











Pic for Slider0123jpg
Pic for Slider012
Pic for Slider011
Pic for Slider010
Pic for Slider009
Pic for Slider008
Pic for Slider007
Pic for Slider006
Pic for Slider005
Pic for Slider003
Pic for Slider002
Pic for Slider001
যেদিন ষ্টাফ কলেজ করতে আসি সেই ১৯৯৭ সালে মীরপুরে, তখন আমরা প্রায় ৯০% অফিসারই মেজর পদবীর। সেনাবাহুনীর কিছু কিছু কোর্ষ আছে যেখানে জুনিয়ার আর সিনিয়ার মিলে কোর্ষ মেট হয়ে যায়। এই ষ্টাফ কলেজ সে রকমের একটা কোর্ষ। জেনারেল আজিজ আমাদের সাথে ২৩ ডি এস সি এস সি (ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কোর্ষ) করেন। খুবই সাদামাতা ক্যালিভারের একজন অফিসার। এটা বল্বো না যে, গননায় নেয়া যাবে না, কারন যারাই ষ্টাফ কলেজ করতে আসেন, তারা অনেক মেধার পরীক্ষা দিয়েই আসেন। কিন্তু এই মেধাবী অফিসারদের মধ্যে যখন তুলনা করা হয়, তখন সাদামাটা বলা চলে। আমরা একই সিন্ডিকেটে ছিলাম।
কালেভদ্রে আমরা যে কোনো কারনেই আর আর্মিতে থাকতে পারি নাই। এতার প্রধান কারন বাংলাদেশের রাজনীতি। এই অপরাজনীতি দেশের অনেক তুখুর মেধাবী ছেলেদেরকে দেশের অনেক কাজে লাগায় নি, লাগাতে দেয়া হয়নি। যারা বেশী তোষামোদি করতে পেরেছে, তারা হয়তো রয়ে গেছেন, আবার যারা মেনে নিতে পারেন নাই, তারা অকালেই সেচ্ছায় চলে গেছেন, আবার অনেকে বের হয়ে কি করবেন এই ভেবের যাতনাটা সহ্য করেই দাতে দাত লাগিয়ে রয়ে যায়।
প্রত্যেকের মাথায় অসংখ্য চিন্তাভাবনা ঘুরে। কেউ খুশী থাকে, কেউ অখুসী, কেউ হুসে থাকে, আবার কেউ বেহুসে, কেউ সন্তুষ্ট আবার কেউ অসন্তুষ্ট। কারো মুখ দেখে কার মাথায় কি চলছে তা কি কখনো জানা সম্ভব? কার মনে কি চলছে, কিংবা তার পরের মূহুর্তে সে কি করতে চলছে, এটা কি কেউ এতো সহজে বুঝতে পারে? কে কি ভাবছে, কি বুঝছে, তার প্রতিক্রিয়াই বা কি হবে, এটা কি আগে থেকে জানা সম্ভব? আমাদের সামনে নিসচুপ ভাবে ঘুরে ফেরা বা বসে থাকা সেই অতি সাধারন মানুষটার মাথায় কি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, সে কি চাচ্ছে, তার মধ্যে কতটা ঘৃণা, কতোটা রাগ, কতটা আবেগ ইত্যাদি তার অনুমান কি কেউ করতে পারে? আসলেই পারে না। আজ পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাষের মতো মানুষের মনের পূর্বাভাষ কখনোই কেউ দিতে পারে না। সিসিটিভি অথবা সার্টিফাইড সিকিউরিটি এজেন্সীগুলি শুধু মানুষের কাজকর্মের উপর নজর রাখতে পারে কিন্তু মানুষের মনের উপর বা পটেশিয়াল অপরাধীর মনের পরিকল্পনার উপর কোনো কিছু রেকর্ড করতে পারে না। ফলে, অনেক অপরাধ খুব সাধারন ভাবে ঘটে যায়, আর খুব সাধারনভাবেই সবার অলক্ষ্যে অপরাধী বেরিয়েও যায়। কখনো কখনো সেই অপরাধী আবার অনুশোচনাকারীদের মধ্যেও এমনভাবে ঢোকে যায় যে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিকারের দুক্ষে ভারাক্রান্ত মানুষটার ও জানতে পারে না, খুনী বা অপরাধী ঠিক তার থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে। তবে যেটাই হোক না কেনো, অপরাধ কোনো সমস্যার সমাধান নয়। একটা রোগ, প্রত্যেক স্টেজে এটা একটা সিম টপ দেখায়, তেমনি একটা অপরাধ সং ঘটিত হবার আগেও সতর্কবার্তা শোনা যায়। এজন্য, প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের চারপাশে কি ঘটছে, কিভাবে ঘটছে, কেনো ঘটছে এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বুঝতে না পারলেও মনের ভিতরে উকি মারা কোনো অযাচিত প্রশ্নকেও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। তল্লাসীতে হয়তো নিজেরা অনেক কিছু খুজে পায় না কারন তল্লাসির সফর লম্বাই হয়। সেই লম্বা সফরের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হয়তো আমাদের নাই কিন্তু মানুষের মন যখন কিছু আচ করে, সেটাই হচ্ছে তল্লাশীর প্রথম ধাপ। কোনো আওয়াজকেই হেলাফেলা করবেন না। ব্ল্যাক মেইল, সাধুবাদ, অতিরিক্ত লয়ালটি, কিংবা হোচট খাওয়ার মতো কোনো ইংগিত, কোনো কিছুই ঝেড়ে ফেলে দেয়া উচিত নয়। সবচেয়ে জরুরী বিষয় মনে রাখা উচিত যে, ব্ল্যাক মেইলের মতো কোনো ইংগিত বা এর আওয়াজ পাওয়ার সাথে সাথেই যারা বড়, সিনিয়র, তাদের সাথে এসব ব্যাপারগুলি পরামর্শ করা উচিত। হোক সেটা কোনো কারনে অথবা নিজের দোষেই। তারপরেও বড় ধরনের বিপদ থেকে হয়তো নিজে এবং আশেপাশের সবাই বেচে যেতে পারেন।
এক তরফা ভালোবাসার মতো এক তরফা শত্রুতাও হয়। আর এই শত্রুতা থাকে খুব গোপনে। এখানে চুপিসারে শত্রুকে মেরে ফেলা হয়। প্রতিশোধের আগুন কয়েক প্রজন্ম জলতে থাকে। এই জলন্ত অগ্নিশিখা মানুষের বংশ পরম্পরায় কখনো ফুলের উপর দিয়ে আবার কখনো ছুড়ির উপর দিয়ে যায়। তাই, সাবধানতা, নিজের নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা সর্বত্র এমন একটা হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে যেখানে অনেক বড় অঘটন থেকে মানুষ বেচে যায়। তারপরেও নিজের অজান্তে অপরাধ তো হয়েই থাকে।
এসব অপরাধের পিছনে থাকে অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা যা মানুষ প্রায়ই সিরিয়াসলী ভাবে না কিন্তু সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা অনেক সময় খুব শক্ত ইংগিত দেয় যা হয়তো আমাদের সাধারন মস্তিষ্ক আমলেই নেয় না। আমাদের মস্তিষ্ক আর তাদের তৈরী হওয়া চিন্তাভাবনা একদিক দিয়ে আমাদের এভাবেই ভাগ্য লিখে দেয় যেখানে কেউ হুসে থাকে, আবার কেউ বেহুসে থেকে সারাজীবন কাতরাতে থাকে।
অপরাধী ভাবে যে, সময়ের সাথে সাথে অপরাধের ভার লঘু হয়ে আসে এবং হয়তো এক সময় সেটা একেবারেই হালকা থেকে হালকা হতে হতে আর এটা কোনো অপরাধের মধ্যেই থাকে না। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় যে, পারফেক্ট ক্রাইম বলতে কিছু নাই। পারফেক্ট ক্রাইম তখনি হয় যখন ক্রাইমের ব্যাপারে সঠিক তদন্ত না।
দূর্নীতি কোনো একজনের কাজ নয়। দূর্নীতি আসলে একটি গোষ্টীর কাজ। আর নীচের লেবেলের মানুষগুলিই এর স্বীকার। অথচ এদের থেকে আবার আকাশ ছোয়ার আশা করা হয়। এরা যে টাকা পায়, তা অনেক ফিল্টার হয়ে নীচে নামে। আর দূর্নীতির মূল ঐ ছাকনীতেই থাকে। ছাকনীই যদি খারাপ হয়, দেশ থেকে কখনোই দূর্নীতি নির্মুল করা সম্ভব না। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ সবাইকে সমান করে ভাগ করে দিলেও দেখা যাবে, দূর্নীতির কারনে হয়তো কারো না কারো কাছে আরেকজনের থেকে বেশী সম্পদ পাওয়া যাবে।
অনেকে হয়তো বলতে পারেন যে, করাপশন কোনো গুন্ডামী নয় যে কারো গলায় ছুড়ি ধরে, দূর্নীতি কোনো শত্রুর নাম নয় যাকে আমরা হারাতে পারি, করাপশন আমাদের কাছে একটা ভয়ংকর রোগ, যতোদিন মানুষ থাকবে ততোদিন করাপশন থাকবে। কিন্তু আমি এই থিউরীর সাথে একমত হতে পারি না। ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, মানুষ কত ঔষধ বের করেছে, বড় বড় রোগকে হারিয়েছে, করাপশন যদি একটা রোগ হয়, তাহলে কোনো না কোনো রকমের চিকিৎসাও থাকবে। হ্যা, হয়তো কোনো এমুনিশন বা ইঞ্জেকশন তৈরী হবে না কিন্তু একটা সিস্টেম তো তৈরী হবে যে দূর্নীতি হতেই দেবে না।
আমরা যখন আমাদের সন্তানদের জন্য স্কুল খুজি, তখন একটা জিনিষ খুবই গুরুত্ত পায়, আর সেটা হলো সংস্কার, ভ্যালু। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে চাই সৎ শিক্ষা পাক, নীতির মধ্যে থাকুক, দূর্নীতির বাইরে থাকুক। কিন্তু বড় হবার পর এই সংস্কার, ভ্যালুজ, সততা, নীতিগুলি কি আর ব্যবহার করা হয়? ছাত্রজীবন শেষ করার পর যখন মানুষ কর্মিজীবনে প্রবেশ করে, তখন এই সংস্কারের অগ্নি পরীক্ষা হয়ে থাকে। সোজা রাস্তা বানানো আর সোজা রাস্তায় চলা দুটুর পার্থক্য আছে। যদি সততা নিজের কাছে মুল্যবান হয়, তাহলে এই দুইটার মধ্যে পার্থক্য নিজেই বুঝে যায়। সোজা রাস্তায় অনেক কাটা, ক্ষতবিক্ষত হতে হয়, অনেক রক্তপাত হয়।
একজন তরুন শিক্ষিত ছেলে বা মেয়ে অথবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় না শিক্ষিত হয়েও অনেক মানুষ ভালো সপ্ন দেখেন, সুস্থ্য সমাজের সপ্ন দেখেন, তারাও তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটা ভালো পরিবেশ উপহার দিতে চান যাতে আজকের প্রজন্মের পরবর্তী সময়ে তাদের রেখে যাওয়া আদরের প্রজন্ম নিরাপদ থাকে, ভালো থাকে। কিন্তু এমন একটা প্রিথিবী যেখানে সর্বদাই তার নৈতিক মুল্যগুলুকে কেউ না কেউ পিষে ফেলে দিচ্ছে। আর তারা অনেক উচু ক্লাশের মানুষ। তারপরেও অনেক মানুষ সপ্ন দেখে। সপ্ন পুরন করা খুব সহজ নয়, না কখনো সহজ ছিলো। আর ভবিষ্যতেও সহজ হবে না। আসলে ভালো সপ্ন দেখাই তো কঠিন। অথচ এই সপ্নই আমাদেরকে জোড়া লাগিয়ে রাখে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, আমরা এই সপ্ন নিয়েই বাচি। নিজের সপ্নকে কখনো ভাংতে নাই।
সুস্থ্য সমাজ গড়ে তোলতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুস্থ মানসিকতা, দূর্নীতিমুক্ত চিন্তা এবং চেতনা, সাথে এর কঠিন প্রয়োগ। আর এই প্রয়োগকারী হিসাবে প্রথম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ত রাষ্ট্রের নেতার, দেশের কর্নধার, প্রশাসনের। আর এদের মৌলিক ইউনিট হচ্ছে সেসব মানুষগুলি যারা করাপশন করেন না, এবং করাপশনকারীকে তারা নিজেদের প্রানের বিনিময়ে হলেও পাকড়াও করেন। যারা করাপশন করে না, তাদের কাছে টাকা আর সম্পদের কোনো মুল্য থাকে না। তারা শুধু বেচে থাকতে চান মানুষের উপকার করার জন্য। কিন্তু তাদের জন্য প্রতিনিয়ত রয়েছে মৃত্যুফাদ আর হুমকি। যখন কোনো নেতা, বা কোনো বড় মানুষকে প্রানে মেরে ফেলার হুমকী দেয়া হয়, তখন তাকে পুলিশের সুরক্ষা দেয়া হয়। ভালো রাষ্ট্র তা দেয়।
কেনো?
কারন তারা দেশের সেবক। যে একনিষ্ঠ এবং সৎ মানুষটি দূর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে, তাকে করাপ্টেড লোকেরা প্রানে মেরে ফেলার হুমকী সব সময়ই দিয়ে থাকে। তাই, এইসব ভালো মানুষগুলিকেও পুলিশের সুরক্ষা দেয়া উচিত। তারা দেশের সম্পদ। তাদের প্রান বাচানো দেশেরই উচিত। দেশের জন্য তারা অনেক মুল্যবান সম্পদ। যখন এইসব জ্ঞানী, গুনী, সৎ মানুষগুলির প্রান চলে যায় আর সমস্ত আনাচে কানাচের প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দায়সারা গোছের একটা তথাকথিত ইনভেষ্টিগেশনের নাটক সাজিয়ে গোলেমেলে একটা সমাধান দিয়ে দেয় এবং আসল সত্যকে অনুসন্ধানে বিরত রাখে, তখন এইটা বুঝতে আর কোনো অসুবিধা হয় না যে, রাষ্ট্রের অনেক উচু স্তরে এর জন্ম। তারাই কোনো না কোনোভাবে করাপশনের নিমিত্তে ঘটিত কেস ডিসমিস করে দেন নিজের মুখোশ আড়াল করার জন্য। কিন্তু আসলেই কি কেস ডিসমিস হয়ে গেলো বলে মনে হয় তখন? সর্বোচ্চ মহল যখন এই কথিত ইনভেষ্টিগেশনে খুসী হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন, তখন কারোই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ইনভেষ্টিগেশনে বানানো স্টোরি আসলে কি।
আর এভাবেই দেশের সম্পত্তি লুট আর তার বিরোধিতা করা মানুষের খুন কোনোটাই এদেশে শেষ হয় না। পত্রিকা খুলুন, টিভিতে নিউজ দেখুন, বড় বড় হেড লাইনসে রোজ একটা নতুন স্ক্যাম। কিন্তু ভিতরের পাতায় রোজ একজন সাধারন মানুষের, দিন মুজুরের খুনের নিউজ অতিশয়ই কিঞ্চিত। সাধারন জনতা, আপনি, আমি আজ থার্ড ক্লাস রোডের জন্য টোল ট্যাক্স দিয়ে থাকি। ওইসব রাস্তায় সফর করতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে থাকি। এই রাস্তাগুলি হয়তো কখনোই ভালো হবে না। হয়তো কোনো স্ক্যামে অভিযুক্ত কোনো ঠিকাদারেরও আজীবন সাজা ভোগের কোনো নথি নাই, উদাহরনও নাই। হয়তো বিদেশী ব্যাংকে গচ্ছিত কালো টাকাও কখনো এদেশে ফেরত আসবে না, আসেও না। তাহলে উপায়? উপায় একটাই। আমাদের সবাইকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা।
করাপশন দূরারোগ্য ব্যাধি নয়। করাপশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রথম হাতিয়ার হিসাবে আমাদের উচিত, করাপশনের বিরুদ্ধে লড়াই করা নিহত বা মৃত বীর মানুষগুলির কাহিনী শুধু কাগজ আর ইন্টারনেটে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং বাচ্চাদের টেক্সট বুকে জায়গা দেয়া, তাদের বুনিয়াদ তৈরী করা। আমাদের এটা দায়িত্ত যে, আমরা যেনো আগামী প্রজন্মকে করাপশন সম্পর্কে অবগত করি যেটা আমাদের মজবুত আর উন্নত দেশ বানাতে বাধা দেয়। দিতীয় ধাপের হাতিয়ার যদি বলি সেটা হচ্ছে-সমাজকে সর্বোচ্চ স্তর থেকে ভয় দূর করা, সুশাসন দেয়া। যদি সেটা না হয়, তাহলে করাপশন কোনোদিনই দূর তো হবেই না, ধীরে ধীরে এর প্রভাব এতোটাই বিস্তার হবে যার ফলে প্রতিটি মানুষ একে একে এর নেতিবাচক দিক পাবেন, হোক সেটা অনেক পয়সাওয়ালা বা দরিদ্র। বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই এই ব্যাধি থেকে পরিত্রানের অবস্থানে নাই আমরা, না দেশ। ছোট একটা গল্প দিয়ে শেষ করি লেখাটা-
একজন রাজা ছিলো। খুবই শয়তান আর নিষ্টুর রাজা। সে নিজের সভাসদ আর প্রজাদের খুব ভয় দেখিয়ে রাখতো। একবার সেই রাজা তার নিজের দর্জিকে বল্লো, আমাকে এমন একটা পোষাক বানিয়ে দাও যেটা কারোর কাছে নেই। আর সাথে এটাও বল্লো, যদি আমি জানতে পারি, এ রকমের পোষাক অন্য কারো কাছে আছে, তাহলে তোমার গলা কেটে দেবো। দর্জি খুব ভয় পেয়ে গেলো, বাড়ি ফিরে দুসচিন্তার মধ্যে পড়লো কিভাবে একটা উপায় বের করা যায়। সকালে উঠে সে রাজার জন্য একটা স্যুট তৈরী করে ফেল্লো, “হাওয়ার স্যুট”। দর্জি ঐ ‘হাওয়ার স্যুট’ রাজার উলংগ শরীরে পড়িয়ে দেয়। রাজা খুব খুশী হলো। সভাসদরাও খুব বাহবা দিলো। ঐ ‘হাওয়ার স্যুট’ পড়ে উলংগ রাজা নিজের প্রজাদের মাঝে যায়, তাদের মতামত জানার জন্য। প্রজারাও সবাই খুব বাহবা দিলো। কারোর এটা বলার সাহস হলো না যে, রাজামশাই, আপনি নিজের তামাশা নিজেই বানাচ্ছেন। সারাদিন উলংগ রাজা তার নগরে ঘুরে বেড়ালো। তারপর একটা ভবঘুরে বাচ্চা এগিয়ে এলো। আর জোরে জোরে হেসে বল্লো, “রাজা তো উলঙ্গ!!”
আমরা এই গল্পের শেষটুকু এখনো জানি না। কিন্তু নিশ্চয় ঐ ভবঘুরে বাচ্চাটা বাচেনি হয়তো।
এখন প্রশ্ন এটাই, করাপশনের বিরুদ্ধে গিয়ে ঐ জ্ঞানী সৎ মানুষগুলি কতদিনই বাচে যদি এই উলংগ অত্যাচারী রাজার মতো হয়? কারন তারা উলংগ রাজাকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ওরা উলংগ। তাই তাদের মরাই জরুরী।
পরিশেষে আমি বলতে চাই, আমায় মনে রেখো না, বা আমার কাজকেও মনে রেখো না। শুধু এইটুকু আশা রাখি যে, শুধু বার্তাটা মনে রেখো।
আজকাল যে কোনো সার্ভিস প্রোভাইডার, তা সে হোটেলই হোক, রেষ্টুরেন্টই হোক বা ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা যে কোনো পন্য, তারা ফিডব্যাক চেয়ে থাকে। তারা জানতে চায় যে, তাদের কাষ্টোমার তাদের সার্ভিসে খুশী হয়েছে নাকি হয়নি। এই ফিডব্যাকের মাধ্যমে প্রত্যেকে তারা জানতে পারে আরো ভালো সার্ভিস দেয়ার জন্যে তারা কি করতে পারে। অনেক সময় কাষ্টোমারের এই ফিডব্যাক দেয়া ডেটাবেজ অন্য মার্কেটিং কাজেও ফিড ব্যাক দেয়া কাষ্টোমারের অজান্তে অন্য আরেকটি সার্ভিস প্রোভাইডারের সাথে কানেক্ট করে তারাও আমাদের ফোন, ই মেইল আইডি ব্যবহার করে অন লাইনে ফিড ব্যাক চাওয়া শুরু করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-ফিড ব্যাক সিস্টেমের মাধ্যমে কাউকে এমন ব্যক্তিগতভাবে তথ্য দেয়া কখনো কি কোনো বিপদের কারন হতে পারে?
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য যেমন তাদের ফোন নাম্বার, ইমেইল আইডি, কিংবা ঠিকানা সবই খুব মুল্যবান তথ্য। কারন এই থথ্যগুলির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে মানুষের নিরাপ চলাচল আর নিরাপত্তা। কোনো কাষ্টোমার ফিডব্যাকের মাধ্যমে দেয়া তার কোনো তথ্য কোনো কোম্পানীকে দেয়া আর তার পরিবর্তে ওইসব কোম্পানী কাষ্টোমারের এই তথ্যসমুহ একে অপরের কাছে আদান প্রদান করা কি বেআইনী নয়? অথচ সব সার্ভিস প্রোভাইডার এটাই করে থাকে। যদিও ফিড ব্যাক ফর্মের মধ্যে ষ্পষ্ট করে এটা দাবী করা হয় যে, কাষ্টোমারের ব্যক্তিগত তথ্য তারা গোপনী এবং সুরক্ষিত রাখবে। অথচ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সেটা তারা রক্ষা করে না। ফলে যারা আমাদের ফোন নাম্বার কিংবা ইমেইল আইডী পাওয়ার কথা না, তারাই প্রতিদিন আমাদেরকে ফোন করে করে, মেইল করে করে হয়রান করতে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবি, তারা আমার নাম্বার বা আইডি পেলো কিভাবে? ক্রেডিট কার্ড, বিভিন্ন পন্যের বাজার কিংবা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী কতই না বিরক্ত করতে থাকে আমাদের প্রতিদিন। আমরা হয়তো কোনো এক জায়গায় বিশ্বাস করে কোনো একটা ফিডব্যাক ফর্মে আমাদের ব্যক্তিগত নাম্বার, বা মেইল এড্ড্রেস দিয়ে থাকি বটে কিন্তু হাজার হাজার কোম্পানী থেকে প্রতিনিয়ত কল আসতেই থাকে যাদের সাথে আমাদের কোনো কালে কোনো যোগাযোগই ছিলো না। কোনো একটা প্রয়োজনীয় বিষয়ে ইনকুয়ারী করা কল, আমাদের জন্য নিয়ে আসে হাজারটা অপ্রয়োজনীয় কল। এম্নিতেই তো “ডু নট ডিস্টার্ব ফ্যাসিলিটি” আছে, তবু আমাদের শান্তি ভাংতে কল এসেই যায়। কেউ কেউ এটা বলতে পারেন যে, কঞ্জিউমারের কালচারে এসব তো চলতেই পারে, কিন্তু এই কালচারে সবাই বিশেষ করে সার্ভিস প্রোভাইড করেন যে সব ষ্টাফ, তারা তাদের ক্রেডিবিলিটি দেখাতে কিছু না কিছু ব্রেক থ্রো পেতেই চায়, তাই এই বিনা অনুমতিতে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে অন্যকে তারা টার্গেট করে নতুন বাজার তৈরী করতে চায়। ফলে ফিডব্যাক ফর্ম এমন একটা কালচার তৈরী করে ফেলেছে যে, কোম্পানীগুলি মিলে যেনো একটা কর্পোরেট বাজার আর আমরা তাদের পৃথক পৃথক গ্রাহক হয়ে দাড়িয়েছি। বাধা দেয়ার মতো কোনো সিস্টেম আমাদের হাতে অন্তত নাই হোক সেটা আমার দরকারী বা বিরক্তিকরের। আর এই সার্ভিস প্রোভাইডারের নাম করে কখনো কখনো কোনো না কোনো ব্যক্তি আমাদের জীবনে তার নিজের সার্থে বা প্রয়োজনে মারাত্তক একটা হুমকী হয়ে দাড়াতে পারে ব্ল্যাক মেইলিং এর মতো কোনো জালে ফাসিয়ে দিয়ে।
তাই, যতোটুকু পারা যায়, আমাদের উচিত আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য কোথাও লিক না করতে দেয়া। সেটা ফিড ব্যাক ফর্মই হোক কিংবা অন্য কিছু। পরিবারের নিরাপত্তার চেয়ে বড় আর কোনো নিরাপত্তা নাই। পরিবারের নিরাপত্তা মানেই সমষ্টিগতভাবে সার্বিক দেশের নিরাপত্তা।
আগের বার একটা পোষ্টে বলেছিলাম যে, আমার মতো সব ভাগ্যবান স্বামীদের জন্য আমার কোনো উপদেশ নাই কিন্তু যাহারা আমার মতো এইরুপ সুপ্রশন্ন ভাগ্য লইয়া জীবন সুখে অতিবাহিত করিতে চাহেন কিন্তু এখনো সেই সোনার হরিন হাতে পাইতেছেন না বা হন্যে হইয়া খুজিতেছেন, তাহাদের জন্য আমার কিছু উপদেশ আছে বৈ কি।
যেমন ধরুন, আমি আমার স্ত্রীর কাছে আজ থেকে ২০ বছর আগে ১০ হাজার টাকা কোনো কারনে লোন নিয়েছিলেম। এই ২০ বছরে কতবার এটা শোধ করেছি সেটা আর বলার কোনোই দরকার নাই। আমার জানাই ছিলো না যে, স্ত্রীর কাছ থেকে লোন নেয়া টাকা কখনোই পরিশোধ হয় না। তার পাওনা টাকা আপনি ফেরত দিবেন না কেনো? তিনি কি আপনার পর মানুষ? আপনজনের বিশেষ করে স্ত্রীর কাছে পাওনা টাকা সব সময় অপরিশোধিতই থাকে। মাঝে মাঝে আবার ঐ টাকা থেকে আমার স্ত্রীও লোন হিসাবে এডভান্স নেয়, কিন্তু সেটা সব সময় অফেরতযোগ্য। যদি আপনি সুখী সমৃদ্ধ থাকতে চান, লোন নেয়াটা মনে রাখবেন, লোন পরিশোধ করলেন সেটা মনে রাখার কোনোই দরকার নাই। আর যদি এইটা নিয়ে বারবার মনে করাইয়া দেন, তাহলে আপনার রাতের পরোটাতে একটু হলেও পোড়া গন্ধ পাইবেন। পোড়া পরাটা খাইতে গিয়া আবার কৈফিয়ত চাইয়েন না, কারন এটা চুলার দোষ মনে কইরা স্ত্রীর সহিত সহমর্মিতা প্রদর্সন করা ভালো স্বামীর গুনাবলীর মধ্যে একটা।
আর আপনি যদি মাসের সাংসারিক খরচের সব টাকা একবারে স্ত্রীর কাছে দিয়া নিজেরে সংসারের খরচের দায়িত্ত হইতে খালাস মনে করেন, আপনি নির্ঘাত ভাবিয়া নিতে পারেন, আপনার বিয়ের বয়স হয় নাই। সবসময় মানিব্যাগে পর্যাপ্ত পরিমানে ক্যাশ টাকা মজুত রাখিবেন। স্ত্রীর সংসারের খরচ সবসময় তার হাতে থাকে না। আপনার মানি ব্যাগ সব সময় তার জন্য পুর্ন রাখবেন। হিসাব নিতে যাইয়েন না কত নিলো, যদি নিতে চান, আরো যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর একান্তই যদি হিসাব যদি নিতে চান, তাহলে অন্তত দুই মাসের এডভান্স টাকা দিয়া আশেপাশে আরেকটা ব্যাচলর মেসে একটা সিট বুক করিয়া রাখিবেন। যদি কোনো কারনে ঘরের দরজা বন্ধ হইয়া যায়, তাহলে অন্তত ব্যাচেলর মেসে আপনার জায়গা হইলেও হইতে পারে। অন্তত কাটাইতে পারিবেন। যদি এহেনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আগে থেকেই বাসাটা স্ত্রীকে চিনাইয়া রাখিয়েন। তা না হইলে পুলিশ আবার স্ত্রীদের চোখের পানিতে স্বামীদেরকে ধরার জন্য একটু বেশী আগ্রহ থাকে। আরেকটা খুবই গুরুত্বপূর্ন তথ্য মাথায় রাখা দরকার-তার টাকা তার টাকা, আপনার টাকাও তার টাকা। এটার উলটা আবার ভাবতে যাইয়েন না।
আমার স্ত্রীর এই কথাটা বড়ই সত্য যে, তাহার মতো বউ আমার কপালে জুটিয়াছিলো বলিয়া এতোদিন সংসার টিকিয়া আছে। অন্য কোনো স্ত্রী হইলে আমার কপালে কত যে বিরম্বনা বাধিত তাহার কোনো ফর্দ থাকিতো না। আমি অনেক হিসাব করিয়া দেখিয়াছি, ঠিকই তো বলিয়াছে। তাহার কথা একেবারে ভগমানের অস্তিত্তের মতো সত্য। কারন, আমি কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়ীক হিসাব অনায়াসে করিতে পারিলেও সংসারের চাল, ডালের হিসাব, কিংবা কোন শব্জিতে কতটুকু তেল ঢালিলে কি পরিমান সাধ হইবে, কিংবা ডিমটা কতোক্ষন গরম পানিতে সিদ্ধ করিলে উহার খোষা ছাড়াইতে আর বেগ পাইতে হইবে না, এইসব ব্যাপারে আমার থেকে নাদান মনে হয় আর একটাও এই দুনিয়ায় আল্লাহ সৃষ্টি করিয়াছেন কিনা আমার জানা নাই। আমি স্রিষ্টিকর্তার কাছে অতিশয় বিনয়ের সাথে কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করি যে, তাহার মতো একজন রুপবতী, গুনবতী এবং মাতৃসুলভ একজন স্ত্রী দান করিয়াছেন। হে ঈশ্বর, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
মাতৃসুলভ কেন বলিলাম?
এই বয়সে আসিয়া আমরা প্রায় ভাইবোনের মতোই যেনো হইয়া গিয়াছি। আবার তিনি যখন আমাকে কোনো কিছু আদেশ করেন কিংবা কোনো ব্যাপারে জ্ঞান দান করা শুরু করেন, তিনি সেই বিষয় সম্পর্কে এমন করিয়া আমাকে বুঝাইয়া দেন, যেনো তিনি মায়ের মতোই ৭ বছরের কোনো বালককে কিছু বুঝাইতেছেন অথবা ক্লাসে কোনো নির্বোধ ছাত্রকে কঠিন কোনো থিউরী পড়াইতেছেন। কাগজে আকিয়া, হাত নাড়াইয়া, তথ্যবহুল উদাহরনের মাধ্যমে তিনি আমাকে ব্যাপারটা যুতসই জ্ঞান দিয়া একেবারেই সহজ করিয়া আমার ঘিলুতে প্রবেশ করাইয়া দেন। তাহার পরেও যদি তাহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকিয়া যায় যে, আমার মতো একটা নির্বোধ মানুষ পুরু ব্যাপারটা বুঝিয়াছে কিনা কে জানে? তাই আবার ফোনে কিংবা ডিজিটাল মেসেজেও পুনরাবৃত্তি করেন। আমি সতর্ক মানুষ, তাই একবার বুঝিয়া থাকিলেও যেনো কিছুটা বুঝিবার বাকী ছিলো এই ভান করিয়া অতি মনোযোগের সহিত কানের কাছে ফোনটা ধরিয়া বোবা প্রানীর মতো পুলকিত ভাব দেখাইয়া, “এইবার ব্যাপারটা বুঝিয়াছি” বলিয়া উচ্ছাসিত আবেগ প্রকাশ করি। তিনি খুশী হন। আমিও মনে মনে হাসি যে, ব্যাপারটা বুঝিয়াছি।
আমার মতো সব ভাগ্যবান স্বামীদের জন্য আমার কোনো উপদেশ নাই কিন্তু যাহারা আমার মতো এইরুপ সুপ্রশন্ন ভাগ্য লইয়া জীবন সুখে অতিবাহিত করিতে চাহেন কিন্তু এখনো সেই সোনার হরিন হাতে পাইতেছেন না বা হন্যে হইয়া খুজিতেছেন, তাহাদের জন্য আমার কিছু উপদেশ আছে বৈ কি।
যেমন ধরুন, তিনি আপনার মোবাইল ফোনটা ব্যবহার করতে চান। কোনো দ্বিধা করিতে পারিবেন না। হাসিমুখে দিয়ে দিন। আর তিনি আপনার মোবাইল ফোন ব্যবহার করিবেন না কেনো? অবশ্যই করিবেন। তাহার বন্ধু বান্ধবীদের সাথে অনেক জরুরী খোশগল্প করার জন্য তাহার মোবাইলের টাকা খরচ তিনি কেনো করিবেন? তিনি তো আপ্নাকেই ফোনে এতো উপদেশ, বুদ্ধি, পরামর্শ দিয়া থাকেন, তাহাতেই তো তাহার ফোনের ব্যলান্স অর্ধেক হইয়া যায়। আপনার নাদানত্তের কারনেই তাহাকে অনেক মোবাইল বিল ছাড় দিতে হয়। এখন তিনি তাহার বন্ধু বান্ধবীর সাথে এই অল্প কয়েক ঘন্টা কথা বলিয়া মনের ভাবটা পুরন করিবেন, তাহার জন্য তাহার মোবাইলের টাকা খরচ করিবেন কেনো? ইহা বড়ই অন্যায়। ফোনটা তাহার হাতে তুলিয়া দেন। রাগ করিবেন না। আপনার জরুরী ব্যবসায়ীক কথাবার্তার চেয়ে তাহার মন ভালো রাখাটা অতীব আবশ্যক।
যদি রাগ হইয়া থাকে আপনার, ভুলেও উহা তাহার সামনে প্রকাশ করিবেন না। তাহা হইলে যেটুক আরাম করিয়া নাক ডাকিয়া ঘুমাইতে পারিতেন, সেইটুকুও আর আপনার কপালে জুটিবে না। এমনো হইতে পারে, আপনার উপর অসন্তুষ্ঠ হইয়া মনের আবেগী কষ্টে তিনি তাহার ফেসবুক আইডিতে এমন কিছু মন্তব্য করিয়া ফেলিতে পারে, যাহার কারনে তাহার অন্যান্য ফেসবুক বন্ধু বান্ধব্দের অতিরিক্ত ভালোবাসায় আর উদারতার কমেন্টে আপনার জীবন যতোটুকু স্থিত হইয়াছিলো, ইহা আবার অস্থিতিশীল হইয়া আরব বসন্তের মতো আপনার সিংহাসন তো কাপিবেই, আপনার বুকের ভিতরের ছোত হৃদপিণ্ডটাও কাপিয়া উঠিতে পারে। কারন তাহাদের “কিরে কি হইলো আবার?”, “তোর মন খারাপ? আরে দুনিয়াটাই এই রকমেরই, কেউ বুঝতে চায় না রে বইন”, কিংবা এমনো কমেন্ট পাইতে পারেন, “উফ আপু, আপনার কষ্টে আমারো বুক ফাটিয়া যাইতেছে, সব পুরুষ মানুষ এক রকমের” অথবা আরো উচ্ছসিত হইয়া কোনো একসময় বাসে একত্রে যাতায়ত করিতে গিয়া কয়েক মিনিটের পরিচয়ী বান্ধবী এমন কমেন্টও করিতে পারেন যে, “আরে আপু, বেটারে ছেড়ে দিয়ে শিক্ষা দেন, দেখবেন, কত কাঠালে কত বিচি” ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই রাগ দমাইয়া রাখেন। তাহার পরেও যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করিতে না পারার কারনে রাগ করিয়াই থাকেন, তাহা হইলে অতিসত্তর রাগ কমিলে তাহাকে ভাই বোনের মতো আদর করিয়া ইহা বলুন, “আরে, মাথা ঠিক ছিলো না, দোষ তো তোমার না, দোষ ঐ পল্টু মিয়ার। সেইই তো আমার মাথাটা অফিসের সময় বিগড়াইয়া দিয়াছিলো, আর সেই কারনেই তো আমার রাগ হইয়াছিলো”। এই সময়ে কিছু কঠিন কথা শুনিবার জন্য মন প্রস্তুত রাখিবেন। যেমন ধরুন, “তোমার এই সংসারে আইস্যা আমার জীবন তেজ পাতা হইয়া গেলো, কি পাইলাম এই জীবনে হায় ভগবান?, কিংবা আমাত্রে সোজা পাইয়া যা খুশী কইরা গেলা, অন্য কেউ হইলে দেখতা কবে তোমারে ছাইরা যাইতো গা? ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পর্যন্ত হইলে আপনি নিছক অতশয় ভাগ্যবান। আপনার চৌদ্দ গোষ্টির কেউ বাচিয়া থাকুক আর নাইবা থাকুক, তাহারা এই সময়ে জীবিত হইয়া আপনার মতো অকর্মন্য লোকের কারনে তাহারাও কিছু কঠিন মধুর কথা শুনিতেও পারেন। ভাগ্যিস, তাহারা এখন বধির এবং পরকালে থাকায় কোনো শক্তি খাটাইতে পারেন না, তাহা না হইলে, এই সময়ে আপনার স্ত্রীর কথায় আপনার কান ঝালাপালা না শুধু, সেইসব চৌদ্দ গোষ্ঠির এক থাপড়ে আপ্নিও বধির হইবার সম্ভাবনা থাকিতো।
(চলবে)
বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, তখন ওদেরকে কখনো হাতছাড়া করবো এটা মাথাতেই আসে নাই, কারো আসেও না। তখন সময়টা এক রকমের। হোক সেটা ছেলে বা মেয়ে।
যখন ওরা মাত্র বেবি, ওরা যখন কথা বলাও শুরু করে নাই, কিন্তু ঝড়ের গতিতে হাত পা নাড়তো, খুব মজা লাগতো দেখে, ওটাই ছিলো বেবিদের ভাষা। তখন তো মনে হতো, আহা, কি মিষ্টি বাচ্চারা। কথা নাই অথচ হাত পা নেড়েই যেনো সব কথা বলে। এই ভাষাতেই ওরা জানান দিতো, ওদের হাসি, আহলাদ, কিংবা কষ্টের ইংগিত।
ওরা যখন হাটতে শিখলো, তখন তো ওরা যেনো আরো সাধিন। যেখানে খুসী হাটা ধরে, যেনো সারা প্রিথিবী ওদের জন্য। ওরা হয়তো জানেই না কোনটা ওদের জন্য বিপদ আর কোনটা ওদের জন্য ফ্রেন্ডলী। আর এই পার্থক্যটা আমরা পেরেন্টসরা বুঝি বলে সারাক্ষন আমরা আমাদের বাচ্চাদের আগলে রাখি, ধমক দেই, শাসন করি।
ওরা অনেক সময় আমাদের এই শাসনের ভাষা হয়তো বুঝতে পারে না বলে মনের আবেগে চোখের পানি ফেলে, রাগ করে না খেয়ে থাকে, অভিমান করে কথা বলা বন্ধ করে, ডাকলেও শুনে না, আরো কতকি?
টাইম মতো ওরা না ঘুমালে আমরা ওদেরকে হয়তো বকা দেই, গোসল ঠিক মতো করেছে কিনা, ঠিক সময়ে খাবারটা খেলো কিনা, সব বিষয়েই আমরা সর্বদা সজাগ থাকি। জোর করে করাই আর ওরা হৈচৈ করে। অনেক সময় পুরু বাড়িটা হই চই এর মধ্যে রাখে, সরগোল আর চেচামেচিতে বাড়িটায় যেনো একটা শব্দদূশনে পরিনত হয়, চারিদিকে ছেড়া কাগজ, ঘরে বইপত্র অগোছালো করে দিশেহারা করে রাখতো। ওরা মাঝে মাঝে কত আবদার করতো, অনেক আবদার নিছক শখে কিংবা অনেক আবদার না বুঝেই। আর সেটাই হয়তো ওদের সারা রাতের খুসী অথবা কষ্টের কারনে ঘুম নষ্ট হতো। যদি পেতো, সারাটা রাত না ঘুমে আবার যদি না পেতো তাতেও সারা রাত না ঘুমে কাটিয়ে দিতো অভিমান করে।
এই বাচ্চারাই যখন আর ধীরে ধীরে সমাজের বিভিন্ন কর্মকান্ডে ঢোকে যায়, ঘর থেকে বেরিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, আমরা এই ভাগ্যবান পিতামাতা অভাগার মতো একা হয়ে পড়ি। মন খারাপ হয়, স্মৃতি পাহাড়ের মতো স্তুপ হয়ে যায়। তখন, এই সব আদুরে বাচ্চাদের ফেলে যাওয়া খেলনা, পরিত্যক্ত হাতের লেখার খাতা, কিংবা তার ব্যবহৃত কোনো পোষাক দেখলেই আমাদের বুকে হটাত করে ধক করে উঠে ব্যথায়। তখন তাদের অতীতের পদচারনা আমাদের কানে ঝুমকোর মতো বাজে, ওদের অতীতের একগুয়েমী রাগ কিংবা আব্দারের কথা কিংবা অযথা রাগ অভিমানের স্মৃতির কথা মনে করে আমার চোখের কোন ভিজে উঠে। মনে হয় মাঝে মাঝে, আহা, ঘরটা একসময় কত ভর্তি ছিলো, আজ একেবারেই শুন্য। ঘরকে নোংরা করার জন্য কত বকা দিয়েছি, বাথরুমের সেন্ডেল পড়ে সারা ঘর ঘুরে বেড়ানোর জন্য কত বকা দিয়েছি। অযথা রাগ অভিমান করে খাবার না খাওয়ার জন্য রাগ করেছি, শাসন করেছি, অথচ আজ, আমার বাড়ির প্রতিটি ঘর শুন্য, একদম পরিপাটি যা সব সময় রাখতে চেয়েছিলাম ওরা যখন ছিলো। আজ আর কেউ বাথ রুমের সেন্ডেল পড়ে ঘুরে না, আজ আর কেউ আমার কাছে অনলাইনে শপিং করার জন্য একশত টাকা আবদার করে না, কিংবা হটাত করে পিজার অফার থাকলেও আর অফারের জন্য বায়না ধরে না। সব যেনো নীরব। আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যখন ওরা সাথে ছিলো? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘরে সবাই শান্ত হয়ে থাকে? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘর নোংরা না করে সারাক্ষন পরিপাটি করে রাখুক? অথচ আজ ঠিক তেমনটাই তো আছে। কেউ ঘরে নাই, কেউ ঘর নোংরা করে না, কেউ হৈচৈ করে না। কিন্তু তারপরেও কেনো মনে শান্তি নাই? কেনো মনে হয়, ঘরটা নয়, অন্তরটা শুন্য? যেখানেই তাকাই সব ঠিক আছে, শুধু ঘরটাই খালী।
আজ কেনো জানি বারবার মনে হয়, ওরা আবার ফিরে আসুক, ওরা আবার আমার সাথে আবার ঝগড়া করুক, ওরা আবার আমার কাছে অহেতুক বায়না ধরুক, আমি আর কখনো ওদের বকা দেবো না, সব বায়না আমি মেনে নেবো। খুব মনে পড়ে আজ যে, যখন অফিস থেকে এসেই মেয়ের রুম খুলে বলতাম, কিরে মা, কি করিস? হয়তো তখন মেয়ে রুমেও নেই, হয়তো অন্যঘরে আছে বা রান্নাঘরে কিংবা বাথরুমে কিন্তু জানতাম বাসাতেই আছে। আজ যখন অফিস থেকে বাসায় এসে মেয়ের রুমে যাই, মুখ দিয়ে বলতে চাই, কি রে মা কোথায় তুই? কিন্তু ভিতর থেকে অন্তরের কষ্টে আর কথাটাই বের হয় না। জানি, মেয়েটা আর বাসায় নাই। ওর টেবিল, টেবিলের উপর সেই ঘড়িটা, ওর আলমারী, ওর চেয়ার, সবই তো আছে। কিন্তু মেয়েটাই নাই। প্রতিটা টেবিল, বই, খাতা, আল্মারী, সেই পুরানো ঘড়ি কিংবা বিছানার চাদরটায় হাত দিয়ে আমি অনুভব করি আমার সন্তানদের শরীরের সেই চেনা গন্ধ। খুব করে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে সব কিছু।
ভালোবাসি।
সব সময়।
সর্বদা।
চোখের পানির ফোয়ারা দিয়ে যে ভালোবাসা বেরিয়ে আসে, সেখানে রাগটাও হয়তো ছিলো আমার ভালোবাসার আরেক রুপ। হয়তো বকাটাও ছিলো আমার মায়ার আরেক রুপ। দম বন্ধ হয়ে আসে যেনো তোমাদের ছাড়া।
এখন প্রায়ই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে আবার বাবার কথা। হয়তো তারাও একদিন আমাকে খুব মিস করেছে, আমি বুঝি নাই। আর আজ আমি তাদেরকে মিস করি কিন্তু ওরা কেউ নেই এই মায়াবী পৃথিবীতে। আজ হয়তো আমিও আমার সন্তানদের মিস করছি। হয়তো কোন একদিন ওরাও আমাকে অনেক মিস করবে। সেদিন হয়তো পৃথিবীতে আরেকটা নতুন ক্যালেন্ডারের “সময়” চলছে।
“সময়” কারোই বন্ধু নয়, অথচ সে সবার সাথে আছে। কিন্তু সময়ের স্মৃতি মানুষকে সব সময় নষ্টালজিক করে রাখে। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে আমি তোমাদের সাথে আছি আর থাকবো।
উতসর্গঃ
(কনিকার ইউএমবিসিতে (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি) ভর্তির চুড়ান্তে আমার কিছুটা নষ্টালজিকতা)
টাকা যদি কাছে থাকে, তখন জীবনটা খুব সহজ হয়। মানুস নিজের সব সপ্ন পুরন করতে পারে। সেটা যেমন করেই হোক, সব সুখ আদায় করে নেয়। টাকা যদি কাছে থাকে তাহলে দুক্ষ অনেক পিছনে পড়ে থাকে। আর আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারি। তাই শুধু টাকা থাকা দরকার। টাকা সবার চাই। যতো বেশী টাকা, তাকে পাওয়ার চাহিদাও ততো বেশী। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি যে, টাকা গাছে হয় না। কিন্তু অনেকেই এই সপ্ন দেখেন যে, যদি টাকা গাছে হতো!! আর সেই গাছটা নিজের হতো। টাকা আসে অনেক পথে, চুরি, লোপাট, ডাকাতি, ক্ষেত বা চাষবাস অথবা ভাগ্যবসে কোনো লটারী বা বিজনেস।
যে বিজনেজ আপনি বুঝবেন না, তাতে ইনভেষ্ট করবেন না। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হলো যে, মানুষ প্রতিদিনই শিকার হয় একটি সপ্নের যে, টাকা গাছে ফলতে পারে। একজন বুদ্ধিমান ভালো মানুষও এই সপ্নের ছায়ায় অন্ধ, কালা, বোবা হয়ে যান। কোনো প্রশ্নই করতে পারেন না। আর ফ্রড নিজের চোখের সামনে হচ্ছে দেখেও তার ইংগিত শুনতে পান না। ফ্রড তার চালাকী খুব চালাকীর সাথেই করে। সে তার জাল অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। তারপর তার পরিকল্পনা মানুষের কাছে এতো মিষ্টি করে বিক্রি করে যে, তারা জানতেই পারে না যে তাদের ফাসানো হচ্ছে। পায়ে পায়ে বেনিফিট। যখন কোনো মানুষ এটা বলে যে, সে এই স্কীমে এতো টাকা পেয়েছে, এতো বেনিফিট পেয়েছে, তখন অন্যরা ভাবে যে, এই স্কীমে নিশ্চয়ই কোনো সোনার খনি আছে। যদি সে পেয়ে থাকে তাহলে আমরাও পাবো। প্রতারকরা সেইসব মানুষের সুযোগ নিয়ে থাকে যারা তাদের মিথ্যা স্কীমকে সত্য বলে ধরে নেয়। প্রায়শই শিক্ষাদীক্ষা করা মানুষেরা এই ধরনের প্রতারনার শিকার হয়ে যান। কারন টাকার গাছ হবে, এই সপ্নটা সবাই দেখে। এই যে ‘যুবক’, ‘ইউনিপেটু’, কিংবা ডেস্টিনি ইত্যাদি এই ফ্রড কোম্পানীগুলির মূলনীতি সাধারনত একই রকম ছিলো। মুলনীতিটা যেনো এরুপ ছিলো- ইনভেষ্টরদের আসল টাকার প্রথম সুদের কিস্তি দিয়ে দাও, নতুন সদস্য আনার জন্য বোনাস দাও, আর তারপর ইনভেষ্টদের বিনিয়োগের বাকী টাকা লুট করে নাও। যেটা হয় যে, ২য় রাউন্ডের ইনভেষ্টদের ১ম জন অনেক টাকা কামিয়েছে, আর সেই লোভে পড়ে সেও অনেক টাকা ইনভেষ্ট করে। পুরু দেশ থেকে যখন কোটি কোটি টাকা কোম্পানীগুলির কাছে চলে আসে, তখন এই ফ্রড কোম্পানীগুলি এক রাতের মধ্যে সমস্ত টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ভুয়া কোম্পানী, জাল ঠিকানা, ফ্রড ফ্রন্ট অফিস, আর দেশের বাইরে থেকে অপারেশন হলো এইসব কোম্পানির আসল মুলমন্ত্র। ফিনান্সিয়াল করাপ্সন জব্দ করা খুবই কঠিন কাজ, আর সবচেয়ে বেশী কঠিন হয় ইনভেষ্টদের টাকা রিকভার করা।
সাধারন মানুষের কাছে টাকা আয় করা রাস্তা একটাই আছে, আর সেটা হলো সততার সাথে পরিশ্রমের রাস্তা।
হীরা একটি খুবই মুল্যবান জিনিষ। আর এর ব্যবসা!
রহস্যে আবৃত চুপিসারে হয়ে চলা কোটি কোটি টাকার বিজনেস। এই হীরে এমন এক জিনিষের নাম যা সৌভাগ্য আর দূর্ভাগ্য দুটুই আনতে পারে। নিখুত নিরাপত্তা আর কঠিন শততাই এই হীরে ব্যবসার প্রধান স্তম্ভ। কে কখন বেইমানী করবে তার কোনো ভরষা নাই। এসব ব্যবসাতেই সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক অবিশ্বাসের কাজটা করে থাকে। অথচ এই ব্যবসাটা শুধুমাত্র বিশ্বাস আর কাজের পারদর্শিতার উপরই চলে। মজার ব্যাপার হলো, আনপলিসড হীরাও হীরা। তার ও একটা মুল্য আছে যা সোনার থেকেও দামী। আর যদি সেই হীরা পলিসড করা হয়, তাহলে সেটার চাহিদা হয় অনেকগুন বেশী। হীরে চিনতে মানুষের ভুল হতে পারে। কিন্তু খারাপ হীরে, অচল পয়সা, আর ধুর্তলোক একদিন না একদিন ওদের সত্যতা বেরিয়ে আসেই। আর ধরা পড়ে যায়। একটা সময় আসে, যখন এই নকল হীরা, অচল পয়সা কিংবা ধুর্তমানুষগুলি কানাগলিতেই হারিয়ে যায়। ওদের ব্যাপারে কেউ আর মনে রাখতে চায় না। এমনকি নিজেদের লোকেরাও না। যাই হোক, যাকে এই ব্যবসায় কাজ দেয়া হয় তার উপর কনফিডেন্স থাকাটা নির্ভর করে যিনি কাজটা নেন তার চরিত্র আর স্বভাবের উপর। আগে থেকে জানলে কেউ আর ঠকবাজী করতে পারে না, অথবা একবার যদি কোনো কারনে কারো উপরে এমন সন্দেহের উদ্রেক হয় যে, ন্যনুতম কোনো আচ পাওয়া যায় যেখানে বিশ্বাস নিয়ে খেলা হয়, তখন দ্বিতীয়বার আর ভরষা করা কখনোই সম্ভব না কারন এখানে বিশ্বাসের মুল্য এতো বেশী যা কল্পনা করা যায় না। দ্বিতীয়বার ঠকার মুল্য এতো বেশি যে, হয় এটা জীবনকে শেষ করে দেয়, নতুবা জীবনকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। এ জন্য যতো ধরনের যাচাই বাছাই দরকার, কমিটমেন্ট করার আগেই সেটা করতে হয়। যদি সেই যাচাই বাছাইয়ের মধ্যে কোনো গাফিলতি থাকে তখন যেদিন কোনো ঘটনা নিজের সাথে হবে সেদিন আফসোস ছাড়া আর কোনো কিছুই অবশিষ্ঠ থাকে না। কিন্তু একটা মজার ব্যাপার হলো, এই ঠকবাজগুলি বোকা। এদের ব্যাপারে অনেকে অনেক বড় বড় সুযোগের সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা করলেও ওরা শুধু বর্তমানটা নিয়ে বাচে। আর ভবিষ্যত নিয়ে অলীক কল্পনা করে থাকে যে কল্পনা শুধুই মরিচিকা। কোনো কাজে আসে না সেটা। তাদের উন্নতি করার ইচ্ছা থাকে, করতেও পারতো, কিন্তু নিজেদের বোকামীর জন্য ওরা সেই উন্নতির রেল লাইনটায় এমন একটা দেয়াল তুলে যেখানে নিজেরাই ফেসে যায়।
মানুষের চরিত্র এই হীরের থেকেও অধিক মুল্যবান। যদি হীরে সম্পর্কেই আমাদের নীতি এমন হয়, তাহলে মানুষের চরিত্র, সততা আর একনিষ্ঠতার উপর কি নীতি হওয়া উচিত? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত এই আমরা আমাদের মুল্যবোধ, চরিত্র, সততা এবং একনিষ্ঠতা নিয়ে মামুলী খেলা খেলতে থাকি। একজন মহিলার কাছে এই সততা যুগ যুগান্তরের, আর একজন পুরুষের কাছে এই সততা জীবনে সার্থকতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছোবার একমাত্র উপায়। যে যতো বেশী সফল, সে ততো বেশী মুল্যবান।
সায়েন্সেরই হোক আর কমার্শিয়াল সাব্জেক্টেই হোক, বিজ্ঞবান হোক আর যতো চালাকিই হোক, ব্ল্যাক মেইলের মতো কোনো বিষয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা কখনোই কারো উচিত না। কারন এই সব এক্সপেরিমেন্ট সব সময় বাজে ভাবেই ফেল করে। আর যখন ফেইল করে, তখন মানুষ পিছলা পথের মতো অনেক দূর পিছিয়ে যায়। একবার পিছলে গেলে আবার উঠে দাড়াতে পারবে, কেউ এটা সবসময় ভাবা উচিত নয়। হয়তো সেই একবার পিছলে যাওয়ার কারনেই সারাটা জীবন নষ্ট আর ধ্বংসই হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার হয়তো আর কোনো সুযোগ আসেই না।
বেশীরভাগ মানুষ এই সব এক্সপেরিমেন্ট কিংবা অন্য অর্থে যদি বলি, “প্রতিশোধ” কোনো না কোনো অতীতের ঘটনা থেকেই প্রভাবিত হয়। আসলে, পাষ্ট পাষ্টই হয়। অতীত অতীতেই হারিয়ে যায়। ভালো থাকার জন্য আমাদের সবার আজকের দিনের তথা আগামী দিনের কথাই ভাবা উচিত। অতীতকে ভোলা হয়তো কঠিন হতে পারে কিন্তু অসম্ভব না। কিন্তু কেউ যদি সেই অতীত কোনো অপরাধ আর দুক্ষবোধকে জাগিয়ে হিংসার রুপ দেয়, তাকে থামিয়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, তা না হলে সেই অতীত আজকের দিনের শান্তি আর ভবিষ্যত দিনের আশার মৃত্যু হতে পারে। কেউ যদি মনে করে যে, অতীতের কোনো ঘটনা কারো মাথায় বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে, ব্যক্তিত্তের উপর আঘাত হেনেছে, তাহলে এটা বিপদের আভাষ দেয়। অতীতের ভার অপশনাল, বইতে গেলে এটা আসলে ভারী, কিন্তু যদি মন থেকে ঐ বোঝা সরিয়ে ফেলা যায়, তা তুলোর থেকেও হালকা, চট করে হারিয়ে যায়।
আমাদের আজকের দিন তথা ভবিষ্যতের সুখের কথা মাথায় রেখে সব সময় সতর্ক থেকে এমন কিছু করতে হবে যাতে এটা মনে না হয় বা না হয়ে যায় যে, এক জনের শিকল থেকে বেরিয়ে গিয়ে শান্তির আশায় আরেকজনের কাছে এটা উনুন মনে হয়। যদি এটা হয়ে যায়, তখন মনে হয় পুল থেকে বেরিয়ে গিয়ে খাদে পরার মতো অবস্থা। ব্লাকমেইল কিংবা রিভার্স ব্ল্যাকমেইল সব কিছু থেকে দূরে থাকা খুব জরুরী। একটা জিনিষ বারবার মনে করতে থাকুন যে, হাজার হাজার সম্পর্ক ভেংগে যায়, তারপরেও আবার মানুষ নতুন সম্পর্ক করে। আর এই নতুন কোনো সম্পর্ক হয়তো আগামী দিন গুলিকে আসলেই সুন্দর করে তুলতে পারে।
মানুষ তার জীবনকে সুন্দর আর শান্তিময় করার জন্যই সমাজ সৃষ্টি করেছিলো যা অন্য বেশীরভাগ বুদ্ধি সম্পন্ন প্রানীরা করে না। আর সেই সমাজ চালানোর জন্য কিছু নিয়ম ও তৈরী করা হয়। এই নিয়ম কানুন এইটা ভেবেই করা হয়েছিলো যে, মানুষ একে অপরের সাথে মিলে মিশে সুন্দরভাবে জীবন কাটাতে পারে। একে অপরের সুখ দুঃখের ব্যাপারে এগিয়ে আসে। তাই, সব সমাজই অনেক শর্ত আর নীতির শিকল দিয়ে মানুষের কল্যানের জন্য অনেক প্রকারের সম্পর্কের ভিত তৈরী করে থাকে। জাত, ধর্ম আর বর্নের স্তর গুলি ঠিক রেখেও কিছু কিছু সমাজ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে হরেক রকমের এই সম্পর্কের বেড়াজালের শর্ত জূড়ে দিয়েছিলো যাতে সামাজিক নিয়মের মধ্যে সবাই যার যার গন্ডির মধ্যে সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে এই সম্পর্কগুলি কিছু কিছু প্রতাপশালী শাসক, ব্যক্তি আর ধর্মজাযকদের প্ররোচনায় তাদের আরাম আয়েশের জন্য, তাদের খায়েস মেটানোর জন্য তারা সুক্ষ থেকে সুক্ষতমভাবে আইন কানুনের কিছু বন্ধন শিথিল করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে গিয়ে প্রথাগুলি এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, প্রথা থেকে যায় ঠিকই, রীতি রয়ে যায় ঠিকই কিন্তু যে মানুষগুলির জন্য সম্পর্কের এই ভীত তৈরী করা হয়েছিলো, তারাই বদলে যায়, আর সেই আইনী আর শর্তাবতাবলীর ফাক দিয়ে অনেক সম্পর্কের পরিবর্তিত আদলে মানুষের কল্যান তো দূরে থাকুক, তা কেড়ে নেয় মানুষের সুখ আর জীবনও।
একটা সময় আসে যখন শুধু প্রথার নামে অনেক অশ্লীল আর বেপরোয়া কাজের বৈধতা পায়। এর প্রেক্ষাপটে উদাহরণসরুপ দেখা যায় যেমন বিয়ের প্রথা। বিয়ে নামক প্রথা থেকে মানুষ সরে আসতে আসতে এটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, বিয়ের বদলে সহঅবস্থান, সহঅবস্থান থেকে লিভিং টুগেদার, পার্ট টাইম স্টেইং টুগেদার এর মতো প্রথা হয়ে গেছে। এ সবই আসলে টাকা আর লোভের কারনেই হয়। কিন্তু মানুষ সবসময় ভুলে যায় যে, টাকা আর লোভ কোনো সম্পর্ককেরই শক্ত ভীত তৈরী করে না যতোক্ষন এটার মধ্যে সমঝোতা আর শ্রদ্ধাবোধ না থাকে। কিছু মানুষ সম্পর্ক তৈরী করার আগে সবসময় পরিকল্পনা করতে থাকে যে, ভবিষ্যতে তৈরী হওয়া সম্পর্ক থেকে কিভাবে ফায়দা লুটা যায়। এই যে লুকানো একতা লোভ বা বিশ্বাসঘাতকতা, এর আড়ালে যে এফেয়ার্সের জন্ম, কারো কাছে এটা ভালোবাসা আবার কারো কাছে এটা কামনা। আর কারো কাছে এটা একটা চুক্তি। সম্পর্কের দাম যখন টাকার মুল্যে বিচার করা হয়, সেটা একটা ইংগিত যে, এফেয়ার্সের এই গাড়িটা ব্ল্যাক মেইলের লাইনে চলে যাচ্ছে। ভালোবাসার নেশায় কেউ চাদতারা এনে দেয়ার প্রতিশ্রতি দিতে পারে বটে কিন্তু সেই ভালোবাসা বা এফেয়ার্স চাদতারা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত কিনা তা খতিয়ে দেখাটা সব পক্ষেরই উচিত। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল আমরা অনেক সময় বুঝেও না বুঝার ভান করি। আবার অনেক সময় বুঝতে চাইলেও বুঝি না। কিন্তু ভুলটা ভুলই। সময়ের স্রোতে এই ভুলটা আমাদেরকে প্রমান করে দেয় যে, আমরা ভুল ছিলাম, এবং বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক আমরা ভুল কাজটাকেই পছন্দ করেছি এবং সেটাই করেছি সম্পর্কের নামের অযুহাতে। অনেক সময় আমরা প্রোফেশনাল আর পার্সোনাল দুটুর সীমাই লংঘন করে ফেলি যখন এই ভুলের মধ্যে থাকি। যখন আমরা এই ভুলটা বুঝতে পারি, তখন অনেক দেরী হয়ে যায় আর কিছু বাকী থাকে না। বাকী থাকে শুধু ভুলের জন্য মাশুলটা। কারন তখন একটা ক্রাইমের সৃষ্টি হয়ে গেছে। ক্রাইম জগতে প্রত্যেক জিনিষের সাথে অন্য জিনিষের লেনদেন থাকে। সত্যিটাকে কখনোই লুকিয়ে রাখা যায় না। সত্য জিনিষটা একটা গন্ধ্যের মতো, এটা বাতাসে বের হয়ই।
এর বাইরে আরো অনেক প্রকারের সম্পর্ক থাকে। কিছু সম্পর্ক ঈশ্বর তৈরী করেন যা রক্তের সম্পর্কের সাথে বাধা থাকে, কিছু সম্পর্ক এই যে একটু আগে বলেছি, সমাজ তৈরী করে যা সমাজের নিয়মের আইন কানুনের শিকলে বাধা থাকে, আর এমনো কিছু সম্পর্ক থাকে যা হৃদয়ের তরীতে সওয়ার হয়ে আকাংখার মাঝ নদীতে সাতার কাটতে থাকে। ঈশ্বর প্রদত্ত সম্পর্কের বেলায় আজো অনেক কিছু যেভাবে চলার কতাহ সেভাবে চলে হয়তো, কিন্তু সমাজ কর্ত্রিক অথবা এই দুই রীতির বাইরে যে সম্নপর্ক গোপনে বা আধা প্রকাশ্যে অথবা প্রকাশ্যেই হোক তৈরী হয় তাদের মধ্যে অনেক কিছুই ধীরে ধীরে খুব ধোঁয়াশা এবং জটিল আকার ধারন করে কারন এই সপর্কগুলি যেখানে খুশী টেনে নেয়া যায়। কখনো তা তীরেও পৌছতে পারে আবার কখনো তা ডুবেও যেতে পারে। তীরে পৌছা অথবা ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনার বেড়াজাল একটা সুপ্ত এঙ্গেল বা কোনের উপর নির্ভরশীল যার নামঃ ত্রিভুজের চতুর্থ কোন।
এই কোন বা এঙ্গেল যেমন দৃশ্যমান থাকে না কিন্তু হিসাবে আনতে হয়। তেমনি এর মান ত্রিভুজের সব কোনের সমষ্টির যোগফলের থেকেও অধিক অথবা শক্তির তৃতীয় সুত্রের মতোই ঋণাত্মকও হতে পারে। এই চতুর্থ কোনের প্রভাব ত্রিভুজের সমষ্টিগত মুল্যায়নে এমন একটা নতুন আদল তৈরী করে যেখানে কবর খুড়ে লাশ বের হয়ে আসা প্রবাদটি পালটে হয়ে যায় কবর খুড়ে লাশ নয়, লাশের ভিতরের কংকালকে বের করে আনা। যেখানে ঐ কংকালের প্রতিটি হাড়ে লেখা থাকে তার ফেলে আসা অনেক না বলা কথা, বেদনা আর ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের টেবিল অফ কন্টেন্টের প্রথম অধ্যায়েই থাকে রোমাঞ্চকর প্রেমের উপখ্যান। কিন্তু যে প্রেমকে যুগে যুগে মানুষ রক্ত, জল, গোলাপের ঘ্রান হিসাবে আখ্যায়িত করতো, সেই প্রেম আসলে শুরু থেকেই ছিলো একটা কলশির দুধের মতো। দুধকে যেমন বেশী করে আচে বসালে উতলে অর্ধেক হয়ে যায়, তেমনি আবার কম আচে বসালেও সেটা আরো গাঢ় হতে থাকে। এক সময় তা গাঢ় হতে হতে পুড়ে সব শেষ হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, এই কাহিনীর শেষ অধ্যায়ে প্রথম জীবনের প্রেমের দুধ কাহিনী থেকে তখন সবাই একে একে বের হয়ে যাওয়ার আপ্রান চেষ্টা করলেও সবাই সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না। এর প্রধান কারন, যখন কোনো সম্পর্ক ভিতর থেকে ভেংগে যায় কিন্তু ছিড়ে যায় না, তখনি এই দুটু সম্পর্কের পরিভাষাও হয় দুই রকমের। আর এই পরিভাষার নাম; অপরাধের ভাষা।
অপরাধের ছায়া যখন কোনো সম্পর্কের উপর পতিত হয়, পৃথিবীর কোনো শক্তি আর তাকে জোড়া লাগাতে পারেনা। মনের জ্বালা বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে রিভার্স ব্ল্যাক মেইলের মাত্রা। ঈশ্বর মানুষের মনের ভিতরের এই সুপ্ত কাহিনী জানেন, বুঝেন এবং তাকে একটা নির্দিষ্ট লিমিট পর্যন্ত যেতে দেন এই কারনে যদি মনুষত্ত্য কিংবা বাস্তবতার নিরীখে কোনো মানব তার এই রিভার্স ব্ল্যাক মেইল তথা মনের অপরাধের আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে নেয় তো সে হয়তো ডুবতে ডুবতে কিনারায় উঠে যায় কিন্তু যদি সেটা না হয় তার অবস্থা এমন হয় যেনো সে দুটু ফুটূ নৌকায় পা রাখার সামিল। ডোবা তখন গ্যারান্টেড। আজ পর্যন্ত এমন কোনো ডিগ্রী তৈরী হয় নাই যেখানে প্রেমের জ্বালাই বলি আর রিভার্স ব্ল্যাক মেইলই বলি, সেটা নিরুপিত করতে পারে। যখন এই রিভার্স ব্ল্যাক মেইল শুরু হয়, তখন ওখানে হয় অপরাধের পিএইচডি। যখন পিএইচডি শেষ হয়, তখন দেখা যায়, কখন কবে কিভাবে কবরের লাশের কংকাল কোনো এক গাছের সাথে লম্বা হয়ে ঝুলতে আছে। আর যখন কোনো কংকাল নিজে নিজে গাছের সাথে ঝুলতে থাকে, ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের একটুও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই গাছে কংকাল উঠার পিছনে কারো না কারো হাত তো আছে, তার সাথে আছে অনেক রাত জাগা পরিকল্পনাও।
একটা সম্পর্ক যখন গড়ে উঠে, তখন গানিতিক বিশ্লেষনে এর দুটু কম্পোনেন্টই আসলে কাজ করে, একটি হলো “সময়” আরেক”চাহিদা”। সময় একটা যেমন আপেক্ষিক জিনিষ না হয়েও মানুষের অভিলাষের কাছে এটা আপেক্ষিক, তেমনি চাহিদা নিজেই আমৃতকাল পর্যন্ত একটা পরিবর্তনশীল ফ্যাক্টরই ছিলো। সময়ের নিরিখে কারো উপর যখন কারো লোভ তৈরী হয়, চাহিদার মান ততো বেড়ে যায়, আর এই চাহিদাই সেটা যা মানুষের মৌলিক স্বভাবকে আমূল পরিবর্তন করে ত্রিভুজের চতুর্থ কোনে নিয়ে হাজির করায়, যা কখনো দেখা যায় না।
সম্পর্কের গ্রাফের এই স্তরে এসে, একটি শেষ হয়ে যাওয়া সম্পর্ক কিংবা পূর্ব থেকে ঈসশরের দেয়া আইন কানুনে বাধা কোনো সম্পর্ক আরেকটা তৃতীয় চরিত্রের ধারায় এমন কিছু রসায়ন তৈরী করে যা জীবনকে শেষ করেই তারপর শেষ হয়ে যায়। সম্পর্ক যখন ফাপা হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে অনেক দূষিত বাতাস ঢোকে যায়, আর দূষিত বাতাসে অক্সিজেনের অভাবে ভরে থাকে শুধু বিষাক্ত গ্যাস। যা শুধু মরনের কারন হয়। আবার এমনো হতে পারে, সম্পর্কটা প্রথম থেকেই ফাপা থাকে কিন্তু হয় কোনো পক্ষ বুঝে অথবা কোনো পক্ষই টের পায় না। তিলে তিলে এই ফাপা জায়গাটা আরো বড় হয়ে আরো বেশী দূষিত বাতাসের ঘনত্ত বেড়ে যায়। দূষিত বাতাসের ছোয়ায় আর সময়ের অবহেলায় এই সম্পর্ক তখন সিমেন্টের গাথুনীর বধলে আজীবন নরম মাটির মতো নরম ভীতে দাঁড়িয়ে থাকে। যখন কোনো সম্পর্ক নরম মাটি দিয়ে গাথা হয়, তখন এটা ভাংতে বেশী সময় লাগে না। ছোট ছোট ঢেউয়ে খুব তারাতাড়ি ধস নামে।
তখন যেটা হয়, যে, ঈশ্বর কর্ত্রিক প্রদত্ত সম্পর্ক, কিংবা সামাজিক রীতিতে বন্ধন কৃত সম্পর্ক অথবা গোপনে তৈরী ব্যক্তিগত সম্পর্ক বলতে আর কোনো কিছুই ফারাক থাকে না। মান ইজ্জত, অভিলাষ, পজিশন, কিংবা ভালোবাসা, আহলাদ, মায়া কিংবা বন্ধন সব টুটে একেবারে ছিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ে ঐ সমুদ্রে যার গভীরতা মাপার কোনো যন্ত্র আজো মানুষ সৃষ্টি করতে পারে নাই।
এভাবেই চলমান থাকে আইনের কাজ, শাসনের অপব্যবহার আর মনুষত্ত্যের বিলোপ। একদিন এই অবলুপ্তির বিকাসেই মানুষ হারিয়ে ফেলবে তার আসল মনুষত্ত্যের নীতিকথা। প্রতিটি জীবই ধ্বংস হয়ে যাবে নিজেদের কারনে।
মুদ্রার এক পিঠে যদি থাকে আফসোস, হতাশা, মানসিক যন্ত্রনা আর না পাওয়ার বেদনা, ঠিক তেমনি সেই একই মুদ্রার আরেক পিঠে থাকে সাফল্য, পাওয়ার আনন্দ আর খুশীর জোয়ার। মুদ্রার এক পিঠের দিকে তাকাইলে যেমন বুক ধড়ফড় করিয়া হার্টবিট বাড়াইয়া দেয়, নীল আকাশকেও মনে হয় ধূসর মেঘাচ্ছন্ন, তেমনি মুদ্রার আরেক পিঠে তাকাইলে মনে হয় মেঘলা আকাশও ভারী মিষ্টি। আশার জগত যখন নিরাশার বেড়াজাল কাটাইয়া প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে আসিয়া এই কথা কানে কানে বলে-” আমি আসিয়াছি, যাহা আপনি অনেক দিন ধরিয়া খুজিতেছিলেন, এই সেই আমি”। এই কাঙ্ক্ষিত ঘটনা যখন নিজের চোখের সামনে দাড়াইয়া আলিঙ্গন করে, তখন ইহাকে তো অবশ্যই, যাহারা যাহারা এই কাঙ্ক্ষিত শুভসংবাদ কিংবা সাফল্যমন্ডিত করার পিছনে ভালোবাসায় শ্রম দিয়াছে, তাহাদেরকেও মনে হয় খুব করিয়া বলি- আমি আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ, সবাইকে আমার অন্তর হইতে হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধ্যা আর ভালোবাসা।
এমনি একটা কাঙ্ক্ষিত সংবাদ- আমার বউ এর পোষ্টিং। আজ আমার বউ এর পোষ্টিং হইলো, সরকারী বাঙলা কলেজ, অর্থনীতি বিভাগ, অধ্যাপক হিসাবে। অজস্র শুভাকাঙ্ক্ষী আমার জন্য আর আমার বউ এর জন্য দোয়া করেছেন, কেউ আবার সাহাজ্যও করেছেন, কেউ মনে প্রানে চেয়েছেন, আমাদের ইচ্ছাগুলি পুর্ন হোক। সেটাই অসীম দয়াময় আল্লাহতালাহ এমন একটা শুভ সংবাদ দিয়ে আমাদের সবার মনকে শান্ত আর সুখী করিলেন। (আলহামদুলিল্লাহ)
(মিটুলের পোষ্টিং অর্ডার বাহির হইবার কারনে “অধ্যাপিকা মিটুল চৌধুরী ওরফে আমার বউ” কে উতসর্গ করা।)
একজন অভিভাবক, কিংবা পিতামাতা তার জীবনের সমস্ত আনন্দ, আরাম, আয়েস, শখ আহলাদ বিসর্জন দিয়ে তার সন্তান মানুষ হোক এটাই মনে প্রানে চায় এবং সে মোতাবেক তার ক্যাপাসিটি অনুযায়ী সব কিছুই করে। কিন্তু যখন এই সন্তান বড় হয়, যোগ্য হয়, সমাজের বড় পরিসরে উঠে আসে, গর্বে পিতামাতার বুক ফুলে উঠে ঠিকই কিন্তু সেই সন্তান অনেক সময়ই বাবা মার এই ত্যাগ, এই বিসর্জন সঠিকভাবে মুল্যায়ন করেন না। এটা সব সন্তানের বেলায় যদিও সত্য নয় তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আজকাল এটা যেনো প্রায় একটা রীতি হয়ে যাচ্ছে। এই রীতির আবর্তে পড়ে দেখা যায়, প্রায়শই সেই বৃদ্ধ বাবা মা সন্তানবিহীন একাই দূর্বিসহ জীবন যাপন করেন। তারা একাই থাকেন, কিংবা তাদের কারো কারো আশ্রয় হয়ে যায় সেই নতুন রীতির আবর্তে গড়া ব্রিদ্ধাশ্রম। যারা বৃদ্ধাশ্রমে যান, তারা হয়তো কারো পরোক্ষ যত্নে কিছুটা ভালো থাকেন, কিন্তু যারা সেই ভাগ্য নিয়েও আসেন নাই, তারা পরিপূর্ন একা জীবন যাপন করেন। কেউ তাদের অনেক সময় খোজখবরও নেন না। ফলে একাকীত্ব দূর করার লক্ষ্যে অনেক বয়ষ্ক মানুষেরা এমন কিছু মানুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেন যারা কষ্মিঙ্কালেও তাদের বংশের কেউ ছিলো না কিংবা তারা তাদের কেউই না। তারপরেও মরুভূমির মধ্যে শুষ্ক কোনো পাতাবিহীন গাছকেও একটা অবলম্বন মনে করে এই অসহায় মানুষগুলি জীবনের তাগিদে সেই অপরিচিত আপাত বন্ধুসুলভ মানুষগুলিকেই আপন ভাবতে থাকেন। একটা কথা ইদানিংকালের জন্য ঠিক যে, শহরের মধ্যে যতো দ্রুত মানুষ বাড়ছে, ততো দ্রুতই মানুষের মধ্যে মানুষের দূরত্ব বেড়ে চলছে। আমরা প্রায়শই জানতে পারি না যে, আমাদের পাশের বাড়িতে কি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সেইসব বয়ষ্ক মানুষেরা যারা একা থাকেন তারা অপরাধীদের কাছে সহজেই শিকার হয়ে যান। আর যদি সেই অপরাধী কাছের কোনো মানুষ হয়, কিংবা কাছের মানুষের মতো মনে হয়, তাহলে বিপদ আরো বেড়ে যায়। আমাদের একাকী বয়ষ্ক মানুশেরা হয়তো তাদের হতাশা আর একাকীত্বের কারনে তারা তাদের সুখ বেদনার কথা যে কোনো অচেনা মানুষের সাথে ভাগ করে নেয়, কাউকে আপন করে নেন, এটা তাদের দোষ নয়। কিন্তু এত অন্ধবিশ্বাস মাঝে মাঝে খুবই প্রানঘাতিও হয়। ফলে দেখা যায়, সিনিয়র সিটিজেনরাই সমাজে ইদানিং সবচেয়ে বেশী অপরাধের শিকার হচ্ছেন। সমাজের এই অবক্ষয় দ্রুত বেড়ে চলছে আমাদের দেশে।
আমরা যে কথাটা প্রায়ই ভুলে যাচ্ছি যে, যে মা বাবা আমাদের জীবন তৈরী করার জন্য তারা তাদের সারাজীবন উজার করে দিয়ে, সমস্ত আনন্দ, শখ বিলিয়ে দিয়ে জীবনের এই পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছেন। সন্তানরা যখন বায়না ধরেছে, জেদ করেছে, আরএইসব মা বাবা সেটাকে পুর্ন করার জন্য দায়িত্ত হিসাবে আপ্রান চেষ্টা করেছেন, তাদের জীবন দেখভাল করা কি আমাদের সন্তানদের কর্তব্য নয়? আমরা যেনো এটা না ভুলে যাই যে, জীবনের এই অধ্যায়ে একদিন না একদিন আমাদেরকেও দাড়াতে হবে।
আমরা যখন ভুল করতে থাকি, আমরা যখন নিজেদের সার্থের উপর দাঁড়িয়ে কোনো একটা সিচুয়েশনের অবমুল্যায়ন করতে থাকি, আর সেই অবমুল্যায়নের পথ ধরে যখন একটা এমন সিদ্ধান্ত নেই যেখানে যাওয়ার পর মনে হয়, আহা, ব্যাপারটা ঠিক হয় নাই, ঠিক তখনই শুরু হয়, “যদি আর একবার” এর মতো অনুশোচনা। এই ” যদি আর একবার” অনুশোচনা এমন একতা অনুশোচনা যেখানে নিজের হাতে আর কিছুই থাকে না, তাহকে পুরুটাই ভাগ্যের উপর। এই “আহা, যদি আর একবার” সুযোগটা খুব কম ভাগ্যবানের কপালে ফিরে আসে। বেশীর ভাগ সময়েই এটা আর ফিরে আসে না। কিন্তু এর অনুশোচনা, এর বোকামীর ফল কিংবা এর ফলে সৃষ্ট মনোবেদনা আজীবন কাউকে গোপনে বা প্রকাশ্যে মেনে নিয়ে একটা হতাশার সৃষ্টি করেই থাকে। তখন এই হতাশা তাকে বারবার এটাই মনে করিয়ে দেয়, “আহা যদি এই রকম না করতাম তখন”, “আহা যদি আরেকটু চুপ থাকতাম”, “আহা, কি দরকার ছিলো ঐ সময় এমনটা করার” ইত্যাদি। এই অনুশোচনা তাদের বেশী হয় যারা একটা সুযোগ হারিয়েছেন, যারা কোনো না কোনো ভাবে এই সুযোগ আর ফিরে পাবে না বলে নিশ্চিত থাকেন। তখন নিজেকে পৃথিবীর সব বোকা আর অবুঝের মতো মনে হয়। এই অনুশোচনা আরো বেশী করে প্রতিনিয়ত মানুষকে বেদনায় ফেলে যখন দেখা যায় যে, ফেলে আসা সুযোগটিই আসলে দরকার ছিলো, কিংবা এটাই আসলে তার জীবনের মোড়টা ঘুরিয়ে দিতে পারতো কিন্তু ব্যাপারটা না বুঝার কারনে ঘরে কাছে এসেও ভাগ্য তাকে এমনভাবে বিতাড়িত করেছে যার জন্য দায়ী সে নিজেই।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেনো আমরা এমন পরিস্থিতিতে পড়ি।
অনেক সময় কড়া কৈফিয়তকে মানুষ অপমান মনে করে। হোক সেটা কোনো চাকুরীর ক্ষেত্রে, কোনো কিছু কেনা কাতার ক্ষেত্রে, কোনো দায়িত্তিয়ের ক্ষেত্রে, কিংবা কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে। কিন্তু মানুষ প্রায়ই ভুলে যায় যে, সবাই যার যার হিসাবটা যখন নিজেরাই কড়ায় গন্ডায় সে নিজেই বুঝে নিতে চায়, কিন্তু অন্য কেউ যখন এই একই কাজটা নিজের উপরে করতে চায়, তখন সেটাকে নিজে বড় অপমান মনে করে, কিংবা অবিশ্বাস মনে করে। ভাবে, কেনো আমার কাছ থেকে এতো শক্ত করে কৈফিয়ত চাইতে হবে? কিংবা কেনো আমার উদাসিনতার কারনে এতো জবাব্দিহি করতে হবে? আমি তো তার অমুক, আমি তো তার তমুক, কিংবা আমি তো অনেক বড় আত্তিয় কিংবা আমি তো এটা সেটা ইত্যাদি। আমার তো এতো কৈফিয়ত দেওয়ার কথা না। আর এই অবাস্তব চিন্তা মানুষকে প্রায়ই একটা ভুল সংবাদ দেয় যে, তার এগুলি সহ্য করতে কেনো হবে? আর এই “কেনো সহ্য করতে হবে” এই ভুল ভাবনাটাই তাকে এমন একটা পরিস্থিতিতে নিয়ে হাজির করে যার নাম “ইগো”। আর এই ইগো থেকেই তারা ভাবে যে, কি হবে এইসব মানুষের থেকে সরে গেলে? ফলে, তারা অনেক সময় এই “ইগো”র কারনে হয় তারাই ক্রমশ সেইসব মানুষের থেকে, যারা বন্ধু, যারা আত্তীয়সজন কিংবা কাছের মানুষগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অথবা তারাই তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রাথমিকভাবে এটাই মনে হয় যে, ছেড়ে গেলে যেনো কিছুই যায় আসে না। এই যে ছেড়ে দেয়া বা ছেড়ে ফেলার পর কি হতে পারে, সেটা ঐ মুহুর্তে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উভয়েই না করে বিশ্লেষন, না করে এর বাস্তব প্রতিফলন। কিন্তু এর একটা প্রতিক্রিয়া সবসময় থাকে যা সময়ের আবর্তে উম্মোচিত হয়। যখন উম্মোচিত হয় তখন একটা জিনিষ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। আর সেটা হলো, যিনি সুপেরিয়র, তার যতোটা না ক্ষতি হয়েছে, তার থেকে অনেক অনেক বেশী ক্ষতি হয়েছে যিনি ইনফেরিয়র। দেখা যায় যে, ছেড়ে আসার ফলে যা ক্ষতি যাকে ছেড়ে আসা হয়েছে তার থেকে বেশী নিজের, তখনই শুরু হয় এই আহাজারি, “আহা, যদি আবার” আরেকটা সুযোগ পাই, “আহা, যদি আবার আমাকে ডাকা হতো” আমি কোনো প্রশ্ন ছাড়া সেই আগের জায়গায় চলে আসতাম। তখন মনে হয়, যে কোনো শর্তেই আমি আবার সেই আগের জায়গাটা ফিরে পেতে চাই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, কদাচিত সেই সুযোগটা কারো জীবনে ফিরে আসে। বিশেষ করে যিনি সুপেরিয়র, সে যদি আর সুযোগটা না দেয়, তাহলে ইনফেরিয়রের জন্য এটা আর কখনোই ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না।
অনেক সময় লোভ মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে যতটুকু পাওয়ার জন্য আমরা যোগ্য, তার থেকে যখন আমরা বেশী পেতে চাই কিন্তু কোনো কারনে সেটা আমাদের জীবনে বা হাতে না আসে, তখন রাগ হয়, জিদ হয়, মনে হয় যেনো কেউ আমাদেরকে ইচ্ছে করে ঠকাচ্ছে। এই যে পরের ধনের উপর আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত লোভ, এটা মানুষকে এমন একটা জায়গায় উপনীত করে যে, মনে হয় ঐ মানুষগুলি আমার কেউ না। নিজের অভিমান, নিজের চাওয়ার মধ্যে পাওয়ার যে ব্যবধান, এই সুত্রটাই আমাদেরকে একে অপরের থেকে ছিটকে পড়তে সাহাজ্য করে। যখন কেউ ছিটকে যায়, তখন যিনি লোভ করেছিলেন, তিনি বুঝতে পারেন, তার এই অযাচিত লোভই তাকে এমন এক কুড়েঘরে নিক্ষেপ করেছে যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। তখন সে নিজেই তার মুল্যবোধ বুঝতে পারে আর ভাবে, “আহা যদি আর একবার” সুযোগটা পেতাম, তাহলে অন্তত আমার জীবনটা আরো সুন্দর হতো। চোখের সামনে যখন দেখা যায় যে, যে আয়েশী জীবনটা আমার হাতের পাশ থেকে ছুটে গেলো আর যেটা অন্য আরেক জন উপভোগ করলো, তখন সেই নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে বড্ড অসহায় আর বোকাই মনে হয়। কিন্তু তার মন জানে কোথায় সে ভুলটা করেছে। যখন সে একা থাকে, তখন সে ঠিক এটাই ভাবে, আবার যদি এ রকম একটা সুযোগ আসে, আমি আর একই ভুল করবো না। কিন্তু সেটা শুধুই ভাগ্যের উপরে নির্ভরশীল একটা ইচ্ছা। বাস্তব আর নাও হতে পারে।
অপরিপক্ক বয়সের কারনেও এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আজকে কোনো এক দৈবচক্রে কারো ভাগ্য এমনভাবে খুলে যেতে পারে যা তার জীবনে দ্বিতীয়বার না হবারই কথা। যেমন ধরুন, কোনো এক মধ্যবিত্ত অপরিপক্ক যুবকের ভাগ্যে এমন এক প্রতাপ্সহালী আর ধনাঢ্য পরিবার সম্পর্ক করে ফেলতে পারে। অকালে এতো বিত্ত আর ক্ষমতার সহচার্য্যে নিজের যোগ্যতাকে যুবক এমন কিছু ভাবা শুরু করতে পারে যার কারনে সেই ধনাঢ্য পরিবার বারবার বিব্রতকর পরিবেশে পড়ে এবং তার লোভের নেশার কারনে সমুলে ছেড়ে দিতে পারে। যখন কোনো একদিন যুবক বুঝতে পারবে কি হারালো সে, তখন তার কাছে বারবার মনে হবে, “কি বোকাটাই না ছিলাম, কি প্রয়োজন ছিলো আমার এই সুযোগ হাতছাড়া করার?” ইত্যাদি। কিন্তু এই অবস্থায় দ্বিতীয়বার আর কোনো সুযোগ আসার কোনোই সম্ভাবনা থাকে না কারন Once fortune comes with luck but when lost, same fortune would come after lots of vigorous testing, and may not even come again. তখন হতাশাটা আরো ব্যাপক। অনুশোচনাটাও শুধু নিজের জন্যেই।
কারো প্ররোচনায়ও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
নিজেদের অলসতার কারনেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
ইন্টার পরীক্ষার ফলাফলের আগে থেকেই কনিকা আসলে এদেশে পড়বেনা বলে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলো। কনিকার সমস্যা হচ্ছে, ও যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত আমি বদল করতে পারি না, মাঝে মাঝে বদল করতেও চাইনা আসলে। ইন্টার ফলাফল পাওয়ার পর দেখা গেলো কনিকা সবগুলি সাব্জেক্টেই এপ্লাস মানে গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। এতে আরো সুবিধা হয়ে গেলো যে, ওর পরীক্ষার ফলাফলে যে কোনো ইউনিভার্সিটিতেই ভর্তি হবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলো। এর মধ্যে অনেকগুলি ইউনিভার্সিটিতে এপ্লিকেশন করেছে। কোনো ইউনিভার্সিটিই ওকে রিজেক্ট করে নাই বরং কনিকা ফাইনান্সিয়াল এইডের কারনে সে নিজেই বেশ কিছু ইউনিভার্সিটির এক্সেপ্টেন্স রিজেক্ট করেছে।
প্রথমে কনিকা সবগুলি ইউনিভার্সিটি চয়েজ করেছিলো বোষ্টন বেজড। কারন আমার বড় ভাই বোষ্টনে থাকেন। একটা সময় আমার মনে হলো যে, আসলে আমার বড় ভাইয়ের উপরে নির্ভর করে কনিকাকে এতোদূরে পাঠানো ঠিক হবেনা। প্রায়শ ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি যে, আমার বড় ভাইয়ের উপর অনেক ব্যাপারে ভরষা করা যায় না। কোনো কিছুতেই আমার বড় ভাই না করেন না বটে কিন্তু ঠিক শেষ মুহুর্তে এসে দেখা যাবে তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। বিশেষ করে যখন কোনো ফাইনান্সিয়াল কোনো ব্যাপার থাকে সেখানেই তার সব বিপত্তি। তাই ভাইয়ার উপরে আমার ভরষা আমার ছোট মেয়েকে পাঠানো উচিত হবেনা বলে আমার কাছে মনে হলো। দেখা গেলো যখন কনিকার কোনো প্রয়োজন হবে ঠিক তখন কনিকার জন্য সাহাজ্য আর আসছে না।
আমি মতামত চেঞ্জ করে কনিকাকে বললাম যে, তুমি শুধু বোষ্টনের জন্য এপ্লাই না করে আমাদের আরো আত্তীয়সজন যেখানে বেশী আছে, সেখানেও এপ্লাই করো। আমেরিকাতে বাল্টিমোরে থাকে লুসিরা, ছোটভাই, এবং আরো অনেকেই। ফলে আমি কনিকাকে বাল্টমোরের জন্যেও এপ্লাই করতে বললাম। আজই উনিভারসিটি অফ বাল্টিমোর থেকে সরাসরি ওর ভর্তির ব্যাপারে চিঠি এসছে যে, ওরা কনিকাকে নিতে আগ্রহী এবং যত দ্রুত সম্ভব ওরা আই-২০ ফর্ম পাঠাতে চায়। শুনলাম, ওখানে লুসির ছেলেও আবেদন করেছে। লুসিরা খুব খুসিযে, কনিকা ওখানে পড়তে যাবে।
আপডেটঃ ১১ মার্চ ২০২১
আজ কনিকার আই-২০ ফর্ম এসছে ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, বাল্টমোর কাউন্টি) থেকে। ইউ এম বি সি বাল্টিমোরের সবচেয়ে ভালো একটা ইউনিভার্সিটির মধ্যে একটি। আর সবচেয়ে এক্সপেন্সিভও বটে। আমি খুশী যে, কনিকা নিজে নিজেই সব গুলি কাজ করেছে এবং খুবই স্মার্টলী ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করেছে। এবার ওর দূতাবাসে দাড়ানোর পালা। যদি ইনশাল্লাহ সব কিছু ঠিক থাকে, তাহলে আগামী জুলাই মাসে কনিকা আমেরিকায় চলে যাবে। এটা যেমন একদিকে আমার জন্য ভালো খবর, অন্য দিকে একটু কষ্ট ও লাগছে যে, মেয়েতা অনেক দূর চলে যাবে। ইচ্ছা করলেই আর ওর সাথে রাত জেগে জেগে আলাপ করা যাবে না। বাচ্চারা এভাবেই কাছ থেকে দূরে বেরিয়ে যায়।
নাফিজ হচ্ছে আমার এক বোনের মেয়ের ছেলে। আমার বোনের নাম শায়েস্তা খাতুন। সেই শায়েস্তা খাতুনের মেয়ে শেফালী। নাফিজ শেফালীর ছেলে। নাফিজের বাবার নাম নেওয়াজ আলী মোল্লা। সে গত ——তারিখে মারা গেছে। নাফিজ জাপানে থাকে, ওখানেই কোনো রকমে কাজ করে যতোটুকু পারে পরিবার এবং নিজের ভবিষ্যত গরার চেষতা করছে। নাফিজ যখন বিদেশ যায়, তখন আমিই ওকে স্পন্সর করেছিলাম। প্রায় ৩/৪ বছর পর নাফিজ দেশে এসছে। কিন্তু কবে দেশে এসছে, আর কোথায় কিভাবে বিয়ে করছে সেটা নিয়ে সে আমার সাথে কোনো পরামর্শ যেমন করে নাই, তেমনি ও যে ঢাকায় এসছে সেটাও আমাকে জানায় নাই। এগুলি নিয়ে আমার তেমন কোনো মাথা ব্যথাও নাই।
আজকে শুনলাম যে, আজ নাফিজের বিয়ে। এটা শুনলাম আমি মিটুলের কাছ থেকেই। ব্যাপারটা নিয়ে আমি একেবারেই সময় কিংবা মাথা খাটানোর চিন্তাও করি নাই কারন যার যার লাইফ তার তার। কে কিভাবে তাদের লাইফ উপভোগ করলো সেটা নিতান্তই তাদের ব্যাপার। আমি সাধারনত এ ব্যাপারে কারো জীবনেই হস্তক্ষেপ করি না কিংবা করতে পছন্দও করি না।
আমি ২০১৭ সাল থেকেই শেফালী মেয়েটাকে আর পছন্দ করি না। এই না পছন্দ করার পিছনে অনেক কারন আছে। সেটা পরে বলছি। শেফালী আর নাফিজ আজকে মিটুলকে নাকি ফোন করে বলেছে যে, নাফিজের বিয়েতে যেতে হবে। আমি মিটুলকে বললাম, নাফিজ ঢাকায় কবে এসছে? মিটুল নিজেও বলতে পারলো না।
আমি বললাম, আমি জানি, নাফিজ প্রায় ১ মাস আগে ঢাকায় এসছে। বাক্তার চর থেকে ঢাকায় যেতে সব সময় আমার অফিস পার হয়েই তারপর ঢাকায় যেতে হয়, নাফিজ যদি আমাকে ইম্পর্ট্যান্ট মনে করতো যে, আমি ওদের বড় কেউ গার্জিয়ান, তাহলে ঢাকায় আসার পরেই হয় আমাকে একটা ফোন করতে পারতো অথবা আমার অফিসে এসে দেখা করতে পারতো। এর মধ্যে আবার ওর কোথায় বিয়ে ঠিক হচ্ছ্যে, কার কি সমস্যা ইত্যাদি নিয়েও সে আমাকে নক করে নাই কিন্তু আমি জানি ওর বিয়ে নিয়ে ওর এক্স গার্ল ফ্রেন্ডদের মধ্যে বিশাল একটা ঝামেলা চলছে। আমি সব খবর পাই কিন্তু যেহেতু আমাকে কেউ কিছু বলছে না, ফলে আমি উপজাজক হয়ে এদের মধ্যে ঢোকতেও চাই না।
আমার করোনা পজিটিভ থাকায় আমি এম্নিতেও নাফিজের বিয়েতে যেতাম না, হয়তো আমার অন্যান্য সদস্যদেরকে পাঠিয়ে দিতাম। কিন্তু আমি চাই না যে, আমি বা আমার পরিবারের কেউ ওর বিয়েতে যাক। আমি জানি আমি না গেলে কি পরিমান প্রশ্নের সম্মুখীন হবে শেফালী এবং নাফিজ। ওরা জানেই না যে, পায়ের তলার মাটি সরে গেলে নিজের শরীরের ওজনটাকেও ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এটা আমি ওদের বুঝিয়ে দিতে চেয়েছি এবার। শেফালীর বাবা ছিলো না, মা ছিলো না, শেফালির বোন নুরুন্নাহারের থেকে শুরু করে জমজ দুই ভাই লিয়াকত আর শওকাত এদেরকে সেই দুই মাস বয়স থেকে আমরাই লালন পালন করেছি। ওদের বাবার নাম ওরাও হয়তো ভালোভাবে বলতে পারবে না। গ্রামের মানুষ, আশেপাশের মানুষ ওদেরকে এই নামেই চিনে যে, ওরা মেজরের ভাইগ্না ভাগ্নি। আর এটাই ছিলো ওদের সবচেয়ে বড় শিল্ড। আর ওরাই কিনা আজকে আমাকে ইগনোর করার চেষ্টা করেছে। আমার খারাপ লাগে নাই ততোটা কারন আমি বুঝে গেছি যে, ওরা আসলে নিমক হারামের জাত।
বিয়েতে গেলাম না। আমি না যাওয়াতে কি হলো সেটা আমি জানি। শেফালীকে হাজার প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়েছে কেনো মামা এলো না। আমাদের গ্রামের মানুষ অনেকেই আমাকে দেখে নাই কিন্তু নাম শুনেছে। আবার অনেক পুরানো দিনের মানুষেরা আমার সান্নিধ্যে আসতে চেয়েও আমার অফিস পর্যন্ত আসার স্কোপ না থাকায় দেখাও করতে পারে না। আবার আমার পজিশনাল ফ্যাক্টরের কারনে অনেকে ভয়েই আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা থাকলেও দেখা করতে পারে না। এমন একটা পরিস্থিতিতে যখন কেউ শুনে যে, আমার কোনো আত্তীয়ের কোনো অনুষ্ঠান, তারা ভাবে যে, এবার নিশ্চয়ই মেজরের সাথে দেখা হবে। ফলে কেউ দাওয়াতে আসে আমার সাথে দেখা হবে বলে, কেউ আবার অপেক্ষা করে আমার সাথে দেখা হবে বলে। কিন্তু যখন আমার আর ওখানে যাওয়া হয় না, তখন কেনো যাই নাই, কি কারনে যাই নাই এই প্রশ্নে জর্জরীত হতে হয় তার যার বাড়িতে অনুষ্ঠান।
এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর যখন আমার সেই আত্তীয় দিতে পারে না, তখন এতোদিন যে নামের ক্ষমতায় সারা গ্রাম চষে বেড়িয়েছে, যে লোকটির ক্ষমতায় সারাটা গ্রামকে ভয়ের মধ্যে রেখেছে, অনেকেই শুধু এই নামটার জন্যই যখন তাদেরকে তোষামোদি করেছে, তারা তখন এই প্রশ্নটাই করে- কই এতোদিন যাদের জোরে এতো তাফালিং, তারা তো আপনাদের কোনো অনুষ্ঠানেই আসে না, তাহলে কিসের এতো বাহাদুরী?
