১৭/৫/২০২৪-চীন-রাশিয়ার একত্রিভুত পদক্ষেপ

এক নাগাড়ে ৭৫ বছর যাবত চীন এবং রাশিয়ার বৈরিতার পরে যখন রাজনীতির ভুল চালে এই দুই ভেটো পাওয়ারধারী নিউক্লিয়ার শক্তধর পরাশক্তি চরম শত্রু থেকে চরম বন্ধু বনে যায় এবং কাছাকাছি চলে আসে, তখন আর কোনো বিশ্লেষনের প্রয়োজন পড়ে না যে, বাকি সব পরাশক্তির দূর্দশা একেবারেই দরজার পাশে।

প্রাচীনকাল থেকেই আমেরিকার প্রথম কুটনৈতিক ফর্মুলাই ছিলো যাতে চীন এবং রাশিয়া কখনোই কাছাকাছি না আসতে পারে এবং তারা বন্ধু হতে না পারে। এটা আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্টই তাদের মাথা থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে দেয় নাই। এমন কি রগচটা ডোন্যাল্ড ট্রাম্পও না। ট্রাম্প নিজেও চীনকে ট্যারিফ, বানিজ্য সীমাবদ্ধতা কিংবা এমন এমন চাপে রেখেছিলো যাতে চীন আর যাইই করুক, আমেরিকাকে একহাত দেখে নিতে না পারে। ট্রাম্পের বিশেষ চোখ ছিলো চীনের বানিজ্যতে। কারন চীনের দরকার পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ান মার্কেট। আর সে কারনেই চীনকে সহজে বশ মানানো যাচ্ছিলো। আর চীন নিজেও জানতো ডলার হেজিমনি, ইউনিপোলারিটি ইত্যাদি ছিলো চীনের জন্য মারাত্তক বাধা। সে একা এই বাধাগুলি অতিক্রম করতে পারছিলো না। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে মনে করে একতা “গ্যাস স্টেশন”, চীনকে মনে করে একটা “ক্মুনিস্ট সুইট শপ” যাদের উভয়ের সেনাবাহিনি কোনো ব্যাটল টেষ্টেড না।

পশ্চিমাদের বর্তমান প্রশাসন তাদের এই মিথ্যা বিশ্বাসকে নিজেরাই বিশ্বাস করে ইউক্রেন-রাশিয়া কনফ্লিকটকে কেন্দ্র করে জো বাইডেন প্রশাসন আমেরিকাকে তো অবশ্যই সাথে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে সাথে নিয়ে জোট বেধে রাশিয়াকে বধ করতে গিয়ে এখন দুই রাঘব বোয়াল, চীন এবং রাশিয়া, এমনভাবে এক করে ফেলেছে। সব রোগের এক ঔষধ নয়। আর “নিষেধাজ্ঞা” তো অবশ্যই কোন মেডিসিন নয়। কিছু কিছু দেশের বিপক্ষে এই মেডিসিন সাময়িক কার্যকর হলেও চীন, ভারত, রাশিয়া এদের বিপক্ষে এগুলি কোন এন্টি বায়টিক হিসাবে কখনোই কার্যকর যে হবে না এটা বর্তমান প্রশাসন ভাবেনি। এটাও ভাবেনি যে, এই “নিষেধাজ্ঞা” কার্যকরী না হলে এর পরিনতি কি হতে পারে। ফলে যা হবার তাই ঘটছে এখন। ডলার হেজিমনি, কোনো আইনের বই ব্যতিরেকে রুলস বেজড ইন্তারন্যাশলার অর্ডারের সমাপ্তি,  ইউনিপোলারিটি থেকে মাল্টিপোলারিটি এবং আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে এখন। একটা কথা মনে রাখা দরকার-শ্ত্রুর শত্রু হল মিত্র।

পশ্চিমা বিশ্ব নেতাদের মাথা থেকে সম্ভবত একটা কন্সেপ্ট উধাও হয়ে গিয়েছিলো যে, চীন এবং তদানিন্তত সোভিয়েট রি পাব লিকের মধ্যে এই ৭৫ বছরের দন্ধ বেসিক্যালি ছিলো কট্টর কমুনিজমের কারনে। কিন্তু সেই সোভিয়েট ইউনিয়ন এখন আর নাই, এটা এখন রাশিয়ান ফেডারেশন, আধুনিক কন্সেপ্টে বর্তমান প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। একই অবস্থা চীনেরও। সেই পুরানো জের ধরে থাকা বর্তমান প্রজন্ম নয় এরা। সেখানে ওয়াল্মার্ট, জেসি পেনি, ম্যাডোনাল্ডস, সিয়ারস, ম্যাকির মতো পশ্চিমাদের দোকানে যেতে এই প্রজন্মের কোনো বাধা নাই।  

রাশিয়া ইউরোপের একটা অংশ হওয়ায় ইউরোপ এখন যতোই অন্যের তালে পড়ে নাচানাচি করুক না কেনো, খুব অচীরেই ইউরোপ তার নিজের প্রয়োজনে আবার রাশিয়ার সাথে একত্রিভুত হতে বাধ্য। রাশিয়ার যতোটা না ইউরোপকে প্রয়োজন, ইউরোপের তার থেকে বেশী প্রয়োজন রাশিয়াকে। কারন পুরু ইউরোপ রাশিয়ার অনেক কমোডিটি, অনেক রিসোর্সের উপর প্রায় শতভাগ নির্ভরশীল। অন্যদিকে চীনের রিসোর্স, সস্তা টেকনোলোজি এবং বিশাল সাপ্লাই সারা দুনিয়ায় এমনভাবে জড়িত যে, যা রাশিয়ার নাই তা চীনের আছে, আবার যা চীনের নাই তা রাশিয়ার আছে।  তাছাড়া বর্তমান চীনের বাজার এতো সম্প্রসারিত যে, পশ্ছিমা বা ইউরোপিয়ান মার্কেটের যতো না চীনের দরকার তার থেকে অনেক গুন বেশী দরকার চীনকে তাদের। একটা মুল্যবোধ সর্বদা মনে রাখা দরকার যে, বাজারে গিয়ে কোনো কাষ্টোমার তার দেশ প্রেম দেখায় না। তার কাছে কমোডিটির মুল্যটাই প্রধান, হোক সেটা চীনের, বা রাশিয়ার বা অন্য কোনো দেশের।

এই দুই রাঘব পরাশক্তি নিউক্লিয়ার এবং ভেটো শক্তির অধিকারি দেশকে কখনোই আমেরিকার ভুল রাজনৈতিক চালের কারনে এক হতে দেয়া ঠিক হয় নাই। ফলে পরবর্তী যে কনো বিশ্ব ইস্যুতে আর কখনোই কারো ভেটো পাওয়ারের কোনো কার্যকারিতা থাকবে না। এই ভেটো পাওয়ার এখন শুধু ব্যবহৃত হবে যে কোনো সিদ্ধান্তকে নাকচ করার জন্য। ইউনিলেটারাল সিদ্ধান্তের দিন সমাপ্ত।

একটা সময় খুব কাছাকাছি যে, ইউরোপ আবার রাশিয়ার সাথে একত্রিভুত হবেই, ন্যাটো সয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর অবস্থায় অথবা বিলুপ্ত হবে। রাশিয়া, চীন, ইরান, মিডল ইষ্ট, ভেনিজুয়েলা, নর্থ কোরিয়া এশিয়া, আফ্রিকা মিলে একটা গ্র্যান্ড মেরুকরন হবে যেখানে সেকেন্ডারি কিংবা আরো নীচের ধাপে চলে যাবে পশ্চিমা বিশ্ব।

এই বিশাল পরিবর্তিত অধ্যায়ের জন্য একমাত্র দায়ি করা হবে শুধুমাত্র বাইডেন প্রশাসনকে যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাংগার একমাত্র কারন বলা হয় গর্ভাচেভকে।

২৯/২/২০২৪-নতুন ইউরোপ  

ইউরোপে আভ্যন্তরীন একটা অসচ্ছ এবং খুব জোরালো যুদ্ধ চলছে নিজেদের মধ্যে যেখানে পশ্চিমারা একটা নতুন ইউরোপের স্বপ্ন দেখছে এবং কাউকে সেই স্বপ্নটা দেখাচ্ছেও। ইউরোপের এই নতুন উত্থাপনে মুলত লিড দিচ্ছে প্রকাশ্যে পোল্যান্ড এবং তার সাথে আরো তিনটা বাল্টিক দেশ যারা প্রকাশ্যে রাশিয়ার বিপক্ষে নিজেদেরকে দাড় করিয়ে এটাই মুলত প্রমান করতে চাইছে যে, তারা বেশ শক্তিশালী ইউনিয়ন। পশ্চিমারাও সেই বাল্টিক দেশগুলিকে দিয়ে এটাই প্রমান করাতে চাইছে যে, তাদের মাধ্যমে রাশিয়াকে দূর্বল করা সম্ভব যা জার্মানি বা ফ্রান্স পারে না। তাতে জার্মানির কিংবা ফ্রান্সের ইনফ্লুয়েন্স বর্তমান ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে তাদের মোগলগিড়ির ভাটা পরবে। এই নতুন ইউরোপের চেহাড়া যাকে হয়তো বলা যায় ‘বাল্টিক ন্যাশনস ইউনিয়ন’  ধীরে ধীরে কিন্তু ফুটে উঠছে ইউরোপের ভিতরেই। কিন্তু এটা কি আসলেই সম্ভব? পোল্যান্ড কিংবা বাকী বাল্টিক দেশগুলি কখনোই ইউরপিয়ান ইউনিয়নকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে না যেমন গাধা কখনো ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। রাশিয়াকে যেমন পশ্চিমারা আজিবন শত্রু মনে করে, তেমনি, পশ্চিমারা জার্মানি এবং ফ্রান্সকেও তাদেরকে শত্রুই মনে করে। উপরে উপরে হয়তো ইউরোপিয়ান ইউরপিয়ান ভাব ধরে সবাই একই নৌকায় বসে আছে কিন্তু এই আরহিদের মধ্যে সবাই সবার ভালো চায় না।

কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে-না জার্মানী না ফ্রান্স এই নতুন ইউরপীয়ান চেহারায় কাউকে নতুন মোড়ল ভাবার অবকাশ দেবেনা। যখন নিজেদের সার্থের মধ্যে কঠিন আঘাত আসে, তখন ইউনিটি বলতে কিছু থাকে না। তখন সেই ইউনিটি ভাঙ্গতে বাধ্য। কেউ যখন একবার প্রতারিত হয়, সেটা হয়তো ‘শিক্ষা’ কিন্তু যখন কেউ দুইবার প্রতারিত হয় সেটা স্টুপিডিটি, কিন্তু কেউ যখন তিনবার প্রতারিত হয়, সেটা ‘স্টাবর্ন’ হিসাবে দেখা হয়। পুরানো ইউরোপ কখনোই ‘বাল্টিক ন্যাশন’ হিসাবে নতুন ইউরোপকে দেখতে চাইবে না কখনো। কেননা গাছ কোনদিন কুড়াল মার্কায় ভোত দিবে না, যে কূড়াল ব্যবহার হবে সেই গাছ কাটার জন্যই।

চোরদের মধ্যে কোনো “অনার” কাজ করে না।

২৯/২/২০২৪-রাশিয়া ইউরোপের

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে আমেরিকা এবং ইউকে কখনোই ইউরোপ অঞ্চলের মধ্যে জিওগ্রাফিক্যালী পড়ে না, তারপরেও তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশ হিসাবে পরিগনিত। অন্যদিকে রাশিয়া খোদ ইউরোপ অঞ্চলের মধ্যে থেকেও সে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অংশ নয়। একইভাবে যদি দেখি, ন্যাটো যাকে নর্থ আন্টালন্টিক ট্রিটি হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় সেখানেও আমেরিকা, ইউকে এরা প্রধান দল। ন্যাটোর বিপরীতে রাশিয়া ওয়ার্শ গড়ে তুলেছিলো বটে কিন্তু যখন রাশিয়া ভেংগে গেলো, তখন তার সাথে ওয়ার্শও ভেংগে দিলো তদানিন্তন সোভিয়েট রাশিয়া। পক্ষান্তরে ন্যাটো কিন্ত রয়ে গেলো আর সেটা বর্তমান রাশিয়ার বিপরীতে। অনেকবার রাশিয়া এই খোদ ন্যাটোতে জয়েন করার কথা জানালেও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা ন্যাটো তথা পশ্চিমারা তাতে সাড়া দেয়নি।

এবার যে কয়টা প্রশ্ন মনে জাগে সেটা হল-

(১)       ন্যাটো যদি ওয়ার্শ এর বিপরীতেই তৈরী হয়ে থাকে, সেই ওয়ার্শই যখন নাই, তাহলে এখনো ন্যাটো আছে কেনো?

(১) রাশিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য না হয়েও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাদের ব্যবসা বানিজ্য, এনার্জি সেক্টর থেকে শুরু করে লোহা, ইউরেনিয়াম, খাদ্য, গ্যাস, তেল, মাছ, এমন কি সামরিক সরঞ্জামাদিসহ সবকিছু রাশিয়ার উপর নির্ভরশিল। রাশিয়া তার দেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে সমস্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দেশসমুহকে সস্তায় তেল, গ্যাস রপ্তানী করে। আর এই সস্তায় তেল গ্যাস, ইউরেনিয়াম, লোহা, খাদ্যশস্যের উপর ভিত্তি করে জার্মান ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনইতিক দেশ হিসাবে কমপেটিটিভ মার্কেটে দাঁড়িয়ে আছে।

আমেরিকাতে পৃথিবীর ৫০% রিজার্ভ তেল মজুতে আছে কিন্তু সে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কোনো দেশের জন্যই আজ পর্যন্ত একটা পাইপ লাইন তৈরী করে নাই। কেনো করে নাই?

সারা দুনিয়ায় যে সব সফেস্টিকেটেড যুদ্ধ সরঞ্জামাদি আছে তার মধ্যে আমেরিকার তৈরী যুদ্ধ সরঞ্জাম অত্যাধুনিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গত কয়েক বছর আগ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভান্ডারে যা যুদ্ধ সরঞ্জামাদি রয়েছে সব রাশিয়ান প্যাটার্নের। এখন এই পুরু যুদ্ধ সরঞ্জামের রাশিয়ার বিকল্প হিসাবে যদি পশ্চিমা যুদ্ধ সরঞ্জামাদিতে রুপান্তরীত করতে হয় তাহলে কত বিশাল একটা মার্কেট আমেরিকার জন্য? আমেরিকা তাদের সবকিছুতে আর্থিক লাভ খোজে। আর এটাও একটা লাভ যে, এবার রাশিয়ার সব যুদ্ধ সরঞ্জামাদি বাদ দিয়ে পশ্চিমা যুদ্ধ সরঞ্জামাদিতে সরে আসা।

প্রায় ১৫ হাজার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে রাশিয়ার উপর। রাশিয়া সবচেয়ে বড় পজিটিভ দিক হচ্ছে যে, সে শুধু ইউরোপের সাথেই কানেক্টেড না, সে এশিয়ার সাথেও কানেক্টেড। আর আমেরিকা বা পশ্চিমারা আফ্রিকায় এতোটাই কলোনিয়ালিজম করেছিলো যে, বর্তমানে আফ্রিকা কিছুতেই আর পশ্চিমা প্রোপাগান্ডায় নির্ভর করতে চায় না। বরং তারা সাইড নিয়েছে রাশিয়ার দিকে।

বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মিডিয়া যেভাবে প্রোপাগান্ডা সারা দুনিয়ায় ছড়াচ্ছে, তাতে সারা বিশ্ব এখন এটাই ভাবছে যে, যেখানেই পশ্চিমারা পদার্পন করেছে সেখানে ওদের ওরাল ন্যারেটিভের বিপরীতেই ফলাফল হয়েছে। এতে ইরাক, আফগানিস্থান, লিবিয়া, ইয়েমেন, ইত্যাদি দেশগুলি আরো বিপর্জ্যের মধ্যে পড়তে হয়েছে।

বর্তমান ইউক্রেনও তার পরিনতি ভোগছে।

একটা সময় আসবেই যখন এই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আবার রাশিয়ার সাথে ঝুকে পড়বে, এই ইউক্রেন যুদ্ধ আলোচনার মধ্যেই শেষ হবে, নতুন যারা ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে, তারা একসময় আফসোস করবে, এবং ডলার হেজিমনি শেষ হয়ে গেলে পশ্চিমারা পুনরায় সেই ইউকে এর মতোই আচরন করবে যে ইউকে কোনো এক সময় সারাটা দুনিয়া দাপটের সাথে শাসন করেছে বটে কিন্তু সে এখন একটা দ্বীপ ছাড়া আর কিছুই না।

এখানে একটা কথা বলে রাখি যে, অন্যান্য দেশের কারেন্সি প্রিন্ট করার আগে যেমন সেটা গোল্ডব্যাকড হতে হয়, কিন্তু আমেরিকার ডলার প্রিন্ট করার জন্য কোনো গোল্ডব্যাক লাগে না। তাই তারা যতো খুশি, যখন খুশি ডলার ছাপাতে পারে যা আসলে একটা কাগজের নোট ছাড়া তাদের কাছে আর কিছুই না কিন্তু অন্য দেশের জন্য এটা অনেক বড় ব্যাপার। যখন একদিন এই ডলার তার নিজভুমে ফেরত আসবে বিকল্প কারেন্সির চাপের কারনে, তখন সেখানে এতো বেশি মুল্যস্ফিতি হবে যা কল্পনার অতীত।

২৪/০৮/২০২৩-প্রিগোজিনের জেট ক্রাশ-১

রাশিয়ার টিভিয়ার রিজিয়নে ভাগনার গ্রুপ প্রধান প্রিগোজিনের  প্রাইভেট জেট ১৩৫ বিজে লিগেসি ৬০০ মস্কো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার প্রাক্কালে ক্রাশ করে এবং অনবোর্ড সাতজন আরোহী এবং তিনজন ক্রু মোট ১০ জনই নিহত হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। এই সাতজন আরোহীর মধ্যে ভাগনার গ্রুপ প্রধানের নাম লিষ্টেড ছিলো। খুব স্বাভাবিক চিন্তায় এটাই ভাবার কথা যে, ভাগনার গ্রুপ চীফ আর বেচে নেই। কিন্তু কোনো রাশিয়ান টিভি নিউজ, কিংবা গোয়েন্দা তথ্যে তাঁর মৃত্যুখবরের সত্যতা নিশ্চিত করছেনা। খবরে আরো প্রকাশ করেছে যে, প্রিগোজিনের দুটু জেট পরপর উড্ডয়ন করেছিলো যার একটির টেইল লেজ আরএ-০২৭৯৫ এবং অন্যটি আরএ-০২৮৭৮। প্রথমটিতেই ভাগনার চীফের নাম প্যাসেঞ্জার লিষ্টে ছিলো যেটা ক্রাশ করেছে কিন্তু ২য়টি সেফ ল্যান্ডিং করেছে। ইতিমধ্যে ১০ জন নিহতের মধ্যে ৮ জনের বডি পাওয়া গেছে আর দুইজনের পাওয়া যায়নি। এই আটজনের মধ্যে প্রিগোজিনের বডি নাই।

উপরের খবরগুলিই এ পর্যন্তই সবসুত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আমার কিছু এনালাইসিস আছে। যা নিম্নরূপঃ

(ক)    এমন একটা জেট ক্রাশিং এর জলন্ত অগ্নীর বিভিষিকায় কারোরই বডি কিছুটা হলেও অক্ষত থাকতে পারেনা। অন্তত মুখ দেখে তাদেরকে সনাক্ত করার উপায় থাকার কথা না। ডি এন এ টেষ্ট করার মতোও কোনো উপযোগী তথ্য পাওয়া যাওয়ার কথা না অথচ আটজনকে খুব সহজেই শনাক্ত করা গেলো। ব্যাপারটা খুব একটা কনভিন্সিং না আমার কাছে।

(খ)     আজকাল বডি ডাবল করা খুব কঠিন কাজ নয়। বডি ডাবল করে আজকাল বিখ্যাত লোকেরা যে কোনো নামীদামী হোটেলেও তাদের নামে হোটেল বুকিং করে দেখা যায় অন্যত্র অরিজিনাল ব্যক্তি অন্য কাজ করছে। আর এটা তো মাত্র একটা প্রাইভেট জেট, আর প্যাসেঞ্জার লিষ্টে নাম তোলাও খুব একটা আহামরি কিছু না। তাহলে কি এটা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় যে, প্রিগোজিন নিহত হবার ব্যাপারটা একটা নাটক বা ভিন্ন কৌশল? হয়তো বডি ডাবল? হতে পারে প্রিগোজিনের এই নাটক দিয়ে প্রিগোজিন আবার নিরাপদ জীবন যাপনে স্বাভাবিক লাইফ লিড করবেন কিনা। 

(গ)     প্রিগোজিনের জেট ক্রাশ করার সময় সিংগেল হ্যান্ডে ইউক্রেনের একটা আর্মারড ব্রিগেডকে ধংশকারী রাশিয়ার ট্যাংক সদস্যকে মেডাল পুরুষ্কার দিচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং এ যাবত সময় পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রিগোজিনের নিহত হবার ব্যাপারে বা অন্যান্য সদস্যদের নিহত হবার ব্যাপারে কোনো প্রকার মন্তব্য করেন নাই। তিনি পুরুই নীরব। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগছে।

(ঘ)     প্রিগোজিনের মৃত্যুর সংবাদ এর আগেও অনেকবার খবরের মধ্যে ব্রেকিং নিউজ হিসাবে এসেছিলো। ১ম বার এসেছিলো তাও আবার অফিশিয়ালভাবে ২০১৯ সালে আফ্রিকায়। অতঃপর সে জীবিত অবস্থায় ডনবাসের ফ্রন্টলাইনে আবার যুদ্ধ করেছে।

(ঙ)     যদি প্রিগোজিন আসলেই নিহত হয়ে থাকে যা এখনো কেউ নিশ্চিত করছেনা, তাহলে হতে পারে কি যে, প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রিগোজিনের তথাকথিত অভ্যুথানের কারনে পূর্বের সাধারন ক্ষমা ঘোষনায় লোক দেখানো একটা নাটক করেছিলো কিন্তু এই ক্রাশের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেয়াই ছিলো মুল পরিকল্পনার একটা গোপন পর্ব যাতে প্রেসিডেন্টের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন না হয়? কিন্তু এখানে আরো একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায় তখন, আর সেটা হলো নিষ্পত্তিমূলক একটা বিতর্কিত ভুল বুঝাবুঝির অবসানের পর প্রিগোজিনকে সরিয়ে দিয়ে পুতিনের লাভ কতটুকু। অথবা পুতিনের থেকেও কি অন্য কারো আরো বেশী লাভ হয়েছে প্রিগোজিনকে সরিয়ে দিয়ে? এখানে বলে রাখা ভালো যে, প্রিগোজিন সেই অভ্যুথানের পরে রাশিয়াকে গ্রেট এগেইন করার একটা প্রতিশ্রুতি এবং আফ্রিকাকে আরো মুক্ত করার ঘোষনা দিয়েছিলো।   পুতিনের থেকে তাহলে আর কাদের বেশী লাভ হতে পারে প্রিগীজিন নিহত হলে? প্রিগোজিন আফ্রিকার নিজারে কোনো প্রকার হস্থক্ষেপ করুক এটা পশ্চিমা বিশ্ব, ফ্রান্স, ব্রিটিশ এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কেউ চায়নি বরং তারা প্রিগোজিনের ব্যাপারে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। অন্যদিকে পোল্যান্ড বেলারুশে ভাগনার গ্রুপ এবং তাঁর চীফ প্রিগোজিন অবস্থান করবে এটা জেনে যথেষ্ঠ দুসচিন্তায় ছিলো এবং ইতিমধ্যে পোল্যান্ড সেখানে প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে। এটাও হতে পারে যে, রাশিয়া নয়, অন্য কেউ এই স্যাবোটাজ করেছে?

অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা এখুনি হয়তো জানতে পারবো না, হয়তো কখনোই জানতে পারবো না। “সময়” সব সময় এর সঠিক উত্তর জানে।

বিশ্ব শান্তিতে থাকুক, যুদ্ধ বন্ধ হোক, সাধারন মানুষের জীবনযাত্রা আরো নিরাপদ হোক, আসলে আমাদের মতো আম জনতা এটাই চায়।

২১/০৮/২০২৩-মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ উধাও

Metaverse Foreign Exchange Group – MTFE

মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ নাকি ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে উধাও। আর এর ৯০% গ্রাহক নাকি বাংলাদেশের। সিংগাপুর বা কানাডাভিত্তিক পরিচালিত।

খবরটা শুনে দেশের জন্য খারাপ লাগলেও গ্রাহকদের বেলায় আমার ন্যুনতম খারাপ লাগেনি। কেনো গ্রাহকদের জন্য খারাপ লাগেনি সেটা বলছি।

৬৫০০০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতিমাসে ২৪০০০ টাকা মুনাফা দেবে এই মেটাভার্স। এরমানে ৪৫০% হারে। আবারো বলছি- চার শত পঞ্চাস পারসেন্ট হারে। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কোনো ফর্মুলা? আমরা যারা ব্যবসা করি, তার ১০% প্রফিট পেলেই বলি, আলহামদুলিল্লাহ, অনেক প্রফিট। আর মেটাভার্স দিচ্ছে ৪৫০%? কোথায় কোন ব্যাংক, ফাইনান্সিয়াল ইন্সটিটিউট কিংবা শেয়ার মার্কেট কিংবা দাদন ব্যবসায়ী এত হারে প্রফিট দিয়েছে?

এদেশের মানুষকে কেউ বোকা ভাবার কোনো কারন নাই। মানুষ বোকা নয়। মানুষ আসলে লোভী, অলস এবং ভয়ানক চতুর। শর্টখাটে দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশ্রমবিহীন অনেক বড়লোক হতে চায়। তারা একবারও ভাবেনা যে, শর্টখাটে পরিশ্রমবিহীন কেউ বড়লোক হতে পারে না।

বড়, মাঝারী কিংবা ছোট ছোট সাকসেস পাওয়া কোম্পানি গুলির দিকে যদি তাকান, দেখবেন, তারা কি পরিমান পরিশ্রম করে এই পর্যায়ে এসছেন। অনেকটা যুদ্ধ করতে হয়েছে।

অথচ, এই যে মেটাভার্সের গ্রাহকরা তারা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে পরিশ্রম ছাড়া মাসে মাসে অনেক অনেক টাকা রোজগার করে ফেলবেন বলে। এই মেটাভার্সের কোনো অফিস এদেশে নাই, কোনো লিয়াজো অফিস নাই, নাই কোনো কর্মচারী। কিছু হায়ার করা খন্ডকালীন কিছু এজেন্ট আছে যাদের কোনো নিয়োগপত্রও নাই।

কাউকে পাচ হাজার টাকা ধার দিলেও তো মানুষ সেই টাকাটা ফেরত পাবে কিনা, আর পেলেও কতদিনে ফেরত পাবে এগুলি নিয়েও ভাবে। আর এই মেটাভার্সে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলো কেউ এর নিরাপত্তা নিয়ে একবারও ভাবলো না? গরু বেচবে,বাইক বেচবে, জমি বেঁচবে কারন মেটাভার্স ৬৫০০০ টাকায় মাসে ২৪০০০ টাকা লাভ দেবে। যখন মেটাভার্স উধাও, এই গ্রাহকেরা এবার জানেনও না, কার কাছে গিয়ে এই বিনিয়োগ ফেরতের কথা জানাবে।

“যুবক”, ইউনিপেটু, ডেস্টিনি, ইভ্যালি এ রকম অনেক অনেকবার প্রতারিত হয়েও এসব মানুষের শিক্ষা হয়নি।

আমি অবাক হচ্ছি না যে, আগামিতেও এমন খবর যে পাবো না।

লোভী গ্রাহক, তুমি ঠকবাই, কারন তুমি কাজ করতে চাও না, তুমি অলস, তুমি সহজে বড়লোক হতে চাও, তুমি অনেক অনেক টাকার মালিক হতে চাও। আর তোমার ইচ্ছা ঠিক থাকলেও তোমার কর্মপন্থা একেবারেই ভুল। তুমি আজীবন ঠকতেই থাকবা।

খারাপ লাগে দেশের জন্য যে, তোমাদের মত লোভী কিছু মানুষের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। সেদিক থেকে যদি বলি, তোমরা লোভীর সাথে সাথে রাষ্ট্রের জন্যেও ক্ষতিকারক।

(কোনো নির্দিষ্ট গ্রাহককে উদ্দেশ্য করে এই লেখা নয়। তবে যারা এমন কাজ ভেবেচিন্তে করেন না, তাদের এই খারাপ পরিনতির জন্য তারাই দায়ী, এটা বিশ্বাস করে ভবিষ্যতে আর পা দেয়ার কথা ভাববেন)

১৬/৮/২০২৩-বিশ্ব রাজনীতিতে একটা অসম সমঝোতা

নিজারের (Niger) অভ্যুথান বিশ্ব রাজনীতিতে একটা অসম সমঝোতার সৃষ্টি করছে বলে আমার ধারনা। ব্যাপারটা এমন যেনো কোনো এক সুতার বান্ডেলের মতো অগোছালোভাবে পেচিয়ে জট পাকিয়েছে। অনেক হিসাব কিতাব এখন আর সহজ সরলীকরনের মধ্যে থাকছে না। তাহলে একটু দেখিঃ

(ক)     নিজারে (Niger) ফ্রান্স এবং আমেরিকার সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিসহ তাদের বেশ কিছু মিলিটারী বেজ রয়েছে। আমেরিকার রয়েছে দুটূ (বেজ ১০১, এবং এয়ারবেজ ২০১)। বর্তমানে নিজার (Niger) ফ্রান্সের সমস্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ তাদের যাবতীয় মিলিটারী বেজকে অপসারনের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি অথবা তাদের সামরিক বেজগুলির ব্যাপারে নিজার (Niger) আপাতত কিছুই বলেনি। এখানে উল্লেখ্য যে, সামরিক উপস্থিতি বা সামরিক এই বেজগুলি প্রধানত ওয়েষ্ট আফ্রিকান দেশসমুহের সাথে মিলে ইউএস, ফ্রান্স, ইউএন এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশসমুহ সাহেল রিজিয়নে ইসলামিক এক্সট্রিমিষ্টদেরকে দমনের লক্ষ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রম, সার্ভিলেন্স এবং রেকি মিশনসহ যাবতীয় মিলিটারী ট্রেনিং, সামরিক এয়ারক্রাফট লিফটিং এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

(খ)      পার্শবর্তী দেশ চাঁদ, মালি, গিনিয়া, বারকিনো ফাসুতে মিলিটারী সরকার গঠনের পর সেখানে ফ্রান্স, আমেরিকা, ইউএন এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশসমুহের সামরিক উপস্থিতি বাদ হয়ে যাওয়ায় এবার নিজারেও (Niger) সেই একই ধাচের সরকার আরম্ভ হওয়ায় ধরে নেয়া যাচ্ছে যে, সর্বশেষ দেশ, অর্থাৎ নিজার (Niger) থেকেও যদি তাদের এই সামরিক উপস্থিতি বা বেজগুলি গুটিয়ে আনতে হয়, তাহলে অত্র অঞ্চলে তাদের আর কোনো প্রভাব খাটানোর মত কোনো ফোর্স অবশিষ্ট রইলো না। এই অবস্থায় যদি আমেরিকা নিজারের (Niger) মিলিটারী অভ্যুথানকে অভ্যুথান হিসাবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে পশ্চিমাদেরকেও উক্ত অঞ্চল থেকে সমস্ত বেজসহ সামরিক বাহিনীকে গুটিয়ে নিতে হবে। এতে ওয়েষ্ট আফ্রিকায় বা সাহেল রিজিয়নকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদের পরিচালিত অপারেশন গুলি আর করা সম্ভব হবে না। 

(গ)      ঠিক এই অবস্থায় আমেরিকা একটি কঠিন পরিস্থির সুম্মুক্ষিন হয়েছে বলে আমার ধারনা। যদি অভ্যুথানকে সমর্থন দেয়, তাহলে তাদের সাথে মিলিটারী টু মিলিটারী চুক্তিসমুহ বাতিল করতেই হবে এবং সর্বপ্রকার এইডস বা সাহাজ্য সহযোগিতা দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আর এই এইডস বা সাহাজ্য সহযোগীতা দেয়া থেকে বিরত থাকলেই নিজার (Niger) আর আমেরিকাকে আলাদা করে দেখার কোনো অবকাশ নাই, ফ্রান্সের মতোই তাদেরকেও নিজার (Niger) ছাড়তে নির্দেশনা দেয়া হতে পারে। আবার যদি অভ্যুথান কে অভ্যুথান হিসাবে স্বীকৃতি না দেয় তাহলে আমেরিকাকে এইডস বা সাহজ্য সহযোগীতা প্রবাহ চালিয়ে যেতে হবে যা কিনা আমেরিকার আইনের পরিপন্থি। অন্যদিকে আবার এই এইডস বা সাহাজ্য সহযোগীতা প্রবাহ বন্ধ না করলে আমেরিকার সাথে ফ্রান্স এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক খারাপের দিকে যাবে। তাতে ইউক্রেন যুদ্ধ একটা বেমালুম প্রহসনে পরিনত হবে। কারন রাশিয়াকে আটকাতে সবচেয়ে বেশী প্রক্সি ওয়ার পশ্চিমা দেশগুলিই চালাচ্ছে এবং সে মোতাবেক আমেরিকাই সবাইকে চাপের মধ্যে রেখেছে যেনো ইউক্রেনে সবাই পর্যাপ্ত পরিমানে সাপোর্ট দেয়। যদিও আমি কোনো যুদ্ধের পক্ষেই না। হোক সেটা নিজারে (Niger) বা ইউক্রেনে।

এখানে আরো একটা দুশ্চিন্তার কারন রয়েছে আমেরিকার। আর সেটা হলো, নিজার (Niger) আসলে ইসলামিক এক্সট্রিমিষ্টদের কোনো আখড়া নয় কিন্তু রাশিয়ার সমর্থনে ভাগনার গ্রুপ অবশ্যই একটা বড় ধরনের হুমকী যারা রাশিয়ার এজেন্ডা নিয়ে অপারেশন পরিচালনা করে। ভাগনার গ্রুপ অনেক আগে থেকেই মালি, বারকিনো ফুসু, চাঁদ, কিংবা সাধারনভাবে যদি বলি তারা ওয়েষ্ট আফ্রিকায় অপারেশন করে। ফলে রাশিয়ার প্রভাব এই এলাকায় দমনের জন্যে হলেও তাদের মিলিটারী বেজ, সামরিক উপস্থিতি এবং অন্যান্য মিলিটারী কার্যাবলীসহ অপারেশন চালিয়ে নেয়া দরকার।  

ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষকে (একদিকে ফ্রান্স, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে হাতে রাখা, আবার অন্য দিকে নিজারের (Niger) মিলিটারী অভ্যুথানকেও সমর্থন করা) সামাল দেয়ার থেকে আগে এটা নিশ্চিত করতে চায় নিজা (Niger) আসলে কি চায় সেটা জানা। আর এই কারনেই সবার ইন্টারেস্টকে একদিকে সরিয়ে আমেরিকার নিজস্ব ইন্টারেষ্টকে প্রাধান্য দিয়ে আমেরিকা ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ডকে নিজারে (Niger) আলাপের জন্য পাঠিয়েছেন। সে নিজারের (Niger) জান্তাদের সাথে আলাপ করতে গেলেও কতটা সফল হয়েছে এ ব্যাপারে না ন্যুল্যান্ড না তাঁর প্রধান এন্টনী ব্লিংকেন কোনো মন্তব্য করেছেন। তবে তথাকথিত রীতি অনুযায়ী আপাতত নিজারে (Niger) আমেরিকার এইডসকে স্থগিত (বাতিল নয় কিন্তু) করেছে এবং ‘এটা একটা খন্ডকালীন সামরিক অপারেশন হিসাবে চালিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অভ্যুথান হয়েছে বলেন নাই।

ফ্রান্স এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাই খুবই ক্ষুদ্ধ। 

১৫/০৮/২০২৩-ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ফাটল

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ক্ষোভের বহির্প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তাঁর কিছু নমুনা যদি বলি-

(১)      রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়ার মুল কারন ছিলো যেনো রাশিয়ার তেল, গ্যাস, খাদ্য সামগ্রীসহ অন্যান্য মৌলিক উপাদান রপ্তানী থেকে আয় ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয়ের একটা সোর্স না হয়ে উঠে এবং আরেকটা কারন ছিলো যাতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেংগে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা বুমেরাং হয়েছে বলে এখন বিশ্বনেতাদের ধারনা। কারন কি? কারনটা দৃশ্যমান, রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল, গ্যাস, খাদ্য সামগ্রী আমদানী না করায় ইউরোপ নিজেই এখন ডি-ইন্ডাস্ট্রিলাইজেশন, ডি-ডলারাইজেশনের এর শিকার। প্রতিটি ইউরোপিয়ান দেশে এখন জীবনমাত্রা এতোটাই শোচনীয় যে, তারা আর আগের মতো লাইফ লিড করতে পারছে না। জনগন বিরক্ত তাদের শাসকদের উপর। প্রাথমিকভাবে যে আকারে এবং যে গতিতে ইউক্রেন উদ্ভাস্থদেরকে ইউরোপিয়ানরা গ্রহন করেছিলো থাকার জায়গা দিয়ে খাবারের খরচ, হাত খরচ, স্কুলিং ইত্যাদি দিয়ে, এখন তারা এটাকে একটা বোঝা মনে করছে। সেই আগের আবেগ কিংবা সহায়তার মনমানসিকতা তারা আর ধরে রাখতে পারছে না। তারা নিজেরাই এখন বিরক্ত ইউক্রেনের উদ্ভাস্তদের নিয়ে, শাসকদের কমিটমেন্ট নিয়ে।

(২)      ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনৈতিক দেশ জার্মানীর প্রায় ৪৫% এর উপরে ইন্ডাস্ট্রিজসমুহ বন্ধ শুধুমাত্র গ্যাস এবং তেলের সংকটে। শুধু তাইই নয়, হিটিং ব্যবস্থার আমুল সংকটে দেশটি। দেশের এনার্জি মিনিষ্টার এবং বিরোধী দল এই মুহুর্তে যে বিষয়টির উপর সবচেয়ে বেশী জনমত তুলে ধরছেন তা হলো-পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে জার্মানি এখন তেল গ্যাসের অভাবে তাদের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ইন্ডাস্ট্রিজসমুহ যেমন ক্ষতিগ্রস্থ তেমনি সাধারন জনগনের অবস্থা চরম খারাপ। ঠিক এই মুহুর্তে অচীরেই রাশিয়ার উপর সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আবারো তাদের কাছ থেকে আগের মতো সব পন্য যেনো আমদানী করা হয় সেই দাবী উঠছে। এখানে বলে রাখা উত্তম যে, জার্মানী ৪০% নির্ভরশীল রাশিয়ার গ্যাস এবং তেলের উপর। জার্মানীর উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়েই উঠেছে রাশিয়ার সস্তা কমোডিটির উপরে। তারমধ্যে নর্ডস্ট্রিম-১, ২ উভয়ই এখন অকেজো হবার কারনে অদূর ভবিষ্যতেই রাশিয়া থেকে এতো সহজে আর আগের মতো তেল বা গ্যাস আমদানী করা সম্ভব না। জার্মানীর এহেনো খারাপ পরিনতির কারন হিসাবে সাধারন জনগন, বিরোধী দল, সরকারী আমলা এবং বেশ কিছু প্রতাপশালী মন্ত্রী মিনিষ্টার খোদ পশ্চিমাদের দায়ী করছেন যে, পশ্চিমারা এক ঢিলে দুই পাখী (জার্মানীর অর্থনীতিকে ধংশ এবং রাশিয়াকে পিউনিটিভ শাস্তি) মেরেছে। নর্ড স্ট্রীম নষ্টে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে জার্মানীর আর সবচেয়ে লাভ হয়েছে পশ্চিমাদের। জার্মানীর উলফ শলাজ নিজেও এখন চাচ্ছেন যে, ইউক্রেনের যুদ্ধ যেভাবে হোক বন্ধ হোক। দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা এখন জার্মানীর।

(৩)      এবার আসি ফ্রান্সের ব্যাপারে। নিজারে (Niger) ফ্রান্স এবং আমেরিকার উভয়ের প্রায় দুই হাজারের বেশী করে সামরিক বাহিনীর সদস্য আছে এবং বেশ অনেকগুলি সামরিক ঘাটিও আছে তাদের। মজার ব্যাপার হলো নিজার (Niger) শুধুমাত্র ফ্রান্সের বাহিনীকে সেখান থেকে তাড়ানোর বিক্ষোভ করছে, সাথে অভ্যুথান। আমেরিকানদের বিরুদ্ধে নয়। ফ্রান্স নিজার (Niger) থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলন করে তাঁর দেশের পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি সচল রাখতো। সবার সাথে তাল মিলিয়ে ফ্রান্স রাশিয়ার গ্যাস, তেল ইত্যাদি বয়কট করলেও তাদের বিকল্প ব্যবস্থা চালূ ছিলো এই ইউরেনিয়াম চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গুলি দিয়ে। এবার নিজার (Niger) সেই ইউরেনিয়াম এবং গোল্ড উত্তোলন এবং রপ্তানী পুরুপুরি বন্ধ করায় ফ্রান্সের বিদ্যুতায়ন এখন প্রশ্নের সম্মুক্ষে। ঠিক এই মুহুর্তে হয়তো যথেষ্ঠ পরিমান ইউরেনিয়াম মজুত আছে বলে ইম্প্যাক্টটা বুঝা যাচ্ছে না কিন্তু এটার প্রভাব হয়তো বছরখানেক পর অনুভুত হবে। ফ্রান্স তাঁর বেজগুলি এবং সামরিক উপস্থিতি ছাড়তে নারাজ। তাই তারা একোয়াসের (ECOWAS) সাথে সুর মিলিয়ে ক্যু সরকারকে মিলিটারিলি উৎখাত করার সিদ্ধান্তে অটল। একোয়াসও (ECOWAS) চেয়েছিলো নিজারে (NIGER) কাউন্টার অফেন্সিভের মাধ্যমে পূর্বর্তী প্রেসিডেন্ট বাজোমকে আবার স্থলাভিষিক্ত করে। কিন্তু একয়াসের (ECOWAS) সামনে দুটো বড় প্রশ্ন এসে হাজির হয়েছে

(১) রাশিয়া নিজারে (Niger) কোনো প্রকার মিলিটারী অভিযানের পক্ষে না। আর রাশিয়ার এই অবস্থানে একোয়াস (ECOWAS) নিজেরাও ক্রান্তিলগ্নে। কারন আফ্রিকার দেশসমুহে রাশিয়া যে পরিমান অস্ত্র, খাদ্যশস্য এবং ইকোনোমিক্যাল সাপোর্ট দেয়, যদি রাশিয়ার কথার বাইরে কেউ যায়, সেটা রাশিয়া হয়তো বন্ধ করে দিতে পারে। আফ্রিকার দেশ গুলি এম্নিতেই গরীব, তারমধ্যে রাশিয়ার এই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে তাদেরকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। রাশিয়াই একমাত্র দেশ যে আফ্রিকায় বিনামুল্যে এই যুদ্ধের মধ্যেও আফ্রিকার খাদ্য ঘাটতির কারনে ৯০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য সরবরাহ করেছে, ২৪ বিলিয়ন ডলার সমপরিমান ঋণ মওকুফ করে দিয়েছে এবং বিনামুল্যে আরো ৫০ মিলিয়ন টন সার দেয়ার কথা বলেছে। অন্যদিকে পশ্চিমারা বা ইউরোপ বা ফ্রান্স কিংবা তাদের মিত্র দেশগুলি সাহাজ্য তো দূরের কথা তারা মালি, গিনি, বারকুনো ফুসু, নিজার, চাঁদ, এবং আরো কিছু আফ্রিকান দেশসমুহে নিষেধাজ্ঞা আরোপন করেছে। ফলে আফ্রিকান দেশগুলি স্বাভাবিক কারনেই রাশিয়ার কথার বাইরে যেতে পারার কথা না। একোয়াসে আফ্রিকার মোট ১৫টি দেশ। এরমধ্যে কয়েকটিতে চলছে মিলিটারী শাসন। তারা হচ্ছে গিনি, নিজার, মালি, বারকিনো ফুসু, গিনিয়া বিসাও, লাইবেরিয়া সবেমাত্র বেরিয়ে গেছে। একোয়াসের মধ্যে বাকী যে কয়টা দেশ আছে, তাদের সামরিক ক্ষমতাও খুবই নগন্য। সক্ষমতার দিক দিয়ে একোয়াস মিলিটারী কোনো দেশের জন্যই কোনো হুমকী না।

(২)      ফ্রান্স যেহেতু মনে প্রানে চাচ্ছে যে, একোয়াস (ECOWAS) মিলিটারী অপারেশন করুক নিজারে (Niger) কারন সেক্ষেত্রে ফ্রান্স একোয়াসের বাহানায় সেইই মিলিটারী অপারেশনটা করবে যাতে ফ্রান্সের দোষ না হয়, দোষ হয় একোয়াসের। কিন্তু একোয়াস অনেক ভেবেচিন্তে দেখছে এটা করা ওদের সমুচীন হবেনা। অন্যদিকে ফ্রান্স এটাও ভেবেছিলো যে, তাদের ইউরোপিয়ান মিত্র হিসাবে আমেরিকা অবশ্যই নিজারের ( Niger)ব্যাপারে জোরালো কিছু করবে। কিন্তু আমেরিকা সেটা না করে তারা যেটা করেছে সেটা হলোঃ আমেরিকা থেকে প্রতিনিধি হিসাবে ন্যুল্যান্ডকে নিজারে (Niger) পাঠিয়েছে অভ্যুথানের কমান্ডারদের সাথে এক মিটিং করার জন্য। তাঁর বক্তব্য ছিলো নিজার (Niger) যাতে ভাগনার নামক ভাড়াটে বাহিনীর কোনো সহায়তা না নেয় এবং প্রয়োজনে আমেরিকা অভ্যুথানকারীদের সাথে সমঝোতা করতেও ইচ্ছুক। অভ্যুথানের কমান্ডারদের সাথে ন্যুল্যান্ডের এমন বৈঠকে ফ্রান্স খুব ক্ষুদ্ধ এবং কিছুতেই খুশী না তারা। তারা মনে করছে-আমেরিকা ঠিক সেই কাজটাই করেছে যেটা ফ্রান্সের সার্থের বিপরীত। তারা অবশ্য এটাও বলেছে যে, আমেরিকার সামরিক বেজগুলি নিজারে (Niger) রাখার সার্থেই ন্যুল্যান্ডের এই ভিজিট।

তাহলে কি দাড়ালো? একদিকে জার্মানী নাখোশ, অন্যদিকে ফ্রান্স নাখোস। ইতালী তো আগে থেকেই নাখোস, তুরষ্কের ব্যাপারটা আমরা সবাই জানি। সে না ন্যাটোর ঘরে, না ন্যাটোর বাইরে, না সে ইউরোপে না সে এশিয়ায়। হাংগেরী তো বহু আগে থেকেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের গলার কাটা। পোল্যান্ড গত কয়েকমাস যাবত ইউক্রেনের উপর ভীষন ক্ষিপ্ত। কারন পোল্যান্ড তাঁর নিজের দেশের কৃষকদের বাচানোর জন্য ইউক্রেনের শস্য আমদানীতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় পোল্যান্ডের সাথে ইউক্রেনের সম্পর্ক এখন চরম খারাপ। একদিকে পোল্যান্ড বেলারুশকে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে ভাগনার গ্রুপ যে কোনো মুহুর্তে পোল্যান্ডে প্রবেশ করার পায়তারা করছে। ফলে চরমপন্থি পোল্যান্ড এখন নিজের ঘর সামলাবে নাকি ইউরোপিয়ান জোটের সার্থে সে ইউক্রেনকে সাপোর্ট করবে নাকি পশ্চিমাদেরকে খুশি করবে, সেটা নিয়েই সন্দিহান। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আরেক শক্তিধর যুক্তরাজ্য তো আরো ক্ষেপা এই ইউক্রেনের উপরে যার প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেসের এক কথায় যে, ইউরোপ বা ন্যাটো কোনো আমাজন নয় যে ইউক্রেন যখন যা চাইবে তাকে তখনি সেটা দিতে হবে।

উপরের কয়েকটা বিশ্লেষণে যেটা খালী চোখেই ধরা পড়ে সেটা হচ্ছে যে, ন্যাটো বা ইউরোপিয়ান জোট ধীরে ধীরে নেতিয়ে যাচ্ছে এবং এদের সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাসের একটা ফাটলের সৃষ্টি হচ্ছে। আর এই ফাকে পুরু দুনিয়ায় একটা বিশাল পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে বেড়াচ্ছে- মাল্টিপোলারিটি, ডি-ডলারাইজেশন, ব্রিক্সের উত্থান এবং চীন-ভারত-রাশিয়ার সাথে ইরান-সৌদি-সিরিয়া- ব্রাজিল- সাউথ আফ্রিকা ইত্যাদি মিলে একটা ভিন্ন জোট।

আমার কাছে যেটা মনে হয়, একসময় এই পুরু ইউরোপিয়ান জোট তাদের নিজেদের সার্থেই আবার রাশিয়ার সাথে মিলতে বাধ্য হবে। আর যদি সেটাই হয়, তাহলে ন্যাটোর পরিবর্তে এমন আরেক জোট তৈরী হবে যেটা শুধুমাত্র নতুন ইউরোপের যেখানে আধিপত্য করবে চীন, রাশিয়া এবং আফ্রিকা যদিও চীন বা আফ্রিকা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কেউ না।

সময় হয়তো বলে দেবে।

১৯/০৭/২০২৩-রাশিয়া কেনো ন্যাটোতে জয়েন করছে না?

অনেকেই প্রশ্ন করে আসলেই কি রাশিয়া বা সোভিয়েট ইউনিয়ন কখনো ন্যাটোতে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো? আর যদি তাইই হয়, তাহলে রাশিয়াকে ন্যাটোর সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হলো না কেনো? রাশিয়া যদি ন্যাটোর সদস্য হতো, তাহলে কিন্তু এরুপ কোল্ডওয়ার, ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার এমন বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করতো না। রাশিয়া ন্যাটোতে যোগ দিলে সারা  বিশ্বের কাছে ব্যাপারটা কিভাবে দেখা হতো, আমার আজকের লেখাটি এসব প্রশ্ন নিয়েই।

হ্যা, রাশিয়া একবার নয়, পরপর কয়েকবার ন্যাটোতে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো।

প্রথমবার রাশিয়া এপ্লাই করেছিলো ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিন মারা যাওয়ার এক বছর পর এবং ১৯৫৫ সালে ওয়ার্শো প্যাক্ট তৈরী হবার পূর্বে। সেই প্রোপোজালের নাম ছিলো “Molotov’s Proposal and Memorundum-1954”। উক্ত প্রোপোজাল ন্যাটোতে পাঠানো হয় মার্চ ১৯৫৪ সালে। কিন্তু তখন আমেরিকা ক্রেমলিনের এই ইচ্ছাকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়ে এই ব্যাপারে কোনো আলাপ আলোচনাই করা চলে না বলে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলো। মলোটোভ ম্যামোরান্ডামের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো যে, ইউরোপের কালেক্টিভ নিরাপত্তা কিভাবে রক্ষা করা যায় সেটা। আর এই প্রস্তাবে রাশিয়া যেটা প্রস্তাব করেছিলো তা হলোঃ

(ক)     ওয়েষ্টার্নদের বিকল্প হিসাবে শুধুমাত্র ইউরোপের সবদেশ মিলে কিভাবে ইউরোপের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করা যায় সেটা। আর সেটা মলোটোভা প্রস্তাবে নামকরন করা হয় “ইউরোপিয়ান ডিফেন্স কমিউনিটি”। ন্যাটো হয় বিলুপ্ত হবে অথবা তাদের কাজ হবে শুধুমাত্র ডিফেন্সীভ মানে টেররিজমের বিরুদ্ধে, কিংবা লোকাল পুলিশের ভূমিকায়।

(খ)      পশ্চিম জার্মানকে পুনরায় পুর্ব জার্মানীর সাথে কিভাবে একত্রিত করা যায় এবং জার্মানীকে আবারো রি-আর্মড করে তাকে ইউরোপের মধ্যে একটা শক্তিশালী দেশ হিসাবে গন্য করা যায়। 

(গ)      কোল্ড ওয়ার কিভাবে নিউট্রেলাইজ করা যায়।

(ঘ)     এই মলোটভা প্রোপোজালে রাশিয়া আমেরিকাকে ইউরোপের অংশ নয় বিধায় তাকে বাদ দিয়েছিলো এবং শুধুমাত্র ইউরোপের দেশ সমুহ মিলে “ইউরোপিয়ান ডিফেন্স কমিউনিটি” করার প্রস্তাব ছিলো এবং অন্যদিকে চীনকে রাখা হয়েছিলো অবজার্ভার স্ট্যাটাসে।

এই প্রস্তাবে আমেরিকা মনে করেছিলো যে, তারা ইউরোপ থেকে বহিষ্কার হয়ে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে ন্যাটোকে খর্ব করা হচ্ছে যেখানে ন্যাটোর সমস্ত ক্ষমতার চাবিকাঠি আমেরিকার কাছে। ফলে আমেরিকা চায় নাই, মলোটভা প্রোপজাল কিংবা ইউরোপিয়ান ডিফেন্স কমিউনিটি বাস্তব হোক এবং ন্যাটোর খবরদারী খর্ব হোক।

পরবর্তীতে মলোটোভা ম্যামোরান্ডামে সংশোধন আনা হয় এবং বলা হয় যে, ন্যাটোরর বিলুপ্তির দরকার নাই তবে ন্যাটো থাকবে ডিফেন্সীভ কাজের জন্য। কোনো মিলিটারী বা এগ্রেসিভ ভূমিকায় ন্যাটোকে ব্যবহার করা যাবে না। উপরন্ত, আগে আমেরিকাকে বাদ দেয়া হয়েছিলো, সংশোধিত ডকুমেন্টে এবার আমেরিকাকে রাখা হলো। সাথে রাশিয়াও পুর্নাজ্ঞ সদস্য পদে যোগ দেয়ার কথা বলা হলো।

On 10 March Gromyko presented Molotov a draft note for the Presidium proposing that the Soviet position on European collective security should be amended (a) to allow full US participation in the system and (b) the possibility of the USSR joining NATO.[1] 

এই নতুন ড্রাফট পুনরায় ২০ এবং ২৪ মার্চ ১০৫৪ সালে উত্থাপন করা হয়। অতঃপর উক্ত ড্রাফট অবিকল সেভাবেই ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং আমেরিকার কাছে পাঠানো হয় ৩১ মার্চ ১৯৫৪ তে। কিন্তু এবারো মে ১৯৫৪ তে পশ্চিমারা উক্ত প্রস্তাবকে রাশিয়াকে অগনতান্ত্রিক একটা দেশ হিসাবে চিহ্নিত করে ন্যাটোতে গ্রহন করা যাবে না এবং পশ্চিমাদের ডিফেন্সিভ মতবাদের সাথে রাশিয়ার ডিফেন্সিভ মতবাদ এক হবেনা বিধায় তারা মলোটোভা মেমোরান্ডাম রিজেক্ট করে এবং রাশিয়াকেও ন্যাটোতে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকে। এর বিরুদ্ধে ভেটো দেয় আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং কিছু পশ্চিম ইউরোপের দেশসমুহ। এর আসল ব্যাখ্যাটা অন্যরকমের।

আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের ধারনা ছিলো যে, রাশিয়াকে ন্যাটোতে নিলে রাশিয়া তাদেরকে কোনঠাসা করে ফেলতে পারে বিধায় তারা পশ্চিম ইউরোপের দেশসমুহগুলিকে ক্রমাগত আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড চাপ তথা প্রভাব খাটিয়ে রাশিয়ার সব প্রস্তাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করায়। শুধু তাইই নয়, যেহেতু রাশিয়া ইউরোপের মধ্যেই অবস্থান এবং রাশিয়া মানে ইউরোপ, এবং আমেরিকা বা ইংল্যান্ড ইউরোপের কোনো অবস্থানেই পড়ে না, ফলে একট সময় আসবে যখন আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড ইউরোপ থেকে রাশিয়ার কারনেই বিচ্যুত হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া মলোটভা মেমোরান্ডাম বা ইউরোপিয়ান ডিফেন্সিভ কমিউনিটির সৃষ্টি হলে যৌথ জার্মানীর পুনসংযোগে জার্মানিতে আমেরিকার মিলিটারী বেসগুলি ভবিষ্যতে আর না থাকার সম্ভাবনাও বেশী যা আমেরিকা কখনোই এই অঞ্চল ছাড়তে নারাজ।

আরেকটি কারন হলো-ন্যাটোকে ডিফেন্সীভ মুডে রাখা বা কোনো এক সময় ন্যাটোকে বিলুপ্ত করে ফেলা হতে পারে এই চিন্তায় পশ্চিমারা ইউডিসি (ইউরোপিয়ান ডিফেন্সীভ কমিউনিটি) কে ফর্ম করতে দিতে চায়নি। উপরন্ত চীনকে সরাসরি অব্জার্ভার হিসাবে চুক্তিতে রাখাও পশ্চিমারা পছন্দ করে নাই।

দ্বিতীয়বার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়েলতসিনের আমলে ন্যাটোকে যোগ দেবার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল কিন্তু সেবারেও ন্যাটোতে রাশিয়াকে নেয়া যাবে না বলে রিজেক্ট করা হয়।

তৃতীয়বার পুতিন ২০০০ সালে ক্লিটনের আমলে পুনরায় ন্যাটোতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব করে। ব্লুম্বার্গের এ ব্যাপারে ক্লিন্টনের একটা বক্তব্য তুলে ধরা যায়- “Berger suddenly found a fly on the window to be extremely intriguing. Albright looked straight ahead. Clinton glanced at his advisers and finally responded with a diplomatically phrased brush-off. It was something on the order of, If it were up to me, I would welcome that.”

চতুর্থবার পুতিন আবারো ২০০৩ সালে ন্যাটোতে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে রিজেক্ট করা হয়।

পঞ্চমবার ২০০৮ সালে পুনরায় মেদ্ভেদেভ (যিনি ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল অবধি রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ছিলেন), তিনিও ন্যাটোতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব করেন। সেখানে মেদভেদেভ এটা উল্লেখ করেন যে, ন্যাটোতে রাশিয়াকে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিলে ন্যাটোর ইষ্টার্ন এক্সপানশনের আর কোনো প্রয়োজন নাই, এবং ইউরোপের নিরাপত্তা বলয়কে সুরক্ষা দিতে নতুন ইউরোপিয়ান  সিউকিউরীটি আর্কিটেকচার’ নামে একটি চুক্তিও হতে পারে, পাশাপাশি ন্যাটো তো ডিফেন্সীভ মুডে থাকলোই। কিন্তু এতেও কোনোভাবেই রাশিয়াকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্তিতে পশ্চিমারা রাজী হলো না।

প্রকৃত সত্যটা হলো- ন্যাটোর জন্মই হয়েছে রাশিয়াকে কন্টেইন করার জন্য, রাশিয়াকে মার্জিনালাইজড এবং আইসোলেট করার জন্য। ন্যাটো হচ্ছে আমেরিকার জিও পলিটিক্যাল একটা প্রোজেক্ট। রাশিয়া যদি ন্যাটোতেই যোগ দেয়, সেক্ষেত্রে ন্যাটোর থাকার তো অর্থ নাই। ন্যাটোর জন্মই হচ্ছে রাশিয়াকে থামিয়ে দেয়া। যদি শত্রুই না থাকে তাহলে ন্যাটোর আর থাকার দরকার কি? টেরোরিজমের বিরুদ্ধে ফাইট করা ন্যাটোর মতো অরগেনাইজেশনের কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। তাছাড়া রাশিয়ার মতো এতো বড় একটা শক্তিশালী জায়ান্টকে ন্যাটোতে নেয়া মানে একক ক্ষমতা খর্ব হবার সম্ভাবনা। যদি সেটাই হতো, তাহলে ওয়ার্শো প্যাক্ট বিলুপ্ত হবার পরেই তো ন্যাটোর পরিসমাপ্তি ঘটতে পারতো। কিন্তু সেটা হয় নাই। আর ঠিক এ কারনেই রাশিয়া যতোবারই ন্যাটোতে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করুক না কেনো, তাতে কখনোই রাশিয়া সফল হবে না। এটাই বাস্তবতা।

রাশিয়া কেনো ন্যাটোতে যোগ দিতে চায়?

রাশিয়ার উদ্দেশ্য-ন্যাটোতে জয়েন করতে পারলে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের মধ্যে একটা যোগবন্ধন তৈরী হবে, ইউরোপের সাথে আরো সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হবে, তাতে তার অর্থনীতিসহ অন্যান্য সেক্টরে আরো লাভবান হবে। এছাড়া ন্যাটোর সদস্য হলে রাশিয়া সদস্য হিসাবে ন্যাটোর অনেক রিফর্ম করা তার পক্ষে সম্ভব হবে। তাতে কোল্ড ওয়ার সিচুয়েশনটাও বন্ধ হবে ইত্যাদি। 

কি হতে পারে যদি রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করে?

  • কোনো কারনে যদি রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করে, এর সবচেয়ে বেশী ইফেক্ট করবে চীনকে। কারন বর্তমানে পশ্চিমারা যাকে প্রধান শত্রু মনে করে সেটা চীন, রাশিয়া নয়। রাশিয়ার সাথে শত্রুতা করে পশ্চিমারা ইউরোপে টিকে থাকা সম্ভব না। কারন রাশিয়া নিজেও ইউরোপের একটা বিশাল অংশ। কোনো না কোনো সময় ইউরোপ রাশিয়াকেই চাইবে, রাশিয়া ইউরোপকে না চাইলেও ইউরোপের বেশী প্রয়োজন রাশিয়াকে।
  • সেন্ট্রাল এশিয়ার পুরানো সোভিয়েট দেশগুলি তখন হয়ত তারাও ন্যাটোতে জয়েন করবে, অথবা চীনের সাথে মার্জ করবে।
  • দক্ষিন আমেরিকার দেশগুলি খুব সম্ভবত রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করলে খুব একটা খুশী হবে না। কারন তারা আমেরিকার বিপক্ষে রাশিয়াকে একটা শক্তি মনে করে। যদি রাশিয়াই ন্যাটোতে জয়েন করে তাহলে তো আর কিছু থাকলো না।
  • নর্থ কোরিয়া একেবারেই এটা পছন্দ করবে না। কারন তাতে নর্থ কোরীয়া একটা পার্টনার হারালো বলে মনে করবে।
  • মধ্যপ্রাচ্য মিক্সড একটা রিসপন্স করবে। সৌদি, জর্দান, ইরাক এরা হয়তো নিরপেক্ষ ভুমিকায় থাকবে, অথবা তারা রাশিয়ার ন্যাটোতে জয়েন করাকে স্বাগত জানাতে পারে। অন্যদিকে ইজরায়েলকে প্রেডিক্ট করা মুষ্কিল, কিন্তু সিরিয়ায়, ইরান, ইয়েমেন অবশ্যই অখুশী হবে।
  • এশিয়া প্যাসিফিকের দেশসমুহ যেমন ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া, কিংবা নিউজিল্যান্ড এরা হয়তো খুশী মনে রাশিয়াকে বরন করবে। তারা চীনের শক্তি কমে যাবে ভেবেই খুশী হবে। জাপান, তাইওয়ান কিংবা দক্ষিন কোরিয়াও খুশী হবে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েত্নাম ভ্র্য কুচকাবে এই ভেবে- এটা রাশিয়া কি করলো?
  • ইন্ডিয়ার সাথে রাশিয়ার এবং পশ্চিমাদের উভয়ের সাথেই সম্পর্ক বেশ গ্রহনযোগ্যতায় আছে। তারা হয়তো খুশী হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।
  • আফ্রিকান এবং নর্থ আফ্রিকান দেশসমুহের মধ্যে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। লিবিয়া, আলজেরিয়া, মিশর, রাশিয়ার এহেনো ন্যাটোতে যোগ দিলে সন্দেহের চোখে দেখারই কথা যদিও তিউনেশিয়া অবশ্যই এটাকে সাধুবাদ জানাবে কোনো সন্দেহ নাই।

তবে এটা ঠিক যে, রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করলে পৃথিবীতে ন্যাটোর আগ্রাসন ভুমিকা, পশ্চিমাদের রুল বেজড অর্ডার, একক হেজিমনি, যুদ্ধ, হানাহানি, কাটাকাটি অনেক কমে যাবে। রিসোর্সের সদব্যবহার হবে, ওয়ার্ল্ড অরগেনাইজেশনগুলির অনেক রিফর্ম হবার সম্ভাবনা থাকবে, ইচ্ছে করলেই কেউ যা খুশী করতে পারবে না।

তাহলে কি রাশিয়া কখনোই ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না?

