১৯/১২/১৯৮৫-বিএমএ ১৩ লং কোর্ষের পাসিং আউট প্যারেড

আজ আমাদের পাসিং আউট প্যারেড হয়ে গেলো। গত কয়েকমাস যাবত নিরবিচ্ছিন্ন পাসিং আউট প্যারেডের প্র্যাকটিস করতে করতে এক রকম রোবোটের মতোই হয়ে গিয়েছিলাম। সকাল থেকে শুরু হয় প্র্যাকটিস আর সেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। জেন্টেল্ম্যান ক্যাডেট থেকে কমিশন অফিসার হয়ে যাওয়ার এই বিশাল মেকানিজমে যা দেখেছি তা এক জীবিনের অভিজ্ঞতা।

যেদিন প্রথম বিএমএ (বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমী) তে ঢোকেছিলাম, সেদিন গেটে ঢোকেই হতভাগ হয়ে গিয়েছিলাম এই কারনে যে, আমরা সবাই খুব সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় পড়ে এসেছিলাম। কেউ টাই পড়ে, কেউ কোট পড়ে, কেউ আবার বিদেশী স্টাইলের হেট পড়ে। সবার ভাবখানা এইরকম যেনো, জেনারেল সাহেব বনে গেছি ইতিমধ্যে। এই রকম একটা ভাব সবার মধ্যেই ছিল। আমি বিএমএ স্টাফ বাসে করে চিটাগাং থেকে হালিশহরের মধ্যে ঢোকি। যেই না গেটের ভিতরে ঢোকেছি, অমনি একদল স্টাফ হটাত করে অতর্কিতে খাস আজরাইলের মতো গাড়ির সামনে এসে দাড়ালেন আর হুংকার ছাড়লেন, "গেট ডাউন, নো টাইম"। ভেড়ার পালে হটাত যদি একটা আলসেশিয়ান কুকুর এমন করে দাবড়ায় যে, কোনো ভেড়াই আর অন্য কোনো ভেড়ার সাথে কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় এই শলা পরামর্শের কোনো সুযোগ থাকে না। তখন যে যেভাবে পারে দিকবিদিক জ্ঞান হারা হয়ে জান বাচানোর তাগিদে উত্তর দক্ষিন পুর্ব পশ্ছিমে যেখানেই পারুক হম্বদম্ভ হয়ে দৌড় দিতে থাকে। আমাদের অবস্থাও অনেকটা এমন। বাসে আসতে আসতে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে, চারিধারের গাছপালার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা মাথায় কতই না সপ্নে বিভোর ছিলাম। আর একাডেমির ভিতরে ঢোকতেই হুংকার-গেট ডাউন, নো টাইম????

এটা আবার কেমন কথা ভাই? আরে টাইম তো কিছু লাগবেই নাকি? এটা আবার কেমন কথা, "নো টাম গেট ডাউন"! সরু বাসের গেট, সবাই কি আর একসাথে নামতে পারবে? তারপরেও ওই যে বললাম, ভেড়ার পালের মতো অবস্থা আমাদের। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে বাসের গেটের মধ্যেই অনেকে আমরা আটকা পড়ে গেছি। কেউ পিছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে, কেউ আবার হুহু শব্দ করে ফাকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। ওদিকে ষ্টাফরা তো পারে না আমাদেরকে তাদের গলার শব্দ দিয়েই চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। “এখনো নামেন নাই আপ্নারা”? তারপর বাশি আর বাশি। একেবারে ইসরায়েল-প্যালেষ্টাইন যুদ্ধ। সবাই একসাথে বের হতে গিয়ে বাসের গেটে ঢাকা শহরের জ্যামের মতো অবস্থা। তারমধ্যে কারো কারো হাতে আবার ছোট ছোট ব্যাগ। কিসের কি। স্টাফরা এমন করে আমাদের সাথে আচরন করতে লাগলেন যেনো আমরা সবাই প্যালেষ্টাইনি কিছু হিজবুল্লাহ দাগী আসামী, আর তারা মোসাদের বংশধর।