ক্ষমতার রেশ ছুটে যাচ্ছে, অপমানে মুখ দেখানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই যে অসহায় একটা পরিস্থিতি, এটা কিন্তু আমি তৈরী করি নাই, করেছে ওরা নিজেরাই। ওদের আর কোনো মনোবল নাই আমার সামনে এসে কোনো দাবী নিয়ে জোর দিয়ে বলতে পারে, যে, আপনি অবশ্যই আসতে হবে আমাদের অনুষ্ঠানে। একদিকে আমাকে না নিতে পারার কষ্ট আর অন্যদিকে মানুষের কাছে হেয় হবার অপমান কোনোটাই কম না।
আজকে আমার বউ আমার কাছে এসে বল্লো, যে, সেফালি অনেক কান্নাকাটি করেছে যে, মামা যদি নাও আসতে পারে, অন্তত আপনি ১০ মিনিটের জন্য হলেও একবার গ্রামে নাফিজের বিয়েতে ঘুরে যান, অন্তত আমি মানুষকে বলতে পারবো যে, মামা অসুস্থ তাই মামী এসেছেন। তা না হলে আমার আর অপমানের শেষ নাই। আমি সবার কাছে যেমন ছোট হয়ে যাবো, তেমনি আমি পরিবেশগতভাবেও অনেক দূর্বল হয়ে যাবো।
আমি শুধু মিটুলকে বললাম, যদি তুমি যেতে চাও, যাও, আমাকে কোনোভাবেই কনভিন্স করার চেষ্টা করো না যে, আমাকে নাফিজের বিয়েতে যেতে হবে। যে ছেলেটা একটা ফোন করেও আমাকে যেতে বলে নাই, তাদের আবার এতো অপমানের ভয় কিসের? তুমি যেতে চাও, যাও, দরকার হলে আমার যে কোনো গাড়ি নিয়েও তুমি যেতে পারো।
আসলে আমি একটা পানিশমেন্ট দিতে চেয়েছি এই শেফালীকে। আর এখন তার সেই শাস্তিতাই পাচ্ছে। আমার ধারনা, সেফালী আরো বড় শাস্তির অপেক্ষায় আছে। তাহলে সেই শাস্তিটা কি? ব্যাপারটা হয়তো এভাবে ঘটবে-
আমি নাফিজকে চিনি। অত্যান্ত দূর্বল চিত্তের একজন মানুষ, ইমোশনাল একটি ছেলে। শক্ত করে কোনো কিছুর প্রতিবাদ করার সাহসও এই ছেলেটার মধ্যে আমি দেখি নাই। সবসময়ই একটা ভাবুক উপলব্ধির মধ্যে থাকে। আজ যে বাড়িতে নাফিজ বিয়ে করছে, সেফালীর ধারনা যে, তার থেকে একটু উচ্চবিত্তের বাড়িতে সম্পর্ক করলে হয়তো বা সমাজে তাদের একটা আলাদা প্রতাপ বাড়বে কিংবা কোনো এক সমস্যায় হয়তো ওরা হাত বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু কুইনিন জ্বর সারালেও কুইনিন সারাবে কে এটা ওদের মাথায় নাই। অর্থাৎ যেদিন এই পরিবারটা নিজেই সেফালীর জন্য একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, তখন তাদেরকে প্রতিহত করার উপায় কি? লোহাকে লোহা দিয়ে পিটাতে হয়, কাঠ দিয়ে লোহাকে পিটিয়ে কোনো আকারে আনা যায় না। শুনেছি নাফিজের নবাগত স্ত্রী একজন ডাক্তার কিংবা নার্স বিষয়ক সাব্জেক্টে পরাশুনা করে। ডাক্তার যে না এটা আমি সিউর কারন কোনো এমবিবিএস পড়ুয়া মেয়ে অন্তত নাফিজের মতো ছেলেকে বিয়ে করার রুচী বা পছন্দে আনতে পারে না। হয়তো নার্স হবে। সাধারনত যেটা হয় যে, গ্রাম্য এসব মেয়েগুলি একটু শিক্ষিত হলেই ভাবে যে, তারা অনেক ক্ষমতাশীল এবং ডিমান্ডেড। ফলে ওরা ওদের অনেক কিছুই চাহিদার বাইরে আব্দার বা দাবী করার প্রয়াশ পায়। আর এই কারনেই এই মেয়েটা একদিন ওর যা খুসী তাইই করার স্বাধীনতা রাখবে। ভাববে যে, সে তো নাফিজের থেকেও বেশী যোগ্য। তাই ওর যা দাবী সেটা তো নাফিজকে মানতেই হবে। নাফিজ তাকে তার অক্ষমতার কথা কিংবা দূর্দশার কথা কিংবা কোনো অন্যায় আব্দারের ব্যাপারে রাজী না হয়ে বাধা প্রদান করলে নাফিজের সব কথা সে নাও শুনতে পারে। আর যদি নাফিজ তাকে শাসন করতে যায়, তখন এই নবাগত স্ত্রী তার পরিবার মিলে নাফিজকেই শায়েস্তা করে ফেলবে। এমনো হতে পারে যে, অচিরেই নাফিজের স্ত্রী তার শাশুড়ির সাথে ধীরে ধীরে সম্পর্কটা অনেক দূরে নিয়ে যাবে, আর সেই দূরে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে শুধু সে নিজেই দূরে চলে যাবে না, সাথে নাফিজকেও দূরে নিয়ে যাবে। নাফিজের এতোটা মনোবল শক্ত নয় যে, নাফিজ বউকে ছেড়ে বা বউকে কড়া ভাষায় কথা শুনিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াবে। ফলে এমন একটা সময় আসবে যে, নাফিজের দেয়া মাসিক ভাতাটাও একদিন সেফালির জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। এই নাফিজের স্ত্রীই করাবে বন্ধ। এবার আসি সেফালীর আরেক ছেলের কথা। সেফালীর অপর ছেলে নাহিদকে দেখে আমার প্রতিবন্ধী মনে হয়। সারাদিন ঘর থেকে বের হয় না। কারো সাথেই সে কোনো কথাবার্তাও বলে না। শুধু রাতের বেলায় উঠোনে নাকি বের হয় আর রাতেই সে গোসল করে। এই এমন একটা ছেলের কাছ থেকেও সেফালির কিছু আশা করা উচিত না। নাহিদ একদিন নিজেকেই নিজে চালাতে পারবে না। যখন নাফিজের দেয়া ভাতা, বা টাকা সেফালীকে দেয়া কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিন এই নাহিদ এমনো হতে পারে নিজের জীবন নিজেই নিয়ে নিবে। কারন সে বেশীরভাগ সময়ে এই পৃথিবীর মানুষের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখে না। সমাজের মানুষ যেমন তাকে সচরাচর দেখে না, তেমনি সেও সমাজের সবাইকে ভালমতো চিনেও না। শুধু মুখ দেখে নাম বলতে পারাটাই চিনা নয়। যখন এই পরিস্থিতি আসবে, নিজেকে খুবই অসহায় মনে করবে নাহিদ আর ভাববে- ওর চলে যাওয়াই উচিত। আর থাকলো সেফালির মেয়ে। মেয়েরা যতোক্ষন পর্যন্ত নিজেরা নিজের পায়ে না দাড়ায়, ততোদিন সে না পারে নিজেকে সাহাজ্য করতে, না পারে তার আশেপাশের কাউকে সাহায্য করতে। ফলে ওর মেয়েরও একই অবস্থা হবার সম্ভাবনা আছে। হয়তো নিজের জীবন না নিলেও শুধুমাত্র বেচে থাকার তাগিদে কোনো এক ছেলেকে বিয়ে করে জীবনটা পার করে দেবে। সেখানে কিছুদিন হয়তো সেফালির ঠাই হবে কিন্তু স্থায়ী হবে না।
নাফিজের থেকে সেফালির দূরে চলে যাবার কারন হবে দুটু। (ক) নাফিজের স্ত্রীর সাথে সেফালির শাশুড়ি বনাম পুত্রবধুর সম্পর্কটা সেফালী নিজেই তৈরী করতে পারবে না বা পারার কথা নয়। সেফালীর যে চরিত্র সেটাই আমাকে এ কথা বলার কারন বলে মনে হয়েছে। আর এই শাসুড়ি বনাম পুত্রবধুর সম্পর্ক ভালো না হওয়ার কারনে সারাক্ষন নাফিজের স্ত্রী নাফিজের মার সম্পর্কে কটু কথা, কান কথা লাগাতেই থাকবে। আর সব শেষে গিয়ে নাফিজের স্ত্রী নাফিজকেই দায়ী করতে থাকবে সব কিছুর জন্য এবং একসময় নাফিজ তার মায়ের উপর এতোতাই বিরক্ত হবে যে, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা সেটা যাচাই করার আর কোনো মানসিকতা নাফিজের থাকবে না। ফলে যেতা হবে তা হচ্ছে- নাফিজ তার স্ত্রীর পক্ষ নিয়াই কথা বলবে। যেহেতু নাফিজ তার স্ত্রীকে কঠিন ভাষায় মায়ের পক্ষে ওকালতি করতে পারবে না, অথবা উচ্চবিত্ত শশুড়ের মুখের সামনেও দাড়াতে পারবে না, ফলে সে তার মাকেই সে ত্যাগ করবে। সেটাই নাফিজের জন্য সহজ পথ। সেফালি একদিন সত্যিই একা হয়ে যাবে আর সে একাকিত্তে নিজের জীবন নিজেই চালাতে গিয়ে ওর মা আজ থেকে ৪৫ বছর আগে যেভাবে জীবনযাপন করেছে, সেফালিকেও ঠিক সেভাবেই জীবনযাপন করতে হতে পারে। অর্থাৎ পরের ক্ষেতে ধান কাটার পর মাঠ ঝারু দিয়ে পরিত্যক্ত ধান কুড়িয়ে ধান আনা, কিংবা অন্যের ক্ষেতে বদলীগিরি করে, কিংবা এই জাতিয় কাজ করেই ওকে নিজের জীবন নিজেকে চালাতে হবে। (খ) আর দ্বিতীয় কারনটি হলো- লিয়াকত। যতোদিন লিয়াকত নিজের পায়ে দাড়াতে না পারবে, সে ততোদিন সেফালির ঘাড়ের উপরে বসেই জীবন বাচাতে হবে। কিন্তু লিয়াকতের বয়স এখন প্রায় ৩৮। সে লেখাপড়াও করেছে। কিন্তু জীবনমুখী নয়। ওর মতো বয়সের একটা ছেলে কোনো না কোনোভাবে নিজের জীবনসহ একটা সংসার চালাতে পারা সক্ষম হওয়া উচিত ছিলো। অনেকভাবে আমিও চেষ্টা করেছি, হাবীব ভাইও চেষ্টা করেছেন, এমন কি আমি ওকে গাজীপুরে একটা কম্পিউটার ট্রেনিং ইন্সটিটুটের মধ্যে লাগিয়েও দিয়েছিলাম, কিন্তু কোথাও সে এডজাষ্ট করতে পারে নাই। শেষতক আবার সেই সেফালির ঘাড়েই গিয়ে পড়েছে। যতোদিন নাফিজ বিয়ে করে নাই, ততোদিন লিয়াকতের হয়তো ততোটা সমস্যায় পড়তে হয় নাই। কিন্তু নাফিজের বিয়ের পর নাফিজের বউ সেফালির বাসায় থাকতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে নাফিজ দেশে নাই। অথচ লিয়াকত একই বাড়িতে থাকে। এটা কোনোভাবেই হয়তো নাফিজের স্ত্রী আরামবোধ করবে না। এই যে নাফিজের স্ত্রীর ভাষায় সে “আরাম বোধ করছি না” এর মানে একটাই- লিয়াকতকে সেফালির বাড়ি থেকে হটাও। সেফালির বাড়ি থেকে যখন লিয়াকত চলে যেতে বাধ্য হবে, তখন হয়তো সেফালি কিছুটা হলেও তার ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে চাইবে। আর এক কথা বলা চাওয়ার মধ্যেই সেই “দূরে” চলে যাওয়ার ব্যাপারটা লুকায়িত। তবে চুড়ান্ত কথা একটাই- যে কোনোভাবেই হোক, সেফালিকে শেষতক একাই থাকতে হবে, নিজের জীবনের জীবিকা তাকে একাই জোগাড় করতে হবে। এটাই হয়তো শেষের অধ্যায়।
এই যে সেফালিকে নাফিজের স্ত্রি ধীরে ধীরে পছন্দ করছে না এতা বুঝার কিছু উপায় আছে। দেখা যাবে যে, মাসের পর মাস নাফিজের স্ত্রী সেফালির বাসায় আসবে না। কারন দেখাবে যে, সে লিয়াকতের কারনে বিব্রত। সে ফ্রি না লিয়াকতের উপস্থিতিতে ইত্যাদি। ফলে লম্বা সময়ের জন্য সেফালির সাথে বিচ্ছেদ। কিংবা যদি সেফালি অসুস্থ্য হয়ে যায়, তখনো নাফিজের স্ত্রী সেফালিকে দেখভাল করতে আসবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। হয়তো কারন দেখাবে- করোনা কিংবা তার নিজের অসুস্থতা। যদি এমন কিছু ঘটতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যে, প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এটার ভাঙ্গন শুরু।
অন্যদিকে, যদি নাফিজ আমাকে গার্জিয়ান হিসাবে সামনে রেখে ও ওর বিয়ের সমস্ত তদারকি করাতো, আর যাইই হক, নাফিজের শশুর বাড়ির মানুষের যে বাগাম্বর ভাবটা এখন আছে উচ্চবিত্তের ধারনায়, সেটা আর থাকতো না। কারন সে আমার তুলনায় কিছুই না। আমার মতো এমন একটা গার্জিয়ানের সামনে না নাফিজের স্ত্রী, না নাফিজের শশুড়বাড়ির কোনো লোক মাথা উচু করে কথা বলতে পারতো। সেফালিও তার গলা উভয়ের সামনে ঠিক আগের মতোই ধরে রাখতে পারতো। আমি একদিক থেকে একটা ব্যাপার নিয়ে শান্তিতে আছি যে, আমাকে আর এসব উটকো ঝামেলা আর পোহাতে হবে না।
এখানে আরেকটা কথা না বললেই নয়। কোনো একদিন নাফিজের শশুরবাড়ির লোকেরাও আমাকে হারিকেন জালিয়ে হন্যে হয়ে খুজবে যখন নাফিজের সাথে, নাফিজের স্ত্রী, কিংবা সেফালির সাথে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা তৈরী হবে। তখন তারা খুজবে কাকে ধরলে সমস্যা সমাধান হবে। আর সেই “কাকে ধরলে” খুজতে খুজতে ঠিক আমার আস্তানায় চলে আসবে এসব ‘উচ্চবিত্তরা”। আমি আসলে সেদিনটার জন্য অপেক্ষা করছি। শাস্তিটা আমি তখন দেবো ঠিক এভাবে যে- Who are you people? Do I know you?
আমার বাবা যদিও অত্র কয়রাখোলা এলাকার খুবই নামীদামী এবং প্রতাপ শালী একজন মাদবর ছিলেন কিন্তু তিনি তার ঘরের মধ্যে একটা বিষয় নিয়ে খুবই অসফল লোক ছিলেন। আর সেটা হলো তারই নিজের ১ম পক্ষের ছেলে মোঃ তাজির আলীকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাজির আলী ছিলেন আমাদের স্টেপ ব্রাদারদের মধ্যে ২য় ভাই। প্রথম জনের নাম ছিলো নজর আলী, ২য় জনের নাম এই তাজির আলী এবং ৩য় ভাইয়ের নাম ছিলো মোহসীন আলী। তাজির আলী ভাইয়ের সবচেয়ে বেশী রাগ ছিলো আমার মায়ের উপর। কারন তিনি আমার মাকে কোনোভাবেই তার ২য় মা হিসাবে মেনেই নেন নাই। তার মধ্যে আমাদের এই পক্ষে আরো গোটা ৫ বোন আর ২ ভাই ইতিমধ্যে জন্ম গ্রহন করে ফেলেছি। আমার বাবার ছিলো অঢেল জমিজমা। আর বিশাল বাড়ি। তাজির আলী যখন বিয়ে করে, তখন থেকেই সে অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো। এর কারন হলো তাজির আলীর শশুড় বারীও ছিলো একটা খারাপ বংশের মানুষ। তারা মানুষের কাছে ডাকাতের সমপর্যায়ের শ্রেনী হিসাবেই গন্য হতো। এমতাবস্থায় শশুড় বাড়ির আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে তাজির আলী এতোটাই উছ্রিখল হয়ে উঠেছিলো যে, এক সময়ে সে এটাই ভেবে নিলো যে, ২য় পক্ষের আমাদের সবাইকেই সে হত্যা করবে। যদি দরকার হয়, সে তার বাবা অর্থাৎ আমার বাবাকেও হত্যা করে সমস্ত সম্পত্তি তাদের নামে লিখে নেয়া। আমরা তখন খুবই ছোট ছোট। শুধুমাত্র আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ সবেমাত্র ইন্টার পাশ করছেন। হাবীব ভাইয়ের এই ইন্টার পাশ করাও যেনো তার অনেক হিংসা এবং রাগ। বাবা ব্যাপারটা কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলেন না। আমার বাবা ছিলেন আসলেই খুব জ্ঞানী মানুষ। তিনি জানতেন, তাজির আলী যতোই হামকি ধামকি দিক, বাবার জিবদ্দশায় যে তাজির আলী কিছুই করতে পারবেন না সেটা তিনি নিসচিত। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তাজির আলীর কিংবা আমাদের অন্যান্য স্টেপ ব্রাদারদের কার কি ভুমিকা হবে এটা নিয়ে তার অনেক শংকা ছিলো। তাই তিনি দেখতে চাইলেন, তার অনুপস্থিতিতে কার কি ভুমিকা হয়। এতা তার একটা টেষ্ট করা দরকার।
বিশয়টা নিয়ে বাবা আমার ভাই হাবীবুল্লাহ্র সাথে বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার ভাইয়ের সাথে আমার বাবার ছিলো খুবই বন্ধুত্তের সম্পর্ক। ফলে, তারা দুজন মিলে একটা বুদ্ধি করলেন। বুদ্ধিটা এরকমের যে, হতাত বাবা উধাও হয়ে যাবেন। তখনকার দিনে তো আর মোবাইল ছিলো না, আবার ল্যান্ড লাইনের ফোন ও ছিলো প্রায় দুষ্কর, তাই বাবা যদি হটাত করে কোথাও কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যান, তাহলে সবাই ধরে নিবে যে, বাবা হয়তো কোথাও গিয়ে দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। এই সময়টায় কাদের কি কি ভুমিকা হয় সেটার আপডেট বাবা ভাইয়ার কাছ থেকে নিবেন। ব্যাপারটা জানবে শুধুমাত্র আমার ভাই আর বাবা। এমনকি আমার মাও জানবেন না। খুবই একটা গোপন বিষয়। আমার ভাই তখন সবেমাত্র ইন্তার পাশ করে জগন্নাথে ভর্তি হয়েছেন। বাবা ঢাকাতেই থাকবেন, কিন্তু কারো কাছেই প্রকাশ্যে আসবেন না। আমার ভাই মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ব্যাপারতা কে কিভাবে নিচ্ছে সেটা অব্জার্ভ করবেন এবং বাবাকে ফিডব্যাক দিবেন।
প্ল্যান মোতাবেক, বাবা একদিন সুদুর চট্টগ্রামে যাবেন বিধায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রাম ছাড়লেন। কিন্তু আর তিনি ফিরে এলেন না। একদিন যায়, বাবা আসেন না, দুইদিন যায় বাবা আসেন না। এভাবে সবাই খুব দুসচিন্তা করতে লাগলো। বাবাকে খোজা শুরু হলো। কোথাও বাবাকে পাওয়া গেলো না। আসলে যিনি লোক চক্ষের আড়ালে পালিয়ে থাকতে চান, তাকে যেভাবেই খোজা হোক, তাকে তো প্রকাশ্যে পাওয়া যাবেই না। কিন্তু বাবা আছেন, সুস্থই আছেন। আর এ খবরটা জানেন শুধু আমার ভাই। তারা প্রতিদিন শ্যাম বাজার শরীর চর্চার ঘাটে দেখা করেন। ভাইয়া বাবাকে তার তরোধানের পর গ্রামের খবরাখবর দেন। বাবা সেই খবরের উপর ভিত্তি করে তিনি তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আটেন।
দিনের পর দিন দিন যখন বাবা আর গ্রামে ফিরে এলেন না, মা খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমার অন্যান্য ভাওবোনেরাও চিন্তা করতে লাগলেন। গ্রামের গনমান্য ব্যক্তিরাও কোনো কিছু আছ করতে না পেরে প্রায় মাস তিন চার পর ধরে নিলেন যে, বাবা হয়তো কোথাও দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। খবরতা এবার বেশ পাকাপোক্ত হয়ে গেলো। আর অরিজিনাল প্ল্যানের কার্যক্রমটা যেনো এখান থেকেই শুরু।
তাজির আলি ভাইয়ের দাপটের চোটে, তার সাথে আমার অন্যান্য স্টেপ ব্রাদার এবং বোনদের দাপট এতোটাই চরমে উঠলো যে, আমাদের ২য় পক্ষের সব ভাই বোনেরা এখন জীবন নিয়ে শংকিত। বাবা প্রতিদিন তার বাড়ির খবর পেতে থাকলেন এবং মনিটর করতে লাগলেন যেনো ব্যাপারটা কোনো অবস্থাতেই অনেক খারাপের দিকে না টার্ন নেয়।
তারপর……
তারপর একদিন বাবা সব বুঝে যাওয়ার পর ভাবলেন, ওনার যা বুঝার তিনি বুঝে গেছেন যে, তার মৃত্যুর পর আমাদের ২য় পক্ষের ভাইবোনদের কি অবস্থা হবে। তিনি হটাত করে গ্রামে এসে হাজির হলেন। সবাই তো অবাক। কোথায় ছিলো এতোদিন এই হোসেন আলী মাদবর? বাবা কাউকেই কিছু বললেন না, শুধু বললেন যে, সুদুর চট্টগ্রামে গিয়ে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন। যেহেতু কারো মাধ্যমেই খবর দেয়া সম্ভব হয় নাই, তাই আর বলা হয় নাই। কিন্তু তিনি মনে মনে জানেন কি হয়েছে আর এখন তাকে কি করতে হবে।
বাবা ভাবলেন, আমাদেরকে আর মুনশীগঞ্জে রাখাই যাবে না। আমাদেরকে মাইগ্রেট করে অন্যত্র নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে যে কোনো সময়ে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যাবে। বাবা আমার খালু গনি মাদবরের সাথে ব্যাপারটা বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার খালু গনি মিয়া ছিলেন আরেক মাদবর এবং খুবই প্রতাপ শালী মানুষ। যার অঢেল সম্পত্তিও ছিলো কিন্তু সবই কেরানীগঞ্জ। বাবা ভাবলেন আমাদেরকে খালুর দেশেই নিয়ে আসবেন।
কিন্তু বিপত্তি হবে যখন আমার স্টেপ ব্রাদার এবং বোনেরা জানবে যে, বাবা আমাদেরকে মুনশীগঞ্জ থেকে কেরানিগঞ্জে নিয়ে আসবেন তখন। তাতে মারামারি কাটাকাটিও হতে পারে। এই ব্যাপারটা নিয়েও বাবা ভাইয়ার সাথে আর খালুর সাথে আরেকটা বিস্তারীত পরিকল্পনা করলেন কিভাবে সব মারামারি, কাটাকাটি হানাহানি পরিত্যাগ করে নির্বিঘ্নে মুনশী গঞ্জ থেকে একদিনের মধ্যে কেরানীগঞ্জে আনা যায়। কিন্তু এইটা ঠিক যে, আমাদেরকে খালুর দেশে কেরানীগঞ্জে আনতেই হবে আমাদের নিরাপত্তার জন্য।
আমার বাবা যখন শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, আমাদেরকে যে কোনো ভাবেই হোক, যতো দ্রুত আদি নিবাস মুনশিগঞ্জ, সিরাজদিখানের কয়রাখোলা থেকে কেরানিগঞ্জে স্থান্তান্তর করতেই হবে। আমার খালুর সাথে আমার বাবা অতি গোপনে বিস্তারীত ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এই স্থানান্তরের সবচেয়ে কঠিন বিষয়টা হচ্ছে গোপনীয়তা রক্ষা এবং কাজটা করতে হবে কেউ বুঝে উঠার আগেই। যদি ১ম পক্ষের কেউ বিন্দুমাত্র আভাষ পায়, তাহলে তাজির আলী, কিংবা অন্যান্যরা কিছুতেই আমাদেরকে কেরানিগঞ্জে আস্তে দিবে না, বাধা দিবে এবং এটা একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির স্রিষ্টি করবে যা ভাবাই যায় না।
আমার খালু ছিলেন কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর এলাকার অনেক প্রতাপশালি একজন ধনাঢ্য মাদবর। আমার খালু (গনি মাদবর) এবং আমার বাবা হোসেন আলী মাদবর দুজনে একটা ব্যাপারে একমত হলেন যে, যেদিন তাজির আলী কয়রাখোলার বাইরে থাকবে, হোক সেটা কোনো এক রাতের জন্য বা দুই রাত, সেই সময়ে পুরু বাড়িটা না ভেংগে কয়েক শত লোক নিয়ে এক রাতের মধ্যে বাড়িটা কেরানীগঞ্জে শিফট করা। এদিকে খালু তার নিজের একটা জমিতে আমাদের কয়রাখোলার বাড়ির অবিকল মাপে মাপে সব কিছু খুড়ে রাখবেন যাতে এক রাতের মধ্যেই পুরু বারিটা স্থাপন করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা হলো কয়রাখোলা থেকে বাক্তার চরে আসার মাঝপথে একটা নদী আছে। সেই নদী এতো বড় আস্ত একটা বাড়ি কিভাবে পার করা সম্ভব? এটার ও একটা বিহীত হলো। পরিকল্পনা হলো যে, খালু ২/৩ শত কলা গাছ দিয়ে নদীর উপর ভেলা বানিয়ে রাখবেন যাতে ঘর সমেত লোকজন পার হতে পারে।
এবার শুধু অপেক্ষার পালা, কবে তাজির আলী অন্য কোথাও বেরাতে যায়। ব্যাপারটা বেশীদিন সময় নিলো না। সমস্ত লোকজন ঠিক করা ছিলো, ভেলার জন্য কলা গাছ ও রেডি করা ছিলো, শুধুমাত্র আদেশের অপেক্ষা। তাজির আলী তার শশুড় বাড়িতে তিন চারদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার আওয়াজ শুনা গেলো। এদিকে বাবা এবং খালু সেই সময়তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
ঠিক যেদিন তাজির আলি তার শশুড় বাড়ি চলে গেলো, ওই দিন রাতেই একদিকে আমার বাবা তার দলবল নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়ি তুলে ফেলার ব্যবস্থা করলেন, খালূ নদীর উপর ভেলা সাজিয়ে ফেললেন, আর এদিকে আমার ভাই বাক্তার চরে পুরু বাড়িটা প্রতিস্থাপনের জন্যে দায়িত্তে থাকলেন।
মাত্র একটি রাত।
আর এই রাতের গহীন অন্ধকারেই আমার বাবা তার চার শতাধিক কর্মীবাহিনীকে নিয়ে, আমার খালু আরো দুই শতাধিক কর্মীবাহিনী নিয়ে আর অন্য দিকে আমার ভাই আরো প্রায় গোটা বিশেক পচিশেক লোক নিয়ে পুরু বাড়িটা ভোর হবার আগেই বাক্তার চরে সেট করে ফেললেন। গ্রামের মানুষ যখন ঘুম থেকে উঠলেন, তখন তারা একটা জিনিষ দেখলেন যে, কয়রাখোলায় আর বাড়ি নাই, অথচ বাক্তার চরে নতুন একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো। এটা কোনো আলাদিনের দৈত্যের কাহিনীকেও হার মানিয়েছে।
আমরা নতুন ঠিকানায় চলে এলাম। অন্যদিকে যখন তাজির আলীরা এই সংবাদ পেলো, তারা অনেক হৈচৈ লরেছে বটে কিন্তু ততোক্ষনে সব কিছু ওদের হাতের বাইরে চলে গেছে। এই নতুন ঠিকানায় এসে সবচেয়ে বড় কষ্টে ছিলেন আমার বাবা। তার সাম্রাজ্য ছেড়ে এখন তিনি নতুন এলাকায় কোনো কিছুই না। ভাগ্যের কি পরিহাস। গতকালের রাজা আজ অন্য কোথাও আরেকজনের প্রজা।
এখানে আমার (মেজর আখতার) একটা কমেন্ট করার খুব ইচ্ছে হলোঃ
শুধুমাত্র একটা বাড়ি তুলে আনাই কি মাইগ্রেশন? আর বাড়িতা তুলে না এনে কেনো আমার বাবা তার অর্থ খরচ করে বাক্তার চরে আরেকটা বাড়ি করলেন না? একটা নতুন বাড়ি করার পরেই তো তিনি আমাদের সবাইকে বাক্তার চরে মাইগ্রেট করাইতে পারতেন। এই জায়গাটায় আমার সাথে আমার বাবার বা খালুর বুদ্ধির সাথে এক হলো না। নিশ্চয়ই এর ভিতরে আরো কোনো মাহাত্য ছিলো যা এই মুহুর্তে আমার জানা নাই।
আগেই বলেছিলাম যে, আলী হোসেন সরকার আর আমার বাবা কন টেম পোরারী সময়ে প্রায় একই পর্যায়ের মাদবর ছিলেন। কেউ কাউকে হেয় না করলেও তারা কখনোই এক সাথে কাধে কাধ লাগিয়ে চলতেন না। কে সুপেরিয়র আর কে সুপেরিয়র নন এটা বুঝানো যাবে না আবার কেউ কারো থেকেও কম না এটাই আসলে তাদের মধ্যে ছিলো একতা অলিখিত দন্ধ। আলী হসেন সরকারের বাড়িতে কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে হোসেন আলী মাদবরে যেমন দাওয়াত থাকতো তেমনি হোসেন আলী মাদবরের বাড়িতেও কোনো অনুষ্ঠান হলে আলী হোসেন সরকারের ও দাওয়াত থাকতো। কিন্তু তারা কখনোই একে অপরের দাওয়াতে আসতেন না। এটাও এক রকমের গ্রাম্য রাজনীতর একটা বড় ঢং বলা যায়।
তো একবার আমার বাবা আসলেই চেয়েছিলেন যে, আলী হোসেন সরকার যেনো আমাদের বাড়িতে কোনো একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াতে আসেন। আমার বাবা জানতেন যে, তথাকথিত দাওয়াতে আলী হোসেন সরকার না আসারই কথা। তাই বাবা যা করলেন তাতে আলী হোসেন সরকারের না এসেও পারেন নাই। বাবা তার ইগো ঠিক রাখার জন্যেও তিনি নিজে আলী হোসেন সরকারের বাড়িতে গিয়ে তাকে দাওয়াত দিলেন না। যদিও তিনি সেটা করতে পারতেন। যাই হোক, বাবা, তার নিজের হাতের লাঠিটা এক পত্রবাহককে দিয়ে তার সাথে একটা চিরকুট লিখলেন-
জনাব আলী হোসেন সরকার, আমার সালাম নিবেন। আমার বাড়িতে আপনার দাওয়াত ছিলো। আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করছি আপনি আজ আমার বাড়িতে দাওয়াতে আসবে। আমি আমার হাতের লাঠিটি পাঠালাম, সাথে এই পত্রটি। ধরে নিবেন, লাঠিটি আমি নিজে এবং পত্রটি আমার কথা। আপনি আসবেন।
আলী হোসেন সরকারও সেই লেবেলের বুদ্ধিমান লোক, তিনি বুঝলে এর মর্মার্থ। তিনি বাবার হাতের লাঠিটি পত্র বাহকের কাছ থেকে রেখে দিলেন, সাথে পত্রটিও। তিনি রীতিমত পরিপাটি সাজগোছ করলেন। তারপর ঠিক সময় মতো বাবার হাতের লাঠিটি সাথে নিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে র ওয়ানা হলেন। আলী হোসেন সরকার যখন প্রায় আমাদের বাড়ির ঘাটে, আমার বাবা হোসেন আলী মাদবর নিজে ঘাটের কাছে গিয়ে আলী হোসেন সরকারকে অভ্যর্থনা জানালেন আর আলী হোসেন সরকার ও তার সেই অভ্যর্থনায় কোলাকুলি করে একটা যুগান্তকারী ব্যাপার ঘটিয়ে দিলেন।
আসলে তাদের মধ্যে সব সময় বন্ধুত্বই ছিলো, কোনো রেষারেসি ছিলো না। তারা কারো সম্পদ হজম করতেন না, গ্রাম বাসী ও তাদেরকে যথেষ্ঠ সম্মান করতেন। তারা জানতেন এই সব মাদবরদের একটা ওজন আছে, তাদের কথার ভ্যালু আছে, তাদের নীতি আছে। হ্যা, একে অপরের সিদ্ধান্ত সব সময় মেনে নেবেন সেটা হয়তো ছিলো না কিন্তু গ্রাম একটা সঠিক নেত্রিত্তের মধ্যে ছিলো।
আজো তারা সবার মুখে মুখে আছেন। প্রায় ৫০ বছর পার হয়ে গেছে, তাদের কথা আজো গ্রাম বাসী মনে রেখেছেন। আমরা আজো তাদের হেরডিটি উপভোগ করি। যখন কেউ জানে যে, আমরা হোসেন আলী মাদবরের বংশধর, মানুষ এখনো অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন আর বলেন তাদের সেই পুরানো ঐতিহ্যের কথা। ভালো লাগে।
সিরাজদিখানে যতোগুলি মাদবর আমার বাবার আমলে প্রতাপ শালী ছিলেন, তার মধ্যে আমি প্রায়ই যার নাম শুনেছি তার নাম আলী হোসেন সরকার। আমার বাবার নাম ছিলো হোসেন আলী মাদবর, আর ওই ব্যক্তির নাম ছিলো আলী হোসেন সরকার। তারা সরকার বাড়ির লোক। ভাইয়ার কাছ থেকে শুনেছিলাম যে, সরকার বাড়ির মানুষেরা কোনো না কোনোভাবে আমাদের বংশেরই আওতাধীন ছিলো। যাই হোক সেটা এখন আর বড় ব্যাপার নয়।
এই আলী হোসেন সরকার আর আমার বাবা হোসেন আলী মাদবরের মধ্যে গ্রাম্য পলিটিক্সের বেড়াজালে একটা অলিখিত আক্রোশ ছিলো। কিন্তু সেই আক্রশ তা এমন নয় যে, কোনো জমি জমা নিয়ে, বা পারিবারিক কোনো কোন্দল নিয়ে। এটা ছিলো নিতান্তই পাওয়ার পলিটিক্স। যেখানে হোসেন আলী মাদবর কোনো শালিসীতে থাকতেন, সেখানে আলী হোসেন সরকার থাকতেন না। আবার যেখানে আলী হোসেন সরকার থাকতেন সেখানে হোসেন আলী মাদবর থাকতেন না। প্রকৃত পক্ষে ওনারা ওনাদের কোনো সিদ্ধান্তে কেউ বাধা হয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রোশে সম্পর্কটাকে বিপদজনক করেন নাই।
এখানে মজার একটা ব্যাপার চলছিলো এই দুই পরিবারের মধ্যে। শুধুমাত্র আলী হোসেন সরকার আর হোসেন আলী মাদবরের মধ্যে যাইই থাকুক না কেনো, এই দুই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা খুব মিলেমিশেই থাকতেন। একজনের ভাতের হাড়ির কিছু অংশ যে আরেক জনের বাড়িতে যেতো না এমন নয়। এরা আবার আসলেই একে অপরের বন্ধুও ছিলো। কিন্তু সেটা প্রকাশ্যে নয়। কি রকমের একটা সম্পর্ক সেটা একটা উদাহরণ না দিলে ব্যাপারটা ঠিক বুঝা যাবে না।
আমার ভাই হাবীবুল্লাহ যখন লেখাপড়া করছিলেন, তখন আমার অন্য পক্ষের ভাইয়েরা এটাকে কোনোভাবেই ভালো লক্ষন হিসাবে নেন নাই। বিশেষ করে তাজির আলী ভাই। তার সব সময় টার্গেট ছিলো যে কোনো মুহুর্তে হাবীব ভাইয়াকে ক্ষতি করা, বিপদে ফেলা কিংবা মেরে ফেলা। এটা আমার বাবা খুব ভালো করে জানতেন। একদিন, আমার বাবা আলী হোসেন সরকারকে ব্যাপারটা শেয়ার করলেন যে, তিনি হাবীব ভাইয়ার জীবন নিয়ে তাজির আলির থেকে শংকিত। কি করা যায় পরামর্শ দরকার।
কি অদ্ভুত!!
হোসেন আলী সরকার কোনো কিছুই চিন্তা না করে আমার বাবাকে বললেন, শোনো হোসেন আলী মাদবর, তোমার ছেলে আর আমার ছেলের মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না এবং রাখীও না। আমার বাড়ি তোমার ছেলের জন্য ১০০% নিরাপদ। আগামীকাল থেকে তোমার ছেলেকে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। এখানেই খাবে, এখানেই পড়বে, এখানেই ঘুমাবে। তোমার যখন দরকার তখন আসবা, ওর যখন যেখানে যাবে ওর সাথে আমার ছেলেরা থাকবে।
সেই থেকে আমার ভাই আলী হোসেন সরকারের বাড়িতে থেকেই অনেক দিন পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। এরাই আসলে মাদবর, এরাই আসলে বুদ্ধিমান। এরা যখন কোথাও শালিসিতে যেতো সেদিন ওনারা কারো পক্ষের বাড়িতে পানিও খেতেন না, কারন কোনো পক্ষপাতিত্ত তারা করতেন না।
মন্তব্যঃ
আজকাল গ্রামের উঠতি মাদবরদের বয়স দেখলে মনে হয় ওদের এখনো মোছ দাড়িও গজায় নাই। কেউ আওয়ামীলীগের সভাপতি, কেউ ছাত্রনেতা, কেউ এটা কেউ সেটা। এরাই মাদবর। এরা না করে বড়দের সম্মান, না করে ছোটদের আদর। ওরা প্রতিনিয়ত ঘুষের টাকায় চলে, ঘুষের কারনে ওরা রায় বদলায়। এদেরকেও কেউ সম্মান করে না।
নুর জাহান আপা আমার জেঠস ছিলেন। অর্থাৎ আমার স্ত্রীর আপন বোন। তিনি একজন শিক্ষিকা ছিলেন, মীরপুরের সিদ্ধান্ত স্কুলের শিক্ষিকা। আমি নুরজাহান আপাকে চিনি আমারও বিয়ের প্রায় অনেক বছর আগ থেকে কারন আমরা গোলারটেকেই থাকতাম পাশাপাশি। আমি যেহেতু সবার সাথে খুব একটা মিশতাম না তাই বিয়ের আগে ঊনাদের সাথেও আমার খুব বেশি ঊঠানামা ছিল না। জাস্ট চিনতাম, ঊনারাও আমাকে চিনতেন। তার স্বামীর নাম জয়নাল চৌধুরী, তিনি প্ল্যানিং কমিশনে চাকুরী করতেন এক সময়। বর্তমানে অবসর নিয়েছেন। ভালো মানুষ একজন।
নুর জাহান আপা অনেকদিন যাবত লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। আপা নিজে খুব পহেজগার মহিলা ছিলেন। তার দুই মেয়ে, সোমা এবং সনি আর এক ছেলে, নাঈম আহমদ। দুইজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছেলে থাকে আমেরিকায়। সেও বিয়ে করেছে।
আপার শরীরটা আস্তে আস্তে খারাপ হবার সাথে সাথে তিনি প্রথমে ইন্ডিয়া যান চিকিতসা করাতে। ওখানকার ডাক্তাররা বলেছিলেন যে, তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করাতে হবে, তানা হলে তাকে আর বেশিদিন বাচানো যাবে না। ব্যাপারটা প্রায় ঠিকই ছিলো। ইন্ডিয়া থেকে আসার পর আপা দ্রুত খারাপের দিকে যেতে শুরু করলেন। শেষে তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করাবেন এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হলো। কিন্তু জটিল ইন্ডিয়ান সিস্টেমের কারনে ইন্ডিয়া গিয়েও তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করা সম্ভব হয় নাই।
অতঃপর আপা আবারো আমেরিকায় তার নিজের ছেলের কাছে গিয়ে আমেরিকার উন্নত মানের চিকিতসার জন্য। কিন্তু আমেরিকায় যাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। তার মৃত দেহ আমেরিকায় সতকার করা হয়। তার মানে নূরজাহান আপাকে আমরা দেশে কবর দিতে পারি নাই।
সানজিদা তাবাসসুম কনিকা আমার ছোট মেয়ে। জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ২০০০।
ভাবলাম, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাসায় আছি, সময়টা কাটছে না খুব একটা। সবার ব্যাপারে কিছু লিখতে থাকি।
কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমি জানতাম না যে, আমার আরেকটি মেয়ে হচ্ছে। আমি জানতেও চাই নাই। এটার পিছনে বেশ একটা কারন ছিলো। আর সেটা হচ্ছে যে, আমার শখ ছিলো আমার প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। আল্লাহ সেটা আমার বড় মেয়ে উম্মিকাকে দিয়ে সেই শখ পুরা করেছেন। তারপরের সন্তান আমার ছেলে চাই না মেয়ে চাই এটা নিয়ে আমার কোনো কৈফিয়ত কিংবা কোনো প্রকারের হাহুতাশ ছিলো না। শুধু চেয়েছিলাম যেনো আমার সন্তান সুস্থ্য হয়।
মেয়ে হয়েছে, এই খবরটা দেয়ার আগে ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমার প্রথম সন্তান কি? আমি উত্তরে বললাম, যেটাই হোক, মেয়ে হলেও আমি কিছুতেই অখুসি নই। দুটুই আমার সন্তান। এবারো সিজারিয়ান বেবি। মিটুলের অনেক কষ্ট হয়েছে এবার। আমার মা ঢাকার বাসাতেই ছিলেন, আমার মেয়ে হয়েছে শুনে, আমার মায়ের খুব মন খারাপ। আমি হেসেই বাচি না। আমি প্রথমে ব্যাপারটা মজা মনে করে মাকে কিছুই বলি নাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখলাম, আমার মা আমার ছোট মের্যেকে একেবারেই পছন্দ করেন না। বারবার শুধু একটা কথাই বলে- ওই ত্যুই ছেলে হইতে পারলি না?
আমার মেয়ে তো কিছুই বুঝে না। সে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে আর দাদির লগ্না হচ্ছে। কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমার বুকে একটা ধক করে উঠেছিলো। এতো অবিকল চেহারা হয়? একদম আমার মায়ের চেহারা। তার চোখ, মুখ, নাক , কান, মুখের আকৃতি সব কিছু আমার মায়ের চেহারা। আমি মনে মনে ভাবলাম, হে আল্লাহ, তুমি আবার এই ছোট মাকে আমার কোলে দিয়ে আমার বড় মাকে নিয়ে যেও না।
মাকে বললাম, মা , ছোট মেয়ে একেবারে তোমার অবিকল চেহারা পেয়েছে। তুমি যখন থাকবা না, এই মাইয়াটাই আমার কাছে তুমি হয়ে আজীবন বেচে থাকবা। অনেক দিন ছোট মেয়ের নাম রাখা হয় নাই। আমি মাকে দায়িত্ত দিয়েছি মা যেনো ছোত মেয়ের নাম রাখেন। যা খুশী সেতাই রাখুক। অবশেষে একদিন মা, ছোট মেয়ের নাম রাখলেন- কনিকা।
উম্মিকা ছোট অবস্থায় আমার সাথে থাকতে পারে নাই কারন আমি তখন বিভিন্ন সেনানীবাসে খালী পোষ্টিং আর মিশনের কাজে বিদেশ করে বেড়িয়েছি। কিন্তু কনিকার বেলায় বেশ লম্বা একতা সময় এক সাথে থাকার সুযোগ পেয়েছি।
তারপরেও বেশ অনেক গ্যাপ হয়েছে আমার ওদের সাথে থাকার। কনিকা বড় মেয়ের মতো সেও প্রথমে মেথোডিস্ট স্কুল মিডিয়ামে, তারপর মোহাম্মাদপুর প্রিপারেটরী এবং অতঃপর বিআইএস থেকে শহীদ আনোয়ারা গার্লস কলেজে পরাশুনা করে এস এস সি পাশ করেছে। সাংঘাতিক টেনসনবিহীন একটি মেয়ে। অল্পতেই খুব খুতখুতে কিন্তু খুব বুদ্ধিমতি। কনিকা উম্মিকার থেকেও একটু বেশি চালাক কিন্তু ধূর্ত নয়। আমার ইচ্ছে যে, কনিকা এডমিন ক্যাডারে চাকুরী করুক এবং সচীব হয়ে অবসর নিক। অথবা ব্যারিস্টার হোক। তাতে নিজের ব্যবসা নিজেই করতে পারবে, কারো সরনাপন্ন হতে হবে না।
কিন্তু আমার ইচ্ছাটাই সব কিছু নয়। এই করোনা পেন্ডেমিকের সময় সরকার কর্তৃক অটোপাশের মাধ্যমে কনিকা ইন্টার পাশ করে ফেল্লো। কনিকার দেশে থাকার কোনো ইচ্ছা নাই। এই যে, সবাই আগামীতে কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, কোথায় ভর্তি হবে ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত আর কনিকা সারাদিন ইন্টারনেটে বিদেশের কোনো ইউনিভার্সিটিতে সে পড়বে সেটা খুজতে খুজতে ব্যস্ত। সে মনে প্রানে আর দেশে নাই। অনেক গুলি ইউনিভার্সিটিত থেকে কনিকা ইতিমধ্যে অফার লেটার পেয়েছে। আমি জানি আগামী বছরের মধ্যে কনিকা আর দেশে নাই। বাকী কি হয় কে জানে?
আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা আমার বড়মেয়ে। জন্ম তার ১৬ জানুয়ারী ১৯৯৪ সাল।
তার জন্মের আগে আমার বড় ইচ্ছে ছিলো যে, আমার যেনো একটা মেয়ে হয়। আমি কখনোই ছেলে হোক চাই নাই। আল্লাহ আমার মনের আশা পুরন করেছেন উম্মিকাকে আমার ঘরে দিয়ে। সে খুব ভালো একটা মেয়ে। কিন্তু সে খুব সিম্পল।
উম্মিকার জন্মের আগে (সম্ভবত ৪/৫ দিন আগে) আমি একটা সপ্ন দেখেছিলাম। তাহলে সপ্নটা বলিঃ
ঢাকা সেনানীবাসের মেস বি তে আমি একটা রুমে আছি। আমার পোষ্টিং ছিলো খাগড়াছড়িতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অধীনে। মিটুল পোয়াতি অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। যে কোনো সময় আমার বাচ্চা হবে। আমি ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসেছি শুধু আমার অনাগত বাচ্চার আগমনের জন্যই। নামাজ পড়ি, খাই দাই, আর সারাদিন হাসপাতালে মিটুলের সাথে সময় কাটাই।
একদিন রাতে (ডেলিভারির ৪/৫ দিন আগে) আমি সপ্নে দেখলাম যে, আমি আমাদের গ্রামের কোনো একটা দোকানে বসে আছি। ওখানে আরো অনেক লোকজন ও আছে। হতাত করে সবুজ একটা সুতী কাপড় পড়ে একজন মহিলা কোনো একটা ঘরের ভিতর থেকে বাইরে এসে আমাকে বল্লো, আমাকে আপনি কি চিনেন? আমি তাকিয়ে তাকে বললাম, জী না আমি আপনাকে কখনো দেখি নাই। উত্তরে মহিলাটি আমাকে বললেন, যে, তিনি হযরত আছিয়া বেগম অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর মা। আমি তো অবাক। কি বলে এই মহিয়সী মহিলা?
আমি ততক্ষনাত উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে তো আপনার কাছে আমাদের নবীজির অনেক চিঠি থাকার কথা! মহিলা বললেন, হ্যা আছে তো।
এই কথা বলে তিনি আবার ঘরের ভিতরে চলে গেলেন চিঠিগুলি আনার জন্য। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। আমি তখন সময়টা দেখলাম, রাত প্রায় শেষের পথে কিন্তু তখনো ফজরের আজান পড়ে নাই।
পরদিন ছিলো শুক্রবার। আমি জুম্মা নামাজ পড়ে ইমামের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললাম। তিনি প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবনা কিনা। আমি বললাম, আমরা খুব শিঘ্রই বাচ্চার আশা করছি। তিনি বললেন, আপনার মেয়ে হবে এবং খুব ভালো একজন মেয়ে পাবেন আপনি।
তার ৪/৫ দিন পর আমি আসর নামাজের পর কোর আন শরীফ পড়ছিলাম। এমন সময় আমার মেস ওয়েটার তড়িঘড়ি করে আমার রুমে নক করে বল্লো যে, স্যার আপনাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেছে। আমি তখন যেখানে কোর আন আয়াত পড়ছিলাম, ঠিক সেখানেই মার্ক করে কোর আন বন্ধ কত্রে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। মিটুলকে ওটিতে নেয়া হচ্ছে, সিজারিয়ান করতে হবে।
প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার মিষ্টি মেয়েটার জন্ম হলো এই পৃথিবীতে। কি নাম রাখবো সেটা আমি ঠিক করেছিলাম যে, আমি যেখানে কোর আন শরীফ টা পড়া বন্ধ করেছি, আর যে আয়াতে, আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ঠিক সেই আয়াত থেকেই কোনো একটা শব্দ দিয়ে নাম রাখবো। অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে- আমি ওই সময়ে হজরত মুসা (আঃ) এর উপরেই আয়াতগুলি পড়ছিলাম। সেখানে আয়াতে লিখা ছিলো- ইয়া হাইলা আলা উম্মিকা মুসা। অর্থাৎ হে মুসা, আমি তোমার মাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।
আমি ঠিক এই শব্দতটাই আমার মেয়ের নাম রাখার সিদ্ধান্ত নেই যে, ওর নাম হবে উম্মিকা। অর্থাৎ মা।
আমার সেই উম্মিকার প্রথম শিক্ষা শুরু হয় মীরপুর স্টাফ কলেজের টর্চ কিন্ডার গার্ডেনে। অতঃপর মেথোডিস্ট ইংলিশ মিডিয়াম, তারপর শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ এবং সেখান থেকে হলিক্রস। হলিক্রস থেকে উম্মিকা এইচএসসি পাশ করে ডাক্তারী পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে শহীদ জিয়া মেডিক্যালে আল্লাহর রহমতে ইন্টার্নী করে ২০২০ সালে ডাক্তারী পাশ করলো। এটা আমার একটা স্বপ্ন যে সে ডাক্তার হোক। আমার আরেকটা স্বপ্ন হচ্ছে, সে যেনো সেনাবাহিনীর ডাক্তার হয়। তাতে যে লাভটা হবে তা হচ্ছে, বাবার সেনাবাহিনীর জব ছিলো। রাজনীতির প্রতিহিংসায় সে ইচ্ছে করে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলেন, জেনারেল পর্যন্ত যেতে পারেন নাই। আমি চাই আমার মেয়ে সেটা হোক। আর ২য় কারন হচ্ছে, আজীবন কাল সে সেনাবাহিনীর সব বেনিফিট গুলি যেনো পায়। কিন্তু বাবাদের সব সপ্ন তো আর সার্থক হয় না। আমার মেয়ে চায় বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সে বেসামরীক লাইফেই থাকে।
কোনো কিছুই কোনো কারন ছাড়া ঘটে না, এটাই সত্য। যে ঘটনাটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিলো কেনো গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেললাম বলে, আজ সেটা পরিষ্কার হলো। আমার করোনা টেষ্টে পজিটিভ এসেছে। আমার বড় মেয়েরও করোনা পজিটিভ। ছোট মেয়ের করোনা নেগেটিভ। উম্মিকার মার তো আগেই একবার করোবা ধরা পড়েছিলো, তাই আর করাইতে দেই নাই। এর মানে হলো, শুধু ছোট মেয়ে ছাড়া আমাদের বাসায় সবার করোনা ধরা পড়লো। আল্লাহ যা করেন নিশ্চয় মংগলের জন্যই করেন। করোনা ধরা পড়ায় একটা জিনিষ মনে হলো যে, আমাদের আর টিকা নেওয়ার দরকার পড়বে না হয়তো।
দেশে টিকা এসেছে, সবাই টিকা নিতে ভয়ও পাচ্ছে, আবার এই টিকা নিয়ে যে কত রাজনীতি হয় তাও দেখা যাবে। এদেশে প্রতিটি জিনিষ নিয়েই রাজনীতি হয়। টিকা নিয়েও লম্বা সময় ধরে রাজনীতি হবে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যারা একবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এসছেন, হয়তো তারা আর টিকার ব্যাপারে কোনো মাথা ঘামাবে না, তারপরেও হয়তো টিকাটা নেয়া দরকার হতে পারে যেহেতু এটা একটা ভ্যাকসিন।
বাসায় আছি কদিন যাবত। করোনা হবার কারনে আমার শরীরে কোনো প্রকার আলাদা কোনো সিম্পটম নাই। সুস্থই আছি। বড় মেয়ের ঠান্ডাটা একটু বেশি। আমি প্রতিদিন ছাদে রোদে প্রায় ঘন্টা ২/৩ পুড়ি। ভালোই লাগে। কিন্তু বড় মেয়ে বি সি এস পরীক্ষার প্রিপারেশনে রাত জেগে পরাশুনা করে বলে দিনের অর্ধেক সময় পর্যন্ত ঘুমায়।
চারিদিকে বেশ ঠান্ডাও পড়েছে ইদানিং। এবারের ঠান্ডাটা একটু বেশী মাত্রায় পড়েছে বলে মনে হয়।
আমি গত কয়েকদিন যাবত করোনায় ভুগছি। সাথে আমার বড় মেয়েও। কিভাবে ঘটনাটা হলো তা আমার এখনো জানা নাই। সে ব্যাপারটা পরে আসছি। বড় ভাবী (অর্থাৎ লিখনের মা) গতকাল ইন্তেকাল করেছেন। আজ তাকে মানিকগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়েছে মানিকগঞ্জ গোরস্থানে দাফন করার জন্য। আমি যেতে চেয়েছিলাম কিনা জানিনা, যেহেতু করোনায় ভুগছি, তাই কেহ আমাকে যেতেও বলে নাই। আর আমি যাওয়ার কোনো কারনও দেখিনা।বড় ভাবীর মৃত্যুর ঘটনায় আমার বেশ কিছু অব্জারভেশন চোখে পড়েছেঃ
ক। লিখন আমেরিকায় ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে আছে যে, লিখন ইচ্ছে করলে ওর মাকে দেখতে আসতে পারতো ঠিকই কিন্তু হয়তো আর আমেরিকায় ফিরে যেতে পারবে না। এই ভয়ে লিখন ওর মাকে আর দেখতেই এলো না। ওর মাকে দেখার চেয়ে হয়তো ওর আমেরিকায় থাকাটা জরুরী মনে হয়েছে বিধায় লিখন আর ওর মাকে শেষবারের মতো দেখতে আসে নাই। প্রথিবীটা অনেক ছোট, আর কে কখন কোথায় থাকবে এটার ফয়সালা আল্লাহর হাতে। আমেরিকাতেই থাকতে হবে আমি এটা বিশ্বাস করি না। এই বাংলাদেশেও অনেক বিখ্যাত মানুষেরা বাস করে এবং অনেক পয়সা ওয়ালারা বাস করে। আমেরিকা কোনো সর্গরাজ্য নয় যে ওখানেই সেটেল হতে হবে সব আত্তীয়সজন বাদ দিয়ে। এই যে, আজকে লিখন তার মাকে শেষবারের মতো ও দেখতে পারলো না, ওর মা লিখনের হাতের মাটিও পেলো না, এর কোনো মানে হয় না। আমি জানি না আমার মৃত্যুর সময় আমার বাচ্চারাও আমাকে দেখতে আস্তে পারবে কিনা কিংবা আমি ওদের হাতে মাটি পাবো কিনা, তবে আমি মনে করি এমন কোনো জটিল পরিস্থিতিতে যেনো আল্লাহ আমাকে বা আমার সন্তানকে না ফেলেন যে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় আমি আমার সন্তানদের কাছে না পাই।
খ। বড় ভাবী যখন করোনায় আক্রান্ত, তখন দেশে তার সব ছেলেরা ছিলো। মারুফ ছিলো, তুহীন ছিলো, মুবীন ছিলো, ইমন ছিলো, সবাই ছিলো। একমাত্র মুবীন সারাক্ষন হাসপাতালে ওর মার জন্য ডিউটি করেছে। আর বাকী ছেলেরা খুব একটা দেখতেও যেত না আবার হাসপাতালেও ছিলো না। যেহেতু মায়ের করোনা, তাই সবাই দূরে দূরেই ছিলো। খুবই হতাশার কথা হচ্ছে, যখন বড় ভাবী মারা গেলেন, তখন মানিকগঞ্জে তার লাশের সাথে কে যাবে, বা কারা যাবে এটা নিয়েও একটা কনফিউশন ছিলো। ইমন, তুহীন কিংবা মারুফ তারা ওর মায়ের সাথে যাবে কি যাবে না তারা ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। লিখন দেশে থাকলে লিখন কি সিদ্ধান্ত নিতো সেটা আমি জানি না, তবে, খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা হতো বলে আমার জানা নাই। বড্ড খারাপ লাগলো কথাতা শুনে যে, যে মা আজীবন ছেলেদের জন্য জীবন দিয়ে দিলো, যে মা এতোটা বছর ওদেরকে বুকে পিঠে মানুষ করলো সেই মাকে করোনায় মারা যাওয়ার কারনে মানিকগঞ্জে গোরস্থানে একমপ্যানি করবে কি করবে না সেটাই এখন সবচেয়ে যেনো বড় প্রশ্ন। আসলেই পৃথিবীটা খুবই সার্থপর একটা জায়গা। এখানে মানুষ নিজেকে ছাড়া আর কারো কথাই সে ভাবে না।
গ। লিজি আপা যখন বিল্ডিং বা বাড়ি বানানোর জন্য তার বাবার সম্পত্তির উপর সবার কাছে অনুমতি চাইলেন, তখন সব ভাইবোনেরা রাজী থাকলেও শুধুমাত্র লিখনদের পরিবার লিজি আপাকে তার বাবার সম্পত্তি থেকে উতখাত করার জন্য একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিলো। লিখনের সাথে একজোট হয়েছিলো ওর স্ত্রী শিল্পীও, যদিও শিল্পি লিজি আপার আপন বোনের মেয়ে। লিজি আপার এই বাড়ি বানানো নিয়ে লিখন এবং তার পরিবার (বড় ভাবী সহ) এমন একটা সিচুয়েশ তৈরী করে ফেলেছিলো যে, তুহীন বলেছিলো- যদি লিজি ওখানে বাড়ি বানায়, তাহলে লিজিকে সে খুন করে ফেলবে, মারুফ বলেছিলো যে, লিজিকে সে লাথি লাথিতে ওখান থেকে বের করে দেবে, আর অন্যান্রা বলেছিলো, তারা কখনোই আর মানিকগঞ্জে যাবে না। ইত্যাদি। আমি আর মিটুল সব সময় চেয়েছি যে, লিজি আপা যেনো ওখানে বাড়িটা করে। এর জন্য আমি নেপথ্যে থেকে যতো প্রকার সাহাজ্য করার দরকার, আমি সেটাই করেছি। আজ ঠিক এই মুহুর্তে মানিকগঞ্জে লিজি আপার ৬ তালা বিল্ডিং সায় দাঁড়িয়ে। বড় ভাবীর মৃত্যু দিয়ে আল্লাহ এমন সময় ওদেরকে মানিকগঞ্জে নিয়ে গেলেন যখন ওরা সবাই দেখল লিজি আপার ৬ তালা বাড়ি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, আজ সেই লিজি আপার বাড়িতেই সবার আশ্রয়। কি অদ্ভুদ না? আল্লাহ জুলুমকারীকে এবং অহংকারীকে কিছুতেই পছন্দ করেন না। সমস্ত দম্ভ ভেংগে দিয়ে আজ আল্লাহ এইসব সদস্যদেরকে একেবারে সেই লিজি আপার বাড়িতেই উঠাইলো। কিছু কি শিখতে পারলো ওরা?
ঘ। মজার ব্যাপার হলো, যেদিন লিজি আপা মানিকগঞ্জে বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলেন, ঠিক সেই সময়ে লিখন আমেরিকায় গিয়েছিলো রুটিন ভিজিটে। কি এক অদৃশ্য শক্তিতে আল্লাহ লিখনকে ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে দিলো যে, লিখন আর বাংলাদেশেই আসতে পারলো না। লিখন বলেছিলো যে, সে যদি দেশে থাকে তাহলে লিজি আপা কিভাবে বাড়ি বানায় সেটা সে দেখে নেবে। লিজি আপার পিতার ভিটা, তার নিজের হকের জমি, লিখনের জমিও না, অথচ লিখনের এই রকম দাম্ভিকতা আল্লাহ নিশ্চয় পছন্দ করেন নাই। কোনো না কোনো অজুহাতে আল্লাহ ঠিক তার ম্যাকানিজমে একেবারে সুদুর আমেরিকায় এমন করে বন্দি করে দিলো যে, ওর বাংলাদেশের চাকুরীটাও আর নাই, আর আমেরিকায় ৭/১১ দোকান গুলিতে খুবই সস্তায় একটা জব করতে বাধ্য হলো। এই ঘটনাটা আর যে কেউ যেভাবেই দেখুক, আমি দেখি আল্লাহর ন্যায় বিচারের নমুনা।
ঙ। এখানে একটা কথা না বললেই না। মারুফের ছেলের বয়স মাত্র ৩ বছর। বড় ভাবী তার নায় নাতকুরের জন্য ছিলেন ডেডিকেটেড। সারাক্ষন তাদেরকে খাওয়ানো, পরানো, বাইরে নিয়ে গুরিয়ে আনা, কোথাও বেড়িয়ে আনা ইত্যাদি কাজগুলি খুব আদরের সাথে করতেন। আর তার নাতি নাতকুরেরাও বড় ভাবীর প্রতি খুবই ভক্ত ছিলো। কিন্তু যেদিন বড় ভাবীর করোনা ধরা পড়লো, ঠিক সেদিন থেকে মারুফের ৩ বছরের ছেলে মশারী তাংগীয়ে যে এক ঘরে বসে গেলো, ভুলেও সে আর তার দাদীর কাছে আসে নাই। সে বারবার বলতো যে, সে করোনায় ভয় পায় এবং সে তার দাদীর কাছে আসতে চায় না। বড় ভাবীর মরার আগ পর্যন্ত এই অবুঝ বাচ্চাটাও আর ভাবীর কাছে আসে নাই। কি নির্মম তাই না?
যাই হোক, আমি এই কথাগুলি বলে কাউকে ছোট করতে কিংবা আল্লাহ ওদেরকে শাস্তি দিয়েছেন এটা ভাবি না। শুধু ভাবী যে, মানুষের উচিত বান্দার হক সব সময় ফিরিয়ে দেয়া। এ জগতে কেউ থাকে না, থাকবেও না। কিন্তু আজ যে কর্মগুলি আমরা রেখে গেলাম, সেটার ফলাফল সে পাবেই।
এইমাত্র মিটুল বড় ভাবীর দাফনের পর বাসায় এলো। বেশ কিছু জানতে ইচ্ছে করল। যেমন, লিখন আমেরিকায় আছে, ওর মা মারা গেলেন, লিখন কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, ছটফট করেছে কিনা, না আসার কারনে, কিংবা অনেক মন খারাপ করে ওর মার জন্য কান্নাকাটি করছে কিনা ইত্যাদি। মিটুল জানালো যে, যখন ভাবীকে দাফনের নিমিত্তে কবরে নামানো হবে, তখন অনেকেই ভাবীকে দেখার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো। কেউ কেউ আবার ভিডিও ও করেছিলো। ওই সময় নাকি ইমন এবং মুবীন লিখনকে ফোন করে জানিয়েছিলো লিখন ভাবীর ভিডিও দেখতে চায় কিনা, কিংবা কিছু বলতে চায় কিনা। লিখন নাকি উত্তর দিয়েছিলো যে, সে কনো কিছুই দেখতেও চায় না, না ওর ছেলেমেদেরকে দেখতে দিতে চায়। এই ব্যবহারের অর্থ শুধু জানে লিখন। যাই হোক, ইতিহাস এটাই।
আজ থেকে হাসমত আরা (ভাবীর নাম) নামে কোনো মহিলার আনাগোনা এই দুনিয়া থাকলো না। কয়েকদিন সবাই তাকে নিয়ে হয়তো গল্প করবে, হাহুতাশ করবে, কেউ কেউ হয়তো তার অভাব ফিল করবে, কেউ আবার তার কথা ভুলেই যাবে। সময় তাকে আরো বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এক সময় হাস মত আরা নামে কোনো মহিলা এই দুনিয়ায় ছিলো এটাই কেউ জানবে না। মানিকগঞ্জের বাড়িই বা কি, সন্তানই বা কি কোনো কিছুই আর নাই। এটাই জীবন। জীবন সব সময় মৃত্যুর কাছেই পরাজয় বরন করেছে, আর করবেও। বড় ভাবী এখন ৩ হাত মাটির নীচে অন্ধকার কবরে একা এবং তার সাথে আর কেহই নাই। না তার সাধের বিছানা, না নায় নাতকোর, না আমেরিকার কোন সুসংবাদের কাহিনী।
আমি সব সময় মৃত মানুষের জন্য দোয়া করি। ভাবীর জন্যেও আমি দোয়া করি। তার উপরে আমার কোনো রাগ নাই।
গত ২৩/০১/২০২১ তারিখের সকাল ৮ টার সময় হটাত করে মনে হলো কোনো গন্ধই পাচ্ছি না। এর ২/৩ দিন আগে থেকে একটু একটু শরীর খারাপ ছিলো। দূর্বল লাগছিলো, ঘুম ঘুম ভাব ছিলো। একটু একটু ঠান্ডাও ছিলো। গন্ধ না থাকার কারনে ভাবলাম, করোনা কিনা। এর মধ্যে আবার জিহবায় একটা ছোট দাগ ছিলো যেটা আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো ঘা। ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম, উনি বললেন ভিটামিন সি খান। হয়তো ভিটামিন সি এর অভাব। ব্যাপারটা আমলে নিয়েছিলাম বটে কিন্তু গত কয়েক মাস আমি যেভাবে ভিতামিন সি খেয়েছি, তাতে আমার মনে হয়েছিলো আমার ভিটামিন সি সারপ্লাস হবার কথা। তারপরেও আরো বেশী করে লেবু প্লাস ভিটামিন সি ট্যাবলেট খাইতে থাকলাম। কিন্তু ঘা টার কোন কমার লখন দেখি নাই। এর মধ্যে হটাত করে গন্ধ না পাওয়ার কাহিনী। একটু ভয় তো পাইলামই কিন্তু শরীরে অন্য কোনো উপসর্গ নাই। যেমন, কোনো কাশি নাই, গলা ব্যথা নাই, জর নাই, অক্সিমিটারে অক্সিজেন লেবেল ৯৯% দেখায়। গায়ে কোনো ব্যথাও নাই। তারপরেও সেফ এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট, প্যারাসিটামল, আর ম্যাগ্নেশিয়াম ট্যাবলেট খাইলাম বেশ কয়েকদিন। অফিসেও গেলাম না। একই কাহিনী আমার বড় মেয়ের উম্মিকা। সেও কোনো গন্ধ পায় না কিন্তু রুচী আছে। অবশ্য ওর একটু ঠান্ডার ভাব আছে। সেটাও মারাত্তক না। তাই আমি , উম্মিকা আর কনিকার করোনার স্যাম্পল টেষ্টের জন্য প্রভা হেলথ কেয়ারকে বাসায় এনে স্যাম্পল দিলাম। এই তিন দিন যাবত ছাদে প্রায় ২/৩ ঘন্টা করে রোদ পোহালাম। রোদ পোহাইতে ভালোই লাগে।
একটু আগে ছাদ থেকে বাসায় এসে গোসল করলাম। আমি সাধারনত গোসলের পর পারফিউম দেই। হটাত খেয়াল করলাম, আমি পারফিউমের গন্ধটা পাচ্ছি। যেটা আগে একেবারেই পেতাম না। কি হলো?
কেদনোই বা গন্ধের সেন্সর আউট হয়ে গেলো আবার কেনোই বা গন্ধের সেন্সর আবার ফিরে এলো এটা আমার কাছে একটা গবেষনার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। যাই হোক, অন্তত খারাপ কিইছু সম্ভবত হয় নাই। বাকীটা আল্লাহ ভরসা।
সারাদিন বাসাতেই ছিলাম। এ কদিন বাসাতেই ছিলাম আসলে কারন আমি কোনো কিছুতেই গন্ধ পাচ্ছিলাম না। দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিলো। ফলে অনেকেই ফোন করেছিলো বুঝতে পারি নি। এই মাত্র ১০ মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠে কিছু নাস্তা করলাম। দেখলাম অনেকক্ষন যাবত মিটুল ওর ভাই বোনদের সাথে কথা বলছিলো। বিষয় ছিলো ‘বড় ভাবীর অসুস্থতা”। বড় ভাবী বেশ কয়েকদিন যাবত করোনার কারনে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। লাইফ সাপোর্টে ছিলো। হটাতই মিটুলের চিৎকার শুনলাম। বুঝলাম, ভালো খবর নাই।
কানতে কানতেই ড্রইং রুম থেকে আমার রুমে এসে বল্লো যে, “বড় ভাবী আর নাই”। ইন্না নিল্লাহে পড়ে বললাম, ভাবীর জন্য দোয়া করো, এ ছাড়া তো আর কারো কিছুই করার নাই।
মৃত মানুষের উপর কোনো রাগ রাখতে নাই। এই মুহুর্তে বড় ভাবীর উপরেও আমার কোনো রাগ নাই। তবে যতোদিন উনি জীবিত ছিলেন, তার উপর আমার একটা প্রচ্ছন্ন রাগ ছিলো। আর রাগটা নিতান্তই আমার কারনে নয়। মানুষ যখন জেনে শুনে ইনসাফ করে না, তার জন্য আমার রাগ হয়। বড় ভাবীর উপরেও আমার এই একটা কারনে বেশ রাগ ছিলো।
বড় ভাবীর ছেলে লিখন ভালো চাকুরী করে। কিন্তু তার চাকুরীর সমমর্যাদার মতো তার মধ্যে ইনসাফের অনুপাতটা একই রকম ছিলো না। লিজি আপা যিনি কিনা বাবার হক প্রাপ্য এবং লিজি আপাকে এই লিখন এবং তার পরিবার যে কোনো ভাবেই হোক, তার সেই বাবার হক থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করা যায়, সেটাই করার চেষ্টা করেছিলো। আমি এই অন্যায়টা যেনো না হয় তার ১০০% বিপরীতে দাড়িয়েছিলাম। শেষ অবধি লিজি আপারই জয় হয়েছিলো আল্লাহর রহমতে। কোনো একদিন আমি বড় ভাবীকে একটা কথা বলেছিলাম যে, যেদিন মারা যাবেন, সেদিন যেনো সবার হক সবাই পেয়েছে কিনা সেটা মন থেকে জেনে তারপর মারা যান। তানা হলে এর কৈফিয়ত দিতে দিতে আল্লাহর কাছে ঘেমে যাবেন। যদি লিখন কোনো অন্যায় করে থাকে, তাহলে মা হিসাবে লিখনকে বুঝানো দরকার যে, এটা অন্যায়। এটুকু বল্লেও আপনার পক্ষে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হয়, আপনি বেচে যাবেন।
আজ বড় ভাবীর সমস্ত ফাইল ক্লোজড। উনি মাত্র ১০ মিনিট আগে ইন্তেকাল করলেন। (রাত সাড়ে আটটায়)। লিখনকে কোনো প্রতিবাদ করেছিলেন কিনা জানি না। তারপরেও আমি তার জন্যে দোয়া করি তিনি যেনো জান্নাতবাসী হোন।
লিখন আমেরিকায় ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে আছে যে, না সে ঢাকায় আসতে পারতেছে, না ওখানেও ভালো কোনো জব করতে পারতেছে। ছেলেটার মধ্যে ভীষন রকমের খারাপ কিছু এটিচুড আছে যা ওর সাথে মানায় না। যাই হোক, যে যেভাবে চলে হয়তো ঈশ্বর তাকে তার পূর্ন প্রতিদান সেভাবেই দেন। কারো জন্য বদদোয়া আমি করি না। কিন্তু আমি সবার জন্য ইনসাফ করতে সর্বদা আগ্রহী।
আল্লাহ ভাবীকে জান্নাত বাসী করুন।
(Our Days are Numbered)
গত ১/১২/২০১৯ তারিখে কোরবানীর পরপরই আমাদের বাসায় একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান ছিলো। সেদিনই ছিলো বড় ভাবীর জন্য তার জীবনে আমাদের বাসায় শেষ অনুষ্ঠান। আর আজ ২৬/০১/২০২১ তারিখ। এই দুইটি তারিখের মধ্যে মোট দিন ছিলো ৪২২ দিন অর্থাৎ ১ বছর ১ মাস ২৫ দিন।
আমরা প্রায়ই বলি, আমাদের আয়ুষ্কাল নাম্বারড। কিন্তু কোন তারিখ থেকে এই নাম্বারটা কাউন্ট ডাউন হচ্ছে সেটা আমাদের কারোরই জানা নাই। সেদিন ১/১২/২০১৯ তারিখে বড় ভাবীকে আমরা খুব স্বাভাবিক একজন সুস্থ্য মানুষ হিসাবেই আনন্দে মেতেছিলেন দেখেছিলাম। উনি আসলেন, সভাবসুলভভাবেই সবার সাথে কথা বললেন, দেখা করলেন, খাওয়া দাওয়া করলেন, সবার সাথে ছবি তুল্লেন, একসময় সবার সাথে বাসায়ও চলে গেলেন।
উনি কেমন মানুষ ছিলেন সেটার বিবেচনার ভার আজকের দিনের প্রতিটি মানুষের কাছে ভিন্ন। কারো কাছে তিনি দেবীর মতো, কারো কাছে তিনি অতি প্রিয়জন, কারো কাছে আবার অপ্রিয় মানুষের মতো কিংবা কারো কাছে হয়তো কিছুই না। আমি তাকে সব সময়ই পছন্দ করতাম। কিন্তু একটা জিনিষ আমার কাছে সারা জীবন ঈসশরের কাছে রহস্যের মতো প্রশ্ন থেকেই ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, কেনো ঈশ্বর কোনো অবলা মেয়ে মানুষকে তার সংগীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেকদিন বাচিয়ে রাখেন? এর উল্টাটা তো হতে পারতো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে? এসব মহিলাদের অনেক কষ্ট থাকে একা একা বেচে থাকার। কেনো বলছি এ কথাটা?
এর কারন, যখন কোনো অবলা নারী তার সংগীর বা স্বামীর অনেক পরে তার জীবন অবসান ঘটান, তাদের অনেক বেদনা থাকে, অনেক চাওয়া থাকে কিন্তু তার সেই বেদনার অংশীদার তিনি কাউকে না দিতে পারেন, না বলতে পারেন। নিজের মনের মধ্যেই সব চেপে রাখেন। তার সংগী যখন আর বেচে থাকে না, তখন তার অনেক ইচ্ছা অনিচ্ছার মুল্যায়ন আর প্রাধান্য থাকে না। আমি এই তথ্য কথাটা বড় ভাবীর ব্যাপারে বলছি না। আমি আমার মাকেও দেখেছি। আমার বাবার অনুপস্থিতিতে আমার মাকেও কারো না কারো উপরে এমনভাবে নির্ভরশীল হতে হয়েছিলো যেখানে নিজের বাক স্বাধীনতা কিংবা ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন না। তাই, একটা বিধবা মহিলার থেকে অসহায় আর কোনো মানুষ হয় না। এই অসহায়ত্ত খাবারের জন্য নয়, এই অসহায়ত্ত কোনো স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নয় যে, তিনি তার ইচ্ছেমতো যেখানে সেখানে ঘুরে ফিরতে পারেন না এমন। এই অসহায়ত্ত অন্য রকমের। অনেক কিছুই আর নিজের থাকে না যা এক সময় ছিলো। সংগীর অবর্তমানে যেনো সব কিছু হারিয়ে যায়। চাপিয়ে রাখে নিঃশ্বাস, দমন করে রাখেন আশ্বাস, কিংবা অন্ধ হয়ে থাকেন তার নিজের বিশ্বাস থেকে অথবা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধেও। কিন্তু সব কিছু তারা বুঝেন, জানেন, ভাবেন কিন্তু বলার শক্তি থাকে না।
যাক যা বলছিলাম, সেই ১/১২/২০১৯ থেকে ভাবী কি জানতেন যে, তার দিনগুলি ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে? তিনি যদি জানতেন যে, আজ এই ১৬/১/২০২১ তারিখের পর আর এই পৃথিবীর কোনো কিছুই তার থাকবে না, তাহলে হয়তো তিনি গুনতেন একটি একটি করে দিন, ক্ষন সেকেন্ড আর মুহূর্ত যে, তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন শেষ দিনটার জন্য। ঈশ্বর এই দুটু তারিখ মানুষের বা প্রানীর জীবন থেকে এমনভাবে লুকিয়ে রেখেছেন যে, আজ অবধি কারোরই, হোক সে ক্ষমতাধর কোনো সম্রাট, কিংবা অতি জাদরেল বিচারপতি কিংবা সম্পদের অঢেল মালিক, জানার কোনো উপায় নাই। ভাবীও জানতেন না যে, গত ১/১২/২০১৯ তারিখে যে, ভাবীর আর মাত্র ৪২২ দিন ব্যালেন্স ছিলো।
হয়তো এমনি একটা মুহুর্ত আমার জীবনেও আসবে যার ইতিহাস এবং আমার জীবনের নাম্বারটা আজ থেকে কত ব্যালেন্স আছে বা ছিলো সেটা হয়তো কেউ লিখবেন।
(বড় ভাবীর জন্য জান্নাত কামনায় তাকে উতসর্গ করা এই লেখা)
তারিখটা চোখে পড়তেই খুব একটা খটকা লাগল। ২০২১ সাল।
যখন এই তারিখটা এমন হবে ২১২০ সাল, তখন প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে। আমার বয়সের আর কারোরই সম্ভবত এই দুনিয়ায় বেচে থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নাই। আজকের দিনের এমডির চেয়ারটায় আর আমি বসে নাই, আজকের দিনে আমার ব্যবহৃত গাড়িটি হয়তো অন্য কেউ ব্যবহার করছে অথবা আর এটা কোনো রাস্তাতেই নাই, অনেক পুরানো বলে। আমার সাধের বাড়িটায় হয়তো অন্য কেউ তার মতো করে বাস করছে, কিংবা কোনো ভাড়াটিয়াও হতে পারে। যে যত্ন করে আমি আমার ছাদ বাগানটা প্রতিদিন যত্ন করি, পানি দেই, গাছগুলির পাতায় হাত বুলিয়ে দেই, সেখানে আর কোনো ছাদ বাগান আদৌ আর থাকবে কিনা কে জানে। ছাদের কোনায় যে পাখীটা বাসা বেধেছিলো, সেটা কবেই মরে গেছে, হয়তো অন্য কোনো পাখী এসে তার জায়গাটা দখল করেছে। অথবা সেখানে আর কোনো বাসাই নাই।
একশত বছর পর, সেই সময়ে চলমান আমার বংশধরেরা বেচে থাকবে, কিন্তু হয়তো আমি ওদের মধ্যে আর বেচে থাকবো না। যেমন বেচে নাই এখন আমার মধ্যে আমার সেই নাম না জানা পূর্বপুরুষেরাও। মাঝে মাঝে আমি তাদের কথা জানতে চাই, তাদের সবার নামও জানতে চাই, তাদের জীবনধারার ধরন জানতে চাই, নিশ্চয়ই তারাও অনেক ব্যস্ত ছিলো, নিশ্চয়ই তারাও প্রাত্যাহিক জীবনে অনেক গল্পগুজব করতো, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দিত, হয়তো কখনো জীবনের সমস্যায় জর্জরীত হয়ে মানসিক কষ্টে কিংবা জীবনের কোনো সাফল্যে আনন্দিত হয়ে হয়তো অতিশয় খুশীতে কোনো এক বিকালে গোল করে কোনো অনুষ্ঠান করতো। আর এটাই তো হবার কথা। যেমন হচ্ছে ঠিক আমার এই সময়টায়। খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন ছিলো আমার দাদীর দাদীমা? অনেক সুন্দুরী? কিংবা অনেক মায়াবী? অথবা কেমন সুপুরুষ ছিলেন আরো একশত বছর আগের আমার দাদার দাদারা? কে কোন মাছ খেতে পছন্দ করতো? বা কার সপ্নের বাসনা কেমন ছিলো? খুব জানতে ইচ্ছে করে, কি ছিলো তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা যা পূর্ন হয় নাই অথচ শখ ছিলো?
সেই একশত বছর আগে হয়তো অনেক জনপদ ছিলো যা কালের বিবর্তনে সব কোথায় যেনো হারিয়ে নতুন জনপদ তৈরী হয়েছে। হতে পারে যে জায়গাটায় আমার পূর্বসুরী কোনো এক দাদা তার প্রেয়সীর টানে হয়তো কোনো এক রাস্তার ধারে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিলো, আজ সেই জনপদ কোথাও নাই, হয়তো তলিয়ে গেছে কোনো এক নদীর ভাংগনে, অথবা সেই জনপদ বিলুপ্ত হয়ে হয়তো তৈরী হয়েছে আজকের কোনো অসাধারন অট্টালিকা। আজ যদি সেই সব মানুষ গুলিকে আবার ফিরিয়ে আনা যেত, হয়তো বলে উঠতো, ‘ওই যে দেখছিস ওই বড় বিল্ডিংটা, ওখানে ছিলো এক প্রকান্ড খাল, ওখানে আমরা সাতার কাটতাম। ওই যে দেখছিস বড় রাস্তাটা, ওটা ছিলো তখনকার প্রতাপ্সহালী সগীর মিয়ার হারিয়ে যাওয়া কোনো এক প্রাসাদ। আরো কত কি’।
তাদের কারো কথাই আজ কেউ মনে রাখে নাই। মনে রাখার দরকারও মনে করে না। আসলে সময় কাউকেই আজীবন মনে রাখতে দিতে চায় না। কত শতক প্রজন্মকে যেমন টপকে আমরা আজ এই শতকে নিজেদের নিয়ে মশগুল আছি, তেমনি আরো অনেক শতক প্রজন্মও আমাদেরকে টপকে তাদের সময়ে তারা তাদেরকে নিয়ে মশগুল থাকবে এটাই তো হবার কথা। অথচ আজ কতই না ব্যস্ত আমি, আমরা। কতই না প্রতিযোগীতা আমাদের মধ্যে। সম্পদের পাহাড় গড়েও যেনো শান্তি নাই। তারপর?
তার আর পর নাই। আসলেই আর কোনো পর নাই।
২১২০ সালে আমরা এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আর দেখার সৌভাগ্য হবে না। অথচ তখনো সূর্য যেভাবে উঠার কথা সেভাবেই উঠবে, সেদিকে ডোবার কথা সেদিকেই ডববে। শুধু আমরা আর কোনো সুর্যদোয় কিংবা সুর্যাস্ত দেখতে পাবো না। পর্যন জায়গা গুলি অন্য কেউ উপভোগ করবে, শীতকালের আমেজ, কিংবা নতুন মহামারীও তাই।
জীবনটা আসলে মানুষের কল্পনার থেকেও ছোট।
আজ থেকে শত বছর পরে আমার এই লেখাটা যারা পড়বেন তাদের মধ্যে আজকের দিনের আর কেউ বেচে নেই। অথচ আজকের দিনের জীবিত মানুষগুলি কিংবা আমার আগের শতবছরের মানুষগুলি যে বিষয়গুলি নিয়ে একে অপরের সাথে পরস্পরে বিবাদ, মনোমালিন্য, যুদ্ধ, অভিমান, মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি করেছি, সেগুলি আর আমরা কেহই মনে রাখতে পারবো না, আমরা একেবারেই ভুলে যাবো। পুরুটাই ভুলে যাবো। এসবের আর কোনো মাহাত্য আমাদের কাছে কোনো কিছুই আর অবশিষ্ঠ থাকবে না।
আমরা যদি আরো শতবছর আগে ফিরে যাই, ধরি সেটা ১৯২২ সাল। সেই দিনের পৃথিবী কেমন ছিলো আর সেই পৃথিবীর মানুষের মধ্যে কি নিয়ে ভয়, শংকা, মারামারি, হানাহানি নিয়ে তাদের মস্তিষ্কে কি ভাবনার খেলা চলছিলো, তাদের মুখের চাহনীতে কি চিত্র ফুটে উঠেছিলো সেই চিত্র কিন্তু আজকের দিনের কোনো মানুষের মাথায় বা মস্তিষ্কেও নাই। আর ইতিহাসের কল্পনায় থাকলেও সেই বাস্তবতার নিরিখে তার আসল চিত্রের ধারে কাছে আমরা তা আচ করতে পারি না।
জাষ্ট একবার ভাবুন তো! সেই অতীত দিনের কোনো এক পরিবারের সদস্যগন হয়তো তাদের পারিবারিক জমাজমি, কিংবা সম্পদের রেষারেষিতে যখন এক ভাই আরেক ভাইকে, কিংবা এক বোন আরেক ভাই বা বোনের বিরুদ্ধে চরম রেষারেষিতে একে অপরকে খুন, জখম বা আঘাত করেছে, কিংবা নিজের লোভের কারনে অন্যের কোনো সম্পত্তি দখল করার জন্য চরম আঘাত করেছে কিংবা এক অংশীদার আরেক অংশীদারকে সমুলে বিনাশ করতে মরিয়া ছিলেন, সেই সম্পদ কিংবা সেই অর্থ এখন কার কাছে? আর সেই বা কোথায়? পাহাড় পরিমান সম্পদ গড়া হয়েছিলো, ব্যাংক ভর্তি টাকা, সোনাদানা হয়তো জমা করা হয়েছিলো, সেই হিসাবের খাতা এখন আর কোনো গোপন নাই, না আছে তাকে যক্ষের মতো ধরে রাখার কোনো আকুতি বা পেরেসানি। কারন আমি সেই জগতেই নাই। আমাদের গড়ে যাওয়া সম্পদ যেখানে, তার থেকে আমরা এত দূর যে, তাকে কোনো অবস্থাতেই আর স্পর্শ পর্যন্ত করার কোনো অলৌকিক শক্তিও নাই। এটাই মানুষের জীবন। সে যাইই কিছু আকড়ে ধরুক না কেনো, সময়ের কোনো এক স্তরে গিয়ে সে আর কোনো কিছুই নিজের জন্য আজীবন আগলে রাখতে পারে না। যদি বলি-সেগুলি পরিবার পাবে, পরিবারের পরিবার বংশ পরম্পরায় পাবে, সেটাও সঠিক নয় কারন পরিবার গঠন হয় অন্য পরিবারের মানুষ নিয়েই যারা পিউর পরিবার বলতে কিছুই থাকে না। এটা অনেকের কাছে শুনতে অবাক বা যুক্তিহীন মনে হলেও এটাই ঠিক যে, আত্মকেন্দ্রিক এই পৃথিবীতে নিজের সন্তানও নিজের মতো না, নিজের পরিবারও নিজের মতো না। আমাদের নিজের চিন্তাভাবনা নিজের সন্তানের চিন্তাভাবনা, বা নিজের পরিবারের চিন্তাভাবনা কখনোই একই সমান্তরালে বহমান নয়। আর ঠিক তাই, এক পরিবার আরেক পরিবারের সাথে মিশ্রন হতে হতে প্রাচীন পরিবারটিও একদিন তার নিজের সত্ত্বা হারিয়ে খান বংশের মানুষেরা, সৈয়দ বংশ, সৈয়দ বংশ বঙ্গানুক্রমে মাদবর কিংবা চৌধুরী বংশে রুপান্তরীত হয়ে যায়। আমাদের আমিত্ব পর্যন্ত আর কেউ রাখতে পারেনা।
যাক যেটা বলছিলাম শত বছরের বিবর্তনের কথা।
ছোট একটা উদাহরন দেই। আজ থেকে সবেমাত্র ৩০/৪০ বছর আগের কথা যখন আমরা বা আমি ছোট ছিলাম, স্কুলে লেখাপড়া করতাম। তখনো স্কুলের ক্লাস ক্যাপ্টেন হবার জন্য কিংবা কলেজের ফুটবল টীমে নাম লিখার জন্য এক সহপাঠির সাথে আরেক সহপাঠির মধ্যে কতই না কোন্দল কিংবা বিরুপ সম্পর্কে পতিত হতাম, আজ প্রায় সেই ৩০/৪০ বছর পর সেই স্কুলের কেইবা মনে রেখেছে কে স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলো বা সেই দিনের সেই ফুটবল টীমের আমি একজন সদস্য ছিলাম? আজব ব্যাপার হচ্ছে-আমি যে সেই স্কুলের একজন দাপুটে এবং অতীব জনপ্রিয় ছাত্র ছিলাম, সেটাই বা কয়জন এখন আবিষ্কার করতে গিয়ে তাদের সময় অপচয় করছে কিংবা মনে রাখার চেষ্টা করছে? যদি সেটাই হয়, ভাবুন তো আজ থেকে শতবছর পর তাহলে আমার বা আমাদের অস্তিত্বটা কোথায়? কোথাও নাই। আর এই শতবছর পেরিয়ে যখন আরো শতবছর পেরিয়ে যাবে, তখন যেটা হবে সেটা হলো-আমি যে এই পৃথিবীতে ছিলাম, সেটাই বিলীন হয়ে যাবে। এখন আমরা যারা যাদেরকে এই পৃথিবীতে গর্ব করে মনে রাখি তারা হয়তো অতীব ব্যতিক্রম। তারা তাদের সময়ে সম্পদের কারনে নয়, কর্মের কারনে ‘সময়’টাকে আলাদা করে যুগে যুগে সেই কর্মের ফল ভোগ করতে পারে এমন কিছু কর্ম হয়তো পিছনে ফেলে গিয়েছেন বিধায় হয়তো শতবছর পরেও আমরা তাদের সেই কর্মফল ভোগকারীরা কিছুটা মনে রাখি। এটার হার অতীব এবং নিছক খুব বেশী না। আমরা সেই তাদের দলে পড়ি না।
হয়তো অনেকেই বলবেন, আজকের দিনের ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা আমাদের আজকের দিনের সমস্ত মেমোরী সংরক্ষন করে রাখতে পারি যা যুগে যুগে আমাদের বংশ পরম্পরায় এর সংরক্ষন করে আমাদেরকে জীবিত রাখবেন। এটা কোনোভাবেই সত্য না। এ ব্যাপারে একটা আরো ছোট উদাহরন দেই- জগত বিখ্যাত সঙ্গীতরাজ মাইকেল জ্যাকসন যিনি ২০০৯ সালে মারা যান। খুব বেশীদিন নয়, এটা মাত্র ১৩ বছর আগের কথা। এই মাইকেল জ্যাকসন সারা দুনিয়ায় এমন কোনো জায়গা ছিলো না যে যুবসমাজ, কিংবা শিক্ষিত সমাজ তাকে না চিনতো। তার বিচরন ছিলো সর্বত্র। তার চলাফেরা, পোষাকাদি, তার অঙ্গভঙ্গিও তখনকার দিনের প্রতিটি যুবক যেনো মডেল হিসাবে নিয়ে নিজেরাও সে রকমের পোষাক, আচরন ভঙ্গীতে অনুসরন করতো। একবার ভাবুনতো, এ যুগের কতজন যুবক আজ সেই মাইকেল জ্যাকসনের নামটা পর্যন্ত জানে? তাহলে আজ থেকে শতবছর পরের চিত্রটা কি হবে? হতে পারে, এই মাইকেল জ্যাকসনের নামটা সারা সঙ্গীত শুধু নয়, আর কোথাও হয়তো প্রতিধ্বনিতে বেজে উঠবে না। অথচ এক সময় সেইই ছিলো ঐ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটা ইমেজ। আরো খুব কাছের একটা উদাহরন দেই।
প্রতিদিন আমরা অসংখ্য ছবি তুলছি, আমরা তা আমাদের ফেসবুক, সোস্যাল মীডিয়ায় তা প্রতিদিন পোষ্ট করছি। আমরাই গত পাচ বছরের আমাদের ছবিগুলিই পুনরায় রিভিউ করে দেখার সময় পাই না নতুন নতুন ইভেন্টের ছবির কারন। যা একবার তোলা হয়েছে, যা একবাএ দেখা হয়েছে, তার আর খুব একটা সংরক্ষন করে বারবার দেখার স্পৃহাই আমাদের নাই, তাহলে আমার এসব স্মৃতিময় ইভেন্টের সেই স্মৃতি অন্য আরেকজন রাখবে এটা ভাবা বোকামি। হতে পারে আমার বা আমাদের অন্তর্ধানে সাময়িকভাবে সেগুলি খুব কাছের কিছু লোক একবার দুইবার দেখে কিছু স্মৃতি রোমন্থন করবেন। আর ব্যাপারটা এখানেই শেষ।
আর এটাই জীবন। আমাদের এই ছোট আধুনিক জীবনে আমরা আসলে একে অপরের সাথে হয়তো কন্টাক্টে আছি, কিছু সেই কন্ট্যাক্ট মানে কিন্তু এটা নয় যে, আমরা একে অপরের সাথে কানেক্টেড। একই ঘরে বসবাস করে, কিংবা একই প্লাটফর্মে একসাথে থাকার নাম হয়তো কন্ট্যাক্ট, কিন্তু এর মানে কানেকশন নয়। আমরা ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে কানেকশনবিহীন হয়ে পড়ছি। আর এমন একটা কানেকশনবিহীন সম্পর্কে কেনো আমরা একে অপরের সাথে বিদ্বেষ নিয়ে বেচে থাকছি?
