১৫/৫/২০১৯-২০ বছর আগের কিছু স্মৃতি…পর্ব-৩

আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগের কিছু দূর্লভ মূহুর্ত যা এখন অনেক অংশে ইতিহাস। এই ছবিগুলির মধ্যে অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন (আল্লাহ তাদের বেহেস্তবাসী করুন), কেউ কেউ বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন, যারা সেই সময় ছোট পুতুলের মতো পুতুল নিয়ে খেলা করেছে, তারা অনেকেই আজ সমাজে কেউ ডাক্তার, কেউ বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে কর্মরত, মেয়েদের মধ্যে অনেকেই মা হয়ে গেছে। ছেলেরাও আজ মাশ আল্লাহ খুব ভালো আছে। এইসব বাচ্চা গুলি, কিংবা বড়রা আমার অনেক কাছে মানুষ, এদের আগমন সব সময়ই আমাকে আনন্দিত করেছে। কিছুটা অবসর সময় ছিলো, তাই আগের দিনের কিছু ভিডিও আর স্থীর চিত্র নিয়ে বসেছিলাম। অতীত সামনে চলে আসে, নস্টালজিক হয়ে যাই। হয়ত কোনো একদিন, আমিও এই ভাবে ইতিহাস হয়ে যাবো, কিছুটা সময় কাছের মানুষেরা মনে রাখবে, এক সময় আমার জন্য এই পৃথিবী শেষ। গুটিকতক মনিষী ছাড়া বেশীর ভাগ মানুষেরাই অজানা ইতিহাসে মিশে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়।

এটাই পৃথিবীর বাস্তব নিয়ম।

২৮/০৪/২০১৯-নতুন ওয়ালেট

আমার ওয়ালেটটা বয়সের ভারে উহার গায়ের ছাল বাকলা উঠিয়া প্রায় জরাজীর্ন হইয়া গিয়াছিলো। নতুন একটা ওয়ালেট কিনি কিনি করিয়াও কেনা হইতেছিলো না। তো, আমার ব্যসায়ীক পার্টনার মূর্তজা ভাই একদিন উহার রুপ দেখিয়া বড়ই কাতরতা অনুভব করিলেন। আর মৃদু মৃদু হাসিয়া কহিলেন, আহা রে আপনার এই ওয়ালেট খানা তাহার কোম্পানী পাইলে উহা তাহাদের আর্কাইভে এন্টিক পিস হিসাবে রাখিয়া দিয়া বলিত, দেখো, আমাদের কোম্পানীর ওয়ালেট এতো জরাজীর্ন হইয়া যাইবার পরেও কাষ্টমারগন তাহা ব্যবহার করিতেই থাকেন। ইহা এতো আরামদায়ক এবং ব্যবহারযোগ্য।”

আমিও কিঞ্চিত হাসিয়া কহিলাম, আজ প্রায় ৫৫ বছর অতিবাহিত করিতেছি, আজ পর্জন্ত নিজে কোনোদিন ওয়ালেট কিনি নাই। ওয়ালেট কোম্পানীর নামও জানি না। ফলে নিজেও বুঝিতে পারি না কোন কোম্পানী ভালো ওয়ালেট বানায় আর কে ঠকায়। সব সময় প্রিয় জনেরাই আমাকে ভালোবাসিয়া, কেউ শ্রধ্যা করিয়া, ওয়ালেট সমুহ উপহার দিয়া থাকেন। এখন বৃদ্ধ হইয়াছি, বড়রা হারাইয়া যাইতেছেন বলিয়া স্নেহ করিয়া ওয়ালেট দেওয়ার মতো লোক হারাইয়া যাইতেছে, কিন্তু ছোটদের ভালোবাসা ক্রমেই বাড়িতেছে বটে কিন্তু ডিজিটাল যুকে আজকালকার ছেলেমেয়েরা ওয়ালেটের পরিবর্তে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন বিধায় অনেকেই ওয়ালেট উপহার হিসাবে দেওয়ার কথা মনে রাখেন না। তারপরেও কেহ কেহ আবার উপহার দেওয়ার সময় কি উপহার দেওয়া যাইতে পারে ইহা মাথা খাটাইয়া অনেক সময় ওয়ালেট সমুহ উপহার হিসাবে দিয়া থাকে। কিন্তু সেইসব অনুজগন এখনো হয়ত আমার ওয়ালেটটির বুড়ো বয়সের খবরটা জানিতে পারেন নাই। ফলে আরেকটি নতুন ওয়ালেট ও আমার পকেটে ঢোকিতেছে না। প্রৌড় স্ত্রীর মতোই আমার ওয়ালেটটি সকালে অফিসে যাওয়ার প্রাক্কালে সঙ্গী হইয়া রাতে পকেটে থাকিয়াই নীড়ে প্রবেশ করে।

গতকাল আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার এবং আমি একসাথে দুপুরের খাবার খাইতে বসিয়া তাহার সদ্য জার্মানীর ভ্রমন কাহিনী শুনিতেছিলাম। গল্প করিতে করিতে একেবারেই মামুলী ভাবে আমার সামনে একটি চমৎকার বক্সের ছোট কি যেনো ধরাইয়া দিলেন। বলিলেন, ভাই, এটা আপনার জন্য কিনিয়াছি। কোনো প্যাকেট দিলে, তাও আবার এই রকমের পার্টনার, যিনি আমার ব্যসায়ীক পার্টনারের থেকে বেশি হইতেছেন, আমার পরিবারের সদস্যদের মতো, উহা সাথে সাথে না খুলিয়া আর পারা যায় না। মন সারাক্ষণ অশান্ত হইয়া, চঞ্চল হইয়া ভাবিতে থাকে, কি উহা। না দেখা পর্যন্ত মন না শান্ত হয়, না কৌতূহল নিবারন হয়। যুবতীর বস্ত্র হরনের মতো অতি তাড়াতাড়ি আমি প্যাকেটটি খুলিয়া দেখিতে পাইলাম, আহা, বড় সুন্দর এক খানা ব্রান্ডের ওয়ালেট। Mont Blank। খুবই সুন্দর, যেনো উঠতি বয়সের বালিকার গায়ের গন্ধের মতো সুবাস, আর চেহাড়া। টান টান তাহার গতর, ইহার মাঝখানে কপালে টিপ দেওয়ার মতো একটা ছোট তারকা খচিত টিপ। ২ বছরের ওয়ারেন্টি। আবার ইন্স্যুরেন্স করা। কি তাজ্জব ব্যাপার বিদেশীদের। যেখানে আমাদের দেশের মানব কুলের জীবনের নিরাপত্তা নাই, যেখানে যাহাই কিনি তাহাতেই হরেক পদের দূষন জাতীয় জিনিষ দিয়া ভেজালে সমৃদ্ধ, সেখানে বিদেশী কোম্পানী গুলি বাংলাদেশ কে অনুসরন না করিয়া নির্ভেজাল জিনিষ বানাইয়া ২ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়া আবার তাহার সহিত ইন্স্যুরেন্স পর্যন্ত করিয়া দেয়। আসলে তাহারাই ব্যবসা বুঝিয়া গিয়াছে। তাই আমাদের মতো আমজনতারা ভালো জিনিষ পাইবার জন্য সুদূর বিদেশ গমন করিতে হয়। বাংলাদেশের চামোরা দিয়াই তাহারা তৈরী করিয়া বাংলাদেশেই আবার ব্যবসা করিতে করিতে তাহাদের ব্যাংক ভরিয়া উঠিতেছে। আর এ দেশের ব্যবসায়ীরা ক্রমেই লাটে উঠিয়া দুর্নীতির সমাজ আরো আঁকড়াইয়া ধরিয়া যতটুকুন নীচে তলাইয়া যাইতে পারে তাহারই যেনো প্রতিযোগিতায় নামিয়াছে।

খুবই ভালো লাগিলো। খবই আনন্দিত হইলাম তবে আশ্চর্জ হইলাম না। কারন মাঝে মাঝেই দেশের বাইরে গেলে আমার পার্টনার আমার জন্য নামী দামী ব্রান্ডের কোনো না কোনো উপহার নিয়া আসেন। দাম জিজ্ঞাসা করিলে তিনি কখনো তাহা ডিস্ক্লোজ করেন না, বরং এমন করিয়া হাসেন যেনো, উহা এমনিতেই বিদেশীরা দিয়া দিয়াছেন। তিনি দাম না জানানোর ব্যাপারে এতোই সচেতন যে, উপহারের গায়ে লিখা স্টিকারটিও খুজিয়া খুজিয়া চিরতরে ধংশ করিয়া দেন। কিন্তু এইবার তিনি বোধ হয় দামের স্টীকারটি খুজিয়া না পাইয়া উহা আর সরাইতে পারেন নাই। আমি ওয়ালেট খানা নতুন পীরিতের মানুষের মতো, তাহার গতর, পকেট, আনাচে কানাচে সর্বত্র উলতাইয়া পালতাইয়া দেখিতে গিয়া কোনো এক গোপন পকেটে দামের স্টীকারটি নজরে পড়িল। “২৩৫ ইউরো”!!

এমনিতেই বাহিরে রোদের তাপমাত্রা ছিলো প্রায় ৪১ ডিগ্রী, ঘরে এসি থাকা সত্তেও প্রাইস স্টীকার দেখিয়া প্রথমে মাথা, পরে মন ভন ভন করিতে লাগিলো। ওয়ালেটে টাকা রাখিবো কি, এখন দেখিতেছি, ওয়ালেট নিজেই সব তাকা খাইয়া ফেলিতেছে। তাও আবার ফরে কারেন্সি।

যাই হোক, নতুন ওয়ালেটে খুশি হইয়াছি অনেক কিন্তু পরক্ষনেই আমার মনের ভিতরে একটা তীব্র বেদনাও অনুভুত হইলো এই কারনে যে, এতদিনের পুরানো আমার বৃদ্ধ ওয়ালেটটির এখন অবসর গ্রহনের সময় হইয়াছে। নতুন ওয়ালেটের আগমনে আমার পুরানো ওয়ালেটকে অতি সত্তর জায়গা ছাড়িয়া দিতে হইবে। হয়ত আগামীকাল হইতে তাহার আর কোনো প্রয়োজন হইবে না। এতোদিন যাহাকে আমি প্রতিনিয়ত পকেটে আগলাইয়া রাখিতাম, যে আমার নিত্য সাথী ছিল, যা কিনা আমার গিন্নীর, বা ছেলেমেয়েদের প্রয়োজনে বুক খুলিয়া তাহাদের সাহায্য করিয়া আনন্দের ভাগ বাড়াইয়া দিতো, আগামিকাল হইতে তাহাকে আর কেহই খুজিবে না। এই কথা ভাবিতে ভাবিতে আমি নতুন এবং পুরাতন উভয় ওয়ালেটকেই পাশাপাশি রাখিয়া কিছুক্ষন স্তব্দ হইয়া নিবিড় চোখে তাকাইয়া রহিলাম। চোখ ভিজিলো কিনা জানি না, তবে মন গলিয়া উঠিলো। ভাবিলাম, আমরাও একদিন নতুনদের ক্রমাগত আগমনে এই সোনালী আকাশ, সবুজ গাছ পালা, সমুদ্রের ঢেউ, আকাশ ভর্তি জোস্নার আলো ছাড়িয়া নতুনদের জায়গা করিয়া দিতে হইবে এবং হয়। তখন আমরাও হয়ত এমন কোথাও অদৃশ্য হইয়া যাইবো। জগত সংসারে ইহা একটি চিরাচরিত নিয়ম। তারপরেও সব পুরানো দিন, পুরানো মানুষ, পুরানো বন্ধু, পুরানো সময় আমাদেরকে আরেক জগতে লইয়া যায়।

মন খারাপ হইবে ভাবিয়া আমার পুরানো ওয়ালেটটির ছবি প্রকাশ করিলাম না। তবে নতুন ওয়ালেটটির শুভ কামনায় তাহার কয়েকটি ছবি পোস্ট করিলাম। তাহার যাত্রা শুভ হোক। সবাই তাহার জন্য দোয়া করিবেন যাহাতে তাহার পেট সব সময় ভরা থাকে।

অনেক অনেক ধন্যবাদ মুর্তজা ভাইকে

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ওয়ালেটের জন্মদিনে বা পুরানো ওয়ালেটের অবসর গ্রহনের নিমিতে কোনো আকিকা বা ফেয়ারওয়েল কিংবা মিলাদ পড়ানোর সুযোগ নাই। ইহা ধর্মীয় মতে গ্রহনযোগ্য নহে। তবে কেহ সহী হাদিস সাপেক্ষে আবেদন করিলে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশে কিছু একটা দোয়া মাহফিল করা যাইতে পারে?

১৭/৪/২০১৯-খান এবং মেজর-ড্রাফট লিখিত চুক্তিনামা

মোট জমির পরিমান নিম্নরুপঃ

ক্রমিক মালিকানার নাম মৌজা জমির পরিমান
মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) চর গলগলিয়া ২২ শতাংশ ১৭৩.৫ শতাংশ
৮৭ শতাংশ
১৬ শতাংশ
২২.৫ শতাংশ
২৬ শতাংশ
মর্তুজা আলি চর গলগলিয়া ৮৮.৫ শতাংশ ২৫২.৫ শতাংশ
চর কুন্দুলিয়া ৮০ শতাংশ
চর কুন্দুলিয়া ৮৪ শতাংশ
জজ মিয়া চর কুন্দুলিয়া ৮৫ শতাংশ ৮৫ শতাংশ
আব্দুল মান্নান + আক্কাস চর কুন্দুলিয়া ৫১ শতাংশ ৫১ শতাংশ
সেলিম গং চর কুন্দুলিয়া ১৮২ শতাংশ ১৮২ শতাংশ
মোট জমির পরিমান ৭৪৪ শতাংশ

বিক্রিযোগ্য জমির বিবরনঃ

ক্রমিক মালিকানার নাম মৌজা পরিমান মোট জমি বিক্রিযোগ্য পরিমান মন্তব্য
মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) চর গলগলিয়া ২২ শঃ ১৭৩.৫ শতাংশ ২২ শতাংশ রেকর্ড জমি
৮৭ শঃ ৮৭ শতাংশ আরএস খাস
১৬ শঃ ১৬ শতাংশ রেকর্ড জমি
২২.৫ শঃ ২২.৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
২৬ শঃ ২৬ শতাংশ রেকর্ড জমি
মর্তুজা আলি চর গলগলিয়া ৮৮.৫ শঃ ২৫২.৫ শতাংশ ৮৮.৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
চর কুন্দুলিয়া ৮০ শঃ ৪৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
চর কুন্দুলিয়া ৮৪ শঃ ৮৪ শতাংশ রেকর্ড জমি
জজ মিয়া চর কুন্দুলিয়া ৮৫ শঃ ৮৫ শতাংশ ৮৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
আব্দুল মান্নান + আক্কাস চর কুন্দুলিয়া ৫১ শঃ ৫১ শতাংশ ৫১ শতাংশ রেকর্ড জমি
সেলিম গং চর কুন্দুলিয়া ১৮২ শঃ ১৮২ শতাংশ ১০৬ শতাংশ রেকর্ড জমি
মোট জমির পরিমান ৭৪৪ শতাংশ ৬৩৩ শতাংশ

হাতে লিখিত খসড়া চুক্তির বরখেলাপের নমুনা সমুহঃ

হস্তলিখিত ড্রাফট বাতিলের কারন সমুহঃ

(১)       এমওইউঃ হস্ত-লিখিত ১৭/০৪/২০২১ তারিখের ড্রাফট চুক্তির অনুচ্ছেদ (১৩) মোতাবেক ড্রাফট চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে চুড়ান্ত এমওইউ সম্পন্ন করার কথা, যদি ৩০ দিনের মধ্যে চুড়ান্ত এমওইউ না করা হয় তাহলে উক্ত হস্ত লিখিত চুক্তিটি বাতিল বলে গন্য করা হবে। কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান ৩০ দিন অতিবাহিত হলেও তিনি আর বিক্রেতার সাথে কোনো প্রকার চুড়ান্ত এমওইউ করেন নাই। বিধায় উক্ত হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তিটি ১৬/০৫/২০১৯ তারিখেই বাতিল বলিয়া গন্য হয়। যেহেতু চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায় ফলে উক্ত হস্ত লিখিত চুক্তির কোনো শর্তই আর কার্যকরী নহে। পরবর্তীতে যতো বেচা-কেনা সংঘটিত হয়, তা প্রকৃতপক্ষে কোনো চুক্তির অধীনে কিংবা কোনো শর্তের মধ্যে বেচা-কেনা সীমাবদ্ধ ছিলো না।

(২)       বায়নানামাঃ ওই একই হস্ত লিখিত চুক্তির অনুচ্ছেদ (৬) এ উল্লেখিত ছিলো যে, ৩০ দিনের মধ্যে বায়না করতে হবে। অর্থাৎ এই বায়নাও বেচা-বিক্রির নিমিত্তে একটা চুক্তি যেখানে এমওইউ এর মতো উভয় পক্ষের সমঝোতা বিষয়ক বিস্তারীত তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে এবং স্বাক্ষরিত হয়। জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব ৩০ দিনের মধ্যে কোনো বায়নানামাও করেন নাই।  

(৩)      ক্রয়-বিক্রয় সময়সীমাঃ হস্ত লিখিত ড্রাফট দলিলের অনুচ্ছেদ (৮) মোতাবেক শর্ত ছিলো যে, ক্রেতা মোট ৬৩৩ শতাংশ জমি প্রতি শতাংশ জমির গড়মুল্য ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকা হারে মোট ৬ মাসের মধ্যে ক্রয় সম্পন্ন করবেন। অতিরিক্ত আরো ৩ মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ৯ মাসের মধ্যে সম্পুর্ন ৬৩৩ শতাংশ জমি বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রয় করবেন। কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব উক্ত ৯ মাসের মধ্যে মাত্র ১৬৭.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন এবং বাকী জমি আর ক্রয় করতে পারেন নাই। অর্থাৎ মাত্র ২৫% জমি ক্রয়ের পর ক্রেতা আর কোনো জমি গত ২ বছরেও কিনতে পারেন নাই। জমি কেনা বেচার সময় সীমা পার হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে উক্ত হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তিটি ২য় বারের মতো বৈধতা হারায়।

(৪)       শরীকানা মালিকের জমি গোপনে ক্রয় করাঃ বিক্রেতা ৬৩৩ শতাংশ জমির মালিক তিনি একা ছিলেন না। মোট বিক্রেতা ছিলো ৫ জন মালিক। তাদের জমির পরিমান নিম্নে দেয়া হলোঃ

