১৫/১১/২০০৩-খোলাহাটি সেনানীবাসে এটাই আমার প্রথম আসা নয়,

খোলাহাটি সেনানীবাসে এটাই আমার প্রথম আসা নয়, এর আগেও একবার এসেছিলাম ২০০১ সালে যখন আমি আর্মি হেডকোয়ার্টারে কর্মরত ছিলাম। তখন এসেছিলাম আমি ক্যাপ্টেন টু মেজর পরীক্ষার একটা গোপন প্রশ্নপত্র নিয়ে। আর এখন এলাম একেবারে পোষ্টিং নিয়ে। অনেক পরিবর্তন হয়েছে এলাকাটার। আগে তেমন গাছপালা ছিলো না, ফ্যামিলী কোয়ার্টারগুলি তখনো নির্মানাধীন ছিলো, এখন সেই গাছগুলি অনেক বড় হয়ে গেছে, বিল্ডিংগুলি যে নতুন সেটাও বুঝা যাচ্ছে আবার অনেক বিল্ডিং রঙ করা দরকার সেটাও বুঝা যাচ্ছে। আমি পরিবার নিয়ে আসি নাই, ফলে অফিসার মেসেই আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আজ পর্যন্ত যেখানেই পোষ্টিং হয়েছে, আমি আমার পরিবার নিয়ে কখনো থাকি নাই, শুধুমাত্র যখন বগুড়ায় লোকেটিং ইউনিটে চাকুরী করেছিলাম ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত, তখন কয়েক মাসের জন্য আমি আর আমার স্ত্রীকে নিয়ে জাহাংগিরাবাদ সেনানীবাসে কোয়ার্টার নিয়ে থেকেছি। তখন কোনো বাচ্চা কাচ্চা হয় নাই, আমি আর মিটুলই ছিলাম। এবার আমি আমার দুই মেয়ে আর মিটুলকে ঢাকায় রেখেই আমি নিজে ব্যাচলর লাইফ লিড করার জন্য এই খোলাহাটিতে এলাম। মন ভালো নাই, প্রোমশনটা হয় নাই, কোনো কিছুতেই আর আগের মতো সিরিয়াসলি কাজ করতে মন চায় না। অনেক আগে থেকেই এই চাকুরীটা করবো না করবো না করছিলাম, কিন্তু সেটা অনেক কারনেই বাস্তবায়ন হয় নাই, কিন্তু এবার মনে হচ্ছে হয়তো আর থাকা যাবে না। এর আগে চাকুরী থেকে বের হতে পারি নাই অনেকগুলি কারনে যে, আবার নতুন একটা চাকুরী খুজতে হবে, নিজের বাসা নাই স্থায়ীভাবে, কোথায় থাকবো, কোথায় কি ধরনের আবার চাকুরী পাই সব মিলিয়ে আর্মির চাকুরীটাই ভালো মনে হয়েছে বিধায় আর যাওয়া হয় নাই। কিন্তু এবার প্রোমোশন না হওয়াতে আমার জুনিয়াররা যদি আমার সিনিয়র হয়ে আমার থেকেও কম কোয়ালিফাইড হয়ে আমাকে কন্ট্রোল করতে চায়, এটা আমি মানতে পারবো না। শেষ পর্যন্ত অবস্থা যেমনই হোক, আমাকে বেরিয়ে যেতেই হবে।

খোলাহাটি সেনানীবাস রংপুর সেনানীবাসের অধীনের একটা ব্রিগেড। কিন্তু রংপুর থেকে খোলাহাটি অনেক দূর বিধায় সেনানীবাসের সাভাবিক কার্যক্রমের মধ্যে কিংবা রুটিন অনেক দেখভালের মধ্যে এটা পড়ে না। এটা একটা লোকাল গ্যারিসন হিসাবে অনেকটাই আরামদায়ক। তাং কম।

সিও ফেরদৌস স্যারের সাথে যেহেতু ক্যাডেট কলেজে অনেক লম্বা সময় ধরে পরাশুনা করেছিলাম, ফলে, আমার সাথে তাঁর সখ্যতা অনেক ফ্রেন্ডলী। তিনিও আমার প্রোমোশন না হওয়াতে খুব আপসেট। আমরা একই সাথে স্টাফ কলেজ করেছি। খুব বেশী দরকার না হলে ফেরদৌস স্যার আমাকে অনেক চাপ দেন না কিংবা আমাকে অযথা হয়রানী করেন না। জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে যারা আছে তারাও খুব ভালো। লেঃ মাহফুজ বর্তমানে এডজুটেন্টের কাজ করছে, লেঃ রাকিব করছে কোয়ার্টার মাষ্টারের কাজ। অনেক পরিশ্রমী ছেলেগুলি। আমি চেষ্টা করি যাতে ওরা আরো ভালো কিছু করতে পারে। ওরাও বুঝে যে, আমার লেঃ কর্নেল হবার কথা থাকলেও যে কোনো কারনেই আমার প্রোমোশন না হওয়াতে ওরাও কিছুটা মনক্ষুন্ন কারন এতো যোগ্যতা রেখেও যখন প্রোমোশন হয় না, এতে ওদের মধ্যেও ক্যারিয়ার গড়ার যে একটা অনুপ্রেরনা থাকার কথা তাতে মনে হচ্ছে ঢিলেমী এসছে।

নতুন মহিলা অফিসার নিয়োগ হয়েছে। আমাদের এই খোলাহাটিতে দুইজন মহিলা অফিসারের পোষ্টিং হয়েছে। আমার ইউনিটে এসছে ২লেঃ তাহমিনা আর পাশের ৮ ফিল্ডে এসছে ২লেঃ নাজনিন। দুজনেই খুব ভালো মেয়ে। তাহমিনার বাবা একজন অবসর প্রাপ্ত জেসিও। হয়তো একটা সময় আসবে যে, ওরা ইউনিট কমান্ড করবে, ব্রিগেড কমান্ড করবে। আমি যখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে এমটি ডাইরেক্টরে ছিলাম, তখন মহিলা অফিসার নেয়া হবে কিনা এটার তোড়জোড় শুরু হয়। আমি মহিলা অফিসার নেওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্তক পজিটিভ ভুমিকা রেখেছিলাম। আজ সেই ভুমিকার অংশ নিজের চোখে দেখে গেলাম। মহিলা অফিসারের কমিসন হয়েছে।

আমি প্রায়ই ঢাকায় যাই পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য। ঢাকা থেকে একটি মাত্র বাস খোলাহাটিতে আসে আর তাঁর নাম হচ্ছে, “হক বাস সার্ভিস”। অন্যান্য বাসগুলি রংপুর পর্যন্ত এসেই থেমে যায় কিন্তু “হক” বাসটি খোলাহাটি পর্যন্ত আসে। খুব ভাল সার্ভিস না কিন্তু অন্তত এটা খোলাহাটি পর্যন্ত আসে বিধায় আমি সবসময় “হক” বাসের মাধ্যমেই ঢাকা থেকে আসি এবং যাই। এসি নাই।

আসলে আমি প্রতিদিন নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করছি।  কয়েকদিন আগে নতুন অফিসার হিসাবে আসা অফিসারদের জিওসির একটা সাক্ষাতকার ছিলো। আমারো উনি সাক্ষাতকার নিলেন। মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার। বাংলাদেশ আর্মির একজন ডেসিং এবং স্মার্ট অফিসার। উনার সাথে যখন আমার সাক্ষাত হয় বা ইন্টারভিউ হয়, আমি বেশ কিছু উত্তর জানার চেষ্টা করেছিলাম। সেটা আমি ছোট করে লিখছিঃ

জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় আমার সাথে অত্যান্ত চমৎকার ব্যবহার করলেন। উনি নিজেও আমার সব কোয়ালিফিকেশনগুলি দেখে একটা মন্তব্য করলেন যে, আমি আসলেই দুঃখিত যে, তোমার প্রোমোশনটা হয় নাই। আমি স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে, উনি তো আমাদের প্রোমোশন বোর্ডে ছিলেন, কোথায় আমার কি সমস্যা ছিলো যার কারনে আমার প্রোমোশনটা হয় নাই। সে ব্যাপারে কি আমি কিছু জানতে পারি? উনি তাঁর একটা ছোট নোটবই (নোট খাতা) বের করে কিছুক্ষন কি যেনো দেখলেন, পড়লেন, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে একটা কথাই শুধু বললেন যে, শোন মেজর আখতার, সবসময় যোগ্যতাই প্রোমোশনের জন্য ক্রাইটেরিয়া নয়। যখন কোনো সিনিয়র অফিসার মনে করে যে, সে তাঁর অধস্তন কর্মকর্তার থেকে কম কোয়ালিফাইড, তখন ওই জুনিয়ার অফিসারকে নিয়ে কাজ করতেও অনেকেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করে গানার জেনারেলদেরকে জিজ্ঞেস করো কেনো তারা তোমাকে ভয় পায়। জিজ্ঞেস করলাম, কে আমার নামে ভেটো ভোট প্রদান করেছে স্যার সেটা কি আমি জানতে পারি? উনি সরাসরি আমাকে বললেন না কিন্তু বুঝলাম, আরেক মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (আর্টিলারী) আর মেজর জেনারেল শাহাবউদ্দিন হয়তো এই ব্যাপারে কোন মন্তব্য রেখেছেন। বড্ড খারাপ লাগল শুনে।

আমি জিওসিকে বললাম, স্যার, আমি সম্ভবত এপেন্ডিক্স যে লঞ্চ করতে পারি ভলান্টিয়ারভাবে আর্মি থেকে সুবিধা নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার জন্য। জিওসি বললেন, দেখো গানার, সময় সব সময় তোমার অনুকুলে হয়তো থাকবে না। একটু ওয়েট করো, হয়তো পরেরবার তোমার প্রোমোশন হবেই।

আমি বললাম, স্যার, যে আমি গত ১৮ বছরে কোয়ালিফাই করতে পারলাম না, কি এমন আমি করে ফেলবো যে, আগামি এক দুই বছরের মধ্যে আমার প্রোমোশন হয়ে যাবে?  তারপরেও উনি আমাকে অনেক এডভাইস করলেন। আমি জিওসিকে বললাম, স্যার, আমার কোনো কাজ করতে ভালো লাগে না আর। সকাল থেকে শুরু করে যে আমি এতো পরিশ্রম করতাম, এখন কেনো জানি মনে হয়, এসবের কোনো দরকার ছিলো না। এখানে পরিশ্রমের আর যোগ্যতার মুল্য আসলেই নাই। যখন ডিভিশনে বড় বড় কাজের জন্য দায়িত্ত দেয়ার ব্যাপারে অফিসার খুজে বেড়ায়, তখন খুজে খুজে আমাকেই বের করা হয়, যখন স্টাডি পিরিয়ড করার জন্য দিনে রাতে আমাকে স্ক্রিপ্ট তৈরী করে আর্মি হেডকোয়ার্টারে প্রেজেন্ট করতে হয়, তখন সবাই বাহবাই দেয় কিন্তু যখন প্রোমোশনের টেবিলে বসে, তখন আমাদের এই পরিশ্রমের কথা তারা ভুলেই যায়। তাহলে আর পরিশ্রম করার দরকার কি? জিওসি রেজ্জাকুল হায়দার আমাকে বুঝলেন। বললেন, আমার ডিভিসনে তোমার কোনো অবমুল্যায়ন হবে না। তুমি তোমার মতো করে চলো।

জিওসি অনেকবার কাউকে না জানিয়ে খোলাহাটিতে পিটি প্যারেডের সময় চলে আসতেন। আমি প্রায়ই এই পিটি প্যারেড মিস করতাম, কিন্তু জিওসি কখনো আমাকে কেনো মিস করছি, কেনো সময় মতো পিটিতে যাচ্ছি না, এ ব্যাপারে কোনোদিন প্রশ্ন করেন নাই। একসাথে মেসে নাস্তাও করেছি যখন ইউনিটে পিটি প্যারেড হচ্ছিলো। কথা হতো এই জেনারেলের সাথে। ভালো লাগতো।

এভাবে সময় যেতে থাকে, মন ভালো আর খারাপের মধ্যে আমি অনেক সময় পার্থক্য বুঝি না।

১৫/১০/২০০৩-১ম বার সুপারসিডেড, খোলাহাটি পোষ্টিং

জর্জিয়ার মিশন শেষ করে ঢাকায় ফিরে এসেছি। ঢাকায় ফিরে এসেই শুনলাম আমাদের প্রোমশন কনফারেন্স হচ্ছে। মেজর থেকে লেঃ কর্নেল। আমি এখনো ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসায় আছি। যখনই কেঊ বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসে, তখন অনেকগুলি ফর্মালিটিজ করতে হয়। মেডিক্যাল চেক আপ, ক্লিয়ারেন্স, যদি মিশনে যাওয়ার সময় কোনো কিছু ইস্যু করে থাকি সেতা জমা দেয়া, আবার যদি কোনো পোষ্টিং হয় তাহলে তো আরো অনেক ফর্মালিটিজ। আমরা লগ এরিয়ার আন্ডারে আপাতত সুপার নিউমিরাল স্ট্যাটাসে আছি। প্রোমোশন কনফারেন্সে আমাদের প্রোমশন হবার কথা। অনেক রিউমার শুনছি, কেউ বলছে আমাদের অনেকের প্রোমশন হয়েছে আবার কেউ বলছে এখনো ফাইনাল নয়। টেনসনে তো অবশ্যই আছি কিন্তু আমার প্রোমশন না হবার কোনো কারন আমি দেখিনা। স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, ভালো ভালো জায়গায় পোস্টিং ছিলো, পদাতিক ডিভিসনের জিএসও-(অপারেশন-২) ছিলাম, আর্মি হেডকোয়ার্টারেও জিএসও-২ (ট্রেনিং) ছিলাম। মিশন করলাম দুইবার, কোথাও কোনো কিছুর ঘাটতি নাই। প্রোমোশন বোর্ডে আমাকে চিনে এ রকম অন্তত বেশীরভাগ জেনারেলরা আছেন। যেমন, জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া (আমি যখন জিএসও-২ অপারেশন পদাতিক ডিভিসনে কর্মরত ছিলাম, তখন তিনি ছিলেন কর্নেল স্টাফ), জেনারেল মুবিন (আমি যখন এমটি ডাইরেক্টরে ছিলাম, তখন তিনি ছিলেন ডিএমটি), জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (আমার ইউনিটের টুআইসি এবং সিও উভয়ই ছিলেন), জেনারেল সাহাব (আমরা বগুরায় একসাথে পাশাপাশি ইউনিটে কাজ করেছিলাম, তখন উনি ছিলেন ১ ফিল্ডের সিও আর আমি ছিলাম লোকেটিং ইউনিটের টুআইসি, একসাথে হাট হাজারীতে ফায়ারিং করেছি, প্রতিদিন প্রায় দেখা হতো), জেনারেল মইন ইউ আহমেদ (স্টাফ কলেজে উনি ছিলেন আমার ডিএস), সিজিএস জেনারেল ইকরাম (আমি যখন আর্মি হেডকোয়ার্টারে কাজ করেছি, তখন উনি আমার সিজিএস ছিলেন, বহুবার তাঁর সাথে আমার ইনটারেকসন হয়েছে), আছেন জেনারেল মুনিরুজ্জামান (আমার ৪ মর্টারের টুআইসি এবং সিও), মেজর জেনারেল রফিক (সিগ ন্যাল) এর সাথে আমি কাজ করেছি দুবার। একবার আমি স্টাফ কলেজ করার সময় তিনি ছিলেন আমার ডাইরেক্ট ডি এস আবার উনি যখন ৪ সিগ ন্যালের সিও ছিলেন বগুড়ায়, তখন আমি জি এস ও-২ (অপারেশন), এই রকম আরো অনেকগুলি জেনারেলের সাথে আমার ডাইরেক্ট কর্মজীবন পার হয়েছে। ফলে আমাকে বোর্ডে চিনবেন না এমন কেউ নাই। আর যারা চিনবেন না, তারাও আমার প্রোফাইল দেখলে অন্তত ভাববেন যে, আমার কোয়ালিটির কোনো কমতি নাই। ফলে আমি প্রোমোসন পাবো না, এটা আমার মাথায় আনতে চাই না।

কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই নাকি রাত হয়। বিএনপির রাজনৈতিক আমল। আমাদের ১৩ লং কোর্সের অনেক প্রবাব্যাল অফিসারকে টাচ করলো না। প্রোমশন কনফারেন্সের পর প্রায় ২ দিন হয়ে গেল, কিংক্রিত কোনো তথ্য পেলাম না। অবশেষে খবর পেলাম যে, আমাদের প্রোমশন হয় নাই। প্রায় শতভাগ ১৩ লং কোর্সের কারোরই প্রোমশন হয় নাই। এর প্রধান কারন, আমাদের একজন কোর্সমেট আছে মেজর ওয়াকার। সে আগের সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজের মেয়ের জামাই এবং আওয়ামীলিগের ঘরনার। সবার মন খারাপ। কেনো এই পলিটিক্স? যখন ফাইনাল প্রোমোশন তালিকা বের হলো, দেখলাম, আমাদের আর্টিলারীর কেউ প্রোমশন পায় নাই বটে কিন্তু আমাদের জিনিয়র ১৪ লং কোর্সের অন্য আর্মস এর অফিসারদের প্রোমোশন হয়েছে। এর মানে হলো, আমরা এবার সুপারসিডেড হয়ে গেলাম। আমার পোষ্টিং হয়ে গেলো খোলাহাটি, সইদপুর সেনানিবাসে ৪ ফিল্ডের টুআইসি হিসাবে। ওখানে আমার সিও হবেন আমাদেরই ক্যাডেট কলেজের আমার এক বছরের সিনিয়র ভাই লেঃ কর্নেল ফেরদৌস, ১০ম লং কোর্সের।  ভালো মানুষ। কিন্তু আমার মেজাজ ভাল নাই। ঢাকার বাসা ছাড়তে হবে। আমি আবার আমার পরিবারকে খোলাহাটিতে নিতে ইচ্ছুক না কারন মিটুলের কর্মস্থল ঘিওর ঢাকার এনসিটিবি (ন্যাশনাল কারিকুলাম টেক্সট বুক বোর্ড) তে।

এমতাবস্থায় নিরাপত্তার খাতিরেই আমাকে আমার পরবারকে এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে মিটুল বাচ্চাদের নিয়ে একা থাকতে পারে। তাই, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসা ছেড়ে দিয়ে কচুক্ষেতে একটা বাসা ভাড়া করলাম, বাড়িওয়ালা অবসর প্রাপ্ত ফেরদৌস স্যার। আমাকে চলে যেতে হবে খোলাহাটিতে। 

০৮/১০/২০০৩- জর্জিয়া ত্যাগ

সেই পহেলা অক্টোবর ২০০২ তারিখে আমি জর্জিয়ার জাতীসংঘ মিশনে এসেছিলাম। আজ সেই জর্জিয়া থেকে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছি। আর কখনো এই দেশে ফিরে আসা হয় কিনা জানি না। যেদিন প্রথম এদেশে ল্যান্ড করেছিলাম, সেদিন দেশটাকে যতোটা না আপন মনে হয়েছিলো, আজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছে, কিছুটা মায়া ধরেছে, অনেক লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে, অনেক পরিবারের সাথে অনেক সখ্যতা হয়েছে, তাদের কারো কারো মুখখানা একেবারে চোখের সামনে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলজ্বল করছে। এদের সাথে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না।

সোরেনা গামছাখুরদিয়ার পরিবারটা ছিলো আমার সবচেয়ে কাছের একটি পরিবার। ওর সাথে দেখা হলো না। দেদুনা বুকিয়া, রুসুদিন, কিংবা ওদের আরো অন্যান্য সদস্যরাও যেমন সালোমী, তামারা সবাই জানে আজ আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু দেখা করবার মতো কোনো উপায় নাই। ওরা কেউ কেউ থাকে সেই সুদূর টিবলিসিতে, কেউ আবার জুগদিদিতে, আবার কেউ গালীতে। যুদ্ধ বিপর্যস্ত এলাকায় আসলে কোনো কিছুই সঠিক নিয়মে চলে না।

এদেশের মানুষগুলি খুব ভালো ছিলো। ছোট ছোট বাচ্চারা বেশ মিশুক, মেয়েগুলি ওয়েষ্টার্নদের মতো ড্রেস পড়লেও উচ্ছৃঙ্খল নয়। তারা আমাদের দেশের মেয়েদের থেকেও অনেক রুচিশীল এবং পরিবারকেন্দ্রিক। এরা একটি মাত্র বিয়েতেই সুখী। পরিবার নিয়ে সুখে বসবাস করার জন্য যেভাবে স্বামীকে মেনে চলতে হয়, যেভাবে বাচ্চাদের নিয়ে চলতে হয়, ঠিক সেটাই করে। মেয়েরাই বেশীরভাগ সময় সংসারের হাল ধরে রাখে, আর পুরুষগুলি মদের নেশায় পড়ে থাকে।

একটা সময় ছিলো, রাশিয়ার আমলে এরা খুবই সাবলীল এবং বিলাসবহুল লাইফ লিড করেছে। কিন্তু পোষ্ট কোল্ড ওয়ার এর পরে রাশিয়ার অর্থনইতিক বিপর্যয়ের সাথে সাথে ওরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো হয়ে গেছে কিন্তু আচার ব্যবহার রয়ে গেছে সেই আগের বিলাসবহুল পর্যায়ের। জুগদিদিতে থাকার সময় আমার ল্যান্ড লেডি ছিলো জুলি। তার দুইটা ছেলে আছে, নাম গোগা আর লেবানী। জুলির স্বামী আলেক একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু একটু ট্রিকি। একসময় প্রুচুর পয়সাকড়ি ছিলো। এখন হাতে কোনো পয়সাকড়ি আসে না। আমরা যে ভাড়াটা দেই, তাতেই ওদের সংসার চলে। গালী সেক্টরে থাকার সময় ল্যান্ড লেডি ছিলো মানানা। আর তার স্বামী ছিলো জামাল। ওদের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জরিয়ে আছে। জুলির বয়স প্রায় পঞ্চাশ। মায়ের মতো। একদম ইংরেজী পারে না কিন্তু যেভাবে ইংরেজী বলে তাতে ওর কথা বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না।

এইতো গত ৪ অক্টোবর ২০০৩ তারিখে আমি আবারো জুলির বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। এক রাত থাকলাম। জুলি জানে আমি এক সপ্তাহ পরেই দেশে ফিরে আসবো। রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। খুব সকালে ঘুম ভাঙ্গলো একটা চমৎকার ছোয়ায়। আমি চোখ খুলতেই দেখলাম, জুলি আমার কপালে ঘুমন্ত অবস্থায় চুমু খেলো। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। চোখ মেলতেই দেখলাম, জুলি আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখ তার ছলছলে। আমি তার দিকে তাকাতেই সে ফিরে যাচ্ছিলো। আমি বললাম, মামা, এদিকে আসো। মামা মানে মা, জুলি আমাকে জড়িয়ে ধরে একেবারে কান্নায় ভেংগে পড়লো। বল্লো, নো সি, নাহ? কাম এগেইন সন। অর্থাৎ তোমার সাথে আর কখনো কি দেখা হবে না? আবার এসো আমার ছেলে। কিছুই বলা গেলো না। সকালটাই একটা কষ্টের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো। ওরা খুব ভালো মানুষ। আমি আমার অনেক মালামাল কিছুই আনলাম না। একটা টেপ রেকর্ডার কিনেছিলাম, দিয়ে এলাম, অনেকগুলি গিফট কিনেছিলাম দেশে আনবো বলে। সব কিছু দিয়ে দিলাম। ওরা এক সময় অনেক ধনী ছিলো, ওদের এসবের কোনো প্রয়োজন ছিলো না রাখার, কিন্তু আমিই জোর করে দিলাম। খুব খুসি হলো। জুলি তার আলমারী থেকে ৬ টা গ্লাস সেট বের করে অতি যত্নের সাথে একটা পুরানো পেপারে প্যাক করে আমাকে দিয়ে বল্লো, “ওয়াইফ, গিভ, আই গিভ ওয়াইফ, লাভলু” অর্থাৎ এর মানে হলো, এটা তুমি তোমার বউকে দিবা। বল্বা আমি দিয়েছি। আর বল্বা, আমি তাকে ভালবাসি। কি অদ্ভুদ ফিলিংস। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য অনেক ভাষা জানার দরকার নাই। মানুষের ভালবাসা কথা বলে চোখ, কথা বলে মুখ, কথা বলে অন্তর। আর তার বহির্প্রকাশ সারাটা শড়ির তার নিজের ভাষায় প্রকাশ করে।  

আজ এই চলে যাওয়ার দিনে মনটা ভীষন খারাপ হচ্ছে। সকাল থেকেই সমস্ত জিনিষ্পত্র গুছিয়ে রেখেছিলাম। আমি গালীতে আছি, আমাকে যেতে হবে প্রথমে জুগদিদি সেক্টরে। ওখানে জাতীসংঘের প্রশাসনিক দপ্তর থেকে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নিয়ে, মালামাল ট্রান্সপোর্ট সেকসনে হস্তান্তর করে শুধুমাত্র আমার একটা হ্যান্ডব্যাগ সাথে নিয়ে সুখুমী থেকে আমাদের নিজস্ব প্লেনে তুরষ্কের এয়ারপোর্টে আসতে হবে।

গালীতে আমি যে রুমটায় থাকতাম, তার ঠিক পাশের রুমেই থাকতো মানানার স্বামী জামাল। অত্যান্ত ভালো একজন মানুষ। মানানাও খুব ভালো একজন মহিলা। সারাক্ষন কাজ করে। আমাদের জন্য রান্না করে, বাজার করে, কাপড় চোপড় ধুয়ে আবার ইস্ত্রী করে রাখে। জামাল কোনো কাজ করে না। ওদের একটা ছেলে আছে। আমি কখনো দেখি নাই। সে থাকে বাকুতে, তার স্ত্রীসহ। মাকে ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু কখনো আসে না। না আসার কারন একটাই, ওর পাস্পোর্ট নাই।

(চলবে)  

০২/০৮/২০০৩- জর্জিয়ার টিবলিসিতে ভ্রমন

গতকাল ২০ দিনের ছুটিতে টিবলিসিতে এসেছি। টিবলিসি শব্দের অর্থ গরম জল। কেনো এই নাম দেয়া সেটা জানা গেলো সোরেনার কাছ থেকে। এখানে প্রচুর সালফিউরিক স্প্রিং আছে। আর এই সালফিউরিক স্প্রিং গুলির কারনে সারা বছরই এলাকাটা গরম থাকে। এই সালফিউরিক স্প্রিং এর কারনেই আসলে টিবলিসির নামকরন। যাই হোক, আমি এখানে কোনো হোটেলে উঠি নাই। যদিও প্রচুর হোটেল আছে।

সোরেনা আমাদের সেক্টরের একজন দোভাষী। ওর সাথে আমার অন্যান্য দোভাষীদের থেকে একটু আলাদা সম্পর্ক। খুবই ভালো একটা মেয়ে। আমি যখন সোরেনাকে বললাম, যে, আমি টিবলিসিতে বেড়াতে যাবো, তখন সোরেনাই আমাকে প্রপোজাল দিলো যে, তার এক খালার বাসা আছে টিবলিসিতে। যদি আমি কিছু মনে না করি, তাহলে আমি ওদের খালার বাসায় থাকতে পারি। রাশিয়ান মানুষেরা খুবই অতিথি পরায়ন। আমি রাজী হলাম। কিন্তু সোরেনা আমার সাথে যেতে পারবে না, ওর ছুটি নাই। ফলে আমাকেই একা যেতে হবে ওর খালার বাসায়। অনেকদিন পর্যন্ত জর্জিয়ায় আছি, ফলে আমি মানুষগুলির স্বভাব, আচরন, ব্যবহার ইত্যাদি সম্পর্কে বেশ জানা আমার। আমার যে কোনো অসুবিধা হবে না, এ ব্যাপারে আমি মূটামুটি নিশ্চিত ছিলাম।

ফলে, টিবলিসি যেতে প্রথমে আমাকে আমার কর্ম ক্ষেত্র গালী সেক্টর থেকে জুগদিদি সেক্টরে আসতে হয়েছে। জুগদিদিতে আমাদের ইউ এন এর জন্য নির্ধারিত এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের নিজস্ব ফ্লাইট দিয়ে সরাসরি টিবলিসিতে এসেছি। আমাদের নিজস্ব প্লেনে আসা যাওয়ায় কনো ভাড়া লাগে না। প্রায় আড়াই ঘন্টা ফ্লাইট। ছোট আন্তোনোভ প্লেন। মাত্র ৪ জন পেসেঞ্জার আমরা। নেমে গেলাম টিবলিসি এয়ারপোর্টে।

সোরেনা আগে থেকেই আমাকে একটা গাইড লাইন দিয়ে রেখেছিলো, কিভাবে টিবলিসি এয়ারপোর্টে নেমে কোনো কোন ইমিগ্রেশন পয়েন্ট দিয়ে বেরিয়ে কোথায় যেতে হবে। এটাও গাইড লাইনে ছিলো যে, এয়ারপোর্টের বাইরে একজন মেয়ে থাকবে আমার জন্য, যাদের বাসায় আমি উঠবো। মেয়েটির নাম দেদুনা বুকিয়া।

আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আমার জন্য অপেক্ষারত মেয়েটির সন্ধান করছিলাম। একটা প্লেকার্ড থাকলে ভালো হতো। কিন্তু সম্ভবত প্লেকার্ডের ধারনাটা ওর নাই। আর আমি মেয়েটাকে চিনিও না। জর্জিয়ার সব মেয়েরাই সুন্দর আর সবাই দেখতে প্রায় একই রকমের। ভাবলাম, আমি তো আর জর্জিয়ানদের মতো নই। ফলে হয়তো মেয়েটা আমাকে দেখলে বুঝতে পারবে।

ঠিক এই সময় ২২/২৩ বয়সের একটি চমৎকার নীল নয়না যুবতী মেয়ে সেন্ডু একটা গেঞ্জি পড়ে আমার সামনে এসে বল্লো, তুমি কি মেজর আখতার?

বুঝলাম, এটাই সেই মেয়ে যার জন্য আমি অপেক্ষা করছি।

আমি হেসে দিয়ে বললাম, হ্যা, আমিই মেজর আখতার। তোমার নাম কি?

সে উত্তরে বলল, তার নাম দেদুনা বুকিয়া। সোরেনার খালাতো বোন।

মেয়েটি অসম্ভব সুন্দুরী, কোকড়ানো চুল, আর তার চোখ সত্যি সত্যিই একদম নীল রঙ এর।

বললাম, চলো।

দেদুনা একতা ট্যাক্সি ভারা করলো, কি যেনো বল্লো, তারপর আমি আর দেদুনা একসাথে ওদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। দেদুনা বল্লো, ওখান থেকে প্রায় ৪০/৪৫ মিনিটের পথ। একটা পাহাড়ি বা মাল্ভুমিতে ওদের বাসা। ওটা একটা সরকারী কন্ডোমুনিয়াম, থাকতে খারাপ লাগবে না।

কথা হচ্ছিলো দেদুনার সাথে। সুন্দর ইংরেজী বলে। সে আসলে একজন সাংবাদিক। অবিবাহিত।

বললাম, দেদুনা, তোমার চোখের দিকে তাকালেই তো ট্যাক্সী ভারা মাফ হয়ে যাবার কথা। কারন লন্ডনে যাদের চোখের রঙ নীল, তাদের জন্য সবকিছু মাফ। কারন তারা মনে করে, ওরা রয়েল ফ্যামিলির সদস্য। এভাবেই ওর সাথে বেশ অনেকক্ষণ কথা বিনিময়ের পর, একটা মালভুমির মতো এলাকায় গাড়ি ঢোকে গেলো।

জর্জিয়ার সব গুলি বাড়ি প্রায় একই রকম। রাশিয়ার ধাচেই করা। জায়গাতা আমার ভালো লাগলো। এতা একতা সরকারী কোয়ার্তার। দেদুনার মা একটা সরকারী স্বাস্থ্য বিভাগের কনো একটা ডিপার্ট্মেন্টে রেডিওলোজিষ্টের কাজ করেন। অত্যান্ত অমায়িক মহিলা।

বাসায় ঢোকেই দেখলাম, আমার জন্য একতা আলাদা রুম দেয়া হয়েছে। আমার রুমের পাশেই বড় হাইওয়ে রাস্তা দেখা যায়। আমার রুম থেকে বের হলেই দেদুনাদের ড্রইং রুম, সেখানে ২০ ইঞ্চির একতা টিভি আছে, সোফাসেট আছে। সরকারী কোয়ার্তার সব সময়ই বড় সাইজের হয়। আমার পাশেই একটা কমন টয়লেট, তারপাশে থাকে দেদুনা আর ওর আরো দুইবোন, তামারা আর সালোমি। তামারা বড় আর সালোমী ছোট। আমি তো প্রথমে সালোমীকে দেখে বুঝতেই পারি নাই যে, ও ছেলে না মেয়ে। কারন ছোট ছোত চুল, গড়ন দেখে মেয়েলী বুঝা যায় না। সবাই খুব মিশুক। সোরেনা আগে থেকেই সম্ভবত ওদের বলে রেখেছিলো আমার খাবারের অভ্যাস গুলি কি। তাই আমি যখন বাসায় পৌঁছলাম, তখন প্রায় দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছিলো। ওরা বেগুন আর ভাত পাক করেছিলো। বাংলাদেশের মতো তো আর খাবার হবে না, কিন্তু খেতে পারলাম।

রাশিয়া বা জর্জিয়ার একটা কথা আগেই বলেছিলাম যে, এরা যে কোনো অতিথিকে “চা চা” নামের এক প্রকার এল্কোহল দিয়ে আপ্যায়ন করে। আমরা যেমন কেউ এলেই চা দেই বা কফি দেই, ওরা দেয় “চা চা” প্রায় ৭৫% এল্কোহল। নিজেরাই বানায়।

আমি ওদের সাথে প্রায় কয়েকদিন থাকার যেহেতু প্ল্যান করেছি, ফলে আমিও চাইছিলাম যে, আমি ওদের মতো করে একেবারে মিশে যাবো। দেদুনাকে বললাম, দেদুনা, একটা সিডিউল করো, আমরা প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাবো, ঘরে থাকবো শুধু রাতের বেলায়। ওরা অনেক ভ্রমন পিয়াসু, খুব পছন্দ করলো। প্রথম দিন আমরা টিবলিসির একটা “ঈগল” রেষ্টুরেন্টে সবাই ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করতে গেলাম। আন্টি গেলেন না। এখানে আমাদের সাথে আরো একজন সাথী জয়েন করেছিলো, সেও দেদুনার খালাতো বোন, নাম রুসুদিন। সে ডাক্তার। কারোরই বিয়ে হয় নাই।

আমরা যেখানেই যাই দল বেধে এই কয়জন যাই। খেতে গেলেও এক সাথে, ঘুরতে গেলেও এক সাথে, গল্প করলেও এক সাথে। অনেক রাতে বাসায় ফিরলাম।

পরদিন খুব ভোরে আমার ঘুম ভাংগলো। দেখলাম, এতো ভোরে ঘুম ভাংগ্লেও সবাই জেগে গেছে। আমি জাগার পর দেদুনা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, নাস্তা খাবো কি খাবার। বললাম, তোমরা যা খাও আমিও সেটাই খাবো। দেদুনা বল্লো, আমরা তো পাউরুটি খাবো।

ওরা একটা পিপায় পাউরুটি রাখে, সাথে একতা ছোট কুড়াল। কারন পাউরুটি গুলি প্রিজার্ভেশনের নিমিত্তে এমন করে বানানো হয় যে, পাউরুটির উপরিভাগ অনেক শক্ত রাখে যা সাধারন হাতে ছিড়া যায় না, একটা ছোট কুড়াল লাগে। যেই পাউরুটির উপরিভাগ কেটে ফেলা হয়, ভিতরের পাউরুটি একদম ফ্রেস থাকে এবং নরম।

দেদুনাকে বললাম, ডিম ভাজি করতে পারো? বল্লো, হ্যা পারি তো।

আমি দেদুনার সাথে রান্না ঘরে গেলাম, দেখলাম কিভাবে ওরা ডিম ভাজে। খুব মজার একটা জিনিষ শুখলাম। ওরা তেল খায় না। প্রায় খায় না বললেই চলে। তাহলে ডিম ভাজে কিভাবে? ওরা যে কাজতা করে, করাইয়ের মধ্যে একটু দুধ দিয়ে দেয় যেটা তেলের কাজ করে। এই দুধের করাইতে ওরা ডিম ভাজে। ব্যাপারটা খারাপ না।

এভাবেই দুইদিন কেটে গেলো।

আমি ভাবলাম, পরোটা খেতে পারলে ভাল হয়। কিন্তু ওরা পরোটা কি তাইই জানে না। আমি বিকালে কিছু ময়দা নিয়ে এলাম, সাথে সোয়াবিন তেল। আমিই সকালে দেদুনাকে নিয়ে আর সালোমিকে নিয়ে ময়দা ছানলাম, তেল দিয়ে করাই গরম করলাম, তারপর কোনো রকমে বিচ্ছিরী সেপের একটা পরোতা বানালাম। কারন পরোতা বানানোর কোনো বেলুনি ছিলো না। যখন আমি তেলের ভেজে পরোটা বানালাম, ওরা ব্যাপারটা খেয়ে খুবই মজা পেলো। শুরু হয়ে গেল পড়োটার নাস্তা প্রতিদিন। এই সময়ে আমার মাথায় একতা বুদ্ধি এলো, আর বুদ্ধিতা হচ্ছে, আমি যদি কিছু বাংলাদেশী খাবার বানাই, তাহলে ওরা হয়তো পছন্দ করতেও পারে। আমি রান্না জানি না, কিন্তু যেহেতু এতো বছর ধরে বাংলাদেশী খাবার খাচ্ছি, ফলে একতা ধারনা তো আছেই।

পরদিন বললাম, তোমরা কি খিচুড়ি খেতে পছন্দ করো? খিচুড়ি কি, সেটা তো ওরা জানে না। কিন্তু এবার ওরা ভাবছে, পরোটা খেয়ে যেহেতু ওরা খুব মজা পাচ্ছে, খিচুড়ি নিশ্চয় আরো কোনো ভাল খাবার হতে পারে। ভাবলাম, খিচুড়িতে কিছু গরুর মাংশ দিলে মন্দ হয় না। কিনে আনলাম কিছু গরুর মাংশ। আমি মুটামুটি তেল আর কিছু মসল্লা (আমি সাথে করে কিছু মসল্লা নিয়ে এসেছিলাম) মেখে মাংশটা কসিয়ে নিয়ে নরম করে তরকারীর মতো করে ফেললাম। তারপর খিচুড়ি পাক করা তো কোনো ব্যাপার না। একটু ঝাল হয়ে গিয়েছিলো। সবাই খেয়ে আরো মজা পেলো কিন্তু ঝালের ব্যাপারটা ওরাই বুঝে নিলো কতটুকু ঝাল দেয়া দরকার।

দেদুনাদের বাসায় আমার খাবার নিয়ে কোনো প্রকারের আর ঝামেলা রইলো না।

আমি প্রতিদিন সবাইকে নিয়ে কখনো পার্কে, কখনো রেষ্টুরেন্টে, কখনো কোনো ঐতিহাসিক স্পটে আবার কখন মার্কেটে, আবার কখনো বীচে যাই। বিকিনী পরা আমার এই বন্ধু গুলিকে আমি কখনো অশ্লীল চোখে দেখার মনোভাব খুজে পাই নাই। এমনো হয়েছে, গলায় গলায় ধরে, আমরা হেটে গিয়েছি, বীচে শুয়েছি, খেলা করেছি। অদ্ভুদ সময়টা কেটেছে। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি এখানে একজন অতিথি।

৫/৬ দিন পর সোরেনা এলো। আরো ভালো সময় কাটলো।

যেদিন আমি চলে আসবো, ওরা আমাকে কাদিয়েছিলো বিরহে। একটা গাড়ি নিয়ে সেই টিবলিসি থেকে সরাসরি আমি যুগদিদিতে এসেছিলাম। কিন্তু আমি সরাসরি আমার বাসায় এলাম না। দেদুনা যুগদিদিতে ওর এক খালার বাসায় আমাকে নিয়ে গেলো। প্রথমে বুঝতে পারি নি ওরা যে এতো গরীব। ওরা আসলে কাউকেই বুঝতে দেয় না ওদের আর্থিক অবস্থার কথা। আমি আর ওর খালু এক রুমে থাকলাম, দেদুনা আর ওর অন্যান্য সব বোনেরা থাকলো আরেক রুমে। রাতে সবার সাথে খাওয়া দাওয়া করলাম। খুব মজা হলো। পরেরদিন সকাল ১০ তাঁর দিকে আমি আমার ২০ নম্বর বাংলাদেশী বাসায় যুগদিদিতে চলে এলাম। সবার কথা আজো আমার খুব মনে পড়ে।

২৮/০১/২০০৩-রাশিয়ার সচি ভ্রমন

বেশ অনেকদিন হয়ে গেলো জর্জিয়ায় এসেছি। গত অক্টোবর মাসে জর্জিয়াতে জাতীসংঘের মিশনে এসেছি। আশেপাশে সারাটা দেশ ঘুরলাম। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, তারপরেও বেশ সুন্দর। বুঝা যায় যে, সোভিয়েট ইউনিয়নের সময় দেশের অবস্থা যথেষ্ঠ পরিমান মজবুত আর শক্ত ছিলো। বেশ গাছ গাছালী আছে সব জায়গায়। মাঝে মাঝে আমার একটা কথা মনে হয় যে, আমরা যারা বাংগালী নিজের দেশের সবুজ বনায়ন দেখে কত গান, কত কবিতা লিখি যেনো আমাদের দেশটাই শুধু সবুজ গাছগাছালী দিয়ে ঈশ্বর সাজিয়েছেন। কিন্তু সেটা মোটেও সত্য নয়। বিভিন্ন দেশ ঘুরে তো দেখলাম, যে, বরং আমাদের দেশটাই পিছিয়ে আছে। এমন কি এই সবুজ বন্যায়নের দিক দিয়েও। কয়েকদিন যাবতই ভাবছিলাম, পাশেই রাশিয়া, ঘুরে আসি। আমাদের জাতীসংঘের সেনাবাহিনীর কোনো জায়গাতেই যাওয়া আসার জন্য কোনো রেস্ট্রিকসন নাই। ইচ্ছে করলেই ইউনিফর্ম পড়েই যেতে পারি, জাতীসংঘের গাড়ি সেলফ ড্রাইভিং করেই যাওয়া যায় একদেশ থেকে আরেকদেশে। তেলের খরচ লাগে না, গাড়ির জন্য কোনো আলাদা পয়সা লাগে না। বেশ ভালো।

কোনো বাংলাদেশীদের সাথে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। তাদের সাথে গেলে যেটা হয়, হয় বেশি আতেল্গিরি না হয় একটা বোঝা হয়ে দাড়ায়। আনন্দের চেয়ে হয় বিরক্ত আসে অথবা মেহনত বাড়ে। কিন্তু কোনো বিদেশীদের সাথে একোম্পানি করলে ব্যাপারটা অনেক সাচ্ছন্ধবোধ লাগে। এখানে অনেকের সাথেই আমার খুব ভালো খাতির। বিশেষ করে পর্তুগাল, পোল্যান্ড কিংবা তুরুষ্কের অফিসারদের সাথে। জার্মানীর সবার সাথেই আমার বেশ ভাল একটা ফ্রেন্ডশীপ আছে। অনেকেই বেড়াতে যাওয়ার সময় আমাকে সংগী করে নিতে চাইলেও কেনো জানি আমার যাওয়া হচ্ছিলো না। তাই এবার ভাবলাম, রাশিয়া থেকে ঘুরে আসি। জর্জিয়া থেকে সবচেয়ে কাছের যে পোর্ট সিটি তার নাম সচী। আমাদের মিশন এলাকা থেকে বেশীর ভাগ অফিসাররা এই সচীতে গিয়েই সপ্তাহান্তের ছুটিগুলি কাটিয়ে আসে। কেউ যায় সস্তা রাশিয়ান মেয়েদের সাথে সেক্স করতে আবার কেউ যায় জাষ্ট একটা বিনোদনের উদ্দেশ্যে। আমার কোনো শখ নাই রাশিয়ান মেয়েদের সাথে কোনো প্রকার দৈহিক আনন্দের, আর এটা আমি মোটেও পছন্দ করি না। তাই আর যাওয়াও হচ্ছিলো না।

উরুগুয়ের এক বিমান বাহিনীর অফিসার, নাম লিওনার্দো, আমার খুব ভালো বন্ধু। সে একদিন এসে বল্লো, আখতার চলো সচী থেকে ঘুরে আসি। ভাবলাম, যাওয়া যেতে পারে। আমাদের সচী যাওয়ার জন্য যা লাগবে তা হলো একটা গাড়ি, আর অনুমতি। দুটুই সহজ এখানে। সেভাবেই আমি আর লিউনার্দো পরিকল্পনা করলাম ২৪ তারিখেই সচী যাবো। তিনদিনের ছুটিই যথেষ্ট। আমি রাশিয়ান ভাষা একদম বুঝি না, এদিকে আবার লিউনার্দো উরুগুয়ের বাসিন্দা বলে অনর্গল পারুস্কি বা রাশিয়ান ভাষাটা তার দখলে। ফলে আমরা তারিখ করেই ফেললাম যে ২৪ তারিখে আমরা রাশিয়ার সচিতে বেড়াতে যাবো। আমি আর লিউনার্দো খুব ভোর বেলা রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমরা দুজনেই ড্রাইভিং জানি। সুতরাং কিছু সময় আমি আবার কিছু সময় লিউনার্দো ড্রাইভ করতে করতে সচীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তাটা বেশ লম্বা। প্রায় আরাই শ কিলোমিটার। আমাদের রাস্তাটা ছিলো প্রায় এই রকম-

জুগদিদি-গালি-অচামছিড়া-লাব্রা-সুখুমি-গুদাউটা-ঘাগ্রা-সিনাতলে-গান্দিয়াদি-খিবানি-আডলার-খোসতা-খোস্টিনিস্কি হয়ে সচী। পুরু রাস্তাই এ-১৪৭ নামে পরিচিত। খুব সুন্দর রাস্তা।

আমরা যখন সচী পৌঁছলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয় হয়। পথে অনেকবার থেমেছিলাম, কখনো কফির জন্য, কখনো এম্নিতেই ছবি তোমার জন্য। আবার কখনো কারো সাথে রাস্তার ডাইরেকশন জানার জন্য। শীতকাল। ফলে দ্রুত বেলা পড়ে আসছিলো। আমরা তখনো জানি না কোন হোটেলে যাবো। কিন্তু আগে থেকেই একটা ধারনা ছিলো যেহেতু অনেকেই এখানে আসেন। আমাদের অন্যান্য অফিসাররাও এখানে আগে আসায় তাদের কাছ থেকে আমরা একটা আইডিয়া করে এসছি।

প্লেহানোভা স্ট্রীটে ইম্পেরিয়া নামে মূটামুটি ভালোমানের একটা হোটেল আছে যেখানে অনেক অফিসাররাই এসছিলো, ফলে আমরা সেটার খোজই নিচ্ছিলাম। হোটেলে যাওয়ার পর দেখলাম একেবারে মন্দ না। দামও মুটামুটি সস্তাই। রুমভাড়া মাত্র ২৫ ডলার করে। ডাবল বেড। আমার আর লিউর তাতে হয়ে যায়। আমরা ব্যাগ রুমে পাঠিয়ে দিলাম, আর গাড়িটা হোটেলের গ্যারেজেই দেওয়ার জন্য একটা দরখাস্ত করে ফেললাম। রিসেপসনে যে ভদ্র মহিলা বসেছিলেন, তার বয়স প্রায় ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, খাবারের ব্যবস্থা কি। আমরা আসলে হোটেলের খাবারের উপর নির্ভর করতে চাই নাই। ফলে আমরা আগেই হোটেল রুম ভাড়া নেওয়ার সময় ফুড পোর্শনটা বাদ দিয়ে ভাড়ার ব্যাপারটা মিটিয়ে নিয়েছিলাম। যেহেতু আমাদের সাথে গাড়ি আছে, ফলে, যে কোনো লং ডিসটেন্সে গিয়েও আমাদের চয়েজ মতো খাবার খেতে পারি।

হোটেলে ঢোকার পর একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম। তারপর আবার বেরিয়ে গেলাম বাইরে। লিউ যেহেতু রাশিয়ান ভাষাটা বুঝে ফলে আমার খুব একটা বেগ পেতে হয় নাই। রাশিয়ায় খুবই কম লোক ইংরেজীতে কথা বলতে পারে কিংবা বলে। ফলে আমি কতটুকু ইংরেজীতে দক্ষ তাতে কিছুই যায় আসে না। বরং পুরা বাক্য না বলে যদি কেউ ভেঙ্গে ভেঙ্গে গুটিকতক ইংরেজি শব্দ বলতে পারা যায়, তাহলে হয়তো কেউ কেউ কিছু ইংরেজী ভাষা বুঝতে পারে। গ্রামার দিয়ে শুদ্ধরুপে যেই ইংরেজী বলবেন, সব তালগোল পাকিয়ে ওরা আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যদি কাউকে বলেন, ডু ইউ নো হাউ টু স্পিক ইংলিশ? কিছুই হয়তো বুঝবে না। তাকে যদি বলেন, স্পিক স্পিক ইংলিশ? তাহলে হয়তো কাজে দিতেও পারে।

প্রথম দিন সচীতে। রাতের বেলায় বেরিয়ে কোনো একটা মার্কেট খুজতেছি। ভালো মার্কেট যে কোথায় সেটা পাওয়া খুবই জটিল মনে হলো। রাত প্রায় ৯টা বেজে গেছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা কোনো রকম রেষ্টুরেন্টে আমি আর লিউনার্দো কিছু একটা আপাতত খেয়ে নিলাম। লিউকে দেখে অনেকটা রাশিয়ান রাশিয়ান মনে হলেও আমি যে এখানে বিদেশী এটা ওদের কারোরই বুঝার বাকী ছিলো না। রাস্তাঘাট বেশ ফাকা। একটা বয়স্ক মহিলা আমাদের কাছে এসে বল্লো, “তেবে নুঝনা দেবুস্কা?” লিউনার্দো আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিয়ে বল্লো, বুঝতে পেরেছো, মহিলা কি বলছে? আমি বললাম, নাহ। লিউনার্দো বল্লো, তোমার কোনো মেয়ে চাই কিনা। তার কাছে ভালো আনাড়ি সুন্দুরী মেয়ে আছে, এবং যুবতী। বুঝলাম, সচী এমন একটা জায়গা যেখানে বেশ্যাবৃত্তি হচ্ছে প্রধান ব্যবসা। একটু পরপরই কেউ না কেউ এসে সেই একই কথা বলে যাচ্ছে, আমাদের কোনো মেয়ে চাই কিনা। কি তাজ্জব।

যাই হোক, আমি আর লিউনার্দো হোটেলে চলে এলাম। আমি লিউকে বললাম, লিউ বেশীদিন তো আর এখানে থাকতে আসিনি, চলো, রাতের রাশিয়া দেখে আসি। লিউ আমার খুব ভক্ত। বল্লো, চলো যাই তাহলে। আমরা গাড়ি নিলাম না। পায়ে হেটেই বেশ কিছুদুর এগুলাম। শুনশান রাস্তা, লাইট পোষ্টগুলি জলছে। কুয়াসায় রাস্তা প্রায় ঢেকে যাচ্ছে। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে লিউকে নিয়ে সচী রিভারের কাছাকাছি চলে এলাম। প্রচুর মানুষ নদীর পারে। দেখলাম, প্রায় সবগুলি মানুষই মাতাল। ছেলেমেয়েরা একে অপরের সাথে প্রেম করছে, মাতামাতি করছে। আর পাশে এক বেহালাবাদক নিজের মনের সুখে বেহালা বাজিয়ে যাচ্ছে। এই বেহালার সুরে আবার কোনো কোনো মাতাল কিছু একটা দিয়ে বাদ্য যন্ত্রের মতো ঢোল পিটাচ্ছে। আর এই ঢোলের তালে তালে আবার কেউ কেউ এমন নাচনী দিচ্ছে, মনে হয় না কোনো কালে সে নাচ শিখেছে। এই নাচ দেখে আবার কেউ কেউ তাকে উতসাহও দিচ্ছে। মানুষ যখন মাতাল হয়, পাশে বসা কুকুরের আওয়াজ ও মধুর সুরের মতো হয়তো মনে হয়। মাতাল অবস্থা একটা দেখার মতো অভিজ্ঞতা।

রাত প্রায় বারোটার দিকে আবার আমি আর লিউনার্দো হেটে হেটেই আমাদের হোটেলে চলে এলাম। এই আসার পথে কমপক্ষে তিন থেকে চার জন আমার কাছে সিগারেট চেয়ে নিলো। এখানে সিগারেট চাওয়া যেনো একটা মামুলি ব্যাপার, হোক সে পরিচিত বা অপরিচিত। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, রাস্তায় অনেক লোক নেশা করে হেটে বেড়ায় কিন্তু অসভ্যতা করে না। আমাদের দেশ হলে তো ব্যাপারটা হতো ভয়ংকর। এখানে মাতালেরও একটা নীতি আছে।

হোটেলল রুমে ঢোকেই দেখি দরজার নীচ দিয়ে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬টা ভিজিটিং কার্ড পড়ে আছে। সবগুলি কার্ড সেক্স গার্লদের। রুম সার্ভিস সহ অফার। কি তাজ্জব। সেক্স এখানে এতো জনপ্রিয় আর সস্তা? অনেক রাস্তা আজ ড্রাইভিং করেছি, আবার রাতও কম হয় নাই। টায়ার্ড লাগছে, তাই আমি আর লিউ পাশাপাশি বেডে শুয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন, প্রায় অনেক বেলা হয়ে গেলো ঘুম থেকে উঠতে উঠতে। আমরা যখন ঘুম থেকে উঠলাম, বেলা তখন প্রায় ১১ টা সকাল। প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। আমার আসলে ভাত না হলে চলেই না। লিউকে বললাম, লিউ চলো, ভাতের কোনো রেষ্টুরেন্ট পাও কিনা। লিউ আবার এইসব ভাত খেতে পছন্দ করে না। আমাদের ইম্পেরিয়ার পাশেই একটা ছাউনীওয়ালা লোকাল রেষ্টুরেন্ট ছিলো। আমার মনে হলো, সেখানে হয়তো ভাত পাওয়া যেতে পারে। লিউ যেতে চাইলো না। ওর নাকি ক্ষুধা নাই। সে একটা বিয়ার নিয়ে জানালার পাশে বিয়ার খেতে থাকলো। আমি একাই বেরিয়ে গেলাম। বেশী তো আর দূর নয়, এই পাশেই তো। প্রচুর লোক তখনো খাচ্ছে। একটা গমগম ভাব। আমি ঢোকলাম, আমি জানিনা কিভাবে ‘ভাত খাবো এটা বলতে হয়’। তো, ওখানে একটা ২০/২২ বছর বয়সী ছেলে খাবার সার্ভ করছিল। আমি ইশারা করতেই সে আমার কাছে এসে, ওদের ভাষায় কি খাবো হয়তো জিজ্ঞেস করলো। আমি আসলে বুঝতে পারি নাই। বললাম, মেন্যু কার্ড?  ছেলেটা আমার কথা বুঝলো। একটা মেন্যু কার্ড নিয়ে এলো। বেশীর ভাগ লেখা রাশিয়ান ভাষায়। এম্নিতেই ভাষা বুঝিনা, তাও আমার লেখা। এটা আমার কাছে থাকা যা, আর না থাকা একই। ছেলেটাকে বললাম, ‘রাইস?”

ছেলেটা কি বুঝলো বুঝলাম না, সে একটু পড়ে ফিস কাটলেট নিয়ে হাজির। আমি খুব বিরক্ত হলাম, কারন, আমি ভুলেও ফিস উল্লেখ করি নাই, সে কেনো ফিস নিয়ে এলো? আমার মুখের অভিব্যক্তিতে ছেলেটা বুঝতে পেরেছিলো। সে “প্রোস্তিতে” প্রোস্তিতে, বলতে বলতে আবারো ভিতরে চলে গেলো। এবার কোনো খাবারই সে আনে নাই। এদিকে আমার ক্ষুধায় পেট চু চু করছে। একটু বিরক্তও হচ্ছিলাম। লোকজন তাদের খাবার খেয়ে একে একে বের হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি খাবারের অর্ডারই দিতে পারলাম না।

আবারো আমি ছেলেটাকে বললাম, রাইস রাইস? সে যেন আমার কথা কিছুই বুঝলো না এবার। মাথা নেড়ে যা বল্লো সেটার অর্থ, সে আমার কথা বুঝতে পারছে না। আমি এতোটাই বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, যে, ভাবলাম, এখানে খাওয়ারই দরকার নাই। আমি উঠতে যাচ্ছিলাম। একটু রাগ আমার চোখে। প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিলাম, এমন সময় খুব চমৎকার ইংলিশে পিছন থেকে একটা ২৪/২৫ বছরের ইয়াং মেয়ে বল্লো, এক্সকিউজ মি স্যার!!

আমি পিছনে তাকিয়ে দেখলাম, মেয়েটার গায়ে একটা এপ্রোন পরা। সম্ভবত রান্না ঘর থেকে এসছে। আমাকে ক্লিন ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, ক্যান আই হেল্প ইউ? মনে মনে খুব আশ্বাস পেলাম যে, মেয়েটা মনে হয় ইংরেজী বুঝে।

আমি বললাম, আমি ভাত খেতে চাই, আছে?

মেয়েটা আমার হাত ধরে টেনে রান্না ঘরের দিকে নিয়ে গেলো। সম্ভবত সে ‘রাইস’ কথাটা বুঝে নাই। অথবা বুঝলেও কেনো আমাকে রান্না ঘরে নিয়ে গেলো সেটা আমার মাথায় আসলো না। রান্না ঘরে যাওয়ার পর সে একেএকে তার ডেকচিগুলি খুলে আমাকে দেখাচ্ছে, কোন খাবারটা আমি খেতে চাই। আমি একটা ডেকচিতে দেখলাম, ভাত আছে। বললাম, এইটা।

মেয়েটা হেসে দিয়ে বল্লো, অহ রিস? বুঝলাম, ওরা রাইস বলে না, বলে রিস।

সে আমাকে আবারো টেবিলে বসতে বল্লো, আর বল্লো, ফাইভ মিনিটস।

বসে আছি, প্রায় ১০ মিনিট পর মেয়েটা শুধুমাত্র এক কাপ ভাত আর একটা খালি প্লেট নিয়ে আমার টেবিলে রাখলো। আমি তো অবাক।

আরে ভাই, ভাতটা খাবো কি দিয়ে?

যাই হোক, মেয়েটা আমার অসহায়ের অবস্থাটা বুঝতে পেরে, প্রথমে ছেলেটা যে ফিসকাটলেটটা নিয়ে এসছিলো, সেটা দিয়ে বল্লো, আপাতত এটা দিয়ে খাও। আমি তোমাকে পরে ভাল খবর দেবো। তুমি কি ইন্ডিয়ান?

মেয়েটি আমাকে তার একটা ভিটিং কার্ড দিয়ে বল্লো, রাখো এটা, কাল আবার তোমার সাথে ঠিক এই সময় এস, কথা বল্বো। কার্ড তা হাতে নিয়ে পড়ে দেখলাম, ওর নাম, এলিজাবেথ (লিজা), ৪র্থ বর্ষ, হোম আর্টস, ইউনিভার্সিটি অফ রাশিয়া।

১২/১০/২০০২-ট্র্যাবজন থেকে জর্জিয়া

ট্র্যাবজনে যখন পৌছলাম, তখন রাত প্রায় দশটা। ছোট একটা এয়ারপোর্ট। একেবারেই নিস্তব্ধ। গুটি কতক লোক যেনো পুরু এয়ারপোর্ট টাকে আগলে রেখেছে। দোকান পাট যাও আছে, খদ্দরের অভাবে সে গুলিও প্রায় বন্ধের মতো। এয়ারপোর্ট যতোই নিস্তব্ধ হোক, এর ভিতরের একটা  রুপ আছে। সুন্দর, পরিপাটি ফ্লোর, দোকান পাট বন্ধ থাকলেও এদের বাইরের সাইন বোর্ড আর বিজ্ঞাপন চোখে পড়ার মত। এখানে যে সব দোকান পাট খোলা, তারা যেনো নিরাপত্তার মতো ব্যাপারটা মাথায়ই নাই, কোনো চোর ডাকাতের ভয় নাই। এটা একটা  আরেক জগত।

এয়ারপোর্টের ভিতরেই টাকা ভাঙ্গানোর এক্সচেঞ্জ গুলি বসে আছে। সুদুর ঢাকা থেকে ডলার নিয়ে এসেছি কিছু। কোথাও কিছু খেতে গেলে বা কিনতে গেলেও লোকাল কারেন্সি লাগবে। তাই মেজর ইরশাদ বল্লো, স্যার, কিছু দলার চেঞ্জ করে নেই। খারাপ বলে নাই, ভাবলাম, শ পাছে ডলার ভাংগিয়ে নিয়ে যাই। আবার ভাবলাম, আগামী কালই তো চলে যাবো তুরস্ক ছেড়ে, এতো ডলার এক্সচেঞ্জ করা কি ঠিক হবে? যাই হোক, সিদ্ধান্ত নিলাম, তিনশত ডলার আপাতত এক্সচেঞ্জ করি। বাকিটা জর্জিয়া গেলে তো ওখানকার লোকাল কারেন্সি লাগবে।

এখানে একটা মজার ব্যাপার ঘটে গেলো যা আমার বা মেজর ইরশাদের অভিজ্ঞতার বাইরে। ডলার ভাঙ্গাতে গিয়ে হতবাক হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। এদের মুদ্রার নাম লীরা। আর এখানে এক ডলার দিয়ে প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার লিরা পাওয়া যায়। তার মানে আমি যদি এখন ৫০০ ডলার ভাঙ্গাই, তাহলে কত লীরা হবে বুঝতে পারছিলাম না। একি দেশ?  তারপরেও, নিলাম। এখন কত পাইলাম, আর কত পাওয়া উচিত ছিলো, আদৌ সব ঠিক মতো পাইলাম কিনা এই অবেলায় ক্ষুধার্থ পেটে আর মাথা কাজ করছিলো না। সারাদিনের প্রচন্ড জার্নীতে শরীর প্রায় অবশ। এখন তাড়াতাড়ি কোনো একতা হোতেলে গিয়ে উঠতে পারলেই যেনো বাচি। প্রায় এক ব্যাগ লীরা নিয়ে এয়ারপোর্ট ছেড়ে ট্র্যাবজন শহরের দিকে ছুটলাম। তখন রাত প্রায় ১১ টার কাছাকাছি। শহরও প্রায় নির্জন হয়ে এসছে।

একটা ভাড়া করা গাড়িতে আমি আর মেজর ইরশাদ ট্র্যাবজন শহরে চলে এলাম, পথে ঘাটে লোকজন নাই বললেই চলে। গাড়ির ড্রাইভার আমাদেরকে একতা সাধারন হোটেলের সামনে এনে কাকে যেনো উচ্চস্বরে ডাক দিলো। যেহেতু আমরা ওদের ভাষা বুঝি না কিন্তু আকার ইংগিতে এটা বুঝলাম যে, সম্ভবত হোটেলের কোনো এক কর্মচারীকে নতুন খদ্দর নিয়া এসেছি এটা জানান দিলো।

একটু পর মধ্য বয়সী একজন লোক এসে তাদের মধ্যে কি কি কথাবার্তা জানি হলো, আমাদেরকে একতা ক্যাল্কুলেটরের মাধ্যমে বুঝাইলো যে, হোটেল ভাড়া এক রুম প্রতি দিনের জন্য প্রায় ৫০ ডলারের সমান। কিছু করার ছিলো না। কারন রাত অনেক, শরীরের উপর অনেক ধকল, এদিকে আবার অন্য কোথাও গিয়ে রুম পাই কিনা, পাইলেও এর থেকে ভালো এবং সস্তায় হবে কিনা জানি না, তাই রাজী হয়ে গেলাম। ড্রাইভারকে ভাড়া দিতে গিয়াও কারেন্সীর হিসাব নিয়া বড় বেসামাল। একেকতা নোত এক লক্ষ লীরার সমান। নোটের মধ্যে এতো বড় বড় সংখ্যা যে, পড়তে গেলে এক দুই তিন করে করে খালী শুন্যই গুনতে হয়।

আমি আর ইরশাদ মালামাল নামিয়ে হোটেলে উঠে গেলাম। শীত টা ঝাকালো না কিন্তু আবার কম ও না। ল্যাপ কম্বল সব বুঝে নিলাম। আমরা হাত মুখ ধুয়ে বাইরে খাওয়ার জন্য বেরিয়ে গেলাম। পাশেই একতা ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে এমন একতা রেষ্টুরেন্ট আছে। আমরা বেশি ঘুরাঘুরি না করে পাশের রেষ্টুরেন্টেই খাওয়ার জন্য ঢোকে গেলাম।

রেষ্টুরেন্টের ভিতরে মাত্র দুজন মানুষ বসে আছে। একজন মহিলা আর আরেক জন পুরুষ। এ গুলি নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা নাই। কিন্তু পরে অনুভব করলাম, আমাদের যদিও তাদের নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নাই, কিন্তু তাদের মাথা ব্যথা ছিলো আমাদের নিয়ে। তাদের মধ্যে পুরুষ ব্যক্তিটি আমাদের টেবিলে এসে বসলেন। ভালো ইংরেজী বলতে পারেন। সালাম দিয়ে আমাকেরকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে এসেছি।

এখানে একতা কথা বলে রাখা ভাল যে, মিশনে আসার আগে আমরা তুরস্ক নিয়েও একতা ফিডব্যাক নিয়ে এসছিলাম। এখানকার লোক গুলি নাকি অনেক ফ্রড, সুযোগ আর সময় পেলেই বিদেশি পর্যটকদের ঠকাইতে ছাড়ে না। আমাদের মাথায় এতা ছিলো। ফলে, খুব সহজেই কারো ট্র্যাপে পড়ে যাবো এতা ভাবি না। যাই হোক, লোকটার আমাদের টেবিলে বসার উদ্দেশ্য নিয়ে আমার এবং মেজর ইরশাদের দুজনের মধ্যেই একই রকম সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিলো। আমরা মোটামুটি একতা সাধারন খাবারের অর্ডার দিয়ে খাবারের জন্য অপেক্ষা করছি, আর এই ফাকে ভদ্রলোক আমাদের বিনোদনের জন্য এমন কিছু লাগবে কিনা জানালেন। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝি নাই।

বললাম, সিগারেট দরকার। কোথায় পাই?

লোকটি হেসে দিয়ে বললেন, আরে সিগারেট পাওয়া যাবে, সাথে কোনো সাথী লাগবে কিনা, লাগলে বলেন।

বুঝলাম, এরা মেয়ে ঘটিত কোনো ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছে।

বললাম, না ভাই, আমরা মুসলমান, এসব ব্যাপারে আমরা আলাপ করতে চাই না। তারপর আগাইয়া এলেন সেই ভদ্র মহিলা। ব্যাপারটা ভালো ঠেকছিলো না। আর হোটেলটার মধ্যে লোক জন একেবারেই নাই। একটু নার্ভাস লাগছিলো যে, এরা আবার কোনো সংঘবদ্ধ গ্যাং কিনা কে জানে। ঠি এই সময়ে তৃতীয় একজন খদ্দর এলেন খাবারের জন্য। মনে হলো তিনীও আমাদের মতো এখানে নতুন।

আমাদের সালাম দিয়ে বললেন, আনারা কি এখানে আজই এসেছেন? বললাম, জী, আমরা জাতী সংঘের লোক। জর্জিয়ায় যাচ্ছি কাল ভোরে। কি মনে হলো, আর কি জানি হলো, আগের দুইজন লোক (মহিলা আর পুরুষটী০ এই নতুন লোকটিকে দেখার পর চলে গেলো।

আমরা মোটামুটি খেয়ে হোটেলে চলে এলাম।

আগামীকাল খুব ভোরে আমাদের ফ্লাইট, তাই কোনো বাক্সই আর খুললাম না। বাথ রুম করে শুয়ে পড়বো, কিন্তু বাথ রুমে গিয়ে দেখি পানি নাই। অনেক দাকাডাকি করেও কাউকে পেলাম না। ফোন আছে রুমে, কাউকে ফোন করেও পাওয়া গেলো না। রিসেপ্সন একটা আছে, কিন্তু কোনো লোক নাই। এয়ারপোর্ট থেকে দুই বোতল পানি কিনেছিলাম, আপাতত সেই পানি দিয়াই সব কাজ সারা হল। মেজাজ খারাপ করার কোনো উপায় নাই। একদিকে ভাষা বুঝি না। অন্যদিকে কেউ নাই যার সাথে রাগ দেখাতে পারি। ফলে আমি আর মেজর ইরশাদ তুরুষ্কের সরকারকে কিছুক্ষন গালাগালি করেই মনের শান্তি লাভ করিয়া ল্যাপ গায়ে দিয়া ঘুমাইয়া পড়িলাম।  

১০/১০/২০০২-জর্জিয়ায় আগমন

গত ৪ অক্টোবর ২০০২ তারিখে আমি দ্বিতীয় বারের মতো জাতীসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষা বাহিনীর অধীনে  মিশনে এলাম। এবার মিশন এককালে রাশিয়ার অধীনে থাকা জর্জিয়ায়। ইউরেশিয়ার ককেশিয়ান রিজিয়নের মধ্যে ওয়েষ্টার্ন এশিয়া আর ইষ্টার্ন ইউরোপের মধ্যে অবস্থিত এই দেশটি। পশ্চিমে ব্ল্যাক সি, উত্তরে রাশিয়া আর দক্ষিনে আছে তুরস্ক আর আর্মেনিয়া। দক্ষিন পূর্বে আছে আজারবাইজান।

৪ অক্টোবর ২০০২ এ ঢাকা থেকে সুদুর জর্জিয়ায় কিভাবে কিভাবে এলাম, এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা। রোজার দিন। আমি আর মেজর ইরশাদ (আমার জুনিয়ার, ১৭ লং কোর্ষের) আমরা একসাথে মিশনের উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়েছিলাম দুপুরের দিকে। আমি কর্মরত আছি আর্মি হেডকোয়ার্টারে এমটি পরিদপ্তরে আর মেজর ইরশাদ কর্মরত ছিলো এএফডি তে (আর্ম ফোর্সেস ডিভিশন)। দুটুই পাশাপাশি অফিস।

গত কয়েকদিনে মিশন এলাকার ব্যাপারে ওখানে থাকা মেজর আখতার শহীদের সাথে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। মিশন এলাকায় সিএমও (চীফ মিলিটারী অবজারভার) হিসাবে আছেন আমাদের বাংলাদেশের জেনারেল আশফাক। স্যারের সাথেও অনেকবার মেইলে চিঠি আদান প্রদান হয়েছে। একটা আভাষ পাওয়া গেছে মিশন এলাকার ব্যাপারে। সে মোতাবেক মোটামুটি প্রিপারেশন নিয়ে বাক্স পেটরা গুছিয়ে নিয়েছি।

আমাদের ফ্লাইটটি ছিল ঢাকা থেকে ইস্তানবুল (তুরষ্ক) হয়ে, তুরষ্কেরই আরেকটি প্রদেশ ট্রাবজনে যাওয়া। সেই ট্রাবজনে আমাদের জন্য স্পেশাল ফ্লাইট থাকবে জাতীসংঘের। সেটা দিয়ে আমরা পরেরদিন জর্জিয়ার রাজধানী টিবলিসি শহরে পৌছব। টিবলিসি থেকে আরেকটি ফ্লাইটে আমরা পরের কয়েকদিন পর জর্জিয়ায় যাবো। এই পুরু ভ্রমনটা ঢাকা থেকে জর্জিয়ায় পৌঁছানোর সময় ছিলো মাত্র দুইদিন। অর্থাৎ ৬ তারিখের মধ্যেই আমাদেরকে আমাদের মিশন এরিয়াতে হাজির হইতে হবে।

আমরা যথারীতি রওয়ানা হয়ে গেলাম। পরিবারের সবার কাছ থেকে একটা আবেগঘন বিদায় হলো। আমার দুই মেয়ে ঊম্মিকা আর কনিকা। উম্মিকার বয়স সবেমাত্র ৮ বছর হয় নাই, আর কনিকার বয়স তো মাত্র ৩ ও হয় নাই। আমি জানি মিটুল দায়িত্তশীল মহিলা, সব সামাল দিতে পারবে। বাসা সেনানীবাসের ভিতরেই স্টাফ রোড ১৪৯/৪ নং বাসা। ফলে ওদের নিরাপত্তা নিয়া আমি চিন্তিত ছিলাম না। তারপরেও প্রায় এক বছরের জন্য যাচ্ছি, একটু তো মন খারাপ হবেই, তাইই হয়েছিলো আমার।

রোজা ছিলাম বলে প্লেনের ভিতরে কোনো কিছুই খেতে পারি নাই। প্লেন প্রায় ৫ ঘন্টা উরে গিয়ে সন্ধ্যার দিকে ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে নামলো। তুরুষ্কে এটাই আমার প্রথম পদার্পন। বিশাল একটা এয়ারপোর্ট। প্রুচুর লোকের আনাগোনা, কেউ ল্যান্ড করেছে, কেউ আবার ফিরে যাওয়ার জন্য লবিতে বসে আছে, ছোট বড় সব বয়সের মহিলা পুরুষের বিস্তর একতা ভদ্র মেলার মতো। কোনো কোনো সৌখিন মহিলারা ট্যাক্স ফ্রি পছন্দের সই কেনা কাটা করছে, কেউ আবার কেনার সামর্থ না থাকলেও দেখাদেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বার, মদের দোকান, সবই আছে। নেশাখোরদের জন্য এটা একতা ভালো ব্যবস্থা। প্রকাশ্যে নেশা করলেও কেউ কিছু বলবে না বিধায় পেটপুরে যতটুকু পানিয় খেলে কন্ট্রোলে থাকা যায় তাতেই বেশ আনন্দ সহকারে খেয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ আবার ফ্লাইট দেরীর কারনে অলস ভাবে কোন এক লোহার চেয়ারে হেলান দিয়ে, কেউ আবার দুই পা তুলে সঠান হয়ে লম্বা একখান ঘুম দিয়ে নিচ্ছে। যারা পেটুক স্বভাবের, তারাও কম যায় না, পেটে জায়গার অভবে যেনো সব কিছু খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও খাওয়া যাচ্ছে না ভেবে আফসোস করছে। কেউ কেউ আবার কম্পিউতার যন্ত্রের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেনো ইহাইয়া তাহার একমাত্র সাথী আর সংগী। যাই হোক সব কিছু মিলে কিছু কোলাহল, কিছু নীরবতা মিলে বেশ সুন্দর। বাংলাদেশের এয়ারপর্ট দেখলে এয়ারপোর্ট সম্পর্কে যা ধারনা হয়, এই এয়ারপোর্ট দেখলে নিজের দেশের দুরাবস্থার কথা মনে হয়। অথচ দুটুই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে আমাদের একটা কানেক্টিং ফ্লাইট ছিলো সরাসরি ট্রাব্জন এয়ারপোর্টের জন্য। আমি আর ইরশাদ দ্রুত সেই কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার জন্য এখান থেকে সেখানে, লাগেজ নেওয়া ইত্যাদি করতে করতেই আর ইফতারির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। অথচ তখন রাত বাজে প্রায় নয়টা। এখানে একতা কথা জানিয়ে রাখা ভালো যে, আমরা সূর্যের অপোজিটে যাচ্ছিলাম বলে যদিও আমরা লোকাল টাইমে রাত নয়টা দেখছি কিন্তু বাংলাদেশ টাইমে আসলে ওটা ছিলো আরো বেশি। ফলে আমাদের রোজার সময়তা এতো বেশি বড় হয়ে গিয়েছিলো আর এতো ধকল যাচ্ছিলো যে, পেটের ক্ষুধায় মনে হচ্ছিলো আর পারছিলাম না। তারপরেও কাজের কারনে বিশেষ করে কানেক্টিং ফ্লাইটের কারনে আমাদের খাওয়া হয় নাই।

আমরা কানেক্টিং ফ্লাইটে উঠে গেলাম ট্রাবজনে যাবো। ছোট একটা তুর্কী বিমান। বেশ লোকজন আছে। একটা জিনিষ খুব খেয়াল করলাম যে, তুরষ্ক একটা মুসলমান দেশ, তার মধ্যে এখন রোজার মাস কিন্তু মেয়েদের কাপড় চোপরের স্টাইল একেবারেই ওয়েষ্টার্ন দেশের মতো। কিছুইতেই বুঝা যাচ্ছিলো না যে, এরা মুসল্মান কালচার ধারন করে।

কিছুক্ষন পর, আমাদের কানেক্টিং ফ্লাইট উড়ে চল্লো ট্রাবজনের উদ্দেশ্যে।

২৬/০৩/২০০২-মা আর নাই

জন্মঃ তারিখ জানা নাই

মৃত্যুঃ ১৮ মার্চ ২০০২, ১০ মোহররম, সোমবার

স্থান_ নতুন বাক্তার চর

সেনানীবাসের ৪৯/৪ ষ্টাফ রোডে আমার বাসা। আর্মি হেডকোয়ার্টারে মিলিটারী ট্রেনিং ডাইরেক্টরেটে আমি জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ হিসাবে কর্মরত আছি। প্রচুর কাজ থাকলেও এখানে একটা ভালো বিষয় হচ্ছে, অফিস আওয়ারের পর খুব বেশী একটা অফ টাইমে অফিসে যেতে হয় না। সাধারনত বিকালের দিকে বেশ ফ্রি থাকি। এই ফাকে আমি নিবাইস ইন্সটিটিউটে এমবিএ এর সন্ধ্যাকালীন কোর্ষে ভর্তি হয়েছি। আমার সাথে আমার কোর্ষমেট মেজর সালাম, মেজর জাবের, মেজর মাসুদ ইকবালও ভর্তি হয়েছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রোফেসর আব্দুল মান্নান নিবাইশ এর মালিক এবং তিনি কয়েকদিন আগেই সবেমাত্র নিবাইশ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি হিসাবে চাউ করেছেন। তিনি আমাদের পেয়ে বেশ উৎফুল্ল মনে হয় কারন আমরা ইতিমধ্যে তার নিবাইস ইন্সটিটিউটে একটা সারা জাগাতে পেরেছি। সপ্তাহে দুইদিন ক্লাস হয়। শুক্রবার আর শনিবার। তাই শুক্রবারটা আমার খুব ব্যস্ত সময় যায় দুটু কারনে, এক, নিবাইশে ক্লাস আর ২য় টা হচ্ছে- আমি প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার মাকে দেখার জন্য গ্রামে যাই।

মাকে ঢাকায় রাখতে চাইলেও মা ঢাকায় থাকতে সাচ্ছন্ধবোধ করেন না। যতোদিন আমার কাছে থাকেন, ভালোই লাগে, কিন্তু যখনই গ্রামে চলে যান, আমি প্রতি সপ্তাহে মাকে দেখার জন্য গ্রামে যাই। নিজের গাড়ি নাই তাই, সকাল বেলা একটা সিএনজি সারাদিনের জন্য ভাড়া করি, সরাসরি গ্রামে যাই, মায়ের সাথে এক বেলা সময় কাটাই, তারপর দুপুরে মায়ের সাথে খাওয়া দাওয়া করে বিকালে ওই একই সিএনজি নিয়ে সরাসরি নিবাইসে ঢোকি ক্লাসের জন্য। রাত ১০টা অবধি ক্লাস চলে। মায়ের সাথে আমার সময়টা কাটাতে বেশ লাগে। গ্রামে যখন হাজির হই, মা জানে আজ আমি যাবো, কিভাবে জানে জানি না। মাকে কখনো আগাম জানিয়ে আমি গ্রামে যাই না। যখনই সময় পাই, চলে যাই। মা আমার আসার কথা ভেবে, দুপুরে বেশ ভালো তরকারী আগে থেকেই রান্না করে রাখেন। আমি আর মা একসাথে খেতে বসি, কিন্তু মা খান না, আমার খাওয়া দেখেন আর সারাক্ষন আমার শরীরে হাত বুলাতে থাকেন। মাঝে মাঝে মাকে আমি প্রশ্ন করি, আচ্ছা মা, আমি কি এখন ছোট যে, তুমি এভাবে সারাক্ষন আমার পিঠে, মাথায়, মুখে হাত বুলিয়ে আদর করো যেনো আমি একটা ছোট বাচ্চা। মা কিছুই বলেন না, হাত বুলাতেই থাকেন, আমার ভালোই লাগে।

এবার গ্রামে গিয়েছিলাম মাকে দেখতে গত ৮ মার্চ ২০০২ তারিখে। বেলা তখন প্রায় ১১ টা বাজে। মাকে দেখলেই আমার প্রান জুড়িয়ে যায়, মন ভালো হয়ে যায়। অনেক গল্প হয় মার সাথে। গ্রামে ঘটে যাওয়া গত সাতদিনের সব খবর আমি মার কাছ থেকে পাই। গল্প করতে করতে দুপুর হয়ে যায়। কখনো কখনো দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর, আমি আর মা এক সাথে গল্প করার জন্য বাইরের বাতাসে আমাদের পুর্ব পাশে রান্না ঘরের বাইরে মাদুর নিয়ে বসি। এবারও তাই হলো। দুপুরটা বেশ সুন্দর কিন্তু রোদের তেজ এতো বেশি যে, ভাবলাম, একটু বেলা পড়ে গেলেই রওয়ানা হবো, ক্লাশ আছে। এই সময়টা মার সাথে গল্প করি। অন্যান্য বারের মতো মা আজো আমাকে তার মুখ থেকে চিবানো পান দিয়ে বল্লো, আগামী সপ্তাহে আবার কবে আসবা? বললাম, আমার তো মা, শুক্রবার ছাড়া আসা হয় না, সারা সপ্তাহ কাজ থাকে। কিন্তু এই আগামী সপ্তাহে ১৫ মার্চ শুক্রবারে মনে হয় আসতে পারবো না। কারন বগুড়া সেনানীবাসে একটা কনফিডেনশিয়াল চিঠি নিয়ে আমাকেই যেতে হবে। কিন্তু ১৫ তারিখের পর ১৮ মার্চ তারিখে আশুরার জন্য সোমবার ছুটি আছে, সেদিন ইনশাল্লাহ চলে আসবো।

মা, আমার খালী পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে একটু নীচু স্বরে কি যেনো বললেন, ভালো বুঝা গেলো না কিন্তু এটা যেনো স্পষ্ট শুনতে পেলাম যে, মা বললেন, ওইদিন আমাকে পাও কিনা, কে জানে?

আমি মায়ের দিকে তাকালাম। বললাম, মা তুমি কি বল্লা?

