জীবনকে যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছিলাম, যখন থেকে এটা বুঝেছিলাম যে, পরিবারের সবার জন্য এমন একজন মানুষ থাকে যার কাছে প্রয়োজনেই হোক, অপ্রয়োজনেই হোক, কিংবা আবদারের আবেগেই হোক অথবা বিনা কারনেই হোক তার কাছে সবকিছু চাওয়া যায়। সে দিতে পারুক বা না পারুক সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু মনের চাহিদার কথা তো কাউকে জানানো যায়। আর তার নাম ‘বাবা’। আমি আমার বাবাকে দেখেছিলাম কিন্তু তার কোনো স্মৃতি আমার কিছুই মনে নাই। না তার চেহারা, না তার রঙ, না তার কোনো আচরন। কারন আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র ছিলো দেড় কি দুই। ফলে ‘বাবা’ নামক সেই মানুষটি আমার বেলায় প্রজোজ্য না। আমার বেলায় যা ছিলো সেটা আমার বড় ভাই। ‘বাবা’ আর ‘ভাই’ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক। ফলে সেই ছোটবেলা থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, যখন মন যা চায়, সেটাই আমার পাওয়ার কথা না। তাই নিজের চাহিদার ব্যাপারে আমি সবসময়ই ছিলাম অতিমাত্রায় কন্ট্রোল্ড। অর্থাৎ যা না হলেই নয়, হয়তো সেটাও যদি কোনোভাবে ম্যানেজ করা যায়, তাহলে আর কারো কাছে এটা নিয়ে আর হাত পাতার দরকার মনে করতাম না। এরই ফলশ্রুতিতে আমি যেটা আমার মধ্যে দেখেছি সেটা হচ্ছে, নিজের চাহিদার ভারসাম্যতার সাথে পাওয়ার নির্ভরতা। কোনো কিছুর উপরেই আমার কখনো লোভ, সাধ আহলাদ কিংবা চাহিদা খুব একটা ছিলো না, এমনকি খাবার দাবারের বেলাতেও আমি ছিলাম অতিমাত্রায় অতীব সাধারান। কোনো কিছুই আমাকে আকর্ষন করতো না। এতা খেতে ভালো লাগে না, ওইটা চাই, কিংবা ওইটা খেতে পারছি না বলে অন্য আরেকটা খাবার না দিলেই নয়, এমন কখনোই ছিলো না।
মাত্র ১২ বছর বয়সেই আমি বাড়িছাড়া হই। আর সেটা হয়েছিলো একটা খুব ভালো অরগ্যানাইজেশনের কারনে। তার নাম ‘ক্যাডেট কলেজ’। ক্যাডেট কলেজে যারাই ভর্তি হয় অন্যান্য ছাত্ররা, তার বেশীর ভাগ ছাত্ররাই সবাই বেশ বড় বড় পরিবারের সন্তান। তাদের আচার আচরন, তাদের চাহিদা, তাদের কথাবার্তার সাথে আমার অনেক পার্থক্য ছিলো। আমি কাউকেই চিনি না, কেউ আমার খুব কাছের বন্ধু হবে এটাও ভাবি নাই, কারন ওদের মধ্যে ওদেরই সখ্যতা বেশী। ওদের আচরনে বুঝতাম, ওরা অনেকেই অনেককে চিনে আগে থেকে। গুটিকতক আমরা ছিলাম নিতান্তই অজপাড়াগা থেকে উঠে আসা কিছু ছাত্র। এই গুটিকতক আমরাও আসলে আমাদের কাউকে চিনি না। গ্রামের ছাত্রদের একটা ব্যাপার হলো, তারা খুব ছোট গন্ডি থেকে আসে বলে নিজের থেকেও কেউ মন খোলে একে অপরের সাথে কথাও বলে না, বা বলতে সংকোচ বোধ করে। আমাদের এই গুটি কতক গ্রাম্য ছাত্রদের ও বেলায় এই ঘটনাটা ঘোতে গেলো। আমরাও উপযাযক হয়ে কেউ কারো সাথে খুব একটা ঘনিষ্ঠ হবার পথ খুজে বের করি নাই। যার ফলে একাকীত্তের কারনে মন খারাপ হওয়া শুরু করতো মাঝে মাঝে। বয়স মাত্র ১২ আমার, কিই বা বুঝি জীবন সম্পর্কে? খালী মায়ের কথা মনে পড়তো, গ্রামের কথা মনে পড়তো, গ্রামের বন্ধু বান্ধবদের কথা মনে পড়তো আর নিদ্রাবিহীন সকাল হয়ে যেতো আমার। আমি জানতাম, আমার মা, আমার সেই পাড়াগা, আমার সেই অজপাড়াগায়ের বন্ধুদের কথা মনে পড়লেও তারা যে আমার মনের কোনো কষ্ট, বেদনা কিংবা হতাশা লাঘব করতে পারবে সেটা কখনোই হবে না কিন্তু একাকী জীবনে