প্রচন্ড শক্তিশালী জীবের রাহু থেকে মুক্তি পেয়ে একটী ক্ষুদ্র প্রানির যা হয়, আজকে আমার অবস্থাটা যেন সেই রকম মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার মাথা থেকে একটা বোঝা কমে গেল। কিন্ত কেন মনে হচ্ছে একটা বোঝা কমে গেল এবং কি একটা বোঝা কমে গেল তাও বুঝতেছিনা। সারাদিন ঘুমে কাটাতে চাইলাম কিন্তু ভাল ঘুম হল না। গতকাল Firing থেকে ফিরে এসেছি।
হাট হাজারী Firing এ গিয়ে এবার একটা দৃশ্য দেখেছি । দৃশ্যটি আমাকে খুব ব্যথিত করেছিল। শুয়ে শুয়ে যেন ঐ কথা গুলো আমার কানে বারবার বেজে উঠছিল। আমি চট্টগ্রামের ভাষাটা বলতে পারি না, তাই আমার মতো করে ঘটনাটা লিখছি।
হাট হাজারী Firing range এর পচ্ছিম পাশে একটা চায়ের দোকান আছে। ওখানে চা খেতে গিয়েছিলাম আমি আর লেঃ তারেক (ভাল নাম হচ্ছে তারেক মোঃ ভাওয়ালি, আমরা ওকে কাওয়ালি বলেও ডাকি অনেক সময়)। চায়ের দোকানে আরো কিছু অচেনা লোক ও বসেছিলো। হয়ত এই এলাকার কেউ হবে। দেখলাম, ৫০ বয়সের এক বুড়ো চা বানাচ্ছে। মুখে তার ঘন সাদা দাড়ি, খালী গা, গলায় একটা গামছা জড়ানো। বুকের যতোগুলি পশম আছে, সবগুলিই পাকা। মাথায় চুল নাই বল্লেই চলে। খুব বেশি কাষ্টমার নাই, আমরা যারা এখানে ফায়ারিং করতে আসি, মুলত্তারাই তার খদ্দের। আর যারা হাট হাজারী ফায়ারিং রেঞ্জের এই রাস্তাটা ব্যবহার করে, বিশেষ করে স্থানীয়রা, তারাই এই চা দোকানের খদ্দের। আমি আর তারেক দুজনেই দুজনের অজান্তে বুড়ো লোকটিকে দেখছিলাম। এক সময় তিনজনই একসঙ্গে ব্যাপারটা মার্ক করাতে সবাই হেসে উঠলাম।
আমার একটা বদ অভ্যাস আছে। বুড়োমানুষ দেখলেই আমার গল্প শুনতে ভাল লাগে। তার অতীত গল্প। আমি এমন অনেক বুড়ো মানুষের সাথে নিছক গল্আপ করতে করতে এমন কিছু সত্যি কাহিনী জেনেছি, যা আমাদের সমাজের বড় একটা কাজের সাথে হয়ত জড়িত, অথবা এমনো দেখেছি, যতো নামীদামী মানুষের কথা আমরা জানি তাদের ঐ সব ইতিহাসের পিছনে এই সব লুকিয়ে থাকা মানুষের কন্ট্রিবিউশন। আমি বুড়ো লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম,
"চাচা আপনার বাড়ি বুঝি এখানেই?" বুড়ো আমার উত্তর না দিয়ে পাল্টা বলতে শুরু করলেন, “পোয়া এর আগে আমাকে এখানে দেখো নাই? "
আমি আসলে দেখবো কি, এবারই তো প্রথম এলাম এই ফায়ারিং রেঞ্জে। আমার সামরীক জীবনটাই তো বেশী দিনের না। আগে এলে হয়ত আমার সাথে তার পরিচয় নিশ্চয় হতো। আমার আগে যারা এখানে এসেছেন, তারা নিশ্চয় এই বুড়োকে ভালোভাবেই চিনে। হয়তো অনেকের সাথে তার পরিচয়ও আছে। এতো কিছু না বলে আমি শুধু চাচাকে বললাম, না চাচা, আমি এর আগে এখানে কখনো আসি নাই।
