১০/ ১০/১৯৯৫-হাইতিতে মায়ের ডাক

হাইতিতে মিশন করতে এসে প্রায় প্রতিদিনই ইদানিং ঝুকিপূর্ন এলাকায় পেট্রোলিং করতে যেতে হচ্ছে। হাইতির সাধারন জনগন বাংলাদেশের কন্টিঞ্জেন্টের উপরই মনে হচ্ছে একটু ভরষা রাখতে পারছে আর বাকী ব্যাটালিয়ন গুলির (যেমন, পাকিস্থান ব্যাটালিয়ান, ইন্ডিয়ান ব্যাটালিয়ান, ক্যানাডিয়ান কন্টিনজেন্ট, অথবা ঈগল ক্যাম্প নামে আমেরিকান কন্টিনজেন্ট) উপর তেমন একটা ভরষা করতে পারছে না। ফলে এখানে যিনি এস আর এস জি (স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ অফ সেক্রেটারি জেনারেল) হিসাবে দায়িত্বরত আছেন, মিষ্টার লাখদার ব্রাহিমী, তিনি সব ফোর্সের সাথে বাংলাদেশের কাউকে না কাউকে অংশ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সে মোতাবেক, আমি এখন কিউ আরএফ (কুইক রি-একশন ফোর্স) এর একজন। আমার কাজ হচ্ছে যেখানেই কোনো সমস্যা শোনা যাবে, তাতক্ষনিকভাবেই আমার দল নিয়ে ক্যানাডিয়ান, অথবা আমেরিকান অথবা অন্যান্য ফোর্স কে অগম্যান্ট করা। জাগোয়ার রেডি, গাড়ি সব সময় স্ট্যান্ডবাই থাকে। আমরাও মোটামুটি এনটিএম ১০ (অর্থাৎ ১০ মিনিটের মধ্যে নোটিশ টু মুভ) অবস্থায় থাকি।

গতকালও একটা অপারেশনে গিয়েছিলাম।  জায়গাটার নাম ডেলমাস। খুব ঘন বসতি একটা জায়গা। অনেকটা বস্তির মতো। লোকজন ও খুব ডিসিপ্লিন না। সারাক্ষন নেশার মধ্যে থাকে অধিকাংশ লোক। এটা আসলে একটা মাদকের আড্ডাখানা আর কুখ্যাত লোকদের আশ্রয়স্থল। গতকালের গোপন খবরে জানা গেলো যে, এখানে অভ্যুথানকারী জেনারেল সেড্রাসের একটা বাহিনী কুছু আর্মস ডিল করবে।

সকালে আমি ঈগল ডেনে গেলাম ব্রিফিং ছিলো। বেশ কিছু গোপন তথ্য আমাকে এবং আমার অন্যান্য দল সমুহ যারা কাজ করবে, তাদের সবাইকে জানানো হলো। নির্দেশ ছিলো যে, যদি কেউ আমাদেরকে হুমকীর মধ্যে ফেলে দেয়, তাহলে যেনো আমরা সাথে সাথে ফায়ার ওপেন করি। মিশনে আসার পর আজ অবধি কখনো এই রকম একটা আদেশ পাই নাই যে, আমরা আমাদের ফায়ার আর্মস দিয়ে কাউকে গুলি করতে পারি। আজ পেলাম। ফলে মনে হলো অপারেশন টা খুব একটা সাধারন অপারেশন নয়।

সকাল ১১ তাঁর দিকে প্রথমে আমি আমার টিম নিয়ে ডেলমাসের উদ্ধেশ্যে পজিশন নিয়ে নিলাম। তাঁর ৫/৭ মিনিট পর পজিশন নিলো পাকিস্থান বাহিনীর একটা দল। আমাদের সবার এরিয়া ভাগ করা ছিলো। কোথায় আমেরিকানরা থাকবে আর কোথায় অন্যান্য টিম থাকবে। অপারেশনের মেইন দায়িত্তে ছিলো ঈগল বেসের। মানে আমেরিকানদের আন্ডারে। ওরা অনেক সতর্ক থাকে, কোনো কিছুই হেলাফেলা করে এগোয় না। ব্যাপারটা যেনো এমন, যে কোনো মুহুর্তে যে কোনো ঘটনায় তারা যেনো কুইক পালটা রি-একশনে যেতে পারে ঠিক তাই।