অবুঝ কোনো শিশু অথবা বোবা কোনো প্রানী যার সাথে মনের কোথায় যেনো একটা সখ্যতা আছে তাদের সান্নিধ্য কিংবা মনের ভিতরের কল্পনার সেই বিচরন হয়তো ক্ষনিকের জন্যে হলেও মন ভালো হয়ে যেতো। মনে হয়- আছে তো ওরা। এমন একটা পরিবেশে কিছুতেই আমার এই সখের ক্যাডেট কলেজ আর ভালো লাগছিলো না। আসলে ক্যাডেট কলেজে পড়ার আমার কোনো শখ ও ছিলো না। আমি তো এর নামই জানতাম না। এটা ছিলো আমার বড় ভাইয়ের জন্য একটা আশির্বাদ যাতে তিনি আমাকে কোনো একটা সেফ জায়গায় রেখে স্কলারশীপে কানাডায় যেতে পারেন, তার একটা বিকল্প ব্যবস্থা। আমার এই একাকীত্ব আর মন খারাপের কথা বলে আমার বড় ভাইকে আমি একটা চিঠি লিখলাম। কিন্তু চিঠিটা পোষ্ট করা হয় নাই আমার। কেনো করি নাই সেটাও আমার মনে আছে। কারন, আমি তখনো জানতেই পারি নাই কিভাবে ক্যাডেট কলেজ থেকে কার মাধ্যমে কোথায় চিঠি পাঠালে চিঠি যায়। ফলে ওই চিঠিটা আজো আমার কাছে রয়ে গেছে। আজ আমি এখানে সেই চিঠিটার কিছু অংশ লিখছি-
ভাইয়া, কিছুই ভালো লাগছে না আমার। না পড়াশুনা, না খাবার, না খেলাধুলা। বারবার গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি আপনাকে ভয় পাই সব কিছু বলতে কিন্তু আপনাকে না বলা ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ও নাই। এখানের সিনিয়ার ভাইয়েরা বড় নির্দয় এবং শাসক শ্রেনীর। কারনে অকারনে চোখ রাঙ্গায়, মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হয় যেনো জেল খানার কোনো কয়েদি আমি। কলেজের স্যারেরা ভালো কিন্তু তাদের কাছে কোনো কথা বলার মতো এতটুকু সাহস আমি আজো সঞ্চয় করতে পারিনি। বন্ধুবান্ধব যারা আছে, তারা সবাই যেনো কোনো এক গ্রহ থেকে এসছে। ওরা ওরাই কথা বলে, হাসে, খেলে আড্ডা দেয় কিন্তু আমি ওদের সাথেও খুব ভালো করে মিশতে পারি না। আমার কথার সুরে গ্রামের টান আছে, অনেকেই এটা নিয়ে হাসে। আমি বুঝতে পারি না, কোথায় আমার সমস্যা। এতো সব সমস্যা নিয়ে আমার পড়াশুনাতেও আমি খুব ভালো করছি বলে মনে হয় না। একটা রুমে মোট দশ জন ছাত্র থাকি, সবাই যার যার বিছানায় থাকি বটে কিন্তু মনে হয় আমিই এক মাত্র যে কিনা রুমে শুয়েও রুমে নাই। আমাএ সেই গ্রামের স্কুলই ভালো ছিলো। অন্তত বন্ধু বান্ধব দের সাথে স্কুলে হৈ হুল্লুর করে আর পড়াশুনা করে সময় কেটে যেতো। খুব ভোরে উঠতে হয়, মাঝে মাঝে বাথ রুমের সল্পতার কারনে অথবা অন্যান্য ছাত্রদের আধিপত্যতার কারনে আমি সব সময় বাথ রুমে গিয়েও পিছিয়ে যাই। কেনো জানি মনে হয়, আমি শুধু আমার স্যারদেরকেই ভয় পাই না, আমি সম্ভবত এই শহুরে ছাত্রদেরকেও কিছুটা ভয় পাই।
………… মার কথা মনে পড়ে, আপনার কথা মনে পড়ে, বোনদের কথা মনে পড়ে, আর সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে স্কুল শেষে স্কুলের মাঠে খেলার কথা, রাতের বেলায় উচ্চস্বরে বই পড়া আর তালে তাল দিয়ে কবিতা মুখস্থ করা। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের হেড স্যার অনেক রাগী হলেও তার মধ্যে একটা আদরের ভাব ছিলো। কিন্তু এখানে স্যাররা আমাদের আদর করেন কিনা সেটা আমি বুঝতে পারি না।
………… আপনি আমাকে ৫০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। তার থেকে আমি ৫ টাকা খরচ করে ফেলেছি।
