিনিস্টার কি করবেন। মরার পর কি হবে এটা ভাবার জন্য এখনো কোন আইন করা হয় নাই বলেই হয়ত তারা এটা ভাবতে পারেন না।কবে যে এই আইন টা করা হবে যে মরার পর কি হবে। তাহলে মনে হয় কিছু কিছু আইন আর দরকার পরত না যেমন ঘুস খাওয়ার কারনে শাস্তি, র্যাপ করার কারনে শাস্তি, কারো হোক কেরে নেওয়ার জন্য শাস্তি ইত্যাদি। আচ্ছা আমি এই বিচারপতিদের নিয়ে কেন মন্তব্য করছি? আমি তো লিখছি ঢাকা কাহিনি তাও আবার এ জার্নি বায় কার ফ্রম মিরপুর তো পোস্তগোলা। বিচারপতিরা জানলে আবার কোর্ট অবমাননা করার কারনে আমার এই রাস্তাটা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।যাক বিচারপতিদের আবাস স্থল পার হয়ে এসেছি ভাই, এবার আমি কাকরাইল তব্লিক অফিস। বকসির প্রিয় জায়গা।
তবলিক করে বহু মানুষ উপকৃত হয়েছ নিজে নিজে। তবে শুনেছি এতে ব্যক্তিগত ভাবে উপকৃত হলেও অনেক পরিবার এতে উপকৃত হয় নাই। তারা কিভাবে চলবে, কিভাবে চলছে, এটা অনেকেই ভেবে দেখে না। কোন টা যে কার হক অনেকেই তার সঠিক মানে বুঝে না।যাক এটা আমার গবেষণার বিষয় নয় এখন। আমি চলছি ঢাকার রাস্তায়। আমি ঠিক বকসির অফিসের সামনে। কিন্তু ঘুরে আসার জন্য সাহস পাচ্ছি না । অনেক জ্যাম।
ইশা খা হোটেল। আমি তো ঢাকার রাস্তায় দোস্ত। আমি শুধু রাস্তার চারিপাশের বর্ণনা দিচ্ছি আর মাঝে মাঝে কমেন্ট করছি দোস্ত। এটা কি আঙ্গুল ঢোকানো বলে? তবে তাই হোক। রাজমনি সিনেমা হল, বাহ, বিশাল পোস্টার। “ভালবাসার তাজমহল”। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম, দেখলেই ভয় লাগে। এখানে নাকি সব বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে। আচ্ছা বেওয়ারিশ লাশ কি? যার কোন পরিচয় নাই সে? এই পৃথিবীতে কে এমন আছে যার কোন পরিচয় নাই? বাপ মা নাই? ভাই বোন নাই? কে যে কেমন করে কখন বেওয়ারিশ হয়ে যায় বা কেন হয়ে যায়, আমি বুঝতে পারি না।আমি জানি আমার পরিচয় আছে, আমার বাবা ছিল , আমার মা ছিল, আমার পরিবার আছে, আচ্ছা আমি কি কখনো বেওয়ারিশ হতে পারি? হয়তবা…… কারন আমি বেওয়ারিশের সংজ্ঞা এখনো বিঝি না।আচ্ছা কেউ কি এখন ভাইবারে নাই? খালি আমি ই কথা বলে যাচ্ছি!! আমার এখন অফুরন্ত সময়।
তুমি আজ হারিয়ে গেলে আমরা তোমারে খুজব, কিন্তু তুমিও কোন একদিন বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যেতে পার,। অথচ আমরা তোমারে খুজছি। তবে বেওয়ারিশ লাশ না থাকলে অনেক অসুবিধা হত। যেমন আমার মেয়ে ডাক্তারি পড়ে, তার একটা কঙ্কাল দরকার। কে দেবে এই কঙ্কাল? বেওয়ারিশ লাশ । কে জানে হয়তবা আমারই কোন এক জেনারেসন আমার কঙ্কাল নিয়েই হয়ত পরাশুনা করবে, সে জান্তেও পারবে না, কোন একদিন আমি ওদের পরিবারের একজন ছিলাম। আমার হাড়ের কোন এক অংশই হচ্ছে সে। মানুষ কখনো মানুষ, কখনো লাশ, আবার কখনো কঙ্কাল , কি আজব না?
আমি এখন প্রেসিডেন্টের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছি। পাশে নবনির্মিত হানিফ ফ্লাই অভার। অনেক পুলিশ পাহারায় থাকে প্রেসিডেন্ট সাহেবের জন্য। অনেক বড় জায়গা। আচ্ছা কবরের মাপ কি সবার জন্য সমান? তাহলে অনারা ওই ছোট্ট কবরে সখিনার সমান মাপের কবরে কেমন করে ঘুমাবেন? সখিনা, তোমার জন্য সুখবর আছে, তোমার কবরের মাপ আর আমাদের প্রেসিডেন্ট সাহেবের কবরের মাপ নাকি সমান। তখন তোমার উপর কেউও ন্যায্য কাজ করতে পারবে না। না বিচারপতিরা, না দেশের স্বাধীনতা, না সময় না কেউ। আমি এখন “দয়া গঞ্জের” মোড়।
কয়েকদিন আগে এখানে আগুন লেগেছিল, অনেকগুলো বস্তিবাসী মারা গিয়েছিল।পরেরদিন খবর হয়েছিল, “বস্তিতে আগুন লেগে ৫ বস্তিবাসি পুরে ছাই”। আমি ওদেরকে চিনি না। কিন্তু যেহেতু আমি প্রতিদিন এইখান দিয়ে যাই, কে জানে হয়তা বা আমি ওদের কোন একজনের সঙ্গে হয়তবা আমার দেখা হয়েছিল!! এই ইতিহাসটা আমার জানা নাই। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে এই স্থানটা পার হবার সময় আমার এই কথাট প্রায়ই মনে পড়ে। হয়তবা কোন একদিন আমিও আর এই স্থানটি দিয়ে আর কখনো আসব না। আমার এই গারিটিতে অন্য একজন বসবে, আমি আর এই রাস্তার উপর দিয়ে যাব না। আমার এই রাস্তার উপর দিয়ে যাওয়ার অধিকার হারিয়ে যাবে। আমার স্থান হবে এই রাস্তার মাটির নিচে। খুব কস্টের না? আর এভাবেই শেষ হয়ে যায় আমার “এ জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা”। নাহ বকসি ভাই, আমি শুধু আমার আজকের দিনের পার্থিব কিছু ফিলিংস এর কথা বললাম। এর মাঝে অনেক আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে, অনেক অবিচারের কোথা আছে, অনেক ন্যায্য তার কোথা আছে, অনেক হতাশার কথা আছে। কিন্তু এর প্রতিটি কথার অনেক বিশ্লেষণ আছে যা আমি এই মুহূর্তে করতে চাইনি বকসি ভাই। চলে এসেছি। আমার সেই পুরানো ফ্যাক্টরিতে। এখানে আমি বড় সাহেব। আমাকে হাসতে হয় মেপে মেপে, কথা বলতে হয় অনেক ভেবে চিনতে। আমি এখানে সাধিন নই কন্তু আমাকে কেউ কমান্ড করে না।
দেখা হবে পড়ে আবার। ভাল থেক সবাই।
মীরপুর, গোলার টেক, পাল পাড়া রোড, ঢাকা-১২১৬
প্রধান মন্ত্রী,
তুমি নিশ্চয়ই ভগবানের থেকে বড় না। আমি ভগবানকে তুমি করে বলি। আমি তোমাকেও তুমি করে বলতে পারি। তুমি খুব ভাগ্যবতি, কারন তুমি দেশের প্রধানমন্ত্রী । ভগবান তোমাকে সুস্হ করে বানিয়েছেন, তোমার কোন অঙ্গহানি নাই, তুমি সবল। তুমি কথা বলতে পার, তুমি প্রিথিবির রূপ দেখতে পার, তুমি সূর্য দেখতে পার, তুমি চাঁদ দেখতে পার, তুমি একা একা চলতে পার, তুমি হাযার হাযার মানুষের থেকেও ভাল আছ। তুমি মেয়ে মানুষ অথচ তুমি অনেক ছেলেদের থেকেও পাওয়ারফুল। তুমি এতিম কিন্তু তুমি এতিমের মত না, তোমাকে মানুষ সম্মান করে, তুমি এদেশের সবচে সিনিওর। ভাবত একবার প্রধানমন্ত্রী! অথচ তুমি অনেক মানুষের সপ্ন বাস্তব দিতে পারছ না। কেন? তুমি কি চোর? তুমি আমাকে বল তুমি যদি চোর না হও তবে কেন তুমি চোর পাল? কি তোমার ভয়? তুমি হ্মমতা হারাবে? নাহ। তুমি হ্মমতা হারাবে না। এদেশের মানুষ অনেক চালাক, তারা বুঝতে পারে কি হচ্ছে কোথায়। তোমাকে আমি মাঝে মাঝে বুদ্ধিমতি বলে মনে করি কিন্তু অনেক সময় তুমি বুদ্ধিমানের মত কাজ কর না। কি তোমার সমস্যা? বলনা দেশবাসিকে? ওরা তোমাকে ভালবাশে, তুমি কি এটা জান? তুমি কেন হিটলার হতে পার না? তুমি কেন স্তালিন হতে পার না? তুমি কেন আরেকটা মুজিব হতে পারনা? মুজিব তো বলেছিল, আমার কম্বল কই? তুমি কি সে কোথা ভুলে গেছ? মুজিব তো বুলেটের সামনে এসে বলেছিল, কিরে তোরা কি চাস? আহ কি দারুন কথা। তুমি কি তার মেয়ে নও? তুমি বল না আমাদেরকে যে, তোমার পরনে কাপড় নাই, আমরা আমাদের কাপড় তোমাকে দিয়ে দেব, তুমি বলনা, তোমার ঘরে খাবার নাই, আমি তোমাকে বলছি, আমি খাব না, আমার খাবার আমি তোমাকে দিয়ে দেব। সুধু দেশটাকে বাচাও প্রধানমন্ত্রী । তুমি সমুদ্র জয় করেছ, এর জন্য তোমাকে আমরা পুজা করব, এর জন্য তোমাকে অনুস্টান করে মালা নেবার দরকার নাই। তুমি এত বোকা কেন? তুমি প্যাপার পরনা? তুমি দেখ না যুবক সমাজ কি বলছে? সময় পাল্টে যাচ্ছে, চোখকান খোলা রাখ প্লিয। আমার জীবনে আমি কখন ভোট দেই নাই, এবার প্রথম আমি সুধু তোমার জন্য ভোট দিয়েছি। আমি কি ভুল করেছি ? আমি জানি, আমাদের ভালবাসা তোমার আয়ুস্কাল নির্ভর করে না, কিন্তু তোমার ভালবাসায় আমদের আয়ুস্কাল নির্ভর করে । তুমি কি ভাল আছ? তুমি ভাল নাই। কেন তুমি এমন কিছু লোক নাওনা যারা দেশের ভাল করবে, হোক না তারা তোমার শত্রু, কিন্তু তারা যদি দেশটাকে ভালবাসে, নাও না ওদের। তুমি কেন নেলসন মেনডেলার মত একটা ইতিহাশ তৈরি করনা? তুমি ইতিহাশ হয়ে যাও। তোমার পথ ধরে তোমার সন্তানরা আসবে, তোমার পথ ধরে আমরা আসব, কেন, কেন তুমি পারনা?
তুমি অগ্নিকন্যা কিন্তু তোমার অগ্নি মানুষকে পোড়ায় না। তাহলে তুমি কেমন আগ্নিকন্যা? আমি রাজনীতি করি না কিন্তু আমি রাজনীতির সব খবর রাখি, আমার ব্যথা লাগে, আমার কষ্ট হয়, তুমি দেখনা প্রধানমন্ত্রী, তুমি পারবে না? তুমি পারবে। তুমি আমাকে খুজনা, আমি রাজনিতিকে ভয় পাই, আমি সুধু চাই আমি অনেক লোকের ভার নিতে চাই না। ওরা তোমাকে চায়, অথচ আমরা তোমার হয়ে কাজ করছি। আমরা তোমাকেও কষ্ট দিতে চাই না। তুমি অনেক ব্যস্ত। সধু তুমি সৎ থাক। এ দেশের মানুষগুলো ভাল, ওরা বাচতে চায়, ওরা তোমার কাছ থেকে টাকা চায় না, ওরা তোমার কাছ থেকে করুনা চায় না, ওরা চায়, ওদের কাজে বাধা দিও না, হরতাল, অবরোধ, ওরা ভয় পায়, তুমি জান এটা? আমি বিরোধী দলকেও ভয় পাই। ওরা আরও অনেক কঠিন কাজ করতে পারে। কিন্তু ওরা কি আমাদের ভালবাসে না? ওরা কার জন্য রাজনীতি করে? যদি রাজনিতি হয়ে থাকে আমাদের জন্য তবে আমদের কথা শোন। আমি অনেক দেশ ঘুরেছি, দেখেছি, নেতা অনেক বড় জিনিস। আমি তোমাদেরকে নেতা মানতে চাই। কে জয়, কে তারেক, এতে আমার কোন দুঃখ নাই, আমি সুধু চাই, শান্তি আর উন্নতি। তোমারা দুইজন এক সংগে বসনা প্লিয। দেখেবে দেশটা ভাল হয়ে যাবে। এ কাজটা তোমার। ওরা বসবে না, তুমি ওদের বস্তে বাধ্য করবে। না বসলে ওদের লাভ, বসলে তোমার লাভ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তুমি কি বোঝতে পারছ দেশের মানুষের কথা? এ দেশের ৫৫% শতাংস লোক তোমাকে ভোট দেয় নাই, কিন্তু তুমি এখন তাদের ও প্রধানমন্ত্রী। তুমি এখন আর তোমার পার্টির কেও নও। তুমি এখন জনগনের সম্পদ। তোমার শরীর খারাপ হলে দেশের প্রত্যেকে জানবে, বিশ্ব জানবে। তুমি কি এটা বুঝ? তাহলে দেশের লোকের শরীর খারাপ হলে, তাদের মন খারাপ হলে, তুমি জানবে না কেন? মানুষ এখন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। ঘরে নিরাপত্তা নাই, রাস্তায় নিরাপত্তা নাই, অফিসে নিরাপত্তা নাই। যে কোন লোক যখন তখন কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ওরা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী? তুমি কি কিছু জান? আর না জানলে কেন জানার চেষ্টা করছ না? আর জানলে কেন একসান নিচ্ছ না? কি হল তোমার? সাগর-রুমি মরে গেল, ইলিয়স মিয়া লাপাত্তা, বাসে বাসে রাজনিতির লাশ, বিশ্বজিত সবার সামনে কিভাবে খুন হয়ে গেল, হাজার হাজার কোটি টাঁকা মানুষ লোটপাঁট করে ফেলছে, সবাই তোমার ছাত্রলীগের নামে কলংক দিচ্ছে। তুমি কি পেপার পর না? তুমি কি কিছুই বুঝতেছ না? তুমি আমলাদের, মন্ত্রীদের কথা বলার লাগাম টেনে ধর, ওরা যা তা বলে। মানুষ বিরক্ত হয়। মাঝে মাঝে তুমি ও কথার বেলেন্স হারিয়ে ফেল। আরও সাবধান হওয়া দরকার। সামনে তো তোমার বিরাট পরিক্ষা!! এ দেশের মানুষ বড় বিচিত্র। এরা সময় মত ছুরি মারে। আর একবার ঠিক মত ছুরি মারতে পারলে উঠতে সময় লাগে। তুমি কি ভুলে গেছ যে, ২১ বছর লেগেছিল তোমার উঠতে, এবার কিন্তু আরও বেশি সময় লাগতে পারে। কারন যুবক সমাজ যুদ্ধ দেখেনি, মুজিবকে দেখেনি, এদের মায়া মহব্বত কম। বাপমাকেই এরা জবাব দেয় আর তুমি তো প্রধানমন্ত্রী।
গোলার টেক, পাল পাড়া রোড, মীরপুর–১২১৬
আমি খুব ভয়ে আছি এই কয়েকদিন যাবত। আর এই ভয়টা জাগিয়ে তুলেছে শাহ্বাগের “প্রজন্ম চত্বর”। কি সুন্দর নাম “প্রজন্ম চত্বর”।
১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই বীরবাঙ্গালী জাতী যতবার আন্দোলন করেছে, যতবার ঘর থেকে রাস্তায় নেমেছে, সবসময় সুফল নিয়েই ঘরে ফিরেছে বারবার। আর এই জন্য আমরা একটা স্বাধীন ভাষা পেয়েছি, একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি। বিশ্বময় আমরা মাথা উচু করে বলতে পারি, আমি বাংলাদেশের ছেলে। আমার দেশের রাজধানীর নাম ঢাকা। কিন্তু ১৯৭১ সলের পর থেকে যতবারই যে কোন আন্দোলন হয়েছে, কোন না কোন ভাবে সেটা কোন না কোন ব্যক্তি বা দলের দখলে চলে গেছে এবং সেটা আবার ছিনিয়ে আনতে নতুন করে আন্দোলন করতে হয়েছে।
১৯৭১ থেকে ২০০০ এর পর যতসব ঘটনা সবার চেহারা এক। আশা ভাঙতে ভাঙতে এখন আর আশাহত হইনা, আশাহীন হয়ে পরেছি। সবসময় ভেবেছি, মিশর বদলিয়ে দিল একদল তরুন, ৪২ বছরের ইতিহাস এক বছরে পাল্টে গেল, লিবিয়া স্বৈরশাসক মুক্ত হয়ে গেল কয়েক দিনের মধ্যে। সিরিয়া, তিউনেসিয়া, আরও অনেক দেশ এখন পাইপ লাইনে চলে এসেছে, সেখানে গনতন্ত্র ছাড়া আর অন্য কোনভিত্তিক শাসন দিয়ে সারা দেশ চালানো সম্ভব নয়। বিশ্ব এখন শুধু হাওয়া বইছে পজিটিভ পরিবর্তনের। অথচ আমরা শুধু “খবর” হয়েছি সারা বিশ্বে হয় বন্যা, না হয় দুর্নীতি, না হয় ক্রসফায়ার, না হয় আভ্যন্তরিন রাজনীতির হিংসাত্তক কর্মকাণ্ডের কারনে। যদিও নোবেল বিজয়ের মত ঘটনাও এ দেশে ঘটেছে, বিজ্ঞান বিষয়ক নতুন উদ্ভাবনী হয়েছে, গারমেন্টস শিল্প অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু একই সময় আবার এক পদ্মা সেতু সব অর্জন যেন এক নিমিষে সারা পৃথিবীতে আমাদেরকে আরও এক ধাপ পিছিয়ে দিয়ে গেছে। পিছিয়ে দিয়ে গেছে দেশের উন্নতির একটা ধারাবাহিক স্বপ্নের, পিছিয়ে দিয়ে গেছে সারা বিশ্বের কাছে আমাদের মাথা উচু করে দাঁড়াবার প্লাটফর্মটা। এটা শুধু একটা লোণ নয়, এটা একটা কলঙ্ক জনক ঘটনা। এটা একটা দেশের চরিত্র, এটা একটা দুঃস্বপ্ন। এই স্বপ্ন ভঙ্গের ব্যথায় কেউ সোচ্চার হলনা, অথচ আমি জানি এটা নিয়ে দেশের ১ম মানুষ থেকে শুরু করে আপামর সব চেয়ে ছোট মানুষটারও বুকে কস্ট আছে। আমি জানি না কেন এমন হল, আমি জানি না কি করলে কি হত। আমার জানা নাই এখানে কার কতটা দোষ বা কার কতটা গাফিলতি। শুধুজানি, স্বপ্নটা সার্থক হতে আরও অনেক সময় পেরিয়ে যাবে। উদ্ধারকারী খুব কাছে কেউ নেই আমাদের।
ঘর থেকে বের হই খুব ভয়ে ভয়ে। এ ঘরে আবার ফিরে আসা হবে তো? নাকি পথে কোন কারন ছাড়া আমি হয়ে যাব লাশ বা বিশ্বসন্ত্রাসী? উচিত কথা বলবার আমার সাহস নাই, এটা আমার দুর্বলতা নয়, এটা আমার একাকিত্তের ফসল। আমি যেন একা। আমার মত সবাই যেন একা। সবাই যেন কোন এক উদ্ধারকারীর অপেক্ষায় আছে, কবে আসবে সেই বীরপুরুষ? আর কেই বা সেই বীর পুরুষ? চারিদিকে নৈরাজ্য, মারামারি, দুর্নীতি, চাপাবাজি, অবিশ্বাস, চারিদিকে হাহাকার, এখানে একটা লাশ এক ভাগ পুঁটি মাছের দামের থেকেও কম, এখানে একটা যুবতির সম্ভ্রম শকুনের ভাগাভাগি করে খাওয়া গলিত শিয়ালের লাশের থেকেও কম গুরুত্তপূর্ণ।
এমন একটা কঠিন সময়ের মধ্যে হটাত করে শাহ্বাগের “প্রজন্ম চত্বর” যেন গহিন সমুদ্রের মধ্যে একছটা আলোর মত মনে হয়। আমার মন আবেগে ভরে উঠে। আশায় ভরে উঠে। দেশের আনাচে কানাচে ভিয়েনামের যুদ্ধের মত সব যৌবন আজ জেগেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের মত সব যৌবন আজ টগবগ করে ফুটছে, এখানে ভোর, সকাল, দুপুর, রাত যেন এক হয়ে গেছে। সময় থেমে গেছে। এখানে আজ ৯০ বছরের থুরথুরে বুড়িও যেন আর বুড়ি নয়, এখানে সব দাত পরে যাওয়া ১০০ বছরের দৃষ্টিহীন বুড়ো যেন তোমাদের স্পর্শে ২৫-৩০ বছরের যুবক বনে গেছে। আমি এখন রাস্তায় বেরোলে আমি জানি তোমরা পাহারায় আছ, আমি জানি তোমাদের সামনে কোন বাধায়ই বাধা নয়। কে আছে আমাকে এখন কটু কথা বলবে? কার এমন দুঃসাহস আছে আমাকে ভয় দেখাবে? আমার পাশে তো “প্রজন্ম চত্বর” আছে। তোমরা তো এখন আমার ক্যাপ্টেন। তোমরাই কি সেই বীর পুরুষ নও? মিশরের মত? লিবিয়ার মত? চেগুভার এর মত? নাকি আবারো হতাশায় ভোগাবে? কোনো উদ্আদেশ্মিয নিয়ে এই প্রজন্ম চত্তর নামে সবার হৃদয়ে আবার শুল চালাবে না তো?
