যখন সাভাবিক কোনো চিন্তাচেতনা কিংবা কার্যক্রম অন্য কোনো নতুন নিয়ম বা চিন্তা চেতনা দ্বারা সম্পন্ন হতে দেখা যায়, তখন এই প্রতিস্থাপিত নতুন পরিবর্তিত চিন্তা চেতনাকেই প্যারাডাইম শিফট বলা যেতে পারে। অন্যঅর্থে যদি বলি- এটা হচ্ছে একটা মডেল, তত্ত্ব, বা দ্রিষ্টিভঙ্গি, ধারনা, কিংবা দৃষ্টান্ত যা প্রকৃত তত্ত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা মডেল থেকে আলাদা। প্যারাডাইমটা আসলেই আসল জিনিষ না, এটা একটা মানষিক ভাবনার সাথে প্রকৃত সত্যের একটা শুধু ছবি। কোনো একটা জিনিষের ব্যাপারে আমরা যা ভাবছি, বা দেখছি এর সাথে সেই জিনিষটার যে রকম প্রকৃত বৈশিষ্ট , এই দুয়ের মাঝেই থাকে প্যারাডাইম তত্তটি। এই প্যারাডাইম দিয়ে মানুষ কোনো একটা ধারনা, চিন্তা চেতনা, কিংবা কোনো একটি জিনিষের ব্যাপারে একটা ধারনা পায়।
কিন্তু প্যারাডাইম শিফট অনেক বড় জটিল। প্যারাডাইম শিফটের মাধ্যমে কোনো একটা তত্ত্ব, চিন্তাচেতনা বা দ্রিষ্টিভঙ্গি পুরুটাই পালটে যায়। একটা উদাহরণ দেই- ধরুন আপনি একটা লোকের চেহাড়া দেখে ভাবলেন যে, সে একটা নিশ্চয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী। আপনার মন তাকে সেভাবেই ট্রিট করছে, সেভাবেই আপনি তাকে ওই খারাপ মানুষদের মধ্যে লিষ্ট করে ফেলেছেন। অনেকপরে যখন জানলেন যে, লোকটা ছিলো খুবই ভদ্র, ভালো ও খুবই অমায়িক এবং পরোপকারী। তখন আপনি অনেক মনোকষ্টে ভোগবেন। আফসোস হবে। এই যে নতুন ভাবনা আপনাকে আগের চিন্তাচেতনা থেকে হটাত করে ১৮০ ডিগ্রী উলটে গিয়ে আরেক নতুন প্যারাডাইমে নিয়ে আসছে, এটাই হলো প্যারাডাইম শিফট।
থমাস কুন তার বিখ্যাত-“দি স্রাইাকচার অফ সায়েন্টিক রেভ্যুলেশন” বই এ প্রথম প্যারাডাইম শিফট শব্দটি চালু করেন। প্যারাডাইম যার যতো বেশি নিখুত, তার প্যারাডাইম শিফট ততো কম। আর যাদের এই প্যারাডাইম কোনো কিছুর ব্যাপারে প্রায় কাছাকাছি থাকে, তারা আসলেই জ্ঞানী এবং বাস্তববাদী। বর্তমান জগতে মানুষের প্যারাডাইম অনেক অনেক সত্যের থেকে বেশী দূরে বিধায়, আমাদের সমাজে গন্ডোগোল বাড়ছে।
আমাদের জন্মের সময়ে আমাদের ব্রেন কিন্তু একদম ফাঁকা থাকে। তারপর আমাদের মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয় স্বজন আমাদের মনের ভেতর (বা পড়ুন ব্রেনের ভেতর) তাদের বিশ্বাস, ভালো লাগা-মন্দ লাগা এইসব ধীরে ধীরে ঢুকাতে থাকেন। একটু বড় হলে স্কুলের শিক্ষকেরা আমাদের ব্রেনের ভেতর নতুন নতুন তথ্য ঢুকাতে থাকেন, সাথে আমাদের আশে পাশের মানুষজনের আচার আচরণ বা ভাবনা, বই পত্রের তথ্য এইসব আমাদের ব্রেনে ঢুকতে থাকে। চারিদিক থেকে আহরণ করা এইসব বিভিন্ন তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকে একরকম ছাপ ফেলে যায়। আমরা আসলে আমাদের আশেপাশের থেকে বিভিন্ন ইনফরমেশন নিয়ে তারপর আমার মতো করে সাজিয়ে আমার ব্রেনে স্থাপন করছি। এইসব ছাপ দিয়েই পরবর্তিতে আমরা লোকভেদে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ডিসিশন নেব।
সাইকোলজিস্টরা এই ছাপকে বলেন ‘প্যারাডাইম’। এই প্যারাডাইমের কি ‘শিফট’ বা পরিবর্তন করানো যায়? বা কখনো সখনো পরিবর্তন করা কি উচিত?