আমার বড় ভাই একটা ব্যাপার খেয়াল রাখার চেষ্টা করতেন যদিও সেই যুগটা আজকালের মতো ছিলো না। মোবাইল ছিলো না, সহজেই এক জায়গা থেকে সল্প সময়ে অন্য জায়গায় যাওয়া যেত না। এরপরেও আমি কেমন আছি, আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, সেটার ব্যাপারে আমার বড় ভাই তার এক বন্ধুর মাধ্যমে খবর নেয়ার চেষ্টা করতেন, তার নাম ছিলো-রফিক কায়সার। রফিক কায়সার আমাদের বাংলা টিচার ছিলেন আর আমার বড় ভাইয়ের ক্লাশমেট ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। ক্যাডেট কলেজে তিনি ছিলেন আমার হাউজের হাউজ টিউটর। বিল্ডিং এর একদম উপরে চিলে কোঠায় থাকতেন একা। অবিবাহীত মানুষ। একদিন তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন জানার জন্য আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। সবসময় খুব ভয়ের মধ্যেই থাকতাম। আমি রফিক স্যারকে বললাম, আমার ক্যাডেট কলেজে থাকতে ইচ্ছে করছে না। আমি চলে যেতে চাই। উনি হেসে দিয়ে বললেন- ঠিক আছে, কয়দিন পর চলে যেও। আপাতত এই টার্মটা যাক। আমি খুশী হয়েছিলাম, কিন্তু এটা বুঝি নাই যে, ‘এই টার্মটা যাক’ মানে আমি যে ধীরে ধীরে এডাপ্টেশনে চলে যাবো এটা তিনি জানতেন। তখন হয়তো আমি ‘চলে যেতে চাই’ এই কথাটাই আর বল্বো না। আর হয়েছিলোও তাই।
তারপর যখন আরো একটু বড় হলাম, (এই বড় হওয়া মানে আমি যখন কলেজ পাশ করলাম তখনকার কথা বলছি, সেটা ১৯৮৩ সাল) তখন আরো একটা কঠিন বাস্তবতা আমার সামনে এসে হাজির হয়েছিলো। এই কলেজ অবধি ‘কঠিন বাস্তবতার’ ব্যাপারটা আমার মনে কখনো জাগ্রত হয় নাই কারন, ক্যাডেট কলেজের আর্থিক যোগান এতোটাই কম লাগতো যে, এটা হয়তো আমার বড় ভাইয়ের উপর কোনো চাপ পড়তো না। মাত্র ১৫০ টাকা মাস। তাতেই খাবার, পোষাক, বইপত্র, থাকা, এবং সব কিছু। আমার বড় ভাই আমেরিকা থাকতেন, ফলে এই ১৫০ টাকা প্রতিমাসে দেয়া খুব একটা চাপের বিষয় ছিলো না। কিন্তু আমি যখন কলেজ পেড়িয়ে সবেমাত্র এই বিশাল উম্মুক্ত দুনিয়ার জগতে পা রাখলাম, তখন যেটা আমার চোখের সামনে এসে ভর করেছিলো সেটা হচ্ছে, আমার ব্যক্তিগত আর্থিক সচ্ছলতার ব্যাপারটা। এতোদিন তো কলেজের মধ্যে সরকারী খরচে ছিলাম, এখন আর সেই সুযোগ নাই। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে হবে, নিজের খরচ, ইউন ইভার্সিটির খরচ ইত্যাদি সব এখন আমার নিজের। বড় ভাই এর পক্ষে এতো খরচ বহন করা সংগত হবে কিনা, তিনি করবেন কিনা সব যেনো এখন একটা শংকা হয়ে উঠলো। ইউনিভার্সিটির খরচ, ঢাকায় থাকার খরচ, খাওয়া দাওয়ার খরচ আর তার সাথে বইপত্র, কাপড় চোপড় এবং হাত খরচের ব্যাপারটা আমাকে প্রায় বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলো। নেহায়েত এটা কম ছিলো না। যার ফলে সবদিক ভেবেচিন্তে আমার কাছে আর্থিক সমস্যাটা একটা জটিল আর ভারী মনে হচ্ছিলো। সম্ভবত এটাই ছিলো আমার প্রথম কারন যার জন্যে আমাকে আবারো সমস্ত ধ্যান ধারনা আর সক্ষমতাকে বারবার হতাশ করছিলো।