কে শুনে কার কথা। শুরু হয়ে গেলো আজরাইলের মতো ব্যবহার। কেউ ধাক্কা দিচ্ছে, কেউ আবার টানাটানি করছে। কেউ আবার সুটকেস নামানোর জন্য একটু অপেক্ষা করছিলো, তাদেরকে ওই সুটকেস সহই কুলিমুজুরের মতো বসিয়ে দিয়ে সুটকেস সহকারে দৌড়াতে আদেশ দেওয়া হল। বসে বসে দৌড়ানো আমি এই প্রথম শুনলাম। প্রতিবাদ করবেন? কোনো উপায় নাই। এখানে কেউ কারো কথা শুনেও না, বুঝেও না। আপনি যদি না বুঝেন, সেটা আপনার সমস্যা এবং এর সমাধান- একটাই- কন্টিনিউয়াস রগড়া।

কোনো রকমে আমরা সবাই বাস থেকে নেমে কেউ সুটকেস মাথায়, কেউ সুটকেস সমেত ব্যাগ কাধে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে একটা খোলা মাঠে জড়ো হলাম। এখানেই জড়ো হতে হবে কিনা জানি না, কিন্তু একে একে সবাই ওখানেই জড়ো হতে থাকলো। এতোক্ষন যে সাহেবী কায়দায় এসেছিলাম, কোট, টাই, পলিশ করা জুতা, নতুন শার্ট, সেটা আর এখন কিছুই অবশিষ্ঠ নাই। শীতের বিকেলেও আমরা ঘেমে একাকার, কারো টাই উলটা হয়ে বুকের উপরে নড়ছে, কারো শার্টই যেনো সুটকেস আর ব্যাগের ঘষায় বং পালটে কি যে রঙ হয়েছে না দেখলে বুঝা যাবে না। মাথার নায়ক নায়ক চুলগুলি আর পরিপাটি নাই, জুতার ফিতাও কখন খুলে লেলেবেলে করছে সেদিকে কারো নজরও নাই। যাক, হাপাতে হাপাতে জড়ো হলাম। অনেককেই তো চিনি না। এখনো কারো সাথেই পরিচয়ও হয় নাই। কিন্তু আমরা যে সবাই এক খোয়াড়ের ভেড়া সেটা বুঝতে পেরেছি। এই অবস্থায় ভাবলাম, মনে হয় এই যাত্রায় বেচে গেলাম।

কিন্তু না, বায়বীয় তারবার্তার মতো পরবর্তী আদেশ চলে এলো, চিকন সিপসিপে লম্বা এক ফৌজি নায়েক (পরে বুঝেছিলাম তিনি আমাদের ড্রিল ষ্টাফ) গলা ফাটিয়ে হুংকার দিয়ে বললেন -“এই যে সাহেবের দল, ঐ যে দেখছেন ড্রেন, নেমে পড়ুন”।

ওরে ভাই, একি কয়? ড্রেনের সাইজ দেখেই তো চক্ষু চরকগাছ। নৌকা চালানো যাবে এমন পাশ, আর লম্বার তো কোনো শেষ দেখি না। সারা শহরের না হোক, অন্তত বিএমএ এর যাবতীয় সব সুসাধু খাবারের বর্জের গোডাউন এটা। এই ড্রেনে নামতে বললেন কেনো? আর এমন সাহেবী পোষাক পড়ে কি কেউ কখনো ড্রেনে নামে? কেউ যদি শত্রুতা করে কাউকে ধাক্কা দিয়ে না ফেলে দেয়, কেউ কি ইচ্ছে করে এমন পায়খান আর ময়লার ড্রেনে কেউ নামে? কিন্তু কাকে জিজ্ঞেস করবেন আপনার মনের প্রশ্ন? দ্বিধা দন্দে থাকতে থাকতেই দেখি, আরো ১২/১৩ জন নায়েক-হাবিলদার এসে ড্রোন হামলার মতো ঝাপিয়ে পড়লেন। “এখনো নামেন নাই সাহেবেরা? বলেই চারিদিক থেকে যেনো মিজাইল শব্দ মারতে থাকলেন। কিসের শার্ট, কিসের জুতা, আর কিসের ব্যাগ-সুটকেস। দেখলাম নিমিষের মধ্যে ১০৮ জন সবেমাত্র প্রবেশ করা জেন্টেলম্যান ইয়াং ছেলেরা বুক পরিমান আবর্জনায় ভরা প্রশস্থ ড্রেনে যেনো জল্কেলীর মতো আবর্জনা-কেলী করছে। আর ড্রেনের উপরে দাঁড়িয়ে ওই সাহেবরা ৩৬ দাত বের করে ফুস্ফুস করছেন।

