২৪/০৪/২০২০-এটা কি পরকীয়া?

প্রায় ৩৩ বছর একসাথে ঘর করার পর কি কারনে মুক্তার সাহেব আসমানী বেগমের অলক্ষ্যে একান্তে সময় কাটানোর জন্যে মাধুরীর সাথে গোপন প্রনয় শুরু করে, সেই ইতিহাস না জানলে মনে হবে, হয়তো মুক্তার সাহেব আসলেই একজন চরিত্রহীন এবং দায়িত্বহীন কোনো এক সামাজিক কিট। সমাজে মুক্তার সাহেবই প্রথম ব্যক্তি নন যিনি ঘরে ভালোবাসার সুন্দুরী আসমানিদের রেখেও তার থেকে অনধিক সুন্দুরী বা শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী এই মাধুরীদের সাথে প্রনয় করে। মুক্তার সাহেব্দের এসব খবর যখন বেশী করে নড়ে উঠে, তখন অনেকে বাসী রুটিও গরম করে খায়। সবসময় গরম গরম পরোটাই যে মজাদার তা নয়, কিন্তু এসব ঘটনা চারিদিকে যখন রটায় তখন এই গরম গরম পরোটার চেয়েও বাসী রুটির কদর বেড়ে যায়। যখন মুখরোচক খবরের ক্ষিদে পায়, তখন রুটি, পরোটা, লুচির মধ্যে আর কোনো তফাত করা যায় না। কিন্তু মুক্তার সাহেবরা তাদের এই ঘটনার জন্য নিজ থেকে কোনো সংবাদের শিকার হতে চান না কখনো বটে কারন, একদিনের মুখরোচক সংবাদ হবার জন্য কিংবা এই নশ্বর প্রিথিবীতে জোরালোভাবে নাম ডাক থাকুক, ইতিহাস হোক, অথবা বিখ্যাত হোক এ লোভে কেউ এসব কাহিনীর নায়ক হতে চান না। এটা তো ঠিক যে, এই ‘বিখ্যাত হবো’ ধরনের ক্ষুধার জন্য কেউ সারা জীবনের তৈরী করা বছরের শব্জীক্ষেত জালিয়ে দেয় না। তারপরেও শব্জী বাগান জ্বলে। আর সেটা ভুলেই হোক, আর ইচ্ছায়ই হোক, জ্বলতেই থাকে। আর এর প্রধান কারন একটাই, আবর্জনা সবসময় এই মুক্তার সাহেবদের মতো সাদা কাপড়েই ফেলা হয়। হাওয়া যখন কারো নামে গরম হয়, তখন আমরা অনেকেই বলি, শনির দশা চলছে। কিন্তু শনি এমন এক হাওয়ার নাম, যে, এই হাওয়ায় কারো নাম ভাসতে থাকলে তার পিছনের কি ইতিহাস, কি আচরন, সত্য-মিথ্যার চকলেটে মোড়ানো বোরহানীর মতো ঝাল-মিষ্টি-টক সবকিছুই তখন একসাথে উড়ে বেড়ায়। যে যেটা পছন্দ করে, তখন সে সেটাই ব্রেকিং নিউজের মতো যতো দ্রুত সম্ভব বাতাসের সাথে মাটিও গরম করে দেয়। তখন চায়ের কাপে, বাজারের দোকানে, কিংবা নদীর ঘাটেও এর পরিব্যপ্তি আর বিস্তার কম হয় না। আর যে বলীর পাঠা হয়, তখন সে হয়ে উঠে বিষাক্ত খাবার। আর সেই খাবার যতো দামিই হোক, তা ফেলেই দিতে হয়। যদি তা গোড়া থেকে উপড়ে  ফেলে না দেওয়া যায়, তখন তার মুল্য শুধু বিপদের আশংকাই বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মুক্তার সাহেবের মতো ব্যক্তিত্তকে বিষাক্ত খাবার মনে করে আসমানী বেগমেরা তাকে ফেলেও দিতে চান না। তারা চান, কিভাবে এই বিষাক্ত খাবার আবার সিদ্ধ করে পুনরায় ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলে পরিবেশন করা যায়।

এসব পরকীয়ার কাহিনীর সাথে সাথে যেহেতু সে ব্যাক্তির পিছনের ইতিহাস, তার আচরন নিয়ে রমরমা পান্ডুলিপি এক হাত থেকে আরেক হাতে ছড়াবেই, তাই এই মুক্তার সাহেবের অতীত ইতিহাস, কিংবা তার আচরন সম্পর্কে তার কাছ থেকেই জানা ভালো। এতে হয়তো কিছুটা রাখঢাক থাকতে পারে অথবা থাকতে পারে কিছু প্রচ্ছন্ন লুকানো তথ্য, তারপরেও সিংহভাগ তথ্য যখন একে একে সারিবদ্ধভাবে জোড়া লাগানো হবে, আমরা নিজেরাই বুঝতে পারবো, কোথায় কোন জায়গায় মুক্তার সাহেব কিছু ছেড়ে গেলেন, আর কোথায় কোন তথ্য নতুন করে আমদানী করলেন। সে বিচার পাঠকের উপর। যে যেভাবে পারেন, তিনি তারমতো করে সেসব গড়মিল জায়গাগুলি নিজের মতো তথ্য যোগ করে প্রতিস্থাপন করলেই পূর্নাজ্ঞ গল্পটি নিজের মানসপটে ফুটে উঠবে। তাহলে শুনি তার এই পরকীয়ার কাহিনী। 

