১১/১১/২০০৪-নতুন সিও লেঃ কর্নেল আব্দুল মজিদ

ফেরদৌস স্যারের পোষ্টিং হয়ে গেলো, তাঁর পরিবর্তে ৪ ফিল্ডের সিও হিসাবে পোষ্টিং হয়েছে প্রধান মন্ত্রীর এডিসি হিসাবে কাজ করতো ১৪ লং কোর্সের আব্দুল মজিদের। এবার মজিদ সম্পর্কে কিছু বলি। আমি যখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে কাজ করছিলাম, তখন একটা রিউমার উঠলো যে, খালেদা জিয়া তাঁর এডিসি হিসাবে মেজর আব্দুল মজিদকে চান। এমএস ব্রাঞ্চে তখন আমার দোস্ত মেজর আকবর ডিএমএস হিসাবে কাজ করছে। আমরা তখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে প্রায় সাতজন কোর্সমেট একসাথে কাজ করছি। আমি এমটি ডাইরেক্টরে, ওয়াহিদ এমটি ডাইরেক্টরে, মেজর মতি, মেজর সালাম আর মেজর চৌধুরী সবাই এমটি ডাইরেক্টরেটে। মানে আমরাই ৫ জন কোর্সমেট এমটি ডাইরেক্টরেটে কাজ করছি। পুরু সেনাবাহিনীর ট্রেনিং কোনো না কোনোভাবে আমাদের হাতে। মেজর শহীদুল (যাকে আমরা চাচা বলে ডাকি) সে কাজ করে আর্টিলারী ডাইরেক্টরেতে, এমএস ব্রাঞ্চে কাজ করে মেজর আকবর, পিপি এন্ড পি তে কাজ করে মেজর আলমগীর। অন্যান্য ডাইরেক্টরেটে যারা কাজ করে তারাও আমাদের হয় এক কোর্স জুনিয়র বা এক কোর্স সিনিয়র। ফলে পুরা আর্মি হেড কোয়ার্টারের মধ্যে কোথায় কি হচ্ছে তা আমরা দিনের কোনো না কোন সময় একে অপরের কাছ থেকে জেনেই যাই।

ঠিক এমন সময় একটা খবর চাউড় হলো যে, ১৪ লং কোর্সের মেজর মজিদের জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চেয়েছেন যেনো মজিদকে তাঁর ব্যক্তিগত এডিসি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। এটা কোন বিস্ময়কর খবর না আসলে, এটা হতেই পারে যে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজস্ব একজন পরিচিত মানুষকে তাঁর ব্যক্তিগত এডিসি হিসাবে চান। কিন্তু বিস্ময়কর খবরটা হলো যে, যখন কোনো অফিসারের এই ধরনের পোষ্টিং হয়, তখন একটা প্যানেল হয়। সেই প্যানেলে চৌকস অফিসারদের নামের তালিকা থাকে। সেখান থেকে মেধা, শারীরিক যোগ্যতা, ক্ষিপ্রতা, আপটেক, ডিপ্লোমেটিক ভদ্রতা, কিংবা আরো অনেক কিছু বিবেচনা নেয়া হয়। বেষ্ট অফিসারটাই আসলে এতো বড় লেবেলের একটা পদে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। এটা তো শুধু দেশের ভিতরেই নয়, যখন প্রধান্মন্ত্রী দেশের বাইরে যাবেন, এই এডিসিরাই অন্যান্য দেশের বড় বড় জেনারেলদের সাথে ইন্টারেকশনে আসবেন। ফলে মেধাবী, শারীরিক যোগ্যতা, প্রেজেন্টেবল, মেধাশীল, ডিপ্লোমেটিক না হলে তাকে তো নেয়াই ঠিক না।