আমি একটা একতলা ভাংগা চুড়া বিল্ডিং এর ঠিক নীচে অস্ত্র আর ওয়াকি টকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার থেকে প্রায় ১০ গজ দূরে আমাদের বাঙ্গাদেশি একজন সার্জেন্ট রুহুল আমাকে কাভার দিচ্ছে। আমার আরেক পাশে প্রায় ৩/৪ গজ দূরে আমার ওয়্যারলেস অপারেটর দাঁড়িয়ে সারাক্ষন এদিক সেদিক লক্ষ্য রাখছে। হাইতির আবহাওয়া সব সময়ই গরম থাকে। এখানে কখনোই শীত পড়ে না। মানে এখানে কোনো শীত কাল নাই।

সকাল ১১ টা থেকে হাইতিতে প্রচন্ড রোদ থাকে বিধায় সারাক্ষন ঘামতে থাকি। ইউনিফর্ম ভিজে যায়। তারমধ্যে কোনো গাছ গাছালী নাই। এই দেশের লোকজন গাছ কাটতে কাটতে দেশতাই প্রায় উদ্ভিদ শুন্য হয়ে গেছে। দূরের পাহাড়ের মধ্যেও কোনো গাছ গাছালি নাই। ছায়া দিতে পারে এই রকম আছে শুধু আম গাছ। কারন এখানে সারা বছর আম ধরে। আম ওদের একটা অর্থকরী ফসল। তাই শুধু এই আম গাছ গুলিকেই ওরা কাটে না। এতো গরমের মধ্যে কোথাও ছায়া না থাকায় আমি যেখানে দাঁড়িয়ে পরিবেশ পর্যালোচনা করছি, সেতা একতলা একটি বিল্ডিং, তাঁর দুই ধার দিয়ে দুটো ছোট ছোট রাস্তা বা গলি চলে গেছে। কেউ গলি থেকে বের হলে কিংবা গলি দিয়ে প্রবেশ করলে আমার নজরে পড়বেই।

টার্গেট ধরার জন্য যেখানে ঈগল টিম কাজ করছে, আমরা তাঁর থেকে প্রায় ১০০ গজের মধ্যেই আছি। আমাদের কাজ, ওদের কে প্রোটেকশন দেওয়া এবং যদি বাইরে থেকে কেউ প্রবেশ করতে চায়, তাদেরকে প্রতিহত করা। এখানে কোনো যুদ্ধ চলছে না। অনেক সাধারন মানুষ হয়তো জানেই না কেনো আমরা এখানে কি কাজে অপারেশন চালাচ্ছি। এতা প্রায়ই হয় বিধায় ওরাও ব্যাপারতা বেশি আর গুরুত্ব দেয় না। ওপারেশন কে ওরা স্বাভাবিক ভাবেই নেয়।

প্রায় ১৫ মিনিট যাবত আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে ছিলাম। হটাত আমার মনে হলো, কে যেনো আমার নাম ধরে ডাকলেন। আমি যেনো স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমার মায়ের গলা। ঠিক এইভাবে উনি ডাকলেন, “এই বাবা…” খুব হতবাগ হয়ে আমি শব্দটা যেই ডাইরেকশন থেকে শুনতে পেয়েছি বলে মনে হলো, সেদিকে একটু নড়ে ঘাড় ঘুরালাম। হয়ত ২/৩ ফুট হবে। ঘাড় ঘুরাইয়া উকি মারতে গেলে একটা মানুষের যেটুকুন জায়গার পরিবর্তন হয় আর কি, ঠিক সেটুকুই হয়ত হবে। ঠিক এই সময়েই আবার আমি সার্জেন্ট রুহুল যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, সেও “স্যার” বলে অত্যান্ত উচ্চস্বরে ডেকে উঠলো। ফলে আমি আরো ২/৩ ফুট স্বরে গেলাম ওর ডাকে। আর ঠিক এই মুহুর্তেই দেখলাম, আমি যেখানে দাড়িয়েছিলাম, সেই বিল্ডিং এর ছাদ থেকে প্রায় ৩০/৪০ কেজির একটা কংক্রিটের স্লাব মাটিতে ধপাস করে পড়লো। আমি ওদিকে তাকাতেই দেখি কে একজন দ্রুত গতিতে এক ছাদ থেকে লাফ দিয়ে অন্য ছাদে গিয়ে পড়ে দৌড়াতে লাগলো।

আমরা ওকে দৌড়াইয়া ধরতে ধরতেই সে গলি থেকে গলি, এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি, এবং হারিয়ে গেলো। তাকে আর আমরা ধরতেই পারলাম না। ব্যাপারটা আমার কাছে অত্যান্ত চমকিয়ে দিলো। কে লোকটা? আর ঐ কংক্রিটের স্লাব তা যদি আমার মাথায় পড়ত, আমি সাথে সাথে মারা যেতাম। লোকটা আসলে আমাকে উদ্দেশ্য করেই ছাদ থেকে কংক্রিটের স্লাব তা আমার মাথায় পড়ুক এই উদ্দেশ্য নিয়ে ফেলেছিলো।