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সব শাখায় আমি ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেও সম্ভবত এই আর্থিক সচ্ছলতার ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম যে, সম্ভবত আর্মিতে যাওয়াই হচ্ছে আমার বেষ্ট অপশন। আমি দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে আর্মিতে আসি নাই। কিংবা আমি দেশের জন্য প্রান উতসর্গ করে দেবো এই ব্রত নিয়েও আর্মিতে যোগ দিতে চাই নাই। সম্ভবত এ রকম অনেকেই থাকবে যারা আজীবন লালন করেছে আর্মিতে আসার কিন্তু আমি এটা ধারন করি নাই। অনেকে পড়াশুনা করতে হবে না আর এই রকম চিন্তাধারায়ও ছেলেমেয়েরা আর্মিতে আসে। সেটা হয়তো আমার ছিলো না। পড়াশুনা নিয়ে আমার কোন সমস্যা ছিলো না। তাহলে ব্যাপারটা এমনই দাড়িয়েছিলো যে, আমি আমার কাছেই একটা আর্থিক বোঝা হয়ে দাড়িয়েছিলাম। লজ্জা, বেদনা, কষ্ট কিংবা অপমান এসবের কোনো ইরেজার নাই। কিংবা এগুলি কোন কিছু দিয়েই দূর করা যায় না। আমার কোনো ব্যাকওয়ার্ড ইন্ট্রিগেশন ছিলো না। ফলে আমার ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই ক্যাপাসিটির মধ্যে অনেক ফারাক ছিলো। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হবার পর নিজকে খুব একা আর ভিতর থেকে শুন্যতায় ভুগছিলাম। কিন্তু তারপরেও আমার কারো উপর রাগ কিংবা অভিমান ছিলো না। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম কিভাবে কি করা যায় আর সেটা নিজের ক্যাপাসিটিতে এবং সৎ ভাবে। সব কিছু ভেবে চিনতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার খুব তাড়াতাড়ি একটা জব দরকার। ডাক্তারী পড়তে গেলে কম পক্ষে ৫/৬ বছর লাগবে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলেও ব্যাপারটা প্রায় একই। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার পর কোথায় চাকুরী পাবো আর কাকে বল্বো সে পথ ও আমার খুব একটা জানা নাই। এর ফলে যেটা হলো- শেষমেশ আমি আর্মিতেই ভর্তি হয়ে গেলাম। দু বছরের ট্রেনিং, ট্রেনিং এর সময় সরকার একটা হাত খরচ দেবে আর আমার ভরন পোষন তো সরকারের দায়িত্ব। এর থেকে সেফ কোনো উপায় আমার কাছে ছিলো না। আর্মিতে গিয়ে আমার যেটা লাভ হয়েছিলো সেটা হলো যে, আমি আমাকে চালাতে পারছিলাম, কারো উপরে আমার নির্ভরতার দরকার ছিলো না। যদিও সেই আর্থিক জোগানটা ছিলো হ্যান্ডস টু মাউথ অবধি। তারপরেও আমি কারো উপরে নির্ভর করতে চাই নাই। আর তেমন কেউ ছিলোও না নির্ভর করার মতো। আমার ভাই ভাইয়ের মতো, তার হিসাব কিতাব তার মতো। আর সেই বা কেনো আমার জন্যে কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করবে? সে হিসাবে আমি মনে মনে হলেও একটা সাধীনতায় ভোগতাম। কিন্তু আর্মিটা আমার জীবনের চয়েজ ছিল না।
ক্যাডেট কলেজে থাকাকালীন এই ৬ বছরে আমার মোট ৪৫ জন বন্ধুওই ছিলো। তারা সবাই আবার আমার যে খুব কাছের তাও না। তবে খারাপ বন্ধু ছিলো না ওরা। বাইরে এসে তো আমার আরো বন্ধু কমে গেলো। যারা ছিলো তারা বেশীরভাগ আমার ‘মেট’। কেউ ‘ক্লাশমেট’, কেউ ‘কোর্ষমেট’, কেউ ‘ইয়ারমেট’। হাতেগোনা কয়েকজন ছিলো আমার হয়তো কাছের ‘মেট’ যাদের সাথে হয়তো আমার মনের কিছু আবেগ, কিছু কথা বলতাম। কিন্তু আমার মনে পড়ে না আমি কারো কাছে আমার কষ্টের কথা, বেদনার কথা বলেছি। কেনো বলতাম না, বা কেনো বলা হয় নাই, এটা কোনো পরিকল্পনা করে করা নয়। আসলে হয়তো শেয়ার করার প্রবনতাই ছিলো না। কিন্তু মনের ভিতরে একটা বাস্তবতা আমার সারাক্ষন জাগ্রত ছিলো-আমি একা, আমাকে সাপোর্ট দেয়ার মতো কোনো মানুষ নাই। অন্তত আর্থিক সাপোর্ট।