আমার বয়স তখন সবেমাত্র কুড়ি পেরিয়েছে। টকবকে যুবক। স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় ঠিক সে রকম মানসিকতা নিয়েই আমি সমাজের প্রতিটি স্তরে অনায়াসেই যাতায়ত করতে পারি। সবার সাথেই ছিলো আমার বন্ধুত্ত। গাজার আসরে যেমন আমি ছিলাম মুক্তার মতো, তেমনি পরাশুনায় ভালো করার কারনে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তদের কাছে ছিলাম মুক্তার হারের মতো। আর নিম্নবিত্ত মানুষদের কাছে যতোটা না ছিলাম আদর্শগত মডেল তার থেকে বেশী ছিলাম গোপন হিংসার একটা অদেখা আলাপের বিষয়বস্তু।  কোনো এক সময়ের জমিদার বাড়ির সন্তান যখন নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো বেড়ে উঠে, তখন তার প্রাচীন উদ্ধত্ত ভাবের সাথে দেমাগ আর জিদটা হয়তো বেচেই থাকে যদিও সামর্থ বলতে কিছুই থাকে না। লেখাপরার প্রতি অনেক ঝোক ছিলো আমার, তাই, গ্রামের আর দশটা যুবকের থেকে আমি ছিলাম একেবারেই আলাদা। অদুর অতীতে কি ছিলো আর ওসব থাকলেও এখন কি হতে পারতাম, এই চিন্তাটা মাথায় একেবারেই ছিলো না, বা না ছিলো কোনো আফসোস যে কেনো অন্যদের অনেক কিছু আছে আর আমাদের নাই। কিন্তু আখাংকা ছিলো অনেক, যেভাবেই হোক নিজের পরিশ্রমে সৎপথে অনেক বড় কিছু হবার। শুনেছিলাম, সুন্দুরী অনেক যুবতীর সফলতা বড় লোকের বেডরুম দিয়ে আসলেও কোনো যুবকের সফলতা কোনো বড় লোকের ঘর জামাই থেকে আসে না। আর যাদের আসে, তারা হয় নেহায়েত ভাগ্যবান নয়তো তারা জীবনের জন্য আজীবন মৃৎপ্রায় লাশের সব শর্তাবলী গলায় নিয়েই ভোগ বিলাস করেন। আমার এই ধরনের না ছিলো কোনো মানসিকতা আর না ছিলো এর সুযোগের সন্ধান।   

২১ বছর বয়সেই আমি আমার মেধার কারনেই হোক আর শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়েই হোক, আমি দেশের একটি অত্যান্ত প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানজনক সেক্টরে অফিসার পদে চাকুরী পেয়ে যাই। যদিও আমার অন্যান্য সেক্টরে চাকুরী পাবার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু সেসব সেক্টরে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হবার জন্য যে কোর্ষ এবং ডিগ্রী দরকার তার সিলেকসনে আমি ছিলাম। কিন্তু সেই সিলেকশনের পর কোর্ষ চালিয়ে যাবার মতো মসলা বা জোগান হাতে ছিলো না যা বর্তমান সেক্টরে সরাসরি পাওয়া যায়। ফলে অন্যান্য সেক্টরের সপ্ন বাদ দিয়ে আমি বর্তমানকেই প্রাধান্য দিলাম যাতে আমি নিজেকে সাপোর্ট দিতে পারি। একটা জিনিষ আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, মাথার উপর ছাদ না থাকলে,  যে দুফোটা বৃষ্টিও আকাশ থেকে ঝরে পড়ে, সেটা আমার মাথায়ই প্রথম পড়বে। আমার না ছিলো কোনো ব্যাকআপ সাপোর্ট, না ছিল কোনো অবলম্বন। আমাকে কেউ সাহায্য করার নাই। এখন না হয় আমি একা, পরিবার হয় নাই, বিয়েটাও করি নাই, ফলে দুশ্চিন্তা হয়তো একটু কম, কিন্তু কখনো যদি আমার পরিবার হয়, সন্তান হয়, তখনো আমি জানি, আমাকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার অসময়ে বা দুঃসময়ে সাহাজ্য করার কেউ নাই। এই কঠিন বাস্তবতাটা আমার মাথায় এমনভাবে গেথে গিয়েছিলো যে, আমার কখনো ভুল হয়নি এটা ভুলে যাবার। আমার বিকল্প আমিই, আর কেউ নয়।

এই অবস্থায় আমার সাথে দেখা হয় এই আজকের আসমানীর। কথা থেকে চিঠি, চিঠি থেকে আরো ঘনিষ্ঠতা, আর সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে একসময় প্রনয়।  অনেকেই আমার এই ঘনিষ্টতা পছন্দ করে নাই। এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমি কিন্তু এতিম ছিলাম না। আমারো মা ছিলো, ভাই ছিলো, বোনও ছিলো, ছিলো শুভাকাংখিও। কিন্তু তাদের অবস্থা এরকম নয় যে, আমার কোনো প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে কোনো আর্থিক সহায়তা করতে পারবেন বরং তারাও তাদের আর্থিক দুরাবস্থার কারনে আমার দিকেই যেনো তাকিয়ে থাকে। কিন্তু এসব শুভাকাংখির একটা বড় সমস্যা হলো যে, নিজেরা কোনো কিছু সাহাজ্য করতে না পারলেও, তারা বিজ্ঞের মতো এমন কিছু মতামত, বা উপদেশ দেন যেনো ওরাই না জানি আমার অভিভাবক বা তাদের পরামর্শ না শুনলে আমার জন্য একটা বড় অপরাধ করা হলো বলে মতামত হয়। কিন্তু ওই যে বললাম, আমি বরাবর স্বাধীনচেতা মনের মানুষ, আর আমার চিন্তাধারার সাথে কারো চিন্তাধারা মিলুক বা না মিলুক সেটা আমার কাছে বড় কোনো বিবেচ্য বিষয় ছিলো না। আমি শুধু ভাবতাম, আমার সমস্ত কিছুর জন্য আমিই দায়ী। হোক সেটা উত্থানের বা পতনের। আমার উত্থানে হয়তো তখন তারা তাদের ভুল পরামর্শের কারনে চুপ থাকবেন, না হয় আমার পতনের কারনে তারা আরো কিছু শুনিয়ে দেবেন যে, তাদের পরামর্শ না শুনার কারনে আজ আমার এতো অধোপতন। কিন্তু এটাও জানি, সেই অধোপতন থেকে আবার টেনে বের করে কোনো এক সঠিক রাস্তায় দাড় করিয়ে দেবার মতো তাদের না আছে সামর্থ বা না আছে কোনো মানষিকতা।    

