০২/১১/১৯৮৭-এপেন্ডিক্স যে ২

০২/১১/১৯৮৭- এপেন্ডিক্স যে ২

আমার এপেন্ডিক্স জে অধিনায়ক ব্রিগেডে পাঠিয়েছন কিনা আমি জানি না। আমার এই এপেন্ডিক্স জে প্রথমে ইউনিট হয়ে ব্রিগেডের মাধ্যমে কমান্দারের এপ্রোভাল হয়ে ডিভিশনে জি ও সির কাছে যেতে হবে। জি ও সি যদি এপ্রোভাল দেন, তাহলে তিনি এটা আর্মী হেড কোয়ার্তারে পাঠাবেন। তারপর চীফের এপ্রোভাল হলেই আমার চাকুরী চ্যুত হবে। লম্বা প্রোসেস। আমাদের জি ও সি হলেন মেজর জেনারেল নুরুদ্দিন স্যার। আজ আমাকে ডি কু জানালেন যে, আগামি যে কনো দিন জিওসির ইন্টারভিউ হতে পারে। রেডি থেকো। ভাবলাম, তাহলে হয়তো ব্রিগেড থেকে আমার এপ্লিকেশন ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে।   

৩০/১০/১৯৮৭- এপেন্ডিক্স যে

আমাদের প্রতিটি ইউনিটেই আর্মির সব ফর্ম থাকে। এপেন্ডিক্স জে ফর্মটাও আছে। আমি একটা এপেন্ডিক্স ফর্ম নিয়ে আজ ফিল আপ করলাম। আগামিকাল অফিশিয়ালী জমা দেবো। ক্যাঃ শিহাব স্যার মানা করলেন। কিন্তু আমার তো আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না এই অবস্থায়। আমার এ ছাড়া আর কোনো উপায় আছে বলে মনে করি না। আর এই আর্মিতে আমার এমন কেউ নাই যে, আমি তার কাছে সাহাজ্য চাইতে পারি। আর আমার এখনো ক্যারিয়ার গড়ার অনেক সুযোগ আছে বাইরে। গেলে এখনি সময়। তাই আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। শিহাব স্যার অনেক পিঠা পাঠালেন আমার মেসে। ভাবী ও এলেন। খুব ভালো একজন মহিলা।

২৮/১০/১৯৮৭- উপধিন্যকের বাসায় যাওয়া

আমার অবস্থাটা খুব খারাপ। একদিকে মানষিক চাপ, অন্য দিকে ইউনিটের থেকেও অনেক চাপ। আমাকে ব্যস্ত রাখার সব ধরনের কৌশল সিও এবং উপ অধিনায়ক আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছেন। আমার কোনো স্বাধীনতা নাই, রেষ্ট করার সময় নাই, ডিউটি আর ডিউটি। দিন রাত অযথা ডিউটি। কোনো কাজ না থাকলেও কোনো না কোনো একটা কাজে আমাকে লাগিয়েই রাখা হচ্ছে।

আজ আমি উপ অধিনায়ক রফিক স্যারকে তার বাসায় গিয়ে দেখা করলাম। ভাবী দরজা খুললেন। বেশ স্মার্ট মহিলা। সম্ভবত মাথায় একটু কম চুল। তাই উপরে খোপা করেন। আমি স্যারের সাথে চা আর সিগারেট খেতে খেতে বললাম, স্যার আমি এপেন্ডিক্স জে দিতে চাই। এপেন্ডিক্স জে হচ্ছে সেচ্ছায় অবসর গ্রহনের একটি তরিকা। মেজর রফিক খুব চালাক লোক, তিনি মনে করেছেন, আমি হয়ত এমনিতেই ভয় দেখানো জন্য তাকে এটা বলতে এসেছি।

তিনি সাথে সাথেই বললেন, তুমি যদি এপেন্ডিক্স জে দাও, আমি ১ মাসের মধ্যে সেতা এপ্রোভ করিয়ে তোমাকে সাহাজ্য করতে পারি। আমি তার চালাকি বুঝি নাই কিন্তু আমি তো মনে মনে এতাই চেয়েছিলাম যেনো আমি এপেন্ডিক্স জে এর মাধ্যমে আর্মি থেকে বের হয়ে যাই।

খুব আনন্দের সাথে তার বাসা থেকে বের হয়ে এলাম। এসে এপেন্ডিক্স জে এর কপি একটা কোথা থেকে পাওয়া যায় সেটা খুজতে থাকলাম।

২০/১০/১৯৮৭ - কোর্ট অফ ইঙ্কোয়ারী

যেহেতু আমি আমার অপরাধ স্বীকার করেছি, ফলে ওয়ানম্যান কোর্ত অফ ইঙ্কয়ারী হল ২ দিনের মধ্যে যাতে আমার শাস্তি হয়ে গেলো 'কঠোর ভতর্সনা"। অর্থাৎ একতা লাল কালী। আমার উপ অধিনায়ক ছিলেন এই কোর্ট অফ ইনকোয়ারীর প্রেসিডেন্ট। আমার অবস্থা দিনকে দিন আরো খারাপ হতে থাকলো। ডিভিশনের মোটামূটি সবাই আমাকে এখন নামে চিনে, হয়ত কেউ কেউ আমাকে দেখলে চিনবে না যে, আমি লেঃ আখতার। মেসে অনেকেই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সাহসের তারিফ করেন বটে কিন্তু আবার অন্যদিকে এটা করা ঠিক হয় নাই এই মন্তব্যও করে।