মা বল্লো, না তেমন কিছু না, তবে গত কয়েকদিন যাবত আমি তোমার বাবাকে বারবার স্বপ্ন দেখছি। তোর বাবা আমাকে বারবার তার সাথে দেখা করতে বলছে। আমিও জানি কেমন করে বলে দিলাম, আমি আসতেছি।

খুব অবাক হলাম মায়ের এরকম বিশ্বাস আর কনফিডেন্স দেখে। বললাম, আপনি কি এগুলি বিশ্বাস করেন? হতে পারে কোনো কারনে আপনার মন খারাপ ছিলো, একাকিত্ত থেকে মানুষ অনেক সময় তার আপনজনকে খুব মিস করা থেকে হয়তো এ ধরনের স্বপ্নের উদ্ভব হয়, তাই হয়ত বাবাকে মনে পড়ছে তোমার। এগুলি বিশ্বাস করা ঠিক না মা। আপনার কিছুই হবে না ইনশাল্লাহ।

মা কিছুই বললেন না বললেন, আমি যখন তোর বাবাকে খুব একটা সপ্নে দেখিনা, কিন্তু যখন সত্যি এমন কিছু আমার জানা দরকার অথচ আমি জানি না, সে রকম কিছু সময়ে আমি তোর বাবাকে সপ্নে দেখি। এটা আমার জীবনে অনেকবার ঘটেছে। সেটা আসলে স্বপ্ন নয়, সেটা আসলেই বাস্তব, হয়তো ব্যাপারটা সপ্নে ঘটে। কিন্তু ব্যাপারটা বাস্তব। মন খটকা লাগলো। মা সাধারনত এ রকমের কথা প্রায়শই বলেন না। কিন্তু যখন বলেন, আমি দেখেছি ব্যাপারটা সত্য হয়। যেমন, আমি যখন খুব গোপনে সবার অগোচরে আর্মিতে পরীক্ষা দিয়ে প্রায় চলে আসবো, ঠিক সে সময় মা কোথা থেকে প্রশ্ন করে বললেন, তুমি কি আমাদেরকে ছেড়ে এমন কোথাও যাচ্ছো যা আমরা কেউ জানি না? আমি অবাক হয়েছিলাম। মা জানলো কিভাবে? আমি মাকে উলটা প্রশ্ন করেছিলাম, কি বলো মা? মা তখন ঠিক আজকের মতো এ রকম কনফিডেন্স নিয়েই বলেছিলো, তোর বাবা সপ্নে আমাকে এ রকমই একটা মেসেজ দিলো যে, “তোর ছোট ছেলে তো কোথাও চলে যাচ্ছে, ওকে ঠেকাও”। যাই হোক, আমি চলে এলাম ঢাকায়। কাউকে কিছুই বলি নাই ব্যাপারটা নিয়ে। আমি আসলে ব্যাপারটা সিরিয়াসলী নেইও নাই।

মাকে নিয়ে আমি সবসময় টেনসনেই থাকি। মা ঝড়কে ভয় পায়, মা রাতে একাকী থাকতে ভয় পায়, মা তার কষ্টের কথা কাউকে বলতে ভয় পায়। মার সাথে আমার টানটা একদম নাড়ির সাথে। দেশে বর্তমানে মোবাইল সবেমাত্র চালূ হয়েছে। গ্রামীন একটা মোবাইল অনেক দাম দিয়ে হলেও কিনেছি। এর প্রধান লক্ষ্য ছিলো যে, মায়ের সাথে আমার যোগাযোগ রাখা। আমাদের পাশের গ্রামে একজন মহিলা আছেন যার নাম্বারে কল দিলে তিনি তার মোবাইলটা নিয়ে আমাদের বাড়িতে যায়, এবং আমি তখন মায়ের সাথে কথা বলতে পারি। যাই হোক, আমি আমার আগের পরিকল্পনা মাফিক, আমি আসলেই এবার শুক্রবারে ব্যস্ততার কারনে গ্রামে যেতে পারি নাই। তাই আগামী সোমবার আশুরার দিনে মাকে দেখতে যাবো এটাই ছিলো আমার পরিকল্পনা। কিন্তু সে দিনটা আর আমার জীবনেই আসে নাই যেখানে মাকে সত্যি সত্যিই জীবিত পাবো।

১৮ মার্চ ২০০২। আশুরা এবং সরকারী ছুটির দিন। সকাল ৯ টার দিকে গ্রামে যাবো মাকে দেখতে এটা ভেবেই গতকাল রাতে মোটামুটি প্রিপারেশন নিয়েছিলাম। বেলা যখন প্রায় সকাল ৮ টা। আমার পাশের বাসায় মেজর জামাল, এএসসি থাকেন। তিনি নক করলেন আমার বাসার দরজায়। ঘুমিয়ে ছিলাম, ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতে স্যার আমাকে জানালেন যে, আর্মি এক্সচেঞ্জ থেকে আমাকে কি একটা জরুরী মেসেজ দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু আমার ফোনের ক্রেডেলটা সম্ভবত ডিস্প্লেস অবস্থায় আছে, তাই এক্সচেঞ্জ ঢোকতে পারছে না। বললাম, কি ব্যাপারে জরুরি মেসেজ স্যার? ওরা কি কিছু বলেছে আপমাকে? তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। মনে খটকা লাগলো।

তাড়াতাড়ি ফোন করলাম আর্মি এক্সচেঞ্জে। আর্মি এক্সচেঞ্জ থেকে আমাকে জানালো যে, বাক্তার চর থেকে মোল্লা নামের এক ভদ্রলোক কি জানি একটা জরুরী মেসেজ দেওয়ার জন্য আমাকে আমার মোবাইল এবং ল্যান্ড লাইন ফোনে চেষ্টা করেছে কিন্তু পাচ্ছে না। আর্মির এক্সচেঞ্জে ফোন অপারেটরকে মোল্লা সাহেব একতা মোবাইল নাম্বার ও দিয়েছে। আমি আরো ঘাবড়ে গেলাম, মার কিছু হয় নাই তো? মোল্লা হচ্ছেন আমাদের ঘরের পাশে প্রতিবেশী। তাকে আমরা কাকা বলে সম্বোধন করি। আমাদের ঘরের সাথে উনার ঘর।

আমি আমার মোবাইল চেক করে দেখি যে, মোবাইল চার্জে দেওয়া ছিলো ঠিকই কিন্তু প্লাগটা অন করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই সারারাত চার্জ না হয়ে বরং চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষন চার্জ দিয়ে আমি গ্রামে মোল্লা কাকাকে ফোন করলাম। ফোনে যেটা উনি বললেন, তাতে আমার আরো সন্দেহ তৈরী হলো। মোল্লা কাকা বললেন যে, আমার মা খুবই অসুস্থ। তার অবস্থা ভালো না। আমি মোল্লা কাকাকে বললাম, কাকা, ঠিক কথাটা বলতে হবে। মা কি অসুস্থ্য নাকি মা আর নাই? আমি শক্ত মানুষ, আমাকে সত্যটা বলতে হবে কারন যদি মা অসুস্থ্য হন, তাহলে আমার গ্রামে যাওয়ার প্রিপারেশন এক রকম, আর যদি মা আর জীবিত না থাকেন, তাহলে আমার প্রিপারেশন অন্য রকম। আমাকে সত্যিটা বলেন।

এবার মোল্লা কাকা বললেন যে, দাদী মারা গেছেন। তুমি আসো।

আমার সারা শরীর কেপে উঠলো। আমার সেদিনের মায়ের কথাগুলি একদম স্পষ্ট মনে পড়লো যখন মা আমাকে বলেছিলেন যে, মাকে আমি আর জীবিত দেখতে পাই কিনা সন্দেহ আছে। কারন, বাবা নাকি মাকে যেতে বলেছেন। তখন কথাটা একেবারেই আমলে নেই নাই, কিন্তু কথাটা কতটা সত্য ছিলো সেটা আজ যেনো আমার কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে উঠলো। আমি দ্রুত মিটুলকে বললাম, মা আর নাই। আমরা দুজনেই হত বিহব্বল হয়ে গেলাম এই আচমকা শোকে। আমি মিটুলকে তাড়াতাড়ি রেডি হতে বললাম। গ্রামে যেতে হবে।

নিজের কোনো গাড়ি নাই। সেদিন আবার সোমবার। সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী সোমবারে গাড়ির লে অফ অর্থাৎ জরুরী এডমিন কাজ ব্যতিত কিংবা ট্রেনিং সঙ্ক্রান্ত কোনো জরুরী বিষয় না হলে আর্মির কোনো গাড়িই সেনানীবাস থেকে বের করার বিধান নাই। মায়ের এ রকম অসময়ের মৃত্যুর কথায় আমার নিজের মাথাও ঠিকমতো কাজ করছিলো না। কোথা থেকে একটা গাড়ি পাওয়া যায় সেটা ভাবতে লাগলাম। হটাত মনে হলো যে, পাশেই মেজর খিজির স্যার (ইএমই) ওয়ার্কশপের ওসি। আমরা এক সাথে হাইতিতে মিশন করেছি। উনাকে বলে দেখি কোনো সাহাজ্য পাই কিনা। যেই আমি মেজর খিজির স্যারকে ব্যাপারটা খুলে বললাম, তিনি ওয়ার্কশপ থেকে একটা ভালো গাড়ি আমাকে দিয়ে বললেন, আগে যাও মাকে দেখার জন্য, পরে দেখা যাবে আইনে কি বলে। গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেলে আমি দ্রুত গোসলে ঢোকি।

কদিন আগে আমি মায়ের একটা ডে লং ভিডিও করেছিলাম। সেখানে আমি মাকে অনেক প্রশ্ন করে করে মায়ের মনের ভিতরের কথা জানার চেষ্টা করেছিলাম। আমি মাকে তার ছোট বেলার কথা, মার সাথে বাবার প্রেমের কথা, মার বিয়ের পর তার শসুর বাড়ির কথা, বাবার মৃত্যুর পর মার মনের কথা, তারপর আমাদের কথা, তার কোন ছেলেমেয়ে তার কাছে কোন পর্যায়ে আছে তার অনেক খবর আমি জানার চেষ্টা করেছিলাম। সেদিন ভিডিও করার সময় আমি মাকে এই প্রশ্নটাও করেছিলাম, যে, মার শেষ ইচ্ছা কি। তার মৃত্যুর পর তিনি কোথায় সমাহিত হতে চান, ইত্যাদি। মায়ের এই তথ্যগুলি আমি এম্নিতেই জানতে চেয়েছিলাম। ভিডিও করার সময় মা কখনো হাসতে হাসতে বিগলিত হয়ে গেছেন আবার কখনো কখনো কষ্টের কথাগুলি বলার সময় তার দুই চোখ দিয়ে অবিরত জল পড়েছিলো। আমি মাকে না হাসায় না কাদায় কোনো বাধা দিয়েছিলাম। বলুক মা।

আজ মাকে কোথায় সমাহিত করতে হবে এই তথ্যটা আমার মাথায় যেনো আসছেই না। এদিকে গ্রাম থেকে বারবার ফোন আসছিলো মাকে কোথায় সমাহিত করা হবে সেটা জানার জন্য। কারন কবর করতে হবে। জায়গাটা না বললে কাজে কেউ হাত দিতে পারছে না। আমি ওয়াসরুমে মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালতে ঢালতে বারবার মনে করার চেষ্টা করছিলাম মায়ের শেষ সমাহিত হবার ইচ্ছেটার কথা। কিন্তু আমার মাথা কিছুতেই আমাকে সাহাজ্য করছিলো না। গোসল শেষ করে আমি ফজরের কাজা নামাজটা পড়তে পড়তে হটাত মনে হলো, হ্যা, মনে পরেছে এবার। আল্লাহই আমাকে মায়ের শেষ ইচ্ছেটা স্মরণে আনতে সাহাজ্য করেছেন। মা বলেছিলেন যে, তিনি তার একমাত্র বোন আমার খালার কবরের পাশে যেনো সমাহিত করি। আমার খালা ছিলো একাধারে আমার মায়ের মার মতো, দিদির মতো, তার একটা বন্ধুর মতো। আমি নামাজ পড়েই মোল্লা কাকাকে ফোন করে বললাম, আমি দ্রুতই গ্রামে আসতেছি, আর মায়ের কবরট যেনো হয় আমার খালার কবরের পাশে। এটা মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিলো।

আমি রওয়ানা হয়ে গেলাম গ্রামের উদ্দেশ্যে। অন্য সবসময় যাই, মাকে জীবিত দেখার জন্য, আর আজ যাচ্ছি মাকে সমাহিত করার জন্য। মনটা বড় কষ্টে আছে। সারাক্ষন মার জন্য তাসবিহ পড়ছি, আর মার জন্য দোয়া করছি। একসময় ভাবলাম, আমি কি ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করবো নাকি মাকে সমাহিত করবো? ভাইয়াকে ফোন করলাম। পেলাম না। তার ফোন এনসারিং মেশিনে দেওয়া। ভাইয়া আমেরিকায় থাকেন। ভাবলাম, ভাইয়া আমাকে ফোনব্যাক করবেন নিশ্চয়ই। আমি যখন ভাইয়াকে ফোন করেছি, তখন আমেরিকায় রাত বেশী না, হয়তো ১০ টা বাজে। এই সময় ভাইয়ার কল ধরার কথা। ভাইয়া কল না ধরার কারনে আমি আমার জেঠস যিনি আমেরিকায় থাকেন, শেলি আপা, তাকে ফোন করে বললাম যে, আমার মায়ের মৃত্যুর খবরটা যে করেই হোক ভাইয়াকে জানান।

আমি গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম যখন তখন বেলা প্রায় ১১ টা সকাল। অনেক লোকের সমাগম। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকেই লোকজন এসেছে। মা শুয়ে আছেন একটা নামাজী পাটির মধ্যে কাত হয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে মা মারা গেলেন। নুরুন্নাহার আমাকে যেটা বলল তার সার্মর্ম এ রকম যেঃ

মা ফজর নামাজের সময় নামাজে ছিলেন। নামাজের মধ্যেই মা মারা গেছেন। আর উঠেন নাই। নুরুন্নাহার মনে করেছিলো, যে, মা মনে হয় নামাজ পরার পর এম্নিতেই নামাজের পাটিতে শুয়ে আছেন। কিন্তু সকাল ৭টা অবধি যখন মা আর পাটি থেকে উঠছেন না, তখন নুরুন্নাহার মাকে জাগাতে গিয়ে দেখে যে, মার কোনো শ্বাস চলছে না। এরপরেই নুরুন্নাহার পাশের বাসার মোল্লা কাকাকে ব্যাপারটা জানায়।

আমি মায়ের শান্ত বডিটাকে কয়েকবার নাড়া দিয়ে মা বলে ডাকলাম, কানের কাছে গিয়েও ডাকলাম। মা কোনো উত্তর করলেন না। আমি মার হাতের পালস চেক করলাম, তখনো মনে হচ্ছে শরীরটা গরম, ঠান্ডা হয়ে যায় নাই। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো মা নাই। সন্দেহ হলো একবার যে, মা কি আসলেই নাই নাকি ক্লিনিক্যালী কোনো এক অবস্থায় আছেন? আমাদের বাড়িতে পাশেই একজন ডাক্তার ছিলেন। তাকে বললাম, ভালো করে একটু দেখবেন মার অবস্থাটা কি? ডাক্তার সাহেব আমাকে টেনে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে বললেন, আখতার ভাই, খালাম্মা আর বেচে নেই। আমি অনেকভাবেই চেক করে দেখেছি। আপনি ঠান্ডা হোন। এখন খালাম্মাকে সমাহিত করার যাবতীয় ব্যবস্থা নিন। জানি আপনার কষ্ট হচ্ছে কিন্তু এটাই বাস্তবতা যে, খালাম্মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

আমার অন্যান্য বোনেরা, মায়ের নায়-নাতকোরগন অনেকেই বিলাপ করে কাদছেন। কিন্তু আমি কাদতে পারছি না। কেনো যেনো আমার কান্নাই পাচ্ছে না। আমি খুব সাভাবিকভাবেই মাকে সমাহিত করার জন্য গোসলের ব্যবস্থা করতে বললাম, কবরের জন্য লোক লাগিয়ে দিলাম। আমার বোন ফাতেমা আর আরেকজন মিলে মাকে গোসল করিয়ে দিল। গোসলের সময়ও আমি কয়েকবার তদন্ত করেছি মা কোন প্রকার নড়াচড়া করেন কিনা। আমার বারবার মনে হচ্ছিলো মা মারা যান নাই। এ রকম সুন্দর একটা নিষ্পাপ মুখ, শান্ত আর সাভাবিক চেহারা যাকে দেখলে মনে হবে তিনি ঘুমিয়ে আছেন। মার চেহাড়াটা আগের থেকে অনেক উজ্জ্বল। মার এই রকম সুন্দর চেহারা আমি কখনই দেখি নাই। গোসলের পর মাকে কাপড় পরানো হবে, আমি আবার মাকে জোরেই ডাক দিলাম। কিন্তু মা আমার ডাকে কোনো সারা দিলেন না। মাকে কাপড় পরানো হলো। সাদা দাফনের কাপড়। মাকে জানাজা পরানো হবে, অনেক লোক অপেক্ষায় আছেন। মাকে জানাজার স্থানে আনা হলো। আমি আবার ওই অবস্থাতেই মাকে ডাকলাম। যদি আবার মা নড়েচড়ে উঠে! এ সময় মোল্লা কাকা আমাকে ধরে বললেন, কাকু, তুমি অস্থির হইও না। দাদি আসলেই মারা গেছেন। তুমি খালি দোয়া করো। তোমাকে দাদি অনেক ভালবাসতো আর ভরষা করতো। তুমি এমন করলে উনি তো আরো কষ্ট পাবেন!!

জানাজা পরানো হয়ে গেল। আমি তখনো ভাইয়ার একটা ফোনকলের জন্য অপেক্ষা করছি, যদি ভাইয়া আমাকে ফোন করেন। ভাইয়াকে আবারো আমার মোবাইল থেকে ফোন করলাম, কিন্তু এবার ভাইয়ার ফোন আর এনসারিং মেশিনে ছিলো না। রিং হচ্ছিলো। কিন্তু যে কোনো কারনেই হোক, ভাইয়া ফোনটা ধরলেন না। আমি আবার শেলী আপাকে ফোন করলাম যদি এরই মধ্যে শেলী আপার সাথে ভাইয়ার কোনো কথা হয়ে থাকে আর ভাইয়া মার মৃত্যুর খবরটা জেনে থাকে সেটা জানার জন্য। শেলী আপা ফোন ধরলেন। আর আমাকে জানালেন যে, ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে। মার মৃত্যুর সংবাদ ভাইয়াকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ভাইয়া নাকি বলেছেন, উনি আসতে পারবেন না। খুব বিরক্ত হয়েছিলাম এমন একটা খবরে। ভাইয়ার উপর আমার শ্রদ্ধাবোধটা নিমিষেই শুন্যের কোঠায় চলে এলো। ভাবলাম, আজ যদি উনি শুনতেন যে, উনার শাসুড়ি মারা গেছেন, হয়তো ঠিকই চলে আসতেন।

কাউকে কিছু বললাম না। জানাজার পর মাকে কবরে সমাহিত করা হবে। আমি সবার উদ্দেশ্যে একটা এনাউন্সমেন্ট করলাম যে, আমার মা আজ চলে যাচ্ছেন, কিন্তু আমি রয়ে গেছি মার ছেলে। যদি কখনো আমার মা কাউকে জানা বা অজানা মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, তাহলে যেনো কেউ তার দাবী না রাখেন। মাকে মাফ করে দিবেন। আর যদি কেউ মার কাছ থেকে কোনো পাওনা থাকে, নির্ধিধায় আমাকে জানাবেন, আমি কোনো প্রকার ভেরিফাই করবো না, আমি মায়ের সব দেনা শোধ করে দেবো। আর যদি মা কারো কাছ থেকে কিছু পাবেন বলে জানেন, আজ আমি তার ছেলে হিসাবে সবকিছু মাফ করে দিলাম। শুধু আমার মার জন্য আপ্নারা খাস মনে দোয়া করবেন।

আমরা সবাই মাকে কাধে করে কবরের কাছে নিয়ে গেলাম। আমার এখনো মন মানছে না যে, মা নাই। মাকে যে আমি সত্যি সত্যিই গোরস্থানে সমাহিত করতে যাচ্ছি এটা বিশ্বাসই করতে পারছি না। কবরে শোয়ানোর ঠিক আগমুহুর্তেও আমি মাকে জোরে আরেকবার ডাক দিলাম। কিন্তু মা তো আমার কথা নিশ্চয়ই শুনছেন কিন্তু কোনো সাড়া দিলেন না। খালার কবরের পাশেই মাকে সমাহিত করা হল।

বেলা তখন প্রায় ৩টা যখন সমস্ত আয়োজন শেষ হয়। মাকে কবর দেয়া হয়ে গেছে। আমি বাড়িতে সব বোনদেরকে নিয়া একসাথে বসলাম। সবার মন খারাপ। কেউ কেউ তখনো কাদছে। আমার চোখে এক ফোটা পানিও নাই। যেনো কিছুই হয় নাই। বিকাল হয়ে গেছে। আর্মির গাড়ি নিয়ে এসেছি, আমাকে আবার সন্ধ্যার আগেই ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। গাড়িটা পার্ক করা আছে প্রায় ১ মাইল দূরে। আমাদের বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি আসে না তাই। আমার যাওয়ার সময় হয়ে এলো। আমি মিটুলকে বললাম, চলো, ঢাকায় যেতে হবে। আমি আগে আগে হাটছি, মিটুলও বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। আমি হাটতে হাটতে প্রায় ৩০০ গজ যাওয়ার পর ভিতর থেকে এতো কষ্ট আর কান্না আসছিলো যে, আমি আর একটি পাও আগাইতে পারছিলাম না।

প্রতিবার যখন আমি গ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই, আমার মা বাড়ির পিছনে বসে থাকেন যতোক্ষন আমাকে দেখা যায়। আমি মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকাই আর দেখি, মা বসে আছেন, হাত নাড়েন। আমিও হাত নাড়ি। মাকে ফেলে যেতে আমার সবসময় মনে কষ্ট হতো। কিন্তু আজকে আমার মনে বারবার এই ভাবনাটাই আসছে, আজ মা বাড়ির পিছনে বসে নাই, আমি পিছন ফিরে তাকাই, মা নাই। আমার গলা ফাটিয়ে কাদতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু আমার গলা দিয়ে একটু আওয়াজও বের হলো না। আমার চোখ জলে এতোটাই ভরে উঠছিলো যে, আমি এক হাত দূরের রাস্তাটাও দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি বসে গেলাম বিস্তর খালী জমিনে। আমার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিলো। মা আমাকে আজ আর দেখছে না। আমাকে খালী জমিনের উপর বসে পড়তে দেখে আমার বাড়ি থেকে কয়েকজন দৌড়ে এলো। মিটুলও এলো। আমার চোখের পানিতে আমি কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার শরিরে কোন শক্তি ছিলো না উঠে বসবার। বুঝলাম, এতোক্ষন যে কষ্টটা আমার বুকের ভিতর শক্ত হয়ে চেপেছিলো, এখন সবগুলি কষ্ট আমাকে চারিদিক থেকে এমন করে ঝাপটে ধরেছে যে, আমার চোখ, আমার কন্ঠ, আমার পা, আমার হাত, আমার মাথা, আমার কান কোনোটাই আর সাভাবিক অবস্থায় নাই। আমি কতোক্ষন চুপ করে বসেছিলাম, আমার মনে নাই।

শক্তি নাই ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কিন্তু আমাকে তো ফিরতেই হবে। মা নাই, কোথায় ফিরে যাবো? এখন এই শুন্যঘরে গিয়ে তো মাকে পাবো না, মায়ের চিবানো পান খাওয়ার আর আমার হলো না। মা বাবার সাথে দেখা করার জন্য চলে গেছেন। আজ হয়তো বাবা অনেক খুসী তার সেই প্রায় ৩০ বছর আগে একা ফেলে যাওয়া প্রেয়সীকে কাছে পেয়ে।

ঢাকায় ফিরতে ফিরতে আমার প্রায় রাত ৮টা বেজে গেলো। মেজর খিজির আমাকে ফোন করে শুধু বললেন যে, খালাম্মার জন্য দোয়া করো। তিনি জান্নাতবাসি হয়েছেন। তিনি আল্লাহ্‌র পাটিতে বসেই জান্নাতে চলে গেছেন, এর থেকে পুন্যের কি হতে পারে? খিজির স্যারকে আমি কখনো তার এই দয়ার ঋণ শোধ করতে পারবো না।

ঢাকায় এসে আমি আমার কম্পিউটারটা খুললাম। মার সেদিনকার ভিডিওটা অন করলাম, উফ, এই তো মা ঠিক আমার সামনেই। তিনি কখনো হাসছেন, কখনো কাদছেন, কখনো আমার দিকে তাকিয়েই আছেন। অনেক রাত অবধি আমি আমার মার ভিডিও টা কয়েকবার আগে পিছে টেনে আবার রিওয়াইন্ড করে করে দেখলাম। অনেক রাত, চারিদিকে শুনশান নীরবতা। কেবল আমার মনের ভিতরেই অত্যান্ত প্রবল আর্তনাদ আমার বন্ধ কবাটির ভিতরে ঘুরপাক খাইতে লাগলো। আমি স্তব্দ তপতীর মতো আমার চেয়ারে ঠেস দিয়া শুধু সেলোলয়েড ফ্রেমে বাধা জীবন্ত মাকে দেখতে লাগলাম বটে কিন্তু মা আমার এখন ঈশ্বরের একদম কাছে চলে গেছে। এখন তার আর ঝড়কে ভয় পাবার কোনো কারন নাই, একা থাকার ভয় নাই, পৃথিবীর কোনো মায়া, কোনো কষ্ট, বা কোনো সুখের প্রভাব নাই। 

সাতদিন পর আমার বড় ভাই আমাকে একটা মেইল করলেনঃ মেইলটা আমি হুবহু আজ এখানেই তুলে দিলাম।

To: Mohammad Akhtar Hossain <makhtar@dotbd.com>
From: “Mohamed Habibullah” <M.HABIBULLAH@neu.edu>
Subject:
MIME-Version: 1.0
Date: Mon, 25 Mar 2002 13:10:31 -0500
Message-ID: <OFF893F0BA.F371BA0B-ON85256B87.0063D6FA@neu.edu>
X-MIMETrack: Serialize by Router on HUB02/Server/NEU(Release 5.07a |May 14, 2001) at 03/25/2002
01:10:51 PM
Content-type: text/plain; charset=us-ascii
Status:
Monday USA time 1:00 P.M.

Dear Akhtar

I just recieved your e-mail. Also.Today, I received a call from Shelly Apa and came to know that Ma died (Inna lillahe wa inna ilaihe rajeoon). I will miss Ma from now on. May Allah keep her in peace in the grave. I know I could not come to see her off. PLease let me know where you buried her. Let me also know everything anout everybody including Badir Bhai, Laila, Fatema and Meherunnesa. Take care.

কি প্রয়োজন এই সব সন্তানের জন্য যাদের হাতে তার জন্মদাত্রী মায়ের মৃত্যুতেও শেষকৃত্য করার জন্য হাতে সময় থাকে না? সম্পর্কের থেকে বেশী যখন নিজের সম্পদের দাম বেড়ে যায়, নিজের জন্মদাত্রির শেষকৃত্য করার জন্য যখন কোনো সন্তানের সময় থাকে না, আল্লাহ বা ঈশ্বর কিংবা ভগবান এইসব কিছুর একটা রেকর্ড রাখেন যাতে কোনো এক সময় যখন তাদের শেষকৃত্য হবে, হয়তো তাদের বেলাতেও এটাই রিপিট হয়। তবে আমি দোয়া করি যেনো, আমার কোন বংশধর অথবা আত্তীয়ের বেলায় এ রকমের শুন্যতা না আসে।

প্রিয় আখতার,

এইমাত্র আমি তোর চিঠি পেলাম। আজকে আমি শেলী আপারও টেলিফোন কল পেয়েছি এবং জানতে পারলাম যে, মা মারা গেছেন (ইন্না নিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহির রাজেউন)। আমি মাকে এখন থেকে অনেক মিস করবো। দোয়া করি আল্লাহ মাকে জান্নাতবাসী করুন। আমি জানি, মার মৃত্যুতে আমি মাকে দেখতে আসতে পারবো না। আমাকে জানাস মাকে কোথায় করব দিলি। বদির ভাই, লায়লা, মেহের এবং ফাতেমাদের সম্পর্কেও আমাকে বিস্তারীত জানাইস। নিজের যত্ন নিস।

১২/১২/২০০০-প্রিয় মেজর নিজান স্যার,

প্রিয় নিজান স্যার,

আমার অন্তরস্থলের গভীর তলদেশ থেকে আপনার প্রতি আমার পরম শ্রদ্ধ্যা। আমার এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি আমার বর্তমান পোষ্টিং আদেশটি সাইন করার জন্য। আজকের এই পোষ্টিং আদেশটির চেয়ে আর কোনো ভালো খবর আমার আর নাই। এই পষ্টিং তা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য খুবই দরকার এবং প্রয়োজন ছিলো। এটা আমাকে এবং আমার পরিবারের জন্য অবশ্যই একতা অতীব সুখবর ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আবারো আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এবং আমার আন্তরীক শুভেচ্ছা জানাই। ইনশাল্লাহ দেখা হবে ঢাকায় আর্মি হেড কোয়ার্টারে।

আল্লাহ আমাদের সবার হহায় হোন।

ইতি

মেজর আখতার

ছাত্র অফিসার

ওজি এস সি-এ ডি-২

আঋলারী সেন্টার এন্ড স্কুল, চট্টগ্রাম

12/12/2000-Dear Major Nizan Sir,

My heartiest respect to you. I must and must thank you from my side and on behalf of my family too for the posting order you signed. Nothing was better news than that of my posting order today. This is really going to help my family, I told you earlier sir. Again I express my sincere gratefulness to you. I will be meeting you soon at AHQ, Dhaka insshaallah.

May Allah help us all.

Maj Akhtar Hossain

OGSC (AD) –2

Arty Center and School

Halishahar

১২/১২/২০০০-প্রিয় কর্নেলস

আসসালামুয়ালাইকুম। আশা করি আপ্নারা সবাই ভালো আছেন, আর সেই সাথে রইলো আমার আসন্ন ঈদের শুভেচ্ছা। আমার পক্ষ থেকে আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সবাইকে আমার প্রান ঢালাশ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা রইলো। আমি আমার গানারী কোর্ষ-এডি করার সময় আপনাদের উপস্থিতি আমি এখনো তাজা মনে অনুভব করি এবং সত্যি বলতে কি, আমি বগুড়ায় জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ (অপারেশন) এর দায়িত্তে থাকা কালীন আপনাদের সাথে কাতানো সময় তা এখন খুব মিস করি। সেটা ছিলো একতা অদ্ভুদ চমৎকার সময় আমার জীবনে।

স্যার, আপ্নারা শুনে হয়তো খুব খুশী হবেন যে, আমি আমার অফিসার্স গানারী ষ্টাফ কোর্ষ-২ (এয়ার ডিফেন্স) খুব সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেছি। এবং আগামীকাল আমি ঈদের ছুটি শেষে পুনরায় আমার নতুন কর্মস্থল আর্মি হেড কোয়ার্টারস এর মিলিটারী ট্রেনিং ডিপার্ট মেন্টে জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ (মিলিটারী ট্রেনিং) এ যোগদান করতে যাচ্ছি।  আমি আপনাদের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ যে, প্রাথমিক ভাবে এই অফিসার গানারী কোর্ষের নির্বাচনী পরীক্ষায় আপ্নারা আমাকে এক মাসের পূর্ন ছুটি দিয়ে যে সাহাজ্য করেছে, তা আসলেই ভুলার মতো নয়। এবং আপনাদের এই সাহাজ্য না পেলে আমার জন্য এতা সত্যি বাস্তবায়ন করা সমভব হতো না। আপ্নারা সবাই জানেন যে, একজন জেনারেল ষ্টাফ অফিসার -২ (অপারেশন) এর কতটুকু গুরু দায়িত্ত থাকে এবং কি পরিমান ওয়ার্ক লোড থাকে।

স্যার, আমি আশা করি, আর্মিতে সবার আগে আমার করা ইন্ট্রানেট ফেসিলিটি নিসচয়ই আপ্নারা উপভোগ করছেন। আমি জানি না, এই মুহুর্তে উক্ত ইন্ট্রানেট প্রোজেক্ট তা কেমন চলছে তবে আমি গর্বের সাথে বলতে পারি যে, যদি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া আমাকে এই কাজে সর্বাত্তক সাহাজ্য না করতেন, তাহলে এই প্রোজেক্ট কোনোভাবেই দাড় করানো সম্ভব হতো না। আজ হয়তো অনেকেই এর মাহাত্য বুঝবে না বা জানছে না, ফলে অনেকেই এর সুফল ভোগ করতে পারছে না স্রেফ এটা না বুঝার কারনে কিন্তু আজ অন্তত ডিভিশনের সবাই জানে ইন্টারনেট কি এবং ইন্ট্রানেট কি। একদিন হয়তো তারা এতার মাহাত্য এবং সুফল কি বুঝতে পারবে এবং তখন হয়তো আজকে আমার করা এই প্রোজেক্ট সবার কাছে একতা প্রশংসার দাবী রাখবে। তখন তারা হয়তো বুঝবে যে, ইনফর্মেশ হাই ওয়ে ছাড়া আসলে জীবন প্রায় অচল।

স্যার আমার জন্যে দোয়া করবেন। স্যার শুনে খুশী হবেন যে, আমার আরো একটি চমৎকার মেয়ে হয়েছে। ওর বয়স এখন দুই মাস। আপ্নারা ভালো থাকবেন। আমার আবারো শুভেচ্ছা এবং শ্রদ্ধ্যা রইলো।

মেজর আখতার

ছাত্র অফিসার

ও জি এস সি- (এ ডি-২)

হালি শহর, চট্টগ্রাম 

Dear Cols,

Assalamualaikum. I wish you a very good Eid Mubarok and happy New Year 2001. Our best regards and respect to you and your family. I often remembered you during my course ‘Officers’ Gunnery Staff Course (OGSC), Air Defense –2’. Sir I really had a very good time with you at Bogra while serving at the Div HQ.

Sir, you will be certainly happy to know that I have just completed my OGSC (AD) –2. Right day after tomorrow we all will be leaving the Artillery School. I will be joining at my new working place (AHQ, MT Dte as GSO-2) right after Eid vacation. Sir, I just wanted to say my deep thanks to you for all types of blessings that I received from you. I just can remember fresh that you gave me complete one-month leave for my preparation. Without that period, it would not be possible to qualify in the entrance test. And you are certainly aware of the load of GSO-2 (Ops). My family and I will remember your kindness.

Sir I hope you are enjoying the Internet facility at Bogra. I don’t know what is the condition of our Local Intranet System but I can proudly boast that if Brig. Gen. Ikbal Karim Bhuiyan and you would not be there, it would not be possible. May be as on today mass people are not yet habituated or dependent on the Information Technology (IT) system, that’s why the project could not get the required speed and cooperation from many users but at least our divisional officers’ came to know, there is something called Intranet and people can interact each other using this Information Super Highway.

Sir, pray for me and for my family. Sir I have been blessed with a beautiful daughter. She is my second daughter. She is two months old now.

My best regards to Madam and your family. Eid Mubarok.

                                                            Maj Mohammad Akhtar Hossain, psc

Student Officer

OGSC- (AD) –2

Halishahar, Chittagong

December 2000

To:

Col Mollah

Col Azim

Col Hasan Shorawardi

২৫/০৪/২০০০-মৃত্যুর সপ্নদেখা

মঙ্গলবার, রাত ১০টা, হালিশহর-

গত ২২ তারিখে সম্ভবত দুপুর বেলা অথবা ২৩ তারিখ দুপুর বেলায় আমি আমার মৃত্যুকে স্বপ্নে দেখেছি। মাঝে মাঝেই আমি আমার মৃত্যুকে একদম সামনে থেকে সরাসরি স্বপ্নে দেখি। সবগুলি সপ্নের দিন তারিখ আমার মনে নাই কিন্তু প্রায় একই রকমের স্বপ্ন আমি প্রায়ই দেখি আর সেটা হচ্ছে আমার মৃত্যুর স্বপ্ন। 

স্বপ্নে দেখলাম, আমি লাশ হয়ে শুইয়ে আছি।আমার জানাজা হচ্ছে। জানাজার মধ্যে যারা হাজির তাদের আমি কাউকেই চিনি না কিন্তু তাদের জন্য আমি অসস্থি বোধ করছি না। আমার শুধু মনে হলো লিখনের আব্বার কথা যিনি এই কয়দিন আগে মারা গেছেন। লিখনের আব্বা আমার স্ত্রীর বড় ভাই। আমার মনে হলো, অনেকবার শুনেছিলাম যে, লাশ নাকি অনেক জোরে জোরে সবাইকে ডাকে কিন্তু কেউ তার সেই ডাক শুনতে পায় না। স্বপ্নে আমার তাই মনে হলো যে, আমি ডাকছি কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতেই পাচ্ছে না। আমার বেশ ভয় লেগেছিলো। আমার কাছে মনে হয়েছে, হ্যা আমি মারা গিয়েছি সেটা সত্য। আমার মরতে খুব ভয় লাগে। 

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তখন দুপুর। লাঞ্চ খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সম্ভবত গতকালের সেমিনারের মানসিক চাপে অনেক ক্লান্ত ছিলাম, তাই খুব গভীর ঘুমে আবোল তাবোল স্বপ্ন দেখেছি। আমি অবশ্য আমার সপ্নগুলিকে কখনো আবোল তাবোল মনে করি না। এর কিছু ব্যাখ্যা দাড় করানোর চেস্টা করি। 

একটা সময়তো আসবেই যখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব মৃত্যুই আমাকে দেখা দিবে এবং তখন আমি আর কাউকে কিছুই জানাতে পারবো না। কারন মৃত্যু যখন আমাকে আলিঙ্গন করবে তখন অন্য কারো সাথে আমার কথা বলা হয়ে যাবে নিষিদ্ধ কোনো এক নীতি। সেখানে আমি পরাজিত এক সৈনিক নই, সেখানে আমি ভিন দেশি কোন প্রিজনার। 

০২/০৪/২০০০-তুমি কিসের নেশায় আমার কাছে

হালিশহর, আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুল

তুমি কিসের নেশায় আমার কাছে ছুটে এসেছিলে? আমি ই বা কিসের নেশায় এমন লোভনীয়তায় পড়ে তোমার কাছে এই রকম পাগলের মতো দিকবিদিক জ্ঞ্যান হারিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম।

পৃথিবীতে স্বার্থ ছাড়া কেউ কোনো কাজ করে না। আজ যে শিশুর জন্ম হয়েছে, যার বোধ শক্তিকে আমরা শুন্য মনে করছি, যার কোনো কিছুই বুঝবার ক্ষমতা নাই, তারও কোনো আরামে ব্যাঘাত ঘটলে নিঃস্বার্থভাবে নির্মম কান্নায় সে প্রতিবাদ করে। প্রকৃতি যখন এই রকমই , সেখানে আমাদের একে অপরের প্রতি ছুটে আসবার কারন নিশ্চয় নিছক পরোপোকার নয়। একে আজ কেউ তাকে রোমান্টিক নামে, ভালোবাসার অনেক নামে নামাঙ্কিত করেছে। কিন্তু এই ভালোবাসার পিছনে কি কোনো ক্ষত বিক্ষতের ইতিহাস বা বোধ নাই? একজন খুনী কি ভালবাসে না? বাসে। সেও তার প্রিয়জনকে ভালোবাসে, নিজেকে ভালোবাসে। তাহলে তো খুনী আর ভালোবাসার মানুষের মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নাই। খুব সুক্ষ একটা লাইন মাত্র। 

কেউ ভালোবেসে খুন করে, কেউ ভালোবাসায় খুন হয়। কেউ খুন করে নিজকে আবার কেউ খুন করে অন্যকে। প্রকাশ্য দিবালোকে খুন যে করে তাকেই আমরা দেখি, অথচ প্রতিদিন প্রতিক্ষনে আনাচে কানাচে কত খুন খারাবি হচ্ছে চেতনায়, অচেতনায় তাকে আমরা কতটুকু দেখি? অথচ তার সংখ্যাটাই বেশি।

কি এমন ছিলো তোমাতে? রুপ? যৌবন? অহমিকা? ধন সম্পদ? পৃথিবীতে কি তোমার থেকে রুপবতী আর কেউ নাই যে তোমার কাছেই আমাকে এই রকম হন্যে হয়ে হুমড়ি খেয়ে যেতে হবে? তোমার থেকে কি আর কেউ রপবতী ছিলো না? তাহলে? তাহলে আমি কি তোমার অহমিকাকে ভেঙ্গে চুরমার করার জন্যই নেশায় পড়েছিলাম? তাও না। ধন সম্পদ? সেটা তুমি চিরকাল জানো যে, ওইসব ধন সম্পদের উপর আমার কখনো কোনো লোভ ছিলো না। দেখো , তারপরেও ঘটনা ঘটেছে, আমি পাগল হয়েছি, আমি নেশায় পড়েছি। হয়ত, তুমি তোমার মতই আর হয়ত তোমার মতো আর কেহ নাই বলেই তুমি ইউনিক।  তাই হয়ত বারবার ফিরে এসেছি তোমার কাছে। 

সবচেয়ে বড় কথা হলো, তোমারও যেমন পরাজয় হয় নাই, আমারো জয় হবার মতো তেমন কিছু আমি দেখিনি। সেই একই গীত যা পুরান আমল থেকেই বেজে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও বাজবে। হয়ত সুরের কিছু পরিবর্তন আর প্রলয়ের কিছু উচ্ছ্বাস থাকবে তাদের নতুন উপদানের অংশ। তাতে কি কোনো পার্থক্য হয়? 

হয় না। 

২২/০৩/২০০০-আমি দাড়িয়েছিলাম কিছুক্ষন বারান্দায়।

হালিশহর মেস, বুধবার, সময়-১৯২৫ ঘন্টা।

আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুল, হালিশহর। …

আমি দাড়িয়েছিলাম কিছুক্ষন বারান্দায়। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো তখন। তিনতলা থেকে অনেকদূর পর্যন্ত শহরের আলো দেখা যাচ্ছিলো। বেশ দূর থেকে চট্টগ্রাম শহর থেকে ট্রেনের হুইশেলের আওয়াজ শুনা যাচ্ছিলো। আর্টিলারি মেস হালিশহর, প্রায় ১০/১২ কিলোমিটার দুরে। তারপরেও এখান থেকেই যেনো বুঝতে পারছিলাম ট্রেন প্রায় ছাড়বে ছাড়বে। লোকজন নিশ্চয় খুব ব্যস্ত এখন, কেউ প্লাটফর্মে, কেউ কামড়ার ভিতরে। কেউ হয়ত তার প্রিয়জনকে বিদায় দিতে এসে চোখের জল মুছছে, আবার কেউ হয়ত এই শহর ছেড়ে যেতে পারলেই বাচি বলে চোখ বুজে আছে। দুনিয়া বড় আজব।

আমাদের আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুলের রাস্তা দিয়ে দুয়েকটি প্রাইভেট কার চলাফেরা করছে। আমি বারান্দায় একা, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি, আর সিগারেট টানছি। মশারা আমাকে একা পেয়ে বেশ খাবলে খাবলে খাওয়ার চেষ্টা করছে। বিরক্ত হচ্ছি না। আমার মৃত্যুর কথা মনে পরলো।

এটাই মনে হলো যে, এখন যা চলছে, এইসব কিছুই তখনো চলবে। দিনের শেষে অন্ধকার হয়ে যাবে, লোকজন যার যার ঘরে ফিরে আসবে। নিত্য নৈমিত্তিকের মতো খাওয়া দাওয়া করবে, টিভি, সিনেমা সবই চলবে, গল্প করবে, হাসি তামাশা, কিংবা পাখিদের কিচির মিচির, সকালের সূর্য উঠা কিংবা এই একটু আগে যেভাবে সূর্য ডোবে গিয়ে এখন একটা ভুতুরে সন্ধ্যা নামিয়ে দিয়েছে এই রকম করে আবারো ভুতুরে এক সন্ধ্যা তখনো নামবে। এই যে আমি আজ যেখানে দাড়িয়েছিলাম ঠিক এই জায়গাটাতে হয়ত এমনি করেই আরো একজন দাঁড়িয়ে হয়তো আমার মতোই ভাববে। কেইবা জানে, এখন থেকে অতিতে কোনো একসময় আরো একজন কেউ এমন করে ভেবেছিলো কিনা। হয়তো বা কোনোটাই সত্য নয়।

আমার আরো অনেক কিছু ভাবনা, অনেক কিছু কথা মনে আসছিলো। এই আমার মা, আমার বোন, আমার ভাই, আমার বউ, আমার মেয়ে, আমাদের নসিরন, তার সাথে বদিভাই, শিমুল, মোস্তাক ইত্যাদির মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? কেউ কারো কাছে কোনো কিছুর জন্যই বাধ্য নয়। ছোট বড় সবার জন্য এক পলিসি, তারপরেও নিজেদের টানে, নিজেদের স্বার্থের কারনে একে অপরের কাছে চলে আসে। আবার কোন এক অস্থিরতার মধ্যেই তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। আর এর মাঝেই মানুসজন নিজেদের কারনেই কিছু কিছু কমন নিয়ম কানুন মেনে চলে। সেগুলো নিতান্তই নিজেদের স্বার্থেই।

আজ থেকে হাজার বছর পূর্বের আমার পূর্ব পুরুসের নাম আমি যেমন জানি না, আমার প্রয়োজন নেই তাদের নাম জানার। তারা আমার জীবনে কোনো কাজে আসবেন না, আর এজন্যই আমি তাদের খোজ করি না, নাম জানি না, জানার প্রয়োজন বোধ করিনা। তাহলে আজ থেকে পরের হাজার বছর পরেও কেনো আমার বংশধরেরা আমাকে খোজে বের করবে? কোন যুক্তি আছে? নাই।

অংক একটাই। কবরের পাশে নিজের নাম খোদাই করা থাকলেও তাদের প্রয়োজনেই ওই নাম প্রতিস্থাপক হয়ে আরো নতুন নাম সেখানেই ঢোকবেই। আর একেই বলে রিপ্লেস্মেন্ট। অতএব কোথাও তোমার পদধ্বনি থাকবে বলে আশা করো না। এই  পৃথিবী বর্তমানের অধীশ্বর। আমার বলতে কিছু নাই। তোমার বলতেও কিছু নাই।

-হতাত কার হাতের স্পর্শে যেনো সম্বিত ফিরে পেলাম। ঘাড় নেড়ে দেখি, আমার দোস্ত মেজর আকবর। আমরা একসাথে গানারী স্টাফ কোর্স করতে এসেছি। আকবর ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র আর আমি মির্জাপুর ক্যাডে কলেজের। আকবরের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় শহিদুল্লাহ হলের ক্যাম্পাসে।

১৬/২/২০০০-লেঃ মাসুদ ইকবাল, রাজশাহী

ওর বড় ভাই সম্ভবত ৩য় লং কোর্সে আর্মিতে ভর্তি হয়েছিল কিন্তু কোন এক মেয়ের পাল্লায় পড়ে শেষ পর্যন্ত কমিসন পান নাই। কিন্তু তিনিও পরবর্তীতে বে-সামরিক চাকুরিতে বেশ ভাল করেছেন। বউদি সম্ভবত ঐ বালিকাই যার জন্য তিনি তার আর্মি ক্যারিয়ারটা আর করতে পারেন নাই। ভীষণ মজার মানুষ তিনি। আর ২লেঃ মাসুদ পরবর্তীতে মেজর পর্যন্ত ক্যারিয়ার করতে পেরেছিলেন কিন্তু তার এক শারীরিক অসুস্থতার কারনে তিনি আর আর্মিতে বেশী দূর যেতে পারেন নি এবং আর্মি ক্যারিয়ার শেষ করে বে-সামরিক এক গার্মেন্টস এবং পড়ে নিজে এক্তা বাইং হাউজ দিয়ে ক্যারিয়ার গরতে চেয়েছিলেন। ওটা আরেক গল্প। এখানে তার বিস্তারিত আলাপের প্রয়োজন মনে করছি না। তবে এটুকু জানা যায় যে, তিনি মেহেরপুরের মিঃ জাহাঙ্গির নামে এক সনাম ধন্য এডভোকেট এর মেয়ে সুরাইয়া পারভিন ওরফে তানি কে বিয়ে করেছেন। ঐ ভদ্র মহিলা তানি আমার বিশেষ পরিচিত।

১৫/০২/২০০০-১১ পদাতিক ডিভিশন, বিদায় জি-২ (অপ্স)

মাঝিরা সেনানিবাস-

১১ পদাতিক ডিভিসন থেকে আমার ফেয়ারওয়েল হয়েছে কারন আমি অফিসারস গানারী স্টাফ কোর্স করতে যাবো হালিশহরে। আমি বেসিক্যালি ফিল্ডের অফিসার কিন্তু গানারী কোর্স করতে যাচ্ছি এডি শাখার। আমি কখনো এডিতে কাজ করি নাই কিন্তু আমার বেসিক কোর্সে এডি এবং ফিল্ড থাকায় আমি যে কোনো গানারী কোর্সের জন্য কোয়ালিফাইড। গানারী স্টাফ কোর্সটাও একটা সিলেক্টিভ পরীক্ষার মাধ্যমে করতে হয়। ভরসা ছিলো না যে পাশ করবো কিন্তু যেভাবেই হোক হয়ে গেছে। জিএসও-২ পদবীতে থেকে এইসব পরীক্ষায় পাশ করা সহজ নয়।

আমি প্রকৃতপক্ষে ১১ পদাতিক ডিভিসন থেকে একপ্রকার এস্কেপ করার জন্যই আমি এডি গানারী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। এমন একটা পদবী (জিএসও-২ অপারেসন) কেউ ইচ্ছা করে ছাড়তে চায় না। কিন্তু আমি বুঝতেছিলাম যে, জেনারেল আনোয়ার এর বিদায়ের পর ডিভিসনে অনেক হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তখনো কোন জিওসির আগমন ঘটে নাই। শুনছিলাম যে, জেনারেল ইমাম নাকি আসবেন। আমি জেনারেল ইমামের সাথে ৪৬ ব্রিগেডে কাজ করেছি একবার যখন ঊনি ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। শক্ত মানুষ। পুরুপুরি বিএনপি ঘেঁষা। সরাসরি রাজনৈতিকবিদ বলা চলে।

যাই হোক, পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি সিউর ছিলাম না যে পরীক্ষায় পাশ করবো কিনা। এর মধ্যে বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জেনারেল ইমাম আসার আগে ১১ আর্টিলারি কমান্ডার ব্রি জেনারেল রফিক এক্টিং জি ও সি হিসাবে ১১ পদাতিক ডিভিসনের দায়িত্ত পালন করছেন। এই ভদ্র লোক কেনো জানি আমাকে একদম পছন্দ করেন না। কোনো কারন নাই, কথা নাই, বার্তা নাই, ঊনি আমাকে পছন্দ করেন না। এক্টিং জিওসি হবার পর ঊনি যেনো একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন কিভাবে তিনি আমাকে একটু বেকায়দায় ফেলবেন। ব্যাপারটা আমার কাছে একদমই ভালো লাগছিলো না। আমি অনেক খুজেছি কারনটা কি হতে পারে?

পরে অবশ্য জেনেছি ব্যাপারটা। কোনো একটা অফিশিয়াল কমেন্টকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে আমাকে অপছন্দ করা শুরু করেছেন। যেটা ওনার ঠিক হয় নাই। যাই হোক, আমি আমার জায়গায় তিনি তার জায়গায়। এখানে আরো একটা মন্তব্য না করলে হয়ত ভুল হবে যে, আওয়ামীলীগ ক্ষমতার আসার পর, মুজিব কিলিং এর জন্য অনেক ব্রিগেডিয়ারদেরকে এই আর্মি থেকে অকালীন অবসর দেওয়া হয়েছে। তারমধ্যে এই ১১ পদাতিক ডিভিসনের অধীনের অনেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জড়িত ছিলেন। আমাদের ১১ আর্টিলারি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিক সাহেবের নামেও একটা চিঠি এসেছিল মুজিব কিলিং এর ব্যাপারে। ভুলক্রমে চিঠিটি যদিও খুব টপ সিক্রেট ছিলো কিন্তু চিঠিটি চলে আসে আমাদের ডিভিসন হেডকোয়ার্টারে। আর আমার হেড ক্লার্ক কিচ্ছু না বুঝে চিঠিটি খুলে ফেলে যা একটা মারাত্মক অপরাধের মধ্যে পরে। আমি তখন ডিভিসন হেডকোয়ার্টারের বাইরে অনুশীলন এলাকায় ছিলাম। আমি যখন সন্ধায় অফিসে আসি, তখন দেখি এটা নিয়ে আমাদের ক্লার্ক লেবেলে বেশ কথা বার্তা হচ্ছে, যে, এখন কি করা যায়।

আমি চিঠিটি পড়েছিলাম এবং পরবর্তীতে ব্রিঃ জেনারেল রফিকের ব্রিগেড মেজর (বিএম) মেজর কায়সারকে ব্যাপারটা শেয়ার করে চিঠিটি পাঠিয়েছিলাম। ব্রিগেডিয়ার জেনারাল রফিক ভাবলেন যে, সম্ভবত আমি ইচ্ছে করে তার ব্যক্তিগত এমন একটা সেন্সেটিভ চিঠি পরার সাহস করেছি। ব্যাপারটা কোনো অবস্থাতেই সঠিক নয়। আর যেহেতু ওই চিঠিটা নিতান্তই ব্যক্তিগত ছিল না, এটা ডিভিসন হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিককে জানাতে বলা হয়েছে, সুতরাং এদিক দিয়ে আমাদের ডিভিসনের পক্ষ থেকে কোন ভুলও হয় নাই চিঠি খোলার কারনে। তবে এই ধরনের চিঠি সাধারনত স্টাফ লেবেলের অফিসারগন সরাসরি হ্যানডেল করেন বিধায় এটা হেড ক্লার্কদের কোনো অবস্থায়ই খোলার ইখতিয়ার নাই।

যাই হোক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিক আমাকে পছন্দ করুক আর নাইবা করুক, তাতে আমার কিছুই যায় আসেনা। আর তার সাথে আমি ইচ্ছে করলেও সরাসরি কাজ আমার সাধারনত হয় না। যদি আমাদের শাখার কোন কাজে তিনি আমার কাছে কৈফিয়ত চান, তাহলে হয়ত আমার সরাসরি দেখা বা কথা বলা হতে পারে। আর তা না হলে জিএসও-১ আছেন, কর্নেল স্টাফ আছেন ইত্যাদি।

আমি একটু এড়িয়েই চলছি এই ভদ্রলোককে। আমার ধারনা, তিনিও আমাকে বেশ এড়িয়ে চলছেন কিন্তু এটার কোনো প্রয়োজন ছিলো না।

এখানে আরো একটা মজার ঘটনা বলি। সম্ভবত তিনি আমার বড় ভাইয়ের শুসুর বাড়ির আত্তিয় সজনের মধ্যে কেউ চেনা জানা। কারন একবার আমি আমার বড় ভাইয়ের শশুর বাড়ির কোনো একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছিলাম ঊনার আগমন। পরে জানলাম যে, তিনি আমার বড় ভাইয়ের শশুর বাড়ির আত্তিয়দের মধ্যে কেউ হন। আমার একদম ভালো লাগে নাই এটা জেনে। কিন্তু সব ভালো লাগা তো আর আমার উপর নিরভর করে না। বেশীদিন এই যন্ত্রনা আমাকে সহ্য করতে হয় নাই কারন বেশ তাড়াতাড়ি জেনারেল ইমাম জিওসি হিসাবে চলে এসেছিলেন। 

৩১/১২/১৯৯৯-বাক্তার চরে অসুস্থ্য মায়ের পাশে

নতুন বাক্তার চর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-

গ্রামে এসেছি। ভাইয়া সাথে আছে। মিতুল ও সাথে আছে। মাসুদ কয়েকদিন আগে গ্রামে এসেছিলো বটে কিন্তু এবার আসে নাই। ঢাকায় রয়ে গেছে। বেশ শীত বটে। বিল্লাল ভাইও গ্রামে এসেছে মায়ের কাছে। মা খুব সুস্থ নন। 

রাত হয়ে গেছে। আমরা সবাই খাটের উপর বসে কথা বলছি। বোনেরা আছে, মা বারবার কাশি দিচ্ছেন। ঘরের ওপাশে মা কাথা গায়ে দিয়ে শুইয়ে  আছেন। আমি বারবার মায়ের কাছে যাচ্ছি যেন মায়ের কোন অসুবিধা হলে বুঝতে পারি। বিল্লাল ভাই নিজেও ডাক্তার। ফলে অন্তত একজন ডাক্তার সাথে আছে এটা আমার একটা ভরসা। 

রাত প্রায় ১১টা বাজে। মা খুব ঘনঘন কাশছেন। আমি মায়ের কাশিটা সহ্য করতে পারছিনা। বিল্লাল ভাই, আমার অন্যান্য বোনেরা সবাই মায়ের কাছে এসে বসলেন, কিন্তু হাবীব ভাই মায়ের কাছে এসে বসার আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। আমি একটু রাগের সাথেই হাবীব ভাইকে বললাম, আপনি মায়ের কাছে যাচ্ছেন না কেনো? ঊনি মায়ের কাশিতে ওনার সমস্যা হতে পারে এই কারনে তিনি মায়ের ওখানে যেতে চান না। আমার এম্নিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলে রাগ উঠে যায়। আর মায়ের ব্যাপারে আমি কোনো কিছুই মানতে পারি না।  রাগ উঠতেছিলো। হাবিব ভাইয়ের প্রতি আমার সম্মানটুকু অনেক কমে গেলো। নিজের মায়ের উপর তার এই ভালবাসা আর শ্রদ্ধ্যা? আমার তো ধারনা যে, মা যদি মারাও যান, হাবিব ভাই আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। 

মা হাবিব ভাইয়ের কাছে একটা বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে মনে হল। মায়ের উপর হাবিব ভাইয়ের কোনো শ্রধ্যাবোধ নাই মনে হলো। ভাবলাম, ভাইয়া, আপনারও কিন্তু সন্তান আছে, কোনো একদিন দেখবেন, আজকে যে আচরনটা আপনি আপনার মায়ের প্রতি করে যাচ্ছেন, কোনো একদিন আপনার সন্তানেরা যখন এই আচরনটা করবে, তখন আজকের দিনের এই আচরনটা আপনার মনেও পড়বে না হয়ত কিন্তু এইটাই হলো আপনার ফেরত পাবার দান। 

আগামিকাল হাবিব ভাই পুনরায় আমেরিকায় চলে যাচ্ছেন। আর কোনদিন তার সাথে মায়ের কিংবা অন্যান্য কারো সাথে দেখা হয় কিনা আমরা কেউ জানি না। 

উম্মিকা মাসুদের সাথে অনেক এঞ্জয় করেছে। উম্মিকা, মাসুদ এরাই আমাদের প্রথম বংশধর যাদের জন্য আমরা একটা পরিবার পেয়েছি। মিতুল খুব ভালো মেনেজ করেছে পুরু পরিস্থিতিটা। বিল্লাল ভাইয়ের বউও এসেছে। 

০২/১২/১৯৯৯-হাবিব ভাই এবং মাসুদের বগুড়া ভ্রমন

মাঝিরা সেনানিবাস, বগুড়া- 

হাবিব ভাই দেশে এসেছেন। সাথে মাসুদ। ভাইয়ের বড় ছেলে। আমার খুব পছন্দের একটা  ছেলে। মাসুদের ভাষায় ঢাকা হচ্ছে একটা ধুলাবালির দেশ আর তার সাথে ধুয়ার একটা চিমনি। সারাক্ষন তার বমি বমি আসে এই অটোরিক্সার ধুয়ায় আর সারাদেশের ধুলাবালির আবহাওয়ায়। মাসুদ কয়েকদিন তার নানীদের বাসায় থাকলো কিন্তু তার কাছে একেবারেই ভালো লাগে নাই। এমনিতেই বাচ্চা ছেলে, তার মধ্যে ঢাকায় তার কোনো বন্ধু বান্ধব নাই। তার মধ্যে আবার কেউ তার সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে হয় বলে অনেকেই এড়িয়েই চলে।

একটা কম্পিউটার দিয়ে দিয়েছি ওর জন্য। কিনতে হয় নাই। আমার দোস্ত আলমগীরের ভাই মাহবুব আমাদের ডিভিসনে কম্পিউটার সাপ্লাই দেয়, তাকে বলে দিয়েছিলাম যেন কয়েকদিনের জন্য একটা কম্পিউটার দিয়ে দেয় আমার ভাতিজা মাসুদের জন্য। মাহবুব তাই করেছে। হয়ত এই কম্পিউটারের জন্যই মাসুদ কয়েকদিন একা একা ওর নানীদের বাসায় থাকতে পেরেছে।

গতকাল মাসুদ এবং ভাইয়া সাথে মিটুল বগুড়া সেনানিবাসে এসেছে। আমি আর মিটুল একরুমে, ভাইয়া আর মাসুদকে অন্যরুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। বেশ শীত পড়েছে বগুরায়। 

হাবিব ভাই সারাদিন বগুড়ার সেনানিবাস দেখলেন, ওনার অনেক বন্ধু বান্ধবের সাথেও দেখা করার সুযোগ হলো। কিন্তু সেনানিবাস হওয়াতে অনেকেই আসতে পারলেন না। জেনারেল আনোয়ারকে ভাইয়ার কথা বলাতে জেনারেল আনোয়ারও ভাইয়ার সাথে দেখা করার মনোবৃত্তি প্রকাশ করলেন। আমি ভাইয়াকে নিয়ে গেলাম জেনারেল আনোয়ারের অফিসে। আর্মি নিয়ে অনেক কথা হলো ভাইয়ার সাথে জেনারেল আনোয়ারের। 

এক সময় ভাইয়া জেনারেল আনোয়ারকে যেতা বললেন সেটা হলঃ 

২১ শতকের সেনাবাহিনী হবে আসলে ভুমিভিত্তিক নয়, এটা হবে সাইবারভিত্তিক। আমরা যদি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে আধুনিকভাবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর সাথে সক্ষমভাবে মোকাবেলা করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে এখনি এই সাইবার ভিত্তিক সেনাবাহিনির দিকে নজর দিতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির দিকে আরো বেশি নজর দিতে হবে। আর এর সাথে সাথে আরসেনালও বাড়াতে হবে। যদি সেনাবাহিনী চায়, তাহলে আমরা আমেরিকায় অনেকেই এই প্রযুক্তির সাথে জড়িত আছি, আমরা বিনে পারিশ্রমিকে এই  সুযোগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দিতে পারি। 

জেনারেল আনোয়ার চীফের সাথে (লেঃ জেনারেল মুস্তাফিজ বর্তমানে বাংলাদেশের চীফ হিসাবে আছেন) কথা বলে ভাইয়ার এই সাজেসনে কি করা যায় জানাবেন বলে আশ্বাস দিলেন। 

বাংলাদেশ আর্মি। কিছুই বলা যায় না। সিদ্ধান্ত নিতে বড্ড ভুল করে। দিন কে দিন এই আর্মির অফিসারেরা মেধাহীন হয়ে যাচ্ছে আর পয়সার দিকে বেশী ঝুকে যাচ্ছে বলে কোয়ালিটি পূর্ণ অফিসার আর তৈরী হচ্ছেনা। দেখা যাক, শেষ তক কি সাজেসন বা সিদ্ধান্ত আসে এই সব জেনারেলদের কাছ থেকে। আমার ধারনা নেগেটিভ হবারই কথা। হয়ত বুঝতেই পারবে না কি নিয়ে কথা হচ্ছে।

৩০/১১/১৯৯৯-জিএসও-২ (অপারেশন) আমার কর্তব্য

মাঝিরা সেনানিবাস, বগুড়া। ১১ পদাতিক ডিভিসন-

বেশ অনেকদিন যাবত একটা লিখা লিখবো লিখবো করে লিখা হচ্ছে না। আমি বেশ অনেকদিন হয়ে গেলো এই ১১ পদাতিক ডিভিসনে জিএসও -২ (অর্থাৎ জেনারেল স্টাফ অফিসার-২ অপারেসনের দায়িত্তে আছি)। আমার কাজ অনেক। এই ডিভিসনে যদি ক্ষমতার দিক দিয়ে বিবেচনা করা হয়, তাহলে জিওসি হচ্ছেন এক নম্বর, তারপর হচ্ছেন কর্নেল স্টাফ, তারপর জিএসও-১, তারপরেই আমি। কমান্ড লেবেলে ব্রিগেড কমান্ডার গন তো আছেনই কিন্তু তারপরেও আমার এই পদটা অনেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।

আমি যেদিন এই ডিভিসনে পোস্টিং হয়ে আসি, আমাকে অনেকেই গ্রহন করতে দ্বিধা বোধ করছিলেন কোনো কোনো ডিভিসনের স্টাফগন। এর পিছনে কারনটা আমি খুজতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু খুব সাফল্য পাই নাই। পেলাম একদিন কোনো এক খেলার অনুষ্ঠানে। ইয়াসিন স্যার (যিনি একিউ ব্রাঞ্চের ডিকিউ), তিনি বললেন, আমাদের জি ব্রাঞ্চের অফিসারগন বিশেষ করে আমার আগের জিএসও-২ (মেজর সাইফ, ১৪ লং কোর্সের)  সাথে একটা ডিস্ট্যান্স মেইটেইন করতো যা তাদের ভালো লাগতো না। তারা সবাই ধরে নিয়েছেন, আমি যেহেতু আর্টিলারি অফিসার, আমার হয়তো আরো বেশি নাক উচা হবে। আমি হয়ত কারো সাথেই মিশবো না।

আমার নীতীটা ভিন্ন। আমার চাকুরী করতে গিয়ে আমি কোথায় কি অবস্থায় আছি, বা থাকি সেটা ভিন্ন। আমার সাথে সব অফিসারদের হতে হবে একেবারে খাটি সম্পর্ক। যার যার জায়গায় সে সে তার অবস্থানে থাকে, সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নাই কিংবা তাদের সাথে আমার কোন বৈরিতা নাই। তাহলে কেনো আমার সাথে তাদের সম্পর্কটা খারাপ হবে?

আমি খুব সহজেই সবার কাছে খুব গ্রহনযোগ্যতা পেলাম। উপরের তালায় বসেন কর্নেল বশীর। কর্নেল এডমিন, একসময় আমার সিও ছিলেন সাভারে ১০ মিডিয়াম ইউনিটে।

আমার কর্নেল স্টাফ এখন কর্নেল আইকেবি, যার পুরু নাম ইকবাল করিম ভুইয়া। বেশ প্রোফেশনাল মানুষ। ভালো মানুষ। কিন্তু জিওসি জেনারেল আনোয়ারের সাথে ঊনি অনেক কিছুই মানিয়ে চলেন। জেনারেল আনোয়ারের পিছন ইতিহাস  বেশ ঘোলাটে। তিনি নাকি অনেকেরই ক্ষতি করেছেন হয় প্রোমোশনের দিক দিয়ে অথবা এসিআর খারাপ দিয়ে। ফলে কেউ তার সাথে এমন কিছু করে না যাতে জেনারেল আনোয়ার তার আগের ফর্মের মত কোনো কাজ করেন এবং অফিসারগন ক্ষতিগ্রস্থ হন।

জিওসির এডিসি ক্যাঃ তৌহিদ খুব অমায়িক ছেলে। আমার পাশের রুমেই থাকে। মেসে। আমার জিএসও -১ হিসাবে কাজ করছেন লেঃ কঃ হাসান সারোয়ারদি। খুব নরম শরম মানুষ। তিনি তার স্ত্রীকে রিতিমত সমিহ করেই চলেন। কেনো এতো সমিহ করেন সেটা আমার জানা নাই। তবে ভেজাল পছন্দ করেন না তিনি। আমার আশেপাশের অন্যান্য অফিসারগন যারা আছেন, সবাই বেশ ভালো। জিএস-২ (আই) মানে ইন্টিলেজেন্স হিসাবে কাজ করছেন নাইন লং কোর্সের জাহিদ স্যার। আমরা এক সাথে ওএমটি কোর্স করেছি ১৯৮৮ সালে। তিনি খুলনার ছেলে। বেশ বুদ্ধি রাখেন সব কিছুতেই। আমরা পাশপাশি রুমেই থাকি।

যেটা বলছিলাম।

আমি পন করেছি, আমার কাছে যে যেই জিনিসের জন্যই সাহাজ্য চাইবে, আমি যতোটুকু সম্ভব তাদেরকে সর্বাত্মক সাহাজ্য করবো। আমি চাই, এই ডিভিসনে সবাই ভাবুক যে, জিএসও-২ এর কাছে কোনো সাহাজ্য চাওয়া মানে সেটা পাওয়া যায়। যে কোনো অবস্থায় যে কোনো র‍্যাংকের অফিসার, যে কোনো ইউনিট সবসময় যেনো আমাকে তাদের সমস্যার কথা সাহস করে বলতে পারে আমি সেটাই চাই। এটা হবে আমার ইনভেস্টমেন্ট। দেখি না কোথায় কি দাঁড়ায়।

আমি ইদানিং এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি। আমার ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। কোনো অসুবিধা নাই। আমি মেসে একাই থাকি। আমি লোড নিতে পারবো।

৩০/১১/১৯৯৯-বদল চাই প্রশাসনের

মঙ্গলবার, ৩ঃ৫৬ঃ৪৪ বিকাল, বগুড়া সেনানিবাস-

আমি নিজেকে প্রশংসা করছি না, এখন যেটা বলছি সেটা লিখে। এটা জাস্ট আমার মনে হয়েছে। মানুষগন যদি তাদের আবেগ এবং বহিরপ্রকাশ ভনিতা করে না দেখায় তাহলে আমার কথাই হয়তো সত্যি। দেশের বেশির ভাগ রাস্ট্র নায়কদের পতন হয় তার আশে পাশের উপদেস্টাদের ভুল জিনিস ভনিতা করে ঠিক জিনিস দেখানোর মধ্যে। রাস্ট্রনায়কগন যা দেখছেন তা সত্য দেখছেন না, যা ভাবছেন তা ভুল জিনিসের উপর বিশ্বাস রেখে ভাবছেন, এবং যা মুল্যায়ন করছেন তা নিতান্তই একটা ভুল জিনিসের উপর দাঁড়িয়ে মুল্যায়ন করছেন। এর কারন তিনি সবকিছুই দেখছেন ওইসব উপদেস্টাদের দেখানো তথ্যের উপর ভিত্তি করে। উপদেস্টাগন কতটুকু কি দেখাচ্ছেন, তা বুঝা যায় রাষ্ট্রনায়কের পতনের পর। কিন্তু তখন যা হবার তা হয়ে গেছে। 

আমি রাষ্ট্রপ্রধান নই। আমার কোন উপদেস্টা নাই। আর যারা উপদেস্টা হিসাবে কাজ করে, তাদের কোনো উপদেশ আমি খুব একটা গ্রহন করছি সেটা এমন নয়।  

গতকাল লিখেছিলাম যে, আমি আমার সাধ্যের বাইরে গিয়ে হলেও সবাইকে সব ধরনের সাহাজ্য সহযগীতা করবোই। ব্যাপারটা কাজে লাগছে/আমি বুঝতে পারছি, ডিভিসনের লোকজন আমার সঙ্গ পছন্দ করা শুরু করেছে। হতে পারে এটা যে, আমি ডিভিসনের অত্যান্ত ক্ষমতাধর একজন মেজর, হয়ত সবাই এইজন্য আমার সঙ্গটা পছন্দ করছে। কেনো করছে সঠিক কারন টা খুব শিঘ্রই বের করে ফেল্বো। তবে অনেক কারন আছে আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার। ওগুলো আমার ক্ষমতার বাইরে। যেমন, আমার চেহাড়া এমন নয় যে, রাজপুত্রের চেহাড়া, কিংবা এমন জিনিয়াস নই যে, সবাই আমাকে নিয়ে নাচবে। খাওয়া দাওয়াও তো এমন না যে, এই জন্য আমার সাথে সবাই থাকে বলে ওই ঊছিলায় তারাও খেতে পারে। 

আমি যদি কারো কাছ থেকে কিছু চাই, থাকলে না দিতে উছিলা দিতে মনে বাধবে। 

আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করছি যে, জেনারেল আনোয়ার কিছু কিছু অফিসারদের বেলায় পক্ষপাতিত্ব করছেন যা আমার কাছে ন্যায়সঙ্গত মনে হচ্ছে না। অনুপ কুমার চাকমা একজন খুব প্রোফেসনাল অফিসার কিন্তু ঊনি চাকমা। তাতে কি? তিনি ৩৯ সাপোর্ট ব্যাটালিয়ানের সিও হিসাবে আছেন। আগামি প্রোমসন বোর্ডে ঊনার নাম আছে কিন্তু আমার ধারনা জেনারেল আনোয়ার তাকে পছন্দ করছেন না এবং যে কোনভাবেই হোক তার মাধ্যমেই তাকে ভুল ধরিয়ে ধরিয়ে এমন কিছু করে ফেলা যেনো ঊনার প্রোমসন এসিয়ারে জেনারেল আনোয়ার প্রোমসনের জন্য রিকমেন্ড না করলেও জেনারেল আনোয়ারের কোনো দোস থাকে না। ব্যাপারটা অন্যায়। 

আমি স্যারকে খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করছি। তাকে কেউ কেউ কান কথা দিচ্ছে। জেনারেল আনোয়ার খুব খারাপ মানুষ না। কিন্তু তাকে বা তার উপদেষ্টাগন তাকে ঠিক জিনিসটা দেখতে দিচ্ছে না। আমি নিজেও কিছু করতে পারছি না। তাই ভাবছি, আমি এইসব অফিসারদের জন্য এমন কিছু করে দেওয়া যাতে জেনারেল আনোয়ার তাদের ভুল কিছু ধরতে না পারেন। 

হতাত হতাত করে জেনারেল আনোয়ার এইসব ইউনিটে ভিজিটে চলে আসেন। সবসময় সিওদের পক্ষে ১০০% ঠিক রাখা সম্ভব নয়। সৈনিকের ছুটি নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে, ফলে ট্রেনিং এ লোক কম থাকতেই পারে। একটা  দুর্বল ড্রাইভার কোথাও গিয়ে একটা এক্সিডেন্ট করতেই পারে, তাতে সিও সাহেবের কিছু করার থাকে না। জেনারেল আনোয়ার কোন জিনিসটা  ধরবেন বলে মনোস্থির করে রেখেছেন, যা আমি আগে ভাগেই জানি, আমি চাইছি সেই গোপন তথ্যগুলি ওই সব অসহায় অফিসারদেরকে দিয়ে দেওয়া যাতে অন্তত জেনারেল আনোয়ার ভাবেন যে, এই সব অফিসারগন তাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছেনএবং ভুল  করছেন না। 

হতাত দেখা গেলো জেনারেল আনোয়ার বললেন, জি-২, কাল অমুক ইউনিটে সকালে পিটি করার সময় আমি যাব, দেখবো, কারা কারা ইউনিটে সকালে বিশেষ করে সিও কিংবা টু আইসিরা পিটিতে যায় না। কি যন্ত্রনা। কি দরকার জেনারেলদের এই সব নিয়ে এতো চিন্তা করার? কন্সেপ্টটাই আমার ভালো লাগতো না। এটা একটা ধরাধরির বাতিক। এভাবে আসলে চলে না। 

আমি হয়ত রাতের বেলায় ওই ইউনিটের সিওকে বলে দিলাম, স্যার , আগামি কাল জিওসি আপ্নাদের ইউনিটে  সাডেন ভিজিটে যাবেন। কে বা কারা কারা পিটিতে অনুপস্থিত থাকে তা দেখার জন্য। একটু সাবধানে থাকতে হবে। দেখা গেলো, ১০০% অফিসার, সৈনিক হাজির। এটাও আই ক্যাচিং। জিওসি বুঝে যাচ্ছে, ইনফরমেশন লিক হয়ে যাচ্ছে। 

দেখা গেলো বাৎসরিক ফিটনেস ভিজিটে আমি অনেক পয়েন্ট গননার মধ্যেই আনি নাই। জিওসি তো আর সবসময় সবকিছু মনে রাখেন না। আবার এমন হয়েছে যে, কোনো কোনো ইউনিটের সিওগন তাদের বাৎসরিক ফিটনেস প্রোগ্রামটা বেশ কিছুদিন পিছিয়ে আরো একটু সময় নিয়ে করতে চান। যদি অফিশিয়ালি চিঠি পাঠাতে বলি, জেনারেল আনোয়ার, কিংবা জিএসও-১, বা কর্নেল স্টাফ হয়তো মানবেন না। আমি কোনো কিছুই না জানিয়ে সবার সিডিউলে একেবারে বদল করে দিয়ে ফাইনাল করে ফেলতাম যাতে সিওরা একটু সস্থিতে কাজ করতে পারে।

এই রকম অনেক কিছু আমি আমার তরফ থেকে সবার জন্য কাজ সহজকরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও অনেক ছোট খাটো উপদেস্টা আছে যাদের কারনে জিওসি অনেক কিছু জেনে যান আর সবার অসুবিধা হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ উপদেস্টা হচ্ছে এফআইইউ র অধিনায়ক। বর্তমানে এফআইইউ র অধিনায়ক হিসাবে আছে মেজর ফারুক। ছেলেটা খারাপ না কিন্তু আরো অনেক কিছু করতে পারতো সবার জন্য। 

ভাবছি, এবার জেনারেল আনোয়ারকে সরাসরি ম্যানেজ করা যায় কিনা। মানুষ তাকে বুঝালে হয়তো বুঝবে। এই সামনের তিন দিনের গ্রুপ ট্রেনিং এক্সারসাইজ আছে। সেটা হবে আমার টার্গেট। 

বদল করে দিতে চাই পুরু কন্সেপ্ট। সবাইকে নিয়ে থাকতে চাই এক সাথে। আমার সবাইকে প্রয়োজন।

২৬/১১/১৯৯৯-একা আমি

০১২০ ঘণ্টা, মাঝিরা সেনানিবাস

সবাই আমার বাইরেরটাই দেখে, কিন্তু আমি নিজে ভিতরে ভিতরে কতোটা  একা তা কেও জানে না। আমি আমার ভিতরে কতটা অসহায় এবং  কতটা  দুঃসহ জীবন কাটাই তা কেও জানে না। আমার  ছুটির দিনে আমি সুধু সিগারেট খাই আর টিভি দেখি। কখনো কখনো সারারাত কম্পিউটার এ কাজ করি, অহেতক কাজ।  তবু ভাল লাগে। কোন কিছুই করার নেই তাই। ঘুমও আসে না, সময়টা অনেক লম্বা মনে হয়। ছুটিরদিনে আমার খাওয়া দাওয়া এত  তাঁরতম্ম্য হয় যে মাঝে মাঝে নিজের ওপর খুব রাগ হয়। আলসেমি আমার বড় বোঝা । পেটের ভিতর  ক্ষুধার আগুন অথচ আলসেমি আমাকে ভর করে রেখেছে। আমি এখানে একা। আমি আমাকে গোছায়ে রাখতে পারি না অথচ গুছানো ঘর আমার খুব প্রিয় । মাঝে মাঝে আমি নিজেও আমার অগোছালো  ঘরটাকে   পসন্দ  করি না। তাই আমি নিজে নিজেই একবার গুছানুর চেষ্টা করি কিন্তু মাত্র ২দিন, আবার যেমন ছিলে।

২৬/১১/১৯৯৯-মিতুলের একক ভাবনা আমি

সুক্রবার, ১১১৫ ঘণ্টা, মাঝিরা সেনানিবাস

সব কিছুর ওপর এটা সত্য, মিতুল আমাকে ছাড়া আর কাওকে ভাবে না।  জিবনের শেষে যেমন  মৃত্যু সত্য, মিতুলের ভাবনার মধ্যে  সুধু আমি, এটাও তাঁরই মতো সত্য। আমি সুখি, মিতুলকে দেখে আমারও মনে হয় সে সুখি। তাঁরপরেও আমাদের দুজনের হয়ত অনেক পারসনাল ভাবনা থাকতে পারে এবং আছেও। এটা কোন পাপ নয়।

১৩/১১/১৯৯৯-আতাউরের ক্যান্টনমেন্ট ভিজিট

শনিবার, মাঝিরা সেনানিবাস, ১৫৫০ ঘণ্টা

আজ আতাউর (মুজিব কাকার ছোট ভাই) তাঁর বউ, শালি (নাজমুন্নাহার), এবং এক শ্যালক নিয়ে আমার এখানে আসলো। মজার পাব্লিক। সউদি আরবে থাকে।  সারখখন সুধু টাকা আর টাকা। তাঁর শ্বশুরের এই আছে, ওই আছে, সে এই পাবে, সে ওই পাবে। কি জ্বালা। কিন্তু একটা  মজার বেপার লক্ষ্য করলাম। বউ এর থেকে শালির ওপর নযর বেশি। ব্যাপারটা আরও ভাল করে লক্ষ্য করলাম। চোখে পরার মতো মাখামাখি। কিনতু ওর বউ কিছু বলে না  কেন? আমার কিছু ব্যাখ্যা আছে। তা হুল এমনঃ

 (১)   আতাউর এর বউ খুব সর্ট। সে দেখতে খুব সুন্দুরি ও নয়। আর একবার যখন বউ পোরানো হয়ে যায়, তখন নতুন একজন মাগনা পেলে খারাপ কি?

(২)  আতাউর এর বউ শিক্ষিত না খুব এতটা। কিন্তু ওর শালি আবার বেশ শিক্ষিত।

(৩) আতাউর এর বউ সম্ভবত ব্যাপারটা বুঝে কিন্তু কিছু না বলার  কারন সম্ভবত যে, সে জানে তাঁর মতো এক জন মেয়ে আরেক বার স্বামী পাওয়া অনেক কষ্টের।

(৪)   সে মেনে নিয়েছে।

বিবাহ জীবন এক বিচিত্র জীবন। কে যে কখন কাকে কিভাবে চায়,তাঁর কোন রুল নাই। কলহ আর রাগের শেষে যদি অনুরাগ না থাকে, তাহলে  দাম্পত্য জীবনের শেষ মুহূর্তটিও বিপদ জনকই থেকে যায়। 

২৩/০৯/১৯৯৯-জেনারেল আনোয়ারের বিদায়

বৃহস্পতিবার , মাঝিরা ক্যানটনমেনট

গতকাল থেকেই একটা কেমন কেমন যেন শূন্য শূন্য অনুভব করছি। সব কিছুই আগের মতই আছে অথচ আগের মতো আজকে অফিসে আমার মন বসছে না। আগের মতো কোন কাজে গতি পাচ্ছি না। মনে হয় খুব টায়ার্ড লাগছে। বারবার এবং খনে খনে মনে হচ্ছে কি যেন মিসিং। কি যেন নাই। কি নাই? একটা প্রিয় মানুষকে হারালে যা মনে হয়, আমার যেন তাই মনে হচ্ছে। আমি কি জেনারেল আনোয়ার কে ভালোবাসি?  ওনি গতকাল ঢাকায় চলে গেছেন।  গতকাল রাতে আমি মেজর জেনারেল আনোয়ার এর বাসায় ফোন  করেছিলাম। সম্ভবত মেজর জেনারেল আনোয়ার এর ছেলে ঊপল ফোনটা ধরেছিল। আমি আসলে জানতে চেয়েছিলাম, মেজর জেনারেল আনোয়ার ঠিক মতো ঢাকাতে  পৌঁছায়েছে কিনা। উপল বলল যে জেনারেল আনোয়ার এখনো পৌঁছান নাই। আমি কেন ফোনটা করেছি, অথবা ফোনটা আদৌ করা ঠিক হয়েছে কিনা আমি জানি না, আমি জিএসও- ২ (অপস) হিসাবে জিএসও- ১ অথবা কর্নেল  স্টাফকেও ফোন করে জেনে নিতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, জিএসও- ১ (Lt Col Azim) অথবা কর্নেল  স্টাফ (Col Mollah Fazle Akbar) কেহই জিনিষটা পসন্দও করবেন না। আগের জিএসও- ১ ছিলেন Lt Col Hossain Shahid Shohrawardi and Col Staff was Col Iqbal karim bhuiyan. আমি আসলে কোন জিএসও- ১ অথবা কর্নেল  স্টাফ এর সাথে  অতটা ফরমাল ছিলাম না। তাঁরপরেও কেন যেন ওঁনাদেরকে ফোন করা হয় নাই। রাত ৯২০ মিনিটে কমান্ড ভইসে আমাকে জানাল যে জিওসি জেনারেল আনোয়ার তাঁর ঢাকার বাসায়  পৌঁছেছেন।  তৌহিদও (এ ডি সি) জেনারেল আনোয়ার এর  সঙে গেছে ঢাকায়।

শুনতে পাচ্ছি, ১১ আর্টিলারী কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার রফিক আপাতত দায়িত্ব পালন করবেন। 

২২/০৯/১৯৯৯-জেনারেল আনোয়ারের ফেয়ারওয়েল

বুধবার  , মাঝিরা ক্যানটনমেনট

আজ মেজর জেনারেল আনোয়ার এর ফেয়ারওয়েল হল। সব ব্রিগেড কমানডাররা, ব্রিগেড স্টাফ, ডিভিসনের স্টাফরা, সব সিওরা এবং কমানডেনটরা সবাই হাযির ছিলেন। এ এক হৃদ্যয় বিদারক  কাহিনি। একটিং জিওসি হিসাবে ব্রিগেডিয়ার রফিক কাজ চালাবেন। ১১ আটিলারি ব্রিগেড কমানডার। আমার সাথে তাঁর সম্পরকটা বড্ড খারাপ। কিন্তু আমি জানি না কি কারনে এই সম্পরকটা বড্ড খারাপ হয়েছে। ডিভিসনের স্টাফ হলে অনেক কিছু জানা যায়। কেও কারো গোপন কথা ফাঁস  করতে চায়না।যাই  হোক, ফেয়ারওয়েল এর সময় জেনারেল আনোয়ার এতই আবেগ আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। প্রায় ১৫ মিনিট সুধু দারিয়ে থাকলেন। আমরাও চুপচাপ। কেও কেও আবার কৃত্তিম চোখের জলও ফেললেন। জিওসি র ফেয়ারওয়েল বলে কথা। জিওসি  সুধু এ কথাটা বললেন যে তিনি এই আর্মিতে তিনবার জন্ম গ্রহন করেছেন। প্রথমবার তাঁর কমিশনের সময়, ১৯৭১ সালে আরেকবার, এবং এখন একবার। এই ত্রিতিয়বার তিনি বুঝলেন, জন্মটা বড্ড কষ্টের । তাঁর ভাবতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে যে তিনি আর কখন ইউনিফরম  পরতে পারবেন না।  আচ্ছা, ইউনিফরম খোলে ফেলা কি খুব কষ্টের? এই মুহূর্তে হয়ত আমি ইউনিফর্ম খুলে ফেলার কি কষ্ট সেটা হয়ত আমার উপলব্ধিতেই আনতে পারবো না, কিন্তু যেদিন আমি নিজে এই কাজটি করবো হয়ত আজকের দিনের জেনারেল আনোয়ারের আবেগ তা আমার কাছে আরো বাস্তব এবং কঠিন হয়ে ধরা দেবে। 

১৯/০৯/১৯৯৯-জেনারেল আনোয়ার এর সম্পর্কে

রবিবার, মাঝিরা ক্যানটনমেনট, ০২৪৮ a.m

তীর ভাঙগা ঢেউ আর তীরে  ভাঙগা ঢেউ কি একজিনিশ? নাহ, কখনই দুটুজিনিষ এক হতে পারে না।  একটি হচ্ছে প্রচণ্ড শক্তিশালী  গতিসমপন্ন জিবনের প্রতিক আর অন্যটি হচ্ছে একটি মরা ইতিহাস যার শুধু অতীত আছে কিন্ত বরতমান বা ভবিসশত নাই। এমনই একটা ইতিহাস যেন রচিত হল এই সপ্তাহে। ঘটনাটা মেজর জেনারেল আনোয়ার কে নিয়ে।  আমি তাঁর GSO-II (Operation) Staff হিসাবে কাজ করছি। আমার সেনাবাহিনির  জীবনে এটা একটা বড় এপ্য়েনমেনট এবং আটিলারি হিসাবে এটা কোরের জন্য অনেক বেশি সম্মানের। আমি নিজেও এই এপ্য়েনমেনট কে আমার এবং আমার কোরের একটা টারনিং পয়েন্ট হিসাবে মেনে নিয়েছি।  পদাতিক ডিভিশন এ যেখানে সব পদাতিকের আদিপত্ত, সেখানে এক জন আটিলারি হিসাবে খুব বেশি সুখের  হবার কথাও নয়। তাঁর পরেও আমি চ্যালেঞ্জেটা সাহসের সাথেই নিয়েছিলাম। যা হোক, এ ব্যাপারে পরে লেখা যাবে। এখন যা বলতে চেয়েছিলাম,  তাই বলি।

মেজর জেনারেল আনোয়ার ১১ পদাতিক ডিভিসনের জিওসি। রাজা যাকে বলে আরকি। জিওসির অপারেশনাল কোড নামও কিন্তু “সম্রাট”।  সুতরাং বুঝতেই পারছেন জিওসি মানে আসলেই রাজা।  মেজর জেনারেল আনোয়ার এর গায়ের রং যদিও কালো কিন্তু চেহারার মধ্যে  একটা বনেদি ভাব আছে। এবং তিনি প্রকরিত পক্ষে একজন বনেদি ঘরের লোকও বটে। কিন্তু  তাকে নিয়ে অনেক রিওমার আছে ক্যানটনমেনট এর ভিতরে।    রিওমার আছে যে, কেহ কেহ মেজর জেনারেল আনোয়ার কে যমের মতো ভয় পায় আবার কেহ কেহ মেজর জেনারেল আনোয়ার কে  ঘ্রিনা করে। কেন করে এর  ব্যাখ্যা আমার  কাছে নাই।  তবে আমার কাছে  মেজর জেনারেল আনোয়ার আজ পর্যন্ত এমন কোন কিছুই করেন নাই যার জন্য আমি তাকে খারাপ কিছু বলতে পারব। আমি  তাকে পসন্দ করি। মেজর জেনারেল আনোয়ার সম্ভবত আর্মির চিপ হবার একটা স্বপ্ন দেখছেন।  তাঁর সে আশার একটা মৃত্যু হল আর কি। তাঁর   পোস্টিং হয়েছে  Ministry of Foreign Affairs এ। সম্ভবত বাইরে কোথাও Ambassador হিসাবে পাঠানো হবে। He may not come back to Uniform again, But what I thought is that he was needed for a better army. When he was CGS, he tried to implement a system in the training doctrine in Bangladesh Army, and when I worked with him as GSO-II (operation), I found his very meticulous in implementing training as soldiers’ requirements. That’s why I just want to say that for a better Army, he was a wave which was waiting to hit the target. কিন্তু কিছুই করার নাই, বালাদেশের রাজনিতি বড় কঠিন।  কে যে কখন কি হয়ে উঠে তাঁর হিসাব রাখা ভারী মস্কিল।

১২/০৯/১৯৯৯-পৃথিবী না দেখা একজন মানুষের গল্প

রবিবার, ১৮০০ ঘণ্টা, মাঝিরা ক্যানটনমেনট

গত সুক্রবার (১০.৯.১৯৯৯) আমি আর মিতুল বেশ ভোরে around 6 o’clock in the morning, strip দিয়ে মিতুল এর ইউরিন   পরীক্ষা করলাম। মিতুল conceived করেছে। আমরা দুজনেই  মানসিক ভাবে প্রস্তত to take the second baby. ফলে খবরটা আমাদের দুজনকেই খুশি করেছে। আমরা দুজন কে দুজন অনেকক্ষণ জরিয়ে রেখেছিলাম। আমরা বেশ কিছুদিন যাবত এটা আশা করছিলাম। আজ খুব ভাল লাগল। আমাদের দিনটা শুধো next calculation করেই কেটে গেল। আমরা কাল্কুলেসন করছিলাম কেমন করে মিতুল মীরপুর থেকে ঘিওর যাবে কলেজ করতে? কিংবা উম্মিকা কে ইসকুলে কেমন করে আনা নেওয়া করা হবে? একটা  সমস্যা হয়ে দাঁড়াল।

সব মিলে  আমরা decision নিলামঃ

(১) মিতুলকে ওতি  তাড়াতাড়ি  মানিকগনজে shift করতে হবে। primary stage এ কোন অব্তাতেই long journey   করতে দেয়া যাবে না। মানিকগনজ থেকে ঘিওর যাওয়া better than that of from Mirpur.

