২৩/০৮/১৯৮৬ সৃষ্টিকর্তার হৃদয় সৃষ্টি-২

শনিবার, আটিলারি  সেন্টার এবং স্কুল, হালিশহর,
চট্টগ্রাম।

অনেকদিন পর ডায়েরি লিখতে বসলাম ।

আশ্চর্য হওয়ার মতো বেশী আশ্চর্য যদি কিছু থাকে এ পৃথ্বীতে- সেটা হল সৃষ্টিকর্তার হৃদয় সৃষ্টি। অদৃশ্য  অস্পর্শ, এক কাল্পনিক অস্তিত্ব যার কোন আকৃতি নেই, প্রকৃতি নেই, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, এবং নিজের কোন কন্ট্রোলেও নেই। বৃষ্টিরদিনে এ একরকম, চৈত্রে আরেক, বসন্তে বা শীতে এ আরেক রকম। কখনো এটা কারন ছাড়াই হাসে, কখনো কাদে, কখনো আবার কিছুই করে না। মানুষ এটাকে দিতে চায়, কিন্ত কেন জানি এটাকে কেও যেন নিতেও পারে না। একই ঘটনায় এই হৃদয় কখনো অভিভুত, কখনো বিচলিত, কখনো আবার নির্বাক।  এই আশ্চর্য ”হৃদয়” বস্তুটা কল্পনাপ্রিয়, কল্পনার জগতে সে অতি মহারাজা। আমার এই আশ্চর্য ”হৃদয়” বস্তুটাও মাঝে মাঝে ভীষণ অন্যরকম ভাবে life টাকে চিন্তা করে। আমি এর কারন খুজে পাই না। যেমন সেদিন ভাবছিলাম যে, আমি আর সে একা একা হাটতে হাটতে বহুদূর চলে গিয়েছি, বাড়ি ফেরার পথ ভুলে গিয়েছি, বাড়ির সবাই আমাদের জন্য হয়ত খুব চিন্তা করছে। চারদিক সন্ধ্যা হয়ে আসছে, একটু  একটু ঠাণ্ডা বোধ করছি আর ভাবছি কখন বাড়ী ফিরে যাব। মনে হচ্ছে বাড়ী ফিরলে দেখতে পাব যে, বাবা অস্থির, মা অস্থির, ভাই বোনেরা অস্থির। সন্ধার বাতি দিতেও ভুলে গেছে সবাই। এমন সময় আমরা বাড়িতে গিয়ে হাযির। আমাদের পেয়ে সবাই কি না আনন্দ…  

অথচ আমি জানি আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই, আমি কয়েক দিন বাড়ি না ফিরলেও কেউ আমার খোজ নেবে না। কারন আমার বাবা নেই, আমার মা আমাকে নিয়ে ভাবেন কিন্তু ওনার  কিছুই করার নেই, আমার বোনেরা এগুলু নিয়ে ভাবে না, আর আমার ভাই থাকেন আমেরিকা। থাকলেও ভাবতেন কিনা আমার জানা নেই। কারন আমার আর্মিতে আসা নিয়ে তিনি অত্তন্ত্য বেজার।

পরিবার একটা কনসেপ্ট, পরিবার একটা আইডেন্টিটি। পরিবার নামক বস্তুটি অনেক সময় কোনোকাজে নালাগলেও, এর সুনাম, এর দূর্নাম, এর বাহ্যিক পরিচয় কনো না কোনোভাবে সাহাজ্য করে। আমি তার থেকে যোজন যোজন দূরে।

২৩/০৮/১৯৮৬ সৃষ্টিকর্তার হৃদয় সৃষ্টি

হালিশহর, চট্টগ্রাম-

আশ্চর্য হওয়ার মতো বেশী আশ্চর্য যদি কিছু থাকে এ পৃথিবীতে- সেটা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার হৃদয় সৃষ্টি। অদৃশ্য, অস্পৃশ্য এক কাল্পনিক বস্তুকে আমরা যাকে হৃদয় বলে আখ্যায়িত করছি, তার গুনাবলী,তার আকৃতি- প্রকৃতি যাইই বলি না কেনো, তাকে ভালো মতো বিচার করার মতো আত্তা কিংবা সত্তা আমাদের কারোরই নাই। কোনো না কোনো একসময় সবকিছু ব্যর্থতায় ঝুকেই যায়। আজ যা ভেবেছি, হয়ত দেখা যায় কাল সেটা ভুল ভেবেছি বলেই মনে হয়। আজ যেটা ভুল মনে হয়েছে , হয়ত দেখা গেলো, আগামিকাল সেটাই ঠিক ছিলো বলে মনে হয়। আমরা মানুষ বলে হৃদয় নিয়ে কথা বলি, আত্তা নিয়ে কথা বলি, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলি। অথচ মানুষের থেকে আকৃতিতে বিরাটকায়, শক্তিশালী এবং অনেক আয়ুধারী প্রানীরাও কিন্তু তাদের হৃদয় নিয়ে এতো মাথা ঘামায় না, সাফল্য নিয়ে গলদঘর্ম হয় না কিংবা ভবিস্যত পরিকল্পনায় কি করলে কি হবে সেটা নিয়েও ভাবে না। আর এই জন্যই মানুষের এতো দুর্ভোগ, অশান্তি এবং আশ্চর্য ধরনের এক সৃষ্টি।

মাঝে মাঝে আমি কেমন যেনো অন্যরকম হয়ে যাই। চারিদিকে যখন দৃষ্টি দেই, মনে হয় সবার একটা আলাদা পরিবার আছে, জগত আছে, সবাই একে অপরের জন্য হৃদয় দিয়ে ভাবে। কেউ কিছুক্ষনের জন্য হারিয়ে গেলেও আরেকজন তার হৃদয়ের কোনো এক প্রকোস্ট থেকে রক্তক্ষরনে ব্যথাতুর চোখে জল ফেলে, উদগ্রীব  হয়ে পথের পানে চেয়ে থাকে।  আমারো একটা পরিবার আছে, এই পরিবারের ইতিহাস অনেক গৌরবময় অথচ আজ এই পরিবারের ইতিহাসের পাতায় কোথায় যেনো বর্ষাকাল, অথবা ক্রান্তিকাল। এই পরিবারের সদস্যগন এখন নিজেদের জগতকে সামাল দিতে অপারগ, আলাদা আলাদা জগত তৈরীতে অপারাগ। কেউ কিছুক্ষনের জন্য কেনো, কয়েকদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও যেনো খুজে নেওয়ার লোক নাই। আমি যদি এখন কোথাও পথ চলতে গিয়ে কোথাও হারিয়ে যাই, আমি জানি আমার জন্য কেউ কোথাও হয়ত দাঁড়িয়ে নাই। আর যারা আছে, তাদের হয়ত এমন কোনো শক্তি নাই যে, আমাকে হারিয়ে যাওয়া গহীন জঙ্গল থেকে ফিরিয়ে আনা।

হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসার যে ভালোবাসা, তার তুলনা ফিরে আসার মাঝেই। তারপরেও আমি কখনো হারিয়ে যেতে চাইনা। কারন আমার ফিরে আসার সম্ভাবনা নাই।

১১/০৮/১৯৮৭-ইউনিট ট্রান্সফার সাভার -হেড ক্লার্ক এডজুটেন্ট

এই কয়মাস ইউনিট স্থানান্তরীত হলো মীরপুর থেকে সাভার সেনানীবাসে। কি যে একটা ঝামেলা হয় এই ইউনিট ট্রাস্ফারের সময়। সব কিছুই তো নিতে হয়। তারমধ্যে আমি কোয়ার্টার মাষ্টার। এতো সৈনিক, এতো অফিসার, এতো সরঞ্জামাদি। সাভার সেনানীবাসে রাখার মতো জায়গাও নাই। শুনেছি যে, আমরা নাকি ব্রিগেডের অনেক কিছুই ঠিকমতো পালন করতে পারছি না আবার আমরা দূরে থাকায় আমাদের অনেক কর্মকান্ড নাকি ব্রিগেডের অফিসাররা ঠিক মতো মনিটর করতে পারেন না, তাই যতো অপ্রতুলই হোক, আমাদেরকে সাভার ৯ আর্টিলারী ব্রিগেডের কাছে নিতে হবে, তাই সাভার সাপোর্ট ব্যাটালিয়ানের কিছু বিল্ডিং এর অংশ আমাদের সৈনিকেরা থাকবে আর একেবারে সর্বশেষ বিল্ডিং এ আমাদের অফিস করা হবে। তাই হলো। আজ কয়েকদিন যাবত অমানষিক পরিশ্রম হচ্ছে। দিনরাত সমানে। ইউনিটেই খাই, ইউনিটেই ঘুমাই।

এর মধ্যে নতুন অফিসার এসেছে ২ লেঃ শেখ মুনিরুজ্জামান। মেহেরপুর বাড়ি। রেজিমেন্টেশন চলছে ওর। কমান্ডার কর্নেল মুনসুর ইউনিট ভিজিটে আসবেন। সে মোতাবেক যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব কমান্ডারের ভিজিটের জন্য ইউনিট রেডি করতে হবে। এই যে ভি আই পি দের দ্বারা ভিজিট, এটা একটা ভোকাস মনে হয় আমার কাছে। তিনি যখন আসেন, তিনি দেখেন, আহা, ইউনিট কি সুন্দর, ঝকঝকে তকতকে। সবাই যেন ঈদের মতো নতুন জামা কাপড় পড়ে সেজেগ্যজে থাকেন, কমান্ডার বা ভি আই পি এসে কতো সুন্দর বলে যান, আবার এতো সুন্দরের পরেও তার মন জয় হয় না, হাজার হাজার পয়েন্ট দিয়ে যান। ভাবখানা এই রকম যেনো, উনি মোঘল বংশের লোক। তার স্ট্যান্ডার্ড আরো বড়। যেই তিনি চলে গেলেন, আবার ফকিরা বানুর চেহারা। এর কোনো মানে হয়? অতচ এটা কমান্ডার নিজেও জানেন। তাহলে এই রকম লুকুচুরী কেনো?

আমাদের ইউনিটে হেড ক্লার্ক হিসাবে এসেছে ৪ মর্টারের হাবিলদার ক্লার্ক (জেসিও হওয়ার পর) মজিদ। আমার সাথে ৪ মর্টারে কাজ করেছে। অনেক কথা বলে অধিনায়কের ব্যাপারে কিন্তু শুধু আমাকে বলে। আমি তাকে সাবধান করে দেই কিন্তু তার উপদেশ দেওয়া বন্ধ হয় না।

অধিনায়ক সাহেব এখন আমাদের সব অফিসারের উপর ১০০% ক্ষেপা। একরাতে তিনি মিটিং ডেকে বললেন, যেহেতু আমি যে কোন কাজের ফিডব্যাক চাইলেই দেখি তোমরা হেডক্লার্ক, ব্যারাক এনসিও কিংবা অন্য কোনো স্টাফদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েই আমাকে জানাও, তাই ইউনিটের এডজুটেন্ট আর কোয়ার্টার মাষ্টার হিসাবে দায়িত্তো পালন করবে হেড ক্লার্ক্সগন। জি ব্রাঞ্চের হেড ক্লার্ক এডজুটেন্ট, আর কিউ ব্রাঞ্চের হেড ক্লার্ক কোয়ার্টার মাষ্টার। মাই গড। তাইই হলো। আমরাও অধিনায়কের কথা মেনে নিলাম। সকালে প্যারেড স্ট্যাট দিতে হবে মজিদ সাহেবকে যেহেতু মজিদ সাহেব জি ব্রাঞ্চের হেড ক্লার্ক। আমরা বা এডজুটেন্টরা আর এই কাজে সামিল নই। ঘটনাটা কয়েক মূহুর্তের মধ্যে সারা ডিভিশনে ছড়িয়ে একটা মুখ রোচক কাহিনীতে পরিনত হলো। মেসে আমরা কারো সামনে মুখ দেখাতে পারি না। আমরা যাই বলি না কেনো, এটা আসলে একটা ব্রেকিং নিউজ ছাড়া আর কিছুই না।

যদিও হেড ক্লার্ক গন ইউনিটের এডজুটেন্ট আর কোয়ার্টার মাষ্টারের দায়িত্ত পালন করছেন কিন্তু তাদের নামে সামরীক নিয়মে কখনো কোরো বা 'আদেশ' করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে এটা নিয়ে একটা কানাগুঞ্জন চলছে কেনো দায়িত্ত পালন করে কিন্তু তার বিনিময়ে তারা স্টাফ পে পাবে না? অধিনায়ক আসলে সামরিক নিয়মকে তোয়াক্কা না করেই এই কাজটি করেছেন যেটা আইনত একটা অপরাধ। কিন্তু অধিনায়ক তারপরেও কোনো তোয়াক্কা নাই। কমান্ডার ফেডআপ, বিএম মেজর সাকিল আর ডিকিউ মেজর বদ্রোজ্জাও ব্যাপারটা নিয়ে খুব বিব্রত। কোনো রিপোর্ট চাইতে গেলে তাদেরকে সাধারনত ইউনিটের এডজুটেন্ট অফিসার আর ইউনিটের কোয়ার্টার মাষ্টার অফিসারদের কাছেই চাইতে হয়। কিন্তু আমাদের ইউনিটে দুইজনই হচ্ছে জেসিও। তাদের না আছে ফোন না আছে সরকারী প্রোটকল। কি এক পরিস্থিতি করে রেখেছে অধিনায়ক আমাদের ইউনিটের।

পাশেই ১৫ ফিল্ড আর্টিলারী, অত্যান্ত সুন্দরভাবে চলছে ইউনিট। ১৫ ফিল্ডের উপ অধিনায়ক মেজর মজিদের সাথে মাঝে মাঝে আমার কথা হয়। ইউনিটে আসার সময় তিনি হোন্ডায় আসেন, আমাকে মাঝে মাঝে লিফট দেন। সেই সুবাদে অনেক কথা হয়।

এই কয়মাস ইউনিট স্থানান্তরীত হলো মীরপুর থেকে সাভার সেনানীবাসে। কি যে একটা ঝামেলা হয় এই ইউনিট ট্রাস্ফারের সময়। সব কিছুই তো নিতে হয়। তারমধ্যে আমি কোয়ার্টার মাষ্টার। এতো সৈনিক, এতো অফিসার, এতো সরঞ্জামাদি। সাভার সেনানীবাসে রাখার মতো জায়গাও নাই। শুনেছি যে, আমরা নাকি ব্রিগেডের অনেক কিছুই ঠিকমতো পালন করতে পারছি না আবার আমরা দূরে থাকায় আমাদের অনেক কর্মকান্ড নাকি ব্রিগেডের অফিসাররা ঠিক মতো মনিটর করতে পারেন না, তাই যতো অপ্রতুলই হোক, আমাদেরকে সাভার ৯ আর্টিলারী ব্রিগেডের কাছে নিতে হবে, তাই সাভার সাপোর্ট ব্যাটালিয়ানের কিছু বিল্ডিং এর অংশ আমাদের সৈনিকেরা থাকবে আর একেবারে সর্বশেষ বিল্ডিং এ আমাদের অফিস করা হবে। তাই হলো। আজ কয়েকদিন যাবত অমানষিক পরিশ্রম হচ্ছে। দিনরাত সমানে। ইউনিটেই খাই, ইউনিটেই ঘুমাই।

এর মধ্যে নতুন অফিসার এসেছে ২ লেঃ শেখ মুনিরুজ্জামান। মেহেরপুর বাড়ি। রেজিমেন্টেশন চলছে ওর। কমান্ডার কর্নেল মুনসুর ইউনিট ভিজিটে আসবেন। সে মোতাবেক যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব কমান্ডারের ভিজিটের জন্য ইউনিট রেডি করতে হবে। এই যে ভি আই পি দের দ্বারা ভিজিট, এটা একটা ভোকাস মনে হয় আমার কাছে। তিনি যখন আসেন, তিনি দেখেন, আহা, ইউনিট কি সুন্দর, ঝকঝকে তকতকে। সবাই যেন ঈদের মতো নতুন জামা কাপড় পড়ে সেজেগ্যজে থাকেন, কমান্ডার বা ভি আই পি এসে কতো সুন্দর বলে যান, আবার এতো সুন্দরের পরেও তার মন জয় হয় না, হাজার হাজার পয়েন্ট দিয়ে যান। ভাবখানা এই রকম যেনো, উনি মোঘল বংশের লোক। তার স্ট্যান্ডার্ড আরো বড়। যেই তিনি চলে গেলেন, আবার ফকিরা বানুর চেহারা। এর কোনো মানে হয়? অতচ এটা কমান্ডার নিজেও জানেন। তাহলে এই রকম লুকুচুরী কেনো?

আমাদের ইউনিটে হেড ক্লার্ক হিসাবে এসেছে ৪ মর্টারের হাবিলদার ক্লার্ক (জেসিও হওয়ার পর) মজিদ। আমার সাথে ৪ মর্টারে কাজ করেছে। অনেক কথা বলে অধিনায়কের ব্যাপারে কিন্তু শুধু আমাকে বলে। আমি তাকে সাবধান করে দেই কিন্তু তার উপদেশ দেওয়া বন্ধ হয় না।

অধিনায়ক সাহেব এখন আমাদের সব অফিসারের উপর ১০০% ক্ষেপা। একরাতে তিনি মিটিং ডেকে বললেন, যেহেতু আমি যে কোন কাজের ফিডব্যাক চাইলেই দেখি তোমরা হেডক্লার্ক, ব্যারাক এনসিও কিংবা অন্য কোনো স্টাফদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েই আমাকে জানাও, তাই ইউনিটের এডজুটেন্ট আর কোয়ার্টার মাষ্টার হিসাবে দায়িত্তো পালন করবে হেড ক্লার্ক্সগন। জি ব্রাঞ্চের হেড ক্লার্ক এডজুটেন্ট, আর কিউ ব্রাঞ্চের হেড ক্লার্ক কোয়ার্টার মাষ্টার। মাই গড। তাইই হলো। আমরাও অধিনায়কের কথা মেনে নিলাম। সকালে প্যারেড স্ট্যাট দিতে হবে মজিদ সাহেবকে যেহেতু মজিদ সাহেব জি ব্রাঞ্চের হেড ক্লার্ক। আমরা বা এডজুটেন্টরা আর এই কাজে সামিল নই। ঘটনাটা কয়েক মূহুর্তের মধ্যে সারা ডিভিশনে ছড়িয়ে একটা মুখ রোচক কাহিনীতে পরিনত হলো। মেসে আমরা কারো সামনে মুখ দেখাতে পারি না। আমরা যাই বলি না কেনো, এটা আসলে একটা ব্রেকিং নিউজ ছাড়া আর কিছুই না।

যদিও হেড ক্লার্ক গন ইউনিটের এডজুটেন্ট আর কোয়ার্টার মাষ্টারের দায়িত্ত পালন করছেন কিন্তু তাদের নামে সামরীক নিয়মে কখনো কোরো বা 'আদেশ' করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে এটা নিয়ে একটা কানাগুঞ্জন চলছে কেনো দায়িত্ত পালন করে কিন্তু তার বিনিময়ে তারা স্টাফ পে পাবে না? অধিনায়ক আসলে সামরিক নিয়মকে তোয়াক্কা না করেই এই কাজটি করেছেন যেটা আইনত একটা অপরাধ। কিন্তু অধিনায়ক তারপরেও কোনো তোয়াক্কা নাই। কমান্ডার ফেডআপ, বিএম মেজর সাকিল আর ডিকিউ মেজর বদ্রোজ্জাও ব্যাপারটা নিয়ে খুব বিব্রত। কোনো রিপোর্ট চাইতে গেলে তাদেরকে সাধারনত ইউনিটের এডজুটেন্ট অফিসার আর ইউনিটের কোয়ার্টার মাষ্টার অফিসারদের কাছেই চাইতে হয়। কিন্তু আমাদের ইউনিটে দুইজনই হচ্ছে জেসিও। তাদের না আছে ফোন না আছে সরকারী প্রোটকল। কি এক পরিস্থিতি করে রেখেছে অধিনায়ক আমাদের ইউনিটের।

পাশেই ১৫ ফিল্ড আর্টিলারী, অত্যান্ত সুন্দরভাবে চলছে ইউনিট। ১৫ ফিল্ডের উপ অধিনায়ক মেজর মজিদের সাথে মাঝে মাঝে আমার কথা হয়। ইউনিটে আসার সময় তিনি হোন্ডায় আসেন, আমাকে মাঝে মাঝে লিফট দেন। সেই সুবাদে অনেক কথা হয়।

০৯/০৬/১৯৮৭-৪ মর্টার থেকে ৬ ফিল্ডে আগমন

আজ নতুন ইউনিট ৬ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারীতে যোগদান করলাম। মীরপুর সেনানিবাস, ঢাকাতে। লেঃ কর্নেল দাউদ আমাদের সিও। কয়েকদিন মেজর হান্নান উপ-অধিনায়ক ছিলেন, আমি আসার পর পরই উনার পোস্টিং হয়ে যায়। মেজর খলিল নতুন উপ অধিনায়ক। শোনা যায় অধিনায়কের সাথে উপ অধিনায়কের কোনো কিছুতেই মিল না হওয়ায় অধিনায়ক তদবির করে হান্নান স্যারকে কিছু একটা বরাতে শাস্তি দিয়ে অন্যত্র পোস্টিং করে দিয়েছেন। নতুন ইউনিট, তাই কোনো কিছুই নাই। এই ইউনিটে অফিসার আছেন লেঃ সাদাত স্যার, ক্যঃ শিহাব, (এই দুই জনেই আবার তারা কোর্সমেট), ব্যাটারী কমান্ডার হিসাবে আছেন মেজর সালেহ স্যার। এরশাদ সাহেবের সাথে তিনি কাজ করেছেন। বিষেষ করে বর্তমান চীফ জেনারেল আতিক স্যারের খুব প্রিয় মানুষ তিনি। ১৪ লং কোর্সের ২ লেঃ মুনীর আছে।

মীরপুর বাসা হওয়াতে আমার একটু লাভ হয়েছে। সময় আর সুযোগ পেলে মীরপুরেই বদি ভাইয়ের বাসায় যাওয়া যায় কিন্তু আমি খুব বেশি কম্ফোর্ট ফিল করি না ঘন ঘন যেতেও। কোথাও আমার ঢাকায় যাওয়ার যায়গা নাই, তারপরেও ঢাকার ছেলে যেহেতু, ঢাকাতে থাকলে মনটা ভালো লাগে। বদি ভাইয়ের বাসা আমার কখনোই নিজের বাসা বলে মনে হয় নাই। এখানে আমার জন্য ডেডিকেটেড কোনো রুম নাই, আমি এসে যে কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে এখানে আড্ডা দেবো এসবের কোনো বালাই নাই। অন্য দশ জনের মতো আমিও এখানে একজন গেষ্টই বলা চলে। এটা তাদের দোষ নয়। আর আমার এই রকম আবদার করাও সমীচিন নয় যে, এখানে আমার কোনো অধিকার আছে। তারপরেও অন্য দশ জন থেকে হয়তো আমার প্রায়োরিটি একটু বেশি এখানে, এটুকুই। ফলে এখানে আসার জন্য আমি একেবারে পাগল থাকি না। এরপরেও তো একটা জায়গা আছে বলা যায়। বলতে পারি কাউকে যে, আমার বাসা মীরপুর। এতাই বা কম কিসের?