আর কাঁদতে চাই না, আমাকে আর আশাহত কর না, আমি বিশ্বাস করতে চাই, ওই আলো আমাদের, ওখানে কোন আর হায়েনারা নাই, দল নাই, ব্যক্তি নাই, তোমরা জেগে থাক একটা একটা সপ্ন নিয়ে, তোমাদের আর ঘুমিয়ে থাকার অবকাশ নেই। তোমরা কি সেই আলো? তোমরা কি সেই উদ্ধারকারী? হয়ত বা তাই, আমি তাই বিশ্বাস করতে চাই। এখন আমাকে তোমরা প্রশ্ন করতে পার, তাহলে আমি ভয় পাই কেন? আমি ভয় পাই এই ভেবে যে, যে আলো তোমরা দেখাচ্ছ, সে আলো কি তোমরা ধরে আছ কিনা, যে আলোর তাপ তোমরা বিকিরন করছ, সে আলোর মিছিল একান্তই আমাদের কিনা। আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমার মাথা আঁচড়ানোর সময় নাই, আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমার গায়ে ঘামের গন্ধ, আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমরা যা অ-গ্রহনযোগ্য তা নিমিষে বর্জন করতে পার এবং সত্যিটাকে আগলে রাখ। কিন্তু ভয় লাগে যখন দেখি দেশি-বিদেশি বর্ণচোরা হায়েনারা তোমাদের পাশে ঘুরঘুর করে সুযোগ খুজছে, আমার ভয় করে যখন দেখি তোমার মাথার চুল আর এবড়ো থেবড়ো নয়, বেকব্রাশ করা পরিপাটি চুল, আমার ভয় করে যখন দেখি তোমার ঘর্মাক্ত সার্ট আর ঘামে ভিজে নেই, অনেক অসাধু সুযোগ সুন্ধানী হায়েনাদের মত ইস্ত্রি করা। আমি তোমাদের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে চাই, তোমাদের অনেক কাজ। একটা একটা করে করতে হবে, এখানে আশা ভঙ্গ করা মানে, শেষ তলয়ার শেষ হয়ে যাওয়া। তোমরা কি শুনতে পাও ঐ স্বামীহারা স্ত্রীর কান্না যে একা একা গত ৪০ বছর ধরে পরাধীনের মত গ্লানি টেনেছে? তোমরা কি শুনতে পাও ঐ স্বামীহারা স্ত্রীর স্বামীহীন অসহায় জীবনের একাকীত্ব? তোমারা কি শুনতে পাও কত বিরঙ্গনার আর্তনাদ যারা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে মরনের আগে শুধু তার সতিত্তের বিচার পাওয়ার জন্য? এরা কেউ তোমার মা, কেউ তোমার বোন, কেউ তোমার মেয়ে। ওরা কারো কাছেই কোন বিচার পাবে বলে আর আশা করে না। আর যারা ঐ ৩০ লাখ তরুন মানুষ তোমাদের ভবিষ্যৎ সুখের জন্য তাদের যৌবন ত্যাগ করেছে, বর্তমান ত্যাগ করেছে, তাদের জন্য কি সুসংবাদ দিবে তোমরা? তোমরা শুধু একটা কাজ করে যাও, তোমরা তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর বাংলাদেশ রেখে যাও যা তোমাদের পুর্বসূরিরা তাদের জীবন ত্যাগ করে তোমাদের জন্য করে গেছেন।
আমি ৭১ দেখেছি কিন্তু ৭১ কি আমি তখন কিছুই বুঝিনি। আমি দেখেছি আমার মা শুধু রাত জেগে বসে থাকতেন কখন আমার বাবা চুপে চুপে রাতের আধারে মার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, দিন পার হয়ে গেছে, মাস পার হয়ে গেছে, বাবা আর ফিরে আসেন নি। আমার ভাই কতই বা বয়স তার, ১৯ কি ২০ ! কি অদম্য সাহসের সাথে কোন এক রাতে মাকে না বলেই চলে গেলেন ৭১ এর যুদ্ধে। কি হয়েছিল তার? দেশ তো স্বাধীন হয়েছে, কই আমার ভাই কি আর ফিরে আসবে না? হয়ত বাবা আর আমার ভাই এখন এক সঙ্গেই আছেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমার বাবা কি আমাকে মিস করে? আমার ভাই কি আমাকে মিস করে? আমি তাদের খুব মিস করি। আমার মা আমাকে প্রতিদিন হাতির গল্প, ভুতের গল্প, রাজা রানীর গল্প শুনাতেন। ৭১ এর পর আমার মাকে আর কখন কোন দিন আর হাতির গল্প, ভুতের গল্প বলতে শুনিনি। আমার মাকে গল্প বলতে বল্লে শুধু একটা গল্পই বলতেন, “এক ছিল এক রাজা, রাজার ছিল রানী। রাজা-রানির ছিল এক রাজপুত্র। এক দিন রাজা যুদ্ধে মারা গেলেন, রানীও কয়েক বছর পর মারা গেলেন রাজার শোকে। বেঁচে রইল রাজপুত্র”। মা এখনেই গল্পটা শেষ করে দিতেন। আমি বলতাম, তারপর কি হল মা? মা বলতেন, “রাজপুত্র বড় হবে, সেও যুদ্ধ করবে রাজার মত কারন রাজার রক্ত যে রাজপুত্র বহন করে”। আমি বলতাম, কোথায় মা সেই রাজপুত্র? মা কিছুই বলতেন না। আমি আজ তার উত্তরটা জানি। সে এখন “প্রজন্ম চত্বরে”।
আবার আমার শতভাগ ভুল হলেও হতে পারে। হতেও পারে, যা দেখছি, পুরুটাই ভুল।
বাঙালি বড় অসহায়।
মীরপুর, গোলারটেক
ঢাকা-১২১৬ –
মনটা ভাল নেই। ও খালিখালি আমাকে সন্দেহ করে। আমি জানি মদ খাবার পর আমি অনেক উলটা পাল্টা বলি কিন্তু আমি আজো খারাপ হয়ে যাই নাই। মাথার উপর কত চাপ, অথচ ও গুলো বুজতেই চায় না। কি হবে আমি মরে গেলে? মিতুল কিছুতেই আমর এই সাম্রাজ্জো বাচাতে পারবে না। আমার মা পারে নাই, মিতুলও পারবেনা। আমি একটা প্রদিপের মত। আমি জলছি, কিন্তু সবাই আমার কাছ থেকে আলো নিচ্ছে। কিন্তু আমি যে শেষ হয়ে যাচ্ছি সেটা কেউ দেখে না। একদিন ওরা সবাই জানবে আমার অনেক আলো ছিল, আমি আরও অনেক আলো দিতে পারতাম কিন্তু দেবার জন্য যে সাপোর্ট দরকার ছিল সেটা আমি পাই নাই। আমি এখনো কোন ভুল কিছু করিনি, কিন্ত আমি সম্বভত ভুল করতে যাচ্ছি। কি করে ঠেকাবা যদি না জান কি ভুলটা আমি করছি? আমি খুব ব্যথিত। ২২ বছর একত্রে থেকে বুজতে পারলে না? আর বুজতে পারবে না। আমি এই রকমই।
সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে স্টল গুছিয়ে ভাবলাম আবারেকবার রাশিয়া ঘুরে যাই। ফলে আমি, রাজীব ভাই (ওরফে সজীব ভাই) আর মূর্তজা ভাই তিনজনেই আমরা ট্রেনে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে সরাসরি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে র ওয়ানা হলাম। এমন একটা সময় যে, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্যে খুব ভালো ট্রেন সূচী তো নাইই, বরং মারাত্তক ট্রেন বিপর্যয় হয়েছে এই সময়। তারপরেও বিদেশী হিসাবে অনেক কষ্ট করে আমরা তিনটা টিকেট জোগাড় করতে পারলাম। এখানে একটা জিনিষ খুব নজরে পড়লো যে, এমন কি যারা রাশিয়ার নাগরীক, সবাই রাশিয়ায় যেতে পারেন না, আর পারলেও তারা কয়েকদিনের জন্য এমন ভাবে সরকারী অনুমতি লাগে যে, তিন দিন বা চারদিনের জন্য। ফলে রাশিয়ায় প্রবেশ করার এবং বের হবার সময় এটা খুব কড়াকড়িভাবে সরকারী কর্মচারীরা চেক করেন যেনো কেউ অনির্দিষ্ট কালের জন্য রাশিয়ায় থাকা চলবে না। এটা সম্ভবত রাশিয়ায় যাতে অন্য শহরের মানুষ এসে অযাচিত ভীর না করে এবং ঘন বসতির সৃষ্টি না করে সেজন্য। ব্যাপারটা আমার কাছে কিছু মন্দ লাগে নি। আমাদের ঢাকা শহরের জন্যেও এমন ব্যবস্থা হলে অন্তত ঢাকা একটা বসবাসের শহর হিসাবে গড়ে উঠতো।
যাই হোক, আমরা একটা হোটেল খুজতে গিয়ে খুবই বিড়ম্বনায় পড়লাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার একবার এই হোটেলে, আরেকবার ওই হোটেলে নিয়ে যেতে লাগলো, কোথাও ভালো রুমের হদিস পাচ্ছিলাম না। অনেক পর্যটক সম্ভবত এই সময়, কোথাও খালি পাচ্ছিলাম না। অতঃপর একতা স্বাভাবিক মানের হোটেলেই উঠলাম। আমরা তিনজনেই এক রুমে উঠলাম। রাত তখন প্রায় ৩টা। কিছু খাবার সাথেই ছিলো, সেটাই আমরা তিনজনে ভাগ করে খেয়ে নিলাম। তারপর ঘুম। আগামীকাল এই রাশিয়ান এয়ারপর্ট থেকেই আমরা ফিরে যাবো ঢাকায়, বিকেল ৪ টায় ফ্লাইট। এর মধ্যেই যতোটুকু রাশিয়ার আশেপাশে দেখা যায় সেটাই ভালো।
সকালে রাজীব ভাই অন্যত্র চলে গেলেন। আমি আর মূর্তজা ভাই পায়ে হেটে অদূরে ক্রেমলিন দেখতে যাবো। যেহেতু ভালো মতো চিনি না, তাই একতা গাড়ি ভাড়া করলাম। পরে দেখলাম, আসলে আমাদের হোটেল থেকে ক্রেমলিন অতো কাছে নয়। আমরা যখন ক্রেমলিনের চত্তরে পৌঁছলাম, তখন মাত্র সকাল ১০ টা হবে। বিশাল চত্তর সামনে। অনেক নাম শুনেছিলাম এই ক্রেমলিনের, আজ নিজের চোখে দেখে মনে হলো, এতা পরাশক্তির একটা হেড কোয়ার্টার। জীবনে আল্লাহ অনেক কিছু দেখালেন। আমেরিকা দেখেছি, এবার রাশিয়ার ক্রেমলিনও দেখলাম।
ক্রেমলিনের সামনে অনেক সিকিউরিটির লোক থাকে, কিন্তু তারা কাউকে কিছুই বলেনা। যারা দর্শানার্থী, তারা নির্বিঘ্নে ক্রেমলিনের বাইরের বিশাল চত্তরে আনাগোনা করছে। মনে মনে ভাবলাম, এদের অনেকেই আছে গুপ্তচর যাদের হয়তো আমরা চিনি না কিন্তু তাদের কাজের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা।
অনেক ক্ষন থাকলাম, দেখলাম, ছবি নিতে কোনো বাধা নাই তবে মাঝে মাঝেই লেখা আছে, ‘এই এলাকায় ছবি তোলা নিষেধ”। খুব গোপনেই কয়েকটা ছবি নিলাম, বলা যায় না কোথায় কোন ক্যামেরা ফিট করা আছে, আবার কেউ আমাদের সন্দেহ করে ধরেও নিয়ে যেতে পারে এই ছবি তোলার জন্য। আশেপাশে কোনো দোকান পাট নাই, ভীষন পানির পিপাসা লেগেছিলো, সাথে অল্প একটু পানি ছিলো, তাতেই পানির পিপাসা মিটাতে হলো।
ক্রেমলিন থেকে আমরা পায়ে হেটে আশেপাশে বেশ দূরে কিছু শপিং মলা আছে। সেখানে গেলাম। মূর্তজা ভাই একতা স্পোর্টস দোকানে ঢোকলেন, তাঁর বাচ্চাদের জন্য কিছু স্পোর্টস গিয়ার কিনবেন। আমিও ভাবলাম কিছু কিনি। ওরে ভাই, এতো দাম? তারপরেও পকেটে ডলার ছিলো বেশ, আর এগুলি ঢাকায় ফিরিয়ে নেবার ইচ্ছা ছিলো না। তাই প্রায় ১৫০০ ডলার দিয়ে আমিও কিছু স্পোর্টস গিয়ার কিনলাম মুর্তজা ভাইয়ের দেখাদেখি। হয়তো আমার পরিবার এ গুলি ব্যবহার করে কিনা জানি না, আবার করতেও পারে। ব্যবহার করলে ভালো লাগবে আর না করলে পুরা টাকাটাই গচ্চা।
একটা রেষ্টুরেন্টে ঢোকে আমরা কিছু খেয়ে নিলাম। বিকাল ৩ তাঁর দিকে এয়ারপোর্টে গেলেই হবে। ওই সময় রাজীব ভাইও আমাদের সাথেই ঢাকায় ফিরবেন। আমরা খাওয়া দাওয়া করে বিকাল তিনটার আগেই এয়ারপোর্টে চলে এলাম, বিশাল এয়ারপোর্ট। চমৎকার জায়গা। খুব ভালো লাগলো। অনেক দেশ ঘুরে একটা জিনিষ বুঝেছি যে, আমাদের দেশের এয়ারপর্ট বিদেশের লোকাল এয়ারপোর্টের থেকেও খারাপ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায়, ডেকোরেশনে, সুযোগ সুবিধা সব কিছু মিলিয়ে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল এউয়ারপর্ট কোনো অবস্থাতেই ইন্তারন্যাশনাল পর্যায়ে পড়ে না। যাই হোক, আমরা চেকিং করে ফেললাম। আমাদের সাথে যে স্যাম্পল গুলি সেন্ট পিটার্সবার্গে নিয়ে এসেছিলাম, সেগুলি আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গেই দান করে এসেছিলাম। ওগুলি আর দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো মানে হয় না। কারন তাতে আমাদের অনেক লাগেজ খরচ বহন করতে হতো।
একটা কথা না বললেই নয় যে, আমরা যে উদ্দেশ্যে এই সেন্ট পিতার্সবার্গে স্টল খুলেছিলাম, আসলে এতার কোনো সাফল্য আসে নাই। আমরা ভেবেছিলাম যে, এখানে বায়াররাও আসে। ফলে আমরা অনেক অর্ডার পাবো দেশ বিদেশ থেকে। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম যে, আসলে এখানে খুচরা ক্রেতা বেশী। অর্থাৎ এক পিস দুই পিচ কেনার ক্রেতা। আমরা তো এটা চাই নাই। পুরুটাই আসলে একটা অসফল ফেয়ার ছিলো। আমি মুর্তজা ভাইকে বললাম, যে, এর পরে এভাবে আর আমরা কোনো স্টল দেয়া উচিত না। তাতে খুব লাভ হয় না।
আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম।
গত কয়েকদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম এই সেন্ট পিটার্সবার্গে ফ্যাশন মেলায় আসার জন্য। 39th International Exhibition of Textile and Light Industryএর মেলাটার সময়কাল ১৫ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত। কোনো পরিকল্পনা ছিলো না আগে থেকে। হতাত করেই মূর্তজা ভাই বললেন, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে একটা মেলা হচ্ছে, বাংলাদেশের অনেকেই যাবে, আমরা যাবো কিনা?
সেন্ট পিটারসসবার্গের কথা অনেক পড়েছিলাম আমাদের বই পুস্তকে সেই ছোট বেলা। যখন ছাত্র ছিলাম তখন আবার রাজপুটিনের গল্প শুনতে শুনতে এই সেন্ট পিটার্সবার্গের ব্যাপারে অনেক বাসনা ছিলো মনে। আমাদের ক্লাস এইটের একটা বইয়ের মধ্যে একতা ছোট বালকের গল্পপড়েছিলাম যে, তাঁর বাবাকে রাশিয়ার কোনো এক রাজা শাস্তি সরুপ এই সেন্ট পিটার্সবার্গে পাঠিয়েছিলো। কারন সাইবেরিয়ার মতো নাকি এখানে প্রায় সারা বছর বরফ থাকে আর যাতায়তের তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থা নাই। তারপর সেই বাবাকে দেখার জন্য তাঁর ছোট ছেলে একাই পরিকল্পনা করে যতো বরফই থাকুক আর যতো খারাপ রাস্তাই হোক, সে তাঁর বাবার সাথে দেখ করবেই। যখন গল্পটা পড়েছিলাম, তখন আমার ও একবার এই সাইবেরিয়া অথবা সেন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার খুব শখ হয়েছিল।
মূর্তজা ভাই যখন আমাকে ব্যাপারটা বললেন, আমি যতোটা না ব্যবসার প্রসার হবে তাঁর থেকে বেশী আগ্রহী ছিলাম এই সেন্ট পিটার্সবার্গ দেখার ব্যাপারে। খরচ কত হবে সেটা জিজ্ঞেস করতেই পুরু প্যাকেজের দাম পড়বে প্রায় লাখ বিশেক টাকা ভেন্যু ভাড়া, এয়ার টিকেট, হোটেল ভাড়া, অন্যান্য সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখের মত। কম না। তারপরেও আমরা আমাদের ফ্যাক্টরীর বাজেট পর্যালোচনা করে দেখলাম, সম্ভব প্ল্যান করা। ব্যবসা কতটুকু পাবো জানি না, কিন্তু যাওয়া যেতেই পারে।
গতকাল আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গে অনেক স্যাম্পল নিয়ে এসেছি। সারাদিন বুথ সাজানোর কাজে ছিলাম। প্রুচুর ঠান্ডা। তবে দেশটা এতো সুন্দর, সেতা আমার কল্পনায়ও ছিলো না। সারাদিন কাজের শেষে আমি আর মুর্তজা ভাই সাথে বাংলাদেশের আরেক জন সজীব ভাই, এক সাথে বের হলাম। আমরা বাংলাদেশ থেকে অনেকেই এখানে এসেছি। কেউ জ্যাকেটের ব্যবসা, কারো শার্ট প্যান্টের ব্যবসা, কারো আমাদের মতো সুয়েটার্স এর ব্যবসা।
সারাদিনই গুড়ি গুড়ি বরফ পড়ছে বাইরে। এটা অনেকটা গুড়ি গুড়ি বরফ পরার বৃষ্টির মতো। রাস্তাঘাট সারাক্ষনই ভিজা, গাছের পাতাগুলি ঝরে পড়ে পড়ে গাছের নীচে একটু একটু পচন ধরায় কেমন জানি একটা গন্ধ আসে। রাস্তায় সবাই গাড়ি, কিংবা বাইক বা স্কুটি নিয়ে চলে। সবার হাতেই ছাতা আছে। রাশিয়ান মেয়েরা অনেক সুন্দর হয়, সেন্ট পিটার্সবার্গ সে রকম।অনেক লম্বা হয় এদেশের মেয়েরা।
এসেই একটা মোবাইল ফোন কিনেছিলাম। খুব ছোট একটা মোবাইল ফোন, দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। আসলে আমার কেনার দরকার ছিলো না, কনিকা ছোট ছোট জিনিষ পছন্দ করে, তাই এটা কেনা। রাতের সেন্ট পিটার্সবার্গ দেখতে গিয়ে যা চোখে পড়লো, সেটা অভাবনীয়। প্রতিটি রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে লাইট। মানুষ জন খুব কম কিন্তু যারা বাইরে বেরিয়েছেন, তাদের বেশীরভাগ মানুষই পর্যটক। লোকাল লোকজন বেশ কম। প্রচন্ড বাতাস। সন্ধ্যা হলেই সব অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু সব গুলি বিল্ডিং এর বাইরের দিকে এমনভাবে আলকিত যে, মনে হয় অভিনব রকমের সুন্দর। যেখানেই তাকাই, সব কিছুই এতো চোখ জুরানো সুন্দর, ভাবাই যায় না। যে সব জায়গায় পার্ক আছে সে গুলিত গাছে গাছেও বেশ চমৎকার করে আলোকিত করা। গাড়ির তেমন ভীড় নাই, আবার কিছু কিছু ট্যাক্সি ক্যাব আছে, যারা ছোট ছোট ট্রিপ দেয়।
আমরা একটা নদীর ধারে দাড়ালাম। নদীর দূর প্রান্তের ওপারে যে ছোট শহরের মতো দেখা যায়, মনে হচ্ছে একটা ছবি। আমরা গুড়ি গুড়ি বরফের কুচিতে ভিজে যাচ্ছিলাম বটে কিন্তু আশ্রয় নিতে ইচ্ছে করছিলো না। সিগারেট ধরিয়েছি, খুব সাবধানে টানছি যাতে সিগারেট ভিজে না যায়। সজীব ভাই আর মূর্তজা ভাই একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছেন। আমিও মাঝে মাঝে তাদের সাথে জয়েন হচ্ছি কিছু ছবি তোলার জন্যে। বেশ ভালো সময় যাচ্ছে।
রাত প্রায় বারোটা বাজে। সাথে আমাদের গাড়ি নাই। যখন বেরিয়েছিলাম, সাথে গাড়ি ছিলো, ভারা করা গাড়ি। এবার হোটেলে ফিরে যাবো, এমন সময় একটা ট্যাক্সী ক্যাব আমাদের সামনে এসে দাড়ালো। যুবক একটা ছেলে। ভালো ইংরেজি বলে। জিজ্ঞেস করলাম, সে ভাড়ায় যাবে কিনা। সে বেসিক্যালি ভাড়ায় যায় না, এমনিতেই সে ঘুরতে বেড়িয়েছিলো। আমাদের এতো রাতে এই নির্জন জায়গায় দেখে গাড়ি থামিয়েছে। সে একজন আই টি বিভাগের লোক। ব্যক্তিগত একটা ছোট ফার্ম আছে। সে বল্লো যে, সেন্ট পিটার্সবার্গে অধিক রাত নিরাপদ নয়। আমাদের হোটেলে ফিরে যাওয়া উচিত। কারন এখানে অনেক খারাপ লোক রাতে বিচরন করে। আমরা সবাই একটু ভয় পেয়ে গেলেও যেহেতু সবাই একসাথে আছি, ফলে মনে সাহস ছিলো।
বললাম, কি নাম তোমার?
সে তাঁর নাম আলেক্স বল্লো।
আমরা বললাম, আলেক্স, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিতে পারবা? আমরা তোমাকে যা ভাড়া আসে সেটাই দিয়ে দেবো। সে একটু হেসে দিয়ে বল্লো, তাঁর ভাড়া লাগবে না, কিন্তু সে যে ইংরেজীতে আমাদের সাথে কথা বলতে পারছে এটাই তাঁর লাভ। কারন এখানে সে কারো সাথে ইংরেজিতে কথা বলার মানুষ পায় না। অতচ সে ভালই ইংরেজী বলতে পারে। আমরা তাঁর গাড়িতে উঠে গেলাম, অনেক ফান করলাম তাঁর সাথে, সেও খুব মজা পেলো বলে মনে হলো। সে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে বল্লো যে, যদি তারা আগামীকাল আরো সুন্দর সুন্দর জায়গায় যেতে চায়, তাহলে তাঁর নাম্বারে ফোন দিলে বিনে পয়সায়ই সে আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে। আলেক্স ছেলেটাকে ভালো লাগলো। বললাম, ঠিক আছে, আগামী কাল বিকাল পাচতার পর আমরা ফ্রি হবো, আলেক্স যদি ফ্রি থাকে সে যেনো আমাদেরকে আবার এইখান থেকেই পিক করে নিয়ে যায়। কথামতো সে রাজী হলো।
পরেরদিন ঠিক সময়েই আলেক্স চলে এলো। আমরা আলেক্সকে বললাম, কোথায় কোথায় যাওয়া যায় সে যেনো আমাদেরকে নিয়ে যায়। আলেক্স বল্লো, বেশি জায়গা হয়তো সে ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে না, তাহলে অনেক রাত হয়ে যাবে তবে দিনের আলোয় যে কয়টা দর্শনীয় স্থান দেখা সম্ভব সেটা সে প্ল্যান করে রেখেছে, আর রাতে একটা ব্রিজ দেখাতে নিয়ে যাবে যা দেখার জন্য অনেক মানুষ এখানে আসে। ব্রিজটা রাত দেড়তার পরে খোলা শুরু হয় আর ভোর পাচটার আগেই আবার বন্ধ করে দেয়া হয় যাতে স্বাভাবিক গাড়ি ঘোড়া আবার চলতে পারে। মানে ব্রিজটা দিখন্ডিত হয়ে যায় রাত দেড়টার পর। আমি কখনো এই ধরনের ব্রিজ দেখি নাই। ব্রিজটি নেভা রিভারে।
আলেক্স আমাদেরকে প্রথমেই নিয়ে গেলো, সেন্ট আইজাক ক্যাথেড্রালে, ভীষন সুন্দর দেখতে। তারপর গেলাম চার্চ অফ দি সাভিউর অন স্পিল্ড ব্লাড এ, তারপর নিয়ে গেলো আলেক্সজান্ডার কলাম ইন পেলেস স্কোয়ারে। প্রতিটি জায়গা সুন্দর। এর মধ্যেই রাত প্রায় আটটা বেজে গিয়েছিলো।
সেন্ট আইজাক ক্যাথেড্রালঃ
আলেক্সজেন্ডার-১ এর আমলে, সেন্ট আইজাক ডালমাটিয়ার নামে উতসর্গকৃত এই ক্যাথেড্রালটি ‘পিটার দি গ্রেট’ এর চীফ পেট্রোন ‘সেন্ট আইজাক’ এর নামে করা। এটা বর্তমানে মিউজিয়ামে রুপান্তরীত করা হয়েছে। ১৮৫৮ সালে তৈয়ারি করা এই ক্যাথেড্রালটি সন্ধ্যার পরে বন্ধ হয়ে যায় বিধায় আমরা এর ভিতরে ঢোকতে পারি নাই কিন্তু বাইরেও বহু দর্শানার্থির জন্য দেখার বেশ কিছু আছে। আমরা বেশীক্ষন এখানে থাকতে পারি নাই কারন আমরা এমনিতেই বেশ দেরী করে বের হয়ে আরো বেশ কিছু জিনিষ দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। আর আমরা এই সেন্ট পিটার্সবার্গে দিনের বেলায় বের হবার সম্ভাবনা নাই কারন আমাদের মেলায় আমাদের সারাক্ষন থাকতে হয়। কিছু ছবি তুলে বেরিয়ে গেলাম আলেক্সজেন্ডার পেলেসের উদ্দেশ্যে। কারন ওখানে আবার বেশী রাতে ঢোকার অনুমতি নাই।
আলেক্সজেন্ডার কলাম ইন প্যালেস স্কোয়ার দর্শনঃ
ফ্রান্সের নেপোলিয়ানের সাথে যুদ্ধবিজয়ের পর আলেক্সজেন্ডার-১, এটা তৈরী করেন। প্রায় ১৫০ ফুট উচু এই কলামের উচ্চতা। এতো বিশাল খালি জায়গা এর সামনে, দাড়ালেই মন ভরে যায়। খুব পরিষ্কার করে রাখা জায়গাটি। একদম উপরে একটা এঞ্জেল একটা ক্রস ধরে আছে। কেনো এই ক্রস কিংবা কিসের কারনে এই সিম্বল দেয়া, সেতা আমাদের গাইড আলেক্স ভালো বলতে পারলো না। তবে একটা কথা আলেক্স বল্লো যে, এঞ্জেলের মুখখানা আলেক জেন্ডার-১ এর মুখের আকৃতি স্বরূপ করা। কিছুক্ষন থাকার পর আমরা আরেকটি দর্শনীয় জায়গার জন্য র ওয়ানা হয়ে গেলাম। আসলে কোনো স্থানই আমাদের ভালো করে দেখা হচ্ছিলো না কারন এমনিতেই রাত হয়ে যাচ্ছিলো আবার আমাদের হাতে দিনের বেলাতেও সময় নাই। অন্যদিকে আর এখানে এসেছি মাত্র ৪/৫ দিনের জন্য।
চার্চ অফ দি সেভিউর অন স্পিল্ড ব্লাডঃ প্রকৃত পক্ষে এটা একটা ইমোশনাল জায়গা রাশিয়ানদের জন্য। আলেক্সজেন্ডার-২ কে হত্যা করা হয়েছিলো তারই কোনো প্রতিপক্ষের মানুষ। ‘নিহিলিস্ট’ মুভমেন্টের সময় আলেকজান্ডার-২ কে হত্যা করা হয় যার কোনো বেসিক ভিত্তি ছিলো না। এই সেই একই জায়গায় রুমানভ ইম্পেরিয়াল পরিবার আলেকজান্ডার-২ এর স্মৃতি রক্ষায় একটি মনুমেন্ট তৈরী করেন যা এখন চার্চে পরিনত হয়েছে।
নেভা রিভার ব্রিজঃ
এই নদীতে একটা ব্রিজ রয়েছে যা গভীর রাতে বড় বড় শিপ, একপাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়ার জন্য খুলে দেয়া হয়। স্বয়ংক্রিয় ভাবে এটা খুলে যায় দুইধারে। আবার ভোর পাচটার আগেই পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয় যাতে দিনের বেলায় স্বাভাবিক গাড়ি ঘোড়া চলতে পারে। আমরা যখন এই নেভা নদীর তোরে এলাম, দেখালম, প্রচুর লোকজন এই ব্রিজ কখন খুলবে সেটা দেখার জন্য বেশ ভীড়। আমরা প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে দাড়িয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বৃষ্টি বা গুড়ি গুড়ি বরফের কোনো কুচি ছিলো না। অনেক শীত। প্রায় রাত দুটুর দিকে একটা বেশ বড় সড় সাইরেন বাজলো। বুঝলাম এখন হয়তো ব্রিজ খুলবে। ব্রিজ খোলার আগে তারা একতা জিনিষ নিশ্চিত করেন যে, দুই পারের কোনো গাড়ি আছে কিনা বা ব্রিজের উপরে কোনো গাড়ি আটকা পড়লো কিনা। ব্রিজ খোলার আগে তারা সমস্ত এন্ট্রি বন্ধ করে দেয় এবং একটা সাইরেন বাজানো হয়। যদি কোনো গাড়ি খুব কাছাকাছি থাকে যাদের পার হবার জন্য ব্রিজের দিকে আসবে, তারা ওই সাইরেন বাজার ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে এসে গেলে পার হবার সুযোগ পাবে আর এর পরে ভোর পর্যন্ত গাড়ি পারাপারের কোনো সুযোগ নাই। এই টাইম টেবিলটা এখানকার মানুষজন জানে বিধায় সেভাবেই চলাফেরা করেন। দেখলাম, ব্রিজটা খুব ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যস্থল থেকে দিখন্ডিত হয়ে দুই পাশে একদম প্রায় ৬০/৭০ ডিগ্রী খারা হয়ে যায়। ফলে যে কোনো বড় বড় শীপ ও এই দুই ফাক দিয়ে ক্যানাল্টায় প্রবেশ করতে পারে। অদ্ভুদ টেকনোলোজি। আমরা বন্ধ্যের ব্যাপারটা আর দেখতে চাই নাই কারন তাতে প্রায় রাত পার হয়ে যাবে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় তিনটা বেজে গেলো।
পুটিনের বাবার বাড়ি পরিদর্শনঃ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্লাদিমির পুতিন আসলে এই সেন্ট পিটার্সবার্গের ছেলে। সেন্ট পিটার্সবারকে বলা হতো এক সময় লেনিনগ্রাড। এটাই এখন সেন্ট পিটার্সবার্গ। ব্লাদিমির পুতিনের বাড়িতা খুব সাধারন গোছের একতা বাড়ি। চারিদিকে বেশ গাছপালা, পাশেই নদী। ভাবছিলাম, দুই পরাশক্তির একজন এই ব্লাদিমির পুতিনের আজ থেকে প্রায় ৪০/৪৫ বছর আগেও এই এলাকার অনেকেই ভাবেন নাই যে, পুতিন একটা সদাহারন বালক এই রকমের পরাশক্তির চেয়ারে বসে দুনিয়া কাপিয়ে তুলবেন। অনেক কিছুর সাক্ষি এই সব জায়গার মানুষ গুলি। ব্লাদিমির পুতিনের বাবা ছিলেন একজন অতি সাধার ফোরম্যান, আর মা ছিলেন গৃহিণী। ভাবাই যায় না এই রকমের একটা পরিবার থেকে ব্লাদিমির পুতিনের মতো এতো বড় পরাশক্তির হেড হয়। তারপরেও ইতিহাস বলে কথা। আর এটাই বাস্তবতা। পুতিন এখানে থাকেন না, তিনি এখন মস্কোর বাসিন্দা।
বৃহস্পতিবার, ১৫ চৈত্র ১৪১৮
গত ২০ মার্চ আমি পঞ্চম বারের মত চীন গিয়েছিলাম। চীন দেশটা বড় সুন্দর, রাস্তা ঘাঁট খুব সুন্দর, মানুষ গুলো ভাল, সারকার খুব কঠিন বলে মনে হল। ঢাকা এয়রপোর্ট থেকে রাত ১২৪০ মিনিটে সাউদারন বিমানে ফ্লাইট । ২০ মার্চ বাংলাদেশ আর ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা ছিল, বাংলাদেশ জিতল। ২২ তারিখে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান ফাইনাল খেলা খেলবে। আর সেদিন বাংলাদেশ মাত্র ২ রানে হেরে গেল।
আমি চীনে এসে HUA CHEN BUSINESS HOTEL এ উঠেছি। RUIN CITY র Wenzhou town এ ।এবারই এই হোটেলে প্রথম ওঠলাম। খুব ভাল না ভেবেছিলাম প্রথমে কিন্তু পরে দেখলাম, হোটেল তা একেবারে Mr Zhang Xuan এর office এর কাছে এবং হোটেলের কর্মচারী গুলো খুব ভাল। এখানে মনে রাখার মত অনেক কিছু আছে। এই হোটেলের একজন মেয়ে (চাইনিজ) রিসেপসনিস্ত হিসাবে কাজ করে। আমার রুমটা ঠিক তার উল্টা দিকে। আমার একটা সুবিধা হয়েছে। যখনি যা লাগে, শুধু ডাক দিলেই হয়। কিন্তু সে ইংরেজি ভাষা কিছুই বুঝে না। আবার আমি তাদের চাইনিজ ভাষা কিছুই বুঝি না। তারপরেও একটা ভাষা আছে, সেটা বডী লেঙ্গুয়েজ। ও আমাকে ভীষণ আদর করল। ও আমাকে খুব পছন্দ করেছে। অথচ আমি ওর নামটাই জনি না। আবার যদি আমি কখন চায়না যাই আমি আবারো এই হোটেলেই উঠবো। আর উঠবো শুধু ওর জন্য।
Auto Bricks Industry করার কাজে এসেছি। এর আগে Mr Zhang Xuan এর কাছ থেকে মা পলাস্তিক ইন্ডাঁশ্রি করার কাজে এসেছিলাম। আমার গার্মেন্টস এর পারটনার মুরতুজা ভাই ও এসেছে কিন্তু ওঁনি হংকং থেকে চীনে এসেছে। Mr Zhang Xuan আমাকে যেঁ পরিমান সমীহ করে এবং ভালবাসে আমি তার এক অংশ ফেরত দিতে পারব না । সব সময় সে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে আমাকে এখানে ওখানে নিয়ে যাচ্ছে, কোন খাবারের বিল দিতে দেয় না, কি যেঁ কারবার !
