অজানা থেকে একজন ডিক্টেটর – হিটলার

১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল সকাল ৬:৩০ মিনিটে অস্ট্রিয়ার কোনো এক নাম না জানা ব্রাউনুন গ্রামে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক এডলফ হিটলারের জন্ম হয়। তার বাবার নাম ছিলো এলুইস এবং মায়ের নাম ছিলো ক্লারা। বাবা মায়ের ৪র্থ সন্তান ছিলেন হিটলার। কিন্তু তার আগের তিনজনই তার জন্মের আগে মারা গিয়েছিলেন। হিটলারের পরে তার আরো দুইজন ভাইবোন ছিলো। তাদের নাম ছিলো এডমাউন্ড এবং পউলা। হিটলারের দাদামহ কে ছিলেন সেটা আজো ইতিহাস সঠিক তথ্য দিতে পারে নাই। তবে বলা হয় যে, হিটলারের বাবা এলুইস ছিলেন মারিয়া আন্না নামের কোনো এক মহিলার সন্তান এবং তারপাশের বাড়ির দুধ বিক্রেতা জোহান জর্জ হেইডলার ছিলেন এলুইসের বাবা। এলুইস যে একজন অবৈধ সন্তান এটা তখনকার দিনে ওই সমাজে খুব একটা অপ্রীতিকর ব্যাপার ছিলো না বলে এলুইস কখনোই তার পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন নাই। কিন্তু তিনি তার মায়ের শেষ নামটাই সবসময় ব্যবহার করতেন। আর সেটা ছিলো সিক্লগ্রুবার। পরবর্তীতে অস্ট্রিয়ায় ১৮৭৬ সালে অফিশিয়াল জন্ম নিবন্ধনের সময় তিনি তার এক চাচার "হেইডলার" নামের সাথে ম্যাচ করে এলুইস হেইডলার নামকরনে অভিষিক্ত হন। তখন তার বয়স ছিলো ৩৯। কিন্তু সরকারী খাতায় "হেইডলার" নামটি ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হয় "হিটলার" হিসাবে। আর পারিবারিক নামের জের ধরেই পরবর্তীতে এই মহানায়কের নামেও এডলফ হেইডলারের পরিবর্তে এডলফ হিটলার হিসাবেই আজ বিশ্ববাসি জানে। 

১৮৯৫ সালে হিটলার তার ছয় বছর বয়সে ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হন গ্রামের কোনো এক স্কুলে। হিটলার সপ্ন দেখতেন তিনি একজন আর্টিস্ট হবেন। ফলে হিটলার ক্লাসিক্যাল কোনো এক স্কুলে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার বাবা এলুইস চাইতেন যে, হিটলার সরকারী কোনো কর্মচারী হিসাবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলক। ফলে তার বাবা হিটলারকে ক্লাসিক্যাল স্কুলের পরিবর্তে টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। হিটলার তার বাবাকে খুব ভয় পেতেন। ১৯০৩ সালে হতাত করে হিটলারের বাবা ফুস্ফুসের ক্যান্সারে মারা যান। তার বাবার মৃত্যুর পর হিটলার পুরুপুরি স্বাধীনতা পেয়ে যান। কোনো দায়িত্ববোধ বলে কিছু ছিলো না তার। এমনকি নিজের জন্যেও না। ফলে বাউন্ডেলে জীবনের মত হিটলার অস্ট্রিয়ার আনাচে কানাচে বিভিন্ন মিউজিয়ামে, অপেরা পার্টির সঙ্গে এখানে সেখানে ঘুরে বাড়াতে লাগলেন। আর এভাবে হিটলার তার লেখাপড়ায় মোটামোটি একটা ইতিই টেনে ফেলছিলেন। এইভাবে করতে করতে, ১৯০৭ সালে হিটলার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি ভিয়েনা একাডেমিতে ফাইন আর্টসে ভর্তি হবেন। কিন্তু তিনি খুব খারাপভাবে ভর্তি পরিক্ষায় ফেল করলেন এবং ভিয়েনা একাডেমিতে আর ভর্তি হতে পারলেন না। মনের দুঃখে তিনি পুনরায় ভিয়েনা থেকে তার নিজের বাড়ীতে মায়ের কাছে ফিরে এলেন। কিন্তু তখন তার মা আন্না ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ১৯০৭ সালের ডিসেম্বরে তার মা আন্না ক্যান্সারে মারা যান। 

