মাঝিরা সেনানিবাস-
১১ পদাতিক ডিভিসন থেকে আমার ফেয়ারওয়েল হয়েছে কারন আমি অফিসারস গানারী স্টাফ কোর্স করতে যাবো হালিশহরে। আমি বেসিক্যালি ফিল্ডের অফিসার কিন্তু গানারী কোর্স করতে যাচ্ছি এডি শাখার। আমি কখনো এডিতে কাজ করি নাই কিন্তু আমার বেসিক কোর্সে এডি এবং ফিল্ড থাকায় আমি যে কোনো গানারী কোর্সের জন্য কোয়ালিফাইড। গানারী স্টাফ কোর্সটাও একটা সিলেক্টিভ পরীক্ষার মাধ্যমে করতে হয়। ভরসা ছিলো না যে পাশ করবো কিন্তু যেভাবেই হোক হয়ে গেছে। জিএসও-২ পদবীতে থেকে এইসব পরীক্ষায় পাশ করা সহজ নয়।
আমি প্রকৃতপক্ষে ১১ পদাতিক ডিভিসন থেকে একপ্রকার এস্কেপ করার জন্যই আমি এডি গানারী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। এমন একটা পদবী (জিএসও-২ অপারেসন) কেউ ইচ্ছা করে ছাড়তে চায় না। কিন্তু আমি বুঝতেছিলাম যে, জেনারেল আনোয়ার এর বিদায়ের পর ডিভিসনে অনেক হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তখনো কোন জিওসির আগমন ঘটে নাই। শুনছিলাম যে, জেনারেল ইমাম নাকি আসবেন। আমি জেনারেল ইমামের সাথে ৪৬ ব্রিগেডে কাজ করেছি একবার যখন ঊনি ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। শক্ত মানুষ। পুরুপুরি বিএনপি ঘেঁষা। সরাসরি রাজনৈতিকবিদ বলা চলে।
যাই হোক, পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি সিউর ছিলাম না যে পরীক্ষায় পাশ করবো কিনা। এর মধ্যে বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জেনারেল ইমাম আসার আগে ১১ আর্টিলারি কমান্ডার ব্রি জেনারেল রফিক এক্টিং জি ও সি হিসাবে ১১ পদাতিক ডিভিসনের দায়িত্ত পালন করছেন। এই ভদ্র লোক কেনো জানি আমাকে একদম পছন্দ করেন না। কোনো কারন নাই, কথা নাই, বার্তা নাই, ঊনি আমাকে পছন্দ করেন না। এক্টিং জিওসি হবার পর ঊনি যেনো একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন কিভাবে তিনি আমাকে একটু বেকায়দায় ফেলবেন। ব্যাপারটা আমার কাছে একদমই ভালো লাগছিলো না। আমি অনেক খুজেছি কারনটা কি হতে পারে?
পরে অবশ্য জেনেছি ব্যাপারটা। কোনো একটা অফিশিয়াল কমেন্টকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে আমাকে অপছন্দ করা শুরু করেছেন। যেটা ওনার ঠিক হয় নাই। যাই হোক, আমি আমার জায়গায় তিনি তার জায়গায়। এখানে আরো একটা মন্তব্য না করলে হয়ত ভুল হবে যে, আওয়ামীলীগ ক্ষমতার আসার পর, মুজিব কিলিং এর জন্য অনেক ব্রিগেডিয়ারদেরকে এই আর্মি থেকে অকালীন অবসর দেওয়া হয়েছে। তারমধ্যে এই ১১ পদাতিক ডিভিসনের অধীনের অনেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জড়িত ছিলেন। আমাদের ১১ আর্টিলারি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিক সাহেবের নামেও একটা চিঠি এসেছিল মুজিব কিলিং এর ব্যাপারে। ভুলক্রমে চিঠিটি যদিও খুব টপ সিক্রেট ছিলো কিন্তু চিঠিটি চলে আসে আমাদের ডিভিসন হেডকোয়ার্টারে। আর আমার হেড ক্লার্ক কিচ্ছু না বুঝে চিঠিটি খুলে ফেলে যা একটা মারাত্মক অপরাধের মধ্যে পরে। আমি তখন ডিভিসন হেডকোয়ার্টারের বাইরে অনুশীলন এলাকায় ছিলাম। আমি যখন সন্ধায় অফিসে আসি, তখন দেখি এটা নিয়ে আমাদের ক্লার্ক লেবেলে বেশ কথা বার্তা হচ্ছে, যে, এখন কি করা যায়।
আমি চিঠিটি পড়েছিলাম এবং পরবর্তীতে ব্রিঃ জেনারেল রফিকের ব্রিগেড মেজর (বিএম) মেজর কায়সারকে ব্যাপারটা শেয়ার করে চিঠিটি পাঠিয়েছিলাম। ব্রিগেডিয়ার জেনারাল রফিক ভাবলেন যে, সম্ভবত আমি ইচ্ছে করে তার ব্যক্তিগত এমন একটা সেন্সেটিভ চিঠি পরার সাহস করেছি। ব্যাপারটা কোনো অবস্থাতেই সঠিক নয়। আর যেহেতু ওই চিঠিটা নিতান্তই ব্যক্তিগত ছিল না, এটা ডিভিসন হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিককে জানাতে বলা হয়েছে, সুতরাং এদিক দিয়ে আমাদের ডিভিসনের পক্ষ থেকে কোন ভুলও হয় নাই চিঠি খোলার কারনে। তবে এই ধরনের চিঠি সাধারনত স্টাফ লেবেলের অফিসারগন সরাসরি হ্যানডেল করেন বিধায় এটা হেড ক্লার্কদের কোনো অবস্থায়ই খোলার ইখতিয়ার নাই।
যাই হোক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিক আমাকে পছন্দ করুক আর নাইবা করুক, তাতে আমার কিছুই যায় আসেনা। আর তার সাথে আমি ইচ্ছে করলেও সরাসরি কাজ আমার সাধারনত হয় না। যদি আমাদের শাখার কোন কাজে তিনি আমার কাছে কৈফিয়ত চান, তাহলে হয়ত আমার সরাসরি দেখা বা কথা বলা হতে পারে। আর তা না হলে জিএসও-১ আছেন, কর্নেল স্টাফ আছেন ইত্যাদি।
আমি একটু এড়িয়েই চলছি এই ভদ্রলোককে। আমার ধারনা, তিনিও আমাকে বেশ এড়িয়ে চলছেন কিন্তু এটার কোনো প্রয়োজন ছিলো না।
এখানে আরো একটা মজার ঘটনা বলি। সম্ভবত তিনি আমার বড় ভাইয়ের শুসুর বাড়ির আত্তিয় সজনের মধ্যে কেউ চেনা জানা। কারন একবার আমি আমার বড় ভাইয়ের শশুর বাড়ির কোনো একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছিলাম ঊনার আগমন। পরে জানলাম যে, তিনি আমার বড় ভাইয়ের শশুর বাড়ির আত্তিয়দের মধ্যে কেউ হন। আমার একদম ভালো লাগে নাই এটা জেনে। কিন্তু সব ভালো লাগা তো আর আমার উপর নিরভর করে না। বেশীদিন এই যন্ত্রনা আমাকে সহ্য করতে হয় নাই কারন বেশ তাড়াতাড়ি জেনারেল ইমাম জিওসি হিসাবে চলে এসেছিলেন।