পাশেই আছে ৪৫ ইষ্ট বেংগল। ওখানে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের আমাদের ব্যাচের সমান আরেক অফিসার আছে। লেঃ রাকীব। নতুন হোন্ডা কিনেছে, ডেলহীম বাইক। নতুন হোন্ডা কিনলে যা হয়, বাইরে ঘুরাঘুরি একটু বেড়ে যায়। আমরা সবাই অস্থায়ী অফিসার মেস নামে ইউনিটের পাশেই ৪ তালা বিল্ডিং এ থাকি। আসলে কোনো মেস নাই এখানে স্থায়ীভাবে। আর যেটা আছে সেটা এএ আর্টিলারী ব্রিগেডের একটা মেস, খুব বেশি কিছু নাই। আমরা ঐ মেসের আন্ডারেই আছি, খাওয়া দাওয়া ওখান থেকে আসে, কিন্তু রুমেই বেশির ভাগ সময় খাই।

অধিনায়ক লেঃ কর্নেল দাউদ খুব সাংঘাতিক একরোখা মানুষ। খুব ছোট ছোট ভুলের কারনেও যে কোনো সৈনিক অথবা অফিসারদেরকে বড় বড় শাস্তি দেওয়ার পক্ষপাতি। ফলে সবাই অধিনায়কের উপর ভীষন ক্ষেপা। তাকে কোনো অফিসারই লাইক করেন না। উপঅধিনায়ক খলিল স্যার মাঝে মাঝে অধিনায়কের বিরদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু আগের উপঅধিনায়কের দফা দেখে খুব বেশি মাতামাতিও করতে পারেন না। কারন লেঃ কর্নেল দাউদের রেকর্ড খুব ভালো না। তিনি ব্রিগেড কমান্ডার কিংবা জিওসি কাউকেই নাকি পরোয়া করেন না।

আমরা যদিও মীরপুর থাকি কিন্তু আমরা ৯ম আর্টিলারী (সাভার) ব্রিগেডের অধীনে। এই সুবাদে আমরা মাঝে মাঝেই সাভার ক্যান্টনমেন্টে যাই। আমি ৪ মর্টার রেজিমেন্টে থাকতে এডজুটেন্টের দায়িত্তে ছিলাম, কিন্তু এই ৬ ফিল্ডে আসার সাথে সাথে আমাকে কোয়ার্টার মাষ্টার বানানো হলো। আমি এই নিয়োগটাকে খুবই অপছন্দ করি। রেশনের হিসাব, গাড়ী, অস্ত্র আরো খুটিনাটি বিষয় নিয়ে সুক্ষ হিসাব করতে হয়। দেওয়ালে কখন চুনকাম করাতে হবে, কিংবা সৈনিকের পায়খানা কখন কখন পরিস্কার করাতে হবে এইসব আমার একদম ভালো লাগে না। তার মধ্যে রেশনের হিসাব তো একটা চুরির খনি।

সকালে পিটিতে সবাইকে আসা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাঝে মাঝে সিনিয়র ব্যাটারী কমান্ডারগন আসতে চান না। আর অধিনায়ক প্রতিদিন আসেন। কি ঝামেলা একটা। প্রতিদিনই আমাকে কারো না কারো নামে মিথ্যা বলতে হচ্ছে। অধিনায়ক জিজ্ঞেস করেন কেনো অমুক অফিসার আসে নাই, হয়তামি বানিয়ে কিছু একটা বলে দিয়ে আপাতত খালাস হচ্ছি। কিন্ত অধিনায়ক সাহেব আমার কথা ঠিক আছে কিনা, কিংবা অনুপস্থিত অফিসার ঠিক কথা আমাকে বলেছেন কিনা এটা উনি বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাইয়ের চেষ্টা করেন বিধায় আমিও ধীরে ধীরে অধিনায়কের কাছে খারাপ হয়ে যাচ্ছি। এখানে উল্লেখ থাকে যে, সাদাত স্যারকে ইউনিটের এডজুটেন্ট বানানো হলেও তিনি ইউনিটে সকালে হাজির থাকেন না, তাই কোয়ার্টার মাষ্টার সকালে এডজুটেন্টের দায়িত্ত পালন করি। সাদাত স্যার ইন্ডিয়ায় যাবেন পিটি কোর্স করতে, তাই তিনি প্রি-কোর্সে আছেন অন্য একটা ইউনিটে।

বড্ড মানষিক কষ্টে দিনপাত করছি অধিনায়কের অধীনে। ব্যাটারি কমান্ডারদের হাতে অধিনায়ক কোনো ক্ষমতাই রাখতে চান না। ফলে ব্যাটারী কমান্ডারগন কোনো কাজও করছেন না। আর সবদোষ পরছে আমাদের উপর। ওদিকে স্যাররা এতো সিনিয়র মানুষ, কিছুই বলতে পারছি না। মাঝে মাঝে আমি স্যারদের অফিসে যাই, দুক্ষের কথা বলি কিন্তু স্যাররা আমাকে আদর করলেও তারা কোনো ব্যাপারেই কিছু করতে পারবেন না এটা আকার ইঙ্গিতে বলেন। সালেহ স্যার তো ফান করে মাঝেই মাঝেই বলেন, যে, ঐ মিয়া, অধিনায়কেরে বুঝাও, এতো ঠেলাঠেলী ভালো না। কিন্তু আমি তো কর্নেল দাউদের কাছে পোকামকড়ের সমান।

মেজর সালেহ স্যার যখন সচিবালয়ে কাজ করতেন, সে সুবাদে তিনি নতুন ইউনিট ৬ ফিল্ডের জন্য অনেক অনেক জিনিষপত্র ফ্রিতে এনে এই ইউনিটে দিয়েছেন। যেমন টাইপ রাইটার, আল্মারী, অনেক নতুন ফাইলপত্র, চেয়ার টেবিল, ফ্যান, আরো অনেক কিছু। কিন্তু অধিনায়ক তাতে খুব একটা খুশী নন সালেহ স্যারের উপর। তার ধারনা, সালেহ স্যার অধিনায়কের যে কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখেন।

মেজর সালেহ ভাবী অনেক স্মার্ট একটা মহিলা। হাতাকাটা জামা পড়েন। খুব ভালো ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। তিনি ইউনিটের অন্যান্য ভাবীদের সাথে খুব একটা মিশেন না। এতেও মনে হয় সালেহ স্যার কিছুটা সমস্যা পড়ছেন বিশেষ করে অধিনায়কের নজরে।কেনো সালেহ ভাবী সবার সাথে মিশেন না, কেনো এই, কেনো সেই ইত্যাদি।

অধিনায়ক আসলে আদার র‍্যাঙ্ক থেকে এই পর্যন্ত এসেছেন। তার চরিত্রের মধ্যে সেই ভাবটা কিছুটা রয়ে গেছে। শুনেছি তিনি তার প্রথম বউ মারা যাওয়ার পর তার শালিকে বিয়ে করেছেন। এটাও শুনি যে, তিনি এবং তার শালী নাকি যৌথ ভাবে ১ম স্ত্রীকে মেরে ফেলেছেন। বাকীটা কে জানে?  

০৭/০৬/১৯৮৬-টাকা পয়সার টানাটানি

টাকা পয়সার খুব ক্রাইসিসে আছি। মাত্র ৭৫০ টাকার বেতনস্কেল দিয়ে কি আর এইভাবে চলে? প্রায় প্রতি মাসেই ওডি (ওভার ড্রাফট) করতে হচ্ছে। অথরিটি লেটার দিয়েই এখানকার ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে হয়। যা বেতন পাই তার থেকে আমাদের খরচ বেশী। এদিকে লেঃ সাকির এই বেতন থেকেই টাকা জমিয়ে পাহাড় বানিয়ে ফেলতেছে। লেঃ সাবির তো রীতিমত ব্যবসাই শুরু করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে এই সাকির আর সাবিরই আমাদের লোনের ভরসা। কিভাবে ওরা টাকা জমায়?

খুলনার ছেলেদের একটা ভালো গুন আছে। ওরা যখন কেউ জানে সে খুলনার লোক, ওরা সবাই মোটামুটি এক হয়ে যায়। ভালো কাজ হোক আর খারাপ কাজেই হোক, ওরা দলবদ্ধ থাকে। ইদানীং সাবির হালিশহরে পুরানো গাড়ি ক্রয় বিক্রয়ের মধ্যে ঢোকেছে। মনে হয় বেশ কিছু পয়সা হাতে আছে। সে আবার ইদানিং হাতে কম্বেট কালারের ঘড়িও পড়ে। যখন বাইরে যায়, সে কম্বেট কালারের ঘড়ি পড়ে। যখন ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে থাকে, তখন সাধারন ঘড়ি পরে। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার দোস্ত? ক্ষনে ক্ষনে ঘড়ির মডেল পালটাচ্ছো?

উতুর পাওয়া না গেলেও এটা বুঝি যে, মিলিতারী ঘড়ি, মিলিটারী ক্যাপ, মিলিটারী ব্যাগ ব্যবহারে বেসামরিক পোষাকে সহজেই এতা প্রমান করা যায়, সে মিলিটারী পরিবারের সাথে জড়িত। তাতে কিছু তো লাভ হয়ই।

আমার এক মাসের মেসের টাকা প্রায় বাকী পরে গেছে। কিন্তু কোথায় যে সেলারীর টাকা খরচ করলাম, সেটাও বুঝি না। অন্যদের বেলায় যখন কারো টাকা পয়সা শর্ট পড়ে, তখন তারা হয় বাড়ি থেকে আনে অথবা কোনো বড় লোক আত্মীয় দের কাছ থেকে সাময়ীকভাবে ধার নেয়। আমার তো সেটাও নাই। ফলে আমাকে আমার নিত্য প্রয়োজনীয় সাধ আহ্লাদ কাট ছাট করেই টাকা পয়সার সামাল দিতে হবে। শুনেছি, আমাদের নাকী অনেক জমা জমি। কিন্তু এইসব জমা জমি আমাদের জীবনে কখনোই কাজে লাগলো না। যদি কোনো এসেট কাজেই না লাগে, তাহলে এইসব এসেট করে কি লাভ?

০৩/০৬/১৯৮৭-নিতুন নিয়ম, রিক্সা বন্ধ

ইদানিং রোল কলে প্রায়ই দেখা যায় যে, যশোর সিএমএইচ এর রাস্তা দিয়ে আমাদের ইউনিটের ভিতর দিয়ে ঠিক রোল কলের সময় কিছু কিছু রিক্সা ঢোকে। যা অনেক বিব্রতকর। রোলকল শুরু হয় সাড়ে সাতটায়। ভাবছি, সাতটার মধ্যে আটটা পর্যন্ত এই গেট দিয়ে কোনো রিক্সা প্রবেশ নিষেধ করে দেবো। দরকার হলে আটটার পরে আবার চলবে। কিন্তু দেখা যায় আউট পাশ থেকে সব সৈনিকেরা ছয়টার মধ্যেই ইউনিট লাইনে ঢোকে যায়। তখন তো আর কেউ সেনানীবাসে ঢোকার কোনো লোকও থাকেনা। যারা ঢোকে তারা গুটিকতক সৈনিক যারা ফ্যামিল্যম্যান হিসাবে ইউনিটের বাইরে থাকে অথবা ছুটি থেকে আগমন করে অথবা কেউ সিএমএইচ থেকে বের হয়। এরজন্য বিকল্প রাস্তাও আছে। আমি ইচ্ছে করলে আমাদের আভ্যান্তরীন এই রাস্তাটা বন্ধ করেও দিতে পারি রাত সাতটার পর। অধিনায়ককে বললে আবার হরেক রকমের ব্যাখ্যা দিতে হবে, দরকার নাই। আগামীকাল এসএম সাহেব কে দিয়েই আদেশটা দিয়ে দেবো।

এই আর্মীতে একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছি। একবার যদি কেউ কোনো আদেশ দিয়ে ফেলে, আর সেটা যদি একজিকিউট করা হয়ে যায়, সেটা রদবদল করতে অনেক সময় লাগে। হয়ত দেখা যাবে, আজকে আমার একটা উদাসীন আদেশ বলে হয়তো কাল থেকে রিক্সা আসলেই বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু এটাকে পুনরায় বহাল করার জন্য আমাকেই হয়ত ইউনিটের সিও সাহেবের অথবা ব্রিগেডের আদেশ নিতে হতে পারে। আর্মীর অফিসারগন কোনো রিস্ক নেন না। কিন্তু বাইরের বেসামরীক লোকজন কিন্তু আর্মীকে অনেক সাহসী কিছু মনে করে। তারা আর্মীকে ভয় পায়, কিন্তু আর্মী ভয় পায় নিজেদের। ১৯৭১ এর আর্মী আর ১৯৮৭ র আর্মী এক নয়। যতো দিন যাবে, এই আর্মী একদিন প্রোফেশনাল হবে ঠিকই কিন্তু এর যে অলিখিত বীরত্ব, অলিখিত সৌন্দর্য আর সাহসীকতার প্রতীক, এটা হারিয়ে যাবে। এর ব্যাখ্যা আমি এখন দিতে পারবো না। কিন্তু আমার কাছে এতাই মনে হচ্ছে। 

০২/০৬/১৯৮৬-বেসিক কোর্সের চেহারা

আমরা যে বেসিক কোর্ষটা করছি, তার নাম হচ্ছে AOBC-4 (Artillery Officers' Basic Course-4). বেসিক কোর্সের যা নমুনা দেখছি তাতে মনে হয় না আমি খুব ভালো করছি। স্টাফরা (যারা এআইজি অর্থাৎ এসিস্ট্যান্ট ইন্সট্রাকটর গানারী, নামে পরিচিত) ইউনিটের অফিসারদের জন্য পক্ষপাতিত্ত করেন, আইজি  (ইন্সট্রাক্টর গানারী) অফিসারগনও মনে হচ্ছে তার একটু একটু ছোয়া আছে। আমাদের সাথে কিছু অনেক সিনিয়র অফিসাররা আবার বেসিক কোর্স করতে এসেছেন কারন তারা তাদের বেসিক কোর্সের সময় চার্লি (অর্থাৎ সি গ্রেড) পেয়েছেন বিধায় আবার ইম্প্রোভমেন্ট কোর্সের জন্য এসেছেন। তাদের মধ্যে ১ম লং কোর্সের মেজর মোজাম্মেল স্যার, মেজর শওকাত স্যার, মেজর জামাল স্যার। এরা সবাই আমাদের অনেক আইজির থেকেও সিনিয়র। কয়েকজন সিনিয়র আইজি আছেন তারা (যেমন মেজর জাকির, মেজর আশরাফ, মেজর রফিক, মেজর হাসান নাসির) ব্যক্তিত্ত সম্পন্ন অফিসার। ক্যাঃ লতুফুল হায়দার একেবারেই বাচালের মতো ক্লাশ নেন। তবে ক্যাঃ তারেক ভালো ক্লাশ নেন।

আমি পারতপক্ষে এইসব স্যারদেরকে এড়িয়ে চলি। আমার ভালো লাগে না তাদের ব্যবহার। ছোট ছোট লেফটেন্যান্টদের সাথে কোর্স করতে এসে যেনো তারা আবার লেফটেন্যান্টই হয়ে গেছেন এমন ভাব কিন্তু আবার তারা যে মেজর সেটাও দেখাইতে কার্পন্য করে না। সার্থ এমন জিনিষ যা শুধু নিজের জন্যই কাজ করে, এর বাইরে কিছু নাই। আমি জানি, এইসব বাচলামী বা গা ঘেষানোওভ্যাস কোনো এক সময় তাদেরকে অনেক মুল্য দিয়ে বুঝিয়ে দেবে যে, সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে যে গ্যাপটা থাকার দরকার ছিলো বা রাখার দরকার ছিলো সেটা আজকে পালন করা হচ্ছে না বলে ভবিষ্যতে মুল্য দিতে হতে পারে।

বেসিক কোর্সে আমরা যারা আছি, তাদের মধ্যে আমার এমসিসি এর ব্যাচম্যাট লেঃ জাহিদ (১২ লং), লেঃ ইশা রুহুল করিম, এবং লেঃ লুতফর (১২ লং), অন্যান্যদের মধ্যে আছে লেঃ মোটা জাহিদ স্যার (সিরিয়াল ১৪ নামেই সবাই তাকে ডাকেন), লেঃ এনায়েত (১২ লং), লেঃ কাদের (১২ লং), লেঃ সিদ্দিক (১২ লং) , লেঃ বশীর (১২ লং), লেঃ জাহাঙ্গীর (১২লং), লেঃ মোমেন (১২ লং), লেঃ কাদের (১২ লং), লেঃ মাহফুজ (১২ লং), ১৩ লং এরও লেঃ মাহফুজ একজন আছে, লেঃ জাহাংগির (১৩ লং), লেঃ ফেরদৌস ((১৩ লং), লেঃ আলমাস (১৩ লং), লেঃ শহিদুল আলম (১৩ লং), লেঃ মাসুদ ইকবাল (১৩ লং), লেঃ সাকির (১৩ লং), লেঃ সাবির (১৩ লং), এই কয়েকজনের সাথেই আমার বেশ খাতির বেশী। আমার কোর্সম্যাট লেঃ জাহাঙ্গীর (জাহাঙ্গীর চা নামে পরিচিত) যেভাবেই হোক, তাকে বি প্লাস পেতেই হবে এই নীতিতে সে মুটামুটি আদাজল খেয়ে লেগেছে। লেঃ সাকির আছে খালি গান আর বাজনা নিয়ে। আর সাবির তো মুটামুটি একটা ব্যবসা সেন্টার খুলে ফেলেছে গোপনে গোপনে। খুলনার ছেলে, বুঝাই যাচ্ছে, বয়সের তুলনায় মাথা বেশি পাকা। লেঃ আকবরকে রীতিমতো ভয় পায় আমার আরেক কোর্সম্যাট লেঃ এটিএম হাসান (দাদা নামে সবাই তাকে মেনেই নিয়েছে)।  

ক্লাশে কি পড়ছি আর কি পড়াচ্ছে সেটা খুব একটা গরজ আছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু প্রায় প্রতিদিন আমি আর লেঃ ইকবাল শহরে যাচ্ছি, ফিরছি রাত করে। লেঃ সাকিরের ক্যাসেট প্লেয়ার আমার খুব প্রিয় একটা যন্ত্র, আধুনিক গান আর সোলস এর গান শুনতে শুনতেই রাত পার হয়ে যায়।

সবার চরিত্রে এমন সব জিনিষ চোখে পড়ছে যা হাসার উদ্রেক জোগায়। যেমন, আমার কোর্সম্যাট লেঃ ফেরদৌস যখন মেসে চায়ের অর্ডার দেয়, চিৎকার করে বলে- এই কে আছিস রে, আমারে এক কাপ চা দাও, কিন্তু শুধু দুধ। লেঃ মোটা জাহিদ যখন ডিম ভাজির কথা বলে তখন তার ডিম ভাজিতে তেল কম হবে পোড়া পোড়া হবে, একটু আধটু হলুদ হবে , কাচা মরিচ বেশী হবে কিন্তু ঝাল হতে পারবে না। আবার ভাওয়ালী যখন পানি চায়, তখন মোটা গলায় বলবে- ঐ মেস ওয়েটার, এক গ্লাস ঠান্ডা গরম পানি দাও। লেঃ লুতফর সারাক্ষন কার পিছনে লাগা যায়, সেই মেজাজে কার্টুন আকতেই আছে আর মেসের আনাচে কানাচে পোস্টিং করেই যাচ্ছে। আইজি মেজর জাকির স্যার যখন লং ডিসটেন্সে কল করেন, তখন মনে হয় চার তলায় ছাদে গিয়ে কথা বললেই ঢাকার রিসিভার পরিস্কার কথা শুনতে পাবেন। ওদিকে মেজর রফিক এমন করে ইংরেজী বলেন যে, সয়ং ইংরেজরাই তার কাছ থেকে ইংরেজী শেখার জন্য কোচিং করতে হবে বলে আমার ধারনা। কমান্ডেন্ট কর্নেল হারুন যেদিক দিয়ে যান, ঐ এলাকায় একটা ঝড় শুরু হয়, আর আশেপাশে যতো ফিতাধারী সৈনিক আছে তাদের ডিমোশন হতেই থাকে। এআইজি জেসিও জাহাঙ্গীর সাহেব ছাত্র অফিসার দেখলেই ম্যাথ টেবিল দিয়া অংক ধরাইয়া দেন। লেঃ বশীর (১২ লং) কমান্ডান্ট হারুন স্যারের খুব প্রিয় মানুষ, যদিও তাদের বাড়ি একই জায়গায় নয়। কেনো বা কি কারনে মাঝে মাঝে আমাদের উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশ বানী শুনালেই তিনি লেঃ বশীরের বরাত টানেন। আর কোর্সের মধ্যে রিউমার উঠছে, হারুন স্যার নাকি তার মেয়ের পাত্র খুজছেন, বশীর তার মধ্যে এক নম্বর লিষ্টে আছে। তাই ওরে সবাই জামাই বলেই ডাকে। আর বশীর মিয়াও ব্যাপারটা বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক, মিটিমিটি হাসে। আমার আরেক দোস্ত লেঃ রবী (১২লং) সব কিছুতেও খায় ধরা। অথচ ওর মতো ভালো একটা পোলা আর কেউ নাই, লেঃ ইশা রুহুলের মতো।

১৩/০৫/১৯৮৬ “বড় বাড়ীর বউ”

আটিলারি  সেন্টার এবং স্কুল, হালিশহর, চট্টগ্রাম। 

গত ১০ তারিখে হালিশহর এসেছি। হালিশহরে এটাই আমার প্রথম আসা নয়। বি এম এ থেকে যেদিন আমাদের পোষ্টিং অর্ডার শুনিয়েছিলো, তার কয়েকদিন পরেই এই আর্টিলারী সেন্টার এন্ড স্কুল আমাদেরকে একটা সম্ভর্ধনা দিয়েছিলো। তখনো একটা বেসিক কোর্ষ চলছিলো যেখানে আমাদের ৪ মর্টার রেজিমেন্টের ২লেঃ নিজাম স্যার, লেঃ রাজ্জাক স্যার আর লেঃ আমিন স্যার বেসিক কোর্ষ করছিলেন। ইউনিটে গিয়ে আমি এই সব অফিসারগুলিকে পেয়েছিলাম।

আজ প্রায় ৩ দিন পার হয়ে গেলো এসেছি। প্রচণ্ড ব্যস্ততা গেলো এই কয়দিন। অরিয়েন্টেশন ক্লাশ, বিকালে বৈ পত্র ইস্যু করা, আর্টিলারীর কিছু বেসিক মাল্পত্র ইস্যু করা, হাতিয়ার ইস্যু করা, ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে দিন আর রাত কখনো সময় করে উঠতে পারছিলাম না ডায়েরী লিখতে। আজ লিখতে বসলাম।

এবার ঢাকায় গিয়ে একটা মজার ঘটনা হল। যশোর থেকে ছুটি পেয়ে বদি ভাইয়ের বাসায় থাকাকালীন, গত ৭ মে ১৯৮৬, পাশের বাড়ির একটা মেয়ের সংগে আমার পরিচয় হল। তার নাম আসমা। মেয়েটিকে আমি কখনো দেখেছি কিনা মনে পরে না। মেয়েদের নিয়ে আমি আসলে খুব একটা ভাবিও না। আমি এ ব্যাপারে খুব বেশি উদাসিন। গানই গাইতে পারি না আবার মেয়ে মানুষ নিয়ে প্রেম। যাকগে সে সব কথা। মেয়েটি যখন এসেছেই তাঁর সাথে কিছুটা সময় আমি কাটাতেই পারি। আমি তো আর রবিন্দ্রানাথ নই যে তারে নিয়া আমি শেষের কবিতা লিখব। আচ্ছা, রবিন্দ্রানাথ কি কখনো “শেষের কবিতা”র মতো কোন “শুরুর কবিতা”ও কি লিখেছেন? মনে হয় না। এর কোন  কারন আছে নাকি?  

যাই হোক, মেয়েটি আমার বদি ভাইয়ের বউ এর সাথে বেশ নিবিড় ভাবে বেশ কথা বলছে। বুঝলাম, যে মেয়েটি ভাবীর বাসায় নতুন নয়। মেয়েটি ভাবীর সংগে খুব মজা করে চাল বাচছে আর ভাবী সবজি কাটছে। ভাবীর সংগে আমার সম্পর্কটা অনেকটা আদর্শ দেবর- ভাবীর মতই।  সুতরাং আমার খুব একটা বেগ পেতে হল না ওদের  সংগে আড্ডা দেওয়া।

আমি ওদের আসরে গিয়ে বসলাম, ভাবী কোন কারন ছাড়াই একটু মুচকি হাসলেন। ভাবখানা এমন যে প্রেম করতেই যেন আমি ওখানে বসেছি। মেয়ে মানুষ, হাসতেই পারেন, এই গুনটা বিধাতা মেয়ে মানুষকে দিয়ে খুব রহস্যময়ি করে রেখেছেন। অবশ্য ওরা নাকি অকারনেও হাসে, আবার অকারনেও কাঁদে। কোন মেয়ে মানুষ যদি এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে আমার জেলও হতে পারে। আচ্ছা, মেয়েরা কারনে অকারনে কেন হাসে আবার কেন কাঁদে? কিন্তু আমি তো ভাবীকে কখন কাঁদতে দেখিনি। হতে পারে ওনি কাঁদতে শিখেন নি।  আর কাঁদলেও হয়ত কারো সামনে তিনি কখন কাদতে চাননি।  ভাবী তখনো মুচকি মুচকি হাসছেন। হটাত আমাকে বল্লেন, আখতার তুমি তো হাত দেখতে জানো, তাই না? দেখতো ওর হাতে কি লেখা আছে? এখানে বলা ভাল যে এই বয়সে আমার ধারনা সবাই একটু একটু  হাত দেখতে জানে, বিশেষ করে মেয়েদের হাত, আর সেটা পূরটাই মিথ্যা। এখন ভাবীর কাছে তো আর মিথ্যা হওয়া যাবে না। কাজ শুরু হল, আমি মেয়েটির হাত দেখা শুরু করলাম।

বেশ বিজ্ঞের মতো বললাম, আরে, একি?

