আমাকে গত রাতেই ও জানালো খুব ভয়ে ভয়ে যে, প্রায়ই নাকি ওর বুকের ডান দিকে একটু একটু ব্যথা করে। এই ব্যথার কারনে নাকি সে মাঝে মাঝে মাঝ রাতে উঠে বসে থাকে, পানি খায়, তারপর আবার ব্যথা একটু কমলে ঘুমানোর চেষ্টা করে। ব্যাপারটা কেনো সে আমাকে বলে নাই এতোদিন বুঝি নাই। কিন্তু যখন গতকাল বল্লো, আমি কালবিলম্ব না করে ওকে খুব ভালো একটা হাসপাতালে ইমারজেন্সী বিভাগে যোগাযোগ করতে বলি। আজ ওরা তিনজনেই ওখানে গেলো, সব ধরনের টেষ্ট করালো। আপাতত টেষ্টগুলি দেখে মনে হলো পুরুটাই গ্যাস্ট্রিক রিলেটেড একটা ব্যাপার। তারপরেও যা যা টেষ্ট দিয়েছে তাতে সারা শরীরের একটা লিপিড প্রোফাইল, সিবিসি, এলএফটি, ইসিজি এবং থাইরয়েড টেষ্টগুলি করালো। রিপোর্ট আগামিকাল পাওয়া যাবে। আপাতত সে ভালো আছে।
গ্রামের মানুষগুলির সবচেয়ে বড় এবং করুন আক্ষেপ হচ্ছে, তারা পরিবারের সবচেয়ে উচ্ছিষ্ঠ মানুষগুলির মধ্যে একজন। সে ঘর ঘুচিয়ে রাখবে, সন্তান ধারন করবে, সন্তান পালন করবে, সবার জন্য রান্নাবান্না করবে, বাড়ির সবার দেখভাল করবে, কিন্তু তার শরীর খারাপ হওয়া যাবেনা, তার রেষ্টের দরকার নাই, তার আহলাদের কোনো বালাই থাকবে না, তার ভালোমন্দ খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই। আর যদি তার অসুখ করে, সেটা নিতান্তই একটা উপদেশ বা বকা দিয়ে সেরে ফেলতে হবে, খুব বেশী হলে আটানা পয়সা খরচ করে একটা প্যারাসিটামল খেলেই যেনো তার সর্বরোগ উপশম হয় এর বেশী কিছু তার প্রাপ্য নাই। ভগবানও বেশ রশীক বা সদয়বান, তাদের খুব একটা ঝামেলায়ও ফেলেন না। তাদের শরীর খুব একটা খারাপ হয়ও না। এভাবেই ওরা অভ্যস্থ। হয়তো এই রীতিটা এতো বছর পর্যন্ত নিজের চোখে দেখে এসছে বলে, ওর যে বুকে প্রায়ই ব্যথা করে, এটাও বলার মতো সাহস তার বুকে হয়ে উঠে নাই। কিন্তু আমি তো সে রকম নই। আমি বিজ্ঞান বুঝি, আমি মানব শরীর বুঝি, আমি তার প্রতিকারগুলি বুঝি। ভালোলাগার মানুষেরা যখন ঘরের বিছানায় শুয়ে কাতরাতে থাকে, তার আর কোনো সাহাজ্য আমাদের না লাগলেও, তার নিজের যে একটা সাহাজ্য লাগতে পারে, এটা আমরা পুরুষ সমাজ সবসময়ই ভুলে যাই বা এটাকে কোনো প্রাধান্যই দেই না। এটা অনেক বড় একটা ডিপ্রাইভেশন ছাড়া আর কিছু না। ওরাতো আমাদের উপর ভরষা করে, ওরা তো আমাদের হাত ধরেই বাচে, ওদের ছোটছোট সপ্নগুলি পুরনে খুব বেশী হয়তো খরচ পড়ে না। তারপরেও আমরা ওদের ব্যাপারে অনেক উদাসীন।
আমরা শিশুকালে যার কোলে মাথা রেখে বড় হবার সপ্ন দেখি, শৈশবকালে যার হাত ধরে আমরা আমাদের ক্যারিয়ার গড়তে চিন্তা করি, যৌবনকালে এসে সেই চিন্তায় অনেক স্রোতের মতো উচ্ছল হয়ে উঠে, আর যারা এতোকাল আমাদেরকে বুকে পিঠে আগলে রেখে ভালো একটা সময়ের কথা ভাবতেছিলো, তাদের চিন্তায় সেটা যেনো ধীরে ধীরে ভাটা পড়ে। যে সন্তানের মুখ চেয়ে যে পিতামাতা আকাশের চাদের সপ্ন দেখে, সেই সন্তান তখন তার পূর্ব পুরুষের রেশ ধরে সেই একই চিন্তায় মশগুল হয়ে এইসব মানুষ গুলিকে আবারো হতাশায় ফেলে দেয়। তাদের বুকে আশার বদলে ভয় ঢোকিয়ে দেয়। চাওয়ার থেকে তখন শুধুমাত্র বেচে থাকার জন্যই ওরা বেচে থাকে। সেই পুরানো সাধ আহলাদ, সেই সুখের চিন্তা আর মাথায় আসে না।
কিন্তু যখন কারো জীবনে এর ব্যতিক্রম হয়, সে যখন দেখে তাকে কেউ তার অসুখের সময় আগলে রেখেছে, তার প্রতি যত্ন নিচ্ছে, একটু ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, কিংবা তার জন্য কেউ চিন্তা করছে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা অনেক লোভনীয় আর সুন্দর। আর এটাই তো হবার কথা। এটাই তো মানবতা। সুখে দুখে যখন কেউ একসাথে থাকে, থাকতে পারে, তখন পরিবারের প্রতিটি জিনিষ যেনো চকচক করে হেসে উঠে সব শান্তির পাখা মেলে।
ওরা পরিবর্তন আনুক এই সমাজের, ওরা পরিবর্তিত সমাজে বাচুক আরো আনন্দ আর হাসি নিয়ে।