২২/০৩/২০২৬-ঈদের পরেরদিন

যেদিন আমি এই অবিনশ্বর পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেবো, আমার আর কখনো ফেরা হবে না, কোন কিছুই আর আমাকে স্পর্শ করবে না, সেদিন হটাত করেই তোমার হৃদয়ের ভিতরে কন এক অচেনা বেদনায় মনে হবে-আমি তোমার জীবনে কতটুকু গুরুত্বপুর্ন ছিলাম যে প্রতিদিন তোমার খোজ নিতো, প্রতিটি খুচরা মুহুর্তে তোমার কথা ভাবতো। তোমার সেদিন আক্ষরিক অর্থেই মনে হবে, তুমি আমার কাছে কতটা শখের মানুষ ছিলে। সেদিন তুমি বুঝবে এই পৃথিবীতে কেউ তোমার জন্য এতোটা যত্নশিল ছিলো। আমি যেদিন আর এখানে থাকবো না, চলে যাবো, সেদিন তুমি আমাকে কবরস্থানে খুজতে যেও না, আমাকে তুমি খোজো তোমার প্রতিটি শ্বাসরুদ্ধকরী সুর্যোদয়ে। প্রতিটি গানে যা তোমারে অকারনে কাদায়। আমার আত্মারা যেখানেই চলে যাক না কেনো আমি তখনো তোমাকে ভালোবেসেই যাবো। যখন কোনো আত্তা কাউকে এতোটাই ভালোবাসে, সেই আত্মা কখনোই তোমাকে সত্যি ছেড়ে যেতে পারে না। হয়তো তুমি তখন আমার কন্ঠ শুনবে না, তবে মনে রেখো আমার সর্বস্ব দিয়ে আমি তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, মায়ায় জড়িয়ে রেখেছিলাম। আমি তোমাকে এমনভাবে সবার থেকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম যা আমি ভাবিনি আমি অন্য কারো জন্য কখনো করেছি কিনা। আমার সামনে অনেক পথ খোলা ছিলো, অনেক মানুষ হাজির ছিলো, আমি যে কোনো পথ , যে কোন মানুষকে বেছে নিতে পারতাম, কিন্তু এতোসব বিকল্পের মধ্যে আমি তোমাকেই বেছে নিয়েছিলাম। আমি সব সময় তোমার জন্য তোমার পাশে থেকে গিয়েছি। কিন্তু আমি নিয়ম ভাংতে পারিনি। খুব করে তোমাকে চাইলেও আমি চুপ থাকার তাগিদে আর তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি কোনো নিয়ম ভাংতে পারিনি। তীব্র মায়া, তীব্র ভালোবাসা থাকা সত্তেও, একসাথে বুড়ো হবো ভাবলেও কিংবা সমাজ সম্মুক্ষে তীব্র অনুভুতি থাকা সত্তেও আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরার নিয়ম ভাংতেব পারিনি। এই সমাজে জীবনের চেয়ে, জীবনের কষ্টের চেয়ে, গোপন যন্ত্রনার চেয়েও নিয়ম যেনো অনেক বড়। অথচ আমরা বলি জীবনের থেকে মুল্যবান কিছুই নাই। আমরা কে কখন কার কাছ থেকে কিভাবে বিদায় নেবো আমরা সেটা জানি না। হয়তো হতে পারে এটাই তোমার জন্য আমার শেষ বার্তা। আমি জানি না আগামীকাল আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে, কিন্তু আমি শুধু তোমাকে জানাতে চাই যে, তুমি আমার কাছে খুব বিশেষ কেউ ছিলে। হাসিমুখ হোক কিংবা চুপচাপ, তোমার সাথে আমার কাতানো সময়গুলি ছিলো অনবদ্য এবং বাস্তব। যাইই ঘটুক না কেনো, জীবনে সব সময় হাসিখুশী থাকবে যেমন এখন আছো। মনের ভিতরে কখনো কোনো দুক্ষকে বাসা বাধিতে দিও না। মনে রাখবা, আমার মনের ভিতর তোমার জন্য সব সময় একটা স্পেশাল জায়গা ছিলো এবং থাকবে।

শারমিন

This content is password-protected. To view it, please enter the password below.

অরু     

      

অরু নামের কোন চরিত্র বাস্তবে নাই। কিন্তু তার রুপক চরিত্র সর্বদা সমাজের চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। এই অরুদের ইতিহাস খুজতে গেলে অনেক লোমহর্ষক কাহিনী বেরিয়ে আসে। কখনো দেখা যাবে যে, তার জীবন নিয়ে অনেক মানুষ খেলা করেছে, কখনো এদেরকে কেউ তাদের বিশ্বাসের দূর্বলতাকে পুজি করে অতিমাত্রায় ঠকিয়ে অন্য কোথাও সটকে পড়েছে, আবার কখনো কেউ এদেরকে পথ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে পরম যত্নে আদর করে সমাজের ঠিক রেল লাইনটায় উঠিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, অসংখ্য অরুরা তাদের আসল জন্মের কাহিনীই জানে না, কে তারা, কোথা থেকে এসছে, কেমন করে কার কাছে বড় হয়েছে। যৌবন, কৈশোর, কিংবা বৃদ্ধকাল কেনো কার কাছে কিভাবে কাটালো তার কোনো কারনই হয়তো তাদের জানা নাই, এমনকি কেনোইবা তার কাছেই কাটাইলো, এর অনেক ব্যাখ্যা অজান্তেই থেকে যায়। যখন মাঝে মাঝে হটাত কেউ সত্যিটা জানে, তখন তার পায়ের তলার মাটিকে একটা অভিশাপ মনে হয়। মনে হয়, নিজের সমস্ত সত্তা আর সফলতা কিংবা ব্যর্থতার মাঝে কোনো ফারাক নাই। নিজের কাছে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। রাগ হয়। কিন্তু কার উপর রাগ? কিসের ভিত্তিতে রাগ? কোনো উত্তর পাওয়া খুব দুষ্কর। এই জগতে ঈশ্বর একটা রহস্যজনক জালে কত প্রকারের খেলা যে খেলে তার সঠিক ব্যাখ্যা আর কারন কোনো মানুষের জানা নাই। এরই মধ্যে অজস্র ফুলের সমাহারের বাগানে এরা একটা আগাছা হয়ে জন্মালেও তাদের একটা নিজস্ব রুপ আছে, নিজস্ব পরিব্যপ্তি আছে। আগাছা ফুলের সমাহার যখন কেউ ভালোবাসে, তখন সে আর আগাছায় থাকে না, ফুলের মধ্যে নতুন এক প্রজাতীর নাম নিয়ে সুন্দর বাগানে ঠাই করে নেয়। তার তখন নতুন একটা নাম হয়। এইসব অরু নামক ফুলেরও একটা পরিচয় থাকে, কখনো এর নাম হয় মাধুরী, কখনো মেঘলা আকাশের মতো উড়ন্ত কালো জল, আবার কখনো রোজেটা নামের কোনো বিদেশী ফুল। এইসব ফুলেরা কখনো কখনো আমাদের সমাজে অতি আখাংকিত ফুলসমুহ থেকেও অধিক মুল্যাবন হয়ে উঠে। তখন গোলাপ, কিংবা  জুই, অথবা রজনী গন্ধ্যারাও এদের ধারে কাছে থাকে না।  এরা কখনো অভিশাপ হয়ে আসে না, কিন্তু এদের জীবনের মাত্রায় যা দেখা যায়, তার বেশীর ভাগই থাকে অবহেলায় ভরা কানায় কানায় জল। আমি এই রকম একজন অরুর কিছু ব্যক্তিগত উপলব্দি বুঝার চেষ্টা করেছিলাম কোনো এক নামহীন অরুর কাছ থেকে। এই নোটখাতা তেমনি কোনো এক অরুর মনের গোপন উপলব্ধি।তাহলে এখন প্রশ্ন জাগে, অরু নামের কেউ কি আসলে আছেহ্যা, আছে, তবে ইহা তাহাঁর ছদ্ধনামের এক নামকরন। অরুরা অন্য নামেই বেশী বেচে থাকে। এই অরু আমাকেও অনেক উদ্বেলিত করিয়াছিলো সময়ে কোনো এক অধ্যায়ে।  

নীল

This content is password-protected. To view it, please enter the password below.

১৪/১০/২০২৪-আমি আবার হাসতে চাই  

মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তার মধ্যে একটা হচ্ছে-তার জীবন নিরাপদ, নিশ্চিত এবং মৌলিক চাহিদা পুরন করা। এই কটা জিনিষ যেভাবেই আসুক, যেখান থেকেই আসুক, যখন নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন তার জীবন হয়ে উঠে চাকচিক্যময় এবং সুখি পরিবেশের মতো। তখন জীবনকে বড্ড ভালো লাগে, আকাশ ভালো লাগে, গাছপালা ভালো লাগে, আশেপাশের সব কিছুই ভালো লাগে। অল্পতেই পেট ভরে যায়, ছোট জিনিষেও হাসিতে জীবন পরিপুর্ন হয়ে উঠে, সব কিছু সুন্দর মনে হয়। কিন্তু যদি সেই সক্ষমতাকে মানুষ ধরে রাখতে না পারে, ভুল পরিকল্পনায় সব হাতছাড়া হয়ে যায় এবং হটাত যদি তার সামনে এটা দৃশ্যমান হয় যে, তার সেই নিরাপদ জীবন, নিশ্চিত জীবন কিংবা মৌলিক চাহিদার যোগানগুলি প্রায় অনিশ্চিত, তখন সেই মানুষটার থেকে অসহায় আর কেউ থাকে না। সারাক্ষন তার শরীর খারাপ হতে থাকে, তার প্রেসার বাড়তে থাকে, খাওয়া দাওয়ায় এতোটাই অনীহা আসে যে, ঘুম পর্যন্ত হয় না, কারো সাথে মিশতে ইচ্ছে করে না, কারো সান্নিধ্যই আর ভাল লাগে না। বারবার মনে হয়-কি যেন আর আগের মত নাই, কোথায় যেন কি ভুল হয়ে গেছে, অথবা মনে হয় বারবার যে, এখন কি হবে তার? কিংবা কি করলে আবার সেই আগের নিশ্চিত জীবনটা ফিরে পাবে? এসব চিন্তাধারায় একসময় সে চোখের সামনে অন্ধকার দেখতে থাকে, জিবনকে অসহ্য মনে হয়, ঈশ্বরকেও আর ডাকতে ইচ্ছে করে না। আর যদি ঈশ্বরের কাছে মাথা নতও করা হয়, তখন মনে হয়-ঈশ্বরই যেনো অপরাধী। তাকেই তখন বলতে ইচ্ছে করে-কেনো তুমি আমাকে এমন করে শাস্তি দিলে? তুমি কি পারতে না আমাকে আরো একটু সহজ করে দিতে সব? চোখে জল আসে, চোখ বন্ধ হয়ে আসে, কোথায় যেনো বুকের মধ্যে ব্যথা করে। উচ্চসরে কাদতে ইচ্ছে করে। তখন মনে হয় সব কিছু দ্রুত কেনো জানি নিজের কাছ থেকে সব অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। নিজের শরীর চলতে চায় না, গান ভালো লাগে না, বন্ধুবান্ধব ভালো লাগে না, একা থাকতে ভালো লাগলেও সেটাও এক সময় খুব অসহায় মনে হয়। নিজের খাটটায় শুয়ে বসেও যেনো আরাম পাওয়া যায় না। জানালার পাশে গিয়ে তখন বসি। দূরে গাড়ির ডাক শোনা যায়, কত মানুষ রাস্তায় হাটাচলা করে, সবাই ব্যস্ত। কেউ নাড়ির টানে, কেউ বাড়ির টানে, কেউ সংসারের টানে ঘরে ফিরছে। শুধু আমিই যেনো নির্জীব পাথরের মতো দূরের আকাশটাকে দেখি। আকাশটাকেও আর আগের মতো এতো রসীক মনে হয় না, রাস্তার ধারে গাছগুলিতে পাখীরা দূর দূরান্ত থেকে উড়ে উড়ে আসে, কিছুক্ষন বসে থাকে, অতপর আবার জানি কোথায় হারিয়ে যায়। যেমন হারিয়ে যায় সেই অসহায় মানুষের মনও। তখন কাছের আকাশে কি উড়ছে, দূরের আকাশে কি রঙ ধরেছে, আশেপাশের মানুষের কেনো এতো কোলাহল কিংবা কে কাকে কেনো ডাকছে কিছুই তার কানে প্রবেশ করেনা। মানুষ হয়ে জন্ম নেয়া যেমন ভারী আনন্দের, সৌভাগ্যের, তেমনি মানুষ হয়ে অসহায় জীবন যেনো একটা অভিশাপও বটে। অন্য কোনো প্রানীরা তাদের জীবনের জন্য হয়তো এতো কিছু ভাবেনা। কারন তাদের সমাজ নাই, সংসার নাই, তাদের ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের জন্য কোনো তাড়া নাই। তাদের জন্য বাড়িঘর লাগে না, ব্যাংক ব্যালেন্স লাগে না। সন্তান সন্ততির জন্যেও ওরা ভাবে না। শুধু মানুষ এর ব্যতিক্রম। এই পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই হচ্ছে মানুষের শত্রু। কিন্তু মানুষের মানুষবন্ধু ছাড়াও মানুষের সাথে সব প্রানিরাই বন্ধুত্ব করে। অথচ মানুষ যখন অসহায় হয়ে যায়, তখন তার বন্ধুরাও তাকে ছেড়ে অনেক দূর চলে যায়। তখন অতীতের সুন্দর সাবলম্বী জীবনের কথা ভেবে বারবার এটাই মনে হয়, শুধু বারবার এটাই মনে হয়, কেনো বোকামি গুলি করতে গেলাম? কেনো আমার নিজের ভালো একটা সম্ভাবনাময় জীবন এমনভাবে নষ্ট করলাম? তখন নিজের উপর খুব রাগ হয়, রাগ হয় সেই তাদের উপর যাদের উপর অতি বিশ্বাস করে আমার সর্বনাশার ঘুর্নিঝড় শুরু হয়ে সাজনো সেই জীবন, সংসার তছনছ হয়েছে। রাগ হয় সেই সব ঘটনার জন্য যার কারনে আমার ভুলগুলি হতে হতে একটা মহা তান্ডবের সৃষ্টি হয়ে আমাকে একেবারে সর্বহারা করে দিলো।  