(2)  মানিকগনজ না যাওয়া অবধি মিতুল should be at home. She must not go for a single day long journey for college at Ghior.  তাই ১৫ দিনের ছুটির জন্য দরখাশ্ত করল মিতুল কলেজ বরাবর। শনিবার দিন (১১।৯।১৯৯৯)   আমি একা কলেজে ওর দরখাস্তটা নিয়ে এলাম। 

আমকে রাতে পুনরায় ঢাকা থেকে  বগুড়া যেতে হবে অথচ এখন ঢাকা থেকে ঘিওর এবং ঘিওর থেকে ঢাকা লম্বা  জারনিটাও খারাপ লাগছে না। বরং I was feeling all through happy because we are taking care for our next baby inshallah.

মিতুল ভাবছে এবার আমাদের ছেলে হবে। আমারও  তাই ধারনা। হয়ত এটা মনের ব্যাপার বা ভাবনা। এই ভাবনার মধ্যে কোন বৈজ্ঞানিক কারন নাই। তবে  যদি আর একটা মেয়েও হয়, আমার কোন খারাপ লাগবে না। আমার একটাই চাহিদা, ও যেন মিতুল এর মতো অথবা আর সুন্দর হয়। আমার মিতুল এর চেয়ে এতো সুন্দর এবং এতো পবিত্র আর কেহ নয় এবং আমি আজো কাওকে দেখিনি।

“ হে আমার আদরের আগত মানব সন্তান, আমি  তোমাকে এ পৃথ্বীর আলোতে স্বাগত  জানাই। এ বড় সুন্দর পৃথিবী, তোমাকে এ পৃথিবী নেশাগ্রস্ত করে ফেলবে, আমরা আছি তোমার পাশে। তুমি এসো  তোমার মায়ের কোলে। পৃথ্বী কি তোমাকে ডাকছে না? এখানকার আকাশ বড় নীল, সাগর বড় বিশাল, এখানে সূর্য সবাইকে আলো দেয়, পাহাড় আছে, সবুজ গাছ আছে, সুন্দর সুন্দর ফুল আছে, তুমি কি লাল ফুল ভালবাস নাকি নীল? আমি নীল ভালবসি। নীল জানো কি  কিসের অর্থ? “

০২/০৯/১৯৯৯-পারিবারিক অন্তর্কলহ

বৃহস্পতিবার, ছুটির দিন, ১৩৫৭ ঘণ্টা, মাঝিরা 

আমাদের পরিবারটির মধ্যে অন্তরকলহ ব্যাপক বেশি। আমি আমার পরিবার বলতে আমি, আমার বোনেরা, আমার ভাইয়েরা কে বোঝাচ্ছি। আমার মা বড় নিরিহ মানুষ। সে কোন পক্ষেই নয়। সে সত্তেই খুব অসহায়। আমি আমাদের পরিবারের সদস্যদের এবং যাদের সংগে আমাদের সদস্যরা মেলামেশা করে, আমি তাদের সবাইকে খুব কাছে থেকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি। আমি তাদের কারোর মধ্যে কোন difference দেখিনি। এই পরিবারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিটি সদস্য প্রতিটি সদস্যকে ভালবাসে, কিন্ত বিশ্বাস করে না। আবার অন্যদিকে, এই ভালবাসার বহিরপ্রকাশ খুব কম। এরা যানেনা কেমন করে ভালবাসার কথা বলতে হয়। ফলে একজন আরেকজনকে খুব সহজেই ভুল বুঝে। আর ভুল বুঝাবুঝির থেকে Gap তৈরি হয়। আমাদের পরিবারেও এই gap অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। গ্যাপ তৈরি হয়েছে ভাইয়ের সংগে  বোনের, বোনের সংগে ভাইয়ের, ভাইয়ের সঙে ভাইয়ের। একজন আরেক জন তাদের এই ভুল বুঝার কারন বেখ্যা করতে পারেনা। তারা অবস্য জানে না কি কারনে তাদের  এই সমস্যা। ফলে শেষে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে হৈ চৈ আর রাগারাগি। সমাধান নাই।

এই পরিবারের সদস্যরা নিজের ভুল কখনই স্বীকার করে না, এবং তারা যা ভাবে ওটাই মনে করে যে সবচেয়ে ভাল সিদধান্ত। অন্য কারও সিদ্ধান্ত্ব গ্রহনযোগ্য নয়। এখানে আরো একটা মজার ব্যাপার হল, তারা নিজেরা জয় হবার জন্য  যা কিছু করার তাও করার অবকাশ রাখে। ফলে স্বার্থ বজায় রাখার কারনেই  একই ঘটনা এক এক জনের কাছ থেকে এক এক রকম শোনা যায়। এবং এর কোন শেষ নেই। “I am sorry, or I love you, or I miss you” এই জাতিয় কোন কথা এই ফামিলির লোকজন বলতে শিখেনি। তাই  বলে কি এই সব এই  ফামিলিতে  ঘটছে না?

অবস্যই ঘটছে, কিন্তু বহির প্রকাশ ঘটছে না। এই গুলোর বহির প্রকাশ থাকাটা অত্যন্ত জররি। তবে  একটা জিনিশ আমি এখন জানি না, তা হল, এরা কি এদের নিজ নিজ ফামিলির সঙে এই বার্তা আদান প্রদান করে? হয়ত করে এবং সেটা আমার জানা নাই। যেমন, আমি চাই আমার  সন্তান বোজক যে আমি ওদের কে ভালবাসি। আমি ভুল করলে সরি বলতে চাই, মিস করলে বলতে চাই, আমি তোমাকে মিস করছি। এবং এভাবেই ওরা শিখুক যে একটা ফামিলি এভাবেই গড়ে  ওঠোক।  আমি এখনো বুঝিনা আমার ভাই আমাকে কতটা ভালবাসে, আমি এখনো বুঝিনা আমার বোন আমাকে  কতটা ভালবাসে, আমি এখনো বুঝিনা আমি আমার ভাইকে বা বোনকে কতটা ভালবাসি। মাঝে মাঝে আমি আসলে কিছুই বোঝতে পারি না। কি জানি একই অভিযোগ না জানি আমার সন্তানেরা করে কিনা কে জানে।

০১/০৯/১৯৯৯-নিঃসঙ্গতা

বুধবার, ১৯২৪ ঘণ্টা, বগুড়া ক্যানটনমেনট।

নিসঃসঙ্গতা আমার প্রতিদিনের একটা সংগি। চারিপাশে এতো মানুষজন, এতো সারি সারি অট্টালিকা, হাই স্পীডের গাড়ি ঘোড়া চলমান, সবাই কোনো না কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত। কেউ তাদের পরিবার নিয়ে, কেউ নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে, কেউ আবার মহাকাশের অন্তর্নীহিত রহস্য ভেদ করা নিয়ে ব্যস্ত। আমার সব কিছুই আছে, অথচ দিনের বেশীরভাগ সময়ই আমি কেনো জানি একা। কাজের মধ্যে ডুবে থাকি, তারপরেও আমি একাই মনে হয়। দিনশেষে সন্ধ্যায় আমি একা, দিনের আলো ফুটবার সময়েও আমি একা, ভরদুপুর লোকারন্য পরিবেশেও আমি একা।

বাইরে যখন বৃষ্টি হয়, টিনের চালের রিমঝিম শব্দ হয়, কিংবা ঝড়ো হাওয়ায় যখন পাশের গাছ গাছালীগুলি একে একে একদিক থেকে আরেকদিকে দিকবিদিক জ্ঞান হারানোর মতো হেলে দুলে উঠে অথচ ওরা ওদের স্থান পরিবর্তন করে এই ঝড় হাওয়া থেকে মুক্তির পথ খুজে পায় না, তেমনি আমার কাছে মনে হয়, আমি সব কিছুর পরেও অন্য কোথাও যাওয়ার কোনো পথ দেখি না। আমি ও ওই গাছ গাছালী গুলির মতো কোথাও পালাতে পারি না।

গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, আমি জেগে থাকি একা। নিশিচরের মতো আমার চোখে ঘুম নাই, বাইরের অন্ধকার রাতের মতো আমি আমার জীবনের অনেক কিছু তখন আর চোখের সামনে দেখতে পাই না। আমার ভয় করে। কিসের ভয়, কাকে ভয় আমি সেটাও স্থির করতে পারিনা। একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আমাকে চাপা হাতে রুদ্ধ করে কি জানি কানে কানে বলে যায়, আমি তার ভাষা বুঝি না।

আমার সংসার আছে, কেউ না কেউ আমার উপর ভরষা করে। আমি অনেকের ভরষার জায়গা বটে কিন্তু আমি শক্ত করে কোথাও দাড়াতে পারি না। সারাক্ষন মাথা যেনো ভন ভন করে। ক্ষুধা লাগে, খাবার আছে অথচ আমার পেট ভরে না।

আমি একা।

আমার এই একাকীত্ব অবশ্য আজকের একদিনেই তৈরী হয় নাই। দিনে দিনে আমি একটা বাস্তব খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম, এই বিশাল দুনিয়ার মধ্যে এতো সব মানুষ নিজের কাধের উপরে থাকতেও কেনো যেনো মনে হয় কেউ আমার হাতটা ধরে বলে না- আছি তো আমি। এতো ভয় কিসের?

তবে আমি আমার এই একাকীত্ব কে খুব উপভোগ করি মাঝে মাঝে। আমার এই জীবনে কেউ থাকুক বা না থাকুক, আমি তো আছি আমার জন্য। যখন রাত হয়, আমি আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজকে দেখি, যখন সকাল হয় আমি আবার আয়নায় গিয়ে দাড়াই, নিজেকে দেখি। অদ্ভুত লাগে আমাকে। আমার আশেপাশে যাদেরকে দেখি তারা আমার সাহস, আমার কনফিডেন্স, আমার জিদ, আমার নতুন নতুন ইগো দাঁড়িয়ে আছে। ওরা শুধু আমাকে কখনো সাহস দেয়, আমার কনফিডেন্স আমাকে অনেক দূর যেতে সাহাজ্য করে, আমার জিদ আমাকে একা থাকার প্রেরনা জোগায়, আর আমার ইগো? আমার ইগো আমাকে শুধু এটাই বলে, তুমি কারো থেকেই কম কিছু নও। এই দুনিয়ায় তোমার মতো আরো অনেক পুরুষ কিংবা মানুষ জন্মেছিলো যারা একাই সমুদ্র পার করেছে, তারা সমাজকে পরিবর্তন করেছে। তারা এক সময় তোমার থেকেও দূর্বল ছিলো।

কেউ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছি? সদা হাস্যজ্জোল চোখে আমি তড়িত উত্তর দেই- খুব ভালো আছি। কিন্তু আমি কি আসলেই ভালো আছি? হয়তোবা আমি আসলেই ভালো আছি। আমার জগত আলাদা, আমার ভাবনা আলাদা, আমার কষ্ট আলাদা, আমার পছন্দ আলাদা, আমার সুখটাও সবার থেকে আলাদা। পৃথিবীর কেউ সুখী না। আমিও হয়তো সবার মতো সুখী না কিন্তু আমার একাকীত্ব আমাকে সুখী করেছে। সেই সুখটা আমি একাই ভোগ করি। আমি খেতে গেলে একাই খাই, ঘুমুতে গেলে একাই ঘুমাই, হাসলে একাই হাসি। কেউ হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু আমার অপেক্ষার রাত শেষ হয় না, আমার দিন শেষে মনে হয় আমি তো ভালোই আছি।

একটা সময় আসবে, আমি বুড়ো হয়ে যাবো, আমার মন পরিবর্তন হয়ে যাবে। আমার আজকের দিনের অনেক শখ আহ্লাদ পরিবর্তন হয়ে যাবে। আমি হয়তো তখন আর আজকের দিনের বৃষ্টি, আজকের দিনের নিশীথ রাত, কিংবা চাদনী চাঁদ কিছুই আর আকর্ষন করবে না।

আমি তখনো একাই থাকবো। হয়তো তখন আমার সন্তানেরা আশেপাশেই থাকবে, আমার পরিবার এক ছাদের নীচেই থাকবে কিন্তু সেই থাকা আর আজকের দিনের না থাক্র মধ্যে হয়তো কোনো পরিবর্তনই হবে না।

আমি নিঃসঙ্গ একটি মানুষ যার প্রতিটি দিন আর রাতের চরতিত্র এক। তার কষ্ট আর সুখের সংগা এক, তার হাসি আর চোখের জলের ধারা একই। কারন নিঃসঙ্গ মানুষেরা এই রকমেরই।

আমাদের এই নিঃসঙ্গতা (আমার এবং মিতুলের)  আমরা এক রকম মেনেই নিয়েছি। তবে একেবারে অভ্যস্ত হয়ে যাইনি। দু জনের কর্মখেত্র আলাদা আলাদা। তাই ব্যাপারটা মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় আমি দেখছি না। সুতরাং এই  দূরে থাকাটা আমাদের কাছে একটা  রুটিন এর মত মনে হয়। কিন্ত সমস্যা আরেকটী তৈরি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আর সেটা হল আমার মেয়ে ঊম্মিকাও অভ্যাস্ত হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় আসবে যখন এই সময়টা নিয়ে আমরা কঠিন একটা সিচুয়েসন এর মাঝে পড়ব। এই সমস্যা সমাধানের কি কোন উপায় আছে? আমি জানি এর সমাধান কি। আমাকে আর্মি ছাড়তে হবে। কারন, মিতুল তাঁর চাকরি ছাড়বে না। মেয়েরা তাদের চাকরি ছাড়তে চায়না। আমিও ওকে  চাকরিটা ছাড়তে দিতে হয়ত দেব না। সুতরাং অপসন একটা।

২৮/০৮/১৯৯৯-মীরপুর স্টাফ কলেজ থেকে বগুড়া

Almost এক বছরের ও বেশি সময় মিরপুর স্টাফ কলেজ এ ছিলাম। বগুড়া ক্যানটনমেন্টে পোষ্টটিং হয়েছে। ফ্যামিলিকে ঢাকায় রাখতে হবে। বদি ভাই অগ্যত কারনেই একটু positive মনে হয় কিন্তু মাঝে মধ্যে এমন এমন মন্তব্য করেন যা আমার কাছে দূরভেদ্য মনে হয় whether he is positive or negative. ঢাকায় কোথায় ফ্যামিলিকে রাখবো এটা নিয়ে অনেক ভাবলাম। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম যে মীরপুর লক্ষ্মীকঞ্জুতে বাসা ভাড়া নেব এবং নিলাম। ভাবলাম মেয়েটি ছোট, আসমাকে কলেজ করতে হয় সেই ঘিওর। বদি ভাই সাহাজ্যে আসতেও পারেন। কিন্তু লাভ হয় নাই। ওনি হজে গেলেন, বিসশের সবাইকে বলে গেলেন, আমার পাশের ফ্লাটে বলে গেলেন, অথচ আমাকে বলে গেলেন না। আমার মেয়েকে দেখলেও তিনি ডাক দেন না। আমি সালাম দিলেও ওনি সালামের উত্তর নেন না। মুখ ঘুরিয়ে নেন। এর কারনটা কি? ব্যাখ্যা করছি। লক্ষ্মীকঞ্জুর বাড়ির মালিক যিনি, তিনি অততান্ত অসৎ এবং ঘোষখোর। আবার লক্ষ্মীকঞ্জুর মালিকের বড় ভাই বদি ভাইয়ের খুব ভাল বন্ধু। বদি ভাই যে কোন কারনেই হোক, তিনি এই বাড়িটার কেয়ারটেকারের কাজটা করছেন। এই কেয়ারটেকারের কাজটা করার জন্য আমার ধারনা তিনি কোন টাকা পয়সা নেন না। তবু তিনি কাজটা করেন। আমি জিনিসটা সাপোর্ট করিনি। তাই তার এতো রাগ। তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, লক্ষ্মীকঞ্জুর মালিকের আরেক ভাই যিনি তার বন্ধু, তিনি অসৎ নন। And by profession, he is a teacher and ex-principal. So, he cant leave him as friend even his brother partner is not honest.যদিও বদি ভাই কথাটা মুখে বলেন নি কিন্তু কাজকর্মে বুজাছছেন। আমার সঙ্গে বদি ভাইয়ের সম্পর্কটা একদম চরমে। আসমাকে উদ্দেস্য করে উনি একদিন বললেন, আসমা একটি ডাইউস, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, দাইউশ মানে কি? উনি বললেন, যে কোন হুযুরকে জিজ্ঞাসা করলেই জানতে পারব দাইউশ মানে কি। পরে জানতে পারলাম যে, দাইউশ মানে খারাপ মেয়ে।

১৫/০৭/১৯৯৯-উম্মিকার কাছে আমার জিজ্ঞাসা

Dear Ummika,

(My Dream that got fulfilled.)

 In the year of flood-95, the story took place. The true victim was narrating his experiences in the national TV media.

The man was running towards the safe zone because the hurricane, with hot water and very high speed, was rushing towards them from Bay of Bengal. They could not reach to the safe zone. The waters caught them enroute. Thinking immediate sanctuary, he claimed up the big banian tree with his two small kids, Faria , the daughter and Parvez Zaman, the son. The man was holding his two kids very tightly so that none go missing. But  the current of the water was so high that his hands were unable to hold two kids together anymore or otherwise his life was in danger.  Now time has come to decide to surrender one minimum to survive marginally. The man could not decide any thing. What should he do? He can not surrender anyone!  At the moment of “no time left” things happened automatically. The man survived. His one kid is also alive. And the kid is Parvez Zaman, the son. Naturally the daughter was sacrificed. What he could do? He could do so many things but he could not do anything. I do not say any thing right now sitting in a comfortable situation what I will do then, but what the man did it might happen to me too. Luck only can decide their fate, my daughter or my son. Only God knows.

 What you would do Ummi?

০৬/১২/১৯৯৮-মা কি আমাদের পরিবারের বন্ডেজ?

রবিবার, মাঝিরা সেনানীবাস, রাতঃ ১১টা ২৩ মিনিট

মাঝে মাঝে আমি একটা অদ্ভুদ ব্যাপার নিয়ে ভাবি। কিন্তু আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার মাঝে মাঝে বেশ ভাবতে ইচ্ছে করে। আমরা দুই ভাই, পাচ বোনের মধ্যে এখন চারজন বেচে আছেন। মাও বেচে আছেন। মা গ্রামে থাকেন, আমরা সবাই মাকে কেন্দ্র করেই প্রকৃতভাবে আসলে ঈদে, পর্বে কিংবা যে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে একত্রিত হই। আমি বগুড়ায় আছি, মিতুলকে ছাড়াও আমি যখন ছুটি নিতে চাই, তার মাঝেও মায়ের সাথে দেখা করার প্রবনতায় আমার ছুটি যেতে ইচ্ছে করে। হাবীব ভাই আমেরিকায় থাকেন, তার সাধারনত সবসময় বাংলাদেশে আসা হয় না। উনি আসতেও হয়তো চান না। হাবীব ভাইয়ার এই যে না আসার অনীহা, কোনো একদিন হয়তো উনাকে এর বড় মাশুল দিতে হতে পারে। এর কারন একটাই। আজ হাবীব ভাই যে সব কারনে তার অনীহা হচ্ছে, যেমন, বোনদের প্রতি উনার আস্থা নাই বললেই চলে, গ্রামের প্রতি উনার অনেক অনীহা কারন গ্রাম তার স্ট্যান্ডার্ড নয়। থাকা অসুবিধা, খাওয়া অসুবিধা, পায়খানা প্রস্রাবে অসুবিধা। পরিবেশ তার মনের অনুকুলে নয়। তার উপর তার সমসাময়ীক কোনো বন্ধুরাও নাই যে, উনি কোথাও আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে পারবেন। একদিক দিয়ে ভাবলে ব্যাপারটা মনে হয় ঠিকই আছে। আবার যদি সুদূরপ্রসারী ভাবনায় ভাবি, এই বিচ্ছিন্নতা কোন একদিন হাবীব ভাইকে হয়তোবা মাশুল দিতে হবে। কেনো বলছি, তার একটা ব্যাখ্যা আছে। মানুষ বড় হয়, তার সম্পদ হয়, একদিন সম্পদের চাহিদা আর থাকে না। তখন দরকার হয়, আসলে দরকার না, এটাই হবে যে, ইচ্ছে হবে সেই চেনা পরিচিত বাল্যকালের জায়গাগুলিতে ফিরে যাই, তারপর সেখানে সেই গ্রাম, সেই আদি নদী, মেঠো পথের ধারে হাটতে হাটতে সময় কাটানোর বাসনা হবে। সবাই ওই সময় একসাথে জীবিত নাও থাকতে পারে, কিন্তু এই সমসাময়ীক বন্ধুদের ডালপালারা অর্থাৎ তাদের বাচ্চা কাচ্চারাও এক সময় বন্ধুতে পরিনত হতে পারে। কিন্তু এটা সম্ভব তখনই যখন অবিচ্ছিন্ন একটা সম্পর্কের মধ্যে কেউ থাকে।

যাই হোক, আমি ঢাকার বাইরে থাকি বিধায় মায়ের উপর সন্তানের যে প্রাত্যাহিক দায়িত্ত, বাজার সদাই, দেখভাল ইত্যাদি করা সম্ভব হয় না। কিন্তু আমাদের বদি ভাই অত্যান্ত আন্তরীকতার সাথেই মায়ের এই যত্নটা করেন। যদিও তিনি আমার আপন সহোদর ভাই নন। মাসে মাসে এককালীন বাজার করে দিয়ে আসেন, মায়ের খোজ খবর নেন। মাকে তিনি মা বলেই জানেন। এই রকম একজন নিঃসার্থবান মানুষ যুগে যুগে পাওয়া যায় না। বদি ভাইয়ের সাথে আমার বোনদের দেখা হয়, কথা হয়, যেদিন তিনি গ্রামে যান, সেদিন সবার সাথেই উনার দেখা সাক্ষাত হয়। এমন কি আমাদের গ্রামের অনেকের সাথেই উনার এখন ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। সবাই উনাকে স্যার বলেই সম্বোধন করেন।  

কিন্তু সবচেয়ে বড় ভয় হয় আমার যে, হাবীব ভাই দেশে না আসার কারনে যেমন তার সন্তানদের সাথে আমাদের অন্যান্য ভাই বোনদের সন্তানদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠছে না, তেমনি বদি ভাইও তার সন্তানদেরকে আমাদের এই সম্পুর্ন পারিবারিক সিস্টেমের সাথে বহুমুখী বন্ধনের চেষ্টা করছেন না। ফলে আমাদের বোনদের সন্তানেরা যেমন বদি ভাইয়ের সন্তানদের সাথে বন্ধুত্ত গড়ে উঠছে না, তেমনি হাবীব ভাইয়ের সন্তানদের সাথেও একই অবস্থা। এই বন্ধনটা ছাড়া ছাড়া ভাবের। সতস্ফুর্ততা নাই। আমি যখন ঢাকায় যাই, বেশীর ভাগ সময়ই আমি খেয়াল করেছি যে, আমার সময় কাটে কিছু অংশ মানিকগঞ্জে, কিছু অংশ গ্রামে আর মাঝে মাঝে মীরপুর বদি ভাইয়ের বাসায়। আর সেটাও বেশ অল্প সময়ের জন্য।

হাবীব ভাইয়ের ছেলে মাসুদের সাথেও কারো কোনো সখ্যতা গড়ে উঠছে না। এমনকি আমার সাথেও না। তাতে যেটা হচ্ছে তা হলো, কোনো একদিন, আমরা হয়তো এভাবেই ছাড়া ছাড়া ভাবেই দুনিয়া ত্যাগ করবো। কে যে কখন দুনিয়া থেকে চলে যাবে, তখন পরিবারের অনেকেই হয়তো পাশে থাকবে না। এটা মর্মান্তিক।

আমার কাছে মনে হচ্ছে, মাকে কেন্দ্র করে এখনো কিছুটা বন্ডেজ আমাদের সবার মধ্যে আছে। কিন্তু এই বন্ডেজটা কি খুব শক্ত একটা বন্ডেজ? এই বন্ডেজের সবচেয়ে দূর্বল দিক হচ্ছে, যেদিন মা থাকবেন না, সেদিন এই সেনটার পয়েন্ট “মা” এর অভাবে বাকী সব বন্ডেজ নিমিষেই ভেংগে যেতে পারে। কিন্তু এটা তো কোনো পারিবারিক সম্পর্ক হতে পারে না?

কিন্তু আজ যদি আমরা এমন একটা বন্ডেজ তৈরী করতে পারতাম যেখানে “মা” সেন্টার পয়েন্ট নয়, তাহলে মা যেদিন থাকবেন না, সেদিনও এই পারিবারিক বন্ডেজটায় কোনো প্রকার হুমকীর সম্মুখীন হতো না। কিন্তু আমার ধারনা, আমরা সেটা করছি না। আর এর ফলাফল দূর্বিসহ। আমাদের পরবর্তী জেনারেশন একে অপরের কোনো খোজ রাখবে না, চিনবে না, হয়তো কখনো জানবেও না যে, অতীতে কোনো একসময় আমাদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক বিরাজ করেছিলো। অথচ তখনই হয়তো এই বন্ডেজটার অনেক প্রয়োজন।

একটা সময় আসবে, হাবীব ভাইয়ের সবকিছু থাকা সত্তেও তিনি অনিরাপদ ফিল করবেন, পাশে কাউকে হয়তো পাবেন কিন্তু তারা তার পরিবারের কেউ না। আমিও হয়তো ভাববো, আহা যদি এই মুহুর্তে আমার পাশে কেউ থাকতো যাদের শরীরে আমার রক্ত বা যারা আমার একান্ত লোক। আমার পরিবারের বাচ্চারাও হয়তো একদিন প্রশ্ন করবে, আমাদের অতীতের জেনারেশন ছিলো না? তারা কোথায়?

আজ আমি একটা হাইপোথিসিস ডায়াগ্রাম তৈরী করে বুঝতে চেয়েছি, আসলে মা সেন্টারড বন্ডেজ কি আর মা ছাড়া বন্ডেজ কি। গা শিউরে উঠে।

১৮/০৯/১৯৯৮-আমি অসহায় একজন মানুষ

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট,  Friday,

কেনো বললাম আমি অসহায় একজন মানুষ? আমরা বলি যখন কোনো মানুষের হাত তাহকে না, পা থাকে না, চোখে দেখে না, কিংবা কোনো না কোনো ভাবে সে নিজের কাজ কর্মের কাছে অসহায়। তাঁকে অন্য কারো সাহাজ্যে চলতে হয়। এদেরকে বলা হয় আসলে শরাঈরিক প্রতিবন্ধী। আমি সে রকমের কেউ নই। আমার হাত আছে, আমার পা আছে, আমার কোনো অসুবিধা নাই। আমি দৌড়াতে পারি, আমি গান গাইতে পারি, আমি হাসতে পারি, আমার দুচোখ ভরে খুশীতে কান্নায় অশ্রু আসে। তাহলে আমি কেনো নিজেকে অসহায় মনে করছি?

আসলে অসহায়ত্ব এমনি এক বেদনার নাম যা নিজের চোখের সামনে প্রিয়জনের সর্বনাশ হতে দেখেও যখন কেউ তাঁকে রক্ষা করতে পারে না, তার নাম। নদীর ওপারে যখন নিজের পোষা কোনো আদরের কুকুরটি কিংবা মানুষটি কারো হাতে নাজেহাল হয় আর তখন নিজে সাতার না জানার কারনে নৌকার অভাবেও তার কাছে পৌঁছানো না যায় আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের আকুতি শুনতে হয়, তার নাম “অসহায়ত্ব”।

আমি যখন আমার চোখ বন্ধ করি, আমি পরিষ্কার দেখতে পাই , আমার বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার প্রিয় মানুষ গুলির পাশে কিংবা বিপদের পাশে কেউ নাই। এমন কি আমিও যদি কোনো বিপদে আর্তনাদ করি, আমার জন্য কেউ হয়তো দৌড়ে সাহাজ্যের হাত বাড়িয়ে কাছে আসবে না। কারন সে রকমের কোনো বন্ড, মায়া, মহব্বত কিংবা দায়িত্তশীল কোনো মানবের সাথে আমার যোগাযোগ হয় নাই। আমি যাদেরকে আমার চোখের সামনে দেখছি, যেমন বদি ভাই, কিংবা হাবীব ভাই, তারা কেমন যেনো সেলফ কেন্দ্রিক কিছু মানুষ। যে পরিস্থিতির ভয়ে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েও পড়তে চাই নাই, যে ভয়ে বুয়েটে চান্স পেয়েও পড়তে চাই নাই, যে পরিস্থিতির ভয়ে আমি নিজেকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও এই সেনাবাহিনীতে এসেছিলাম, সেই রকমের ভরষার স্থান আজো আমি তৈরী করতে পারিনি মনে হচ্ছে। তাই যখন আমার অকাল মৃত্যুর কথা মনে পড়ে, যখন মনে পড়ে আমার কিছু প্রিয়জন আছে, যেমন তুমি (মিটুল) অথবা উম্মিকা এদের পাশে হটাত কোনো আকষ্মিক সাহাজ্য এসে হাজির হবে কারো কাছ থেকে এটা আমার মনে হয় নাই। তারা আছে, থাকবে আবার নাইও। আমার মা আমাকে ভালোবাসেন কিন্তু তার সামর্থ নাই যেখানে নিজের জীবন দিয়েও কিছু করতে পারে। আমার বোনেরা তো আরো অসহায়। কাউকেই আমি কোনো প্রকারের দোষারুপ করতে পারি না। আসলে সম্ভবত আমরা সবাই অসহায়।

তবে কেনো জানি আমার শুধু একটা কথা প্রায়ই মনে হয়, কোনো একদিন, আবার বলছি, কোনো একদিন হয়তো আমার এই দুশ্চিন্তার অবসান হবে, আমি আর নিজেকে অসহায় মনে করবো না এবং আমার নিজের উপর নিজেরই কনফিডেন্স থাকবে একাই সব সামাল দেয়ার। কিন্তু কেনো মনে হয়, বা কিভাবে এটা হবে আমার জানা নাই। ইন্টিউশন থেকেই এটা মাঝে মাঝে আসে। হয়তো ঠিক তখন আমার প্রিয়জনগুলিও জানবে না আজকের দিনের এই সময়ে এই পরিস্থিতিতে আমার বুকের ভিতর কতটা রক্ত ক্ষরন হয়ে সেইখানে দাড়াতে পেরেছি।

Do my people know how much unhappy I am! Do they know how much uncomfortable I am! No body will ever know this. I am very much alone here. My loneliness always keeps me in unhappiness and more comfortableness.  I start thinking of something like death, like loneliness, something like darkness. Does anyone know what is the pain bearing the loneliness? It is too heavy. It is quiet difficult to bear for a prolong time. If anytime anyone breaks for a while, he has To destroy him and die. Why do I consider myself so lonely? I know if anytime I am caught by any kinds of awkwardness, none is there to stand beside me. I know, the so-called Badi Bhai or my own brother might not stand beside me. I know for-sure that these people will not rather. There is none and really none for me. If I die right now, none will come beside you, Mitul. It is so correct that even those people do not know. We all know how to avoid each other. We are not comfortable to face each other rather. So everyone is lonely. Even though I sometimes feel for them very deeply, they make me sick for sad news and equally make me happy when I hear something good. But maximum times I always get the bad news.

১৪/০৯/১৯৯৮-পৃথিবী বড় সুন্দর

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট, সময় রাত দুইটা সোমবার।

বড় বড় মনিষীরা তাদে বিখ্যাত বিখ্যাত লেখনীতে বারংবার একতা কথাই লিখে গেছে- পৃথিবী বড় সুন্দর।

আসলে এই সুন্দরটা আসলে কি? এটা কি রংগীন? এটা কি নীল? অথবা লাল? নাকি সবুজে ভরা কোনো আকাশ? অথবা নীলে ভরা কোনো পার্ক? কেউ কেউ তাহলে এতো সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে আত্মাহুতির পথ কেনো বেছে নেয়? তারা কি পৃথিবীর এই রুপময় সউন্দর্য দেখে না? অথবা তারা কি এটা জানে না যে, পৃথিবী সুন্দর!! আসলে পৃথিবী সুন্দর তখন যখন মনে অফুরন্ত ভালোবাসার কলি ফুটে, আনন্দের ধারা বয়ে যায় কিংবা মায়ার জালে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে, চলমান পিপ্রার সারি দেখলে তার রুপ মনকে নাড়া দেয়, কিংবা কোনো অবুজ শিশুর অবুঝ বায়নায় সারাদিন সারারাত কান্না কাটি করলেও মনে কেমন যেনো একটা মহব্বতের সুর বেজে উঠে। অজস্র মেঘে ঢাকা আকাশ, খরতাপ মাঠ কিংবা ঝড়ো হাওয়ার মতো তান্ডবেও যখন কোনো প্রকৃতি এলোমেলো হয়ে আছড়ে পড়ে পথের পাশে, সেই সব দৃশ্য ও মনকে পুলকিত কিংবা আন্দোলিত করে আর সেখানেই যেনো লুকিয়ে থাকে এই পৃথিবীর প্রতিটি সুন্দর। বেদনার রং হয়তো নীল কিন্তু এই নীলেও অনেক আহত বেদনার সুখ লুকায়িত থাকে যা সময়ের স্রোতে মনকে দোলায়।

মিটুল সে রকমের একতা প্রকৃতি আমার জীবনে। ওর জন্যে আমার যেমন ঝড়ো হাওয়ার মতো তছনছ হয়ে যেতে পারে সারাটা জীবন আবার ওর জন্যেই বয়ে যায় আমার সুখের বাতাসের মতো শিহরন। যদি ঝরে যায়, যদি হারিয়ে যায়, যদি আর খুজে না পাওয়া যায় তাহলে সেটা হবে আমার জগতের সবচেয়ে বড় মারাত্তক বিপর্যয় কিন্তু যদি রয়ে যায়, যদি আর কোথাও না হারিয়ে যায়, এই প্রথিবী হবে আমার সর্গরাজ্যের মধ্যে উত্তম। পারবে কি তুমি কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকতে? অথবা হারিয়ে যেতে?

আমি তোমাকে সবচেয়ে সুন্দর পৃথিবীটা উপহার দিতে চাই। জানি না কিভাবে। যদি কিছুই দিতে না পারি, অন্তত আমি তোমাকে দেবো স্বাধীনতা আর দেবো ভালোবাসা।

The earth is very beautiful. There are so many things to see so many things to enjoy. A man dies before he sees lot of things of the earth. Why a life is so short? Can it be not more longer, lengthier!

Do you know Mitul, why I could not break myself to anyone? It was not for that reasons that I afraid people. Or I care people for self-prestige. It is nothing but I know someone is waiting for me till death. How can I deprive her from my love? I can not break, rather I don’t want to break to anyone other than Mitul. She is my only friend in this earth! How can I give her pain? It will obviously come back to me with double triple strength. Mitul is my only precious thing. She is an asset for me. Mitul, I will never leave you, you believe me. Please you don’t leave me alone. Even you don’t get any comfort here even though you remain with me, with my daughter. Ummika needs you so much. I need you more. Where you will go. We will go there. How you will stay leaving us! Can you stay a single night without us! I can have bated that you can’t stay even few hours without us, if we could really love you. You are a very nice lady. I love you mony, I love you too much.

০৮/০৯/১৯৯৮-Why I not greedy for

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট,  অফিসারস মেস, বগুড়া 

Why I not greedy for anything around me? I basically do not find anything very precious to be so. But I always am greedy for one very precious piece i.e. Mitul. I never feel sorry for my marriage. What I did with Mitul (marrying without anybody’s consent) I will do the same thing everytime in every single life even none supports me anytime.

০৬/০৯/১৯৯৮-কি চেয়েছিলো তারা আমার কাছে?

অফিসারস মেস, বগুড়া

What they wanted?

Did they want to have a very beautiful girl for me! Or they wanted to do some business with their family! Or they wanted to have complete freedom to others as they have freedom to their own hens, cows or goats. Whenever they want to slaughter them, they can do it without the consent of the slaughterer, whereas the slaughterer must have the rights to know about his death.Did they want like this? Then why could not they accept her! She is absolutely a beautiful lady. So this can’t be the reason not to like her. She qualifies the beautiful they way they wanted. Again if they wanted to do some business with her, why should I do it even they wanted to do it! I am not at all greedy for anything given by anyone! So even they had a plan to do so, they could not do it fore me. These people again love me sometimes very deeply. So here also she is not at fault.

If these people thought the third option to have complete freedom, in that case they have done a great mistake. Because I will never allow anyone to supersede my presence. Neither I will curve her freedom. We want to make a dependent life to each other. Why not to share each other completely! So nothing could work.They did not become happy on our attitude, our behavior and our conduct. Everyone prayed for me, felt for me but none felt for her and afterward my daughter joins with her mother. No one wanted to take any interest and initiative on these two girls. Thereby whenever they used to get some kind of wrong clue where they can punish Mitul, they never used to loose it. They used to complain to me against her. I used to become very emotional and sometimes I used to abuse Mitul very wrongly. She never used to reply it back on the spot. She used to cry only seating beside me. This was the punishment they could achieve.

 Might be they wanted more punishment. But what kind of punishment they wanted? Did they want me to divorce Mitul? Oh God! This is the only thing that I can not do. I love her so much that I can sacrifice the whole world but her. She is the most precious thing to me in this world. Then Ummika. I will not forget ever Mitul. She will be in my heart, in my head, in my illusion always.

০৫/০৯/১৯৯৮-লনলীনেস

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট, ০০০০ রাত. অফিসারস মেস, বগুড়া 

I feel very lonely here. How many days a man can stay alone? -Can it be for whole life? -May be or may not be. But I feel sometimes that I do not like the accompany of people even Mitul! I feel to be remaining absolutely free at my own. In that time I think about death, about love and about the GOD. Is there anything called GOD at all? Sometimes I think I don’t believe in GOD. But in the next moment I afraid of GOD if HE is there what will happen then! Mitul believes in GOD fully. She is a perfect human being and best lady amongst everyone. GOD says and orders people to believe HIM even there is no prove in hand. Mitul believes it hundred percents. She is that kind of lady whatever she asks from GOD she gets it without much waiting. She is also accepted by the GOD HIMSELF.

She is very nice. That is one of the great reasons why I loved her at the first instant

০৩/০৯/১৯৯৮-আমি এই প্রোফেশনটাকে

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট, ০০৩৯ রাত.

অফিসারস মেস, বগুড়া 

I did not want to choose this profession! But nobody can be blamed for this reason that someone forced me to choose it as a profession. If I would have been so lucky to have the proper guardians like father, in that case I would have think otherwise. There were lots of people who were responsible by humanitarian ground or religion based relations. And it was all!

Why I not greedy for anything around me? I basically do not find anything very precious to be so. But I always am greedy for one very precious piece i.e. Mitul. I never feel sorry for my marriage. What I did with Mitul (marrying without anybody’s consent) I will do the same thing everytime in every single life even none supports me anytime.

২৬/০৮/১৯৯৮-আমি কেনো ওকে এতো ভালোবাসি?

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট। অফিসারস মেস, বগুড়া 

Why did I love her so much? Was she very beautiful or very extra ordinary? What was the exceptional quality she had by which she could attract man like even me!  I have seen more pretty looking girl than that of her, I have found girl like a millionaires. Nothing attracted me but herself.

 -Why?

She is not a daughter of a rich man! She neither was very much famous by any means. Even I loved her. Because I wanted a lady who is very smart looking but polite, I wanted someone who should wait for me even at the cost of her life the way I do. I wanted to have a nice hearted lady who will not have any hidden subject within herself. Mitul qualifies all the qualities. She is a very sweet looking girl, she is an extra ordinary mother, an outstanding lover of husband. She waits with full-hearted love and ocean of tear in eyes for me. She is the only place where I enjoy my full kingdom with full concentration. She loves me so much. I can not stay for a single moment without her. Staying together heart to heart.

Sometimes Mitul thinks I always do not trust her. But her this belief can never be corrected. I sometimes abuse her wrongly it is absolutely true. But never I remember about any incident. I never de-trust her. She is the perfect lady in my eyes. She never deprived me from my desire, my wrong behaviors. She used to absorb everything and never protested even she had all the reasons to do so. Instead she used to cry only. She used to cry more thinking that I am getting pain in my heart.  I can tolerate everything but I can not tolerate her tears. I again hug her and she hugs me more tightly. She cries and cries and I feel in my heart that her burning is going away. We trust each other very deeply.

Ummika is an asset for both of us. She is the centre nerve of our plan, happiness and dream. We sometimes feel very pensive in this regard. God is something very special. HE can do and undo anything we can guess. No one will understand what is a blessing getting a kid at his or her own unless someone becomes a parent. It is a matter of experience. No magazine, article or listening from someone will give the actual feeling of being a parent. It is something very special. We are the special group of people. Ummika will not also be able to understand this great affair with the parent. We did not understand. Those who understand, they are very lucky. They are very fortunate.  We want Ummika should be one of them who all are lucky. I always want my Ummika should be just like her mother. I have not seen another good lady like Mitul. Mitul is the perfect.

এই কথাটা আমার তো প্রায়ই মনে আসে, হয়ত অনেকেরই আসে, কেনো আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি? ওকি প্রিথিবীর সেরা সুন্দরী? তার কি এমন কিছু ব্যতিক্রম কোয়ালিটি ছিলো বা আছে যা অন্য কারো নাই? আমার এই ছোট্ট জীবনে তো অনেক মেয়েকে দেখেছি, ওর থেকেও আরো অনেক সুন্দুরী মেয়েকে আমি দেখেছি, দেখেছি পাহাড় সমান সম্পদের মালিকানা পরিবারের মেয়েদেরকেও। কিন্তু কই আমি তো ওইসব মেয়েদের প্রতি কখনো দুর্বল হই নাই? তাহলে আমি ওর ব্যাপারে এতো বেপরোয়া হয়ে ভালোবাস্লাম কেনো?

সে তো কোনোবড় লোকের মেয়েও নয় যে, আমি তার বাবার সম্পত্তির লোভে তাকে ভালোবেসেছি। না ও নিজে খুব বিখ্যাত কেউ। তারপরেও আমি ওকে অনেক ভালোবেসেছি। এর প্রথম কারন হতে পারে যে, আমি একজন দায়িত্তশীল মেয়েকে খুজছিলাম। আমি এমন কাউকে খুজছিলাম যার উপর আমি নির্ভর করতে পারি এবং যে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারে। হয়ত মিতুল এই সব কিছুই কোয়ালিফাই করে।

(অসমাপ্ত……)

১৮/০৪/১৯৯৮-মিতুলকে

MY SWEETEST:

When I was coming back to Bogra after enjoying my last casual leave, I was thinking so many things standing on the platform of the ferry! And most interesting was that I was dreaming about a new baby and you. Every time I was thinking about my family (I always mean my family is yourself, Ummika, myself and mother) I always found your role was extremely significant. Nobody will understand how much sacrifice we made out of our determination and tenacity. All were possible because of you. I always care your demand. You really sacrificed lots of things for me, for us specially. No one can say that someone did something for us. That’s why our understanding became stronger, more meaningful and love becomes the every day’s power of inspiration and power of next day’s power.  How many people can boast about their personal life! How many people and couple can strongly declare that both of them (husband and wife) are equally happy in their conjugal life! Even someone tells, a very few percentage may be correct and maximum will be wrong in saying so. But I declare with challenge that we both of us are equally happy and equally satisfied in our life. It is not an only dialogue but the fact of our two men-life.  I have been told by lots of people that I look and act like a completely happy man, as I do not have any tension and anxiousness. This happened only because I am really a happy man because of you. 30th may, the most finest and glorious day for both of us. I will be always worshipping this day to almighty God. This is the day for which every body can not just take pride. Only few people like us can tell the story of old days to their grandsons and granddaughters. Don’t you think that this is a history!  There are someone who have tremendous set back on this date because they did not want it to be happened. This is one of the reasons why people does not want to come to attend our ceremony even you give them the invitation. But in the same time I enjoy their this pain too. Wish you all the best and my best regards to you. My love and affection will be with you always and always. Have good life and good mind. May Allah make you a very honored lady to everyone in respect to all aspects.

ঢাকা থেকে ছুটি কাটিয়ে বগুরা ফেরার পথে ফেরিতে উঠার প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়েওনেক কিছু ভাবছিলাম। এবং সবচেয়েমজার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমি এইবার প্রথম আমার নতুন বাচ্চার কথা ভাবছিলাম এবং সাথে মিটুলের কথা। প্রতিটি মুহূর্তে মি আমার পরিবারের কথাই (আমার পরিবার বলতে আমি মিতুল, উম্মিকা, আমারমা আর আমাকেই মিন করি) ভাবছিলাম। যখনি আমি আমার পরিবারের প্রতি কারকারকি কন্ট্রিবুসন আছে সেটা ভাবি, তখন যা দেখি তা হচ্ছে, তোমার কন্ট্রিবুইসন সবচেয়ে বেশি বলেই আমি মনে করি। কেউ কখনো বুঝতেপারবে না আমরা কোথা থেকে কিভাবে কি ত্যাগ করছি আমাদের ভালোর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য। অনেক কিছু যা এই মুহূর্তে কঠিন, তা সম্ভভচ্ছেতোমার ত্যাগের কারনে, তোমার অধ্যাবসায়ের কারনে। এটা আম্র ধারনা।

আমি তোমার প্রয়োজনীয় আশা আখাংকার প্রতি খেয়াল রাখার চেষ্টা করি, চেষ্টা করিতোমার সব চাহিদা পুরন করার।  আমাদের জন্য কেউ কিছুই করে নাই। আমি চাইও না কেউ আমাদের জন্য কিছু করে আমাদেরকে বাধিত করুক। আমরা যা করছি, তা আমরাই করছি। আমরা যুগল চেস্টায় করছি। আর এই কারনেই আমি মনে করি আমাদের মধ্যে আন্দারস্ট্যান্ডিং ধীরে ধীরে আরো জোরালো হচ্ছে এবং আমরা আরো একিভুত পরিবার হচ্ছি। আমি তোমাকে নিয়ে যেমন খুশি, তেমনি আমি সুখিও বটে। কত জন কাপল আমার মতো বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তারা সুখি এবং একে অপরের জন্য খুসি? আমি তো বলতে পারছি।

এই সব কিছুর জন্ম হয়েছিল ৩০ মে এর কারনে। এই৩০ মে তারিখটি আমার জীবনে একটা বিশাল স্মরণীয় দিন এবং এই দিন টিকে আমি পুজা করার মতো ভালোবাসি। এই ৩০ তারিখটি তোমাকে নিয়েয়ামার সাথে যে সম্পর্ক টা হয়েছিলো সেতা করতে না দিতে অনেকেই চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এটাও আমরা সার্থক করে আমাদের মধ্যে আনতে পেরেছি। এটা আমদের ইতিহাস। এটা আমার আর তোমার ইতিহাস। আমাদের এই ইতিহাস আমাদের পরবর্তী বংশধরেরা কত টুকু বুঝবে বা বুঝতে পারবে সেতা আমি জানি না কিন্তু তাদের ইতিহাস এই ৩০ মে এর কারনেই হয়েছে সেটা তারা বুঝলেই হল।

২৯/১১/১৯৯৭-ষ্টাফ কলেজ থেকে ভারত ভ্রমন

গত ২৩/১১/১৯৯৭ থেকে ছয় দিনের শিক্ষা সফরে মীরপুর ষ্টাফ কলেজ থেকে দেশী-বিদেশী ছাত্রদের নিয়ে আমরা পাশের দেশ ভারতে গিয়েছিলাম। আমাদের ষ্টাফ কলেজের ব্যাচে প্রায় শতাধিক ছাত্র বিধায় ছাত্রদেরকে তিনটি গ্রুপ করে ভাগ করা হয়েছে। কেউ কেউ ভারত, কেউ কেউ শ্রীলংকা আবার কেউ কেউ নেপাল। এটাই ষ্টাফ কলেজ থেকে প্রথম শিক্ষা সফর দেশের বাইরে। আর এটা এ বছরই চালু হলো। আমি ভারতে যাওয়ার চয়েজ দিয়েছিলাম। সে মোতাবেক গত ২৩ নভেম্বরে আমরা প্রায় ৩৭ জন স্টুডেন্ট ভারতের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করলাম।

আমাদের সাথে আছেন ডিএস (ডাইরেক্টিং ষ্টাফ) লেঃ কর্নেল শফিক, লেঃ কর্নেল তানভীর, চীফ ইন্সট্রাকটর কর্নেল জহির, চীফ ইন্সট্রাকটর মইন ইউ আহমেদ এবং আরো কিছু। আমাদের শিক্ষা সফরটা একটা ডিপ্লোমেটিক ভিজিট হিসাবে গন্য ছিলো। আগে থেকে আমাদের বেশ কিছু অফিশিয়াল ভিজিট কনফার্ম করা ছিলো।

আমরা সকাল বেলায় যার যার ব্যাগ পেটরা নিয়ে জিয়া ইন্টার ন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। ষ্টাফ কলেজ থেকে বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। ভারতে এটাই আমার প্রথম ভ্রমন।

ভারতে গন্ডোগোল চলছে। বেশ ভালই গন্ডোগোল। কিন্তু তাতে আমরা শংকিত নই। আমাদেরকে প্রোটেকশন দেয়া ভারত সরকারের দায়িত্ত। আমরা কলকাতার গ্রান্ড হোটেল “হোটেল ইন” এ সবাই উঠেছি। কলকাতার পরিবেশ মূটামূটি ভালো। শান্ত। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, কলকাতা আর আমাদের ঢাকার গুলিস্থানের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নাই। সব জায়গায় বাংলা কথা বলার লোক। খায়ও বাংগালীদের মতো ডাল ভাত। তবে এখানে ঢোশাটা বেশ জনপ্রিয়। আমাদের হোটেলের পাশেই একটা সিনেমা হল আছে। ওখানে “দিল তো পাগল হ্যা” ছবিটি মাত্র রিলিজ হয়েছে। ৮ম লং কোর্ষের মেজর মোর্শেদ স্যার আমাদের স্টুডেন্ট কোঅর্ডিনেটরের কাজ করছেন। তাকে সাহাজ্য করছেন ৯ম লং কোর্ষের মেজর হক স্যার। কঠিন লোক বটে।

সন্ধ্যা হতে না হতেই ডাক পড়লো যে, রাত আটটায় আমরা ইন্ডিয়ার ডিফেন্স এটাচির আমন্ত্রনে তার অফিশিয়াল বাসভবনে যেতে হবে। ড্রেস হবে সিরিমনিয়াল। মানে এসডি (সার্ভিস ড্রেস)। তড়িঘড়ি করে রেডি হতে হলো। বেশী দূর নয়, মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। পড়ে বুঝলাম, আসলে এটা ডিফেন্স এটাচির বাসা নয়, এটা এয়ারফোর্সের একটা মেস।

পৃথিবীর সকল আর্মির আস্তানাগুলি প্রায় একই ড্রিল অনুসরন করে। মেস ওয়েটারগন আমাদের দেশের মেস ওয়েটারদের মতোই ড্রেস আপ করা, মেসগুলিও প্রায় একই প্যাটার্নের, কালচার বা প্রাকটিসও তাই। ইন্ডিয়ার বেশ কিছু হাই অফিশিয়াল আমাদের উদ্ধ্যশ্যে কিছু কথা বললেন বটে কিন্তু কি বললেন, ভালো মতো বুঝাও গেলো না। আমরা অনেকেই যার যার গল্পে মশগুল ছিলাম। এরমধ্যে ধীরে ধীরে খাবার আসতে লাগলো, সফট ড্রিংক্স, হট ড্রিংক্স, সবই ছিলো। যে যার মতো যা খুশি খেতে পারেন। কোনো বাধা নাই।

এর মধ্যে একজন মেস ওয়েটারের সাথে কথা হলো, নাম, জামিলুর। তার বাড়ি বাংলাদেশের চাপাইনবাবগঞ্জে। সে নাকি আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে তার বাবার সাথে ইন্ডিয়ায় চলে এসেছিলো, আর বাংলাদেশে যায় নাই। এখন সে এয়ারফোর্স মেসে মেস ওয়েটারের কাজ করে। বাংলাদেশী কিছু অফিসার বেড়াতে এসেছে এখানে, তাতেই তার অনেক আনন্দ। যেনো বাড়ির মেহমান এসেছে বহুদিন পর।

রাতে ডিনার শেষ হলো। অনেক অফিসাররা ফ্রিতে বিয়ার আর মদ পেয়ে নাক ডুবিয়ে যেনো খেয়েই যাচ্ছিলো। রাত প্রায় সারে দশটায় আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হলো। ফিরে এলাম হোটেলে। আমি, মেজর আকবর, মেজর আফতাব আর নাইজেরিয়ার মেজর লালা একরুমে থাকি। হটাত দেখি, কিছু অফিসার এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপারটা কি? পড়ে শুনলাম, কিছু অফিসাররা পাশের সিনেমা হলে ‘দিল তো পাগল হায়” দেখার জন্যে যাচ্ছেন। এতো রাতে আবার সিনেমা? যাক, অসুবিধা নাই। আমি আর গেলাম না।

তার কিছুক্ষন পর আবার একটা কেওয়াস শুনলাম। অফিসাররা সিনেমা হলে গিয়ে গেঞ্জাম করেছেন। কারন ইতিমধ্যে হলে সিনেমা শুরু হয়ে গিয়েছিলো, আবার কোনো সিটও খালি ছিলো না। তারা অনেকটা মাতাল অবস্থাতেই সিনেমা হলের ম্যানেজারকে জোর জবরদস্তি করে হলে ঢোকে সিনেমা দেখবেনই এই রকমের নাকি একটা আচরন করেছেন, যা অফিশিয়াল অভিযোগ হিসাবে ইতিমধ্যে দাখিল হওয়াতে বাংলাদেশের একজন দুতাবাসের কর্মকর্তা (নাম মেজর ফজলে আকবর) মধ্যস্ততা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে দিয়েছেন। খুব দুক্ষজনক ব্যাপারটা। নতুন আদেশ জারী হলো যে, কোর্স ডিএস এর অনুমতি ছাড়া কেউ অযথা বাইরে যেতে পারবেন না। কিন্তু কেউ কি কারো কথা শুনে?

পরেরদিন আমাদের ভিজিট ছিলো ফোর্ট উইউলিয়াম দুর্গে। সকাল ১১ টায় সেখানে যেতে হবে। আমরা তার আগেই সেখানে পৌঁছে গেলাম। আগে অনেক নাম শুনেছি। কিন্তু এবার দেখলাম দূর্গ কি জিনিষ। চারিপাশ প্রায় ২০/২৫ ফুট উচু দেয়াল ঘেরা এবং দেয়ালের প্রশস্থতা প্রায় ৩০/৪০ ফুট। যার দ্বারা প্রচুর গাড়ি ঘোড়া চলে। ভিতরে দালান কোঠা সেই ব্রিটিশ আমলের। একেকটা বিল্ডিং এর উচ্চতা প্রায় ২০ ফুটের মতো। ফ্যানগুলি অনেক লম্বা লম্বা ডান্ডা দিয়ে ঝুলানো। প্রচুর গাছপালা।

কমান্ডার ইন চীফ এলেন প্রায়  একটার দিকে। নিজে আর তার এডিসি। কোনো ড্রাইভার দেখলাম না। তার নিজের গাড়িতেই স্টার আছে, সাথে আছে এম্বুলেন্সের মতো হর্ন। এডিসি গাড়ি ড্রাইভ করে এলেন, আর সেকেন্ড সিটার হলেন কমান্ডার। শীখ মানুষ। বেশ ফর্সা। অদ্ভুদ লাগলো ব্যাপারটা। আমাদের দেশে হলে গাড়ির বহরে আর এমপির গাড়ির ঠেলায় ভীর লেগে যেতো, কিন্তু এতো বড় অফিসার এলেন তাও আবার মাত্র এডিসি আর তিনি নিজে। ড্রাইভার ও নাই।

ঘুরে ঘুরে বিল্ডিংগুলি আর আশপাশ দেখছিলাম। অফিসারদের থাকার জায়গাগুলিও বেশ অদ্ভুদ। এখানে যিনি ইনচার্জ, তার কোনো এসি রুম নাই। তবে গরমের দিনে যেনো পরিবেশ ঠান্ডা থাকে তার জন্য এক ধরনের পানির পাইপের মাধ্যমে সারাক্ষন পানির সঞ্চালন করে থাকে, তাতে বাতাস ঠান্ডা থাকে। আর আমাদের দেশ হলে তো এসির কারনেই পরিবেশ গরম হয়ে যেতো যদিও কমান্ডার নিজে ঠান্দায় থাকতেন। ইন্ডিয়া কেনো বড় হবে না? তাদের প্রতিটি কাজের মধ্যে ইকোনোমিক্যাল একটা বাজেট থাকে। এই যেমন কমান্ডার যখন এলেন, তিনি ইন্ডিয়ায় তৈরী মার্সিডিস গাড়িই নিয়ে এলেন। সেটা আবার এসি করা নয়। আর আমাদের দেশে তো জাপানিজ এসি গাড়ি না হলেই তার মান সম্মান থাকে না।

৩য় দিনে আমাদের যাওয়ার কথা দিল্লী। কিন্তু ভারত জুড়ে এতো গন্দগোল যে, আমরা যাবো কিভাবে সেটাই এখন বড় ধরনের প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। বিজেপি, এক ধরনের বক্তব্য, কংগ্রেস আরেক ধরনের পালটাপাল্টি বক্তব্য এবং রামাবাই কিলিং নিয়ে অনেক বিতর্কিত আলোচনা টিভি জুড়ে চলছেই। আমাদের যাওয়ার কথা ছিল এয়ারপোর্ট হয়ে দিল্লিতে কিন্তু একেক বার একেক সংবাদ আসায় আমাদের মুড অফ জার্নি নিয়ে একটা অচলবস্থা তৈরী হলো।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো যে, আমরা বাসে করে কলকাতা থেকে দিল্লী যাবো। প্রায় ২২ ঘন্তার জার্নি।

কলকাতা থেকে আমরা বাসে করে দিল্লী রওয়ানা হলাম। রাস্তা বেশ ভালো কিন্তু বেশ ফাকাও। আমাদের প্রোটেকসনের জন্য ইন্ডিয়ান আর্মির স্কট ছিলো, আর ছিলো হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশ পথে টহলের ব্যবস্থা। প্রায় সন্ধ্যার দিকে দিল্লীতে পৌঁছলাম। হোটেল “সেরেনা” তে আমাদের থাকার জায়গা।

দিল্লীর শহর আসলেই আধুনিক একটা শহর। লাইফ যথেষ্ট পরিমান ফাষ্ট। দিল্লীতে ডিফেন্স মিনিশট্রি থেকে আমাদের জন্য একটা ভিজিট রেখেছেন। তাদের ডিফেন্স মিনিশট্রারের প্রতিনিধি আমাদের ব্রিফ করবেন। আমাদেরকে ডেকে আমাদের ডিএস জানালেন, আমরা যেনো কোন সেনসেটিভ প্রশ্ন না করি। এখানে আমরা ডিপ্লোমেটিক আলোচনায় আসিনি, তাই এমন কোনো প্রশ্ন যেনো আমরা না করি যাতে পরিবেশ অন্যদিকে টার্ন নেয়। কিন্তু কাজের বেলায় ঠিক সে রকম হয় নাই। মেজর হক স্যার এমন এক প্রশ্ন করে বসলেন, যা কিনা বেশ ভালই বিতর্কের জোগান দেয়। সেটা আর এখানে নাইবা বললাম। পড়ে এক সময় আবার বলা যাবে।

আমরা দিল্লী ঘুরে বেড়ালাম। “ভাই” টেমপলে গেলাম। জায়গাটা বেশ সুন্দর। “ভাই টেমপল”টা হচ্ছে তিন ধর্মের জন্য একটা কমন প্রার্থনার স্থান। অদ্ভুত কন্সেপ্ট। এটা নাকি সম্রাট আকবরের সময় করা। ইন্ডিয়া গেট দেখলাম। এই জায়গায় ইন্ডিয়ার সব রাজনৈতিক নেতাদের বসবাস।

দিল্লী থেকে আমরা পরের দুপুরে আগ্রায় গেলাম। আগ্রায় “আকবরিয়া” হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা যখন বাস থেকে নামলাম, তখন একদল বাদ্যবাদক ড্রাম, পাইপার বাজিয়ে আমাদেরকে অভিবাধন জানালেন। দেখলাম, হোটেলের ঠিক সামনেই বিশাল করে ফুল আর ফুলের পাপড়ি দিয়ে ওয়েলকাম বাংলাদেশ লেখা। ভালো লাগলো। আমাদের বাক্সপেটরা নিয়ে গেলেন হোটেলের কর্মচারীরা। আসলে এটা ছিলো সম্রাট আকবরের নিজস্ব প্যালেস। এই প্রথম আমার জিবনে কোনো প্যালেসে রাত্রিজাপন করবো।

সম্রাট আকবরের প্যালেসটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বিশাল বিশাল রুম। খুবই সুন্দর। আমাদের আসার কারনে এখানে কোন গেষ্ট এলাউ করেনি সরকার। মানে শুধু আমরাই থাকবো এখানে দুই দিন আর এক রাত। আমরা জমায়েত হলাম সম্রাট আকবরের খাস কামরা সেটা ছিলো সেখানে। গিয়ে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। ওখানে যে ঝাড় বাতিটা আছে সেটার সাইজ প্রায় ডাবল রুমেরও বড়। আর এটার যে ডান্ডাটা সেটা একটা বিশাল পিলারের সমান। এই খাস কামরার যাওয়ার পর যেটা দেখালাম, এর পাশ দিয়ে একটা বেশ চওড়া রাস্তা গেছে, যার হাইট একটা লম্বা মানুষের সমান উচ্চতা। জিজ্ঞেস করলাম, এই রাস্তাটা কেনো যেখানে আরো রাস্তা বা প্রবেশ দ্বার আছে? আমাদের যে গাইড ছিলেন, তিনি বললেন যে, সম্রাট যখন হেরেমে বসতেন, তখন কোনো কারনে যদি তার রানী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয় তাহলে এই হেরেম খানায় কি ঘটছে সেটা যেনো তার নজরে না আসে, সেই জন্য শুধুমাত্র রানির ব্যবহারের জন্য এই উচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা রাস্তাটা তৈরী। বুঝলাম, এমনি এম্নিতেই তো আর আকবর সাহেব সম্রাট হন নাই।

রাতেই আগ্রার অনেক জায়গা ঘুরলাম। কিন্তু বেশী রাত হয়ে যাচ্ছে বলে বেশী দূর যাওয়া হচ্ছিলো না। রাতেই আবার আকবরিয়ায় ফিরে এলাম। আগামীকাল গাইড আমাদেরকে তাজমহল এবং আগ্রার আরো কিছু জায়গা আমাদের দেখাবেন। সকালেই আমাদের ভিজিট শুরু হবে। প্রথমে তাজমহল দিয়ে।

২৬/১১/১৯৯৭-কুতুব মিনার ভিজিট

দিল্লিতে থাকাকালে আমাদের সাথে থাকা গাইড কুতুব মিনার নিয়ে গিয়েছিলেন। লাল বেলে পাথরে তৈরী এই মিনারটি ভারতের প্রথম মুসলমান শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেকের আদেশে কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে, তবে মিনারের উপরের তলাগুলোর কাজ সম্পূর্ণ করেন ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। প্রখ্যাত সুফি কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। কুতুব মিনার দেখার সময় আমাদের পাশেই একদল ছাত্রদের নিয়ে কিছু ভারতীয় টিচার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কুতুব মিনারের ইতিহাস বুঝাচ্ছিলেন। আমরাও তার কিছু কিছু তথ্য বিভ্রাটে ছিলাম। আমার মনে হলো যে, ঐ টিচাএ এই ভারতীয় ছাত্রদেরকে কুতুব মিনারের আসল সত্যটা না বলে এমন কিছু মন গড়া তথ্য দিচ্ছিলেন, যা কিনা কুতুব মিনারের নামে নেগেটিভ ভাব প্রকাশ পায়। আমরা কিছু বলি নাই কারন ইতিহাস তার নিজের ধারায় উম্মোচিত হয়। তবে কুতুব মিনারের ভঙ্গুর দশা দেখে আমার কাছে মনে হলো, এক সময় এই কুতুব মিনারটির আর কোনো অস্থিত্ত হয়তো থাকবে না।

২৬/১১/১৯৯৭-সম্রাট আকবর প্যালেস।

সম্রাট আকবরের প্যালেসে আমরা যখন পৌছাই তখন বেলা প্রায় ১২টা বাজে। এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমরা যেখানে যেখানে ভিজিটে যাচ্ছি, সেখানে সেখানেই সেদিন অন্য কনো আউট সাইডার ভিজিটর এলাউ ছিল না। ফলে আমরাই গাইডের সাহাজ্যে খুব নিরিবিলিতে পুরু জিনিষগুলি দেখার সুযোগ পাচ্ছিলাম, কোনো কোলাহল ছিলো না, কোনো ভীড়ও ছিলো না।

যাই হোক, সম্রাট আকবরের প্যালেসে  এসে দেখলাম এখানে বেশ কিছু অটোমেটিক নিরাপদ বলয়ের ব্যবস্থা সম্রাট গন আগে থেকেই করে রেখেছেন। যেমন-

(১) আগেকার দিনে সব সম্রাটগনই তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের জন্য, প্রতিটি মেইন গেট এমনভাবে তৈয়ার করেছেন যে, কোনো অতর্কিত হামলায় যেনো বেশ কিছু সময় পাওয়া যায়, এই ব্যবস্থা গুলি করা। আগেকার দিনে হাতী ছিলো শক্তির একটা প্রতিক। যখন কোনো বহির্গমন শত্রু হামলা করতে আসতো, তারা হাতীর ব্যবহার বেশী করতেন। তার সাথে করতেন ঘোড়ার ব্যবহার। হাতী এবং ঘোড়া যখন তার সমস্ত শরীর দিয়ে কোনো একটা বাধা ধাক্কা দিতে চায়, সেক্ষেত্রে তাকে একটা গতির মোমেন্টাম তৈরী করতে হয়। সম্রাটগন এই অংকটা জানতেন। তাই তাদের বাসস্থান এমন একটা উচু জায়গায় করতেন যার উচ্চতা স্বাভাবিক উচ্চতার থেকে প্রায় ১০০ /১৫০ ফুট উপরে। আর এই ১০০/১৫০ ফুট উপরে উঠতে কয়েক ধাপে ঢালুর ব্যবস্থা থাকতো। এই ঢালুগুলি এই রকম করে ঝিকজ্যাক করে তৈরী করা যাতে বাক থাকে, আর প্রতিটি বাক একেবারে ৯০ ডিগ্রী বাকানো। যাতে হাতি বা ঘোড়া কিছুদুর গিয়ে তাকে পুরুপুরি ৯০ ডিগ্রী ঘুরতে হয় এবং সে আবার শুন্য গতিতে চলে আসে। তাতে হাতী বা ঘোড়ার শক্তিও শুন্য হয়ে যায়। ফলে সম্রাট শাহজাহানের প্যালেসে ঢোক্তেও ঠিক এই রকমের কিছু প্রতিবন্ধকতা দিয়েই প্রবেশ পথ সুরক্ষিত। এইরকম প্রায় ৫ থেকে ৬টা বাক আছে, আর প্রবেশ পথগুলি একেবারেই মসৃণ নয়। হাতী বা ঘোরা এই অমসৃণ পথে চলতে তাদের পায়ে ব্যথা অনুভব করতো, ফলে পায়ে ব্যাথা পাবাএ কারনেও হাতী বা ঘোড়া সঠিক গতিতে আসতে পারতো না। এবড়ো থেবড়ো কংক্রিটের রাস্তা। আমরাই স্বাভাবিক জুতা নিয়ে ঐ রাস্তায় হাটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। প্রতিটা রাস্তার দুই ধারে আবার ছোট ছোট পটহোল আহে, যেখানে সেন্ট্রিরা রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো যাতে কোনো শত্রু ঢোকতে গেলে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে মারা যায়।

(২) আমরা উঠে গেলাম সম্রাটের বাসভবনে। উঠেই দেখি, আরেক জগত। বিশাল চত্তর, চারিদিকে গাছগাছালীতে ভরা। একটা মালভূমির মতো। ঠিক মাঝখানে একটা পিতলের বিশাল বড় কলসি। এই কলসীটা এতো বড় যে, অনায়াসে ১০ বারো জন মানুষ এর মধ্যে খেলা করতে পারে। গাইড জানালো যে, শীতের দিনে সম্রাট এই কলসীতে পানি ভরে রাখতেন, সুর্যের তাপে এই পানি গরম হতো, আর রানী তার সহচরীদেরকে নিয়ে এই গরম পানিতে জলকেলি করতেন আর স্নান করতেন। রানী বলে কথা। তখন আমরা প্রশ্ন করলাম, তাহলে গরমের দিনে রানী কিভাবে ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন? গাইড জানালো, আমরা ওইটাও দেখবো কিভাবে সম্রাট রানীর জন্য ঠাণ্ডা জলের ব্যবস্থা করেছিলেন। রানী যেখানে স্নান করতেন, সেখানে কোনো সরাসরি প্রহরী নিয়োগ থাকতো না যাতে তারা দেখতে পায় রানীর গোসল বা জলকেলী। কিন্তু এলাকাটা এমনভাবে ঘেরাও করা যে, বাইরের থেকে কোনো বিপদের সম্ভাবনা নাই। সেভাবেই আউটার চত্তরে গার্ড নিয়োগ করা আছে। যাও আবার গার্ড, তারা আবার নপুংসক সব গার্ড। যাতে কেউ যদি শারীরিকভাবে উত্তেজিত হয়েও যায়, তাতে কোনো সক্ষম পুরুষ রানী কিংবা রানীরে দলবলের কোন ক্ষতির আশংকা না থাকে। শুধু এটাই শেষ নয়। কোনো কারনে যদি বৃষ্টি হয়, ঝড়ো পরিবেশ থাকে অথচ রানী গরম জলেই নিরাপদে অন্যত্র স্নান করতে পারেন, তারও ব্যবস্থা সম্রাট করে রেখেছিলেন। আরেকটি কামরা আছে যেখানে সূর্যের আলোক রশ্মি এমনভাবে ঐ রুমে পতিত হয় যেনো ঐ বড় কলসীতে রাখা পানি ঘরের ভিতরেই ধীরে ধীরে গরম হতে থাকে। সেখানে থাকতো মহিলা নিরাপত্তার বেষ্টনী। আর নিরাপদ দুরুত্তে নপুংসক কিছু রাইফেলধারী প্রহরী।

(৩) এবার গেলাম আমরা আরেকটি কামরায় যেখানে রানী তার সহচরীদের নিয়ে ঠান্ডা জলে গরমের দিনে স্নান করতেন। পাশেই গঙ্গা নদী। ঐ নদী থেকে পানির পাইপ দিয়ে সারাক্ষন ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ থাকতো যাতে কামড়াটা সারাক্ষন জলীয় বাস্পের মাধ্যমে ঠাণ্ডা থাকে। আর এই ঠান্ডা পরিবেশে কলসীতে রাখা পানিও বেশ ঠাণ্ডা থাকে। রানী গরমের দিনে এই শীতল পানিতে স্নান করেন।

পুরু জায়গাটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, আর ভাবলাম, কোনো এক সময় এই সম্রাটদের পদচারনা এ সব স্থানে পড়েছে। তারা পুরু ভারতবর্ষ এসব প্রাসাদ থেকে পরিচালনা করতেন। এখানে সবার প্রবেশের কোনো অনুমতিও ছিলো না। অথচ আজ এতো বছর পর যে কেঊ ১০০ টাকার টিকেট কেটেই যখন তখন ঢোকে যেতে পারে। রাজা নাই, সম্রাট নাই, কোনো প্রহরী নাই, আছে তাদের সমস্ত স্মৃতি আর ইতিহাস। এখান থেকে তাজমহলের চুড়াগুলি দেখা যায়। গাইড বললেন যে, সম্রাট শাহজাহানের পরিকল্পনা ছিলো এই গংগার পাড়ে শাহজাহান মহল তৈরী করার। কিন্তু তার সে পরিকল্পনা বাস্তবরূপ নেবার আগেই তিনি তার ছেলের হাতে বন্দি হন এবং বন্দি অবস্থাতেই মারা যান। সম্রাট শাহজাহানের দেহ সমাধী করা হয় তাজমহলে নূরজাহানের কবরের পাশে। আর এই কবরটাই হচ্ছে একমাত্র আইটেম যা ব্যতিক্রম। আর এর ফলে তাজমহলের সেমিট্রিক্যাল চরিত্রকে আর সেমিট্রিক্যাল রাখে নাই। অর্থাৎ তাজমহলকে যেখান দিয়েই দুইভাগ করা হোক না কেনো, শাহজাহানের সমাধির কারনে এটা দুই ভাগের যে কোনো এক ভাগে থেকে যায় সম্রাটের দেহ, সব কিছুই আর সমান সমান থাকে না।

যখন ফিরে আসছিলাম, অনেক ভাবনা মনে আসছিলো। মনে হচ্ছিলো যেনো, এই মাত্র নবাবের সাথে আমরা দেখা করেই এলাম। কেনো মনে হচ্ছিলো এ রকম?

২৬/১১/১৯৯৭-তাজমহল ভিজিট

আমরা পরদিন (২৬ নভেম্বর)  সকালে তাজমহলের উদ্দেশ্যে সবাই এক সাথে রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমাদের সাথে কোনো এক ইউনিভার্সিটির টিচার গাইড হিসাবে ছিলেন যিনি খুব ভালো ইতিহাস জানেন এবং ভাল ইংরেজি বলতে পারেন। তিনি একে একে তাজমহলের প্রবেশ দ্বার থেকে সব কিছু বলতে থাকলেন কেনো এটা প্রিথিবিতে ৭ম আসচর্জের মধ্যে একটা স্থান পেয়েছিলো। আমরাও এর অনেক কারন জানতাম না। আমি এখানে কিছু কিছু ব্যাখ্যা তুলে ধরি তিনি আমাদেরকে কি কি বলেছিলেন।

প্রথমেই তিনি তাজমহল সৃষ্টির কারন গুলি উল্লেখ করলেন। মমতাজের আসল নাম ছিলো আরজুমান্দ বানু বেগম। মহলটির কাজ শুরু হয়েছিলো ১৬৩২ সালে আর শেষ হয়েছিলো ১৬৫৩ সালে। প্রায় ২১ বছর। শিল্পনৈপুণ্যসম্পন্ন একদল নকশাকারক ও কারিগর সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন যারা উস্তাদ আহমেদ লাহুরির সাথে ছিলেন, যিনি তাজমহলের মূল নকশাকারক হওয়ার প্রার্থীতায় এগিয়ে আছেন। তাজমহলকে (কখনও শুধু তাজ নামে ডাকা হয়) মুঘল স্থাপত্যশৈলীর একটি আকর্ষণীয় নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়, যার নির্মাণশৈলীতে পারস্য, তুরস্ক, ভারতীয় এবং ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। যদিও সাদা মার্বেলের গোম্বুজাকৃতি রাজকীয় সমাধীটিই বেশি সমাদৃত, তাজমহল আসলে সামগ্রিকভাবে একটি জটিল অখণ্ড স্থাপত্য।

এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল। মমতাজ ছিলো সম্রাট শাহ জাহানের ২য় স্ত্রী।

তাজমহলের সামনের চত্বরে একটি বড় চারবাগ (মুঘল বাগান পূর্বে চার অংশে বিভক্ত থাকত) করা হয়েছিল। ৩০০ মিটার X ৩০০ মিটার জায়গার বাগানের প্রতি চতুর্থাংশ উঁচু পথ ব্যবহার করে ভাগগুলোকে ১৬টি ফুলের বাগানে ভাগ করা হয়। মাজার অংশ এবং দরজার মাঝামাঝি অংশে এবং বাগানের মধ্যখানে একটি উঁচু মার্বেল পাথরের পানির চৌবাচ্চা বসানো আছে এবং উত্তর-দক্ষিণে একটি সরলরৈখিক চৌবাচ্চা আছে যাতে তাজমহলের প্রতিফলন দেখা যায়। এছাড়া বাগানে আরও বেশ কিছু বৃক্ষশোভিত রাস্তা এবং ঝরনা আছে। চারবাগ মানেই যাতে স্বর্গের বাগানের প্রতিফলন ঘটবে।

তাজমহলের চত্বরটি বেলে পাথরের দুর্গের মতো দেয়াল দিয়ে তিন দিক থেকে বেষ্টিত। নদীর দিকের পাশটিতে কোনো দেয়াল নেই। এই দেয়ালবেষ্টনির বাইরে আরও সমাধি রয়েছে যার মধ্যে শাহজাহানের অন্য স্ত্রীদের সমাধি এবং মুমতাজের প্রিয় পরিচারিকাদের একটি বড়ো সমাধি রয়েছে। 

(১) তাজমহলে ডোকতে মোট চারটা গেট আছে, প্রতিটি গেট থেকে মেইন তাজমহল একই রকম দেখা যায়। একই রাস্তা, একই গাছ, গাছের সংখ্যাও সমান। প্রশস্ত, এবং দুরত্ত সমান। সব গাছ একই গাছ।

(2) যে গাছ গুলি তাজমহলের প্রবেশ পথ থেকে মেইন বিল্ডিং পর্যন্ত লাগানো আছে, সেই গাছগুলি এমন একটা উচ্চতা পর্যন্ত বড় হবে যা রানীর জন্য সুবিধাজনক। গাছগুলিতে ফুল ফুটলে যেনো রানীর মাথা নুয়ে ফুল তুলতে না হয়, সখীদের নিয়ে হাটতে হাটতে ফুল তুলতে পারেন, ঠিক সেই পরিমান বড় হয়ে গাছ গুলি আর বড় হবে না। কি অদ্ভুদ।

(৩) তাজমহলের প্রবেশ পথে দাডিয়ে মেইন বিল্ডিং এ তাকালে চোখে পড়বে “লা ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”। এই লেখাটা যদি কাছে গিয়া দেখা যায়, দেখা যাবে যে, প্রতিটি অক্ষর কিন্তু সমান নয়। কিন্তু তাজমহলের প্রবেশ পথে দাড়াইয়া দেখলে প্রতিটি অক্ষর সমান মনে হবে। আর এটা সূর্যের আলোর প্রতিসরনাংকের ফর্মুলা কাজে লাগিয়ে করা হয়েছে। এটা খুবই সুক্ষ একটা গনিতের ফর্মুলা। এটা এই তাজমহলে এপ্লাই করা হয়েছে।

(৪) তাজমহলের যেখান দিয়াই কেউ ডোকুক না কেনো, তাকে যদি দুই ভাগ করা হয়, তাহলে প্রতিভাগে সমান সংখ্যক গাছ, সমান সংখ্যক রাস্তা, সমান সংখ্যক বিল্ডিং, সমান সব কিছু হবে। তাই একে বলা হয় সিমেট্রিক্যাল কন্সট্রাকশন বা স্ট্রাকচার।

(৫) তাজমহলে একপাশে একটা মসজিদ আছে। তাজমহলের এই সিমেট্রিক্যাল হবার জন্য পাশাপাশি দুটো মসজিদ বানানোর নিয়ম নাই বলে, একপাশে একটা মসজিদ আর আরেকপাশে মসজিদের ন্যায় একটা জাওয়াব বানানো হয়েছে। বাহ্যিকভাবে দেখে বুঝার উপায় নাই, কোনতা মসজিদ আর কোনটা জাওয়াব । জাওয়াব আলাদা শুধু এর মেহরাম নেই আর এর মেঝে নকশা করা যেখানে মসজিদের মেঝে ৫৬৯ জন মুসল্লির নামাজ পড়ার জন্য কালো পাথর দিয়ে দাগ কাটা। তাজমহল দেয়াল ঘেরা আগ্রা শহরের দক্ষিণ অংশের একটি জমিতে তৈরি করা হয়েছিল যার মালিক ছিলেন মহারাজা জয় শিং। শাহজাহান তাকে আগ্রার মধ্যখানে একটি বিশাল প্রাসাদ দেওয়ার বদলে জমিটি নেন।

(৬) তাজমহলের চার পাশে চারটা বড় বড় পিলার আছে। স্বাভাবিক চোখে দেখলে মনে হবে যে, পিলারগুলি সোজা এবং খাড়া, কিন্তু আসলে এই পিলারগুলি একেবারেই সোজা খাড়া না। এই পিলারগুলি একটু বাইরের দিকে হেলিয়ে বানানো। কোনো কারনে যদি প্রাকৃতিক কারনে পিলারগুলি ভেঙ্গে পড়ে, পিলারগুলি যেনো কোনো অবস্থাতেই তাজমহলের ভিতরের সাইডে না পড়ে সেভাবে বানানো। এটা তার ওজনেই তাজমহলের বাইরের দিকে পড়ে যাবে, যাতে তাজমহলের কোনো ক্ষতি না হয়।

(৭) এবার যাই তাজমহলের ভিতরের অংশে। ভিতরে রঙ বেরংগের পাথর দিয়ে অনেক ইতিহাস লেখা। কখনো যৌবনের প্রতিক, কখনো কোনো প্রেমের কাহিনী। বিভিন্ন কালারের পাথর দিয়ে দিয়ে সমন্নয় করে একটা পাথর আরেকটা পাথরের সাথে নেচারালী লাগানো। কথিত আছে, সম্রাট শাহজাহান একটা পাথরও কেটে লাগাতে দেন নাই। অবিকল পাথরগুলি যেভাবে ছিলো সেটাই একটার সাথে আরেকটা খাপে খাপ মিলিয়ে মিলিয়ে সংযোগ করে লাগানো এবং প্রতিটি পাথর একে অপরের সাথে নিখুতভাবে লাগানো। কত বছর যে লেগেছে এই পাথর বাছাই করার জন্য, এবং তার সাথে রঙ এবং সাইজ মেলানোর জন্য, তার কোনো ইয়াত্তা নাই।

(৮) পাথরগুলি সেমিট্রান্সপারেন্ট। যদি ওয়ালের বা দেয়ালের এক পাশ থেকে টর্চের লাইট দেয়া হয়, ওয়াল বা দেয়ালের উলটো দিকে এই লাইট বেশ প্রবাহিত হতে পারে।

(৯) রানী নূরজাহান যেখানে শুয়ে আছেন, অর্থাৎ তার কবর, সেটায় যেনো কোনো ভিজিটর ভিজিট এর কারনে রানি বিরক্তবোধ না করেন, তার জন্য একই ডিজাইনে, একই তরিকায় ঠিক এমন জায়গায় আরেকটি নূরজাহানের কবরের মতো কবর বানানো হয়েছে যে, যেদিক থেকেই তাজমহলকে ভাগ করা হোক, একদিকে নূরজাহানের অরিজিনাল কবর আর অন্যভাগে নূরজাহানের রেপ্লিকা অর্থাৎ ফেক কবর ভাগে পড়বে। সমস্ত ভিজিটরদেরকে নূরজাহানের এই রেপ্লিকা কবর পর্যন্তই যেতে দেয়া হয়। কিন্তু আমরা যেহেতু ভারতের রাষ্ট্রীয় গেষ্ট হিসাবে বিবেচিত ছিলাম, ফলে আমরা খুব ভাগ্যবান যে, আমরা নূরজাহানের অরিজিনাল করব পর্যন্ত ভিজিট করার অনুমতি ছিলো। দেখে বুঝার উপায় নাই, কোনটা নূরজাহানের অরিজিনাল করব আর কোনটা নূরজাহানের ডুপ্লিকেট। দুটুর ডিজাইন, স্টাইল এবং সব কিছুই এক।

(১০) একষ্টিক থিউরী ব্যবহার করা হয়েছে এই তাজমহলের ভিতরে। একষ্টিক থিউরী হচ্ছে বাইরের কোনো শব্দ তার কোন সুর, কিংবা আওয়াজ নষ্ট না হয়ে বক্তা যে আওয়াজে যে সুরে কথা বলবেন, ঠিক সেতাই শুনা যাবে এই তাজমহলের ভিতরে বসেও। এটা দেখার জন্য আমাদে গাইড জানালেন যে, সম্রাট শাহজাহান, চেয়েছিলেন, যখন বাইরে আজান পড়বে, রানির ঘর থেকে যেনো অই আজানটা অবিকল কোনো শব্দ ডিসটরসন না হয় এবং রানি নূরজাহান ঠিক ঐ আওয়াজটাই শুনতে পান। এটা প্রমান করার জন্য গাইড প্রথমে আমাদেরকে একটা সুমধুর আওয়াজের অডিও শুনালেন বাইরে দাড় করিয়ে, তারপর নিয়ে গেলেন, রানীর কবরের পাশে। আবারো সেই সুমধুর আওয়াজটা বাজানো হলো। আসলেই ঠিক তাই, যে সাউন্ডটা আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম, তদ্রুপ রানীর ঘর থেকেও একই আওয়াজ শুনা যাচ্ছিলো।

(১১) তাজমহল একটা জাইরো সিস্টেমে তৈরী করা। অর্থাৎ পুরা তাজমহল কোনো কারনে যদি ভুমিকম্পের কবলে পড়ে তাহলে এটা অর্থাৎ পুরু তাজমহল প্রায় একদিকে সারে সাত ডিগ্রি অন্য দিকে সারে সাত ডিগ্রী হেলে গেলেও তাজমহলের কোনো ক্ষতি হবে না। অর্থাৎ দুই দিকে মিলে তাজমহল প্রায় ১৫ ডিগী হেলতে পারে। এর ফলে তাজমহল প্রায় ৭ রেক্টর স্কেলের ভুমিকম্প সহ্য করার মতো একটা স্ট্রাকচারাল ডিজাইন হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাজ মহল এর মধ্যে নাকি পর পর দুবার প্রায় এই সম পরিমান ভুমি কম্পে পড়েছিলো কিন্তু এই হেলতে পারা জাইরোর কারনে তাজমহলের কোনো ক্ষতিই হয় নাই। 

(১২) তাজমহলে দাঁড়িয়ে যদি সকালবেলা পূর্ব দিকে সুর্য উঠা দেখেন, তাহলে সুর্য শাহজাহান মহল থেকে যেনো উদিত হচ্ছে এটাই বুঝা যাবে, এটা বছরের যে কোনো সময়ের জন্যই প্রযোজ্য। আবার শাহজাহান মহলে কেউ দাড়াইয়া যদি সুর্যাস্ত দেখেন, তাহলে বছরের যে কোনো সময় মনে হবে যে, সুর্য মমতাজ মহলের উপর দিয়ে সুর্যাস্ত হচ্ছে।

এই রকমের আরো অনেক বৈজ্ঞানিক কারন রয়েছে যার কারনে তাজমহল বিশ্ববাসীর কাছে ৭ম আসচর্যের মধ্যে একটা স্থান করে নিয়েছে। এটা কোনো স্বাভাবিক বিল্ডিং বা স্ট্রাকচার নহে।  আমরা প্রায় ঘন্তা তিনেক তাজ মহলে থাকার পর বেরিয়ে গেলাম সম্রাট আকবরের আস্তানায়।