আর এরমধ্যে আসমানীর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হবার পর আমি নিজেও বুঝতে পারলাম, আমার অবস্থা থেকে আসমানীর অবস্থাও গুরুতর। আমি ছেলে মানুষ, কোনো না কোনোভাবে হয়তো অনেক কিছুই পার পেয়ে যাবো। কিন্তু আসমানী মেয়ে মানুষ, তার অবস্থা আরো শোচনীয়। তারও না আছে তেমন শক্ত কোনো অভিভাবক, না আছে বাবা, না আছে এমন কেউ যাকে নির্ভর করে সে তার মেয়েলী জীবনের একটা সুখের কথা ভাবতে পারে। তার শুধু একটা ভরষাই ছিল। আর সেটা হলো যদি আগত ভবিষ্যতে তার স্বামী হয়, তার উপর। তার চাওয়া পাওয়া, আবদার, আর যতো অভিমান সেই স্বামীকে ঘিরে। আসমানী এটাও জানতো যে, জীবনে এই আদর্শগত স্বামী পেতে হলে তাকেও একটা লেবেল পর্যন্ত যেতে হবে, বিশেষ করে পরাশুনার দিক দিয়ে। তাই, আসমানীর লক্ষ্য যেমন ছিলো ভালো একটা জীবনের জন্য, তেমনি লক্ষ্যকে সফল করার জন্য তাকে এই সমাজ সংসারে এমন করে পরিশ্রম করতে হবে যেখানে সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে ভালো কিছু করা যায়। সরকারী ইউনিভার্সিটি হলো সেই লক্ষ্যভেদের একটা সহজ কৌশল। আসমানি তার পূর্ন সদ্ব্যবহার করেছিলো। একদিকে আসমানী লেখাপরা চালিয়ে যেতে লাগল অন্যদিকে আমাকেও সে ধরে রাখলো।

একটা সময় এলো যে, আমি আর আসমানী একা একাই জীবন সাথী হয়ে গেলাম। আমি আসমানীকে আমার জীবনের বাইরে কখনো ভাবি নাই। আর এই ভাবার মধ্যে ব্যাপারটা এমন ছিলো যে, আমার মতো আসমানীরও কেউ নাই। আমিই আসমানীর দেবতা, আমিই আসমানীর আত্তা, আমিই আসমানীর সর্বত্র। ওর রাগ অভিমান, চাওয়া পাওয়া, সুখ আহলাদ, হাসি কান্না, সবকিছুই আমি। আর আমার বেলায়ও আমি জানি কাউকে আমার কষ্টের কথা, ব্যাথার কথা, কিংবা পরিকল্পনার কথা আসমানিকে ছাড়া কারো সাথেই শেয়ার করা সম্ভব ছিলো না। আমরা আসলে আক্ষরীক অর্থেই অর্ধাংগিনি রুপে একে অপরের জন্য বেছে ছিলাম।

মুক্তার সাহেব কিছুক্ষনের জন্য থামলেন। একটা দীর্ঘশাস ছাড়লেন। কিছুক্ষন চুপ করেও রইলেন। আমি বুঝলাম, তিনি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন। তারপর আবার শুরু করলেন-

আমি আসমানীকে পেতে সবাইকেই ছেড়েছিলাম। হতে পারে যে, আমার পরিবারের সবাইকেই ছেড়েছিলাম যারা হয়তো কোনোদিন জানতেও পারে নাই কবে থেকে আমি তাদের মন থেকেই ছেড়ে পর করে দিয়েছি। এই ছেড়ে দেয়া আর পর করে দেয়াটা এমন ছিলো যে, না কারো সাথে আমার খারাপ সম্পর্ক, না কারো সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। কিন্তু সম্পর্কটা আছে। না আমি তাদের জন্য দায়িত্তশিল, না ওরা আমার জন্য। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করা। আর আমার নিজের পায়ের তলার মাটির সাথে আমি আরো একটা পরিকল্পনা সবসময়ই করতাম যে, যদি কোনো কারনে আমার সব হোমওয়ার্ক শেষ না হয় এবং তারপুর্বেই আমার মৃত্যুবরন হয়, তাহলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বে আমার এই আসমানী। তাই যেভাবেই হোক, আমার বর্তমানকে কাজে লাগিয়ে আমার প্রথম দায়িত্ত হয়ে দাড়িয়েছিলো আসমানীকে সাবলম্বি করে তোলা। আমার পক্ষ থেকে যা যা করা দরকার সেটা আমার শক্তির পুরুটা দিয়ে এবং আসমানীর নিজের দক্ষতায়। দুটুই প্রয়োজন।

আমি আসমানীকে ঠিক সেভাবেই তিলে তিলে গড়ে তুলছিলাম। কিন্তু আমার একার আর্থিক সচ্চলতার ডিগ্রী এমন ছিলো না যে, অচিরেই পাহাড়ের মতো একটা সাবলম্বি পরিস্থিতি তৈরী করে ফেলি। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, আমি আসমানিকে তার নিজের যোগ্যতায় গড়ে তুলতে সক্ষম হই আর সেই সক্ষমতায় আসমানিও একটা সরকারী চাকুরীর সুবাদে প্ল্যাটফর্ম পেয়ে যায়। আসমানীর চাকুরীটাকে অনেকেই সহজ করে মেনে নিতে পারে নাই, কেনো আমি আসমানীকে মহিলা হয়েও চাকুরী করার অনুমতি দিলাম, বিশেষ করে এই ইগোতে। আসমানীর উপর আমার শতভাগ আস্থা ছিলো, আর সেই আস্থা একদিনে গড়ে উঠে নাই। তার মানসিকতা, তার ভালোবাসার গভীরতা আমাকে কখনো এটা সন্দেহ করার অবকাস দেয় নাই যে, আসমানী কোনো না কোনো অবস্থায় তার নিজ গন্তব্য আর ভালোবাসা থেকে ছিটকে পড়বে। আর সে ছিটকে পড়েও নাই কখনো।