এই প্রশ্নটা একটা আপেক্ষিকতা আছে। এই মুহুর্তে রাশিয়ার পক্ষে শতবার চেষ্টা করলেও রাশিয়া ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন ইউরোপ বা পশ্চিমারা রাশিয়াকে নিজের থেকেই ন্যাটোতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব পেশ করবে। আর সেটা তাহলে কিভাবে?

চীন এখনো ন্যাটোর বিরুদ্ধে কোনো হুমকীসরুপ বলে মনে হচ্ছে না ঠিকই কিন্তু এক বা দুই দশকের মধ্যে চীন ঠিক ন্যাটো বা পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একটা কঠিন হুমকী হয়ে দাঁড়াবে। সেক্ষেত্রে রাশিয়ার জন্য পক্ষ দুটু (ক) ন্যাটো ভার্সাস পশ্চিমা (খ) চীন। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ঠিক এই মুহুর্তে রাশিয়া চীনের সাথে অনেক বেশী কাছে চলে এসছে। আর ন্যাটো বা পশ্চিমারাও চাইছে রাশিয়া যেনো কোনো অবস্থাতেই চীনের সাথে এতো ঘনিষ্ঠ না হয়। অন্যদিকে পশ্চিমারা চীনের সাথে এমন একটা সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছে যে, আগামীতে চীনের সাথে পশ্চিমাদের আর কোনো সদ্ভাব থাকবে কিনা সন্দেহ আছে। তারমধ্যে তাঈওয়ান উত্তেজনা তাদের এই সম্পর্ককে আরো তলানীতে নিয়ে গেছে। কিন্তু সময়টা খুব বেশী দূরে না যখন চীনকে মোকাবেলা করতেই ন্যাটো তথা পশ্চিমাদেরকে করতে রাশিয়াকে টানতে হবে।

১২/০৭/২০২৩-লিথুনিয়ার ন্যাটোর সম্মেলনে ইউক্রেন একা হয়ে গেলো

লিথুনিয়ার ভেলনিয়াসে ন্যাটোর সর্ববৃহৎ সম্মেলন শেষ হয়ে গেলো। এই সম্মেলনে ইউক্রেন চেয়েছিলো তাদেরকে যেনো একটা টাইমফ্রেম দেয়া হয় কবে নাগাদ তারা ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে। কিন্তু সম্মেলনের প্রথম দিনে ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারটার অফিশিয়াল ডকুমেন্ট যখন প্রকাশিত হয় তখন রাগে ক্ষোভে জেলেনেস্কী তার যাত্রার প্রাক্বালে টুইট করেছিলেন- “We value our allies, Ukraine also deserves respect. It’s unprecedented and absurd when time frame is not set, neither for the invitation nor for Ukraine’s membership. Uncertainty is weakness. And I will openly discuss this at the summit.”

আমার কাছে এটা মনে হয়েছে জেলেনেস্কীর রাগ এবং ক্ষোভ দুটুই ঠিক। কিন্তু তার এই রাগ কার উপরে? ক্ষোভটা কার উপরে? প্রশ্নটা সেখানে। আর এর উত্তরগুলি এসেছে স্বয়ং ন্যাটোতে যোগদানরত আমেরিকান ডেলিগেশনের রান্ড পল থেকে এভাবে-

“Audacious. There’s an old English adage he might need to become aware of: Never look a gift horse in the mouth, we’ve given them $100 billion and he has the audacity to be so brazen as to tell us we’d better speed it up? I’d say that’s audacious. I’d say it’s brazen, and that’s not very grateful for the $100 billion that we’ve given him so far. As long as we continue to supply unlimited arms to Zelensky, I think he sees no reason to have any negotiations. So I think we’re putting off negotiations, but ultimately, the losers are the Ukrainian people.”

ঠিকই তো। যুদ্ধটা তো ইউক্রেনের। এটা না ন্যাটোর, না ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের, না আমেরিকার। যুদ্ধটা তো রাশিয়া বনাম ইউক্রেনের। অন্যের প্রোরোচনায় আর শক্তিতে কেনো একটা দেশ যুদ্ধের মতো সংঘাতে জড়াবে যেখানে পুরুটাই অন্যের বাহুর শক্তির উপর নির্ভরশীল? নেতা কেনো এই সিম্পল ইকুয়েশনটা মাথায় নিলো না?

কি প্রয়োজন ছিলো প্রতিবেশীর সাথে তাও আবার এমন প্রতিবেশী যাকে তারা সকাল হলেই দেখা হয়, একে অপরের ভাষা বুঝে, কালচার এক, ব্লাডও এক, এমন প্রতিবেশীর সাথে শত্রুতা করে এবং প্রতিবেশীর শত্রুর সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখে কি কখনো সুখে থাকা যায়? কোনোভাবেই উচিত হয়নি।

যাক সে কথা, অবশেষে ভিলনিয়াস সম্মেলনে ইউক্রেনকে কোনঠাসা করে বিবৃতি দেয়া হলো-ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদ পেতে হলে এলায়েন্সের সবার গ্রহণযোগ্যতা লাগবে, ইউক্রেনকে ন্যাটোর স্টান্ডার্ডে আসতে হবে এবং রাশিয়ার সাথে প্রয়োজনে নেগোশিয়েশন করতে হবে, নতুবা নয়। তবে ইউক্রেনকে অস্ত্র এবং সরঞ্জাম দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সহায়তা দেয়া হবে। কিন্তু সেটা কতটুকু?

কি দরকার ছিলো এসবের? তারা কি এতোই রাশিয়ার দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছিলো? নাকি ওরাই রাশিয়ান ভাষাভাষী মানুষগুলিকে ইথিনিক ক্লিঞ্জিং এর মাধ্যমে নিঃশেষ করার পায়তারা করছিলো? সেই ক্রিমিয়া, ডনবাস, খেরসন, এরা তো ইউক্রেনের মধ্যেই বসবাস করতো। তারা তো ইউক্রেনের নাগরিকই ছিলো। তাদেরকে নিয়ে কি একসাথে থাকা যেতো না? এখন তাহলে কি দাড়ালো? সেই ডনবাস, সেই জেপোরিজিয়া, সেই মারিউপোল, সেই খেরশন ইউক্রেন থেকে আলাদা হয়ে গেলো। ইউক্রেনের নিজের ঘরের ভিতরেই অথবা চৌকাঠের সীমানায় বিভীষণদের বসবাস। ন্যাটোতে গেলেও তো ইউক্রেনের ঠিক পাশেই এসব অঞ্চলের মানুষগুলির বসবাস চলমান থাকবে। প্রতিবেশী হিসাবে, ঘ্রিনা আর ক্ষোভ নিয়ে।

ভিলনিয়াসের ডিক্লেয়ারেশনের মাধ্যমে আমার কেবলই মনে হচ্ছে-ইউক্রেন এখন প্রায় একা হয়ে গেলো। যুদ্ধ চলবে যুদ্ধের মতো, অস্ত্র আসবে ব্যবসায়িক লাভের জন্য, মাঝখান দিয়ে নীরিহ জনগনগুলির দূর্ভোগের আর সীমা রইলো না। একটা ভুল সাইডে দাঁড়িয়ে জেলেনেস্কী তার দেশের মানুষের কাছে আজীবন ঘৃণার পাত্র হয়ে রইবে, রাশিয়া কখনোই আর ইউক্রেনকে বিশ্বাস করবে না, পশ্চিমারা যখন কাউকে আর দরকার নাই মনে করে তাকে একাই ছেড়ে দেয়। এই শিক্ষাটা কেউ নেয় না। ইরাক, আফগানিস্থান, লিবিয়া, কাতার, ইউগোস্লাভ, সিরিয়া কিংবা অন্য দেশের লেসন থেকেও কেউ শিক্ষা নিলো না।

ইতিহাস কখনোই কারো ইতিহাস মুছে ফেলে না। রাশিয়ার এই আগ্রাসন, জেলেনেস্কীর এই ভুল সাইডঃ নির্ধারন, পশ্চিমাদের এই রকম আচরন বংশ পরম্পরায় মানুষ ইতিহাস থেকে জানতেই থাকবে যেমন মানুষ এখনো ২য় মহাযুদ্ধের কথা, আনা ফ্রাংকের ডায়েরীর কথা, নরম্যান্ডি ল্যান্ডের কথা, হিটলারের নির্বুদ্ধিতার কথা, কিংবা মুসুলিনি এদের সবার কথা আজো আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গবেষনা করি এবং জানি কত হিংস্র সময় কাটিয়েছে সেই দিনের মানুষগুলি।

শান্তির কোনো বিকল্প নাই। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। স্রষ্টা কোনো দেশকেই নিজ থেকে বাউন্ডারী ভাগ করে দেয় নি। না রিসোর্স কাউকে তিনি একাই সব দিয়েছেন কাউকে।

১১/০৭/২০২৩-যুদ্ধটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এটা শুধু বলতে পারবে “সময়”।

প্রথমদিকে যেভাবে পুরু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং পশ্চিমারা ইউক্রেনকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, রিফুজি একোমোডেশন এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাহাজ্য করেছিলো, সেটা অনেকাংশেই এখন ভাটা পড়েছে। যে কোনো টেনশন কিংবা এখানে যুদ্ধ নামক উত্তেজনাটা যদি ধরি, দেখা যাবে যে, প্রতিটি দেশ এখন তাদের নিজস্ব সার্থ নিয়ে ভাবছে। এটা কোনো দোষের না। লম্বা সময় ধরে কেউ নিজের দেশের সার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে অন্যকে এমনভাবে সহায়তা করে না যেখানে নিজেরাই নিঃস্ব হবার মতো অবস্থা। ফলে ইউরোপিয়ান দেশসমুহের একে অপরের মধ্যে সহায়তা না দেয়ার মনোভাবে একটা টক্কর লাগছে। উদাহরন-বুলগেরিয়া। সেতো সরাসরি বলেছে যে, তার রিজার্ভ নষ্ট হয়, ঝুকির মধ্যে পড়ে এমন সহায়তা সে কখনোই করবে না কারন যুদ্ধটা তার নয়, যুদ্ধটা ইউক্রেনের। ব্রাজিল বলেছে-১২০০ মেইল দূরের কোনো যুদ্ধ তাদেরকে কেনো প্রভাবিত করবে? প্রয়োজন নাই।

ঠিক এভাবেই যত সময় পার হচ্ছে- বিভিন্ন ইউরোপিয়ান এবং পশ্চিমা দেশের জনগনের কাছে ইউক্রেন যুদ্ধটা এখন যেনো গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। যেই ন্যাটোর স্বপ্ন ইউক্রেন দেখে আসছে ২০০৮ সাল থেকে, সেই ন্যাটোই এখন খোলাখুলি বলছে যে, যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ না হয়, আর যদি ইউক্রেন সভ্রেন কান্ট্রি হিসাবে এক্সিষ্ট করে, তাহলেই প্রয়োজনীয় রিফর্মের পরে ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্য করবে। এর আগে নয়।

প্রশ্ন এখানে ৩ টা (ক) যুদ্ধ শেষ হতে হবে (খ) যুদ্ধ শেষে যদি ইউক্রেন দেশ হিসাবে আদৌ টিকে থাকে (৩) অতঃপর ন্যাটো স্ট্যান্ডার্ড মোতাবেক ইউক্রেনকে কোয়ালিফাই করতে হবে। তিনটা অপশনই ইউক্রেনের জন্য যথেষ্ট কঠিন।

আমি রাশিয়া বা পুতিন প্রেমিক নই। কিন্তু একক দেশ হিসাবে সবচেয়ে বেশী (আমেরিকার থেকেও বেশী) নিউক্লিয়ার ধারী রাশিয়া যার রিসোর্সের কোনো কমতি নাই, (গ্যাস তেল, খাদ্য সামগ্রী, লোহা, গোল্ড, সার ইত্যাদি), সেই রাশিয়া এই যুদ্ধকে রীতিমত টেনে লম্বা করা কোনো ব্যাপারই না। তারমানে হচ্ছে- যুদ্ধটা এখনি শেষ হচ্ছে না। যুদ্ধটা যদি লম্বা সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে ইউক্রেনকে সহায়তাকারী দেশ সমুহের মধ্যে একটা ফেটিগ চলে আসবে। আর এই ফেটিগ থেকে ধীরে ধীরে যুদ্ধটাকে জনগন একটা বোঝা মনে করবে তেমনি সাহাজ্যের পরিমানও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, কমছেও। আর তাদের সাহাজ্যে ভাটা পড়া মানেই ইউক্রেন আরো বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। যুদ্ধটা না চালিয়ে নিতে পারবে, না হারানো টেরিটরী পুনরুদ্ধার করতে পারেবে, না নেগোশিয়েশনে বসতে পারবে।

২য় প্রশ্নে আসি। এই মুহুর্তে ন্যাটোতে ইউক্রেনকে সদস্য পদ দিবেই না। কারন সদস্য পদ দেয়া মানেই ন্যাটোর আর্টিক্যাল-৫ অনুযায়ী রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। এটা কোনো পাগলেও এলাউ করবে না। ফলে ন্যাটর এই প্রক্সী ওয়ারে ন্যাটোর তথা ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত দেশ সমুহের সব যুদ্ধাস্ত্র ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে তারাও সার্বিক ঝুকির মধ্যে পড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এখন একটা ফাদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরু ইউরোপ বনাম ন্যাটো বনাম পশ্চিমাদের কাছে। না সরাসরি যুক্ত হতে পারছে, না ছেড়েও দিতে পারছে। যদি এমনই পরিস্থিতি চলতে থাকে যেখানে ন্যাট কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশ সমুহ অথবা পশ্চিমারা পর্যাপ্ত মিলিটারী, আর্থিক সহায়তা দিতে না পারে, তখন রাশিয়া ধীরে ধীরে ইউক্রেনকে এমন একটা রাষ্ট্রে পরিনত করতে সুযোগ পাবে যে, ইউক্রেনের স্বাধীন সার্বোভউম মর্যাদা রাষ্ট্র হিসাবে থাকবে কিনা সেটাই সন্দেহ। আর এটাই ন্যাটোর মহাসচীব তার শেষ বক্তব্যে বুঝানোর চেষ্টা করছেন। ন্যাটোর মহাসচীব স্টলটেন্ট গলা ফাটিয়ে সবাইকে এখন যে যা পারে, সাহাজ্য করতে বলেই যাচ্ছে কিন্তু সেই উচ্চস্বরের চিতকারের সমানুপাতিক সাহাজ্য এখন কোনো দেশই করছে না। শুধু আশ্বাস, শুধু কথা, শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে দেখিয়ে কতদিন? তারপর?

তার আর পর নাই।

কিন্তু ইউক্রেনের দোষ কোথায়? ইউক্রেন যদি আসলেই ইউরোপের নিরাপত্তার দরজা হয়ে থাকে, তাহলে তাকে কেনো ২০০৮ সালেই ন্যাটোতে নেয়া হলো না? যদি তাকে ২০০৮ সালে ন্যাটোতে সদস্যপদ করা হতো, রাশিয়া কোনোদিনই ইউক্রেনকে আক্রমন করার সাহস পেতো না। অথচ এখন তারা তাকে ফুসললিয়ে ফুসলিয়ে এমন একটা মরনপন যুদ্ধে জড়িয়ে ফেল্লো যে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ পুরুই অন্ধকারের মতো। ইউক্রেনের সাধারন মানুষগুলির কি অপরাধ ছিলো? তারা তো ভালোই ছিলো। এখন তারা বিভিন্ন দেশে রিফুজি, কেউ কেউ ধর্ষিতা, অনেকেই এতিম, আবার অনেকেই জানে না তাদের প্রিয়জন কোথায়।

যুগে যুগে কিছু নেতা আসে, যারা নেতার ভূমিকায় জনগনের কল্যানে না এসে জনগনকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে নিজেরা পালিয়ে যায়। সাফার করে আমজনতা।

এসব জেলেনেস্কী, হিটলার, নীরু, মুসুলিনিরা এক সময় চলেই যায়, কিন্তু সাফার করে বংশ পরম্পরায় সেই সব নীরিহ মানুষ গুলি যারা রক্ত দেয়, যারা পরিবার হারায়, কিংবা যাদের সুন্দর ভবিষ্যত দেখার আর কোনো সুযোগ থাকে না।

একটা সবচেয়ে খারাপ শান্তি চুক্তিও একটা যুদ্ধের চেয়ে ভালো। যেদিন জেলেনেস্কী বুঝবে, সব শেষ হয়ে যাচ্ছে- হয় সেদিন সে গায়েব হয়ে যাবে, নতুবা কোনো এক নিরাপদ আশ্রয়ে জীবন জাপন করবে, অথবা এই দুনিয়াই তাকে ছাড়তে হবে। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিলো না।

তাই যুদ্ধটা বন্ধ হোক, আর এখুনী।

১০/০৭/২০২৩-রুপীতে বানিজ্য

বর্তমানে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ব্যবসা করে ডলার কারেন্সীর উপর। প্রথমে ডলার থেকে রুপীতে কনভার্ট করে অতঃপর এক্সপোর্টের ব্যয় বহন করা হয়। এতে বাংলাদেশকে দুটু কনভার্সনের মাধ্যমে যেতে হয় ৯ক) একটা টাকা থেকে ডলারে (খ) আবার ডলার থেকে রুপীতে। এই কনভার্সনে বাংলাদেশের বেশ কিছু সিস্টেম লসের মতো লস গুনতে হয়।

কিন্তু যদি সরাসরী বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া রুপীতে ব্যবসা করে, তাহলে বাংলাদেশকে শুধুমাত্র একটা কনভার্সনে যেতে হবে, আর সেটা হলো টাকা থেকে রুপীতে।

দুইদেশ এভাবে ডলারের বাইরে রুপীতে ব্যবসা করতেই পারে। আর পারলে ভালো। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে- বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া ২ বিলিয়ন সমপরিমান মালামাল আমদানী করে আর বাংলাদেশ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের মালামাল আমদানী করে ইন্ডিয়া থেকে। ২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমান রুপিতে ব্যবসায় বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নাই কিন্তু বাকী ১২ বিলিয়ন ডলার কিভাবে ম্যানেজ করা হবে, সেটা।

যদি ইন্ডিয়া এই বাকী ১২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমান রুপী বাংলাদেশের কারেন্সী টাকাকে একটা ফিক্সড বা ন্যনুতম একচেঞ্জ রেটের মাধ্যমে রাজী হয়, তাহলে ব্যাপারটা আপাতত সহজ হবে। নতুবা বাংলাদেশ সেই ২ বিলিয়ন ডলারের বাইরে ইন্ডিয়ান রুপীতে বাকী ১২ বিলিয়ন ডলারের বিল সমন্নয় করতে পারবে না।

তবে একটা সার্ভের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে যে, সরকারী ডিক্লেয়ারেশনের মাধ্যমে শুধুমাত্র ২ বিলিয়ন ডলার সমপরিমান রপ্তানী হয় আমাদের দেশ থেকে কিন্তু আনডিক্লেয়ারড বা আনঅফিশিয়ালী রপ্তানীর পরিমান প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমান। যদি এই আনডিক্লেয়ারড বা আনঅফিশিয়াল রপ্তানীগুলি অফিশিয়াল্ভাবে করার সিস্টেম তৈরী করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া এই দুই দেশের মধ্যে রুপিতে ব্যবসা কোনো জটিল বিষয় নয়। কিন্তু আমাদের দেশের আইন করে এসব আনঅফিশিয়াল ডিক্লেয়ারেশন ব্যবসা থামানো সম্ভব কিনা সেটা কার্যকর করা খুবই জটিল এবং অসাধ্য ব্যাপার। 

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে, সবসময় ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং এ  “নস্ট্রো” একাউন্ট নামে একটা একাউন্ট খুলতে হয় যেখানে ট্রানজেক্টরী দেশের কারেন্সী সেখানে জমা হয় বা থাকে। যতোটুকু রিজার্ভ বা কারেন্সী সেখানে থাকবে, ততটুকুই দেশসমুহ ইন্টারচেঞ্জ করে ব্যবসা করতে পারে। ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝাতে পারলাম কিনা জানি না, The nostro account is an account that a bank holds with a foreign bank in the currency of the country where the funds are held. It is used to facilitate foreign exchange and international trade transactions involving foreign currencies.

ট্রেড ডেফিসিয়েট যদি অফিশিয়ালী এতো বিশাল ব্যবধান না হতো, তাহলে ব্যাপারটা কোনো জটিল ছিলো না। যে সব দেশে আমদানী এবং রপ্তানী প্রায় দুপক্ষের মধ্যে সমানে সমান, সেসব দেশে তাদের নিজস্ব কারেন্সীতে ব্যবসা করা একেবারেই সহজ।

তাই এখানে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ার ট্রেড ডেফিসিয়েন্ট অনেক বেশী বিধায় বিকল্প চুক্তি করা আবশ্যক যেখানে রুপি এবং টাকার মধ্যে একটা আন্তর্জাতিক সমঝোতা পত্র লাগতে পারে। তাতে বাংলাদেশ একটা ঝুকির মধ্যে পড়তে পারে।

০৬/০৭/২০২৩-সাকাশভিলি এবং জেলেনেস্কী

আমি UNOMIG (United Nations Observer Missions in Georgia) তে কাজ করার সময় জর্জিয়ায় কেনো শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন হইলো সেটা খুব কাছ থেকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছিলাম।

জর্জিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট শাকাসভিলি বর্তমানে জেলে আছেন। এর প্রধান কারন, তিনি তার প্রেসিডেন্সির মেয়াদে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং সেই অপব্যবহারের কারনে জর্জিয়াকে পর পর দুটু রিজিয়ন তার ভুখন্ড থেকে হারাতে হয়েছে-(ক) আবখাজিয়া (খ) সাউথ ওসেটিয়া। দুটুই জর্জিয়ার অংশ ছিল যা বর্তমানে স্বাধীন কিন্তু রাশিয়া অনুরাগী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-জর্জিয়ার অভ্যন্তরের এই দুটু রাজ্য কিভাবে হাতছাড়া হয়ে গেলো যেখানে ভুখন্ড এক, কন্সটিটিউশন এক এবং একই শাসকের অধীনে?

শাকাসভিলি পশ্চিমাদের অনুগত হয়ে সাউথ ওসেটিয়ায় স্নিক এটাক করে তার শাসনামলে সাউথ ওসেটিয়ার অটোনোমাস স্ট্যাটাস থেকে জর্জিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলো যদিও ওসেটিয়া জর্জিয়ারই একটা অংশ মনে করা হতো। তাইওয়ানের মতো। জর্জিয়া যখন সাউথ ওসেটিয়াতে আক্রমন করে, ঠিক তখন রাশিয়া ওসেটিয়ার পক্ষ নেয় এবং ৫ দিনের মধ্যে জর্জিয়া হেরে যায় এবং সাউথ ওসেটিয়া স্বায়ত্তশাসন থেকে পুরুপুরি সার্বোভোম রাজ্যে পরিনত হয়, ফলে জর্জিয়া সাউথ ওসেটিয়াকে হারায়। একইভাবে আবখাজিয়াও তাই। আবখাজিয়াও জর্জিয়ার সায়ত্তশাশন থেকে পুরুপুরি স্বাধীন রাজ্যে পরিনত হয়।   

পরবর্তীতে জর্জিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রেসিডেন্ট স্থলাভিষিক্ত হয় এবং শাকাসভিলি দেশ থেকে পালিয়ে ইউক্রেনে চলে যায়। ইউক্রেনে যাওয়ার পর, ইউক্রেন (পাশ্চাত্য আদেশে) ওডেশার গভর্নর নিয়োগ করে। ইউক্রেন যুদ্ধের ঠিক আগে শাকাসভিলি ওডেসা থেকে আবার জর্জিয়া ফেরত যায়। তার অথবা পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্য ছিলো ইউক্রেনের পাশাপাশি জর্জিয়াকেও অশান্ত করা। কিন্তু জর্জিয়ার শাসকগন কিছুতেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ভূমিকা পালন করতে নারাজ ছিলো। ফলে শাকাসভিলির মিশন ফেল করে এবং তাকে এরেষ্ট করে বিচারের সম্মুখীন করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এখনো সে জেলে আছে।

এবার আসি ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে।

বিশ্ব মহল মনে করছে যে, ইউক্রেনের যুদ্ধটা ঠিক একই ফরমেটে চলছে। আর সেটা কিভাবে? জেলেনেস্কী ক্ষমতায় আসার পর তার পেট্রোনদের অনুগত হয়ে ২০১৪ সাল থেকে একাধারে ডনবাসে স্নিক এটাক করেই যাচ্ছিলো। ডনবাস কিন্তু সাউথ ওসেটিয়ার মতো কোনো স্বায়ত্তশাসিত রিজিয়ন ছিলো না। এটা ছিলো ইউক্রেনের ভুখন্ডের অবিবেচ্ছদ্য অংশ কিন্তু বেশীর ভাগ রাশিয়ান ভাষাভাষী নাগরিক। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীও যত দ্রুত ডনবাসকে পুরুপুরি ইউক্রেনীয় কালচারে, আইনে আনা যায় সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। কিন্তু রাশিয়ার স্পেসাল অপারেশন এখানে সেই সাউথ ওসেটিয়া কিংবা আবখাজিয়ার মতো রুপ নিলো। ডনবাস সহ আরো চারটি রিজিয়ন যারা ইউক্রেনের সাথে কোনো সংঘাতেই ছিলো না, ইতিমধ্যে সেগুলিও রাশিয়ার কাছে হাতছাড়া হয়েছে ইউক্রেনের, এবং শুধু তাইই নয় তারা রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে যুক্তও হয়েছে।  গত ১৬ মাস যাবত ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে এবং এটার কোনো সাফল্য ইউক্রেন এখনো হাতে পায়নি। আর পাবে কিনা সেটা এখনো কিছুই বলা যাচ্ছে না। এই স্পেশাল অপারেশনে ইউক্রেন জর্জিয়ার ওসেটিয়ার লক্ষন থেকেও খারাপ পর্যায়ে রয়েছে। যদি কোনো কারনে পশ্চিমারা এবং ন্যাটো তাদের সাপোর্ট ইউক্রেনে হ্রাস কিংবা বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইউক্রেন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে তার কোনো অস্তিত্ব থাকবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। সাউথ ওসেটিয়ার যুদ্ধটাও পাশ্চাত্যের এবং ন্যাটো ফোর্সের জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটা প্রক্সি ওয়ার ছিলো।

বর্তমানে বলা হচ্ছে যে, ইউক্রেনের কাউন্টার অফেন্সিভে সাফল্য না পেলে ইউক্রেন, তাকে পরবর্তী সাপোর্ট পাশ্চাত্যরা দিবে কিনা আর দিলে কতটুকু সেই বিষয়ে এখন আলোকপাত হচ্ছে। এর মানে প্রক্সি ওয়ারটা প্রায় ধইর্যের শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে ইউক্রেন তার সিংহ ভাগ মিলিটারী জনবল, ইয়াং জেনারেশন, এবং অন্যান্য ফেসিলিটিজ হারিয়ে ফেলেছে। দেশটি এখন ধংস্তসুপের আখড়া। জেলেনেস্কী এবং তার মিলিটারী কমান্ড ইতিমধ্যে এটা বুঝে গেছে যে, অফেন্সিভ, বা কাউন্টার অফেন্সিভ যেটাই বলা হোক না কেনো, এর ফলাফল অনিশ্চিত। যার কারনে জেলেনেস্কী, কুলেভা, কিংবা তার পরিষদবর্গ সাথে Chair of the House Foreign Affairs Committee Michael McCaul এর মধ্যে এই যুদ্ধে হারার পিছনে ন্যাটো কিংবা পশ্চিমাদের দায়ী করছেন সরাসরি। জেলেনেস্কী নিজেও এটা বুঝতে পারছেন যে, সে ইউক্রেনকে নিয়ে না ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে, না সে এই স্পেশাল অপারেশনে কোনো সাফল্য দেখাতে পারবে। 

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা হচ্ছে যে, ইউক্রেনের যে চারটি রিজিয়ন রাশিয়া দলখল করে নিয়েছে, সেগুলিতে ইউক্রেনের সাথে কোনো সমস্যাই ছিলো না। এখন সেই রিজিয়নগুলিই উদ্ধার করা ইউক্রেনের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। আর এই নিরপেক্ষ রিজিয়নগুলি পুনরায় উদ্ধার করতে গিয়ে ইউক্রেন তার সবকিছু হারাচ্ছে। ইউক্রেন যদি মার্চ ২০২২ এ দিপাক্ষীয় চুক্তিটা করে ফেলতো তাতে অন্তত জ্যাপড়িজ্জিয়া এবং খেরসন রিজিয়ন দুটি ইউক্রেনের অধীনেই থাকতো। কিন্তু Anglo-American Axis sabotage spring 2022’s peace process এর কারনে ইউক্রেন সেই চুক্তি থেকে সরে আসে যা একেবারেই ওসেটিয়া এবং আবখাজিয়ার ফরমেট।

এই অবস্থায় ইউক্রেনে পাশ্চাত্যরা যদি এই প্রক্সি ওয়ারে হেরেই যায়, এর থেকে অপমানজনক আর কিছু হতে পারেনা, এটাই পাশ্চাত্যের বদ্ধমুল ধারনা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাটো কিংবা পাশ্চাত্যরা তাদের মানসম্মান একটু হলেও বাচানোর জন্য যেটা ওরা করে, সেটা হচ্ছে-পপুলার সাপোর্ট বিবেচনা করে রিজিম পরিবর্তন করে দেয়, যেমন করেছে জর্জিয়ায়, আফগানিস্থান, কিংবা ইরাক  বা অন্য দেশগুলিতে। এর অর্থ-জেলেনেস্কী আর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নাই। মান রক্ষার্থে হয় ইউক্রেনে একটা ইন্টারনাল রায়ট হবে এবং সেই রায়টে পরে একটা সাধারন নির্বাচন হবে এবং এই ইন্টারনাল আন্দোলন ঠেকাতে সামনে আসবে আর্মির কমান্ডার ইন চীফ ঝালুজনি অথবা গোয়েন্দা চীফ বুদানভ। এটাও সে জর্জিয়ার সেই শাকাসভিলি পরিনতির মতো।

শাকাসভিলির মতো জেলেনেস্কীকেও তার ক্ষমতা হারানোর পর ক্ষমতার অপব্যবহার করার কারনে, দেশে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি করে যুদ্ধ ঠেকানো যেতো এই মনে করে কিংবা তার বিরোধী দলকে সম্পুর্ন দমন করে শাসনভার চালানোর কারনে অপরাধী করা হবে। জেলেনেস্কী যদি ইউক্রেনেই থাকে তাহলে তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, অথবা তাকে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র নির্বাসনে চলে যেতে হবে।

পশ্চিমাদের কোনো এলি নাই, আছে শুধু ভেসেল যা তারা হয় শাকাসভিলি কিংবা জেলেনেস্কীর মতো শাসকদের দ্বারা বাস্তবায়িত করার কাজে লিপ্ত থাকে। কেনো বললাম যে, পাশ্চাত্যদের কোনো এলি নাই, কারন এলি রাজ্যগুলিকে পাশ্চাত্যরা তাদের লয়ালটির কারনে যে কোনো পর্যায়েই যাবতীয় সমস্ত কিছু দিয়ে, এমন কি তাদের নিজের দেশের মানুষের সার্থকে জলাঞ্জলী দিয়ে হলেও সাহাজ্য করে। এই ক্ষেত্রে বিশেষ করে জর্জিয়া, আফগানিস্থান কিংবা ইউক্রেনের ব্যাপারে তারা এদেরকে ভ্যাসেল মনে করে, এলি না। ইউক্রেন হচ্ছে সেই আরেকটা ভেসেল যেখানে ইউরোপ, ইউএস-ব্যাকড ন্যাটো কিংবা পাশ্চাত্য তাদের ইউনিপোলারিটি যাতে ম্রিয়মাণ না হয় সেটা রক্ষার্থে যতদিন সাপোর্ট করা যায় সেটা করবে। যেদিন ইউক্রেন যুদ্ধটা ফ্রোজেন হয়ে যাবে, কিংবা ইউক্রেন হেরে যাবে কিংবা যখন ইউনিপোলারিটি ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ হয়ে যাবে, কিংবা ধীরে ধীরে ডি-ডলারাইজেন আরো গভীর হবে, তখন জেলেনেস্কীর আর কোনো প্রয়োজনই হবে না তার পেট্রোনদের।

তখন একটা প্রশ্ন বাকী থাকবে-জেলেনেস্কী কি শাকাসভিলির মতো জেলে থাকবে নাকি ফ্রিম্যান হিসাবে রাজকীয় জীবন পরিচালনা করবে নাকি সে তার জীবন দিয়ে প্রমান করবে যে, ইচ্ছে করলেই পরিস্থিতি পালটে দিতে পারতো যেখানে সাধারন নাগরিকেরা অন্তত মারা যেতো না, দেশটার অখন্ডতা রক্ষা পেতো।

সময় বলে দিবে।  

২৭/০৬/২০২৩-প্রিগোজিন ক্যু বা ট্রিজন নাকি একটা ছদ্ধবেশ অপারেশন?

বেশ কদিন যাবত আমি প্রিগোজিনের ক্যু এর চেষ্টা নিয়ে বিস্তর খবরাখবর পড়ছিলাম। অনেকগুলি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। উত্তরগুলি জানা নাই তবে প্রশ্নগুলির মধ্যেই যেনো উত্তরগুলি লুকিয়ে আছে এটাই বারবার মনে হয়েছে। প্রশ্নটা হচ্ছে- প্রিগোজিন যা করেছে এটা কি ক্যু নাকি একটা গভীর ক্যামোফ্লাজের অংশ? এর কিছুটা উত্তর প্রিগোজিন নিজেই দিয়েছেন যে, সে রাশিয়ার সরকারকে উতখাত করতে এটা করেনি, মানে এটা ক্যু নয়। সে ন্যায় বিচারের আশায় মস্কোতে যেতে চেয়েছিলো যেখানে সেনাপ্রধান এবং ডিপুটি সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ।

যদি ক্যু না হয়ে থাকে, তাহলে এটা ছিলো একটা পরিকল্পিত নাটক যার পক্ষে বেশ কিছু জোরালো পয়েন্ট আছেঃ

(ক) ওয়েগনার গ্রুপ কিন্তু প্রিগোজিনের দ্বারা স্রিষ্টি নয়, না সে এর মালিক। ওয়েগনার গ্রুপ রাশিয়ান সরকারের অর্থে পরিচালিত হয়। প্রিগোজিন এর ম্যানেজারের মতো।

(খ) একটা জিনিষ খেয়াল করার মতো। প্রিগোজিন কয়েক মাস যাবত রাশিয়ান মিলিটারীর উর্ধতন কমান্ডারদের বিপক্ষে অনেক আজে বাজে মন্তব্য করার পরেও পুতিন প্রিগোজিনকে কোনো প্রকার ভতর্সনা করেন নাই, না তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমন কি কোনো উর্ধতন কমান্ডারগনও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার মুখ খুলেনি। এর কারন কি? সম্ভবত পরিকল্পনাটা অনেক আগে থেকেই সাজানো হচ্ছিলো। আর প্রিগোজিনের এসব উলটা পালটা মন্তব্য অনেকটা সাজানো কোনো মহাপরিকল্পনারই অংশ বলে মনে হয়। তারমানে প্রিগোজিনকে এই কাজ করতে কেউ উদ্বুদ্ধ করেছে। সেটা কে? এক কথায় যদি উত্তর দেই-এটা পুতিন।

(গ) প্রিগোজিন রোস্তভ-অন-ডন মিলিটারী হেড কোয়ার্টার, এয়ারবেস, এবং বেশ কিছু মিলিটারী স্থাপনা জাষ্ট এলো আর দখল করে নিলো। এটা কি বিশ্বাস করার মতো যে, এতোগুলি মিলিটারী স্থাপনা এতোই অরক্ষিত যে, কোনো বাধা ছাড়া কেউ দখল করে নিতে পারে? তারমানে যে, তাকে দখল করতে দেয়া হয়েছে। কোনো গুলাগুলি নাই, কোনো ক্যাজুয়ালিটি নাই, কোনো বাধাও নাই। রোস্তভ-অন-ডন এর মেইন গেটে বিশাল ট্যাংক ঢোকে গেলো। ছাদের উপরে ওয়েগনারের সৈনিক, অফিসের সামনে সৈনিকেরা এমনভাবে গোল চত্তরে অস্ত্র নিয়ে বসে আছে যেনো, কোনো লম্বা সফরের মধ্যে মাঝে একটা বিরতি। কেউ ভয়ে নাই। শুধু তাইই নয়-রাশিয়া সরকার প্রিগোজিনের বিরুদ্ধে প্রায় ১২ ঘন্টা কোনো প্রকার একশানেই যায়নি। আরো মজার ব্যাপার হলো, জনসাধারনের মাঝে কোনো প্রকার ভয়ের ছাপও দেখা যাচ্ছিলো না। সবাই যেনো স্বাভাবিক কাজকর্ম করছে, ওয়েগনার সদস্যদের সাথে ছবি তোলছে, হ্যান্ডসেক করছে, চা কফি পান করছে। একেবারেই সহজ ব্যাপার মনে হচ্ছিলো। অন্যদিকে প্রিগোজিন এবং তার দুই উর্ধতন কমান্ডার রোস্তভ-অন_ডন এর সামনে গাছের নীচে রিল্যাক্স ভংগিতে যেনো কোনো একটা পুরানো রম্য ঘটনা নিয়ে গল্পে মশগুল এমনভাবে একটা ভিডিও দেখা যাচ্ছে। তারমধ্যে কোনো প্রকার দুসচিন্তার ছাপ ছিলো না যে, সে এমন একটা রাষ্ট্রোদ্রোহী কাজে লিপ্ত হয়েছে। খুব সুক্ষভাবে চিন্তা করলে আরেকটা ব্যাপার চোখে পড়বে। ঘটনাটা ঘটেছে শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির জাষ্ট আগে। শনিবার, রবিবার বন্ধ। জনসাধারন হলিডে মুডে ছিলেন। অফিশিয়াল কোনো প্যারা নাই। আবার চকলেট দেয়ার মতো সরকার সোমবারকেও ছুটি ঘোষনা করেছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার।

(ঘ) প্রিগোজিন বক্তব্য দিয়েছে যে, সে তার বাহিনীকে নিয়ে মস্কোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে যা প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার দূরে। ওয়েগনারের মোট সদস্য প্রায় ২৫০০০। এর মধ্যে মাত্র হাজারখানেক সদস্য অংশ নিয়েছে। ওয়েগনারের আর বাকী সদস্যরা কোথায় ছিলো? এই এক হাজার সৈন্যের কিছু অংশ রোস্তভ-অন-ডনে, কিছু ভোরোনেজ এলাকায়, কিছু লিপিটস্কে মোতায়েন করে বাকী হাতে গোনা কিছুসংখ্যক সৈন্য আর গুটিকতক ট্যাংক তাও আবার পুরু খোলা ময়দানের মতো রাস্তা দিয়ে ১৩০০ কিলোমিটার দূরে ২০ ঘন্টা আল্টিমেটামে মস্কো দখল করার অভিপ্রায়। মস্কোতে প্রায় ১৫ মিলিয়ন লোক বাস করে, শত শত গ্যারিশন, মিলিটারী স্থাপনা, এইসবের কোনো ক্যালকুলেশন না করেই প্রিগোজিন রওয়ানা হয়ে যাবে মস্কোতে একটা ক্যু করার জন্য? অবিশ্বাস্য মনে হয় না এটা? তারমধ্যে ট্যাংক রিফুয়েলিং দরকার, কোনো এয়ার সাপোর্ট নাই, না আছে কোনো আর্টিলারী সাপোর্ট। প্রিগোজিন কি জানে না যে, রাশিয়ার একটা এয়ার সর্টিই যথেষ্ঠ প্রিগোজিনের ট্যাংক বহরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য। প্রিগোজিন একজন সমর অভিজ্ঞ মানুষ। তার দ্বারা এমন একটা পরিকল্পনা কি বাস্তবে যায়?

(ঙ) পুটিন তার ভাষনে বললেন-তিনি মাত্র একদিন আগে সমস্ত ডিভিশনাল কমান্ডারস, ইন্টিলিজেন্স হেড কোয়ার্টারস, ফিল্ড কমান্ডার্সদের সাথে একযোগে কথা বলেছেন (কারো কারোর সাথে সরাসরি ফেস টু ফেস, কারো সাথে ভিডিও লিংককে)। এই সময় কোনো সাংবাদিক হাজির ছিলেন না। তিনি আসলে কি কথা বলেছেন? রাশিয়ার ইন্টিলিজেন্স কি এতোটাই ঘুমন্ত যে, প্রিগোজিনের এমন একটা ক্যু তাদের কারোরই নজরে আসবে না, কোনো আগাম তথ্য থাকবে না? এটা কি হতে পারে? এখন যদি প্রশ্নটা অন্যভাবে করি যে, প্রিগোজিন নাটকটা করার জন্যই পুতিনের এই সিক্রেট দরবার করেছিলো যেখানে সব কমান্ডার্স, ওয়েগনার গ্রুপ, ইন্টিলিজেন্স ডিপার্ট্মেন্ট সবাইকে অনবোর্ড করা এবং প্রিগোজিন নিজেও একটা ভূমিকার অংশ!! এখানে মনে রাখা দরকার যে, প্রিগোজিন এবং পুতিন তারা বাল্যকালের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারমানে ধরে নেয়া যায়, এখানে পুতিন থেকে শুরু করে সবাই যার যার অংশে একটা রিয়েল অভিনয় করেছে। স্টেজ মেনেজমেন্ট এন্ড গুড রিহার্সড। প্রিগোজিন সেটাই করেছে যেটা পুতিন তাকে করতে বলেছে। নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুসারে প্রিগোজিনের বিরুদ্ধে ইমিডিয়েট ট্রিজনের মামলা দেয়া হলো। কিন্তু তাকে কিছুতেই এরেষ্ট করা হলো না। অতঃপর, দিনভর লোক দেখানো পর্দার আড়ালে বসে বেলারুশ প্রেসিডেন্টের একটা অনুরোধে প্রিগোজিন এমন একটা রাষ্ট্রোদ্রোহী কাজ থেকে হুট করে ব্যাক করলো, ওয়েগনার সদস্যদের ইমিডিয়েট সব জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়া হলো। একবার কি মনে আসে না যে, বেলারুশ যেটা কিনা রাশিয়ার ট্রাষ্টেড বন্ধু, সেখানে এসাইলাম নেয়া কি প্রিগোজিনির জন্য বোকামী নয় যদি আসলেই এটা স্টেজ মেনেজড না হয়? বেলারুশ প্রেসিডেন্ট হচ্ছে একটা মাস্ক কাম অপারেশনের বৃহৎ পরিকল্পনার আরেক চাপ্টার। একটা পয়েন্ট মনে রাখা দরকার যে, ওয়েগনার এবং প্রিগোজিন খাস রাশিয়ান এবং তাদের দেশপ্রেমিক মনোভাবে কারো কোনো মতৈক্য নাই। যাক সে কথা। একটা ক্যু হবে অথচ কোনো কিছুই ধংশ হবে না, এতে তো মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, সন্দেহ আসতে পারে। তাই এই নাটকে কয়েকটা হেলিকপ্টার এবং ট্যাংকও বিনাশ দেখানো হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কিন্তু কেউ কারা এই ক্রাসড হেলিকপ্টারে ছিলো সেটার নাম জানা যায় নাই। এরমানে এসব টার্গেটেড ট্যাংক এবং হেলিকপ্টার ছিলো রেডিও কন্ট্রোল্ড। এর ভিতরে কোনো পাইলট কিংবা ট্যাংকের লোকই ছিলো না। সোস্যাল মিডিয়া, কিংবা ফেক নিউজ সার্ভ করার মাধ্যমে এই নাটকটা আরো বাস্তব রুপ দেয়া হয়েছে।

(চ) এখানে আরো একটা পয়েন্ট না বললেই নয় যে, প্রিগোজিন যে কমান্ডারদের নামে অভিযোগ করতে এবং ন্যায় বিচার পেতে মস্কোতে যাচ্ছিলেন, তাদের ব্যাপারে আজো কোনো তদন্ত হচ্ছে না কেনো? অথবা তাদেরকে ইমিডিয়েট দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার তো করা উচিত। প্রিগোজিনের এমন একটা ক্যু প্লেনের কিছুই না জানার কারনে রাশিয়ার খোদ ইন্টিলিজেন্স বাহিনী প্রধানকে কোনো কৈফিয়ত চাওয়া হলো না?

(ছ) যখন প্রিগোজিন তার ভূমিকা পালন করছিলেন রোস্তভ-অন ডনে, ঠিক তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মিনিষ্ট্রি অফ ডিফেন্সের ডিপুটি। কেনো? ধোয়াশা মনে হচ্ছে না? ক্যু হচ্ছে, অথচ মিনিষ্ট্রি অফ ডিফেন্সের ডেপুটি সেইখানে ক্যু লিডারের সাথে কফি পান করছেন। একেবারেই যায় না।

(জ) প্রিগোজিন এখন বেলারুশ যাবেন, তার মামলা তুলে নেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হলো, কিন্তু মামলা এখনো তুলে নেয়া হয় নাই। প্রিগোজিন কেনো এতো বিশ্বাস করছেন পুতিনকে যে, প্রিগোজিনের সব পরিকল্পনা বাতিল করলে মামলা না তোলা পর্যন্ত সে স্থান ত্যাগ করবে? কারন প্রিগোজিন জানেন, এগুলি কিছুই না।

প্রিগোজিনের এবারের এসাইন্মেন্ট বেলারুশিয়ান পিএমসিকে প্রশিক্ষন দেয়া। এটা প্রিগোজিনের জন্য কোনো নির্বাসনও নয়, ভেকেশনও নয়। একটা বিশাল দায়িত্ব। আর হয়তো পুতিন এটাই প্রিগোজিনের কাছ থেকে চাচ্ছেন। তার পরবর্তী টার্গেট হয়তো পোল্যান্ড এবং সার্বিয়া। প্রিগোজিন তো আগেই একবার ওয়াদা করেছিলো যে, সে পোল্যান্ড এবং ইউক্রেনের মধ্যে একটা ভাঙ্গনের রুপরেখা দিবেই। এবার হয়তো সেইটার পরিকল্পনা করা হলো তাকে বেলারুশ পাঠিয়ে। ওয়েগনার গ্রুপ পোল্যান্ডকে এমনভাবে এজিটেটেড করবে যাতে পোল্যান্ড বেলারুশকে অথবা ইউক্রেনকে আক্রমন করে। যদি বেলারুশকেই পোল্যান্ড আক্রমন করে, ইতিমধ্যে পুতিন বেলারুশে নিউক্লিয়ার ঘাটি স্থাপনা সম্পন্ন করে ফেলেছেন। পোল্যান্ডের জন্য কাজটা সহজ নয়। অংকটা মিলে যাচ্ছে প্রায়।

(ঝ) এখানে কয়েক মাস আগের রাশিয়ার একটা ক্যামোফ্লাজ মুভের উদাহরন টানা যেতে পারে। দক্ষিন ইউক্রেনে যখন ইউক্রেন অফেন্সিভ অপারেশনের পরিকল্পনা করছিলো, তখন রাশিয়া একটা ‘দাবার গুটি’ চেলেছিলো যে, রাশিয়া হটাত করে তার উত্তর সেক্টর থেকে তাদের ইউনিটসমুহ উইথড্র করে ইউক্রেনের আক্রমন ঠেকাবার জন্য রাশিয়ার দক্ষিন সেক্টরে মোতায়েনের জন্য সরে আনার ভান করে। যা কিনা ন্যাটো কিংবা ইউক্রেন ভাবতেই পারে নাই রাশিয়া এটা করবে। কিন্তু আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল ন্যাটো এবং ইউক্রেনের জন্য যে, রাশিয়া তার সেই উত্তর সেক্টরের ইউনিট সমুহকে দক্ষিনে যাচ্ছে বলে একটা ফেক মুভ দেখিয়ে পুনরায় উত্তরেই গতিপথ পালটে পুরু ইউক্রেন বাহিনীকে এন্সার্কেল করে ফেল্লো। কিন্তু ততক্ষনে ইউক্রেনের হাতে আর কোনো সময় ছিলো না। ইউক্রেন চরমভাবে পরাস্ত হয়ে ভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

(ঞ) ক্যু বা ট্রিজনের আবরনের প্রতিরক্ষা হিসাবে রাশিয়া তার বিশাল সামরিক বাহিনীকে ন্যাটোর অগোচরে উত্তরে, ভোরোনেজের পশ্চিমে এবং বেলগোরোদের উত্তরে মোতায়েন করে সব বাহিনীকেকে ডিস্পার্স করে বর্ডারে নিয়ে এলো। নতুন অক্ষে ফোর্স মোতায়েন করা হলো এবং ন্যাটোকে রাশিয়া এই পরিকল্পনা বুঝতেই দিলো না। এমনিতেই এই অঞ্চলে রাশিয়ার বিশাল সামরিক মুভমেন্ট ন্যাটো কিংবা পশ্চিমারা কোনোভাবেই সহজ করে নেবার কথা না। তারমানে কি এটা বলা যায় যে, এটা Cover a redeployment of Russian Troops?

(ট) এই নাটকে আরো একটা রেফারেন্স টানা হয়েছে-১৯১৭ সালের বলসেভিক মুভমেন্টের। প্রায় হাজার বছর আগের ইতিহাস এবং সেই জিওগ্রাফির রুপরেখা টানা। কেনো? আসলে এই মেসেজটা প্রিগোজিনির ট্রিজনের বা ক্যু এর মধ্যে পড়ে কি? এটা আসলে সেই বার্তা- যা ওডেসা রিজিয়ন, সাউথ অফ আর্ক, কিয়েভ, সুমি, এবং খারকিভকে উদ্দেশ্য করেই বলা। আপাতত খারকিভ তার টার্গেট। কে জানে বেলারুশে যাওয়ার প্রাক্কালে সেই আগের ‘দাবার গুটির’ চালের মতো বেলারুশ না গিয়ে হটাত ইউ-টার্ন নিয়ে ওয়েগনারের দল খারকিভ অপারেশনে নিমগ্ন থাকবে?

(ঠ) আরেকটি কথা শোনা যাচ্ছে যে, প্রিগোজোনি এই নাটকটা এমনভাবে অভিনয় করেছে যে, সম্ভবত সে এখান থেকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে বড় অংকের একটা লাভ বা উৎকোচ গ্রহন করেছে। এটা প্রিগোজিনের পক্ষে করা সম্ভব। হয়তো এটা পুতিন নিজেও এলাউ করেছেন। এর পিছনের ব্যাখ্যা হচ্ছে-পশ্চিমারা দাবী করছে যে, তারা প্রিগোজিনির এই ক্যু সম্পর্কে অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে জানতো। এর অর্থ, প্রিগোজিন পশ্চিমাদেরকেও ধোকা দিয়েছে হয়তো।

২৮/০৪/২০২৩-Dollar Decline vs. Dollar Collapse

আগের পর্বে বলেছিলাম যে, Why a dollar decline is inevitable, and a collapse is unimaginable.

যখন অন্য দেশের লোকাল কারেন্সীর তুলনায় ডলারের মান বা ভ্যালু কমে যাবে তখন ডলার ডিক্লায়েন করছে বলা হবে। এর মানে হলো, অন্য কারেন্সী দিয়ে আগের তুলনায় বেশী ডলার কেনা যাবে অথবা আগের যেই ডলার দিয়ে কোনো একটি পন্য যে দামে কেনা যেত, এখন সেই পন্য তার থেকে কম দামে কিনতে পারবে মানুষ অথবা একই পন্যের দামের বেলায় ডলার বেশী পে করতে হবে আমেরিকান সরকারকে। এটা সব দেশের কারেন্সীর বেলাতেই প্রজোজ্য। আমরা এখানে শুধু ডলার নিয়ে আলাপ করছি বলে ডলারের ভ্যালুর কথা বললাম।

ডলারের মান কমে যাওয়া মানেই ইউএস ট্রেজারীর ভ্যালুও কমে যাওয়া। আগে যদি ইউএস ট্রেজারীতে ২ মিলিয়ন ডলার থাকতো, ডলার এর মান কমে যাওয়াতে সেই ২ মিলিয়ন ডলারের ভ্যালু হয়তো দারাবে পুর্বের দেড় মিলিয়নের মতো। আর এতে সুদের হার বাড়বে, মর্টগেজের পরিমান বাড়বে ইত্যাদি। অন্যভাবে বললে-যে পরিমান ডলার ইউএস ট্রেজারীতে আছে, তার ভ্যালু আর আগের মতো থাকবে না।

দূর্বল ডলারের মাধ্যমে কম বিদেশী গুডস পাওয়া যাবে। এতে আমদানীর দাম বেড়ে যাবে, আর আমদানীর দাম বেড়ে গেলেই মুদ্রাস্ফিতি হবে। বিপদ হলো-ডলারের মান কমতে থাকলেই ইনভেষ্টররা তাদের হাতে থাকা দীর্ঘ মেয়াদী ট্রেজারী বন্ডগুলি হাত থেকে ছেড়ে দিতে থাকে। স্টক মার্কেটের মতো। কোনো শেয়ারের দাম কমতে থাকলে যেমন প্লেয়াররা শেয়ার ছেড়ে দিতে থাকে যদি অনেক অলস মানি হাতে না থাকে। এটা প্রায় এ রকমের।

এ যাবতকাল তেল এবং অন্যান্য কমোডিটিজ শুধুমাত্র ডলারের মাধ্যমে হবে এটাই ছিলো কন্ট্রাক্ট। ফলে ডলার ভ্যালুর সাথে কমোডিটির প্রাইস ইনভার্স রিলেশনে আবর্তিত হয়। ডলারের দাম বাড়লে কমোডিটির দাম কমে, আর ডলারের দাম কমলে কমোডিটির দাম বেড়ে যায়।

আমদানী-রপ্তানীতে ডলারের এই ফ্লাকচুয়েশনে যারা রপ্তানী মুখী ব্যবসায়ী তাদের লাভ হয়। আর যারা আমদানী নির্ভর ব্যবসায়ী তাদের অনেক ক্ষতি হয়।

এবার আসি, কি কি কারনে ডলার ডিক্লায়েন করতে পারে বা করে

কোনো দেশের কারেন্সী পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে দুটি কারনে ডিক্লায়েন করেঃ

(১)      ধনী ব্যবসায়ীরা সরকারকে ট্যাক্স ফাকি দিয়ে

(২)     অনেক ব্যাংক ডলারে ট্রেডিং করেও ডলার নমিনেটেড এসেটসকে লুকিয়ে ট্যাক্স মওকুফ করে ক্লায়েন্টকে সুবিধা দেয় এবং নিজেরা লাভ করে। শুধু লস করে সরকার। তাতে ব্যাংক বা ক্লায়েন্ট কারো ক্ষতি হয় না।

আর এ কারনে ইউএস সরকার ২০১০ সালে ফরেন একাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স আইন জারী করে যাতে এই দুষ্টু কাজগুলি কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যাংক না করতে পারে। আর এর কারনে আমেরিকান অনেক ব্যবসায়ীদেরকে ফরেন ব্যাংকগুলি ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে চায়। যদি এই রকমভাবে ফরেন ব্যাংকগুলি ইউএস কাষ্টোমারকে ছেড়ে দেয় তাহলে ডলার ডিক্লায়েন করবেই। কারন তখন ডলার রোলিং করবে না।

(৩)     ৩য় পয়েন্ট হচ্ছে-যখন ডলারের বিপরীতে অন্য আরেকটি কারেন্সী সমান্তরালভাবে ট্রেডিং কারেন্সী হিসাবে বাজারে চলমান হয়ে যায়, তখন একচ্ছত্র ডলারের আধিপত্য থাকবে না। এরমানে যখন ডলার ১০০% কারেন্সী ট্রেডিং হতো সেটা এখন ১০০% না হয়ে কম পার্সেন্টজী নেমে আসবে। মানে ডলার ডিক্লায়েন করছে। এই বিকল্প কারেন্সী যতো দ্রুত বিকাস ঘটবে ডলার ততো দ্রুত মার্কেট থেকে তার আধিপত্য হারাবে। এরমানে কিন্তু ডি-ডলারাইজেশন না, বা ডলার কলাপ্সড না। শুধু গ্লোবাল মার্কেটে এর আধিপত্য থাকবে না। এতাই এখন হতে যাচ্ছে।

এবার আসি বর্তমানে এই ডলারের অবস্থা কি

প্রায় ৭৯ বছর যাবত চলা গ্লোবাল কারেন্সী ডলার। অন্য কোনো বিকল্প কেউ তৈরী করতে পারে নাই, চেষ্টা করলেও সম্ভব হয় নাই। কিন্তু গত ২০ বছর যাবত আমেরিকা এই ডলারকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে প্রায় ২০টি দেশের রিজার্ভ ব্লক করে দিয়েছে। তাতে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশসমুহ এবং যারা নিষেধাজ্ঞায় পড়ে নাই, তারাও তাদের রিজার্ভ মুদ্রা নিয়ে সংকিত। রিজার্ভ নিয়ে বিভিন্ন দেশসমুহ আমেরিকার একচ্ছত্র ডলারের রিজার্ভ নিয়ে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

চীন বহু আগে থেকেই ডলার রিজার্ভের বিকল্প নিয়ে ভাবছিলো। যেমন চীন ২০১৩ সালে ব্রিটিশ ইনভেষ্টদেরকে ১৪ বিলিয়ব ডলার সমপরিমান তাদের মার্কেটে চীনা কারেন্সীতে ইনভেষ্ট করিয়েছে। চীন ক্রমাগত তার এই প্রকারের ইনভেষ্টমেন্ট বাড়িয়েই চলছে। এর পরিমান এখন প্রায় ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। মজার ব্যাপার হলো-এই ইনভেষ্টমেন্ট সে আরো বাড়াতে পারবে যখন সে ক্রমাগত ইউএস ডলার এর রিজার্ভ বাড়াতে থাকবে। কারন তার বিপরীতে তাদের লোকাল মুদ্রাকে অন্য দেশের ইনভেষ্টদেরকে আকৃষ্ট এবং নিশ্চয়তা বিধান করে করে চীনা মুদ্রায় আটকে ফেলবে। এটা এক দিনে বা ২ বছরে হয়তো হবে না কিন্তু একসময় চীনা মুদ্রা বিকল্প হিসাবে আংশিক হলেও দাঁড়িয়ে যাবে। আরেকটা মজার ব্যাপার হল, চীনাদের কাছেই আমেরিকার ফরেন লোন আছে প্রায় ৩১ ট্রিলিয়ন। আর ফরেন লোন কখনোই কোনো দেশ এমনকি আমেরিকাও গায়ের জোরে ডিফল্ট করতে পারবে না।  এটা পেমেন্ট করতেই হবে।

অনেক দেশই আমেরিকার এই রিজার্ভ আটকে দেয়াকে পছন্দ করছিলো না। এবার ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে রাশিয়া, ইন্ডিয়া, আফ্রিকা, চীন, মিডল ইষ্ট, ইরান, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা ইত্যাদি দেশসমুহ একটা জোট করেছে যে, তারা ডলারের বিপরীতে হয় তাদের লোকাল কারেন্সী অথবা কোন একটা পার্টিকুলার মুদ্রায় ট্রেডিং করতে পারে কিনা। আর সেটা এখন খুব জোড়েসোরে চলছে, যার নাম “ব্রিক্স কারেন্সী” আর সেটা চীনা মুদ্রায়।

একটা সময় আসবে যখন ডলার ছাড়া ৯৭% কোনো ট্রেডিং সম্ভব হতো না, সেখানে ডলারে ট্রেডিং হয়তো নেমে ৫০% এ। এভাবে এই ট্রেডিং এর পার্সেন্টেজ কমতে থাকলে একদিকে ডলার গ্লোবাল কারেন্সী হিসাবে যেমন ডিক্লায়েন করতে থাকবে অন্যদিকে ডলার যে একটা অস্ত্র এটা আর আমেরিকা ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু তাতে যেটা হবে, ডলার হেজিমোনি হারানোর কারনে আমেরিকার অর্থনিতির উপর একটা বড় প্রভাব পড়বে। ইচ্ছে করলেই আমেরিকা আর ফিয়াট কারেন্সীর দোহাই দিয়ে যতো খুশী ডলার প্রিন্ট করতে পারবে না। আর করলেই ডলার আরো ইনফ্লেশনে পড়তে বাধ্য। প্রকৃত সত্য হচ্ছে- বিভিন্ন দেশের রিজার্ভ কারেন্সীকে আমেরিকার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি।  

তাহলে এর প্রভাব ছোট দেশ গুলির উপর কি প্রভাব পড়বে?

ছোট ছোট দেশগুলি যেমন বাংলাদেশ, এদের বিপদ অনেক। তারা তাদের রিজার্ভ যেহেতু খুব স্টং না, ফলে যতোদিন একটা ভায়াবল বিকল্প কারেন্সীর তৈরী না হবে, তারা এই ডলারেই ট্রেডিং করতে হবে। কিন্তু যদি আমাদের মতো দেশগুলি আমেরিকার দ্বারা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কোনো দেশের সাথে ট্রেডিং করতে হয় যেখানে ওইসব দেশ ডলার থেকে বিকল্প কারেন্সীতে ঢোকে যাচ্ছে, তাদের সাথে ট্রেডিং একটা মহাঝামেলার সৃষ্টি হবে। ভায়া হয়ে হয় লোকাল কারেন্সীর মাধ্যমে করতে হবে না হয় সংরক্ষিত ডলারকে হাত ছাড়া করতে হবে। এর জন্য ছোট দেশ গুলির যা করা প্রয়োজনঃ

-উভয় কারেন্সীতেই (ডলার এবং ব্রিক্স) রিজার্ভ রাখা। পারলে ইউরো বা ইয়েন।

-বেশী গোল্ড কিনে রিজার্ভ করা।

-ডলার কারেন্সী ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলা

-দেশীয় পন্য বেশী ব্যবহার করে আমদানী কমিয়ে রপ্তানী বাড়ানো, আর রপ্তানী হতে হবে সেসব দেশে যেখানে বিকল্প কারেন্সী চলে।

-বড় বড় মেগা প্রোজেক্ট হাতে না নেয়া।

-দ্রুততার সাথে ফরেন লোন থেকে আউট হয়ে যাওয়া।

– আইএমএফ থেকে এ অবস্থায় কোনো লোন না নেয়া। কারন আই এম এফ ইউ ডলারড। যদি লোন নিয়েই হয়, সেক্ষেত্রে ইয়েন, রুবল, বা চীনা মুদ্রা যা বিকল্প ব্রিক্স কারেন্সীতে কনভার্টেবল।

এটা সব দেশের জন্য খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের জন্য। কারন আমাদের বেশীরভাগ মার্কেট হয় ইউরোপ, না হয় পশ্চিমা দেশের সাথে। তাই আমাদের দেশকে এখন এদের বাইরেও দ্রুত নতুন মার্কেট খুজতে হবে। নতুন মার্কেট বলতে ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা, চীন, রাশিয়া, বা এইসব দেশ যেখানে বিকল্প কারেন্সীর প্রচলন হতে যাচ্ছে।

ব্যক্তি পর্যায়ে ডলার ডিক্লায়েনের প্রভাব কিভাবে সামাল দেয়া যায়?

