আমার মা

মিসেস হামিদা খাতুন, স্বামীর নাম-মোঃ হোসেন আলি মাদবর, ঠিকানা-নতুন বাক্তার চর, থানা-দক্ষিন কেরানীগঞ্জ, ঢাকা। তিনি আমার মা। আমার মায়ের বংশ ধারাটা এই রকমের। জনাব আহাদুল এর ছেলে হাজি আসাদ উল্লাহর তিন পুত্র (১) জনাব উম্মেদ আলী মুন্সি (২) হাছান আলী মুন্সী (৩) ছলিম উদ্দিন মুন্সী। জনাব উম্মেদ আলীর ছিলো চার ছেলে সন্তান। তারা ছিলেন (১) কুদরত আলী (২) লস্কর আলী (৩) চেরাগ আলী (৪) কেরামত আলী। এই কেরামত আলী ছিলেন আমার নানা অর্থাৎ আমার মায়ের পিতা। উক্ত নানা কেরামত আলীর কোনো পুত্র সন্তান ছিলো না। তার মাত্র দুইজন কন্যা (১) আমার মা (২) আমার খালা সামিদা খাতুন।

মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এক ছেলের মা হয়ে বিধবা হন। খুব বড় লোকের মেয়ে নন বটে কিন্তু মাঝারী পরিবারের বনেদি ঘরের মহিলা। যেই সময়ের কথা বলছি, তখন ১৫ বছর অতিক্রম করলেই গ্রামের মধ্যে আইবুড়ি হয়ে আছে মেয়ে এই রকম একটা অপবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে যদি আবার নিয়তির কারনে কেউ এতো অল্প বয়সেই বিধবা হন, তার তো জীবনটাই যেনো কি রকম দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা জানে শুধু যে সাফার করে সে আর জানে সেই পরিবার যেই পরিবারে এটা ঘটছে। অতঃপর দ্বিতীয় বিয়ে হয় আমার বাবার সাথে। বিস্তর বয়সের তফাত ছিলো আমার বাবার সাথে আমার মায়ের। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় কি দুই তখন আমার বাবা মারা যান। আমি আমার বাবাকে দেখি নাই, এমন কি আমাদের কারো কাছেই আমার বাবার কোনো ছবিও নাই। আমার মা যখন আমার বাবাকে বিয়ে করেন, তখন তার প্রথম পক্ষের ছেলে বিল্লাল হোসেন কে আমাদের ই গ্রামের পাশের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পালক দিয়ে দেন। আমার মা আমার বাবার এমন একটা সংসারে পদার্পণ করেন যেখানে আমার বাবার আগের পক্ষেরই সন্তান ছিলো গোটা আট জন। তাদের সবার বয়স আমার মায়ের থেকে অধিক। এই সন্তানেরা আমার মাকে কোনদিনই আপন করে ভাবতে পারেন নাই। আমার বাবা ছিলেন মাদবর যিনি সারাক্ষনই গ্রামের মাদবরি আর তার জমিজমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এমনই এক সংসারে মা একটানা সংসার করেছেন। আমাদের এই ঘরে পরপর তিন ছেলে আর পাচ কন্যার জন্ম দেন আমার মা। সবার বড় আমার বোন, যার নাম সাফিয়া, তার ছোট শায়েস্তা, এর পরই জন্ম নেয় আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ, তারপর জন্ম নেয় আমার পর পর তিন বোন যথাক্রমে লায়লা, ফাতেমা আর মেহেরুন্নেসা। এতোগুলি মেয়ের পর আমার মার কোল জুড়ে আসে আরেক পুত্র সন্তান কিন্তু সে এই পৃথিবীতে বেশীদিন টিকে থাকতে পারে নাই। তারপরের মানুষটিই হচ্ছি আমি। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় বা দুই, তারপরে আমার বাবা জান্নাতবাসী হন। ফলে আমিই হলাম আমার পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। আমার মা আর বিয়ের সপ্ন দেখেননি। আমাদেরকে নিয়েই তিনি তার সমস্ত ধ্যান ধারনা আর সপ্ন লালিত করেছেন। আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। আমার মায়ের পরিবারের কাউকেই আমার মনে নাই। বরং বলতে পারেন, আমি কাউকেই দেখি নাই। আমার জন্মের আগেই সব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি না দেখেছি আমার দাদি, দাদা, নানা, বা নানি, কিংবা কোনো মামা, মামিকে। কি আজব, না? আসলেই আজব। এমনটা কি কখনো হয়? কিন্তু হয়েছে। আমাদের আদিবাড়ি আছে মুন্সীগঞ্জ জেলার কয়রাখোলায় যা বর্তমানে সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্গত। আমাদের ঐ বাড়িটি আসলে ছিলো আমার নানার প্রাপ্য জমিটাতে। কিভাবে আমার বাবা আমার নানার জমিতে এতো বড় বাড়ি করলো এবং কেনো উনি তার এতো সম্পদ থাকতেও নিজের সম্পত্তিতে কোনো বাড়ি করেন নাই সেটা আমার আজো জানা হয় নাই। পরবর্তীতে আমরা মাইগ্রেট করে কয়রাখোলা থেকে কেরানীগঞ্জ চলে আসি। ফলে আমাদের এখন দুটু গ্রামের বাড়ি- এক) কয়রাখোলা, ২) কেরানীগঞ্জ।