১৭/১০/২০২০-একদিন (One Day) (রঙ লেপা)

“একদিন”, অদ্ভুত একটা সময়।

সবসময় আমরা ভাবি, “একদিন” সবকিছু আমার মতো করে হবে, “একদিন” আমি সবকিছু নিজের মতো করে পাবো, “একদিন” আমি সবকিছু ছেড়ে নিজের মতো করে এই পৃথিবীকে দেখবো, দেখবো এর বিশালত্ব, এর সউন্দর্য, এর অপূর্ব রহস্যময়তা। সেদিন আমার সব ব্যস্ততা, কষ্ট, সব বেদনার দিন শেষ হবে। তখন শুধু আমি আনন্দ আর আনন্দই করবো। কিন্তু আমি জানি না কবে সেই আমার “একদিন”। আমি জানিও না আমার সেই “একদিন” আসলে কবে সেইদিন। আমি কিভাবে জানবো, সেই “একদিন”টা কবে আসবে আমার জীবনে?

ছোট এই সমাজে যেখানে আমরা দৈনিন্দিন সবাইকে নিয়ে বসবাস করি, আমরা সেখানে চাইলেই সবকিছু করতে পারি না।  শিশুকাল থেকে কৈশোর পার করা অবধি আমরা সবাই ওই “একদিন” এর অপেক্ষায়ই থাকি যেদিন আমার সব ইচ্ছা পূরন হবে, আমি মুক্ত পাখীর মতো এই বিশাল আকাশে হাওয়ায় উড়ে উড়ে মেঘ দেখবো, নীচের সবুজ গাছপালা দেখবো, সাগর দেখবো, পাহাড় দেখবো। কিন্তু ক্রমেই যতো বয়স বাড়ে, আমরা একেকটা স্তর পার করে যখন আরেকটা স্তরে পা রাখি, ততোই সামনে চলে আসে কোনো না কোন দায়িত্ব, কোনো না কোনো নতুন আরেকটা চ্যালেঞ্জ। সেটাকে মোকাবেলা করতে করতেই জীবনের বেশ কয়েকটি স্তর, ধাপ পার হয়ে যায়। দাদা ভেবেছেন ছেলেকে মানুষ করা হয়ে গেলে, মেয়েকে ভাল বাড়িতে বিয়ে দিয়ে দিলে আমাদের সব কষ্টের দিন শেষ হয়ে যাবে। বাবাকে, ফুফিকে পার করতে করতে দাদা বৃদ্ধ হয়ে যান, বাবা তার সন্তানদের মানুষ করতে করতে দাদার প্রস্থান ঘটে বাবাও দাদার মতো একই সিড়িতে পা রাখেন। আমরাও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কিংবা তাদের প্রজন্মকে লালন করতে গিয়ে আমরাও একের পর এক ধাপ অতিক্রম করে ভাবি- এইতো, আর কিছুদিন, তারপর সব ঝামেলা, সব কষ্ট, শেষ হয়ে যাবে। তখন শুধু আনন্দ আর আনন্দ। অথচ আবার এর মধ্যে হাজির হয় নায়নাতকুর, তাদেরকে দেখতে গিয়েও আমাদের সেই “একদিন” আবারো পিছিয়ে যায়। আসলে আমাদের কারোই সেই “একদিন” সময়টা যেনো আর আসে না। আজ আমরা নিজের সংসারের জন্য বাচি, কাল আমরা স্বামী বা স্ত্রীর জন্য বাচি, তারপর হয়তো সন্তানের জন্য বাচি, তারপর আবার নায় নাতকুরের জন্য,  আর এভাবেই সামাজিক, পারিবারিক ইত্যাদির দায়বদ্ধতা আর জীবনের তাগিদে আমরা ক্রমশই জীবন নামক নদীতে শুধু ক্লান্ত হয়ে ভাসতেই থাকি। তারপরেও আবার ভাবী, নিশ্চয় “একদিন” আমার সব চ্যালেঞ্জ, সব ক্লান্তি কিংবা সব ঝামেলা শেষ হবে, আর তারপর “একদিন” আমার আর কোনো ঝামেলা, সমস্যা কিংবা আমার সুখের নিমিত্তে কোনো বাধা থাকবে না। সেই “একদিন” নিশ্চয় আমি আমার মতো করে সারা দেশ ঘুরতে পারবো, পার্টিতে নাচতে পারবো, পাখীর মতো যেদিকে খুশী মনের আনন্দে উড়ে বেড়াতে পারবো। কিন্তু আমার সেই “একদিন” যেনো সোনার হরিনের মতো একটু একটু করে পিছিয়েই যায়, কখনোই আসে না। বারবার কোনো না কোনো বাধা এসেই দাঁড়ায়।