আর্মির দু বছর ট্রেনিং করার পর ২ লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন পেলাম। এটা একটা জব। যদিও বেতন মাত্রে সারে আট শত টাকার বেসিক স্কেল। সব মিলিয়ে হয়তো পাই ১৪/১৫ শত টাকা। মেসের খরচাদি দিয়ে সিগারেট বিড়ি খেয়ে মুটামুটি চলে যায় কিন্তু মাকে হাত খরচ দেবার মতো আমার সাধ্য ছিলো না। মাকে আমার বড় ভাইই চালাতেন। প্রতিমাসে ১২০০ টাকা দিতেন। মায়ের ও যে খুব ভালো চলছিলো তাও না। তবে মা ম্যানেজ করে নিতেন। আমার মাঝে মাঝে খুব আফসোস হতো, ইশ যদি অনেক টাকার চাকুরী করতাম, তাহলে আমিই মাকে সব খরচ দিতে পারতাম। এই কষ্টটা থেকেই সম্ভবত আমি যখন ছুটি পেতাম, আমি মাকে যতটুকু পারতাম, ভালো মন্দ করতাম। বাজার করতাম, ফল মুল আনতাম, মা খুশী হতেন। কিন্তু মার খুব একটা আফসোস ছিলো আমার বড় ভাইয়ের উপর যে, তার বড় ছেলে আমেরিকায় কম পয়সা কামাচ্ছে না, তারপরেও মায়ের মাসিক টাকার পরিমানটা কখনো বাড়ে নাই।
আমি যখন সবেমাত্র লেফটেন্যান্ট, মিটুলের সাথে আমার পরিচয়। ওর সাথে যখন আমার সখ্যতা হয়, সম্ভবত আমি এটাই ধরে নিয়েছিলাম, কেউ কিংবা কারো সাথে যদি আমার অপারগতার কথা, আমার ব্যক্তিগত কোনো কথা কিংবা এমন কিছু যা একজন আরেক বন্ধুকে শেয়ার করে সে রকমের ব্যাপার শুধু ওর সাথেই করা যায়। আসলে ঐ আমার জীবনের প্রথম বন্ধু। ওর ব্যাপারটাও প্রায় আমার মতোই ছিলো। অষ্টম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় মিটুল ওর বাবাকে হারিয়েছে। ৮ জন বোন আর ৩টা ভাইয়ের সংসার খুব যে একটা শক্তিশালী সেটাও নয়। ফলে ওর মানসিক, আর্থিক কিংবা অন্যান্য চাহিদার রশি মিটুল নিজেই টেনে ধরেছিলো। প্রায় আমার মতো একই মানষিকতায় মিটুলও গড়ে উঠছিলো। অল্পবিত্ত মানুষের একটা গুন থাকে-আর সেটা হলো, অল্পতেই তারা সবকিছুতে মানিয়ে নেয়। আশেপাশের অনেক লোভনীয় কিছু থাকলেও চোখ সেটা দেখেও না দেখার ভান করে। আর এর প্রধান কারন-সেসব তো না যায় ধরা, না যায় ছোয়া। তাহলে আর সেগুলি নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই। তবে হ্যা, একটা বিশ্বাস তো থাকেই যে, কোনো একদিন, হয়তো আমার সেগুলি আসবে, আর তারজন্যে দরকার নিজেকে তৈরী করা। আর এই তৈরী করাই হলো সেই স্বপ্ন যা তাদেরকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়। ওরা পারে।
মিটুলের সাথে পরিচয় হবার পর, মাত্র এক বছরের মাথায় ওকে আমার বিয়ে করতে হয়। সেটা ছিলো একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি। মিটুলের তখনো ইউনিভার্সিটির কোনো ডিগ্রী শেষ হয় নাই। মাত্র ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়ে। এর মধ্যে যখন ওর আমেরিকা প্রবাসী একজন ভদ্রলোক ওকে দেখে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্থাব দিলো, ওর পরিবার সেই প্রবাসীকে হাতছাড়া করতে চাইছিলো না। কিন্তু আমার আর মিটুলের সম্পর্ক ভাঙবার ছিলো না। কিন্তু এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য আমাকে বিয়েই করতে হয়েছিলো। প্রচন্ড রিস্ক নিয়েছিলাম কারন আর্মিতে আর্লি ম্যারেজের একটা শাস্তি আছে। সেটা জেনেও আমি পিছপা হইনি। বিয়ে করে ফেলি। এমনিতেই আমাকে আমি খুব সচ্ছল্ভাবে চালাইতে পারছিলাম না, এর মধ্যে ঢোকে গেলো আমার নব বিবাহিতা মিটুল। আমি কোনোভাবেই চাইনি যে, আমার বউ এর পড়াশুনার খরচ ওর পরিবার দিক কিংবা ওকে বিয়ে দেবার পরেও মিটুল ওদের পরিবারের আর্থিক সাহাজ্যে চলুক। আমার রোজগারের