চাচা আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বললেন, এখানে অনেক অফিসাররা আসে, চা খায়, কিন্তু আজ অবধি কেউ আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কি করতাম আগে, আমার নাম কি ইত্যাদি কেহই কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। তুমিই মনে হয় এই প্রথম আজ আমাকেকিছু জিজ্ঞেস করলা। তবে এইটুকু বলি যে, আমি এলাকার লোক নই। আর কখনো এই এলাকায় বাস করবো এটা আমার সপ্নেও ছিলো না। তারপরেও নিয়তি বলে একটা কথা আছে, আমরা তাকে কখনোই হাত দিয়ে দূরে ফেলে দিতে পারি না। কেউ এটা বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক। আমি অন্তত এখন এই ৫০ বছর বয়সে এসে সেটা মনে প্রানে বিশ্বাস করি।
চাচা, কোনো দিকে আর না চাহিয়াই চা বানাইতে বানাইতে বলতে থাকে- শোন, তোমাদের মতো আমিও একদিন জোয়ান ছিলাম, আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমি তোমাদের থেকেও দ্রুত গতিতে দৌড়াতে পাড়তাম, আমার মাথায় ভর্তি কাল চুল ছিল। সারাক্ষন এই গায়ের কোথায় কি হচ্ছে, আমার নজর কখনই এরিয়ে যায় নাই। আইউব খানের বিরুদ্দে যুদ্ধ করেছি, ব্রিটিসদের বিরুদ্দে কত শ্লোগান দিয়েছি। সবাই ভাগছে, রাজাকারেরা জয় করতে পারে নাই এ দেশ, মুক্তিযোদ্ধা আছিলাম। দেশটারে স্বাধীন করেছি। তবে এখন মনে হয় জীবনে অনেক হিসাব কিতাব ঠিক মত করা হয় নাই। আইউব খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোন দরকার ছিল না, ব্রিটিশ দের বিপক্ষে এত কথা কবারও দরকার ছিল না, অথবা রাজাকার বলে জাগরে আমরা পাত্তাই দেয়ই নাই, হেরা এখন আমাগো দেইখা হাসে। সবাইরে খেদাইছি ঠিকই কিন্তু এখন যারা আছে তাগো ভাগাইব কে? আগে তো বাঁচার জন্য চায়ের দোকান দিতে হয় নাই, এখন তো বাঁচার জন্য চায়ের দোকান ছাড়া আর কোন গতি নাই। যখন মুক্তিযোদ্ধা আছিলাম, আমার বয়স ছিল ৩২ কি ৩৩। বউ আঁকড়াইয়া ধরল বউরে কইলাম, ভয় পাইস না, ফিররা আমু। কি লাভ হইছে ফিররা আইসা? বউ এখন বিছানা ছাইরা উঠতে পারে না। ভাত দিবার পারি না আবার ঔসধ।“
বুড়া লোকটি একটু থামলেন।
“ঐ যে পোশাকটা তোমরা পড়ে আছ, এটা পাবার জন্য অনেক জাবিউল মারা গেছে, অনেক জাবিউল চা বেচে বেঁচে আছে, অনেক রাহিমারা এখন বিছানায় শুয়ে আছে, তাঁদের দেখার কেউ নাই। তোমাদের উপর আমাদের কোন দুঃখ নাই, তোমরা আমাদের নাতিনাতকুরের মতো। কিন্তু আমাদের কি কেউ দেখার নেই?”
বুঝলাম, তাঁর নাম জাবিউল, তাঁর স্ত্রীর নাম হয়ত রাহিমা। তারপর? একটা বেন্সন সিগারেট আগাইয়া দিয়ে বললাম। নেন, একটা বেনসন খান।
জাবিউল বলে চললেন, “আরেক কাপ চা খাইবা?”
বল্লাম, দেন।
আমার শুনতে ভাল লাগছে জাবিউলের কথা। হয়তোবা আর বেশি জাবিউলরা নাই এ দেশে। হয়তো কালের ঘুর্নিপাকে একদিন আর কোন জাবিউলকে খুজে পাওয়া যাবে না। ইতিহাস কতো জায়গায় কতো ভাবে চাপা পড়ে আছে, কে রাখে তাঁর খবর?