-নিজেদের হার্ড এসেটের পরিমান কমিয়ে লিকুইড এসেটে নিয়ে আসা যাতে দ্রুত এডজাষ্ট করা সম্ভব। কারন হার্ড এসেটকে লিকুইড এসেটে রুপান্তরীত করা অনেক সময়ের ব্যাপার।

-গোল্ড বা অন্য সিকিউরিটিজ যা গ্যারান্টেড সেগুলি কিনে রাখা।

নোটঃ

কেউ যদি এতা বিশ্বাস করে যে, ডলার ডিক্লায়েনের মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনীতি কলাপ্সড করবে সে ভুল ভাবছে। -কারন the dollar would only collapse under extreme economic circumstances. The U.S. economy would essentially have to collapse for the dollar to collapse. While the U.S. economy experiences crashes and recessions, it hasn’t had a brush with a complete collapse in modern times. If the U.S. economy were to completely collapse, and the global economy were to restructure itself around a new reserve currency, then the dollar would collapse.

আর বিকল্প কারেন্সী তৈরী হলেও আমেরিকা সেই বিকল্প কারেন্সীতে কখনোই ট্রেডিং করবে না কারন-The United States is the world’s best customer. It’s the largest export market for many countries. Most of those countries have adopted the dollar as their own currency. Others peg their own currency to the dollar. As a result, they have zero incentive to switch to another currency.

২৭/০৪/২০২৩-ফরেন রিজার্ভ এবং ডি-ডলারাইজেনের মানে কি?

কোনো একটা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের দেশের কারেন্সী বাদে অন্য ফরেন কারেন্সীকে সঞ্চয়ী হিসাবে গচ্ছিত রাখাকেই ফরেন রিজার্ভ বা ফরেন কারেন্সী রিজার্ভ বলে। যেসব মুল কারনে এই ফরেন মুদ্রা তহবিলে রাখতে হয় তার মুল কারন হচ্ছে-দেশের লোকাল মুদ্রার ভ্যালুকে ফিক্সড রেটে রাখা, ক্রাইসিস সময়ে লিকুইডিটি হিসাবে ইনফ্লেশনকে কমানো, বিদেশী ইনভেষ্টরদের নিশ্চিত দান, বৈদেশিক লোন পরিশোধ, আমদানী পেমেন্ট, অপ্রত্যাশিত কোনো বড় বাজেট অন্য কোথাও কাজে লাগানো ইত্যাদি।

এই রিজার্ভ সাধারনত ব্যাংক নোট, ডিপোজিট, বন্ড, ট্রেজারী বিল এবং সরকারী অন্যান্য সিকিউরিটিজের মাধ্যমে রাখা হয়। বেশীর ভাগ রিজার্ভ সাধারনত ইউএস ডলারের মাধ্যমেই গচ্ছিত থাকে কারন বর্তমানে ইউএস ডলারই হচ্ছে সবচেয়ে বেশী গ্রহনযোগ্য গ্লোবাল কারেন্সী। চীনের সবচেয়ে বেশী রিজার্ভ আছে ইউএস ডলারে।

প্রধানত দেশের রপ্তানিকারকেরা এবং ২য়ত শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্স ইত্যাদি  সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক উক্ত ফরেন কারেন্সী রপ্তানীকারক, শ্রমিক কিংবা যারাই ডলার দেশে আনেন তাদেরকে লোকাল কারেন্সীতে প্রদান করে, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কিনে নেয়।  এভাবেই রিজার্ভ বেড়ে উঠে।

ন্যনুতম সাধারনত তিন থেকে ছয় মাসের আমদানী বিলের গড় এবং প্রায় এক বছরের বৈদেশিক লোন পরিশোধের পরিমান রিজার্ভ থাকলেই মুটামুটি একটা দেশে চলে। তবে যার যতো বেশী রিজার্ভ তাদের দেশের কারেন্সী ততো স্থির। (বর্তমানে চীনের এই রিজার্ভ পরিমান প্রায় ৩২০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যেখানে রাশিয়ার আছে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন) ।

যদি কোনো দেশের রিজার্ভ এতোটাই কমে যায়, বা না থাকে তাহলে সে দেশের অর্থনীতিতে একটা বড় ধরনের ধ্বস নামে। সে দেশে যদি অনেক গোল্ড কিংবা ন্যাচারাল রিসোর্সও থাকে কিন্তু লিকুইড রিজার্ভ সঞ্চয় হিসাবে না থাকে, তাহলেও সেই গোল্ড বা ন্যাচারাল রিসোর্স দিয়ে রিজার্ভের উদ্দেশ্য পুরন করা সম্ভব হয় না।

এবার আসি, ডলার কেনো রিজার্ভ কারেন্সী- নীতিগতভাবে যে কোনো দেশের লোকাল কারেন্সীই হতে পারে এই রিজার্ভের কারেন্সী। কিন্তু তা সম্ভব হয় না এই কারনে যে, সেই লোকাল কারেন্সীতে বিশ্ব ব্যাপি ট্রেড হয় না। গ্লোবাল কারেন্সি হতে হয় সেটা যেটায় সবচেয়ে বেশী ট্রেডিং হয়। বর্তমানে ডলার সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত একটা কারেন্সী বিধায় এটা গ্লোবাল কারেন্সী হিসাবে গন্য হয়, তারপর গন্য হয় ইউরো, এবং ৩য় স্থানে আছে জাপানের ইয়েন।

২০১৯ ৪র্থ কোয়াটারের আইএমএফ এর এক সুত্র অনুযায়ী ৬০% ইউ এস ডলার রিজার্ভ হিসাবে ছিলো।  এর পরেই ছিলো ইউরোর স্থান যা প্রায় ২০%। প্রায় ৯০% ফরেক্স ট্রেডিং ইউ এস ডলারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। আন্তর্জাতিক ১৮৫ টি মুদ্রার মধ্যে ডলার হচ্ছে একটি। 

১৯৪৪ সালের আগে বেশীরভাগ দেশ গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে ট্রেডিং করতো। পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে (তখনো যুদ্ধ চলছিলো), ৪৪ দেশের ৭৩০ জন ডেলিগেটস আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারর নিউ উডস এর হোটেল বিটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে মনিটরিং সিস্টেমে আনার জন্য মিটিং করে। সেখানে The Breton Woods system required countries to guarantee convertibility of their currencies into U.S. dollars to within 1% of fixed parity rates, with the dollar convertible to gold bullion for foreign governments and central banks at US$35 per troy ounce of fine gold (or 0.88867 gram fine gold per dollar). অর্থাৎ সব দেশের কারেন্সীর এক্সচেঞ্জ রেট গোল্ডে না হয়ে ডলারের উপর করা হবে। সে সময়ে সবচেয়ে বেশী গোল্ড রিজার্ভ ছিলো আমেরিকার। ১৯৭১ সালে এসে বিভিন্ন দেশ তখন গোল্ডের বিপরীতে রাখা ডলার আবার গোল্ড দাবী করলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন গোল্ড এবং ডলারকে আলাদা করে ডলারকে Fiat Currency হিসাবে ডিক্লেয়ার করেন যাতে ডলারকে আর গোল্ডের বিপরীতে ব্যাকিং করতে হবে না। কিন্তু ইতিমধ্যে এই ২৭ বছরে ডলার রিজার্ভ কারেন্সী হিসাবে প্রচলন হয়েই গেছে। (আমি Fiat কারেন্সীর ব্যাপারে এর আগে একবার লিখেছিলাম (Fiat Currency হচ্ছে সেই কারেন্সী যা কোনো কমোডিটি বা গোল্ড দ্বারা ব্যাকড নয়, বরং ইস্যুইং সরকার এটাকে লিগ্যাল টেন্ডারিং হিসাবে গ্যারান্টি দেয়)

যাই হোক যে কারনে এই লেখাটা।

আমরা ইদানিং প্রায়ই একটা কথা শুনে থাকি এবং বলেও থাকি। সেটা হলোঃ ডি-ডলারাইজেশন। এর মানে কি ডলারকে বের করে দেয়া? বা ডলারের দিন শেষ?

ব্যাপারটা এ রকম নয়। এটা যা বুঝায় তা হচ্ছে- ডলার ডিক্লায়েন। মানে ডলার কলাপ্স নয়। ডলারের ডিক্লাইনেশন ইতিমধ্যে শুরু অবশ্যই হয়েছে কিন্তু ডলার কখনোই কলাপ্সড করবে এটা ভাবাও উচিত না। আর সেটা কিভাবে?

২৬/০৪/২০২৩-ইউরোপ অথবা রাশিয়া কি আবার একত্রে মিলিত হতে পারে?

প্রকৃত সত্যটা হলো যে, রাশিয়া সব সময়ই ইউরোপেরই একটি অংশ এবং সে একটি ইউরোপিয়ান কান্ট্রিই বটে। বিগত কয়েক বছর আগে ক্রিমিয়া আর ডোনবাসকে নিজের পরিসীমায় নিয়ে আসায় রাশিয়া ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বটে কিন্তু রাশিয়া কখনো নন-ইউরোপিয়ান কান্ট্রি ছিলো না। আমেরিকা সর্বদাই চেয়েছে যেনো রাশিয়াকে একঘরে করা যায় কিভাবে। ক্রিমিয়া বা ডোনবাসকে নিয়ে আমেরিকা ২০১৪ সালের রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যেনো একটা ভালো প্রতিশোধ নিতে পেরেছে।

যেভাবেই যে কেউ ভাবুক না কেনো, রাশিয়া এবং ইউরোপ এক সময় না এক সময় আবার রি-ইউনাইটেড হবেই। এটাই চিরসত্য কথা। কারন তারা একে অপরের প্রতিবেশী। ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং জীবন মাত্রার স্টাইল ঘাটলে দেখা যাবে যে, রাশিয়ানরা আসলে (বিশেষ করে অর্থোডোক্স এবং ইথনিক রাশিয়ান এমন কি মুসলিম সুন্নী টাটারস) তারা সবাই ইউরোপিয়ান। রাশিয়ান স্টুডেন্ট, সংস্ক্রিতিক ফিগার, আর্টিস্টস, বৈজ্ঞানিক, স্কলার্স, এমন কি অফিশিয়ালস সবার কাছেই ইউরোপের মডেল একটা পছন্দনীয় ব্যাপার। রাশিয়ান ভাষা ব্যবহার করে এমন অনেক রাশিয়ানরা ইউরোপে সেটেল্ড, মিক্সড ম্যারেজ, এমন কি বাই-কালচার সবচেয়ে বেশী দেখা যায় এদের ইউরোপে। সেন্ট্রাল এবং পূর্ব ইউরোপের মানুষদের সাথে রাশিয়ানদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায় যে, রাশিয়া আসলে ইউরোপের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা কোনো চয়েজ না, এটা ডেস্টিনি। ডেস্টিনিকে কেউ চয়েজ করে নিতে পারে না, এটা ঘটেই। অন্যদিকে যদি দেখি-রাশিয়ার অর্থনীতি আসলে ইউরোপিয়ান বেজড। ইউক্রেন যুদ্ধ এই প্যারামিটার পশ্চিমারা বর্তমানে বিধ্বস্ত করেছে বটে এবং এর ফলে রাশিয়া বিকল্প হিসাবে সে ইউরোপকে কিছুটা ছেড়ে দিলেও ইউরোপ রাশিয়াকে কোনোভাবেই ছাড়তে পারবে না। রাশিয়া ইউরোপের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং পাওয়ারফুল দেশ এটা দ্রুব সত্য। এটাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার পথ নাই। এমন একটা প্রতিবেশীকে বেশীদিন এড়িয়ে চলা সম্ভব না।পক্ষান্তরে, রাশিয়াকে ইউরোপের বেশী প্রয়োজন, যতোটা না ইউরোপকে রাশিয়ার প্রয়োজন। বর্তমানে রাশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে যে বৈরিতা, সেটার সিংহভাগ দায়ী আসলে ইউরোপ নিজে। এজন্য ইউরোপকে আরো বেশী সতর্ক থাকার দরকার ছিলো। কেউ এই ইউরোপকে তাদের ভেসেল হিসাবে ব্যবহার করার চেষতা করছে, এটা ইউরোপের অনেক লিডারগন এখনো বুঝতে অক্ষম। আজ থেকে ২০/৩০ বছর আগে তো ইউক্রেন যুদ্ধ ছিলো না, তাহলে তখনই রাশিয়াকে ইউরোপিয়ান ব্লকে আনা হয় নাই কেনো? রাশিয়া তো নিজেই ইউরোপের সাথে কিংবা ন্যাটোতে যোগ দিতে চেয়েছিলো। তাকে তখন নেয়া হয় নাই কেনো? তখন কোনো ব্রেক্সিট ছিলো না, ইউরোজোনেও কোনো মন্দা ছিলো না, ইউরোপে তখন রাইট উইং রাজনীতিও ছিলো না।  তাহলে রাশিয়াকে ন্যাটোতে কিংবা ইউরোপ ব্লকে নিতে এতো অসুবিধা ছিলো কোথায়? ইউরোপের সাথে মিলিতি হয়ে রাশিয়া গ্লোবাল পলিটিক্সে একটা পাওয়ারফুল একটর হতে পারতো। এর একটাই উত্তর- আমেরিকা চায় নি রাশিয়ার মতো একটা দেশ এই ব্লকে আসুক যেখানে আমেরিকা তখন একচ্ছত্র মোড়লগিড়ি করতে পারবে না। ইউরোপে থেকে ইউরোপকে ছাড়া রাশিয়া যেমন ওই অঞ্চলে একটা পাওয়ারফুল জায়ান্ট হতে পারবে না, তেমনি, রাশিয়াকে ছাড়াও ইউরোপ কখনোই ওই অঞ্চলে আর্থিক দিক দিয়ে উন্নতি তথা শক্তিশালী হতে পারবে না। ইউরোপের যে কয়টি দেশ নিউক্লিয়ার শক্তিধর, তাদের মধ্যে শুধু নয়, গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশী পারমানবিক শক্তিধর দেশ রাশিয়া। রাশিয়া একটি ভেটো পাওয়ারের অধিকারী, ইউএন এর স্থায়ী মেম্বার, তার অজস্র রিসোর্স, গ্যাস, কয়লা, তেল, লোহা, ফার্টিলাইজার, খাদিশস্য সবকিছুতেই রাশিয়া সবার থেকে উপরে। এমন একটা দেশকে এড়িয়ে চলা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়, অন্তত প্রতিবেশীদের। আমেরিকা এড়িয়ে চলতে পারবে, ইউকে পারবে, কানাডা পারবে কারন তারা অনেক দূরের দেশ এবং তাদের নিজ নিজ প্রাকৃতিক রিসোর্সও কম নাই। কিন্তু ইউরোপ সবসময় রাশিয়ার সস্তা রিসোর্সের উপর দাড়িয়েই তাদের অর্থনীতিকে চাংগা করেছে এবং করছে।

রাশিয়া বর্তমানে যতোই এশিয়া ঘেষা হোক, তারা কখনোই এশিয়ার সাথে এতোটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে নাই। সোভিয়েট আমলে কিছুটা কালচারাল দিক থেকে এশিয়ার সাথে কাছাকাছি এলেও অন্য সব কিছুতেই তারা এশিয়া থেকে অনেক দূরের প্রতিবেশীই ছিলো। আর বর্তমান জেনারেশন তো আরো বহুদূরে। এশিয়ান মানসিকতা একেবারেই নাই।

তাহলে এখন যে প্রশ্নটা আসে, সেটা হলো, ইউরোপ নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে কেনো? উত্তরটা একেবারেই কঠিন নয়। দুই তিন দশক আগের ইউরোপ আর আজকের সেই ইউরোপ, একেবারেই এক না। আর সেই ইউরোপকে আর ফিরিয়েও আনা যাবে না। ইউরোপের লিডারশীপে একটা বিশাল অপরিপক্কতার ছোয়া লেগে গেছে। বেশীরভাগ লিদাররা হয় ইয়াং মেয়ে এবং এদের পরিপক্কতাই এখনো আসে নাই। এরা এই বিংশ শতাব্দীতে বসে একবিংশ শতাব্দীর সমস্যা বুঝতে অক্ষম। তারা ইউরোপিয়ান স্টাইল থেকে বেরিয়ে গিয়ে পাশ্চাত্যের ধারায় ডুবে যেতে চাচ্ছে যা কোনোভাবেই ইউরোপিয়ান ভ্যালুতে যায় না। এদের অনেকেই ১ম কিংবা ২য় মহাযুদ্ধ দেখে নাই। যুদ্ধের পর ভংগুর অর্থনিতির পরিস্থিতিতে পড়ে নাই। ইউরোপের যে একটা স্তাইল আছে নিজস্ব, সেটা বর্তমান ইউরোপের নেতারাই তা জানেন না। তারা নিজেরাই ইউরোপকে বিশ্বাস করে না, তাহলে অন্য কেউ কেনো ইউরোপকে ব্যবহার করবে না?

এখন যে প্রশ্নটা মনে জাগে সেটা হলো, তাহলে রাশিয়া কিভাবে পুনরায় ইউরোপে কিংবা ইউরোপ কিভাবে রাশিয়ার কাছে ফিরে যাবে? এটাও কোনো কঠিন উত্তর নয়।

রাশিয়া এখন এশিয়ার নৌকায় উঠে যাচ্ছে যাকে বলা যেতে পারে স্প্রিংবোট। চীন, ইন্ডিয়া এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশ মিলে যখন রাশিয়া একটা গ্রেটার ইউরেশিয়ান জোট তৈরী করে ফেলতে পারবে, তখন রাশিয়া খুব সহজেই ব্রাসেলসের সাথে একটা নতুন বারগেনিং পজিশনে বসতে পারবে। ঐ সময়ে রাশিয়া নয়, ইউরোপ চাইবে যেনো সে আবার রাশিয়ার সাথে একত্রিত হতে পারে।

২৪/০৪/২০২৩-ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সর্বশেষ ইমপ্যাক্ট কি কি হতে পারে

ডি-ডলারাইজেসন, ডি-ইন্ডাস্ট্রিলাইজেশন, এলায়েন্স, জোট, পোলারিটি, রুলস বেজড অর্ডার ইত্যাদির বাইরে আর কি কি ইমপ্যাক্ট হতে পারে?

(ক)       ওয়েষ্টার্ন ইউরোপ, বাল্টিক ন্যাশন এবং ইষ্ট ইউরোপিয়ান দেশ সমুহ ক্লিয়ার বুঝে গেছে যে, তারা তাদের নিজেদেরকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। ফলে তারা ন্যাটো এবং আমেরিকার শরনাপন্ন ছাড়া কোনো গতি নাই। তাছাড়া ফ্রান্সের ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিলিটারী ক্যাপাবিলিটি এটাই প্রমান করে দিয়েছে যে তারা অসফল এবং ভবিষ্যতে সফলতা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। প্রতিটি দেশের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য তাদেরকেই ব্যবস্থা করতে হবে। ন্যাটো একটা জোট বটে কিন্তু তাদের ক্ষমতা এবং সমন্নয় যে খুব একটা শক্তিশালী মেকানিজম নয় সেটা এবার পরীক্ষিত।

(খ) জার্মানীর ডিফেন্স সিস্টেমও দূর্বল এবং তাদেরকেও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরী করা খুবই দরকার। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের ডিফেন্স বাজেট যেভাবে এলোকেট করা হচ্ছে তাতে অনেক দীর্ঘ সময় লাগবে ভায়াবল ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তুলতে।

(ঘ)       রাশিয়ার মিলিটারী ক্ষমতারও একটা পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। কালেক্টিভ ওয়েষ্ট বা ন্যাটোর সম্মিলিত জোটের বিরুদ্ধে রাশিয়া একা অপারগ। ফলে তাকে অন্য এলি যেমন ইরান, চীন এর কাছে সাহাজ্য নিতেই হবে। এতে রাশিয়ার সাথে ইরান এবং চীন দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্দধুত্তের গন্ডিতে থাকতেই হবে।

(চ)        মধ্যপ্রাচ্যে যে বদলটা হচ্ছে তা ভাবার বিষয়। যেমন ইউক্রেনের যুদ্ধের কারনে রাশিয়ার সাথে ইরানের খুব সখ্যতা তৈরী হয়েছে বিশেষ করে ড্রোন সাপ্লাই নিয়ে। এক সময় রাশিয়া, চীন, আমেরিকা, ব্রিটেইন সবাই ইরানের পারমানবিক শক্তিধর দেশ হোক এটা কেউ চায় নাই। কিন্তু এই ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে ইরান সেই সুযোগ হাতছাড়া করবে না বরং সে রাশিয়ার কাছ থেকে পারমানবিক ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য যা সাহাজ্য লাগে তা গ্রহন করবে। মিশরের অবস্থাও তাই। সে পাশ্চাত্য থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার একটা ছুতা পাবে এবং রাশিয়ার দিকে কিছুটা ঝুকে যাবে।

(ছ)       এশিয়া যদিও ইউক্রেন থেকে অনেক দূরে অবস্থিত কিন্তু এই যুদ্ধ রাশিয়াকে এশিয়ার কাছাকাছি নিয়ে এসছে যেখানে চীন অনেকটা দৃঢ় ভাবে স্বীকার করছে যে, রাশিয়া থাকুক এশিয়ান পাওয়ার পলিটিক্সে। কারন চীন যে এশিয়ার একটা জায়ান্ট সেখানে রাশিয়া তার সহযোগী। অন্যদিকে জাপান, সাউথ কোরিয়া, ফিলিপাইন এবং অষ্ট্রলিয়াকে আমেরিকার আরো কাছাকাছি নিয়ে এসছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে-ইন্ডিয়া প্রায় ডুয়েল রোল প্লে করছে এই জন্য যে, সে কোয়াডেও আছে, ব্রিক্স এও আছে আবার রাশিয়ার সাথেও আছে।

(জ)      এবার আসি আমেরিকার ব্যাপারে। ইউক্রেন যুদ্ধটা আমেরিকার পলিটিক্সে বিশাল একটা বিভেদ তৈরী করেছে। রিপাব্লিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে একটা বাই-পার্টিজান তৈরী হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ আমেরিকার ফরেন পলিসিকে একটা অনিরপেক্ষ সেকশনে পরিনত করেছে এভাবে যে, ফরেন পলিসি এখন প্রায় বাইডেন-ব্লিংকেন-সুলিভান পলিসি মনে করা হয়। এটা দেশের জন্য কতটা প্রয়োজন সেটা আর বিবেচ্য মনে হয়না।  এই অবস্থায় আমেরিকা যদি শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের জন্য আর সাহাজ্যকারী না হয় তাহলে রাশিয়া ভেবেই নিবে যে, সে পারে। আর এই পারা থেকে রাশিয়া যদি জর্জিয়া, মলদোবা, ইস্তোনিয়া, অথবা লাটভিয়ায় মিলিটারী অপারেশন চালায় তাতে আসচশ্চর্য হবার কিছু নাই। রাশিয়া কারন একই দেখাবে যে, সে রাশিয়ার নিরাপত্তা নিসচিত করছে।

(ট)        সবেচেয়ে বড় ইমপ্যাক্ট-ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকার উদ্দেশ্য রাশিয়াকে দূর্বল করা বটে কিন্তু ইউরোপকে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল করে তোলা। এতে এই ম্যাসেজ দেয়া যে, আগামী ভবিষ্যত রাজনীতি শুধু দুটু দেশকে নিয়েই আবর্তিত হবে- (১) আমেরিকা (২) চীন। কারন এই যুদ্ধ এটাই প্রমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, রাশিয়া এবং ইউরোপ কোনোভাবেই সামরিক দিক থেকে দক্ষ এবং ক্যাপাবল নয়। ফলে ৩০ বছর পর এই বিশ্ব আবার মাল্টিপোলারিটিতে নয়, বাই-পোলারিটিতে ফিরে যেতে পারে। আর সেটা চীন এবং আমেরিকা।

(ঠ)       এর বিপরীতে আরেকটি সম্ভাবনা আছে যে, যখন ইউরোপ, রাশিয়া তাদের মাথায় এটা আসবে যে, তারাও উপেক্ষিত এবং কন্ট্রোল্ড, তখন ইউরোপ এবং রাশিয়া একত্রিত হয়ে যেতে পারে। তখন ন্যাটোর বিলুপ্তি ঠেকানো কঠিন। হয়তো তখনই ঘটবে মাল্টিপোলারিটি।

২৩/০৪/২০২৩-দুই ফ্রন্টে আমেরিকার যুদ্ধ কি সঠিক?

বর্তমানে ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সাথে এবং তাইওয়ান ঘিরে চীনের সাথে আমেরিকা ভালো রকমের একটা কোন্দলে জড়িয়ে গেছে। চীন, রাশিয়া এবং আমেরিকা তিনটেই সুপার পাওয়ার এবং তিনটেই ভেটো ক্ষমতার অধিকারি, তিনটেই নিউক্লিয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ। রাশিয়া ইউরোপের জোনে, চীন এশিয়া প্যাসিফিক জোনে। আলাদা আলাদা জোন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-একই সময়ে, একই সাথে দুইটি ভিন্ন জোনে দুইটি সুপার পাওয়ারের সাথে আমেরিকার কি দুইটা ফ্রন্ট খোলা উচিত?

আমার মতে, দুই ফ্রন্টে আমেরিকা হয়তো একই সাথে রাশিয়া এবং চীনকে কন্টেইন করবে না, কিন্তু পরিস্থিতির কারনে এটা আবার ফেলেও দেয়া যায় না। স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে একচ্ছত্র ইউনিপোলারিটির কারনে আমেরিকা তার সাথে ইউকে এবং কানাডা সহযোগী হিসাবে মনে করে বিশ্বের তাবত দেশের গনতন্ত্র, সাইবার ক্যাপাবিলিটি, আন্তর্জাতিক সমুদ্র, আকাশ কিংবা মহাকাশ এমন কি প্রতিটি দেশের সার্বোভৌমত্ব রক্ষা তাদের দায়িত্ব। আর এ জন্য সে “রুলস বেজড অর্ডার” এর প্রচলন করেছে অর্থাৎ আমেরিকা পরিস্থিতি বিবেচনা করে রুলস দিয়ে দেবে আর অন্য সবাই সেই রুলস অনুসরন করে তাদের দেশের পলিসিসমুহ এডজাষ্ট করে ইন্টারনাল ফরেন পলিসি করে দেশের শাসনভার পরিচালনা করবে। সেই রুলস বেজড অর্ডারের কেউ বাইরে গেলে হয় সে আমেরিকার শত্রু অথবা সেখানে গনতন্ত্র অনুসরন করছে না এই কারনে আমেরিকা তাকে যা খুশি যেমন নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, এমন কি আক্রমন পর্যন্ত করতে পারে। এটাই ছিলো এ যাবত কালের কৃষ্টি। আমেরিকার নিজস্ব রুলসের মাধ্যমে অন্য দেশসমুহকে এভাবেই তারা নিয়ন্ত্রন করেছে এবং করছে বলে বর্তমান বিভিন্ন দেশসমুহ বিবেচনা করছে।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, দুই ফ্রন্টে দুই পরাশক্তিকে কন্টেইন করা। আমার মতে এটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এখানে আসলে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দুটু ফ্রন্ট দেখা গেলেও এটা শুধু দুইটা ফ্রন্ট না, এখানে রাশিয়া এবং চীন সরাসরি দুইটা ফ্রন্ট দেখা যায়, আরো অনেক অদৃশ্য ফ্রন্ট রয়েছে, যেমন আফ্রিকান ফ্রন্ট, মিডল ইষ্ট ফ্রন্ট, নর্থ কোরিয়া, ইরান কিংবা ইন্ডিয়ান ফ্রন্ট। এই অদৃশ্য ফ্রন্টগুলি হয়তো সামরিক নয়, কিন্তু সেগুলি অবশ্যই ইকোনোমিক, বাই-লেটারেল এবং ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে মারাত্মক ভূমিকা রাখে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এরা সামষ্টিকভাবে আমেরিকার জন্য বিপদজনক হতে পারে।

সামরিক শক্তির বিন্যাস যদি আমরা একটু দেখি, তাহলে দেখবো যে,

আমেরিকার সামরিক শক্তি যেভাবে তারা বিন্যাস করেছে তাতে বিশ্বমোড়ল গিড়ির জন্য একচ্ছত্র সামরিক পেশী সে নয়। ন্যাটো দিয়ে হয়তো কিছুটা আম্ব্রেলা করা গেছে বটে কিন্তু গত ২০ বছরে আমেরিকা যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপের অন্যান্য দেশ কিংবা আফ্রিকান দেশসমুহে তাদের ফোর্সকে ব্যবহার করেছে, তাতে আমেরিকার সামরিক শক্তি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে যেখানে রাশিয়া এবং চীন বিগত কয়েক দশকে তাদের বাজেটের একটা বেশ বড় অংশ ডিফেন্স বাজেটে ক্রমাগত যুক্ত তো করেছেই উপরন্ত তারা কোথাও নতুন কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তারা তাদের সামরিক সক্ষমতাকে লস করে নাই। আর এসব তারা প্রিজার্ভ করেছে শুধুমাত্র আমেরিকাকে মোকাবেলা করার জন্যই। এটা আমেরিকার জন্য বিরাট ভয়ের ব্যাপার।

চীন শীপ বিল্ডিং প্রোগ্রাম এমনভাবে চলমান রেখেছে যে, আমেরিকার নেভী শীপ থেকে চীনের সংখ্যা অনেক অনেক বেশী। চীনের হার্ডপাওয়ারের পরিসংখ্যানে আগামী দিনগুলিতে চীন মিলিটারী গ্লোবাল ব্যালেন্স শিফটিং এ লিড করতে পারে এমন ভাবেই সে তার ডিফেন্স ক্যাপাবিলিটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

যদি রাশিয়ার কথা বলি, আমেরিকার অনেক অস্ত্র রাশিয়ার অস্ত্রের থেকে বেশী কার্যকর বলে ধারনা করা হয়। কিন্তু রাশিয়ার অনেক কিছুতেই সিলেক্টিভ এডভান্টেজ রয়েছে আমেরিকার উপর। যেমন, আমেরিকার ৬০০০ ট্যাংক আছে কিন্তু রাশিয়ার আছে ১২০০০। রাশিয়ার ট্যাক্টিক্যাল নিউক্লিয়ার ক্যাপাবিলিটি আমেরিকার থেকে প্রায় কয়েকগুন বেশী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকার অস্ত্রশস্ত্রের কার্যকর ক্ষমতার এডভান্টেজ থাকলেও এদের সংখ্যাতাত্তিক ইনভেন্টরি এতোই কম যে, আমেরিকার পক্ষে কোনোভাবেই মাল্টিফ্রন্টে নিজেদেরকে এনগেজ করা সম্ভব না।

একটা উদাহরন দেই-আমেরিকাকে যদি রাশিয়াকে কন্টেইন করতে হয়, তাহলে ইষ্টার্ন ইউরোপিয়ান ফ্রন্টে তার মিলিটারী ইউকুইপমেন্ট এবং জনবল মোতায়েন করতে হবে। আর এটা করতে হলে আমেরিকাকে অন্য রিজিয়ন থেকে (যেমন ওয়েষ্ট প্যাসিফিক) এসব ফোর্সকে তুলে আনতে হবে। আর যদি ওয়েষ্ট প্যাসিফিক থেকে অস্ত্রশস্ত্র এবং জনবল অন্যত্র শিফট করতে হয় তাহলে চীনকে আর কন্টেইন করা সম্ভব না। যদি আমেরিকাকে আসলেই ২টা ফ্রন্টে একসাথে ২টা পরাশক্তিকে কন্টেইন করতে হয়, তাহলে বিমান বাহিনীর পাশাপাশি-

(ক) কমপক্ষে ৫০টি ব্রিগেড কম্বেট টিম লাগবে যা বর্তমানে ওদের আছে ৩১টি ব্রিগেড কম্বেট টিম।

(খ) অন্তত ৪০০ টি নেভী ব্যাটল শীপ দরকার যা বর্তমানে আছে ২৯৭ টি

(গ) এ ছাড়া অন্যান্য সুবিধাবাদী শত্রুদেরকেও আমেরিকাকে কন্টেইন করতে হবে-যেমন ইরান, নর্থ কোরিয়া ইত্যাদি। এর জন্যেও আলাদা করে আরো সামরিক শক্তি রিজার্ভ এবং মোতায়েন রাখতে হবে।

উপরের সবকিছু বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, খুব দ্রুতই আমেরিকার পক্ষে একের অধিক দুইটা ফ্রন্টে একই সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্ভব না বা উচিত না। মাল্টিফ্রন্টে যেতে হলে প্রতি বছর আমেরিকাকে তার বাজেটের ৪০% বাজেট আলাদা করে ডিফেন্স ফোর্সকে বন্টন আবশ্যিক। কিন্তু ৪০% বাজেট ডিফেন্স ফোর্সকে দিতে হলে যে পরিমান ট্যাক্স রেভিনিউ সংগ্রহের প্রয়োজন, তাতে সাধারন নাগরকদের উপর বাড়তি চাপ পড়বে, নিত্য নৈমিত্তিক পন্যের দাম বেড়ে যাবে, লিভিং কষ্ট বাড়বে। তাতে জনসাধারনের ক্ষোপ বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। একদিকে যুদ্ধের খরচ, অন্যদিকে যুদ্ধের জন্য উপযোগী হতে বাড়তি খরচ, সাথে জনসাধারনের বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় দেশে নইরাজ্যকর একটা পরিস্থিতি বিরাজ করার সম্ভাবনা। এদিকে আরেকটা খারাপ সংবাদ হচ্ছে- ডি-ডলারাইজেশন। তাতে আমেরিকা মূল চালিকা শক্তিতে একটা ভাটা পড়বেই।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে- ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ না হতেই যদি চীন তাইওয়ানকে কোনো প্রকার আক্রমন করে বসে (সম্ভাবনা যদিও খুব কম, কিন্তু চীনকে বিশ্বাস করা কঠিন), তাহলে আমেরিকাকে সম্ভবত একাই দুটু ফ্রন্টে লিপ্ত হতে পারে। যদি চীন তাইওয়ানকে আক্রমন করেই বসে, তাহলে বুঝতে হবে যে, রাশিয়ার সাথে চীনের একটা বিশাল বোঝাপড়া হয়ে গেছে। এই ফ্রন্টে লিপ্ত হলে সম্ভবত ইউরোপ, জাপান কিংবা ইন্ডিয়া আমেরিকার পাশে থাকার কথা নয়। জাপান এবং ইন্ডিয়ারও নিজেদের এজেন্ডা রয়েছে এই জোনে। আর ইউরোপ মনে করে তাইওয়ান তাদের কোনো মাথা ব্যথার কারন হতে পারেনা। সেক্ষেত্রে চীনকে সমানে সমান কন্টেইন করতে গেলেই ইউক্রেনের উপর আমেরিকার নজর অনেকটাই থিতে হয়ে আসবে। আর এই থিতে হয়ে আসা মানেই রাশিয়া এগিয়ে যাবে।

সময়টা খুব খারাপ আসছে মনে হচ্ছে আগামীতে। কোনো কিছুই সঠিক প্রেডিক্ট করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে।

২৩/০৪/২০২৩-ইউক্রেন এক্সিট প্ল্যান

অনেকগুলি অপারেশন দেখলাম আমার এই ছোট্ট জীবনে। সামরিক বাহিনীতে চাকুরী করার সুবাদে কিছুটা মিলিটারী ট্যাক্টিক্স বুঝতে সুবিধা হয় বলে আমি প্রতিনিয়ত আশেপাশের যুদ্ধাবস্থার খবরাখবর রাখতে পছন্দ করি। কাউকেই আমি যুদ্ধের ব্যাপারে সাপোর্ট করিনা। যুদ্ধ একটা ধ্বংসাত্মক ব্যাপার, জানমালের বিনাসের ব্যাপার। তারপরেও সময়ে সময়ে অহরহ কেউ কেউ যুদ্ধ করেই যাচ্ছে। আর সমকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে আমেরিকা নিজে।

আমেরিকার যুদ্ধের মারাত্মক নেগেটিভ সাইড হচ্ছে-তারা যুদ্ধ শুরু করতে খুবই পারদর্শী কিন্তু এক্সিট প্ল্যানে নয়। অথবা তাদের এক্সিট প্ল্যান থাকে না। সেটাই আমরা দেখেছি, ভিয়েতনাম, আফগানিস্থান, ইরাক ইত্যাদির বেলায়। সেক্ষেত্রে আমার এখন আরেকটা প্রশ্ন জাগছে- ইউক্রেনের বেলায় কি আমেরিকার কোনো এক্সিট প্ল্যান আছে যদি করতেই হয়?

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রায় ১ বছরের বেশী পার হয়ে গেছে আর এটা এখনো সেমি-স্ট্যালমেটেড অবস্থায়। দুপক্ষই তাদের দাবীতে অনড়। ইউক্রেন এই যুদ্ধে পশ্চিমাদের থেকে প্রায় শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের সাহাজ্যে তাদের দেশকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ানদের সরাসরি সাহাজ্য ছাড়া ইউক্রেনের পক্ষে এই যুদ্ধ চালানো কিছুতেই সম্ভব না। এই অবস্থায় একটা বিরাট প্রশ্ন জাগছে- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কি Forever War Territory তে পদার্পন করছে? ৯/১১ পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বা আফগানিস্থানে যুগের পর যুগ আমেরিকা যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, আর সেটার কারন অনেক। কখনো রিসোর্স, কখনো জিওপলিটিক্যাল, কখনো ওয়ার্ল্ড ডমিন্যান্স ইত্যাদি। কিন্তু ইউক্রেনের সাথে সেসব দেশের যুদ্ধের একটা পার্থক্য আছে-আর সেটা হলো-ইউক্রেনে আমেরিকার কোনো সৈন্য গ্রাউন্ডে নাই যা ইরাক বা আফগানিস্থানে ছিলো। 

প্রকৃত সত্য হচ্ছে- রাশিয়ার সাথে আমেরিকার জন্ম জন্মান্তরে শত্রুতা। এই শত্রুতার মাঝে ইউক্রেন হচ্ছে একটা ক্যাটালিস্ট। ফলে আমেরিকা যতো এগুবে, রাশিয়াও ততো এগুবে। এর শেষ হবার কথা নয়। ফলে ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির ঐতিহাসিক মিকাইল কিমাগের মতে- “This is going to be the mother of all forever wars, because of the nature of the adversary.”

৯/১১ পরবর্তীতে আল কায়েদার বিপরীতে যুদ্ধ ঘোষনা করে শেষ অবধি এটাকে ওয়ার অন টেরোরিজমে নিয়ে গিয়েছিলো আমেরিকা যা অদ্যাবধি চলছে। ইরাকেও তাই। প্রথমে ওইপন অফ মাস ডিস্ট্রাকশন, রিজিম চেঞ্জ, ন্যাশন বিল্ডিং, ইরানিয়ান ইনফ্লুয়েন্সকে কাউন্টার করা, অতঃপর আইএসআইএস এর বিপরীতে সৈন্য রাখা। এইম সব সময় বদলে গেছে শুধুমাত্র সামরিক উপস্থিতিকে জারী রাখার জন্য।

কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য কোথায় আমেরিকার? আমেরিকা না ইউরোপের কোনো দেশ, না সে এই অঞ্চলের কেউ। ফলে এখানে যেটা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে- যুদ্ধটা গুড ভার্সাস ইভিল, ডেমোক্রেসি ভার্সাস অটোক্রেসি এই আইডলোজিতে।  টপ লেবেলের অফিশিয়ালগন একেকজন একেকবার একেক রকমের কারন দেখাচ্ছেন। বাইডেন প্রশাসন বলছেন-এটা এমন একটা কারন যাতে কেউ আর আগ্রাসি মনোভাবে অন্য কোনো দেশে মিলিটারী অপারেশন চালাতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা। ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড বলেছেন- এটা করা হচ্ছে যাতে আমাদের সন্তানেরা এবং গ্রান্ড সন্তানেরা ইনহেরেন্ট করে এবং শিখে আমাদের কাছ থেকে। আর এভাবেই পাসচাত্যের এজেন্ডা একেকবার একেকদিকে শিফট হচ্ছে। এই রকম আইডলজিক্যাল শিফটের মধ্যে কোনো যুদ্ধ জয় করা সহজ নয়। ফলে যুদ্ধটা শেষ না হয়ে লম্বা সময়ের জন্য চলতেই থাকবে। প্রতিমাসে ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ লাগছে ইউক্রেন যুদ্ধে। আর এসব সরবরাহ করতে হচ্ছে ইউরোপিয়ান, আইএমএফ এবং আমেরিকাকে। রি-কন্সট্রাক্সন তো আরো অনেক খরচের ব্যাপার যদি যুদ্ধ থেমেও যায়। রাশিয়া এই যুদ্ধকে ইউক্রেন ভার্সেস রাশিয়া মনে করে না। সে মনে করে কালেক্টিভ ওয়েষ্ট, ন্যাটো ভার্সেস রাশিয়া। ফলে সে পিছুবে না। অন্যদিকে আমেরিকাও পিছু হটতে চাইবে না।

কিন্তু এর মধ্যে দুনিয়ার অনেক কিছু পালটে যাচ্ছে, পালটে যাচ্ছে জোট, পালটে যাচ্ছে ইকোনমি, পালটে যাচ্ছে কারেন্সী, পালটে যাচ্ছে শত্রু থেকে মিত্র আর মিত্র থেকে শত্রুতা। ইউরোপ ধীরে ধীরে ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনে পড়ে যাচ্ছে, ইকোনোমি দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। যখন আর পেরে উঠবে না, তখন হয়তো একসময় ইউরোপ নিজেই সস্তা গ্যাস আর তেলের জন্য পুনরায় প্রতিবেশী রাশিয়ার দারস্থ হতে হবে মনে হচ্ছে। আমেরিকার সাথে জোট ধীরে ধীরে লুজ হয়ে গেলে শেষ অবধি হয়তো কালেক্টিভ ওয়েষ্ট বাধ্যই হবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাবার।

সেক্ষেত্রে আমেরিকা কোন পদ্ধতিতে এই ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে এক্সিট করবে? সেটাই এখন দেখার ব্যাপার।

০৫/০৪/২০২৩-পেট্রো ডলার- A Game Changer

যে কোনো দেশের কারেন্সী সাধারনত সোনা বা হার্ড এসেটের মাধ্যমে ব্যাকিং করে সেই অনুপাতে তারা তাদের কারেন্সী প্রিন্ট করতে পারে। যদি হার্ড এসেট এর বাইরে কেউ তাদের কারেন্সী প্রিন্ট করেন, তাহলে সেই কারেন্সী অবমুল্যায়িত হয়ে মুদ্রাস্ফিতিতে পড়ে যায়। এক সময় ডলারও তার বিপরীতে হার্ড এসেটের মাধ্যমে কতটুকু ডলার প্রিন্ট করতে পারবে সেটা নির্ধারিত ছিলো।

কিন্তু ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং সৌদি আরবের প্রিন্স ফাহাদ আবুদুল আজিজ ৬ পাতার যে একটা এগ্রিমেন্ট করেন সেখানে এই দুই দেশ এইমর্মে রাজী হয় যে, তেল আমদানী রপ্তানিতে শুধুমাত্র ডলার ব্যবহার হবে, অর্থাৎ ডলার পেট্রো ডলারের স্বীকৃতি পেলো। এই ডলার যখনই পেট্রো ডলার হিসাবে স্বীকৃতি পেলো, তখন থেকে ডলার আর সোনা বা অন্য কোনো হার্ড এসেট এর বিনিময়ে ব্যাকিং করার দরকার পড়লো না বরং আমেরিকার অর্থনইতিক শক্তির উপরেই এটা হার্ড এসেট হিসাবে গন্য হবে বলে ধরে নেয়া হলো। ফলে আমেরিকার জন্য যেটা হলো যে, সে যতো খুশী ডলার ছাপালেও কিছু যায় আসে না, যেহেতু কোনো হার্ড এসেট লাগে না। এটা একটা আনলিমিটেড শক্তি। প্রায় ৪২% ট্রেড হচ্ছিলো এই ডলারে। এরমানে এই যে, শুধু কাগুজে ডলার দিয়েই আমেরিকা তেল সমৃদ্ধ দেশ ইরাক, ইরান, সৌদি আরব, মিডল ইষ্ট, ভেনিজুয়েলা ইত্যাদি দেশ থেকে তেল ক্রয় করতে পারে। এটার সর্বপ্রথম বিরোধিতা করেছিলো সাদ্দাম এবং পরে বিরোধিতা করেছিলো হূগু সাভেজ। এর ফলে তাদের পরিনতি কি হয়েছিলো সেটা আমরা সবাই জানি।

যাই হোক, ৪২% এর বাকী ট্রেডিং হচ্ছিলো নিজ নিজ দেশের কারেন্সীতে অন্যান্য পন্যে। কিন্তু আরেকটা মজার ব্যাপার ছিলো যে, ডলারকে একমাত্র রিজার্ভ কারেন্সী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া। ফলে অন্য দেশের কারেন্সীতে ট্রেড করলেও প্রতিটি দেশ তাদের নিজের কারেন্সীকে রুপান্তরীত করতে হতো ডলার। এরমানে প্রায় ১০০% ট্রেড এই ডলার কারেন্সীতেই। সব দেশ তাদের রিজার্ভ রাখতে হয় ডলারে আর সেটা আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে। এটাকে অন্যভাবে FIAT Currency ও বলা যায়। এই ফিয়াট কারেন্সি নিয়ে আরেকদিন বল্বো।

যেহেতু পলিসি মোতাবেক সব ট্রাঞ্জেক্সন হয় পেট্রো ডলার বা রিজার্ভ কারেন্সী (ডলার) এ করতে হয়, ফলে প্রায় সব দেশ আমেরিকার কাছে মুটামুটি জিম্মি। ফলে এই ডলার হচ্ছে আমেরিকার লাষ্ট সার্ভাইভিং সুপার পাওয়ার টুলস। এটার মাধ্যমে আমেরিকা যে কোনো দেশকে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারতো, রিজার্ভ আটকে দিতে পারতো। কোনো দেশ আমেরিকার পলিসির বাইরে গেলে বা তাদের সুবিধা মতো কাজ না করলেই আমেরিকা এই রিজার্ভ কারেন্সী আটকে দিয়ে সেটা তাদের নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারতো। এই জিম্মি দশা অনেক দেশ মনে প্রানে মেনে নিতে যেমন পারছিলো না, তেমনি এ থেকে সরে যাবার পথও খোলা ছিলো না। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সুইফট থেকে যখন বাদ দেয়া হলো, তখন রাশিয়া এটাকে ব্লেসিংস হিসাবে ধরে নিলো। বহু দেশ যেনো এই জিম্মি হওয়া ডলার থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো কারেন্সীতে পা রাখা যায় কিনা তার দিকে তাকিয়েই ছিলো। এর সুযোগ গ্রহন করছে চায়না। অর্থনীতির এই জায়ান্ট তার নিজস্ব কারেন্সী ইউয়ানকে ডলারের প্রতিস্থাপক হিসাবে দাড় করানোর চেষ্টায় রাশিয়ার সাথে এবং আমাদের পার্শবর্তী ইন্ডিয়াকে তাদের পাশে নেয়ার চেষ্টায় ব্রিক্স কারেন্সীর উদবোধনে সচেষ্ট হয়ে গেলো। এখন এই ডলার আউট হয়ে যাচ্ছে। রিজার্ভ কারেন্সী হিসাবে ইউয়ান এবং এর সাথে নিজস্ব কারেন্সীতে ট্রেড। নিজস্ব কারেন্সীতে ট্রেড করলে কোনো দেশেয় আর তাদের রিজার্ভ এর ঘাটতি হবে না। এটাই ধ্রুব সত্য।

তাহলে ডলার কিভাবে আউট হয়ে যাচ্ছে? সেটা একটা সংক্ষিপ্ত ভাবে না বললেই নয়।

রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরী কিসিঞ্জার এক সময় ভবিষ্যত বানী করেছিলো যে, যদি আমেরিকাকে তার ইউনিপোলার হেজিমনি ধরে রাখতে হয়, তাহলে সে যেনো সর্বদা রাশিয়া এবং চীনকে কখনোই একত্রে আসতে না দেয়। অন্য কথায় তারা এটা বুঝাতে চেয়েছে যে, রাশিয়া আমেরিকার শত্রু নয়, শত্রু হচ্ছে চীন। চীন এটা জানে এবং সবসময় সেটা মাথায় রাখে। চীন পৃথিবীর সবদেশ গুলির মধ্যে ইকোনোমিক জায়ান্ট। কিন্তু আমেরিকার গত কয়েক রিজিমে এই পলিসি থেকে আমেরিকা অনেক দূর সরে আসায় এখন চীন এবং রাশিয়া এতোটাই কাছাকাছি চলে এসছে যে, তারা বলছে তাদের বন্ধুত্ত সিমেন্টের থেকে শক্ত। তিনটাই সুপার পাওয়ার। দুইটা একদিকে আর আমেরিকা আরেকদিকে।

আমেরিকা গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশসমুহকে এমনভাবে যাতাকলে রেখেছে যে, ধীরে ধীরে সউদী আরব, ইরান, ইরাক, ভেনিজুয়েলা, এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা সবাই এর উপর ত্যাক্ত বিরক্ত। আর সবচেয়ে বিরক্তের ব্যাপার হলো এই যে, ”হয় তুমি আমার দলে, না হয় তুমি শ্ত্রুর দলে” এই কন্সেপ্টে কেউই নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও থাকতে পারছিলো না।

এখন যেহেতু ওপেক, বা ওপেক প্লাস তেল আমদানী-রপ্তানীতে হয় নিজস্ব কারেন্সী অথবা ইউয়ান ব্যবহার চালু করছে বা করতে যাচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশী লাভ হবে চীনের এবং তার সাথে অন্যান্য দেশেরও। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হবে আমেরিকার যারা এতোদিন বিশ্ব কারেন্সীর মোড়ল ছিলো। ডলারই ছিলো একটা মারাত্তক অস্ত্র। এই অস্ত্র এখন হাতছারা হয়ে চলে যাচ্ছে চীনের হাতে।

কিন্ত আমেরিকা এতা হতে দিতে চাইবে কেনো? আর ঠিক এ কারনে গত মার্চ মাসে আমেরিকা ডিক্লেয়ার করেছে যে, তারা ৪০% ডিফেন্স বাজেট বাড়াবে যাতে তারা সরাসরি চায়নাকে এটাক করতে পারে। তারা চায় চায়না যুদ্ধে আসুক। আর ইউয়ান কারেন্সি যেনো ট্রেড কারেন্সি না হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, চীন কখনো কোনো যুদ্ধে জড়ায় না।

বর্তমানে সৌদি আরব, ইরান, রাশিয়া, মিডল ইষ্ট, রাশিয়া, চীন, ইন্ডিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং অন্য বেশীর ভাগ দেশ সবাই এখন ডলারের পরিবর্তে চায়নার ইউয়ানে ট্রেড করতে আবদ্ধ হচ্ছে। এর অর্থ কি?

এটা হচ্ছে গেম চেঞ্জার।

Mohd Akhtar Hossain

Shahriar Hasan Weakenin Dollar means Imports become more expensive and exports become attractive to other clients or consumers outside the US. Another point is that: weak dollars would make consumers to spend high rate in petrolium items, thus, heating cost will be more. Thereby, reducing purchase power for other goods and services. For the poor countries, as their local currency would be utilized to trade things, thus, total available currency would be counted as reserve. Now, you know, what is the benefit.

Shahriar Hasan

Mohd Akhtar Hossain all is good, however, I didn’t understand how local currency would be utilized to trade things? Also, let’s say the Yuan become more powerful than dollar, that would mean Chinese things will get way more expensive and that could be detrimental to the poor countries.

Mohd Akhtar Hossain

আমি যেটা বুঝি সেটা হলো- ধরো, এখন আমি যদি একটা মেশিন কিনতে চাই যে কোনো দেশ থেকে, তাহলে আমাকে এলসি করতে হবে আর সেটা ডলারেই পে করতে হবে। আর সেই ডলার আমার দেশের রিজার্ভ এ থাকা ডলার থেকেই দিতে হবে। আমি ইচ্ছে করলেও টাকাকে কনভার্ট করে মেশিনের দামের অনুপাতে আমি শুধু টাকা পে করতে পারবো না। লোকাল কারেন্সীর বেলায় এই বাধ্যবাধকতাটা সম্ভবত থাকবে না। এক্সচেঞ্জ রেট শুধু কাজ করবে। (২) যখনই কোনো পন্য একচেটিয়া কারো কাছে থাকে সেটার দাম নির্ভর করে পন্যটি কার কাছে আছে তার নির্ধারিত দামের উপর। ইউয়ান যখন ইন্টারন্যাশনাল কারেন্সী হয়ে উঠবে, তখন চীন নিজেও মোড়লগিড়ি দেখাতে পারে, এটা তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু ইউনিপোলারিটি যখন মাল্টিপোলারিটিতে কনভার্ট হবে ক্ষমতা, তখন বর্তমান পরিস্থিতির কিছুটা হলেও পরিবর্তন হবে (৩) কিন্তু এখানে একটা নীতিবোধের তফাত হচ্ছে- আমেরিকা শেফার্ড বা হাস্কির মতো এগ্রেসিভ কিন্তু চীন ততোটা নয়। হয়তো এই কারনে পৃথিবীর মানুষ কিছুটা সস্থি পেতে পারে। তবে সবকিছু “সময়” বলে দেবে।

Mohd Akhtar Hossain

Mozaharul Islam Shawon ৩য় বিশ্ব যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা খুব একটা নাই। কারন ৩য় বিশ্ব যুদ্ধের কারনে কারা ক্ষতি গ্রস্থ হবে এটার বিশ্লেষন তারাই করেছে বেশী যারা এই ৩য় বিশ্ব যুদ্ধের প্লেয়ার। উপরন্ত পৃথিবীর মোরল্গিড়ির বাতাস যেভাবে বইছে সেখানে আগের মোড়লদের জায়গা খুব একটা শক্ত নয়। যেমন ইউকে (Gone), ফ্রান্স (Economically shattered), জার্মানী (Economically devasted right now), ইতালি (Divided), ইউরোপ (Every EU nations almost economically shattered due to heavily depended on Russian oil, gas and other commodities) ফলে তাদের গর্জন আর আগের মতো নাই। এবার ইন্ডিয়া, রাশিয়া, চীন, মিডল ইষ্ট সবাই একত্রিত হচ্ছে বিধায় ব্যাপারটা তত সহজ না। একটা জিনিষ লক্ষ্য করুন, ইরান আর সৌদি আরব এতো বৈরিতা থাকা সত্তেও হ্যান্ডশেক করছে, সিরিয়াকে এখন প্রোটেকসনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে খোদ ইরান এবং সৌদি। এগুলিই আসলে ৩য় বিশ্ব যুদ্ধ।

২৪/০২/২০২৩-রুলস বেজড অর্ডার

গত কিছুদিন যাবত আমি রুলস বেজড অর্ডার নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে একটা ব্যাপার মুটামুটি পরিষ্কার হলো যে, এই “রুলস বেজড অর্ডার” আসলে কোথাও আইনের বই বা লিখিত কোনো দলিল নাই এবং এটা কারা অনুমোদন করেছে সেটাও কেউ জানে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে-বর্তমানে বড় বড় পলিটিশিয়ানরা কথায় কথায় ‘রুলস বেজড অর্ডার’ কথাটা উচ্চারন করেন। কিন্তু তাদেরও এই রুলস বেজড অর্ডার সম্পর্কে খুব একটা ভালো ধারনা আছে বলে আমার মনে হয় না। আর যদি পরিষ্কার ধারনা থেকে থাকে তাহলে আরেকটা জিনিষ খুব পরিষ্কার যে, সবাই যার যার সুবিধার জন্য এবং ফায়দা লুটার জন্য এই “রুলস বেজড অর্ডার” সমর্থন করেন। যেমন, চায়নার এবং আমেরিকা উভয়েরই তাইওয়ানের ব্যাপারে, আমেরিকার ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্থান, প্যালেস্টাইন কিংবা ইসরায়েলের ব্যাপারে, রাশিয়ার জর্জিয়া কিংবা মালদোভার ব্যাপারে, ফ্রান্স এর আফ্রিকান দেশগুলির ব্যাপারে এই “রুলস বেজড অর্ডার” মানতে খুব পছন্দ করে। আসলে এই “রুলস বেজড অর্ডার” আর কিছুই না, এটা যার যার সার্থে তারা নিজেদের মতো করে কিছু আইন বানিয়ে সেটা অন্যকে মানতে বাধ্য করে। সেটা যদি তাদের নিজের দেশের আইনের বিপক্ষেও যায়, তাতেও মানানোর চেষ্টা চলতে থাকে। যেসব দেশ নিজেরা সাবলম্বি নয়, যারা বিগ পাওয়ারের উপর, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের উপর, আইএমএফ এর উপর কিংবা বৈদেশিক লোন বা ডোনেশনের উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য ব্যাপারটা খুবই অসহনীয়। তারা না মানতে পারে, কারন না মানলে সাহাজ্য বন্ধ হয়ে যাবে আবার মানলে দেখা যায় যে, এটা নীতিবহির্ভুত হয়ে যায়। ফলে নিজেদের সার্থেই ছোট ছোট দেশগুলি চুপ থাকে। আর এই চুপ থাকার মানে এই নয় যে, তারা সাপোর্ট করছে, আবার এই চুপ থাকার কারনে যারা এগুলি প্রয়োগ করে তারা ভাবে, কেউ তো আমাকে বাধা দিচ্ছে না।

কিন্তু যখন এই “রুলস বেজড অর্ডার” বড় বড় বিগ পাওয়ারের মধ্যে সংঘাত ঘটে তখন হয় সমস্যা। যেমন এখন হচ্ছে, রাশিয়া-চীন-আমেরিকা-ইউরোপ ঘিরে। তাইওয়ানকে ঘিরে চীন মনে করছে ‘রুলস বেজড অর্ডার’ এর মাধ্যমে তাইওয়ানের উপর সে যা খুশী করতে পারে, আবার আমেরিকাও ভাবে সেই বা নিয়ন্ত্রন ছাড়বে কেনো। ইউএস এর লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্থানে নিজেদের ইচ্ছায় রিজিম পরিবর্তনে কিংবা প্যালেষ্টাইনকে ইসরাইলের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া অথবা ইউক্রেনে এক নাগাড়ে ৮ বছর এক তরফা গোলাগুলিতে প্রতিষ্টিত সরকারকে উতখাত করে নিজের পছন্দমত সরকার গড়ে তোলার মত যে কোনো অজুহাতে তাদেরকে কব্জা করার নিমিত্তে অথবা তথাকথিত ডেমোক্রেটিক ইস্যু বা নিরাপত্তার অজুহাতে তাদেরকে বশে আনা, জর্জিয়া, মালদোভা, কিংবা ইউক্রেনকে ধরে রাখার নামে তাদেরকে রাশিয়ার ডি-মেলিটারাইজড করা, আফ্রিকায় বিভিন্ন দেশ যেমন বারকিনু ফাসো, বা মালি কিংবা নাইজেরিয়ায় সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে ফ্রান্সের আধিপত্য বিস্তার করার সবচেয়ে ভালো আইনটা হচ্ছে এই অলিখিত এবং অন-অনুমোদিত এই “রুলস বেজড অর্ডার”।

এটা একটা “মিথ”।

সবাই কোনো না কোনো এরেনায় আল্টিমেট কন্ট্রোল চায়। যখনই একই এলাকায় একের অধিক কারো নিয়ন্ত্রন রাখার দাবী না চলে আসে, ততোক্ষন এই “রুলস বেজড অর্ডারে” অন্যজন হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু একের অধিক হলেই টক্কর। এটা সবচেয়ে বেশী কার্যকরী হয়েছে যখন মাল্টিপোলার সিস্টেম ভেংগে ১৯৯০ সালে ইউনিপোলার সিস্টেমে দুনিয়াটা জড়িয়ে গেছে। তখন ইউনিপোলার নেতাদেরকে বাধা দেয়ার মতো কোনো শক্তিই অবশিষ্ট ছিলো না। তারা মনে করে যে, সব আইনের উর্ধে তারা। তারা যা বলবে, যা ভাববে, যা করবে সেটাই “রুলস বেজড অর্ডার”। এই রুলস বেজড অর্ডারের মাধ্যমে ইউনিপোলার নেতারা আন্তর্জাতিক সব সিস্টেম (ওয়ার্ড ব্যাংক, আইএমএফ, ইউএন, রিজার্ভ ব্যাংক, ওএসসিই, কিংবা মানবাধিকার সংস্থা ইত্যাদি) যেনো সব তাদের। যাকে খুশী আক্রমন, যাকে খুশী নিষেধাজ্ঞা, যাকে খুশী একঘরে করে রাখা ইত্যাদি এই রুলস বেজড অর্ডারের মাধ্যমে করা যায়।

মজার ব্যাপার হলো, এই রুলস বেজড অর্ডার কোথাও বই আকারে লিপিবদ্ধ নাই। না এর অনুমোদন নেয়া লাগে। সিচুয়েশন বুঝে কংগ্রেস কিংবা প্রেসিডেনশিয়াল আদেশেই নতুন ‘রুলস বেজড অর্ডার’ জানিয়ে দিলেই কাজ শেষ। রুলস বেজড অর্ডারের মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল সিস্টেমকে বুড়ো আংগুল দেখানো খুব সোজা। এ পরিপ্রেক্ষিতে কিম পিটারসন (ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিষ্ট) নিউ এজ পত্রিকায় গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ এ তার লেখায় তিনি লিখেছেন-

…” ইউএস আইসিসি (ইন্টার ন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট) কে রিকগনাইজ করে না। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় ইসরায়েল করত্রিক সংঘটিত রেসিষ্ট কার্যকলাপ সমর্থন, নিকারাগোয়ায় ওয়াটার মাইনিং এর ব্যাপারে ওয়ার্ল্ড কোর্ট রুলিং এর আওতায় দোষি সাবস্থ্য হবার পরেও তা ইগনোর করা, এংলো ইউরোপিয়ান জাপানিজ সাউথ কোরিয়ান জোট বিভিন্ন ভায়োলেশনে জড়িত থাকার পরে আন্তর্জাতিক বিচারে দোষি হওয়া সত্তেও তাদেরকে এই রুলস বেজড অর্ডারের আওতায় পরিশুদ্ধ করা, সিরিয়া দখল, আন প্রভোকড ইরাক আক্রমন, ৭০ বছর যাবত কিউবাকে এক ঘরে করে রাখা ইত্যাদি সব এই রুলস বেজড অর্ডারের দ্বারা জায়েজ। “

অন্যদিকে ফ্রান্স, জার্মানী, ইউকে কিংবা ইউরোপিয়ান দেশগুলির এমন ভগ্ন দশা যে, তারা এককালের মোড়ল অথচ তাদের আর সেই শক্তি নাই যাতে নিজেরা না মানলেও অন্যকে বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাখতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য, আরব দেশগুলি কিংবা দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলিতে তো আজীবন সংঘাত লেগেই আছে, হয় বাইলেটারেল, না হয় জিওপলিটিক্যাল অথবা টোটালেটেরিয়ান সরকারের চর্চা। ফলে ক্ষমতা হারাতে পারে, কিংবা কোনো প্রয়োজনে এসব বিগ পাওয়ারের সাহাজ্য লাগতে পারে ভেবে এরাও এসব বিগ পাওয়ারের বিরুদ্ধে বা রুলস বেজড অর্ডারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। ফলে বাধা না দিয়ে “জি হুজুর” থাকলেই যেনো “কুলও রক্ষা পায় আবার মোড়ল গিড়িও থাকে” এমন একটা পরিস্থিতিতে তাদের বসবাস।

৩য় বিশ্বযুদ্ধ না লাগলে সম্ভবত এবার এই “রুলস বেজড অর্ডার”, ইউনিপোলারিটি, নিউ কলোনিয়ালিজম কন্সেপ্ট ইত্যাদির ইতি হবার সম্ভাবনা।