  ১৯০৮ সালে হিটলার পুনরায় ভিয়েনা একাডেমিতে আবারো ফাইন আর্টসে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেন, কিন্তু আগেরবারের চেয়ে ফলাফল এবার আরো খারাপ হওয়ায় ভিয়েনা একাডেমি তাঁকে পরবর্তী সব ভর্তি পরীক্ষার জন্য স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেন। হতাশ হিটলারের আর কোনো কিছুই করার ছিলো না। মায়ের সঞ্চিত যা ছিল, তাই দিয়ে হিটলার রাস্তায় রাস্তায় এদিক সেদিক ঘুরে বাড়াতে লাগলেন। কখনো পার্কে, কখনো ষ্টেশনে, কখনো বা গাছের তলায়। আস্তে আস্তে মায়ের রাখা সঞ্চয়ও শেষ হতে থাকে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতেও হিটলার রেগুলার কোনো একটা কাজের সন্ধান করেন নাই। শেষতক, হিটলার কাজ না খুজে মানুষের কাছে হাত পাতা শুরু করলেন, আক্ষরিক অর্থে যাকে বলে ভিক্ষা। এইভাবে আর যখন চলছিলো না, তখন হিটলার ১৯০৯ সালের ডিসেম্বরে "হোমলেস শেল্টার" এ আশ্রয় নেন।  

১৯১৩ সালে অস্ট্রিয়ায় যখন বাধ্যতামুলক সেনাবাহিনীতে ভর্তির আদেশ করা হয়, তখন সেনাবাহিনীতে ভর্তি না হবার জন্য চালাকী করে হিটলার তার পিতৃভুমি জার্মানির মিউনিখে চলে আসেন। কিন্তু অস্ট্রিয়ান সরকার ১৯১৪ সালে তার এই চাতুরী ধরে ফেলেন। চতুর হিটলার তার চাতুরীর জন্য এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলভোগের সাজা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হিটলার অস্ট্রিয়ান কনসুলেটকে তার দারিদ্র্যের বর্ণনা দিয়ে অতি আবেগময় একখানা পত্র লিখেন।  অস্ট্রিয়ান কনস্যুলেট হিটলারের পত্রের আবেগময় ভাষা এবং তার নিবেদন খুব পছন্দ করেন এবং তাঁকে শাস্তি না দিয়ে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেন সেনাবাহিনীতে ভর্তির জন্য। কিন্তু হিটলার ইচ্ছে করে সেনাবাহিনীর লিখিত পরিক্ষায় খুব খারাপভাবে ফেল করেন এবং তাঁকে আর অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনীতে কখনোই যোগ দিতে হয় নাই। 

২৮ জুন ১৯১৪ সালে যখন এক সারবিয়ান আততায়ীর হাতে অস্ট্রিয়ার রাজা ফারদিন্যান্ড মারা যান, তখন জার্মানির চ্যান্সেলর কায়জার অইলহ্যাম অস্ট্রিয়াকে সারবিয়ান্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য চাপ দেন এবং অস্ট্রিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করে। পহেলা আগস্ট ১৯১৪ সালে যখন জার্মান যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন মিউনিখে সবার সাথে হিটলার নিজেও ওই আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন।  

এই সময় রাশিয়া অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে তাদের সৈন্যসামন্ত মোতায়েন করেন, অন্যদিকে জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের সৈন্যসামন্ত মোতায়েন করেন। আবার আরেক দিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড জার্মানির বিরুদ্ধে তাদের সৈন্যসামন্ত মোতায়েন করে বসেন। তার মানে এই দাড়ালো যে, অস্ট্রিয়া ও জার্মানি একদিকে, অন্যদিকে সার্বিয়া, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড।    

অস্ট্রিয়ার রাজা যখন সার্বিয়ার আততায়ীর হাতে খুন হন, তখন হিটলার এতোটাই দেশপ্রেমিক বনে যান যে, তিনি এইবার জার্মানির ভ্যাবারিয়ান রেজিমেন্টে স্ব ইচ্ছায় যোগ দেন। হিটলার সার্বিয়ানদেরকে এবং অন্যান্য বিদেশীদেরকেও জার্মানিতে সহ্য করতে পারছিলেন না। হিটলার সেনাবাহিনীর সদস্য হিসাবে মোটেও একজন খাপ খাওয়ানোর মতো লোক ছিলেন না। ঢিলাঢালা, অলস এবং খুবই অপরিচ্ছন্ন সদস্য হিসাবে গন্য ছিলেন। কিন্তু তার একটা ভালো গুন ছিলো। সে বহুবার অল্পের জন্য মৃত্যু থেকে বেচে গেলেও তার সাহসী কাজে খুব উৎসাহ ছিলো এবং তিনি ওইসব কাজে নিজে থেকেই এগিয়ে আসতে চাইতেন। হিটলার কখনো খাবারের জন্য অভিযোগ করেন নাই, কিংবা ব্যারাকে থাকার অবস্থা ভালো নয় এইজন্য তার কোন অভিযোগ ছিলো না, কিংবা তিনি কখনো মেয়েঘটিত ব্যাপার নিয়ে নাক গলান নাই। আর হিটলার কখনো ছুটির জন্যও আবেদন করতেন না।  