মেয়েটি বল্লো, কি?

বললাম,রাজনীতি করার প্রবণতা আছে। 

যার সাথে প্রেম করবেন তাঁর সাথে বিয়ে হবে না।

পরীক্ষায় ভাল করবেন।

অনেক বড়লোক হবেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।  

দিলাম তো মাথা ঘুরাইয়া। রাজনিতিতে নিয়া আসলাম, প্রেমের ব্যর্থতা, এবার কি হবে?  তবে মেয়েটি নিরিহ। তাঁর সম্পরকে আমি আসলে কিছুই জানি না। যাহা বলিলাম মিথ্যা বানাইয়া বলিলাম। সে বিশ্বাস করিল কিনা আমি তাহা তলাইয়া দেখিবার  প্রয়োজন মনে করিলাম না। তবে বলিয়া যেন মজা পাইলাম।

আমাদের বাসায় টিভি নাই, ভাবী আবার কয়েকটা টিভি অনুষ্ঠান দেখার ভক্ত। আর এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য তিনি এই আসমাদের বাসায় অর্থাৎ আসমাদের বোনের বাসায় যান। সেদিন রাতে একটা বাংলা সিনেমা ছিল, “বড় বাড়ির বউ” আমজাদ  হুসেনের পরিচালনা। যেহেতু অনেক লম্বা সময় ধরে সিনেমাটা চলবে, সুতরাং আমি গেলে ভাবীর জন্য সুবিধাই হয়। বিশেষ করে ভাইয়ার পারমিশন পেতে মোটেই অসুবিধা হবার কথা নয়। গেলাম।

বেশ রাত, ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে, আর দর্শক এর সংখ্যা কমছে। অবশেষে দর্শক থাকল খালী আমি আর ওই নিরিহ মেয়েটি।

কত কথা, আমি যেন বিজ্ঞ্য ব্যক্তি বনে গেছি আর কি। প্রায় সকাল হয়ে গেছে, সারা রাত টিভি দেখলাম আমি আর ওই নিরিহ মেয়েটি। খারাপ লাগেনি। হটাত দেখলাম, মেয়েটি আর নাই। আমি টিভির সামনে একা। কিছুক্ষন কেটে গেল, দেখলাম মেয়েটি এসেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় গিয়েছিলেন? সুন্দর  উত্তর, ফযর নামাজটা পরলাম। সংগে কিছু ফল আমার জন্য। এটাকে বলে আথিথেয়তা। বাসায় ফিরে এলাম। ঘুমাব।

বাসায় এসে লম্বা একটা ঘুম দিলাম। উঠলাম প্রায় ১২ টায়। গরমের দিন, সবখানে পানি থাকে না, আমাদের বাসায় আবার পানি থাকে। আসমা মেয়েটি আমাদের বাসায় পানি নিতে এলো। খড়খড়া রোদ, বাইরের রোদ দেখলেই বুঝা যায়, গরমের তান্ডব কত শক্ত। আমার রুমের ঠিক পাশেই টিউব ওয়েল। কেউ পানি নিতে এলে আর চাপকল চাপলে আমার কানে শব্দ আসবেই। আমি ঘরের ভিতর থেকেই জানালা দিয়ে তার সাথে কথা চালিয়ে গেলাম। ফলে আমার সংগে কিছুক্ষন কথাও হল তার।

সে আমার ঠিকানা চাইলো। আমি তাকে ঠিকানাও দিলাম। একটা  কাগজে লিখে দিলাম। আমি অবশ্য তার কাছ থেকে কোনো ঠিকানা চাইলাম না। কারন আমি ওদের ঠিকানা এম্নিতেই জানি। আবার চাইবো কি? ঠিকানা দেয়ার পরেই মেয়েটা এক কলসি পানি নিয়া তার বাড়িতে চলে গেলো। আমি জানালার পাশে বসে ভাবতে লাগলাম- 

গ্যাঞ্জাম মনে হয় পাকাইয়া ফেলিলাম।

৩০/০৪/১৯৮৬-বেসিক কোর্সের জন্য যশোর ত্যাগ

প্রি-কোর্ষ শেষ হয়ে গেছে। এই প্রি-কোর্ষের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কোনো রেজাল্ট নাই। আর থাকলেও এর কোনো মুল্য নাই। যেহেতু আমাদের কোর্ষটা প্রায় ৭/৮ মাসের জন্য, ফলে ইউনিট থেকে আমাদেরকে প্রথমে কয়েকদিন ছুটি দিয়ে দিলো যাতে সবাই যার যার পরিবারের সাথে কয়েকদিন একসাথে সময় কাটিয়ে হালিশহরে কোর্ষে যেতে পারে। তাই আজই আমাদেরকে ছুটি দিয়ে বলা হলো, যার যার বাসায় চলে যাও। তারপর বাসা থেকে সরাসরি চট্টগ্রামে হালিশহরে গিয়ে যোগদান করো।

আমরা সবাই ব্যাচলর মানুষ, খুব একটা ঝামেলা নাই। কিছু ইউনিফর্ম, কিছু বইপত্র, আর ব্যক্তিগত কিছু থাকতে পারে সাথে সিভিল কিছু কাপড় চোপড়, এইই আমাদের সম্বল। কারো কারো আবার ডেকসেট আছে, বাইকও আছে। আমার এসব কিছুই নাই। তাই অসুবিধাও নাই। বিছানার জাজিম নাকি নিতে হয়, বালিশ ছাড়া ঘুমাবো কই? তাই বালিশ চাদর এখন যেটা ব্যবহার করি সেগুলি নিতে হবে।  

আমার ব্যাটম্যানের নাম আতিয়ার রহমান। ব্যাটম্যান আবার কি?

তাহলে একটু বুঝিয়ে বলি। প্রতি অফিসারের একজন করে ব্যাটম্যান থাকে। ব্যাটম্যানটা হচ্ছে, একটা সিভিলিয়ান সার্ভেন্ট। ইউনিটেই খায়, ইউনিটেই ঘুমায়, আর আমরা ওকে যা পারি দেই। এটা অনেকটা পেটের ধান্দায় কিছু গরীব ছেলে পোলাপান আমাদের সাথে থাকে, ফুট ফরমায়েস করে, ইত্যাদি। আতিয়ার ছেলেটার বয়স প্রায় ১২ থেকে ১৩ হবে, ভালোই কাজ করে। ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করা, বুট পালিশ করা, বিছানাপত্র গুছিয়ে রাখা, গেঞ্জি আন্ডারওয়ার ধুয়া, ফুট ফরমায়েশ খাটা ইত্যাদি করে এই ব্যাটম্যান। ছেলেটার বাড়িও যশোর। আমার সাথে সে হালিশহর যাবে বিধায় গত সপ্তাহে ছুটিতে গেছে। আজ সকালেই ইউনিটে এসে হাজির। আমি ঢাকায় ছুটিতে যাবো ১০ দিনের জন্য। আর এরমধ্যে ব্যাটম্যান আমার মালপত্র নিয়া চিটাগাং হালিশহরে ৮/৯ তারিখের দিকে চলে যাবে, আমি যাবো ৯ তারিখে। কারন ১০ তারিখে কোর্স শুরু। হালিশহর আমাদের আর্টিলারী ট্রেনিং সেন্টার। শুনেছি, কর্নেল হারুন আর্টিলারী সেন্টার এন্ড স্কুলের কমান্ডেন্ট। খুব নাকি একরোখা লোক। তার বাড়ীও আমাদের কেরানিগঞ্জ, শুনেছি। কিন্তু তাতে পুলকিত হবার কোনো কারন নাই আমার। আমি এসব গেরাইবাজিতে নাই।

হাসিনা পরিবহনে টিকেট কাটা আছে। যশোর থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য হাসিনা পরিবহনই সবচেয়ে ভালো। অধিনায়কের ইন্টারভিউ হয়েছে, অধিনায়ক অনেক উপদেশ দিয়েছেন। ব্যাটারী কমান্ডার খালী একটা কথাই বলেছেন, 'শোন মিয়া, লুতফররে টপকানো চাই, এক ব্যাচ জুনিয়ার হইয়া আর্মিতে আইছো, এইটাই সুযোগ তারে টপকাইয়া ভালো করার।' কিন্তু লুতফরের উপর আমার কোনো রাগ বা গোস্যা নাই। সে আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু, ক্লাসমেট। আমি আর্মিতে আমার কারনেই ১২  লং কোর্সে যেতে পারি নাই। যদিও আমি সিলেক্ট হয়েছিলাম, আমার ভাইয়ের কারনে আমি যেতে পারিনি।

আমার ব্যাটারী কমান্ডার বা উপ-অধিনায়ক কেনো লুতফরকে নিয়ে এই কথা বললেন আমার জানা নাই। তবে উনি সারাক্ষন সিগারেট খান, বিশেষ করে মিকচার। আমি তার মিকচার বানাইয়া আগুন ধরাইয়া উনাকে সিগারেটের শলাটা হাতে তুলে দেই, উনি মনের সুখে টান দেন আর বলেন,

গাজা খাইছো কোনোদিন?

বলি, না স্যার।

উনি আবারো বলেন, খাইবা খাইবা, যাইতেছো তো বেসিক কোর্সে!! গাজা খাওয়াও শিখবা।

গাজা খাওয়া শিখবো কিনা জানি না, তবে আর্লোটিলারীর উপর বেশ কিছু শিখবো এটা জানি। লোকটিকে আমার পছন্দ। 

রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। আহা- কি আনন্দ! কিন্তু সারাক্ষনই আমার ভিতরে আরেকটা দুঃখময় অনুভুতি কাজ করতো। আমি ঢাকায় যাচ্ছি বটে, অথচ ঢাকায় আমার থাকার কোনো জায়গা নাই সেই বদি ভাইয়ের বাসা ছাড়া। বদি ভাইয়ের বাসায় আমার থাকতেই হয় সেটা ভালো লাগুক আর নাইবা লাগুক। মা থাকেন গ্রামে-বেচারী নিজেই অসহায়। আমার আগমনে মা আনন্দ পান বটে কিন্তু সেই আনন্দটা আর দশটা মা যেমন তার ছেলের জন্য অনেক কিছু উজাড় করে দিয়ে নিজে মনে মনে শান্তি পায়, আমার মায়ের সেই সামর্থ না থাকায় মা হয়তো মনে মনে কষ্টও পান। আমি মাকে সেটা বুঝতেও দেই না আর মাকে কোনো প্রকার অসুবিধায় পড়ুক সেটা আমি করতেও চাই না। আমি মাকে আমার জীবনের চেয়েও বেশী ভালোবাসি। 

গরীব ঘরের সন্তানদের অনেক কিছু ভুলে যেতে হয়। আমরা হয়তো এককালে গরীব ছিলাম না, কিংবা ভবিষ্যতেও হয়তো এমন দিনকালটা পালটে যাবে কিন্তু বর্তমান সময়টা আমার পক্ষে নয়। 

০৫/০৪/১৯৮৭-এডজুট্যান্ট নিয়োগ

লেঃ লুতফর এডজুট্যান্ট থেকে রেলিংগুইসড হয়ে আমি এডজুট্যান্ট হয়েছি। নতুন অধিনায়কের আমলে নতুন এডজুট্যান্ট। অধিনায়কের অফিসের ওয়ালের সাথে আমার অফিসের দেওয়াল। একটা ফুটো করে দুই অফিসের মাঝে একটা লাল লাইট লাগানো আছে যাতে সি ও সাহেব লাল লাইট জালাইলেয়ামার এখানেও লাল বাতি জলে। এর মানে সিও সাহেব আমাকে ডাকছেন। এই ডাকাডাকি যে কতবার হয় দিনে মধ্যে, আমার আর সকালের পিটি করার দরকার হয় না। কিন্তু এডজুট্যান্ট বলে কথা, সব জায়গায় আমাকে প্যারেড স্ট্যাট দিতে হয় বিধায় অন্য কারো  ফাকি দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আমার নাই।

আমাদের এসএম (সুবেদার মেজর) হাসেম সাহেব, খুবই কর্মঠ এবং ফাদারলি এসএম। লোকটারে আমার খুব ভালো লাগে। সে আমার কাজের পরিধির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ন ব্যাক্তি। বলা চলে যে, অধিনায়ক পুরু ইউনিটের বাবা মা হলে এস এম সাহেব হচ্ছেন পুরু সৈনিকদের বাবা মা।

আমি এডজুট্যান্ট হওয়াতে রোমিও ব্যাটারি খুব খুশী কিন্তু আমি জানি এখন রোমিও ব্যাটারী হোক আর পাপা বা কিউবেক যেই ব্যাটারীই হোক সবাই আমার কাছে সমান। আমি চেষ্টা করছি সারাক্ষন কাজে থাকতে। একদিকে ইউনিটের কর্মকান্ড, অন্যদিকে ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজরলুতফুল স্যারের চাপ, আর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার বাশার স্যার তো এক রকম ভীবিষিকা। ব্রিগেড কমান্ডারের বাড়ি সিলেটে। তাদের দেখলেই মনে হয় এতো বড় অফিসার?

সন্ধ্যায় রোল কল হয়। আমাকে আসতেই হয়। মাঝে মাঝে কিছু কিছু অফিসারগন ফাকি দেন। কোনো রকম ছুতা দিয়ে প্যারেড স্ট্যাট মিলিয়ে দেই।  আমার হেড ক্লার্ক নায়েব সুবেদার সামাদ সাহেব। কাজের চেয়ে অকাজ বেশি করেন। তবে আরেকজন ক্লার্ক আছে হাবিলদার মজিদ, সে চালাক চতুর। ম্যানেজ মাষ্টার।

প্রতিটি ব্যাটারীর প্রতিটি সৈনিকের ব্যক্তিগত ট্রেনিং পরিকল্পনা, এবং সারা বছরের পরিকল্পনা ব্রিগেডে জমা দিতে হয়। আর এই কাজটি বেশ স্টুপিড টাইপের কঠিন। এর মধ্যে ছুটি ছাটা, পি লিভ, এডমিন, আবার ট্রেনিং সব মিলিয়ে আসলে সেনাবাহিনীর এই ট্রেনিং কারিকুলামটা আসলে একটা ধাধা। দেখা গেলো যে, একটা সৈনিক ট্রেনিং করছে কিন্তু ক্লাশে নাই, সে হয়ত রেশন কালেকশনে গেছে। আবার কমান্ডার সাহেব ভিজিটে আসবেন, পুরু ক্লাশ মাঠের ঘাস কাটছে অথচ সেই সময় চলার কথা উইপন ট্রেনিং ক্লাশ। আমরাও নম্বর দিয়ে দিয়ে ক্যাডারগুলি পাশ করিয়ে দিচ্ছি সৈনিকদের। সৈনিকগন সব বুঝে, মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়, হাসে, ক্রিটিসাইজ করে। জুনিয়র অফিসারদের কাছে ওরা অনেক কথা বলে।

সৈনিক রা জুনিয়র অফিসারের কাছে যতোটা ওপেন। ততোটাই চুপ সিনিয়র অফিসারদের সাথে। এই ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। একটা সৈনিক যদি তার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি বিনা দ্বিধায় তার উপরস্থ অধিনায়কের কাছে খোলাখুলিভাবে বলতে অপারগ হন, একটা সময় আসবে যে, এইসব সৈনিকেরা তাদের প্রানটা দিয়ে অফিসার এবং অফিসার বর্গের পরিবারের জন্য ১০০% ডেডিকেটেড থাকবে না। জোর করে বশ্যতা হয় না। এখন যেটা চলছে, জোর করে বশ্যতা চলছে। কোন একটা সময় আসবে যে, এখন সৈনিকেরা অফিসারদেরকে জমের মতো ভয় পায়, আগামীতে অফিসাররা এইসব সৈনিকদেরকে ভয় পাবে। আর এর কারন অফিসারগন নিজেরাই।

০১/০৪/১৯৮৬-বেসিক কোর্সের প্রি-কোর্স শুরু

বেসিক শব্দটাই বেসিক। অর্থাৎ সামরিক জীবনে পদার্পন করার পর বিএমএ এর সেই ট্রেনিং আর ইউনিটে কোনো কাজেই লাগে না। প্রতিটি ইউনিট তার পেশাদার মুল্যবোধে ব্যতিক্রম। ইনফ্যান্ট্রির কার্যকলাপ এক রকম, সিগন্যালস এর কাজ, আর্মারড এর কাজ, আর্টিলারীর কাজ যুদ্ধক্ষেত্রে সব আলাদা আলাদা। বিএমএ তে যে ট্রেনিং করেছিলাম, তা ছিলো সিভিলিয়ান থেকে মিলিটারীতে ট্রান্সফর্মেশনের ট্রেনিং। আদব কায়দা, ইটিকেটস, সামরীক ড্রিল, বেসিক কিছু মাইনর ট্যাকটিক্স, আর কিছু কমান্ড জাতীয় ব্যাপার স্যাপার। মুলত বিএমএ এর ট্রেনিং পুরুই আলাদা। যখন অফিসাররা কমিশন পেয়ে যায়, তারা যার যার আর্মস অনুযায়ী আবার নতুন করে বেসিক ট্রেনিং শুরু করে। আমি যেহেতু আর্টিলারীর অফিসার, আমাদের আর্টিলারীর উপরেই এখন যতো ট্রেনিং চলবে। আর এর প্রথম কোর্ষটাই হচ্ছে বেসিক কোর্ষ যার নাম 'আর্টিলারী অফিসার্স বেসিক কোর্ষ (এওবিসি) ।

গত শীতকালীন এক্সারসাইজে আমাকে যারা হাতে কলমে আর্টিলারীর উপরে গানসহ ট্রেনিং করিয়েছে, সেটাই আসলে এবার পেশাগতভাবে আমাদের কোর ট্রেনিং সেন্টারে শিখানো হবে শুদ্ধভাবে এবং পরীক্ষা নীরিক্ষা করে, বাস্তব সম্মতভাবে। এরই পূর্ব প্রশিক্ষন হিসাবে আমাদের ব্রিগেড সবগুলি নতুন অফিসারদেরকে নিয়ে সমবেতভাবে কোনো একটা ইউনিটের আন্ডারে বেসিক কোর্ষের জন্য প্রি-কোর্ষ করিয়ে তারপর সাধারনত বেসিক কোর্ষে পাঠায়।

এরই ধারাবাহিকতায় আগামী মাস থেকে আর্টিলারীর বেসিক কোর্স শুরু হবে। এরজন্য আজ হতে সব নতুন অফিসারদেরকে ব্রিগেডের আন্ডারে ২৬ ফিল্ড রেজিমেন্টের তত্তাবধানে ফিল্ড পোর্শন আর ৫ এডি এর আন্ডারে এএ (এন্টি এয়ারক্রাফট) পোর্শন শুরু হলো। গতকাল আমাদের রেজিমেন্টেশন পিরিয়ড ডিভিশন কর্তৃক তুলে দিয়ে অফিসার মেসে ইন করিয়ে দেয়া হয়েছে। সেটাও একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আমরা এখন পুরুদমে অফিসার।

ইহা একটা ভালো খবর বটে কিন্তু এতোদিন সৈনিক মেসে যখন খাইতাম, তাহাদের মেন্যুই খাইতাম কিন্তু কোনো বিল দেওয়া লাগিতো না। গতকাল হতে অফিসার মেসে ইন হওয়াতে যাই খাবেন, তাই নিজের বিল দিতে হবে। মাত্র ৭৫০ টাকার বেতন। সিগারেটেই যায় এর তিন ভাগের এক ভাগ। এক প্যাকেট গোল্ড লিফ সিগারেটের দাম প্রায় ২০ টাকা। কখনো কখনো দোকানভেদে আবার তারও বেশি। বেতনের টাকায় চলা খুব মুষ্কিল। মেসে খাবারের বিল নাকি আসে প্রায় ৬০০ টাকার মতো। এর মধ্যে আরো অন্যান্য খরচ। কিভাবে চলে অফিসাররা? বেতন যদিও স্কেল অনুযায়ী ৭৫০ টাকা, কিন্তু ব্যাটম্যান ভাতা, এপয়েন্টমেন্ট ভাতা, এবং অন্যান্য মহার্ঘ্য ভাতাসহ হাতে পাই প্রায় ১৫০০ টাকার মতো। যাই হোক, তারপরেও একটা চাকুরী তো।

যেটা বলতেছিলাম। প্রি-কোর্সের যত না আয়োজন, বা লেখাপড়া, তার অধিক বেশি হইতেছে ২৬ ফিল্ডের ফিল্ড মেসে আমাদের আড্ডা। সকাল ৮টা হইতে ১ টা পর্যন্ত খালি গল্প আর মজার মজার আলোচনা। ইউনিটে গিয়া দেখাই, আহা কতই না কষ্ট করতেছি এই প্রি-কোর্সের লেখাপড়া লইয়া। বিকালেও প্রি-কোর্সের ব্যবহারিক হয়, কিন্তু কাজের কিছুই হয় না। মাঝখান থেকে বিকালে একটু আড্ডাটা ভালো করে জমে উঠে।

১২ লং কোর্সের লেঃ জাহিদ সাহেব মাঝে মাঝে এমন সব কাহিনী করেন আর সবাই মিলিয়া কোনো না কোনো ছুতা বাহির করিয়া তাহাকে ফান্দে ফেলিয়া তাহার নামে এইটা খায় তো ওইটা খায়। তার নাম দেয়া হয়েছে-স্যার জাহিদ। মজার মানুষ। ৫ এডির লেঃ মাহফুজ সাহেব তো হাটিবার সময় এমন একটা ভাব করেন যেনো উনি নবাব অথবা ব্রাহ্মণ, আর যদি সেটা না হয় তাহলে নির্ঘাত ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য। সবাই আড়চোখে একটু কথা তো বলিতেছেই কিন্তু তাহাতে তাহার কিছুই আসে যায় না। তিনি বাকা হইয়া আলতোভাবে পা ফেলিয়া ঘাড় মটকাইয়া চলেন। শুনেছি, তাহার এক ভাই চলচিত্রে নাকি নায়ক হয় হয় অবস্থা। নায়ক পরিবারের কেউ হাটিতে গিয়া একটু অভিনয় না করিলে কি আর ইজ্জত বাচে?

