মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তার মধ্যে একটা হচ্ছে-তার জীবন নিরাপদ, নিশ্চিত এবং মৌলিক চাহিদা পুরন করা। এই কটা জিনিষ যেভাবেই আসুক, যেখান থেকেই আসুক, যখন নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন তার জীবন হয়ে উঠে চাকচিক্যময় এবং সুখি পরিবেশের মতো। তখন জীবনকে বড্ড ভালো লাগে, আকাশ ভালো লাগে, গাছপালা ভালো লাগে, আশেপাশের সব কিছুই ভালো লাগে। অল্পতেই পেট ভরে যায়, ছোট জিনিষেও হাসিতে জীবন পরিপুর্ন হয়ে উঠে, সব কিছু সুন্দর মনে হয়। কিন্তু যদি সেই সক্ষমতাকে মানুষ ধরে রাখতে না পারে, ভুল পরিকল্পনায় সব হাতছাড়া হয়ে যায় এবং হটাত যদি তার সামনে এটা দৃশ্যমান হয় যে, তার সেই নিরাপদ জীবন, নিশ্চিত জীবন কিংবা মৌলিক চাহিদার যোগানগুলি প্রায় অনিশ্চিত, তখন সেই মানুষটার থেকে অসহায় আর কেউ থাকে না। সারাক্ষন তার শরীর খারাপ হতে থাকে, তার প্রেসার বাড়তে থাকে, খাওয়া দাওয়ায় এতোটাই অনীহা আসে যে, ঘুম পর্যন্ত হয় না, কারো সাথে মিশতে ইচ্ছে করে না, কারো সান্নিধ্যই আর ভাল লাগে না। বারবার মনে হয়-কি যেন আর আগের মত নাই, কোথায় যেন কি ভুল হয়ে গেছে, অথবা মনে হয় বারবার যে, এখন কি হবে তার? কিংবা কি করলে আবার সেই আগের নিশ্চিত জীবনটা ফিরে পাবে? এসব চিন্তাধারায় একসময় সে চোখের সামনে অন্ধকার দেখতে থাকে, জিবনকে অসহ্য মনে হয়, ঈশ্বরকেও আর ডাকতে ইচ্ছে করে না। আর যদি ঈশ্বরের কাছে মাথা নতও করা হয়, তখন মনে হয়-ঈশ্বরই যেনো অপরাধী। তাকেই তখন বলতে ইচ্ছে করে-কেনো তুমি আমাকে এমন করে শাস্তি দিলে? তুমি কি পারতে না আমাকে আরো একটু সহজ করে দিতে সব? চোখে জল আসে, চোখ বন্ধ হয়ে আসে, কোথায় যেনো বুকের মধ্যে ব্যথা করে। উচ্চসরে কাদতে ইচ্ছে করে। তখন মনে হয় সব কিছু দ্রুত কেনো জানি নিজের কাছ থেকে সব অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। নিজের শরীর চলতে চায় না, গান ভালো লাগে না, বন্ধুবান্ধব ভালো লাগে না, একা থাকতে ভালো লাগলেও সেটাও এক সময় খুব অসহায় মনে হয়। নিজের খাটটায় শুয়ে বসেও যেনো আরাম পাওয়া যায় না। জানালার পাশে গিয়ে তখন বসি। দূরে গাড়ির ডাক শোনা যায়, কত মানুষ রাস্তায় হাটাচলা করে, সবাই ব্যস্ত। কেউ নাড়ির টানে, কেউ বাড়ির টানে, কেউ সংসারের টানে ঘরে ফিরছে। শুধু আমিই যেনো নির্জীব পাথরের মতো দূরের আকাশটাকে দেখি। আকাশটাকেও আর আগের মতো এতো রসীক মনে হয় না, রাস্তার ধারে গাছগুলিতে পাখীরা দূর দূরান্ত থেকে উড়ে উড়ে আসে, কিছুক্ষন বসে থাকে, অতপর আবার জানি কোথায় হারিয়ে যায়। যেমন হারিয়ে যায় সেই অসহায় মানুষের মনও। তখন