২১ তারিখে চীন পৌঁছেছি, ২১ তারিখেই HUA CHEN BUSINESS HOTEL এ মনে রাখার মত ঘটনা ঘটল। ভাল লেগেছে। ২২ তারিখে আগে Mr Zhang Xuan এর office এ অনেক কাজ করলাম, Auto Bricks Industry র জন্য অনেক খবর নিলাম, আজ মুরতুজা ভাই আসবেন। ২২ তারিখে মুরতুজা ভাই আসলেন, খুব ভাল লাগল।
২২ তরিখে আমি, মুরতুজা ভাই, কেরল এবং Mr Zhang Xuan সবাই মিলে HANZHOU গেলাম। হাই স্পীডট্রেন। কত সুন্দর ওদের ট্রেন বেবস্থা। HANZHOU শহরটাও সুন্দর। রাত হয়ে গেল ওখানে পৌছতে। বেশ শীত। রাতে খাবারটা খেলাম। চাইনিজ খাবার, মাফ চাই, প্রায়ই কাচা। আমি যেহেতু আরও কয়েকবার এসেছি, তাই আমি বেশি করে সুধু সবজি খেলাম। অন্তত সবজী কাচা হলে ও খাওয়া যায়। খাবার পর মুরতুজা ভাই একটু মার্কেটে যেতে চাইলেন। গেলাম। কিছুই কেনা হল না। ফিরে এলাম রুমে, ঘুম আসছিল না। তাই, আমি আর মুরতুজা ভাই মিলে একটা সিনেমা দেখলাম টিভিতে Inkheart. মজার সিনেমা। বেশ রাত হল ঘুমাতে। সকালটায় ওঠতে হবে, একটা প্রজেক্ট দেখতে যেতে হবে। ঠিক যা ভেবেছিলাম, তাই হল, আমরা ঘুম থেকে ওঠতে দেরি হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি Restaurant এ গেলাম খেতে, নাশতা শেষ। Restaurant এর মহিলা যেভাবেই হোক নাস্তার ব্যবস্তা করলেন। নাস্তার পর আমরা চলে গেলাম প্রজেক্ট দেখতে।
গতকাল রাতে দশটার দিকে আমার পাশের মসজিদ থেকে মাইকে একটা ঘোষণা এল।
“একটি শোক সংবাদ…গোলারটেক নিবাসী জনাব অমুকের মা জনাবা অমুক আজ রাত আটটার দিকে ইনেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমার নামাজে জানাজা আগামিকাল সকাল দশটায় গোলারটেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।” ঘোষণাটা কয়েকবার দেওয়া হল।
আজ হরতালের দিন। আমি অফিসে যাই নাই। বাসায় বসেই অফিসের যতগুল কাজ করা যায় তাইই করছি। এখন বাজে দুপুর দুইটা। আবারও একটা ঘোষণা এল, ” “একটি শোক সংবাদ…গোলারটেক নিবাসী জনাব অমুকের ভাই জনাব অমুক আজ সকাল এগারটায় ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমার নামাজে জানাজা আগামিকাল বিকাল চারটায় গোলার টেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।”
সকালের জানাজাটা কখন হয়েছিল আমার মনেও নাই। আবারও একটা জানাজার সংবাদ।
আমার বাসায় আমি প্রায় প্রতিদিন না হলেও প্রায় প্রতিনিয়ত এই মসজিদের ইন্তেকালের ফরমায়েশটা প্রায়ই শুনি। ভয় লাগে। হয়ত বা কোন একদিন এমন একটা শোক সংবাদ অনেকেই পাবে যে, ” “একটি শোক সংবাদ…গোলারটেক নিবাসী জনাব মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন আজ রাত আটটার দিকে ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমের নামাজে জানাজা আগামিকাল সকাল দশটায় গোলার টেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।” তখন হয়ত অনেকেই আসবে, হয়ত অনেকেই আসবে না। জানাজার নামাজটা ঈশ্বর ফরজে কেফায়া হিসাবে নির্দেশ করেছেন অর্থাৎ এটা সবার জন্য ফরজ কিন্তু যদি জানাজার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে লোক আসে তাহলে যারা আসে নাই তারা এই আদেশের বলে অন্যায় হয়েছে বলে দোষী সাব্যস্থ হবেন না।
এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সাহেলের (১২ লং কোর্সের কিন্তু এমসিসির) জানাজার কথা মনে পড়ল।
আমি যখন আর্মি সিগন্যাল ব্রিগেডের মাঠে গেলাম সাহেলের জানাজা নামাজের জন্য। গিয়ে দেখি সাহেল শুয়ে আছে একটা খাটিয়ায়। নাকে ওর সুগন্ধি দেয়া তুলা, সারা শরির একটা সুন্দর চাদর দিয়ে ঢাকা। আমি একদম কাছে গিয়ে ওর ঠিক মুখের উপর দাড়িয়ে মনে মনে জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম, “সাহেল, আমি জানি তোমার এখন নরন চড়নের উপায় নাই। কিন্তু তুমি কি কিছু উপলব্ধি করতে পারছ? তুমি কি দেখতে পাচ্ছ কারা কারা এখানে এখন তোমাকে শেষ বিদায় দেওয়ার জন্য এসছে? অথবা তুমি কি কাউকে ডাকছো এই মুহূর্তে? কিংবা তুমি কি তোমার অসমাপ্ত কোন কাজের পরবর্তী নির্দেশনাগুলো কাউকে দিয়ে যেতে চাচ্ছ? অথবা এমন কি কোন অনুসুচনা হচ্ছে যে কারো কাছে কোন ক্ষমা চাওয়ার? বা এমন কোন বানী যা তোমার পরবর্তী বংশধরদের বলতে চাচ্ছ? আমি অনেকক্ষন তোমার দিকে চেয়ে আছি, মনে পড়ছে আমার সঙ্গে তোমার ১৯৭৮ সালের ঐ রুম নম্বর ১০ এর কথা। তুমি প্রথম ভুতের গল্প বলে সবাইকে এমন একটা আচ্ছন্নতায় ভরিয়ে রেখেছিলে যে সারারাত আমরা কেউ ভয়ে বাথরুমে গিয়ে প্রশাবও করতে যেতে পারিনি। তুমি কি এখন কোন ভুতের ভয় পাচ্ছ? এমন কোন ভুত যা তোমার গল্পের মধ্যে ছিল না!! অথবা এমন কোন বিষয় যা তোমার গল্পের মধ্যে ছিল না যা এখন তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছো?
হটাত যেন সাহেল আমার সঙ্গে কথা বলা শুর করল।
দেখ আখতার, আমার একটা শখ ছিল, আমি আবার সেই ছোট্ট শ্যামলিময় গ্রামে চলে যেতে চাই, সেটা আমি তোমাকে গত পরশু ও বলেছিলাম। আমি আর এই যান্ত্রিকতার মধ্যে বাস করতে চাই না। আমি হাপিয়ে উঠেছি। আমার আর এই যান্ত্রিক মেইলের চিঠি পড়তে ভাল লাগে না। তোমরা আমাকে চিঠি লিখবে সেই পুরানো পোস্ট অফিসের ধারনায়। হাতে লেখা নীল রঙের খামে ভরা চিঠি। ষাট দিন লাগবে আমার হাতে পৌঁছতে, আমি আস্তে আস্তে ভাজটা খুলবো আর ভাববো তোমার চিঠি, তোমাদের চিঠি। সেই ঢাকা থেকে এসেছে। সারাদিন আমি আমার মেঠোপথের অকারন ক্লান্তি দূর করে সন্ধায় হারিকেনের বাতি জ্বালিয়ে আবার তোমাদের চিঠিটা পড়বো আর একে একে লিখে যাব আমার সারাদিনের ব্যস্ততার কথা। আমার পুকুরের মাছগুলোর কথা কিভাবে ওরা সকালে খামাখা কোন কারন ছাড়া ছুটাছুটি করে আবার কোন কারন ছাড়াই দুপুরের দিকে শিক্ষানবিস সাতারুর মত নাক উচু করে ভেসে থাকে এক স্তর পানিতে। আমি ঢিল ছুড়ি, প্রথম প্রথম ওরা আমার এই ঢিল ছোড়াকে ভীষণ ভয় পেত কিন্তু এখন আর করে না। ওরাও আমাকে আর শহরের মানুষ মনে করে না। মনে করে আমি বুঝি মাছ হয়ে গেছি। অথবা লিখব আমার সেই পালের গরুগুলিকে নিয়ে। কে যেন এক অহেতুক কারন ছাড়া ছোট্ট অবুঝ বাছুরটি কথা থেকে দ্রুত দৌড়ে এসে প্রচন্ড রক গতিতে তাঁর মায়ের বানে টান দিয়ে আবার আরেক দিকে ছুট। কি অবাক না? ওরাও হয়ত আমাদের শিশুদের মত খেলা করে কিন্তু ওদের খেলনা নেই, ওদের খেলনা শুধু ওদের পরিবার আর পারিপার্শ্বিক জগত নিয়ে। বৃষ্টি এলে ওরাও বুঝে বের হওয়া যাবে না। কোন কাজ নাই তাই অলস সময়ে যাবর কাটে। মাঝে মাঝে ডাক দেয়…হাম্বা হাম্বা। ওদের সব ডাকের উচ্চারন এক কিন্তু তাঁর মিনিং এক নয়। আমরা যেমন কখনো রাগ করলে চোখ দেখলে বুঝা যায়, হাতের নড়াচরা দেখলে বুঝা যায় আমাদের মানসিক অবস্থা কিন্তু ওদের ভাষার কোন পরিবর্তন নাই। ওরা রাগ করলে গুতা দেয়, অথবা ভয় পেলে কোন দিক না দেখেই দৌড় দেয়। অথবা লিখবো আমার মন খারাপের কথা, আমার মন ভাল লাগার কথা। তোমরা হয় ভুলেই যাবে আমার চিঠির উত্তরের কথা। হটাত কোন একদিন অলস পোস্ট মাস্টার অনেকদিন পর যেন একখান দায়িত্ব পাওয়া গেল এই মর্মে আনাচে কানাচে অনেক উল্টা পালটা গলি পার হয়ে অবশেষে তোমার বাড়ির ঠিকানা পেয়ে আমার সেই চিঠিটা তোমার হাতে পৌঁছে দেবে।
সাহেল আমাকে যেন একটা নাড়া দিয়ে বলল, “ঐ কাজল আসে নাই? কাজল কি জানে যে আমি মারা গেছি?” আমি হাসি সাহেলের কথায়। আমি জিজ্ঞ্যেস করি সাহেলকে, আচ্ছা সাহেল মরার পর তোর অনুভুতি কি? তোর ক্যামন লাগছে মরার পর? সাহেলের সহজ সরল উত্তর-ব্যাপারটা আমি এখনো ভালমত বুঝতে পারছি না। নড়াচরা করতে পারছি না। পাটা যেন অবশ হয়ে আছে, কানের কাছে কি একটা তোরা গুজে দিয়েছিস, ভাল মত শুনতেও পারছি না। হাতের কব্জির উপর একটা মশা বসেছে, বেশ লাগছে, মারতে পারছি না। নাকের কাছে এক অসহ্য দুর্গন্ধময় একটা তুলা দিয়ে তোরা আমার শ্বাস ভারি করে রেখেছিস। তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?
বললাম, সাহেল তুই কোন ভাষায় কথা বলছিস এখন? আমি তো তোর কোন কথাই বুঝতে পারছি না। মনে হল সাহেলের চোখের দুই পাশে একটু ভেজা ভেজা। সাহেল, তুই কি কাদছিস? নারে ভাই আমি কাদছি না। আমার খুব মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না আর কখনো তোদের সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা, আমি জানি না আমার সেই মাছগুলুর সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে কিনা। আমার জানা নাই, আর কখনো আমি তোদের মত এমন করে আমার সেই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে আদর করতে পারব কিনা। তুই কি দেখতে পারছিস না ওদের? ওরা কারা? ওরা সবাই আমাকে এভাবে ঘুরে আছে কেন? কেন ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্চে? কথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমার এই বড় রুম, আমার এত কাপর চোপড় কিছুই নিতে দেবে না? কি খাবো আমি ওখানে? কে আছে ওখানে? আমার ভয় করছে ভাই। তোরা কেউ যাসনে প্লিজ।
আমি সাহেলের কোন কথাই আর বুঝতে পারছিলাম না। পাশে নাজমুল দাড়িয়ে ছিল। বলল, কিরে কি দেখছিস এমন করে? আমার সম্বিত ফিরে এল। দেখলাম অনেকে চলে এসেছে। হুজুরও চলে এসেছে। সবাইকে সারি সারি হয়ে জানাজা নামাজের জন্য হুজুর তাড়া দিচ্ছে। এক সময়, হুজুর সবাইকে জিজ্ঞ্যেস করলে, “তিনি কেমন মানুষ ছিলেন? সবাই যেন গদবাধা একখান উত্তর করল, “খুব ভাল মানুষ ছিল”
মরার আগে যিনি এই খেতাবটা শুনে যেতে পারেনি, আজ তাঁর খেতাবের মধ্যে একটা হল ,”তিনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন”
তারপর? তারপরের অনুভুতিটা আমি বাসায় গিয়ে আমার ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। শুনতে চাও? তাহলে আরেকদিন………।
প্রায় এক বছর। আমি, মুর্তজা ভাই আর প্রিয়ান্থা এক সাথে কোনো রকমে কাজ করছিলাম। তারাই ফ্যাক্টরীর একাউন্ট হ্যান্ডেলিং, অর্ডার নেয়া, শিপমেন্ট করা, সবকিছু করেন। আমি জাষ্ট থাকি। কোনো প্রশ্নও করি না। আর করিই বা কিভাবে? আমার শেয়ারে থাকাটা তো ছিলো এক প্রকার দয়ার মতো। কিন্তু এরমধ্যে আমি একটা কাজ করতে পেরেছিলাম যে, আমি পার্টনার হিসাবে অতোটা ক্রিটিক্যাল নই। মানুষ হিসাবেও সহজ সরল। তাই ওনারা আমাকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করতেও পারছিলেন না। আমি ফ্যাক্টরীর এমডি হিসাবেই ছিলাম।
প্রিয়ান্থা ২০০৯ সালে হার্ট এটাকে মারা গেলেন। মাত্র ৪১ বছর বয়সে। প্রিয়ান্থার শেয়ার ছিলো ৪৫% আর মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ার ছিলো ৪৫%। আমার ১০%। প্রিয়ান্থার মৃত্যুর কারনে প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ার এখন অন্য কারো নেয়ার কথা। কিন্তু মুর্তজা ভাই চালাক মানুষ, তিনি চান নাই যে, অন্য আরো কেউ এই ফ্যাক্টরিতে ডাইরেক্টর হয়ে আসুক। ফলে মুর্তজা ভাই একটা প্রোপোজাল দিলেন যে, প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ার আমরা ভাগ করে নিতে পারি কিনা, বিনিময়ে প্রিয়ান্থার ইনভেষ্টেড প্রায় ৭৫ লাখ টাকা তার স্ত্রীকে ক্যাশ প্রদান করতে হবে। আমার তো আর কোনো টাকাই ছিলো না। কিভাবে আমি শেয়ার নেবো? শেষতক আমি মুর্তজা ভাইকে পলাশপুরের ৫৮ শতাংশ জমির বিনিময়ে যার দাম ধরা হলো ৫০ লাখ টাকা, এর বিনিময়ে আমি ২৫% শেয়ার নিলাম আর মুর্তজা ভাই নিলেন ২০% শেয়ার। তাতে এটা দাড়ালো যে, আমার হয়ে গেলো ৩৫% আর মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ারে দাড়ালো ৬৫%। এখন কেনো যেনো মনে হয় যে, সম্মান জনক একটা পজিশনে আছি শেয়ারের কথা ভেবে। আমি এমডিই রয়ে গেলাম আর মুর্তজা ভাই হয়ে গেলেন ফ্যাক্টরীর চেয়ারম্যান।
রিভার সাইডে আমার বিলুপ্তির শেষের দিকে আমি যখন অন্য আরেকটি বিকল্পের কথা চিন্তা করছিলাম, তখন বাসাবোতে তারেক নামে এক ভদ্র লোকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো। আর সেটা মোহসীন সাহেবের মাধ্যমেই। তারেক সাহেব আমাদের ফ্যাক্টরিতে এক্সেসরিজ সাপ্লাই দিতেন। বরিশালের মানুষ, খুব চালাক। তার মাধ্যমে আমি বাসাবোতে আরাই কাঠার একটা প্লট বায়না করেছিলাম এবং যেভাবেই হোক, টাকাটাও এক প্রকার পরিশোধ করেই দিয়েছিলাম। পাটোয়ারী নামে এক লোকের জমি যিনি নিজেও গার্মেন্টস লাইনে ছিলেন। পাটোয়ারী সাহেবের স্ত্রীর নামেও আরো আড়াই কাঠা জমি ছিলো একই দাগে। ফলে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ডেভেলোপারের কাজের একটা বুদ্ধি করলেও পাটোয়ারী সাহেব থাকতে পারেন নাই। ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে কিস্তি কিস্তি করেই টাকা নিয়ে গার্মেন্টস চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এক পর্যায়ে গিয়ে আমি পুরু ৫ কাঠা জমিই নিয়ে নেই আর সেখানে হাউজিং করার জন্য উদ্যোগ নেই।
এতো চড়াই উতড়াই যাচ্ছিলো আমার জীবনের উপর দিয়ে। তারপরেও কিভাবে যে আল্লাহ আমাকে এসব বীভৎস পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছেন, ভাবলেও শরীর কেপে উঠে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি। আমার মাথায় একটা বিষয় সব সময় কাজ করতো যে, যে কোনো মুল্যে আমার পরিবার যেনো সাফার না করে। আমি ওদেরকে বুঝতেই দেই নাই আমার ভিতরে কি চলছে বা আমি কি অবস্থায় আছি।
সারাক্ষন চিন্তায় থাকি, কিভাবে মানুষের লোন গুলি শোধ করবো, কিভাবে সম্মানের সাথে একটা ব্যবসায় টিকে থাকবো। যার কেউ নাই, আসলে তার মতো মানুষের অনেক বড় সপ্ন দেখা অপরাধ। কিন্তু আমার তো সামর্থ না থাকলেও যোগ্যতা ছিলো। আর সেই যোগ্যাটা গুলি আমি আমার সহজ সরল মনের কারনে হারিয়ে ফেলেছিলাম এই সিভিলিয়ানদের ভীড়ে। একটা সময় ভাবলাম, বাসাবোর ৫ কাঠার উপরে যদি বিল্ডিং বানাই আর সেই ফ্ল্যাট গুলি বিক্রি করি, তাতে হয়তো একটা সেক্টর খুলবে। তারেকের এক বন্ধু হারুন নামের এক ভদ্র লোক সামিল হলেন। ভালো মানুষ। বুদ্ধি দিলেন যে, তার এক পরিচিত ভাই আছে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনে। লোন নিয়ে হয়তো কাজে হাত দেয়া যায়। হাউজ বিল্ডিং ফাইনেন্সে গিয়ে জানতে পারলাম, গ্রুপ লোনে বেশী টাকা পাওয়া যায়। ফলে আমার টাকায় কেনা ৫ কাঠা জমি আমি নির্ভয়ে মোট পাচ ভাগে সাক কবলা করে গ্রুপ লোন হসাবে ৬০ লাখ টাকা নিয়ে নিলাম। তাদের মধ্যে একজন লেঃ কর্নেল ফেরদৌস, আমার ভাতিজা মান্নান, আমার স্ত্রী মিটুল চৌধুরী, হারুন সাহেব আর আমি। মোট ৫ জন, ৫ কাঠা। এটাও একটা ভালো বুদ্ধি ছিলো না। কিন্তু আমাকে হয়তো আল্লাহ ভালোবাসেন, তাই মাথায় একটা বুদ্ধি এটে দিলো যে, সাব কবলা করার সাথে সাথে আমি সবার কাছ থেকে আম মোক্তার নিয়ে নিলাম যাতে কেউ আমার সাথে আবার ছল চাতুরী করতে না পারে।
মোহসীন সাহেবের সাথে অনেক ভেবে চিনতে আমি পার্টনারশীপ করি নাই। ব্যবসায়ীক জগতে যেহেতু আমার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না, আর ২০ বছরের অধিক কাটিয়েছি সেনানীবাসে, ফলে খুব যে মানুষ চিনতে পারি সে রকমও নয়। সবাইকেই বিশ্বাস করি, সবাইকেই আপন মনে হয়। কিন্তু মানুষগুলি আমার এই সরলতা আর বিসশাসকে পুজি করে বারবার ঠকিয়েই যায়। ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই আমার যা হারাবার তা নিঃশেষ হয়ে যায়। রিভার সাইডের ব্যবসাটাও প্রায় এমনই মনে হলো। ডিপিএস, সঞ্চয়, অন্যদের কাছে লোন নিতে নিতে আমি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলাম। অন্যদিকে মোহসীন সাহেব যে খুব একটা সিরিয়াসভাবে ব্যবসাটা করছেন, তা মনে হলো না। একটা সময় এলো আমি বুঝতে পারলাম, মোহসীন সাহেবকে দিয়ে আমার এই গার্মেন্টস ব্যবসা হবে না। এরমধ্যে প্রায় কোটি টাকার উপর ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছি। ছোট ভাই (মোস্থাক ভাই) এর কাছে একাই লোন নিয়েছিলাম প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্যবসাটা আর করবো না। এর থেকে বেরিয়ে যাওয়াই উত্তম।
ক্লায়েন্ট খুজতে থাকলাম যদি অন্য কারো কাছে রিভার সাইড হস্তান্তর করে অন্তত যেটুকু লোন আছে সেটুকু দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়, বিশেষ করে ব্যাংকের লোন। শ্রীলংকান অধিবাসি প্রিয়ান্থা আর তার বাংলাদেশী বন্ধু মুর্তজা ভাই আমাদের ফ্যাক্টরী ২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১০০% কিনে নিতে আগ্রহী হলেও পরবর্তীতে এলাকার সিচুয়েসন এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তারা অন্তত ১০% শেয়ারের বিনিময়ে হলেও আমাকে রাখতে চান। প্রাথমিকভাবে আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু বের হয়ে যাচ্ছি, তাহলে আর থাকা কেনো? আমি অন্য অনেকগুলি সেক্টরে ব্যবসার লাইন খুজলেও টাকা পয়সার টানাটানিতে আসলে কোনোটাতেই প্রবেশ করতে পারছিলাম না। খুব রাগ হচ্ছিলো নিজের কাছে। ডেভেলোপারের কাজে হাত দিলাম। কুমা নামে একটা কোম্পানিও ফর্ম করলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, মুর্তজা ভাই আর প্রিয়ান্থা আসলে আমাকে পার্টনার হিসাবে নন, একটা নিরাপত্তার চাদর হিসাবে ব্যবহার করে তাদের ব্যবসাটা নির্বিঘ্নে চালাতে চাচ্ছিলেন। যার কেউ নাই, যার হাতে কিছু নাই, তার কোনো চয়েজ থাকে না। ভাবলাম, এই ১০% নিয়েও যদি আমি মাসিক একটা সেলারী পাই, আর একটা অফিস পাই, তাতেই বা কম কিসের? শেষ অবধি সিদ্ধান্তটা মেনে নিয়েছিলাম। কখনো আসি, কখনো আসি না। আসলে আমার আসা যাওয়া নিয়েও তাদেরও কোনো মাথা ব্যথা ছিলো না। তাদের শুধু একটাই চাওয়া ছিলো, আর সেটা লোকাল কোনো ঝামেলা না থাকা যেটা আমি পারি।
খুব চুপচাপ একটা লাইফ লিড করছি, পরিবারের কাউকেই বুঝতে দেই না আমি কোন অবস্থায় আছি। আমি শুধু এইটুকু নিশ্চিত করতে চাই যে, ওরা যেনো ভালো থাকে। মীরপুরে বাড়িটা সম্পন্ন হওয়াতে একটু স্বস্তি পাচ্ছিলাম যে, অন্তত বাড়ি ভাড়া লাগবে না। মিটুলের চাকুরী আছে, হয়তো না খেয়ে তো আর মরবো না। তদুপরি, ১০% শেয়ার নিয়ে হলেও তো আছি একটা ব্যবসায়, মন্দ কি? মুর্তজা ভাই, আর প্রিয়ান্থা যেনো এক বোটায় দুটি ফুল, একে অপরের উপর খুবই ডিপেন্ডেন্ট। কিন্তু আমার সাথে চলমান একটা সম্পর্ক রাখেন। আমিও তাদের ব্যবসায়িক কোনো কাজে নাক গলাই না। দরকারও মনে করি না। আমি জানি কি ভুমিকা নিয়ে আমি এই রিভার সাইডে আছি। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, তারাও আমাকে ছাড় দেন নাই। যতটুকু ব্যবসায়ীক ফায়দা লুটার বা দরকার পুরুটাই তারা আমার কাছ থেকে করে নিয়েছেন। তাতে আমার কত লস হলো বা কি কারনে আমি এমন একটা ফ্যাক্টরী দিয়ে দিলাম, সেটা তাদের কাছে বিবেচ্য ছিলো না বা থাকার কথাও না। ফ্যাক্টরীর অডিট, কাষ্টম ক্লিয়ারেন্স, অন্যান্য দেনা পাওনা, সবই তারা আমাকে ঐ ১০% এর শেয়ারের মুল্যের উপর আর কিছুটা আমার উপর লোন লিকঝে কাজগুলি সমাধা করে নিয়েছেন। কিছু বলার অবশ্য আমার ছিলো না।
মোহসীন সাহেবকে আমি বিনা পয়সায় শেয়ার দিলেও যখন শেয়ারটা ফেরত চাইলাম, দেখলাম, কেউ নিজের সার্থের উর্ধে নয়। তিনিও আমাকে এক প্রকার জিম্মির মতো করে ফেলেছিলেন শেয়ার ফেরত না দেয়ার কথা বলে। খুব কঠিন একটা পরিস্থিতিতে ছিলাম। কিন্তু যেভাবেই হোক, আমি শেষ পর্যন্ত ছলে বলে কৌশলে মোহসীন সাহেবের কাছ থেকে শেয়ারগুলি লিখিয়ে নিতে পেরেছিলাম।
মোহসীন সাহেব আমার গার্মেন্টস এর পার্টনার। আমার এই লেখাটা লিখার আগে মোহসীন শাহীন সাহেব সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। তিনি অত্যান্ত ধার্মিক একজন মানুষ। সারাদিন পবিত্র কোরআন শরীফ তার সাথে থাকে, তার হাতে তসবিহ থাকে, মাথায় টুপী আর গায়ে আলখেল্লা। মুখভর্তি দাড়ি। খুব ভালো ইংরেজী বলতে পারেন। দেখতে বেশ সুদর্শন। আমি যখন প্রথম রিভার সাইড সুয়েটার্স ফ্যাক্টরিটা জনাব নাজিম উদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে নেই, তখন পর্যন্ত আমার জানা ছিলো না কিভাবে একটা ইন্ডাস্ট্রি চালাতে হয়, তাও আবার গার্মেন্টস এর মতো একটা ঝুকিপুর্ন ইন্ডাস্ট্র। যেহেতু আর্মির মতো এমন একটা প্রেস্টিজিয়াস চাকুরী নিজ ইচ্ছায় ছেড়ে চলে এসেছি, ফলে আমার জিদ ছিল, আর কোনো চাকুরী নয়, এবার নিজের জন্য নিজে কিছু করবো। আল্লাহ আমার সহায় ছিলেন সব সময়। যখন চাকুরী ছেড়ে দেবার কথা ভাবছিলাম, তখন এই জনাব নিজাম উদ্দিন কোনো একটা উছিলায় আমার মীরপুর সেনানীবাসে নিজের থেকেই এলেন দেখা করতে। আমি তাকে জীবনেও দেখি নাই। কিন্তু উনি আমাদের এলাকার একজন নামী মানুষ, যদি তার ট্র্যাক রেকর্ড যথেষথ পরিমান খারাপ। কোনো এক কালে তিনি নাইজ্যা ডাকাত নামে নাকি পরিচিত ছিলেন। এখন তিনি কোটিপতি, লেখাপড়ার কোনো বালাই নাই। একটা নিরক্ষর টাইপের মানুষ।
যাই হোক কিভাবে নাজিম সাহেবের সাথে আমার ব্যবসায়ীক লেনদেন শুরু হয় সেটা আরেক পাতায় লেখা আছে। এখন মোহশীন সাহিনের ব্যাপারেই যখন বলছি, সেটাতেই থাকি। আমি যেহেতু গার্মেন্টস বুঝি না, তাই ফ্যাক্টরী নেয়ার আগে মনে মনে ভাবলাম যে, এই ফ্যাক্টরিতে সফল্ভাবে কাজ করেছে এমন একজন লোক খুজে বের করা। আর সে সুবাদে আমি মোহসীন শাহিনের খবর পাই। আমি মোহসীন শাহীন সাহেবকে খবর দেই যে, উনি গার্মেন্টস করতে চান কিনা। কালের এবং সময়ের বিবর্তনে মোহসীন শাহীন ও বড্ড অসহায় হয়ে সব কিছু হারিয়ে এখন সমাজ সংসার, পরিবার বর্গ ছেড়ে একা একা তাবলিগ করে বেড়ান। ফলে আমার এই সংবাদে তিনি অনেক খুশি হয়েই যতো দ্রুত পারেন চলে এলেন আমার সাথে কথা বলার জন্য। আর এ কাজে সবচেয়ে বেশী সাহাজ্য করেছে হাসনাবাদ এলাকার একটি ভদ্র ছেলে তৌহিদ। ছেলেটা ভালো পরিবারের ছেলে এবং তখন পর্যন্ত তৌহিদ রিভার সাইড সুয়েটার্সেই কাজ করে, বলা যায় কোনো রকমে সে ফ্যাক্টরিটা ধরে রেখেছে।
মোহসীন সাহেব, তৌহিদ এবং আমি এক নাগাড়ে কয়েকদিন এই ফ্যাক্টরীর ভুত-ভবিষ্যত নিয়ে বিস্তর আলাপ করলাম। ফ্যাক্টরিতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার একটা লোন আছে। এই লোনটা ব্যাংকের মাধ্যমে রি-সিডিউলিং করেই চালানো যায়। আমি তখনো রি-সিডিউল কি, গার্মেন্টস কি, অর্ডার কি, এল সি কি, ব্যাক টু ব্যাক কি, নিটিং কি ইত্যাদির কিছুই জানি না। আমি শুধু মোহসিণ শাহীন সাহেবকে বললাম যে, যদি আমি অর্থ এখানে ইনভেষ্ট করি, তাহলে এর ভবিষ্যত কি। মোহসীন সাহেব কিছুক্ষন খাতা কলমে কি কি ক্যাল কুলেশন করলেন, সাথে তৌহিদ নিজেও হ্যা হু করলো, এরপর তারা উভয়েই আমাকে জানান দিলো যে, ছয় মাসের মধ্যে এই ফ্যাক্টরী থেকে প্রতি মাসে যা আয় হবে সেতা এতো বেশী যে, আর কোনো চিন্তা নাই। কিন্তু এর জন্য প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ইনভেষ্ট প্রয়োজন।
আমি যেভাবেই হোক এই টাকার একটা দায়িত্ত নিলাম। মোহসিন সাহেবকে আমি নিঃশর্তভাবে বিনা টাকায় ৩০% শেয়ার হোল্ডার হিসাবে মালিকানার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চেয়ারম্যান বানিয়ে নিলাম। শর্ত ছিলো, গার্মেন্টস তিনিই চালাবেন, আমি প্রশাসনিক দিকটা দেখবো। কোথা থেকে অর্ডার আনা হবে, কিভাবে অর্ডার নেগশিয়েট করা হবে সব করবেন মোহসিন সাহেব। ফ্যাক্টরী শুরু হল। আমি ধীরে ধীরে ব্যবসাটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু আমি একটা ব্যাপার বুঝি নাই যে, মোহসীন সাহেব সব কিছু আমাকে শেয়ার করেন না। আর করতেও চান না সম্ভবত। কিন্তু বছর খানেকের মধ্যে আমি আমার সমস্ত পুজি খালি করেও এটাকে টেনে তুলতে পারছিলাম না। বিভিন্ন জায়গায় এতো লোন হয়ে যাচ্ছিলো যে, আমার একসময় মনে হলো যে, আমার এ যাবত সব সিদ্ধান্ত ভুল। আমার এটা করা ঠিক হয় নাই। মোহসিন সাহেবের মধ্যে একটা উদাসীন ভাব সব সময়ই ছিলো, যেনো কনো কিছুই তাকে স্পর্শ করে না, না ওয়ার্কারদের বেতনের চিন্তা, না অর্ডারের সুরুতহাল, কোনো কিছুই না। এতার একতা কারন অ ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, তিনি তো কোনো ইনভেষত মেন্ট করেন নাই। লস যদি হয়, তাতে ওনার কি? কিন্তু আমি তো ওনার মতো উদাসিন হয়ে শান্ত হয়ে থাকতে পারি না।
এরই মধ্যে মোহসীন সাহেব আবার ঘন ঘন তাবলিগ, ইস্তেমা ইত্যাদির সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেলেন যেনো ওটাই আসল কাজ, গার্মেন্টস কোনো কাজই না। ঠিক এই সময় মোহসিন সাহেব ৪০ দিনের বৈদেশিক একটা দলের সাথে চাঁদ (Chad) নামক একটি দেশে পাড়ি জমালেন। আর আমাকে একটা নোট দিয়ে গেলেন যে, জিএমসি নামক একটা বায়িং হাউজ থেকে আমরা স্কিভা নামের বায়ারদের কাছ থেকে বেশ অর্ডার পেয়েছি, সেগুলি টাইম মতো শিপমেন্ট করতে হবে। সবকিছু তিনি এরেঞ্জ করে দিয়ে গেলেন। কোনো কিছুই বাদ রেখে যান নাই। যেহেতু আমি ব্যাপারটা আগে কখনো হ্যান্ডেল করিনি, তাই ব্যাপারটা বুঝিও নাই। আমিও তাকে এলাউ করলাম। অথচ এখন গার্মেন্টের পিক আওয়ার চলছে। এ সময় যতো জরুরীই থাকুক, কোনো গার্মেন্টসের মালিক অর্ডার না কমপ্লিট করে বাসায়ও যেতে চান না, আর তিনি চলে গেলেন সুদুর চাদে। আমি যখন ব্যাপারটা একা হাতে হ্যান্ডেল করতে গেলাম তখন যা বুঝলাম যে, আমি শুধু নদীতে না, সাগরের মাঝখানে হাবুডুবু খাচ্ছি। কোনো কিছুই ঠিক নাই। ইন্টারনেট খোলা, তাই আমি মোহসীন সাহেবকে একটা মেইল পাঠালাম। মেইলটা ছিল এই রকমেরঃ
মোহসিন ভাই,
এ কয়দিন সমস্ত ব্যাপার, ডাটা এনালাইসিস করে আমি যেটা বুঝতে পারছি যে, আমি খুব একটা ভাল পরিস্থিতিতে নাই। আপনি আমার এই মেইল পাওয়ার পর অবশ্যই অবশ্যই জরুরী ভিত্তিতে সবগুলি পয়েন্টের উপর একে একে ব্যাখ্যা করবেন। ব্যাপারটা অতীব জরুরী।
ক। আপনি জিএমসির মোজাম্মেল সাহেবের বায়িং হাউজ এর মাধ্যমে যে অর্ডারগুলি নিয়েছেন, সেটার ব্রেক-ইভেন-পয়েন্টের অনেক নীচে। এফওবি প্রাইস মাত্র ২২ ডলার যেখানে আমার ফ্যাক্টরীর ওভারহেড কস্ট প্রায় ২৩ ডলার। এই অর্ডারগুলি থেকে সিএম টিকে মাত্র ৯ ডলার। বর্তমানে গার্মেন্টসে পিক আওয়ার চলছে, এবং এটা অফ সিজন নয়। সেক্ষেত্রে কি দেখে আপনি মাত্র ৯ ডলারে কাজগুলি নিলেন? যদি আপনি বলেন যে, জিএমসি এই অর্ডারগুলির মাধ্যমে আমাদেরকে সারাবছর কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই প্রতিশ্রুতির এগ্রিমেন্ট কই? আর যদি প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর তারা যে তাদের প্রতিশ্রুতি ভেংগে আবার অন্য কোথাও অর্ডার প্লেস করবে না তার কি গ্যারান্টি আছে? আর এই সময়ে আমিই বা কিভাবে ২৩ ডলার ওভারহেড নিয়ে মাত্র ৯ ডলারের কাজ করে শ্রমিকদের বেতন ইউটিলিটি বিল ইত্যাদি সামাল দেবো?