সেনাবাহিনীর লাইফটা কিন্তু অনেক ভ্যারাইটির। সকাল হইতে ব্যস্ততা কিন্তু কিসের যে ব্যস্ততা, তাহাই বুঝিতেছি না। অথচ কাহারো হাতে কোনো সময় নাই।

প্রি-কোর্ষের পুরু সময়টায় মনে হচ্ছে, একদল দুষ্টু পোলাপান একসাথে জড়ো হইয়া কোনো এক ইতিহাস রচিত না করিলেও সেখানে যে মহাজ্ঞানের কোনো অভাব নাই তা যে কোনো মুর্খও বুঝিতে পারে। শুধু প্রি-কোর্ষের সাময়িক আইজি (ইন্সট্রাক্টর গানারী) রাই তাহা উপলব্দি করিতে না পারিয়া শত শত অংকের হোমওয়ার্ক দিয়া পাশের টেলিফোনে কাহার সহিত তাহারা এতো মৃদুস্বরে  ফোনে আলাপ করে বুঝি না। তাহাদের ঠোট পর্যন্ত নড়িতে দেখিনা। যখন হটাত করিয়া ‘হা হা “ করিয়া হাসিয়া উঠেন, তখন তাহাদের দন্তবিকশিত হয়। এছাড়া তাহাদের কথা বলার সময় ঠোট পর্যন্ত নড়িতে দেখি না।এই আইজি মহোদয়গন হলেন ২৬ ফিল্ডের লেঃ ফিরোজ, ৪ মর্টার রেজিমেন্টের ক্যাঃ গনী, ২৬ ফিল্ডের আরো একজন আছেন লম্বা অফিসার যাকে লম্বু গানার নামেই অনেকে চিনেন, ভদ্র দি গ্রেট, লেঃ রশীদ স্যার। মাঝে মাঝে আবার আর্টিলারী ব্রিগেডের বিএম (ব্রিগেড মেজর) মেজর আহসান উল্লাহ স্যারও ক্লাস নিতে আসেন। কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার বাকের প্রথম দিন ক্লাসে এসে গুরুগম্ভীর উপদেশ্মুলক কিছু জ্ঞান দিয়া গেছেন, অনেক কঠিন লোক। সিলেটি সম্ভবত। কথায় কথায় যে কাউরে এক্কেবারে সিলেটি ভাষায় গাল দিতে কার্পন্য করেন না।  

সময়টা কেটে যাচ্ছে, কিন্তু শিক্ষা কিছু হইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে না। কারন ছাত্রগুলির পরিচয় পাইলেই বুঝা যাবে কি অত্যাধুনিক মনোযোগী সব ছাত্রের দল। আমাদের ৪ মর্টারের আমি আর লেঃ লুতফর, ২৬ ফিল্ডের ২লেঃ ইকবাল, আর লেঃ জাহিদ, ২৭ ফিল্ডের ২লেঃ আকবর, ৫ এডির ২লেঃ ইশা, আর ২লেঃ ভাওয়ালী, সাথে আছে ১২ লং এর লেঃ মাহফুজ, আরো অনেকে। কেউ কেউ আবার হেভী সিরিয়াস যেনো এইটাই বেসিক কোর্ষ। আমার আসলে কিছুই শিখা হয় নাই।

দিনের বেশীরভাগ সময় প্রি-কোর্ষেই থাকি, বিকালেও। আর রাতে এসে গান শুনি, লুতফরের হোম ওয়ার্ক কপি করি, আর ঘুমানোর আগে ডায়েরী লিখি।

১০/০৩/১৯৮৬-যশোর সেনানীবাসে প্রথম আগমন

গত সপ্তাহে অনুশীলন এলাকা থেকে মেইন সেনানীবাসে আসলাম। এইই প্রথম আমি যশোর সেনানীবাস দেখলাম। বিশাল সেনানিবাস। বড্ড সুন্দর। ৪ মর্টার আর্টিলারী ইউনিট যশোর মেইন সিএমএইচ এর একদম লাগোয়া। ইউনিটের অফিসসমুহ টিনশেডের মধ্যে। ব্যারাকগুলির কয়েকটা বিল্ডিং আবার কয়েকটা টিনশেড। পাশেই ৩৬ ইস্ট বেংগল ইউনিট। ইউনিটের দুইপাশ দিয়েই গাড়ির রাস্তা আছে। একটা রাস্তা (পুর্ব দিকের) দিয়ে ২৬ ফিল্ড, গানার্স ডেন, আর্টিলারী ব্রিগেড অফিস হয়ে ২৭ ইস্ট বেঙ্গলে যাওয়া যায়। আর পশ্চিম দিকের রাস্তা দিরে ৫ লাইট এএ আর্টিলারীতে যাওয়া যায়। এই রাস্তার শেষে আরেকটি রাস্তা মিলিত হয়েছে, যেটা দিয়ে আবার পুর্বদিকের ইউনিট তথা যশোর বিমান বন্দরের দিকেও যাওয়া যায়।

ইউনিটের ক্যান্টিনটা খুব ছোট তবে আসা যাওয়ার পথে পড়ায় যখন তখন ক্যান্টিনের সুবিধাটা পাওয়া যায়। সেনানীবাসের ভিতর বেসামরীক স্টাইলে কোনো দোকান পাট যত্র তত্র পাওয়া যায় না। ফলে ইউনিটের ক্যান্টিনগুলিই একমাত্র ভরসা। আমার রেজিমেন্টেশন চলছে। আমি বিএইচএম সাইদুরের রুমের পাশে একটা সিংগেল রুমে থাকি এখন। অনুশীলন থেকে আসার পর সেই রাতে আমি বি এইচ এম সায়েদুরের রুমেই ওর পাশের বেডে ছিলাম। এই কয়দিনে আমার জন্য আলাদা একটা সিংগেল রুম দেয়া হয়েছে। অফিসার মেসে যাওয়ার এখনো আমার বৈধতা হয় নাই। এই রেজিমেন্টেশন মানে হলো, একজন সৈনিকের মতো ওদের সাথেই থাকা, খাওয়া, ওদের সাথে মেলামেশা করা, ওদের সাথে ঘুমানো, ওদের সাথে রোলকলে যাওয়া, ওদের টয়লেট ব্যবহার করা এবং ওদের সাথে ট্রেনিং করার নামই হচ্ছে ওরিয়েন্টেশন বা রেজিমেন্টেশন। এর মাধ্যমে একজন অফিসার বুঝতে পারে একটা সাধারন সৈনিকের প্রত্যাহিক জীবনধারা কি রকমের, তাদের সাথে একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে মেশার এটা একটা বড় সুযোগ।

টিএ (টেকনিক্যাল এসিস্টেন্ট) হাঃ বারেক এখনো আমার ট্রেনিং এর জন্য দায়িত্তপ্রাপ্ত। আর্টিলারির ট্রেনিং এ অংক খুব গুরুত্তপূর্ন। আর এই টিএরাই হচ্ছে অংকের ভালো শিক্ষক। যদিও সৈনিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুব বেশী না, কিন্তু যারা যারা যার যার ট্রেডে একটা সার্টেন স্ট্যান্ডার্ড মেইন্টেইন করে। সব অফিসারগন সৈনিকদেরকে তুমি করে বলে, শুধুমাত্র জেসিও যারা, তাদেরকে অফিসারগন আপনি করে সম্বোধন করে। আমারো একই নিয়মে সৈনিকদের  তুমি করে বলার কথা কিন্তু যারা সিনিয়র হাবিলদার তাদেরকে আমি 'তুমি' করে বলতে কেমন যেনো মুখে বাধে। আবার হাঃ বারেক যেহেতু আমার সরাসরি ট্রেনিং এর শিক্ষকের মতো, তাকে আমি 'তুমি' না বলে 'বারেক সাহেব' বলেই ডাকি। হাঃ বারেকের অনুপস্থিতিতে সার্ভেয়ার হাঃ মন্ডল আমার আরেক শিক্ষক। সারাক্ষন পান খায়। মজার লোক।

আমার ব্যাটারী কমান্ডার মেজর লুতফুল হক কেমন যেনো চটাং চটাং ভাবের লোক। কাউকেই তিনি খুব একটা পাত্তা দেন বলে মনে হয় না। আমি তাকে ভয় পাই। আমাদের ইউনিটের এবং অন্য কয়েকজন (মেজর ওয়ালী, মেজর লুতফল হক, মেজর ইশহাক, সাথে আর্টিলারী ব্রিগেড মেজর আহসান উল্লা, ওসি এমপি মেজর মাকসুদ আর ২৬ ফিল্ডের উপঅধিনায়ক কেএবি মাইনুদ্দিন) যখন একসাথে হয়, মনে হয়, এরাই সব, আর কেউ কিছুই না। এইসব অফিসারদেরকে দেখলে মনে হয় ফৌজি অফিসারগন আসলেই স্মার্ট।

আমরা অনেকগুলি কোর্সমেট এই যশোর সেনানীবাসে আছি। ৪ মর্টারে আছি আমি, ২৬ ফিল্ডে আছে ২লেঃ ইকবাল, ২৭ ফিল্ডে আছে ২লেঃ আকবর, ৪ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ানে আছে ২লেঃ এমদাদুল বারী, ৩৮ ইস্ট বেঙ্গলে আছে ২লেঃ মইন, ২লেঃ শাহীন, ৫ এডিতে আছে ২ লেঃ তারক ভাওয়ালী। অন্যান্য ইউনিটেও আছে ২ লেঃ আশফাকুল বারী, ২ লেঃ সালাহ উদ্দিন। আর্মার ইউনিটে আছে ২ লেঃ রাকীব। অনেক কোর্সম্যাট। সন্ধার পর মাঝে মধ্যে কোনো কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হয় কিন্তু যেহেতু সবাই রেজিমেন্টেশনে আছি, ফলে অফিসার মেসের কোনো পার্টিতে আমাদের যাওয়ার কোনো অবকাশ নাই। 

অনেক বড় ক্যান্টনমেন্ট। এখনো পুরু ক্যান্টনমেন্ট আয়ত্তে আসে নাই কে কোথায় কিভাবে আছে।

০৪/০৩/১৯৮৬-যশোর সেনানিবাস, সৈনিক লাইন

রাত ৩টা পাচ মিনিট

এই একটু আগে শেষ পর্জন্ত অনুশীলন শেষ করে সেনানীবাসে পৌঁছলাম। সেনানিবাসটা এখনো ভালো করেই দেখি নাই। তবে চমৎকার একটা লোকেশন আর ডেকোরেশন দেখে মনে হলো, বেশ সুন্দর। চারিদিকে আলো জ্বলছিল। সম্ভবত সবাই শীতকালিন মহড়া থেকে ফিরে আসবে বলে রিয়ার এসলন প্রতিটি ইউনিটেই মরিচ বাতি, লাল নীল আলো জালিয়েছে। খুব অবাক হয়ে দেখছিলাম সেনানীবাসের চেহাড়াটা। ভালো লাগছিলো।

ইউনিটে এসে পৌঁছেছি প্রাউ রাত দুইটার দিকে। গাড়ি বহর ইনট্যাক্ট অবস্থায় আছে, আগামিকাল সকাল ৯ টায় আনলোডিং এর কাজ চলবে। আমরা সবাই যার যার রুমে চলে এসছি। আমি এখনো অফিসার মেসে সামিল হই নাই। আমার অবস্থান একটা ব্যারাকে। শীতকালীন মহরার সময় ছিলাম তাবুতে আর এখন বিল্ডিং এ তবে সৈনিক দের সাথেই। বি এইচ এম সায়েদুরের পাশে আমার বিছানা। খুব টায়ার্ড সবাই। অনেকেই হাত মুখ না ধুয়েই যার যার বিছানায় মূটামুটি শুয়ে পড়েছে। আমার ঘুম আসছিলো না। আর এই সময় আমার ডায়েরী লিখার কোনো কারনও নাই, কারন আমি খুব টায়ার্ড। কিন্তু মনটা অনেক ভালো লাগছে এইজন্য যে, যে কারনে আমি গতকাল থেকে একটা অপরাধ বোধে নিমুজ্জিত ছিলাম, সেটা বুক থেকে সরে গেছে। তাহলে ঘটনাটা বলি। ঘটনাটা ঘটেছিলো গতকাল সকালে।  

আমরা তখন সবাই যার যার মালপত্র গুছিয়ে গাড়ির তালিকা অনুযায়ী মালামাল লোডিং করতে ব্যস্ত। সবাই কাজেই ব্যস্ত। কখন সেনানিবাসে ফিরে যাবে এই আনন্দে মালামাল লোডিং এর সময় একটু হৈচৈ হচ্ছে। বড় বড় আর্টিলারী কামান, তাবু, রেশন স্টোর, অফিসারদের মালামাল, অস্ত্র শস্ত্র, টিন, আরো কত কি যে লোডিং এর কাজ। আশেপাশের অনেক বেসামরিক লোকজন জড়ো হয়ে আছে আমাদের এই চলে যাওয়ার প্রিপারেশন দেখতে। ছোট ছোট ছেলেমেয়রা, বড়রা, আরো অনেকেই। গ্রামের বহু লোক জড়ো হয়ে আমাদের চলে যাওয়ার ব্যাপারটা অবলোকন করছে। এই এলাকার সবাই এখন জানে যে, আমরা সবাই চলে যাচ্ছি। হয়তো ওদের জন্যেও ব্যাপারটা খুব আনন্দের না।

আমি গ্রামের লোকজনের ভীড়ের মধ্যে বারবার একটা জিনিষ দেখার চেষ্টা করছি যে, ঐ বুড়িমা আছে কিনা। মনে মনে খুব আরাধনা করছিলাম, আহা যদি বূড়ি মা আসতো। যদি দেখা পেতাম। আমি কাউকে যে জিজ্ঞেস করবো, তার নামও জানি না, সে কার বাড়ির তাও জানি না। ফলে কাউকেই জিজ্ঞেস করতেও পারছিলাম না। একবার একটা স্কুলে পড়া বাচ্চা ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এখানে এমন কোনো বুড়ি কি আছে যে, রাতের বেলায় ঐ রুপদিয়া গ্রামের বরই গাছের তলায় আখের রস জ্বাল দেয়? ছেলেটি মাথা চুলকিয়েছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে কে সেই বুড়ি খোজার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সেও এমন কঠিন প্রশ্নের উত্তর জানে না বলে সহজ করে মুখখানি মলিন করে হেসে দিয়ে বলেছে, জানি না স্যার। মনটায় কোথায় যেনো খচখচ খচ করতেই লাগলো। কিন্তু ঈশ্বর খুব মজার প্রভু। তিনি ব্যথা দেন, আবার ব্যথার ঔষধ দেন, তিনি হতাশ করেন কিন্তু আবার পুষিয়েও দেন। তিনি চোখের জলে আমাদেরকে বুক ভাসিয়ে দিয়ে আবার সেই চোখেই জলভরা আনন্দে বুক ফুলিয়ে দেন। আজ যেনো ঈশ্বর ঠিক সেটাই করলেন। 

হটাত দেখি একজন বুড়ি একটা থালা হাতে নিয়ে বেশ দূরে একা একা দাঁড়িয়ে আছে। আমার চিনতে একটুও অসুবিধা হইলো না, এটাই সেই বুডিমা। আমি মূটামূটি স্পিডে হেটেই বুড়ির দিকে গেলাম। বুড়ি আমাকে চিনতে পারে নাই। না পারারই কথা। কারন সে এমনিতেই চোখে ভালো দেখে না, তারপর ঐ রাতে সে আমাকে ভালো করে চিনতে পারার মতো করেও দেখে নাই।

আমি কাছে গিয়ে বুড়িমা বলতে সে যেনো আকাশের  চাঁদ হাতে পেলো। আমাকে জড়িয়ে ধরে বল্লো, তোর জন্য দুই টুকরা আখের রসের মিঠাই নিয়া আইছি। এতো সৈনিক চারিদিকে, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি বুড়িমাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আমি তোমাকে খুব মিস করছিলাম বুড়িমা। তোমার মিঠাই যতোটা না আমাকে মজা দিবে, তোমার সাথে দেখা হওয়াতে আমার মনটাই ভরে গেলো।

হাত দিয়ে বুড়িমার পা সালাম করে বললাম, বুড়িমা, আজ চলে যাচ্ছি। তোমার বাড়িতে আসবো। কি নাম বললে সবাই তোমাকে চিনবে? বুড়ি বল্লো, জসিমের মা।

আমি বুডিমাকে একটা চেয়ার দিতে বললাম। অনেক বুড়ো মহিলা। হয়তো বেশীক্ষন দাড়ায়ে থাকতে তার কষ্ট হবে। যতোক্ষন না আমাদের গাড়ি বহর রেডি হচ্ছিলো, গ্রামের মানুষ গুলির সাথে বুড়িমাও সেখানে ঠায় চেয়ারটায় বসেছিলো। কি জানি তার মনে কি খেলছিলো, কিংবা কি ভাবনা মনে নিয়ে সে আমাদেরকে বিদায় জানাতে এসেছিলো। গাড়িতে উঠার আগে আমি বুডিমাকে আবারো পায়ে ছুয়ে সালাম করে হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, বুড়িমা, আমি আবার তোমাকে দেখতে আসবো। তুমি শুধু ভালো থেকো।

এবার অনুভব করলাম, বুড়ি একটু কাদছে। আমি সৈনিক, আমার কাদা নিষেধ। কিন্তু মনের ভিতরে কোন কারনে কি দুক্ষে যেনো আমারো একটা কাপুনী হচ্ছিলো। একবার মনে হচ্ছিলো, নিয়ে যাই বুড়িকে, আবার ভাবলাম, কোথায় নেবো? পৃথিবীর অনেক অলিখিত ভালোবাসা শুধু বয়েই চলে না, মাঝে মাঝে কোথাও গিয়ে থেমেও যায়।

তখন গাড়ি বহর লোডিং শেষ হয়ে গেছে, অধিনায়ক সাহেব ইউনিটের প্যারেড স্টেট নিতে চলে এসছেন, আমাকে প্যারেডে থাকতে হবে। আমি আর বুড়িমার কাছে থাকার কোনো সুযোগ নাই। বুড়িমাকে আমি পিছনে ফেলে সামনের দিকে ইউনিটের প্যারেডের দিকে হাটতে থাকলাম। মনে হলো, এতো শত শত চোখগুলি আমাকে দেখলেও এর মধ্যে শুধুমাত্র দুটু চোখ আছে যা এখন হয়তো জলে ভেসে যাচ্ছে। অথচ বুড়ি আমার কেউ নয়, আমিও বুড়ির কেউ নই।

জীবন বড্ড রহস্যময়।

০২/০৩/১৯৮৬-১ম শীতকালীন অনুশীলনের সমাপ্তি

আগামীকাল আমাদের ‘শীতকালীন অনুশীলন’ বা শীতকালিন মহড়ার শেষ। ক্যান্টনমেন্ট এ ফেরার পালা। সবাই যার যার বাক্সপেটরা মোটামুটি গুছিয়ে রাখছে। আমার তেমন কিছুই নাই। আর থাকলেও রানার আছে, সে ধীরে ধীরে গুছিয়ে ফেলবে। এটা যেনো কেউ দুই মাসের জন্য কোথাও এসেছিলো, আগামীকাল তার ফেরার পালা। অনেক জায়গা দেখা হলো, অনেক অপরিচিত মানুষের সাথে কথা হলো, অনেক গ্রাম গঞ্জ চেনা হলো। হয়তো আবার এখানে কখনো আসি কিনা জানি না। এর আগেও আসা হয় নাই, আবার ভবিষ্যতে আসবো কিনা তাও জানা নাই। যে কোনো জায়গায় কিছুদিন অবস্থান করলে কিছু না কিছু স্মৃতি সাথে থেকেই যায়। কিছু স্মৃতি রেখে যাওয়া হয়। অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়, আর যাওয়ার সময় মনটা যেনো কেমন আনচান আনচান করে। জানি, এখানে থাকার জন্য আসিনি, এটাও জানি এখানে আমাদের কোনো সজন ও নাই, তারপরেও এলাকার মানুষগুলিকে কেমন যেনো ছেড়ে যেতে মনের ভিতর একটা চাপ অনুভুত হয়। সবার হয় কিনা জানি না কিন্তু আমার বেলায় এটা হয়। এখন আমি বাইরে বসে আছি, সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। একটা ক্যাম স্টুলের মধ্যে বসে ডুবে যাওয়া সূর্যের লাল আভাটা এখনো উপভোগ করছি। অফিসাররা অনেকেই এদিক সেদিক ঘুরতে গেছে। কোনো অফিসার নাই বললেই চলে। আমার যেতে ভালো লাগেনি, তাই ক্যাম্পেই আছি। আর তাছাড়া একজন না একজন অফিসারকে ক্যাম্পে থাকতেই হয়। আমিই রয়ে গেলাম। আমি আজো যশোর সেনানীবাস দেখিনি। কাল হয়তো প্রথম দেখতে পাবো। সেটা হয়তো আরেক নতুন পরিবেশ।

রুপদিয়া গ্রামটা আমার বেশ ভালো লেগেছিলো। এর চারিধারে ক্ষেত, আখ ক্ষেত, গাছ গাছালী, মানুষ গুলি অনেক গরীব, তবে চোর মনে হয় নাই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও দেখেছি দলবেধে স্কুলে যায়, বড়রা তাদের গরু ছাগল নিয়ে সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে। মহিলারাও পুরুষদের সাথে মিলে মিশে ক্ষেতে কাজ করে। এলাকায় যখন ইউনিফর্ম পড়ে হাটতাম, বড্ড ভালো লাগতো। অনেক বুড়ো, জোয়ান মানুষেরা খুব সমীহ করতো। কেউ কেউ ছালাম দিতো। আবার অনেকেই তাদের গাছের পেয়ারা, কিংবা ফল মুলাদি অফার করতো। কিন্তু আমি কখনো তাদের থেকে এসব খাইতাম না, খেতে বারন নাই কিন্তু আমার ইচ্ছে হতো না।

আজ আমার ঐ বুড়িমার কথা মনে পড়লো। বুড়িমার কথা মাঝে মাঝেই আমার মনে পড়ে। বেচাড়ি হয়তো আরো অনেকদিন একা একাই সেই গভীর রাতে আখের রস জ্বাল দিতেই থাকবে, তার কোনো সাথী নাই, সংগী নাই। জীবন বড় একা তার। ভাবলাম, যাই একবার দেখা করে আসি। এই কয়দিন আসলে বিভিন্ন কাজের চাপে আর এদিকে আসা হয় নাই। ফলে বুড়িমার সাথে বেশ কদিন দেখাও হয় নাই। কাল চলে যাবো, বুড়িমাকে দেখার খুব ইচ্ছে হলো।

রাতে পিকআপের ড্রাইভারকে বললাম যে, আমি আজ রাতে নাইট গার্ড চেকিং এ যাবো। যদিও আমার ডিউটি নাই। রাত ১ টায় পিক আপ নিয়ে গেলাম সেই বরই গাছটার কাছে। কিন্তু আজ বুড়িমা আখের রস জ্বাল দিতে আসেন নাই। খুব মর্মাহত হলাম এই ভেবে যে, আমি তার বাড়িও চিনি না। নামটাও জিজ্ঞেস করা হয় নাই। তাহলে তাকে এই রাতে খুজে বের করবো কিভাবে? মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। বুঝলাম, বুড়িমার সাথে আমার আর দেখা হলো না। অগত্যা ফিরে এলাম। মনের ভিতরে একটা খচখচ করতে লাগলো, আহা, সম্ভবত বুড়িমাকে না দেখেই আমাকে কাল চলে যেতে হবে। অনেকদিন হয়ে গেলো আসা হয় নাই। নিজেকে একটা অপরাধি মনে হতে লাগলো। কিন্তু মনে আরেকটা প্রশ্ন জেগে উঠলো, বুড়িমার কোনো অসুখ বিসুখ করেনি তো? অথবা বুড়িমা বেচে আছে তো? মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। যে উদ্দেশ্যে আজ নাইট গার্ড চেকিং আমার না থাকা সত্তেও আমি এসেছিলাম, সেটা আর হলো না।

০৫/০২/১৯৮৬-নাইটগার্ড চেকিং এর বিরম্বনা

শীতকালীন মহড়া’ মানেই প্রায় সারা দিনরাতই ইউনিটের ভিতরে কোনো না কোনো অনুশীলন থাকে। ছুটির দিনেও কাজ থাকে। লেপাই পোছাই, এবং রক্ষনাবেক্ষন। সবচেয়ে জুনিয়র অফিসার হিসাবে কোনো কাজ নাই আমার কিন্তু সারাদিন কারো না কারো ডিস্পোজালে আছিই আছি। ইদানিং ইউনিটের  ক্যাঃ গনি স্যার আমাকে রাতের কিছু ডিউটি ভাগ করে দিয়েছেন। রাত ২ টা থেকে ৫ টার মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় নাইটগার্ড চেক করা। আসলেই নাইটগার্ড রাতে ডিউটি করছে নাকি ঘুমিয়ে আছে, এটা অত্যান্ত একটা বিবেচনার বিষয়। তারমধ্যে সিভিলিয়ান এরিয়ায় যখন অনুশীলন এলাকা। তাই এটাকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসাবে দেখতে হয়। যে কোনো সময় যে কোন কাল্পনিক শত্রু (অর্থাৎ সাজানো শত্রু) আমাদেরকে এটাক করতে পারে বিধায় সেন্ট্রিকে জাগ্রত থাকতেই হয়। অনেক অস্ত্র, অনেক গোলাবারুদ, অনেক গাড়িঘোড়া।

কিন্তু প্রতিদিন তো আর রাত জেগে জেগে এই নাইট ডিউটিপোস্ট চেক করতে আর ভালো লাগছিলো না। দোস্ত লুতফরকে বললাম, কিরে দোস্ত, একি শুরু হইলো? প্রতিদিন আমাকেই রাতে ২ টা থেকে ৫ টার মধ্যে এতো দূরে দূরে হেটে হেটে আবার কখনো কখনো পিক আপে করে একা একা ডিউটি চেক করতে কি আর ভালো লাগে? তারমধ্যে আবার সারাদিন কাজেই তো থাকি। ঘুমানোর সুযোগ নাই। কিন্তু আমার লুতফর দোস্ত অপারগ। আদেশ মানেই আদেশ। কিচ্ছু করার নাই তার।

