২৫/০৬/২০১৭-আমার জীবনে এমন একটা সময় আসিবে (রঙ লেপা)

আমার জীবনে এমন একটা সময় আসবে একদিন যেদিন আমার জন্যই সবাই একত্রে মিলিত হবে। মিলিত হবে আমাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে। কিন্তু আমি থাকবো সম্পূর্ণ স্থবির আর শান্ত। বাড়িঘর সব ভরে যাবে একের পর এক চেনা জানা এবং অচেনা অনেক লোকের ভীড়ে। উজ্জ্বল দিবালয়ে, অথবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে অশান্ত হৃদয়ে কেউ কেউ লাল নীল জামা পড়ে মাথায় টুপি পড়ে, কেউ আবার হাতে তসবিহ নিয়ে মুখে দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে হাহুতাশ করবে, কেউ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জ্ঞ্যান হারাবে, কেউ আবার মনে মনে যার যার মিশ্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ কেউ আমাকে কোথায় দাফন করবে, কে বা কারা সেই দাফনের নিমিত্তে কোথায় আমার কবরখানা রচিত হবে এই ব্যস্ততায় এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াবে। কেউ আমাকে পেয়ে হারাবে আবার কেউ আমাকে না পেয়েই হারাবে। কারো অধিকার নিয়া মনে মনে ছক কসিয়া অশান্ত রুপ ধরে বিলাপ করবে, কেউ আবার অধিকার পুনরুদ্ধার হবে এই আশঙ্কায় প্রহর গুনবে। কারো জন্য আমার এই প্রস্থান হবে মর্মান্তিক আবার কাহারো জন্য হবে অতীব সুখের।

এইদিনে আমার সমস্ত সিডিউল মোতাবেক আর কেউ অপেক্ষা করবে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ক্যালেন্ডারটি আর আগের মতো সরব হইয়ে উঠবে না। ঘড়ির কাটায় কমবেশি হলেও আমার তাতে কিছুই যাবে আসবে না, আর তাতে আমার কোনো তাড়াহুড়াও থাকবে না। সারাবিশ্ব যেইভাবে চলতেছিলো ঠিক আগের মতোই এই জগতের সব কিছুই চলবে। এক মুহূর্তের জন্যও দিনের সময়কাল পরিবর্তিত হবে না, না চাঁদ তার উদিত হবার বা ডুবে যাবার কোনো ব্যতিক্রমী নিদর্শন প্রকাশ করবে। এমনটিই তো হয়ে আসছে বরাবর প্রতিটি মানুষের জীবন সায়াহ্নে। আমি আমার সারাজীবন ধরে যা আহরন করেছি, যা প্রতিনিয়ত রক্ষা করবার জন্য চারিপাশে সতর্ক দ্রিস্টি দিয়া পাহাড়া দিয়াছি, তা ওইদিন অন্য কারো হাতে চলে যাবে। সেটা নিয়া আমার কোনো কিছুই করবার থাকবে না। আমাকে যারা কখনোই ভালোবাসে নাই, যারা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্টে দেখার পায়তারা করত, তাদের উদ্ধত চাহনী কিংবা দ্রিস্টিভঙ্গি আমাকে আর কোনোভাবেই আহত করবে না। না আমি তাদের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করবো। যে তর্কে জিতবার জন্য আমি খন্ড খন্ড যুক্তি প্রকাশ করে আত্মতৃপ্ত হয়ে হাসিমুখে চারিদিকে বীরের মতো চলমান থাকতাম, সেই তর্ক এখন আর আমার কোনো কিছুই আনন্দ দান করবে না। আমার প্রতিদিনের জরুরি মেইল কিংবা টেক্সট ম্যাসেজের প্রতি আমার আর কোনো তাড়াহুড়া থাকবে না। যাদের বিরুদ্ধে আমার কতইনা রিগ্রেটে যা আমি বহুকাল নিদ্রাবিহিন রাত কাটিয়ে দিয়েছি, সেটার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে না, না আমার মনের মধ্যে এই সবের কোন প্রভাব ফেলবে। কারন আমি স্থবির।

আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে, আমার ওজন বেড়ে যাবে, এই ভেবে আমার রোজকার দিনের খাদ্যাভ্যাসে কোন পরিবর্তন কিংবা আমার সাদা চুলে কালো করবার বাসনা এসব কিছুর আর কোনো প্রয়োজন হবে না, না এসব আমাকে আর বিচলিত করবে। আমার ব্যবসা, আমার সম্মান, আমার প্রতিপত্তি যার জন্য আমি প্রতিনিয়ত ভভেবে ভেবে, নিদ্রাবিহিন কষ্ট করেছি, কিংবা কিভাবে কি করলে আমার সব কলেবর বৃদ্ধি হবে ইত্যাদির জন্য প্রানপন চেষ্টায় লিপ্ত ছিলাম, সেই ব্যবসা, সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি আজ হতে রহিত হয়ে তা অন্যের হাত ধরে চলতে থাকবে। ছোট কিংবা বড় যতো বড়ই অনুশোচনা হোক না কেনো, ক্লান্তি কিংবা কষ্ট যাই হোক না কেন, তা আজ আর কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। না আমাকে আর রাত জাগাইয়া তা নিয়া ভাববার কোন অবকাশ দিবে। জীবনের রহস্যময়তা, কিংবা মৃত্যুর উদাসিনতা যা আমার মন বহুবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তা আজ এক নিমিষের মধ্যেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। জীবন কি, মৃত্যু কি, জীবনের পরে মৃত্যুর কি গন্তব্য যা নিয়া আমি বহুবার তর্কে লিপ্ত হইতাম বা হয়েছি, যুক্তি খুজেছি, সব কিছুর সঠিক তথ্য আজ আমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে।

আমার অনেক অসমাপ্ত কাজ যা করবার জন্য আমি জল্পনা কল্পনা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, তা আজ সব কিছুর ইতি টেনে আমাকে নিয়ে যাবে কোনো এক সুদুর অজানা একস্থানে যা আমি এর আগে একবারের জন্যও বিচরন করি নাই।

আজ এই শান্ত শরীরে আমার চারিপাশের সবাইকে যেনো অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করতেছে কিন্তু আমার শ্বাস রুদ্ধ করা হয়েছে, আমার কণ্ঠনালি রুদ্ধ করা হয়েছে, আমার বাহু, আমার পা, আমার চোখ, আমার যাবতীয় ক্ষমতা আজ রহিত হয়ে একটি ছোট খাটিয়ায় আমি এমন করে শুয়ে আছি যা অবশ্যই হবে বলে আমি একদা জানতাম কিন্তু ইহা যে আজই তা আমি কখনো মনে মনে কিংবা শারীরিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। অথচ আমার এই দিনের জন্য একবারের মতোও কি প্রস্তুতি নেয়া দরকার ছিল বা আমার কি কি করনীয় ছিলো সেই ব্যাপারে আমি কখনোই নিজেকে তৈরী করি নাই। আমার যতো সব সম্পত্তি, যশ, সম্পদ সমস্ত কিছুর বিনিময়েও আজ আমি এই পরিস্থিতি হইতে মুক্ত হতে পারবো না। আমার সর্বত্র এবং সবকিছুতেই খাচায় বন্দি করা হয়ে গেছে।

যে ঘরটিতে একচ্ছত্র আমার অধিকার ছিলো, যার প্রতিটি কোনায় কোনায় আমার হাতের স্পর্শ, আমার পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিলো, তা থেকে আজ আমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আমি মেজর সাহেব বীরদর্পে হেটে যেতাম, যে জায়গাটা জুতা মাড়িয়ে, সিগারেট ফুকিয়ে পায়ে দলিয়া পিছনে ফেলে ফেলকনি খাটে বসে আরাম করে বসতাম, আজ সেই ফেলকনি খাট আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ওই জুতা মাড়ানো স্থানটিই আমার জন্য বরাদ্ধ হয়ে রবে। আমি আমার নামটিও আজ হারিয়ে ফেলবো। আমাকে আর কেউই আমার সেই প্রিয় মেজর সাহেব নামটি ধরে, কিংবা আমার ছোট মেয়ের অতি আদরের ডাকটি ধরে আমাকে গলা জড়িয়ে সম্বোধন করবে না। আমি মেজর আখতার নিতান্তই একটি লাশের নামে পরিচিত হয়ে এই উজ্জ্বল নীলাকাশ সমৃদ্ধ পৃথিবী হতে সবার আড়ালে চলে যাবো।