০৬/০৩/১৯৯৬-ডমিনিকান ভ্রমন

হাইতিতে জাতী সংঘের অধীনে মিশন করতে এসে আশে পাশের অনেক গুলি দেশ বেরানর ইচ্ছা প্রথম থেকেই আমার ছিলো। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে ছিলো ডমিনিকান দেশটি ঘুরে দেখার। এর প্রধান কারন হলো, এতা হিসপানিওয়ালার একটি দেশ। অনেক ছোট বেলায় পড়েছিলাম ইবনে বতুতার কথা, তারপর সেই আমেরিকা আবিষ্কারের কথা। আমেরিকা আবিষ্কার যিনি করেছিলেন যেই জাহাজতা দিয়ে তিনি এসেছিলেন, এটা নাকি এই ডমিনিকানে এখনো আছে। এই রকম আরো অনেক কাহিনী ছোট বেলায় পরেছিলাম। স্বাভাবিক কারনেই এতো কাছে এসে ডমিনিকানে যাবো না, এটা হবে একতা অন্যায় বা অপরাধ। 

যাই হোক, আমরা একতা গ্রুপ করে ফেললাম ডমিনিকানে যাওয়ার জন্য। গাড়ির পথ। হাইতির পাশাপাশি দেশ। আমাদের নিজস্ব গাড়ি আছে। ইউ এন এর গাড়ি। কোনো ভিসার দরকার নাই। ডমিনিকানের চেক পোষতে গিয়ে আমাদের জাতীসংঘের স্টাফ হিসাবে পরিচয় দিলেই আমরা ঢোকতে পারবো এতাই আমাদেরকে জানানো হয়েছিলো কন্সুলেট অফিস থেকে।

আমি, মেজর ইশতিয়াক (৯ম লং কোর্ষ), মেজর মোসাদ্দেক (১১ তম লং কোর্ষের), মেজর ফরিদ (১১তম লং কোর্ষের), মেজর ইলিয়াস (১৭ তম লং কোর্ষের) মেজর ফারুক (১০ম লং কোর্শগের) আর নেভীর একজন অফিসার মিলে আমরা সবাই বেরিয়ে গেলাম ডমিনিকানের উদ্দেশ্যে।

আকাবাকা পাহাড়ি সরু রাস্তা, আশেপাশে কোনো গ্রাম চোখে পড়লো না খুব একটা। মাঝে মাঝে কিছু লকের আনাগোনা দেখা গেছে আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের মতো কিন্তু তারা কোথা থেকে কই যায় বা কোথায় থাকে এ ব্যাপারে খুব একটা জানা হলো না। আমরা ছুটে চলছি তো চলছিই। ক্যারিবিয়ান পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূরা এখানেই অবস্থিত যার নাম পিকো ডুয়ার্তো। সেন্ট ডমিনিকের নামানুসারেই এই দ্বীপ টির নাম হয়েছিলো। এর রাজধানির নাম সেন্ট ডমিনিগো। বর্তমানে ডমিনিকানের প্রেসিডেন্ট হিসাবে আছেন লিওনেল ফার্নেন্দেজ।

প্রায় ৪ ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে প্রায় সকাল ১১ তার দিকে আমরা ডমিনিকান চেক পোষ্টে পৌঁছে গেলাম। খুব একটা সুরক্ষিত বর্ডার বলে মনে হলো না। আমাদের দেশের কিছু বিডি আর সেনাদের মতো লেথাজিক কিছু সৈনিক দিয়ে ডমিনিকা বর্ডারটার চেক পোষ্ট পাহাড়া দেয়া আছে। তবে মেইন গেটে কাতা তারের বেড়ায় কোনো লোক ঢোকতে পারে না এটা ঠিক। আমরা ইউ এন এর গাড়ি গেটের সামনে থামতেই গুটি কয়েক ডমিনিকান সৈনিক আমাদের কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের আসার হেতু কি। হাইতি এবং ডমিনিকানের সাথে যে কমন শহর, তার নাম আসলে মন্ট ক্রিষ্টি। যদিও মন্ট ক্রিষ্টি ডমিনিকানেরই একটি শহর কিন্তু আমরা সেখানকার কো-বর্দার দিয়েই ডমিনিকানে ঢোকেছি।

এখানে একতা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম যে, হাইতিতে প্রায় ৯০% মানুষ কালো আর ডমিনিকানের প্রায় ৯০% লোক সাদা চামড়ার। পাশাপাশি দেশ কিন্তু বিস্তর তফাত। হেসিয়ান লোকগুলি অনেক অস্থির, চালাক আর ফ্রড জাতীয় কিন্তু ডমিনিকানের লোকগুলি ধীর স্থির, কো-অপারেটিভ, ভদ্র বলেই মনে হলো। গেটের সৈনিকগুলি আমাদের সবার পাস পর্ট নিয়ে চলে গেলো ভিতরে। প্রায় ৪০ মিনিট পর এসে জানালো যে, তারা আমাদের পাস্পোর্ট এখুনি ফেরত দিবে না, যখন আবার ব্যাক করবো, তখন গেট থেকে নিয়ে গেলেই হবে। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, যে, যেহেতু আমরা ইউ এন এর গাড়ি নিয়েই ভিতরে যাবো, তখন যদি কোনো প্রশাসন কিংবা আইন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা আমাদেরকে কিভাবে ডমিঙ্কানে প্রবেশ করলাম জিজ্ঞেস করে, তাহলে কি বল্বো? আমাদের কোনো সমস্যা হবে কিনা। ব্যাপারটা তারা বুঝতে পারলেন। ফলে আমাদের সাথে তাদেরই একজন একোম্পানি করবেন বলে রাজী হলেন। এতে আমাদের লাভ হলো দুটু। একজন বিনে পয়সায় গাইড পাওয়া গেলো আবার কোনো ঝামেলা হলে সেইই ব্যবস্থা নিবে।

আমরা ঢোকে গেলাম ডমিনিকানে। খুব সাজানো গুছান একতা দেশ। গরমের সিজন। দেখলাম, ছেলেমেয়েরা খুব নিরাপদেই গাছের ছায়ায় কেউ ঘুমাচ্ছে, আবার কেউ কেউ আড্ডা মারছে। সবাই খুব ভদ্র। আমাদেরকে দেখে অনেকেই এগিয়ে এলেন, হাত মিলালেন, হাসিখুসিতে অনেকে আবার ছবিও তুল্লেন/ ব্যাপারটা খুব মজার। অনেকেই ইংরেজী বলতে পারেন কিন্তু তাদের প্রধান ভাষা হচ্ছে স্প্যানিশ।

ডমিনিকানের প্রধান ধর্ম হচ্ছে রোমান ক্যাথোলিজম। এদের মুদ্রার নাম ডমিনিকান পেসো। আমাদের কাছে ডলার ছিলো, এদেশে ডলার চলে। কিন্তু কোনো কিছু কিনতে গেলে ডলার নেয় ঠিকই কিন্তু দেয় পেসো। আর এক ডলার সমান প্রায় ১৫০০ পেসোর সমান। হাইতিতে অবশ্য ওদের এক হেসিয়ান ডলারের সমান প্রায় ৫ হেসিয়ান ডলার। এদিক দিয়ে ডমিনিকান দের কারেন্সীর অবমুল্যায়ন ধরা যায়। ডমিনিকানে হেসিয়ান ডলার ও চলে। তবে বেশী আগ্রহী অয় তারা। আমরা খুব বেশী মার্কেটিং করার ইচ্ছায় এখানে আসি নাই, তাই এটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথ ব্যথাও নাই।

আমরা আশেপাশের কিছু জায়গা ঘুরে দেখলাম। আমরা আসলে মন্টি ক্রিষ্টি শহরের মধ্যেই ছিলাম। এর বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় নাই কারন আমরা আবার সেদিনই হাইতিতে ফিরে যেতে হবে আর আমাদের রাত থাকার অনুমতি ছিলো না। দুপুরের দিকে আমরা একতা দোকান থেকে কিছু ড্রাই ফুড খেয়েই আবার বিকাল দুইতার দিকে হাইতির উদ্দেশ্যে র ওয়ানা দিয়ে চলে এলাম হাইতিতে।

আমাদের সেই হিস্পানিওয়ালার জাহাজ দেখা হয় নাই। কিংবা আরো বড় বর যে ইতিহাস পড়েছিলাম, তার কিছুই দেখা হয় নাই। এ জীবনে আর কখনো এদেশে আসা হয় কিনা আমার জানা নাই তারপরেও ভাবলাম, ডমিনিকান এর বর্ডার টা তো ছুয়ে গেলাম।

১৮/১২/১৯৯৫-হাইতির জেনারেল (প্রেসিডেন্সিয়াল) ভোট

অনেক চড়াই উতড়াইপার হয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা হাইতিতে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন করতে পারলাম। গতকাল ১৭/১২/১৯৯৫ তারিখে প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন হয়ে গেলো। এখানে মুলত ১৪ জন ক্যান্ডিডেটস ছিলো যার মধ্যে মুলত তিন জনের মধ্যেই লড়াইটা হয়েছে। প্রথম জন রেনে গারসিয়া প্রিভাল (যাকে সবাই রেনে প্রিভাল নামেই চিনে), তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্তে ছিলেন। অত্যান্ত অমায়িক একজন মানুষ। প্রায়ই তিনি আমাদের বেস ক্যাম্পে আসেন, সবার সাথে কথা বলেন, সন্ধায় এলে সবাই আমরা মিলে চা কফি খাই। বেশ সাধারন একজন মানুষ। একটা দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট যে এতো সাধারনভাবে আমাদের ক্যাম্পে আসেন, বুঝাই যায় না। এখানে তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারটা নিয়ে তিনি একেবারেই উদ্বিগ্ন নন। কারন পুরু বেস ক্যাম্পটাই নিরাপদ। এই ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনে প্রিভাল গতকাল ইলেকশনে প্রায় ৮৮% ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরিস্টিডের স্থলাভিষিক্ত হবেন আগামি ৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬ তারিখ থেকে। ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনে প্রিভাল “ল্যাভালাস পলিটিক্যাল অরগ্যানাইজেশন” (যাকে সক্ষেপে বলা হয় ওপিএল) থেকে দাড়িয়েছিলেন। মুখ ভর্তি দাড়ি। দেখলে অনেকটা আমাদের এশিয়ান এশিয়ান টাইপের মনে হয়।

২য় ব্যক্তি ক্যান্ডিডেট হিসাবে ছিলেন লিও জুন। তিনি সতন্ত্র দল বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে দাড়িয়েছেন। ভোটের দিক দিয়ে তিনি মোট ভোট পেয়েছেন প্রায় ২.৫% । তাকে আমরা দেখি নাই। অন্তত আমি এখনো দেখি নাই। আর ৩য় ব্যক্তি যিনি ক্যান্ডিডেট হয়েছিলেন তাঁর নাম ছিলো ভিক্টোর বিনোত। তিনি দাড়িয়েছিলেন “কোনাকমঃ (KONAKOM) পার্টি থেকে। কোনাকম পার্টি আসলে মডারেট সোশ্যালিস্ট পলিটিক্যাল পার্টি যার ইংরেজী নাম হচ্ছে ন্যাশনাল কংগ্রেস অফ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং হেসিয়ানরা একে চিনে কোনাকম নামে। তাঁর ভোটের পরিমান ছিলো সবচেয়ে কম, মাত্র ২.৩%

বাকী ১১ জনের নাম ও আমরা প্রায় আগে খুব ভালভাবে শুনেছি বলে মনে হয় না। তাদের নাম গুলি এই রকমেরঃ

রেনে জুলিয়েন,

ক্লার্ক প্যারেন্ট- হেসিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি

ইদি ভোলেল – ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক র‍্যালি

রিচার্ড ব্লাদিমির -প্যারাদাইস পার্টি

ফ্রান্সিস জীন – রিভুলেশনারী মিলিটারি ফোর্স

জীন আর্নল্ড ডুমাস-ন্যাশনাল পার্টি অফ ওয়ার্কার্স ডিফেন্স

জুলিও লারোসিলেরী-

মিষ্টার জোসেফ- হেসিয়ান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি

গেরাল্ড ডাল্ভিয়াস – অল্টারনেটিভ পার্টি অফ হেসিয়ান ডেভেলপমেন্ট পার্টি

রকফেলার গুরি – ইউনিয়ন অফ ডেমোক্র্যাটিক প্যাট্রিওটস

ফার্মিন জীন লুইস 

মজার ব্যাপার হলো বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরিস্টিড এই ইলেকশনে অংশ গ্রহন করেন নাই। করলে হয়ত তিনি পাশ করতেন। কিন্তু হেসিয়ান সংবিধানের বাধ্যবাদকতার জন্য তিনি অংশ গ্রহন করেন নাই। তবে তাঁর মনোনীত এবং তারই অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনে প্রিভালকে তিনি মনোনীত করেছেন। এবং ফলাফল তাইই হয়েছে যে, রেনে প্রিভাল জয়ী হয়েছেন। সেক্ষেত্রে ধরা যায় যে, যদি এরিস্টিড দাড়াতে পারতেন, তাহলে এবারো তিনিই প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন।

আমি বহুবার এই ধর্মজাজক মানুষটির সাথে মিশেছি। আমি তাঁর প্যালেসে প্রায় তিন মাস একটানা ডিউটি করেছি। মাঝে মাঝেই আমি তাঁর খুব কাছ থেকে অনেক সান্নিধ্য পেয়েছি। 

০৫/১২/১৯৯৫-নর্থ ইষ্টার্ন ইনিভার্সিটি এবং এমআইটি ভিজিট

ভাইয়া নর্থ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে প্রোফেসারি করেন। এর ঠিক উলটো দিকেই হচ্ছে এম আই টি ইউনিভার্সিটি। ভাইয়া আমাকে ওনার ইউনিভার্সিটি তে নিয়ে গেলেন। আজ একটু শীত কম পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশাল বড় একটা ইউনিভার্সিটি। ভাইয়ার অফিসে গেলাম, ভাইয়ার আরো অনেক কলিগ, তাদের অফিসেও গেলাম। এরা সবাই অনেক উচু দরের মানুষ। ভাইয়া আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, তুই ইউনিভার্শিটিটা ঘুরে ঘুরে দেখতে পারিস। কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরে যাস না। দুপুরে একসাথে অন্যান্য কলিগদের সাথে ক্যাফেটেরিয়ায় লাঞ্চ করবো। এর মাঝে আমি কিছু কাজ সেরে নেই, আর তুইও ঘুরে ঘুরে দেখ। ভালোই হলো। ভাইয়া সাথে থাকলে আমার সিগারেট খাওয়া হয় না। এবার আনন্দের সাথে সিগারেট খাওয়া যাবে।

আমি ভাইয়ার অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রথমেই যেখানে পৌঁছলাম, সেতাই আসলে স্টুডেন্ট ক্যাফেটেরিয়া। দেখলাম, অনেক ছেলেমেয়েরা একটা বোর্ডের সামনে বেশ সুন্দর করে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অদূরে দাঁড়িয়ে একতা সিগারেট ধরালাম। এখানে সিগারেট খাওয়া যায় কিনা আগে আমি চেক করে নিয়েছি। আমি দেখেছি এক ভদ্রলোক, সম্ভবত ছাত্রই হবে, সে সিগারেট খাচ্ছিলো। ফলে আমার ধারনা যে, এই স্থানে সিগারেট খাওয়া যায়। আমি সিগারেট খাচ্ছি আর ঐ জটলা ছেলেমেয়েদেরকে দেখছি। একজন একজন করে তারা কি যেনো একটা নোটিশ বোর্ডে পিন দিয়ে লাগাচ্ছে। লাগিয়েই আবার চলে যাচ্ছে।

আমার সিগারেট খাওয়া শেষ হলে আমি বোর্ডটির কাছে গিয়ে দেখি তখন মাত্র দুজন ছাত্র দাঁড়িয়ে। ওরা ইলেকশন পোষ্টার লাগাচ্ছে। কয়েকটি দলের ছাত্র ওরা। পোষ্টার দেখে বুঝলাম।

খুব মজার ব্যাপার হলো, যে যেই দলই করুক, তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো দন্দ দেখলাম না। হানাহানি, হিংস্রতা, কিংবা একে অন্যের উপর রেষারেষি তো নাইই। আমাদের দেশে হলে ইতিমধ্যে মারামারি লেগে যেতো।

০২/১২/১৯৯৫-অস্ত্র ক্রয়

শেষ পর্যন্ত আমার আগ্নেয়াস্ত্র টা মনে হয় কেনাই হলো। বেরেটা পিস্তল। খুব সুন্দর। হাতের তালুতেই রাখা যায়। বব নামের একটি দোকান থেকে কিনতে গেলাম। কেনার আগে অনেকগুলি অস্ত্র দেখালো আমাকে। দোকানদারকে আগেই সমস্ত কাগজপত্র ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ভাইয়া। ফলে এই দুইদিন দোকানদার সমস্ত কাগজ ভেরিফাই করে আজকে আমি যেটা কিনতে চাই সেতা কিনতে পারবো বলে দোকানে গিয়েছিলাম। দোকানীদের ছোট একটা এসি করা ফায়ারিং রেঞ্জ আছে। ওখানে টেষ্ট ফায়ার করা যায়। তবে সর্বোচ্চ ৫ রাউন্ড পর্জন্ত ফায়ার করতে পারবেন। আমি টেষ্ট করলাম। মাত্র ২০০ ডলার। খুবই সস্তা। বাংলাদেশ থেকে আমি যে আগ্নেয়াস্ত্রলাইসেন্স পেয়েছিলাম, সেটা করমুক্ত লাইসেন্স। ফলে আমাকে কোনো কর দিতে হবে না। যদি কর দিতে হতো, তাহলে আমাকে ৩৫০% ট্যাক্স দিয়ে এই অস্ত্র কিনতে হতো। তখন এর দাম পড়তো (২০০+ ৭০০)= ৯৫০ ডলার। কিন্তু আমার পড়ছে মোট ২০০ ডলার।

দোকানদার এই মর্মে জানালেন যে, আমি এখনই এই অস্ত্র সাথে করে নিয়ে যেতে পারবো না। ওনারা উক্ত অস্ত্র বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন, আমাকে বাংলাদেশ থেকে রিসিভ করতে হবে। কিছুই করার নাই কারন আমেরিকায় আমাই অস্ত্র সহ ঘুড়তে পারবো না, সেই অনুমতি আমার নাই। আবার আমি আমেরিকা থেকে হাইতিতেও অস্ত্র বিশেষ করে ব্যক্তিগত অস্ত্র নিয়ে যেতে পারবো না, হাইতির আইনেও আমি অনুমতি প্রাপ্ত নই। ফলে কবে নাগাদ দোকানদার এই অস্ত্র বাংলাদেশে পাঠাবে, সেই তারিখতা আমাকে বলে দিতে হবে যাতে বাংলাদেশে পৌছার পরেই যেনো বেশি দেরী না করে আমি এয়ারপোর্ট থেকে অস্ত্রটি তুলে নিতে পারি।

আমি তাতক্ষনিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বলতে পারলাম না। তবে ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে কনফার্ম তারিখ বলতে পারবো এতা জানালাম। দোকানদার তাতেই মন্তব্য লিখে আমাদেরকে একটা চালান কপি দিয়ে দিলেন।

খুব ভালো লাগছে যে, অনেকদিনের আমার একটা শখের জিনিষ কেনা হলো। এতা দিয়ে আসলেই আমার কোনো উপকার হবে কিনা আমি জানি না কিন্তু শখ বলে কথা। মাসুদ সাথে গিয়েছিলো। ওর হাজার রকমের প্রশ্ন। ও নিজে একটা কিনতে পারবে কিনা, কিনলে কিভাবে এতা চালাইতে হয়। ইত্যাদি।

৩0/১১/১৯৯৫-পিস্তল কেনার প্রস্তুতি

হাইতিতে আসার সময়  বাংলাদেশ থেকে আমি একতা অনুমতি নিয়ে এসেছিলাম যে, যদি আমেরিকায় যাওয়া হয়, তাহলে ওখান থেকে একতা পিস্তল কিনবো। ভাইয়াকে গত সপ্তাহে জানালাম আমেরিকা থেকে পিস্তল কেনা যায় কিভাবে। ভাইয়া কোথায় কোথায় কি কি জানি ফোন করে করে আমাকে জানালেন যে, কেনা যাবে তবে বেশ কিছু কাগজপত্র লাগবে। তাঁর মধ্যে দুটো কাগজ আমার কাছে নাই আর বাকী সবগুলিই আছে। দুটূ কাগজের মধ্যে একটা হচ্ছে আমেরিকার দুতাবাস থেকে ছাড়পত্র এবং আমি যেখানে কাজ করছি (অর্থাৎ হাইতি, সেখানকার কন্টিনজেন্ট কমাডারের অনুমতি পত্র)।

আমি হাইতি থেকে আসার পথে কন্টিনজেন্ট কমান্ডারের কাছে এই ব্যাপারে এপ্লাই করে এসেছিলাম, ফলে ফ্যাক্সের মাধ্যমে চাইলেই সেটা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমেরিকার দুতাবাস থেকে ছাড়পত্র কিভাবে নেবো? ভাইয়া, আমেরিকায় বাংলাদেশ দুতাবাসে ফোন করলেন। বাংলাদেশ এম্বেসী অফিসের ডি এ (ডিফেন্স এটাশে) হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুনসুর আহমেদ। এক সময় আমাদের ৯ আর্টিলারী ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। আমার সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। ভাইয়া নিজেই কথা বললেন দুতাবাসের সাথে, হাবিলদার আছে একজন, সে ভাইয়ার ফ্যাক্স নাম্বারে ছাড়পত্র আগামী দু একদিনের মধ্যেই পাঠিয়ে দেবেন এবং সাথে সাথেই হার্ড কপিও ডি এইচ এল এর মাধ্যমে আমাদেরকে পাঠিয়ে দেবেন বলে নিশ্চিত করলেন। ফলে আমার অস্ত্র কেনায় আর কোনো ঝামেলা রইলো না। এবার খুজে বের করতে হবে কোথায় অস্ত্র বিক্রি করে। এতাও ভাইয়াই খুব আগ্রহের সাথে এখানে সেখানে যোগাযোগ করছেন। আমার কিছুই করতে হচ্ছে না।

২৯/১১/১৯৯৫-আমেরিকায় সেল

একটা মজার কথা না বললেই হচ্ছে না। আজ প্রায় ১৫ দিন পার হয়ে গেলো আমি ভাইয়ার বাসায় আমেরিকাতে এসেছি। এর মধ্যে অনেক জায়গায় গিয়ে অনেক পদের মার্কেটিং করছি ভাবিকে নিয়ে। বেশীরভাগ মার্কেটিং করছি কসমেটিক্স আর কিছু নিত্য ব্যবহারের জিনিষ। যখনই আমি ঐ যে এয়ারপর্ট থেকে পাওয়া কার্ডটি দিচ্ছি, সবাই খুব অবাক হচ্ছে। কারন এই কার্ডধারী খুব একজন সাধারন মানুষ হতে পারে না। যতোবারই কার্ড তা দেখিয়েছি, আমি লাইনে থাকা মানুষ গুলির মধ্যে প্রাইয়োরিটি পাচ্ছি, আর কোনো প্রকারের ভ্যাট, ট্যাক্স দিতে হচ্ছে না। এখানে প্রায় ৩০% ট্যাক্স দিয়ে সব কিছু কিনতে হয়। এর মানে আমি যদি ১০০ ডলারের একটা জিনিষ কিনি, আমাকে পে করতে হবে ১৩০ ডলার। কিন্তু আমার বেলায় ১০০ ডলারের জিনিষ ১০০ ডলারই। দারুন একতা ব্যাপার। এতা যখনই ভাইয়ার ক্লজ বন্ধু বান্ধবদের কাছে জানাজানি হয়ে গেলো, অনেকেই আমার এই কার্ড ব্যবহার করে অনেক মার্কেটিং করে নিলো। আমারো খুব ভালো লাগছিলো যে, আমি অন্তত একটা ব্যতিক্রমী জিনিষ উপহার দিতে পারছিলাম।

আরেকটি জিনিষ আমার কাছে খুব অবাক লাগলো যে, প্রায় সারা বছরই আমেরিকার দোকানগুলিতে “সেল” লেগেই থাকে। “সেল” মানে হচ্ছে ডিস কাউন্টে কোনো কিছু ছেড়ে দেওয়া। হিড়িক পড়ে যায় তখন। আবার এমন হয়েছে যে, গতকাল আমি একটা জিনিষ কিনেছি, কিন্তু সেল” হয়েছে আজ থেকে ঐ আইটেমটার উপর। আমি যদি গতকালের রিসিপ্ট নিয়ে ঐ দোকানে যাই, তারা আবার আজকের দিনের “সেল” এর হিসাব ধরে টাকা হিসাব করে আমাকে বাকী টাকা ফেরত দিবে। কি তাজ্জব ব্যাপার এই দেশে। শুধু তাই না। আরো একতা মজার কাহিনী চোখে পড়লো যে, প্রায় ১৫ দিন আগে কেউ একটা শার্ট বা প্যান্ট কিনে নিয়ে গেছে, ব্যবহার করেছে, ১৫ দিন পরে এসে দোকানে বল্লো যে, আমার এই শার্ড় টা আর ভালো লাগছে না, আমি ফেরত দিতে চাই, ওমা, তারা সব তাকা ফেরত দিয়ে দিচ্ছে আবার “সরি” ও  বলছে যে, জিনিষটা ক্রেতার পছন্দ হয় নাই বলে। বাংলাদেশ হলে বাঙ্গালীরা সারা বছর খালী এভাবে মাগনা মাগনা কিনতো আর বদল করে করে নতুন জিনিষ নিয়ে আবার বদল করতো। এটা আমেরিকা। কোনো যুক্তি ছাড়া এরা দুই নম্বরী করে না।

২৫/১১/১৯৯৫-বোষ্টনে বাঙ্গালি পরিবারে দাওয়াত

সন্ধার সময় ভাইয়া আজকে আমাকে নিয়ে একটি বাঙ্গালী পরিবারে বেরাতে নিয়ে গেলেন। ভাইটির নাম বশীর। তিনি পাকিস্থানী। কিন্তু আপা আমাদের ঢাকার তেজকুনী পাড়ার মেয়ে। বহু বছর আগে তারা দেশ ছেড়েছে। আগে থেকেই সম্ভবত তারা জানতেন যে, আমি আসবো। ফলে আমার সুবাদে এবং ভাইয়ার সুবাদে আরো অনেক বাঙ্গালী পরিবারের কেউ কেউ এসেছেন। আমি কাউকে চিনি না বলে খুব একটা সখ্যতা গড়ে তুওলতে পারছি না। কিন্তু এদের মধ্যে অনেকেই আমাকে একটি প্রশ্ন বারবার করছিলেন যে, আমার ভাই আমেরিকার এতো বড় একতা ইউনিভার্সিটিতে প্রোফেসর কিন্তু আমি আর্মীতে গেলাম কেনো? আর্মী একতা ভালো প্রোফেশন না। তারা মনে করেন, Why should someone to choose a profession to kill someone to survive himself? Its risky and not a good profession.

আমি হেসে হেসেই বলছিলাম, কাউকে না কাউকে তো দেশের আর্মীতে যেতে হবে, সেতা না হয় আমরা কজন গেলামই।

পার্টিতে হাতে বানানো মিষ্টি খেলাম, পোলাও করেছিলো, সবাই খুব আনন্দের সাথে ত্রিপ্তি করে খেয়ে বল্লো, যাক, ছোট ভাইয়ের সুবাদে আজ নাকি তারা বাঙ্গালি খাবার খেলো।

২০/১১/১৯৯৫-বোষ্টন

এই কয়দিন ভাইয়ার বাসায় আছি। শীতের প্রকোপ কমছে না। বাইরে গেলেই তুষারপাত। গতকাল সবাই মিলে একটি ছবি দেখলাম। দি রেইন ম্যান। একটা অটিষ্টিক বাচ্চার কাহিনী। ইউসুফের সাথে প্রচন্ড মিল রয়েছে। সকালের দিকে আমি মাসুদের স্ক্লে গিয়েছিলাম। সুন্দর একটা স্কুল। কো-এডুকেশন অবশ্য। স্কুলে গিয়ে বুঝলাম মাসুদ খুব জনিপ্রিয়। ওর ক্লাশ টিচারের নাম মিস ম্যাপল। মাসুদ আমাকে ওর ক্লাশ টিচারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর ঊনি আমাকে বললেন যে, আমার পক্ষে সম্ভব কিনা হাইতির উপর একটা ছোট খাটো প্রেজেন্টেশন দেওয়া। আমি আসলে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। তারপরেও বললাম, যদি ম্যাপ থাকে তাহলে আমি হয়ত চেষ্টা করতে পারি।

যেই বলেছি যে, আমি ৩০/৪০ মিনিটের একটা ক্লাশ নেবো, অমনি সব ছাত্ররা তাদের টেবিল চেয়ার রুমের একদিকে টানাটানি করে সরিয়ে দিলো, একটা হল ঘর হয়ে গেলো। এই চেয়ার টানাটানির সময় আমি আর মাসুদ মিলে ওদের কম্পিউটার থেকে হাইতির একটা ম্যাপ বের করে ফেললাম। আর আমি একটা ছোট নোট লিখে ফেললাম কি কি বল্বো আর কি কি বল্বো না।

বাচ্চারা খুব হাসি খুশীতে সবাই বসে পড়লো। আমারো খুব ভালো লাগছিলো এই সব পটেনশিয়াল বাচ্চাদেরকে কিছু একটা বলতে।

তাদের হাইতি সম্পর্কে যতোতা না উতসাহ, তাঁর থেকে বেশি উতসাহ দেখলাম আর্মীর জীবন নিয়ে। কি হয়, কিভাবে থাকি, কিভাবে অস্ত্র চালাই, সব অস্ত্র চালাইতে পারি কিনা। একটা গুলি করলে কতজন মরে, আমি শত্রুদেরকে কিভাবে ঘায়েল করি। আকাশ থেকে লাফ দিয়ে পড়তে পারি কিনা। যদি পারি, আর যদি আর না বাচি তাহলে কিভাবে কি আরো কতো যে কি?

হাইতিতে আমি কতজনকে এরেষ্ট করেছি, ওরা আমাদেরকে মারে কিনা, ওদের কি অস্ত্র আছে, সরকার সবাইকে একসাথে ধরে মেরে ফেলে না কেনো ইত্যাদি। ৪০ মিনিটের ক্লাস হয়ে গেলো প্রায় দেড় ঘন্টার। মিস ম্যাপেল শেষে এসে বললেন, মাসুদ এবং আমাকে অনেক ধন্যবাদ ওদেরকে সুন্দর কিছু বলার জন্য এবং আমি টাইম দেওয়ার জন্য।

ওদের স্কুল দেখে একটা জিনিষ বুঝলাম, স্কুলের প্রতিটি দেওয়ালে দেওয়ালে হরেক রকমের ইনফর্মেশন, ম্যাপ, বিভিন্ন সংবাদ এবং বিশেষ ব্যক্তিদের ছবি সহ তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী। মাসু মাত্র ক্লাস এইটে পড়ে। ওদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক বাস্তব ধর্মী। বিভিন্ন ধর্মের ছেলেমেয়েরা আহে। কয়েকজন মুসলমান ছাত্রো এবং ছাত্রীকে দেখলাম। ছাত্রীরা ছোট ছোট হেজাব পড়ে আছে। আমাকে দেখে সালামও দিয়েছে।

সুন্দর একতা সময় কাটলো আজ কে মাসুদের স্কুলে।

১৬/১১/১৯৯৫-আমেরিকা গমন-উইজার্ড ৯৫

বহুদিন ধরেই আমেরিকায় যাবো যাবো করে যাওয়া হচ্ছে না। এখান থেকে আমেরিকা মাত্র ৪৫ মিনিটের ফ্লাইট জার্নি। হাবীব ভাইয়ের সাথে প্রায়ই কথা হয়। হাবিব ভাইও আমাকে বারবার যাওয়ার জন্য বলছেন। অনেকে আবার একবার আমেরিকার ভিসা লাগানোর কথা বলছেন। এ জাতীয় ব্যাপারে আমি বড় উদাসীন। তারপরেও এতো কাছাকাছি এসে ভাইয়ার কাছে যাবো না এটা হয় না। তাই ভিসার জন্য এপ্লাই করেছিলাম, ভিসা পেয়েছি এক বছরের মাল্টিপ্যাল ভিসা। কেএলএম বিমানে টিকেট কাটা হয়েছে, ১৫ নভেম্বর, অর্থাৎ গতকাল। আমার ফ্লাইট সিডিউল হচ্ছে হাইতি-লোগান (বোষ্টন) সরাসরি। 

যেহেতু বিমান বন্দরের সবাই আমাকে চিনে এবং এখানেই আমার ডিউটির জায়গা। ভাবলাম, শেষ মুহুর্তে গেলেও কোনো অসুবিধা নাই। আমার ফ্লাইট বিকাল ৫ টায়। ভিভিআইপির মতো ইমিগ্রেশনে গেলাম প্রায় সাড়ে চারটায়।

ওমা। গিয়ে দেখি বিমানের ডোর ইতিমধ্যে ক্লোজ হয়ে গেছে। ওরা তো আর জানতো না যে, আমি এই বিমানের যাত্রী। তাদেরকে আমি আগে থেকেও জানাই নাই। ফলে দোষটা যে আমার এটাতে কোনো সন্দেহ নাই। ইমিগ্রেশন অফিসার জানালো যে, স্যার, এখন তো আর কোনোভাবেই আপনাকে ঢোকানো সম্ভব না। আপনি এক কাজ করেন, নেক্সট ফ্লাইট আছে রাত আটটায়। কিন্তু ওটা সরাসরি না গিয়ে জেএফকে হয়ে তারপর কানেক্টিং ফ্লাইটে বোষ্টন এয়ারপোর্ট লোগানে যেতে হবে। কিছুই করার নাই।

ফলে আমি ওদেরকে বললাম, সেভাবেই তাহলে আমার ইমিগ্রেশন করে রাখেন। ওরা আমাকে একটু আগেভাগেই এম্বারকেশন টিকেট হাতে ধরিয়ে দিলো। কিন্তু এবার যাচ্ছি আমেরিকান এয়ারলাইন্সে। কেএলএম বাদ। আমার ভাই জানেন যে, আমি কেএলএম বিমানে সরাসরি ফ্লাইটে লোগানে নামবো। আমি এই চেঞ্জটা আর ভাইয়াকে জানাই নাই কারন যেহেতু যাচ্ছিই আর আমি যে এই রকম একটা বোকার মতো কাজ করে ফেলেছি সেটা আর জানাতে চাই নাই।

ঠিক সময় মতো আমেরিকান এয়ারলাইন্স বিমান জেএফকে এর উদ্দ্যেশে ছেড়ে দিলো। কাছাকাছি আসার পর পাইলট জানালেন, লোকাল আবহাওয়া অত্যান্ত খারাপ, বরফে আচ্ছাদিত এয়ারপোর্ট। আমরা নামার চেষ্টা করছি। কয়েকবার এটেম্পট নেবার পরেও পাইলট সম্ভবত নামার ক্লিয়ারেন্স পাচ্ছিলো না। প্লেন নামলো রাত মোটামুটি সাড়ে নয়টায় এবং আমাদের লাগেজ পেতে পেতে আরো আধা ঘন্টা সময় পেড়িয়ে গেলো। যেহেতু এটা সরাসরি ফ্লাইট ছিলো না, ফলে জেএফকে থেকে আরেকটা আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্ল্যান ছেড়ে যাবার কথা রাত সোয়া দশটায়। আমি খুব তাড়াহুরা করছি। অনেক পেসেঞ্জার ইমিগ্রেশনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কানেক্টিং ফ্লাইট মিস করা যাবে না। 

জেএফকে এয়ারপোর্টে পেসেঞ্জার লাইনে পেসেঞ্জারদের ইমিগ্রেশন সুবিধার জন্য কর্তৃপক্ষ চারটি লেনে সাইন বোর্ড দিয়ে রেখেছেন। প্রথম সারি হচ্ছে যারা প্রথম আমেরিকায় এসেছেন তাদের জন্য, ২য় সারি হচ্ছে যারা ডিপ্লোম্যাট তাদের জন্য, তৃতীয় সারি হচ্ছে যারা ২য় বার আমেরিকায় এসেছেন তাদের জন্য। আর ৪র্থ সারি হচ্ছে শুধুমাত্র আমেরিকানদের জন্য।

আমার বুঝতে কোনো অসুবিধা নাই। আমি ১ম আমেরিকায় এসেছি। ফলে আমি ১ম সারিতেই ঢোকে গেলাম। খুব বেশি লোক নয়। আমার টার্ন আসতে মাত্র ৪ জন বাকি। যেইমাত্র আমি ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে দাড়ালাম, তিনি একজন বয়স্ক মহিলা, আমার দিকে ভ্রু কুচকে তাকালেন। আমি জিন্সের একটা প্যান্ট পড়া একটা ওভারকোট কাধে ঝুলানো। হাতে ছোট একটা ব্যাগ।

মহিলা অনেক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে কি যেনো ভাবলেন। প্রেমে পড়েছে কিনা বুঝতে পারছি না, আর প্রেমে পড়লেও লাভ নাই, আমার স্ত্রী এই বয়ষ্ক মহিলার থেকে ঢেড় সুন্দুরী। কিন্তু ওনার চোখ মুখ প্রেমের কথা বলছেনা, বলছে কিছু একটা ভুল হচ্ছে আমার সাথে। তিনি আমাকে একটু ভিতরে ডেকে নিয়ে গেলেন এবং ইমিগ্রেশন পুলিশকে কি যেনো বললেন।

হটাত করে তিন চার জন ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে এমনভাবে জেরা করা শুরু করলেন, আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ইংরেজী ভাষা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই, আমি ইংরেজীটা বাংলার মতোই ভালো বলতে পারি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ করে রেগে গেলে আমি বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই বেশি কথা বলতে সাচ্ছন্দ বোধ করি। তাই আমারও জেরা করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তাদের ধারনা, আমি জাল ভিসা নিয়ে আমেরিকায় ঢোকার চেষ্টা করছি। এই ভিসা আমার নয়।

আমি বললাম, কেনো জাল ভিসা হবে?

তারা বল্লো যে, তারা বাংলাদেশ, পাকিস্থান, ইন্ডিয়ার পাসপোর্ট দেখলেই অনেক বেশী সতর্ক হয়ে যান, কারন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এই তিন দেশের লোকেরা জাল ভিসা নিয়ে আমেরিকায় আসার চেষ্টা করে।

আমি বললাম, কে কি করলো, সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। আমি জাল ভিসা নিয়ে আমেরিকায় ঢোকবো কেনো? আমেরিকা এমন কি মধুর দেশ যে, আমাকে এই কাজ করতে হবে? তোমরা আমেরিকাকে কি মনে করো? সর্গরাজ্য?

আমার এমন কথায় পুলিশ একটু সতর্ক হয়ে গেলো। আমার কথার মধ্যে কোনো জড়তা ছিল না বরং ছিলো প্রচন্ড রাগ। তারা আমাকে আবার বল্লো যে, আমার ছবির সাথে নাকি আমার পাশপোর্টের ছবি মিল নাই। আমার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো।

আমি বললাম, তাহলে পাশপোর্টে কি আমার দাদার ছবি নাকি আপনাদের প্রেসিডেন্টের ছবি লাগানো লাগানো যে আমাকে চেনা যাচ্ছে না? তারা আসলেই আমাকে নিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেলো। এই রকম টাস তাস করে তো জাল ভিসাধারী কথা হয়ত কখনো বলে নাই বা বলে না। তাহলে কি কোনো ভুল হচ্ছে আমার সাথে?

আমি বললাম, আমার কানেক্টিং ফ্লাইট আছে সাড়ে দশটায়। যদি মিস করি, আমি আপনাদের দায়ী করবো এবং আমি সময়মতো আমার নেক্সট ষ্টেশনে পৌছতে চাই।

এবার আরো কিছু নতুন পুলিশ আসলো। আমাকে দেখলো, আমার পাস্পোর্ট দেখলো, তারপর বল্লো, স্যার আপনার কাছে কি আরো কোনো ছবি আছে? তারা আমার সাথে কোনো প্রকার ফালতু ব্যবহার করছে না, বরং আমিই একটু উত্তেজিত হয়ে কথা বলছি। কারন, আমি খুব এম্বেরাসড হচ্ছিলাম মনে মনে।

বললাম, দেখতে হবে, আমার ব্যাগে ছবি আছে কিনা। আমি ব্যাগ চেক করতে গিয়ে প্রথমে বেরিয়ে এলো আমার জাতিসংঘের আইডি কার্ড। পুলিশ সাথে সাথে ঐ আইডি কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখে বল্লো, স্যার আপনি কি জাতিসংঘে কাজ করেন?

বললাম, হ্যা।

এবার তাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে গেলো। এবার তারা আমাকে বল্লো, ওহ স্যার, আপনি আগে কেনো বলেন নাই যে, আপনি জাতীসংগে কাজ করেন, তাহলে তো এতো বিরম্বনা হতো না?

আমাকে এবার তারা এতো সমীহ করে কথা বলা শুরু করলেন যে, তারা যেনো এখন অপরাধি আর আমি পুলিশ।  বলি এবার ব্যাপারটা কোথায় তাদের ধান্দায় ফেলেছিলো।

ব্যাপারটা দাড়িয়েছিলো এই রকমঃ

আমি যখন আমেরিকার ভিসার জন্য এপ্লাই করি, হাইতির কন্সুলেট অফিস আমাকে ডিপ্লোম্যাট ভিসা ইস্যু করেছিল। যেহেতু আমি ডিপ্লোমেটিক হিসাবেই জাতীসংগে কাজ করছি। এটা আমার জানা ছিলো না। আমার ডিপ্লোমেটিক ভিসার কারনে আমার দাড়ানোর কথা ২য় সারিতে। যেহেতু আমি জানতাম না যে আমি ডিপ্লোমেট ভিসায় এসেছি, ফলে আমি এইবারই যেহেতু প্রথম আমেরিকায় এসেছি, ফলে আমি ২য় সারিতে না দাঁড়িয়ে দাড়িয়েছিলাম ১ম সারিতে। এতে ঐ বয়স্ক মহিলার প্রথম সন্দেহ হয় যেহেতু বাংলাদেশী পাসপোর্ট, আবার ভুল জায়গায় দাড়িয়েছি। বয়স্ক মহিলা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন কারন আমার বয়স অল্প, ডিপ্লোম্যাট হবার মতো নয়। এদিকে সাধারনত ডিপ্লোম্যাটরা স্যুট টাই পড়ে এক্সিকুইটিভ হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে চলাচল করেন, আর আমি জিন্সের একটা প্যান্ট তাও আবার ওভারকোট যেটা নিয়েছি সেটা কাউ বয়ের মতো কাধে ঝুলিয়ে দাড়িয়েছি।

এতোগুলি অসামঞ্জস্যতা মহিলা সমন্নয় করতে পারছিলো না। ফলে তাঁর সন্দেহ হবারই কথা। তিনি আমাকে পুলিশের কাছে পাঠিয়েছিলেন ব্যাপারটা ভেরিফাই করার জন্য। কিন্তু এটা তো আর আমার জানার কথাও না আবার দোষও না।

আমি রীতিমত অফেন্ডেড ফিল করছিলাম এবং বললাম, আপনাদের কমপ্লেই রেজিস্টার আনুন, আমি আন্তর্জাতীক পেসেঞ্জার হিসাবে এয়ারপোর্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো। আমি জানতাম, যদি আমাকে এইভাবে হেনস্থা করার জন্য যদি মিলিয়ন ডলারের মামলা করি, সরকার সেটা আমাকে দিতে বাধ্য এবং ইমিগ্রেশন পুলিশেরও শাস্তি হবে। তারা ব্যাপারটা ততক্ষনাত সামাল দেওয়ার জন্য আমাকে অনেক অনুনয় বিনয় করে বল্লো, স্যার, আমরা আসলে বুঝতে পারি নাই ব্যাপারটা। অভিযোগ আপনি করতে পারেন কিন্তু আমরা দুক্ষিত।

তারা তাদের ভুলটা যে একেবারে অমুলক নয় সেটা প্রমান করার জন্য আমাকে অনেক অনুরোধ করে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটা রুমে নিয়ে গেলেন। কফি খাওয়ালেন এবং ঐ রুমে নিয়ে আমাকে যা দেখালেন, তা দেখে আমি হতবাগ। সেখানে বেশ কিছু বাঙ্গালী, পাকিস্তানী এবং ইন্ডিয়ান পেসেঞ্জারকে পিছনে হাত বেধে রাখা হয়েছে জাল ভিসার কারনে। তাদেরকে প্রপার ইন্টারোগেশন করে প্রমান করেছে যে তারা জাল ভিসায় আমেরিকায় ঢোকার চেষ্টা করেছে। এখন তাদেরকে আগামী কাল ফিরতি ফ্লাইটে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

যাই হোক, আমি ব্যাপারটা বুঝেও না বুঝার ভান করলাম। এবার আরো সিনিয়র একজন পুলিশ এসে আমাকে বল্লো, স্যার, আজ সমস্ত কানেক্টিং ফ্লাইট বন্ধ কারন এতো তুষারপাত হচ্ছে যে, কোনো এয়ারপোর্টই ক্লিয়ারেন্স দিতে পারছে না। গত ২৫ বছরেও আমেরিকায় এতো পরিমান তুষারপাত হয় নাই। তাই আজকের এই তুষারপাতের কারনে এর নাম দেওয়া হইয়েছে “উইজার্ড ৯৫”। আগামিকাল বলা যাবে কখন কোন কোন ফ্লাইট যেতে পারবে। ইতিমধ্যে কয়েকটা ফ্লাইট নামার সময় মারাত্তক দূর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। আজকে আপ্নারা যারা আমেরিকায় এসেছেন, তাদেরকে এই এয়ারপোর্টেই থাকতে হবে অথবা আপনাদেরকে রুম দেওয়া হবে, সেখানে আপনি থাকতে পারবেন। তবে স্যার, যেহেতু আপনার সাথে আমাদের একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে, আমরা আপনাকে একটা কিছু দিয়ে অনার করতে চাই যদি অভিযোগ না করেন।

আমি কিছুই বললাম না। এরপর সে আমাকে আরো একটি রুমে নিয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষন পর আমার হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি যে কয়দিন এখানে থাকবেন, এই কার্ডটি দিয়ে যাইই কিনবেন, সব ট্যাক্স মাফ। এটা আমেরিকার ট্রেজারী ব্রাঞ্চ থেকে এবং এস এস ডিপার্টমেন্ট থেকে আপনার জন্য অনার। তারা আরো একটা অনার আমাকে করলেন, সেটা হল তাদের কাছে কিছু ভিআইপি রুম থাকে সেখানে নেক্সট ফ্লাইট না ছাড়া পর্যন্ত আমি থাকতে পারবো। যখন কোনো ফ্লাইট লোগানে যাবে, তারাই আমাকে ডেকে ফ্লাইটে তুলে দেবেন।

দেখলাম, খামাখা কেচাল করে লাভ নাই। আর আমি অভিযোগ করার পর আবার কোন ঝামেলায় পরে যাই তাই কি দরকার এইসব করে যখন তারা আমাকে এতো করে সম্মান দেখাচ্ছেন। আমি কার্ডটি নিলাম। আমি তখনো জানি না এই কার্ডের আসল মাহাত্য কি। তারপরেও সাথে করে নিয়ে গেলাম। কার্ডে আমার ছবি আছে যেটা ওনারা ইমিগ্রেশন করার সময় ওয়েব ক্যামে নিয়েছিলেন।

আমি ইমিগ্রেশন অথোরিটির নির্ধারিত স্যুটে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি ৬ ফুট লম্বা আরেক নিগ্রো পুলিশ অফিসারও আমার সাথে আছেন। তিনি ঐ স্যুটের দায়িত্তে।

আমি পুলিশ অফিসার (নাম তাঁর ফ্রান্সিস) কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি যেনো সিগারেট খেতে পারি এমন একটা রুম দেয়। সে জানালো, এখানে সিগারেট খাওয়া যায় না। কিন্তু একটা করিডোর আছে সেখানে গিয়ে খাওয়া যায়। সে নিজেও সিগারেট খায় বলে মুচকি হেসে দিয়ে বল্লো, You Major must be a bad man like me, because we both smoke.

তখন রাত বেজে গেছে প্রায় বারোটার উপরে। আমি করিডরে দাঁড়িয়ে দেখালাম, বাইরে অনেক সাদা সাদা বরফ। আমার জীবনে আমি কখনো বরফ দেখি নাই। এইই প্রথম। ছুতে চাইলাম, ফ্রান্সিস আমাকে বল্লো, তুমি ওখানে যেও না, প্রচন্ড ঠাণ্ডা। চারিদিকে বিমান বন্দরের আলো কিন্তু এতো বরফ পড়ছে যে, বেশিদূর দেখা যায় না। বরফের বৃষ্টি এইই আমি প্রথম দেখে খুব ভালো লাগছিলো।

ভাবলাম, এবার ভাইয়াকে একটা ফোন করে বলি যে, আমি জেএফকে এয়ারপোর্টে আটকা পড়েছি, চিন্তা করো না। কারন ইতিমধ্যে আমার সিডিউল অনুযায়ী আমার লোগানে থাকার কথা। অনেকবার চেষ্টা করেও ভাইয়াকে পেলাম না। বারবার ভুল নাম্বারে চলে যাচ্ছে ফোন। ওপাশে যিনি ফোন ধরছেন, তিনি একসময় বিরক্ত হয়ে কি যেনো বলছিলো আমাকে, সেটা আমি ভালোমত বুঝতেও পারছিলাম না। কিছু আমেরিকানরা ভালোমত ইংরেজীও বলতে পারে না। নোয়াখালি টাইপের ইংরেজী বললে কি আর আমি বুঝবো? সে মনে হয় আমেরিকান নোয়াখালির লোক।

যাক, রাতে আর ঘুমানোর প্ল্যান করছিলাম না যদিও আমার রুম আছে। বাইরেই ফ্রান্সিসের সাথে প্রায় ১ ঘন্টা সিগারেট খেয়ে গল্প করে কাটিয়ে দিলাম। ভালোই লাগছিলো। সে আসলে আমেরিকার অরিজিনাল লোক নয়। সে জ্যামাইকার মাইগ্রেটেড অফিসার। প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁর পরিবার এখানে মাইগ্রেট করেছিলো। অনেক গল্প বল্লো। তাঁর ছেলেমেয়েদের কথা। তাঁর পরিবারের কথা। আর আমি বললাম, আমার আজকের ইমিগ্রেশনের বাজে ইন্সিডেন্টের কথা। সে খুব হাসলো। বল্লো, তুমি তো ইচ্ছে করলে অভিযোগ করলে বেশ কিছু কম্পেন্সেশন পেতে পারতা। আমেরিকা এইসব অভিযোগকে খুব ভয় পায়। ফ্রান্সিস জানালো, তাঁর ডিউটি আছে, যেতে হবে।

ফ্রান্সিস যাবে এমন সময় একজন মহিলা কোথা থেকে উদয় হয়ে আমাকে সিগারেট খেতে দেখে লাইটারের জন্য এগিয়ে এলো। বুঝলাম, সে সিগারেট খায়। এটাও আমার কাছে নতুন একটা অভিজ্ঞতা। মহিলারা স্মোকার। সেও আটকা পড়েছে এই উইজার্ড-৯৫ এ। যাবে ডেনভার। আমি এখানের কোনো রাজ্যই চিনি না।

ফ্রান্সিস চলে গেলো আর বলে গেলো, সিগারেট খাওয়া হয়ে গেলে যেনো রুমে চলে যাই, ওখানে কিছু ড্রাই ফুড আছে, ইচ্ছে করলে আমি সেসব বিনে পয়সায় খেতে পারি, কোনো বিল উঠবে না। আর এও বলে গেলো, ফ্লাইট চালু হলে সে আমাকে নিয়ে যাবে, কোনো অসুবিধা নাই। এখন মনে হচ্ছে, ইমিগ্রেশনে ঝামেলা হয়ে ভালোই হয়েছে। সুফল পাচ্ছি।

মহিলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে আর আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাবো, কি করি, এইবারই আমেরিকায় প্রথম কিনা ইত্যাদি গল্প জুরে দিলো। যখন সে শুনলো আমি মেজর এবং জাতীসংগে কাজ করছি, তিনি একটু খুশী হয়েছেন বলে মনে হলো। কারন তাঁর একটা ছেলে আছে যে, আমেরিকার নেভিতে কাজ করে। বর্তমানে সে মালয়েশিয়া আছে। মহিলার নাম লিন্ডা।

আমি বললাম, আপনার এতো বড় ছেলে আছে যে কিনা নেভীতে কাজ করে? আপনাকে দেখে তো সে রকম মনে হয় না?

সে বেশ খুশি হলো মনে মনে যে, আমি তাকে অনেক ইয়াং বলে ভাবছি বলে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, বলেন তো, আমার বয়স কত হবে?

মনে মনে ভাবলাম, পৃথিবীর সমস্ত মহিলারা তাদের বয়স বাড়তে দেয় না। বয়স যাই হোক, সে সেটা গোপন রেখেই কম বয়সটা বলে থাকে আর কেউ তাকে ইয়াং বলুক সেটাই চায়। এটা হোক বাঙ্গালী মেয়ে আর হোক আমেরিকার ইংরেজী বলা কোন নারী। আমি চিন্তা করলাম, যদি উনার ছেলে নেভীতে কাজ করে, তাহলে কমপক্ষে ছেলের বয়স ২০। আর এই মহিলা যদি অন্তত ২০ বছর বয়সেও বিয়ে করেন, তাহলে মহিলার বয়স এখন প্রায় ৪০!। আমি বললাম, আপনার বয়স হয়তোবা ৪০ হবে।

ওরে বাপ, তাঁর চেহাড়াই বদল হয়ে গেলো। মনে হলো তাকে ৪০ বলায় তিনি ক্ষিপ্ত। হয়ত আশা করেছিলো আমি ২৫ বা ৩০ বল্বো।

লিন্ডা বল্লো, আমি কি এতোই বুড়া দেখাচ্ছি মেজর?

বুঝলাম, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু এখন তো আর শোধরানোর কোনো পথ দেখি না। আমি বললাম, যদিও তোমার বয়স ৪০ হতে পারে কিন্তু তোমাকে ৩০ এর বেশী লাগে না।

খুশী হলো না। সিগারেট খাওয়া শেষ হলেই লিন্ডা আমাকে কোনো প্রকার সম্মোধন ছাড়াই বিদায় নিলো। আর বল্লো, ধন্যবাদ লাইটারের জন্য। বাই। বলে গট গট করে তাঁর হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে চলে গেলো। একবার পিছন ফিরে তাকালোও না। হায়রে মহিলাদের বয়স। 

আরেক অভিজ্ঞতা হলো। বয়স যাই হোক, আমি আর কোনো মহিলাকে ৩০ এর বেশী বলব না বলে শিক্ষা পাইলাম। তাঁর বয়স ৯০ হলেই কি আর ৩০ হলেই কি। আমার তো কিছু যায় আসে না। কিন্তু খুশী তো করা গেলো কাউকে!! এইবা কম কি। কিসের পাল্লায় পড়লাম রে ভাই। প্রতি ক্ষনে ক্ষনে অভিজ্ঞতা বাড়ছে।

রাত তিনটার দিকে ফ্রান্সিস এলো রুমে। এসেই বল্লো, মেজর, তুমি কি এখন যাবা? একটা ফ্লাইট যাচ্ছে বোষ্টনে। লোকাল ফ্লাইট। ইথিউপিয়ান এয়ারলাইন্স। যদি যাও তাহলে ১০ মিনিটে রেডি হও, আমি নিয়ে যাবো। বললাম, এতো রাতে গিয়ে কি করবো। সকালে কোনো ফ্লাইট নাই?

ফ্রান্সিস বল্লো, সেটা এখনো ডিক্লেয়ার দেয় নাই। আমার মনে হয় তোমার যাওয়া উচিত কারন পুরু বিমান বন্দরে যে পরিমান যাত্রী আটকা পড়েছে, সকালের ফ্লাইট না ধরে তুমি বরং লোগানে গিয়ে নেমে যাও। আমরা তোমাকে ট্যাগ করে দেই যদি ওখানে রেষ্ট করার জন্য কোনো রুম লাগে সেটাও পাবা। আমরা তোমাকে একটা স্লিপ দিয়ে দেবো, সেটা লোগানে দেখালেই তুমি একটা ভালো রুম পাবে যদি চাও। সিদ্ধান্ত নিলাম, চলেই যাই। ফ্রান্সিস আমাকে চট করে একটা এয়ার ট্যাক্সিতে করে একেবারে বিমানের সামনে নিয়ে গেলো। ব্যাগপত্র ফ্রান্সিস নিজেই ক্যারি করে নিয়ে গেলো। আমি ইথুপিয়ান বিমানে উঠে গেলাম।

ফ্রান্সিসকে বিদায় দিতে আমার কষ্ট হচ্ছিলো, হয়তো ওর সাথে আমার আর দেখা হবে না। হ্যান্ডশেখ করতে গিয়ে বললাম, ফ্রান্সিস, তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে মনে রাখবো। ফ্রান্সিস হেসে দিয়ে বল্লো, এটাই মজা। মিসিং পিপল সো সেডলী। তুমিও ভালো থেকো। একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়ে দিলো যদি কখনো এখানে আবার আসি, যেনো ওর মোবাইলে কল করি। কার্ডটা যত্ন করে পকেটে রাখলাম। আমি এখন প্লেনে বসে পড়েছি। অনেক পেসেঞ্জার, যদিও লোকাল প্লেন কিন্তু বেশ বড়। বেশীরভাগ মানুষই মনে হচ্ছে লোগানের বাসিন্দা। আমি একজন বয়স্ক মহিলার পাশে বসেছি। বয়স তাঁর প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি।

প্রায় আরো ৪০ মিনিট ফ্লাই করে লোগানের উপর দিয়ে প্লেন হোবার করছে। এখানেও নামতে মনে হয় দেরী হবে। অনেক বরফে জমে আছে বিমান বন্দর। পাইলট জানালেন, আমরা নামতে নামতে আরো ১৫ মিনিট দেরী হবে।

আমরা শেষতক খুব নিরাপদেই নামলাম। লাগেজ নিতে যেতে হবে অনেক দূরে। প্রায় ১ কিলোমিটার দূর আমাদের লাগেজ ডেলিভারী পয়েন্ট। আমরা নেমেছি সি ব্লকে। একেকটা ব্লক এতো বড়? আমাদের জিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টও তো ওদের একটা ব্লকের সমান না!!

লাগেজ নিলাম। এবার ভাইয়াকে ফোন করা উচিত। এয়ারপোর্টেই টেলিফোন বুথ আছে। পঞ্চাশ সেন্ট ড্রপ করে কথা বলা যায়। আমার কাছে মাত্র একটা কয়েন আছে। ডলার আছে কিন্তু আমার কাছে তো আমেরিকার কয়েন নাই। এদিকে কয়েন ছাড়া ফোন করা সম্ভব না। যাই হোক, কোথায় কয়েন পাবো সেটাও জানি না। যে কয়েনটা ছিলো সেটা দিয়েই চেষ্টা করলাম। ঐ একই সমস্যা। ভুল নাম্বারে ফোন চলে যাচ্ছে এবং একই বাসায় যাচ্ছে। আমি ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতেছিনা, আরে বাবা, যদি ভুল নাম্বারেই যাবে, তাহলে একই নাম্বারে যাচ্ছে কেনো?

এইবার ঐ পাশের ভদ্রলোক মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারছে যে, আমি কিছু একটা ভুল করছি। সে আমাকে বল্লো, আমি আসলে কোথায় ফোন করছি? এবার তাঁর কথাগুলি আমার কাছে ক্লিয়ার মনে হলো। আমি বললাম, এটা কি এই নাম্বার?

সে বল্লো, হ্যা, এটা এই নাম্বারই যেটা আমি বলেছি।

বললাম, আমি আসলে আমার ভাইকে ফোন করছিলাম যিনি থাকে বোস্টনে। এবার তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন। বললেন, আপনি যেখানে আছেন, সেটা লোগান, যদিও ম্যাসাচুসেট এর অধীনে। আপনি আপনার নাম্বারের সাথে একটা ১ যোগ করেন, তারপর ডায়াল করেন, আপনি আপনার ভাইকে পেয়ে যাবেন। যদি ১ যোগ না করেন, তাহলে বারবার আমার নাম্বারেই কল আসতে থাকবে। আর এরইমধ্যে আমার কয়েন শেষ, লাইন কেটে গেলো। আমার কাছে আর কোনো কয়েনও নাই। কি মুশকিল। ভালো লাগলো অন্তত এটা জেনে যে, এবার আর ভুল হবে না। ভাইয়াকে ফোনে অন্তত পাওয়া যাবে। 

কোথায় পাই কয়েন? একটা দোকানে ঢোকলাম এইভেবে যে, কিছু কিনি এবং কয়েন নেই। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হচ্ছে না। কয়েনের যোগাড় হচ্ছে না। হটাত দেখলাম, একজন পুরুষ ক্লিনার ফ্লোর ক্লিন করছে। ভাবলাম, তাকে জিজ্ঞেস করে দেখি সে আমাকে কিছু কয়েন দিতে পারে কিনা। লোকটিকে বলার সাথে সাথে সে বল্লো, তাঁর কাছে ৩ ডলার পরিমান কয়েন আছে। সেটা সে ৫ ডলার হলে দিয়ে দেবে। আরেক অভিজ্ঞতা। সব দেশের ৪র্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের এই এক সমস্যা। ধান্দাবাজী। মেনে নিলাম। কারন আমার কাছে এক টাকাও যা, এক ডলারও তা সেটাই মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত। আমি তাকে ৫ ডলারের একটা নোট দিয়ে ৩ ডলার সম পরিমাণ কয়েন নিলাম।

আমি ঐ ভদ্রলোকের কথা মতো ভাইয়ার বাসার নাম্বারের আগে ১ যোগ করে যেই না ডায়াল করেছি, অপর প্রান্ত থেকে আমার ভাবী ফোন ধরলেন। তিনি এতোই অবাক হলেন আমার ফোন পেয়ে যেনো কেদেই দিলেন। ভাবী বললেন, তুমি বেচে আছো? আমি বললাম, কেনো? আমি মরবো কেনো? কি ব্যাপার?

ভাবী বললেন, আরে ভাই, তুমি যেই প্ল্যানে লোগানে নামার কথা কাল, কেএলএম বিমান, সেটা নামার সময় ক্রাশ করেছে, বহু লোক চরম ভাবে আহত/নহত হয়েছে, কেউ কেউ বলছে মারাও গেছে এবং এখনো রেস্কিউ চলছে। তোমার ভাই তো তোমাকে খুজে খুজে পাগলের মতো অবস্থা। তুমি এখন কোথায় আছো?

আমি বললাম, আমি তো সি ব্লকে আছি। আর আমি তো জানি না যে, কেএলএম ক্রাশ করেছে। কোনো এক কারনে আমি তো ঐ ফ্লাইট মিস করে পরে আমেরিকান এয়ারলাইন্সে এসেছি জেএফকে হয়ে। এখন ইথুপিয়ান এয়ারলাইন্সে একটু আগে নামলাম। আমি ভালো আছি। এবার বলেন, ভাইয়াকে পাবো কিভাবে?

ভাবী এতোটাই আবেগে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন আমার সাথে কথা বলে যে, ভালোমতো কথাই বলতে পারছিলেন না। মরা মানুষের খোজ পাওয়া, চারটিখানি কথা তো আর না। ভাবী বললেন, তুমি যেখানে আছো সেখানেই থাকো, কোথাও যাবে না, আমি তোমার ভাইকে জানাচ্ছি। যেহেতূ তোমার কাছে মোবাইল নাই, তুমি কিন্তু ওখানেই থাকো। আর পারলে একটু পরে আমাকে তোমার কারেন্ট লোকেশানটা জানাও।

প্রায় ২০ মিনিট পর ভাইয়া হাজির। কি যে ভালো লাগলো ভাইয়াকে পেয়ে। ভাইয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, অনেক প্রেসারে ছিলাম তোকে নিয়ে। যাক আল্লাহর রহমত যে, তোকে ভালোভাবে পেলাম। তুই এখানে দাড়া, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।

ভাইয়াকে নিয়ে আমি বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। ভাইয়া নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। দুই ভাই, অনেক গল্প করতে করতে গাড়িতে আসছিলাম। চারিদিকে বরফ, রাস্তায় অনেক গাড়ি দিয়ে লোকজন রাস্তা ক্লিয়ার রাখার চেষ্টা করছে। প্রায় ৪০ মিনিট ড্রাইভ করে আমি আর ভাইয়া ভাইয়ার বাসার এসে হাজির হইলাম।

শান্তি। এক মাস থাকবো এখানে। মাসুদের সাথে দেখা হলো, ইউসুফের সাথে দেখা হলো। তখন বেলা প্রায় ১১টা দিন কিন্তু সূর্য মামার কোনো খবর নাই। চারিদিকে বরফের বৃষ্টি। গাছের চেহাড়া দেখলে মনে হয়, বরফের গাছ, আশেপাশের সবকিছু বরফে ঢেকে আছে। কি দেশ রে বাবা।

সারাদিন গল্প করলাম, বাইরে যাওয়ার কোনো স্কোপ নাই। ঘরের ভিতরে হিট করে ঘর গরম রাখা হচ্ছে। আমি আর মাসুদ এক রুমে থাকার প্ল্যান করেছি। ইউসুফ অন্য ঘরে। পুরু ঘরটাই কার্পেটে মোড়ানো। হাইতিতে গরম অথচ এখানে এসে পড়েছি উইজার্ড-৯৫ এর পাল্লায়। মানে শীতের দেশ।   

১৫/১০/১৯৯৫-আলগোর এবং তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ টিপারের ভিজিট

কয়েকদিন যাবত অবর্ননীয় ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছি। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর হাইতিতে ভিজিটে আসবেন। সাথে আল গোরের স্ত্রীও আসবেন, এই জন্য। চারিদিকে অনেক কাজ, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন প্রকারের নিরাপত্তা বিষয়ক ট্রেনিং, সেমিনার এবং রিহার্সেল, ইত্যাদি। ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের নিরাপত্তার জন্য চারটি লেয়ার নির্ধারন করা হয়েছে। ১ম লেয়ারে থাকবেন আমেরিকার ঈগল বেসের মিলিটারী, ২য় স্তরে থাকবেন আমাদের বাংলাদেশের সামরিক সদস্যগন, ৩য় স্তরে থাকবেন ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্থান বাহিনী, আর ৪র্থ স্তরে থাকবেন সিভিলিয়ান পুলিশ প্লাস এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির লোকজন। আমি কিউ আর এফ হিসাবে এস এস (সিক্রেট সার্ভিস) এর সাথে ১ম স্তর এবং ২য় স্তরের সাথে থাকবো। অর্থাৎ আল গোর যখন বিমান থেকে নাম্বেন, তখনো আমরা অর্থাৎ কিউ আর এফ দল তাঁর সাথে থাকতে পারবো। ভাইস প্রেসিডেন্টের গাড়ী বহরের সামনে পিছনে এস্কর্টে থাকবে বাংলাদেশের  নিরাপত্তা বাহিনী। এর সাথে সিক্রেট সার্ভিসের লোকজনও।

আজ সকাল ৯টার সময়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট হাইতির বিমান বন্দরে নামলেন। সকাল থেকেই নিরাপত্তা খুবই জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত ফ্লাইট গুলির উপর অনেক করাকড়ি আরোপ করা হয়েছে। যাত্রীদের ইমিগ্রেশনে একেবারে কঠিন চোখ রাখা হচ্ছে। বাথরুম, এয়ারপোর্টের অলি গলি, লবি, সব জায়গায় কঠিন নজরদারী। হ্যান্ড লাগেজ গুলি চেক করা হচ্ছে আগের থেকে আরো বেশী। যাত্রীদের চেকিং করায় বেশী সময় নেওয়াতে ফ্লাইট গুলি, বিশেষ করে আউট গোয়িং ফ্লাইট গুলির যাত্রা বিলম্ব হচ্ছে। অন্যদিকে ইনকামিং ফ্লাইট গুলিরও যাত্রীদেরকে একটা সরল রেখায় যেতে বাধ্য করা হচ্ছে যাতে যাত্রীরা এদিক সেদিক না যায়। আমরা এরই মধ্যে কয়েক রাউন্ড দিয়ে ফেলেছি সব জায়গায়। সিসি ক্যামেরাগুলি চেক করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যেনো কোনো একটা জায়গাও গ্যাপ না থাকে। ফুল কাভারেজ। এয়ারপোর্টের  ছাদেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে। যে সব জায়গায় আগে সংরক্ষিত ছিলো না, সহজেই কেউ যাতায়ত করতে পারতো, সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে কথা।

আমাদের কাছে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের এবং তাঁর স্ত্রীর ভিন্ন ভিন্ন ভিজিট সিডিউল দেওয়া আছে। ম্যাডাম এর নাম এলিজাবেদ টিপার। ভাইস প্রেসিডেন্ট বিমান বন্দরে নেমেই একটা বক্তৃতা দিবেন। তারপর তিনি চলে যাবেন প্রেসিডেন্ট এরিস্টিডের প্যালেসে। সেখানে তিনি এক বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা ছোট খাটো ভাষন রাখবেন এবং হাইতির কেবিনেট সদস্যদের সাথে দি-পাক্ষীয় আলোচনা করবেন। কি নিয়ে আলোচনা করবেন তাঁর এজেন্ডা আমাদের কাছে নাই। অন্যদিকে ম্যাডাম এলিজাবেথ টিপার হাইতির একটি শহর সিটি সোলেতে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ভিজিট করবেন। স্বাস্থ্য সেন্টারের নাম ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের স্ত্রীর নামের সাথে মিল আছেঃ এলিজাবেথ স্বাস্থ্য সেন্টার।

ঠিক ১১ টায় ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের অফিশিয়াল বিমান হাইতির এয়ারপোর্টে এসে নামলো। চারিদিকে সুনসান। কোনো দৌড়াদৌড়ি নাই। যার যার জায়গায় তারা কাজ করছেন। বিমানের দরজা খোলার পর আল গোরের দেহরক্ষীগন প্রথমে অস্ত্রসহ বিমানের গেট খুললেন এবং প্রায় ১০ মিনিট অব্জার্ভ করলেন পরিস্থিতি। অতঃপর ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর এবং তাঁর স্ত্রী একে একে বিমান থেকে বেরিয়ে এলেন। বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করা হলো না, সারাক্ষণ গেট খোলাই রাখা হলো। গেটে দুইজন শসস্ত্র পাহারা মূর্তির মতো দাড়িয়েই রইলেন।

বিমানের সামনেই একটা স্টেজ করা হয়েছিলো। যেখান থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর সবার উদ্ধেশে ভাষন দিলেন। আমরা খুব কাছ থেকে সেই ভাষণ শূনলাম কিন্তু সব সময় নজর ছিলো চারিদিকে যেনো কোনো অঘটন না ঘটে। এই সময় সমস্ত যাত্রিদের মুভমেন্ট সম্পুর্নরুপে বন্ধ করা হয়েছিলো। কারো বাথরুম দরকার হলেও এলাউ করা ছিল নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র আউত গেটে কয়েকটা ল্যাভাটরি স্থাপন করা হয়েছিলো, তাও আবার নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত ছিলো। কারো অধিক জরুরী বাথরুমের প্রয়োজনে সেই আউটদোর ল্যাভাটরি গুলি ব্যবহার করতে পারবে।

প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর সবার উদ্দেশ্যে ভাষন দিলেন। এই ভাষনের সময় হাইতির প্রেসিডেন্ট হাজির ছিলেন না। আল গোর ভাষন শেষে গাড়িতে উঠবেন। ম্যাডাম টিপার ও তাঁর জন্য ভিন্ন মটরক্যাদ তৈরী ছিলো, তিনি আলাদা উঠবেন। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়।

আমি কখনো এই ধরনের নিরাপত্তায় কাজ করি নাই। ফলে প্রতিটি কাজ, ড্রিল, এবং স্তর আমার কাছে ছিলো নতুন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর যে গাড়িতে উঠবেন ঠিক সেই রকমের আরো তিনটা গাড়ি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলো। তিনি কোনটায় উঠবেন সেটা আমরাও জানি নাই। এটা জানে শুধু সিক্রেট সার্ভিসের লোক। তিনটা গাড়িতেই আমেরিকার ফ্ল্যাগ চড়ানো। একই ব্রান্ডের, একই চেহাড়া, একই কালার, সব কিছু এক। কালো গ্লাসে মোড়ান জানালা। বুলেট প্রুফ গাড়ি। যেই মুহুর্তে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর ভাষন শেষ করলেন এবং গাড়িতে উঠার জন্য রেডি হলেন, অমনি দেখলাম, একোতা বলয় সৃষ্টি হয়ে গেলো। এবং খুব দ্রুত বলয়টা তৈরী হয়ে গেলো। এই চক্করের মধ্যে আমি এতো কাছে থেকেও বুঝতে পারলাম না ভাইস প্রেসিডেন্ট কোন গাড়িটায় উঠলেন। উঠার সাথে সাথে গাড়ির সামনে থাকা আমাদের এস্কর্ট এবং সিক্রেট সার্ভিসের দেওয়া এস্কর্ট গাড়ি এতো দ্রুত চলে গেলো যা একটা চমকের মতো। ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর হাইতির প্রেসিডেন্ট এরিস্টিডের প্যালেসে চলে গেলেন। থাকলেন ম্যাডাম টিপার।

ম্যাডাম টিপারের বেলায় ও ব্যাপারটা প্রায় একই রকমের ঘটলো। তাঁর সাথে দুইজন খুব সুন্দুরী মেয়ে বডি গার্ড হিসাবে সার্বোক্ষনিক থাকেন। আমি দেখলাম একজনমহিলা বডি গার্ড সবার সামনেই তাঁর উপরের জামাটা খুলে ফেললেন, কালো ব্রা দেখা যাচ্ছে, আর উপরের জামার পরিবর্তে এইবার তিনি একটা অস্ত্র সহহ জ্যাকেট পড়ে এতো দ্রুত ম্যাডামের গাড়িতে উঠে গেলেন যেনো বিদ্যুৎ। মেয়েটার বয়স সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ২৬ এর মধ্যে হবে। আমেরিকান মহিলা। ম্যাডাম প্রথম গাড়িটাতেই উঠলেন সেটা আমি ক্লিয়ার বুঝতে পারলাম।

ম্যাডাম টিপারকে নিয়ে আমাদের ব্যান কনের মেজর ফিরোজ এস্কর্টের কাজ করলো। আমরা পিছনের গাড়িতে ম্যাডামকে ফলো করছি। যাবো সিটি সোলের একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ম্যাডাম ওখানে হেলথ সেন্টার দেখবেন, পরিদর্শন করবেন। সিটি সোল খুব বেশী দূর নয়। মাত্র ৪০ মিনিটের ড্রাইভ।

সিটি সোলে যাওয়ার পথে ঠিক সিটি সোলে ঢোকার পথেই হটাত দেখা গেলো বেশ অনেকগুলি জনতা রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে টায়ার পুড়িয়ে রেখেছে। ওরা ম্যাডাম টিপারের আগমনে আন্দোলন করছে এই কারন দেখিয়ে যে, ওদের জন্য যে টাকা পয়সা বরাদ্ধ হয়েছে, সেটা তাদের জন্য খরচ করছে না এরিস্টিড প্রশাসন। এর তীব্র প্রতিবাদে তারা ম্যাডাম টিপারের গাড়িতে আক্রমন। অনেক ইট পাটকেল ছুড়ে স্বাভাবিক এস্কর্ট গাড়ির বেশ কয়েকটা কাচ ভেঙ্গে ফেল্লো। আমাদের গাড়িও বুলেট প্রুফ (হাম্বি গাড়ী) এবং অন্তত দুইটা মাইন বিস্ফোরন থেকে রেহাই পায় এমন গাড়ি। মেজর ফিরোজ সেই ধরনের একটা গাড়ি এস্কর্টের কাজ করছিল। হেসিয়ান লোকজন চাচ্ছিলো ম্যাডাম টিপারকে পথে থামিয়ে দিয়ে কিছু একটা আদায় করতে। আমরা আসলে এই খবরটা পুর্বে জানতেই পারি নাই যে, সামনে এই ধরনের একটা প্রতিবাদ আন্দোলন হতে পারে। ব্যাপারটা একেবারেই স্পন্টিনিউয়াসলি ঘটে গেলো।

মেজর ফিরোজ আমাদের ওয়াকিটকিতে জানালো যে, সামনে বেশ গেঞ্জাম, স্থানীয় লোকজন রাস্তায় টায়ার পুড়িয়ে রাস্তা ব্লক করে রেখেছে এবং ভিভি আইপির গাড়িতে ঢিল ছুড়ছে। কি করা উচিত এখন? সবচেয়ে বড়সমস্যা হলো, এই ভি ভি আই পি কে নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের নাই এবং নেওয়াও ঠিক না। কিন্তু এটাও বুঝতেছি যে, বেশীক্ষন এই অবস্থায় আটকে থাকলে সমস্যা আরো বেড়ে যাবে। এই খান থেকে যে কোনো উপায়েই বের হয়ে যাওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

মেজর ফিরোজ সহসাই তাঁর নেতৃীত্তে টায়ার পোড়া আগুনের উপর দিয়েই বুলেট প্রুফ গাড়ি চালিয়ে পার হয়ে যায়। সাথে অন্যান্য গাড়িগুলিও। এটা ছিলো খুবই একটা রিস্কি ব্যাপার। সফল হওয়াতে সবাই বাহবা দিলেন ঠিকই কিন্তু কোনো মেজর অঘটন ঘটে গেলে ব্যাপারটা দাড়াতো মারাত্তক। ম্যাডাম টিপার ব্যাপারটা খুবই উপভোগ করেছে বলে পরে সব বাংলাদেশীদেরকে প্রশংসা করেছেন। ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয় নাই। ম্যাডাম টিপার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যাওয়ার পর সেখানেও অনেক লোকজন বিদ্রোহ করছিলো। তিন জন উত্তেজিত লোক তো কম্পাউন্দেই ঢোকে গিয়ে গাড়িতে ইট পাটকেল মারতে শুরু করে। টিয়ার গ্যাস ছুড়তে হলো বিদ্রোহী জনতাকে সামাল দিতে।

কিছুক্ষন পর হেসিয়ান বিদ্রোহী জনতারা আমেরিকার বিরুদ্ধেই স্লোগান দেওয়া শুরু করে এই বলে যার অর্থ এই রকম যে, গো হোম ইয়াংকি, গো। ইউ এন সদস্যদের গাড়িতেও তারা অনেক ইট পাটকেল ছুড়ে।

যাই হোক, খুব অসস্থিতেই গেলো দিনটা। কিন্তু আমাদের দেশের মিলিটারী সদস্যদের প্রশংসায় সিক্রেট সার্ভিস, ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর এবং ম্যাডাম টিপার অনেক মেসেজ দিলেন। এও বলে গেলেন যে, দেশে গিয়ে এই রকম একটা সাহসী পুর্ন কাজের জন্য “লেটার অফ এপ্রিশিয়েশন” ইস্যু করবেন। আমি জানি না সেটা আবার কি ধরনের কি।

যাই হোক, জাতিসংঘের মহাসচিব ভুট্রুস ঘালি গতকাল হাইতিতে এসেছেন। আজ বিকেলে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর এবং মহাসচিব দুজনেই চলে গেলেন। একটা ব্যস্ত দিন গেলো সব মিলিয়ে।  এয়ারপোর্টেই এই দুই ভিভিআইপি প্রায় ৩০ মিনিট একত্রে কি কি আলোচনা করলেন, তারাই জানে। এই সময়ে আমাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিলো এতোটাই কঠিন যে, কোনো কেউ এর ভিতর দিয়ে পার পেয়ে যাবার মতো নয়।

১৪/১০/১৯৯৫-মহাসচিব ভুট্রুস ঘালির হাইতি পরিদর্শন

আগে থেকেই দুটো খুবই ভিভিআইপির ভিজিট প্রোগ্রাম দেওয়া হয়েছিলো। প্রথমটা হলো জাতিসংঘের মহাসচিব ভুট্রুস ভুট্রুস ঘালি (সস্ত্রীক, লিয়া মারিয়া) এবং আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর (সস্ত্রীক, এলিজাবেথ টিপার)। অনেক প্রকারের কাজের মধ্যে এই দুটি ভিজিট নিয়ে প্রায় সব গুলি কন্টিনজেন্ট খুব ব্যস্ত। তাদের সিকিউরিটি বিশেষ করে। আজ দুপুরের দিকে জাতিসংঘের মহাসচিব ভুট্রুস ঘালি এবং তাঁর স্ত্রী লিয়া মারিয়া হাইতিতে এসেছেন। এই প্রথম আমি জাতিসংঘের মহাসচিবকে সরাসরি জীবন্ত চোখে দেখলাম। বেশ বয়স্ক লোক। তাঁর স্ত্রীও অনেক বয়স্ক। মহাসচিব ভুট্রুস ঘালি মিশরের লোক। প্রায় ৭০ এর উপর তাঁর বয়স।

আমাদের এস আর এস জি (Special Representative of Secretary-General) লাখদার ব্রাহিমী মহাসচিবকে সাদরে এয়ারপোর্টে রিসিভ করলেন। ভুট্রুস ঘালী এয়ারপোর্টে নেমেই সোজা চলে গেলেন হাইতিতে অবস্থিত ইউ এন হেড কোয়ার্টারে। সেখানে আমাদের যাওয়ার কোনো দরকার ছিলো না তবে আমাদের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ফরিদ স্যার গেলেন।

আগামিকাল আবার আসবেন আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর। আমরা বিকালে তাঁর আগমনে অনেক প্রিপারেশন নিতে হলো। কোথায় কে কিভাবে নিরাপত্তা বিধান করবে সেতা একবার রিহার্সেল হলো। ব্যাপারটা মনে হচ্ছে যে, ভুট্রুস ঘালীর জন্য যে সব নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে, তাঁর থেকে অনেক বেশী গুন নিরাপত্তা বলয় তৈরী এবং সে মোতাবেক প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই।

১০/ ১০/১৯৯৫-হাইতিতে মায়ের ডাক

হাইতিতে মিশন করতে এসে প্রায় প্রতিদিনই ইদানিং ঝুকিপূর্ন এলাকায় পেট্রোলিং করতে যেতে হচ্ছে। হাইতির সাধারন জনগন বাংলাদেশের কন্টিঞ্জেন্টের উপরই মনে হচ্ছে একটু ভরষা রাখতে পারছে আর বাকী ব্যাটালিয়ন গুলির (যেমন, পাকিস্থান ব্যাটালিয়ান, ইন্ডিয়ান ব্যাটালিয়ান, ক্যানাডিয়ান কন্টিনজেন্ট, অথবা ঈগল ক্যাম্প নামে আমেরিকান কন্টিনজেন্ট) উপর তেমন একটা ভরষা করতে পারছে না। ফলে এখানে যিনি এস আর এস জি (স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ অফ সেক্রেটারি জেনারেল) হিসাবে দায়িত্বরত আছেন, মিষ্টার লাখদার ব্রাহিমী, তিনি সব ফোর্সের সাথে বাংলাদেশের কাউকে না কাউকে অংশ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সে মোতাবেক, আমি এখন কিউ আরএফ (কুইক রি-একশন ফোর্স) এর একজন। আমার কাজ হচ্ছে যেখানেই কোনো সমস্যা শোনা যাবে, তাতক্ষনিকভাবেই আমার দল নিয়ে ক্যানাডিয়ান, অথবা আমেরিকান অথবা অন্যান্য ফোর্স কে অগম্যান্ট করা। জাগোয়ার রেডি, গাড়ি সব সময় স্ট্যান্ডবাই থাকে। আমরাও মোটামুটি এনটিএম ১০ (অর্থাৎ ১০ মিনিটের মধ্যে নোটিশ টু মুভ) অবস্থায় থাকি।

গতকালও একটা অপারেশনে গিয়েছিলাম।  জায়গাটার নাম ডেলমাস। খুব ঘন বসতি একটা জায়গা। অনেকটা বস্তির মতো। লোকজন ও খুব ডিসিপ্লিন না। সারাক্ষন নেশার মধ্যে থাকে অধিকাংশ লোক। এটা আসলে একটা মাদকের আড্ডাখানা আর কুখ্যাত লোকদের আশ্রয়স্থল। গতকালের গোপন খবরে জানা গেলো যে, এখানে অভ্যুথানকারী জেনারেল সেড্রাসের একটা বাহিনী কুছু আর্মস ডিল করবে।

সকালে আমি ঈগল ডেনে গেলাম ব্রিফিং ছিলো। বেশ কিছু গোপন তথ্য আমাকে এবং আমার অন্যান্য দল সমুহ যারা কাজ করবে, তাদের সবাইকে জানানো হলো। নির্দেশ ছিলো যে, যদি কেউ আমাদেরকে হুমকীর মধ্যে ফেলে দেয়, তাহলে যেনো আমরা সাথে সাথে ফায়ার ওপেন করি। মিশনে আসার পর আজ অবধি কখনো এই রকম একটা আদেশ পাই নাই যে, আমরা আমাদের ফায়ার আর্মস দিয়ে কাউকে গুলি করতে পারি। আজ পেলাম। ফলে মনে হলো অপারেশন টা খুব একটা সাধারন অপারেশন নয়।

সকাল ১১ তাঁর দিকে প্রথমে আমি আমার টিম নিয়ে ডেলমাসের উদ্ধেশ্যে পজিশন নিয়ে নিলাম। তাঁর ৫/৭ মিনিট পর পজিশন নিলো পাকিস্থান বাহিনীর একটা দল। আমাদের সবার এরিয়া ভাগ করা ছিলো। কোথায় আমেরিকানরা থাকবে আর কোথায় অন্যান্য টিম থাকবে। অপারেশনের মেইন দায়িত্তে ছিলো ঈগল বেসের। মানে আমেরিকানদের আন্ডারে। ওরা অনেক সতর্ক থাকে, কোনো কিছুই হেলাফেলা করে এগোয় না। ব্যাপারটা যেনো এমন, যে কোনো মুহুর্তে যে কোনো ঘটনায় তারা যেনো কুইক পালটা রি-একশনে যেতে পারে ঠিক তাই।

আমি একটা একতলা ভাংগা চুড়া বিল্ডিং এর ঠিক নীচে অস্ত্র আর ওয়াকি টকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার থেকে প্রায় ১০ গজ দূরে আমাদের বাঙ্গাদেশি একজন সার্জেন্ট রুহুল আমাকে কাভার দিচ্ছে। আমার আরেক পাশে প্রায় ৩/৪ গজ দূরে আমার ওয়্যারলেস অপারেটর দাঁড়িয়ে সারাক্ষন এদিক সেদিক লক্ষ্য রাখছে। হাইতির আবহাওয়া সব সময়ই গরম থাকে। এখানে কখনোই শীত পড়ে না। মানে এখানে কোনো শীত কাল নাই।