ভাবলাম, আমাকেই একটা বিহিত করতে হবে। কিভাবে এই আদেশ রহিত করা যায়। আমার মনে হলো, অধিনায়ক এটা জানেন না যে, আমার উপর এই রকম একটা টর্চার চলছে। তাই গতকাল একটা বুদ্ধি আটলাম। সেটা এই রকমেরঃ

সিও সাহেবের তাবুর পাশে উপঅধিনায়কের তাবু, তার পাশে এডজুটেন্ট লুতফর সাথে কোয়ার্টার মাষ্টার লেঃ নিজাম স্যারের তাবু, তার পাশেই ক্যাঃ গনি স্যারের তাবু। ব্যাটরীর অফিসারগন তাদের নিজ নিজ ব্যাটরীর লোকেশানে তাবু গেড়ে থাকেন। আমার তাবু সৈনিকদের তাবুর সাথে। প্রতিরাতে নতুন নতুন পাশওয়ার্ড দেওয়া থাকে। যখনই কোনো মানুষ বা সৈনিক অথবা অফিসার ক্যাম্প লোকেশানে আসে, রাতের বেলায় পাশওয়ার্ড চেকিং করার মধ্যে সে নিজেদের লোক নাকি অন্য কোথাকার লোক বা শত্রু পক্ষ সেটা বুঝা যায়। এই পাসওয়ার্ড প্রতিটি ইউনিটের জন্য আলাদা এবং অত্যান্ত গোপনীয়।  আমি যখন নাইটগার্ড চেক করতে যাই, তখন সেন্ট্রি আমাকে চ্যালেঞ্জ করে। তখন এই পাশওয়ার্ড বলতে পারলেই ওরা ধরে নেবে যে, আমি বহিরাগত নই, আমি তাদেরই একজন। এখানে একটা ছোট কৌশলের কথা বলি। পাস ওয়ার্ড সাধারনত দুইটা শব্দে বিভক্ত। যেমন ধরুন ‘গোল্ডেন ড্যাডি’। যখন কোনো সেন্ট্রি কাউকে পাস ওয়ার্ড চ্যালেঞ্জ করে, তখন সেন্ট্রি এই দুই শব্দের যে কোনো একটি শব্দ বলবে। আর যাকে চ্যালেঞ্জ করা হলো, তিনি বাকী শব্দটটা বলতে পারলেই নিজেদের লোক, আর না বলতে পারলেই তাকে চ্যাংদোলা। তো, সন্ধ্যার পরপরই আমি অধিনায়কদের তাবুর পাশে যারা রাতে ডিউটি দেয় তাদের বলে রাখলাম যে, আজ রাতে আমি তোমাদের গার্ড চেক করতে আসবো। তখন ডেমোর মতো আমাকে চ্যালেঞ্জ করবা। অর্থাৎ যখন সেন্ট্রি পোষ্ট চেক করতে আসবো, তারা যেনো আমাকে গলা ফাটিয়ে এমনভাবে সেন্ট্রি চ্যালেঞ্জ করে যেনো পুরু এলাকা শুনতে পায়।

আমি রাত সাড়ে তিনটায় কথামতো অধিনায়কের তাবুর পাশে আসার সাথে সাথে ডিউটিরত সৈনিক গলা ফাটিয়ে আমাকে বলে উঠল,

"থাম............... হাত উপর!! ......এগিয়ে আসুন......... তারপর সে পাশওয়ার্ডের অর্ধেক বল্লো, আর বাকীটা আমি বললাম। মিলে গেলো। সুতরাং আমি বহিরাগত নই এটা প্রমান হলো। কিন্তু

সৈনিকের এতো উচ্চস্বরে চিৎকার করার কারনে সিও সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তিনি আসলেই খুব বিরক্ত হয়ে তাবু থেকে বের হয়ে এলেন। এসে আমাকে দেখে বললেন, কী ব্যাপার আখতার, এতো জোরে সেন্ট্রি চ্যালেঞ্জ কেনো? বললাম, স্যার প্রতিদিন আমি তো রাত ২ টা থেকে ৫ টার মধ্যে নাইট গার্ড চেক করি, তাই ভাবলাম, আমার নিজেরও ঘুমঘুম আসে, আবার ওরাও ঘুমে ঘুমে থাকে অনেক সময়, যদি জোরে চিল্লায়, তাহলে হয়ত ঘুমটা থাকবে না।

অধিনায়ক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, প্রতিদিন তুমি কেনো রাত ২ তা থেকে ৫ টা পর্যন্ত গার্ড চেক করো? বললাম, স্যার এটাতো প্রায় সপ্তাহ খানেকই হয়ে গেলো করছি। আর যায় কোথায়। সিও সাহেবের এমনিতেই মেজাজ খারাপ তারমধ্যে আবার তার আইওর এই অবস্থা। সাথে সাথেই ডাকলেন এডজুটেন্ট আর ক্যা; গনি স্যারকে। অতো রাতে এডজুট্যান্ট আর ক্যাপ্টেন গনি স্যার এই শীতের কম্বল থেকে বের হয়ে এলেন। আর যায় কই? অধিনায়ক দিলেন এক বকা।

ক্যাঃ গনি স্যারের বুঝার বাকী নাই ব্যাপারটা। আর লুতফরও মিটি মিটি হাসছিলো। আগামীকাল থেকে আমার নাইটগার্ড চেকিং বন্ধ। অধিনায়কের আদেশ। আর আদেশ তো আদেশই।

অধিনায়ক বিরক্ত নিয়ে তার তাবুতে ঢোকে গেলেন। গনি স্যার চালাক মানুষ, আমার দিকে তীর্যক একখানা চাহনী দিয়ে এটাই বুঝালেন, তুমি যদি যাও ডালে ডালে, আমি যাই পাতায় পাতায়। বুঝলাম, নাইট ডিউটি বাদ হইলো বটে, কিন্তু নতুন কিছু আসিতেছে।

সামরীক বাহিনীর জীবন, বড় বৈচিত্র্যময়।  মাঝে মাঝে কোল্ডওয়ার হয় নিজেদের মধ্যে।

রাতের বেলায় সাধারনত একটি সেন্ট্রি পোষ্টে দুজন করে প্রহরী থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যে, রাত যতো গভীর হয়, একজন আরেকজনকে ঘুমানোর জন্য সাহাজ্যও  করে, এটা বিপদজনক। তাই প্রতি রাতেই কোনো না কোনো অফিসার প্রতিটি সেন্ট্রি পোষ্ট কয়েকবার করে অকস্মাত চেক করেন।

সবসময় দেখা যায় যে, কনিষ্ঠতম অফিসারদের বেলায় এই রকম ভাগ্যে জুটে যে, প্রায় প্রতিরাতেই তাদের নাইট গার্ড চেক করতে হয়। আর অন্যান্য অফিসারগন নিরিবিলিতে শান্তিতে ঘুমাতে থাকেন। কিন্তু কতোক্ষন, কতোদিন একটানা করা যায়?

০২/০২/১৯৮৬-রুপদিয়ার বুড়িমা

এক্সারসাইজ এরিয়া বেশ বড়। একেক ব্যাটারী একেক জায়গায়। সবাই অস্ত্র, গোলাবারুদ, গান ইত্যাদি নিয়েই থাকে। সিভিলিয়ান এরিয়া, কখনো ক্ষেতের মধ্যে, কখনো আম বাগানে, কখনো জংগলের পাশে, কখনো নদীর ধারে আমাদের ব্যাটারী পজিশন গুলি মোতায়েন থাকে। দিনের বেলায় যথেষ্ট ট্রেনিং চলে, রাতেও চলে, তবে দেখা যায় যে, সাধারনত রাত ১০ টা ১১ তার পরে সব কিছু থিতো হয়ে আসে। তখন ইউনিটের এডজুট্যান্ট সাহেব রাতে সমস্ত গার্ড পোষ্ট গুলি সৈনিকরা ঠিকমতো জেগে পাহাড়া দিচ্ছে কিনা সেগুলি চেকিং করার ব্যবস্থা রাখে। আর এই চেকিং গুলি আমাদের মতো জুনিয়ার অফিসাররাই করে থাকে। সঠকভাবে চেক করা হলো কিনা সেটা আবার চেক ব্যাক করার সিশটেম ও আছে। ফাকির জায়গা কম।

প্রায় প্রতিদিন নাইটগার্ড চেক করতে হচ্ছে। একা একা। অনেক দূর দূর সেন্ট্রি পোষ্ট। চারিদিকে আখক্ষেত। রাতের অন্ধকার, মাঝে মাঝে ভয় লাগে, আবার মাঝে মাঝে শীতের রাত বলে একা একা গভীর রাত ভালই লাগে। একটু আগে আমি নাইটগার্ড চেক করে রুমে ফিরেছি। বাইরে খুব শীত। যশোর অঞ্চলটা শিতে কুয়াশায় রাতে একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও ঘন কুয়াশায় ১০ হাত দূরেও দেখা যায় না, আবার কোথাও কোথাও একেবারে ফকফকা পরিস্কার। আকাসে মেঘ থাকে আবার কখনো কখনো মেঘের ফাক দিয়া চাঁদও দেখা যায়। রাতের আকাশের একটা আলাদা রুপ আছে। যখন সেই গভীর রাতে একা কেউ বের হয়, তখন হরেক রকমের শব্দ, চি চি, ঝি ঝি, কুকুরের হটাত করে ডাক, বাতাসের বেগে কোথাও গাছ ঝন ঝন করে উঠে। একটা অন্য রকম পরিবেশ। এই পরিবেশেই আমি কখনো হেটে কখনো পিক আপ নিয়ে, আবার কখনো কখনো গান গাইতে গাইতে, কিংবা মাউথ অরগ্যান বাজাতে বাজাতে আমি সেন্ট্রি পোষ্টগুলির খুব কাছে চলে আসি। সেন্ট্রি পোষ্ট গুলি থেকে ডুরে এসেই আমি আমার মাউথ অরগ্যান বাজানো থামিয়ে দেই যাতে সেন্ট্রি বুঝতে না পারে কেউ এসছে। সেন্ট্রি জেগে থাকলে যে কোনো দিক থেকেই কেউ আসুক তার দেখার কথা। আর দেখলেই আমাকে চেলেঞ্জ করবে। সেন্ট্রী পোষ্টের চেলেঞ্জের একটা প্রক্রিয়া আছে। পাসওয়ার্ড থাকে দুই শব্ধের। একটা সে আমাকে বলবে আর বাকীটা আমি বল্বো, যদি মিলে যায়, বেশ, নিজেদের লোক। আর যদি না মিলে, তাহলে কাম সারছে। পাগলা ঘন্টা। গার্ড চেক করে শেষে আমি বেশ দূরে একটা বেশ আলর গুন্ডি দেখেছিলাম। ভাবলাম, সেন্ট্রি পোষ্টের গার্ড চেক শেষ করে সেখানে যাবো।

ওখানে গেলাম, গিয়ে দেখলাম, একজন বুড়ী। বুড়ি মহিলার সাথে প্রায় ২ ঘন্টা কাটালাম। আমার সব গার্ড চেক করা হয় নাই। তারপরেও আমি এই বুড়ি মহিলার সাথে বেশ অনেক্ষন সময় কাটালাম। অদ্ভুত সব মানুষের জীবন কাহিনী। পৃথিবীর চারিদিকে, আনাচে কানাচে, সর্বত্র একেকটা মানুষ একেকটা জলন্ত উপন্যাশ। 

এই বুড়িকে পেয়েছিলাম আসলে অন্য একটা কারনে। প্রথমবার গার্ড চেক করার সময় রাতের অন্ধকারে আমি মেঠোপথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপরেও হাটতে হাটতে এগিয়ে দেখি, একটা বরই গাছের নীচে আগুন জ্বলছে। খুব শীত, ভাবলাম, কি জানি কোথায় এসে পড়েছি। যাক, একটু আগুন তাপাই আগে। শরীরটাও আর চলছে না। গাছটার কাছে যেতেই দেখলাম, প্রায় ৬০/৬৫ বছরের এক বুড়িমা, আখের রস জ্বাল দিচ্ছেন। একদম একা।

কাছে গিয়ে বললাম, বুড়িমা, তুমি এতো রাতে একা কি করছো? বুড়ি আমার কথা শুনেছে কিনা জানি না। সে কোনো উত্তর করলো না। আমি আরো কাছে গিয়ে বেশ জোরেই বললাম, বুড়ি মা!! কি আখের রস জ্বাল দিচ্ছো? এইবার বুড়ি মনে হয় শুনেছে। উত্তর করলো,

কে গা তুমি?

বললাম, আমি তোমার নাতি।

বুড়ি সম্ভবত আসলেই আমি তার নাতী মনে করে এগিয়ে এলো। ভালো করে হয়তো খেয়াল ও করেনি আমি সামরিক পোষাক পড়া এক ভিন দেশী যুবক। একটা পুরানো কাসার মগে আমাকে গরম গরম আখের রস খেতে দিলো। যখন সে আমাকে কিছুটা দেখেছে, তার সন্দেহ হয়েছে, আমি তার নাতি না। সে পাশে রাখা কুপিটা হাতে নিয়ে একেবারে আমার মুখের কাছে এনে হাত দিয়ে মুখে স্পর্শ করে বল্লো,

-আহা রে বালা কইরে চোহেও কিছু দেহি না। তুমি কে গো?

সে অবশেষে বুঝলো আমি আসলে একজন ফৌজ। কিন্তু তাতে তার কোনো অসুবিধা নাই। বল্লো, হামাক তো এখন আর চাওয়াল থাইকাও নাই, কোনো চাওয়াল নাইরে বাপ, তুমি হামাক দাদী বইলছ, তুমিই হামাক নাতি। যশোরের ভাষা। কিছুটা এখন বুঝি। প্রথম প্রথম অনেক কিছুই বুঝতে পারতাম না।

খুব আন্তরীক। ভালো লাগলো। আমি আমার ক্যাম স্টুলটা পেতে চেয়ারের মতো করে বুড়ির কাছে বসে গরম আখের রস খাচ্ছি আর মাঝে মাঝে এই প্রশ্ন ঐ প্রশ্ন করছি। বুড়িও খুব মজা করে করে উত্তর দিচ্ছে। আমি যশোরের ভাষাটা ভালো বলতে পারি না, ভালো বুঝিও না। তাও বলছি।

জিজ্ঞেস করলাম, এতো রাতে শীতের মধ্যে তুমি একা একা এখানে আখের রস জ্বাল দিচ্ছো, আর কেউ নাই? ভয় করে না? 

বুড়ি অনেক্ষন চুপ থেকে বল্লো (সে যশোরের আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলি বলেছে কিন্তু আমি সেই ভাষাটা ভাল বলতে পারি না বলে নিজের ভাষায় লিখছি),

'মানুষ যখন বূড়ো হয়ে যায়, তখন সে আর কোনো কাজে লাগে না। তখন যে কাজগুলি অন্য সবার আরাম কেটে নেয়, সেই কাজগুলিই তাদের করতে হয়। এটাই এই সংসারের নিয়ম।' আর ভয়? সেটা এক সময় ছিলো। জীবনের ভয়, যৌবনের ভয়, ঘর পাওয়ার ভয়, ঘর হারানোর ভয়, আরো কতো কি!! এখন ওসব আর মনে আসে না। যেটা সবসময় মনে আসে, তা হলো, কবে যাবো। 

কিছুই বললাম না। অনেক মারাত্তক অভিমান, অনেক কষ্ট, অনেক না পাওয়ার বেদনা, জীবনের কাছে হেরে যাওয়ার আক্ষেপ, সবই ছিলো বুড়িমার এই ছোট কিছু কথায়। আবারো প্রশ্ন করলাম, বুড়িমা, দাদু আছে নাকি নাই?

নাহ, তোর দাদু মইরা গেছে সেই গত মাঘ মাসের আগের তিন মাঘ মাস আগে। সে থাকলে কি আর আমাকে এই রাতে আখের রস জ্বাল দিতে দিত?

বললাম, দাদুর সাথে কি প্রেম করে বিয়া করছিলা?

হেসে দিয়ে বল্লো, আরে না, আমাদের সময় কি আর প্রেম ছিলো? আমাদের সময় ছিলো মুরগীর বাচ্চার মতো ধরে পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া কোনো এক খদ্দেরের কাছে তুলে দেওয়া। এতে না ছিলো প্রেম, না ছিলো কোনো সপ্ন। হয়তো কেউ এই পরিস্থিতিতে সপ্ন দেখে, সপ্ন সফল হয়, প্রেম আসে, প্রেম সফল হয়। সবার হয় না। 

বললাম, তাহলে বিয়ে হইলো কিভাবে?

বুড়িমা আমার মগখানা নিয়া আবারো আরেক মগ আখের গরম রস দিয়া বল্লো,

'আমার বয়স তখন ১০ বছর। গ্রামের ছেলেমেয়েরা সবাই দল বেধে এখানে যাই ওখানে যাই, গ্রামে কাবাডি খেলা হয়, আমরা মেয়েরা দূর থেকে কাবাডি খেলা দেখি, পহেলা বৈশাখ হয়, আমরা মেলায় যাই, কত কিছু করতাম!! একদিন দেখি আমার চাচা চাচিরা আমাকে বল্লো, আমার নাকি বিয়া। বিয়া কি জিনিষ তাও বুঝি না। আমি বললাম, আচ্ছা। আমার বিয়া হইয়া গেলো। কাকে কি করলাম, কি বললাম, কি করতে হবে, কি কাজ আমার কিছুই বুঝি না। শশুড় বাড়িতে গিয়া বুঝলাম, আমার শাড়ি পরার নিয়ম, আমার আর গ্রামে কাবাডি খেলা দেখার সুযোগ নাই, মেলায় যাওয়া আমার জন্য নিষিদ্ধ। ঘরের অনেক কাজ, অথচ আমার কোনো অভিজ্ঞতাই নাই। পালাইয়া আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাবা মায়ের কঠিন শাসনে মনের ইচ্ছা আর সাধ আহলাদ কোনো কিছুই আর আমার নাই। এইতো সংসার করতে করতে বাল বাচ্চা হইয়া গেলো। ওরা যার যার মতো ভালই আছে, শুধু আমিই রয়ে গেছি একা।

বুঝলাম, বুড়িমা ইমোশনাল হয়ে গেছেন। চুলায় কাঠ খড়ি দিচ্ছেন, আর কি যেনো ভাবছেন। চুলার আলোয় আমি বুড়িমার মুখখানা দেখলাম, তিনি তার শাড়ির আচল দিয়ে মুখখানা মুছলেন, সম্ভবত বুড়িমা কাদছেন। চোখের পানি এমন এক জল, যা কাউকে না দেখালেও সে তার ভাষা জানান দেয়, মুখের উপর তার রেখা এটে দেয়, চোখ আর সেই আগের চোখ থাকে না। চোখের বেদনাকে লুকানোর কোনো বৈজ্ঞানিক পন্থা আজো আবিষ্কার হয় নাই।

আমি আর তাকে কোনো অতীতের ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করলাম না। বললাম, আজ কি খেয়েছে রাতে?

অনেক্ষন চুপ করে থেকে বললেন, বাড়ির পাশে জংগলে কলমি শাখ ছিলো, সেটা দিয়ে রাতে ভাত খেয়েছেন। তরকারী বলতে সেটাই। খুব ব্যথা অনুভব করলাম। অনেক বয়স্ক একজন মানুষ, কিন্তু দেখার কেউ নাই। আমি বুড়িমাকে পিছন থেকে তার মাথাটা শক্ত করে আমার বুকের কাছে টেনে ধরে বললাম, 'বুড়িমা, তুমি আমার বুড়িমা, আমি তোমার এখানে প্রতিদিন আসবো।'

বুড়িমা বল্লো, চলে যাইবা এখন? বসো, নাও, আরেক মগ রস খাও। বুঝলাম, বুড়িমার ভালো লাগছে আমার সঙ্গ। আমি আরো কিছুক্ষন থাকলাম বুড়িমার সাথে। যখন চলে আসবো, আমি বুড়িমাকে ৫০ টাকার একটা নোট হাতে দিয়ে বললাম, এটা তোমার পানের পয়সা। আমি সময় পাইলেই আবার আসবো।

তখন রাত প্রায় ৫ টা বাজে। সকাল হয়ে আসছে, রুমে যেতে হবে। আমি  যখন বিদায় নেবো, বুড়িমা আমার মাথা, মুখ, হাত, পিঠ, বুলিয়ে দিয়ে কি যেনো বললেন, বুঝতে পারি নাই, তবে তিনি যে আমার জন্য দোয়া করলেন সেটা বুঝতে পেরেছি।

আমি রুমের দিকে যে পথ দিয়ে এসেছিলাম, সেই দিকে আবার হাটা দিলাম। আজকে আর বাকী গার্ড গুলি চেক করার ইচ্ছা হলো না।

বারবার বুড়িমার মুখখানা ভেসে আসছিলো। তখন চারিধারে কিছু পাখীর কিচির মিচির শব্দ শুনা যাচ্ছিলো। নতুন আরেকটি দিনের গর্ভপাত হচ্ছে এই পৃথিবীতে। অনেক দূরে মাইকবিহীন ভোরের আজান ভেসে আসছিলো মনে হলো। প্রতিটি দিন আর প্রতিটি রাত কখনোই এক রকম নয়। কোনো রাত বড্ড ভারী, কোনো রাত হয়তো একেবারেই হালকা, আর আজকের এই রাতটা আমার যেনো ভাড়ির চেয়েও ভারী মনে হলো। আমার মায়ের কথা মনে পড়লো, আমার সেই পুরানো গ্রামের কথা মনে পড়লো। মাকে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছিলো। 

০৭/০১/১৯৮৬ রুপদিয়া অনুশীলন ক্যাম্প

এর মধ্যে আমার নতুন পোষ্টিং হয়ে গেলো। ছিলাম রোমিও ব্যাটারীতে, এখন পোষ্টিং করা হলো হেড কোয়ার্টার ব্যাটারীতে। আর সেখানে আমাকে ইউনিটের আইও (ইন্টিলিযেন্স অফিসার) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মজার একটা নিয়োগ। এটা শুনতে যতোটা গোয়েন্দা গোয়েন্দা মনে হচ্ছে, আসলে এটা তার ধারে কাছেও নাই। আমি এই আইও হিসাবে আসলে অধিনায়কের সরাসরি রানার হিসাবে কাজ করছি। রোমিও ব্যাটারী থেকে হেড কোয়ার্টার ব্যাটারিতে পোস্টিং হ ওয়ায় সব কিছু তে একটু বদল হলো, তার কারনটা পরে বুঝেছি যে, যেহেতু আমি সারাক্ষন অধিনায়কের রানারের মতো, ফলে একটু আধটু যেনো সবাই বেশী সমীহই করে। তাবু তাবুর জায়গায়ই তাবু থাকলো। মানে সৈনিকদের কাতারে। জনবলের হিসাবে আমি শুধু এখন হেডকোয়ার্টার ব্যাটারীতে সামিল। সিও সাহেব কখন কোথায় যাবেন, তার সিগারেট প্যাকেট নিয়েছেন কিনা, চশমাটা তিনি চোখের বদলে অন্য কোথাও রেখেছেন কিনা, তার হাতের লাঠিটা ঠিকমতো হাতে আছে কিনা, তার ফাইলপত্র বাহক হিসাবে আমি ফাইল পত্র নিয়েছি কিনা, কেউ তাকে কিছু দিলে সেটা আমি ক্যারি করছি কিনা। আবার সেটা ইউনিটে এসে কন্সার্ন লোকের কাছে দিচ্ছি কিনা, এইসব আসলে আইও সাহেবের কাজের প্রধান অংশ। সিও আনিস স্যার খুব রিজার্ভ মানুশ, অহেতুক খাটায় না। আদরই করেন। তার বড় মেয়ের নাম ফাতেমা। বেশী বয়স নয়। হয়ত ক্লাস এইটে পড়ে। কথায় কথায় জেনেছিলাম।

