ইদানিং খুব বেশী বেশী মন খারাপ হয়। প্রায়শই ম্যাসেজ আসছে আমারই সমবয়সী কোনো না কোনো এক অফিসার বা চেনা জানা কেউ আগাম সিম্পটম ছাড়াই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে। অথবা এমন সিম্পটম যা বিসশাস করা যায় না যে, সেই মামুলী সিম্পটমের কারনে তারা আর নাই এই দুনিয়ায়। ম্যাসেজটা পড়ি, বারবার পড়ি আর ভাবী, আহা, এই গতকালও তো মানুষটি সবার সাথে ছিল। আকাশ দেখেছে, নদী দেখেছে, সূর্য উঠা দেখেছে, রাত দেখেছে, সবার সাথে আড্ডা দিয়েছে, অথচ মানুষটি আজ নাই। আর কখনো ইচ্ছে করলেও ছুটে আসতে পারবে না। ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেট এক্টিভেট হয়ে গেছে। ভাবতেই যেনো বুকটা মুচড়ে আসে। সবার হাতেই একটা করে ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেট রয়েছে, এটা শুধু মেয়াদ উত্তীর্ন হতে বাকী শুধু। যে কোনো সময়ে আমিও আর এইসব প্রকৃতি, আকাশ, বাতাস, নদ নদী, মানুষের কোলাহল, গাড়ির প্রতিযোগীতা, মানুষের সাথে মানুষের বিভেদ, ভালবাসা, পাখিদের কিচির মিচির, কাজের ব্যস্ততা সব ছেড়ে হুট করে ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেটের এক্টিভেশনে পড়ে যাবো, আমিও তখন হুট করে নাই হয়ে যাব। আমার আর দেখা হবে না আগামিকালের সকাল, কিংবা আজকের কোনো সন্ধ্যা বা জ্যোৎস্না রাত। কি ভয়ানক নিস্তব্দতায় আমি হয়তো ছুটে চলবো কোনো এক অজানা দুনিয়ায় আমি নিজেও জানি না। সাথে কেউ নাই, একেবারে একা, ভীষন একা। খুব ভয় লাগে ভাবতে। সব কিছু ছেড়ে, অফিস, বাড়ী, নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সব ছেড়ে নিমিষেই আমি হারিয়ে যাবো সেখানে যেখানে কেউ আমার সাথে যেতে রাজী নয়। সেদিনও তোমাদের এই পৃথিবীতে সুর্য উঠবে, আকাশ আলোকিত হবে, সকালের ভোরের আজান চারিদিকে প্রতিদ্ধনিত হবে, সবাই শুনতে পাবে সেই আজানের সুর, অথচ আমি সেই আজানের শব্দ হয়তো শুনবো না। আমি থাকবো একদম মাটির নীচে অন্ধকারে। সবাই তাদের নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবে, হাসবে, খেলবে, আর আমি শুয়ে থাকবো একদম একা চুপচাপ।
এই দিনটায় তোমরা এবেলা হয়তো অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলছো। হয়তো আমার অনুপস্থিতি অনুভব করবে, হয়তো আমার সবগুলি স্মৃতি বিজড়িত সয় সম্পদ তোমাদেরকে আরো বিষন্ন করবে। সদ্য বিভাজিত এই জীবনের সাথে আমরা হয়তো সবাই আবার খুব দ্রুতই কোলাহলে মেতে উঠবো শুধু আমি ছাড়া।আমার কাপড়তা হয়তো তখন অন্য কেউ ভাগাভাগি করে পরবে, আমার ঘরটা অন্য কেউ নতুন করে সাজাবে। দিনের সকালটা কারো জন্যই যেহেতু অপেক্ষা করে না, রাতের চাঁদও যেহেতু কারো জন্যই আর থেমে নেই, ফলে সবার সব উৎসব যথারীতি চলবে শুধু আমার পুঞ্জতালিকা ছাড়া। কি অদ্ভুত না? এই কালের বিবর্তনে এবেলার সবার কান্নাটা ওবেলায় গিয়ে কোনো একদিন থেমে যাবে। মাঝে মাঝে মন উতালা হলেও, কিংবা মাঝে মাঝে কখনো অনুভবে আমার স্মৃতি চোখের বা মনের সামনে হাজির হলেও আবার পরক্ষনেই তা ম্লান হতে বেশি সময় লাগবে না। তারপর একদিন, আর কেউ মনে রাখবে না, কারো মনেও থাকবে না যে, কোন এক সময়ের স্তরে আমি ছিলাম, তোমাদের সাথে, অনেক যতনে আর ভালোবাসায়।
আমি হীনা তোমরা কতটা কষ্টে থাকবে, সেটা আমি জানি না, আর জানলেও অসীম কোন যোজন যোজন দূর থেকে তোমাদের প্রতি আমার ভালবাসার টানে আমার কখনো ফেরা হবে না। আমি কতটা বেদনা নিয়ে কোথায় আছি, কিংবা কতটা আনন্দ নিয়ে কতটা সুখে আছি সেই গোপন রহস্যে ঘেরা তথ্য আমি কোনোকালেই তোমাদের জানাতে পারবো না।
খুব আফসোস হয় মাঝে মাঝে, জীবনটা এতো ছোট কেনো? আমার অনেক অনেক দিন বাচতে ইচ্ছে করে প্রতিদিন। আমি থাকবো না এই প্রিথিবীতে, এটা ভাবলেই আমার সব কিছুর প্রতি আকর্ষন থেমে যায়। থেমে যায় অভিসার, থেমে যায় সব সুখের অনুভুতি, মনের কোথায় যেন একরাশ বেদনা পুঞ্জিভুত হয়ে আমাকে ভিজিয়ে দেয় দুঃখের এক নোনাজলে। আমি প্রতিদিন খুব আনন্দে থাকি এবং আনন্দে থাকতে চাই এ কারনে যে, দুঃখ আমাকে স্পর্শ না করুক, হতাশা আমাকে না ঘিরে ফেলিক, যা পাইনি সেটা নিয়ে কোনো প্রকার আফসোস নাই আমার, আর যা পেয়েছি সেটা দিয়েই সর্বাত্তক আনন্দে থাকতে চেয়েছি আমি। আমি জানি আমি তো আর বেশীদিন নাইই, তাহলে কার সাথে কি নিয়ে কতটুকু ঝগড়া, বিবাদ কিংবা জুলুম করবো? এই প্রিথিবীর কোন কারনে আমি দুঃখিত থাকবো!! এই ভাবনায় যাকেই দেখ, তাকেই আমার বন্ধু মনে হয়, মনে হয়, কি জানি যদি ওর সাথে আবার দেখা না হয়!! তাই আমার হাত প্রসারিত হয়ে যায় সব সময় সবার জন্য। শুধু বেচে থাকতে ইচ্ছে করে মরে যাবার পরেও মানুষের অন্তরে। হয়তো আমি দেখবো না, কিন্তু কেউ তো আছে যারা আমাকে মিস করবে, কেউ তো আছে হয়তো কোনো এক অবসরে আমার কথা ভেবে একটা দীর্ঘশাস নিয়ে বল্বে-আহা, উনি আমার জিবনে একটা প্রদীপ হয়ে এসেছিলেন। এটাই বা কম কিসের?