০৮/১০/১৯৯১-নিউ লংকার ক্যাম্প জীবন (পর্ব-২)

উপকার করার মানসিকতা আর উপকার করার ইচ্ছা যদি কারো থাকে, কোনো না কোন একটা উপায় বের হয়েই যায়। ক্যাম্প গুলিতে যে সব সৈনিক রা থাকে, তারা অনেকটা সমাজের একেবারে বাইরের কোনো এক আলাদা সমাজের মতো। এরাই একটা আলাদা সমাজ। কিন্তু এদের পরিবার আছে, সন্তান আছে, নিজেদের বাবা মা আছে, আছে বন্ধু বান্ধব। এদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছুটি নিয়ে। একবার যদি কেউ এই পাহাড়ে ঢুকে যায়, তারা যেনো আর কারো মনের ভিতরেই থাকে না। আমার কাছে দুটু ক্যাম্পের সৈনিকরাই তাদের একতা আবদার বারবার পেশ করে যাচ্ছিলেন, ছুটি কিভাবে রেগুলার করা যায়।  সাজেক আর ওল্ডলংকারের সৈনিকদের ছুটির ব্যাপারে আমি ক্রমাগত মাথা খেলাচ্ছিলাম কিভাবে এসব সৈনিকদের ছুটিটার ব্যবস্থা করা যায়। একদিন পেট্রোল করতে গিয়া আমি উভয় ক্যাম্পের সৈনিকদের সাথে কিভাবে কি করা যায় এটা নিয়ে বিস্তারীত আলাপ করি। কারন তারা ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ককে আমার মতো কনভিন্স করতে সাহস পাচ্ছিলেন না। সাজেকের এক সৈনিক আমাকে একটা সাজেশন দিলো যে, স্যার কোনোভাবে কি ইন্টারক্যাম্প সৈনিকের পোষ্টিং করা যায় যাতে কিছু সৈনিক আপনার ক্যাম্প থেকে আপনার সৈনিক হিসাবে হেলিসর্টির মাধ্যমে ছুটিতে যেতে পারে?

মাথায় বুদ্ধিটা এলো। কিন্তু আসলেই ইন্টারক্যাম্প সৈনিক পোষ্টিং তো আমার হাতে নাই, এটা করতে পারে ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক। তারপরেও আইডিয়াটা খারাপ মনে হলো না। ব্যাটালিয়ানের অধিনায়কেরও তো সৈনিকের ছুটিছাটা নিশ্চিত করার নৈতিক দায়িত্ত আছে। হতে পারে, আমার এই আইডিয়াটা অধিনায়ক মেনে নিতে পারে। ভাবলাম, এটা ওয়্যারলেস সেটে কথা না বলাই ভালো। অধিনায়ক যখন ক্যাম্প ভিজিটে আসবে, তখন তার সাথে বিস্তারীত আলাপ করবো।

