গত মে মাসের ১৪ তারিখে আমার ছোট মেয়ে সানজিদা তাবাসসুম কনিকার অনার্স শেষে কনভোকেশনের অনুষ্ঠানে আমেরিকায় গিয়েছিলাম। গতকাল অর্থাৎ ১১ জুন ২০২৫ তারিখে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম।
প্রায় এক মাস আগে….
এসেছিলাম ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টিমোর কাউন্টি (UMBC) তে ছোট মেয়ের অনার্স শেষে কনভোকেশন অনুষ্ঠানে। সবকিছু খুব দ্রুত পেরিয়ে গেলো। ছোট মেয়ে সানজিদার অতুলনীয় সার্ভিস না থাকলে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে (নায়েগ্রা, লাসভেগাস, রিনু, নেভাদা, পেন্সিলভিয়া, ভার্জিনিয়া, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, এবং আরো অনেক দর্শনীয় স্থান) ঘুরাই হতো না। ধন্যবাদ মা আমার।
আজ ফিরে যাচ্ছি দেশে। মনটা কষ্ট এবং আনন্দের দোলাচালে কেমন যেনো অস্থির। ছোট মেয়েকে আবারো ফেলে যাচ্ছি একা আমেরিকায়। ইউনিভার্সিটির অনার্স শেষেই অনেক ভাল একটা জবে ঢোকেছে। তাকে থাকতেই হচ্ছে। অনেক কষ্ট লাগছে ভিতরে। সন্তান বড় প্রিয় জিনিষ। এয়ারপোর্ট থেকে মেয়েকে বিদায় দিতে চোখের অশ্রু তাকে দেখাতে চাইনি বলে জড়িয়ে ধরে শুধু বলেছিলাম-ভালোবাসি ততটুকু মা যতটুকু একজন পিতা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারে তার আদরের সন্তানকে। অন্যদিকে দেশে ফিরে যাচ্ছি এতেই মনটা আবার ভালোও লাগছে। এমনই একটা দোলাচলে ছিলাম আজ থেকে ৪৮ বছর আগে যেদিন গ্রাম থেকে ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম। একদিকে গ্রাম ছাড়ার কষ্ট, অন্যদিকে ক্যাডেট কলেজে পদার্পনের আনন্দে। অশ্রুসিক্ত নয়ন, মেকী হাসির ঠোটের অন্তরালে অন্তরের কষ্টের যে অনুভুতি তা কি আনন্দের আকি বিষাদের সেটা বর্ননা করা কঠিন।
বড় মেয়েও তার স্বামীকে নিয়ে এই ফাকে সিংগাপুর- মালয়েশিয়ায় ঘুরছে। প্রতিদিন কথা হচ্ছিলো ওদের সাথেও কিন্তু কোথায় যেনো সেখানেও একটা দোলাচালে ছিলাম। কথা হয়, ভিডিওতে দেখা হয় অথচ এক টেবিলে বসে খাওয়া হয় না, আড্ডা হয় না। জীবনটা মনে হয় এমনই। বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, ওদের আবদার, ওদের দুষ্টুমি, ওদের জালাতন একদিন ধীরে ধীরে কমতে কমতে এমন জায়গায় নেমে আসে যেনো আমরাই ওদের কাছে বাচ্চা মানুষ। একদিন যে ছোট ছোট বাচ্চাগুলিকে সবকিছু থেকে আড়াল করে রাখতাম, এখন এই বয়সে এসে দেখলাম, ওরাই হাত ধরে রাখছে আমাদের। এ যেনো কি স্বর্গীয় এক অনুভুতি। এই বুড়ো বয়সে এসে সন্তানদের কাছে নিজেরা বাচ্চাদের মতো হয়ে যেতে মন্দ লাগে না। আমরা আসলেই এই বয়সে আগের মত আর সেই শক্তি, মনোযোগ আর সাহস থাকে না। সন্তানের হাত ধরে হাটা যে কত নিরাপদ তা খুব অনুভব করি। তাই মনের এবং অন্তরের অন্তস্থল থেকে দোয়া বেরিয়ে আসে প্রতিটি ক্ষনে যেনো ওরা থাকে সর্বদা নিরাপদ, সুসাস্থ্যে এবং সুখীতে।
বাংলাদেশ থেকে আসার টিকিট ছিল ইকোনোমি ক্লাশে। বুঝতে পারিনি এক নাগাড়ে ২২/২৩ ঘন্টা ফ্লাইটের অস্বস্থি এবং অস্থিরতা। ছোট মেয়ে সম্ভবত ব্যাপারটা উপলব্ধি করেছিল। আজ যখন এয়ারপোর্টে চেক ইন করি, টিকেট চেক করে দেখি-কখন কবে কিভাবে যে সেটা বিজনেজ/প্লাটিনাম হয়ে রয়েছে। মেয়েকে জিজ্ঞেস করতেই মুচকি হেসে বল্লো-তোমাদের এত বড় জার্নিটায় তোমাদের আসার সময় নিশ্চয় কষ্ট হয়েছিল, আমার সেটা ভাল লাগেনি আব্বু। তাই তোমাদেরকে এই সারপ্রাইজটা দেয়া।
মেয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু মুচকী হাসলাম। টিকেটটা চেঞ্জ করাই মুখ্য ব্যাপার নয়, আমাদের এই বুড়ো বাবা মায়ের আনকম্ফোর্ট বিবেচনা করে মেয়ে আমাদেরকে কম্ফোর্ট দেয়ার জন্য কিছুই না জানিয়ে হাফ মিলিয়ন টাকা খরচ করতেও দিধা করেনি। এটাই হয়ত সন্তানের ভালোবাসা।
আমি তোমাদের ভালোবাসি মা।