১৭/১০/১৯৮৭- রাত ১১ টা

আজ ডিভিশনে গিয়েছিলাম। মেজর সালাম আমাকে অনেক প্রশ্ন করলেন আমি জি ও সির নাম্বার ব্যবহার করে বিদেশে কনো কল করেছি কিনা। করলে কিভাবে করেছি। আমি কনো কিছুই লুকাইলাম না।

বললাম, আমি প্রায় সপ্তাহ খানেক যাবত মেজর আকবর স্যারকে একটা বেদেশী কল বুক করার জন্য অনুরোধ করেও কোন ফয়সালা হচ্ছিলো না। অথচ আমার খুব দরকার ভাইয়ার সাথে কথা বলার। এখন আমি যদি আপনাকে বা অন্য কাউকে বলি যে, আমি জি ও সির টেলিফোন থেকে ফোন করতে চাই, আপ্নারা আমাকে পারমিশন দিবেন না। সেই পারমিশন দিবেন না এই আদেশ পাওয়ার পর ও যদি ফোন করি তাহলে আমি ২ তা অপরাধ করার সামিল হবে। তাই আর আপনাদেরকে আমার বলার দরকার মনে করি নাই। ভুল একটাই হোক।

১৬/১০/১৯৮৭- আমেরিকায় ফোন

আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। যেভাবেই হোক আমাকে ভাইয়ার সাথে কথা বলতেই হবে। এভাবে আর থাকা যায় না। গতকাল আমি ডিভ ডিউটি অফিসার হিসাবে ডিউটি করছিলাম ডিভ হেড কোয়ার্টারে। ডিভ ডিউটি অফিসার হলোঃ প্রতিদিন একজন অফিসার ডিভ অফিসেটেলিফোন অপারেতর হিসাবে কাজ করে। সারা ডিভিশনের একটা রিপোর্ট নেয়, কে বা কারা সেনানীবাসে এলো বাইরের থেকে, কি গাড়ি কোথায় গেলো, কেনো গেলো, কিংবা এই জাতীয় অনেক রিপোর্ট ফোনে ফোনে নিতে হয় মেইন গেট, ইউনীট ইত্যাদি থেকে। অনেক রাত। আমি ডিভ অফিসের এক ক্লার্ক কে আমার কষ্টের কথাগুলি এম্নিতেই শেয়ার করছিলাম। তার নাম শাহজাহান। সে সিগন্যাল ইউনিটের ক্লার্ক। আমাকে সে একটা বুদ্ধি বাৎলে দিলো যে, স্যার, জিওসির একটা সরাসরি ফোন নাম্বার আছে যা থেকে প্রিথিবীর যে কোনো জায়গায় কল করা যায়। আপনি একটা সুযোগ নিতে পারেন আপনার ভাইয়ের সাথে কথা বলার। কিন্তু জিওসির নাম্বার বলে কথা, যদি জেনে যায়, তাহলে কিন্তু অসুবিধা হবে।

আমার কাছে এখন কি অসুবিধা হবে আর কি সুবিধা হবে এটা চিন্তা করার কোনো অবকাশ নাই। ভাইয়ের সাথে আমার কথা বলতেই হবে। ফলে আমি জিওসির নাম্বারটা ক্লোন করে জিওসির টেলিফোনের তার আমার টেলিফোনের সাথে কানেকশন করে ভাইয়াকে রাত ১১ তায় ফোন করলাম। প্রায় ১ ঘন্টা কথা বললাম ভাইয়ার সাথে। আমি আমার সমস্যার কথাগুলি জানিয়ে বললাম, আমার আর আর্মিতে থাকা সম্ভব না, যেভাবেই হোক আমি বের হতে চাই। ভাইয়া আগে থেকেই আমার এই আর্মীতে আসা নিয়ে খুব নারাজ ছিলেন। এইবার আমার আর্মী ছারার কথা শুনে তিনি আমার সিদ্ধান্তকে সায় দিলেন।

কিন্তু কিছুক্ষন আগে ব্রিগেডের ডি কিউ মেজর বদ্দ্রোজা স্যার জানাইলেন আমাকে ডিভিশনের জিএসও-২ (অপ্স) মেজর সালাম আমাকে ডিভিশনে যেতে বলেছেন। বুঝলাম, ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে।

১২/১০/১৯৮৭- ইউনিটেই একঘরে

কয়েকদিন পার হয়ে গেল কিন্তু আমি কিছুতেই আমেরিকার লাইন পাচ্ছি না। মেজর আকবর ও কোনো ভাবেই মিলিয়ে দেবেন এই কথা আর বলছে না। রহস্যটাই  বুঝতে পারছি না। এদিকে গতকাল রাত ১ টার দিকে হটাত করে এফ আই ইউ ইউনিটের অধিনায়ক ক্যাঃ ফেরদৌস (১০ লং) আমার রুমে এসে হাজির। এসে বললেন, তোমার রুম চেক করবো। আমার তো মেজাজ খারাপ। আমি তার সাথে এক প্রকার ঝগড়াই করা শুরু করলাম, এটা কোন ধরনের কথা? আমি কি ক্রিমিনাল?

তিনি আমাকে বললেন, এতা ইউনিট থেকে আমাদের জানানো হয়েছে তোমার রুম হটাত করে চেক করার জন্য। যাই হোক, ব্যাপারটা আমার কাছে অত্যান্ত সিরিয়াস মেটার বলেই মনে হলো আর নিজের কাছে খুব অপমান বোধ করতে লাগলাম।

আমি ইউনিটের মধ্যে মোটামুটি এক ঘরের মতো হয়ে গেলাম। অফিসাররা খুব একটা আমার সাথে মিশতে চান না। ভালভাবে কথা বলে না। কোথাও একতা গন্ডোগল মনে হচ্ছে।