প্রতিটি টাকার হিসাব আমি করতাম। কোনো ভাবেই আমি বেহিসাবী ছিলাম না। এমন একটা পরিস্থিতি কাউকে বুঝতে দিতেও চাইনি। না আমি কারো উপজাজক হয়ে সাহাজ্য পেয়েছি। ফলে যখন আমি বিয়ে করি, তখন যেটা আমার মাথায় সর্বোপ্রথম সর্বদা জেগেছিলো যে, আমার পরিবারের আমাকে ছাড়া অন্য কারো উপরে তাদের নির্ভর করার উপায় নাই। আমার এই ধারনাটাই আমার অনুপস্থিতিতে ওরা কেমন থাকবে, কিভাবে চলবে, কৈ গিয়ে দাঁড়াবে, এসব আমি সবসময় মনে রাখতাম। আর এর সহজ সমাধান ছিলো একটাই। আর সেটা হলো ওদেরকে সাবলম্বি করে তোলা। তাহলে কিভাবে সেই সাবলম্বি করা যায়? আমি এটা ভাবতাম আর ভাবতাম। এই ভাবনা থেকেই আমি কিছু হোম ওয়ার্ক করি। তারমধ্যে সর্বো প্রথম যেটা আমার মাথায় এসেছিলো সেটা হলো-ওদের থাকার জায়গাটা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় ভাবনাটা ছিলো যে, আমার অনুপস্থিতিতে ওদের প্রতিমাসে সচ্ছল্ভাবে চলার জন্য যে টাকা লাগবে সেটা সর্বদা একটা স্থায়ী উৎস থেকে ওদের হাতে আসা। তৃতীয় ভাবনাটা ছিলো-আমার জীবদ্ধশায় আমার সন্তান এবং আমার স্ত্রীকে নিজের পায়ে দাড় করানো। এটাই ছিলো আমার একমাত্র এবং শুধুমাত্র ভাবনা। আমি আমার এই ভাবনাটা থেকে কখনো কোনোদিন এক মূহুর্তের জন্যেও পিছিয়ে যাই নাই।
ক্যাডেট কলেজ ছাড়ার পর প্রায় ৩৭ বছর পর এসে আমি আমার সেই ভাবনার প্রতিফলনটা যদি বলি, তাহলে আমি অনায়াসেই আমার ব্যালান্স শীট কি সেটা বুঝতে পারি। আজকে আসলে আমি লিখতে বসেছি আমার সেই ভাবনার ব্যালান্স শীট নিয়ে যে আমি আসলে এ ব্যাপারে কতটুকু করতে পেরেছি। আমার এই লেখা অন্য কারো জন্য নয়, এটা নিতান্তই একটা সেলফ অডিটের মতো। কেউ জানুক আর নাইবা জানুক, আমি তো নিজেকে বলতে পারবো-আমার সাফল্য আর ব্যর্থতা কি ছিলো আর কি পাই না।
এবার যদি আরো একটু বিস্তারীত বলি তাহলে কথাগুলি হয়তো এ রকমের হবে যে,
খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলাম, মাত্র ২২ বছর বয়সে, আর চাকুরীটাও ছিলো খুব অল্প বেতনের। মাত্র সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, বেতন ৮৫০ টাকা। মিটুলকে আমি সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সময় একটা কথাই বলেছিলাম, নিজের পায়ের উপরে দাড়াতে হবে। মিটুল সেটা করেছে। ইউনিভার্সিটি পাশ করে বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকুরীতে জয়েন দিয়েছে। আজ সে ফুল প্রোফেসর। তার মাসিক একটা ইনকাম আছে, আবার পেনশনের পরেও একটা থোক টাকা পাবে। ঠিক এই মুহুর্তে মিটুলের মাসিক বেতন প্রায় ১ লক্ষ টাকা। এই টাকাটা থেকে আমি কখনো হাত দেই নাই। এখনো না। ওর টাকা বিশেষ বিশেষ জরুরী টান দেয়া ছাড়া প্রায় সব টাকাই সঞ্চিত থাকে। ফলে ওর একটা ক্যাশ ব্যালেন্স আছে। সেটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটা একটা সাপোর্ট অবশ্যই।
আমার বড় মেয়ে ইতিমধ্যে ডাক্তারী পাশ করেছে। বর্তমানে সে ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতালে চাকুরী করে। বেতন যদিও সামান্য, মাত্র ২৮ হাজার টাকা, কিন্তু ওর যে প্রোফেশন তাতে অন্তত সে তার নিজের সংসার চালানোর মতো ক্যাপাসিটি আছে। এ ছাড়া ওর নামেও প্রায় লাখ ত্রিশের টাকার একটা সঞ্চয় করা আছে যা বিপদের সময় ওকে সাহাজ্য করতে পারবে।