এটাই যদি হয় আমাদের জীবনের চিত্র, তাহলে পরিশেষে চলুন আমরা আমাদের জীবনটাকে একটু অন্যরকম করে ভাবী। জীবনটাকে একেবারে সহজ করে ফেলি। কেউ এই পৃথিবী থেকে জীবন্ত ফিরে যেতে পারবো না। কেউ জীবন্ত ফিরে যেতে পারেও নাই, না আজীবনকাল এই প্রিথীবিতে থাকতে পেরেছে। আজকের দিনের যে গাড়িটা কিংবা অত্যাধুনিক ফোনটা আমরা ব্যবহার করছি সেটাও একদিন জাংক হিসাবেই শেষ হবে। কোনো কিছুই আর রিলেভেন্ট মনে হবে না। তাই যে সম্পদের জন্য আমরা আজ এতো হাহাকার করছি, একে অপরের উপর ক্ষিপ্ত হচ্ছি, এইসব কিছুই আসলে নিরর্থক, অকেজো। হ্যা, জীবনের চাহিদার অতিরিক্ত কোনো কিছুই আমাদের দরকার নাই। আমাদের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রন করা আবশ্যিক, একে অপরের ভালোবাসার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে তুলি, কারো উপর কারো বিদ্বেষ না রাখি, কারো সম্পত্তির উপর কিংবা কারো হকের উপর আমরা কেউ লোভ না করি। না কারো উপর কোনো জুলুম করি, না কাউকে নিজের সার্থের কারনে কোনো ক্ষতি করি। যতক্ষন আমরা অন্যের সাথে নিজের সাথে তুলনা না করি, ততোক্ষন পর্যন্ত সম্ভবত আমরা নিজের লোভের কাছে পরাভূত হবো না।
আমাদের সবার গন্তব্য স্থান পরিশেষে একটাই-কবর। কেউ হয়তো আগে কেউ হয়তো পরে। হোক সে মসলমান, হোক সে অন্য কোনো ধর্মের। কোনো কিছুই সাথে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। শতবছর পরে এমনিতেও আমরা হারিয়েই যাবো। যখন নিজেরাই হারিয়ে যাবো, তাহলে আমাদের অসাধু উপায়ে হানাহানি, মারামারি কিংবা জোর করে ছিনিয়ে নেয়া গড়ে তোলা সাম্রাজ্যই বা রাখবো কার জন্যে আর কেনো? কিছুই থাকবে না, রাখতেও পারবো না।
শতবছর পরেও এই আকাশ নীলই থাকবে, পাহাড় সবুজই থাকবে, সাগর সেই শতবছর আগের মতোই কখনো কখনো উত্তালই হবে। শুধু আমাদের নামের সম্পদগুলি অন্য আরেক নতুন নামে লিপিবদ্ধ হবে, আমার শখের সব কিছু অন্য আরেকজন তার নিজের মতো করে ব্যবহার করবে। আমার বলতে কিছুই নাই। আজ যে ক্ষমতার মসনদে বসে আমি হাতের ইশারায় জুলুম উপভোগ করছি, সেই ক্ষমতার মসন্দে বসেই হয়তো অন্য কোনো এক সময়ে আমারই বংশধর কারো দ্বারা শাসিত হচ্ছে, কে জানে। এর পার্থিব অনেক নমুনা আমরা দেখেছি মীর জাফরের বংশে, হিটলারের পতনে, কিংবা মুসুলিনি বা অনেক রাজার জীবনে। আজ তারা সবাই এক কাতারে।
এটা যেনো সেই বাল্ব গুলির মতো-কেউ শত ওয়াটের বাল্ব, কেউ হাজার পাওয়ারের বাল্ব, কেউবা কয়েক হাজার ওয়াটের বাল্ব কিন্তু ফিউজ হয়ে যাওয়ার পরে সবাই সেই ডাষ্টবিনে একসাথে। সেখানে কে শ ওয়াটের আর কে হাজার পাওয়ারের তাতে কিছুই যায় আসে না। না তাদেরকে আর কেউ খুজে দেখে।
অবাক করার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে এ কয়দিন। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কি হচ্ছে আসলে। গত ৯ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে একটা ফোন কল এলো আমার এক পরিচিত নেভী অফিসার ফারুকের কাছ থেকে। ছেলেটাকে আমি চিনতাম প্রায় বছর দুয়েক আগে কোনো একটা ব্যবসায়ীক আলাপের মাধ্যমে। সে এসেছিলো আমার কাছে ম্যাগপাই নামে কোনো একটা কোম্পানীর জন্য পলাশপুরে আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজের খালী স্পেসটা ভাড়া নেয়ার জন্য। সম্ভবত মোট দুদিন দেখা হয়েছিলো। এরপরে আর কখনোই দেখা হয় নাই। পরে শুনেছিলাম যে, ফারুক আর ওই ম্যাগপাই কোম্পানীতে নাই, সে তার শেয়ার বা মালিকানা ব্যাক করে নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।
এর মধ্যে ওর সাথে আর আমার কোনো কথাবার্তা হয় নাই, না দেখা হয়েছে। খুব একটা ভালো মতো ওকে চিনি বলেও মনে হয় না কিন্তু যেটা বুঝেছিলাম সেটা হলো যে, ছেলেটার মধ্যে একটা জিদ আছে। এর মধ্যে আমিও ওকে ভুলে গিয়েছিলাম, আর ফারুক নিজে থেকেও আর কখনো যোগাযোগ করে নাই। ফারুকের সাথে সেদিন আরেক ভদ্রলোক এসেছিলেন মিষ্টার কাম্রুজ্জামান, তার সাথে আমার এখনো যোগাযোগ আছে কারন ম্যাগপাই কোম্পানীটা এখন তিনিই চালাচ্ছেন আর সেটা আমার পরিত্যাক্ত মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কমপ্লেক্সেই। অনেকবার আমি নিজে থেকেই ফারুকের ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খুব বেশী একটা তথ্য কাম্রুজ্জামান সাহেব হয় দিতে চান নাই অথবা যে কোনো কারনেই হোক ফারুক সম্পর্কে তিনি খুব একটা আগ্রহ দেখান নাই।
যাই হোক, অবশেষে, অনেকদিন পর সেদিন ৯ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে হটাত করে ফারুক আমাকে ফোন করেছিলো। ওর ফোন নাম্বারটা আমার কাছে সেভ করা ছিলো, তাই বুঝতে অসুবিধা হয় নাই ফারুকের কল। সাধারনত, আমাকে যারা ফোন দেয়, হয় তারা কোন কাজ চায় অথবা কোনো ধরনের সাহাজ্য বা বুদ্ধিই চায়। অনেক সময় আমি ফোন ধরি, অনেক সময় ফোন ধরিও না। ঠিক একইভাবে সেদিন ৯ ডিসেম্বরে ফারুক যখন সকাল ১১ টার দিকেব আমাকে ফোন করলো, আমি প্রথমে ভাবলাম, হয়তো কোনো সাহাজ্যের জন্যই ফোন করেছে। দিনটায় খুব ব্যস্ত ছিলাম, ভাবলাম, ব্যস্ততা শেষ হলে ফোন ব্যাক করবো। তাই ততক্ষনাত আর ফোনটা ধরতে চাই নাই।
দুপুর পার হয়ে গেলো। আমি একটু ফ্রি হলাম। মোবাইলটা হাতে নিতেই ফারুকের মিস কলটা চোখে পড়লো। একবার ভাবলাম, ওকে একবার ফোন ব্যাক করি। এমনো তো হতে পারে যে, ওর কোনো বিপদ যেখানে হয়তো আমার সাহাজ্য আসলেই দরকার, আবার এমনো তো হতে পারে সে আমাকে এম্নিতেই কেমন আছি জানার জন্য ফোন করেছে কুশল বিনিময় করার জন্য। আবার এমন তো হতে পারে যে, এই ফোন কলটা আমার জন্যই জরুরী!
ফোন দিলাম, ফোনে শুধু ফারুক আমাকে বল্লো যে, স্যার আমার কিছু আত্তীয় আমার বাসায় এসেছে। বাচ্চা মানুষ, কিন্তু বিশাল একটা কাজ হাতে নিয়ে ফেলেছে চায়নীজদের কাছ থেকে, কন্সট্রাকশন রিলেটেড। জিজ্ঞাসা করতে করতে জানলাম যে, যে কোনোভাবেই হোক, ওরা চাইনীজ কোম্পানী “চাইনীজ কন্সট্রাকশন সেভেন্থ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন কর্পোরেশন লিমিটেড” থেকে বড়সড় একটা ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছে বালু আর ইট সাপ্লাইয়ের কাজে। কিন্তু ওদের টাকা নাই তাই কাজটা করতে পারছে না। ওয়ার্ক অর্ডারের ভ্যালু প্রায় হাজার কোটি টাকার উপরে।
ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লেগেছে আমার কাছে। আর অদ্ভুত লাগার অনেকগুলি কারনও আছে। বহুদিন যাবত আমি আর মূর্তজা ভাই এই কন্সট্রাকশন লাইনে কিভাবে ঢোকা যায় সেটার একটা হোমওয়ার্ক করছিলাম। মীর আখতার হোসেন গ্রুপের কর্নধার জনাব মীর নাসিরব আমার আত্তীয়। তার কোম্পানীর মাধ্যমে আমি আর মূর্তজা ভাই কয়েকবার কয়েকটা বড় কাজের সন্ধানেও বেরিয়েছিলাম কিন্তু খুব একটা কাজ হয় নাই। কিন্তু এটা বুঝতেছিলাম যে, সারা ওয়ার্ল্ডে এই কন্সট্রাকশন কাজই একমাত্র ব্যবসা যারা উচু কোনো স্তরে পৌঁছে যেতে পেরেছে। কিন্তু এর জন্য সর্বোচ্চ মহলের অনেক প্রকার আশীর্বাদ যেমন লাগে তেমনি লাগে স্পীড মানির ক্ষমতাও। আমাদের দুটুরই কিছু কিছু সুবিধা ছিলো বটে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কেনো জানি ব্যাপারটা ব্যাটে-বলে সংযোগ হচ্ছিলো না। অনেকবার আমরা আমরাই বেশ কিছু হোম ওয়ার্ক করেছিলাম কিন্তু ব্যাপারটা হোম ওয়ার্কের পর্যায়েই ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের বুরুক্রেটিক সিস্টেমের জন্য আমরা কিছুতেই বুঝতেছিলাম না কিভাবে বড় বড় কন্ট্রাক্ট গুলি ধরা যায়।
ফারুকের ফোনের বিষয়টা মুর্তজা ভাইকে বলার সাথে সাথে ব্যাপারটা বিদ্যুত গতিতে যেনো এগিয়ে যেতে থাকলো। আমার পরিকল্পনা ছিলো, ফারুকের কাছ থেকে ওর আত্তীয়ের কাজের বিষয়টা এর পরেরদিন আমরা দুজনে বসে জেনে নেবো কিন্তু মূর্তজা ভাই যেনো আমার থেকেও বেশী স্পীডি। মূর্তজা ভাইয়ের অনুরোধে আমরা সেদিন রাতেই ফারুক এবং ওর টিমের সাথে মিটিং করলাম মীরপুর ক্যান্টন মেন্টের সিএসডির অভ্যন্তরে। রাত তখন প্রায় ১০টা। । ফারুক নিজে এবং তার দুই আত্তীয় আরিফুজ্জামান রুবেল আর দুলাল মোল্লা নামের দুই জনকেই সেখানে নিয়ে এলো। আরিফ আর দুলালকে দেখে আমার খুব অদ্ভুত লেগেছিলো যে, ওদের বয়স নিতান্তই কম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা ওই রকমের না যার মাধ্যমে এমন সব কাজ হাতে আসবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ওরা সেই কাজটাই করতে পেরেছে যেটা আমরাও পারি নাই। আমি আর মূর্তজা ভাই ওদের কাছে থাকা চায়নীজদের ওয়ার্ক অর্ডারটা নেড়েচেড়ে দেখলাম, পড়লাম, সবই ঠিক মনে হচ্ছিলো। আবার পরক্ষনেই এটাও উড়িয়ে দিচ্ছিলাম না যে, এটা আবার কোনো ফাদ না হয়ে উঠে। ফারুকের উপর আমার কোনো নেগেটিভ ধারনা ছিলো না। ফলে আমি ফারুককে সরাসরি একটা প্রশ্ন করলাম, কেনো ফারুক এই কাজের সাহাজ্যের জন্য আমাকে সে ফোন করলো বা বেছে নিলো। সেতো ইচ্ছে করলে আরো কাউকে বেছে নিতে পারতো। এই কাজ গুলি করার জন্য হয়তো আরো অনেকেই রাজী হবে এবং হতো। ফারুক সেতা না করে, সে আমাকেই কেনো ফোন করলো?
ফারুক জানালো যে, ফারুক নিজেও কোনো কন্সট্রাকশনের কাজে জড়িত নয়। কিন্তু রুবেল এবং দুলাল তারা ওর শশুড় বাড়ির তরফ থেকে আত্তীয়। ওরাই মাঝে মাঝে জীবন ধারনের জন্য ছোট খাটো ঠিকাদারী, কখনো আবার কোনো সাইটে আবার কখনো কোনো বড় কোম্পানীর জন্য টুক টাক সাপ্লাইয়ের কাজ করে থাকে। এসব করতে গিয়ে যেভাবেই হোক, কিছু কিছু মানুষের সাথে ওদের উঠাবসা আছে। আর এই সুবাদে ওরাও চেষ্টা করেছে তারা নিজেরাই কোনো একটা কাজ বাগিয়ে নিতে পারে কিনা।
বাংলাদেশটা এমন এক দেশ যেখানে পয়সার মান সাদাই হোক আর কালোই হোক, বেশীরভাগ মানুষ আজকাল শুধু টাকার পিছনেই ঘুরে। যখন টাকার গন্ধ চারিদিকে মুর মুর করতে থাকে, তখন কে সচীব আর কে মন্ত্রী এর কোনো লেবেল থাকে না। তাদের সবার উদ্দেশ্য একটাই-টাকাটা ধরা। আর এই ধরাকে বলে কালো টাকার বেসাতী। আমরা আজ অবধি কালো টাকার ধারে কাছেও যেতে চাই নাই আর যেতে চাইও না। তাই হয়তো এই গোপন ব্যাপারটা আমাদের ক্ষমতায় ছিলো না। আর যেহেতু আমাদের যপগ্যতা থাকা সত্তেও আমরা কালো টাকার ধারে কাছে যাই না, ফলে এই দেশের বৃহৎ কোনো প্রোজেক্ট আমাদের হাতে আসেও না। যাইই হোক, আমি ফারুকের সাথে বিস্তারীত কথা বলে জানলাম যে, ফারুকের অন্যত্র যাওয়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছা থাকলেও সে চেয়েছিলো এমন একজন মানুষ যারা মিথ্যার বেসাতী করেন না আবার ইন সাফের মুল মন্ত্র নিয়ে কাজ করেন। ফারুকের মনে হয়েছে, আমিই সেই ব্যক্তি যার কাছে পুরু ব্যাপারটা শেয়ার করা যায়। আমি একটা কথা প্রায়ই বলে থাকি-I feel safe in the hands of a pious and justified man. চোর ও কিন্তু চোরকে বিশ্বাস করে না, চোর ও কিন্তু চোরকে পছন্দ করে না। চোর নিজেও চায় একজন ভালো মানুষের সাথে কাজ করুক, সম্পর্ক করুক ইত্যাদি। ফারুক চোর নয়, রুবেল কিংবা দুলাল তারাও চোর নয়, কিন্তু আমাদের আশেপাশে এতো বেশী মুখোশ ধারী চোর রয়েছে যে, তাদের বাজ্যিক চেহাড়া দেখে বুঝবার কোনো উপায় নাই, তারা ইন সাফ করে কিনা। কিন্তু মুখে সারাক্ষন হাদিস কালামের কথা উচ্চারিত হতেই থাকে। কিন্তু এই হাদিস শুনে ভরষা করার কোনো সুযোগ নাই। ঠকবার সম্ভাবনাই বেশী। ফারুকের মনে হয়েছে, আমরা সেই ক্যাটেগরির মানুষ যারা ইন সাফ নিয়ে চলেন, কাউকে ঠকাবার কোনো মানসিকতা কখনোই নাই।
প্রাথমিকভাবে আমি আর মূর্তজা ভাই ওদের কাছ থেকে ইনিশিয়াল তথ্য জেনে বেরিয়ে এলাম। আর বললাম যে, যদি সব কিছু সথিক থাকে, তাহলে হয়তো আমরা ওদেরকে নিয়ে কাজ করবো। ওদের টাকা নাই, কিন্তু আমাদের যা আছে তা দিয়ে তাদের পাওয়া ওয়ার্ক অর্ডারের কাজ করা সম্ভব। হয়তো ৩/৪ কোটী টাকার দরকার। আর সেটা আমাদের আছে। কিন্তু কিভাবে করবো, কাজের ধারা কি হবে, কে কিভাবে পার্টনারশীপ করবে তার একটা বিস্তারীত প্রোফেশনাল গাইড লাইন থাকা দরকার।
ওই যে বলেছিলাম একটু আগে যে, বহু আগে থেকেই কন্সট্রা ক শন কাজের ব্যাপারে আমাদের একটা সুপ্ত বাসনা ছিলো, আর সে মোতাবেক একটা হোম ওয়ার্ক করাই ছিলো। এখন ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, তাহলে সিদ্ধান্তটা নিতে খুব বেশী একটা সময় ক্ষেপন হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস ছিলো। বাসায় এসে আমি আর মুর্তজা ভাই ফোনে আলাপ করলাম যে, এর পরেরদিন অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে ফারুক এবং তার টিমের সাথে আমাদের বিস্তারীত আলাপের দরকার। পরেরদিন আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী হাসনাবাদে একটা সম্মিলিত মিটিং এর দিন ধার্য্য করা হলো।
পরদিন ১০ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে ফারুক, রুবেল আর আমি (মাঝে মাঝে মুর্তজা ভাই) এক সাথে বিস্তারীত আলাপ করে জানলাম যে, বড় বড় টেন্দার গুলির মধ্যে সরকারী অফিসের ছোট ছোট কর্ম কর্তাদের মাধ্যমে বড় বড় কর্মকর্তারা একটা সিশটেম করে রেখেছে এমনভাবে যে, বড় বড় নামীদামী কোম্পানিগুলিকে তারা এখন আর পারসেন্টেজে বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রায়ই তারা তাদের ন্যয্য কালো টাকার ভাগে কম পড়ছে। আর যেহেতু ব্যাপারটা কালো টাকার খেলা, ফলে সেসব কর্মকর্তারা এমন একটা নতুন পলিসি উদ্ভাবন করেছেন যেখানে তাদের ভাগ নিশ্চিত হয় আবার কাজটাও হয়। এতে প্রোজেক্ট ভ্যালু বেড়ে যায়, তাতে কিছুই যায় আসে না। টাকা তো আসবে গৌরী সেনের পকেট থেকে, অসুবিধা কি? এই সিস্টেমে কেউ কাউকে ঠকায় না। আমাদের রুবেল আর আরিফ সে রকম একটা সিশ্তেমের খোজ জানে। এই সিস্টেমে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদুত থেকে শুরু করে দেশের প্রধান হোমরা চোমড়ারাও আছেন। যাক সে কথা এখানে আর না বলি।
রুবেল গত প্রায় ১ বছর যাবত এই সব সিস্টেমের সাথে চলাফেরা করে করে সেও কিছু কাজ হাতে নিতে পেরেছে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সমস্যা দাড়িয়েছে তারদের হাতে ওয়ার্কিং কোনো ক্যাপটাল নাই। ব্যাপারটা খুব মনোযোগ সহকারে বুঝলাম।
এবার আমাদের পক্ষ থেকে কিছু শর্ত জুড়ে দিলাম যে, আমরা কাজ করতে পারবো যদিঃ
ক। কোনো টাকার মধ্যে অর্থাৎ আমাদের পক্ষে আসা কোনো টাকায় কোনো কালো টাকা না আসে। যেমন কাজে ফাকি দিয়ে অযথা বিল না করা হয়। কিংবা দুই নম্বরী করে কোনো কাজ না করা হয়। আমরা আল্লাহকে ভয় পাই। টাকার অতো বেশী আমাদের দরকার নাই কিন্তু সৎ থাকতে চাই নিজের কাছে, নিজের দেশেরর কাছে আর হালাল টাকা কামাই করতে চাই।
খ। যে সব কাজ ইতিমধ্যে রুবেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নামে বরাদ্ধ হয়ে গেছে, সে সব কাজ গুলি পুনরায় একটা নতুন কোম্পানী (যেটা আমরা সবাই মিলে ফর্ম করবো) তার নামে আনতে হবে। যদি কোনো কাজ রুবেল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক্স থেকে ট্রান্স ফার না করা যায়, তাহলে রুবেল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক্স ও আমাদের সবার মালিকানা থাকতে হবে যাতে সেটাও আমাদের পলিসিতে চলে।
গ। আমরা সব ফাইন্যান্স করবো, এবং এই ফাইন্যান্স কোম্পানীকে আপাতত লোন হিসাবে প্রদান করা হবে যা কোম্পানী তার লভ্যাংশ থেকে আমাদেরকে পুনরায় পরিশোধ করে দেবেন।
ঘ। কোম্পানীর একটা নাম ফিক্সড করা হলো। আমি সাথে সাথেই বললাম, এই নতুন কোম্পানীর নাম হ ওয়া উচিত আল্লাহর নামে। যেমন- আন নূর।
সবাই এক সাথে নামটা খুব পছন্দ করলেন। আমরা এই নামের বরকতেই ইনশাল্লাহ সৎ ভাবে সঠিক কাজ গুলি করতে পারবো। আন নূরের জন্ম হয়ে গেলো। এই নতুন কোম্পানীর মধ্যে আমরা নতুন এক ব্যবসায়ীক দরজায় দাঁড়িয়ে গেলাম যার-ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আমি নিজে, চেয়ারম্যান আমার প্রিয় মূর্তজা ভাই, ডাইরেক্টর হিসাবে ফারুক এবং রুবেল আর শেয়ার হোল্ডার হিসাবে থাকলো দুলাল মোল্লা।
জয়েন্ট স্টক থেকে এর নতুন জন্ম শুরু আলহামদুলিল্লাহ।
০০:০০ রাত
ঠিক এই সময়টায় পৃথিবীর কোনো না কোনো জায়গায় হয়তো এমন কেউ আছে যে বিগত বছরের কোনো এক অশান্তির জের অন্তরে নিয়ে আজকের বছরের প্রথম প্রহরে পা রাখছে, কেউ বা আবার এই কনকনে শীতে আর সব দিনরাত্রির মতো এই রাতেও নির্জীব রাস্তায় একা কোনো এক গাছের নীচে আশ্রয় নিয়ে ক্ষুধা পেটে বসে আছে, কেউ হয়তো হাস্পাতালের বিছানায় শুয়ে জীবনের শেষ সময়টা কখন ফুরিয়ে যাবে সেই শংকায় নিঃশ্বাস নিচ্ছে, হয়তোবা কেউ তার অতি প্রিয়জনকে হারিয়ে বিগত বছরের শেষ সেকেন্ড পার করে আজকের নতুন বছরের প্রথম সেকেন্ডে ভেজা চোখে ঠায় নীর্জীব আপন মানুষটির পাশে বসে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবছে। ঠিক এই মুহুর্তে হয়তো কোনো এক নাবিক মহা সমুদ্রের জলরাশীতে ঘোরপাক খেয়ে নিশানা হারিয়ে কোনো এক অচেনা গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে, কিংবা এমনো কেউ আছে হয়তো নতুন জীবনের প্রত্যাশায় যুগলবন্দী হচ্ছে। হয়তোবা কোথাও অঝর ধারায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে, আবার এমনো হতে পারে কোনো এক অজানা দেশে ঘর্মাক্ত গরমে মানুষেরা দিকবিদিক হয়ে কিছুটা পরশের আশায় কোনো এক ব্রিক্ষের নীচে গোল বেধে বসে আছে।
অথচ আমার এখানে অসীম দয়ালু স্রিষ্টিকর্তা আমাকে তোমাকে আর আমাদের সাথে থাকা পরিবারকে কতই না হাসিখুসীতে বছরের শেষ দিনের সাথে আগত বছরের প্রথম মুহুর্তে আনন্দের সাথে মিলন করাইলেন। কোনো কষ্ট নাই, কোনো দুসচিন্তা রাখেন নাই, কোনো আপদ কিংবা বিপদের মধ্যে রাখেন নাই। সুস্থতায় আর মনের পরম শান্তিতে সংযোগ করালেন আরো একটি বছরের সারিতে।
জানি, ঠিক এই মুহুর্তে আমি সবখানে নাই যাদের সাথে আমার থাকার দরকার। ঠিক এই মুহুর্তে আমি আছি কারো একান্তই কাছে, নিকটে। আবার কারো সাথে আছি আমি মনের মাঝে, কাউকে আমি চোখের সামনে রেখে দেখছি, আবার কাউকে আমি মনের চোখে দেখছি। শারীরিক উপস্থিতি যেমন সত্য, তেমনি মানসিক উপস্থিতিও সত্য। এই দুইয়ের মধ্যে তারাই উপলব্ধিটা করতে পারেন যারা এই সত্যতার মধ্যে বাস করেন। চোখ বুঝে যদি আপনি ওইসব মানুষের মুখ আপনার চোখের সামনে একেবারে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠে, তারাও আপনাকে ঠিক আপনার মতো করেই আপনাকে দেখতে পান, আর এই দেখা-অদেখার নামই হলো সত্য ভালোবাসা। আর এখানেই অনুপস্থিতির পরাজয় হয়। এখানেই পরাজয় হয় মৃত্যুর মতো কোনো এক চরম সত্য। চোখের আড়াল হলেও তারা থাকেন সবার মাঝে। আজ এই প্রথম প্রহরে যারা আমার সুম্মুখে নাই অথচ মনের ভিতরে আছেন, যতদূরেই তারা থাকেন না কেনো, তারা আমার সাথেই আছেন। আমি তাদের সবাইকে নিয়াই এই তাবত মানুষকে জানাই শুভ নববর্ষ। ২০২১ বর্ষ হোক সবার জন্য উম্মুক্ত সেই আনন্দের, যে আনন্দে মানুষের চোখ ভিজে আসে ভালোবাসায় আর খুশীতে।
আজ থেকে প্রায় ৫৪ বছর আগে, আমার বাবা বুঝতে চেয়েছিলেন, তার অবর্তমানে তার পরিবার কিভাবে থাকবে, কে কিভাবে আচরন করবে, কার চেহারা কি হবে ইত্যাদি। আর এ কারনে তিনি একবার ৬ মাসের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার মাও জানতেন না আমার বাবা কোথায় আছে কেমন আছে। শুধু জানতেন আমার বড় ভাই। আর বাবা আমার বড় ভাইয়ের আশেপাশেই ঢাকায় গোপনে ছিলেন। আমার ভাই প্রতিনিয়ত বাবাকে গ্রামের, বাড়ির, এবং অন্যান্য সদস্যদের আচার ব্যবহার আপডেট দিতেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, বাবা হয়তো কোথাও মারা গিয়েছেন, অথবা আর কখনোই ফিরে আসবেন না। তাতে যেটা হয়েছে সেটা হলো, সবাই তার নিজ নিজ চেহারায় আবর্ভুত হয়েছিলো। ফলে ৬ মাস পর যখন বাবা ফিরে এলেন তার গোপন আস্তানা থেকে, তখন তিনি বুঝলেন, কে আমাদের আপন, কে আমাদের পক্ষের আর কে আমাদের বিপক্ষের। শুধু তাইই নয়, আমাদের পরিবারের মধ্যেও তিনি বিভিন্ন সদস্যদের চরিত্র সম্পর্কে একটা নিখুত ধারনা পেয়েছিলেন। অন্তর্ধানের পরে আমার বাবা আরো বেশী বাস্তববাদী হয়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আমাদের জন্য ছিলো যুগান্তকারী এবং পারফেক্ট।
এই ঘটনাটা এখানে বলার অন্য কোনো কারন নাই। নিছক একটা সমকালীন ভাবনার মতো। আমার ছোট মেয়ে মানসিকভাবে আসলে আর এদেশেই নাই। তার ভাবনা কবে কোথায় কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, তাও আবার আমেরিকার কোনো এক ইউনিভার্সিটিতে। সারাক্ষন তার এই একই চিন্তা, আর এই চিন্তার রেশ ধরে সারাক্ষন তার সেই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য এখানে এপ্লিকেশন, ওখানে এপ্লিকেশন, স্যাট পরীক্ষা, আইএলটিএস ইত্যাদি। আমরা ধরেই নিয়েছি, যে, আগামী বছরের শেষের দিকে আমরা আমার ছোট মেয়েকে আর পাচ্ছি না। সে বিদেশের মাটিতে পড়াশুনা করবে। এটা যেনো এক প্রকার মেনেই নিয়েছি। আর কনিকা তো শতভাগ সেভাবেই ভাবছে। বাকীটা আল্লাহর রহমত।
বড় মেয়েও বিসিএস পরীক্ষায় যদি চান্স না হয়, তারও পরিকল্পনা প্রায় একই রকমের। সেও সেই সুদূর আমেরিকার উদ্দেশ্যেই হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাবে। এই যে, একটা ভ্যাকুয়াম, মানে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার একটা আভাষ, তখন আমাদের জীবন কি হবে, কেমন কাটবে, সেই ভাবনাটা যেনো আজ পেলাম। কারন আজকে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে বগুড়ায় আছে। বাড়ি একেবারেই খালি। একদম ফাকা। এ যেনো সেই পরীক্ষাটা যখন ওরা কেউ আর আমাদের সাথে থাকবে না, তখন কেমন হবে আমাদের জীবনটা।
আজ বুঝলাম, কেমন হবে জীবনটা। সারাটা বাড়ি ফাকা। সবই আছে, চেয়ার টেবিল যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছে। উম্মিকার ঘরের কোনো কিছুই এদিক সেদিক হয় নাই, কনিকার ঘরেরও। ডাইনিং টেবিলে সব কিছু আগের মতোই আছে, ড্রইং রুমটাও তাই। খাবার টেবিলে সবসময় যে মেয়েরা আমার সাথে খেতে বসে, সেটাও না। কিন্তু তখন হয়তো ওরা ওদের রুমেই থাকতো। কিন্তু আজকে মনে হলো, ওরা বাসায় কেহই নাই মানে আমার খাবার টেবিলের খাবারের সাধটাও ভিন্ন। ওদের ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষগুলি এখানে বসতো, এখানে কম্পিউটারে কাজ করতো, ওইখানে ওরা পায়ে পায়ে হাটতো। ওদের মা কারনে অকারনে কখনো ডাকাডাকি, কখনো না খাওয়ার কারনে রাগারাগি, কখনো আবার একসাথে বসে হাসাহাসি করতো। আজকে কিন্তু ওরা আছে কিন্তু কাছে নাই। এতো ফাকা লাগছে কেনো?
ওদের বগুড়ায় যাওয়ার মাধ্যমে আমি যেনো ওদের আমেরিকা যাওয়ার একটা প্রক্সি অনুভব করলাম। এটাই হবে যখন ওরা সত্যি একদিন আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে থাকবে। আজকে একটা কথা প্রায়ই মনে পড়লো-
তাহলে আমার এতো বড় ব্যবসা, এতো বড় বানিজ্য, আমার এতো বড় বড় প্রোজেক্ট নিয়ে কি হবে যদি ওরাই আর এখানে না থাকে? কে দেখভাল করবে আমার অনুপস্থিতিতে এই বিশাল সাম্রাজ্য? কোথায় যেনো একটা খটকা লাগলো। দরকার আছে কি এতোসবের?
অনেক ভাবনার বিষয়।
ভালোবাসি না
ভালোবাসা কি? ভালবাসা কি কোনো দ্রব্য বা কোনো পদার্থ যা চোখে দেখা যায়, ছোয়া যায় বা স্পর্শ করা যায় বা মাপা যায়? এটা কি এমন যে, ষোল ছটাকে এক কেজি ভালোবাসা হয় অথবা এটা কি এমন যে, চার আনা এক গন্ডায় এক শতাংশ ভালোবাসা হয়? অথবা এটা কি এমন যে, পাখীরা জেগে উঠলে, তাদের কিচির মিচির শব্দে কোনো এক সকালে বা সন্ধ্যায় সন্ধ্যতারা আকাশে উদিত হলে ভালোবাসার জন্ম হয়? কোথাও কি কোনো মহা মনিষী লিখেচ গেছেন, কি কি ভাব ভংগিতে, কোন কোন সুরে বা কোন কোন আবেগে ভালোবাসা প্রকাশ পায়? ৫৫ বছর বয়স পার হয়ে গেলো আমার, কিন্তু কোনো বিদ্যালয়, কোনো কলেজ, কোনো ধর্মালয় আমাকে কেঊ এই ভালোবাসার বিক্রয়কেন্দ্র অথবা বিনিময় শ্তলের নাম দিতে পারলো না। আমি ভালোবাসাকে আজো চোখে দেখি নাই। অনেক দেশ ঘুরেছি আমি। সম্রাট শাহজাহানের গড়া তাজমহল দেখেছি, প্রিন্স আর্চ বিশপ ডাইট্রিচের প্রিন্সেসের সালোমির জন্য গড়া মার্বেল প্যালেস দেখেছি, উইলিয়াম কেলী স্মিথের প্রথম ছেলে সন্তানের জন্য গড়া “ক্যালী কেসেল” দেখেছি। কিন্তু আমি ওখানেও কোনো ভালোবাসার শপিং মল অথবা ভালোবাসা কিনতে পাওয়া যায় এমন কোনো দোকান দেখি নি। যারা ভালোবাসা বুঝে, কিংবা ভালো বাসে, তারা কিছু না কিছু দিয়েই তাদের সেই অদেখা, অচেনা ভালোবাসার সৌধ নির্মান করে কিছু না কিছু স্মৃতি রেখেই প্রমান করে গেছেন যে, তারা ভালোবেসেছে।
এতো বড় বড় অট্টালিকা, তাজমহল, ক্যাসেল, গার্ডেন বানানোর আমার কোনো সামর্থ নাই। আচ্ছা, ভালোবাসা কোথায় খুচরা কিনতে পাওয়া যায়? কোনো সুপার শপে? বা কোনো বড় মলে? অথবা কোনো কারখানায়? আমি তো অনেক মল, অনেক সুপার সপ কিংবা অনেক কারখানায় খুজেছি এই ভালোবাসাকে। অথচ আজো আমি কারো জন্যেই এক ছটাক, এক শতাংশ কিংবা এক পাউন্ড ভালোবাসা কিনে আনতে পারি নাই!! কোথাও পাইও নাই!! তাহলে আমি কি কখনো কাউকে ভালোবাসি নাই? হয়তো তাই। আমি কাউকেই ভালোবাসি নাই হয়তো।
অথচ, আমি কি অবুঝ বারবার। আমি ওদেরকে না ভালোবেসে, বারবার শুধু ওদের জন্য দুশ্চিন্তায় দিন কাটাই। সারাক্ষন ভাবি, ওরা যেনো ভালো থাকে, ওরা যেনো আনন্দে থাকে। ওরা যেনো নিরাপদে থাকে। আর এটা ভেবেই আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু ওদের জন্য ঈশ্বরের কাছে ওদের সুস্বাস্থ্যের দোয়া করি। সমগ্র বিসশে যেন ওরা মাথা উচু করে নিজের সম্মানে দাড়াতে পারে তার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করে রোজগার করি। আমার অবর্তমানে যেনো ওরা থাকে সাবলম্বি, তারজন্য আমার সারাটা দিন, সারাটা মাস আর সারাটা জীবন নিজের সকল আরাম, আয়েশ, আর সৌখিনতাকে ত্যাগ করে ওদের জন্য সঞ্চয় করি। নিজের অচল হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনটা, কিংবা খষে যাওয়া জুতার সোউলটা বারবার সেলাই করে, ওদের শখের ইচ্ছাগুলি পুরনে সদা চেষ্টা করি। খাবারের টেবিলে বড় সুসাধু চিংড়ি মাছটি নিজের খেতে ইচ্ছে করলেও সেটা আমি ওদেরকে দিতে পছন্দ করি। দূর থেকে কয়েকদিন বিরহের সময়টা কাটানোর পর যখন সন্তানেরা ঘরে ফিরে, গিন্নী যখন অসুস্থ্যতা থেকে সুস্থ্য হয়ে ঘরে ফিরে, আমি তখন আনন্দে ওদের বুকে জড়িয়ে ধরি আর বুক ভাসিয়ে দেই আমার অবাধ্য চোখের জলে। কোথাও ওদেরকে একা ছাড়তে ভয় পাই। সাতার না জানা আমার ছোট মেয়েটি বা অল্প সাতার জানা আমার বড় মেয়েটি যখন নদীর জলে নামতে চায়, তখন নিজের শরীরে জ্বর নিয়েও আমি ওদের সাথে পানিতে সঙ্গ দেই যেনো ওরা পানিতে ডুবে না যায়। নাইট কোচের কোনো গাড়িতে বসে আমি সারারাত না ঘুমিয়ে গাড়ি ঠিকমত নিরাপদে চলছে কিনা সেই পাহারায় ক্লান্ত শরীর নিয়েও সারাটা রাস্তা জেগেই থাকি। অথচ, ওদেরকে আমি ভালোবাসি কিনা সেটা সবাইকে দেখানোর জন্য আমি কোনো ইমারত তৈরী করতে পারিনা। কারন, আমার ভালোবাসা হয়তো ও রকমের সুউচ্চ ভবনের মতো নয়।
আচ্ছা, মানুষ ভালবেসে কি কখনো কাদে? অথবা মানুষ ভালোবেসে কি খিলখিল করে হাসে? এমন কি হয় যে, মানুষ ভালোবেসে কারো জন্যে মন খারাপ করে বসে থাকে? শুনেছি, ভালোবাসায় নাকি কান্না থাকে, হাসি থাকে, বেদনা থাকে, থাকে আরো অনেক কষ্ট, বিরহ, আবার থাকে আনন্দও। আমারো এ রকম হয়। যখন সে আমার কাছে থাকে না, যখন ওর শরীর খারাপ হয়, যখন ওর মন খারাপ হয়, যখন কোনো কিছুর জন্যে ওদের চোখে পানি আসে, আমারো মন খারাপ হয়, আমারো চোখেও পানি আসে। যখন আমার সন্তানেরা আমার থেকে দূরে থাকে, ওরা নিরাপদে আছে কিনা তারজন্যে আমার ভয় হয়। ওরা ঠিকমতো খেলো কিনা, ওরা ঠিকমতো ঘুমালো কিনা, ওরা ভাল আছে কিনা এই ভাবনায় আমি তখন ওদের জন্য ভিতরে ভিতরে কষ্ট পাই, ভয় পাই, চোখ ভিজে আসে কান্নায়। আমি ওদের মিস করি। যখন ভাবি, ওরা একদিন আমার থেকে দূরে চলে যাবে, ওদের সংসার হবে, আমি একা হয়ে যাবো, আমারো অনিশ্চিত বিরহে চোখে জল আসে।
এটা কি ভালোবাসা?
যদি এটাই হয় ভালোবাসা, তাহলে আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, তাজমহল নির্মান না করেও, কোনো ক্যাসেল তৈরী না করেও, কোনো অট্টালিকা, কোনো ব্যবিলনের মতো শুন্যদ্যান নির্মান না করেও, সবটুকু মহব্বত দিয়ে, আদর দিয়ে আমি তোমাদেরকে আজীবন শর্তবিহীন ভালোবাসি। যখন আমি তোমাদের উপর রাগ করি, সেটাও আমার ভালোবাসা। যখন আমি অভিমান করি, সেটাও আমার ভালোবাসা, যখন আমি গোস্যা করি সেটাও আমার ভালোবাসা। কারন, আমার সব রাগ বা অভিমানের সব কিছুতেই মিশে আছে কোনো না কোনো দুসচিন্তা, কোনো না কোনো ভয় আর মিশে আছে শতভাগ সেই শর্তহীন ভালোবাসা। আমার প্রতি আমার সেই বাবা মার এই ভালোবাসাটা বুঝতে আমি ৫৫ বছর পার করে বুঝেছি, ছোটবেলার তাদের সেই শাসনেও ভালোবাসা ছিলো, শৈশবের কোনো এক সাধ অপুরনে আমার পিতামাতার অন্তরের ভিতরের কষ্টেও ভালোবাসা ছিলো, স্কুলের পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট না করায় সেই রাগ অভিমানের মধ্যেও ভালোবাসাই ছিলো।
তারা আজ কেউ কোথাও নাই। অথচ, আমি আজ বুকভরা সেই ভালোবাসা নিয়ে বারবার ফিরে যেতে চাই সেই অজপাড়াগায়ে আমার সেই ভিটায় যেখানে কাদামাখা হাতে আমার মা একটা বেত নিয়ে দুরন্ত ছেলেটাকে নদী থেকে উঠে আসার মেকি রাগ মাখা চোখে অথচ সত্যিকারের ভালোবাসা নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। আর বলতো-
-“উঠে আয় বলছি? তা না হলে আয় একবার, এই বেতটা দিয়ে তোকে মারি”।
হয়তো তোমরাও একদিন…… বার বার ফিরে আসে যুগে যুগে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।
কি অদ্ভুত ভালোবাসা, তাই না?
ছবি দেখিলেই যেনো বুক ধক করিয়া উঠে। অতীতের ছবি তো আরো ধকের মাত্রা বাড়াইয়া দেয়। অতীতে যে ছবিটা ভালো হয় নাই বলিয়া ছিড়িয়া ফেলিয়াছিলাম, আজ সেই অস্পৃশ্য, ঝাপসা স্যাতস্যাতে ছবিটা দেখিলেও ভালো লাগে। একাগ্রচিত্তে ছবিগুলি দেখিলে বারবার শুধু ইহাই মনে হয়, দিন ফুরাইয়া যাইতেছে। সময়ের ক্রমাগত টিকটিক শব্দে আমার দিনও টিকটিক করিয়াই ফুরাইয়া যাইতেছে। ইহাকে কোন বাধনেই আর থামাইয়া রাখা সম্ভব নয়, আর কেউ পারিয়াছে বলিয়াও আজ পর্যন্ত কোনো দলিল নাই, এবং আগামিতেও কেহ পারিবে ইহার স্বপক্ষে কোনো বিজ্ঞান কিংবা দর্শন আবিষ্কৃত হয় নাই। সময়ের এই টিকটিক শব্দ আমি আমার বুকের প্রতিটি ধুকধুক আওয়াজের, ঘুমের ঘোরে, নিশিথে কিংবা যখন একা থাকি তখন শুনিতে পাই। যখন একা থাকি, তখন “সময়” যেনো আমার কানে কানে ফিসফিস করিয়া বলিয়া যায়,
“—পিছনে তাকাইয়া দেখিয়াছো কত বেলা পার করিয়া আসিয়াছো? তুমি তোমার জন্মের ক্ষন, দুরন্ত শৈশব, কৈশোর পার করিয়া আসিয়াছো, তোমার অনেক বেলা পার হইয়া গিয়াছে, এখন আর তোমার জন্য সকাল বলিয়া কোন কাল নাই। বিকালের রোদের আমেজ কি তুমি বুঝিতে পারিতেছো? যদি তুমি ইহা অনুধাবন করিতে না পারো, তাহা হইলে, আয়নার সামনে গিয়া দাঁড়াইয়া এক পলক তোমার চোখের নিচে তাকাইয়া দেখো, অথবা হাত পায়ের রক্ত প্রবাহের ধমনীগুলির দিকে তাকাইয়া দেখো। ইহারা অনেক সময় ধরিয়া অবিরাম কাজ করিতে করিতে প্রায় অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। তোমাকে দেখিয়া কি রাস্তার ঐ অবুঝ বালক আর “ভাই” বলিয়া সম্বোধন করে? না করেনা। এখন তোমাকে অনেকেই “চাচা” বা আংকেল” বলিয়া ডাকিতে পছন্দ করে। আর কয়েকদিন অতিবাহিত হোক, দেখিবে, তুমি এই “চাচা” কিংবা “আংকেল” উপাধিটাও ধরিয়া রাখিতে পারিবেনা। তখন কেউ তোমাকে “দাদা” কিংবা “নানা” বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিবে। তোমার এখন পা কাপিতেছে, হাত কাপিতেছে, চোখেও খুব ভালো করিয়া সব দেখিতে পাওনা। বৃহৎ অট্টালিকায় উঠিতে এখন তোমার সাহস আর আগের মতো কাজ করেনা, সমুদ্রে ঝাপ দেওয়ারও সাহস হয় না। তুমি আস্তে আস্তে নির্জীব পদার্থের ন্যায় হইয়া যাইতেছো। এখন একটু বর্ষার পানিতেই তোমার সর্দিকাশি বাধিয়া বসে, শীত আসিলেই মনে হয়, এই বুঝি রাজ্যের সব ঠাণ্ডা তোমার সারা শরীরের উপর দিয়া বহিয়া যাইতেছে।……
ছবি দেখিতে দেখিতে মনটাই খারাপ হইয়া যায়। মনে হয়, আমি কি সত্যি সত্যি একদিন এই নীল আকাশটা আর দেখিতে পারিবো না? এই ফুলগাছ, এই রাস্তার ধার, এই নদীর ঢেউ, এই শীতের হাড়কাঁপুনি ঝাঁকুনি, কিংবা বৃষ্টির শীতল জলেরচ্ছটা কোণো কিছুই কি আমি আর উপভোগ করিতে পারিবো না? সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর রাতে বাড়ি ফিরিবার আনন্দটা কি আর পাওয়া যাইবে না? অথবা পরিবারের সঙ্গে, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে চুটিয়ে ঝগড়া কিংবা হৈচৈ করার অবকাশ কি আর কখনোই আমার হইবে না? মন বড় বিষণ্ণ হইয়া উঠে। মনে হয় এই জনমটা কেনো হাজার বছরের জন্য হইলো না? ভগবান বড় নিষ্ঠুর। কেহ হয়ত ভগবানকে বিশ্বাস করিয়া ইহাই মানিয়া নেন, আবার কেহ ভগবান আছে ইহাই বিশ্বাস করেন না। ভগবানকে অবিশ্বাস করিয়া যদি হাজার বছরের অধিক বাচিয়া থাকা যাইতো, তা না হইলে একটা যুক্তি থাকিত, কিন্তু ভগবান আছে বা নাই, এই বিশ্বাসের উপর পৃথিবীতে অধিককাল বাচিয়া থাকিবার কোনো উপায়ও নাই।
শৈশবের উচ্ছল চঞ্চলতা, যৌবনের অদম্য বন্যতা আর এখনকার বৈষয়িক ব্যস্ততার মাঝে কখনোই মনে হয় নাই যে, একদিন আমার এই সাম্রাজ্য, আমার এই আধিপত্যতা, কিংবা এই বাহাদুরী, অহংকার একদিন কোনো একটা ছোট বিন্দুর মধ্যে আটকাইয়া যাইবে যেখানে আমার শ্বাস নীরব, আমার মস্তিষ্ক নীরব, আমার হাত নীরব, আমার শরীর নিথর। আমার সবকিছুই নীরব। আমার চারিধারের কোনো কিছুরই পরিবর্তন হইবে না। তখনো ঠিক সময়েই সূর্য উঠিবে, পাখীরা ঠিক সময়েই কিচিরমিচির করিয়া ভোরের আলোকে জাগাইয়া তুলিবে, প্রাত্যাহিক কাজে সবাই যার যার কাজে ঠিক সময়েই ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া আবার ঠিক সময়েই ঘরে ফিরিয়া আসিবে। ঠিক সময়েই সবাই তাহাদের প্রতিদিনের সকালে নাস্তা, দুপুরের খাবার, কিংবা পরিবার পরিজন লইয়া বিকালে শরতের কোন একসন্ধ্যায় বাহির হইয়া পড়িবে, শুধু আমি ছাড়া।
আজ হইতে শতবছর আগেও কেউ না কেউ হয়ত এইভাবেই তাহারা আজকের দিনটার কথা ভাবিয়া ভাবিয়া তাহাদের ঐ সময়ের ব্যথার কথা, এই পৃথিবী ছাড়িয়া যাওয়ার আক্ষেপের কথা, এই পৃথিবী ছাড়িয়া না যাওয়ার আকুতির কথা বলিয়াছিলেন। তাহাদের কেউ হয়ত এই পৃথিবীতে অনেক প্রতাপশালী রাজা ছিলেন, কেউ হয়ত ক্ষমতাশিল সেনাপতি ছিলেন, কেউ হয়ত কোটিপতি ধনকুবের ছিলেন, কিন্তু কেহই এই প্রস্থানের রাহু গ্রাস হইতে মুক্তি পায় নাই। আমার কোন পূর্বসুরী যেমন পায় নাই, আমিও পাইবো না আর আমার পরের কোনো উত্তরসুরীও পাইবে না। আজ যতো সুখ নিয়াই এই পৃথিবীতে বিচরন করি না কেনো, যত অভিযোগ নিয়াই বাচিয়া থাকি না কেনো, কিংবা যত কষ্ট নিয়াই দিনযাপন করিনা কেনো, যখন কেউ থাকে না, তখন তাহার প্রতি মুহূর্তের হাসি, উচ্ছ্বাস, মহব্বত, গালি কিংবা মেজাজের প্রতিধ্বনি শুনিতে পাওয়া যায়। এই প্রতিধ্বনি কখনো কাউকে কাদাইবে, কখনো কাউকে একা একাই হাসাইবে, আবার কাউকে এমন এক জায়গায় নিয়া দাড় করাইবে যেখানে মনে হইবে, হয়ত আমার বাচিয়া থাকাটা তাহাদের জন্য খুব প্রয়োজন ছিলো। হয়ত সব রাগ, অভিমান, অভিযোগ সত্তেও মনে হইবে আমার চলিয়া যাওয়ার কারনে এই শুন্যস্থানটা কেহই পুরন করিবার মতো নয়। তখনো এই ছবিগুলিই নীরবে কথা বলিবে।
কিন্তু তাহার পরেও সবচেয়ে সত্য উপলব্ধি হইতেছে, একদিন, সবাই আমরা একে অপরের হইতে আলাদা হইয়া যাইবো। কেউ আগে আর কেউ পড়ে। আমরা সবাই একদিন একজন আরেকজনকে হারাইয়া ফেলিবো, মিস করিবো। দিন, মাস, বছর কাটিয়া যাইবে, হয়ত কাহারো সাথে আর কাহারো কোনো যোগাযোগ থাকিবে না। একদিন হয়ত আমাদের সন্তানেরা, নাতি নাতিনিরা আমাদের অতিতের সব ছবি দেখিয়া কেহ কেহ তাহাদেরই সাথী লোকদের প্রশ্ন করিবে, “কে এটা? কে ওটা?”, “উনি কে” বা “উনারা কারা”? তখন হয়ত অনেকেই চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু অশ্রুজলে অদৃশ্য কোনো এক মুচকি হাসি দিয়া বলিবে,
“এরা ছিলো ওইসব লোকজন যাদের সঙ্গে আমি আমার সবচেয়ে ভালো কিছু সময় কাটিয়েছি। আজ ওরা কেউ নাই।”
এরই নাম ছবি।
আমি কি কেবলই ছবি? তারা কি কেবলই ছবি যারা আজ থেকে শত বছর আগে এই পৃথিবীতে এসেছিলো এবং এখন যারা আর কোথাও নাই? কেউ কেউ তো আবার কোথাও ছবি হিসাবেও নাই? অথচ তারাও এক সময় আমার মতো এই পৃথিবীর আলো বাতাসে বড় হয়েছে, তাদের মধ্যেও প্রেম এসেছিলো, মহব্বত এসেছিলো। তারাও সংসার করেছে, জীবনের প্রয়োজনে এক জায়গা থেকে অন্যত্র সঞ্চালিত হয়েছে। তারাও নীল আকাশ দেখে, নদীর পানি দেখে, বসন্তের ফুল আর ফুলেল পরিবেশে কখনোকখনো কবিতাও লিখেছে। গুনগুন করে গান গেয়েছে। পাখির কোলাহলে তারাও কখনো কখনো আপ্লুত হয়েছে। তাদের সময়েও শীত বসন্ত, বর্ষা, সবই এসেছে। তারাও কারো না কারো সাথে হাত হাত ধরে জীবনের অনেক পথ পড়ি দিয়েছে। এদের অনেকেই হয়ত আজিকার আমাদের থেকেও অনেক নামি দামী মানুষের মতো ছিলেন। আরো কত কি? কিন্তু ওই সব গুনীজনেরা, মানুষগুলি আজ কোথাও নেই। কেউ হয়ত কারো কারো ড্রইং রুমে ছবি হয়ে আছে, কিন্তু তার দেহ পচতে পচতে মাটির সাথে মিশে দেহ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। যেই হাড়গুলি ছিলো, সেগুলিও এদিক সেদিক হতে হতে ওগুলো আর কোথাও খুজে পাওয়া যাবে না। যে কবরে একদিন তাদেরকে শুইয়ে হাজার হাজার লোক, আত্মীয়সজনেরা বিলাপ করেছিলো, সেইসব আত্তীয় সজনেরাও আজ কোথাও হয়ত নাই। ওই কবরেই হয়ত একে একে শুইয়ে আছেন তারাও। ওই কবরটাও কারো একচ্ছত্র নয়।
এই পরিসংখ্যানে আমিও তাহলে নিছক একটা ছবি এবং কোনো এক সময় এই ছবি থেকেও আর কোথাও নাই। আমার ইতিহাস এই পৃথিবীর কেউ মনে রাখবে না। আমার আজকের দিনের এই রাজত্ব, আমার সাম্রাজ্য, আমার রেখে যাওয়া সব সম্পদ আর সম্পত্তি হয়ত হাত বদলের মাধ্যমে আমার বংশ পরম্পরায় কারো হাতে সেটা পৌঁছে যাবে কিন্তু আমার নাম, আমার আজিকার দিনের পরিশ্রম, আমার আজিকার দিনের কোনো কিছুই তার কাছে পৌঁছে যাবে না। সে হয়ত জানবেই না, কার তৈরী করা সিংহাসনে বসে তিনি কার উপরে প্রতিনিধিত্ব করছেন। হয়ত তিনি জান্তেও চাইবেন না।
তাহলে কিসের জন্য? কার জন্য?
আজ যারা তোমরা আমার এই মন্তব্যগুলি পড়ছো আর ভাবছ, তাহলে কি আমরা সবাই হাত গুটিয়ে কোনো কিছুই করবো না? হ্যা, করবো। শুধু নিজের জন্য আর নিজের আরামের জন্য।
তোমাদেরও এক সময় আসবে, আমার মতোই চিন্তা তোমাকে আচ্ছাদিত করবেই। কারন এটাই এই পৃথিবীর আসল রুপ আর বিবেদেচ্ছ্য মায়া। এই প্রিথিবী কাউকেই তার অপ্রয়োজনে মনে রাখে না।
প্রিয় আনিস (নেভাল অফিসার)
যখন নিজের কেউ সারারাত বাড়ি ফিরে আসে না, তখন সেই কালো রাত জীবনের থেকেও লম্বা হয়। তখন হরেক রকমের ভয়, দুসচিন্তা, আর অনিয়ন্ত্রীত ভাবনা কিংবা সব অশুভ সম্ভাবনা নিজের মনকে আকড়ে ধরে। যার নিজের লোক সারারাত বাড়ি ফিরে না, তার শান্তিতে দম নেবারও কোনো অবকাশ থাকে না। প্রাত্যাহিক জীবনের রুটিন থেকে বিচ্যুত হয়ে ছিটকে পরা এই মানুষটার জন্য তখন প্রতিদিন সকাল থেকে তার পরেরদিন অবধি চারিদিকে একটা শুন্যতাই বিরাজ করে। আর এই শুন্যতা এমন কিছু আশংকার স্থান তৈরী করে যার নাম – অমিবশ্যার কষ্ট। এই অমাবশ্যা কবে কাটবে, আদৌ কাটবে কিনা সেটা একটা আগামীকালের বিবেচনা। অনেক সময় মানুষ এই অমাবশ্যা কিভাবে কাটবে তারজন্য হয়তো জজ্ঞের আয়োজন করে, কিন্তু অমাবশ্যা কাটবে কিনা সেটা কোনোভাবেই এই জজ্ঞ নিসচয়তা দেয় না। অনেক সময় ছোট ব্যাপার অনেক বড় সড় ব্যাপার হয়ে দারায়। আর সেই ছোট থেকে বেড়ে উঠা বড় ব্যাপারটা সারাটা জীবনের জন্য ঝামেলার কারন হয়। একটা জিনিষ সর্বদা মনে রাখা দরকার যে, সবসময় গরম গরম পরোটাই যে খেতে মজা তা নয়, অনেক সময় এই গরম গরম পরোটার চেয়ে বাসী রুটির অনেক কদর বেড়ে যায়। কারন হাওয়া যখন কারো নামে গরম হয়, তখনই এটা হয়। আর আমরা এটাকে বলি শনির দশা। শনি এমন এক হাওয়ার নাম যে, এই হাওয়ার সাথে আরো অনেকের নামও গরম হয়। আর এই হাওয়া সবসময় চলমান। মুদি দোকানে এর উৎপত্তি, আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এর বিনাশ। এই শনির হাওয়ায় অনেকেই বলীর পাঠা হয়। আর কেউ যখন বলীর পাঠা হয়, সেই বলীর পাঠাকে সবাই বিষাক্ত খাবারই মনে করে। ফলে, যতো দামি পাঠাই হোক, বলীর পাঠার কোনো দাম হয়না। এটা তখন হয় একটা বর্জ্য। আর বর্জ্য কেউ নিজের কাছে রাখে না। সবাই এটাকে বিষাক্ত মনে করে ফেলেই দেয়।
একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, ক্ষমতাশীল রাজত্তে দেওয়ালের শুধু কানই থাকে না, চোখও থাকে। আবার এটাও ঠিক যে, রাজনীতিতে কোনো কিছুই সারা জীবনের জন্য হয় না। কোনো না কোনো সময় এর একটা শেষ আছে। ওই শেষের অধ্যায়টার জন্য অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়। রাজনীতির সবচেয়ে বড় দূর্বল পয়েন্ট হচ্ছে- রাজনীতিতে ভরষা আর বিশ্বাস যেমন ছেলেখেলার মতো হয়, তেমনি এই একই রাজনীতিতে হুমকীও অনেকটা হাচির মতো হয়। কিন্তু এই হাচিস্বরূপ হুমকী যখন সবল হয়, তখন পুরু রাজনীতিটা একটা বেওয়ারিশ বোমের মতো আত্মপ্রকাশ করে। তখন কেউ জানে না, ওটা কখন কিভাবে কোথায় ফাটবে আর কে কে এর মধ্যে মারা যাবে, আহত হবে বা হবে নিখোজ। যদি রাজনীতির এই দূর্বল পয়েন্টটা কেউ ভালোভাবে পর্জবেক্ষন করতে সক্ষম হয়, তখন নিজ দলের রাজনীতি থেকেও মানুষকে সাবধান থাকতে হয়। কারন, বিপদজনক জল যখন মাথার উপর উঠে যায়, তখন যা দরকার, তা হচ্ছে বহির্শক্তির। যদি এই বহির্শক্তি সময়মতো না আসে, তখন যিনি ডুবে আছেন, তিনি তো ডুববেনই, তার সাথে আরো অনেকেই ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, বিশেষ করে আপনজন। আর এটাই হচ্ছে এখন তোমার বেলায়। তুমি কারো নিজের সার্থের জন্য তোমার নিজের শব্জীক্ষেত জ্বালিয়ে দিতে পারো না। আর যদি একটা ভুলের কারনে তোমার শব্জী বাগানে আগুন লাগে, সেটা তোমার একান্তই নিজের ক্ষতি। রাজনীতি করতে গেলে হয়তো কিছুটা আগুনের ফুল্কী গায়ে লাগতেই পারে, কিন্তু সেই ফুলকী নিভানোর জন্য যথেষ্ঠ উপকরন রাজনীতি থেকেই সাপ্লাই দিতে হয়। যদি সেই সাপ্লাই দল থেকে না আসে, তাহলে সেই ফুল্কী থেকে নির্ঘাত আগুন লাগার সম্ভাবনা অধিক। আগুন থেকেই আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি এটা মাথায় রাখা খুবই প্রয়োজন। আগ্নেয়গিরির আগুন থেকে কোনো দমকল বাহিনী আজ পর্জন্ত কাউকে বাচাতে পেরেছে কিনা তার কোনো রেকর্ড নাই।
শোনো ভাই, রাজনীতিতে যদি মানবিকতা আর সচ্চতা থাকতো তাহলে কেহই এই রাজনীতি করতে আসতো না। রাজনীতিতে পূর্নিমা আর অমাবশ্যা যেমন একসাথে চলে আবার জোয়ারভাটাও একসাথে চলে। এই রাজনীতিতে আবার কোনো কোনো সময় কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই বাস্তব, এটাই সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। বড় বড় রাজনীতিবিদরা তাদের সার্থ হাছিল করার জন্যই কর্মী বাহিনীর জন্য শুধু ভরসার স্থান তৈরী করে আর নাটক বানায়। আর এই চরিত্রগুলির মধ্যে কেউ কেউ মূল আবার কেউ কেউ ইচ্ছে করেই সহযোগীর ভুমিকায় থাকতে পছন্দ করে। এটা সময়ের পরিস্থিতি বুঝেই তারা নিজ নিজ পছন্দের এই চরিত্রগুলি বেছে নেয়। অথচ যারা ডেডিকেটেড, তারা বুঝতেও পারে না সত্যিকারের পরিস্থিতিটা কি। এই মেকী ভরষার স্থান যখন উম্মোচিত হয়, যখন সামনে বড্ড ভয়ংকর এবং আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসে কিংবা কেউ যখন আসল চেহারাটা দেখে বা বুঝে ফেলে, তখন ডেডিকেটেড কর্মীগুলি নিজেদেরকে নিজের কাছে বড় অসহায় মনে করে, নিজেকে বোকা মনে করে। কারন মিথ্যা ভরষায় ভর করে যখন কেউ সামনের দিকে নিজের ইচ্ছায় এগিয়ে আসে, তখন সেই জায়গা থেকে আর কারো ফিরে আসার পথ খোলা থাকে না।
শোনো ভাই, যখন কেউ কাউকে আঘাত করার জন্য চেষ্টা করে থাকে তখন সে এটা ভুলে যায় যে, সে আঘাতের ব্যথা চিরকাল থাকে। আর এই ব্যথা থেকে উৎপত্তি হয় রাগ। আর সেই ব্যথা, সেই রাগ আমদের একটা কথা বলে দেয় যে, সতর্ক থাকো। কেননা অনেক সময় সেই আঘাত বা রাগ নতুন রুপ নিয়ে তোমার আমার কাছেই ফিরে আসে। তুমি বা আমি হয়তো সে শব্দটা শুনতে পাই অথবা জেনে বুঝে এড়িয়েও যাই। আবার উলটো দিকে যদি বলি, এই রাগ উঠার মুহুর্তে আমাদের মনে যদি এই অনুভুতি জাগে যে, প্রতিশোধই হচ্ছে এর একমাত্র আসল চিকিৎসা, তাহলে আরো মারাত্তক ভুলের দিকেই ঢোকে যাই আমরা। আমাদের এই রাগ, অভিমান, প্রতিশোধ, ক্রমশই ধংশের পথকে এগিয়ে নিয়ে চলে। আমরা নিজেদের রাগ আর সেই রাগের বশে যে সব পদক্ষেপ নিতে পারি তার ফলাফলের বিশয়ে সতর্ক থাকা উচিত। কেননা ক্ষোভের বশে নেয়া পদক্ষেপের ফল কখনোই বদলনো যায় না। আর পিছনে পরে থাকে শুধুই উপলব্ধি। আরম্ভ হয় সেই “যদি”। “যদি” অমুকটা না করতাম,, “যদি” অমুকটা করতাম, “যদি” তার সাথে আমার দেখা না হতো, “যদি” অমুকের সাথে আমার আগে দেখা হতো, “যদি” ওই সময়ে আমি ওইটা না করতাম, “যদি” সময়টা পিছিয়ে নেয়া যেতো, “যদি” এটা না করে ওটা করতাম ইত্যাদি।
– তারপরেও একটা কথা থেকেই যায়- তাহলে কি ফেরার কোনো পথ নাই?
– আছে। তাহলে সেটা কি?
ভিত্তিহীন আর অকারন গুরুত্তহীন কথা শুনবার সময়ে আমাদের সর্বদা নিজের বুদ্ধিমত্তা, নিজের অভিজ্ঞতা আর মেধাকে ধীরেসুস্থে নিকটস্থ ভালো কিছু মানুষের সাথে, কিংবা পরীক্ষিত ভরষা করা যায় এমন কিছু গুনীজনের পরামর্শে নিজের মৌলিক চেতনাকে বাচিয়ে জীবনে কাকে কতটা জায়গা দেবো সেটা ঠিক করে ফেলা। তাহলে জীবনে আর কোনো সমস্যাই থাকে না। আর কার সাথে কি কমিট্মেন্ট করা দরকার তার যদি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তখন জীবনের স্রোত সবসময় একই থাকে বলে আপাতত মনে হয়। তখন পিছুটানের আর ভয় থাকে না। আর যখন পিছুটানের ভয় থাকে না, তার সামনে দ্রুতগতির শক্তিটাও ধীরগতি বলে মনে হয় না। যতোক্ষন যেটা নিজের কাছে ভালো লাগবে, ততোক্ষন সেটা সে চালিয়েই যায়, আর সেখানেই শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে বেশী লাঞ্ছনা। কারন মিথ্যের বোঝা যদি বুদ্ধিমত্তার উপর চেপে বসে তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে চোরাবালির বাকেই আটকে পড়ে। যেখানে আফসোস ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আমরা একা নই, সাথে পরিবার আছে, সন্তান আছে, আমাদের বাবা মা অন্যান্য আত্মীয়স্বজন আছে। যদি সে সবকে আমি মানি, ভালবাসি, বিশ্বাস করি, তাহলে কোনো কিছুই আমি একা একা যা ইচ্ছা তাই করতে পারি না। হোক সেটা রাজনীতি কিংবা অন্য কিছু। তাই সব কিছু পরিহার করো। শুধু আকড়ে রাখো সেতা যেটায় তোমার নিজের লাভ, যেটায় তোমার পরিবারের লাভ।
এখানে আরো একটা পরামর্শ তোমার জন্য আমার দেয়া দরকার, যে, এয়ারপোর্টের লাউঞ্জই হোক আর ফাইভ স্টার হোটেলই হোক। এগুলি যতো সুন্দরই হোক সেটা আমার তোমার নিজের ঘর নয়। তার উপর মায়া জড়াতে নেই। তাতে শুধু কষ্টই বাড়ে। নিজের হয় না। ঠিক সে রকম হলো রাজনীতির দলনেতা বা তার ভালোবাসা। সেটা আমার পরিবার নয়, না আমার বংশ। তার উপরেও আমার মায়া জড়াতে দেয়া উচিত না। তাই এয়ারপোর্ট কিংবা ফাইভ স্টার হোটেল থেকে চেক আউটের সময় যেমন মন খারাপ করা মানে নিজেকে বোকা মনে করা, তেমনি এই রাজনীতি বা দলনেতাদের উপর থেকে আস্থা ফিরিয়ে নেয়ার সময়েও মন খারাপ করা উচিত নয়। সব সময় আমি ভাবি যে, বেশীর ভাগ মানুষের দুটু মুখ থাকে। একটা মুখ যেটা সে সারা দুনিয়াকে দেখায়। আরেকটা আসল মুখ যেটা সে লুকাতে চায়। কিন্তু দেখো মজার ব্যাপার হলো, সত্যিটাকে কেউ লুকাতে পারেনা, কারন সত্যিটাকে লুকানো যায় না, সত্যি লুকিয়ে থাকে না। হয়তো সত্যিটা মিথ্যার চাপে কিছুদিন আত্তগোপন করে কিন্তু সত্যি একদিন বেরিয়ে আসেই। আর এটাই হলো সত্যির আসল চেহাড়া। রাজনীতিতেই সবচেয়ে বেশী হয় এটা। সবসময় মানুষের দুমুখো চেহারাটা অথবা আসল চেহারাটা অনেক সময়ই ধরা সম্ভব হয়ে উঠে না। বিশেষ করে তখন যখন সে খুব কাছের মানুষ হয়, হোক সেটা রাজনীতির দল বা নিজের গোত্র।। তাই এসব দলনেতা বা লিডারদের কাছ থেকে যতোটা দূরে থাকা যায়, ততোটাই ভালো। এটাও সঠিক নয় যে, সবাই দুমুখো। কিন্তু এটা সত্য যে, কখনো যদি একটু আভাষও পাওয়া যায় তাহলে তার থেকে সতর্ক হওয়াটা খুবই জরুরী। নিজের প্রান, মান বাচানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
এখন যেমন তুমি নিজেই দেখছো, তুমি আসলেই একা। কাউকে দেখতে পাও চোখের দ্রিষ্টির সীমানায়? কাউকে না। কিন্তু যাদেরকে দেখতে পাও, তারা সবাই খুব অসহায়। এইসব প্রিয়জনেরা কোনো প্রিয় মানুষের আসার অপেক্ষায় যখন অধীর আগ্রহে বসে থাকে, দিন গুনতে থাকে, আর সে যখন ফিরে আসে না তখন পৃথিবীর যত দুসচিন্তা আর অমংগল চিন্তাগুলিই শুধু তাদের মাথায় চড়ে বসে। আর প্রতিটি দুশ্চিন্তার কোনোটাই তখন আর ফেলনা মনে হয় না। ভাষার আর কোনো প্রয়োজন পড়ে না কষ্টকে বহির্প্রকাশ করার। তখন ভিতর থেকে তাদের সবকিছু শুন্য মনে হয়। একটা জিনিষ খুব ভালো করে জেনে রাখো যে, শুন্য অন্তরে শক্তি কম, চেলেঞ্জ কম। এই সময়ে যেনো সময়টাই কাটতে চায় না। কষতের সময়টা বা দিনটা অনেক লম্বা মনে হয়। মনে হয়, যেনো কষ্টটা পিছু ছাড়ছেই না। তারপরেও সময় ভালো হোক আর না হোক, সময় কেটেই যায়। নতুন সময় সামনে আসে। সেটাও কেটে যায়, আবার আরেকটা সময় সামনে আসে। আর প্রতিটা সময় সবার জন্যই কিছু না কিছু রেখেই যায়। এই রেখে যাওয়া সময়ের সাক্ষি একদিন ইতিহাস হয়ে যায়, আবার কারো কারো সময়ের এই ইতিহাস এমন কিছু দিয়ে যায় যা সারা জগতময় চারিদিকে অনেক লম্বা সময় ধরে ভেসেই বেড়ায়। তাই, আজকের দিনের কষ্টের সময়টাকে মনের ভিতরে স্মরণ রেখে বাকী সব কিছু ভুলে যাও। আবার নতুন করে নতুন ভাবনায় সবাইকে নিয়ে জীবন শুরু করো। এই দুনিয়ায় আপনজন ছাড়া আসলেই আর কারো কেউ না।
তোমার জন্যে আমার একটা উপদেশ থাকলো, এই আমাদের অসমানভাগে ভাগ করা সমাজে প্রতিমুহুর্তে সবার অধিকার ক্ষুন্ন হলেও, এটা নিয়ে কারো কাছেই বিচার চাইবার কোনো পথ নাই। আমি বা তুমি একা এই অসমানভাগে বিভক্ত সমাজকে ভেংগে চুরে সমান করতে যেমন পারবো না, তেমনই সবার জন্য আমি বা তুমিও দায়বদ্ধ নই যেখানে সমাজটাই অসমান। এই অসমানভাগে ভাগ করার কারনে কেউ তো আছে যারা তাদের নিজেদের সার্থ হাসিল করে। ফলে যারা অসমান ভাগে সমাজকে ভাগ করে নিজেদের আরামকে হাসিল করে, তারাই আসলে জুলুমবাজ। এই জুলুমবাজ সব রাজনীতির একটা প্রধান অলিখিত সংবিধান, একটা অলিখিত আইন। তাহলে আমি বা তুমি কার বিরুদ্ধে লড়াই করছি? তোমার এই আন্দোলন বা অসহিস্নুতা ভুল, যদিও তুমিই ঠিক। কিন্তু অসাংবিধানিকভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে রচিত এই অসমানভাগে ভাগ করা সমাজে সবাই জুলুমবাজই হতে চায়। হোক সেটা তোমার দলনেতা, হোক সেটা কোনো ভাই কিংবা তোমার প্রিয় কোনো কর্মী। সবাই লাভ চায়। তাহলে কিসের জোরে তুমি বা আমি এই অসমর্থিত অসমান ভাগে সমাজকে দোষারুপ করে তাকে ক্লিন করার চেষ্টা করছি? কার জন্যে? মাথা থেকে এই ভাবনা একেবারে ছুড়ে ফেলো। আগে নিজের জন্য করো।
পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে যা খুব সুন্দর। যেমন মায়া, যেমন বন্ধুত্ত, যেমন আদর ইত্যাদি। এই জিনিষগুলি কখনো বদলায় না। আরো কিছু জিনিষ আছে যা বদলায় না যেমন, মানুষের অনুভুতি, রাগ হিংসা, প্রতিশোধের ইচ্ছা। মানুষ যতোই মডার্ন হোক না কেনো এই ফিলিংসগুলি কখনোই যাবে না। আমি পরের জিনিষ গুলিকে অনেক ভেবে চিনতে করি। আমার অনুভুতি প্রখর, রাগও প্রখর কিন্তু অনুভুতিকে কাজে লাগাই, রাগকে নয়। কিন্তু রাগকে আমি ছেড়ে দেই না। এই রাগও একটা সাফল্য আনে। যাদের রাগ নাই, তাদের অনুভুতিতে ধার নাই। কিন্তু বেশী ধারালো রাগ হলে নিজের হাত পা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই আমার রাগটাকে আমি একটা খাচায় বন্ধি করে রাখি যাতে আমার অগোচরে হাত লাগলেও হাত পা না কাটে। তুমিও তাই করবা। এখন তুমি যদি আমাকে প্রশ্ন করো- এটা তোমার ভাগ্যে আছে বা লেখা ছিলো। কথাটা আমি অন্তত মানি না। ভাগ্য খারাপের দোষ শুধু এক তরফা হয়, অথচ এই ভাগ্য বলতে আসলে কিছুই নাই। যদি এই ভাগ্য খারাপের ইতিহাস, কিংবা উৎপত্তি থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত অনুসন্ধান করা যায়, দেখা যাবে, আসলে ভাগ্য বলতে কিছুই নাই, যা আছে হয় সেটা কারো পরিকল্পনা অথবা কোনো পরিকল্পনাই নাই। এই পরিকল্পনার “আছে” আর “নাই” এর মধ্যে আসলে ভাগ্য খেলা করে। যখন আমরা এর পুরু ইতিহাস না জানি, তখনই আমরা সেই শুন্যস্থান পুরুন করি ভাগ্যকে দোষ দিয়ে। ভাগ্য একটা “যদি”র মতো। কষ্টি দেখে ভাগ্য মিলানো যেমন একটা মনগড়া শান্তনা, তেমনি কষ্টি না দেখে ভাগ্যকে দোষারুপ করাও একটা মনগড়া বিবেচনা বটে।
তাই তোমার জন্য আমার কিছু উপদেশ রইলো, তুমি সেটা পালন করবে কি করবে না সেটাও তোমার নিজস্ব জ্ঞান বা বিবেচনা।
যাই হোক আনিস, ভুল না বুঝে তো হতেই পারে, কিন্তু ভুল যদি জেনেশুনে হয়, সেটাকে কি বলা যায়?
ভালো থেকো।
ছোট বেলায় মনে করতাম, আহা, স্কুল ছুটি হবে, ক্লাশ থাকবে না, টিচারদের কাছে আর জ্ঞ্যানগর্ব লেকচার শুনতে হবে না, ইচ্ছেমতো নদীতে গিয়ে বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে লাফঝাপ মারবো, সারাদিন মাঠে গিয়ে যখন তখন খেলাধুলা করবো। সন্ধ্যা হলে আর পড়ার টেবিলে বসতে হবে না, সকাল সকাল আর ঘুম থেকে উঠতে হবে না, আরো চার আনা, আট আনা দিয়ে চালতার আচার যতো খুশী কিনে খাবো। কত কি!!
মাঝারী বেলায় মনে করতাম, আহা, অফিস ছুটি হলে সারাদিন বাসায় বসে টিভি দেখবো, ঘুমাবো, সন্ধ্যায় আড্ডা দেবো। বন্ধু বান্ধদের নিয়ে রাতভর গল্প করবো। লম্বা লম্বা ঈদের ছুটিতে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবো। কি মজা হবে। কোনো অফিস নাই, বসের আদেশ পালনের তাড়াহুড়া নাই। সকাল সকাল উঠে তাড়াহুড়া করে অফিসের জন্য রওয়ানা হতে হবে না। অনেক অনেক মজা করে সময়টা পার হবে। এই বয়সে এসেও মনে হয়, আহা এইবার ছুটিতে অনেক অনেক সময় পাওয়া যাবে। স্টাফদের ফোন আসবে না, সাপ্লাইয়াদের হিসাব কিতাব নিয়ে বসার দরকার হবে না। বাসায়, আত্মীয় স্বজনদেরকে সময় দিতে পারবো, বেশ জমজমাট একটা সময় পার হবে।
অথচ আজ এই ৫৫ বছর বয়সে আমার নিজের অফিস আছে, অফিসে দেরী করে গেলেও কেউ কৈফিয়ত চাবে না জানি, অফিসে না গেলেও কারো কাছে জবাব্দিহি করার নাই, যখন যেথায় খুশী যেতে চাইলেও কেউ আমাকে বাধা দেয়ার নাই। এই কয়দিন যাবত আমি ছুটিতেই আছি। কাজ নাই, অফিস নাই, তাড়াহুড়াও নাই। বড়দের চাপ নাই, শিক্ষকদের শাসন নাই, স্টাফদের ফোন কল নাই, সাপ্লাইয়াদের কোনো চাপ নাই, কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছে কি যেনো নাই। আচ্ছা, কি নাই? আমি তো ইচ্ছে করলে এখন পুরানো সেই বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে নদীতে যখন তখন ঝাপ দিতে পারি কারন শাসন করার কেউ নাই, ইচ্ছে করলেই সারাদিন টিভি দেখতে পারি, ইচ্ছে করলেই সারাদিন ঘুমাতেও পারি, ইচ্ছে করলেই হাড়ি হাড়ি চালতার আচার, কিংবা বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে রাত ভত আড্ডা, গল্প করতে পারি কিন্তু তারপরেও আমি তা করতে পারছি না বা করতে ইচ্ছে করছে না। কি অদ্ভুত না ব্যাপারটা!!
এখন মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু সময় আছে, সেই সময়ের সঙ্গে আমাদের ছুটির একটা বড় রকমের যোগসুত্র আছে। আজ এই ৫৫ বছর বয়সে আমি আর আগের সেই ১২ বছরের বালকের ন্যায় উচ্ছাস নদীতে তরঙ্গলম্ফ দিতে পারি না, ইচ্ছেও করে না। অথবা সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবলের অভাবে নারার-খেরের বল বানিয়ে গুটিকতক অদম্য পোলাপানের মতো গ্রামের সেই স্কুলের মাঠে বৃষ্টি বাদলের মধ্যেও হৈচৈ করে, ভরদুপুরে দৌড়াদৌড়িও করতে পারি না। অথবা পাশের বাড়ির পেয়ারা গাছের আধাপাকা পেয়ারাগুলি আর এখন আমাকে লোভ দেখায় না। বয়সটা পেড়িয়ে গেছে। আর তাই বড় আফসোস লাগে, আহা যদি আবার সেই বাল্যকালের শিক্ষকদের শাসনটা ফিরে আসতো! আহা, যদি আবার সেই পুরানো বন্ধু বান্ধবরা আগের রুপে ফিরে আসতো! মাঝে মাঝে আজ খুব হাসি আসে সেই বাচ্চা বয়সের কথা মনে করে। কতই না রাগ করেছি সবচেয়ে ভালো বন্ধুর সাথে। কত যে ঝগড়া করেছি ওদের সাথে। কখনো কারনে, কখনো অকারনে। কখনো আমি দোষ করেই উলটা রাগ করেছি, আবার কখনো ওদের দোষের কারনেও রাগ করেছি। এক মিনিট সময় লাগেনি তাকে বলতে যে, আমি তাকে ঘৃণা করি কারন সে আমাকে তার লাল পেন্সিলটা একদিন ব্যবহার করতে দেয় নাই, অথবা নদীতে আমার আগে সে লাফ দিলো কেনো এই কারনে আমি তার সাথে জিদ ধরে কয়েকদিন হয়ত কথাই বলিনি ইত্যাদি। জিদ ধরেছি একে অপরের সঙ্গে, কখনো কখনো আড়ি হয়েছে, কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে, আরো কত কি? ইশ, কি মিষ্টি ছিলো দিনগুলি!!
আজ বড় নস্টালজিক মনে হয়, আহা, এমন একটা বয়স যদি আবারো ফিরে আসতো! আমার সেই বন্ধুরাতো আজো আছে, আশেপাশেই আছে। কিন্তু বাল্যকালের সেই উচ্ছ্বাস, সেই অদম্য দুস্টুমিপনা, সেই আবেগ আর নাই। বয়স একধাপ থেকে উঠে আরেক ধাপে, আরেক ধাপ থেকে আরো আরেক ধাপে চলে গেছে। আগের ধাপের স্মৃতি ধরে রেখেছে কিন্তু কার্যপ্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কথা হয় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে, জীবনের উৎকণ্ঠা নিয়ে, পরিবারের ভালমন্দ নিয়ে, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংস্কৃতি নিয়ে। এখন আর বৈশাখী মেলায় মাটির ব্যাংক, বাঁশের বাঁশী, ভাজা বুট, চালতার আচার, নাগরদোলা, ফোটকা বেলুন, বাশের কঞ্চিতে বানানো বাশি ইত্যাদি নিয়ে কোনো আবেগ আসে না। অফুরন্ত সময় আছে, খেলার মাঠও সেখানেই আছে, নদীও আগের জায়গায়ই আছে, কিন্তু সেই ফেলে আসা বাল্যকালটা আর নাই। নদী দেখলে এখন মন চায় যদি ঝাপ দিতে পারতাম, কিন্তু দেওয়া হয় না। সবুজ ধানক্ষেত দেখলে ক্ষেতের আইল ধরে কচিকচি পায়ে দৌড় দিয়ে কোথাও হারিয়ে যেতে মন চায় কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হয় না। মন মনের জায়গায়ই আছে কিন্তু মনের সঙ্গে শরীর আর শরীরের সঙ্গে মনের মধ্যে এখন বিস্তর ব্যবধান বনে গেছে। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে “সময়” নামক এক বিশাল অদৃশ্য দেওয়াল। পাশে থাকা বাল্য বয়সের ছেলেমেয়েরা যখন তাদের ইচ্ছার কথাগুলি বলতে থাকে, আমি বুঝতে পারি ওরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে আর কি বলছে। বড্ড ভাল লাগে। মাঝে মাঝে ধমক দেই বটে, মাঝে মাঝে বারন করি, কখনো কখনো রাগও করি। আবার এও জানি, এটাই তো করার কথা ওদের। কিন্তু ওরাও একদিন এই সময়টা হারিয়ে ফেলবে। আজ ওদেরকে শাসন করি, একদিন আমাদেরকেও আমাদের অভিভাবকরা শাসন করতো। অভিভাবকদের ওই শাসনে কখনো মন খারাপ হয়েছে, অনেক আনন্দ মাটি করে ফেলেছি রাগে, দুঃখে মনের কষ্টে। জিদ ধরে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। সারাদিন না খেয়ে কষ্ট হচ্ছে দেখে হয়ত মাও খান নাই, বাবা ছেলের অহেতুক জিদে, মায়ের মনের কষ্টে তার সব শাসন ভুলে হয়ত আমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন, আর আমি সেটাই আমার বীরত্বই বলি, আর আমার জয়ই বলি, গর্বে আরো ঘাড় বেকে বসে থাকতাম খাবো না বলে। একদম অবুঝের মতো। আজ ওইগুলু মনে পড়লে বড্ড মন খারাপ হয়। আজ ঐ শাসনগুলি খুব মিস করছি। চোখের পাতা ভিজে আসে। কোথায় হারিয়ে গেলো ওইসব?
যখন ছোট ছিলাম, সবচেয়ে অপছন্দের চিঠি ছিল আমার অভিভাবকদের। সেই একই কথা। কোনো চিঠি না খুলেই বলে দিতে পারতাম, বাবা কি লিখেছে বা মা কি বলতে চেয়েছে। একদিন খুব দুস্টুমি করে আমি আমার অভিভাবককে বলেছিলাম, আচ্ছা, কস্ট করে বারবার একই চিঠি লেখার দরকার কি? একটা চিঠি ফটোকপি করে রাখলেই তো হয়। কদিন পরপর শুধু ওটা পোস্ট করে দিবা! কারন কথা তো একই থাকে। কেমন আছো তুমি, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করবে, সন্ধ্যা হওয়ার আগে ঘরে ফিরে আসবে, বেশী রাত জাগবে না, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে ভালোভাবে মিলেমিশে থাকবে, বড়দেরকে সম্মান করবে, আমাদের জন্য মন খারাপ করো না। এই তো? তাহলে আর বারবার লেখার দরকার কি? অথচ আজ এতো বছর পর মনে হচ্ছে, আমি ওই কথাগুলিই খুব মিস করছি। খুব করে মনে হয়, তোমরা আবারো আমাকে এই একই কথাগুলি লিখে পাঠাও না বাবা! আমি জানি, আজ আমার সন্তানেরাও ঠিক একই কথা বলবে। হয়ত কোনো একদিন আজকের এই দিনের মতো তারাও হয়ত আমার সেই একই কথা শুনার জন্য তাদের মন খারাপ করবে। সব বাবাদের কথা এক হয়, সব মায়েদের সন্তানের জন্য চিন্তা এক হয়। তোমরা যখন বাবা মা হবে, সেদিন হয়ত বুঝবে, আজ আমি কি বলতে চাচ্ছি।
যে বালকটি আজ থেকে ৫৫ বছর আগে উচ্ছল, চঞ্চল, দুরন্তপনা, অদম্য সময় কাটিয়েছিলো, ওই সময় যে তোমাদেরকে অনেক কঠিন দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে রাখতো, সময়-অসময় তোমাদের মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়াতো, আজ সেই একই বালক ৫৫ বছর পর শান্ত, ধীর এবং অভিভাবকরুপে রূপান্তরিত হয়ে শুধু একটা আবেগের কথাই বলতে চাই, ফিরে এসে দেখে যাও, সে আর আগের মতো দুস্টুমি করে না, হটাত বৃষ্টিতে তোমাদের অগোচরে ভিজে আর অসময়ে জ্বর বাধিয়ে ফেলে না, কিংবা তোমাদের না বলে হটাত করে কিছু দুষ্টু বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় না। তোমরা যে ছেলেকে সারাক্ষন ঘরের মধ্যে শান্ত হয়ে থাকতে বলতে। বলতে আর কতজল ফেলবি আমাদের চোখে? আর কত দুসচিন্তায় ফেলবি আমাদের? আজ এই বয়সে এসে আমি তোমাদের শুধু একটা কথাই বলতে পারি, এখন এসো আমার ঘরে, দেখে যাও, তার এখন অফুরন্ত সময় এবং সে এখন সত্যিই শান্ত একটি মিষ্টি ছেলে। এখন আর তোমাদেরকে আমি কোনো দুসচিন্তায় ফেলবো না। আজ আমার ছুটি। লম্বা ছুটি। আমি তোমাদের একজন লক্ষি ছেলে হয়েই ঘরে বসে আছি। কিন্তু তোমরা কই? তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাও? আমি তোমাদের খুব ভালবাসি।
সারাদিন ওরা আমার অফিসেই ছিলো। আজ ওদের জন্য একটা বিশেষ দিন। আমি দুই বোনকে মোট ২৬ শতাংশ জমি বায়না রেজিষ্ট্রি করে দিলাম। টাকার শর্ট ছিলো, তাই সাব কবলা করা হলো না। কিন্তু যে কন সময় ওদেরকে আমি দিয়ে দিতে পারবো, আর যদি আমার মরন ও হয়, ওরা মাত্র ১ লাখ টাকা জমা করে কোর্টের মাধ্যমে জমিটা নিজেদের নামে লিখে নিতে পারবে সে ব্যবস্থাটা করে রাখলাম। এর মধ্যে সোহেল এবং লিয়াকত অফিসে এলো। আমি ওদেরকেও একটা ল্যাব করে দিয়েছি, কিন্তু আমার ধারনা হচ্ছে সোহেল এবং লিয়াকত ল্যাবটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না। সোহেলের মধ্যে আগে যেটা দেখি নি, সেটা এখন আমার মনের মধ্যে একটু একটু করে সন্দেহের বীজ উকি দিচ্ছে, ওকে ব্যবসায়িক পার্টনার করাটা সম্ভবত ভালো সিদ্ধান্ত হয় নাই।
অনেকদিন পর আমার বড় মেয়ে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাসায় আসবে কাল ইনশাল্লাহ। তারপর ওকে নিয়ে আমরা সবাই কক্সবাজার যাবো বেড়াতে। অনেকবার গিয়েছি কক্সবাজারে, কিন্তু এবার যেনো কেনো একটু বেশী ভাল লাগছে যেতে। আসলে কক্সবাজার জায়গাটার মধ্যে কোনো মজা নাই, মজা হলো পুরু পরিবার একেবারে নিজের মতো করে এক সাথে হৈ হুল্লুর করা। সময়টা একেবারে নিজেদের মতো করে কাটে। এটা আসলে একটা ব্রেকটাইম।
প্রথমে উম্মিকার যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না, মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো আমাদের সবার। বারবারই মনে হচ্ছিলো যে, উম্মিকা যেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ওর ইন্টার্নীর ঝামেলায় উম্মিকার সম্ভব হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত উম্মিকা ম্যানেজ করেছে ছুটিটা। আর এই ছুটিতেই উম্মিকা আগামীকাল বাড়ি আসছে। ওর বাড়িতে ও আসছে, এতে যেনো বাড়িটাই আনন্দিত হয়ে উঠছে। ওর মা আজ ওর জন্য স্পেশাল বাজার করে আনলো, কনিকাও প্রস্তুতি নিচ্ছে কাল ওর আপু আসবে, তাই কি স্পেশাল খাওয়া যায়, তার একতা লিষ্ট ও করে ফেলছে। আগামী পরশু আমি উম্মিকা আর কনিকাকে ১৩ শতাংশ করে চমৎকার জায়গায় দুজনকেই এক খন্ড জমি লিখে দেবো, সেটাও একতা আনন্দ হচ্ছে। জমিটার দাম নিছক কম নয় প্রায়, ৭৫ লাখ টাকা করে উভয়ের, মানে প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি। তাই উম্মিকা আর কনিকাকে আমার ফ্যাক্টরীতে নিতে হবে আগামী পরশুদিন ইনশাল্লাহ।
প্রথমে উম্মিকার যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না, মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো আমাদের সবার। বারবারই মনে হচ্ছিলো যে, উম্মিকা যেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ওর ইন্টার্নীর ঝামেলায় উম্মিকার সম্ভব হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত উম্মিকা ম্যানেজ করেছে ছুটিটা। আর এই ছুটিতেই উম্মিকা আগামীকাল বাড়ি আসছে। ওর বাড়িতে ও আসছে, এতে যেনো বাড়িটাই আনন্দিত হয়ে উঠছে। ওর মা আজ ওর জন্য স্পেশাল বাজার করে আনলো, কনিকাও প্রস্তুতি নিচ্ছে কাল ওর আপু আসবে, তাই কি স্পেশাল খাওয়া যায়, তার একতা লিষ্ট ও করে ফেলছে। আগামী পরশু আমি উম্মিকা আর কনিকাকে ১৩ শতাংশ করে চমৎকার জায়গায় দুজনকেই এক খন্ড জমি লিখে দেবো, সেটাও একতা আনন্দ হচ্ছে। জমিটার দাম নিছক কম নয় প্রায়, ৭৫ লাখ টাকা করে উভয়ের, মানে প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি। তাই উম্মিকা আর কনিকাকে আমার ফ্যাক্টরীতে নিতে হবে আগামী পরশুদিন ইনশাল্লাহ।
একটা ফাদ পাতা হয়েছিলো। প্রথমে প্রেমের অভিনয়, তারপর তাকে অপহরন, তারপর তাকে শেষ করে দেয়া। কিন্তু ঘুনাক্ষরে অপরাধী টের পায় নাই এর শেষ পরিনতি কি। ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দেয়। আর এখানে সেটাই এই অপরাধী ঘটিয়েছিলো। সোজা অপহরন। অন্যদিকে, যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের সবার ঘুম নষ্ট হয়ে বিভ্রান্তের মতো দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে চৌহদ্দির বাইরে গিয়েও সর্বাত্তক চেষ্টা চলে হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে আবার ফিরিয়ে আনা। আর এই ভয়ংকর খোজাখুজির মধ্যে অনেক গোপন তাস প্রকাশ্যে আসে, প্রকাশ্যে আসে গোপন সন্ধি, গোপন লেনদেন, গোপন শর্তাবলি। তবে কিছু তাস সবাই জানলেও বেশীরভাগ তাসই অজানা অন্য সবার কাছে থেকে। এই অজানা তাসের মধ্যে কারো বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কিছু তাস আন্দাজ করা হয়, কারো নির্বোধ রাজনীতির কারনে আরো কিছু তাস গোপনে বেরিয়ে আসে আবার কারো আইনের নির্ভিক প্রশাসনিক দক্ষতায় শেষ অবধি অপরাধীর মতো তুরুকের তাসটি একেবারেই হাতে চলে আসে। তবে মজার ব্যাপার হলো, সময়ের পথ চলায় কিন্তু সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। ধীরে ধীরে এর মুখোশ উম্মোচিত হয়ই। অনেকেই রাজনীতি করেন নিজের যোগ্যতায়, কেউ রাজনীতি করে বাপদাদার পৈত্রিক উত্তরাধীকার সুত্রে। কিন্তু জ্ঞান তো আর উত্তরাধীকার সুত্রে পাওয়া যায় না। এটা অর্জন করতে হয়। পৈত্রিকসুত্রে পাওয়া রাজনীতির পদাধিকারী হয়তো জানেনই না যে, রাজনিতিতে পূর্নিমা আর অমাবশ্যা একসাথে চলে। জোয়ারভাটা এক সাথে চলে, কিন্তু সেটা কখন কিভাবে, কোথায় তার জ্ঞান থাকা দরকার।
আমরা অসহায় ছিলাম, আমাদের না ছিলো পাওয়ার-পলিটিক্সের ক্ষমতা, না ছিলো কারিকারি অর্থ। কিন্তু আমাদের ছিলো অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা আর ছিলো দায়িত্তবোধ। কিছু কিছু দায়িত্তশীল মানুষের আশ্বাস, ভরষা আমাদেরকে ক্রমাগত একটা অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছিলো, আমরা হারিয়ে যাওয়া আমাদের পরিবারের মানুষটির অজানা ব্যথায় ব্যথিত হচ্ছিলাম বটে কিন্তু সব ঠিক হয়ে যাবে, সব ঠিক করে দেয়া হবে এরুপ ভরষায় আমাদের আতংক দিনে দিনে এতোটাই বেড়ে উঠছিলো যে, আমাদের প্রতিটি পরিবারের জীবন্ত সদস্যরা যেনো মৃত মানুষের মতো বেচেছিলো। বুঝতেছিলাম যে, ঠিকঠাক হওয়া আর ঠিকঠাক দেখানোর মধ্যে কত পার্থক্য, এটা যেনো সত্য আর মিথ্যার মতো। এই দুয়ে চোখ আর মন এক সাথে চলছিলো না। অবশেষে বুঝলাম, বহুদূর অবধি খুজেও যখন কোনো সুত্র পাওয়া না যায় তখন কাছে দেখতে হয়। বুঝেছিলাম যে, সেটা কাছেই চোখের আড়ালে লুকিয়েছিলো। আর সেটা হলো স্থানীয় রাজনিতিকদের মাথায়। প্রশাসনিক দপ্তরের পজিটিভ মনোভাবে হারানো মানুষটাকে পাওয়া গেলো বটে কিন্তু অপরাধী ধরাছোয়ার বাইরেই রয়ে গেলো।
সবাই আমাদেরকে নিয়ে মাইন্ড গেম খেলছিলো। রাজনীতিকসহ। মাইন্ড খেলা বিপদজনক নয় তবে যার জন্য খেলা হয় সে যদি জেনে যায় যে, তাকে নিয়ে কেউ মাইন্ড গেম খেলছে, তাহলে মাইন্ড গেম উলটা ফল দেয়। এটা তখন হয় বুমেরাং কেননা যার উপর মাইন্ড গেম খেলা হচ্ছে সে যখন বুঝেই যায় যে তার উপর মাইন্ড গেম এপ্লাই করা হচ্ছে, তখন সে জেনেশুনে ঐসব উপাত্তগুলিই দেয় যা আসলে মাইন্ড গেমারকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আর তাকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এসব উপাত্তগুলি দেয়া হয়। জেনেশুনেই দেয়া হয়। তখন যিনি ছিলেন গেমার, তিনি হয়ে যান সাবজেক্ট, আর যিনি ছিলেন সাব্জেক্ট, তিনি হয়ে যান গেমার। আর তখন আসল মাইন্ড গেমার নিজেই তখন আরেকজনের মাইন্ড গেমের বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। এটা বুঝতে একটু সময় লেগেছিলো আমাদের। মনের কষ্টে, বেদনায় আর হতাশায় যেখানে যেখানে ধর্না দিয়েছি, কোথাও যখন এর প্রতিকার হচ্ছিলো না, শেষ প্রতিকার ছিলো অর্থ। অর্থ যে কত বড় শক্তি, সেটা এবার বুঝলাম। মৃত মানুষও এই অর্থের জন্য হাত বাড়ায়। এদেশের ভাগ্য বড় খারাপ যে, দেশমাতা বেশীরভাগ রাজনীতিবিদদেরকে যেনো অপরাধী সন্তান হিসাবেই জন্ম দিয়েছে। সবাই নয়, তবে অধিকাংশ। দেশমাতা নিজেও এর বলীর শিকার। আমাদেরকে এবার তারা সেটাই করতে বললেন যেটা আমরা চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যাপারটা গোপন থাকার শর্তে। এই অতি ধূর্ত মানুষটি দুটু গেম খেলছিলেন দুই দিকে। একটা লুকানো, আরেকটা বিভ্রান্ত। লুকানো গেমে আমরা আর বিভ্রান্তের গেমে তার অনুসারীরা।
অতএব, অপরাধী এলো, তিনি এলেন না। কারন তিনি আসবেন না এটাই ছিলো বিভ্রান্তের মুল লক্ষ্য। শেষতক, যুবরাজ অপরাধী এলেন, ধরা পড়লেন, লালঘরে চলে গেলেন। আর পরদিন সবাইকে আবারো বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে আমাদেরকে এক তরফা শাসিয়ে দিলেন। এটাই রাজনীতি। রাজনীতিতে অনেক সময় অনেক বড় জিনিষ ছোট ভাবেও বলা যায়। এই রাজনীতির খেলায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাহিনী বলে কিন্তু সত্যটা থাকে অন্য কিছু। সময় হলো সবচেয়ে বড় ভিলেন। আর এই ভিলেনের সবচেয়ে বড় বন্ধু তারা যারা বারবার মাইন্ড গেম খেলেন এবং খেলান।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
আমাদের বাসায় দুটু গাড়ি আছে। একটা এলিওন, আরেকটা নোহা। মানুষ আমরা মোট চারজন। বড় মেয়ে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্নী করছে ফলে ঢাকার বাসায় আমি, আমার স্ত্রী এবং ছোট মেয়ে কনিকাই থাকি। দুটু গাড়িতে আমাদের খুব ভালোভাবেই চলে যায়। কিন্তু খুব শীঘ্রই আমার বড় মেয়ে যখন ইন্টার্নী করে ঢাকায় চলে আসবে, নির্ঘাত আমাকে আরো একটা গাড়ি কিনতেই হবে ওর জন্য। আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার তার হাইলাক্স সার্ফ গাড়িতা বিক্রি করে তিনি আরো একটা গাড়ি কেনার পরিকল্পনা করেছেন। ব্যবসায়ীক পার্টনারের এই গাড়িটা আমরা ৭৩ লক্ষ টাকা দিয়ে ২০১০ সালে কিনেছিলাম আমাদের প্রয়াত আরেক বিদেশী পার্টনার প্রিয়ান্থার জন্য। প্রয়ান্থা মারা যাওয়ার পরে আমিই বলেছিলাম মুর্তজা ভাইকে যেনো উনিই এই গাড়িটা কিস্তিতে কিনে নেন। গাড়িটা সেকেন্ড হ্যান্ড ছিলো না। ফার্ষ্ট হ্যান্ড গাড়ি ছিলো।
গাড়িটা আমার কাছে খারাপ লাগে নাই। তাই রেখে দিলাম। এই রেখে দেওয়ার পিছনে দুটু কারন ছিলো। এক, আমাকে এখুনী কোনো টাকা পয়সা দিতে হবে না। দুই, কয়েকদিন পর আমাকে আরেকটা গাড়ি কিনতেই হবে। তাহলে এখন এটা রেখে দেয়াই ভালো। ড্রাইভার নিতে হবে না কারন মিটুল এলিওন গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করবে, বড় মেয়ে এবং ছোট মেয়ের জন্য নোহা গাড়িটা থাকবে আর আমার জন্য এই হাইলাক্স সার্ফ গাড়িটা রইলো।
গ্যারেজের সল্পতা আছে। আমাদের বাসায় সর্বোচ্চ দুটু গাড়ি পার্ক করা যায়। তাই পাশের বাসার সাত্তার সাহেবের বাড়িতে একটা গ্যারেজ ভাড়া নিতে হলো। পাশাঅয়াশি বাসা। কোনো অসুবিধা নাই।
একটা কথা তো ঠিক যে, যার কেউ নাই, তারও কেউ না কেউ আছে। যখন বাবা মা অভিভাবকরা বেচে থাকেন, তখন তো তারা আছেনই, কিন্তু যখন তারা আর কেউ বেচে থাকেন না, মনে হতে পারে, হয়তো আমাদের জীবনে আমাদের পাশে আর কেউ নাই। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে- এই বিশাল দুনিয়ায় যার কেউ নাই, তারও পাশে কেউ না কেউ থাকে, থেকেছে। হয়তো এটা আগে থেকে লিষ্টে তাদের নামে থাকে না কিন্তু প্রয়োজনে এসেই যায়। তাই আমি সবসময় নিজে এবং অন্য সবাইকে বলি, কখনো নিজেকে একা ভাববেন না, কখনো নিজেকে অসহায় ভাববেন না। আর কারো যদি সত্যি সত্যি নিজের আপনজনের লিষ্টে কারো নাম খুজে না পান, আর ভবিষ্যতে পেতে চান, তাহলে নিজের সন্তানদেরকে মানুষ করুন। তাদেরকে উপযুক্ত ব্যক্তিত্তে গড়ে তুলুন। তাদেরকে পড়াশুনা করে সুশিক্ষিত করুন। তাদেরকে শিক্ষা দিন যে, শর্টখাট রাস্তায় কোনোদিন বড় হওয়া যায় না। তাই তাদেরকে পরিশ্রমের মাধ্যমে বড় করে তুলুন। তাদের নিজের শক্তিতে প্রস্ফুটিত হোক সে ব্যবস্থাটা করুন অর্থাৎ পরিবেশটা দিন। নিজের ভিতরে একটা প্রচন্ড শক্তি সেই ঈশ্বর কিংবা ভগবান যাইই কিছু বলি না কেনো, আমাদের স্রিষ্টিকর্তা আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে একটা সুপ্ত শক্তি দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাদেরকে এই অদৃশ্য শক্তিটা বুঝাতে শিখুন। কেউ এর সন্ধান খুজে পায়, আর কী এর অস্তিত্তই খুজে পায় না। নেটওয়ার্কি নয়, কানেক্টিং পিপল, এই তথ্যে আপ্নিও বিশ্বাস করুন, তাদেরকেও বিশ্বাস করার শিক্ষা দিন।
আমাদের সমাজে মেন্টরের খুব অভাব আছে। মানুষ মেন্টর হতে চায় না, তারা মেন্টর খুজে, তাদের সাথে যুক্ত হতে চায়। তাই, আমি উপদেশ দেই, আপনি নিজে মেন্টর হোন। মানুষ আপনাকে খুজবে।
সিনহা হত্যা সবাই দেখেছে, সিনহার লাশ সবাই দেখেছে। সিনহা বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়েছে, এটা বাস্তব। এটা কোনো গাজার আসরে বসে কোনো মাতালের বয়ান নয়। এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসের বাইরে বা ভাবনার বাইরে নয় যে, সিনহাকে হত্যা করা হয় নাই। কারন এটা কোনো লেখকের কল্প কাহিনী নয়। কিন্তু… এরপর?