১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো আমরা সবাই বিশাল বিশাল ড্রেনের ভিতর সাতার কাটতে থাকলাম। ব্যাপারটা যেনো এই রকম, সবাই মাছ ধরছি, তাও আবার মনের আনন্দে। পায়খানা, পচা ময়লা, পলিথিন, আর কি যে আছে, তাও জানি না। এর মধ্যেই মাথা ভিজিয়ে ডুব দিয়ে কি যে রত্ন খোজা, কে জানে। উপরে দাঁড়ানো আজরাইলগুলি আবার মাঝে মাঝে এই রকম রংগ করছেন যে, “কি সাহেব, কিছু পেলেন? এখনো পান নাই? খুজতে থাকেন”

এই যে একটু আগে টাইটুই পড়ে বাবু হয়ে সেজেগুজে এসেছিলাম, এখন কাউকে দেখলে বুঝার কোনো উপায় নাই, কোনটা টাই আর কোনটা আমার মুখ। সারা বছর এই নোংরা পানি আর মলমুত্রের আড্ডাখানা ড্রেনটা আমাদের নদীর সাতারের একটা বদ্ধ খালের মতো মনে হলো। দূর্গন্ধ আর নোংরা পানিতে একাকার। ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মহামান্য রথীগন। কেউ টু শব্দ করলেই নতুন আইটেম। যা আরো ভয়াবহ। চল্লো এইভাবে প্রায় ৩০/৪০ মিনিট। তারপর পরের আইটেম।

একটু আগে সল্প পরিচয়ের কোর্ষমেটরা মাত্র পরিচিত হয়েছিলাম, সবার নামও ঠিক মতো আয়ত্তে আসে নাই। আর এখন সারা শরীরে ড্রেনের ময়লা, মাথায় জট পাকানো পচা সব আবর্জনায়, জামা কাপড়ের যে কোনটা কি কালারের তাও সঠিক না বুঝার কারনে এখন আর সেই সল্প পরিচয়ের কাউকেই পরিচিত মনে হচ্ছিলো না। সবার চেহারা যেনো এক। মাথায় হরেক রকমের আবর্জনায় ভর্তি, কারো কারো মুছের মধ্যেও কি সব আবর্জনা লেগে আছে। ভুতের চেহারাও অনেক সুন্দর। আর আমাদের চেহাড়া যা হয়েছে তাতে শার্ট লেগে আছে চামরায়, সাথে গু-মুত, পায়খানা, পলিথিন কিংবা আরো বর্জ্য যা থাকার কোনোটাই বাদ নাই। একেবারে বন্য টাইপের।

এভাবে ৩০/৪০ মিনিট পর ড্রেনের ময়লা কাদাওয়ালা দূর্গন্ধময় আঠালো পানিতে সাতারের পর, দয়া পরবশ হয়ে মহারথী স্টাফগন আমাদেরকে গলা অবধি ডুবে থাকা ড্রেন থেকে উঠে আসার আদেশ করলেন। আমরা হাসের বাচ্চার মতো সবাই কোনো টু শব্দ না করেই একে একে উঠে এলাম। এখানেও তাড়াহুড়া। কেনো আমি ওর আগে উঠতে পারলাম না, বা কেনো এতো দেরী হলো ঊঠতে ইত্যাদির কারনে আরেক আইটেমে অনেকেই পড়ে গেলাম। যেমন, ওই দূরের গাছটাকে দৌড়ে গিয়ে একবার টাচ করে আসতে হবে। কাউকে আবার ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো এক ইউকেলিপটাস গাছের কাছে গিয়ে প্রনাম করার ভংগীতে সালাম দিতে হবে, কেউ আবার নায়িকা ববিতাকে খালা বলে বলে বাচাও বাচাও বলে উচ্চসরে গান গাইতে হবে, উফ কি এক মহাজজ্ঞ।