সকাল ১১ টা থেকে হাইতিতে প্রচন্ড রোদ থাকে বিধায় সারাক্ষন ঘামতে থাকি। ইউনিফর্ম ভিজে যায়। তারমধ্যে কোনো গাছ গাছালী নাই। এই দেশের লোকজন গাছ কাটতে কাটতে দেশতাই প্রায় উদ্ভিদ শুন্য হয়ে গেছে। দূরের পাহাড়ের মধ্যেও কোনো গাছ গাছালি নাই। ছায়া দিতে পারে এই রকম আছে শুধু আম গাছ। কারন এখানে সারা বছর আম ধরে। আম ওদের একটা অর্থকরী ফসল। তাই শুধু এই আম গাছ গুলিকেই ওরা কাটে না। এতো গরমের মধ্যে কোথাও ছায়া না থাকায় আমি যেখানে দাঁড়িয়ে পরিবেশ পর্যালোচনা করছি, সেতা একতলা একটি বিল্ডিং, তাঁর দুই ধার দিয়ে দুটো ছোট ছোট রাস্তা বা গলি চলে গেছে। কেউ গলি থেকে বের হলে কিংবা গলি দিয়ে প্রবেশ করলে আমার নজরে পড়বেই।

টার্গেট ধরার জন্য যেখানে ঈগল টিম কাজ করছে, আমরা তাঁর থেকে প্রায় ১০০ গজের মধ্যেই আছি। আমাদের কাজ, ওদের কে প্রোটেকশন দেওয়া এবং যদি বাইরে থেকে কেউ প্রবেশ করতে চায়, তাদেরকে প্রতিহত করা। এখানে কোনো যুদ্ধ চলছে না। অনেক সাধারন মানুষ হয়তো জানেই না কেনো আমরা এখানে কি কাজে অপারেশন চালাচ্ছি। এতা প্রায়ই হয় বিধায় ওরাও ব্যাপারতা বেশি আর গুরুত্ব দেয় না। ওপারেশন কে ওরা স্বাভাবিক ভাবেই নেয়।

প্রায় ১৫ মিনিট যাবত আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে ছিলাম। হটাত আমার মনে হলো, কে যেনো আমার নাম ধরে ডাকলেন। আমি যেনো স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমার মায়ের গলা। ঠিক এইভাবে উনি ডাকলেন, “এই বাবা…” খুব হতবাগ হয়ে আমি শব্দটা যেই ডাইরেকশন থেকে শুনতে পেয়েছি বলে মনে হলো, সেদিকে একটু নড়ে ঘাড় ঘুরালাম। হয়ত ২/৩ ফুট হবে। ঘাড় ঘুরাইয়া উকি মারতে গেলে একটা মানুষের যেটুকুন জায়গার পরিবর্তন হয় আর কি, ঠিক সেটুকুই হয়ত হবে। ঠিক এই সময়েই আবার আমি সার্জেন্ট রুহুল যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, সেও “স্যার” বলে অত্যান্ত উচ্চস্বরে ডেকে উঠলো। ফলে আমি আরো ২/৩ ফুট স্বরে গেলাম ওর ডাকে। আর ঠিক এই মুহুর্তেই দেখলাম, আমি যেখানে দাড়িয়েছিলাম, সেই বিল্ডিং এর ছাদ থেকে প্রায় ৩০/৪০ কেজির একটা কংক্রিটের স্লাব মাটিতে ধপাস করে পড়লো। আমি ওদিকে তাকাতেই দেখি কে একজন দ্রুত গতিতে এক ছাদ থেকে লাফ দিয়ে অন্য ছাদে গিয়ে পড়ে দৌড়াতে লাগলো।

আমরা ওকে দৌড়াইয়া ধরতে ধরতেই সে গলি থেকে গলি, এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি, এবং হারিয়ে গেলো। তাকে আর আমরা ধরতেই পারলাম না। ব্যাপারটা আমার কাছে অত্যান্ত চমকিয়ে দিলো। কে লোকটা? আর ঐ কংক্রিটের স্লাব তা যদি আমার মাথায় পড়ত, আমি সাথে সাথে মারা যেতাম। লোকটা আসলে আমাকে উদ্দেশ্য করেই ছাদ থেকে কংক্রিটের স্লাব তা আমার মাথায় পড়ুক এই উদ্দেশ্য নিয়ে ফেলেছিলো।

আমি ঘটনাটা আমাদের বাংলাদেশ কমান্ডারকে ওয়্যারলেস সেটে এবং অপারেশনের দায়িত্তে থাকা ঈগল কমান্ডারকে জানালাম। তারা দ্রুত আমার এখানে চলে এলেন। আর জানালেন যে, ওনারা যেখানে টার্গেট আছে বলে ইনফর্মার প্রতিবেদন দিয়েছিলো, আসলে সেটা ভুল ছিলো। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আসলে সেতাই ছিলো টার্গেটের মুল স্থান। আমরা যখন ওখানে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা পর্যালোচনা করছিলাম, অবজার্ভ করছিলাম, টার্গেট আমাদেরকেই টার্গেট করে কাউকে হতাহত করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

আমাদের অপারেশন বিফল হয়েছে।

আমি আমার রুমে ফিরে এসে অনেক্ষন একটা ব্যাপার নিয়ে খুব ভাবহিলাম। আর সেতা হচ্ছে, আমি কিভাবে আমার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। আমার কাছে কেনো মনে হলো যে, আমার মা আমাকে ডাকছেন? মা তো বাংলাদেশে। আর আমি হাইতি। মার ডাক তো কিছুতেই আমার শুনার কথা না। এটা কিভাবে হলো? আমি আসলে আমার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনেই কিন্তু প্রথমে ২/৩ ফুট স্বরে গিয়েছিলাম। তাঁর সাথে সার্জেন্ট হারুনের ডাকে আরো ২/৩ ফুট স্বরে গিয়েছিলাম। এতে মোট প্রায় ৫/৬ ফুট জায়গা পরিবর্তন হয়েছে। উপর থেকে কংক্রিটের যে স্লাব টা আমার মাথায় পরার কথা, আমার এই ৫/৬ ফুট জায়গা সরার ফলে ওটা আমার মাথায় না পড়ে খালি জায়গায় পড়েছিল আর আমি জীবন ফিরে পেলাম। আমি কিছুতেই ব্যাপারটা কাকতালীয় ভাবে নিতে পারছিলাম না। এখানে বলে রাখি যে, বাংলাদেশের সাথে হাইতির সময়ের ব্যবধান ১০ ঘন্টা। অর্থাৎ আমি যখন দিনের ১১ টায় হাইতিতে ডিউটিতে ছিলাম, তখন বাংলাদেশে রাত ১ টা বাজে। মা হয়ত ঘুমাচ্ছেন, অথবা তাহাজ্জুত নামাজ পড়ছেন।

আমি সন্ধ্যায় ঢাকায় আমার বউ এর কাছে ফোন দিয়ে বললাম, মা কেমন আছে? আমার মা আমার বউ এর সাথে থাকেন। মার সাথে কথা বললাম। মা প্রথমেই যা বললেন, আমার গা শিউরে উঠলো। মা বললেন, গতকাল রাতে আমি একটা খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেখলাম, কে যেনো তোমাকে পিছন থেকে মারার চেষ্টা করছে। আমার ঘুম ভাংগার ঠিক পর পরই আমি তাহাজ্জুতের নামাজে তোমার জন্য আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া করেছি। যেনো তোমাকে আল্লাহ সব রকমের বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। এ কথা বলে মা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন আমাকে নিয়ে এটাও প্রকাশ করলেন।

আমি হিসাব করে দেখলাম, যে মুহুর্তে মা তাহাজ্জুতের  নামাজে রত ছিলেন এবং যখন আল্লাহর কাছে আমার নিরাপত্তার জন্য দোয়া করছিলেন, ঘটনাতা ঠিক ঐ মুহুর্তেই ঘটেছিলো।

মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য সাথে সাথে আল্লাহ কবুল করেন, এতাই তাঁর প্রমান। মার দোয়ায় আল্লাহ যেনো কোনো এক গায়েবী আওয়াজে আমার কানে মায়ের স্বর পৌঁছে দিয়ে আমাকে মাত্র কয়েক ফুট সরিয়ে দিলেন। আর সেই ৩/৪ ফুট সরে যাওয়ার কারনেই এতো বড় একটা কংক্রিটের স্লাব ছাদের উপর থেকে ফালানো আমার উপর না পড়ে পড়লো খালী জায়গায়।

এই মায়েদের দোয়া আমি যেনো সারাজীবন পাই, সেই তৌফিক দান করুন আল্লাহ আমাকে। আমার মাকে তুমি সারাক্ষণ হেফাজত করো আর আমার মাথার উপরে যেনো তিনি ছায়ার মতো থাকেন সেই তৌফিক দান করো। 

৩০/০৯/১৯৯৫-হাইতির এয়ারপোর্টে প্ল্যান ক্রাশ

আমি, ক্যাঃ মুনীর, আর মেজর ফরিদ আমাদের ক্যাম্পের বাইরে একটা ছোট তাবুর আউটারে বসে আছি। ক্যাঃ মুনীর মালয়েশিয়ান হালাল ফুডের একটি প্যাকেট নিয়ে ওভেনে গরম করছে। এর ভিতরে মুরগীর মাংশ, চিজ, এবং কিছু রাইচ দেওয়া। বেশ খেতে। বেস ক্যাম্প থেকে ক্যাঃ জাহিদ এসেছে কিছুক্ষন আগে।

আমাদের প্রতিটি ক্যাম্পেই একটা করে ভিডিও ক্যামেরা থাকে। প্রয়োজন হলে আমরা এতার ব্যবহার করি। ক্যাঃ জাহিদ ভিডিও ক্যাম টি নিয়ে বাইনোকুলারের মতো বন্দরে বিমান উঠানামা দেখছে। সময়টা ধরা যায়, আড্ডার মতো। ফরিদ স্যার আগামী সপ্তাহের পেট্রোলিং সিডিউল বানাচ্ছেন। মাঝে মাঝেই আমাকে কাকে কখন দিলে কার সুবিধা হয় এতা নিয়ে আলাপ করছেন আর সিডিউল বানাচ্ছেন।

হটাত করে জাহিদের উচ্চস্বরে আমরা হচকচিয়ে গেলাম। জাহিদ এমনভাবে চিৎকার দিয়ে উঠলো যেনো মারাত্তক কিছু ঘটেছে।

আসলেই মারাত্তক কিছু ঘটেছে। আমরা পোর্ট অ প্রিন্স বিমান বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্তে আছি। কিন্তু বন্দরের আভ্যন্তরীন ইমিগ্রেশি কিংবা চেকিং অথবা এক্সিট এইসব ব্যাপারে আমরা কোনো নাক গলাই নাও। এখানে বেশ কিছু প্ল্যান সারাদিনে উঠা নামা করে। একেবারে আমাদের চোখের সামনে। দেখতে ভালোই লাগে।

ঠিক এগারোটার সময় একটা ছোট সেসনা বিমান পোর্ট থেকে কিছুদূর উড্ডয়নের পরেই হটাত করে নীচে পড়ে গেলো। বিকট শব্দ আর বিশাল আগুনের ফুলকী। আমাদের ক্যাম্প থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে এসে সেসনাটি ভুপাতিত হলো। ক্যাঃ জাহিদ আসলে এমেচার হিসাবে এই সেসনার উড্ডয়নের ভিডিও করছিলো। ফলে সেসনাটি উড্ডয়নের সময় এবং পড়ে যাওয়ার সময়ের ভিডিওটা আসলেই অর ভিডিও ক্যামে রেকর্ড হয়ে গেলো।

বিমানটি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর বিশাল হৈ চৈ শুরু হয়ে গেলো। ক্যাম্পের সৈনিক গন ভয়ে আতঙ্কিত। আর একটু পশ্চিম দিকে এসে বিমানটি ভুপাতিত হলেই আমাদের ঠিক ক্যাম্পের মাথায় এসে পরতো। ভাগ্যিস সেতা হয় নাই। তাহলে আরো বড় ধরনের সমস্যা হতো।

আমরা সবাই দৌড়ে গেলাম ঘটনাস্থলের কাছাকাছি। তখনো আগুন জ্বলছে। কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ১ ঘন্টা পর আগুনের শিখা পরে যাওয়ার পর আমরা স্পটে ঢোকলাম। এর মধ্যে এফ বি আই, হেসিয়ান টেলিভিশন, আমাদের বেস ক্যাম্পের সিনিয়র অফিসার গন, এবং বিমান বন্দরের বড় বড় কর্তাগন সাথে হেসিয়ান পুলিশ এবং সিবপোল চলে এসেছে।

স্পটে গিয়ে দেখলাম, কেহই জীবিত নাই। মোট নাকি চার জন লোক ছিলো সেসনার ভিতর। তাঁর মধ্যে একজন মেয়ে, একজন পাইলট, আরেকজন পুরুষ এবং একজন কো-পাইলট। বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে এখানে সেখানে। মানুষুগুলি পড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনো একটা অংশ ও নাই। কোনো বডি পার্তস পাওয়া গেলো না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে কয়েক পিস মুরগীর মাংশ ইন্ট্যাক্ট অবস্থায় আছে, দুটু ব্ল্যাক লেবেল মদের বোতল ভেঙ্গে পড়ে আছে। আর পাওয়া গেলো কয়েক খন্ড হাড় গোড়। সেসনাটি মাত্র কয়েক মিনিট আকাশে ছিলো। আমাদেরকে অনেকে অনেক প্রশ্ন করছেন, কিন্তু ব্যাপারতা আমরাও ভালোভাবে খেয়াল করি নাই।

এর মধ্যে এভিয়েশন থেকে তদন্তের আদেশ এলো। আমরা যা দেখেছি, সেটা আগামীকাল তদন্তের কর্মকর্তাদের কাছে বলে একটা সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিতে হবে। সন্ধায় আমাদের বেস কমান্ডার কঃ ফরিদ ডেকে পাঠালেন। একটু আগে আমরা ব্যানব্যাট থেকে ফিরে এসেছি।

এখানে একটা মজার ব্যাপার কাকতালীয় ভাবে ঘটে গেলো। ক্যাঃ জাহিদ ভিডিও ক্যামের মাধ্যমে যে ভিডিও টা করেছিলো সেখানে প্ল্যানটার উড্ডয়ন থেকে শুরু করে ভুমিতে পরার ভিডিও টুকু পুরুতাই করা হয়ে ছিলো। কিন্তু জাহিদ ভয় পেয়ে যাওয়ায় ভুমিতে পরার পর আগুন সহ প্ল্যানটির আর কোনো ভিডিও নাই। তাতে কি। এতাই তো অনেক রেয়ার একটা ভিডিও। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে (এটিসি) তে হয়ত কোনো ফুল ভিডিও হয়ে থাকতে পারে কিন্তু এটিসির বাইরে আমাদের কাছে ঠিক উড্ডয়নের এবং পতনের ভিডিও টা আছে। এতা জানার সাথে সাথে আমাদের কর্তব্যপরায়নতার একোতা বিশাল প্লাস পয়েন্ত হয়ে দারালোযে, আমরা কত সিন্সিয়ার যে, এই রকম ভাবে আমরা বেশ দায়িত্তের সাথে কাজ করি। আমরা বললাম যে, সাধারনত আমরা প্রতিটি বিমানের উড্ডয়নের সময় এবং নামার সময় ভিডিও করি। দিন শেষে আবার এইগুলি মুছে ফেলি। কোনো অঘটন থাকলে সেতা আমরা উর্ধতন কর্মকর্তাকে জানাই। আর তা না হলে আমরা ভিডিও গুলি আর সংরক্ষন করি না।

আমাদের এই ভিডিও তা হাইতির টেলিভিশন চ্যানেলে দেখানো হলো। আমাদের কন্টিনজেন্টের সুনাম আরো বেড়ে গেলো যে, আমরা অনেক সচেতন আমাদের ডিউটির ব্যাপারে। বিবিসি টেলিভিশন আমার ইন্টারভিউ নিলেন, আমাদের সাথে বেস ক্যাম্পে ক্যাঃ জাহিদ, মেজর আলীর ও ইন্তারভিউ হলো বিবিসির। মেজর আলী অপস অফিসার হিসাবে কাজ করছে।

কারো সর্বনাশ আবার সেই সর্বনাশের ফলাফলে কারো আবার পুর্নিমার রাত। কারা মারা গেলো আমার জানা নাই, কিন্তু খুব অবাক হলাম যে, ওরা মদ নিয়ে চিকেন নিয়ে হয়ত বা মজা করার জন্যই আকাশে উঠেছিলো। কিন্তু স্রিষ্টিকর্তা কাকে কখন কিভাবে নিয়ে যাবেন, একমাত্র তিনিই জানেন। ওদের আর চিকেন বা মদ খাওয়া হয় নাই। তাঁর আগেই আকাশ থেকে ভুমিতে মৃত অবস্থায় ঝরে পড়েছে।

এলাকাটি পুলিশের হলুদ টেপ দিয়ে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করা আছে, ক্রাইম জোন বা নো এন্ট্র্যান্স হিসাবে। চারিদিকে পুলিশ পাহারা দিয়ে রেখেছে তদন্ত শেষ না হওয়া অবধি এটা থাকবে। তবে আমাদের প্রবেশের কোনো বাধা নাই।

১৯/০৯/১৯৯৫-অরুনিমার গল্প

গত শনিবার ইউ এন হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলাম আই ডি কার্ড করার জন্য। বিকাল তখন প্রায় চারটা। ফাকা অফিস। মাত্র দুইজন বিদেশী স্তাফ হাজির ছিলো। আমি যেতেই ওরা আমার ডিটেইলস নিয়ে নিলো। ফিঙ্গার প্রিন্ট, ছবি এবং ব্লাড গ্রুপ জেনে নিলো। আমার জন্ম সনদের বিপরীতে পাসপোর্ট দিতেই প্রায় সব গুলি কাজ যেনো এক সাথে ওরা পেয়ে গেলো। সবই আছে এর মধ্যে। যে মেয়েটা এইসব করছিলো সে সম্ভবত লোকাল এই হেসিয়ান। ভালো ইংরেজী বলতে পারে না। আমার সাথে দোভাষী ছিলো তাই কাজটা সহজেই করা গেলো। আই ডি কার্ড করতে গিয়ে একটা ঘটনা ঘটে গেলো যা সেদিনই লিখার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু সময়ের অভাবে লিখা হয়ে উঠে নাই।

ঘটনাটা তাহলে বলিঃ

আমি যখন প্রায় সব কাজ শেষ করে ফেলেছি, এমন সময় একটা ২২/২৩ বছরের একটি সুন্দর মেয়ে আমার কাছে এসে খুব সুন্দর করে ভারতীয় স্টাইলে দুই হাত নমস্কারের আদলে কূর্নিশ করলো। মেয়েটিকে দেখতে কিছুতেই ভারতীয় মনে হলো না কিন্তু তাঁর চেহাড়ায় একটা বাঙ্গালি বাঙ্গালী ভাব ছিলো। আমার সামনে এসে সে চমতকাত ইংরেজীতে বল্লো, আপনি কি ইন্ডিয়ান?

কেউ আমাকে ইন্ডিয়ান বললে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমি ইন্ডিয়ান নই, আমি বাংলাদেশী। ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশ এক নয়। তারপরেও বাংলাদেশ এখনো  যেহেতু বিশ্ব দরবারে অতোটা পরিচিত হয়ে উঠে নাই, সবাই মনে করে বাংলাদেশ মানেই ইন্ডিয়া।

যাক, মেজাজ খারাপ না করেই বললাম, ‘না, আমি ইন্ডিয়ান নই, আমি বাংলাদেশী।’

মেয়েটি ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশের পার্থক্যটা বুঝে দেখলাম। বল্লো, ও আচ্ছা, আপ্নারা ঢাকার লোক। ঢাকা তো বাংলাদেশের রাজধানী।

বললাম, হ্যা। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী।

মেয়েটি আর কোনো কথা বাড়াতে চাইলো না। কিন্তু আমার আগ্রহটা একটু বেড়ে গেলো।

আমি বললাম, আপনি কি কোনো ইন্ডিয়ানকে খুজছেন?

সে বল্লো, হ্যা, আমি নতুন কোনো ইন্ডিয়ান এলেই তাকে জিজ্ঞেস করি সে ইন্ডিয়ান কিনা।

বললাম, কেনো আপনি কোনো ইন্ডিয়ানকে খুজছেন?

মেয়েটি পাশেই কফি শপের দিকে ইংগিত করে আমি কফি খাবো কিনা জিজ্ঞেস করলো। আমি যেহেতু পেট্রোলিং এর কাজে বের হয়েছি, আমার কোনো তারাহুরা নাই। হয়ত, এই মেয়েটার কোনো সমস্যাও  আমার পেট্রোলিং এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

মেয়েতী একোতা গোলাপি গেঞ্জি পড়া। মাথার চুলগুলি ছোট, বব কাটিং এর মতো। ভালো স্বাস্থ্য, ইন্ডিয়ান গায়ের রঙ, বেশ স্মার্ট। জিন্সের প্যান্ট পরা।

কফি খেতে খেতে সে আমাকে জানালো, সে ইউ এন এর সিভিল ডিপার্টমেন্টে পার্ট টাইম কাজ করে। সে আসলে থাকে পোর্টোরিকুতে। পাশেই আইল্যান্ডটা। ওখানে ওর মা আছে। তাঁর আর কোনো ভাই বোন নাই।

বাবা কি করেন, জিজ্ঞেস করতেই সে যেটা বল্লো, তা হলো, সে তাঁর বাবাকেই খুজছে। সে তাঁর বাবাকে কখনোই দেখে নাই। কোনো এক ইন্ডিয়ানের সাথে তাঁর মায়ের প্রেম ছিলো। তাঁর মা ছিলো মূলাট্টো। মানে না নিগ্রো না শ্বেতাঙ্গ। মুলাট্টো হচ্ছে নিগ্রো আর শ্বেতাঙ্গ টাইপের একটা মিক্সড ব্লাড। ইন্ডিয়ানরা শ্বেতাঙ্গ বলা যাবে না কিন্তু অনেক ইন্ডিয়ান আছে যারা বেশ ফর্সা। হতে পারে তাঁর মা আর ঐ ইন্ডিয়ানের ফলে মেয়েটির চেহাড়া অনেকটা মুলাট্টো ধরনের কিন্তু তাঁর মধ্যে মুলাট্টোর যা যা গুন বা আচরন, তাঁর থেকে অনেক আলাদা। বেশীর ভাগ আচরন আমার কাছে আমাদের সাব কন্টিনেন্ট এর মতোই মনে হলো।

মেয়েটির ভাষ্য যে, আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে কোনো এক ইন্ডিয়ান অই পোর্টোরিকুতে এসেছিলেন। তখন তাঁর মায়ের সাথে অই ইন্ডিয়ান লোকটির প্রেম হয়। প্রেম থেকে তারা একত্রে থাকতে থাকেন। বিয়ের মতো এইরকম কোনো ফর্মালিটিজ আসলে হয় নাই। যাকে আমরা লীভিং টুগেদার হিসাবে বলতে পারি।

বছর কয়েক পর এভাবে থাকার পর, এই মেয়েটির জন্ম হয়। মেয়েটির জন্মের মাত্র কয়েক মাস পরেই সেই ইন্ডিয়ান বাবা তাঁর স্বদেশের কোনো কাজে ইন্ডিয়ায় চলে যান। কথা ছিলো তিনি কাজ সেরেই আবার এই পোর্টোরিকুতে সন্তান-স্ত্রীর কাছে ব্যাক করবেন।

এই যে তিনি গেলেন আজ অবধি তিনি আর ফিরেন নাই। তাদের কাছে থাকার মধ্যে আছে শুধু কয়েকটি ছবি আর পুরানো একটা ঠিকানা। যেহেতু তাঁর মা কখনো পোর্টোরিকুর বাইরে যান নাই, বা তিনি জানেন না কিভাবে ইন্ডিয়া গিয়ে বাবাকে খুজতে হবে, ফলে সেই ২৩ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাবার জন্য আজো তাঁর মা অপেক্ষাকরেন, তিনি ফিরে আসবেন।

মায়ের এই কষ্টে, এবং বিশ্বাসে মেয়ে এতো বছর পর নীরবে তাঁর বাবাকে খুজেন। এর মধ্যে সে দুইবার ইন্ডিয়াও গিয়েছিলো, কিন্তু তাঁর বাবার পোর্টোরিকুতে আসার কোনো রেকড়ড়দ তাদের ডাটাবেজে নাই, এমনকি যেই স্টেটের কথা তাঁর মা জানে সেই স্টেটে গিয়েও মেয়েটি তাঁর বাবার কোনো হদিস মিলাতে পারেন নাই।

বাবাকে পাওয়া না পাওয়ার জন্য তাঁর আফসোস নাই। না পেলেও তাঁর মনে যে অনেক কষ্ট তাও না। কিন্তু যখনই সে তাঁর মায়ের দিকে তাকায়, সে বুঝে, ভালোবাসায় কিভাবে মানুষ এক জনের জন্য সারাটা জীবন একা থাকতে পারে। তাঁর শুধু এইটুকু জানার দরকার যে, তাঁর বাবা কি আজো বেচে আছেন? নাকি এই পৃথিবীতেই নাই। যদি বেচে থাকেন, তাহলে কি অপরাধে তাঁর বাবা তাকে কিংবা তাঁর মাকে আর একবারের জন্য ও দেখা দিলেন না? যদি তাঁর বাবার আর কোনো ভালোবাসাই আর তাদের উপর না থাকে, সেটাও তারা মেনে নিতে মানষিকভাবে প্রস্তুত, কিন্তু সেতাও তো জানা দরকার।

কথা বলতে বলতে দেখলাম, কয়েকবার মেয়েটির গলা বুজে আসছিলো, হয়ত ইমোশনাল হয় গেছে। কফির কাপে চুমু দিয়ে একটু টাইম নিয়ে আবার বলতে থাকলো যে, আমার জন্ম নিয়ে আমি অতোটা উদাসীন নই কিংবা কোথাও কোনো কাজে আমার বাধা নেই। কিন্তু আমারো খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমার বাবা কোথায়, কি করেন তিনি। তাঁর কি কখনো আমার কথা মনে পড়ে না? আমার মায়ের কথা না হয় বাদই দিলাম, আমার কথাও কি তাঁর মনে পড়ে না? কষ্ট হয় মাঝে মাঝে। আমার মা ইন্ডিয়ান রীতি অনুযায়ী প্রদিন সকালে বিকালে আমাদের ঘরে ধুপ জ্বালায়। তিনি নিজেকে ইন্ডিয়ান বউ মনে করেন আজো। এখন তাঁর বয়স হয়ে গেছে। আমি মাঝে মাঝে মাকে বলি, মা , তিনি হয়ত আর বেচে নেই। তা না হলে কারো না কারো নাড়ীর টানে তিনি একবার হলেও আসতেন। যে ব্যক্তিটা প্রথিবীতেই নাই, তাঁর জন্য কেনো তুমি এতো কষ্ট করছো?

মা মানতে রাজী নন।

জিজ্ঞেস করলা, এইখানে তো একটা ইন্ডিয়ান ব্যাটালিয়ান আছে, তুমি কি সেখানে গিয়ে খোজ করেছো কারো কাছে? বা কারো কাছে কি এতা নিয়ে আলাপ করেছো?

মেয়েটি বল্লো যে, হ্যা সে এই ব্যাপারে ইন্ডিয়ান কন্টিনজেন্টে একবার কোনো এক অফিসারের সাথে আলাপ করেছিলেন। সে ঠিকানা টা ধরে প্রায় তিন মাস পরে জানিয়েছিলো যে, যেই ঠিকানাটা আমার মা জানতেন, সেই ঠিকানায় এখন কোনো বসতি নাই। সেটা এখন নাকি কোনো এক শিল্প নগরী হয়ে সেখানে অনেক কলকারখানার রাজ্য হয়ে গেছে। আর সেই ২৫ বছর আগের কোনো ডাটা তারা দিত অপারগ।

অনেক্ষন কথা বললাম মেয়েটার সাথে। খারাপ লাগলো। কিন্তু আমারই বা কি করনীয়? আমি মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করলাম, সে হেসে দিয়ে বল্লো, মা তাকে ডাকে অরুনিমা হিসাবে, আর সে সবাইকে অফিশিয়াল নাম জানায় তামান্না হিসাবে।

তামান্নাই হোক আর অরুনিমাই হোক, বিকালটা আমাকে খুব ব্যথিত করে দিলো। পেট্রোলিং করার সময় বারবার অরুনিমার মুখখানা আমার চোখে ভেসে আসছিল আর ভাবছিলাম, গরীব নয় সে, তাঁর বাবার টাকার কোনো দরকার নাই। সে শিক্ষিত, তাঁর একটা গতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, ইন্ডিয়ান বাবার কোনো সম্পত্তির জন্য তাঁর কোন তাড়া নাই, না আছে কোনো পারিবারিক ঐতিহ্যের চাওয়া পাওয়া। সে শুধু একটাই জানতে চায়, তাঁর বাবা কে, কোথায় আছে কিভাবে আছে। আর কিছুই না। একটা পরিচয়।

এই পৃথিবীতে কত রকমের কষ্টে মানুষ বসবাস করে তাঁর কোনো ইয়াত্তা নাই। কেউ টাকার কাংগাল, কেউ সম্পদের কাংগাল, কেউ ভালোবাসার কাঙ্গাল, আবার কেউ শুধু আমি কে, কি আমার পরিচয়, সেইটা পেলেই তাঁর সব সুখ।

১৬/০৯/১৯৯৫-হাইতি-শনিবার

আজ ছুটির দিন। বেশ দেরী করে ঘুম থেকে উঠেছি। ক্যাঃ মুনীর সারাক্ষন গান বাজিয়ে ক্যাম্পটাকে মাতিয়ে রাখে। একটু চটপটেই সে। দেশে ফোন করার একতাই নিয়ম, ট্রেসকম  টেলিকোম্পনি থেকে প্রি-পেইড কার্ড কিনতে হয়। খুবই এক্সপেন্সিভ। তাই সব সময় কথা বলা যায় না। এখানে আরেকটা সমস্যা হলো, আমরা এখানে মাত্র ২৫% সেলারী পাই। দুপুরের পর আমার নিজের পেট্রোলিং আছে।

জাতিসংঘের আইডি কার্ড এখনো হাতে পাই নাই। ইউ এন হেড কোয়ার্টার আমাদের বেস ক্যাম্প থেকে বেশী দূরে নয়। ওখানে যেতে হবে আইডি কার্ড করার জন্য। অনেকেই করে ফেলেছে কিন্তু আমার এখনো যাওয়া হয় নাই। যদিও আজ বন্ধ্যের দিন কিন্তু আই ডি কার্ডের অফিসটা খোলা। ভাবছি, আজ পেট্রোলিং এ যাওয়ার পথে ইউ এন হেড অফিসে গিয়ে কাজগুলি শেষ করে ফেল্বো। আজ ভীড় একটু কম থাকবে। ড্রাইভার জাহাঙ্গীর আমাদের ড্রাইভার। কুজো হয়ে গাড়ি চালায় কিন্তু ভালো গাড়ি চালায়। ওকে আসতে বলেছি বিকাল তিনটায়। প্রায় তিন ঘন্তার পেট্রোলিং।

এই পেট্রোলিং এ আমাদের কাজ আসলে খুব সীমিত। আমরা গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যায়। কোথাকার কি পরিস্থিতিসেতা অবলোকন করি। কোনো অঘটন দেখা হলে আমরা সেখানে থামি। এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলি। ব্যাপারতা কন্ট্রোলে রাখার চেষ্টা করি। কোনো বেগতিক দেখলে আমরা সেটা তাতক্ষনিক আমাদের বেস ক্যাম্পে রিপোর্ট করি, সে মোতাবেক আমরা পরবর্তী কাজ গুলি করি।

০৭/০৯/১৯৯৫-পোর্ট অ প্রিন্স এয়ারপোর্টে পোস্টিং

আমাকে পোস্টিং করা হয়েছে এয়ারপোর্ট দেখভাল করার। পোর্ট অ প্রিন্স এয়ার পোর্ট। বিমান বন্দরে প্রতিদিন সকালে যাই, সারা অফিস চত্তর একবার করে ঘুরে আসি। আমার সাথে আছে মেজর ফরিদ (১১ লং কোর্সের), ক্যাঃ শেখ মুনীরুজ্জামান ( মেহেরপুরের, আমার সাথে ৬ ফিল্ডে ছিলো) আর আছে ক্যাঃ জাহিদ। দুটি বড়বড় সৌদি তাবুতে আমরা আছি। তিন নম্বর তাবুটা আমাদের রিক্রেশন রুম। তাতে একটা দাবার সেট আছে, টিভিও আছে, ভিসিডি আছে, আর আছে একটা ছোট ফ্রিজ। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের তাবুতেও একটা করে টিভি আছে। আমরা শুয়ে শুয়েই টিভি দেখতে পারি। আমরা আমাদের এই ক্যাম্পে নামাজের জন্য আরেকটা তাবু করে দিয়েছি। এখানে নামাজের ব্যবস্তাহ আছে। বেশ গরম হাইতীর আবহাওয়া। এখানে নাকি কোনো শীতকাল নাই। সারা বছর আম ধরে। এদের কারেন্সি হেসিয়ান ডলার যার মান ১ ইউ এস ডলার দিলে ৫ হেসিয়ান ডলার পাওয়া যায়। আর এক ডলার দিয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ টা বড় বড় আম পাওয়া যায়। মানুষ গুলি খুব গরীব, আর পানির সংকট প্রচন্ড অথচ পাশেই ক্যারিবিয়ান সমদ্র।

০৩/০৯/১৯৯৫-২য় দিন হাইতি

সকালে উঠেই অফিসে যেতে হলো। অনেক ফরমালিটিজ। জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে মেডিক্যাল কার্ড, নিহের ফর্ম পুরন করা, আইডি কার্ডের জন্য আরেক অফিসে যাওয়া, ভ্যাকসিন নেওয়া, অরিয়েন্টেশন ক্লাশ করা ইত্যাদির ভারে সারাটি দিন বেশ ভালই চাপের মধ্যে গেলো। আমরা হাইতির ভাষা বুঝি না, তাই দোভাষী এলো। একজনের নাম নাতাশা। প্রায় ৪০ বছরের মতো হবে। এখানকার সবাই ব্ল্যাক। প্রায় ৯৫% মানুষ ব্ল্যাক। আমি কখনো ব্ল্যাক মানুষ এতো কাছ থেকে দেখিনাই।

এদের দেখলে কোনো অবস্থাতেই ভালো লাগে না। নোংরা নোংরা মনে হয়। মেয়েগুলির নিতম্ব এতো বড় আর বুক পেট এতো উচু তাঁর সাথে মুখের চেহারা এতো বিদ্গুটে যে, এদের আমার ভালোই লাগছিলো না। কিন্তু আমি পজিটিভ মানুষ। তাদেরকে আমার ভালো লাগতে হবে এটাই সবচেয়ে বড় কথা। আমি এদের সাথে এদের জন্য এদের দেশে কাজ করবো অথচ আমি এদের কে পছন্দ করবো না, এটা অন্যায়, এবং করা উচিত না।

আমরা কে কোথায় কি ডিউটি করবো এটা এখনো কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ভাগ করে দেন নাই বিধায় আমরা সবাই আপাতত বেস ক্যাম্পেই থাকছি, আর ক্যারাবানে ঘুমাচ্ছি।

০২/০৯/১৯৯৫-হাইতি গমন

২০ জুলাই ১৯৯৫ তারিখে আমাকে ৭ ফিল্ড রেজিমেন্ট থেকে ১ ফিল্ড রেজিমেন্টে পোস্টিং করা হয়েছিলো ১ ফিল্ডের সাথে হাইতিতে জাতিসঙ্ঘ মিশনে যাওয়ার জন্য। ১ ফিল্ডের নতুন নামকরন করা হয়েছে ব্যানব্যাট। এর মানে হলো বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন। আজ আমরা হাইতিতে আগমন করলাম। জাতিসঙ্ঘ মিশনে এটাই আমার প্রথম মিশন। আমাদের কোর্সের মেজর সাকির আমাদের সাথে আছে। ১২ লং কোর্সের মেজর জাহিদ (সিরিয়াল-১৪ নামে বেশী পরিচিত) আছে। ১১ লং কোর্সের মেজর ফরিদ, মেজর মোসাদ্দেক, ১০ লং কোর্সের মেজর ফারুক, ৯ লং এর মেজর ইশ্তিয়াক এবং মেজর সারোয়ার, ১৬ লং এর মেজর আলী (সুন্দর আলী নামেই সে বেশি পরিচিত)। এয়ারফোর্সের স্কোয়াড্রন লিডার শফিক স্যার (নায়ক রাজ রাজ্জাকের মেয়ে ময়নার জামাই) ও আছেন। আর্মি, এয়ারফোর্স এবং নেভী মিলিয়ে প্রায় ৬/৭ শত জোয়ান।

হাইতিতে আসার আগেই এর মধ্যে দুই দফায় দুটি দল ইতিমধ্যে চলে এসেছিল। তাদের কাজ ছিলো মেইন বডি আসার আগে সমস্ত বাসস্থান রেডি করা। শুধু তাইই নয়, এর আগে যে ইউনিট ছিলো বাংলাদেশের তাঁর থেকে সমস্ত মালামাল, গাড়ী, অস্ত্র ইত্যাদি বুঝে নেওয়া। 

আমাদের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল ফরিদ (আর্টিলারী), তাঁর সাথে আরো ৬ জন লেঃ কর্নেল আছেন। আমরা প্লেন থেকে নেমে সবাই পোর্ট অ প্রিন্স বিমান বন্দরেই সবাই সারিবদ্ধ হয়ে প্রথমে ওকে রিপোর্ট নেয়া হলো। আমরা সবাই বাংলাদেশী ইউনিফর্ম পড়া। এই প্রথম ইউনিফর্ম পড়ে কোনো ভিন দেশে আমার আগমন। সারাদিন প্লেন জার্নিতে টায়ার্ড লাগছিলো। ক্ষুধাও ছিলো পেটে। আমাদের বেস ক্যাম্পে আসতে আসতে প্রায় রাত ৯ টা বেজে গেলো। আমরা সবাই পর্বে পর্বে বেস ক্যাম্পে এলাম।

কোনো স্যহায়ী বিল্ডিং নাই, প্লাস্টিকের ডোঙ্গার মতো ছোট ছোট ক্যারাবান। একটা ক্যারাবানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টির মতো রুম। আমার রুম মেট ১০ লং কোর্সের মেজর ফারুক স্যার। দুজনেই সিগারেট খাই। সুতরাং রুমে সিগারেটের ধুয়ায় প্রথম দিনই ভরে গেলো।

ইউনিফর্ম চেঞ্জ করে মেসে খেতে গেলাম। খেতে খেতে রাত প্রায় ১২ টা বাজলো।

০৫/১০/১৯৯৩-মাকে মনে পড়ে

মাঝে মাঝে আমার মাকে খুব মনে পড়ে। আমার মা একজন অসামান্য personality সম্পন্ন মহিলা।  তিনি শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর ভিতরে অনেক গুন আছে। তিনি পাঁচ ওয়াক্কত নামাজ পরেন,  কোন মিথ্যা কথা বলেন না। তাকে আমি ভীষণভাবে ভালবাসি। এইতো কদিন পর আমি ছুটি যাব এবং আমি তাকে দেখতে পাব। কিন্তুঁ এখনি তাকে আমার দেখতে ইচ্ছে করছে। আমার মা আমাকে ভালবাসে তাঁর ছেলে হিসেবে তো অবশ্যই তবে ভালবাসে একজন রক্ষক হিসেবেও। আমি তাঁর পাশে আছি মানে সে আর কোন কিছুই ভয় পায় না। এই মাকে আমি ভালবাসি আমার জীবনের চেয়ে বেশি। আমি আজ পর্যন্ত আর কারও জন্য কাদিনি, কিন্তু আমার মণে হয় আমি মার জন্য অনেক বার কেদেছি কোন কারন ছাড়া। আমি আমার বাবাকে দেখিনি, আমার যখন জ্ঞান হয়েছে, আমি শুধু মাকেই দেখেছি। পাঁচজন কন্যা, আর একজন ছেলে, বড় ছেলে থাকে আমেরিকা এবং তাকে সব সময় ভয়েই থাকতে হয়। এটা কোন সাধারন পরিস্থিতি নয়।  আমার মা তাঁর মেয়েদের ব্যাপারে অনেক কষ্ট তাঁর মনে আছে কিন্তু যার কোন সামর্থ্য নেই, সে কি করতে  পারে? পারে শুধু কানতে আর একা একা বসে ভাবতে । আমরা  সামর্থ্য নেই  মাকে সাহায্য করবার। খুবই অল্প বেতনে চাকরি করি। আমি যখন ছুটিতে আসি, তখন আমার অনেক আজে বাজে কাজ থাকে যার জন্য আমি ঠিকমত সময়ও দিতে পারি না। গ্রামের কিছু অল্প শিক্ষিত বন্ধুবান্ধব যারা আমাকে খুব সমীহ করে, ওদের সঙ্গে  সময় কাটাতে আমার খারাপ লাগে না। গ্রামের সরু পথ, যার দুপাঁশে ঘাস গজে আছে, রোডের পাঁশে কোন আলো নাই, অন্ধকার চারিদিকে, ফেরার পথে হাতে একটা সিগারেট, মন্দ না। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর, আর এই সুন্দরের পিছনে মা একটা অনেক বড় ব্যাপার। যার সুন্দর এবং ভাল একটা মা আছে, তার সুন্দর একটা পৃথ্বী আছে। একটা ভাল মা একটা দেশের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। সে নেতা  তৈরি করে, সে আরও ভাল মা তৈরি করে, সে পৃথিবীটাকে গড়ে তোলে মধুর একটা পরিবেশ দিয়ে। তার প্রতিটি হাসিতে মায়ামমতা আর ভালবাসা আছে। আমার মা ঠিক তার মত। সে হাসলে আমার প্রান ভরে যায়, তার দুঃখে আমার চোখে জল আসে। আমি তাকে  খুব ভালবাসি। আমি কখনো ভাবতে চাই না আমার কেমন যাবে দিনগুলো যখন আমার মা আর বেঁচে থাকবেন না। এখন আমার হাতে অনেক টাকা নাই, আমি চাইলেও আমি মাকে সাহয্য করতে পারি না কিন্তু আমি জানি একদিন আমার হাতে অনেক টাকা হবে এবং আমার কেন জানি খালি মনে হয়, মা তখন থাকবেন না। এটাই হবে সবচে দুঃখজনক।

৩০/১০/১৯৯১-খাসি কুকুর হয়ে গেলো

আমি নিউলংকার বিডিআর ক্যাম্পের দায়িত্তে আছি। নির্জন পাহাড়িয়া এলাকা। শান্তিবাহিনীর আমল। সুদুর চট্টগ্রাম থেকে এই নিউলংকার ক্যাম্পে আসার জন্য কোনো যানবাহন নাই, পুরু পথ পায়ে হেটে আসতে হয়। এতো এতো উচু পাহাড় আর নালা যে, এক কিলোমিটার হেটে আসতে সময় লাগে প্রায় ২/৩ ঘন্টা। যেহেতু যানবাহনের সুযোগ নাই, তাই, আমার এই ক্যাম্পে যতো খাবার আসে, সবকিছু হেলিকপ্টার দিয়ে সরবরাহ করে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে মাঝে মাঝে আমাদের ক্যাম্পের খাবারের সল্পতা দেখা যায়। তখন আমাদেরকে অনেক কম সরবরাহে জীবনযাপন করতে হয়। প্রতি ১৫ দিন পরপর হেলিসর্টি হয়। আমরা ব্যাপারটায়  প্রায় অভ্যস্থ হয়ে গেছি যে, মাঝে মাঝেই আবহাওয়ার কারনে ক্যাম্পে হেলিসর্টি বিঘ্নিত হতেই পারে। এরফলে আমরা বিকল্প ব্যবস্থার স্রিষ্টি করি। যেমন, লোকাল লোকজনের কাছ থেকে কিছু চাল, কিংবা শব্জি, অথবা কখনো কখনো হাস মুরগী বা ছাগল জাতীয় বাজার কিনে দিনানিপাত করি। 

পাহাড়িয়া এলাকার মানুষ বেশ গরীব। তারা অল্প দামেই এসব আমাদের ক্যাম্পে এসে বিক্রি করে। অনেক সময় তারা ভয়েও বেশি দাম বলে না বা ওরা হয়তো এ রকমই। অল্পতেই খুশী। ওদের জীবন যাত্রা একেবারেই সাদাসিদে। অনেক ট্রাইব। কোনো কোনো ট্রাইব গরু ছাগল হাস মুরগী কুকুর বিড়াল সবই খায়। কিন্তু সব ট্রাইবদের একই স্বভাব প্রায় যে, এরা কোনো খোয়াড়ে কোনো পশু বা জন্তু বন্দি করে পালন করে না। পাহাড়িয়া মানুষদের মতো এই জন্তুগুলিও সারাদিন পাহাড়ের এপাশে ওপাশে ঘুরে ঘুরে ঘাস কিংবা লতাপাতা খেয়ে পেট ভর্তি করে, আর পেট ভরে গেলে জন্তুগুলি যার যার বাড়িতে সয়ঙ্ক্রিয় ভাবেই পৌঁছে যায়। জন্তুগুলিও ওদের নিজের আস্তনা যেনো ভালো করেই চিনে। কখনো কখনো একপাল ছাগল, বা ভেড়া দলবদ্ধভাবে এক পাহাড় থেকে মনের আনন্দে ঘাস খেতে খেতে মাইলের পর মাইল হেটে আমাদের ক্যাম্পের পাশেও চলে আসে। 

বর্ষার দিন চলছে। প্রায়ই আবহাওয়া চরমরুপে থাকে। কখনো কখনো ঝর, কখনো মুষল্ধারে বৃষ্টি হয়। আমরা যেখানে থাকি, তার উচ্চতা প্রায় ২/৩ হাজার ফুট। মাঝে মাঝে মেঘের ভেলা আমাদের গা ভিজিয়ে দিয়ে যায়। আমার বড্ড ভালো লাগে আকাশের এই লুকুচুরি। ইদানিং আবহাওয়া খারাপ থাকায় আমাদের ক্যাম্পে হেলিসর্টি আসতে পারছে না। পাহাড়িয়া ঝড় খুব বেপরোয়া। আমাদের ক্যাম্পের রসদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পে চাউলের কোনো সমস্যা নাই কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সবজি বা কোনো মাংশের ব্যবস্থা নাই। আমরা প্রায় ৪০ জন মানুষ। প্রতিদিন হেলিসর্টির জন্য অপেক্ষা করি বটে কিন্তু প্রতিদিনই সেটা আবহাওয়ার কারনে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। 

বসে আছি ক্যাম্পের মেইন গেটের সামনে। এমন সময় দেখলাম, একটা কাল ছাগল ঘাস খেতে খেতে আমাদের গেটের সামনে এসে হাজির। আমার সেন্ট্রি বল্লো, স্যার, ক্যাম্পে তো কোনো কিছুই নাই, আবার কবে হেলিসর্টি আসবে সেটাও সিউর না। এই যে একটা ছাগল গেটের সামনে ঘাস খাচ্ছে, আমরা তো এটাকে জবাই করে আপাতত জীবন বাচাতে পারি। 

আমি বললাম, কার না কার ছাগল। কিভাবে জবাই করি? যদি মালিক পাওয়া যাইতো, তবে না হয় টাকা দিয়ে কিনে নিতে পারতাম। সেন্ট্রি বল্লো, স্যার যদি আমরা খেয়ে ফেলি, এক সময় অরিজিনাল মালিক হয়তো কাল বা পরশু এই ছাগল কোথায় গেলো খুজতে খুজতে ক্যাম্পে আসতেও পারে। তখন না হয় দাম দিয়ে দেবো। 

একদিকে ক্যাম্পে কোনো খাবার নাই, অন্যদিকে কার না কার ছাগল জবাই করে খেয়ে ফেলবো, ব্যাপারটা আমার কাছে কখনো অবস্থায় কারনে সঠিক বলে মনে হলেও আবার পরক্ষনে এটা নীতি বিরুদ্ধ কাজ সেটাও মাথায় চলে আসে। আমি আসলেই আমার সৈনিকদের নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি। এই চিন্তা নিয়েই ঘুমাতে গেলাম। 

পরদিন সকালে দেখলাম, ছাগলটা তখনো মেইন গেটের সামনেই শুয়ে আছে। এটা আর তার নিজ মালিকের ঘরে ফিরে যায় নাই। ব্যাপারটা আমার কাছে অসাভাবিক মনে হয়েছে। আরো অসাভাবিক মনে হয়েছে যে, কোনো উপজাতী তার ছাগলটা হারিয়ে গেছে এর জন্যে খুজতেও আসে নাই। কয়েকজন উপজাতী এর মধ্যে আমাদের ক্যাম্পে এসেওছিলো। কিন্তু কেউ বলতে পারে নাই আসলে এই ছাগলটা কার বা কে মালিক। 

হেলি সর্টি না আসার কারনে আমার মাথাও বেশ অগোছালো মনে হচ্ছিলো যে, কিভাবে এই ৪০/৪২ জন সৈনিকের প্রতিদিনকার খাবার আমি ব্যবস্থা করবো। এক সময় মনে হইলো যে, যদি আগামি কালও দেখি ছাগলটা ক্যাম্পের গেটে আছে, তাহলে এটাকে জবাই করে খেয়ে ফেলবো। পরে যদি কেউ খুজতে আসে, তখন না হয় মাফ চেয়ে ন্যয্য মুল্য দিয়ে দেবো। আপাতত জীবনতো বাচুক। 

রাতে ঘুমাতে গেলাম। বাইরে প্রচন্ড ঝড়, সাথে তুমুল বৃষ্টি, আগামী কালও যে হেলিসর্টি হবেনা এ ব্যাপারে আমি নিসচিত। 

সপ্নঃ 

আমরা ছাগলটা জবাই করে ফেলেছি। ক্যাম্পের সবাই আনন্দের সাথেই এটার মাংশ ছারাচ্ছে। আজ ভালো একটা খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে, এই আনন্দে প্রায় সবাই ছোট এই ছাগলটার মাংশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও পাশেই একটা চেয়ারে বসে সৈনিক মাংশ ছারান দেখছি। ছাগলের মাংশ বানানো শেষ। বিকালে বাবুর্চি মাংশ রান্না করেছে। রাতে আমার রানার ভাত আর ছাগলের মাংশ নিয়ে এলো আমার জন্য। কিন্তু একি? আমি ছাগলের মাংশের পরিবর্তে মনে হলো এটা তো কুকুরের মাংশ মনে হচ্ছে! আমার খুবই ঘেন্না লাগল। আমি কিছুতেই মাংশটা খেতে পারলাম না। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। 

আমি পরদিন দেখলাম, ছাগলটা তখনো মেইন গেটে শুয়ে আছে। কিন্তু এবার আর আমার সিদ্ধান্ত নিতে দেরী হয় নাই। আমি মনে মনে ভাবলাম, এতা খাওয়া যাবে না। এতা আমার জন্য এইভাবে খাওয়া হারামের ইংগিত দিচ্ছে। 

২৩/১০/১৯৯১-কেনো আমি নিজ ইচ্ছায় হিলে আসতে চেয়েছিলাম

জীবনে কিছু কিছু সময় থাকে যখন নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা জেনেও সে সেটাই করে। আপাতদৃষ্টিতে সিদ্ধান্তটা আত্তঘাতী বলে মনে হতে পারে, অথবা মনে হতে পারে মানষিক কোনো সমস্যা, কিন্তু যিনি এই মোড় ঘুরে যাওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তিনিই একমাত্র জানেন, কেনো এই আত্তঘাতীমুলক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বা নিতে হচ্ছে। কারো জীবনে যখন সারাটি দিন, ক্ষন অথবা মুহুর্ত বিপদের মধ্যেই থাকে, কিংবা এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই তার জীবন অতিবাহিত হয় যা সাভাবিক জীবন থেকে অনেক আলাদা, তখন কোনটা নিশ্চিত ক্ষতি আর কোনটা নিশ্চিত লাভ, এটা আর তখন বাছ বিচার করার সময় থাকে না, তেমনি থাকে না কোনো প্রাইয়রিটিও। সামনে যেটা আসে, সেটা আপাতত সামাল দিতে তখন যা যা করা উচিত বলে মনে হবে, সেটাই আসলে সঠিক সিদ্ধান্ত হিসাবে তাকে তাইই করতে হয়। হোক সেটা আত্তঘাতীমুলক বা এই জাতীয় কিছু। কখনো কখনো এই সিদ্ধান্তগুলি মানুষকে নিশ্চিত পরাজয়ের দারপ্রান্তে যেমন নিয়ে যেতে পারে, তেমনি পারে নিশ্চিত সাফল্যের দারপ্রান্তে নিয়ে যেতে। এটা এক প্রকারের গেম্লিং বলা যেতে পারে।

আমি যে সব ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে আমার প্রাত্যাহিক জীবন চালিয়ে যাচ্ছিলাম, তাতে আমার ব্যাপারে কি ঘটবে আর সেটা কিভাবে সামাল দেবো, এই বিচার আমারই ছিলো তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম না আমি কি পরাজয়ের পথে এগুচ্ছিলাম নাকি নিশ্চিত বিজয়ের পথে। আমার প্রাত্যাহিক জীবনে বেশ কিছু বিষয় ছিলো যা অনেকটা অমাবশ্যার দিন রাত্রির মতো। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কিভাবে এই রাহু বৃত্ত অমাবশ্যার ছোবল থেকে আমার নিস্তার বা পরিত্রান। আর আমি এটাও বুঝতেছিলাম না, আমার এই অমাবশ্যার ক্ষন কিভাবে কেটে যাবে। অমাবশ্যা কবে কাটবে তার জন্য হয়তো জজ্ঞের আয়োজন করা যেতে পারে কিন্তু অমাবশ্যা কাটবে কিনা সেটা কোন ভাবেই জজ্ঞ নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক সময় ছোট ব্যাপার বড় হয়, আর সেই বড় ব্যাপার থেকে তৈরী হতে পারে কোনো বড় ধরনের ঝামেলা। আমি ঠিক সে রকম একটা অমাবশ্যার পরিস্থিতিতে যেনো আছি।

বগুড়া সেনানীবাসে লোকেটিং ইউনিটে কর্মরত ছিলাম। আমার ওসি মেজর ইকবাল স্যার অনেক ভালো মানুষ কিন্তু চাপা সভাবের হওয়াতে তার সাথেও আমি অনেক কিছুই শেয়ার করতে পারছিলাম না। তাহলে ব্যাপারটা খুলেই বলিঃ

সেনানীবাসে একজন আর্মি অফিসারের বিয়ের বয়স অফিশিয়ালি নির্ধারন হয় তার বয়স কমপক্ষে ২৬ হতে হবে অথবা চাকুরীর মেয়াদ কমপক্ষে ৬ বছর যেটা আগে হয়। কিন্তু যে কোনো পরিস্থিতিই হোক আমি গত ৩০ শে মে ১৯৮৮ তারিখে কাউকে না জানিয়ে মিটুলকে বিয়ে করে ফেলি। এই ঘটনাটা জানাজানি হলে আমার শাস্তি হবে অনেক কঠোর এই কারনে যে, আমি আর্মির আইন ভংগ করে বিয়ে করেছি। সবচেয়ে কম শাস্তি হবে এই রকম যে, আমার অন্তত ২ বছরের সিনিয়রিটি কেড়ে নেয়া হতে পারে। তাই, আমার এখন কাজ হচ্ছে, সময় পার করা যাতে আমি আর্মির নিয়ম অনুসারে অন্তত হয় ২৬ বছর বয়সী হই অথবা চাকুরীর মেয়াদ অন্তত ৬ বছর পার করি। আর এটা হতে আমার আরো দেড় বছর বাকী। এই দেড় বছর আমাকে এতোটাই সাবধানে চলতে হবে যেনো কোনো গোয়েন্দা, কিংবা কোনো অফিশিয়াল তদন্তের মধ্যে পড়ে না যাই। ব্যাপারটা খুবই আতংকের। মিটুল (মানে আমার স্ত্রী) যেহেতু জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, ফলে ওকে হোষ্টেলে রাখাতে আমার অন্তত একটা বউ লুকানোর জায়গা ছিল। কিন্তু মাঝে মাঝে মিটুল বগুরায় ওর এক বোনের বাসায় আসে যেখানে আমরা দেখা করি, রাত্রি যাপন করি। এটাও খুব বিপদজনক। কারন বগুড়া সেনানীবাস খুব ছোট একটা সেনানিবাস (বিশেষ করে জাহাজ্ঞিরাবাদ সেনানিবাস)। এখানে প্রতিটা অফিসারের মুভমেন্ট গোয়েন্দা সংস্থা খুব শক্ত করে মনিটর করে।

এমনই এক সময়ে আমাকে আমার আরপি (রেজিমেন্টাল পুলিশ) হাবিলদার (হাঃ মোজাম্মেল) কানে কানে একটা ইনফর্মেশন দিলো যে, স্যার, মিটুল চৌধুরী কে? আমার তো পিলে চমকে উঠার মতো অবস্থা। কারন মিটুল চৌধুরী সম্পর্কে বা এই নামটা তো অন্তত আমার আরপি হাবিলদার কোনোভাবেই জানার কথা নয়। জিজ্ঞেস করলাম, কেনো, কি হয়েছে? মোজাম্মেল জানালো যে, কোনো এক গোয়েন্দা বাহিনীর কেউ তাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছে। ব্যাপারটা আমাকে ভীষনভাবে ভাবিয়ে তুল্লো। ভাবলাম, যদি সত্যি সত্যিই কেউ এ ব্যাপারে খোজ খবর নেয়, তাহলে, আমি ফেসে যাবো, আর সেটা খুব দ্রুত। এর থেকে মুক্তির একটা উপায় বের করতে হবে যাতে আমি নিরাপদে আরো দেড় বছর কারো চোখে না পড়ি।

অনেক ভাবলাম ব্যাপারটা নিয়ে। কারো সাথে এটা নিয়ে কোনো আলাপ আলোচনাও করতে পারতেছিলাম না। তাই নিজে নিজে দুটূ জিনিষ নিয়ে গবেষনা করলাম। (১) কোনো না কোনোভাবে আমার জানান দেয়া উচিত যে, মিটুল চৌধুরী আমার কি হয়। (২) জানান দেয়ার পর আমাকে ইমিডিয়েটলী লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়া যাতে আমাকে নিয়ে গোয়েন্দা বাহিনীর কারো অতিরিক্ত ইন্টারেষ্ট নিতে না হয়। সে মোতাবেক, পরেরদিন আমি আমার ওসিকে বললাম, স্যার, আমার বাড়ি থেকে আমার বিয়ের ব্যাপারে মেয়ে দেখা হয়েছে। আপাতত “এঙ্গেজমেন্ট” করতে হয়েছে কিন্তু বিয়ের বয়স হলে আমরা বিয়ে করবো। আমার ওসি মেজর ইকবাল হাসলেন, কেনো হাসলেন বুঝা গেলো না। শুধু বললেন, ভালোই তো।

আমি সবাইকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিতে চাই বলে যারা যারা এটা নিয়ে মাতামাতি করতে পারে সেখানে সেখানে একটা করে মিষ্টির প্যাকেট পাঠিয়ে দিলাম যেখানে লেখা ছিল, ” মিটুল চৌধুরীর সাথে ক্যাপ্টেন আখতারের এঙ্গেজমেন্টের মিষ্টি”। ব্যাপারটা খুব কাজে লাগলো। মুটামুটি সবাই জানতে পারলো যে, আমার এঙ্গেজমেন্ট হয়েছে মিটুলের সাথে কিন্তু বিয়ে পরে হবে। আর্মিতে বিয়ের বয়সের আগেও এঙ্গেজমেন্ট করার বিধান আছে। ফলে এটা কোন অপরাধ নয়। এবার আমার ২য় পলিশিতে পদার্পন করার পালা। অর্থাৎ লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়া। কিভাবে সেটা? ঠিক এর মধ্যে চিটাগাং হিল ট্রেক্সে ডেপুটেশনে যাওয়ার একটা অপসন চলে এলো। আর সেটা চিটাগাং হিল ট্র্যেক্সে বিডিআর এর সাথে সংযুক্তি। ছয় মাসের জন্য সংযুক্তি। আমি জানি এটা খুব রিস্ক কারন চিটাগাং হিলট্র্যেক্স একটা ঝুকিপুর্ন এলাকা যেখানে প্রতিদিন শান্তিবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করেই বেচে থাকতে হয়। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, ওখানে গেলে আমার লাইফ রিস্ক আছে কিন্তু তাতে লাভ হবে যে, আমি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে পারবো। ফলে নরম্যাল সেনানীবাসে আমাকে নিয়ে আর কেউ মাতামাতি করবে না। আবার যদি না যাই, তাহলেও বিপদ। আমি প্রথম বিপদটাই বেছে নিলাম। এর কারন দুইটা। এক নম্বর কারন হচ্ছে-লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়া আর দ্বিতীয় কারন হচ্ছে কিছু টাকাও বাড়তি আসবে যেহেতু ওখানে রিস্ক এলাউন্স পাওয়া যায় আবার খরচও কম। আমার টাকারও দরকার ছিলো। এই উভয় সঙ্কট পরিস্থিতিতে আমি আমার ওসিকে বললাম যে, স্যার আমি বিডিআর এর সাথে সংযুক্তি হতে ইচ্ছুক। ডিভিশনে অনেকেই হিলট্রেক্সে যাওয়ার ব্যাপারে উদাসীন, সেখানে আমি ইচ্ছুক বিধায় অপ্সনটা পেতে সময় লাগে নাই। আমার অনুমতি মিলে গেলো। আর সেই সুবাদে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ তারিখে আমার অফিশিয়াল সংযুক্তি আদেশ জারী হলো। আর আমি এর মাঝে কয়েকদিন ছুটি কাটিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে এই নিউ লংকারে ক্যাম্পে যোগ দিয়েছি।

চিটাগাং হিল ট্রেক্সে সচেতন থাকলে হয়তো বেচে যাবো কিন্তু প্লেইন ল্যান্ডে গোয়েন্দারা জোকের মত যেভাবে পিছনে লেগে থাকে তাতে সচেতন থাকলেও বেচে যাওয়ার সম্ভাবনা নাই। তাই হয়তো এই নিউ লংকার বিডিআর ক্যাম্প আমাকে বাচিয়ে দিতে পারে।

১৮/১০/১৯৯১-নিউ লংকার ক্যাম্প জীবন (পর্ব-৪)

জ্যোৎস্না সন্ধ্যায় যখন আমি ক্যাম্পের উঠোনের ঠিক মাঝখানে বসি, তখন দেখিতে পাই আকাশের মেঘমালা একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়া পাহাড়ি বাতাসের সাথে একাকার হইয়া কাধে কাধ লাগাইয়া, এক জায়গা হইতে অন্য জায়গায় দ্রুত স্থান পরিবর্তন করিতেছে। কখনো কখনো এই মেঘমালা চাদের কিরনকে পরিবেষ্টিত করিয়া আমার পুরু ক্যাম্পকে আবছা অন্ধকারে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করে, আবার কখনো কখনো মেঘগুলি এতো নীচু দিয়া প্রবাহিত হয় যে, আমার সারা শরীর ভিজিয়া যায়, আমার হাতে থাকা সিগারেটটাও সিক্ত হইয়া আসে। আর্মিতে আসিবার পর আমি অনেক রাত একা একা নির্জন কোনো গায়ের পথ ধরিয়া মাইলের পর মাইল হাটিয়া গিয়াছি। গহীনরাতে আমি সেই মেঠোপথে পেচাদের ডাক শুনিয়াছি। কখনো কখনো আলো আধারে ঘেরা কোনো এক পুকুরের পাশে বসিয়া ব্যংগ সমুহের নাক ডাকা শব্দও শুনিয়াছি।  এই পৃথিবীর রুপ দেখিয়া আমি দিনের আলোয় জেগে উঠা পৃথিবীর রুপের কোনো মিল খুজিয়া পাই নাই। আসলে ঘুমন্ত পৃথিবীর একটা রুপ আছে। জ্যোৎস্নায় ইহার রুপ এক রকম, আবার অমাবশ্যায় ইহার রুপ অন্য রকম। জাগ্রত পৃথিবীর রুপ ঘুমন্ত পৃথিবীর রুপের মতো নয়।

এখন রাত প্রায় বারোটা। আমার ক্যাম্পের সেন্ট্রিপোষ্টের প্রহরী ছাড়া আর সবাই ঘুমিয়ে আছে। আমার থেকে অনতিদূরের ঘরটায় নূর মোহাম্মাদ ওয়্যারলেস অপারেটর মৃদু হারিকেনে ঝিমাইতেছে। নূর মোহাম্মাদের পাশে থাকা ওয়্যারলেস যন্ত্রটা মাঝে মাঝে বেশ সিজিত হইয়া অন্য কোনো ষ্টেশন থেকে “হ্যালো হ্যালো” বার্তা দিয়া নীরবতা ভঙ্গ করিতেছে। আমি আকাশ থেকে ঝরে পরা নির্মল জ্যোৎস্নায় স্নান করিতেছি একা।

হটাত কারো পায়ের আওয়াজ পাইলাম। ঘাড় ঘুরাইয়া দেখিতে পাইলাম, হাবিলদার আব্দুর রহমান রুম হইতে বাহির হইলো। জিজ্ঞেস করিলাম, কোথায় কি কারনে বাহির হইলো। আমাকে একা উঠানে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া আব্দুর রহমানও একটু হচকচিয়ে গেলো। এতো রাতে তো আমাকে এই উঠনে দেখার কথা নয়। সালাম দিয়া বলিল, স্যার, ঘুম আসিতেছে না? আমি রহমানকে কিছুই বলিলাম না। প্রায় মিনিট পাচেক পর আব্দুর রহমান বাথরুম করিয়া আবারো তাহার ঘরে প্রবেশ করিতে যাইবে, এমন সময় আমার মনে হইল, আব্দুর রহমানের সাথে কিছু কথা বলি। আমি তাহাকে ডাকিয়া বলিলাম, -রহমান, কাল তোমার কি ডিউটি? অফ ডিউটি নাকি কোনো ডিউটি আছে?

আব্দুর রহমান সাবলিল ভংগিতে জানালো, -স্যার আগামিকাল আমার কোনো ডিউটি নাই। পরপর কয়েকদিন আমি ডিউটি করার কারনে আগামি দুইদিন আমার অফ ডিউটি। কিন্তু স্যার ক্যাম্পের মধ্যে অফ ডিউটি আর অন ডিউটির মধ্যে আসলে কোনো তফাত নাই। যেখানে থাকার ঘর তার পাশেই ডিউটির ঘর, আবার তার পাশেই রান্না ঘর তো তারই পাশে টিভি রুম। কতটুকুই বা জায়গা স্যার।

বললাম, বসো। আচ্ছা রহমান, তুমি সারাদিন জাল বুনো কেনো? এটা কি তোমার নেশা? আব্দুর রহমান পাশেই একটা ছোট কাঠের গুড়ি নিয়া আমার সামনে বসিয়া পড়িলো। আগেই একবার বলিয়াছিলাম যে, বিডিআর সৈনিকেরা আমাদের আর্মির সৈনিকের চেয়ে ঢেড় বেশী ফ্রি। তাহারা আমাদের আর্মির সৈনিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ক। আব্দুর রহমান, কাঠের গুড়িটায় বসিয়া বলিতে লাগিলো-

স্যার, জাল বুনা আমার নেশা না। এটা বলতে পারেন আমার একটা ইনকামের পথ। আমি প্রতি তিনদিনে একটা জাল বুনি। এ যাবত কাল আমার ট্রাংকের মধ্যে প্রায় ৫০ টার বেশী জাল বুনা আছে। আমি যেদিন ছুটি যাবো, আমি এই জালগুলি সাথে করে নিয়ে যাবো। প্রতিটা জালে আমি প্রায় একশত করে টাকা লাভ করতে পারবো। তাতে আমি ৫০টি জালে হাজার পাচেক টাকা লাভ করবো। আমার পরিবারের জন্য টাকাটা অনেক কাজে লাগবে। আমার বড় ছেলেটা এবার মেট্রিক দেবে। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে। ভাল আছি স্যার সব মিলিয়ে।

আব্দুর রহমানের কথায় আমি খুবই অবাক হইলাম। মাত্র হাজার পাচেক টাকা তো বিডিআর সৈনিকের কাছে কিছুই না। যে পরিমান অবৈধ পন্য, চোরা কারবারীর মাল ,কিংবা বর্ডার সুরক্ষার নামে যে পরিমান অবৈধ নারকোটিক্স পাচার হয়, তাতে তো কোটি টাকার খেলা। আর এই আব্দুর রহমান কিনা মাত্র ৫ হাজার টাকাতেই এতো খুসি? আব্দুর রহমান এই নিশব্দ রাতে, একাকী আমাকে যাহা যাহা বলিলো, তাহাতে আমার রহমানের প্রতি বিনম্র ভালোবাসা আর শ্রধ্যায় মাথা হেট হইয়া আসিলো।

স্যার, যেদিন আমি প্রথম এই কর্মজীবনে আসি, আমি দেখেছি, কি হরিলুট হয় আমাদের এই কর্মজিবনে। এমনো হয়েছে যে, এক রাতের ইনকাম হয় লাখ লাখ টাকা। আমি আজ পর্যন্ত কোনোদিন কখনো কোনো অবস্থাতেই একটি টাকাও অবৈধভাবে কামাই করি নাই, খাইও নাই। অনেক সময় আমার সহকর্মীরা ভাগ বাটোয়ারা করে হয়ত আমার ভাগেরটা আমার তোষকের নীচে রেখে গেছে, আমি সেটা কোনোদিন খুজেও দেখি নাই, ধরেও দেখি নাই। কেউ যদি এই অবৈধ টাকা আমার তোশকের তল থেকে চুরী করেও নিয়া যায়, বা গেছে, তাতেও আমার কোনো কিছুই যায় আসে না। টাকাটাই তো আমার না। আমি সবসময় সৎ রোজগারে বিশ্বাসী ছিলাম, এখনো আছি, আল্লাহই যথেষ্ঠ আমার শান্তি আর সুখের জন্য। নামাজ পড়ি, রোজা করি, কারো সাথে ঝামেলায় যাই না, আমি আমার কাজগুলি ঈমানের সাথে করার চেষ্টা করি। কয়দিনই বা বাচবো স্যার। তারপর কি? আমি কি আমার এই সব সম্পদ, টাকা পয়সা সাথে করে নিয়ে যেতে পারবো? স্যার আমি মরনকে দেখেছি খুব কাছ থেকে। আমি দেখেছি কত বিত্তবান মানুষ অঢেল সম্পত্তির উপর শুয়ে থেকেও তার ওই সব টাকা কোনো কাজেই লাগে নাই। তাহলে কি লাভ এই পচা, অবৈধ আর দূষিত টাকা কামানো? তার থেকে আমি এই যে প্রতি তিন দিনে একটা জাল বানাই। আর যা লাভ হয়, সেটায় অনেক বেশী বরকতময় স্যার। আমার সাথে কারোই বনে না বলে ওরা আমাকে রদ্দিমাল বলেই কেউ কেউ টিটকারী করে, কেউ আবার বোকা বলে, কেউ আবার আমার কিছুই নাই বলে ফকিরন্নীও বলে। আমি তাতে কোনো কিছুই মাইন্ড করি না। আমি শুধু জানি, আমাকে সম্মানীত করার মালিক একমাত্র আমার প্রভু, আল্লাহ।

আব্দুর রহমান কথাগুলি বলিয়া চলিয়া গেলো। আর আমাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলো, স্যার, অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাইয়া পরেন। খোলা আকাশে এভাবে বসে থাকলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। পাহাড়িয়া এলাকা, কেউ অসুস্থ্য হলেও তাকে সুস্থ্য করবার লোক আশেপাশে থাকে না। আব্দুর রহমান চলিয়া গেলো।

কি অদ্ভুত দর্শন আব্দুর রহমানের। টাকাই যদি সমস্ত সুখের মূল হইতো তাহলে আজ থেকে শত বর্ষ আগে যে সব রাজ রাজারা সমস্ত ভুখন্ডের মালিক ছিলো, তারা তো আর আজীবন কাল যেমন বাচিয়া নাই, তাদের বংশ ধরেরাও হয়তো আর রাজ রাজাদের মতো বিলাশ বহুল জীবনেও নাই। আমি আরো অনেক ক্ষন সেই জোস্নাস্নাত রাতের আলোতেই ক্যাম্পের উঠোনে বসিয়া রইলাম। পাশেই কোনো এক বাদুরগোছের কোনো নিশাচর হয়তো একটা গাছ হইতে আরেকটা গাছের ডালে যাইবার জন্য কুহুকুহু শব্দের মতো শব্দ করিয়া স্থান পরিবর্তন করিলো। লোকচক্ষুর অন্তরালে, ঘুমন্ত পৃথিবীর চরনতলে, একা একা কত ঘটনা, কত ইতিহাস, কত যে, গল্প তৈরী হয়, তাহা অনেকের হয়তো জানা নাই কিন্তু জীবন্ত পৃথিবীর তুলনায় ঘুমন্ত প্রিথিবীতেই বেশির ভাগ ইতিহাসের সুত্রপাত।

আমি আকাশের দিকে চাহিয়া ভগবানকে দেখার চেষ্টা করিলাম। আসলেই কি ভগবান অই আকাশের উর্ধতলে থাকেন? নাকি তাহার বিচরন ওই আকাশের উর্ধতল থেকে শুরু করিয়া আমার ক্যাম্পের এই সেন্ত্রিপোষ্টের একটি খাম্বার পাশেও থাকেন, অথবা ওই যে বাজপাখীটা এইমাত্র স্থান পরিবর্তন করিলো ইহার মনের ভিতরেও আছেন। সারাটি পৃথিবীর মানুষ যখন ঘুমায়, ভগবানের এতো বড় দুনিয়ায় তখন হয়ত অন্য কোনো গ্রহে, অন্য কোন নক্ষত্রে কিংবা অন্য কোনো এক অপরিচিত জগতে আমার মতো হয়ত কেউ আরেকট নিউলংকার ক্যাম্পে মাঝরাতে বসিয়া সেই ভগবানের রহস্য লইয়া ভাবিতেছে। কে জানে। 

দুনিয়া বড় রহস্যময় স্থান। এর দিন আর কাল যেমন সদা পরিবর্তনশীল, জীবন ও একদিন সব কিছু পরিবর্তন করিয়া তাহার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়া স্থিত হইবে। তখন ইহার আগের ইতিহাস কেউ হয়তো আর মনেও রাখিবে না যেমন আজ থেকে হয়তো আরো ৫০ বছর কিংবা ৫ বছর পরে কেউ মনে রাখিবে না যে, আমি ঠিক এই স্থানে এক রাতে ঈশ্বরের কথা ভাবিয়া অনেকতা সময় পার করিয়াছি।

১২/১০/১৯৯১-নিউ লংকার ক্যাম্প জীবন (পর্ব-৩)

ক্যাম্প লাইফ ভীষন বোরিং। কতক্ষন একটা ছোট জায়গায় বন্দি হয়ে থাকা যায়? ভাবলাম, পাশের গ্রাম গুলিতে মাঝে মাঝে ঘুরতে যাবো। ওদের সাথে একতা সামাজিক বন্ধন তৈরী করলে অসুবিধা কি? আমরা তো সমাজের বাইরে কেউ না। আর আমি তো এখানে আছিই এই সেতু বন্ধনের মতো একতা ভালো পরবেশ তৈরী করে এই এলাকাকে নিরাপদ করা।  সে মোতাবেক, আমি একতা সিডিউল করলাম, কিভাবে কখন কি নিয়ে ওদের সাথে আলাপ করা যায়, কিভাবে ওদের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হ ওয়া যায়। যে যতো কিছুই বলুক, আর্মির উপস্থিতি কোনো উপজাতী পছন্দ করে না। এটা তারা মনে করে তাদের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ। অনেকে হয়তো সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু তাদের আকার ইংগিত আর চাল চলনে এতা খুবই স্পষ্ট। ওরা আসলেই আমাদের আর্মিএ পছন্দ করে না। কিন্তু বন্দুকের নলের সামনে আর যাই হক, বাহাদুরী চলে না। তাই ইচ্ছা না থাকলেও ভালো সম্পর্ক আছে এটাই প্রকাশ করতে হয় প্রতিটি উপজাতীকে। অথচ আমি হয়তো বুঝতে পারছি না, কোন আচরন তা শুদ্ধ আর কোন আচরনটা আসলে লোক দেখান। সত্য এবং মিথ্যার বসতির এই সম্পর্কের মধ্যে না জানা যেমন অনেক কথা থাকে, তেমনি অনেক বিপদের গন্ধও থাকে। না বলা কথা না জানার চেয়ে বিপদের গন্ধতা আচ করতে পারাতা অনেক বেশী জরুরী। তাই আমিও সচেতন হয়েই কিছু কিছু সময় পাশে পাংখু এলাকায় গ্রাম বাসীদের সাথে মেলামেশার চেষ্টা করছি। কিন্তু চোখ কান খোলা আছে।

আমি ক্যাম্প লাইফটাকে আরো সহজ এবং আরামদায়ক করার জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলাম। তার মধ্যে একটা হচ্ছে- ক্যাম্পে মাটি কেটে কেটে মাটির উপরেই ব্যাপের মত বিভিন্ন স্থান তৈরী করা যা বর্তমান আমার এলাকায় আছে। যেমন কার বাড়ির পাশে কার বাড়ি, কোন গ্রামের পর কোন গ্রাম, কোন কোন রাস্তা আছে কোন কোন জায়গায় যেতে, কোথায় টংঘর, কোথায় রুট প্রোটেকশন ক্যাম্পগুলি আছে। ইত্যাদি। ক্যাম্পের সৈনিকদের বেশ সারা পাওয়া গেলো। আমরা যার যার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটা মুটামুটি মাটির অপারেশন রুম বানিয়ে ফেললাম।

আমার ক্যাম্পটা খুব বেশী বড় না। মোট ৫ টা ঘর। একটা আমার ঘর, একটা মসজিদ, একটা ছোট ওয়্যারলেস রুম কাম সৈনিকের থাকার জায়গা, একটা টিভি রুম। আরেকটা ঘর বেশ বড় সেখানে সৈনিকেরা থাকে, সাথে একটা ক্যান্টিন। রান্না ঘর, বাথ রুম, এগুলি সব আলাদা। প্রচুর গাছপালা আছে। ক্যাম্পের অদূরেই আরেকটা হিলটপ আছে যেখানে আমরা হেলিপ্যাড বানিয়েছি। যখন হেলিসর্টি হয়, তখন এই হেলীপ্যাডেই হেলিকপ্টার ল্যান্ড করে। আমাদের হেলিপ্যাডটা আমাদের সেন্ট্রিপোষ্ট এর অস্ত্র দ্বারা কাভার করা। এটা খুবই জরুরী। আমার রুমটা যেখানে, সেটা মেইন গেটের একদম সাথে। আমার ঘরটার পিছন দিয়ে ছোট একটা রাস্তা গেছে যাতে আমি অন্যান্য সেন্ট্রি পোষ্টগুলিতে অনায়াসেই যেতে পারি। ক্যাম্প সুরক্ষার জন্য আমি মোট তিনটা জায়গায় ইন্টারলক সিস্টেমে সেন্ট্রিপোষ্ট লাগিয়েছি। দিনের বেলায় সেন্ট্রি পোষ্টগুলিতে একজন আর রাতের বেলায় দুইজন করে ডিউটি করে। সবার কাছে একটা করে হুইসেল আর টর্চ লাইট দেয়া আছে। সেন্ট্রিপোষ্টের অস্ত্রটি একটি লোহার চেইন দিয়ে বাধা যাতে কোনো কারনে রাতের বেলায় সেন্ট্রি তার অগোচরে ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে শান্তিবাহিনী অস্ত্রটি তুলে নিয়ে যেতে না পারে।

আমি ক্যাম্পের তিনপাশেই তিনটা বেতের চেয়ারের মতো করে বাশের কঞ্চি দিয়ে দিয়ে চেয়ার বানিয়েছি যাতে আমি ওখানে বসতে পারি। পড়ন্ত বিকালে কিংবা খুব সকালে এই জায়গাগুলিতে বসে প্রাকৃতিক সউন্দর্য দেখতে বড্ড মিষ্টি মনে হয়। খুব ভোরের আকাশ আর সুর্যাস্তের আকাশে একটা বড্ড মিল আছে। দুটি সময়েই আকাশকে বড় নির্মল মনে হয়। লাল আভায় ফুটে উঠে চারিদিকের পাহাড়। সুর্যের প্রথম আলো যখন আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের উপর প্রতিফলিত হয়, তখন মেঘের রঙেও একটা শৈল্পিক রুপ ধারন করে।  দূরের পাহাড়ের গাছপালাগুলি আমার ক্যাম্প থেকে দেখলে এমন মনে হয় যেনো, আমি পুরু পাহাড়টার উপর থেকে নীচের বনরাজ্যকে দেখছি। আমার ক্যাম্প থেকে বঙ্গোপসাগরের পানি দেখা যায়। সেই সুদুর সাগর, নীল আকাশ আর পাশের পাহার একসাথে মিলে কি যে এক অদ্ভুদ নৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি করে ভাবাই যায় না।   

মাঝে মাঝে সারাদিন বৃষ্টি হয়। মুষল্ধারে যখন বৃষ্টি হয়, তখন কোথা থেকে যে কয়েকটি কাক আমার ঠিক ঘরের নীচে বেল্কনীর মতো একতা জায়গায় এসে আশ্রয় নেয় জানি না। হয়তো আশেপাশেই এর বাসা। ব্রিষ্টির কারনে আবহাওয়া একটু ঠান্ডা থান্ডা ভাব থাকে, শীত শীত ভাব থাকে। আমি তখন কম্বল গায়ে দিয়ে ব্রিষ্টির পানি পরতে দেখি। আমার গ্রামের কথা মনে পড়ে, আমার মায়ের কথা মনে পড়ে, আমার বাড়ির কথা মনে পড়ে। 

এবার বলি আমি এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে কিভাবে একটা সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাটা করলাম। পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষিত লোক নাই এটা বললে একেবারেই ভুল হবে। এদের সমাজের মধ্যেও এরা কাউকে মানে, কাউকে গুরু মনে করে আবার কাউকে শসাওন ও করে। এদের নিজস্ব একটা বলয় আছে যা আমাদের তথাকথিত সমাজের বাইরে। আমি এখানকার হেড ম্যানকে মাঝে মাঝে ডাকা শুরু করলাম। তাকে আমিও হেড ম্যান হিসাবে অথবা একটা গুরুজন হিসাবে দেখা শুরু করলাম। সে যখন ক্যাম্পে আসে, আমি তাকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম। ওরা অনেক কষ্ট করে যে ফসল ফলায়, তার থেকে কিছু ফসল নিজেদের জন্য রেখে সেই বহুদূর বাকীটা বিক্রি করে। আমরা অবশ্য আমাদের সব খাবার দাবার হেলি সর্টির মাধ্যমে চিটাগাং থেকে আসে বিধায় আমরা ইচ্ছা করলেও আমরা পাহাড়ি উপজাতীর কাছ থেকে সব পন্য কিনতে পারি না। তারপরেও আমি দেখেছি আমার সৈনিকেরা মাঝে মাঝে কিছু পন্য ওদের থেকে কিনে থাকে। তাই ভাবলাম, আমরা পরিকল্পনা করে যদি কিছু জিনিষ পত্র কিনতে থাকি, তাহলে ওরাও আর কষ্ট করে এতোদূর হাটে গিয়ে পন্য বিক্রি করতে হয় না। যারা এই পন্য ক্যাম্পের পাশেই বিক্রি করতে পারবে, তারাও ধীরে ধীরে ক্যাম্পের মানুষ গুলির সাথে একটা বন্ধুত্ত তৈরী করবে। এছাড়া আরেকটা বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি যে, প্রায়ই ওরা কিছু না কিছু ট্রাইবাল অনুষ্ঠান করে। আমি ওদেরকে বলেছি যে, যখন কোনো সাহাজ্য লাগবে আমি কিছু কিছু সাহাজ্য করতে পারবো, যেমন রঙ্গিন বেলুন দেয়া, কিংবা কিছু টাকা পয়সা দেয়া ইত্যাদি। এসবের একটাই কারন ছিলো যাতে ওরা মনে করে আমরা ওদেরকে নিষ্পেষিত করতে এখানে আসি নাই, আমরা আর ওরা একই দেশের নাগরিক। আমরা একে অপরের জন্য। দেশটা আমার যেমন, এই দেশটা তাদেরও। আমার এই কর্মশালা ভীষন কাজে দিলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে গেলাম যে, আমরা যখন ওদের গ্রামে পেট্রোল করতে যাই, তাদের আচরন পালটে গেছে, তাদের ব্যবহার আগের থেকে অনেক বেশী আন্তরীক। 

ভালোবাসা কে বুঝে না? একটা অবুঝ শিশু ও ভালোবাসা বুঝে যে হয়তো কোনো ভাষাই জানে না। একটা বোবা পশু ও ভালোবাসা বুঝে যে কিনা আমাদের মানুষের সমাজের কোনো আইনের ধার ধারে না। কিন্তু ভালোবাসায় অনেক ভালো ফল পাওয়া যায়। ক্যাম্প লাইফটা আগের থেকে অনেক ভালো লাগছিলো। এখন আর খুব একটা বোরিং লাগে না। কেউ না কেউ ক্যাম্পে আসেই। কখনো যুবক, কখনো মহিলা, কখনো বয়ষ্ক ব্যক্তিরা। মাঝে মাঝে কয়েক জন মিলেও ক্যাম্প দেখতে আসে। আমি নিরাপত্তার ব্যাপারটা মাথায় রেখে যতোটা সম্ভব তাদেরকে আপ্যায়ন করি। ওরা খুসি মনেই আবার ফেরত যায়। ওরা একটা জিনিষ বুঝে গেছে আমরা ওদের কোনো ক্ষতি করবো না। ওরাও আর আমার ক্ষতি করতে পারে এটার ঝুকিটাও কমে গেছে। 

০৮/১০/১৯৯১-নিউ লংকার ক্যাম্প জীবন (পর্ব-২)

উপকার করার মানসিকতা আর উপকার করার ইচ্ছা যদি কারো থাকে, কোনো না কোন একটা উপায় বের হয়েই যায়। ক্যাম্প গুলিতে যে সব সৈনিক রা থাকে, তারা অনেকটা সমাজের একেবারে বাইরের কোনো এক আলাদা সমাজের মতো। এরাই একটা আলাদা সমাজ। কিন্তু এদের পরিবার আছে, সন্তান আছে, নিজেদের বাবা মা আছে, আছে বন্ধু বান্ধব। এদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছুটি নিয়ে। একবার যদি কেউ এই পাহাড়ে ঢুকে যায়, তারা যেনো আর কারো মনের ভিতরেই থাকে না। আমার কাছে দুটু ক্যাম্পের সৈনিকরাই তাদের একতা আবদার বারবার পেশ করে যাচ্ছিলেন, ছুটি কিভাবে রেগুলার করা যায়।  সাজেক আর ওল্ডলংকারের সৈনিকদের ছুটির ব্যাপারে আমি ক্রমাগত মাথা খেলাচ্ছিলাম কিভাবে এসব সৈনিকদের ছুটিটার ব্যবস্থা করা যায়। একদিন পেট্রোল করতে গিয়া আমি উভয় ক্যাম্পের সৈনিকদের সাথে কিভাবে কি করা যায় এটা নিয়ে বিস্তারীত আলাপ করি। কারন তারা ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ককে আমার মতো কনভিন্স করতে সাহস পাচ্ছিলেন না। সাজেকের এক সৈনিক আমাকে একটা সাজেশন দিলো যে, স্যার কোনোভাবে কি ইন্টারক্যাম্প সৈনিকের পোষ্টিং করা যায় যাতে কিছু সৈনিক আপনার ক্যাম্প থেকে আপনার সৈনিক হিসাবে হেলিসর্টির মাধ্যমে ছুটিতে যেতে পারে?