ব্যস্ততার শেষ নাই। আবার কোনো কাজ যে করছি সেটাও না। ছুটি ছাটাও নাই। আর আমি ছুটি ছাটার জন্য কোনো পেরেশানও করি না। কারন ঢাকায় গেলে আমার নিজেরও তো কোনো স্থায়ী ঠিকানা নাই। সেই গ্রাম। আর গ্রামে গিয়ে বেশীদিন থাকতেও ইচ্ছে করে না। বস্তুত একা মানুষের জীবনের চাহিদা কম। তবে তাদের বেচে থাকার জন্য অনেক পেরেশানী থাকে। এইজন্য এইসব একা মানুষ সারাক্ষন একটা মানষিক ক্লান্তিতে থাকে। আমারও তাই।

যখন কোনো অফিসারকে যে কোনো কারনেই হোক, কোনো এপয়েন্টমেন্ট দেয়া যায় না কিন্তু একটা তো কিছু দিতেই হবে, তখন এই আইও এপয়েন্টটা বড় জ্যাক একটা। লাগানো যায়। এই ব্যাপারটা ইউনিটের মোটামুটি সবাই জানে আর বুঝে। স্পেয়ার প্লাগ আর কি। তবে ২লেঃ এর উপরে আইও আজো আমি কাউকে দিতে দেখি নাই।

যদিও আমি অধিনায়কের আইও, কিন্তু কোচিং বন্ধ নয়। প্রতিদিন গান ড্রিল, টি এ (ট্যাকনিক্যাল এসিষ্টেন্ট), আর বোর্ড প্লটিং সহ বিভিন্ন লগারিদমের বৈ নিয়া বড় বড় অংক সাথে গানের এলিভেশন, ডিফ্লেকশন সুচারু রুপে বের করা চলছেই। আর আমার এন সি ও কোচিং শিক্ষকরা যতো পারে রাতে ব্যস্ত রাখার জন্য এমন এমন ভারী ভারী হোমওয়ার্ক দিতে থাকে যে, সারাদিনের পরিশ্রমের পর রাত ২ টা ৩ টা বেজে যায় শুধু এসব হোমওয়ার্ক করতে করতেই। ওদেরই বা দোষ দেই কিভাবে? পরেরদিন ব্যাটারী কমান্দাররা, উপ-অধিনায়ক সাহেব রাজার হালে নাস্তা করে ডিপ্লয় মেন্ট এরিয়াতে এসেই জিজ্ঞেস করে- প্রশিক্ষনের অগ্রগতি কি? হোম ওয়ার্ক দিয়েছে কিনা, আর সেই হোম ওয়ার্ক আমি শেষ করেছি কিনা, করলে আমার জ্ঞান কতটুকু, আমি কি বোধাই নাকি একটু মনোযোগী এই ফিডব্যাক তো তাদের দিতে হয়। আমার প্রশিক্ষক হলো হাবিলদার বারেক আর মন্ডল। বারেক পাতলা পোতলা মানুষ, এরা যদিও নন মেট্রিক কিন্তু এল্গোরিদম, লগারিদম, ইত্যাদিতে বেশ পাকা। আর মন্ডল কখন যে পান চিবায় না সেটা খুজে বের করা সম্ভব না। সারাক্ষন হাসি খুশিতেই থাকে। ভারিক্কি একটা ভাব আছে কিন্তু আমি যে একজন অফিসার সেটা তার কখনো ভুল হয় না। এস এম হাসেম সাহেব মাঝে মাঝে খোজ খবর নেয়, আর বলে, স্যার, কষ্ট হবে, চিন্তা কইরেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। কি ঠিক নাই আর কি ঠিক হয়ে যাবে সেটাও আমি মাঝে মাঝে বুঝি না। তবে সে যে একজন ফাদারলী মানুষ, দেখলেই বুঝা যায়। রোমিও ব্যাটারির বিএইচএম (ব্যাটারী হাবিলদার মেজর) ছিলো সাইদুর রহমান। ভারিক্কি মেজাজ তবে বেশ ভালো। যদিও আমি আর রোমিও ব্যাটারিতে নাই, তারপরেও আমার বেশ খোজ খবর রাখে।

দিন চলে যাচ্ছে এক এক করে।

০২/০১/১৯৮৭-কোর্স শেষে যশোর ফেরত,

শুক্রবার যশোর ক্যান্টনমেন্ট-

কোর্স শেষ করে যশোর ক্যান্টনমেন্টে আবার ফিরে এসেছি। এই গ্যারিসনে আমাদের ১৩ লং এর অনেকগুলি অফিসার আমরা। লেঃ আকবর, লেঃ ইকবাল, লেঃ মাহফুজ, লেঃ ভাওয়ালি, লেঃ বারি, লেঃ এনাম, লেঃ শাহিন। লেঃ মইন, লেঃ আশফাক, লেঃ রুসদ, লেঃ আমির, লেঃ ইসা, এরা তো শুধু আমার ১৩ লং কোর্সের দোস্তরা।  কিন্তু বেসিক কোর্স করার পর ১৪ কিংবা ১২ লং কোর্সের অফিসাররাও এক রকমের কোর্সমেটদের মতোই হয়ে গেছে। ভালো সময় কাটছে কোর্সের পর থেকে ইউনিটে।

নতুন ব্যাটরী কমান্ডার মেজর ইশহাক স্যার। তার সাথে লুতফুল স্যার অন্য ব্যাটরী কমান্ডার। ওয়ালি স্যার হচ্ছেন ইউনিটের টুআইসি। সারাক্ষন সিগারেট খান। আর ইউনিটের সিও হচ্ছে কর্নেল মামুন স্যার। বেসিক কোর্সে যাওয়ার সময় অধিনায়ক ছিলেন লেঃ কর্নেল আনিস স্যার, এখন লেঃ কর্নেল মামুন স্যার এসেছেন। কোনো কিছুতেই ভালো জ্ঞ্যান নাই। ফলে টুআইসি এবং ব্যাটারি কমান্ডারগন যার যার মতো করে স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কমান্ডার স্ট্রং না হলে বা কমান্ড স্ট্রং না হলে এমনই হয়। নতুন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মামুন স্যারের প্রথম দরবারের কথা আমার মনে পড়লে কেমন যেনো লাগে। তাহলে একটু বলিঃ

লেঃ কর্নেল মামুন স্যার দেখতে ললিপপের মতো। খুব রুচীশিল বলে আমার ধারনা কিন্তু আর্টিলারী খাতে ওনার জ্ঞ্যান খুব সীমিত। অবশ্য উনি এই ব্যাপারে কারো উপর মাষ্টারী করতেও চান না। উনি দরবারে বললেন, আমি রংপুর সেনানীবাসে ডিকিঊ থাকার সময় আমার উপর একটা গুরুদায়িত্ত ছিলো প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের মাকে দেখভাল করা। এরশাদ সাহেব আমার এই কাজে অনেক সন্তুষ্ট এবং এই সন্তুষ্টির কারনেই আমার মেজর থেকে লেঃ কর্নেল পদে প্রমোশন। ফলে আমি আর এর বেশি হয়ত প্রমোশন পাবো কিনা জানি না, তবে আমি খুশী যে, অন্তত অধিনায়ক হিসাবে আমি একটা সুযোগ পেয়েছি। আমি আমার কোরের উপর যে খুব ভালো জ্ঞ্যান রাখি, তাও না। তবে আমি যা চাই, আপনারা এমন কোনো কাজ করবেন না যাতে আমি আমার উপরের কমান্ডারদের কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়। টাইম মতো প্যারেডে আসবেন, অফিসে আসবেন, ব্রিগেড বা ডিভিশন থেকে যে কাজ দেয়, সেগুলি আমি সবাইকে ভাগ করে দেবো, টু আই সি সাহেব ভাগ করে দেবেন, আপনারা সবগুলি কাজ ভালোভাবে করবেন, তাহলেই আমি সফল হতে পারবো। চুরি ডাকাতির কোনো কাজ যেনো না হয়, ছুটিতে গেলে সময় মতো ফিরে আসবেন, কারো কোন আকামের জন্য আমি কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। আমি জানি আমার আর কোনো প্রমোশন হবার সম্ভাবনা নাই, তাই আমি কাউকে পরোয়াও করি না। 

যাই হোক, এই ছিলো অধিনায়কের প্রথম দরবারের ম্যাসেজ। তিনি পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বেশী পছন্দ করেন, এই ব্যাপারে কোনো ছাড় নাই। তার একটিই ছেলে, মুনতাসির মামুন। তিনি এবং তার স্ত্রী খুব ভালো একজন পরিবার। এই জাতীয় অনেক কথা। কতটা প্রোফেশনাল আর কতোটা পারিবারিক সে কথা অধিনায়ক সাহেব এই দরবারে বলার মাপকাঠি জানেন না। তারপরেও অধিনায়ক, বলতেই পারেন।

সামনের সপ্তাহে শীতকালিন অনুশীলন শুরু হবে। ৫৬ দিনের অনুশিলন। খারাপ লাগে না। ইউনিটে অনেক মজার মজার অফিসারগন আছেন। ক্যাপ্টেন গনি স্যার (এইট লং কোর্সের), নাইন লং কোরসের আছেন রাজ্জাক স্যার, সারাক্ষন অফিসার হিসাবে তিনি অনেক ভালো এবং তার অনেক কোয়ালিটি আছে এইটা প্রমান করতেই ব্যতিব্যস্ত। তিনি সৈনিক র‍্যাংক থেকে পরবর্তীতে অফিসার পদে এসেছেন বলেই হয়তেটা তার কাছে একটা বাতিক কিন্তু আমরা যারা রেগুলার অফিসার হয়ে আর্মিতে এসেছি, সেটা নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না। দশ লং কোর্সের লেঃ আমিন স্যারের জুরি নাই। মেয়েলী গলায় সুন্দর কথা বলতে পারেন আর মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ত করার ঊনার কোনো জুরি নাই। কিন্তু মানুষটা চমৎকার। লেঃ নিজাম স্যার হচ্ছেন আমার খুব পছন্দের একজন মানুষ। আমাদের মীরপুরের বাসিন্দা তিনি। আমি বেশীর ভাগ সময় নিজাম স্যারের সাথেই কাটাই। তিনি আমাদের কোয়ার্টার মাস্টারের দায়িত্তে আছেন। ১২ লং কোর্সের আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু হচ্ছে লেঃ লুতফর। আপাতত এডজুট্যান্ত হিসাবে কাজ করছে। আমার রুমমেট।

৩য় লং কোর্সের মাহবুব স্যার মাই ডিয়ার লোক। দারুন মানুষ। ভালো মানুষ। পিচ্চি পুচ্ছি দু একটা ২ লেঃ আছে তার মধ্যে ১৪ লং কোর্সের আলমগীর, আমাদের মানিকগঞ্জের ছেলে। ভালো ছেলে, লাজুক গোছের। আর বরিশালের হেমায়েত করিম এই কয়দিন আগে কমিসন পেয়ে ৪ মরটারে এসেছে। এখনো পুব পশ্চিম কিছুই চিনে না। চিনে যাবে। 

একটু ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। সামনে শীতকালিন অনুশিলনের কারনে সবাই বেশি খাটাখাটি করাচ্ছে এবং করছে। আমাকে এডজুট্যান্ট বানানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু আমার এই সময় বেশি আগ্রহ নাই। দেখা যাক সিও সাহেব কি করেন।

মিতুলকে সময় দিতে পারছি না। তবে চিঠি লিখা অব্যাহত আছে।

০১/০১/১৯৮৬ রুপদিয়া অনুশীলন এলাকা, যশোর

গত ৩১ ডিসেম্বর তারিখে ৪ মর্টার রেজিমেন্টে আর্টিলারীতে আমার আগমন হয়েছে। অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আনিস, উপঅধিনায়ক হিসাবে আছেন মেজর ওয়ালি উল্লাহ স্যার। ঊনি জেআরবি (জাতীয় রক্ষী বাহিনী) এর অফিসার। এখানে একটু বলে রাখি, জেআরবি মানে কি। জেআরবি হচ্ছে 'জাতীয় রক্ষী বাহিনী'। জাতীয় রক্ষীবাহিনী একটি নিয়মিত আধাসামরিক বাহিনী যা নবপ্রতিষ্ঠ বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে গঠন করা হয়। শুরুতে মুজিব বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এই বাহিনীর পত্তন করা হয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে এই বাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। ক্যাপ্টেন এ এন এম নূরুজ্জামানকে রক্ষীবাহিনীর প্রধান করা হয়। আনুষ্ঠানিক নাম জাতীয় রক্ষীবাহিনী হলেও সাধারণত এই বাহিনীকে ‘রক্ষীবাহিনী’ বা সংক্ষেপে জেআরবি (JRB) বলে অভিহিত করা হতো। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে শেখ মুজিব নিহত হবার পর এই বাহিনী অবলুপ্ত করা হয়। অবলুপ্ত হওয়ার পর রক্ষীবাহিনীর অনেক সদস্য নিয়মিত সামরিক বাহিনীতে আত্মীকৃত হন। মেজর ওয়ালী স্যার সেই আত্তীকরনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। আমি রোমিও ব্যাটরীর এজিপিও (এসিস্ট্যান্ট গান পজিশন অফিসার) হিসাবে পোষ্টিং পেয়েছি। ছোট ছোট অফিসারদের মধ্যে আছে আমার কলেজের ব্যাচম্যাট লেঃ লুতফর রহমান (১২ লং কোর্সের), লেঃ নিজাম স্যার (১১ লং কোর্সের), লেঃ আমিন স্যার (১০ লং কোর্সের), লেঃ রাজ্জাক স্যার (৯ লং কোর্সের)। লেঃ গনি স্যার (৮ম লং কোর্সের)। ক্যাপ্টেন মাহবুব (৩য় লং কোর্স), সাথে ক্যাঃ শওকাত আলী বুলবুল স্যার, তিনিও ৩য় লং কোর্সের। ব্যাটরী কমান্ডার আছেন মেজর লুতফুল স্যার, আছেন মেজর ইসহাক স্যার।

ইউনিট অনুশীলনে আছে রুপদিয়ায়। ৫৬ দিনের অনুশীলন। সবাই ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকে এই সময়। শীতকাল, তাবুর জীবন। আমার তাবুটি একেবারে সৈনিকদের সাথে লাগানো। বাথরুম করার জন্য বদনা হাতে নিয়ে সৈনিকদের টয়লেটেই যেতে হয়। একটু একটু লজ্জা লাগে। কেমন দেখা যায় যে, একজন অফিসার পায়খানা করার জন্য হাতে বদনা নিয়ে প্রায় ১০০ গজ দূরে পায়খানার জন্য যাচ্ছে, আর এটা প্রায় সব সৈনিকদের সামনে দিয়েই। 

ইউনিটে আসার পর সিনিয়ররা এমন এমন সব ব্যবহার করলেন, কই একটু খেদমত টেদমত করবেন, তা না। বরং কেউ মেস ওয়েটার সেজে, কেউ আর্দালী সেজে কেউ বা আবার নকল অধিনায়ক সেজে আমাকে কিভাবে নাস্তানাবুদ করা যায় সেইসব চেষ্টার কোনোই বাকী রয় নাই। মেডিক্যাল চেকআপের নামে ডাক্তার সেজে আসা এক অফিসার তো আমাকে রাতের বেলায় একেবারে দিগম্বর করে সবার সামনে ঘটার পর ঘন্টা রাতের কালো অমাবশ্যা রাতে দাড় করিয়েই রাখলো, তাও তো প্রায় ঘন্টা দুয়েক হবে। বুঝতেছি কি হচ্ছে, কিন্তু কিছুই বলার নাই, কিছুই করারও নাই।

শুধু একফাকে আমার দোস্ত লুতফর এসে বল্লো, পালন করে যা, যা বলছে। তা না হলে ঐ যে দেখছিস পুকুর, সারারাত ওখানেই কাটাতে হবে। লুতফরকে দেখে প্রানে একটু আশার বানী পেয়েছিলাম বটে কিন্তু মাত্র ৬ মাসের সিনিয়ার সে আমার কাছ থেকে, তার অবস্থা হয়তো একটু পুরানো কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ওর গায়ের থেকে সেই বিএমএ এর শিটপটের গন্ধ মুছে গেছে। সেও এক প্রকার ভয়ে ভয়েই জীবন চালায়। লুতফর আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু। আমরা মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৫ ইনটেকের ব্যাচের ছাত্র। লুতফর ছিলো আমাদের কলেজ ক্যাপ্টেন।

যাক, শেষ হয়েছে সেদিনের তাদের নতুন অফিসারের সাথে রংগলীলা। পরেরদিন অধিনায়কের সাথে আমার ইন্টারভিউ হলো। বিশাল বড় তার তাবু। সামরীক বাহিনীর লোকেরা যে একটা তাবুকে এই রকম বালাখানা করিয়ে ফেলতে পারে, অধিনায়কের তাবু না দেখলে বুঝা যাবে না। টিভি, ফ্রিজ, আলীশান টেবিল, নীচে কার্পেট সবই আছে। অধিনায়ক আমাকে অনেক কিছু জানালেন, বুঝালেন, এবং বললেন, এই সামরীক বাহিনীর চাকুরীতে সবচেয়ে বেশি জরুরী হলো নিজেকে সামরীক বাহিনীর আদলে শিক্ষিত করে তোলা। খুব ভালো লাগলো অধিনায়কের কথা।

আমার দোস্ত লুতফর একটু পরে এলো। শুনলাম সে নাকি ইউনিটের এডজুটেন্ট। খুব পুলকীত হবার কারন নাই। গত কয়েকদিনে আমার ৬ বছরের ক্যাডেট কলেজের বাল্যবন্ধু লুতফরও অনেক পালটে গেছে। সামরিক জীবনে সিনিয়ার জুনিয়ারের মাহাত্য না কেউ বুঝলে তার কপালে দুঃখ আছে। এখানে যেনো আগের ইতিহাসের কোনো মুল্য নাই। থাকলেও সেটা খুবই কিঞ্চিত। এখানে কাজ করে জুনিয়রিটি আর সিনিয়রিটি। লুতফর আমার সিনিয়র। এটাই বড়।

সারাদিন কম্বেট ইউনিফর্ম পড়ে কোমরে একটা পিস্তল ঝুলিয়ে ম্যাপ আর বাইনোকুলার সাথে নিয়ে অগোছালো ক্ষেতের আড়, জংগল, কবরস্থান, সব কিছুই যেনো আমাদের চলার পথ, থাকার পথ, যুদ্ধ খেলার পথ। যেহেতু আর্টিলারীর কিছুই জানি না, তাই, আমার জন্য বেশ কিছু চতুর আর চৌকশ এনসিও বরাদ্ধ করা হলো যেনো আর্টিলারীর আদিপান্ত আমাকে শিখানো হয়। যাকে বলে বিনে পয়সায় কোচিং। এর মধ্যে আমার দোস্ত লুতফরও সামিল।

৩১/১২/১৯৮৫ রুপদিয়া অনুশীলন ক্যাম্প

বিএমএ থেকে পাওয়া ১০ দিনের ছুটি শেষ। পোষ্টিং অর্ডার হয়েছে যশোরে। যশোর সেনানীবাস, ৪ মর্টার রেজিমেন্ট আর্টিলারী। কখনো এর আগে যশোর আসি নাই। এবারই প্রথম। এই একটু আগেই ইউনিটে এসে পৌঁছলাম। সে এক নতুন অভিজ্ঞতা।

আমরা কয়েকজন একসাথে ঢাকা থেকে যশোরে এসে পৌঁছলাম। আমি, ২লেঃ এমদাদুল বারী, ২ লেঃ আশফাকুল বারী। নামলাম মনিহার সিনেমা হলের সামনে। মনিহার সিনেমা হলে নেমে পাশেই রেলওয়ে স্টেশনে চলে গেলাম কারন ইউনিটে বলা ছিলো যে, আমরা যশোর রেলওয়ে স্টেশনে থাকবো যেখান থেকে ইউনিটের গাড়ি আমাদেরকে পিক করবে। যদিও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিং কিন্তু আমাদের যেতে হবে সেখানে যেখানে আমাদের ইউনিট শীতকালীন অনুশীলনে করছে। নাম রুপদিয়া। আমি চিনি না। ইউনিট থেকে গাড়ি গিয়েছিলো আমাকে আনার জন্য।

অনেক্ষন বসে আছি আমি আর ওরা। কে যে আসবে তাকেও আমি চিনি না। সিগারেট খাচ্ছি আর বসে বসে যাত্রীদের আনাগোনা দেখছি। ওয়েটিং রুমে বসে আছি। প্রচুর যাত্রী। আমরা ভগ্ন সাস্থ্য ওয়ালা, গলাছিলা মুরগীর মতো হেয়ারকাট নিয়ে বসে আছি। আমরা যেমন যাত্রীদেরকে দেখছি, কিছু কিছু যাত্রী উতসুখ নয়নে আমাদেরকেও দেখছে। হয়তো ভাবছে-কিরে ভাই, এমন পোলাপান গুলি এভাবে হেয়ারকাট নিয়েছে কেনো?

পড়নে আমাদের সাহেবী পোষাক। বারী আবার হেট পড়েছে। ওর বাবা সিনেমার ফটোগ্রাফার। হয়তো সেই নায়ক নায়ক ভাবটা গত দুই বছের তড়েনিং এ ও পুর্ন বিলুপ্ত হয় নাই। এমন সময় একজন হালকা পাতলা ফৌজ, মুখে গোপাল ভাড়ের রাজার মতো গোফ, কিন্তু পরনে সামরীক ইউনিফর্ম, এসে হাজির। ওয়েটিংরুমে এসেই বল্লো, এখানে কে লেঃ আখতার স্যার? আমি তাকিয়ে দেখলাম, বেশ স্মার্ট একজন সৈনিক।

আমি সাড়া দিতেই সে আমার ব্যাগ গুছিয়ে একাই কাধে তুলে নিল, আমাকে গাড়ি কোথায় আছে দেখিয়ে বল্লো, স্যার, আমাকে ফলো করেন। গিয়ে দেখি একটা পিকআপ। পিকআপের সেকেন্ড সিটে বসলাম। ড্রাইভার আছে। নাম জব্বার। যে আমাকে আনতে গিয়েছিলো সে পিকআপের পিছনে গিয়ে বসলো। আগেই বলেছি- যশোর আমার এই প্রথম পদার্পন। কখনো আসি নাই। এই প্রথম। একটু একটু কেমন যেনো লাগছিলো।

গাড়ি বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর ড্রাইভার রাস্তার একপাশে থামিয়ে বল্লো, স্যার এসএম (সুবেদার মেজর) সাহেব বাজারে গেছেন, ঊনি এইখান থেকে উঠবেন। এস ম সাহেব কি, কে বা কি তার কাজ আমার কিছুই জানা নাই। বললাম, ওকে।

প্রায় ১০ মিনিট পর এসএম সাহেব এলেন। হাতে তার বাজারের একটা পোটলা। গায়ে ইউনিফর্ম, মাথায় টুপী নাই তাই তার টাক মাথা পুরুটাই রোদে চিকচিক করছে। আমার কাছে এসে সালাম দিয়ে বললেন, স্যার ভালো আছেন? আমি ইউনিটের এসএম হাসেম।

ওনার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, বয়স আমার থেকে প্রায় ডাবল। চুল একখানও নাই। মোটা একটা মানুষ। খুব বেশি কথা বলার নাই। হাসেম সাহেব উঠে গেলেন পিকআপের পিছনে। গাড়ি ছুটে চল্লো গন্তব্যের দিকে। প্রায় ৪০ মিনিট ড্রাইভ করে যেখানে থামলো, দেখি আশেপাশে বেশ জংগল, কিন্তু ভিতরটা বেশ সাজানো গুছানো।

আমি নামতেই রায়হান নামে একজন পিচ্চি টাইপের সৈনিক এসে আমার ব্যগ তুলে নিলো, হাসেম সাহেব কাকে যেনো কি বল্লো, ড্রাইভার আমাকে ছেড়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো। রায়হান আমাকে একটা ছোট তাবুতে নিয়ে গেলো, যার নাম ফোর্টি পাউন্ডার তাবু। ছোট একটা পরিসর। আমাকে এখানেই থাকতে হবে। তাবুর ভিতরে মাটি কেটে খাট বানানো, নাড়ার খেরা দিয়ে সেই খাট ভরা, আর খেরের উপরে একটা তোষক দেওয়া, এটাই আমার বালাখানা। খাটের পাশে পা রাখার জন্য মাটি কেটে একটু নীচু করে রাখা যাতে পা রাখা যায়।

খুব ক্ষুধা লেগেছে, বললাম, খাবারের ব্যবস্থা আছে কিনা। রায়হান বল্লো, স্যার একটু অপেক্ষা করতে হবে রান্না হচ্ছে। মিনিট যায়, ঘণ্টা যায়, খাবার আর রেডি হয় না। প্রায় ৩ টার দিকে রায়হান কয়েকটা রুটি  আর শব্জী নিয়ে এলো। দেখেই মেজাজ যেনো তেলে বেগুনে। বললাম, কি ব্যাপার, রুটি কেনো, ভাত নাই?