ক্রমিক মালিকানার নাম মৌজা পরিমান মোট জমি বিক্রিযোগ্য পরিমান মন্তব্য
মেজর আখতার হোসেন (অবঃ) গলগলিয়া ২২ শঃ ১৭৩.৫ শতাংশ ২২ শতাংশ রেকর্ড জমি
৮৭ শঃ ৮৭ শতাংশ আরএস খাস
১৬ শঃ ১৬ শতাংশ রেকর্ড জমি
২২.৫ শঃ ২২.৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
২৬ শঃ ২৬ শতাংশ রেকর্ড জমি
মর্তুজা আলি গলগলিয়া ৮৮.৫ শঃ ২৫২.৫ শতাংশ ৮৮.৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
কুন্দুলিয়া ৮০ শঃ ৪৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
কুন্দুলিয়া ৮৪ শঃ ৮৪ শতাংশ রেকর্ড জমি
জজ মিয়া কুন্দুলিয়া ৮৫ শঃ ৮৫ শতাংশ ৮৫ শতাংশ রেকর্ড জমি
আব্দুল মান্নান + আক্কাস কুন্দুলিয়া ৫১ শঃ ৫১ শতাংশ ৫১ শতাংশ রেকর্ড জমি
সেলিম গং কুন্দুলিয়া ১৮২ শঃ ১৮২ শতাংশ ১০৬ শতাংশ রেকর্ড জমি
মোট জমির পরিমান ৭৪৪ শতাংশ ৬৩৩ শতাংশ

উপরের টেবিলে ক্রমিক (৩) এবং ক্রমিক (৪) এর শরিকানা মালিকের যথাক্রমে ৮৫ শতাংশ এবং ৫১ শতাংশ জমি ক্রেতা গোপনে আতাত করে কম মুল্যে ক্রয় করেন। এর বাইরেও তিনি জজ মিয়া থেকে তাঁর বিবেচনায় IWT এর বাইরে পানির মধ্যে রেকর্ডিয় জমিও ক্রয় করেন।  

এখানে উল্লেখ্য যে, চরকুন্দুলিয়া জমির মুল্য এবং চরগলগলিয়া জমির মুল্য সমান না থাকায়, এবং চরকুন্দুলিয়া মৌজার জমির দাম কম আর চরগলগলিয়া মৌজার দাম বেশী হওয়ায়, বিক্রেতা উভয় মৌজার দামের মধ্যে সমন্নয় করে গড়মুল্য নির্ধারন করেন প্রতি শতাংশ ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকা। যাতে চরকুন্দুলিয়া মৌজার বর্ধিত দাম থেকে চরগলগলিয়া মৌজার গড় মুল্যের মধ্যে অতিরিক্ত মুল্য যোগ করে তিনি চরগলগলিয়ার প্রকৃত জমিওয়ালাদেরকে ন্যায্য মুল্য দিতে পারেন। ফলে ক্রেতা যে কোনো মৌজা থেকেই জমি ক্রয় করেন না কেন, ক্রেতাকে প্রতি শতাংশ জমির মুল্য ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকাই দেওয়ার কথা। কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান খান সাহেব গোপনে উক্ত শরীকদের সাথে আতাত করে জনাব জজ মিয়া এবং আব্দুল মান্নান গংদের জমি হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তির বাইরে বিক্রেতার অগোচরে আলাদা এবং কমমুল্যে যথাক্রমে ৮৫ শতাংশ এবং ৫১ শতাংশ জমি খরিদ করেন। এর ফলে বিক্রেতা শুধু মাত্র জজ মিয়ার জমিতেই ১ কোটি ৩২ লক্ষ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মান্নান গং দের জমিতে বিক্রেতা প্রায় ৫৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হন। একুনে বিক্রেতা প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হন।

(৫)      শর্ত মোতাবেক জমি না কেনার প্রস্তাবনাঃ ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব যখন ৬৩৩ শতাংশ জমির ব্যাপারে হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তি করেন, সেখানে মা ইন্ডাস্ট্রিজের জমি (৮৭ শতাংশ যাহা আরএস খাস), মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইস্টাবলিষ্টমেন্ট, মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইলেক্ট্রিক্যাল লাইনস সহ ক্রয় করবেন বলে হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তিতে বলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি উক্ত আরএস খাসজমি, মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইস্টাবলিষ্টমেন্ট, মা ইন্ডাস্ট্রিজের ইলেক্ট্রিক্যাল লাইনস ইত্যাদি না কেনার সিদ্ধান্ত নেন। এ ছাড়া তিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজের সম্মুখে ২২ শতাংশ জমি যা ৬৩৩ শতাংশ জমির মধ্যে ছিলো, তিনি সেটাও না কেনার সিদ্ধান্ত নেন বরং তিনি উক্ত ২২ শতাংশ জমি থেকে শুধুমাত্র রাস্তার নিমিত্তে ১৬ ফুট পরিমান জমি ক্রয় করে বাকী জমি না কেনার সিদ্ধান্ত নেন। এ ছাড়াও ক্রেতা মুজিবুর রহমান সাহেব ৬৩৩ শতাংশ জমির ভিতরে জনাব মর্তুজা সাহেবের চরকুন্দুলিয়ার এক অংশে ৮৪ শতাংশ জায়গা আলাদা ছিলো, যা ক্রেতা পরবর্তীতে উহা আর কিনবেন না বলে জানান।

(৬)       IWT সীমানাঃ হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির অনুচ্ছেদ (১২) মোতাবেক শর্ত ছিলো যে, ক্রেতা IWT সীমার বাইরের জমি ক্রয় করবেন। উক্ত এলাকায় সরকার কর্ত্রিক কোনো IWT সীমানা পিলার নাই বা সীমানা পিলার দিয়ে তা নির্ধারিত করা হয় নাই। কারন নদীর মধ্যেও ব্যক্তি মালিকানায় অনেক রেকর্ডিয় জমি রয়েছে। উক্ত ব্যক্তিগন সর্বদা উক্ত জমির ট্যাক্স, খাজনা ইত্যাদি নিয়মিত দিয়ে আসছেন। নদী দক্ষিন দিকে সরে যাওয়ার সাথে সাথে জমির মালিকগন তাদের রেকর্ডিয় জমিসমুহ ভোগ করতে থাকেন। ধরে নিলাম যে, শুষ্ক মৌসুমে সর্বশেষ নদীর পানি যেখানে থাকে সেটাই নদী শাসনের সীমানা। তাহলে ক্রেতা জনাব জজ মিয়ার জমি কেনার সময় তিনি নদীর ভিতরে তাঁর ব্যক্তি মালিকানায় থাকা জমি কিনলেন কেনো? সেটা কি IWT সীমার মধ্যে পড়ে না?

(৬)      নতুন দামে একই জমির উপর আলাদা বায়না করাঃ ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব পুনরায় আলাদাভাবে জনাব মর্তুজা সাহেবের সাথে তাঁর চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়ার জায়গার দাম পুনর্বিন্যাশ করে চরকুন্দুলিয়া জমির প্রতি শতাংশ জমি ৪ লক্ষ টাকা এবং চরগলগলিয়া জমির প্রতি শতাংশ জমি ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ধার্য্য করে নতুন করে জনাব মর্তুজা সাহেবের সাথে বায়না করেন। কিন্তু উক্ত জায়গা হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির মধ্যে ছিলো। এতো বছর পর তিনি হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির বরাত দিয়ে তুনিই আবার সেই হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির বরাত দিয়ে নিজের সার্থে বিক্রেতাকে একটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে তাঁর নামে বদনাম করা হচ্ছে।

ক্রেতার বর্তমান দাবীসমুহ

(৭)       বর্তমানে ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান এইমর্মে বারংবার বিক্রেতাকে চাপ দিচ্ছেন যে, তিনি হস্ত লিখিত চুক্তির অনুচ্ছেদ (১২) মোতাবেক IWT বহির্ভুত জমি বুঝিয়া নিতে চান। অর্থাৎ চরকুন্দুলিয়ার দক্ষিনে অবস্থিত ধলেশ্বরী নদীর পানি শুষ্ক মৌসুমে যেখানে গিয়ে স্থিত হয়, তাঁর থেকে আরো ১৫০ ফুট ছেড়ে টানের দিকের জমি তাঁর প্রাপ্য বলিয়া দাবী করেন।

(৮)       ক্রেতা আরো উল্লেখ করেন যে, যেহেতু চরকুন্দুলিয়া আর চরগলগলিয়া মৌজার গড়মুল্যে তিনি জমি কিনেছেন, ফলে উভয় মৌজা থেকে সমান সমান পরিমান জমি তাঁর প্রাপ্য। তাই তিনি এখন চরকুন্দুলিয়া থেকে কিছু জমি বিক্রেতার রেজিষ্ট্রেশন খরচে চরগলগলিয়া মৌজায় সমপরিমান জমি চান।

ক্রেতার দাবীসমুহের বিপরীতে বিক্রেতার ব্যাখ্যা

(৯)       ক্রেতার উপরোক্ত দাবী-বক্তব্যের আলোকে বিক্রেতার ব্যাখ্যা এই যে, ১৭/০৪/২০১৯ তারিখে হস্ত-লিখিত ড্রাফট চুক্তিটি প্রথমত ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত এমওইউ অথবা বায়নানামা না করার কারনে পুরুপুরী বাতিল হয়ে যাওয়ায় উক্ত চুক্তির কোনো শর্তই আর কার্যকরীতা থাকেনা। ফলে ক্রেতার দাবী অনুযায়ী হস্তলিখিত চুক্তির  (১২) অনুচ্ছেদের কোনো কার্যকারীতাও থাকে না।

এখানে উল্লেখ থাকে যে, ৬৩৩ শতাংশ জমি কেনাবেচার লক্ষ্যে উক্ত চুড়ান্ত বায়নানামা কিংবা চূড়ান্ত এমওইউ তে বিস্তারীত তথ্য যেমন জমির মৌজা, তফশীল, জমির পরিমান, জমির প্রকার, জমির চৌহদ্দি, জমিরমুল্য, জমির আসল মালিকদের কার কতটুকু পরিমান কোন মৌজায় জমি, মা ইন্ডাস্ট্রিজ ইস্টাবলিসমেন্ট সমুহের বিবরন, সেখানে জমিতে গাছ গাছালীর বিবরন, সাবকবলা করার প্রক্রিয়া, কোন মৌজায় কখন কতটুকু কার মালিকানার জমি সাবকবলা করা হবে, জমির মুল্যশোধের পরিমান এবং প্রক্রিয়া তাঁর বিবরন ইত্যাদি চুড়ান্তভাবে উল্লেখ থাকার কথা। উক্ত বিষয়াদি বিস্তারীত উল্লেখ থাকলে বিক্রেতা যেমন শর্ত মোতাবেক জমি দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতো, তেমনি ক্রেতাও গোপনে বিক্রেতার কোনো শরীকানা থেকে জমি কিনতে পারতেন না।    

(১০)      ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব চুক্তির অনুচ্ছেদ (৮) মোতাবেক চুক্তিতে উল্লেখিত ৬৩৩ শতাংশ জমি মোট ৬ মাস এবং অতিরিক্ত ৩ মাস সর্বমোট ৯ মাসের মধ্যে ক্রয় করার কথা। তিনি সেই শর্ত মোতাবেক গত ২ বছরেও জমি ক্রয় করতে পারেন নাই। তিনি মাত্র ১৬৭.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। অর্থাৎ ২৫% জমি তিনি ক্রয় করতে পেরেছেন।

(১১)      হস্তলিখিত ড্রাফট চুক্তির অনুচ্ছেদ (১১) মোতাবেক এই শর্ত ছিলো যে, বিক্রেতা যে সকল জমির কাগজাদি ক্রেতাকে সরবরাহ করবেন, ক্রেতা সেসব কাগজাদি তাঁর ল ইয়ার দিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে সঠিক পাওয়ার পর ‘লিগ্যাল ডকুমেন্টস’ অনুযায়ী হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির গড়মুল্যে তিনি উক্ত জমি ক্রয় করবেন। বিক্রেতা মোট ৬৩৩ শতাংশ জমির সম্পূর্ন লিগ্যাল ডকুমেন্টস একসাথে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করছেন। ক্রেতা তাঁর ইচ্ছেমতো চরকুন্দুলিয়ায় ১৫১.৫ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশ জমি সাবকবলা ক্রয় করেন। অতঃপর তিনি সেই জমির ডিসিআর কাটেন, নিজের নামে খাজনা দেন, তাঁর নিজের নামে নামজারী করেন এবং তাঁর ব্যাংকে উক্ত জমি মর্টগেজ দেন। এখন তিনি তাঁর জমি বুঝে পান নাই বলে যে দাবী করছেন, তা একটা অবৈধ দাবী।

(১২)     গত ১৪ অগাষ্ট ২০২১ তারিখে ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব বিক্রেতার সাথে এক চুড়ান্ত বৈঠকে বসেন এবং সেখানে তিনি এইমর্মে তাঁর পরিবর্তীত সিদ্ধান্ত জানান যে,

(ক)       তিনি হস্তলিখিত ড্রাফট চুক্তির বলে তাঁর বিবেচনায় IWT এরিয়া বহির্ভুত চরকুন্দুলিয়ার জমির বদলে তিনি চরগলগলিয়ায় আরো প্রায় ৮৬ শতাংশ জমি চান।

(খ)       তিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আরএস খাস জমি কিনবেন না। কিন্তু তাঁর ভিতর দিয়ে ১৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তা চান।

(গ)       তিনি পলাশপুর রাস্তা থেকে মা ইন্ডাস্ট্রিজের ভিতরে যেতে ২২ শতাংশ জমি না কিনে শুধুমাত্র তাঁর থেকে ১৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তা চান, যা কিনা আগের ড্রাফট হস্তলিখিত চুক্তিতে ক্রেতার কেনার কথা ছিলো। এখানে উল্লেখ থাকে যে, উক্ত ২২ শতাংশ জমির প্রস্থ মাত্র ৩৭ ফুট যার থেকে তিনি ১৬ ফুট প্রস্থের একটি রাস্তা চান এবং বাকী জায়গা তিনি কিনতে আগ্রহী নন। বাকী উক্ত ২১ ফুট প্রশস্ত জায়গা বিক্রেতার অধীনে রাখতে চান কারন উক্ত জায়গা তাঁর রাস্তায় ১৬ ফুট ব্যবহার করার পর এতো অল্প প্রশস্থের জায়গায় ক্রেতা অন্যকিছু করতে পারবেন না বলে তিনি সেই অংশ নিবেন না। কিন্তু বিক্রেতার কি হবে সেটা তিনি ভাবারও প্রয়োজন মনে করলেন না।

(ঘ)       জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব (ক্রেতা) একই চরকুন্দুলিয়া মৌজায় অন্য দাগে আরো ৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেন, তিনি এখন সেই জমিও বিক্রেতার চরগলগলিয়া মৌজা থেকে বিনিময় চান।

(ঙ)       শুধু তাইই নয়, ক্রেতা মুজিবুর রহমান সাহেব বিক্রেতার আরেক শরীকানা জনাব মুর্তজা আলী সাহেবের চরকুন্দুলিয়ার ডকইয়ার্ডের মধ্যে অবস্থিত ৮৪ শতাংশ জায়গাও এখন আর কিনতে আগ্রহী নন।

(১৩)    কিন্তু তিনি এটা বলছেন না যে, তিনি যে বিক্রেতার শরীকানা মালিক থেকে আলাদা করে গোপনে জমি কিনলেন সেটা অন্যায়। সেইসাথে তিনি যে সেইসব শরীকানা থেকে তাঁর বিবেচনায় নেয়া IWT এর সীমানার বাইরে নদীর মধ্যে জমিও কিনলেন এটা তাঁর নীতি বহির্ভুত নয়। তিনি এটাও অন্যায় মনে করছেন না যে, বিক্রেতার প্রোপোজড ৬৩৩ শতাংশ জমির মধ্যে নিহিত মর্তুজা সাহেবের চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়া মৌজায় পৃথকভাবে নতুন করে গত জুলাই ২০২১ মাসে উচ্চ মুল্যে বায়না করা।  

(১৪)     বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতা যখন জুলাই ২০১৯ মাসে জমি ক্রয় শুরু করেন, তখন ক্রেতার সাথে বিক্রেতার মধ্যে কোনো প্রকারের লিখিত বা মৌখিক চুক্তি হয় নাই কোনো শর্তাবলীও নাই স্বাভাবিক নিয়মে বিক্রেতা লিগ্যাল ডকুমেন্টস ক্রেতাকে দিবেন, ক্রেতা সেইসব লিগ্যাল ডকুমেন্টস পরীক্ষা নীরিক্ষা করে নিজে সন্তুষ্ট হবার পরেই তা সাবকবলা করবেন, এবং ক্রেতা সেই মোতাবেকই বিক্রেতার কাছ থেকে মোট ১৬৭.৫ শতাংশ জমি সাবকবলা করেন, নামজারী করেন, ডিসিআর কাটেন, এবং ব্যাংকে মর্টগেজ করেন এখানে IWT, নদীশাসন কিংবা কোন মৌজা (চরকুন্দুলিয়া নাকি চরগলগলিয়া) ইত্যাদির কোন প্রকারের বাধ্যবাধকতা ছিলো না এবং নাইও ফলে ক্রেতা তাঁর চয়েজ মতো মৌজাভিত্তিক যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই সাবকবলা করার আয়োজন করেন তাতে তিনি চরকুন্দুলিয়ায় ১৫১.৫ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশ জমি সাবকবলা করার জন্য প্রয়োজনীয় কমিশন করে সাবকবলা রেজিষ্ট্রেশন করেন ফলে ক্রেতা এখন সেই পুরানো ১৭/০৪/২০১৯ তারিখের হস্তলিখিত ড্রাফট চুক্তির কোনো শর্তের উপরেই কোনো প্রকার চাপ বা দাবী করার ইখতিয়ার রাখেন না এখানে আরো জোরালোভাবে উল্লেখ থাকে যে, ক্রেতা পুরানো সেই হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির মোট ১৪ টি শর্তের মধ্যে প্রায় ১৩ টি শর্ত নিজেই ভংগ করেছেন এবং নিজের সার্থেই তিনি এখন এসব করছেন যা আইনত একটি নীতি বহির্ভুত কাজ

এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, অন্য একটি আলাদা দাগে যে ৪ শতাংশ জমি চরকুন্দুলিয়ায় ক্রয় করেছেন, তিনি উক্ত জমির নকশা এবং দাগ একাধিকবার তাঁর নিজের ল ইয়ার এবং ব্যাংকের ল ইয়ার দিয়েও পরীক্ষা নীরিক্ষা করিয়ে তারপর তিনি তা ক্রয় করার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন 

ফলে দিলল মোতাবেক ক্রেতা তাঁর জমি উপভোগ করবেন, এটাই নিয়ম। যদি এর বাইরে ক্রেতা মনে করেন যে, তিনি দলিল মোতাবেক তাঁর জমি ঘাটতি পেয়েছেন, নামজারী করতে পারেন নাই, বা ডি সি আর কাটতে পারেন নাই, খাজনা দিতে পারেন নাই, তাহলে তিনি বিক্রেতাকে ঘাটতি জমির জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারেন।

(১৫)     এখানে আরো একটি তথ্য বলা বাঞ্চনীয় যে, ক্রেতা উক্ত ১৬৭.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করার সময় একটি তঞ্চকতা করেছেন যে, তিনি সাবকবলা করার সময় সম্পুন্ন ক্রয় করা জমির গড়মুল্যে বিক্রেতাকে টাকা ক্যাশ পরিশোধের কথা ছিলো কিন্তু বিক্রেতার সরলতার সুযোগ নিয়ে তিনি সাবকবলার দিন ক্যাশ টাকা হস্তান্তর না করে হটাত শুধু চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন। তিনি এইমর্মে জানান যে, সাবকবলার দিন কোনো এক অজ্ঞাত কারনে তিনি ক্যাশ টাকা সংগ্রহ করতে পারেন নাই, কিন্তু ততোক্ষনে জমি সাবকবলা করা হয়ে গিয়েছিলো কমিশনের মাধ্যমে। বিক্রেতা অতি দয়ালু প্রকৃতির এবং ক্রেতাকে বিশ্বাস করেছেন বলেই ক্রেতাকে সম্মান দেখিয়ে ২ কোটি ৬০ লক্ষ টাকার চেক নিয়ে উক্ত ১৬৭.৫ শতাংশ জমি সাবকবলা করে দেন। ক্রেতা উক্ত টাকা গত ২ বছরেও পরিশোধ করতে পারেন নাই। এখনো প্রায় ৫ লাখ টাকার উপরে চেকের টাকা বাকী আছে। এই ২ বছরে জমির মুল্য বেড়েছে কয়েক গুন যা ক্রেতা নিজেও জনাব মর্তুজা সাহেবের নতুন বায়নায় উল্লেখ করেছেন।

(১৬)     একটি সাধারন হিসাবঃ

(ক)       ক্রেতা যদি বিক্রেতার শরীকানা মালিক জনাব জজ মিয়া এবং মান্নান গংদের থেকে গোপনে আলাদা জমি না কিনতেন, তাহলে জজ মিয়া এবং মান্নান গংদের জমির পরিশোধিত মুল্য থেকে বিক্রেতা পাওয়ার কথাঃ

(কক)      জজ মিয়ার জমির অতিরিক্ত টাকা (৮৫@ ১৫৫০০০/০০)                  = ১৩১৭৫০০০/০০ টাকা

(খখ)        মান্নান গং দের জমির অতিরিক্ত টাকা (৫১@ ১০৫০০০/০০)              = ৫৩৫৫০০০/০০  টাকা

———————————————————————————————————

বিক্রেতা আরো মোট টাকা পাওয়ার কথা                                                           =১৮৫৩০০০০/০০ টাকা

যদি প্রতি শতাংশ জমির গড়মুল্য ৩০৫০০০/০০ টাকা  দিয়ে উক্ত টাকাকে ভাগ করা হয় তাহলে জমির পরিমান দাঁড়ায়  ৬০.৭৫ শতাংশ।

অর্থাৎ ক্রেতা পরিশোধিত মুল্যে জজ মিয়া এবং মান্নান গংদের জমি পাওয়ার পরে তিনি বিক্রেতা জনাব মেজর আখতারের কাছ থেকে জমি পাওয়ার কথা (১৬৭.৫ মাইনাস ৬০.৭৫) = ১০৬.৭৫ শতাংশ

বর্তমানে তিনি পেয়েছেন (৯৫+১৬) = ১১১ শতাংশ জমি। উক্ত জমি পুরুটাই নদীর পানি থেকে আরো অনেক উপরে। অর্থাৎ যদি IWT এর কথাও বলি, তাতেও উক্ত জমি কোয়ালিফাই করে। বরং ক্রেতা অতিরিক্ত ৬০.৭৫ শতাংশ জমি বেশী পেয়েছেন যা তাঁর প্রাপ্য ছিলো না। 

ক্রেতা যেভাবেই তাঁর দাবী পেশ করেন না কেনো, কিছুতেই তিনি নীতির মধ্যে তাঁর দাবী গ্রহনযোগ্য নহে। উক্ত দাবী একটা অনৈতিক এবং সার্থান্নেসি দাবী ছাড়া আর কিছুই না।

জমি ক্রয়ের বিবরনঃ

১ম দফায় জমি ক্রয়

পরবর্তীতে কোনো চুক্তি করা ছাড়াই ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান এবং বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) চর কুন্দুলিয়া এবং চর গল গলিয়া মৌজায় আগের মৌখিক গড়মুল্যে কতক শতক জমি ক্রয়-বিক্রয় করেন যার বিবরন নিম্নরুপঃ

 (৭)      হস্ত লিখিত ড্রাফট চুক্তির প্রায় ৩৬ দিন পর অর্থাৎ ২২/০৫/২০১৯ তারিখ অবধি দুই পর্বে ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেনকে মোট ৭৫ লক্ষ টাকা অগ্রীম প্রদান করেন।

(৮)      অগ্রিম প্রদানের পর ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়ার জমির বৈধতা এবং কাগজ সঠিক আছে কিনা যাচাইয়ের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় কাগজাদির ফটোকপি চান এবং বিক্রেতা তা সরবরাহ করেন।

(৯)       ২২/০৫/২০১৯ থেকে শুরু করে ১৮/০৬/২০১৯ পর্যন্ত ক্রেতা জমির সমস্ত কাগজাদি ভূমি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিস, নিজেদের ল-ইয়ারসহ ব্যাংকের ল-ইয়ারের মাধ্যমে সরেজমিনে জমির কাগজাদি যাচাই বাছাই করে এইমর্মে বিক্রেতা জনাব মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেনকে ১৯/০৬/২০১৯ তারিখে কমিশনের মাধ্যমে জমির সাবকবলা করবেন বলে চুড়ান্তভাবে জানান এবং ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান আরো ২৫ লক্ষ টাকাও প্রেরন করেন। উক্ত ২৫ লক্ষ টাকা সহকারে ১৮/০৬/২০১৯ পর্যন্ত বিক্রেতা মেজর আখতারকে ক্রেতা সর্বোমোট ১ কোটি টাকা প্রদান করেন। ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব এইমর্মে জানান যে, প্রথমে তিনি চরকুন্দুলিয়ায় ৫৩ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশ জমি সাবকবলা করবেন। এখানে উল্লেখ থাকে যে, চরকুন্দুলিয়া এবং চরগলগলিয়ার জমির দামের পার্থক্য থাকলেও ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই পূর্বের গড়মুল্য অর্থাৎ প্রতি শতাংশ জমি গড়ে ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকাই ধার্য থাকে। ফলে চরকুন্দুলিয়ায় ৫৩ শতাংশ এবং চরগলগলিয়ায় ১৬ শতাংশের মুল্য দাঁড়ায়

= (৫৩+১৬) = ৬৯ @ ৩০৫০০০/০০    = ২১০৪৫০০০/০০ টাকা

অগ্রীম বাবদ দেয়া ছিলো                        = ১০০০০০০/০০ টাকা

—————————————————————————————    

 বাকী থাকে                                           = ১১০৪৫০০০/০০ (এক কোটি দশ লাখ পয়তাল্লিশ হাজার)

উক্ত বাকী টাকা ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব কমিশনের মাধ্যমে সাব কবলা রেজিষত্রি করার সময়ে বিক্রেতার কাছে ক্যাশ হস্তান্তর করবেন বলে নিশ্চিত করেন।           

(১০)      কিন্তু ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব ১৯/০৬/২০১৯ তারিখে ৬৯ শতাংশ জমি কমিশনের মাধ্যমে সাব কবলা রেজিষ্ট্রি হয়ে যাওয়ার পর জানান যে, তাঁর সেই মুহুর্তে টাকার সমস্যা আছে এবং তিনি আপাতত বাকি ১ কোটি ১০ লাখ ৪৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করবেন। বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ সম্মানার্থে উক্ত চেকের টাকাতেই তিনি ৬৯ শতাংশ জমি জনাব মুজিবুর রহমান সাহেবকে সাক কবলা করে দেন। অতঃপর জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব জমি ক্রয়ের পরেরদিন অর্থাৎ ২০/০৬/২০১৯ তারিখে বাকী টাকা থেকে আরো ৮০ লক্ষ টাকা মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেনকে পরিশোধ করলে জনাব মুজিবুর রহমান সাহেন বিক্রেতার কাছে ৩০৪৫০০০/০০ (ত্রিশ লক্ষ পয়তাল্লিশ হাজার) টাকা ঋণী থাকেন।

(১১)      জনাব মুজিবুর রহমান সাহেব উক্ত জমি ক্রয়ের পর তাঁর নিজ নামে নামজারী জমাভাগ করাইয়া, নামজারী করান, খাজনা/ট্যাক্স জমা দেন, ডিসিআর কাটেন এবং পরবর্তীতে তিনি ব্যাংকে মর্টগেজ দেন।

২য় দফায় জমি ক্রয়ঃ

(১২)      ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান পুনরায় জমির কাগজাদি ভূমি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিস এবং তাঁর নিজস্ব ল ইয়ার / ব্যাংকের ল ইয়ারের মাধ্যেম চর কুন্দুলিয়ার ৯৮৫ শতাংশ জমি ক্রয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত করেন এবং পূর্বের ৩০ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার নিমিত্তে এবং কিছু টাকা অগ্রীম প্রদানের নিমিত্তে ২৫/০৬/২০১৯ তারিখে ৭০ লক্ষ টাকা বিক্রেতা মেজর মোহাম্মাদ আখতারকে প্রদান করেন। ফলে

২৫/০৬/২০১৯ তারিখে পুর্বের বকেয়া পরিশোধের নিমিত্তে                      = ৩০৪৫০০০/০০ টাকা

২৫/০৬/২০১৯ তারিখে নতুন জমি ক্রয়ের নিমিত্তে অগ্রীম প্রদান            = ৩৯৫৫০০০/০০ টাকা

—————————————————————————————————–

২৫/০৬/২০১৯ তারিখে মোট প্রদান                                                       = ৭০০০০০০/০০ টাকা

(১৩)     সমস্ত কাগজাদি যাচাই বাছাই করার পর ২৫/০৭/২০১৯ তারিখে জনাব মুজিবুর রহমান চরকুন্দুলিয়া মৌজায় ৯৮৫ শতাংশ জমি সাব কবলা করার জন্য কমিশন করেন।

৯৮৫ শতাংশ জমির মুল্য হয়                                                     = ৩০০৪২৫০০/০০ টাকা

অগ্রিম বাবদ পূর্বে প্রদান                                                            = ৩৯৫৫০০০/০০ টাকা

——————————————————————————————-

জমির মুল্য বাবদ পরিশোধ করার কথা                                       = ২৬০৮৭৫০০/০০ টাকা

কমিশনের দিন অর্থাৎ ২৫/০৭/২০১৯ তারিখে ক্যাশ প্রদান          = ৬০০০০০০/০০ টাকা

——————————————————————————————–

জমির মুল্য বাকী থাকে                                                              = ২০০৮৭৫০০/০০ টাকা

(১৪)      উক্ত ২৬০৮৭৫০০/০০ টাকা কমিশনের দিন সাবকবলার সময়ে পরিশোধ করার জন্য কথা থাকলেও ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান মাত্র ৬০০০০০০/০০ টাকা প্রদান করেন এবং বাকী টাকা ব্যাংক চেকের মাধ্যমে অর্থাৎ ২০০৮৭৫০০/০০ টাকা বাকী রাখেন।

(১৫)     উক্ত টাকা গত ২৫/০৭/২০১৯ তারিখ থেকে আরম্ভ করিয়া অদ্যাবদি ক্রেতা জনাব মুজিবুর রহমান সম্পুর্ন টাকা পরিশোধ করেন নাই। বর্তমানে বিক্রেতা আরো আট লাখ টাকার মতো পাওনা রিহিয়াছেন।

(১৬)     এই উক্ত ২ বছরে জমির মুল্য প্রায় দিগুন হয়েছে এবং বিক্রেতা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।

খান সাহেবের এখন করনীয়

যদি খান সাহেব উক্ত এলাকায় তাঁর প্রোজেক্ট স্থানান্তর করতে চান, সেক্ষেত্রে তাঁর এক্সক্লুসিভলী পলাশপুর রাস্তা থেকে চরকুন্দুলিয়া পর্যন্ত রাস্তা লাগবে। এই একই সমস্যা জনাব মর্তুজা সাহেবের বেলাতেও প্রযোজ্য। মর্তুজা সাহেবের জমিতে যাওয়ার জন্যেও তাঁর এক্সক্লুসিভলী রাস্তা লাগবে যা তাঁর নাই। সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উপায়সমুহে তা সমাধান করা সম্ভবঃ

২৩/০৩/২০১৯-আজ মীরপুর ১ থেকে প্রায় নিউ মার্কেট পর্যন্ত দেখলাম

আজ মীরপুর ১ থেকে প্রায় নিউ মার্কেট পর্যন্ত দেখলাম কিছুক্ষন পর পরই ট্রাফিক পুলিশ বাস, প্রাইভেট কার এবং অন্যান্য যানবাহনকে একটা ডিসিপ্লিন ওয়েতে লেন করে চালানোর চেস্টা করছেন। এতে প্রায় কম করে হলেও পুরু এই রাস্তায় ৪০০ জন ট্রাফিক পুলিশ নিয়োজিত আছেন। তারা ভালো কাজ করছেন,সন্দেহ নাই। কিন্তু এইভাবে যদি সারা ঢাকায় ফিজিক্যাল হাজিরার মাধ্যমে ট্রাফিক লেন মেইন্টেইন করাইতে হয়, তাহলে কত পুলিশ দরকার?

অথচ তারা যদি কম্প্রোমাইজ না করে ড্রাইভার, পথচারী এবং অন্যান্য যানবাহন এর বিরুদ্ধে আইনমাফিক হার্ড লাইনে থাক্তো এবং ইন্সট্যান্ট জরিমানা, শাস্তি, পেনাল্টি, লাইসেন্স বাতিল, রুট পার্মিট বাতিল করতো তাহলে ২ দিনের মধ্যে ঢাকার এই বিস্রিংখলা ঠিক হয়ে যেতো।

যান পরিবহন একটা ব্যবসা। কেউ যদি স্ট্রাইক করতে চায়, তাকে করতে দিন। সিস্টেম ঠিক করার জন্য এক দুই মাস জনগন কস্ট করবে। Nation needs to be Civilized and disciplined first.

১৭/০৩/২০১৯-উম্মিকার ডাক্তার হওয়ার পারিবারিক অভিষেক

উম্মিকার ডাক্তার হওয়ার পারিবারিক অভিষেক অনুস্টানের পর্বটি একটা আনন্দঘন দিনে পরিনত হয়েছিলো। চৌধুরী বাড়ির লোক সংখ্যা এমনিতেই এতো যে, ডাক দিলেই হাতের কাছে গোটা ১০ জন পাওয়া যায়। তারমধ্যে আবার দাওয়াত, তাও আবার আমার বাসায়। এ যেনো মহা যজ্ঞ।  সবাই নিজের বাড়ির মতো করে আনন্দ করে। সারা বাড়িতে গটা কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে যায়। ছোটরা হৈচৈ, বড়রা চিল্লাচিল্লী, মাঝারী গুলা তাস, কিংবা সেলফী, আর বুড়ারা গাল গল্পে।

উম্মিকার ডাক্তারী পরীক্ষার ফলাফলের পর পরই একটা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বিভিন্ন ঝামেলায় করা হচ্ছিলো না। উম্মিকার আম্মু আবার এসব বিষয়ে পিছিয়ে থাকার লোক না। সব বাড়ি থেকেই লোকজন এসেছিলো। উম্মিকা আঞ্জুমানদেরকে আসতে বলেছিলো। আঞ্জুমানরা এক সময় আমাদের বাসায় ভাড়া থাকতো, এখন সে ৪ সন্তানের মা। খুব ভালো একতা মেয়ে। মান্নারা, বাসাবো থেকে বুটী আপারা, মূটামুটি সবাই এসেছিলো। খুব সুন্দর একটা গেট টুগেদার হলো আজ।

বিকালে সবাই ছাদে গেলো, সন্ধ্যার পর আবার আরেকতা ভুড়িভোজ হলো। সব মিলিয়ে এক কথায় উপভোগ্য একটা দিন ছিলো। প্রায় ৫ বছর আগে যখন উম্মিকা ডাক্তারী পড়তে যায়, আমি কখনো ভাবি নাই যে, উম্মিকা একা একা সেই আরেকটা দূরের শহরে থাকতে পারবে। মেস লাইফ, কঠিন লাইফ। কিন্তু তারপরেও উম্মিকা এক চাঞ্চসেই আল্লাহর রহমতে ডাক্তারী পরীক্ষায় পাশ করে ফেলেছে, এটা ওর জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো। অনেক প্রতিকুলতার মধ্যে এবং মানষিক যন্ত্রনায় ওকে পরীক্ষা গুলি দিতে হয়েছে। উম্মিকা বরাবরই ভালো ছাত্রী ছিলো, ফাকীবাজ ছিলো না, ফলে সব গুলি টার্মেই উম্মিকা ভালো করায় একটা ডিস্টিঙ্কট নিয়ে পাশ করেছে। আমি সব সময় চেয়েছিলাম উম্মিকা ডাক্তার হোক, আজ সেটা উম্মিকা পুরন করেছে, মাশ আল্লাহ।

শেষ পর্বটি ইমনের আতশবাজী পোড়ানো ছিল এলাকায় একটি উৎসব মূখর পর্ব। আশেপাশের সব বাড়িগুলি থেকে অনেক মানুষ ইমনের এই আতশবাজী দেখার জন্য বাসার বাইরে দাড়িয়েছিলো। আমাদের সাথে সাথে পাড়াপ্রতিবেশীও ব্যাপারটা আনন্দ করেছে। ধন্যবাদ ইমন

১২/০৩/২০১৯-উম্মিকার ডাক্তারী পরীক্ষার ফলাফল

গত ১২ মার্চ ২০১৯ তারিখে আমার বড় মেয়ের মেডিক্যাল ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। খুব টেনশনে ছিলো মেয়ে পাশ করে কিনা। প্রায়ই তার মেজাজ মর্জি খারাপ থাকতো এই টেনশনের কারনে। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়েছে সে এই পড়ার সময়। তার পরেও সে তার লক্ষ্য স্থির রেখেছে যেনো এক চান্সেই পড়াটা শেষ হয়। আল্লাহর অসীম রহমত যে, সে এক চান্সেই মেডিক্যাল পরীক্ষাটা পাশ করে এখন সে পূর্ন ডাক্তার হয়ে গেলো। আল্লাহর কাছে শুকরীয়ার শেষ নাই।

সেদিন আমি বাসায়ই ছিলাম। বেলা প্রায় একটার ও বেশী। বউ কলেজে ছিলো। আমরা বাসায় একত্রে খাবো বলে অপেক্ষা করছি। আমি কম্পিউটারে কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। দুই মেয়েও বাসায়। বড় মেয়ে উম্মিকা ড্রয়িং রুমে কিছু একটা করছিলো। হটাত করে “আব্বু” বলে বড় মেয়ে চিৎকার। আমি চমকে গেলাম, কি হলো মেয়ের। তাড়াতাড়ি কম্পিউটারের কাজ ফেলে ড্রয়িং রুমে যাচ্ছিলাম, দেখি মেয়েই এগিয়ে এসছে হাতে তার মোবাইল নিয়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদতে কাদতে বলছে, “আব্বু, আমাদী মেডিক্যালের ফলাফল দিয়েছে। আমি পাশ করেছি আব্বু”।

আমি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় চুমু খেতে খেতে বললাম, “কাদছিস কেনো তাহলে?”

মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে থর থর করে কাপছে আর আরো কাদছে। অনেক আদর করে বললাম, আল্লাহর কাছে হাজার শুকরীয়া যে, তুমি পাশ করে গেছো।

অনেক্ষন লাগলো আমার বড় মেয়ের স্থির হতে। ঠিক এমন সময় আমার বউ বাসায় ঢোকলো। আমার তখন মাথায় একটা দুস্টু বুদ্ধি এলো, ওর মাকে ভড়কে দেবার। বললাম, “দেখো, মেয়ের পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে, মেয়ে কান্নাকাটি করছে। মেয়েকে থামাও”।

লক্ষ্য করলাম, আমার বউএর মুখাবয়ব হটাত করে পরিবর্তন এবং টেনশনের ছায়া। হাতের ব্যাগ টা কোনো রকমে টেবিলের উপর রেখেই মেয়েকে শান্তনা দেবার জন্য জড়িয়ে ধরলো আর বল্লো, কি রেজাল্ট মা?

আমি হেসে দিয়ে বললাম, মেয়ে তো পাশ করেছে। যেই না বলেছি যে, পাশ করেছে, আর অমনি মা মেয়ের দুজনেই এখন কান্নার রোল। এতক্ষন তো ছিলো একজনের কান্না, এখন দেখি দুইজন। ঠেলা শামলাও এবার।

বেশ মজা পাইলাম মা মেয়ের এই রকম একটা আবেগ পুর্ন মুহূর্তের জন্য। সবই আল্লাহর ইচ্ছা এবং দয়া। আজ থেকে আমার বড় মেয়ের একটা ভালো আইডেন্টিটি হলো, “ডাক্তার” উম্মিকা।

ধন্যবাদ মা তোমাকে। আমি তোমার উজ্জল জীবনের জন্য দোয়া করি সব সময়। 

১০/০২/২০১৯, টাচ-১৩: আমাদের স্বপ্ন

জন্মসুত্রে আমরা যা পাই তা হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্ক। এটা আমরা অর্জন করি না। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে আমরা যা অন্যের কাছ থেকে যা পাই তা হচ্ছে বন্ধুত্ব। এটা আমরা অর্জন করি। আর এই বন্ধুত্তের পর্যায়কালগুলি যখন একে একে ধাপ পেরিয়ে শিশুকাল থেকে বাল্যকাল, বাল্যকাল থেকে কৈশোর, আর কৈশোরের পর থেকে ক্রমান্বয়ে যুবক থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়, এর প্রতিটি ধাপেই থাকে কিছু রোমাঞ্চকর স্মৃতি, ছোটখাটো খুনঠুসি। এই প্রতিটি ধাপই একটা সময়ের বেড়াজালের। এইসব বেড়াজালের স্মৃতিতে সবাই একেকটা আইকনিক নাম নিয়ে বন্ধুদের অন্তরে এমন করে বেড়ে উঠে যা শুধুমাত্র বন্ধুদের ঠোট আর কানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে ভালো মনের বন্ধুটিও হয়ত তার কালো চেহারার জন্য আদরের নাম হয়ে উঠে “কালা জাহাংগির” আবার সবচেয়ে মিস্টি চেহারার বন্ধুটি হয়তো “সুন্দুরি বা “মেডোনা” নামে বন্ধু আড্ডায় পরিচিত হয়ে উঠে। এইসব আসলে কেবলমাত্র বন্ধু সরোবরে একটি আইকনিক আদরে উচ্চারিত নাম বটে যা অন্য কোথাও প্রযোয্যও নয়, এবং তা গ্রহনযোগ্যও নয়। এসব কেবল ব্যক্তিগত আড্ডার একটা অতীব একান্ত গোপন রোমন্থন বটে। শিশুকালের একটা দন্তবিহীন শব্দ, কিংবা আঞ্চলিক ভাষার কারনে কোনো এক বাক্য  হয়ে উঠে এই সব আইকনিক নামের মিস্টি ডাক। হতে পারে কৈশোরের একটি স্মৃতি বিজড়িত কথার সারাংশ, কিংবা যুবক বয়সের কোনো এক নেশাগ্রস্ত প্রেমিকের নামও কোনো এক বন্ধু বিশেষকে অন্য সব বন্ধুর কাছে যতোটা আপন আর আলোচিত করে থাকে সেটা হয়ত খুবই আপনার কিন্তু এইসব প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যবহার যোগ্য নয়। আবার একেবারেই ব্যবহারযোগ্য নয় এমনো নয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মেধায় তা যে কেউ সম্পর্ক অনুপাতে আনন্দের সহিত তা গ্রহনযোগ্য সাপেক্ষে ব্যবহার করা কোনো সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সেটা নিতান্তই দুইজন বন্ধুর ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাধনের উপর নির্ভর করে।

সন্তানেরা যখন সুউচ্চ মর্যাদায় উপনীত হয়, পিতামাতারাও তখন সেই সন্তানকে আর সেই ছোট বয়সের বিচিত্র নামে ডাকেন না। সন্তান যখন দেশের কর্নধার হন, পিতামাতাও তাকে মিস্টার প্রেসিডেন্ট বলেই সম্বোধন করেন। তাতে না পিতামাতার মান ক্ষুন্ন হয়, না সন্তানের। বরং উভয়েই এই বলে গর্বিত হন, তারা একে অপরের সাথে বহু বছর অতোপ্রোতভাবে এমনভাবে জড়িয়ে আছেন যে, সব সাফল্য তাদেরই। তারা উভয়েই গর্বিত।

টাচ-১৩ এমন একটি ফোরাম, যা আমরা দাবী করতে পারি, এটা আমাদের অর্জন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন এই টাচ-১৩ এর পত্তন হয়। এর ইতিহাস হয়তো অনেকেরই মনে নাই কিন্তু এর পিছনে যে সব বন্ধুরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাদের ভুমিকা নিয়ে আজ নতুন করে কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন মনে করি না কিন্তু এইসব বন্ধুদের সবারই একটা কমন উদ্দেশ্য ছিলো। আর তা হচ্ছে আমরন বন্ধুত্তের শিকলে একে অপরকে বেধে ফেলা। এই ফোরামে আমরা সবাইকে একই কাতারে রেখে (কাউকে ছোট বা কাউকে বড়, কাউকে ধনী, কাউকে কম ধনী, কাউকে অধিক শিক্ষিত, কাউকে কম শিক্ষিত, কেউ ছোট র‍্যাংকের বা কেউ বড়  র‍্যাংকের, এই রকমের কোনো পার্টিজান করি নাই) আমরা ফোরামটাকে তৈরী করতে চেয়েছি। আমরা তথাকথিত সিভিলিয়ানদের মতো কারো কারো আর্থিক সচ্ছলতার কারনে সুবিধা যেমন নিতে পারতাম, আবার কারো কারো আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে তাকে এই ফোরামের অতি নগন্য সদস্য হিসাবেও স্থান দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা সেটা কখনোই মাথায়ও আনি নি। বরং কেউ যেনো ছোট কেউ যেনো বড় না ভাবি সেটাই মাথায় রেখে আমরা চেয়েছি সবাই সেই বন্ধু হতে যেনো বৃদ্ধ বয়সে অন্তত লাঠিতে ভর করে হেটে হেটে আরেক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে এক কাপ চা খাই আর গল্প করার পরিবেশ তা তৈরী হয়। বয়সের  ভারে দন্তবিহীন দুইবন্ধু গল্প তো করতে পারবো কোনো এক সন্ধ্যায়। এটাই হলো টাচ-১৩ এর মুল উদ্দেশ্য। যখন আর কেউ আমাকে নাম ধরে ডাকবে না, তখন এই টাচ-১৩ এর কোনো একবৃদ্ধ বন্ধু হয়তো পিছন থেকে এসে বলবে, “কিরে বন্ধু, কি করস?  কিংবা চল বন্ধু ঐখানে বসি”। আর তো কিছু চাওয়ার নাই। কিন্তু সময়ের পরাক্রমে, আমাদের এইসব বন্ধুরা কেউ দেশের কর্নধার, কেউ জাতীর ভরসা যখন হয়ে উঠেন, আমরাও সেই বন্ধুদের জন্য আপাদমস্তক গর্ববোধ করি। প্রকাশ্য দিবালোকে আমরা তাদেরকে সেই বাল্যকালের “করিম” কে “অই করিম্যা” কিংবা যুবক বয়সের “কুদ্দুস” কে অই “কুদ্দুস্যা” বলে ডাকি না, ডাকতেও পারি না, পারা উচিতও নয়।

বাল্যকালে কত কিছুই তো করেছি। না জেনে গাজাও খেয়েছি, আবার বিপদের সময় সবাই মিলে আল্লাহর দরবারে হাতও তুলেছি। বয়স হয়েছে, এখন তো কেউ বিনে পয়সায় গাজা কেনো রিফাইন্ড আফিম দিলেও সেবন করার কোনো মানসিকতা নাই। তাই বলে কি এখন এই বয়সে এসে “বাল্যকালে একবার আমি গাজা খেয়েছিলাম বলে কোনো ক্রেডিট নেবার স্কোপ আছে, না আছে কোনো গর্ব করার বিষয়? কিন্তু এর মানে আবার এই নয় যে, ব্যক্তিগত আড্ডায় তা আমরা বন্ধুদের কাছে লুকানোর কোনো চেস্টা করি। তখন অপরিপক্ক বয়সে এই ছাইপাস খেয়ে কে কি রকম রাজকীয় ডায়ালগ ছেড়েছে তা নিয়েও বিস্তর হাসাহাসি হয়। এটাই তো সেটা যা চেয়েছি। আবার ব্যক্তিগত আড্ডায় আমাদের সেই বন্ধুরা যারা তাদের নিজ নিজ স্থানে গর্ব করার মতো অবস্থানে আছেন তাদের বর্তমান পদকে অতিরিক্ত সমীহ করে বিস্তর গ্যাপ করে বন্ধুত্তটাও নষ্ট করার কোনো অবকাশ রাখতে দিতে চাই নাই। মধুর আড্ডায় এখানে সবাই জেনারেল, সবাই ব্যবসায়ী সবাই ভাই আবার সবাই এক। এই বন্ধু ফোরামে তখন বাল্যকালের জসিমই “ জইস্যা” বা ফর্সা চেহারার বন্ধুটি অই যে “সুন্দুরী”। তখন কুদ্দুস আমাদের কাছে কুদ্দুস্যাই, আর করিম আমাদের কাছে করিম্যাই। এই তফাতটা যদি আমরা এই বয়সে এসে না বুঝতে পারি, তাহলে না আমরা বন্ধুত্তকে সম্মান করছি, না সম্পর্কটাকে।

 আমার বর্তমান পেশার এমনসব অনেক রাঘব মানুষদের সাথে আমার এমন অনেক সখ্যতা আছে যারা শুধু দেশের কর্নধারই নন, আন্তর্জাতীক মহলেও তাদের অনেক সুনাম আছে। টিপু মুন্সী ভাই, আতিকুল ভাই, আনিস ভাই (যিনি মারা গেছেন), মহিউদ্দিন ভাই, মীর গ্রুপের কর্নধার, কিংবা আজাদ ভাই আরো অনেক মানুষগুলি যখন আমরা এক ফোরামে বসি, অনেক সময় ফান করে মুন্সী ভাইকে হুজুর ডেকেও বলি ভাই মাথায় হাত রেখে একটু ফু দিয়া দেন বা এক গ্লাস পানি পরা দেন ইত্যাদি। হয়ত মুন্সী ভাইও ফান করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, এই নাও বাছাধন, প্রনাম করো পা ধরে। আবার তার থেকেও আরো কঠিন রশীকতা করে বলেন (থাক আর বললাম না) কিন্তু যখন মুন্সী ভাই দেশের একজন নীতিনির্ধারক, তাকে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত আড্ডায় যাই বলি না কেনো, প্রকাশ্যে আমরা তাদের ঐটুকু সম্মান করি যা তিনি প্রাপ্য এবং আমরা তখন সেটাই করি যাতে তিনি এবং আমরা উভয়েই একটা ক্লাশ রিপ্রেজেন্ট করি বলে অন্য সবাই বুঝে। এটা বুঝবার জন্য অনেক শিক্ষিত হবার দরকার নাই।

টাচ-১৩ কে এই পর্যায়ে আনার জন্য অনেক সদস্যের কিন্তু অনেক বেগ পেতে হয় নাই। গুটিকতক সদস্য জানে এর পিছনে কি পরিমান পরিশ্রম দিতে হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যখন আমরা ফাউন্ডিং প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, এবং ইসি মেম্বার ছিলাম, তাদের থেকে এখন পরিশ্রম অনেক অনেক বেশি। যারা এর সাথে জড়িত তারাই শুধু জানেন কি মুল্য দিতে হয় এই ফোরামকে সচল রাখার জন্য। একটা চায়নীজ চাদর যখন গ্রুপ থেকে কমন গিফট হিসাবে আমাদের হাতে আসে, এর পিছনের ইতিহাস যে কত পরিশ্রমের, সেটা জানে শুধু সে যে এই চাদর সুদুর চীন থেকে কিনে এয়ারপোর্ট পার হয়ে দেশে আনেন। মাঝে মাঝে পরিবারের সবাই এর সাথে জড়িত হয়ে যায়। তাঁর মানে আমি এই বলতে চাচ্ছি না যে, সবাই আরাম করে টাচ-১৩ উপভোগ করবে আর কেউ কেউ খেটে মরবে কেনো। সেটা না। যা বলতে চাচ্ছি, তা হলো, এই টাচ-১৩ আমাদের একটা স্বপ্ন, আমাদের একটা গর্ব। এর কোথাও একটু ফাটল মানে আমাদের গায়ের চামরায় আচড়ের মতো। আর যদি এই আচড় এমনভাবে লাগে যে, সেলাই দরকার, তাতে রক্তক্ষরন হয় তাদের বেশি যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে একে সবার ঈর্শা করার মতো একটা ফোরাম ইতিমধ্যে তৈরী করতে পেরেছেন।

গত কয়েকদিন আগে আমি এনবিআর এর একজন সচীবের সাথে আমাদের এই টাচ-১৩ এর পুরু ব্যবস্থাপনাটা নিয়ে আলাপ করছিলাম। সেখানে আরো কয়েকজন উচ্চ পদস্থ সচীব এবং এডিশনাল সচীবও ছিলেন। তাঁরা এতো অবাক হলেন জেনে যে, ১৩৭ জন বেসিক সদস্য নিয়ে (যা এখন প্রায় হাজারের কাছাকাছি উঠে গেছে বাল-বাচ্চা-নাতী নাতকোর নিয়ে) কিভাবে আমরা এতোদূর আসতে পারলাম যা তারা কয়েক ডজন সচীবও পারছেন না। আমার শুধু একটাই উত্তর ছিলো, আর তা হচ্ছে- বিশ্বাস এবং ইনসাফ। এর মানে এই যে, আমরা আমাদের বন্ধুদের, আমাদের ইসিদের, আমাদের উপদেষ্টাদের বিশ্বাস করি, এবং তারা (আমাদের বন্ধুরা, আমাদের ইসিগন, আমাদের উপদেষ্টাগন) আমাদের অন্য বন্ধুদের উপর সঠিক ইনসাফ করেন।

টাচ-১৩ আমাদের একটা স্বপ্ন, আমাদের একটা দাড়াবার স্থান। আর এইটা আমার ব্যক্তিগত জীবনে একটা সাফল্য। এটার ব্রেইন চাইল্ড আমরা গুটিকতক মানুষ যারা স্বপ্ন দেখেছিলো আর সেই স্বপ্ন সবাই একসাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আর সেই ব্রেইন চাইল্ডের মধ্যে আমি নিজে, ওয়াহিদ, সালাম, হুমায়ুন, মতিউর, জাকির এবং আরো অন্যান্যরা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম বলে মাঝে মাঝে যখন দেখি এর মাঝে কিছু ভাংগনের বাতাস বয়, আমার বড় কস্ট হয়। কেউ এই ফোরাম থেকে মনে কস্ট নিয়ে বেরিয়ে যাবেন আর আমরা তা জীবদসশায় দেখবো, সেটা আমি কখনো মান্তেও পারবো না, মানতে চাইও না। আমার ধারনা, আমার সাথে যারা এই স্বপ্ন দেখেছিলো, তারাও এটা মানতে পারবে না।