ছোট মেয়ে আমেরিকায় চলে গেছে পড়াশুনার জন্য। ওর আগামী এক বছরের সমস্ত খরচ আমার অগ্রীম দেয়া আছে। ফলে আগামী বছরে গিয়ে ওর আবার টাকা লাগবে। এর মধ্যে কনিকা আমেরিকার লাইফ বুঝে যাবে, হয়তো সে নিজেই নিজের খরচটা জুগিয়ে ফেলতে পারবে।
চমৎকার পরিবেশে থাকার জন্য আমার একটা বাড়ি করা আছে। যার দোতালায় ওরা আজীবন নিজের বাড়িতে থাকতে পারবে। আর বাকী ফ্ল্যাটগুলি থেকেও প্রতিমাসে অন্তত ৬০/৭০ হাজার টাকা ভাড়া আসে। বাসাবোতে আমার একটা ফ্ল্যাট রয়েছে যেখান থেকেও একটা প্রায় ১৫ হাজার টাকার মতো ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া মিটুল কিছুদিন আগে নিজেদের অন্যান্য সঞ্চয় দিয়ে তিনবোন মিলে নিজদের বাপের বাড়িতে একটা বিল্ডিং করেছে যার মধ্যে তার নিজের আছে ৭টি ফ্ল্যাট। এখনো ভাড়া শুরু হয় নাই কিন্তু যখন এই ফ্ল্যাটগুলি ভাড়া শুরু হবে, তখন কম করে হলেও প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া আসবে।
এখন যদি আমি হিসাব করে দেখি, দেখা যাবে যে, মিটুলের মাসিক বেতন, আমার বাড়ির থেকে ভাড়ার আয়, বাসাবো থেকে বাড়ি ভাড়া আর মানিকগঞ্জের বাসা থেকে আয় মিলে প্রায় দুই লাখের উপরে টাকার জোগান হয়ই। এ ছাড়া নিজেদের থাকার জন্য কোনো বাসা লাগছে না কারন মীরপুরের বাসায় আমরা দোতালার পুরুটাই থাকি। যদি কখনো ক্যাশ টাকার দরকার হয়, মিটুল, উম্মিকার আর কনিকার যে সঞ্চয়পত্রগুলি কেনা আছে তাতে প্রায় এক কোটির উপরে সেভিংস আছে। নিজেদের তিনটা গাড়ি আছে। আমার অনুপস্থিতিতে ওদের হয়তো তিনটা গাড়ির দরকার হবে না। আমার জীপ গাড়িটা হলেই হবে। আর নিদেনপক্ষে যদি দুটু গাড়িও ওরা রাখতে চায়, তাতেও কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। সেক্ষেত্রে তিন নম্বর গাড়িটা বিক্রি করে দিলেও কিছু ক্যাশ টাকা হাতে আসবে।
আমি বর্তমানে ব্যবসা করছি। আর্মির চাকুরীটা ছেড়ে দিয়েছিলাম আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে। এই ১৬ বছরে আমার ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান আল্লাহর রহমতে প্রায় ৫০/৬০ কোটি টাকার মুল ধনে পৌঁছেছে। এর ৩৫% শেয়ার আমার নিজের। প্রতিমাসে অনারারিয়াম হিসাবে ২০২২ সাল অবধি আমি নিজেই নিচ্ছি তিন লাখের উপর। গাড়ির খরচ, ড্রাইভারের খরচ ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান থেকেই আসে। আমার একজন ব্যবসায়ীক পার্টনার আছে যার শেয়ার ৬৫%। ব্যবসায় ভবিষ্যত কি হয় সেটা আগে থেকে বুঝা যায় না। তবে যেভাবে চালাচ্ছেন আল্লাহ, ভালো যাচ্ছে। তারপরেও আমি আমার অনুপস্থিতিতে ব্যবসায়িক লাইনের উপর কোনো নির্ভরতা করি না। আমার ব্যবসায়ীক লাইন থেকে যদি কখনো কোনো টাকা নাও পায় আমার পরিবার, আজ যেভাবে তারা লাইফ লিড করছে, আমার ধারনা ইনশাল্লাহ ওরা কারো কাছে আর হাত না পেতেই ঠিক এভাবেই ওরা তাদের লাইফ লিড করতে পারবে ইনশাল্লাহ। আর আমি ঠিক এটাই চেয়েছিলাম। আর যদি আমার অনুপস্থিতিতে আমার পার্টনার আমার শেয়ার বিলুপ্ত করে আমার পরিবারকে বিদায় করতে চান, তারপরেও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান থেকে শেয়াএর অনুপাতে কম করে হলেও আমার পরিবার ১০/১৫ কোটি টাকা নগদ পাবে। সেই টাকা যদি আমার পরিবার শুধু ব্যাংকেই রেখে দেয়, তারপরেও প্রতিমাসে তারা নুন্যতম হলেও ৬/৭ লাখ টাকা পাবে। আমাদের পারিবারিক সঞ্চয় আর ব্যবসায়ীক টাকার লাভ মিলে আমার পরিবার প্রায় ৭/৮ লাখ টাকা প্রতিমাসে পাওয়ার কথা। আর এই পরিমান টাকায় যে কোনো পরিবার খুব ভালোভাবেই চলতে পারবে ইনশাল্লাহ।
