এই পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষই কোনো না কোনো সময়ে দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করে। কেউ জেনে করে, কেউ না জেনে। এই দিমুখী জীবনের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে এর কোনটা আগা আর কোনটা মাথা তার হদিস পাওয়া যায় না। কখনো এর শেষ থেকে শুরু আবার কখনো মাঝপথ থেকে। যাদের দ্বিমুখী জীবন জীবনের প্রারম্ভেই শুরু হয় তাদের বেলায় এটা বলা অনেক কঠিন তাদের আসল অবয়াবব টা কি। এই দ্বিমুখী জিবনের মানুষগুলি সর্বদা একটা বর্নচোরা রুপে এই সমাজে, এই সংসারে এমন করে বাস করেন যাদের মুখ এবং মুখোস কোনোটাই আলাদা করা যায় না। তাদের প্রতিটি দৃষ্টি ভংগীতে থাকে আবছা আবছা কিংবা পরিকল্পিত কোনো ছায়ার রুপ রেখা যেখানে সামনে থাকা মানুষগুলিকে তারা কখনোই সাধারন মানুষ হিসাবে দেখেন না। তারা যা দেখেন আর যা দেখান পুরুটাই একটা মাস্ক। যেদিন এই মাস্ক আলাদা করার মতো পরিস্থিতি আসে, তখন হাজারো রকমের প্রশ্ন মনে জেগে উঠে- কেনো, কিভাবে, কার জন্যে কিংবা কি প্রয়োজনে এই দ্বিমুখী জীবনের আবশ্যকতা। অনেকেই তখন মাস্ক পরিহিত মানুষটাকেই আসল মনে করে আসল মানুষটাকেই আর চিনতে পারেন না। পাশাপাশি কয়েক যুগ একত্রে বসবাস করার পরেও অনেক ক্ষেত্রেই এই দ্বিমুখী জীবনের সন্ধান পাওয়া যায় না অথচ ব্যাপারটা ঘটছে। ঘটছে প্রকাশ্যে, দিবালোকে আর সবার অজান্তেই। এটা যেনো সেই কচুরীপনা যা স্রোতের মধ্যে স্রোতের বিপরীতে চলমান। হতাত করে চোখে পড়ে না কিন্তু যখন নিজের অবস্থান থেকে সেই কচুরীপানা অনেক দূর অবধি চলে যায়, তখন হয়তো ব্যাপারটা দৃশ্যমান হয় বটে কিন্তু সেই কচুরীপানা আর হাতের বা দৃষ্টির মধ্যে থাকে না। সে চলতেই থাকে তার মতো। চলমান সমুদ্রে কিংবা ভরা নদীর বুকে ভেসে থাকলেও এই কচুরীপানা তার নিজের প্রয়োজনে এক পেট জল সর্বদা নিজের করে ধরে রাখে যা তার হয়তো প্রয়োজনই নাই। কিন্তু দ্বিমুখী জীবনের মানুষ গুলির এই প্রয়োজন আছে বলেই তারা কোনো সুযোগ নেয় না, তারা তাদের প্রয়োজনটাই আগে বিবেচনা করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। পিছনে কার কি হলো, তাতে তাদের ভাবার কোনো আবশ্যকতা মনে করে না। দ্বিমুখী জীবনের ভালোবাসায় প্রচুর খাদ থাকে কিন্তু এই খাদের উপরের চাকচিক্য এমনভাবে প্রতিফলিত হয় যা আসল সোনার রং টাকেই আরো আসল বানিয়ে চোখ ঝলসে দেয়, অন্যের মন আকর্ষন করে তাঁকে আরো কাছে আসার সুযোগ করে দেয়। আর এটাই সেটা যেখানে সমাজের মানুষ গুলি প্রতিদিন প্রতারিত হয়।
দ্বিমুখী জিবনের সত্তা দ্বিধা বিভক্ত। তাদের দুটুই পাশাপাসি বিচরন করে- ঘৃণা আর মাত্রাতিরিক্ত ভরষা, সত্যতা আর মিথ্যার বেশাত, কঠিনতা আর দূর্বলতা, মায়া এবং হিংসা। এই দ্বিমুখী জিবনের সময় আর অসময় বলে কিছু নাই। যখন প্রয়োজন তখন তারা উভয়ই ব্যবহার করতে কোনো দিধাবোধ করেন না। ফলে দেখা যায় যে, যাকে কেউ কোনোদিন এমন কোনো কাজ, এমন কোনো ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতে পারে বলে ভাবেন ও নাই, তারাই সেটা করে ফেলে। তখন তারা সবাইকে এমনভাবে তাক লাগিয়ে দেয় যে, সবার মনে এই প্রশ্ন জাগে এটা কিভাবে সম্ভব সেই তার দ্বারা যে কিনা একটা তেলাপোকা দেখলেও ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে থাকতো।
দ্বিমুখী জীবন শুধু গোপন আর প্রকাশ্যেই নয়, আসলে এই দ্বিমুখী সত্তা প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনেই মানুষ তথা অন্যান্য জীবেরাও বহন করে। যে মানুষটি ঘরের মধ্যে একজন খাব ভালো বাবা, কিংবা যে মা বাইরে অনেক সমাজ মুখীতা, যে বাচ্চাটা তার বন্ধুর কাছে সমানভাবে গৃহীত, সেই বাবাই অফিসে তার পুরুদস্তর চেহাড়া অন্য রকমের, সেই মা ই ঘরের ভিতরে আরেক সাজে থাকেন কিংবা সেই বাচ্চাটা হয়তো তার নিজের বাড়িতে এতোটাই চুপচাপ যা বাড়ীর লকের ধারনাই নাই সে কত টা সতষ্ফুর্ত তার বন্ধুদের মাঝে। একটি বাঘ যখন হরিন শিকার করে, তখন বাঘিনীর মধ্যে যে মাতৃত্ব বোধ, সেটা হরিনের বাচ্চাদের কাছে কোনো প্রমান নাই। অথচ এক বাঘিনী মা তার নিজের বাচ্চাদের জন্য আরেক হরিনী মাকে মেরে ফেলতে একটুও দিধাবোধ করে না। ভালোবাসার এই দ্বৈত রুপের নামই হচ্ছে কখনো কখনো দ্বিমুখী স্বভাব।
