নতুন একটা নির্দেশিকার কথা শোনা গেলো যে, জি-৭ তেলের মুল্যের উপর প্রাইস ট্যাগ ধার্য্য করে দিবে যাতে রাশিয়া কোনোভাবেই তেলের উপর দাম বাড়াতে না পারে। এরমানে হলো যেইই কিনুক, সেটার দাম কোনোভাবেই সেই নির্ধারিত দামের উপরে কিনতেও পারবে না আবার বেচতেও পারবে না।
এক দেশের পন্য, আরেক দেশসমুহ কিভাবে এই ফিক্সড প্রাইস ট্যাগ ধার্য্য করে দেয়? এটা অনেকেরই প্রশ্ন আসতে পারে মনে। আমারো এসেছে। কিন্তু আমি ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, এটা আসলে সম্ভব। তবে এই সম্ভবের মধ্যে অনেক বড় একটা জালিয়াতী আছে, আবার আছে অত্যান্ত বিপদজনক সংকেত।
উদাহরন দেই-
ধরুন, আমার ধান আছে। দাম আমার নির্ধারন করার কথা যে কত দামে আমি বিক্রি করবো। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখলাম আমি কিছুতেই বাজারের নির্ধারিত দামের উপরে আমি তা বিক্রি করতে পারছি না। অর্থাৎ আমার দামের কোনো ভ্যালু নাই। এতে যেটা হবে সেটা হলো, হয় আমি আমার ধান সেই প্রাইস ট্যাগে বিক্রি করবো অথবা আমি বিক্রিই করবো না। যদি ধানের প্রাপ্যতা অনেক থাকে, তাহলে হয়তো আমি আমার ধান সেই প্রাইস ট্যাগেই বিক্রি করতে বাধ্য হবো। কিন্তু যদি এমন হয় যে, ধানের ক্রাইসিস আছে, আর আমার মজুদ ধানের উপর কম বেশী সবাই নির্ভরশীল এবং আমি না বেচলে ক্রাইসিস আরো বাড়বে। তাহলে আমি সেই ধান আমার দামে না উঠা পর্যন্ত আমি বিক্রি না করে ধরে রাখবো। প্রাইস ট্যাগ আমাকে কিছুই করতে পারবে না। যেহেতু ধানের সল্পতা আছে ফলে সবাই আমার দামেই ধান কিনতে চাইবে, হোক সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে। কিন্তু যেহেতু প্রাইস ট্যাগের দামের উপরে কেউ ডিক্লেয়ার করতে পারবে না, তাই, তখন কমোডিটি বিক্রি হবে আন্ডারহ্যান্ডে। কিনবে অধিক দামে কিন্তু ইনভয়েস করবে প্রাইস ট্যাগের সমান। আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রাইস ট্যাগ নিশ্চিত করা হয় ইভয়েস ভ্যালু আর ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে। ফলে বিক্রেতা তার নিজের দামেই মালের দাম পায়, কিন্তু ক্রেতা অধিক দামে কিনে সেটা প্রাইস ট্যাগের সমান ইনভয়েস করে ক্রয় ভ্যালু দেখায়।
আরো সহজ করে যদি বলি-দেখবেন যে, জমি বেচাকেনার সময় বাস্তবে জমির দাম বেশী হলেও দলিলে সবসময় ক্রেতা সরকারী ভ্যালু (যাকে বলতে পারেন প্রাইস ট্যাগড ভ্যালু) দিয়েই জমি ক্রয় দেখায়। আর বাকী অতিরিক্ত টাকাটা ক্রেতা বিক্রেতাকে হ্যান্ড টু হ্যান্ড দেয়। ফলে সরকার নির্ধারিত মুল্যেই জমি ক্রয় বিক্রয় হয়েছে বলে ধরে নেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই দলিলের নাম ‘ইনভয়েস ভ্যালু’। এটাই প্রাইস ট্যাগ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে-রাশিয়ার যেহেতু একচ্ছত্র আধিপত্য তেল এবং গ্যাসের কিংবা গোল্ডের (৪র্থ বৃহত্তম গোল্ড সাপ্লাইয়ার) উপর এবং এই কমোডিটি গুলি জি-৭ সহ অন্যান্যদের লাগবেই, সেক্ষেত্রে কি রাশিয়ার উপর চাপিয়ে দেয়া প্রাইস ট্যাগ কোনো কার্যকরী ভুমিকা রাখবে? সম্ভবত কোনো কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারবে না। ফলে ক্রেতারা প্রাইস ট্যাগড ভ্যালুতে ইনভয়েস করবে এবং বাকী টাকা ভিন্ন পথে আন্ডারহ্যান্ডে লেনদেন হতে বাধ্য হবে। ফলে রাশিয়া তার নিজের ভ্যালুতেই কমোডিটির দাম পাবে।
কিন্তু এই সিস্টেমে আরো একটা বিশাল সমস্যার সৃষ্টি হবে। সমস্যাটা হলো যে, ক্রেতারা যখন আবার খুচরা বাজারে কমোডিটি বিক্রি করবে, তখন সে যে পরিমান টাকার বিনিময়ে কমোডিটি কিনেছিলো অর্থাৎ ইনভয়েস ভ্যালু এবং আন্ডারহ্যান্ড ভ্যালু, সেটা তুলতে গেলে ক্রয় মুল্যের থেকে অনেক বেশী বিক্রয় মুল্য ধার্য্য করতে হবে। কারন তাকে পুরু টাকাটাই (ইনভয়েস ভ্যালু + আন্ডারহ্যান্ড পেমেন্ট ভ্যালু) তুলতে হবে। যেহেতু ক্রেতা দেখিয়েছে কেনা ভ্যালু কম, ফলে সে কেনা ভ্যালু আর আন্ডার হ্যান্ড পেমেন্ট ভ্যালু যোগ করে যখন মুনাফা সহকারে বিক্রি করতে যাবে তখন বিক্রয় মুল্য অনেকাংশে বেড়ে যাবে। তখন সরকার তাকে ধরে বসবে যে, কেনো প্রাইস ট্যাগড ভ্যালুতে কিনে সে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে? এই কারনে ক্রেতারা হয়তো আর কোনো কমোডিটি আমদানিই করবে না। কারন লস দিয়ে কোনো ব্যবসায়িই কমোডিটি বিক্রি করতে চাইবে না। আর এর কারনে ব্যবসায়ীরা প্রাইস ট্যাগড ভ্যালু পরিবর্তন না করা পর্যন্ত কোনো কমোডিটিই আর আমদানী করবে না। আর আমদানী না করলে দেশে পুরু কমোডিটির একটা বিশাল ভ্যাকুয়াম তৈরী হবে, যা সরকারের জন্য আরো বেশি বিপদজনক। কারন সরকারকে জনগনের কাছে জবাব্দিহি করতে হবে।
সার সংক্ষেপঃ ভিন্ন দেশের কমোডিটির উপর অন্য কোনো দেশ জোর পূর্বক প্রাইসট্যাগ বসালে সেই দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয় যে দেশ প্রাইস ট্যাগ বসায়।