মাথায় বুদ্ধিটা এলো। কিন্তু আসলেই ইন্টারক্যাম্প সৈনিক পোষ্টিং তো আমার হাতে নাই, এটা করতে পারে ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক। তারপরেও আইডিয়াটা খারাপ মনে হলো না। ব্যাটালিয়ানের অধিনায়কেরও তো সৈনিকের ছুটিছাটা নিশ্চিত করার নৈতিক দায়িত্ত আছে। হতে পারে, আমার এই আইডিয়াটা অধিনায়ক মেনে নিতে পারে। ভাবলাম, এটা ওয়্যারলেস সেটে কথা না বলাই ভালো। অধিনায়ক যখন ক্যাম্প ভিজিটে আসবে, তখন তার সাথে বিস্তারীত আলাপ করবো।

আল্লাহর কি রহমত, এরই মধ্যে খবর পেলাম, বিডিআর ক্যাম্পগুলিতে সয়ং জিওসি ভিজিট করবেন। ভাবলাম, এটাই সুযোগ। আমি কি জিওসিকে সরাসরি সৈনিকদের এই পয়েন্টটা দিবো কিনা। আবার দিলে কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটাও ভাবা দরকার। সব মিলিয়ে আমি সরাসরি জিওসিকে না বলাই উত্তম মনে করলাম। বরং আমি ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক মেজর জিয়াকে সৈনিকদের ছুটির এই সমস্যাটা তুলে ধরলাম যে, জিওসির ভিজিটের সময় যদি কোনো সৈনিক তার ছুটির সমস্যাটা তুলে ধরেন, তাতে ব্যাটালিয়ানের ইমেজ খারাপ হতে পারে এবং অধিনায়কের ব্যাপারেও জিওসির ধারনা খারাপ হতে পারে যে, এই ইউনিটে সৈনিকের এডমিন ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। মেজর জিয়া এবার ব্যাপারটা কিভাবে সমাধান করা যায়, সেটাও তিনি আমাকে ভাবতে বললেন। জিয়া স্যার চান না যে, ছুটির এই ব্যাপারটা জিওসির কানে আসুক। আমি মেজর জিয়াকে বললাম, যে, স্যার, যদি এমন হয় যে, আমার পাশের দুই ক্যাম্পের সৈনিকদেরকে পর্যায়ক্রমে আমার ক্যাম্পে ইন্টারচেঞ্জ করা যায়, তাহলে পাইলটদের বলে আমি ৩ জনের জায়গায় হয়ত ৪ জন তুলে দিতে পারবো। বিশেষ করে যখন এমআই ১৭ হেলি এখানে আসে। এমআই ১৭ হেলিতে বেশ কিছু অতিরিক্ত পেসেঞ্জার তোলা যায়। মেজর জিয়া ব্যাপারটা বুঝে রাজী হয়ে গেলেন। তার মানে দাড়ালো এটা যে, যারা যারা ছুটি যাবে ওই সাজেক এবং ওল্ডলংকার থেকে, শুধুমাত্র তারাই আমার ক্যাম্পে বদলি হবেন হেলিসর্টির আগে। বাকীটা আমরা এরেঞ্জ করে নেবো। এভাবেই আমি আমার ক্যাম্প, অল্ডলংকার এবং সাজেকের অনেক সৈনিকের বহুত আখাংকিত ছুটির একটা ফয়সালা করে ফেললাম। তাতে একটা মজার ব্যাপার ঘটে গেল যে, যদিও আমি সাজেক কিংবা ওল্ড লংকারের ক্যাম্প কমান্ডার না, কিন্তু আনঅফিশিয়ালি সৈনিকেরা ক্রমান্নয়ে যেন আমিই তাদের কমান্ডার এরুপ আচরন করে প্রচুর সমস্যা শেয়ার করতে লাগলো। দেখা গেলো, আমি যেদিন পেট্রোলে যাবো হয় সাজেক বা ওল্ডলংকারে, সেদিন যেনো ক্যাম্পগুলির সৈনিকেরা একটা আনন্দের মধ্যে থাকে যে, আমি যাচ্ছি তাই। আমিও যেনো অলিখিতভাবে ওদের ক্যাম্প কমান্ডারই ভাবতে লাগলাম। 

সৈনিক জীবনের মতো জীবন কোথাও নাই। আর এই জীবন কারো পক্ষেই কোথাও কৃত্তিম ভাবে পালন করা সম্ভব নয়। হাতে অস্ত্র আছে, সাথে আছে বুলেট, আর যার কাছে এটা সরকার বৈধ ভাবে সারাক্ষন রাখার লাইসেন্স করে দিয়েছেন, তারা সবাই প্রশিক্ষিত। অথচ ট্রিগারটা টিপার আগে সেই সৈনিক হাজারবার চিন্তা করে। সব তার হাতে কিন্তু কন্ট্রোলিং ক্ষমতা কমান্ডারের মনে। কি অদ্ভুত না!! আমি যতোক্ষন এই সৈনিক দের সাথে থাকি, বুক ভরা ভরষা আর নিরাপত্তা বোধ করি অথচ এরা আমার পরিবারের কেউ না, না কোনো আত্তীয় স্বজন। অথচ আমার পিপাসায় ওরা ব্যস্ত হয়ে উঠে, নিজের পানির বোতলের পানি নিজে পান না করে সেই পানিটা আমার জন্যে হাত বাড়ায়। আমার শরীরের গন্ধে ভরা ইউনিফর্মটা যতো তাড়াতাড়ি পারে ধুয়ে আবার সঠিক জায়গায় রেখে যায়। এর মতো মহব্বতের কম্রেড শীপ আমি কোথাও দেখি নাই। ওরা যখন ছুটি যায়, আর ছুটি থেকে ফিরে আসে, তখন যা ঘটে সেটা আনন্দের একটা ফিলিংস। ওরা এখন মনের সুখে বাড়ি যায়, জানে ওরা যতোদিন আমি আছি, ওদের আর ছুটির কোনো সমস্যা নাই। আবার যখন ফিরে আসে, তখন কেউ কেউ কিছু না কিছু যেনো নিয়ে এসে আমার হাতে দিতে পারলে মনে হয় যেনো কিছু একটা আনন্দ পেলো। ইউনিফর্মের মতো প্রেস্টিজিয়াস কিছু আর নাই। হোক সেটা বিডি আর অথবা আনসার কিংবা আর্মি। পুলিশের ব্যাপারটা আলাদা। ওদের মধ্যে এই বিশেষায়িত জীবনের লক্ষ্য সব সময় থাকে টাকার। টাকা যেখানে মূল, সেখানে মৌলিক গুনাবলী অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। পুলিশ কোনো ইউনিফর্মের ধার ধারে না। তাদের ইউনিফর্মে থাকে শুধু মানুষের অভিশাপের টাকা আর বেদনা।

০৫/১০/১৯৯১-নিউ লংকার ক্যাম্প জীবন (পর্ব-১)

পাহাড়ি জীবনের একটা আলাদা সৌন্দর্জ আছে। এই সৌন্দর্জ সমতল ভুমির সাথে কিছুতেই মিল নাই। এখানে পাহাড় কথা বলে, আকাশ কথা বলে, এখানকার গাছ গাছালিও কথা বলে। দিনের বেশীরভাগ সময় পাহাড় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে একেবারে নিস্তব্দ হয়ে, কখনো কখনো পাহাড় হয়ে উঠে গম্ভীর আবার কখনো কখনো মেঘের সাথে এই পাহাড়ের মধ্যে মিতালিও হয়। আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘমালা পাহাড়ের চুরায় চুরায় বসে থাকে, কখনো আবার রঙধনু হয়ে আকাশের সাথে দূর পাহাড়ের মধ্যে একটা সেতু বন্ধন গড়ে তোলে। বিধাতার কি অপরুপ খেলা।

এই পাহারের সর্বোচ্চ চূরায় বসে আমি যখন উচ্চস্বরে কথা বলি, পাহাড় তার প্রতিধ্বনি দিয়ে আমাকে সেই একই কথা আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়। আমি মাঝে মাঝে উদাসীন হয়ে ক্যাম্পের কোনো এক স্থানে বসে বসে বন মোরগের ডাক শুনি, আবার মাঝে মাঝে পূর্নিমার রাতে হরিন শাবকের কচিকচি ঘাস খেতে দেখি। বানরেরা এখানে ঠিক বানরের মতো অসভ্য নয়। মানুষ দেখলে তারা মুখ ভেংচি করে দৌড় দিয়ে পালিয়ে যায় না। আবার বন্ধু মনে করে একেবারে কাছেও আসে না। কিছু কিছু অদ্ভুদ পাখী নজরে পড়ে। কোথা থেকে এরা উড়ে আসে আমি জানি না। কিন্তু বেশ সুন্দর। লম্বা লম্বা ঠোট আর বিভিন্ন রঙ এর।

অফিসার হিসাবে আমি একাই এই ক্যাম্পে আছি। আর আমার সাথে আছে প্রায় ৪০ জন বিডিআরের সৈনিক। আর্মির সৈনিকদের সাথে বিডিআরের সৈনিকদের মধ্যে আলাদা একটা পার্থক্য খুব সহজেই ধরা পড়ে। আর সেটা হচ্ছে, কনিষ্ঠতম বিডিআর সৈনিকও অফিসারের সাথে আর্মির সৈনিকের থেকে বেশী মিশুক। এখানে ওয়ারলেস অপারেস্টর হিসাবে সার্বোক্ষনিক কাজ করে নূর মোহাম্মাদ। ছেলেটা বেশ চটপটে। আমার যে রানার, তার নাম জসিম। আর্মির সৈনিকের চেয়ে এরা অফিসারেদেরকে অনেক বেশী সার্ভিস দেয়।

যখন পেট্রোল করে আসি, সারা শরীর ঘেমে একাকার, আর পা যেনো বিষিয়ে উঠে। প্রায় ২/৩ হাজার ফুট পাহাড় বেয়ে ক্যাম্পে উঠতেই তো জীবন শেষ। যখন ক্যাম্পে ফিরে আসি, একটা জিনিশ লক্ষ্য করলাম যে, জসীম দ্রুত আমার পায়ের বুট খুলে দেয়, মাঝে মাঝে আমার পাও এমনভাবে মালিশ করে দেয় যেনো কাজটা করতে ওর বেশ ভালই লাগছে। আমার কেমন যেনো ইতস্তত বোধ হয়, কিন্তু জসীম প্রায় জোর করেই কাজটা করে আর বলে, স্যার, আপনি হচ্ছেন, আমাদের নেতা। এটা আমার দায়িত্ত আপনাকে ভালো রাখা।

ক্যাম্পে একটা ছোট মসজিদ আছে। কে বা কারা এই মসজিদ প্রথম উদ্ভোধন করেছিলো আমার জানা নাই। তবে এখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজ হয়। নামাজের ইমামতি করেন আমাদের সিনিয়র এক জেসিও। হাবিলদার রহমান নামে একজন হাবিলদার আছে আমার ক্যাম্পে, সে সারাক্ষন যখন ক্যাম্পে থাকে সুতা দিয়ে জাল বুনতে থাকে। হাবিলদার অন্যের সাথে খুব একটা মিশেও না। ব্যাপারটা আমার চোখ এড়ায় নাই। 

প্রতিদিন পেট্রোল করতে হয় না। সপ্তাহে তিনদিন আমরা আশেপাশের এলাকায় পেট্রোল করি। এই কয়দিনে আমি প্রায় প্রতিটা জায়গা যা আমাদের এরিয়ার অন্তর্গত, সবখানেই গিয়েছি। যেদিন পেট্রোল থাকে না, সেদিন আমি প্রায় সারাক্ষনই সৈনিকদের সাথে কোনো না কোন ব্যাপার নিয়ে আলাপ করি, গল্প করি। আর বিকাল বেলায় একমাত্র ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভিতে ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট দেখি। ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট বা ক্রিকেট খেলাটা আমার কখনোই বেশী পছন্দের ছিলো না। কিন্তু ক্যাম্পের এই বেকার জীবনে এই একটি মাত্র বিনোদন যন্ত্রতে যা দেখানো হয় সেটাই বিনোদনের অংশ হিসাবে আনন্দ নেবার চেষ্টা করি।

আমার উত্তরে যে ক্যাম্পটা আছে সেটা সাজেক, আর দক্ষিনে যে ক্যাম্পটা আছে সেটার নাম ওল্ড লংকার। সাজেকে প্রচুর কমলা হয়। আর এর পাশ দিয়ে চলে গেছে সাজেক রিভার। সাজেক রিভার পার হলেই ভারতের মিজোরাম শহর। কোনো ক্যাম্পেই অফিসার নাই। আমরা যেদিন উত্তরে যাই, সেদিন সাজেক আর যেদিন দক্ষিনে যাই সেদিন ওল্ড লংকারে যাই। এই যাওয়া আসার মাঝে অনেকগুলি গ্রাম পড়ে। এখানে বেশীর ভাগ ট্রাইব পাংখু। চাকমা খুব কম। পাংখু উপজাতীরা বেশ স্মার্ট। কেউ কেউ জিন্সের প্যান্ট আর গিটারও বাজায়। এখানে যিনি হেডম্যান, তিনি বেশ দয়ালু। সে পারা প্রতিবেশীদের খবরাখবর রাখে। তার বাড়িতে আমরা প্রায়ই যাই, খুব বেশি দুরেও না।

ক্যাম্পে যেহেতু আমার অঢেল সময় হাতে থাকে। ভাবলাম, দুটু প্রোজেক্ট হাতে নেয়া যায়। (এক) আমি ইংরেজীতে যতটুকু পারি চর্চা করবো যাতে আমার ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়ে। তাই ভাবলাম, ঢাকা কুরিয়ার নামে একটা টেবলয়েড ইংরেজী পত্রিকা সের দরে কিনে আনি। আমি সেগুলি পড়তে থাকি। পড়তে পড়তেই একসময় আমার ভোকাভেলুয়ারী বাড়বে। আর এর মধ্যে আমি বিবিসির ইংরেজী প্রোগ্রামটা রীতিমতো শুনবো তাতে কিভাবে ইংরেজীতে আরো ফ্লুয়েন্ট কথা বলা যায় সেটাও বাড়বে। আর আমার দ্বিতীয় প্রোজেক্ট হলো যে, আমি বাংলায় পবিত্র কোরান শরীফটা পড়বো এবং শেষ করবো। অন্তত জানতে পারবো আমাদের পবিত্র কোরান শরীফ আমাদের জন্য কি কি বার্তা দিয়েছেন।

বিডিআর এর সৈনিকরা ইতিমধ্যে আমার সাথে অনেক বেশী ফ্রেন্ডলী হয়ে গেছে। আর আমিও ওদেরকে যথেষ্ট পরিমানে আমার নিজের সৈনিকের মতোই দেখার চেষ্টা করি। অবসর সময়ে আমি কখনো কখনো ওদের সাথে তাশ, ক্যারম, কিংবা অন্য যে খেলাগুলি ক্যাম্পে বসে খেলা যায়, সেগুলি করি। ওরাও বেশ মজা পায়।

সন্ধ্যার পর আমরা বেশীরভাগ লোক খাওয়া দাওয়ার পর এশার নামাজের পর জিকিরে বসি। একটা পবিত্রতা আসে। জসীম, আমার রানার, আমাকে যতোটুকু সার্ভিস দেয়া যায়, দেয়।

একদিন জসীম আমাকে বল্লো, স্যার, আজ প্রায় ৬ মাস হয়ে গেলো ছুটি যাই না। বাড়িতে বউ আছে, ছোট একটা বাচ্চাও আছে। কোনো যোগাযোগ করতে পারি না। আমার মতো এ রকম অনেক সৈনিক আছে যারা ছুটির জন্য বসে আছে কিন্তু ব্যাটালিয়ান থেকে আমাদেরকে নামানো হচ্ছে না। দেখেন না স্যার, আপনি কিছু করতে পারেন কিনা। এ ব্যাপারটা আমার নজরে ছিলো না। আমি পরেরদিন আমার দোস্ত ক্যাপ্টেন মাহফুজের (ব্যাটালিয়ানের উপঅধিনায়ক) সাথে আলাপ করলাম। মাহফুজ যেটা জানালো সেটা একটা জাষ্ট মামুলি ব্যাপার। মানে, কোনো একটা সৈনিককে ক্যাম্প থেকে নামিয়ে ছুটি দিতে হলে দুটু পেট্রোল করতে হয়। এক, যে নামবে তার জন্য একটা, আর যে প্রতিস্থাপিত হবে তার জন্য একটা। ফলে সব সময় এই পেট্রোল করার লোক থাকে না। আবার সব সময় প্রতিস্থাপকের লোকও থাকে না। আমি যদি প্রতিস্থাপকের জন্য চাপ না দেই, তাহলে তারা ছুটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবে না।

ব্যাপারটা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হলেও এর একটা সমাধান তো দরকার। কি করা যায়, এটা নিয়ে আমি আমার ক্যাম্পের সৈনিকদের সাথে পরামর্শ করলাম। ওয়্যারলেস অপারেটর চমৎকার একটা পরামর্শ দিল যে, স্যার, আমাদের ক্যাম্পে যখন হেলিসর্টি হয়, যদি আপনি ওই হেলিসর্টির সাথে একজন দুইজন করে আনা নেওয়া করতে পারেন, তাহলে এক্সট্রা কোন পেট্রোল করতে হয় না।  আর আমরা তো রতিন পেট্রোল করি না। আর যখন পেট্রোল করি, যাই মাত্র ২০ জনের মতো, কোনো কারনে যদি ছুটির কারনে ২/৩ জন কম ও থাকে বাকি ১৬/১৭ জন দিয়ে ক্যাম্প প্রোটেক্সন দেয়া কোনো ব্যাপার না। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হল।

আমার ক্যাম্পে যারা হেলিসর্টি দেয়, সেসব পাইলট সবাই আমার কোর্সমেট। তার মধ্যে আছে ফ্লাইট লেঃ রেজা, ফ্লাইট লেঃ কামরুল, ফ্লাইট লেঃ পাশা, আর ফ্লাইত লেঃ হাসান মাসুদ। আমি বললাম সবাইকে যে, ঠিক আছে, তোমরা সবাই একটা লিষ্ট করো কে কখন কখন ছুটি কয়দিনের জন্য যেতে চাও। সবাই একসাথে ছুটিতে যেতে চাইলে সেটা সম্ভব হবে না। যেহেতু পাইলট সবাই আমার বন্ধু মানুষ, আমি হয়তো ব্যাপারটা এরেঞ্জ করতে পারবো।

যখন এর পরেরবার হেলিসর্টি এলো, আমার বন্ধু কামরুল আসলো। আমি ওকে বললাম, ব্যাপারটা। ও আমাকে একটা ভালো বুদ্ধি দিল যে, এর পরেরবার যখন হেলিসর্টি হবে, তুমি তোমার ক্যাম্প থেকে কে নামতে চায় সেটা হেলিসর্টির মধ্যে যেনো ইনক্লুড করে দেই। এটা একতা ডিভিশনাল ফর্মালিটিজ। তা না হলে সেও কোনো পেসেঞ্জার নিতে পারবে না।

যেই কথা, সেই কাজ। আমি ব্যাপারটা সহজ করে ফেললাম। অধিনায়ক মেজর জিয়া প্রথমে একটু নারাজ ছিলেন কিন্তু আমার বলিষ্ঠ প্রতিবাদে সেও মানতে রাজী হলো। আমি বললাম, আমার প্রতিস্থাপকের দরকার নাই। আমাই ২/৩ জন কম সৈনিক নিয়েও সুন্দরমতো ক্যাম্প চালাতে পারবো। অধিনায়ক রাজী না হলে এই ব্যাপারটা সৈনিক নামানো সহজ ছিলো না।

এখানে একটা কথা বলা খুব দরকার যে, কেনো মেজর জিয়া আমার কথায় রাজী হতে বাধ্য হলেন। তিনি নিজে একজন অসত লোক। বিডিআর এর অনেক সোর্সমানি, জংগল কাটার টাকা, কিংবা সৈনিকের বাৎসরিক ছুটির টাকা নিজের একাউন্টে রেখে ইন্টারেষ্ট খাওয়া সবই তার ছিলো যেটা একতা নিষিদ্ধ কাজ, কিন্তু আমি জানতাম মেজর জিয়া এটা করেন। যখন তিনি রাজী হচ্ছিলেন না, আর নীতির কথা শুনাচ্ছিলেন, তখন আমি এক পর্যায়ে দূর্নীতির কথা বলে তার এই দুর্বল চারিত্রিক দিকটা আমি তুলে ধরেছিলাম। আর এই কথাগুলি আমার অপারেটর নূর মোহাম্মাদ তথা ক্যাম্পের সবাই জেনে গিয়েছিলো। আমার এ রকম প্রতিবাদী কথায় আমার সৈনিকেরা অনেক সাহস আর আমার উপর একটা ভরষার স্থান তৈরী করে ফেলেছিলো। তারা আমার এ রকম একটা ব্যবস্থাপনায় এতোটাই খুশি ছিলো যে, আমি যেনো তাদের সাক্ষত ত্রানকর্তা রুপে আবির্ভাব হয়েছিলাম।

প্রথম হেলিসর্টিতে নামানো হলো আমার রানার জসীমকে, সাথে আরো একজন। ব্যাপারটা যখন বাস্তবায়ন হচ্ছিলো, সবাই একটা হোপ করছিলো যে, আগামি কয়েক দিনের মধ্যে কারো না কারো টার্ন আসবেই। আর ব্যাপারতা তাইই ঘটতে লাগল। প্রতি হেলিতে আমি তিনজন করে ছুটিতে পাঠাতে লাগলাম। কোনো প্রতিস্থাপক ছারাই আমি আমার সৈনিকদেরকে ছুটিতে পাঠানো শুরু করলাম।

যখনই কোনো সৈনিক ছুটি থেকে আবার ক্যাম্পে ফিরে আসে, তখন কেউ না কেউ আমার জন্য কিছু না কিছু গিফট নিয়ে আসে। কেউ এক প্যাকেট সিগারেট, কেউ একটা ভালো পত্রিকা, কেউ দুটু ব্যাটারি, ইত্যাদি।

এ কাজটা করতে গিয়ে আমি আরো একটা সমস্যায় পরলাম। সাজেক এবং ওল্ড লংকারের সৈনিকেরা জেনে গেলো যে, আমার ক্যাম্প থেকে সৈনিকেরা এখন পালা করে ছুটিতে যেতে পারছে। কিন্তু ওই দুই ক্যাম্প থেকে তারা এ সুযোগটা পেতে চায়। কিন্তু এখন উপায়? উপায় তো একটা বের করতেই হবে। (চলবে)  

২৪/০৯/১৯৯১-বরকলে আমার ১ম পেট্রোল অভিজ্ঞতা

নির্মম সত্য যখন কেউ বুঝাতে পারে না, অথবা বুঝতে চায় না, আর এই সত্য না বুঝানোর কারনে যখন কিছু মানুশ একাধারে নিষ্পেষিত হতে থাকে, তখন তারা নিজেরা বাচার জন্যে এমন কিছু পথ অবলম্বন করে যা সত্যের থেকে অনেক দূরে। আর এই সত্য যখন নিষ্পেষিত মানুষগন সবাই জেনেও গোপন রাখে, তখন যা হবার তাইই হয়- আর সেটা হচ্ছে বিপর্যয়। এই বিপর্যয় সবসময় ঘটে না। কিন্তু যখন ঘটে যাবে, আর যখন সত্যটা প্রকাশ্যে আসে তখন যারা এই সত্যটাকে আমলে নেন নাই অথচ নেওয়ার দরকার ছিলো, তখন তারাই উর্ধতন কর্মকর্তা বা পরিস্থিতির জন্য দায়ী হয়ে একপ্রকার অপরাধীই সেজে থাকেন। আর যখন নিজেরা তাদের অগোচরের কাহিনী একে একে প্রকাশ করতে থাকেন, তখন আমাদের সবার চক্ষু চরগগাছে রুপান্তরীত না হলেও বুকভরা কষ্টে অনেক জীবনকে বলি দেই। আজ আমার জীবনের প্রথম পেট্রোল করতে গিয়ে এটাই চোখে ধরা পড়লো।

আমরা সেই ভোর ৪টায় বেরিয়ে পড়েছিলাম পেট্রোল করার জন্য। আমাদের টার্গেট ছিল ব্যাটালিয়ান থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরের কোনো এক গ্রামে যাওয়া আর যাওয়ার পথে রাস্তা ঘাটের কি পরিস্থিতি তা উপলব্ধি করা। আমাদের সাথে ৪৪ ইষ্ট বেংগলের কিছু ঝানু হাবিলদার আর একজন জেসিও ছিলো। আমি পেট্রোল কমান্ডার হিসাবে ছিলাম।

পেট্রোল নিয়ে বের হতে না হতেই মুশল্ধারে বৃষ্টি নেমে এলো। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা ভিজে চুপসে গেলাম। যেহেতূ আজই আমার প্রথম পেট্রোল, ফলে আমি বই মোতাবেক, পুস্তক মোতাবেক আর সিনিয়রদের উপদেশ মোতাবেক প্রতিটি পেট্রোল ড্রিল অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করছিলাম। কখনো স্টকিং, কখনো হল্ট, আবার কখনো কখনো খুব সন্তর্পণে চলা ইত্যাদি কোনো কিছুই বাদ দেই নাই। কিন্তু একটা জিনিশ আমি লক্ষ্য করলাম যে, আমার এই একনিষ্ঠতা আমার অন্যান্য পেট্রোল সদস্যরা মেনে নিতে পারছিলো না। আমরা হাটতে হাটতে প্রায় একটা ছড়ার পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম, তখন বেলা উঠে গেছে। ছড়া পার হবার পুস্তকীয় নির্দেশনা মোতাবেক আমি যখন অন্যান্য সবাইকে নির্দেশনা দিচ্ছিলাম, বুঝলাম, এটা তাদের একেবারেই পছন্দ না।

ছরাটা তারপরেও পার হলাম আমার পুস্তকীয় ধারায়। ছরা পার হবার পর আমাদের যে উপঅধিনায়ক জেসিও আছেন, তিনি আমার কাছে এসে বললেন, স্যার আমরা তো সকালে নাস্তা করি নাই। ওইখানে একটা স্কুল ঘরের মতো ঘর আছে। প্রয়োজনীয় প্রোটেক্সন নিয়ে আমরা সবাই নাস্তাটা করে ফেলি। ভাবলাম, যুক্তি আছে। এই পাহাড়িয়া এলাকায় কতোক্ষন আর নাস্তা না করে হাটা যায়?

আমিও তাদের সাথে নাস্তা করতে বসলাম। এবার জেসিও সাহেব বললেন, স্যার, আপনি আজ নতুন পেট্রোল করতে এসেছেন। একটা কথা বলতে চাই, যদি কিছু মনে না করেন, আর যদি ব্যাপারটা গোপন রাখেন। বললাম, বলেন।

জেসিও বল্লো, যে, স্যার এ রকম নিয়ম মেনে প্রতিদিন পেট্রোল করা যায় না। এই যে আজকে আমরা সবাই পেট্রোল করতে বেরিয়েছি, খোদা না করুক যদি কোথাও কোনো অঘটন ঘটে, আবারো দিন নাই রাত নাই, খাওয়া নাই, নাওয়া নাই, এই আমাদেরকেই আবার অপারেশনে আসতে হবে। এই এক কাপড়েই থাকতে হবে দিনের পর দিন। তাই আমরা জানি কিভাবে শরীরকে ঠিক রাখা যায়। মানে স্যার, আমরা এখানেই থাকবো, আর কোথাও যাবো না। আমাদের যেখানে যাওয়ার দরকার টার্গেট অনুযায়ী, সেখানে যেতে আরো ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে। আবার সেখান থেকে ব্যাটালিয়ানে যেতে সময় লাগবে প্রায় আরো ৪ ঘন্টার মতো। মোট এই ৮ ঘন্টা এক নাগাড়ে হাটাহাটির পর যদি জরুরী কোনো অপারেশনে যেতে হয়, আমরা কি পারবো দিনের পর দিন এভাবে শারীরিকভাবে সাপোর্ট দিতে? তাই, যদি ব্যাপারটা গোপন রাখেন, আমরা এখান থেকে প্রতি আধা ঘন্টা পর পর ব্যাটালিয়ানে রিপোর্ট দেবো যে, আমরা কোথায় আছি। আর সেটা ম্যাপ দেখে দেখেই দিবো।

অবাক হলাম। বলে কি?

কিন্তু এটাই হলো নির্মম সত্য। মনে মনে ভাবলাম, নিজাম স্যার তো এই কারনেই মারা গেছেন। কারন দিনের পর দিন ওইসব এলাকায় না যাওয়ার কারনে শান্তিবাহিনী মনে করেছে যে, এসব এলাকায় আর্মির কেহ আসে না। তারা নিজের সময়মতো আদর্শ ফাদ পাতার সময় পেয়েছিলো আর অপেক্ষায় ছিল কোনো একদিন যদি আর্মির টহল এখানে আসে, সেদিন হবে প্রতিশোধের চরম মুল্য। আর এটাই হয়েছিলো নিজাম স্যারের বেলায়।

একবার ভেবেছিলাম, এই নির্মম সত্যটা আমি সিও সাহেবকে জানাই। আবার ভাবলাম, এটা কি শুধু আমিই জানি নাকি ইউনিটের অন্যান্য সবাই জানে খালি সিও ছাড়া? অথবা এমনো তো হতে পারে, সিও সাহেব নিজেও জানেন, কিন্তু তিনিও চুপ করেই আছেন? হয়তো জানে না খালি সেই ব্রিগেড হেড কোয়ার্টার।

এভাবেই আমি আমার প্রায় প্রতিটা পেট্রোল করে সময় পার করলাম ওরিয়েন্তেশনের পিরিয়ড।

২৩/০৯/১৯৯১-বরকল আগমন

মানুষ যখন একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠে। তখন প্রথমে বিদ্রোহ হয় তাকে মন থেকে গ্রহনের বর্জনতায়। তারপর এটা সংক্রমিত হয় একজন থেকে আরেকজনে। এভাবেই কিছু সংখ্যক বিদ্রোহী যখন একটা দল হয়ে উঠে, তারা তখন তাদের ইথিক্যাল ভ্যালুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সেই এলাকার অন্যান্য মানুষের মনেও বিষ্ক্রিয়া চালাতে থাকে। বিষের মাত্রা যখন প্রায় সহনীয় পর্যায়ের থেকে বেশী মাত্রায় চলে যায়, তখন কমিউনিটি সংক্রমন হতে বাধ্য। আর যখনই কমিউনিটি সংক্রমন বাড়তে থাকে, তখন দেশের প্রচলিত নিয়মে এসব দলকে শায়েস্তা করার জন্য সরকার একের পর এক আইন বানাতে থাকে। আবার এই আইনের বার্তায় বিদ্রোহীরাও নতুন নতুন কৌশল স্রিষ্টি করে সরকার বাহাদুরকেও তাক লাগানর বাহাদুরি বা আস্পরা দেখাতে আহলাদি হয়ে উঠে। আর এই আহলাদির নাম- যুদ্ধ।

হিলে এখন সেই যুদ্ধ চলছে। শান্তিবাহিনীর স্বাধিকার আন্দোলনের চেয়ে যেনো মনে হয় ব্যাপারটা এখন গুটিকতক উপজাতীর নিজস্ব দেমাগে পরিনত হয়েছে। কেনো বললাম বা কেনো আমার কাছে এটা মনে হয়েছে সেটা বলি। আজই দুপুরের দিকে আমি বরকল পৌঁছেছি। চট্টগ্রাম থেকে আসা অবধি যতো ব্রিফিং শুনেছি, তার সবগুলি ব্রিফিং প্রায় একই রকম। কিন্তু এই বরকলে এসে ব্যাপারটা আমার কাছে অন্যরকম একটা ধারনা দিল। এখানে সবাই বিদ্রোহী নয়। শুধুমাত্র চাকমা গোষ্ঠীটাই এই বিদ্রোহের প্রধান হোতা। এখানে পাংখু আছে, মার্মা আছে, ত্রিপুরা আছে আরো অন্যান্য ট্রাইবস যারা শান্তিপূর্ন জীবন চায়। এর মানে হলো, আমরা যদি শুধুমাত্র এই চাকমা ট্রাইবটাকে আইসোলেশন করতে পারি, তাহলে সংখ্যাটা অনেক অংশে কমে যায়। যাই হোক, ব্যাপারটা আরো নিবিড়ভাবে দেখা এবং বুঝা দরকার। এখনি সব কল্পনা বাস্তব বলে উপসংহারে  আসা যাবে না।

বরকলে আসার জন্য সেনাবাহীনি পেট্রোল বোট ইউজ করে। কিন্তু সাধারন মানুষজন ব্যবহার করে বটবটি নামে ইঞ্জিন চালিত নৌকা। এতোক্ষন আমরা যারা বিডিআর এর সাথে সংযুক্তিতে ছিলাম, তারা একইসাথে ছিলাম। তাদের মধ্যে যারা ছিলো তারা হচ্ছে ৬ ফিল্ডের শাহরিয়ার (সে মদনে পোষ্টিং), আমি নিউলংকারে, ক্যাপ্টেন জামাল ১৪২০ ক্যাম্পে, তাসওয়ার রাজা (হাসন রাজার নাতি) আরেক ক্যাম্পে, ইকবাল (সিগ্ন্যালের) সেও মদনের আরেক ক্যাম্পে। ফলে আমি আর জামাল স্পীড বোটে রওয়ানা হলাম বরকলের উদ্ধেশ্যে। চমৎকার একটা লেক। খুবই সুন্দর। আমাদের স্পীড বোট প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে কাপ্তাই থেকে রওয়ানা দিয়ে বরকলের দিকে যাচ্ছে। এতো লম্বা পথ হাই স্পীড বোটে আমার এটাই প্রথম। আশেপাশে উপজাতীদের কিছু কিছু বাড়িঘর চোখে পড়ে। অবাক লাগে, এরা কোথায় বাজার করে, কোথায় বেচাকেনা করে, কার কাছে করে আমার জানা নাই। আমরা সবাই ইউনিফর্ম পরা অস্ত্র নিয়ে বসে আছি। আমি জানি না যদি কোনো শত্রু আমাদেরকে এই অবস্থায় আক্রমন করে, আমরা কতটুকুই বা সামাল দিতে পারবো। শুনলাম আমাদের যাওয়ার রাস্তার দুই ধারে নাকি রুট প্রোটেক্সন আছে, চোখেও পড়েছে অনেক রুট প্রোটেক্সন ক্যাম্প।

৪০ মিনিট চলার পর আমাদের বোট একটা ঘাটে এসে থামলো। এটাই ৪৪ ইষ্ট বেংগলের প্রধান ব্যাটালিয়ান। আমরা নেমে গেলাম। সিনিয়র জেসিও মোজাম্মেল আমাদেরকে ঘাট থেকে রিসিভ করলেন। আমরা (আমি আর ক্যাপ্টেন জামাল) নিজেদের ব্যাগ বোটেই রেখে নেমে গেলাম। কারন আমাদের ব্যাগ নেওয়ার লোক আছে। ৪৪ ইষ্ট বেঙ্গলে যাওয়ার পর দেখলাম, প্রায় সবগুলি ঘরই বাশের বেড়া দিয়ে ঘেড়া। একদিকে সিও সাহেব তার পরিবার নিয়ে থাকেন, সেটা আবার মাটির প্রলেপে ওয়াল দেয়া। আর বাকী সবগুলি ঘর নিঘাত বাশের। আমরা অফিসার ফিল্ড মেসে ঢোকলাম। গিয়ে দেখলাম, ক্যাপ্টেন ইসমাত (১১ লং কোর্ষের) স্যার ভিডিওতে ইন্ডিয়ান ছবি দেখছেন। একটু পরে এলো আমার কোর্ষ্ম্যাট লেঃ তারেক। সে আমাদের ক্যাডেট কলেজের এক বছর সিনিয়র ছিলো। কিন্তু এখন আমাদের কোর্ষের সাথে কমিশন পাওয়ায় আমি আর আগের সম্পর্কটা ধরে তাকে ভাই বলি না। তুমি করেই সম্মোধন করি। সাথে আরো দুই কোর্ষম্যাট মামুন আর আব্দুল্লাহও এলো। ভালো লাগলো ওদের দেখে। একটু ভরষাও যেনো পেলাম। আমি আর্টিলারীর লোক, এখানে ওরিয়েন্টেশন করবো সেটা ওরা কিভাবে নেয় জানি না, তবে আমার কোর্সম্যাটদের দেখে একটু ভালো লাগলো।

ইসমাত স্যার এই ইউনিটের এডজুটেন্ট। আমরা ছবি দেখতে দেখতে ইসমাত স্যার বললেন, সিও সাহেব সন্ধ্যায় কথা বলবেন। সিও সাহেবের নাম, লেঃ কর্নেল আশফাক। স্যার এটাও বললেন, তার সামনে স্মার্ট হইও না কারন মানুষ বেশি সুবিধার না। একটু ভরকে তো গেলামই। উপঅধিনায়কের পদে আছেন মেজর মিজান স্যার। বেশ তোতলামিতে ভরপুর। আমার মাঝে মাঝে খুব অবাক লাগে, কমিশন পাবার সময় কি বিএমএ তে স্যারের এই তোতলামী ধরা পরে নাই? কিন্তু মানুষ হিসাবে বেশ ভালো। সিও সাহেবের কথার বাইরে যাবার কোনো অবকাশ নাই। তার দুই মেয়ে। লাঞ্চের পরে অনেক আলাপ করলাম ফিল্ড মেসে বসেই।

আলাপ আলোচনার পর আমরা আমাদের ব্যারাকে চলে গেলাম। কি এক অবস্থা। সৈনিকের সাথেই থাকা আর তাদের একই খাবার সবার জন্য। তবে আমরা ইচ্ছা করলে অফিসার মেসেও খেতে পারি। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে, কোম্পানি কমান্ডারগন যার যার কোম্পানীর সাথেই ডাইনিং করেন। তাতে একটা লাভ হলো, কোনো টাকা লাগে না। হয়তো এই কিছু টাকা বাচানোর জন্যেও অফিসাররা সৈনিকদের সাথেই ডাইনিং করেন।

রাতে সিও সাহেবের সাথে আমাদের দেখা হলো। তিনি অনেক কিছু বললেন না, শুধু বললেন, আমাদের জন্য ওরিয়েন্টেশনের প্রোগ্রাম করা হয়েছে কিনা, আর করে থাকলে সেটা যেনো আমাদেরকে দিয়ে দেয়া হয়। আগামিকাল থেকেই পেট্রোল চলবে। আর প্রতিদিন পেট্রোল রিপোর্ট সিও সাহেবকে দেখাতে হবে।

আমরা যার যার ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের একটা করে কপি হাতে নিয়ে আবারো চলে এলাম যার যার ঘরে। আগামীকাল ভোর ৪ টায় আমার একটা পেট্রোল আছে। 

২২/০৯/১৯৯১-রাংগামাটিতে গমন

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই রেডি হলাম। ২১ রাইফেল ব্যটালিয়ানের কোত থেকে একটা এস এম জি (সাব মেশিন গান) আমার নামে বরাদ্ধ করা হলো। এটা বিডিআর এর সাথে সংযুক্তি থাকা অবস্থায় আমার জিম্মায় থাকবে। সাথে এক বান্ডেল পোচ এমুনিশন। রাংগামাটিতে যেতে হলে একটা সিংগেল গাড়ি যাওয়ার নিয়ম নাই কারন এলাকাটা ঝুকিপুর্ন। তাই অন্তত দুটু গাড়ির একটি বহর নিয়ে যেতে হয়। সপ্তাহে দুইদিন ওই ঝুকিপুর্ন এলাকায় রুট প্রোটেকশনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর লোকজন চলাচল করে। এই রুট প্রোটেকশনের ব্যাপারটা আমার আগে জানা ছিলো না। রুট প্রোটেক্সন হচ্ছে, যখন কোনো কনভয় হিলে ঝুকিপুর্ন জায়গায় যায় বা আসে, তখন রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় আর্মি, বিডিআর এবং আনসার সম্বলিত প্রায় তিনজন করে একেকটা পয়েন্টে কিছু ভিজিবল রাস্তা বা একটা দায়িত্তপুর্ন এলাকা প্রোটেকশন দেয়া, যাতে শান্তিবাহিনী কোনো অপারেশন করলে দ্রুততম সময় এই বাড়তি লোকজন সামাল দিতে পারে অথবা দায়িত্তপুর্ন এলাকাটি নিরাপদ আছে সেটা নিশ্চিত করা।

রাংগামাটি যেতে রাংগামাটি আর চিটাগাং এর মাঝামাঝি একটা জায়গা আছে যার নাম, আমতলি। এখানে সবাই নেমে আর্মস লোড করে, একটা ব্রিফিং হয় এবং এই আমতলী থেকেই ঝুকিপুর্ন এলাকা বলে এয়ারমার্ক করা। আমতলি পর্যন্ত হিল আসলে বুঝা যায় না। প্রায় সমতলের মতো। এখান থেকেই বড় বড় পাহারের উতপত্তি। আমরা সবাই আর্মস লোড করে নিলাম। পিকআপ গাড়িতে একটা এলএমজি (লং মেশিন গান) ফিট করা, আর পিকআপের দুই ধারে সৈনিকরা এমনভাবে বসে, যাতে সবাই বাইরের দিকে তাদের আর্মস তাক করা থাকতে পারে। আকাবাকা রাস্তা। দুইধারে বিশাল বিশাল পাহাড়। কখনো গাড়ি নীচে নামছে, কখনো গাড়ী আবার পাহাড়ের কোল ঘেষে একেবারে চুড়ায় উঠে যাচ্ছে। ঈশ্বর তার সৃষ্টি এমন করে চোখের আড়ালে এতো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন, দেখলেই মন ভরে যায়। কখনো কখনো দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে দুরের আকাশ দেখা যায়। একটু ভয়ও লাগে। আবার এই ভয়কে উপচিয়ে প্রকৃতির সউন্দর্য এমনভাবে মনকে পুলকিত করে যা আমার হৃদয়ে কি যেনো পরম অনুভুতি জাগিয়ে দেয়। আমি ভয়বিসন্ন অন্তর নিয়ে একট মিশ্রিত ভালো লাগার অনুভুতিতে পুরু রাস্তাটা পার করলাম। যেহেতু শান্তিবাহিনী কখনো চোখে দেখি নাই, তাদের তান্ডবলীলাও আমার জানা নাই ফলে শান্তিবাহিনীর ধংসাত্তক কার্যকলাপের চিহ্ন আমার মনের মধ্যে ভেসে উঠে নাই বরং বর্তমান সময়ে প্রকৃতির রুপটাই আমাকে বেশী বিমোহিত করেছিল। কখনো কখনো মনে হয়েছিলো, একবার গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ের এই অদ্ভুদ রুপকে প্রানভরে দেখি, কিন্তু রুট প্রোটেকশনের নীতিমালা অনুযায়ী এটা করার কোনো নিয়ম না থাকায় দ্রুত গতিতেই একটার পর একটা দৃশ্য যেনো সিনেমার পর্দার মতো চোখের পলকে হারিয়ে যাচ্ছে।

দূরে কোথাও মেঘের ভেলা দেখা যাচ্ছে, আবার পরক্ষনেই সেই মেঘের ভেলা যেনো একেবারে আমাদের গাড়ির নিকটবর্তী হয়ে একটা উড়ন্ত বকের ঝাকের মতো পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। পাহাড়ের আকৃতির কারনে রাস্তাগুলিও একবার উত্তর থেকে দক্ষিনে, আবার কখনো কখনো পুর্ব থেকে পশ্চিমে লম্বা সারি হয়ে আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে। কখনো সূর্য ঠিক মাথার উপর, আবার কখনো সূর্য আমাদের পিছনে চলে যাচ্ছে।

দূর পাহাড়ের কোল ঘেষে ঝর্না দেখা যায়, ভারতের পাহাড়গুলি আর আমাদের দেশের পাহাড়্গুলির মধ্যে একটা যোগসুত্র আছে। এদেশের পাহাড় যেখানে শেষ, হয়তো ভারতের পাহাড়গুলি সেখানেই শুরু। এই পাহাড়দের মধ্যে কোনো আঞ্চলিক বিরোধ নাই। তাদের একটা দেহের কিছু অংশ এদেশে থাকলেই কি আর ভারতে থাকলেই কি, এরা একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা যারা টেরিটরিয়াল বাউন্ডারি করে এদের পরিচয়ে বাধা দিয়ে বলি এটা আমাদের আর ওটা ওদের, তাদের এই পাহাড়দের কিছুই যায় আসে না। কোনো পাহাড় টেরিটরিয়াল আইন মানে না। তারা অনবরত একটা অবিচ্ছেদ্য অংশই হয়ে থাকে আজীবন।

প্রায় দুই ঘন্টা হাইস্পীডে গাড়ি চালিয়ে শেষ অবধি আমরা পাহাড়ের চুড়া থেকে নেমে রাংগামাটির প্লেন ল্যান্ডে চলে এলাম। এই রাংগামাটি শহরটা কি কখনো আগে পাহাড়ের মতো ছিলো কিনা আমি জানি না, কিন্তু দেখলে বুঝা যায় যে, এরাও তাদের পুর্বসত্তাকে হারিয়ে ফেলেছে মানুষের ক্ষুরধার কোনো বুল্ডজার বা সাবলের আঘাতে। এখন সে একটা সমতল ভুমি। অনেক পিচঢালা রাস্তা, বিল্ডিং এ ছড়াছড়ি। অনেক নিয়ন লাইট আর হরেক রকমের বিজ্ঞাপনে ভর্তি এই শহর। মানুষের মধ্যে কোনো আতংক নাই, কেউ বাজার করছে, বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে, কেউ আবার স্কুল থেকে ফিরে যাচ্ছে। দোকানীরা তাদের পন্য বেচাকেনায় মগ্ন। আশেপাশে কয়েকটা বিডিআর কিংবা আর্মির গাড়ি অলসভাবে টহল দিচ্ছে। আমরা রাংগামাটির বুকে এখন। প্রায় দুপুর হয়ে গেছে।

আমরা বিডিআর রেষ্ট হাউজে চলে এলাম। ভীষন সুন্দর একটা রেষ্ট হাউজ। ক্যাপ্টেন আখতার (১১ লং কোর্ষের), তিনি আমাদের রিসিভ করলেন। বিডিআর রেষ্ট হাউজটা একটা লেকের পাশে, আবার লেকের ঠিক পরেই পাহাড়। রেলিং দেয়া চারিদিকে। রেলিং এ দাড়ালে মনে হয় পানির উপরে দাঁড়িয়ে আছি। অদ্ভুদ সুন্দর রেষ্ট হাউজটা।

আমরা খাবারের জন্য তৈরী হলাম। আগে থেকেই সম্ভবত আমাদের খাবারের কথা বলা হয়েছিলো। খেতে গিয়ে দেখলাম, বড় বর মাছের খন্ড। জিজ্ঞেস করতেই মেস ওয়েটার জানালো যে, এই মাছ কাপ্তাই লেকের থেকে আনা। এখানে জ্যান্ত মাছ পাওয়া যায় আর সেটা বেশ সস্তাই। অনেক ক্ষুধা লেগেছিলো। ভয়ের একটা গুন আছে। পেটে যতোই ক্ষুধা থাকুক, ভয় যখন ভর করে তখন পেটও তার ক্ষুধার কথা জানান দেয় না। যেই ভয় দূর হয়ে যায়, তখন পেটের ভিতর যতো ক্ষুধা এতোক্ষন চুপ করেছিলো, তা একঝাকে জেগে উঠে। মারাত্তক উগলে উঠে পেট খাবারের জন্য। আমাদেরও তাই হল। এতোক্ষন ক্ষুধাটা বুঝি নাই। এখন মনে হচ্ছে, রাজ্যের ক্ষুধায় পেট চু চু করছে। আমরা বেশ আনন্দের সাথেই দুপুরের খাবার খেলাম। 

আমাদের খাবারের পর ক্যাপ্টেন সাফিন (জিএসও-৩ অপারেশন) আমাদেরকে জানালো যে, রাত আটটায় কমান্ডারের ব্রিফিং হবে। সবাইকে ব্রিগেড অফিসে রাত আটটার মধ্যে থাকতে হবে। অনেক সময় হাতে। ভাবলাম, রাংগামাটি শহরটা ঘুরে দেখা যেতে পারে।

আমাদের অনুরোধ রাখা হলো। আমরা দলবেধে ঘন্টাখানেক পর একটা স্কর্ট আর একটা পিকআপ নিয়ে রাংগামাটির বেশ কিছু জায়গা দেখলাম। ঝুলন্ত ব্রিজ, পরিত্যাক্ত পাহাড়ের কিছু অংশ, লেক, হাইড্রোলিক পাম্প, এবং জলবিদ্যুৎ এরিয়া সবগুলিই আমাদেরকে দেখানো হলো।

পানির যে কি শক্তি এই হাইড্রোলিক পাম্প এবং জলবিদ্যুত কেন্দ্র না দেখলে বুঝা যাবে না। অফুরন্ত পানির প্রবাহের একটা শব্দ আছে, অনবরত এই শব্দ মানুষকে বিমোহিত করে। হাজার হাজার টন পানি যখন একসাথে বেরিয়ে যাবার জন্য প্রতিযোগীতা করে তখন তার সামনে কি আছে আর কি নাই এটা কোনো ব্যাপার না। জলোচ্ছাস কি, তার কি তান্ডব, আর্টিফিশিয়ালভাবে এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কিছু আভাষ পাওয়া যায়। খুব অবাক হয়ে ভাবছিলাম যে, দেশের সিংহভাগ বিদ্যুৎ এই কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরবরাহ হয়। কোনো কারনে যদি এই জলাধার আর না থাকে, বা শুকিয়ে যায় বা কোনো আকস্মিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে দেশের অন্যান্য সব অঞ্চল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। এটা ভাবতেই মাথা ঘুরে যায়। দেশের এই মুল্যবান সপদ এমন এক জায়গায় যেখানে সারা বছর ঝুকিপুর্ন। রাংগামাটি শহর দেখা হল। মন ভরলো না। আবার কবে আসি জানি না কিন্তু এর বিস্ময়কর স্মৃতি আমার মাথায় পুরে থাকল।

রাত আটটায় আমরা ব্রিগেড অফিসে গেলাম। কমান্ডার আসেন নাই। কিন্তু অপারেশন অফিসার মেজর লিয়াকত আমাদেরকে প্রায় এক ঘন্টা কিভাবে কি অপারেশন করতে হবে, কিভাবে পেট্রোল করতে হবে, শান্তিবাহিনির ট্রেন্ড কি, তারা কিভাবে কিভাবে অপারেশন করে, কোন কোন দল এখানে কাজ করে, তাদের কমান্ডাদের নাম এবং সংঘটন সম্পর্কে একটা ধারনা দিলেন। সন্টু লার্মা যিনি এই শান্তিবাহিনীর কমান্ডার তার সম্পর্কেও অনেক কথা জানলাম। কিছু নোট করলাম, কিছু মাথায় নিলাম, আবার অনেক কিছুই মাথার উপরে দিয়ে গেলো বলে মনে হল। ক্যাপ্টেন নিজাম স্যার কেনো এম্বুসে মারা গেলেন এই উদাহরন বারবার টানা হলো। ক্যাপ্টেন নিজামের কাহিনীটা কোনো এক সময়ে বিস্তারীত লিখবো।

চলে এলাম রেষ্ট হাউজে। তখন রাত প্রায় ১১ টা। আমি যে রুমে আছি, সে রুমেই থাকে ক্যাপ্টেন আখতার। অনেক রাত অবধি স্যারের সাথে গল্প হলো। স্যার নতুন বিয়ে করেছেন, ভাবীর কথা অনেক আলাপ করলেন। তার মনের কষ্টের কথা, তার ভালো লাগার কথা, তার একাকিত্তের কথা অনেক বললেন। পাহাড়িয়া এলাকায় সব অফিসারের একটা আলাদা জগত আছে। এই জগতের কথা সবাই জানে না। এটা নিতান্তই নিজের আর গোপন। যাই হোক, আগামীকাল আমরা বরকলে অবস্থিত ৪৪ ইষ্ট বেংগলে ওরিয়েন্টেশনের জন্য রওয়ানা হবো। এই কয়দিনে আমি যেনো যাযাবরের মতো আজ এখানে, কাল ওখানে দিনকাল কাটাচ্ছি। কোনো স্থানের অভিজ্ঞতাই যেনো এক নয়।

প্রায় দেড়টার দিকে ঘুমিয়ে গেলাম।

২১/০৯/১৯৯১-২১ রাইফেল ব্যাটালিয়ান

আজই ২১ রাইফেল ব্যাটালিয়ানে সংযুক্ত হলাম। প্রকৃত হলো যে, কোনো বিডিআর ব্যাটালিয়ানে এটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। মেজর জিয়া (৮ম লং কোর্ষ) ২১ রাইফেলের অধিন্যক। তার সাথে উপঅধিনায়ক হিসাবে আছে আমার কোর্ষম্যাট আর্টিলারীর মাহফুজ। ২১ রাইফেল রিয়ারে রাত কাটালাম, আমার সাথে ১৪ লং কোর্ষের জামাল (ইঞ্জিনিয়ার) ও ২১ রাইফেলের সাথে এটাচড। রাতে বেশ জমিয়ে সবাই আড্ডা দিলাম বটে কিন্তু কোথায় যেনো একটা অস্থিরতা কাজ করছিলো আমার।

রাংগামাটিতে একদিন থাকবো। তারপর ওখানে রাংগামাটির ব্রিগেড কমান্ডার করত্রিক আমাদেরকে একটা রিসেপ্সন প্লাস ব্রিফিং করবেন। তারপর সেখান থেকে যার যার ব্যাটালিয়ানের জন্য সবাই চলে যাবো। আমাদের আবার বিডিআর ব্যাটালিয়ানে যাওয়ার আগে সেই এলাকায় অবস্থিত কোনো ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ানের সাথে অরিয়েন্টেশন করতে হবে। আমার মারিষ্যা জোনে আছে ৪৪ ইষ্ট বেংগল, আমাকে ৪৪ ইষ্ট বেংগলে প্রথম ৭ দিন অরিয়েন্টেশনের জন্য থাকতে হবে।

রাতে চট্টগ্রাম সেনানীবাসটা ঘুরলাম। সেই বেসিক কোর্ষের পর টিএ এন্ড এস (টার্গেট একুইজেশন এন্ড সার্ভে) কোর্ষ করার সময় এখানে কয়েকবার এসেছিলাম। তবে খুব একটা রাত কাটাই নাই এই সেনানীবাসে। এবারই প্রথম রাত কাটাচ্ছি। চট্টগ্রাম সেনানীবাস যশোর সেনানীবাস থেকে কিংবা সাভার, বা খুলনা ইত্যাদি সেনানীবাস থেকে একেবারেই আলাদা। বেশীর ভাগ অফিসারগন থাকে হিলে। যারা ছুটিতে যায় কিংবা ছুটি থেকে ফিরে আসে, তারাই একমাত্র এই অফিসার মেসগুলিতে থাকে। আর থাকে সার্ভিস কোরের অফিসাররা যাদেরকে হিলে যেতে হয় না। ফলে অফিসার মেসগুলি খা খা করে। তার মধ্যে আবার মেসগুলি পাহাড়ের ভাজে ভাজে যেনো লুকিয়ে আছে। এক ধরনের মাদকতা আছে এই মেসগুলিতে।

রাতের বেলায় যখন সেনানীবাসে ঘুরছিলাম, দেখলাম কোথায় মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়েছে, কোথায় কিভাবে কে কি করেছে তার কিছু ঐতিহাসিক জায়গা। এই চিটাগাং আমাদের দেশের অনেক বড় বড় ইতিহাসের সাথে জড়িত। 

ঘুমিয়ে গেলাম। সকাল অর্থাৎ ভোর ৫ টায় রওয়ানা দিতে হবে রাংগামাটির উদ্দেশ্যে।

২০/০১/১৯৯০-২৯ ডিভ লোকেটিং এ আগমন

আসলে খুব হাপিয়ে উঠেছিলাম ৬ ফিল্ড রেজিমেন্টে। উপ-অধিনায়ক মেজর রফিকের ধুর্ততা যে কত গভীরের, সেটা যে না ভুক্তভোগী, সে বুঝবে না। খুবই চালাক একজন বান্দা। ৬ ফিল্ড আসলে প্রথম থেকেই বেশ বুদ্ধিদীপ্ত এবং জ্ঞানী সিও বা উপ অধিনায়ক পায় নাই। কিন্তু যারা সিও হিসাবে বা উপ অধিনায়ক হিসাবে এই ইউনিটে পোষ্টিং হয়েছেন, তারা কিন্তু কোনোভাবেই বোদাইও ছিলেন না। যেমন, রেইজিং সিও ছিলেন, লেঃ কর্নেল দাউদ, লেঃ কর্নেল আহসান উল্লাহ, লেঃ কর্নেল খাইরুল, আরো অনেকে। এই ক্ষুদ্র একটি ইউনিটে আমার ক্ষুদ্র সময়ে ৬ ফিল্ডে অনেক কিছু ঘটে গেছে। আমার জীবনের অনেক নতুন কিছু ঘটেছে। কোনোটা খুবই আনন্দের, আবার কোনোটা জীবনের জন্য খুবই মর্মান্তিক। কে জানে, ভবিষ্যত কি বা কোথায় যাচ্ছি।

গত পহেলা জানুয়ারীতে ৬ ফিল্ড রেজিমেন্ট থেকে আমার পোষ্টিং হয়ে গেছে। নতুন ইউনিট ২৯ ডিভ লোকেটিং। বগুড়া সেনানিবাস। বগুড়া এলাকায় দুটু সেনানিবাস আছে, একটার নাম মাঝিরা সেনানীবাস এবং আরেকটা জাহাংগিরাবাদ সেনানিবাস। ২৯ ডিভ লোকেটিং ইউনিট জাহাংগিরাবাদ ক্যান্টনমেন্টে।

মাইনর ইউনিট। মেজর ইকবাল ইউনিটের ওসি। বেশ ভদ্র মানুষ। হাসি খুসী মানুষ। থার্ড লং এর উনি। পাশেই ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট, তার পাশে ৬ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ান এবং ৩২ এসটি ব্যাটালিয়ান। এখানে একটা ফিল্ড এম্বুলেন্স আছে। এই মিলিয়ে আসলে জাহাংগিরাবাদ সেনানীবাস। ১১ আর্টিলারী ব্রিগেড, ১ ফিল্ড এবং আমাদের ইউনিট একদম লাগোয়া।

১ ফিল্ডের সি ও লেঃ কর্নেল মাহবুব স্যার। আমার বেসিক কোর্ষের আই জি ছিলেন। তাকে সবাই পন্ডিত বলেই চিনে। আমার ২৯ ডিভ লোকেটিং ইউনিটে আমার সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে যে, আমারই কোর্ষ্মেট ক্যাপ্টেন আলমাস আছে। আমরা মোট তিন জন অফিসার ইউনিটে। ইকবাল স্যার, আলমাস আর আমি।

আমরা সবাই মেসে থাকি। সময়টা ভালোই কাটে। বেশ ঘরোয়া পরিবেশের মধ্যে জাহাংগিরাবাদ সেনানিবাস। শহরের কাছাকাছি। বগূড়া শহরে যেতে মাত্র সময় লাগে ১৫ মিনিট। বগুড়ায় আমার আরো একটি ভালো জিনিষ ছিলো যে, এই শহরেই মিতুলের এক বোন বাস করে। উনার সাথে আমার কখনো দেখা হয় নাই। আমি না উনাকে চিনি, না উনার জামাইকে চিনি , না উনার কোনো পরিবারের সদস্যকে চিনি। তবে শুনেছি উনি নাকি এখানে বেশ ভালো ব্যবসা করেন।

যে কারনে মিতুলের এই আত্তীয় আমার জন্য সুখবর হয়েছিলো সেটা হচ্ছে, মাঝে মাঝে যদি মিতুলকে বগুড়ায় আনার দরকার পড়ে তাহলে মিতুল ওর বোনের বাসায় থাকতে পারবে, আর আমিও ওখানে গিয়ে একটু ভালো সময় কাটাইতে পারবো।

দেখা যাক, জাহাংগিরাবাদ আমার জীবনে কতটা সমৃদ্ধি আনতে পারে। এখানকার জিওসি হিসাবে আছেন মেজর জেনারেল সাদিক। সিলেটী মানুষ। এডিসি হিসাবে কাজ করে লেঃ দেলোয়ার। সে এস টি ব্যাটালিয়ান থেকেই গেছে এই মাত্র কয়েকদিন আগে। দেলোয়ার আমার রুমের পাশি থাকতো, আমরা দুজনেই ভালো আর্ট করতে ভালোবাসতাম।

দেলোয়ার এডিসি হয়েই এসটি ব্যাটালিয়ান থেকে চেঞ্জ করে ইনফ্যান্ট্রিতে চেঞ্জ করলো। বুঝতেছি যে, সম্ভবত জেনারেল সাদিকের মেয়ের সাথে দেলোয়ার কনো সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। 

০২/০৭/১৯৮৮-বিয়ের রিং

নতুন বিয়ে করে এসেছি। এই খবরটা জানে শুধু লেঃ আশফাক আর ক্যাঃ রেজা। অন্য কাউকে এই ব্যাপারে কিছু জানানো যাচ্ছে না। কারন মিলিটারী রুল অনুযায়ী আমার বিয়ের বয়স এখনো হয় নাই। সেমোতাবেক বিয়ে করার জন্য আমাকে আরো ৪ বছর অপেক্ষা করতে হবে। যেটা খুবই একটা কঠিন বিষয়। যদি জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে সেনা আইনে আমার অনেক ক্ষতি হবে। আমার চাকুরীচ্যুতও হতে পারে। আমাকে অনেক সাবধানে সব বিষয়ে আচরন করতে হবে।

বিয়ের পরে আমার হাতে একটা বিয়ের সোনার রিং আছে। এতা সম্ভবত আমার পড়া ঠিক হচ্ছে না। অনেকেই জিজ্ঞেস করে, এটা কি? আমি এড়িয়ে যাই। আর এম্নিতেও সোনার আংটির উপর আমার কোনো গরজ নাই। মিতুলের সাথে আমার যোগাযোগের একমাত্র উপায় প্রতিদিন চিঠি লিখা। অবশ্য সেও প্রতিদিন আমাকে চিঠি লিখছে। বাসার কেউ জানে না আমি বিয়ে করেছি। বদি ভাই, হাবীব ভাই কিংবা অন্য কেউওই জানে না যে, আমি বিয়ে করে এসেছি এই মে মাসে।

আমার বিয়ের ব্যাপারে যদি আমি আমার অভিভাবকদের উপর নির্ভর করতে হতো, তাহলে হয় আমি মিতুলকে সাভাবিকভাবে পেতাম অথবা ওর সাথেয়ামার বিয়েই হতো না। পরের অপশনটাই বেশি হতো। আমি যাকে চাই, সেটা আমার পেতে অসুবিধা কই? কিন্তু এখন অসুবিধাটা হচ্ছে আমার বিয়ের খবরটা গোপন রাখা। ভাবছি, এবার কোর্স শেষ করে আমার বিয়ের ব্যাপারটা আমার পরিবারের সাথে মিটিয়ে ফেল্বো। আমি এটাও জানি আমার এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বদি ভাই কিংবা হাবীব ভাই মেনে নিবেন না। তাতেও আমার সিদ্ধনাত আমাকে অটল থাকতে হবে। আমি আলাদা ব্যক্তিত্ত হয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামতকে প্রাধান্য দিতে চাই। এটা আমার পরিবারের ট্রেডিশন থেকে অনেক আলাদা। আমি তো জানি আমার একমাত্র আমিই সব। মা আমার পাশে থাকবেন ঠিকই কিন্তু আমারমায়ের তেমঙ্কোনো সামর্থ নাই যাতে তিনি সবার উর্ধে গিয়ে আমাকে একচ্ছত্রভাবে সাপোর্ট দিতে পারবেন। তবে আমার মা যে খুশী হবেন সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নাই।

আর বেশীদিন নাই কোর্স শেষ হবার। খুব তাড়াতাড়িই আবার সাভারে চলে আসবো।

৩০/০৫/১৯৮৮-বিবাহ

গিলাতলা সেনানীবাস, খুলনা

খুব ক্লান্ত শরীর। সারাদিন লং ড্রাইভের ক্লাশ ছিলো। মেসে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা বনে গিয়াছে। মনটা আজো খারাপ কারন আজো তাহার চিঠি আসে নাই। কয়েকদিন যাবতই আমি তাহার চিঠি পাইতেছি না। এমন হইবার কথা নহে। যেখানে প্রতিদিন তাহার চিঠি পাইয়া থাকি, সেখানে আজ প্রায় চারদিন যাবত তাহার কোনো চিঠি আমার কাছে আসিতেছে না, ইহা আমার জন্য একটি দুশ্চিন্তার কারন বটে। খুলনা শহর হইতে বেশ দূরে আমি সেই সাভার সেনানীবাস হইতে আসিয়া গিলাতলা সেনানীবাসে প্রায় তিন মাসের ড্রাইভিং কোর্স করিতে আসিয়াছি আমি। ইতিমধ্যে প্রায় দুইমাস পার করিয়া দিয়াছি। 

ক্লান্ত শরীরে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়া হাতে বানানো ক্যাপসটেইন মিকচার দিয়া সিগারেট বানাইয়া ঠান্ডা একটি কোকের বোতল মাঝে মাঝে চুমুক দিয়া অবশ এবং অলশ শরীরে সূর্যাস্তের পর নাতিদীর্ঘ সন্ধ্যাটি উপভোগ করিতেছিলাম। মন টা খুব ভালো নাই। আমি তাহার চিঠি পাইতেছি না। এমন সময় মেস ওয়েটার সুম্মুখে আসিয়া বলিল, “স্যার, দুপুর বেলায় আপনার একটা ফোন এসেছিলো ঢাকা থেকে। আপনাকে জরুরী ভিত্তিতে তাকে ফোন ব্যাক করতে বলেছেন। ব্যাপারটা নাকি খুব জরুরী। নাম তার…… ।”

হতাত করিয়া আমার ক্লান্ত দেহ, অলশ মস্তিস্ক এবং নাতিদীর্ঘ সন্ধ্যাটি কেমন যেনো নাড়াচাড়া দিয়া আমাকে উত্তেজিত করিয়া তুলিলো। কারন মেস ওয়েটার যাহার নামে ফোন আসিয়াছিলো বলিয়া সংবাদটি দিলো, তাহার ফোন কস্মিনকালেও আমি আশা করি নাই এবং করিও না। বেশ এলোমেলো লাগিতেছিলো মনটা। সন্ধ্যাটা আরো কালো আকার ধারন করিয়া আমার সামনে যেনো আরো অন্ধকার করিয়া তুলিলো। শরতচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে একবার লিখিয়াছিলেন, অন্ধকারেরও রুপ আছে, কিন্তু আজ এই অন্ধকার সন্ধ্যায় আমি শরতবাবুর সেই অন্ধকারের কোনো রুপ খুজিয়া পাইলাম না, যাহা পাইলাম তাহা কেবল দুসচিন্তা আর অবসন্নতা মিশ্রিত বিসন্নতা। যাহাই হোক, আমাকে ঐ ভদ্রলোককে যেভাবেই হোক ফোন করিয়া জানিতে হইবে কেনো সে আমাকে ফোন করিয়াছিল এবং আমার তাহাতে কী কী করনীয়।

এমনিতেই খুব ছোট র‍্যাংকের অফিসার আমি, তাহার মধ্যে এই খুলনা শহরে কোর্স করিতে আসিয়া আমরা এইস্থানে একটা বিদেশী নাগরিকের মতো অনেক অধীকারই আমাদের নাই বলিয়া মেসে রক্ষিত একমাত্র ল্যান্ড ফোনটি আমাদের জন্য এসডি কলের সুবিধা নাই, আর আজিকার দিনের মতো তখনকার দিনে হাতে হাতে মোবাইল কোম্পানীও এই সুযোগ করিয়া দেন নাই যাহাতে আমরা নিরিবিলিতে নিকটাত্মীয়, কিংবা প্রিয়জনের সাথে অবকাশ সময়ে কথা বলিতে পারি। যাহাই হোক, সন্ধ্যা ঘনাইয়া রাতের দিকে প্রবাহিত হইতে লাগিলো বটে কিন্তু আমার মাথা ক্রমশ দুসচিন্তায় সমাধানের দিকে না আগাইয়া আমাকে আরো উদ্বেলিত করিয়া বিহব্বল করিয়া তুলিতে লাগিলো।  

প্রতিকুল পরিবেশে মাথা যতোই বিচলিত থাকুক, অন্তর থাকে তাহার থেকে আরো অধিক বিচলিত। আর বিচলিত অন্তর শুধু অন্তক্ষরনই করেনা মাঝে মাঝে ঈশ্বরের উপর এমন একটা ভাবনা লইয়া হাজির হয় যেনো কস্মিনকালেও কোনো ঈশ্বর বা ভগবান ছিলো কিনা তাহাই ভাবিতে মন চাহেনা। আর যতোক্ষন অন্তক্ষরন হয় ততোক্ষন পেটে অম্লের সৃষ্টি হয় আর অম্ল থেকে সৃষ্টি হয় এক ধরনের ঢেকুর। আর একবার যদি ঢেকুরের খনি তৈরী হয়ে যায়, তখন, সবচেয়ে খাইতে মজা লাগে শুধু সিগারেট। আমিও তাই একটার পর একটা ক্যাপসটেইন মিকচার দিয়া ঘনঘন সিগারেট বানাইয়া তৃপ্তি না হোক একটা চরম অস্থিরতার মধ্যে সময়টা পার করিতে লাগিলাম। অন্তক্ষরনের শেষে আরেকটি উপসর্গ দেখা যায়। আর তাহা হইলো, হতাত করিয়া অম্লের ঊর্ধ্বগতির কারনে মাথার গোল চাকতির ভিতরে এক প্রকারের চাপ অনুভুত হওয়ায় ফাক ফোকরের পাশ দিয়া কিছু কিছু গ্লোকজের মিশ্রনে হতবাক করার মতো কিছু সাহস আর বুদ্ধি জাগিয়া উঠে। আমারো তাহাই হইলো।

আমি আমার হইতে অধিক সিনিয়র কিন্তু এই কোর্সের রাজকীয় পরিবারের মতো একজন সিনিয়র শিক্ষকের নাম আমার মস্তিস্ক পর্দায় উদিত হইয়া উঠিলো যে, তাহাকে বলিলে হয়তোবা তাহার অধীনে থাকা দুস্প্রাপ্য ল্যান্ডফোনের  মাধ্যমে আমাকে সুদুর ঢাকায় ফোন করিবার সুযোগ করিয়া দিতেও পারেন। তাহার নাম ক্যাপ্টেন রেজা।  

আমি তাহার রুমের সামনে গিয়া কয়েকবার পায়চারী করিতে থাকিলাম। আর মনে মনে অনেকবার কি কথা কিভাবে বলিবো, সেইটা নিজে নিজে কয়েকবার অনুশীলনের মতো কানে শুনা যায় এইভাবে নিজেকে শুনাইলাম। একবার ভাবিলাম, সব সত্য কথা বলিবো। আবার ভাবিলাম কিছু সত্য কিছু অসত্য (মিথ্যা নয়) মিশ্রন করিয়া একটা যুক্তি সঙ্গত কাহিনী বলিবো কিনা? যদি বলি, আমি প্রেম করিতেছি এবং গত কয়েকদিন যাবত আমি আমার প্রেমিকার কোনো চিঠিপত্র পাইতেছি না, তাহার সাথে আমার কথা বলিবার বিশেষ প্রয়োজন, তাহা হইলে তিনি কিভাবে তাহা গ্রহন করিবেন, সেটা আম্র বোধগম্য হইতেছিলো না। আবার যদি বলি, বাড়িতে বিপদ, মহামারী হইয়াছে, কথা বলিবো বাসায়, এইজন্য তাহার ল্যান্ডফোনটা আমার ব্যবহার করিতে হইবে। আর তখন যদি তিনি অতি দয়া পরবশ হইয়া আমার পরিবারের খোজ খবর নিতে চাহেন, তখন আবার না হিতে বিপরীত হইয়া যায় ইত্যাদির আশংকা করিতেছি। সবচেয়ে বড় বিপদ হইলো যে, সত্য এবং অসত্যকে মিশ্রন করিয়া কাহিনী বানানো এবং তাহাকে একটা সত্যের যুক্তিক নাটকীয় অধ্যায় দেওয়া কতটা যে কঠিন তাহা ঐদিন বুঝিলাম। গলা শুকাইয়া যায়, মাথা ভনভন করিতে থাকে, বুক ধরফর করিতে থাকে আর গলার সুর মাঝে মাঝে এমন করিয়া ব্যাঙ্গ করে যে, নিজেই নিজের গলার সুর পরিচিত বলিয়া মনে হয় না, চিনিতে ভুল হয়। এমন একটা প্রতিকুল পরিস্থিতে শেষতক আমি ইহা মনস্থির করিলাম যে, যাহা বলিবো সত্য বলিবো। তাহার যদি অন্তর থাকিয়া থাকে তাহা হইলে তিনি আমাকে এই প্রতিকুল অবস্থা হইতে বাচিয়া যাইবার কোনো রাস্তাও তো বাতলাইয়া দিতে পারেন। আর যদি তিনি রাজকীয় পরিবারের সদস্য হইয়া আমাকে দন্ড দিতে চাহেন, তাহা হইলে তো আরো একটা বড় হাংগরের মুখে আসিয়া পড়িয়াছি বলিয়াই মনে করিতে হইবে।

এই কেরানীগঞ্জ, এইখানে কি করিস? কিছু বলতে এসেছিস নাকি?

হতাত করিয়া ক্যাপ্টেন রেজা তাহার রুম হইতে বাহির হইয়া আমাকে দেখিয়া ইহাই ছিলো তাহার ডায়ালগ। তিনি আমাকে বেশীর ভাগ সময় নাম না ধরিয়া ডাকিয়া আমার নিবাসস্থল কেরানীগঞ্জ বলিয়াই ডাকিতেন। এমিনিতেই আমি ধরাশায়ী রোস্তমের মতো অবস্থা তাহার মধ্যে আবার পরিকল্পনা ছাড়াই কি কথা বলিবো সেই পরিস্থিতি সামাল না দিতেই তাহার সামনে পড়িয়া গেলাম। এবার আর সত্য এবং অসত্য মিশাইয়া কিছু বলিবার অবকাশ রহিলো না। খুব সন্তর্পণে বারান্দায় দাড়াইয়া দাড়াইয়াই বলিলাম,

-স্যার, আমি ঢাকায় একটা ফোন করিতে চাই। মেসের ফোন কাজ করিতেছে না কিন্তু আমার ঢাকায় ফোন করা খুব জরুরী। তাই আপনার এখানে আসা। যদি অনুমতি দেন তো, আমার উপকার হয়।

কোনো কথা না বাড়াইয়া ক্যাপ্টেন রেজা স্যার বলিলেন, কি ব্যাপার, গাল ফ্রেন্ড সমস্যা নাকি?

কানের কাছে টাস করিয়া বোমা ফুটিলে যেমন কিছুক্ষন কানে আর কোনো শব্দ প্রবেশ করে না, অথবা নদীতে ঝাপ দিলে প্রথমকয়েক মুহূর্ত যেমন সাতারুর কানে স্থলবিশ্ব সম্পর্কে কোনো আওয়াজ তাহার কানে প্রবেশ করে না, আমারো হইলো ঠিক সেই অবস্থা। গালফ্রেন্ড সমস্যা কথাটি যেনো আমার কানের কাছে এইরুপ একটা ছোট খাটো টাস করিয়া বোমার মতো অথবা সাতারুর নদীতে ঝাপ দেওয়ার মতো ঘটনাই ঘটনাই ঘটিলো। তিনি আমাকে তাহার ল্যান্ড ফোন টি ব্যবহার করিতে অনুমতি দিলেন।

আমি কয়েকবার ফোন করিবার পর অতঃপর  ঢাকার প্রান্ত হইতে এক ভদ্র মহিলা ফোন ধরিলেন।

হ্যালো বলিতেই মনে হইলো তিনি যেনো আমার ফোন পাইয়া ৫ম বিশ্ব যুদ্ধের কোনো খলনায়ক তাহাকে এই বলিয়া ফোন করিয়াছে যে, আমি আপনাদেরকে খুব শিঘ্রই আক্রমনের নিমিত্তে আসিতেছি। তিনি আমাকে কোনো সুযোগ না দিয়া এই বলিয়া ফোন রাখিয়া দিলেন যে, কোন সাহসে আমি তাহার বাসায় ফোন করিয়াছি? শুধু তাহাই নয়, আর যদি তাহাকে ফোন করি, তাহা হইলে তাহার যাহা যাহা মিজাইল, আর আগ্নেয়াস্ত্র আছে তাহা দিয়াই আমাকে সমুলে ধ্বংস করিতে তিনি দিধাবোধ করিবেন না। 

কি হইলো, বুঝিতে পারিলাম না। আমি নাৎসি বাহিনীর কোনো কমান্ডারও না, কিংবা মিত্রবাহিনীর কোনো নৌবহরের কমান্ডারও না, তাহার পরেও তিনি আমাকে তাহার এমন শত্রু বলিয়া আমাকে এইরুপ আক্রমন করিলেন কেনো? যে ভদ্রলোক আমাকে ফোন করিতে বলিয়াছিলেন, তাহার সহিত আমার কোনো কথা বলা তো দুরের তাহা অবধি আমি পৌছাইতেই পারিলাম না।

আমি আবারো ফোন করিলাম। এইবারও ফোন ধরলেন সেই ভদ্রমহিলা। আমি তাহার কথা বলা শুরু করিবার আগেই বলিলাম, আপা, আমি খুলনা হইতে বলিতেছি, জনাব (অমুকের সাথে) আমি কথা বলিবো। জরুরী কথা আছে।

তিনি আর বেশী কিছু কথা না বাড়াইয়া ফোনখানা উক্ত ব্যক্তিকে ধরাইয়া দিলেন। কিন্তু আমার এইপাশ থেকে শুনিতে পাইতেছিলাম যে, তিনি তাহাকে এমন কিছু কথা বলিয়া শাসাইতেছিলেন যেনো তাহাদের ওখানে কি ঘটিতেছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য আমাকে না দেওয়া হয়। বুঝলাম, কিছু একটা সিরিয়াস ম্যাটার।

বুক ধরফর করিতেছিলো। বুকের ভিতর কেমন যেনো একটি আতংক পাথরের মতো ভর করিয়া আমার শ্বাস আর নিঃশ্বাসের দৈর্ঘ্য প্রস্থ এক করিয়া দিতে লাগিলো। উৎকণ্ঠায় আমার কপালের শিরায় শিরায় কেমন ঘামের শিশির বিন্দুর উৎপত্তি হইতে লাগিলো। আমি বুঝিতে পারিতেছিলাম, আমার শরীরের ভিতর রক্ত যতো দ্রুতই চলুক না কেনো, ঠোট  শুকাইয়া আসিতেছে, হাত পা ঠান্ডা হইয়া যাইতেছে।

মুস্তাক সাহেব ফোন ধরিলেন। এই মুস্তাক সাহেবের কথাই আমার মেস ওয়েটার বলিয়াছিলো।

তাহার সাথে আমার ইতিমধ্যে খুব একটা বেশি কথাবার্তা হয় নাই, তবে একদিন বা দুইদিন তাহার সাথে আমার দেখা হইয়াছিলো এবং অতীব ছোট খাটো কুশল বিনিময় হইয়াছিলো। আমি সালাম দিতেই তিনি আমাকে ফিরতি কোনো কুশল না দিয়া বলিতে লাগিলেন, শুনেন আখতার সাহেব, আমি শুধু বলিয়া যাইবো, আপনি শুধু শুনিয়া যাইবেন, কোনো প্রশ্ন করিবেন না, হ্যা বা না দিয়া উত্তর ছাড়িয়া দিবেন। বেশীক্ষন আপনার সাথে কথা বলিবার সময় আমার হাতে নাই, আর থাকিলেও আমার পক্ষে হয়ত কথা বলিবার সুযোগ নাই। এই বলিয়া তিনি যাহা বলিলেন, তাহা হইতেছে এইরুপঃ

-আমার ছোট বোনের বিয়া ঠিক হইয়াছে। আমেরিকার প্রবাসী। ছেলের বাড়ির সবাই মেয়েকে অত্যান্ত পছন্দ করিয়াছে। আমাদেরও ছেলের বাড়ির সবাইকে পছন্দ হইয়াছে, কিন্তু আমার বোন তাহাতে বাধ সাধিয়াছে যে, সে আপনার সাথে কোনো কথা না বলিয়া সে তাহার কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারিবে না। আমাদের সবার ধারনা, আপনি এই মুহূর্তে আপনার অফিশিয়াল নিয়মে বিবাহ যোগ্য বয়স না হওয়ায় আপনি হয়ত আগাইয়া আসিতে পারিবেন না, হয়ত সময় চাহিয়া বসিবেন, যাহা আমাদের হাতে নাই। আমরা যোগ্য পাত্র পাইয়াছি, আমরা এই সুযোগ হাতছাড়া করিতে চাহি না। আপনিও যোগ্য নন এমন নয় কিন্তু আপনার অফিশিয়াল বাধ্যবাধকতার জন্য হয়ত আপনি এখনই কোনো প্রকারের সমাধান করিতে পারিবেন না। তাই সবার অমতে আমি এই বলিয়া সবাইকে বুঝাইবার মনস্থির করিয়াছি যে, যেহেতু মেয়ে একবারের জন্য হইলেও আপনার সাথে কথা বলিয়া তাহার সিদ্ধান্ত চুরান্ত করিতে চায়, তাই আজকে আপনাকে ফোন করা। এইবার আপনি সক্ষেপে আপনার বক্তব্য বলিতে পারেন।

আমি তাহার সাথে অধিক্ষন কথা বলিবার মানসিকতা দেখাইলাম না, শুধু বলিলাম, আমি মেয়ের সাথে কথা বলিতে পারিবো কিনা। তিনি আমাকে এই উপকারটুকু করিলেন।

সে ফোন ধরিয়া কোনো কথা বলিতে পারিলো না। আমি এইপাশ হইতে শুধু তাহার ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাদিবার শব্দ পাইতেছিলাম। আমি তাহাকে কিছুক্ষন সময় দিলাম কাদিবার জন্য। আকাশ যখন কালো মেঘে ভরপুর হইয়া উঠে, চারিদিকের বাতাস যখন মেঘের এই কালো অন্ধকারাচ্ছন্ন রুপ দেখিয়া হতভবের মতো স্থির হইয়া যায়, তাহার সহিত চারিপাশের গাছপালারাও ঢালপালা না নাড়াইয়া, পাতা না নাড়াইয়া একেবারে নিথর ভংগিতে দাড়াইয়া থাকে এইটা দেখিবার জন্য যে, আকাশের ওই মেঘ কি ঘন বরসায় বর্ষিত হইবে নাকি তাহার সহিত আরো ঘূর্ণিঝড়ের আবাস রহিয়াছে। আমি তাহার ফুফাইয়া ফুফাইয়া কাদিবার জন্য কিছুক্ষন সময় দিলাম, বাহির হইয়া যাক তাহার বুকের তপ্ত করুন কষ্ট, বাহির হইয়া যাক তাহার আবেগের কিছু মর্মান্তিক বেদনা। আমি চুপ করিয়া তাহার কান্নার শব্দগুলি শুনিতে লাগিলাম। এতো দুরের কান্নার আওয়াজ আমার মনের ভিতর প্রকান্ড একটা টর্নেডোর মতো শক্তি যোগাড় করিয়া কিছুক্ষন পর শুধু বলিলাম,

– তুমি কি এখনো আমাকে ভালোবাসো?