মানুষের সবচেয়ে ভালো গুন যেমন সঠিক সময়ে বন্ধু চেনা, আবার সবচেয়ে বিপদ হলো সঠিক সময়ে বন্ধু না চেনা। যখন সঠিক সময়ে বন্ধু কিনা এটা না জেনেই বন্ধুত্ব হয় তখন চির শত্রু কিংবা সার্থপর মানুষেরা মানুষের বন্ধু হয়ে সব ছিনিয়ে নেয় আর সর্বশান্ত করে। আজকের দুনিয়ায় মানুষের অন্তরের খবত কেউ আগ থেকে কখনো বুঝতে পারেনা। মানুষ আজকের দুনিয়ায় এমন আচরন করে বেড়ায় যে, মনে হয় তার থেকে বিশ্বস্ত বন্ধু আমার কেউ নাই, এমনভাবে কাছে আসে যে, মনে হবে সে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমার জন্য হয়তো সে তার জীবনটাকেও বিসর্জন দিতে পারে। অথচ বাস্তব রুপটা সে কখনোই প্রকাশ করে না। এরা হায়েনার থেকেও ভয়ংকর। আরো একটা কঠিন জিনিশ হল-এই সব খারাপ বন্ধু গুলি বারবার কোনো না কোনো বেশ ধরে বারবার ফিরে আসতে চায়। বারবার তারা বিভিন্ন কায়দায় লুট করতে চায়। অথচ এরা কখনোই আমাদের বন্ধু না। মানুষ এখানেই জুয়া খেলার মতো বারবার হেরে যায়। কোনোবারই মানুষ এই হার থেকে শিক্ষা নেয় না।  আর বারবার হারে। এক সময় হারতে হারতে মানুষ জীবনের উপর এতোটাই বিরক্ত হয়ে উঠে যে, তখন জীবনতাকেই আর ভালো লাগে না। অথচ পৃথিবী কর সুন্দর, এখানে বেচে থাকা আনন্দের, আকাশ দেখতে ভালো লাগে, পাহাড়ে চড়তে ভালো লাগে, কখনো কখনো চোখের জলে কাদতেও ভালো লাগে।

যখন এ জীবনটাকে আর ভালো লাগতে চায় না, মনে হয় অসহায়, যখন মনে হয় কি হবে আর বেচে থেকে? তখন মানুষ ভুলে যায় যে, সে আর কখনোই এই সুন্দর পৃথিবীতে ২য় বার আসার কোনো সুযোগ নাই। সে ইচ্ছে করলেই ব্রিষ্টিতে ভিজতে পারবে না, ইচ্ছে করলেই আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নীল শাড়িতা বা সবুক সেলোয়ারটা দেখার সুযোগ নাই। বাইরের কোলাহল শুনতে পাবে না, বাচ্চাদের কিচিরমিচির, পাখীদের উরে যাওয়া, সন্ধ্যার লাল সুর্যতা আর দেখতে পাবে না। তার যাত্রা তখন এমূকখী। ফিরে আসার কোনো পথ খোলা নাই।  ফিরে আসতে চাইলেও আর আসার কোনো যানবাহন নাই, পথ নাই, কেউ টেনেও আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। অন্ধকার মাটির নীচে কার সাথে বসবাস, কার সাথে কি কথা হবে কেউ কখনো ওখান থেকে ফিরে এসে কাউকেই বলে যায় নাই। আমরাও কেউ জানি না। তাই আমি সেই অন্ধকার জীবনটাকে ভীষন ভয় পাই।

তাই আমি একাই বাচতে চাই, আমার কোনো সমাজ দরকার নাই, আমার কোনো সন্তান দরকার নাই, আমার কোন বন্ধু দরকার নাই। আমি শুধু এই পৃথিবীর রুপ আর সউন্দর্য নিয়ে মন ভরে বাচতে চাই। বাচতে চাই হাসিতে, বাচতে চাই মনের উল্লাশে। কারন আমি না চাইলেও একদিন আমাকে তো চলেই যেতে হবে। তাহলে নিজে থেকে আগেই চলে যেতে চাইবো কেনো? আমি আবার বাচতে চাই ঠিক সেভাবে যেভাবে আমি বাচতে চেয়েছিলাম। কাউকেই আমার কোনো দরকার নাই। এ জীবন অনেক সুন্দর আর মিষ্টি।

তাই, এবারের যুদ্ধটা আমার সাথে আমার। এবারের যুদ্ধটা আমি করতে চাই শুধু আমার জন্য, আর কারো জন্যই না। কেউ আমার না, আমিও কারো না। কারো উপর ভরসা করে আমি আর ব্যস্ত পথ পার হতে চাই না। আমি আমার জীবনটাকে আবার সেই চূরায় নিয়ে যেতে চাই, যেখান থেকে আকাশ দেখা যায়, রংগীন সব কিছু দেখা যায়। আমি সবার থেকে দামি জীবন নিয়ে বেচে থাকতে চাই। নো সমাজ, নো কিছু। শুধু আমি। আর এটাই আমার যুদ্ধ।

এই বিষাদ জানালা আমার জন্য নয়, এই অসহায় লাইফ আমার জন্য নয়। আমি এই রকম নই। আমি হাসতে জানি, আমি অট্টহাসিয়ে ঘরময় উচ্ছাসে পরিনত করতে পারি। মানুষ আমাকে দেখলে মাথা নত করে, আমি সেটাই। আমি আবারো বুক টান করে, সিনা উচু করে আগের জীবনতায় ফিরে যাবো। সেটাই আমার প্রতিজ্ঞা।

তুমি কি আমার এই যুদ্ধে পাশে থাকবে নীল? হ্যা, আমি জানি, কেউ থাকুক বা না থাকুক, নীল নামক একটা অস্পৃশ্য পুরুষ আমার জীবনে ছায়া হয়ে থাকবেই। ভগবান যেমন সত্য, এই নীলটাও সত্য।  

২/৩/২০২৪-ঈশ্বর কি পারতো না?

ঈশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারতো না?

আমি ঈশ্বরকে আমাদের এই সম্পর্কে কোনরূপ দোষারুপ করতে নারাজ। ঈশ্বর ঠিক তোমার আমার মিলন লিখেছেন এবং এক করেছেন। কিন্তু আমাদের এই সমাজ সেটা মানতে অনীহা প্রকাশ করেছে। সেটাও সম্ভবত শতভাগ সঠিক নয় যে, সমাজ আমাদের এই সম্পর্ককে বাধা প্রদান করেছে। কারন এই সমাজে এখনো অনেকেই আমার তোমার মত সম্পর্ককে মেনে নিয়েছে। তাহলে আমি কেনো ঈশ্বর বা সমাজকে এক তরফা দোষারুপ করছি?

দোষ আসলে আমার নিজের। আমি সাহসি নই, আমি ভীরু, আমি কিছু মানুষের কাছে জিম্মি। আমি পারিনি তোমাকে আমার নিজের করে প্রকাশ্যে পরিচয় করাতে। তোমার কন দোশ নেই, তুমি তো তোমার সর্বোচ্চটা দিয়েই আমাকে কাছে নিয়েছো। যতটুকু ব্যার্থতা তা সবটুকু আমার নিজের।

অথচ তুমি আছো আমার বুকে, আমার মনে, আমার মস্তিষ্কে, আমার সমস্ত চিন্তায়। তারপরেও আমি তোমাকে আমার সর্বোচ্চটা দিতে পারিনি। আমাদের সমাজ, আমাদের কিছু পরিস্থিতি, আমাদের কিছু ভাবনা, কিছু ভালোবাসা আর আমাদের কিছু মায়া এই সব নিয়ে আমরা মানুষ অনেক জটিল একটা সমাজে বাস করি। তোমার আমার মাঝের এই সম্পর্কটা ঠিক সে রকমের একটা জটিল পরিস্থিতি নিয়ে লেগে আছে। মন যা চায় সেটা কতটুকু গ্রহন যোগ্য, আর কতটুকু গ্রহন যোগ্য সেটা যখন মন মানতে চায় না, তখনই আমরা আরো অনেক জটিল সমস্যায় ভোগতে থাকি।

কতটুকু আর জীবন? অথচ এই জীবনে তুমি আমার অপ্রাকশ্যই থেকে যাবে। যেদিন আমি আর থাকব না, সেদিন তোমার কাছে মনে হবে, পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির জায়গাটা তুমি হারিয়ে ফেলেছো। গলা ফাটিয়ে কাদলেও তার অন্তর্নিহিত কারন তুমি কাউকে বলতে পারবে না, না তুমি আমাকে কাছে এসে একটু ছুয়ে ধরে বলতে পারবে-তুমি ভালো থেকো পরপারে।

আমার চলে যাওয়ার পরের দিনগুলি তোমার কেমন যাবে আমি জানি না। কিন্তু আমি তোমার অন্তর থেকে কখনোই যে মুছে যাবো না সেটা আমি নিশ্চিত। সকাল দশটা বাজলে তোমাকে কেউ আর ফোন করবে না, মিছিমিছি টাকা পাও এই বায়না আর কখনো তুমি কারো কাছে করতে পারবে না, অহেতুক কোনো কারন ছাড়া আজ যেমন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করো, তখন পুরু স্বাধীনতা থাকা সত্তেও আর বের হতে ইচ্ছে করবে না।  কেমন যেনো সকাল, দুপুর বিকাল কিংবা রাত একই রকম মনে হবে। নতুন শাড়ি কিনে আর বারবার আয়নায় নিজেকে কেমন দেখা যায়, সেতা আর আগের মত মনে হবে না। তুমি আর আমার আসার অপেক্ষায়ও থাকার কোনো কারন পাবে না।

মানুষ বেচে থাকে, কখনো ইতিহাসে, কখনো খবরে, কখনো বিশ্বাস ভংগের কারনে, কখনো অন্য কারনে। কিন্তু আমি তোমার অন্তরে বেচে থাকব একেবারেই গোপনে চোখের জলে। কাউকে এটা বলেও নিজেকে শান্তনা পাবার কোনো সুযোগ নাই।

তোমার জন্যই আমাকে আরো অনেকদিন বাচতে ইচ্ছে করে। মনে হয় তুমি আমার সাথে আরো অনেকদিন বাচো। অতদিন বাচো যতদিন না তুমি বুড়ি হও, যতদিন না তুমি সাহসী হও, যতদিন পর্যন্ত না তুমি একা একা চল্লেও আর কখনো ভয় না পাও। আমি প্রতিদিন তোমার জন্য দোয়া করি, আমি প্রতিদিন চাই তুমি যেন ভালো থাকো, সুখে থাকো।

০১/০৩/২০২৪-ইন্ডিভিজুয়াল পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন

মানুষ সৃষ্টিগতভাবে কিছু গুনাবলী নিয়েই এই পৃথিবীতে আসে। কেউ খুবই অস্থির প্রকৃতির, কেউ দোদুল্যমান, কেউ অতীব চঞ্চল, কেউ আবার সেই ছোটবেলা থেকেই চুপচাপ আবার কেউ তার বয়সী মানুষের থেকে চালাক। বয়স বাড়ে আর মানুষের অভিজ্ঞতার কারনে এসব জন্মগত গুনাবলীর এক্সপাংশনের সাথে সাথে আরো কিছু গুনাবলির সংযোজন ঘটে। তারমধ্যে হিংসা, পরোপোকারী, লোভ অথবা অবিশ্বাসী অথবা উদার মনের গুনাবলীগুলি অন্যতম। পরিস্থিতি অবশ্য এসব বাহ্যিক গুনাবলীর বড় একটা কারন।

কিন্তু সব কিছুর পরেও সবার একটা ইন্ডিভিজুয়াল পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন থাকে যেখান থেকে যতো কিছুই হোক, যতো খারাপ বা ভালো পরিস্থিতিই হোক সে আর ব্যাক করতে পারেনা। কোনো ব্যক্তি তার এই ইন্ডিভিজুয়াল পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন সম্পর্কে সে নিজেও বেশিরভাগ সময়ে জানে না। এটা হটাত করেই তার ব্যক্তি মনে এমনভাবে উদয় হয় যখন সে তার আশেপাশের কোনো পরিস্থিতিই আর আমলে নেয় না এবং হতাত করেই তার মধ্যে এই কঠিন মনোভাবটায় সে একেবারে এমনভাবে পতিত হয় যে, সে নিজেও সেই পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না। সেটা সে এক্সিকিউট করেই ফেলে।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এ কারনেই মানুষ আত্মহত্যা, ডিভোর্স, ব্যবসায় থেকে বিচ্ছিন্ন, সম্পর্ক থেকে আলাদা ইত্যাদিতে নিপতিত হয়। ক্ষেত্র বিশেষে কারো কারো এই পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে বিশাল জনবহুল গোষ্টি, কর্পোরেট সংস্থা, পারিবারিক জীবন এতোটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয় যে, তার নিজের সাথে অন্যান্য সবাই আরো বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

কাউকে সেই পরিস্থিতিতে কখনোই ঠেলে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমারো সম্ভবত ব্যবসায়িক লাইনে এমন একটা পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন চলে এসছে।

৫/১১/২০২৩-মাঝে মাঝেই দেখবেন কেনো যেন মনে হয়

মাঝে মাঝেই দেখবেন কেনো যেন মনে হয়-কোথায় যেনো কি ঠিক নাই, কোথায় যেন কোনো কারনবিহীন একটা অসস্থিবোধ করছেন অথচ বলতে পারছেন না ব্যাপারটা আসলে কি। মনের আনাচে কানাচে অনেক কিছু খতিয়ে দেখেও কিছু পাওয়া যায় না যে, কেনো মনে হচ্ছে, কি যেনো ঠিক নেই। খাচ্ছেন, ঘুরছেন, ঘুমাচ্ছেন, সবার সাথে মেলামেশাও করছেন কিন্তু মাঝে মাঝেই আবার সেই চিন্তাটা মাথায় আসছে, কেন জানি অসস্থিবোধ করছেন। অথচ আপনি সেটার কারন বুঝতে পারছেন না। কাউকে জানাবেন? কিন্তু কি জানাবেন? সেটাও নির্দিষ্ঠ করে বলতে পারছেন না।

এমনি কিছু কিছু পরিস্থিতিতে আমাদের সবার সাবধান হওয়া উচিত। আমরা অনেক কিছু বুঝে উঠার আগে আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সম্ভবত কিছু একটা আঁচ করতে পারে কিন্তু তার কাছে কংক্রিট কোনো তথ্য নাই বা প্রমান নাই। সে কিছুর একটা আভাষ দেয়। তাই একটা কথা সবসময় মনে রাখা উচিত যে, বিপদের আভাষ পাওয়া মানেই সবসময় এটা ভুল নয়। এটাও তো হতে পারে যে, আপনি কারো বিকৃত মানসিকতাকে অলৌকিকভাবে অনুভব করছেন? আর এটা কোনো সন্দেহ নয়। এটাও তো হতে পারে যে, সত্যিই আপনার বিপদের আশংকা আছে!!  যখন অবচেতন মন একটা অদ্ভুত কিছুর আশংকা করে, মনে হয় যেনো something is not right, বা Something is wrong somewhere, তাই এটা জরুরী যে, আপনি সবসময় সতর্ক থাকুন। তানা হলে বিপদ যখন একদম একদিন সত্যিই সামনে চলে আসবে তখন আর প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো সময় থাকে না। ভয়কে ম্যানেজ করা আমাদের জীবনে একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। যদি কোনো ছোট খাটো ভয় বারবার মনে আসে, তাহলে সেটাকেই বিশ্বাস করে একেবারে প্যানিক পর্যায়ে যাওয়া বুদ্ধিমত্তার কাজ নয় কিন্তু যদি সেই ভয়ের কারন আছে বলে মনে হয় তাহলে তাঁকে ভ্রম, বা হ্যালোসিনেসন কিংবা মায়াজাল মনে করে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়।

০৩/০৪/২০২১-কি এটা?