মেজর মজিদ মেধাশীল নয়, ষ্টাফ কলেজ করে নাই, নিজের আর্মসের আর্টিলারীর গানারী ষ্টাফ কোর্সটাও করতে পারে নাই, কোনো একটা কোর্সে যে টপ করেছে সে রেকর্ডও নাই, তাঁর কোর্স ১৪ তম লং কোর্সের মধ্যে সে একজন শেষের দিকের অফিসার, শারীরিকভাবে সে মেডিক্যালি ফিট নয় কারন সে ক্যাটেগরি “সী’ একজন অফিসার। ক্যাটেগরি সি মানে তিনি মেডিক্যালী আনফিট, এবং কোনো কাজের জন্যই তিনি ফিট নন। তাঁর মধ্যে তাঁর আছে ডায়াবেটিস। এমন একটা অফিসারকে হটাত করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কেনো চয়েজ করলেন? সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো। খোজখবর নিয়ে যখন জানা গেলো, সেটা আরো স্বজনপ্রীতি ছাড়া আর কিছুই না। মেজর মজিদের বাবা খালেদা জিয়ার বাড়িতে মালির কাজ কিংবা কেয়ার টেকারের কাজ করেন বহুবছর যাবত। মজিদের বাবা সেই সুবাদে খালেদা জিয়ার সাথে ব্যক্তিগতভাবে জানা এবং চেনা, এবং বহুবছর যাবত আছেন। খালেদা জিয়া যখন গৃহিণী, অর্থাৎ জেনারেল জিয়া যখন বেচে ছিলেন, মজিদের বাবা তখনো তাদের বাড়িতে মালীর কাজই করতেন। মজিদের বাবা এখন খালেদা জিয়াকে অনেকভাবে অনুরোধ করেছেন যেনো তার ছেলেকে একটা ভাল পোষ্টে রাখেন, পারলে তাঁর এডিসি করে নেন। ব্যাপারটা হয়তো মজিদ নিজেই তাঁর বাবাকে এই রকমের একটা কথা বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদার কাছে পাঠিয়েছেন। হয়তো খালেদা জিয়া আপাতত “এইটা আর কি এমন রিকুয়েষ্ট” মনে করে সেনাপ্রধানকে ব্যাপারটা কার্যকরী করার জন্য বলেছেন। তারপর আর যায় কই। প্রধানমন্ত্রীর একটা কথা সেনাপ্রধানের জন্য আদেশেরই নামান্তর।

সেনাবাহিনীর সমস্ত নর্ম ভেংগে, সমস্ত প্রথা অমান্য করে, পলিসি ব্রেক করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন কাউকে একটা সুযোগ করে দেন, তখন আর বেশী করে ভাবা দরকার হয় না যে, তিনি কতটুকু দেশনেত্রি বা কোনো বাহিনীকে তিনি কতটা সম্মান করেন। বুঝলাম, দূর্নীতির শেকর খুব উপরে। হয়তো কোনো এক সময় এই দলই তাঁর নিজের এ রকম দুর্নীতির কারনে এমন জায়গায় পা আটকে যাবে যখন দাপটওয়ালা অফিসার তাদের আশেপাশে খুজে পাওয়া যাবে না। যখন এই দলের জন্য কোনো চৌকস অফিসার লাগবে, তখন এই মজিদেরা না পারবে হাল ধরতে, না পারবে পুরা ক্রিটিক্যাল সময়ে অন্য কোন অফিসারদেরকে হাতে নিতে। এই দলের ভাগ্যে চরম দূর্ভোগ আছে অদুর ভবিষ্যতে। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিএনপিই একমাত্র প্রথম দল যেখানে দলীয় বিবেচনায় যোগ্ কে বাদ দিয়ে অযোগ্য কোনো অফিসারকে পদায়ন করেছে, আর যোগ্য ব্যক্তিদেরকে অসম্মান করেছে। এর মাশুল হয়তো এই রাজনৈতিক দলকে খুব বেশী ভোগাবে একদিন। সেদিন পর্যন্ত বেচে থাকলেই হয়।

মজিদ ইউনিটে এলো, ফেরদৌস স্যারের সাথে হ্যান্ডিং টেকিং হয়ে গেলো। আমি উপঅধিনায়কই রয়ে গেলাম। কিন্তু আমি এবার এডামেন্ট যে, যতো তারাতাড়ি সম্ভব, আমাকে আর্মি থেকে বের হতেই হবে। মজিদ পরেরদিন ইউনিটের দরবার নিবে। রাতে আমার সাথে একান্তভাবে কথা বল্লো। কি কথা হলো এবার বলিঃ