এইভাবে প্রায় সারাটা বিকাল থেকে শুরু করে রাত ১টা পর্যন্ত চল্লো আমাদেরকে সিভিলিয়ান থেকে ফৌজের ধারায় মোটিভেট পরিবর্তন করার কৌশল। কোনো খাওয়া দাওয়া নাই, কোনো রেস্ট নাই, কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত টর্চারে বমিও করে দিচ্ছে। মহারথী স্টাফগন এর মাঝে আবার কৌতুক করে বলছেন, কেউ কি ক্ষুধার্থ? যে বলেছে, সে ক্ষুধার্থ, তাকেই ওই বমির কাছে নিয়ে গিয়ে বলছেন, খেতে পারেন। উফ, কি অমানুষ। কিন্তু কিছুই করার নাই। হয় ক্ষুধা নিবারন করবেন, না হয় ক্ষুধা আছে এটা বলা যাবে না। বুঝলাম, এটা একটা অন্য জগত। এই ডেমোক্রেটিক দেশে এই রকম একটা গারদ আছে জানাই ছিলো না। অথচ এর পাশ দিয়ে এতো সুন্দর একটা হাইওয়ে আছে, বাসে বা গাড়িতে যেতে যেতে মনে হয় যেনো সর্গরাজ্য।

সারা শরীর প্রায় অবশের মতো। মাথা ঝিমঝিম করছে, পেটে ক্ষুধার যন্ত্রনায় পেট পাকাচ্ছে, এতোক্ষন দূর্গন্ধ পাচ্ছিলাম, এখন আর সেই দূর্গন্ধটা নাই বলে মনে হচ্ছে। নাক এর মধ্যে দূর্গন্ধ সহ্য করে ফেলেছে। শার্টের মধ্যে হেভী ডেন্সিটির ময়লা প্রায় শুকিয়ে চটলা বেধে গেছে। প্রিয় শার্টাটার প্রতি এখন আর মায়া লাগছে না। জুতা জোড়া কখন যে কোন জায়গায় পড়ে গেছে খালি পা দেখেই বুঝলাম, আমি জুতাহীন। পেন্টের পকেটে সাদা একটা রুমাল ছিলো, খুলে দেখি সেটা এখন কালো রঙ ধারন করে তেনার মতো হয়ে গেছে। যাই হোক, রাত ৮টার পরে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো নাপিতের দোকানে।

বিএমএ এর নাপিতও অনেক সেয়ানা। মাথাটা ধরলেন, বাটির মতো করে ঘ্যাচাং করে চারিপাশ এমন করে কাটলেন, যা আমি আজো এই রকম বাটিছাট দেখি নাই। না আছে এর কোনো স্টাইল, না আছে কোনো ক্যারিশমা, না আছে কোনো মহব্বত। কোনো কথা বলবেন নাপিতের সাথে? ওরে বাবা, সেও আরেক দফা সামরীক জেনারেল। তবে চুল কাটার সময় মনে হইলো, আহা, কি শান্তি। অন্তত কিছুক্ষন সময় তো আজরাইলদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া গেলো। আরামে চোখ বুজে আসে কিন্তু নাপিতের ঝাকুনিতে তন্দ্রা ভেংগে যায়। “স্যার-ঘুমান ক্যা” বারবারশপ কি খাট নাকি ঘুমুচ্ছেন?

নাপিতের দোকান থেকে যখন আমরা বেরিয়ে আসি, রাত তখন প্রায় ১টা। আমাদেরকে গরু ছাগলের মতো রাখালের পাহাড়ায় নিয়ে যাওয়া হলো ডাইনিং হলে। বিশাল সুন্দর আর বড় একটা ডাইনিং হল। এসি করা। প্রচন্ড ক্ষুধার কারনে মনে হচ্ছে গোগ্রাসে খাই। টেবিলে খাবার সাজানো। দেখেই মনটা ভরে গেলো। সবাই দারিয়ে আছি খাবারের আদেশ হওয়া মাত্রই মনে হচ্ছে, এক মিনিটে খেয়ে ফেলবো। হাত ধোয়া নাই, পা ধোয়া নাই, টিপ টিপ করে গা থেকে, শার্ট থেকে, প্যান্ট থেকে ড্রেনের পানি পড়ছে। খাওয়ার আদেশ হলেই খেতে পারবো। কিন্তু ঐ যে, আবার নিয়মের বালাই।