“দেশ স্বাধীন হল, কি আনন্দ চারদিকে। আমরা এখন শুধু আমরা । ব্রিটিস গেছে, পাকিস্তান গেছে। আমরা যারা ফিরে এলাম, তারা খুব ভাগ্যবান মনে হলেও এখন মনে হয় যারা ফিরে নি তারা বেশি ভাগ্যবান। ওদের বেঁচে থাকার জন্য চা বেচতে হয় না । ওদের বেঁচে থেকে রাহিমাদের কষ্ট দেখতে হয় না। একটা চাকরীর জন্য অনেক দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট কোন কাজে আসেনি। পরে ওই সার্টিফিকেট আগুণে পূড়ে ফেলেছি। কি হবে একটা অযৌক্তিক সার্টিফিকেট রেখে? আমার বাড়ি আছিল ঢাকার পাশে বছিলা নামে এক গ্রামে। কত বছর আগে যে ঐ গ্রামটা ছাইরা আইছি, সেখানে যাইতে ইচ্ছে করে কিন্তু আমার ওখানে গেলে মন খারাপ হইয়া যায়। পাশে একটা গনকবরের সমাধি আছে। খালি যুদ্ধের কথা মনে পরে। খালি মানুষের লাশের গন্ধ আসে নাকে। যাইতে চাইলেও মন, শরীর যেতে চায় না। তাই এই জঙ্গলের কাছে পইরা আছি, বলতে পারো পালাইয়া আছি। জানো কার কাছ থেকে পালাইয়া আছি? নিজের কাছ থেকে।"
আমি প্রশ্ন করলাম, পালাইতে পারছেন? জবিউল আমার প্রশ্নের আগেই সে উত্তর দিল, "কিন্তু আমি জানি আমি পালাইতে পারি নাই। নিজের কাছে নিজে কেউ পালাতে পারে না।"
জবিউল আর কথা বলতে পারে না। তার গলা ভেঙ্গে আসছে, হয়ত তার চোখে পানিও এসে থাকতে পারে কিন্তু অন্ধকার সেই অশ্রু সবার চোখ থেকে আড়াল করে রাখল। সূর্য অনেক আগেই ঢলে পড়েছে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। আমি আরও একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে দেখলাম, জাবিউল তাঁর গামছাটা দিয়ে চোখ মুছছে। জাবিউল একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারা নাকি এ দেশের সর্বকালের সর্বর্শ্রেষ্ঠ সন্তান। কে বলেছিল এ কথা? জাবিউলরা বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে রাজাকারেরা। এখন দেশে রাজাকার আর রাজাকারের মধ্যে সিমাবদ্ধ নাই। অনেক রাজকার ৭১ এর পরেও জন্মেছে । রাজাকাররা শুধু দেশের স্বাধীনতায় বাধা দেয় না, যারা এ দেশের মানুষের স্বাধীনতাকে হরন করে, যারা গরিবের ধন চুরি করে, যারা ন্যায় অন্যায় কিছুই বুঝতে চায় না, যারা মানুষের ঘর বাড়ি দখল করে, যারা বিনা অপরাধে মানুষ খুন করে, মেয়েদের ধর্ষণ করে, যারা মানুষের মতামতের কোন সম্মান করে না, তারা সবাই রাজাকার।
এই জাবিউলের সামনে আমার ইউনিফর্মটাকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। রাত নেমে এসছে, মেসে ফিরতে হবে, জাবিউলকে শুধু একবার জড়িয়ে ধরা ছাড়া আমার আর কোন কিছুই দেবার নাই। আমি জাবিউলকে তাঁর অজান্তে একটা স্যালুট দিয়ে ফিরে এলাম। মনে হল আজ অন্তত একটা মুক্তিযোদ্ধাকে আমি প্রানভরে ইউনিফর্ম পড়ে স্যালুট করলাম যে আমার এই স্যালুটের জন্য বসে নেই। তাঁরপরেও সে একজন ইতিহাস রচনাকারী মুক্তিযোদ্ধা, যার জন্য আমি আজ একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক এবং যার জন্য আমি আজ একটা স্বতন্ত্র ইউনিফর্ম পেয়েছি। আমি জাবিউলের কাছে ঋণী, দেশ হয়তো নয়।