খ। আপনি তাবলিগে যাওয়ার সময় আমাকে যে নোটটা দিয়ে গেছেন, সেখানে আপনি ক্লিয়ারলি লিখেছেন যে, গার্মেন্টস রিলেটেড সমস্ত ব্যাক টু ব্যাক, এক্সেসরিজ, এপ্রোভাল, স্যাম্পল সবকিছু ওকে করেই আপনি তাবলিগে গেলেন, কিন্তু এখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, না কোনো স্যাম্পল এপ্রোভাল করা আছে, না কোনো এক্সেসরিজের ফয়সালা দেয়া আছে। এলসি মোতাবেক আমাদের শিপমেন্ট তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০০৭, আর এখন ২০ মে ২০০৭, তারপরেও কোনো কিছুই আমি সমাধান করতে পারছি না। সেক্ষেত্রে আপনি আমাকে এই ধরনের একটা মিথ্যা ঝুকির মধ্যে রেখে তাবলিগে গেলেন কেনো? আর এর মধ্যে আমিই বা আগামী ১৫ তারিখের মধ্যে ওয়ার্কারদের বেতন দেবো কিভাবে? আপনি কি জানেন না, এখন গার্মেন্টস সেক্টরে ওয়ার্কারদের কি তান্ডব চলছে?
গ। জিএমসির মোজাম্মেল আমাকে জানালো যে, এই অর্ডারের তাদের কমিশন ৪৯৫০০০ টাকা। আর সেটা অর্ডার শিপমেন্ট হোক বা না হোক, আগেই তাদের পে করতে হবে। এটা কোন ধরনের সিস্টেম? যেখানে আমি শিপমেন্টই করতে পারছি না, সেখানে মোজাম্মেল সাহেব প্রতিনিয়ত তাদের কমিশনের জন্য গন্ডোগোল করছে? আমি কি শিপমেন্ট করেছি মাল? যদি বায়ারদের কাছ থেকে টাকাই না পাই, আমি মোজাম্মেলকে কমিশনের টাকা দেবো কোথা থেকে?
ঘ। মোহসীন ভাই, আমি ব্যাংকে গিয়েছিলাম গতকাল। ওখানে গিয়ে দেখলাম যে, আপনি কোনো একটা এক্সেসরিজ কোম্পানির নামে ২০ হাজার ডলারের এক্সেসরিজের ব্যাক টু ব্যাক দিয়েছেন। আমি যখন তাদেরকে ফোন দিলাম, কেউ কোন রিস্পন্স করলো না। পরবর্তীতে আরো অনুসন্ধান করে দেখলাম যে, জিএমসির এমডি মোজাম্মেলকে আপনি ইতিমধ্যে ৪৯৫০০০ টাকা কমিশন দিয়েই দিয়েছেন (?), তাহলে আর বাকী টাকাগুলি কই? যাদের নামে আপনি ব্যাক টু ব্যাক করেছেন, ওই নামের কোনো সংস্থার অস্তিতই নাই। এটা কিভাবে সম্ভব? আপনি যখনই আমাকে কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক সাইন করতে বলেছেন, আমি সেটা অতি বিশ্বাসের উপর কোনোদিন সন্দেহ অনুভব করি নাই কেনো ব্ল্যাঙ্ক চেক সাইন করবো। অথচ আজ দেখলাম যে, তারা আমার এই চেকগুলি দিয়ে এখন সবাই টাকার জন্যে হন্যে হয়ে আমার অফিসে ছুটছে। কি করে এ কাজটা আপনি আমার পার্টনার হয়ে করতে পারলেন? আমি তো আপনাকে আপনার লস্ট ইমেজ আবার পাওয়ার জন্য একটা চেয়ারম্যানের স্ট্যাটাস পর্যন্ত দিয়েছি যেটা আপনার আপন ভাইও করবে না। তাহলে আপনি এগুলি করতে গেলেন কেনো?
চ। এসবের বাইরেও আমার আরো অনেক কিছু জানার আছে। প্লিজ, আপনি আমার সবগুলি প্রশ্নের উত্তর যতো দ্রুত পারেন, জানান। আর সেগুলি হচ্ছে- আমি আপনাকে টেন্ডেম বায়ারের সাথে এয়ার শিপমেন্ট এর ব্যাপারে সবকিছু সেটেল করে যাবেন বলে বলেছিলাম। আপনি আমাকে বারবার আশ্বস্ত করেছেন যে, এ ব্যাপারে তারা আমাকে নক করবে না। এতা তো পুরুতাই মিথ্যা কথা। আজ আমি আমার অফিসে ওদের এয়ারওয়ে বিল না পাওয়ার কারনে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। টেন্ডেম বলেছে, এ ব্যাপারে আপ্নার সাথে ওদের কোনো কথাই হয় নাই। কেনো এসব মিথ্যা কথা বলেছেন আমাকে?
ছ। আরএমএম এর মতো ভালো একটা কোম্পানির সাথেই বা আমরা এমন ব্যবহার কেনো দেখালাম যেখানে ওরা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে সাহাজ্য করে যাচ্ছে? রায় ভাই আর মাহিন ভাই তো আমাদের বন্ধুর মতো। তো তাদের সাথে এ রকম একটা ফলস কন্ট্যাক্ট শো করে ব্যাংক থেকে তাকা নেয়ার কি দরকার ছিল? কি মনে করছে তারা এখন? আপনি না ইসলামের নীতিকথা বলেন, তাহলে এখন আবার এসব কেনো? কাকে খুসি করার জন্য সুদুর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ইসলাম প্রচার করতে গেলেন চাদে? কি প্রচার করবেন ওখানে গিয়ে? নীতি নাকি দূর্নীতি? পোল্যান্ডের বায়ার লিঞ্জেন গার্ল এর মালিক টম এতো খারাপভাবে কেনো আমাদের ফ্যাক্টরী সম্পর্কে কথা বলবে? টম তো ভালো মানুষ। সেতো আমাদেরকে ভালো দামেই অর্ডার প্লেস করেছে, আর প্লেস করেই কিন্তু টিটি দিয়েছে। তাহলে ওর সাথে আমরা এভাবে আচরন করলাম কেনো? ও তো একতা মাল ও নিতে পারছে না সুতার সমস্যার কারনে আর বুতাম লাগে না এর কারনে। এই গার্বেজ কে কিনবে এখন?
জ। আপনি তাবলিগে যাওয়ার প্রাক্কালে আগের ইয়ার্ন কন্ট্রোলার মান্নানকে বাদ দিলেন, আমাকে জানালেন না। তার পরিবর্তে ইউসুফ নামে একজনকে ইয়ার্ন কন্ট্রোলার বানালেন। কে এই ইউসুফ? তার কি কোনো জ্ঞান আছে সুতার ব্যাপারে? না সে জানে লট কি, না জানে ইনভেন্টরী কি। ইয়ার্ন কন্ট্রোলার মান্নান ব্যাংকের ওয়ালি সাহেবের আত্তীয় বলেই কি আপনি তাকে তার পোষ্ট থেকে সরিয়ে দিলেন? আর আপনি কি জানেন যে, এই ইউসুফ বর্তমানে সুতার লট এবং ইস্যু নিয়ে কি তালগোলটা পাকিয়েছে? একতা গার্মেন্টসও ঠিক লট দিয়ে করা হয় নাই। এতো গুলি পিস এখন আমি কি করবো?
ঝ। মিজান হুজুর তো আপনাকে দেবতার মতো ভক্তি করে। মিজান হুজুর তার সমস্ত তল্পিতল্পা নিয়ে একটা হালাল কাজের উদ্দেশ্যে আপনার কাছে এসেছে। তাহলে কেনো তার কাছ থেকে এরুপ লাখ লাখ টাকা নিয়ে তাকেই কাজতা দিলেন না? তিনি তো কাজের জন্যই আপনাকে টাকাগুলি দিয়েছে। কি ইসলামীক নিদর্শন দেখালেন আরেকতা হুজুরের কাছে?
ট। উলসীর আরেক মোহসিন ভাই কি আমাদের জন্য এতোটাই জরুরী যে, যেখানে আমাদের ওয়ার্কাররা কাজ পায় না, অথচ আপনি আমাদের ৩ গেজ মেশিন দিয়ে দিলেন, আবার কাজও দিলেন। কেনো? উলসির মোহসিন ভাই আপনার আত্তিয় আমি জানি, তাই বলে কি নিজের ফ্যাকটরীর ওয়ার্কারদের বাদ দিয়ে অন্য আরেকজনকে এভাবে সাহাজ্য করতে হবে? এটা আপনার ফ্যাক্টরী না? আমি অবাক হচ্ছি মোহসিন ভাই।
মনে রাখবেন, আপনার এই ছলচাতুড়ির জন্য কোনো এক সময় আপনি আপানার কপাল থাপরাবেন। এভাবে ব্যবসা হয় না। সম্ভবত আমার অনেক ভুল ছিলো। আপনি যদি পারেন, তাবলিগ বাদ দিয়ে দেশে চলে আসেন। অনেক ব্যাপার স্যাপার আছে। এমনো হতে পারে, আমি আর ব্যবসাটা চালাবো না। যা লস হবার তো হয়েছেই। কোনো না কোনোভাবে হয়ত আমি উতড়ে যাবো। কিন্তু আপনি কি এই ব্যবসায় আর দাড়াতে পারবেন?
গত ২৮শে জুলাই দ্বিতীয় বারের জন্য ভারত যাচ্ছি। প্রথমবার গিয়েছিলাম ষ্টাফ কলেজ থেকে জাতীয় প্রোটোকলে ডিপ্লোমেটিক ভিসা নিয়ে। কিন্তু এবার যাচ্ছি বেসামরিক হয়ে এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে। আগেরবার ভিসা নিয়ে কোনো সমস্যা হয় নাই। কিন্তু এবার ইন্ডিয়ান ভিসা পেতে বেশ জটিলতায় পড়েছিলাম, খোদ ইন্ডিয়ান হাই কমিশনারের সাথে আমাকে ইনটারভিউ দিতে হয়েছিল। বিনা সিক্রী হাই কমিশনার হিসাবে আছেন বাংলাদেশে। ভিসা ইস্যু করার আগে আমাকে এম্বেসী অফিস থেকে জানানো হলো যে, আপনার ভিসা পেতে হাই কমিশনার এর সাথে ইন্টারভিউ দিতে হবে। ব্যাপারটা সাভাবিক না। তারিখ দেয়া হলো, আমি সময় মতো পৌঁছে গেলাম এম্বেসী অফিসে। কিন্তু উনি সরাসরি আমার ইন্টারভিউ নিতে পারেন নাই কারন যেদিন আমার তারিখ পড়েছিলো, সেদিন তিনি কোনো এক জরুরী কাজে হটাত অফিসের বাইরে ছিলেন। ফলে হাই কমিশনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেব আমার ইন্টারভিউটা নিলেন। বেশ মজার একটা সাব্জেক্ট নিয়ে তার সাথে আলাপ হয়েছিলো।
বাংলাদেশে এখন গার্মেন্টস সেক্টরে বেশ আন্দোলন চলছে। শ্রমিকরা অযথাই ফ্যাক্টরীগুলিতে আন্দোলন করছে কিছু খুচরা কারন নিয়ে। যেমন, তাদের বেতন বাড়াতে হবে, কারো কারো দাবী, ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে হবে, আবার কারো কারো সরাসরি দাবী যে, পিস রেট এর কাজ আগে থেকেই তাদের বলে দিতে হবে, যদি পছন্দ হয়, করবে আর যদি পছন্দ না হয়, করবে না। এই রকম আরো অনেক অযুক্তিক দাবীও তারা করছিলো। ধারনা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ এই সেক্টরে বেশ ভালো করায় পার্শবর্তী দেশগুলি বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে একটা গন্ডোগোল পাকানোর চেষ্টা করছে। এর আরেকটা প্রধান কারন আছে। সেটা হলো, বাংলাদেশ সব বায়ারদের জন্য জিএসপি (Generalized System of Preferences) ইস্যু করে। এই জিএসপিটা আসলে কি? যার জন্য বায়াররাও এদেশে কাজ করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?
জি এস পি টা একটু ব্যাখ্যা করিঃ
যারা রপ্তানীমুখী শিল্প চালান, তারা যে র মেটেরিয়াল বাইরে থেকে আমদানী করেন, সেটার উপর সরকার কোনো ট্যাক্স নেন না যদি সেই রপ্তানী শিল্প পুনরায় উক্ত র মেটেরিয়াল দিয়ে বানানো মাল আবারো রপ্তানী করেন বাইরের কোনো দেশে। তাতে রপ্তানী কৃত মালটির সর্বশেষ মুল্য বেশ কম থাকে। এই সুবিধা বিশেষ করে পান, যারা এদেশ থেকে মাল কিনেন তারা। একটা উদাহ রন দেই, ধরুন, আমি সুতা আনবো বাইরে থেকে। সুতা এনে আবার শার্ট বানিয়ে সেই শার্ট বাইরেই রপ্তানী করবো। তাহলে এই সুতার উপর কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না, আবার শার্ট রপ্তানিতেও আমাকে কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না। এর ফলে যারা বায়ার, তাদের তৈরী মুল্য কম হয়। ভারতে এই সুবিধাটা নাই। ফলে ট্যাক্স যখন যখন যোগ হয়, যে শার্ট টা আমি ১০০ টাকায় বায়ারকে দিতে পারবো, সেটা ইন্ডিয়া ট্যাক্সের কারনে হয়তো গিয়ে দাঁড়াবে ১২০ টাকা। এই যে ২০ টাকা বেশি দিতে হলো বায়ারকে, সে এটা বিক্রি করে লাভ করতে হলে কমপক্ষে ১২০ টাকার বেশী মুল্য ধরতে হবে যখন ইন্ডিয়া থেকে শার্টতা সে নেবে। কিন্তু এদেশ থেকে নিলে তাকে কম্পক্ষেব ১০০ টাকার মুল্য এর বেশী হলেই তার লাভ হবে। এ কারনে বহু দেশ জি এস পির সুবিধার কারনে আমাদের দেশকেই পছন্দ করে অর্ডার দিতে। আবার যে কেউ জি এস পি চালু করতে পারেন না। যে দেশে র মেটেরিয়াল আছে, অর্থাৎ লোকালী পাওয়া যায়, তারা জি এস পির প্রবর্তন করতে পারে না। ফলে ইন্ডিয়া ইচ্ছে করলেও জি এস পি সুবিধা দিতে পারে না। তাই যদি এই জি এস পি এর নীতি পরিবর্তন করা যায় বা বাংলাদেশ থেকে জি এস পি তুলে দেয়া যায়, তাতে অন্যান্য দেশ একই কাতারে চলে এলে বাংলাদেশ চলমান প্রতিযোগীতায় টিকে না থাক্রই কথা। হয়তো এতাই কারন হতে পারে যে, একটা আন রেষ্ট চালিয়ে এই খাতকে সমুলে ধংশ করে দেয়া যাতে বায়াররা আর এদেশে এই ঝুকির কারনে অর্ডার না প্লেস করেন।
যাই হোক, আমি ইন্ডিয়ান এম্বেসিকে এসব ব্যাপারে খুব একতা বিশ্লেষনে গেলাম না। খালি ভাসা ভাসা কিছু হাই হ্যালোর মধ্যেই থেকে গেলাম। অবশেষে আমার ভিসা হয়ে গেলো।
এখানে একটা ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয় যে, কি কারনে আমি ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি। আমি গার্মেন্টস করছি বিধায় আমাকে মিঃ মুরাদ নামের এক ভদ্রলোক ফ্যাক্টরীতে এসে দেখা করলেন। তাকে আমি আগে থেকে চিনি না। কিন্তু আমার পার্টনার মিঃ মোহসীন শাহিন তাকে চিনেন। আমার অফিসে তিনি এসে বললেন যে, ওয়ার্লড ব্যাংক থেকে বিনা সুদে বেশ একটা লোন পাওয়া যায়, যা আমার মতো একজন ব্যবসায়ী অনায়াসেই গ্রহন করতে পারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেনো ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আমাকে এই সুযোগটা দেবে? উত্তরে তিনি বললেন যে, ইন্ডিয়ার উড়িষ্যার যিনি কংগ্রেস (আই) এর মহাসচীব, তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিনিধি (তিনি একজন অবসর প্রাপ্ত কর্নেল)। তিনি মুজিব সরকারের সময়ে শেখ মুজিবের একজন খুব কাছের মানুষের একান্ত পরিচিত। এই পরিচিত মানুষটি কখনো কোনো সুবিধা নেন নাই কিন্তু তিনি এখন আর্থিক দিক দিয়ে খুব ভালো অবস্থানে নাই। তাকে উক্ত কংগ্রেস নেতা সাহাজ্য করতে চান। আমি বললাম, কিভাবে? তিনি বললেন, যে, যদি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক লোন পাশ করে, তাহলে এর একটা অংশ উনি নিবেন, আর বাকী অংশ আমাদেরকে ৮ বছরের কিস্তিতে শোধ করে দিলেই হবে। কোনো ইন্টারেষ্ট হবে না। বস্তুত ব্যাপারটা এই দাড়ায় যে, এই ৮ বছরে যে ইন্টারেষ্ট হবে তার তুলনায় মুজিব সরকারের সময়ের এই গুরুত্তপুর্ন ব্যক্তির (নামটা বলা ঠিক হবে কিনা জানি না, তবু বলি, তার নাম মুসা সাহেব) নিয়ে যাওয়া টাকাও অনেক অনেক কম। তা ছাড়া বেশ বড় অংকের টাকা আমরা লোন নিতে পারবো যার কোনো ইন্টারেষ্টই নাই। হিসাব করে দেখলাম, লাভ আছে। তাই ওখানে বিস্তারীত আলাপ হবে।
আসলে আমি বিস্তারীত অনেক কিছুই জানি না এই লোনটা কিভাবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আমাকে দিতে চায়। একটু রহস্য তো লাগছেই। আবার মজাও লাগছে। দেখি ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়। অন্তত ইন্ডিয়া তো বেড়ানো হলো, লোন হোক বা না হোক। আমি আর মুরাদ বাসে করে ইন্ডিয়ার জন্য রওয়ানা হয়ে গেলাম। মুরাদ বাংলাদেশে কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং এর উপর ছোট খাটো একটা ল্যাব চালায়। এ কয়দিনে মুরাদের সাথে আমার ঘন ঘন দেখা হওয়াতে অনেক বেশী ফ্রি হয়ে গিয়েছিলাম।
আমরা বেনাপোল বিডিআর ক্যাম্পে গিয়ে প্রথমে যখন থামলাম, তখন বেলা প্রায় ১১ টা। ওখান থেকেই আমাদের বর্ডার ক্রস করতে হবে। আমার বন্ধু মেজর মাহফুজ তখন বেনাপোল বিডিআর এর দায়িত্তে নিয়োজিত। আগেই ফোন করে রেখেছিলাম। আমি ওখানে যাওয়ার পর দেখলাম যে, বন্ধু মাহফুজ বেশ ভালো খাবার দাবারের আয়োজন করে রেখেছে কিন্তু ওর বিশেষ তাড়া থাকায় ক্যাম্পে থাকতে পারেনি। আমি বিডিআর ক্যাম্পে উঠে একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম। সৈনিক সাত্তার এসে বল্লো যে, স্যার আপনাদের পাসপোর্টগুলি দেন, আমি ইমিগ্রেশন করিয়ে নিয়ে আসি, আর এরমধ্যে আপ্নারা একটু চা নাস্তা খেয়ে রেষ্ট করেন। প্রচুর লোকের ভীড়। আমার ধারনা ছিলো না যে, কত মানুষ বেনাপোল দিয়ে এভাবে ইন্ডিয়ায় যায়। প্রায় ঘন্টাখানেকের মধ্যে আমাদের ইমিগ্রেসন হয়ে গেলো। লাগেজ তেমন ছিলো না। তাই আমরা অনায়াসেই বর্ডার পার হয়ে ওপাড়ে চলে এলাম, অর্থাৎ ইন্ডিয়া। আমরা শ্যামলী বাসে চড়েছিলাম। বাংলাদেশের থেকে যে বাসটি বেনাপোল পর্যন্ত ঢাকা থেকে গিয়েছিল, সেটা বেনাপোলে গিয়েই শেষ। ইমিগ্রেশনের পরে ইন্ডিয়ার পার্টে আবার নতুন শ্যামলী বাসে উঠতে হয়। ইমিগ্রশনের ঠিক পরেই যে জায়গায়টায় আমরা বাসে উঠলাম, তার নাম আসলে বিস্তরভাবে বললে পেট্রোপোল হিসাবে ধরা যায়। বাংলাদেশের এপাড়ের সাথে ওপাড়ের মানুষের বৈশিষ্ঠের কোনো তফাত নাই। যদি কেউ না বলে দেয় যে, এই পার্টটা ইন্ডিয়া আর ওই পার্টটা বাংলাদেশ, কারো বুঝার সাধ্যি নাই। মানুষের যেনো হুরাহুড়ি, কে কার আগে বাসে উঠবে। তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখলাম। মনে মনে ভাবলাম, সবার জন্য কিন্তু সিট রিজার্ভ করা আছে, তারপরেও কেনো যে মানুষগুলি এ রকম তাড়াহুরা করে বাসে উঠছে আমার বোধগম্য হচ্ছিলো না। এরমধ্যে চায়ের হকার, পানের হকার, সিগারেটের হকার, কেউ কেউ আবার ঘাড় টিপাবেন কিনা, কান খোচাবেন কিনা এই জাতীয় হরেক হরেক পদের সার্ভিসদাতার কোনো অভাব নাই। মুরাদ বল্লো, স্যার, পকেট সাবধান। এখানে যতো না ভালো মানুষের দেখা পাবেন, তার মধ্যে অর্ধেক পাবেন চোর।
আমরা বাসে চলছি, আর মাঝে মাঝে কোন জায়গা ক্রস করছি সেটা পড়ছি। বেনাপোল থেকে কলিকাতা পর্যন্ত যে সব প্রমিনেন্ট জায়গার নাম মনে আছে তার মধ্যে হল- সুবাসনগর, গোলকনগর, মন্দালপাড়া, বকচড়া, গাইঘাটা, ধর্মপুর, হাবরা, বামনগাছি, দমদমের কিছু অংশ এবং শেষে কলিকাতা। পথিমধ্যে আমাদের বাস ধর্মপুরে আধা ঘন্টার জন্য একটা হল্ট দিয়েছিলো। কলিকাতা যখন পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় তিনটা বাজে। কি যে এক অবস্থা। পুরাই গুলিস্থান। মানুষের ভীড় আর দোকানপাটের এমন হযবরল, কোনো তফাত নাই আমাদের ঢাকা শহরের গুলিস্থান আর কলিকাতার মধ্যে। আমরা একটা হোটেলে উঠলাম। হোটেলে উঠে আমি আমার ব্যাগ একটা টেবিলে রেখে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হবো বিধায় লুংগি পড়ে বাথরুমে ঢোকলাম। মুরাদ রুমেই ছিলো। আমি বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে যখন বের হলাম, মুরাদের এক কথায় আমি হচকচিয়ে গেলাম।
মুরাদ বল্লো, আখতার স্যার, আমার মোবাইলটা পাচ্ছি না। আমি আমার মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখি, আমার মোবাইলটাও খুজে পেলাম না। কি তাজ্জব ব্যাপার!! বললাম, রুমে কি কেউ এসেছিলো?