রায়হান অভিজ্ঞ রানার, বল্লো, স্যার ফিল্ড মেসে ইন হলেই আপনার পছন্দমতো খাবার খেতে পারবেন, আজ সৈনিক মেস থেকে খাবার আনা হয়েছে। আমরা দুপুর রুটি আর শব্জী খাই। ফিল্ড মেস আবার কি, আমি জিজ্ঞেস করলাম। রায়হান কি উত্তর দিবে ঠিক বুঝা গেলো না। শুধু বল্লো, স্যার আপনাকে দুই মাস আমাদের সৈনিকের সাথে থাকতে হবে, তাদের খাবার খেতে হবে, একই টয়লেট ইউজ করতে হবে। এই দুইমাস পার হবার পর অন্যান্য স্যারেরা যেখানে খায় সেখানে আপনি খেতে পারবেন। সেটাকে বলে ফিল্ড মেস।

হায় রে, একেই বলে নমসুদ্র আর ব্রাহ্মণ। আমি এখন নমসুদ্রের দলের মতো ব্রাহ্মণের দল থেকে আলাদা যদিও অফিসার। রায়হানকে বললাম, সিগারেট কিনবো কোথা থেকে, আমার তো সিগারেট লাগবে। রায়হান বল্লো, স্যার ক্যান্টিনে সিগারেট পাওয়া যায়, এনে দিচ্ছি। একটু পর রায়হান আমার কাছে এক প্যাকেট সিগারেট দিয়ে গেলো। আমি তো অবাক। কিরে ভাই, টাকা দিলাম না, পয়সা দিলাম না, সিগারেট চলে এলো? অনেক পরে জানলাম, ক্যান্টিন থেকে আমার নামে সিগারেট বাকী আনা যায়, মাস গেলে এর বিল দিতে হয়। ভালোই তো।

শুরু হয়ে গেলো সামরীক জীবন।

১৯/১২/১৯৮৫-বিএমএ ১৩ লং কোর্ষের পাসিং আউট প্যারেড

আজ আমাদের পাসিং আউট প্যারেড হয়ে গেলো। গত কয়েকমাস যাবত নিরবিচ্ছিন্ন পাসিং আউট প্যারেডের প্র্যাকটিস করতে করতে এক রকম রোবোটের মতোই হয়ে গিয়েছিলাম। সকাল থেকে শুরু হয় প্র্যাকটিস আর সেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। জেন্টেল্ম্যান ক্যাডেট থেকে কমিশন অফিসার হয়ে যাওয়ার এই বিশাল মেকানিজমে যা দেখেছি তা এক জীবিনের অভিজ্ঞতা।

যেদিন প্রথম বিএমএ (বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমী) তে ঢোকেছিলাম, সেদিন গেটে ঢোকেই হতভাগ হয়ে গিয়েছিলাম এই কারনে যে, আমরা সবাই খুব সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় পড়ে এসেছিলাম। কেউ টাই পড়ে, কেউ কোট পড়ে, কেউ আবার বিদেশী স্টাইলের হেট পড়ে। সবার ভাবখানা এইরকম যেনো, জেনারেল সাহেব বনে গেছি ইতিমধ্যে। এই রকম একটা ভাব সবার মধ্যেই ছিল। আমি বিএমএ স্টাফ বাসে করে চিটাগাং থেকে হালিশহরের মধ্যে ঢোকি। যেই না গেটের ভিতরে ঢোকেছি, অমনি একদল স্টাফ হটাত করে অতর্কিতে খাস আজরাইলের মতো গাড়ির সামনে এসে দাড়ালেন আর হুংকার ছাড়লেন, "গেট ডাউন, নো টাইম"। ভেড়ার পালে হটাত যদি একটা আলসেশিয়ান কুকুর এমন করে দাবড়ায় যে, কোনো ভেড়াই আর অন্য কোনো ভেড়ার সাথে কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় এই শলা পরামর্শের কোনো সুযোগ থাকে না। তখন যে যেভাবে পারে দিকবিদিক জ্ঞান হারা হয়ে জান বাচানোর তাগিদে উত্তর দক্ষিন পুর্ব পশ্ছিমে যেখানেই পারুক হম্বদম্ভ হয়ে দৌড় দিতে থাকে। আমাদের অবস্থাও অনেকটা এমন। বাসে আসতে আসতে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে, চারিধারের গাছপালার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা মাথায় কতই না সপ্নে বিভোর ছিলাম। আর একাডেমির ভিতরে ঢোকতেই হুংকার-গেট ডাউন, নো টাইম????

এটা আবার কেমন কথা ভাই? আরে টাইম তো কিছু লাগবেই নাকি? এটা আবার কেমন কথা, "নো টাম গেট ডাউন"! সরু বাসের গেট, সবাই কি আর একসাথে নামতে পারবে? তারপরেও ওই যে বললাম, ভেড়ার পালের মতো অবস্থা আমাদের। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে বাসের গেটের মধ্যেই অনেকে আমরা আটকা পড়ে গেছি। কেউ পিছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে, কেউ আবার হুহু শব্দ করে ফাকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। ওদিকে ষ্টাফরা তো পারে না আমাদেরকে তাদের গলার শব্দ দিয়েই চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। “এখনো নামেন নাই আপ্নারা”? তারপর বাশি আর বাশি। একেবারে ইসরায়েল-প্যালেষ্টাইন যুদ্ধ। সবাই একসাথে বের হতে গিয়ে বাসের গেটে ঢাকা শহরের জ্যামের মতো অবস্থা। তারমধ্যে কারো কারো হাতে আবার ছোট ছোট ব্যাগ। কিসের কি। স্টাফরা এমন করে আমাদের সাথে আচরন করতে লাগলেন যেনো আমরা সবাই প্যালেষ্টাইনি কিছু হিজবুল্লাহ দাগী আসামী, আর তারা মোসাদের বংশধর।

কে শুনে কার কথা। শুরু হয়ে গেলো আজরাইলের মতো ব্যবহার। কেউ ধাক্কা দিচ্ছে, কেউ আবার টানাটানি করছে। কেউ আবার সুটকেস নামানোর জন্য একটু অপেক্ষা করছিলো, তাদেরকে ওই সুটকেস সহই কুলিমুজুরের মতো বসিয়ে দিয়ে সুটকেস সহকারে দৌড়াতে আদেশ দেওয়া হল। বসে বসে দৌড়ানো আমি এই প্রথম শুনলাম। প্রতিবাদ করবেন? কোনো উপায় নাই। এখানে কেউ কারো কথা শুনেও না, বুঝেও না। আপনি যদি না বুঝেন, সেটা আপনার সমস্যা এবং এর সমাধান- একটাই- কন্টিনিউয়াস রগড়া।

কোনো রকমে আমরা সবাই বাস থেকে নেমে কেউ সুটকেস মাথায়, কেউ সুটকেস সমেত ব্যাগ কাধে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে একটা খোলা মাঠে জড়ো হলাম। এখানেই জড়ো হতে হবে কিনা জানি না, কিন্তু একে একে সবাই ওখানেই জড়ো হতে থাকলো। এতোক্ষন যে সাহেবী কায়দায় এসেছিলাম, কোট, টাই, পলিশ করা জুতা, নতুন শার্ট, সেটা আর এখন কিছুই অবশিষ্ঠ নাই। শীতের বিকেলেও আমরা ঘেমে একাকার, কারো টাই উলটা হয়ে বুকের উপরে নড়ছে, কারো শার্টই যেনো সুটকেস আর ব্যাগের ঘষায় বং পালটে কি যে রঙ হয়েছে না দেখলে বুঝা যাবে না। মাথার নায়ক নায়ক চুলগুলি আর পরিপাটি নাই, জুতার ফিতাও কখন খুলে লেলেবেলে করছে সেদিকে কারো নজরও নাই। যাক, হাপাতে হাপাতে জড়ো হলাম। অনেককেই তো চিনি না। এখনো কারো সাথেই পরিচয়ও হয় নাই। কিন্তু আমরা যে সবাই এক খোয়াড়ের ভেড়া সেটা বুঝতে পেরেছি। এই অবস্থায় ভাবলাম, মনে হয় এই যাত্রায় বেচে গেলাম।

কিন্তু না, বায়বীয় তারবার্তার মতো পরবর্তী আদেশ চলে এলো, চিকন সিপসিপে লম্বা এক ফৌজি নায়েক (পরে বুঝেছিলাম তিনি আমাদের ড্রিল ষ্টাফ) গলা ফাটিয়ে হুংকার দিয়ে বললেন -“এই যে সাহেবের দল, ঐ যে দেখছেন ড্রেন, নেমে পড়ুন”।

ওরে ভাই, একি কয়? ড্রেনের সাইজ দেখেই তো চক্ষু চরকগাছ। নৌকা চালানো যাবে এমন পাশ, আর লম্বার তো কোনো শেষ দেখি না। সারা শহরের না হোক, অন্তত বিএমএ এর যাবতীয় সব সুসাধু খাবারের বর্জের গোডাউন এটা। এই ড্রেনে নামতে বললেন কেনো? আর এমন সাহেবী পোষাক পড়ে কি কেউ কখনো ড্রেনে নামে? কেউ যদি শত্রুতা করে কাউকে ধাক্কা দিয়ে না ফেলে দেয়, কেউ কি ইচ্ছে করে এমন পায়খান আর ময়লার ড্রেনে কেউ নামে? কিন্তু কাকে জিজ্ঞেস করবেন আপনার মনের প্রশ্ন? দ্বিধা দন্দে থাকতে থাকতেই দেখি, আরো ১২/১৩ জন নায়েক-হাবিলদার এসে ড্রোন হামলার মতো ঝাপিয়ে পড়লেন। “এখনো নামেন নাই সাহেবেরা? বলেই চারিদিক থেকে যেনো মিজাইল শব্দ মারতে থাকলেন। কিসের শার্ট, কিসের জুতা, আর কিসের ব্যাগ-সুটকেস। দেখলাম নিমিষের মধ্যে ১০৮ জন সবেমাত্র প্রবেশ করা জেন্টেলম্যান ইয়াং ছেলেরা বুক পরিমান আবর্জনায় ভরা প্রশস্থ ড্রেনে যেনো জল্কেলীর মতো আবর্জনা-কেলী করছে। আর ড্রেনের উপরে দাঁড়িয়ে ওই সাহেবরা ৩৬ দাত বের করে ফুস্ফুস করছেন।

১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো আমরা সবাই বিশাল বিশাল ড্রেনের ভিতর সাতার কাটতে থাকলাম। ব্যাপারটা যেনো এই রকম, সবাই মাছ ধরছি, তাও আবার মনের আনন্দে। পায়খানা, পচা ময়লা, পলিথিন, আর কি যে আছে, তাও জানি না। এর মধ্যেই মাথা ভিজিয়ে ডুব দিয়ে কি যে রত্ন খোজা, কে জানে। উপরে দাঁড়ানো আজরাইলগুলি আবার মাঝে মাঝে এই রকম রংগ করছেন যে, “কি সাহেব, কিছু পেলেন? এখনো পান নাই? খুজতে থাকেন”

এই যে একটু আগে টাইটুই পড়ে বাবু হয়ে সেজেগুজে এসেছিলাম, এখন কাউকে দেখলে বুঝার কোনো উপায় নাই, কোনটা টাই আর কোনটা আমার মুখ। সারা বছর এই নোংরা পানি আর মলমুত্রের আড্ডাখানা ড্রেনটা আমাদের নদীর সাতারের একটা বদ্ধ খালের মতো মনে হলো। দূর্গন্ধ আর নোংরা পানিতে একাকার। ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মহামান্য রথীগন। কেউ টু শব্দ করলেই নতুন আইটেম। যা আরো ভয়াবহ। চল্লো এইভাবে প্রায় ৩০/৪০ মিনিট। তারপর পরের আইটেম।

একটু আগে সল্প পরিচয়ের কোর্ষমেটরা মাত্র পরিচিত হয়েছিলাম, সবার নামও ঠিক মতো আয়ত্তে আসে নাই। আর এখন সারা শরীরে ড্রেনের ময়লা, মাথায় জট পাকানো পচা সব আবর্জনায়, জামা কাপড়ের যে কোনটা কি কালারের তাও সঠিক না বুঝার কারনে এখন আর সেই সল্প পরিচয়ের কাউকেই পরিচিত মনে হচ্ছিলো না। সবার চেহারা যেনো এক। মাথায় হরেক রকমের আবর্জনায় ভর্তি, কারো কারো মুছের মধ্যেও কি সব আবর্জনা লেগে আছে। ভুতের চেহারাও অনেক সুন্দর। আর আমাদের চেহাড়া যা হয়েছে তাতে শার্ট লেগে আছে চামরায়, সাথে গু-মুত, পায়খানা, পলিথিন কিংবা আরো বর্জ্য যা থাকার কোনোটাই বাদ নাই। একেবারে বন্য টাইপের।

এভাবে ৩০/৪০ মিনিট পর ড্রেনের ময়লা কাদাওয়ালা দূর্গন্ধময় আঠালো পানিতে সাতারের পর, দয়া পরবশ হয়ে মহারথী স্টাফগন আমাদেরকে গলা অবধি ডুবে থাকা ড্রেন থেকে উঠে আসার আদেশ করলেন। আমরা হাসের বাচ্চার মতো সবাই কোনো টু শব্দ না করেই একে একে উঠে এলাম। এখানেও তাড়াহুড়া। কেনো আমি ওর আগে উঠতে পারলাম না, বা কেনো এতো দেরী হলো ঊঠতে ইত্যাদির কারনে আরেক আইটেমে অনেকেই পড়ে গেলাম। যেমন, ওই দূরের গাছটাকে দৌড়ে গিয়ে একবার টাচ করে আসতে হবে। কাউকে আবার ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো এক ইউকেলিপটাস গাছের কাছে গিয়ে প্রনাম করার ভংগীতে সালাম দিতে হবে, কেউ আবার নায়িকা ববিতাকে খালা বলে বলে বাচাও বাচাও বলে উচ্চসরে গান গাইতে হবে, উফ কি এক মহাজজ্ঞ।

এইভাবে প্রায় সারাটা বিকাল থেকে শুরু করে রাত ১টা পর্যন্ত চল্লো আমাদেরকে সিভিলিয়ান থেকে ফৌজের ধারায় মোটিভেট পরিবর্তন করার কৌশল। কোনো খাওয়া দাওয়া নাই, কোনো রেস্ট নাই, কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত টর্চারে বমিও করে দিচ্ছে। মহারথী স্টাফগন এর মাঝে আবার কৌতুক করে বলছেন, কেউ কি ক্ষুধার্থ? যে বলেছে, সে ক্ষুধার্থ, তাকেই ওই বমির কাছে নিয়ে গিয়ে বলছেন, খেতে পারেন। উফ, কি অমানুষ। কিন্তু কিছুই করার নাই। হয় ক্ষুধা নিবারন করবেন, না হয় ক্ষুধা আছে এটা বলা যাবে না। বুঝলাম, এটা একটা অন্য জগত। এই ডেমোক্রেটিক দেশে এই রকম একটা গারদ আছে জানাই ছিলো না। অথচ এর পাশ দিয়ে এতো সুন্দর একটা হাইওয়ে আছে, বাসে বা গাড়িতে যেতে যেতে মনে হয় যেনো সর্গরাজ্য।

সারা শরীর প্রায় অবশের মতো। মাথা ঝিমঝিম করছে, পেটে ক্ষুধার যন্ত্রনায় পেট পাকাচ্ছে, এতোক্ষন দূর্গন্ধ পাচ্ছিলাম, এখন আর সেই দূর্গন্ধটা নাই বলে মনে হচ্ছে। নাক এর মধ্যে দূর্গন্ধ সহ্য করে ফেলেছে। শার্টের মধ্যে হেভী ডেন্সিটির ময়লা প্রায় শুকিয়ে চটলা বেধে গেছে। প্রিয় শার্টাটার প্রতি এখন আর মায়া লাগছে না। জুতা জোড়া কখন যে কোন জায়গায় পড়ে গেছে খালি পা দেখেই বুঝলাম, আমি জুতাহীন। পেন্টের পকেটে সাদা একটা রুমাল ছিলো, খুলে দেখি সেটা এখন কালো রঙ ধারন করে তেনার মতো হয়ে গেছে। যাই হোক, রাত ৮টার পরে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো নাপিতের দোকানে।

বিএমএ এর নাপিতও অনেক সেয়ানা। মাথাটা ধরলেন, বাটির মতো করে ঘ্যাচাং করে চারিপাশ এমন করে কাটলেন, যা আমি আজো এই রকম বাটিছাট দেখি নাই। না আছে এর কোনো স্টাইল, না আছে কোনো ক্যারিশমা, না আছে কোনো মহব্বত। কোনো কথা বলবেন নাপিতের সাথে? ওরে বাবা, সেও আরেক দফা সামরীক জেনারেল। তবে চুল কাটার সময় মনে হইলো, আহা, কি শান্তি। অন্তত কিছুক্ষন সময় তো আজরাইলদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া গেলো। আরামে চোখ বুজে আসে কিন্তু নাপিতের ঝাকুনিতে তন্দ্রা ভেংগে যায়। “স্যার-ঘুমান ক্যা” বারবারশপ কি খাট নাকি ঘুমুচ্ছেন?

নাপিতের দোকান থেকে যখন আমরা বেরিয়ে আসি, রাত তখন প্রায় ১টা। আমাদেরকে গরু ছাগলের মতো রাখালের পাহাড়ায় নিয়ে যাওয়া হলো ডাইনিং হলে। বিশাল সুন্দর আর বড় একটা ডাইনিং হল। এসি করা। প্রচন্ড ক্ষুধার কারনে মনে হচ্ছে গোগ্রাসে খাই। টেবিলে খাবার সাজানো। দেখেই মনটা ভরে গেলো। সবাই দারিয়ে আছি খাবারের আদেশ হওয়া মাত্রই মনে হচ্ছে, এক মিনিটে খেয়ে ফেলবো। হাত ধোয়া নাই, পা ধোয়া নাই, টিপ টিপ করে গা থেকে, শার্ট থেকে, প্যান্ট থেকে ড্রেনের পানি পড়ছে। খাওয়ার আদেশ হলেই খেতে পারবো। কিন্তু ঐ যে, আবার নিয়মের বালাই।

বসে খাওয়ার জন্য চেয়ার টানতে একটু শব্দ হলো। আর যায় কোথায়। চেয়ার টানতে শব্দ হয় আবার? চেয়ার টানতে শব্দ হলো কেনো এর কারনে মহারথীদের এমন এক হুংকার, মনে হলো এই রাজ্যে সাউন্ড প্রুফ কোনো ডিভাইস রাখা হয়েছে, এদের হুংকার ঘরের ভিতর থেকে কখনো বাইরে যায় না। সবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। বাইরে আনা হলো। আরেক আইটেম। এমনিতেই শরীর আর চলছে না। দাড়াতেও পারছি না ক্ষুধায়।

আদেশ আবর্তিত হলো-ডাইনিং হলের বাইরের চত্তরে বিল্ডিং এর চারিপাশে এলোপাথারী দৌর, অতঃপর যারা আগে আসবে, তাও আবার মাত্র ৫ জন, তাদেরকেই পুনরায় ডাইনিং হলে ঢোকানো হবে। শুরু হয়ে গেলো এবার প্রতিযোগিতা। হায় রে বাপ-কে কার আগে আসবে, ল্যাং মারাই হোক আর ধাক্কা মারাই হোক, আগে যেতে হবে। মানুষ বড় সার্থপর। যে যেভাবে পারে আগে আসতেই হবে। এই দোউড়ের কোনো আইন নাই, নিয়ম নাই, ধাক্কা, ল্যাং যেভাবে পারো, আগে আসো। এভাবে করতে করতে এর মধ্যে আমার মূটামুটি ৬ চক্কর দেয়া হয়ে গেলো। কোনো রকমে মহারথীদের দয়ায় এবার অন্য বাকী সবাইকে নেয়া হলো ডাইনিং হলে।

এই সম্রাজ্যে হাত দিয়ে খাওয়ার কোনো গল্প নাই। চামচ দিয়ে খেতে হবে, সেটা আমার অভ্যাস আছে। কিন্তু সবার তো আর সেটা নাই। ক্যাডেট কলেজে পড়ার কারনে সারা বছর চামচ দিয়েই খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। কিন্তু বিগড়ে গেলো কিছু বেসামরিক বন্ধুদের কারনে। কাচের বাটি আর চামচ, কিছু তো শব্দ হবেই। কিন্তু এই জগতে খাওয়া যাবে কিন্তু কাচের বাটির সাথে চামচের কোনো শব্দ হবে না। যেই না কিছু সিভিলিয়ান বন্ধুদের বাটি-চামচের শব্দের কারনে অর্ধেক খাওয়া না সেরেই আবার ডাইনিং এর বাইরে। আবারো সেই দোউড়ের পালা। তবে এবার আর বিল্ডিং এর চারিদিকে নয়। আদেশ হলো-ঐ যে দূরে “চীর উন্নত মমশীর” দেখতে পাচ্ছেন, সেখানে উঠে পড়ুন।

প্রচুর শীত, কনকনে শীত। গায়ের সব জামাকাপড় ভিজা। উঠছি তো উঠছিই। হায়রে পাহাড়। দূর থেকে পাহাড়ের রুপ যাইই হোক, যখন পাহাড়ে উঠবেন, দেখবেন, পাহাড় কত নিষ্ঠুর। সে এক ইঞ্চি জায়গাও সহজ করে দেয় না। ঝোপঝার, পোকা মাকর, জোক আরো কত যে কি!! সবাই আপনাকে উপেক্ষা করে কেউ কামড়ে দিচ্ছে, কেউ খোচা মারছে। যাই হোক, উঠলাম। পাহাড়ের উপর ঈশ্বর যেনো বাতাশের খনি রেখেছেন। হায় রে বাতাশ। তারমধ্যে ভিজা শরীর।

এবার নামবো কিনা তার আদেশের অপেক্ষায়। মহারথীরা আদেশ দিলেন-গান গেতে হবে পাহাড়ে বসে। আর সেই গানের কলি বড্ড মিষ্টি। “ববিতা খালা কোথায় গো, ববিতা খালা বাচাও গো”। আপনারাই বলেন, কোনকালে ববিতা মানে নায়িকা ববিতা আমার খালা ছিলো? যাই হোক, বেসুরা গলায় গাইতে গাইতে পাহাড় থেকে নেমে গেলাম। কেউ আছাড় খাচ্ছে, কেউ চিতপটাং। কিন্তু মুখে ববিতা খালার নাম। ববিতা খালা নিজেও জানেন না যে, আগামি দিনের সেনাপ্রধান যারা হবেন, কিংবা কেউ কেউ রাষ্ট্র নায়ক হবেন, তারা আজ এই নিশিথ রাতে ববিতা খালার নাম করে পাহাড় থেকে নামছেন। এইভাবে রাত শেষ হয়ে কখন যে ভোর হয়ে যায় টুকরো টুকরো শাস্তির বিনিময়ে বুঝতেই পারি নাই।

১ম টার্মকে বলা হতো শিটপট, মানে পায়খানার সমান এরা। ২য় টার্মকে বলা হয় বদনা। অন্তত কিছুটা সলিড বস্তূ, ৪র্থ টার্ম মানে মহারাজা। সর্বত্র তার রাজত্ব। শিটপটেরা কোনো সিনিয়রকেই আজ পর্জন্ত চোখে দেখে নাই। সিনিয়র দেখলেই চোখ বন্ধ। ভাবখানা এই রকম যে, না জানি কোনো এক মহারাজারা যাচ্ছেন পাশ দিয়ে। বিএমএর ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না। প্রতিদিন নতুন ইতিহাস, প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা।

এইভাবে ২ বছর পার করে আজ সেই কাঙ্ক্ষিত পাসিং আউট। কি যে অনুভুতি ভাষায় বুঝানো যাবে না। যে স্টাফগন একদিন আমাদেরকে কারনে অকারনে ট্রেনিং করানোর জন্যে অনেক বাজে ব্যবহারও করেছেন, আজ সেইসব স্টাফগনই রেংক পড়ার পর সামনে এসে স্যালুট দিয়ে বললেন, স্যার, কত ভুল করেছি, কিছুই মনে রাইখেন না। জড়িয়ে ধরলাম।