আমি পরিশেষ একটা কথা বলতে চাই, আমরা সবাই এক, আবার সবাই একই রকম  নই। যাকে সম্মান দেয়া দরকার, যার সম্মান পাওয়ার দরকার, তাকে তা অকপটে দিতে হবে। আমি তো গর্ব করে বলি, আমার আছে অতোটা জেনারেল, অথচ এক সময় যেই জেনারেলদের ভয়ে তাঁর অফিসের ধারে কাছেও যাই নাই, আর আজ আমারই বন্ধুরা জেনারেল। এর থেকে আর কত সম্মান আমার দরকার? আমরা এই বন্ধু জেনারেলকে যেমন সম্মানীত করবো তেমনি সম্মান দেবো সেই সব বন্ধুদেরও যারা তাদের নীজ যোগ্যতায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে সম্মানীত। অতীত থাকবে, আড্ডা থাকবে, ফান থাকবে, কিন্তু প্রকাশ্য আর অপ্রকাশ্য আড্ডা একসাথে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। বন্ধুই তো বন্ধুকে সম্মান দেবে, গর্ববোধ করবে। আমরাই যদি তা না দেই তাহলে কোন ভরসায় আমরা একে অপরের জন্য শিল্ড হয়ে দাড়াবো? আমরা সবাইকে যার যার স্থানে সম্মান দেখানো আমাদের কর্তব্য। ভালোবাসা যদি দিতেই না পারি, তাহলে ভালোবাসা চাইবো কিভাবে? এখানে আরো একটা কথা না বললেই নয় যে, হয়তো ভালোবাসার বহির্প্রকাশ একেক জনের একেক রকমের। হয়তো আমরা অনেকেই না জেনে, না বুঝেই হয়তো অনেকে অনেক কিছু বলে ফেলি, এটা হয়তো ভালোবাসার আতিশয্যের আরেক টি প্রকাশ। তাঁর পরেও আমি বলবো, আমরা আমাদের কমন ভালোবাসার বাইরে এমন কিছু করতে চাই না যারা এই বয়সে এসে কিছুটা হলেও মনে কস্ট পাক। ভালোবেসে চুমু খেতে খেতে যদি আমার সন্তান দম বন্ধ হয়ে মরেই যায়, তাহলে এই চুমুটা আমার সনাতেনের জন্য ভালোবাসা নয়।

এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, আমাদের ইসি, উপদেস্টা, এবং কার্যকরী সদস্য যারা আছেন, তারা কিন্তু কেউ বেতনভোগী নন। আমরা আমাদের সবার কাজগুলি এইসব কিছু গুটিকতক বন্ধুদের উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত মনে আছি। তার একটাই কারন, We respect our friends, we trust our friends, and we do believe, no one is going to do any such activities where Touch-13 is even slightly harmed. এইসব বন্ধুরা টাচ-১৩ কে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কাজে লিপ্ত। তারা কোনো আইন আদালত নিয়ে কিন্তু বসেন নাই। বিচার শালিশি করা আমাদের ইসির কাজ নয়। কিন্তু কেউ যদি আমাদের যে কাউকে মনে কস্ট দেন, বা কারো জন্য আমাদের কেউ কস্ট পান বা মনে করেন যে, এই ফোরাম কারো উপর অবিচার করছে বা করেছে, তখন আমরা এই ১৩৭ জন বেসিক সদস্যই ইসি। এটা ইসি অফ ফ্রেন্ডশীপ। তবে ১৩৭ জন বিচারকের আসনে যেহেতু বসানো সম্ভব নয়, ফলে আমাদের সম্মানিত টাচ-১৩ এর ইসিরাই আমাদের ১৩৭ জনকে রিপ্রেজেন্ট করে। এর মানে এই নয় যে, এর বাইরে কেউ যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে পার্টিসিপেট করতে চান তাকে ভিজিটর হিসাবে অপারগতা দেখানো হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা- কেনো আমরা আমাদের জন্য বন্ধু ফোরামে নালিশ করতে হবে। কেনো আমরা সময়, স্থান এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে সব কিছু মুল্যায়ন করবো না! এটা মাথায় রাখলেই তো সব ঠিক।

একটা ছোট বাস্তব গল্প দিয়ে লেখাটা শেষ করি। আমার এক ব্যাংকার বন্ধু ( যিনি বর্তমানে একটি প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি) জাহাংগিরনগর ইউনিভার্সিটিতে নিজ উদ্যোগে মাসিক বুলেটিন বের করতেন। তিনি হটাত মাস্টার্স পরীক্ষার আগে পড়াশুনার ব্যস্ততার কারনে পরপর দুই মাস মাসিক পত্রিকাটি বের করতে পারেন নাই। তো অন্য এক বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করছেঃ কিরে দোস্ত, তোর মাসিক বন্ধ নাকি? তো বুলেটিন বন্ধু বলছেঃ হ্যারে দোস্ত, দুইমাস ধরে আমার মাসিকটা বন্ধ। এই হয়ে গেলো বুলেটিন বন্ধুর নাম “ মাসিক”। এখন সে একটা প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি। অনেক বড় পোস্ট। গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, বানিজ্যমন্ত্রী ইত্যাদি বড় বড় কর্নধারদের সাথে আমার এই বন্ধুর উঠাবসা। দেখা হলে হয়তো চুপে চুপে এখনো বলি- কি দোস্ত মাসিক ঠিক আছে তো? সেও খুব মজা পায়। হয়তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মজার মজার উত্তর দেয়। কিন্তু তাই বলে কি আমরা তাকে প্রকাশ্যে এই আইকনিক নামে আর ডাকতে পারি বা পারা উচিত?

( বিশেষ নোটঃ যাদের বাচ্চা কাচ্চারা অল্প সল্প গল্প ফোরামে বাবাদের পাশাপাশি তাদেরও এক্সেস আছে, তারা এই পোস্ট না পড়াই ভাল। আর যদি পড়, তাহলে এই লেখা থেকেও শিক্ষা নাও কি বলতে চেয়েছি। আমরা ও চাই তোমরা জন্মগতভাবে প্রাপ্য এই ফোরাম কে নিজের অর্জন মনে করে সবাই মিলে এক সাথে একটা পরিবারের মতো এগিয়ে নিয়ে যাও। তাহলেই সার্থক হবে আমাদের স্বপ্ন)

৩১/১/২০১৯-প্রকৃতি তাঁর নিজস্ব চরিত্র

প্রকৃতি তাঁর নিজস্ব চরিত্র, চক্র বা সত্ত্বাকে কখনো বদলায় না। শীত বা বসন্ত কিংবা শরতের আগমন বা প্রস্থান আপাতদৃষ্টিতে আগেপিছে হইলেও ইহা প্রকৃতির বদলানোর কোন হেরফেরের বিষয় নয়। আমাদের প্রয়োজনে আমরা যেমন সময়কে একটা স্ট্রাকচারের মধ্যে বন্দি করিয়া সেই স্ট্রাকচার দিয়া বহমান প্রকৃতির আসা যাওয়াকে হিসাবে কষি, প্রকৃতি সেটারও ধার ধারে না। সে তাঁহার সময়ে গ্রীষ্ম দেয়, সে তাঁহার সময়ে শীতের আবির্ভাব ঘটায়। সে তাঁহার নির্দিস্ট চক্রেই তাঁহার যাবতীয় কর্মসম্পাদন করে। ফল পাকিবার বয়স, কিংবা ঝড় আসিবার কাল, অথবা মানুষ পরিপক্ক হইবার ক্ষন সবই এই প্রকৃতি তাঁহার ঠিক সময়ের অনুচক্রে পরিবর্তন ঘটাইয়া থাকে। প্রকৃতির এই চক্রকালের সহিত মানবকুলের সৃষ্টি সময়ের অনুচক্রে অনেক সময়ই গরমিল হয় বলিয়া যে সময়টাকে যাহার জন্য আমরা পরিপক্ক বলিয়া একটা আদর্শ মাপকাঠি ধরি, তাহা আসলে প্রকৃতির অনুচক্রে হয়তো তখনো তাহা অপ্রাপ্ত বা অপরিপক্ক হিসাবেই পরিগনিত হইয়া রহিয়াছে। এইরূপ দুইটি অসামঞ্জস্য চক্র যখন একই ঘটনায় খেলিতে থাকে, তখন কোথাও অধিক পরিপক্কতার কারনে, আবার কোথাও আমাদের মাপকাঠিতে অপরিপক্কতার নিদর্শনে গড়মিল হইয়া মানব সমাজে একটা অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলা কায়েম করে। ইহাতে মানবকুল ক্ষতিগ্রস্থ হয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাস দোলাচলে একে অপরের জন্য দুর্বিসহ পরিস্থিতির কারন ঘটাইয়া সমাজ আলোড়িত করে।

এই আলোড়িত সমাজে তখন কারো কারো জীবনে অসময়ে যেমন সাফল্য আসিতে দেখা যায়, তেমনি, সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও অনেক ক্ষেত্রে কারো কারো জীবনে শুধু ব্যর্থতাই চোখে পড়ে। আমরা তখন প্রকৃতির নিয়মটাকে অগ্রাহ্য করিয়া একে অপরের দোসারুপে মগ্ন থাকি। দর্শন তৈরী করি, উপদেশবানী প্রচারিত করি। সব উপদেশ বা দর্শন সর্বক্ষেত্রে আবার একই পরিনাম আনে না। ইহার কারন, প্রকাশ্যে ভালো মানুষের বেশ ধরে অনেকেই চলাচল করিলেও আড়ালে খারাপ কাজ করার লোকের অভাব নাই। এই খারাপ লোকদের হইতে সাবধান হইবার জন্য তখন আমরা আরো এক ধাপ আগাইয়া “লেসন” বা “শিক্ষনীয় নীতিবাক্য” জাহির করিয়া একে অপরের জন্য ভালো কিছু বলিয়া থাকি।

তবে একটি কথা ঠিক যে, জীবনে সাফল্য পাইতে হইলে অন্য কারো সহানুভুতির চেয়ে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস অনেক জোরালো থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কঠিন পরিশ্রম যদি হয় কোনো সাফল্যের মূলশক্তি, নিজের আত্মবিশ্বাস হইলো সেই শক্তির মুলচালিকা উপাদান। অতীতে কি হইয়াছে, কি কারনে ব্যর্থ হইয়াছেন, কি করিলে কি হইতে পারিতো এইসব বিস্লেশন করা আবশ্যক বটে, তবে তাহা একটি শিক্ষা হিসাবে ভবিষ্যতে কাজে লাগাইয়া সাফল্যের সকাল দেখিতে হইবে। একটা ব্যর্থতাই জীবনের সবকিছু নয়। যার জীবনে ব্যর্থতা নাই, তিনি সাফল্য পাইলে কি অনুভুতি হয় তাহা বুঝিতে পারিবেন না। এইজন্য, প্রতিটি কাজে নিজের বিবেচনা খাটাইতে হয়। সবাইকে সবসময় বিশ্বাস করিতে নাই। মনে রাখা দরকার যে, ইবলিশও এককালে ফেরেস্তা ছিল। তবে কাউকে তাহাঁর কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে বিশ্বাস করা উত্তম। কেননা, কথা মিথ্যা হইতে পারে কিন্তু কাজ মিথ্যা আর সত্যকে পৃথক করে। কোনো মানুষের সুন্দর্জ নির্ভর করে তাঁর সময়ের সাথে সাহসীকতা, তাহাঁর রুচি আর বেশীর ভাগ নির্ভর করে তাঁর পরিপক্ক জ্ঞানের উপর।  আজকে কারো উপর আপনার নির্ভরতার মাত্রা যদি হ্রাস পায়, এটা আপনার দোষ নয়, বরং ইহা তাহাঁর দোষ যিনি আপনাকে নির্ভরতা দিতে পারে নাই। ভুল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে কারো সাথেই বন্ধুত্ব না করা শ্রেয়। ভুল মানুষ সাথী করার চেয়ে একা আগাইয়া যাওয়া অনেক বেশী আরামদায়ক। কখনো যদি মনে হয়, আপনি ভুল মানুষের সাথে হাটছেন, তাহাঁর থেকে অতিদ্রুত পৃথক হইয়া যাইবেন। এটা সেই নড়ে যাওয়া দাতের মতো, যতোক্ষন সাথে থাকিবে ততোক্ষন যন্ত্রনায় থাকিবেন। তখন একা নিজেই আগাইয়া যাইবেন। জীবনকে নিজের দুইটি পায়ের মতো করিয়া দেখিবেন। কোন পা আপনার সামনে গেলো আর কোন পা আপনার পিছনে রহিলো তাহাতে কিছুই যায় আসে না। কারন পাদ্বয় জানে তাহাদের অবস্থানের পরিবর্তন হইবেই আগাইয়া যাওয়ার পথে। আপনি তখন নিজেই নিজের সাথি। সাফল্য বা ব্যর্থতা সবই নিজের। এই পথ চলার মাঝে শুধু একটি বিশেষ উপদেশ সর্বদা মাথায় রাখিবেন, যে, যাহারা আপনার থেকে বৃদ্ধ, তাহাদেরকে সম্মান করিবেন, আর যাহারা আপনার থেকে অধিক দূর্বল, তাহাদেরকে সাহায্য করিবেন আর যদি ভুল করিয়া থাকেন তাহা অকপটে স্বীকার করিয়া লইবেন। ইহার একটি কারন আছে যে, আপনি নিজেও একদিন বৃদ্ধ হইবেন, প্রকৃতির কোনো না কোনো ভুলচক্রে পড়িয়া হয়তো আপনি নিজেও অনেকের থেকে দূর্বল হইয়া পড়িতে পারেন এবং আপনি নিজেও কোথাও কারো কাছে ভুল করিতে পারেন। আজকের দিনের এইসব মানবিক গুনাবলী আপনাকে আগামীতে অনেকের কাছে আরো গ্রহনযোগ্য করিয়া তুলিবে এবং আপনার জীবন আরো সহজ করিয়া রাখিবে। এরই মাঝে যদি কখনো মনে হয় আপনি সাফল্য পাইলেন না, মন ভারাক্রান্ত করিয়া চোখের দৃষ্টিকে ঝাপসা করিয়া রাখিবেন না, ইহাতে অনতিদূরে অপেক্ষামান আরো নতুন সাফল্য আপনাকে পাশ কাটাইয়া চলিয়া যাইবে। স্বপ্ন সার্থক করিবার লক্ষ্যে মনে কোনো সন্দেহ লইয়া কাজ করিবেন না। স্বপ্ন সার্থক হইবার পিছনে যতো না ব্যর্থতা কাজ করে, তাহাঁর অধিক ব্যর্থতা আনে যখন আপনি কোনো কিছু সন্দেহ লইয়া কাজ করিবেন। অবিচল থাকিবেন আপনার স্বপ্নের লক্ষ্যে। মনে রাখিবেন, আজকের দিনটি কিন্তু গতকাল আপনার কাছে আগামীকাল ছিলো যাহা নিয়ে আপনি গতকাল বিচলিত ছিলেন। বিচলিত থাকিবেন না। অনেক দূর যাইতে হইবে। যদি কখনো মনে হয় যে, দ্রুত যাইবেন, তাহা হইলে একা হাটুন, কিন্তু যদি মনে করেন, অনেক দূর যাইতে হবে, তাহা হইলে কাউকে সাথে নিন। আর এই সাথী নির্বাচনে দাপট, অবস্থান এবং শক্তির উৎস খুজিবেন না। কারন এইসব দাপট, অবস্থান আর শক্তি সারাক্ষন থাকে না। শুধু বিবেচনায় নিন, সাথী নিজে পরিশ্রমী কিনা, তাহাঁর ভিতরে মানবতা আছে কিনা, আর পরীক্ষা করুন তিনি লোভী কিনা। ইহার সাথে ইহাও পরীক্ষা করুন, তিনি সত্যকে জানিয়া, সত্যকে দেখিয়া মিথ্যার জালে বাস করছেন কিনা। যদি আপনি তাহাকে ভালোবাসিয়া সাথী করিয়া থাকেন, কিন্তু বুঝিতে পারেন তিনি আপনাকে ভালোবাসেন নাই, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে আপনি অ-জায়গায় অপাত্র লইয়া ঘুরিতেছেন। তাহাঁর সহিত আপনি কিছুদুর হাটিতে পারিবেন বটে কিন্তু বেশীদিন হাটিতে পারিবেন না। আপনি যদি মেয়ে মানুষ হইয়া থাকেন, যদি দেখেন কেহ আপনাকে একটি সুবিধা লইবার পায়তারা করিতেছে বা সুবিধা লইবার পাত্র বলিয়া বিবেচনা করিতেছে, তাহা হইলে তাহাকে অতি দ্রুত ছাড়িয়া দিন। কিন্তু যদি মনে মনে এই প্রমান পান যে, আপনি মেয়ে মানুষ হিসাবে আপনার সাথী আপনাকে একটি দায়িত্ব বলিয়া ভাবে, সে আপনার প্রকৃত সাথী হইবে নিশ্চিত থাকিবেন। কোনো পুরুষ যদি তাহাকে পুরুষ মনে করিয়া আপনার থেকে অধিক সুপেরিয়র ভাবিয়া থাকে, তাহা হইলেও তাহাকে ছাড়িয়া দিন। তিনি আপনার বন্ধু হইবার যোগ্য নহেন।

২৩/০১/২০১৯-সে আমার অলিখিত ভগবান।

এক বছর আগের আজকের এই দিনটা অর্থাৎ ২৩/০১/২০১৮ তারিখটা আমার জীবনে যেমন খুবই একটা স্পর্শকাতরের দিন, আবার অন্যদিকে আমার জীবনকে এই মানুষশাসিত নারীর প্রতি একতরফা ভারসাম্যহীন সমাজে টিকিয়ে রাখার জন্যেও আমার জীবন বলি দেয়ার একটা দিন। আবার যদি বলি, এটা এমনো একটা দিন ছিলো যা কিনা কখনোই আমি হয়তো চাইনি। অথচ আমাকে এই দিনে সেই কাজটাই করতে হয়েছিলো যা আমি নিজের ইচ্ছায় করতেই চাই নাই। কারন আমি ইতিমধ্যে এই সমাজের মুখোসের আড়ালে যে মুখাবয়ব দেখেছিলাম যা এক কথায় যদি বলি সেটা হচ্ছে- মেয়েরা আজো আমাদের এই সমাজে একটা অলিখিত বোঝা।