আপনি যখন আপনার বাসার কাজের মেয়ের বিচার করছেন, আপনি কি তার ‘দৃষ্টিকোণ’ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখেছেন? অথবা আপনার ছেলে বা মেয়ে হঠাৎ করে কেমন খাপছাড়া আচরণ করছে, আপনি কি তার মনের ভেতরটা দেখে নিয়েছেন? আপনারা স্বামী বা স্ত্রী আজকাল এমন আচরণ করছেন কেন? আপনি কি তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা ভেবে দেখেছেন? আপনার বন্ধু আপনাকে আজকাল এভয়েড করছে, কেন করছে তা কি তার মতো করে ভেবে দেখেছেন? আপনি যে লোকটাকে প্রচণ্ড খারাপ বলে মনে করছেন, আসলেও কি সে তা-ই?
সাইকোলজিস্টরা বলেন, হ্যাঁ, এই প্যারাডাইম শিফট করা যায়, আপনি যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছু বিচার করতে চান, তবে তা পরিবর্তন করাই উচিত।
প্যারাডাইম শিফটের পরের অবস্থা: অনেক সময়ে মনে হয় যেন ডিমের খোলস ভেঙে মাত্র দুনিয়া দেখছি
The mind that opens to a new idea never returns to its original size.
Albert Einstein
সং গ্রিহীত
পরিচিত এক বড় ভাই বুয়েটে পড়া অবস্থায় ইন্টারে পড়ুয়া এক মেয়েকে টিউশনি করাতো..
ভাই দেখতে হ্যান্ডস্যাম। পড়তো কম্পিউটার সাইন্সে। ছাত্রী তখন তার রঙিন বয়সটা পার করছে। সুতরাং যা হবার তাই হলো।
সে ইনিয়ে বিনিয়ে ভাইকে প্রেম প্রস্তাব দিয়ে বসলো। ভাই এই প্রস্তাবের জবাবে শুধু একটা কথাই বলেছিলো “তুমি সবে মাত্র ইন্টারে পড়। কম্পিউটারটা ঠিকমত চালাতে পারো না। তবুও তোমার একটা লেটেস্ট ল্যাপটপ আর একটা ডেক্সটপ আছে। আমার দুইটা সেমিস্টার পার হয়ে গেল। বাবাকে বলেছি কম্পিউটার সাইন্সে পড়ি। একটা কম্পিউটার দরকার। বাবা দিতে পারেন নাই। বাকিটা তুমি বুঝে নিও। কাল থেকে আর পড়াতে আসবো না” এরপর সেই ছাত্রীর কি হয়েছিলো জানি না।
তবে ভাই আজ বেশ সফল একজন মানুষ।
সেদিন এক বন্ধুর হাতের রান্না খেলাম। খুব সুন্দর রান্না করে। মাংশতে এত ঝাল দিছে যে আমার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছিলো। বন্ধুকে বললাম, ‘এত ঝাল খাস কেন?
“ছোট বেলায় খুব অভাব ছিলো। প্রায়ই শুধু মরিচ দিয়ে ভাত খেতাম। সেই থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে”।
বন্ধুর জবাবটা এমনই ছিলো। আমি চমকে তাকালাম!
অভাব আর পাওয়া না পাওয়ার গল্পগুলো সবাই বুঝতে পারে না; আর বর্তমান জেনারেশনের বেশির ভাগই সব পেয়েছির দল। তাই তাদের কাছে এই কচকচানি বিরক্তিকর মনে হতেই পারে। তবে শুধু এইটুকু বলি- “জীবনটাতে অভাব, টানাপোড়ন, স্ট্রাগল-সংগ্রাম এই জিনিস গুলো বড্ড প্রয়োজন।”
না আমি কারো সামর্থ্য থাকাকে দোষ দিচ্ছি না। সেটা অবশ্যই শুকরিয়া করার বিষয়। তবে কেউ কেউ চাওয়া মাত্র সব পেয়ে জীবনটাকে বিভিন্ন রং এর সাথে গুলিয়ে ফেলে। তাদের কাছে জীবন মানে একটা সেলফি, চেকইন, ডিজে পার্টি, হ্যাং আউট, বারবিকিউ, কিংবা ভার্চুয়াল কিছু অনূভুতি।
তারা কি জানে বাস্তবটা অত সোজা না? যেখানে একটা স্ট্যাটাস কিংবা দুইটা সেলফি দিয়ে সবকিছু আপডেট রাখা যায় না।
বাস্তব জীবনটাকে আপডেট রাখতে হলে ছুটতে হয়। ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়। হোঁচট খেয়ে ব্যাথা পেলে চোখে জল আসে। সেই চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটতে হয়।
-সংগৃহীত