আমার কোন ইচ্ছাই ছিল না এই ডায়েরী বা কিছু তথ্য তোমাদেরকে লিখবার জন্য। কোন দরকার ছিল কিনা সেই ভাবনাটা আমারো ভাববার সময় অবশ্য এখন নয়। উহা তোমরা ভেবে দেখবা আগামী দিনে। সময়ের বিবর্তনে হয়তোবা এই লেখাগুলি হয়তো তার জায়গা দখল করে নিবে এই ভেবে যে, তার কতটা দরকার ছিল, আর কতটা দরকার ছিল না। তবুও আমার মনে হল, মাঝে মাঝে বেশ কিছু অবসর সময় পাই, কিছুতো একটা করি। তাই উপন্যাস না লিখে, গ্লোবাল ইস্যু সম্পর্কে না লিখে কিংবা ধর্মীয় কোন বই না লিখে নিজের পরিবারের সাথে আপাতত যে সময়টা কাটাচ্ছি, সেই সব কথাগুলিই না হয় লিখি। কোনো কিছুই হবে না জানি, এসব অনেকটা আবর্জনার কতো তথ্য, কারো কোনো উপকার আসবে না, না কেউ এগুলি পড়ে পড়ে কোনো গবেষনা করবে। তারপরেও লিখছি। লিখছি এমন কিছু বিষয়ের উপর যা আমাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিয়েছে, যা আমার কাছে প্রায়ই মনে হতো-আহা যদি এমন কিছু কেহ আমার জন্য লিখিয়া যাইত, অথবা এমন কিছু যাহা আমি প্রায়শই জানিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু কোথাও উহার কোন অস্তিত্ত পাই নাই। তাহলে “উহ” কি এমন জিনিস যাহা আমার মধ্যে প্রায়শই মনে আসিত, খুজতাম কিন্তু কোথাও তাহা আমি পেয়েছি বলে মনে হয় নাই। আমি মাঝে মাঝেই ভাবতাম, আমার পূর্বে যারা আমার বংশে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই হয় বা ছিলেন জমিদার, কেউ বা ছিলেন অনেক উচ্চ স্তরের ব্যক্তিকর্তা, হয়তা আবার কেউ এমনও থাকতে পারেন যাদের জীবন লইয়া এখন অনেক বড় বড় লোমহর্ষক কাব্য লিখা যেতো অথবা এমন কেউ থাকতে পারেন যাদের অতিষ্ঠে মানুস প্রতিনিয়ত কায়মনে তাদের মৃত্যু কামনাই করতেন, আবার এমনও হতে পারে যে, কারো কারো জীবননাশের কারনে কোন এক সমাজ ব্যবস্থা হয় ভাঙ্গিয়াই পড়েছিলো, কে জানে এই সব কথা বা কাহিনি?
মাঝে মাঝে আমার খুব জানিতে ইচ্ছে করিত, এইসব তাহার কেউ কি আমাদের কথা কখনও এমন করে ভাবিয়াছিলেন যে, কোন একদিন হয়তবা কেউ তাহাদের স্মরণ করিয়া তাহাদের ব্যাপারে আরও অধিক জানিবার জন্য আকুপাকু করিবেন? হয়ত কেহ কেহ করিয়াছিলেন, কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারনে তাহারা তাহাদের কোন কথাই আমাদের জন্য রাখিয়া যাইতে পারেন নাই, হয়তোবা আবার চেষ্টাও করেন নাই। বহুদিন আগে আমি একখানা ছায়াছবি দেখিয়াছিলাম, কালো মানুষের কাহিনী। সম্ভবত ছবিটির নাম ছিল “রুটস”। আলেক্স হেলির বানানো। তিনি অনেক বছর গবেষণা করিয়া করিয়া যতদুর সম্ভব তাহার পূর্বপুরুসের ইতিহাস লইয়া তাহার অই অনবদ্য কঠিন জিবনের কাহিনী পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। কিন্তু আমার আলেক্স হেলির মত অত ধৈর্য নাই যে আমি বছরের পর বছর আমার পূর্ব পুরুসের নাম গবেষণা করিয়া করিয়া এক একটা অধ্যায় লিখিব। সে সাধ্যও আমার নাই। কিন্তু আমি একটা কাজ করিতে পারি অনায়াসে। আর তাহা হইল, আজ হইতে হাজার বছর পরে যদি কেউ আমার কথা জানিতে চায়, আমার সম্পর্কে ভাবিতে চায়, কিংবা আজ এই বিংশ শতাব্দিতে বসে আমি কি ভাবিতেছি, কি ভাবিতেছি না, কিংবা আমি আজ থেকে আরও শত বছর পর, অন্তত এই ভাবনাগুলি তো আমি আমার ঐসব পরবর্তী বংশধরদের জন্য লিখিয়া যাইতেই পারি। তাহাতেই বা কম কিসের? তাই ভাবছি, আমি সারাদিন কি করি, কি ভাবি, কেমন করিয়া ভাবি, আমার কি ইচ্ছা আমার বংসধরদের লইয়া, যদি আমি এক টুকরো কাগজের মধ্যে লিখিয়া রাখি, হয়ত বা কোন একদিন আমারই কোন উদাসীন এক বংশধর এই লেখাটা পড়িয়া জানিতে পারিবে , তাঁহারও আগে কেউ একদিন কি করেছিল।