১৯১৬ সালের ৭ অক্টোবরে কোনো এক যুদ্ধে ( ব্যাটল অফ সুম্মি) তে হিটলার গুরুতর পায়ে আঘাত পান এবং জার্মানির এক হাসপাতালে ভর্তি হন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এটাই হিটলারের প্রথম অনুপস্থিতি। আরোগ্য লাভের পর হিটলারকে তখন হাল্কা কাজ দেওয়া হয় আর তিনি তখনো মিউনিখেই থাকেন। এদিক সেদিক ঘুরে বাড়ান, বার্লিনে এই প্রথম হিটলার ঘুরতে যান। ১৯১৮ সালের ১০ নভেম্বরে হিটলার খবর পান যে, জার্মানির পরাজয় হয়েছে। হিটলারের বয়স তখন ২৭। এই টকবগে তরুন হিটলার জার্মানির এই পরাজয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তার বারবার মনে হচ্ছিলো যে, জার্মানির পরাজয় সামরিক বাহিনীর অক্ষমতার জন্য হয় নাই, বরং পরাজয়টা হয়েছে অযোগ্য রাজনীতিবিদদের কারনে, বিশেষ করে ইহুদীদের কারনে। হিটলারের মনে ইহুদীদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ জন্ম নিতে থাকলো।  

১৯১৯ সালের ২৮ জুন জার্মানির পরাজয়ের কারনে মিত্রপক্ষ "ভারসাই চুক্তি" নামে একটি চুক্তি করে যেখানে সম্পূর্ণ দায়ভার জার্মানির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং যুদ্ধে যার যা ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপুরন হিসাবে জার্মানিকে কি কি করতে হবে তা ওই চুক্তির মধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়। এই চুক্তির বলে জার্মানিকে তাদের নিজস্ব কিছু ভূখণ্ডও পোল্যান্ড এবং ফ্রান্সকে দিয়ে দিতে হয়।  শুধু তাই নয়, চুক্তি মোতাবেক বলা হয় যে, জার্মানি তার সেনাবাহিনী কোনো অবস্থাতেই একলাখের বেশী সৈন্য সামন্ত বাড়াতে পারবে না, তাদের কোনো মিলিটারী বিমান থাকতে পারবে না, এমনকি সাবমেরিন জাতীয় কোন নৌজানও রাখতে পারবে না। এটা ছিলো বিশ্ববাসীর সামনে জার্মানির একটা অপমানসুচক চুক্তি।  

হিটলার তখনো জার্মানির গোয়েন্দা বাহিনীতে একজন "ইনফরমার" হিসাবে কাজ করছিলেন এবং তিনি মিউনিখেই থাকতেন। কিছুদিন পর হিটলারকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে "পলিটিক্যাল ইনডক্ট্রিনেসন" কোর্সে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। আর ওখানেই হিটলার তার জীবনের একটা মোড় ঘুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজর কাড়েন। হিটলার তার নিজের লেখা "মেইন ক্যাম্প" এ লিখেছিলেন, "একদিন আমি ওই কোর্স করার সময় অনেক ছাত্রদের মিলিত সভায় ইহুদীদের ব্যাপারে আমার কিছু কথা বলার সুযোগ হয়েছিল যেখানে অধিকাংশ ছাত্ররা আমার মতের পক্ষেই সমর্থন দেয়। আর এর ফলশ্রুতিতেই আমাকে সেনাবাহিনি থেকে মিউনিখ রেজিমেন্টে .এডুকেসনাল অফিসার" হিসাবে প্রেসনে পাঠায়।"  