খুব ভালোভাবেই চলছিলো আমাদের। আমাদের সন্তান হলো, সংসারে খরচ বাড়লো বটে কিন্তু দুজনের মিলিত চেষ্টায় আমাদের অন্তত প্রাত্যাহিক জীবন ধারনের নিমিত্তে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছিলো না। আমরা ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে শুরু করলাম। ওইযে বললাম, আমার মাথা থেকে কখনো এটা সরে যায় নাই যে, আমার অবর্তমানে আমার নিজস্ব পরিবার যেনো থাকে সুরক্ষিত এবং সাবলম্বি। সেই লক্ষ্যটা আমার কোনোদিন বিচ্যুত হয় নাই। তাই তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য একটা বাড়ি, নিরাপদে চলার জন্য একটা গাড়ি, কিছু স্থায়ী আর্থিক উৎস যা যা লাগে আমি সেটার ব্যবস্থা করছিলাম। সময়ের সাথে সাথে সেটা আসলেই একটা স্থায়ী রুপ নিয়েছিলোও। আর এই লম্বা সময়টা লেগেছে আমার প্রায় ২৫ বছর। এই ২৫ বছরে আমি চরাও উতরাই পের হয়েই এসেছি। এখন আমার আসমানি জানে সে সাবলম্বি, আমিও জানি আমার আসমানি সাবলম্বি। সে নিজে নিজে চলতে পারবে। তার একটা স্থায়ী আর্থিক উৎসও হয়ে গেছে। আর সেটা তার নিজের চাকুরী, পেনসন আর আমার সৃষ্ট একটা খাত, বাড়ি ভারা থেকে। এই বিশাল অবস্থানটা করতে আমাকে আমার জীবনের বহু মুল্যবান সময় পার করতে হয়েছে বটে। আমার যৌবন পেরিয়ে আমি মধ্য বয়স্ক পুরুহীতে পরিনিত হয়ে গেছি। আমি এখানেই ব্যাপারটা শেষ বলে মনে করি নাই। আমার মনে হয়েছে যে, থাকার জন্য বাড়ি কিংবা নিরাপদে রাস্তায় চলার জন্য গাড়ি আর প্রাত্যাহিক জীবনের চলার জন্য চাকুরি প্লাস বাড়িভাড়াই সব হয়তো নয়। তার পাশাপাশি কিছু ক্যাশ ব্যাংক ব্যালেন্স থাকাও খুব জরুরী। ফলে আমি যে কাজটি করতাম, তা হলো, আমি কখনো আসমানীর চাকুরী থেকে পাওয়া বেতনের কোনো অংশই স্পর্শ করতাম না, সে সেই টাকা দিয়ে তার যা যা করতে ইচ্ছে হয় করতে পারতো। হোক সেটা সঞ্চয়, হোক সেটা কাউকে দান কিংবা নিজের জন্য কোনো বিলাসিতা। আমি সংসারের সমস্ত খরচ আলাদা করেই আসমানীকে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এভাবে শুধু নিজের বাড়িই নয়, আমি অন্য উৎস থেকে আরো কয়েকটি ফ্ল্যাটও তার নামে বরাদ্ধ করে দিয়েছিলাম, যাতে আরো কিছু ক্যাশ টাকা ওর হাতে আসে। আমি এখন বেশ শান্ত যে, আমার অবর্তমান আসমানীর জন্য কোনো হুমকীসরুপ নয়। আসমানী নিজেও চাকুরী করার সুবাদে বিভিন্ন অফিস আদালত, কিংবা সমাজকে মোকাবেলা করার মতো মানসিক শক্তি রাখে। একটা পুরুষ মানুষ যেভাবে একা গার্জিয়ান হিসাবে একটা পরিবারকে সুরক্ষিত করতে পারে বা রাখে, আমার আসমানীও একইভাবে সে সমপরিমান দায়িত্ত নিয়ে একটা সংসার সামলাতে পারবে। আমি অনেক খুসী। কিন্তু তারপর…।

এই পর্যায়ে এসে মুক্তার সাহেব একটা বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেট ধরালেন। কফির কাপে চুমু দিলেন। তারপর আমাকে তিনি প্রশ্ন করলেন- বলুন তো, একটা মানুষের জীবন সুখী হয় কি কি জিনিষ থাকলে?

আমি বললাম, টাকা থাকলে, সম্পদ থাকলে, সমাজে একটা ভালো পজিসন ইত্যাদি থাকলে আর যদি শরীর সুস্থ থাকে, তাহলে তো সে সুখী মানুষ বলেই গন্য হয়। মুক্তার সাহেব একটু মুচকী হাসলেন। তারপর বললেন,

তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন, রাস্তায় যে সব মানুষ ভিক্ষা করে, তারা কেউ সুখী নয়? কিংবা যাদের এক ফোটা সম্পদ নাই, তারা কি সুখী নয়? অথবা সমাজে যারা অনেক বড় বড় পজিশন নিয়া নাই, তারা কি সুখী নয়? অথবা যদি বলি, বিছানায় অবশ হয়ে পড়ে থাকা সব মানুষই কি দুখী? তারা কি কোনো না কোনো স্তরে সুখী না? যদি এমন হতো যে, টাকা আছে, পয়সা আছে, অঢেল সম্পদ আছে, সমাজে মানসম্মান প্রতিপত্তি আছে আবার শারীরকভাবে সুস্থও আছে, তারা তাহলে কিসের নেশায় নিজের ঘরে থাকা সুন্দুরী স্ত্রীকে রেখে পুনরায় পরকীয়ায় মেতে উঠেন? সবাই কি পারভার্ট? নাকি যৌনতাই প্রধান? অথবা যদি বলি যে, ৯০ বছরের এক ব্রিদ্ধ যখন তার অঢেল টাকা পয়সা ব্যাংক ব্যালেন্স থাকার পরেও নিজের ৮৫ বছরের স্ত্রীর বিয়োগে আরেকটা বিয়ে করতে মানিসকভাবে প্রস্তুতি নেন, যখন তার যৌনতায়ও কোনো ক্ষমতা নাই, সে তাহলে এটা কিসের নেশায় করে? আমি অবিশ্বাস করছি না যে, সবক্ষেত্রেই আমার এই প্রশ্ন সঠিক বা সঠিক নয়, তবে এর অন্তরনিহিত গুঢ় রহস্য খুজতে গেলে দেখা যাবে, এসবের কোনটাই এর উত্তর  নয়। উত্তর লুকিয়ে আছে শুধুমাত্র না দেখা একটা অনুভুতিতে। আর সেটা হচ্ছে- একাকীত্ত বা নন একোম্প্যানিয়ন।