ইহা এমন একটা জিনিষ যাহা স্বাভাবিক চোখে দেখা যায় না। প্রতিটি জীব এটাকে এমনভাবে লুকাইয়া রাখে যাতে সহজেই কারো চোখে না পড়ে। তারপরেও অনেকে ফাক ফোকর দিয়া এটাকে দেখার চেষ্টা করে। এটা যখন ছোট অবস্থায় থাকে, তখন এর রুপ একরকম, আবার একটু বয়স হলে এর রুপ একটু ভিন্ন। এটা যখন পরিপক্ক হয়, এটা ছোট বেলার মতো আর মনে হয় না। শিশুকালে এর প্রতি কারোই তেমন কোনো প্রিতি নাই, সময়ের পরিবর্তনে এর চাহিদা জনে জনে বৃদ্ধি পায়। এর মুখ আছে, পাতা আছে, ঢালা পালা না থাকলেও চারিদিকে প্রায়ই ঘন জংগলের মতো আগাছা গজাইয়া উঠে। সময়ে সময়ে এটা রক্ষনাবেক্ষন না করলে এর চারিদিক এক সময় আগাছায় ভরে উঠে, আর চারিদিকে দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটা যখন অন্যের কাছে স্থায়ীভাবে বিক্রি করে দেয়া হয়, তখন নিজের সম্পদ হলেও ক্রেতাই হন এর প্রকৃত মালিক। তখন এই ক্রেতা ছাড়া আসল মালিক এটাকে আর কারো কাছে হস্তান্তর করতে পারেন না। এটাকে রক্ষনাবেক্ষন করার জন্য খুব বেশী কিছু লাগে না।

কেউ কেউ আবার এর মধ্যে বীজ লাগিয়ে রাখে। ফল সব সময় হবে এমন না। পরিপক্ক হলে এর ভিতরেই অংকুর হয়, প্রায় বছর খানেক পরে এর ফলাফল বুঝা যায়। চাষের সময় অনেকেই এর প্রতি যত্নবান হলেও এক সময় চাষের পরে আর কোনো রক্ষনাবেক্ষন করেন না। তবে যার সম্পদ সে মাঝে মাঝে অন্যত্র লিজ দিয়ে দেন। লিজের ব্যাপারটা কখনোই গ্রহনযোগ্য নয়, তারপরেও অনেকে ভালো খদ্দর পেলে লিজ দিয়ে দেন।

নতুন লিজ নেওয়ার সময় ঘন ঘন হালচাষ হয়, অতিরিক্ত হাল চাষের কারনে অনেক সময় সার বেশী পড়ে যায়। ক্ষতিও হয় কিন্তু দ্রুত আবার আগের জায়গায় এটা ফিরে আসে। এটার আরেকটা গুন হলো, ফল যখন আসে, মুরগীর ডিম যেমন তার ভিতর থেকে মুরগী বের করে দেয়, তেমনি এর ফলও এর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে। এই ফল সব সময় নাজুক। যদি সঠিক লিজের মাধ্যমে হয়, তাহলে ফলের যত্ন মালিক ভালো করে নেয়, আর যদি অবৈধ লিজিং এর কারনে মালিক ফসল ফলায়, সে নিজেও আর ফসল ঘরে নিতে চায় না। এই ধরনের ফসল অনেকে আবার বছরের পর চাষ করেও পায় না, আবার অনেকে কোকিল ছানার মতো কাকের বাসায় অনায়াসেই পয়দা করে ফেলে যায়। এটা মারাত্তক খারাপ একটা চাষ।

যে ক্ষেতে এটা ফলানো হয়, তখন এই ক্ষেতেরও অনেক ক্ষতি হয়।

এটা সব প্রানীর বেলায় এক রকম না।

২৮/১০/২০২০-বেঞ্চমার্ক, মাপদন্ড

কারো জীবনের উন্নতি মাপার পদ্ধতি। জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রত্যেকটা মানুষ নিজের বেঞ্চমার্ক তৈরী করে। এই বেঞ্চমার্কটাই মানুষকে ভিতর থেকে অনুপ্রেরনা দেয়, সামনের দিকে পুষ করে। তাহলে এখন প্রশ্ন জাগে, এই বেঞ্চপার্কটা আসলে কি? এই বেঞ্চমার্কটা আসলে হচ্ছে একটা শক্তি, মনের শক্তি, যোগ্যতার শক্তি আর শক্তি ইচ্ছার। এটা কারো নিজের ভিতর থেকে উতগিরিত হয়। এটা অন্য কেঊ তৈরী করে দিতে পারে না। কিন্তু যখনই এই বেঞ্চমার্ক বা মাপদন্ড কারো জন্য অন্য কারো বেঞ্চমার্কের সাথে তুলনায় মাপদন্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন এই তুলনা করতে করতে আমরা এটা ভুলে যাই যে, আমরা কাউকে এতোটাই হতাশায় ফেলে দেই যার ফলে সেই ব্যক্তি নিজের অক্ষমতা আর যোগ্যতাকে একটা নিছক নিজের দূর্বলতা মনে করে একটা বড় ধরনের ভূল পদক্ষেপ নিয়ে বসে। আর সেই ভুল পদক্ষেপে হয় সে নিজের উপর নয় সেই তুলনাকার বেঞ্চমার্কের উপর প্রতিশোধের নেশায় মেতে উঠে। তাতে আর যাই হোক, হয় একজনের নতুবা দুজনের জীবনেই নেমে আসে সবচেয়ে সামাজিক অবক্ষয়, অপরাধ, অথবা খুন বা আত্মহত্যা।

 দুজন মানুষের মাঝে তুলনা করা আর সেটা নিজের মধ্যে নিয়ে নেওয়া প্রত্যেক মানুসের জীবনের একটা অংশ আর তুলনা করা এই বিষয়টা প্রায়ই মানুসের জীবনে একটা বেড ইম্প্যাক্ট ফেলে। ছোট বেলায় পড়াশুনা, যৌবনে রোজগার, ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ে তুলনা যার দিকটা একটু দুর্বল হয়ে থাকে সে প্রত্যেকটা মুহুর্তেই একটা হীনমন্যতায় ভোগে। দুটু প্রজাপতি যেমন এক হতে পারে না, সেখানে দুজন মানুষ কি করে এক রকম হবে? ঈসশরই বলুন, আর প্রকৃতিই বলুন, বা নিয়তিই বলুন, তিনি প্রত্যাক মানুষকে আলাদা আলাদা উপহার দিয়েছেন। কেউ সে উপহারের র‍্যাপার আগে খুলে ফেলে, আবার কারো বা এই উপহারটা আছে এটাই বুঝতে সারা জীবন কেটে যায়। এই সময় যখন কোনো মানুশকে বলা হয় যে, তুমি ওর মতো হতে পারো না? ও তো এই কাজে তোমার থেকে এগিয়ে বা তুমি কেনো ওকে অক্ষরে অক্ষরে ফলো করো না? ওর মতো হবার চেষ্টা করো ইত্যাদি, তখনি আসলে ওই মানুষটা থেকে ঐ উপহারটা ছিনিয়ে নেয়া হয়। তার নিজেকে চেনার চেষ্টাটা কেড়ে নেয়া হয়। গুরুত্ত না দেয়া এই জখম, ভবিষ্যতে কোনো মারাত্তক ক্ষতির কারন হতে পারে।

২৮/০৬/২০২০-আমি ফিরে এসেছি আবার

ঈশ্বর নাই কে বলে? ঈশ্বর আছেন, তিনি অদৃশ্য বটে কিন্তু মানবের সব অন্তরের কথা তিনি শোনেন। রাতজাগা ক্লান্ত পাখীর মতো ভেজা চোখের ক্রন্দনের আরাধনা ঈশ্বর শুনেছেন। আমি ফিরে পেয়েছি আমার সেই পুরানো ঘর, পুরানো জানালা। সেই জানালা দিয়ে আজো সেই আগের বাতাসের গন্ধ আমি পাই। ঘরে যে টিকটিকিটা একদিন দেখেছিলাম, আজ আমার পদচারনায় সেও যেনো অনেক খুশী। ছোট সেই টিকটিকিটা আজ বেশ বড় হয়ে উঠেছে। কতদিন ছিলাম না? মাত্র তো ২৪ টা দিন। কোনো কিছুই তেমন পরিবর্তন হয় নাই, আবার অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার মন পরিবর্তন হয়ে গেছে, আমার দেহ পরিবর্তন হয়ে গেছে, ছোট সেই টিকটিকিটাও বড় হয়ে গেছে। ঘরের কোনায় একটা মাকড়শা জাল বেধেছে। এটা আগে ছিলো না। বাথরুমের মেঝটা একটু ধুলায় কালো হয়ে গেছে। হয়তো অনেক ব্যকটেরিয়ারা তাদের মতো করে বাসা বেধে ফেলেছে। টেপটা ভালো মতো বন্ধ করা হয় নাই বিধায় অবিরত টপটপ করে ফোটায় ফোটায় পানি পড়ে জায়গাটা কালো হয়ে গেছে। রান্নাঘরের থালা ধোয়ার জায়গাটা শেওলা পড়ে সবুজ হয়ে গেছে। তারপরেও বড্ড আপন মনে হচ্ছে আমার সবকিছু। ঘরের দেয়ালে হাত দিয়ে আমি বুঝতে পারি ওরাও অনেক খুশি। আমি ফিরে এসেছি এই সেই ঘরে যেথায় আমি কতই না অভিমান করতাম, গুনগুন করে গান গাইতাম। ছোট ছোট পায়ে এঘর থেকে ওঘরে হাটাহাটি করতাম। কি শান্তি আর কি সুখ। আমার চোখ ভিজে যায় আনন্দে। আমার অন্তর বিকশিত হয়ে উঠে সুখে। কি অসাধারন আমার এই ছোট ঘরটি।

এই তো, এখানে বসেই তো আমি চুল আচড়িয়েছি কতদিন। এইতো এই টুলটায় বসে আমি কতদিন আকাশ দেখেছি। যেখানে তাকাই, সব আমার মনে হয় আজ। কত আপন মনে হচ্ছে আজ। যেদিন সকালে আমি এই ঘর থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলাম, বুকের ভিতরে একটা কষ্ট বেধেছিলো, চিনচিন করে ব্যথা লেগেছিলো। ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাওয়া যে কত কষ্টের, যে ঘর ছাড়ে নাই, সে কখনো বুঝবে না পরিচিত ঘর কিভাবে নিঃশব্দে কাদে। সেই কান্না আমিও শুনেছিলাম সেদিন। কিন্তু অভিমানের পাল্লা এতো বেশী ছিলো যে, ঘরের নিঃশব্দ কান্না আমার অন্তরের অভিমানের কাছে হেরে গিয়েছিলো। আজ আমি ফিরে এসেছি। সমস্ত ঘরটা যেনো ফিকফিক করে হেসে উঠলো। এটা আমার ঘর। এই ঘরের প্রতিটি বাতাসে মিশে আছে আমার নিঃশ্বাস, মিশে আছে আমার আকাশের পায়ের ধুলো। ওর শরীরের গন্ধ। আমি চোখ বুঝে নিঃশ্বাস নিলেই যেনো ওর গায়ের গন্ধ পাই। কি অদ্ভুদ না?