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে মিউনিখের "জার্মান ওয়ার্কার পার্টি"র কোনো এক ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে হিটলারকে তদন্ত করতে পাঠানো হয়। ওই সময় এই "জার্মান ওয়ার্কার পার্টি"টি ছিলো মুলত একটি ছোট নাম না জানা "আলাপচারিতা দলের" মত। খুব কমসংখ্যক লোক এরসঙ্গে জড়িত এবং এদের কোনো এজেন্ডা ছিলো না। হিটলার সূক্ষ্মভাবে ভাবলেন যে, এই ছোট দলটি দিয়েই একটা কিছু করা সম্ভব এবং একে সাংঘটনিকভাবে সাজাতে হবে। এদের প্রতিটি সদস্যই ইহুদীদের বিপক্ষে। হিটলার নিয়মিত এই "আপালচারিতা দল"টিকে একটা রাজনৈতিক দলের আদলে তৈরী করা শুরু করলেন। এই দলটির পক্ষে মাঝে মাঝে হিটলার বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করলেন যেনো এর পরিচিতি বাড়ে। এমনই এক সময়, ১৬ অক্টোবর ১৯১৯ সালে, হিটলার তার এই ক্ষুদ্র দলের সদস্যদের উদ্দ্যেশে এমন এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেন যে, তার এই বক্তব্য, তার এই ইহুদী বিরোধী মনোভাব অনেক জার্মান নাগরিককে উক্ত দলে এসে হিটলারের ভাষণ শুনার জন্য প্রলুব্ধ করে। আর এই সুযোগ নিয়ে ১৯২০ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারীতে প্রায় ২০০০ হাজার জার্মান নাগরিকের সম্মুখে হিটলার ২৫টি দাবী সম্বলিত এক আশাবাদী এবং জ্বালাময়ী বক্তৃতা রাখেন। এই বক্তব্যে প্রধানত হিটলার ইহুদী বিরোধী বক্তব্যের সঙ্গে "ভারসাই চুক্তি" বাতিল, ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডকে দেওয়া ভুখন্ড ফেরত, প্রতি বছর মিলিওন মিলিওন ডলারের ক্ষতিপুরন বন্ধ, ইহুদীদের অনধিকার অধিকার, জার্মানিদের দুরাবস্থা ইত্যাদি তুলে ধরেন। হিটলার আরো বলেন যে, যুদ্ধের পরে যে সব ইহুদীগন জার্মানিতে বসবাস শুরু করেছে, তাদেরকে যতো দ্রুত সম্ভব বিতাড়িত করতে হবে।  

হিটলারের এই অভিপ্রায়ে জার্মানির অধিকাংশ নাগরিক এমনভাবে সমর্থন দিলেন যে, হিটলার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান নাই। তিনি অতিদ্রুত আগের "ওয়ার্কার পার্টি" নাম বদল করে একে "ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি" হিসাবে নাম পরিবর্তন করেন। যাকে আমরা পরবর্তীতে "নাজি" পার্টি হিসাবে জানি। এই পার্টির তিনি একটি লাল পতাকার মধ্যে সোয়াস্টিকাও লেপ্টে দেন পার্টির সিম্বল হিসাবে।  অবশেষে হিটলার উক্ত পার্টির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন ১৯২১ সালে, যদিও তিনি এক্সিকিউটিভ কমিটির মধ্যে ছিলেন ৭ম।  

হিটলার ভ্যাবারিয়ান সরকারের কিছু রাজনীতিবিদদের সমন্নয়ে ১৯২৩ সালে ৮ নভেম্বরে মিউনিখে একটি আন্দোলনের সুচনা করেন যেখানে পরিকল্পনা ছিলো যে, তৎকালীন বার্লিন সরকারকে উতখাত করবেন হিটলার এবং তার মিত্র লুদেনদ্রফ। কারন বার্লিন সরকারে অধিকাংশই ছিলো ইহুদী এবং কমিউনিস্ট। কিন্তু তাদের ওই আন্দোলন সার্থক না হয়ে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বার্লিন সরকার হিটলার এবং লুদেনদ্রফকে পাচ বছর করে জেল দেন। কিন্তু জার্মানির বিচারক উভয় হিটলার এবং লুদেনদ্রফকে যুদ্ধের সময় জার্মানির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার জন্য ৫ বছরের স্থলে মাত্র ৮ মাস জেল খাটার ব্যবস্থা করেন। জেল থেকে বের হবার পর, হিটলার এইবার আন্দোলনের মাধ্যমে নয়, রাজনীতিকভাবে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করলেন এবং তিনি তার নব্যদলকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