আমি আমার বাবাকে দেখি নাই। আমি যখন মাত্র দুই কি আড়াই বছরের, তখন তিনি জান্নাতবাসি হয়েছেন। ফলে ঊনার কোনো ছবি, কিংবা কোনো স্মৃতি আমার কাছে নাই। শুনতাম, তিনি ছিলেন অত্যান্ত নামীদামী মানুষ। মাদবর মানুস। অনেক সম্পত্তি ছিলো তার। ওই সময় যে কয়জন মানুষ ধনীদের কাতারে ছিলেন, তার মধ্যে আমার বাবা একজন। আমি যখন মাত্র ক্লাস ফাইভে বা সিক্সে পড়ি, তখন আমাদের বাড়িতে কোনো একবাক্সে আমার বাবার হাতের লিখা কিছু পত্র দেখিয়াছিলাম। খুব সুন্দর হাতের লেখা ছিলো। আমি তখন ছোট ছিলাম, বুঝি নাই এইসব স্মৃতিগুলি রক্ষনাবেক্ষন করা উচিত কিনা। আমি বা আমরা কেহই ওইসব হাতের লিখা চিঠিপত্র গুলিও সংরক্ষন করি নাই। আজ আমার কাছে মনে হচ্ছে ওই গুলি অনেক দামি বস্তু ছিলো। খুব আফসোস হয় এখন আমার সেই লেখাগুলির জন্য, বাবার লেখা চিঠি।
আমাদের গ্রামের বাড়ি দুই জায়গায়। একটা মুন্সিগঞ্জের কয়রাখোলায়, আরেকটা হচ্ছে কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর।
ওই মুন্সিগঞ্জের বাড়িতে থাকতো আমাদের আগের মায়ের সন্তানেরা আর আমরা থাকতাম কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। যদিও আমার বাবার আমলে আমরা সবাই একই বাড়িতে থাকতাম সেই মুন্সীগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু একসময় আমরা কেরানিগঞ্জ মাইগ্রেট করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার বাবা কোনো একসময় তার জীবদ্দশায় ভেবেছিলেন যে, আমরা কোনোভাবেই তার আগের সন্তানদের কাছে নিরাপদ নই এবং আমাদের জীবননাশ হবার সম্ভাবনা আছে। ফলে আমার বাবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসাবে তিনি আমাদেরকে মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানীগঞ্জ আমার আপন খালুদের এলাকায় রিহেবিলেট করার পরিকল্পনা করেন। আমার বাবার পরিকল্পনা একদম ঠিক ছিল বিধায় তিনি মারা যাবার আগে আমাদেরকে এই কেরানিগঞ্জের এলাকায় স্থানান্তর করে গিয়েছিলেন।
আচ্ছা, আমার বাবার আর কি কি প্ল্যান ছিলো যা তিনি শেষ করে যেতে পারেন নাই? অথবা তার কি কি শখ ছিল যা আমাদের পরবরতী জেনারেশনের উচিত তার বাস্তবায়ন করা? কিছুই জানি না। আর এখানেই আমার দুঃখ। এখানে একটা গল্প (বাস্তব) না লিখলেই নয়। এটা আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা। আমার বাবা কিভাবে বুঝলেন যে, আসলেই তিনি যা ভাবছেন সেটা সঠিক কিনা।
তার এই সিদ্ধান্ত কতটা ঠিক তা যাচাইয়ের জন্য একদিন ঠিক করলেন, তিনি কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যাবেন। তার এই প্ল্যানটা শুধুমাত্র জানালেন আমার বড় ভাইকে। আমার বড় ভাই তখন জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন। বাবা সবার অজান্তে হটাত করে নিখোজ হয়ে গেলেন, তিনি আর বাড়ি ফিরলেন না। একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিনদিন যায়। একমাস, দুইমাস, এইভাবে প্রায় ছয়মাস। সবাই ধরে নিলেন, বাবা হয়তো কোথাও দুর্ঘটনায় মারা গেছেন যার হদিস কেউ জানে না। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিলো না যে কন্ট্যাক্ট করা যাবে। অঘোষিত মৃত বাবা কিন্তু প্রতিদিন আমার বড় ভাইয়ের সাথে সদর ঘাটের নবকুমার শরীর চর্চা কেন্দ্রের ঘাটে দেখা করতেন আর প্রতিদিনের ফিডব্যাক নিতেন কি হচ্ছে গ্রামে তার অনুপস্থিতিতে। ধীরে ধীরে বাবার আইডিয়াটাই যেনো সঠিক প্রমান হচ্ছিলো। আমাদের স্টেপ ব্রাদাররা, বোনেরা, স্বৈরাচারের মতো আমাদের উপর ব্যবহার করা শুরু করছিলো, জমিজমার সব ফসল একে একে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো, আমাদেরকে প্রাননাশের হুমকী দিচ্ছিলো। এমন কি আমাদের এই পক্ষের সদস্যদেরকে অত্যাচার আর নীপিড়নে মেরেই ফেলার চেষ্টা করছিলো। সবাই ধরেই নিয়েছিলো যে, হোসেন মাদবর মারা গেছে এবং তার থেকে আর ভয়ের কোনো কারন নাই। হোসেন মাদবর যেহেতু মারা গেছে, ফলে উনি তো আর ফিরে আসবেন না, আমার অই পক্ষের ভাই বোনদের অত্যাচারের বিচারও উনি আর করতে আসবেন না। এভাবেই অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। অত্যাচার যখন তুঙ্গে, তখন একদিন হটাত করে বাবা সশরীরে এসে হাজির। সবাই অবাক, কোথায় ছিলো এই হোসেন মাদবর? তিনি সত্যিটা লুকিয়ে শুধু বললেন, চট্টগ্রামে তার চোখের অপারেসন হয়েছিলো বলে কাউকে কোনো খবর দিতে পারেন নাই। আর শরীর ভালো না অবধি ডাক্তাররা তাকে ছাড়েনও নাই। তিনি বুঝে গেলেন, তার কি করা উচিত এবং তার সিদ্ধান্ত যে সঠিক সেটা তিনি পরীক্ষা করেই নিলেন।
অতঃপর বাবা আমার খালুর সাথে অতি গোপনে পরামর্শ করলেন, কিভাবে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে এবং দ্রুত সেই মুন্সিগঞ্জ থেকে খালুর এলাকায় আমাদেরকে মাইগ্রেট করবেন। আমার খালু ছিলেন তার এলাকায় একজন অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী মানুষ। মাঘে মহিসে একসাথে জল খাওয়ার মতো। বাবা তার দিক থেকে প্রায় ৪০০ লোকের আয়োজন করলেন, আর খালু তার এলাকায় এই রকমেরই প্রায় ৪০০/৫০০ লোকের আয়োজন করলেন। মাঝে নদী থাকায় আরো কয়েক শত কলাগাছের ভেলা বানিয়ে নদীর উপর দিয়ে মুটামুটি একটা রাস্তা করে ফেললেন। মুন্সিগঞ্জের আমাদের বাড়িটা না ভেঙ্গে বাবা আস্ত বাড়িটাকে ঐ লোকজন দিয়ে মাথায় করে এইপাড়ে নদী পাড় করে দিলেন। আর খালু এইপারে তার লোক দিয়ে সেই আস্ত বাড়িটা এক রাতের মধ্যে বসিয়ে দিলেন। বাবা কাজটি এমন এক দিনে করলেন যেদিন আমাদের ঐ পক্ষের সদস্যরা কোনো এক অনুষ্ঠানের জন্য গ্রামের বাইরে কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলেন। ব্যাপারটা আলাদিনের চেরাগের গল্পের মতো ঘটে গেলো। আমরা মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানিগঞ্জে চলে এলাম চিরতরে। সব কিছু রয়ে গেলো ঐ মুন্সিগঞ্জে। নিজেদের স্মৃতি, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, ক্ষেত খামার সবকিছু।
আমি এখানে শুধু আমার বাবার প্রসঙ্গটাই তুলেছি কারন আমার কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় নাই আমার বাবার আগের জেনারেশনের কি অবস্থা ছিলো বা কে কি করতেন। আমার জানার কোনো ত্রুটি ছিলো না কিন্তু কেহই তাদের ব্যাপারে আমাকে কোনো তথ্য বিস্তারিত ভাবে দিতে পারেন নাই। যাই হোক, এবার তোমাদের পালা। তোমরা অন্তত একটা বেজ হিসাবে আমার লেখা এই ডায়েরী বা এই ওয়েবসাইট পেয়েছো যেখানে আমাদের ফ্যামিলির কিছু তথ্য রেডিমেট পেয়েছো। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার মতো ইচ্ছুক হও, তাহলে আমার এই তথ্যাবলী সামনে রেখে আমাদের ফ্যামিলী ওয়েব সাইটটি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারো।
আর এটাই হবে আমার কাম্য।
আমার এই ডায়েরীর শুরুর কাল ১৯৮৩ সাল। ফলে ১৯৮৩ সালের মানসিকতা থেকেই আমার পথচলা। কখনো কখনো এই সময়ে আগের ঘটনার বিবরন আসতেই পারে কিন্তু লিপিবদ্ধ হবার সময়কাল ১৯৮৩ থেকে শুরু।

কনিকা, কনিকার হাজবেন্ড (ব্রেডি স্মিথ) এবং আমরা