ক্ষমতা, ক্ষমতার পদাধীকার আর সেই ক্ষমতার প্রভাব এই সমাজে সেই কাজ করা যায় যা সাধারন মানুষ ভাবতেও পারে না, বুঝতেও পারে না। তাহলে সাধারন মানুষ কি করতে পারে? “প্রশ্ন”- হ্যা, সাধারন মানুষ শুধু প্রশ্ন করতে পারে। আর যদি সেই প্রশ্নের উত্তরের জায়গায় তারা শুধু নীরবতাই পায়, তাহলে সাধারন মানুষ নীরব থেকে সেই নীরবতাকেই উত্তর মনে করে।
সিনহা হত্যা এখন এমন এক প্রশ্নের উদয় করেছে- আদৌ কি সিনহা নামের কোনো সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার ছিলো যে কিনা কোনো এক রাতে একদল আইন শ্রিংখলা বাহিনীর পুলিশের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত হয়েছে? হয়তো ছিলো, হয়তোবা ছিলই না। এমনো হতে পারে- এটা কোন লেখকের মনগড়া কল্পনাপ্রসুত লোমহর্ষক এডভেঞ্চার কাহিনীর কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা যা শুধু লেখকই জানেন।
যারা সারাজীবন কারো নিরাপত্তার দায়িত্ত নিয়ে জীবন বাজী রাখে, এক সময় তারাই হয়ে উঠে জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুকিপূর্ন মানুষ। তখন শত্রুর শত্রুতায় জীবন ঝুকিতে পরে না, ঝুকিতে পরে অতীব কাছের মানুষের শত্রুতায়। গোয়েন্দারা আসামি শনাক্ত করার জন্য অনেকগুলি পথ অনুসরন করে থাকেন। তার একটি হল প্রত্যেককেই সন্দেহের দ্রিষ্টিতে দেখা। সবচেয়ে বেশী তাকে করা হয় যাকে মনে হবে কম সন্দেহজনক। ইতিহাস আমাদেরকে বারবার শিখিয়ে গেছে যে, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় যে শত্রু তাকে কখনো চেনা যায় না। সে থাকে সবচেয়ে কাছের বন্ধুর মত করে। আমাদের সবার ব্যক্তিগত জীবনও তাই। আপনি সবচেয়ে বেশী প্রতারিত হবেন আপনার কাছের মানুষদের কাছ থেকে। আপনার সবচেয়ে বেশী কষ্টের তালিকা করলে সেখানে শত্রু না, আপন মানুষের নাম বেশী দেখতে পাবেন। শত্রু কখনো বিশ্বাসঘাতক হয় না, বিশ্বাসঘাতকতা করে কেবল আপন মানুষেরাই। এরিস্টোটল বলেছিলেন, দূর্ভাগ্যবান তারাই যাদের প্রকৃত বন্ধু নাই। অপরদিকে সেই প্রকৃত বন্ধুই যখন শত্রু হয়ে উঠে, তখন সেই জীবন নিয়ে বেচে থাকা কষ্টকর, যন্ত্রনাদায়ক ও পীড়াদায়ক। এমন কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুরও কারন হয়ে দাঁড়ায়। তাই শত্রুকে যদি একবার ভয় করো, তাহলে বন্ধুকে ভয় করো অন্তত দশবার। কারন বন্ধু যদি কখনো শত্রু হয়, তখন তার কবল হতে মুক্তি পাওয়া কিছুতেই সম্ভব হয় না।
একটা হাংগেরীয়ান মুভি দেখছিলাম আজ। ছবিটার নাম “Dear Elza”। লম্বুস মিহালি নামের এক যুদ্ধা ইষতার্ন ফ্রন্ট থেকে যুদ্ধ কালীন সময়ে ১৫ দিনের ছুটি পায়। কিন্তু সে ভুল একটা লাইনে দাড়িয়েছিলো। ছুটির লাইন আর যুদ্ধে যাওয়ার লাইন। সে ভুল করে ছুটির লাইনে না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো যুদ্ধে যাওয়ার লাইনে। ফলে তাকে আবারো ইষ্টার্ন ফ্রন্টেই ছুটিতে না পাঠিয়ে ওয়ার ফ্রন্টে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর সে রাশিয়ান বাহিনী দ্বারা ধরা পড়ে। আর রাশিয়ান বাহিনী তাকে মানিএ পা দিয়ে দিয়ে মাইন আছে কিনা সেটা যাচাইয়ের কাজে লাগানো হয় যা ছিলো একটা মারাত্তক ব্যাপার। এই রাশিয়ান ক্যাপ্টিভিটির সময় তার কিছু বন্ধু সুলভ বন্ধুরা তার সাথে বিট্রে করে বটে কিন্তু তার কিছু শত্রু পক্ষ তাকে সাহাজ্যও করে। ছবিটার শেষে এসে লবুস এটাই শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করে যে, the effort of military morality and the ancient instinct of survival can not coexist. লম্বুস যুদ্ধে যেতে চায় নাই। তারপরেও তাকে যুদ্ধে যেতে হয়েছিলো। জীবনের ভুল লাইনে কেউ একবার দাঁড়িয়ে গেলে সেই ভুল পথ থেকে ফিরে আসতে হয়তো কারো কারো এক জীবনেও আর ফেরা হয় না। জীবন আসলে কাউকেই ক্ষমা করে না। সেটা ভুলই হোক আর ভুল না ই হোক। হোক সেটা নিজের ভুলে, বা অন্য কারো ভুলে।
ছবিটা দেখতে দেখতে আমারো আমার সৈনিক জীবনের বহুস্মৃতি মানষ্পটে ভেসে উঠলো। ভেসে উঠলো আমার অতীত। আমিও এই আর্মিতে যেতে চাইনি। পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে, মেডিক্যালে, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সমস্ত সুযোগ এবং কোয়ালিফিকেশন থাকা সত্তেও আমাকে যেতে হয়েছিলো ঠিক যেটা আমি কখনো চাই নাই- সেই সেনাবাহিনী।
শ্ত্রু পরিবেষ্ঠিত বিপদসংকুল চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্সে শান্তিবাহিনির বিরুদ্ধে পেট্রোল করার সময় সবাই যখন জীবনের আতংক নিয়ে খুব সন্তর্পনে পেট্রোলিং করতো, সবাই যখন জীবন বড় অমুল্য ধন ভেবে বাচার জন্য সব ধরনের প্রতিকার নিতো, সবাই যখন জীবনকে বাচিয়ে রাখার জন্য আপ্রান চেষ্টা করতো, তখন আমি ছিলাম নির্বিকার। কেনো যেনো জীবনের জন্য আমার এতোটুকুও মায়া জমেনি। অবহেলায় গরে উঠা আমার এই মাংশ পিন্দের দেহটা যেনো আমারই না। আমার মা ছাড়া আমার এই দেহে কেউ আদর করে দিয়েছে এটা আমার মনেই পড়ে না। ফলে আমার এই দেহ, আমার এই মন ছিলো আমার মনের বাইরে। কখনো কখনো প্রোটেকশন ছাড়াই হাতে একটা এসএমজি নিয়ে একা একা পাহাড়ি পথে হেটে গিয়েছি। কখনো কখনো কোনো অস্ত্র ছারাই বিস্তর পথ একাই হেটে বেড়িয়েছি। জীবনের জন্য কখনো অসস্থি বোধ করিনি। জানি এটা সামরক আইনের পরিপন্থি। তারপরেও মনে হয়েছে- জীবনের নিঃশ্বাস শেষ হবার পর কোনো আইন আর তার জন্যে কোনো কিছুই না। কিসের বিচার আর কিসের আইন ভাংগার শাস্তি। চরমটা তো পেয়েই গেলাম নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। জীবন যখন তার এসেট ভ্যালু নিয়ে ভাবে না, তখন তার হৃদয়ের দামই বা কি, আর তার নিসশাসের দামই বা কি, এটা আর কোনো মান্দন্ডে আর মাপা যায় না।
কখনো একা একা পাহাড়ের জংলী ফুল দেখেছেন? দেখেছেন কখনো কোন পাখী কিসের কারনে কোন গাছে উড়ে বসে? কখনো উপলব্ধি করেছেন কয়েকদিন নির্ঘুম রাত কাটানোর পর মুখের খোচা খোচা দাড়ি কিভাবে আপনাকে পরিহাস করে? কখনো যুদ্ধ বিদ্ধস্থ এলাকায় কোনো এক ছোট বাচ্চার ভয়ের হৃদপিণ্ড দেখেছেন কতটা জোরে জোরে কাপে সে যখন দেখে ইউনিফর্ম পরা অস্ত্র হাতে কোনো এক কম্বেট্যান্টকে বা সৈনিককে? কখনো কারো মৃত্যু কি নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করতে দেখেছেন? কখনো কি এটা ভেবেছেন যে, আপনার একটা আঙ্গুলের ট্রিগারের চাপে কোনো এক জলজ্যান্ত যুবকের নিঃশ্বাস বের করে দিতে পারে? কখনো কি শুনেছেন ওই যুবকের শেষ কথা যে বাচতে চেয়েছিলো আমার মত, আপনার মত কোনো এক নিয়ন লাইটের শহরে? কখনোও কি সাধ নিয়েছেন অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে জলন্ত নিবু নিবু ভেজা সিগারেটের গন্ধ? আমি এর প্রতিতা স্তর পার করেছি। আমি দেখেছি, কখন আমার জীবন অন্যের হাতে বন্দি, আমি দেখেছি সেই ঝর্নার মতো বৃষ্টির রাতে নিবু নিবু সিগারেটের গন্ধ। আমি দেখেছি সেই জলজ্যান্ত যুবকের লাশ, যার উপর বসে আমি সকালের চা খেয়েছি। আমি দেখেছি সে পথ হারা ছোট বাচ্চার দিগন্ত স্পর্শী চিৎকার আমার অস্ত্র সহ ইউনিফর্মের ভয়ার্থ কারনে। আমি তাকে শান্ত করতে যাইনি। আমি শুধু ভেবেছি, সে আমাকে মানুষ মনে করে নাই। আমি তার কাছে নিতান্তই একতা দানব। অথচ আমার পেট ভর্তি কষ্ট, মন ভর্তি মায়া আর অন্তর ভর্তি মহব্বত। কিন্তু এগুলি তো দেখা যায় না। দেখা যায়, আমার ঘুমহীন চোখের অগোছাল মুখাবয়ব, অশান্ত চেহাড়া আর কঠিন চোয়াল।
কত বিচিত্র সে জীবন। জোনাকির ভিড়ে, কালো অমাবশ্যার রাতে চকচক করা ফুটন্ত ছোট ছোট মরিচ বাতির মতো কোনো এক মিডনাইট, আকাসের মেঘের ফাকে ফাকে সেই দুড়ন্ত চাঁদ, যে কিনা একাই জেগে থাকে আকাশে। আমি সেই পথ দিয়ে বহুবার হেটে গিয়েছি একা। মরা মানুষের ভীরের আস্তানা সেই গোরস্থান দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় সালাম দিয়েছি স্তব্ধ কবরের নির্জীব মানুষগুলিকে। বসেছি কখনো কোনো কবরের উপর। হয়তো সে এই বাহ্যিক প্রিথিবীতে কোনো এক রাজকুমার ছিলো। আজ সে নাই। হয়তো কোনো এক শায়িত কবরের পাশে বসে সিগারেট ফুক্তে ফুক্তে ভেবেছি, এখানে ঠিক আমার পায়ের নীচে হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো এক গ্রাম কাপানো সুন্দুরী। যার সারাটা দিন কাটতো তার রুপের বাহানায়। অথচ আজ সেও নাই। কখনো নিকষকালো জ্যোৎস্নায় গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ভেবেছি, কেউ কি এখনো জেগে আছে আমার মতো? হয়তো তখন আমার মা জেগেই থাকতো তার সেই ছোট পলাতক ছেলেটির কথা ভেবে ভেবে। আমি তখন যোজন দূরে একা কোনো এক শত কিলোমিত্র দূরে বৃষ্টির ফোটা মাথায় নিয়ে ভেজা হাতে হয়তো একটা জলন্ত সিগারেট নিয়ে ভাবতাম, আমি আমার মাকে মিস করি।
সেই ছোট বেলা থেকেই চিঠি আসতো না আমার কখনো। অনেকেরই চিঠি আসতো, কোনো এক জনাকীর্ন বাড়ির বউ কিংবা তার ছোট ভাই বোনেরা, কতই না রঙ বেরং এর খামে চিঠি লিখতো আমারই পাশে শুয়ে থাকা আমারই কমরেডদের কাছে। তারা চিঠি পড়তো, হাসতো, আবার কেউ কেউ অন্য মনস্ক হয়ে যেতো। তারাও চিঠি লিখতো। তাদের ভালোবাসার মানুষের কাছে। আমার কোনো চিঠি আসতো না। চিঠি না আসা মানেই কেউ আমাকে ভালোবাসে না, আমি কখনো এটা মনে করি নাই। মনে হতো, জীবনটাই তো একটা চিঠি। কেউ লিখে রাখে আর কেউ মনে মনে রাখে।
আমি ডায়েরী লিখতাম, কোনো এক “কল্পনা” আপুকে সেই “আনা’র ডায়েরীর মতো। জগত বড় বিচিত্র।
যে ভয়টা পেয়েছিলাম, সেটাই হয়েছে। আজ রাত ১০টায় প্রভা হেলথ সেন্টার যারা গতকাল মিতুলের করোনার টেষ্টের জন্য স্যাম্পল নিয়ে গিয়েছিলো, তারা মেইল করে জানালো যে, মিতুলের করোনা ভাইরাস “পজিটিভ”। মিটুল প্রায় সপ্তাহখানেক যাবত এতোটাই দূর্বল আর অসুস্থ্য হয়ে গিয়েছিলো যে, এটা করোনা ছাড়া আর কোনো কিছুই না। অন্যকোনো কিছুই তার বেঠিক নয় অথচ ওর না আছে শরিরে শক্তি, না খেতে পারছে, না একটু নড়াচরা করতে পারছে। যাইহোক, আশার কথা হচ্ছে যে, মিতুলের “করোনা” আসলে আরো আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো। যা আমরা কেনো, কোনো ডাক্তার কিংবা হাসপাতালও বুঝে নাই। বারংবার বলার পরেও তারা মিতুলের “করোনা” টেষ্ট করানোর প্রয়োজন নাই বলেই তাকে অন্যান্য মেডিকেশন প্রেস্ক্রাইব করেছে। এই করোনা প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে আমাদের সিএমএইচ অন্তত মিতুলের করোনা টেষ্টটা করানোর জন্য উপদেশ দিতে পারতো। আমরা শুধুমাত্র “করোনা” টেষ্ট করার ব্যাপারেও কথা বলেছিলাম কিন্তু তারা এটাকে “করোনা”র কোনো সিম্পটম নাই বলে আর উৎসাহ দেন নাই। মিতুলের সিম্পটমগুলি খুব ক্রিটিক্যাল। ওর জর নাই, কাশি নাই, অন্যান্য কোনো বাহ্যিক সিম্পটম নাই, অথচ ওর খাবার খেতে অনিহা, ঘ্রান পায় না। আর মাঝে মাঝে “আম আম” পায়খানা হয়। আজ জানলাম, এটা “করোনার” আরেক ক্রিটিক্যাল চেহাড়া। করোনার রোগীর সব সময় জর হতে হবে সেটাও না, আবার কাশি থাকতে হবে সেটাও না, করোনার অনেক চেহাড়া।
যাই হোক, মিতুল সম্ভবত ইতিমধ্যে করোনার যে শক্তিশালী থাবা, সেটা অতিক্রম করে ফেলেছে। এখন ধীরে ধীরে খাওয়ার চেষ্টা করছে। কোথাও ভর্তি করলাম না। বাসায় ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। যেহেতু করোনার কোনো ট্রিটমেন্ট নাই, ফলে আমরা চেষ্টা করছি ওকে সাভাবিক খাবার দিতে, গরম পানি আর লেবুর চা, শরবত, সাথে কফের জন্য সুডুকফ নামের একটি সিরাপ, ম্যাগনেশিয়াম টেবলেট, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট এবং প্যারাসিটামল খাওয়াচ্ছি রুটিন করে। আর তার সাথে স্যুপ, ফল,জুস এবং কিছু শক্ত খাবার বিশেষ করে জাউ,বার্লি, সাগু এবং নরম খিচুড়ি। মিটুল নিজেও চেষ্টা করছে যাতে শরীরে কিছুটা শক্তির সঞ্চার হয় এমন খাবার জোর করেই খেতে।
আমার ছোট মেয়েও কদিন আগে যখন মিটুল অসুস্থ্য হয়ে যায়, তখন কনিকার একটু একটু কাশি ছিলো, জরও ছিলো। ব্যাপারটা খুব আমলে নেই নাই। দুদিন পর দেখলাম, কনিকা আবার সুস্থ্য। ভাবলাম, হয়তো সিজনাল জর বা এসি চালিয়ে ঘুমায় বলে ঠান্ডা লেগেছে। আমার নিজেরও মাঝে একটু খারাপ এগেছিলো, এটাও আমি খুব একটা আমলে নেই নাই। আজ মনে হচ্ছে, করোনা আমাদেরকেও সম্ভবত টাচ করেছিলো, কিন্তু কনিকা বা আমাকে করোনা কাবু করতে পারে নাই।
আমরা এখন সবাই আরো চেষ্টা করছি যাতে অন্তত প্যান্ডেমিক আমাদেরকে আঘাত করতে না পারে। বাকিটা আল্লাহর দয়া।
পরিবারের সবচেয়ে কর্মঠ মানুষটি যদি কোনো কারনে তার সচলতা কমে যায়, তার শরীর খারাপ হয়ে নিজেই বিছানায় পড়ে যায়, তার নিজের খাবারটুকুও যখন আর বানানোর শক্তি থাকে না, তখন যেটা হয় তা অবর্ননীয়। পরিবারের সবার সুখ নষ্ট হয়, বিরক্ত লাগে, কোনো কিছু যেনো হাতের কাছে পাওয়া যায় না, প্রতিদিনকার রুটিনে একটা বাধাগ্রস্থ হয়। এটা একটা পানির মেইন পাইপের মতো। ফ্লো বাধাগ্রস্ত হতে হতে সবার জীবনের মধ্যে একটা স্থবিরতা, ক্লান্তি নেমে আসে। আমার পরিবারে মিটুলের অসুস্থতা ঠিক তেমন একটা ব্যাপার দাড়িয়েছে। গত ১০/১২ দিন যাবত মিটুল অসুস্থ্য। কিন্তু কি তার রোগ এটাই যেনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। না ডাক্তার না আমি। পর পর তিনটা ইন্সটিটিউসন বদলামাম। প্রথমে ইবনে সিনা, তারপর এপোলো, অতঃপর সিএমএইচ। সবার রিপোর্ট আর ডায়াগনস্টিকে প্রায় একই কনফার্মেশন। এনোরেক্সিয়া, পটাশিয়ামের অভাব, ইলেক্ট্রোলাইট-কে এর অভাব সাথে ম্যাগনেশিয়াম। সবগুলি মেডিসিন এপ্লাই করছি কিন্তু খুব একটা ইম্প্রোভ করছে বলে মনে হয় না। সারাদিন মিটুল শুয়েই থাকে। আমি ওর জন্য অফিসে যেতে পারছি না প্রায় তিনদিন। আমিও চেষ্টা করছি যাতে মিটুল তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায় কিন্তু ব্যাপারটা আমার ইচ্ছার গতির সাথে ওর সুস্থতার গতিতে মিলছে না।
আজ সন্ধ্যায় ডাঃ নিখিলের সাথে কথা বললাম। তিনি আমাদের রিভার সাইড সুয়েটার্স এর ডাক্তার। তিনিও আজ ৪ দিন যাবত পিজিতে করোনার কারনে ভর্তি। মিটুলের যখনই কোনো অসুখ হয়, নিখিলদা ওভার ফোনেই সব প্রেসক্রিপশন করে থাকেন, আর তাতেই আল্লাহর রহমতে মিটুল ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এবারই প্রথম কেনো জানি কিছুতেই মিটুল দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে না।
একটু আগে প্রভা হেলথ কেয়ার-বনানীতে ফোন করে মিটুলের জন্য করোনার টেষ্ট করানোর জন্য হোম সার্ভিসে ফোন করলাম। ওরা আগামিকাল সকাল ১১টার দিকে বাসা থেকে স্যাম্পল নিয়ে যাবে। আমার ধারনা, মিটুলের করোনার হবার সম্ভাবনা আছে। যদিও খুব একটা সিম্পটম দিচ্ছে না। আজই প্রথম ওর জর হলো ১০১, কোনো সর্দি নাই, বুক ব্যথা নাই, কিন্তু সুষ্ক একটা কাশির ভাব আছে। আজকাল করোনাও চালাক হয়ে গেছে। বিভিন্ন মানুষের শরীরে সে বিভিন্ন রুপে আসে। হতে পারে মিটুলের ক্ষুধামন্দা আর একটু জরই হচ্ছে পিজিটিভ হবার লক্ষন। ঘ্রান পায় যদিও করোনার রোগীর ঘ্রান থাকে না। একটু একটু করে খেতে পারে যদিও কোনো টেষ্ট পায় না সে খাবারের মধ্যে। দেখা যাক, আল্লাহ ভরষা।
আমাকে গত রাতেই ও জানালো খুব ভয়ে ভয়ে যে, প্রায়ই নাকি ওর বুকের ডান দিকে একটু একটু ব্যথা করে। এই ব্যথার কারনে নাকি সে মাঝে মাঝে মাঝ রাতে উঠে বসে থাকে, পানি খায়, তারপর আবার ব্যথা একটু কমলে ঘুমানোর চেষ্টা করে। ব্যাপারটা কেনো সে আমাকে বলে নাই এতোদিন বুঝি নাই। কিন্তু যখন গতকাল বল্লো, আমি কালবিলম্ব না করে ওকে খুব ভালো একটা হাসপাতালে ইমারজেন্সী বিভাগে যোগাযোগ করতে বলি। আজ ওরা তিনজনেই ওখানে গেলো, সব ধরনের টেষ্ট করালো। আপাতত টেষ্টগুলি দেখে মনে হলো পুরুটাই গ্যাস্ট্রিক রিলেটেড একটা ব্যাপার। তারপরেও যা যা টেষ্ট দিয়েছে তাতে সারা শরীরের একটা লিপিড প্রোফাইল, সিবিসি, এলএফটি, ইসিজি এবং থাইরয়েড টেষ্টগুলি করালো। রিপোর্ট আগামিকাল পাওয়া যাবে। আপাতত সে ভালো আছে।
গ্রামের মানুষগুলির সবচেয়ে বড় এবং করুন আক্ষেপ হচ্ছে, তারা পরিবারের সবচেয়ে উচ্ছিষ্ঠ মানুষগুলির মধ্যে একজন। সে ঘর ঘুচিয়ে রাখবে, সন্তান ধারন করবে, সন্তান পালন করবে, সবার জন্য রান্নাবান্না করবে, বাড়ির সবার দেখভাল করবে, কিন্তু তার শরীর খারাপ হওয়া যাবেনা, তার রেষ্টের দরকার নাই, তার আহলাদের কোনো বালাই থাকবে না, তার ভালোমন্দ খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই। আর যদি তার অসুখ করে, সেটা নিতান্তই একটা উপদেশ বা বকা দিয়ে সেরে ফেলতে হবে, খুব বেশী হলে আটানা পয়সা খরচ করে একটা প্যারাসিটামল খেলেই যেনো তার সর্বরোগ উপশম হয় এর বেশী কিছু তার প্রাপ্য নাই। ভগবানও বেশ রশীক বা সদয়বান, তাদের খুব একটা ঝামেলায়ও ফেলেন না। তাদের শরীর খুব একটা খারাপ হয়ও না। এভাবেই ওরা অভ্যস্থ। হয়তো এই রীতিটা এতো বছর পর্যন্ত নিজের চোখে দেখে এসছে বলে, ওর যে বুকে প্রায়ই ব্যথা করে, এটাও বলার মতো সাহস তার বুকে হয়ে উঠে নাই। কিন্তু আমি তো সে রকম নই। আমি বিজ্ঞান বুঝি, আমি মানব শরীর বুঝি, আমি তার প্রতিকারগুলি বুঝি। ভালোলাগার মানুষেরা যখন ঘরের বিছানায় শুয়ে কাতরাতে থাকে, তার আর কোনো সাহাজ্য আমাদের না লাগলেও, তার নিজের যে একটা সাহাজ্য লাগতে পারে, এটা আমরা পুরুষ সমাজ সবসময়ই ভুলে যাই বা এটাকে কোনো প্রাধান্যই দেই না। এটা অনেক বড় একটা ডিপ্রাইভেশন ছাড়া আর কিছু না। ওরাতো আমাদের উপর ভরষা করে, ওরা তো আমাদের হাত ধরেই বাচে, ওদের ছোটছোট সপ্নগুলি পুরনে খুব বেশী হয়তো খরচ পড়ে না। তারপরেও আমরা ওদের ব্যাপারে অনেক উদাসীন।
আমরা শিশুকালে যার কোলে মাথা রেখে বড় হবার সপ্ন দেখি, শৈশবকালে যার হাত ধরে আমরা আমাদের ক্যারিয়ার গড়তে চিন্তা করি, যৌবনকালে এসে সেই চিন্তায় অনেক স্রোতের মতো উচ্ছল হয়ে উঠে, আর যারা এতোকাল আমাদেরকে বুকে পিঠে আগলে রেখে ভালো একটা সময়ের কথা ভাবতেছিলো, তাদের চিন্তায় সেটা যেনো ধীরে ধীরে ভাটা পড়ে। যে সন্তানের মুখ চেয়ে যে পিতামাতা আকাশের চাদের সপ্ন দেখে, সেই সন্তান তখন তার পূর্ব পুরুষের রেশ ধরে সেই একই চিন্তায় মশগুল হয়ে এইসব মানুষ গুলিকে আবারো হতাশায় ফেলে দেয়। তাদের বুকে আশার বদলে ভয় ঢোকিয়ে দেয়। চাওয়ার থেকে তখন শুধুমাত্র বেচে থাকার জন্যই ওরা বেচে থাকে। সেই পুরানো সাধ আহলাদ, সেই সুখের চিন্তা আর মাথায় আসে না।
কিন্তু যখন কারো জীবনে এর ব্যতিক্রম হয়, সে যখন দেখে তাকে কেউ তার অসুখের সময় আগলে রেখেছে, তার প্রতি যত্ন নিচ্ছে, একটু ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, কিংবা তার জন্য কেউ চিন্তা করছে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা অনেক লোভনীয় আর সুন্দর। আর এটাই তো হবার কথা। এটাই তো মানবতা। সুখে দুখে যখন কেউ একসাথে থাকে, থাকতে পারে, তখন পরিবারের প্রতিটি জিনিষ যেনো চকচক করে হেসে উঠে সব শান্তির পাখা মেলে।
ওরা পরিবর্তন আনুক এই সমাজের, ওরা পরিবর্তিত সমাজে বাচুক আরো আনন্দ আর হাসি নিয়ে।
বিডিসি বনাম মেজর আখতার
প্রথম পর্বের ইতিহাসঃ
১। সিএস রেকর্ড মোতাবেক মোট ৫ জন মালিকানা এবং জমির পরিমান মোট ২৭০ শতাংশ। ফলে প্রত্যেকেই ৫৪ শতাংশ করে মালিক ছিলেন। তারা হলেনঃ
ক। রঘুনাথ বৈরাগী, পিতা- শ্রীকৃষ্ণ বৈরাগী – ৫৪ শতাংশ
খ। গুলমনি বৈরাগী, পিতা- শ্রীকৃষ্ণ বৈরাগী – ৫৪ শতাংশ
গ। চুড়ামনি বৈরাগী, পিতা- শ্রীকৃষ্ণ বৈরাগী – ৫৪ শতাংশ
ঘ। বিপিন বৈরাগী, পিতা- লালমোহোন বৈরাগী – ৫৪ শতাংশ
ঙ। যোগেন্দ্র বৈরাগী, পিতা- ঠাকুর দাস বৈরাগী – ৫৪ শতাংশ
২। আলোচ্য মামলার সমস্ত বেচাকেনা সংঘটিত হয়েছে উপরোক্ত চূড়ামনি বৈরাগীর ৫৪ শতাংশ সম্পত্তি নিয়ে। অন্য ৪ ওয়ারিশ অর্থাৎ রঘুনাথ বৈরাগী, গুলমনি বৈরাগী, যোগেন্দ্র বৈরাগী এবং বিপিন বৈরাগীগন নিজে বা তাদের কোনো ওয়ারিশ কেহই কোনো জমি বিক্রি করেন নাই কিংবা তাদের দ্বারা বিক্রি হয়েছে এমন কোনো নথি নাই। অর্থাৎ (৫৪ x ৪) = ২১৬ শতাংশ জমি সম্পুর্নই অবিক্রিত অবস্থায় আছে।
৩। চুড়ামনি বৈরাগীর মোট ৫ ছেলে ছিলো। তারা হলেন, চানমোহন বৈরাগী, ইন্দ্রমোহন বৈরাগী, হরেন্দ্র বৈরাগী, ধনঞ্জয় বৈরাগী, এবং মনমোহন বৈরাগী।
৪। ১৯৩২ সালে চুড়ামনি বৈরাগীর ৫৪ শতাংশ জমি মানিডিক্রী মামলা ৪৮৭/১৯৩২ দারা প্রকাশ্যে নিলাম হয়। উক্ত নিলাম সরকার বাহাদুরের বয়নামা দলিল নং ৫৪ তারিখ ০৯/১২/১৯৩৩ এর মাধ্যমে শ্রীদেবেন্দ্রনাথ গংগোপধ্যায় ক্রয় করেন। ফলে চুড়ামনির আর কোন সম্পত্তি অবশিষ্ঠ রইলো না এবং সে নিঃস্ব হয়ে যান।
৫। নিলামে ক্রয় করা ৫৪ শতাংশ জমি শ্রীদেবেন্দ্রনাথ গংগোপধ্যায় ১২/০৮/১৯৪২ তারিখ দলিল ৩৫৩৩ এর মাধ্যমে পরিমল সুন্দুরী দে ওরফে সাহার কাছে সাবকবলা বিক্রি করে দিয়ে শ্রীদেবেন্দ্রনাথ গংগোপধ্যায়ও নিঃস্ব হয়ে যান।
৬। কিন্তু বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ পর্যালোচনা করিয়া দেখা যায় যে, ১৯৩২/৩৩ সালে নিলামের পর চূড়ামণির কোনো সম্পত্তি না থাকা সত্তেও তাহার ৫ ছেলেরা ১৯৩৯ সাল থেকে আরম্ভ করিয়া ১৯৪২ সাল পর্যন্ত নিম্নলিখিত দলিলের মাধ্যমে নীচের টেবিলে ক্রেতাদের কাছে মোট ১৩৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন, যাহা কোনো ভাবেই বৈধ ছিলো না। কারন চূড়ামনির প্রাপ্য মোট ৫৪ শতাংশ সম্পত্তি ১৯৩২ সালে নিলাম হইবার পর তাহাদের কোনো সম্পত্তিই অবশিষ্ঠ ছিলো না।
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান |
|
চান মোহন বৈরাগী ইন্দ্র মোহন বৈরাগী হরেন্দ্র বৈরাগী সর্বপিতা-চুড়ামনি বৈরাগী |
হরিদাসী মোদক স্বামী-রাধা বল্লভ |
দলিল- ১৯৬৪, তাং ০৫/০৫/১৯৩৯ |
১৩ শং |
|
চান মোহন বৈরাগী পিতা-চুড়ামনি বৈরাগী |
কিরন বালা দত্ত স্বামী-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত মনোরঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত) পিতা-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত |
দলিল- ১৪১, তাং- ০৮/০১/১৯৪০ |
৩৩ শং |
|
ধনঞ্জয় বৈরাগী পিতা-চুড়ামনি বৈরাগী
|
কিরন বালা দত্ত স্বামী-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত মনো রঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত) পিতা-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত |
দলিল-৪০৬৪ তাং ০৫/১১/১৯৪০ |
৩৩ শং |
|
মন মোহন বৈরাগী পিতা-চুড়ামনি বৈরাগী |
কিরন বালা দত্ত স্বামী-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত মনো রঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত) পিতা-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত |
দলিল-১৬৭০ তাং ১৬/০৩/১৯৪২ |
১৪ শং |
|
হরেন্দ্র বৈরাগী মনমোহন বৈরাগী ধনঞ্জয় বৈরাগী সর্ব পিতা- চুড়ামনি বৈরাগী |
পোকাই মাদবর পিতা-হাবিল মাঝি |
দলিল-৫৩৯২ তাং ১৮/১১/১৯৪২ |
৪২ শং |
| চুড়ামনির ৫ ছেলের দ্বারা অবৈধ ভাবে বিক্রিত মোট জমির পরিমান | ১৩৫ শং | ||
অর্থাৎ চূড়ামনির ৫ ছেলে হরিদাসি মোদকের কাছে ১৩ শতাংশ, কিরনবালা ও তাঁর ছেলে মনোরঞ্জন দত্তের কাছে ৮০ শতাংশ এবং পোকাই মাদবরের কাছে ৪২ শতাংশ একুনে মোট ১৩৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। এই সম্পুর্ন বেচা-কেনাই ছিলো অবৈধ।
৭। অতঃপর, হরিদাসী মোদকও তার কেনা ১৩ শতাংশ জমি দলিল নং ২০১৬ তাং- ০১/০৫/১৯৪০ দ্বারা বিক্রি করেন কিরনবালা ও কিরনবালার ছেলে মনোরঞ্জন দত্তের কাছে। ফলে কিরনবালা ও তাঁর ছেলে মনোরঞ্জন দত্তের মোট জমির পরিমান দাঁড়ায় (৮০ + ১৩) = মোট ৯৩ শতাংশ।
৮। কিরনবালা ও তার ছেলে মনোরঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত) তাদের ৯৩ শতাংশ জমি জনাব কিতাব আলি পিতা-আজিম বেপারী কাছে দলিল-১৩১৪, তাং-১২/০২/১৯৪৮ দ্বারা সাবকবলা বিক্রি করে দেন। কিরনবালা এবং তাঁর ছেলে চিরতরে নিঃস্ব হন। তাদের আর কোনো জমি অবশিষ্ঠ রইলো না। অর্থাৎ কিতাব আলীর এই ৯৩ শতাংশ জমিও অবৈধ ভাবেই বেচাকেনা হয়। কারন কিরনবালা এবং তাঁর ছেলে মনো রঞ্জন দত্তের কেনা ৯৩ শতাংশ জমিই বৈধ ছিলো না।
যাই হোক, বর্তমানে কিতাব আলি ৯৩ শতাংশ জমির মালিক হন।
৯। জনাব কিতাব আলী সাহেব (পিতা-আজিম ব্যাপারী) পোকাই মাদবরের ৪২ শতাংশ জমি থেকে দলিল নং ৯০২, তাং-১৪/০২/১৯৪৯ দ্বারা আরো ১২ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। ফলে কিতাব আলীর জমির পরিমান দাড়ায় (৯৩ +১২ ) = মোট ১০৫ শতাংশ। কিন্তু এই সম্পুর্ন জমিগুলিই অবৈধ। কারন পূর্বর্তী বায়া দলিলগুলিও অবৈধ।
১০। এবার কিতাব আলী সাহেব তাহার ১০৫ শতাংশ জমি তাহার ২ পুত্র (ক) নুরুল ইসলাম এবং (খ) দীন ইসলামকে হেবা দলিল নং ২১২৭ তারিখ ০৫/০৬/১৯৭৯ এর মাধ্যমে প্রত্যেককে ৫১.৫ শতাংশ করে মোট ১০৩ শতাংশ জমি লিখে দেন। ফলে কিতাব আলী, পিতা-আজিম বেপারীর আরো ২ শতাংশ জমি নিজের নামে রহিয়া যায়। এবার দেখা যাক, কিতাব আলীর ২ পুত্র তাদের প্রত্যেকেই হেবায় প্রাপ্য ৫১.৫ শতাংশ জমি কিভাবে কি করলেন।
(ক) জনাব নূরুল ইসলাম তাহার পিতার থেকে হেবায় প্রাপ্ত ৫১.৫ শতাংশ জমির মধ্যে সাবকবলা দলিল নং ৯২৫৮, তারিখ ১৮/০৪/১৯৮৫ এর মাধ্যমে জনাব আবুল হোসেন, পিতা আব্দুল বারেকের কাছে ১৬.৫ শতাংশ বিক্রয় করেন এবং বাকী ৩৫ শতাংশ জমি জনাব নূরুল ইসলাম জনাব ওয়াহেদুজ্জামান, পিতা-চুন্নু বেপারিকেকে আমি মোক্তার দলিল নং ১৬৭১৫ তারিখ ০৪/১২/২০০৬ এর মাধ্যমে আম মোক্তারনামা দেন। ফলে নূরুল ইসলাম নিঃস্ব হন।
(খ) অন্যদিকে জনাব জনাব দীন ইসলাম তাহার পিতার থেকে হেবায় প্রাপ্ত ৫১.৫ শতাংশ জমির মধ্যে সাবকবলা দলিল নং ৯২৫৯ তারিখ ১৮/০৪/১৯৮৫ দ্বারা আবুল হোসেন, পিতা-আব্দুল বারেকের কাছে ১৬.৫ শতাংশ জমি বিক্রয় করেন এবং জনাব আব্দুল বারেক, পিতা-আব্দুস সোবহানের কাছে সাবকবলা দলিল নং ৩২৮৬ তারিখ ১৭/০৫/১৯৯৯ দ্বারা বাকী ৩৫ শতাংশ জমি বিক্রয় করেন এবং নিঃস্ব হন।
(গ) ফলে, জনাব কিতাব আলীর ১০৩ শতাংশ জমির নতুনভাবে মালিকানা হন নিম্নোক্ত ব্যক্তিরাঃ
(১) আবুল হোসেন, পিতা-আব্দুল বারেক মোট ৩৩ শতাংশ জমির মালিক হন।
(২) আব্দুল বারেক, পিতা-আব্দুস সোবহান ৩৫ শতাংশের মালিক হন।
(৩) এবং আম মোক্তারবলে জনাব ওয়াহিদুজ্জামান ৩৫ শতাংশের মালিক হন।
কিতাব আলী, তাঁর ২ ছেলে নূরুল ইসলাম এবং দীন ইসলাম সবাই নিঃস্ব হয়ে যান। যদি টেবিল আকারে সাজাই, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এই রকমেরঃ
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান |
|
নুরুল ইসলাম পিতা কিতাব আলী |
আবুল হোসেন
পিতা-আব্দুল বারেক |
দলিল নং ৯২৫৮,
তাং- ১৮/০৪/১৯৮৫ |
১৬.৫ শতাংশ |
| ওয়াহেদুজ্জামান
পিতা-চুন্নু বেপারী |
আমমোক্তার দলিল ১৬৭১৫
তাং- ০৪/১২/২০০৬ |
৩৫ শতাংশ | |
|
দীন ইসলাম পিতা-কিতাব আলি |
আবুল হোসেন
পিতা আব্দুল বারেক
|
দলিল নং ৯২৫৯
তাং- ১৮/০৪/১৯৮৫ |
১৬.৫ শতাংশ |
| আব্দুল বারেক
পিতা-আব্দুস সোবহান |
দলিল নং ৩২৮৬
তাং- ১৭/০৫/১৯৯৯ |
৩৫ শং | |
| ১০৩ শং | |||
এখানে উল্লেখ থাকে যে, এ যাবতকাল যতো বেচাকেনা হয়েছে, সবই অবৈধ। কারন কেহই সঠিক মালিক থেকে জমি ক্রয় করেন নাই।
১১। এবার একুনে আবুল হোসেনের ক্রয় করা ৩৩ শতাংশ জমি তাহার স্ত্রী রেহানা বেগম স্বামীর ওয়ারিশসুত্রে প্রাপ্ত হইয়া উক্ত ৩৩ শতাংশ জমি দলিল নং ১২৫৮৬ তারিখ ১৩/১২/২০১২ এর মাধ্যমে বিডিসিকে সাবকবলা বিক্রয় করিয়া দেন। বিডিসির উক্ত ক্রয় অবশ্যই অবৈধ।
১২। ওয়াহেদুজ্জামান, পিতা-চুন্নু বেপারী (নূরুল ইসলামের কাছ থেকে প্রাপ্ত আমমোক্তার নামা দলিল বলে) ৩৫ শতাংশ জমি দলিল নং ১৮২৬৮ তারিখ ২৪/১২/২০০৬ এর মাধ্যমে বিডিসির কাছে বিক্রয় করিয়া দেন। এটাও সম্পুর্ন অবৈধ।
১৩। অন্যদিকে, জনাব আব্দুল বারেক তার ৩৫ শতাংশ জমি জনাব ওয়াহেদুজ্জামান, পিতা-চুন্নু বেপারীকে আমমোক্তার নামা দলিল প্রদান করেন। যা পরবর্তীতে জনাব ওয়াহেদুজ্জামান, পিতা-চুন্নু বেপারী দলিল নং ১২৫৫৯, তারিখ ২৭/০৯/২০০৫ এর মাধ্যমে বিডিসিকে বিক্রি করেন।
১৪। ফলে, বিডিসি যথাক্রমে আবুল হোসেনের স্ত্রী রেহানা বেগমের কাছ থেকে ৩৩ শতাংশ এবং ওয়াহেদুজ্জামানের কাছ থেকে আম মোক্তারবলে (৩৫ +৩৫) মোট ৭০ শতাংশ জমি সাবকবলার মাধ্যমে মোট ১০৩ শতাংশের মালিক হন। যদি টেবিল আকারে সাজাই, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এই রকমঃ
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান |
| আবুল হোসেন (স্ত্রী রেহানা) | বিডিসি | দলিল নং ১২৫৮৬
তাং- ১৩/১২/২০১২ |
৩৩ শং |
| ওয়াহেদুজ্জামান
পিতা-চুন্নু বেপারী |
বিডিসি | দলিল নং ১৮২৬৮
তাং- ২৪/১২/২০০৬ |
৩৫ শং |
| আব্দুল বারেক
পিতা- আব্দুস সোবহান |
ওয়াহেদুজ্জামান
পিতা-চুন্নু বেপারী |
আম মোক্তার দলিল ৭৫৪৮
তাং- ২৩/০৬/২০০৫ |
৩৫ শং |
| ওয়াহেদুজ্জামান
পিতা-চুন্নু বেপারী |
বিডিসি | দলিল নং ১২৫৫৯
তাং- ২৭/০৯/২০০৫ |
৩৫ শং |
মন্তব্যঃ
উপরে উল্লেখিত দলিল দস্তাবেজ মোতাবেক দেখা যায় যে,
ক। চুড়ামনি বৈরাগীর ৫ ছেলের বিক্রি করা ১৩৫ শতাংশ অবৈধ।
খ। চুড়ামনি বৈরাগীর কাছ থেকে ক্রয় করা ব্যক্তিবর্গ (হরিদাসি মোদক, কিরনবালা, মনোরঞ্জন দত্ত, পোকাই মাদবর) সবাই যে যে জমি ক্রয় করেছেন, তা সম্পুর্ন অবৈধ।
গ। পরবর্তীতে এইসব ব্যক্তিবর্গের (হরিদাসি মোদক, কিরনবালা, মনোরঞ্জন দত্ত, পোকাই মাদবর) কাছ থেকে কিতাব আলির ক্রয় করা জমিও অবৈধ।
ঘ। অতঃপর কিতাব আলী থেকে তার ২ ছেলে জনাব নূরুল ইসলাম এবং দীন ইসলাম যে জমি পেয়েছেন, তাহাও অবৈধ।
ঙ। অতঃপর, নুরুল ইসলাম এবং দীন ইসলাম থেকে জনাব আবুল হোসেন, জনাব আব্দুল বারেকের ক্রয় করা জমিও অবৈধ।
চ। জনাব নুরুল ইসলাম কর্তৃক প্রদেয় জনাব ওয়াহেদুজ্জামানকে আমমোক্তার নামাও অবৈধ।
ছ। জনাব আবুল হোসেন (তথা তাহার স্ত্রী রেহানা কর্তৃক) এর বিডিসি কাছে বিক্রি করা জমিও অবৈধ।
জ। জনাব আব্দুল বারেক কর্তৃক জনাব ওয়াহেদুজ্জামানকে আমমোক্তার প্রদান এবং উক্ত আম মোক্তার বলে জনাব ওয়াহেদুজ্জামানের মাধ্যমে বিডিসিকে জমি বিক্রিও অবৈধ।
ঝ। অর্থাৎ বিডিসি কর্তৃক সর্বসাকুল্যে ১০৩ শতাংশ জমি ক্রয় সম্পুর্ন অবৈধ।
দ্বিতীয় পর্বের ইতিহাসঃ
১৫। কিরনবালা এবং তাহার ছেলে মনোরঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত) তাহাদের ৯৩ শতাংশ জমি জনাব কিতাব আলি, পিতা-আজিম বেপারীর কাছে বিক্রি করার পর আর কোনো জমি অবশিষ্ট ছিলো না এবং নাই। কিন্তু উভয়ই অর্থাৎ কিরনবালা এবং তাহার ছেলে মনোরঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত, পুনরায় জনাব সাবু সরকার, পিতা-হাজি কালুর কাছে দলিল নং ২৭১৭, তারিখ ০৬/০৪/১৯৪৮ দ্বারা আরো অতিরিক্ত ৭২ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। এই জমি কিরনবালা এবং তাহার ছেলে মনোরঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত) কাহার কাছ হইতে ক্রয় করিয়াছেন বা পাইয়াছেন তাহার কোনো বৈধ রেকর্ড নাই। অর্থাৎ সাবু সরকার, পিতা-হাজি কালুর উক্ত ৭২ শতাংশ জমিও অবৈধভাবে ক্রয় করেন।
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান | মন্তব্য |
| কিরন বালা দত্ত
স্বামী-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত মনোরঞ্জন দত্ত (সন্তোষ চন্দ্র দত্ত) পিতা-মহেন্দ্র চন্দ্র দত্ত
|
সাবু সরকার
পিতা-হাজী কালু |
দলিল নং ২৭১৭
তাং- ০৬/০৪/১৯৪৮ |
৭২ শং | এই ৭২ শতাংশ জমি বিক্রেতা কোথা থেকে পাইলেন বা কার কাছ থেকে ক্রয় করে মালিক হইলেন তাঁর কোনো রেকর্ড নাই। অথচ হুট করে মালিক সেজে সাবু সরকারের কাছে মিথ্যা দলিল করে ৭২ শতাংশ জমি বিক্রি করলেন। বিক্রিত জমির বিবরনীতেও তাদের পূবর্বর্তী ক্রয়ের বায়া দলিলের কোনো ইতিহাস নাই। |
অর্থাৎ অবৈধভাবেই সাবু সরকার এবার ৭২ শতাংশের মালিক হইলেন। এবার দেখি সাবু সরকার এই ৭২ শতাংশ জমি কি করলেন। নীচে তাঁর বিস্তারীতঃ
১৬। এবার সাবু সরকার, পিতা-হাজি কালু অবৈধ এই ৭২ শতাংশ জমি তাহার ৪ ছেলে (জুম্মন মিয়া, নূর মোহাম্মাদ, সুর মোহাম্মাদ এবং দীল মোহাম্মাদ) কে সমানভাগে প্রত্যেককে ১৮ শতাংশ করিয়া ২৮/১২/১৯৫৯ তারিখে হেবা দলিল নং ৮০২৪ দ্বারা হেবা করিয়া দেন। এর অর্থ হলো, সাবু সরকার নিঃস্ব হইলেন কিন্তু তাঁর ৪ ছেলে সবাই ১৮ শতাংশ করে মালিক হইলেন যদিও সেটা অবৈধ। টেবিলের মাধ্যমে সাজাইলে দাঁড়ায় এই রকমঃ
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান | সাউথ টাউন রেফারেন্স |
|
সাবু সরকার পিতা-হাজী কালু |
জুম্মন মিয়া
পিতা-সাবু সরকার |
হেবা দলিল নং ৮০২৪ তারিখ ২৮/১২/১৯৫৯ |
১৮ শং | |
| নূর মোহাম্মাদ
পিতা-সাবু সরকার |
১৮ শং | |||
| সুর মোহাম্মাদ
পিতা-সাবু সরকার |
১৮ শং | |||
| দীল মোহাম্মাদ
পিতা-সাবু সরকার |
১৮ শং | |||
| ৭২ শং |
১৭। সাবু সরকার যদিও তাহার ৪ ছেলে (জুম্মন মিয়া, নূর মোহাম্মাদ, সুর মোহাম্মাদ এবং দীল মোহাম্মাদ) কে সমান ১৮ শতাংশ করে জমি হেবা করে দেন, কিন্তু জুম্মন মিয়া, নূর মোহাম্মাদ এবং দীল মোহাম্মাদ তাহাদের তিনজনের মোট (৩x১৮)=৫৪ শতাংশ কারো কাছে বিক্রি করেন নাই। অন্যদিকে সাবু সরকারের ছেলে সুর মোহাম্মাদ হেবা সুত্রে প্রাপ্য ১৮ শতাংশ জমির বিপরীতে ৭৯.২৪ শতাংশ জমি বিক্রয়/হেবা করেন যাহা কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। আমরা দলিল এবং ক্রেতা-বিক্রেতার নাম অনুযায়ী নীচে টেবিল আকারে সাজাইলামঃ
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান |
| জুম্মন মিয়া
পিতা-সাবু সরকার |
বিক্রি করেন নাই | ১৮ শং | |
| নূর মোহাম্মাদ
পিতা-সাবু সরকার |
বিক্রি করেন নাই | ১৮ শং | |
| দীল মোহাম্মাদ
পিতা-সাবু সরকার |
বিক্রি করেন নাই | ১৮ শং | |
| সুর মোহাম্মাদ
পিতা-সাবু সরকার |
(১) নান্নু মিয়া
পিতা-মফিজ উদ্দিন ওরফে মরন মিয়া (২) আতর বানু সামী-নান্নু মিয়া |
দলিল নং ৪১৮৬
তাং- ০২/০৮/১৯৮৮ |
৩৭ শং |
| সুর মোহাম্মাদের ছেলেমেয়ে
(১) আশিক মাহমুদ (২) আপেল মাহমুদ (৩) জাসমিন জাহান |
(১) মোঃ নাজিম উদ্দিন
পিতা-জুম্মন মিয়া (২) আঃ খালেক পিতা-জুম্মন মিয়া |
আমমোক্তার দলিল-১৪৪৫৪
তাং ১০/০৩/২০০৯ |
২৪ শং |
| সুর মোহাম্মাদের ২ মেয়ে
(১) জাসমিন জাহান (২) নাসরীন জাহান |
মোঃ নাজিম উদ্দিন
পিতা-জুম্মন মিয়া |
আমমোক্তার দলিল- ১১২৬৫
তাং-০৮/১১/২০১০ |
৯ শং |
| সুর মোহাম্মাদের মেয়ে এবং স্ত্রী
(১) শাহনাজ জাহান (২) স্ত্রী হাসিনা জাহান |
(১) মোঃ নাজিম উদ্দিন,
পিতা-জুম্মন মিয়া (২) মোঃ ওবায়দুর রহমান পিতা- জুম্মন মিয়া |
আম মোক্তার দলিল- ১৪৮৪
তারিখ ৩০/০১/২০১১ |
৯.২৪ শং |
১৮। অতঃপর, সুর মোহাম্মাদ নিজের দ্বারা বিক্রিত ৩৭ শং জমি, তাহার স্ত্রী হাসিনা জাহান এবং তাহার ৩ মেয়ে জাসমিন জাহান, নাসরীন জাহান, এবং শাহনাজ জাহান) ও তার ২ ছেলে আশিক মাহমুদ, আপেল মাহমুদ কর্তৃক প্রদেয় আমমোক্তার দ্বারা প্রাপ্য ৪২.২৪ শং জমি একুনে মোট ৭৯.২৪ শতাংশ হইতে ৭৪ শতাংশ জমি নিম্নরুপ ভাবে বিডিসির কাছে বিক্রয় করেন যাহা সম্পুর্ন অবৈধঃ
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান |
| (১) নান্নু মিয়া
পিতা-মফিজ উদ্দিন ওরফে মরন মিয়া (২) আতর বানু সামী-নান্নু মিয়া |
বিডিসি | দলিল নং ৫১৪২
তারিখ ২৬/০৪/২০০৬ |
৩৭ শং |
| (১) মোঃ নাজিম উদ্দিন
পিতা-জুম্মন মিয়া (২) আঃ খালেক পিতা-জুম্মন মিয়া |
বিডিসি | দলিল নং ১৭৪৫৭
তারিখ ২২/০৭/২০০৯ |
২৪ |
| (১) মোঃ নাজিম উদ্দিন
পিতা-জুম্মন মিয়া (২) মোঃ ওবায়দুর রহমান পিতা- জুম্মন মিয়া |
বিডিসি | দলিল নং ৫৫৭৪
তারিখ ১০/০৪/২০১১ |
১৩ শং |
| ৭৪ শং |
মন্তব্যঃ
ক। কিরনবালা এবং তাহার ছেলে মনোরঞ্জন দত্ত ওরফে সন্তোষচন্দ্র দত্ত হটাত করিয়া কোন উৎস হইতে ৭২ শতাংশ জমি পাইলেন, তাহার কোন রেকর্ড নাই। কিন্তু তাহারা ৭২ শতাংশ জমি জনাব সাবু সরকার, পিতা হাজি কালুর কাছে বিক্রি করেন। ইহা একটি অবৈধ বিক্রি।
খ। সাবু সরকার, পিতা হাজি কালু, তিনি তাহার ৪ পুত্রকে (জুম্মন মিয়া, নূর মোহাম্মাদ, সুর মোহাম্মাদ এবং দীল মোহাম্মাদ) সমান প্রত্যেককে ১৮ শতাংশ করিয়া হেবা করিয়া দিলেও পুত্র জুম্মন মিয়া, পুত্র নূর মোহাম্মাদ, এবং পুত্র দীল মোহাম্মাদ তাহাদের তিনজনের মোট ৫৪ শতাংশ জমি কারো কাছে বিক্রি করেন নাই। অন্যদিকে পুত্র সুর মোহাম্মাদ নিজে এবং তাহার ছেলে, মেয়ে এবং স্ত্রী সাবকবলা দলিল এবং আমমোক্তার দ্বারা মোট ৭৯.২৪ শতাংশ জমি খারিজ করেন। যাহা সম্পুর্ন অবৈধ।
গ। উক্ত ৭৯.২৪ শতাংশ জমি হইতে পরবর্তীতে বিডিসি ৭৪ শতাংশ জমি সাবকবলা দলিল মুলে সুর মোহাম্মাদ এবং তাহাদের ওয়ারিশ কর্তৃক প্রদেয় আমমোক্তার বলে খরিদ করে, ইহাও অবৈধ।
ঘ। অর্থাৎ সাবু সরকার কর্তৃক ৭২ শতাংশ জমি যেমন অবৈধ, তেমনি বিডিসি কর্তৃক ৭৪ শতাংশ জমি ক্রয়ও অবৈধ।
অর্থাৎ দেখা যায় যে, প্রথম পর্বের ইতিহাস অনুযায়ী বিডিসির ক্রয় করা ১০৩ শতাংশ সম্পত্তি এবং দ্বিতীয় পর্বের ইতিহাস অনুযায়ী বিডিসির ক্রয় করা ৭৪ শতাংশ জমি সর্বোমোট (১০৩+৭৪) = ১৭৭ শতাংশ জমি পুরুটাই অবৈধ। তারা এ জমির বৈধ মালিক নহেন। বরং বর্তমানে রঘুনাথ বৈরাগী, গুলমনি বৈরাগী, যোগেন্দ্র বৈরাগী এবং বিপিন বৈরাগীগন তথা তাদের বৈধ ওয়ারিশগন উক্ত জমির মালিক। এই জমি যে কোনো মুহুর্তে তারা বৈধ ভাবে নিজেরা ভোগ দখল তথা অন্যত্র বেচা বিক্রি করার ইখতিয়ার রাখেন।
তৃতীয় পর্বের ইতিহাসঃ
১৯। ১৯৩২ সালে চুড়ামনি বৈরাগীর ৫৪ শতাংশ জমি মানিডিক্রী মামলা ৪৮৭/১৯৩২ দ্বারা প্রকাশ্যে নিলাম হয়। উক্ত নিলাম সরকার বাহাদুরের বয়নামা দলিল নং ৫৪ তারিখ ০৯/১২/১৯৩৩ এর মাধ্যমে শ্রী দেবেন্দ্রনাথ গংগোপধ্যায় ক্রয় করেন। শ্রী দেবেন্দ্রনাথ গংগোপধ্যায় ১২/০৮/১৯৪২ তারিখ দলিল ৩৫৩৩ এর মাধ্যমে পরিমল সুন্দুরী দে ওরফে সাহার কাছে সাব কবলা বিক্রি করে দিয়ে শ্রী দেবেন্দ্রনাথ গংগোপধ্যায়ও নিঃস্ব হয়ে যান। এই তথ্য আমরা প্রথম পর্বের ইতিহাসে বিবরন দিয়েছিলাম।
২০। উক্ত পরিমল সুন্দুরী দে ওরফে সাহা তাহার ৫৪ শতাংশ জমি থেকে দলিল নং ৮৬৬২, তারিখ ১৬/১২/১৯৫৮ দ্বারা জনাব সার্থক আলি, পিতা-আব্দুল গফুরের কাছে ৩৯ শতাংশ জমি তার পারিবারিক সংসারের খরচের এবং অন্যত্র জমি ক্রয়ের নিমিত্তে সাবকবলা বিক্রি করেন। অতঃপর, জনাব সার্থক আলি তাহার ক্রয় করা ৩৯ শতাংশ জমি পুনরায় সাবকবলা দলিল নং ২২৮৩ তারিখ ০৩/০২/১৯৭১ দ্বারা নাব মোহাম্মাদ আলী, পিতা মেনু মিয়ার কাছে বিক্রি করে সার্থক আলী নিঃস্ব হয়ে যান। একইভাবে, জনাব মোহাম্মাদ আলী, পিতা-মেনু মিয়াও তাহার ৩৯ শতাংশ জমি পুনরায় দলিল নং ৬৪৩, তারিখ ০৭/০২/১৯৮৩ দ্বারা খোসনুর বানু, স্বামী-আফজাল বেপারীর কাছে বিক্রি করে জনাব মোহাম্মাদ আলীও নিঃস্ব হয়ে যান। টেবিল আকারে সাজাইলে দাঁড়ায় এই রকমঃ
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান | মন্তব্য |
| পরিমল সুন্দুরী দে ওরফে সাহা | সার্থক আলি
পিতা-আব্দুল গফুর |
দলিল নং ৮৬৬২
তাং- ১৬/১২/১৯৫৮ |
৩৯ শং | পরিমল সুন্দুরী নিঃস্ব হন নাই। ৫৪ শতাংশের মধ্যে আরো ১৫ শঃ রয়ে গেলো এবং তিনি অন্যত্র জমি ক্রয় করেছেন বলে দলিলে উল্লেখ থাকে। এ ছাড়া পৈত্রিক সুত্রে (পিতার ওয়ারিশ সুত্রে) তার আরো ৫৪ শতাংশ জমি সিএস থেকে পাওনা আছে। অর্থাৎ সার্থক আলীর কাছে ৩৯ শতাংশ জমি বিক্রি করার পরেও পরিমল সুন্দুরীর ৬৯ শতাংশ জমি আছে। (কারন তিনি নিজে কিনেছিলেন ৫৪ শতাংশ এবং পিতার ওয়ারিশ সুত্রে আছে ৫৪। মোট ১০৮ শতাংশ। বিক্রি করল্রন ৩৯ শঃ। বাকী থাকে ৬৯ শঃ। |
| সার্থক আলী
পিতা-আব্দুল গফুর |
মোহাম্মাদ আলী
পিতা-মেনু মিয়া |
দলিল নং ২২৮৩
তাং- ০৩/০২/১৯৭১ |
৩৯ শং | সার্থক আলি নিঃস্ব হন। |
| মোহাম্মাদ আলী
পিতা-মেনু মিয়া |
খোসবানু
স্বামী-আফজাল বেপারী |
দলিল নং ৬৪৩
তাং- ০৭/০২/১৯৮০ |
৩৯ শং | মোহাম্মাদ আলীও নিঃস্ব হন। |
২১। খোসবানু ৩৯ শতাংশ জমির মালিক হইয়া তিনি দুই দলিলে পৃথক পৃথকভাবে জনাব আব্দুল কাদের, পিতা-আফজাল বেপারী (তার নিজের ছেলে) এর কাছে দলিল নং ৪৫১৪ তারিখ ১৫/০৫/২০০৪ দ্বারা ১৩ শতাংশ জমি এবং দলিল নং ৪৪৯৯, তারিখ ১৭/০৫/২০০৪ দ্বারা (ক) হালেমা খাতুন, স্বামী-মৃত মোহাম্মাদ আলী (খ) মালেকা খাতুন, স্বামী-মোঃ জামাল (গ) মনোয়ারা খাতুন, স্বামী-আঃ মালেক এবং (ঘ) আনোয়ারা খাতুন, স্বামী-সামসুল হক এর কাছে মোট ২৬ শতাংশ জমি একুনে মোট ৩৯ শতাংশ জমি বিক্রি করে খোসবানু চিরতরে নিঃস্ব হন। টেবিল আকারে সাজাইলে দাঁড়ায় এই রকমঃ
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান | |
|
খোসবানু স্বামী-আফজাল বেপারী |
আব্দুল কাদের
পিতা-আফজাল বেপারি |
দলিল নং ৪৫১৪
তারিখ ১৫/০৫/২০০৪ |
১৩ শং | |
| হালেমা খাতুন
স্বামী- মৃত মোহাম্মাদ আলী |
দলিল নং ৪৪৯৯ তারিখ ১৭/০৫/২০০৪ |
২৬ শতাংশ | ||
| মালেকা খাতুন
স্বামী- মোঃ জামাল |
||||
| মনোয়ারা খাতুন
স্বামী-আঃ মালেক |
||||
| আনোয়ারা খাতুন
স্বামী- সামসুল হক |
২২। জনাব আব্দুল কাদের, পিতা-আফজাল বেপারী, তাহার ১৩ শতাংশ জমি হইতে পরবর্তীতে সাবকবলা দলিল নং ৮৫৯৬ তারিখ ২৫/০৬/২০০৬ দ্বারা ১২ শতাংশ জমি বিডিসির কাছে বিক্রি করেন। অন্যদিকে হালেমা খাতুন, স্বামী-মৃত মোহাম্মাদ আলী, মালেকা খাতুন, স্বামী-মোঃ জামাল, মনোয়ারা খাতুন, স্বামী-আঃ মালেক এবং আনোয়ারা খাতুন, স্বামী-সামসুল হক সবাই সাবকবলা দলিল নং ৮৫৯৬ তারিখ ২৫/০৬/২০০৬ দ্বারা তাদের ২৬ শতাংশ জমি হইতে মোট ২৩ শতাংশ জমি বিডিসির কাছে বিক্রয় করেন। ফলে, বিডিসি সর্ব সাকুল্যে মোট ৩৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন।
| বিক্রেতার নাম | ক্রেতার নাম | দলিল নং ও তারিখ | জমির পরিমান | মন্তব্য |
| আব্দুল কাদের
পিতা- আফজাল বেপারী |
বিডিসি | দলিল নং ৮৫৯৬
তারিখ ২৫/০৬/২০০৬ |
১২ শং | আব্দুল কাদের এখনো ১ শতাংশের মালিক রয়ে যান। |
| হালেমা খাতুন
স্বামী- মৃত মোহাম্মাদ আলী |
বিডিসি | দলিল নং ৮৫৯৬
তারিখ ২৫/০৬/২০০৬ |
২৩ শং | হালেমা খাতুন, মালেকা খাতুন, মনোয়ারা খাতুন, আনোয়ারা খাতুন সবাই মিলে এখনো ৩ শতাংশের মালিক রয়ে যান। |
| মালেকা খাতুন
স্বামী- মোঃ জামাল |
||||
| মনোয়ারা খাতুন
স্বামী-আঃ মালেক |
||||
| আনোয়ারা খাতুন
স্বামী- সামসুল হক |
||||
| বিডিসি মোট ক্রয় করে | ৩৫ শং | |||
অর্থাৎ বিডিসির ক্রয় করা মাত্র ৩৫ শতাংশ জমি সম্পুর্ন বৈধ। বাকী সমস্ত জমি অবৈধ।
মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) এর জমি ক্রয়ের বিবরনঃ
১। জনাব মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) অরিজিনাল ক্রয়সূত্রে (শ্রী দেবেন্দ্রনাথ থেকে নিলামের জমি ক্রয় ভিত্তিতে) মালিক শ্রীমতি পরিমল সুন্দুরীর নামে নামজারী করা জমি তারই (শ্রীমতি পরিমল সুন্দুরীর) পৌত্র ওয়ারিশদের কাছ থেকে সরাসরি দুই দলিলে দলিল নং-১৯০০ তাং ১৮/১০/২০০৮, জমির পরিমান ৩৫ শতাংশ, এবং দলিল নং- ১০৫৯২ তাং ১৪/১০/২০১২, জমির পরিমান ৬ শতাংশ একুনে মোট মোট ৪১ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। অতঃপর নামজারী করেন ৩৫ শতাংশ জমির, কারন আরএস রেকর্ড নামজারী হিস্যা অনুযায়ী মোট ৩৫ শতাংশ জমির নামজারি করা যায়। নামজারী ও জমাভাগ নথি নম্বর-১৭৯৫০/০৮-০৯ তাং ২২/০২/২০০৯ এবং ডিসিআর করা হয়।
২। পরিমল সুন্দুরী দে এর পৈত্রিক সুত্র থেকে পাওয়া জমি কিন্তু (৫৪ শতাংশ) রয়েই গেছে। পরিমল সুন্দুরীর ওয়ারিশ পর্যালোচনা করলে দেখলে দেখা যাবে যে, উক্ত ৫৪ শতাংশ জমি পরিমল সুন্দুরী নিজেই পান। কিন্তু আমরা সেই পৈত্রিক সম্পত্তির উপর কোনো জোরজবর দস্তি কিংবা ভাগ নিচ্ছি না। যতোক্ষন আমি মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) উক্ত জমি না পাই, তাহলে পরিমল সুন্দুরীর বাকী পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে জমি পুরা করা হবে যেহেতু তার নামে কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ নামজারী আছে বিক্রি করার পরেও।
৩। মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) তাঁর জমির চারিদিকে বাউন্ডারীওয়াল করেন এবং নামফলক দেন।
৪। অতঃপর সাউথ টাউনের প্রোজেক্ট ইনচার্জ জনাব ওয়াহেদুজ্জামান, জনাব মেজর মোহাম্মাদ আখতারের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেন যেনো মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) তার জমির সমস্ত কাগজপত্র সাউথ টাউনের বরাবর জমা দেন এবং সাউথ টাউনের সাথে একটি যৌথ চুক্তির মাধ্যমে ডেভেলপার বনাম মালিক হিসাবে জমি ভাগাভাগি করে প্লট নম্বর নিয়ে সাউথ টাউনের সমস্ত ফেসিলিটি ভোগ করতে পারেন। সে মোতাবেক মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) ১২/০৪/২০১৪ তারিখে একটি ফরোয়ার্ডিং লেটারের মাধ্যমে সমস্ত কাগজাদি তিনি জনাব ওয়াহেদুজ্জামানের কাছে প্রেরন করেন। জনাব ওয়াহেদুজ্জামান তা স্বাক্ষর করে জমা নেন পরবর্তী ধাপে কাগজপত্র যাচাই বাছাই করার নিমিত্তে। (কাগজ সংযুক্ত)
৪। অতঃপর, কাগজ জমা দেওয়ার ১ মাস পর জনাব ওয়াহেদুজ্জামান সমস্ত কাগজাদি চেক করে ১২/৫/২০১৪ তারিখে সাউথ টাউনের পক্ষে সাউথ টাউনের প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসাবে জনাব ওয়াহিদুজ্জামান, সাউথ টাউনের সার্ভেয়ার মোঃ হামিদুল ইসলাম এবং প্রজেক্ট সহকারী জনাব আব্দুল আলীম সম্মিলিতভাবে এইমর্মে ডেভেলপার বনাম মালিক হিসাবে মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) এর সাথে একটি খসড়া চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যার সারমর্ম ছিলো এই রকমঃ
(ক) মোট জমি = ৪১ শতাংশ অর্থাৎ ২৪.৮০ কাঠা।
(খ) রাস্তা বাবদ = (৪/২৬) অনুপাতে =৩.৮১৫৩ কাঠা কাটা হবে।
(গ) সাউথ টাউন = (১০/২৬) অনুপাতে ৯.৫৩৮৪ কাঠা পাবে।
(ঘ) মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) = (১২/২৬) অনুপাতে = ১১.৪৪৬ কাঠা পাবেন।
(ঙ) রাউন্ড ফিগারে মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) কে ১১৪৪৬ কাঠার পরিবর্তে মোট ১২ কাঠা জমি প্লট আকারে যেখানে বর্তমানে মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) এর জমি আছে, সেখানেই দেয়া হবে। এই মর্মে একটি স্বাক্ষর চুক্তি হয়। (কাগজ সংযুক্ত)
৪। পরবর্তীতে চুক্তিপত্র মোতাবেক সাউথ টাউন কর্তৃক উপরোক্ত অনুপাতে ল্যান্ড ভাগাভাগি করে প্লট নাম্বার দেওয়ার নিমিত্তে ভাওতাবাজি করে এবং একদিন ওয়াহেদুজ্জামান মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর ৪১ শতাংশ জায়গায় করা বাউন্ডারী ওয়াল ভেংগে ফেলেন, নামফলকও তুলে ফেলেন এবং জনাব ওয়াহিদুজ্জামান জানান যে, শীঘ্রই মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর নামে আগের খসড়া চুক্তি মোতাবেক ১২ কাঠার একটি প্লট নাম্বার দেওয়ার কাজ চলছে। সাউথ টাউনের এমডি/চেয়ারম্যান/ডাইরেক্টর জনাব মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিন সাহেব দেশের বাইরে থাকার কারনে প্লট বরাদ্ধ চুড়ান্ত করা যাচ্ছে না। তাই কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। কিন্তু ইতিমধ্যে তারা প্রোজেক্টের অন্যান্য কাজ এগিয়ে নেওয়া নিমিত্তে দেয়াল ভেংগে ফেলেছেন।
৫। হটাত একদিন মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে একটি মামলার নোটিশ পান যে, উক্ত স্থানে নাকি মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর কোনো জায়গায়ই নাই। বাংলাদেশ ডেভেলপ মেন্ট কোম্পানী (বিডিসি) বাদী হয়ে মেজর মোহাম্মাদ আখতার (অবঃ) এর নামে মামলা করেন।
৬। এখন মামলা চলছে।
প্রশ্ন
(১) চুরামনি বৈরাগী সিএস মোতাবেক জমি পাওয়ার কথা মোট ৫৪ শতাংশ, কিন্তু তাহার ৫ ছেলে জমি বিক্রয় করেন ১৩৫ শতাংশ। বাকি জমি পাইলো কই?
(২) রঘুনাথ বৈরাগীর ৫৪ শতাংশ জমি তিনি বিক্রয় করেন নাই। এই জমি গেলো কই?
(৩) বিপিন বৈরাগীর ৫৪ শতাংশ জমি তিনি বিক্রয় করেন নাই। এই জমি গেলো কই?
(৪) গুলমনি বৈরাগীর ৫৪ শতাংশ জমি তিনি বিক্রয় করেন নাই। এই জমি গেলো কই?
(৫) যোগেন্দ্র বৈরাগীর ৫৪ শতাংশ জমি তিনি বিক্রয় করেন নাই। এই জমি গেলো কই?
(৬) পোকাই মাদবের জমি যদিও অবইধ ভাবে কেনা, তারপরেও ৪২ শতাংশ জমি থেকে মাত্র ১২ শতাংশ জমি বিক্রয় করেছেন, ফলে তাহার ৩০ শতাংশ জমি গেলো কই?
(৭) কিতাব আলীর দলিল দস্তাবেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায় তিনি মোট ১০৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন, কিন্তু বিক্রি করেন মোট ১০৩ শতাংশ জমি। তাহার বাকী ২ শতাংশ জমি গেলো কই?
(৮) জুম্মন মিয়ার পৈতৃক সুত্রে পাওয়া ১৮ শতাংশ জমি গেলো কই? তিনি কারো কাছে বিক্রি করেন নাই।
(৯) নূর মোহাম্মাদের পৈতৃক সুত্রে পাওয়া ১৮ শতাংশ জমি তিনি বিক্রি করে নাই। এই জমি গেলো কই?
(১০) দীল মোহাম্মাদ তার পৈতৃক সুত্রে প্রাপ্ত ১৮ শতাংশ জমি পেয়েছেন। কিন্তু কারো কাছে বিক্রি করেন নাই। এই জমি গেলো কই?
(১১) অন্য দিকে সুর মোহাম্মাদ পৈতৃক সুত্রে জমি পেয়েছেন মাত্র ১৮ শতাংশ, কিন্তু তার ওয়ারিশগন মোট জমি বিক্রয় করেছে ৭৯২৪ শতাংশ। এই জমি তাহারা পেলো কই?
(১২) কিরনবালা এবং মনোরঞ্জন দত্ত মোট জমি ক্রয় করেন ৯৩ শতাংশ কিন্তু বিক্রি করেন ১৬৫ শতাংশ। কিরনবালা এবং মনোরঞ্জন দত্ত ৭২ শতাংশ জমি পেলো কই?
(১৩) হালেমা খাতুন, মালেকা খাতুন, মনোয়ারা খাতুন, আনোয়ারা খাতুন জমি ক্রয় করেন ২৬ শতাংশ, বিডিসির কাছে বিক্রি করেন ২৩ শতাংশ, বাকী ৩ শতাংশ গেলো কই?
(১৪) আব্দুল কাদের জমি কেনেন ১৩ শতাংশ, বিক্রি করেন বিডিসির কাছে, বাকী ১ শতাংশ গেলো কই?
(১৫) পরিমল সুন্দুরী মোট জমি কিনেন ৫৪ শতাংশ, বিক্রি করেন সার্থক আলীর কাছে ৩৯ শতাংশ, তাহলে বাকী জমি গেলো কই?
(১৬) পরিমল সুন্দুরীর ৩৯ শতাংশ সার্থক আলীর কাছে বিক্রি করার পরেও সার্থক আলির নামেও ৩৯ নামজারী হয় আবার পরিমলের নামেও ৩৫ শতাংশ নামজারী হয়। তারমানে পরিমলের এই ৫৪ শতাংশ জমির বাইরেও আরো জমি আছে এই দাগে কারন সার্থক আলীর কাছে বিক্রিত দলিলে এইরুপ তথ্য উল্লেখ আছে যে, সার্থক আলীকে ৩৯ শতাংশ জমি বিক্রির টাকায় তিনি সাংসারিক খরচ এবং অন্যত্র জমি ক্রয় করিবেন। অর্থাৎ তিনি এই ৩৯ শতাংশ জমি বিক্রি করে অন্যত্র এই দাগেই জমি কিনেছেন। যদি নাও কিনেন, তারপরেও পৈত্রিক সুত্রে পরিমল সুন্দুরীর তার পিতার ৫৪ শতাংশ জমিরও মালিক। সে সুবাদেই হয়তো সার্থক আলীর কাছে ৩৯ বিক্রি করার পর তার নামে (৫৪-৩৯) = ১৫ শতাংশ এবং পৈত্রিকভাবে প্রাপ্ত ৫৪ শতাংশ একুনে মোট ৬৯ শতাংশ হতে ৩৫ শতাংশ নামজারী হয়। ফলে তার ওয়ারিশ গন মেজর আখতারের কাছে ৩৫ বা ৪১ শতাংশ বিক্রি করেন। কিন্তু নামজারী ছাড়াও তার ওয়ারিশ গন আরো নামজারী কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ অথবা ২৮ শতাংশ বিক্রি করতে পারেন।
(১৭) মেজর আখতার পরিমলের ওয়ারিশদের কাছ থেকে ৩৫ শতাংশ জমি ক্রয়ের পর, মেজর আখতারের নামেও নামজারী হয়। অর্থাৎ পরিমলের পর পরিমল থেকে কেনা সার্থক আলি, এবং মেজর আখতার উভয়ের নামেই ক্রয় অংশের সঠিক নামজারী হয়। তাহলে মেজর আখতার ৩৫ শতাংশ জমি পাবেন না কেনো?
(১8) সাউথ টাউনের প্রোজেকটা ম্যানেজার ওয়াহিদ, সার্ভেয়ার এবং ইঞ্চার্জ যখন মেজর আখতারের সাথে একটি যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তার আগেই তারা মেজর আখতারের কাগজাদি চেক করেন এবং চেক করার পরেই এই উক্ত যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তাহলে পরবর্তীতে কেনো তারা মেজর আখতারের বাউন্ডারী ওয়াল ভেংগে সমান করার পর দাবী করেন যে, এখানে মেজর আখতারের কোনো জমি নাই? এটা একটা চক্রান্ত নয় কি?
(১৫) এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে যে, সব গুলি অবৈধ জমি ওয়াহিদ মেম্বার আম মোক্তার নামা দিয়ে বিডিসি বা সাউথ টাউনকে জমি কয়ে সহায়তা করেন। এই ওয়াহিদ মেম্বার নিজের মেজর আখতারের সব কাগজাদি চেক করেন। আমার ধারনা, তিনি এখন তার অবৈধ কার্যকলাপের জন্য আমার জমিটা খেয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন।
কি কি হতে পারে?