    তার "নাজি" পার্টি ধীরে ধীরে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করলেন এবং ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে হিটলার তার পার্টি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেন। কিন্তু তার প্রতিপক্ষ ১ম বিশ্বযুদ্ধের নামকরা পল ভন হিন্ডেনবার্গকে হিটলার হারাতে পারলেন না। কিন্তু পল ভন হিন্ডেনবার্গও এককভাবে সরকার গঠন করার মতো জয়ী হলেন না। ফলে কোয়ালিসন সরকারের মতবাদে হিটলার পল ভনের সহিত সরকারের সাথে আতাত করলেন যেখানে পল ভন হিন্ডেনবার্গ হলেন জার্মানির চ্যান্সেলর।  

কিন্তু হিটলার বসে থাকার লোক নন। তিনি সময় অসময়, ন্যায়-অন্যায় ভাবে, যেভাবেই খুশী অধিস্টিন চ্যান্সেলরকে ভয় ভিতী, অসহযোগ অনেকভাবেই বিব্রত করতে লাগলেন যাতে তিনি বাধ্য হন হিটলারকে চ্যান্সেলর হিসাবে ডিক্লেয়ার করতে।  

পরিশেষে ১৯৩৩ সালের ৩০ শে জানুয়ারিতে পল ভন হিন্ডেনবার্গ বাধ্য হয়ে হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর হিসাবে মেনে নেন।  

তার পরের কাহিনি তো মাত্র শুরু। হিটলার চ্যান্সেল হওয়ার দিন থেকেই তিনি তার "নাজি" দলের বিশাল প্রচার, তাদের দলের আখাংকা, তাদের করনীয় কাজসমুহ, জনসম্মুখে জাহির করতে থাকলেন। জেনারেল গোয়েব্যালস ছিলেন হিটলারের এইসব প্রচারনার মুল হোতা। আর পুরানো যারা পল ভনের সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন তারা কিছুটা ভয়ে, কিছুটা আতংকে আস্তে আস্তে সরে যেতে থাকেন। এইবার হিটলার তার বহুল আখাংকিত কাজ, "ইহুদী নিধন" শুরু করেন। আর তিনি এই কাজটি শুরু করেন ১৯৩৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে যেদিন তিনি ইহুদীদের কে জার্মানিতে "বয়কট" এর নির্দেশ দিলেন।  

তারপরের কাহিনী আমরা অনেকেই জানি।            

ইংরেজদের ব্রেক্সিটের

আজ ইংরেজদের ব্রেক্সিটের গনভোটের রায়ের উপর ইত্তেফাকে দারুন একটা নিউজ পরে নিজের কাছে খুব পুলকিত মনে হলো যদিও আমার এই পুলকিত হওয়া মানে আনন্দিত নয়। ইত্তেফাকের নিউজটা ছিলো এই রকম, " ব্রিটিশ ভোটারদের আক্ষেপ!" খবরটার কিছু কথা এই রকম, ..."যেঁ সব ব্রিটিশ এই গনভোটে হ্যা ভোট দিয়েছেন, তারা কি মনে করছেন? তারা কি জেনে শুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন? ব্রিটিশরা যারা অনেকেই ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তারা অনেকেই জানে না কেনো তারা ভোট দিয়েছেন। বরং গনভোটের হ্যা রায়ের বিপরিতে ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে যেঁ ঝুকি সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে এখন সব ব্রিটিশ নাগরিকেরা শঙ্কিত"। এদিকে অন্য আরেকটি পত্রিকা এই একই খবর ভিন্ন ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছে। করেছে এইভাবে, " ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার আশা এখনো জিইয়ে রেখেছে ব্রিটেনের জনগন। ঐতিহাসিক এই বিচ্ছেদ আটকাতে এখন দ্বিতীয়বার গন ভোট চাইছে।" ওদিকে পাশাপাশি আরেকটি খবর ছাপা হয়েছে, যেঁ, "ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়ার ব্যাপারে তুরস্কে গন ভোট হতে পারে।"  