আমি কিছু বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মুক্তার সাহেব তার হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে আবার বলতে লাগলেন-

হ্যা, হয়তো আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই একাকীত্ত কি বা এই নন-একোম্প্যানিয়ন এর মর্মার্থ কি। এটা বুঝবার জন্য আপানাকে কিছু সুক্ষ জিনিষের ভিতরে ঢোকতে হবে। আর সেটা হচ্ছে-অনুভুতি, আবেগ, তার সাথে মানবিক চাহিদা। মানবিক চাহিদার সাথে শারীরিক চাহিদার একটা যোগসুত্র থাকতে পারে যা আমি পরে বল্বো। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি আপনাকে ছোট একটা উদাহরন দেই। কখনো কি উপলব্ধি করেছেন যে, A person can be lonely in a crowdy city? অথবা কখনো কি ভেবেছেন যে, an one-month infant baby who has no idea about the world or even does not know how to talk, does understand our any language, can be a good accompanist as well!! অর্থাৎ একটা কোলাহলপুর্ন জনসমুদ্রের মধ্যেও কেউ একা। আশেপাশে হাজার হাজার লোক ঘুরছে, ফিরছে, খাচ্ছে, তামাশা করছে, আনন্দ করছে অথচ কোনো একজন এই ভীড়ের মধ্যেও একা। আবার অন্যদিকে দেখবেন, অনেক আপন লোকজন আপনার আশেপাশে আছে, কথা শুনার মতো লোকজনও আছে, কিন্তু তাদের থেকে আপনার কাছে মনে হবে একটা অবুঝ বাচ্চা যে কথাই বলতে শিখে নাই, যে আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝে না, তারসাথেও আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারছেন। অথচ তার সাথে আপনি বিজ্ঞান নিয়ে আলাপ করতে পারেন, মহাকাশ নিয়া আলাপ করতে পারেন, কখনো সে কোনো কারন ছারাই কেদে দেবে, কখনো সে চার হাত পা নেড়ে নেড়ে কি জানি ভাব প্রকাশ করবে যার সাথে আপনার বিষয় বস্তুর কোনো মিল নাই, অথচ আপনি খুব ভালো সময় কাটাচ্ছেন। এই নবজাতক এক মাসের বাচ্চাটাও আপনার খুব ভালো সংগি হয়তো। এই অনুভুতী কি বুঝেন? আর এখানেই মানুষের সুখ এবং সাথীর সাথে আপনার চিরবন্ধন। এই বন্ধন থেকে আপনি কখনোই টাকার বিনিময়ে, সম্পদের বিনিময়ে, কিংবা আপনার সামাজিক উচ্চতার মাপকাঠিতে মুক্ত হতে পারবেন না। যতো বিপদই আসুক, যতো খারাপ সময়ই আসুক, এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।   

মুক্তার সাহেবের এই যুক্তি বুঝতে আমার বেশ অনেক সময় লেগেছিলো। হয়তো আমি আমার ছোট এই মস্তিষ্কে ব্যাপারটা তখনো ধরে উঠতে পারি নাই। কিন্তু যখন তিনি তার কাহিনিটার প্রায় শেষে, তখন আমার একটা কথাই মনে হয়েছিলো যে, যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, অথবা থাকে ভিতরের কিছু কথা যা বলার জন্য মন ছটফট করে, তাহলে সে সবসময়ই চাইবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুক্ষটা, কষ্টটা, কিংবা অনুভুতিটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক বা না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই ব্যাপারগুলি শেয়ার করা দরকার। যখন এই লোকগুলি আর কাছে বসে তাকে আর সময় না দেয়, কিংবা যদি এমন হয় যে, তার এই ব্যাপারগুলি সে কারো কাছে আর শেয়ার করতে পারলো না, তখনই সে অনুভব করে, সে একা। আর এই একাকিত্ত মানুষটাকে ‘সময়’ নামক দানব বা বাহক ধীরে ধীরে সবার থেকে আলাদা করে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে খোজে কে আছে তার এই আবেগগুলি শোনার? আর যে শুনবে, তারই জিত, আর যারা শুনবে না, তারাই আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় এই মানুষটার গন্ডি থেকে। সে যেই হোক, হোক তার স্ত্রী, হোক তার প্রানের সন্তান অথবা প্রিয় বন্ধুবান্ধব। অন্যদিকে, আরেকদল, যারা এই সুযোগ লুফে নেয়, সে যতোই অশিক্ষিত হোক বা অসুন্দর, কিংবা তুলনামুলক ভাবে নিম্নধাপের, তাতেও কিছুই যায় আসে না, তারাই হয়ে উঠে তার মনের মানুষ, কাছের মানুষ। আর তাই বারবার তার এই একাকিত্তে ভোগা মন ছুটে যায় তাদের কাছে যারা তাকে সময় দেয়, দেয় একটা কম্প্যানিয়ন।

আমি মুক্তার সাহেবকে প্রশ্ন করলাম, তাহলে কি এমন একাকিত্তে আপনি ভোগছিলেন যেখানে শেষ অবধি মনে হলো যে, এই ৩৩ বছর একসাথে থেকেও আপনি আসমানীর থেকে একা? অথবা কি এমন কারন ছিলো যা আপনাকে সবার থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়েছে এই সাজানো সংসার, পাতানো সুখী জীবন থেকে?