১। সাউথ টাউনের প্রজেক্তের সাথে জড়িত স্টাফগন সম্ভবত সাউথ টাউনের এমডিকে সত্যিটা বলছেন না বিধায় তিনি একটা ভুল মুভ করেছেন মামলা করে।
২। মামলা করার ফলে সমস্ত কাগজ পত্র সাউথ টাউনকে কোর্টে পেশ করতেই হয়েছে। এই মামলার সমস্ত কাগজ পত্র বিবেচনায় দেখা যায় যে, কোনো অবস্থাতেই আদালত সাউথ টাউনকে তাঁর অবৈধ ভাবে কেনা ১৭৭ শতাংশ জমির বইধতা দিতে পারবেন না। আর এই অবৈধ কাগজ গুলি এখন সবার হাতে হাতে (যেমন জজের হাতে, পেশকারের হাতে, আইনজীবিদের হাতে, আমার হাতে, আমার সাথে আরো অন্যান্য লোকের হাত) কপি চলে গেছে। সবাই এই সব তথ্য জানার পর যারা লোভী, তারা ইতিমধ্যে ওইসব অবিক্রীত জমিগুলিকে হাতে নেওয়ার জন্য মানুষ রেডি করে হয় আম মোক্তার বা বায়না নামা বা অল্প কিছু পয়সা দিয়ে সাব কবলা করে ফেলার সম্ভাবনা বেশী।
৩। যে মুহুর্তে ওই সব লোকগুলি কনো না কোনো ভাবে এই অবিক্রীত জমি গুলির ব্যাপারে ন্যুনতম সুরাহা করে ফেলবে, তখন তারাই বাদী হয়ে সাউথ টাউনের বিরুদ্ধে মামলা করবে। বাদী হিসাবে মামলার তারিখ দ্রুত করা যায় বা হাইকোর্টে কোনো এক আদেশ বলে মামলাটা ত্বরান্বিত করা সম্ভব। বিবাদী হিসাবে সেতা হয়তো কিছুটা জটিল।
৩। পক্ষান্তরে মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর কেনা ৪১ শতাংশ জমির মালিক। কারন পরিমল সুন্দুরী বৈধভাবে সার্থক আলীর কাছে ১৯৫৮ সালে ৩৯ শতাংশ জমি বিক্রি করার পরেও আর এস রেকর্ড মোতাবেক জনাব সার্থক আলীর নামেও ৩৯ শতাংশ জমি নামজারী হয় এবং শ্রীমতি পরিমল সুন্দুরীর নামেও ৩৫ শতাংশ জমি নামজারী হয়। এর মানে পরিমল সুন্দুরীর শ্রী দেবেন্দ্রনাথের থেকে ৫৪ শতাংশ জমি কেনার পরে হয়তো তাঁর আরো জমি অন্য কোনো জায়গা থেকে পেয়ে মালিকানা ছিলেন। ফলে সব কিছু পর্যালোচনা করে দেখা যাবে যে, মেজর আখতারের পক্ষে রায় হবেই।
৪। যদি মেজর আখতার এই মামলায় রায় পান, তাহলে এই রায়ের কপি নিয়েই ওই সব লোভী মানুষগুলি যারা অবিক্রীত জমির একটা সুরাহা করে নিয়েছেন, তারা অবশ্যই জিতে যাবে। ফলে সাউথ টাউন ২১৬ শতাংশ সহ আমার জমিও হারাবেন।
৫। শুধু তাইই নয়, যদি সাউথ টাউন মামলায় কোনো রুপ জটিলতা করেন, তাহলে প্লট বুকিংকারী, প্লটের কিস্তি পরিশোধ করেছে কিন্তু প্লট পায় নাই এমন অনেক ক্লায়েন্ট, আবার যারা ডিপ্রাইভড লোক যারা সাউথ টাউনের বিপক্ষের লোক, তারা সবাই প্রকাশ্যে দিবালোকে মিছিল করে মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষন করে দেশের প্রধান একটা শিরোনামে নিয়ে আসতে পারে।
৬। সাউথ টাউনের এখনো অনেক জমি তারা দখল করে রেখেছেন যে সব জমি এখনো অবধি সাউথ টাউন কিনেই নাই। ওই সব মানুষগুলিও এবার তাদের জমির কাগজপত্র নিয়ে হাজির হয়ে দখলে যাবে। সাউথ টাউনের এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আশে পাশের ডেভেলপার গন অনায়াসেই ওই সব জমি ওয়ালাদের কাছ থেকে অল্প পয়সায় জমি জিরাত কিনে সাউথ টাউনে ঢোকে যাবে। আর যখনই ওইসব ডেভেলপার ঢোকে যাবে, তখন যুদ্ধ হবে (অন্য ডেভেলপার +জমি ওয়ালা+ ক্লায়েন্ট + শত্রু পক্ষ) বনাম সাউথ টাউন। সাউথ টাউন লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শুধু তাইই না, সাউথ টাউনকে সুদ সমেত ক্লায়েন্টদের টাকা ফেরত দিতে হবে।
সমাধান
৭। অতি দ্রুততম সময়ে প্রোজেক্টের ভিতরের জাসুসদেরকে সরাইয়া ফেলতে হবে।
৮। সব কাগজপত্রের নিরাপত্তা বিধান খুবই জরুরী বিশেষ করে এমন সব কাগজ পত্র যে কাগজের মাধ্যমে সাউথ টাউনের দূর্বলতা আছে।
৯। মেজর আখতারের মামলার কোনো রায় না করানো এবং তার সাথে ক্লিনভাবে একটা সমঝোতায় গিয়ে মামলাটা আর না চালানো। যতদিন এই মামলা চলবে, ততোদিন আদালত কর্ত্রিক কাগজপত্র চাইতেই থাকবে এবং কাগজপত্র প্রকাশ্যে আসতেই থাকবে। এ ক্ষেত্রে সাউথ টাউন পরিমল সুন্দুরীর থেকে পরিমল সুন্দুরীর বাকী ওয়ারিশ দের কাছ থেকে কমপক্ষে ২৮ এবং বেশীর পক্ষে ৩৪ শতাংশ জমি এখুনী লিখে নেয়া উচিত এবং উক্ত কাজটি এই কয়েক দিনের মধ্যেই করে কাগজ পত্র গুছিয়ে ফেলা উচিত বলে আমি মনে করি এবং এ ব্যাপারে মেজর আখতার সর্বাত্তক সহযোগীতা করতে পারেন।
১০। অতঃপর যদি কেউ জেনুইন কাগজ নিয়ে সাউথ টাউনে আসে, তাহলে তার কাছ থেকে যতোটা সহনীয় পর্যায়ে পারা যায় জমিগুলি কিনে নিয়ে বইধ করে ফেলা।
১১। যে সব এজেন্টের মাধ্যমে (যেমন ওয়াহিদ মেম্বার) অনেক অবৈধ জমি ক্রয় করা হয়েছে, তাকে আইনের আওতায় এনে তার কাছ থেকে ক্ষতিপুরন নেয়া।
১২। কোম্পানীর ল ইয়ার ইমিডিয়েটলী পরিবর্তন করা খুবই জরুরী। কিন্তু তাকে পরিবর্তন করা হলে আরেকটা বিপদের সম্মুক্ষিন হতে পারে যে, তার কাছেই সব কাগজাদি আছে যা তিনি অফিসচ্যুত হলে সাউথ টাউনের বিরুদ্ধে কাজ করবে। ফলে, ল ইয়ারকে পরিবর্তন এখুনি না করে তাকে দিয়েই ধীরে ধীরে সব কাগজ বৈধ করে নিয়ে তারপর অফিসচ্যুত করা।
১৩। সম্ভবত ডিকে খানকে আবারো অফিসমুখী করা হলে এতে একটা ভালো সুফল হতে পারে।
অন্যান্য তথ্যাদি
১। বিডিসির বিআরএস করার পর মেজর আখতার তেজগাও সেটেলমেন্ট অফিসে উক্ত বিআরএস এর বিপক্ষে ৩০ ধারা মতে বিশেষ আপত্তি কেস (বি আর এস সংশোধন প্রসংগে) ১৩/০১/২০১০ তারিখে একটি এপ্লিকেশন করেন। তার ডায়েরী নং ১৬০ তাং ১৩/১০/২০১০
২। পরিমল সুন্দুরী দে এবং স্বামী- ভুপতি মোহন সাহার ব্যাখ্যাঃ
(ক) হিন্দুদের যারা ব্যবসার সাথে জড়িত, তারা এক সময় উপাধি যাহাই হোক না কেনো, তাদেরকে সাহা নামেই ডাকা হয়। ভুপতি মোহন দে নিজে ব্যবসা করতেন বলে তাকে অনেকেই ভুপতি মোহন সাহা বলেও ডাকতেন।
(খ) এই বাঘইর এলাকাতেই খতিয়ান নম্বর ৭৩৫, যে এল ৮৭ তে পরিমল সুন্দুরী দেবীর (দেবীর সক্ষিপ্ত রুপ “দে”) এর স্বামীর নাম ভুপতি মোহন সাহা উল্লেখ আছে।
৩। অত্র সাউথ টাউন এলাকার জমির চৌহদ্দিগুলি পর্যালোচনায় দেখা যায়, উক্ত সাউথ টাউন এলাকার একই জমির মধ্যে বিভিন্ন দলিলের চউহদ্দিতে ভুপতি মোহন সাহার কথা উল্লেখ আছে।
প্রায় দু মাস হলো নেওয়াজ আলী কুয়েত থেকে একেবারে দেশে ফিরে এসেছে। প্রায় ৩২ বছর দেশের বাইরে ছিলো। নেওয়াজ আলি আমার ভাগ্নী শেফালির হাসবেন্ড। সংক্ষিপ্ত আকারে এই নেওয়াজ আলীর ইতিহাসতা না বললেই চলে না।
তখন ১৯৮৭ সাল। আমি সবেমাত্র সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট পদে চাকুরী করছি। মাঝে মাঝে গ্রামে যাই, আগের মতো না। এম্নিতেই গ্রামে এখন আর আগের মতো যাওয়া হয় না, আবার গেলেও আগের মতো বন্ধু বান্ধবরাও খুব একটা ধারে কাছে নাই বিধায় আড্ডাও জমে না। একদিন মা জানালেন যে, শেফালীর তো বিয়ে দেয়া দরকার। শেফালীর জন্য কুমড়া বারীর নেওয়াজ আলী বিয়ের কথা বলছে। ব্যাপারটা ভেবে দেখিস। কুমড়া বাড়ির নেওয়াজ আলীর বাবা জলিল মোল্লাকে আমি মামা বলে ডাকি। তারা কততা আমাদের কাছের বা রক্তের সে হিসাবটা আমি জানি না, আজো না। তবে জলিল মামার বাড়িতে আমাদের অনেকগুলি সম্পর্ক কেমন করে জানি পাচিয়ে গেছে। আমার তিন নাম্বার বোন লায়লার বিয়ে হয়েছে এই কুমড়া বাড়িতে ইসমাইল ভাইয়ের সাথে। আমার মুসল্মানীর সময় দোস্তি হয়েছে নেওয়াজ আলীর ছোট ভাই মোতালেব বা মূর্তুজ আলির সাথে, অন্যদিকে জলিল মোল্লাকে আমরা আবার ডাকি মামা বলে। এখন আবার বিয়ের সম্পর্ক করতে চায় নেওয়াজ আলী আমাদের ভাগ্নি শেফালীর সাথে। একেকটা সম্পর্ক একেকতার সাথে পরস্পর বিরোধি। যদি জলিল মামাকে মামা বলে কেন্দ্র ধরি, তাহলে লায়লার বিয়ের জন্য জলিল মামাকে বলতে হয় ভাই বা বিয়াই। আবার লায়লার বিয়ের সম্পর্ককে যদি কেন্দ্র ধরি, তাহলে জলিল মামাকে আর মামাই বলা যায় না। আবার জলিল মামার পোলা মোতালেবের সাথে আমার দোস্তি পাতার কারনে জলিল মামা হয়ে যায় আমার খালু বা আংকেল। এখন যদি শেফালিকে নেওয়াজ আলীর সাথে বিয়ে দেই, এতোদিন যেই নেওয়ায়জ আলিকে আমি ভাই বলতাম, তাকে এখন আমার বলতে হবে জামাই বাবু আর নেওয়াজ আলি আমাকে বলা শুরু করবে “মামু”। অন্যদিকে আরেকটা ঘটনা প্রায় ঘটেই যাচ্ছিলো, সেটা না হয় নাইবা বললাম। এতো সব প্যাচালো একটা সম্পর্কের মধ্যে আমাকে এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে শেফালির বিয়ের ব্যাপারটা নেওয়াজ আলীর সাথে।
এবার আসি শেফালীর ব্যাপারে কিছু কথা। শেফালির মা শায়েস্তা খাতুনের প্রথম পক্ষের মেয়ে শেফালী। শেফালীর জন্মের পর শেফালীর বাবা তার দেশে যাওয়ার নাম করে সে আর ফিরে আসে নাই। কেনো ফিরে আসে নাই, আদৌ বেচে আছে কিনা, বা তার একেবারে নিরুদ্দেশ হবার কল্প কাহিনী আজো আমরা কেউ জানি না। শেফালী আমাদের বাড়িতেই বড় হতে লাগলো। শেফালীর মায়ের অন্য আরেক জায়গায় বিয়ে হয়ে গেলো। সেখানে লিয়াকত, শওকাত আর ফারুকের সাথে এক মেয়ে নুরুন্নাহার এর জন্ম হয়। শেফালী আমাদের বাড়িতেই বাপ মা বিহিন আমার মায়ের কাছে বড় হতে লাগলো। এই ধরনের বাচ্চাদের বেলায় বিয়ে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা মামারা যারা গ্রামের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছি, তাদের বেলায় এটা অনেকতা উপকারই হয়। তারা এইসব বাচ্চাদের বেলায় মামাদেরকেই আসল গার্জিয়ান ভেবে সম্পর্ক করতে আগ্রহী হয়।
নেওয়াজ আলীর ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন। খুবই সুন্দর একতা ছেলে। কিন্তু অশিক্ষিত। দেশে কাজের কিছু নাই। বেকার। বিদেশ যাওয়ার একতা হিরিক পড়েছে। কিন্তু নেওয়াজ আলীদের বা জলি মোল্লার সামর্থ নাই যে, ছেলেকে বিদেশ পাঠায়। তাই, বিয়ের মাধ্যমে যদি কনে পক্ষ থেকে কিছু ক্যাশ নেওয়া যায়, তাহলে বিদেশ যাওয়ার জন্য একটা আশার পথ খোলে। ফলে শেফালি চেহারায় অনেক কালো হলেও টাকার কাছে এটা কোনো বিশয়ই ছিলো না। তাদের দাবী- ২০ হাজার টাকা দিতে হবে ক্যাশ, নেওয়াজ দেশের বাইরে চলে যাবে বিয়ের পর। দেশের বাইরে যেতে মোট টাকা লাগবে ৩০ হাজার, বাকী ১০ হাজার জলিল মোল্লা জোগাড় করবে। শেফালীর ভুত-ভবিষ্যত অনেক কিছু চিন্তা করে শেষ নাগাদ আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, শেফালীকে আমরা নেওয়াজ আলীর সাথেই বিয়ে দেবো এবং হাজার বিশেক টাকা সহই দেবো। সেই থেকে শেফালির হাজবেন্ড নেওয়াজ আলি জুয়েতেই ছিলো, মাঝে মাঝে দেশে এসছে। এর মধ্যে শেফালির তিন সন্তানের মা, নাফিজ, নাহিদ আর একটা মেয়ে।
নেওয়াজ আলীর প্রায় ৩২ বছরের বিদেশ থাকা অবস্থায় ওর স্বাস্থ্যের অনেক ক্ষতি হবার পাশাপাশি যে, পরিবারের অনেক উন্নতি হয়েছে সেটাও না। অবশেসে নেওয়াজ আলি গত ২ মাস আগে চুরান্তভবে দেশে চলে আসে। এখন তার বয়স প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। ওর বড় ছেলে নাফিজ জাপানে থাকে, ছোট ছেলে নাহিদ মাত্র মেট্রিক দেবে, মেয়ে আরো ছোট। দেশে আসার পর আমার সাথে নেওয়াজ আলীর দেখা হয় নাই। মানে নেওয়াজ আলীর সাথে আমার দেখা হয় নাই প্রায় কয়েক যুগ।
যাই হোক, দুদিন আগে জানতে পারলাম, ৭ বছর আগে নেওয়াজ আলীর যে বাইপাশ সার্জারী হয়েছিলো কুয়েতে, সেই বাইপাস সার্জারীতে আবার নাকি ব্লক। তাকে পুনরায় অপারেশন করাতে হবে। ৩২ বছর বিদেশ চাকুরী করার পরেও তাদের যে খুব একটা সঞ্চয় আছে সে রকমের কিছু না। হয়তো সব মিলে লাখ পাচেক টাকার একটা ক্যাশ ব্যালেন্স থাকলেও থাকতে পারে। গতকাল নেওয়াজ আলি বুকের ব্যথায় উঠানে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো, তড়িঘড়ি করে আজগর আলী হাসপাতালে আনা হয়। তারা নেওয়াজ আলীর ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলো যে, সে ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছে। রাখতে চায় নাই। অগত্যা আবার গ্রামে। আসলে মাথার উপর যখন কেউ থাকে না, আর যে মাথা হিসাবে থাকে, যখন তারই কোন বিপদ হয়, তখন সে থাকে সবচেয়ে অসহায় পজিশনে। নেওয়াজ আলীর অবস্থা অনেকটা এ রকমের। অসুস্থ্য শরীর নিয়ে একবার হাসপাতাল, আরেকবার গ্রামে, এই করতে করতেই সে আরো অসুস্থ্য
আজ সকালে আবারো নেওয়াজ আলিকে হাসপাতালে “বারডেম হাসপাতাল” নিয়ে আসা হয়েছে। হার্টের পেসেন্ট, কেনো যে বারডেমে আনা হয়েছে সেটাও আমি জানি না। আর কেনো জানি ব্যাপারটায় আমি জানতেও মন চায় নাই। আর জানতে না চাওয়ার পিছনেও একটা কারন ছিলো, যা এখন আর বলছি না। একটু আগে লিয়াকত (শেফালীর ভাই) ফোনে জানালো যে, সম্ভবত নেওয়াজ আলি বাচবে না। তার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। খরটা আমার কাছে অন্য দশটা খবরের মতোই মনে হয়েছিলো। তাড়াহুরা ছিলো না। আমার স্ত্রী মিটুলের শরীরটা অনেক খারাপ, তাকে নিয়ে ইবনে সিনায় গিয়েছিলাম, সেখান থেকে গিয়েছিলাম সি এম এইচে। ফেরার পথে আনুমানিক ২ তার দিকে লিয়াকত ফোনে জানাল যে, নেওয়াজ আলি আর নাই, মারা গেছে।
গ্রামে লাশ দাফনের জন্য যাওয়ার দরকার ছিলো, এটা একটা প্রোটকলের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমারো কোমড়ে একটু ব্যথা ছিলো বলে যেতে চাই নাই। আর কোমড়ে ব্যথা না থাকলেও হয়তো যাওয়া হতো কিনা আমার সন্দেহ আছে। মন যেতে চায় নাই।
শেফালি সম্ভবত কাদছে, ওর ছেলেমেরা কাদছে, এই কান্নাটা শুরু হয়েছে। আমি দোয়া করি ওদের যেনো কাদতে না হয় কিন্তু আমি জানি কান্নার ভাষা। আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই বাবা ছাড়া দুর্দশা জীবন থেকেই আজ এখানে এসেছি। তবে একতা বিষয় স্পষ্ট যে, যাদের মাথার উপরের বৃষ্টি অন্যের ছাতায় নিবারন হয়, তাদের উচিত না ওই ছাতাওয়ালা মানুষতাকে কোনোভাবেই ছাটার নীচে থাকতেই হিট করা। তাতে যে ছাতার আবরনটা সরে যেতে পারে এটা যখন কেউ বুঝে না, তখন ছাতাটা যখন সরে যায়, তখন ওই ছাতার মাহাত্য টা হারে হারে টের পাওয়া যায়। আমি হয়তো ওদের জন্য ওই ছাতা ওয়ালাই ছিলাম।
বাস্তবতা গল্পের থেকেও ভয়ংকর। এ যাবতকাল যতো আইন বহির্ভুত হত্যাকান্ড ঘটেছে, গল্প হয়তো একটা ছিলোই কিন্তু গল্পটা কেউ বিশ্বাস করলো কিনা সেটা যিনি গল্প বানালেন, না তিনি বিশ্বাস করেন, না যাকে বললেন, তিনিও বিশ্বাস করেন। গল্প লেখক নিজেও জানেন, গল্পটা কেউ বিশ্বাস করে না। তারপরেও সেই একই গল্প বলতেই থাকেন, এইভেবে যে, তাদের অপরাধের কোনো খবর কেউ জানে না। তারা ভুলে যান যে, আজ হয়তো কোনো ইনফর্মেশন হাতে নাই, কিন্তু কাল যে ইনফর্মেশন থাকবে না সেটা কি হয়? অপরাধকারী সবসময় ভুলে যায় যে, আইন অপরাধের গন্ধ পায়, আবার অপরাধীরও। কোনো অপরাধে কারো ইচ্ছা থাকুক আর নাই বা থাকুক, যখন সেই অপরাধের সাথে কেউ যুক্ত হয়, সেও অপরাধের সমান ভাগীদার। আইনের চোখে সেও সমান অপরাধী।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যে, অপরাধীর পাপের ভার যখন অনেক বেশী হয়ে যায়, তখনই তার রেশ টেনে ধরার লক্ষ্যে পাপ সেই পাপীর জীবনকে অনেকগুলি ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। আর এই বিভক্তি ভাগগুলি একটার সাথে আরেকটা এমন কিছু স্তরে নিয়ে যায় যেখানে অপরাধী নিজের অজান্তেই সীমাহীন জটিলতার পথ প্রশস্থ করে দেয়। তখন অপরাধীর পক্ষে অপরাধের সেগমেন্ট গুলিকে জোড়া লাগানো জটিল না শুধু সম্ভবও হয় না। ফলে এদের যে কোনো একটা ভাগ যখন সঠিক আইনের পাল্লায় পড়ে যায়, তখন প্রতিটি সেগমেন্টে করা অপরাধের সঠিক বিচারের মুখুমুখি হয়। এই সময়ে অপরাধী তাঁর গল্প অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্য নতুন কোনো গল্প বল্লেও কাজ হয় না। কারন অপরাধী যতো পা ই এগিয়ে থাকুক আইন তাঁর থেকেও দুই পা এগিয়েই থাকে। শেষ অবধি অপরাধী একটা শান্তনার দিকেই চেয়ে থাকে, কপালের লেখা বা ভাগ্য। কিন্তু আইন কপালের লেখা বা ভাগ্যকে মানেই না। অপরাধীর তখন একটু একটু করে বোধোদয় হতে থাকে যে, অপরাধের পরিনাম অপরাধী যা ভেবেছিলো সেটা তার ভাবনার থেকেও অনেক বেশী ভয়ংকর।
যখন কোনো কেসে বিখ্যাত লোক ফেসে যান, তখন সেই কেস খুব সহজেই নিজের থেকে মিডিয়া, কিংবা জনমন বা জনগন নজর কেড়ে নেয়। এ রকম কেসে শোনানো রায়ে মানুষ চুলচেড়া বিশ্লেষণ করে থাকে। তখন এইসব রায় আর কেস পুরু দেশকে নাড়িয়ে দেয়। এইসব কেসে যেমন গ্লামার থাকে, হরর থাকে তেমনি থাকে আক্রোশ। তখন পাবলিকের কাছে রায় এমনভাবে চুলচেড়া বিস্লেষনে মনে হয়, এই কেসের রায় ন্যায় হয় নি বা হয়েছে। আদালত যেই রায়ই দিক না কেনো।
মেজর সিনহার কেসটা এখন সেই পর্যায়ের একটা স্তর পার করছে দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে। এখানে শুধু কিছু আসামীর ব্যাপারেই সারা দেশ বিস্লেষন করছে না, তারা তদন্ত প্রোসেস, বিচার বিভাগের ন্যায় পরায়নতা , আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এইসব কিছুর দিকেই সুনিপুন মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষন করছে। ফলে সব বিভাগের জন্য এটা একটা অগ্নি পরীক্ষা বটে। হয়তো এটা সর্বোচ্চ প্রশাসনের জন্যেও একটা অগ্নি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যদি আমরা হেরে যাই, হেরে যাবে সমগ্র দেশ।
আমার বিশ্বাস বাংলাদেশ কখনোই হারে নাই, এবারো হারবে না।
চারিদিকে শুধু খারাপ সংবাদ পাই। একদিকে করোনা মহামারী, অন্যদিকে সারাদেশ বন্যায় কবলিত, আবার এরই মধ্যে মেজর সিনহার পুলিশের গুলিতে নিহত হবার ঘটনায় পুরু দেশ উত্তাল। ব্যবসা বানিজ্য অনেকটাই স্থবির না হলেও বেশ জটিল। আমাদের অবস্থাটা ততোটা খারাপ নয়। ফ্যাক্টরী চলছে আগের মতোই, অফিসে যাচ্ছি প্রতিদিন, মহামারী আর বন্যা এই মুহুর্তে কোনোটাই খুব বেশী প্রভাব ফেলে নাই আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে।
আজ শুক্রবার, অফিসে যাই নাই। বন্ধের দিন। একটু আগে মোস্তাক ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে জান্নাহ আমেরিকা থেকে হটাত ফোন করে জানালো যে, ওর হাজবেন্ড ওকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করছে এবং সে ওখানে একেবারেই নিরাপদ নয়। ওর হাজবেন্ড নাকি ওর মুখে তোয়ালে ঢুকিয়ে ওকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছিলো। ওর ফোন কেড়ে নিয়ে গিয়েছিলো। ওর ছোট মেয়ে এলিনা ভয়ে কান্নাকাটি করছিলো। ডিজিটাল যুগ, ফোন কেড়ে নিয়ে গেলেও রাকীব (জান্নাহর হাজবেন্ড) বুঝতে পারে নাই যে, ফোন ছাড়াও অন্যান্য ডিভাইস যেমন ল্যাপটপ বা এপ্স (হোয়াটস আপ, ভাইবার, ফেসবুক) ইত্যাদি দিয়েও সারা দুনিয়ায় কথা বলা যায়। ফলে অতিদ্রুত জান্নাহ আমাদের বাসায় ব্যাপারটা জানিয়ে দিলো ভাইবারে কল দিয়ে। আর আমরা জেনে গেলাম। ইনফর্মেশন এতো দ্রুত ট্রাভেল করে যে, আজকাল আর ডিস্ট্যান্স কোনো ব্যাপার নয়। আমরা সাথে সাথে প্রথমে জান্নাহর বাবা মোস্তাক ভাই, পরে তার ছেলে ফয়সালকে জানানোর পরেই লোকাল পুলিশ জান্নাহর বাসায় ১০ মিনিটের মধ্যে চলে এলো। রাকীবকে এরেস্ট করা হয়েছে। আমেরিকা- বাংলাদেশ, আবার বাংলাদেশ-আমেরিকা, একটা ঘটনা, প্রশান চলে এলো মাত্র ১০ মিনিটে। এটাই দুনিয়া।
রাকীবের সাথে জান্নাহর বেশ কিছুদিন যাবত দাম্পত্য জীবন নিয়ে বনিবনা হচ্ছিলো না। আমি প্রথমে রাকীবকে সাপোর্ট করলেও পরবর্তীতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, সমস্যাটা জান্নাহর সাথে নয়, সমস্যাটা রাকীবের। রাকীব অত্যান্ত হিংস্র একজন মানুষ, কিন্তু কথা বলতে পারে বেশ গুছিয়ে। ছেলেটা ডক্টরেট করেছে বটে কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতায় কচি কচুর মতো। প্রায় এক বছর আলাদা থাকার পর জান্নাহই ফিরে গিয়েছিলো রাকীবের বাসায় কিন্তু রাকীব দিতীয় বারের মতো জান্নাহকে তার সংগীনি হিসাবে গ্রহন করতে পারে নাই। এটা রাকীবের ব্যর্থতা।
আসলে আজকে আমার ডায়েরীটা জান্নাহ বা রাকীবকে নিয়ে নয়। ঘটনাটা ঘটে গেলো কিছুক্ষন আগে, তাই হয়তো লিখলাম। আমার আজকের প্রেক্ষাপট ছিলো, আমাদের জীবনের পথ চলার কাহিনী নিয়ে। “সময়ের লম্বা পথ” ধরে যখন আমরা হাটি, এই পথের প্রতিটি মুহুর্তই আসলে একে অন্যের সাথে কোনো সামঞ্জ্যস্য থাকে না। একটা মুহুর্ত আরেকটা মুহুর্তের সাথে চেইনের মতো বাধা থাকে বটে কিন্তু প্রতিটি মুহুর্ত-চেইন তার আলাদা বৈশিষ্টে ভরপুর। কিন্তু একটা জায়গায় এরা সবার মিল। প্রতিটি মুহুর্ত-চেইন যেখান থেকে সৃষ্টি হয়, পুনরায় সেই বিন্দুতে ফিরে না আসা পর্যন্ত এরা কেহই একটা পূর্নাজ্ঞ বৃত্ত তৈরী করে না বা করতে পারে না। জীবনের বেলায়ও তাই। এই মুহুর্ত-চেইন গুলিতে কখনো কেউ বিউটি কুইন আবার কখনো সেইই হয়ে যায় কিচেন কুইন। কখনো মনে হয় অতি সুবাসিত গোলাপ, আবার পরক্ষনেই মনে হবে গোলাপ নয়, এটা গোলাপের বিষাক্ত কাটা। কখনো কখনো এই মুহুর্ত-চেইগুলিকে জোরা লাগাতে গিয়ে জোড়ার বদলে জট লেগে যায়। ফলে আসচর্য হবার থেকে এই মুহুর্ত-চেইনগুলিকে মনে হয় অসম্ভব জটিল যার একদিকে যেমন মনে হয় খাদ, অন্যদিকে মনে হয় পুরুটাই ফাদ।
যখন জীবন শুরু হয়, একটা অসহায় প্রানী হয়ে এমনভাবে জন্ম নেয় যে, তাকে কেউ না খাইয়ে দিলে খেতে পারে না, কেউ তাকে পরিষ্কার না করিয়ে দিলে সে পরিষ্কার হতে পারে না, কেউ তাকে লালন পালন না করলে তার বড় হয়ে উঠা সম্ভব হয় না। শুধু তাইই নয়, জীবনের যে সময়টায় মানুষ পরিপূর্নতা লাভ করে বলে ভাবে, আসলে সেটাও তার আসল পরিপুর্নতা নয়, প্রতিটা মুহুর্ত-চেইন পরিপুর্নতার জন্য দায়ী। এই পরিপুর্নতার মধ্যে যে সব উপাদান থাকে তা কখনো শিশুকাল, কখনো কিশোরকাল, কখনো যৌবনকাল, কখনো প্রোউরকাল, ইত্যাদি। প্রতিটা মুহুর্ত-চেইন যখন তার শেষ ক্রান্তিলগ্নে এসে সেই লগ্ন বা পর্ব পেরিয়ে যায়, তখন সে একটা উপাদান হারিয়ে ফেলে কিন্ত তার ইনভেন্টরীতে এসে জমা হয় আরেকটা উপাদান। শিশুকাল ঝরে গিয়ে কিশোরকাল, কিশোরকাল ঝরে গিয়ে যৌবনকাল আর যৌবনকাল ঝরে গিয়ে আসে তার পরেরকাল। কিন্তু এই বৃত্তটা চলমান থেকে যায় আর বৃদ্ধি হতে থাকে। আর সামনে এগিয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া উপাদানের অভিজ্ঞতা আর আস্বাদন নিয়ে। একে একে যখন সবগুলি উপাদান বিলুপ্ত হতে থাকে, তখন ব্রিত্তের আর্ক আরো বড় হয়, এগিয়ে যায় সেইস্থানে যেখান থেকে বৃত্তের প্রথম উৎপত্তি। যখন বৃত্তটা প্রায় সম্পন্ন হতে শুরু করে তখন দেখা যাবে সেই ৯০ বছরের মানুষটি পুনরায় একই আচরন করে যখন তার বয়স ছিলো মাত্র শিশু। ৯০/১০০ বছরের কোনো মানুষ আর ছোট কোনো বাচ্চার মধ্যে খুব একটা তফাত চোখে পড়ে না, একটা বিষয় ছাড়া- আর সেটা হল “অভিজ্ঞতা”। ছোট বাচ্চার কাছে “অভিজ্ঞতা” ছিলো না কিন্তু শত বছরের বাচ্চা মানুষটির ঝুলিতে ভরপুর “অভিজ্ঞতা”। সেই শত বছরের মানুষটিও কারো সাহাজ্য ছাড়া খেতে পারে না, কারো সাহাজ্য ছাড়া পরিষ্কার হতে পারে না, কেউ তাকে লালন না করলে তার চলাও হয়ে উঠে না। যেদিন বৃত্তটা পুরু হয়ে যায়, সেদিন তিনি আর আমাদের মাঝে নাই। আর এটাই জীবন। বৃত্তটা এ রকম যে, কোনো মাইল ফলকের এপিঠ আর অপিঠ যার একদিকে “শুন্য” বা “শুরু” লেখা অন্য পিঠে “শেষ” লেখা। অথচ পয়েন্টটা একটাই।
অর্থাৎ পয়েন্ট “এ” এর একপিঠে যদি পয়েন্ট “বি” পর্যন্ত যেতে লেখা থাকে “এক্স” কিলোমিটার তাহলে “বি” থেকে “এ” পর্যন্ত আসতে পয়েন্ট “এ” এর অন্য পিঠে লেখা হবে “শুন্য” কিলোমিটার। এটা সেই স্টার্টিং পয়েন্ট যা বৃত্ত সম্পন্ন করার নিমিত্তে ফিনিসিং পয়েন্টও বটে। আর এই পুরু ব্রিত্ততাই আমাদের লাইফ। যারা এই বৃত্তের বাইরে ছিটকে পড়ে যান, তাদের বেলায় আমরা বলি দূর্ঘটনা।
যদি রাগ বা অপরাধ করার মুহুর্তে মনে এই অনুভুতি জাগে যে, অন্য কারো ভুলের কারনে আমরা আমাদের জীবন নষ্ট করতে চলেছি, তাহলে হয়তো অনেক অপরাধ ঠেকানো সম্ভব। অভিমান, প্রতিশোধ, ক্রমশই ধংশের পথকে এগিয়ে নিয়ে চলে। ফলে আমরা নিজেদের রাগ আর সেই রাগের বশে যে সব অপরাধ বা পদক্ষেপ নিতে পারি তার ফলাফলের বিশয়ে সবসময় সতর্ক থাকা উচিত। অপরাধের ফল সব সময় দুই রঙ এর হয়। যখন মনে মনে অপরাধ করার চক্রান্ত করা হয়, তখন অনেক কঠিন পরিস্থিতি সহজ বলে মনে হয়। কিন্তু সেটা কেবলমাত্র দেখার ভুল। সেটা একটা ছলনা। অপরাধের আসল রুপ পরে সামনে আসে, যখন চক্রান্ত অসফল হয়, যখন অপরাধ সবার সামনে প্রকাশ হয়। ক্ষোভের বশে নেয়া পদক্ষেপের ফল কখনোই বদলনো যায় না। কিন্তু পিছনে পরে থাকে শুধুই উপলব্ধি। আবারো সেই “যদি”।
এই “যদি”তে তখন এটাই মনে হতে থাকে, আহা “যদি” সমস্যার সমাধানের জন্য মূল উপড়ে ফেলার বিকল্প হিসাবে ওই অপরাধটা না করতাম, “যদি” ওই আইন বিরোধী কাজটা না করতাম, “যদি” একটু ধইর্য ধরতাম, তাহলে হয়তো আমাদের বর্তমান ইতিহাসটা কালো অক্ষরে লেখা হতো না ইত্যাদি।
কারো ইতিহাস যখন কালো অক্ষরে লেখা হয়ে যায়, তখন সেটা যতো চেষ্টা করাই হোক তাকে আর সাদা অক্ষর করা যায় না। হ্যা, হতে পারে তারপরের সব ইতিহাস হয়তো আবারো সাদা অক্ষরে লেখা করা যেতে পারে। কিন্তু এই সাদা অক্ষরের ইতিহাস এতোটাই বেশী পরিমানে হতে হয়, যতোক্ষন না পর্যন্ত অতীতের কালো অক্ষরের পুরু অধ্যায় ম্লান হয়। তখন সেটা হতে হয় আমুল পরিবর্তন। এই পরিবর্তন সবাই পারে না। যারা পারে, তারাই হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লিজেন্ড। কারন তখন কালো অক্ষরের ইতিহাসধারীর মৃত্যু হয়ে নতুন রুপে আবিরভুত হয়।
আমি খুবই বাস্তব বাদী একজন মানুষ, আর আমি অনেক সহজেই যে কোনো কিছুতেই হার, বিশেষ করে সেসব ব্যাপারে যেগুলিতে হেরে গেলে শুধুমাত্র আর্থিক কিছু ক্ষতি হয়, মেনে খুব সহজে মনের জোরে একটা সাভাবিক লাইফ চালানোর খাপ খেয়ে নিতে পারি। আমি সব সময় মনে করি, যেটা হয়, তার মধ্যেও নিশ্চয় ভালো কিছু তো আছেই। সময় ভালো হোক আর না হোক, সময় কেটেই যায়। নতুন সময় সামনে আসে। সেটাও কেটে যায়, আবার আরেকটা সময় সামনে আসে। আর প্রতিটা সময় সবার জন্যই কিছু না কিছু রেখেই যায়। এই রেখে যাওয়া সময়ের সাক্ষি একদিন ইতিহাস হয়ে যায়, আবার কারো কারো সময়ের এই ইতিহাস এমন কিছু দিয়ে যায় যা সারা জগতময় চারিদিকে অনেক লম্বা সময় ধরে ভেসেই ভেড়ায়।
তোমাদের বেলায় আমার ধারনা একেবারেই সচ্ছ। কারন তোমাদেরকে আমিই তিলে তিলে বড় করছি। তোমাদের অনেক আইডিয়া আমার থেকে জন্ম নেয়। তোমাদের অনেক পছন্দ আমার থেকে উতপত্তি। তোমরা ইচ্ছে করলেই আমার এই বলয় থেকে ছুটে যেতে পারো বটে কিন্তু তোমরা বাকী জীবনের সবকিছু আমার তৈরী ডাইস দিয়েই লাইফ চালাবে বা চালাইতে হবে। বারবার মনে হবে, যদি বাবা এখন আমার পাশে থাকতো। যদি আকাশ আমার হাত ধরে বলতো, এটা না, ওটা করো। তুমি নির্ধিধায় সেটাই করবে বা করতে। কারন আমার উপর তোমাদের বিশ্বাস শতভাগ।
আমি তোমাদেরকে যতোটা ভালোবাসি, তার থেকে বেশি সম্ভবত মায়া করি। মায়া হচ্ছে একটা বাড়ির মতো। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ যতো সুন্দরই হোক, অথবা ফাইভ স্টার হোটেল যতো ভালই হোক, সেটা আমার নিজের ঘর নয়। তার উপর মায়া জরাতে নেই। তাতে শুধু কষ্টই বাড়ে। নিজের হয় না। তাই চেক আউটের সময় অর্থাৎ ওখান থেকে বের হবার সময় মন খারাপ করা মানে নিজেকে বোকা মনে করা। কিন্তু নিজের ঘর, নিজের মানুষ যতো অসুন্দরি হোক কিংবা গরীব, সেটা আমার নিজের। তার থেকে চেক আউট করার সময় চোখের পানি পড়া মানেই মায়া।
তোমরা আমার লাউঞ্জ না, না কোনো ফাইভ স্টার হোটেল। তোমরা আমার নিজের ঘর। আমি এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ পছন্দ করি, ওখানে খেতে পছন্দ করি কিন্তু মায়ায় জরাই না। তোমাদেরকেও আমি ঠিক তাই মনে করি যে, তোমরা আমার একটা মায়া। তোমাদের থেকে চেকআউট করা আমার চোখে জল ছাড়া আর কিছুই না। আর আমি আমার চোখের জলকে ভয় পাই। যে চোখের জলকে ভয় পায়, সে এমন কোনো কাজ করে না যে, জল পড়বে। আমি জল চাই না। তোমরা আমার অনেক কাছের একটা বাড়ি। ইট পাথর দিয়ে দাড় করিয়ে দেয়া চারটা দেওয়াল মানেই কিন্তু বাড়ি নয়। সেটা শুধুমাত্র ঘর। আর সেই ঘরকে বাড়ি বানায় তাতে বসবাস করা হাসি খুশী পরিবার। এমন একটা পরিবার যারা একে অপরকে ভালোবাসে। ভরষা করে। আর এই বাড়ির প্রধান ফটক টা হচ্ছি আমি নিজে যেখান দিয়ে কোন অশুভ শক্তি যেমন প্রবেশ হতে দেই না আবার তেমনি বাড়িত শান্তি বিনষ্ট কারী কোনো উপাদানকেও আমি বাড়ির চারপাশে রাখার কোনো অনুমতি দেই না।
আমি কারারক্ষীর মতো সর্বদা সজাক, আর এটা শুধু তোমাদের জন্য।
আকাশে আগুন লাগে না। কিন্তু আকাশে যখন আগুন লাগে, সেই আগুনে জ্বলে পড়ে ছাড়খাড় হয় মাটি আর শুকিয়ে যায় নদীর জল। আকাশের হয়তো কিছুই পূড়ে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যে, লোভের আগুনে হাত সেকলে হোক সেটা আকাশে বা জমিনে, সেই আগুন হাতকেই পুড়িয়ে দিতে পারে এটা কোনো লোভী মানুষের প্রায়ই মনে থাকে না। লোভের চুলা যখন অপরাধের ফায়ার প্লেস হয়ে যায়, যে কোনো মুহুর্তে সেই ফায়ার প্লেস এক সময় লোভিসহ আশেপাশে যারাই তার সাথে থাকে সবাইকে জালিয়েই মারে। তখন কেউ আকাশের উপরেই থাকুক আর জমিনে। আকাশের মেঘ কিংবা বাতাস সেই আগুনকে নিভাতে পারে না। যখন এই আগুনটা লাগে, তখন জমিনে থাকা মানুষ গুলি দেখে আকাশে বিস্ফোরন হয়েছে। আর সেই বিস্ফোরন ধীরে ধীরে ছাই হয়ে এই জমিনেই পড়ে। তখন তার নাম হয়, অপবাদ। এর থেকে মুক্তির একটাই পথ- এই আগুনকে আটকাতে হয়। যদি আটকানো না যায় তাহলে নেভাতেই হয়। আগুন নিয়ে খেলা উচিত না কখনোই। এতে পড়ে যাবার ভয় থাকে সারাক্ষন। আর সেটাই হয়েছে খেলার চিতা। তাহলেই সাফল্য আসবে। একটা জিনিষ প্রতিটা মুহুর্তে মনে রাখতে হবে যে, সাফল্যের প্রতিটি ধাপে কখনো আপনজন, কখনো অন্য কেউ হাত বাড়াতেই পারে কিন্তু কোন হাত কি কারনে বাড়ায় সেটা বুঝবার ক্ষমতা থাকা খুব জরুরী। কেউ মিথ্যার হাত বাড়ায়, আর তারা মিথ্যাকে লুকায় বহু পরিশ্রমের দ্বারা। আর সেই মিথ্যা পরিশ্রম কখনোই কাজে দেয় না। কারন সত্যের একটাই চেষ্টা থাকে- বাইরে এসে আলোয় দারানো। মিথ্যের রাত যতো লম্বাই হোক না কেনো, সত্যের সুর্জ ঠিক উঠবেই। আমি তোমাকে সব সময় এতাই বুঝাতে চাই যে, আমি মিথ্যা নই আর যারা তোমার পাশে আছে বা থাকার আশ্বাস দেয়, তারা সবাই মিথ্যা। কিছু আপন জন আছে, তারা হয়তো মিথ্যার আশ্বাস দেয় না, কিন্তু তারা কোনো আশ্বাসও দেয় না। হয়তো তারা কোনো ক্ষতিও করবে না। যেমন ওরা যারা ইতিমধ্যে তোমার আর আমার ব্যাপারটা জানে। সাফল্যের একটা মুল্য থাকে যেতা কাছের মানুষকেই জোগাতে হয়। সাফল্যের এ উন্নতি হচ্ছে শাখের করাত, একদিকে সে পৃথিবীর সমস্ত খুসী নিজের কাছে পেতে পারে, কিন্তু ততোক্ষন পর্যন্ত যতোক্ষন পর্যন্ত তার পা মাটিতে থাকবে এবং সেই সাথে সঠিক দিকে। সফলতা সাব্ধানতাকেও নিয়ে আসে, যে সেটা বুঝতে পারে না, সে ভুল জায়গায় গিয়ে ভুল রাস্তায় চলে যায়, যার নাম ‘পতন’। অন্যদিকে রাগ কিংবা সন্দেহ একটা বিষাক্ত ফল, এটা মনজমিনে পোতা উচিতই না। এটা সবার আগে নিজের অস্তিত্বকেই শেষ করে দেয়। তারপর পথে যাইই পায় সেটাকে পায়ে ঠেলতে থাকে, ধ্বংস করতে থাকে। রাগ হচ্ছে একটা রাক্ষস, যে সররোনাশ করে। আর সন্দেহ হচ্ছে একটা শক্তি যা বিশ্বাস কে খুন করে। আর বিশ্বাসের খুন যখন হয়, তখন শারীরিক খুনের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
নিজদের মধ্যে বিশ্বাস আর ভরষা প্রত্যেকটি সম্পর্কের প্রয়োজন। এই বিশ্বাস আর আস্থা একটি ভিত্তি তৈরী করে যার উপর তাদের ভালোবাসা, তাদের বুঝাপরার ইমারত দাঁড়িয়ে থাকে। বিসশসাস ভাজন হবার জন্য দরকার সেক্রেফাইস, দরকার একনিষ্টতা। আর দরকার নিজের সাথে নিজের সৎ হওয়া। কিন্তু বিশ্বাস আর অন্ধ বিশ্বাস এক জিনিষ নয়। অন্ধ বিশ্বাস এমন এক চোরাবালী, যার না আছে একুল, না আছে ওকুল। সেখানে না কোনো জ্ঞানের আলো পৌছতে পারে না সেখানে তর্কের কোনো জায়গা আছে। মানুষের জীবনের বিজ্ঞান, তর্ক আর মনুষত্যের রাস্তাতেই চলে। জীবিনকে তর্ক, জ্ঞান আর বিবেকের মাধ্যমেই চালানো উচিত, অন্ধ বিশ্বাসে না। এই বিশ্বাস আর অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে আমাদের মাঝে অনেক প্রকারের মানুষের সাথে দেখা হয়, পরিচয় হয়। তার মধ্যে একজন হয় বন্ধু। বন্ধুত্ব আমাদের জীবনের একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। আমরা আমাদের ভাল বা খারাপ সময়ের সময় আমরা এই বন্ধুগুলির মাঝেই থাকি। কিন্তু এই বন্দধুত্ত যদি কোনো ভুল মানুষের সাথে হয়ে যায়, তাহলে আমরা বিপদে মধ্যেও পড়তে পারি। কারন খারাপ সঙ্গের ফল খারাপই হয়। কেউ যখন কোনো খারাপ সংস্পর্শে চলে আসে, তখন তার শোধরানোটা এতো কঠিন হয়ে যায় যে, যখন আসলটা উম্মোচিত হয় তখন দেখা যায় কত ভয়ংকর সেটা। তখন নিজের কাছে নিজকে বড় বোকা মনে হয়। কারন মিথ্যে ভরসায় ভর করে কেউ যখন নিজের ইচ্ছায় সেই জায়গায় চলে আসে যেখান থেকে আর কেউ ফিরে না, তখন, বাকী ইতিহাস শুধু নীরব ইতিহাসই হয়ে থাকে। কখনো তা বাইরে আসে না। মিথ্যে চোখের জল একটা সময় আর কাজে লাগে না।
মেয়েরা আজো আমাদের সমাজে বোঝা। যাকে অন্যের বাড়িতে পাঠানোর জন্য আমরা অনেক কিছু করতে পারি। একটা বাবা মা যখন সন্তানের জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এটা বুঝতে না পারে, তাহলে সেই পরিবারে সেই সন্তান একটা অসুস্থ্য পরিবেশেই বড় হতে থাকে। আর অসুস্থ্য পরিবেশ শুধু সাস্থ্যইকেই ক্ষতি করে না, মনকেও। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের নিজের মনের আওয়াজ শোনা খুব জরুরী। তারা আসলে কি শুনতে পায় নিজের ভিতর থেকে? যদি সেই আওয়াজ মনের সাথে চিন্তার মিল না হয়, তাহলে সব সময়ই জন্ম হতে থাকবে একটা ভয়, একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যত।কারো ফিলিংস আর দায়িত্ববোধ দুটু যখন আলাদা আলাদা হয়, যদিও ব্যাপারটা আসলেই আলাদা, কিন্তু যখন এক মনে হবে, তখন সেতাই হচ্ছে কোনো মেয়ের জন্য সঠিক স্থান যেখানে সে পেতে পারে নিখাদ ভরষা। তখনই আসে একটা সরল জীবন। সরল জীবন আর উন্নত জীবন সবচেয়ে সুখের।
মানুষ যখন সব দিক থেকে সমস্যার সুম্মুখিন হয়, তখন সে মসজিদ মন্দিরে যায়। সব ধর্মস্থানেই মানুষ বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা নিয়ে যায়, কোনো রকম ভয় বা সন্দেহ ছাড়াই। ধর্ম সেটা যাইই হোক না কেনো, ধর্মস্থান যেটাই হোক না কেনো, শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস মানুষকে ঠিক সেখানে টেনে আনে। ধ্বনি বা গরীব প্রত্যেকের একটা কথাই মনে হয় যে তার সমস্ত সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র ঈশ্বর বা ভগবান করতে পারেন। তাদের যা কিছু চাই, ভগবান তা নিসচয় দেবেন। আর এই বিশ্বাস নিয়ে রোজ লক্ষ লক্ষ মানুষ, মন্দির, গির্জা আর মসজিদে যান, তাদের দুঃখ আর সমস্যা নিয়ে। প্রত্যেকেই তাদের ভগবানের কাছে কিছু না কিছু চান। কারো মনের শান্তি চাই, কারো টাকা পয়সা, কারো বা ভালোবাসা। আমি সব সময় চাই, তুমি ভালো থাকো, তুমি সুখী হও। আমি এই দোয়া সব সময় আমার ঈশ্বরের কাছেও করি, কারন তুমি সব কিছু ছেড়েই অতি ভরষা নিয়েই এই বয়সে সব ছেড়ে আমার কাছে এসেছো। আর আমিও এটাই বিশ্বাস করি যে, তুমি যা আমাকে দিয়েছো বা আমি যা দেখি তা নিখাদ। মানুষের জীবনে জীবনের অনেক কাহিনী থাকতে পারে যা রহস্যে ঘেরা থাকে। যখন কেউ এই রহস্য ঘেড়া চাদর সরাতে যান, তখন এমন এমন কিছু প্রশ্নের উদয় হতে পারে যা সাভাবিক জীবনের ভিত নড়ে যেতে পারে। কিন্তু আমি তোমার জীবনে কোন রহস্য ঘেরা অধ্যায় দেখতেও চাই না, রাখতেও চাই না। আর যদি কোনো রহস্য ঘেরা অধ্যায় থেকেও থাকে, আমি সেই অধ্যায় উম্মোচিত করতেও চাই না। আমার সে সময়টা আর নাই। কারন তোমার লাইফ নিয়ে আমি কোনোদিন রাজনীতি বা লীলাখেলা করতে চাই না। তোমার লাইফটা আমার কাছে অতোটাই ইম্পর্ট্যান্ট যতোটা ইম্পর্ট্যান্ট আমার পরিবারের সদস্যদের। আমি এখানে জোয়ার আর ভাটার কথা ভাবি না যে, আমি ভাটায় আর তুমি জোয়ারে, কিংবা আমি পূর্নিমায় আর তুমি অমাবশ্যায়। আমি তোমার জীবন থেকে চলে যাবার জন্যে আসি নাই। আর আমি এটাও ভাবি না যে, তুমি চলে যাবার জন্যই আবার নতুন করে ফিরে এসেছো। তুমি এটাতো ওই ২৪ দিনে অন্তত বুঝেছো যে, কেউ চলে যাবার পর কি পরিবর্তন নজরে আসে। আর এই পরিবর্তন সবার জন্য সব সময় সুখের না।
এ যাবতকাল যতো যুদ্ধ হয়েছে, সম্ভবত অতি অল্প সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশী এইড পেয়েছে ইউক্রেন। বিভিন্ন সময়ে বরাদ্ধ কৃত এইড মিলিয়ে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে ইউক্রেনকে দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্যাকেজ ছিলো আমেরিকার দেয়া এক কালীন ৪০ বিলিয়ন।
কিন্তু অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে- এই এইড কিভাবে ইউক্রেন কোথায় খরচ করছে তাঁর হিসাব নিতে পারছে না আমেরিকা। না তাদের কোনো একাউন্টিবিলিটি আছে। আমেরিকায় ক্রমবর্ধমান ইনফ্লেশন, বেবী ফর্মুলা, তেলের দাম, খাবারে দাম, অন্যান্য সব আইটেমের দাম এতোটাই স্কাই রকেটিং এ যাচ্ছে যে, এর মধ্যে আমেরিকান নাগরিকেরাই তাদের প্রশাসনকে কোথায় এতো টাকা দেয়া হয়েছে তাঁর হিসাব দিতে বলেছেন। নাগরিকেরা এখন অধইর্য হয়ে গেছেন এই ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য। দেশের ভিতরে বাইডেন প্রশাসন চাপের মুখে থাকায় বাইডেন প্রশাসন এবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীকে আপাতত এই ৪০ বিলিয়ন ডলারের খরচের খাতের হিসাব দিতে বলেছেন। কিন্তু জেলেনেস্কী এই তথ্য আমেরিকার কাছে দিতে অস্বীকার করেছেন।
এখন এই পর্যায়ে তিনটা প্রশ্নের অবতারনা হয়ঃ
(ক) হটাত করে কেনো বাইডেন প্রশাসন এখন এই টাকার খরচের খাত চেয়েছেন।
(খ) জেলেনেস্কীই বা কেনো এই খরচের খাতের হিসাব দিতে চাচ্ছেন না।
(গ) আসলেই এই টাকাগুলি গেলো কই?
নিউইয়র্ক টাইমসের সাবেক এক কর্মকর্তা এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছে যে, জেলেনেস্কী কেনো ইউক্রেন মিলিটারী অপারেশনাল পরিকল্পনা আমেরিকার সাথে শেয়ার করছে না? যদি ইউক্রেন তাদের এই মিলিটারী পরিকল্পনা আমেরিকার সাথে শেয়ার নাইবা করে, তাহলে কিভাবে কোথায় আমেরিকা ইউক্রেনকে কি দিয়ে টার্গেট বাতলে দিবে সেটাই তো সম্ভব না।
এ ব্যাপারে তিনি মন্তব্য করেছেন যে, প্রাথমিকভাবে মিডিয়ার কারনেই হোক অথবা প্রশাসনের অত্যাধিক ততপরতার কারনেই হোক, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় বেশীর ভাগ নাগরিকেরা এটাই চেয়েছিলো যে, আমেরিকা সবকিছু দিয়েও যেনো ইউক্রেনকে সাহাজ্য করে। রিপাবলিকানরাও সেটাই চেয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে এই ভাবনায় তাদের ছেদ পড়েছে। ৪০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার সময় মাত্র একজন এমপি ভেটো দিয়েছিলো কিন্তু বর্তমানে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন অস্ত্র এবং আরো এইড পাঠানোর ব্যাপারে এবার প্রায় ৫৭ জন এমপি ভেটো দিয়েছে। তারা বিব্রিতি দিয়েছেন যে, আগে যে এইড পাঠানো হয়েছে তাঁর একটা খাতওয়ারী হিসাব ইউক্রেনকে দিতে হবে।
ইক্রেনের প্রেসিডেন্ট সেই এইডের খাতওয়ারী হিসাব দিতে অস্বীকার করেছেন। আসলে যুদ্ধের প্রথমদিন থেকে বাইডেন প্রশাসন যে ভাবটা দেখিয়েছিলো সেটা হচ্ছে-ইউক্রেন যুদ্ধটা যেনো আমেরিকার নিজের যুদ্ধ। ফলে জেলেনেস্কী মনে করছে, সে বাইডেন প্রশাসনের হয়েই ইউক্রেন যুদ্ধটা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই তাঁর আবার হিসাব দেয়ার কি আছে? সে তো আমেরিকার হয়েই কাজ করছে!! জেলেনেস্কীর মধ্যে আরো একটা চিন্তা কাজ করছে বলে ধারনা করা হচ্ছে যে, বাইডেন প্রশাসন খুব একটা শক্ত না। তারা তো ইউক্রেনকে শক্ত করে হিসাব দেয়ার কথাও বলছে না। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে গেলেও যেনো এটা আমেরিকারই হার। আর আমেরিকাক্র হার না মানতে চাইলে তাদের জেলেনেস্কীকে দরকার। তাই তাঁকে সাহাজ্য করতেই হবে।
তারপরেও অন্ধকারে ঢিল মেরেছেন রিপাব লিকান এমপি মারজুরী টেলর গ্রীনি যে, সম্ভবত এই এইড প্যাকেজ মানি লন্ডারিং এর একটা অংশ। তাঁর ভাষায় যদি বলি সেটা এ রকম- The Georgia Republican said that federal lawmakers “fund nonprofits, they fund NGOs, they fund grants, grants that go to people, and if you really look into it, a lot of times it’s their friends and families that operate these nonprofits and NGOs, and it’s basically like money laundering schemes.” Greene, along with 56 House Republicans, has incessantly strived to block Biden’s efforts to lavish hard-earned American money on Ukraine. We do know that Ukraine has become a black hole of sorts. Ukraine is home to neo-Nazi groups, informal militias and non-State actors.
কয়দিন আগে several US intelligence experts বিবৃতি দিয়েছেন যে, “American military aid falling into the hands of non-state actors. Various US officials, policy, and defence analysts have raised concerns about the fact that some of these weapons may end up in the hands of militias that the US does not want to arm in the long run. So, American Dollars being exported to Ukraine could end up in hands of militias or get laundered for vested interests.
ইউক্রেন যুদ্ধটা যতো দীর্ঘায়িত হবে, তাতে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে যা এতোদিন হয়তো বড় বড় হোমড়া চোমড়ারা অতি গোপনে সুরক্ষিত রেখেছিলেন।
-https://tfiglobalnews.com/2022/06/11/ukraine-denies-to-furnish-any-information-about-the-usage-of-the-40-billion-sent-by-the-us/
“I’ll be there”. এই মাত্র তিনটি ইংরেজী শব্দের অর্থ করলে দাঁড়ায়, “আমি সেখানে তোমার পাশে আছি, যেখানে তোমার দরকার”। মাত্র তিনটি শব্দ কিন্তু এই তিনটি শব্দ আমাদের জীবনকে এবং জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত যতো পারষ্পরিক জীবন্ত মনুষ্য-উপাদান আছে, হোক সেটা বন্ধু-বান্ধব, হোক সেটা নিজের আত্মীয়স্বজন কিংবা হোক যে কোনো ক্ষনিকের পরিচয়ের কেউ, সবার জীবনকে এমন একস্তরে উপনীত করতে পারে যার প্রভাব শুধু সুদূরপ্রসারী নয় বরং চৈত্রের খরতাপ রোদের মাঝে যেনো কোনো এক মরুদ্যানের মতো প্রশান্তিমূলক এক বিশ্বয়ীক আনন্দে পথচলা প্রশস্থ নিরাপদ ভরষামুলক রাস্তা। এই তিনটি শব্দে আমাদের সম্পর্ককে যেমন মজবুত করে, তেমনি এই শব্দগুলির এমন কিছু ক্ষমতা রয়েছে যা নতুন বন্ধুত্তে শক্ত ভিত দেয়, পুরানো সম্পর্ককে আরো নতুন আঙ্গিকে বাড়িয়ে তোলে, ভাংগা কোনো সম্পর্ককে আবার নতুন ভাবে গড়ে উঠতে সাহাজ্য করে। মনে মনে চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন তো যে, কোনো এক মধ্যরাত্রীতে যখন আপনার কোনো এক অকস্মাৎ জরুরী সময়ে আপনি এক বন্ধুকে ফোন করে বললেন, আপনার আদরের সন্তানটি খুবই অসুস্থ, তাকে এখনই হাসপাতালে নেয়া প্রয়োজন। কোনো যানবাহন নাই কিংবা ধরুন আপনার প্রানপ্রিয় মা গুরুতর অসুস্থ, কিন্তু আপনি এতোটাই নার্ভাস অথচ পাশে কেউ নাই অথবা ধরুন তো, আপনি কোনো এক অচেনা জায়গায় শতমাইল দূরে আপনার গাড়িখানা নষ্ট হয়ে গেছে এবং আপনি এক শংকাজনক পরিস্থিতিতে আছেন, জরুরী উদ্ধারের খুবই দরকার। ঠিক এই সময়ে কারো কাছ থেকে যদি শোনেন, “I’ll be there” আপনি কি ভাবতে পারেন কতটা প্রশান্তি আর আপন মনে হবে কথাগুলি? মনে হবে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম উপহারের থেকেও এই তিনটি শব্দ আরো উত্তম। অসময়ে অথবা কঠিন সময়ে যিনি এই তিনটি শব্দ শোনলেন, আর যিন এই তিনটি শব্দ সত্যিকার অর্থেই “তার পাশে থাকবেন” বুঝালেন, এর থেকে উত্তম আর কোনো উপহার হতে পারে না। এই দেয়া নেয়ার মধ্যে তখন যা ঘটে তা হচ্ছে নতুন করে আবারো বন্ধুত্ত, নতুন আঙ্গিকে আবারো পুরাতন সম্পর্ককে জোরদার, এবং তার সাথে শতভাগ নিখুত নির্ভেজাল ভালোবাসা। Being there is at the very core of civility.
“I miss you”. ইংরেজী এই তিনটি শব্দের অর্থ যদি করি, তাহলে দারায়, “আমি তোমাকে বা আপনাকে খুব মিস করছি”। সত্যি বলতে কি, এই তিনটি শব্দের আক্ষরীক এবং সততার বহির্প্রকাশে হয়তোবা অনেক দাম্পত্য জীবন তিক্ততার পরিবর্তে অথবা বিচ্ছেদের পরিবর্তে বেচে যেত পারে বা পারতো, হয়তো এই তিনটি শব্দের বহির্প্রকাশে হাজার হাজার দাম্পত্য জীবনের ভিত আরো অনেক সিমেন্টেড হতো বা হতে পারতো বা হয়ও। এ রকম ক্ষমতাবান “I miss you” একটি কথা, আসলে তার পার্টনারকে, লাইফ পার্টনারকে এটাই উপলব্দিতে আনায় যে, আপনি তার কাছে কতটাই অপরিহার্য। আপনাকে সে মিস করছে, আপনাকে তার দেখতে ইচ্ছে করছে, তার মন আপনার জন্য খারাপ হয়ে আছে, সে আপনাকে ফিল করছে। ভাবুন তো একবার যে, আপনি যখন কাজের মধ্যে ডুবে আছেন, কিংবা অনেক ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, ঠিক তখন অপ্রত্যাশিত ভাবে আপনার পার্টনার বা স্ত্রী অথবা আপনার স্বামী শুধুমাত্র এই টুকু জানানোর জন্য কল করে বলছে, “I miss you”, ভালোবাসার স্থায়ী আধারকার সেই হৃদয় তখন প্রকম্পিতে হয়ে সমস্ত শরীর, মন, দেহ যেনো প্রশান্তিতে ভরে উঠে। দেখবেন, আপনার চোখ, আপনার ঠোট, আপনার হাসি সব কিছু এক নিমিষেই ভরে উঠবে। মনে হবে, জীবনটা সত্যিই আনন্দের।
“I respect You.” যার অর্থ হয় আমি আপনাকে সম্মান করি। এই যে “সম্মান করি”, এতে না তিনি অসম্মানীত হন, না যাকে বলা হলো তাকে প্রভু হিসাবে দলিল দেয়া হলো। সম্মান করি মানে হলো আমি তাকে সমানভাবেই আমার মতো করেই ভাবি। ধরুন আপনি আপনার ছোট সন্তানের সাথেই যদি কথা বলেন, সে যদি এডাল্ট একজন মানুষ হতো, তাহলে আপনি যদি এটাই প্রদর্শন করেন যে, আপনি তাকে সম্মান করেন, দেখবেন, শক্তিশালী বন্ধুত্তের পাশাপাশি আপ্নারা আরো বেশী কাছের মানুষ বনে গেছেন। অনেকে হয়ত এ কথাতাই এভাবে বলেন যে, মনে হয়, আপনি বা তুমিই ঠিক, বা আমি সম্ভবত ঠিক নই। দেখবেন, কোনো এক অমীমাংসিত কিংবা উত্তেজিত কোনো মূহুর্তে সম্পর্ক তিক্ততায় না গড়িয়ে অন্তত তাতক্ষনিক ইমোশনাল অসুস্থ পরিবেশকে একটা শান্ত সমঝোতার দরজায় পৌঁছে দিতে পারে।
Please forgive me আরেকটি মারাত্তক তিনটি শব্দ। অনেক ভাংগা সম্পর্ককে এই তিনটি শব্দ নিখুতভাবে জোরা লাগাতে যেমন পারে, তেমনি পারে ক্ষত বিক্ষত কোনো হৃদয়কে পুনরায় সুস্থ করে তোলতে। আমরা সবাই সব সময়ই কোনো না কোন জানা অজানায় ভুলের মধ্যে, ব্যর্থতার মধ্যে কিংবা অযাচিত সন্দেহের মধ্যে পড়তেই পারি। একটা মানুষ যখন ভুল করে, যখন নিজের কারনে, কিংবা অজানা কোনো কারনে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তার কখনোই নিজের এই দোষ স্বীকার করার মধ্যে লজ্জা পাওয়া উচিত নয়। আজ স্বীকার না করে বুদ্ধিমানের মতো আচরন না করে যদি কেউ Please forgive me বলে দোষ স্বীকার করে নেবার মানসিকতা দেখান, নিঃসন্দেহে তিনি গতকালের বুদ্ধিমান হবার ভান করার চেয়ে আজকের বুদ্ধিমান হবার সাহসীকতা অনেক বেশী।
Count on me, তেমনি আরো তিনটি জোরালো শব্দ যেখানে সবাই যখন হা ছেড়ে দিয়ে কোনো এক জটিল, অজানা কিংবা অনিশ্চিত বিষয় থেকে ওয়াক আউত করে বেরিয়ে যায়, অথচ Count on me বলা মানুষটি সেই হাল ছাড়া জটিল অনিশ্চিত বিষয়কে নিজের কাধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সমাধানের প্রত্যয়ে। লয়ালটি হচ্ছে বন্ধুত্তের সবচেয়ে বড় উপাদান। যাদের বন্ধুত্তের বন্ধন যতো বেশী উচু, তারাই দাঁড়িয়ে থাকেন Count on me বলে। ভাবুন তো একবার, যখন কঠিন কোন এক বিপদে আপনি হাবুডুবু খাচ্ছেন, কোনোদিক থেকেই কন আশ্বাস বা সাহাজ্যের চিহ্ন পর্যন্ত নাই, ঠিক তখন যদি আপনার কন এক বন্ধু বলে Count on me, কি প্রসাহ্নতিতে ভরে উঠে মন এবং জীবন!!
এ রকমের অনেক ছোট ছোট তিনটি শব্দ যা আমরা সবাই জানি কিন্তু আমরা তার প্রকৃত ব্যবহার করি না। অথচ আমার পরিবার, আপনার পরিবার, কিংবা আমাদের চারিদিকের যারা আমরা একে অপরের দ্বারা পরিবেষ্টিত, তারা হয়তো মাত্র এই সব কতিপয় ছোট ছোট মাত্র তিনটি শব্দ যেমন Let me help, Try for it, Go for it, I love you, God Bless You, দ্বারা পুরু জীবনটাকেই বদলে দিতে পারি।
আমরা আমাদের সন্তানদের ভালোবাসি কিন্তু কখনো তাদেরকে কাছে এনে কিংবা কাছে গিয়ে বলি না, আমি তোমাকে ভালবাসি অথচ ভালবাসি। যখন কোনো বন্ধু কোনো এক কনফিউশনের দার প্রান্তে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হিম শিম খাচ্ছে, তখন নিজের অভিজ্ঞতার আলকে হয়তো নিজের ঘাড়ে দোষ চলে আসতে পারে বিধায় বলছি না, Go for it অথবা Try for it. আমরা কাউকেই আমার মতো হউক সেতা জোর করাতে চাই না, কিন্তু আমি তো তাকে আইডিয়া দিতেই পারি, তাকে সাহস দিয়ে বলতেই পারি, জাষ্ট গো ফর ইট।
সম্পর্ক, একটা জটিল সমিকরন। এটা শুধু বিয়ের কবুলের মধ্যেই যেমন সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি সন্তান জন্ম দিলেই শুধু বাবা মা হয়ে উঠে না। প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা সপ্ন থাকে, আমরা প্রত্যেককেই তাদের সপ্নকে, তাদের ইচ্ছাকে সম্মান যেমন দেয়া জরুরি, তেমনি জরুরী তার সপ্নকে সার্থক করার জন্যে সর্বাত্তক সাপোর্ট যদি সেটা হয় কল্যানের আর সম্মানের।
“চলুন, বদলে চাই”।
আমাদের জন্যই আমরা বদলে যাই।
আমি অফিসে বসে ছিলাম। কাজের চাপ ছিলো বটে কিন্তু তারপরেও কাজের চাপ কমে এসেছিলো দুপুরের দিকে। ফ্যাক্টরীর সেলারী দিতে হবে, কাজ প্রায় সম্পন্ন। কফি পান করছিলাম। এমন সময় বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে মিটুল (আমার স্ত্রী) ফোন করলো। ফোন ধরলাম, তার কন্ঠ উৎকণ্ঠায় ভরপুর।
-শুনছো?
-কি শুনবো?
-আরে, ফাতেমা আপার জামাই দুদু ভাই মারা গেছেন।
-বললাম, কখন?
-এইমাত্র ওনার মেয়ে খালেদা জানালো যে, ওর বাবা মারা গেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
খারাপ লাগলো। কারন গতকালও আমি ওনার সাথে ফোনে কথা বলেছিলাম। বলেছিলো যে, ওনার শরীরটা বেশী ভালো নাই। অথচ আজকে ২৪ ঘন্টা পার হয় নাই, লোকটা আর এই প্রিথিবীতেই জীবন্ত নয়। এটাই জীবন। যার কোনো স্ট্যাবিলিটি নাই। কখন উনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সেতাও জানি না, আবার কেনো ভর্তি হয়েছিল সেতাও জানি না। দুদু ভাই হার্টের স্ট্রোকের কারনে মারা গেছেন বলে ডাক্তার জানিয়েছে।
দুদু ভাই আর ফাতেমার গল্পটা বলি।
১৯৭৬ সাল। আমি তখন গ্রামে। গ্রামের স্কুলেই লেখাপড়া করি। দেশের অবস্থা বেশ খারাপ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই, তার মধ্যে কয়েকদিন আগে শেখ মুজিব, যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাকে সামরিক অভ্যুথানে খুন করা হয়েছে। গ্রামের অনেক লোক বেকার, যে যেভাবে পারে কোনো রকমে দিন চালাচ্ছে। আমরা ৫ বোন আর মা এবং আমি। আমাদের সংসার যার প্রধান মানুষ আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ। তিনিও সাবলম্বি নন, স্টুডেন্ট থেকে সবেমাত্র ঢাকা ইউনিব্ররসিটিতে লেকচারার হিসাবে যোগ দিয়েছেন। কোনো রকমে আমাদের সংসার চলে। বাড়িতে এতোগুলি বোন আর আমি তো সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ি, এরকম একটা থমথমে দেশের পরিবেশে ভাইয়ার উপর লোড কম নয়। একদিকে নিরাপত্তা, আরেকদিকে জীবন ধারনের যুদ্ধ। হাবীব ভাই নিজেও তার ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিদেশে যাবেন বলে পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু বোনদের বিয়ে না দেয়া পর্যন্ত তার এই পরিকল্পনায় অনেক কঠিন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছিলো।
এই সময় দুদু ভাই প্রেমে পড়লেন আমার ৪র্থ বোন ফাতেমার সাথে। গ্রামে ওই সময় প্রেম করা একটা যেমন জঘন্য ব্যাপার বলে মনে করা হতো, তেমনি যারা প্রেম করছেন, তারাও অনেক অসুবিধায় থাকতেন। মনের তীব্র ইচ্ছা দেখা করার কিন্তু না আছে সুযোগ না আছে কোনো অনুমতি। ফলে চিরকুট, চিঠি ইত্যাদি দিয়ে যতোটুকু রোমাঞ্চ করা যায় সেটাই ছিল একমাত্র ভরষা। আমার ৩য় বোন লায়লার বিয়ে হয়ে গেছে, ১ম বোন সাফিয়ার বিয়ে ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। তার প্রথম স্বামী গত হয়েছেন। আমার মা, ফাতেমা আর দুদু মিয়ার প্রেমের এই গল্পটা ভাইয়ার কাছে একেবারেই গোপন করে রাখলেন। মায়েরও অনেক চিন্তা ছিলো তার মেয়েরদের জন্য ভালো পাত্রের ব্যাপারে।
দুদু ভাই তখন ফুটন্ত যুবক। দেখতে খুবই সুদর্শন আর স্মার্ট। বেকার ছেলে কিন্তু তার বাবার একটা মনোহরী দোকান ছিলো। তিনি হাপানীতে ভোগেন প্রায়ই। ফলে সবসময় বাজারের দিনে তিনি ঠিকমতো বাজারে গিয়ে পসরা বসাতে পারেন না। এই সুযোগে দুদু ভাই তার বাবার ব্যবসাটা দেখভাল করেন।
সময়টা ছিলো বর্ষাকাল। আমাদের গ্রামে বর্ষাকালে হাটে বাজারে যাওয়ার জন্য প্রতিটি গ্রাম থেকে নৌকা বা কোষা লাগতোই কারন বর্ষাকালে গ্রামের একদম কিনার পর্যন্ত পানিতে ভরপুর থাকতো। আমাদের নিজস্ব কোনো নৌকা বা কোষা নাই। ফলে যখনই কোনো নৌকা বা কোষা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়া বাজারে যেতো, আমি ওইসব নৌকা বা কোষায় অনুরোধের ভিত্তিতে উঠে যেতাম। দুদু ভাইদের যেহেতু দোকানের অনেক মাল নিয়ে হাটে, বাজারে যেতে হয় পসরা সাজানোর জন্য, ফলে তাদের একটা নিজস্ব নৌকা ছিলো। ঘোষকান্দা থেকে বিবির বাজারে যেতে হলে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতে হয়। ফলে দুদু ভাইদের নৌকা করেই আমি বেশীর ভাগ সময় হাটের দিন আমি হাটে যেতাম। আর দুদু ভাই যেহেতু ফাতেমার সাথে একটু ভাব আছে, তিনিও চাইতেন যেনো কোনো ছলেবলে তার নৌকা আমাদের ঘাটে ভিরুক। তাতে হয়তো কখনো কখনো ফাতেমার সাথে দুদু মিয়ার ক্ষনিকের জন্য হলেও চোখাচোখি হয়। এটাই প্রেম। এভাবে অনেকদিন চলে যায়।
মা একদিন হাবিব ভাইকে ব্যাপারটা খুলে বলেন। আমি ঠিক জানিনা কেনো বা কি কারনে হাবীব ভাই দুদু ভাইদের পরিবারটাকে পছন্দ করতেন না, সে রহস্য আজো আমার কাছে অজানা। হাবীব ভাই ফাতেমার সাথে দুদু মিয়ার বিয়েতে কিছুতেই রাজী ছিলেন না। কিন্তু মায়ের জোরাজোরিতে এবং ফাতেমার প্রবল ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত হাবীব ভাই এই বিয়েতে রাজী হলেন। আমার ধারনা, হাবীব ভাই আরেকটা কারনে তিনি রাজী হয়েছিলেন, আর সেটা হচ্ছে, যেহেতু হাবিব ভাই নিজেও ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে চান, এবং তার আগে সব বোনদের বিয়ের ব্যাপারটা নিসচিত করতে চান, ফলে যেমনই হোক, ফাতেমার একটা গতি হচ্ছে এটা ভেবেও দুদু মিয়ার সাথে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশী বাড়াবাড়ি করেন নাই। কিন্তু তিনি যে নিমরাজী এটা ভালভাবেই হাবিব ভাই প্রকাশ করতে পেরেছিলেন।
অন্যদিকে দুদু মিয়ার খুব একটা মনোযোগ ছিলো না কোনো কাজেই। না বাবার ব্যবসা, না অন্য কিছুতে। ফলে দুদু মিয়ার বাবাও এই মুহুর্তে সে বিয়ে করুক এটাও রাজী ছিলেন না। আরো একটা কারন ছিলো দুদু মিয়ার বাবার এই বিয়েতে রাজী না হবার। আর সেটা হচ্ছে যে, আমাদেরর গ্রামে সব সময়ই ছেলেরা যখন বিয়ে করে, তখন তারা নির্লজ্জের মতো কনে পক্ষ থেকে মোটা দাগে একটা যৌতুক দাবী করে এবং পায়ও। দুদুর বাবাও এ রকমের একটা পন আদায়ের লক্ষে ছিলেন কিন্তু হাবিব ভাইয়ের এক কথা, কোনো যৌতুক দিয়ে আমরা বোনের বিয়ে দেবো না। ফলে দুদু ভাইয়ের বাবারও এই বিয়েতে মতামত ছিলো না। অথচ শেষ পর্যন্ত বিয়েতা হয়েছিলো। দুদু মিয়ার এক্ষেত্রে আমি একটা ধন্যবাদ দেই যে, সে তার বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও অনড় ছিলো যে, যৌতুক বা পন বুঝি না, আমি ফাতেমাকেই বিয়ে করবো। গ্রামে এ ধরনের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্তের বড় অভাব। কিন্তু দুদুর মধ্যে এই সাহসটা ছিলো। ফলে ফাতেমার সাথে দুদুর বিয়ে হলো ঠিকই কিন্তু তার বাবা, বা মা, কিংবা অন্যান্য আত্তীয় সজনেরা এই বিয়েটায় তারা লস করেছে বলে ধরে নিয়েছে। আর এই লসের কারন ফাতেমা। এতে যা ঘটলো তা হচ্ছে, ফাতেমাকে শসুড়বাড়ির অনেক বিড়ম্বনার মুখুমুখি হতে হয়েছে। বিয়েটাকেই টিকিয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো ফাতেমার। কিন্তু আমি আজ দুদু মিয়াকে অনেক ধন্যবাদ দেই যে, যদি দুদু মিয়া বলিষ্ঠ না হতো, তাহলে ফাতেমার পক্ষে ওই বাড়িতে টিকে থাকা সম্ভব হতো না। একটা সময় ছিলো যে, দুদু মিয়া শুধুমাত্র ফাতেমার কারনে তাকে তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে উৎখাত হতে হয়েছিলো। আর তখন ফাতেমা আর দুদু মিয়া আমাদের গ্রামের বাড়িতেই থাকা শুরু করেছিলো। এই থাকা অবস্থায় ফাতেমার সব সন্তানদের জন্ম হয়।
দেশের ক্রমবর্তমান খারাপের কারনে দেশে কোনো কাজ নাই। এদিকে দুদুর বাবার ব্যবসাটাও আর তার হাতে নাই। আমাদের গ্রামে তখন দলে দলে লোকজন দেশের বাইরে যাবার হিরিক পড়েছে। কেউ সৌদি, কেউ কুয়েত, কেউ লিবিয়া, কেউ ইতালি আবার কেউ কেউ যেখানে পারে সেখানে। দুদু ভাইও সে লাইনে পড়ে গেলো। বেশ টাকার প্রয়োজন, অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। দুদু ভাই নিজের বাবাকে পটিয়ে, কিছু আমাদের থেকে আবার কিছু লোন নিয়ে শেষ অবধি সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন। পিছনে রেখে গেলো ফাতেমাকে, তার ছেলে ফরিদকে, মেয়ে সালেহা, খালেদা আর ছেলে কামাল এবং জামালকে।
কিন্তু যে লোক আরাম প্রিয়, ভারী কাজে অভ্যস্থ নয়, তার পক্ষে ওই সৌদি আরবের গরম বালুর জমিনে, গরু মহিষ চড়ানো কিছুতেই ভাল লাগার কথা নয়। তারমধ্যে এম্নিতেই সৌদি লোকজন ৩য় দেশের বিশেষ করে বাংলাদেশের শ্রমিকদেরকে মিসকিন হিসাবে ট্রিট করে। দুদু মিয়া স্বাধীনচেতা মানুষ, আরামপ্রিয় মানুষ, তার কত টাকা ক্ষতি হলো বা ক্ষতি হচ্ছে এসবের কোন বালাই ছিলো না। তিন মাস না যেতে যেতেই দুদু মিয়া পুনরায় বাংলাদেশে চলে এলেন। এই ঘটনায় দুদু মিয়ার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেলো। যেটুকু ভরশা তার বাবা তার উপর করেছিল এবং কিছু লাভের আশায় যে কয়টা টাকা দিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছিলো, পুরুটাই গচ্চা যাওয়ায় দুদু মিয়ার বাবা এবার তাকে মুটামুটি ত্যাজ্য করার মতো অবস্থায় চলে গেলো। দুদু মিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলো, আর দুদু মিয়া কোথাও কোনো জায়গা না পাওয়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতেই স্থায়িভাবে উঠে গেলো।
আমাদের বাড়িটা বড়ই ছিলো। আর যেহেতু মা থাকেন, ফলে আমরা আপাতত মাকে দেখভাল করার জন্য যে একজন লোকের দরকার ছিলো সেটা অন্তত পেলাম। ফাতেমাই মার দেখভাল করেন। মার খাওয়া দাওয়ার খরচ আমরাই দেই কিন্তু ফাতেমা আমাদের বাড়িতে থাকায় মার কখন কি লাগবে, সেটায় ফাতেমাই টেককেয়ার করে। কিন্তু সংসার চালানোর জন্য তো ফাতেমার একটা স্থায়ী সোর্স থাকা দরকার। কখনো আমরা কিছু সাহাজ্য করি, কখনোও দুদু মিয়াও কোথা থেকে কিভাবে টাকা আনে আমরা জানিও না। শুনলাম, দুদু মিয়া একটা আদম ব্যবসা খুলেছে। মানে লোকজনকে বিদেশ পাঠানো। তার সাথে আমাদের গ্রামের একজন লোক পার্টনার হিসাবে আছে। প্রথম প্রথম মনে হলো ব্যবসাটা ভালোই চলছে। কিছু কিছু লোকজনকে তো দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে। আবার নতুন লোকের লাইন হচ্ছে, টাকা আসছে। কিন্তু সুখ তার বেশীদিন টিকে নাই। আদম ব্যবসা যারা করেছে, সব সময় এটায় কোনো না কোনো দুই নম্বরী কিছু ছিলোই। কেউ হয়তো সাফল্য পেয়ে তাদের মাধ্যমে বিদেশ চলে যেতে পারছে আবার কেউ মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও বিদেশ যেতে পারছিলো না অথচ টাকা পরিশোধ করা আছে। এ রকম করতে করতে প্রায় অনেক বছর কেটে গিয়েছিলো। পাওনাদাররা এসে ঝামেলা করে, থ্রেট দেয়, ফাতেমাকে পর্যন্ত শাসিয়ে যায়, মামলা করে, আবার কেমন করে যেনো এসব ঝামেলা থেকে দুদু মিয়া পারও পেয়ে যায়।
আমি তখন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। এ রকমের বহু কেস আমার কাছেও এসেছে। কিন্তু সমাধা করতে গিয়ে দেখেছি, দোষটা এই আদম ব্যবসা কোম্পানীর, সাথে দুদু ভাইদের। আমার পক্ষে আনইথিক্যাল করা কিছু সম্ভব হয় নাই বটে কিন্তু আমি সেনাবাহিনীতে আছি এই নাম ভাংগিয়ে দুদু ভাই এবং তার পার্টনার অনেক ফায়দা তো অবশ্যই নিয়েছেন। আমি কখনো এসব নিয়ে না মাথা ঘামিয়েছি না কেউ এলে আমি তার পক্ষে বিপক্ষে কোনো একসানে গিয়েছি।
দুদু ভাইয়ের সন্তানেরা ততোদিনে বড় হয়ে গেছে। বড় ছেলে ফরিদ খুব হিসেবি। নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করছে কিন্তু খুটিতে জোর না থাকলে সব সন্তানের ভাগ্য অতোটা বেড়ে উঠে না যতোটা তার প্রাপ্য। কিন্তু আমি ফরিদের উপর অনেক সহানুভুতিশীল ছিলাম। আমারো ওই রকম ইনকাম নাই যে, যা লাগে সাপোর্ট করতে পারি। ফরিদের গল্পটা পড়ে লিখবো।
দুদু ভাই যতোটা কামাই করে নিজের পরিবারকে সাহাজ্য করতে চান, দেখা গেলো, তার থেকে বেশী ঝামেলায় পড়ে আরো বেশী ক্ষতিপুরন দিতে হচ্ছে। হাত খোলা লোক। যখন টাকা আসে, মনে হয় কতোক্ষনে টাকাটা খরচ করবে। কিন্তু যখন থাকে না, তখন গোল্ডলিফ বা বেনসন সিগারেটের পরিবর্তে স্টার সিগারেটও তিনি খেতে পারেন। লোকটার কথায় আশ্বাস পাওয়া যায় কিন্তু সেই আশ্বাস কতোটা নির্ভরযোগ্য, সেটা অনেকবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে দেখা গেছে। ফলে, একটা সময়ে, তার সন্তানেরা, তার স্ত্রী ফাতেমা সাফ বলে দিয়েছিলো যে, তার কোনো রোজগারের দরকার নাই, শুধু ঝামেলার কোনো কাজে না গেলেই হলো। এভাবেই দুদু ভাই সংসার দেখে, ফরিদ বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়, আরো এক ছেলে কামালও কুয়েতে থাকে, সেও পাঠায়। তারা ভালোই ছিলো। হজ্জ করেছে, গ্রামে তার একটা পজিশন তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলো শেষ বয়সে হলেও।
আসলে, মানুষ যখন একা একা অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে নিজেকে বাচাতে হয়, তখন অনেক সময় কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়, কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত না, এই বিচারে আর যাই চলুক জীবন চলে না। কেউ নিজের থেকে খারাপ কিংবা বদনাম কুড়াতে চায় না। বেশীরভাগ মানুষ পরিস্থিতির শিকার। দুদু ভাই খারাপ লোক ছিলেন না। তার অন্তর বড় ছিলো, তার প্রতিভা ছিল। কিন্তু গরীবের ঘরে সবসময় প্রতিভা আলোকিত হয় না। এটা সেই ফুটন্ত ফুলের মতো, পরাগায়ন না হবার কারনে অকালেই ফল হয়ে না উঠে ঝরে যাওয়ার কাহিনী। এটা কার দোষ? দুদু ভাইয়ের নাকি তার পরিবারের নাকি আমাদের এই ভারসাম্যহীন সমাজের?
অনেক লম্বা একটা সময় দুদু ভাই ছিলো আমাদের সাথে। অনেক রাগ করেছি, বকা দিয়েছি, মাঝে মাঝে আবার ভালোবাসায় আগলেও রেখেছি। আজ প্রায় ৭০ বছর বয়সে এসে দুদু ভাই সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। উনার লাশটা যখন আমার ফ্যাক্টরীর সামনে এসে থামলো, একটা লাশবাহী গাড়িতে কাপড়ে মোড়ানো ছিল দুদু ভাই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রামে নিয়ে যাবার সময় আমি তার ছেলে জামাল এবং ভাতিজা আরশাদকে বলেছিলাম যেনো ফ্যাক্টরীর সামনে থামায়। কিছু খরচাপাতি ব্যাপার আছে, যাওয়ার সময় ওদের হাতে তুলে দেবো। কারন এই মুহুর্তে এটা খুব দরকার।
দুদু ভাই অনেকবার আমার এই ফ্যাক্টরিতে এসেছিলেন। খাওয়া দাওয়া করেছে আমার সাথে, হেটে হেটে ঘুরে ঘুরে দেখেছে আমার ফ্যাক্টরি। গত মার্চ মাসেও একবার আমার এই ফ্যাক্টরীতে এসেছিলো খালেদাকে নিয়ে, মিজান (খালেদার জামাই) ছিলো, মিজানের আব্বা, মিজানের চাচা এবং জেঠারা ছিলো। খালেদা ছিলো, জামাল ছিল। একসাথে খেয়েছি। অথচ আজ, দুদু ভাইয়ের কোনো ক্ষমতা নাই লাশবাহী গাড়ি থেকে নেমে আমার সাথে একবার দেখা করেন, তার কোনো শক্তি নাই আরো একবার আমার ফ্যাক্টরীর নতুন মেশিনগুলি হেটে হেটে ঘুরে ঘুরে দেখার। তার এই দুনিয়ার সাথে সমস্ত নেটওয়ার্ক ছিন্ন করা হয়েছে। এই পৃথিবীতে তারজন্য আর কোনো অক্সিজেন বরাদ্ধ নাই, তার পায়ের শক্তি রহিত করা হয়েছে, তিনি আর এই বাজ্যিক পৃথিবীর কেউ নন। উনাকে আমরাও আর আটকিয়ে রাখার কোনো ক্ষমতা নাই, রাখাও যাবে না। লাশবাহী গাড়িটার সামনে গিয়ে দাড়ালাম, দুদু ভাই সাদা একটা কাপড়ের ভিতর একটা জড়ো পদার্থের মতো শুয়ে আছেন গাড়ির সিটের নীচে। যে লোকের জীবন্ত অবস্থায় সিট বরাদ্ধ ছিলো, আজ তার স্থান গাড়ির সিটের নীচে। এটাই জীবন। লাশবাহী গাড়ি চলে গেলো গ্রামের পথে।
তার বড় ছেলে ফরিদের সাথে কথা হল। ফরিদ জাপানে থাকে। বর্তমানে করোনার মহামারী চলছে সারা দুনিয়াব্যাপি। জাপানের সাথে এই মুহুর্তে আমাদের দেশের বিমান চলাচল সাময়ীকভাবে বন্ধ আছে। কিন্তু যদি কেহ আসতে চায়, তাহলে ইন্ডিয়া হয়ে হয়তো আসা যাবে। ফরিদ তার বাবাকে দেখতে ঢাকায় আসতে চাচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হল, এটা ঠিক হবে না। কারন কোনো কারনে যদি ফরিদ ঢাকায় চলে আসতেও পারে, বলা যায় না, করোনার মহামারীর কারনে বাংলাদেশ সরকার বিদেশ ফেরত যাত্রী হিসাবে ফরিদকে ১৫ দিনের কোয়ারেন্টাইন করে ফেললে ফরিদের পক্ষে আরো ১৫ দিন গ্রামেই আসা হবে না। আর যদি লাশকে এখন আবার ঢাকায় কোনো হাসপাতালে মর্গে রাখতেও যায়, দেখা যাবে কোনো হাসপাতাল সেটা নাও রাখতে পারে। আবার যদি লাশ রাখাও যায়, ফরিদকে কোনোভাবে এয়ারপর্ট থেকে কোয়ারেন্টাইন ছারাও গ্রামে আনা যায়, তাহলে ফরিদের জাপানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারেও একটা করাকড়ি থাকতে পারে। আবার এই মুহুর্তে আগামী ৩ দিনের মধ্যে কোনো ফ্লাইটও নাই। সব মিলিয়ে আমি ফরিদকে ঢাকায় আসতে বারন করে দিলাম। ফরিদের না আসার সিদ্ধান্তটা যখন কনফার্ম করা হলো, আমি গ্রামের উদ্ধেশ্যে রওয়ানা হলাম দুদু ভাইকে কবর দেওয়ার জন্য। আমি যখন গ্রামে পৌঁছলাম, তখন রাত প্রায় পৌনে আটটা। গ্রামে ফাতেমাকে দেখলাম, ওর অন্যান্য সন্তানদের সাথে কথা বললাম। সবার মন খারাপ, কান্নাকাটি করছে। দুদু ভাইয়ের লাশ ঘিরে অনেক মানুষ উঠানে খাটিয়ার পাশে জড়ো হয়ে বসে আছে।
জন্ম আর মৃত্যুর মধ্যে একটা ভীষন মিল আছে। জন্মের সময়ে নতুন অতিথির চারিদিকে যেমন বাড়ির সবাই বসে হাসিমুখে বরন করে নেয়। এই নতুন অতিথির আগমনে যেমন সবাই বাড়িভর্তি মানুষের ভীড় লেগে যায়, ঠিক তেমনি মৃত্যুর সময়েও বাড়িভর্তি মানুষের ভীড় জমে যায়। কিন্তু এ সময়ে সবাই থাকে ভারাক্রান্ত আর শোক বিহব্বল।
আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন, রাত বেড়ে যাচ্ছে, কবর এখনো খোড়া শেষ হয় নাই। রাতে এশার নামাজের পর জানাজা হবে। এশার নামাজ হবে রাত নয়টায়। ফরিদের শ্বশুর মোল্লা কাকা বাকী সব সামলাচ্ছেন। গোসল, কাফন আর যাবতীয় সব। মাঝে মাঝেই কেউ কেউ উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করছে। কেউ কাদতেছে কাদতে হবে বলে। ফলে উচ্চস্বরেই সে তার সেই বিলাপ লোক সম্মুখে জাহির করার অভিনয়ে এটাই বুঝাতে চাইছে, দুদু মিয়ার শোকে সে এতোটাই বিহব্বল যে, তার বুক ফাটছে, তার অন্তর কাদছে ইত্যাদি। কিন্তু আমার চোখে এই মিথ্যা কান্নাটা ধরা পড়েছে। কিন্তু তারপরেও কাদুক। আবার কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলছে, তার এই কান্না অন্তরের ভিতর থেকে। নিঃশব্দ কান্নার কষ্ট হাহাকার করে কান্নার থেকেও অধিক কষ্টের।
ফাতেমা কাদছে নিঃশব্দে, আমাকে দেখে একটু উচ্চস্বরে কান্নার উপক্রম হয়েছিলো, বুঝলাম আবেগ। হবেই তো। নিজের লাইফ পার্টনার চলে গেছে। খারাপ হোক ভালো হোক, একজন লোকতো ছিল যার সাথে অভিমান করা যায়, যার কাছে অভিযোগ করা যায়। আজ সে চলে গেছে। প্রায় ৪৪ বছরের পার্টনারশীপ লাইফে কত কথাই না লুকিয়ে আছে ফাতেমার জীবনে। এই সংসার গুছাইতে কতই না সময় ব্যয় করেছে ওরা।
বললাম ফাতেমাকে- আজ তুমি একা কিন্তু একা নও। আমরা তো আজীবনই ছিলাম, এখনো আছি। নিজের উপর যত্ন নিও, আর কখনো ভেবো না যে, তুমি একা হয়ে গেছো। ভাই আর বোনের সাথে তো নাড়ির সম্পর্ক। তুমি ভাল থাকবা, মনের জোর রাখো আর দোয়া করো এইমাত্র চলে যাওয়া মানুষটার জন্য যার সাথে তুমি নির্দিধায় অন্ধকারেও হাতে হাত ধরে রাস্তা পার হতে পেরেছিলা। আজ তোমার দোয়া তার জন্যে সবচেয়ে বেশী দরকার। মনটা আমারো খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো ফাতেমার চোখের জল দেখে। আজ অনেকদিন পর সেই কথাটা মনে পড়লো-
যদি কখনো তোমার কাদতে ইচ্ছে করে, আমাকে ডেকো,
আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমাকে হাসাতে চেষ্টাও করবো না।
কিন্তু আমি তোমার সাথে কাদতে পারবো।
যদি কখনো তোমার কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, আমাকে ডেকো
আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমাকে একটুও বাধা দেবো না
কিন্তু আমি তো তোমার সাথে হারিয়ে যেতে পারবো।
যদি কখনো তোমার কারো কথাই শুনতে ইচ্ছে না করে, আমাকে ডেকো
আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমার সাথে কোনো কথা বল্বো না, নিসচুপ থাকবো।
কিন্তু কখনো যদি তুমি আমাকে ডেকেছো কিন্তু আমার কাছ থেকে কোন সাড়া পাও নাই,
তুমি এসো
হয়তো সেদিন সত্যিই তোমাকে আমার প্রয়োজন।
ফিরে এলাম। জানাজায় শরীক হতে পারি নাই। অনেক রাত হয়ে যাবে। আর সারাটা বাড়িতে এতো বড় করোনার মহামারী সত্তেও কারো মুখে মাস্ক নাই। খুব অসস্থি বোধ করছিলাম।
গাড়িতে উঠে বারবার দুদু ভাইয়ের কথাই মনে পড়ছিল। আজ থেকে আমি ইচ্ছে করলেও তার মোবাইল নাম্বারে ফোন করে কথা বলতে পারবো না। ইচ্ছে করলেও কোনো কারনে বকাও দিতে পারবো না। তিনি আজ সব কিছুর উর্ধে।
আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো যার কাছ থেকে এসেছিলাম। আজ থেকে ৫০ বছর কিংবা ১০০ বছর পর হয়তো কেউ জানবেও না, দুদু নামে কোনো একজন আজ তিরোধান হলো। এই তিরোধানের প্রাকটিস যুগে যুগে সব সময় হয়ে এসেছে, হবেও। আমরা সময়ের স্রোতে একে একে হারিয়ে যাবো। কারন আজ থেকে শত বর্ষ আগেও এখানে এমন দুদু, এমন আখতার, এমন ফাতেমারা এসেছিলো। আজ তারা কেহই নাই। তাদের কোনো ইতিসাহও কোথাও লিখা নাই। আর যেখানে লিখা আছে, তা ঈশ্বরের কাছে। সেখানে আমাদের কোনো পদচারনা নাই।
আল্লাহ আপনার জন্য জান্নাত বরাদ্ধ করুন।
প্রতিটি মহামারী, প্রতিটি দূর্যোগ প্রতিবার সমাজে একেকটা শিক্ষা নিয়ে আসে। কিছু দূর্যোগ শিক্ষা দেয় সমাজকে একত্রে বসবাস করার, কিছু শিখায় ধইর্য, আবার কিছু শিখায় ঈসশরকে যেনো ভুলে নাই তা। কিন্তু এবার করোনা ভাইরাস আমাদেরকে যে শিক্ষা দিলো, তার থেকে আদৌ আমরা কিছু শিক্ষা নিলাম কিনা কে জানে। এই পৃথিবীর ভুখন্ড কে নিয়ন্ত্রন করলো, আর কে কাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারলো, কোন ধর্মালয়কে কেনো কি কারনে খুলে দিলো, কতদিন পর খুলে দিলো, কার বিশ্বাস কোথায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত ঠেকলো, এসব বিষয়ের বাইরেও আমি যেটা শিক্ষা পাইলাম তা হলো, আমরা সবাই একা এবং কেউ কারো জন্যই না।
একজন জীবিত মানুষের যে মুল্য, পরক্ষনেই সেই জীবিত মানুষটি যে এতো সস্তা এবং অবহেলিত, এটা আমার চোখে এবার খুব করে ধরা পড়লো। এই দুনিয়ার কোনো ধন সম্পদ, টাকা পয়সা কিংবা পজিশন কোনো কিছুই কারো কাছে মুল্য নাই। হোক সে দেশের প্রধান কর্মকর্তা, হোক সে সমাজের প্রধান কিংবা হোক সে বাড়ির কোনো হর্তাকর্তা। নিজের জীবনের যখন কারো হুমকী আসে, সে যতো ছোটই হোক বা বড়, তার নিজের হিসাব একেবারেই আলাদা। অন্য কোনো হোমরা চোমরা যেই হোক, যে যতো প্রতাপশালিই হোক, যে যতো সম্মানীয়ই হোক, যার যতো পয়সাই থাকুক, করোনা এই শিক্ষাটা চোখের মধ্যে আংগুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলো, আপনি আমার প্রিয় স্বামী ছিলেন তো কি হয়েছে? আপনার করোনা, তাই আমি আপনার সাথে এক বিছানায় ঘুমাইতে পারবো না। আপনি দেশের প্রধান কর্তা তো কি হয়েছে? আপনার করোনা হয়েছে, তাই আপনার ধারে কাছেও আমি যাবো না। যদিও যাই, তাহলে আমি এমনভাবে যাবো যেন আপনার কোনো কিছুই আমার ধারে কাছেও স্পর্শ না করে। দূর থেকে এবং ইশারায় কথা হবে আপনার সাথে আমার। কিন্তু আপনি তো কথাও বলতে পারবেন না, কারন আপনার কন্ঠনালি রুদ্ধ। আপনি ধর্মজাজক, তো কি হয়েছে? আপনার করোনা হয়েছে, আপনার কাছে বসে আমি ধর্মের কোনো বানিও শুনতে ইচ্ছুক নই। আপনি করোনায় মরবেন, তো আমি কি করবো? আমি আপনার জন্য দূর থেকে চোখের জল ফেলবো কিন্তু কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরবো না। এমন কি আপনার জানাজার জন্য কোনো লোকও পাবেন না। আপনি সমাজে এইডস রোগীর থেকেও খারাপ। আপনি দিনরাত পরিশ্রম করে এতো অঢেল পয়সা সঞ্চয় করে গেলেন আপনার এতো আদুরে বাচ্চাদের জন্য, তো কি হয়েছে? আপনার করোনা, তাই, আপনাকে আর আমাদের দরকার নাই। যদি বলেন যে, সমস্ত সম্পত্তি আমার জন্য আপনি বিলিয়ে দেবেন, তারপরেও আমি আপনার সাথে একা ঘরে আপনার জন্যে সময় দেবো না।
বিশ্বাস হয় না? খালী একবার মুখ ফুটে মিথ্যা মিথ্যাই বলুন এবং করোনা রোগীর মতো অভিনয় করুন যে, আপনার করোনা হয়েছে, তারপরের ইতিহাসটা নিজের চোখেই দেখুন।
করোনা এটাই বুঝিয়ে গেলো, আমি আপনি সবাই একাই। হিসাবটা পরিষ্কার।
তুমি মাঝে মাঝে আমাকে প্রশ্ন করো না যে, আমি এতো বুঝি কেনো? এতার অনেক কারন এবং ইতিহাস আছে।
মাঝে মাঝে আমার সাফল্যের দিকে তাকালে আমার নিজের ভাল লাগলেও কেনো জানি এটাও মনে হয়, আমার এই সাফল্যের দরকার ছিলো না। আমার আজকের দিনের সাফল্য না হলে সবাই একটা গন্ডির মধ্যে থাকতো। জীবন নিয়ে ভাবতো। চিন্তা করতো। অভাব মানুষকে একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে একত্রে বসবাস করতে বাধ্য করে। ওর আচরন ইদানিং আমার কাছে অনেক উদ্দত্যপূর্ন মনে হয়। কোনো কিছুই বলা যায় না। আর্গুমেন্ট আর যুক্তির যেনো কোনো শেষ নাই। আমি আসলে ওর উপরে আমার কমান্ড এক প্রকার হারিয়েই ফেলেছি বলা চলে। আমার কোনো সুখের কথা, ভালো লাগার কথা, আমার কোনো সাফল্যের কথা, আমার কোনো কষ্টের কথা আজকাল ওর সাথে শেয়ার করা খুব মুষ্কিল। তার এসব শোনার কোনো যেমন সময় নাই, তেমনি ইচ্ছাও নাই বলে মনে হয়। কবে শেষ আমি আমার জীবনের একান্ত কিছু কথা ওর সাথে শেয়ার করতে পেরেছি , সেটা আর মনে পড়ে না। এর জন্য দায়ী আমি নিজেও। কিন্তু আমার কোনো অনুশোচনা নাই। ও নিজেও আসলে আমার অনেক কিছুই জানে না। এটা ওর ব্যর্থতা। ধীরে ধীরে মানুষ যখন কারো কম্পেনিয়ন থেকে সরে যেতে থাকে, তখন, অনেক কাছে থেকেও সে অনেক দূর। এই কাছে থাকার কোনো মানে হয় না যখন অন্তরে অন্তর লাগিয়ে কোনো কথা হয় না। তার থেকে বিস্তর দূরে থাকা এক প্রকার শান্তনাও ভাল।
তবে একটা অভিজ্ঞতা বলছি যে, মহিলাদের আর্থিক সাধীনতা যখন পরিপূর্ন হয়ে যায়, তখন তারা অনেক দেমাগী হয়ে উঠে। আর্থিক সাবলম্বিতা একটা নারী স্পেসিসকে অনেক বেশী ইমব্যালান্স করে দেয়। নারী স্পেসিসরা অতক্ষন পর্যন্ত ক্রিয়েটিভ, যতক্ষন পর্যন্ত তার কাছে নিয়ন্ত্রিত কমান্ড, ফান্ড, এবং রিসোর্স থাকে। যখনই এই জিনিষগুলি অঢেল আকারে হাতে চলে আসে, তখনই সে খেই হারিয়ে ফেলে বলে আমার ধারনা। ওর বেলায়ও আমার কাছে তাই মনে হচ্ছে। একা থাকা যায়, আর সেই একা থাকার জন্য যা যা লাগে এটা যখন নিশ্চিত হয়ে যায়, দেখা যায় মহিলা স্পেসিসরা অনেক বেপরোয়া হয়ে উঠে। তারা সাধারনত একা থাকাকে ভয় পায় না। বরং কারো চাপ নাই এটা ভেবে এক প্রকার শান্তিতেই থাকে। ব্যাপারটা আমি মাঝে মাঝেই উপলব্দি করি। কিন্তু আমি আবার ভুলে যাই। যদিও ভুলে যাই, তারপরেও আমার মধ্যে একটা ট্রান্সফর্মেশন হচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে পরিবর্তীত হচ্ছি। হয়তো আরো সময় লাগবে।
আমার কিছু কিছু দায়িত্ত ছিলো। বিশেষ করে সংসারের জন্য। আমার এই দায়িত্ত প্রায় শেষের পথে। আমি ওকে সাবলম্বি করে দিয়েছি, মেয়েকে ডাক্তারী পড়িয়েছি। ছোট মেয়ে এখনো পাইপ লাইনে। তারপরেও হিসাব করলে দেখা যায়, সিংহভাগ দায়িত্ত প্রায় শেষ। এখন কে কিভাবে তাদের লাইফ সেট করবে বা করা উচিত বলে মনে করবে, এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এইসব ব্যাপার নিয়ে বা তাদের লাইফকে নিয়ে আমার কোনোই দরকার নাই বেশী করে ভেবে ভেবে আমার মানসিকতায় আঘাত করা। তাদের কেউ মানষিকভাবে সুখি হতে পারলো না, তাতে আমি কি করতে পারি? কেউ তার পরবর্তী লাইফে সেট করতে পারল না, তাতে আমি কি করতে পারি? আমার কাজ রশদ জোগান দেয়া। আমি সেটা করেছি কিনা তার উপর আমার নিজের সেটিসফেকসন নির্ভর করবে। হ্যা, যদি তাদের সাফল্যও আমার চোখে পরে তাহলে আমার সেটিসফেকসন হবে ডাবল যে, আমার সমস্ত চেষ্টা সার্থক হয়েছে, আমার ভালো লাগবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়ার পরেও যদি তারা কেউ সুখী না হয়, তাহলে আমার কি করার আছে? যদি কিছু করারই না থাকে, তাহলে উত্তম হচ্ছে, নিজেকে তার মধ্যে চুবিয়ে রেখে নিজের ক্ষতি না করা।
আমি সেটাই করছি এখন। আমি জানি, আমার জন্য এখন অনেকেরই আর আগের মত এতো মহব্বত থাকার কথা না। সময়ও নাই। সবাই সবাইকে নিয়েই ব্যস্ত। এখন লাইফ সবার জন্য আলাদা। এক ঘরে থেকেও সবাই আলাদা আলাদা। কারো জন্য কারো সময় নাই। তারমধ্যে আবার, সবাই খালি বলতে চায়, কেউ শুনতে চায় না। তাই আমিও আর বলি না। যতোক্ষন নিজের কাছে মাল আছে, ততোক্ষন তুমি রাজা। এটা হোক কোনো মহিলারা ক্ষেত্রে, বা হোক কোনো পুরুষের জন্যে। তাই নিজের আরামের জন্য, আনন্দের জন্য সব কিছু একেবারে বিলিয়ে দিয়ে নিজে দাতা হাতেম তাই হওয়া উচিত না। এটা নিজের বউই হোক, আর ছেলেমেয়েই হোক, বা অন্য যে কেউ।
আমি একটা জিনিশ খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করছিলাম যে, তানির দাম্পত্য জীবনের ব্যার্থতার পর, ও নিজে তার পলিসি পালটেছে এইভেবে যে, যদি কখনো ওর জীবনেও এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাহলে? তাই, আগে থেকেই এর সাবধানতার অংশ হিসাবে নিজে সাবলম্বি হই, তারপর যা হবার হবে। আর সম্ভবত এই ধারনার পরিপ্রেক্ষিতে যেখান থেকে অর্থ আসুক, সেটা আগে নিজের জন্য সেভ করে বাকী সব খরচ হতে হবে আমার কাছ থেকে যাতে তার নিজের সাবলম্বিতা নষ্ট না হয়। এই ধারনাটা আমার কেনো হয়েছে আমি জানি না, কিন্তু আমার ভিতরে যেনো এটাই মনে হচ্ছে ওর ব্যবহারবিধিতে। অনেক কিছুই যেন আগের মতো নাই। আমার কোনো দুঃখ নাই। আমি তো চেয়েইছিলাম, সর্বাবস্থায় ওরা ভালো থাকুক। এমন কি আমার জন্য না , ওদের জন্যই ওরা ভালো থাকুক।
কিন্তু আমি তো আমি। আমি সর্বদা এমন একটা ডিফেন্স লাইনে থাকতে চাই, যাতে অন্তত আমিও সর্বাবস্থায় কারো কাছে হাত পাততে না হয়। আমি জানি আমার কিছু লোন রয়েছে সোনালি ব্যাংকে। এই টাকাটা নিয়ে আমি চিন্তিত না। কারন যা লোন আছে তার থেকে অনেক বেশী আছে আমার এসেটস। তাই আমি ভাবছি, ধীরে ধীরে আমি আমার লাইফটাকেও এমনভাবে পরিবর্তন করবো যাতে কারো কাছেই আমার কোনো কিছুর জন্যই মুখাপেক্ষি হতে না হয়। এমনকি ওর কাছেও না। একসাথে থাকার মধ্যেও দূরে থাকার ব্যাপারটা আমি অভ্যস্থ হয়ে গেছি প্রায়। এটাও ও পেরেছে বলে আমার ধারনা। কিন্তু এটা আমার জন্য যতোটা না খারাপ, তার থেকে অনেক বেশি খারাপ ওর জন্যে।
একটা কথা কখনোই আমি ভুলি না যে, যে নদীর স্রোতধারা থেমে যায়, তার জলের বিশুদ্ধতাও নষ্ট হয়। আমি কখনোই থেমে থাকতে চাই না। যেখান থেকেই হোক, যেভাবেই হোক, আমি আমার জীবনকে আনন্দেই ভরে রাখতে চাই। এটা যার বিনিময়েই হোক। আমার মাথা নত করার কোনো কারন আগেও ছিলো না, এখনো নাই।
উচ্চাখাংখার চেয়ে যখন কোনো মানুষ বা শহর ছোট হয়ে যায়, তখনই বেড়ে উঠে বড় বড় গ্যং। রেলওয়ের প্ল্যাটফর্মের ইদুররা কোনো আওয়াজে গর্তে ঢোকে যায় বটে কিন্তু গ্যাং স্টাররা সে রকম কোনো রেলওয়ের ইদুর না। তারা কারো হুমকিতেই ভয় পায় না। আন্ডার ওয়ার্ল্ডে সব গ্যাংরা একটা ফ্যামিলি গ্যাং এর মতো। মৃত্যুতেও ওরা ভাঙবে না, বরং ওদের প্রতিজ্ঞা আরো কঠিন হয়ে যায়। এই গ্যাং সদস্যারা একে অপরের উপর শতভাগ ট্রাষ্ট করে, তাই তারা ট্রাস্টের উপর ইনভেস্টিগেশন করে না। কিন্তু যখন কোনো সন্দেহ হয়, তারা সন্দেহের উপর ইনভেষ্টিগেশন করে। সব সাধু যেমন দেখতে একই রকম লাগে। তেমনি তাদেরকেও দেখতে একই রকম লাগে।
যারা এখনো মনে করছেন যে, লক ডাউনটাই হচ্ছে সমাধান, সেটা সম্ভবত সঠিক নয়। এ বিশ্ব অচিরেই করোনা মুক্ত হবে না। কোথাও না কোথাও এর পরিব্যপ্তি থাকবেই। ফলে বছরের পর বছর লক ডাউন ভাবা যায় না। কোথাও না কোথাও হয় আক্রান্ত, আক্রান্তের পর সুস্থ্য, আবার আক্রান্ত, আবার কেউ ক্যারিয়ার, কেউ আবার উপসর্গ ছাড়া করোনায় আক্রান্ত ইত্যাদি নিয়েই ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠিতে মানুষ বিচরন করবেই। আর একজন মানুষই যথেষ্ঠ পুনরায় এই মহামারীর জন্ম দেওয়ার।
যে দেশই বলুক তারা লক ডাউনের মাধ্যমে দেশ করোনা মুক্ত করে ফেলেছে, তারা এখন সেফ। এটাও ঠিক নয়। তারা কি বিশ্ব বানিজ্য, বিশ্ব গনমানুষের আন্তরদেশীয় আনাগোনা বন্ধ করতে পারবে? পারবে না, আর পারবে না বলেই তারাও মুক্ত হয়েও আবার মুক্ত নয়। কারন যতোই চেকিং করে মানুষদেরকে নিজ দেশে ঢোকানো হোক না কেনো, উপসর্গবিহীন বহু মানুষ করোনা নিয়েও ঘুরে বেরাবেন যা সহজেই ধরা যাবে না। বছরের পর বছর লক ডাউন কার্যকরী করে রাখা সম্ভব নয়। ফলে, আজ হোক কাল হোক, লক ডাউন সবাইকে তুলে দিতেই হবে। কোনো না কোনো দেশ কোনো না কোনো কিছুর জন্যে এক দেশের না হয় আরেক দেশের উপর অবশ্যই নির্ভরশীল। ফলে অর্থিনীতির চাহিদার জন্যই সব উম্মুক্ত করতেই হবে।
লক ডাউনে যা ক্ষতি হয়েছে সেটা হচ্ছে অর্থনীতি। ক্ষতি হয়েছে সঞ্চিত সম্পদের ব্যয় এবং তা প্রায় নিঃশেষ। অর্থনীতি বিপর্যয় হচ্ছে সমস্ত বিপর্যয়ের জননী। আমি প্রথম থেকেই লক ডাউনের ফর্মুলায় বিশ্বাস করতে চাইনি। আমাদের ইসলামীক ইতিহাসও লক ডাউন করার ব্যাপারে কোনো তথ্য দেয় না। কিন্তু মহামারীতে আক্রান্ত জায়গা সমুহে অবাধ যাতায়তে নিষেধের আদেশ ছিলো। লক ডাউনে হার্ড ইম্মিউনিটি তৈরী হয় না। বরং সংক্রমন দীর্ঘায়িত হয় বছরের পর বছর। লক ডাউন একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
করোনার পরে যেটা মহামারী হয়ে আসবে তা হচ্ছে দুর্ভিক্ষ। আর এই দুর্ভিক্ষের একমাত্র মেডিসিন, অর্থনীত সবলতা। অর্থনীতি সবল হলে ঘরে চাল আসবে, ডাল আসবে, সব আসবে, সাথে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মেটেরিয়ালও আসবে। আর এটাই বাস্তবতা। সচেতনতা এখানে বড় ব্যাপার। অসচেতন হলে ভালো রাস্তায়ও মানুষ দূর্ঘটনায় মারা যায়।
(১) এই করোনায় যারা মাস গেলে মাইনে পাবেন বলে সিউর, তারা সত্যিকার ভাবেই ছুটি উপভোগ করছে, আর ফেসবুকে একটার পর একটা উপদেশ দিয়েই যাচ্ছেন, এই কইরেন না, ওই কইরেন তো ওখানে যাইয়েন না তো ওইখানে যাইয়েন ইত্যাদি। কিন্তু যারা বেতনের ব্যাপারটা সিউর না, তারা তো ডাল ভাতও পাচ্ছে না। উন্নত দেশগুলির চিত্র আলাদা। তারা ট্যাক্স দেয়, ফাকি দেয় না, ট্যাক্স পায় সরকার, বিভিন্ন খাত থেকে রাজস্ব পায়, ফলে তারা তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে জনগোষ্ঠিকে আপদকালীন সাহাজ্য করা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু আমাদের সরকার? তারা সবার কাছ থেকে তো ট্যাক্সও পায় না। এদেশের মাত্র ২০/২৫% লোক ট্যাক্স দেয়। আর সবাই ফাকিই দেয়। সরকারী কর্মকর্তাদের বেতনটাও করমুক্ত। অন্যদিকে, রাজস্ব আয়েও তো ভীষন রকমের ঘাটতি আছে দূর্নীতির কারনে। তাহলে সরকার বিপদকালীন সময়ে সাহাজ্যটা করবে কোথা থেকে? অর্থনীতিকে চালিয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট মদদ নাই সরকারের কাছেও। ফলে যেখান থেকে সরকার যতটুকুই রাজস্ব আয় পাবে, সেগুলিকে তাকে খুলতেই হবে। প্রত্যক্ষ কর পুরোটা আদায় করতে পারে না বলে ভ্যাটের ওপর যেহেতু সরকার নির্ভরশীল, ঈদের আগে সম্ভবত সে কারণেই শপিংমল খোলার ঘোষণা। এছারা ওই ক্ষুদ্র মালিকদের জন্যেও একটা আপদকালীন কিছু অর্থ আসার আশা।
(২) এদেশ আসলে কিছু ফরেন রেমিট্যান্স আর কিছু রপ্তানীমুখী শিল্পের উপর নির্ভরশীল। ফলে এসব যদি কোনো কারনে হাতছাড়া হয় ভাবতে পারেন কি আছে সরকারের হাতে? মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির নিরিখে আমরা এখন বিশ্বের শীর্ষ কাতারে, অথচ রাজস্ব-জিডিপির অনুপাতে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে নিচের সারিতে। অর্থাৎ কর-ফাঁকির প্রবণতার দিক থেকে আমরা শীর্ষে। তাহলে সরকার করবেটা কি?