এখন প্রশ্ন জাগে, যদি সবাই তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময়ে এই দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করেই থাকেন, তাহলে দ্বিমুখী না কারা? আসলে এর উত্তর খুব কঠিন নয়। সবার দ্বিমুখী জীবনের সংগা এক নয়। কেউ কেউ অতি অল্প বিশয়েই তার দ্বিমুখী জীবনের শুরু আর শেষ আবার কারো কারো এই বৈশিষ্ট এমন যে, প্রতিটি বিশয়েই তারা দ্বিমুখী। কারো দ্বিমুখী জীবনের ধারা শুধু মাত্র বৈষয়িক, আবার কারো কারো দ্বিমুখী জীবন ব্যক্তিগত। কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষ্মুক্ত করেন, আবার কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষিত করেন। দুটু দ্বিমুখী জীবন একসাথেও চলতে পারে যদি তাদের সেই দ্বিমুখী জিবনের গতিপথ হয় একই রেলের উপর। যখন এই দ্বিমুখী জীবনের সাথে ভিন্ন ধারার দ্বিমুখী জীবনের সংযোগ হয়, তখন ভয়ংকর পরিনতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না।
দাম্পত্য জীবনেও এমন কিছু সময় আসে যখন মানুষ পরিস্থিতির কারনে কখনো কখনো দ্বিমুখী চরিত্রে ঢোকে যায়। যখন কোনো মহিলার স্বামী তার স্ত্রীর প্রয়োজনটা বুঝতে না পেরে বড় গাড়ি, বড় বাড়ি বড় বড় সপ্নে বিভোর হয়ে সার্বোক্ষন তার নিজের সংসার থেকে উদাসীন থাকে আর অন্যত্র ব্যতিব্যাস্ত হয় সময় কাটাতে থাকে, তাহলেই তার নিজের স্ত্রীর দ্বিমুখী জীবনে প্রবেশ করার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায় আর সেই মহিলাও দ্বিমুখী জীবনে তার নিজের অজান্তেই ঢোকে যায়। কারন, যখন একটা মেয়ে একা হয়ে যায়, নিজের ঘরে স্বামীর সংস্পর্শও ধীরে ধীরে অবহেলায় পরিনত হয়, যখন সারাদিন কাজকর্ম করার পর যখন মনে হয় কেউ শুধু হাতটা ধরুক। অথচ কেউ আর পাশে থাকে না, তখন তার একাকিত্ত বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন তার চলাফেরা, আচার আচরন, মনোভাব দেখে কারো সন্দেহ থাকে না যে, সে একা। এরপরেই শুরু হয় ভয়ংকরতা। সমাজ তাঁকে স্পর্শ করার জন্য মুখিয়ে থাকে। আর সে যতোদূর সম্ভব সেই স্পর্শ তাঁকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা তাও একা একাই। একা থাকা একটি মেয়ে সমাজে সস্তায় পাওয়া লটারীর টিকেটের মত হয়। সবারই মনে তাঁকে পাওয়ার একবার ইচ্ছা হয়। কিন্তু যে পেয়ে যায় সেই রাজা। তাই প্রত্যেকেই সেই ভাগ্যটা একবার ছুয়ে দেখতে চায়। আর সেই ব্যক্তি তখনি রাজা বনে যায় যখন কোনো মহিলা সমস্তা চেষ্টা করার পরেও আর একাকিত্তে বসবাস না করতে পেরে দ্বিমুখী চরিত্রে প্রবেশ করে ফেলে।
এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই যে, আজকের এই সমাজে মহিলা এবং পুরুষদের সমান দ্রিষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু এই কথাটাও খুবই সত্যি যে, মহিলাদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টি ভংগীর পরিবর্তনের অনেকটা পথ বাকী রয়েছে। আজ কোনো পুরুষ তার অফিসে মহিলা বস এর আদেশ পালন করা অতোটা সমস্যার বিষয় মনে করে না কিন্তু নিজের ঘরে নিজের স্ত্রীকে নিজের সমান মর্যাদা দেয়া সে এখনো মানতে পারে না।
বড় বড় গাড়ি, বড় বড় বাড়ির শখ খারাপ কিছু না কিন্তু যেটা নেই সেটা পাওয়ার জন্য যেটা আছে সেটা হারিয়ে ফেলা না বুদ্ধিমানের কাজ আর না সঠিক। সেজন্য ভালোবাসায় সময় দিন, ছোট ছোট খুশী গুলি পরিবারে ভাগ করে নিন, সময় দিন পরিবারকে। দাম্পত্য জীবনে কোনো মহিলার বা কোনো পুরুষের দ্বিমুখী চরিত্র স্রিষ্টির পিছনে আমরাই অনেকাংশে দায়ী থাকি।