আমি ঘটনাটা আমাদের বাংলাদেশ কমান্ডারকে ওয়্যারলেস সেটে এবং অপারেশনের দায়িত্তে থাকা ঈগল কমান্ডারকে জানালাম। তারা দ্রুত আমার এখানে চলে এলেন। আর জানালেন যে, ওনারা যেখানে টার্গেট আছে বলে ইনফর্মার প্রতিবেদন দিয়েছিলো, আসলে সেটা ভুল ছিলো। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আসলে সেতাই ছিলো টার্গেটের মুল স্থান। আমরা যখন ওখানে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা পর্যালোচনা করছিলাম, অবজার্ভ করছিলাম, টার্গেট আমাদেরকেই টার্গেট করে কাউকে হতাহত করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

আমাদের অপারেশন বিফল হয়েছে।

আমি আমার রুমে ফিরে এসে অনেক্ষন একটা ব্যাপার নিয়ে খুব ভাবহিলাম। আর সেতা হচ্ছে, আমি কিভাবে আমার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। আমার কাছে কেনো মনে হলো যে, আমার মা আমাকে ডাকছেন? মা তো বাংলাদেশে। আর আমি হাইতি। মার ডাক তো কিছুতেই আমার শুনার কথা না। এটা কিভাবে হলো? আমি আসলে আমার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনেই কিন্তু প্রথমে ২/৩ ফুট স্বরে গিয়েছিলাম। তাঁর সাথে সার্জেন্ট হারুনের ডাকে আরো ২/৩ ফুট স্বরে গিয়েছিলাম। এতে মোট প্রায় ৫/৬ ফুট জায়গা পরিবর্তন হয়েছে। উপর থেকে কংক্রিটের যে স্লাব টা আমার মাথায় পরার কথা, আমার এই ৫/৬ ফুট জায়গা সরার ফলে ওটা আমার মাথায় না পড়ে খালি জায়গায় পড়েছিল আর আমি জীবন ফিরে পেলাম। আমি কিছুতেই ব্যাপারটা কাকতালীয় ভাবে নিতে পারছিলাম না। এখানে বলে রাখি যে, বাংলাদেশের সাথে হাইতির সময়ের ব্যবধান ১০ ঘন্টা। অর্থাৎ আমি যখন দিনের ১১ টায় হাইতিতে ডিউটিতে ছিলাম, তখন বাংলাদেশে রাত ১ টা বাজে। মা হয়ত ঘুমাচ্ছেন, অথবা তাহাজ্জুত নামাজ পড়ছেন।

আমি সন্ধ্যায় ঢাকায় আমার বউ এর কাছে ফোন দিয়ে বললাম, মা কেমন আছে? আমার মা আমার বউ এর সাথে থাকেন। মার সাথে কথা বললাম। মা প্রথমেই যা বললেন, আমার গা শিউরে উঠলো। মা বললেন, গতকাল রাতে আমি একটা খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেখলাম, কে যেনো তোমাকে পিছন থেকে মারার চেষ্টা করছে। আমার ঘুম ভাংগার ঠিক পর পরই আমি তাহাজ্জুতের নামাজে তোমার জন্য আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া করেছি। যেনো তোমাকে আল্লাহ সব রকমের বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। এ কথা বলে মা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন আমাকে নিয়ে এটাও প্রকাশ করলেন।

আমি হিসাব করে দেখলাম, যে মুহুর্তে মা তাহাজ্জুতের  নামাজে রত ছিলেন এবং যখন আল্লাহর কাছে আমার নিরাপত্তার জন্য দোয়া করছিলেন, ঘটনাতা ঠিক ঐ মুহুর্তেই ঘটেছিলো।

মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য সাথে সাথে আল্লাহ কবুল করেন, এতাই তাঁর প্রমান। মার দোয়ায় আল্লাহ যেনো কোনো এক গায়েবী আওয়াজে আমার কানে মায়ের স্বর পৌঁছে দিয়ে আমাকে মাত্র কয়েক ফুট সরিয়ে দিলেন। আর সেই ৩/৪ ফুট সরে যাওয়ার কারনেই এতো বড় একটা কংক্রিটের স্লাব ছাদের উপর থেকে ফালানো আমার উপর না পড়ে পড়লো খালী জায়গায়।

এই মায়েদের দোয়া আমি যেনো সারাজীবন পাই, সেই তৌফিক দান করুন আল্লাহ আমাকে। আমার মাকে তুমি সারাক্ষণ হেফাজত করো আর আমার মাথার উপরে যেনো তিনি ছায়ার মতো থাকেন সেই তৌফিক দান করো।