অনেকেকেই কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন তারা ভালো আছেন, কিন্তু তারা জানেন তাদের সময়টাই ভালো যাচ্ছে না। সত্যি কথাটা বলার জন্যে সাহস থাকলেও সেটা আসলে পুরুপুরি কাউকে যে বুঝাবেন, সেটা মুখের কথায় বুঝানো যায় না। আয়নায় চেহারা দেখা যায় কিন্তু কষ্ট দেখা যায় না। ভিতরটা কেউ দেখে না যদিও সত্যিটা ভিতরেই থাকে। সেই কষ্টে ভরা সুর শুধ্য নিজের কান থেকে নিজের অন্তরেই ঘুরাঘুরি করে প্রতিধ্বনি করতে থাকে। অন্য কারো অন্তর কিংবা হৃদয়ে সেটা কোনোভাবেই পুশ করা যায় না। আসলে একটা কথা আছে-কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট যে কষ্টের কোনো নাম নাই, যে কষ্টের রুপ কাউকে দেখানো যায় না।

আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে কোনো এক সিড়ি থেকে পিছলে পড়ে আমি এমন একটায় জায়গায় পতিত হয়েছিলাম যেখান থেকে না আমি নিজে বা না আমার পরিবার অথবা আমার কেউ সজ্জন টেনে আবার সেই রাস্তাটায় তুলে দিতে পারে। আর সেই সখমতা তাদের কারো ছিলোও না।  অনেক সময় কারো মুখ দেখে কারো ভিতরের যন্ত্রনাকে উপলব্দি হয়তো করা যায়। তখন কারো হয়তো মন চায় যে তার কাছে যেতে, তার মনের কথা জানতে, কিন্তু আমাদের সমাজটা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে সচেতন মানুষের মন বলে উঠে “মাথা ঘামিও না, যদি কোনো সমস্যায় পড়তে হয়!! বিপদে জড়িয়ে পড়লে?” উপলব্ধি সবাই করে। সবার মনকেই ছুয়ে যায়। কেউ কেউ ঝাপিয়েও পড়ে। মনুষ্যত্তের অবনমন যেমন আছে, মনুষত্যের উত্তোরনও তেমন আছে। এমনটি হতেও পারে যে আপনি কোনো মানুষকে দেখে বুঝতে পারলেন সে সমস্যায় রয়েছে। তার মুখে লুকিয়ে থাকা কষ্টকে বুঝলেন আর জানতে পারলেন যে তার পিছনে অত্যাচারের এক ঘৃণ্য কাহিনী বা অন্য কোনো কাহিনী লুকিয়ে আছে। সন্দেহের বশে অসুবিধায় রয়েছে এমন মানুষকে দেখে কোনো প্রশ্ন করা মোটেই অহেতুক হস্তক্ষেপ নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই সব সচেতন মানুষ সামাজিক লাঞ্ছনার ভয়ে সেই কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাড়াতে ভয় পায়। আমার বেলাতেও ঠিক সে রকম একটা পরিস্থিতির স্রিষ্টি হয়েছিলো। আমার মুখ দেখে স্পষ্ট বুঝা হয়তো গিয়েছিলো, আমি ভালো নেই, কষ্টে আছি কিন্তু পর নির্ভর আমার এই পরিবারের কোনো সদস্যদের এইটুকু ক্ষমতা ছিলো না যে, তথাকথিত আমাদের এই সমাজের ভাবধারাকে এড়িয়ে কেউ আমার জীবনে এসে দাঁড়ায়। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমাদের অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। আমিও সেটাই করতে বাধ্য হয়েছিলাম- আমার বিয়ে হয়ে গেলো এমন এক মানুষের সাথে যাকে আমি চিনতাম আমার জন্ম লগ্ন থেকেই। তার সাথে আমার কখনোই এমন কোনো সম্পর্ক ছিলো না যাকে আমরা বলি- ভালোবাসা বা নির্ভরতা। হয়তো তার উদারতা কিংবা আমার রুপের মুগ্ধতায় সে আমাকে বরন করতে চেয়েছিলো। কোনো অবস্থাতেই তার সাথে আমার যায় না, অন্তত বিয়ে করে সংসার করার মতো ব্যাপারে তো নাইই।

ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই হোক আর সামাজিকতা রক্ষার জন্যই হোক, আমি তার সাথে শেষ পর্যন্ত বিয়ে নামক সম্পর্ককে মেনেই নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আর যাইই হোক, আমার এই মেনে নেয়ার সিদ্ধান্তে আমার পরিবার বেচে যাবে একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে, আমি বেচে যাবো একটা অপয়া অপবাদ থেকে, কারন আমি সমাজকে ভয় পাই। কিন্তু তখনো আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারি নাই যে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর পরিবেশের জন্ম দেয়। অনেক সময় প্রতিবেশি বা সমাজের সম্মান বাচানোর জন্য অনেক সময় এই ইচ্ছের বিরুদ্ধে সম্পর্ক গড়ে তোলতে হয় বটে কিন্তু সময়ের পাল্লায় এই সম্পর্ক একটা বোঝা হয়েই দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে আজো এমন অনেক বিয়ে হয়ে থাকে যা শুধু পরিবারকে খুশি করার জন্য। যাকে অন্যের বাড়িতে পাঠানোর জন্য আমরা অনেক কিছু করতে পারি। আমরা তখন হাসিখুশী অববয়ব নিয়ে বিয়ের সব ফরমালিটিজ করে সুখী হবার ভান করি। কিন্তু আরো একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা উচিত যা আমি দেখেছি চাক্ষুষ নিজের বেলায়। বিয়ের সময় দেখানো খুসি আর ভালোবাসার অভিনয়ে এটা প্রমানিত হয় না যে, ভবিষ্যতে এই সুম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বা ঘৃণা আসবে না। একসময় দেখা যায়, এই দেখানো ভালবাসা প্রকাশ্য ঘৃণার বিষে রুপান্তরীত হয়। এই বিষে যখন ঘৃণা ঢোকে পড়ে, তিক্ততার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে এখন এই সম্পর্ককে শেষ করা উচিত। বুঝে শুনে বেরিয়ে আসা উচিত। যাতে তার আগে কোনো মারাত্তক অঘটন না ঘটে। কেননা প্রায়ই তিক্ত সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে বুদ্ধির জায়গায় হিংসা ঢোকে পড়ে, আর তখন কিসের সমাজ আর কিসের জীবন সেটার পরাজয় ঘটে। নিজেকে শেষ করে দেয়া বা নিজের ঘৃণার মানুষতাকে শেষ করে দেয়াই যেনো মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এমন অনেক কিছু হয় যে, সেই দম্পতি যে একদিন ভালোবেসে কিংবা উদার মন নিয়ে খুব কাছে এসেছিলো, তারাই সম্পর্কের তিক্ততায় একজন আরেকজনকে চাকু, বন্ধুক চালাতে পিছপা হয় না। আমি সেটা পর্যন্ত আমার এই অসম দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নিতে চাই নাই। কিন্তু আমার বাবা মা কখনোই আমার এই মনের ভিতরের আবেগতা বুঝতে চায় নাই। একটা বাবা মা যখন সন্তানের জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এটা বুঝতে না পারে, তাহলে সেই পরিবারে সেই সন্তান একটা অসুস্থ্য পরিবেশেই বড় হতে থাকে। আর অসুস্থ্য পরিবেশ শুধু সাস্থ্যইকেই ক্ষতি করে না, মনকেও। আমি আমার নিজের মনের আওয়াজ শুনোট পেয়েছিলাম। এই জীবনে শুধুমাত্র একটা থাকার জায়গা হলেই হয় না, জীবনে বাচার জন্য নিঃশ্বাস ফেলার একটা জায়গাও লাগে। ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কোনো ব্যক্তিত্ত বেশীদিন অসহায় থাকে না। আমার কাছেও সেতাই একদিন চরমভাবে মনে হয়েছিলো যে, কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। আমার জীবনের প্রতিটি দিন যেনো চলছিলো ঠিক এরকম যে, এক শিফটে উনুন, আর আরেক শিফটে বিছানাইয় কারো জন্যে অপেক্ষা করা যে কখনোই না আমার ছিলো, না আমি তার ছিলাম। এটাই কি গরিবের লাইফ। আমার এই যৌবনের দাম, আমার এই জীবনের দাম যদি শুধু শরীর দিয়েই হয়, তাহলে আমি কেনো এমন জীবন বেছে নেই না যেখানে আমি অন্তত আমার মতো করে বেচে যেতে পারি? আর সেই বাচায় যদি কেউ আমাকে নিঃশ্বাস ফেলার একতা অবকাশ ও করে দেয়? কে চায় না তার জীবন আরো ভালো থাকুক?

আমি বদ্ধপরিকরভাবে এক তরফা এবার নিজের জন্যেই নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম- যে জীবনকে সমাজ প্রোটেকশন দেয় না, যে সমাজ ব্যবস্থা আমার মতো কোনো নারীর দায়ভার গ্রহন করে না, যে সমাজে আমি নারী হয়ে একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই না, সে সমাজের কোনো আইন কিংবা নীতি আমার জন্যে না। আমার জীবন আমারই। আমি যদি বেচে থাকি, তাহলে সমাজ আছে, যদি আষ্টেপিষ্ঠে আমি প্রতিনিয়ত আমার সমস্ত অধিকার থেকে নিপীড়িত মানুষের মতো একটা পাশবিক বন্ধি জীবনই এই সমাজের নিতীর কারনে মেনে নিয়ে সামনে এগুতে হয়, আমার সে জীবনের কোনো প্রয়োজন নাই, না সেটা আমার জীবন। আমার এ রকম সিদ্ধান্তের কারনে বারংবার বড় ছোট সবার কাছ থেকেই হরেক রকমের উপদেশ আর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়েছিলাম। কিন্তু সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমি আমার এই সম্পর্কের শেষ পরিনতি ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছিলাম যে, সমাজের চাপের কারনে নেয়া আমার সেই সম্পর্ক একদিন আমাকে অনেক চড়া মুল্য দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। তখনো এই সমাজ আমার পাশে দাঁড়াবে না। তাই সব কিছু আমি অনেক ভেবে চিন্তেই আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।

এমনিতেই প্রত্যেকটা মানুষ নিজের মতো করে বাচতে চায়। আর এই বাচার জন্য হয়তো অনেক আর্থিক ক্ষমতা না থাকলেও মানুষ যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটার উপরেই ভরষা করে নিজের মতো করে নিজে বাচতে চায়। কিন্তু কিছু মানুষের মধ্যে কর্তৃত্ব করার প্রবনতা এমন বেশী থাকে যে, এই ধরনের প্রবৃত্তির কারনে অন্য কিছু মানুষ ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে থাকে। এক সময় তারা একাই হয়ে যায়। আমিও এক সময় মনে হলো- একাই আমি। আমি যদি আসলে একাই হই, তাহলে পরাজয়ের গ্লানী টানবো কেনো?

দুটু মানুষকে জুড়ে দিয়ে একটা নতুন জীবন দেয়ার এই প্রথার নাম বিয়ে। বিয়েও কিন্তু একটা কন্ট্রাক্ট, দায়িত্তের কন্ট্রাক্ট, সরকারী অনুমোদিত একটা কন্ট্রাক্ট। হতে পারে এই কন্ট্রাক্টের মাধ্যমেই দুটু পরিচিত বা অপরিচিত মানুষ একজন আরেকজনের হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শপথ করে। কিন্তু কারো হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু উন্নতির দিকে যাওয়া সেটা কিন্তু নয়। আগে খুব জানা দরকার, হাত ধরা মানুষটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। সাফল্যের সপ্ন, জীবনের আশা আর পরিশ্রমের পথ যিদি  যাত্রার পথ একদিকে না হয়, তাহলে আর যাই হোক, সাফল্যকে হাতে পাওয়া যায় না। আই লাভ ইউ বললেই শুধু ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসার বহির্প্রকাশ হয় তার কাজে আর বাস্তবে। অনেকে হয়তো আই লাভ ইউ বললেই ভাবে ভালোবাসা হয়ে গেলো, কিন্তু সেটা কি অন্তরের না শরীরে তা যাচাই করার কোনো দরকার মনে করে না। ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যা কাছে থাকলে এর প্রয়োজন অনুভব করা যায় না, মনে হয় আছেই তো। কিন্তু যখনই চোখের আড়ালে যায়, মন শুধু আনচান করে আর প্রতীক্ষায় থাকে, কখন কাছে আসবে। ভালোবাসা, কোনো ড্রেস বা জুতা তো নয় যে ফিটিং হলো না আর শপিংমলে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবো। একটুখানি ময়লা হলো বা ফেটে গেলো তো আলমারীর ভিতর লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু ওই ড্রেস বা জুতু যদি ফিটই না হয় তো তাহলে আমরা কি করবো? আমরা তো সেটা পড়তেই পারবো না। আর যদি পড়তেই না পারি আবার ফেলতেও না পারি তাহলে তো আলমারী ছাড়া আর কোথায় রাখবো? তখন হয়ত অন্যদের মতো আমরা আরেকটা শার্ট বা ড্রেস কিনে পড়ে নেবো যা একদম ফিটিং। কিন্তু যেদিন আমি সমস্ত কিছু একপাশে রেখে ওর সাথে জীবন বেধেছিলাম, সেদিন থেকেই আমি পন করেছিলাম, যাইই হোক, আমি থাকবো। সেদিন থেকে আমি তো অন্য কারো কাছে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি নাই। কারো চোখে তাকানোর কথা ভাবতেই পারি নাই। অন্যের সাথে থাকা, অন্যের হাসি, অন্যের জন্য আমি তো কোনো সপ্নই দেখতে পারি নাই। কিন্তু পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে আমার ভাগিকে নিয়ে দাড় করিয়েছিলো যে, আমি হয়তো ওর হাতটা আজীবন ধরেই রাখতে পারতাম, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে, সেক্ষেত্রে আমার হাতটাই হয়তো কাটা যাবে।

আমি বারবার আমার সেই ফেলে আসা কয়েকটা বছরের প্রতিটি মুহুর্ত বিচার আর বিশ্লেষন করে দেখছিলাম। আমার সেই পুরানো বন্ধু যার কারনে আজ আমার এই সমাজে এতো নাজেহাল অবস্থা। কিন্তু সেই নাজেহাল হবার কারনটায় তার কোনো ভুমিকা ছিলো না। সে তো চেয়েইছিলো আমি কিভাবে ভালো থাকি। যা হয়েছে তা শুধু এক তরফা আমার ভুলের কারনে। আমি আজো সেই দিন গুলির কথা ভাবি আর মনকে এটা বুঝাতে সক্ষম হই, জীবন আমার, সমাজ আমার নয়, জীবনের সব দুঃখ আমার আর সেটা আমি সমাজ থেকে পেতে চাই না, জীবনের সুখ আমার আর সেই সুখ আমি নিজের জন্য তৈরী করবো, সমাজের কোনো নিয়মের মধ্যে নয়। কোনো এক ঝড়ের সময় আমার উপড়ে যাওয়া ঘর যখন ঝড়ের শেষে বিলীন হয়ে যায়, সমাজের প্রতিটি মানুষ পাশে এসে শুধু মুখে আর ঠোটেই আহাজারী করে, কিন্তু পুনরায় মেরামত করে যে, একটুখানী সহায়তা করবে সেটা আমার এই সমাজ নয়। বরং আমার সেই অসহায়ত্তকে কেন্দ্র করে আমাকে লুটে পুটে খাওয়ার একতা প্লট তৈরী করবে। যদি সেটাই হয়, তাহলে তো আমার সেটাই করা উচিত যা আমার সেই বন্ধুটি আমাকে সম্মানের সাথে বাচাতে চেয়েছিলো। প্রতিদান একটা মনুষত্যের ব্যাপার, আমার যা আছে তার বিনিময়ে সে যদি সত্যিকারভাবেই আমাকে সমাজের বাইরে গিয়ে এমন একটা জীবন দান করে যেখানে এই সমাজেই আমি একজন প্রগতিশীল মানুষ, শুধু নারীই নই, আমি একজন নীতিনির্ধারক ও বটে, অথবা এমন একটা জীবন যেখানে সমাজের সব আইন আর কানুন আমার পায়ের নীচে পদায়িত, তাহলে কেনো আমি শুকনো রুটি দিয়ে গলা ফাসাবো? আর জল চাই, আমার ভালো পরিবেশ চাই। জীবন তো একটাই। সেতো আমাকে এতাই বলেছিলো যে, “আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ।“ আমি যেনো সম্বিত ফিরে পেয়েছিলাম।

সময় নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। আবার “সময়” পুরানো সম্পর্ককে নতুন করে সাজিয়েও দেয়। তখন ওই সম্পর্ক যে আকার আর যে রুপ নিয়ে ফিরে আসে, সেখানে থাকে আগের করা সব ভুল আর মানসিকতা বিবর্জিত। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। সে আমার প্রকৃত পরিবার ছিলো। আমি ফিরে তাকাতে চেয়েছিলাম এবার নতুন আংগিকে। যখন ফিরে তাকালাম, দেখলাম, গাছটা কেটে দিয়েছিলো কিন্তু শিকরটা কেউ কাটতে পারে নাই। সেই শিকর থেকে আবারো নতুন ঢাল পালা আর নতুন পাতার জন্ম নিচ্ছিলো। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া মানে জীবনটাই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। একটা রোমান্টিক সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া নাতো মানুষকে কাপুরষ বানিয়ে দেয়, আর না ছোট করে। একটা ব্রেক আপ শুধুমাত্র একটা ইংগিত যে, জীবনে রোমান্স ছাড়াও আরো অনেক সুন্দর উপহার আছে। যেগুলিকে আমাদের চিনতে হবে, খুলতে হবে, আর পুরু উপভোগ করতে হবে। আমার জীবনে সে ছিলো ঠিক সে রকমের একতা ব্যক্তিত্ত। আমি নারী, আমার মুল্য কারো কাছে হয়তো ঠিক ততোটা যতোটা আমি সক্ষম অবস্থায় দিতে পারবো। কিন্তু তার কাছে “নারী” ছিলো একটা দায়িত্ত, একটা অপরুপ মায়ার ভান্ডার। কতোটা আমি দিতে চাই, অথবা দিতে ইচ্ছুক সেটা তার কাছে জরুরী ছিলো না, তার কাছে জরুরী ছিলো সেটা যেতা আম্র দরকার। একটা সম্মানীত জীবন। সমাজের কাছে আমার মাথা উচু করে দারাবার সিড়ি। কিন্তু আমি জানি আমার কি দেবার ক্ষমতা ছিলো। আসলে আমার কাছে কিছুই দেবার ছিলো না তার জন্যে। যা দিতে পারি সেটা তার হাতের কাছেই সারাদিন গড়াগড়ি যায়।

