(Purpose of my Life-1)
আজ থেকে ১০০ বছর পর ঠিক এই সময়ে আমাদের যুগের বেশীরভাগ মানুষ আর এই পৃথিবীতেই হয়তো থাকবে না। হয়তো খুবই নগন্য কিছু সৌভাগ্যবান অথবা অন্যঅর্থে দূর্ভাগ্যবানও বলা যেতে পারে, তারা বার্ধক্যের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্ষীনদৃষ্টি আর দূর্বল শরীরে এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে যা কখনোই তারা চায় নাই। যার নাম ‘মৃত্যু’।
এই শতবর্ষে ক্যালেন্ডারের পাতা প্রতিদিন পালটে যাবে, তাঁর সাথে সাথে পালটে যাবে তারিখ, মাস, বছর এবং অতঃপর যুগ। কেউ এটাকে আমরা থামাতে পারিনি, পারবোও না, আর কেউ পারেও নাই। এটাই প্রকৃতি আর এটাই তার সতসিদ্ধ নিয়ম।
এই মুহুর্তে যারা পথেঘাটে আমার পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে, তাদের বেশীর ভাগ মানুষকেই আমি চিনি না। এদের কেউ হয়তো কোটটাই পড়া, কেউ হয়তো ফুটপাতে নোংরা চুলে বসা, আবার কেউ হয়তো আমার মতোই চলমান বা স্থবির। সময়ের পথ ধরে আমরা সবাই পূর্ব পুরুষদের পথ ধরে মহাশ্মশানের সারিসারি পাথরে লুকিয়ে যাবো ঠিক সেইস্থানে যার কথা আমরা আজ ভাবতেও পারি না। সেখানে না আছে কোনো কোট টাই পড়া আধুনিক পোষাক, আর না আছে কোনো আলখেল্লা। অনেকের বেলায় হয়তো সেই নামফলকটাও থাকবে না। কোথায় আছেন তারা, কার জায়গায় আছেন তাঁরও কোনো হদিস পাওয়া যাবে না। আজ যে শরীরটাকে প্রতিদিন নোংরা মনে করে দেশী বিদেশী সাবান শ্যাম্পু দিয়ে সুগন্ধী মাখছি, তখন এই শরীরের মধ্যে হাজারো পোকা মাকড়, কর্দমাক্ত মাটি, নোনা জল, অপরিষ্কার জলের সাথে ভেসে আসা দূর্গন্ধময় আবর্জনায় সারাটা শরীর ভেসে গেলেও তাকে আর সুগন্ধী কেনো, উম্মুক্ত হাত দিয়ে সরানোর মতোও আমাদের কোনো শক্তি থাকবে না। শরীরে মাংশ পচেগলে মিশে যাবে মাটির সাথে। হয়তো কোনো এক কুকুর কিংবা শিয়াল আমাদের শরীরের অবশিষ্ঠ হাড্ডিটি নিয়ে দূরে কোথাও পচে যাওয়া মাংশটুকু খাওয়ার জন্য দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। কার সেই কংকাল, কার সেই হাড্ডি, এই পৃথিবীর কোনো জীবন্ত মানুষের কাছে এর কোনো মুল্য নাই।
যে ঘরটায় আমি সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অবসাদ শরীর নিয়ে মুলায়েম বিছানায় গা হেলিয়ে দিতাম, সেই ঘরটা হয়তো থাকবে অন্য কারো দখলে। কে তারা, কি তার পরিচয়, সেটাও হয়তো আমার জানা হবেনা। যে বাগানটায় আমি প্রায়ই পায়চারী করে আকাশ দেখতাম, গাছগাছালীর মধ্যে উড়ে আসা ভ্রমর কিংবা পোকামাকড় দেখতাম, সেই বাগানের দখল এখন কার দখলে কে জানে। বাগানের গাছগাছালীর পরিচর্যার নামে যে পোকামাকড়গুলিকে আমি বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করতাম, আমি আজ তাদেরই দখলে। যে বাচ্চাদের মুখরীত কোলাহলে আমার ঘর ভরে থাকতো, যাদের আগমনে আমার মন পুলকিত হতো, আজ সেখানে অন্য কেউ মুখরীত হচ্ছে।