মুক্তার সাহেব আবারো মুচকী হেসে বললেন,

কই নাতো? আমি তো এই সাজানো সংসার বা পাতানো জীবন থেকে সরে যাইনি। ওই যে আপনাকে আগেই বলেছিলাম যে, বলীর সব পাঠা সবসময় বিষাক্ত হয় না। আর যদি হয়ও, আর যদি পাঠাটাকে বলী দিতে গেলে অনেক বিপদের সম্ভাবনা থাকে, কিংবা অনেক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাঠা বিষাক্ত হলেও তাকে কোন না কোনভাবে পুনরায় শুদ্ধ করে ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলেই পরিবেশন করা হয়। আমিও ঠিক সেরকম ঝলমলে টেবিলেই এখনো আছি। তবে এই ‘আছি’র মধ্যে অনেক অংশ জুরে আছে  আসলেই’ নাই’ আর অনেক অংশ জুরে আছে কিছু দায়িত্তবোধ। আমি ‘আছি’ আর আমি ‘দায়িত্তে আছি’ এই দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। জেলখানায় বন্দি কয়েদির পাশে কোন এক মানুষ যখন বলে, ‘আমি আছি’ তোমার পাশে, এর মানে কি, সেটা তো আপনি নিশ্চয় বুঝেন। এর মানে, কখন তার কি করলে এই জেলখানা থেকে তার মুক্তি মিলবে, অসুস্থ হলে দূরপাল্লা পথ অতিক্রম করে সে তখন চোখে জলভরা চাহনীতে আপনাকে দেখতে আসবে, আপনার কষ্টে সে ব্যাথিত হবে, আপনাকে সে প্রতিনিয়ত মিস করবে। আপনার একাকিত্তকে সে মিস করবে ইত্যাদি। কিন্তু সেই প্রহরী যে আপ্নার দায়িত্তে আছে, তার ভুমিকা নিশ্চয় এক নয়। কয়েদির দায়িত্তে থাকা প্রহরীর কাজ যেনো কোনোভাবেই এই বন্দি পালাতে না পারে, এটাই তার প্রথম দায়িত্ত।  কাছে থাকা আর দায়িত্তে থাকা কখনোই এক নয়। আমার কাজ যেনো সেই দায়িত্ত যাতে আমার এই সাজানো সংসার ভেংগে না যায়, আমার দায়িত্ত সেটা যাতে আমার অন্তত এই জীবদ্দশায় আমার আসমানীর জীবনে কোনো কষ্ট না আসে, আমার সন্তানের কোনো বিপর্জয় না আসে।

মুক্তার সাহেব আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা আগে দিলেন। তারপর তিনি শুরু করলেন আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর। আমি তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি বাক্য এতো তন্ময় হয়ে শুনছিলাম যে, মনে হচ্ছিলো আমি কোনো ফিলোসোফির ক্লাশে উচ্চমানের কোনো তত্তকথা শুনছি। বারবার মনে হচ্ছিলো, মুক্তার সাহেব জীবনকে যেভাবে দেখেন, আমরা হয়তো এর বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে দেখি। আমরা যখন অন্দর মহলের আগরবাতির গন্ধটা আনন্দ করি, তখন মুক্তার সাহেব এই আগরের গন্ধের সাথে সাথে আগরের জ্বলে পড়ে ছাই হবার কষ্টটাও দেখেন। আমরা সাধারনভবে যাকে প্রকৃতি বা ন্যাচার বলি, মুক্তার সাহেব এটাকে শুধু ন্যাচার বলে ঘটনাপ্রবাহ এড়িয়ে যান না। তিনি এর অন্তরনিহিত কারনগুলি খোজেন। আর সেই কারনের মধ্যেই যেনো আসল রুপ আর ঘটনা ঘটার সবগুলি উপাদান খুজে পান। মুক্তার সাহেব এবার বলতে শুরু করলেন-

জীবন একটাই। আজ থেকে শতবর্ষ আগে সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজের জন্য যখন তাজমহল তৈরী করেন, তার ওই তাজমহল কতটা ভালোবাসা প্রকাশ করেছে সেটা জানার চেয়ে আমরা কি কখনো এভাবে ভেবে দেখেছি যে, সম্রাট কতোটা কষ্ট থেকে এই তাজমহল বানিয়েছেন? তাজমহলের ইমারতে কি সেই কষ্ট আমরা দেখতে পাই? আমরা যা দেখি, তা হচ্ছে শাহজাহানের ভালোবাসার নিদর্সন। যা দেখতে পাই, তা হচ্ছে মুল্যবান রত্নে খচিত একটা দামী প্যালেস। কিন্তু আমি যদি বলি এটা সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসার মৃত্যুর নিদর্সন? তাহলে কি ভুল হবে? যদি বলি এটা ভালোবাসার কষ্ট থেকে নির্বাসিত এক রাজার মনের কষ্টের আকুতি বা অনুভুতি? তাহলে কি ভুল কিছু বলা হবে? হয়তো দুটুই ঠিক। এখন আমার অনেকগুলি প্রশ্ন জাগে, সম্রাট শাহজাহানের ২য় স্ত্রী ছিলেন এই আরজুমান্দ বানু বেগম ওরফে মমতাজ। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন কান্দাহারী বেগম। রানী মমতাজ ছাড়াও সম্রাটের জীবনে আরো আটজন রানী এসেছিলো। তাহলে সম্রাট শাহজাহান শুধুমাত্র মমতাজের জন্যই এতোবড় একটা বিশ্বনন্দিত মহল তৈরী করলেন কেনো? আর কারো জন্যে নয় কেনো? এর অন্তর্নিহিত অনুভুতি হয়তো শুধু জানেন শাহজাহান নিজে। আমার মাঝে মাঝে এইরকম প্রশ্নও জাগে যে, এতো বড় বড় নাম যাদের, তারা কেনো একটিমাত্র নারীকে নিয়ে জীবনে সুখী হতে পারলেন না? তাদের তো কোনো টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জত, প্রতিপত্তি, ক্ষমতার দাপট কোনো কমতি ছিলো না? তাহলে আবারো আমার ওই যে সেই আগের কথা ফিরে আসে। তারমানে, শুধু টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জর সম্মান প্রতিপত্তিই সুখী বা খুসী জীবনের একমাত্র ভিত্তিপ্রস্তর নয়। এর বাইরেও কিছু আছে যা যুগে যুগে প্রমানিত হয়েছে।