পৃথিবী আবার শান্ত হবে। এটাই প্রত্যাশা।

২১/০২/২০২৩-পচা সামুকে পা কাটে

গ্লোবাল অর্ডার চোখের সামনে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ইউনিপোলার থেকে মাল্টিপোলার। এটা পরিবর্তন হবারই কথা ছিলো। কারন সব কিছুর একটা এক্সপায়ারী সময় থাকে। কিন্তু সে সময়টা কখন এবং কবে সংঘটিত হবার কথা ছিলো সেটা নির্ধারিত ছিলো না। বড় বড় ঘটনা হটাত করেই সংঘটিত হয়, আর হটাত করেই বিষ্ফোরন ঘটে।

যে কোনো বড় পরিবর্তনের পিছনে কিছু হট, কিছু কোল্ড, কিছু চালাক এবং আর কিছু নির্বুদ্ধিওয়ালা নেতা থাকে। এর মানে বড় পরিবর্তনের সময় এসব গুনাবলীওয়ালা নেতাদের আবির্ভাব হয়। আর এটা হতে হয় একই সময়ে। সবাই চালাক হলে কিংবা সবাই নির্বুদ্ধিওয়ালা হলে বড় বড় ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়। ১ম মহাযুদ্ধের কথা বাদই দিলাম, ২য় মহাযুদ্ধ যদি আমরা বিশ্বনেতাদের পরিচয় দেখি, তাতে দেখবো, মুসুলিনি (ইতালী), হিটলার (জার্মান), চার্চিল (ইউকে), স্ট্যালিন (সোভিয়েত ইউনিয়ন), রুজভেল্ট (আমেরিকা), তোজো (জাপান), চার্লস ডি গুয়ালে (ফ্রান্স) এদের জন্ম হয়েছিলো। এদের একপক্ষ ছিলো সামরিক খাতে শক্তিশালী কিন্তু হট হেডেড। অন্যদিকে আরেক পক্ষ তাদেরও সামরিক খাত যৌথভাবে শক্তিশালী ছিলো কিন্তু সেসব নেতারা অন্য পক্ষের মতো এতো হট হেডেড ছিলো না। এক্সিস পাওয়ারে ছিলো হিটলার, মুসুলিনি এবং তোজো। অন্যদিকে এলাইড পাওয়ারে ছিলো বাকী সব।

অসম্ভব ক্ষমতাধারী হট হেডেড হিটলারকে নিঃশর্ত সাপোর্ট করেছে মুসুলিনি এবং তোজো, কখনো বুঝে, কখনো না বুঝে। তারা এটাই মনে করেছে যে, হিটলার যা বলবে সেটাই ঠিক। আর এর আরেকটা কারনও ছিলো, হিটলারের জনপ্রিয়তা জার্মানীতে এমন তুংগে ছিলো যে, তার কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হবে এটাই অনেকে ভাবতে পারতো না। তাই হিটলারের পরিকল্পনায় কেউ কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় নাই বরং নিসশর্তভাবে সাপোর্ট দিয়ে হিটলারকে আরো বেপরোয়া করে তুলেছিলো। হিটলারের প্রাথমিক দিকে তারা সমরক্ষেত্রে সাফল্যও পাচ্ছিলো। কিন্তু এই সাফল্য কতটুকু টেকসই ছিলো সেটা তারা ভাবতে ভুল করেছিলো। অন্যদিকে এলাইড পাওয়ারের মধ্যে ছিলো বেশ কিছু বুদ্ধিমান নেতা যারা কখন কোথায় কতটুকু ফোর্স নিয়ে কিভাবে কাকে আক্রমন করতে হবে এবং কার কতটুকু দায়িত্ব সেটা খাতা কলমে বেশ পরিকল্পনা মাফিক ছকে একে একে এগোচ্ছিলো। ফলে, কিছুটা সময় সাফল্য না পেলেও পরবর্তীতে যুদ্ধের মোড় পুরুই ঘুরে গিয়েছিলো।

তখন যুদ্ধটা ছিলো শুধুই সামরিক অস্ত্র আর দক্ষ সৈন্যবলের কেরামতি। কিন্তু এবারে প্রক্সিওয়ার সে রকমের নয়। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেউ মনে করছেন রাশিয়ার আগ্রাসন, কেউ মনে করছেন দূর্বলের জন্য আমেরিকার দায়িত্ব জ্ঞানের বহির্প্রকাশ, কেউ মনে করছেন, পিউর গনতন্ত্রের পক্ষে বিপক্ষের একটা মারাত্তক হুমকী। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এগুলি কোনোটাই আসলে না। এখানে সবাই জড়িত, কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে আবার কেউ নীতিগতভাবে, কেউ ক্ষমতাকে আকড়ে ধরার জন্য, কেউ কারো ক্ষমতাকে খর্ব করার জন্য, কেউ আবার অতি উতসাহে। এখানে শুধু সামরিক অস্ত্র আর দক্ষ সৈন্যবলই শেষ কথা নয়। এখানে জড়িয়ে আছে প্রতিটি দেশের অর্থনইতিক কর্মকান্ড, জিওপলিটিক্যাল ইনফ্লোয়েন্স, ইউনিপোলারিটি ভার্সেস মাল্টিপোলারিটির মতো হিসাব কিতাব আর আছে কলোনিয়ালিজমের বা দখলদারিত্তের মতো কিছু মোগলগিড়ির বিপক্ষে একটা ক্ষোভ।

স্পেশাল অপারেশনটা যদি এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যেত, তাহলে এতো কিছুর হিসাব কিতাব হয়তো আসতো না। কোনো না কোনো কারনে এই স্পেশাল অপারেশনটা ইচ্ছে করেই যেনো কেউ দীর্ঘায়িত করছে। আর এর ফলে অনেক হিসাব সবার কাছে বেরিয়ে আসছে, কার কি ইন্টারেষ্ট। থলে যে এতো বিড়াল ছিলো আমরা সেটা এই যুদ্ধ শুরুর আগে বুঝতেও পারিনি। কোনোটা বুনু বিড়াল, কোনোটা বাঘা বিড়াল, কোনোটা মিচকে বিড়াল, কোনোটা আবার চাপাহুয়া বিড়াল। 

২য় মহাযুদ্ধের বিভীষিকা যুদ্ধের সময় সাধারন জনগন যতোটা না উপলব্ধি করেছে, তার থেকে বেশী উপলব্ধি করেছে যখন নুরেনবার্গ ট্রায়াল শুরু হয়। মানুষ ২য় মহাযুদ্ধের গভীর ক্ষতের কথা, মানুষের সাফারিংস এর কথা, যুদ্ধের আসল মোটিভের কথা ইত্যাদি সাধারন মানুষ জানতে পেরেছিলো সেই নুরেনবার্গ ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে। আর এখন ইউক্রেনের এই স্পেশাল অপারেশনের সময়কাল দীর্ঘায়িত হবার কারনে আমরা আমজনতা ধীরে ধীরে এটা বুঝতে পারছি কে কার বিপক্ষে কি নিয়ে কথা বলছে আর সেভাবে কে কার সাথে জোট পাকাচ্ছে।

আফ্রিকা (যার কাছে আছে ৫৪টি ভোট ইউএন পরিষদে) এখন সবার মাথা ব্যথা হয়ে দাড়িয়েছে। কে আফ্রিকাকে কন্ট্রোল করবে, কতটুকু কন্ট্রোল করবে, আর কিভাবে কন্ট্রোল করবে। অথচ এই আফ্রিকাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, যুগের পর যুগ না খেয়ে মরতে হয়েছে, তাদের রিসোর্স চুরি হয়েছে, তাদেরকে অগ্রসর হবার কোনো পথই কেউ দেখায় নাই। সব কলোনিয়াল মোড়লেরা সব সময় একে ব্যবহার করেছে তাদের রিসোর্স লুন্ঠন করে করে। একসময় এই সেন্টার অফ ফোকাস ছিলো মধ্যপ্রাচ্য। সেই মধ্যপ্রাচ্য এখন সবার হাতের বাইরে। তারাও কলোনিয়ালিজমের গন্ডি থেকে বেরিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ভারতবর্ষ একসময় ইতিহাসের নির্মম শিকার হয়েছে, তার বুকচিড়ে পাশ্চাত্যরা যা পেরেছে লুন্ঠন করেছে, প্রায় ২০০ বছর নাগাদ নিজের দেশেই তারা ক্রীতদাসের মতো জীবন যাপন করেছে। সেই ভারতবর্ষ এবার যেনো তাদের ইতিহাসের প্রতিশোধ নিতে চায়। রুখে দাড়িয়েছে। সোভিয়েট সবসময়ই পাশ্চাত্যের দুশমন ছিলো, সেটা এখনো আছে। সোভিয়েট ভেংগে ১৫টি দেশে রুপান্তরীত হয়েছে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই। তাদের কষ্ট নাই এমন হতে পারেনা। চীন সবসময়ই চালাক ছিলো। তারা পারতপক্ষে কারো সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। তারা মনে করে, যুদ্ধে যে পরিমান অর্থ আর মানুষের ক্ষতি হয় সেটার বদলে সেই অর্থ আর জনবল দিয়ে অন্য দেশকে কন্ট্রোল করা সহজ। আর সেটা স্থায়ী। ফলে চীন একাধারে আফ্রিকা, দক্ষিন এশিয়া, ভারতবর্ষ, এবং রাশিয়ার সাথে কোলাবরেটর হিসাবে অন্যত্র সহযোগী হয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত। এখন চীন সবার জন্যই একটা মাথাব্যথার কারন।

যাক যেটা বলছিলাম, একই সময়ে কিছু কিছু নেতাদের আবির্ভাব ঘটে যেখানে একপক্ষ আরেক পক্ষ থেকে কম বুদ্ধিমান অথবা একদল হট হেডেড আর আরেক দল কোল্ড হেডেড। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাপারটা একেবারেই দৃশ্যমান। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অধিকাংশ নেতারা কোথায় যেনো কোনো এক পরাশক্তির কাছে সারেন্ডার করে আছে নিসশর্তভাবে যেমন করেছিলো তোজো, কিংবা মুসুলিনি হিটলারের কাছে। ফলে ক্রমাগত বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারনে যে শক্তির উপর আজকে এই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দাঁড়িয়ে সেটা যেনো ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। পেট্রোডলার মার খেয়ে যাচ্ছে, এনার্জি রিসোরসের ঘাটতির কারনে ইউরোপ প্রায় ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের মধ্যে পড়ে গেছে। অন্যদিকে ইউরোপের বাইরে প্রতিটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষোভের কারনে তারা এবার একসাথে এমন করে জোট পাকিয়ে যাচ্ছে যে, যারা এতোদিন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এদের সবাইকে ভয়ের মধ্যে রেখেছিলো তারাই সেইসব দেশের একীভুত হবার কারনে নিজেরা যেনো একা হয়ে যাচ্ছে, আর নিষেধাজ্ঞা পাওয়া দেশগুলিই এখন বড় সংঘটনে রুপ নিচ্ছে। এককালের ক্ষমতাধর দেশ ব্রিটেন নিজেই যেনো এখন ছোট একটা দ্বীপে রুপান্তরীত হচ্ছে, ইউরোপ শরনার্থির চাপে এবং উচ্চ ইনফ্লেশনের মুখে তথা এনার্জি ক্রাইসিসে ডি-ইন্ডাস্ট্রিলাইজেশনের মুখে বড় বড় বিলিওনারেরা দেউলিয়ার দিকে এগুচ্ছে। একচেটিয়া রিজার্ভ ধারনকারী দেশসমুহ তাদের ক্রেডিবিলিটি হারিয়ে এখন মাল্টি কারেন্সির স্রোতে ধরাশায়ী হয়ে পড়ছে। আর এর মধ্যে একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্তে যেনো আরো গভীর সমস্যায় পতিত হবার লক্ষন দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়-যারা নিজের সম্পদকে রক্ষার জন্য এসব দেশে জমা করতো তাদের সেই সব সম্পদ এখন পুরুটাই অনিশ্চয়তার পথে। ফলে ভবিষ্যতে আর কেউ অধীক নিশ্চয়তার লক্ষে কখনো তাদের সম্পত্তি এসব দেশে রাখবে কিনা সে ব্যাপারে শতভাগ সন্দেহ আছে।

আজকে ছোট ছোট দেশ যারা অন্য বিগ পাওয়ারের উপর নির্ভরশীল, তারা হয়তো মুখ সেটে বসে আছে, কিছু বলছে না কিন্তু ক্ষোভ তো ভিতরেই জমা হয়ে আছে। নিজের দুক্ষের কথা কাউকে বলতে পারছে না মানে এই নয় যে, তাদের কষ্ট নাই। তাদের এই কষ্টের কথা যারাই শুনবে, তাদের দলেই একদিন এরা ভিড়ে যাবে খুব গোপনে। তখন এদেরকেও আর পাশে পাওয়া যাবে না। কেউ তো আছে এদের কথা শুনবে।

আজকের দিনের এই ইতিহাস যেদিন মানুষেরা উপলব্ধি করবে, সেদিন হয়তো প্রিথিবী শান্ত হয়ে যাবে আর আমরা গবেষনাগারে বসে বসে এটাই বিশ্লেষন করবো কখন কে কোথায় কি ভুল করেছিলো। আর এভাবেই “সময়” নামক অপরিবর্তনশীল ফ্যাক্টরটি তার রাজত্ব চালিয়ে যায় যেখানে এক সময় রোম, এক সময় জার্মান, এক সময় ফ্রান্স, এক সময় ব্রিটিশ, কিংবা আমেরিকাকে লিডার হিসাবে বসিয়েছিলো।  আর সবাইকে সেই লিডারকে মানতে বাধ্য করেছিলো। কিন্তু সেই “সময়” নামক ফ্যাক্টরটি যে সব সময় সবার সাথে থাকে না, এটাই আমরা হট এবং কোল্ড হেডেড মানুষেরা বুঝতে অক্ষম। পচা সামুকে পা কাটে এটা আমরা অনেক পরে বুঝি যখন পা কেটে যায়।

সম্ভবত এখন “সময়” তার নিজের অভিযান চালিয়ে আবার পুনরায় বিশ্বকে ঢেলে সাজাচ্ছে। কে এখন পরবর্তী পথ প্রদর্ষক সেটা দেখার বিষয়।

ইউক্রেন যুদ্ধ আসলে ইউক্রেনের জন্য নয়। সে একটা শুধু ক্যাটালিস্ট মাত্র।

৫/৮/২০২২-ডলার আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে কেনো তার পজিশন হারাবে

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের মান অনেক শক্ত। অর্থাৎ Strong US Dollar. এটার আসলে মানে কি?

আমরা যে কোনো কিছু Strong কেই পজিটিভভাবে নেই কারন সেটার একটা ক্ষমতা আছে। কিন্তু মনে রাখা উচিত যে, ফাইন্যান্স এবং অর্থনৈতিক ভাষায় এই শক্ত কারেন্সীর মুল্যায়ন কিন্তু অন্য রকম। এটা খুব সহজ নয়। কারন ডলারের স্ট্রং পজিশন মুলত ডাবল এজড একটা ছুড়ির মতো। আর এটার কোন পাশের ধার দিয়ে কাকে কিভাবে যে কাটবে সেটা প্রেডিক্ট করা খুব কঠিন।

যেমন ধরুন, এক ডলারের দাম বাংলাদেশে বর্তমানে আগের থেকে প্রায় ২৩/২৪ টাকা বেশী, ইয়েনের মুল্য কমেছে প্রায় ১০% এর উপর, ইন্ডিয়ার কারেন্সীর মুল্য কমেছে প্রায় ১৫%, পাকিস্থানের রুপীর দাম এমন কি ইউরোর দামও কমে গেছে ডলারের কাছে। এটার মুল কারন কি? (এখানে একটা ছোট কথা বলে রাখি- ডলার আন্তর্জাতিক মুদ্রা হওয়ায় ডলার একটা তাজা ইস্যু। যদি ডলারের সাথে সাথে আরো অনেকগুলি আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে চলমান থাকতো তাহলে বিশ্ব বাজারে ডলার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কোনো দেশকেই কাবু করতে পারতো না।)

যেটা বলছিলাম, ডলার এতো স্ট্রং হবার কারন কি?

খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করে দেখবেন-মার্কিন অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের কারণে ডলার কিন্তু এতটা শক্তি অর্জন করছে না। ডলার স্ট্রং হচ্ছে উলটা দিকে থেকে মানে বিশ্বের বাকি অংশে হতাশাজনক অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার কারণে।

যারা ডলারের দেশ সেসব নাগরিকদের জন্য স্ট্রং ডলার একটা মারাত্তক সুখবর। কারন একই পরিমান ডলার খরচ করে এসব কাষ্টোমার বেশী লাভ পায়, বেশী পন্য কিনতে পারে। কিন্তু যারা আমদানির উপর নির্ভরশীল বা যে সব ব্যবসায়ীরা আমদানী করে কাচামাল কিংবা ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আনতে চায়, তাদের জন্য স্ট্রং ডলার মারাত্তক খারাপ খবর। তারা একই পরিমান পন্য আগের তুলনায় বেশী নিজস্ব কারেন্সী দিতে হয় অর্থাৎ বেশী কারেন্সী দিয়ে ডলার কিনতে হয়। অথবা একই পরিমান পন্য কিনতে গেলে বেশী পরিমান ডলার কিনতে হয়। এটা গেলো যারা ডলারের দেশ না তাদের জন্য খারাপ খবর।

স্ট্রং ডলার থাকার পরেও আমেরিকার জন্য বা ডলারের দেশের জন্য এটা খারাপ খবর কিভাবে যেখানে তাদের অনেক খুশী হবার কথা?

আমেরিকার জন্য স্ট্রং ডলার অন্যদের চেয়ে বহুলাংশে বেশী বিপদ, এই কারনে যে, এটি মার্কিন রপ্তানিকে বিদেশী তৈরি পণ্যের সাথে আরও ব্যয়বহুল করে তোলবে, যার ফলে অন্য দেশের চাহিদা কমিয়ে দেবে বা জোর করে কমিয়ে দিতে দেশ বাধ্য হবে। এটা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি যে, বহু দেশ অনেক ভোগবিলাস পন্য আমদানীতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে যাতে নিজেদের কারেন্সীর অনুপাতে ডলারের মাধ্যমে অতিরিক্ত খরচ না করতে হয়। ফলে যারা রপ্তানী করে সে সব দেশের রপ্তানী আয় কমে যায়। অর্থাৎ আমদানীকারকেরা ডলারের দাম বাড়ায় তারা আমদানীতে নিরুসাহিত করে। এর ফলে বিদেশী রাজস্ব স্ট্রীমসহ মার্কিন কোম্পানিগুলি সেই লাভের মূল্য হ্রাস দেখতে পায়। আমেরিকার জিডিপি কমে যায় বা যাচ্ছেও।

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে-এটা কিভাবে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করে?

সাধারণভাবে, এর অর্থ হল একটি শক্তিশালী ডলারের অধীনে মার্কিন ইক্যুইটিগুলির উচ্চ এক্সপোজারসহ একটি পোর্টফোলিও আন্তর্জাতিক ইক্যুইটিগুলির উচ্চ এক্সপোজারের চেয়ে ভাল করতে পারে বটে, তবে সেই মার্কিন ইকুইটিগুলি যেগুলি বিদেশে প্রচুর ব্যবসা করে সেগুলি হ্রাস পেতে পারে। উদাহরণ যদি দেই-প্রক্টর এবং গ্যাম্বল, একটি মার্কিন কর্পোরেশন, বিশ্বের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্য কোম্পানি যার বার্ষিক বিদেশী বিক্রয় বিলিয়ন ডলারের সাথে এই মঙ্গলবার রিপোর্ট করেছে যে তাদের ত্রৈমাসিক আয় ৩১% শতাংশ কমেছে । এর একটাই কারন, স্ট্রং ডলার।

এটাকে বলে ট্রেডওয়ার। এই ট্রেডওয়ারে কারেন্সী ডিভালুয়েশনের কারনে অন্যান্য দেশের পন্যের মুল্য কমে যায়। যেমন জাপান, তাদের বর্তমান গাড়ির মুল্য আগের থেকে অনেকাংশে কমে গেছে শুধুমাত্র ডলারের স্ট্র হবার কারনে। এর ফলে জাপান এখন তাদের উতপাদিত গাড়ি সেসব দেশে পাঠাতে দ্বিধা করছে। তারা আপাতত পন্য রপ্তানীতে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে যারা আমদানী নির্ভর দেশ, যেমন আমেরিকা, তাদের জনগন পন্য পাওয়া থেকে বিরত হয়। অথচ আমেরিকার কাছে স্ট্রং ডলার থাকার পরেও পন্য নাই।

এই ট্রেডওয়ারের কারনে বিভিন্ন দেশে স্টক এক্সচেঞ্জগুলিও উঠানামা করছে, ফলে ডলারের দেশের পন্যের স্টক এক্সচেঞ্জের ক্রয় বিক্রয়ও অনেকাংশে কমে গেছে। এর ফলে খোদ আমেরিকাতেও রিসেসন নামক একটা ধাক্কা লাগছে। কিন্তু ডলার স্ট্রং।

এই বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামীতে যা দেখা যাবে সেটা হচ্ছে- ডলারের বিপরীতে অন্য কোনো কারেন্সী বা কারেন্সীসমুহ দাড় করানো। ডলারকে আর একক আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে গন্য না করা। হতে পারে সেটা ‘ব্রিক্স কারেন্সি’, হতে পারে নতুন কোনো কারেন্সী যা ইউরোর মতো সব দেশ ব্যবহার করবে। ইউরো যেমন এখন ২৯টি দেশের কমন মুদ্রা।

ডলারের জন্য এটাই সবচেয়ে মারাত্তক খারাপ খবর।

০৩/০৮/২০২২-তাইওয়ানে  পেলোসির ভিজিটে

তাইওয়ানে  পেলোসির ভিজিটে চীনের এতো হুমকী ধামকীর কোনো প্রকার বহির্প্রকাশ আদতে দেখা যায় নাই। অবাক শুধু সারা বিশ্বই হয়নি, পেলোসি এবং আমেরিকাও অবাক হয়েছে। এটা কি হলো?

তবে আমার কাছে দুটু জিনিষ একেবারেই ক্লিয়ার ছিলো-(ক) পেলোসি তাইওয়ানে যাবেই (২) চীন কিছুই করবে না যা তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হয়। বিশেষ করে তাইওয়ানে আক্রমন বা পেলোসির বিমানে হামলা কিংবা পেলোসির উপরেই হামলা। এই প্রসঙ্গে আমি ফেসবুকেও ব্যাপারটা শেয়ার করেছিলাম। সেটাই আসলে হয়েছে। তাহলে ব্যাপারটার রহস্য কি হতে পারে?

তাইওয়ানিজরাও চায়নিজ। ভাষা এক, কালচার এক, হেরিডিটিও এক। ঠিক রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের জনগনের যে অবস্থা। মেইন স্ট্রিম মিডিয়া বা যারা সত্যটাকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন, তাদের কাছেই বেশীরভাগ শোনা যাবে যে, ইউক্রেনের অধিকাংশ জনগন রাশিয়াকে ঘৃণা করে, রাশিয়াকে তারা চায় না ইত্যাদি। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক ঐ রকমের না। সবদেশেই ভিন্ন মতালম্বীর লোক থাকে, তাদেরকে ইনিয়ে বিনিয়ে ইন্টারভিউ নিয়ে একটা কঠিন সত্যকে মিডিয়াগুলি লুকিয়ে ফেলে তাদের জন্য যারা এসব ব্যাপারে খুব একটা বেশী জানেন না। ফলে বিশ্বব্যাপি একটা আলাদা মনোভাব সৃষ্টি হয়। সোস্যাল মিডিয়ায় না জেনেই বিজ্ঞের মতো মতামত পড়তে থাকে। রাশিয়া প্রথম থেকেই ইউক্রেনের সাধারন জনগনের উপর কোনো আক্রমন করে নাই বা যদিও রাশিয়ার বেশ কিছু অপারেশনের কারনে ইউক্রেনের লোক আহত নিহত হয়েছে সেটা কোলেটারেল ড্যামেজ। ঠিক তেমনি, তাইওয়ানের মধ্যেও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ আছে। কিন্তু বেশীরভাগ তাইওয়ানিজরা কিন্তু নিজেরদের সায়ত্তশাসিততা এবং গ্রেট চীনের অধীনেই ভালো আছে বলে মনে করে। এ কারনে চীন যদি তাইওয়ানের উপর আক্রমন করে বা করতো, তাতে চীনের রেপুটেশন অবশ্যই নষ্ট হতো এবং তাইওয়ানের জনগনের মধ্যে একটা ঘৃণার সৃষ্টি হতো। চীন তাইওয়ানিজদেরকে ব্রাদার মানুষ হিসাবে নিজেদের গোত্রীয়ই গন্য করে। চীন তাই সম্ভবত তাৎক্ষনিক আক্রমনে যেতে চায়নি।

তাছাড়া পেলোসিকে আক্রমন করা বা তার বিমানে হামলা করা মানেই হলো, সরাসরি আমেরিকাকে যুদ্ধে ডেকে আনা, হোক সেটা যারই ভুল বা এরোগ্যান্সি। যুদ্ধটা গতকালই লেগে যেতো। তখন না আমেরিকা, না চীনের কারো হাতে আর কোনো কন্ট্রোল থাকতো। আমেরিকা পেলোসির এই ভিজিটটাকে ইজ্জতের ছাওয়াল হিসাবে ভেবে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার, ৮টি US Air Force warplanes, including F-15s, Four US warships, including an aircraft carrier এগুলি দিয়ে পেলোসিকে তাইওয়ানে মাত্র ১৪ ঘন্টার জন্য ভিজিট করিয়েছে। মানে তারা চীন আক্রমন করুক চেয়েছে।  ফলে চীন আমেরিকার ফাদে পা দেয়নি। চীন এদিক দিয়ে অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ করেছে।

তাহলে পেলোসির ভিজিট তাইওয়ান কিংবা পশ্চিমাদের উপর কিংবা চীনের উপরেই কি প্রভাব হতে পারে? এটা একটা লং টার্ম, (হতে পারে অনেক মাস, হতে পারে অনেক বছর) ইফেক্টে যাচ্ছে। আমার ধারনা, চায়নীজদের রিস্পন্সটা পর্যায়ক্রমে আসতে থাকবে। আর সেটা কোনোভাবেই যুদ্ধের রুপ নেবে না। প্রথম ইফেক্টটা হবে-আমেরিকার সাথে চায়নার সম্পর্ক আজীবনের জন্য খারাপ থাকবে এবং প্রতিনিয়ত চায়না তাইওয়ানকে বিভিন্নভাবে চাপের মধ্যে রাখবে যেটা করছে রাশিয়া ইউক্রেনের উপর।

এখানে একটা ব্যাপার মনে রাখা দরকার যে, জাতিসংঘের দ্বারা নির্ধারিত তাইওয়ানের এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোন চীনের কন্ট্রোলে। চায়না যে কোনো সময়ে তাইওয়ানের সমস্ত বহির্গত এবং আভ্যন্তরীন বানিজ্যিক কার্যক্রম  বন্ধ করার ইখতিয়ার রাখে। শুধু তাইই না, তাইওয়ানের সমস্ত নদীপথের একচ্ছত্র কন্ট্রোল্ধারী চীন। যে কোনো সময়ে চীন তাইওয়ানের সমুদ্রপথ ব্লক করার ইখতিয়ার রাখে আর এটা জাতিসংঘের দ্বারাই নির্ধারিত। এর ফল স্বরূপ এই মুহুর্তে চীন বলেছে যে, তাইওয়ানের কোনো পন্য আমদানী করবে না, না সমুদ্রপথে অর্থাৎ এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোন দিয়ে তাইওয়ান নির্দিষ্ট কিছু পন্য পরিবহন ছাড়া অন্যান্য পন্য পরিবহন করতেও পারবে না বলে নিষিদ্ধ করেছে। চীন তাইওয়ানের আকাশপথ এবং সম্যদ্র পথে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে।

পেলোসির ভিজিটকে উপলক্ষ করে চায়না এই প্যাসিফিক অঞ্চলে তার পুরু আগের চেহাড়া পালটে ফেলবে। আর সেটা সামরিক উপস্থিতির সাথে সল্প মেয়াদীতে চীন তাইওয়ানের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে দূর্বল করতে থাকবে। যেটা রাশিয়া করছে ইউক্রেনকে। চীন তাইওয়ানের সরকারের প্রতিটি ভুল পদক্ষেপকে মারাত্তক এগ্রেসিভভাবে কাজে লাগাবে। চীন তাইওয়ানের জনগনের উপর কিন্তু ক্ষিপ্ত নয়, ক্ষিপ্ত তাইওয়ানের প্রশাসকদের উপর যারা চীনের না বলা সত্তেও পেলোসির ভিজিটকে সমর্থন করেছে যেখানে হাজার হাজার তাইওয়ানিজরা এই ভিজিটের বিপক্ষে আন্দোলন করেছে। এর সাথে চীন তাইওয়ানের উপর সাইবার এটাকের মাধ্যমে তাদের প্রচুর পরিমানে ক্ষতি করার সম্ভাবনা আছে।

পেলোসির এই ভিজিটের পরিপ্রেক্ষিতে বাইডেন প্রশাসনের রুপরেখা “গার্ডরেইল” আর বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনাই নাই।

৮০র দশকে পশ্চিমারা এই সোভিয়েট ইউনিয়নকে ভেংগেই ইউনিপোলার ক্ষমতাধারী হয়েছিলো। এবার রাশিয়া আর চীন একত্রিত হয়ে পশ্চিমাদেরকে একঘরে করার পায়তারা করে তার ইউনিপোলার ক্ষমতার অবসান যেমন ঘটাতে পারে, তেমনি ক্রমাগত অর্থনৈতিক রিসেসনের কারনে পশ্চিমার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যগুলিও নিজস্ব সাধীনতার জন্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ভাঙ্গনের সুর। এটা হতে হয়তো কয়েক যুগ লেগে যেতে পারে কিন্তু সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।  যেমন এখন শুরু হয়েছে গ্রেট ব্রিটেনে আয়ারল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডে। গ্রেট ব্রিটেনে ক্রমাগত জনগনের দূর্ভোগের কারনে আয়ারল্যান্ড , স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসের ভিতর এই আন্দোলনের সুরে গতকাল ইউকে রাশিয়ার উপর এককভাবে বেশ অনেকগুলি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, তার মধ্যে একটা শিপিংলাইন এলাউড এবং ইন্সুরেন্স বৈধতা, যাতে রাশিয়া তেল এবং অন্যান্য কমোডিটি ইউকে তে পাঠাতে পারে। খবরটার হেডিং এ রকমের- “London has re-allowed the provision of insurance for aircraft, sea vessels and their components to Russia-linked entities”

আমেরিকার Veteran Intelligence Professionals (এটা সিআইএ এর অবসর প্রাপ্তদের একটা সংঘটন) গত ৩০ জুলাই ২০২২ এ ওপেন একটা চিঠি লিখেছেন (লিংক চাইলে দিতে পারি) বাইডেন প্রশাসনকে যে, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বেজড পলিসিতে যতো না অন্য দেশকে ক্ষতি করছে তার থেকে বেশী ক্ষতি করছে পশ্চিমা এবং তাদের মিত্রদেরকে। ফলে ইতমধ্যে যে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার সাথে যুদ্ধ মনোভাব দেখানো মানেই হচ্ছে বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে ফেলা। চীন-রাশিয়া এই সুযোগ অবশ্যই নিবে এবং পেলোসির এই ভিজিট অবশ্যই পশ্চিমাদের এবং তাদের মিত্রদেরকে ক্রমাগত ইউনিপোলার ক্ষমতা থেকে ছিটকে দেবে। তারা আরো বলেছেন যে, আমেরিকার USS Ronald Reagan carrier battle group যা বর্তমানে সাউথ চায়না সমুদের অবস্থান করছে, সেই অঞ্চল পশ্চিমাদের আওতায়ও নয়। বহুদূর। ফলে এই শিপগুলিতে যদি চীন আক্রমন করে এবং একটা শীপ বা ক্রু নিহত হয়, তখন নিউক্লিয়ার যুদ্ধ ছাড়া বিকল্প কোনো অপশনও নাই। আর সাউথ চায়না সমুদ্র চীনেরই আওতায় বেশী।

এর মানে হলো দুইপক্ষই নিউক্লিয়ার যুদ্ধ এড়াবে ঠিকই কিন্তু চায়নার রেঞ্জের কাছে ক্ষুদ্র ওয়েপনারী দিয়েও তারা ডিটারেন্ট ইফেক্ট করার সক্ষমতা রয়েছে যা পশ্চিমাদের নাই। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কিনা জানি না, চীন লাইভ এমুনিশন দিয়ে উক্ত সাউথ চায়না সমুদ্রে অনুশীলন করার নামে আমেরিকার শীপসমুহকে উক্ত রেঞ্জের বাইরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। আর সেটা লিখিত ভাবেই।

এবার আরেকটা কথা বলি। ইউক্রেনকে পশ্চিমারা এখন অফিশিয়াল্ভাবেই ডি-প্রাইরাটাইজ ঘোষনা করেছে। তারমানে এবার ইউক্রেন প্রচন্ড সংকটের মুখে। আর ঠিক এই মুহুর্তে রাশিয়া ইউক্রেনকে সংবাদ দিয়েছে- রাশিয়ার টার্মে যদি ইউক্রেন যুদ্ধবন্ধে রাজী হয় তো ভালো, তা না হলে রাশিয়া তার মুল উদ্দেশ্য যেভাবেই হোক সমাপ্ত করবেই।

এখানে আরেকটা মজার ব্যাপার হলো- ইইউ কিংবা ন্যাটো পেলোসির ভিজিটে কোনো প্রকার মুখ খুলেনি, তারা কিন্তু একেবারে নীরব। অন্যদিকে ন্যাটো এই চায়না-আমেরিকার তাইওয়ান ইস্যুতে জড়ানোর কোনো প্রকার ইখতিয়ারই নাই।

হতে পারে এবার ন্যাটো তাইওয়ানকে ন্যাটোতে ফাষ্ট মুভিং প্রোসেসে ন্যাটো মেম্বার করতে চাইবে। কিন্তু সেটা হলে হবে ৩য় বিশ্বযুদ্ধ।  

০৭/০৭/২০২২-ইউরোপবসন্ত

আরব বসন্তের কথা মনে আছে? শুরু হয়েছিলো ২০১০ সালে।

আরব বিশ্বে সর্বপ্রথম গণবিক্ষোভের শুরু হয়েছিল মিশরে। গণবিক্ষোভ ছিল মিশরীয় জনগণের দীর্ঘকালের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহি:প্রকাশ। ১৭ দিন গণআন্দোলনের পর ১১ই ফেব্রুয়ারি হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের পতন হয়। এরপর তা লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, আলজেরিয়া, বাহরাইন, ইরান, জর্ডান, মরক্কো, তিউনিসিয়ায় সহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সৌদি-আরব, সুদান, সিরিয়াতেও ছোট বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিদ্রোহে হরতাল, বিক্ষোভ প্রদর্শন, জনসভা প্রভৃতি কর্মসুচী নেয়া হয়।

আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বয়ে যাওয়া গণবিপ্লবের ঝড়কে পশ্চিমা সাংবাদিকরা আরব বসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত করে। মিশরের আগেও আরব বসন্তের সূচনা হয় আসলে তিউনেশিয়ায়। স্বৈরাচারী শাসক বেন আলীর দুঃশাসনের ফলে সেই দেশে বেকারত্বের হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এর প্রতিবাদে এক যুবক প্রকাশ্য রাস্তায় নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহুতি দেয়। ফলাফলস্বরুপ, লোকজন বেন আলীকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে রাস্তায় নেমে পড়ে। ফলে সূচনা হয় আরব বসন্ত। যদিও তিউনিসিয়ায় এটিকে জেসমিন বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করা হয়।

চরম রাজতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, দুর্বল অর্থনীতি, বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য ও শিক্ষিত হতাশাগ্রস্থ যুবসমাজ, খরা ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়ছিল।

আরব বিশ্বের এই গনঅভ্যূত্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সরাসরি আঘাত হেনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়কের পতন ঘটাতে সাহয়ক ভূমিকা রেখেছিল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, আরব বসন্তের ফলে মাত্র দুই বছরে লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের গণ-আন্দোলনের ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৫৬ কোটি ডলার।

এতো বছর পর, কেনো জানি আমার কাছে মনে হচ্ছে-এবার বসন্তটা হবে “ইউরোপশ্চিমা বসন্ত”। কেনো বলছি?

এই ইউরোপের দেশগুলিতে এখন পুরুদমে একনায়কতন্ত্রের চর্চা, মানবাধীকার লঙ্ঘন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, দুর্বল অর্থনীতি, বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য ও শিক্ষিত হতাশাগ্রস্থ যুবসমাজ, খরা, খাদ্য, তেল গ্যাস এমন কি শিশুদের খাবারের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে সারাটা ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশগুলিতে সরকার প্রধানদের অবস্থা মুটামুটি টালমাটাল।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অপসারন এই ইফেক্টের প্রথম কারন বলা যায়। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অবস্থাও প্রায় বরিস জনসনের মতো হতে যাচ্ছে। একে একে তাঁর কোয়ালিশন পার্টি এবং কিছু সতন্ত্র এমপি ইতিমধ্যে সরকার থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে প্রধানমন্ত্রী পেটকভকে একঘরে করে ফেলছেন। বাকীটা হয়তো অচীরেই নজরে আসবে।

জার্মানীর অভ্যন্তরে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়াকে বিভিন্ন কমোডিটির উপর স্যাংকশন দেয়ার কারনে দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধিসহ অনেক শিল্প কারখানা প্রায় বন্ধের উপক্রম। তাতে বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে, আয় কমে যাচ্ছে, কিন্তু সরকার নাগরিকদের জন্য বিকল্প কিছু তৈরী করতে না পারায় জার্মানীর ভিতরে নাগরিকগন এতোটাই হতাশ যে তারা এখন রাস্তায় নেমে পড়েছেন।

স্পেনের মাদ্রিদে এখন প্রকাশ্যে আন্দোলন চলছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের তথা ন্যাটোর একচ্ছত্র সিদ্ধান্তকে স্পেন সরকার মানার কারনে। তারা ব্লক থেকে বের হয়ে যাবার জন্য আন্দোলনসহ ন্যাটোর বিলুপ্ত চান। ফ্রান্সের অবস্থাও প্রায় একই। যে নির্বাচনে ম্যাক্রো অনেক ভোটে এগিয়েছিলো, কিন্তু পার্লামেন্টারী পর্বে গিয়ে তাঁর ভরাডুবি হয়েছে। ইতালী, পোল্যান্ড, লাটভিয়া, ইত্যাদি দেশগুলিতে এখন নাগরিকেরা প্রায়ই আন্দোলনে শরীক হচ্ছেন অর্থনইতিক বিপর্য্যের কারনে।

আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট বাইডেনের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচন করার মত কোনো পরিবেশ আর অবশিষ্ঠ নাই বলেই মনে হচ্ছে। তাঁর পাবলিক রেটিং নীচে নামতে নামতে এখন দাড়িইয়েছে মাত্র ২৭% তে যা আমেরিকায় এ যাবতকালের যে কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য সর্বনিম্ন। আমেরিকার নিজস্ব কোনো প্রোডাক্ট তেমন দেশের মধ্যে নাই। আর যা আছে, তা খুবই সামান্য। আমেরিকা গাড়ি থেকে শুরু করে সব কিছুতেই তারা কোনো না কোনো দেশের উপরে নির্ভরশীল। ফলে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞাসহ আরো প্রায় ৩০টি দেশের উপর এ যাবতকাল নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় আমেরিকা নিজেই এখন প্রায় একঘরে হয়ে যাচ্ছে। আরব দেশগুলির কারো সাথেই আমেরিকার ভালো সম্পর্ক নাই, আফ্রিকার দেশগুলির সাথেও না। এবার শুরু হয়েছে এশিয়া দেশগুলির সাথে দন্ধ। ফলে আমেরিকা সারা প্রিথিবীকে একঘরে করতে করতে এখন সে প্রায় নিজেই একপেশে হয়ে গেছে। প্রতিটি দেশে তাদের কারেন্সী বিশেষ করে ইউরো এবং ডলারের ইনফ্লেশন হচ্ছে। বলা হচ্ছে ইউরোপিয়ান দেশগুলি অচিরেই ১০% জিডিপি শ্লথ হবে। এসব কিছু মিলিয়ে উপসংহারটা যে খুব ভালোর দিকে এগুচ্ছে না, সেটা এখন প্রায় পরিষ্কার।

আগামী বছর এর পুরু দৃশ্যটা একেবারে চোখের সামনে ভেসে উঠবে যদি না এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নেয়া হয়।

‘চাঁদ উঠুক বা না উঠুক, আজ বসন্ত”।

০১/০৭/২০২২-রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা কেনো কার্যকরী হচ্ছে না

কেউ যদি বলে থাকেন যে, রাশিয়ার উপর পশ্চিমাদের দেয়া প্রায় দশ হাজার নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র একটি ফ্যাক্টর অর্থাৎ রাশিয়ার তেল এবং গ্যাসের কারনে ইফেক্টিভ হয় নাই, তাহলে সেটা হবে একটা ভুল ধারনা। হ্যা, এটা অনেকগুলি ফেক্টরের মধ্যে একটা ফ্যাক্টর তো অবশ্যই। তার আগে একটা কথা জেনে রাখা ভালো যে, নিষেধাজ্ঞার কারনে একটা দেশে কি কি ইফেক্ট হয় সেটা।
(ক) সাধারন মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমশই সংকুচিত হয়ে আসে। মানুষজন সাফার করতে থাকে।
(খ) দ্রবুমল্য অস্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। মানুষের সেভিংস কমতে থাকে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোনে জর্জরিত হয়ে যায়। দৈনিন্দিন আয় রোজগার কমে মানুষকে হতাশ করে ফেলে।
(গ) বিভিন্ন খাতে নেগেটিভ প্রভাব পড়তে থাকে। জীবন প্রায় থেমে যেতে থাকে। নতুন প্রজন্মের লেখাপড়া, ভবিষ্যত, পরিবারের জন্য হাউজিং খাত, ব্যবসা বানিজ্যে সাস্থখাতে বীমা সব জায়গায় প্রভাব পড়তে থাকে।
(ঘ) এহেনো অবস্থায় কর্মক্ষেত্রে ছাটাই শুরু হয়, বেতন কমে যায় মানুষ বেকার হয় ইত্যাদি।
(ঘ) এই রকম একটা দূর্বিসহ পরিস্থিতিতে দেশের নাগরিকগন তাদের নেতাদের উপর ত্যাক্ত বিরক্ত হয়, নেতাদের ক্রেডিট রেটিং কমে যায়, এবং এক সময় দেশের নাগরিকগন অসহিনষু হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে। নেতাদের পতন হয়।

তাহলে দেখি, এবার এই প্রভাবগুলি কিভাবে রাশিয়ার নাগরিকদের জীবনে কি ইফেক্ট হলো। আসলে এদের একটাও কঠিনভাবে ইফেক্ট করে নাই। বরং সেটা উলটোপথে বেগবান হলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-কেনো?
রাশিয়ার উপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা আসে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা ছিলো লিমিটেড ভার্ষন। এই লিমিটেড ভার্ষন নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার নাগরিকেরা তাদের কোনটা প্রাইওরিটি আর কোনটা লাক্সারি, কোনটা জরুরী আর কোনটা না হলেই নয় এই পার্থক্যটা বুঝে গিয়েছিলো। মানুষজন উক্ত নিষেধাজ্ঞায় জীবনপ্রনালী কিভাবে এডজাষ্ট করতে হবে সেটার একটা হোমওয়ার্ক করে ফেলেছিলো, অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলো। আসলে রাশিয়ার মানুষজন ১৯৯০ সাল থেকেই এই এডজাষ্টমেন্টটা শুরু করেছিলো যখন রাশিয়া ভেংগে গিয়ে ১৫ টা রাজ্যে পরিনত হয়। ফলে ২০১৪ তে এসে তারা পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞায় খুব একটা ভোগে নাই। ২০১৪ সালের নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ানরা বুঝেই নাই।

এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার।

রাশিয়ানদের চরিত্রের একটা ভালো দিক হলো, তারা খুব তাড়াতাড়ি লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করে কিভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভালো থাকা যায় সেটায় বেশ পারদর্শী। আর এই ক্যারেক্টার বৈশিষ্ট পেয়েছে তারা সোস্যালিজম সরকারের কারনে। বেশীরভাগ নাগরিকগন পুরানো সমাজতান্ত্রিক নিয়মে বেড়ে উঠায় নেতাদের উপর তাদের একটা অলিখিত আনুগত্যের মানসিকতায় বাস করতো। তারা এটাকে সাভাবিক নিয়ম হিসাবেই ধরে নিয়ে বড় হইয়েছে। তারা সবসময় সোস্যালিজমের কারনে আধুনিক ক্যাপিটালিজমের মতো বৈষয়িক ব্যাপারে ধার ধারে না। সারাদিনের খাবার নিশ্চিত থাকলে, দেশে খামাখা হাংগামা না থাকলে, ছেলেমেয়েরা ঠিকমত স্কুল কলেজে যেতে পারলে, অতঃপর রাতে সবাই মিলে নিজেদের তৈরী ভোদকায় মত্ত থাকতে পারলেই ওরা খুশী। ফলে ২০১৪ সালে নতুন নিষেধাজ্ঞায় তারা এটাই ভেবেছে যে, নেতারা আছে, তারাই ব্যাপারটা দেখবেন বরং তারা ন্যুনতম যা দরকার সেটা পাচ্ছে কিনা তাতেই তারা খুশী। যেহেতু রাশিয়া এখন পুরুপুরি সমাজতান্ত্রিক না আবার ক্যাপিটালিমেও না, এটা একটা মিক্সড ব্যবস্থা, ফলে আগে সরকার যেমন খাদ্য, বাসস্থান, চিকিতসা ইত্যাদি আনকন্ডিশনালী নিশ্চিত করতো, এখন যেহেতু সেটা নাই, ফলে সরকারী সহযোগিতায় আর পরিবারের প্রতিটি সদস্য দ্বারা তাদের নিজের মুল কাজের বাইরে কোনো না কোনো প্রোডাক্টিভ কাজের মাধ্যমে অর্থনইতিক প্রয়োজনটা নাগরিকেরা মিটিয়ে নেয়। সরকারও প্রায় সেই পুরানো ধাচে সমাজতান্ত্রিক নিয়মে সবাইকে সরকারী চাকুরী, ছোট খাটো ব্যাংক লোন, কমদামে দৈনিন্দিন জীবনের কমোডিটির সহজলভ্যতায় একটা ইকুলিব্র্যামে রাখে। কোনো অসস্থিকর পরিবেশে সরকার কাউকেই সরকারী জব থেকে ছাটাই করে না, বেতনও কমায় না, বরং খুব কম সুদে ব্যাংক থেকে লোনের মাধ্যমে সরকার তার নাগরিকদেরকে কোনো না কোনো খাতে আরো কিছু এক্সট্রা আয় করার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়। তাতে যেটা হয় যে,

(ক) কেউ সরকারকে দোষী করে না।

(খ) সরকারের উপর তাদের একচেটিয়া বিরক্ত ভাবটা আসে না।

(গ) সরকারকে পতনের মাধ্যমে নতুন রিজিম পরিবর্তনে আন্দোলন করে না।

এটাই হচ্ছে সেই ট্রাম কার্ডটা যে, ভিনদেশের নেতারা যা ভাবেন যে, নিষেধাজ্ঞায় ইন্টার্নালী দেশের নাগরিকগন তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন গড়ে উঠবে। নেতাদের পতন হবে, আর তাদের নিষেধাজ্ঞা ছুরির মতো কাজে দিবে। এটা রাশিয়ায় কখনোই সম্ভব না। রাশিয়ায় প্রায় ১ বছরের বেশী আমার থাকার কারনে আমি তাদের চরিত্রে এটা খুব ভালো করে দেখেছি। সাধারন নাগরিকেরা রাজনীতি নিয়ে আলাপই করে না। অনেক পরিবার তাদের বাসায় রান্নাও করে না। যাইই আছে, সবাই মিলে সন্ধ্যা ৬টার পর প্রায় প্রতিটি রেষ্টুরেন্টে, কফি শপে, বারে, রাস্তায় ছেলে মেয়ে ব্রিদ্ধরা মিলে এক মহাকোলাহলে নেচে গেয়ে সেই দিনটা পার করে। আগামীকাল কি হবে, সেটা দেখা যাবে আগামীকাল। এটাই রাশিয়া। তবে এটা ধীরে ধীরে চেঞ্জ হচ্ছে। কিন্তু এটা এখনো সেই সমাজতান্ত্রিকভাবেই ক্যাপিটালিজম মিক্সড হয়ে আছে।

যাক যেটা বলছিলাম।

এবারের পশ্চিমাদের প্রায় দশ হাজারের বেশী নিষেধাজ্ঞায় পশ্চিমারা প্রথমেই যেটা বলেছিলো যে, এইসব নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ান নাগরিকদের উপরে নয়। কিছু কিছু রাশিয়ানরা বিশ্বাসও করেছিলো, আবার ভয়ও পেয়েছিলো। আশ্বাস পেয়েছিলো এই কারনে যে, পশ্চিমারা রাশিয়ান নাগরিকদের ভালো চায় এবং তারা তাদের পক্ষে। কিন্তু রাশিয়ানরা তাদের ভুলটা কিছুদিনের মধ্যেই ভেংগে গিয়েছিলো যে, পশ্চিমারা মিথ্যা কথা বলেছে। কারন, পশ্চিমারা ক্রমাগত দেশের বনিক শ্রেনীর উপরে, তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে, দেশের বিভিন্ন অলিগার্দের উপরে, স্পোর্টসম্যানদের উপরে, ছাত্রদের উপরে, এমনকি বিদেশে অবস্থানরত রাশিয়ানদেরকে কিংবা রাশিয়ান কালচারকে পুরুপুরি বয়কটের মাধ্যমে যেভাবে কোণঠাসা করে অপমানিত করছিলো তাতে রাশিয়ান নাগরিকেরা পশ্চিমা এবং ইউরোপের কথায় এবং কাজে মিল খুজে পাচ্ছিলো না। একদিকে তারা রাশিয়ানদের যেটা ভালো সেটাই করার চেষ্টা করছে বলে গলা ফাটাচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ানদের সমস্ত মৌলিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এই কর্মটি রাশিয়ান নেতারা খুব ভালো করে তাদের জনগনের কাছে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, পশ্চিমারা বা ইউরোপিয়ানরা রাশিয়ানদের অতীত ধংশ করতে চায়, বর্তমানকে কঠিনতর করতে চায় এবং ভবিষ্যতকে অন্ধকারময় করতে চায় যার আরেক নাম ধংশ। যেহেতু রাশিয়ানরা সেটাই বাস্তবে দেখছিলো যেটা তাদের রাশিয়ান নেতারা বলছে, ফলে রাশিয়ানরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় জাতধর্ম, শ্রেনী বিভেদ ভুলে নিজেরা নিজেরা এক হয়ে যায়। তারা এটা পরিষ্কার বুঝে যায় যে, পশ্চিমারা তাদেরকে ভুল ম্যাসেজ দিচ্ছে, এবং তারা এখন পশ্চিমাদের প্রতিটি কথা কুটকথা হিসাবে ভাবছে। তারা উপলব্ধি করতে পারছিলো যে, কিভাবে পশ্চিমারা তাদের কারেন্সীকে দূর্বল করার চেষ্টা করছে, কিভাবে সাধারন মানুষের জীবন যাত্রায় কঠিন করে দিচ্ছে, এবং তারা এটা বুঝতে একটুও বাকী ছিলো না যে, তাদেরকে জিম্মি করে এশিয়ান দেশ লিবিয়া, আফগানিস্থান, ইয়েমেন, ইরান কিংবা আফ্রিকান দেশগুলির ন্যায় তারাও শেষ হয়ে যাবে যদি তারা পশ্চিমাদের কথায় সায় দেয়। তাই এই অবস্থায় তারা একটা কথাই ভেবেছে, যে, সমুলে ধংশ থেকে বাচার জন্য তাদেরকে আরো সুসংঘটিত হয়ে, নেতাদের উপর আরো গভীর বিশ্বাসে অবিচল থাকতে হবে। ফলে রাশিয়ার ভিতরে যে কোনো প্রকার আন্দোলন সংঘটিত হবে না এটা রাশিয়ান নেতারা খুব ভালো করে নিশ্চিত হয়ে যায়। যে কোনো একনায়কত্ত ডিকটেররের সবচেয়ে বেশী ভয় থাকে নিজের দেশের জনগনকে মোকাবেলা করার। রাশিয়ায় এই আন্দোলন হবে না আর সেটা সম্ভব নয় এটা তারা বুঝে গিয়েছিলো। আর ঠিক এ কারনেই রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের লিডারশীপের ক্রেডিট রেটিং ৫২% থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে এখন সেটা দাড়িয়েছে প্রায় ৮৩%। অন্যদিকে জোটের নেতাদের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সহ সবার বর্তমান ক্রেডিট রেটিং অনেক নীচে চলে এসছে। এর কারন তাদের দেশের জনগনও এবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, নেতারা সুসংঘটিত নন, এবং সুচিন্তিত নন। যার ফলে রাশিয়ার উপরে প্রদেয় নিষেধাজ্ঞায় এবার এই সব নেতারাই ফাদে পড়ে গেছেন, তাদের জীবনযাত্রা এখন অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে, নিজের দেশের ভিতরে তিনি নিজেই সমালোচিত হচ্ছেন। যেটা হবার কথা ছিলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের। এই অবস্থা থেকে তারাও বেরিয়ে যেতে পারছেন না।

যেহেতু আভ্যন্তরীন আন্দোলনের ভয় থেকে রাশিয়া মুক্ত, ফলে, রাশিয়ার নেতাদের এবারের মনোযোগ ছিলো, সাধারন নাগরিকেরা যেনো নিজ দেশে সাভাবিক জীবন যাপনে কোনো প্রকার অসুবিধায় না পড়ে সেটা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ধ্বস থেকে যত দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া। আর এই হোমওয়ার্ক গুলি রাশিয়ার নেতাদের আগেই করা ছিলো, কখন কোন পলিসি তারা এপ্লাই করবে ইত্যাদি। রাশিয়া যেহেতু নিজে অনেকগুলি সেকটরে নিজেই সয়ংসম্পুর্ন, অন্যদিকে চীন, ইন্ডিয়া, আফ্রিকান দেশ, এবং মধ্যপ্রাচ্য সবাই কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ অপ্রকাশ্যে রাশিয়াকে সমর্থন দিচ্ছে, ফলে যে কোনো নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলা করা সহজ হয়ে গেছে তার জন্যে।

দাবা খেলায় প্রতিপক্ষ একটা ভুল চাল দিলে অন্য প্রতিপক্ষ দুটূ লাভ পায়। একটা লাভ হচ্ছে, ভুলের কারনে নিজের ক্ষতি যা প্রতিপক্ষের লাভ, আরেকটা হচ্ছে ভুলের মাশুলের ফল হিসাবে আরেকটা কঠিন পরিস্থিতি যা তার প্রতিপক্ষ চালতে যাচ্ছে। অর্থাৎ যে কোনো একটা ভুলে প্রতিপক্ষ দুইটা লাভ পায়। এখানেও তাইই হয়েছে।

সেটা কিভাবে?

রাশিয়াকে জি-৮ থেকে বাদ দেয়া, ইউএন হিউম্যান রাইটস থেকে বাদ দেয়া, আন্তর্জাতীক মহলে (যেমন স্পোর্টস, ভ্রমন, ব্যাংকিং) ব্যক্তি শ্রেনীকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া, সুইফট থেকে বাদ দেয়া, রিজার্ভ আটকে দেয়া, যুদ্ধটাকে প্রক্সিওয়ার হিসাবে আখ্যায়িত করা, এই যুদ্ধের মধ্যেও যে কারনে যুদ্ধ (ন্যাটোর এক্সপানসন) সেটা সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডকে যোগ করার পায়তারায় রাশিয়ার নেতাদের কথাকেই অন্যদের কাছে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তোলায়,, কালিনগ্রাদকে ব্লকে ফেলানো, এবং অবুঝের মতো নিজের প্রয়োজনীয় কমোডিটি যেমন তেল, গ্যাস, খাদ্য, ফার্টিলাইজার, লোহা, ইউরনিয়াম, ইত্যাদির উপরে নিষেধাজ্ঞা দেয়া ইত্যাদি সব কিছু ভুল ছিলো। অন্যান্য দেশের উপরে অতীতে হয়তো এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকরী হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে এটা কতটুকু কার্যকিরী হবে এটার কোনো হোমওয়ার্ক করা হয়নি। রাশিয়া একটা সাভাবিক দেশ নয়। এটা নিজেই একটা ক্ষমতাশীল দেশ। একই প্রেস্ক্রিপসন যা অন্য দেশের উপর শতভাগ কাররযকরী হয়েছে বলে ফলাফল পাওয়া গেছে, এখানে সেটা কাজে লাগবে কিনা সেটা ভাবা দরকার ছিলো। ল্যান্ডলিজ, প্রক্সিওয়ার, নিষেধাজ্ঞা এসবই সেই পুরানো কৌশল। সেই একই কৌশল এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিউকসমৃদ্ধ একটা গ্রেট পাওয়ারের বিরুদ্ধে কাজ করবে কিনা এটা ভাবার দরকার ছিলো। এসব নিষেধাজ্ঞা কাজে লাগে নাই বরং নিজেরাই ফাদে পড়ে যাওয়ায় আবার সেটা আবার অবমুক্ত করতে দ্বিধায় পড়ে গেছে পশ্চিমা সহ ইউরোপিয়ানরা।

লাভ হয়েছে শুধু রাশিয়ার। জি-৭ এর বিকল্প হবে ব্রিক্স, চায়নার গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি, আফ্রিকার সাথে রাশিয়া-চায়না-ইন্ডিয়ার মার্জিং, মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমা থেকে সরে আসার প্রবনতা, ব্যাংকিং সেক্টরে নতুন কারেন্সীর আবির্ভাব, ট্রেড ফরমালিটিজে আমুল পরিবর্তন ইত্যাদি পৃথিবীকে এখন মনোপলি থেকে বের করে মাল্টি পোলার ওয়ার্ল্ডে নিয়ে যেতে বাধ্য।

অবাক হচ্ছি এটা ভেবে যে, ন্যাটো তো রাশিয়ার দোড়গোড়ায় এস্টোনিয়া, লাটভিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ইত্যাদির মাধ্যমে ছিলোই, সেখানে ইউক্রেনকে টেনে পশ্চিমাদের প্রক্সীওয়ারের কোনো দরকারই ছিলো না। বরং রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ত করে পশ্চিমাদের আসল শত্রু যারা, চীন, তাদের বিরুদ্ধে একটা জোট করার দরকার ছিলো। এখন আবার ন্যাটোতে সুইডেন, ফিনল্যান্ডকে আমন্ত্রন জানিয়ে আসলে কোনো লাভ হলো কিনা জানিনা, অন্যদিকে সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দেয়ায় তাদের কতটা লাভ হলো সেটাও এখন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মনে হচ্ছে। ন্যাটোর জোটে থাকা মানেই হলো, যে যাইই কিছু করুক, সেখানে একটা বড় বাধা আছে। কিছু হইলেই সারা ইউরোপ দায়ী, ন্যাটো দায়ী। আবার ইউরোপের সবাই তো ইইউতে নাই। সেখানেও আরো ১৪ টা দেশ এই ব্লক থেকে মুক্ত। একটা সময় আসবে হয়তো যে, সেইসব মুক্ত ইউরোপিয়ান দেশসমুহ ইউরোপের বিরুদ্ধেই সংঘটিত করবে এই রাশিয়া, চীন, ইন্ডিয়া আফ্রিকানরা বা মধ্য প্রাচ্যরা একটা জোট হয়ে।

একটা কথা উজ্জ্বল দিবালোকের মতো সত্য যে, ন্যাটো কখনোই রাশিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না কারন যখনই অস্ত্র ধরবে, তখন রাশিয়া তার সেই কথাটা রাশিয়া প্রমান করেই ছাড়বে যে,

যদি রাশিয়াই এই পৃথিবীতে না থাকে, তাহলে এই পৃথিবী থাকার দরকারটা কি?