কি আশ্চর্য, একজন ছাড়ার জন্য ভোট দিচ্ছে, আরেকজন যোগ দেওয়ার জন্য ভোট দিচ্ছে। একজন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বুঝেছে যেঁ, তারা ভীষণ ভুল করেছে, এখন আবার ইইউতে থাকার জন্য অনুরধ করছে, আক্ষেপ করছে। এই পরিস্থিতে আমার তর্জমা হচ্ছে, কেউ না কেউ ঐ সব ব্রিটিশদেরকে কোনো না কোনো যুক্তি দেখিয়ে ইইউ ছেড়ে দেওয়াই হবে বেশি লাভ, এই যুক্তি দেখিয়েছিল বা এমন কিছু লোকের পাল্লায় তারা পরেছিল যেঁ, কেউই বুঝে নাই কি করা উচিত আর কি করা উচিত না। দুই পক্ষই ছিল নাদান এবং অপরিপক্ক। এখন যখন বিচ্ছেদের রায় হয়ে গেছে, তখন জিবিনের সব স্বপ্ন, সব আরাম, সব চাহিদার মধ্যে অনেক বেশি গরমিল মনে হচ্ছে বলে নিজেকে নিজেদের অনেক বেশি অপরাধী মনে করছেন। এবং আসলেই তারা অপরাধী। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনেও আমি এমন কিছু লোকের সম্মুখীন হয়েছি, যারা এক ইঞ্চি দুরের লাভটাই দেখেন, কিন্তু দুরের লসের অংশটা চোখে দেখেন না, বুঝেও না। ফলে এক ইঞ্চি পরিশর লাভ নিয়ে যখন রায় দিয়ে উল্লসিত হয় বা জিতে গেছি বলে পুলকিত হয় আর নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমিয়ে যায়। পরদিন ঘুম থেকে উঠে যখন দেখে তাদের সব স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে, সব আরাম ধুলিস্যাত হয়ে গেছে, ঐ দুরের অনেক ক্ষতির আভাস গুলু যখন একে একে উম্মচিত হতে থাকে এবং লসের পরিমান গুলু যখন একের পর এক জমা হতে থাকে, তখন তাদের আত্তা কাপে, ভয় লাগে, সব হিসাব নিকাশ ভুল হয়েছে বলে সারাক্ষন আক্ষেপ করে, তখন যারা এই ধরনের ভুল করতে চায় নাই, তাদের এক প্রকার পুলকিতই হয়। কারন এই ভাবনাটা তারা অনেক আগেই করেছিল কিন্তু বোকার দলেরা বুঝে নাই।     তাই, আগে নিজের ভালোটা বুঝুন। তারপর অন্যের ঘেউ ঘেউ শুনুন। গন্তব্যপথে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ঘেউ ঘেউ করা প্রানিদের প্রতি ঢিল মারতে থাকা মানে খুব দ্রুত গন্তব্যদিক হারিয়ে ফেলা। ঘেউ ঘেউ প্রানি থাকবে, তাদের ঘেউ ঘেউও থাকবে, মাঝে মাঝে বিরক্ত হবেন, মনে হবে উচিত শিক্ষা দেই। কিন্তু না, গন্তব্য স্থানে না পৌঁছানো অবধি ধৈর্য ধরা অত্যান্ত প্রয়োজন। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মত লোকের অভাব নাই, কিন্তু ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে টেনে তোলার লোকের অনেক অভাব আছে। বিচ্যুতিতে সবচেয়ে ক্ষতি নিজের। তৈরি করা সাম্রাজ্যে রাজাগিরি করা যতোটা সহজ, নিজে সাম্রাজ্য তৈরি করা ততোটা সহজ নয়। আজ ব্রিটিশরা বুঝে, তাদের দিন এবং রাত দুটুই খারাপ। কোনো এক ব্রিটিশ পূর্ব পুরুষেরা ব্রিটিশকে উচ্চ শিখরে তুলে দিয়ে গিয়েছিল। ঐ সব ব্রিটিশ রা মুসলমানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে তাদের নিজের ফায়দা লুতার জন্য, অপেক্ষা করেছে বেশ কিছুটা সময় যেনো সব কিছু হাতের মধ্যে এসে যায়। এই অপেক্ষার সময়ে ব্রিটিশদের কে জারজ সন্তানের গালিও খেতে হয়েছে। তো কি হয়েছে? তার উদ্দেশ্য তো ছিল এই বিশ্বকে রোল করা। তারা তাই করেছিল। কিন্তু আজ এই যুগের বলদ কিছু আহাম্মক ব্রিটিশরা সেইদিনের পূর্ব পুরুসদের রচিত সাম্রাজ্য বোকার মত সিদ্ধান্ত দিয়ে তার সমাধি করলো। কারন এই যুগের ব্রিটিশরা সাম্রাজ্য গরে তোলে নাই। তাই ধ্বংস ও তাদের মনে আঘাত হানে না। এখন আঘাত হানে এই কস্টে যেঁ, তারা আর আগের মতো আরাম করতে পারবে না, আগের মতো চাকচিক্য পাবে না। এটা হচ্ছে পাপের ফল।