(৩) আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এদেশে মানুষজন বেসিক্যালি ক্ষুদ্রশিল্পের উপর লোকালী নির্ভরশীল। তাদের প্রনোদনা কি? তারা কিভাবে আবার আগের প্লাটফর্মে আসবে যদি একেবারেই সব স্তব্ধ হয়ে যায়? সরকার সামাল দিতে পারবে এতো বিশাল বুভুক্ষ জনগোষ্ঠীকে লালন করতে? সরকার যদিও বেশ কিছু সেক্টরে লোন প্রনোদনা ঘোষনা করেছেন, কিন্তু আরও কয়েক সপ্তাহের আগে প্রণোদনার টাকা হাতে আসবে বলে মনেও হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসের বেশি এবং যেসব শর্ত ধরা হয়েছে, অনেকের জন্য এটা অর্থহীন। কে জানে, কীভাবে ওই সব শর্ত পূরণ করে কত দিনে বরাদ্দটা মিলবে? প্রণোদনার ধরনও খুবই অস্পষ্ট। তত দিনে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাদের অবস্থাটা কি? আমার আপনার বাসায় তো ডাল ভাতের জোগাড় আছে, কিন্তু ৮৬% লোকের তো সেটাও নাই? তাহলে কিভাবে তারা না খেয়ে ঘরে থাকতে বলি? আমি আপনি কি পারবো না খেয়ে দিনের পর দিন ঘরে পানি খেয়ে থাকতে?
(৪) করোনা ভাইরাস মহামারী আসলে একটা অর্থনীতি বিনাশী ঘটনা। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক সমস্যা—কিছুই এর সমতুল্য নয়। সমাজের ২৫ ভাগ লোক হঠাৎ স্থায়ীভাবে কঠিন বেকারত্বে পড়ে যাবেন, আর এটা সেরে উঠতে লাগবে কয়েক যুগ, হতে পারে আর আগের ফর্মে ফেরাই যাবে না। অর্থনীতি ধ্বংস হলে সমাজও থাকবে না, রাজনীতিও থাকবে না, গনতন্ত্র তো দূরের কথা। তছনছ করে দেবে পরিবার, সম্পর্ক, উদারতা, মানবিকতা কিংবা সজ্জনতা। একটা কথা আছে। অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাকি সব বিপর্যয়ের জননী।
(৫) প্রচুর মানুষের কাছ থেকে কি পরিমান রিকুয়েষ্ট যে পাই, তা বলার ভাষা নাই। আগে তো সামর্থবান ফকির দেখলে ভিক্ষে দিতাম না, কিন্তু এখন কোনো বয়স বা জেন্ডার দেখি না, যা আছে সেটাই দিতে চাই, হয়তো এই মানুষটা ১দিন না খেয়ে তারপর হাত পেতেছে।
এই লক ডাউন কন্সেপ্টে অনেক ভুল আছে। লক ডাউনটা কত দিনের? ২ মাস, ৩ মাস,৬ মাস কিংবা আরো বেশি? কিন্তু এই করোনা ভাইরাস থাকবে আরো কম্পক্ষে ৪/৫ বছর। বর্তমানে কারখানা খোলা, শপিংমল খোলা বা এই জাতীয় বিজনেজ সচল রাখা মানে লাভের জন্য নয়, এটা পুরু দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঠেক দেওয়া। যারা খালি ফেসবুকে বিজ্ঞের মতো মন্তব্য করেই যাচ্ছেন, তারাই বলুন তো, দেশে কত জনকে ব্যক্তিগতভাবে আপ্নি নিজে আর্থিক সাহাজ্য করেছেন? এবং কত টাকা? একটা পরিবারকে বাড়ি ভাড়া, বিল, খাওয়া এবং সব মিলিয়ে ঢাকা শহরে কম্পক্ষে ২০/২৫ হাজার টাকা লাগে। কয়জনকে পারবেন দিতে? খালি ৫ কেজি চাল আর ১ লিটার তেল দিয়ে কাউকে উপদেশ দিয়ে এটা বলা যাবে না যে, stay home. আসুন একটা জরীপ করি- কারা কারা এইসব মধ্যবিত্তদেরকে আগামি ৩/৪ মাস সাপোর্ট দিতে ইচ্ছুক। একজনকেও পাব না এ ব্যাপারে আমি শতভাগ সিউর। তাহলে এই শুকনা উপদেশে কার মন ভরবে?
সহজ না উপলব্ধি করা। কিন্তু উপদেশ দেয়া খুব সহজ। তাই আগে অবস্থাটা আরো সামনের দিকে দ্রিষ্টি দিয়ে ভাবুন তারপর মন্তব্য বা উপদেশ যাইই করার করুন। সরকার এই মুহুর্তে আমার ধারনা একদম ঠিক সিদ্ধান্তগুলিই নিচ্ছেন।
এটার কোনো ডাউনফল পিক পয়েন্ট নাই। প্রতিটা নতুন সংক্রমন লকডাউনে থাকা ফ্রেসব্যক্তি পুর্ন উদ্যমে আবার নেক্সট স্টার্টিং পয়েন্ট হয়ে যায়। বরং কারেক্ট সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং (তাইওয়ানের মত, ৪৫৬ টোটাল আক্রান্ত, ডেথ মাত্র ৬, তাও আবার উহানের ঠিক পাশে থাকা দেশ) এবং হার্ড ইম্মিউন এর একমাত্র লং টার্ম সমাধান। অনেক উপসর্গহীন মানুষও করোনায় আক্রান্ত।
যখন আমার বান্দা ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তাকে বন্ধু বলে জানি। যখন বন্ধু বলে জানি, তখন আমি তার কান হই যা দ্বারা সে শোনে, আমি তার চোখ হই যা দ্বারা সে দেখে, আমি তার হাত হই যা দ্বারা সে কিছু ধরে, আমি তার পদযুগল হই যা দ্বারা সে হাটে (হাদিসে কুদসি)।
ফলে, নৈকট্য লাভের উপায় অনুসব্ধান করো (সুরা মায়িদা ৫ঃ৩৫)। আল্লাহর ইবাদতে তুমি এমনভাবে মশগুল হও যেনো তুমি তাকে দেখতে পাচ্ছো। আর যদি দেখতে না পাও, তবে মনে রেখো, তিনি অবশ্যই তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন। যা আমি বলেছি, তা শরিয়ত, যা করেছি তা তরিকত, যা দেখেছি তা হাকিকত আর যা চিনেছি ও জেনেছি তা মারেফাত। (আল হাদিস)। পৃথিবীতে সফর করো ও দেখো অপরাধীদের কি পরিনাম হয়েছিলো (সুরা নমল-২৭ঃ৬৯) এবং দেখো, জানো এবং মানো আর লক্ষ্য করো পরিনতি-যারা করেছে আর যারা করেনি এবং (এক ধরনের হুমকী দিয়ে বলেছেনঃ) আমি কি এমনি এমনি ছেড়ে দেবো? (সুরা কিয়ামা-৭৫ঃ৩৬)
মন্তব্যঃ- সৃষ্টি তার, সার্বভৌমত্ব তার, তিনিই একমাত্র অধিপতি। আমরা তার দাস। যে দাস, সে রায় দিতে পারেন না। এখানে ন্যয্য কিংবা অন্যায্য কি সেটা বলার কোনো ইখতিয়ারও নাই। গায়ের জোর দিয়ে কিছুই বলা যাবে না কিংবা স্রিষ্টির সব রহস্য যেহেতু আমাদের জানা নাই, তাই আমাদের জ্ঞানের কোনো বিশ্লেষনও নাই। আমরা তো এটাও জানি না, কিয়ামতের পরে কি স্রিষ্টিকারী সব শেষ করে দিয়ে আবার চুপ করে থাকবেন নাকি পুনরায় আবার কোনো জগত তৈরী করে নতুন কোনো রহস্যা সৃষ্টি করবেন? সবই তো রহস্যা। জ্ঞানের স্তর অনেক। আমাদের যার যার জ্ঞানের পরিধিতে একই জিনিষ পরিমাপ করতে পারি না। জ্ঞান নিজেও একটা রহস্য।
এই করোনা পরিস্থিতিতে মিডিয়ায়, টকশো তে গার্মেন্টসের উপর পরিবেশিত খবরগুলি দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে একটা সন্দেহ জাগছে যে, ভাবখানা যেনো এ রকম, গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে তারা সরকারের বিধিনিষেধ থাকা সত্তেও সরকারের আদেশ উপেক্ষা করে ফ্যাক্টরীসমুহ খোলা রাখছেন। আর যেহেতু খোলা রাখছে, ফলে দূরদুরান্ত থেকে শ্রমিকগন কেউ চাকুরী রক্ষার কারনে, অথবা বেতন পাবেন না অনুপস্থিত থাকলে ইত্যাদি কারনে পায়ে হেটে হেটে সেই গ্রামগঞ্জ থেকে কারখানার উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হয়ে গেছেন। এই ব্যাপারটা কি এইরকমই যে রকম করে বিভিন্ন মিডিয়া প্রকাশ করছে?
ব্যাপারটা অবশ্যই এই রকম না। ২৬ মার্চ ২০২০ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী করোনা মহামারী উপলক্ষ্যে দেশের উদ্দেশ্যে ভাষনের সময় কলকারখানা বন্ধ রাখার কথা কিছুই বলেন নাই। তবে প্রচুর বৈদেশিক আদেশ পর পর বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে এবং আরো অর্ডার বাতিল হয়ে যাওয়ার আশংকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী তথা দেশের অর্থনীতিতেও একটা আতংকের সৃষ্টি হয়। আবার অন্যদিকে সরকার সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিলেন যে, জরুরী কোনো কাজ না থাকলে যেন কেহ ঘরের বাইরে না যান। বিকেএমই এ সরাসরি সমস্ত কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ জারী করে কিন্তু বিজিএমইএ সে রকম সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন নাই। এমতাবস্থায় ২৮ মার্চ তারিখে বিজিএমইএ এর অধীনে কলকারখানাগুলি খোলা থাকবে কি থাকবে না, এটা নিয়ে মালিকপক্ষের মধ্যে বিস্তর সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরবর্তিতে ২৭ মার্চ ২০২০ তারিখেই সরকারের পক্ষ থেকে সরকারের কলকারখানা অধিদপ্তর থেকে সুস্পষ্ট একটি নির্দেশনা এলো। আর সেটি হচ্ছে, যে সমস্ত কলকারখানায় আন্তর্জাতিক এক্সপোর্ট অর্ডার আছে এবং যে সব কারখানায় করোনার প্রোটেকশনের নিমিত্তে পিপিই, মাস্ক ইত্যাদি বানানো হয়, সে সমস্ত ফ্যাক্টরির মালিকগন প্রয়োজনীয় করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থার গ্রহনের নিমিত্তে (যেমন শ্রমিকদের প্রবেশের সময় ১০০% সেনিটাইজার/সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে, মাস্ক পড়িয়ে, থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে বডি টেম্পেরেচার মেপে ইত্যাদি) ই্ছে করলে কারখানা খোলা রাখতে পারবেন।
কিন্তু যে কোনো ভাবেই হোক ২৯ মার্চ ২০২০ তারিখে বিজিএমই এ সভাপতি ডঃ রুবানা হক পুনরায় মালিকদেরকে কারখানা সমুহ বন্ধ রাখার অনুরঢ করেন। বাধ্য হয়েই আমরা সেটা পালন করি। এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে গেলো। যারা দূর দুরান্ত থেকে ঢাকায় এসেছিলেন, তারা আবার ঢাকার বাইরে চলে গেলেন। এই যে আসা এবং যাওয়ার মধ্যে প্রচুর লোক সমাগম হ ওয়াতে টক শো এর বিজ্ঞ এবং আদার বেপারী জাহাজের খবর নেবার মতো বিশেষজ্ঞরা একটা পরিচিতি লাভের আশায় সবার সাথে তাল মিলিয়ে একবাক্যে প্রচার করা শুরু করলেন, যতো দোষ, সব যেনো নন্দ ঘোষের। অর্থাৎ গার্মেন্টস মালিকদের। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এবারো কোনো দিক নির্দেশনা এলো না যে, কল কারখানা বন্ধ রাখা হোক। বরং কল কারখানা চালুর রাখার ব্যাপারে এবারো কল কারখানা অধিদপ্তর খোলা রাখা যাবে এই মর্মে আবারো আদেশ জারী করেই রাখলেন।
অথচ অন্য দিকে সরকার কাউকেই ঘরের বাইরে আসতে দিতে নারাজ। ফলে ব্যাপারটা এমন দেখাচ্ছে মিডিয়াগুলি যেনো, সব দোষ গার্মেন্টস মালিকদের, আর তাই অপবাদ যেনো গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের। এটা কেনো?
কিছু লোক আছে সবসময় সবকিছুতেই পোশাকশ্রমিক নিয়ে বেশি মাতামাতি করেন। এদের উদ্দেশ্য কি ?
বাংলাদেশে আজ ৮ মে পর্যন্ত ১৩০০০ করোনা রোগি, এর মধ্যে পোশাক শ্রমিক ১৯৬ জন, পুলিশ ১৫০০ জন। পোষাক শ্রমিক ৪০ লক্ষ, তাদের মধ্যে করোনা রোগি ১৯৬ জন। পুলিশ ২ লক্ষ, তাদের মধ্যে করোনা রোগি ১৫০০ জন। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি, তাদের মধ্যে করোনা রোগি ১৩০০০ জন। বাংলাদেশের মোট শ্রমিক সংখ্যা ৬ কোটি, এর মধ্যে পোশাকশ্রমিক ৪০ লক্ষ।
তাহলে সবকিছুতেই পোষাকশ্রমিক হেডলাইন করে মাতামাতি করেন কেন? এটা একটা চক্রান্ত।
যারা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, তারা কি করোনাকে ভয় পান না? তাদের কি পরিবার পরিজন নাই? যে কোনো মুহুর্তে তিনি নিজে আক্রান্ত হয়ে তার পরিবারকেও তো আক্রান্ত করতে পারেন, তার কি সেই ভয় নাই? তিনি কি এতোটাই গরীব যে, তার ঘরে খাবার নাই বলে তিনি রোজগারের জন্য কারখানা খোলা রেখেছেন? তিনি কি ঘরের মধ্যে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে পারেন না? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুব সহজ।
এই গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরাও করোনাকে ভয় পান, তারা নিজেরা আক্রান্ত হলে তার নিজের পরিবার পরিজনও বিপদের সুম্মুখিন সেটাও তারা জানেন। তিনি এতোটা গরীব নন যে, তাকে অন্তত কয়েক মাস ঘরে বন্দি হয়ে থাকলেও রোজগারের বাইরে যেতে হবে। তাহলে তারপরেও তারা কারখানা খোলা রাখছেন কেনো? এর প্রধান কারন, সরকার জানেন, যে, এই সেকটর খোলা রাখা জরুরী। আর জরুরী এই জন্য যে, দেশের জনগনকে সেবা দেওয়ার জন্য যে খরচ, যে ব্যয়, যে, অর্থ প্রয়োজন, তার একটা বড় উতস আসে এই সেকটর থেকে। শুধু তাই নয়, সবচেয়ে যিনি বেশী ভেবেছেন তা হচ্ছে দেশের কর্নধার হিসাবে যিনি দেশ পরিচালনা করছেন তিনি, প্রধানমন্ত্রী। আমি কোনো দল করি না, আমি রাজনীতিও করি না। কিন্তু আমি একজন নিরপেক্ষভাবে কিছু মন্তব্য করে চাই।
সারাবিশ্ব এই মুহুর্তে প্রায় লক ডাউন। প্রতিটি নাগরীক প্রায় গৃহবন্দি। বিশ্ব বাজারের সবগুলি ষ্টোর, ওয়্যার হাউজ, বড় বড় শপিংমল সবকিছু বন্ধ থাকায় কোনো প্রকারের বেচাকেনা, বানিজ্য আদানপ্রদান একেবারেই নাই বললেই চলে। সারাবিশ্ব একেবারে স্থবির। এই অবস্থায়, ধনী দেশ গুলির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, নাগরীক ভাতা, ইত্যাদি দিয়ে কিন্তু তাদের জনগনকে মাসের পর মাস সাপর্ট দিতে বদ্ধপরকর। আর ওটা অই সব সরকারগুলি করতে পারেন কারন শান্তিকালীন সময়ে প্রতিটি নাগরীক তারা সরকারকে সঠিক ট্যাক্স দেন, তারা ব্ল্যাক মানি রাখেন না, কিংবা তারা দেশের সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করেন। তাই সরকার আপদকালীন সময়ে ঠিক সাহায্য তা করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা কি তাদের মতো? আমাদের দেশের ৬০-৭০% মানুষই তো প্রায় ট্যাক্স দেন না, হেলথ ইন্সুরেন্স করেন না, আবার দেশের সম্পদ যখন যেভাবে খুশী অপচয়, চুরি ডাকাতিতে এমন থাকেন যে, সরকার আপদকালীন সাহায্য করবে কি দুরের কথা প্রশাসনিক কর্মকান্ডই তো পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হয়।
এই অবস্থায় সরকারের পক্ষে কি কোনোভাবেই সম্ভব এই বিশাল জনগোষ্টিকে মাসের পর মাসে হাউজ কোয়ারেন্তাইনে রেখে ভরন পোষন করা? তার মধ্যে সরকার যেটুকু টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় লাভ করেন, রপ্তানী থেকে, রেমিট্যান্স থেকে সেগুলি যদি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে তো দেশের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে উঠবে।
গত কয়েকদিন যাবত বারবার মনের ভিতর একটা প্রশ্নই উঠে আসছে। আমি জানি না এটা কতটা প্রাসংগিক বা আমার করা আদৌ উচিত কিনা। তারপরেও মনের ভিতরে কেনো জানি উত্তরটা জানতে খুব ইচ্ছে করে। অনেক পরাশুনা করছি এটা নিয়ে।
ধরুন, আজ কিয়ামত হয়ে গেলো। সারা দুনিয়া ভেংগে তছনছ হয়ে গেলো, বিশ্ব ভ্রমান্ড, মহাজগত, আল্লাহর সমস্ত সৃষ্ট জগত যা দেখতে পাই আর যা দেখতে পাই না, সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে জাজমেন্ট ডে তে এসে গেলাম। কোথাও আর কিছুই নাই। এই আকাশ, মহাজগত, এই পাহাড় পর্বত, মানুষজন, সমস্ত প্রানী সকল, বৃক্ষরাজী, গ্রহনক্ষত্র, যা যেখানে ছিলো সব কিছু শেষ হয়ে গেলো। বাকি আছেন শুধুমাত্র স্রিষ্টিকারী নিজে। সবার যার যার বিচার বিশ্লেষন করে কেউ বেহেস্ত, কেউ দোজখ ইত্যাদি পেয়ে গেলেন। আজীবনকাল পর্যন্ত স্রিষ্টিকর্তার নির্দেশে যে যেখানে থাকার আদেশ হল, সেখানে পৌঁছে গেলেন এবং প্রায়শ্চিত্ত বা সুখভোগে লিপ্ত হলেন। তারপর কি?
তারপরে কি স্রিষ্টিকর্তা চুপচাপ তার আরশেই বসে থাকবেন? নাকি আবারো তিনি আরেকবার কিছু একটা করবেন যা এইরুপ পৃথিবী, গ্রহনক্ষত্র, মহাজাগতিক বিস্তার, নতুন করে সৃষ্টি করে আবারো তার নবী, রাসুল, ফেরেস্তা সকল কিংবা এইরুপে ভালো মন্দ মিশিয়ে মানুষ্রুপী কিছু প্রজাতী, কিংবা জীনরুপি কোনো এক গোষ্টী আবারো তৈরী করে নতুন কিছু করবেন?
এ ব্যাপারে আমি আজ পর্যন্ত কোনো কোরআন, কিংবা হাদিসে আলোকে কিছু পাইনি যা কিয়ামতের পরে নতুন কিছু সিষ্টিকর্তা করবেন কি করবেন না। কি তার পরিকল্পনা, কি তার খেলা, কিংবা কি তার রহস্য। সর্বত্র যা পাই তা হচ্ছে, সব কিছুই শেষ কিয়ামতের মাধ্যমে। কিন্তু তখনো তো সৃষ্টিকর্তা রয়ে যাবেন, তার তো কোনো ধংশ নাই, তাহলে তখন তিনি কি সৃষ্টি করবেন, কি আকারে আবার সেই নতুন জগত হবে? এটার কোনো তথ্য কোথাও সৃষ্টিকর্তা কোথাও উল্লেখ করেন নাই।
অদ্ভুত না?
ফকফকা ভবিষ্যৎ দেখেন এমন সব মানুষের আবির্ভাবে ইদানিং ফেসবুকে অনেক বাইড়া গেছে। কেউ কেউ নিশ্চিত দিয়া কইতাছে, বাংলাদেশে নাকি আগামি ১৫ দিনের মধ্যে ৫ লাখ লোক করোনা ভাইরাসে মইরা যাইবো। আবার কেউ কেউ খালি মরার কথা না, সাথে রাস্তায় রাস্তায় নাকি লাশও স্তুপ হইয় পইড়া থাকবো, এমন কথা কইতাছে। অনেকে আবার এইটা বলেও আমাদের মতো আমজনতাকে সাবধান কইরা দিতাছে যে, সরকার বাহাদুর মার্কেট মুর্কেট যাহাই খুইল্লা দিক, যাইয়েন না, গেলে নাকি ওখানেই মরমু, আর যদি ওখানে না মরি, তাহলে নাকি ঘরের মধ্যে আসার পর বাল-বাচ্চা লইয়া একসাথে মইরা যামু। আবার অনেকে এইটাও কইতাছে, সাবধান, সরকার গার্মেন্টস খুইল্লা দিছে, সব করোনার উৎস নাকি ওই হালার গার্মেন্টসের শ্রমিকের গায়ে। এরা যেই পথ দিয়া হাটে, সেখানেই নাকি করোনার মহামারির সৃষ্টি হইয়া যায়, তয় পরিবহন সেক্টরের কোটি কোটি শ্রমিক, রিক্সাওয়ালা, কুলি কিংবা অন্য সেক্টরের হাজার হাজার শ্রমিক, কিংবা কন্সট্রাকশন সেক্টর, মৎস্য সেক্টরের অসংখ্য শ্রমিক, হাউড়ে ধান কাটার জন্য লক্ষ লক্ষ দিন মুজুর কিংবা কোটি কোটি বস্তিবাসী মানুষের ঢলে কোনো করোনা নাই, এটা সিউর, গার্মেন্টস ছাড়া অন্য কোন জনতার ঢলে করোনা নাই। খালি গার্মেন্টস শ্রমিক একসাথে না হইলেই রক্ষা। অবশ্য অন্যসব সেক্টরে কোনো শ্রমিকও নাই, তারা সব ডাইরেক্টর। যতো শ্রমিক দেখবেন রাস্তায়, সব গার্মেন্টেসের। এমন কি জানাজা মানাজায়ও যাগোরে দেখবেন, তারাও গার্মেন্টেসের। খালি ওইসময় টুপি পড়ছিলো। এই আর কি। এরজন্য কিছু মানুষের আবার দুশ্চিন্তায় একেবারে ঘুম আসতেছে না। আমজনতার পাশাপাশি সরকার বাহাদুরকেও রীতিমত ফ্রিতে দেশ-বিদেশ যেখানেই থাকুক না কেন, উপদেশ দিয়া যাইতেছে।
মাগার একটা জিনিষ খুব ভালো কইরা খেয়াল করবার চেষ্টা করতাছি যে, হালার এই ফকফকা ভবিষ্যত দেখে এই গোষ্ঠিটা কারা? বা এদের পাওয়া যায় কোথায়?
এরা হইলো, হয় বিদেশে থাকে কোনো মাইয়া মানুষ বা মাইয়া মানুষের মতো কিছু পোলা মানুষ, যাদের খাওয়া দাওয়ার কোনো চিন্তা নাই, আজাইরা বইসা বইসা বাপের বা জামাইয়ের কামাই খাইতাছে, বাসার বাইরে না গেলেও চলে, কেউ কেউ আছে সরকারী বা প্রাইভেট চাকুরী করে, খাবারের চিন্তা নাই, টাকা আসবেই, এই শ্রেনীর কিছু সাদা মনের লোক, কেউ আবার আছে সরকারী চাকুরী করতো কিন্তু মাগার ভালো করতে পারে নাই, তাই চাকুরী থেকে হয় ভাগছে বা ইস্তফা দিয়া প্রাইভেট চাকুরিতে ঢোকছে, কিন্তু ওইখানেও মারা খাইতেছে, বেশী একটা ভালো করতে পারতেছেনা, কিন্তু মনে মনে ভাবে “আমি না জানি কি হনুরে” টাইপের, আবার কিছু আছে হতাশাগ্রস্ত বেকার শিক্ষিত ডিজিটাল যুবক যারা নিমিষেই একটা ইস্যুকে খবর বানাইয়া ফেলতে পারে, আবার কিছু আছে সব কিছুতেই বিশ্বাস করে এমন সহজ সরল আমার মতো নাদান আম-জনতা, আর কিছু আছে সমাজে আতংক সৃষ্টি করার কিছু ব্ল্যাক শীটস। আর এই গ্রুপটা সবচেয়ে বেশী রেফারেন্স দেয় কিছু রাজনীতিবাজ দেশী বিদেশী আমলা বা সংস্থার কিছু উঠকো মন্তব্য। ভাবখানা এই রকম, দেখছেন? আমি যাহা ভাবি, আমার মতো অইসব রাগোব বোয়ালেরাও আমার মতো ভাবে। আরে হালার পুত হমুন্দিরা, ওই শালারা তো করে রাজনীতি, তুই হালার ওদের রাজনীতি কি বুঝুস?
(যাক গে, ভাই আমার এই আদর কইরা ডাকা “হালার পুত”, কিংবা হমুন্দির ভাই ইত্যাদি ডাকে মাইন্ড খাইয়েন না। হালার পুরান ঢাকার মানুষ তো আমরা, কথায় কথায় হালার ভাই, হমুন্দির পুত কিংবা এই জাতীয় মুখরোচক কিছু কথা প্রায়ই কইয়া থাকি। এটা আমরা আদর কইরাই কই। গালি না।)
আসেন এবার করোনার ভবিষ্যৎবানী গুলি কিছু দেখি।
অনেক বড় বড় হোমড়া চোমড়া বিদেশী সংস্থা আজ থেকে প্রায় দুই মাস আগে কইছিলো, বাংলাদেশ নাকি ২০ লাখ লোক করোনায় আক্রান্ত হইবো, আর ৫ লাখের বেশি লোক মারা যাইবো। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ অসচেতন, তাই সংখ্যাটা আরো বাড়বো। বিদেশীরা ইস্পেশাল উড়োজাহাজ ভারা কইরা নিজেগো দেশে চইলা গেলো। কারন কয়দিন পর রাস্তায় লাশের গন্ধে নাকি অসুস্থ হইয়া যাইবো। আবার নিজেরাও মইরা যাইতে পারে।
আমিও ডরাইছিলাম। হালায় কয় কি? আমার মতো অনেকেরই মাথায় হাত। পরিবার আর বউ ঝির মুখ দেহি আর ভাবি, ওগো লক্ষি, কি শুনতাছি গো!! আমি অথবা তুমি যে কেউ যখন তখন মইরা যাইতে পারি। আবার দুইজনেই আগে পিছে মইরা যাইতে পারি। কেম্নে কি গো? তুমি মইরা গেলে আমার কি হইবো, আর আমি মইরা গেলে আবার তুমি আমার বাল বাচ্চা গো ফালাইয়া অন্যখানে বিয়া করবা নাতো? কি যে, অবস্থা।
মহব্বত বাইরা গেলো, ঘরে থেকে আর বাইর হৈ না। সরকারও না করছে বাইর হইবার। বউ এর সব কাজে অতি মহব্বতের সহিত সাহাজ্য করি। ঘর মুইছা দেই, তরকারী কুইট্টা দেই, আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। খাই-দাই-ঘুমাই, আর ফেসবুক করি। কিন্তু হালার ডর আর যায় না। ডরে ডরে প্রতিদিন ভাবি, এই বুঝি মিডিয়া কইবো, আজ গাবতলীর বাস স্ট্যান্ডের পাশে পাচ হাজার লাশ পাওয়া গেছে, হয়তো কাল হুনুম, ওই মতিঝিল এলাকায় আরো ২ হাজার লাশের স্তুপ পাওয়া গেছে, আর গত রাইতে করোনায় মরা এই সব মানুষের লাশ। দুই মাস পার হইয়া গেলো। কিন্তু হালার মাত্র মরার খবর আইলো দেড় শ? আর আক্রান্ত হইলো মাত্র সাত আট হাজার?
এবার আমার ওইসব ভাইজানেরা আবার মন্তব্য করলেন, সরকার বাহাদুর সঠিক তথ্য লুকাইতেছে। আক্রান্ত আরো লক্ষগুন বেশী। টেষ্ট করতাছে না, তাই ধরা পড়তাছে না। বুঝলাম যে, করোনা টেষ্ট না করার কারনে কয়জন আক্রান্ত হইছে এইডা না হয় সরকার বাহাদুর গোপন করতাছে কিন্তু হালার মরার খবর তো আর আটকাইয়া রাখতে পারার কথা না যেখানে প্রতিটা মানুষের হাতে একটা কইরা মোবাইল ক্যামেরা আর সবাই সাংবাদিক। আমি তো হালার সারা ফেসবুকের মরার খবর যোগ কইরাও ৫০০ অতিক্রম করাইতে পারলাম না। তাইলে ওই হালার বিদেশি সংস্থাগুলি কি ছিড়ার কথা কইলো? আর ফকফকা ভবিষ্যৎ দেখা আমাগো ওই ফেসবুক এস্ট্রোলোজারগুলি কি কয় এখন? নাকি আরো কিছু টাইম বাড়াইয়া লইবেন যে, আরো ২ মাস যাক? কোনটা? এদিকে কিন্তু ঘরের মজুত খাবার শেষ, আবার অনেকের চাকুরী আছে কি নাই এইটা নিয়াও দন্দে আছে। তবে এখনো বাপের বা জামাইয়ের বা সরকারের তহবিল থেকে যাদের খাবারের ব্যবস্থা আছে, তারা হালার বিজ্ঞের মতো মন্তব্য করা ছাড়ে নাই।
আমি অংকে কাচা, সাইন্সেও হালায় মাথা বেশী ভালো না। তয় যেটা বুঝতাছি, সেটা হইলো গিয়া, এমনো তো হইতে পারে যে, ঘরে ঘরে এখন অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হইয়া আছে। কিন্তু তারা এমন কইরা শান্তিতে বাস করতাছে যে, কোনো উপসর্গ প্রকাশ করতাছে না। কে জানে যে, যারা বিজ্ঞের মতো ভবিষ্যৎ বানী করতাছে, তাদের মধ্যেই হয়তো সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হইয়া বইসা আছে, জানেই না। আবার এমনো হইতে পারে, সারাদিন টো টো কইরা বাইরে ঘুরতাছে, তার কোনো করোনাই নাই, কিন্তু ফার্মের মুরগীর মতো ঘরে মাসের পর মাস বন্দি হইয়া উপসর্গবিহীন করোনা লইয়া বইসা আছে। কেম্নে বুঝবেন? পরীক্ষা তো করান নাই। আবার ডরের ঠেলায় করাইবেনও না।
শোনেন ফেসবুক এস্ট্রোলজারগন, এই পৃথিবীতে করোনাই একমাত্র নতুন কোনো মহামারী প্রথম আগমন করে নাই। এর আগেও এর থেকেও অনেক বড় বড় মহামারী এসেছিলো। আর ওইসব মহামারীর তান্ডব কিন্তু এখনো প্রিথিবী থেকে শেষ হইয়া যায় নাই। কিন্তু সেগুলি নিয়া আমরা ডরাই না কেন?
উদাহরন দেই, ডায়েরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ম্যালেরিয়া, টিউবারকিউলুসিস, রুবিওলা, ইবোলা, স্মল পক্স, প্লেগ এই সবই মহামারীর মতো কইরাই এই দুনিয়ায় কোনো না কোনো সময় তান্ডব চালাইছিলো। আর এগুলি কোনো না কনোভাবে ছোয়াছেই। একটা পরিসংখ্যান বলে যে, খালি ২০১২ সালেই নিউমোনিয়ায় মারা গেছে এক কোটি দশ লক্ষ লোক, আর প্রতি বছর মারা যায় প্রায় ১ থেকে ২ মিলিয়ন লোক (মানে সোয়া এক কোটি থেকে দুই কোটি), টিবি রোগেই মারা যায় প্রায় দেড় কোটি লোক, ইবোলা, ইনফেকসাস ডায়েরিয়া বা ম্যালেরিয়া এইডস ইত্যাদি রোগেও কম নয় সংখ্যাটা। আর করোনায় এই সংখ্যার কাছে কিছুই না। তাহলে ওইসব ছোয়াছে রোগ নিয়ে আমরা একেবারে ঘরের মধ্যে রুদ্ধ হইয়া বইসা রই না ক্যান? কারন, আমাদের শরীর, মন, এবং সচেতনতা এই সব রোগের ব্যাপারে এখন এক্টিভ। নতুন কইরা ডরের কিছু নাই। এইসব রোগের ব্যাপারে আমাদের বাসর হইয়া গেছে। আমরা এখন তারে চিনি। আর জানি কিভাবে সামলাইতে হয়।
কিন্তু এইসব রোগে এতো সংখা মরার খবর জেনেও নিউ ফেসবুক এস্ট্রোলজাররা সবাইকে আবার নতুন কইরা সতর্ক করতাছে না ক্যান?
ব্যাপারটা খুব সোজা। সবাই সবার থেকে এক ডিগ্রী চ্যাম্পিয়ান হইতে চায়। কে কার আগে কতো তাড়াতাড়ি নতুন নতুন সংবাদ প্রচার কইরা ক্রেডিট লইবো। সত্যই হোক আর মিথ্যাই হোক, কিছুই যায় আসে না, সংবাদটাতো নতুন। আরে হমুন্দির ভাই, এইটাই তো সবচেয়ে বড় সাইবার হাতিয়ার মানুষকে আতংকিত করার আর এই হাতিয়ারটাই তো বড়বড় রাগোব বোয়ালরা ব্যবহার করেছে। একেকটা উঠতি জাতীয় শিল্পকে ধংশ করার মোক্ষম অস্ত্র তো এগুলাই।
কোনো একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী যখন নতুন কোনো উঠতি ব্যবসায়ীকে আজীবনের জন্য শেষ করে দিতে চায়, তখন সেই প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ী একই প্রোডাক্ট কমমুল্যে এমন কি খরচের থেকে কম মুল্যে নিজের হোগা মাইরা হইলেও বাজারে ছাইরা দেয়। কম্পিটিশনে টিকতে না পাইরা ওই উঠতি ব্যবসায়ী নাকে খত দিয়া ব্যবসা থেকে চিরতরে আউট। এটাই তো চায় ওইসব প্রতিষ্ঠিত জাতীগুলি। আর আমরা না বুঝেই বাইল্লা মাছের মতো অনেক্ষন বর্শীর দিকে তাকাইয়া থেকেও বুঝতে পারি না যে, এটা একটা ফাদ। এক সময় গিল্লা ফালাই আর মরি।
শোনেন ভাইজানেরা, আল্লাহ মানুষের শরীরের মধ্যেই একটা কইরা ল্যাব এইড বা এপেলো হস্পিটালের মতো মেডিক্যাল স্টোর দিয়া দিছে যার নাম “ইম্মিউন সিস্টেম”। নতুন ভাইরাস করোনা। এটার সম্পর্কে আমাদের শরীর আগে থেকে সতর্ক না। তাই শরীরের ইম্মিউন সিস্টেমের ইনভেন্টরীতে এই রোগের ইম্মিউন সিষ্টেম তৈরী করা ছিলো না। কিন্তু গত দুই মাসে আমাদের দেশে লাখ লাখ মানুষের শরীরে এই এন্টি বডি তৈরী সম্ভবত হইয়া গেছে। যদি টেষ্ট করা হয়, হয়তো দেখা যাবে ঘরে ঘরে বহুত মানুষের করোনার ভাইরাস আছে, বা আক্রান্ত কিন্তু উপসর্গ দেখা দিচ্ছে না, বা মরতাছে না কারন আল্লাহর দেয়া এই ইম্মিউন সিষ্টেম ইতিমধ্যে করোনার বিপরীতে ডিফেন্স সিষ্টেম তৈরী করে ফেলেছে। ফলে লোকজন মারা যাচ্ছে কম। আবার সুস্থই আছেন তারা।
ডরাইয়েন না। আর মানুষকে ডর দেহাইয়েন না। ডর মানুষের মানসিক শক্তিকে দূর্বল করে দেয়। সচেতন হইলেই হবে। রোগের থেকে আমাদের শরীরের ইম্মিউন সিষ্টেম অনেক বেশী শক্তিশালী। কাজে যান, রোজগার করেন, যতো টুকু সম্ভব ভালো ভালো খাবার খান, ইম্মিউন সিষ্টেমকে আরো শক্তিশালী করুন। আজাইরা ঘরের মধ্যে বইসা থেকে ইম্মিউন সিষ্টেমকে অকেজো কইরা দিয়েন না। আর অযথা গুজব টাইপের তথ্য শেয়ার কইরা পন্ডিত সাইজেন না।
একটা কথা বলি, যতোক্ষন না পর্যন্ত জানতে পারতাছেন যে, আপনার ঘরের মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হয় নাই, ততোক্ষন তো মনের আনন্দে একে অন্যের সাথে মনের সুখে হাসি তামাশা করতাছেন, কিন্তু যেই মুহুর্তে জানলেন যে, ওইরে ভাই, আমাদের ঘরেই তো দাদীটা বা দাদাটা কিংবা বোনটা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হইয়াই আছে, তাহলে কি সব শেষ? কেনো? তার তো করোনা হইয়াই ছিলো, তাও তো ভালই ছিলো, তার ইম্মিউন সিষ্টেম হয়তো অনেক স্ট্রং থাকায় দ্রুত এন্টি বডি তৈরী করে করোনাকে পরাস্ত করে তাকে সুস্থই রেখেছে, কোনো উপসর্গই সে দেখায় নাই। অথচ এই আক্রান্ত হইবার তথ্য জানার পর অর্ধেক মরা হইয়া গেলেন? এইটা কোনো কথা?
ভয়ের কিছু নাই ভাই। এই করোনা থেকেও অনেক অনেক বেশি মানুষ মরে যায় নরম্যাল নিউমোনিয়া, ডেংগু কিংবা হার্ট/লিভার ডিজিসে। এটা মহামারি কারন একসাথে সবখানে হয়েছে বলে। ভরষা রাখেন নিজের উপর, আল্লাহর উপর। আর একটু সচেতন থাকুন। এটা অনেক বড় রোগ নয়। এর মর্টালিটি হার আসলেই কম। আশেপাশের মানুষ, মিডিয়া, সব দেশে এক সাথে হওয়ায় আর অতিরিক্ত এটেশন দেওয়ার কারনেই আমরা বেশি ভয় পাচ্ছি। অনেকেই হয়ত জানেই না যে, নিজের ঘরের অনেক সদস্যরা ইতিমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এন্টিবডি তইরী করে সুস্থই আছেন।
জানি, নতুন সব কিছুই আতংকের ব্যাপার। নববধুর কাছেও তো শুনি বাসরঘর নাকি আতংকের। তাই বলে কি…।। থাক কইলাম না। আমি আশাবাদি মানুষ।
আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষের একটা প্রবনতা আছে (বদ না ভাল সেটা বলতে চাই না), আর সেটা হল, কোনো একটা ব্যাপারে কেউ যদি মিডিয়াতে, বা টকশোতে ঝড় তুলতে পারে, তাহলে এর বাইরে আশেপাশে আরো বড় বড় কোনো ইস্যু যাইই হোক না কেনো, যেটার উপর ঝড় উঠলো, তো সেটা নিয়ে এমন তুলকালাম বাধাবে যে, পৃথিবীতে বুঝি ওটা ছাড়া আর কোনো ইস্যু নাই। হোক সেটা রাজনীতি, হোক সেটা কোনো চুরি, বা কোনো রোমাঞ্চকর ব্যাপার। আর মজার ব্যাপার হলো, ওটা যে কি, এটার আগামাথা না জেনে, না বুঝে, এর ইমপ্লিকেশন কি, বা তাতপর্য কি কিছুই বুঝুক বা না বুঝুক, জ্ঞানীদের মতো বিজ্ঞ বিজ্ঞ মন্তব্য না করে ছাড়বে না। ভাবখানা এই রকমের যে, সবাই সিপিডি জাতীয় উন্নততর কোনো গবেষনা প্রতিষ্ঠানের এক মহারাজ্যে তাকে কন্সাল্টেন্ট হিসাবে যখন তখন বসাইয়া দেয়া যায়। পাওয়ার ব্যাংক আর সেন্ট্রাল ব্যাংক যে এক না, এটাই হয়তো অনেকে বুঝে না। খালি ব্যাংক হলেই বুঝি টাকার সাথে জড়িত বলে ভাবে।
আজকে আমার প্রসংগটা গার্মেন্টস নিয়ে। গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে বহুত মানুষ জানেই না এর পুরু প্রোসেসটা কি, কিভাবে এর সফলতা বা ব্যার্থতা আসে। যার ফলে দেখা যায়, এই সেক্টরে বুঝি হাজার হাজার কোটি টাকা খালি বাতাসে উইড়া বেড়ায়, এই চিন্তা করে বহুত উঠতি নাদান পাবলিক বাপের বাড়িঘর বেইচ্যা, বউ এর গহনা গাট্টি বন্ধক দিয়া, বন্ধু বান্ধবদেরকে মোটা লাভের লোভ দেখাইয়া টাকা পয়সা লোনে জোগাড় কইরা ব্যবসা শুরু করে। যেহেতু এর আগামাথা কিছুই বুঝে না, অল্পদিনেই মাইর মুইর খাইয়া নাস্তানাবুদ, আর ফলস্বরূপ দেনার ভারে মাথা নুয়াইয়া মোবাইল ফোন বন্ধ কইরা চোরের মতো এদিক সেদিক হয় ঘুইরা বেড়ায় নতুবা কোনো না কোনো ফন্দিফিকির কইরা কোনো রকমে বউ ঝি ফালাইয়া বিদেশ পাড়ি মাইরা হয় ক্যাব চালায় না হয় ৭/১১ এ কাজ শুরু করে। আর দোষ পড়ে হয় শ্রমিকের, না হয় বায়ারের, না হয় সরকারের ইত্যাদি। নিজে যে একটা চুদুর বুদুর টাইপের জ্ঞানি, সেটা স্বীকার করে না। একজনে কোটি টাকা লোন কইরা একখানা বাড়ি করলো মানেই কিন্তু সে ফাইনালি বাড়ির মালিক বইন্যা যায় না। যে বাড়ি বানাইছে লোন নিয়া, সে বুঝে মাসিক কিস্তি দিতে না পারলে তার হার্টবিট কত রেটে চলে, কয়েক মাসের মাসিক কিস্তি যদি বকেয়া পইড়া যায়, তাহলে ওই বাড়িওয়ালার রাতের ঘুম হবে হয় রাজপথে না হয় কবরে। কিন্তু আশেপাশের লোক কিন্তু দেখতাছে, বেটা তো সাততালার একখানা বাড়ির মালিক। মজার ব্যাপার হইল আরেকটা, জোগালি বা রাজমিস্ত্রী যে এতো কষ্ট কইরা বাড়ি একখান বাড়িওয়ালার পক্ষে বানাইয়া দিলো, কেউ কিন্তু কয় না, জোগালির বা রাজমিস্ত্রির ঘামের রক্তে বেটা বাড়ি বানাইছে, এখন জোগালি বা রাজমিস্ত্রিরেও আজিবন বেতন দেয়া হোক। কিন্তু গার্মেন্টসের বেলায় কিন্তু এই কথা জোর গলায় কইতাছে, শ্রমিকদের রক্তে নাকি মালিকরা বড় লোক হইতাছে। আরে ভাই, দেন না একটা ফ্যাক্টরী। আপ্নিও বড়লোক হইয়া যান!! খামাখা চাকুরীর জন্য আবার ওই গার্মেন্টেই আহেন কেন?
বাংলাদেশে যতোগুলি গার্মেন্টস আছে আমি সবাইকে এক কাতারে ফেলছি না। কিন্তু যেসব গার্মেন্টসগুলি কমপ্লায়েন্স করা (অনেকে তো আবার কমপ্লায়েন্স কি সেইটাই বুঝেন না), সেডেক্স, বিএসসিআই, ইউএল, আইএসও, একর্ড, এলায়েন্স ইত্যাদি সোস্যাল কমপ্লায়েন্সগুলিতে কোয়ালিফায়েড, তাদের কথা বলছি। এইসব ফ্যাক্টরীগুলি এইসব কমপ্লায়েন্স করতেই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এবং এসব বাংলাদেশের কোনো অথরিটি দেয় না। দেয় আন্তর্জাতীক সংস্থাগুলি। আর ওখানে ঘুষের কোনো কারবার চলে না। সব শর্তাবলী পালন করেই এইসব সার্টিফিকেট পাইতে হয়। এরা টাইমমতো বেতন দেয়, টাইমমতো বোনাস দেয়, সময়মতো ওয়ার্কিং টাইম মেইন্টেইন করে, মাতৃত্ব ছুটি, বাৎসরিক ছুটি, মেডিক্যাল লিভ, ক্যাসুয়াল লিভ, হেলথ এন্ড হাইজিন, পরিবেশ সংক্রান্ত ব্যাপারগুলি সব মেনে ব্যবসা করে। কারন কমপ্লায়েন্সওয়ালা ফ্যাক্টরীগুলি এসব বিষয়ে প্রতিনিয়ত ব্রান্ড বায়ারদের কাছে জবাব্দিহি করতে হয়। কিন্তু এর বাইরেও হাজার হাজার গার্মেন্টস আছে, যারা না এইসব কমপ্লায়েন্সের ধার ধারে, না কোনো স্ট্যান্ডার্ড মেইন্টেইন করে। ওইসব ফ্যাক্টরিগুলি না দেয় টাইম মতো বেতন, না দেয় শ্রমিকদেরকে তাদের সঠিক পাওনাগুলি। আর এইসব ফ্যাক্টরির জন্য যারা অরিজিনালি ভালো ফ্যাক্টরী তাদের বদনাম হয়। ওই যে একটা কথা আছে না, মাছ খায় সব পাখী, নাম পড়ে মাছরাংগার। ব্যাপারটা প্রায় এই রকম যে, গুটিকতক অসৎ সদস্যের কারনে পুরা সেক্টর বা ডিপার্টমেন্টের (হোক সেটা যে কোনো ডিপার্টমেন্ট, ডাক্তার, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষক, বা সরকারী কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী ইত্যাদি) বদনামের ভাগীদার হতে হয়। একটা উদাহরন দেই, এই যে, ঢাকার বাইরে থেকে যারা এখন ঢাকার উদ্দেশ্যে লকডাউনের মধ্যে পুনরায় ঢাকামুখী হচ্ছেন, তারা কি সবাই গার্মেন্টস শ্রমিক? আসলেই না। এদের মধ্যে আছে অন্যান্য সেক্টরের মানুষজনও যেমন পরিবহন সেক্টর, কন্সট্রাকশন সেক্টর, চা বাগান, মৎস্য সেক্টর, সাধারন শ্রমজীবি, আর আছে লম্বা ছুটি পাওয়ার কারনে বহুত সরকারী-বেসরকারী লোকজন। কিন্তু দেখবেন, ফেসবুক সয়লাব হয়ে যাবে নতুন পুরানো পোষ্ট মিলাইয়া যে, এই যে গেলো সব। গার্মেন্টস শ্রমিকেরা এইবার সারা দেশের করোনা, ধরোনা, বা সরোনা টাইপের যতো রোগ আছে সববুঝি চারিদিকে ছরাইলো। আরে ভাই, এর মানে কি এই যে, গার্মেন্টসের সব শ্রমিকেরা করোনা লইয়া ঘুরে? পরিসংখ্যানে কয়টা ধরা পরছে যে, একশত লোকের মধ্যে ৯০ টাই গার্মেন্টস শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত?
সরকার অযথা ঘুরাঘুরি করতে না করতেছেন, তারপরেও কে কার কথা শুনছেন? ঘরে আর ভালো লাগে না, ঘরে ঘরকন্নার কাজ করতে করতে অস্থির, তাই খুশির ঠেলায় একটু খামাখাই বাইরে যাই। আর এদিকে সারাক্ষন রাস্তায় যারা নিজের জীবন বিপন্ন কইরা আর্মি, পুলিশ র্যাটব এবং অন্যান্য সেচ্ছাসেবীরা হিমশিম খাচ্ছেন, তাদেরকে মিথ্যা একখান অজুহাত দিয়া ফাকি দিয়া কখনো আজাইরা বিড়ি ফুকার জন্য বাজারে, মাঠেঘাটে, অলিতে গলিতে আড্ডা মারতেছে, তাদের কোনো দোষ নাই করোনা ভাইরাস ছড়ানোর বেলায়। তারা মনে হয় স্থায়ী প্রতিষেধক লইয়া জন্ম গ্রহন করিয়াছে, তাই তারা বুক ফুলাইয়া ঘুরিতে পারে, তাতে কোনো প্রশ্ন নাই।
আরেকখান কথা না বললেই না। দুনিয়ার বিখ্যাত বিখ্যাত অনেক কোম্পানি যেমন, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, পোষাক শিল্পের নাম করা এইচ এন্ড এম, জারা, তেল কোম্পানী, আরো অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলি এই করোনার প্রভাবে দেউলিয়া হইয়া ব্যবসা পর্যন্ত বন্ধ করে দিচ্ছে, তারাও তো হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছিলো, কিন্তু এরপরেও বন্ধ হচ্ছে কেনো? যারা ব্যবসা করেন (আজাইরা ব্যবসা না, অরিজিনাল ব্যবসা) তারা বুঝতেছে কি চলছে তাদের একাউন্ট ডিভিশনগুলিতে। এটা কোনো ফুস্কার দোকান না। কিংবা মালাইকারীর দোকান না যে, মনে হইলো ২০০ টাকার মুলধন লইয়া ব্যবসায়ী হইয়া গেলাম, আর সমস্যা হইছে তো, ঘরে গিয়া আরামছে স্টার জলসা দেখা শুরু করলাম।
মজার ব্যাপার হইলো আরেকটা। সরকারের বহুত অর্থপূর্ন সিদ্ধান্তগুলিকে কিছু কিছু নব বুদ্ধিজীবিরা এমনভাবে সমালোচনা কিংবা ফেসবুকে উপদেশ দেয়া শুরু করছেন যেনো তারাই সরকারের চেয়ে ভালো বুঝে বিশ্ব অর্থনীতি, কিংবা দেশের অর্থনইতিক অবস্থা। আরে ভাই, যে গিন্নি সংসার চালায়, সে বুঝে কয় বেলার খাবার ঘরে আছে আর কয়দিন কিভাবে চলবে। আর বিকল্প কোথা থেকে কি না আসলে সামনে তার সংসার চালানো কি বিপদ। যিনি সরকার চালান, তিনি জানেন তার মাথায় কি পরিমান বোঝা লইয়া তারা ঘুমাইতে যান। কাল যখন করোনা থাকবে না, আর আপনি যখন গাড়িখানায় নিজের বউ বাচ্চা লইয়া অনেকদিন পর একটা লং ড্রাইভে যাওয়ার জন্য আগে তেল ভরার জন্য পেট্রোল পাম্পে যাইবেন, গিয়া দেখবেন, অকটেন, ডিজেল নাই, আবার শুরু করবেন সরকারের চৌদ্দগোষ্টি উদ্ধারের। পরশু যখন দেখবেন ফারনেস ওয়েলের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ আর বিদ্যুৎ দিতে পারবে না, তখন আবার খুশীর ঠেলায় সরকারের আটাইশ গোষ্টি শুদ্ধা উদ্দার করবেন। বিদেশে আদরের বাচ্চাটারে পরাইতে পাঠাবেন, ডলার লাগবে, কিডনী খারাপ হইয়া গেছে, বাইরে না গেলেই নয়, পগারপার হইয়া যাইবেন, বাড়ি ঘর বেইচ্যা হইলেও বাচতে চাইবেন, তাই ডলার লাগবে, নিত্যদ্রব্য কিনতে গেলেও তো বিদেশী কারেন্সীই লাগবে। কেডা দিবো এই কারেন্সী? ফরেন রেমিট্যন্স তো এখন প্রায় শুন্যের কোটায় কিন্তু সরকারকে তো এইসব কিছুই ডলার দিয়া কিনতে হয়। তাহলে এই ডলারগুলি কি আমাদের কেউ যৌতুক দিবেন সরকারকে? সরকার খুব ভালো করেই জানেন, তার কি করা উচিত। এতো বিশেষজ্ঞ সবার না হইলেই ভালো। WHO কইলো ৫ লাখ লোক নাকি মরবো আমাদের দেশে ২ মাসের মধ্যে, আরে ভাই, ওইটাও একটা রাজনৈতিক কেরামতি। দেশের ৫ লাখ লোক মইরা যাইব আর সরকার আকাশের তারা গুববো নাকি? তার চিন্তা নাই? অবশ্যই আছে। আর তারা সেটাই করছে, যা করনীয়।
যাইই হোক, এসব ব্যাপার বেশী কথা বলতে চাই না। এই করোনা অবস্থাতে যারা ভালো ফ্যাক্টরি, তারা নিজের ঘরের সদস্যদের থেকেও তাদের শ্রমিকদের ব্যাপারে অনেক বেশী খেয়াল রাখেন এবং রাখছেন। যেসব ফ্যাক্টরীগুলি সাবস্ট্যান্ডার্ড, তারা আরো ৫০ বছরেও ওই সাব-স্ট্যান্ডার্ডই থেকে যাবে। আর এর কারন হইলো এই যে, যারা অতি লোভে ব্যবসা করতে আসেন, তাদের ব্যবসা শুরু করার আগেই ক্যালকুলেটরে লাভের অংক কষতে থাকেন। তারা তো ব্যবসায়ীই না। তাদের জন্য ভালো ফ্যাক্টরীগুলির বদনাম হবে কেনো? এই তলাবিহিন রাষ্ট্রটার এখন শক্ত তলা হয়েছে শুধুমাত্র ভালো ব্যবসায়িদের সমন্নয়ে সরকারের বুদ্ধিদীপ্ত নির্দেশনার কারনেই। তাই, আমাদের উচিত না কালো বা হলদে সাংবাদিকতার খপ্পরে পইরা দেশের সতেরোটা বাজাই আর সোনার ডিম দেয়া মুরগীটারে জবাই করি। এটাও ঠিক যে, সোনার ডিম পাড়া মুরগীরে কেউ সোনার মুকুট পড়ায় না। এটা আমরা জানি। মুকুট পড়াইয়েন না, অন্তত মুরগীটারে বাচতে দেন, আপ্নারই লাভ হবে।
আরেকটা মজার কথা বলি। যারা সত্যিকারের গার্মেন্টস শ্রমিক, তারাও এই সেক্টরের জন্য বহুত টেনসনে আছেন। তারাও দুই হাত তুইল্লা আল্লাহর কাছে তাদের নিজেদের ফ্যাক্টরির জন্য আর মালিক যেনো বাচতে পারে তার জন্য নামাজ কিংবা পুজা যে যার ধর্ম মোতাবেক দোয়া করতেছে। আর যাদের আপ্নারা রাস্তায় দেখেন, তারা আসলে কোনো শ্রমিকই না। তারা হচ্ছে শীতের পাখীর মতো হটাত কইরা কিছু অসৎ মানুষের পাল্লায় পইরা ৫০/৬০ টাকার কমিশনে ঘন্টা খানেকের জন্য রাস্তায় একটা উত্তাপ ছরাইয়া দেয়া। কিছু টায়ার পুরাইয়া একটা অরাজকতার স্রিষ্টি করা। এটাই ওদের কাজ। অথচ আসল শ্রমিকেরা এর বিরোধিতাও করতে পারে না কারন তারা সত্যিই নীরিহ। ঝগড়া ফ্যাসাদে জরাইতে চায় না। কিন্তু মনে মনে ঠিকই বলে, হালার দে না আমারে এক মাসের খাবারের টাকা? তখন কিন্তু আবার তাদের পাশে নাই। তারাও নাই, মিডিয়াও নাই, আবার যারা বুদ্ধিজীবির মতো মন্তব্য করেন, তারাও নাই। এটাও হতে পারে যে, ওইসব পোলাপান ওইসব সাব স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরী গুলিরই শ্রমিক। ভালো এবং দক্ষ শ্রমিকেরা সাব স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্তরীতে কাজও করতে যায় না। যারা অদক্ষ, তারাই ওখানে গিয়া ভীড় জমায়।
যাই হোক, আসুন আমরা দেশের এই ক্রান্তিকালে যেটা ভালো সেটাই করি। তবে, হ্যা, যেহেতু করোনা ভাইরাসটি একটি ছোয়াছে রোগের মতো, তাই সবাইকেই সচেতন হইতে হবে। এটা গার্মেন্টস শ্রমিকই হোক, মালিকই হোক আর যে শ্রেনীর লোকই হোক। এটা একটা সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ত। কারোরুই কম দায়িত্ত নয়। জীবন চলতে হবে, জীবনের জন্য জীবিকাও চালাইতে হবে। বছরের পর বছর এই ভাইরাস নাও শেষ হইতে পারে। তাই বলে কি এতো লম্বা সময় শুধু ঘরে বসে থেকে সবকিছু কারো পক্ষে সরবরাহ করা সম্ভব? তাই, আমাদেরকে বিশ্ব বানিজ্যের সাথেও তাল মিলাইতে হবে। তানা হলে সারা দুনিয়া থেকে আরেকবার এতো দূর পিছাইয়া যামু, যে, ম্যারাথন দৌড় দিয়াও লাভ হইবো না। কারন ভেনিজুয়েলা, রাশিয়া, রোমও একসময় সারা দুনিয়া মাদবরি কইরা গেছে, কিন্তু সময় আর রিসোর্সকে সঠিকভাবে কাজে লাগাইতে পারে নাই বইল্লা, তাদেরকে টপকাইয়া তৃতীয় দেশগুলি ফরফর কইরা আগাইয়া গেছে। গাছ তলায় বইসা প্রেম করা যাইতে পারে কিন্তু গাছ তলায় বইসা সংসার চলে না।
(কাউকে উদ্দেশ্য কইরা এই লেখা না, কেউ আবার মাইন্ড খাইয়েন না, নিরপেক্ষভাবে পইড়েন, হয়তো কিছুটা হলেও সম্বিত ফিররা আইতে পারে, আজাইরা কমেন্টের দরকার নাই। বুদ্ধিজিবি চাই না, বিবেকবান চাই)
ফেসবুকে কিছু কিছু লোকের কিছু কিছু সাবজেক্টে কমেন্টস আর যুক্তি শুনলে মনে হয়, দুনিয়ার কোনো সাব্জেক্টেই তেনাদের জ্ঞানের কোনো কমতি নাই। রোগতত্তের উপরই হোক, অর্থনীতির উপরই হোক, গ্লোবাল রাজনীতির উপরই হোক, মনে হয়, ওরে বাবা, না জানি কত বড় জ্ঞানি। কিন্তু যদি জিজ্ঞাস করেন, বলেন তো বাংলাদেশের রাজধানীর নাম কি? অথবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস কোনটা অথবা বিজয় দিবস কোনোটা, দেখবেন, বলতে না পাইরা বলদের মতো দাত কেলাইয়া হাসবে। আবার হাসিটাও এমুন, যেনো নুরানী মার্কা।
আবার কিছু লোক আছে যারা জীবনে কিছুই হইতে পারে নাই, কিন্তু অন্যে কেনো সফল হইলো, তারজন্য মনে তার এক প্রকার ভীষন জ্বালা। অধিক মরিচ খাইয়া হাগু করতে গেলে যেমন জ্বলে, ঠিক এই রকম তাগো কইলজার ভিতরে সারাক্ষন জ্বলতেই থাকে। ঠান্ডা পেপ্সি কিংবা লাবাং খাইলেও কোনো কাজ হয় না। জ্বলা আর কমে না। তাই যতো পারো সুযোগ পাইলেই এই সফল লোকগুলির বিরুদ্ধে যতোপদের চিলিকবাজী মন্তব্য আছে, করতে কোন দিধা নাই। পরের পাছা, মরিচ দিতে অসুবিধা নাই। বড়ই মজা। এদের কিন্তু জীবনে বড় হইবার খায়েস কখনো যায় না। খালি সপ্ন দেখে, আর ভাবে, হালার শর্ট খাট রাস্তাটা কি? খালি সটখাট মারবার চায়, খুইজ্জা পায় না। এরা আবার মাঝে মাঝে ফেয়ার এন্ড লাভলীও মাখে। এরা কথায় বড় ধান্দাবাজ। এরা যখন কথা কয় তখন আমজনতা (আমজনতা কারা, ব্যাখ্যাটা করতাছি একটু পরে) তন্ময় হইয়া শুনতেই থাকে। আর ভাবে, আরে, ভাই, এতো দেখি মহাজ্ঞানী, এরেই তো খুজতাছি। এতোদিন কোথায় ছিলেন, বনলতা সেন টাইপের আকুতি। আমজনতা তার কথা শোনার পর আবার মোবাইল নম্বরটাও চাইয়া লয়, যদি কখনো আবার কাজে লাগে। কিন্তু মজার ব্যাপার হইলো গিয়া, এরা কারো কাজেই লাগে না, নিজেরও না। এরাই অন্যের বড় বড় বানী টাইম মতো মুখস্থ ছাইরা দেয়, অন্যের ছোট খাটো লিমিটেশন্স মস্ত বড় কইরা ঢেকুর তোলে, এরা সারাক্ষন মাইনষের পোন্দের মধ্যে মরিচের গুড়া মাখতেই থাকে।
আবার কিছু পাবলিক আছে, খায় মালিকেরটা, কাম করে পরের অধীনে, কিন্তু সুযোগ পাইলে ওই মালিকের পাছায় বাশ দিতে একটুও কার্পন্য করে না। ভাবখানা এই রকম যে, হালায় মালিক হইলো কেন? আমি তো হের থেকে আরো সুন্দর ইংরাজী কই, আমি তো ব্যাকব্রাশ চুল আচড়াই, আমার চেহারা তো হের থেকে আরো সুন্দর, হালায় আমি ক্যান মালিক না। মারো পোদে বাশ। যেই না আবার সমস্যায় পরে, পুনরায় তেল দিতে দিতে আর জুতার তলা ক্ষয় করতে করতে আবার এইসব মালিকের পা ই ওরা চাটতে পছন্দ করে, যদি একটা ইঙ্ক্রিমেন্ট পাওয়া যায় তার আশায়।
আবার কিছু পাবলিক আছে, তার তথাকথিত বুদ্ধিমান বন্ধু কোনো একটা পোষ্টে একটা মন্তব্য করছে, তার কাছে মনে হইলো, ওর বন্ধু তো মনে হয় বুইজ্জাই মন্তব্য করছে। আর কোনো চান্স নেয় না, এক্কেবারে তার সাথে ঢোল পিটাইয়া লাইক দেয় আর কয়, আমিও সহমত। আরে হালার ভাই, সহমত দিবি না সহমরনে যাবি, যা, কিন্তু বুইজ্জা তো ক? এখানেই শেষ না, পারলে আরো কিছু যোগ এমনভাবে করে যেনো আদার বেপারী জাহাজের খবর তো নেয়ইে, পাশাপাশি টাইটানিকের নেয়। কারন ওই তথাকথিত বুদ্ধিজীবি অকর্মন্যা বন্ধুর লগে সহমত না হইলে তো আমার প্যাদা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্যাদা যদি নাও খায়, বোদাই হিসাবে গন্য হইবার সমুহ সম্ভাবনা তো থাকেই। তাই সহমত হইলে আর কোনো রিস্ক থাকে না। এর মধ্যে আবার এমন কিছু আবাল টাইপের বন্ধুও আছে, যারা আবার ইচ্ছা কইরাই সহমত হয় না। ওরা আরো এক ধাঁচ উপরে। তিনি আবার সহমত না প্রকাশ কইরা, এমন এক মন্তব্য ইংরেজী বাংলায় লিখেন যেনো পইড়া মনে হয়, হায় রে ইংরাজী। যদি ব্রিটিশরা এই ইংরাজি পড়তো, তাহলে, ভারতবর্ষে ওই যে, ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন হইছিলো, সেটার আর কোনোই প্রয়োজন হইতো না। ব্রিটিশ সরকার এম্নিতেই মাফ চাইয়া কইতো, ভাই আমাদের ইংরেজী ভাষাকে আর পোদ মাইরেন না, আমরা ভারতবর্ষ ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবো।
আবার এমন কিছু লোক আছে, প্রিন্ট বা ছাপানো কিছু দেখলেই মনে করে, আবে হালার, এইতো পাইছি অরিজিনাল খবর। তাহলে তো ব্যাপারটা সত্যি। যায় কই। লাগলো এর পিছনে যুক্তি মারা। এটা গুজব না, সজব, না মিথ্যা নাকি একটা চক্রের কাম, সেটা কোনো ব্যাপার না। ছাপার অক্ষরে লেখা আছে না? সত্য না হইয়া যায় কই? এইসব পাবলিক আর্বি ভাষায় কোনো পর্ন পত্রিকা দেখলেও সেটা পবিত্র মনে করিয়া বুকে জরাইয়া চুমা খাইবে। কারন এই পাবলিকগুলি কোনটা যে কি কিছুই বুঝে না। হে ঈসশর, তুমি এদের হেদায়েত করো।
আবার কিছু লোক আছে, অতি সাধারন। যাহা দেখে তাহাই বিশ্বাস করে। এদের বলা হয় আমজনতা। ওই যে আগে বললাম। বেশীর ভাগ আমজনতা না বুইজ্জাই ফেসবুকের খবর, ভিডিও, পোষ্ট পড়ে আর রিয়েকশন দেয়। রাত জাইজ্ঞা জাইজ্ঞা ফেসবুক করে। এরা কখনো আবেগে কান্দে আর টিস্যু দিয়া চোখ মুছে । কখনো কখনো খিলখিল কইরা হাসে। আবার কখনো কখনো এমনি এমনি চুপ কইরা বইয়া থাকে আর কি জানি ভাবে। মাঝে মাঝে আবার দুই হাত তুলে ঈশ্বরের কাছে মুনাজাতও করে। এরা নীতিবান। কিন্তু এরা কোনো ফ্যাক্টর না। কিন্তু এরাই সবচেয়ে বেশী গুজবটা ছরায়।
কারন উপরের যা যা দেখলেন, এই আমজনতা সবগুলিই শেয়ার করে।
রাজনীতি আর মিডিয়া, এরা একে অপরের খুব কাছাকাছি বন্ধুসুলভ শত্রু। যখন প্রয়োজন হয় তখন মিডিয়া আর পলিটিশিয়ান একে অপরের বন্ধু হয়ে যায়। ফলে পুর্নসত্য অনেক সময় বেরিয়ে আসে না। বেরিয়ে আসে মিক্সড এবং অর্ধসত্য। অর্ধেক সত্যি কোনো কাজে আসে না। আর এই অর্ধসত্য যখন কেউ খুজে বের করার চেষ্টা চালায়, তখন তাদের ব্যাপারে ফিডব্যাক ফর্মের মতো অনেক প্রতিবেদন চারিদিক থেকে জড়ো হতে থাকে। এই অর্ধসত্য আর অর্ধমিথ্যা ফিডব্যাক ফর্মের ভারে যেখানেই যা কিছু বলা হোক না কেনো, মনে হয় তখন যে, ক্ষমতাশীল রাজত্তে দেওয়ালের শুধু কানই থাকে না, অবিবেচক চোখও থাকে। তখন নীরবতা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। অথচ, এই নীরবতা সমাজে অনেক বড় ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দেয়। এই অপরাধ থেকে মৃত্যু হয় বিশ্বাসের। বিশ্বাসের খুন যখন হয়, তখন শারীরিক খুনের আর কোনো প্রয়োজন পড়ে না। জিবন্ত লাশের মতো এই পরিস্থিতিতে বসদের শুনতে হয় অনেক অধিনস্থদের কষ্টের কথা। কিন্তু একটা কথা তো ঠিক যে, সাধারনত বসেরা কোনো স্টাফের কথা শুনতে পারে, কিন্তু তার কষ্টতো বসেরা মাথায় নিয়ে ঘুরতে পারে না। বসেরা শুধু এই কষ্টটা আবারো সেই মিডিয়া আর রাজনীতির কর্নধাদের কাছেই প্রতিস্থাপিত করা ছাড়া আর কোনো উপায়ও দেখেন না। আবারো সেই চক্রকার গোলকধাধা। বসেরা কি জানে না যে, রাজনীতিতে যদি মানবিকতা আর সচ্চতা থাকতো তাহলে কেহই এই রাজনীতি করতে আসতো না!! গুটিকতক রাজনীতিবিদেরা হয়তো এই চক্রাকার গন্ডির ভাইরে থাকে যাদের জন্য এখনো দেশ তথা জাতী ক্রিতজ্ঞ।
লুকানো এক জিনিষ আর বিভ্রান্ত করা আরেক জিনিষ। আমার কাছে মনে হচ্ছে, সব সময়ই গার্মেন্টস সেকটর নিয়ে বিভিন্ন স্তরে সর্বদা শুধু সত্যকে লুকিয়েই রাখা হয় না, বিভিন্ন মনগড়া তথ্য দিয়ে একে বিভ্রান্তও করা হয়। কিছু কিছু জিনিষ সামনে আসতে অনেক সময় লাগে আবার কিছু জিনিষ সামনে আসতেই দাবিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু মজার আর সত্য ব্যাপার হলো, কিভাবে কখন জল মাথার উপর উঠে যায়, কেউ জানে না। আর জল যখন মাথার উপর উঠে যায়, তখন যা প্রয়োজন তা হচ্ছে বাইরের থেকে আচমকা সাহাজ্য। আর যদি সেই বাইরের থেকে আচমকা সাহাজ্য না আসে তখন যিনি ডুবে আছেন, তার সাথে আরো অনেকেই জ্লে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আরএমজি সেক্টর এখন সেই অতল জলের ঠিক বিপদ সীমার লাইন বরাবর চলছে। এর প্রতিফলন আমরা দেখবো জানালা দিয়ে নয়, সরাসরি সদর দরজা দিয়ে। দুর্ভিক্ষের বীজ ইতিমধ্যে বুনা হয়ে গেছে, এখন বাকী শুধু মৃত্যুর ফাদে আটকে পরার সময় গুনা। কেনো বললাম জানেন?
বললাম এ কারনে যে, যেভাবে সাইন্স প্রমানের উপর ভিত্তি করে এগিয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই অর্থিনীতির সুচকের মাপকাঠির তথ্য প্রমানের উপর ভিত্তি করেই বিশ্ববানিজ্য এগিয়ে বা পিছিয়ে যায়। আর এই প্রমান কি করে পাওয়া যায়? পাওয়া যায় যখন সেটা নির্দিষ্ট পথে খোজা হয়। আর এইপথ কোথা থেকে খোজা হয়? অতীতের সুত্র বা ডাটা অথবা আগামি দিনের সুচক ধরে। যেটাকে বলা হয় ইম্পেরিক্যাল ডাটা। আর তদন্ত গবেষনা ডিপার্টমেন্টে একে বলে কেস হিষ্ট্রি।
কোথায় যেনো একটা ভুল থিউরী কাজ করছে, যা সবাই আন্দাজ করতে পারলেও দেখতে পাচ্ছে না। যে কোনো আলোড়ন প্রথমে মৃদুকম্পন দিয়েই শুরু হয়। একটা সময় আসবে, হয়তোবা সময়টা খুব কাছেই চলে আসছে যখন এই মৃদুকম্পন একটা বড় আলোড়ন হয়ে দেখা দেবে, তখন কেউ আতংকিত থাকবে, আবার কেউ আফসোস করবে। কিছু জিনিষ সময়েই ঠিক করতে হয়, তা না হলে পড়ে অনেক বেশী মুল্য দিতে হয়।
মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ৫ বিলিয়ন উধাও হয়ে যাচ্ছে আমাদের সুচক থেকে। অর্থাৎ বছর শেষে ২০ বিলিয়ন। কারো কলশীতেই যখন পানি থাকবে না, কারাকারি করেও কেউ পানি পাবে না। পানি থাকলেই তো তখন তা পাবার সুযোগ থাকে, কলসীটা যারই হোক। এটা সায়েন্স, কোনো স্লোগান না।
আজ থেকে ৭ বছর পূর্বের কথা! তখন ভেনিজুয়েলার জিডিপি ছিল ৫.৬৩%। জনসংখ্যার মাত্র ২০% দারিদ্র সীমার নিচে। সৌদি আরবের পর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল মজুদ দেশটির! চীন তখন দেশটির খুব কাছের বন্ধু। শক্তিশালী অর্থনীতি! এত তেলের মজুদ! আমেরিকাও ওকে ঘাটাতে চাইতো না!
এখন ২০১৯ সাল। মাত্র ৭ বছরের ব্যবধানে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে গোরস্থান হয়ে গেছে। কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা যুদ্ধ ছাড়াই দেশটি এখন বিশাল অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। যার পরবর্তী ধাপটির নাম দূর্ভিক্ষ! মূদ্রাস্ফীতি ৮০,০০০% অতিক্রম করেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে ২০১৯ শেষে তা ১০০,০০০% অতিক্রম করবে।
এই সংকটের প্রধান কারণ বলা হচ্ছে দুটি-
১. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থের হিসাবে প্রতিনিয়ত গরমিল।
২. ডাচ ডিজিজ।
ডাচ ডিজিজ রোগটা যেকোনো দেশের জন্য বেশ ভয়ঙ্কর। এই রোগের লক্ষণ ৩টি-
১. দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০% আসবে কোনো একটা নির্দিষ্ট সেক্টর থেকে।
২. জিডিপি বাড়তে থাকবে খুবই দ্রুত। মানুষ তার জীবনযাত্রার মান বাড়াবে। শ্রমিক তার বেতন বাড়াবে আরো সুখে থাকার আশায়। তাদের জীবনযাত্রার সাথে তাল মেলাতে আমদানি নির্ভর অর্থনীতি গড়ে উঠতে থাকবে।
৩. সমাজের ক্ষুদ্র একটা অংশ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে আর সিংহভাগ মানুষের সম্পদ, উপার্জন কমতে থাকবে।
এই সুখের সংসার ততদিনই টিকে থাকবে, যতদিন একটি নির্দিষ্ট সেক্টর দেশকে ৮০% আর্থিক সাপোর্ট দিতে থাকবে।
ভেনিজুয়েলার ৮০%-ই আসতো তাদের তেল রপ্তানি থেকে। ২০১৪ সালে আরব বসন্তের ঝাকুনিতে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম কমার সাথে সাথেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে তাদের এত দিনের শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি!
বাংলাদেশের জিডিপি গ্রোথ রেট এখন ৮% এর উপরে (সরকারি হিসেব)। রপ্তানি আয়ের ৮১%-ই আসে গার্মেন্টস থেকে। আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধিও অন্য যেকোনো দেশের চাইতে বেশি!
এদেশেও ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। ব্যাংকের টাকা পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে বিদেশে। বিনিয়োগও হচ্ছে বাইরের দেশে। আবার ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির তালিকাতেও ১ নম্বরে বাংলাদেশ! সবচেয়ে বেশি আয় বৈষম্যের দেশের তালিকাতেও বাংলাদেশ উপরের দিকে!
অর্থাৎ আমরা অলরেডি ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে গেছি! এখন দরকার সামান্য একটা ধাক্কা, তাতেই…
এই ধাক্কাটা নানাভাবেই আসতে পারে।
কতদিন চলবে এমন সুদিন? আমাদের এই সেক্টরের ভবিষ্যত কী সুরক্ষিত?
অবশ্যই না। এই সেক্টরটা বেদুইনদের মত একদেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়ায় এর বেঁচে থাকা নির্ভর করছে ২টি বিষয়ের উপর-
১) Low making cost
২) Low shipment cost
চীন আফ্রিকার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলাকে দখল করে নিচ্ছে। এ বছরেও ৫০ বিলিয়ন ডলার লোন দিয়েছে শুধু আফ্রিকার দেশগুলোর অবকাঠামো ঠিক করার জন্য। সেসব কাজের ঠিকাদারি করছে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোই। বেশ জোরেশোরেই চলছে নির্মাণ যজ্ঞ। বড় বড় ব্রীজ, বিরাট সব পাওয়ার প্লান্টের কাজ চলছে। টাকা দিচ্ছে চায়না, কাজ করছে চায়না, শুধু লোনটুকু ফিরিয়ে দেবে আফ্রিকা! বাজি ধরেই বলা যায়, আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে চীন বিশ্বে নতুন ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।
চীন জানে আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো তাদের টাকা ফিরিয়ে দিতে পারবে না, যেমনটা পারেনি শ্রীলঙ্কা। লোনের দায়ে হাম্বানটোটা বন্দরকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয়েছে লঙ্কানরা। আফ্রিকার সমুদ্র বন্দর এবং সস্তা শ্রমের দিকেই নজর চীনের।
এইসব সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলো পুরোপুরিভাবে তৈরি করার পরপরই চীন যা করবে তা আমাদের জন্য ভয়ংকর দুঃসংবাদই বয়ে আনবে।
শিল্প বিপ্লবের প্রথম ধাপে ঘটে বস্ত্রশিল্প বিপ্লব। সুতরাং আবারো গার্মেন্টস সেক্টর চলে যাবে চীনের বলয়ে। ইতিমধ্যে ইথিওপিয়ার মত দেশও আমেরিকার কাছ থেকে বড়সড় অর্ডার নিচ্ছে। ওদের মজুরিও আমাদের চেয়ে কম। আফ্রিকা থেকে আমেরিকা-ইউরোপ বেশ কাছাকাছি। সুতরাং কমে যাবে শিপিং কস্ট। ওদের শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়লে এবং এই খাতটা একটু ম্যাচিউরড হলেই ইউরোপ আমেরিকার বায়াররা বাংলাদেশের মতো দূরবর্তী দেশে আসবে না- একথা বলাই বাহুল্য।
এভাবে যদি এই সেক্টরটা ধসে পড়ে তাহলে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা কী? ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে হেভি ইন্ডাস্ট্রিতে কনভার্ট হয়ে গেছে। ইন্ডিয়া তথ্য প্রযুক্তিতে খুবই স্ট্রং জায়গায় চলে গেছে। ওরা ব্যাকআপ তৈরি করেছে। আমরা কী করেছি?
এখন প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, আয় বাড়ছে বলে কি সবসময় বাড়বে? একসময় এটা স্থির এবং মাইনাস হবেই। ভেনিজুয়েলা ২০১২-তে বেশ সুখে ছিল। এখন? দেশের মানুষগুলো কোনোরকম যুদ্ধ বিদ্রোহ ছাড়াই দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, উদ্বাস্তু হয়ে অন্য দেশে ঢুকে মার খাচ্ছে।
ভেনিজুয়েলা মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তের পরোক্ষ শিকার। কোন দেশের কোন ঢেউ এসে এখানে আঘাত হানবে কে জানে! যাতে এখনই আমাদের সাবধানতা প্রয়োজন এবং কেবলমাত্র একটি খাতের নির্ভরতা এড়ানো উচিত আমাদের অন্যান্য খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আমার মন্তব্যঃ
লোকাল সেক্টর দিয়ে আভ্যন্তরীন চাহিদা হয়তো কিছুটা ঠেকানো সম্ভব কিন্তু ফরেন কারেন্সী দেশে প্রবাহ না করতে পারলে না অনেক কিছুই করা সম্ভব হবে না। বাহিরে লেখাপরার ব্যয়, সাস্থ খাতে বাহিরের চিকিতসা বনাম মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টস আমদানী, পেট্রোলিয়াম কোনো আইটেম অথবা এমন সব নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ যা অন্য দেশ থেকে আমাদের আমদানী করতে হবে লোকাল সেক্টরকে জীবিত রাখতে, সেই সব মালামালের জন্য আমদানীতে ফরেন কারেন্সী না থাকলে আমাদের পক্ষে কোনো কিছুতেই দারানো সম্ভব না। রেমিট্যান্স প্রায় শুন্যের কোটায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, পাট শিল্প এখন আর সোনার ডিম নয়, চিংড়ি খাত ভংগুর, এখন বাকী আছে শুধু গার্মেন্টস সেক্টর। সেটাও এই করোনা এবার ভালোভাবেই আক্রান্ত করেছে।
যদি একে হাতছারা করি, তারপর কি? অনেক বিজ্ঞজনেরা অনেক কিছু না জেনেই অনেক মন্তব্য করেন বটে, কিন্তু যেদিন নিজের প্লেটে আর আগের মতো বিরিয়ানী আর পিজ্জা উঠবে না, তখন মনে হবে- সোনার ডিম পাড়া মুরগীটা গেলো কই?
(লেখাটা আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক মালিক নজরুল ভাই এর হোয়াটস আপ গ্রুপ থেকে নেয়া)
দিন হোক আর রাত হোক, প্রাকৃতিক দূর্যোগ থাকুক আর নাইবা থাকুক, কোনো এক “লক্ষ্য”কে সফল করার জন্য যখন কেউ যাত্রা করে, আর যাত্রার পথে যখন সে কোন এক চৌরাস্তার মধ্যে এসে দাড়ায়, তখন লক্ষ্যের দিকে যেতে সে কোন রাস্তা বেছে নিবে সেটা নির্ভর করে রাস্তাটা সে চিনে কিনা বা তার ধারনা আছে কিনা। যদি জানা থাকে, তাহলে মুল লক্ষ্যে যেতে কোন অসুবিধা নাই, কিন্তু যদি সঠিক নিশানা জানা না থাকে, তাহলে তার ভুল রাস্তা বেছে নেবার কারনে তার মুল লক্ষ্য তো দূরের কথা ভুল রাস্তায় গিয়ে আরো কতই না বিড়ম্বনায় পরতে হয়, সেটা সে ঐ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে কল্পনাও করতে পারে না। যে যাত্রার উদ্দেশ্য ছিলো মুল লক্ষ্যে পৌঁছানো, তখন আর তার সেই মুল জায়গায় পৌঁছানো হয়ত হয়ে উঠেই না, বরং এর পর থেকেই শুরু হয় প্রতিটি পদক্ষেপ ভুলে ভরা বিড়ম্বনা। আর সেখানে পৌছতেই যদি না পারা যায়, তাহলে সেই সব যাত্রার কোন মুল্য নাই। তাই চৌরাস্তায় এসে কোনটা নিজের মুল গন্তব্যের রাস্তা তা জানা খুবই প্রয়োজন। নিজের এই চৌরাস্তার সঠিক দিক না জানার কারনে চলার পথে অনেকের কাছেই হয়তো আপনি সঠিক নিশানার দিক জানতে চাইতেই পারেন, কিন্তু সবাই যে আপনাকে সঠিক নিশানা দিতে পারবেন এটাও সঠিক না। হতে পারে কিছু আনাড়ি অপরিপক্ক আর অনভিজ্ঞ জ্ঞানহীন মানুষ সর্বজান্তার মতো মনে মনে আন্দাজ করে আর বুদ্ধিদীপ্ত কালো মুখোশ নিয়ে জ্ঞান গম্ভীর বিবেচনায় আপনাকে একটা ভুল রাস্তার দিকে প্রবেশ করিয়ে দিল। তার তো কোনো ক্ষতি হলো না, কিন্তু তাকে আপনি বিশ্বাস করে আপনি যে ক্ষতির মুখে পতিত হলেন, সেটার মাশুল অনেক বড়। আপনি না জানার কারনে ইচ্ছেমতো আন্দাজ করে যদি ভুল রাস্তায়ও যেতেন আর যতোটা ক্ষতিগ্রস্থ হতেন, এসব বিবেকহীন মানুষের কারনে আপনি একই রকম ক্ষতিগ্রস্থ হবেন সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। তাই, কোন পথটা সঠিক আর কোন পথটা সঠিক নয়, এটা জানা অতীব জরুরী মুল লক্ষে পৌঁছানোর জন্য। এখানে আরো একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, আপনার গন্তব্যস্থানের দিক সঠিকভাবে দেখিয়ে দেয়ার জন্য যে সবসময় বয়স্ক আর বুদ্ধিজিবী মানুষেরই দরকার তা কিন্তু নয়, হতে পারে একটা আনাড়ি বাচ্চাও আপনাকে সঠিক দিকটা দেখিয়ে দিতে পারে যা কোনো বয়স্ক ব্যক্তি যার ঐ রাস্তা গুলির সঠিক গন্তব্য দিক সম্পর্কে কোনো ধারানা নাই। তাই কোনো ক্রান্তিলগ্নে দিক নির্দেশনার জন্য এক তরফা বিবেচনা না নিয়ে বিভিন্ন শ্রেনীর মতামত নিন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন আপনি নিজে। যেহেতু আপনি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, এবং আপনি জানেন না কোনটা আপনার রাস্তা, সেহেতু কারো উপর না কারো উপর আপনাকে নির্ভর করতেই হবে। তাই ভালো উপদেষ্টার সংগী হোন। বিপদে টাকার সাহাজ্যের চেয়ে একজন বুদ্ধিদাতার ভুমিকা অনেক বেশী গুরুত্ত পূর্ন।
কথাগুলি কেনো বললাম, সেটা এবার বলি। করোনা ভাইরাসের কারনে সারা বিশ্ব এবার এক সাথে যুদ্ধ করছে। এই যুদ্ধটা এমন যেখানে মানবিকতা দেখাতে চাইলেও অনেকের পক্ষে তা দেখানো সম্ভব না। প্রতিটা ব্যক্তি পর্যায় থেকে আরম্ভ করে রাজ্য পর্যন্ত সবাই যার যার তার তার, এই চিন্তায় মশগুল। শুধুমাত্র সুস্থভাবে বেচে থাকাই যেনো একটা বাহাদুরি। খেয়ে দেয়ে সুস্থ হয়ে বেচে থাকলেই কেবল আপনি আগামীকালের সকালটা উপভোগ করতে পারবেন। তাই এ মুহুর্তে ব্যক্তি পর্যায়ের একক সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজ্য পর্যায়ে সামিগ্রিক বুদ্ধিদীপ্ত সঠিক সিদ্ধান্ত অনেক বেশী কার্যকর উত্তোরনের জন্য।
আমরা এখন চৌরাস্তার বিড়ম্বনায় দাঁড়িয়ে। কোন রাস্তায় হাটলে আমি এবং আমার রাজ্য সঠিক গন্তব্যে গিয়ে পৌছতে পারবো এটা এখন সবচেয়ে বেশী দরকার। কেনো জানি মনে হচ্ছে- ঠিক রাস্তায় হাটছি না। একটা ভুল রাস্তায় প্রবেশ করে ফেলছি।
যে যাইই কিছু বলুক আমাদের এই গার্মেন্টস শিল্পকে ব্যাংগাত্তক করে, কেউ একে রক্তচোষা মালিক পক্ষ বলেন, কেউ কেউ মনে করে এই শিল্পের মালিকগন মাসে মাসে কোটি কোটি টাকা আয় করেন আর ঘুরে বেরায়। যারা এইসব কথা বলেন, তারা এর সেকটরে ১% জ্ঞান রাখেন না বলেই আমার ধারনা। যে দেশে ৮৬% ফরেন কারেন্সী আয় করেন যে সেক্টর, যে সেক্টর আমাদের অন্যান্য খাতের জরুরী জিনিষ ক্রয়ের নিমিত্তে ফরেন কারেন্সি সরবরাহ করে, যে সেক্টর দেশের উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশী কারেন্সীর ব্যবস্থা করে, যে সেক্টর আপনি যে গাড়িটা চালান তার এবং সেটার পেট্রোল অকটেন কেনার ডলার আনে, সেই সেক্টরকে অনেকেই মুল্যায়ন করে বলে মনে হয় না। বর্তমান প্রতিযোগী গ্লোবাল মার্কেটিং এ যে এই সেকটর দাঁড়িয়ে আছে, সেটা তাদের নিজেদের পরিশ্রমের ফল।
এদেশে গার্মেন্টস ছাড়াও আরো অনেক সেক্টর আছে যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারী কাজ করেন। সে সব কর্মচারির দায়দায়িত্ত অই সব সেক্টরের মালিকগন কেনো নিচ্ছেন না, সেটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন আসে না। আবাসন খাত, কন্সট্রাকশন খাত, কৃষি খাত, চামড়া খাত, আরো অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের কথা তো কেউ বলেন না যে, তারা কেনো এই সব শ্রমিকদের দায় দায়িত্ত নেয় না?