বসে খাওয়ার জন্য চেয়ার টানতে একটু শব্দ হলো। আর যায় কোথায়। চেয়ার টানতে শব্দ হয় আবার? চেয়ার টানতে শব্দ হলো কেনো এর কারনে মহারথীদের এমন এক হুংকার, মনে হলো এই রাজ্যে সাউন্ড প্রুফ কোনো ডিভাইস রাখা হয়েছে, এদের হুংকার ঘরের ভিতর থেকে কখনো বাইরে যায় না। সবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। বাইরে আনা হলো। আরেক আইটেম। এমনিতেই শরীর আর চলছে না। দাড়াতেও পারছি না ক্ষুধায়।

আদেশ আবর্তিত হলো-ডাইনিং হলের বাইরের চত্তরে বিল্ডিং এর চারিপাশে এলোপাথারী দৌর, অতঃপর যারা আগে আসবে, তাও আবার মাত্র ৫ জন, তাদেরকেই পুনরায় ডাইনিং হলে ঢোকানো হবে। শুরু হয়ে গেলো এবার প্রতিযোগিতা। হায় রে বাপ-কে কার আগে আসবে, ল্যাং মারাই হোক আর ধাক্কা মারাই হোক, আগে যেতে হবে। মানুষ বড় সার্থপর। যে যেভাবে পারে আগে আসতেই হবে। এই দোউড়ের কোনো আইন নাই, নিয়ম নাই, ধাক্কা, ল্যাং যেভাবে পারো, আগে আসো। এভাবে করতে করতে এর মধ্যে আমার মূটামুটি ৬ চক্কর দেয়া হয়ে গেলো। কোনো রকমে মহারথীদের দয়ায় এবার অন্য বাকী সবাইকে নেয়া হলো ডাইনিং হলে।

এই সম্রাজ্যে হাত দিয়ে খাওয়ার কোনো গল্প নাই। চামচ দিয়ে খেতে হবে, সেটা আমার অভ্যাস আছে। কিন্তু সবার তো আর সেটা নাই। ক্যাডেট কলেজে পড়ার কারনে সারা বছর চামচ দিয়েই খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। কিন্তু বিগড়ে গেলো কিছু বেসামরিক বন্ধুদের কারনে। কাচের বাটি আর চামচ, কিছু তো শব্দ হবেই। কিন্তু এই জগতে খাওয়া যাবে কিন্তু কাচের বাটির সাথে চামচের কোনো শব্দ হবে না। যেই না কিছু সিভিলিয়ান বন্ধুদের বাটি-চামচের শব্দের কারনে অর্ধেক খাওয়া না সেরেই আবার ডাইনিং এর বাইরে। আবারো সেই দোউড়ের পালা। তবে এবার আর বিল্ডিং এর চারিদিকে নয়। আদেশ হলো-ঐ যে দূরে “চীর উন্নত মমশীর” দেখতে পাচ্ছেন, সেখানে উঠে পড়ুন।

প্রচুর শীত, কনকনে শীত। গায়ের সব জামাকাপড় ভিজা। উঠছি তো উঠছিই। হায়রে পাহাড়। দূর থেকে পাহাড়ের রুপ যাইই হোক, যখন পাহাড়ে উঠবেন, দেখবেন, পাহাড় কত নিষ্ঠুর। সে এক ইঞ্চি জায়গাও সহজ করে দেয় না। ঝোপঝার, পোকা মাকর, জোক আরো কত যে কি!! সবাই আপনাকে উপেক্ষা করে কেউ কামড়ে দিচ্ছে, কেউ খোচা মারছে। যাই হোক, উঠলাম। পাহাড়ের উপর ঈশ্বর যেনো বাতাশের খনি রেখেছেন। হায় রে বাতাশ। তারমধ্যে ভিজা শরীর।