সে এই প্রশ্নে আরো কাদিয়া উঠিলো আর বলিল, আমার আচরনে কি তোমার এইটাই মনে হইলো?– বলিলাম, তুমি কি আমার আসিবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যদ্ধু চালাইয়া যাইতে পারিবে? যদি তোমার যুদ্ধে জিতার ক্ষমতা তোমার ক্ষমতা বাহিরে চলিয়া যায়, তাহা হইলে তুমি শবমেহের হইয়া যাও। আমি আসিতেছি।

এই বলিয়া আমি ফোন ছাড়িয়া দিলাম এবং আমার পাশে রাখা ওই সিনিয়র স্যারের খাটের উপর বসিয়া পড়িলাম। আমার এহেনো আচরন এতক্ষন আমার ওই সিনিয়র অফিসার ক্যাপ্টেন রেজা খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করিতেছিলেন। তিনি বিবাহিত মানুষ, আমার থেকে কয়েক বছরের সিনিয়র মানুষ, হয়তো অভিজ্ঞতাও বেশি। তিনি আমার কাছে আসিয়া বসিলেন।

– বুঝিতে পারিয়াছি কি হইতেছে। যদি ভালোবাসো, তাহা হইলে আজই এই রাতে তুমি ঢাকার উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া যাও। আমি সব সামলে নিবো। ভালোবাসা আর বিসসাসের থেকে বড় ভরসা প্রিথিবীতে আর নাই।

আমি বলিলাম, স্যার, আমার হাতে একটি টাকাও তো নাই। আর আজ হরতাল চলিতেছে। আমার কি করা উচিত, আর কি করা উচিত নয় আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

তিনি আমাকে আমার রুমে যাইতে বলিলেন, আর বলিলেন, কাহারো সাথে যেনো আমি এই ব্যাপারটা নিয়া আলাপ না করি। বাকীটা তিনি দেখছেন। অসময়ে কেউ যখন অতি দুর্বল এক্তা হাত ও বাড়াইয়া দেয়, তখন তাহা অতিকায় বড় একটা আশ্বাসের বস্তু হইয়া বাকীটা মনের জোরে আগাইতে পারা যায়।

আমি আমার রুমে আসিলাম, আমার রুমের বন্ধুকে ব্যাপারটা খুলিয়া বলিলাম। সে আমার অত্যান্ত ভালো বন্ধু, আর সে আমার ব্যাপারটা পুরুই জানিত। ফলে তাহাকে বলিলে আমার কোনো অসুবিধা নাই এইটা আমার জানা ছিলো। আমার প্রুস্তুতির মধ্যে ছিলো শুধুমাত্র জামাটা বদল করা আর কোথায় কত টাকা আছে তা খুজিয়া বাহির করা। মানিব্যাগ রাখিতাম না, যা টাকা বেতন পাই তাহার বেশীর ভাগ চলিয়া যায় মেসের খাবারের বিল দিতে দিতেই। ফলে অবশিষ্ট টাকা কখনো বালিশের তলায়, কখনো মেট্রেসের তলায়, কখনো ড্রয়ারের কোনায় কখনো বা ব্যাটম্যানের কাছে রাখিতাম। সব জায়গায় খুজাখুজির পর সবমিলিয়ে আমি যাহা পাইলাম তাহাতে তিন শত টাকার উপরে নয়। মেস হাবিলদারকে তলব করিলাম এবং তাহার কাছ থেকে আরো পাচ শত টাকা ধার করিলাম। এইটা সেনাবাহিনীর একটা প্রচলিত ধারা যে, অফিসারগন মেস থেকে মাঝে মাঝে টাকা ধার নিতে পারেন যাহা মাসের শেষ সমন্নয় করা হয়। সব মিলিয়ে এখন আমার কাছে সম্বল মাত্র আটশত টাকার মতো।

একটু পর আমার সেই সিনিয়র স্যার ক্যাপ্টেন রেজা আমার রুমে ঢোকিলেন। বলিলেন, বাডি, আজ রাত সাড়ে দশটায় সৌখিন পরিবহন ঢাকায় যাবে কিন্তু হরতালের কারনে সব সিট বিক্রি হয়ে গেছে। স্যার কোনো রকমে একটা সিট ম্যানেজ করিতে পারিয়াছেন। সৌখিন পরিবহন আমাদের গিলাতলা সেনানীবাসের সামনে দিয়েই ঢাকায় চলাচল করে। ফলে সৌখিন পরিবহনে যাইতে হইলে আমাকে আর কষ্ট করিয়া শহরে যাইতে হইবে না। স্যার আরো একটি উপকার করিলেন। তিনি আমাকে একটা পাচ শত টাকার নোট ধরাইয়া দিয়া বলিলেন, যুদ্ধে যাচ্ছো, উদ্দেশ্য তোমার প্রিয়জনকে উদ্ধার করা। ইহাতে আর কারো কোনো ক্ষতি করার দরকার নাই। মুল উদ্দেশ্য সফল হইলে যতো তারাতাড়ি আবার ফিরে এসো। আমি ম্যানেজ করিয়া লইবো তোমার ছুটি। আর ইহাও বলিলেন, এমন কিছু করিয়া আসিবা যাহাতে তুমি বাকী সময়টা নিশ্চিন্তে পরাশুনা করিয়া আবার তাহাকে ফিরিয়া পাও। কি তাহার ইংগিত ছিলো আমি তখনো বুঝি নাই আর তিনিও আমাকে খোলাশা করিয়া বলিলেন না।

আমি শুধু স্যারকে জরাইয়া ধরিয়া বলিলাম, স্যার আমার জন্য একটু দোয়া করিবেন। এই যুদ্ধ আমার আর আমার মহিলার।

রাত এগারোটা বাজিয়া গিয়াছে, সৌখিন বাস এখনো আমাদের এলাকার কাছাকাছি আসে নাই। ফোন করিলাম। তাহারা এইবার এমন একটা সংবাদ দিলেন যে, বাস সম্ভবত ঢাকা পর্যন্ত পৌছাইতে পারিবে না কারন নদীর ওপাড়ে এখনো হরতালের কারনে পথ ঘাট অবরুদ্ধ রহিয়াছে। ফলে তাহারা এখনো সন্দিহান ঢাকার উদ্দশ্যে বাস ছাড়িবে কিনা।

অবশেষে বাস আসিলো রাত বারোটার সময়। জনগনের অনুরোধে বাস মালিক যেই পর্যন্ত বাস যাইবে সেই পর্যন্ত লইয়া গেলেই হইবে এই শরতে বাস ছাড়িলো। আমি যথারীতি বাসে উঠিলাম কিন্তু আমার সিট কে বা কাহারা দখল করিয়া আছে দেখিলাম। কোনঠাসা মানুষ, একটা খালি সিট থাকিলে কে বসিতে না চায়? কিন্তু আমি ঊঠার পর আমার সিটদখলদার সিট খালি করিয়া দিলেন।

মে মাস। আকাশের অবস্থা সেই সন্ধ্যা হইতেই খারাপ ছিলো। মাঝ রাতে বর্ষণ শুরু হইলো। আমাদের বাস চালক, এই অতিবর্ষণেও খুব সন্তর্পণে ধীরে ধীরে বাস চালাইতে থাকিলেন। যেখানে ফরিদপুর অতিক্রম করিবার কথা রাত তিন্টায়, সেই বাস ফরিদপুর অতিক্রম করিলো সকাল আটটায়। সকাল আটটায় আবার হরতালের নতুন দিন শুরু হইয়াছে। ফলে আমাদের বাস আর সামনের দিকে আগাইলো না। ওখানেই তাহার যাত্রা শেষ হইয়া গেলো। আমরা সবাই যার যার বাক্স পেট্রাসহ ফরিদপুরের কোনো এক বাজারের কাছে নামিয়া গেলাম। কিন্তু আমাকে তো যাইতেই হইবে। একদিকে হরতাল, অন্যদিকে আবহাওয়ার এই রকম একটা উত্তাল চেহাড়া।

অশান্তমনে আমি এক্তার পর এক্তা বিড়ি ফুকিতেছি আর ভাবিতেছি কি করা যায়। আমি দেখিতে পাইলাম, কিছু কিছু ট্রাক স্থানীয়ভাবে অল্প অল্প দুরুত্তে চলাচল করছে। আমি এই সুযোগটি গ্রহন করিলাম। অনেক ট্রাকওয়ালারা সাধারনত অন্য কোনো পেসেঞ্জার তাহাদের ট্রাকে নিতে আগ্রহী হয় না কিন্তু আমি আমার সেনাবাহিনীর পরিচয় দেওয়াতে অনেকেই আমাকে ছোট ছোট লিফট দিতে সাহাজ্য করিলেন। এইভাবে আমি দৌলত দিয়া ঘাট পর্যন্ত আসিয়া হাজির হইলাম।

এখানে আসিয়া দেখিলাম, রাজ্যের অসংখ্য মানুষ ঘাটে অত্যান্ত মানবেতরভাবে ফেরির জন্য অপেক্ষা করিতেছে। উত্তাল ঝড়ের কারনে সব ফেরি চলাচল বন্ধ। কখন ফেরি চালু হইবে কেহই বলিতে পারে না। নদীতে অনেক বড় বড় ঢেউ। নদী পার হইবার কোনো রাস্তা নাই। কিন্তু আমাকে তো যেভাবেই হোক এই সাগর পাড়ি দিতেই হইবে কারন আমার জন্য পথ চাহিয়া বসিয়া আছে কোনো এক মেয়ে যাহার সমস্ত শক্তি দিয়া সে তাহার ভালোবাসার জন্য যুদ্ধ করিতেছে।

আমি একটার পর একটা সিগারেট শেষ করিতেছি আর ভাবিতেছি কি করিবো। এমন সময় দেখিলাম, কিছু লোক এক্তা ছোট লঞ্চ নিজেরা ভাড়া করিবার উপক্রম করিতেছে আর লঞ্চওয়ালাকে তাহাদের জরুরী কাজের কাহিনী বলিয়া বেশী টাকার লোভ দেখাইয়া ব্যাপারটা এইরুপ বুঝানোর চেস্টা করিতেছে যে, যদি তিনি রাজী হন তাহা হইলে এই মানুসগুলির অনেক বিপদ থেকে রক্ষা পায়। ঈশ্বর সব সময়ই এক্তা পথ বাতলে দেন। এইবারও তাহাই হইলো। লঞ্চওয়ালা রাজী হইলেন নদী পার হইতে। আমিও সেই লঞ্চে উঠিয়া গেলাম। পানির যে কত শক্তি আর বাতাসের সাথে ইহার যে কি রুপ এক্তা বন্ধুত যদি পানি আর বাতাস একসাথে হয়, তাহা হইলে ইহাদের তান্ডব লীলা দেখাইবার জন্য যেনো ইহারা এতোটাই হিংশ্র হইয়া উঠে যাহারা দেখেন নাই তাহারা ভাবিতেও পারিবেন না ইহা কি। বা ইহার রুপ কি। একবার একদিকে লঞ্চ হেলিয়া পড়ে তো সব মানুষজন হুমড়ী খাইয়া অন্য দিকে ঢলিয়া পড়ে, আবার ভারসাম্য রক্ষায় যখন মানুষ অন্যদিকে ঢলিতে চাহে, তখন সেই একই রুপ হয় যাহা একটু আগে হইয়া ছিলো। এইভাবে হেলিয়া দুলিয়া আমাদে ছোট লঞ্চটা কোনো রকমে আরিচা ঘাটে আসিয়া পড়িল। যখন লঞ্চটি আরিচা ঘাটে পউছিলো তখন আমাদের কাহারো পরনের জামা আর সুস্ক নাই, কাহারো মাথার চুলও আর পরিপাটি নাই। সারারাত না খাওয়ার কারনে আমার প্রচন্ড ক্ষুধা লাগিয়াছিলো বটে কিন্তু আমার সেই ক্ষুধা আমার ইন্দ্রিয় অবধি পউছায় নাই।

এই পাড়ে আসিয়াও দেখিলাম হরতাল আরো কঠিন করিয়া পালন হইতেছে। রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় আর জন-জীবনের প্রয়োজন তাহাদের নিজস্ব বাস্তবতা। তাই অতীব প্রয়োজনে কিছু কিছু রিক্সা অল্প দুরত্তে ভাংগিয়া ভাংগিয়া চলিতেছে। আমি চলমান বৃষ্টি আর বাতাস উপেক্ষা করিয়া কোনো রকমে এক রিক্সা থেকে আরেক রিক্সায়, এইভাবে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত চলিয়া আসিলাম।

এখানে একটা কথা বলিয়া রাখা খুব দরকার যে, আমার ভালোবাসার মেয়েটি ঢাকার যেই জায়গায় অন্তরীন হইয়া চাতক পাখীর ন্যার আমার আসিবার জন্য উতসুখ হইয়া আছে, ওই স্থানটি আমি চিনি না। কিভাবে যাইতে হইবে আর কিভাবে তাহার অবধি পৌছাইতে হইবে ইহা আমার জানা নাই। তাই আমি মনেপ্রানে ভাবিলাম, আমি তাহার পিত্রিস্থল মানিকগঞ্জে আগে যাইয়া সেইখান হইতে কাহাকেও লইয়া আমি ঢাকার সেই অন্ত্রীন জায়গায় পৌছাইতে হইবে।

আমি মানিকগঞ্জে পউছিলাম, সেখানে এক করুন অবস্থা আমার গোচরীভুত হইলো। শুনশান বাড়ি, কারো মুখে কোনো কথা নাই। আমাকে দেখিয়া তাহার বৃদ্ধ মা এইবার একটি অশনি শংকেতের আভাস পাইলেন। ভাবিলেন, কি হইতে কি হইয়া যাইবে কিছুই বলা যাইতেছে না। আজিকার আকাশের মতো তাহার পরিবারে একটা ঝর বহিতেছে, তাহার মধ্যে আমি আবার টর্নেডোর মতো সেই সুদুর খুলনা হইতে আগমনে তাহার মনের অবস্থা আরো শঙ্গিত বলিয়া মনে হইলো। তিনি আমাকে একা ছাড়িতে চাহিলেন না তবে এইটুক ভরসা দিলেন যে, তিনি আমাকে অপছন্দ করেন না। তিনি আমার সাথে ঢাকা যাইবেন বলিয়া মনস্থির করিলেন। সাথে তাহার আরেক কন্যার স্বামী।

আমরা তিনজন একসাথে মানিকগঞ্জ হইতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম বটে কিন্তু আমার মন আরো একটি দুশ্চিন্তা ভর করিতে লাগিলো। পকেটের অবস্থা। হ্রতালের কারনে, ঝড় বৃষ্টির কারনে ভাংগিয়া ভাংগিয়া যাতায়তের কারনে অনুমানের চেয়ে বেশী খরচ হইয়া আমার পকেটে খুব সামান্য কিছু টাকা অবশিষ্ট রহিয়াছে যাহা জরূরি কোনো অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই সাভার সেনানিবাসের কাছে আসিয়া আমি আমার ব্যাংক মেনেজারের কাছে দেখা করিলাম আর তাহারা বাহিরে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। যেহেতু আমার আসল কর্মস্থল সাভার সেনানিবাস, তাই ব্যাংক মেনেজার একটু সদয় হইয়া আমাকে প্রায় আরো চার পাচ হাজার টাকার উত্তোলন করিবার (ওডি হিসাবে) অনুমতি দিলেন। বড্ড কাজে লাগিলো আমার এই সাহাজ্যটা।

আবার আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া গেলাম। পথ যেনো শেষ হইতে চায় না। স্কুটারে করিয়া আমরা সাভার হইতে ঢাকায় যাচ্ছি। রাস্তাঘাটে খুব একটা গাড়ি চলাচল করিতেছে না, কিছু রিক্সা আর কিছু স্কুটার লইয়াই আজ রাস্তার সংসার।

আমি যখন ঢাকারা বাসায় পউছিলাম, তখন বেলা দুপুর। আমার আগমন হয়ত তাহারা কেহ জানিতো না। তাই আমাকে দেখিয়া অনেকেই তেলেবেগুনে জলিয়া উঠিলো এবং আমার সাথে কেহই ভালো ব্যবহার করিবার কোন চেস্টাই করিলো না।

যাহারা যাহারা ওই বেদেশী বরের সাথে আমার ভালোবাসার মেয়ের সাথে সম্বন্ধ পাকাপোক্ত করিয়া মনের সুখে পান চিবাইতে চিবাইতে সময়টা পার করিতেছিলেন, আমার আগমনে তাহাদের সেই পানের সাধে যেনো একটু গন্ডোগোল পাকাইয়া দিলো। কেউ পানের পিক ফালাইবার জন্য বাহিরে গিয়া আর ফিরিয়া আসিলেন না, কেউ আবার গোদগোদ করিতে করিতে আমাকে কেনো এখনো এই বাড়ি হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হইতেছে না তাহা লইয়া কানাঘোসা করিতেছিলো। আমি বাড়িতে ঢোকিয়াই প্রথম যে কাজটি করিলাম, আমি আমার ভালবাসার মানুস্টিকে খুজিয়া তাহার সহিত কথা বলিবার জন্য দেখা করিলাম।

দেখিলাম, তাহার চোখজোড়া মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো ফুলিয়া আছে, বুঝিলাম বাহিরের আকাশের সহিত পাল্লা দিয়া সেও সারারাত হয়তো চোখের জল ফেলিয়াছে। পরনে তাহার কত দিনের মলিন কাপড় বুঝা যাইতেছিলো সেই দিকে তাহার কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। আমাকে দেখিয়া সে যেনো এইবার বাধ ভাংগা নদীর মতো আমাকে সবার সামনে জরাইয়া ধরিয়া কাদিতে কাদিতে বলিলো, আমাকে এইখান হইতে অন্য কোথাও লইয়া চলো। ওরা আমাকে মারিয়া ফেলিতেছে।

প্রায় দুইদিন না খাওয়ায় আমার শরীরের অবস্থা যেমন হইয়াছে, শুধুমাত্র মনের জোরে আমি টিকিয়া আছি। কিন্তু এই বাসায় আমার কোনো খাওয়া জুটিবে কিনা সেটা নিয়ে আমি মোটেই চিন্তিত নই তবে ভদ্রতা বলিয়া যদি কিছু থাকে তাহা হইলে হয়তো বা আমার কপালে কিছু খাবার জুটিবে, আর না জুটিলেও আমার কোনো সমস্যা নাই। আমি এইখানে খাইতেও আসি নাই, আর কেউ আমাকে সম্মান করুক সেইটা নিয়েও আমি ব্যস্ত নই। আমার কাজ ভিন্ন আর সেইটা সাফল্য হইলেই আমি সার্থক।

দুপুরের দিকে তাহার দুইভাই বাহির হইতে আসিয়া প্রথমেই একজন এই রকম উচ্চস্বরে কাকে যেনো উদ্দেশ্য করিয়া এমনভাবে চিৎকার করিতেছিলেন যে, তাহার সব কথাই আমার কানে আসিতেছিলো। সেই কথাগুলির সারমর্ম হইলো এই যে, কেনো আমাকে এখনো এই বাড়ি হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হয় নাই।

আমি অনেক ধৈর্য সহকারে সমস্ত কিছু গলাদ করন করিতেছিলাম। তাহাদের কোনো কথায়ই আমি বিচলিত ছিলাম না। একটু পর তাহার দুইভাই এবং এক ভাবি আমার সাথে কথা বলিবেন বলিয়া মনস্থির করিলেন। তাহাদের এই সিদ্ধান্তে উপস্থিত অনেকেই মনঃক্ষুণ্ণ হইতেছিলেন এবং তাহাদের সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে চাহিতেছিলেন না। কিন্তু আমাকে তো কিছু বলিয়া এই বাড়ি হইতে বিদায় করিতে হইবে। সুতরাং আমার সাথে কথা না বলিবার আর কোনো অবকাশ রহিলো না। ফলে যাহারা যাহারা এই সিদ্ধান্তে নারাজ ছিলেন, তাহারা একে একে বাড়ি ত্যাগ করিয়া প্রস্থান করিলেন। আমি তাহার দুই ভাই আর এক ভাবীর সামনে বসিয়া কথা আরম্ভ করিলাম।  

আজো আমার ওই কথাগুলি স্পষ্ট ভাবে মনে আছে। তাহা একেবারেই যেনো নিম্ন্রুপঃ

– ভাবী বলিলেন, দেখেন, আমাদের মেয়ের একটা ভালো সম্বন্ধ আসিয়াছে, ছেলে আমেরিকায় থাকে, অত্যান্ত ভালো পরিবার। আমরা আমাদের মেয়েকে ওই ছেলের সাথেই পাকাপাকি বিয়ার প্রস্তাব দিয়া দিয়াছি। আপনি অহেতুক গোল পাকাইয়া আমাদের মেয়ের জীবন নষ্ট করিবেন না। আমরা আপনার সাথে মেয়েকে বিবাহ দিতে পারিবো না।

– আমার উত্তর ছিলো খুব সোজা। আমি বলিলাম, তাহা হইলে আমি যে মাঝে মাঝে আপনাদের মানিকগঞ্জের বাসায় সবার সাথে কয়েকবার ভর মজলিশে দেখা করিয়াছি, একসাথে বসিয়া খাওয়া দাওয়াও করিয়াছি, তখন কেনো আমাকে বারন করিলন না যে, ইহা আপনাদের পছন্দ নয়। আমার আর আগনোর প্রয়জন নাই?

– এই প্রশ্নে ভাবি বলিলেন, দেখেন আমরা জানি আপনার সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে বিবাহ করিতে আরো তিন থেকে চার বছর বাকী। এতো লম্বা সময়ে আমরা কেহই ভবিষ্যৎ বলিতে পারি না। কি এমন গ্যারান্টি আছে যে, আপনি এই কয়েক বছরে পরিবর্তন হইয়া যাইবেন না? তখন না আপনি আমাদের মেয়েকে আর পছন্দ করিবেন না আমরা আবার এই রকমের এক্তা সুপাত্র পাইবো সেইতার ও কোনো গ্যারান্টি নাই। আমরা মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করিয়া আজ এইরুপ সিদ্ধান্ত লইয়াছি যে, আমরা ওই বিদেশী প্রবাশির সাথেই মেয়েকে বিবাহ দিবো।– আমি গনক নই যে, ইহা বলিতে পারি যে, আগামি তিন চার বছর আমি বাচিয়াই থাকিবো কিনা। তবে আমি আমাকে চিনি, আমার উপর আপ্নারা ভরসা করিতে পারেন। আমি কথা দিতেছি যে, আমার অফিশিয়াল বিয়ের বয়স যেদিন হইবে তার থেকে এক মুহূর্তও দেরী করিবো না বিবাহের।

– ভাবী মানিলেন না।

আমি আবার বলিতে থাকিলাম যে, যদি এই বিস্তর সময় আমাকে আপ্নারা ভরসা করিতে না পারেন, তাহা হইলে আমাকে অন্তত আরো এক্মাস সময় দিন, আমি বর্তমানে খুলনায় এক্তা সেনা কোর্সে আছি,তাহা শেষ করি, ঢাকায় ফিরে আসি, আমি আমার নিজের সব গার্জিয়ানদের নিয়ে ঘটা করিয়া বিবাহ করিবো। হয়ত আমি সেইতা সেনাবাহিনীকে জানাইবো না কারন সেনাবাহিনী আমাকে তিন চার বছর আগে বিবাহ করিবার অনুমতি প্রদান করিবে না।

– তাহাতেও তাহারা রাজী হইলেন না।

-আমি এবার সমস্ত সিদ্ধান্ত নিজের তরফ হইতে লইয়া লইলাম যে, যদি আপনাদের কোনো অপ শনেই আমার উপর ভরসা করিতে না পারেন, তাহা হইলে আজি এক্ষুনী কাজীকে তলব করেন, আমি এই আজকের দিনেই আপনাদের মেয়েকে বিবাহ করিবো।

এইবার তো আর কোনো যুক্তি তাহাদের খাটিল না। সিদ্ধান্ত হইয়া গেলো, আজ ই আমাদের বিবাহ হইবে। আমি বৈঠক হইতে উঠিয়া গিয়া আমার ভালোবাসাকে জানাইয়া দিলাম, আজ আমাদের বিয়া।

আমি বলিলাম, চলো আমরা বাহির থেকে একটু ঘুরিয়া আসি, চা খাইয়া আসি, মুক্ত বাতাশে একটু দম লইয়া আসি। আমি আর সে দুইজনে আশেপাশেই একটি চায়ের দোকানে ঢোকিয়া চা খাইতে বসিলাম।অত্যান্ত নীচু মানের একটি চায়ের দোকান কিন্তু সেইটা আমাদের কাছে কোনো ব্যাপার নয়। আমরা দুইজনে এখন একটু মুক্ত বাতাসে দম লইতে আসিয়াছি। সারাদিন ধকল গিয়াছে। আমরা চুপচাপ চা পান করিতেছি।

তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। খুব এক্তা লোকজন দোকানে নাই। হয়তো আমি আর ও। দকানের মালিক আমাদেরকে হয়তো বারবার লক্ষ্য করিতেছিলেন। আমরা চা পান করছি ঠিক ই কিন্তু আমাদের মধ্যে না আছে কোনো উচ্ছাস না আছে কোনো আবেগ। বিল দিতে গেলাম, দোকানি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করিলেন, আমরা একে অপরের কি হই?বললাম, আজ আমাদের বিয়ে।দোকানি এতোটাই হতবাক হইলেন যে, তিনি আর কোনো কথা বলতে পারিলেন না। শুধু বলিলেন, আমি অবাক হইতেছি যে, আপনাদের দেখিয়া কোনো বস্তির লোক বলিয়া মনে হইতেছে না, অথচ আপা খালি পায়ে এই দোকানে চা খাইতে আসিয়াছেন, আবার আপ্নারা যেনো কোনো কথাই কেউ কাহারো সাথে বলিতেছেন না। আমি বুঝতে পারিতেছি, আপ্নারা কোনো একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়া পার হইতেছেন। আমি দোয়া করি আপ্নারা সুখী হোন আর আজ আমি আপনাদের কাছ হইতে কোনো বিল নিতে চাই না। তিনি আমাদের কে অনেক দোয়া করিলেন।

বাসায় ফিরিয়া আসিলাম। দেখিলাম, কয়েকটি মুরগী কেনা হইয়াছে, কিন্তু কাটিবার লোক নাই, কিছু পোলাও হয়তো পাকানো হইবে, কিন্তু কে রান্না করিবে? একটু পরেই কাজী হয়তো আসিয়া পড়িবেন। মেয়ের মেঝো ভাই তাহার বোনের জন্য একটা শাড়ি, হউয়তো কিছু কস্মেটিক্স কিনিতে বাহিরে চলিয়া গিয়াছেন। কনে কিছু না ভাবিয়া রান্না করিবার জন্য রান্না ঘরে চলিয়া গেলো। নিজের বিয়ে, নিজে রান্না করিবে, তারপর হয়তো একটু হাত মুখ ধুইয়া সাজোগূজো করিবে, তাহার পর আমাদের বিয়ে হইয়া যাইবে।

লিলি নামের একজন মেয়ে যিনি কনের সমবয়সী, সে আসিয়া কনেকে রান্না বান্নায় একটু সাহাজ্য করিলো, অতঃপর সে তাহাকে হাতে মেহেন্দি আর মাথায় কিছু সাদা সাদা ফোতা দিয়া কোনো রকমে কনে সাজাইয়া ঘরের মধ্যে বসাইয়া দিলো।

কাজী আসিলেন, কত টাকা কাবিন হইবে আমাকে জিজ্ঞেস করিলেন। আমি শুধু বলিলাম, এক টাকা হইতে আরম্ভ করিয়া শত কোটি টাকার যে কোনো একটি অংক যাহা তাহাদের মন কে শান্ততা দেয় তাহাই যেনো লিখিয়া লয়, তাহাতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু কাবিনের খরচ দিবার মতো আমার কাছে কোন টাকা নাই। আর যদি কেহ আমাকে ওই কাবিনের খরচের সম পরিমান টাকা ধার দিতে চায়, দিতে পারে আমি পরে শোধ করিয়া দেবো।

অবশেষে তাহারা দশ টাকার কাবিনে বিবাহ হইবে বলিয়া মনস্থির করিলেন।

কনের বিয়ের কাপড়, সাজ সরঞ্জামাদি, আলতা, কস্মেটিক্স এইসব নাকি বরের বাড়ি হইতেই দেওয়া হয়। তাই নিয়ম পালনের জন্য তাহারা আমাকে খরচের কথা বলিলে আমি বলিলাম, কিছুই আমার দেওয়ার মতো এখন সামর্থ্য নাই। এক কাপড়ে বিয়া হইলেও আমার কোনো আপত্তি নাই। তাহার পরেও বিয়া বলিয়া কথা। কনের বড় ভাই তাহার নিজের পকেটের টাকা খরচ করিয়াই মোট ৪৭২০ টাকায় সব কিনিয়া আনিলেন। আমার বিয়ের বাজেট এইটাই। ৪৭২০ টাকা। আজো আমার কাছে ওই রশিদ টা সংরিক্ষিত আছে। ইহা একটি বিবাহের দলিল।

কাজী আসিলেন। বরের পক্ষ হইতে কে আসিয়াছে তাহা জিজ্ঞেস করিতেই আমি বলিলাম,

-আমিই বর, আমিই বরের পিতা, আমিই বরের মাতা, আমিই বরের ভাইবোন এবং বরের সব। ইহা শুনিয়া কাজী আর কিছুই বলিলেন না। শুধু বলিলেন, অনেক বিবাহ করিয়েছি। কিছু গোপনে, কিছু কোর্ট ম্যারেজ হিসাবে, কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে। কিন্তু আজ দেখিলাম ইহা না প্রাইতিস্টহানিক না গোপন, না কোর্ট ম্যারেজ। ইহা একটি ওপেন প্রাতিষ্ঠানিক কোর্ট ম্যারেজের মতো যাহা আমার জীবনেওএক্টা ইতিহাস হইয়া রহিলো। আপ্নারা সুখী হোন।

৩০/০৪/১৯৮৮-খুলনায় ওএমটি কোর্স

গিলাতলা, খুলনা।

খুলনায় এলাম ওএমটি কোর্স করতে। এটা বেসিক্যালি গাড়ির কোর্স। ড্রাইভিং, রক্ষনাবেক্ষন, ইত্যাদি। সবই গাড়ি রিলেটেড। এ এস সি সেন্ট্রা এন্ড স্কুলে হয় এটা। অনেকগুলু কোর্সম্যাট। লেঃ আলমাস (আর্টিলারী), লেঃ সাকির, লেঃ আসফাক (ইষ্ট বেঙ্গল), লেঃ এনাম (সিগন্যাল), লেঃ সাইফ (ইষ্ট বেঙ্গল), আমি, লেঃ তোহা (১২ লং ইষ্ট বেঙ্গল), ৯ লং কোর্সের লেঃ জাহিদ স্যার এবং আরও অনেকে। কখনো খুলনায় এর আগে আসিনি। প্রায় মাস তিনেক থাকব। মেজর মোশাররফ স্যার আমাদের কোর্স ওআইসি। ক্যা; রেজা কোর্স কোর্ডিনেটর। এখানে সেনানীবাসটি খুব সুন্দর। খুলনা শহর থেকে বেশ দূরে। পাশ দিয়ে হাইওয়ে চলে গেছে। একদিকে একাডেমিক ভবনসমুহ, অফিসার মেস, আর রাস্তার উত্তর দিকে বিশাল ট্রেনিং গ্রাউন্ড। একটা জু আছে। ঘোড়া আছে আস্তাবলে অনেকগুলি। এখানকার কমান্ডেন্ট ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রব। শুনেছি ওনার বাড়ি নাকি আমাদের কেরানিগঞ্জে। খুলনায় ওএমটি (অফিসার্স মেকানিক্যাল এন্ড ট্রান্সপোর্ট কোর্স) কোর্সে আসার একটা মজার কাহিনি আছে। কাহিনীটা আর যাই হোক, আমার কাছে বেশ হাস্যকর মনে হয়েছে। তবে ঘটনাটা একটু খুলেই বলি।

আমার সিও হচ্ছেন কর্নেল খাইরল আলম (৪১ তম পাকিস্থানি ব্যাচ), অনেক সিনিওর মানুষ কিন্তু সোজা সাপটা এবং বেশী জ্ঞ্যান রাখেন বলে আমার কাছে মনে হয় নাই। আমাদের যে টুআইসি (মেজর রফিকুল হাসান), সে সিও সাহেবকে কাবু করতে বেশিক্ষন সময় নেয় না। যেহেতু সিও সাহেবের জ্ঞ্যানের একটু আধটু ঘাটতি আছে, সেহেতু টুআইসিকে সিও সাহেব জমা দিয়েই চলেন। আর সেই সুবাধে, টুআইসি সাহেব মাঝে মধ্যে সিও সাহেবের থেকে এক্ত বেশী স্মার্ট ভাব নিয়ে অন্যান্য অফিসারদের উপর খরগ চালাতে দ্বিধাবোধ করেন না। আমার আবার এই একটা জায়গায় মানতে অসুবিধা। ইউনিটে অনেকগুলু গুড়া গাড়া অফিসার আছি (আমি, ৮ লং কোর্সের সাহাব স্যার, অনেক সিনিওর মেজর সওকাত স্যার, খলিল স্যার, সালেহ স্যার, এহসান, মুনির, ওমর আর অনেকে)। শওকাত স্যার আর খলিল স্যার আবার কোর্স ম্যাট। সালেহ স্যার আবার অনেক ভাল জায়গা থেকে পোস্টিং এসেছেন, সুতারং এদেরকে স্পর্শ করা আমাদের সিও অথবা টু আই সি সাহেবের মুরুধ কম। সব পাঠার বলি আমরা যারা জুনিয়র। ঠেলা সামলাও।

০২/১১/১৯৮৭-এপেন্ডিক্স যে ২

০২/১১/১৯৮৭- এপেন্ডিক্স যে ২

আমার এপেন্ডিক্স জে অধিনায়ক ব্রিগেডে পাঠিয়েছন কিনা আমি জানি না। আমার এই এপেন্ডিক্স জে প্রথমে ইউনিট হয়ে ব্রিগেডের মাধ্যমে কমান্দারের এপ্রোভাল হয়ে ডিভিশনে জি ও সির কাছে যেতে হবে। জি ও সি যদি এপ্রোভাল দেন, তাহলে তিনি এটা আর্মী হেড কোয়ার্তারে পাঠাবেন। তারপর চীফের এপ্রোভাল হলেই আমার চাকুরী চ্যুত হবে। লম্বা প্রোসেস। আমাদের জি ও সি হলেন মেজর জেনারেল নুরুদ্দিন স্যার। আজ আমাকে ডি কু জানালেন যে, আগামি যে কনো দিন জিওসির ইন্টারভিউ হতে পারে। রেডি থেকো। ভাবলাম, তাহলে হয়তো ব্রিগেড থেকে আমার এপ্লিকেশন ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে।   

৩০/১০/১৯৮৭- এপেন্ডিক্স যে

আমাদের প্রতিটি ইউনিটেই আর্মির সব ফর্ম থাকে। এপেন্ডিক্স জে ফর্মটাও আছে। আমি একটা এপেন্ডিক্স ফর্ম নিয়ে আজ ফিল আপ করলাম। আগামিকাল অফিশিয়ালী জমা দেবো। ক্যাঃ শিহাব স্যার মানা করলেন। কিন্তু আমার তো আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না এই অবস্থায়। আমার এ ছাড়া আর কোনো উপায় আছে বলে মনে করি না। আর এই আর্মিতে আমার এমন কেউ নাই যে, আমি তার কাছে সাহাজ্য চাইতে পারি। আর আমার এখনো ক্যারিয়ার গড়ার অনেক সুযোগ আছে বাইরে। গেলে এখনি সময়। তাই আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। শিহাব স্যার অনেক পিঠা পাঠালেন আমার মেসে। ভাবী ও এলেন। খুব ভালো একজন মহিলা।

২৮/১০/১৯৮৭- উপধিন্যকের বাসায় যাওয়া

আমার অবস্থাটা খুব খারাপ। একদিকে মানষিক চাপ, অন্য দিকে ইউনিটের থেকেও অনেক চাপ। আমাকে ব্যস্ত রাখার সব ধরনের কৌশল সিও এবং উপ অধিনায়ক আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছেন। আমার কোনো স্বাধীনতা নাই, রেষ্ট করার সময় নাই, ডিউটি আর ডিউটি। দিন রাত অযথা ডিউটি। কোনো কাজ না থাকলেও কোনো না কোনো একটা কাজে আমাকে লাগিয়েই রাখা হচ্ছে।

আজ আমি উপ অধিনায়ক রফিক স্যারকে তার বাসায় গিয়ে দেখা করলাম। ভাবী দরজা খুললেন। বেশ স্মার্ট মহিলা। সম্ভবত মাথায় একটু কম চুল। তাই উপরে খোপা করেন। আমি স্যারের সাথে চা আর সিগারেট খেতে খেতে বললাম, স্যার আমি এপেন্ডিক্স জে দিতে চাই। এপেন্ডিক্স জে হচ্ছে সেচ্ছায় অবসর গ্রহনের একটি তরিকা। মেজর রফিক খুব চালাক লোক, তিনি মনে করেছেন, আমি হয়ত এমনিতেই ভয় দেখানো জন্য তাকে এটা বলতে এসেছি।

তিনি সাথে সাথেই বললেন, তুমি যদি এপেন্ডিক্স জে দাও, আমি ১ মাসের মধ্যে সেতা এপ্রোভ করিয়ে তোমাকে সাহাজ্য করতে পারি। আমি তার চালাকি বুঝি নাই কিন্তু আমি তো মনে মনে এতাই চেয়েছিলাম যেনো আমি এপেন্ডিক্স জে এর মাধ্যমে আর্মি থেকে বের হয়ে যাই।

খুব আনন্দের সাথে তার বাসা থেকে বের হয়ে এলাম। এসে এপেন্ডিক্স জে এর কপি একটা কোথা থেকে পাওয়া যায় সেটা খুজতে থাকলাম।

২০/১০/১৯৮৭ - কোর্ট অফ ইঙ্কোয়ারী

যেহেতু আমি আমার অপরাধ স্বীকার করেছি, ফলে ওয়ানম্যান কোর্ত অফ ইঙ্কয়ারী হল ২ দিনের মধ্যে যাতে আমার শাস্তি হয়ে গেলো 'কঠোর ভতর্সনা"। অর্থাৎ একতা লাল কালী। আমার উপ অধিনায়ক ছিলেন এই কোর্ট অফ ইনকোয়ারীর প্রেসিডেন্ট। আমার অবস্থা দিনকে দিন আরো খারাপ হতে থাকলো। ডিভিশনের মোটামূটি সবাই আমাকে এখন নামে চিনে, হয়ত কেউ কেউ আমাকে দেখলে চিনবে না যে, আমি লেঃ আখতার। মেসে অনেকেই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সাহসের তারিফ করেন বটে কিন্তু আবার অন্যদিকে এটা করা ঠিক হয় নাই এই মন্তব্যও করে।

১৭/১০/১৯৮৭- রাত ১১ টা

আজ ডিভিশনে গিয়েছিলাম। মেজর সালাম আমাকে অনেক প্রশ্ন করলেন আমি জি ও সির নাম্বার ব্যবহার করে বিদেশে কনো কল করেছি কিনা। করলে কিভাবে করেছি। আমি কনো কিছুই লুকাইলাম না।

বললাম, আমি প্রায় সপ্তাহ খানেক যাবত মেজর আকবর স্যারকে একটা বেদেশী কল বুক করার জন্য অনুরোধ করেও কোন ফয়সালা হচ্ছিলো না। অথচ আমার খুব দরকার ভাইয়ার সাথে কথা বলার। এখন আমি যদি আপনাকে বা অন্য কাউকে বলি যে, আমি জি ও সির টেলিফোন থেকে ফোন করতে চাই, আপ্নারা আমাকে পারমিশন দিবেন না। সেই পারমিশন দিবেন না এই আদেশ পাওয়ার পর ও যদি ফোন করি তাহলে আমি ২ তা অপরাধ করার সামিল হবে। তাই আর আপনাদেরকে আমার বলার দরকার মনে করি নাই। ভুল একটাই হোক।

১৬/১০/১৯৮৭- আমেরিকায় ফোন

আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। যেভাবেই হোক আমাকে ভাইয়ার সাথে কথা বলতেই হবে। এভাবে আর থাকা যায় না। গতকাল আমি ডিভ ডিউটি অফিসার হিসাবে ডিউটি করছিলাম ডিভ হেড কোয়ার্টারে। ডিভ ডিউটি অফিসার হলোঃ প্রতিদিন একজন অফিসার ডিভ অফিসেটেলিফোন অপারেতর হিসাবে কাজ করে। সারা ডিভিশনের একটা রিপোর্ট নেয়, কে বা কারা সেনানীবাসে এলো বাইরের থেকে, কি গাড়ি কোথায় গেলো, কেনো গেলো, কিংবা এই জাতীয় অনেক রিপোর্ট ফোনে ফোনে নিতে হয় মেইন গেট, ইউনীট ইত্যাদি থেকে। অনেক রাত। আমি ডিভ অফিসের এক ক্লার্ক কে আমার কষ্টের কথাগুলি এম্নিতেই শেয়ার করছিলাম। তার নাম শাহজাহান। সে সিগন্যাল ইউনিটের ক্লার্ক। আমাকে সে একটা বুদ্ধি বাৎলে দিলো যে, স্যার, জিওসির একটা সরাসরি ফোন নাম্বার আছে যা থেকে প্রিথিবীর যে কোনো জায়গায় কল করা যায়। আপনি একটা সুযোগ নিতে পারেন আপনার ভাইয়ের সাথে কথা বলার। কিন্তু জিওসির নাম্বার বলে কথা, যদি জেনে যায়, তাহলে কিন্তু অসুবিধা হবে।

আমার কাছে এখন কি অসুবিধা হবে আর কি সুবিধা হবে এটা চিন্তা করার কোনো অবকাশ নাই। ভাইয়ের সাথে আমার কথা বলতেই হবে। ফলে আমি জিওসির নাম্বারটা ক্লোন করে জিওসির টেলিফোনের তার আমার টেলিফোনের সাথে কানেকশন করে ভাইয়াকে রাত ১১ তায় ফোন করলাম। প্রায় ১ ঘন্টা কথা বললাম ভাইয়ার সাথে। আমি আমার সমস্যার কথাগুলি জানিয়ে বললাম, আমার আর আর্মিতে থাকা সম্ভব না, যেভাবেই হোক আমি বের হতে চাই। ভাইয়া আগে থেকেই আমার এই আর্মীতে আসা নিয়ে খুব নারাজ ছিলেন। এইবার আমার আর্মী ছারার কথা শুনে তিনি আমার সিদ্ধান্তকে সায় দিলেন।

কিন্তু কিছুক্ষন আগে ব্রিগেডের ডি কিউ মেজর বদ্দ্রোজা স্যার জানাইলেন আমাকে ডিভিশনের জিএসও-২ (অপ্স) মেজর সালাম আমাকে ডিভিশনে যেতে বলেছেন। বুঝলাম, ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে।

১২/১০/১৯৮৭- ইউনিটেই একঘরে

কয়েকদিন পার হয়ে গেল কিন্তু আমি কিছুতেই আমেরিকার লাইন পাচ্ছি না। মেজর আকবর ও কোনো ভাবেই মিলিয়ে দেবেন এই কথা আর বলছে না। রহস্যটাই  বুঝতে পারছি না। এদিকে গতকাল রাত ১ টার দিকে হটাত করে এফ আই ইউ ইউনিটের অধিনায়ক ক্যাঃ ফেরদৌস (১০ লং) আমার রুমে এসে হাজির। এসে বললেন, তোমার রুম চেক করবো। আমার তো মেজাজ খারাপ। আমি তার সাথে এক প্রকার ঝগড়াই করা শুরু করলাম, এটা কোন ধরনের কথা? আমি কি ক্রিমিনাল?

তিনি আমাকে বললেন, এতা ইউনিট থেকে আমাদের জানানো হয়েছে তোমার রুম হটাত করে চেক করার জন্য। যাই হোক, ব্যাপারটা আমার কাছে অত্যান্ত সিরিয়াস মেটার বলেই মনে হলো আর নিজের কাছে খুব অপমান বোধ করতে লাগলাম।

আমি ইউনিটের মধ্যে মোটামুটি এক ঘরের মতো হয়ে গেলাম। অফিসাররা খুব একটা আমার সাথে মিশতে চান না। ভালভাবে কথা বলে না। কোথাও একতা গন্ডোগল মনে হচ্ছে।

০৯/১০/১৯৮৭-মিতুলদের আগমন সেনানিবাসে

আজ শুক্রবার। সকালে আমার ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু ইউনিটে অধিনায়ক হটাত করে এক মিটিং ডাকাতে আমার আর যাওয়া হয় নাই। ভেবেছি বিকালে যাবো। মিটিং শেষ হলো সকাল ১০ টায়। আমি মিটিং শেষ করেই ভাবলাম, মেসে যাই, রেডি হৈ এবং পরে ইউনিভার্সিটিতে যাই। আমি মাত্র মেসে আএসেছি, এমন সময় মেসের ফোনে ফোন এলো যে, আমার গেষ্ট এসেছে ইউনিটে। আমি ভেবে পাইলাম না কে হতে পারে আমার গেষ্ট? মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।

গেলাম ইউনিটে আবার। গিয়ে দেখি, ঊহ মাই গড। মিতুল, সুরাইয়া পারভীন তানি আর তার আরো কয়েক বন্ধু আমার ইউনিটে এসে হাজির। আমাদের ইউনিট নতুন সাভারে এসেছে বিধায় অফিস, ব্যারাক আর মেস সব এক বিল্ডিং এর মধ্যে। ওরা সব ইয়াং মেয়েরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি করে হাসছে আমি যখন রক্সায় করে ইউনিটের কোয়ার্টার গার্ডের সামনে নামছিলাম। লেঃ ওমর শরীফ ইউনিটেই ছিলো, কেরানীগঞ্জের ছেলে। সিও এবং অন্যান্য অফিসাররা সবে মাত্র মিটিং শেষ করে যার যার বাসায় চলে গেছে, ফলে ইমিডিয়েটলী কোনো রি-একশন পাইলাম না বটে কিন্তু আমি জানি এটা একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। কারন মেয়েদেরকে অফিসার মেসে আনা হয়ত সম্ভব কিন্তু খোদ ইউনিটের অফিসে এভাবে আনা যায় না। এটা সাংঘাতিক সামরীক আইনের পরিপন্থি বলে আমাকে সিও সাহেব কড়া নোটিশ দিলেন।

আমি ওদেরকে আপাতত রিক্সায় করে আমার মেসে নিয়ে এলাম, দেখা যাক পড়ে কি হয়। এই ঘটনায় আমি খুবই চাপে পড়ে গেলাম। এফআইইউ ইউনিট আমার পিছনে সারাক্ষন জোকের মতো লেগে গেলো। সিও সাহেব আমাকে খুবই খারাপ নজরে দেখা শুরু করলেন, উপঅধিনায়ক মুখে এক কথা বলেন বটে কিন্তু কাজে অন্য রকম। আমাদের ইউনিটের ক্যাঃ শিহাব স্যার একমাত্র আমাকে একটু মনোবল দিয়ে যাচ্ছেন। ইউনিটে অনেক অফিসাররা আছেন (মেজর খলিল, মেজর শ ওকাত, লেঃ মুনীর, লেঃ সাদাত, আরো অনেকে কিন্তু সব ব্যাপারেই যেনো আমি টার্গেট। ব্যাপারটা আমার কাছে একটা মানসিক কষ্টের কারন হয়ে দাড়িয়েছে। এম্নিতেই আর্মীতে থাকার ইচ্ছাটা মরে যাচ্ছে, তারমধ্যে আবার পরিবেশ এমন হয়ে উঠছে যে, আর্মী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাটা যেনো তড়িত হলেই বাচি।

আমার প্রতিদিনের ডিউটি বেড়ে গেলো। এমন একটা ব্যাপার ঘটলো যে, আমার কোথাও যাওয়ার আর কোনো সময় হয়ে উঠছে না। আমি মিতুলকে আমাদের ইউনিটে আর কখনো এইভাবে না আসার জন্য বলে দিলাম।

চাকুরীর প্রতি আর মায়া রাখতে পারছি না। হাপিয়ে উঠেছি। এমনিতেই এই আর্মিতে আমার আসার ইচ্ছে ছিলো না, তারপর আবার এই ধরনের একটা পরিস্থিতি যা আমার চাকুরীর জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়। ইউনিটে যাই করি, পদে পদে সিও খায়রুল স্যার আমার ভুল ধরার চেষ্টা করেন, উপ অধিনায়কও তার সাথে আরো জোগান দেন। ইউনিটের প্রতি আমার টান বা মহব্বত অনেক কমে গেলো।

ভাবছি, হাবীব ভাইকে বল্বো যে, আমি আর আর্মিতে থাকতে চাই না। নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। কিন্তু কথা তো বলতে হবে হাবীব ভাইয়ের সাথে। কিভাবে কথা বল্বো?

আমি আর্মি এক্সচেঞ্জে হাবীব ভাইয়ের আমেরিকার নাম্বারে কল বুক করতে বললাম। মেজর আকবর ওসি সিগন্যাল স্ট্যাটিক। তিনিই এই সব ব্যাপারে সাহাজ্য করতে পারেন। তার সাথে কথা বললাম, তিনি আমাকে আশসাস দিলেন, কথা বলিয়ে দেবেন আমার ভাইয়ের সাথে।

০২/১০/১৯৮৭-মিতুলের সাথে ডেইলী দেখা

সাভার পোষ্টিং হওয়াতে আমার সবচেয়ে যে লাভ তা হয়েছে তা হলো-আমি প্রায় প্রতিদিন মিতুলের সাথে জাহাঙ্গীর নগর ইউনিবার্সিটিতে দেখা করতে যেতে পারি। বিকাল হলেই আমি চলে যাই ইউনিভার্সিটিতে। সন্ধ্যা পর্জন্ত ওখানেই সময় কাটাই। মিতুল জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির ছাত্রী। তারসাথে তার বন্ধুদের মধ্যে সুরাইয়া পারভীন তানি, রোজী, রোজ, রোজী দিপু, কেকা, এই মেয়েগুলির সাথেই আমার খুব বেশি ভালো বন্ধুত্ত। আমার এই প্রতিদিনের যাওয়া আসা নিয়ে সম্ভবত কেউ নজর রাখছে। কিন্তু তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। বেসিক কোর্ষ থেকে যখন হালিশহর ত্যাগ করে যশোরে আসার পথে ঢাকায় অবস্থান করছিলাম, তখন মাসুস ইকবাল আমার সাথে একদিন রাত কাটালো মীরপুরে। ওর বাড়ি রাজশাহী। এর মধ্যে ভাবলাম, আমি যেহেতু ছুটিতেই আছি, দেখা করে আসি মিটুলদের সাথে। গত কয়েকদিন আগে আমি মিটুলের সাথে সেই সাভারে গিয়ে সারাদিন কাটালাম। এটাই আসলে আমার আর মিটুলের প্রথম একান্তে সাক্ষাৎকার।

আমি না ধনী পরিবারের ছেলে, না আছে আমার কাছে অনেক জমানো পয়সা। যে কয়টা পোষাক আছে সেগুলিও যে খুব একটা সিলেক্টিভ তাও না। কিন্তু আমার মধ্যে এসবের কোনো বালাই ছিলো না। আমি যা, আমি সেটাই। আমি জানি আমার ভিতরে কি আছে, আর বাইরের পোষাক দিয়ে আমার ভিতরের আমিকে না পারবো লুকাতে, না পারবো কিছু বেশী দেখাতে। মিটুলের অবস্থাও যে আমার থেকে অনেক বেশী উন্নত সেটা আমি বলছি না। আসলে আমরা উভয়েই প্রায় একই রকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। ওর যেমন না ছিলো অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা চাহিদা না সে আমাকে আমার ব্যাপারে কিছু বেশী জানতে চেয়েছে। অনেক দিনের পরিচয় না হলেও যেহেতু পাশাপাশি বাড়িতেই আমরা থাকতাম, হয়তো সে সুযোগে আমার অনেকটা পরিচয় কিংবা ব্যক্তিত্ত সে জেনেই থাকবে।

যেদিন ওর সাথে আমি সাভারে প্রথম দেখা করতে যাই, আসলে আমার পরিকল্পনাই ছিলো কিছুটা সময় কাটানো আর ওর সাথে থাকা। সাভার স্মৃতি সৌধে একটাই রেষ্টুরেন্ট, সে রেষ্টুরেন্টেই আমি আর মিটুল খুব যত সামান্য খাবারই খেয়েছিলাম। এটা নিয়ে না আমার কোনো আফসোস ছিলো, না ওর। আমরা আসলে দুজনে দুজনকেই আজীবনের জন্য পেয়ে গিয়েছি বা আমাদের মধ্যে পৃথক হবার সম্ভাবনার কথা কখনোই মাথায় ছিলো না। এতা আসলে প্রেম ছিলো না। প্রেমটা আগের জনমেই ছিলো, এখন শুধু আবার এক সাথে হয়েছি, ব্যাপারটা এমন।

প্রতিদিন যাই ওর কাছে, না গেলে যেনো দিনটাই সফল হলো না। কি যেনো করা হলো না মনে হয়। অথচ থাকি মাত্র কয়েক হাজার গজ দূরে। এক বিকাল থেকে আরেক বিকাল যেনো কাটে না। আর এর মাঝেই আবার চিঠিও লিখছি মিটুলকে, পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে নয়, ব্যাট্ম্যান আতিয়ারের মাধ্যমেই সব চিঠি আসে আর যায়। ব্যাট্ম্যান আতিয়ারই যেনো হয়ে উঠেছে আমাদের ব্যক্তিগত পোষ্টম্যান।

আমাদের এই যুগল সব প্রেম আর গোপন সব কথা, ব্যথা, আনন্দ হাসির সবচেয়ে কাছের যে মানুষটি মিটুলের পাশে ছিলো সেটা সুরাইয়া পারভীন তানি। কবে থেকে যে, তানি আমাকে ‘ছোটদা’ বলে ডাকা শুরু করেছে আমার মনে পড়ে না। তবে আমি ওর আসল না হলেও প্রকৃত একজন ভাই বটে।

৩০/০৯/১৯৮৭-রিক্রুট আত্তহত্যা

১৫ ফিল্ডের সৈনিক দের ট্রেনিং করাতে গিয়ে আজ একটা অঘটন ঘটে গেলো। রাতে রোল কল করার সময় একজন রিক্রুটের খোজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। আমরা সব জায়গায় খোজাখুজি করেছি কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেলো না। আমরা ধরে নিলাম সে হয়ত পালিয়ে গেছে। কিন্তু তার ব্যাগ পত্র যেখানে থাকার কথা সবই আছে। তাহলে সে কোথাও লুকিয়ে আছে এটাই ধরে নেওয়া যায়।

হটাত এক সৈনিক এসে জানালো যে, স্যার আমাদের বিল্ডিং এর ৪ তলায় একটা বাথ্রুমের দরজা খোলা যাচ্ছে না। আমরা ঐ খানে চেক করতে পারছি না আসলেই কেউ ভিতরে আছে কিনা। আমরা সবাই তড়িঘড়ি করে বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে ফেললাম। আর সেখানেই পাওয়া গেলো সৈনিকের ফাসিতে ঝোলা লাশ।

আমি কখনো ফাসির লাশ দেখি নাই। আমি তার জিব্বাহ আর চোখ দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। ফাসিতে মরা মানুষের জিব্বা কত বড় হয়ে যায় এটা এইই প্রথম দেখলাম। চোখগুলি মনে হচ্ছে তিন গুন বড় হয়ে বের হয় এসেছে। চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেলো। একটু পরে মাজেদ স্যার, অন্যান্য সিও, কিমান্ডার, বিএম, ডিকিউ, এফআইইউ ইউনিটের সবাই এসে হাজির।

ঘটনাটার কোর্ট অফ ইঙ্কয়ারীর আদেশ দিলেন অধিনায়ক। এখন কিভাবে কি হইলো এটা খুজে বের করার পালা।

২০-২৬/০৮/ ১৯৮৭- সোলজার রিক্রুটমেন্ট

২৬/০৮/ ১৯৮৭- রিক্রুটমেন্ট গ্রামে

গতকাল আমাদের গ্রাম থেকে ৪০ জনের একটা দল নতুন রিক্রুট মেন্টের জন্য আসার কথা ছিলো। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস, মাত্র একজন টার্ন অভার করলো। বাকীরা কেউ এলো না। ওরা বোকা। একটা চমৎকার সুযোগ হাতছাড়া করলো। হয়তো ওরা জানলোই না কি হতে পারতো ওদের জীবনে। মজিদ স্যারকে ব্যাপারটা জানালাম। তিনি হেসে দিয়ে বললেন, সবাইকে নিজের মতো ভাবো কেনো? তুমি একটা সুযোগ করে দিতে চেয়েছিলে, ওরা নেয় নাই, এতে তোমার তো কোনো দোষ নাই। বাদ দাও, যে কয়জন আসে, তাদের লিষ্টটাই ফাইনাল করে পাঠিয়ে দাও।

একটু খারাপ লাগলো যে, আমাদের গ্রামের লোকজন বুঝলো না। তবে কোনো এক সময় হয়ত ওরা আফসোস করবে এই সু্যগ তা না নেওয়ার কারনে যদি বুঝে আর কি। আর না বুঝলে কখনোই আফসস করবে না।

২১/০৮/ ১৯৮৭- রিক্রুটমেন্টের জন্য গ্রামে আসা

আমি গ্রামে এসে সরাসরি আমাদের গ্রামের হাই স্কুলে গেলাম অনেকের সাথে কথা বললাম। আর এটাও বললাম যে, যারা আর্মিতে আসতে চায়, আমি সাহাজ্য করতে পারবো, তোমরা আর্মিতে সৈনিক পদে এপ্লাই করো। বেশ সাড়া পেলাম। প্রায় ৪০ জনের মতো ইয়াং ছেলে পেলেরা আমার কথায় উতসাহী হয়ে আর্মি এপ্লাই করার কথা জানালো। আমি আগে থেকে প্রায় ১০০ ফর্ম সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে ৪০ জনের জন্য ফর্ম পুরুন করে নিয়ে এলাম আর বলে আসলাম আগামি ২৫ তারিখে সবাই সাভার সেনানীবাসে চলে এসো। আমি তোমাদের সবাইকে ভর্তি করিয়ে নেবো। আমি আসলে এই সুযোগটাই নিতে চেয়েছিলাম যে, অন্তত কিছু ছেলেপেলেদের আর্মিতে চাকুরী হোক।

২০/০৮/ ১৯৮৭- সোলজার রিক্রুটমেন্ট

সেনানিবাসে সোলজার রিক্রুটমেন্ট ক্যান্টনমেন্টেই হবে এই সার্কুলারে আমাকে ইউনিট থেকে ১৫ ফিল্ডের সাথে এটাচমেন্ট করা হলো। মনে মনে শান্তি পেলাম যে, এখন ইউনিটের অধিনায়কের বিরম্বনা থেকে রেহাই পাবো। কিন্তু ইতিমধ্যে অধিনায়কের পোস্টিং আদেশ চলে এসেছে। তার বদলি হয়েছে ডিজিএফআইএ। নতুন অধিনায়ক এসেছেন লেঃ কর্নেল খায়রুল আলম। একই সাথে উপঅধিনায়ক খলিল স্যারেরও পোস্টিং হয়ে গেলো। নতুন উপঅধিনায়ক এসেছেন মেজর রফিকুল হাসান স্যার।

কিন্তু ইউনিটে এই বদলীর কারনে খুব একটা শান্তি ফিরে এলো বলে মনে হলো না। আগেরবার ছিলো যে, অধিনায়ক আর উপ অধিনায়কের মধ্যে ছিলো সাপে নেউলের মতো সম্প্ররক, আর এখনকার অধিনায়ক আর উপঅধিনায়কের মধ্যে খুব মিল যেনো স্বামী স্ত্রী। তবী বেলায় স্বামী হচ্ছেন উপ-অধিন্যক আর স্ত্রীর ভুমিকায় আছেন অধিনায়ক সাহেব। কিন্তু তারা সৈনিক কিংবা অফিসারদের বেলায় সেই কঠোর কমান্ডই বহাল রাখলেন। আমার সাথে অবশ্য উপঅধিনায়কের সাথে একটু ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠলো। আমি ১৫ ফিল্ডের অধীনে সৈনিক নির্বাচন করার কাজে ব্যস্ত আছি। কিন্তু পাবলিকের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। মেজর মজিদ আমাকে জানালেন, দেখো তোমাদের আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে ছেলেদের রিক্রুট করা যায় কিনা। আমি স্যারের কাছ থেকে ২ দিনের ছুটি নিয়ে আমাদের গ্রামে বাক্তার চর চলে এলাম।

২৮/১১/১৯৮৬-অনিরাপদ আমি

১১ অগ্রায়ন, ১৩৯৩, ০৬০০ সকাল, শুক্রবার

আজকে ডাইরি লেখার কোন ইচছেই ছিল না আমার। তাও আবার এত সকালে। কিন্ত আমি যেন শান্তিতে নেই। আর এই অশান্তিটা কিসের আমি ভাল ব্যখ্যা করতেও পারছি না। একটা অসস্তি কাজ করে সারাক্ষন। হরেক রকমের চিন্তা মাথায় আসছে। আমি আসলে ব্যক্তিগতভাবে খুবই অনিরাপদ অবস্থানে আছি। অনিরাপদ বলতে যা বুঝায়, তা হলো, আমি আসলেই একা। যদি কেউ প্রশ্ন করে আমাকে, তোমার নাম কি? আমি বলব, আখতার। যদি প্রশ্ন করে, তোমার বাবার নাম কি? আমি উত্তর দেব, আখতার। যদি প্রশ্ন করে, তোমার মায়ের নাম কি? আমি তাও বলব আখতার। অর্থাৎ আমি একা।  যেদিন থেকে আমার জ্ঞ্যন হয়েছে সেদিন থেকে আমি অন্তত একটা জিনিস বুঝতে পেড়েছি যে, আমি একা। তবে আমার ভাই আমাকে একটা প্লাটফর্ম দিতে পেড়েছিল যার উপর দাঁড়িয়ে আজ আমি অন্তত একটা সম্মানজনক চাকরি করতে পারছি। একা বেচে যেতে পারব। এ যেন সাগরের সেই ওপারের গল্প। গল্পটা শুনিয়ে দিয়েছ, সাগরেও নামিয়ে দিয়েছ অথচ আমার না আছে বৈইঠা, না আছে নৌকা। সাতার দিয়ে আমি ওই পাড়ে যেতে পারব তো?

ছোট বেলার অভিজ্ঞতা আমার খুব একটা সুখের নয়। শুনেছি আমাদের বিশাল রাজত্ত ছিল একদা। জমিজমা ছিল অঢেল, আমাদের বাড়িতে নাকি কখন চুলা নিভত না। কে এল, আর কে গেল, কে খেয়ে গেল এটা এ বাড়ীর কোন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু বাবা মারা যাবার পর এ বাড়িতে আর চুলা জ্বলতে চায় না। পাঁচটি বোন, একটা ভাই (আমি নিজে) আর একটা মা, সব দায়িত্ত পরল গিয়ে ঐ হাবিব ভাইয়ের উপর। উনার বয়সই বা কত? সবে মাত্র কলেজ পাশ দিয়েছে। এর মধ্যে আবার দেশে একটা যুদ্ধ (১৯৭১) হয়ে গেল। চারিদিকে হাহাকার, হাবিব ভাইয়ের জন্য না আছে সঞ্চিত টাকা, না আছে জমি থেকে পাওয়া শস্য, না আছে একটা চাকরি। অথচ তার রয়েছে এক বিশাল সংসার। গা শিউরে উঠে। কি কঠিন পথ। আর এটা বাস্তবতা।

হাবিব ভাই প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসতেন, এসে আমাদের পড়াতেন, আসার সময় দুই হাতে দুইটা ব্যাগে আটা এবং চাল নিয়ে আসতেন। ওটাই ছিল আমাদের সপ্তাহের খাবার। মা অনেক ক্যালকুলেসন করে করে কোন রকমে আমাদের খাওয়াতেঁন। রুটি বানালে বেশি আটা লাগে তাই আটা জ্বাল করে আমরা খেতাম। ব্যাপারটা রিফুজিদের মতো। আমি এই আটা জ্বাল খেতে পারতাম না। ফলে মা, কোন রকমে পাতলা একটা বা দুটু রুটি বানাতেন শুধু আমার জন্য। আমার বাকী পাচ বোনেরা এটা নিয়ে কখনো কোন প্রশ্ন তুলে নি। কারন তারা জানে আমি আতা জ্বাল খেতে পারি না, আবার তারা আমাকে একমাত্র ছোট ভাই হিসাবে খুবই স্নেহ করে। সপ্তাহে আমরা হয়ত দুইদিন ভাত খেতে পারতাম তাও আবার অর্ধেক পেট। পড়াশুনা করা আমার কাছে একটা বিরক্ত মনে হত। প্রায়ই হাবিব ভায়ের দিয়ে যাওয়া পড়াশুনাটা আমি শেষ করতে পারতাম না, সারাদিন সুধু খেলা করতে ভাল লাগত। আমি তখন মাত্র ক্লাস ফাইভে থেকে সিক্সে উঠেছি। হাবিব ভাই বুঝতে পারলেন, আমি গ্রামে ভাল মত পড়াশুনা করছি না।

একটা সময় ছিলো যখন এতো কষ্টের মধ্যেও অনিরাপদ মনে হতো না। কিন্তু আজ আমি কষ্টে নাই, তারপরেও কেনো এতো অনিরাপদ মনে হয়? অনেকবার ভেবে দেখেছি ব্যাপারটা। ভালো উত্তর খুজে পাই নাই। তবে একটা ভাবনা মনে হয়েছে যে, অনিরাপদ শুধু ভালো থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদ জীবনের জন্য আশেপাশে আপনজনের প্রয়োজন। যখন ছোট বেলায় এতো আর্থিক কষ্টে ছিলাম, তখন মাথার উপর ভাই ছিলো, মা ছিলো, বোনেরা ছিলো। কিছু হলে তারা তো আছেন, এটা একটা ভরসার স্থান ছিলো। এখনো তারা আছেন, কিন্তু এখন তারা ঐ রকম করে নেই যে আগলে রাখবেন। এখন আমি বড় হয়েছি, অনেক কিছুই আমাকে আর কৈফিয়ত দিতে হয় না। কিন্তু যেদিন থেকে কৈফিয়ত দেওয়ার দিন শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেই সব, নিজের সব কিছু নিজেকেই সামাল দিতে হয়। কিন্তু এতো বড় দুনিয়ায় সব তো একা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই মাঝে মাঝে খুব ভয় করে, অনিরাপদ মনে হয়।

হয়তো, এটাই এটা সেটা যা আমার বেলায় হচ্ছে। জীবন বড় কষ্টের এবং বেচে থাকার নামই হচ্ছে বাহাদূরী। 

২৬/১১/১৯৮৬-মিতুলকে চিঠি

০৯ অগ্রায়ন, ১৩৯৩

মিতুল

এখানে সারাদিন কোলাহল থাকলেও রাত হলেই জায়গাটা একেবারে নিস্তবদ্দ আর নিঃশব্দ হয়ে ওঠে। মনে হয় লোকজন নেই, হয়ত কোনকালে ছিলও না। হাটি হাটি পা পা করে যখন সিঁড়ি বেয়ে ছাদে আসি, খোলা আকাশের নীচে দাড়াই, ঠিক তখনি সমস্ত আঁধার কিংবা জোসনা ভেদ করে নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী কোরে যেন প্রায়ই তুমি এসে হাজির হও আমার পাশে। তুমিও কি একা? রাত বাড়ে, আর তুমিও যেন আরও কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরো। কেন এমনটা হচছে? আমি কিন্তু তোমাকে নিয়ে এমন কোন অসম্ভব ভাবনা ভাবছি না, তারপরেও কেন ইদানিং এ মোহটা আমাকে চারিদিক থেকে আঁশটেপিষ্টে ঘিরে ফেলছে? আগে কোন কিছু হারানোর ভয় আমার মধ্যে কাজ করত না, কিন্তু ইদানিং কিছু একটা হারানোর ভয়ই সারাক্ষন কাজ করে। মনে হয় যদি সারাজীবন এর চাহিদা না থাকে তবে কেন এই চাওয়া? অর্ধপাওয়া যে আরও কষ্ট। আমার এ ভয়টা মূলত তোমাকে নিয়ে। কদিন যাবত আমি তোমার কোন চিঠি পাইনি। আজও পেলাম না। ভাল লাগছে না। তুমি ভাল আছ তো ? বিকেলে একটা পার্টি ছিল, ভাল লাগছিল না, তাই গেলাম না। আমি ভাল গানও গাই না আবার ভাল হারমনিয়ামও বাজাতে পারি না, কিন্তু কিছু কিছু গান হারমুনিয়মে আমি তোলতে পারি। যখন মন খারাপ থাকে, আমি হারমুনিয়ামে ঐ গানগুলো প্রায়ই বাজাই। আজ ঐ গানগোলোও ভাল লাগলো না। ভাবছি আগামী ৪ তারিখে আসব না, কারন ৬/১২/১৯৮৬ তারিখে একটা কনফারেন্স আছে। তোমাকে না পেলে আরও খারাপ লাগবে আমার ঐদিন। আমি ভাল আছি, তুমি ভাল থেক। কি লিখব আর আজ? তুমি ভালভাবে পড়াশুনা করবে, পড়াশোনার ক্ষতি করে রাত জেগে আমাকে চিঠি লেখার দরকার নেই। সময় পেলেই চিঠি লিখবে। আর আমি এটাও জানি, তুমি সময় কোন না কোন ভাবে বের করবেই। তানি ক্যামন আছে? ওকে চিঠি লিখেছিলাম, পেয়েছে কি? ওর প্রতি রইল স্নেহ আর শুভেচছা। আর তোমাকে? এক রাশ সবুজ ফুলের কিছু সুগন্ধিমাখা ভালবাসা।লাল ফুল আমার প্রিয় নয়।

আজ এখানেই।

আখতার

২৩/১১/১৯৮৬-ঢাকায় গমন

০৬ অগ্রায়ন, ১৩৯৩

গত কয়েকটি বৃহস্পতিবার পরপর ঢাকায় গেলাম। কারনটা মানসিক ছাড়া আর কিছুই না। সেই সুদূর চিটাগাং থেকে ঢাকায় আসা আবার ঢাকা থেকে  চিটাগাং একই দিনে ফিরে যাওয়া খুব সহজ কাজ না। তারপরেও কাজটা আমার কাছে বোরিং মনে হয় নাই। এই আসা যাওয়ার মধ্যে একটা অন্তর্নিহিত আরেকটা আশা জেগে থাকে। আর সেটা নিছক একজন মানুষকে দেখার নিমিত্তে। সবাই মনে করতে পারে যে আমি শুধু ভাবি আর ভাইয়াকে দেখতে এসেছি, আসলেই কি তাই? এর আগেও তো অনেক  বৃহস্পতিবার এসেছে, তখন এতো ঘন ঘন আসিনি, কেন? ব্যাপারটা আসলে মিতুল। যেদিন থেকে ও আমাকে চিঠি দিয়েছিল তারপর থেকে আমি বোধহয় একদিনও মিস করিনি যে আমি ওকে চিঠি লিখিনি। ব্যাপারটা একটা  নেশার মত হয়ে দাড়িয়েছে। ঢাকায় আসা যদি ভাইয়া আর ভাবীই কারন হত তবে আমার সবসময় বাসায়ই থাকা হত কিন্ত আমি বেশীর ভাগ সময় কাটাচ্ছি বাইরে বাইরে। সন্তান যখন বড় হয়, তার সাথে অভিভাবকদেরকে বন্ধুর মতো বসতে হয়, তার গতিবিধি বুঝতে হয়। আমার বেলায় এই দিকটা একেবারেই অনুপস্থিত। এই যে গত বৃহস্পতিবার ২২ নভেম্বর, অনেকক্ষণ বাইরে ছিলাম, যার ফলে বাসায় দুপুরের খাবার খাওয়া হয় নাই, রাতেও ফিরলাম অনেক রাতে। কোথায় যাচ্ছি, কেনো যাচ্ছি, এতো দূর থেকে কোনো কারন ছাড়াই ঢাকায় আসছি, আবার তড়িঘড়ি করে সেদিনই ব্যাক করছি, এইসব অভিভাবকদের খেয়াল করতে হয়। বাইরে থেকে খেয়ে আসছি, ঘরের খাবারে মন টিকছে না। পেটে খুধা নেই, তারপরেও খেতে হবে বাসায়। এটাই হচ্ছে। আজ রাতেই ১০ টায় আবার চিটাগাং যেতে হবে। খেতে বসলাম, ভাবী অভিমানের সুরে বললেন, তোমাকে খেতে হবে না। বুঝলাম, রাগ করেছেন। রাগ করারই কথা। ভাইয়া সকালে উঠে সেই ঘাঁট থেকে ছোট মাছ কিনে এনেছেন, ভাবী কষ্ট করে রান্না  করেছেন অথচ আমার খাওয়া হয় নাই। এটা কেমন কথা?

কারো উপরেই আমার রাগ নাই। কার উপর রাগ করবো? আমি তো বড়ই হচ্ছি একেবারে কোনো মালী ছাড়া। মালী ছাড়া বাগানে যতো সুন্দর আর দামী গাছই থাকুক না কেনো, তার বিকাশ তার মতো করেই হবে। যাই হোক।

গত শুক্রবারে মিরপুরে মিতুলের সংগে দেখা হল। আর দেখাটাও হল আকস্মিক। আমি আর লেঃ ভাওয়ালি আমাদের বাসা থেকে হেটে হেটে গাবতলি যাচ্ছিলাম সাভার যাব বলে। ঠিক মোড়েই মিতুলের সংগে দেখা। ও রিক্সায় হয়ত কোঁথাও যাচ্ছে। সম্ভবত ওদের বাসায় ফিরছে। আমাদের দেখে মিতুল খুব লজ্জায় পরেছে বুঝতে পারলাম। আমি হেসে দিলাম, মিতুলও। ভাওয়ালি বলছিল মিতুলকে নিয়ে সশস্র বাহিনি দিবসের অনুষ্ঠানে যেতে, কিন্তু মিতুলকে বললে কি আসলেই ও যেত? আমাদের সমাজ এখনো ঐ স্তরে পৌছায় নাই যেখানে পরের বাড়ির একটি মেয়ে ভালো লাগে বলেই আমার সাথে কোনো এক মেলায় যেতে দিবে। আমিও সেটা আশা করি না।

০১/১১/১৯৮৬-প্রভু

১৪ কার্তিক, ১৩৯৩

 প্রভু, তুমি আপনাতে আপনি এত বিভোর হয়ে সারাশব্দহীনভাবে কেন বসে আছ? আমি তো আমার সব নিয়ে বসে আছি প্রভু ! আমি আমার সব বেদনা, সব হাসি, সব কান্না আর ভালবাসা নিয়ে তোমার জন্য বসে আছি। আমি তো আমার সব গোপন কথাগুলো সব উজার করে তোমাকে বলেছি, তুমি কি আমার কোন আরাধনাই শুননি? আমি তোমার  বিশ্বকে ভয় পাই, তুমি এই বিশ্ব ভর্তি করে রেখেছ লাল রক্ত, নীল রক্ত, কাল রক্ত, আরও কত পদের রক্তে ! আমি ঐ সব কিছুই চিন্তে পারিনা প্রভু। শুনেছি, বাঘের শত্র  মানুষ, কিন্ত মানুষের শত্রু বাঘ নয়, মানুষের শত্রু মানুষ। কারা এই মানুষ প্রভু? আমি কিভাবে চিনবো কে মানুষ আর কে মানুষ না? তুমিও কি চিনো না? এখানে নেকড়ে বাঘ আছে, কিন্ত তারা মানুষকে ভয় পায়, এখানে হায়ানারা আছে, কিন্ত তারা মানুষকে ভয় পায়, ওরা কোন মানুষ প্রভু ? আমি কি মানুষ না? ওরা কি আমাকেও ভয় পায়? মাঝে মাঝে আমি আমাকেও চিন্তে পারি না। আমি কি বেচে আছি? সুবোধ বালকের মত হেটে বেড়ানো, খাবারের সময় খাবার খাওয়া, ঘুমানোর সময় ঘুমানো, এটাই কি জীবন্ত মানুষের লক্ষন? আর কি কিছুই নেই? সেটা দাও আমাকে।

আমি বাচতে চাই, আমি কাদতে চাই, আমি হাসতে চাই।

৩১/১০/১৯৮৬-কোনো এক বিকেল

১৩ কার্তিক ১৩৯৩

কার্তিক এর বিকেলগুলোর একটা বৈশিষ্ট আছে আলাদা । ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ময়লা হাত পায়ে কলতলায় ভীর জমায়, হৈচৈ শব্দ, দূরে কাঁচা সড়কের ধার ধরে রাখালের গলাছাড়া গানের আওয়াজ, ভুবনের অন্ধ হয়ে যাওয়া ধীরে ধীরে, রাত নেমে আসে সবার অগোচরে। ঘরে ঘরে কুপির আলো জ্বলে উঠে। আর ঐ কুপির আলোর পাঁশে গোল হয়ে বসা একদল অমনযোগী ছাত্রের মনযোগী হয়ে পড়ার ভান করা দেখতে মন্দ না। গ্রামের এই দৃশ্য দেখতে খুব মজার। কুপি জ্বলছে, দূর থেকে কিছু দুরন্ত পোকামাকর কুপির আলো চুরির লোভে আত্মাহুতি, সবই সুন্দর। তার মধ্যে না শীত না গরম চমৎকার একটা আবহাওয়া। শহরে এর প্রভাব বোঝা যায় না, কিন্তু গ্রামে এটা একটা লোভনীয় ব্যাপার। গ্রাম এই তার রূপ কখনও বদলাতে পারে না। আর এই কারনেই কার্তিক কার্তিক মাসেই আসে, বর্ষা বর্ষাতেই আসে। হেমন্তকে পেতে চাও? গ্রামে চলে এস, শীত পেতে চাও? সবই এ গ্রামে আছে। পথ হারিয়ে ফেলেছ? বহু দূর? কোন অসুবিধা নেই, তোমাকে পথ দেখিয়ে দেবার অনেক মানুষ আছে। এখানে মানুষ বাস করে, এরা যন্ত্র নয়, এরা সবার দুখে কাঁদে, এরা হাসেও প্রানখুলে। তুমি অবাক হয়ে যাবে, ওদের পেটে খুধা আছে কিন্তু সর্বনাশার প্রতিহিংসা নেই। কার্তিক বড় আনন্দের মাস ওদের। ঘরে ঘরে ধান উঠবে, ঘরের বউরা অনেক ব্যাস্ত। ওরা সন্তান পালন করে বুকে আগলে রেখে, শ্যামকে তারা ত্রিপ্ত করে কলিজা দিয়ে, এরা কখন মা, কখন জননি, আবার কখন বা কন্যা। আমার মা এই গ্রামের একজন মানুষ ।

আমি যেখানে আছি, সেটা সাগরের পাঁশে একটা জায়গা। এখানে গ্রামের ছোঁয়া আছে, শহরের ছোঁয়া আছে, কিন্তু এটা আদর্শ গ্রাম নয়, এটা আবার আদর্শ শহরও নয়। এখানে মানুষগুলো গ্রাম চিনে কিন্তু শহরের ভাষা বলে, এখানকার মানুষ গুলো পল্লীগীতি বুঝে কিন্তু মাইকেল জেক্সনের গান গায়। এদের কষ্ট অন্য কেও বুঝে না, ওরাওঁ অন্যর কষ্ট বুঝতে চায় না।

ওরা কষ্টে আছে। আমি কি এখানে ভাল আছি?

৩০/১০/১৯৮৬-বদি ভাইয়ার ৫০০ টাকা

১২ কার্তিক ১৩৯৩

 আজকে ভাইয়ার (বদি ভাই) কাছ থেকে ৫০০ টাকা পেলাম। একদিন ভাইয়াকে বলেছিলাম কিছু টাকা লাগবে, আমি তারপর ভুলেই গিয়েছিলাম । এই ভুলে যাবার পিছনে একটা কারনও আছে। আমি জানি আমাকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করবার লোক আসলে নেই। কোথা থেকে টাকাটা পাঠীয়েছেন আমার জানা নাই  কিন্তু তিনি দায়িত্তশীল ব্যত্তি, তাই ভুলে যায় নাই। টাকাটা পাঠিয়ে দিয়েছেন। এটা একটা ভালবাসা হতে পারে, এটা একটা sympathy  ও হতে পারে  আবার এটা একটা প্রতিশোধ ও হতে পারে। যেটাই হোক আমি খুব খুশী হয়েছি। বদি ভাই আমাদের পরিবারের জন্য বেশ অনেক কিছু করেছেন। আমরা যখন খুব অভাবের মধ্যে ছিলাম, শুনেছি তিনি হাবিব ভাইকে অনেক সাহায্য করেছেন। ঢাকায় আমার থাকার কোন জায়গা ছিল না এবং এখনো নাই। ঢাকায় থাকতে হলে এখনো বদি ভাইয়ের বাসায়ই উঠতে হয়। আমার ঢাকায় আসার সেই কাহিনি মনে পড়ে গেল আজ। তাহলে আমার সেই ঢাকায় আসার গল্পটা বলি।

আমি যেদিন প্রথম ঢাকায় আসি, আমার একদম মন টিকতো না। আমি তখন মাত্র ক্লাস সেভেন এ পড়ি। মনে পড়ে অনেক কথা। সেই ১৯৭৬ এর কথা। আমি প্রথম যেদিন ঢাকায় প্রবেশ করলাম, ঢাকার একটা গন্ধ আমি পেয়েছিলাম। শহরের একটা গন্ধ আছে। এখন আর এই গন্ধটা পাই না। প্রথমে নৌকা, তারপর রিকশা তারপর বদি ভাইয়ের বাসা। প্রায় সকাল ১১ টার দিকে বদি ভাইয়ের বাসায় পৌঁছলাম। সঙ্গে হাবিব ভাই।  হাইকোর্ট চত্তর । হাইকোর্ট এলাকাটা বেশ বড়ো খোলামেলা জায়গা, মাঝে মাঝে শুধু হাঁটলেও ভাল লাগে। সময়টা কেটে যাচ্ছে। এটা একটা সাবলেট । সব কিছুই নতুন। বদি ভাই, হাবিব ভাইকে আমরা সবাই খুব ভয় পেতাম, আমি পারত পক্ষে এই লোক গুলোকে এড়িয়ে চলবার সুযোগ খুজতাম, আর এখন আমি একদম তাদের হাতের ভিতর। এক দিকে ভয় আরেক দিকে আমি গ্রাম মিস করছি, একদম একা একা লাগত। কোন কিছুই আমার ভাল লাগত না। ঢাকায় আসার পিছনে একটা কারনও ছিল, আমি ক্যাডেট কলেজে পরিক্ষা দিব। আমার কোন কাজ নাই, শুধু পড়াশোনা। আমার জন্য একটা রুম দেয়া হল আর সেখানে আমি হাদিয়া আপার সাথে রাতে ঘুমাতাম। হাদিয়া আপা হল বদি ভাইয়ের বোন। আমার থেকে অনেক বড় আপা। এক বার সম্ভবত বিয়ে হয়েছিল কিন্তু সেটা আমি সিওর না। আমাকে কেও ওরা কখন বলে নি।

বদি ভাইয়ের বউ কেও আমি ভয় পেতাম, কি জানি ওনারা শহরের লোক, আমার গার্জিয়ান আর বদি ভাইয়ের বউতোঁ আর যেনতেন লোক নন। সুতরাং আমার কোন কারন নাই বদি ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে খুব একটা সহজ হয়ে মিশবার। বদি ভাই খুব বড় একটা চাকরি করেন না, খুব হিসেব করে চলেন। WAPDA ( Water and Power Development Authority) র Section Officer.তবে ওনি office এ একজন দাপটওয়ালা লোক। সৎ লোক, প্রফেসনাল লোক।

হাদিয়া আপার খুব শখ যে তিনি ভাল ইংরেজি শিখতে চান। প্রায়ই দেখতাম ইংরেজি বাক্য মুখস্ত করছেন। তারও কোন কাজ নাই আসলে। বদি ভাইয়ের ছেলে সাকি খুব ছোট। হাদিয়া আপা পানের সাদা পাতা খেতে খুব পছন্দ করতেন, হয়ত এ একটা নেশা।  কিন্তু বাইরে গিয়ে কেনবার ক্ষমতা তার ছিল না। এই কাজ তা আমি তাকে করে দিতাম। আর আপা এই জন্য আমাকে খুব আদরও করতেন। হাদিয়া আপা আমাকে আরও একটা কারনে আদর করতেন। হাদিয়া আপাও এখানে একা। আমার কাছে একটা জিনিস খুব অবাক লাগত যে এই বাড়িতে মাত্র দু জন মহিলা, এক ভাবি, আর এক হাদিয়া আপা কিন্তু  ওনাদের মধ্যে ভাল মিল ছিল না। ঝগড়া হয়ত করতে আমি দেখি নাই কিন্তু একটা গ্যাপ ছিল। আমার এই বাড়ীর খাবার  খেতে ভাল লাগত না। রুটিটা মনে হত শক্ত আর ভাত গুলো মনে হত পাথর। তবুও ত আমাকে এখানে থাকতে হবে।

হটাত একদিন দেখলাম মেহের (আমার ইমিডিইয়েট বড় বোন বদি ভাইয়ের বাসায় চলে এসেছে। ভাল লাগলো যে আমাদের বাড়ীর আরও একজন এখন আমার সাথে আছে। কিন্তু আমরা দুজন যেন রাজ্যের কষ্টে এবং মনে ব্যথা নিয়ে দিন কাটাতে লাগলাম। বেশ পড়ে বুঝতে পারলাম যে মেহেরকে আসলে এখানে আনা হয়েছে সাকিকে রাখবার জন্য আর ভাবিকে ঘরের কাজে সাহায্য কবার জন্য। হাবিব ভাই মাঝে মধ্যে এখানে আসতেন।

আমার শরীর দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। একদিন হাবিব ভাই কোন এক সন্ধায় হাইকোর্ট এর বাসায় আসলেন এবং আমাকে দেখে ওনি অবাক হয়ে গেলেন। আমাদর কষ্ট হচ্ছে ব্যাপারটা ওনি বুঝলেন। অনেক পড়ে আমি জানতে পেরেছিলাম যে, আমার থাকার কারনে হাবিব ভাই বদি ভাইকে টাকা দিতেন। কিছু দিনের মধ্যে বদি ভাই তার বাসা বদল করলেন, এবার হাইকোর্ট নয়, আগামাসিলেন , ১২৫ আগামাসিলেন। আরও একটা পরিবার থাকে এখানে । আমার সঙ্গে তাদের খুব একটা ওঠাবসা নেই বললেই চলে। হাদিয়া আপাও আছেন। একদিন হটাত করে হাবিব ভাই বল্লেন, ছবি তুলতে হবে , জীবনে কোনদিন ছবি তুলিনি, ব্যাপারটা নতুন একটা অনুভুতির জোগান দিল। ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য ছবি লাগবে। আমার পরনে যে শার্টটি ছিল, এটা ভালমত ধোয়া ছিল না। আমি হাবিব ভাইকে বললাম, শার্টটা ধোয়া দরকার ছবি তোলার আগে। ওনি হাসলেন। আমি আজও অবদি ঢাকা শহর ঘুরে দেখিনি। বিশেস করে রাতের বেলায়। রঙ বেরঙের আলো, লাল, নীল, সবুজ আরও অনেক। এই প্রথম আমি ঢাকা শহর দেখলাম বলে মনে হল। বাসায় এসে আমি ভাবীকে খুব মজা করে ঢাকা শহরের বর্ণনা দিলাম, ওনারা বেশ মজা পেলেন আমার কথাশুনে । আসলে ওনারা আমার ঢাকা শহরের বর্ণনা শুনে মজা করেননি, মজা করেছেন আমার বালকশুলব কথা শুনে। আমার এই ঢাকা শহরের বর্ণনা তাদের কয়েকদিন হাসির খোরাক হয়েছিল বলে আমার ধারণা। 

কোন এক অজ্ঞেত কারনে আবার আমার  পোস্টিং হয়ে গেল সাহিদুল্লাহ হলে, হাবিব ভাইয়ের রুমে। হাবিব ভাই আমাকে তার হলে (সাহিদুল্লাহ হলে) নিয়ে এলেন। সবাই ব্যাচেলর। সেকুল ভাই (Applied Physics এর Lecturer), আবু সুফিয়ান ভাই (সম্ভবত তিনি ছিলেন অংকের ল্যাকচারার), আর হাবিব ভাই ছিলেন Statistics এর ল্যাকচারার।  তারা সবাই ঢাকা ইউনিভর্সিটির টিচার। এখানে মাঝে মাঝে সুবরনা মুস্তফা (পরে ওনি অনেক বড় অভিনয় শিল্পি হয়েছিলেন) আসতেন, হুমায়ুন আহমেদ (পরে তিনি অনেক বড় লেখক হয়েছিলেন) আসতেন।  যাগগে সে কথা। যেটা বলছিলাম, এখানে যার যার বিছানা আলাদা, আমি আর হাবিব ভাই এক সঙ্গে এক খাটে ঘুমাই। সবাই আমাকে খুব আদর করেন কিন্তু আমি তাদের সবাইকে ভয় পাই। মেহের চলে গেছে গ্রামে, আমি শহিদুল্লাহ হলে। আমার এখানে সবচে ভাল সঙগি হচ্ছে বেগমের মা। বেগমের মা হচ্ছে ভাইয়াদের জন্য কাজের বুয়া। তিন বেলা পাক করে দিয়ে যায়। পাতলা একটা মহিলা, দেখেই বোঝা যায় যে সে অভাবে আছে।  

  West End High School এ ভর্তি হয়েছি, বেশ দুরে।  হাবিব ভাই আরও একটা পরিবারের সঙ্গে  আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন,তা হল Newton দের পরিবার। West End High School এ আমার বেশ দুজন ভাল বন্ধু জোটে গেল, একজনের নাম মালেক, আর একজনের নাম রুমি। প্রতিদিন আমি Dhaka Medical College এর পাশ দিয়ে Salimullah Hall পার করে Azimpur Palashi র মোড় পার হয়ে Azimpur Girls School এর পাশ দিয়ে West End School এ পৌঁছতে হয়। আমি সময় পেলেই রুমিদের বাসায় চলে আসতাম, ওরা থাকত Salimullah Muslim Hall এর পাশের Quarter এ। আমি অত্যন্ত ঘনিস্ঠ হয়ে মিশে গিয়ছিলাম ওদের সাথে। আসলে কোঁথাও আমার মেলা মেশার জায়গা ছিল না। গ্রামের একটা uncultured ছেলে, শহরের অনেকের কাছেই আমার কথার বাচনভঙগী, উচ্চারণ আর গ্রামের গেয়ো কিছু আচরণতো চোখে পড়তই। আজ রুমি কোথায় আছে আমি জানি না। সে হয়ত আমাকে আর মনেই রাখেনি। রুমিরাও অনেক বড় লোক ছিল না কিন্তু কোনদিন আমি ওদের বাসা থেকে না খেয়ে আসতে পেড়েছি এটা আমার মনে পড়ে না। রুমির একটা বড় বোন ছিল, আমাকে খুব আদর করত। আজ এই সব বোনেরা কোথায় আমার খুব জানতে ইচছে করে। হাদিয়া আপা মারা গেছেন, সেটা আম জানি, কিন্তু রুমির বোন, বেগমের মা, এরা যে এখন কে কোথায় আমি  কিছুই জানি না।

West End High School এর ক্লাস করা ছাড়া আমার এখানে একটাই কাজ, লেখাপড়া আর লেখাপড়া, ক্যাডেট কলেজের জন্য প্রিপারেসন নেয়া। আমি প্রতিদিন রটিন করে পড়াশোনা করি আর হাবিব ভাই আমার পরড়াশোনার খবর নেন। আমি প্রতিদিন সকালে TSC (Teachers Student Center) এর পাঁশে Dhaka University র মাঠে এবং জিমনেসিয়ামে ব্যায়্যম করতে যাই। এটা ও ক্যাডেট কলেজে ভর্তির একটা অংশ । Dhaka University র মাঠে এবং Dhaka University র জিমনেসিয়ামে আমার মত একজন পিচ্চি ছেলে ব্যায়্যম করতে যাওয়া কিছুতেই মানায় না, তারপরেও যারা (বড়রা) ওখানে ব্যায়্যম করতে যেতেন, তারা কখনও আমাকে কোশ্চেন করতেন না কে আমি বা কেন আমি ওখানে ব্যায়্যম করতে যাই । সময়টা ভালই কাটছিল কিন্তু সমস্যা হল, এখানে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে। সবাইত ব্যাচেলর, আবার এখানে যার যার বিছানা আলাদা, আমি আসলে এখানে অনেক ভাবেই মানানসই নই। West End High School টা ও দূরে, হাবিব ভাই হয়ত অনেক কিছু ভেবে শেষ পর্যন্ত আমাকে Newton দের বাসায় রাখার প্লান করলেন। Newton ও ক্যাডেট কলেজে পরিক্ষা দেবে, সুতরাং ব্যাপরটা ম্যাচ করছিল। এখানে এসেও আমি একজন খুব ভাল বোন পেলাম। নাম জুয়েনা আপা। জুয়েনা আপা আমাকে খুব আদর করতেন। আমার অনেক কাজ, অনেক বকা, অনেক Emotional দাবী সবই পুরা করতেন । Newton খুব চাল্লু ছিল, আমি যা বুঝতে পারতাম আজ, Newton তা বুঝতে পারত তিন দিন আগে।

হাবিব ভাই ওলমোস্ট প্রতিদিন আসতেন আমাদের পড়াতে। সামনেই ক্যাডেট কলেজের পরিক্ষা। ক্লাসও করি আবার ক্যাডেট কলেজের প্রিপারেসনও নিচ্ছি ,

আমার ধারণা আমি চান্স পাব।

যাক, এবার যা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তা বলি। এই বদি ভাই না থাকলে হয়ত আমি ভালভাবে ঢাকায় থাকতেই পারতাম না। ওঁনার অনেক অবদান আছে আমার জীবনে। ভাবীকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, ভাল মহিলা। খুব বেশি দাবী দাওয়া তার নাই। তার একটা সংসার দরকার এবং সেটা আছে। ব্যাস, ওনি খুশী।    

২৯/১০/১৯৮৬-হালকা হওয়া

১১ কার্তিক ১৩৯৩

সারাদিনের পরিস্রমের পর সন্ধা হলেই গোসল করার পর একটু “হালকা” হয়ে যাবার ইচছে করে। আর এই “হালকা” Period এ ইদানিং মিতুলকে নিয়ে বেশ চিন্তা করছি। এই মুহূর্তে আমি একটু “হালকা” র মধ্যে আছি এবং মিতুলের সাথে কথা বলতে ইচছে করছে। কিন্তু দেখা হলে কি কথা বলব? এটাকে বলে সঙ্গদোষ। মানুষের সাধারন প্রবৃত্তি হচ্ছে, সে সহজেই এমন কিছু সঙ্গ দোষের কারনে নিয়মিত হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে এটা ব্যক্তিগত, সামাজিক জীবনে চরম অবক্ষয় ডেকে আনে। আমার উচিত হচ্ছে না এই অফিসারদের সাথে সঙ্গ দোশের কারনে এমন কিছু করা যা আমার দ্বারা শোভা পায় না। নষ্ট হয়ে যাওয়া খুব সহজ কিন্তু ভালো হতেও পয়সা লাগে না। আমাদের উচিত ভালো কিছু করা। বিখ্যাত কোনো মিনিষির উক্তিকে ভুল্ভাবে ব্যাখ্যা করে তাকে নিজের জন্য কাজে লাগানো কোনোভাবেই উচিত নয়। তাতে লাভ হয় না। বরং ক্ষতিটাই বেশি। 

মিতুল তোঁমাকে বলছি, তুমি ইদানিং কেমন করে দিন গুলো কাটাচ্ছ?  নিশ্চয়ই তুমি আমার চিঠি পাবার আশায় আছ, নিশ্চয়ই টিভি দেখে অথবা মাঝে মাঝে গান শুনে। আর হয়তো মাঝে মাঝে আমার নাম লিখে শতবার মুছেমুছে।  আমি আসলে আমার অবস্থাটা কল্পনা করেই এই মন্তব্যটা করছি। আমি কি মেয়েটার প্রেমে পড়েছি? না দেখে তো একবার কার্লার প্রেমে পড়েছিলাম। সেই প্রেমের শেষটা জানি কি হয়েছিল? আমি আসলে মেয়েদেরকে বুঝতে পারি না। আকাশে চাঁদ উঠলে ওরা কবিতা আর শুনতে চায় না, ব্রিষ্টির দিনে সারা শরীর ভিজিয়ে গোছল করতে চায় না, অর্থওয়ালা ছেলে ওদের বেশ পছন্দ, আমি ধনী নই, আমার বাবা নাই, আমি একজন নিতান্তই সাধারণ ঘরের ছেলে। আমাকে পাবার জন্য অনেক সাধনার প্রয়োজন নেই, আমাকে পাবার জন্য শুধু হৃদয়টাই দরকার। আছে কি তোমার সেই হৃদয়? 