ছলনার ফল ভালো হয় না। কিন্তু আমি তো ছলনা করি নাই।  যে আমার সাথে ছলনা করেছিলো, যে আমাকে ঘর ছাড়া করেছিলো, যে আমাকে আমার অতীব চেনা এই ঘর থেকে বের করেছিলো, আজ তার ঘর নাই। আজ সে নিজের ছলনায় নিজেই আটকে গেছে। স্ত্রী জাতীরাই আসলে স্ত্রীজাতীর চরম শত্রু। আর এ জন্যেই এক স্ত্রীর ঘর ভাংগে আরেক স্ত্রী জাতীর কারনে। পুরুষ সব সময়ই উদাসীন। তাকে ধরে রাখতে হয়। তার হাত ছাড়তে হয় না। আমি ওর হাত ছেড়ে বুঝেছিলাম, আরেকটা হাত আমার মনের মতো নাও হতে পারে। সেই হাত, সেই আংগুল, সেই হাতের ছোয়া আমার ফেলে যাওয়া হাতের মতো নাও হতে পারে। আমি এই উপলব্দিটা বুঝেছিলাম সেই রাতেই যেদিন আমি আমার আকাশ থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। সেদিন বুঝেছি যেদিন রাতে আমি ঘন কালো আকাশ দেখে ভয় পেয়েছিলাম। আমি তো এই কালো আকাশকে চাই নাই। আমি চেয়েছিলাম জোস্নাভরা নীল আকাশ।

আজ আমার ঘরের সেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের ওই নীল আকাশটাকে দেখছি। ফুরফুরা বাতাস আমার জানালায় ঢোকছে আর আমাকে শীতল করে দিচ্ছে। কতদিন এই নির্মল বাতাস আমার এই ঘরে যে প্রবেশ করে নাই কে জানে। আজ বাতাসেরাও আনন্দিত। অফুরন্ত বাতাস। বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়ার মধ্যে কত যে আনন্দ। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে আমার আকাশের পানে ওর ভালোবাসার গন্ধ পাচ্ছি।

ঈশ্বর আমাকে আবারো ফিরিয়ে এনেছে আমার সেই পরিচিত ঘরে যেখান থেকে আমি একবার ঝরে পড়েছিলাম, আজ আবারো আমার বাগানে আমি মালী হিসাবেই ফিরে এসেছি। দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দেয়ালকে বললাম, জানো দেয়াল, আমি আমার এই দূর্বল শরীর তোমার গায়ে হেলান দিয়ে আবার দাড়াতে চাই, তুমি আমাকে ধরে রেখো। আমি সেই টপটপ করে ফোটায় ফোটায় পানি পরা টেপটাকে বললাম, আমি আবার ফিরে এসেছি, এবার আর তোমাকে ফোটা ফোটা অশ্রু বিসর্জনে কাদতে দেবো না। তুমি আমাকে গরমে শীতল করো আর আমাকে পরিশুদ্ধ করো। আমি আমার সেই পরিচিত রান্নাঘরের চুলাটার কাছে গিয়ে বললাম, যে আগুনে আমি এতোদিন পূরেছি, আজ বুঝতে পারি, তুমি কতোটা আগুনে পূড়ে আমাকে অন্ন দাও, সুমিষ্ট খাবার দাও। আমি আবারো তোমাকে আমার আদরের হাত দিয়ে দিয়ে ভরে দেবো। খাটের কোনায় বসে আমি ভাবী আর ভাবী, এই পুরু সংসারটা আমার। এই সংসারে আছে টিকটিকি, আছে বাতাস, আছে জানালা, আছে রাতের জ্যোৎস্না। আর আছে আমার ভালোবাসা আকাশের জন্য।

আমি আর কখনো আকাশকে ছেরে কোথাও যাবো না।

২৪/০৪/২০২০-এটা কি পরকীয়া?

প্রায় ৩৩ বছর একসাথে ঘর করার পর কি কারনে মুক্তার সাহেব আসমানী বেগমের অলক্ষ্যে একান্তে সময় কাটানোর জন্যে মাধুরীর সাথে গোপন প্রনয় শুরু করে, সেই ইতিহাস না জানলে মনে হবে, হয়তো মুক্তার সাহেব আসলেই একজন চরিত্রহীন এবং দায়িত্বহীন কোনো এক সামাজিক কিট। সমাজে মুক্তার সাহেবই প্রথম ব্যক্তি নন যিনি ঘরে ভালোবাসার সুন্দুরী আসমানিদের রেখেও তার থেকে অনধিক সুন্দুরী বা শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী এই মাধুরীদের সাথে প্রনয় করে। মুক্তার সাহেব্দের এসব খবর যখন বেশী করে নড়ে উঠে, তখন অনেকে বাসী রুটিও গরম করে খায়। সবসময় গরম গরম পরোটাই যে মজাদার তা নয়, কিন্তু এসব ঘটনা চারিদিকে যখন রটায় তখন এই গরম গরম পরোটার চেয়েও বাসী রুটির কদর বেড়ে যায়। যখন মুখরোচক খবরের ক্ষিদে পায়, তখন রুটি, পরোটা, লুচির মধ্যে আর কোনো তফাত করা যায় না। কিন্তু মুক্তার সাহেবরা তাদের এই ঘটনার জন্য নিজ থেকে কোনো সংবাদের শিকার হতে চান না কখনো বটে কারন, একদিনের মুখরোচক সংবাদ হবার জন্য কিংবা এই নশ্বর প্রিথিবীতে জোরালোভাবে নাম ডাক থাকুক, ইতিহাস হোক, অথবা বিখ্যাত হোক এ লোভে কেউ এসব কাহিনীর নায়ক হতে চান না। এটা তো ঠিক যে, এই ‘বিখ্যাত হবো’ ধরনের ক্ষুধার জন্য কেউ সারা জীবনের তৈরী করা বছরের শব্জীক্ষেত জালিয়ে দেয় না। তারপরেও শব্জী বাগান জ্বলে। আর সেটা ভুলেই হোক, আর ইচ্ছায়ই হোক, জ্বলতেই থাকে। আর এর প্রধান কারন একটাই, আবর্জনা সবসময় এই মুক্তার সাহেবদের মতো সাদা কাপড়েই ফেলা হয়। হাওয়া যখন কারো নামে গরম হয়, তখন আমরা অনেকেই বলি, শনির দশা চলছে। কিন্তু শনি এমন এক হাওয়ার নাম, যে, এই হাওয়ায় কারো নাম ভাসতে থাকলে তার পিছনের কি ইতিহাস, কি আচরন, সত্য-মিথ্যার চকলেটে মোড়ানো বোরহানীর মতো ঝাল-মিষ্টি-টক সবকিছুই তখন একসাথে উড়ে বেড়ায়। যে যেটা পছন্দ করে, তখন সে সেটাই ব্রেকিং নিউজের মতো যতো দ্রুত সম্ভব বাতাসের সাথে মাটিও গরম করে দেয়। তখন চায়ের কাপে, বাজারের দোকানে, কিংবা নদীর ঘাটেও এর পরিব্যপ্তি আর বিস্তার কম হয় না। আর যে বলীর পাঠা হয়, তখন সে হয়ে উঠে বিষাক্ত খাবার। আর সেই খাবার যতো দামিই হোক, তা ফেলেই দিতে হয়। যদি তা গোড়া থেকে উপড়ে  ফেলে না দেওয়া যায়, তখন তার মুল্য শুধু বিপদের আশংকাই বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মুক্তার সাহেবের মতো ব্যক্তিত্তকে বিষাক্ত খাবার মনে করে আসমানী বেগমেরা তাকে ফেলেও দিতে চান না। তারা চান, কিভাবে এই বিষাক্ত খাবার আবার সিদ্ধ করে পুনরায় ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলে পরিবেশন করা যায়।

এসব পরকীয়ার কাহিনীর সাথে সাথে যেহেতু সে ব্যাক্তির পিছনের ইতিহাস, তার আচরন নিয়ে রমরমা পান্ডুলিপি এক হাত থেকে আরেক হাতে ছড়াবেই, তাই এই মুক্তার সাহেবের অতীত ইতিহাস, কিংবা তার আচরন সম্পর্কে তার কাছ থেকেই জানা ভালো। এতে হয়তো কিছুটা রাখঢাক থাকতে পারে অথবা থাকতে পারে কিছু প্রচ্ছন্ন লুকানো তথ্য, তারপরেও সিংহভাগ তথ্য যখন একে একে সারিবদ্ধভাবে জোড়া লাগানো হবে, আমরা নিজেরাই বুঝতে পারবো, কোথায় কোন জায়গায় মুক্তার সাহেব কিছু ছেড়ে গেলেন, আর কোথায় কোন তথ্য নতুন করে আমদানী করলেন। সে বিচার পাঠকের উপর। যে যেভাবে পারেন, তিনি তারমতো করে সেসব গড়মিল জায়গাগুলি নিজের মতো তথ্য যোগ করে প্রতিস্থাপন করলেই পূর্নাজ্ঞ গল্পটি নিজের মানসপটে ফুটে উঠবে। তাহলে শুনি তার এই পরকীয়ার কাহিনী। 

আমার বয়স তখন সবেমাত্র কুড়ি পেরিয়েছে। টকবকে যুবক। স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় ঠিক সে রকম মানসিকতা নিয়েই আমি সমাজের প্রতিটি স্তরে অনায়াসেই যাতায়ত করতে পারি। সবার সাথেই ছিলো আমার বন্ধুত্ত। গাজার আসরে যেমন আমি ছিলাম মুক্তার মতো, তেমনি পরাশুনায় ভালো করার কারনে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তদের কাছে ছিলাম মুক্তার হারের মতো। আর নিম্নবিত্ত মানুষদের কাছে যতোটা না ছিলাম আদর্শগত মডেল তার থেকে বেশী ছিলাম গোপন হিংসার একটা অদেখা আলাপের বিষয়বস্তু।  কোনো এক সময়ের জমিদার বাড়ির সন্তান যখন নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো বেড়ে উঠে, তখন তার প্রাচীন উদ্ধত্ত ভাবের সাথে দেমাগ আর জিদটা হয়তো বেচেই থাকে যদিও সামর্থ বলতে কিছুই থাকে না। লেখাপরার প্রতি অনেক ঝোক ছিলো আমার, তাই, গ্রামের আর দশটা যুবকের থেকে আমি ছিলাম একেবারেই আলাদা। অদুর অতীতে কি ছিলো আর ওসব থাকলেও এখন কি হতে পারতাম, এই চিন্তাটা মাথায় একেবারেই ছিলো না, বা না ছিলো কোনো আফসোস যে কেনো অন্যদের অনেক কিছু আছে আর আমাদের নাই। কিন্তু আখাংকা ছিলো অনেক, যেভাবেই হোক নিজের পরিশ্রমে সৎপথে অনেক বড় কিছু হবার। শুনেছিলাম, সুন্দুরী অনেক যুবতীর সফলতা বড় লোকের বেডরুম দিয়ে আসলেও কোনো যুবকের সফলতা কোনো বড় লোকের ঘর জামাই থেকে আসে না। আর যাদের আসে, তারা হয় নেহায়েত ভাগ্যবান নয়তো তারা জীবনের জন্য আজীবন মৃৎপ্রায় লাশের সব শর্তাবলী গলায় নিয়েই ভোগ বিলাস করেন। আমার এই ধরনের না ছিলো কোনো মানসিকতা আর না ছিলো এর সুযোগের সন্ধান।   

২১ বছর বয়সেই আমি আমার মেধার কারনেই হোক আর শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়েই হোক, আমি দেশের একটি অত্যান্ত প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানজনক সেক্টরে অফিসার পদে চাকুরী পেয়ে যাই। যদিও আমার অন্যান্য সেক্টরে চাকুরী পাবার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু সেসব সেক্টরে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হবার জন্য যে কোর্ষ এবং ডিগ্রী দরকার তার সিলেকসনে আমি ছিলাম। কিন্তু সেই সিলেকশনের পর কোর্ষ চালিয়ে যাবার মতো মসলা বা জোগান হাতে ছিলো না যা বর্তমান সেক্টরে সরাসরি পাওয়া যায়। ফলে অন্যান্য সেক্টরের সপ্ন বাদ দিয়ে আমি বর্তমানকেই প্রাধান্য দিলাম যাতে আমি নিজেকে সাপোর্ট দিতে পারি। একটা জিনিষ আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, মাথার উপর ছাদ না থাকলে,  যে দুফোটা বৃষ্টিও আকাশ থেকে ঝরে পড়ে, সেটা আমার মাথায়ই প্রথম পড়বে। আমার না ছিলো কোনো ব্যাকআপ সাপোর্ট, না ছিল কোনো অবলম্বন। আমাকে কেউ সাহায্য করার নাই। এখন না হয় আমি একা, পরিবার হয় নাই, বিয়েটাও করি নাই, ফলে দুশ্চিন্তা হয়তো একটু কম, কিন্তু কখনো যদি আমার পরিবার হয়, সন্তান হয়, তখনো আমি জানি, আমাকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার অসময়ে বা দুঃসময়ে সাহাজ্য করার কেউ নাই। এই কঠিন বাস্তবতাটা আমার মাথায় এমনভাবে গেথে গিয়েছিলো যে, আমার কখনো ভুল হয়নি এটা ভুলে যাবার। আমার বিকল্প আমিই, আর কেউ নয়।

এই অবস্থায় আমার সাথে দেখা হয় এই আজকের আসমানীর। কথা থেকে চিঠি, চিঠি থেকে আরো ঘনিষ্ঠতা, আর সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে একসময় প্রনয়।  অনেকেই আমার এই ঘনিষ্টতা পছন্দ করে নাই। এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমি কিন্তু এতিম ছিলাম না। আমারো মা ছিলো, ভাই ছিলো, বোনও ছিলো, ছিলো শুভাকাংখিও। কিন্তু তাদের অবস্থা এরকম নয় যে, আমার কোনো প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে কোনো আর্থিক সহায়তা করতে পারবেন বরং তারাও তাদের আর্থিক দুরাবস্থার কারনে আমার দিকেই যেনো তাকিয়ে থাকে। কিন্তু এসব শুভাকাংখির একটা বড় সমস্যা হলো যে, নিজেরা কোনো কিছু সাহাজ্য করতে না পারলেও, তারা বিজ্ঞের মতো এমন কিছু মতামত, বা উপদেশ দেন যেনো ওরাই না জানি আমার অভিভাবক বা তাদের পরামর্শ না শুনলে আমার জন্য একটা বড় অপরাধ করা হলো বলে মতামত হয়। কিন্তু ওই যে বললাম, আমি বরাবর স্বাধীনচেতা মনের মানুষ, আর আমার চিন্তাধারার সাথে কারো চিন্তাধারা মিলুক বা না মিলুক সেটা আমার কাছে বড় কোনো বিবেচ্য বিষয় ছিলো না। আমি শুধু ভাবতাম, আমার সমস্ত কিছুর জন্য আমিই দায়ী। হোক সেটা উত্থানের বা পতনের। আমার উত্থানে হয়তো তখন তারা তাদের ভুল পরামর্শের কারনে চুপ থাকবেন, না হয় আমার পতনের কারনে তারা আরো কিছু শুনিয়ে দেবেন যে, তাদের পরামর্শ না শুনার কারনে আজ আমার এতো অধোপতন। কিন্তু এটাও জানি, সেই অধোপতন থেকে আবার টেনে বের করে কোনো এক সঠিক রাস্তায় দাড় করিয়ে দেবার মতো তাদের না আছে সামর্থ বা না আছে কোনো মানষিকতা।    