কাল চলে যাবো বিএমএ থেকে। এতো ছাড়তে চেয়েছিলাম এই স্থানটি, এর উপর কত রাগ, কত গোস্যা, আজ যখন আমাকে এই জায়গাটি ছাড়তেই হবে, তখন মনে হচ্ছে, এটা তো আমার জায়গা। ছেড়ে যেতে কিছুতেই মন চাইছে না। এই রাস্তা, এই পাহাড়, এই ডরমেটরী, এই পিটি গ্রাউন্ড, এই সব গাছপালা সব কিছু আমার চেনা। এখানে প্রতিটি জায়গায় আমার পায়ের চিহ্ন আছে, প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আমার ঘামের গন্ধ আছে। যে জায়গাটাকে প্রতিদিন ঘৃণা করতাম, যেখান থেকে পালানোর জন্য প্রতিদিন চেষ্টা করতাম, যে জায়গাটাকে আমি কখনো নিজের মনে করি নাই, আজ হটাত করে এসে দেখলাম, এই জায়গাটা আমার জীবিনের সাথে এমন করে জড়িয়ে গেছে যে, একটু বিচ্ছেদের টান পড়লেই কোথায় যেনো প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভব করি।  তবু আজ আমাকে যেতেই হবে। যেতে হবে নতুনকে স্থান দেওয়ার জন্য।

১০ দিনের ছুটি। এসেছিলাম সিভিলিয়ান হিসাবে, আজ বের হচ্ছি সামরীক মানুষ হিসাবে। ভবিষ্যৎ কি, কেমন, কোথায় আমার কিছুই জানা নাই।

০৫/০৯/১৯৮৩-হাবীব ভাইয়ের বিয়ে (৭ আগষ্ট ১৯৮৩)

ডঃ মোহামেদ হাবীবুল্লাহ আমার বড় ভাই। ওনাকে আমার বড় ভাই বললে ওনার উপর সঠিক মুল্যায়ন হবে না। উনি একাধারে আমার বড় ভাই, পিতার সমতুল্য এবং আমার সকল কিছুর গার্জিয়ান। শুধু আমার নয়, আমাদের পুরু পরিবারের সবার গার্জিয়ান। আমি আমার সমগ্র ধ্যান ধারনা আরোপ করেও কখনো আমার বাবা কেমন ছিলেন, তার কোনো অবয়ব আমি আমার কল্পনায় আনতেও পারি নাই। কারন আমি আমার বাবাকে কখনোই দেখি নাই। আমার বয়স যখন সম্ভবত দুই কিংবা আড়াই, তখন তিনি মারা যান। ফলে ওই বয়সের একটা বাচ্চার কাছে কোনো মুরুব্বী মানুষের চেহারা কেমন ছিলো, কে আমার কি হতো এসব তো মাথায় যেমন থাকার কথা না, তেমনি আমার মাথায়ও নাই। যাই হোক, সে প্রসংগ এখন না টানি।

আমি সবেমাত্র ইন্টার পাশ করে গ্রামে এসেছি। পড়তাম ক্যাডেট কলেজে। সেই ১৯৭৭ সালের ১৯ শে জুন থেকে ১৯৮৩ সাল নাগাদ এক নাগাড়ে ক্যাডেট কলেজে পরাশুনা করে ইন্টার পাশ দিয়ে সবেমাত্র গ্রামে এসেছি। হাবীব ভাই থাকেন আমেরিকা। তিনিও ১৯৭৮ সালে আমেরিকায় গিয়েছিলেন পড়াশুনা করতে, অতপর পরাশুনা শেষে তিনি সেখানেই থেকে গেলেন। প্রায় ৬ বছর পার হয়ে গেছে ভাইয়ার আমেরিকার জীবন। তিনিও দেশে এসেছেন। এই লম্বা সময়ে হাবীব ভাই আর কখনো দেশে আসেন নাই। এবার দেশে এসেছেন প্রধানত বিয়ের উপলক্ষে। হাবীব ভাইয়ের অবর্তমানে আরো একজন মানুষ আছেন যিনি একাধারে হাবীব ভাইয়ের মতোই আমাদের গার্জিয়ান আবার হাবীব ভাইয়ের ও একাধারে  উপদেষতা কাম বন্ধু কাম ভাই কাম গার্জিয়ান বলা চলে। উনার নাম বদ্রুদ্দিন তালুকদার। এই দুজন মানুষকে আমাদের বাড়ির প্রতিটি সদস্য শুধু ভয়ই পায় না, বরং তাদের সামনে কোনো প্রকারের ব্যক্তি স্বাধীনতা আমাদের কারোরই চ্ছিলো না। তারা যদি কোন এক সোমবার কে বলেন আজ রবিবার, তাহলে সেটা রবিবারই।

আমার পাচ বোন, আর আমরা দুই ভাই। এর মধ্যে আমাদের সবার বড় বোন যার নাম সাফিয়া খাতুন, সে ১৯৭৯ সালেই সন্তানহীন অবস্থায় মারা গিয়েছেন। ফলে এখন বর্তমানে দেশে আছি আমরা চার বোন আর আমি, এবার হাবীব ভাই দেশে আসাতে সবাই এক সাথেই গ্রামে রয়েছি। বোনদের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। যে যার যার যোগ্যতায় যেমনই হোক সংসার পেয়েছে এবং বাংলাদেশের আরো হাজার হাজার পরিবার যেমন থাকে তারাও অভাব কিংবা প্রাচূর্য নিয়া ভালই আছে। বোনদের সবারই বাচ্চা কাচ্চা আছে। আমাদের ভগ্নিপতিরাও এই দুই জন মানুষকে (হাবীব ভাই এবং বদি ভাই) আমাদের মতোই যেমন মুরুব্বি মানেন তেমনি তাদের ও কোনো সাহস নাই যে, মুক্ত বাক স্বাধীনতার। অনেকতা সমীহ করেই সবাই চলেন। আর এতার আরেকটা কারন ছিলো যে, তারা দুজনে শিক্ষিত এবং সময়ে অসময়ে অনেক কাজেই লাগে, হোক সেতা কনো অর্থক্রী সাহাজ্য কিংবা অন্য কোনো বিশয়ে।

আমি ক্যাডেট কলেজে পরার কারনেই হোক আর আমার চরিত্রের বইশিষথের কারনেই হোক, আমি ছোট বেলা থেকেই একটু এক রোখা ছিলাম। যতোটা মুক্ত বাক থাকার দরকার কনো কোনো ক্ষেত্রে আমি তার থেকেও হয়তো বেশী সোচ্চার ছিলাম। হয়তো এটা ইমোশনাল কারনেই হোক আর যুক্তির ধারেই হোক। আমি অন্যান্য বোনদের মতো কিংবা তাদের পতীদের মতো অতোটা নীরব ছিলাম না।

হাবীব ভাইয়ের বিয়ে কোথায় হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে, কে সেই মেয়ে যাকে তিনি বিয়ে করবেন তাদের কোথায় বাড়ি কি তাদের স্ট্যাটাস কিংবা কিভাবে কি হচ্ছে এ ব্যাপারে আমরা পরিবারের কোনো সদস্যই কনো কিছু জানতাম না। আর জানলেও এতা কোনো পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন কিংবা আমাদের কনো মতামতের কোনো দাম বা মুল্যায়নের কোনো বালাই ছিলো না। এখানে হয়তো বদি ভাইয়ের একটা মতামত থাকলেও থাকতে পারে সেতা আমরা কেউ জানিও না। শুধু জানলাম, হাবীব ভাই বিয়ে করবেন, তারিখ ঠিক হয়েছে ৭ আগষ্ট ১৯৮৩।

ঢাকায় আমাদের কোনো বাড়ি নাই। বদি ভাইয়ের একটা স্থায়ী ঠিকানা আছে মীরপুর (৩৮ গোলারটেক) কিন্তু সেতাও একতা টিনের ঘর। মাত্র দুটু রুম, সেতাও আবার মাঝখানে একতা পার্টিশান দিয়ে কোনো রকমে থাকা। নতুন বউ নিয়ে উঠার মতো পরিবেশ নয়।

হাবীব ভাই এবার যখন দেশে এলেন, তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির টি এস সি ৫ নাম্বার রুমটা আগে থেকেই সম্ভবত বুক করে এসেছিলেন। ফলে হাবীব ভাই বদি ভাইয়ের বাসায় থাকার পরিবর্তে টি এস সি র ৫ নাম্বার রুমেই থাকাটা বেশ সাচ্ছন্ধ বোধ করছিলেন। আমি প্রায় প্রতিদিন টি এস সি তে যাই, ভাইয়ার সাথে দেখা করি। অনেকের সাথেই আমার পরিচয় হয়। তারা অনেক অনেক উচু স্তরের লোক। প্রায় সবাই ইউনিভার্সিটির গনমান্য ব্যক্তিবর্গ। একদিন হাবীব ভাই আমাকে নিয়ে ইব্রাহীম মেমোরিয়াল হাসপাতালে গেলেন। সেখানে ডাঃ মাহবুব সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইব্রাহীম মেমোরিয়ালের প্রতিষ্ঠাতা সম্ভবত নীলিমা ইব্রাহীম এর সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলেন। শুনলাম যে, ভাইয়ার বিয়ের মূটামূটি যা যা ব্যবস্থা করছেন, এই সেই মাহবুব সাহেব এবং নীলিমা ইব্রাহীম।

আমরা হাবীব ভাইয়ের ভবিতব্য বা হবু স্ত্রীকে বিয়ের আগে দেখি নাই, আর এতা যে আমাদের দেখার দরকার আছে সেটার কোনো প্রয়োজন ও ছিলো না। কারন আমাদের দেখায় পছন্দ অপছন্দের কোনো কিছুই নাই। আমরা আছি, আমরা এভাবেই আছি।

গত ৭ আগষ্টে হাবীব ভাইয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। এই বিয়েতার ব্যাপারে যদিও আমার অতো নাক গলানো বা আমার কোনো মতামত, কোনো ভুমিকার কোন কিছুই যায় আসে না, এমন কি আমার মায়ের ও কোনো মতামতের কোনো বিশয় ছিলো না,। শুধু তাই নয়, আমাদের বোনদের পতীদের সাথেও কোনো শলা পরমর্শ করা কোনো বিশয় ছিলো না। ফলে আমরা নতুন ভাবীর পরিবারের কাছে কিভাবে উত্থাপিত হয়েছি, আদৌ কোনো আত্তীয় ভাবে উত্থাপিত হয়েছি কিনা সেটাও আমাদের বোধগম্য ছিলো না। তারা আমাদের কোন এংগেল থেকে কি রকম আত্তিয়তার সুত্রে বিবেচনা করেছে সেতাও আমাদের কোনো ধারনা ছিলো না। তবে ধীরে ধীরে আমার কাছে একতা জিনিষ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিলো যে, বদি ভাই কোনো না কোনো কারনে হাবীব ভাইয়ের এই বিয়ের উপলক্ষে খুশি ছিলেন না। কেনো ছিলেন না, সেতা যদিও আমার পক্ষে কিছুতেই গোয়েন্দাগিরি করে বের করা সম্ভব ছিলো না কিন্তু বদি ভাই যেহেতু অখুশি ছিলেন, ফলে কিছু কিছু মনের কষ্টের কথা তিনি আমার সাথে এ সময়ে শেয়ার করতেন।

যেদিন হাবীব ভাইয়ের বিয়ের অনুশ্তহান হলো ঢাকার প্রেস ক্লাবে, সেদিন বিয়ের ঠিক পরেই ভাইয়া নতুন বউ নিয়ে বাসর করলেন আজীম পুর কলোনীতে ভাইয়ের আরেক বন্ধু আনোয়ার ভাইয়ের বাসায়। সে বাসাটা আমার আগের থেকেই পরিচিত ছিলো কারন আমি যখন প্রথম ঢাকায় আসি এবং ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে ভর্তি হই, তখন এই বাসায় আমি বেশ কিছুদিন থেকেছিলাম। সেখানে জুয়েনা আপা ছিল (আনোয়ার ভাইয়ের ছোত বোন), নিউটন ছিলো (নিউটন আমার সাথে ওয়েস্ট এড হাই স্কুলেই পড়তো), শরীফ নামে আরেকটা ভাই ছিলো নিউটনের। আমাদের সাথেই পড়তো তবে ওয়েস্ট এন্ড স্কুলে না, অন্য স্কুলে। আনোয়ার ভাই হাবীব ভাইয়ের খুব ভালো বন্ধু ছিলো, আর উনি কাজ করতেন ওয়াপদায়, বদি ভাইও ওয়াপদায় কাজ করতেন।

প্রেস ক্লাব থেকে যখন সরাসরি নতুন বউ নিয়ে হাবীব ভাই আনোয়ার ভাইদের বাসায় উটজলেন, তারপর আমি আর বদি ভাই স রাতে চলে আসি টি এস স্যার সেই ৫ নাম্বার রুমে রাত থাকার জন্য, যেহেতু তখন রুমটা খালি ছিলো। সেই রাতে বদি ভাই আমাকে বেশ কিছু জিনিষ শেয়ার করলেন।

তিনি আমাকে বললেন, আখতার, আমার কাছে মনে হয়, এই বিয়েটা ঠিক হয় নাই। আর আমার ও একেবারে শতভাগ মতামত ছিলো না। কিন্তু হাবীব আমার মতের কোনো মুল্যায়ন ই করলো না। কষ্ট লাগছে।

এ ব্যাপারে যেহেতু আমার কোনো জ্ঞান ছিলো না কি খারাপ আর কি ভালো হয়েছে , ফলে আমার আসলে কোনো গুরু গম্ভীর মতামত ও ছিলো না। কিছুক্ষন পর আমি এম্নিতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। পরেরদিন একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, বদি ভাই পুনরায় আজিম্পুর হাবীব ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছা প্রকাশ করলেন না। তিনি সরাসরি আমাকে নিয়ে চলে এলেন মীরপুর তার নিজের বাসায়।

এদিকে মা এবং আমার অন্যান্য বোনেরা সেদিনের রাততায় মীরপুরে কাটিয়ে পরদিন সবাই গ্রামে ফিরে ফিরে গিয়েছিলো।

ভাইয়ার শসুর চাকুরী করতেন বুয়েটে। তিনি ছিলেন বুয়েটের প্রোফেসর জনাব আলী আশরাফ। নামকরা লোক। সবাই উনাকে চিনে। তিনি থাকতেন বুয়েট কলোনীতে। কয়েকদন পর ভাইয়া আনোয়ার ভাইয়ের বাসা থেকে সিফট করে উঠে গেলেন বুয়েট কলোনীতে শসুরালয়ে। ভাইয়ার শ্যালক আছে দুজন (একজনের নাম বাবু, আরেক জনের নাম ফার্মি)। ফার্মি আমার জুনিয়র। উনার শ্যালিকা আছেন লুনা আপা। ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্রী। আমি প্রায় প্রতিদিন অই ভাইয়ার শ্বশুর বাড়িতে যেতাম হয় সকাল অথবা বিকালে। এই যাওয়া আসার মধ্যে আমি কন আত্তিয়তার ভালো বন্ধন কখনো দেখি নাই। আমি যে ভাবীর একতা দেবর, এই ভাবতা আমার মধ্যে কখনো তৈরী হয় নাই। মনে হয়েছে যে, আমি ভাইয়ার কাছে যেমন সর্বদা মাথা নীচু করে ছত হয়ে থাকতে হয়, ভয়ে কাচুমাচু হয়ে থাকতে হয়, ভাবীর কাছে আমি ব্যাপারতা এই রকমেরই একটা আচরন দেখতে পাই। শুধু সেতাই নয়, ওই বাড়ির অন্যান্য লোকগুলির মধ্যেও আমরা যেনো একতা সাব স্ট্যান্দার্ড তাইপের কেউ সেতা তাদের চোখে র দিকে তাকালে বুঝা যেতো। ওদের বাড়ির চাকর বাকরেরাও আমাদেরকে মনে হয় সে রকম ভাবেই কাউন্ট করতো। যখন যেতাম, যেনো বহিরাগত কেউ দেখা করতে এসেছে এমন একটা ভাব। হয়তো ড্রইং রুমে বসে আছি তো আছিই। কেউ এক গ্লাস পানি কিংবা চা দিয়ে যে আপ্যায়ন করবে তার কোনো বালাই নাই। নিজের কাছে অসস্থি বোধ করতাম কিন্তু উপায় নাই, মাওতেই হবে। আমরা হাবীব ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল। এতা ওরা জানে। আর হাবীব ভাই আমাদের থেকে বেশী এখন ওদের। ওদের দরকার ছিলো হাবীব ভাইকে, আমাদেরকে নয়। ফলে আমাদেরকে আপ্যায়ন করলেই কি, আর না করলেই কি। বুঝতাম ব্যাপারতা। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না। হাবীব ভাইও যেনো অই পরিবারে বিয়ে করে একতা জাতে উঠে গিয়েছিলো এমন একটা ভাব তার মধ্যেও ছিলো। ফলে, আমরা ওখানে গেলে হাবীব ভাই নিজেও খুব একতা সস্থি বোধ করতেন না। বরং আমাদের পরিবারের কেউ না গেলেই উনি খুশী। এমনি একতা ফিলিংস আমার মধ্যে মনে হয়েছিলো। যাই হোক, হাবীব ভাইয়ার বিয়ের কয়েকদিন পরে ভাইয়াও আবার নতুন বউ ঢাকায় রেখে আমেরিকায় চলে গেলেন। শুনলাম, ভাইয়া আমেরিকায় গিয়েই দুই এক মাসের মধ্যে ভাইয়া ভাবীকে আমেরিকায় নিয়ে যাবেন।

হাবীব ভাই আমেরিকায় চলে যাবার পর ভাবী একদম একা হয়ে গেলেন। ভাইয়া অনেকবার চেষ্টা করেও ভাবীকে নিতে পারছিলেন না। এর মধ্যে দু দুবার আমেরিকার দুতাবাস থেকে ভাবীর ভিসা রিজেক্ট হয়েছে, আরেকবার রিজেক্ট হলে উনার আমেরিকায় যাওয়াই অনিসচিত হয়ে যাবে। আমি ভাবিকে সময় দেই। ভাবী যেখানে যেতে চান, রিক্সায় করে নিয়ে যাই। ফকির দরবেশ, ওঝা যতো কিছু আছে, আমেরিকার ভিসা পাওয়ার জন্য যেখানে যেখানে যাওয়া লাগে, মানত করা লাগে ভাবী রেগুলার করে যাচ্ছেন, আর আমি ওনাকে সংগ দিচ্ছি।

এরই মধ্যে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা, মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা, বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার সবগুলি দিয়ে দিলাম। এখানে আরো একতা কথা বলে রাখা দরকার যে, আমি ক্যাডেট কলেজের ছাত্র বিধায় আমি ইন্টার পাশের পর পরই হাবীব ভাইয়ার ঠিক বিয়ের আগে আর্মিতে কমিশন পদে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার পরেও যেতে পারি নাই কারন হাবীব ভাই চান নাই যে, আমি আর্মিতে যাই। আমি ১২ লং কোর্ষের সাথে আর্মিতে কমিশন পরীক্ষায় টিকে গেলেঈ ২৭ জুলাই ১৯৮৩ সালে আমার বি এম এ তে যাইয়ার তারিখ ছিলো। কিন্তু হাবীব ভাই আমাকে কিছুতেই আর্মিতে যায়ার অনুমতি দেন নাই। ফলে আমি ১২লং কোর্ষের সাথে আর বি এম এ তে জ্যেন করতে পারি নাই।  

এদিকে যখন ভাবীর ভিসা একের পর এক রিজেক্ট হচ্ছিলো, তখন উপায়ন্তর না দেখে হাবীব ভাই আবারো নভেম্বরের প্ররথম সপ্তাহে ঢাকায় চলে আসেন। এবার তিনি ভাবীকে সাথে করে নিয়ে যাবেন এই পরিকল্পনায় ঢাকায় আসেন। হাবীব ভাই কাউকেই আগাম কোনো খবর দিয়ে এবার ঢাকায় আসেন নাই। ফলে হাবীব ভাই ঢাকায় আসার পর আমি প্রথম ভাবীর কাছে জানতে পারলাম ভাইয়া ঢাকায় এসেছেন। আমি খবরটা বদি ভাইকে মীরপুরে গিয়ে দিয়ে এলাম।

সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার হলো, এই যে বিয়ের পর থেকে এবার হাবীব ভাইয়ের ঢাকায় আসার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত হাবীব ভাইয়ের বউ এক বারের জন্যেও কোনোদিন বদি ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ও করেন নাই, ওখানে ওনার বাসায় যাওয়ার জন্যে কখনো আমাকেও বলে নাই। এর ফলে এম্নিতেই বদি ভাইয়ার একটু রাগ কিংবা গোস্যা ছিলো তাদের উপর, ভাবীর এরুপ আচরনে বদি ভাই আরো মর্মাহত হলেন। তার উপর আবার হাবিব ভাই কোনো আগাম খবর না দিয়ে যখন ঢাকায় এলেন, তখন ব্যাপারতা প্রকাশ্যেই একটা বিরোধের সৃষ্টি হলো।

আমার ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রায় সব গুলির আউট হয়ে গিয়েছিলো, আমি বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেলাম, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্ট্মেন্টে চান্স পেলাম, কিন্তু বুয়েটে আমার কাংগখিত ফলাফল এলো না। যেদিন হাবীব ভাই ঢাকায় এলেন, আমার ফলাফলে উনি মারাত্তক রেগে গেলেন যখন আমি তার শ্বশুর বাড়িতে গেলাম। অনেকতা খুব রাগারাগি তো করলেনই এবং কিছুটা অপমানিত ও করলেন। মেডিক্যাল উনি পছন্দ করেন না, ফলে মেডিক্যালে পাশ করে কনো লাভ হলো না। ইউনিভার্সিটিতে ইউনিট আমাকে পরাতে চান না, কিন্তু আমেরিকায় নিয়ে যেতে চান, তাই ক্লার্কভাইল ইউনিভার্সিটিতে ভরতির আয়োজন করা যাবে বলে জানালেন।

আমি খুবই অপম্নিত বোধ করলাম, কারন আমি কিন্তু তখন ছোট একটা শিশু নই। আমার এই অপদস্তের ব্যাপারটায় যেনো বাবু ভাই, ফার্মি, লুনা আপা, মজাই পেলেন সেতাই আমার কাছে মনে হলো। আমি দুপুরে কিছু না খেয়েই চলে এসেছিলাম। অনেকটাআ রাগ করেই।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়, প্রায় ১৯ দিন পার হয়। ভাইয়া না গেলো মার সাথে গ্রামে দেখা করতে, না গেল বদি ভাইয়ের বাসায় দেখা করতে। এক নাগাড়ে ১৯ দিন তিনি ভাবিদের বুয়েট কলোনীতে থাকলেন। এদিকে মা অপেক্ষা করছেন কবে তার বড় ছেলে গ্রামে যাবে, আর তিনি দেখবেন। মার রাগ হয়েছিলো কিনা আমি জানি না তবে মা কষ্ট পেয়েছিলেন এটা আমি জানি। মা তো মাই।

আমি তখন অস্থায়িভাবে ঢাকা শহীদুল্লাহ হলের দাইনিং কোয়ার্তারে আগে যেখানে হাবীব ভাই থাকতেন, সেখানে মাসুদ নামে আমার এক আত্তীয় থাকতো, তার রুমেই থাকি আর মাঝে মাঝে হাবীব ভাইয়ার শসুর বাড়ি অইখান থেকেই যাই। ২০ তম দিনে মা আর আমার বোনের প্তীরা বেশ কিছু ফল মুল, নারিকেল নিয়ে ঢাকায় এলেন হাবীব ভাইকে দেখার জন্য। কারন মায়ের আর দেরী করা সম্ভব হচ্ছিলো না। তারা গ্রাম থেকে প্রথমে আমার ওইখানে শহীদুল্লাহ হ্লে এলেন। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করলেন। বিকাল ৫ তার দিকে মাকে নিয়ে আমার দুলাভাইয়েরা হাবীব ভাইয়ের শ্বশুর বাসায় বুয়েট কলোনীতে গেলেন। কোনো কারনে আমার তাদের সাথে যাওয়া সম্ভব হয় নাই। ফলে আমার বোনের হাসবেন্ডরা মাকে নিয়ে হাবীব ভাইকে দেখতে গেলেন।