——————————————————-
(এখানে একটা কথা জানার জন্য লিখছি যে, আমিও রাশিয়ার এই আগ্রাসন ইউক্রেনের বিপক্ষে সাপোর্ট করি না, আবার ইউক্রেনেরও বড় গার্জিয়ান মাথার উপর আছে এইভেবে রাশিয়াকে হুমকীর মধ্যে ফেলানোর দরকার ছিলো না। সেটা আরেক চাপ্টার)

০১/০৭/২০২২-স্ন্যাক আইল্যান্ড

এই ইউক্রেন যুদ্ধের আগে জীবনেও আমি এই দ্বীপের নাম শুনিনি। গত কয়েকদিন যাবত এই স্ন্যাক আইল্যান্ডের নাম খুব ঘন ঘন শোনা যাচ্ছে। এই স্ন্যাক আইল্যান্ড আসলে কি? ঐ যে বলে না যে, চাপে পইরা কিছু জানা। আর আমার বেলাতেও এই জানাটা হইছে এই ইউক্রেন যুদ্ধে স্ন্যাক আইল্যান্ড নামক জায়গাটার ব্যাপারে জানা হলো।

ইউরোপের ডানুবি ডেল্টা নদীর নিকটে কৃষ্ণ সাগরের পাশে ইউক্রেনের অধীনে একটি দ্বীপ যাকে ইউক্রেনিয়ানরা “জিনি আইল্যান্ড” আর ইংরেজীতে একে “সার্পেন্ট বা স্ন্যাক আইল্যান্ড” নামে ডাকে। ১৮৪২ সালে রাশিয়া সেখানে একটি লাইট হাউজ তৈরী করেছিলো এবং সেটা রাশিয়ার অংশ হিসাবেই পরিগনিত হতো কিন্তু ১ম বা ২য় বিশ্ব যুদ্ধে এই লাইট হাউজ ক্ষতিগ্রস্থ হলে সেখানে পতনের বছর পর রোমানিয়া একটি কেরোসিন দ্বারা পরিচালিত লাইট হাউজ তৈরী করে সামুদ্রিক পরিবহনের দিক নির্দেশনার কারন হিসাবে। 

২০১২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায় যে, মাত্র ৩০ থেকে ১০০ জনেরও কম জনবসতি এই আইল্যান্ডের একটি গ্রাম যার নাম বিলি, সেখানে বসবাস করত। এদের বেশীরভাগ মানুষ হচ্ছে ফ্রন্টিয়ার গার্ডস, কিংবা ট্যাকনিক্যাল হ্যান্ডস যারা তাদের পরিবার নিয়ে ওখানে বাস করে। সুপেয় পানির কোনো সম্ভাবনা সেখানে নাই। এরা কিভাবে কি খায়, কোথা থেকে কিভাবে কি আনে এটা আমি জানি না। তবে জানা যায় যে, সব কিছুই হেলি সাপোর্টেড হয়।
এই আইল্যান্ডের আয়তন মাত্র ৬৯০ বাই ৬৮২ মিটার। অর্থাৎ 0.205 km2 খুবই ছোটো একটা ল্যান্ড।। যদিও এটা এখন ইউক্রেন ওদের টেরিটরি হিসাবে ভাবে কিন্তু এর ৮০% রোমানিয়ার অংশ হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত। মাত্র ২০% হচ্ছে ইউক্রেনের।১৯৯৭ সালে ইউক্রেন তার পুরু অংশ রোমানিয়ার কাছে ছেড়ে দিয়েছিলো কিন্তু পরবর্তীতে রোমানিয়া সার্ভে করে দেখেছিলো যে, এই আইল্যান্ডে শুধুমাত্র সাগরের রক ছাড়া আর কিছুই নাই বিধায় সে এটাকে রক্ষনাবেক্ষনের অংশ থেকে পরিত্যাগ করে।

২০০৭ রোমানিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ইউক্রেন সেখানে হেলিকপ্টার প্লাটফর্ম, নেভিগেশনাল সিস্টেম, সোলার এবং ডিজেল সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুতায়ন করে কিছু বেসামরিক স্থাপনা যেমন রিসার্চ সেন্টার, পোষ্ট অফিস, ব্যাংক (ওখানে ইউক্রেনের ‘আভাল ব্যাংকের’ একটি শাখা আছে), সেটেলাইট টেলিভিশন, প্রাথমিক চিকিতসার একটি কেন্দ্র, মোবাইল ফোনের টাওয়ার স্থাপন করে। যদিও রোমানিয়া তার সত্ত্ব ছাড়েনি বলে আখ্যা দেয়। তারমানে এটা এখনো ইউক্রেন আর রোমানিয়ার জন্য একটা ডিসপুটেড আইল্যান্ড।

ইউক্রেনের কোষ্টাল এরিয়া থেকে এই আইল্যান্ড ২২ মাইল এবং রোমানিয়ার কোষ্টাল এরিয়া থেকে এই আইল্যান্ড মাত্র ২৮ মাইল দূরে অবস্থিত। যদি শহরের দুরত্ত ধরি, তাহলে ইউক্রেনের ভিল্কোবি শহর থেকে এটা ৩১ মাইল আর রোমানিয়ার সিলুনা শহর থেকে এর দুরুত্ত মাত্র ২৯ মাইল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২২ তারিখে রাশিয়া এই আইল্যান্ড নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। যদিও রাশিয়ার এই আইল্যান্ডের কোনো প্রয়োজনই ছিলো না এবং এখনো প্রয়োজন নাই।

দখল নেয়ার সময় ইউক্রেনিয়ানরাও জানতো না কতজন আসলে ওখানে ছিলো। ফলে ইউক্রেন জানায় যে, মোট ১৩ জন এই স্ন্যাক আইল্যান্ডে ছিল যারা সবাই মারা গেছে রাশিয়ার দখলের সময়। তাই প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকী ওই ১৩ জনকেই দেশের সর্বাধিক মরনোত্তর পুরুষ্কারে ভূষিত করেন। পরবর্তীতে রাশিয়া এই স্ন্যাক আইল্যান্ড থেকে আরো ১৯ জন নাগরিককে আটক করে, সেই আটককৃত নাগরিকদেরকে বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছে ছেড়ে দেয়।

এই স্ন্যাক আইল্যান্ড স্ট্রাটেজিক লোকেশন হিসাবে যতোটা না ইম্পর্ট্যান্ট, তার থেকে বেশী ইম্পর্ট্যান্ট হচ্ছে যে, ল্যান্ড লকড কান্ট্রি হিসাবে যদি ইউক্রেন লকড হয়ে যায়, তাহলে ওডেসা থেকে এই স্ন্যাক আইল্যান্ডের মাধ্যমেই একমাত্র পথ যার মাধ্যমে ব্ল্যাক সি এরিয়া দিয়ে রোমানিয়া হয়ে ইউক্রেন তার পন্য পরিবহনে সক্ষম। এটা ইউক্রেনের ম্যারিটাইম টেরিটরিয়াল হিসাবে ইউক্রেনের কাছে বেশী জরুরী। রাশিয়ার কাছে নয়।

রাশিয়া গত ৩০ জুন ২০২২ তারিখে ‘গূড গেশ্চার’ হিসাবে স্ন্যাক আইল্যান্ড থেকে তার মিলিটারী প্রত্যাহার করেছে। রাশিয়া বলতে চাচ্ছে যে, ইউক্রেনের খাদ্য সামগ্রী দেশের বাইরে রপ্তানীর সুযোগ করে দেয়ার জন্যই তারা এই আইল্যান্ড পরিত্যাগ করেছে যাতে কেউ রাশিয়াকে এটা বলতে না পারে যে, ম্যারিউপোল কিংবা ইউক্রেনের অন্যান্য সমুদ্র বন্দর রাশিয়া দখল করার কারনে ইউক্রেন তাদের খাদ্য সামগ্রী বাইরে রপ্তানী করতে পারছে না। এবার তারা সেই সুযোগ করে দিয়ে প্রমান করাতে চায় যে, ইউক্রেন আসলেই তাদের খাদ্য সামগ্রী বাইরের দেশে রপ্তানী করতে ইচ্ছুক কিনা।
যদিও ইউক্রেন জানিয়েছে যে, ইউক্রেনের ক্রমাগত অবিরাম বোমার কারনে তারা স্ন্যাক আইল্যান্ড পরিত্যাগ করেছে।

২৯/০৬/২০২২-ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং তুরুষ্কের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিঃ

অবশেষে ফিন ল্যান্ড এবং সুইডেনকে ন্যাটোতে যোগদানে ত্রি-পক্ষীয় চুক্তির শর্তে আগামী জুন শেষে তুরুষ্ক ভেটো প্রদান থেকে বিরত থাকবে বলে চুক্তি স্বাক্ষরিত।

(ক) সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডের YPG/PYD কে টেরোরিষ্ট অর্গ্যানাইজেশন হিসাবে আখ্যায়িত করা হলো। ফলে এদের দ্বারা কিংবা এদের সিস্টার অর্গ্যানাইজেশন বা এদের দ্বারা প্রতিপালিত যে কোন সংস্থা, ব্যক্তি কিংবা এই জাতীয় যে কোনো ভার্চুয়াল কিংবা রিয়েল কার্যকলাপ অথবা এই সন্কেসথাকে যারা বা যে কোনো অর্গ্যানাইজেশন সাপোর্ট করবে কিংবা সহযোগীতা করবে তাদের সমস্ত কার্যিকলাপকে টেরোরিষ্ট এক্টিভিটি হিসাবে গন্য করে উভয় দেশ তা প্রতিহত, এবং নিসচিত করবে। এর জন্য উভয় দেশের ক্রিমিনাল কোডে যে সব এমেন্ডমেন্ট উভয় দেশ অতীতে এনেছিলো সেগুলি সংশোধন পূর্বক নতুন ক্রিমিনাল কোড অন্তর্ভুক্ত করে সাংবিধানিকভাবে ১ম জানুয়ারী ২০২২ থেকে কার্যকরী করে তা বাস্তবায়ন করবে।

(খ) এই গ্রুপের যে সব নেতা এবং ব্যক্তিবর্গকে তুরুষ্ক টেরোরিষ্ট হিসাবে পূর্বেই চিহ্নিত করেছিলো, তাদেরকে তুরুষ্কের হাতে তুলে দিতে হবে, সে ব্যাপারে ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন রাজী হয়েছে।

(গ) তুরুষ্কের উপর সমস্ত আর্মস নিষেধাজ্ঞা অবমুক্ত। উপরন্ত তুরুষ্ক সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড থেকে সাভাবিক পদ্ধতিতে যে কোন ধরনের মিলিটারী অস্ত্র আমদানী করতে পারবে বলে নিসচিত প্রদান করা হইলো।

(ঘ) তুরুষ্কের বিরুদ্ধে কোনো প্রকারের হুমকী, মিলিটারী এক্টিভিটিজ কিংবা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন যে কোনো কার্যকলাপ থেকে উভয় দেশ সর্বদা বিরত থাকবে বলে অংগীকার।

যারা পুরু ট্রাইলেটারাল চুক্তিটা পড়তে চান, দেয়া হলো।

২৮/০৬/২০২২-প্রাইস ট্যাগ কি এবং এর কি ইফেক্ট

নতুন একটা নির্দেশিকার কথা শোনা গেলো যে, জি-৭ তেলের মুল্যের উপর প্রাইস ট্যাগ ধার্য্য করে দিবে যাতে রাশিয়া কোনোভাবেই তেলের উপর দাম বাড়াতে না পারে। এরমানে হলো যেইই কিনুক, সেটার দাম কোনোভাবেই সেই নির্ধারিত দামের উপরে কিনতেও পারবে না আবার বেচতেও পারবে না।

এক দেশের পন্য, আরেক দেশসমুহ কিভাবে এই ফিক্সড প্রাইস ট্যাগ ধার্য্য করে দেয়? এটা অনেকেরই প্রশ্ন আসতে পারে মনে। আমারো এসেছে। কিন্তু আমি ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, এটা আসলে সম্ভব। তবে এই সম্ভবের মধ্যে অনেক বড় একটা জালিয়াতী আছে, আবার আছে অত্যান্ত বিপদজনক সংকেত।

উদাহরন দেই-

ধরুন, আমার ধান আছে। দাম আমার নির্ধারন করার কথা যে কত দামে আমি বিক্রি করবো। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখলাম আমি কিছুতেই বাজারের নির্ধারিত দামের উপরে আমি তা বিক্রি করতে পারছি না। অর্থাৎ আমার দামের কোনো ভ্যালু নাই। এতে যেটা হবে সেটা হলো, হয় আমি আমার ধান সেই প্রাইস ট্যাগে বিক্রি করবো অথবা আমি বিক্রিই করবো না। যদি ধানের প্রাপ্যতা অনেক থাকে, তাহলে হয়তো আমি আমার ধান সেই প্রাইস ট্যাগেই বিক্রি করতে বাধ্য হবো। কিন্তু যদি এমন হয় যে, ধানের ক্রাইসিস আছে, আর আমার মজুদ ধানের উপর কম বেশী সবাই নির্ভরশীল এবং আমি না বেচলে ক্রাইসিস আরো বাড়বে। তাহলে আমি সেই ধান আমার দামে না উঠা পর্যন্ত আমি বিক্রি না করে ধরে রাখবো। প্রাইস ট্যাগ আমাকে কিছুই করতে পারবে না। যেহেতু ধানের সল্পতা আছে ফলে সবাই আমার দামেই ধান কিনতে চাইবে, হোক সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে। কিন্তু যেহেতু প্রাইস ট্যাগের দামের উপরে কেউ ডিক্লেয়ার করতে পারবে না, তাই, তখন কমোডিটি বিক্রি হবে আন্ডারহ্যান্ডে। কিনবে অধিক দামে কিন্তু ইনভয়েস করবে প্রাইস ট্যাগের সমান। আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রাইস ট্যাগ নিশ্চিত করা হয় ইভয়েস ভ্যালু আর ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে। ফলে বিক্রেতা তার নিজের দামেই মালের দাম পায়, কিন্তু ক্রেতা অধিক দামে কিনে সেটা প্রাইস ট্যাগের সমান ইনভয়েস করে ক্রয় ভ্যালু দেখায়।

আরো সহজ করে যদি বলি-দেখবেন যে, জমি বেচাকেনার সময় বাস্তবে জমির দাম বেশী হলেও দলিলে সবসময় ক্রেতা সরকারী ভ্যালু (যাকে বলতে পারেন প্রাইস ট্যাগড ভ্যালু) দিয়েই জমি ক্রয় দেখায়। আর বাকী অতিরিক্ত টাকাটা ক্রেতা বিক্রেতাকে হ্যান্ড টু হ্যান্ড দেয়। ফলে সরকার নির্ধারিত মুল্যেই জমি ক্রয় বিক্রয় হয়েছে বলে ধরে নেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই দলিলের নাম ‘ইনভয়েস ভ্যালু’। এটাই প্রাইস ট্যাগ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে-রাশিয়ার যেহেতু একচ্ছত্র আধিপত্য তেল এবং গ্যাসের কিংবা গোল্ডের (৪র্থ বৃহত্তম গোল্ড সাপ্লাইয়ার) উপর এবং এই কমোডিটি গুলি জি-৭ সহ অন্যান্যদের লাগবেই, সেক্ষেত্রে কি রাশিয়ার উপর চাপিয়ে দেয়া প্রাইস ট্যাগ কোনো কার্যকরী ভুমিকা রাখবে? সম্ভবত কোনো কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারবে না। ফলে ক্রেতারা প্রাইস ট্যাগড ভ্যালুতে ইনভয়েস করবে এবং বাকী টাকা ভিন্ন পথে আন্ডারহ্যান্ডে লেনদেন হতে বাধ্য হবে। ফলে রাশিয়া তার নিজের ভ্যালুতেই কমোডিটির দাম পাবে।

কিন্তু এই সিস্টেমে আরো একটা বিশাল সমস্যার সৃষ্টি হবে। সমস্যাটা হলো যে, ক্রেতারা যখন আবার খুচরা বাজারে কমোডিটি বিক্রি করবে, তখন সে যে পরিমান টাকার বিনিময়ে কমোডিটি কিনেছিলো অর্থাৎ ইনভয়েস ভ্যালু এবং আন্ডারহ্যান্ড ভ্যালু, সেটা তুলতে গেলে ক্রয় মুল্যের থেকে অনেক বেশী বিক্রয় মুল্য ধার্য্য করতে হবে। কারন তাকে পুরু টাকাটাই (ইনভয়েস ভ্যালু + আন্ডারহ্যান্ড পেমেন্ট ভ্যালু) তুলতে হবে। যেহেতু ক্রেতা দেখিয়েছে কেনা ভ্যালু কম, ফলে সে কেনা ভ্যালু আর আন্ডার হ্যান্ড পেমেন্ট ভ্যালু যোগ করে যখন মুনাফা সহকারে বিক্রি করতে যাবে তখন বিক্রয় মুল্য অনেকাংশে বেড়ে যাবে। তখন সরকার তাকে ধরে বসবে যে, কেনো প্রাইস ট্যাগড ভ্যালুতে কিনে সে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে? এই কারনে ক্রেতারা হয়তো আর কোনো কমোডিটি আমদানিই করবে না। কারন লস দিয়ে কোনো ব্যবসায়িই কমোডিটি বিক্রি করতে চাইবে না। আর এর কারনে ব্যবসায়ীরা প্রাইস ট্যাগড ভ্যালু পরিবর্তন না করা পর্যন্ত কোনো কমোডিটিই আর আমদানী করবে না। আর আমদানী না করলে দেশে পুরু কমোডিটির একটা বিশাল ভ্যাকুয়াম তৈরী হবে, যা সরকারের জন্য আরো বেশি বিপদজনক। কারন সরকারকে জনগনের কাছে জবাব্দিহি করতে হবে।

সার সংক্ষেপঃ ভিন্ন দেশের কমোডিটির উপর অন্য কোনো দেশ জোর পূর্বক প্রাইসট্যাগ বসালে সেই দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয় যে দেশ প্রাইস ট্যাগ বসায়।

27/06/2022-আমার একটা জিনিষ কিছুতেই বুঝে আসে

আমার একটা জিনিষ কিছুতেই বুঝে আসে না যে, নিষেধাজ্ঞা কি আসলেই  কোনো কাজ করে? হ্যা, করতো যদি সারা দুনিয়ার দেশগুলি একসাথে সেই সিদ্ধান্তে এক থাকে। সেটা যে কোনো ক্ষমতাশীল দেশের জন্যে অবশ্যই বিপদজনক। কিন্তু সারা দুনিয়া কি এক সাথে এই নিষেধাজ্ঞায় কাজ করছে? করছে না। তাহলে দেখি-কতগুলি দেশ এবং কত জনসংখ্যার মানুষ এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে?

সারা দুনিয়ায় দেশ আছে ১৯৫টি। ইউরোপেই আছে ৪৪ দেশ। ইউরোপের ৪৪টি দেশের মধ্যে ইইউ এর অধীনে আছে ২৭টি দেশ। বর্তমানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মাধ্যমেই শুধু রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছে, পুরু ইউরোপের মাধ্যমে কিন্তু নয়। এরমানে ইইউ, আমেরিকা, ইউকে আর কানাডা মিলে মাত্র ২৯টি দেশ নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। ২৭টি ইইউ দেশের জনসংখ্যা ৪৫০ মিলিয়ন। আর পুরু ইউরোপ জুড়ে জনসংখা ৭৫০ মিলিয়ন। অর্থাৎ ইউরোপেই প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষ রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দেয় নাই। ইউরোপের বাকী ১৭টি দেশ এবং ৩০০ মিলিয়ন লোক রাশিয়ার বিরুদ্ধে নয় ধরে নেয়া যায়। অন্যদিকে অর্থাৎ সারা দুনিয়ার আরো ১৯৫ টি দেশের মধ্যে ১৬৫টি দেশ নিষেধাজ্ঞা দেয় নাই।

সারা দুনিয়ায় মানুষের সংখ্যা ৮ বিলিয়ন বা ৮০০০ মিলিয়ন। এই ৮ হাজার মিলিয়ন থেকে মাত্র ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন প্লাস আমেরিকা কানাডা আর ইউকে মিলে ৪৫০ মিলিয়ন মানুষের দেশসমুহ রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় বাকি ৭৫৫০ মিলিয়ন মানুষের দ্বারা রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা পায় নাই। অর্থাৎ মাত্র ৫%+ এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বাকী ৯৫% রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞায় রাখে নাই। এতো বিশাল জনগোষ্ঠীর মার্কেটিং, অপুরচুনিটি তো অবাধ!! তারমধ্যে রাশিয়া নিজেই কিছু কিছু জায়গায় খুব শক্ত অবস্থানে যেমন খাদ্য সামগ্রী, ইউরেনিয়াম, গোল্ড, ডায়মন্ড, তেল, গ্যাস, আয়রন, কয়লা, প্লাটিনাম, নাট্রোজেন ফার্টিলাইজার, কপার, কাঠ, ক্যামিকেল ফার্টিলাইজার (ফসফরাস, পটাশিয়াম) এ তারা সয়ং সম্পুর্ন এবং এক্সপর্ট করে।  রাশিয়ার এইসব পন্যের উপর সারা দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশ সমুহ কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল। সেই সব দেশ সমুহের মানুষেরা অযথা ইউক্রেনের উপর এতো আবেগিত হয়ে তাদের নিজের ক্ষতি করার মতো পাগল এখনো হয় নাই।  তারমানে, রাশিয়ার বাজার ৯৫% লোকের জন্য উম্মুক্ত।

এবার আসি, এই ইউরোপিয়ান দেশগুলির মধ্যে শক্তিধর দেশ হিসাবে কারা কারা। বলা হয় ফ্রান্স, জার্মানী এবং ইতালী হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মেরুদন্ড। এবার দেখি এদের মেরুদন্ডের শক্তিটা কত। ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২২ এর হ্যান্স এন্ড ম্যাট কোর্ডার হিসাব মতে মোট ৯টি দেশে নিউক্লিয়ার অস্ত্র আছে-পাকিস্তান (১৬৫), ভারত (১৬০), ইসরায়েল (৯০), ফ্রান্স (২৯০), আমেরিকা (৫৪২৮), ব্রিটেন (২২৫), রাশিয়া (৫৯৭৭), চায়না (৩৫০) এবং নর্থ কোরিয়া (২০)। ইরানের ব্যাপারটা এখনো পরিষ্কার নয়। রাশিয়া এবং আমেরিকা একত্রে মোট ৯০% নিউক্লিয়ার অস্ত্র আছে আর বাকী ১০% আছে বাকি ৭টি দেশে। এরমানে ফ্রান্সের আছে ২৯০টি নিউক, জার্মানীর নাই, ইতালীর নাই। এটা হচ্ছে প্রধান ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মেরুদন্ড।

একটা কথা সবার জানা থাকা দরকার যে, আমেরিকা, ব্রিটেন, এবং কানাডা কিন্তু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অংশ নয় এবং তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যও না। কানাডা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে স্ট্রাটেজিক পার্টনার, ইউকে ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছে, আমেরিকা ইউরোপের অংশই না। হ্যা, তারা ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটো আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এক কথা নয়। ফলে ইউরোপিয়ানের শক্তি শুধু জার্মান, ফ্রান্স আর ইতালী যাদের শুধুমাত্র ফ্রান্সের ২৯০ টি নিউক আছে। সম্বল এটাই।

অন্যদিকে যেহেতু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের না হয়েও ন্যাটোর সদস্য আমেরিকা আর ইউকে, তাই ন্যাটোর সদস্য হিসাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের থেকে ন্যাটোর নিউক বেশী। তারমানে এটা ইউরোপের সম্পদ না। একটা ডায়ালগ প্রায়ই শুনে থাকবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বা ইউকে প্রেসিডেন্টের মুখে যে, আমরা ন্যাটোভুক্ত দেশের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করবো, এটা বলে না যে, আমরা ইউরোপের প্রতিটা দেশের  প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করবো।

আমেরিকার নিউক্লিয়ার অস্ত্র বেলজিয়াম, জার্মানী, ইতালি, তুরুষ্কের সাথে ন্যাটোর অংশ হিসাবে শেয়ার্ড করা। এরমানে হচ্ছে আমেরিকার বেশ কিছু নিউক্লিয়ার অস্ত্র এসব দেশে মোতায়েন করা আছে যেগুলির কন্ট্রোল আমেরিকার কাছে তবে ন্যাটো দেশ যাদের নিউক নাই তারা এগুলিতে ট্রেনিং নেয়। ব্যাপারটা বিকন্দ্রিকরনের মতো। রাশিয়া, চায়না, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান আর নর্থ কোরিয়া মিলে মোট নিউক আছে  ৬৬৭২। তারা সেগুলি পূর্ন কন্ট্রোলে রেখেছে, বিকন্দ্রীকরন করে নাই। আমেরিকা, ফ্রান্স, ইউকে, ইসরায়েল মিলে নিউক আছে ৬০৩৩ টি। ইসরায়েল এই যুদ্ধে নিউক ইউজ করবে না কারন তার ভয় ইরান। ফলে ইসরায়েল বাদ গেলে ন্যাটোর কাছে মোট নিউক আছে ৫৯৪৩। যদি অনুপাত করি তাহলে দাঁড়ায়, (1) : (0.88)

শুধুমাত্র এই শীতকাল যদি রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠতে পারে, তাহলে মনোপলিজম এর মতো ইউনিপোলারিটির একচ্ছত্র রাজত্তের অবসান হবে, পেট্রো ডলারের রাজত্ব হারিয়ে যাবে, সারা দুনিয়ার হিসাব কিতাব অনেক বদলে যাবে।

এবার যেহেতু গোল্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা এসছে, এর প্রভাব সবচেয়ে ভাল পাবে অন্যান্য দেশ, আর নেগেটিভিটিতে থাকবে হেজিমুনিয়াল কারেন্সী ডলার এবং ইউরো। এটা নিয়ে আরেকদিন লিখবো।

১৭/০৬/২০২২-সেন্ট পিটসবার্গে পুটিনের ভাষন

সেন্ট পিটসবার্গে পুটিন তাঁর বিখ্যাত ভাষনটি দিয়েছেন। মোট ৭টি এরিয়া সে কাভার করেছে। আমি সেটাইই অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। আসলে হুবহু অনুবাদ করা অনেক কঠিন। বিশেষ করে থিম ঠিক রাখা। আমার বন্ধু আসাদ এ ব্যাপারে অনেক পারদর্শী। যাই হোক, ভুল ভ্রান্তি ক্ষমা করবেন।  

The old world order is gone with the wind

নতুন ‘সেন্টার অফ পাওয়ার’ ইতিমধ্যে দুনিয়ায় প্রসব করেছে। ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ড আর কখনোই ব্যাক করবে না। না ‘কলোনিয়াল’ ধারনার আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে। যেদিন নিজে নিজে “কোল্ড ওয়ার” এ আমেরিকা জিতে গেছে বলে নিজেকে ডিক্লেয়ার করলো, সেদিন থেকেই তারা তাদেরকে মনে করেছে, “ম্যাসেঞ্জার অফ গড”। তাদের সব চিন্তা চেতনা, তাদের সুবিধাভোগী ভাবনাই শুধু সঠিক এবং পবিত্র। তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ নাই অন্য কারো। পাশ্চাত্যের এই ধ্যান ধারনা সবাই না মানতে পারলেও ঠিক সেদিন থেকেই অন্যান্যের মধ্যে নিজেদের রাষ্ট্রীয় সিস্টেম, আর্থিক মডেল এবং সার্বোভোমত্তকে প্রোটেক্ট করার জন্য সুপ্ত নতুন সেন্টার অফ পাওয়ারের জন্ম হোক সেটা ভাবছিলেন। সেই ভাবনায় লুকিয়ে ছিলো সত্যিকারের একটা রেভুলেশন, জিওপলিটিক্সে টেক্টোনিক পরিবর্তন এবং বর্তমান টেকনোলজিক্যাল বিষয়ে সার্বিক গ্লোবাল অর্থনীতির পরিবর্তন ও তাঁর বিকাশ। অন্যান্য সবাই জানে যে, এটা একটা মৌলিক পরিবর্তন যাকে এতোদিন পশ্চিমারা অস্বীকার করেছে। আজকের যে নতুন সেন্টার অফ পাওয়ার তৈরী হতে যাচ্ছে, এটা আজ না হয় হয়, কাল হতোই। কেউ এতো লম্বা সময় ধরে এই টার্বুলেন্ট পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে চায় নাই। সবকিছু আবার নরম্যাল হোক এটাই সবাই চেয়েছে। আর সেটাই এখন হতে যাচ্ছে।

Anti-Russian sanctions backfired on the West

যখন আমেরিকা এবং তাঁর মিত্ররা ইউক্রেনের অপারেশনকে সামনে রেখে একসাথে রাশিয়াকে বাতিল বলে ঘোষনা দিলো, তাতে তারা মনে করেছিলো রাশিয়া দ্রুতগতিতে এর ঐতিহ্য হারাবে এবং নতজানু অর্থনীতিতে ভেংগে পড়বে। কিন্তু সেটা না হয়ে যেটা হয়েছে- বুমেরাং, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং মিত্রদের মধ্যে পারষ্পরিক হতাশা আর বিভেদ। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান মিত্রদের মধ্যে যারা একটা অদৃশ্য জালের মধ্যে আটকে গেছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং পশ্চিমারা তাদের পলিটিক্যাল সভরেন্টি সম্পুর্নভাবে আস্থা হারিয়েছে। ইউরোপিয়ান বুরুক্রেটিক্সগন অন্যের বাজনার সুরে, সেটা যে সুরই হোক, নৃত্য করতে গিয়ে তারা তাদের নিজেদের মানুষগুলির উপর এবং চালিকাশক্তি অর্থনীতির  চরম ক্ষতি এবং ভারসাম্য নষ্ট করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এহেনো অবাস্তব অবিবেচক সিদ্ধান্তে প্রতিবছর তাদের কম করে হলেও ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি সম্মুখিন হতে হবে। এটা একটা ক্লিন হিসাব।

‘Elite change’ awaits the West

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং আমেরিকা নেতাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মধ্যে যথেষ্ট পরিমান ফারাক রয়েছে। কারো কারো আর্থিক বা সামরিক দুর্বলতার কারনে কিংবা সামাজিক মানদন্ডের পার্থক্য থাকায় কেউ কেউ সিদ্ধান্ত পার্টিসিপেশনে কোন প্রকারের প্রাধান্যই পায় না। প্রাধান্য না পাওয়ার সেইসব দেশের নাগরিকেরাও নিজেদেরকে অন্য মিত্রদের কাছে হেয় অনুভুতিতে ভোগছেন। তারা তাদের ভ্যালু, অরিয়েন্টেশন, ঐতিহ্য যেনো এই ইউরোপিয়ান কোয়ালিশনে এসে হারাতে বসেছেন। এই যে অলিখিত কিন্তু প্রকাশ্য বাস্তবিক দুরুত্ত যা প্রতিটা মিত্রের মধ্যে বিদ্যমান, সেটা তলে তলে আগ্নেয়গিরির মতো ফুলে ফেপে উঠছিলো। এটা আরো প্রকট হয়েছে এই ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে আরো বেশী। তারা নিজেরাই এখন বুঝতে পারছিলো কে কার কোথায় অবস্থান কিংবা কে কাকে কতটুকু সুরক্ষিত দেখতে চায় এবং সেটা কিভাবে। এই প্রেক্ষাপট তারা নিজেরা নিজেদের অনুভুতি দিয়ে এবার বুঝার চেষ্টা করছে বলে সেখানে একটা রেডিক্যাল মুভমেন্ট, সোস্যাল এবং অর্থনীতির পরিবর্তন, এবং মোদ্দাকথা একটা ‘এলিট পরিবর্তনের আন্দোলনের আভাষ সামনে হাজির হচ্ছে। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।  

Economic development is an expression of sovereignty

২১ শতকে দাঁড়িয়ে সার্বোভোমত্তকে একটা আংশিকখাত হিসাবে দেখার কোনো সুযোগ নাই। সার্ভোবোমত্তের যতগুলি উপাদান আছে, তার প্রতিটি উপাদানকে সমানভাবে জরুরী এবং প্রয়োজনীয় মনে করতে হবে। কারন প্রতিটি উপাদান একে অন্যের সাথে জড়িত। রাশিয়া আর্থিক উন্নতির উপাদানে পাচটি মৌলিক নীতি অনুসরন করবে-(ক) ওপেননেস (খ) ফ্রিডম (গ) সোস্যাল জাষ্টিস (ঘ) ইনফ্রাষ্ট্রাকচার (চ) টেকনোলোজিক্যাল সভরেন্টি। রাশিয়া কখনোই সেলফ আইসোলেশন এবং অটার্কীতে বিশ্বাস করে না এবং করবেও না। তাই রাশিয়া যে কোনো কারো সাথে যখন খুশী, বন্ধুত্বপুর্ন মর্যাদা রেখে একে অপরের সাথে বোঝাপড়ায় আন্তরিকতার সাথে সম্পর্ক বাড়াতে চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যা যা আছে তা আমরা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো, প্রাইভেট ব্যবসা বানিজ্যে রাশিয়া আপ্নাদেরকে সাহাজ্য করবে, সামাজিক বৈষম্য দূরিকরনে রাশিয়া যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে টেকনোলোজি পর্যন্ত আমরা একে অপরের সাথে শেয়ার করবো। একটা কথা আমি নিশ্চিত দিয়ে বলতে চাই যে, স্বাধীন দেশসমুহ ইকুয়াল পার্টনারশীপে কাজ করার কথা। সেখানে কে কোন দিকে দূর্বল আর কে কোন দিকে সবল সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় হওয়া কখনোই উচিত না। পুতিনের কথাটা ঠিক এ রকমের-

“Truly sovereign states are always committed to equal partnerships,” while “those who are weak and dependent, as a rule, are busy looking for enemies, planting xenophobia, or finally losing their originality, independence, blindly following the overlord,” he said.

Reasons for the Ukraine conflict

গত ফেব্রুয়ারীতে ইউক্রেনে বিশেষ অপারেশনের একটাই কারন যে, পশ্চিমারা তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিই মানতে অস্বীকার করছিলো বারবার এবং তাদের সাথে আর কোনোভাবেই কোনো প্রকারের সমঝোতা করার কোনো স্কোপই ছিলো না, আবার নতুন করে কোনো সন্ধি করার ব্যবস্থাও ছিলো না। কারন তারা এ ব্যাপারে আমাদের কোনো কথাই শুনতে নারাজ ছিলো।

ইউক্রেনে বিশেষ অপারেশন চালানোর ব্যাপারে আমার উপরে বলতে পারেন বাধ্য করেছিলো এবং এটার খুবই দরকার ছিলো। কারন, রাশিয়ার নিরাপত্তা এমনভাবে বিঘ্নিত হচ্ছিলো যে, আমরা শংকিত হয়ে পড়েছিলাম। আর এটার বাহ্যিক উদাহরন ছিলো দনবাসে রাশিয়ানপন্থি মানুষগুলিকে কিংবা রাশিয়ান ভাষাভাষি নাগরিকদেরকে গনহত্যা করা হচ্ছিলো। আর এর পিছনে মদদ ছিলো পশ্চিমাদের। যারা নব্যনাৎসি বাহিনী তৈরী করে সেই ২য় বিশ্ব যুদ্ধের তরিকায় নির্বিঘ্নে এবং খুবই অমানবিক কৌশলে গনহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিলো। পশ্চিমারা বছরের পর বছর অস্ত্র দিয়ে, ট্রেনিং দিয়ে, এবং সামরিক যতো প্রকারের উপদেষ্টাগত পরামর্শ দিয়ে এই ইউক্রেনকে বেছে নিয়েছিলো এই নিধনে। এই অবস্থায় ইউক্রেনের মানুষগুলির কি হবে, ইউক্রেনের অর্থনীতির কি ক্ষতি হবে, বা ইউক্রেনের সার্বিক কি হতে পারে সেটায় পশ্চিমারা একটুও মাথা ঘামায় নাই। তাদের শুধু লক্ষ্য ছিলো রাশিয়াকে কিভাবে বাতিল করা যায়। ফলে ইউক্রেনকে এক তরফা ভরষা দিয়ে রাশিয়ার দারপ্রান্তে পশ্চিমাদের  সামরীক শক্তি ন্যাটোকে রাশিয়ার নাকে ডগায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলো। আর এই কাজটা একদিনে ওরা করে নাই। ইউক্রেনিয়ানদের মনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটা ঘ্রিনা এবং রাগের মতো মনোভাব তৈরীতে সক্ষম হয়েছিলো, বিশেষ করে শাসক গোষ্টির মধ্যে।  স্কুল কলেজ, গির্জা, কালচার, ধর্ম কিংবা আচার আচরনে সর্বক্ষেত্রে ইউক্রেনের নাগরিকদের মনে, মাথায় ধ্যানে কার্যকলাপে এতাই শিক্ষা দেয়া হচ্ছিলো যে, রাশিয়ানরা খারাপ যাকে রাশিফোবি বলা চলে। আমাদের কোনো উপায় ছিলো না। এবার রাশিয়া তাঁর এজেন্ডা মোতাবেক সবগুলি নির্মুল না করা পর্যন্ত আমাদের আনকন্ডিশনাল এই অভিযান চলতেই থাকবে, এটা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

Energy prices and inflation are self-inflicted

এনার্জি প্রাইস এবং ইনফ্লেশন যদি বলেন, পশ্চিমারা এর জন্য দায়ী করছে রাশিয়াকে।  তারা যেটা বলেছে- “Putin’s price hike is a “stupidity” and “designed for people who can’t read or write,”  পশ্চিমাদের এই অপবাদ কোনোভাবেই সত্য নয় এবং গ্রহনযোগ্য নয়। দাম বাড়া এবং ইনফ্লেশনের জন্য আমাদেরকে দায়ী করতে পারেন না, দায়ী আপ্নারা। দায়ী আপনাদের অবিচকের মতো অবাস্তব সিদ্ধান্তসমুহ।  কভিডের কারনে ইউরোপিয়ান এবং আমেরিকা অগনিত ইউরো আর ডলার ছাপানোর কারনে যেমন এখন ইনফ্লেশন তৈরী হয়েছে, তেমনি অন্ধভাবে রাশিয়ার গ্যাস এবং তেলের বিকল্প তৈরীতে আরো এতো লম্বা সময় লাগবে যে, ইউরোপ এবং পশ্চিমাদের অর্থিনীতিতে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেই ইনফ্লেশন তারা কিভাবে মোকাবেলা করবেন সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার।

If there’s a famine, it won’t be Russia’s fault

পশ্চিমা দেশ এবং ইউরোপের নিষ্রধাজ্ঞার কারনে খাদ্যশস্য এবং সার এর সল্পতার কারনে যদি দূর্ভিক্ষ হয়, তাঁর জন্য তো দায়ী তারা। দুনিয়ার অনেক দরিদ্র দেশসমুহ কোনো অপরাধ না করেও তারা দূর্ভোগ বহন করবে। তারা এই জরুরী খাদ্যপন্য এবং পরবর্তী বছরের জন্য সার পন্য না পেলে তাদেরও অনেকদেশ ক্ষতির মুখে পড়বে। আর এর জন্য দায়ী শুধুমাত্র ইউরোপিয়ান বুরুক্রেটস এবং পশ্চিমা নেতাদের অবাস্তব সিদ্ধান্ত এবং নিষেধাজ্ঞা।

আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য, এশিয়ার সর্বত্র রাশিয়া এই জরুরী পন্যসমুহ সরবরাহ করতে প্রস্তুত আছে। কিন্তু পশ্চিমাদের দেয়া ট্রান্সপর্ট ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার কারনে এই সরবরাহ অনেক অংশে বিঘ্নিত হচ্ছে। সেটা তো রাশিয়ার দোষ নয়। আমরা সবাইকে সব কিছু দিতে প্রস্তুত আছি।

পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ান নেতাদের অদুরদর্শীতার কারনে তারা নিজের সমস্যা যেমন সমাধান করতে অপারগ, তেমনি তাদেরকে যারা অন্ধ্যের মতো অনুসরন করে, তারাও এখন সমস্যায় নিমজ্জিত। আর এই পুরু অকৃতকার্যতার দোষ শুধুমাত্র রাশিয়ার উপরে বর্তায়ে তারা পার পেতে চাচ্ছেন। কিন্তু সময় বলে দিচ্ছে- বাস্তবটা কি। শুধু তাইই নয়, অপরিকল্পিত predatory colonial policy,”  র মাধ্যমে অগনিত

১৩/০৬/২০২২-বুলগেরিয়া ক্রমাগত

বুলগেরিয়া ক্রমাগত আর্থিক ইনফ্লেশনের কারনে এবং এ অবস্থাতেও দেশের সার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে চিন্তা না করে ইউক্রেন যুদ্ধকে সাপোর্ট করতে গিয়ে বর্তমানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সবচেয়ে গরীব দেশ বুলগেরিয়া এখন বিপদে। বুলগেরিয়ার প্রচুর বৈদেশিক ঋণ রয়েছে এবং অর্থনীতি এখন প্রায় বিপর্দস্থ অবস্থায় আছে। এরপরেও বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পেটকভ ইউক্রেন যুদ্ধে মিলিটারী এইড দিতে রাজী হওয়ায় আর তারই সরকারের কোয়ালিশন পার্টের (Inspectia tehnica periodica (ITP) নেতা টিফানভ তাতে রাজী না হওয়ায় শেষমেস ITP র ডিপ্লোমেটিক চীফ টিউদোরা সহ মোট ১৩ জন এমপি সরকারী দল থেকে রিজাইন দিয়েছেন। এতে কার্যত পেটকভ তাঁর মেজরিটি হারিয়ে ফেলেছেন।

বুলগেরিয়ার আরেকটি কোয়ালিশন দল সুফিয়া অঞ্চলের ‘বুলগেরিয়ান সোস্যালিষ্ট পার্টি (BSP)ও একই হুমকী দিয়েছে যে, তারাও কোয়ালিশন সরকার থেকে তাদের সাপোর্ট উঠিয়ে নেবে।

This has increased the chances of Bulgaria being pushed into a state of ‘political instability’ again. এখানে উল্লেখ থাকে যে, গত ২০২১ সালে পরপর তিনবার নির্বাচন হয়েও কোনো দল নিরঙ্কুশ মেজরিটি পায় নাই বিধায় ৪টি দলই একত্রে মিলে বুলগেরিয়ার সরকার গঠিত হয়। তাঁর মধ্যে ITP এবং BSP দুইটি দল। অনেকদিন যাবত বুলগেরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই দৈন্যদশা চলছিলো এবং সেন্ট্রাল ব্যাংক ব্যর্থ হচ্ছিলো ফরেন ঋণ পরিশোধের। আর অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারনেই বুলগেরিয়া রাশিয়া থেকে গ্যাস/তেল রুবলে কিনতে পারছিলো না। ফলে ইউক্রেনকে সাপোর্টকারী দেশ হিসাবে বুলগেরিয়াকে রাশিয়া ‘আনফ্রেন্ডলী দেশ” হিসাবে রাশিয়া বুলগেরিয়ায় তেল সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছিল। তাতে বুলগেরিয়ার নাগরিকদের অবস্থা আরো শোচনীয় পর্যায়ে পড়ে।

বেচারা ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হইয়েছিলেন। মাত্র ৬ মাস।

দেশের মানুষের সার্থ রক্ষা না করে অদৃশ্য বিগ বসদের হুকুম তামিল করলে পরিনতি এমনই হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আরো কতজনের কপালে যে কি আছে, সময় শুধু বলতে পারে।

১২/০৬/২০২২-যে কোনো যুদ্ধের সমাপ্তি হয়

যে কোনো যুদ্ধের সমাপ্তি হয় নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে। ১ম বা ২য় বিশ্ব যুদ্ধও কিন্তু শেষমেশ নেগোশিয়েশনের মাধ্যমেই শেষ হতে হয়েছিলো। কিন্তু সেই নেগোশিয়েশনে বসা পার্টিগুলি কে কিভাবে প্রভাবিত করবে তার নির্ধারন হয় পার্টিগুলির হাতে কি কি তুরুকের তাস আছে তার উপর। যার হাতে যতো বেশী বার্গেনিং কার্ড থাকবে, তাঁর ততো দাবী নেগোশিয়েশন টেবিলকে প্রভাবিত করবে, এটাই নিয়ম। যেমন-২য় মহাযুদ্ধে যখন হিটলার হেরে গেলেন, তখন তাঁর দেশ জার্মানীর হাতে আর কিছুই ছিলো না। কিন্তু মিত্রবাহিনীর কাছে ছিলো পুরু তুরুকের তাস। বিধায় মিত্রবাহিনী যা যা ডিমান্ড করেছে, তার শতভাগ ওই নেগোশিয়েসন টেবিলে জার্মানীকে মানতে এবং ছাড় দিতে হয়েছে। সেই চুক্তিকে বলা হয়, প্যারিস চুক্তি-১৯৪৭। একটু সারসংক্ষেপ যদি দেখি কি কি ছাড় দিতে হয়েছিলো জার্মানিকে?

-জার্মানীকে ১০% টেরিটোরিয়াল ল্যান্ড ছাড়তে হয়েছে।

-জার্মানীর বাইরে জার্মানীর যতো ওভারসিজ কলোনী ছিলো (যেমন Alsace and Lorraine to France, cede all of its overseas colonies in China, Pacific and Africa to the Allied nations) তার সবগুলি কলোনী ছেড়ে দিতে হয়েছে।

-১৬% কয়লার খনি, ৪৮% লোহার খনি এবং ১৩% জনবসতি ছাড়তে হয়েছে।

-বার্লিন যেটা সোভিয়েত টেরিটোরিতে ছিলো, সেটাকে ৪টি ভাগে ভাগ করতে হয়েছিলো। সোভিয়েট নিয়েছিলো পূর্ব পাশ, আর পশ্চিম পাশ ছাড়তে হয়েছে অন্যান্য মিত্র বাহিনীকে। একটা পার্ট আছে জার্মানীর কাছে এখন।

-ওডার এবং নিশি নদীর পূর্ব পাশের সমস্ত টেরিটোরি ছাড়তে হয়েছে পোল্যান্ডের কাছে।

-এই চুক্তি অনুসারে বেলজিয়ামকে, চেকোস্লাভাকিয়াকেও কিছু ল্যান্ড ছাড়তে হয়েছে।

-শর্ত অনুসারে জার্মানী আক্রমণাত্মক কোনো আর্মি গঠন করতে পারবে না, শুধুমাত্র ডিফেন্সিভ বাহিনী হিসাবে সীমিত আকারে নৌ, বিমান এবং সেনা বাহিনীর করতে পারবে। ফলে জার্মানী বিশ্বে বর্তমানে ৩০তম বৃহত্তর মিলিটারী ফোর্স হিসাবে পরিগনিত। তবে ন্যাটো ফোর্সে তাঁর অবস্থান ২য়।

-শর্ত অনুযায়ী জার্মানী কোনো প্রকার বায়োলজিক্যাল, ক্যামিক্যাল এবং নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরী করতে পারবে না। ফলে জার্মানীর কাছে কোনো প্রকার নিউক্লিয়ার অস্ত্র নাই, তবে ন্যাটোর বাহিনীর সদস্য হিসাবে যুক্তরাজ্যের নিউক্লিয়ার অস্ত্রের উপর তাদের ট্রেনিং করানো হয়।

-৪ লক্ষ হলোকাষ্ট সার্ভাইবারদেরকে জার্মানী প্রতি বছর ক্ষতিপুরন দেয়। তাতে দেখা যায় যে, জার্মানী প্রতিবছর প্রায় ৫৬৪ মিলিয়ন ডলার পে করে।

-চুক্তি করার সময়ে মিত্রবাহিনীকে জার্মান এককালীন ২৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি পুরন দিতে হয়েছিলো।

এবার বুঝেন, ২য় মহাযুদ্ধে জার্মানির মেরুদন্ড শুধু ভাংগাই হয় নাই, সোজা করে দাড়ানোর মত শক্তিও রাখে নাই। হিটলারের যদি তখন নিউক্লিয়ার শক্তি থাকতো, তাহলে নেগোশিয়েশন টেবিলেই জার্মানী বসতো না। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় (অথবা সুখের বিষয়) যে, হিটলারের কাছে তখন নিউক্লিয়ার অস্ত্র ছিলো না।

এবার আসি, রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধের কিছু অপশন।

সবচেয়ে বড় দূর্বলতা ইউক্রেনের যে, তারা না পরাশক্তি, না নিউক্লিয়ার ক্ষমতাধর, না ন্যাটোর মেম্বার, না ইউরোপিয়ান ব্লকের কেউ। এদেরকে কেউ পিছন থেকে উষ্কানী দিচ্ছে, আর সেই উষ্কানী ইউক্রেন ১০০% বিশ্বাস করে ভাবছে, তাঁকে কেউ না কেউ উদ্ধার করবেই। কিন্তু আজকে প্রায় ১১০ দিন পার হয়ে গেছে যেখানে কোনো পরাশক্তি, কোনো সাহাজ্যকারী আর্মি, কিংবা কোনো নিউকধারী দেশ কার্যত ইউক্রেনকে সরাসরি সাহাজ্য করতে আসে নাই, আর আসবেও না। একটা ‘নো ফ্লাই যোন” পর্যন্ত করলো না। এদিকে আগ্রাসী রাশিয়া সেই সুযোগে ইউক্রেনের বেশ কিছু কিছু শহর নিজের করে শুধু নিচ্ছে না, সেখানে রাশিয়ার সমস্ত চরিত্র ইঞ্জেক্ট করে দিচ্ছে। পাসপোর্ট, কারেন্সী, ন্যাশনাল আইডি, সবকিছু পালটে দিয়ে রাশিয়ান কালচার প্রতিষ্ঠা করে দিচ্ছে। দিন যতো যাচ্ছে, পিপড়ার গতিতেই হোক, বা কচ্ছপের গতি, রাশিয়া ধীরে ধীরে ইউক্রেনের বেশ কিছু টেরিটোরি গিলেই ফেলছে। কেউ সেটাকে প্রতিহত করছে না বা ডাইরেক্ট কিছুই করছে না। অন্যদিকে, ইউক্রেনের সামরিক শক্তি ধীরে ধীরে এতোটাই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে যে, একটা সময় সম্ভবত রাশিয়াকে আর কোনো বোম্ব বা মিজাইল মারতে হবে না, এম্নিতেই দখলে চলে যাবে। যে রাশিয়া নিজেই অন্য পরাশক্তিকে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত, সে রাশিয়াকে কোন পরাশক্তি আক্রমন করবে? এটা কিন্তু ভাবতে হবে। তারমধ্যে চীন, ইন্ডিয়া, মধ্য প্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা রাশিয়ার পাশে। এমন কি ইজরায়েল নিজেও। ইউক্রেনের সপ্ন ভঙ্গ হতে হয়তো একটু বেশী সময় লাগছে।

বিভিন্ন দেশ যারা ইউক্রেনকে সাহাজ্য করতে আপাতত আভাষ দিয়েছিলো, তারা তাদের দেশেই এখন খাদ্য সংকট, তেল সংকট, গ্যাস, এবং অন্যান্য কমোডিটির ঘাটতিতে নিজের দেশের নাগরিকদের কাছে অপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা এখন এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যে, সেইসব রাষ্ট্রনায়কেরা তাদের গদি টিকিয়ে রাখার জন্যই আর ইউক্রেনকে নিয়ে ভাবার সময় হয়তো হবে না। উপরন্ত, যেসব রিফুজি অন্যান্য দেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদেরকে নিয়েও সেইসব দেশগুলি এখন ক্রমাগত বিব্রতবোধ করছে তাদের দেশের নাগরিকদের কাছে। সেইসব রিফুজির জন্যেও তো দেশগুলির অর্থনীতির উপর চাপ বাড়ছে। কার বোঝা কে নেয়?

রাশিয়া বারবার ইউক্রেনকে নেগোশিয়েশন টেবিলে বসাতে চাইলেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কী সেটায় কর্নপাত করছে না। রাশিয়ার তিনটা শর্ত বারবার উচ্চারিত করছে যে, ক্রিমিয়া, দনবাস, এবং ডোনেটস্ক কে (যা আগেই রাশিয়ার কন্ট্রোলে বা তাঁর নিয়ন্ত্রীত বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রীত ছিলো) এর স্বীকৃতি, ইউক্রেন যেনো কোনো অবস্থাতেই ইউরোপিয়ান ব্লকের অধীনে মিলিটারী জোট ন্যাটোতে যোগ না দেয় আর তাঁর আর্মি এমন একটা সীমিত পর্যায়ে থাকবে যাতে অফেন্সিভ বাহিনীতে পরিনত না হয়। রাশিয়া কোনোভাবেই রিজিম চেঞ্জ চায় না, তাঁর দরকারও নাই। এটা জেলেনেস্কীর মাথায় যেনো ঢোকছেই না। গো ধরে বসে আছে কোনো এক আলাদিনের চেরাগের আশায়। গত ১৫ বছরেও ইউক্রেন ন্যাটোর মেম্বার হতে পারে নাই, না ইউরোপিয়ান ব্লকের কোনো সদস্য। এই ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তাদের কি এটা বুঝা উচিত না যে, ইউরোপ ইউক্রেনকে কিভাবে দেখে? ইউক্রেনকে ভালোবেসে অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশগুলি বা পশ্চিমারা তাঁকে সাহাজ্য করছে বলে জেলেনেস্কীর যে ধারনা, সেটা আসলে ভুল। আসলে তারা চেয়েছিলো রাশিয়াকে সাইজ করতে। ইউক্রেন তো শুধু একটা ক্যাটালিষ্ট। আজকে রাশিয়া আগ্রাসীর ভুমিকায় না হয়ে যদি এটা হতো জার্মানী কিংবা ইউকে বা আমেরিকা, তাহলে সারা দুনিয়ার মানুষ হয়তো জানতোই না যে, ইউক্রেনে জার্মানি, বা ইউকে বা আমেরিকা এটাক করেছে। এই যুদ্ধে রাশিয়া নিজেও তাঁর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ছে, আবার ইউক্রেনও। অন্য যারা উষ্কানী দিচ্ছে, তারা স্রেফ মেলায় অংশ নিয়েছের মতো।

যুদ্ধ যতো লম্বা হবে, ধীরে ধীরে ইউক্রেন আরো অনেক টেরিটোরি হারাবে বলে আমার ধারনা। যেমন সে এখনই মারিউপোল, খেরশন, খারখিভ, সেভেরিদোনেটক্স, আজভ সাগরের পোর্ট অর্থাৎ প্রায় ২৫% টেরিটোরি ইতিমধ্যে রাশিয়া দখল করেছে বলে জানা যায়। এমতাবস্থায়, ইউক্রেনের উচিত ছিলো নিজের ভালোটা বুঝা এবং ইউক্রেনের উচিত হাতে কিছু থাকতে থাকতে রাশিয়ার সাথে নেগোশিয়েশন টেবিলে বসা। পশ্চিমাদের উষ্কানী বা আশ্বাসে বিলম্ব না করে একটা সমঝোতা চুক্তিতে যাওয়া এবং নিজের দেশের মানুষগুলিকে তথা যারা বাস্তহারা হয়ে গেছে, তাদেরকে ফিরিয়ে এনে আবারো নতুন ইউক্রেন হিসাবে তৈরী করা। রাশিয়ার সাথে তাঁর একটা বন্ধুত্বপুর্ন সম্পর্ক তৈরী করলে এবং সে পশ্চিমা ধ্যান ধারনা থেকে সরে এসে রাশিয়ার সাথে আতাত করলে হয়তো রাশিয়াই তাঁকে আবার পুনর্গঠনে সাহাজ্য করতেও পারে।

এখানে একটা কথা ক্লিয়ার করা উচিত যে, জার্মানীর কাছে কোনো প্রকার নিউক্লিয়ার উইপন নাই। আর সে এটা করতেও পারবে না। করলে ২য় মহাযুদ্ধের সময় এলাইড ফোর্সের সাথে ওদের চুক্তি ভঙ্গের জন্য অপরাধ হবে। তবে Under NATO nuclear weapons sharing, the United States has provided nuclear weapons for Belgium, Germany, Italy, the Netherlands, and Turkey to deploy and store. তারা শক্তিশালী মিলিটারী ফোর্সও বানাতে পারবে না। জার্মানী সামরিক শক্তির দিক দিয়ে বিশ্বে ৩০তম দেশ। এখানে NATO nuclear weapons sharing বলতে আসলে কি বুঝায়? এটা হলো-ন্যাটো দেশভুক্ত রাষ্ট্রগুলির ভুখন্ডে আমেরিকা ইয়াদের কিছু কিছু নিউক্লিয়ার উইপন স্টোর বা মজুত করে ডিপ্লয় করে রাখে। সেগুলিতে একচ্ছত্র কমান্ড থাকে পেরেন্ট দেশের অধীনে। যেসব দেশে এগুলি ডিপ্লয় করা থাকে, তারা শুধু এগুলির উপর ট্রেনিং করে থাকে যাতে পেরেন্ট দেশ আদেশ করলেই তারা সেগুলি মারতে পারবে। ফলে আমেরিকার নিউক্লিয়ার উইপন আসলে ভাগ হয়ে আছে Belgium, Germany, Italy, the Netherlands and Turkey তে।

১২/০৬/২০২২-ইউক্রেন যুদ্ধটা এখন “ফান পর্যায়ে”

ইউক্রেন যুদ্ধটা এখন “ফান পর্যায়ে” চলে গেছে বলে মনে হয়। উরসুলা জানে না সে কি বলছে এবং যা বলছে ২/৩ মাস পরেই সেটা আবার পালটে যাচ্ছে। বাইডেন কথা বলতে বলতে অন্য মনষ্ক হয়ে এক কথার মধ্যে আরেক কথা বলে ফেলে, আসল বিষয়বস্তু মাঝে মাঝে ভুলেই যায়।

এবার বাইডেন বলছে, US could buy cheap Russian Oil and supply to EU. অথচ তারাই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যুদ্ধটা ইউক্রেনের, আমেরিকা বা ন্যটো কোনোভাবেই এই যুদ্ধে জড়াইতে চায় না, আবার অন্যদিকে এটাও বলছে যে, এই যুদ্ধে রাশিয়াকে হারানোর জন্য দুনিয়া এদিক সেদিক করতেও আমেরিকা প্রস্তুত।

লং রেঞ্জ HIMARS যার রেঞ্জ ৩০০ কিমি যা আঘাত হানতে পারে রাশিয়ার টেরিটোরিতে, আবার এটাও বলছে যে, রাশিয়ার টেরিটোরিতে যেনো কোনো আঘাত না আনা হয় এই ভরষায় HIMARS দিচ্ছে ইউক্রেনে।

অন্যদিকে এত অস্ত্র যাচ্ছে কই এই প্রশ্নও আমেরিকা করছে। কারন তারা কোনো প্রকারের হদিস পাচ্ছে না পাঠানো অস্ত্রের। অনলাইনে ব্ল্যাক মার্কেটে জেভেলিন, স্টিংকার কেনার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। ইউরোপে ইল্লিগেল আর্মস ভরে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লিগ্যাল আর্মস দিয়ে। ইউক্রেনের প্রায় ২০ থেকে ২৫% অঞ্চল রাশিয়ার দখলে চলে৷ গেছে, এখনো জেলেনেস্কি ভাবছে – জিত তাদেরই হবে। হ্যা হবে হয়ত, কিন্তু অনেক অনেক যুগ কেটে যাবে তাতে। ইউরোপে ইউক্রেন রিফুজি যতটা আনন্দের সাথে আশ্রয় পেয়েছিল, এখন প্রতিটি পরিবার এবং দেশ এই ওভার বার্ডেন্ড রিফুজিকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করছে, খারাপ ব্যবহার করছে।

দেশে দেশে তেল গ্যাস খাবারের সল্পতা দেখা দিচ্ছে, তারপরেও নিজেদের ক্ষতি করে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আরো ক্ষতির মুখে পড়ছে। অথচ শুধুমাত্র রাশিয়াকে ধরাস্ত করার মনোভাবে ইউক্রেনসহ নিজেদের মানুষগুলিকে বিপদে ফেলছে।

আমেরিকা ইউরোপের কোনো দেশই না, রাশিয়া হচ্ছে ইউরোপের একটা পার্ট, অথচ সেই ইউরোপ রাশিয়াকে বাদ দিয়া আমেরিকার সাথে টাই আপ করে প্রকারান্তে ইউরোপ নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সব কিছু রাশিয়ার উপর নির্ভরশিল ( গম, সিরিয়াল, তেল গ্যাস, ইউরেনিয়াম, লোহা, ডায়মন্ড সব) হয়েও রাশিয়াকে চেপে ধরেছে। ইউক্রেনকে ন্যাটোতে মেম্বার তো করবেই না, ইউরোপিয়ান ব্লকেও আনতে চায় না ই ইউ। অথচ বিনা প্রয়োজনে ইউক্রেন সেই ন্যাটো বা ই ইউতে যাওয়ার জন্য এমন মনোভাবে থেকে রাশিয়াকে ক্ষেপিয়ে তুল্লো। এটার হয়তো প্রয়োজনো ছিল না।

জার্মানি আধুনিক আইরিশ-টি দিবে ইউক্রেনকে অথচ ওদের ইনভেন্টরিতে আইরিশ-ট ই নাই। পোল্যান্ড ইউক্রেনকে তার সব ট্যাংক দিয়ে দিলো জার্মানি পোল্যান্ডকে আধুনিক ট্যাংক দিবে এই আশায়। জার্মানি তার বদলে আরো পুরানো ট্যাংক দিতে চাইছে পোল্যান্ডকে।

এটা একটা ফান ছাড়া আর কিছুই না। ফানটা অনেক খারাপ একটা ফান।

১১/০৬/২০২২-ইন্টারন্যাশনাল ইকুইলিব্রিয়াম অফ পাওয়ার

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধটা নিয়ে কোনো আলাপ করতে চাইছিলাম না। কিন্তু যে কার্যকরনটা নিয়ে পুরু বিশ্ব এখন তালমাতাল, সেটা আর এই যুদ্ধের মধ্যে কোনো অবস্থাতেই সীমাবদ্ধ নাই। যেমন, ফুড সংকট, তেল সংকট এবং আরো অন্যান্য সংকট। এটা এমন নয় যে, শুধুমাত্র রাশিয়া আর ইউক্রেন একাই সারা দুনিয়ার খাবার সরবরাহ করে, অথবা শুধু রাশিয়াই সারা দুনিয়ায় তেল বা গ্যাস সরবরাহ করে। সবদেশই কিছু না কিছু ফুড গ্রেইন উৎপন্ন করে, এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র উৎপন্ন করে। তারা রপ্তানীও করে। উদাহরন দেইঃ

গম উৎপাদনে রাশিয়া ১৩%, আমেরিকা-১৩%, অস্ট্রেলিয়া ১৩%, কানাডা-১২%, ইউক্রেন-৮%, ফ্রান্স-৮%, আর্জেন্টিনা-৬%, জার্মানি, রুমানিয়া, ইন্ডিয়া, বুলগেরিয়া প্রত্যেকেই-৪% করে গম রপ্তানী করে। এ ছাড়া কাজাখিস্থান, পোল্যান্ড, লিথুনিয়া, হাংগেরীও গম উৎপাদন করে। এরা সবাই মিলে ৯৫% গম রপ্তানী করে থাকে সারা দুনিয়ায়। যদি রাশিয়া এবং ইউক্রেন একত্রে ধরি তাহলে তারা উভয়ে মিলে ২১% রপ্তানি করে। এর মানে ৭৪% গমের রপ্তানী কিন্তু করে অন্যান্য দেশ। অথচ ইতিমধ্যে গম, ভুট্টা, যব ইত্যাদির একটা বিশাল শুন্যতা দেখা গিয়েছে। আর এই মুল উপাদান শস্যের কারনে অন্যান্য সব খাবারের উপর প্রভাব পড়েছে। এর কারন কি? এর একটাই কারন-এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে, এটা কেউ বলতে পারছে না। ফলে সবাই একটা এমন আতংকের মধ্যে আছে যে, কেউ এখন তাদের গোডাউন খালী করতে চায় না। সবাই যার যার খাদ্য সামগ্রী অন্যত্র রপ্তানী থেকে বিরত রয়েছে। আর একারনেই সংকট। অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের বেলাতেও তাই হয়েছে। এটা যুদ্ধ আতংকের বাই প্রোডাক্ট। আমেরিকা সম্ভবত এই ক্যালকুলেশনেই রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রনয়ন করেছিলো যে, মাত্র ১৩% শর্টফল কাভার করা সম্ভব, কিন্তু এর সাইড ইফেক্টটা কি হবে সেটা সম্ভবত হিসাবের মধ্যে ধরেনি।  

একইভাবে তেল উৎপাদনকারী দেশসমুহের মধ্যে যদি দেখি, তাহলে দেখবেন

আমেরিকা, রাশিয়া, সৌদি আরব, কানাডা, ইরাক, চায়না, আরব আমিরাত, ব্রাজিল, কুয়েত এবং ইরান মিলে মোট ৯৫% তেল উৎপাদন করে কিন্তু আমেরিকা ছাড়া অন্যান্য সবাই রপ্তানী করে। শুধু রাশিয়ার উৎপাদন বাদ দিলে মোট উতপাদনের পরিমান থেকে মাত্র ২৫% রপ্তানী হয়তো বাদ পড়বে এবং বাকী ৭০% অন্যান্য দেশ থেকে পুরন করা যেতো যদি তারা সবাই একটু একটু করে উৎপাদন বাড়িয়ে দিতো।, তাহলে রাশিয়ার তেল ছারাও চলতো। তারমানে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরী হতো। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরী হচ্ছে না কেনো?  