মুরাদ বল্লো, হ্যা, একটা ক্লিনার বয় এসেছিলো।
সাথে সাথে ম্যানেজারকে জানালাম, কিন্তু ম্যানেজার আমাদের এমন কথা বললেন যে, আমরা একটা সহি পবিত্র হোটেলে উঠেছি, এখান থেকে কখনো কোনো কিছুই হারানোর রেকর্ড নাকি নাই। এর মানে হল আমরা অন্য কোথাও মোবাইল হারিয়ে এসেছি অথবা আমাদের কাছে কোনোকালেই কোনো মোবাইল ছিলো না। কিছুই বলার নাই। আমার সাধের ফোল্ডেড নকিয়া মোবাইল্টা হারিয়ে এখন সে অন্য কারো বাসর করছে। দুক্ষটা এখন অন্যটা। আমার সব কন্ট্যাক্ট নাম্বার গুলি হারিয়ে ফেললাম।
মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। কলিকাতায় আমাদের থাকা হবে না। আমরা আসলে যাবো, উড়িষ্যায়। তাই এক রাত থাকা হবে এই কলিকাতায়। আবার যাওয়ার সময় আমরা উড়িষ্যা থেকে পুনরায় কলিকাতায় আসতে হবে ঢাকার বাস ধরার জন্য। তখন আরেক রাত থাকা হবে।
আমি আর মুরাদ সন্ধ্যায় বের হলাম। একটা মোবাইল কিনতে হবে, সাথে ইন্ডিয়ার সিম। মুরাদ বহু বছর ইন্ডিয়ায় ছিলো, বাংগালুরে ওর শিক্ষা জীবন কাটিয়েছে। ফলে ও বেশ ভালো হিন্দি বলতে পারে এবং তার ইন্ডিয়া মানুষদের ব্যাপারে একটা ভালো ধারনাও আছে। শুধু তাইই নয়, ও ইন্ডিয়ার কোন শহর থেকে কোন শহরে কিভাবে কখন যেতে হয়, এ ব্যাপারে বেশ ভালো আইডিয়া আছে বলে আমি মুটামুটি আরামেই ছিলাম। মুরাদ জানালো যে, আগামীকাল সকাল ৮ টায় আমরা কলিকাতা থেকে ট্রেনে উড়িষ্যায় যাবো। ট্রেন স্টেসন এখান থেকে বেশি দুরেও নয়। সকালে সাতটায় বের হলেই নগদে টিকেট কেটে আমরা উড়িষ্যায় পৌছতে পারবো। কলিকাতা থেকে উড়িষ্যায় যেতে ট্রেনে প্রায় ৬/৭ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। মানে আমরা হয়তো দুপুরের পরে গিয়ে হাজির হবো।
আমরা দুজনেই একেবারে সস্তায় দুটু মোবাইল কিনলাম। সাথে দুটু সিম। রাতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। সম্ভবত কোনো পর্ব হচ্ছে এখানে। রাস্তাঘাট বেশ আলোকিত। রাতে ঢোষা আর সবজি খেয়ে ডিনার শেষ করলাম। যেহেতু ইন্ডিয়া, তারা হালাল হারাম বুঝে না, তাই সাধারনত আমি এসব দেশে কোনো মাংশ খেতে নারাজ। মাছ, ডিম, ডাল আর সব্জি দিয়েই আমি চালিয়ে নেই। এগুলিতে হারাম হালালের কোনো বালাই নাই। রাত ১০টার দিকে রুমে এসে ঢাকায় বাসায় কল করলাম, তারপর ঘুমিয়ে গেলাম।
পরেরদিন বেশ সকালেই ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো। হাতমুখ ধুয়ে নামাজ পড়লাম। মুরাদ নামাজ পড়ে না সম্ভবত। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ধর্ম যার যার। ঈশ্বরের কাছে জবাব্দিহিতা যার যার তার তার। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, যদিও ইন্ডিয়ানরা মুসল্মানদেরকে পছন্দ করে না, কিন্তু ব্যবসার খাতিরে কিছু কিছু নর্ম মানতেই হয়। আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেটা কোনো স্টারওয়ালা হোটেল না। তারপরেও দেখলাম, ছাদের এক কোনায় কোন দিকে কিবলা, সেটা মার্ক করা আছে। এরমানে হলো, এখানে বহু মুসলমান ব্যক্তিরা হয়তো আসে, আর তারা বারবার কিবলার দিক জানতে চায় বলে হোটেলওয়ালারা ব্যবসার সার্থে কিবলার দিকটা একটা এরো মার্ক দিয়ে ইন্ডিকেট করে রেখেছে। সাথে একটা জায়নামাজও রেখে দিয়েছে। অনুভুতিটা ভালো লাগলো।
আমি আর মুরাদ উড়িষ্যায় যাওয়ার জন্য সকালেই বের হয়ে গেলাম। ট্রেন স্টেসনে গিয়ে নাস্তা করলাম। এখানকার ট্রেন ষ্টেশনগুলি বাংলাদেশের ট্রেন ষ্টেসন গুলি থেকে অনেক পরিষ্কার এবং প্লাটফর্মটাও অনেক প্রশস্থ। তাছাড়া সকাল বেলা হওয়াতে হয়তো ক্লিনাররা পরিষ্কার করে গেছে, তাই আরো পরিষ্কার লাগছে। লোকজনের সমাগম খুব বেশী না। আমরা দ্রুতই টিকেট পেয়ে গেলাম। ট্রেন ছাড়বে সকাল সোয়া আটটায়। হাতে তখনো প্রায় ২০ মিনিট বাকী। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসেও নাই।
ঠিক সময়ে ট্রেন চলে এলো। আমরা ট্রেনে উঠে গেলাম। এবার লম্বা একটা জার্নি। উড়িষ্যায় আমি কখনো যাই নাই। ফলে ট্রেন জার্নিতে আমি যতোটুকু মজা করা যায়, সেটা উপভোগ করছিলাম। মানুষের হাবভাব দেখছিলাম, হকার এসব ট্রেনেও উঠে। চায়ের কেটলী নিয়ে চা ওয়ালাও উঠে। বাংলাদেশের ট্রেনগুলির মতোই। তবে একটা জিনিষ যে, এদের ট্রেনের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আমাদের দেশের ট্রেনের চেয়ে একটু ভালো। আমরা যখন উড়িষ্যায় পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় ৩টা বাজে। ভুবনেশ্বর ট্রেন স্টেসনে নামতে হয় উড়িষ্যায় যেতে হলে। কলকাতা থেকে কেশবপুর- কসবা- নারায়নগড়-বালাসুর-ধর্মশালা-কুরুমিতা-ভুবনেশ্বর। একনাগাড়ে ছুটে চলল ট্রেন। মাঝে মাঝে কিছু কিছু বড় বড় ষ্টেসনে ট্রেন থামলো বটে কিন্তু খুব বেশী নেয় না। টাইম মেইন্টেইন করে বুঝা যায়। ভুবনেশ্বর থেকে মুরাদ একটা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করলো, কিভাবে কিভাবে কি বলল হিন্দিতে আমি সবটা বুঝতে না পারলেও বুঝলাম যে, আরো প্রায় ৩০/৪০ মিনিট লাগবে। ক্যাবওয়ালা আমাদেরকে ইনিয়ে বিনিয়ে হরেক রকম রাস্তা দিয়ে শেষতক সেই কর্নেল সাহেবের বাসায় নিয়ে হাজির।
বেশ বিশাল বাড়ি। এটা সরকারী বাড়ি, কংগ্রেসের উড়িষ্যার মহাসচীবের বাসা বলে কথা। আমরা যখন তার বাসায় পৌঁছলাম, তখন প্রায় ৪টা বাজে। মাঝে কোথাও খাওয়া হয় নাই। ভীষন ক্ষুধা লেগেছিলো। আমাদের আসার কথা দুপুরের মধ্যে। কিন্তু আমাদের কোনো গাফিলতি ছিলো না, তারপরেও প্রায় ঘন্টাদুয়েক দেরী হয়ে গেছে। কর্নেল বাসায়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমরা তার বাসার ড্রইংরুমে অপেক্ষায় আছি, তার সাথে দেখা হবে। প্রায় ২০ মিনিট পর কর্নেল আসলেন। এর মধ্যে কর্নেলের ওয়েটার আমাদেরকে একজগ পানি আর দুটু গ্লাস দিয়ে গেছেন। ইন্ডিয়ানদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ওরা বেশীর ভাগ মানুষ কিপটা। এক কাপ চা পাঠাবেন, সেই খরচটাও তারা ব্যয় মনে করেন। কিন্তু পানি তো পানিই। অসুবিধা নাই।
কর্নেল এলেন। তার সাথে প্রাথমিকভাবে আর্মি নিয়েই কথা হলো। তিনি আর্টিলারীর অফিসার, আমার মতো। অবসরের পর তিনি রাজনীতি বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি কংগ্রেস (আই) এর উড়িষ্যার মহাসচীব। অনেক বড় পোষ্ট এবং মর্যাদা। কিন্তু তার এই পোষ্টের মর্যাদা আমার কাছে একেবারেই ছোটলোক মনে হলো কারন আমরা সেই সুদুর বাংলাদেশ থেকে এসেছি তার সাথে দেখা করার জন্য, তাও আবার তারই দাওয়াতে। অথচ এককাপ চা অফার করার মতো সৌজন্যতাবোধ দেখতে পেলাম না। অবশেষে তার ওয়েটার গুনেগুনে ৪টা বিস্কুট নিয়ে এলেন। খুব হাসি পেলো। হায় রে আমার কর্নেল ভাই। যাই হোক, মেজাজ একটু খারাপ হচ্ছিল, আবার একটু অপমানবোধ করছিলাম।
কথায় আসি, বলে বললাম, স্যার, আমাদেরকে আপনি এখানে কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে আলাপের জন্য দাওয়াত করেছিলেন। আমরা কি সে ব্যাপারে বিস্তারীত কথা বলতে পারি? উনি প্রথমে আমাকে বাংলাদেশে সিমেন্টের ব্যবসা করলে কি রকম লাভ হতে পারে, আমার কোনো সিমেন্ট ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় আছে কিনা ইত্যাদি নিয়েই প্রথমে আলাপ শুরু করলেন। আসল কথা ছেড়ে উনি আমাকে যা নিয়ে আলাপ করা শুরু করলেন, আমি তার আগা মাথা কিছুই বুঝতেছিলাম না। আমি বাংলায় মুরাদকে বললাম, মুরাদ, কি ব্যাপার নিয়ে আসলে আমরা এখানে এসেছি, উনি কি এটা জানে?
মুরাদ বল্লো, স্যার জানে তো। নিশ্চয়ই তিনি এ ব্যাপারে আলাপ তুলবেন। শেষ পর্যন্ত তুল্লেন। আলাপের সার্মর্মটা বলি-
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে তারা আমাকে ৭ মিলিয়ন ডলার লোন নিয়ে দিতে পারবেন। এটা একটা প্রনোদনা ফান্ড। যেহেতু তিনি উড়িষ্যার কংগ্রেস (আই ) এর মহাসচীব, ফলে তার পদমর্যাদায় তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যংকের সাথে একটা ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ আছেন। তার কিছু প্রভাব রয়েছে। এই ৭ মিলিয়ন ডলার যদি আমরা নেওয়ার জন্য এপ্লাই করি, তাহলে এটা তিনি পাশ করিয়ে দিতে পারবেন। ইন্ডিয়ায় কেনো করছেন না তিনি এ প্রশ্নে জানালেন যে, এটা ইন্ডিয়ার কোনো ব্যবসায়ীর জন্য প্রযোজ্য হবে না, দিতে হবে ইন্ডিয়ার বাইরে যে কোনো মুসলিম দেশে। এই ফান্ডটা বেসিক্যালি কোনো আরব কান্ট্রি করছে এবং শর্ত হচ্ছে এটা কোনো মুস্লিম কান্ট্রিকে দিতে হবে। তো খুব ভালো কথা। আমি দুটু বিষয়ে কোয়ালিফাই করি। প্রথমত আমি ব্যবসায়ী এবং দ্বিতীয়ত আমি মুসলমান কান্ট্রি রিপ্রেযেন্টেটিভ করি। কথার দ্বিতীয় ভাগে উনি আমাকে মোটামুটি চমকে দিলেন। বললেন যে, এই ৭ মিলিয়ন ডলার যদি আমাকে তিনি পাইয়ে দেন, তাহলে ডলার পাওয়ার পর ২ মিলিয়ন ডলার উনি কেটে রাখবেন। আর বাকি ৫ মিলিয়ন ডলার আমি ইচ্ছে করলে মেরে দিতে পারবো। সে ব্যবস্থাও উনি করে দেবেন। এর মানে হলো নির্ঘাত চুরি। আমি এতোক্ষন খুব মনোযোগ সহকারে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম। উনি বললেন যে, এই যে ৫ মিলিয়ন ডলার আমি মেরে দেবো, এটা পুরাটাই আমার নয়। এর থেকে ২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে মুসা সাহেবকে যার থেকে মুরাদও কিছু পাবে আর বাকি ৩ মিলিয়ন আমার একার। আমি কর্নেল সাহেবকে একটা সিগারেট অফার করলাম। যে কোন দেশের যে কোন আর্মির এই একটা গুন আছে, জুনিয়র সিনিয়রের সামনেও সিগারেট ফুকতে পারে যদিও অনেক সময় সিনিয়রার সিগারেট খায় না। কিন্তু এই কর্নেল সাহেব সিগারেট খান, ফলে আমরা দুজনেই সিগারেট ফুকতে শুরু করলাম।
আমি বললাম, স্যার, আপনার অফারটা বেশ লোভনীয়। যে কেউ এটা লুফে নেওয়ায়র কথা। কিন্তু সম্ভবত আমি এই অফারটা নিতে পারবো না। আমি কোনো ডলার চুরীর মধ্যে নাই। আমি ভেবেছিলাম, এটা লোন, ব্যবসা করবো, লাভ করে আমি লোন ফেরত দেবো। কিন্তু এখন যা দেখছি যে, এটা আমার সেই স্বপ্নের পুর্বাভাষ যে, পানিটা পরিষ্কার কিন্তু এটা শোধন করা হয়েছে পায়খানার কোনো জলের ভান্ডার থেকে। আমি এভাবে কোনো ফায়দা চাই না। আপনি অন্য কোনো পার্টনার দেখতে পারেন। কর্নেল খুব মর্মাহত হলেন। বললেন, তিনি যদি এই অফার অন্য যে কোন মুসলিম কান্ট্রিতে যে কোনো ব্যবসায়ীকে অফার করতেন, নিঃসন্দেহে এটা তারা গ্রহন করতেন। আমার মতো তারা এভাবে প্রত্যাখান করতো না। আর যদি প্রত্যাখান করতোও তাহলে কিছুটা সময় নিতো ভাবার জন্য। আমি বললাম, আমি অন্য ১০ জনের মতো নই স্যার। এটা আমার কাছে অপরিষ্কার প্রপোজাল মনে হচ্ছে। এটা আমার কাছে হারাম মনে হচ্ছে। আমি হারাম খেতে চাই না।
আর বেশীক্ষন কথা বলার প্রয়োজন আমি মনে করিনি। প্রায় ৩০ মিনিট পর আমি আর মুরাদ বেরিয়ে গেলাম। আমি মুরাদকে বললাম, মুরাদ, আমি যদি জানতাম, ব্যাপারটা এ রকম, আমি তাহলে ঢাকা থেকেই এখানে আসতাম না। তোমার কি মন খারাপ আমার নেগেটিভ হওয়ায়? মুরাদ ভিতরে ভিতরে কি ভেবেছে জানি না, কিন্তু আমার কাছে এটা স্বীকার করলো যে, সেও এই রকম একটা প্রপোজাল সম্পর্কে জানতো না, আর জনলে মুরাদ আমাকে এখানে আনতো না।
আমাদের ক্যাব বাইরে দাড়িয়েই ছিলো। কথাশেষে আমরা পাশেই একটা হোটেলে একরাত থাকার জন্য একটা রুম বুকড করলাম। খুব শান্তি লাগছে যে, আমি একটা অপরাধ করলাম না। কার না কার টাকা, কার না কার হক, আমি এভাবে কিভাবে করবো? টাকাটাই সবচেয়ে বড় নয়। আমাকে এক সময় এসব টাকা পয়সা ছেড়েই দুনিয়া ত্যাগ করতে হবে। আমি অবৈধ কোনো কাজ করতে চাই না।
অতঃপর, উড়িষ্যায় এক রাত থাকার পর আবারো ফিরে এলাম কলিকাতায় তার পরেরদিন। এবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পালা।
এখানে কিছু কথা না বললেই নয়। দেশ বিদেশে অনেক রাগব বোয়াল আছে, যারা আসলেই কেউ আছে বলে কোনো অস্তিত্ব নাই, তারা অনেক সময় শধু একটা ছদ্ধনামেই বিচরন করে। আসলে এই মুখুশওয়ালা মুখেশ নামধারী মানুষগুলির আদৌ কোনো চরিত্রই নাই। অথচ এদের দোউরাত্ত আছে, প্রভাব আছে। এরা দেশের ভিতরে এবং বাইরে এমনকি বহির্দেশেও এই মুখেশরা ততপর, এক্সটরশন, স্মাগ্লিং সবই চলে এই মুখেশদের নামে। এই কথাটা রক্ত দিয়ে লিখে দিলেও কিছু যায় আসে না। মুখেশ একটা ধোকা দেওয়ার নাম। মনগড়া একটা চরিত্র। মুখেশ একটা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই না। মাঝে মাঝে ক্ষেত্র বিশেষে এই মুখেশরা চরিত্র খোজে। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি হচ্ছি সেই খুজে পাওয়া বা বানানো আরেক কোনো মুখুশওয়ালা চরিত্র। যা কাজের শেষে আমার নিজের কোনো অস্তিত্তই রবে না। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন জবাব্দিহিতার দরকার হয়। কিভাবে কখন জল মাথার উপর উঠে যায়, কেউ জানে না। হোক সেটা নিজের কাছে, হোক সেতা সমাজের কাছে কিংবা ঈশ্বর। ওই সময় কথা বা সত্য প্রকাশের নিমিত্তে উগলে নেওয়ার সময় হয়ে উঠে। হতে পারে আমি হয়তো একটা বলীর পাঠা। যখন কেউ বলির পাঠা হয়, তখন সে হয়ে উঠে বিষাক্ত খাবার। আর সেই খাবার যতো দামিই হোক, তা ফেলেই দিতে হয়। যদি তা গোড়া থেকে উপড়ে ফেলে না দেওয়া যায়, তখন তার মুল্য শুধু বিপদের আশংকাই বাড়িয়ে দেয়। সব সময় বাজীতে জিতবেন, এটা কিন্তু ঠিক না। এখানে আরো একটা কথা থেকে যায়, কর্নেল সাহেব একটিভ রাজনীতিতে জড়িত। রাজনীতিতে কোনো কিছুই সারা জীবনের জন্য হয় না। না বন্দধুত্ত না শত্রুতা। যখন প্রয়োজন হয় তখন মিডিয়া আর পলিটিশিয়ান একে অপরের বন্ধু হয়ে যায়।
আমি যতোক্ষন এই কর্নেল সাহেবের মুল প্ল্যান জানতে পারি নাই, ততোক্ষন একটা স্বপ্নের মধ্যে ছিলাম। আমার ধারনা, মুরাদ বা মুসা সাহেব পুরু ব্যাপারটাই জানতেন। কিন্তু তারা আমাকে আগবাড়িয়ে কিছু বলেন নাই। একটা তাসের খেলার মতো কৌশল নিয়েছিলেন। ফলে কিছু তাস প্রকাশ্যে এসেছিলো, আর কিছু তাস তখনো আমার কিংবা তাদের জানা ছিলো না। ফলে এই খেলায় প্রত্যেকেই ভাবছিলো, হয়তো খেলাটার তুড়ুকের তাস তাদের কাছেই আছে। কিন্তু ধীরে ধীরে হলেও একেকটা তাস ভুল প্রমানীত হলো। তারপর হটাত করে সব তাস চারিদিকে প্রকাশ্য হয়ে চোখের সামনে চলে এল। ব্যাপারটা আর সাফল্যের মুখ দেখলো না। তাতে তাৎক্ষনিক কষ্ট পেলেন এই কর্নেল সাহেব। তার মধ্যে অনেক কিছুর অভাব ছিলো। রাজনীতিতে যদি মানবিকতা আর সচ্ছতা থাকতো তাহলে কেহই এই রাজনীতি করতে আসতো না। তিনি কোনো অবস্থাতেই আমার নজরে একজন ভালো, মানবিক এবং সচ্ছলোক ছিলেন না। কোনো কোনো সময় কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই নাটক তৈরী করা হয়। আর এখানেও তাই ঘটেছিলো।
যাই হোক, হয়তো ঈশ্বর আমাকে দিয়ে এমন কোনো কাজ করাতে চান নাই, যা তিনি চান না।
মানবতা এবং নিষ্ঠুরতা তাদের নিজস্ব নিজস্ব ক্ষেত্রে তারা তাদের একটা রুপ নিয়ে অবস্থান করে। একটা বাঘ যখন কোনো একটা হরিনকে শিকার করে, তখন এর দুটু দিক আছে। এর একদিকে আপনি পাবেন বড় নিষ্ঠুরতার চিত্র আরেক দিকে পাবেন বড্ড মমতার দৃশ্য। আপনি যদি ভাবেন যে, একটি বাঘ তার ছোট ছোট বাচ্চাদের খাদ্য অন্বেষণে হরিন শিকার করে, তখন্তাকে আদর্শ মা হিসাবেই দেখবেন। বাঘের বাচ্দেচারা তাদের মায়ের উপর অনেক খুশী। এক্ষেত্রে দেখবেন এর ভিতরের মমতাবোধ। অন্যদিকে, যদি দেখেন যে, আহা, ওই হরন শিকার করে হরিনের বাচ্চাদেরকে এতিম করে দিলো। হরিনের বাচ্তচাদের কাছে বাঘ একটা নিষ্ঠুর কোনো প্রানি ছাড়া আর কিছু নয়। সেখানে দেখবেন এর নিষ্ঠুরতার চিত্র।
যদিও এটা প্রাকৃতিক নিয়মের একটা অংশ। আবার এটাও ঠিক যে, প্রকৃতি একদিকে মানবতা এবং নিষ্ঠুরতা দুটুই একই সময়ে তার নীতিরমধ্যে লালন করে। এখানে কেউ এই নীতি ব্রেক করে না। এখানে আরো একটি নীতি কাজ করে। যেমন ধরুন, কোনো একটি বাঘ যদি শিকার করে তার পেট ভরে যায়, সে পরবর্তী ক্ষুধা না লাগা অবধি ওই বাঘটি আরেকটি হরিন শিকার করে না। বরং শিকার এবং শিকারী তখন পাশাপাশি বিচরন করে। নির্বিঘ্নে পাশাপাশি বসবাস মিত্র এবং শত্রুর। এটাই প্রকৃতির এক অদ্ভুত নীতি।
কিন্তু এই প্রাকৃতিক নীতিটার মধ্যে ব্যাঘাত কিংবা আইন ভঙ্ঘ করে একমাত্র মানুষ। আমরা যখন একজনকে ভালোবাসি, আমাদের নজর থাকে আরেক জনের উপরও। আমরা একজনকে দেখি আরেক জনের সত্তায়ও। ফলে যখনই একজনের উপর আমাদের মন অতৃপ্তিতে ভরে যায়, সাথে সাথে আমরা আমাদের নজর পরবরতী চরিত্রের উপর ফোকাস করে তৃতীয় কোনো মনোবাঞ্চার দিকেও রিজার্ভ করে রাখি। আমরা একই সাথে সুখি নই আবার খুশীও নই। আমরা মানুষের দল একই খাবারে, একই পোষাকে, কিংবা অল্পতেই সুখি নই। আর এখানেই আমাদের মানুসদের ওই বন্য প্রানীদের কাছে অনেক কিছু শিখার আছে। বন্যপ্রানিরা কোনো বাড়িঘড় ছাড়া, টাকা পয়সা ছাড়া, কিংবা রিজার্ভ ফুড ছাড়া সব ঋতুতেই সুখি।
আজ আমি এই স্থান ছেড়ে চলে যাচ্ছি। যাওয়ার প্রাক্কালে শুধু আমি একটা কথাই বলে যাই যে, এই স্থানটি আমার জন্য একদিকে যেমন বড্ড ভালো লাগার আবার অন্যদিকে অতি ঘৃণারও বটে। চলে যাচ্ছি চিরকালের জন্য এমন কিছুমানুসদের ছেড়ে যারা আমাকে কখনো কখনো ভালোবেসেছিলো আবার কখনো কখনো তারা আমাকে ভালো তো বাসেই নাই বরং ঘৃণার চোখেই দেখেছিলো। এখানে কেউ কেউ আমাকে ভালোবেসেছে শুধুমাত্র কিছু অর্থকরী মুনাফার জন্য।
(চলবে)
আমার এপেন্ডিক্স-জে লঞ্চ করার কারনে এবার আমার প্রোমোশন হবার কথা না। আর সেটাই হয়েছে। আমি এবার প্রোমশনের ব্যাপারটা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাই নাই। কারন আমি ব্যক্তিগতভাবে আর চাচ্ছিলাম না যে, আমার প্রোমোশনটা হোক আর আমি আবার আর্মিতেই থেকে যাই। এবার আমার কমান্ডার আগেরজন নাই, ফার্ষ্ট লং কোর্সের সোর্ড প্রাপ্ত অফিসার আমাদের ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার, ব্রিগেডিয়ার মাহফুজ স্যার। আমি যেহেতু আর ইন্টারেস্টেড না প্রোমোশনের ব্যাপারে, ফলে মজিদ কিংবা অন্যান্য অফিসাররাও আমাকে মূটামূটি ধরেই নিয়েছে যে, আমি আর থাকছি না। মজিদ আমার সাথে বেশ অন্তরঙ্গভাবে অনেক কথাই বল্লো। এটাও বল্লো যে, স্যার আপনি যদি এপেন্ডিক্স-জে টা সাবমিট না করতেন, খুব ভালো হতো। এবার আপনার প্রোমোশনটা হতোই।
আমার এমনিতেই এই ব্যাপারে মন ভালো ছিলো না, তারপর আবার আদিখ্যেতাভাব। বললাম, মজিদ, আমি জানি আমি বাইরে গিয়ে কি করবো। যে আমি আর্মিতে আর্মির জন্য এতো শ্রম দিতে পেরেছিলাম, সেই আমি এবার বাইরে গিয়ে নিজের জন্য শ্রম দেবো। আজীবন তো আর আর্মিতে থাকা যাবে না। যদি সেটাই হয়, দেখি না বাইরে গিয়ে কি করা যায়। তবে একটা জিনিষ আমি হলফ করে বলতে পারি যে, আজ যারা আমাদের মতো অফিসারদেরকে মুল্যায়ন করে নাই, কোনো এক সময় এই রাজনৈতিক দল আমাদের অনুপস্থিতির জন্য আফসোস করবে। আফসোস করবে এই কারনে যে, আমরা কোন রাজনৈতিক দল করতাম না। আমরা ছিলাম সত্যিকার অর্থে প্রোফেশনাল আর নিরপেক্ষ। তোমরা যারা পদ দখল করে আছো, তারা একসময় হয়তোবা এই কথাটা অক্ষরে অক্ষরে ফিল করবা যে, আজ যারা তোমরা দলের জন্য অনুপ্রানিত, কোন এক সময় অন্য দলের জন্যেও অনেক অফিসাররা অনুপ্রানিত হবে না এটা ভাবা উচিত নয়। তখন আর যোগ্য অযোগ্য বলে কোনো কথা থাকবে না। তোমরাই তো শিখিয়ে দিলা যে, আর্মিটাকে দলীয়করন করা যায়। আজ তোমরা ক্ষমতায় আছো, এমনো হতে পারে যে, যখন ক্ষমতা হাত ছাড়া হয়ে যাবে, তখন ওইসব অনুপ্রানিত দলকানা অফিসারদের জন্য তোমরা আর ঢোকতেই পারবা না। তখন মনে হবে শিড়দাড়াওয়ালা কিছু নীতিবান অফিসারদের দরকার ছিলো যারা ভোট কারচুপি করবে না, অন্যায় কাজ করবে না, এবং ন্যায় কাজ করার কারনেই হয়তোবা তোমরা আবার ক্ষমতায় আসতে পারতা। এর মাশুল তোমার দলকে দিতেই হবে। আমরা কোন না কোনোভাবে টিকে যাবো, বিলিন হয়ে যাবা তোমরা আর তোমাদের দল। আমি যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছের কেউ হতাম, আমি তাকে ঠিক এই কথাগুলিই বলে পরামর্শ দিতাম যে, কোয়ালিফাইড লোক যখন থাকে না, তখন সাফার করে সবাই, আর সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় দল। মাননিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আপনার ভবিষ্যত খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। মাসুলটা হয়তো অনেক বড় আকারের দিতে হতে পারে। এটা বাংলাদেশ। তাই ন্যায় কাজ করে কোয়ালিফাইড অফিসারদেরকে এই আর্মিতে রাখুন। এতে আপ্নাদেরই লাভ বেশি হবে।
যাক, চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী। আমি এবার সুপারসিডেড হবার কারনে ঠিক জবাব দিয়ে দিলাম, আমি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে যেতে চাই। আমাকে ছেড়ে দেয়া হোক। মজিদকে বললাম, অন্তত এইটুকু উপকার আমার করে দাও তোমার দলিয় প্রধানকে বলে। মজিদ, রাজী হলো।
মজিদ প্রধান মন্ত্রি খালেদা জিয়ার এডিসি ছিলো এবং সেই সুবাদে ক্যাটেগরি সি, এবং মেডিক্যালি আনফিট হওয়া সত্তেও উপরন্ত কোনো ষ্টাফ কোর্ষ বা গানারী ষ্টাফ না করেও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে আমার ৭ ফিল্ডের সিও হয়েছে।