মজিদ আমাকে ওর অফিসে নিয়ে খুব সমাদর করে বল্লো, স্যার, আপনি যেমন আমাকে চিনেন, আমিও আপনাকে খুব ভালো করেই চিনি। আমি জানি আমার প্রোমোশন হবার কোনো কারন নাই। কিন্তু যেহেতু সুযোগ ছিলো, এটা পেয়েছি। আমি হয়তো ইউনিটের অধিনায়ক কিন্তু আপনি আমার সিনিয়র মানুষ এবং আপনার কোয়ালিফিকেশনের কোনো কমতি নাই। আমি সিও হলেও ইউনিট চালাবেন আপনি, আমাকে শুধু গাইড করবেন আমাকে কি করতে হবে, আর কি করলে ভালো হয়। আপনি আপনার মতো করে অফিস করবেন, ব্রিগেড থেকে যদি কোন অব্জারভেশন না আসে এমন কোনো কাজ ছাড়া আপনি সাধীনভাবে যা খুশী আপনি করবেন, আমার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপ নাই। কিছু কিছু প্রোটকল হয়তো আমাদের মানতে হবে কিন্তু সেটা শুধুমাত্র প্রোটোকলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, আমি মন থেকে আপনাকে জানাচ্ছি যে, আসলে আপ্নিই আমার সিও। আর আমি আপনাকে একটা কথা বলে রাখি, যদিও এবার আপনার প্রোমোশন হয় নাই, কিন্তু আগামিবার আমি নিজে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে আপনার ব্যাপারে জানাবো যাতে আপনি আপনার ডিও প্রোমোশন পান। আসলেই তো আপনার প্রোমোশন হওয়া দরকার ছিলো।

আমি সেদিন মজিদকে কিছুই বলি নাই। মজিদের কি দোষ। দোষ তো আমাদের সিস্টেমের। যে সিস্টেম তাঁর নিজস্ব আইন, নিজের পলিসি, কিংবা ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে জানে না। আর এই কারনেই বারবার অনেক যোগ্য অফিসাররা ঝরে যাবে, আর অযোগ্য অফিসাররা আর্মিতে থেকে যাবে। এই অযোগ্য আর্মি অফিসাররাই একদিন জেনারেল হবে, শিরদাড়া না থাকলেও কাধে চমকপ্রদ স্টার নিয়ে গাড়িতে স্টারপ্লেট নিয়ে, হাতে ছড়ি ঘুরাতে ঘুরাতে বলবে আমি সেনাপ্রধান, আমি অমুক, আমি তমুক। হতভাগ্য জাতি এভাবে পতনের মুখ দেখে।

আমি মজিদকে বললাম, মজিদ, আমি চাই না এই কয়দিনের জন্য আমার অন্য কোথাও ঢাকার বাইরে পোষ্টি হোক, আর আমি চাই, প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা ডিও (ডেমি অফিশিয়াল লেটার) লিখতে। কারন আমি সত্যিই সুপারসিডেড হয়ে আর আর্মিতে চাকুরী করতে চাই না। এই একটা  ব্যাপারে তুমি আমাকে সাহাজ্য করলেই হবে। আমাদের মধ্যে আর বেশী কথা হলো না।

আমি এবার নিজের বাড়ি বানানোর জন্য মনযোগ দিলাম। আর আর্মি থেকে বের হয়ে গেলে কি ব্যবসা করবো সেটা নিয়ে একদম সিরিয়াস হয়ে গেলাম। আর এরসাথে আমি একটা এপয়েন্টমেন্ট চাইলাম এমএস (মিলিটারী সেক্রেটারী) এর সাথে দেখা করতে। বর্তমানে এমএস হিসাবে দায়িত্তে আছেন মেজর জেনারেল সফিক স্যার। তিনি সিগন্যালের লোক।  আরেকটা  ডিও চিঠি লিখলাম, সেনাপ্রধানকে যেনো আমি তাঁর সাথে একটা এক্সক্লুসিভভাবে সাক্ষাত করতে পারি। আমার কিছু কথা বলার আছে, তাই।

অপেক্ষায় আছি, কবে এমএস এবং সেনাপ্রধান আমাকে সাক্ষাত দেন। আমি এর মাঝে প্রধানমন্ত্রীকেও ডিও লেটার লেখার ড্রাফট করতে বসে গেলাম। আর্মি থেকে বের হয়ে যাবার আগে আমি আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা এসব রাঘব বোয়াল টাইপের অফিসারদেরকে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলে যেতে চাই। আর এটা আমার বলার হক আছে।