আসলে এই “একদিন” কখনোই আমাদের জীবনে আসে না। কারো জীবনে আসেও নাই। বৃদ্ধ বয়সে এসে যখন পেরিয়ে যাওয়া জীবনের সেই দিন গুলির দিকে ফিরে তাকাই, কেনো যেনো চোখ ভিজে আসে, সেই ছেলেবেলার জোলাভাতিতে এক মুঠো চাল, আর একটা করে ডিম নিয়ে গ্রামের গাছতলায় বসে বনভোজনের মতো আনন্দ, শীতের দুপুরে একদল দুরন্ত পোলাপান আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে নদীর ঘাটে কাদায় পিচ্ছিল খাওয়া, কোনো এক ঝড়ের দিনে পাশের বাড়ির আম গাছের তলায় ছোট ছোট আম গুলি কতই না পরশে কোচর ভর্তি করা, শিলা বৃষ্টিতে শখের ধনের মতো বরফ কুড়িয়ে রাখা, আহা কি সুন্দর সেই জীবনটাকে অনেক মিস করি। এখন কেনো যেনো বার বার সেই ছোট বেলার দিন গুলিতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে অথচ আমার এই অবেলায় সেই দীর্ঘ পথে যাওয়া আর সম্ভব না। তখনো ভেবেছি, “একদিন” আমি বড় হবো, অনেক বড় হবো, অন্য সবার মতো আমিও অনেক আনন্দ করবো, আমিও ছুটে বেরাব পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। “একদিন” আমি অনেক আনন্দ করবো সবার সাথে। কিন্তু যদি জীবনের সবসুত্র, সব মায়াজাল, সব জটিল সমীকরন ছিন্ন করে প্রকৃতির সাথে চলমান ধারাবাহিকতায় সার্থপরের মতো দেখি, তাহলে এটাই চোখে পড়বে যে, আসলে, “একদিন” হচ্ছে আজকের এইদিন, আজই। এই আজকের দিনটাই আসলে আমার সেই “একদিন”। আজকের দিনটার জন্যই আমি বাচি। আজকের দিনের পর হয়তো আমার জীবনে আরো একটি দিন আসে কিনা কেইবা বলতে পারে? তাহলে সেই আগামীর একদিনের জন্য আমি কেনো আজকের দিনটাকে বিসর্জন দেই? হয়তো আরো “একদিন” আর কখনোই আমার জীবনেই আসবে না। আমার কাছে শুধু “একদিন”ই বাকী-আর সেটা আজ। যদি আমার সারাটা ক্যালেন্ডারেকে একটা একটা করে দিন ভাগ করে সিডিউল বানাই, দেখা যাবে, আজকের দিনটাই আমার বাস্তবতা। আর এই আজকের দিনটাই সেই “একদিন”। আর বাকী দিনগুলি আমার হাতেও নাই, আর যেগুলি চলে গেছে তাদের আমি কখনো ফিরিয়েও আনতে পারবো না। যেটা আছে আমার কাছে, সেটা আজ- আর এটাই সেই “একদিন”। তাই আমি শুধু আজকের দিনটার জন্যই বাচতে চাই। হাসতে চাই, খেলতে চাই, আকাশটা দেখতে চাই, বৃষ্টিতে ভিজতে চাই, পৃথিবীর সব গাছপালা, সব পাহাড় পর্বত, নীল আকাশ, সবকিছু দেখে প্রানভরে বাচতে চাই। আমি শুধু আমার জন্যই আজ বাচতে চাই। কালটা থাকুক আর সবার জন্য।