আর এরমধ্যে আসমানীর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হবার পর আমি নিজেও বুঝতে পারলাম, আমার অবস্থা থেকে আসমানীর অবস্থাও গুরুতর। আমি ছেলে মানুষ, কোনো না কোনোভাবে হয়তো অনেক কিছুই পার পেয়ে যাবো। কিন্তু আসমানী মেয়ে মানুষ, তার অবস্থা আরো শোচনীয়। তারও না আছে তেমন শক্ত কোনো অভিভাবক, না আছে বাবা, না আছে এমন কেউ যাকে নির্ভর করে সে তার মেয়েলী জীবনের একটা সুখের কথা ভাবতে পারে। তার শুধু একটা ভরষাই ছিল। আর সেটা হলো যদি আগত ভবিষ্যতে তার স্বামী হয়, তার উপর। তার চাওয়া পাওয়া, আবদার, আর যতো অভিমান সেই স্বামীকে ঘিরে। আসমানী এটাও জানতো যে, জীবনে এই আদর্শগত স্বামী পেতে হলে তাকেও একটা লেবেল পর্যন্ত যেতে হবে, বিশেষ করে পরাশুনার দিক দিয়ে। তাই, আসমানীর লক্ষ্য যেমন ছিলো ভালো একটা জীবনের জন্য, তেমনি লক্ষ্যকে সফল করার জন্য তাকে এই সমাজ সংসারে এমন করে পরিশ্রম করতে হবে যেখানে সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে ভালো কিছু করা যায়। সরকারী ইউনিভার্সিটি হলো সেই লক্ষ্যভেদের একটা সহজ কৌশল। আসমানি তার পূর্ন সদ্ব্যবহার করেছিলো। একদিকে আসমানী লেখাপরা চালিয়ে যেতে লাগল অন্যদিকে আমাকেও সে ধরে রাখলো।

একটা সময় এলো যে, আমি আর আসমানী একা একাই জীবন সাথী হয়ে গেলাম। আমি আসমানীকে আমার জীবনের বাইরে কখনো ভাবি নাই। আর এই ভাবার মধ্যে ব্যাপারটা এমন ছিলো যে, আমার মতো আসমানীরও কেউ নাই। আমিই আসমানীর দেবতা, আমিই আসমানীর আত্তা, আমিই আসমানীর সর্বত্র। ওর রাগ অভিমান, চাওয়া পাওয়া, সুখ আহলাদ, হাসি কান্না, সবকিছুই আমি। আর আমার বেলায়ও আমি জানি কাউকে আমার কষ্টের কথা, ব্যাথার কথা, কিংবা পরিকল্পনার কথা আসমানিকে ছাড়া কারো সাথেই শেয়ার করা সম্ভব ছিলো না। আমরা আসলে আক্ষরীক অর্থেই অর্ধাংগিনি রুপে একে অপরের জন্য বেছে ছিলাম।

মুক্তার সাহেব কিছুক্ষনের জন্য থামলেন। একটা দীর্ঘশাস ছাড়লেন। কিছুক্ষন চুপ করেও রইলেন। আমি বুঝলাম, তিনি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন। তারপর আবার শুরু করলেন-

আমি আসমানীকে পেতে সবাইকেই ছেড়েছিলাম। হতে পারে যে, আমার পরিবারের সবাইকেই ছেড়েছিলাম যারা হয়তো কোনোদিন জানতেও পারে নাই কবে থেকে আমি তাদের মন থেকেই ছেড়ে পর করে দিয়েছি। এই ছেড়ে দেয়া আর পর করে দেয়াটা এমন ছিলো যে, না কারো সাথে আমার খারাপ সম্পর্ক, না কারো সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। কিন্তু সম্পর্কটা আছে। না আমি তাদের জন্য দায়িত্তশিল, না ওরা আমার জন্য। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করা। আর আমার নিজের পায়ের তলার মাটির সাথে আমি আরো একটা পরিকল্পনা সবসময়ই করতাম যে, যদি কোনো কারনে আমার সব হোমওয়ার্ক শেষ না হয় এবং তারপুর্বেই আমার মৃত্যুবরন হয়, তাহলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বে আমার এই আসমানী। তাই যেভাবেই হোক, আমার বর্তমানকে কাজে লাগিয়ে আমার প্রথম দায়িত্ত হয়ে দাড়িয়েছিলো আসমানীকে সাবলম্বি করে তোলা। আমার পক্ষ থেকে যা যা করা দরকার সেটা আমার শক্তির পুরুটা দিয়ে এবং আসমানীর নিজের দক্ষতায়। দুটুই প্রয়োজন।

আমি আসমানীকে ঠিক সেভাবেই তিলে তিলে গড়ে তুলছিলাম। কিন্তু আমার একার আর্থিক সচ্চলতার ডিগ্রী এমন ছিলো না যে, অচিরেই পাহাড়ের মতো একটা সাবলম্বি পরিস্থিতি তৈরী করে ফেলি। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, আমি আসমানিকে তার নিজের যোগ্যতায় গড়ে তুলতে সক্ষম হই আর সেই সক্ষমতায় আসমানিও একটা সরকারী চাকুরীর সুবাদে প্ল্যাটফর্ম পেয়ে যায়। আসমানীর চাকুরীটাকে অনেকেই সহজ করে মেনে নিতে পারে নাই, কেনো আমি আসমানীকে মহিলা হয়েও চাকুরী করার অনুমতি দিলাম, বিশেষ করে এই ইগোতে। আসমানীর উপর আমার শতভাগ আস্থা ছিলো, আর সেই আস্থা একদিনে গড়ে উঠে নাই। তার মানসিকতা, তার ভালোবাসার গভীরতা আমাকে কখনো এটা সন্দেহ করার অবকাস দেয় নাই যে, আসমানী কোনো না কোনো অবস্থায় তার নিজ গন্তব্য আর ভালোবাসা থেকে ছিটকে পড়বে। আর সে ছিটকে পড়েও নাই কখনো।

খুব ভালোভাবেই চলছিলো আমাদের। আমাদের সন্তান হলো, সংসারে খরচ বাড়লো বটে কিন্তু দুজনের মিলিত চেষ্টায় আমাদের অন্তত প্রাত্যাহিক জীবন ধারনের নিমিত্তে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছিলো না। আমরা ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে শুরু করলাম। ওইযে বললাম, আমার মাথা থেকে কখনো এটা সরে যায় নাই যে, আমার অবর্তমানে আমার নিজস্ব পরিবার যেনো থাকে সুরক্ষিত এবং সাবলম্বি। সেই লক্ষ্যটা আমার কোনোদিন বিচ্যুত হয় নাই। তাই তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য একটা বাড়ি, নিরাপদে চলার জন্য একটা গাড়ি, কিছু স্থায়ী আর্থিক উৎস যা যা লাগে আমি সেটার ব্যবস্থা করছিলাম। সময়ের সাথে সাথে সেটা আসলেই একটা স্থায়ী রুপ নিয়েছিলোও। আর এই লম্বা সময়টা লেগেছে আমার প্রায় ২৫ বছর। এই ২৫ বছরে আমি চরাও উতরাই পের হয়েই এসেছি। এখন আমার আসমানি জানে সে সাবলম্বি, আমিও জানি আমার আসমানি সাবলম্বি। সে নিজে নিজে চলতে পারবে। তার একটা স্থায়ী আর্থিক উৎসও হয়ে গেছে। আর সেটা তার নিজের চাকুরী, পেনসন আর আমার সৃষ্ট একটা খাত, বাড়ি ভারা থেকে। এই বিশাল অবস্থানটা করতে আমাকে আমার জীবনের বহু মুল্যবান সময় পার করতে হয়েছে বটে। আমার যৌবন পেরিয়ে আমি মধ্য বয়স্ক পুরুহীতে পরিনিত হয়ে গেছি। আমি এখানেই ব্যাপারটা শেষ বলে মনে করি নাই। আমার মনে হয়েছে যে, থাকার জন্য বাড়ি কিংবা নিরাপদে রাস্তায় চলার জন্য গাড়ি আর প্রাত্যাহিক জীবনের চলার জন্য চাকুরি প্লাস বাড়িভাড়াই সব হয়তো নয়। তার পাশাপাশি কিছু ক্যাশ ব্যাংক ব্যালেন্স থাকাও খুব জরুরী। ফলে আমি যে কাজটি করতাম, তা হলো, আমি কখনো আসমানীর চাকুরী থেকে পাওয়া বেতনের কোনো অংশই স্পর্শ করতাম না, সে সেই টাকা দিয়ে তার যা যা করতে ইচ্ছে হয় করতে পারতো। হোক সেটা সঞ্চয়, হোক সেটা কাউকে দান কিংবা নিজের জন্য কোনো বিলাসিতা। আমি সংসারের সমস্ত খরচ আলাদা করেই আসমানীকে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এভাবে শুধু নিজের বাড়িই নয়, আমি অন্য উৎস থেকে আরো কয়েকটি ফ্ল্যাটও তার নামে বরাদ্ধ করে দিয়েছিলাম, যাতে আরো কিছু ক্যাশ টাকা ওর হাতে আসে। আমি এখন বেশ শান্ত যে, আমার অবর্তমান আসমানীর জন্য কোনো হুমকীসরুপ নয়। আসমানী নিজেও চাকুরী করার সুবাদে বিভিন্ন অফিস আদালত, কিংবা সমাজকে মোকাবেলা করার মতো মানসিক শক্তি রাখে। একটা পুরুষ মানুষ যেভাবে একা গার্জিয়ান হিসাবে একটা পরিবারকে সুরক্ষিত করতে পারে বা রাখে, আমার আসমানীও একইভাবে সে সমপরিমান দায়িত্ত নিয়ে একটা সংসার সামলাতে পারবে। আমি অনেক খুসী। কিন্তু তারপর…।

এই পর্যায়ে এসে মুক্তার সাহেব একটা বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেট ধরালেন। কফির কাপে চুমু দিলেন। তারপর আমাকে তিনি প্রশ্ন করলেন- বলুন তো, একটা মানুষের জীবন সুখী হয় কি কি জিনিষ থাকলে?

আমি বললাম, টাকা থাকলে, সম্পদ থাকলে, সমাজে একটা ভালো পজিসন ইত্যাদি থাকলে আর যদি শরীর সুস্থ থাকে, তাহলে তো সে সুখী মানুষ বলেই গন্য হয়। মুক্তার সাহেব একটু মুচকী হাসলেন। তারপর বললেন,

তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন, রাস্তায় যে সব মানুষ ভিক্ষা করে, তারা কেউ সুখী নয়? কিংবা যাদের এক ফোটা সম্পদ নাই, তারা কি সুখী নয়? অথবা সমাজে যারা অনেক বড় বড় পজিশন নিয়া নাই, তারা কি সুখী নয়? অথবা যদি বলি, বিছানায় অবশ হয়ে পড়ে থাকা সব মানুষই কি দুখী? তারা কি কোনো না কোনো স্তরে সুখী না? যদি এমন হতো যে, টাকা আছে, পয়সা আছে, অঢেল সম্পদ আছে, সমাজে মানসম্মান প্রতিপত্তি আছে আবার শারীরকভাবে সুস্থও আছে, তারা তাহলে কিসের নেশায় নিজের ঘরে থাকা সুন্দুরী স্ত্রীকে রেখে পুনরায় পরকীয়ায় মেতে উঠেন? সবাই কি পারভার্ট? নাকি যৌনতাই প্রধান? অথবা যদি বলি যে, ৯০ বছরের এক ব্রিদ্ধ যখন তার অঢেল টাকা পয়সা ব্যাংক ব্যালেন্স থাকার পরেও নিজের ৮৫ বছরের স্ত্রীর বিয়োগে আরেকটা বিয়ে করতে মানিসকভাবে প্রস্তুতি নেন, যখন তার যৌনতায়ও কোনো ক্ষমতা নাই, সে তাহলে এটা কিসের নেশায় করে? আমি অবিশ্বাস করছি না যে, সবক্ষেত্রেই আমার এই প্রশ্ন সঠিক বা সঠিক নয়, তবে এর অন্তরনিহিত গুঢ় রহস্য খুজতে গেলে দেখা যাবে, এসবের কোনটাই এর উত্তর  নয়। উত্তর লুকিয়ে আছে শুধুমাত্র না দেখা একটা অনুভুতিতে। আর সেটা হচ্ছে- একাকীত্ত বা নন একোম্প্যানিয়ন।

আমি কিছু বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মুক্তার সাহেব তার হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে আবার বলতে লাগলেন-