একদম ক্ষুদ্র একটা উদাহরণ দেই, যারা এতো বড় গলায় বাহাদুরী করে কথা বলেন, তাদের বাসার যে ৩/৪ জন ছুটা বুয়া কাজ করে, সেই সব ছুটা বুয়ার আগামী তিন মাসের বেতন ভাতা যদি আজকে দিতে বলা হয় কোনো কাজ না করিয়ে, অথবা বলা হয় যে, কেউ ঐ সব ছুতা বুয়ার যে টাকাতা দিতে হবে তা সরকার বা অন্য কোনো লোক ধার দেবেন কিন্তু টাকাতা পাবে সরাসরি বুয়ারা কিন্তু লোনটা হবে গৃহকর্তার নামে, তখন তারা এক নিঃশ্বাসে বলবেন, আরে, কাজ করে নাই তাহলে আমি তিন মাসের বেতন ভাতা সেটা কিনা প্রায় হাজার বিশেক টাকা আমি দেবো কেনো? কিন্তু অন্যের বেলায় ঠিকই মন্তব্য করবেন, যাদের ঘামে আজ এই সেক্টরের মালিকরা কোটিপতি, তারা এই ভার নিবে না কেনো? কই, আপ্নারা যারা এতো লম্বা লম্বা কথা বলেন, তারা উদ্যোক্তা হন না কেনো? পরের গোলামি না করে দিন না একটা গার্মেন্টস কারখানা? আপ্নারাও কোটি পতি হয়ে যান!! খালি ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে ফেসবুক কাপালেই ইন্টেলেকচুয়াল হওয়া যায় না।
আমার এই মন্তব্য সবার বেলায় প্রযোজ্য না, কিছু কিছু লোক আছে যারা গোলামি করতে পছন্দ করে কিন্তু যার গোলাম তাকে সে ঘৃণা করে। তার ঘৃণার একটা কারন হচ্ছে- সে কেনো পারবেনা, আর অন্য কেনো পারলো। আর যেহেতু সে নিজে পারলো না, তাই, যখনই পারো, মারো গুতা। আবারো ছোট আরেকটা উদাহরণ দেই? আমাদের প্রানপ্রিয় সেনাবাহিনীর নামেও কিন্তু কেউ কেউ কথা বলার সময় কম কয় না? কিন্তু বিপদের বেলায় এই বাহিনি ছাড়া চলে না। সার অব্যবস্থাপনা? আর্মি। বন্যা? আর্মি। মহামারী? আর্মি। যেই বিপদ শেষ, আর্মি আবার কেডা। ঠিক এইরকম, যখন ডলার লাগবে, গার্মেন্টস শিল্প, যখন রিজার্ভ বাড়াতে হবে, এই শিল্প,। চাকুরী নাই? তো গার্মেন্টস তো আছে। আবার এই শিল্পকে কিভাবে চেপে ধরা যায়, কথার ফুলঝুরি আর মাটিতে পড়ে না। অনেক শিক্ষিত মানুষের মুখেও এই রকমের কথা শুনি যিনি গার্মেন্টস এর টার্মনোলজিই জানে না। এলসি কি, ইউপাস কি, শোর টু শোর কি, ব্যাক টু ব্যাক কি, কমপ্লায়েন্স কি, ইডিএফ কি, ইউডি কি, এফ ও বি কি, থার্দ পার্টি কি, কিছুই না। কিন্তু কথা যখন বলে, মনে হয় পায়ের নীচে রাজপ্রাসাদ।
অথচ গার্মেন্টস শিল্প একটা প্রতিনিয়ত চেলেঞ্জের মুখে কাজ করছে। কখনো বিদেশীদের দাবীর মুখে একর্ড, এলায়েন্স আরো কত যে বাহানা। কই ওইসব বায়াররাও তো এতোদিন মানবতা, সোস্যাল রাইটস নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে, ১৮ বছরের নীচে শ্রমিক নেয়া যাবে না, একর্ড কোয়ালিফাই না হলে অর্ডার দেওয়া যাবে না, ইত্যাদি। তারাও তো এখন তাদের আওড়ানো বুলির ধারে কাছেও নাই। তারা তো তৈরী পোষাকগুলিও নিতে অস্বীকার করছে!! আর এবার? এই করোনা ভাইরাসের প্রভাবে খুব বেশী দেরী নাই যে, এটা আমরা পসিবল কম্পিটিটরদের কছে মার্কেট হারাতে বসেছি। এখন খালি সময়ের ব্যাপার।
একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরছিঃ গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত আমাদের গার্মেন্টস এর যারা প্রতিযোগী দেশ, তাদের করোনা পরিস্থিতিটা একবার দেখুন। তাহলে বুঝা যাবে, আমাদের থেকে এই অর্ডার ঐসব দেশে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটা যুক্তিসংগত।
দেশ/ আক্রান্ত সংখ্যা/ মৃত্যুর সংখা/ টেস্ট এর সংখ্যা /পারসেন্টেজ হার
** বাংলাদেশ- ৮৬০/৩৯/১১২২৩ / ৭.৭%
ক। কম্বোডিয়া- ১২২/০ / ৫৭৬৮/ ২.১%
খ। ভিয়েতনাম- ২৬৫/০ /১২১৮২১/ ০.২২%
গ। শ্রিলংকা- ২১৭/৭ /৪৫২৫/ ৪.৮%
ঘ। ইথিউপিয়া-৭৪/৩/ ৫৪১০/ ১.৩৫%
চ। তাইওয়ান- ৩৯৩/ ৬ /৪৭২১৫/ ০.৮৩%
ছ। মায়ানমার ৪১/৪
জ। ইন্ডিয়া- ৯৬৩৫/৩৩১/১৮১১১১ / ৫.৩১%
এর মধ্যে আরো একটা খবর দিয়ে রাখি-
শিল্প বিপ্লবের প্রথম ধাপে ঘটে বস্ত্রশিল্প বিপ্লব। সুতরাং এই বিপ্লবে গার্মেন্টস সেক্টর চলে যাবে চীনের বলয়ে। চীন আফ্রিকার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলাকে দখল করে নিচ্ছে। এ বছরেও ৫০ বিলিয়ন ডলার লোন দিয়েছে শুধু আফ্রিকার দেশগুলোর অবকাঠামো ঠিক করার জন্য। সেসব কাজের ঠিকাদারি করছে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোই। বেশ জোরেশোরেই চলছে নির্মাণ যজ্ঞ। বড় বড় ব্রীজ, বিরাট সব পাওয়ার প্লান্টের কাজ চলছে। টাকা দিচ্ছে চায়না, কাজ করছে চায়না, শুধু লোনটুকু ফিরিয়ে দেবে আফ্রিকা! বাজি ধরেই বলা যায়, আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে চীন বিশ্বে নতুন ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। চীন জানে আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো তাদের টাকা ফিরিয়ে দিতে পারবে না, যেমনটা পারেনি শ্রীলঙ্কা। লোনের দায়ে হাম্বানটোটা বন্দরকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয়েছে লঙ্কানরা। আফ্রিকার সমুদ্র বন্দর এবং সস্তা শ্রমের দিকেই নজর চীনের। এইসব সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলো পুরোপুরিভাবে তৈরি করার পরপরই চীন যা করবে তা আমাদের জন্য ভয়ংকর দুঃসংবাদই বয়ে আনবে।
ইতিমধ্যে ইথিওপিয়ার মত দেশও আমেরিকার কাছ থেকে বড়সড় অর্ডার নিচ্ছে। ওদের মজুরিও আমাদের চেয়ে কম। আফ্রিকা থেকে আমেরিকা-ইউরোপ বেশ কাছাকাছি। সুতরাং কমে যাবে শিপিং কস্ট, কমে যাবে লেবার কস্ট। ওদের শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়লে এবং এই খাতটা একটু ম্যাচিউরড হলেই ইউরোপ আমেরিকার বায়াররা বাংলাদেশের মতো দূরবর্তী দেশে আসবে না- একথা বলাই বাহুল্য।
রেমিট্যান্স প্রায় শুন্যের কোটায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, পাট শিল্প এখন আর সোনার ডিম নয়, চিংড়িখাত ভংগুর, এখন বাকী আছে শুধু গার্মেন্টস সেক্টর। সেটাও এই করোনা এবার ভালোভাবেই আক্রান্ত করেছে।
যদি একে হাতছারা করি, তারপর কি? অনেক বিজ্ঞজনেরা অনেক কিছু না জেনেই অনেক মন্তব্য করেন বটে, কিন্তু যেদিন নিজের প্লেটে আর আগের মতো বিরিয়ানী আর পিজ্জা উঠবে না, তখন মনে হবে- সোনার ডিম পাড়া মুরগীটা গেলো কই?
আজকে মিডিয়ায় একটা খবর দেখে আমি একেবারেই অবাক হই নাই। আর সেটা হলো, আগামিতে বিশ্বে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দরিদ্র সীমার নীচে চলে আসবে এই করোনা ভাইরাসের ব্যবসায়ীক মন্দার প্রভাবে। বিশ্বে প্রায় ১৩% বানিজ্যিক মন্দা বিরাজ করবে।
যে দেশে দরিদ্র সীমার নীচেই বসবাস করে প্রায় ২০-৩০% মানুষ, সেখানে যদি ঐ হারে দেশে দারিদ্রের হার আরো বেড়ে যায়, তখন দেশ করোনা ভাইরাস মহামারী থেকে মুক্ত হয়ে যুক্ত হবে আরেক মহামারীতে যার নাম দূর্ভিক্ষ। আমাদের দেশের লোকাল জিডিপি এমন নয় যে, অনায়াসেই সমগ্র দেশকে মাসের পর মাস সরকার তার নিজ তহবিল থেকে এই ২য় মহামারী সামাল দিতে পারবে। যেহেতু সমগ্র বিশ্ব এখন মন্দায় কাবু, সেক্ষেত্রে বহির্দানও যে খুব একটা আশা করা যায় তেমনও হবে না। প্রতিটি দেশ তাদের নিজ নিজ অবস্থা সামাল দেয়ার জন্য নিজেদের তহবিল থেকে অন্যত্র সাহাজ্যের নিমিত্তে তহবিল ছাড় দেবার সম্ভাবনা খুবই কম। এমতাবস্থায় সবক্ষেত্রে এখুনী বড় ছোট সেক্টরে হোমওয়ার্ক করা খুবই জরুরী। সেই হোমওয়ার্ক গুলি কি কি হতে পারে?
১। উন্নত দেশগুলির করোনা ভাইরাসের অবস্থা ধীরে ধীরে ক্রমশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এর প্রধান কারন, উক্ত দেশগুলি আমাদের দেশের বেশ আগেই সংক্রামিত হয়েছে বিধায় তারা আমাদের আগেই প্রতিকুল অবস্থাটা পেরিয়ে উঠতে পারবে। এই সময় হটাত করেই দেখা যাবে, পুনরায় বিশ্ব বানিজ্য বিশেষ করে পোষাক শিল্পে, কৃষিখাতে, কিংবা রপ্তানীমুলক খাতগুলিতে অন্যান্য দেশ বানিজ্য শুরু করবে। ঐ সময় যদি আমাদের দেশের করোনার অবস্থার কোনো উন্নত না হয়, তাহলে অন্যান্য দেশ যারা তুলনা মুলকভাবে করোনা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তারা সব রপ্তানীমুলক কার্যাদেশগুলি ছিনিয়ে নেবে। একবার যদি এই সুযোগগুলি দেশ থেকে হাতছারা হয়, ২য় বার পুনরায় তা বহাল রাখা বা ফিরিয়ে আনা হবে অনেক কঠিন। সেক্ষেত্রে হোমওয়ার্কের আওয়তায় পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে, যারা যারা করোনার বিরুদ্ধে সমস্ত প্রোটেক্সন নিয়েই রপ্তানীমুলক কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন বলে আশস্থ করতে পারবেন, হয়তোবা সরকার নিরুপায় হয়েই সেসব কারখানা চালিয়ে রাখার আদেশ দিতে হতে পারে। এটা করতে হবে কারন অর্থনীতির যোগান না হলে, কোনো অবস্থাতেই কোনো সরকার, সমাজ বা পরিবার কিছুতেই অনির্দিষ্টকালের জন্য এই প্রতিকুল অবস্থা সামাল দিতে পারবেন না। এই মুহুর্তে হয়তো অনেক মিডিয়া, অনেক বুদ্ধিজীবিরা রপ্তানীমুলক শিল্পগুলির বিরুদ্ধে অনেক মজাদার কথা বলে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তখন অনেক নিরুপায় হয়েই আবার এইসব মিডিয়াই কিংবা বুদ্ধিজীবিরা একটু শিথিল পরিবেশেই রপ্তানি কাজ কেনো চালিয়ে যাচ্ছেন না, করা যেতে পারত ইত্যাদি বলে বলে হয়তো মুখে ফেনা তুলে ফেলবেন। কৃষক যদি খাদ্যে দেশকে সাবলম্বি করে দিতে পারেন, আর এই রপতানীমুখী শিলপ গুলি যদি বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিতে পারেন, তাহলেই গাড়িতার তেল পুড়িয়ে খাবারটা খেয়ে অন্তত কেউ বুদ্ধিজীবির মতো টক শোতে আসতে পারতেও পারেন। সরকারের তহবিল মোটা করতে সবার যেমন সঠিভাবে ট্যাক্স প্রদান, সবার দায়িত্তশীল ভুমিকা পালন করা দরকার সেখানে এই দেশে সবে মাত্র ৪০% নাগরীক সরাসরি সরকারকে সাহাজ্য করেন, যার থেকেই সরকার এই সব ডেভেলপমেন্ট কাজ, বিশেষ তহবিল গঠন করেন। তাই সরকার জানেন তিনি কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে আছেন। সবার ইন্টেলেকচুয়াল কথা শুনলে তো দেশ চালানো যাবে না। সব দায়িত্তই সরকারের নয় এটা সবারই বুঝা উচিত। আপদকালীন সময়ে হয়তো সরকার তার সর্বস দিয়ে ক্রিটিক্যাল সময়টা পার করে দিতে পারেন কিন্তু মাসের পর মাস এটা কোনো সরকারের পক্ষেই পারা সম্ভব না, আর আশা করাও কোনো দায়িত্তশীল নাগরিকের কাম্য নয়। হাওয়া যখন গরম হয়, তখন আমরা বলি শনির দশা চলছে। আর শনি এমন এক হাওয়ার নাম যে, যেখানেই যাই হোক বলির পাঠা হয় সরকার। সরকারের সাথে সাথে বলির পাঠা হয় সেই সব অরগ্যানাইজেশন গুলিও যাদেরকে চোখে দেখা যায় তারা। ফলে কেনো সরকার ওটা করলেন না, কেনো সরকার ঊটা করতে গেলেন, কিংবা কেনো ঐ অরগ্যানাইজেশন গুলি এতা করছে না ইত্যাদি। সমালোচনার আর শেষ নাই। কিন্তু কেউ যেনো দায়িত্তশীল নয়, সব দোষ এই সরকার বাহিনীর।
তাই এই মুহুর্তে আমার ধারনা, রপ্তানীমুলক প্রতিষ্ঠানগুলিতে যারা কাজ করেন, তাদের শতভাগ করোনা টেষ্ট করে এটা নিশ্চিত করা যে, তারা এই মহামারীতে আক্রান্ত হন নাই এবং যখনই বাইরের দেশগুলি করোনা শেষে পুনরায় রপ্তানীর জন্য আগ্রহী হবেন, তখন যেনো আমাদের রপ্তানীমুলক শিল্পগুলি কোনো রিস্ক ছাড়া দ্রুত উতপাদনে গিয়ে শতভাগ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনতে পারেন তার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে, এই সব শ্রমিক কর্মচারিদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইনে না রেখে কারখানা কোয়ারেন্টাইনে রেখেই রপ্তানীমুলক কাজে উতসাহিত করা। এটা এখনি করতে হবে সেটা বলছি না। সময়টা হবে যখন উন্নত দেশগুলি পুনরায় বানিজ্যিক কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত নেবেন তখন। মিডিয়া অনেক সময় সরকারের অনেক ঘটনমুলক কাজকে যেমন উতসাহী করেন আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেকটা না বুঝেই নিরুতসাহীও করে ফেলে। অনেকেই বলতে শুনি যে, পলিটিক্সে মিডিয়া একটা হুমকীর মতো। ফলে কখনো কখনো রাজনীতি মিডিয়ার কাছে একটা বেওয়ারিশ বোমের মতো হয়। কেউ জানে না উটা কখন কিভাবে কোথায় ফাটবে আর কে কে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এজন্য আমাদের দরকার, যারা প্রকৃতভাবেই অর্থনীতি বুঝেন, বিশ্ব রাজনীতি বুঝেন, তাদেরকে টকশোতে প্রকৃত অবস্থাটা মিডিয়ায় বাস্তবভাবে তুলে ধরা। কান্ডজ্ঞানহীন কিছু মানুষ যখন জ্ঞানবিহিন কোনো বিষয়ে কথা বলেন, তখন যারা সরল আমজনতা, তারা বিভ্রান্ত হন। আমজনতাকে বিভ্রান্ত করা দেশের জন্য একটা অশুভ কাজ।
২। কৃষি খাতকে আরো দেশীয়ভাবে সাবলম্বি করে তোলা যাতে খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের দেশের কৃষক এবং ভুমিগুলি অন্তত খাদ্য ঘাটতি পুরনে সক্ষম হয়। কারন একটা সময় আসবে, যখন টাকা খাওয়া যাবে না, বা ডলার খাওয়া যাবে না, দরকার খাদ্য শস্য। আর আমাদের জমি, ভুমিই হতে পারে সাময়িকভাবে তার একমাত্র অবলম্বন।
৩। ডেভেলপমেন্ট খতে এই মুহুর্তে বিশেষ নজর না দিয়ে ঐ সব ফান্ডগুলি শুধুমাত্র সাস্থখাত, ভর্তুকি এবং অন্যান্য কাচামালের উপর বিশেষ ছাড় দেয়া। যাতে করোনার উন্নতির পাশাপাশি সমস্ত শিল্প, সমস্ত উদপাদনশীল কারখানাগুলি দ্রুততম সময়ে বৈদেশীক মুদ্রা ঘরে আনতে পারে। যতো বেশী বৈদেশিক মুদ্রা ঘরে ঢোকবে, তত দ্রুত দেশের অর্থনীতর চাকা সল্প সময়ে চালু হবে। কর্ম সংস্থান বাড়বে। দূর্ভিক্ষ কমবে। (চলবে)
(লেখাটি কোনো পক্ষকেই সমালচনা করার জন্য নয়, এতা একটা ঘটনমুলক চিন্তা থেকেই ব্যক্তিগত মতামত। আপ্নারাও আপনাদের ঘটন মুলক মতামত দিতে পারেন।)
Isa Ruhul Karim Isa Food security is the base, we must put maximum efforts on agricultural at this moment.
Mohd Akhtar Hossain খাদ্য সয়ং সম্পর্নতায় যেটা হবে তা হচ্ছে, দেশের মানুষ ক্রিটিক্যাল সময়টা অন্তত না খেয়ে সাফার করবে না। আবার আমদানিও করতে হবে না। আসলে আমদানী করার কোনো স্কোপও থাকবে না কারন সব দেশই একই পলিসি এডোপ্ট করবে, কোনো খাদ্য শস্য হয়তো তেমন ভাবে রপ্তানীও করবে না। আগে নিজের দেশের চাহিদা মেটানোর পর যদি সারপ্লাস থাকে তাহলেই হয়তো চড়া দামে অন্য দেশ তা রপ্তানি করবে, আবার সেক্ষেত্রেও তোমার বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে। ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, কিংবা অনেক কাচামাল আছে যা আমাদের রপ্তানীর জন্য কিংবা ডেইলি লাইফে চলার জন্যেও তা আমদানী করতে হবে। তাহলে সেই সব কমোডিটিজ আনতে বৈদেশিক মুদ্রা পাবো কই? সেই জন্যএই আমাদের পোষাক শিল্পকে এবং এই জাতীয় শিল্প যারা বৈদেশিক মুদ্রা সহজেই আনতে পারে তাদেরকে দাড় করাইতে হবে দ্রুত।
Mosharraf Hossain লিখেছেন ভালো ।তবে এ মূহুর্তে আপনার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সরকারের পক্ষে কঠিন হবে ।বি জি এম ই ও বিকে এমই এর নেতৃবৃন্দ কে আরও চৌকষ হতে হবে ।তাদের সাথে সদস্যদের সমন্বয়ের অভাব আছে মনে হয়। হতাশ হওয়ার কিছু নেই,যেখানে ধ্বংস সেখানে সৃষ্টির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
Mohd Akhtar Hossain আমি এই মুহুর্তের কথা বলছি না আসলে। আমি বলছি যে, এটা হোমওয়ার্ক দরকার যখন অন্যান্য দেশগুলি করোনার ইফেক্ট থেকে বেরিয়ে এসেই বিপুল পরিমানে সব ব্যাপারে ঘাটতি পুরনে সর্বাত্তক কাজে লেগে যাবে, তখন । তখন আমাদের কি কি করা উচিত যদিও আমরা তখনো কিছুটা করোনায় কবলিত থাকবো হয়তো। এই মুহুর্তে কেহই কিছু করতে পারবে না বলেই সব দেশের সরকার আপদ কালীন ঠেক দিচ্ছেন। আমিও সেটাই বলছি, যখন স্রিষ্টির সুযোগটা আসবে, তখন আমরা সেই সুযোগটা নিতে পারবো কিনা। নাকি অন্য কেউ সেটা নিয়ে নেবে স্যার।
Mozaharul Islam Shawon গতকাল শুনেছি গার্মেন্টস মালিকের কাছ থেকে যে বেশিরভাগ অর্ডার বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। আবার মাত্র ১ সপ্তাহ সময় দিয়েছে এক্টা বড় অর্ডারের সিপমেন্ট এর জন্য। দেখলাম তারা প্রানান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন অন্তত যেটুকু কাজ বাকি আছে,সেই সেক্টরকে চালিয়ে সিপমেন্ট সময়মত করার। এই অংশে বাধা দেবার কিছু নাই। তবে মহামারির প্রয়োজনিয় পরীক্ষা করার সক্ষমতা যেন গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ নিতে পারেন,সেই সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা কি বলে?
Mohd Akhtar Hossain শাওন ভাই, বেসিক্যালি এ যাবত পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের উপর অর্ডার বাতিল হলেও গার্মেন্টস সেক্টর প্রায় ৫০/৬০ বিলিয়ন অর্ডারের কাজ করে বাংলাদেশ। বায়াররাও তাদের এই মৌলিক চাহিদা পুরন করতে হবে। ফলে অনেক আদেশ বাতিল হয় নাই, পুশ ব্যাক করেছে, বা হোল্ড করেছে। কিন্তু অনেক বায়ার আবার এই সর্তও দিয়েছে যে, পেমেন্ট করতে চায় আরো ৬ মাস পড়ে। তাতেও বাংলাদেশের রাজী হওয়া উচিত যদি বায়ার শুধু সিএমটা দেয়। কোনো কারনে যদি এই বিপুল পরিমান অর্ডার আসলেই শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়, তাহলে যে যাইই কিছু বলুক, দেশের অর্থনীতিকে চাংগা করার মতো আর কোনো সেক্টর নাই যেখানে এই পরিমান ফরেন কারেন্সী আনা। রেমিটেন্স এই মুহুর্তে বা আরো কয়েক মাস প্রায় শুন্যের কোটায় থাকবে। সেক্ষেত্রে বিকল্প কি? বিকল্প একটাই, একে সচল করা। একটা কথা ঠিক শাওন ভাই, আপনি হয়তো এই শিল্পের সাথে জড়িত কিছু মানুষের সাথে আলাপ আলোচনা আছে বলে এই মন্তব্যতা করতে পেরেছেন যে, ” অন্তত যেটুকু কাজ বাকি আছে, সেক্টরকে এলাউ করা যে সিপমেন্ট গুলি বাকী আছে তা সময়মত করার। এই অংশে বাধা দেবার কিছু নাই। তবে মহামারির প্রয়োজনিয় পরীক্ষা করার সক্ষমতা যেন গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ নিতে পারেন,সেই সুযোগ থাকা উচিত।”। কিন্তু এমনো কিছু গুনিজন আছেন যারা না জানে আদার ব্যাপারীর কাজ না জানে জাহাজের খবর কিন্তু মন্তব্য করে যেন উনীই একমাত্র কান্ডারী। যেনো এই করিলে সেই হইবে, ঐ না করিলে উহা হইবে না। হাসি মাঝে মাঝে।
Mozaharul Islam Shawon Mohd Akhtar Hossain
জি বৃহত স্বার্থে জরুরী বটে। তবে নিজ দায়িত্বে হলেও কর্মিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা জরুরী। সেজন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সকল ব্যবস্থা নেবার ক্ষমতা গার্মেন্টস মালিকদের দেয়া উচিত এবং সেখানে সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রন রাখা উচিত। বিমানবন্দরের সনদ পাওয়ার মত যেন না হয়।1
Mohd Akhtar Hossain Mozaharul Islam Shawon একটা মালিক শুধু দেশের কমপ্লায়েন্স সিস্টেমেই দায়বদ্ধ না। সে ইন্তারন্যাশনাল লেবার আইন, কমপ্লায়েন্স, সেফটি এন্ড ওয়ার্কি এনভায়রনমেন্ট পরিপুর্ন করলেই ব্রান্ড বায়ারের কাজ করতে পারে। ফলে যে সব প্রোটেকসন নিয়ে গার্মেন্টস মালিকগন কাজ করেন, সেটা অনেকেই জানে না। রানা প্লাজার পর সব কিছু আমুল পরিবর্তন যে হয়েছে এটা অনেকের পেটেও নাই, মাথায় তো নাইই। বাসায় যতোতা না করোনার ব্যাপারে মানুষ যত্ন নেয়, তার থেকে অনেক বেশি গুনে মালিকপক্ষ করোনার ব্যাপারে যত্নশীল। আর এতার মনিটরিং রেকর্ড করে বিজিএমইএ, এবং ব্রান্ড বায়ার সবাইকে রিপোর্ট পাঠাতে হয় যেমন থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা হয়েছে কিনা, প্রতিটা সিড়ি থেকে শুরু করে টেবিল পর্যন্ত সেনিটাইজ করা হয়েছে কিনা, ফ্লোর সেনিটাইজ করা হয়েছে কিনা, সোস্যাল ডিস্ট্যান্সে বসাচ্ছে কিনা, মাস্ক পড়ছে কিনা, হ্যান্ড সেনিটাইজ দিয়ে প্রতিবার বের হওয়্যার সময় বা বাহির থেকে আসার পর হাত ধোয়া হচ্ছে কিনা, এই সব কিছুই মালিকগন নিজের সার্থেই করে থাকেন। কারন এখানে একটা লোক আক্রান্ত মানে উরা ফ্যাক্টরি আন্ডার লক দাউন। নিজেরা সহ। তো কে চায় নিজের ক্ষতি করতে? মালিকগন নিজের পরিবারের থেকেও বেশি যত্নশীল তাদের ফ্যাক্টরির ওয়ার্কারদের ব্যাপারে। এটা কেউ বিশ্বাস করুক আর নাইবা করুক। কারন আমি নিজে করি।
Mozaharul Islam Shawon Mohd Akhtar Hossainগুড। এর সাথে তাদের আবাসস্থলের দিকেও নজর দিতে হবে এবং সুরক্ষায় আনতে হবে। সেখানেও আপনাদের তদারকিতে নিতে হবে। আমি কি খুব বেশি বিরক্ত করছি?1
Mohd Akhtar Hossain Mozaharul Islam Shawon না, আপনি ঠিকই করছেন। এটা বিরক্ত না শাওন ভাই, এতা বাস্তবতা যেতা আপনি বলছেন। আমাদের ওয়ার্কাররাও কিন্তু এখন অনেক সচেতন। তারা নিজেরাও ফ্যাক্টর থেকে হ্যান্ড সেনিটাইজার নিয়ে বাসায় যায়, মাস্ক নিয়ে যায়, আমরাই দেই। আবার সেতা ঠিক্মতো ওয়াস হচ্ছে কিনা সেতাও আমরা পরীক্ষা করি। আর তাদেরকে তো মোটিভেশন করেই যাচ্ছি।
প্রকৃতির কাছে মৃত্যু এবং জীবন এই দুই এর মধ্যে কোনো তফাত নাই। ফলে মৃত্যুর বেদনা অথবা জীবনের উচ্ছাসের আবেগ প্রকৃতিকে একটুও বিচলিত কিংবা ব্যতিব্যস্ত করে তোলে না। তার কাছে চলমান পিপড়া কিংবা উড়ন্ত পাখী যেমন খেয়ালি,তেমনি স্তুপীকৃত কাঠ আর সবুজ জংগলও তেমনি খেয়ালি। তার কাছে সদ্য জন্ম নেয়া নবজাতকের প্রস্থান কিংবা রোগাকীর্ন শতবর্ষী বৃদ্ধ্যের বেচে থাকার মধ্যেও কোনো অমুলক যুক্তির সৃষ্টি করে না। আমরা যারা কিছুটা বিবেগবান মনে করে এই পৃথিবীর রুপ, সৌন্দর্য, সম্পদ আর সম্পর্ক নিয়ে আবেগিত থাকি তারাই হয়ত মৃত্যুকে বিচ্ছেদ ভেবে সাময়িক অচল হয়ে মন খারাপ করি। তবে যারা বিধাতাকে মানেন,তার উপর শতভাগ নির্ভর করেন, তাদের এই বিচ্ছেদ একটা সাময়িক রুপান্তর মনে করে কিছুটা হলেও আরামবোধ করেন।
লোভ একটা লালসার নাম, লালসা একটা হিংসার নাম। আর এই হিংসা থেকে ভেংগে যায় বন্ধুত্ব, ভেঙ্গে যায় টোটাল সিস্টেম, সৃষ্টি হয় শত্রুতা। শত্রুতা যখন একবার সুপ্ত বীজের মতো রোদ, মাটি আর পানি পেয়ে বসে তখন এই শত্রুতা এক ভয়ংকর বিষবৃক্ষ হয়ে সমাজে চারিদিকে কুকর্মই ফল হিসাবে একের পর এক সর্বোনাশ প্রশব করতে থাকে। আর প্রতিটি কুকর্ম মিথ্যর মুখোশ আর অপরাধের খোলস পড়েই আমাদের চারিপাশে ক্রমাগত চক্রাকারে সংঘটিত হতে থাকে। অথচ যারা এই মিথ্যা আর অপরাধের সাথে গোচরে বা অগোচরে জড়িত তারা জানে না যে, মিথ্যার রঙ যতোই সুন্দর হোক, সত্য তার আসল চেহারা নিয়েই বেরিয়ে আসে, সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। কেউ যখন গল্প বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে, হয় সে সত্য বলছে, না হয় পুরু বানিয়ে সত্যের মতো মিথাকে সত্য বানানোর রুপ দিচ্ছে। এই প্রাকটিস সর্বত্র স্তরেই হয়, ব্যক্তি জীবনে, ঘড়য়া পারিবারিক বা সমাজ তথা রাজ্যের প্রশাসনিক দপ্তরেও। এতোসব কিছু জেনেও মানুষ, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে একটা মিথ্যা বারবার এতোবার বলে যে, মিথ্যেটাই যেনো সত্যি হয়ে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে এমন একটা মিথ্যে যা লালসার জন্যে করা হচ্ছে। আর যাকে বলা হচ্ছে সেও হয়তো গভীরে না গিয়ে মিথ্যাতাকেই সত্য বলে মেনে নিয়ে বৃহৎ পরিসরে একটা ব্যার্থতার পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এটা অপরাধ। আর অপরাধ কখনো খালি হাতেও আসে না আবার কখনো খালি হাতে যায়ও না।
জীবনের অনেক কাহিনী আছে যা রহস্যেঘেরা থাকে। যখন কেউ এই রহস্যঘেরা চাদর উম্মোচন করতে যান, তখন এমন কিছু প্রশ্নের উদয় হয়, যা স্বাভাবিক জীবনের ভীত নড়ে দেয়। এসব রহস্যঘেরা প্রশ্নের উত্তর জানলেও যেমন অসুবিধা আবার নীরব থাকলেও অসুবিধা। কারন নীরবতা অনেক বড় বড় ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দেয়। এই সময় যা ঘটে যেতে পারে তা হচ্ছে বিদ্ধেষের আগ্নেয়গিরির উত্থান। আর এই আগ্নেয়গিরির লাভা যখন যখন নিজের ভিতরে ফুসে উঠে, তখন লাভাকে হয় নিজে সামাল দিতে হয়, আর তা না হলে অন্যের ঘাড়ে তুলে দিতে হয়। অন্যের ঘাড়ে তুলে দিতে না পারলে শেষ অবধি সে এমন একটা ভুল জায়গায় গিয়ে ভুল রাস্তায় উদ্গীরন হয় যার নাম ‘পতন’।
এই ‘পতন’ যখন নিজের মন আর বিবেক মেনে নিতে পারে না, তখন সমাজের প্রতিটি স্তরেই কোনো কারন ছাড়াই প্রিম্যাচিউরড বেবি হিসাবে জন্ম দেয় এক অনিয়ন্ত্রিত রোগের, যার না, ‘রাগ’। রাগ একটা বিষাক্ত ফল, এটা মনজমিনে পোতা উচিতই না। এটা সবার আগে নিজের অস্তিত্বকেই শেষ করে দেয়। তারপর পথে যাইই পায় সেটাকে পায়ে ঠেলতে ঠেলতে ধ্বংস করতে থাকে। রাগ হচ্ছে একটা রাক্ষস, যে সর্বোনাস করে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অনেকটা সেই রোগের জন্ম দিচ্ছে সময়ের প্রতিটি মুহুর্তে।
সময় হচ্ছে সবচেয়ে বড় ভিলেন। যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, সে সব সময়ই চায় যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুক্ষটা, কষ্টটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু সময়ের সুযোগ নিয়ে যখন কেউ এর অপব্যবহার করে, কিংবা শুনেও কিছু না করার প্রত্যয়ে অবিচল থাকে, তখন এই ‘সময়’টাই একসময় ভিলেন হয়ে এমনভাবে তার চোখের সামনে আবির্ভুত হয় যে, সবকিছু তখন নাটকই মনে হবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ‘নাটক’ আর ‘বাস্তবতা’ কখনোই একে অপরের সম্পুরক নয়। তখন “সময়” কিছু নাটক এমনভাবে হাজির হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই কি সব সত্যি অথবা এটাই কি সব মিথ্যা? নিজের উপর নিজের তখন এতোটুকুই অভিসম্পাত দিতে ইচ্ছে করবে, মনে হবে, এই পৃথিবীতে বেচে থেকে কি লাভ? যখন বেচে থাকার মতো লোভ আর কারো থাকে না, তখন সে হয়ে উঠে সবচেয়ে বড় হিংস্র প্রানিদের মধ্যে একজন।
তাই সময়ের ডায়াল কাটায় যে ঘটনা ঘটে যায়, তাকে আবেগের উচ্ছাসে বা লোভের লালসায় কিঙ্গা মিথ্যার জাল দিয়ে বুনানো উচিত না। কারন, হাওয়া যখন কারো নামে গরম হয়, তখন আমরা অনেকেই বলি, শনির দশা চলছে। কিন্তু শনি এমন এক হাওয়ার নাম যে, এই হাওয়ায় অনেকের নামও গরম হয়ে উঠতে পারে। কে কতগুলু চায়ের কাপের সাথে জড়িত তার উপর নির্ভর করে কতটুকু গরম হাওয়া কার কাপে ঝড় তুলবে।
রবী ঠাকুর তার “প্রায়শ্চিত্ত” নামের এক ছোট গল্পে একটা কথা লিখেছিলেন, “স্বর্গ ও মর্তের মাঝখানে একটা অনির্দেশ্য অরাজক স্থান আছে যেখানে ত্রিশঙ্কু রাজা ভাসিয়া বেড়াইতেছেন, যেখানে আকাশ কুসুমের অজস্র আবাদ হইয়া থাকে। সেই বায়ুদূর্গবেষ্টিত মহাদেশের নাম ‘হইলে-হইতে পারিত’। যাহারা মহৎ কার্য করিয়া অমরতা লাভ করিয়াছেন তাহারা ধন্য হইয়াছেন, যাহারা সামান্য ক্ষমতা লইয়া সাধারন মানবের মধ্যে সাধারনভাবে সংসারের প্রাত্যাহিক কর্তব্যসাধনে সহায়তা করিতেছেন তাহারাও ধন্য; কিন্তু যাহারা অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হটাত দুয়ের মাঝখানে পড়িয়াছেন তাহাদের আর কোনো উপায় নাই। তাহারা একটা-কিছু হইতে পারিতেন কিন্তু সেই কারনেই তাহাদের পক্ষে কিছু-একটা হওয়া সর্বাপেক্ষা অসম্ভব।
এই কথাগুলির সাথে বর্তমান বিশ্ব মহামারী করোনা পরিস্থিতির একটা মিল রহিয়াছে। অনির্দেশ্য অরাজক স্থানের ত্রিশঙ্কু রাজা আমাদেরকে সেই সর্গ আর মর্তের মাঝে এমন করিয়া ফেলিয়া দিয়াছেন যেখানে কিছু মহৎ মানুষ অন্যের সেবা দান করিয়া অমরতা লাভ করিতেছেন, আবার কিছু নিতান্তই সাধারন মানব তাহাদের সংসারের দায়িত্ত পালন করিয়াও ধন্য হইতেছেন। কিন্তু আমরা যারা না মহৎ মানুষের দলে, না পুরুপুরি সাধারন মানবের দলে, তাহারা অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে এই দুইয়ের মাঝে পড়িয়া হাজার খানেক গার্মেন্টস জনগোষ্টিকে লইয়া এমনরুপে হিমসিম খাইতেছি, যে, না এই বিশাল জনগোষ্টি আমাদেরকে দোষারুপ করিতে পারিতেছে, না আবার ক্ষমাও করিতে পারিতেছে, না আমরা কোনো দৈব ক্ষমতায় তাহাদেরকে এইরুপ কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারিতেছি যে, কোনো অসুবিধা নাই, আমরা আছি তোমাদের সাথে। তোমরা আকাশের পানে চাহিয়া, আর আমাদের কথার উপর ভিত্তি করিয়া যাহা নির্দেশ হইতেছে তাহাই করিয়া যাও, কোনো ভয় নাই। সর্বদাই একটা শংকা কাজ করিতেছে মনের ভিতর, মাথার ভিতর আর এই দুই শঙ্কা প্রতিনিয়ত কাবু করিয়া ফেলিতেছে জীবনীশক্তি থেকে শুরু করিয়া আয়ুষ্কালও। চারিদিকে আজ সারা বিশ্ব ব্যাপিয়া করোনা প্রতিটা ব্যক্তি, প্রতিটা সংসার আর গোটা সমাজ জীবনকে এমন করিয়া চাপিয়া ধরিয়া ত্রাসের সৃষ্টি করিয়াছে যে, নীরব শোকের ছায়াতলে সুগভীর সহিষ্ণুতা আর ধরিয়া রাখা যাইতেছে না।
ঢাকা শহরের রাস্তার একটা রুপ আছে। যত্রতত্র যানবাহনের ছড়াছড়ি, যেখানে সেখানে জটলা, হকারদের একচ্ছত্র দৌরাত্ত, পদভ্রজকদের যেনোতেনো হাটাহাটি, ফেরীওয়ার চিৎকার চেচামেচি, জনসমাগম, মিছিল, মিটিং, আরো যে কতকিছু দিয়া ভরপুর থাকে এই শহরের প্রতিটি অলগলি, আনাচে কানাচে। কোথাও দিনেরবেলায়ও অলস লাইটম্যানদের মনভোলার কারনে প্রখর সুর্যালোকেও রাস্তার স্ট্রীট লাইটগুলি আলো দিতে থাকে, উলটা পালটা গাড়ির হর্ন, স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের অবাধ চলাচল ইত্যাদি মিলাইয়া ঢাকার রাস্তাঘাট শুধু সচল নয়, যেনো মহাসচল হইয়া ব্যস্ততায় ভরপুর হইয়া থাকে। অথচ, আজ দুইদিন পর ফ্যাক্টরীর অফিসে আসিবার নিমিত্তে সকাল সাতটার সময় ঘর ছাড়িয়া আমি যেনো আমার সেই চিরাচরিত চেনা ঢাকা শহরকে নিজেই চিনিতে পারিতেছিলাম না। ঢাকার রাস্তার এই নতুন রুপ আমার চোখে আগে কখনো পড়ে নাই। ঈদের ছুটি সমুহের ইহার একটা নমুনা জানিতাম, কিন্তু আজ সেই ঈদের ছুটির সময়ের রাস্তার চেহারাও মলিন হইয়া নতুন এক রুপে আবির্ভুত হইয়াছে।
কোথাও কোনো হকার নাই, ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো পদচারনা নাই, মিটিং মিছিল যেনো উধাও হইয়া কোথায় যেনো স্থবির হইয়া ঝিমাইতেছে, ফেরী ওয়ালাদের সেই চেনা ডাক নাই, কোনো যানবাহনের হর্নও শোনা যাইতেছে না। মাঝে মাঝে বিকট সংকাপূর্ন সুর দিয়া কিছু এম্বুলেন্স অথবা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ফাকা রাস্তা পাইয়া উর্ধগতিতে পাশ কাটিয়া কোথাও হারাইয়া যাইতেছে, আর তারসাথে কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জলপাই কালারের সেনাবাহিনীর গাড়ি অথবা নীল রংগের পুলিশের গাড়ি এদিক সেদিক টহল দিতেছে, অথচ দেশে কোনো যুদ্ধ নাই, কারফিউ নাই, না আছে কোনো জরুরী অবস্থা। মাত্র ২২ মিনিটে অনায়াসেই আমি আমার অফিসে চলিয়া আসিলাম।
বর্তমান পরিস্থিতে যেখানে প্রতিটি পরিবার তাহাদের আপনজনের সুরক্ষায় চিন্তিত, নিজেদের জানমালের সুরক্ষায় চিন্তিত, আর এই সুরক্ষার তাগিদে সবাই ঘরের মধ্যে বন্দি হইয়া আছেন। কেহই মহামারীর আক্রান্ত হইবার ভয়ে ঘর হইতে এক কদম ও বাহির হইতে নারাজ, সেখানে আমরা যারা ঐ অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হাজারখানেক গার্মেন্টস জনগোষ্টির দায়িত্তপ্রাপ্ত হইয়াছি, তাহারা নিজের সুরক্ষার পাশাপাশি, নিজের পরিবারের সুরক্ষা ছাড়াও এই বিশাল জনগোষ্টীর সুরক্ষায়ও চিন্তিত। আমি খুব গর্ববোধ করিতেছি যে, এই কঠিন দূর্যোগের দিনেও যেখানে প্রতিটি সাধারন মানুষ তাহাদের রুটি রোজগার লইয়া মহাচিন্তায় শংকিত, সেখানে অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হাজারখানেক গার্মেন্টস জনগোষ্টির দায়িত্তপ্রাপ্ত হইয়া সমস্ত দুসচিন্তা, সমস্ত দায়ভার নিজের কাধে লইয়া কিছুটা হইলেও তাহাদের রুটি রোজগারের ব্যবস্থা করিতে পারিতেছি, তাহাদের এই দুঃসময়ে পাশে দাড়াইয়া একটু হইলেও আশার আলো দেখাইতে পারিতেছি, তাহাতেই আমি সুখী এবং খুশী। মহা সংকট ময় এই দিনে যখন সবার ঘরে সুরক্ষায় থাকিবার কথা, আমি এবং আমার মতো অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হাজারখানেক গার্মেন্টস জনগোষ্টির দায়িত্ত প্রাপ্ত মালিকগন এই সব শ্রমিক দের জন্য নিজের সন্তানের মতো, নিজের পরিবারের মতো নিজেদের ক্যাপাসিটির সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়া কারখানার ভিতরে সুরক্ষার ব্যবস্থা করিবার আপ্রান চেষ্টা করিয়া যাইতেছি। এতোগুলি মানবের জন্য যখন আমাদের প্রান নিয়োজিত, ঈশ্বর নিশ্চয় আমাদেরকে এবং আমার মতো সেইসব অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হাজারখানেক গার্মেন্টস জনগোষ্টির দায়িত্ত প্রাপ্ত মালিকগনকে হেফাজত করিবেন।
ফলে রবী ঠাকুরের সেই কথাগুলি -“যাহারা অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হটাত দুয়ের মাঝখানে পড়িয়াছেন তাহাদের আর কোনো উপায় নাই। তাহারা একটা-কিছু হইতে পারিতেন কিন্তু সেই কারনেই তাহাদের পক্ষে কিছু-একটা হওয়া সর্বাপেক্ষা অসম্ভব” – বলিয়া মনে হইলো না। আমরা হয়তো একটা কিছু হইতে পারিয়াছি। বাকিতা মহান ঈশ্বর জানেন।
করোনা ভাইরাস প্রথম ধরা পড়ে চীনের উহান শহরে। তারা জানতো এই ভাইরাসের তীব্রত এবং ক্ষতিকারক দিকগুলি। ফলে, কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটাকে বিশ্বসমাজে ধামাচাপা দেওয়ার নিমিত্তে উহানকে আইসোলেট করে তারা নিজস্ব সোর্স এবং দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে নামে বেনামে এর প্রতিষেধক ক্রয় করে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু একটা সময়ে সেটা আর চাপা দেওয়ার সম্ভব না হওয়ায় ভাইরাসটির ব্যাপারে তারা প্রকাশ করতে যেমন বাধ্য হয়, তেমনি তাদের গাফিলতির কারনে ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসটি বিভিন্ন দেশে সংক্রমনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এটা যেমন চীনের করা ঠিক হয় নাই তেমনি এই করোনার তীব্রতা নিয়েও বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান এবং জনগনও প্রাথমিকভাবে বেশী গুরুত্ত না দেওয়ায় ব্যাপারটা এখন বৈশ্বিক মহামারিতে পরিনত হয়েছে যেখানে প্রতিনিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে আবার নতুনভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েও পড়ছে। সারাবিশ্ব এখন ঘরবন্দি। কিন্তু ঘরবন্দিই এর সমাধান নয়। এর প্রধান কারন ১৪/১৫ দিন ঘরে বন্দি হয়ে হয়তো যারা আক্রান্ত হন নাই বা হয়েছেন তাদের উপসর্গটা বুঝা যাবে কিন্তু যিনি ১৪ তম দিনে আক্রান্ত হবেন, তাকে তো আবারো ১৪/১৫ দিন বন্দি থাকতে হবে। তাহলে এভাবে কি চলতেই থাকবে কোয়ারেইন্টাইন? কিন্তু কতদিন? কত মাস বা কত বছর? একজন আক্রান্ত ব্যক্তিই পারে আরো নতুন মানুষকে আক্রান্ত করতে, ফলে ঘরবন্দি এর সমাধান নয়। এর সমাধান হতে হবে প্রতিটি মানুষ করোনা আক্রান্ত কিনা তার টেষ্ট করা। এটা সহজ কাজ নয়। জার্মানি, ইতালী, চীন, আমেরিকা, স্পেন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে পরীক্ষা করছে। যেখানে আমরা সম্ভবত এ পর্যন্ত আইইডিসিআর এর মাধ্যমে ১০৬৮ জনকে টেস্ট করতে পেরেছি। তাতে যদি চলতি মার্চ মাস পুরোটা ধরা হয়। তাহলে ২৮ দিনে,এ পর্যন্ত গড়ে ২৪ ঘন্টায় ৩৮ জনকে টেস্ট করা হয়েছে। কিন্তু করোনাতঙ্কে বিদেশ থেকে এসেছেন প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী। সেই হিসাব দেখা যায় ২৪ ঘন্টায় ৪২ জনকে টেস্ট করলে ১০ লাখ মানুষকে পরীক্ষা করতে লাগবে ২৩,৪০৯ দিন অর্থাৎ ৬৫ বছর। এই কাজ করতে যদি এই এত বছর লেগে যায়, তাহলে কি সারা দেশ এত বছরই ঘরবন্দি হয়ে থাকবেন? এটা কিছুতেই সম্ভব না।
এরজন্য সত্যিকার অর্থে যা করনীয় তা হচ্ছে, সত্যি তথ্য জানা। সরকার, এবং ব্যক্তি পর্যায়ে প্রতিটি মানুষ একযোগে সত্য পরিবেশন করা এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকরী ভুমিকা নেওয়া। আমাদের দেশে করোনা নাই, (যদিও টেষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষিত নয় বক্তব্যটা) বা আর নতুন কোনো করোনা হয় নাই, এইসব কথা বলে আমরা আপাতত ক্রেডিট নিতে পারি কিন্তু লং রানে যা ঘটবে যে,
(১) সারা বিশ্ব যখন করোনা মুক্ত হয়ে যাবে, তখনো আমাদের দেশে পরীক্ষা না করার কারনে হয়তো বা কিছু কিছু মানুষের করোনার উপসর্গ ধরা দিতে পারে যা অন্যদেশ এইসব গুটিকতক মানুষের জন্য আমাদের বহির্গমন যাত্রা অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করে দিতে পারে। একটা কথা আমার মনে হয় যে, এখন থেকে সমস্ত এয়ারপোর্টে করোনার বিপরীতে স্বস্ব দেশের এয়ারপোর্ট করোনা আছে কিনা এই টেষ্ট করিয়েই কোনো যাত্রীকে তাদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দিবে হয়ত। আর এটা যদি হয় নতুন কোনো শর্ত আরোপ, তাহলে, আমাদের দেশের যাত্রীদের মধ্যে যদি এই ধরনের কোনো সিম্পটম কোথাও পাওয়া যায়, সাথে সাথে এই তথ্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে আর তখন যেটা হবে, সেটা হলো এই যে, লোক, যাত্রী, এমন কি মালামাল স্থানান্তরেও বাংলাদেশকে সমগ্র বিশ্ব কোয়ারেন্টাইন করে ফেলতে পারে।
(২) আরেকটা মারাত্মক ব্যাপার ঘটে যেতে পারে যে, সঠিক করোনা আক্রান্ত তথ্যের অভাবে প্রকৃতপক্ষে করোনায় মৃত্যুবরনকারীর করোনা হয় নাই এইটা বিশ্বাস করে তার কবর, তার গোসল, জানাজা ইত্যাদি পালনের কারনে দেশে নতুন নতুন করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে শেষ অবধি না একটা মহামারীর রুপ নিয়ে নিতে পারে। তখন দেখা যাবে, বিশ্ব যেখানে প্রায় করোনা মুক্ত, আমরা সেখানে মহামারীতে আক্রান্ত।
(৩) এই অবস্থায় ঠিক যা যা ঘটছে, তা তা সব মিডিয়ার মাধ্যমে গুজব না ছড়িয়ে সঠিক তথ্যটা আমাদের সবাইকে জানানো দরকার এবং যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্ত এলাকায় বা পরিবার বা যারা কোনো না কোন একটা উপসর্গে (হাচি, কাশি, জর, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদির যে কোনো একটা) মারা যাচ্ছেন, তাদের এবং তাদের সাথে মেলামেশা করেছেন এমন ব্যক্তি বর্গ/এলাকায় জরুরি টেষ্ট করিয়ে নিশ্চিত করা তিনি করোনায় মৃত্যুবরন করেছেন কি করেন নাই। এটাই এখন সমাধান। এ ব্যাপারে ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত একটা তথ্য (আমি এর সত্যতা জানি না) শেয়ার করছি যে,
বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, টেস্ট না করার কারণে সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না যে দেশে আসলে করোনা আক্রান্ত সংখ্যা কত। এদিকে জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া একটি আন্তঃসংস্থা নথি মোতাবেক, করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রশমন ও অবদমনে জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে “৫ লাখ থেকে ২০ লাখ” মানুষের মৃত্যু হতে পারে। “জাতীয় প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা” (সিপিআরপি ভি১) শীর্ষক এই নথিতে এই সংখ্যাকে “ভয়াবহ” বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে ঢাকায় বিদেশী কূটনীতিকদের এই নথিটি দেওয়া হয় বলে খবর প্রকাশ করেছে সুইডেন ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম নেত্র নিউজ। ২৬ মার্চের এই নথিতে বলা হয়, “বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক হওয়ায়, বৈশ্বিকভাবে প্রযোজ্য মডেলিং পদ্ধতি ও পরামিতি অনুমান অনুযায়ী, কভিড-১৯ রোগের প্রভাবের পূর্বাভাস হলো, মহামারী চক্রে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষের জীবনহানি ঘটবে। অন্যান্য দেশে ব্যবহৃত মডেলিংয়ের বিপরীতে চিন্তা করলে এই সংখ্যা ও মাত্রা খুব আশ্চর্য্যজনক কিছু নয়। কিন্তু এই সংখ্যা অত্যন্ত ভয়াবহ। এই সংখ্যাকে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো উচিৎ।”
ধীরগতির টেস্টের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকেও যেতে পারে। তখন শুধু লকডাউন দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।
আগামি ৪ এপ্রিল সরকার ঘোষিত লক-ডাউন সিস্টেমে সেলফ কোয়ারেইন্টাইন শেষ হবে। গত দুই তিন দিন যাবত মিডিয়ায় দেখতে পাচ্ছি, নতুন কোনো করোনার রোগী শনাক্ত হয় নাই বরং যারা শনাক্ত হয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশ রোগী ভাল হয়ে গেছেন। খবর যদি সত্যি হয়, আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু কোনো কারনে যদি আমাদের এই তথ্যের মধ্যে গাফিলতি থাকে, তাহলে সাধারন মানুষ উক্ত তথ্যকে সত্যি মনে করে যখন নির্বিগ্নে ঘরের বাইরে চলে আসবে, ঢল নামবে, তখনই হবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। সুতরাং যারা পারেন, যাদের সামর্থ আছে, তারা নিজেরা আরো ১৫ দিনের অঘোষিত সেলফ কোয়ারেইন্টাইনে থাকুন, ব্যাপারটা বুঝুন এবং পরিষ্কার হোক পরিস্থিতি, তারপর বের হোন।
আর যদি নিতান্তই বের হতে হয়, মনে মনে বিশ্বাস করুন যে, করোনার প্রভাব এখনো আপনার আশেপাশেই আছে, এখন যেভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন, বাইরে গেলেও ঠিক একইভাবে আরো অন্তত ১৫/২০ দিন সব কিছুর ব্যাপারে অধিক সতর্ক থাকুন। বাকীটা পরিবেশই আপনাকে বলে দেবে পরিসংখ্যানটা কি।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এমন এক মহামারী চলছে যে, তৃতীয় কোনো বিশ্বযুদ্ধ হলেও কোনো না কোনো পক্ষ বিপক্ষ থাকতো, আর এই দুই পক্ষ-বিপক্ষকে সামাল দেয়ার জন্য হয়তো তৃতীয় কোনো সমঝোতাকারীও থাকতো। কিন্তু এখানে পক্ষ যেনো একটাইঃ দৃশ্যমান মানবজাতী বনাম অদেখা অমাবশ্যারমতো করোনার মহামারী। সারাবিশ্ব আজ স্থবির। থেমে গেছে সব। সবাই আজ এক কাতারে, কেউ আজ আর কারো জাত, ধর্ম কিংবা গোত্র নিয়ে কথা বলে না। এই অমাবশ্যায় সব কিছুই উলট পালট হয়ে যাচ্ছে, সব কিছুর হিসাব পালটে যাচ্ছে। এই অমাবশ্যা কবে কাটবে সেটাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। অনেকেই হয়ত অমাবশ্যা কাটার জন্য জজ্ঞের আয়োজন করছেন, উপাসনা করছেন, কিন্তু অমাবশ্যা কাটবে কিনা সেটা কোনভাবেই জজ্ঞ নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। কারন, এই মহামারী বর্তমান মানবজীবনের অস্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক করতেই যেনো এর আবির্ভাব। অর্থাৎ বিধাতার শুদ্ধি অভিযান চলছে। সবাই যেন দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন, কোনটা সঠিক সিদ্ধান্ত আর কোনোটা সঠিক নয় এটাও সঠিকভাবে নিতে পারছেন না, না দেশের সর্বোচ্চ মহল, না তাদের আমলাতন্ত্র না সাধারন জনগন। সবাই দিশেহারা। সারাটা বিশ্ব যেনো একটা মর্গ। মর্গে যেমন ঠাণ্ডা থাকে তেমনি থাকে নিস্তব্দতা। বিশ্ব এখন ঠান্ডা আর নিস্তব্ধ।
জীবন একটাই, এ জীবনে সাহসীরাই জয়ী হয়, আর দুর্বলেরা খড়কুটা ধরে কোনো রকমে বেচে থাকে। যে জীবনে চ্যালেঞ্জ নাই, সেটা এডভেঞ্চারাস নয়। যে জীবনে প্রত্যাশা নাই, সে জীবন একটা বোরিং লাইফ। অলিম্পিকের একজন দৌড়বিদ চুড়ান্ত সাফল্য পেতে একই দৌড় হাজারবার দিতে হয়। সব প্রতিযোগীরাই অলিম্পিকের একটা দৌড়ে সাফল্য পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একই দৌড় দিতে থাকে। সাফল্য আসবে কিনা সেটা বিচারের দিন সাবস্থ্য হয় সেদিন যেদিন সব দৌড়বিদরা একসাথে প্রতিযোগীতায় নামে। সেদিন বুঝা যায়, কে কতটা সাফল্যের জন্য দৌড়েছিলো। মজার ব্যাপার হলো, সাফল্যের একটা ফেস ভেল্যু আছে। দৌড়ে হয়তো একজন দৌড়বিদ সাফল্য পায়, কিন্তু তারসাথে সাফল্য পায় তিনিও যিনি এই ক্রিড়াবিদকে গাইড দিয়ে, অভিজ্ঞতা দিয়ে, মেধা দিয়ে সাফল্য পেতে সাহাজ্য করেছেন। আর তার সাথে বড়সড়ে সাফল্য পায় দেশ তথা বিশ্ব। এই সাফল্যমন্ডিত জীবন তখন হয়ে উঠে একটা লিজেন্ড। আর লিজেন্ডরা জগতে বারবার উচ্চারিত হয়। জীবনে সাফল্য আসে শুধুমাত্র নিজের গুনে। কেউ যদি সাফল্য না পান, সে অনেকের ঘাড়ে তার এই ব্যর্থতা চাপিয়ে দিতে পারেন বটে কিন্তু ব্যর্থ মানুষকে কেউ মনে রাখে না। ইতিহাসে কিছু নামীদামী ব্যর্থ মানুষের নাম কেউ মনে রাখলেও সেটাও নিতান্ততই সাফল্য মন্ডিত ওই লিজেন্ড যার বিপরীতে কারো ব্যর্থতা এসেছিলো, তাই তাকে পাশাপাশি হয়তো মনে রাখে। এটা ওই ব্যর্থ লোকের কারনে নয়, আবারো সেই লিজেন্ডের কারনেই হয়তো ব্যর্থ মানুষটি বেচে থাকে ইতিহাসের পাতায়। নিজকে ভালোবাসো, নিজকে বিশ্বাস করো। সাফল্য তোমার। যারা নিজের উপর ভরসা করে নাই, তাদের প্রতিভা থাকা সত্তেও নিজেকে প্রস্ফুটিত করতে পারে নাই।
কোম্পানী ফর্ম করার যাবতীয় কাজ খুব দ্রুত গতিতে চলতে থাকলো। আর নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হলো যে, আন নূর কন্সট্রাকশন লিমিটেড পুরুপুরী অফিশিয়ালভাবে কাজ করার আগ পর্যন্ত আমরা রুবেল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক্সকে সাংঘটনীক পরিবর্তনে পীরগঞ্জে পাওয়া চায়নীজদের কাজ তদারকি এবং যাবতীয় সাপ্লাই দেয়া। এই উপলক্ষ্যে আমি আর মূর্তজা ভাই পরিকল্পনা করলাম যে, দিনে দিনে রংপুর-পীরগঞ্জ গিয়ে পুরু ব্যাপারটা একবার দেখা দরকার। তাই ভাবলাম যে, বিমানে সৈয়দপুর বিমান বন্দর নেমে সেখান থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে আমরা রংপুর যাবো, কাজ দেখবো, আবার লাষ্ট ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসবো। সাথে ১৫ লক্ষ টাকাও নিয়ে গেলাম।
বিয়ে নামক পরীক্ষায় সবাই এক রকম প্রশ্ন পত্র পায় না। কারো প্রশ্ন নীল আকাশের মতো চোখ জুড়ানো, আবার কারো প্রশ্ন ককেশিয়াস পাহাড়ের দূর্গম পিচ্ছিল ঢালুর মতো অমসৃণ। আর সেইপত্রের সমস্ত উত্তরও এক রকম হয় না। কেউ সহজেই সব কিছু উৎরে যায়, আবার অনেকেই পিচ্ছিল পথে শুরুতেই নিখোজ হয়ে যায়।
অনেক বিবাহিত জীবনের নম্বর সময়ের সাথে সাথে বেড়ে লেটার মার্কে উঠতে পারে, আবার অনেক ক্ষেত্রে পাশ মার্ক থেকে কমতে কমতে ফেল মার্কেও নেমে আসতে পারে। তারপরেও নিজের চেষ্টায়, নিজের বিবেক দিয়ে, চারিপাশ বুঝে কেউ যদি আন্তরীক হয়, এই ফেল নম্বর নিয়ে কখনো কখনো তা বেড়ে আবার সঠিক জায়গায় উঠে যেতে পারে যদি না এই সম্পর্কের মাঝে অন্য কিছু যুক্ত হয়, অথবা এমন কিছু যুক্ত হয় যা তিক্ততায় রুপান্তরীত হয়।
যদি সম্পর্কের মাঝে অন্য কিছু যোগ হয়ে যায়, যা হওয়া উচিত না, যার তার ফলে লেটার মার্ক পাওয়া একটা সম্পর্ক শীতের পারদের মতো দ্রুত নামতে নামতে ফেল মার্কের নীচে চলে যায়, তাহলে বুঝতে হবে সেই ভালবাসার পারদে এমন কিছু ভেজাল ঢোকেছে যা খালি চোখে দেখা যায় না, বা বর্নচোরার মতো তাকে পারদের মতো একই মনে হয়। এই ক্ষেত্রে এই ভালোবাসার ব্যারোমিতার দিয়ে কোনো পক্ষেরই ভালোবাসার তাপমাত্রা বুঝা সম্ভব হয় না। প্রতিবারই মনে হবে রিডিং ভুল। ব্যারোমিতার পালতানো যায় কিন্তু আমি বুয়ারোমিটার না পালটে আমাদের সেই ব্যারোমিতার সঠিক কাজ করে এমন কেনো করতে পারি না? এর একটাই কারন, আমরা বর্নচোরা ভেজালতাকে সনাক্ত করতে অক্ষম। ভালোবাসার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর একটা সার্বোজনীন সমাধান যুগে যুগে মিনিষিরা দিয়ে গেছেন বটে কিন্তু সেটা আমরা না মনে রাখি, না অনুসরন করি। যার ফল সরূপ আমরা অধিক মনো কষ্ট নিয়েই একে অপরকে দুইটি পথের শেষ প্রান্তে এসে চোখের জলেই বিদায় দেই, অথচ ভিতরে ভিতরে যন্ত্রনার আর শেষ থাকে না। তাহলে সেই সমাধানটা কি?
আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে যে, মানুষের জীবনের এই রকম একটা দুদুল্যমান পরিস্থিতিতে দুইটা মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো কারনে সহনশীলতা, মানবিকতা অথবা এই জাতীয় মানবিক আইটেম গুলিতে নম্বর ধীরে ধীরে কমে শুন্যতায় নামতে থাকে। এই শুন্যতায় যেনো কারো স্কোর না নেমে আসে, তার জন্য সবচেয়ে বড় যা দরকার তা হচ্ছে, কোনো শর্ত ছাড়া একে অপরের বিশ্বাসভাজন থাকা, দরকার সেক্রেফাইস বা ত্যাগ, দরকার একনিষ্টতা আর দরকার নিজের সাথে নিজের সৎ থাকা। কেউ যদি মনে করে যে, একটা মিথ্যাকে বারবার মিথ্যে বললে সেটা সত্যি হয়ে যায়, সেটা ভুল, হয়তো ব্যাপারটা এরকম যে, একটা মিথ্যা বারবার বলাতে সত্যিটা কিছুটা ফেকাশে হয়ে যায়। কিন্তু এক সময় মিথ্যাটা প্রকাশ্যে আসেই। কখনো যদি কোন ভুল হয়েও যায় যা নিছক অনিচ্ছহায়, তখন তার হাতে থাকে একটাই অস্ত্র। আর সেটা হচ্ছে, নিসশার্তভাবে ক্ষমা চাওয়া। ক্ষমা চাওয়া কোনো দোষের না। ক্ষমা যিনি চান তিনিও সম্মানীত, আর যিনি ক্ষমা করেন তিনিও। আর এই ক্ষমা চাওতা যতো দ্রুত হয়, ততো মংগলজনক। ততো ক্ষতির সম্ভাবনা কম। অনেক ক্ষেত্রে এই ক্ষমা চাওয়ার মতো সুযোগটাও আসে না। কিন্তু যদি আসে, তা কর্তব্যবোধ বা রিস্পেক্তের সাথে পুনরায় তা শোধন করা সম্ভব। কোনো একটা পজিটিভ ফিগার থেকেই আরো পজিটিভ ফিগার বাড়ে, শুন্য থেকে কিছুই বাড়ে না। শুন্যতায় নেমে যাওয়ার আগেই এই প্রক্রিয়াতা বুঝা দরকার। বুঝা দরকার তাদের, যারা এর ভুক্তভুগী। পরিস্থিতি শুন্যের কোটায় নেমে গেলে এবং উন্নত না হলে এই ক্ষমা কোনো কার্জকরী ভুমিকা রাখে না। একটা কথা খুব ভালো করে মনে রাখা দরকার যে, ঘরের দরজা বন্ধ হবার সাথে সাথে সব সময় মনের দরজা যে বন্ধ হবে এমন কোনো কথা নাই। কিন্তু মনের দরজা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন ঘরের দরজা এম্নিতেই বন্ধ হয়ে যায়। আর এই পরিস্থিতির জন্য যার জন্য্যে বন্ধ হয়, সেইই দায়ী। কারো ফিলোসফির এয়ারপ্ল্যান যতোক্ষন না পর্যন্ত ভূমিতে ল্যান্ড করে বাস্তবে ফিরে না আসে, ততোক্ষন সেই ফিলোসোফি কারো কাজে আসে না।
দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিন গুলির কথা মনে করে দেখলে বুঝা যায়, সবাই সব স্তরের প্রত্যেকেই একটা পজিটিভ দিক থেকেই এগিয়ে এসেছিলো বলেই সম্পর্কটা স্থাপিত হয়েছে। যদি কখনো বিস্লেষন করেন, দেখবেন, দাম্পত্য জীবনের ইতি শুধু স্বামী স্ত্রীর কারনেই হয়েছে এমন নয়, এর মধ্যে আরো অনেক অনেক বহুমাত্রিক মন্তব্য, বিস্লেষন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি বর্গের কারনেই বেশীর ভাগ দাম্পত্য জীবনের সফলতা আসে নাই। এই ক্ষেত্রে যারা দাম্পত্য জীবনের মধ্যে বন্দি হয়েছেন, তাদের উচিত, সমস্ত জ্ঞানি, গুনীজন কে এক পাশে রেখে, নিজেদের ভিতরের আত্তার কথা শুনা। নিজের হৃদয়ের কথা শুনা।
চোখ বন্ধ করুন, নিজের উপর ভরষা রাখুন, সৃষ্টি কর্তাকে স্মরণ করুন, দেখুন বন্ধ চোখে কে আপনার সামনে আসে বারবার। যদি হয়ে থাকে সে, যাকে আপনি দূরে সরিয়ে রেখেছেন সেই ভেজাল কিছু বর্ন চোরা পারদের কারনে, আপনি ঠিক ভেজাল টা ধরতে পেরেছেন। পালিয়ে যান সবার কাছ থেকে। কারন, আপনি সব ভেজাল পরিবেশ দারা এখন পরিবেষ্ঠিত। একমাত্র আপনার একা বেরিয়ে যাওয়াই হচ্ছে পরিশুদ্ধ হইবার একমাত্র পথ।
আবার নতুন করে ভালোবাসুন, নতুন করে পৃথিবীর সব কিছু শুরু করুন সেই তাকে নিয়ে যার হাত ধরে একদিন আপনি সবার সামনে শপথ করেছিলেন, আমরা এক সাথে বৃদ্ধ হবো।
জীবন অনেক সুন্দর। আর একতাই জীবন। মনে রাখবেন, অতীতের কোনো ভবিষ্যত নাই। ভবিষ্যত হয় শুধু আজকের জন্য।
সারপ্রাইজটা অনেক বেশী হয়ে গেলো।কি সেই সারপ্রাইজ, আর কিভাবে হলো সেটাই বলছি।
সকাল বেলায় নাস্তা করার সময় মেয়ে আর বউ দুজনেই বল্লো, হ্যাপি বার্থ ডে।
মনে পড়লো, ও আজ আমার বার্থডে।
আমি কখনো আমার নিজের বার্থ ডে ঘটা করে পালন করি নাই। আর করার মতো পরিবেশও আসলে ছিলো না। এই মেয়েরা শখ করে, ফলে কখনো কখনো মেয়েদের চাপে পড়েই ইদানিং জন্ম দিনটা পালন হয়। কখনো ঘরোয়া ভাবে, কখনো একেবারেই নিজেরা, আবার কখনো কখনো সবাই মিলে। ফলে আমার জন্মদিন নিয়া আমি খুব একটা উচ্ছসিত থাকি না। সম্রাট আকবরের কিংবা নেপোলিয়ানের জন্ম তারিখ পরীক্ষার খাতায় ভুল করলে সেটা শুধু নম্বরের উপর দিয়েই যাবে, ঘরে শান্তি নষ্ট হবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু আমি ভুলেও আমার মেয়েদের বা বউ এর জন্মদিন ভুলি না। বুদ্ধিমান স্বামীরা এইটা ভুল করার কথা না। করলেই অনেক কথা শুনার একটা রাস্তা তৈরী হয়ে যায়, অশান্তি আসার সম্ভাবনা থাকে। ওনাদের জন্মদিন পালন না করুন, অন্তত সকালে উঠে সবার আগে বলা চাই, বউ হলে হ্যাপি বার্থ ডে জানু,, আর মেয়েদের বেলায় “হ্যাপি বার্থ ডে মা” ইত্যাদি।
যাক, যা বলছিলাম।
ঘুম থেকে উঠেই আমি সাধারনত মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি রাতে কেউ ফোন দিলো কিনা, বা কেউ ফোনে না পেয়ে ম্যাসেজ দিলো কিনা। এটাও তাঁর কোনো ব্যত্যয় হলো না। আমার রোজকার অভ্যাস। আজকে মোবাইল হাতে নিতেই দেখি অনেকগুলি ম্যাসেজ। কিছু রোটারীর বড় বড় হোমড়া চোমড়াদের অত্যান্ত চমৎকার মেসেজ। কিছু আছে ব্যাংকের তরফ থেকে। আবার কিছু আছে সার্ভিস সেন্টার গুলি থেকে। প্রায় সব গুলিই কমার্শিয়াল। খুব একটা পুলকিত হবার মতো না এইসব মেসেজে। তারপরেও খারাপ লাগে না। গালি তো আর দেয় নাই। শুভেচ্ছা দিছে।
দেখলাম, প্রথম মেসেজটাই আমার বড় মেয়ের। রাত ১২০১ মিনিটে পাঠিয়েছে। আমাকে জন্মদিনের উইশ করে চমৎকার একটা ম্যাসেজ। “Happy Birth day, my Super Hero, Dad. You are the best example of a father and all the moments I have lived with you is unforgottenable. With each passing year, I wish your happiness become double. I wonder if you know how much I love you. I may not tell you enough but I do love you from my heart to infinity and beyond. Happy birthday Abbu. এতো চমৎকার করে বলা, সেটা যেনো হৃদয় ছুয়ে যায়। মুচকি হেসে দিলাম। সকালতাই যেনো কেমন মিষ্টি মনে হলো।
এতো বছর পরে এসে এখন আমার যদিও আর সেই ছোট বেলার মতো জন্মদিন, কিংবা এই জাতীয় কোনো কিছু আর উচ্ছাসিত করে না। তারপরেও মেয়েদের এই রকম অন্তরস্পর্শী মেসেজ মনকে বড় উতালা করে তোলে। পরিবার তখন মনে হয় আমার সবচেয়ে আনন্দের একটি জায়গা। তখন দিনটাকে আর নিছক অন্যান্য দিনের মতো মনে হয় না। যদিও অনেক সময় মনে হয়, ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েরা এগুলা নিয়ে বেশ মজা পায়, সেলিব্রেট করে, একটা ফানডে করে, কিন্তু এটা সব সময় সত্য যে, আমাদের সারা বছরের ব্যস্ত দিন গুলির ফাক ফোকর দিয়ে এইসব ছোট খাট বিষয় নিয়ে পরিবারে একটা গেট টুগেদার তো হয়। একদিক দিয়ে খারাপ না। অনেকেই আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে এইসব করা নাজায়েজ বলে কথাও বলেন। আমি ধর্মের বিষয়টা এখানে কোনোভাবেই আলোকপাত করতে চাই না। এতা যার যার ব্যাপার।
যাক যেটা বলছিলাম, আমার জন্মবার্ষিকির কথা।
বউ এর হ্যাপি বার্থ ডে বলার উপলক্ষে বউকে বললাম, আরে, এখন কি আর সেই চমক আছে যে, জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি করার? তাঁর মধ্যে বড় মেয়ে বগুড়ায়, ছোট মেয়ের সামনে পরীক্ষা। তোমার আবার কলেজ থাকে। সব মিলিয়ে সবাই তো ব্যস্তই থাকি। কি দরকার খামাখা আবার একটা ঝামেলা করার।
তারপরেও বউ বল্লো, আরে, চলে এসো একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে। রাতে বাইরে আমরা আমরাই কোথাও ঘুরতে যাবো, খেয়ে রাতে বাসায় ফিরবো। সময়টা হয়তো ভালই যাবে। একটা ব্যতিক্রম দিন যাবে। ভাবলাম, ঠিক আছে, এই উপলক্ষে না হয় একটু যাওয়া যেতেই পারে।
অফিসে এলাম, সকাল তখন প্রায় দশটা। আমি এসে স্টাফদের বললাম, কার কি কাজ আছে আমার সাথে, একটু গুছিয়ে নিয়ে আসো, আমি হয়ত আর্লি লাঞ্চ করে বের হয়ে যাবো। সবাই মুটামুটি দ্রুত গতিতেই আমার সাথে জড়িত যার যার কাজ গুছিয়ে নিয়ে এলো। প্রায় ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সেরে ফেল্লো সব কাজ। আমি নামাজ পড়ে, আর্লি লাঞ্চ করতে বসে গেলাম। এরই মধ্যে আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার (আসলে ব্যবসায়ীক পার্টনার বললে ভুল হবে, আমরা আসলে দুজনেই দুজনকে ফ্যামিলি হিসাবেই দেখি) মূর্তজা ভাই ফোন দিলেন। ব্যবসায়ীক কাজেই ফোন দিলেন। কথা শেষে আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি আজকে অফিসে আসবে কিনা। জানলাম, আসতে উনার দেরী হচ্ছে, একটা অফিশিয়াল কাজেই আটকা পড়েছেন। ফলে, আমি যে আর্লি বের হয়ে যাচ্ছি সেটা ওনাকে জানাতে গিয়ে কোন ফাকে যে বলে ফেলেছি যে, আজ আমার জন্মদিনের উপলক্ষে বাসায় বউ পোলাপান আগে যেতে বলেছে। মুর্তজা ভাই, হাসলেন। আমিও হাসলাম। কিছু ফান ও করলাম এই জন্মদিনের অনেক কথা নিয়ে (সেগুলি এখানে বলছি না)।
যাক, আমি প্রায় দুটোর দিকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। রাস্তার যে অবস্থা, ট্রাফিক জ্যাম ক্রস করে করে বাসায় পৌছাতে পৌছাতে প্রায় ৪টা বেজে গেলো। এতো আগে সাধারনত আমি অফিস থেকে কখনো বাসায় আসি না। ফলে সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক বাকী। আর আমরা তো প্ল্যান করেছি সন্ধার পরে বাইরে যাবো। এই অল্প সময়টুকুন কি করা যায় আমাকে আর ভাবতে হলো না। ছাদে আমার বাগান আছে, আমি নিজেই এর দেখাশুনা করি। ফলে ছাদে যেতে চাইলাম। বউ বল্লো, আরে, আজকে আর ছাদে যাওয়া লাগবে না। একটু রেষ্ট নাও। সন্ধ্যায় ঘুরতে গেলে ফ্রেস লাগবে।
কথাটা মন্দ লাগলো না। শুয়ে শুয়ে ক্রাইম পেট্রোল দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম। মাগরিবের আজান পড়ছে, ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বিছানা থেকে উঠে মনে হলো, আজ বহুদিন পর দিনে ঘুমিয়েছি। আশেপাশে কিছু পাখীর কিচির মিচির হচ্ছিলো। শব্দটা ভালই লাগছে। এদিকে দরজাতা বউ ডেংগুর ভয়ে সন্ধ্যার আগেই বন্ধ অরে রেখেছে। ডেংগু বড় খারাপ জিনিষ। আমরা অনেকেই সচেতন নই বিধায় মশারা আমাদের থেকে একটু চালাক। সন্ধ্যা হলেই কাম্রাইয়া কিছু রক্ত খেয়ে নেয় আর ডেংগুর জীবানু উপহার দিয়ে তারপরের ইতিহাস নাইবা বললাম। ভালো ঘুম হয়েছে, তবে ঘুমের রেওয়াজটা এখনো আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভালই লাগলো ঘুমটা। নামাজ পড়ে বউকে বললাম, কোথায় যাবা প্ল্যান করেছো?
খুবই স্বাভাবিক স্বরে বউ জানালো, এখনো তো ঠিক করা হয় নাই কোথায় যাবো। তবে, চলো, খুজে বের করা যাবে। বের হলেই দেখা যাবে কোথায় যাওয়া যায়। আমি তাকে একটু সাজগোছ করতে দেখলাম। তাঁর এই সাজগোছে কিন্তু আমার কাছে একটা জিনিষ বারবার খুব অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, বাইরে যাচ্ছি আমি, আমার ছোট মেয়ে আর আমার বউ। একেবারেই একটা ঘরোয়া ব্যাপার। কিন্তু তারা হটাত করে এতো সাজগোছ করছে কেনো?
বউকে জিজ্ঞেস করায় সে বল্লো, আরে তোমার জন্মদিনের একটা ছোটখাটো জিনিষ মনে করি নাকি আমরা? একটু ছবি টবি তুলবো, একটা রেষ্টুরেন্টে যাবো, সেজেগুজে যেতেই ভালো লাগছে। ওদিকে, আমার ছোট কন্যাকে কোথাও নিতে গেলে তাকে সাজবার জন্য কতবার যে তাগাদা দিতে হয়, তাঁর কোনো ইয়াত্তা নাই। কিন্তু আজ দেখলাম, বাহ, নিজেই ড্রেস পছন্দ করছে, সময় নিয়ে ড্রেস পড়ছে। ব্যাপারটা খুব নিঃশব্দে হচ্ছে। আমার কাছে একটু খটকা লাগছে বটে কিন্তু একেবারেই আবার অস্বাভাবিকও মনে হচ্ছে না। হতে পারে, আজ ওদের মন খুব ফুরফুরা।
যাই জিজ্ঞেস করি, তাতেই তারা হাসে। আমার রুমে গেলাম। আমার রুম মানে আমি যেখানে কম্পিউটার নিয়ে কাজ করি সে রুমে। একটু কফি খেলাম। ভাবতেছিলাম, ওরা কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছে? ওদের কি আমাকে কিছু সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করছে? ওরা কি কোনো গিফট বা এই জাতীয় কিছু আগে থেকেই কিনে রেখেছে যা রেষ্টুরেন্টে গেলে হয়ত বের করবে? ইত্যাদি। আমি হেটে হুটে ঘর ময় নীরবে একটু চেক ও করলাম, চোখে এই জাতীয় কোনো কিছু পড়ে কিনা। পেলাম না। ফলে ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়েই ফেলে দিলাম কারন কোনো ক্লু পাচ্ছিলাম না। মেয়ে মানুষেরা তো সময় অসময় সব সময়ই সাজ গোছ করতে পছন্দ করে। হয়ত এতা তারই একটা অংশ।
তো, ওরা প্রায় রেডি হয়ে যাচ্ছে দেখে আমিও রেডি হবার জন্য আমাদের মেইন ঘরে গেলাম। ভাবলাম, আমরাই তো। একটা টি সার্ট অথবা গেঞ্জি পড়ি, সাথে সেন্ডেল সু পড়ি, আরাম লাগবে। হটাত করে আমার বউ বল্লো, আরে নাহ, শার্ট প্যান্ট পড়ো। আমরা যেহেতু সবাই একটু সাজ গোছ করছি, তুমি আবার গেঞ্জী, স্যান্ডেল সু পড়লে কেমন দেখায়। বললাম, আরে, এতে কি অসুবিধা। আর আমরা কোথায় যাচ্ছি আসলে খেতে?
বউ এর উত্তর, চলো যাই, একটা কোথাও গেলেই হবে। যাক, বউ যখন সেজেগুজে শাড়িটাড়ি পড়ছে, মেয়েও যখন তাঁর পছন্দের মতো করে সেজেছে, তাহলে আমি আবার গেঞ্জীগুঞ্জী পড়ে লাভ কি? আমিও না হয় শার্ট প্যান্টই পড়ি।
কিন্তু মনের ভিতরে একটা খটকা লেগেই থাকলো। আমার এক সময় মনে হলো, ওরা কি কোনো বড় সড় গিফট কিনেছে নাকি? কিংবা এমন কিছু যা আমি দেখছি না কিন্তু ওরা লুকাচ্ছে? আমি একটা টেকনিক খাটালাম।
আমি আমার মেয়ের রুমে গিয়ে বললাম, কিরে মা, আজকের জন্মদিনে আমার জন্য কোনো গিফট কিনলি না? মেয়ে হেসে দিয়ে বল্লো, না আব্বু, সময় পাই নাই। তাছাড়া আপু বগুড়া থেকে আসুক, তারপরে দুই বোনে গিয়ে তোমার জন্য গিফট কিনবো বলে আমরা ভেবেছি। তাই আর কেনা হয় নাই। এই বলে ছোট মেয়েও একটু মুচকি হাসলো। আমার সন্দেহের খটকাটা দূর হচ্ছিলো না। কিছু তো একটা চলছিলো যা আমি আবিস্কার করতে পারছিলাম না। কি হতে পারে? কত কিছু ভাবলাম, কত ভাবে ভাবলাম, ব্যাপারটা আমার মাথায়ই আসছে না, কি হতে পারে?
সবাই বের হলাম। আমি একটু আগেই বের হলাম। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, তোর ম্যাডাম কিছু প্যাকেট দিছে নাকি? ড্রাইভার সহজ ভাবে বল্লো, না তো স্যার। কিছু দেওয়ার কথা নাকি? কই ম্যাডাম তো কিছু বল্লো না।
আমরা সবাই গাড়িতে বসে পড়লাম। গাড়ির ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো, স্যার কোথায় যাবো। আমি কিছু বলার আগেই আমার বউ বলে উঠলো, চলো, রেডিসনের আশেপাশে ভাল রেষ্টুরেন্ট আছে, ওখানেই চলো। আমি বললাম, আরে, বড় মেয়ে আসুক, তখন না হয় ওকে নিয়েই একবারে যাওয়া যাইতো। বড় মেয়ে শুনলে ভাববে, দেখো, আমি ঢাকায় নাই, আব্বু আম্মু, আর কনিকা সবাই আব্বুর জন্মদিনে রেডিসনে পার্টি করছে। ওর হয়ত একটু মন খারাপ হতে পারে। কি দরকার। থাক না আজকে না হয় এই করিমুল্লা বা রহিমুল্লার কোনো নরম্যাল একটা রেষ্টুরেন্টে যাই, এম্নিতেই কিছু খাওয়া দাওয়া করে চলে আসি।
আমার বউ নাছোড়বান্দা। আমার বউকে আজকে মনে হচ্ছে, বেশ সার্থপর। বড় মেয়ের জন্যও তাঁর আজকে যেনো আফসোস নাই। বল্লো, আসুক মেয়ে, তারপর ওকে নিয়ে আরেকদিন যাবো। সব তো আর শেষ হয়ে গেলো না।
গাড়ি যাচ্ছে, হটাত দেখি আমার বউ গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমি দেখলাম, একটু সন্দেহ হলো কেনো সে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে? কিন্তু আবার মনে হলো, হয়ত কোনো ভালো রেষ্টুরেন্টের খোজ মনে মনে নিয়ে রেখেছে যেটা সে ভালোমত চিনে না। তাই গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমরা যাচ্ছি, যাচ্ছি, যেতে যেতে রেডিসন পার হয়ে গেলাম। সামনে কূর্মিটোলা গল্ফ ক্লাব। ভালো সাজিয়েছে মনে হচ্ছে। অনেক গাড়ি পার্ক করা। হয়তোবা কারো বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, অথবা বড় কোনো পার্টি। শহরের ঝলমল আলতে কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবটা যেনো তাঁর নিজের আলতে আরো চকচক করছে। লাল নীলা, সবুজ আলো, অনেক প্রকারের স্টাইলে জ্বলছে আলগুলি। ভালই লাগছে। পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে হর্ন বাজিয়ে আবার ব্যস্ত শহরের গাড়ি ঘোরা ছুটে চলছে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও সামনে এগুচ্ছি।
বললাম, চলো, কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে ঢোকি।
আমার বউ আজগুবি একটা কথা বল্লোযে, এখানে তো আমাদের আর্মির জায়গা। অনেকবারই এসেছি। চলো দেখি, আরো সামনে যাই, কি কি ভালো রেষ্টুরেন্ট আছে। সেখানেই যাই। বললাম, সামনে তো আছে রিগেন্সি, ম্যাপল লীফ, আরো অনেক কিছু। আসলে তোমরা কি প্ল্যান করেছো কোথায় যাবা?
বউ বল্লো, চলো না যাই। তুমি আর এখন ব্যস্ত না।
ঠিক আছে, দেখা যাক কোথায় নিয়ে যায় বউ।
গাড়ি আরো সামনে চলে যাচ্ছে। চলে এসেছি প্রায় রিগেন্সির কাছাকাছি। বললাম, চলো তাহলে রিগেন্সিতেই যাই। তাতেও আমার বউ খুব একটা সায় দিলো বলে মনে হলো না। বল্লো, আরে নাহ, এটাও খুব একটা ভালো মানের না। মনে হয় ১ বা ২ স্টারের মানের। এর থেকে আরো ভালোটায় যাই।
বললাম, তাহলে চলো, ম্যাপললীফে যাই। ওটায় আমি এর আগেও এসেছি। খারাপ না। এবার মনে হলো বউ রাজী। কিন্তু গাড়ি থামানোর কোনো প্রস্তাবনা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেলো না। ফলে গাড়ী ম্যাপললিফের জায়গা পার হয়ে চলে গেলো আরো দূরে। সামনে এবার লা মেরিডিয়ান।
আমার বউ বল্লো, চলো, এখানে তো তোমাদের নওরোজ ভাই চাকুরী করেন। এখানেই যাই।
বললাম, তাহলে চলো। দেখি, দোস্তরে পাই কিনা। পাইলে তো মন্দ হয় না। একটু আডদাও দেওয়া যাবে। যদিও আমি এখানে আরো কয়েকবার এসেছি। বললাম, তো তুমি তো আগে এখানে আসো নাই। খারাপ হবে না।
গাড়ি ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। পার্ক করলাম। ড্রাইভারকে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, যে, তুমি খেয়ে নিও কিছু। আমাদের আসতে আসতে একটু দেরী হবে।
আমার বউ আমার সামনে দিয়ে হেটে ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। কঠিন চেক আপ। মনে হচ্ছে কোনো এয়ারপোর্টে ঢোকছি। হাত ব্যাগ, মোবাইল, পকেট, সব চেক টেক করে তারপর ঢোকতে দিলো। আমার বউ আর মেয়ের হ্যান্ড ব্যাগ টাও চেক করাতে হলো। চেকিং এর পর্ব শেষ। আমরা লবিং এ ঢোকে গেলাম।
আমি বললাম, চলো কয়েকটা ছবি তুলে দেই তোমাদের। মেয়ে আর বউ এক সাথি বলে উঠলো, আরে, চলো আগে খাওয়া দাওয়া করে নেই। পরে ছবি তোলার অনেক সময় পাওয়া যাবে। এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে। অবাক হলাম। আমার বউ ছবি তোলায় পাগল থাকে। হটাত তাঁর কি এমন তাড়া যে, ছবি তোলতেও এখন তাঁর ব্যস্ততা? সে কোনোদিকেই ভ্রুক্ষেপ না করে আমার সামনে দিয়ে এমনভাবে হেটে যাচ্ছিলো যেন সে এখানে প্রায়ই আসে, জায়গাটা তাঁর বেশ পরিচিত। একটু অবাক হচ্ছিলাম। আমি বললাম, তুমি কি চিনো কোথায় যেতে হবে?
সাথে সাথে উত্তর, হ্যা, ১৫ তালা।
একটু অবাক হচ্ছিলাম। কিন্তু যেহেতু কোনো কারন নাই তাই ব্যাপারটা আমিও বুঝতেছিলাম না আসলে কি হচ্ছে। আবার এটাও ভাবছিলাম, হয়তো ওর আগে থেকেই ইন্টারনেটে ঘেটেঘুটে জেনে নিয়েছে কোথায় কি আছে। হতেই পারে। আজকালকার যুগ। সবাই স্মার্ট। ইন্টারনেটে কোথায় লবি, কোথায় লিফট, কোথায় রেষ্টুরেন্ট, কয় তালায় রেষ্টুরেন্ট, আজকাল এক ক্লিকেই সব পাওয়া যায়।
লিফটে উঠে গেলাম ১৫ তালায়। ১৫ তালায় রেষ্টুরেন্টে ঢোকলাম। ঢোকেই দেখি-
ওরে বাবা, মুর্তুজা ভাই। একেবারে জাস্ট অবাক আমি। আমি থমকে গেলাম। ভাবলাম, হয়তো কোনো বায়ার নিয়ে এসছে, আমাকে বলার জন্য ভুলে গেছে। বললাম, কোনো বায়ার এসছে নাকি ভাই? আপনি এখানে যে?
হেসে দিয়ে বললেন, আজকে আপনার জন্মদিন না!! আমরাও এলাম আপনার জন্মদিনে। ভাবী, আনিকা, জিওন সবাই এসেছে। আমি তো রীতিমত অবাক। তাইতো বলি, আমি যাহাই বলি না কেনো, আমার বউ তাহলে এই সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই এতো গোপনীয়তা!! ছোট মেয়েও!! আমাকে সাহ্ররট গেঞ্জি না পরতে দেওয়া, গুগল ম্যাপ চালু করা, গলফ ক্লাবকে একঘেয়ে জায়গা বলা, রিগেন্সির মত ভালো মানে একটা রেস্টুরেন্ট কে ১ স্টারে নামিয়ে দেওয়া, ওদের সাজগোছ করা, সব কিছু এখন আমার কাছে লা মেরিডিয়ানের চকচকে আলোর কাছে পরিস্কার।
ভাবলাম, কে বলে, মেয়েরা পেটে কথা রাখতে পারে না? যে এটা বলেছে, সে ভুল বলেছে।
মুর্তুজা ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন, একটা টেবিলে। ওমা, ওখানে গিয়ে দেখি আরো চমক!!