কাছের আকাশে কি উড়ছে, দূরের আকাশে কি রঙ ধরেছে, আশেপাশের মানুষের কেনো এতো কোলাহল কিংবা কে কাকে কেনো ডাকছে কিছুই তার কানে প্রবেশ করেনা। মানুষ হয়ে জন্ম নেয়া যেমন ভারী আনন্দের, সৌভাগ্যের, তেমনি মানুষ হয়ে অসহায় জীবন যেনো একটা অভিশাপও বটে। অন্য কোনো প্রানীরা তাদের জীবনের জন্য হয়তো এতো কিছু ভাবেনা। কারন তাদের সমাজ নাই, সংসার নাই, তাদের ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের জন্য কোনো তাড়া নাই। তাদের জন্য বাড়িঘর লাগে না, ব্যাংক ব্যালেন্স লাগে না। সন্তান সন্ততির জন্যেও ওরা ভাবে না। শুধু মানুষ এর ব্যতিক্রম। এই পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই হচ্ছে মানুষের শত্রু। কিন্তু মানুষের মানুষবন্ধু ছাড়াও মানুষের সাথে সব প্রানিরাই বন্ধুত্ব করে। অথচ মানুষ যখন অসহায় হয়ে যায়, তখন তার বন্ধুরাও তাকে ছেড়ে অনেক দূর চলে যায়। তখন অতীতের সুন্দর সাবলম্বী জীবনের কথা ভেবে বারবার এটাই মনে হয়, শুধু বারবার এটাই মনে হয়, কেনো বোকামি গুলি করতে গেলাম? কেনো আমার নিজের ভালো একটা সম্ভাবনাময় জীবন এমনভাবে নষ্ট করলাম? তখন নিজের উপর খুব রাগ হয়, রাগ হয় সেই তাদের উপর যাদের উপর অতি বিশ্বাস করে আমার সর্বনাশার ঘুর্নিঝড় শুরু হয়ে সাজনো সেই জীবন, সংসার তছনছ হয়েছে। রাগ হয় সেই সব ঘটনার জন্য যার কারনে আমার ভুলগুলি হতে হতে একটা মহা তান্ডবের সৃষ্টি হয়ে আমাকে একেবারে সর্বহারা করে দিলো।
মানুষের সবচেয়ে ভালো গুন যেমন সঠিক সময়ে বন্ধু চেনা, আবার সবচেয়ে বিপদ হলো সঠিক সময়ে বন্ধু না চেনা। যখন সঠিক সময়ে বন্ধু কিনা এটা না জেনেই বন্ধুত্ব হয় তখন চির শত্রু কিংবা সার্থপর মানুষেরা মানুষের বন্ধু হয়ে সব ছিনিয়ে নেয় আর সর্বশান্ত করে। আজকের দুনিয়ায় মানুষের অন্তরের খবত কেউ আগ থেকে কখনো বুঝতে পারেনা। মানুষ আজকের দুনিয়ায় এমন আচরন করে বেড়ায় যে, মনে হয় তার থেকে বিশ্বস্ত বন্ধু আমার কেউ নাই, এমনভাবে কাছে আসে যে, মনে হবে সে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমার জন্য হয়তো সে তার জীবনটাকেও বিসর্জন দিতে পারে। অথচ বাস্তব রুপটা সে কখনোই প্রকাশ করে না। এরা হায়েনার থেকেও ভয়ংকর। আরো একটা কঠিন জিনিশ হল-এই সব খারাপ বন্ধু গুলি বারবার কোনো না কোনো বেশ ধরে বারবার ফিরে আসতে চায়। বারবার তারা বিভিন্ন কায়দায় লুট করতে চায়। অথচ এরা কখনোই আমাদের বন্ধু না। মানুষ এখানেই জুয়া খেলার মতো বারবার হেরে যায়। কোনোবারই মানুষ এই হার থেকে শিক্ষা নেয় না। আর বারবার হারে। এক সময় হারতে হারতে মানুষ জীবনের উপর এতোটাই বিরক্ত হয়ে উঠে যে, তখন জীবনতাকেই আর ভালো লাগে না। অথচ পৃথিবী কর সুন্দর, এখানে বেচে থাকা আনন্দের, আকাশ দেখতে ভালো লাগে, পাহাড়ে চড়তে ভালো লাগে, কখনো কখনো চোখের জলে কাদতেও ভালো লাগে।