এর কারন কিন্তু ফুড গ্রেইনের মতো আতংকের কারনে নয়। এটা হচ্ছে আমেরিকা বা ন্যাটো, বা ইউরোপের উপর অন্যান্য দেশের একটা প্রতিশোধমুলক ব্যবস্থার কারনে। আমেরিকা একচ্ছত্রভাবে যেটাই করুক, সেটাই ন্যায়, তাঁর কোনো অন্যায় নাই, এটা হয়তো আমেরিকা মনে করলেও, অন্যান্য দেশ সেটা মনে করে না। আবার সেটা অন্যান্য দেশ মেনে না নিলেও এতোদিন তাঁরা যে কোনো কারনেই হোক (হোক সেটা পলিটিক্যাল, হোক সেটা একাকীত্ব, হোক সেটা নিজেরা আইসোলেট হবার ভয়ে) সেটার ব্যাপারে সোচ্চার হওয়াও সম্ভব ছিলো না। ফলে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, চীন, সবাই ভিতরে ভিতরে একটা রাগ সুপ্ত অবস্থাতে লালন করছিলো। এই যুদ্ধে রাশিয়া বেকে বসায় এবার সেই অন্তর্দাহ কিংবা সুপ্তরাগ একসাথে সবাই আমেরিকার বিরুদ্ধে উচ্চারিত হতে দেখা গেছে। একটা কথা আছে- শত্রুর শত্রুরা একে অপরের কিন্তু বন্ধু। আর ঠিক এটাই হয়েছে এবার। রাশিয়ার সাথে চীন, ইন্ডিয়া, সাথে মধ্যপ্রাচ্য, লাগোয়া আফ্রিকা সবাই একযোগে বন্ধু হয়ে গেছে আর তাদের কমন শত্রু যেনো ইউরোপ, আমেরিকা, অথবা ন্যাটো।

এই তথ্যগুলির প্রচুর অভাব ছিলো সম্ভবত আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনীর তথ্য ভান্ডারে। পুতিনকে তারা পড়তে পারেনি, পড়তে পারেনি চীনের মনোভাবকেও, কিংবা ইন্ডিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদেরকেও। আবার অন্যদিকে তলে তলে যে এই সব বিচ্চু বাহিনীগুলি এতোটা জোটে আবদ্ধ হয়ে যেতে পারে, এই প্রেডিকশনটা আমেরিকা-লিড জোট ভাবেই নাই। আর যখন তাদের বোধোদয় হয়েছে, তখন গরম গরম সাক্ষাতেও তাদেরকে আর দলে টানা যাচ্ছিলো না, যায়ও নাই। ফলে প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা বুমেরাং হয়ে নিজেদের উপরেই ফিরে আসা শুরু করেছে।

আমার ব্যক্তিগত ধারনা যে, ন্যাটোকে নিয়ে তো শুধুমাত্র রাশিয়ার ভয়। চীন, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা তাদের তো ন্যাটোকে নিয়ে কখনো কোনো মাথা ব্যথাও ছিলো না, এখনো নাই। ন্যাটোর যতো এক্সপানশন, যতো প্রস্তুতি সবইতো এই রাশিয়াকে ঘিরেই। ন্যাটোকে জীবিত রাখাই হয়েছে রাশিয়াকে সাইজ করার জন্য। আর ন্যাটো তো একটা সুযোগই খুজছিলো কবে কিভাবে এই ন্যাটোকে দিয়ে রাশিয়াকে সাইজ করবে। এবার তো সেই সুযোগটা এসেছিলো যেটার জন্য তারা এতো যুগ ধরে অপেক্ষা করেছে। তাহলে ন্যাটো কি আসলেই তৈরী ছিলো রাশিয়াকে সাইজ করার এই মুক্ষোম সুযোগটা পেয়ে? ন্যাটোর নিজেরও কোনো প্রস্তুতি ছিলো না। অতি সন্নাসীতে যে গাজন নষ্ট হয়, এই প্রবাদটা ইংরেজীতে মনে কেউ পড়ে নাই। জানা থাকলে আগে তারা ন্যাটো কতটা ঐক্যবদ্ধ্য সেটা যাচাই করা দরকার ছিলো। অনেক হোমওয়ার্ক করার দরকার ছিলো। আমরা দেখেছি-প্রতিটি মেজর মেজর সিদ্ধান্ত পশ্চিমারা নিতে সময় নেয় নাই। প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত হয়েছে এক রাতের মধ্যে কিংবা এক দুপুরের মধ্যে, কখনো কখনো একই দিনেও অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। কিন্তু একটিবারও ভাবেন নাই, এসব মারাত্তক মারাত্তক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরে কি কি ইফেক্ট হতে পারে। পুরু ব্যাপারটা ঘটেছে গুটিকতক মানুষের ব্রেইন চাইল্ড হিসাবে। ফলে একজন ‘ইয়েস’ বলেছে আর সবাই এর পুরুপুরি বিশ্লেষণ না করেই হুজুগের বশে ‘ইয়েস’ বলেছে আর যারা বলতে পারেনি, তারা হয়তো মৌন থেকেছে। বাধা দেয় নাই। এর ফলে নিষেধাজ্ঞার পর নিষেধাজ্ঞায় কোনো কাজ হচ্ছিলো না। দেখা গেছে ৭ম নিষেধাজ্ঞা দিয়েও কাজ হয় নাই।

সুইফট বন্ধ করলে কি হতে পারে, বিকল্প তৈরী হয়ে গেলে কি করা যাবে, পেট্রো ডলার আউট হয়ে গেলে কি হতে পারে, অন্য কারেন্সী ইন্টারন্যাশিনাল কারেন্সী হিসাবে গন্য হয়ে গেলে অতিরিক্ত ডলারগুলির কি হবে, বড় বড় কোম্পানীগুলি তাদের ব্যবসা বানিজ্য গুটিয়ে নিলে কি হতে পারে, যারা পুতিনকে কিংবা চীনকে বুঝিয়ে একটা দফারফা করতে পারে সেই লোকগুলিকে নিষেধাজ্ঞায় ফেলে দেয়ায় কি হতে পারে এগুলির কোনো হোমওয়ার্ক একেবারেই করা হয় নাই। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নিজেই নিজেরা কতটা কে কাকে ভরষা করে, এটাও যাচাই করার দরকার ছিলো এসব করার আগে। সেটাও করা হয় নাই। প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাদের নিজেদের নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধ, আমেরিকা বা ইউরোপের কাছে নয়। তারা ইচ্ছে করলেই তাদের নাগরিকদেরকে পথে নামিয়ে দিয়ে পশ্চিমাদের খুশী করার জন্য কিংবা তাদের তাবেদারী করে ক্ষমতায় থাকতে পারেনা। এটা বুঝা দরকার ছিলো। একদিকে ডেমোক্রেসির কথা বল্বো আবার অন্যদিকে দেশের নাগরিকের কথা মাথায় রাখবো না, এটা হতে পারে না।

আমি শুধু পশ্চিমাদেরকেও দোষ দেবো না। কারন তারা গত কয়েক যুগ এভাবেই ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সফলতা পেয়েছে। সফলতা পেয়েছে ইরানে, ইরাকে, আফগানিস্থানে, সিরিয়ায়, প্যালেষ্টাইনে, ইয়েমেনে, লিবিয়ায়, মেক্সিকো, সোমালিয়া, নিকারাগোয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, কংগো, কম্বোডিয়া, হাইতি, মিশর, এবং অন্যান্য আরো দেশ সহ আফ্রিকান দেশগুলিতে। ফলে যখন এভাবে তারা সফলতা পেয়েই গেছে, তাহলে একই ইন্সট্রুমেন্ট তারা ব্যবহার তো করবেই। কিন্তু এবারের দেশটা ছিলো রাশিয়া। ২য় বৃহত্তর মিলিটারী ফোর্স, নিউকের অধিকারী, ভেটো ক্ষমতার অধিকারী, নিজেরাই প্রায় সবদিক দিয়ে সাবলম্বী, আর তারমধ্যে এতো বেশী সময় ধরে অভিজ্ঞ একজন রাষ্ট্রপ্রধান পুতিন যার মেয়াদ আরো বাকী ১৪ বছর, যার ব্রেইনকে পড়ার জন্য ইন্টেলকে একটা আলাদা সেল খুলতে হয়েছে, তাঁকে অন্যান্য সবার কাতারে ফেলে এমন হুইমজিক্যাল গেম খেলা ঠিক হয় নাই।

এর মানে আমি এটা বলছি না যে, ইউক্রেনকে রাশিয়া আক্রমন করে ঠিক কাজটাই করেছে। সেও অন্যায় করেছে। কিন্তু পশ্চিমারা তো এই অন্যায়গুলিই করে এসছে এতোকাল। পুতিনের তো হোম ওয়ার্ক করা ছিলো। পুতিন তো এটাই বলেছে- হয় এখন, না হয় আর কখনোই না। ফলে এক কালা জাহাংগীর (কেউ খারাপ ভাবে নিয়েন না) আরেক কালা জাহাংগীরকে শায়েস্তা করার আগে কালা জাহাংগীরদের তো আরো অনেক বেশী হোমওয়ার্ক করার দরকার থাকে। যদু মধুওকে থাপ্পর দিয়ে পার পেলেও এক কালা জাহাংগীর আরেক কালা জাহাংগীরকে শায়েস্তা করার আগে কি শুধু থাপ্পর দিলেই কাজ হয়ে যাবে?

ফলে এই অকালিন এবং কিছু গুটিকতক মাথামোটা মানুষের বুদ্ধির কারনে যেটা আমি দেখতে পাচ্ছি, সেটা হচ্ছে-

(ক) ইউরোপের ইউরোর মতো এশিয়ায় আরেকটা কমন কারেন্সীর প্রবর্তন হবে।

(খ) পেট্রো ডলারের আধিপত্য শেষ হয়ে যাবে।

(গ) ট্রেড প্রবাহে ইউরোপ বা পশ্চিমারা পিছিয়ে যাবে।

(ঘ) ইউরোপ একটা নড়বড়ে জোটের সৃষ্টি হবে।

(চ) ন্যাটোর উপর সর্বজনীন আস্থা কমে যাবে।

(ছ) রাশিয়া, চীন, ইন্ডিয়া, তুরষ্ক, এবং অন্যান্য দেশ মিলে প্যাসিফিক নিয়ন্ত্রন করবে।

(জ) সুইফট সিস্টেমের আধিপত্য শেষ হবে।

(ঝ) রিজার্ভ শিফট হয়ে যাবে অন্যত্র এবং অন্য কারেন্সীতে।

(ট) ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশ গুলিতে ইনভেষ্টমেন্টে ভাতা পড়বে।

(ঠ) জাতিসংঘের পাশাপাশি আরেকটা লিগ অফ ন্যাশনের সৃষ্টি হবে।  

ইন্টারন্যাশনাল ইকুইলিব্রিয়াম অফ পাওয়ার বলতে যা বুঝায় তাঁর জন্ম হতে যাচ্ছে। ২০১১ জুন প্রকাশনায় ডিফেন্স জার্নালে ঠিক এ রকম একটা লেখা ছিলো আমার। Is Super Power Shifting? Why and Who is Next?

৯/৬/২০২২-আমেরিকা কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা জারি

এ যাবত কাল আমেরিকা কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা জারি করা দেশসমুহঃ

কিউবা, নর্থ কোরিয়া, ইরান, ভেনিজুয়েলা, সিরিয়া, আফগানিস্থান, বেলারুশ, বলিভিয়া, কম্বোডিয়া, ক্রিমিয়া, ইরিত্রিয়া, লাওস, নিকারাগুয়া, প্যালেস্টাইন, ইয়ামেন, জিম্বাবুই, রাশিয়া

আর ব্যক্তি পর্যায়ে আমেরিকা যে দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে তাদের লিষ্টঃ

বাংলাদেশ, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, চায়না, কংগো, হংকং, ইরাক, লেবানন, লাইবেরিয়া, মালি, মায়ানমার, সোমালিয়া, সুদান, তুরুষ্ক

এভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে করতে একটা সময় আসবে, সবাই যার যার জায়গায় অন্যের সাথে ঠিকই ব্যবসা বানিজ্য, যাতায়ত, কালচারাল এক্সচেঞ্জ, স্পোর্টস এক্টিভিটিজ ইত্যাদি করা শুরু করেছে আর সেখানে নাই শুধু আমেরিকা। নিজের জালে আমেরিকা ফেসে যাচ্ছে। তার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না। আমেরিকাকে বুঝতে হবে, পুরু পৃথিবী তার নিয়ন্ত্রনে নয়। আর সেটা সে নিয়ন্ত্রন করতে পারবেও না। তাই এই “নিষেধাজ্ঞা” নামক অস্ত্র আমেরিকাকে পরিত্যাগ করে ভিন্ন পথে আগাইতে হবে। না আগাইলে তার নিজেরই ক্ষতি হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী।

উদাহরনঃ আমেরিকার নতুন আফ্রিকান ট্রেড মিটিং সবাই বয়কট করলো আজ। এরমানে কেউ তাদের সাথে কোনো টাই-আপ করতে নারাজ।

নর্থ কোরিয়াকে আবারো নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাব আমেরিকা পেশ করার পর জাতিসংঘের স্থায়ী কমিটিতে চায়না এবং রাশিয়া শতভাগ ভেটো প্রদান করেছে। ফলে একচ্ছত্র নিষেধাজ্ঞা দেয়া সম্ভব হয় নাই। তাই শুধুমাত্র আমেরিকার ট্রেজারী ব্রাঞ্চ উক্ত নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। নর্থ কোরিয়া তো গত ১৫ বছর যাবত নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই আছে, তার আবার নতুন কি নিষেধাজ্ঞা?

এগুলি আমেরিকার লিডারদেরকে ভালো করে মাথায় নেয়া উচিত। এ গুলি ভালো লক্ষন নয় আমেরিকার জন্য।

৯/৬/২০২২-ক্ষমতার ভারসাম্য

একটা সময় ছিলো যখন ‘সময়’ টাকে রাজত্ব করেছে বাইজেন্টাইন, রোম, প্যারিস, জার্মানী, তারপর ব্রিটিশ। এখন তারা আর সেই একচ্ছত্র ক্ষমতার শীর্ষেও নেই, রাজত্বও করার সুযোগ নাই। নব্বই দশক থেকে একচ্ছত্র ক্ষমতার শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিটি শীর্ষ ক্ষমতাধর সম্রাজ্য কোনো না কোনো যুদ্ধের মাধ্যমেই তাদের পতন হয়েছে।

যারা আগের দিনে রাজত্ব করেছে, তারা যদিও একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি কিন্তু তাদের মধ্যে সেই মোড়লগিড়ি করার প্রবনতাটা বিদ্যমান আছে আর সেই প্রবনতা থেকেই বর্তমান বড় মোড়লের তালে তাল মিলিয়ে ক্ষমতার একটা মজার ভাগ তারাও শেয়ার করে যাচ্ছে। 

এবার এই ইউক্রেন যুদ্ধকে আমার কাছে মনে হয়েছে সেই রকম একটা যুদ্ধ যেখানে একচ্ছত্র ক্ষমতার পালাবদল হয়।  টার্নিং পয়েন্ট। আমি প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি- দ্রুত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে নিজেদের সার্থের দন্ধে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে, ভুল কিছু নিষেধাজ্ঞার কারনে সারা দুনিয়া থেকে পেট্রো ডলারের একচ্ছত্র প্রভাব শেষ হয়ে যাচ্ছে, সুইফট সিস্টেমের এর বিপক্ষে অনেকগুলি সমগোত্রীয় অন্য সিস্টেম কাজ করা শুরু হয়ে গেছে। ফলে একচ্ছত্র অর্থ নিয়ন্ত্রনের মুল কারবারীর বিশ্ব অর্থিনীতি থেকে ডলার বা ইউরো হারিয়ে যাবে ধীরে ধীরে। এর বিপক্ষে অন্য কারেন্সী প্রাধান্য পাবে।

যারা একটা সিস্টেমকে বিশ্বাস করে ব্যক্তি পর্যায়ে বা দেশীয় পর্যায়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের সমপরিমান অর্থ যুক্ত্রষ্ট্রের মতো দেশের রিজার্ভ ব্যাংকে এতো পরিমান নিজেদের অর্থ রাখে, সেই অর্থ একটা মুখের কথায় যখন বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার কালচার আমেরিকা শুরু করেছে, ফলে কোনো দেশ বা কোনো ব্যক্তি অন্তত আর ওই পথে পা ফেলবে বলে মনে হয় না। তাতে আমেরিকার রিজার্ভ ব্যাংক ধীরে ধীরে খালী হয়ে যাবে। অন্যদিকে আমেরিকা যে পরিমান অর্থ চায়না বা অন্যান্য ধ্বনি দেশগুলি থেকে ঋণ নিয়েছে, তাঁর পরিমানও নেহায়েত কম নয়। অর্থাৎ ইকোনোমিক্যাল ব্যালেন্সও কিন্তু ইকুইলিব্রিয়ামের মধ্যে নাই।

এমন একটা অবস্থায় পুর্বের মোড়ল গুলি যেমন জার্মানী, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, তুরুষ্ক এবং তাদের সাথে ইউরোপিয়ান গোষ্ঠীরা খুব দ্রুত অন্যান্য দেশ যেমন  চায়না, রাশিয়া, মিডল ইষ্ট, এবং আমেরিকাকে পছন্দ করে না এমন দেশ সমুহ একজোট হয়ে যাচ্ছে। এতে যেটা হবে, খুব বেশীদিন হয়তো আমেরিকা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারে কিনা আমার সন্দেহ হচ্ছে। আজকাল মিডিয়ার যুগ, মিস-ইনফর্মেশন-ওয়ার খুব একটা সুফল আনে না। তথ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও ইনফর্মেশন সুপার হাই ওয়েতে সব তথ্য এক সাথে চলে আসে। ফলে আমেরিকাকে তাঁর হেজিমুনি ধরে রাখতে  এখন সুপার ইন্টেলেকচুয়াল এবং অনেক বেশী বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন নেতার প্রয়োজন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেই যে সে ভালো নেতা, সব বুদ্ধির অধিকারী, কিংবা চালাক কিংবা দুরদর্শী লিডার বা ইন্টেলেকচুয়াল এমনটা ভাবার দিন হয়তো শেষ।

7/6/2022-আবার আলোচনায় নর্দান আয়ারল্যান্ড প্রটোকল

পুরানো ঘা আবার নতুন ঘায়ে পরিনত হতে যাচ্ছে। আর সেই ঘায়ের রেসে এবার ইউরোপ না নিজেই আহত হয় কে জানে। প্রসংগ- নর্দান আয়ারল্যান্ড। 

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রটোকলের অনেক প্রশ্নই অমীমাংসিত থেকে গেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্রেক্সিট চুক্তি সাক্ষরীত হলেও আয়ার ল্যান্ড কে নিয়ে ইউরোপ আর ব্রিটেনের মধ্যে অনেক দর কষাকষি চলছিলো। শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিট চুক্তির ১৬ নম্বর ধারা সংযোজন করে অবশেষে ইউরোপ থেকে ব্রিটেনের চিরতরে বিচ্ছেদ হয়। এর মানে ব্রিটেন কোনোভাবেই আর ইউরোপিয় ইউনিয়নের সদস্য নয়।

আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে এতো কি সমস্যা ছিলো? নভেম্বর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালে আমার একটা পূর্নাজ্ঞ লেখা ছিলো যা পর পর ২টা প্রকাশনায় কাভার পেজ হিসাবে ডিফেন্স জার্নাল প্রকাশ করেছিলো। সেখানে এই আয়ার ল্যান্ড এর স্ট্যাটাস নিয়ে বিস্তারীত বলা হয়েছিলো। তারপরেও সবার কিছু মেমোরী ফ্রেস করার জন্য বলছি যে,

আইরিশ প্রজাতন্ত্র দুটুভাগে বিভক্ত, একটা শুধু আয়ারল্যান্ড নামে পরিচিত, আরেকটা নর্দান আয়ারল্যান্ড নামে। এই আয়ারল্যান্ড দ্বীপের আয়ারল্যান্ড অংশটি ইইউর সদস্য আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ। ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারনে নর্দান আয়ারল্যান্ডও যুক্তরাজ্যের সাথে ইউরোপিয়ান ব্লক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আইরিশ প্রজাতন্ত্র বা আয়ারল্যান্ডের দুটু অংশই ইউরোপিয়ান ব্লকের সাথে থাকতে চেয়েছিলো এবং তারা সেভাবেই গনভোটে রায় হয়েছিলো। ইউরোপের যে কোনো দেশ কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়া, কাস্টম চেক ছাড়া, কোনো ভিসা ছাড়া এক ইউরোপিয়ান দেশ আরেক ইউরোপিয়ান দেশে যাতায়ত, মালামাল পরিবহন, প্রোটেকশন, মালের স্ট্যান্ডার্ড সব কিছু অবাদে চলে। কিন্তু যখনই নর্দান আয়ার ল্যান্ডে কিছু আসবে সেখানে আর সেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কোনো কিছু বহাল থাকার কথা নয়। এখানে সব কিছু ভিন্ন একটা দেশের মতো আচরন করার কথা কিন্তু এই আয়ারল্যান্ড তো মুল আয়ারল্যান্ডের সাথেই থাকতে চায়!! ফলে একটা দেশকে কেচি দিয়ে দুই ভাগ করে ফেলার মতো অবস্থা দারায়। ইউরোপিয়ান ব্লকে থাকলে এটা আর সমস্যা হতো না। কিন্তু ইউরোপ আর ব্রিটেনের ডিভাইডিং লাইনে চলে এসছিলো নর্দান আয়ারল্যান্ড জাষ্ট একটা ব্রেক্সিটের কারনে। অনেকদিন এর স্ট্যাটাস নিয়ে ঝুলে ছিলো। অনেক প্রপোজাল, অনেক অপশন অনেক সমাধানের পথ খুজেও যখন সমঝোতা হয় নাই।  ইইউ সদস্য রাষ্ট্র আইরিশ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ব্রিটেনের একমাত্র স্থলসীমান্তে পণ্যের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে ব্রেক্সিট চুক্তির মধ্যে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রোটোকল নামের বিশেষ ধারা রাখা হয়েছিল৷ ১৯৯৮ সালের আইরিশ শান্তি চুক্তির স্বার্থে ব্রিটেনের এই প্রদেশকে ইউরোপীয় অভিন্ন বাজারের মধ্যে রাখার চাপ মেনে নিতে কার্যত বাধ্য হয় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকার। ব্রিটেনের সংসদও ব্রেক্সিট চুক্তির অন্তর্গত সেই প্রোটোকল অনুমোদন করে। যাকে ১৬ নাম্বার ধারা বলা হয়। এই ১৬ নম্বর ধারাটি এখানে বলছি না। প্রায় ৮টি বিশেষ প্রটোকল আছে এর মধ্যে। এই প্রটোকলে ইইউ থেকে ব্রিটেন চলে যাওয়ার পর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্যনীতি কী হবে, তা বলা আছে।

তাহলে এখন আবার কি সমস্যা জাগরন হলো একে নিয়ে?

বাস্তবে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে পণ্য চলাচলের ক্ষেত্রে এক অদৃশ্য সীমানা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় একতরফাভাবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রোটোকল বাতিল করার হুমকি দিচ্ছে ব্রিটেন। অন্যদিকে ইইউ ব্রেক্সিট চুক্তির মধ্যে কোনোরকম মৌলিক রদবদল করতে প্রস্তুত নয়

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্রিটেনের উত্তর আয়ারল্যান্ড প্রদেশ৷ ইইউ সদস্য রাষ্ট্র আইরিশ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ব্রিটেনের একমাত্র স্থলসীমান্তে পণ্যের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে ব্রেক্সিট চুক্তির মধ্যে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রোটোকল নামের বিশেষ ধারা রাখা হয়েছিল৷ ১৯৯৮ সালের আইরিশ শান্তি চুক্তির স্বার্থে ব্রিটেনের এই প্রদেশকে ইউরোপীয় অভিন্ন বাজারের মধ্যে রাখার চাপ মেনে নিতে কার্যত বাধ্য হয় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকার৷ ব্রিটেনের সংসদও ব্রেক্সিট চুক্তির অন্তর্গত সেই প্রোটোকল অনুমোদন করে৷ কিন্তু বাস্তবে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে পণ্য চলাচলের ক্ষেত্রে এক অদৃশ্য সীমানা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠায় একতরফাভাবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রোটোকল বাতিল করার হুমকি দিচ্ছে ব্রিটেন। অন্যদিকে ইইউ ব্রেক্সিট চুক্তির মধ্যে কোনোরকম মৌলিক রদবদল করতে প্রস্তুত নয়৷

DW এর প্রতিবেদনে বলা হয়ঃ ……….[ব্রিটেন ব্রেক্সিট চুক্তির ১৬ নম্বর ধারা কাজে লাগিয়ে এমন একতরফা পদক্ষেপ নিলে তার পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছে ইইউ। ব্রিটেন থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে পণ্যের সরবরাহ আরও সহজ করতে ইইউ একগুচ্ছ প্রস্তাব রাখবে বলে জানিয়েছে। ইইউ কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারস সেফকোভিচ জানিয়েছেনতিনি আগামী সপ্তাহেই সেই প্রস্তাবের খসড়া পেশ করবেন। কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য সম্ভব না হলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইইউ ব্রিটেনের পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক চাপাতে পারে। ব্রিটেনের শিল্পবাণিজ্য জগত এমন চরম পদক্ষেপ এড়াতে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মিটিয়ে নেবার আহ্বান জানিয়েছে। শুধু ব্যবসাবাণিজ্যে বিঘ্ন নয়ইইউৃর সঙ্গে সংঘাতের কারণে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে মোটেই ব্রিটেনের পাশে দাঁড়াবেন নাসে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। ইউরোপের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি ব্রিটেনের স্বার্থের কতটা ক্ষতি করবেসে বিষয়ে জল্পনাকল্পনা চলছে।]

গত নির্বাচনে ৯০ টি আসনের মধ্যে শিন ফেইন পেয়েছে ২৫টি আর ডিইউপি পেয়েছে ২৫। ৩য় পার্টি পেয়েছে ৯টি।  কেহই সরকার গঠনে সমর্থ নয়। ডি ইউ পি চুক্তি বাতিলের পক্ষে। ৩য় পার্টি  চুক্তি বাতিলের পক্ষে অর্থাৎ ইউনাটেড আয়ারল্যান্ড। এর মানে নর্দান আয়ার ল্যান্ডের বিচ্ছেদ হতে পারে মুল ব্রিটেন থেকে। দেশটা আরো ছোত হয়ে যাবে এটা সিউর। আর তা না হলে যুদ্ধ। আর যুদ্ধ হলে ইউরোপ তো আর ব্রিটেনকে ছেড়ে দিবে না। আয়ার ল্যান্ড যে ইউরোপের একটা দেশ, তাই।

দেখা যাক, বরিস ভাই কি করেন। আর উরসুলা কি করেন।

৭/০৬/২০২২-NATO chief conditions for Finland and Sweden

জেনস স্টল্টেনবার্গ বলেছেন যে, আগামী ২৮-৩০ জুন ২০২২ তারিখে ন্যাটোর সম্মিলিত মিটিং এ ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন যতোক্ষন না তুরুষ্কের দাবী না পুরন করবে, ততোক্ষন তারা ন্যাটোর সদস্য পদের জন্য মনোনীত হবেন না। তিনি আরো বলেছেন “No country has suffered as much from terrorist attacks as Turkey,” Stoltenberg said, adding that “Turkey is an important ally and when an ally has concerns it should be discussed and the problem resolved.” এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নর্থ মেসিডোনিয়ার উদাহরন টেনে বলেন, গ্রীসের বিরোধিতার কারনে মেসিডোনিয়াকে ১০ বছর লেগেছিলো ন্যাটোর মেম্বার হতে।  তবে মাদ্রিদে এই দুইটি দেশ অতিথি হিসাবে থাকতে পারেন কিন্তু কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কারন তুরষ্ক ন্যাটোর একটি অতীব ইম্পর্ট্যান্ট মেম্বার যাকে ন্যাটোর খুবই দরকার।

যদি এটাই হয়, তাহলে এই দুটি দেশের অবস্থা এখন কি হবে? একদিকে রাশিয়াকে ক্ষেপাইয়া দিলো, আগের অবস্থানে তো আর যেতেই পারবে না যদিও বারবার রাশিয়া একটা কথাই বলেছিলো যে, তাদের কোনো ভয় নাই যেমন ছিলো না বিগত বছরগুলিতেও। আবার না ন্যাটোর কোনো সিমপ্যাথি পাইলো।

ন্যাটো ষ্টুপিড নাকি দেশ দুটির নেতারা?

01/06/2022-Kissinger-peace settlement in Ukraine

সাবেক ইউএস সেক্রেটারী অফ স্টেট হেনরী কিসিঞ্জারের দূরদর্শীতার প্রশংসা না করেই পারলাম না। ৯৮ বছরের এই ঝানু পলিটিশিয়ান বলেছেন-“আগামী দুই মাসের মধ্যে যদি শান্তি চুক্তির জন্য রাশিয়ার সাথে বসা না হয়, তাহলে রাশিয়া স্থায়ীভাবে ইউরোপ থেকে বেরিয়ে গিয়ে চায়নার সাথে স্থায়ীভাবে মিত্রতা করার সম্ভাবনা। রাশিয়া গত ৪০০ বছর যাবত যেখানে সে ইউরোপের সাথে আছে, তাকে কোনোভাবেই অবমুল্যায়ন করা যাবে না। নীতিগত এবং আদর্শগতভাবে ইউক্রেনের আগের অবস্থার সাথে যদি  ডিভাইডিং লাইনে না থাকা হয়, এরজন্য অনেক বড় মাশুল অপেক্ষা করছে। আমার মতে [কিসিঞ্জারের মতে], যদি ওই লাইনের বাইরে যুদ্ধকে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সেটা শুধু ইউক্রেনের সাধীনতাকেই খর্ব করবে না, সেটা ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধকেই প্রলুব্ধ করবে যা হবে আত্তঘাতী। মিন্সক চুক্তি অনুযায়ী যা করার দরকার ছিলো তাঁকে কোনোভাবেই ইউক্রেনের বা ন্যাটোর ভাংগার প্রয়োজন ছিলো না। যখন রাশিয়া ৮ বছর আগে ইউক্রেনে আর্মড কনফ্লিক্ট করে, তখনি আমি ]কিসিঞ্জার] বলেছিলাম, ইউক্রেন নিরপেক্ষ থাকুক, এবং ইউরোপ আর রাশিয়ার মাঝে একটা সেতুবন্ধন তৈরী করুক। কিন্তু তারা সেটা না করে ইউরোপের দিকে ঝুকে গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে।“  

কিসিঞ্জার আরো বলেন, “ইউরোপিয়ানদের এটা মনে রাখা উচিত যে, গত ৪০০ বছর যাবত রাশিয়া ইউরোপের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং রাশিয়ার যতো না ইউরোপকে দরকার তার থেকে অনেক বেশী দরকার রাশিয়াকে ইউরোপের। ইউরোপের তাই এটা সর্বদা মাথায় রাখতে হবে যেনো রাশিয়া কোনোভাবেই ইউরোপ থেকে স্থায়ীভাবে বিদায় না নেয়। রাশিয়া যদি স্থায়ীভাবে চায়নার সাথে মিত্রতা করে ইউরোপকে বিদায় জানায়, সেক্ষেত্রে ইউরোপের অবস্থা গুরুতর ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কারন চায়না এবং রাশিয়া মিলিত শক্তি আমেরিকা এবং ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশী এবং এটা সারা বিসশে একটা দূর্জয় নেমে আসবে। “

তিনি আরো বলেন, “ইউক্রেনের রাজনীতিদের এটা বুঝতে হবে যে, অস্ত্র চাওয়ার থেকে তাদের শান্তির প্রয়োজন তাদেরই বেশী। তাই যুদ্ধ বিরতির জন্য বা শান্তি চুক্তির জন্য ইউক্রেনকেই এগিয়ে আসতে হবে।“  

30/5/2022-রাশিয়া ১৯৯০ সাল থেকেই একটা প্যাসিভ

রাশিয়া ১৯৯০ সাল থেকেই একটা প্যাসিভ মোডে ছিলো কারন তার সক্ষমতা ভেংগে গিয়েছিলো সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের পর। অন্যান্য সুপার পাওয়ারের মতো রাশিয়া তেমন কোনো ভুমিকা রাখতে না পারার কারনে তার ফরেন পলিশি ছিলো খুবই নমনীয়। আর এই সুযোগ গ্রহন করেছিলো আমেরিকা একচ্ছত্রভাবে। ইরাক, ইরান, নর্থ কোরিয়া, আফগানিস্থান, লিবিয়া, প্যালেষ্টাইন, ভেনিজুয়েলা, ফিলিপাইন, ইত্যাদি দেশসমুহে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যায়। এ সময়ে দেশে দেশে রিজিম চেঞ্জের একটা থিউরী তৈরী হয়। যখনই কোনো দেশ এই পশ্চিমাদের বাইরে দাড়াতে চেয়েছে তখনই তাদের উপর নেমে এসছে খড়গ-আর সেটা প্রথমে নিষেধাজ্ঞা। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিবারই এই নিষেধাজ্ঞা একটা মারাত্তক অস্ত্রের মতো কাজ করেছিলো এবং সফল হয়েছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ন্যাটো, জাতীসংঘ, সেন্ট্রাল রিজার্ভ ব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল, আইসিজে, সমস্ত মিডিয়া ইত্যাদি যাইই কিছু বলি না কেনো, সব কিছুর নির্দেশদাতা যেনো একটি দেশ। আর তা হচ্ছে আমেরিকা। কোথাও কোন ট্রু জার্নালিজম নাই। ফলে যা কিছু ইচ্ছা করা যায় এমন একটা ধারনা আমেরিকার হয়েই গিয়েছিলো। সবাই তার কথা শুনতে বাধ্য, সবাই তার কথা মতো চলতে বাধ্য এবং যারাই তাদের কথামতো চলবে না, তাদেরকে একই অস্ত্রে বিদ্ধ করার ক্ষমতা তার আছে বলে আমেরিকার মনে ভয় একটু কমই ছিলো। কিন্তু রাশিয়ার বেলায়? সে তো আহত বাঘ। আহত বাঘ হয়তো প্রতিঘাত করার চেষ্টা করেনা ঠিকই কিন্তু ভিতরে তার প্রতিশোধের নেশায় থেকেই যায়। শুধু তার দরকার হয় কিছুটা সময়ের। রাশিয়া এখন ঠিক সেই জায়গাটায়।

সে হয়তো আরো পরে তার প্রতিক্রিয়া জানাতো, হয়তো সে আরো বড় প্রিপারেশনের পথে সে ছিলো। কিন্তু তাঁকে যখন কোনঠাসা করে তার ঘরের দরজায় ন্যাটো নোংগড় করতে চাইল, সে আর কাল বিলম্ব করে নাই। প্রিপারেশন তার চলমান ছিলোই। চীন, ভারত, পুর্ব এশিয়া, আফ্রিকান আর আরব দেশ মিলে তার একটা চলমান প্রিপারেশন প্রক্রিয়া ছিলোই। যা আমেরিকা বা ইউরোপিয়ানদের ছিলো না। ট্রাম যখন রাশিয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলো, সেটা এমনি এমনি করে নাই। ট্রাম্পের সাথে রাশিয়ার একটা গোপন বন্দধুত্ত ছিলো। সেই সুবাদে সে হয়তো কিছু গোপন ব্যাপার জেনেই গিয়েছিলো যা ট্রাম্প পরবর্তীতে আর গোপন রাখতে পারে নাই। আর সেটার খেসারত সে দিয়েছে নির্বাচনে পুনরায় না জিতে। সেখানেও রাশিয়ার হাত থাকতেই পারে যেমন হাত ছিলো প্রথবার ট্রাম্পের বিজয়ের উপর।

রাশিয়ার বিশেষ অভিযান (সে কিন্তু এটাকে যুদ্ধ বলে অভিহিত করে নাই, যেনো এটা একটা এক্সারসাইজ, একটা জাষ্ট অপারেশন) যখন ইউক্রেনে নেমে এলো, রাশিয়ার হোম ওয়ার্ক করা ছিলো, সব জায়গায় একতার পর একটা অপারেশনাল প্লেনের মতো সিরিয়াল করা অর্ডার এবং বিকল্প, বিকল্পের বিকল্প সাজানোই ছিলো। ২২ বছরের রাষ্ট্রপ্রধানের অভিজ্ঞতা সহ মোট ৪০ বছরের কেজিবি একজন মানুষ কে ছোট করে ভাবার কোনো কারন নাই। বর্তমান ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের লিডারস গন, ন্যাটোর কমান্দার গন কেজিবির এই প্রধানের কাছে অভিজ্ঞতায় অনেক পিছিয়ে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত দেশ গুলির আইন প্রনেতাদের মধ্যে মত ৫৫% হচ্ছেন শুধুমাত্র মহিলা যাদের পলিটিক্যাল অভিজ্ঞতা খুবই কম। কারো কারো বয়স ৪০ এর ও নীচে।  ফলে আমেরিকার জন্য এসব ইউরোপিয়ান দেশ সমুহে প্রভাব খাটানো খুব সহজ ছিলো। রাশিয়াকে ইউক্রেনের উপর আক্রমনের কারনে সেই একই আস্ত্র (নিষেধাজ্ঞা) দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হলো যা ছিলো মারাত্তক আত্তঘাতী। রাশিয়া গত ৩০ বছরের পশ্চিমাদের এই স্টাইল নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষন করে দেখেছে, কোথায় কোথায় রাশিয়াকে হিট করা হবে। রাশিয়া সেই প্রোবাবল হিটিং এরিয়া ভেবে তার বিকল্প তৈরী সে করেছিলো একমাত্র রিজার্ভ ব্যাংকের কাউন্তার মেজার ছাড়া।

ইউক্রেন অপারেশনে রাশিয়া অনেক গুলি নতুন মিলিটারী ট্যাকটিক্সের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে কিয়েভের মাত্র ১৫ কিমি দূরে থেকেও সে কিয়েভ ধংশ করে নাই এবং দুখল করে নাই। এটাকে বলা যায় ‘সুনামী ট্যাক্টিক্স”। মানে প্রথমে বীচ শুকিয়ে দেয়া, সবাই আনন্দে বীচে নামবে, পরে বড় ঢেউ দিয়ে সব তলিয়ে দেয়া হবে। রাশিয়া কিয়েভে গিয়ে সবাইকে এটাই বুঝিয়েছিলো, আর এদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের এয়ার ফিল্ডস, আর্মামেন্টস স্টোর, পিস কিপিং অপারেশন আস্থানা, যেখানে যেখানে ইউক্রেনের সামরীক সনজাম ছিলো বা তৈরী হতো সব কিছু ধংশ করছিলো। একটা দেশকে পংগু করে দেয়ার মতো।

খেয়াল করলে দেখবেন প্রাথমিক দিন গুলিতে যে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতা ব্রিন্দ, পশ্চিমা নেতা রা কি করবেন, কি করা উচিত, কি করলে কি হবে সেগুলি নিয়ে রাত ভর ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিলো, আর ওদিকে রাশিয়ার পুতিন নির্বিকার কাজ করে যাচ্ছিলো। অদ্ভুদ পার্থক্য। এক স্টন্টেনবার্গ, আরেক উরসুলা, এবং জো বাইডেন সহ বরিস ছাড়া কোন নেতার উচ্চসর শুনা যাচ্ছে না। সবাই জি স্যার জি স্যার ভুমিকায়। ফলে বারবার ভুল সিদ্ধান্ত ভুল সিগন্যাল যাচ্ছিলো ইউক্রেনের কাছে। ইউক্রেন মরিয়া কিন্তু পাশে সবাই অথচ কেউ নাই যেনো মাঠের কিনারে সবাই চিৎকার চেচামেচি কিন্তু বল শট দেয়ার মতো ক্ষমতা নাই।

২৮/৫/২০২২-প্রায় ৩০ বছর পিছিয়ে গেছে আমেরিকা

প্রায় ৩০ বছর পিছিয়ে গেছে আমেরিকা এই অঞ্চলে এই ধরনের একটা ট্রেড ইনিশিয়াটিভ গ্রুপ তৈরিতে। যেখানে চায়না, ইন্ডিয়া, রাশিয়া আরো ৩০ বছর আগে শুরু করেছিলো। এই অঞ্চলে যে কয়টা সবচেয়ে পুরানো এবং বড় ট্রেড ইনিশিয়াটিভ আছে সেগুলি (১) RCEP (২) CPTPP (৩) Belt and Road । আর এর প্রতিটিতেই চায়না, রাশিয়া আর ইন্ডিয়া জড়িত। এদের প্রত্যেকের ইনিশিয়াটিভের উদ্দেশ্য একই।

অন্যদিকে এই ১৩ টা দেশের বর্তমান যারা নতুন করে জয়েন করছে, তারা হলোঃ আমেরিকা, অষ্ট্রলিয়া, ব্রুনেই, ইন্ডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিন কোরিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, এবং ভিয়েতনাম।

এখানে রাশিয়া আর চায়না নাই বটে কিন্তু তাদের গ্রেট এলায়েন্স ইন্ডিয়া আছে, ফিলিপাইন আছে, ইন্দোনেশিয়া আছে, আর আছে ভিয়েতনাম।

হিসাবটা খুব সহজ বলে মনে হবে না।

আমেরিকা বারবার এতো তাড়াহুড়া করছে এর অন্তর্নিহিত মানে বুঝার জন্য একটা কথাই যথেষ্ট। আর সেটা হলো রাশিয়ার উপর ‘নিষেধাজ্ঞা’ দিয়ে রাশিয়া এই অঞ্চলগুলিতে একচেটিয়া বাজার ধরে ফেলতেছে আর ডলার মুদ্রা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে সুইফট ব্যবস্থা সহকারে। তাছাড়া, অল্প দামে রাশিয়া থেকে কমোডিটি পাওয়ায় অন্যান্য দেশের কমোডিটির দাম আমেরিকার কমোডিটির দামের চেয়ে কম থাকবে। ফলে আমেরিকার সব কমোডিটি খুব অচীরেই বাজারে দামের কারনে পিছিয়ে যাবে। বাজার হারানোর সম্ভাবনা খুব বেশী।

নিষেধাজ্ঞাটা খুবই খারাপ ফলাফল এনে দিয়েছে সমস্ত ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশে। একদিকে রিফুজি ক্রাইসিস নিয়ে ভোগা শুরু হবে ইউরোপের দেশ গুলি, অন্যদিকে এনার্জি সংকটে পড়ছে ইতিমধ্যে, ইউরোপিয়ান দেশগুলির মধ্যে ঐক্যের ফাটল শুরু হয়ে গেছে। সাধারন নাগরিকগন এখন আর এসব চাইছে না।

ফলে আমেরিকার সেফ এক্সিট পেতে হলে, ন্যাটো নিয়ে এতো কিছু থেকে সরে আসতে হবে, রাশিয়ার সাথে (ইন্ডিয়া, চায়নাসহ) এদের সাথে একটা সৌহার্দ্যপূর্ন কম্প্রোমাইজে আসতেই হবে।

এই যুদ্ধটার আনবিক বোমাটা হচ্ছে আসলে ইকোনোমি। রাশিয়া তাই যুদ্ধটা অনেক বিলম্ব করবেই। যত বিলম্ব হবে, ততো ইউরোপ আতঙ্কিত এবং সাফার করতে থাকবে। নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে লাভবান হয়েছে রাশিয়া। যদি সারা বিশ্ব রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দিতো, তাহলে রাশিয়ার শক্তি কমাতে পারতো। শুধুমাত্র পশ্চিমা দেশ আর ইউরোপ নিয়েই তো সারা বিশ্ব নয়। এখানেই ভুলটা হয়েছে বড় বড় নেতাদের।

18/5/2022-সুইডেন-ফিনল্যান্ডের হেরীটেজ রোগ

গতকাল একটা খবরে খুবই আশ্চর্য হয়েছি যে, ফুন ল্যান্ড এবং সুইডেনদের একটা কমন রোগ আছে যা হেরিডিটি হিসাবে বংশগতভাবে ওরা পায়। আর সেটা হলো জেনেটিক ডিস অর্ডার। এর মাত্রা কমানোর উদ্দেশ্যে ওরা যেটা করে সেটা হলো- ওরা সুইডেন-সুইডেন, বা সুইডেন ফিনল্যান্ড, বা ফিনল্যান্ড-ফিনল্যান্ড কাপ্লিং থেকে বিরত থাকে। কারন উভয় বাবা মা যাদের জেনেটিক ডিস অর্ডার আছে, তাদের বাচ্চাদের ও সেই একই জেনেটিক ডিস অর্ডার  হ ওয়ার সম্ভাওবনা প্রায় শতভাগ। তাই ওরা সব সময়ই চায়, ফিন ল্যান্ড-রাশিয়ান, সুইডেন-রাশিয়ান কাপ্লিং করতে। এর ফলে যেটা হয়েছে, সেটা হলো, প্রায় প্রতিটি সুইডিস বা ফিনিশ পরিবারেই রাশিয়ান বংশভুত নাতি পুতি বিদ্যমান।

ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার এত বড় সিদ্ধান্তটা কোনো দেশই রেফারেন্ডামে আনতে ভয় পাচ্ছে, কারন মিডিয়া হয়তো অতি রঞ্জিত করে ন্যাটোতে যোগ দেবার জনগনের রায় দেখাচ্ছে ৮০% এর উপরে, অথচ বাস্তবে ৪০% এর ও নীচে সাধারন জনগনের সায় আছে বলে এক সুইডিস সাংবাদিক গতকাল TFI Global এর বরাত দিয়েছে।

ওরা ন্যাটোতে যোগ দিক বা না দিক সেটা তাদের ব্যাপার, কিন্তু যদি পরি সংখ্যান টা এমনই হয়, তাহলে তো দেখা যাচ্ছে নাতি পুতিদের মধ্যে এবার যুদ্ধ বা ঝগড়ার সূচনা শুরু হয়ে গেলো।

১৪/০৫/২০২২-ফিনল্যান্ড নয়াটোতে জয়েনের আগ্রহ

গতকাল ১২ মে তে প্রেসিডেন্ট সুওলি নিনিতসু ন্যাটোতে যোগ দেয়ার কথা অফিশিয়ালী জানিয়েছেন। তাতে রাশিয়া ফিনল্যান্ডের উপর খুবই নাখোস।  এই দুটু বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমার নিজস্ব কিছু বিশ্লেষনঃ

যে কোনো সাধীন দেশ তার নিজের দেশের সার্থের কারনে যে কোনো আন্তর্জাতিক জোট করতেই পারেন। এটা সে দেশের ইখতিয়ার। সেই দিক দিয়ে আমি বল্বো, ফিনল্যান্ডের সিদ্ধান্ত শতভাগ সঠিক। সুইডেনের ব্যাপারেও তাই।

অন্যদিকে আসি, ন্যাটোতে কেনো যেতে হবে তাহলে? কারন ন্যাটো ইউরোপকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতবদ্ধ। এটাই সবার জানা। কিন্তু ন্যাটো যখন গঠিত হয় সেটা আসলে শুধু ইউরোপকে সুরক্ষিত দেয়ার জন্য হয়েছে এটা বললে একটু ভুল হবে, এটা আসলে চিরাচরিত সর্বদা রাশিয়াকে যেভাবেই হোক সাইজ করার জন্য। আর এই সত্যটা রাশিয়া জানে। তারমানে এই দাঁড়ায় যে, ন্যাটো এবং রাশিয়া আজীবন একটা বৈরী সম্পর্কের নাম।

রাশিয়া ১৯৯০ সালের পর থেকে ধরা যায় একটা আত্তগোপনেই নিজের মধ্যে নিজেরা আছে। আশেপাশের কাউকে খুব একটা ডিস্টার্বড করছিলো না। তারপরেও বিভিন্ন পলিটিক্যাল কর্মকান্ডে যে নাই সেটা নয়, যেমন সিরিয়ার আসাদের সাথে তার একচ্ছত্র ফ্রেন্ডশীপে সিরিয়া বিধ্বস্ত, মায়ানমারের সইরাশাসকদের সাথে আতাত করে রোহিংগাদের বিতাড়ন এসব। ক্রিমিয়ার ব্যাপারটা আলাদা। এসব বিগপাওয়ারগুলি সবসময় একটা এজেন্ডা নিয়েই থাকে, আর তাতে বেশ অনেক জাতী, অনেক দেশ আজীবন ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নিপিড়িত হতে থাকে। যেমন আমেরিকা করেছে ইরাক, প্যালেস্টাইন, ইরান, কিউবা, আফগানিস্তান, লিবিয়া এমন আরো অসংখ্য দেশে। এটাই ওদের কাজ। কেউ দুধে ধোয়া তুলসীপাতা নয়।

এখন ঝগড়াটা লেগেছে ইউক্রেনকে ঘিরে কিন্তু মারামারিটা করছে সেই রাশিয়া আর পশ্চিমা তথা ন্যাটোজোটই। মাঝখান দিয়ে অতি সাধারন মানুষগুলি বাস্তহারা হচ্ছে, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখছে, বয়ষ্ক মানুষগুলির আয়ু সংক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একটা দেশ লন্ডভন্ড হয়ে চিরতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারোরই লাভ হচ্ছে না, লস হচ্ছে শুধু সেখানটায় যেখানে বোমা আর মিজাইল পড়ে ক্ষত হচ্ছে পুরু দেশ তাদের।

ফিনল্যান্ড এবার যেনো টার্গেট হতে যাচ্ছে রাশিয়ার। কিন্তু রাশিয়ার জন্য ব্যাপারটা অতো সহজ হবে না যতোটা সে ইউক্রেনে করতে পারছে। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আর্টিলারী ইকুইপমেন্ট (রাশিয়া ব্যতিত) আছে ফিনল্যান্ডের। খুবই শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম আছে ফিনল্যান্ডের, ট্যাংকের দিক দিয়েও ফিনল্যান্ড অত্যান্ত শক্তিশালী এবং তাদের আছে অত্যাধুনিক Leo 2´s plus এন্টি ট্যাংক মিজাইলস যাদের মধ্যে আছে Swedish-U.K. NLAW, the U.S. made TOW, Israeli made SPIKE-missile  ইত্যাদি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অতি পরিকল্পনা মাফিক এবং মনোযোগের সহিত ফিনল্যান্ড তাদের ডিফেন্স সিস্টমকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে, প্রায় ৮ লক্ষ নাগরীক রিজার্ভ ফোর্সে আছে, দেশের প্রায় ৮০% স্থলভাগ ফরেস্ট অধ্যুষিত এলাকা এবং রাস্তাগুলি এমনভাবে বানানো যা সব ডিফেন্স ফোর্সের পরিকল্পনা মাফিক। ইউক্রেন যুদ্ধে ফিনল্যান্ড সুইডেনের মতো এ রকম প্রকাশ্যে কোনো কিছুই করে নাই অথচ করেছে। তুরষ্কের পরে ফিনল্যান্ডের আছে দ্বিতীয় বৃহত্তম ল্যান্ডফোর্স। প্রকৃত কথা হচ্ছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিনল্যান্ড তাদের ডিফেন্স সিস্টমকে একেবারে পরিকল্পনা মাফিক সাজিয়ে গেছে। এ কথাটা প্রকৃত আভাষ পাওয়া যায়, তাদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট  সুওলি নিনিতসু গত ১২ মার্চ ২০২২ তারিখে রাশিয়ার আগ্রসন এবং ফিনল্যান্ডের অবস্থানের উপর রিপোর্টার আমানপোরের এক প্রশ্নের উত্তরে-আমানপোর প্রশ্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট সিওলি নিনিতসুকে, Are you scared? উত্তরে প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, We are not scare but we are awake.

এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আর রাশিয়ার পুতিনের সম্পর্কটা কি রকম। দুটুই খুব ডিপ্লোমেটিক চরিত্রের। খুব কম কথা বলে। ওদের একটা বাক্যে অনেক কিছু প্রকাশ করার মতো ক্ষমতা থাকে।

Finland’s President Sauli Niinistö has known Putin for a decade and often acts as a de facto interpreter, explaining the Russian president’s thinking to Western allies – and vice versa. Niinistö is among a handful of world leaders who continue to contact the Russian president, trying to put a stop to the war.

ফিনল্যান্ড এ যাবতকাল রাশিয়ার প্রতিবেশী হিসাবে ভালোই ছিলো এবং রাশিয়াও ফিনল্যান্ডকে নিয়ে কোনো দুসচিন্তায় ছিলো না। ইউক্রেন যুদ্ধ ফিনল্যান্ডকে ভাবিয়ে তুলেছে, অন্যদিকে ঘোলা পানিতে মাছ ধরার মতো একটা পরিস্থিকে কাজে লাগিয়ে ন্যাটো এবার ফি ল্যান্ডের কান ভারী করে তাদেরকেও ন্যাটোর সদস্য করতে উঠে পড়ে লেগেছে কারন ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ার সাথে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার কমন বর্ডার নিয়ে আছে। আর ন্যাটোত চাচ্ছেই রাশিয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে যাক যাতে রাশিয়া নড়াচড়া করতে না পারে।

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট সিওলি নিনিতসুর সাথে একবার পুতিনের আন্তরীকভাবে কথা হয়েছিলো (ওরা আসলে একসাথে অনেক বছর ধরে ঘোড়া দৌড় খেলতো, ওরা দুজনেই ভালো স্পোর্টসম্যান) এই ন্যাটো সংক্রান্ত ব্যাপারে। প্রেসিডেন্ট সিউলি নিনিতসু জিজ্ঞেস করেছিলো, যদি তারা ন্যাটোতে যোগ দেয়, তাহলে পুতিনের জবাব কি? পুতিন বলেছিলো যে, এখন আমরা ফিনল্যান্ডের প্রতিটি বর্ডার গার্ডকে বন্ধু মনে করি, কিন্তু তোমরা যদি ন্যাটোতে যোগ দাও, তাহলে তাদেরকে আর আমরা বন্ধুর চোখে দেখবো না।

এই বক্তব্যগুলি মারাত্তক। কারন, পুতিন খুব ডেস্পারেট চরিত্রের মানুষ। সে মনে করে ইউরোপ, পশ্চিমারা রাশিয়াকে অনেক অনেক ক্ষতি করেছে এবং এখনো তারা তার ক্ষতিই চায়। সে এটাও মনে করে যে, রাশিয়া যদি ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতে নিঃশেষই হয়ে যায়, তাহলে অন্যদের আর বাচিয়ে রেখে লাভ কি? এটা একটা ভয়ংকর ধারনা। সুইসাইডাল মানুষের কাছে প্রিথিবীর কোনো কিছুই দামী নয়।

ফিনল্যান্ড হয়তো ভীতু নয়, কিন্তু রাশিয়া যেহেতু তার অস্তিত্ব সংকটে ভোগছে ফলে মরন কামড় দিতে তার কোনো ভয় নাই। আর এই কারনে ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের আরো সময় নেয়া উচিত ন্যাটোর আতিশয়তায় কিংবা উচ্ছসিত অভিনন্দনে এই মুহুর্তে পা না দেয়া বা ন্যাটোতে যোগ না দেয়া। তাতে রাশিয়ার কি হবে সেটা তো সে আগেই ভেবে নিয়েছে, অস্তিত্ব সংকট, ফলে যা হবে সেটা হলো রাশিয়া ফিনল্যান্ডকে আঘাত করবেই। ফলাফল কি হবে সেটা যাই হোক। এতে ন্যাটোর হয়তো কিছুই হবে না, মাঝখান দিয়ে সাজানো একটা দেশ যুদ্ধের কবলে পড়ে শান্তি নষ্ট হবে আর সাধারন মানুষ বিপাকে পড়বে। ন্যাটোর সদস্যপদ পাইতেও ফিনল্যান্ডের হয়তো আরো বছরের উপর লেগে যাবে যদি সবদেশ তাদের পার্লামেন্টে এটা পাশ করে। তানা হলে হয়তো আরো অধিক সময় পার হবে। সেই অবধি ন্যাটোর পক্ষে ফিনল্যান্ড এর জন্য কিছুই করার ইখতিয়ার নাই। ফিনল্যান্ডকে একাই ফেস করতে হবে রাশিয়াকে। ইউক্রেনও ভীতু ছিলো না, তারাও Awaken ছিলো, কিন্তু পরিশেষে কি দেখা গেলো? সারাটা দেশ এখন ধুলিস্যাত।

FINLAND IS ONE OF THE BEST COUNTRIES IN THE WORLD, WANTING ONLY PEACE, AND HAS AND NEVER WILL START ANY WAR.

12/05/2022-খুব দ্রুত রাশিয়া ইউক্রেনে তাদের

(১) খুব দ্রুত রাশিয়া ইউক্রেনে তাদের স্পেশাল অভিযান আপাতত স্থগিত করবে কারন রাশিয়ার উদ্দেশ্য যা ছিল তার প্রায় বেশিরভাগ সম্পন্ন। স্পেশাল অপারেশন বন্ধ করলে রাশিয়ার লাভ দুটু। এক. আমেরিকা বা অন্য দেশ ইউক্রেনে আর যুদ্ধাস্ত্র পাঠানোর ব্যবসাটা করতে পারবে না। দুই. ওদিকে সে ইউক্রেন ছেড়েও দেবে না। জাষ্ট পাহাড়াদারের মত অবস্থান। তার শক্তিও ক্ষয় হবে না।

(২) অন্যদিকে চীন তৈরী হচ্ছে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের স্ট্যাটাস এবং ইন্দোপ্যাসিফিক কন্ট্রোল নিয়ে। কথাবার্তা ঠিক মনে হচ্ছেনা।

(৩) দুইটা সুপার পাওয়ারের সাথে একই সংগে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয় আমেরিকার।

(৪) আরব বসন্তের মতো এবার আবার পশ্চিমা বা ইউরোপিয়ান বসন্তের বাতাস বইতে শুরু না করে। কারন জার্মানি, ইউকে, আমেরিকায় ইনফ্লেশনে সাধারন জনগন ধীরে ধীরে ক্ষিপ হচ্ছে।

(৪) কাতারের সাথে জার্মানের তেল বিষয়ক কথাবার্তা বিফল হচ্ছে। বিকল্প তেল না পেয়ে জার্মানি বোকার মত রাশিয়ার তেল গ্যাস পুরুপুরি বর্জনের কথা আগাম বলে দিয়েছে যা আপাতত মনে হচ্ছে ভুল হয়েছে।

(৫) ইউক্রেন নিজের থেকে ইউক্রেনের ট্রাঞ্জিট দিয়ে তেল গ্যাস বন্ধ করায় জার্মানি, ইউক্রেন, স্লোভাকিয়া, পোল্যান্ডে এখন ওয়ান থার্ড সরবরাহ বন্ধ। ফলে ইউরোপের ইউনিটিতে একটা ফাটল দেখা যাচ্ছে।

(৫) গতকাল দেখলাম চীন খুব স্পষ্ট ভাষায় আমেরিকাকে হুশিয়ারী দিয়েছে এভাবেঃ আমেরিকা উইল বি হার্ট ইফ দে ইন্টারফেয়ার এবাউট তাইওয়ান স্ট্যাটাস এন্ড ইন্দোপ্যাসিফিক ইস্যু। কথাটা ছিলোঃ হার্ট। বিপদজনক ঠান্ডা কিন্তু কঠিন শব্দ।

(৬) চীন তার ডলার রিজার্ভের ব্যাপারে নিরাপদ রাখার সিস্টেম উদ্ভাবন করছে in case sanctioned. কথা হচ্ছে- চীন নিষেধাজ্ঞার কথা মাথায় নিচ্ছে কেনো? সামথিং রঙ।

(7) চীনের সরকারী সব অফিস আদালতে চাইনিজ মেইড কম্পিউটার রিপ্লেস করছে। চীনের ব্যাংকিং সেক্টর সুইফটকে বাইপাশ করে কিভাবে ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজেকশন চালু রাখা যায় সেটা ইতিমধ্যে চালু করেছে।

এই রকম অনেক হোমওয়ার্ক চীন করে যাচ্ছে, যার আলামত আসলেই বিপদজনক।

পচা শামুকে কার কার যে পা কাটে বা কাটবে, একমাত্র সময় বলতে পারে।

06/05/2022-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভুমি

১৮ শতাব্দীর শেষের দিকে জন্ম আজকের ইউক্রেনের। ইতিহাসের শেষের অধ্যায়ে এসে ইউক্রেন পোল্যান্ড এর গন্ডি থেকে বেরিয়ে যায় এবং তখন ইউক্রেন অষ্ট্রিয়া-রাশিয়ার মাঝামাঝিতে বর্দার করে অবস্থান নেয়। রাশিয়ার কাছাকাছি অংশটি প্রধানত রাশিয়ান ভাষাতেই বেশী অভ্যস্থ যদিও তারা ইউক্রেনেরই নাগরীক।

(ছোট নোটঃ After the Union of Lublin in 1569 and the formation of the Polish–Lithuanian Commonwealth, Ukraine fell under the Polish administration, becoming part of the Crown of the Kingdom of Poland)

ইউক্রেনের প্রাগৈতিহাসিক কাহিনীতে না যেয়ে আমি ১৯৯১ সাল থেকে ইউক্রেনের বিষয়টি যদি বিশ্লেষন করি দেখা যাবে- বার্লিন পতনের ২ বছর পর ১৯৯১ সালে যখন ইউক্রেন স্বাধীনতা পেলো, ঠিক তখন থেকেই ইউক্রেনের ভিতরে রাজনৈতিক এবং কূটনইতিক ঝামেলার শুরু। প্রাথমিকভাবে এটা ছিলো ইউরোপ এবং রাশিয়ার জিওকালচার এর বিভক্তির কারনে। কিন্তু  ২০০৪ সালের অরেঞ্জ রেভুলিউশন দিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। অরেঞ্জ রেভুলিউশন হলো- a series of protests and political events that took place in Ukraine from late November 2004 to January 2005, in the immediate aftermath of the run-off vote of the 2004 Ukrainian presidential election, which was claimed to be marred by massive corruption, voter intimidation and electoral fraud.

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী Viktor Yushchenko এবং Viktor Yanukovych এর মধ্যে ভোট কারচুপির ঘটনায় এই অরেঞ্জ রেভুলিউশন। যদিও Viktor Yushchenko  জয়ী হন কিন্তু এটা দেশের জনগন মেনে না নেওয়ায় দেশের ভিতরেই উত্তপ্ত অবস্থা চলতে থাকে। অবশেষে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় এবং নিরপেক্ষ ভোট গননায় শেষমেষ ৫২% ভোটে জয় দেখিয়ে Viktor Yushchenko কেই প্রেসিডেন্ট হিসাবে আদেশ দেয়া হয় এবং অরেঞ্জ রেভুলিউশনের নিষ্পত্তি হয়।

এর মধ্যে অন্য অঞ্চলে একটা অঘটন ঘটে যায়। জর্জিয়া আগে থেকেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যোগ দেয়ার জন্যে উম্মুখ হয়েছিলো। এই সময়ে জর্জিয়ার মতাদর্শে যুক্ত হয় ক্রোয়েশিয়া এবং ইউক্রেন।  রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জর্জিয়া এবং ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদ দিতে না করেন ন্যাটোকে। ফলে ন্যাটো শুধুমাত্র ক্রোয়েশিয়াকে সদস্যপদ দিয়ে জর্জিয়া এবং ইউক্রেনকে বাদ দেয় ঠিকই কিন্তু ইউক্রেনের বেলায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন একটা “association agreement” করে যার লক্ষ্য বলা হয় Implementation of the association agreement could mean major changes in Ukraine that would bring it closer to EU standards. রাশিয়া ইউরোপিয়ানের এবং ন্যাটোর এই উদারতাও পছন্দ করে নাই। আবার অন্যদিকে রাশিয়ার কারনে জর্জিয়া ন্যাটোতে যুক্ত হতে না পারায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে জর্জিয়া আন্দোলন শুরু করলে ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমন করে এবং Abkhazia and South Ossetia কে জর্জিয়া থেকে আলাদা সার্ভোমত্ত স্ট্যাটাস প্রদান করে।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, প্রেসিডেন্ট Viktor Yushchenko  এর আমলটা তার ভালো কাটে নাই এবং তিনি জর্জিয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই আক্রমনে জর্জিয়ার পক্ষ নেয় যার ফলে ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার একটা শত্রুতামুলক সম্পর্ক তৈরী হয়। অবশেষে ২০১০ সালে তিনি ভোটে হেরে যান এবং Viktor Yanukovych (যিনি ২০০৪ সালে হেরে গিয়েছিলেন, তিনি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু তার ক্ষমতায়নের সময়ে তিনিও বিরোধি দলের দাপটে দেশ পরিচালনায় ভালো করতে পারেন নাই ফলে সারা দেশ জুড়ে ‘মাইডান স্বাধীনতা চত্তরে” বিশাল গনঅভ্যুথানে ২০১০ সালে (ক্ষমতার ৪ বছর পর) ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হন। একেই মাইডান বেভুলিউশন নামে পরিচিত। মাইডান রেভুলিউশনের মাধ্যমে ইউক্রেনিয়ানরা চেয়েছিলো যে, “association agreement”  যা কিনা এক অর্থে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে একাত্ততা বা সদস্যপদ লাভে একটা দরজা খোলা রাখা সেটা ঘোষনা করা আর সাক্ষরিত হওয়া। Viktor Yanukovych  ছিল প্রো-রাশিয়ান। তিনি সেটা করতে অস্বীকার করেন। এই সময়ের বিরোধী পার্টির নেত্রী মহিলা Tymoshenko ছিলেন রাশিয়া বিরোধি কিন্তু ইউরোপিয়ান পক্ষীয় মতাদর্শের।  ক্রমাগত তার দাবী এবং আন্ডলন চলতে থাকলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইউনোকোভিচ ২০১১ সালে তাঁকে এরেষ্ট করেন এবং ৭ বছরের জেল দেন। এসব জটিল রাজনৈতিক টালমাতাল অবস্থায় শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট Viktor Yanukovych  রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং প্রোসেংকু নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহন করেন।

প্রেসিডেন্ট প্রোসেংকো ছিলেন প্রো-ওয়েষ্টার্ন। তিনি প্রেসিডেন্ট হবার পরে সর্বাত্তক চেষ্টা করেন যাতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যোগ দেয়া যায়। এখানে বলা বাহুল্য যে, প্রেসিডেন্ট প্রোসেংকোকে ব্যবহার করে আমেরিকা এবং ইউরোপ বেশ কিছু কাজ করে ফেলেন। তদানিতন ওবামা প্রশাসন ২০১৪ সালে ওয়েষ্টার্ন লিড ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কার্যাদি দেখভালের জন্য তদানিন্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে প্রধান করে ওবামা প্রশাসন ইউক্রেনের দায়িত্ত দেন। এই কার্যাদির মধ্যে যেতা ছিলো তা হচ্ছে- ডনবাস, ডনেস্ককে এই দুই অঞ্চলকে রাশিয়ার মতাদর্শ থেকে উতখাত করা। কারন ইউক্রেন সর্বদা এদেরকে প্রো-রাশিয়ান ভাবতো, এখনো ভাবে। ফলে এদের উপর চলে সর্বাত্তক হামলা, আক্রমন, এবং সামরীক অভিযান। ওদেরকে এক প্রকার রাজাকারের মতো ট্রিট করা হতো এবং এই দুই অঞ্চলের মানুষ তথা রাশিয়ান স্পিকিং ইউক্রেনিয়ানদেরকে নির্দিধায় খুন, বাস্তুহারা এবং শারীরিক টর্চারে নিমজ্জিত করতে শুরু করে। শুরু হয় জটিল সমীকরন। উপায়ন্তর না দেখে রাশিয়া এই দুই অঞ্চলকে সাহাজ্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ২০১৪ সালে মালিয়েশিয়ান যাত্রীবাহী প্লেন ২৯৮ জন যাত্রীসহ ইউক্রেনে মিজাইল ফায়ারে নিপতিত হলে উক্ত দোষ রাশিয়ার উপর চাপিয়ে দেয় যদিও রাশিয়া সেটা প্রত্যাখ্যান করে। একদিকে রাশিয়ার সাপোর্টে ডনবাস, ডোনেস্ক অস্ত্র তুলে নেয় অন্যদিকে ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট প্রোসেঙ্কোর নেত্রিত্তে ডনবাস এবং ডোনেস্ক এবং ক্রিমিয়ার মানুষগুলিকে সরকারী সামরীক বাহিনী, অস্ত্র এবং সৈনিক দিয়ে উতখাত করার সর্বাত্তক চেষ্টা করে। অবশেষে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। রাশিয়ার এহেনো তীব্র সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট প্রোসেঙ্কো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে মিনস্কে এক বৈঠকে মিলিত হন যেখানে ফ্রান্স প্রেসিডেন্ট President Francois Hollande এবং German Chancellor Angela Merkel এর উপস্থিতি ছিলো। উক্ত বৈঠকে ১৩টি শর্ত সাপেক্ষে যুদ্ধ বিরতি কিংবা অবসানের ঘোষনা দেন উভয় পক্ষ। আর সেটাই হলো মিনস্ক চুক্তি। লক্ষ্য ছিলো- end the war, an immediate cease-fire and the withdrawal of all heavy weaponry in order to create a “security zone.”