আরেকটা ছোট তত্ত আমাদের সবার জানা থাকা দরকার যে, মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছুই মেনে যায়। আর সেই মেনে যাওয়া আর মেনে নেয়ার মধ্যেও একটা ফিলোসোফি থাকে। মানূশ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো কিছুর আশায় হয়তোবা অনেক কিছুই নিজের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানিয়ে নেয়। কিন্তু যখন সেই আশার সফলতা পায়, তারমধ্যে তখন ‘আমিত্ত’ কাজ করে। তারমধ্যে তখন বৈতরনি পার হয়ে নিরাপদ জোনে চলে আসায় সে তখন  অনেক কিছুই আর আগের মতো অনুগত নাও থাকতে পারে। ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে আমার আসমানির মধ্যে। আমি বলছি না যে, সে সীমা অতিক্রান্ত করে আমাকে হেয় করছে কিন্তু একতা তাচ্ছিল্যের ভাব তো তার অজান্তেই আছে এতা তো ফেলে দেবার মতো নয়।

যে আস্মানীকে আমি যাই উপদেশ দিয়েছি, বিনা বাক্যে, বিনা দ্বিধায় সে সেটা বেদবাক্য মনে করে অন্ধবিশ্বাসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালন করেছে। আজ আমি সেই আসমানীকে খুজে পাই না। এর মানে এইটা নয় যে, সে আমার কথা শুনে না বা শুনতে চায় না। কিন্তু তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যখন আমাদের অনেক কিছু ছিল না, তখন একটা রিক্সায় করে মাইলকে মাইল ঘুরেও আমাদের আনন্দ হয়েছে যা এখন এসি গাড়িতেও পাওয়া যায় না। একটা সময় ছিল যখন আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা কি করলে কি হবে, কি করলে আরো ভাল হবে, সেটা নিয়ে কোনো তর্কবিহীন আলাপ আলোচনা শলা পরামর্শ হয়েছে। আজ যেটা করা তো দুরের কথা, আলোচনা করার জন্য পরিবেশও নাই। আমি বলতে চাইলেও তার হয়তো সময় নাই শোনার। এর মানে এই নয় যে, সে আমাকে অগ্রাহ্য করছে। আমি বলতে চাচ্ছি, এটা নিয়ে আর কোনো শলা পরামর্শ হয় না। একটা সময় ছিলো যখন, আমার প্রিয় খাবারগুলিই শুধু টেবিলে শোভা পেত, যা এখন আমাকে বলেই দিতে হয় হয়ত এটা নয় ওটা খাইলেই মনে হয় ভালো লাগতো। কখনো কখনো ইচ্ছে না থাকলেও তাদের পছন্দের খাবারের তালিকাটাই এখন আমার খাবারের তালিকা করে নিতে হয়। এর মানে এই নয় যে, আমি বললে সেটা তৈরী করা হবে না। কিন্তু আগে এটা বলতে হয় নাই। সমৃদ্ধ জীবনের চেয়ে অভাবী জীবনে অনেক বেশী প্রেম আর ভালোবাসা থাকে। যদিও সেখানে ঝগরাও থাকে, তবে সেই ঝগড়াটাও একটা ভালোবাসার অন্য রকমের বহির্প্রকাশ।

জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন আপনাকে নিয়ে কেউ আর হৈচৈ করবে না। কিন্তু আপনার প্রয়োজন তাদের কাছে ফুরিয়েও যাবে না। আপনি আছেন কারো কারো প্রয়োজন মিটানোর জন্যই। আপনার কখন একটু ছাদে হাওয়া খেতে ভাল লাগবে, সেই হাওয়া খাওয়ার সময় আগে তো একজন আসমানীর সংগ পাওয়া যেতো কিন্তু এখন তার জগত অনেক বিশাল। এখানে আপ্নিই একমাত্র মানুষ নন যাকে ঘিরে তার দিনের সিংহভাগ সময় আরাধনায় কাটবে। এর মানে আবার এই নয় যে, আসমানি অন্য কাউকে মন দিয়ে বসে আছে। আগে আপানার অনুপস্থিতি হয়তো তাকে একা করে দিতো বটে কিন্তু এখন সেটা সেরকম নয়। কেনো যেনো মনে হয় কি যেনো মিসিং। এখন সম্পর্কটা যেনো একটা শোষনের পর্যায়ে নেমে গেছে। মানসিক টর্চারের মতো মনে হয় কিছু কিছু সময়। আর বারবারই আমার কাছে এটাই মনে হয়েছে যে, দূর্বল সময়টা ওরা সবাই পেরিয়ে গেছে বলেই হয়তো এখন আর আগের মতো সব কিছুতেই বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে এমনটা না। ব্যাপারটা জানি কেমন, সব না মানলেও তো সমস্যা তেমন নাই। উত্তর আর প্রতি-উত্তরের জামানা মনে হয় এখন, যেটা আগে ছিলো না। কম্প্রোমাইজ আর সাইলেন্ট থাকাই যেনো এখন সময়। কিন্তু এটা তো আমি চাইনি?