হ্যা, হয়তো আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই একাকীত্ত কি বা এই নন-একোম্প্যানিয়ন এর মর্মার্থ কি। এটা বুঝবার জন্য আপানাকে কিছু সুক্ষ জিনিষের ভিতরে ঢোকতে হবে। আর সেটা হচ্ছে-অনুভুতি, আবেগ, তার সাথে মানবিক চাহিদা। মানবিক চাহিদার সাথে শারীরিক চাহিদার একটা যোগসুত্র থাকতে পারে যা আমি পরে বল্বো। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি আপনাকে ছোট একটা উদাহরন দেই। কখনো কি উপলব্ধি করেছেন যে, A person can be lonely in a crowdy city? অথবা কখনো কি ভেবেছেন যে, an one-month infant baby who has no idea about the world or even does not know how to talk, does understand our any language, can be a good accompanist as well!! অর্থাৎ একটা কোলাহলপুর্ন জনসমুদ্রের মধ্যেও কেউ একা। আশেপাশে হাজার হাজার লোক ঘুরছে, ফিরছে, খাচ্ছে, তামাশা করছে, আনন্দ করছে অথচ কোনো একজন এই ভীড়ের মধ্যেও একা। আবার অন্যদিকে দেখবেন, অনেক আপন লোকজন আপনার আশেপাশে আছে, কথা শুনার মতো লোকজনও আছে, কিন্তু তাদের থেকে আপনার কাছে মনে হবে একটা অবুঝ বাচ্চা যে কথাই বলতে শিখে নাই, যে আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝে না, তারসাথেও আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারছেন। অথচ তার সাথে আপনি বিজ্ঞান নিয়ে আলাপ করতে পারেন, মহাকাশ নিয়া আলাপ করতে পারেন, কখনো সে কোনো কারন ছারাই কেদে দেবে, কখনো সে চার হাত পা নেড়ে নেড়ে কি জানি ভাব প্রকাশ করবে যার সাথে আপনার বিষয় বস্তুর কোনো মিল নাই, অথচ আপনি খুব ভালো সময় কাটাচ্ছেন। এই নবজাতক এক মাসের বাচ্চাটাও আপনার খুব ভালো সংগি হয়তো। এই অনুভুতী কি বুঝেন? আর এখানেই মানুষের সুখ এবং সাথীর সাথে আপনার চিরবন্ধন। এই বন্ধন থেকে আপনি কখনোই টাকার বিনিময়ে, সম্পদের বিনিময়ে, কিংবা আপনার সামাজিক উচ্চতার মাপকাঠিতে মুক্ত হতে পারবেন না। যতো বিপদই আসুক, যতো খারাপ সময়ই আসুক, এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।   

মুক্তার সাহেবের এই যুক্তি বুঝতে আমার বেশ অনেক সময় লেগেছিলো। হয়তো আমি আমার ছোট এই মস্তিষ্কে ব্যাপারটা তখনো ধরে উঠতে পারি নাই। কিন্তু যখন তিনি তার কাহিনিটার প্রায় শেষে, তখন আমার একটা কথাই মনে হয়েছিলো যে, যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, অথবা থাকে ভিতরের কিছু কথা যা বলার জন্য মন ছটফট করে, তাহলে সে সবসময়ই চাইবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুক্ষটা, কষ্টটা, কিংবা অনুভুতিটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক বা না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই ব্যাপারগুলি শেয়ার করা দরকার। যখন এই লোকগুলি আর কাছে বসে তাকে আর সময় না দেয়, কিংবা যদি এমন হয় যে, তার এই ব্যাপারগুলি সে কারো কাছে আর শেয়ার করতে পারলো না, তখনই সে অনুভব করে, সে একা। আর এই একাকিত্ত মানুষটাকে ‘সময়’ নামক দানব বা বাহক ধীরে ধীরে সবার থেকে আলাদা করে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে খোজে কে আছে তার এই আবেগগুলি শোনার? আর যে শুনবে, তারই জিত, আর যারা শুনবে না, তারাই আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় এই মানুষটার গন্ডি থেকে। সে যেই হোক, হোক তার স্ত্রী, হোক তার প্রানের সন্তান অথবা প্রিয় বন্ধুবান্ধব। অন্যদিকে, আরেকদল, যারা এই সুযোগ লুফে নেয়, সে যতোই অশিক্ষিত হোক বা অসুন্দর, কিংবা তুলনামুলক ভাবে নিম্নধাপের, তাতেও কিছুই যায় আসে না, তারাই হয়ে উঠে তার মনের মানুষ, কাছের মানুষ। আর তাই বারবার তার এই একাকিত্তে ভোগা মন ছুটে যায় তাদের কাছে যারা তাকে সময় দেয়, দেয় একটা কম্প্যানিয়ন।

আমি মুক্তার সাহেবকে প্রশ্ন করলাম, তাহলে কি এমন একাকিত্তে আপনি ভোগছিলেন যেখানে শেষ অবধি মনে হলো যে, এই ৩৩ বছর একসাথে থেকেও আপনি আসমানীর থেকে একা? অথবা কি এমন কারন ছিলো যা আপনাকে সবার থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়েছে এই সাজানো সংসার, পাতানো সুখী জীবন থেকে?

মুক্তার সাহেব আবারো মুচকী হেসে বললেন,

কই নাতো? আমি তো এই সাজানো সংসার বা পাতানো জীবন থেকে সরে যাইনি। ওই যে আপনাকে আগেই বলেছিলাম যে, বলীর সব পাঠা সবসময় বিষাক্ত হয় না। আর যদি হয়ও, আর যদি পাঠাটাকে বলী দিতে গেলে অনেক বিপদের সম্ভাবনা থাকে, কিংবা অনেক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাঠা বিষাক্ত হলেও তাকে কোন না কোনভাবে পুনরায় শুদ্ধ করে ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলেই পরিবেশন করা হয়। আমিও ঠিক সেরকম ঝলমলে টেবিলেই এখনো আছি। তবে এই ‘আছি’র মধ্যে অনেক অংশ জুরে আছে  আসলেই’ নাই’ আর অনেক অংশ জুরে আছে কিছু দায়িত্তবোধ। আমি ‘আছি’ আর আমি ‘দায়িত্তে আছি’ এই দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। জেলখানায় বন্দি কয়েদির পাশে কোন এক মানুষ যখন বলে, ‘আমি আছি’ তোমার পাশে, এর মানে কি, সেটা তো আপনি নিশ্চয় বুঝেন। এর মানে, কখন তার কি করলে এই জেলখানা থেকে তার মুক্তি মিলবে, অসুস্থ হলে দূরপাল্লা পথ অতিক্রম করে সে তখন চোখে জলভরা চাহনীতে আপনাকে দেখতে আসবে, আপনার কষ্টে সে ব্যাথিত হবে, আপনাকে সে প্রতিনিয়ত মিস করবে। আপনার একাকিত্তকে সে মিস করবে ইত্যাদি। কিন্তু সেই প্রহরী যে আপ্নার দায়িত্তে আছে, তার ভুমিকা নিশ্চয় এক নয়। কয়েদির দায়িত্তে থাকা প্রহরীর কাজ যেনো কোনোভাবেই এই বন্দি পালাতে না পারে, এটাই তার প্রথম দায়িত্ত।  কাছে থাকা আর দায়িত্তে থাকা কখনোই এক নয়। আমার কাজ যেনো সেই দায়িত্ত যাতে আমার এই সাজানো সংসার ভেংগে না যায়, আমার দায়িত্ত সেটা যাতে আমার অন্তত এই জীবদ্দশায় আমার আসমানীর জীবনে কোনো কষ্ট না আসে, আমার সন্তানের কোনো বিপর্জয় না আসে।

মুক্তার সাহেব আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা আগে দিলেন। তারপর তিনি শুরু করলেন আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর। আমি তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি বাক্য এতো তন্ময় হয়ে শুনছিলাম যে, মনে হচ্ছিলো আমি কোনো ফিলোসোফির ক্লাশে উচ্চমানের কোনো তত্তকথা শুনছি। বারবার মনে হচ্ছিলো, মুক্তার সাহেব জীবনকে যেভাবে দেখেন, আমরা হয়তো এর বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে দেখি। আমরা যখন অন্দর মহলের আগরবাতির গন্ধটা আনন্দ করি, তখন মুক্তার সাহেব এই আগরের গন্ধের সাথে সাথে আগরের জ্বলে পড়ে ছাই হবার কষ্টটাও দেখেন। আমরা সাধারনভবে যাকে প্রকৃতি বা ন্যাচার বলি, মুক্তার সাহেব এটাকে শুধু ন্যাচার বলে ঘটনাপ্রবাহ এড়িয়ে যান না। তিনি এর অন্তরনিহিত কারনগুলি খোজেন। আর সেই কারনের মধ্যেই যেনো আসল রুপ আর ঘটনা ঘটার সবগুলি উপাদান খুজে পান। মুক্তার সাহেব এবার বলতে শুরু করলেন-

জীবন একটাই। আজ থেকে শতবর্ষ আগে সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজের জন্য যখন তাজমহল তৈরী করেন, তার ওই তাজমহল কতটা ভালোবাসা প্রকাশ করেছে সেটা জানার চেয়ে আমরা কি কখনো এভাবে ভেবে দেখেছি যে, সম্রাট কতোটা কষ্ট থেকে এই তাজমহল বানিয়েছেন? তাজমহলের ইমারতে কি সেই কষ্ট আমরা দেখতে পাই? আমরা যা দেখি, তা হচ্ছে শাহজাহানের ভালোবাসার নিদর্সন। যা দেখতে পাই, তা হচ্ছে মুল্যবান রত্নে খচিত একটা দামী প্যালেস। কিন্তু আমি যদি বলি এটা সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসার মৃত্যুর নিদর্সন? তাহলে কি ভুল হবে? যদি বলি এটা ভালোবাসার কষ্ট থেকে নির্বাসিত এক রাজার মনের কষ্টের আকুতি বা অনুভুতি? তাহলে কি ভুল কিছু বলা হবে? হয়তো দুটুই ঠিক। এখন আমার অনেকগুলি প্রশ্ন জাগে, সম্রাট শাহজাহানের ২য় স্ত্রী ছিলেন এই আরজুমান্দ বানু বেগম ওরফে মমতাজ। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন কান্দাহারী বেগম। রানী মমতাজ ছাড়াও সম্রাটের জীবনে আরো আটজন রানী এসেছিলো। তাহলে সম্রাট শাহজাহান শুধুমাত্র মমতাজের জন্যই এতোবড় একটা বিশ্বনন্দিত মহল তৈরী করলেন কেনো? আর কারো জন্যে নয় কেনো? এর অন্তর্নিহিত অনুভুতি হয়তো শুধু জানেন শাহজাহান নিজে। আমার মাঝে মাঝে এইরকম প্রশ্নও জাগে যে, এতো বড় বড় নাম যাদের, তারা কেনো একটিমাত্র নারীকে নিয়ে জীবনে সুখী হতে পারলেন না? তাদের তো কোনো টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জত, প্রতিপত্তি, ক্ষমতার দাপট কোনো কমতি ছিলো না? তাহলে আবারো আমার ওই যে সেই আগের কথা ফিরে আসে। তারমানে, শুধু টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জর সম্মান প্রতিপত্তিই সুখী বা খুসী জীবনের একমাত্র ভিত্তিপ্রস্তর নয়। এর বাইরেও কিছু আছে যা যুগে যুগে প্রমানিত হয়েছে।

আরেকটা ছোট তত্ত আমাদের সবার জানা থাকা দরকার যে, মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছুই মেনে যায়। আর সেই মেনে যাওয়া আর মেনে নেয়ার মধ্যেও একটা ফিলোসোফি থাকে। মানূশ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো কিছুর আশায় হয়তোবা অনেক কিছুই নিজের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানিয়ে নেয়। কিন্তু যখন সেই আশার সফলতা পায়, তারমধ্যে তখন ‘আমিত্ত’ কাজ করে। তারমধ্যে তখন বৈতরনি পার হয়ে নিরাপদ জোনে চলে আসায় সে তখন  অনেক কিছুই আর আগের মতো অনুগত নাও থাকতে পারে। ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে আমার আসমানির মধ্যে। আমি বলছি না যে, সে সীমা অতিক্রান্ত করে আমাকে হেয় করছে কিন্তু একতা তাচ্ছিল্যের ভাব তো তার অজান্তেই আছে এতা তো ফেলে দেবার মতো নয়।

যে আস্মানীকে আমি যাই উপদেশ দিয়েছি, বিনা বাক্যে, বিনা দ্বিধায় সে সেটা বেদবাক্য মনে করে অন্ধবিশ্বাসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালন করেছে। আজ আমি সেই আসমানীকে খুজে পাই না। এর মানে এইটা নয় যে, সে আমার কথা শুনে না বা শুনতে চায় না। কিন্তু তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যখন আমাদের অনেক কিছু ছিল না, তখন একটা রিক্সায় করে মাইলকে মাইল ঘুরেও আমাদের আনন্দ হয়েছে যা এখন এসি গাড়িতেও পাওয়া যায় না। একটা সময় ছিল যখন আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা কি করলে কি হবে, কি করলে আরো ভাল হবে, সেটা নিয়ে কোনো তর্কবিহীন আলাপ আলোচনা শলা পরামর্শ হয়েছে। আজ যেটা করা তো দুরের কথা, আলোচনা করার জন্য পরিবেশও নাই। আমি বলতে চাইলেও তার হয়তো সময় নাই শোনার। এর মানে এই নয় যে, সে আমাকে অগ্রাহ্য করছে। আমি বলতে চাচ্ছি, এটা নিয়ে আর কোনো শলা পরামর্শ হয় না। একটা সময় ছিলো যখন, আমার প্রিয় খাবারগুলিই শুধু টেবিলে শোভা পেত, যা এখন আমাকে বলেই দিতে হয় হয়ত এটা নয় ওটা খাইলেই মনে হয় ভালো লাগতো। কখনো কখনো ইচ্ছে না থাকলেও তাদের পছন্দের খাবারের তালিকাটাই এখন আমার খাবারের তালিকা করে নিতে হয়। এর মানে এই নয় যে, আমি বললে সেটা তৈরী করা হবে না। কিন্তু আগে এটা বলতে হয় নাই। সমৃদ্ধ জীবনের চেয়ে অভাবী জীবনে অনেক বেশী প্রেম আর ভালোবাসা থাকে। যদিও সেখানে ঝগরাও থাকে, তবে সেই ঝগড়াটাও একটা ভালোবাসার অন্য রকমের বহির্প্রকাশ।

জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন আপনাকে নিয়ে কেউ আর হৈচৈ করবে না। কিন্তু আপনার প্রয়োজন তাদের কাছে ফুরিয়েও যাবে না। আপনি আছেন কারো কারো প্রয়োজন মিটানোর জন্যই। আপনার কখন একটু ছাদে হাওয়া খেতে ভাল লাগবে, সেই হাওয়া খাওয়ার সময় আগে তো একজন আসমানীর সংগ পাওয়া যেতো কিন্তু এখন তার জগত অনেক বিশাল। এখানে আপ্নিই একমাত্র মানুষ নন যাকে ঘিরে তার দিনের সিংহভাগ সময় আরাধনায় কাটবে। এর মানে আবার এই নয় যে, আসমানি অন্য কাউকে মন দিয়ে বসে আছে। আগে আপানার অনুপস্থিতি হয়তো তাকে একা করে দিতো বটে কিন্তু এখন সেটা সেরকম নয়। কেনো যেনো মনে হয় কি যেনো মিসিং। এখন সম্পর্কটা যেনো একটা শোষনের পর্যায়ে নেমে গেছে। মানসিক টর্চারের মতো মনে হয় কিছু কিছু সময়। আর বারবারই আমার কাছে এটাই মনে হয়েছে যে, দূর্বল সময়টা ওরা সবাই পেরিয়ে গেছে বলেই হয়তো এখন আর আগের মতো সব কিছুতেই বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে এমনটা না। ব্যাপারটা জানি কেমন, সব না মানলেও তো সমস্যা তেমন নাই। উত্তর আর প্রতি-উত্তরের জামানা মনে হয় এখন, যেটা আগে ছিলো না। কম্প্রোমাইজ আর সাইলেন্ট থাকাই যেনো এখন সময়। কিন্তু এটা তো আমি চাইনি?