জীবনে কাকে কতটা জায়গা দেবো সেটা ঠিক করে ফেলতে পারলে জীবনে আর কোনো সমস্যাই থাকে না। আর কার সাথে কি কমিটমেন্ট করা দরকার তার যদি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তখন জীবনের স্রোত সব সময় একই থাকে। পিছুটানের আর ভয় থাকে না। আর যখন পিছুটানের ভয় থাকে না, তার সামনে দ্রুত গতির শক্তিটাও ধীর গতি হয় না। যতোক্ষন যেটা ভালো লাগবে, ততোক্ষন সেটা চালিয়ে নাও। আর যদি কখনো তাতে কোনো উলতা স্রোতের আবাষ পাওয়া যায়, হয় তাকে সমাধান করতে হবে, নতুবা নিজের পায়ের শকিতে জোরদার করতে হবে। কখনো কখনো বিয়েটা শেষ হয়ে যায়, সম্পর্ক নয়। তখন বেচে থাকে একটা বন্ধুত্তের অভ্যাস, মায়া। তখন যেটা হয়, একজন আরেক জনের কষ্টে বা বিপদে অন্য জন ততোটাই কষ্ট আর বিপদে থাকে যতোতা সে থাকে। অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে তারা হয়তো ঠিক লোক। আর এটাই সেই ঠিকানা যেটা ভুল কিন্তু সেখানে যিনি আসেন বা থাকেন, তিনি আমার জীবনের জন্য সঠিক। ভুল ঠিকানায় আমার সমস্ত জীবনের সঠিক মানুষটি বাস করে।

সামাজিক রীতির মাধ্যমে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ আমরা দুজন মানুষের মধ্যে কোনো একদিন আমি তার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে আমি সমাজের রীতির বাইরে গিয়ে এমন এক সম্পর্কে নিজে চিরদিনের মতো আবদ্ধ হয়ে গেলাম, যেখানে আমি আছি আমার মতো করে। অতীত ভুলে যাওয়া যায় না বটে কিন্তু সেই অতীত আমাকে যেনো আর কখনো দুক্ষে ভারাক্রান্ত না করতে পারে সেই বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আজকের দিনের মানুষটি আমাকে সম্মানের সাথে গলায় পড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারপরেও অতীতের সেই তারিখটা যখন বারবার বছরান্তে ফিরে আসে, আমি হয়তো কখনো সেই মানুষটার জন্য দয়া অনুভব করি, কখনো ঘৃণা অনুভব করি, আর ভাবি, কতোটা পরাজয়ে মানুষ কতোটা ভালো থাকে। এখন শুধু তার সেই অযাচিত ব্যবহার, সমাজের অপনীতি আজ আমাকে শুধু মুচকী হাসিতে ভড়িয়ে দেয়। আমি সুখে আছি। আজ সমাজ আমাকে ঘিরে নিতির ব্যাপারে পরামর্শ করতে চাইলেও আমি এই সমাজকে পরিবর্তনের কোনো উপদেশ দেই না কারন এই সমাজ কারো কোনো উপদেশ শুনে না। আজ সেই তারিখটা আরো এক বছরের জন্য কালের গর্ভে হারিয়ে গেলো কিন্তু মনে করিয়ে দিয়ে গেলো আমার অতীতের অনেক কষ্টের কথা আর আজকের দিনের সুখের মাত্রাটা। অসহায় মানুষ একদিন কারো না কারো হাত ধরে ঘুরে দাড়ায়ই।

সে আমার অলিখিত ভগবান।

১৯/০১/২০১৯-আমি আর ও খুব ভালো বন্ধু ছিলাম (চলবে)

While I was cleaning my drawer, I went over a pile of letters in my box. Letters that I wrote and received..I wanted to share this to you what I have written in the past…This is what i wrote…

আমি আর ও খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। অনেক সময় ধরে আমি আর সে খুব কাছাকাছিই ছিলাম। আমার জীবনের ম্যাক্সিমাম কিছুই ওকে ঘিরেই চলছিলো। এক সময় আমরা  সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমরা আরো ঘনিষ্ঠ হতে চাই। ফলে আমার পরিবার আর ওর পরিবার ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ আলোচনা করে নীতিগতভাবে একটা সিদ্ধান্ত নিলো যে, আমাদের উভয়ের সিদ্ধান্তই সম্মান করা হবে। পরিবার থেকে যখন ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশী কোনো আপত্তি না থাকায় আমরা বেশ ভালোই সময় কাটাচ্ছিলাম। আমি যাই ওর বাসায়, ওর পরিবারের সবাই আমাকেও বরন করেই নিয়েছে বলে মনে হলো। আর আমাদের পরিবার আমার সিদ্ধান্তকে যথোপযোক্ত সম্মান দিয়েই ওদের পরিবারটাকেও আপন করেই নিয়েছিলো। দিন যায় সপ্তাহ যায়, মাস যায়, আমি বুঝতে পারতেছিলাম না, আসলে আমাদের সম্পর্কটা আসলেই কতটুকু শক্ত। অনেক কিছুই আমার কাছে ধীরে ধীরে অস্পষ্ঠ মনে হচ্ছিলো। কিন্তু আমিও নিশ্চিত নই কোথায় গড়মিলটা হচ্ছে। এক সময় আমিও ধীরে ধীরে পুরু ব্যাপারটা বুঝার চেষ্ঠা করি। আমার পরিবার অনেক সচ্ছল, এবং বাবার ব্যবসা, মায়ের অধ্যাপনা, রাজধানীর বুকে নিজেদের বাড়ি, গাড়ি সব কিছুই আছে আমাদের। অন্যদিকে ওর পরিবারের অবস্থাটা অতোটা সচ্ছল নয় যা আমাদের পরিবারের সাথে ম্যাচ করে। তারপরেও আমার পরিবার অতোসতো চিন্তা মাথায় নেন নাই। তারা আমার সুখ এবং আমার মতামতটাই প্রাধান্য দিয়েছেন। পারিবারিক অংশীদার হিসাবে আমরা দুইবোন যা পাবো, তাতে আমাদের নিজের এবং আমাদের পরবর্তী বংশধরগণ অনায়াসেই সচ্ছল অবস্থায় চলতে পারার কথা।

এই বয়সে দুটো নর নারী যে পরিমান ভালোবাসা থাকা দরকার, যে পরিমান একে অপরের প্রতি টান অনুভব করার দরকার, আমি যেনো সেই আকর্ষনের মধ্যে, সেই টানের মধ্যে একটা ঘাটতি অনুভব করতে শুরু করলাম। যেমন, আমি যখন অন্য শহরে থাকি (পড়াশুনার তাগিদেই থাকতে হয়), সে আমাকে দেখার দেখার জন্য অস্থির থাকে না। আমি যখন ছুটিতে নিজ শহরে আসি, তখনো সে আমার জন্য সব ফেলে ছুড়ে আমাকে বাস স্ট্যান্ড থেকে রিসিভ করতে আসে না। যখন ছুটিতে আসি, অদম্য ইচ্ছা নিয়েও আমার সাথে দেখা করার জন্য পাগল থাকে না। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আমি আমলেই নেই নাই। কিন্তু যখন আমার কাছে মনে হলো যে, আমার যে মনের টান, আমার যে অনুভুতি, তার থেকে ওর মনের টান অনেক কম, আকর্ষন অনেক কম, তখন ব্যাপারটা আমকে ভাবিয়ে তুলেছে। 

অনেক কিছু ভেবেচিন্তে আমি ধীরে ধীরে ওর কাছ থেকে একটু দূরে সরে যেতে চাইছিলাম, কারন অনেক কিছুই যেনো আমার কাছে মানান সই মনে হচ্ছিলো না। বিশেষ করে মানষিক চিন্তাধারা, পজিটিভনেস, কিংবা কোনো বিষয়ে একটা পরিপক্কতার অভাব মনে হচ্ছিলো।

আমার এই মনোভাব এক সময় ওদের গোচরীভুত হয়। সম্ভবত ব্যাপারটা নিয়ে ও ওর পরিবারের সাথেও কথা বলে। আমি এইসব ব্যাপারগুলি নিয়ে কখনোই আমার পরিবারের বাবা মায়ের সাথে আলাপ করি নাই। ফলে আমাদের মধ্যে যে দুরুত্ত সৃষ্টি হচ্ছে সে ব্যাপারেও তারা ওয়াকিবহাল নন। তারা সব কিছুই ঠিক আছে মনে করে স্বাভাবিক আচরনই করতে থাকেন।

হতাত একদিন ওর পরিবার আমাদের যুগল বন্ধনে বন্দি করার জন্য ওর বাবা মা আমাদের পরিবারে চলে আসেন। যুগল বন্ধনে বন্ধি হবার জন্য কিংবা ওকে আমার আর পাওয়ার জন্য মন আনচান করে না। ফলে ব্যাপারটা তখন আমার কাছে খুব অসস্থিকর মনে হচ্ছিলো। আমি আমার আগের সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে আমার নতুন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম যে, আমি ওর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। আমার মনে হয়েছে, সে আমার যোগ্য নয় বা আমার পরিবারের জন্য যোগ্য নয়। কিন্তু আমি কোনোভাবেই আমার বাবা মাকে এই সত্য অনুভুতিটা বুঝাতে সক্ষম হই নাই। আমার বাবা মা এক কথার মানুষ। একবার যখন আগে সিদ্ধান্ত দিয়েই দিয়েছেন, এখানে সম্পর্ক করবেন, আর এরই মধ্যে তারা ছেলেতার মধ্যে কোনরূপ অস্বাভাবিক কিছু পান নাই, ফলে তারা আগের সিদ্ধান্ত থেকে নড়তে চাইলেন না। মোটামুটি আমার অমতেই জোর করে আমাদের বিয়েটা দিয়ে দিলেন।

কিন্তু বিয়েটা হয়ার পর পরিস্থিতি যেনো আরো খারাপের দিকে যেতে থাকলো। আমার বাবার সম্পত্তির উপর, আমার বাবার টাকা পয়সার উপর, আমার বাবার ব্যবসার উপর ওর এবং ওদের নজর পড়ে গেলো। কখনো বাবার ব্যবসার শেয়ার নিতে, কখনো তার ব্যবসার খুটিনাটি দেখার চেয়ে তার গাড়ির, এসি কিংবা অন্যান্য সুবিধা আদায়ে আমার উপরেক রকম টর্চারই শুরু হলো। আমার বাবা শুন্য থেকে খেটে এই পর্জন্ত এসেছেন। ফলে তিনি জানেন কিভাবে মানুষ খাটলে বড় হ ওয়া যায়। কিন্তু সে সেটার ধারে কাছেও আছে বলে মনে না হ ওয়ায় বাবা প্রথমে তাকে আমার বাবার ব্যবসায় পেইড ডাইরেক্টর হিসাবে মোটা অংকের বেতনে কাজে লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু অবস্থার আরো অবনিত হতে থাকলো। আর আমার বাবাও এমনি এমনি তেই কাউকে ছাড় দিতে ইচ্ছুক নন। তার কাছে কাজ এবং প্রোফেশন আর প্রতিষ্ঠান একদিকে আর সেই একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিজের লোকের ও ইভালুয়েশ অন্য দিকে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, সে এটা বুঝতেই চাইলো না যে, হেড অফ দি অরগেনাইজেসন আর ফাদার ইন ল যদিও এক জন কিন্তু ব্যাপারটা ভিন্ন।

অবস্থা এক সময় এমন হলো যে, 

৩০/১২/২০১৮-একাদশ জাতীয় সাধারন নির্বাচনের দিন

অনেকদিন পর আজ ডায়েরী লিখতে বসলাম। বছরের প্রায় শেষ দিন। তাঁরমধ্যে আজ দেশে সাধারন নির্বাচন হচ্ছে। আজকের লিখাটি সাধারন নির্বাচন নিয়ে। আমি কোনো প্রকারের রাজনীতির সাথে জড়িত নই। আজ পর্যন্ত মাত্র একটি সাধারন নির্বাচনে (২০০৮ সালের সাধারন নির্বাচন) আমি ভোট দিয়েছিলাম। ভোট দিলাম কিন্তু একান্তই নিজের ইচ্ছায়।  এটাকে ফেয়ার ইলেকশন বলে না। আমাকে কেউ জোর করেনি ভোট চুরি করার জন্য কিন্তু যা দেখছিলাম, তাতে কিছুতেই ভালো লাগেনি।

এই ইলেকশনের ফলাফল মানুষ কে বিভ্রান্ত করবে। হয়ত দেখা যাবে ৯৯% ভোট ই পড়বে শাশক দলের জন্য। এটা জনগনের রায় হবে না। তবে একটা দুশ্চিন্তার কথা মাথায় আসে। ধরুন, কোনো কারনে শাসক দল ভোটে জয়ী হলেন না। তাহলে কি কি হতে পারে?

-হতে পারে একটা রায়ট। কারন, প্রায় ১২ বছর পর যখন জামাত জোট একটা শাসক দল হটাত ক্ষমতায় আসবে, তখন চিরাচরিত নিয়মেই হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে তাদের জোট প্রচুর পরিমানে রক্তক্ষয়ী এক্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি অমুলক নয়। যদি সেটা হয়, তাহলে বর্তমান শাসক দল একেবারেই অসংঘটিত বলা যাবে না, তারা যথেষ্ট পরিমানে সাংঘটনিক ভাবে ইতিমধ্যে শক্ত স্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদেরকে সহজেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়। ফলে পালটা একটা প্রতিঘাত অবশ্যাম্ভাবি।

প্রশাসন হচ্ছে মুলশক্তি বর্তমান শাসক দলের সমর্থক। এই অবস্থায় পুনরায় পুরু প্রশাসন নতুন করে সংঘটিত না করে, বর্তমান প্রশাসন দিয়ে কোনোভাবেই নতুন সরকারী দল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শক্তি রাখে না।

দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বর্তমান শাসক গোস্টির অন্তরালে রিষ্ট পুষ্ট, ফলে তাদেরকে হটাত করে টার্গেট করে রাজনীতির মতো কোনো ফায়দা নতুন শাসক দলের পক্ষে সম্ভব না।

এইসব কারনে, আমার মনে হয় কারচুপির ভোটে দেশের শান্তি বিরাজ করবে।

কিন্তু সমস্যা হতে পারে যদি কোনো বিরোধী দল না থাকে সংসদে।

০৫/০৮/২০১৮-একটা সময় আসে

একটা সময় আসে, যখন মানুষ একা থাকতে চায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ যখন একাকীত্বকে ভয় পায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ বুঝতেই পারে না সেকি একা থাকতে চায় নাকি মানুষের ভীড়ে থাকতে চায়? মানুষ তখন থাকে খুব ঘোরের মধ্যে। ঘোরের মধ্যে থাকা অবস্থাটা একটা বিপদজনক। এটা পশুদের বেলায় হয় না। তাদের পেট ভরা তো সব কাহিনী শেষ। সে তখন কোনো এক নির্জন জঙ্গলে গাছের নীচে একাই ঘুমিয়ে যায় যতোক্ষন তার পেট আবার ক্ষুধার ইঙ্গিত না দেয়। তাদের কাছে কৃষ্ণচূড়ার পাতার রঙ অথবা গোলাপের গন্ধ অথবা মরা জীবের কোনো অসহ্য ঘ্রান কোনো কিছুই বদল করে না। শীত এলে তারা গুহা খোজে, আশ্রয় চায়। বর্ষায় ওরা ভিজে ভিজে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পায়েপায়ে অনেক দূর চলে যায়। কোথা থেকে এলো আর কোথায় গিয়ে থামবে, এটা নিয়ে ওদের কোনো মাথা ব্যথা নাই।

কিন্তু মানুষের বেলায়, সে সমাজ চায়, সে মানববসতি চায়। সে নদীর কুল চায়, চায় নদীর সাথে সাথে সভ্যতাও। এই সভ্যতার রেস ধরে মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসার কথা বলে। একজন আরেকজনের থেকে সুখি, আর খুসি হতে চায়। প্রতিযোগিতা বাড়ে। পছন্দ অপছন্দের হরেক পদের বং বাহারের যুক্তি তুলে কত যে নাটক, সিরিয়াল করে, তার কোনো ইয়ত্তা নাই। সুন্দর থেকে সুন্দরতমের তপস্যা চলে এই মানুষদের। আর এই তপস্যার অন্তরজালে কত কিছুই যে ব্যতিক্রম হয়, কেনো হয় কিভাবে হয় সে রহস্য সন্ধানেও আমরা বেশীরভাগ সময়ে ব্যর্থ হই। প্রতিযোগিতায় সুন্দুরী মেয়েরা সুখের ঘর হারায়, আবার সবচেয়ে অসুন্দর কোনো এক পঙ্গু মহিলা দিব্যি সুখে সংসার করে বেড়ায়। অশিক্ষিত কোনো এক মায়ের কোল ঘেঁষে দুনিয়া কাপানো সন্তানের জন্ম হয়, আবার সবচেয়ে পরিকল্পিত শিক্ষিত মায়ের কোলেই হয়ত বেড়ে উঠে সমাজের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটি। কেউ ভালোবাসে, অনেক সপ্নের ভিতর ডুব দিয়ে দিঘির জলের ভেসে বেড়ায়। কেউ কেউ আবার ঐ দিঘির জলের নীল চ্ছটায় কল্পনাকে ভাসিয়ে দিয়ে আকাশের নীলাভ মেঘ দেখে হয়ত ভাবে, কেউ কি তার জন্য অনেকদিন বাচতে চায়? কিংবা এমন কি কেউ আছে যে, তার সমস্তটা দিয়ে নিজের করে ভালোবাসে? সবুজ ক্ষেতের ধারে বসে কোন এক কল্পনায় কোনো এক অপরিচিত রাজপুত্রের সাক্ষাতে কত কথাই না বলাবলি করে। কিন্তু তা নিছক কল্পনার রাজ্যেই থেকে যায়। হয়ত কাউকে রাজপুত্র ভেবে মিথ্যা কোন প্ররোচনায় আবদ্ধ হয়ে সারাটি জীবন মিথ্যার মধ্যেই বসবাস করে। জানে, মনে কষ্ট, জানে হেরে গেছে, জানে এই পথ থেকে বেড়িয়ে যাবার আর কোনো রাস্তা নাই, তারপরেও জীবন তো, চলতেই থাকবে। কিন্তু কোথায় সে রাজপুত্র আর কোথায় গিয়ে এর শেষ? জোছনা রাতের চকচকে আকাশের তারার মেলায় পাখা মেলে ঝি ঝি পোকার মতো করে একগুচ্ছ ঝিনঝিন আওয়াজের মতো কতই না সঙ্গিত রচনা হয়ে আছে বুকের পাজরের মাঝে। যত্ন করে ধরে আছে ভালোবাসা। কিন্তু ঐ ভালোবাসা তো এক তরফা। যন্ত্রনা শুধু বাড়েই। ওটাই কি শেষ? এই মিথ্যা ভালোবাসায় কোনো অংশিদারিত্ত নাই, কম্প্রোমাইজ আছে কিন্তু এডজাস্টমেন্ট নেই, কান্না আছে অনুতাপের কিন্তু শান্তনা নাই, ব্যথা আছে কিন্তু বলার লোক নাই, এই ভালোবাসা শুধু খুসি রাখা আর কিছুই নাই। এখানে ভালোবাসার নির্ঘাত ভালোবাসার পচন ধরেছে। আর এই পচন শুরু হয়ছে অন্তর থেকে, তারপর শরীরে। আর যেদিন থেকে এই পচন শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই অস্থিত্তের পচন ধরেছে। এখন নিজের বাড়িতে, নিজের সমাজে, নিজের গন্ডিতে কেউ তার সাথে থাকতে চায় না। পরাজয় হয় সারা জীবনের।