ভালোবাসার যেমন একটা শক্তি আছে, অনিহারও একটা বিপদ আছে। অনিহার অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইমোশন যখন ধীরে ধীরে বুদবুদের মতো অন্তরে জমা হতে থাকে, একসময় সেটা সারা অন্তর জুড়েই এমনভাবে বিচরন করে যেনো ভালোবাসার বুদবুদের আর কোনো স্থান থাকে না। অথচ আগের সে ভালোবাসার বুদবুদ গুলি তখনো মরে যায় নাই, বেচেই আছে কিন্তু কোনঠাসা হয়ে। তখন এই কোনঠাসা ভালোবাসার অতৃপ্ত বুদবুদগুলি জলবিহিন মাছের মতো অতি অল্প পরিসরে ছটফট করে, এক সময় কোনো এক দূর্বল ছিদ্র দিয়ে মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসে। যখন এই ভালোবাসার বুদবুদগুলি একসাথে ঝাকেঝাকে বেরিয়ে আসে, তখন সেটা খুজতে থাকে কিছু নিরাপদ আশ্রয়। আর সেই নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাড়ায় মাধুরীর মতো কিছু অসহায় মানুষ যারা একে স্থান দেয় সেই পূর্বেকার আসমানীদের মতো যখন আসমানীরা এক সময় দূর্বল ছিলো, সাবলম্বি ছিলো না। সেই স্থানটা তখন দখল করে নেয় মাধুরীরা। তখনই ঘটে এক বিপ্লব। যে বিপ্লবের নাম, ওই যে বললাম, ‘আমি আছি’ আর  আমি দায়িত্তে আছি’র মতো বিপ্লবে।

এবার, আপ্নিই বলেন, এই অতৃপ্ত আত্তা, এই শুষ্ক হৃদয় কখন কোথায় ভিজে আবার উজ্জিবিত হয় সেটার নির্ধারন করে কে তাহলে? এটা হয়তো আসমানিদের দোষ নয়, না মুক্তার সাহেবদেরও। এটা সময়ের একটা চক্র যখন কোনো মরুভুমি আচমকা কোনো অঝর ধারায় ব্রিষ্টির জ্বলে সবুজ ঘাসের মাঠে রুপান্তিত হয়। প্রকৃতি মনে হয় এরকমই।

এতোক্ষন আমি মুক্তার সাহেবের কথাগুলি খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। কোথাও আমি মুক্তার সাহেবের অপরাধ বলে মনে হলো না। আবার এটাও মানা যায় না যে, কেনো এতো বছর পর আসমানিরা বদলে যায় কিংবা মুক্তার সাহেবেরা ছিটকে পড়ে যায় আরো একটা আসমানীর কাছে যাদের নাম মাধুরী। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। বিশ্বাস আর ভরষার যখন মৃত্যু হয়, তখন শারীরিক দুরুত্ত অনেকগুন বেড়ে যায়। আর এই দুরুত্ত বাড়ার সাথে সাথে তখন ‘সময়’ নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। এই সময় ইচ্ছা থাকুক আর নাইবা থাকুক, অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নেয় আসমানীরা, আবার আসমানীরা আছে, এতা জেনেও মেনে নেয় মাধুরীরাও। মেনে নিতে শিখতে হয়। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ দুজন মানুষের মধ্যে যখন ভালোবাসার এই অপুর্নতার স্রিষ্টি হয়, তখন কোনো একজন তার কাংখিত সুখ কিংবা একাকিত্ত কাটানোর জন্য সেই সপর্কের বাইরে যেতেই পারে। আর যখনই পা একবার বাইরে ছুটে, তখন, তাকে আর বিয়ে নামক অলিখিত বায়বীয় সম্পর্কটা আর শক্ত ভীত তৈরী করতে সক্ষম হয় না। প্রবল স্রোতে তীর ভাংগা পারের মতো প্রতিতা ক্ষনেক্ষনে এর ভাংগনের শব্দ পাওয়া যায়। আর যখন এই ভাংগা একবার শুরু হয় তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। হয় তাকে মুক্ত করে দিতে হয়, আর তা না হলে মেনেই নিতে হয়। কাউকে জোর করে কিছুক্ষনের জন্য হয়তো চুপ করিয়ে রাখা যেতে পারে কিন্তু সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। ফলে একদিকে যেমন আসমানীরা তাদের অধিকার ছেড়ে দিতে চায় না, আবার অন্যদিকে  মুক্তার সাহেবদের জন্য তাদের সময়েরও অনেক ঘাটতি থাকায় তাদের ধরেও রাখা যায় না। অগাধ সম্পত্তির বিবেচনায় একটা কথা ঠিক যে, পৃথিবীতে এমন কিছু সম্পর্ক আছে যা সব সম্পত্তির থেকেও বড়। আর সে সম্পর্কটা হচ্ছে অনুভুতির সম্পর্ক। আর মুক্তার সাহেবরা হচ্ছেন এমন এক সপর্কের নাম, যারা সাফল্যের সিড়ি বেয়ে বেয়ে উপরের তলায় স্থান করে নিয়েছেন। তাদের এই সাফল্যের একটা ফেসভ্যালু থাকায় তাদেরকে সবাই ছেড়েও যেতে চায় না। সীমা লঙ্ঘন আর সীমা শেষ এক জিনিষ নয়। আসমানি, মাধুরী আর মুক্তার সাহব্দের এই ত্রিমাত্রার সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যেখানে সিমা লংগন হয়েছে কিন্তু সীমা শেষ হয়ে যায় নাই। তারা সবাই যেনো দুক্ষের খাচায় বন্দি। আর এটাই সত্যি। সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না। আর কোনো  কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব। মুক্তার সাহেব আরো একটা কাপে কিছু কফি আর আরেকটা সুগারেট ধরিয়ে বলতে লাগলেন যে,

যেদিন আমি প্রথম আসমানীকে দেখেছিলাম, ঠিক একই রকম ভাবেই আমি দেখেছিলাম এই মাধুরীকে। (চলবে)