যখন এ জীবনটাকে আর ভালো লাগতে চায় না, মনে হয় অসহায়, যখন মনে হয় কি হবে আর বেচে থেকে? তখন মানুষ ভুলে যায় যে, সে আর কখনোই এই সুন্দর পৃথিবীতে ২য় বার আসার কোনো সুযোগ নাই। সে ইচ্ছে করলেই ব্রিষ্টিতে ভিজতে পারবে না, ইচ্ছে করলেই আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নীল শাড়িতা বা সবুক সেলোয়ারটা দেখার সুযোগ নাই। বাইরের কোলাহল শুনতে পাবে না, বাচ্চাদের কিচিরমিচির, পাখীদের উরে যাওয়া, সন্ধ্যার লাল সুর্যতা আর দেখতে পাবে না। তার যাত্রা তখন এমূকখী। ফিরে আসার কোনো পথ খোলা নাই। ফিরে আসতে চাইলেও আর আসার কোনো যানবাহন নাই, পথ নাই, কেউ টেনেও আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। অন্ধকার মাটির নীচে কার সাথে বসবাস, কার সাথে কি কথা হবে কেউ কখনো ওখান থেকে ফিরে এসে কাউকেই বলে যায় নাই। আমরাও কেউ জানি না। তাই আমি সেই অন্ধকার জীবনটাকে ভীষন ভয় পাই।
তাই আমি একাই বাচতে চাই, আমার কোনো সমাজ দরকার নাই, আমার কোনো সন্তান দরকার নাই, আমার কোন বন্ধু দরকার নাই। আমি শুধু এই পৃথিবীর রুপ আর সউন্দর্য নিয়ে মন ভরে বাচতে চাই। বাচতে চাই হাসিতে, বাচতে চাই মনের উল্লাশে। কারন আমি না চাইলেও একদিন আমাকে তো চলেই যেতে হবে। তাহলে নিজে থেকে আগেই চলে যেতে চাইবো কেনো? আমি আবার বাচতে চাই ঠিক সেভাবে যেভাবে আমি বাচতে চেয়েছিলাম। কাউকেই আমার কোনো দরকার নাই। এ জীবন অনেক সুন্দর আর মিষ্টি।
তাই, এবারের যুদ্ধটা আমার সাথে আমার। এবারের যুদ্ধটা আমি করতে চাই শুধু আমার জন্য, আর কারো জন্যই না। কেউ আমার না, আমিও কারো না। কারো উপর ভরসা করে আমি আর ব্যস্ত পথ পার হতে চাই না। আমি আমার জীবনটাকে আবার সেই চূরায় নিয়ে যেতে চাই, যেখান থেকে আকাশ দেখা যায়, রংগীন সব কিছু দেখা যায়। আমি সবার থেকে দামি জীবন নিয়ে বেচে থাকতে চাই। নো সমাজ, নো কিছু। শুধু আমি। আর এটাই আমার যুদ্ধ।
এই বিষাদ জানালা আমার জন্য নয়, এই অসহায় লাইফ আমার জন্য নয়। আমি এই রকম নই। আমি হাসতে জানি, আমি অট্টহাসিয়ে ঘরময় উচ্ছাসে পরিনত করতে পারি। মানুষ আমাকে দেখলে মাথা নত করে, আমি সেটাই। আমি আবারো বুক টান করে, সিনা উচু করে আগের জীবনতায় ফিরে যাবো। সেটাই আমার প্রতিজ্ঞা।
তুমি কি আমার এই যুদ্ধে পাশে থাকবে নীল? হ্যা, আমি জানি, কেউ থাকুক বা না থাকুক, নীল নামক একটা অস্পৃশ্য পুরুষ আমার জীবনে ছায়া হয়ে থাকবেই। ভগবান যেমন সত্য, এই নীলটাও সত্য।