অথচ কতই না সাবধানতায় আগলে রেখেছিলাম আমার সেইঘর, সেই লন, কিংবা আমার যতো আয়েশী জিনিষ, আজ সেগুলি আমার কিছুই নয়। আমার সুন্দুরী স্ত্রী যখন তাঁর লাল শাড়িটা পড়ার পর কিংবা আমিই যখন নতুন কোনো একটা ড্রেস পড়ে বারবার আয়নার সামনে গিয়ে কতবার দেখতে চেয়েছি-কেমন লাগে আমাকে দেখতে, আজ সেই আমি বা আমার সেই সুন্দুরী স্ত্রী তাঁর চেহাড়া কেমন দেখায় কাফনের সেই ধবল পোষাকে সেটা দেখার কোনো পায়তারাও আমার নাই। আমি সেই ধবল পোষাকে এতোটাই শংকিত, যা আমি কাউকে বলতেও পারছি না। এখন সেই বৃহৎ আয়নাটার আর কোনো মুল্য নাই আমার কাছে। হয়তো সেখানে অন্য কেউ এখন তাঁর চেহাড়া দেখছে, হয়তো লাল শাড়ির পরিবর্তে নীল বা লাল টাইকোট পড়া কোনো এক পুরুষ একটা ভেষ্ট পড়া ব্যাকব্রাস চুলের মহড়া দিচ্ছে। যে গাড়িটা প্রতিদিন আমাকে মাইলকে মাইল ঠান্ডা কিংবা শীততাপ হাওয়ায় বসিয়ে, মিষ্টি মিষ্টি গান শুনিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে, সেটা আর আমার কোনো প্রয়োজন নাই। না সে আমাকে আর খোজে।
কখন কোথায় কাকে নিয়ে কবে কোথায় কি আনন্দে মেতেছিলাম, সেই ইতিহাস আর কেউ কখনো মনে রাখবে না। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কতটা পথ হেটেছিলাম, আর সেই হাটাপথে আমি কতটুকু ঘাম ঝরিয়ে চূড়ায় উঠে কি তৃপ্তি পেয়ে কি আনন্দে কতটুকু আত্তহারা হয়েছিলাম, সেই তথ্য না কেউ জানবে, না কেউ জানার কোনো আগ্রহ দেখাবে। কার সাথে কি নিয়ে আমার মনোমালিন্য হয়েছিলো, বা কে আমাকে কতটুকু ভালোবেসে কি অবদান রেখেছিলো অথবা কার কোন আগ্রহে আমি কোথায় কি করেছিলাম, কার কারনে আমার অন্তরে জালা উঠেছিলো আর কার কারনে আমার দিন আর রাত একহয়ে গিয়েছিলো, সেই ইতিহাসের কোনো মুল্য আজ বেচে থাকা মানুষগুলির কাছে কোনো অর্থ বহন করেনা। না তাদের কাছেও যাদের জন্য এসব অন্তর্জালা ঘটেছে। নতুন প্রজন্ম নতুন পরিবেশ, নতুন সব কাহিনীতে ভরে থাকবে বর্তমান আর আগামীর প্রজন্ম। সেই পুরাতন পরিবেশের কোনো স্থান থাকবেনা আজকের এই পরিবর্তীত পরিবেশে। হয়তো কোনো এক ছোট বালিকা আমাদের কথা শুনে, অথবা ভালোবেসে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে আমাদের সেই সমাধিতে দাঁড়িয়ে একটু অন্যমনষ্ক হয়ে পুষ্পস্তবক দিতেও পারে কিন্তু সেটা নিছক একটা মুহুর্তের ইমোশনাল কারনে। সবার বেলায় এটা আবার নাও হতে পারে। কিংবা জন্ম জন্মান্তরের শেষে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শেষে আমি এমন করে বিলীন হয়ে যাবো যে, সেই অবুঝ বালিকার পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর একটা বাশী ফুলও নিয়ে আমার সেই সমাধিতে দাঁড়াবে না। কারন আমি তাদের কোনো ইতিহাসের মধ্যেই নাই। চিরতরেই বিলীন।