ভালোবাসার যেমন একটা শক্তি আছে, অনিহারও একটা বিপদ আছে। অনিহার অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইমোশন যখন ধীরে ধীরে বুদবুদের মতো অন্তরে জমা হতে থাকে, একসময় সেটা সারা অন্তর জুড়েই এমনভাবে বিচরন করে যেনো ভালোবাসার বুদবুদের আর কোনো স্থান থাকে না। অথচ আগের সে ভালোবাসার বুদবুদ গুলি তখনো মরে যায় নাই, বেচেই আছে কিন্তু কোনঠাসা হয়ে। তখন এই কোনঠাসা ভালোবাসার অতৃপ্ত বুদবুদগুলি জলবিহিন মাছের মতো অতি অল্প পরিসরে ছটফট করে, এক সময় কোনো এক দূর্বল ছিদ্র দিয়ে মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসে। যখন এই ভালোবাসার বুদবুদগুলি একসাথে ঝাকেঝাকে বেরিয়ে আসে, তখন সেটা খুজতে থাকে কিছু নিরাপদ আশ্রয়। আর সেই নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাড়ায় মাধুরীর মতো কিছু অসহায় মানুষ যারা একে স্থান দেয় সেই পূর্বেকার আসমানীদের মতো যখন আসমানীরা এক সময় দূর্বল ছিলো, সাবলম্বি ছিলো না। সেই স্থানটা তখন দখল করে নেয় মাধুরীরা। তখনই ঘটে এক বিপ্লব। যে বিপ্লবের নাম, ওই যে বললাম, ‘আমি আছি’ আর  আমি দায়িত্তে আছি’র মতো বিপ্লবে।

এবার, আপ্নিই বলেন, এই অতৃপ্ত আত্তা, এই শুষ্ক হৃদয় কখন কোথায় ভিজে আবার উজ্জিবিত হয় সেটার নির্ধারন করে কে তাহলে? এটা হয়তো আসমানিদের দোষ নয়, না মুক্তার সাহেবদেরও। এটা সময়ের একটা চক্র যখন কোনো মরুভুমি আচমকা কোনো অঝর ধারায় ব্রিষ্টির জ্বলে সবুজ ঘাসের মাঠে রুপান্তিত হয়। প্রকৃতি মনে হয় এরকমই।

এতোক্ষন আমি মুক্তার সাহেবের কথাগুলি খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। কোথাও আমি মুক্তার সাহেবের অপরাধ বলে মনে হলো না। আবার এটাও মানা যায় না যে, কেনো এতো বছর পর আসমানিরা বদলে যায় কিংবা মুক্তার সাহেবেরা ছিটকে পড়ে যায় আরো একটা আসমানীর কাছে যাদের নাম মাধুরী। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। বিশ্বাস আর ভরষার যখন মৃত্যু হয়, তখন শারীরিক দুরুত্ত অনেকগুন বেড়ে যায়। আর এই দুরুত্ত বাড়ার সাথে সাথে তখন ‘সময়’ নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। এই সময় ইচ্ছা থাকুক আর নাইবা থাকুক, অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নেয় আসমানীরা, আবার আসমানীরা আছে, এতা জেনেও মেনে নেয় মাধুরীরাও। মেনে নিতে শিখতে হয়। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ দুজন মানুষের মধ্যে যখন ভালোবাসার এই অপুর্নতার স্রিষ্টি হয়, তখন কোনো একজন তার কাংখিত সুখ কিংবা একাকিত্ত কাটানোর জন্য সেই সপর্কের বাইরে যেতেই পারে। আর যখনই পা একবার বাইরে ছুটে, তখন, তাকে আর বিয়ে নামক অলিখিত বায়বীয় সম্পর্কটা আর শক্ত ভীত তৈরী করতে সক্ষম হয় না। প্রবল স্রোতে তীর ভাংগা পারের মতো প্রতিতা ক্ষনেক্ষনে এর ভাংগনের শব্দ পাওয়া যায়। আর যখন এই ভাংগা একবার শুরু হয় তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। হয় তাকে মুক্ত করে দিতে হয়, আর তা না হলে মেনেই নিতে হয়। কাউকে জোর করে কিছুক্ষনের জন্য হয়তো চুপ করিয়ে রাখা যেতে পারে কিন্তু সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। ফলে একদিকে যেমন আসমানীরা তাদের অধিকার ছেড়ে দিতে চায় না, আবার অন্যদিকে  মুক্তার সাহেবদের জন্য তাদের সময়েরও অনেক ঘাটতি থাকায় তাদের ধরেও রাখা যায় না। অগাধ সম্পত্তির বিবেচনায় একটা কথা ঠিক যে, পৃথিবীতে এমন কিছু সম্পর্ক আছে যা সব সম্পত্তির থেকেও বড়। আর সে সম্পর্কটা হচ্ছে অনুভুতির সম্পর্ক। আর মুক্তার সাহেবরা হচ্ছেন এমন এক সপর্কের নাম, যারা সাফল্যের সিড়ি বেয়ে বেয়ে উপরের তলায় স্থান করে নিয়েছেন। তাদের এই সাফল্যের একটা ফেসভ্যালু থাকায় তাদেরকে সবাই ছেড়েও যেতে চায় না। সীমা লঙ্ঘন আর সীমা শেষ এক জিনিষ নয়। আসমানি, মাধুরী আর মুক্তার সাহব্দের এই ত্রিমাত্রার সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যেখানে সিমা লংগন হয়েছে কিন্তু সীমা শেষ হয়ে যায় নাই। তারা সবাই যেনো দুক্ষের খাচায় বন্দি। আর এটাই সত্যি। সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না। আর কোনো  কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব। মুক্তার সাহেব আরো একটা কাপে কিছু কফি আর আরেকটা সুগারেট ধরিয়ে বলতে লাগলেন যে,

যেদিন আমি প্রথম আসমানীকে দেখেছিলাম, ঠিক একই রকম ভাবেই আমি দেখেছিলাম এই মাধুরীকে। (চলবে)

২৩/১২/২০১৯-কিছু কিছু অপেক্ষার প্রহর অনেক লম্বা

কিছু কিছু অপেক্ষার প্রহর অনেক লম্বা। এই প্রহরগুলি কাটতে চায় না। মন উতালা করে, মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। আবার এই মনই নিজেকে শান্তনা দেয়। অদ্ভুত না এই “মন” বিষয়ক ব্য্যাপারটা?? কখনো কখনো হাজার বছর এক সাথে থেকেও কেউ কেউ আপন হয় না। আবার কেউ কেউ ক্ষনিকের মধ্যেই কেনো যেনো মনে হয়, আরে এই তো সে, কই ছিলো? কিন্তু এটাও হয়তো সত্য নয়। আবার সত্যও হতে পারে। মানুষের বাচার জন্য চাই একজন সুরক্ষাকারী বটবৃক্ষ। আর দরকার সেই বটবৃক্ষের তলায় হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার মতো কেউ একজন।

অনেক সাধ আমাদের জীবনে, কিন্তু সাধ্য না থাকায় মাঝে মাঝে মনে হয়, এমন কি কেউ নাই যে আমাকে একটা পথ বাতলে দেয় যে, এখানে এইটা করো, তবেই না পাবে তুমি তোমার মনের ইচ্ছা পুরনের চাবিটা!! শুধু খেয়ে পড়ে বেচে থাকার নামই জীবন না। এর বাইরেও কিছু থাকে। নতুন নতুন জায়গায় অনুসন্ধান করে জীবন শুধু পিছিয়্যেই পড়ে, সামনে যেনো আগাইতেই চায় না। জীবনে সম্ভবত স্থিতি আসা খুব জরুরী। হোক সেটা কোনো এক মান্দাতার আমলের আদলেই। তাই হয়তো পরান জায়গাতেই আসল সুখের সন্ধান রয়েই যায় যা প্রথম চোখে পড়ে নাই। সব সময় পরিস্কার আকাশই মানুষকে উদ্বেলিত করে না, কোনো কোনো সময় মেঘলা আকাশও মানুষকে উদ্বেলিত করে। কিন্তু আমি সবসময়ই ঝড়ো আকাশকে ভয় পাই। ভয় পাই এই কারনে যে, থাক……

২৮/০৫/২০১৬-আশ্বিন মাসের ভোরবেলায়

আশ্বিন মাসের ভোরবেলায় অতি ঈষৎ নবিন শীতল বাতাশে নিদ্রোত্থিত দেহে তরুপল্লব যেমন শিহরিত হয়, ভরা গঙ্গার উপর শরত প্রভাতের কাচা সোনা রোদ যেভাবে চাপা ফুলের মত ফুটে উঠে, আজ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার দুরন্ত যৌবন জোয়ারের জলের মধ্যে রাজ হাসের মত ভেসে উঠেছে। আপনি এতদিন হয়ত দিনের আলো কিংবা রাত্রির ছায়ায়তা  দেখতে পান নাই, কিন্তু আজিকার এই বর্ষণ আপনার পঞ্জরে পঞ্জরে ঘৃতকুমারি নৌকার মত চারিদিকে ঘুরপাক খেয়ে আপনার চারিগাছি মল অনবদ্য এক প্রেমের সুচনা করেছে। অপেক্ষা করুন সে আসবে, আর সে আপনার জন্যই আসবে। যখন সে আসবে, দেখবেন ঐ দুরের ঘাটে যে ফিঙেটি বাসা বেধেছে সে কোন এক ভোরে উসুখুসু করে জেগে মৎস্যপুচ্ছের ন্যায় তার জোড়াপুচ্ছ দুই চারিবার দ্রুত নাড়াইয়া শিস দিয়া আকাশে উড়িয়া যাইবে। অথবা পাশের বাসায় কোন এক কোকিল উচ্চস্বরে ডাকিয়া কুহু কুহু গানে কলরব করিবে। তখন আপনার এই ইচ্ছা, এই সাধ বৃষ্টিতে ভিজার জন্য আর অপূর্ণ থাকবে না। 

০১/০৬/২০১৬-গল্পটা যদি এমন হতো?

এক যে ছিল রাজকুমার, আর এক যে ছিল রাজকুমারি। রাজকুমার রাজকুমারিকে আর রাজকুমারি রাজকুমারকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু হটাত করে কোন এক দিন রাজকুমার হারিয়ে যায়। দিন যায়, রাত যায়, মাস যায় বছর আসে, বর্ষা যায় শিত আসে, রাজকুমারি পথ চেয়ে বসে থাকে। কিন্তু রাজকুমারের কোন হদিস মেলে না। চোখের সবগুলো স্বপ্ন নিয়ে আর অশ্রুভরা নেত্রে রাজকুমারি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জস্না দেখে, চাদের পানে চেয়ে ঐ চাদের বুরির সঙ্গে একাই কথা বলে।  কত রাজ কুমার এলো গেলো। কিন্তু রাজকুমারীর কোন রাজকুমারের প্রেমেই পরতে পারলেন না। তার রাজ্য চাই না, জহরত চাই না, সোনার পালঙ্ক চাই না। তিনি শুধু রাজকুমারের জন্য পথ চেয়ে থাকেন।

একদিন হটাত কোন এক বসন্তের সকালে মাথা ভর্তি এলো মেলো চুল নিয়ে, উসুখুসু খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে রাজকুমার এসে হাজির। রাজকুমারি তার জীবনের সব আনন্দ আর ভালবাসা দিয়ে রাজকুমারকে জরিয়ে ধরে শুধু বললেন, আমাকে একা ফেলে তুমি কোথায় গিয়েছিলে রাজকুমার? আমি তো তোমার পথ চেয়েই এতটা দিন, এতটা সময় পার করে দিয়েছি, একবারও কি মনে পরে নাই আমায়? তুমি কি আমার ভালোবাসার স্নিগ্ধ ঘ্রান কখনোই পাও নাই রাজকুমার? এই বুকে কান পেতে দেখ, কি উত্তাপ আর কি যন্ত্রনা নিয়ে আমি এই এতগুল বছর তোমার প্রতিক্ষায় অপেক্ষা করে আছি! আমাকে তুমি তোমার বুকের ভিতরে একটু জায়গা দাও রাজকুমার। আমি বড় ক্লান্ত, আমি আজ অনেক অবসন্ন। আমাকে জোর করে ধরে রাখ এবার। আমি তোমাকে আর কখনো হারাতে চাই না কুমার।

রাজকুমার তার পকেট থেকে একটি ছোট ঘাস ফুল বের করে রাজকুমারির ঘন কালো চুলের খোঁপায় গুজে দিয়ে বললেন, এই হোক সাক্ষী আজ তোমার আর আমার প্রেমের আলিঙ্গনের। আমাদের সুতীব্র ভালোবাসার।