অফিসে যাইবার প্রাক্কালে যেই সুন্দরী বউটি বারবার জিজ্ঞাসা করত কখন আবার বাসায় ফিরবো, কিংবা আজ অফিস হতে ফিরতে দেরী হবে কিনা, অথবা বিদেশে যাত্রাকালে মেয়েদের এই আবদার, ওই আব্দারের লিস্ট সম্বলিত দাবীনামার মতো আজ আর কেউই আমাকে কিছুই জিজ্ঞেসা করবে না, কখন আবার বাসায় আসবো, কিংবা কেহ আমার সাথে যাবার জন্যও বায়না ধরবে না। ইহা এমন এক যাত্রা যেথায় কেহই কাহারো সাথী হতে ইচ্ছুক নহে।

আমি জানি আমি তোমাদেরকে আর কিছুই বলতে পারব না। যদি এটাই হয়ে থাকে আমার জীবনের শেষ বার্তাটুকু তোমাদের জন্য, তাহলে আমি আজ তোমাদের কাছে এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করতেছি যে, যদি কারো মনে, অন্তরে, শরীরে, ইচ্ছায়  বা অনিচ্ছায়, স্বার্থের কারনে বা বিনা স্বার্থে আমার অগোচরে কোনদিন আঘাত করে থাকি, যদি আমার দ্বারা এমন কোনো কাজ হয়ে থাকে যা উচিত ছিলো না, যা কারো অধিকার খর্ব হয়েছে, কিংবা আমার দ্বারা জুলুম হয়েছে বলে মনে মনে অনেক অভিশাপ দিয়াছেন, আমাকে সবাই খাস হৃদয়ে অনুশোচনাপূর্বক ক্ষমা করে দিবেন। আমিও আপনাদের সবাইকে ক্ষমা করিয়া দিলাম। আমি আমার দায়িত্ত কতটুকু পালন করতে পেরেছিলাম, সেই বিশ্লেষণ আমার উত্তরসুরী, আমার পরিবার আর আমার সমাজের উপর। আমার পরিবার, আমার সমাজ আমাকে কতটুকু দিয়াছিলো সেই বিশ্লেষণ আমার কাছে আর নাই তবে আমি আপনাদের সহিত ভালো একটা সময় কাটিয়ে গেলাম এটাই আমার জন্য অনেক ছিলো।

সবার শেষে আমি তোমাদের জন্য এই কথাটাই বলতে চাই-

যদি আমি কখনো আমার জানা অজানায় তোমাদেরকে ইগনোর করে থাকি, আমি দুঃখিত।

যদি কখনো আমি তোমাদের খারাপ লাগার কারন হইয়া থাকি, আমি দুঃখিত।

যদি আমি কখনো তোমাদেরকে কারো কাছে অপদস্থ করে থাকি, আমি দুঃখিত।

যদি আমি কখনো দাম্ভিকতার পরিচয় দিয়ে আমি তোমাদের থেকেও উত্তম বা বড় ভেবে থাকি, আমি ক্ষমা প্রার্থী।  

তোমরা কখনো এটা ভেবো না যে, আমি তোমাদের ভালোবাসি নাই, আমি তোমাদের সব সময় ভালোবাসিয়াছি।

যদি কখনো তোমরা ভাবো আমি তোমাদের দুঃসময়ে পাশে ছিলাম না, সেটা হয়তো আমারো ক্ষমতা ছিলো না, তারপরেও, আমি দুঃখিত।

যতো অপরাধ বা ভুল করিয়াছি, যাহার প্রতিই করিয়াছি, তোমরা আমাকে ক্ষমা করিয়া দিও।

কেনো আমি আজ তোমাদেরকে এই সব কথা বলিতেছি?

হতে পারে, আমার আর এইসব কথা বলার জন্যে আগামিকালটা আসবেই না।

হতেও তো পারে, আজকের পরে আমার জীবনে আর কোনো আগামীকালই নাই!!

এমনো তো হতে পারে, তোমাদের কাছে হাত জোর করে আমি তোমাদের কাছে আর ক্ষমা চাওয়ার দিনটাই আমি পাবো না!!

কোথায় যেনো একবার পড়িয়াছিলাম, All that Glory leads but to the grave……