এবার নামবো কিনা তার আদেশের অপেক্ষায়। মহারথীরা আদেশ দিলেন-গান গেতে হবে পাহাড়ে বসে। আর সেই গানের কলি বড্ড মিষ্টি। “ববিতা খালা কোথায় গো, ববিতা খালা বাচাও গো”। আপনারাই বলেন, কোনকালে ববিতা মানে নায়িকা ববিতা আমার খালা ছিলো? যাই হোক, বেসুরা গলায় গাইতে গাইতে পাহাড় থেকে নেমে গেলাম। কেউ আছাড় খাচ্ছে, কেউ চিতপটাং। কিন্তু মুখে ববিতা খালার নাম। ববিতা খালা নিজেও জানেন না যে, আগামি দিনের সেনাপ্রধান যারা হবেন, কিংবা কেউ কেউ রাষ্ট্র নায়ক হবেন, তারা আজ এই নিশিথ রাতে ববিতা খালার নাম করে পাহাড় থেকে নামছেন। এইভাবে রাত শেষ হয়ে কখন যে ভোর হয়ে যায় টুকরো টুকরো শাস্তির বিনিময়ে বুঝতেই পারি নাই।

১ম টার্মকে বলা হতো শিটপট, মানে পায়খানার সমান এরা। ২য় টার্মকে বলা হয় বদনা। অন্তত কিছুটা সলিড বস্তূ, ৪র্থ টার্ম মানে মহারাজা। সর্বত্র তার রাজত্ব। শিটপটেরা কোনো সিনিয়রকেই আজ পর্জন্ত চোখে দেখে নাই। সিনিয়র দেখলেই চোখ বন্ধ। ভাবখানা এই রকম যে, না জানি কোনো এক মহারাজারা যাচ্ছেন পাশ দিয়ে। বিএমএর ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না। প্রতিদিন নতুন ইতিহাস, প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা।

এইভাবে ২ বছর পার করে আজ সেই কাঙ্ক্ষিত পাসিং আউট। কি যে অনুভুতি ভাষায় বুঝানো যাবে না। যে স্টাফগন একদিন আমাদেরকে কারনে অকারনে ট্রেনিং করানোর জন্যে অনেক বাজে ব্যবহারও করেছেন, আজ সেইসব স্টাফগনই রেংক পড়ার পর সামনে এসে স্যালুট দিয়ে বললেন, স্যার, কত ভুল করেছি, কিছুই মনে রাইখেন না। জড়িয়ে ধরলাম।

কাল চলে যাবো বিএমএ থেকে। এতো ছাড়তে চেয়েছিলাম এই স্থানটি, এর উপর কত রাগ, কত গোস্যা, আজ যখন আমাকে এই জায়গাটি ছাড়তেই হবে, তখন মনে হচ্ছে, এটা তো আমার জায়গা। ছেড়ে যেতে কিছুতেই মন চাইছে না। এই রাস্তা, এই পাহাড়, এই ডরমেটরী, এই পিটি গ্রাউন্ড, এই সব গাছপালা সব কিছু আমার চেনা। এখানে প্রতিটি জায়গায় আমার পায়ের চিহ্ন আছে, প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আমার ঘামের গন্ধ আছে। যে জায়গাটাকে প্রতিদিন ঘৃণা করতাম, যেখান থেকে পালানোর জন্য প্রতিদিন চেষ্টা করতাম, যে জায়গাটাকে আমি কখনো নিজের মনে করি নাই, আজ হটাত করে এসে দেখলাম, এই জায়গাটা আমার জীবিনের সাথে এমন করে জড়িয়ে গেছে যে, একটু বিচ্ছেদের টান পড়লেই কোথায় যেনো প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভব করি।  তবু আজ আমাকে যেতেই হবে। যেতে হবে নতুনকে স্থান দেওয়ার জন্য।

১০ দিনের ছুটি। এসেছিলাম সিভিলিয়ান হিসাবে, আজ বের হচ্ছি সামরীক মানুষ হিসাবে। ভবিষ্যৎ কি, কেমন, কোথায় আমার কিছুই জানা নাই।