দিন যায়, রাত যায়, বড় ভাল জীবন কাটছিল রাজকুমারের আর রাজকুমারির। একদিন হটাত রাজকুমারের অন্তর্ধান হয়। রানী আবারো একা বসে থাকেন ঐ বেলকনির রেলিং ধরে। সন্ধায় চিল কাতুরের ডাকে তার মন ভারি হয়ে আসে। জোনাকির ডাকে তার সব অতিতের কথা মনে হয়। মনে হয় রাজকুমার তার পাশেই হাত ধরে বসে আছেন। কিন্তু না। সব আশা, আহ্লাদ, সব স্মৃতি মলিন করে দিয়ে তার গরভের অনাগত সন্তানের নড়াচড়ায় সম্বিত ফিরে আসে।

আজ নতুন রাজকুমার এসেছে তার জীবনে। হাটি হাটি পা পা করে ছোট রাজকুমার বড় হতে থাকে। একদিন সে কথা বলতে থাকে। ছোট রাজকুমার কে মা রাজকুমারি কতই ই না গল্প শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে দেন। কিন্তু রাজকুমারি সব সময় একই গল্প বলতে থাকে……… এক যে ছিল রাজা আর এক যে ছিল রানী। তাদের ছিল এক রাজপুত্তর। রাজপুত্রকে নিয়ে রাজা আর রানী বড় ভালবাসায় জীবন কাতাইতেছিলেন। একদিন হটাত করে রাজা হারিয়ে যান কোন এক গহিন জঙ্গলের ভিতর। রাজপুত্র ধীরে ধীরে বড় হয়। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, মা আমার বাবা কই? রানী চোখের জল মুছে ছোট রাজপুত্রের কপোলে চুমি খেয়ে বলেন, তোমার বাবা একদিন ঘোড়ায় চরে টকবক করে ঐ গহিন জঙ্গল থেকে আমাদের নিতে আসবেন। তুমি বড় হও। রাজা ফিরে না এলে আমরাই তাঁকে খুজে আনবো। ছোট রাজপুত্র ঐ গহিন জঙ্গলের রহস্য বুজে উঠতে পারেন না। শুধু মাকে জরিয়ে ধরে থাকে আর বলে, মা আমি তোমায় খুব ভালবাসি।

৩১/০৫/২০১৬-যেদিন দেখবেন আকাশের মেঘ মালা

যেদিন দেখবেন আকাশের মেঘ মালা আপনার জগতের কাছে শেষ বর্ষণ হয়ে আপনার পায়ের কাছে টাপুর টুপুর করে লাফিয়ে পরছে, যেদিন দেখবেন ঐ পাশের জঙ্গলের ভিতর অবহেলায় কোন এক রজনি গন্ধার সুবাস আপনার নাশারন্দ্রে ভেসে আসছে, যেদিন দেখবেন চারিদিকের মানুষ গুলো আপনাকে দেখে কোন কারন ছারাই আর আপনাকে সেই আগের মত করে দেখছে না কিন্তু মিটি মিটি করে হাসছে আপনার নতুন ভালোবাসার অববয়বে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীতে আরও অনেক বছর বাচতে ইচ্ছে করবে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীর সব রঙ সুন্দর, যেদিন মনে হবে আপনার হাসতে ভাল লাগে, কাদতে ভাল লাগে, একাকী বসে জানালায় পাখি দেখতে ভাল লাগছে, অথবা যেদিন দেখবেন চোখের জলের মধ্যে অফুরন্ত কষ্টের মাঝেও মন বড় উতালা হয়ে আছে কোন এক অস্পৃশ্য মানুষের জন্য, যেদিন দেখবেন সোনালী রোদ আপনাকে উদ্ভাসিত করে, যেদিন দেখবেন জোড়া শালিক না দেখেও আপনার মনে হবে এই বুঝি আজকে ও আসবে, সেদিন আপনার এই অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে দেখবেন মাঘের পরে ঐ দিগন্তে দাড়িয়ে আছেন তিনি যাকে আপনি এতদিন ধরে খুজছেন। আপনার আর কোন কিছুর জন্যই কাউকে কিছুই বলার নাই। শুধু আপনি আর থাকবে বনলতা সেনের মত সেই মানুষটি, বলবেন তখন, ………এতদিন কোথায় ছিলেন? 

বলুন না কোথায় তাঁকে দেখেছেন প্রথমবার?

৩০/০৫/২০১৬-অপেক্ষার অনেক নাম

অপেক্ষার অনেক নাম। কখনো কষ্ট, কখনো সুখ, কখনো উদাসীনতা আবার কখনো শুধুই ভালবাসা। আজ আপনার এই অপেক্ষার নাম কি সুখ আর ভালবাসা? সার্থক হোক সে মিলন, আর সার্থক হোক আপনার চিত্ত। অহংকারীরা দেখুক আপনার দিবসের মুখদ্ধকর সীমাহীন আনন্দের চ্ছটা আর নিন্দুকেরা জ্বলে পুড়ে মরুক নিজ দাবগাহনে। আপনার ইচ্ছাই আপনাকে নিয়ে যাবে স্বর্গের ঐ নীল জানালায় যেখানে বসে আপনি রাতের কালো আকাশে ধ্রুবতারা দেখবেন আর নিজেকে অস্পৃশ্য কোন এক মানুষের পাশে ঠায় দাড়িয়ে অরুন্ধতী হয়ে কাল পুরুষকে ছারিয়ে সকালের লাল সূর্যের দিগন্ত রেখা ছুয়ে দেবেন। আমার সকল শুভ কামনা রইল আপনার জন্য। আপনার সবার জন্য।

১৫/০৫/২০১৬-রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে

রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে মৃন্ময়ীর বাল্য আর যৌবনকাল কিভাবে দ্বিখণ্ডিত হইয়া গিয়াছিল তার চমৎকার একটা বর্ণনা করিয়াছিলেন ঠিক এইভাবে-” নিপুন অস্ত্রকার এমন সূক্ষ্ম তরবারি নির্মাণ করিতে পারে যে, তদ্বারা মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করিলেও সে জানিতে পারে না, অবশেষে নাড়া দিলে দুই অর্ধখন্ড ভিন্ন হইয়া যায়। বিধাতার তরবারি সেইরূপ সূক্ষ্ম, কখন তিনি মৃন্ময়ীর বাল্য ও যৌবনের মাঝখানে আঘাত করিয়াছিলেন সে জানিতে পারে নাই। আজ কেমন করিয়া নাড়া পাইয়া বাল্য- অংশ যৌবন হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িল এবং মৃন্ময়ী বিস্মিত হইয়া ব্যথিত হইয়া চাহিয়া রহিল।”

আমিও যেদিন এই অস্পৃশ্য পুরুষটাকে প্রথম আমার অন্তরদৃষ্টি দিয়া দেখিয়াছিলাম, তখন আমিও ব্যথিত হৃদয়ে বুঝিতে পারিলাম, আমার আর বাল্যকাল বলিয়া কিছুই অবশিষ্ট নাই। আমার বাল্যকাল আমার অজান্তেই আমা হইতে কবে বিদায় নিয়া চলিয়া গিয়াছে, আমি বর্ষার কিংবা শরতের অথবা শীতের কোন ঋতুতেই তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যখন বুঝিতে পারিলাম, তখন আমার শুধু এইটুকু মনে হইল আম্র কাননের শুভিত কোন পুস্পের জন্য যখন মৌমাছিরা দূর দূরান্ত হইতে উড়িয়া আসে, আমিও তাই। কিন্তু আমার ভ্রম কাটিতে বেশি সময় লাগিল না। আমি যাহাকে পুস্প বলিয়া এতদূর উড়িয়া আসিয়াছি, উহা আসলে অন্য কাহারো বাগানের মৌমাছিমাত্র। সেই বাগানে পুস্প আছে, তাহার সহিত মৌমাছির সঙ্গে তাহার দলবলও আছে। বাগানের মালিও আছে, মালিকও আছে। আমি উহাতে বিচরন করিতে পারি কিন্তু উহা আমার নয়। আমি তাহাকে দূর হইতে আপন ভাবিতে পারি কিন্তু কাছে গিয়া বলিতে পারি না, ইহা আমার। আমি ইহাকে অনুভব করিতে পারি কিন্তু জড়াইয়া ধরিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে পারি না, এই পৃথিবীতে আমি আসিয়াছি শুধুমাত্র ইহার পাজর হইয়া।

আমি যাহা দেখিতে পাইতেছি জগতে তাহা হইতে আরও অধিক সৌন্দর্যের আর অধিক আকর্ষণীয় হয়ত কিছু আছে কিন্তু যাহাকে একবার মনে ধরিয়াছে, তাহা হইতে আরও কোন দামী, আকর্ষণীয় অথবা মূল্যবান হাতের কাছে আনিয়া দিলেও মনে হইবে, আমি উহা চাই নাই। আমি চাহিয়াছি শুধু উহা যাহা আমার কাছে এখন অস্পৃশ্যই। তারপরেও সে আমার। মনের ভিতরের যে জগত সেখানে তো আর এই বায্যিক পৃথিবীর কোন আইন বা আদালতের অস্তিত্ব নাই। তাই নীলিমার আকাশের দিকে তাকাইলেও আমি তাহাকে দেখি আবার ঘন বর্ষার বৃষ্টির ছায়াতলেও আমি তাহাকে দেখি। কখনো সে আমাকে জলের মত ভাসাইয়া লইয়া যায় অতল সমুদ্রের গহিনতলে আবার কখনো সে আমাকে জলের স্রোতে ভাসাইয়া দেয় আমার দুই নয়নের ধারা।    

১৪/০৫/২০১৬-আজ থেকে বহু বছর আগে যখন

আজ থেকে বহু বছর আগে যখন তোমার এই পৃথিবীতে আগমন হইয়াছিল, তারও অনেককাল পরে আমি এই পৃথিবীর নীল আকাশ দেখিয়াছিলাম, লাল সূর্য দেখিয়াছিলাম, বাতাসের গন্ধ শুকিয়াছিলাম। কিন্তু তখন আমার কাছে ঐ নীল আকাশ শুধু নীলই ছিল, সূর্য তখন একটা জলন্ত অগ্নিপদার্থ হিসাবেই ছিল, বাতাসের গন্ধ আমি ভাল করে মনেও করিতে পারি নাই। কিন্তু যেদিন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হইয়াছিল, আমি নীল আকাশের মাঝে নীলমেঘ দেখিয়াছিলাম, ঐ মেঘেরা কিভাবে একস্থান হইতে ভাসিয়া ভাসিয়া অন্যত্র চলিয়া যায় তাহা দেখিয়াছিলাম, ঐ প্রখর সূর্যের আলো আমার অপেক্ষার পালাকেও যন্ত্রনা দিতে পারে নাই, বাতাসের গন্ধের সঙ্গে আমি আরও একটা গন্ধ শুকিয়াছিলাম। আর সেটা তোমার গায়ের গন্ধ, তোমার সুগন্ধির গন্ধ, তোমার ক্লান্তির ঘর্মাক্ত শরীরে গন্ধ।

আজ অনেক বছর হইয়া গেলো, আমি এখনো সূর্যকে দেখি, আমি ঐ নীলাকাশ দেখি, ঐ নীলাকাশের নীল মেঘগুলি দেখি, দক্ষিনা বাতাসের গন্ধও শুকি। সবকিছু আগের মতই আছে বলিয়া মনে হয়। শুধু মনে হয় ঐ বাতাসের সাথে তোমার গায়ের গন্ধটা নাই, তোমার সুগন্ধির গন্ধটা নাই, তোমার গায়ের সেই ক্লান্তির ঘর্মাক্ত গায়ের গন্ধটাও নাই।

আমি অনেক খুজেছি তোমায়, ” শিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে…… “

আচ্ছা তুমি কি কোথাও নাই?

১৩/০৫/২০১৬-কোন একরাতে হটাত

কোন একরাতে হটাত যদি বাইরের আকাশের মুষলধারার বৃষ্টির শব্দে কখনো ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি আমার বেলকনিতে এসে দারাই। উম্মুক্ত সেই বেলকনি, বৃষ্টিরচ্ছটা আমার মুখের চারিদিকে এসে আমাকে ভিজিয়ে দেয়। চোখের চশমাটা ঝাপ্সা হয়ে আসে। আমি মুছতে চাইনা সেই কাচের চশমাটা। আকাশের বিদ্যুৎ ঝলকানিতে আমি অন্ধকারে গাছের ঢালগুলি দেখি, পাতাগুলি দেখি, ভিজে ওরা শিতল হচ্ছে ধরণির তটে। গাছের মগঢালে বাবুই পাখির বাসাগুলি অনবরত এদিক সেদিক হেলেদুলে ঢুলছে। পাখিরা নিশ্চিতে হয়ত জেগে আছে তাদের ছোট ছোট কচি কচি বাচ্চাদের নিয়ে। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হয়ত এখন বৃষ্টি নাই, আবার কোথাও না কোথাও হয়ত আরও অঝোর ধারায় ঘূর্ণিপাক হচ্ছে। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি আমার এই ছোট্ট বেলকনির একেবারে কার্নিশের কাছে। সব মানুষেরা এখন ঘুমিয়ে আছে। আমি জেগে আছি। মনে পরছে আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কোন একদিন তোমার সঙ্গে আমিও এমন একরাতে ঘনকালো আকাশের এই বৃষ্টির ধারা দেখেছিলাম। তখন তুমি ছিলে আমার পাশে আমাকে জরিয়ে ধরে বলেছিলে, আমি সব সময় থাকবো ঠিক এমন করে এই জলের ধারার সঙ্গে।

আজ আমি কিন্তু একা।

…………… তুমি কি আছো এখানে?  

২০/০৪/২০১৬-দিন যাচ্ছে আর মনের আকুতি

দিন যাচ্ছে আর মনের আকুতি ততই বেড়ে উঠছে। সারাদিনের কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকি বটে কিন্তু তারপরেও ব্যস্ততার মধ্যে সব সময় তোমার কথা মনে পরে। মনে পরে অনেক কিছু। কখনো অনুভুতি হয় কি হচ্ছে এইসব? আর কেন হচ্ছে এইসব? বিশাল এই পৃথিবীর চারপাশে এত সব ঘটনা ঘটে যার হিসাব মিলানো যায় না, মনে হয় এটা হবার কথা নয় তারপরেও হয়। কেন হয়? কে করায়? (চলবে)