আমি যখন প্রায় সব কিছু ফাইনালাইজ এর পথে, তখন একদিন আমার দোস্ত মাসুদ ইকবালের সাথে রিভার সাইড নিয়ে বিস্তারীত আলাপ আলোচনার জন্য ওর অফিসে গেলাম। আমি ওকে প্রথমে বললাম, যে, মাসুদ রিভার সাইডের নাম শুনেছে কিনা। রিভার সাইডের নাম শুনেই ইকবাল বলে দিলো যে, ওটা একটা খুব খারাপ ফ্যাক্টরী এবং ওটা না নেওয়াই উত্তম। ইকবাল এমনো বল্লো যে, নাজিম সাহেব যদি ইকবালকে রিভার সাইড সুয়েটার্স বিনে টাকাতেও দিতে চায়, তারপরেও ইকবাল এটার ব্যাপারে উতসাহী নয়। জিজ্ঞেস করলাম, এর কারন কি? উত্তরে ইকবাল বল্লো যে, এই ফ্যাক্টরীতে সাবকন্ট্রাক্ট কাজ দিলে ওরা সুতাও বিক্রি করে দেয়। মাল তো দেয়ই না, বরং লায়াবিলিটিজে পড়তে হয়। আমি ইকবালকে বললাম, আরে, এটা তো বর্তমান ম্যানেজমেন্টের সমস্যা। আমরা যদি চালাই, তাহলে আমরা তো আর সুতা বিক্রি করে দেওয়ার কোনো কারন নাই। এরপরেও ইকবাল এটার ব্যাপারে কোনো উতসাহ দেখালো না। একটু খারাপ লাগলো। বললাম, এমনো তো হতে পারে যে, আমরা ভালো করবো। যেহেতু ইকবাল অনেকদিন যাবত গার্মেন্টস লাইনে আছে, ওর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা এই ফ্যাক্টরী দাড় করাতে পারবো বলে আমার ধারনা। কিন্তু ইকবাল তাঁর সিদ্ধান্তে একেবারেই অনড়।
একটু খারাপ লাগলো ইকবালের কথায় কিন্তু আমি দমে যাই নাই। বাসায় এলাম। তারপর আমি কয়েকজন অফিসারের সাথে একে একে কথা বললাম। তাঁর মধ্যে একজন ফেরদৌস স্যার, তারপরে কথা বললাম কেএম সাফিউদ্দিন স্যারের সাথে। আর বেশ রাতে কথা বললাম ফারুক স্যারের সাথে। সবাই এখনো পজিটিভ মুডেই আছেন বলে মনে হলো। ওইদিন মোহসীন সাহেবের সাথে মিটিং করার পর আমি সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে একটু খোজ খবর নিতে গিয়েছিলাম তউহিদকে নিয়ে। ওখানে গিয়ে জানলাম যে, ব্যাংক রিসিডিউলিং করতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার দরকার। রিসিডিউলিং মানে হচ্ছে রিভার সাইডের লোনটাকে আবার রেগুলারাইজেশন করা। এখন কিস্তি না দেয়ার কারনে এটা একটা খারাপ লোনে পরিনত হয়েছে। খারাপ লোন হলে সেসব কারখানায় ব্যাংক সাপোর্ট পাওয়া যায় না, আবার কোনো এলসিও খোলা যায় না। কাজও করা যায় না।
এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি একটা আইডিয়া করলাম যে, আমাকে এই মুহুর্তে প্রায় লাখ ৫০ টাকার মতো নিয়ে মাঠে নামতে হবে। কিন্তু দূর্ভাগ্য হচ্ছে যে, আমার কিন্তু এতো টাকা নাই। আমি হয়তো পেন্সনের টাকা পেলে সর্বোচ্চ লাখ ২০ টাকা ইনভেস্টমেন্ট করতে পারবো। কিন্তু বাকীটা? ফলে আমি ধরে নিলাম, যদি ফেরদৌস স্যার, সাফি স্যার আর ফারুক স্যার জয়েন করেন, আমরা সবাই যদি ২০ লাখ করে টাকা ইনভেস্ট করি, তাতে টাকার সমস্যাটা আর থাকে না। আমি এই তথ্যটা উক্ত তিন অফিসারকে জানালাম। এবং আমাদের পরিকল্পনা হলো যে, আগামি বন্ধের দিন সবাই ফ্যাক্টরী দেখতে যাবো। তাঁর আগে কারো যদি কোনো অভিজ্ঞ গার্মেন্টস মালিক কিংবা কর্তার কাছে পরামর্শ নিতে হয়, আমরা নেবো।
খুব ভালো লাগছে এটা ভেবে যে, আমার সপ্নটা বাস্তবায়ন হচ্ছে ইনশাল্লাহ।
বাড়ির কাজ চলছে পুরুদমে। প্রতিদিন মীরপুর গোলারটেক আমি যাই। বড্ড ভালো লাগে যখন দেখি একতা একটা করে ইটের গাথনীতে আমার একটা একটা করে তালা সম্পন্ন হচ্ছে। ঠিক যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবেই যাচ্ছে। হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন থেকে ১৫ লাখ টাকার লোন ইতিমধ্যে পেয়ে গেছি। প্রতিমাসে কিস্তি প্রায় ১৮০০০ টাকা করে দিতে হবে। ১৫ বছর। অন্যদিকে আমার পেনসন কমুটেশন থেকেও লোন পেয়েছি ১০ লাখ টাকার। হাতে যে টাকা ছিলো, তাঁর সাথে এই লোনগুলি পাওয়াতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, চারতালা পর্যন্ত আমি একনাগাড়ে করে ফেলতে পারবো। আমার বাড়ির ডিজাইন করে দিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ইঞ্জিনিয়ার রফিক ভাই। অত্যান্ত অমায়িক লোক। উনি সাধারনত কারো ব্যক্তিগত বাড়ির ডিজাইন করে দেন না কিন্তু বন্ধুত্তের খাতিরেই তিনি আমার জন্য কাজটা করে দিলেন।
এপেন্ডিক্স জে সাবমিট করে দিয়েছি। যেকোনো মুহুর্তে আমার ডাক পড়তে পারে হাইয়ার হেড কোয়ার্টারে। অপেক্ষা করছি তাঁর জন্য। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছেও একটা ডিও পাঠিয়েছি। একই প্রকারের ডিও পাঠিয়েছি চীফের কাছেও। লেঃ জেনারেল হাসান মাশউদ। কেনো জানি লোকটাকে আমার পছন্দ নয়। আমি এই ভদ্রলোককে কমান্ডেন্ট হিসাবে পেয়েছিলাম এসআই এন্ড টি তে (স্কুল অফ ইনফ্যান্ট্রি এন্ড ট্যাক্টিক্স) সিলেটে। উনি বিএনপি ঘরোয়ার লোক।
আমার মা বেচে নেই কিন্তু শাশুড়ি মা বেচে আছেন। আমার খুব শখ ছিলো মা যদি দেখে যেতে পারতেন আমার একটা স্থায়ি ঠিকানা হচ্ছে ঢাকায়, খুব ভালো লাগতো। আমার শাশুড়ি আমার সাথেই থাকেন মীরপুরে। তাঁর ও খুব শখ আমার নতুন বাড়িতে তিনি থাকবেন। আমার খুব একজন মানুষ তিনি। দোয়া করি যেনো এই সব মা গুলিকে অনেক হায়াত দেন।
ইদানিং যেনো সব কিছু খুব ফাস্ট মুভ করছে। রিভার সাইড সুয়েটার্স এর ব্যাপারেও অনেক এগিয়ে গিয়েছি। কথাবার্তা চলছে বটে কিন্তু নাজিম সাহেবের মতিগতি খুব একটা স্টেবল মনে হচ্ছে না। আসলে তাঁর কাছে কয়েক কোটি টাকা লস কোনো ব্যাপারই না। মাঝে মাঝেই আমি নাজিম উদ্দিন সাহেবের আস্তনায় যাই। কিন্তু তাঁর সব সাংগ পাংগরা এতোটাই দুর্ব্রিত্ত যে, ওদের সাথে আমার যায় না। তারপরেও আমি বিশেষ কারনেই তাঁর সাথে একটা ভালো সম্পর্ক রাখছি।
তৌহিদের সাথে আমার প্রতিনিয়ত যোগাযোগ অব্যাহত আছে। সে চায় আমি ফ্যাক্টরীটা নেই। তৌহিদ আমাকে জানালো যে, এই ফ্যাক্টরীতে জনাব মোহসীন নামে একজন ডিএমডি হিসাবে কাজ করতেন। গার্মেন্টস লাইনে তিনি এতোটাই পাকা যে, যদি তাকে খুজে পাওয়া যায়, তাহলে আমার জন্য খুবই ভালো হয়। কারন তিনি মার্কেটিং জানেন, কষ্টিং জানেন, প্রোডাকসন জানেন এবং অত্যান্ত ভালো একজন মানুষ। আমি মীরপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকেই সবকিছু তৌহিদের মাধ্যমে ফ্যাক্টরীর সব বিষয়ে আপডেট নেই। লুতফর রহমান সাহেব কি করছেন, তাঁর মোটিভ কি, ইত্যাদি।
এর মধ্যে আমি ফা এপারেলস এ ভিজিটে গিয়েছিলাম, সাভারে, দেখেছি যে, প্রায় সব ওয়ার্কাররা বসে আছে। এখন নাকি কাজ নাই। জাবের জানালো যে, এটা একটা অফ সিজন, আর অফ সিজনে ওয়ার্কারদের কাজ না থাকলেও ছাটাই করা বুদ্ধিমানের কাজ না। কারন পিক টাইমে আবার ওয়ার্কার পাওয়া যায় না। সাথে লিখনকে নিয়ে গিয়েছিলাম। লিখনও আমাকে খুব একটা ভালো ফিডব্যাক দিতে পারলো আসলে একটা ভাল ফ্যাক্টরীর কি ক্রাইটেরিয়া থাকে। শুধু একটা কথা বল্লো যে, কমপ্লায়েন্স এর ব্যাপারে আরো কিছু কাজ করতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কমপ্লায়েন্স আসলে কি? এই কমপ্লায়েন্স মানেও আমাকে লিখন ভালো করে বুঝাতে পারলো না। হয়তো আমি বুঝবো না বলেই খোলাসা করে বলে নাই।
যাই হোক, আমি বারবার কেনো জানি রিভার সাইড সুয়েটার্স এর দিকে ঝুকে যাচ্ছি। তউহিদকে বললাম, মোহসীন সাহেবকে খুজে বের করো, আমি তাঁর সাথে কথা বল্বো। দেখি কোনো আইডিয়া দিতে পারেন কিনা।
আমার ব্রিগেড কমান্ডার আমার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি বুঝতে পারছি তিনিও খুব আপসেট। যখন কোনো ব্রিগেড লেবেলের অনুষ্ঠান হয়, তিনি আমাকেও সিওদের সাথে একতা চেয়ার রাখেন, কিংবা যখন সিওদের একান্ত কোনো মিটিং করেন বা এই জাতীয় কিছু এরেঞ্জ করেন, তিনি আমাকেও ডাকেন। অনেক সময় মজিদকে ডাকেন না। কারন তিনি এইটুকু জানেন যে, আল্টিমেটলী মজিদকে বল্লেও মজিদ শেষ পর্যন্ত আমাকে এসেই বলবে। তাঁর থেকে ভালো অন্যান্য সিওদের সাথে কমান্ডার আমাকেই ডাকেন, মজিদকে নয়। ব্যাপারটা ভালো লাগে, কিন্তু তারপরেও মনের ভিতরে একটা কি যেনো খস খস করতেই থাকে। কমান্ডারকে বললাম, স্যার, আমি কি এম এস এর সাথে দেখা করতে পারি? আমার জানার খুব শখ আসলে আমার প্রোমোশন না হবার পিছনের রহস্য টা আসলে কি? এটা কি ১৩ লং কোর্সের অফিসার আমি এই জন্য? যদি সেটাই হয় তাহলে এই প্রোমোশন বোর্ডে কিছু কিছু ১৩ লং কোর্সের অফিসারদের কিন্তু প্রোমোসন হয়েছে। তাহলে ওরা কি বিএনপি ঘেষা? আমি তো কোনো রাজনীতি করি না। এমন কি আওয়ামিলীগও করি না। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় লুকিয়ে আছে রহস্যটা? কমান্ডার শেষ পর্যন্ত এম এস জেনারেল সফিকের সাথে আমাকে দেখা করিয়ে দিলেন। সকালেই আর্মি হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলাম। অনেকদিন পর আসলাম আবার আর্মি হেডকোয়ার্টারে। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নতুন অফিসার, নতুন নতুন মুখ।
স্যার দেখা দিলেন। প্রথমেই আমার কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন, আমি স্যারকে চিনি আগে থেকেই, কিন্তু খুব একটা ব্যক্তিগত সখ্যতা নাই। অনেক কিছু নরম্যাল কথা বলার পর স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো কি কারনে আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছো? আমি বললাম যে, স্যার বেসিক্যালি আমি অনেক বছর আগে থেকেই একটা বিকল্প অপসন খুছিলাম কিভাবে আমার চাকুরীর ফিল্ড চেঞ্জ করা যায় কিন্তু সেটা যেভাবেই হোক ব্যাটে বলে মিলছিলো না। কিন্তু পর পর দুবার সুপারসিডেড হবার কারনে প্রক্রিয়াটা এবার আমি শুরু করতে চাই। কিন্তু তাঁর আগে আমার খুব জানার ইচ্ছা যে, আসলে কোন কারনে আমার বা আমার মতো আরো কিছু অফিসারের প্রোমোশন হয় নাই। এটা তো আমাদের জানার একটু ইচ্ছে হতেই পারে স্যার। আপনি যদি আমাকে খোলামেলা বলতেন, হয়তো নিজের কাছে একটা জবাবদিহিতার সুযোগ পেতাম।
স্যার খুব মুচকী হেসে বললেন, দেখো আখতার, আমি আসলে প্রোমোশন দেওয়ার মালিক নৈ, আমার কাজ তোমাদের ফাইলগুলি ঠিকঠাক মতো বোর্ডে দেয়া আর বোর্ডের কাজ সেগুলি বিশ্লেষন করে কাকে কিভাবে কি করবেন সেটা করা। হ্যা, প্রতিটা ফাইলে অনেক মন্তব্য থাকে, অনেক অব্জারভেশন থাকে, সেগুলি কাউকে কাউকে আবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়, বা কন্সার্ন কমান্ডাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে জানানো হয় যাতে ওই অফিসারকে তারা জানাতে পারেন। তবে তোমার ব্যাপারে পার্টিকুলার কোনো বড় ধরনের অভিযোগ বা অব্জারভেশন ছিলো না। একটা পি ই টি তোমার এ সি আর থেকে মিসিং আছে, সেটা ছাড়া আর তেমন কোনো অব্জারভেশন পাওয়া যায় নাই। কিন্তু এসব হচ্ছে মামুলি ব্যাপার, বোর্ডে অনেক জেনারেল গন আরো কিছু উত্থাপিত হয়তো করেন যা সব সময় ফাইলে লিপিবদ্ধ করেন না, হোয়াইট, গ্রে বা ব্ল্যাক মন্তব্য থাকে যা আমি তোমাকে এই মুহুর্তে সেসব বলতে পারবো না। তোমার কোর্স মেট আছে মেজর ওয়াকার। সেটা নিয়ে এক সময় সম্ভবত তুমি ওর ফাইলটা নিয়ে কাজ করেছিলা, যেখানে বেশ কিছু মন্তব্য তুমি লিখেছো।
আমি হাসলাম। আর বললাম, স্যার, এই আর্মির জন্য আমি আমার পরিবারকে পর্যন্ত সময় দিতে পারি নাই। জীবনের এই ১৮/১৯ বছরের মধ্যে প্রায় সময়ই শুধু আর্মির সার্ভিস দেয়ার জন্য ম্যারেড ব্যচলর হিসাবেই মেসে মেসে কাটিয়েছি। আজ এতো বছর পর বুঝলাম, আসলে এটা আমার কখনো আপন ছিলো না। যাই হোক, আমি আজো জানতে পারলাম না কি কারনে আসলে আমার প্রোমোশনতা হলো না। আমি স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, জি এস ও -২ (অপ্স) ছিলাম, আর্মি হেড কোয়ার্টারে কাজ করেছি, সি জি এস এর সাথে কাজ করেছি, চীফের সাথে কাজ করেছি, অন্তত ৫ থেকে ৬ টা জেনারেলের সাথে ডাইরেক্ট কাজ করেছি, বিপসটের মতো একটা জায়গায় একা প্রায় ৩৫ টা দেশের সাথে ট্রেনিং কোওর্ডিনেট করেছি একা। আসলে এসবের কোনো মুল্য ছিলো না। কিন্তু যারা সারা বছর ক্যাটেগরি সি হয়ে আরাম আয়েস করেছে, কাজে ফাকি দিয়েছে, ওরা অপদার্থ বলে কোনো সিনিয়ররা পর্যন্ত ওদেরকে কোনো কাজ দিতে চাইতো না, তারাই সময় মতো আমাদের মাথায় বসে অধিনায়কগিরি করে আর আমরা তাদের অধীনে উপ অধিনায়ক, কিংবা বড় জোড় কোনো একটা ইউনিটে বা সংস্থায় পার্মানেন্ট সুপারসিডেড হয়ে কলুর বলদের মতো কিছু বেতনের জন্য কাজ করে যাই। আমার এই বেতনের অর্ধেক তাকাই তো খরচ হয়ে যায় আমার সিগারেটের পিছনে। আর্মির বাইরের দুনিয়াটা আমি দেখি না, কিন্তু ওটা যে এই আর্মির থেকেও অনেক বড় একটা পরিসর সেটা আমার জানা। আমি স্যার এপেন্ডিক্স যে সাবমিট করলে কাইন্ডলী আমার এপ্লিকেশনটা ফরোয়ার্ড করবেন। আমাকে অন্তত এই উপকারতা করবেন। আমি আপনার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ থাকবো। সবাই এই আর্মিতে আজীবন থাকবে না। হয়তো আবার আমাদের দেখা হবে বাইরের কোনো বড় পরিসরে যেখানে আমার আপনার চেয়ারের লেবেল সমান। আমি স্যার চীফকেও বলে যাবো কিছু কথা। উনাকে একটা ডিও লিক্ষেছি, প্রধান মন্ত্রীকেও। দেশের একজন নাগরীক হিসাবে তিনি আমার প্রধান মন্ত্রী, তাঁর কাছে আমার কষ্টের কথা বলাই যায়। যদি উনি সময় দেন, তো ভালো, না দিলে হয়তো আমার কিছু করার নাই।
সফিক স্যার আমাকে শান্তনার বানী দিয়ে বললেন, দেখো আখতার, সময় পালটায়, সময় সব সবার সময় এক রকম যায় না। আরেকতা বার সুযোগ নাও, দেখো কি হয়। দুবার যখন হয় নাই, তৃতীয় বার তো হতেও পারে। কিন্তু তুমি যদি এপেন্ডিক্স-জে দাও, তখন তোমার এপ্লিকেশন থাকাকালে আমরা ইচ্ছা করলেও তোমার ফাইল পরবর্তী বোর্ডে পাঠাতে পারবো না। সেক্ষেত্রে তোমার প্রোমোশন হয়তো কন্সিডার করবে না যা একটা সুযোগ ছিলো, সেটাও তুমি হারাবা। আমি বললাম, স্যার, অফিসে যেতেই ভালো লাগে না। এতো লম্বা সময় কাটাবো কিভাবে? জুনিয়র আন কোয়ালিফাইড একজন ছেলে আমার অধিনায়ক হিসাবে মাথায় ছড়ি ঘুরাবে, আর আমি প্রতিটি মুহুর্ত এটা হজম করে করে বেচে থাকতে হয়তো পারবো না।
যাই হোক, চলে এলাম। কিন্তু জানা হলো না আমার প্রোমোশন না হবার মুল রহস্য কি।
আমি রীতিমত হন্যে হয়ে একটা ব্যবসার কথা চিন্তা করছি। রিভার সাইড সুয়েটার্স যদি শেষ পর্যন্ত না নেয়া হয়, সেক্ষেত্রে আমি আরো কিছু বিকল্প চিন্তা করছিলাম। এই চিন্তা থেকে আমার কোর্সমেট জাবেরের সাথে ফোনে কথা বলি। কারন জাবের নিজেও একটা ফ্যাক্টরী চালায়, নাম “ফা এপারেলস”, সাভার। জাবের আমার ব্যবসার চিন্তাভাবনা শুনে বল্লো যে, আমি ওর সাথেও ফা এপারেলসে পার্টনারশীপ করতে পারি যদি চাই। ওখানে ইতিমধ্যে আমার আরেক কোর্সমেট মেজর বশীর আছে, আর তাছারা আরো বেশ অনেক গুলি কোর্সমেট ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাজেট ইনভেষ্টমেন্ট করেছে। তাঁর মধ্যে আছে মেজর সালাম, মেজর জসীম, মেজর নওরোজ, আরো অনেকে। অনেকেই নাকি প্রায় প্রত্যেকেই কমপক্ষে ১০ লাখ করে টাকা ইনভেষ্ট করেছে। কেউ কেউ বেশীও করেছে। ফলে আমি যদি চাই, তাহলে আমিও ওখানে ওদের মতো ইনভেষ্ট করতে পারি। জাবের রাতে আমার বাসায় এলো। সাথে বশীর। মীরপুরের বাসায় আমরা সবাই প্রায় ঘন্টা দুয়েক আলাপ করলাম। কিন্তু আলাপের মধ্যে আমি কিছুটা বিভ্রমের গন্ধ পাচ্ছিলাম।
বিভ্রমটা তাহলে কি? আমাকে জাবের আর বশীর প্রোপোজাল দিলো যে, লাভে টাকা খাটাইতে। যদি লাভ হয় তাহলে পার্সেন্টেজ অনুযায়ী আমাকে লাভ দেয়া হবে। আমি তখন জাবেরকে বললাম যে, যদি লাভ না হয় এবং লস হয় তখন কি হবে? জাবের আমাকে বল্লো যে, লসের ভাগিদার ওরা, কিন্তু লাভের ভাগিদার থাকবো আমরা। আর এভাবেই নাকি অন্যান্য কোর্সমেটরা টাকা খাটিয়েছে। ব্যাপারটা আমার কাছে বিশেষ সুবিধার মনে হলো না। আমি জাবেরকে বললাম, আমার ইনভেষ্টমেন্টের সমান পরিমান শেয়ার দিতে আপত্তি কি? কিন্তু সেটা তারা রাজী নয়। আমি ব্যবসা বুঝি না কিন্তু হালাল হারাম বুঝি। আমার কাছে মনে হলো, জিনিষটা হালাল নয় যে, শুধু লাভ নেবো, লস নেবো না। আবার আমি এক অর্থে পার্টনার কিন্তু আবার শেয়ার হোলডার না। কনফিউজিং একটা স্টেট।
আমি জাবেরকে রিভার সাইড সুয়েটার্স এর কথা বললাম যে, আমি একটা ফ্যাক্টরী নিয়ে কথা বলতেছি। যদি ওটা হয়ে যায়, তাহলে আর জাবেরদের সাথে আমি যাচ্ছি না। জাবের আমাকে ডিসকারেজ করলো যে, তুই আগে আমার ফ্যাক্টরিটা দেখ, তারপর অন্য ফ্যাক্টরী নিয়ে ভাবিস। বললাম, আমি এম্নিতেও জাবেরে ফ্যাক্টরীতে ভিজিট করতে যাবো, টাকা ইনভেষ্ট করি আর নাইবা করি, অন্তত একটা অভিজ্ঞতা তো হবে। ডেট ঠিক করলাম যে, আমার এক আত্তীয় আছে, বেক্সিমকোতে চাকুরী করে, ওকে নিয়ে আগামী বন্ধের দিন ফা এপারেলস ভিজিটে যাবো। জাবের এবং বশীর চলে গেলো। আমি রিভার সাইডের মধ্যে বেশী টান অনুভব করলাম। অনেক রাত অবধি আবার তৌহিদের সাথে ফ্যাক্টরী নিয়ে কথা বললাম।
কথা বললাম, কিভাবে শেয়ার ট্রান্সফার করতে হয়, জয়েন্ট স্টক কি, ইত্যাদি। তৌহিদ বলল যে, হিরু নামের এক ভদ্রলোক আছে, যে এই সব শেয়ার ট্রান্সফার কাজগুলি করে। ওর সাথে বসে আলাপ করলেই আরো ব্যাপারটা ক্লিয়ার হবে।
রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড ভিজিট করলাম। অনেক সুন্দর একটা ফ্যাক্টরি। আমি গার্মেন্টসের কিছুই বুঝি না। কিন্তু ওভারঅল পরিবেশ, স্পেস, মেশিনারিজ, সেটআপ দেখে মনে হলো, জিনিষটা সুন্দর। ফ্যাক্টরীর বিভিন্ন সেকসন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তৌহিদ আমাকে দেখালো। সাথে আনসার নামে একজন লোক ছিলো যে, সিকিউরিটি ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে, লোকাল। তৌহিদ যেখানেই যায়, এই আনসারকে নিয়েই যায়। শুনলাম, আনসার নাকি তৌহিদের একজন আত্তীয়ও বটে। ফ্যাক্টরীতে ঘুরে দেখার সময় বুঝলাম, কারেন্ট লাইন কাটা। প্রায় ৭/৮ মাসের কারেন্ট বিল না দেয়ায় বিদ্যুৎ অফিস লাইন কেটে দিয়েছে। ফলে কয়েকটা মেশিন চলে জেনারেটর দিয়ে। এদিকে গ্যাস লাইনও বিচ্ছিন্ন কারন গ্যাস বিল দেয়া হয় না প্রায় ৫/৬ মাস যাবত। আজিম গ্রুপের কিছু কাজ চলছে সাবকন্ট্রাক্ট হিসাবে। দেখলাম মোট ১২ থেকে ১৫ জন ওয়ার্কার নীচ তলায় কাজ করছে অথচ এখানে একসময় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করতো। লুতফর রহমান সাহেব ফ্যাক্টরীতে ছিলেন না। উনি হয়তো জানেন না যে, আমি এটার উপর গবেষনা করছি।
ফ্যাক্টরী ভিজিট করার সময় আমি অনেক নতুন নতুন মেশিনারিজ দেখলাম, এটাই আমার ব্যবসায়ীক কোনো প্রতিষ্ঠানে এই প্রথম ভিজিট। ফলে আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, যে, এই ফ্যাক্টরী যদি আমি চালানোর জন্য নেই, তাহলে কত টাকা নিয়ে নামতে হবে, আর কিভাবে কিভাবে অর্ডার পাবো, কিভাবে কোথায় বায়ার পাবো ইত্যাদি। মনে মনে এটাও ঠিক করলাম যে, আমার মতো অনেক আর্মি অফিসাররাই বিকল্প কিছু ব্যবসার কথা ভাবছেন এই মুহুর্তে। অনেকের প্রোমোশন হয় নাই, অনেকেই চাকুরী থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পায়তারা করছে। যদি বাজেটের সমস্যা হয়, তাহলে তো আমি ওইসব অফিসারদের সাথে সমন্নয় করে একটা পার্টনারশীপ করেও ব্যবসাটা চালাইতে পারি। ফলে এ মুহুর্তে যাদের নাম আমার মাথায় এসছিলো তারা হচ্ছেন- ফেরদৌস স্যার, ১০ লং কোর্সের ফারুক স্যার, ১০ লং কোর্সের কে এম সাফিউদ্দিন স্যার। কারন উনারা এক সময় আমাকে ব্যবসার কথা বলেছিলেন। দ্বিতীয় যে পয়েন্টটা আমার মাথায় আসলো, তা হলো, আমার এক আর্মির বন্ধু আছে মেজর মাসুদ ইকবাল। ১৩ লং কোর্সের, তানির হাসবেন্ড। আমার খুব ভালো বন্ধু। ও এখন কোনো গার্মেন্টেসে চাকুরী করে, নাম অর্নব সুয়েটারস। ওরেও তো আমি একটা প্রোপোজাল দিতে পারি যদি আমার সাথে পার্টনারশীপ করে মন্দ কি। তাছাড়া আমাদের এক আত্তীয় লিখন তো বহুদিন যাবত গার্মেন্টস লাইনে আছে, ওর কাছ থেকেও একটা বুদ্ধি পরামর্শ নিতে পারি। লিখন বেক্সিমকোতে আছে। পয়েন্টগুলি আমি লিখে নিলাম।
আজ আরেকটা কাজ করে এসছিলাম যে, আমি পরপর দুটু ডিও লেটার ড্রাফট করে এসছি। একতা সেনাপ্রধানের জন্য, আরেকটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য। বাসায় গিয়ে এগুলি আবার আরেকবার চেক করে আমি সরাসরি এই দুইজনকে অফিশিয়ালী পাঠাইতে চাই।
রিভার সাইড সুয়েটারস ফ্যাক্টরীটা আমার গ্রামের পাশে। কিন্তু কোনোদিন আমার চোখে পড়ে নাই যে, এখানে এমন একটা রপ্তানীমুখী কারখানা আছে। অথচ এই পথ দিয়েই আমি আমার গ্রামে যাই। আজ মনে হলো, এতা আমার এতো কাছের একটা ফ্যাক্টরি, হলে তো খুব ভালো হয়। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনাই করে ফেললাম যে, আল্লাহ যেনো আমাকে রক্ষা করেন। আর্মির চাকুরীটা আর ভালো লাগছে না। আমি এর থেকে পরিত্রান চাই।
একটা অদ্ভুদ ঘটনা ঘটে গেলো আজ। লোকটাকে আমি চিনি না, কখনো দেখিও নাই। অথচ আজ আমার সাথে এমন একটা বৈঠক হলো তাঁর সাথে, যা আমি এতোদিন মনে মনে খুবই আশা করছিলাম। একটা ব্যবসা। আমি যেনো আজ সেটার একটা আলো দেখতে পেলাম। ব্যাপারটা কাক্তালীয়ভাবে ঘটে গেলো। মান্নান আমার ভাইতিজা। ও কিছুই করে না। অথচ সংসারটা বেশ বড়। আমাকে মান্নান গত কয়েকদিন আগে একটা ব্যাপারে ফোন করে বল্লো, কাকা, আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। বললাম, তাহলে শুক্রবার দিন আসো মীরপুর যেখানে আমি বাড়ি বানাচ্ছি সেখানে। মান্নান আমার কন্সট্রাকসন সাইটে এলো দুপুর বারোটার দিকে। মান্নান যেটা বলতে এসেছিলো সেটা হলঃ