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, উক্ত মিনস্ক চুক্তি ইউক্রেন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে উলটা আমেরিকার দ্বারস্থ হয়। তখন তদানিতন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনে লিথ্যাল অস্ত্র সরবরাহ বিক্রির অনুমোদন দেয় যা ওবামা প্রশাসন করতে না করেছিলো। আর একাজে ট্রাম তার ডিফেন্স এডভাইজার কার্ট ভলগারকে দায়িত্ত দেন। ব্যাপারটা এখানেই শেষ ছিলো না। বরং আমেরিকা Ukraine Security Assistance Initiative এর নামে প্রচুর পরিমান সামরীক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষে আর্থিক সাহাজ্য দেয়ার জন্য কংগ্রেসে অনুমোদন পাশ করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে রাশিয়া আমেরিকাকে এই অঞ্চলে একটা প্রক্সি ওয়ারের সামিল হওয়া হিসাবে গন্য করছিলো। Russia accuses the United States of encouraging the break in order to weaken Moscow, and a Kremlin spokesperson reissues a promise to defend “the interests of Russians and Russian-speakers.”

২০১৯ সালে ভ্লডিমির জেলেনেস্কী প্রায় ৭০% শতাংশ ভোটে প্রেসিডেন্ট প্রোসেংকোকে হারিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়। জেনেস্কীর পার্টি পার্লামেন্টেও মেজরিটি পায়। তার ইলেকশন মেনিফেষ্টু ছিলো-(ক) দূর্নীতি এবং দারিদ্রতা দূরীকরন (খ) পুর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধকে দমন করা।

জেনেস্কী প্রেসিডেন্ট হয়েই তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন এবং এক টেলিফোন বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেলেনেস্কীকে এক প্রকার উষ্কানীই দিয়েছেন বলে জানা যায় যাতে ইউক্রেন অতি সত্তর রাশিয়ার বিরুদ্ধে এবং আমেরিকার নেত্রিত্তে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে তথা ন্যাটোতে যোগদানের পথ তরান্নিত করে।

(https://edition.cnn.com/2019/09/25/politics/donald-trump-ukraine-transcript-call/index.html)

যাই হোক, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কিংবা অন্য কারো ফেক ভরসায় প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কী গত ২০২০ এর জুনে ইউক্রেন NATO Enhanced Opportunities Partner তে নাম লিখায়। যেখানে অষ্ট্রেলিয়া, জর্জিয়া, ফিনল্যান্ড, জর্দান, এবং সুইডেনও ন্যাটোর যুগ্ম মিশন এবং সামরীক মহড়ায় অংশ নিতে অংগীকার বদ্ধ হয়। একই বছর সেপ্টেম্বরে জেলেনেস্কী তার পার্লামেন্টে ন্যাটোতে যোগ দেয়ার দৃঢ় অংগীকার হয়ে National Security Strategy অনুমোদন করে যার অর্থ ছিলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ইউক্রেন ন্যাটোতে এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ। উক্ত আইন পাশ করার পরে জেলেনেস্কী ফেব্রুয়ারী ২০২১ সালে অনেকগুলি কাজ করে ফেলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-(ক) ইউক্রেনের রাশিয়াপন্থী অলিগার্দের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন বিশেষ করে অইলিগার্গ ভিক্টোর মেদ্ভেদচুক যিনি ইউক্রেনের বৃহৎ প্রো-রাশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টির চেয়ারম্যান (খ)  ইউক্রেনের সরকার মেদ্ভেদচুকের সমস্ত আর্থিক এসেট কব্জা করেন (খ) রাশিয়ার সমস্ত টিভি চ্যানেল ইউক্রেনে সম্প্রচার বন্ধ করেন (গ) জাতীয় স্লোগান- ইউক্রেন শুধু ইউক্রেনিয়ানদের জন্য, আর বাকী সব অবৈধ।

রাশিয়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলো যে, এখানে শুধু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীই জড়িত নয়, তারসাথে আমেরিকা এবং ইউরোপ সামিল। তাই ভ্লাদিমির পুতিন ডিসেম্বর ২০২১ থেকে জানুয়ারী ২০২২ পর্যন্ত তার দখলে থাকা ক্রেমিয়ায় অজস্র সামরীক যন্ত্রাদি এবং সৈন্য মোতায়েন শুরু করে। তবে একই সাথে পুতিন আমেরিকা এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে এইমর্মে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নিতে বলেন। সেখানে পুতিন Set of Security Gurantees নামে একটা কন্সেপ্ট পেপারও দাখিল করেন-This includes a draft treaty calling for tight restrictions on U.S. and NATO political and military activities, notably a ban on NATO expansion. The Biden administration delivers written responses in January; few details are made public, but it rejects Russia’s insistence that Ukraine never be accepted into NATO and proposes new parameters for security in the region.

রাশিয়ার এজেন্ডাকে ন্যাটো বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কোনো প্রকার গুরুত্ত না দিয়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ এ  Germany announces the suspension of the Nord Stream 2 pipeline, while the United States, EU, and UK pledge additional financial sanctions against Russian entities. রাশিয়া ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২২ তারিখে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালায়।

5/5/2022-কে জিতছে এই যুদ্ধে?

একটা যুদ্ধ হচ্ছে রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে যেনো এটা একটা ঘরোয়া ব্যাপারের মতো যদিও রাশিয়া তার পার্শবর্তী সাধীন দেশ ইউক্রেনকে আক্রমন কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারেনা। তারপরেও এটা বাস্তবে ঘটেছে। এখন এই যুদ্ধের বা অপারেশনের বিশ্লেষনে যদি যাই আমরা কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর এখনো জানি না বলেই মনে হচ্ছে।

এই যুদ্ধে কার কি ইন্টারেষ্ট, যদি সেটা জানা যায়, তাহলে হয়তো ব্যাপারটা আচ করা সম্ভব। একটা জিনিষ খেয়াল করেছেন সবাই যে, আমরা যারা আমজনতা, যাদের পোট্রেইট মিডিয়া ছাড়া অন্য কোনো মিডিয়ায় এক্সেস নাই বা যেতে চাই না। আর সোস্যাল মিডিয়া হচ্ছে সবচেয়ে অনির্ভরশীল একটা প্রোপাগান্ডার মাধ্যম। পোট্রেইট মিডিয়াগুলিতে প্রতিনিয়ত এটা দেখছি যে, পশ্চিমা মিডিয়াগুলি

(ক) অনবরত ইউক্রেন জিতে যাচ্ছে, ইউক্রেন জিতবেই এ ধরনের খবর দিচ্ছে। এই খবরগুলির পিছনে কতটা গ্রাউন্ড তথ্য নিয়ে বিশ্লেষন করা তা কিছু কেউ জানাচ্ছে না।

(খ) কোনো পশ্চিমা দেশ বা ইইউ কিন্তু এই যুদ্ধটাকে থামানোর জন্য এগিয়ে আসছে না।

(গ) বরং যে যেখান থেকে পারে, সব ইইউ দেশগুলি একযোগে টাকা পয়সা, অস্ত্র, ট্রেনিং এমনকি বিশেষ টেকনোলজি এবং প্রোপাগান্ডা দিয়ে ইউক্রেনকে সাহাজ্য করছে এবং পিস টকে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছেই না।

(ঘ) সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- পশ্চিমা পক্ষসহ ইইউ আগ্রাসী রাশিয়ার কোনো কথাই শুনতে নারাজ বিধায় তাদের মিডিয়া পুরু দুনিয়া থেকে ব্লক, তাদের সাথে কোনো সেমিনারে বসলে ওয়াকআউট ইত্যাদিও করছে। অর্থাৎ আমাদেরকে যা শুনতে হবে তা শুধু একপক্ষ থেকে। তাহলে দুই পক্ষ না শুনে আমরা যারা আমজনতা তারা কিভাবে বিচার করবো কে কতটুকু দোষী বা দায়ী?

কার কি ইন্টারেষ্ট

এবার একটু এদিকে নজর দেই। যুদ্ধটা হচ্ছে ইউক্রেনে যে কিনা ইইউর সদস্যও নয়, আবার ন্যাটোরও না। অথচ ইইউ এবং ন্যাটো পুরু ইউক্রেন যুদ্ধটাকে যেনো নিজের যুদ্ধ মনে করে এগিয়ে নিচ্ছে। অথচ ইউক্রেনকে গত ১৪ বছর যাবত ইইউ এর সদস্যপদ বা ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করার আশা দিয়েও ইইউ বা ন্যাটো তাঁকে কোনো সদস্যপদ দিতে নারাজ ছিলো। তাহলে হটাত করে সবাই ইউক্রেনের জন্য এতো উঠে পড়ে লাগলো কেনো? কার কি ইন্টারেষ্ট এখানে? যে পরিমান ডলার, আর অস্ত্র ইউক্রেনে এ যাবত দেয়া হয়েছে, কার কাছে যাচ্ছে, কে ইউজ করছে, কিভাবে সেগুলির কন্ট্রাক্ট কিছুই কিন্তু ফলোআপ হচ্ছে না। অথচ এই পরিমান অর্থ যদি যুদ্ধের আগে এই ইউক্রেনকে দেয়া হতো, তাহলে ইউক্রেন ধনী দেশসমুহের মধ্যে একটা হয়ে যেতো।

 

ইউকে

ইউকে খুব অল্প কিছুদিন আগেই ইইউ এর সদস্যপদ থেকে নিজের ইচ্ছায় বেরিয়ে গেছে কারন তার পোষাচ্ছিলো না। যে বাজেট দিয়ে তাঁকে ইইউ তে থাকতে হয় আর কমন এজেন্ডায় থাকার কারনে অন্য ২৭টি দেশ থেকে যেভাবে ফ্রি মাইগ্রেশন হয় ইউকে তে, তাতে তাদের লাভের থেকে ক্ষতি অনেক বেশী হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, সবচেয়ে বেশী লাভ হয় আসলে অন্যান্য দরিদ্র ইইউ এর দেশগুলির যাদের মেম্বারশীপ ফিও কম, আবার সদস্য থাকায় তাদের জন্য বরাদ্ধ বোনাস অনেক বেশী। তাই ইউকে এর নাগরিকগন ব্রেক্সিট এর মাধ্যমে এই ইইউ থেকে চিরতরে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ন্যাটো যেহেতু একটা কোঅর্ডিনেটেড ডিফেন্স সিস্টেম, তাই ইউরোপ তার নিজস্ব ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে না তোলা পর্যন্ত ইউকে কে থাকতে হবে এমন শর্তেই ইইউ ইউকেকে সদস্যপদ খারিজ করার অনুমতি দিয়েছিলো। ফলে, ইউকে এর আধিপত্যতা ইইউ দেশসমুহে প্রায় নাই বললেই চলে একমাত্র ন্যাটো কান্ট্রির ডিফেন্স নিরাপত্তার একজন সদস্য ছাড়া। কয়েকশত বছর সারা দুনিয়া চষে বেড়ানো ইউকে, তার মোড়লগিড়ি কখনোই ছাড়তে চায় না, কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, তার হাত ক্রমশই ইন্টারন্যাশনাল এরিয়াতে দূর্বল হওয়াতে সে আগের হাবভাব ধরে রাখা সম্ভবও হচ্ছিলো না। আর এজন্যই অন্তত ন্যাটোর ডিফেন্স বলয়ে থেকে এবং একটা গ্রেট পাওয়ারের মাহাত্যে এই যুদ্ধে আসলে সরগরম থাকতে চাচ্ছে ইউকে। তাছাড়া আমেরিকার বলয় থেকে ইউকে যেতে পারবে না বা যেতেও চায় না। কারন ইউরোপিয়ান ফেডারেল সেন্ট্রাল ব্যাংক এই ইউকের জন্য একটা মারাত্তক আর্থিক অস্ত্র যেটা না থাকলে ইউকে এর অনেক ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। এটাকে ধরে রাখাও ননমেম্বার ইউকে এর বিশেষ চাল। ফলে, একটা এটা তার আর্থিক নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত করে তেমনি তার আধিপত্যতা বজায়ের একটা মই ছাড়া আর কিছুই না। অন্যদিকে ইউকে এই রাশিয়া বা ইউক্রেনের বেশীর ভাগ পন্যের উপর যেমন তেল, গ্যাস, অন্যান্য কমোডিটির উপর সে নির্ভরশীলও নয়। তাই, ইউক্রেন ধংশ হলেই কি আর বেচে গেলেই কি। অন্যদিকে পুরানো শত্রু রাশিয়া যদি এই যুদ্ধে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাতে ইউকে এর লাভ ছাড়া তো ক্ষতি নাই।

ইউএসএ

আমেরিকা কিন্তু ইইউ দেশের সদস্য নয়। কিন্তু সে ন্যাটোর সদস্য। দুটু দুই জিনিষ। আপনি যদি লয়েড অষ্টিনের সর্বশেষ বক্তব্যটা শুনেন, দেখবেন তিনি সেখানে বলেছেন, আমরা রাশিয়াকে অতোটাই দূর্বল দেখতে চাই যতোটা হলে রাশিয়া আর মাথা তুলে দাড়াতে পারবে না। আর ঠিক এই বক্তব্যটাই হচ্ছে ইউএসএ এর ইন্টারেষ্ট ইউক্রেনে। ইউক্রেনকে ভালোবেসে আমেরিকা এতো টাকা পয়সা এতো অস্ত্র সাপ্লাই দিচ্ছে ভাবলে সেটা হবে ভুল। তারাও একটা প্রচন্ড ব্যবসায়ীক লাভের মুখ দেখছে অস্ত্র বিক্রি করে। আর যতোদিন এই যুদ্ধটা থাকবে, আর্মস বিক্রির ততোটাই বাজার থাকবে আমেরিকার। কারন রাশিয়ার সাথে বর্ডারিং দেশগুলি তাদের নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যে খাবারের থেকে বেশী অস্ত্র কিনতে আগ্রহী হবে রাশিয়ার সাথে বর্ডারিং দেশগুলি, হোক সেটা ন্যাটোর অধীনে বা ইইউর অধীনে বা নন-ইইউভুক্ত দেশ। এখানে আরেকটা ব্যাপার খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করার বিষয় আছে-সেটা হলো, রাশিয়ার সাথে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে আমেরিকা তো রাশিয়ার সাথেই যুদ্ধ করছে, কিন্তু যুদ্ধটা নিজের দেশের মধ্যে নয় আবার রাশিয়াকে সরাসরি এটাক করতেও হলো না। পেন্টাগন স্বীকার করেছে যে, তারা জার্মানীতে ইউক্রেনের অনেক নাগরীককে মিলিটারী প্রশিক্ষন দিচ্ছে যাতে তারা ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে পারে। তারমানে যুদ্ধটা আরো বিলম্বা হোক। আর আমেরিকা রাশিয়ার তেল, গ্যাস কিংবা অন্যান্য কমোডিটির উপরেও ততোটা নির্ভরশীলও নয়। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট একচ্ছত্র ২২ বছর ক্ষমতায় থাকাতে রিজিম পরিবর্তনেরও কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, যা পশ্চিমাদের জন্য একটা অবশ্যই মাথাব্যথার কারন। আর এই যুদ্ধের মাধ্যমে যদি সেটা অর্জিত হয়, খারাপ কি? তাহলে এমন একটা যুদ্ধ আমেরিকা থামাতে যাবে কেনো? ইউক্রেন ঠিক সেই ট্রাপটাতে পা দিয়েছে আমেরিকার হয়ে যেই ট্র্যাপটা রাশিয়া দিয়েছিলো আফগানিস্থান যুদ্ধে। কিন্তু রাশিয়াও সেই যুদ্ধে টিকে নাই।

ইউক্রেন

এখানে একটা কথা না বললেই নয়। আমরা কি কেউ জানি ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল অবধি ডনবাস, ম্যারিউপোল, ক্রিমিয়ায় কি হয়েছিলো? আমি ২য় মহাযুদ্ধের এ যাবতকাল যতো ওয়ারফুটেজ আছে, সম্ভবত তার ৬০% নিজে দেখার চেষ্টা করেছি এবং সেই ফুটেজগুলিতে আমি একটা জিনিষ ক্লিয়ারলি বুঝেছি যে, হিটলার কিভাবে ইহুদীজজ্ঞ শুরু করেছিলো এবং শেষ করতে চেয়েছিলো। সেই সব ইহুদীরা নিরাপদ ছিলো না আবার অন্যায়কারীও ছিলো না। হিটলারের মতাদর্শে তারা চলতে চায় নাই বিধায় তাদের ওই পরিনতি ভোগ করতে হয়েছিলো। সেই ফুটেজগুলি দেখার পরে যদি ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল অবধি ডনবাস, ম্যারিউপোল, কিংবা অন্যান্য সিটিতে স্পেশাল ফোর্স আজব ব্যাটালিয়ান কি করেছে পাশাপাশি দেখি, একই ছক, একই প্ল্যান, একই সিস্টেম। এমন কি এই আজব ব্যাটালিয়ান হিটলারের সময়ে ব্যবহৃত ইন্সিগ্নিয়াও ইউজ করতো। একদম ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে স্কুল কলেজগুলিতেই শিক্ষা দেয়া শুরু হয়েছিলো যাতে ছোট ছোট ইউক্রেনিয়ান বাচ্চারা মনেপ্রানে বিশ্বাস করে যে, রাশিয়া ইউক্রেনের শত্রু। Battle in Donbass, Donbass war at Airport, Fast Forwar to Fasicim, War in Europe-Drama in Ukrain, Trapped ইত্যাদি গ্রাউন্ড যিরো থেকে নেয়া ফুটেজগুলি দেখি, তাহলে হিটলারের ইহুদীনিধন আর ইউক্রেনের মধ্যে রাশিয়ান নাগরিকদের নিধনের মধ্যে কোনো তফাত পাবেন না। এই বিগত ৮ বছরের নিধনে কোনো ইউরোপিয়ান দেশ, বা পশ্চিমারা কোনো প্রকারের ভয়েস রেইজ করেন নাই। এমন কি আমরা যারা আমজনতা তারাও মিডিয়ায় এর একচুয়াল প্রতিফলন না হওয়াতে কিছুই জানি না। কিন্তু এরমধ্যে মিন্সক চুক্তি করে আপাতত একটা যুদ্ধবিরতি ঘোষনা করেছিলো ইউক্রেন। আমাদের অনেকের মনে এই প্রশ্নটা কেনো আসে না যে, মিন্সক চুক্তিটা কি এবং কেনো হয়েছিলো? ২০১০ সাল থেকে ২০২১ সাল অবধি ওই যুদ্ধে প্রতিটি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট (ভিক্টোর ইউনিকোভিচ, ওলেক্সান্দার টুরচিউনোভ, পেট্রো প্রোসেঙ্কো, এবং বর্তমান জেলেনেস্কী) সবার স্ট্রাটেজি ছিলো এক-“রাশিয়ান স্পিকিং নাগরীক বা রাশিয়ার প্রতি ইনক্লাইনেশন আছে এমন ইউক্রেনিয়ান নাগরিক কিংবা দাম্পত্য জীবনে মিক্সড রাশিয়ান নাগরিকদেরকে নিধন করে ফেলা”। ইউক্রেনের জাতীয় টেলিভিশনে দেয়া সেই সব প্রেসিডেন্ট গনের ভাষন শুনলে দেখবেন, কি ম্যাসেজ ছিলো। সেই ২০১০ থেকে ইউকে এবং ইউএসএ এবং তাদের মিত্ররা ক্রমাগত ইউক্রেনকে আর্থিক সাহাজ্য করে যাচ্ছিলো। আর এই কথাটা কিন্তু ডিফেন্স মিনিষ্টার লয়ে অষ্ওটিন স্বীকার করেছেন, তার সাথে স্বীকার করেছেন ডিফেন্স সেক্রেটারী লিজ ট্রুসও।

২০১০ সাল থেকে ২০২১ সাল অবধি ইউক্রেনে একটা সিভিলওয়ার এমনিতে চলছিলো। আর সেটা ইউক্রেনের মধ্যে রাশিয়া স্পিকিং এবং ইউক্রেনিয়ান নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো শুধুমাত্র ডনবাস, লুটেন্সক, ক্রিমিয়া, মারাইউপোল, এবং আরো কিছু শহর যাকে বলা যায় ইথনিক ক্লিঞ্জিং অপারেশন হিসাবে। আর এবার শুরু হয়েছে গোটা দেশ জুড়ে। খুবই দূর্নীতি পরায়ন দেশ হচ্ছে এই ইউক্রেন।

চীন

চীন, ইন্ডিয়া, এশিয়ান দেশ, আফ্রিকান এইসব দেশগুলি কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে যায় নাই, আবার খুব ট্যাক্টফুলি ভোটদান থেকে বিরত থেকে এটাই প্রমান করেছে যে, অন্তত তারা পশ্চিমাদের সিদ্ধান্তের সাথে একমত নয়। এই চীন, ইন্ডিয়া, আফ্রিকা কিংবা অন্যান্য এশিয়ান দেশের কি ইন্টারেষ্ট সেটা বিস্তারীত না বল্লেও বুঝা যায় যে, রাশিয়াকে এদের প্রয়োজন বেশী ইউক্রেন থেকে।

ইইউ

যদি একটা জিনিষ লক্ষ্য করা যায় কারা কারা এই ইইউ তে আছেন। ইইউ এর সদস্যদেশুলি হচ্ছে- Austria, Belgium, Bulgaria, Croatia, Republic of Cyprus, Czech Republic, Denmark, Estonia, Finland, France, Germany, Greece, Hungary, Ireland, Italy, Latvia, Lithuania, Luxembourg, Malta, Netherlands, Poland, Portugal, Romania, Slovakia, Slovenia, Spain and Sweden. এই দেশগুলির বর্তমান আর্থিক বা সামরিক ক্ষমতা কি? যদি এই দেশগুলিকে তিনটা গ্রুপে ভাগ করি, তাহলে দেখা যাবে যে, খুবই দূর্বল আর্থিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা দেশগুলি হচ্ছে-অষ্ট্রিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, এস্টোনিয়া, হাংগেরী, আয়ারল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, লুক্সেমাবার্গ, মালটা, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া। মানে প্রায় ৩০ টি দেশের মধ্যে ১৪টি দেশ। ৫০%। একটু শক্ত কিন্তু দূর্বলের থেকে একটু উপরে আছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ইতালী, পোল্যান্ড। ২৫%। আর যারা প্রথম সারিতে আছেন, তারা হচ্ছেন-ফ্রান্স, জার্মানী, গ্রীস, স্পেন। অর্থাৎ ২৫%। তার মানে সিদ্ধান্ত মেকিং এ সবসময়ই দেখবেন, ফ্রান্স, জার্মানী, আর কেউ নয়। অর্থাৎ ১০%। এমন একটা কাঠামোর মধ্যে ইইউ জড়িয়ে আছে যে, বিগ বস যেভাবে চাবেন, সেভাবেই ছোটরা থাকলে ভালো হবে মনে করে যে কোনো সিদ্ধান্তেই তারা ‘ইয়েস’ বলে চালিয়ে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। ইউক্রেন না ইইউর সদস্য, না ন্যাটোর সদস্য, অথচ ইইউর সদস্যরা এই ইউক্রেনের পাশে বিগ বসের কারনে দাঁড়িয়ে থাকায় যেটা হয়েছে, ইইউর নিজের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। ক্ষতি ইউকের হয় নাই, ইউএসএ এর হয় নাই, হয়েছে ইইউ এর। যারা রাশিয়ার উপর সর্বোতভাবে নির্ভরশীল।

জার্মান

একটা জিনিষ খেয়াল করলে দেখা যায় যে, গ্রাউন্ড যিরোতে জার্মান সাংবাদিক প্রায় নাই বললেই চলে। কারন বর্তমান ভাইস চেন্সেলর ওলফ সুলজ তাদের সাংবাদিকদেরকে এভাবেই ব্রিফ করেছেন যেনো ইউক্রেন যুদ্ধের গ্রাউন্ড জিরো প্রতিবেদন মিডিয়াতে সম্প্রচার না হয়। একমাত্র ডিডব্লিউ কিছু নিউজ করে যেগুলিও প্রায় ৫০-৫০ বায়াসড যা না করলেই হলুদ সাংবাদিকতায় পড়ার সম্ভাবনা। Frank-Walter Steinmeier জার্মান প্রেসিডেন্ট, তাঁকে গত সপ্তাহে ইউক্রেন ভিজিট করতে বললে তিনি সেই ইনভাইটেশনকে পরিত্যাগ করেছেন। তিনি কিয়েভে আসবেন না। কারন ইতিমধ্যে জার্মানীতেও তাদের দল, নাগরীক এবং অন্যান্য সুধীজনের মধ্যে প্রচন্ড একটা দ্বিভাজন শুরু হয়েছে পক্ষে বিপক্ষে। কারন, সাধারন নাগরিকগন ইতিমধ্যে রাশিয়ার গ্যাস, তেল, কমোডিটির অভাবে একটা অশনি পরিস্থিতির আন্দাজ করতে পারছেন। একটা পলিটিক্যাল চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সবাই তো যুদ্ধংদেহী নয়।

কিছু কথাঃ

অজস্র অস্ত্র প্রবাহ একটা সময়ে বুমেরাং হতে পারে। আফগানিস্থানে যেসব অস্ত্র আমেরিকা ফেলে এসেছিলো বা সরবরাহ করেছিলো, ওইসব অস্ত্র শেষ পর্যন্ত আফগানিস্থানের মিলিশিয়ারা আমেরিকার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে শুরু করেছিলো। যার কারনে কোনো বিকল্প ছাড়াই আমেরিকাকে তড়িঘড়ি করে আফগানিস্থান ছেড়ে আসতে হয়েছিলো।

নিষেধাজ্ঞা পুরু ওয়েষ্ট এবং ইইউসহ সারা দুনিয়ায় একটা অস্থিরতা আনবে। যেমন ইইউ শেষ পর্যন্ত একটা ব্যাপার স্বীকার করেছে যে, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা কোনো কাজে আসে নাই।

রাশিয়ার রুবলকে দূর্বল করার জন্য যখন সুইফট থেকে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কেটে দেয়া হলো, তখন রাশিয়ার নিজের কারেন্সী ছাড়া কোনো প্রকারের ব্যবসা করা সম্ভব ছিলো না। ফলে রুবল যখন একমাত্র অপসন, আর রাশিয়ার কমোডিটি যখন অন্যের খুবই দরকার, তখন বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত অন্যানরা সুইফটের বাইরে গিয়ে রাশিয়ার শর্ত মেনে নিয়েই এখন রুবলে তাদের লেনদেন করতে বাধ্য হচ্ছ্যে। যেই রুবল যুদ্ধের আগে ছিলো ১ ডলার= ৭২ এখন সেই রুবল চলে এসছে ১ ডলার= ৬৭। অথচ নিষেধাজ্ঞার ঠিক পরপরই ১ ডলারের সমান ছিলো ১৩৯ রুবল। একই রুবল যুদ্ধের আগের থেকেও শক্ত অবস্থানে চলে এসছে। পুরু ইউরোপ জুড়ে এখন ডলারের চেয়ে বেশী প্রবাহ হচ্ছে রুবলের। এতে যেটা হবে, সেটা হচ্ছে পেট্রো ডলারের নির্ভরতা অনেক অনেক কমে যাবে। ফলে ডলার তার শক্তিশালী অবস্থা হারাবে, ইউরোপিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তাদের আধিপত্যতা হারাবে, চীন, দুবাই, আরব দেশগুলি তাদের তেল হয় রাশিয়ান রুবল, বা চীনের আরএমবি, অথবা নিজস্ব কারেন্সীতে লেনদেন করা শুরু করবে।

তাহলে কারা জিতছে এই যুদ্ধে?

(পুরুই আমার ব্যক্তিগত মতামত)

4/5/2022-Russia’s 3B strategy in Ukraine

যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে বড় ট্যাক্টিক্স হচ্ছে সেই কউশলটা যা আগে কোথাও ব্যবহার করা হয় নাই। সব দেশ সব সময় তাদের সামরিক সদস্যদেরকে একটা ধাচের মধ্যে সমর বিদ্যা চর্চা করান। কিন্তু কেউ যদি ততাহকথিত সমর জ্ঞান পালটে এমন কিছু অভিনব কায়দা গোপনে পরিচালনা করেন যার সম্পর্কে কারো কোনো ধারনা নাই, তখন অনেক অস্ত্র খরচ করেও শত্রুকে মোকাবেলা করা সম্ভব হয় না। পুতিনের সমর কৌশলের মধ্যে এমন কিছু নতুনত্ত আছে যা সচরাচর বই পুস্তকে লিখা নাই। একটু খোলাসা করে বলি;

কিয়েভের একদম কাছে গিয়ে সে আর কিয়েভ দখল করলো না। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে দখল করতে পারলো না। কিভের কাছাকাছি (মানে মাত্র ১০ কিমি দূরে) অবস্থান করলো প্রায় ৮ দিন। কিছুই করলো না। অবাক লাগার কথা। প্রায় ৬৬ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলো, বুঝা যাচ্ছে না আসলে কে জিতে যাচ্ছে। রাশিয়ার আগ্রাসনকে আমি কিন্তু সাপোর্ট করছি না। এটা আগ্রাসনই বল্বো। অন্যায় তো অবশ্যই। কিন্তু যেহেতু সুপার পাওয়ারগুলি এখন নিজেরাই নিজেদের জন্য খেলছে, দেখি রাশিয়া কোন রহস্যময় সমর কৌশল অবলম্বন করছে।  

Cdr Benjamin “BJ” Armstrong, a US naval officer যাকে বলা হয় সমর চিন্তায় একজন পারদর্শী। তিনি মন্তব্য করেছেন, রাশিয়া ক্রিমিয়া দখলের সময় যে ট্যাক্টিক্স অবলম্বন করেছিলো যাকে Russia’s 3B strategy বলা হয়, সেই একই ট্যাক্টিক্স পুতিন ইউক্রেনেও অবলম্বন করেছে বলে মনে হয়। তাহলে এই Russia’s 3B strategyটা কি?

In Russia’s 3B strategy, the first B stands for ‘Blockade’,

the second for ‘Bombardment’ and

the third for ‘Boots’ on the ground.

US military experts suggest that Russia so far has successfully executed this strategy that has seriously hampered Ukraine’s fighting ability in the eastern part of the country.

এই স্ট্রাটেজি পালনে ক্রিমিয়া দখলের সময় রাশিয়া প্রথমে ইউক্রেনের Sevastopol port কে ব্লকেড এবং চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল। তারপর রাশিয়া ইউক্রেনের ডিফেন্স ফোর্সকে বোম্বার্ডমেন্টে ধংশ করে ফেল্লো। then it landed its boots in Crimea.

ঠিক একই কাজ ফেব্রুয়ারীর ২৪ তারিখ থেকে রাশিয়া শুরু করেছে।  রাশিয়া  ইউক্রেনের Sevastopol port কে লঞ্চিং প্যাড হিসাবে ব্যবহার করেছে, ক্রিমিয়া দখলের সময়ও সে এটা করেছিলো। অতঃপর সেখান থেকে ডেডলী মিসাইলস, মেরে ইউক্রেনের ডিফেন্স ফোর্সকে এটাক করেছে। অতঃপর রাশিয়া Kerch Strait প্রনালীকে ব্লক করে দিয়েছে। Kerch Strait হচ্ছে আজম সাগর এবং ব্ল্যাক সাগরকে সংযোগ করে। ফলে আজব সাগরের পুরু কন্ট্রোল রাশিয়া নিয়ে নেয়। And lastly, it landed its boots in Ukraine to usurp the vast swathes of the country. এর মাধ্যমে রাশিয়া ঠিক আগের মতোই তার 3B strategy পরিচালনা করলো।

Now, Russia is applying this strategy to the whole of Ukraine, by creating a blockade of the Ukrainian territories by hijacking the port cities of Mariupol, Berdyansk, Mykolayiv and Odesa.

এখন যেটা রাশিয়া করছে তা হলো-এই ব্লকেডের মাধ্যমে ইউক্রেনের ফোর্স এবং অর্থনীতি পুরুটাই বিপর্য্যের মুখে। রাশিয়ার এই ব্লকেডের জন্য ইউক্রেন তাদের অঢেল খাদ্য সামগ্রী এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকায় রপ্তানী করতে পারছে না। অথচ ইউক্রেনকে বলা হতো ইউরোপ/আমেরিকার খাদ্য ভান্ডারের একটি গুদাম।

একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ২০১৯-২০২০ সালে ইউক্রেন ছিলো প্রিথিবীর ২য় বৃহৎ রপ্তানীকারক দেশ। ২০২০-২১ সালে আগের বছরের থেকেও প্রায় ২৫% বেশী উতপাদন করেছিলো ইউক্রেন যেখানে প্রধান খাবারগুলি ছিলো বার্লি, কর্ন, সিরিয়াল, ভেজিটেবল ওয়েল। এখন সে সব খাদ্য সামগ্রির বহির্বিসশে ইউক্রেন রপ্তানী করতে পারছে না। অচিরেই সারা বিসশে খাদ্যের একটা সংকট তৈরী হতে পারে বলে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম জানিয়েছে।

Now, you may ask, what exactly are America and Ukraine doing to prevent Russia’s 3B strategy to come to fruition? Well, frankly speaking, the two nations seem to be falling prey to Russia’s carefully fabricated military warfare. Ukraine still has not devised any strategy to break Russia’s 3B trap, and that’s what has now unnerved US military experts in epic proportions.

4/5/2022-মার্কিন ডিফেন্স মিনিষ্টার লয়েড অষ্টিন  এর বক্তব্যের বিপরীতে ছোট একটা বিস্লেষন

গত সপ্তাহে মার্কিন ডিফেন্স মিনিষ্টার লয়েড অষ্টিন কিয়েভে গিয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীর সাথে দেখা করতে। বিশালদেহী মানুষ। তিনি সেখানে একটা কথা মনের অজান্তেই প্রেস ব্রিফিং এ হুট করে বলে ফেলেন। আর সেটা হলো- “Our focus in the meeting was to talk about those things that would enable us to win the current fight and also build for tomorrow.” Furthermore, Austin admitted for the first time that the US is a fighter in the war by using the first-person plural to describe both the US and Ukraine engaged in a “battle” against Russia. “We want to see Russia degraded to the point where it can’t do the types of things it did in invading Ukraine,” Austin continued.

এই বক্তব্যের মাধ্যমে অষ্টিন সরাসরি স্বীকার করে নিলেন যে, আমেরিকা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি অংশ। কিন্তু লয়েড অষ্টিনের কথার সাথে জো বাইডেন প্রশাসনের উম্মুক্ত ডিক্লেরেশনের মিল নাই। জো বাইডেন প্রশাসন সবসময় যেটা বলে আসছে যে, ন্যাটো দেশের সাথে যে কোনো কনফ্রন্টেশন মানে ৩য় বিশ্ব যুদ্ধ। সেটা কিছুতেই আমেরিকা চায় না। কিন্তু লয়েডের বক্তব্যে সেটা নাই, লয়েড যেটা বলেছে সেটা আসলেই পর্দার ভিতরের কথা, আর তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। এই মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া বক্তব্যে আমেরিকার কি কি ক্ষতি হতে সেটা ভাবার ব্যাপার।

(১)        জো বাইডেন প্রশাসনে অনেকেই আছেন যারা চায় যে, আমেরিকা যুদ্ধে নামুক। কিন্তু ফেডারিয়ালিষ্ট সিনিয়ার এডিটর জন ডেনিয়েল ডেভিশসন বলেন যে, যদিও রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে ব্যাটল ফিল্ড হিসাবে ব্যবহার করে আমেরিকা যুদ্ধে যেতেই পারে কিন্তু আমেরিকার সাধারন জনগনের এই যুদ্ধে কোনো ম্যান্ডেট নাই বিধায় আমেরিকার যুদ্ধে যাওয়া ঠিক হবে না এবং এই যুদ্ধে আমেরিকা প্রক্সি ওয়ার হিসাবে অংশ গ্রহন করছে এটাও প্রকাশ করা যাবে না।

(২) যদি রাশিয়াকে প্রকাশ্যে আমেরিকা এইমর্মে ইংগিত দেয় যে, আসলেই তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আছে (যদিও রাশিয়া এটা জানে কিন্তু অফিশিয়লি নয়) তাহলে রাশিয়া আমেরিকার যে কোনো সৈনিক তথা জনগনকে রাশিয়ার শত্রু মনে করে টার্গেট করবেই।

(৩)       A second possibility is that if Putin sees his conventional military forces being suffocated, he will resort to further cyber attacks on Western infrastructure, chemical weapons, or his tactical, “battlefield” nuclear weapons arsenal. It’s a prospect that was unthinkable eight weeks ago but is now routinely discussed and this will put more Americans in danger.

লয়েড অষ্টিনের এই মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া বক্তব্য ইতিমধ্যে রাশিয়ার মাথায় ঢোকে যাওয়া আমেরিকার প্রক্সী ওয়ারকে আরো বেশী বেগবান করে তুলতে পারে। To date, there has been no American bloodshed in the thick of the war in Ukraine. However, Russia may not hesitate to do so now.

তাই এই লেবেলের মানুষদের কথা বলার সময় শব্দচয়ন, ডিপ্লোমেসি, এবং কি বলা দরকার সেটা সর্বদা মাথায় রেখে বলা উচিত। তা না হলে যে কোনো সময়ে বড় ধরনের কিছু আশংকাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

০৩/০৫/২০২২-ইউক্রেন যুদ্ধ সমাচার

অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানগন (বিশেষ করে ইইউ, ইউকে, ফ্রান্স, জার্মানী অথবা ইউএস ইত্যাদি) তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা হয়তো একটা টেনিউর অথবা সর্বোচ্চ দুইটা টেনিউর। অনেকের আবার ২য় টেনিউরে রাষ্ট্রপ্রধান হবেন কিনা সে চিন্তায় সারাক্ষন কি কি করা যায়, কিভাবে কি পলিশি করলে ভোট বেশী পাওয়া যাবে তার মহাচিন্তায় মহাপরিকল্পনা করতে থাকেন। গ্লোবাল রাজনীতির থেকে নিজের জন্য রাজনীতিই বেশী করেন। অথচ রাশিয়ার পুতিন গত ২২ বছর যাবত প্রেসিডেন্ট হিসাবে তো বহাল আছেনই, তার উপর আগামী আরো ১৪ বছর তার প্রেসিডেন্সীর নিশ্চয়তাও রয়েছে। তারমানে ৩৬ বছরের একনাগাড়ের প্রেসিডেন্ট মিঃ পুতিন সাহেব। এমন একটা ঝানু রাজনীতিবিদ কি একেবারে কোনো হোমওয়ার্ক ছাড়া একা সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে নামবে, এটা কি বিশ্বাস করা যায়? যত যাইই হোক, পুতিন এই ইউক্রেন যুদ্ধে হারার জন্য নামে নি, আর যুসশটা কতদিন চালাবে এটার সম্পুর্ন কন্ট্রোল আসলে পুতিনের হাতেই। আরো কিছু মাহাত্য তো আছেই।

ইউক্রেন আক্রমনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করিনা। কিন্তু জুলুমের রাজত্তে যখন কেউ না কেউ অধিক শক্তিশালী রাজ্য দারা প্রতিনিয়ত শোষিত হয়, তখন শোষকদের উপর কেউ জুলুম করলে সেটা অনেকটা মনের অজান্তেই সমর্থন পাওয়া শুরু করে যদিও আক্ষরিক অর্থে তা সমর্থনযোগ্য নয়। রাশিয়াকে সাপোর্ট করার পিছনে বেশীরভাগ মানুষের মনের ভাবটা ঠিক এইরকম। যাই হোক, ইউক্রেন যুদ্ধের কিছু আভাষ আমি পূর্বেই লিখেছিলাম, এবার মনে হচ্ছে সেগুলির বেশ কিছু নিদর্শন বাস্তবে প্রকাশ হতে শুরু করেছে। সেই পরিবর্তনগুলি কিঃ

ক।       ইউনিপোলার ওয়ার্ড অর্ডার পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন হয়তো ট্রাঞ্জিশন পিরিয়ড চলছে বলে বলা যায়। 

খ।        ডলার কারেন্সীর একচ্ছত্র রাজত্ব খুব অচীরেই শেষ হতে যাচ্ছে। পেট্রোডলারের যে রাজনীতি সারা দুনিয়ায় একচ্ছত্র দাদাগিরি চালিয়ে একটা ভারসাম্যহীন অর্থনীতির বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো, সেটার প্রায় বিলুপ্তির সূচনা শুরু হয়ে গেছে।

গ।        মানি সিস্টেমের যে “সুইফট ব্যবস্থাপনা” সারাটা দুনিয়ায় প্রতিটি দেশকে জালের মতো একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে সবাইকে আটকে ফেলেছিলো, সেটা থেকেও দেশগুলি বিকল্প পথ পেয়ে যাচ্ছে।

ঘ।        পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক বলয়ে যতটা আঘাত হানার কথা ভাবা হয়েছিলো, ততোটা কিন্তু আঘাত হানতে পারেনি। রুবল সেই ধাক্কাটা প্রায় কাটিয়ে উঠে যাচ্ছে। ফলে রুবল একটা শক্তিশালী কারেন্সী হিসাবে আবির্ভুত হতে যাচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল কি ?

ক।       আমেরিকার প্রাথমিক ইনিশিয়াটিভে ন্যাটো যতোটা তাদের মধ্যে হুজুগে পড়ে বন্ডেড হয়েছিলো, এখন সেই ন্যাটো সদস্যদের মধ্যেই বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কারন প্রতিটি দেশের চাহিদা আলাদা আলাদা। একটি দেশের মুলনীতি, মুল চাহিদা, মুল কাঠামোর সাথে অন্য যে কোনো দেশের মুলনীতি, মুল চাহিদা বা মুল কাঠামোর মধ্যে তফাত থাকেই। আর সেই তফাতের কারনেই একেক দেশের ভূমিকা একেক পরিস্থিতিতে একেক রকম হবে। প্রাথমিক হুজুগের বলয় থেকে বেরিয়ে যখন বাস্তবতায় দেশগুলি চোখ খুল্লো, তখন দেখা গেলো, নিজের দেশের জনগনের জন্য প্রয়োজনীয় তেল, গ্যাস, খাবার, কিংবা মৌলিক চাহিদার যোগানের জন্য যা দরকার আর যেখানে এটা আছে সেটার উপরেই তারা পুর্বান্নে নিষধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। আর সেই নিষ্রধাজ্ঞা যেনো এখন বুমেরাং হয়ে নিজেদেরকে আঘাত করছে। এর ফলে যা হচ্ছে- ন্যাটোর মধ্যেই একে অপরের উপর আস্থা কমে যাচ্ছে। এরা এখন আর আগের মতো দল বেধে মিটিং, সেমিনার, কিংবা দ্বি পাক্ষীয়, তৃপাক্ষীয় ক্লোজডোর বৈঠক করছে না। ভাটা পড়েছে সব কিছুতেই। এই অনাস্থার অনুপাতটা আরো বাড়বে দিনে দিনে।

খ।        জেলেনেস্কী বারবার সারা দুনিয়াকে রাশিয়ার তেল, গ্যাস ইত্যাদি না নিতে অনুরোধ করছে, নিষেধাজ্ঞায় রাখতে বলছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, জেলেনেস্কির এতো আকুতি মিনতি করে এই নিষেধাজ্ঞা পালনে কাউকে এতো অনুরোধ করার দরকার ছিলো না যদি সে নিজেই ইউক্রেনের উপর দিয়ে রাশিয়ার পাইপলাইন গুলিকে অকেজো করে দিতো। পাইপলাইনই যদি সচল না থাকে, নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কেউ রাশিয়া থেকে তেল/গ্যাস নিতে পারতো না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-জেলেনেস্কী তাহলে ইউক্রেনের উপর দিয়ে প্রবাহিত তেল/গ্যাস লাইন/পাইপ লাইন ধংশ করে দিলো না কেনো? এর কারন একটাই-যদি জেলেনেস্কী এই কাজটা করতো, তাহলে ইইউ নিজেই ইউক্রেনকে ধংশ করে দিতো। আর ২য় কারনটা হচ্ছে, জেলেনেস্কী নিজেও ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক লোকসানে পড়ত। তাই জেলেনেস্কী কোনোটাই করে নাই, এবং ইইউ নিজেও ইউক্রেনের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত রাশিয়ান পাইপ লাইনকে সবসময় সুরক্ষা দিয়ে সাপ্লাই সচল রেখেছে।

গ।         রাশিয়া কিন্তু তার অস্ত্র ভান্ডারের কিছুই আপাতত ব্যবহার করে নাই। বিশেষ করে আধুনিক যন্ত্রপাতী। যা করেছে সেটা নেহায়েতই একটা অবসলিট এবং পুরানো দিনের জাঙ্ক মেশিনারিজ দিয়ে। রাশিয়া এই ইউক্রেন যুদ্ধটা এখনই শেষ করতে চাইবে না। কারনঃ

(১)        রাশিয়া পেট্রোডলার কারেন্সী শেষ করে নিজেদের কারেন্সী বা চায়নিজ-রুবল-রুপি ইত্যাদির সমন্নয়ে একটা কারেন্সী প্রতিস্থাপিত না করা অবধি পুতিন ইউক্রেনের যুদ্ধটা চালিয়ে যাবে। আর এর মধ্যে দেয়া তার সেই সব পয়েন্ট তো আছেই যা সে উল্লেখ করেছে- নিউ নাৎসি, মিলিটারাইজেশন ইত্যাদি।

(২)       আগামী শীত হবে ইইউর জন্য একটা বিপর্যয়। কারন উক্ত শীতে রাশিয়ার তেল এবং গ্যাস, গম, যব, সিরিয়াল ইত্যাদির অভাবে ইইউর উপর একটা বিপর্যয় নেমে আসবে। তখন হয় ইইউ রুবলেই ট্রেড করবে, অথবা জনগন সাফার করবে। তাতে প্রতিটি দেশে বিক্ষোভ হবার সম্ভাবনা এবং তখন নেতারা নিজেদের গদি নিয়ে হুমকীর মধ্যে থাকবেন।

(৩)       এমতাবস্থায় সবাই ইউক্রেনকেই তাদের জীবন বিপর্য্যের কারন হিসাবে দায়ী করবে। ভুলে যাবে মানবতা, রিফুজিরাও সেই দেশ থেকে বিতাড়িত হবার সম্ভাবনা থাকবে। জেলেনেস্কী আত্তগোপনে চলে যাবেন, রাশিয়া তার নিজের পছন্দমত সরকার প্রতিস্থাপন করবেন। সেই সরকার এসে হয়তো রাশিয়াকে আবার আগের মতো সব কিছু করতে বলবেন যাতে ইইউর সাথে আবার সাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠে।  

কে কি ভুল করছে বলে মনে হয়ঃ

ক।       ওয়ার্শো ভেংগে যাবার পরে আসলে রাশিয়া কখনোই ইইউ অথবা আমেরিকার শত্রু ছিলো না। রাশিয়া অনেকটা ইউরোপের ধাচেই এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু আমেরিকা সর্বদা রাশিয়াকে তার চিরশত্রুই মনে করে। আসলে আমেরিকার শত্রু চিনতেও ভুল হয়েছে। তার শত্রু চীন, রাশিয়া নয়। তাই রাশিয়াকে ওর দলে নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করা উচিত ছিলো আমেরিকার। ইউক্রেনকে দিয়ে অযথা রাশিয়ার গলায় পারা দেয়া আমেরিকার ঠিক হয় নাই। এতে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে চীন। আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে আমেরিকা এবং ইইউ ।

খ।        রাশিয়া যখন ন্যাটোর সদস্যপদ চেয়েছিলো, ন্যাটোর উচিত ছিলো রাশিয়াকে সদস্যপদ দেয়া। যদি সেই সদস্যপদ দিতো, তাহলে আজকে ইউরোপ থাকতো সবচেয়ে নিরাপদে, চীন থাকতো সবচেয়ে চাপে। এশিয়াও থাকতো চাপের মধ্যে। রাশিয়াকে ইচ্ছে করেই আমেরিকা সদস্যপদ দিতে চায় নাই। এটা একটা মারাত্তক ভুল ছিলো।

গ।        ইউক্রেন যুদ্ধে জেলেনেস্কী আসলে ইউক্রেনের মংগল কামনা করে নাই। যখন যুদ্ধশেষে ইউক্রেনের চিন্তাবিদেরা এই যুদ্ধের আগাগোরা নিয়ে বিশ্লেষন করবেন, তখন দেখা আযবে যে, জেলেনেস্কী আসলে ছিলো রাজাকার প্রেসিডেন্ট। আজকে তাকে ;হিরো’ আখ্যায়িত করলেও সব বিবেচনা করে একটা সময় আসবে যখন ইউক্রেনের মানুষেরা ‘জেলেনেস্কী’ নামটা ‘মীর জাফর’ নামের মতো হয়তো ব্যবহার করবে।

03/05/2022-জাপান কেনো ক্ষেপে যাচ্ছে ইউক্রেনের উপর

এশিয়ার বড় ক্ষমতাশীল দেশ জাপান সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষে এ যাবত কাল সাপোর্ট করে এসছে। যেখানে ইন্ডিয়া নিরপেক্ষ ভুমিকায় এবং চায়নাও প্রো-রাশিয়ান হিসাবে খ্যাত।  কিন্তু হটাত করে জাপান কেনো ইউক্রেনের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো?

জাপান অইতিয্য গতভাবে খুব দেশ প্রেমিক। তারা তাদের ইতিহাসের খুব মর্যাদা দেয়। গত ২৮/২৯ এপ্রিলে ইউক্রেন ২য় মহাযুদ্ধ্যের উপর একটা ডকুমেন্টারী ফিল্ম তৈরী করে তাদের সরকারী ওয়েব সাইট এবং টুইটারে আপ লোড করে যেখানে ইউক্রেন রাশিয়াকে ফ্যাসিবাদ উল্লেখ করে ফ্যাসিজিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই যাবে বলে ঘোষনা দেয়। উক্ত ভিডিওতে ২য় মহাযুদ্ধে মোট ৩ ব্যক্তিকে আক্রমন করা হয় ফ্যাসিবাদের চরিত্র হিসাবে। (১) জার্মানীর হিটলার (২) ইতালীর মুসুলিনি (৩) জাপানের প্রধান মন্ত্রী হিরুহিতোকে।

জাপানে সম্রাট বা প্রধানমন্ত্রী হিরোহিতোকে অনেক বেশী সম্মানের সহিত দেখে জাপানিজরা। ইউক্রেনের এই ভিডিও জাপানিজদেরকে উত্তক্ত করে দিয়েছে। জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মাশাহিয়া সাতো উক্ত ভিডিও এর প্রতিবাদে ইউক্রেনের সরকারকে অবিলম্বে ভিডিও তাদের ওয়েব সাইট এবং টুইটার থেকে সরিয়ে ‘দুক্ষ” প্রকাশ করতে বললে ইউক্রেন ইতিমধ্যে জাপানের নাগরিকের কাছে ‘দুঃখ” প্রকাশ সমেত ভিডিও টি সরিয়ে নিয়ে পরবর্তীতে শুধু মাতে হিটলার এবং মুসুলিনিকে রেখে পুনরায় ভিডিওটি আপ্লোড করেন।

Japan’s Deputy Chief Cabinet Secretary Yoshihiko Isozaki said that “portraying Hitler, Mussolini and Emperor Showa in the same context is completely inappropriate” and “extremely regrettable”. Now, Ukraine is in damage control mode. In response to Masahisa Sato’s remarks, Ukraine said, “Our sincere apologies to @japan for this mistake. We had no intention to offend the friendly people of Japan.”

But now, Japan is unlikely to support Ukraine. Japan is already trying to battle the stigma attached to it since the Second World era and has also been trying to shed post-War pacifism. Now, if a country is going to spread more negativity against it and that too by making negative comments about Hirohito, Japan will not let the matter go lightly.

জাপানের হিরোহিতোকে বাদ দিয়ে পরবর্তীতে যে ভিডিওটি ইউক্রেনের সরকারী টুইট এ দেয়া হয়েছে সেটা দেখতে পারেন।

https://twitter.com/Ukraine/status/1518217114766696449

30/4/2022-হুজুগের বশে অন্যান্য বন্ধুপ্রতীম দেশের নিষেধাজ্ঞায় তাল মিলাইতে গিয়া লাটভিয়া উভয় সংকটে

বাল্টিক ন্যাশনের ছোট একটা দেশ লাটভিয়া। লিথুনিয়া এবং ইস্তোনিয়ার সিদ্ধান্তের সাথে একাত্ম হয়ে  হুজুকের বশে লাটভিয়াও রাশিয়ার গ্যাসের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এখন চরম বিপর্য্যের মধ্যে পড়েছে। কারন লাটভিয়া এই নিষেধাজ্ঞা পালন করতে গিয়ে ২৪ ঘন্টায় তার দেশের বেশীর ভাগ সিস্টেম অকেজো হয়ে পড়েছে। লিথুনিয়া এবং ইস্তোনিয়া অনেক বছর আগে থেকেই রাশিয়ার গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার জন্য বিকল্প পথ তৈরী করে ফেলেছে যা এখন তারা রাশিয়ার গ্যাস ছাড়াও চলার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু লাটভিয়ার ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন।

মাইগ্রির (Maigre) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাল্টিক দেশগুলির সাথে অন্য কোনো দেশের গ্যাস লাইনের সাথে যুক্ততা নাই, আছে শুধু মাত্র রাশিয়ার সাথে। এমন কি Western European electric grid (UTCE) বা the Scandinavian grid (Nordel) এদের সাথেও বাল্টিক দেশগুলির কোনো যোগাযগ নাই। ফলে গ্যাস না নেয়ার ঘোষনায় লাটভিয়া মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এখন নিরুপায় হয়ে তাদের দেশ রাশিয়ার সাথে আগামী ৩০ বছরের জন্য রুবল এর মাধ্যমে গ্যাস নেয়ার চুক্তি সম্পন্ন করলো কারন এই ২৪ ঘন্টায় লাটভিয়ার প্রায় অধিকাংশ ইন্ডসাট্রিজের অবস্থা প্রায় থমকে গিয়েছে। ফলে Latvia strikes the deal to preserve its business and economic interests. This indicates that to pull through their economy, Baltic nations are heavily reliant on Russia and it has shown to other European nations that there’s no way out of this Russian gas trap.

৩০/৪/২০২২-রাশিয়ার তেল/গ্যাস এবং ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা

আমি এর আগেও অনেকবার লিখেছিলাম যে, নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে দুইমুখু সাপের মতো, শাখের কারাতের মতো, যেতেও কাটে, আসতে কাটে। ফলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে যিনি নিষেধাজ্ঞা দিবেন, তাঁকে অনেক হিসাব কষে দেখতে হবে, তিনি আবার সেই নিষেধাজ্ঞার কারনেই প্রতিঘাতে না পড়েন। যেদিন ইউরোপ রাশিয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা দিতে থাকলো, তখনি বুঝেছিলাম, মারাত্তক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। ইংরেজীর সেই প্রোভার্ভ কাজে লাগে নাই এই ইমোশনাল নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সময় যে- Never bite the hand who feeds you.

নিষেধাজ্ঞার প্রভাবঃ

রাশিয়ার উপর প্রায় ৭ হাজারেরও বেশী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইউরোপ এবং পশ্চিমারা। অথচ এই রাশিয়ার উৎপাদিত ন্যাচারাল গ্যাস, ফসিল ওয়েল, নিকেল, এলুমিনিয়াম, গম, লোহা, ইস্পাত, ইউরেনিয়ামের উপর ইউরোপের সবগুলি দেশ প্রায় ৪০ থেকে ৭০% পর্যন্ত নির্ভরশীল। এমন একটা অবস্থায় বহুদূরের যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রর নেত্রিত্তে বা পরামর্শে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞায় তারা যতোটা না কাবু হবে তার থেকে  এই নিষেধাজ্ঞায়  ইউরোপ কাবু হবে ৪০-৭০% বেশী। কারন ইউরোপ ৪০-৭০% কমোডিটির উপর রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল। এটাই হবার কথা ছিলো আর সেটাই হয়েছে। নিষেধাজ্ঞায় পশ্চিমাদের বুদ্ধিতে ইউরোপের মারাত্তক ভুলটা হয়েছে যখন রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংককে সুইফট সিস্টেম থেকে বের করে দিয়ে পুরু বিশ্ব ব্যাংকিং থেকে আউট করায়। ফলে কি ঘটেছিলো? ঘটছিলো যে, আগে রাশিয়ার পন্য কিনে তারা পেমেন্ট করেছে ইউরো বা ডলারে। রাশিয়া সুফট সিস্টেমে থাকায় রাশিয়া সহজেই সেই ইউরো বা ডলার কনভার্ট করে তাদের নিজস্ব কারেন্সীতে পরিবর্তন করতে পারতো অথবা ইউরো বা ডলারকে রিজার্ভ হিসাবে রাখতে পারতো। কিন্তু এখন সুফট সিস্টেম থেকে আউট হওয়ায় রাশিয়া এখন আর ইউরো বা ডলারের পেমেন্ট ক্যাশ করতে পারেনা। এরমানে, রাশিয়া তার পন্য ঠিকই দেবে কিন্তু মুল্য ঘরে পাবেনা যেহেতু সেটা সুইফট সিস্টেমের আওতায় ইউরো বা ডলারের কারনে আটকে যাচ্ছে। পশ্চিমারা চেয়েছিলো যাতে অর্থনীতির দিক দিয়ে রাশিয়াকে পঙ্গু করে দেয়া যায়। কিন্তু রাশিয়া তো আর লিবিয়া, ইরাক বা আফগানিস্থান নয়। এবার রাশিয়া ডিক্রি জারী করেছে-রাশিয়া তার নিজস্ব কারেন্সী ছাড়া কোনো প্রকারের কারেন্সীতে রাশিয়া তার পন্য বিনিময় করবে না। আর সেটা শুরু হবে গ্যাস পন্য দিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপের সবকটি দেশ রাশিয়ার এই গ্যাসের উপরে কম বেশী কেউ কেউ ৪০% থেকে শুরু করে ৭০% পর্যন্ত নির্ভরশীল।

রুবলে ব্যবসাঃ

শুধুমাত্র হাঙ্গেরী ছাড়া প্রাথমিকভাবে কেহই রাশিয়ার এই নতুন নির্দেশ মেনে নিতে রাজী হয়নি। তারা ইউরো বা ডলারেই পেমেন্ট করবে বলে রাশিয়াকে ফের জানিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে-দোকানীর জিনিষ যদি দোকানীর আইনে কেউ না নিতে পারে, তাতে খদ্দেরেরই ক্ষতি। হয় দোকানীর নিয়মে পন্য নাও, না হয় যাও। আর ঠিক এটাই হয়েছে। প্রথমে রাশিয়া পোল্যান্ড এবং বুলগেরিয়ার গ্যাসলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। পোল্যান্ড খুব হিম্মতের সাথে জানিয়ে দিয়েছে-রাশিয়ার গ্যাস ছাড়াও তারা চলতে পারবে কারন তাদের রিজার্ভ আছে প্রায় ৭৫%। আমার মাথায় আসে না, এই রিজার্ভ কিন্তু ন্যাচারাল সোর্স থেকে রিজার্ভ নয়, এটা রাশিয়া থেকেই কেনা অতিরিক্ত গ্যাস। এটাতো একসময় শেষ হবেই? তখন পোল্যান্ড কি করবে? পোল্যান্ড বলছে-সে জার্মানীর থেকে গ্যাস নিবে। তাহলে জার্মানীর গ্যাস থাকতে হবে নিশ্চয়ই! অথচ জার্মানী নিজেই রাশিয়া এবং স্পেন থেকে গ্যাস কিনে। এদিকে জার্মানীও রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং ইউরো/ডলার ছাড়া তারাও রাশিয়াকে রুবলে পেমেন্ট করবে না বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে অনেকদিন ঘুমিয়ে থাকার পর স্পেন হটাত ঘুম থেকে জেগে বলে বসলো যে, জার্মানী যদি পোল্যান্ডকে গ্যাস সরবরাহ করে, তাহলে স্পেন জার্মানিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। কেমন চক্কর!!

যাই হোক যেটা বলছিলাম-

রাশিয়ার কঠিন হুশিয়ারীতে পোল্যান্ড এবং বুলগেরিয়ার গ্যাসলাইন বন্ধ করার কারনে বাকী ইউরোপিয়ানদের একটু টনক নড়েছে যে, গ্যাস তো লাগবেই, গ্যাস ছাড়া তো আর রুম হিটিং হবে না, কলকারখানা চলবে না, সব অচল হয়ে যাবে, ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ হয়ে যাবে ইত্যাদি। কিন্তু উলটা মন্তব্য করতেও দ্বিধা করেনি ইউরোপ। তারা বলেছে-রাশিয়া গ্যাসের মাধ্যমে ইউরোপকে ব্ল্যাকমেইল করছে। আজব ব্যাপার হচ্ছে-একদিকে ইউরোপ রাশিয়ার সবকিছুর উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যে, কেউ যেনো রাশিয়া থেকে কিছুই না নেয়। একেবারে এক ঘরে করতে চেয়েছে। এখন আবার যখন রাশিয়া নিজেই সেই  সাপ্লাই ইউরোপে বন্ধ করে দিলো এবং ইউরোপের কথাতেই রাশিয়া একঘরে হয়ে থাকতে চাইলো যে, যেহেতু কেউ আমার পন্য নিবে না, তাই আমিও বন্ধই করে দিলাম, তখন আবার ইউরোপ বলছে, এটা কেমন কথা? আমরা নিষেধাজ্ঞা দিবো ঠিকই, কিন্তু তুমি আমাদেরকে তেল গ্যাস সব দিবা কিন্তু ফ্রিতে। কারন আমরা ইউরো/ডলারে দাম দেবো আর সেটা পশ্চিমারা তাদের ব্যাংক সিস্টেমে আটকে দিবে। আমাদের টাকা আমাদের কাছেই রয়ে গেলো, আবার পন্যও ফ্রিতে পাইলাম!!