২৮/১০/১৯৮৬-মিতুলকে প্রথম চিঠি

১০ কার্তিক ১৩৯৩

আজকে মিতুলকে নিয়ে অনেকক্ষণ চিন্তা করার চেষ্টা করেছি। ওকে এখনো চিঠি লিখিনি, লিখব লিখব করে লেখা হয়ে ওঠছে না। আমি ভাবছি কি লিখব বা কি দিয়ে লেখাটা শুরু করব। একটা শুরু, এটা আমার কাছে যতটা না জারুরি, এটা মিতুলের কাছে ততটাই জরুরি হয়ে ওঠতে পারে। আজ ভাবছি ওকে চিঠি লিখব। ভাবছি অন্তত প্রথম চিঠিটা আমার  ডাইয়েরিতে লিখে রাখব। 

প্রিয় মিতুল

আপনার চিঠি পেলাম। এতদিন পর আপনার চিঠি আমাকে বেশ আনন্দ দিলেও আরও বেশি অবাক করেছে যে আপনি আমাকে অনেকদিন ধরে মনে রেখেছেন এবং আপনি আমাকে ভুলে যাননি। ভাবতেই জিনিসটা ভাল লাগছে আর মনটাও ভাল লাগছে। নাহ, আমি আপনাকে ভুলতে ভুলতেও ভুলিনি। তবে আপনার আরেক নাম যে মিতুল তা আমার জানা ছিল না। নামের কারনে চিঠিটা প্রায় হারাতে বসেছিলাম, যাক, শেষ পরযন্ত হাত ছাড়া হয় নাই আর কি। অনেকবার আপনার চিঠিটা পরলাম, তারপরেও চিঠিটা পরতে ভাল লাগছিল। খুব খুশী হয়েছি আপনার চিঠি পেয়ে। ক্যামন কাটছে আপনার ওখানে? আমি আসলে কি লিখব আপনাকে আমি এখনো বুঝে উঠটে পারছি না, তবে আপনাকে লিখতে আমার ভাল লাগছে।

চিঠি লিখবেন, আমি ও আপনাকে চিঠি লিখব। ধন্যবাদ।

আখতার

২৭/১০/১৯৮৬-মিটুলের প্রথম চিঠি

৯ কার্তিক ১৩৯৩

আজ থেকে প্রায় ৫ মাস আগে মীরপুরে যে মেয়েটির সাথে আমার সারারাত টিভি দেখা হয়েছিলো, সেই মেয়ে, মিটুল, তার কাছ থেকে আজ আমি একটা চিঠি পেলাম। আমার জীবনে আজ পর্যন্ত যে কয়টি মেয়ে চিঠি লিখেছে, তার মধ্যে সে দ্বিতীয়। প্রথম জন ছিলো কার্লা। এই কার্লার সাথে আমার চিঠি আদান প্রদান হয় প্রায় ৪ বছর। কোনো ক্লান্তি বোধ করি নাই। বারবার মনে হয়েছে, আমি কখনোই যেনো ক্লান্ত হবো না। কিন্তু শেষ অবধি তার যবনিকা হয়েছে কোনো এক মর্মান্তিক শোকের মাধ্যমে। আমি সেই গল্পটা কখনই কাউকে বলতে চাই না।

চিঠিটি পেয়ে প্রথমেই ভরকে গেলাম। আমি এটা receive  করতে দ্বিধা বোধ করছিলাম কারন মিতুল নামে আমি কাউকে চিনিনা। তবুও receive করলাম এবং এটার কারনও ছিল। কারন হল মিতুল নামের ঠিক নিচেই Jahangir Nagar University লেখা ছিল। আর আমি Jahangir Nagar University তে ভর্তি হয়েছে এমন একজনকে চিনি, সেটা হল আসমা। যার কথা আমি আগেও লিখেছি। সত্যি তাই হল চিঠি খোলার পর। মিতুলই আসমা।

খুব সুন্দর চিঠি লিখেছে সে কিন্তু অতি সামান্য কথা।

“ঠিকানা ছিল না আপনাকে দেবার মত, তাই চিঠি লিখতে পারিনি। নিশ্চয়ই ভুলে  যান নাই। চিঠি লিখলে খুশী হব। আমাকে লেখার ঠিকানা দিলাম। চিঠির অপেক্ষায় থাকলাম।“ 

উপরে নীচে কোথাও কোনো সম্বোধন নাই। আমি কি বন্ধু, নাকি ভাই, নাকি প্রিয় কেউ, কিছুই উল্লেখ নাই। এলাকার ভাই হলে এক কথা, নাও না। আবার প্রিয় কেউ হলে অন্য রকমের সম্বোধন হবে। আর ও ট আমার বন্ধু হয়েই উঠেনাই এখনো। হয়তো সময়ই বলে দেবে কি সম্বোধন হবে কোনো এক সময়।

আসলে মিতুলকে আমি প্রথম দিন যতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম ও তার থেকেও বেশি বাস্তববাদী । আর একারনেই ও  আমাকে নির্ভয়ে চিঠি লিখেতে পেরেছে। বাংলাদেশটা এখনো অতটা আগায় নাই যেঁ ইচছে করলেই একটা মেয়ে নির্ভয়ে অন্য একটি ছেলেকে  চিঠি লিখেতে পারে। এটা একটা সাহসের ব্যপার। এ সমাজে আমরা যারা বাস করি, হয়ত এটা আগের শতাব্দির বা যুগের থেকে অনেক এগিয়ে আছে কিন্তু এর মানে এই নয় যে, প্রকাশ্যে আমরা এতা বলার সাহস করতে পারি যে, আমি অমুককে ভালোবাসি, অথবা অমুক আমাকে ভালবাসে। হয়ত এমন একটা যুগ সামনে এম্নিতেই আসবে যখন বাবা-মাই জিজ্ঞেস করবে, কেনো তাদের বাচ্চাদের কোন প্রিয় মানুষ নাই। এখন যেমন প্রিয় মানুষ থাকলে বাবা মায়েরা, অভিভাবকেরা অসস্থিতে ভোগেন, হয়ত এমন একটা সময় আসবে যখন বাবা মায়েরা কেনো তাদের প্রিয় মানুষ নাই তার জন্য অসস্থিতিতে ভোগবেন। আর এটাই হচ্ছে সময়ের বিবর্তন।

মিটুল আমাকে চিঠি লিখতে পারে নাই কারন তাকে আমার চিঠি যাওয়ার কোনো ঠিকানা সে দিতে পারে নাই। ওর বাসায় আমার চিঠি যাক, এতা যেমন ওর জন্য সস্থিদায়ক নয়, তেমনি আমার জন্যেও নয়। আর এখন যেহেতু সে ইউনিভার্সিটির হলে থাকছে, ফলে ঠিকানা একটা তো পাওয়াই গেলো যেখানে সব কিছুই রক্ষা হয়। যোগাযগের ব্যাপারটা থাকলো কিন্তু বাড়িতে গোপন রইলো। ব্যাপারটা এটাই ঘটেছে ওর বেলায়।

আমাদের বাড়ীর অথবা মিতুলদের বাড়ীর কেউ এখনো জানে না আমাদের এই যোগাযোগের ব্যাপারটা । আমি জানি তারা কেউ এইসব ব্যাপারে জানলে খুব একটা খুশিও হবে না। আর এ ব্যাপারে আমিও খুব একটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নই। কারন আমি আমার পরিবারকে চিনি, আমি বদি ভাইকে চিনি, আমি হাবিব ভাইকে চিনি, তারা আর যাই হোক হিটলারের বংশধর ছাড়া আর কেউ নয়। কিন্তু আমি আগাগোড়া নিজের পছন্দেই কাজ করতে ভালোবাসি। আমার মতামতকে আমি সম্মান করি। তাতে অন্য কারো মতামত আমাকে আমার মতামতের উপরে স্থান দেবো সেটা সাবজেক্টের উপর নির্ভর করে। মিটুলের ব্যাপারতা নিয়ে আমি কোনভাবেই দিধাগ্রস্থ নই। কেউ যদি জানেও, আমার এইটুকুন সাহস আছে তা মুখুমুখি হবার।  

মিতুল সম্পরকে আমার কিছু মন্তব্য আমি আগেই করেছিলাম যদিও আমি তাকে মাত্র একটা পুরা রাত দেখেছি, একসাথে বসে টিভি দেখেছি। তাতে আমার যে ধারনাটা হয়েছে সেতা আবারো বলি, সে একেবারেই একটা সাধারন গোছের কঠিন প্রত্যয়ের মানুষ। প্রশংসায় খুশী হয়ত হয় কিন্তু সে নিজে জানে কোন প্রশংসা তার জন্য অতিরঞ্জিত আর কোন প্রশংসা তার জন্য প্রযোজ্য নয়। গা ভাসিয়ে দিয়ে আপ্লুত হবার মেয়ে সে নয়। তার মধ্যে আরো একটা গুনাবলী আমি মার্ক করেছি যে, অযাচিত ভাবে কারো ব্যাপারে মন্তব্য করাকে তার পছন্দের মধ্যে পড়ে না। অল্পতেই খুসী থাকার চেষ্টা করে। বলতে গেলে একটু সাহস রাখে সব কিছুতেই। এদেশের অধিকাংশ মেয়েরা হয় বাবা মায়ের নাম বেচে তার অস্তিত্ব জানান দেয়, অথবা যাদের নাই, তারা নিজেকে প্রতিষ্টিত করার চেষতা করে। আমার কাছে মনে হয়েছে মিটুলের ব্যাপারে দ্বিতীয়টা খাটে।

যাই হোক, অনেকদিন পর ওর চিঠি পেয়ে আমারো অনেক ভাল লাগছে, মনে হচ্ছে আমি ওর চিঠির জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। আজ সে চিঠিটা এসেছে। আমি কি ওকে খুজছিলাম? আমি আসলে কাকে খুজছিলাম? আমি ওর জন্যে বা ওর চিঠির জন্য কতোটা অপেক্ষায় ছিলাম, সেটা এই চিঠি পাবার আগে অতোটা খুচিয়ে দেখিনি, তবে মনে হলো, আমি অনেক অনেক খুশি হয়েছি।

কিছু কিছু কথা আমার মাঝে মাঝে “কাকে” যেন বলতে ইচছে করে। কিন্তু সেই “কাকে” পাই কোথায়? বড় বউদিকে মাঝে মাঝে বলি কিন্তু সব কি আর তার সাথে বলা  যায়?  কখন কখন এমদাদ কে শেয়ার করি, কিন্তু সে তো আর সেই “কাকে” নয় ।

মিতুল অনেক কিছু জানতে চেয়েছে। আমি কেমন আছি, আমার দিন কেমন যাচ্ছে, ইত্যাদি। কি জানাবো ওকে? আমি যদি বলি, আমি ভাল নেই, কি হবে এতে? আমি যদি বল, আমি মাঝে মাঝে হারিয়ে যাই, কিভাবে নেবে সে? আমি যদি বলি, আমি কাওকে ভালবাসতে চাই, কি করতে পারবে সে? আমি সেই “কাকে” চাই। ও কি সেই “কাকে”?

তারপরেও আমি ওকে চিঠি লিখব।

২২/১০/১৯৮৬-হতাশা

৪ কার্তিক ১৩৯৩

প্রচণ্ড হতাশা আর অধৈর্য আমাকে প্রতিনিয়ত ধরে বসেছে। হতাশ, কারন আমার আর ভালো লাগছে না এই রকমের একটা নিঃসঙ্গ জীবন। সেই যে যেদিন ঢাকায় পদার্পন করেছিলাম, সেই থেকে তো আমি একাই চলছি। আমার না আছে ডেডিকেটেট কোন বন্ধু, না আছে পরিবারের এমন কেউ যাদের জন্য আমাকে বাচার একটা কঠিন শপথ নিতে হয়। বড় ভাই আছেন, তিনি আমার শাসকের মতো। বোনেরা আছে কিন্তু তারা নিতান্তই বেচে আছে তাদেরকে নিয়েই। মা ও আছেন, কিন্তু তার তো শুধু ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই দেবার নাই। আর অধৈর্য!! আমার চারিপাশে আমার সমসাময়িক আর্মি অফিসারেরা একধরনের বেপরোয়া হয়ে উঠছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। কেউ মেয়ে, কেউ ড্রাগ, কেউ আবার  অশ্লিল ছবি ইত্তাদি নিয়ে। আর্টিলারি সেন্টার যেন একটা মানুষ নষ্টের কারখানা হয়ে উঠছে দিনে দিনে।

ইদানিং দেখতে পাচ্ছি, সিনিয়র স্টুডেন্ট অফিসাররা গোপনে মদ গিলছেন ছোটদের নিয়ে। কেউ আবার গাজার পোটলা ও সংরক্ষণ করছে যখন তখন খাওয়ার জন্য। মেসের ছাদে গেলে আকাশের বাতাস আর আগের মতো সুগন্ধি ছড়ায় না। ভেসে আসে গাজার তীব্র গন্ধ। অনেক রাত অবধি মেসে ভিসি আর চলে। দল বেধে ছোত বড় অফিসাররা মিলে গরম গরম ভিডিও ছবি চলে। তখন মেসের মেস ওয়েটারদের  কে আশে পাশে রাখা হয় না। একেবারে কেটলীতে করে চা এর ব্যবস্থা করে রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে আবার কেউ ধীরে ধীরে সুরা পান ও করছেন।

ব্যাপারটা আর্টিলারী সেন্টারের কর্তৃপক্ষ হয়তো জানেন না। জানলে এসব করতে অনুমতি দেওয়ার কথা নয়। আমি একঘরে হয়ে যাচ্ছি। আমার এসব দেখতেও ভালো লাগছে না, আবার সারাটা মেসে যেনো কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে অফিসারেরা। ক্লাশে গিয়ে আজকাল অফিসাররা প্রায়ই ঘুম ঘুম চোখে ক্লাশ করছেন যেনো রাতে রাজ্যের পড়ায় ব্যস্ত ছিলেন।

১২/১০/১৯৮৬-হিন্দুদের পুজায় একদিন

২৫ আশ্বিন, ১৩৯৩

গতকাল সন্ধ্যার পর  হিন্দুদের এক পুজা দেখতে গিয়েছিলাম। পুজা দেখাটা আমার শখের মধ্যে একটা।  হিন্দু সমাজে কাস্টভেদে অনেক প্রকারের রেওয়ায চালু আছে। পথে যেতে যেতে  দেখলাম, একটা ছোট বালিকা তার থেকে আরও বড় একজন বালিকার সামনে দাঁড়িয়ে একটা হারিকেন জ্বালিয়ে মন্ত্র পড়ছে। আবার কেউ ভাইকে সামনে রেখে বোন, বোনকে সামনে রেখে ভাইও মন্ত্র পড়ছে। একটা সুতা পড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যাপারটা খুব বড় কিছু না কিন্তু এটা একটা রেওয়াজ হয়তো।

প্রতিটি ধর্ম ভালো কথা বলে, প্রতিটি রেওয়াজ কোন না কোন মহৎ একটা উদ্যোগে তৈরী হয়। এইসব উদ্যোগ পরবর্তীতে কে কিভাবে পরিশোধন করে সমাজে কি অঘটন আর কি শুভ লক্ষন নিয়ে আসে, তা দেখার জন্য অনেকটা সময় পার করতে হয়। আজকে এই যে রেওয়াজ টা দেখছি, তার মাহাত্য হচ্ছে, এতে বড় আর ছোটর মধ্যে একটা ভালবাসার বন্ধন তৈরি করা, একটা শ্রদ্ধার পরিবেশ সৃষ্টি করা। ছোতদের শিখিয়ে দেয়া যে, বড়দের সম্মান করতে হয়, আর বড়রা শিখে যে, ছোটদের ক্ষমাকরে দিতে হয়। এটা আজীবনকাল হয়তো চলবে আর এভাবেই বেঁচে থাকবে ওদের বন্ধন। হয়ত আজ সারদিন ওরা ঝগড়াও করেছিল, কিন্তু এখন সব ঝগড়া ভুলে পুজা করছে। একজন দিচ্ছে আর আরেকজন নিচ্ছে। দিনশেষে কারোর কোন  কষ্ট নাই আর। ছোট পুজার ছলে ক্ষমা চেয়ে নিলো আর বড় ভালবাসায় সিক্ত করে দিল ছোটকে। বড় সুন্দর  দৃশ্য। এই রকম আরো অনেক ছোট ছোট রেওয়াজ প্রায় সব ধর্মের মধ্যেই আছে।

পুজা মণ্ডপে পৌঁছে গেছি, গিয়ে দেখলাম দশহাতওয়ালা একটা মানব, সাথে একটা বাঘের মুখ। বাঘের মুখে মানবের ডান হাত কামড়ান। আরেক হাতে একটা তীর ছুড়ানো, অন্য হাতে ছায়া প্রদানের উৎস, প্রকৃত অর্থ প্রতিটি হাতে দাড় করানো হয়েছে। ওটা হচ্ছে দেবী। এই দেবীর আসে-পাশে আরও অনেক দেব-দেবি আছে। দেবীর পিছনে একটা মহাশূন্য আছে, তাতে কয়েকটা নক্ষত্রও জ্বলছে। পুরো জিনিষটা একটা ঘরের মধ্যে রাখা। ঘরের চারদিকে  মোমবাতি  জ্বালানো। আগরবাতিও আছে, কিছু সুগনধি আছে, পরিবেশটা ভাল লাগছে। একটু একটু ঠাণ্ডা আছে, কিন্তু শীত পড়েনি এখনো। দেবীর সামনে কিছু কুমারী, কিছু বৃদ্ধা, কিছু বিবাহিতা পুরুষ ও মহিলা  সজল নয়নে নতজানু হয়ে বসে আছে। আর তাদের এক পাঁশে একজন লোক বিভিন্ন ধরনের বাতি দিয়ে দেবতাকে বিভিন্ন ধরনের রঙে সাজিয়ে তুলছে। ঘরের বাইরে প্রচণ্ড জোরে জোরে ঢোল বাজতেছে, সঙ্গে পিলচি, এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র। বাজনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক যুবক যুবতী নাচতেছে। পুরো জিনিসটা একটা পুজা। অনেকক্ষন পুজা মণ্ডপে থাকলাম, দেখলাম, কিছু খাওয়া হল এখানে। এটা ফ্রি। যে আসে সেই খেতে পারে। কে এখানে মুসলমান, আর কে এখানে খ্রিস্টান, তারা এটা ভাবে না। তারা ভগবানের জন্য পুজা করছে, এটাই বাস্তবতা।  রাজনীতির কোন আলাপ এখানে হয় না, মেয়ে মানুষ নিয়ে এখনে কোন আলাপ হয় না, এখানে যে যার মত করে ভাবে।

এখানে এখনো হিন্দুদের সাথে সব ধর্মের মানুষেরা তাদের পুজা মন্ডপে আসে। অনেকে আবার মূর্তি পুজা করে হিন্দু সমাজ এটা ভেবে পুজা মন্ডপের ধারে কাছেও আসেন না। আমি অনেকবার অনেকভাবে চিন্তা করে দেখেছি, কেনো এতো শু=ইক্ষিত হিন্দু মানুষগুলিও সাধারন একটা নিজের বানানো মাটির পুতুলের সামনে এই রকম করে নতজানু হয়ে পুজা করে? তারা কি বুঝে না যে, এটা একটা মূর্তি? এটার কোন ক্ষমতা নাই? এর কাছে চাওয়ার কিছুই নাই? জানে তারা। তাহলে তারপরেও কেনো করে? সম্ভবত ব্যাখ্যাটা এই রকম নয় যা খালি চোখে দেখা যায়।

ধরুন, আপনি একটা মেয়েকে বা কোনো এক ব্যক্তিকে অথবা কোনো এক ক্ষমতার উতসকে মন থেকে অনেক ভালোবাসেন, সম্মান করেন, অথবা এমন একটা ব্যাপার যে, আপনি তার জন্য নিজের জীবন ও বিপন্ন করতে দ্বিধা বোধ করবেন না। এই ভালো লাগার ব্যক্তিটি জীবন্ত একতা স্বত্বা। যখ সে আপনার সামনে থাকে, তার কারনে আপনি অনেক গর্হিত কাজ, অনেক অসদাচারন, কিংবা কোন অন্যায় কাহ করতে পারেন না। সে যদি আপনাকে কোনো কাজ করতে বারন করেন, আপনি বিনা দ্বিধায় তা পালন করেন। এটাই সেই স্বত্বার সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। সে আপনার ইন্দ্রিয় কন্ট্রোল করে, আপনার মনোভাব পরিবর্তন করে, অথবা সে আপনাকে পরিচালিত ও করে। এই অবস্থায় ধরুন যে, সে আর আপনার সামনে নেই। আপনি মনে মনে তাকে আগের মতো ভালবাসেন, শ্রধ্যা করেন, তার আদেশ নিষেধ পালন করেন, কিন্তু যতোটা ইফেক্ট তার উপস্থিতিতে করা হয়, তার অনুপস্থিতিতে এই ইফেক্ট অনেকাংশেই কমে আসে। বা কমে যায়। এটা ইচ্ছা কৃত নয়। এতা একতা প্রভাব। কিন্তু যদি সেই একই ব্যক্তির একটা প্রতিমা বা ছবি বা এমন কিছু আলামত সামনে রাখা যায় যাতে মনোযোগ অন্যত্র চলে না যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, একেবারে অনুপস্থিত অবস্থার থেকে প্রতিমা বা ছবি রাখলে মনোযোগের মাত্রাটা একটু বাড়ে। এজন্য বাড়ে যে, মনে হবে তিনি আমাকে দেখছেন বা আমি তার সামনেই আছি। আসল কথা হচ্ছে, পুজাকারী ব্যক্তি আসলেই এই প্রতিমাটাকে বা তার ছবিকে পুজা করছে না, করছে যার প্রতিমা বা ছবিটা সামনে আছে তাকে। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যখন এই পুরু জিনিষটা দেখে, মনে হবে সে আসলে নিজের তৈরী এই মাটির মুর্তিকেই পুজা করছে। এখানেই দেখার আর বুঝার পার্থক্য।

যাক, আমি ধর্ম নিয়ে অনেক কথা বলতে চাই না। যার যার ধর্ম সে সে পালন করুক। কারন কে ঈশ্বর আর কে ভগবান আর কে আল্লাহ, এর বিচার প্রতিটি ব্যক্তির নিজসস ব্যাপার। ঈসশরের বা আল্লাহর কাছে সে নিজে একা জবাব্দিহি করতে হবে। ফলে অন্তরে তার কে বাস করে, কিভাবে বাস করে এটা জানেন শুধু একজন। সেই মহাম স্রিষ্টিকর্তা।

আজকের পুজা মন্ডপে এসে যা বুঝেছি তা হলোঃ একটা  সময় আসবে যখন ধর্ম নিয়ে আরো অনেক বিড়ম্বনা আছে। এই ধর্ম একদিন সমাজের মানুষগুলিকে আলাদা করে ফেলবে। এই ধর্মের কারনে কেউ সমাজ হারাবে, কেউ তার পরিচয় হারাবে। আবার এই ধর্মের কারনেই মানুষ একে অপরের সাথে দন্দে জড়িয়ে পড়বে, শান্তি নষ্ট হবে।  

আমি যদি আমার কথা বলি- সেটা হচ্ছে, মানুষ গুলিই প্রধান। আমার মুসলমান বন্ধুরা যেমন আমার কাছে প্রিয়, ঠিক তেমনি হিন্দু বন্ধুরা ও আমার কাছে সমান প্রিয়। ওদের থালায় খাবার খেতে আমার কোনো আপত্তি থাকে না। আবার ওদের প্রয়োজনে আমার শরীরের রক্ত ডোনেশন করতেও আমার কোনো দ্বিধা নাই। 

০৯/১০/১৯৮৬-কার্লার চিঠি

২২ আশ্বিন ১৩৯৩

আজ তোমার সেই চিঠি গুলো খুলে পড়লাম। একটি চিঠিতে তোমার লিপস্টিকে অনেকগুলো ছাপ তোমার ঠোটের। ইস, কি আনন্দে, কত ভরসা, কত আশা নিয়ে তুমি আমার কাছে এই চুমুগুলো সুদূর ১৪ হাজার মাইল দূর থেকে প্রতিদিন পাঠাতে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাঙলায় তুমি লিখতে, “ আমি তোমাকে ভালবাসি”। আমার মনে আছে, যেদিন তুমি প্রথম শাড়ি পড়ে আমাকে একটা ছবি পাঠালে, আমি অবাক হয়ে শুধু তাকিয়েছিলাম, কি সুন্দর তুমি। সাদা একজন বিদেশিনী, পড়নে বাঙলার শাড়ি, তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কি সুন্দর তোমার চুল, কালো নয়, সাদাটে, ঠোটে লিপস্টিক নেই কিন্তু লাল ঠোট, চোখে কাজল নেই কিন্তু মিষ্টি একটা চাহনি। আমার খুব তোমাকে ধরতে ইচ্ছে করেছিল, কিন্তু তুমি তো ১৪ হাজার মাইল দূরে।

আচ্ছা, তোমার কি মনে পড়ে সেই প্রথম দিনের কথা? আমি তোমাকে কখনো দেখিনি, আমি তোমাকে কখনো জানতামও না। হটাত, একদিন আমার নামে এক চিঠি। ক্যাডেট কলেজে পড়ি, মাত্র ক্লাশ টেন এ পড়ি। আমরা দুপুরে খাবারের জন্য সবাই হাউজের সামনে একসঙ্গে দাড়াই। এই সময় চিঠি এলে দুপুরের খাবরের আগে হাউজ লিডার সবাইকে চিঠি গুলো যার যার হাতে দিয়ে দেন। অনেক সময় একই ক্যাডেট ঘন ঘন চিঠি পেলে FUN করার জন্য হাউজ লিডার ছোট খাটো মজা করেন সবার সামনে। আমি চিঠি না পেলেও আমার এই হাউজ লিডার এর ছোট খাটো মজা অনুভব করতাম। আমি কখনো কারো  কাছ থেকে চিঠি পাবার আশা করি না কারন, আমাকে চিঠি লেখার মানুষ নাই। তবে মাঝে মাঝে আমার বড় ভাই আমেরিকা থেকে অনেক উপদেসশমুলক চিঠি লেখেন যা আমার পড়তে ভাল লাগে না। তবুও তো পাই।  সেদিনও আমি একটা চিঠি পেলাম। নিশ্চয় আমার ভাইয়ের চিঠি। কি আর লিখবেন, ‘ভাল করে পড়াশুনা করিস, আমাকে চিঠি লিখিস। ইত্তাদি।‘ দুপুরের খাবার খেয়ে রুমে এলাম, বিছানায় গেলাম, চিঠিটা খুললাম, ওমা! একি! আমার ভাইয়ের চিঠি নয়, আর হাতের লেখা এত জঘন্য !!

"আমার নাম কার্লা ডুরাইন উইলসন। আমার ড্যাড তোমার ভাইয়ের সাথে একইওফিসেকাজ করে। ফলে তারা একে অপরেরবন্ধু। ড্যাডের বন্ধু হিসাবে একদিন আমি তোমার ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তোমার ভাইয়ের বাসার ওয়ালে চমৎকার একটা ছবি আমার নজরে এলো। জিজ্ঞেস করলাম, ওটা কে? তোমার ভাই আমাকে জানালো এটা তুমি, তার ছোট ভাই। তোমাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। আমার খুব ইচ্ছে হলো তোমার সাথে আমি ফ্রেন্ডশীপ করি। আমি তোমার ভাইয়াকে ব্যাপারটা জানাইতেই তিনি আমাকে তোমার সাথে চিঠিতে যোগাযগ করতে বললেন। আমি লোভ সামলাতে পারি নাই। আমি ক্লাশ সিক্সে পড়ি। তুমি কি আমার সাথে ফ্রেন্ডশীপ করবে? তোমার চিঠির আশায় থাকবো। চিঠি লিখো।" - কার্লা

এই ছিলো তোমার প্রথম চিঠি। 

তোমার প্রতি আমার কোন লোভ হল না, তোমাকে চিঠি লেখার ইচ্ছেও আমার হল না। এর অবশ্য অনেকগুলি কারন ছিলো। প্রথম কারন যে, আমি চিঠি লিখতে অভুস্থ নই। আর আমি মেয়েদের সাথে কিভাবে কি কথা বল্বো সে ব্যাপারে কোনোদিনই চেষ্টা করিনি। বলতে পারো, আমি একজন মেয়ে বিবর্জিত চরিত্র। ক্লাশ শেষে আমি সারাদিন মাঠে খেলা করি। খেলার প্রতি আমার অনেক বেশী ঝোক। আমি বেমালুম ভুলে গেলাম। কিন্তু আমি ভুলে গেলে কি হবে, তুমি ভুলনি। পরদিন, আবারো আরও একখান চিঠি।

"আমি মনে হয় অস্থির হয়ে আছি। কখন তোমার চিঠি পাবো। মাত্র গতকাল চিঠি লিখেছি, আজকেই আমার উত্তর পাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। কিন্তু কেনো যেনো বারবার মনে হচ্ছে, আমি যেনো তোমার সাথে কথা বলতে চাই। আমি তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে ছবিটা নিয়ে এসেছি। তোমার ভাই কেনো যেন হেসে দিয়েছিলো। আচ্ছা, তোমার ছবিটা চেয়ে নেওয়া কি আমার ঠিক হয়েছে? তুমি আমাকে অনেকগুলি ছবি পাঠাবে।--ইতি কার্লা"

ব্যাপারটা যেনো কেমন হয়ে দাড়াচ্ছে। তার চিঠির অর্থ পরে মনে হচ্ছে, আমি তার সাথে না জানি কত জনমের পরিচিত। পর পর দুটো চিঠি পেলাম। কিন্তু আমার কেনো যেনো ওর প্রতি না কোনো টান অনুভব করলাম, না আখাংকা। পরদিন আবারো একই ঘটনা। এবার, অনেকগুলো ছবি। পরপর তিনদিন তিনটা চিঠি আমাকে নাড়া দিল। মনে হলো, এটা মনে হয় ঠিক নয় যে, আমি তাকে গ্রহন করি আর নাইবা করি, আমার সৌজন্যবোধ থেকেও জানানো উচিত, আমার মানষিকতাটা।  

আমি তোমাকে প্রথম চিঠি লিখতে বসলাম। আচছা, আমি কি তোমাকে প্রেমের চিঠি লিখেছিলাম? না, আমি তা করিনি কারন আমি তোমাকে ভালবেসে চিঠি লিখিনি। আমি নিতান্তই তোমাকে জানার জন্য চিঠি লিখেছিলাম। আমি তখন মাত্র ক্লাশ টেন এ পড়ি। আমার সেই চিঠিটি যা আমি তোমাকে লিখেছিলাম, সেটা ছিলো ঠিক এই রকমঃ

"আমি তোমার সবগুলি চিঠিই পেয়েছি। সময়ের কারনে বা ব্যস্ত আছি ক্লাশ নিয়ে এই কারনে আমি তোমার চিঠির উত্তর দিতে পারি নাই তা নয়। তোমার হাতের লেখা দেখে আমার একদম ভালো লাগে নাই। কিন্তু আজকে তোমার ছবি গুলি দেখে তোমাকেও আমার খুব ভালো লেগেছে। আজ মনে হয়েছে, সবার তো দেশে বন্ধু থাকে, কিন্তু আমার একজন বিদেশী বন্ধু থাকলে তো আরো ভাল। কিন্তু আমি তোমার মতো এতো ঘন ঘন চিঠি লিখতে পারবো না। আর আমার কাছে এখন অনেক ছবি নাই। যে কয়টা ছবি আছে, তার থেকে দুটো ছবি পাঠাইলাম। সামনে আমার পরীক্ষা।"

তুমি এক অদ্ভুত কাজ করে ফেলছিলে প্রতিদিন। প্রতিদিন আমি তোমার চিঠি পেতে শুরু করলাম। এর মানে তুমি প্রতিদিন চিঠি পোষ্ট করছ। আর আমিও এক নেশায় পড়ে গেলাম। তোমাকে চিঠি না লিখলে আমার যেন কি করা হল না মনে হয়। আর আমিও দেখলাম যে, তোমার চিঠি না পেলে আমারও আর ভাল লাগছে না। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, আমার এবং তোমার চিঠির ভাষা বদলে যেতে শুরু করছে। তোমার রোজকারের সব ঘটনা, কে তোমাকে কি বলল, কে তোমাকে আঘাত করল, তোমার টিচার,  তোমার বন্ধুরা কে কিভাবে তোমার সাথে ব্যবহার করে, সব যেন আমাকে না লিখলে তোমার আর ভাল লাগে না। ম্যানডি নামের তোমার একজন খুব ভাল বন্ধু ছিল যার সাথে তুমি তোমার নিজের গোপন বিষয় গুলু শেয়ার করতে। তুমি আমাকে মেন্ডির ব্যাপারেও অনেক বিস্তারিত লিখেছিলে। হঠাত একদিন ঐ মেন্ডিও আমাকে খুব মজা করে একখান চিঠি লিখেছিল।

"তোমাকে আমি দেখি নাই কিন্তু প্রতিদিন কার্লার কাছ থেকে যা শুনছি আর জানছি তাতে দেখার থেকে কম কিছু নয়। তোমরা কি একে অপরকে ভালোবাসো? তুমি তো দারুন চিঠি লিখো। তোমার প্রতিটি চিঠি আমি পড়ি। কার্লা আমাকে পড়ে শুনায়। ইশ, আমারো যদি তোমার মতো একজন এমন ভালো চিঠি লিখার বন্ধু থাকতো!!"

মেন্ডিও আমার আরও একজন অদেখা বিদেশী বন্ধু বনে গেল। ওরা একই ক্লাশে পড়ে। আমেরিকার ক্লাশ গুলি কি রকম, ওরা কিভাবে পড়ে, ওরা অফ তাইমে কি করে। বাবা মায়ের সাথে ওরা কিভাবে বাসায় একত্রে খায়, ঘুমায়, সব যেনো আমার জানা হয়ে যাচ্ছে ওর চিঠি পড়ে পড়ে। আমেরিকার ছেলেমেয়েরা কম বয়সেই অনেক পাকামো করে, ওরা অনেক কিছুই আমাদের থেকে একটু আগে বুঝে। এমনকি ভালোবাসাটাও।  এমন করে প্রায় চার বছর কেটে গেল। এই চার বছরে কত যে তোমার চিঠি আমার বাক্স ভরে গেছে। জানো? বাক্সতার নাম কি রেখেছি? "আমেরিকার বেলুন"।

কি অদ্ভুত, আমাদের মধ্যে কোন ক্লান্তি, কোন থামাথামি নেই। আমরা ধীরে ধীরে একে অপরের জন্য শুধু যেন অপেক্ষা করছি কখন আমরা আমাদের দেখতে পাব, কাছে পাব। এটা এখন সত্যি সত্যি প্রেমে রুপান্তর হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ক্লাশ টেনে পড়া একটি বাঙ্গালি ছেলে বিএমএ তে দুই বছর ট্রেনিং করে লেফটেন্যান্ট হয়ে গিয়েছি, তারপরেও আমার প্রেমের কোন ঘাটতি নেই। কে গো তুমি মানসী? কেন তুমি এত দূর থেকে আমাকে না দেখে ভালবাসতে শুরু করেছ? আমিও তো তোমাকে দেখিনি গো মেয়ে। কি হবে কখন যদি এই প্রশ্ন সামনে এসে হাজির হয়, আমাদের দেখা হওয়াটা কি ভুল হয়েছিল? যদি কখনো এই ধারণা হয়ও, আমি শুধু তোমাকে বলব, আমরা ভুল করিনি, আমাদের প্রেম সৎ এবং সত্যি ছিল। আমি তোমাকে ভুলব না। আমি এখনো এক অদেখা নারীর প্রেমেই আছি। এখন আমি তোমাকে ভালোবাসি।

০৫/১০/১৯৮৬-বড় বৌদি (বদি ভাইয়ের বউ)

৫ কার্তিক, ১৯৯৩

বড় বউদি, তোমাকে আমি সাধারনত কখনো চিঠিপত্র লিখিনি। তুমিও আমাকে কখনো চিঠি লিখনি। এরমানে এই নয় যে আমি কিংবা তুমি আমাকে বা আমি তোমাকে ভালবাসি না। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি, আমি তোমাকে আমার মায়ের মতই ভালবাসি। আমি একটা জিনিষ লক্ষ করছি যে, তুমি একটা জায়গায় ফেল করছ। আর তা হচ্ছে তুমি তোমার সন্তানদেরকে মানুষ করতে পারছ না। বিশেষ করে শাসন।  পারবে এত দূর নিয়ে যেতে সবাইকে?

একটা সময় আসবে যখন তুমি আর কখনো ওদের শাসন করতে পারবে না। কারন তখন শাসনের বয়সটাই থাকবে না। আজ তুমি যতোটা আদর করে ওদের অনেক অযাচিত আবদার, অনেক শৃঙ্খলা বহির্ভূত আচরণ, অনেক অগ্রহণযোগ্য ব্যবহার গলাদকরন করছো, কোন এক সময় এই অহেতুক আব্দারের প্রেক্ষাপটে তাদের বর হয়ে উঠা, তাদের বিশৃঙ্খল হয়ে বেড়ে উঠার মাশুল শুধু তুমি না, তোমার এই আদরের সন্তানদেরকেও দিতে হবে। তখন হয়ত এরাই তোমার দিকে আঙুল তুলে এইটা বলবে, কেনো আমাদেরকে যখন শাসন করার দরকার ছিলো, সেতা করো নাই? আজ মনে হচ্ছে তুমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাও না। মনে হচ্ছে তুমি আগামী প্রজন্মের যে ধারা এই পৃথিবীতে আসছে, তুমি সেই ধারনার থেকে অনেক পিছিয়ে আছো।

আমি যেদিন গ্রাম থেকে ঢাকায় আসি, সেদিন দেখেছিলাম, আমাদের গ্রাম এই অল্প দূরের ঢাকা শহর থেকে কত পিছিয়ে ছিলো। আর তার সাথে সাথে আমি দেখেছি, গ্রামের গর্ভে যারা তখনো বসবাস করছে, তারা ঢাকার সভ্যতা থেকে কতই না পিছিয়ে আছে। কথার বলার স্টাইল, একে অপরের সাথে ব্যবহার করার অভ্যাসে, কিংবা স্বপ্ন দেখার বাউন্ডারী পর্যন্ত জানে না ঐ সব গ্রামের মানুষগুলি। আমি গ্রাম থেকে এই শহরে এসে পুরুই একটা বেমানান প্রানীতে পরিনত হয়েছিলাম। কিন্তু আমি চলমান ছিলাম, আমি ব্যতিক্রম কি, কোথায় তার প্রতিকার, কি করা উচিত, সেটা ভাবতে বেশী সময় নিতে চাই নাই। আমি খুব দ্রুত ঢাকার পরিবেশের সাথে, মানুষগুলির সাথে, এই শহরের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিয়েছিলাম। যতোদিন পারি নাই, সেটা আমার ব্যর্থতা নয়, সেটা আমার এডাপটেশনের জন্য সীমারেখার সীমাবদ্ধতা। তারপরে যখন আমি এই শহর থেকে আরো একধাপ এগিয়ে ক্যাডেট কলেজে গেলাম, তখন দেখেছি, সমাজের উচু স্তরের পরিবারের ছেলেমেয়েরা কিভাবে বেড়ে উঠে। তাদের কথাবার্তা, তাদের চলাফেরা ঢাকা শহরের মানুষগুলির থেকেও আলাদা। তাদের চিন্তা ধারা আলাদা, তাদের সব কিছু আলাদা। ঢাকা শহরে তোমাদের বাসায় এর চর্চা নাই। আর না থাকারও কথা। তোমরা সমাজের উচু স্তরের লোক নও। মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষ। আমি সেই অজ পাড়াগায়ের সাথে এই উচু স্তরের পরিবার গুলির মধ্যে যে পার্থক্য, যে দুরুত্ত, সেটা যথাসম্ভব বুঝবার চেষ্টা করেছি এবং আমাকে আমি ঠিক আমার পরিস্থিতির আওতায় তা মানিয়ে চলার চেষ্টা করেছি। তারপর যখন আমি ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে সেনাবাহিনীর নতুন জগতে প্রবেশ করলাম, দেখলাম, এখানে আরেক জগত। এর সব ধরনের শাখা বা উইং আছে। গ্রামের অজ পাড়াগায়ের লোকজন ও আছে, মধ্যবিত্ত ঘরের অসচ্ছল সসদ্য ও আছে, আবার একেবারে উচু স্তরের সদস্য রাও আছে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, পাশাপাশি, কাছাকাছি, একই ইউনিফর্ম, একই রেশন, একই কমান্ড, অথচ কেউ কারো সাথে ম্যাচ করে না। কিন্তু সিস্টেম কাজ করে। এই এডাপ টেশন টা একটা জটিল বষয় কিন্তু একেবারেই সহজ আমার জন্য। কারন আমি সব গুলি স্তর ইতিমধ্যে নিজে পার হয়ে অভিজ্ঞ হয়ে এসেছি। তলাহীন গ্রামে বড় হয়ে দেখেছি, এখানে যারা ঐ তলাবিহীন সমাজ থেকে এসেছে তাদের কি মনের অবস্থা, তাদের কি চাহিদা। আবার তোমাদের সাথে আমি মধ্যবিত্ত ঘরের সদস্য হিসাবে এতাও অভিজ্ঞতায় পেয়েছি, এই মধ্যবিত্ত মানুষগুলির মানষিক অবস্থা কি, কি তাদের বৈশিষ্ট। ফলে সেনাভিনীর এই মধ্যবিত্ত সদস্যগুলি কে নিয়েও আমার খাপ খাইতে অসুবিধা হয় নাই। আবার ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুবাদে আমি উচু স্তরের মানুষ গুলির ব্যবহার, আচরণ, প্রত্যাশা, বৈশিষ্ঠও আমার জানা ছিলো। ফলে প্রতিটি স্তরের পরিবেশ, মানুষগুলির চাহিদা কিংবা তাদের সাথে উঠাবসা করার কৌশল আমার অনেকটাই জানা। এই সুবিধা গুলি কিন্তু আমাকে কেউ এমনি এমনি দেয় নাই, আমাকে প্রতিটি জিনিষ আহরন করতে হয়েছে, পাওয়ার জন্য আমাকে  সেই চেষ্টা গুলি করতে হয়েছে। 

আমি যদি সেই অজ পাড়া থেকে উঠে এসে এই স্তরে আসতে সক্ষম হই, তাহলে তুমি বা তোমরা কেনো এক ধাপ এগিয়ে থাকা তোমার সন্তানদেরকে আরেক ধাপা এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছো না? তোমার কাজ তো শুধু ঘরের রান্না বান্নাই না। পেটে সন্তান ধরেছো, তাহলে তাদেরকে আধুনিক সমাজের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য কি তোমার বা তোমাদের কিছুই করার নাই? ওরা পিছিয়ে পড়ছে মুল ধারার সমাজ থেকে। ওরা পিছিয়ে যাচ্ছে অবিরত যেখানে সমাজ, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। কোনো এক সময় তুমি বা বদি ভাই এর মাশুল দিয়ে হয়ত এটাই বলবে, দেশের জন্য অনেক কিছুই তো করলাম, কিন্তু নিজের পরিবারের জন্য কি করলাম? দেশ তোমাকে তোমার ঘরে এসে তোমাকে সেবা প্রদান করবে না। দেশের যাবতীয় কাঠামো গত সুবিধা তোমাকে পেতে হলে তোমার সন্তানদেরকে সেই স্তরে উঠিয়ে দিতে হবে। আর যেটা তুমি আজ করছো না। এটাই হচ্ছে তোমাদের ভুল।

তোমার সঙ্গে হাবিব ভাইয়ের বউয়ের বিশাল একটা পার্থক্য আছে। তুমি কি সেই পার্থক্যটা বুঝো? তুমি সাগরের মত পানি আর সে দিঘিতে রাখা জল। তোমার সাগর সমান পানি অনেক সময় তৃষ্ণা মিটাবে না কারন সাগরের পানি পান করতে গেলেও তাকে অনেক শোধনাগারে শোধন করতে হয়। কিন্তু হাবীব ভাইয়ের বউ দীঘির জলের মতো পরিষ্কার, সেটা শোধনের জন্য অনেক বেশী পরিশ্রমের দরকার নাই। আমার এই কথাগুলি আজ হয়তো কোনো অর্থ বহন করে না কিন্তু হয়তবা আজ থেকে ৩০ বছর পর যদি আমরা বেচে থাকি, তার একটা পার্থক্য ধরা পড়বেই। আজ তোমার সংসার তোমার হাতে, তোমার রান্না করার পরিকল্পনা তোমার হাতে। আজ তোমার সাধ্যের মধ্যে যা কিছু ইচ্ছে হয় তুমি কোনো নাকোনোভাবে সেটা নিজের তরিকায় পুরুন করার ক্ষমতা তোমার হাতেই। কিন্তু কোনো এক সময় তোমার এই সংসার আর তোমার হাতে নাও থাকতে পারে। তখন এর চাবিকাঠি হয়ত অন্য কারো হাতে চলে যাবে। এখন তুমি শক্ত সামর্থবান, কিন্তু যখন তুমি শারীরিকভাবেও দূর্বল হয়ে পড়বে, সংসারের চাবিকাঠি আর তোমার হাতেথাকবে না, তখন মনে হবে, এই সংসার জীবনে কি আমি কিছুই করি নাই? নিজেকে তখন খুব অসহায় মনে হবে। আজ তোমার স্বামী তোমার রাজা। তার উপর তোমার অধিকার শুধু স্বামীহিসাবেই নয়, সে তোমার ধারন করে। কিন্তু কোনো এক সময়, যখন হয়ত সে আর থাকবে না, তখন তুমি অনেকের কাছেই একটা এক্সট্রা মালামালের মতো বোঝা হয়ে পড়বে। আমি আমার মাকে দেখেছি সে কতটা অসহায়। আমি আমার ভাইকে দেখেছি, পট পরিবর্তনে কতটা সময় লাগে। আজকের এই দিনটা আগামীকাল নাও একই থাকতে পারে। 

তুমি ভাল থেক।

২৪/০৯/১৯৮৬-একজন পরিত্যাক্ত মুক্তিযোদ্ধা

প্রচন্ড শক্তিশালী জীবের রাহু থেকে মুক্তি পেয়ে একটী ক্ষুদ্র প্রানির যা হয়, আজকে আমার অবস্থাটা যেন সেই রকম মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার মাথা থেকে একটা বোঝা কমে গেল। কিন্ত কেন মনে হচ্ছে একটা বোঝা কমে গেল এবং কি একটা বোঝা কমে গেল তাও বুঝতেছিনা। সারাদিন ঘুমে কাটাতে চাইলাম কিন্তু ভাল ঘুম হল না। গতকাল Firing থেকে ফিরে এসেছি।

হাট হাজারী Firing এ গিয়ে এবার একটা দৃশ্য দেখেছি । দৃশ্যটি আমাকে খুব ব্যথিত করেছিল। শুয়ে শুয়ে যেন ঐ কথা গুলো আমার কানে বারবার বেজে উঠছিল। আমি চট্টগ্রামের ভাষাটা বলতে পারি না, তাই আমার মতো করে ঘটনাটা লিখছি।

হাট হাজারী Firing range এর পচ্ছিম পাশে একটা চায়ের দোকান আছে। ওখানে চা খেতে গিয়েছিলাম আমি আর লেঃ তারেক (ভাল নাম হচ্ছে তারেক মোঃ ভাওয়ালি, আমরা ওকে কাওয়ালি বলেও ডাকি অনেক সময়)। চায়ের দোকানে আরো কিছু অচেনা লোক ও বসেছিলো। হয়ত এই এলাকার কেউ হবে। দেখলাম, ৫০ বয়সের এক বুড়ো চা বানাচ্ছে। মুখে তার ঘন সাদা দাড়ি, খালী গা, গলায় একটা গামছা জড়ানো। বুকের যতোগুলি পশম আছে, সবগুলিই পাকা। মাথায় চুল নাই বল্লেই চলে। খুব বেশি কাষ্টমার নাই, আমরা যারা এখানে ফায়ারিং করতে আসি, মুলত্তারাই তার খদ্দের। আর যারা হাট হাজারী ফায়ারিং রেঞ্জের এই রাস্তাটা ব্যবহার করে, বিশেষ করে স্থানীয়রা, তারাই এই চা দোকানের খদ্দের। আমি আর তারেক দুজনেই দুজনের অজান্তে বুড়ো লোকটিকে দেখছিলাম। এক সময় তিনজনই একসঙ্গে ব্যাপারটা মার্ক করাতে সবাই হেসে উঠলাম।

আমার একটা বদ অভ্যাস আছে। বুড়োমানুষ দেখলেই আমার গল্প শুনতে ভাল লাগে। তার অতীত গল্প। আমি এমন অনেক বুড়ো মানুষের সাথে নিছক গল্আপ করতে করতে এমন কিছু সত্যি কাহিনী জেনেছি, যা আমাদের সমাজের বড় একটা কাজের সাথে হয়ত জড়িত, অথবা এমনো দেখেছি, যতো নামীদামী মানুষের কথা আমরা জানি তাদের ঐ সব ইতিহাসের পিছনে এই সব লুকিয়ে থাকা মানুষের কন্ট্রিবিউশন। আমি বুড়ো লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম,

"চাচা আপনার বাড়ি বুঝি এখানেই?" বুড়ো আমার উত্তর না দিয়ে পাল্টা বলতে শুরু করলেন, পোয়া এর আগে আমাকে এখানে দেখো নাই? "

আমি আসলে দেখবো কি, এবারই তো প্রথম এলাম এই ফায়ারিং রেঞ্জে। আমার সামরীক জীবনটাই তো বেশী দিনের না। আগে এলে হয়ত আমার সাথে তার পরিচয় নিশ্চয় হতো।  আমার আগে যারা এখানে এসেছেন, তারা নিশ্চয় এই বুড়োকে ভালোভাবেই চিনে। হয়তো অনেকের সাথে তার পরিচয়ও আছে। এতো কিছু না বলে আমি শুধু চাচাকে বললাম, না চাচা, আমি এর আগে এখানে কখনো আসি নাই। 

চাচা আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বললেন, এখানে অনেক অফিসাররা আসে, চা খায়, কিন্তু আজ অবধি কেউ আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কি করতাম আগে, আমার নাম কি ইত্যাদি কেহই কখনো জিজ্ঞেস করে নাই তুমিই মনে হয় এই প্রথম আজ আমাকেকিছু জিজ্ঞেস করলা তবে এইটুকু বলি যে, আমি এলাকার লোক নই আর কখনো এই এলাকায় বাস করবো এটা আমার সপ্নেও ছিলো না তারপরেও নিয়তি বলে একটা কথা আছে, আমরা তাকে কখনোই হাত দিয়ে দূরে ফেলে দিতে পারি না কেউ এটা বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক আমি অন্তত এখন এই ৫০ বছর বয়সে এসে সেটা মনে প্রানে বিশ্বাস করি 

চাচা, কোনো দিকে আর না চাহিয়াই চা বানাইতে বানাইতে বলতে থাকে- শোন, তোমাদের মতো আমিও একদিন জোয়ান ছিলাম, আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমি তোমাদের থেকেও দ্রুত গতিতে দৌড়াতে পাড়তাম, আমার মাথায় ভর্তি কাল চুল ছিল সারাক্ষন এই গায়ের কোথায় কি হচ্ছে, আমার নজর কখনই এরিয়ে যায় নাই আইউব খানের বিরুদ্দে যুদ্ধ করেছি, ব্রিটিসদের বিরুদ্দে কত শ্লোগান দিয়েছি সবাই ভাগছে, রাজাকারেরা জয় করতে পারে নাই দেশ, মুক্তিযোদ্ধা আছিলাম দেশটারে স্বাধীন করেছি তবে এখন মনে হয় জীবনে অনেক হিসাব কিতাব ঠিক মত করা হয় নাই আইউব খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোন দরকার ছিল না, ব্রিটিশ দের বিপক্ষে এত কথা কবারও দরকার ছিল না, অথবা রাজাকার বলে জাগরে আমরা পাত্তাই দেয়ই নাই, হেরা এখন আমাগো দেইখা হাসে সবাইরে খেদাইছি ঠিকই কিন্তু এখন যারা আছে তাগো ভাগাইব কে? আগে তো বাঁচার জন্য চায়ের দোকান দিতে হয় নাই, এখন তো বাঁচার জন্য চায়ের দোকান ছাড়া আর কোন গতি নাই  যখন মুক্তিযোদ্ধা আছিলাম, আমার বয়স  ছিল ৩২ কি ৩৩ বউ আঁকড়াইয়া ধরল বউরে কইলাম, ভয় পাইস না, ফিররা আমু কি লাভ হইছে ফিররা আইসা? বউ এখন বিছানা ছাইরা উঠতে পারে না ভাত দিবার পারি না আবার ঔসধ

 বুড়া লোকটি একটু থামলেন। 

যে পোশাকটা তোমরা পড়ে আছ, এটা পাবার জন্য অনেক জাবিউল মারা গেছে, অনেক জাবিউল চা বেচে বেঁচে আছে, অনেক রাহিমারা এখন বিছানায় শুয়ে আছে, তাঁদের দেখার কেউ নাই তোমাদের উপর আমাদের কোন দুঃখ নাই, তোমরা আমাদের নাতিনাতকুরের মতো কিন্তু আমাদের কি কেউ দেখার নেই?”

বুঝলাম, তাঁর নাম জাবিউল, তাঁর স্ত্রীর নাম হয়ত রাহিমা।  তারপর? একটা বেন্সন সিগারেট আগাইয়া দিয়ে বললাম। নেন, একটা বেনসন খান।

জাবিউল বলে চললেন, আরেক কাপ চা খাইবা?”

বল্লাম, দেন।

আমার শুনতে ভাল লাগছে জাবিউলের কথা। হয়তোবা আর বেশি জাবিউলরা নাই এ দেশে। হয়তো কালের ঘুর্নিপাকে একদিন আর কোন জাবিউলকে খুজে পাওয়া যাবে না। ইতিহাস কতো জায়গায় কতো ভাবে চাপা পড়ে আছে, কে রাখে তাঁর খবর?

দেশ স্বাধীন হল, কি আনন্দ চারদিকে আমরা এখন শুধু আমরা ব্রিটিস গেছে, পাকিস্তান গেছে আমরা  যারা ফিরে এলাম, তারা খুব ভাগ্যবান মনে হলেও এখন মনে হয় যারা ফিরে নি তারা বেশি ভাগ্যবান ওদের বেঁচে থাকার জন্য চা বেচতে হয় না ওদের বেঁচে থেকে রাহিমাদের কষ্ট দেখতে হয় না  একটা চাকরীর জন্য অনেক দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট কোন কাজে আসেনি পরে ওই সার্টিফিকেট আগুণে পূড়ে ফেলেছি কি হবে একটা অযৌক্তিক সার্টিফিকেট রেখে? আমার বাড়ি আছিল ঢাকার পাশে বছিলা নামে এক গ্রামে কত বছর আগে যে গ্রামটা ছাইরা আইছি, সেখানে যাইতে ইচ্ছে করে কিন্তু আমার ওখানে গেলে মন খারাপ হইয়া যায় পাশে একটা গনকবরের সমাধি আছে খালি যুদ্ধের কথা মনে পরে খালি মানুষের লাশের গন্ধ আসে নাকে যাইতে চাইলেও মন, শরীর যেতে চায় না তাই এই জঙ্গলের কাছে পইরা আছি, বলতে পারো পালাইয়া আছি জানো কার কাছ থেকে পালাইয়া আছি? নিজের কাছ থেকে"

আমি প্রশ্ন করলাম, পালাইতে পারছেন? জবিউল আমার প্রশ্নের আগেই সে উত্তর দিল, "কিন্তু আমি জানি আমি পালাইতে পারি নাই নিজের কাছে নিজে কেউ পালাতে পারে না"

জবিউল আর কথা বলতে পারে না। তার গলা ভেঙ্গে আসছে, হয়ত তার চোখে পানিও এসে থাকতে পারে কিন্তু অন্ধকার সেই অশ্রু সবার চোখ থেকে আড়াল করে রাখল। সূর্য অনেক আগেই ঢলে পড়েছে।  সন্ধ্যা নেমে গেছে। আমি আরও একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে দেখলাম, জাবিউল তাঁর গামছাটা দিয়ে চোখ মুছছে। জাবিউল একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারা নাকি এ দেশের সর্বকালের সর্বর্শ্রেষ্ঠ সন্তান। কে বলেছিল এ কথা? জাবিউলরা বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে রাজাকারেরা। এখন দেশে রাজাকার আর রাজাকারের মধ্যে সিমাবদ্ধ নাই। অনেক রাজকার ৭১ এর পরেও জন্মেছে । রাজাকাররা শুধু দেশের স্বাধীনতায় বাধা দেয় না, যারা এ দেশের মানুষের স্বাধীনতাকে হরন করে, যারা গরিবের ধন চুরি করে, যারা ন্যায় অন্যায় কিছুই বুঝতে চায় না, যারা মানুষের ঘর বাড়ি দখল করে, যারা বিনা অপরাধে মানুষ খুন করে, মেয়েদের ধর্ষণ করে, যারা মানুষের মতামতের কোন সম্মান করে না, তারা সবাই রাজাকার। 

এই জাবিউলের সামনে আমার ইউনিফর্মটাকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। রাত  নেমে এসছে, মেসে ফিরতে হবে, জাবিউলকে শুধু একবার জড়িয়ে ধরা ছাড়া আমার আর কোন কিছুই দেবার নাই। আমি জাবিউলকে তাঁর অজান্তে একটা স্যালুট দিয়ে ফিরে এলাম। মনে হল আজ অন্তত একটা মুক্তিযোদ্ধাকে আমি প্রানভরে ইউনিফর্ম পড়ে স্যালুট করলাম যে আমার এই স্যালুটের জন্য বসে নেই। তাঁরপরেও সে একজন ইতিহাস রচনাকারী মুক্তিযোদ্ধা, যার জন্য আমি আজ একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক এবং যার জন্য আমি আজ একটা স্বতন্ত্র ইউনিফর্ম পেয়েছি। আমি জাবিউলের কাছে ঋণী, দেশ হয়তো নয়।

১৯/০৯/১৯৮৬-ভগবানের প্রতি

হে ভগবান, তোমাকে কিছু বলার আমার সাহস নেই, তোমাকে আমার বুকের অফুরন্ত যন্ত্রনাগুলু দিয়ে প্রতিবাদ করারও শক্তি আমার নেই। কিন্তু তোমাকে ভালবাসা দিয়ে বেঁধে রাখবার ক্ষমতা বা অদম্য ইচ্ছেও আমার নেই। অথচ আমি অনেকবার সব দিক ভেবেছি, চিন্তা করেছি, কল্পনা করেছি, এই জগতে সবচেয়ে কে বেশী আমার আপন, আর সবচেয়ে কার উপর আমার রাগ। যতবারই আমি চারিদিক বিশ্লেষণ করেছি, আমি দেখেছি দু দিকেই তুমি। তোমাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি। আবার তোমার উপরই আমার রাগ বা গোস্যা সবচেয়ে বেশী। ভালবাসি এ কারনে যে, তোমাকে অস্বীকার করার ইচ্ছে তুমি আমাকে দিয়েছ। ঘৃণার শক্তিও তুমি আমাকে দিয়েছ।  আমি ইচ্ছে করলে তোমাকে অস্বীকার করতেও পারি আবার মেনেও নিতে পারি। তাতে তুমি আমাকে কিছুই বলবে না। আর এ জন্য তোমাকে আমি ঘৃণা করার আগেই আমি তোমাকে পূজা দেই, অন্তর থেকে ভালো বাসি। আবার যখন খুব মন খারাপ হয়, তখন ভাবি, তুমি কেমন গো? চারিদিকের মানুষগুলির মতো আমাকে কেনো তুমি এটা দিলে না, ওটা দিলে না, একতা পরিবার দিলেনা, একটা খেলার ভাই দিলে না, ছলনা করার জন্য মিষ্টি একটা বোন দিলেনা, রাগ করার পিতামাতা দিলে না। কিছুই দিলে না। আবার ভাবি, তুমি তো আমাকে দুটো চমৎকার চোখ দিয়েছো, হাত দিয়েছো, পা দিয়েছো, সুস্থ্য শরীর দিয়েছো। আমি চোখ দিয়ে মন খারাপ হলে তোমার বিশাল নীলাকাশ দেখতে পাই, কোঠাও যাওয়ার প্রয়োজনে আমি সেই হিমালয়ের মতো পাহাড়ের চূড়ায় উথে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে আমাই আমার কষ্টের বেদনাগুলি ঐ চঞ্চলা সাগরের বুকে ছুড়ে দিতে পারি। আমার থেকেও তো অনেক হতভাগা মানুষ তুমি স্রিষ্টি করেছো যাদের তুমি এ গুলাও দাও নাই। রাগ থেমে যায়, কষ্ট কমে যায়, চোখ ভিজে আসে কোনো এক মায়াজালে। বাচিয়ে তো রেখেছো অন্তত। এটা তোমার বিশ্ব, এটা তোমার রাজত্ব, যাহ কিছু ঘটবে এখানে, সব তোমার আইন। খনিকের তরে যখন তুমি আমাকে তোমার এই মহাবিশ্বে নিয়ে যাও তখন আমি বুঝতে পারি তুমি কতটা বিশাল।

কবি নজরুলের ঐ গানটায় কবি একদম সত্যি কথাগুলিই বলেছেন-

খেলিছো, তুমি বিশ্ব লয়ে, হে বিরাট শিশু। ক্ষনেক্ষনে তুমি ভাংছো আবার ক্ষনেক্ষনেই তুমি আবার নতুন কিছু গড়ছো। রাশি রাশি রবি, সসী, গ্রহ নক্ষত্র সব কিছু তোমার পায়ের তলায় খেলনার মতো লুটুপুটি খায়, তোমার কোনো কিছুতেই কিছু যায় আসে না। অথচ এই আমরা প্রতিনিয়ত কতই না কস্ট, কতইনা দুক্ষে আবার কতই না অহেতুক আনন্দে ফেটে পড়ছি। 

কোনো একদিন তোমার সাথে যেদিন আমার দেখা হবে, আমি শুধু একটা প্রশ্নই আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করবো। 

সবই যদি তুমি ঠিক করে রাখলে, সবই যদি তুমি নিয়ন্ত্রন করলে, তাহলে আমাকে এতো ভালোবাসা আর আখাংখা দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠালে কেনো? তাহলে ওইসব আখাংকা, ভালোবাসা, প্রত্যাশা কি নিছক মায়াজাল?

১৮/০৯/১৯৮৬-৭ই মে এর সেই মেয়েটা

হটাত করে মনে পড়ে গেল একদিন একটা মেয়ের সাথে আমার দেখা হয়েছিল ৭ মে তে। কেনো দেখা হলো, কি কারনে দেখা হলো এই প্রশ্ন অবান্তর। পাশাপাশি বাসা, কেনো আগে দেখা হয়নি সেতাও যেনো একটা প্রশ্ন। বাইরে ছিলাম। যশোর সেনানীবাস থেকে ১০ দিনের ছুটিতে আছি, বেসিক কোর্ষের কারনে। এখান থেকেই আমি হালিশহর যাবো প্রায় এক বছরের একটা কোর্ষ করতে। কোনো কাজ নাই, সারাক্ষনই বাইরে বাইরে থাকি। লেঃ ভাওয়ালী আমার খুব ভালো বন্ধু, ফলে বেশীর ভাগ সময় আমি ওর সাথেই ঢাকার বিভিন্ন বন্ধুদের বাসায় আড্ডা দেই। কখনো দুপুরে ফিরি, কখনো ফিরতে ফিরতে রাত ও হয়ে যায়। বদি ভাই কিছু বলেন না, আর বলার কোনো কারন ও নাই। আমি কোনো অন্যায় করে বেরাচ্ছি না। আজ কোথাও যাওয়া হয় নাই। হয়তো দুপুর গড়িয়ে গেলে বিকালের দিকে বের হবার সম্ভাবনা আছে। বাসাতেই ছিলাম কিন্তু বদি ভাইয়ের সাথে বাজারে গিয়ে সকাল ১০ টার দিকেই বাসায় হাজির আমি। তখনি ওর সাথে দেখা হয়েছিলো। ভাবীর সাথে কি যেনো গল্পে গল্পে কিছু রান্নাবান্নার কাজে শরিক হয়েছিলো। সেদিন ওর মধ্যে একটা জিনিষ আমি লক্ষ্য করেছিলাম, ও ভাল মা হবে। ভাল বউ হবে কিনা জানিনা, আমিতো আর বিয়ে করিনি যে বুঝবো কি দেখলে বোঝা যাবে ভাল বউ হবে কিনা ।

তবে সব মানুষের উঠতি বয়সের কিছু লক্ষন ভবিষ্যতের কিছু লক্ষন তো থাকেই। আমি যেদিন ওকে দেখেছিলাম, বুঝেছিলাম যে, অন্য ১০ টি মেয়ের মতো ওর উচ্চাকাংখ্যা এই রকম নয় যে, যে করেই হোক, আমাকে বড় হতে হবে, আমাকে ধনী হতে হবে অথবা পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝি বা না বুঝি আমার এই চাই আমার ঐ চাই, ইত্যাদির মতো মনে হয় নাই। 

কিছু কিছু মানুষ বড় হয় মনে মনে। "মনে মনে বড় হওয়া" আবার কি জিনিষ? এটা হচ্ছে সেটা যা আমার মনে আছে আমি করবো, আমি হবো, বা আমি ওটা করে ঐটা করতে চাই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার অসত উপায়েও সেটা অর্জন করতে নারাজ। ফলে, প্রতিদিনের কর্মে, প্রতিদিনের চেষ্টায় একটা প্রত্যয় সব সময়েই থাকে মনের গোপন স্বপ্নগুলিকে নিজের ক্ষমতায় রূপ দেয়া। এর জন্য যা যা প্রয়োজন, যতোটুকু চেষ্টার প্রয়োজন, সেটা নিয়ে লেগে থাকা। যদি এই চেষ্টায় সফল হয় তো ইচ্ছে পুরুন হয়ে গেলো। আর যদি চেষ্টা সফল না হয়, তাতেও কোনো দুঃখ নাই, কারন ক্ষমতা তো ছিলোই না সব সপ্নগুলি পুরনের। কারো উপরই দোষ চাপিয়ে দেয়া যায় না সপ্ন না পুরন হবার জন্য। আমি ওর মধ্যে এই রকম একটা উজ্জ্বল মনোভাব দেখেছি।

আমার এই কথার মানে কিন্তু এটা নয় যে, সে অতি মানবী। হতে পারে কোনো একদিন হয়তো ও ওর স্বপ্নগুলিকে বাস্তবায়ন করতে পারবে। আমি ওর অন্যান্য সব বোনগুলিকে দেখি নাই কিন্তু যে দুজন বোন মীরপুরে আমাদের বাসার পাশে থাকে তাদের দেখেছি। বিস্তর একটা ফারাক চোখে পড়ে। ওরা ৮ বোন আর ৩ ভাই। আমি কাউকেই (শুধুমাত্র মীরপুরের ২ বোন ছাড়া) দেখি নাই। শুধু সেই রাতে ওর সাথে কথা বলে যা বুঝেছি, তা হলো, মনে মনে বড় হবার একটা তীব্র আখাংকা আছে। 

একটু একটু করে ভাবছি ওকে, আবার একটু একটু করে মনেও করছি। একটু একটু ভালোও লাগছে। 

১২/০৯/১৯৮৬-সপ্তাহ অন্তে ছুটি

হালিশহর, চট্টগ্রাম, আর্টিলারি অফিসারস মেস 

আজকে সকালেই week-end এ চিটাগাং থেকে ঢাকায় গেলাম। সকালে তারেকের বাসায় গেলাম। ওর আম্মার সাথে, ওর বোনের সাথে দেখা হল। আপা একজন ভীষন ভালো মানুষ। আমাকে ঊনি তাদের বাসার সদস্য হিসাবেই দেখেন। কখনো বুঝতে দেন না যে, আমি অন্য বাড়ির একজন মানুষ। কখনো বকেন, কখনো উপদেশ দেন, কখনো একসাথে মা আর সন্তানের মতো কেরম খেলেন। আপা পান খেতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু ওনার জীবনেও একটা দুঃখ আছে। কিছুদিন আগে ঊনি তার স্বামীকে ত্যাগ করেছেন। কেনো করেছেন, কি কারনে করেছেন, কার কতটুকু দোষ ছিলো আমার জানা নাই, কিন্তু তিনি একজন শিক্ষিকা, ফলে তার মানবিক গুন, সাধারন সেন্স সব কিছুই আমার কাছে যুক্তির মনে হয়েছে। যাক সে কথা বিস্লেসন করে হয়ত আমি কিছুই সুখের পাবো না। আপাদের সাথে সময়গুলি খুব আপন জনের মতো কাটছে, সেটাই আমার কাছে বড়। 

তবে একটা কথা ঠিক, আমাদের দেশে এখনো ছেলে পক্ষ মেয়ে পক্ষের মানুষগুলিকে এক প্রকার ইনফেরিওরিটির চোখেই দেখে। ভাবখানা এই রকম যে, মেয়েকে বিয়ে করে যেনো মেয়ের বাড়ির মানুষগুলিকে উদ্ধার করেছে তারা। কেনো এই রকম ধারনা? এটা অত্যান্ত নীচু মনের একটা পরিচয়। আমি এই ভাবটা বেশীর ভাগ পরিবারের মধ্যেই দেখেছি। গরীবই হোক আর বড় লোকই হোক, যাদের এই ভাবটা আছে, আমি হলফ করে বলতে পারি, রাজ্যের হুড়পরি কিংবা এঞ্জেল নিয়ে আসলেও তাদের কাছে মনে হবে, হয়তো আরো ভালো কিছু পাওয়া যেতো। ছেলেটার কি যোগ্যতা, ছেলেটা মেয়েটার যোগ্য কিনা, সেটা নিয়ে এই সব পরিবারের কোনো মাথাব্যথা নাই। সব দোষ যেনো ঐ মেয়ে পরিবারটির। আমাদের দেশে যদি এই ধারা চলতে থাকে, তাহলে একদিন এই সমাজ শুধুমাত্র মেয়েদের কাছেই জিম্মি হয়ে যাবে যেদিন মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের দেশের মেয়েরা যেহেতু বেশীর ভাগই স্বাবলম্বী নয়, ফলে তারা এই যুগে এসে অনেক অন্যায় আবদার, অন্যায় আচরন কিংবা এমন কিছু ব্যবহার যা তার প্রাপ্য নয়, সেটাও সে সহ্য করে যাচ্ছে, কিন্তু তারা তাদের পরবর্তী জেনারেশনকে এমনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে যাতে তাদের পরবর্তী মেয়ে জেনারেশন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায়। আর তখন যেটা হবে সেটা হচ্ছে, মেয়েদের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত। তখন ছেলের পরিবারের কর্তৃত্ব আর চলবে না। এখন তো মেয়েরা ছেলের কর্তৃক ডিভোর্সড হয়, তখন ডিভোর্সড হবে ছেলেরা, মেয়েদের কর্তৃক।

ওখান থেকে মিরপুর গেলাম। গিয়ে দেখি ভাইয়া (বদি ভাই) কোরান শরিফ পড়ছেন আর ভাবী ঘর ঝারু দিচ্ছেন। আমাকে দেখেই হটাত আশ্চর্য হয়ে বললেন, “ছুটি পেয়েছ নাকি?” ভাইয়ার, বৌদির, মান্নার, সাদির সবার ছবি তুল্লাম আমার ক্যামেরা দিয়ে। নতুন ক্যামেরা কিনেছি, খুবই কম দামি কিন্তু শখ মেটানো যায়। ২লেঃ অফিসার, কতো টাকাই বা বেতন, সব মিলে মাত্র হাজারের উপর টাকা। এর মধ্যে সিগারেট, এর মধ্যে যাতায়ত, এর মধ্যে মেসিং, কাপড়- চোপড়, সবইত এর মধ্যে। “ওডী” করেই চলতে হয় সারা মাস।

এমদাদের বাসায় গিয়েছিলাম। গিয়ে এমদাদকে পেলাম। ও আজকেই যশোর চলে যাবে, আজকেই এসছিলো। ওখানে লুনা আর এমদাদের একটা ছবি তুললাম। আজই আবার চিটাগাং চলে যাবো।

আমি বুঝি না, কেনো এই ছোট একটা সময়ের জন্য এলাম, আবার আজই আমি চলে যাচ্ছি। আর এই জার্নিটাও কিন্তু ছোট না। আসা যাওয়া মিলে প্রায় ১১ ঘন্টার একটা ব্যাপার। সম্ভবত এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার যে, আমি বাসায় এলাম, আমার একটা বাসা আছে ঢাকায়। কিন্তু আসলেই কি আমার কিছু আছে এই ঢাকা শহরে? আমার গ্রাম আছে, কিন্তু গ্রাম আমাকে টানে না। বদি ভাইয়ের বাসা আছে, কিন্তু আমি সে বাসাটাকে কখনো আপন করে নিতে পারি নাই। বরং ওরাও আমাকে আপন করে নিতে পারে নাই। আমার মা আছেন কিন্তু তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না। আমার বোনেরা তাদের জীবন নিয়ে বেচে থাকতেই সংগ্রাম করছে। তাহলে আমি ঢাকায় কেনো আসি? আমার কাছে ঢাকা যেমন, হালিশহর তো একই। তারপরেও যেনো আমি কিছু খুজি।

কি খুজি?   

৯/৯/১৯৮৬-লুনার চিঠি

আজকে ওর চিঠি পেলাম। আর “ওর” বলাতে আবার অনেকেই ব্যাপারটা ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে। ও আমার ছোট বোন লুনা, লেঃ এমদাদের আপন ছোট বোন। একটা ছবি পাঠিয়েছে পারুর ছবির  সংগে। পারুটা কে আমি চিনিনা। উপলক্ষ্য আমার জন্মদিন। গতকাল আমার জন্মদিন ছিল, আমার মনে নেই, কিন্তু ও মনে রেখেছে। একটা ভিউকার্ডও পাঠিয়েছে। লুনা সুন্দর চিঠি লিখে, যেমন এই  যে আজকের চিঠিটা। লিখেছে, “ভাইয়া, এখানে এই মিষ্টি মধুর লাজুক গাঁয়ে এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাটা–সত্যি তাই। দীর্ঘ ৫ বছর পর আমি গ্রামে এসেছি। অতীতে ছিলাম একা, চঞ্চল ছোট্ট মেয়ে, আর এখন? চঞ্চলা তরুণী। তাই অতীতে যা ভালবাসিনি এখন সেটা বেশ ভাল লাগে।“ বাপরে বাপ কি পাকা পাকা কথা।

অনেকদিন যাওয়া হয় নাই ওদের বাসায়। পাশেই থাকে শহীদ ভাই। এমদাদের পরিবারের সাথে ওদের খুব মিল। শহীদ ছেলেটাও সাদামাটা। আমরা সবাই একটা ক্লাবের সাথে জড়িত। নাম সৃজনী সঙ্ঘ। আমরা যখন ছুটিতে আসি, তখন রেগুলার হই এই ক্লাবে কিন্তু খুব অল্পই ছুটি পাই। লুনারা ইব্রাহীমপুর থাকে। জায়গাটা কচুক্ষেতের পাশে। আমার ঐটা এলাকা নয়, তারপরেও আমি অনেকের সাথেই পরিচিত।

এবার আসি লুনার ব্যাপারে আরো একটু বলি। অসম্ভব ধরনের কালচারালা মাইন্ডেড একটা মেয়ে। যে কোনো বিষয় নিয়ে ওর সাথে আলাপ করা যায়। ওর সাথে যখন বসে আড্ডা দেই, তখন বড় আপা (লুনার বড়) মাঝে মাঝে এমন সব মন্তব্য করেন যেনো আমি আর লুনা প্রেমে পড়েছি, লুনা আমার হবু বউ। মাঝে মাঝে আমিও লুনাকে এতাই বলি, যে, বউ হবি? ও হাসে আর বলে- না থাক, দাদাই ভালো। আজীবন পাশে থাকা যাবে। বউদের কোনো সিউরিটি নাই। না আছে স্বামীদের।

এমদাদের বাবা (লুনার বাবা) ও খুবই খোলা মনের মানুষ। আর ওর মা তো আরেক লক্ষী ঘরের বউ। কি দিয়ে যে কি আপ্যায়ন করেন মাঝে মাঝে আমি খুব অবাক হই। ছুটিতে ওদের বাসায় না গেলে ভাবেন, বুঝি ভুলে গেছি, হয়তো আর মহব্বতটা আগের মতো নাই। অথচ আমি না কখনোই বদলাই, না কেউ আমাকে বদলে ফেলতে পারে। আমি জানি না, ‘সময়’ আমাদের সবাইকে কোন রাস্তায় একদিন নিয়ে যাবে।

৪/৯/১৯৮৬-ছবি

আজ পুরান একটা খাতা উল্টাতেই অনেক মজার মজার লেখা চোখে পড়ল। কোন অসতর্ক অবস্থায় কখন যে কি লিখেছিলাম নিজেরই মনে নেই। এক পাতায় লিখেছিলাম, “ছবি আমার জীবনে এক বিরাট অধ্যায় ফেলে যাচ্ছে বারবার। এক ছবি দেখে পাগল হয়েছিল কার্লা, আর টিভিতে বাংলা ছবি দেখে হয়ত পাগল হচ্ছে আরেকজন। কিন্তু ঐ দ্বিতীয় মানুষটির সম্পর্কে আমি কতোটুক জানি?”  আসমা মেয়েটি মাঝে মাঝে উদিত হয় আমার মনে, বিশেষ করে রাত এলে, অথবা বেদনায় বুক ভরে গেলে, মাঝে মাঝে মনে পড়ে ওর সুচিস্নাত মুখমণ্ডল ফজরের পরে। আচ্ছা, আমি কেন আসমা মেয়েটিকে নিয়ে ভাবছি?

মানুষ যখন একা থাকে, তার যখন আর কেউ থাকে না তার কথা বল্বার, বা তার কথা শুনবার, তখন সে কথা বলে রাস্তার ধারের বড় বড় গাছের সাথে। এটা দেখে হয়তো কেউ তাকে মানসিক ভারসান্য হারানো কোনো ব্যক্তি বলে ভুল করতে পারেন বলে হয়তো অনেকে সে কাজটাও করতে পারেন না। তাই, তারা প্রায়শই ডায়েরী লিখেন, তাদের কথাগুলি কোনো এক কাল্পনিক মানুষকে বলেন, অথবা নিজে নিজেই কথা বলেন। যখন সময় পেরিয়ে যায়, যখন আরো একা একা হয়ে যায়, তখন আগের সেই লেখাগুলি হয়তো কোনো এক অফুরন্ত অবসরে উল্টাতে উল্টাতে এটাই তুলনা করেন, যে সময় গুলি পেরিয়ে গেলো তা কি বর্তমান সময়ের চেয়ে আরো নিঃসঙ্গ ছিলো? সেই নিঃসঙ্গতা মানুষকে দোলায়িত করে, হয়তো কখনো কখনো বিচলিতও করে। আমি আমাকে নিয়ে সব সময়ই বিচলিত ছিলাম, আর এখন সেই বিচলিত অবস্থার কোনো পপ্রিবর্তন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

যখন সবাই থাকা সত্তেও কেউ আসলে নেই বলে মনে হয়, তখন নিজের সাহসের উপর আর নিজের কনফিডেন্সের উপর ভরষা করার নাম আত্ম বিশ্বাস। আমিও সেই আত্ম বিশ্বাসের উপর ভর করেই সকাল দেখি, সন্ধ্যা পার করি আর পরবর্তী দিনের জন্য সাহস সঞ্চয় করে ঘুমাতে যাই। কিন্তু আমাকে দেখে কি বাইরে দেখে এটা বুঝার কোনো উপায় আছে যে, আমি নিঃসঙ্গ? মোটেও না। কারন আমার এই নিঃসঙ্গতা একান্তই আমার।

মিটুলের ব্যাপারটাও আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে মাঝে মাঝে বুঝবার চেষ্টা করছি। আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আমাদের মানুষ গুলি এখনো অবধি ওই পর্যায়ে পৌছায় নাই যেখানে, পরনির্ভর কোনো পরিবার সদস্য তার মতামতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পরিবারের বাইরে পা রাখতে পারে বা এমন পর্যায়ে পৌছায় নাই যেখানে কারো উপরে হতাত করে নির্ভর করে তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল নিমিষেই জলাঞ্জলি দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। সাহস আর সামর্থ এক জিনিষ নয়। কোনো কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সামর্থ লাগে আবার কোনো কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে লাগে সাহস। কিন্তু বেশীর ভাগ সময়েই কোনো পরিস্থিতি সামালের জন্য লাগে দুটুই। আমার সাহস আছে, সামর্থ কতটুকু সেটা যাচাই করার সুযোগ নাই। আবার সামর্থের মধ্যে যতটুকু আছে, সেখানে অধিক রিস্ক নেয়াটা কতটা সাহসের ব্যাপার সেটাও আমি জানি না। সব কিছু নির্ভর করে আবারো সেই ‘সময়’।