নাজিমুদ্দিন নামে আমাদের ইকুরিয়ায় একজন চেয়ারম্যান আছে যিনি বসুন্ধরা গ্রুপের সাথে জড়িত। নাজিমুদ্দিন আমাদের ওখানে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে জমি ক্রয় করেন, তারপর ওই জমি বসুন্ধরাকে লাভের উপর বিক্রি করে দেয়। তাতে প্রতি শতাংশে নাজিমুদ্দিন পাবলিককে দেয় এক লাখ টাকা, আর বসুন্ধরাকে বিক্রি করার রেট পায় সে আরো ত্রিশ হাজার টাকা বেশি। ফলে প্রতি বিঘায় সে নয় লাখ টাকার মতো লাভ করে। যেহেতু প্রতিটি লোকের কাছে নাজিমুদ্দিনের যাওয়া সম্ভব না, ফলে নাজিমুদ্দিন লোকালি কিছু এজেন্ট রেখেছে যারা প্রতি শতাংশে হাজার দশ টাকা কমিশন পায়, তারাই পাবলিকের কাছ থেকে জমি কিনে নাজিমুদ্দিনকে দেয়। তাতে নাজিমুদ্দিনের আসলে কোনো কাজই করতে হয় না কিন্তু ফাক দিয়ে প্রতি শতাংশ জমিতে বিশ হাজার টাকা লাভ পায়। বসুন্ধরা এখানে প্রায় কয়েকশত একর জমি ক্রয় করার কথা ভাবছে একটা হাউজিং করবে বলে। মান্নান চাচ্ছিল নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে এমন একটা এজেন্টগিরি যেনো পায়। মান্নানের পক্ষে এটা কিছুতেই সম্ভব না, কিন্তু আমি যদি নাজিমুদ্দিনকে বলে দেই, তাহলে এটা অনেক সহজ এবং নাজিমুদ্দিন মান্নানকে এজেন্ট করবে বলে ওর ধারনা। মান্নানের সাথে শামসুদ্দিন এবং জয়নাল নামের আরো দুজন ভদ্রলোক আছেন, যারা মান্নানের সাথে চলে আর এই বুদ্ধিটা আসলে এই দুই ভদ্রলোকই মান্নানকে দিয়েছে বলে মান্নান আমাকে জানালো। মান্নান আরো জানালো যে, সামসুদ্দিন সাহেব নাকি কোনো এক সময় আমার বড় ভাই হাবীব উল্লাহ্র সাথে ছোট বেলায় একসাথে কেএল জুবিলী স্কুলে পরাশুনাও করতো। যাই হোক, তিনি হাবীব ভাইয়ের সাথে পড়তো কিনা সেটা আমার যাচাইয়ের বিষয় নয়, আমার বিষয় হচ্ছে নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে মান্নানকে একটা এজেন্টশীপ নিয়ে দেওয়া।
আমি প্রাথমিকভাবে প্রথমে শামসুদ্দিন সাহেব এবং জয়নাল সাহেবের সাথে ব্যাপারটা বুঝার জন্য আমার বাসায় দাওয়াত করি। দেখলাম, ব্যাপারতা সত্য। তাদের কাছ থেকে এতা জানলাম যে, নাজিমুদ্দিন উক্ত এলাকায় একজন অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী এবং পয়সাওয়ালা লোক। কিন্তু একেবারেই অশিক্ষিত। তাঁর অক্ষরজ্ঞান বলতে কিছুই নাই। আর সারাক্ষন মদ আর মেয়ের নেশায় থাকে। বিএনপি র রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাদের কাছে সব কথা শুনে আমারো নাজিমুদ্দিনের সাথে দেখা করার একতা ইচ্ছা জেগেছিলো। সেই সুবাদে আমি গত মিটিং এ এই সামসুদ্দিন এবং জয়নাল সাহেবকে বলেছিলাম, নাজিমুদ্দিন সাহেবকে আমার অফিসে দাওয়াত দেয়া যায় কিনা। তারা একতা আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং নাজিমুদ্দিন সাহেবকে আমার অফিসে নিয়ে আসবেন বলে কথাও দিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে আজ নাজিমুদ্দিন সাহেব আমার অফিসে এসেছিলেন। বিকেল তিনটায় মীরপুর এম পি গেট থেকে আমাকে এম পি ফোন দিয়ে জানালো যে, বেশ কয়েকজন গেষ্ট এম পি চেক পোষ্টে আমার কাছে আসতে চায়, তাদের একজনের নাম জনাব নাজিমুদ্দিন। আমি কাল বিলম্ব না করে বললাম, উনাদের আসতে দিন, আমারই গেস্ট।
উনারা আমার অফিসে এলেন, আমি ইউনিফর্ম পড়াই ছিলাম। ফিল্ড মেসে লুচী, মাংশ আর অন্যান্য ফলের অর্ডার দিয়ে বললাম, যতো তাড়াতাড়ি পারে যেনো সার্ভ করে। আমরা অফিসে আলাপে মগ্ন হলাম। জনাব নাজিমুদ্দিন, সামসুদ্দিন, জয়নাল সাহেব, মান্নান আর আরো একজন তাঁর সাথে ছিলো। বুঝলাম, নাজিমুদ্দিন সব সময় একতা দল নিয়ে চলে। ভীষন কালো রঙ এর চেহাড়া, বয়স প্রায় ৫০ এর উপর। লাল লাল চোখ। কিন্তু আদব কায়দা বেশ বুঝে। আমি কুশল বিনিময় করে উনার কথা শুনতে চাইলাম। কিছু বলার আগেই নাজিমুদ্দিন তাঁর কি কি আছে, কি করে, কোথায় আরো কি কি করবে লম্বা একটা ইতিহাস বলা শুরু করলেন। আমারো প্ল্যান ছিলো লোকটা সম্পর্কে জানা এবং বুঝা আসলে তাঁর কি ক্ষমতা আছে আর কি কি করতে পারে সেটা জানা। কথায় কথায় জানলাম যে, উনার অনেক ব্যবসা আছে। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবসা হচ্ছে বসুন্ধরার সাথে উনার পার্টনারশীপ। বসুন্ধরার যে মালিক জনাব শাহ আলম (আকবর সোবহান) তাঁর সাথে প্রায় হাজার কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট। তাঁর আরো গার্মেন্টস ব্যবসা আছে, ঢাকা টাওয়ারের মালিক উনি, শ্যামলী টাওয়ারের ও মালিক উনি। এটা আমাদের শ্যামলী তে অবস্থিত, যা এখনো আন্ডার কন্সট্রাকসন অবস্থায় আছে। এটার দেখভাল করেন বাবুল ভাই। যিনি আমার অফিসে বর্তমানে হাজির আছেন। বাবুল সাহেব আবার কেরানীগঞ্জের শাখা বিএন র সভাপতিও। এ ছাড়া উনার আরেকতা ব্যবসা আছে পাক-বাংলা সিরামিক। আছে একটা ফিল্ম স্টুডিও, যার নাম নাফিম নাদিম। সারোয়ার নামে এক ভদ্রলোক এই ফিল্ম স্টুডিওটার দেখভাল করেন। তিনিও আমার অফিসে আজ হাজির ছিলেন। গল্প করতে করতে নাজিমুদ্দিন সাহেব বললেন যে, যদিও তিনি একতা গার্মেন্টস ইন্ডাষ্ট্রিজের মালিক কিন্তু এটা এখন ভালো চলে না। প্রতিমাসেই শ্রমিকরা বেতনের জন্য আন্দোলন করে আর তাঁর বাসায় গিয়ে ঝামেলা করে। লুতফর রহমান নামে এক ভদ্রলোক ফ্যাক্টরীটা চালান কিন্তু সে ভদ্রলোক একজন জুয়ারী বলে যেমন কোনো মাল শিপমেন্ট করতেও পারেন না, আর যে সাব কন্ট্রাক্ট করেন সেই টাকা শ্রমিকদের না দিয়ে নিজেই নিয়ে নেন। কারেন্ট বিল পেন্ডিং, গ্যাস বিল পেন্ডিং, শ্রমিকদের সেলারী পেন্ডিং। বেশ লসে আছেন। তাঁর মধ্যে আবার সোসাল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংকে বড় একটা লোন রয়ে গেছে যেটা গার্মেন্টস চালিয়ে পরিশোধ করার কথা কিন্তু তারা কেউ এটা করছে না। তিনি চাচ্ছেন এখন এই গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিটা কাউকে দিয়ে দেবার জন্য। আমি তাঁর কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম আর অন্য কিছু মনে মনে ভাবছিলামও।
বুঝলাম, নাজিমুদ্দিন সাহেব গল্প করার মানুষ, খারাপ না তবে তাঁর সাংগপাংগরা একেবারেই যে ভাল মানুষ নয় সেটা বুঝতে আমার সময় লাগে নাই। নাজিমুদ্দিন সাহেব আমার উপর একদিনেই মনে হলো খুব খুশী। কথায় কথায় বলেই ফেললেন, মিয়া ভাই, দেখেন না আপনি ফ্যাক্টরিটা চালাইতে পারেন কিনা। শুনলাম, আপনি নাকি আর চাকুরী করতে চান না, যদি মনে করেন যে, আমার এই ফ্যাক্টরিটা চালাইতে পারবেন, তাহলে নিয়াই নেন। আমিও বেচে যাই।
আমি আসলে এমন একটাই পথ খুজতেছিলাম মনে মনে। কিন্তু পাচ্ছিলাম না। আমি নাজিমুদ্দিন সাহেবকে বললাম, যদি আমি নেই তাহলে কিভাবে আপনি দিতে চান? নাজিম ভাই আমাকে জানালেন, আপনি একাও চালাতে পারেন আবার আপনি আমাকে রেখেও চালাতে পারেন। সেক্ষেত্রে ব্যাংকে অনেক কিস্তি পেন্ডিং হয়ে আছে, সেটা রিসিডিউল করতে হবে। রিসিডিউল কি আমি সেটাই তো বুঝি না। এটা একটা ব্যাংকিং টার্ম ব্যবসার সাথে জড়িত। হয়তো ব্যাংকে গেলে এ ব্যাপারে আরো বিস্তারীত জানা যাবে। আমরা যারা আর্মিতে চাকুরী করি বা যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করি তারা ব্যবসার সাথে জড়িত অনেক ব্যাংকিং ফর্মালিটিজ আসলেই বুঝি না। এগুলি বুঝে তারা যারা সরাসরি ব্যবসার সাথে জড়িত।
আমি নাজিম ভাইকে বললাম, তাহলে আমি ফ্যাক্টরীটা সরে জমিনে দেখতে হবে। কি অবস্থায় আছে, কি করা দরকার, ব্যাংকিং সেক্টরে কি কি সমস্যা আছে, সব জেনে আমি জানাতে পারবো আসলে আমি চালাতে পারবো কিনা। তিনি আমাকে বললেন যে, এখন বর্তমানে জনাব লুতফর রহমান চেয়ারম্যান হিসাবে ফ্যাক্টরী চালায়, আর সেটা পুরুটাই সাব কন্ট্রাক্ট বেসিসে। কিন্তু লুতফর রহমান সাহেব নাজিম ভাইকে এ ব্যাপারে কিছুই জানায় না। ব্যাংকের লোন গুলিও পরিশোধ করে না, আবার সময় মতো শ্রমিকদের বেতন ভাতাও দেয় না। এই মিলে প্রতিমাসেই শ্রমিকরা আন্দোলন করতে করতে তাঁর বাসায় গিয়া হাজির হয়, অপারগ হয়ে শেষ পর্যন্ত নাজিম ভাইকেই তাঁর অন্য সোর্স থেকে তাদের পারিশ্রমিক দিতে হয়। ওখানে লুতফর রহমানের সাথে নাজিম ভাইয়ের একজন আত্তীয় তৌহিদ নামের একটি ছেলে প্রোডাক্সনের কাজ করে। তাঁর সাথে কথা বললে হয়তো আরো বিস্তারীত জানতে পারবেন।
আমি নাজিম ভাইকে বললাম, যে, আমার যেহেতু এই মুহুর্তে গাড়ি নাই, আগামীকাল যদি কাউকে দিয়ে আমাকে একতা গাড়ির লিফট দিয়ে ফ্যাক্টরী পরিদর্শন করানো যেতো, হয়তো আমি ব্যাপারটা নিয়ে আরো একটু সিরিয়াসলী ভাবতে পারতাম। তিনি রাজী হলেন পরেরদিন গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন বলে।
নাজিম উদ্দিন ভাইয়ের সাথে কথা বলার পর রাতে আমি তৌহিদের সাথে অনেক ক্ষন টেলিফোনে কথা বললাম, জানলাম, বুঝলাম যে, ফ্যাক্টরিতে এক সময় কারা কারা ছিলো, তখন কত লাভ হতো, অনেক ভালো একটা পজিসনে ছিলো, আর এর মধ্যে অনেক শেয়ার হোল্ডার মালিকগন ছিলেন, যারা ধীরে ধীরে সরে গেছে। বর্তমানে শুধু লুতফর রহমান আর তাঁর ভাই বাবলুর রহমান ১৫% করে মোট ৩০% শেয়ার নিয়ে চেয়ারম্যান-ডাইরেক্টর আর নাজিমউদ্দিন সাহেব ৭০% শেয়ার নিয়ে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসাবে আছেন। তৌহিদের ভাষ্য অনুযায়ী যা বুঝলাম যে, যদি আমি আগে যারা এখানে মার্কেটিং এর কাজ করতো তাদের কাউকে আনা যায়, তাহলে এই ফ্যাক্টরী পুনরায় চালু করা কোনো ব্যাপার না। তাছারা নাজিম ভাইয়ের টাকার কনো সমস্যা নাই, সে যদি থাকে তো কোনো সমস্যাই না। নাজিম ভাইয়ের দরকার শুধু ঠিক মতো ফ্যাক্টরীটা যেনো চলে। তাকে লাভ দিতে হবে এমন নয়। আর সবচেয়ে আরেকটা বড় ব্যাপার হচ্ছে যে, ফ্যাক্টরীর ভাড়া দিতে হয় না যেহেতু এটা নাজিম সাহেবের নিজস্ব বিল্ডিং। তৌহিদের সাথে কথা বলে আগামীকালের সময়টা ঠিক করলাম, কিভাবে কিভাবে আগানো যায়। একতা পরিকল্পনাও কাগজের মধ্যে লিখে নিলাম।
গত পহেলা সেপ্টেম্বরে আমি আমার মিরপুরের বাড়ির কাজ শুরু করেছি। আমার কেনো যেনো বারবার মনে হয়েছিলো যে, আমার আর বেশীদিন এই আর্মিতে থাকা হবে না। তাই আমার ওই দুইটা ভাবনার সমস্ত কাজ খুব জোরেসোরে শুরু করেছিলাম। আমার হাতে মিশন থেকে প্রাপ্ত টাকা আছে ১১ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা। আর মিটুল মালয়েশিয়ায় ট্রেনিং করার কারনে কিছু টাকা সেভ করতে পেরেছে, তাঁর পরিমান নেহায়েত কম না, প্রায় চার লাখ টাকা। মোট পনেরো লক্ষ টাকা দিয়ে ভাবলাম যে, অন্তত একতলা একটা বাড়ি করলেও আমার থাকার ব্যবস্থাটা হয়ে যায়। মনে অনেক সাহস ছিলো, জোরও ছিলো। আর যেহেতু সিদ্ধান্ত প্রায় চুড়ান্ত করে ফেলেছিলাম যে, আমি আর থাকবো না আর্মিতে, ফলে আমার পিঠ প্রায় দেয়ালেই ঠেকে গিয়েছিলো। অফিসে যেতে ভালো লাগে না, কোথাও কোনো দাওয়াত খেতে যেতে ভালো লাগে না, অফিসাররা বাসায় এলে তাদের সাথেও আগের মতো আর গল্প করতে ভালো লাগে না। এটা একটা অত্যান্ত খারাপ সময় পার করছি।
একদিন শুনলাম যে, পেনশনের টাকা থেকে আগাম নাকি কমুটেশন করে কিছু লোন নেয়া যায়। যোগাযোগ করলাম এফসি আর্মিতে। ব্যাপারটা সত্য। আমি কালবিলম্ব না করে, তাড়াতাড়ি ১০ লক্ষ টাকার একটা লোনের দরখাস্ত করে দিলাম। টাকাটা পেলে আমার বাড়ি করতে খুব কাজে লাগবে। এখানে একটা কথা বলে রাখা খুব দরকার যে, যে জায়গায় আমি বাড়ি বানাচ্ছি, সেই জমিটা আমি কিনেছিলাম আমাদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে। উনি যখন আমেরিকায় ছিলেন, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত জনাব আজাদের মাধ্যমে আমমোক্তার বলে আমি তদানিন্তত প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের কাছ থেকে পৌনে তিন কাঠা জমি সর্বোমোট ১০ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছিলাম। এই সংযোগটা হয়েছিলো আমাদের মীরপুর এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হোসেন খানের মাধ্যমে। এখন আমি সেই পৌনে তিন কাঠা জমির উপর আপাতত চার তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে আপাতত একতলা বাড়ি বানানোর নিয়ত করেছি। কারন বাকী তালা করার জন্য আমার কাছে বাজেট নাই।
আমি প্রতিদিন বাড়ির কাজ তদারকী করতে অফিসের পরে আর্মির জীপ নিয়ে, আর্মির ড্রেস পড়েই চলে আসি। বাড়ির কাজ দেখতে ভালো লাগে। অনেক রাত হয়ে যায় ফিরতে ফিরতে। আমি ক্যান্টনমেন্টের বাসায় থাকি। কিন্তু মন পড়ে থাকে এই নতুন বাড়ির কন্সট্রাকসনে। বদর ভাই একদিন বাসায় আসলেন, বদর ভাই হচ্ছে মিটুলের কলিগ, সিংগাইর বাড়ি। নিতান্ত ভদ্রলোক। কথাত কথায় জানালেন যে, উনার এক আত্তীয় আছেন হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনে। ওখান থেকেও বাড়ি বানানোর জন্য সহজ কিস্তিতে লোন নেয়া যায়। তাঁর নাম সিদ্দিক সাহেব। বদর ভাইকে নিয়েই গিয়েছলাম ওই অফিসে, ভাগ্য খুব ভালো। একতা এপ্লিকেশন করতে বললেন। দুই মাসের মধ্যে নাকি ১৫ লক্ষ টাকার একটা লোন দেয়া সম্ভব। এবার আমার বাজেট দারালো (হাতে ছিলো ১৫ লাখের মতো, পেনসন কমুটেশন থেকে পাবো ১০ লাখ টাকা আর হাউজ বিল্ডিং কর্পোরেশন থেকে পাবো আরো ১৫ লাখ টাকা) মোট ৪০ লাখ টাকা। এই টাকায় আমি একেবারে এক নাগাড়ে চার তলা পর্যন্ত করে ফেলতে পারবো ইনশাল্লাহ। ঠিক ৪০ লাখ টাকায় হবে না জানি, কিন্তু দোকানে আরো লাখ দশেক তাকার মেটেরিয়াল বাকীতে নিলে হয়েই যাবে। আর সেই বাকীর তাকাগুলি আমার পেনসনের পর যে টাকা পাবো তা দিয়ে শোধ করা সম্ভব। অন্তত একটা কাজ হয়ে যাচ্ছে। একটা ফ্লোর নিয়ে যদি আমি আমার পরিবার নিয়ে থাকি, তাহলে বাকী ফ্ল্যাট গুলি থেকে একটা ভালো ইনকাম আসবে যা আর্মির বেতন থেকেও ডাবল। তাঁর উপরে মিটুল চাকুরী করে। আমার চলায় কোনো অসুবিধা নাই।
এখন পরবর্তী যে জিনিষটা দরকার, তা হচ্ছে একটা ব্যবসার প্ল্যান করা। আমি এই ব্যাপারে চারিদিকে খোজ খবর নিচ্ছি। দেখা যাক, কি হয়।
ফেরদৌস স্যারের পোষ্টিং হয়ে গেলো, তাঁর পরিবর্তে ৪ ফিল্ডের সিও হিসাবে পোষ্টিং হয়েছে প্রধান মন্ত্রীর এডিসি হিসাবে কাজ করতো ১৪ লং কোর্সের আব্দুল মজিদের। এবার মজিদ সম্পর্কে কিছু বলি। আমি যখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে কাজ করছিলাম, তখন একটা রিউমার উঠলো যে, খালেদা জিয়া তাঁর এডিসি হিসাবে মেজর আব্দুল মজিদকে চান। এমএস ব্রাঞ্চে তখন আমার দোস্ত মেজর আকবর ডিএমএস হিসাবে কাজ করছে। আমরা তখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে প্রায় সাতজন কোর্সমেট একসাথে কাজ করছি। আমি এমটি ডাইরেক্টরে, ওয়াহিদ এমটি ডাইরেক্টরে, মেজর মতি, মেজর সালাম আর মেজর চৌধুরী সবাই এমটি ডাইরেক্টরেটে। মানে আমরাই ৫ জন কোর্সমেট এমটি ডাইরেক্টরেটে কাজ করছি। পুরু সেনাবাহিনীর ট্রেনিং কোনো না কোনোভাবে আমাদের হাতে। মেজর শহীদুল (যাকে আমরা চাচা বলে ডাকি) সে কাজ করে আর্টিলারী ডাইরেক্টরেতে, এমএস ব্রাঞ্চে কাজ করে মেজর আকবর, পিপি এন্ড পি তে কাজ করে মেজর আলমগীর। অন্যান্য ডাইরেক্টরেটে যারা কাজ করে তারাও আমাদের হয় এক কোর্স জুনিয়র বা এক কোর্স সিনিয়র। ফলে পুরা আর্মি হেড কোয়ার্টারের মধ্যে কোথায় কি হচ্ছে তা আমরা দিনের কোনো না কোন সময় একে অপরের কাছ থেকে জেনেই যাই।
ঠিক এমন সময় একটা খবর চাউড় হলো যে, ১৪ লং কোর্সের মেজর মজিদের জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চেয়েছেন যেনো মজিদকে তাঁর ব্যক্তিগত এডিসি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। এটা কোন বিস্ময়কর খবর না আসলে, এটা হতেই পারে যে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজস্ব একজন পরিচিত মানুষকে তাঁর ব্যক্তিগত এডিসি হিসাবে চান। কিন্তু বিস্ময়কর খবরটা হলো যে, যখন কোনো অফিসারের এই ধরনের পোষ্টিং হয়, তখন একটা প্যানেল হয়। সেই প্যানেলে চৌকস অফিসারদের নামের তালিকা থাকে। সেখান থেকে মেধা, শারীরিক যোগ্যতা, ক্ষিপ্রতা, আপটেক, ডিপ্লোমেটিক ভদ্রতা, কিংবা আরো অনেক কিছু বিবেচনা নেয়া হয়। বেষ্ট অফিসারটাই আসলে এতো বড় লেবেলের একটা পদে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। এটা তো শুধু দেশের ভিতরেই নয়, যখন প্রধান্মন্ত্রী দেশের বাইরে যাবেন, এই এডিসিরাই অন্যান্য দেশের বড় বড় জেনারেলদের সাথে ইন্টারেকশনে আসবেন। ফলে মেধাবী, শারীরিক যোগ্যতা, প্রেজেন্টেবল, মেধাশীল, ডিপ্লোমেটিক না হলে তাকে তো নেয়াই ঠিক না।
মেজর মজিদ মেধাশীল নয়, ষ্টাফ কলেজ করে নাই, নিজের আর্মসের আর্টিলারীর গানারী ষ্টাফ কোর্সটাও করতে পারে নাই, কোনো একটা কোর্সে যে টপ করেছে সে রেকর্ডও নাই, তাঁর কোর্স ১৪ তম লং কোর্সের মধ্যে সে একজন শেষের দিকের অফিসার, শারীরিকভাবে সে মেডিক্যালি ফিট নয় কারন সে ক্যাটেগরি “সী’ একজন অফিসার। ক্যাটেগরি সি মানে তিনি মেডিক্যালী আনফিট, এবং কোনো কাজের জন্যই তিনি ফিট নন। তাঁর মধ্যে তাঁর আছে ডায়াবেটিস। এমন একটা অফিসারকে হটাত করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কেনো চয়েজ করলেন? সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো। খোজখবর নিয়ে যখন জানা গেলো, সেটা আরো স্বজনপ্রীতি ছাড়া আর কিছুই না। মেজর মজিদের বাবা খালেদা জিয়ার বাড়িতে মালির কাজ কিংবা কেয়ার টেকারের কাজ করেন বহুবছর যাবত। মজিদের বাবা সেই সুবাদে খালেদা জিয়ার সাথে ব্যক্তিগতভাবে জানা এবং চেনা, এবং বহুবছর যাবত আছেন। খালেদা জিয়া যখন গৃহিণী, অর্থাৎ জেনারেল জিয়া যখন বেচে ছিলেন, মজিদের বাবা তখনো তাদের বাড়িতে মালীর কাজই করতেন। মজিদের বাবা এখন খালেদা জিয়াকে অনেকভাবে অনুরোধ করেছেন যেনো তার ছেলেকে একটা ভাল পোষ্টে রাখেন, পারলে তাঁর এডিসি করে নেন। ব্যাপারটা হয়তো মজিদ নিজেই তাঁর বাবাকে এই রকমের একটা কথা বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদার কাছে পাঠিয়েছেন। হয়তো খালেদা জিয়া আপাতত “এইটা আর কি এমন রিকুয়েষ্ট” মনে করে সেনাপ্রধানকে ব্যাপারটা কার্যকরী করার জন্য বলেছেন। তারপর আর যায় কই। প্রধানমন্ত্রীর একটা কথা সেনাপ্রধানের জন্য আদেশেরই নামান্তর।
সেনাবাহিনীর সমস্ত নর্ম ভেংগে, সমস্ত প্রথা অমান্য করে, পলিসি ব্রেক করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন কাউকে একটা সুযোগ করে দেন, তখন আর বেশী করে ভাবা দরকার হয় না যে, তিনি কতটুকু দেশনেত্রি বা কোনো বাহিনীকে তিনি কতটা সম্মান করেন। বুঝলাম, দূর্নীতির শেকর খুব উপরে। হয়তো কোনো এক সময় এই দলই তাঁর নিজের এ রকম দুর্নীতির কারনে এমন জায়গায় পা আটকে যাবে যখন দাপটওয়ালা অফিসার তাদের আশেপাশে খুজে পাওয়া যাবে না। যখন এই দলের জন্য কোনো চৌকস অফিসার লাগবে, তখন এই মজিদেরা না পারবে হাল ধরতে, না পারবে পুরা ক্রিটিক্যাল সময়ে অন্য কোন অফিসারদেরকে হাতে নিতে। এই দলের ভাগ্যে চরম দূর্ভোগ আছে অদুর ভবিষ্যতে। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিএনপিই একমাত্র প্রথম দল যেখানে দলীয় বিবেচনায় যোগ্ কে বাদ দিয়ে অযোগ্য কোনো অফিসারকে পদায়ন করেছে, আর যোগ্য ব্যক্তিদেরকে অসম্মান করেছে। এর মাশুল হয়তো এই রাজনৈতিক দলকে খুব বেশী ভোগাবে একদিন। সেদিন পর্যন্ত বেচে থাকলেই হয়।
মজিদ ইউনিটে এলো, ফেরদৌস স্যারের সাথে হ্যান্ডিং টেকিং হয়ে গেলো। আমি উপঅধিনায়কই রয়ে গেলাম। কিন্তু আমি এবার এডামেন্ট যে, যতো তারাতাড়ি সম্ভব, আমাকে আর্মি থেকে বের হতেই হবে। মজিদ পরেরদিন ইউনিটের দরবার নিবে। রাতে আমার সাথে একান্তভাবে কথা বল্লো। কি কথা হলো এবার বলিঃ
মজিদ আমাকে ওর অফিসে নিয়ে খুব সমাদর করে বল্লো, স্যার, আপনি যেমন আমাকে চিনেন, আমিও আপনাকে খুব ভালো করেই চিনি। আমি জানি আমার প্রোমোশন হবার কোনো কারন নাই। কিন্তু যেহেতু সুযোগ ছিলো, এটা পেয়েছি। আমি হয়তো ইউনিটের অধিনায়ক কিন্তু আপনি আমার সিনিয়র মানুষ এবং আপনার কোয়ালিফিকেশনের কোনো কমতি নাই। আমি সিও হলেও ইউনিট চালাবেন আপনি, আমাকে শুধু গাইড করবেন আমাকে কি করতে হবে, আর কি করলে ভালো হয়। আপনি আপনার মতো করে অফিস করবেন, ব্রিগেড থেকে যদি কোন অব্জারভেশন না আসে এমন কোনো কাজ ছাড়া আপনি সাধীনভাবে যা খুশী আপনি করবেন, আমার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপ নাই। কিছু কিছু প্রোটকল হয়তো আমাদের মানতে হবে কিন্তু সেটা শুধুমাত্র প্রোটোকলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, আমি মন থেকে আপনাকে জানাচ্ছি যে, আসলে আপ্নিই আমার সিও। আর আমি আপনাকে একটা কথা বলে রাখি, যদিও এবার আপনার প্রোমোশন হয় নাই, কিন্তু আগামিবার আমি নিজে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে আপনার ব্যাপারে জানাবো যাতে আপনি আপনার ডিও প্রোমোশন পান। আসলেই তো আপনার প্রোমোশন হওয়া দরকার ছিলো।
আমি সেদিন মজিদকে কিছুই বলি নাই। মজিদের কি দোষ। দোষ তো আমাদের সিস্টেমের। যে সিস্টেম তাঁর নিজস্ব আইন, নিজের পলিসি, কিংবা ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে জানে না। আর এই কারনেই বারবার অনেক যোগ্য অফিসাররা ঝরে যাবে, আর অযোগ্য অফিসাররা আর্মিতে থেকে যাবে। এই অযোগ্য আর্মি অফিসাররাই একদিন জেনারেল হবে, শিরদাড়া না থাকলেও কাধে চমকপ্রদ স্টার নিয়ে গাড়িতে স্টারপ্লেট নিয়ে, হাতে ছড়ি ঘুরাতে ঘুরাতে বলবে আমি সেনাপ্রধান, আমি অমুক, আমি তমুক। হতভাগ্য জাতি এভাবে পতনের মুখ দেখে।
আমি মজিদকে বললাম, মজিদ, আমি চাই না এই কয়দিনের জন্য আমার অন্য কোথাও ঢাকার বাইরে পোষ্টি হোক, আর আমি চাই, প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা ডিও (ডেমি অফিশিয়াল লেটার) লিখতে। কারন আমি সত্যিই সুপারসিডেড হয়ে আর আর্মিতে চাকুরী করতে চাই না। এই একটা ব্যাপারে তুমি আমাকে সাহাজ্য করলেই হবে। আমাদের মধ্যে আর বেশী কথা হলো না।