ভাবী, আনিকা, আর জিওন হাতে চমৎকার অনেকগুলি সাদা গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেওয়ার জন্য। কি অদ্ভুদ ভালবাসা। নিজেকে বড্ড সুখী এবং ভাগ্যবান মানুষের মধ্যে একজন মনে হলো। এরা সবাই আমার পরিবার। সবার হাসিখুশী মুখ, আর চাহনী দেখেই মনটা ভরে গেলো।
সত্যিই সারপ্রাইজড হয়েছি। খুবই সারপ্রাইজড। শুধু ফুল নিয়েই মুর্তুজা ভাই আসেন নাই। সাথে “কাপল ওয়াচ” মানে একটা পুরুষের ঘড়ি আর সাথে একই ডিজাইনের আরেকটা মহিলার ঘড়ি। আমাদের জন্য কিনেছেন একজোড়া আর ভাই ভাবীর জন্য ও কিনেছে এক জোড়া। অনেক দাম, ব্র্যান্ডের ঘড়ি। আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। এতোক্ষনে বুঝলাম সেই বিকাল থেকে কি একটা গোপন জিনিষ আমার কাছে আমার বউ, আমার ছোট মেয়ে আর সবাই লুকিয়েছিল। আরো অবাক করার বিষয় হচ্ছে- আমার বড় মেয়ে নাকি জানতো জিনিষটা। সেই দুপুর থেকেই জানতো। আমি ওর সাথেও দুপুরে অনেক্ষন কথা বলেছি। কিন্তু ও নিজেও আমাকে কিছুই বলে নাই।
অজানা জিনিষের হটাত করে যখন চোখের সামনে সারপ্রাইজ হয়ে ধরা দেয়, আর সেটা যদি হয় একটা ভাল কিছু, মনের আনন্দের সাথে চোখের পাতাও সেই আনন্দে জলে ভিজে চিকচিক করে। বড্ড ভালো লাগলো সবার এ রকম একটা লুকোচুরি খেলা।
অত্যান্ত ঘরোয়া পরিবেশে আমার পরিবার আর মুর্তজা ভাইয়ের পরিবার অনেক্ষন সময় কাটালাম। ব্যবসার কোনো কথাবার্তা হলো না। পুরুটাই পরিবার নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তাদের পছন্দ অপছন্দের জিনিষ নিয়ে। আমরা ওদের বলার চেষ্টা করেছি, আমরা এই বিশাল দুনিয়ায় এতো মানুষের ভীড়েও কখন কোথায় কিভাবে একা অনুভব করি। আর সেই একাকীত্তের একমাত্র ভরষার স্থানগুলি কোথায়। এটাই হচ্ছে পরিবার। কোনো কোনো অতীতের অনেক সময় কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু বর্তমানের জন্য এমন কিছু ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে, যা আজকের দিনের কোনো এক সুখদুক্ষের এমন ঘরোয়া পরিবেশেই তাঁর জন্ম হয়। এটা যেনো সেই রকম একটা ঘরোয়া পরিবেশ।
অনেক ধন্যবাদ মুর্তজা ভাইকে, অনেক ধন্যবাদ ভাবী, আনিকা এবং জিওনকে। ধন্যাবাদ আমার ছোট মেয়েকে। আর ধন্যবাদ আমার বউকে। ধন্যবাদ আমার বড় মেয়েকে যে আমাকে সব জেনেও কিছুই জানায় নাই অথচ এতো সুন্দর একটা মেসেজ রেখেছিলো সকালেই। ধন্যবাদ সবাইকে। এতো চমৎকার একটা পরিবেশ দেওয়ার জন্য।
মাঝে মাঝে অনেক কষ্টের পরিবেশে বাচতে বাচতে যখন হাপিয়ে উঠি, যখন ঞ্জেকে একা একা মনে হয়, তখন এই সব ছোট ছোট ঘরোয়া ভালবাসা আবারো মনে করিয়ে দেয়, আমরা পরিবারকে ভালোবাসি, আমরা পরিবারের জন্য বাচি। আর এই পরিবারতাই হচ্ছে আমাদের সব সুখের মুল উৎস।
ঈদ-উল আযহার পরের দিন আজ। অনেকদিন সবাইকে নিয়ে বিশেষ করে পরিবার পরিজন নিয়ে একসাথে খাওয়া দাওয়া হয় না। তাই ঈদের কদিন আগে মিটুলকে বললাম, সবাইকে দাওয়াত দাও যেনো ঈদেরপরের দিন সবাই আমাদের বাসায় আসে, একটা গেট টুগেদার করা যাক। উম্মিকাও আছে বাসায়। ওর যারা যারা বন্ধু বান্ধব আছে, ওদেরও আসতে বলো। কনিকার বন্ধু বান্ধব কয়েকদিন আগে দাওয়াত খেয়ে গেছে, তাই এতো শর্ট তাইমে আবার ওর বন্ধু বান্ধবদের দাওয়াতের দরকার নাই। মিটুল গ্রামের অনেককেই দাওয়াত করেছে আর ওদের ভাইওবোনদের তো আছেই। ওরাও আমার বাসায় আসার জন্য ব্যাকুল থাকে। ধরে নিয়েছিলাম প্রায় শখানেক হবে উপস্থিতি।
তাইই হলো, প্রায় শ খানেকের মতোই লোকজন এসে হাজির হলো।
ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো। ফলে আমার ছাদতায় ভাল করে আয়োজন করা যাচ্ছিলো না। তাই গ্যারেজই ভরষা। কাবাবের স্টল করা হলো মুবিনের নেতৃত্তে। মুরগীর আর গরুর কাবাব। মিটুলের রান্নার জুরি নাই, সবাই ওর খিচুরী, পোলাও এবং অন্যান্য আইটেম খুব মজা করে রান্না করে।
উম্মিকার ৬/৭ জন বন্ধু বান্ধব এসেছিলো। আমি ফাউন্ডেশনের এম ডি রানা, ওর বউ, সবাই এসেছিলো। খুব ভালো একটা সময় কেটে গেলো। এর সাথে নেভীর কমান্ডার মামুনও এসেছিলো দীপু আর ওর পরিবার নিয়ে। যদিও একটু একটু করে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো, তবুও সবাই একে একে বাগান দেখতে গেলো। বাগানে একটা ছাতা আছে, লাইটিং করানো। ছবি তোলার জন্য একটা মুক্ষম জায়গা।
কোরবানীর ঈদের পরদিন। আমার বাড়িতে ছোত বড় সবাই এক সাথে যেমন ঈদের দিন আসতে পছন্দ করে, তেমনি কাউকে দাওয়াত দিলে পারতপক্ষে কেউ মিস করতে চায় না এটা আমার সৌভাগ্য। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি সেই সকাল থেকেই। মিতুল (আমার স্ত্রী) তাদের ভাইর বোন সবাইকে দাওয়াতের পাশাপাশি আমাদের গ্রামের ভাই বোনদের কিছু ছেলেমেয়েরদেও আজকের দিনের দাওয়াতে হাজির হতে অনুরোধ করেছিলো। গুড়ু গুড়ি বৃষ্টির কারনে গ্রাম থেকে অনেকেই আসতে পারে নাই।
জাহাংগীর নগর ইউনিভার্সিটির মিতুলের বান্ধবী দীপু এবং ওর হাজবেন্ড কমোডর মামুন সহ ওদের পরিবারের সবাইকেও দাওয়াত করেছিলো মিতুল। দাওয়াত করেছিলো উম্মিকার কিছু বন্ধু বান্ধব্দের। আমিন ফাউন্ডেশন এর পরিবারদেরকেও মিতুল দাওয়াত করেছিলো, সবাই এসেছে। বেশ গমগম একটা পরিবেশ।
মুবীন দুপুর থেকেই কাবাব বানানোর সমস্ত আয়োজন করে রেখেছিলো। ইমন আবার রাতে কি আতশবাজী পুরানোর জন্য এক গাদা আতশবাজীও তার স্টকে রেখেছিলো। বৃষ্টি হওয়াতে ছাদে কাবাব বানানোর পরিকল্পনাতা ভেস্তে গেলো কিন্তু নীচে গ্যারেজ বনে গেলো রীতিমত একটা কাবাব ফ্যাক্টরির রান্নাঘর। চারিদিকে কাবাবের মনোরম গন্ধ, লোকজনের সমাবেশ, মন্দ লাগছিলো না।
অনেক লোক যখন এক জায়গায় সমাবেশ করে, এম্নিতেই জায়গাটা শোরগোলের মতো কিচির মিচিরে ভর্তি থাকে। তার মধ্যে আবার চৌধুরী বাড়ির মানুষ, তাদের গলার আওয়াজ সব সময়ই চ ওড়া। তারা আস্তে কথা বলতে পারে না। হয় তারা কানে কম শুনে বলে উচ্চস্বরে কথা বলে অথবা কে কার কথা শুনবে, সেটা সুপারসেড করার কারনে একে অন্যের থেকে চরা ভয়েসে কথা না বলে কোনো উপায়ও নাই। ফলে সেই দুপুর থেকে আমাদের বাসায় একটা অবিরত হট্টগোলের মধ্যে ছিলো। শব্দ দূষনে নিঃসন্দেহে আজকে আমার বাসা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবার কথা।
ঈদের দিন সাধারনত আমি ছোট বড় সবাইকে সালামী দেই। এতা আমার খুব ভালো লাগে। সালামী তা লোভনীয় করার জন্য আমি আগে থেকে ব্যাংক থেকে নতুন নতুন নোট নিয়ে রাখি। আর সালামীর পরিমানতাও আমি বাড়িয়ে দেই যাতে সবাই বিশেষ করে ছোটরা এই সালামির লোভেই সবাই আমার বাসায় সকাল সকাল চলে আসে। ছোটরা যখন বায়না ধরে, বড়রা তখন আসতে বাধ্য হয়। ফলে আমি খুব গোপনে এই সালামীর টোপ তা সব সময় দিয়ে রাখি।
সবাই লাইন ধরে দাঁড়ায়, একে একে সালাম করে। সালাম করাতা বা পাওয়া তা আম্র মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে, এই যে সালামীটা পাওয়ার জন্য বাচ্চারা অধীর আগ্রহে বসে থাকে। সবাইকে আমি সম পরিমান সালামি দেই। বড়দের বেলায় অবশ্য বেশী থাকে।
বেশ রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলে, আর অবিরত খাবারের, জুসের, আর মিষ্টির ব্যবস্থা থাকে। কখনো ফুস্কা, কখনো হালিম, কখনো অন্যান্য আইটেম তো আছেই। বয়স ভিত্তিক পোলাপান এক এক রুমে আড্ডা দেয়, কেউ কেউ আবার একই রুমে বসে নিজেরা নিজেরা সোস্যাল মিডিয়ায় এত ব্যস্ত থাকে যে, কাছে আছে তবুও যেনো সোস্যাল মিডিয়ায়র মাধ্যমেই হাই হ্যালো করতে পছন্দ করে।
দিনটা আমার বেশ ভালো কাটে এইসব কিচির মিচির করা বাচ্চা আর তাদের বড়দের নিয়ে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি একটা সময় আসবে, তখন হয়তো এটার ভাটা পড়বে। হয়তো অনুষ্ঠান তা হবে, আমার অনুপস্থিতিতে। হয়তো ওরা আমার এই সালামিটাই তখন সবচেয়ে বেশী মিস করবে। কিন্তু পৃথিবীর তাবত নিয়ম মেনেই যুগে যুগে এই রীতি চলতেই থাকবে সেই কফি হাউজের আড্ডাটার মতো।
আমার ফ্যাক্টরীতে প্রতি বছরই ১০/১২ জন করে হিজড়া আসে কিছু চাদা নেওয়ার জন্য। এই হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকগুলিকে সবাই এক রকম এড়িয়ে চলে। এড়িয়ে চলার অনেক কারন ও আছে। ওরা চাদার জন্য এলেও সবার সাথে বেশ খারাপ ব্যবহার করে, বিশেষ করে চাদা না পেলে।
প্রথম বছর যখন ওরা আমার ফ্যাক্টরীতে চাদার জন্য আসে, সেদিন আমি গেটে নামার পর দেখলাম, আমার এইচ আর ডিপার্ট্মেন্ট হেড, আমার চীফ সিকিউরিটি, এবং ম্যানেজার হিমশিম খাচ্ছে ওদেরকে সামাল দিতে। আমাকে দেখেই আমার স্টাফরা যেনো আরো হচকচিয়ে গেলো। তড়িঘড়ি করে হিজড়াদেরকে বল্লো, যে, বড় সাহেব এসেছেন, তোমরা এখন যাও। পরে এসো। হিজরারা তো আরো মওকা পেয়ে গেলো। এবার বড় সাহেবকেই তারা তাদের সমস্যার কথা বলবে বলে একজোট হয়ে গেলো।
আমার ফ্যাক্টরিতে প্রতি বছর ১০/১৫ জন করে হিজড়া আসে। প্রথ (২০০৭) সালে যখন প্রথম ওরা সাহায্যের জন্য আসে, আমার HR Dept Head, Security Dept Head এবং অন্যান্যরা অন্য সব পাবলিকের মতোই একটু তাচ্ছিল্যভাবে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল। ঠিক ঐ সময়ে আমি মাত্র অফিস ঢোকবো। ওরাও ওদের স্বভাব গত ভাবে রি এক্ট করে যাচ্ছিল। আমি ওদের বললাম, কি হয়েছে? ওরা সাহায্য চায়। আমি বুঝতে পারলাম দুই পক্ষই এগ্রেসিভ। কিচ্ছু না বলে আমি এডমিন কে বললাম, ওদেরকে আন্তরীকতার সাথে ভিজিটিং রুমে বসাও, চা পানি দাও, আমি কথা বলবো। সেভাবেই এডমিন কাজটা করলো। আমি ওদের সাথে বসলাম, একসাথে চা খেলাম, ওদের লাইফ স্টাইল শুনলাম। খুব কষ্ট লাগলো। ওদের ও অনেক কষ্ট আছে, বেদনা আছে। ওরা কারো কাছ থেকেই ভালো ব্যবহার পায় না। তাই ওরাও এগ্রেসিভ থাকে। অনেক কথা হলো। আমি ওদেরকে ওরা যা চেয়েছিল তার থেকেও বেশী সাহায্য করেছিলাম। আজ অবধি ওরা প্রতি বছর আসে, যত্ন করে সালাম দেয়, আমাদের ষ্টাফ রাও ওদেরকে ভালোভাবে সম্মানের সহিত আপ্যায়ন করে, সাহায্য করে কিন্তু আমার সাথে দেখা না করে কখনো যায় না। যদি অফিসে না থাকি, সেদিন কোনো সাহায্যও নিতে চায় না, ওরা বলে এমডি স্যার যেদিন আসবে সেদিন নেবো আর দোয়া নিয়ে যাবো। ওদের সাথে সম্মানের সাথে ব্যবহার করা উচিত। ওরা হিজড়া, সেটা ওদের অপরাধ নয়। ওরা একদম স্বাভাবিক সমাজের একজন মানুষ। ওরা যখন না আসে, আমিই বরং খবর নেই এডমিনকে দিয়ে, ওরা আসে নাই কেনো। একটা জিনিষ ওরা জানে যে, আমার ফ্যাক্টরিতে এলে ওরা ভাল ব্যবহার পায় এবং ওরাও খুব ভালো ব্যবহার করে। ওরা দল বেধে চলে নিরাপত্তার খাতিরে। ওরাও আমাদের মতো কারো না কারো বাবা মার সন্তান।
মেয়েটা জন্মের দিনই আমার বুক কাপিয়ে দিয়েছিল। অবিকল আমার মায়ের চেহারা নিয়ে সে এই পৃথিবীতে পদার্পন করেছিল। আমি ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, সে আমার মায়ের রিপ্লেসমেন্ট কিনা ভেবে। আজ আমার মা বেচে নেই কিন্তু কনিকা আছে। কনিকার মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ায় আমার মা কনিকাকে একদম পছন্দ করে নাই। কিন্তু এতা তো আর আমার কনিকার দোষ নয়। আর আমিও কোনোদিন কেনো আমার বর মেয়ে হবার পর আবারো একটা মেয়েই হল, ছেলে কেনো হলো না, এ প্রশ্নতা আমার মাথায় কখনোই আসে নাই, এখনো না। ওরা দুজনেই আমার সন্তান আর আমার ভালো লাগার মানুষ।
কনিকা ছোত বেলায় যেমন বেশী অভিমানী ছিলো, আজ এতো বর হয়ে গেছে, তার সেই ভাবতা এখনো কমে নাই। বকা দিলে কান্না করে, বিশেষ করে আমি বকা দিলে তো ওর চোখের পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। ওর মা যখন সারাক্ষন এই পরা, ঐ রুম গোছানো, অই তাইম মতো না খাওয়া, ঐ ঠিক মতো গোসল না করা, তাইম মতো পড়তে না বসা ইত্যাদির কারনে বকতেই থাকে, এতা ওর কান দিয়ে আদৌ ঢোকে কিনা আমার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে। নির্বিকারই তো থাকে। যেই আমি একটু বকা দিয়েছি- গেলো এদিনের মতো দিন বরবাদ। কেনো এমনতা হয় জানি না তবে আমি ওকে বকতেও পারি না।
মাঝে মাঝে কনিকা আমার কাছে চিঠি লিখে। চিথির বেশীর ভাগ মুল উপাদান, অর্থ নৈতিক আলাপ আলোচনা। এই যেমন, বড় আপিকে সে কিছু হোম ওয়ার্ক করে দিয়েছে, তার সাথে সেই হোম ওয়ার্কের মুজুরী হিসাবে একটা ডিল হয়েছে, তাই তাকা দিবে কে? বাবা। একজনের হোম ওয়ার্ক, আরেক জন করে দিবে, আর আরেক জন সেই তাকার মুজুরী দেবে, ফলে কত বার্গেনিং হবে এটা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কারন বাবা টাকা দিবে। সেই তাকা আবার কাজের পর পরই তাদের হাতে যেতে হবে, আর হাতে যাবার পরই সেতা আবার তার মায়ের কাছে জমা হবে। ওর মা অদের ব্যক্তিগত একাউন্টে জমা করে দেবে। অর্থ নীতির এই চক্রটা বেশ মজার।
আবার কোনো কোন সময় কনিকার কিছু কাজ তার বড় আপি করে দেবে, ফলে চক্রতা একই। শুধু মালিক পক্ষের মুজুরী পাওনা হবে বড় মেয়ে, তাকা দেবেন বাবা, কাজ হাসিল করবেন কনিকা। এই দুয়ের আবার একটা ভারসাম্য করে যার যার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ কে কত টাকার কাজ করিয়ে নিলো, আর কে কত পাবেন তার একটা কঠিন হিসাবের ডেবিত ক্রেডিট আমার কাছে লেখা ঐ চিঠিতে বিস্তারীত থাকে। তবে মজার বায়াপার হলো সেন্ট্রাল ব্যাংকের মানি ব্যাক থেকে সব তাকাই পরিশোধ যোগ্য।
আবার কিছু কিছু চিঠিতে এমন থাকে যে, অন লাইন অর্ডার করা হয়ে গেছে, আইটেমটা চলেই আসবে দু একদিনের মধ্যে, আমার সাথে কথা বলার হয়তো কোনো অবকাশ হচ্ছে না, তার কোচিং আর আমার অফিসের তাইমিং এর কারনে। কিন্তু ডেবিট নোটের মতো আমার ওয়ালেটে কনিকার একটা চিঠি পাওয়া যাবে তাতে কবে কত টাকা ডেবিট করে দিতে হবে তার বিস্তারীত বর্ননা থাকে।
এটা অবশ্য আমার বড় মেয়ে করে না। সে আবার তার মায়ের সাহাজ্য নেয়। ওর মা আমাকে ফোন করে, তখন আমার ওয়ালেটের উপর চাপ পড়ে। আমার দুই মেয়ের এই ব্যাংকিং হিসাব কে যে ওদের শেখালো আমার জানা নাই, তবে তাতে ব্যাপারতা অনেক সহজ ভাবেই এল সি এর মতো ট্রাঞ্জেক্সন হয়।
কিছু কিছু চিঠি আবার অভিযোগ পত্রের মতো। আর সেই অভিযোগ হয় তার মায়ের নামে না হয় তার আপির নামে। যেমন, তার উপর পরার চাপ পড়ে যাচ্ছে, তার বিনোদনের সময়টা কেড়ে নেয়া হচ্ছে, তার আই পড ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। তাতে তার মন ভালো নাই। সে আর এই বাড়িতাকে বসবাসের যোগ্য মনে করিতেছে না। এতার একটা সমাধান হোক।
এই রকমের হাজার হাজার না হলেও মাসে দু একটা অভিযোগ পত্র তো পাইই।
ছোট মেয়ে কনিকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়ে। মিটুলের বানানো টিফিন কনিকার কাছ থেকে ভাগ করে খেতে খেতে একদিন সব বন্ধু বান্ধবরা কনিকাকে ধরেই বসলো, আন্তির রান্না করা খাবার খাবো। আসলে বাচ্চারা আজকাল ফাষ্ট ফুড, পোলাও বিরিয়ানি ইত্যাদি খেতে এতো পছন্দ করে যে, কোনো না কোনো অজুহাত তো আছেই এই সব খাবারের আয়োজনের। কখনো কনিকার বাসায়, কখনো মনিকার বাসায়, কখনো আলভীর বাসায়, লাগাতার তাদের এই খাওয়া চলতেই থাকে। তবে ব্যাপারটা কিন্তু মজার আমাদের বড়দের জন্য। অন্তত আমাদের বাচ্চারা আনন্দের সাথেই সময়তা কাটায়।
আজ কনিকার প্রায় ১৬/১৭ জন কলেজ বান্ধবীরা আমাদের বাসায় খেতে আসবে। মিতুল রান্না করায় খুবই এক্সপার্ট। আর বাচ্চাদের খাওয়াতে সে খুব পছন্দ করে। কনিকার বান্ধবীরা বাসায় খেতে আসবে এই প্রোগ্রামের কারনে তার গত কয়েকদিন এই বাজার সেই বাজার, বাচ্চারা কি খেতে পছন্দ করে, আর কি করলে আরো মজা করবে, সেতার জন্য প্রায় দুই তিনদিন যাবত মহা ব্যস্ত।
কনিকা মাঝে মাঝে বাজার দেখে, সাথে সাথে ফেসবুকে একটা পোষ্ট ও মেরে দেয়। একটা খুবই ঘরোয়া দাওয়াত যে কততা ম্যাগনিচুড বারাতে পারে, এটা আজকালের পোলাপানেরা খুব ভালো করেই জানে। আজ সেই মেঘা অনুষ্ঠানের আয়োজন। সকাল থেকেই কনিকা, উম্মিকা ঘর গোছাচ্ছে, পর্দার কাপড় গুছাচ্ছে, বাড়ি ঘর কাজের বুয়ার দ্বারা এক রকম দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি চলছে। চেয়ার টেবিলের কভার পরিবর্তন, তাদের বিছানার চাদর পরিবর্তন, দেখলেই মনে হচ্ছে একটা যজ্ঞ। খারাপ না।
বড় মেয়েকে দেখতে এসেছিলাম শহীদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজে।। ইন্টার্ন ডক্টর হিসাবে দিন রাত পরিশ্রম। কিছুতেই বাসায় আসার সময় পাচ্ছে না। মন খারাপ করছিল। আমিও মেয়েকে খুব মিস করতেছিলাম। সন্তানের থেকে বড় কাছের কেউ নাই। এটা বুঝতে হলে বাবা মা হতে হয়। যতোদিন কেউ বাবা মা হবে না, তাকে অন্য কোনো ডায়ালগ, অন্য কোনো ফিলোসোফি দিয়েও বুঝানো যাবে না, সন্তান বাবা মায়ের কাছে কি। সব সন্তানেরা এই কথাটা বুঝতে পারে যখন তাদের বাবা মা আর বেচে থাকে না আর তারা তখন বাবা মা হয়। আমার নিজের ও ভালো লাগছিলো না। আমরা সবাই তাই ওর কাছেই চলে এলাম। সেনানিবাসেই থাকি যখন বগুড়ায় আসি।। সকাল বেলায়…. মেসের সামনে…
আমি যে হোটেলটায় উঠেছি, তার করিডোরে একটা জায়গা আছে যেখানে ধুমপায়ীরা লবির নীচে না গিয়েও রুমের পাশে এই জায়গায়টায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে পারেন। দাড়ানোর একটু জায়গা, পাশে হাই ভোল্টেজ একটা ট্রান্সফর্মার। কাচের জানালাটা খোলা যায় না কিন্তু একটা একজষ্ট ফ্যান দেয়া আছে যার মাধ্যমে সিগারেটের ধোয়াগুলি সহজেই করিডোর থেকে বাইরে বেরিয়ে যায় এবং করিডোরে সিগারেটের কোনো গন্ধ আর থাকে না। হোটেলের মালিক নিশ্চয় সিগারেট খান। তাই সিগারেট পায়ীদের প্রতি তার একটা মায়া নিশ্চয়ই আছে।
ওখানে প্রথম দিন সিগারেট খেতে গিয়ে একটা মজার জিনিস চোখে পড়লো। একটা কবুতর চুপ করে বসে আছে। আমাকে সে আজই প্রথম দেখলো, তাই তার মধ্যে একটু অস্থিরতা কাজ করছিলো। পাখীরা যখন ঘুমায় তারা ঘন ঘন চোখ মেলে আবার চোখ খোলে। তাতে তাদের কতটা ভালো ঘুম হয় তা আমি জানি না। পর পর দুটু সিগারেট খাইলাম শুধু কবুতরটাকে ভালো করে দেখার জন্য। কোনো ডিস্টার্ব করলাম না কারন ডিস্টার্ব করলে কবুতরটা হয়তো কাল থেকে আর এখানে আসবে না।
মিটুলকে নিয়ে আমি আই এল বি এস হাসপাতালে চলে গিয়েছিলাম একটু পরে। প্রায় সারাদিনই ওখানে ছিলাম। কবুতরটার কথা আর মাথায় আসে নাই। যখন আবার হোতেলে ফিরলাম, সিগারেট খেতে গিয়ে দেখি ঐ জায়গায়টায় আর কবুতরটা নাই। একটু খটকা লাগলো। সকালে আমার আচরনে কি কবুতরটা কোনো অনিরাপদ ভাব দেখেছিলো আমার কোনো আচরনে?
তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। আবারো আমি ঐ একই জায়গায় সিগারেট খেতে এসে দেখলাম এবার একটা নয়, দুটু কবুতর। সম্ভবত ওরা স্বামী স্ত্রী জোড়া। পাখার নীচ দিয়ে বুঝা যাচ্ছে পেট পুড়ে খাওয়া হয়েছে ওদের। এখন ওদের আর কোনো চিন্তা নাই। এই প্রানীকুলের মধ্যে সম্ভবত এক মাত্র মানুষই এক মাত্র প্রজাতী যাদের জন্য বড় বট অট্টালিকা লাগে, বড় বড় হাসপাতাল লাগে, বড় বড় গাড়ি ঘোড়া লাগে, বিস্তর খাবারের সমারোহ লাগে। আর অন্যান্য প্রানীদের কিছুই প্রয়োজন হয় না। তারা সকালে বেরিয়ে যায় ডানায় ভর করে, কেউ নিজের পায়ে ভর করে, সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে নিজের মনের আনন্দে স্রিষ্টিকর্তার এই বিশাল ভুবনে পেট পুরে খেয়ে রাতে নিশ্চিত মনে ঘুমিয়ে পড়ে। তাদের বাচ্চাদের জন্যে ওরা কোনো কিছুই সঞ্চয় করার প্রয়োজন বোধ করে না, না প্রয়োজন বোধ করে কোনো বৃহৎ অট্টালিকা গড়ার। এদের রোগ হলে সেই বন জংগলের কোনো পাতা কিংবা খড় খেয়েই তাদের অসুখ সারিয়ে নেয়, ওদের জন্য কোনো মহামারী নাই, গায়ে ফেন্সি কোনো কাপড়ের দরকার নাই, রোধ বৃষ্টি ঝর যাইই থাকুক ওরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে নিজকে বাচিয়ে রাখে। তারা একে অপরের সম্পত্তি দখলে যায় না, এরা এক গাছে থেকেও কারো উপর কারো শত্রুতা নাই।
আমার উপস্থিতি টের পেয়ে একটা কবুতর একটু নড়েচড়ে বস্লো, অন্যটা ঘুমের মধ্যেই যেনো পড়ে রইলো। বুঝলাম যেটা ঘুমের মধ্যে রইলো সেটা সকালে আমাকে দেখেছিলো। একটু হলেও সে হয়তো বুঝতে পেরেছিলো যে আমার থেকে ওদের কোনো অনিহা হবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু নতুন কবুতরটা ঠিক এক ঠায়ে আমার দিকে চেয়ে থাক্লো। সে হয়তো ভাবছে, আমি কি করতে পারি কিংবা আমি কোনো ভয়ানক প্রানী কিনা।
আমি ইচ্ছে করলেও কবুতরটাকে হাত দিয়ে ধরতে পারবো না কারন আমি জানালার কাচের এ পাশে আর কবুতরগুলি জানালার কাছে ওপাশে, আর কাচটা ফিক্সড করে বন্ধ করা। আমার সিগারেট খাওয়া শেষ, তাই আবার রুমে চলে এলাম। অনেক রাতে আবার আমি যখন সিগারেট খেতে আসলাম, দেখলাম, খুব নিসচিন্তে মনে কবুতর দুটু ঘুমাচ্ছে। কিন্তু পাখীদের ৭ম ইন্দ্রিয় অনেক সেন্সেটিভ। আশেপাশে কে আছে বা কে যাচ্ছে তারা সেটা খুব সহজেই বুঝতে পারে। এবার দুটু কবুতরই একবার আড় চোখে আমাকে দেখলো বটে কিন্তু ভয়ের কোনো কারন নাই বিধায় আবার নড়ে চড়ে ঘুমিয়ে গেলো।
পরদিন বেশ সকালে সিগারেট খেতে এসে দেখি ওদের একটার ও কেউ নাই। পাখীরা আসলে আমাদের মতো নয় যে, আজ ছুটির দিন তো একটু বেশী বেলা করে ঘুমাবে বা আলসেমী করে গরাগড়ি যাবে। সকাল হলেই ওরা বেরিয়ে যায় নিয়মিত খাদ্যের খোজে, হোক সেটা শনিবার বা রবিবার। কিংবা শীত বা বর্ষা। এবার আমিও ওদেরকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় নাই, মনে মনে ভাবছিলাম যে, আমার সাথে ওদের একতা অলিখিত বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। আমি ওদের কেউ না কিন্তু আমিই ভাবছি ওরা আমার বেশ বন্ধুর মতো। পাখীদের সাথে এতো সহজে আসলে বন্ধুত্ব হয় না। এটা এমন না যে, একজন অপরিচিত মানুষকে যতটা তাড়াতাড়ি ফ্রেন্ড বানান যায়, ততোটা সহজ পাখীদের বেলায় হয় না। ওরা আসলে মানুষকে কখনো বন্ধু মনেই করে না। পোষা পাখীর বেলায় ব্যাপারটা অনেক আলাদা। তারা বশ্যতা মেনে নিয়েই মানুষের দাসত্ব করে।
সন্ধ্যায় আবার এলাম জায়গাটায়। দেখলাম, আবার তারা ফিরে এসেছে। ব্যাপারটা আমার কাছে এবার পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, এতা ওদের আস্তানা। সকালে বেরিয়ে যায় আর সন্ধ্যা হলেই আবার তারা তাদের বাসায় ফিরে আসে। এই কবুতর গুলি যেহেতু এখানেই থাকে, ফলে ওরাও হয়তো বুঝে গেছে আমি এই জায়গার স্থায়ী বাসিন্দা নই। হয়তো কয়েকদিন থাকবো আমি, তারপর তারা জানে যে, অন্যান্য অতিথির মতো কদিন পর আমিও আর এখানে থাকবো না।
এ কয়দিন এই কবুতরটা আমার সিগারেট খাওয়ার পরিমানটা বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্ভবত আমি এর প্রেমেই পড়ে গেছি। প্রতিদিন আমি সকালে ওদেরকে বাইরে যাওয়ার আগেই দেখতে আসি জানালাটার পাশে। সিগারেট খাই, আবার ইদানিং কফি নিয়েও আসি। যাতে বেশ কিছুক্ষন আমি কবুতরগুলির পাশে থাকতে পারি। বেশ ভালো সময় কাটছে আমার। মিটুলকে কবুতর গুলীর কথা বললাম। খুব একটা আহামরী খবর তার কাছে মনে হলো না। বল্লো, ভালই তো।
আজ রাতে যখন আমি আবার সিগারেট খেতে এলাম, ভাবলাম, ওদের ছবি নেই। খুব গোপনে মোবাইল ক্যামেরা বের করতেই মনে হলো কবুতর দুটু একটু ভয় পেয়েছে। একটা প্রায় উরাল দেয় দেয় ভাব, অন্যটা ও একটু নড়ে চড়ে বসলো। কিন্তু তার যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা মনে হলো না। ছবি তুললাম, কোন ফ্লেস ইউজ করলাম না কারন ফ্লেশ ইউজ করলে হয়তো ভয় পেতে পারে। আমি এখানে আর বেশীদিন থাকবো না, হয়তো আর মাত্র দুইদিন থাকবো। তারপর আমি আমার দেশে ফেরত যাবো। একটু মন খারাপ হচ্ছিলো যে, কবুতরগুলি আসলে আমার কেউ না কিন্তু কোথায় যেনো একতা মায়ায় ধরে গিয়েছিলো। যখন দেশে ফিরে যাবো, হয়তো আমি ইচ্ছে করলেও আর এই স্থানে এসে সিগারেট খাওয়ার বাহানা করে এই যুগল কবুতর গুলিকে দেখতে পাবো না।
কাল রাতে দেখলাম, কবুতরটা নাই। মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেলো। কেউ কি তাকে কোনো ভয় দেখিয়েছে কিনা। আজ রাতে আবার চেক করবো। রাতে আবার চেক করলাম, কবুতর গুলি আসে নাই। ভিতরে একতা কেমন যেনো কষ্টের মোচড় অনুভব করলাম। একটা সিগারেট ধরালাম, খুব ভালো করে দেখার চেষতা করলাম, আশেপাশে কোথাও কবুতরগুলি আছে কিনা। আমাদের বিল্ডিং এর পাশে আরো একটা উচু বিল্ডিনে অনেক গুলি কবুতর থাকে। তাহলে কি ওরা স্থান পরিবর্তন করেছে? কিন্তু কেনো? আগামিকাল সকাল ১২ তায় আমার হোতেল থেকে চেক আউটের সময়। বারবার কবুতর গুলির কথা মনে পড়ছিল। আমি সকালে আবার কবুতর গুলি ফিরে এসছে কিনা ওখানে গেলে দেখলাম, বাসাটা খালী কিন্তু দুটু পালক ওখানে পড়ে আছে। হাত দিয়ে ধরার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো পালক দুটিকে।
প্রেম বড় খারাপ জিনিস, হোক সেটা কোনো পাখীর সাথেই। মায়া হচ্ছে, গেলো কই কবুতরটা? কোনো বেজী কিংবা কোন শিকারী কি ওদের ধরে নিয়ে গেলো?
মন্টাই খারাপ হয়ে গেলো।
হরিদ্বার থেকে ফেরার পথে আমার এক বন্ধু মেজর মহিউদ্দিন ফোনে জানিয়েছিলো যে, আমার আরেক বন্ধু মেজর জেনারেল ওয়াকার ভারতেই দিল্লীর হার্ট ইন্সটিটিউটে ওপেন হার্ট সার্জারী করে ভর্তি। এবার ওয়াকার সম্পর্কে একটু বলি-
আমি যখন ১৯৭৭ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় আজিমপুরে থাকতাম তখন হাবীব ভাইয়ের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আমার এক বন্ধু নিউটনের ভাই। আমি ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে ওখানেই থাকতাম। শরীফ ছিলো, নিউটন ছিলো, জুয়েনা আপা ছিলো আরেকজন আপা ছিলো এই মুহুর্তে নামটা আমার মনে নাই। ঐ সময় এই ওয়াকারের সাথে আমার পরিচয়। আসলে ওয়াকার ছিলো এই নিউটনদের আত্মীয়। আমি ক্যাডেট কলেজে চলে যাওয়ার পরে আর কারো সাথেই যোগাযোগ ছিলো না। অতঃপর, ক্যাডেট থেকে আমি আর্মিতে চলে যাই।
বিএমএ তে ট্রেনিং এর সময় একদিন ফার্ষ্ট টার্মের শাস্তি খাওয়ার সময় কনকনে শীতে দাঁড়িয়ে ছিলাম ‘চির উন্নত মম শীর’ পাহাড়ের পাদদেশে। সবাই মুটামুটি খালী গা। যেনো আমরা সবাই বাহাদুর, শীতের কোনো পরোয়া নেই। আর অন্যদিকে সিনিয়ারদের ভয়ে কনকনে শীতের সময় খালী গায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শরীর যেনো বরফ হয়ে যাচ্ছে। ফার্ষ্ট টার্মের ক্যাডেট আমরা, ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানীর ক্যাডেটদেরকে এখনো ভালোমতো চিনিই না। আর সবার চেহারা তো গলা ছোলা মুরগের মতো। সবার চেহারা এক।
তো আমার পাশে একজন ক্যাডেট খুব ভদ্রভাবে শীতটাকে যেনো উপভোগ করছে, কোনো পরোয়া নাই, না আছে কোনো দুঃখ কিংবা রোমান্স। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই পাশের ঐ ক্যাডেটকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হালার ক্যান যে আইছিলাম মরতে এই বিএমএ তে। বাইরে ছিলাম, ভালোই তো ছিলাম। কথায় কথায় কই আমি থাকতাম, কোথায় বাড়ি, ইত্যাদি আলাপের একসময় পরিচয় হলো যে, সে নিউটনের ভাগ্নে, ওয়াকার। আমি বললাম, আরে, নিউটন তো আমার ছোট বেলার বন্ধু!! বলতেই ওয়াকার বল্লো, আমি তো তোমারে চিনছি। তোমার সাথে তো আমার দেখা হতো সেই ১৯৭৭ সালে আজিমপুর কলোনীতে। এই সেই ওয়াকার। খুব ভালো একটা ছেলে। নামাজী, ধীর এবং সৎ। ওয়াকার শেখ পরিবারের একজন। আর আমাদের প্রধান্মন্ত্রী শেখ হাসিনার আপন ফুফা জেনারেল মুস্তাফিজ সাহেবের মেয়ের জামাই। উভয় পক্ষ থেকেই ওয়াকার একেবারে খাটি শেখ পরিবারের একজন। আর এই কারনেই আমাদের কোর্ষ ১৩ বিএমএ লং কোর্ষ বিএনপি এর শাসনামলে কেহই মেজর থেকে লেঃ কর্নেল পদে প্রোমোশন পাই নাই। রাজনীতি নিয়ে এখানে আলাপ না করি তবে বিএনপি এর জন্য আরো ৩০ বছর খেসারত দিতে হতে পারে।
ওয়াকার যখন লন্ডনে ষ্টাফ কলেজ করতে গিয়েছিলো, আমি তখন ট্রেনিং ডাইরেক্টরেটে জিএসও-২ হিসাবে কাজ করি। ওকে অনেক জালিয়েছিলো আমাদের এই আর্মি কারন সে আওয়ামীলীগের লোক ছিলো আর তখন চলছিলো বিএনপির শাসন। ওয়াকারের জন্য লন্ডনে টাকা পাঠাচ্ছিলো না আর্মি থেকে, বাধ্য হয়ে ওয়াকার অনেক কষ্ট করে শেষ করেছিলো কোর্ষটা। আমি অনেক প্রতিবাদ করেছিলাম তদানীন্তন ডিএমটি ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তীতে চীফ অফ আর্মি ষ্টাফ হয়েছিলেন তিনি) মুবিন এর সাথে। এমনো হয়েছিলো যে, ওয়াকার আর্মি হেডকোয়ার্টারে ঢোকতে পর্যন্ত ওকে বাধা দেয়া হচ্ছিলো। কিন্তু একদিন আমি ওয়াকারকে গেটপাশ দিয়ে যখন আমার অফিসে ঢোকালাম, আমাকে ডিএমআই মাহমুদ স্যার বললেন, এটা কেনো করেছি। খুব মেজাজা খারাপ হয়েছিলো তার এই প্রশ্নে- আমি বলেছিলাম, সে আমার কোর্ষম্যাট আর ওয়াকার এখনো সার্ভিং, আর না ওয়াকার পিএনজি। তাহলে আমি আমার বন্ধুকে আমার অফিসে আসতে দিতে পারবো না ক্যান? এটা নিয়ে অনেক অসুবিধায় পড়তে হয়েছিলো আমাকে। আমি অফিস থেকে ওয়াকারকে নিয়ে ছুটির পরে বের হয়ে হেটে হেটে আসতে আসতে শুধু একটা কথাই বলেছিলাম, যতো অসুবিধাই হোক, আমরা থাকি বা না থাকি, তুই কিন্তু আর্মি থেকে ভলান্টিয়ারী চাকুরী ছারবি না। এর শেষ দেখা দরকার।
আমার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি আর্মি ছেড়েছিলাম, ওয়াকার রয়ে গেলো। আজ আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াকার মেজর জেনারেল। আমি খুশী। সেই ওয়াকার ইন্ডিয়ায় বেড়াতে এসে হেলথ চেক আপ করাতে গিয়ে হার্টে অনেকগুলি ব্লক ধরা পড়েছে। আর এই সুবাদে ওপেন হার্ট সার্জারী।
আমি আর আমার স্ত্রী মিটুল ফোর্টেস এসকর্ট হার্ট ইন্সটিটিউটে এসে পড়লাম বেলা ১২ টার দিকে। এখানে ইন্ডিয়ার ডিফেন্স এটাশে ওর সব দেখভাল করছে। আমি রিসেপ্সনে গিয়ে ওয়াকারের কথা বলতেই একজন অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাঁকে কিভাবে চিনি। বললাম, সে আমার ব্যাচম্যাট আর আমি ইন্ডিয়ায় এসেছি অন্য একটা কাজে, শুনলাম ওয়াকার এখানে ভর্তি তাই দেখতে এলাম। আমাকে আর আমার স্ত্রীকে খুব সম্মানের সহিত একজন অফিসার ওর রুমে নিয়ে গেলো। দেখলাম, ওয়াকার পেটে একটা পট্টি দিয়ে শুয়ে আছে। আমাদের দেখে ওয়াকার খুব খুসি হলো। ওখানে ওর স্ত্রী আর শাশুড়ি ছিলো। সবার সাথেই অনেকক্ষন থাকার পর আমি কানেকানে ওয়াকারকে জিজ্ঞেস করলাম, ওর কোনো ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট লাগবে কিনা। আমার বন্ধু আমার হাত ধরে খালী বল্লো- দোস্ত, আসলে আমি জানতাম না যে, আমার ওপেন হার্ট সার্জারী করাতে হবে। জাষ্ট হেলথ চেক আপ করাতে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকটা ব্লক। পরে আমাকে ডাক্তার বল্লো, ওপারেশন করাতে হবে, আমিও রাজী হয়ে গেলাম। ব্যাপারটা একদম আকষ্মিকভাবে ঘটে গেলো। হাতে যা টাকা ছিলো তা চলবে আর আমার শাশুড়ি ঢাকা থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছেন, আপাতত লাগবে না। আমি জানি ওয়াকার ঠিক কথাগুলিই বলছে। খুব সৎ একজন মানুষ।
বললাম, আমিও বেশীদিন এখানে থাকবো না। আমার স্ত্রীর মেডিক্যালের বাকী কাজগুলি শেষ হয়ে গেলে আমিও দেশে ফিরে যাবো। যদি এর মধ্যে আবার আসতে পারি আসবো, আর তা না হলে আজকে এখানেই। বলে আমি আবার আমাদের হোটেলে চলে এলাম। আমার আর ওর ওখানে যাওয়ার সময় হয়ে উঠে নাই।
যদিও মিটুলের চিকিৎসার জন্য এই দিল্লীতে আসা কিন্তু ইন্ডিয়ায় ঘুরে বেড়ানোর অনেক জায়গা থাকায় এই লোভটা কখনোই সামলাইতে পারি না যে আশেপাশের কিছু বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান ভিজিট না করা। হোটেলের পাশেই অনেক গুলি ট্রাভেল এজেন্সী আছে। সন্ধ্যায় খবর নিলাম কোথায় কোথায় যাওয়া যায়। দেখলাম, আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে সবাই একটা জিনিষই সাজেশন দিচ্ছে যে, হিন্দুদের তীর্থ স্থান হৃষীকেশ এবং হরিদ্দারে যাওয়া।
শনিবার সকাল, খুব শান্ত সকাল। ছুটির দিন বলে হয়তো ভীড় একটু কম। কিন্তু আসলে এখানে এতো গরম পড়েছে যে, মানুষ বের হতেই চায় না। মুখে তাপ লাগে যখন গাড়ির কাচ খোলা হয়। আমরা একটা এসি গাড়ি ভাড়া করলাম, যাত্রী মোট ৫ জন। আমি মিটুল, সাবিহা আপা, সাবিহা আপার মেয়ে এবং তার জামাই নাঈম। খুব ভদ্র একটা ছেলে, দেখতেও সুন্দর। দিল্লীর হোটেল থেকে প্রায় ৪/৫ ঘন্টার জার্নী। পথে পথে অনেক বার থেমেছি অনেক গুলি জায়গায়।
পাজারগঞ্জ থেকে গাজিয়াবাদ হয়ে ফরিদ নগর- আমিনাগর- মনসুরপুর হয়ে মুজাফফর নগর দিয়ে যেতে হয়। হরিদ্দারের কাছাকাছি গেলে বাহাদারাবাদ হয়ে সেলি পুর হয়ে জালাপুর । জালাপুর থেকে খুব বেশী দূর নয় হরিদ্বার। হরিদ্দারের আশেপাশে প্রচুর পরিমানে মন্দির আছে আর আছে কয়েক শত পরিমান ছোট ছোট আবাসিক টাইপের হোটেল। সম্ভবত যারা এখানে আসে, পরিবার পরিজন নিয়েই আসেন, তাই কয়েকদিন থাকার জন্য আশেপাশের মানুষগুলি একটা আবাসিক হোটেলের মতো করে তাদের কিছু ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি ঘর ভাড়ায় দিয়ে থাকেন। লাল মন্দির, উম মন্দির, আর অনেক আশ্রম আছে এখানে।
আমরা যখন হরিদ্বার পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় সারে বারোটা। প্রচুর ট্রাফিক, পুলিশের হিম শিম খেতে হচ্ছে এই ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে। আমরা গাড়ি কোনো একটা ওপেন স্পেসে রেখে বেশ কিছুদুর হেটে যেতে হলো। এতোটাই রোদ আর গরম ছিলো যে, আমরা তাতক্ষনিকভাবেই সবাই একটা করে ছাতা কিনতে হলো। একটা জিনিষ লক্ষ্য করলাম যে, বাংলাদেশের মানুষের মতোই ইন্ডিয়ার এই এলাকার মানুষগুলি মানুষের চাহিদার উপরে পন্যের মুলয় আপ ডাউন করে। যেটা কোনোভাবেই উচিত না। একেকটা ছাতা আমরা কিনলাম তার ফেস ভ্যালু থেকে প্রায় তিন গুন দামে। উপায় ছিলো না, সুতরাং কিনতেই হলো। আমরা হিন্দুরা যেখানে গংগা স্নান করে সেখে হেটে হেটেই এলাম। মাঝে একতা বিশাল পায়ে চলার ব্রিজ তবে রিক্সাও এর উপর দিয়ে যাতায়ত করে। যদি গাড়ি পার হতে হয় ব্রীজের সেই ধারন ক্ষমতাও আছে কিন্তু ব্রীজের এই পারে গাড়ি রাখার খুব একটা পার্কিং স্থান নাই বিধায় বেশীর ভাগ গাড়ি সাধারনত ব্রীজ পার হয় না।
অসম্ভব মানুষের ভীর। গরু ছাগল, মানুষ, ছেলে মেয়ে বুড়া বুড়ি সবাই গঙ্গার পানিতে যে যার মতো করে স্নান করছে। হাজারো পশারীর দোকান আশেপাশে। কেউ আবার প্রসাদ নিয়ে বসে আছে, কেউ সেটা কিনে গংগা দেবতার জন্যে পানিতে নিক্ষেপ করছে যদি দেবতা তার উপর সন্তুষ্ঠ হন এই ভেবে। মানুষের বিশ্বাস এমন একটা বস্তু যার জন্যে কোনো প্ল্যাটফর্ম লাগে না যদি হয় সেটা কোনো ধর্মের উপরে বিশ্বাস। কেউ দেবতাকে দেখেন নাই কিন্তু সবার অন্তরে যার যার মতো করে দেবতা বাস করেন। কারো সাস্থের জন্য প্রার্থনা, কারো রোগ মুক্তির প্রার্থনা, কারো ধন সম্পদের জন্য প্রার্থনা, কেউ আবার কোনো এক নাম না জানা মনের অস্থরতা থেকে মুক্তির প্রার্থনা করছে। যখ কেউ পানি ডুব দিচ্ছেন, দেখে বুঝা যায় যেনো এই মাত্র তিনি একেবারে নিষ্পাপ হয়ে পানির উপরে উঠলেন যেনো। তিনি কতোতা নিষ্পাপ হলেন আর কতোটা হলেন না এতা কোনো মানদন্দ দিয়ে মাপা যাবে না কিন্তু প্রত্যেকের মনের ভিতরে ডুব দিয়ে উঠার পর যে তৃপ্তি তা দেখে বুঝা যায় তার মনের সুখ আর খুসির অবস্থান। আমার বউ হরদ্দারের চারিদিকে ঘুরে দেখার ইচ্ছা পোষন করলো। চারিদিক দেখার জন্য আমাকে আবার মেইন রাস্তা ধরে অন্য প্রান্তে যেতে হবে। সাবিহা আপা গেলেন না। আমরাই গেলাম। একটা বিশাল মাঠ যার চারিদিকে অনেক দেবতা দাঁড়িয়ে আছেন কেউ ঘোরার উপর, কেউ ধনুক নিয়ে আবার কেউ প্রার্থনার ভংগিতে। কিছু অলস যুবক কোন এক গাছে নীচে বসে হয়তো ফেসবুক টিপছেন। কেউ আবার গাজার আসরে মগ্ন।
এই জায়গার আরেকটি বৈশিষ্ঠ হলো যে, গংগার পানিকে উৎস করে ভারত সরকার বড় একটা জলবিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করেছেন। পানির স্রোত অনেক। কেউ কেউ আবার এই পানির স্রোতকেই দেবতার শক্তি মনে করে মাঝ নদীতে সাতরে গিয়ে স্রোতকে আলিংগন করছে। সাধারনত অল্প বয়সী যুবকেরাই এটা করছে। পুন্য স্নানের জন্য পুরু হরিদ্দারের ঘাট গুলিতে সিড়ি দেয়া যাতে লোকজন বসে প্রসাদ দিতে পারে, শরীরে পানি দিতে পারে এবং খুব আরাম করে পানিতে নামতেও পারেন। জল থেকে উঠেই অনেকে আবার কোলাকুলিও করছেন যেমনটা আমরা করি কন ঈদের নামাজের পর মুসল্লীরা। এই গংগার ধারেই এতো বেশী দোকান যে এটা প্রায় আমাদের দেশের গুলিস্থানের মতো। খাবারের দোকান, পসারীর দোকান, ফল ফুলের দোকান, প্রাসাদ বিক্রির দোকান, ডোসার দোকান, কি নাই এখানে। আগরবাতির গন্ধে পুরু এলাকাটা যেনো কেমন স্যাতস্যাতে হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় কিন্তু এখানকার মানুষেরা এই আগর বাতীর গন্ধেই হয়তো ভগবানকে খুজে পান। প্রায় ঘন্টা দেড়েক থাকার পর আবার আমরা আমাদের দিল্লীর হোতেলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ক্ষুধাও লেগেছে। রাস্তার ধারে প্রচুর পরিমানে আখের রস বিক্রি করে এমন সব মানুষ আখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা নেমে সবাই আখের রস খেলাম। জুস ও পাওয়া যায়, আপেলের, অরঞ্জের ইত্যাদির। তাটকা জুস, খেতে খারাপ লাগে না। একটা কথা না বললেই নয় যে, এখানে যদিও তাপমাত্রা প্রায় ৪৫/৪৬ ডিগ্রী কিন্তু হিউমিডিটি কম থাকায় শরীর ঘেমে যায় না।
একটা ভালো রেষ্টুরেন্ট খুজতেছিলাম দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। প্রায় আরো ৩০/৪০ মিনিট গাড়ি চালিয়ে একটা চমৎকার রেষতুরেন্ট পেলাম, ফুল এসি করা। খাবারের মান ও ভালো। আমরা সবাই দুপুরের খাবার খেতে খেতে প্রায় ৪ টা বেজে গেলো। আমরা যখন দিল্লীর প্রায় কাছাকাছি, এমন সময় বাংলাদেশ থেকে আমার এক আর্মির বন্ধু মেজর মহিউদ্দিন ফোন করলো যে, আমার আরেক বন্ধু মেজর জেনারেল ওয়াকার (বর্তমানে প্রধান মন্ত্রীর ফুফাতো ভাই এবং ফুফাতো বোনের সামিও বটে) সে ফোর্ট্রেস হসপিটালে ভর্তি, পারলে যেনো দেখে আসি। ওয়াকারের বাংলাদেশের নাম্বার আমার কাছে ছিলো কিন্তু দিল্লীতে এসে কোন নাম্বার সে ব্যবহার করছে সেটা না পাওয়ায় ওয়াকারের সাথে আর কথা বলতে পারলাম না কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামীকালই ওকে হাসপাতালে দেখতে যাবো।
আমাদের হোটেলে পৌছতে পৌছতে প্রায় রাত ৭ টা বেজে গেলো।
ইন্সটিটিউট অফ লিভার এন্ড বিলিয়ারী সায়েন্স (আইএলবিএস) দিল্লী তথা এশিয়ার মধ্যে লিভার সংক্রান্ত চিকিৎসায় একটি নামকরা হসপিটাল। S.K. Shirin হচ্ছেন একজন আন্তর্জাতীক এবং ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ পদকপ্রাপ্ত একজন বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক। তার কাছেই আমার ওয়াইফের এপয়েন্টমেন্ট করা ছিল। এর আগে বেশ কিছু স্বাভাবিক টাইপের কিছু টেষ্ট করানোর জন্য ইতিমধ্যে হসপিটালে রক্ত দেয়া হয়েছে। আজ ২৪/৫/২০১৯ তারিখে এস কে সারিনের সাথে সরাসরি বৈঠক হবে আমাদের বিষয়ে। তাঁকে আমরা কখনো দেখি নাই। আমরা হাসপাতালের করিডোরে অন্যান্য রোগীদের মতোই ওয়েটিং এ ছিলাম। আমাদের সিরিয়াল দেয়া ছিলো। একটা রোগা পাতলা লোক হটাত করে আমাদের সামনে দিয়েই যেনো কোথায় যাচ্ছিলেন। তার পিছনে বেশ একটা দল তাঁকে ফলো করছিলো। আমরা তাঁকে চিনি নাই বটে কিন্তু আশেপাশের রোগীদের কাছে জানলাম, তিনিই এস কে সারিন। বেশ লম্বা এবং ফর্সা। আমাদের টার্ন এলো প্রায় আধা ঘন্টার পরে। বিদেশী রোগীদের আলাদা সিরিয়াল, তাই তাড়াতাড়িই হলো। অত্যান্ত সল্পভাষী কিন্তু অধিক সময় দেন তিনি। মিটুলকে বেশ কিছুক্ষন পর্যবেক্ষন করার পর কোনো প্রকারের রিস্ক নিলেন না তিনি। যা যা করনীয় সেটাই করলেন এবং একজন ডাক্তার (তার একান্ত বিশেষ ডাক্তার ডাঃ আদিত্যকে বলে দিলেন যেনো কেসটা নিজেই হ্যান্ডেল করেন। ছবিতে পাশেই অমায়িক ভংগিতে দাঁড়িয়ে আছে ডাঃ আদিত্য। আদিত্য ভালো বাঙলা বলে এবং বুঝে। জিজ্ঞেস করেছিলাম কিভাবে সে এত ভালো বাঙলা বুঝে এবং বলে। পরে জানালো যে, তার মা কলিকাতার আর বাবা দিল্লীর। তাহলে বাঙলা না বুঝার কোনো কারন নাই। ভাল লেগেছে এস কে শিরিনের প্রোফেশনালিজম। A real good doctor in his field. পরে সার্চ করে দেখলাম S. K Shirin কে নিয়ে ওয়াইকিপিডিয়া, গুগল কিংবা বিভিন্ন ওয়েব সাইট গুলিঅনেক কাভারেজ করেছে।
ডাঃ এস কে শিরিন আদিত্যকে আরেকটা ইন্সট্রাকশন দিলেন যে, মিটুলের যেনো ইমিডিয়েটলি লিভার বায়োপ্সি করানো হয় এবং সেই রিপোর্টটা আগামীকাল সকালে যখন তিনি আবার বসবেন, তখনি দেয়া হয়। দেখলাম, ডাঃ এস কে শিরিনের ব্যক্তিগত একটি ইন্সট্রাকশন পুরু হসপিটাল এমনভাবে পালন করে যেনো একটি বেদবাক্য। তিনি যা করলেন আমাদের জন্য, সেটা ধন্যবাদ দেওয়ার মতো না, আরো অনেক বড় কিছু। কোনো প্রকারের ডিলে যেনো না হয় সেটাই তিনি করলেন। আমার কাছে ব্যাপারটা একটু খটকা লাগছিলো। এমন নয় যে, এস কে সারিন এর চেয়ে আর কোনো ভালো ডাক্তার ওখানে নাই। কিন্তু এস কে সারিনকেই কেনো এতো সমীহ? পরে আরো জানলাম যে, আসলে তিনি এই আইএলবিএস হাসপাতালের মালিকদের মধ্যে তিনিও একজন।
মিটুলের বায়োপ্সি করানোর জন্য অনেক গুলি ফর্মালিটিজ করতে হলো। কোথাও টাকা জমার ফর্মালিটিজ, কোথাও আবার ওর কিছু ব্যক্তিগত ফর্ম ফিল আপ, আবার কোথাও এমন হয়েছে যে, ইন্টার ন্যাশনাল রোগি হ ওয়াতে বাড়তি কিছু ঝামেলা। এসব করতে করতে প্রায় অনেক বেলা হয়ে গিয়েছিলো। আমি অনে ডিপার্ট্মেন্টই চিনি না। ওখানে ক্লিনারের কাজ করে এমন এক লোকের সাথে পরিচয় হয়ে গেলো। ভালো বাঙলা সেও বলে। নাম তার মিষ্টিলাল। সেইই আমাদেরকে সবখানে নিয়ে গেলো। বেশী বেগ পেতে হয় নাই। প্রায় ৩ টার দিকে মিটুলের বায়োপ্সি করানো হবে, তাই আমরা এর মধ্যেই কাফেটেরিয়া থেকে যা পেলাম খেয়ে নিলাম। সাবিহা আপার জন্য এ ধরনের কোনো ঈন্সট্রাক্সন ডাক্তার দেন নাই বিধায় তিনি হোটেলে চলে গেলেন। ওনার মেয়ে আর ওনার মেয়ের জামাই (নাম নাঈম) সেও চলে গেলো। আমি আই এল বি এস হাসপাতালে রয়ে গেলাম। মিটুল খুব ভয় পাচ্ছিলো। আমার হাত ধরেছিলো যখন তাঁকে ওটিতে নেয়া হয়। যেখানে বায়োপ্সি করানো হবে, আমি সেই ইন চার্জ ডাক্তারকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি থাকতে চাই আমার স্ত্রীর অপারেশনের সময়। তিনি বললেন, খুব ছোট একটা অপারেশন, হয়তো ১০ মিনিটেই শেষ হয়ে যাবে, আর ভয়ের কিছু নাই। যে ডাক্তার মিটুলের বায়োপ্সি করাবেন, তিনিই আমাকে তার রুমে বসিয়ে বললেন, আপনি এখানে রেষ্ট করুন, পাশের রুমেই মিটুলকে তারা অপারেশন করাবেন। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানানো হবে।
প্রায় ৩০ মিনিট পর মিটুল বের হলো, খাটে করে। তাঁকে নেয়া হবে পোষ্ট অপারেটিভ রুমে। সেটা আবার অন্য আরেক জায়গায়। মিষ্টিলাল সাথেই ছিলো। আমরা মিটুলকে পোষ্ট অপারেটিভ রুমে রেখে আসলাম। আমাকে বলা হলো যে, বায়োপ্সি রিপোর্ট টা নিজে গিয়ে তদারকী না করলে এস কে শিরিন বল্লেও সিরিয়ালে থাকার কারনে আগামীকাল হয়তো রিপোর্ট টা পাওয়া নাও যেতে পারে। এর মানে তদবির লাগবে। আমি মিষ্টিলালকে নিয়ে একেবারে পরীক্ষাগারে চলে গেলাম। সেখানে সবার যাওয়া নিষেধ ছিলো। কিন্তু মিষ্টিলাল থাকায় আর আমি বিদেশী হ ওয়ায় একটু সুবিধা হলো। পরীক্ষাগারে যিনি রিপোর্ট টা দিবেন, তাঁকে বললাম, যে, আমাদের খুব তাড়া আছে, যদি আমাদের বায়োপ্সি রিপোর্ট টা একটু প্রাইয়োরিটি দিয়ে দেয়া যায়, তাহলে খুব ভালো হয়। তিনি এটাকে টপ প্রাইয়োরিটি দিয়ে লিখে দিলেন আর বললেন, আগামীকাল সকাল ১০ টার মধ্যে হাতে পেয়ে যাবেন।
আমি এবার আবার মিটুলের পোষ্ট অপারেটিভ রুমে এলাম। দেখলাম অন্যান্য রোগীদের অনেক অভিযোগ। পানি নাই, ডাক্তার ও নাই, কিছু কিছু রোগীর এখুনী ডাক্তারের দরকার কিন্তু কোনো এটেন্ডেন্ট ডাক্তার না থাকায় অনেক রোগী চিল্লা পাল্লা করছে। বুঝলাম, যতোটা না এর সুনাম, এর দূর্নামও আছে। কিন্তু এটা এমন কেনো হবে? মানুষেরা অনেক টাকা পয়সা খরচ করে এ রকম নামীদামি হসপিটালে আসে, তাদের জন্য অবশ্যই এক্সট্রা কেয়ার থাকা উচিত। তা না হলে সরকারী আর প্রাইভেট হস্পিটালের মধ্যে তফাতটা কি? মিটুলের বেশ ব্যথা হচ্ছিলো। ব্যথার মেডিসিন অপারেশনের সময় দেয়া ছিলো কিন্তু সেটা ধীরে ধীরে কার্য ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ায় মিটুলের এখন বেশ ব্যথা হচ্ছে বলে আমাকে জানালো। আমি এ কথা কোনো ডাক্তারকে জানানোর জন্য কোনো ডাক্তারকে খুজে পেলাম না। একজন মহিলা নার্স ছিলো। সে একদিকে ডিসচার্জ লেটার লিখছেন, একদিকে নতুন রোগীর ভর্তির ফর্মালিটিজ করছেন, আবার অন্যদিকে সিরিয়াস রোগীদের কাছে যাচ্ছেন, আবার ফোন ধরছেন। আমি তার অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি একা কেনো? আর লোক কই?
উনি বুঝলেন যে, আমি রাগ করিনি কিন্তু তার অসহায়ত্তের ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছি। নার্স খুব আক্ষেপ করে আমাকে বললেন, দেখেন স্যার, আমি একা কি করবো? স্যারদেরকে ফোন দিচ্ছি, তারা কেউ ফোন ও ধরছে না। আমি এখন কি নতুন রোগীর কাগজ লিখবো, নাকি পুরান রোগীর ডিসচার্জ লেটার লিখবো নাকি রোগীকে এটেন্ডেন্ট করবো। আমরা পেটের দায়ে কাজ করি, কেউ আমাদের অবস্থাটা বুঝে না। রোগীদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে গেছে। তখন রাত প্রায় ৯ টা। আমি আর হোটেলে ফিরে যাই নাই। সারারাত আমি মিটুলের পাশেই ছিলাম। মাঝে মাঝে সিগারেট খাওয়ার জন্য বেরিয়েছি বটে কিন্তু মিটুলের কাছেই ছিলাম, কারন কখন ওর কি লাগে বুঝা যায় না। রাতে মিটুলের ভীষন ক্ষুধা লেগেছিলো। হাসপাতালের খাবার ওর কিছুতেই সহ্য হচ্ছিলো না। খাওয়া মতো ছিলো না আসলে। আমি বাইরে গিয়ে ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে দেখি ক্যাফেওটেরিয়া বন্ধ হচ্ছে প্রায়। জিজ্ঞেস করলাম, এটা সারারাত খোলা থাকে না? তারা বল্লো, এটা বারোটার পর বন্ধ হয়ে যায়। কি তাজ্জব ব্যাপার!! আশেপাশে কোনো খাবারের দোকান ও নাই, তাহলে রোগীরা খাবার পাবে কই কেউ যদি খাবার কিনে আনতে চায়? অত্যান্ত নাজুক একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যাই হোক, বিদেশি বলে ওরা আমাকে কিছু খাবার দিলো বন্ধ করার আগে। অন্তত মিটুলকে দিতে পারবো।
পরেরদিন, মিটুলের রিপোর্ট পেতে পেতে প্রায় বিকেল হয়ে গেলো। ফলে পরেরদিন এস কে শিরিনকে রিপোর্ট টা দেখাতে পারলাম না। শুনতে পাচ্ছি যে, এস কে শিরিন নাকি ৬ দিনের জন্য আবার আসবেন না। তাহলে মিটুলের রিপোর্ট চেক করবে কে? আমরা তো এস কে শিরিনের কারনেই এই হাসপাতালে আসা। অন্য কোনো ডাক্তারের জন্য তো এখানে আসি নি। বেশ কয়েক জায়গায় ব্যাপারটা চেক করে জানলাম, এস কে শিরিনের বাইরে যাওয়ার সিডিউল চেঞ্জ হয়েছে, অসুবিধা নাই, আমরা ওনার কাছেই মিটুলকে দেখাতে পারবো।
২৬/৫/২০১৯ তারিখে আমরা এস কে শিরিনের সাথে আবার দেখা করলাম। এর মধ্যে মিটুল পোষ্ট অপারেটিভ থেকে রিলিজ নিয়েছে। এখন ভালো আছে। এস কে শিরিনি মিটুলকে বললেন যে, মিটুলের যে লিভারের সমস্যাটা হচ্ছে এটার ব্যাপারে আজো কোনো মেডিসিন আসলে বের হয় নাই। তবে ফাইজার একটা মেডিসিন প্রায় ৭৫% টেষ্ট করে বের করে ফেলছে যেটা আগামী বছরে বাজারে আসবে। এর জন্য বর্তমানে ঐ মেডিসিনটা প্রায় ১০০ জন হিউম্যান বডিতে এপ্লাই করা হচ্ছে। এখন হয়তো আরো ৩/৪ জন বাকী আছে। এস কে শিরিন সবাইকে এই সুযোগ দেন না। কিন্তু তিনি মিটুলকে এই সুযোগ দিতে চান যে, ঐ মেডিসিনটা এপ্লাই করে দেখা কাজ করছে কিনা।
আমরা আসলে ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না। তিনি বললেন যে, ফাইজার সিংগাপুর হেড অফিসে মিটুলের সমস্ত বায়োপ্সি রিপোর্ট আলাদা করে টেষ্ট করবে, ওনারা ঐ মেডিসিন টা এপ্লাই করবে এবং মাসে একবার করে ইন্ডিয়ায় ফলো আপ করাতে আসতে হবে। এর জন্য ফাইজার সমস্ত খরচ বহন করবে, আসা যাওয়ার এবং যদি কোনো কারনে কোনো পার্শ প্রতিক্রিয়া হয়, তাহলে ফাইজার বাংলাদেশে এসেও মিটুলের চিকিৎসার ভার নিবে। শুধু তাইই নয়, যদি তাদের এই মেডিসিন এপ্লাই করার কারনে মিটুলের শারীরিক কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে প্রায় ৪ কোটি সম পরিমান ক্ষতিপুরন দিতেও বাধ্য থাকবে। মিটুল এস কে সারিনকে জিজ্ঞেস করেছিলো, কেনো তিনি মিটুলকে এই সুযোগটা দিচ্ছেন। তিনি জানালেন, তারা সবাইকে এই সুযোগ দেন না তবে যারা শিক্ষিত এবং প্রাথমিক স্টেজে আছেন রোগের, আর যারা একচুয়াল ফিডব্যাক দিতে পারবেন, তাদেরকেই তিনি এই সুযোগ দিচ্ছেন। এস কে সিরিন ফাইজারের একজন উচ্চমানের কন্সাল্টেন্ট ও বটে।
তিনি এটাও বললেন যে, যদি মিটুল রাজী থাকে, তাহলে আগামীকাল এস কে সিরিনের সাথে সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ফাইজার কোম্পানীর টপ লেবেল মালিকদের সাথে এবং ডাক্তারদের সাথে কথা বলবেন। আমরা আসলে ব্যাপারটাকে ভালোমতো বুঝিই নি। তারপরেও রাজী হয়ে গেলাম। পরদিন মিটুলের সাথে এস কে শিরিনের ভিডিও এর মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে কথা বলবেন। অর্থাৎ মিটুল এবং এস কে শিরিন একদিকে, ফাইজারের অন্যান্য দাক্তার প্লাস মালিক বৃন্দ অন্য প্রান্তে। পরদিন আমরা সেটাও করে ফেললাম। অনেক কাগজ পত্র মিটুল সাইন ও করলো। কিন্তু একটা অপ্সন খোলা ছিলো যে, মিটুল চাইলে যে কোনো সময়ে এটা বাতিল করতে পারে।
আমরা আমাদের হোটেলে চলে এলাম। ব্যাপারটা নিয়ে দুজনে ভাবলাম। কারন প্রতিমাসে ঢাকা থেকে এই আই এল বি এস এ এসে চেক কারানো সহজ কথা নয় যদিও ফাইজার কোম্পানী সমস্ত খরচ বহন করবে। আবার আরেকটা ব্যাপার মাথায় এলো যে, মেডিসিনটা এখনো এপ্রোভড না, কেনো আমরা মিটুলকে গিনিপিগ হিসাবে ব্যবহার করতে দেবো? আমার মীতুলের যদি কোনো কিছু হয়ে যায়, তাহলে? এবার আমরা একজন ডাক্তার বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। হতাত মনে পড়লো যে, মিটুলের এক বান্ধবী আছে কলিকাতায় থাকে-পরীর জামাই। সে মানিকগঞ্জের মেয়ে। ওনার স্বামী আর বড় মেয়ে দুজনেই দাক্তার। তাঁকে ফোন করলাম, ব্যাপারটা বললাম, তিনি শুনেই কয়েকতা কথা বললেন যে- আখতার ভাই, এস কে শিরিনের চেয়ে ইন্ডিয়ায় হাজার গুনের ভালো ডাক্তার এই লিভার বিষ্যকই আছেন যাদের সমকক্ষ নন এই এস কে শিরিন। আর কেনো মিটুলকে একটা রিস্কের মধ্যে গফেলবেন। তারা আসলে হিউম্যান বডিতে এপ্লাই করার জন্য লোক খুজে পাচ্ছেন না, আর আপ্নাদেরকে শিক্ষিত, সহজ পেয়ে এমন একটা অফার দিয়েছে। কোনো অবস্থাতেই রাজী হবেন না। মনে হলো একটা বোঝা নেমে গেলো। আমরা ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম যে, আমরা এস কে শিরিনের এই সিদ্ধান্তে রাজী নই। তাঁকে আমরা কিছু বল্বো না কিন্তু রাজীও হবো না। কারন যদি এই মুহুর্তে আমরা এস কে শিরিনের কোনো কথায় রাজী না হই, এম্নো হতে পারে মিটুলের চিকিৎসাটা হয়তো ভালো করে করবেই না।
আমরা আমাদের মতো করে ইন্ডিয়াতে যে কয়দিন লাগে এই এল বি এস থেকে চিকিৎসা টা করিয়েই যাই। এতে প্রায় ৭/৮ দিন কেটে গেলো। বেশ অনেক গুলি মেডিসিন দিলেন এস কে শিরিন। আমরা ৬ মাসের মেডিসিন কিনে ফেললাম যাতে দেশে এসে যদি এই মেডিসিন গুলি না পাই, তাই।
শেষ অবধি আমার ইন্ডিয়ার ভিসাটা খুব তাড়াতাড়িই হয়ে গেলো। মোট ৩ দিনে ভিসা পেলাম। রওয়ানা হয়ে গেলাম ইন্ডিয়াতে। বাসায় থাকলো উম্মিকা, কনিকা, নসিরন আর ওর মেয়েরা। সাথে অনেক ডলার নিয়ে গেলাম। যদিও আমি মিটুলের সাথে যতোটা দরকার ডলারের তার থেকে বেশীই সাথে করে দিয়েছিলাম, তারপরেও আমি আমার সাথে করেও বেশ কিছু ডলার নিয়ে গেলাম। ক্রেডিট কার্ডেও প্রায় হাজার আটেক ডলার ছিলো। টাকা পয়সা নিয়ে যাতে কোনো প্রকার টেনসনে থাকতে না হয় সেটা আমার দায়িত্ব ছিলো। কারন কখন মিটুলের জন্য কি লাগে আমার জানা ছিলো না। মিটুল আর সাবিহা আপা ইতিমধ্যে আই এল বি এস এ ডাক্তার এস কে সারিনের সাথে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে কথা বলে বেশ কিছু টেষ্ট ও করিয়ে ফেলেছে, রিপোর্ট পেতে এখনো সময় লাগবে। এর মধ্যে মিটুল আর সাবিহা আপা তাদের আগের হোটেলটা পরিবর্তন করে নতুন একটা হোটেলে উঠে গেছে আজি। নাম “কটেজ, ইয়েস প্লিজ” অদ্ভুত নাম মনে হলো। আমি যখন দিল্লিতে নামলাম (ডাইরেক্ট ফ্লাইট ছিলো বাংলাদেশ বিমানে) তখন রাত হয়ে গেছে। সেখান থেকে আমি সরাসরি একটা মাইক্রো গাড়ি নিয়ে পাহাড়্গঞ্জের উদ্দেশ্যে র ওয়ানা হয়ে গেলাম। ১ হাজার রুপী নিলো। ওরা নাকি আমার কাছ থেকে বেশীই নিয়েছে। সেটা আমার কাছে কোনো বিষয় ছিলো না। আগে তো মিটুলের কাছে যাই। প্রায় ১ ঘন্টা জার্নির পর আমি মিটুলের দেখা পাই। হোটেল “কটেজ, ইয়েস প্লিজ” টা খারাপ না। মেইন রাস্তার উপরেই। সাথে সাথেই হোটেলের একটা কার্ড নিয়ে নিলাম। ঠিকানাটা 1843, Lakshmi Narayan St, Aram Bagh, Paharganj, New Delhi, Delhi 110055, India।
দোতালায় দুটু রুম নেয়া আছে। একটা রুমে তিন জন থাকা যায়, আর আরেকটা রুমে দুজন। সাবিহা আপার মেয়ে এবং মেয়ের স্বামী এক রুমে আর আমি, সাবিহা আপা আর মিটুল এক রুমে থাকবো। আসলে বেশীরভাগ সময়ে তো আমরা বাইরে বাইরেই থাকবো, খালী রাতের বেলাতে ঘুমানোর জন্য রুমে থাকা।
মিটুল আর সাবিহা আপার মেডিক্যাল রিপোর্ট পেতে আরো দু একদিন দেরী হবে। তাই আমরা ভাবলাম, এই দুইদিনে ঐ অঞ্চলে কোথায় কি দর্শনীয় স্থান আছে দেখে ফেলি। আমার খুব একটা ইচ্ছা নাই এসবে কিন্তু মিটুল আর সাবিহা আপার কৌতূহলের শেষ নাই। হোটেলের ঠিক উলটা পাশেই এসব স্থান দেখানোর জন্য অনেক এজেন্ট আছে যারা গাড়ি সহ গাইড দিয়ে দেয়। খারাপ না। পরিকল্পনা হলো যে, আমরা হরিদ্বার, এবং আশেপাশের সব জায়গুলি দেখবো। রোজার দিন ছিলো কিন্তু এখানে রোজা রাখা সম্ভব না। তাই প্রতিদিন সকালে পাশেই রেষ্টুরেন্টে আমরা খেতে যাই। একটা জিনিষ আমার কিছুতেই ভালো লাগছিলো না যে, ইন্ডিয়ানরা এতো বেশী মসল্লা খায় যে, যদি দাঁড়িপাল্লা দিয়ে গ্রাম করে মাপা যায় দেখা যাবে ৭০% হলো মসল্লা আর ৩০% তরকারী বা শব্জী। কিছুতেই খেতে পারছিলাম না। ফলে আমরা একটা প্ল্যান করলাম যে, শুধু ডাল, ডিম আর মসল্লা ছাড়া যে কোনো তরকারী খাবো। একটা নির্দিষ্ট হোটেলেই খাবো যাতে ওরা আমাদের ফুড হ্যাবিটটা বুঝতে পারে।
এই দিল্লীতে কেউ ভালো বাঙলা বলে না আবার আমরা হিন্দি বলতে পারি না। কিছু কিছু শব্দ যা বাঙলা আর হিন্দিতে প্রায় সমার্থক, সেটা দিয়েই ওদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করছি। দারুন উপভোগ করছিলাম আমাদের এই অলিখিত মিশ্রি বান্দি বা বাঙলা +হিন্দি ভাষা। কিন্তু মিটুলের নাদি ভাষায় আমরা সবাই হাসতে হাসতে খুন। দোকানীও মজা পাচ্ছিলো বেশ। ভালো কর্ডিয়াল হিসাবেই ওরা নিচ্ছিলো আমাদের এই বান্দি ভাষাটা।
এই সময় ইন্ডিয়ার তাপমাত্রা প্রায় ৪৩ বা ৪৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। পুরু শহর যেনো ওভেন। শরীরের উপর দিয়ে বাতাস গেলে মনে হয় চুলার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। হোটেলে রুমের ভিতর এসি আছে বলে রুমে থাকলে খারাপ লাগে না কিন্তু যখনই গাড়িতে উঠি, ভীষন গরম। এসি গাড়ি সব সময় পাওয়া যায় না। আবার ইন্ডিয়ানরা এতো কিপ্টে যে, এসি থাকলেও এসি ছাড়তে চায় না। এসি গাড়ির ভাড়া বেশী হলেও এসি ছাড়লে আবার এক্সট্রা টাকা চায়। কি তাজ্জব। এদেশের মানুষেরা এখনো এক টুকরা ইলিশ মাছ কিংবা ৫০ গ্রাম আম কিনতে পারে। তারা পুরু আমটাও কিনে না। তো তাদের কাছ থেকে তো এটা আশা করাই যায়।
ইন্ডিয়ায় এখন নরেন্দ্র মুদীর ইলেকশন চলছে। খুব বিরক্ত মানুষ নরেন্দ্র মোদীর শাসনকাল নিয়ে। আসলে নরেন্দ্র মোদী নিজেও একটা কট্টর পন্থী মানুষ যারা কিনা বাংলা অথবা মুসলমানের বিরুদ্ধে।
মিটুলের শরীরটা মাঝে মাঝেই কেনো জানি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ওর শরীরের ইম্মিউন সিশটেমটা অনেক দূর্বল। মিটুল যখন শারীরিকভাবে কোনো সমস্যায় না থাকে, অনেক পরিশ্রম করার ক্ষমতা রাখে এবং করে। সকালে উঠে নামাজ পড়ে কাজ শুরু করে, তার পর থেকে কাজের বুয়ার জন্য নির্দেশনা, তার সাথে হাতে হাতে কাজ সেরে ফেলা, কলেজে যাওয়া, অফিস করা, সংসারের যাবতীয় দেখভাল, মেয়েদের দিকে খেয়াল রাখা, বাজার করা, বাড়ি ওয়ালী হিসাবে সব ভাড়াটিয়াদের সাথে সমন্নয় করা, বিদ্যুৎ বিল দেয়া, পানির বিল দেয়া, বাড়ি ওয়ালী হিসাবে বাড়ি রক্ষনাবেক্ষন করা, ছাত্রদের পরীক্ষার খাতা দেখা, সারাক্ষন আত্তীয়সজনের খেয়াল রাখা, কি করে না মিটুল!! সপব কাজেই সে আছে। আমি তো খালী অফিস করি আর বাসায় আসি। বাড়ির কোনো কাজই আমি করি না এক মাত্র বাগান করা ছাড়া। এই মিটুল যদি অসুস্থ্য হয়ে বিছানায় পড়ে যায়, আমি আর নাই। তাই ওর শরীর খারাপ হলে সবচেয়ে বেশী টেনশনে পড়ি আমি। রাগ ও করি যে, সারাক্ষন এতো কাজ, আর এতো দেখভাল করার দরকার কি? বিশেষ করে বাকী আত্মীয়স্বজনের জন্য? ওর বাড়ির সব আত্তীয় স্বজন মনে করে, কোনো সমস্যা? মিটুলের সাথে যোগাযগ করো, কোনো দরকারী তথ্য? মিটুলের সাথে যোগাযগ করো। কারো কোনো সাহাজ্য? মিটুলের সাথে যোগাযোগ করো। কেউ টাকা পাঠাবে বিদেশ থেকে? মিটুলের সাথে যোগাযোগ করো। কেউ টাকা নিয়ে যাবে বিদেশে? মিটুলের সাথে যোগাযোগ করো। এত বললাম ওদের আত্মীয়স্বজনের কথা। কিন্তু ওর কলেজের ছাত্র বা কল্গদের কথাই বলি!! একই অবস্থা। কারো কোনো ডকুমেন্ট গেজেটেড অফিসার দ্বারা সত্যায়িত করতে হবে? রাত বারোটা বাজলেও মিটুলের সাথে যোগাযোগ করো। কারো চাকুরী দরকার? মিটুলের সাথে যোগাযোগ করো। ভাড়াটিয়ার কোনো সমস্যা? ম্যাডামের সাথে যোগাযোগ করো। কি যে একটা অবস্থা। আমি কোনো কিছুতেই মিটুলকে বাধা দেই না। করুক। ভালো কাজই তো। কিন্তু এই সব কাজ করতে গিয়ে মিটুলের কোনো প্রকারের রেষ্ট হয় না। সকাল থেকে শুরু করে রাত ১ টা অবধি চলে এই যজ্ঞ। মাঝে মাঝে আমি ওকে ফান করে বলি- ভয়েস অফ আমেরিকা (ভিওএ)। একটা তথ্য ভান্ডার।
মিটুল বেশ মাঝে মাঝেই কয়দিন যাবত ওর শরীর খালী দূর্বল লাগে এই অভিযোগটা আমাকে করছে। আমি নিজেও দেখতে পাচ্ছি- মিটুল অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে। সি এম এইচে অনেকবার অনেক টেষ্ট করালাম, অনেক মেডিসিন দিলো, ডায়াবেটিস আছে, এস জি পি টি বেশী অর্থাৎ লিভারে একটু সমস্যা আছে কিন্তু খুব একটা যে কঠিন কিছু সেটা ডাক্তার রাও বলছে না। অথচ মিটুল আসলেই অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে। তাই এবার ভাবলাম, আমাদের সি এম এইচে নয়, বাইরের কোনো প্রাইভেট হাসপাতালে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাই। আমাদের বাসায় ভাড়া থাকেন পাপ্পু নামের এক টিচার। ভালো মানুষ। তার স্ত্রী আমার বউ কে জানালো যে, আজগর আলী হাসপাতালটা নাকি বেশ ভালো। ভাবলাম, আগে সেখানে যাই, দেখি ডাক্তার কি বলে।
আজগর আলী হাসপাতালের একজন ডাক্তার মিটুলের লিভারের টেষ্ট করিয়ে দেখলো যে, ওর লিভারে আসলে সমস্যা আছে যা কিনা স্টেজ-২ এর কাছাকাছি। এই অবস্থায় উনি ইন্ডিয়ার এস কে সারিনার শরনাপন্ন হতে বললেন কারন এই উপমহাদেশে এস কে সারন অত্যান্ত নামকরা একজন লিভাএ সহ অন্যান্য রোগের বিশেষজ্ঞ। তিনি বসেন আই এল বি এস অর্থায় ইন্সটিটিউট অফ লিভার এন্ড বিলিয়ারী সায়েন্স হাসপাতালে।
দেরী করতে চাইনি। কারন আমি মিটুলের স্বাস্থ্য নিয়ে আসলেই চিন্তিত ছিলাম। ওর ভিসা লাগে না কারন সরকারী কর্মকর্তা। ওরই কলেজের আরেক মহিলা কলিগ সাবিহা আপার ও একই সমস্যা বহুদিন যাবত। ওনার সমস্যাটা মিটুলের থেকেও বেশী একিউট। তাই ওরা দুইজনেই আই এল বি এসে যাওয়ার পরিকল্পনা করলো। আমি যেতে চাচ্ছিলাম কিন্তু আমার ভিসা লাগবে, তাই ভিসা ফর্মালিটিজ না হ ওয়া অবধি আমি ইন্ডিয়ায় যেতে পারবো না। মিটুলরা ১৯ মে ২০১৯ তারিখে ইন্ডিয়ার জন্য রওয়ানা হয়ে গেলো। আমি ভিসার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
সকালে রওয়ানা দিয়ে ওরা প্রায় রাত ৮ টার দিকে দিল্লীর পাহাড়্গঞ্জের লক্ষী নারায়ন রোডে একটি হোটেলে উঠে গেলো। সাবিহা আপার মেয়েও সাথে ছিলো এবং সাবিহা আপার মেয়ের স্বামী ও তাদের সাথে আছেন। রাতে ওদের সাথে কথা বললাম। কিন্তু যে হোটেলে ওরা উঠেছে সেটা নাকি ততোটা স্বাস্থ্য সম্মত নয়। বললাম- তাড়াতাড়ি হোটেল পাল্টাও কারন আগে থাকার জায়গা হতে হবে নিরাপদ এবং হাইজিনিক। মিটুল আর সাবিহা আপার জন্য আসলে কোনো গাইড লাগে না, কারন তারা নিজেরাই দায়িত্তশীল এবং অফিসার বনাম বুঝে কোথায় কিভাবে কি ম্যানেজ করতে হবে। তাছাড়া ছেলে মানুষ হিসাবে সাবিহা আপার মেয়ের স্বামী তো সাথেই আছে। আমার দুশ্চিন্তা চিলো না। আমি ইন্ডিয়ার ভিসার জন্য চেষ্টা করে যতো দ্রুত ভিসা পাওয়া যায় সেটা করছি। মিটুল জানে আমি ইন্ডিয়ায় আসছি না কারন ফ্যাক্টরীতে বেশ কাজের চাপ। কিন্তু আমি জানি আমি যাচ্ছি যখনই ভিসা পাবো। আগে পরিবার, তারপর দেখা যাবে কোনটা কিভাবে সামাল দেয়া যায়। ফ্যাক্টরীর জন্য তো আমার পার্টনার আছেই। রোজা চলছে।
আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগের কিছু দূর্লভ মূহুর্ত যা এখন অনেক অংশে ইতিহাস। এই ছবিগুলির মধ্যে অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন (আল্লাহ তাদের বেহেস্তবাসী করুন), কেউ কেউ বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন, যারা সেই সময় ছোট পুতুলের মতো পুতুল নিয়ে খেলা করেছে, তারা অনেকেই আজ সমাজে কেউ ডাক্তার, কেউ বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে কর্মরত, মেয়েদের মধ্যে অনেকেই মা হয়ে গেছে। ছেলেরাও আজ মাশ আল্লাহ খুব ভালো আছে। এইসব বাচ্চা গুলি, কিংবা বড়রা আমার অনেক কাছে মানুষ, এদের আগমন সব সময়ই আমাকে আনন্দিত করেছে। কিছুটা অবসর সময় ছিলো, তাই আগের দিনের কিছু ভিডিও আর স্থীর চিত্র নিয়ে বসেছিলাম। অতীত সামনে চলে আসে, নস্টালজিক হয়ে যাই। হয়ত কোনো একদিন, আমিও এই ভাবে ইতিহাস হয়ে যাবো, কিছুটা সময় কাছের মানুষেরা মনে রাখবে, এক সময় আমার জন্য এই পৃথিবী শেষ। গুটিকতক মনিষী ছাড়া বেশীর ভাগ মানুষেরাই অজানা ইতিহাসে মিশে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়।
এটাই পৃথিবীর বাস্তব নিয়ম।
আমার ওয়ালেটটা বয়সের ভারে উহার গায়ের ছাল বাকলা উঠিয়া প্রায় জরাজীর্ন হইয়া গিয়াছিলো। নতুন একটা ওয়ালেট কিনি কিনি করিয়াও কেনা হইতেছিলো না। তো, আমার ব্যসায়ীক পার্টনার মূর্তজা ভাই একদিন উহার রুপ দেখিয়া বড়ই কাতরতা অনুভব করিলেন। আর মৃদু মৃদু হাসিয়া কহিলেন, আহা রে আপনার এই ওয়ালেট খানা তাহার কোম্পানী পাইলে উহা তাহাদের আর্কাইভে এন্টিক পিস হিসাবে রাখিয়া দিয়া বলিত, দেখো, আমাদের কোম্পানীর ওয়ালেট এতো জরাজীর্ন হইয়া যাইবার পরেও কাষ্টমারগন তাহা ব্যবহার করিতেই থাকেন। ইহা এতো আরামদায়ক এবং ব্যবহারযোগ্য।”
আমিও কিঞ্চিত হাসিয়া কহিলাম, আজ প্রায় ৫৫ বছর অতিবাহিত করিতেছি, আজ পর্জন্ত নিজে কোনোদিন ওয়ালেট কিনি নাই। ওয়ালেট কোম্পানীর নামও জানি না। ফলে নিজেও বুঝিতে পারি না কোন কোম্পানী ভালো ওয়ালেট বানায় আর কে ঠকায়। সব সময় প্রিয় জনেরাই আমাকে ভালোবাসিয়া, কেউ শ্রধ্যা করিয়া, ওয়ালেট সমুহ উপহার দিয়া থাকেন। এখন বৃদ্ধ হইয়াছি, বড়রা হারাইয়া যাইতেছেন বলিয়া স্নেহ করিয়া ওয়ালেট দেওয়ার মতো লোক হারাইয়া যাইতেছে, কিন্তু ছোটদের ভালোবাসা ক্রমেই বাড়িতেছে বটে কিন্তু ডিজিটাল যুকে আজকালকার ছেলেমেয়েরা ওয়ালেটের পরিবর্তে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন বিধায় অনেকেই ওয়ালেট উপহার হিসাবে দেওয়ার কথা মনে রাখেন না। তারপরেও কেহ কেহ আবার উপহার দেওয়ার সময় কি উপহার দেওয়া যাইতে পারে ইহা মাথা খাটাইয়া অনেক সময় ওয়ালেট সমুহ উপহার হিসাবে দিয়া থাকে। কিন্তু সেইসব অনুজগন এখনো হয়ত আমার ওয়ালেটটির বুড়ো বয়সের খবরটা জানিতে পারেন নাই। ফলে আরেকটি নতুন ওয়ালেট ও আমার পকেটে ঢোকিতেছে না। প্রৌড় স্ত্রীর মতোই আমার ওয়ালেটটি সকালে অফিসে যাওয়ার প্রাক্কালে সঙ্গী হইয়া রাতে পকেটে থাকিয়াই নীড়ে প্রবেশ করে।
গতকাল আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার এবং আমি একসাথে দুপুরের খাবার খাইতে বসিয়া তাহার সদ্য জার্মানীর ভ্রমন কাহিনী শুনিতেছিলাম। গল্প করিতে করিতে একেবারেই মামুলী ভাবে আমার সামনে একটি চমৎকার বক্সের ছোট কি যেনো ধরাইয়া দিলেন। বলিলেন, ভাই, এটা আপনার জন্য কিনিয়াছি। কোনো প্যাকেট দিলে, তাও আবার এই রকমের পার্টনার, যিনি আমার ব্যসায়ীক পার্টনারের থেকে বেশি হইতেছেন, আমার পরিবারের সদস্যদের মতো, উহা সাথে সাথে না খুলিয়া আর পারা যায় না। মন সারাক্ষণ অশান্ত হইয়া, চঞ্চল হইয়া ভাবিতে থাকে, কি উহা। না দেখা পর্যন্ত মন না শান্ত হয়, না কৌতূহল নিবারন হয়। যুবতীর বস্ত্র হরনের মতো অতি তাড়াতাড়ি আমি প্যাকেটটি খুলিয়া দেখিতে পাইলাম, আহা, বড় সুন্দর এক খানা ব্রান্ডের ওয়ালেট। Mont Blank। খুবই সুন্দর, যেনো উঠতি বয়সের বালিকার গায়ের গন্ধের মতো সুবাস, আর চেহাড়া। টান টান তাহার গতর, ইহার মাঝখানে কপালে টিপ দেওয়ার মতো একটা ছোট তারকা খচিত টিপ। ২ বছরের ওয়ারেন্টি। আবার ইন্স্যুরেন্স করা। কি তাজ্জব ব্যাপার বিদেশীদের। যেখানে আমাদের দেশের মানব কুলের জীবনের নিরাপত্তা নাই, যেখানে যাহাই কিনি তাহাতেই হরেক পদের দূষন জাতীয় জিনিষ দিয়া ভেজালে সমৃদ্ধ, সেখানে বিদেশী কোম্পানী গুলি বাংলাদেশ কে অনুসরন না করিয়া নির্ভেজাল জিনিষ বানাইয়া ২ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়া আবার তাহার সহিত ইন্স্যুরেন্স পর্যন্ত করিয়া দেয়। আসলে তাহারাই ব্যবসা বুঝিয়া গিয়াছে। তাই আমাদের মতো আমজনতারা ভালো জিনিষ পাইবার জন্য সুদূর বিদেশ গমন করিতে হয়। বাংলাদেশের চামোরা দিয়াই তাহারা তৈরী করিয়া বাংলাদেশেই আবার ব্যবসা করিতে করিতে তাহাদের ব্যাংক ভরিয়া উঠিতেছে। আর এ দেশের ব্যবসায়ীরা ক্রমেই লাটে উঠিয়া দুর্নীতির সমাজ আরো আঁকড়াইয়া ধরিয়া যতটুকুন নীচে তলাইয়া যাইতে পারে তাহারই যেনো প্রতিযোগিতায় নামিয়াছে।
খুবই ভালো লাগিলো। খবই আনন্দিত হইলাম তবে আশ্চর্জ হইলাম না। কারন মাঝে মাঝেই দেশের বাইরে গেলে আমার পার্টনার আমার জন্য নামী দামী ব্রান্ডের কোনো না কোনো উপহার নিয়া আসেন। দাম জিজ্ঞাসা করিলে তিনি কখনো তাহা ডিস্ক্লোজ করেন না, বরং এমন করিয়া হাসেন যেনো, উহা এমনিতেই বিদেশীরা দিয়া দিয়াছেন। তিনি দাম না জানানোর ব্যাপারে এতোই সচেতন যে, উপহারের গায়ে লিখা স্টিকারটিও খুজিয়া খুজিয়া চিরতরে ধংশ করিয়া দেন। কিন্তু এইবার তিনি বোধ হয় দামের স্টীকারটি খুজিয়া না পাইয়া উহা আর সরাইতে পারেন নাই। আমি ওয়ালেট খানা নতুন পীরিতের মানুষের মতো, তাহার গতর, পকেট, আনাচে কানাচে সর্বত্র উলতাইয়া পালতাইয়া দেখিতে গিয়া কোনো এক গোপন পকেটে দামের স্টীকারটি নজরে পড়িল। “২৩৫ ইউরো”!!
এমনিতেই বাহিরে রোদের তাপমাত্রা ছিলো প্রায় ৪১ ডিগ্রী, ঘরে এসি থাকা সত্তেও প্রাইস স্টীকার দেখিয়া প্রথমে মাথা, পরে মন ভন ভন করিতে লাগিলো। ওয়ালেটে টাকা রাখিবো কি, এখন দেখিতেছি, ওয়ালেট নিজেই সব তাকা খাইয়া ফেলিতেছে। তাও আবার ফরে কারেন্সি।
যাই হোক, নতুন ওয়ালেটে খুশি হইয়াছি অনেক কিন্তু পরক্ষনেই আমার মনের ভিতরে একটা তীব্র বেদনাও অনুভুত হইলো এই কারনে যে, এতদিনের পুরানো আমার বৃদ্ধ ওয়ালেটটির এখন অবসর গ্রহনের সময় হইয়াছে। নতুন ওয়ালেটের আগমনে আমার পুরানো ওয়ালেটকে অতি সত্তর জায়গা ছাড়িয়া দিতে হইবে। হয়ত আগামীকাল হইতে তাহার আর কোনো প্রয়োজন হইবে না। এতোদিন যাহাকে আমি প্রতিনিয়ত পকেটে আগলাইয়া রাখিতাম, যে আমার নিত্য সাথী ছিল, যা কিনা আমার গিন্নীর, বা ছেলেমেয়েদের প্রয়োজনে বুক খুলিয়া তাহাদের সাহায্য করিয়া আনন্দের ভাগ বাড়াইয়া দিতো, আগামিকাল হইতে তাহাকে আর কেহই খুজিবে না। এই কথা ভাবিতে ভাবিতে আমি নতুন এবং পুরাতন উভয় ওয়ালেটকেই পাশাপাশি রাখিয়া কিছুক্ষন স্তব্দ হইয়া নিবিড় চোখে তাকাইয়া রহিলাম। চোখ ভিজিলো কিনা জানি না, তবে মন গলিয়া উঠিলো। ভাবিলাম, আমরাও একদিন নতুনদের ক্রমাগত আগমনে এই সোনালী আকাশ, সবুজ গাছ পালা, সমুদ্রের ঢেউ, আকাশ ভর্তি জোস্নার আলো ছাড়িয়া নতুনদের জায়গা করিয়া দিতে হইবে এবং হয়। তখন আমরাও হয়ত এমন কোথাও অদৃশ্য হইয়া যাইবো। জগত সংসারে ইহা একটি চিরাচরিত নিয়ম। তারপরেও সব পুরানো দিন, পুরানো মানুষ, পুরানো বন্ধু, পুরানো সময় আমাদেরকে আরেক জগতে লইয়া যায়।
মন খারাপ হইবে ভাবিয়া আমার পুরানো ওয়ালেটটির ছবি প্রকাশ করিলাম না। তবে নতুন ওয়ালেটটির শুভ কামনায় তাহার কয়েকটি ছবি পোস্ট করিলাম। তাহার যাত্রা শুভ হোক। সবাই তাহার জন্য দোয়া করিবেন যাহাতে তাহার পেট সব সময় ভরা থাকে।
অনেক অনেক ধন্যবাদ মুর্তজা ভাইকে
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ওয়ালেটের জন্মদিনে বা পুরানো ওয়ালেটের অবসর গ্রহনের নিমিতে কোনো আকিকা বা ফেয়ারওয়েল কিংবা মিলাদ পড়ানোর সুযোগ নাই। ইহা ধর্মীয় মতে গ্রহনযোগ্য নহে। তবে কেহ সহী হাদিস সাপেক্ষে আবেদন করিলে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশে কিছু একটা দোয়া মাহফিল করা যাইতে পারে?