আজ যে সেলফীটা অনেক যত্ন করে তোলা হয়েছে, হাসিমাখা মুখ, চুলের বাহার, পোষাকের পরিপাটিতা, সবকিছু ধীরে ধীরে সেই শতবর্ষ পরে এমন করে মলিন হয়ে যাবে, হয়তো দেখা যাবে, সেই ছবিটাই পরে আছে এমন এক কোনায় যেখানে থাকে পরিত্যাক্ত কোনো কাগজ বা ময়লার বাক্স। কোনো একদিন সেটা হয়তো অপ্রয়োজনীয় হয়েই বেরিয়ে যাবে আমার সেই শখের ঘরের দরজা পেরিয়ে। আমার প্রতিদিনের নেশা সেই সোস্যাল মিডিয়া, হোয়াটসাপ, ইত্যাদি সবকিছু এক নিঃশ্বাসে বন্ধ হয়ে যাবে আমার সারাদিনের আপডেট আর কাহিনি। যে অর্থের জন্য আমি প্রতিদিন সারাটা সময় শুধু পরিশ্রমই করে গেছি, সেই অর্থ আজ আমার কোনো কাজেই আসবে না। শতবছর পরে তো আমার অর্থে গড়া কোনো এক ইমারতের কোনো একটা ইটের মধ্যেও আমার কোনো নাম বা অস্তিত্ব থাকবে না। হোক সেটা আমার পরিশ্রমে গড়া কিংবা আমার নিজের। সেখানে হাত বদলে বদলে আমার অস্তিত্তের শেষ পেরেগটুকু মেরে সেখানে হয়তো কোনো এক লোকের নাম লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যেটা আজ আমার নামে পরিচিত, শত বছর পর সেটা আমার আর নাই, না সেটা আমার নামেও অহংকার করে।
কি অদ্ভুত না?
শত বছরের হিসাবে যেমন আমি আর নাই, হাজার বছরের হিসাবে তো আমি কখনোই নাই। তারপরেও আজ আমি অনেক ব্যস্ততায় দিন কাটাই আগামিকালের জন্য, প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যের ধন প্রকাশ্যে অথবা গোপনে চুরি করে বিত্তবান হবার পার্থিব জগতে সুখী হবার নিমিত্তে আগামীকালের শান্তির জন্য মগ্ন আমি। অথচ আগামিকালটাই আমার না। এই পৃথিবী আমাকে কখনোই মনে রাখবে না। কারন সে আমাকে ভালোই বাসে নাই। অথচ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম আমার জীবনের থেকেও বেশী। আর এটাই এই পৃথিবী। আমার থেকেও অনেক নামীদামী রাজা, মহারথী সময়ের পথ ধরে বিশ্বকে দাপিয়ে গেছেন, তাদেরকেও এই পৃথিবী মনে রাখে নাই। আসলে এই পৃথিবীর কোনো বর্ষাই আমার না, কোনো শরতই আমার না। এর গাছপালা, এর নীলাকাশ, এর সুগভীর সমুদ্র কিংবা ঘনসবুজ পাহাড় কোনো কিছুই আমার না। আমার ঘরটাও না।
শতবছর পরে, আমি এক অচেনা, নামহীন, অস্তিত্বহীন মানুষ যে আজকের দিনে বহু ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটিয়ে কিছুটা সময় এই নীল আকাশ, ঘন সবুজ পাহাড় অথবা পাখীদের কিচির মিচির শুনেছিলাম। অথচ এই সময়ে এসে কোনো এক সন্ধ্যায় খুব জানতে ইচ্ছে করে-আজ থেকে শত বছর আগে কি ঠিক এখানে কেউ বসেছিলো যেখানে আমি বসে আছি? খুব জানতে ইচ্ছে করে-কে সেই ভাগ্যবান যুবক আজ থেকে ঠিক শতবর্ষ পরে এখানে বসে চা কিংবা কফি পান করছে? হয়তো দেখা হবে সবার সাথে কোনো এক নাম না জানা ময়দানে যার নাম The Final Day.
এতো কিছুর পরে আজ এই সায়াহ্নে এসে বারবার একটা প্রশ্ন জেগেই রইলো-স্রিষ্টিকর্তা আমাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিশ্ব ভ্রমান্ডে পাঠিয়েছিল?