আহাম্মকের মতো মনে হয়েছে আমার কাছে এই সিন্ডিকেটিজমটা। সত্তোর্ধ বয়সী প্রায় ২৪ বছর যাবত একাধারে রাষ্ট্রনায়কের কাছে এসব একেবারে হাস্যকর মনে হবার কথা না? তাই পুতিন স্যাম্পল হিসাবে আপাতত পোল্যান্ড এবং বুলগেরিয়ার গ্যাসলাইন বন্ধ করে দিলেন। ঠেলার নাম বাবাজি এটা সবাই জানে, ফলে এবার দেশের অবস্থা বেগতিক দেখে প্রথমে ইউরোপের ৪টি দেশ ইতিমধ্যে রাশিয়ার সাথে রুবলে পেমেন্টের জন্য একাউন্ট খুলতে রাজি হয়ে গেলো এবং তারা পেমেন্টও করে দিলো।  তাহলে বাকী দেশগুলি এখন কি করবে?

ইউরোপের জন্য কি অপশন খোলাঃ

ইউরোপের জন্য এখন দুটু অপশন খোলা-(ক) হয় রাশিয়ার শর্ত মেনে নিয়ে রুবলের মাধ্যমে গ্যাস নেওয়া অথবা (খ) রাশিয়ার গ্যাসের উপর বিকল্প তৈরী করে রাশিয়ার গ্যাস না নেয়া এবং নিষেধাজ্ঞা জারী রাখা।

জার্মানীর চ্যান্সেলর উলফ সোলজ রাশিয়ার এই নতুন নির্দেশনায় খুবই ক্ষিপ্ততার সাথে রাশিয়ার শর্ত নাকচ করে দিয়ে ২৯ মার্চ বলেছিলো যে, কোনো অবস্থাতেই তারা গ্যাস কন্ট্রাক্টের বাইরে অর্থাৎ হয় ইউরো না হয় ডলারে পেমেন্ট, অন্য কোনো কারেন্সিতে জার্মানী যাবে না। আজ প্রায় ৩০ দিন পর জার্মানীর একমাত্র গ্যাস ক্রেতাকোম্পানি UNIPER পুতিনের শর্ত মেনে নিয়ে রুবলের মাধ্যমেই এখন গ্যাস ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অষ্টিন কোম্পানি O&V, ইতালীর ANI এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশের গ্যাস সরবরাহ কোম্পানীগুলিও একইভাবে গ্যাজপ্রোম ব্যাংকে তাদের রুবলের একাউন্ট খুলছে।

নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা কিঃ

এখন প্রশ্ন হচ্ছে-রাশিয়ার উপর পশ্চিমা এবং ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকা সত্তেও, সুইফট থেকে রাশিয়াকে আউট করে দিয়েও আবার সেই রাশিয়া থেকেই রাশিয়ার শর্তে গ্যাস কেনায় পশ্চিমাদের কিংবা ইউরোপের কি সম্মান বজায় থাকলো? নিষেধাজ্ঞা কি তাহলে কার্যকরী হলো?। এর ব্যাখ্যা তাহলে কি?

রাশিয়া থেকে গ্যাস কেনা আর রাশিয়া থেকে পুতিনের শর্তে গ্যাস কেনা এক নয়। যদি এসব কোম্পানীগুলি পশ্চিমা এবং ইউরোপিয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাশিয়া থেকে গ্যাস ক্রয় করে, তাহলে এসব কোম্পানীকে শাস্তির মুখে পড়ার কথা না?  কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে-ব্রাসেলস এখন পুরুই নিশ্চুপ। তাহলে ব্রাসেলসের এই চুপ থাকার কারন কি? এরও একটা ব্যাখ্যা আছে যা আমাদের মতো আমজনতা জানেই না। আর সেটা হচ্ছে-নিষেধাজ্ঞার শর্তের মধ্যে একটা ছোট ফাক রাখা হয়েছিলো। আর সেটা কি?

কিছুদিন আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সব সরবরাহকারীদের জন্য একটা গাইডবুক দিয়েছে। সেখানে তিনটা গাইডলাইন দেয়া হয়েছেঃ

(1)        Uphold EU sanction

(2)        Abide by Putin’s Decree

(3)        Secure Natural gas for Europe.

আসলে এই গাইডলাইনে উভয়পক্ষের জন্য Win-Win Situation রাখা হয়েছে। আর ঠিক এই গাইডলাইনের ২ নং শর্তের কারনেই ইউরোপের গ্যাস কোম্পানীগুলির বিরুদ্ধে ইউরোপ বা পশ্চিমারা কোনো শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নিতে পারবে না বা পারতে চায় না। তারা সবাই সানন্দে এখন দুটু করে একাউন্ট খুলছে গাজপ্রোম ব্যাংকে। প্রথম একাউন্ট ইউরো বা ডলারে, অন্যটি রুবলে। একই ব্যাংকে, গাজপ্রোম ব্যাংক।

লেনদেনটা কিভাবে হবেঃ

তাহলে এই লেনদেনটা কিভাবে হবে? সেটাও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বলে দিয়েছে। প্রথমে ক্রেতা তার পেমেন্ট ইউরো বা ডলারে জমা করবে গাজপ্রোম ডলার/ইউরো ব্যাংক একাউন্টে। গাজপ্রোম ব্যাংক অতঃপর সেই ইউরো বা ডলার রুবলে কনভার্ট করে তাদের পেমেন্ট নিয়ে নিবে। কিন্তু এখানে আরেকটা জটিল সমস্যা আছে যে, যেহেতু ইউরোপ এবং পশ্চিমারা রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংককে সুইফট থেকে বের করে দিয়েছে, ফলে গাজপ্রোম ব্যংক কিছুতেই গ্যাসের পেমেন্ট ইউরো বা ডলার থেকে রুবলে কনভার্ট করতে পারবে না। তাহলে উপায়?

ঠিক এখানেও ইউরোপিয়ানরা তাদের সরবরাহকারীদেরকে গাইডলাইন দিয়ে দিয়েছে এভাবে-

(এখানে একটা কথা না বললেই নয়। আমরা যারা ব্যবসা করি তারা এটা খুব ভাল করে জানি কিন্তু অন্যান্য ব্যক্তিরা যারা ব্যংকিং সেক্টরে এলসির (LC: Letter of Credit)  সাথে জড়িত নন, তাদের বুঝার জন্য বলছি যে, সাধারনত ইম্পোর্ট এক্সপোর্টে যখনই কোনো পেমেন্ট বেনিফিশিয়ারী ব্যাংক রিসিভড হয়, তখনই পেমেন্টের কাজ শেষ হয়ে যায় বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে যতোক্ষন না পর্যন্ত ইউরো বা ডলার রাশিয়ার রুবলে কনভার্ট না হচ্ছে ততক্ষন পর্যন্ত পেমেন্ট রিসিভড হয়ে বলে ধরে নেয়া যাবে না। আর এটার জন্য শুধুমাত্র ইন্টারকারেন্সী চেঞ্জ পালিত হবে। তার মানে কি? তারমানে গ্যাজপ্রোম ব্যংক তাদেরই গ্যাজ প্রোম ডলার/ইউরো একাউন্টে রুবল বিক্রি করবে এবং রুবলের দামের উপর ইউরো বা ডলার উঠানামা করবে। ইউরো বা ডলারের মানের উপর রুবলের মান উঠা নামা করবে না। খুবই বিপদজনক অবস্থায় আছে এখন ইউরো এবং ডলার। আগে ইউরো বা ডলারের মাপে রুবল উঠানামা করতো, এবার ডলার/ইউরো রুবলের মাপে উঠা নামা করবে।

তাহলে রুবল কি দূর্বল হতে যাচ্ছে নাকি সবলঃ

তাহলে আরেক প্রশ্ন জেগে উঠে- রুবলকে শক্তিশালী করা নাকি রুবলকে দূর্বল করলে ডলার বা ইউরোর লাভ? যদি পশ্চিমারা ১ ডলার সমান ২০০ রুবল করতে চায়, করুক, তাহলে যখন ইউরোপিয়ানরা রুবলে গ্যাসপেমেন্ট করবে তখন ডলার বা ইউরোর সমান পরিমান রুবল দিতে হলে ওদেরকে অনেক ডলার বা ইউরো খরচ করতে হবে। আর যদি ডলার/ইউরোর মান সমান সমানে থাকে তাহলে ইউরো/ডলার কম খরচ করতে হবে। আর ঠিক একারনেই এবার পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ানরা রুবলের মান শক্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু বিজ্ঞ পুটিন বলছে, তোমরা আমার রুবলের দাম আরো কমাইয়া দাও, আমার কোনো সমস্যা নাই।

ইউরোপ এর বন্ডেজের ভীত তাহলে কই যাবেঃ

ইউরোপের আসলে এখন কিছুই করার নাই। In fact, for Europe, its a choice between Air Conditiong and Peace. জার্মানী পরিষ্কারভাবে Air Conditioning বেছে নেয়ার চেষ্টা করেছিলো ইতালীর মতো। ইতালী তার জনগনকে এসি চালানোর ক্ষেত্রে একটা তাপমাত্রা নির্ধারন করে দিয়েছে। কিন্তু সেটা কয়দিন?

মূল কথায় আসি। ইউরোপ এবং পশ্চিমাদের দ্বারা আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মুল লক্ষ্য ছিলো রাশিয়াকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পংগু করে ফেলা। কিন্তু সেটা কি হয়েছে? সেটা কিন্তু হয় নাই। ইউরোপ নিজেই রাশিয়াকে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ মিলিয়ন ইউরো পে করে থাকে এই গ্যাসের জন্য। এরমানে ইউরোপ নিজেই পুতিনের ওয়ারমেশিনকে ফান্ডিং করছে। জার্মান কিংবা ইউরোপিয়ান কোম্পানী রাশিয়াকে মিলিয়ন মিলিয়ন ইউরো/ডলার দিচ্ছে, রাশিয়া সেই ইউরো/ডলার দিয়ে তার যুদ্ধের খরচ মিটিয়ে ইউক্রেনকে ধংশ করছে। আর ইউক্রেন আবার জার্মানী কিংবা ইউরোপীয়া ইউনিয়নের দেশগুলি থেকেই অস্ত্র সরবরাহ পাচ্ছে। তার মানে কি দাড়ালো?

Moral of the Story is: All the lectures and principles are farse and what matters in the end is only own interest.

২৮/০৩/২০২২-ন্যাচারাল প্রতিশোধ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য শোনার জন্য কানাডা, আমেরিকা, ইউকে, পোল্যান্ড, ইজরায়েল, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মান, ফ্রান্স ইত্যাদি পার্লামেন্টে বিশেষ অধিবেশন হয়েছে। সব এমপিগন, মিনিষ্টারগন স্ট্যান্ডিং ওভেশনে সম্মান দিয়ে একাত্ততা দেখিয়েছেন। এছাড়া জি-৭, জি-২০, স্কোয়াড, ব্রিক্সস, ব্রাসেলস মিটিং তো আছেই, তারপর ন্যাটোর পরপর অনেকবার মিটিং, ন্যাটো দেশসমুহের মধ্যে বারবার মিটিং/ বৈঠক, জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে বহুবার গুতেরিসের ভাষন, প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীরও ভার্চুয়াল ভাষন, ইত্যাদি বহুবার সম্প্রচার করা হয়েছে। এ ছাড়া, বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিশেষ বিশেষভাবে কয়েকজন একত্রে মিলিত হয়ে বৈঠক করেও বিভিন্ন প্রস্তাব করেছেন। রাশিয়ার একনায়কতন্ত্র স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার নিষেধাজ্ঞাসহ রাশিয়ার কমার্শিয়াল, ইকোনোমিক্যাল নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে অন্যান্য দেশ সমুহকেও ন্যাটো এবং পশ্চিমারা বিভিন্ন দেশকে এমন এমন চাপের মধ্যে রেখেছে যে, হয় তাদেরকে ন্যাটো, ইইউ দেশসমুহ তথা পশ্চিমাদের কথা শুনতে হবে, অথবা তারাও তাঁদের নিষেধাজ্ঞায় পতীত হবেন এমন কথাও বলা হয়েছে। উপরন্তু, যেসব দেশকে আগেই এই পশ্চিমারা বিভিন্ন কারনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিলো, যেমন ইরান, ভেনিজুয়েলা ইত্যাদি তাদেরকে এখন আবার নিষেধাজ্ঞার বাইরে নিয়ে ওই সব দেশের তেল/ গ্যাস রপ্তানীর শর্তে যোগাযোগও করেছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, হাজার হাজার মিলিয়ন, বিলিয়ন ডলারের সাহাজ্য, মাত্রাতিরিক্ত অস্ত্র সরবরাহ, এমনকি প্রানে মেরে ফেলার হুমকী দিতেও কোনো বাধা ছিলো না। একটা সুপার পাওয়ারের দেশের প্রেসিডেন্টকে আরেকটা সুপার পাওয়ারের দেশের প্রেসিডেন্ট তাঁর ক্ষমতা উতখাতের নিশ্চয়তা দিয়ে, রিজিম পরিবর্তনের হুমকীও দিয়েছে।

আমি মানি, রাশিয়া ইউক্রেনের মতো একটা স্বাধীন রাষ্ট্রকে এভাবে অতর্কিত হামলায় হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তি কিংবা দেশ দখলের মতো কাজ করতে দেয়া উচিত না এবং তাঁর এই কাজকে কোনোদিনই সমর্থনযোগ্য নয়। সারা দুনিয়ার বিশেষ করে ন্যাটো, ইইউ, ব্রিক্স, পশ্চিমা দেশ, ফ্রান্স, জাপান, অষত্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, জার্মান কিংবা এসব দেশ যে মানবতা দেখাচ্ছে, তা ঠিকই আছে। আমিও তাঁদের এসব কর্মকে সমর্থন করি।

কিন্তু ঠিক তারপরের যেটা আমার জানতে ইচ্ছে করে-

তারা কি এসব শুধু ইহুদী, খ্রিশটিয়ান, হোয়াইটস এর জন্যই প্রজোজ্য নাকি সব মানুষের জন্য? তারা কি আফগানিস্থান, সিরিয়া, প্যালেষ্টাইন, ইয়েমেন, তালেবান, ইরাক, ইত্যাদি দেশগুলির মানবেতর মানুষগুলির জন্যেও এটা করতে পারতেন না? এতো এতো পার্লামেন্টারী সেসন না হোক, অন্তত কিছুটা আওয়াজ, কিছুটা সাহস, কিছুটা আশসাস? এখানে এই কথা আবার কেউ বলবেন না যে, অন্যান্যদের উপর অত্যাচারের কারনে ইউক্রেনের সাধারন মানুষের ভোগান্তি কেনো সমর্থন করা হবে? ঠিকই তো। সেটাও সমর্থন যোগ্য নয়। কিন্তু প্রশ্নটা ইউক্রেনের সাধারন মানুষের ব্যাপারে নয় শুধু, প্রশ্নটা সেই ভোগান্তিগুলির মানুশ গুলির জন্যেও। কিন্তু অইসব ভোগান্যি গুলির জন্য দায়ী কারা? কে বা কারা করেছে সেসব? কাদের দ্বারা সেই সব ভোগান্তিগুলি হয়েছে বা হচ্ছে? এখনো তো হচ্ছে? এই ন্যাটো, এই পশ্চিমারা, এই ইহুদীরা, এই খ্রিষ্টানরা, এই হোয়াইটসরাই তো বিমান থেকে অতর্কিত হামলা, হাজার হাজার মানুষের রিফুজি হবার কান্নার সিনারীও, ধর্ষন, লুটপাট, জীবননাশ করেছে। হয়তো ফ্রান্স করে নাই কিন্তু আমেরিকা করেছে, তখন ফ্রান্স চুপ ছিলো। হয়তো আমেরিকা করে নাই ইউকে করেছিলো, তখন আমেরিকা, ফ্রান্স উভয়েই চুপ ছিলো, হয়তো রাশিয়া করেছে কিন্তু টার্গেট মুসলমান ছিলো বলে আমেরিকা, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মান সবাই চুপ ছিলো। তখন কি ওই সব সন্ত্রাসী ক্ষমতাধরদেরকে অন্তত কথা দিয়ে ধমক দিয়ে প্রতিহত করার নৈতিক দায়িত্ব রাখতে পারতো না? সেসব দেশের মানুষেরাও তো অতীব সাধারন জনগনই ছিলো। তাঁদের বেলায় এতো কাভারেজ, এতো মিটিং, এতো সোচ্চার কেনো করলো না আজকের দিনের নেতারা? তখন কি তারা ওয়ার্ল্ড লিডার হিসাবে এই ওয়ার্ল্ডে ছিলেন না? তারা যদি সমন্নিতভাবে আবার বলছি সমন্নিতভাবে এক জোটে সেই সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতেন, তাহলে কি এই প্রিথিবিতে অন্য আরেক জুলুমবাজের তৈরী হতো?

এর মানেই এই, যারা আজ রাশিয়ার এই এগ্রেসিভ অন্যায়কে সমর্থন করে, তারা আসলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কথা বলছে না, কথা বলছে সেসব ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যারা ইউক্রেনের এই অবস্থায় মনে করছে যে, ইউক্রেনদের উপর আরেক জুলুমবাজ অন্যায় হচ্ছে বলে এতো ব্যাপক নরাচরা করছেন। এটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বলেই ভাবা হচ্ছে। ১৪ গোষ্টি নিয়া একজনের বিরুদ্ধে লড়াই করাই যায়। ১৪ গোষ্টির শক্তি নিয়া পাশের বাড়ির বস্তির মফিজও মাস্তানী করতে পারে একজনের বিপক্ষে। ওয়ান টু ওয়ান করুক না? দেখা যাক কি হয়? সব শিয়ালেরে একসাথে করে হুক্কা হুয়া দেয়া মানে একা সাহসী নয়। এই যে ৩ হাজার ইহুদী ইজরায়েলে গেলো ইউক্রেন থেকে, তাদেরকে বাসস্থান দেয়ার জন্যে অকোপাইড গাজায় শুরু হয়েছে আরেক ধংশযজ্ঞ। কই কেউ তো এই মুহুর্তে সেটার ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছে না? মিডিয়া কাভারেজও নাই, কিন্তু ওইসব নীরিহ মানুষগুলি তো বাস্তচ্যুত হচ্ছে। তাঁদের ব্যাপারে কেউ তো কিছু বলছে না?

ন্যাচার যখন প্রতিশোধ নেয়া শুরু করে, তখন শুরু হয় খুব ছোট কিছু থেকে। তখন সব জুলুমবাজদের সাথে যারা চুপ ছিলো, তারাও সেই ন্যাচারাল প্রতিশধের আওতায় এসে যায়। হতে পারে, সেই প্রক্রিয়টা শুরু হয়ে গেছে আর এটা খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে বলে আমার ধারনা। এই মুহুর্তে যতোটা ক্লিন দেখা যায় পরিস্থিতি, সেটা হয়তো ততোটা ক্লীন নয়। যার যার সার্থে আঘাত লাগলে কিছুদিন পর বুঝা যাবে, কে কার বা কার কে।

গ্রামে যখন দুই মোড়ল মারামারি করে, সেই গ্রামেই কেউ কেউ খুব মুচকী মুচকি হাসে এইজন্য যে, অন্তত এক মোড়ল আরেক মোড়লেরে ঘুষি তো মারছে!! যে ঘুষিটা আসলে অই মুচকি মুচকি হাসা নীরিহ পাবলিক মারতে চাইতো কিন্তু কখনো পারে নাই। এই দুই মোড়লকে আসলে কেহই পছন্দ করে না। তারা গাড্ডায় পড়লে অধিকাংশ লোকই অন্তরে একটু শান্তি পায়। মজা হলো-দুই মোড়লের অধোপতন সবাইই চায়। ভালোবাসা বা ক্রতজ্ঞতা যতোটুকু কেউ দেখায় সেটা জাষ্ট না পাইরা।

এই আর কি।

18/03/2022-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষ্রধাজ্ঞার প্রভাব  

যুদ্ধ কোনো কালেই কারো জন্য ভালো সংবাদ বয়ে আনে নাই। দুটু মোরগের মধ্যে ফাইটিং এ ও দুটু মোরগই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর যখন দেশ যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন দেশের মানুষের সাথে অন্যান্য প্রতিবেশী যারা যুদ্ধেই নেই, তারাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই তথ্যটা জানে না এমন নয়, তারপরেও যুদ্ধ হয়। এর একটাই কারন যে, সব প্রতিকুল আবহাওয়ায় ক্ষতির সাথে কিছু মানুষের ব্যবসা, আর সেই ব্যবসায় লাভ ও হয়। হতে পারে এই লাভটা অন্য এমন মানুষের যারা মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধটা চালিয়ে যাক এটাই দোয়া করছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার সাথে একটা অসম যুদ্ধ। এটা হবারই কথা না। কিন্তু তারপরেও হয়েছে এবং হচ্ছে। তাহলে এখানে কে ফাদে পড়লো, কাকে কে ফাদে ফেল্লো, এটা জানা আরো বেশী দরকার যাতে যুগে যুগে এই ফাদ পাতা ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নিতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে-ইতিহাস থেকে কেউ কখনো শিক্ষা নেয় না।

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে অনেক গুলি বিশ্লেষন বেরিয়ে আসছে ক্রমাগত। আজ আমি একটা নিয়ে আলাপ করার চেষ্টা করছি। যার নাম ‘নিষেধাজ্ঞা’।

রাশিয়ার উপর পুরু বিশ্ব প্রায় হাজার খানেকের বেশী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা নিয়েই আজকের আলাপ।

২৪ শে ফেব্রুয়ারী তে যখন ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন আক্রমন করে, পুতিন কি এসবের ব্যাপারে হোম ওয়ার্ক করে নাই? রনক্ষেত্র এক জিনিষ আর সারা দেশের অর্থনইতিক বিষয়টা আরেক জিনিষ। যদি পুতিন সেই রনক্ষেত্রের বাইরে দেশের অর্থনইতিক ব্যাপারটা নিয়ে হোম ওয়ার্ক না করে থাকেন, তাহলে আমি বল্বো এটা হয় আমাদের ভুল ধারনা, না হয় পুতিন বিচক্ষন নয়। কিন্তু ২২ বছর যাবত একটা রাষ্ট্রপ্রধান তাও আবার সুপার পাওয়ারের মতো দেশ রাশিয়ার, কেজিবির প্রধান, বয়ষ্ক ব্যক্তির পক্ষে এগুলি নিশ্চয় সে ভেবেছে। তাহলে এবার আসি, পুতিন এই অর্থনইতিক নিষেধাজ্ঞা কিভাবে মোকাবেলা করছে।

দেশের অর্থনীতিকে স্টাবল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

(ক)       রাশিয়াকে পশ্চিমারা সুইফট নামক  গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল সিস্টেম থেকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মার্কেটে লেন দেনে বিশাল অসুবিধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ফলে রাশিয়া তাঁর নিজস্ব মীর নামক সিস্টেমের মাধ্যমে ইলেল্ট্রনিক ট্রান্সফার, বিদেশী ব্যংকের সাথে লেন দেন, মাষ্টার কার্দের বিকল্প মিরের মাধ্যমে লেন দেনের বিকল্প ব্যবস্থা করেছে। এটা হয়তো সারা বিশ্ব জুড়ে এখনই কাজ করতে সক্ষম হবে না কিন্তু প্রয়োজনীয় লেন দেনে কোনো অসুবিধা নাই। একটা সময় আসবে যখন এই পশ্চিমাদের একচ্ছত্র সুইফট এর বিকল্প হিসাবে একদিন মীর দাঁড়িয়ে গেলে, রাশিয়ার অর্থনইতিক নিষেধাজ্ঞা অচিরেই বেশ আবার পুনর্জীবন পেয়ে যাবে।

(খ)       পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা হচ্ছে রাশিয়ার রিজার্ভে যে ইউ এস ডলার এবং ইউরো ছিলো, সেতার উপর কঠিন নিষেধাজ্ঞা। তাঁর মানে ডলার এবং ইউরো রাশিয়ার জন্য একেবারেই এখন নিরাপদ না। এর জন্যে রাশিয়া যা করেছে সেতা হলো- রাশিয়া এখন চায়নার মতো নিজস্ব কারেন্সীর মাধ্যমে বিদেশীদের সাথে ট্রেড করা শুরু করেছে। রাশিয়ার সাথে চায়নার মধ্যে রুবল-ইয়েন প্রথা চালু হয়েছে ইতিমধ্যে। ন্তুরষ্ক রুবলের মাধ্যমে রাশিয়ার সাথে ট্রেড লেন দেনে সম্মত হয়েছে। ভারতের সাথেও রুবল-রুপীর একটা সমঝোতা  হয়েছে তেল বিষয়ক লেন দেনে। এসব করার কারনে পুরু দুনিয়ায় যেখানে ডলার- ইউরোওই ছিলো একমাত্র ব্যবসায়ীক লেন দেনের কারেন্সী, সেটা ধীরে ধীরে কমে আসবে।

(গ)       আমদানী কারকদেরকে ডলারের বিপরীতে রুবলে পেমেন্ট প্রদানের নীতিমালায় রাশিয়া একটা প্যাকেজ ঘোষনা করেছে যে, বিদেশী সবার সাথে রাশিয়া ৮০% ডলার রেটে রুবলের পরিবর্তনে তাঁদের আমদানী দ্রব্যের দাম পরিশোধ করা। এতে যা হবে সেটা হলো- রুবল ধীরে ধীরে আন্ত্রজাতিক মুদায় পরিনত হবে এবং আমদানীকারকেরাও অনেক কিছু ২০% ছাড়ে মালামাল আমদানী করতে গেলে লাভবান হবে। তাঁর মানে এই যে, ডলারের বাজার একটা বিশাল এরিয়ায় অকেজো হয়ে যাবে।

(ঘ)       রাশিয়া ২০২২ সাল অবধি ইউরেসিয়া ইকোনোমিক ইউনিয়ন ভুক্ত দেশে সমস্ত পন্য রপানীতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাকিস্থান, কিরগিস্তান ইত্যাদি। এর মাধ্যমে রাশিয়া তাঁর নিজের দেশের লোকদের নিত্যদিনের পন্যকে নিরাপদ করে ফেললেন। বাইরের লোকদের জন্য এসব নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য এখন অসুবিধায় পড়বে। তাঁদের জন্য পন্যের দাম হবে আকাশ্চুম্বি। তাতে রাশিয়ার কিছুই যায় আসে না। কারন রাশিয়া আগে নিজের দেশের মানুষকে ভোগান্তি থেকে বাচাবে।

(চ)       রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে ২০% করেছে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার রুবলের দরপতন হ ওয়াতেও সাধারন জনগন রুবলের দরপতনে কিছুটা হলেও ইনফ্লেশন থেকে মুক্তি পাবে। প্রাইস স্ট্যাবিলিটি করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ এই পদিক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এখানে একটা ব্যাপার জানা দরকার যে, সুদের হার বাড়ালে কিভাবে প্রাইস স্ট্যাবিলিটি ঠিক থাকে। সেটা একটা বিশাল অংকের হিসাব, তাই বিস্তারীত আলাপ করা হলো না। তবে জেনে রাখা ভালো যে, সুদের হার বাড়িয়ে প্রাইস স্ট্যাবিলিটি একটা সাময়িক পদক্ষেপ মাত্র। রাশিয়া এখানেই থেমে থাকেনি। ক্রেডিট ইন্সটিটুশন গুলিকে রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংক নতুন লোনে কোনো ইন্টারেস্ট নেবে না কিংবা কেউ যদি ডিফল্টার হয় রুবলের দরপতনে, তাদেরকে ডিফল্টার হিসাবে ধরা হবে না যতোক্ষন রুবল স্ট্যাবল না হয়। এর ফলে দেখা যাচ্ছে ২৪ ফেব্রুয়ারিতে যখন ১ ডলারের দাম ছিলো ১২০ রুবল, এখন সেটা ১০০ রুবলের নীচে চলে এসছে।

(ছ)       আন্তর্জাতিক লোনের ব্যাপারে রাশিয়ার দুটু পেমেন্ট সিডিউল ছিলো গত ১৫ মার্চে। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক রাশিয়ার ডলার রিজার্ভ ব্লক করাতে সে ১১৭ মিলিয়ন ডলার পেমেন্ট করতে পারছিলো না। যদি রাশিয়া এই পেমেন্ট দুটু রিপেমেন্ট করতে না পারতো, তাহলে রাশিয়া আন্তর্জাতিকভাবে ব্যনাগকিং সেক্টরে একটা ডিফল্ট করে ফেলতে পারতো। একবার কোনো কোম্পানী বা দেশ যখন কোনো একটা জায়গায় ফল্ট করে, তখন তাঁর সি আই বি ও লাল হয়ে যায়। আর সি আই বি লাল হলে অন্য কোনো ব্যাংক বা দেশ তাঁর সাথে আর লেন দেন করতে পারে না। কিন্তু রাশিয়া তাঁর রিজার্ভ ফান্ড যেটা ডলার বা ইউরোতে ছিলো, ইতিমধ্যে বাজার রেটে ১১৭ মিলিয়ন ডলারের সমান রুবলে পেমেন্ট রিলিজ করার জন্য অফিশিয়ালী আদেশ দিয়ে দিয়েছে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে। এখন যদি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সেটা রুবল কারেন্সীতে পেমেন্ট না করে, তাহলে এটার দায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের, রাশিয়ার না।

(জ)      রাশিয়া বিনা মুল্যে তাঁর নাগরিকদেরকে অনেক সুবিধা প্রদানের অঙ্গীকার করেছে এবং দেয়া শুরু করেছে। তাঁর মধ্যে জরুরী বিষয়গুলি হচ্ছে- ছাত্রদের টিউশন ফি, পারিবারিক ভরন পোষনের খরচ, সিনিয়ার সিটিজেন্দেরকে অতিরিক্ত রুবল প্রদান, চাকুরীজীবিদের বেতন বৃদ্ধি, পেন শনের টাকা বৃদ্ধি, পাবলিক সেক্টরে আরো অনেক কিছুর ছাড়।

(ট)        স্মল এবং মিডিয়াম এন্টারপ্রিনিউরদেরকে রাশিয়া সরকার প্রনোদোনা প্যাকেজ দেয়া হচ্ছে যাতে তারা এই রুবল দরপতনে তাঁদের ব্যবসা আগের মতো করতে পারে। সাবসিডিয়ারী, ক্রেডিট ফেসিলিটি সহ সব ধরনের ব্যবস্থা রাশিয়া ইতিমধ্যে ব্যবস্থা করেছে।

(ঠ)       নিষেধাজ্ঞার কারনে কোনো ব্যবসায়ী যেনো তাঁদের উতপাদিত দ্রব্য উতপন্নে কম না করে তাঁর জন্যে রাশিয়া সরকার যা যা লাগে তাঁর সব ব্যবস্থা করবে বলে আশহাশ দিয়েছে। আর সেসব পন্য আপাতত ডমেষ্টিক বাজারেই ব্যবহারের ঘোষনা দিয়ে কিন্তু বাইরে রপ্তানী করতে নিষেধ আরোপন করেছে। তাতে দেশের ভিতরে দ্রব্যমুল্য একটা নিয়ন্ত্রনে থাকবে এবং বহির্বিশহে অন্যরা সাফার করবে। এটাই রাশিয়ার পরিকল্পনা। এর মধ্যে রয়েছে চিনি, গ্যাসোলিন, মেটাল, গম, ডিজেল, এবং অন্যান্য রপ্তানীমুলক দ্রব্য।

(ডঃ)     বিদেশী কোম্পানীগুলি যারা রাশিয়াতে ব্যবসা বন্ধ করার জন্য বলেছে, রাশিয়া তাঁর ব্যবসায়ীদেরকে বলেছেন যে, তাঁর নিজের দেশের নাগরিকগন যেনো সেসব ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান নিজেরা চালায়। বিদেশীদের এই ব্যবসাগুলি চালাইতে যা অর্থের জোগান লাগবে, সেটা রাশিয়ান সরকার বহন করবে। এর সাথে রাশিয়ার সরকার এটাও বলেছে, যদি কোনো বিদেশী কোম্পানী রাশিয়ায় এখনো ব্যবসা করতে চায়, তাহলে তারাও একটা ছাড়ে করতে পারে কিন্তু যদি রাজী না হয়, তাহলে এসব কোম্পানীগুলি রাশিয়ার তরফ থেকে রাষ্ট্রীয়করন করে রাশিয়ানরাই চালাতে পারে। এদের মধ্যে রয়েছে- ম্যাডোন্যাল্ডস, ভক্স ওয়াগন, শেল, এপেল, মাইক্রোসফট, এইচ এন্ড এম, ইত্যাদি।

(ব)       চায়নার ইউনিপে রাশিয়ার সর্বত্র চালু করা যার মাধ্যমে মাষ্টার কার্ড, ভিসা কার্ডের ইফেক্ট কমে যায়। মীরের পাশাপাশি ইউনিপে দুটুই চালু থাকবে।

যে কোনো একটা নতুন সিস্টেম পুরুপুরী চালু হতে কিছুটা সময় লাগে। রাশিয়ার এসব বিকল্প যখন ধীরে ধীরে সফল হতে থাকবে, তখন বিশ্ব বাজারে যেটা হবে সেটা হলো- মাষ্টারকার্দের মতো কিংবা ভিসা কার্দের মতো সিস্টেম গুলি আর সার্বোজনীন থাকবে না। তারা বেশ বড় একটা বাজার হারাবে। এর সাথে রাশিয়ার মীর কিংবা চায়নার ইউনিপে নতুন করে একতা বিপ্লব দিবে।

বড় বড় কোম্পানীগুলি বিসশ বাজার থেকে অনেক গুটিয়ে আসবে, বাজার হারাবে। আমাদের দেশে এক সময় কে এফ সি, পিজা হাট একচ্ছত্র বাজার পেলেও এখন প্রচুর লোকাল পিজার বাজার ভর্তি যা অইসব বিদেশী দোকান গুলি থেকে অনেক সস্থা। হতে পারে মানের দিক দিয়ে হয়তো ততোটা নয়, কিন্তু তারপরেও অনেক সাধারন ক্লায়েন্ট লোকাল পিজা বাজারেরো ভীর কম না। এর মানে বেশ কিছু ক্লায়েন্ট হারানোর মতো।

রাশিয়ার র মেটারিয়াল অন্যান্য দেশে রপ্তানী না যাওয়াতে অইসব দেশের অনেক শিল্প মুখ থুবরে পড়ে যাবে। তেল, গ্যাসোলিন, গ্যাস, স্টীল, গম, বার্লি, চিনি, ইত্যাদির সল্পতার কারনে বিসশে একটা উর্ধগামী মুল্যের প্রভাব পড়বে। যা অন্যান্য দেশকেও বিপদেই ফেলবে। কিন্তু এর মধ্যে রাশিয়া ধীরে ধীরে সাবলম্বি হয়ে উঠবে।

এর অর্থ একটাই- অর্থনইতিক অবরোধে সবাই একইভাবে সাফার করবে, শুধু রাশিয়া একা নয়।

13/03/2022-যুদ্ধের ১৭ দিন পর ইউক্রেন যুদ্ধে

যুদ্ধের ১৭ দিন পর ইউক্রেন যুদ্ধে গোপনে গোপনে একটা কম্প্রোমাইজের কথা শুনা যাচ্ছে যে, জেলেনেস্কি রাশিয়ার তিনটা শর্তই মেনে যুদ্ধ বন্ধ হোক, সাভাবিক জীবন আবার ফিরে আসুক, তাতে সায় দিয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধ আমাদেরকে কি কি শিক্ষা রেখে গেলো?

যুদ্ধের প্রথম দিনে জেলেনেস্কি দৃঢ়কন্ঠে ঘোষনা দিয়েছিলো যে, ইউক্রেনের প্রতিটি ইঞ্চি তারা ডিফেন্ড করবে। কারন সে সেটাই বলেছিলো যেটা পশ্চিমারা ওকে বলতে বলেছিলো যে, We will defend every inch of land of our friendly allainaces. কিন্তু সেটা কেনো হলো না? যদি কিছুটা বিশ্লেষন করি দেখবো যে, জেলেনেস্কী চারটা ভুল করেছেঃ

(১) সে পশ্চিমা, ইউরোপ এবং ন্যাটোর সাপোর্টের উপর অতিরিক্ত ভরষা করেছিলো। জেলেনেস্কী জানতো যে, ইউক্রেন রাশিয়ার কাছে সবদিক দিয়েই দূর্বল। কিন্তু জেনেস্কী পশ্চিমাদের, ইইউ এবং এলায়েন্সেরের ভরষাকে একটা ট্রাম কার্ড হিসাবে ভেবেছিলো। আর এটা তাঁর কোনো দোষ না। কারন ১লা সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে জেলেনেস্কী এক ভাষনে বলেছিলো যে, স্বয়ং বাইডেন জেলেনেস্কিকে বলেছেন, ইউক্রেন ন্যাটোর মেম্বারশীপ পাবেই আর সেটা যেভাবেই হোক। শুধু তাই না, জেলেনেস্কি এটাও বলেছেন যে, এপ্রিল ২০২১ এ বাইডেন তাকে এই কথাও বলেছেন যে, ইউক্রেনকে কখনোই আমেরিকা একা ছেড়ে যাবে না যদি রাশিয়া বা অন্যকোন কেউ তাকে আঘাত করেও। জেলেনেস্কী ভেবেছিলো, রাশিয়ার এতো বড় আর্মি আনবিক বোমা ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রথমে ন্যাটো তথা অন্যান্য দেশের পারমানবিক হুমকীর মাধ্যমে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইইউ, তাকে তৎক্ষণাৎ সাহাজ্য করবে, তারপরের ঘটনা তো আছেই, আর্থিক সাহাজ্য, ইত্যাদি।

কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছে উলটা। আমেরিকা সামনে আসলো না, ন্যাটোকেও ব্যবহার করলো না, নো ফ্লাই জোনও তৈরী করলো না, আবার বিমানও দিলো না। তারা তাকে এটাও বলেছিলো যে, আমেরিকা, ন্যাটো, ইইউ সবাই রাশিয়াকে এমনভাবে বয়কট করবে যাতে তাঁর তেল, গ্যাস, ফুড কমোডিটি ইত্যাদি আর কেউ না নেয়। রাশিয়াকে পংগু করে দেয়া হবে। কিন্তু সেটাও হলো না। আর হলেও সেতার ইফেক্ট অনেক অনেক পরে হয়তো। কথায় কথায় আমেরিকা রাশিয়ার তেল/গ্যাস বয়কট করলো ঠিকই, কারন না রাশিয়ার রপ্তানী আমেরিকাকে ইফেক্ট করে , না আমেরিকার আমদানী আমেরিকাকে সাফার করায়। তারা দুটুই তেল, গ্যাসের দেশ। অন্যদিকে বিট্রেন কিন্তু বয়কট করার পরেও তেল গ্যাস রীতিমত নিতেই থাকলো কারন সেটা তাঁদের নিত্যদিনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য। আবার অন্যদিকে ইইউ বাইডেনের এই অবরোধে রাজী হলো না। তারা আরো ৫ বছর সময় চাইলো। কারন প্রায় ৪০% তেল/গ্যাসের উপর পুরু ইউরোপ রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল। তাঁদের জনগনের অসুবিধা তারা করতে পারবে না।

(২) জেলেনেস্কীর ২য় ভুল ছিলো-পশ্চিমাদের কাছে ইউক্রেনের গুরুত্তকে অনেক বেশী, এটাই সে মুল্যায়ন করেছিলো । জেলেনেস্কি ভেবেছিলো যে, ইউক্রেন হচ্ছে ইউরোপের একটা শিল্ড। জেলেনেস্কী ২২/০১/২০২২ তারিখে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে তাঁর এক ভাষনে বলেছিলো-গত ৮ বছর যাবত ইউক্রেন ইউরোপের শিল্ড হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ইউক্রেন গত ৮ বছর যাবত রাশিয়ার মতো এমন একটা বৃহৎ আর্মিকে ঠেক দিতে পারছে। শুধু তাইনা, গত ২১/০২/২০২২ তারিখে অনুরুপ ভাষনে জেলেনেস্কী এটাও বলেছিলো যে, ইউক্রেন ছাড়া ইউরোপের ডিফেন্স বলয় কোনদিন সুরক্ষিত নয় এবং ইউরোপ ইউক্রেনকে ছাড়া স্বয়ংসম্পুর্নও নয়। ফলে ইউক্রেনের টেরিটোরিয়াল সভরেন্টি যদি ইউরোপ না রক্ষা করে, তাহলে ইউরোপ নিজেই রাশিয়ার কাছে হুমকী। কিন্তু জেলেনেস্কি বুঝতেই পারে নাই যে, ইউক্রেন হচ্ছে এই ইউরোপের কাছে একটা এক্সপেন্ডেবল আইটেমের মতো। তারা তাকে ন্যাটোর সদস্যপদ আগেই দেয় নাই, এখন তো আরো অনেক বাধা। দিচ্ছে, দিবে, এই এপ্লিকেশন গ্রহন করা হয়েছে ইত্যাদি বলে ইউক্রেনকে আবার ছেড়েও দিচ্ছিলো না। আসলে ব্যাপারটা হলো যে, তারা তাকে শুধু পুতিনের বিরুদ্ধে একটা টুলস হিসাবে ব্যবহার করছিলো যেটা জেলেনেস্কি বুঝতেই পারে নাই। মজার ব্যাপার হলো, এই ইউজফুল টুলস এর একটা এক্সপায়ারী ডেট ছিলো। আর সেটা এই ২৪ ফেব্রুয়ারী যখন রাশিয়া ইউক্রেনকে আক্রমন করে।

এই একই ঘটনা ঘটেছিলো ১৯৮০ এ আফগানিস্তানে যখন পশ্চিমারা মুজাহিদিনদেরকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ফাইট করার জন্য অর্থ সাপোর্ট দিয়েছিলো। অথচ আফগানিস্তান কিন্তু পশ্চিমাদের কাছে স্ট্র্যাটেজিক্যালী ইম্পোর্ট্যান্ট ছিলো না। আসলে সেটা ছিলো জাষ্ট সোভিয়েটকে পশ্চিমাদের একটা ব্লাডি নোজ দেয়ার পরিকল্পনা। সেখানেও আফগানিস্থান রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের একটা টুলস ছিলো।

সেই একই কাজ কিন্তু আমেরিকা করেছে জর্জিয়ার সাথেও। জর্জিয়াকে পশ্চিমারা ন্যাটো মেম্বারশিপ দেয়ার কথা বলেছিলো ২০০১ সালে। পশ্চিমারা জর্জিয়াকে প্রচুর আর্মস দিয়েছিলো, অতঃপর জর্জিয়া যুদ্ধ করে জর্জিয়া রাশিয়ার সাথে। যখন যুদ্ধ শুরু হলো, পশ্চিমারা পুলআউট করলো। আবখাজিয়া নামে আরেকটা দেশের সৃষ্টি হয়েছিল ২০০৩ সালে। আবখাজিয়া রাশিয়ার খুবই অনুগত একটা দেশ যা জর্জিয়ার জন্য হুমকী।

এই ভুলটাই জেলেনেস্কি করলো যে, তাকে ন্যাটোর মেম্বারশিপ দেয়া হবে, ইইউর সদস্য করা হবে, আর ইউক্রেন ইইউর সবচেয়ে বড় ঢাল হিসাবে রাশিয়ার ফোরফ্রন্টে স্ট্র্যাটেজিক ইম্পোর্ট্যান্ট হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকবে, ভেবেছিলো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে-ইউক্রেনের জন্য ন্যাটো একটা জাষ্ট কথার ঝুলি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না।

(৩) জেলেনেস্কীর ৩য় ভুলটা ছিল-সে পুতিনের রিয়েল ইনটেনশনকে পড়তে পারে নাই। আর পড়লেও ভুল পড়েছে। এটা অবশ্য জেলেনেস্কীর দোষ না। যুদ্ধ লাগার আগেও কেউ বুঝতে পারে নাই যে, পুতিন আসলেই ইউক্রেন এটাক করবে। জেলেনেস্কী ভেবেছিলো, থ্রেট আগেও ৮ বছর যাবতই ছিলো, রাশিয়া বারংবার থ্রেট দিতেই থাকবে, কিন্তু গত ৮ বছরের মতো পশ্চিমাদের ভয়ে রাশিয়া সাভাবিকভাবেই অন্তত যুদ্ধনামক ভয়াবহতায় জড়াবে না। এমন কি ২৮ জানুয়ারী ২০২২ তারিখে জেলেনেস্কির এক ভাষনে বলেছিলো যে, মিডিয়ার ভাষ্যে যেনো মনে হয় আমরা অতি শীঘ্র রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছি। কিন্তু রাশিয়া কখনোই যুদ্ধে জড়াবে না এটা নিশ্চিত। যুদ্ধ হবে এটা জেলেনেস্কীর মাথাতেও ছিলো না।

(৪) জেলেনেস্কির ৪র্থ ভুল টা ছিলো-জেলেনেস্কী সবসময় বিশ্বাস করতো যে, তাকে ন্যাটো, ইইউ, ইউকে, আমেরিকা, ফ্রান্স, কিংবা জার্মান সবাই সবকিছু দিয়ে একত্রে সাহাজ্য করবেই। সে বিশ্বাস হারায় নাই। ফলে সে পুতিনের কোনো কথায় রাজী না হয়ে শেষমেষ যুদ্ধেই থেকে গেলো। সে বুঝতেই পারে নাই যে, সবাই ‘অনলাইন’ যুদ্ধ করবে। আর সে মাঠে একা হয়ে যাবে।

যুদ্ধে একাই থেকে যাওয়ার কারনে হয়তো জেলেনেস্কী আপাতত হিরো হয়ে গেলো কিন্তু যখন যুদ্ধ থেমে যাবে, সবশর্ত মেনে ইউক্রেন আবার ফিরে আসবে, তখন ব্যাখ্যায় দেখা যাবে অনেকেই, জেলেনেস্কী কতটা ভুল করেছিলো। আর এই ভুল একদিন জেলেনেস্কীকে নামিয়ে আনবে ওদের দেশের ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে নীচে। আজকের দিনের ইউটিউব, ফেসবুক কমেন্টস একদিন ফেড হয়ে গিয়ে সেটাই সামনে আসবে যে, পুতিন প্রথমে যেটার দাবী করেছিলো সেটাই তো হলো, সারাবিশ্ব শুধু তাকিয়েই ছিলো, তাহলে ইউক্রেনের লিডারের এটা বুঝতে এতো দেরী করেছিলো কেনো? ইতিহাস তাঁর উত্তর দিবে। জনগন এতো কিছু বুঝে না, তারা বুঝে প্রতিদিনের আনন্দ, তাঁদের পরিবার আর সম্পর্ক। রাজ্য, রাজা, দেশ নিয়ে এতো কিছু তারা ভাবে না।

ইতিহাস এটাও বিচার করবে কিভাবে সারাবিশ্ব এই মানুষগুলিকে ধোকা দিয়েছে, যুদ্ধনামক এমন একটা ভয়াবহতায় ছেড়ে দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে কথার ঝুলি ছেরেছে। বড্ড মায়া লাগে যখন দেখি, ছোট একটা বাচ্চা আহত মায়ের কোলে ঘুমিয়ে আছে, সে হয়তো জানেই না চারিদিকে যুদ্ধ। কিন্তু একদিন সে এই ইতিহাস পড়বে আর নিজের বিবেচনায় বুঝতে শিখবে, কোথায় সিনিয়াররা ভুল করেছিলো, আর কি করা উচিত ছিলো। তখন তাঁর কাছে আজকের দিনের এইসব হিরোইক ইউটিউবের কোনো মুল্য থাকবে না।

যুদ্ধ কারো জন্যই ভাল নয়। রাশিয়ার পুতিন ও একদিন তাঁর দেশে একটা খারাপ মানুষের মধ্যে মুল্যায়িত হবে। কারন সারা বিশ্ব কর্তৃক অবরোধের কারনে ওরাও প্রতিদিন কষ্টে থাকবে।

কিয়েভ খুব কঠিন রাস্তায় এটা শিক্ষা পেলো যে, পশ্চিমাদের, ইউরোপের কিংবা অন্যান্য এলায়েন্সের মিথ্যা নির্ভরশীলতায় এবং মিথ্যা সাপোর্টের আশ্বস্ততায় অসম দেশের সাথে যুদ্ধ করতে যাওয়া একটা খারাপ আইডিয়া।

12/03/2022-এই কয়দিনের রাশিয়ান-ইউক্রেন যুদ্ধের

এই কয়দিনের রাশিয়ান-ইউক্রেন যুদ্ধের উপর মানুষের বিভিন্ন কমেন্টস পরে যেটা আমার ধারনা সেটা হলো-

আসলে কেহই কিন্তু ইউক্রেনের মতো একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের উপর রাশিয়ার এটাক সাপোর্ট করে না। তারপরেও কেউ রাশিয়াকে আবার কেউ ইউক্রেনের পক্ষে মনতব্য লিখছেন। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় তাঁদের এই কন্ট্রাডিকশন?

ব্যাপারটা কি এই যে, আমেরিকা, ইইউ, কিংবা ন্যাটো, বা জায়ান্ট সংবাদ মিডিয়াগুলির বিভিন্ন সময়ে পক্ষপাতিত্বমূলক ব্যবহারের কারনে মানুষেরা এখন ওই সব এলায়েন্সের উপর বিরক্ত এবং রাগ। অনেক দেশে ওরা অন্যায় করে, কিন্তু সেটা ওরা অন্যায় বলে স্বীকার করে না, সেটাকে একটা ভিন্ন নামে টেরোরিষ্ট এক্টিভিটি নামে ধংশজজ্ঞ চালায়, নির্বিঘ্নে মানুষ মারে, বাচ্চাদের মারে, সাথে দেশটাও ধংশ করে প্রায় দখলই করে থাকে। ওদেরকে অন্যায়টা বুঝানো যায়না, কারন ওরা শক্তিশালী, মোড়ল। আমরা আমজনতা, গরীব, শক্তিহীন এবং ওদের বিপক্ষে কথা বলার কোনো সাহস কিংবা সুযোগ নাই। এই আমজনতা কষ্ট পায়, দুঃখ পায়, ভাষাহীনভাবে নিজের ঠোট নিজেরাই কামড় দিয়ে চুপ করে থাকে। অসহায় এই আমজনতা। কিন্তু স্বৈরশাসক মোড়লেরা এবং জায়ান্ট সংবাদ মিডিয়াগুলি এসব আমজনতার পালস বুঝলেও স্বীকার করে না যে যেটা ওরা করছে সেটা অন্যায়। আফগানিস্থানে প্রথবার আমেরিকার এটাক যেমন আম জনতা না মানলেও কিছু বলতে পারে নাই, আবার সেই আফ গানিস্তানেই যখন আবার তারা সেই আগের তালেবানদেরকে ক্ষগমতায় বসিয়ে আরেকবার আম জনতাকে উদ্দেগের মধ্যে ফেলে কোনো প্রতিকার করে না, তখনো আম জনতা দুটু ঘটনাকেই আগ্রাসন এবং অন্যায় বলে জেনেছে। আম জনতা দেখেছে যে, ওরা নিজের সার্থেই সব কিছু করে। ওদেরকে কেউ কিছু বলতে পারেনা। এরফলে অন্য আরেক জুলুমবাজ যখন সেই একই জুলুম করতে থাকে, আর সেই জুলুমের প্রতিকারের জন্য সইসব মোড়লেরা, সংবাদ মিডিয়া তাঁদের রক্ষার জন্য একাধারে সাপোর্ট করতে থাকে, তখন রাশিয়ার মতো জুলুমবাজ মোড়লেরা কোনো না কোনো আবেগ থেকে একটা প্রচ্ছন্ন সাপোর্ট পায় এই আম জনতার কাছ থেকে। আর এই সাপোর্ট টা আর কিছুই না, আম জনতার রাগ আর বিরক্তের কারনে। আম জনতা তখন ভাবে- মরুক এরা এবার যারা আগেও মানুষের উপর জুলুম করেছে কিন্তু কিছু করার ছিলো না। এবার ওরা সাফার করুক। আর এই সাফার করুক কন্সেপ্টের মধ্যে ইউক্রেনের মতো, সিরিয়ার মতো, আফগানের মতো, রোহিংগারদের মতো আম জনতারা মরে, আর করুনার পাত্র হয়।

তাহলে যুদ্ধটা আম জনতার মধ্যে আসলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নয়, বা রাশিয়ার পক্ষেও নয়, এটা একটা সেই সব মোড়ল আর সংবাদ মিড়িয়ার বিপক্ষে যারা সাদাকে সাদা বলে না, কালোকে কালো বলে না। তাঁদের এসব চিন্তাধারা যতোদিন পরিবর্তন না হবে, জুলুমবাজদের পক্ষে সবসময় কেউ না কেউ সাপোর্ট করতেই থাকবে। এর ফলে সাধারন আমজনতার কষ্ট হতেই থাকবে, হোক সেটা ইউক্রেন কিংবা অন্য কেউ।

আজকে যদি জুলুমবাজ পুতিন মরেও যায়, তারপরে কি পশ্চিমারা রাশিয়ার আমজনতার কথা ভেবে তাঁদের উপর দেয়া সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিবে বলে ভাবছেন? নিবে না।  

আমাদের দেশে একটা কথা আছে- পাটা পুতায় ঘষাঘশিতে মরিচের জান শেষ। আমরা, হোক সেটা ইউক্রেন, সিরিয়া, আফগানিস্থান, ইরাক, ইয়েমেন, কিংবা কাশ্মীর, সবাই হচ্ছি সে মরিচ। আর এক জুলুম্বাজ রাশিয়া আরেক জুলুমবাজ পশ্চিমা বা এলায়েন্স হচ্ছে পাটা পুতা।

23/02/2022-আমি ২০০৩ সালে ইউক্রেনের কিয়েভে

আমি ২০০৩ সালে ইউক্রেনের কিয়েভে বেড়াতে গিয়েছিলাম একবার। তখন আমি জর্জিয়ায় জাতিসঙ্ঘ মিশনে কর্মরত ছিলাম। ইউক্রেনের এক মেজরের বাসায় উরুগুয়ের এক পাইলটকে সাথে নিয়ে তাঁর বাসায় বেড়াতে গিয়ে কিয়েভ সম্পর্কে আমার ধারনা একেবারে পালটে গিয়েছিলো। মানুষগুলি খুবই শান্তপ্রিয় আর শহরটাও মানুষগুলির মতো একেবারে শান্ত। কোনো কোলাহল নাই, সবাই ব্যস্ত আর খুবই মিশুক। মাত্র সপ্তাহখানেক ছিলাম।

উরুগুয়ের ওই পাইলটের সাথে এখনো আমার যোগাযোগ থাকলেও ইউক্রেনের সেই মেজরের সাথে আমার যোগাযোগ নাই। গতকাল সেই ইউক্রেনের উপর রাশিয়া আক্রমন করেছে শুনে খুব কষ্ট লাগলো মনে। ক্রেমলিন দেখার খুব শখ ছিলো। আমি ক্রেমলিনেও ভিজিট করতে গিয়েছিলাম। যেহেতু মিলিটারী অবজারভার হিসাবে কর্মরত ছিলাম, ফলে আমার সাথে কর্মরত একজন রাশিয়ান আর্মি অফিসারের সহায়তায় আমরা ক্রেমলিনের কিছুটা অংশ আমি সেখানে ভিজিট করতে পেরেছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, কতই না শক্তিশালী এসব ক্রেমলিন। আজ যেনো এটাই মনে আসলো দ্বিতীয়বার।

বিশ্ব রাজনীতির অভ্যন্তরে অনেক দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক এজেন্ডা লুকিয়ে থাকে বিধায় আমরা যা নগ্ন চোখে দেখি সেটা আসলে সেটা না যেটা দেখি। তাঁর ভিতরে হয়তো লুকিয়ে থাকে আরো ‘গভীর কিছু’। কিন্তু এই ‘গভীর কিছুর’ দ্বারা সংঘটিত কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা পুরু বিশ্বকে অগোছালো করে ফেলে যদিও এই ‘গভীর কিছু সংঘটিত’ বিষয়ে অনেকেই জড়িত থাকেন না। ছোট বা বড় কোনো দেশই এর থেকে পরিত্রান পায় না। ছোয়া লাগেই। ইউক্রেনকে আক্রমন করে রাশিয়া কতটুকু উপকৃত হবে বা ইউক্রেন কতটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু আমাদের মতো দেশ যারা এর আশেপাশেও নাই তাঁদের কি কি হতে পারে?

আমাদের দেশ অনেকটাই আমদানী-রপ্তানী নির্ভর একটি দেশ। আর এই আমদানী-রপ্তানী বেশীরভাগ হয় ইউরোপের অনেকগুলি দেশের মধ্যে। ইউরোপে মোট ২৮ টি দেশ আলাদা আলাদা হলেও বাস্তবিক হচ্ছে এরা একটা গুচ্ছগ্রামের মতো। ফলে ইউরোপের একটি দেশের ভিসা পেলেই আমরা অনায়াসে অন্য দেশগুলি ভ্রমনের সুবিধা পাই। কারেন্সীও একটা ‘ইউরো’ যদিও সবার আলাদা আলাদা কারেন্সী আছে। ইউরোপের এই দেশ গুলি কোনো কোনো ন্যাচারাল সম্পদে বেশ উন্নত। ফলে একটা দেশে যদি এ রকম গোলমাল চলতে থাকে, সাভাবিকভাবেই অন্য এলাকায় এর প্রভাব পড়েই। প্রভাব পড়বে জ্বালানীর দামে, গ্যাসের দামে, বেড়ে যাবে আমদানী রপ্তানী খরচ যা প্রকারান্তে সাধারন মানুষের উপরেই বর্তাবে। প্রভাব পড়বে উগ্র পন্থীদের যারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে আশেপাশের দেশ সমুহে। প্রভাব পড়বে ‘মুক্ত ও গনতান্ত্রিক বিশ্ব কন্সেপ্টে’ যদিও ‘মুক্ত ও গনতান্ত্রিক বিশ্ব কন্সেপ্ট’ এখন আছে বলে মনে হয় না। প্রভাব পড়বে সাইবার সিস্টেমে, শেয়ার মার্কেটে, ভোগ্য পন্যে, ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রভাব পড়বে বন্দরগুলিতে। 

বাংলাদেশ যদিও এর অনেক দূরের একটি দেশ কিন্তু ইউরোপে রপ্তানী করা পোষাক শিল্প একটা ঝুকির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা প্রচুর। আর যারা সরাসরি ইউক্রেনের সাথে আমদানী-রপ্তানীতে যুক্ত তাঁদের অবস্থা এখন খুবই আতংকের। আমাদের দেশ ইউক্রেন এবং রাশিয়া থেকে অনেক ভোগ্যপন্য আমদানী করে যেমন মটর, সোয়াবিন, গম,  ইত্যাদি, সেটা আরো উর্ধ গতি হতে পারে দামে। এ ছাড়াও আমাদের রপ্তানীকারক মালামাল যেমন প্লাষ্টিক, চামড়া, চামড়া জুতা, হিমায়িত খাবার, পাট বা পাটের দ্রব্য এসব রপ্তানীতে ঘটবে প্রচুর ব্যাঘাত। এমন একটা পরিস্থিতিতে আসলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

অন্যদিকে বড় বড় পরাশক্তি যতোই পিউনেটিভ একশন নিবে বলে যত প্রতিশ্রুতিই দেন না কেনো, যা ক্ষতি হবার তাঁর বেশীরভাগ ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। জাতিসঙ্ঘ, ন্যাটো, কিংবা অন্যান্য অক্সিলারী ফোর্স গ্রাউন্ডে যেতে যেতে রাশিয়ার উদ্দেশ্য হাসিল হয়েই যাবে। তারমধ্যে ইউক্রেন ন্যাটোর কোনো সদসই না।

ভবিষ্যৎ কি হবে এই মুহুর্তে বলা খুব দূরুহ।

6/2/2022-ইউক্রেন যুদ্ধ

যে যাইই বলুক, যুদ্ধ কারো জন্যই ভালো নয়। হোক সেটা ইউরোপে, আর হোক সেটা মধ্যপ্রাচ্যে। সবার, বিশেষ করে ওয়েষ্টার্ন এবং ইইউ, তাঁদেরও উচিত সাদাকে সাদা বলা, কালোকে কালো বলা যখন কোন আগ্রাসন হয় হিউম্যানের উপর। যদি সেটা না হয়, তাহলে এই দুনিয়ার মানুষের মধ্যে বিভেদ হতেই থাকবে। তারা সাদাকে সাদা না বলায়, কালোকে কালো না বলায়, এখন যেটা হচ্ছে, সেটা হলো, এই অসহায় ইউক্রেনবাসীদের উপরে অনেকেই মায়া দেখাচ্ছে না অথচ তারা কোনো দোষও করে নাই। তারাও আমাদের মতো অতি সাধারন মানুষ। একবার ভাবুন তো, যখন আমার আপনার পরিবার এ রকমভাবে সাফার করে, তখন কি পরিমান রক্তক্ষরন হয়? হোক সে যে কোনো ধর্মের বা দেশের। এই কঠিন উপলব্ধিটা যতোদিন ক্ষমতা লোভি নেতারা না বুঝবে, ততোদিন সর্বত্র সর্বসাধারন মানুষ, হোক সে প্যালেষ্টাইন, সিরিয়া, ইরাকী, বা ইউক্রেন, কিংবা হোক সে ইহুদি কিংবা মুসলিম, তাঁদের জীবন কোনোভাবেই সুরক্ষিত না।

আজকে যারা রাশিয়ার আক্রমনকে একটা প্রতিশোধমূলক হিসাবে দেখে আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন, তারাও কিন্তু যুদ্ধকে সায় দেননা কিন্তু তারপরেও তাঁদের মন্তব্য অনেক সময় এমন হয় যে, মরুক ওরা আর ওদের নেতারা যারা দূর্বলকে এতোদিন মেরেছে। এবার ওদের পালা যারা অসহায় মানুষকে এতোদিন নির্মমভাবে মেরেও কোনো আফসোস করতো না। এখন সেইসব নেতাসহ সাধারন জনগন যারা কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলে নাই,  তাঁদেরকে মরতে দেখে বা কষ্ট দেখে বাকীরা যেনো মনে একটা শান্তি অনুভব করেন। কিন্তু এটাই আসল সত্য নয়। কারন এই মানুষগুলিও জানে যে, সেই সব শিশুরা, অসহায় ব্যক্তিরা তো তাঁদের নেতাদেরকে সাদাকে সাদা আর কালকে কালো না বলার জন্য অনুপ্রানিত করে নাই। তাহলে এখন নেতাদের সাথে ওরা কেনো অন্যদের সিম্প্যাথি পাবে না? কিন্তু তারপরেও কিছু রাগ কিংবা গোস্যা থাকে যে, তারাও তো সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলে নেতাদের বিপক্ষে আন্দোলন করে নাই!! তারাও তখন চুপ ছিলো, নীরব ছিলো।

আমি ইউক্রেন, ইরাকী, সিরিয়া, প্যালেষ্টাইন, ইয়েমেন, সব সাধারন মানুষের জন্য কষ্ট অনুভব করি। হুশ হোক বিশ্ব নেতাদের, জ্ঞান ফিরে আসুক সব নেতাদের যারা অন্যায়কে অন্যায় আর আগ্রাসনকে আগ্রাসন, সাদাকে সাদা আর কালোকে লো বলে সবার জন্য একটা সমান প্লাটফর্ম তৈরী করবেন। তাহলেই এই যুদ্ধ, এই আগ্রাসন এবং এই ঘৃণা কিংবা বিদ্বেষ কমে শান্তির একটা বিশ্ব তৈরী হবে।

এই বিশ্বভ্রমান্ডে কাউকে ছাড়া কেউ বাচতে পারবে না। সমস্ত সম্পদ আল্লাহ সব জায়গায় এক তরফা দেন নাই। সবাই সবার উপর নির্ভরশিল। সবাইকেই সবার সরকার।