আল্লাহ যদি আমাকে বাচিয়ে রাখেন, তাহলে এর মধ্যে আমি চিন্তা করছি যে, আমার যে সব জায়গা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সবগুলি বিক্রি করে দেবো। কারন আমার সেসব সম্পত্তি আসলেই আমার স্ত্রী বা মেয়েরা কখনোই খুজে বের করে তার তদারকী করবে না বা করতে পারবেও না। ফলে তাদের জামাইয়েরা যখন দেখবে অনেক জায়গায় জমিজমা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তখন ওরা যা করবে সেটা হচ্ছে ৫ টাকার মাল ২ টাকায় বিক্রি। যদি সেটাই হয়, তাহলে আমিইবা কেনো ৫ টাকার জিনিষ এই মুহুর্তে ৩ টাকায় বিক্রি করি না? তাই ওই সব জমিজমা আমি ভেবেছি বিক্রি করে দিয়ে ক্যাশ করে ফেলবো। তাতে দেখা যায় যে, আমার হাতেও প্রায় দুই তিন কোটি টাকা ক্যাশ থাকবে যা একটা এসেটের মতো। রিভার সাইড সুয়েটার্স ব্যবসাটা তো আছেই। তাহলে আমি কি এটা বলতে পারি না যে, আজ থেকে ৪৫ বছর আগে যে দুঃস্বপ্নটা আমি দেখেছিলাম, আজ সেই খারাপ অনুভুতিটা আমার অনেকাংশেই কমে গেছে? অর্থাৎ আমি ঠিক পথেই ছিলাম আমার পুরু পরিকল্পনাটা নিয়ে।
মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমি চালাতে পারিনি। এটা ব্যবসায়ীক সাফল্য দেখেনি। উপরন্ত মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমার অনেক লাভ, অনেক সঞ্চয় কেড়ে নিয়েছে। আমি আমার চেষ্টার কোনো প্রকার ত্রুটি করিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজকে রক্ষা করার জন্য কিন্তু যেভাবেই হোক যে কারনেই হোক, মা ইন্ডাস্ট্রিজ বারবার ভুল মানুষের হাতেই পড়েছে আর বারবার শুধু ক্ষতির সম্মুক্ষিণই হয়েছে। অবশেষ আমি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে, আর কখনোই এই মা ইন্ডাস্ট্রিজকে সচল করে চালানোর দরকার নাই। সেই ২০১০ সাল থেকে মা ইন্ডাস্ট্রিজ চালানোর পর কম করে হলেও ৪/৫ কোটী টাকা আমি লস করেছি। কিন্তু মা ইন্ডাস্ট্রিজ এক জায়গায় আমাকে সেটা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। আর সেটা হচ্ছে জমির ভ্যালু।
মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জায়গায় আমার মোট জমি আছে (২২ + ৪৬ + ২২.৫ +২৬ ) শতাংশ। আমি ২২ শতাংশ জমি বিক্রি করে দিয়ে মা ইন্ডাস্ট্রিজের লোন অবমুক্ত করার পরেও আমার কাছে বাকী জমিগুলি রয়ে গেলো। যার দাম নেহায়েত কম নয়। সব মিলিয়ে কম করে হলেও এর দাম প্রায় ৩ কোটী টাকা। সাউথ টাউনের প্রায় ৪১ শতাংশ জমি এখনো ডিস্পিউট অবস্থায় আছে। পেলে ভালো, আর পেলেও আফসোস করবো না। তবে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। আর ধলেশ্বরী গ্রীন ভিলেজে আমার নিজের সম্পত্তি আছে প্রায় ২৮ বিঘার মতো। এতো কিছু সব তো আমিই করেছি। আলহামদুলিল্লাহ।
আজ প্রায়ই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। আজ যদি আমার মা বেচে থাকতেন, যেটা আমি করতাম সেটা হলো- মাকে ইচ্ছে মতো যত খুশী টাকা দিতাম আর বলতাম, যা খুশী করেন। যদি টাকা পূড়িয়েও আনন্দ পান, তাহলে টাকাও পুড়িয়ে দেন। হয়তো সেটাই আমার হতো আনন্দ যে, মা আনন্দ পাচ্ছেন। কিন্তু তিনি আজ বেচে নেই।