আমি এবার নিজের বাড়ি বানানোর জন্য মনযোগ দিলাম। আর আর্মি থেকে বের হয়ে গেলে কি ব্যবসা করবো সেটা নিয়ে একদম সিরিয়াস হয়ে গেলাম। আর এরসাথে আমি একটা এপয়েন্টমেন্ট চাইলাম এমএস (মিলিটারী সেক্রেটারী) এর সাথে দেখা করতে। বর্তমানে এমএস হিসাবে দায়িত্তে আছেন মেজর জেনারেল সফিক স্যার। তিনি সিগন্যালের লোক। আরেকটা ডিও চিঠি লিখলাম, সেনাপ্রধানকে যেনো আমি তাঁর সাথে একটা এক্সক্লুসিভভাবে সাক্ষাত করতে পারি। আমার কিছু কথা বলার আছে, তাই।
অপেক্ষায় আছি, কবে এমএস এবং সেনাপ্রধান আমাকে সাক্ষাত দেন। আমি এর মাঝে প্রধানমন্ত্রীকেও ডিও লেটার লেখার ড্রাফট করতে বসে গেলাম। আর্মি থেকে বের হয়ে যাবার আগে আমি আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা এসব রাঘব বোয়াল টাইপের অফিসারদেরকে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলে যেতে চাই। আর এটা আমার বলার হক আছে।
৪ ফিল্ডের মেইন বডি এরই মধ্যে মীরপুর চলে এসেছে। লেঃ কর্নেল ফেরদৌস অন্যান্য বাকী অফিসারদেরকে নিয়ে মীরপুরে চলে এসেছিলেন। ইউনিটে মেজর আলি, মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, তাহমিনা এবং অন্যান্য সবাই চলে এসছে। ভরপুর ইউনিট। ৪৬ ব্রিগেডের দায়িত্ব অনেক, তারমধ্যে সেনাপ্রধানের বাসভবনের পাহাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের পাহাড়া ছাড়াও ঢাকায় যতো প্রকারের ইন এইড অফ সিভিল পাওয়ারের কাজ হয়, তাঁর সিংহভাগ কাজ আমাদের দায়িত্তের মধ্যে পড়ে। মেজর আলী আমার ৬ ফিল্ডের অফিসার। আমার হাত দিয়েই ওর রেজিমেন্টেশন হয়েছিলো। অমায়িক ছেলে। তাঁর উপর আবার আমার সাথে হাইতিতে মিশন করেছে। এখন আমার ইউনিটে আবার ব্যাটারী কমান্ডার। আমি ওদের সাথে একেবারেই মিলিটারী কমান্ড প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। অন্যদিকে মেজর হায়দার তো পোলাপানের মতো, সারাক্ষন ‘বড়দা” বড়দা” বলেই কথা বলতে থাকে কারন মেজর হায়দার আমার মীর্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছোট ভাই। ওর বাবা সুজা হায়দার ছিলেন আমার আর্টের শিক্ষক। ফলে ওর প্রতিও আমি কিছুইতেই উপ অধিনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। আরো দুইজন মেজর আছে, ওরাও আমার সাথে এমন একটা সম্পর্ক করে ফেলেছে যে, এখন মনে হচ্ছে, আমি একটা হাসের মা। যেখানেই যাই, ওরাও দল বেধে আমার পিছু পিছুই যায়। খারাপ লাগে না। ভালই লাগে।
বাসা পাই নাই। তাই অফিসার্স মেসের তিন তলার ব্যারাকে আমরা সবাই অর্থাৎ বিবাহিত অফিসারগন দুইটা করে রুম নিয়ে নিয়ে থাকি। ফেরদৌস স্যারের পরিবার থাকে দোতালায়, আমি তিনতালায়, মেজর আলী আর মেজর হায়দার বাসা নেয় নাই কারন ওদের বাসা ঢাকায় আছে। অন্যান্য অফিসাররাও আমাদের বিল্ডিং এর মধ্যেই থাকে। প্রায়ই আমরা ওদেরকে ডেকে ডেকে দাওয়াত করে একসাথে খাই। কখনো আবার তরকারী কিংবা ভালো খাবার পাক করলে পাঠিয়ে দেই। ইউনিট হলো আসলে একটা পরিবার। আমাদের অফিস একদম আমাদের বাসার সাথে লাগোয়া। প্যারেড গ্রাউন্ডও একদম লাগোয়া। ব্যাপারটা এই রকম যে, ১০০ গজের মধ্যে সবকিছু। অনেক ব্যস্ত থাকতে হয় অফিশিয়াল কাজে কিন্তু তারপরেও একটা ভালো সময় যাচ্ছে।
প্রোমোসন বোর্ড শুরু হয়েছে। বেশ ৪/৫ দিন লাগবে। ৪৬ ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ স্যার অনেকবার আমাকে ডেকেছিলেন। আমার সাথে কথা বলেছেন। একটা জিনিষ কমান্ডার বুঝেছিলেন যে, আমাকে হয়তো এর আগেরবারই প্রোমোশন দেয়াটা উচিত ছিলো, কিন্তু কেনো দেয় নাই, এ ব্যাপারে তিনি অনেকবার আমাকে প্রশ্ন করলেও আমি আসলে ভালো কোনো উত্তর দিতে পারি নাই কারন আমাকে কখনো আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে লিখিত কিছুই জানানো হয় নাই কেনো আমার প্রোমোশনটা হয় নাই। ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের প্রায় সব সিও, উপঅধিনায়ক, বিএম, ডিকিঊ, এবং অন্যান্য আশেপাশের ইউনিটের অফিসারগন ইতিমধ্যে আমার ডিভিশনাল লেবেলের এক্সারসাইজ, টিউট (TEWT, Technical Exercise Without Troops), মডেল ডিস্কাসনে মেধা আর যুক্তি দেখে, আমার শিক্ষার যোগ্যতা দেখে এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, আমি একজন যোগ্য কোয়ালিফাইড শিক্ষিত অফিসার যাকে প্রথমবারই প্রোমোশন দেয়াটা জরুরী ছিলো। যাই হোক, এবার সবাই আশা করছেন যে আমার প্রোমোশনটা হবে। কিন্তু আমার মন বলছিলো অন্য কথা।
প্রোমোশন বোর্ড আরম্ভ হবার আগে আমাকে অনেকেই একটা পরামর্শ দিয়েছিলো যে, আমার উচিত কিছু কিছু পরিচিত জেনারেল সাহেবদের বাসায় ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার। কিন্তু আমার কাছে এটা খুব অপমানজনক মনে হচ্ছিলো। কারন, প্রোমোশন হবে আমার যোগ্যতা দিয়ে, আমার মেধা দিয়ে, আমার পারফরমেন্স দিয়ে, আমি কেনো বিভিন্ন জেনারেলদেরকে পটাতে যাবো বা অনুরোধ করতে যাবো? ফলে আমি কারো সাথেই দেখা করার অভিপ্রায় হলো না। যদি আমাকে এই আর্মি যোগ্য মনে না করে, যদি এই আর্মি মনে করে যে, আমার থেকেও আরো কেউ যোগ্যতা রাখে আমাকে টপকিয়ে প্রোমোশন পাবার, তাতে আমার কোনো কৈফিয়ত নাই বা দুঃখও নাই। কিন্তু কাউকে আগে থেকে আমি অনুরোধ করবো, তারপর তাদের দয়ায় আমার প্রোমোশন হবে এটা আমি চাই না।
বোর্ডের প্রথম দিন শেষে আমার সিও সাহেব ফেরদৌস স্যার বললেন যে, আজ যাদের নাম পর্যন্ত বোর্ডে আলাপ হয়েছে, সে পর্যন্ত নাকি আমাদের নাম আসে নাই। বোর্ড আরো ৩ দিন চলবে, হয়তো আলাপ হয়ে যাবে, ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে বুঝলেন যে, আমাদেরটা হয়ে যাবে? ফেরদৌস স্যার আমাকে জানালেন যে, তিনি নিজ উদ্যোগে জেনারেল আমিনুল করিমের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন, এবং জেনারেল আমিনুল করীম আমাকে খুব ভালো করেই চিনেন, আমার ব্যাপারটা নাকি খুব স্ট্রং ভাবে দেখবেন। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব জোরালো মনে হয় নাই, তারপরেও ফেরদৌস স্যারের কথা আমি বিশ্বাস করি।
বোর্ডের দ্বিতীয় দিন পার হয়ে গেলো, কোনো খবর পেলাম না। রাতে ব্রিগেড কমান্ডারকে দিনের শেষের ফলাফল জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, যে পর্যন্ত নাম মুটামুটি ড্রাফট হয়েছে সেখানে আমার নাম আছে। অর্থাৎ আমার আপাতত প্রোমোশন বোর্ডে নাম পাশ হয়েছে। কেনো জানি একটু সস্থি পাচ্ছিলাম না যদিও কমান্ডার আমাকে অযথা মিথ্যা কথা বলবেন না। আর মোশাররফ স্যারের সাথে আমার সম্পর্কটা অত্যান্ত ফ্রেন্ডলী। আমি কাউকেই কোনো আগাম খবর দিতে চাই না। আমি আমার বউ মিটুলকেও কোনো খবর দিলাম না। কারন এখন যদি একটা আশা দিয়ে রাখলাম, আর পরে যদি সেটা নেগেটিভ হয়, তাহলে একটা ভালো সংবাদের যে আনন্দ সেটা থেকে বিচ্যুত হয়ে আরেকটা নেগেটিভ খবরের কারনে মনের ভিতর যে বেদনার সৃষ্টি হবে, সেই চাপ মিটুল নিতে পারবে কিনা সন্দেহ। ফলে আমি ওকে না ভালো, না খারাপ কোনোটাই দিতে চাই নাই ফ্রেস এবং চুড়ান্ত ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত।
এভাবে ৩/৪ দিন পেরিয়ে প্রোমোশন বোর্ড পার হল। প্রোমোশন বোর্ড শেষ। এবার ফলাফল প্রকাশিত হবে। সেই চুরান্ত ফলাফলে আমাকে জানানোও হলো যে, আমার এবারো কোনো প্রোমশন হয় নাই। তবে আগেরবারের মতো আমাকে অন্ধকারে রাখা হলো না। আমি কমান্ডারের কাছে জানতে চাইলাম, আমার কোথায় ঘাটতি ছিল? তিনি উত্তরটা দিতে গিয়ে নিজেও খুব লজ্জিত বোধ করছিলেন। কমান্ডার আমাকে জানালেন যে, ১৯৮৮ সালে কোনো এক ষান্মাসিক পিইটি (ফিজিক্যাল এফিসিয়েন্সী টেষ্ট) তে নাকি আমি জয়েন করি নাই। তাই আমার প্রোমোশন হয় নাই। কমান্ডার বোর্ডকে বলেছিলেন যে, যদি মেজর আখতারের একটা পিইটি ঘাটতি থাকে, তাহলে ওকে ডেকে আনি, সে ওই ঘাটতিটা এখন পুরা করে দিক, তাই বলে আজ থেকে ১৬ বছর আগের একটা পিইটির দোহাই দিয়ে এ রকম একটা চৌকষ অফিসারকে প্রোমোশন না দেয়াটা অন্যায়। এতে অনেক বদনাম হবে এই আর্মির প্রোমোশন বোর্ডের চেহারার। তাছাড়া উনি আরো নাকি বলেছিলেন যে, এই গত এক বছরে তাহলে উনাকে কেনো জানানো হয় নাই যে, মেজর আখতারের একটা পিইটি ঘাটতি আছে? তাহলে তো আমিই সেটা নিয়ে নিতে পারতাম? কিন্তু সেই গল্পের মতো বলতে হয় যে, যদি কারো দোষ ধরতে চান, তাহলে লক্ষাধিক কারন তো খুজেই পাওয়া যায়। আর সেই লক্ষাধীক দোষের যে কোনো একটা আপাতত এপ্লাই করলেই তো হয়। তাতে বোর্ডের তো আর দোষ দেয়া যাবে না। বাঘ আর হরিনের সেই পানি খাওয়ার গল্পের মতো।
বাঘ হরিন দুটুই একটা ঝর্নার মধ্যে পানি পান করছিলো। হরিন ভাটার দিকে আর বাঘ উজানের দিকে। বাঘের মনে হলো হরিনের একটা দোষ বের করে সেই দোষে ওকে ভক্ষন করা। তাই বাঘ হরিনকে বল্লো, ওই বেটা হরিন, পানি খাইতেছিস তো ঘোলা করতেছিস ক্যান? তোর ঘোলা পানি তো আমার দিকে আসতেছে। তখন হরিন বল্লো, বাঘ মামা, আমি তো ভাটায়, আর আপনি তো উজানে। পানি তো আপনার দিকে থেকে আমার দিকে আসতেছে। আমি আবার ঘোলা জল আপনার দিকে দিলাম কিভাবে? বাঘ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বল্লো, আরে বেটা তুই না হয় ঘোলা জল দিচ্ছিস না, কিন্তু তো আগে তোর দাদা একবার এই রকম করছিলো, তাই তোর দাদার দোষ মানে এখন তর দোষ। এই বলে হরিনকে ঘায়েল করে দিলো বাঘ মামা।
বোর্ড যে কোনো কারনেই আমাকে বা ১৩ লং কোর্সের অফিসারদেরকে প্রোমোশন দেবে না, তাই আজ থেকে ১৬ বছর পূর্বের কোনো এক পিইটি দেয়া হয় নাই, এই দোহাই দিয়ে আমার প্রোমোশন বন্ধ। কি তাজ্জব ব্যাপার।
বাসায় এলাম অফিস থেকে। বউ জিজ্ঞেস করলো, তোমার মন খারাপ দেখলেই বুঝা যায়, বুঝেছি, তোমার প্রোমশন হয় নাই। মিটুলেরও খুব মন খারাপ হলো। আম মিটুলকে শান্তনা দিলাম না। ফেরদৌস স্যার বাসায় এলেন। অন্যান্য অফিসাররাও বাসায় এলেন। আমার মন এম্নিতেই ভালো ছিলো না, তারপরে আবার অফিসাররা এসেছেন আমাকে শান্তনা দিতে। কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য বোর্ডের সিদ্ধান্ত মনে হয় নাই, আমি মেনে নিতে পারি নাই।
আরো খারাপ সংবাদ পেলাম যে, আমার ইউনিটের সিও হিসাবে যে আসতেছে, সে হচ্ছে ১৪ লং কোর্সের মজিদ যে কিনা কোনো ষ্টাফ কলেজ করে নাই, গানারী ষ্টাফও করে নাই, অন্যদিকে মেডিক্যালী সে ক্যাটেগরী সি। অর্থাৎ আনফিট। এমন একটা অফিসারের প্রোমোশন হয় কিভাবে? সে কথা আরেকদিন বল্বো।
মিটুল মালয়েশিয়া ট্রেনিং করে দেশে ফিরে এসছে। অনেক অসুবিধার মধ্যে ছিলাম মিটুলের এই দীর্ঘ সময়ে অনুপস্থিতির কারনে। তারপরেও কোনো রকমে মানিয়ে চলার চেষ্টা করেছি। আমার মেয়েরাও লক্ষী মেয়ের মতো ওরাও বুঝতে পেরেছিলো কিভাবে মাকে ছাড়া চলা যায়। শুধু মাকে ছাড়া নয়, বাবাকে ছাড়াও। এর মধ্যে আমার আরেকটা ভালো খবর ছিলো যে, ৪ ফিল্ড খোলাহাটি থেকে মীরপুর পোষ্টিং হয়ে আসবে এই সুবাদে আমি এডভান্স পার্টি নিয়ে আর কোয়ার্টার মাষ্টার রাকিবকে নিয়ে মীরপুর এসছি কয়েকদিন যাবত। তাতে যেটা হয়েছিলো যে, অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও আমার মেয়েরা আর আমি একসাথে বাসায় থাকতে পেরেছিলাম। মিটুল এখন দেশে চলে আসাতে আমি হয়তো এই বাসাটা ছেড়ে মীরপুর সেনানীবাসের একটা অস্থায়ী অফিসার্স ফ্যামিলী কোয়ার্টারে চলে যাবো। বাসা পেতে অনেক দেরী হবে কিন্তু মীরপুরের যেখানে অফিসারগন পরিবার নিয়ে থাকে সেটা ও একটা অফিসার্স মেস কিন্তু সেখানে কিছু কিছু অফিসার দুইটা মাত্র রুম নিয়ে পরিবার নিয়ে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে স্থানীয় কমান্ডার। ৪ ফিল্ড ১২ ফিল্ড রেজিমেন্টকে প্রতিস্থাপন করছে। আমরা সমস্ত কিছু হস্তান্তর করছি। ১২ ফিল্ড চলে যাচ্ছে হিল ট্র্যাক্সে। ১২ ফিল্ডের সিও হিসাবে আছে ১২তম লং কোর্সের লেঃ কর্নেল বশীর। আমরা এক্সাথেই বেসিক কোর্স করেছিলাম। একটু কনফিউজড টাইপের অফিসার। কিন্তু মানুষ হিসাবে খারাপ না, সৎ বটে।
মীরপুরের ফিল্ড আর্টিলারী ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্রিগেডের অধীনে। এর আগেও আমি একবার এই মীরপুর সেনানীবাসে ৭ ফিল্ডের সাথে চাকুরী করেছিলাম। তখন কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমামুজ্জামান। তাঁর সাথে আমি আরো একবার কাজ করেছিলাম বগুড়ায়। আমি আমার জিএসও-২ (অপ্স) এর শেষ প্রান্তে আর তিনি বগুড়ায় পোষ্টিং হয়ে আসলেন। আমি তাঁর সাথে মাত্র সপ্তাহ খানেক কাজ করেছিলাম। তারপর চলে গিয়েছিলাম গানারী ষ্টাফ কোর্সে। এবার ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার আছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ স্যার। বিএনপির বনমন্ত্রীর ছোট ভাই বলেই সবাই জানে। আমার সাথে প্রায়ই ইউনিটের হ্যান্ডিং টেকিং নিয়ে কথা হয়। খুব ঝামেলা হচ্ছে বশীরের সাথে আমার। আমরা যদিও ১২ এবং ১৩ লং কোর্সের অফিসার কিন্তু আমি বশীরকে তুই বা তুমি সম্বোধনই করি কারন আমরা ক্যাডেট কলেজের একই ব্যাচ। তবে বশীর ফৌজদার হাট ক্যাডেটের আর আমি মীর্জাপুর ক্যাডেটের। বশীরের ইউনিটের অনেক কিছুই বিশেষ করে হস্তান্তরযোগ্য আইটেমের সঠিক ইনভেন্টরী নাই। এর কোথায় কি তাঁর ও সঠিক ব্যাখ্যা নাই। আমি আবার সব কিছু বুঝে না নিলে পরবর্তীতে সব কিছুর ব্যাপারে আমাকেই জবাব্দিহি করতে হবে বিধায় কোনো ছাড় দেওয়ার ও কোনো অবকাশ নাই। ফলে নিত্য নৈমিত্তিক একটা খারাপ সম্পর্ক সৃষ্টি হচ্ছিলো। তারপরেও আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যে করেই হোক কন্ট্রোল আইটেম গুলি ছাড়া অন্যান্য আনকন্ট্রোল আইটেমে ছাড় দেয়ার। ১২ ফিল্ড যাওয়ার পরেই আমরা ওদের খালী হ ওয়া ব্যারাক গুলি এবং অফিসার্স কোয়ার্টার গুলিতে উঠতে পারবো। তাঁর আগে আমি ওই কচুক্ষেতেই পরিবার রাখতে হবে।
আমি প্রতিদিনই কউক্ষেত বাসায় যেতে পারি। সকালে অফিসে চলে আসি আর সন্ধ্যায় আবার কচুক্ষেত বাসায় চলে যাই। এর মধ্যে কমান্ড নেটে আমি খোলাহাটিতে ফেরদৌস স্যারের সাথে কথা বলে তাকে প্রায়ই আপডেট দেই। ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্রিগেডের কমান্দার থেকে শুরু করে বিএম, ডিকিউ সবাই আমাকে যথেষ্ট পরিমান সমীহ করেন। সময়টা ভালই যাচ্ছে।
সামনে আরো একটা প্রোমোশন বোর্ড আছে। আমার মনে এবারো একটা সন্দেহ জাগছে যে, এই বি এন পির আমলে আমাদের হয়তো আর প্রোমোশন হবে না। একটা বোর্ডে তো প্রোমোশন হয় নাই, এবার যে হবে সেতার ও কোনো নিশ্চয়তা নাই। তবে যেটাই হোক, যদি এবার প্রোমোশন না হয়, আমি ৩য় বারের জন্য কোনো চান্স নেবো না। এই চিন্তায় আমার কয়েকটা কাজ খুবই বাস্তবায়ন করা জরুরী হয়ে পড়েছিলো। তাঁর প্রথম কাজতা ছিলো, আমার একতা স্থায়ী বাড়ি বানানো যেখানে আমি সেনানীবাস থেকে বেরিয়ে গেলে নিজের বাড়িতে থাকতে পারি। দ্বিতীয় কাজটি ছিলো যে, যদি আর্মির চাকুরী ছেড়েই দেই, আমি কনো প্রাইভেট চাকুরী করতে চাই না। ফলে চাকুরীর বাইরে কি কি ব্যবসা করা যায় সেটা ভাবা। এই দুটু বিষয় আমার মাথায় সর্বক্ষন ছিলো।
শেষ পর্যন্ত রিভার সাইডে ডিএমডি হিসাবে কাজ করেছেন যে মোহসীন সাহেব, তাকে পাওয়া গেলো। বয়স প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ এর মতো হবে। বেশ ফর্সা করে লোকটি। পাঞ্জাবী পরিহিত, মাথায় একটা গোল টুপী এবং হাতে সব সময় তসবীহ থাকে। আমার বাসায় তৌহিদ, মোহসীন সাহেব আর আনসার এলো রাত ৮ টার দিকে। মোহসীন সাহেবের বাড়ি বরিশাল। বেশ ভালো ইংরেজী বলতে পারেন। অনেকক্ষন আলাপ করলাম। আসলে এবারই প্রথম আমি মোহসীন সাহেবের সাথে রিভার সাইড সুয়েটারস নিয়ে বিস্তারীত আলাপের একটা সুযোগ পেলাম। আমার যে জিনিষগুলি তাঁর কাছ থেকে জানার ছিলো সেটা এ রকমেরঃ
(১) ফ্যাক্টরী চালাতে মোট কত টাকা প্রাথমিকভাবে ইনভেস্টমেন্ট করা লাগতে পারে।
(২) এটার ফিউচার প্রোস্পেক্ট কি?
(৩) গার্মেন্টস উনি আমাকে নিয়ে চালাইতে পারবেন কিনা।
(৪) লাভ হবার সম্ভাবনা কেমন।
এই সব প্রশ্নের উত্তর মোহসীন সাহেব দিতে গিয়া একটা নোট খাতায় তৌহিদ আর তিনি একটা ক্যালকুলেশন করলেন। এবং পরিশেষে আমাকে জানালেন যে, মোহসীন সাহেব আমার সাথে জয়েন করলেও তিনি কোনো অর্থ ইনভেস্টমেন্ট করতে পারবেন না। আর তাঁর যে অভিজ্ঞতা আছে, তাতে ছয় মাসের মধ্যে এই ফ্যাক্টরি থেকে কয়েক লাখ টাকা প্রোফিট করা সম্ভব। কিন্তু এর জন্য যা করতে হবে সেটা হচ্ছে, প্রথমে সাবকন্ট্রাক্ট করা, এবং পরবর্তীতে সরাসরি এলসি এর মাধ্যমে বায়ারদের কাজ করা। আর এসব তিনি অনায়াসেই করতে পারবেন। এই ফ্যাক্টরী নাকি প্রাথমিক সময়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকা করে লাভের মুখ দেখেছিলো। কিন্তু এতো বেশী শেয়ার হোল্ডার ছিলো, তাদের ব্যক্তিগত কোন্দলের কারনে পরে মোহসীন সাহেবকে তারা স্কেপগোট বানিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলো। আর মোহসীন সাহেব চলে যাবার পর থেকেই এই ফ্যাক্টরীর দূর্দশা শুরু হয়। এটা তৌহিদও আমাকে জানালো, আনসারও সায় দিলো এবং মোহসীন সাহেব নিজ থেকে কিছু না বল্লেও ব্যাপারটা যে এ রকমেরই, সেটা বুঝালেন। আমি এম্নিতেই রিভার সাইড ফ্যাক্টরীটা নেয়ার পক্ষে ছিলাম, এখন তো ব্যাপারটা যেনো আরো পাকা পোক্ত হয়ে গেলো।
অনেক রাত পর্যন্ত মোহসীন সাহেবের সাথে আমার মিটিং হলো। মনটা চাংগা হয়ে গিয়েছিলো। এবার আমার কাজ হবে নাজিম সাহেবকে কিভাবে কনভিন্স করা যায়। কিন্তু নাজিম সাহেবকে পাওয়াই যায় না। আমি কিভাবে আগাবো এবার তৌহিদের সাথে মোহসীন সাহেবও একজন গাইড হিসাবে যোগ হলেন।
আজ আমি ঢাকায় এলাম একটা বিশেষ কাজে। কাজটা হলো আমার স্ত্রী আগামী কয়েকদিন পরে বিদেশ চলে যাবে ট্রেনিং করতে। তাকে সব কিছু ঠিক ঠাক করতে হলে আমাকে অনেকগুলি এক্সট্রা ব্যবস্থা করা দরকার।
এম্নিতেই আমি থাকি খোলাহাটি, ঢাকা থেকে অনেক দূর। এর মধ্যে আমার স্ত্রী মিটুলের আবার বৈদেশিক একটা ট্রেনিং এর নাম এসছে মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ায় সে ট্রেনিং এ যাবে কিনা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো। আমি এক কথায় বলে দিয়েছি যে, তাঁর মালয়েসিয়ায় ট্রেনিং এ যাওয়া উচিত। মিটুলের সেই ১৯৮৮ সাল থেকে যা যা ক্যারিয়ারে দরকার সাহাজ্য করা তাতে আমার কখনোও কোনো কার্পন্য ছিলো না। আর এর প্রধান কারন হলো, মিটুলকে সাবলম্বি করে তোলা। আমি জানি, আমার আসলে সাহাজ্য করার মতো আশেপাশে কোনো হোমরা চোমড়া নাই। না আছে আমার বাবার দিক থেকে কোনো সাহাজ্য, না আছে আমার শ্বশুর বাড়ির দিক থেকে কোনো সাহাজ্য। ফলে যদি আমাকে কেউ সরাসরি সাহাজ্য করার কেউ থাকে সেতা হচ্ছে আমার স্ত্রী মিটুল। আর সেইই যদি ওই অবস্থায় না থাকে বা নিজের পায়ে দাড়াতে না পারে, তাহলে আমাকে বা আমার পরিবারকে অথবা আমার অনুপস্থিতিতেই বা মিটুল কিভাবে সাহাজ্য করবে? এই চিন্তা ধারা থেকেই আসলে আমি সব সময় চেয়েছি মিটুল গড়ে উঠুক।
মিটুলের মালয়েশিয়ার কোর্স টা শুরু হবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে। প্রায় ছয় মাসের মতো একটা কোর্স। সমস্যা দাঁড়াবে যে, আমিও ঢাকায় আমার বাচ্চাদের কাছে নাই আবার এবার মিটুল ও থাকবে না। উম্মিকার বয়স মাত্র আট বছর আর কনিকার বয়স মাত্র তিন। এই দুইজনের জন্য দেখভাল করার কোনো লোক ও নাই। বাজার করার লোক, রান্না বান্নার লোক, যদি মেয়েরা অসুস্থ হয়, তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়ারও কোনো লোক নাই। তারপরেও আমি মিটুলকে মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্তে আওটল থাকলাম। সব কিছু নির্ভর করে আল্লাহর উপর। বাড়িওয়ালা মেজর (অবঃ) ফেরদৌস স্যার ভালো মানুষ। অন্তত দরকারী প্রয়োজনে তাঁর ডাইরেক্ট সাহাজ্য পাওয়া যাবে এটা একটা ভরষার স্থান ছিলো।
নসিরন নামে আমার বাসায় যে কাজের মেয়েটি আছে, সে অত্যান্ত ভালো একজন মেয়ে। তাঁর কোনো আত্তীয় স্বজন নাই, আমরাই তাঁর বাবা, আমরাই তাঁর মা, আমরাই তাঁর সব। আর নসিরন নিজেও এটা জানে আর এতাও জানে আমাদের বাসা ছাড়া ওর আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। সে আমার মেয়েদের কাছেও অনেক প্রিয় একজন নসি আপু। সমস্ত কাজ কর্ম নসি করতে পারে। কিন্তু কথা বলে খুবই কম। সে নিজে অসত নয় এবং তাঁর চাহিদাও অনেক বেশী নয়। আমি যেভাবে মিটুলের অনুপস্থিতিতে ব্যাপারটা সামলাবো বলে ভাবছি সেতা হলো যে, আমি প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় এসে নিত্য নৈমিত্তিক শুকনা বাজার গুলি করে দিয়ে যাবো। আর ডেইলী বাজার যদি লাগে, পাশেই দোকান পাট আছে, তাদের কে বলে দিলে ওরাই বাসায় পৌঁছে দেবে। দোকানদারদের সাথে আমার সম্পর্কটা আমি এমনভাবে তৈরী করেছিলাম যাতে আমার বাসা থেকে একটা চিরকুট দিলেও দোকানদারগন মালামাল বাসায় কাউকে দিয়ে পৌঁছে দেন। যদি বাকীতেও হয়, তাতেও যেনো সবাই মালামাল দিয়ে দেন এবং আমি ঢাকায় এসে সমস্ত টাকা পয়সা দিয়ে দেবো।
মিটুলের খুব মন খারাপ। কারন সে অনেকদিন থাকবে না, একটা মানসিক টেনসনে আছে বাচ্চাদের জন্য। এই টেনসনটা হয়তো থাকতো না যদি আমাদের বাসায় এমন কেউ থাকতো মুরুব্বি টাইপের যারা অন্তত বাচ্চাদেরকে আগলে রাখতে পারবে। আমার মন খারাপ নয়, আমি অনেক টেনসনেও নাই কারন আমি এভাবেই জীবনে বড় হয়েছি। যাদের জীবনে অনিশ্চয়তা সব সময়ই থাকে, তারা অনিশ্চয়তাকে জীবনের স্বাভাবিক দোসর হিসাবেই ধরে নিয়ে জীবন চালাতে থাকে। আমিও ঠিক সে রকমের একজন মানুষ।