আল্লাহর কি রহমত, এরই মধ্যে খবর পেলাম, বিডিআর ক্যাম্পগুলিতে সয়ং জিওসি ভিজিট করবেন। ভাবলাম, এটাই সুযোগ। আমি কি জিওসিকে সরাসরি সৈনিকদের এই পয়েন্টটা দিবো কিনা। আবার দিলে কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটাও ভাবা দরকার। সব মিলিয়ে আমি সরাসরি জিওসিকে না বলাই উত্তম মনে করলাম। বরং আমি ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক মেজর জিয়াকে সৈনিকদের ছুটির এই সমস্যাটা তুলে ধরলাম যে, জিওসির ভিজিটের সময় যদি কোনো সৈনিক তার ছুটির সমস্যাটা তুলে ধরেন, তাতে ব্যাটালিয়ানের ইমেজ খারাপ হতে পারে এবং অধিনায়কের ব্যাপারেও জিওসির ধারনা খারাপ হতে পারে যে, এই ইউনিটে সৈনিকের এডমিন ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। মেজর জিয়া এবার ব্যাপারটা কিভাবে সমাধান করা যায়, সেটাও তিনি আমাকে ভাবতে বললেন। জিয়া স্যার চান না যে, ছুটির এই ব্যাপারটা জিওসির কানে আসুক। আমি মেজর জিয়াকে বললাম, যে, স্যার, যদি এমন হয় যে, আমার পাশের দুই ক্যাম্পের সৈনিকদেরকে পর্যায়ক্রমে আমার ক্যাম্পে ইন্টারচেঞ্জ করা যায়, তাহলে পাইলটদের বলে আমি ৩ জনের জায়গায় হয়ত ৪ জন তুলে দিতে পারবো। বিশেষ করে যখন এমআই ১৭ হেলি এখানে আসে। এমআই ১৭ হেলিতে বেশ কিছু অতিরিক্ত পেসেঞ্জার তোলা যায়। মেজর জিয়া ব্যাপারটা বুঝে রাজী হয়ে গেলেন। তার মানে দাড়ালো এটা যে, যারা যারা ছুটি যাবে ওই সাজেক এবং ওল্ডলংকার থেকে, শুধুমাত্র তারাই আমার ক্যাম্পে বদলি হবেন হেলিসর্টির আগে। বাকীটা আমরা এরেঞ্জ করে নেবো। এভাবেই আমি আমার ক্যাম্প, অল্ডলংকার এবং সাজেকের অনেক সৈনিকের বহুত আখাংকিত ছুটির একটা ফয়সালা করে ফেললাম। তাতে একটা মজার ব্যাপার ঘটে গেল যে, যদিও আমি সাজেক কিংবা ওল্ড লংকারের ক্যাম্প কমান্ডার না, কিন্তু আনঅফিশিয়ালি সৈনিকেরা ক্রমান্নয়ে যেন আমিই তাদের কমান্ডার এরুপ আচরন করে প্রচুর সমস্যা শেয়ার করতে লাগলো। দেখা গেলো, আমি যেদিন পেট্রোলে যাবো হয় সাজেক বা ওল্ডলংকারে, সেদিন যেনো ক্যাম্পগুলির সৈনিকেরা একটা আনন্দের মধ্যে থাকে যে, আমি যাচ্ছি তাই। আমিও যেনো অলিখিতভাবে ওদের ক্যাম্প কমান্ডারই ভাবতে লাগলাম। 

সৈনিক জীবনের মতো জীবন কোথাও নাই। আর এই জীবন কারো পক্ষেই কোথাও কৃত্তিম ভাবে পালন করা সম্ভব নয়। হাতে অস্ত্র আছে, সাথে আছে বুলেট, আর যার কাছে এটা সরকার বৈধ ভাবে সারাক্ষন রাখার লাইসেন্স করে দিয়েছেন, তারা সবাই প্রশিক্ষিত। অথচ ট্রিগারটা টিপার আগে সেই সৈনিক হাজারবার চিন্তা করে। সব তার হাতে কিন্তু কন্ট্রোলিং ক্ষমতা কমান্ডারের মনে। কি অদ্ভুত না!! আমি যতোক্ষন এই সৈনিক দের সাথে থাকি, বুক ভরা ভরষা আর নিরাপত্তা বোধ করি অথচ এরা আমার পরিবারের কেউ না, না কোনো আত্তীয় স্বজন। অথচ আমার পিপাসায় ওরা ব্যস্ত হয়ে উঠে, নিজের পানির বোতলের পানি নিজে পান না করে সেই পানিটা আমার জন্যে হাত বাড়ায়। আমার শরীরের গন্ধে ভরা ইউনিফর্মটা যতো তাড়াতাড়ি পারে ধুয়ে আবার সঠিক জায়গায় রেখে যায়। এর মতো মহব্বতের কম্রেড শীপ আমি কোথাও দেখি নাই। ওরা যখন ছুটি যায়, আর ছুটি থেকে ফিরে আসে, তখন যা ঘটে সেটা আনন্দের একটা ফিলিংস। ওরা এখন মনের সুখে বাড়ি যায়, জানে ওরা যতোদিন আমি আছি, ওদের আর ছুটির কোনো সমস্যা নাই। আবার যখন ফিরে আসে, তখন কেউ কেউ কিছু না কিছু যেনো নিয়ে এসে আমার হাতে দিতে পারলে মনে হয় যেনো কিছু একটা আনন্দ পেলো। ইউনিফর্মের মতো প্রেস্টিজিয়াস কিছু আর নাই। হোক সেটা বিডি আর অথবা আনসার কিংবা আর্মি। পুলিশের ব্যাপারটা আলাদা। ওদের মধ্যে এই বিশেষায়িত জীবনের লক্ষ্য সব সময় থাকে টাকার। টাকা যেখানে মূল, সেখানে মৌলিক গুনাবলী অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। পুলিশ কোনো ইউনিফর্মের ধার ধারে না। তাদের ইউনিফর্মে থাকে শুধু মানুষের অভিশাপের টাকা আর বেদনা।