যে ভালোবাসায় জিততে চায়, তাকে ভালোবাসা দিতে জানতে হবে। আর যে ঘৃণাকে জিয়িয়ে রাখতে চায়, তাকে সাফল্য এনে সেই জায়গায় যেতে হবে যেখানে তাকে স্পর্শ করার আর কারো ক্ষমতাও নাই। দুটুই কঠিন কাজ। কিন্তু এমনো কেউ আছে, যে ভালবাসল, সে হয়ত ভালবাসায় জিততেই পারলো না। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, সে ভালোবাসায় হেরে গেলো। হয়ত সে ভুল জায়গায় ভুল জিনিসের সন্ধান করেছে। আজ কোনো এক ভাগ্যের গুনে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা ফেরত যায়, কাল সে ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়েই হারে। অথচ এমনো মানুষ আছে, কখনোই ভালোবাসা কি জিনিস নিজেও জানে না কিন্তু নিজের অজান্তেই সে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এমন করে স্থান নিয়ে আছে যে, চারিদিকে ভালোবাসা শুধু মৌ মৌ করে বেড়ায়। এরা এক সময় সমাজ নিয়ন্ত্রন করে, এরা এক সময় সবাইকে নিয়ন্ত্রন করে। আর যখন এটা কেউ মানতে নারাজ হয়, তখন মনে হয়, ঐ যে একবার চুপি চুপি ভালোবাসা এসেছিলো, সেটাই ছিলো জীবনের সবচেয়ে সস্থির সময় যা দেমাগ আর অশালীন ব্যবহারে মানুষ দূরে ঠেলে দিয়েছে। অনুতাপের আর শেষ থাকে না তখন।

আসলে এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নাই। আবার সব কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। কেউ কবি হতে চায়, কেউ বৈজ্ঞানিক হতে চায়, কেউ অনেক ধনী হতে চায়, কেউ রাজনীতিক হতে চায়। আসলে এইগুলি ইচ্ছের উপর কিছুই নিরভর করে না। আবার এইগুলি যে ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না, তাও ঠিক নয়। কারন কোথাও না কোথাও এর একটা রদ বদলের পালা আছে। কোথাও না কোথাও এই যোগসূত্রের একটা টার্ন আছে। যা কিছুদুর পর্যন্ত দেখা যায়, আর বড় অংশটাই আমাদের নজরের মধ্যে নাই। সবচেয়ে ট্যালেন্টেড ছাত্রটি আজ হয়ত কোথাও কোনো এক বড় অফিসের কেরানীর চাকুরী করে। অথচ যে সময়ে তাকে ট্যালেন্টেড ভাবা হয়েছিলো, সেটার গতিপথ পাল্টে আরেক দিকে টার্ন নেওয়ার কারনেই আজ সে সাফল্যের যে চূরায় উঠার কথা ছিলো তার থেকে অনেক দূরে। আবার এমনো হতে পারে, ব্যাকবেঞ্চে বসে থাকা সবচেয়ে নিরীহ ছাত্রটি আজ বিসসের কাছে এতোটাই সমাদৃত যে, কোনো সুত্রই মিলছে না। এই সুত্রটাই মিলাতে হবে। কারন কোন কিছুই হতাত করে হয়ে উঠে না। প্রকৃতি তার ধর্ম কখনোই পাল্টায় না। সেই একইভাবে, যে বালকটি একদিন কবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ সবচেয়ে বড় সমাজসেবি, যে একদিন সমাজসেবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ কারো কারো জন্যে ত্রাস। যা ঘটে তা সময়ের বিবর্তনের পালাক্রমে কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই ঘটে। আজ যে রুপের কারনে আমি আপনি অহংকারী, মনে হয় পৃথিবী বুঝি আমার চরনতলে আছড়ে পড়লো। শত শত হিরো, শত শত সুশ্রী মানবীগন না জানি কতদিন কতরাত তাদের ঘুম হারাম করে রাত জেগে জেগে আমার কথা ভাবছে। এটা ভাবা সহজ। হয়ত এমনো হতে পারে, আমাদের এই আজকের দিনের সম্ভাব্য সবকিছু দেখেই কারো চোখ, কারো বুক, কারো লালসার অন্তরালে এমনই ভালবাসার জাল বানিয়ে অক্টোপাসের মতো ঘিড়ে ফেলেছে, যে, কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা ছলনা, বুঝাই দায়। যাকে তোমার আরধ্য, হয়তো দেখা যাবে তোমার চেয়েও অতি কুৎসিত কোনো রমনী তোমার আরধ্য কোনো পুরুষ তার শয্যাশায়ী। ব্যাপারটা হারজিতের নয়, ব্যাপারটা মতবাদেরও নয়, ব্যাপারটা অনেকাংশেই বৈষয়িক, আর কিছুটা তপ্ত বাসনা। ব্যাপারটা পছন্দেরও না অনেকাংশে। যে জামাটি আমি অপছন্দ করে দোকানে রেখে দিয়েছি, হয়তো ওই জামাটাই আরেকজন হন্যে হয়ে খুজছেন।

আজকে যে ট্রেনটায় আপনি উঠেছেন, সে ট্রেনের যে ব্যক্তিটি আপনার হাত ধরে তুলে নিলো, হয়ত সেই ছিলো আপনার সেই আরধ্য মানুষ। আপনি তাকে দেখেছেন কিন্তু হয়তো চিনতে পারেন নাই। কাল যখন আবার ট্রেনে উঠবেন, আপনি সেই ব্যাক্তিকে হয়ত আর কখনোই খুজে পাবেন না। সে অনেক দূর চলে গেছে। 

১৯/০৬/২০১৮-ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার কাহিনী

৪১ বছর আগের ঘটনা।

আজ হইতে প্রায় ৪১ বছর আগে এইদিনে আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার জন্য সকাল হইতেই প্রস্তুতি লইতেছিলাম। আজ আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার দিন, অর্থাৎ আমি ১৯ শে জুন ১৯৭৭ সালে ক্যাডেট কলেজে পদার্পণ করিয়াছিলাম।  

অজ একটা পাড়াগ্রাম। স্বাভাবিক জীবন যাত্রার জন্য একটি জনপদের যে সব মৌলিক উপাদান কোন একটি জনগোষ্ঠীর প্রাপ্য সেইসব মৌলিক চাহিদা কোনো কিছুই এই অজ পাড়াগ্রামের কোথাও চোখে পড়ে না। বিদ্যুৎ নাই, রাস্তা ঘাট নাই, ভালো একটা মাধ্যমিক স্কুলও নাই। রাজধানী ঢাকা হইতে আমার গ্রাম এতো কাছের একটা জনপদ, তাহার পরেও কোনো পাকা রাস্তা নাই যাহাতে কেহ জরুরী ভিত্তিতেও রোগী লইয়া বা অন্য কোনো ইমারজেন্সি হইলে গাড়ি করিয়া সল্প সময়ে ঢাকার কোনো জায়গায় আসিতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ। মাত্র ৫/৬ বছর পার হইয়াছে ইহার স্বাধীনতার বয়স। মানুষ সবেমাত্র স্বাধীনতার স্বাদ পাইতে শুরু করিয়াছে, কিন্তু সবকিছুই নতুন। নতুন স্বাধীনতার একটা রুপ আছে। এই স্বাধীনতায় যে যেইভাবে পারে, সে সেইভাবেই তাহা উপভোগ করে। কেউ গায়ের জোরে, কেউ অস্ত্রের জোরে, কেউ সম্পত্তির জোরে, কেউ পারিবারিক প্রভাবের জোরে একজন আরেকজনের উপর, একগোত্র আরেক গোত্রের উপর কিংবা এক গ্রাম আরেক গ্রামের উপর প্রভাব খাটাইয়াই স্বাধীনতা উপভোগ করে। আর এই নব্য স্বাধীনতাই আমাদের প্রতিটি গ্রামে, গঞ্জে, আনাচে কানাচে পালিত হইতেছে। কেউ হটাত করিয়া বড়লোক হইয়া যাইতেছে, কেউ আবার সবকিছু হারাইয়া দেশান্তরী হইতেছে। মেলথাসের কোনো থিউরী, কিংবা নিউটনের ৫ম সুত্র কিংবা ডারউইনের নতুন কোনো সুত্র না হইলে যেনো আর রক্ষা নাই। কেউ নতুন সেটেলার হিসাবে নিজের পিতামহের আদি আবাসস্থল ছাড়িয়া অন্য কোনো নতুন জায়গায় তাহার আবাসস্থল গড়িয়া তোলার আপ্রান চেস্টা করিতেছে আবার কেহ কোথাও কোনো স্থান না পাইয়া এই ইহজগত হইতেই বিদায় লইতেছে। নিয়তি বলিয়া একটা কথা আছে, কেউ এটা মানুক আর নাই বা মানুক। সবাই নিয়তির দিকে তাকাইয়া সামনের দিকে চলিবার ভান করিতেছে। ঘরের পালিত পশু পাখিরাও যে কে কাহার, তাহারাও মাঝে মাঝে বিতর্কিত হইয়া কখনো এই মালিকের গোহালের থেকে অন্য মালিকের গোহালে স্থান পরিবর্তন করিতেছে। তাহারা তাহাদের মুখের ঘাস গুলিও চর্বণ করিবার সময় পাইতেছে না।  

আমরা গ্রামে থাকি। গ্রামের বাড়ী যেই রকম হয়, আমাদের গ্রামের বাড়ীটিও সেই রকমের। মাটির উঠোন, চারিদিকে গাছ পালার সমারোহ, কাচা পায়খানা, পাশেই ক্ষেত, হরেক রকমের ফসলের শোভা দেখা যায়। সন্ধ্যা হইলেই বাবুই পাখী, চড়ুই পাখী এবং তাহাদের আবাসস্থলে বেড়াইতে আসা অনেক নাম না জানা অতিথি পাখিরা মিলে হরেক পদের সুরে এবং শব্দে মুখরীত করিয়া তোলে এলাকাটি। তাহারা একে অন্যকেকে লইয়া ঝগড়া ঝাটি করে না। তাহাদের স্বাধীনতা আমাদের মতো নয়। তাহারা জমি লইয়া, বাড়ি বা বাসা লইয়া ভাগ বাটোয়ারা লইয়া মারামারি করে না। উহারা শরত কালে যেমন একে অপরের বন্ধু, বৃষ্টির দিনেও একে অপরকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না। পাখীরা সবাই মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার বলিলে ভুল হইবে। আমাদের উপার্জনক্ষম সদস্য বলিতে একমাত্র আমার বড় ভাই যিনি সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসাবে যোগদান করিয়াছেন। প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয় এই ঢাকা ইউনিভার্সিটি। আমরা পাচ বোন আর দুই ভাই, সাথে আমার মা। সংসার ছোট নয়, কিন্তু সে তুলনায় আয়ের পরিমান আমাদের জন্য অনেক ছিলো না। এইটা তখনকার দিনের প্রায় অধিকাংশ পরিবারেরই হালচাল।

আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব একটা পরিকল্পনা ছিলো কিন্তু আমরা যাহারা ছোট ছোট ভাই বোন আছি, তাহাদের জন্য আমার ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় অনেক ব্যঘাত ঘটিতেছিলো। আর ইহার প্রধান কারন হইলো, তিনিই আমাদের মা, তিনিই আমাদের বাবা, তিনিই আমাদের দেখভাল করার জন্য একমাত্র ব্যক্তি। তাহার নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিতে গিয়া তিনি আমাদেরকে ছাড়িয়া একা কোথাও যাইতে পারেন না। ফলে আমাদের একটা গতি না করিয়া তিনিই বা কিভাবে তাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিবেন? আমি সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ি, আমার ইমিডিয়েট বড় বোন আমার সাথেই গ্রামে পড়াশুনা করে। আমার আরেক বোন আমার থেকে এক ক্লাস উপরে পড়ে আর তার বড়জন পড়ে মাত্র ক্লাস এইটে। সবার বড় দুই বোন এর মধ্যে একজন স্বামীর সাথে পৃথক হইয়া এখন আমাদের বাড়িতেই থাকেন। আমার দ্বিতীয় বড় বোনের তখনো বিয়েই হয় নাই। ফলে ধরিয়া নেওয়া যায়, পাচ বোনের কারোরই বিয়ে হয় নাই। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই সুস্থ নয়। মেয়েঘটিত অনেক প্রকারের অঘটন চারিদিকে ঘটিতেছে। আমরা আছি একটা বিপদের মধ্যে। আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নাই। দেশ স্বাধীন হইয়াছে বটে কিন্তু দেশের মানুষগুলি এখনো আতংকের মধ্যেই দিন কাটাইতেছে।

যাই হোক যাহা বলিতেছিলাম সেখানেই আসি। আমার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথা।

আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় যাহা ছিলো তাহা হইলো যে, আমাকে কোনো একটা ভালো আবাসিক স্কুল কিংবা কলেজে স্থায়ীভাবে ভর্তি করাইয়া দিতে পারিলে আমার ব্যাপারে তিনি দুশ্চিন্তা মুক্ত হন, আর আমার সবগুলি বোনকে বিয়া দিতে পারিলে পুরু পরিবারকে নিয়া তিনি শংকামুক্ত হন। আর এই শংকামুক্ত হইতে পারিলেই তিনি একান্ত নিশ্চিত হইয়া তাহার পিএইচডি করিবার লক্ষে বিদেশে স্কলারশীপ লইয়া বাইরে চলিয়া গিয়া নিজের ক্যারিয়ার তৈরী করিতে পারিবেন, অন্যথায় ব্যাপারটা সফল হইবে না। অনেক কঠিন কাজ এবং এই সবগুলি কাজে একের পর এক সাফল্য আসিলেই তিনি তাহার পরিকল্পনায় সার্থক হইবেন। কোনো একটা কাজে সাফল্য না আসিলে সেখানেই তাহার মহা পরিকল্পনা ভেস্তে যাইতে পারে এবং বড় ধরনের একটা হুমকী হইয়া দাড়াইবে।

ফলে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আমি। আমি গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করি। গ্রামের স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করিলেই যে কেউ খুব মেধাবী বলিয়া প্রমানিত হয়, তাহা কিন্তু মোটেও সত্য নয়। তবে আমি নাকি বেশ মেধাবী ছিলাম ইহা আমাদের স্যারেরা বলিতেন। আর এই মেধাবীত্ব প্রমানের লক্ষে মাঝে মাঝে আমার শিক্ষকগন আমাকে দিয়া আমার থেকে ছোট ক্লাসের তাহাদের ক্লাশ গুলি নেওইয়া লইতেন। তাহাতে স্যার দের দুইতী লাভ হইতো। অনায়াসেই স্যারেরা স্কুলে না আসয়া নিজের পরিবারের জন্য বাজারের দিন বাজার করিতে পারিতেন, কিংবা বৃষ্টির দিনে বাসায় বসিয়া ভুনা খিচুড়ি খাইতে পারিতেন।

একদিন ভাইয়া গ্রামে আসিয়া আমাকে কাছে টানিয়া বলিলেন, তোকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হইতে হইবে। আমার জীবনে এমনিতেই আমি আমার গ্রামের স্কুলের নাম ছাড়া অন্য কোনো স্কুল কলেজের নাম পর্যন্ত শুনি নাই, সেখানে ক্যাডেট কলেজ কি তাহাই তো জানি না। আমি আমার এই তথাকথিত মাথার অভ্যন্তরের সবগুলি প্রকোষ্ঠ খুজিয়া কোথাও ক্যাডেট কলেজের কোনো তথ্য আমার মাথার মধ্যে সন্ধান পাইলাম না। কি করিয়া জানিবো ক্যাডেট কলেজ জিনিসটা কি? আমরা সবাই ভাইয়াকে খুব ভয় পাইতাম, কিন্তু এই ভয়ের মাঝেও আমি একটু এরোগ্যান্ট ছিলাম বলিয়া বুঝিয়াই হোক আর না বুঝিয়াই হোক, একটু আধটু ঘাউরামীও করিতাম। আমার বড় ভাই আমার এই এরোগেন্সিটাকে কখনো বেশ করিয়া উপভোগ করিতেন আবার কখনো কখনো রাগে এমন শাসন করিতেন যে, গায়ে হাত দিতে একটুও কার্পণ্য করিতেন না। যেনো আমি তাহার নিজের কোনো সম্পদ, যখন যাহা খুশী তাহাই করিতে পারেন। কিন্তু অনেক পরে আমি বুঝিয়াছি, আমি শুধু তাহার সম্পদই ছিলাম না, আমি ছিলাম তাহার অন্তর। তাহার শাসনে আমি যতোটা না ব্যথা পাইতাম, আমার ভাই তাহা হইতে অধিক আঘাত পাইতেন বলিয়া আজ মনে হয়। আমি আমার বড় ভাইয়ের এই শাসনটা আজ খুব মিস করি। ভাইয়ার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথায় আজ এরোগ্যান্ট হইবার কোনো কারন আমি দেখিলাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম, ক্যাডেট কলেজ কি জিনিস ভাইয়া?

ভাইয়া বলিলেন, সমস্ত বাংলাদেশ হইতে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য ছেলেরা পরীক্ষা দেয়। হইতে পারে এক লাখ ক্যান্ডিডেট, হইতে পারে তাহার থেকেও বেশি, কিন্তু সবগুলি ক্যাডেট কলেজ মিলাইয়া ছাত্র ভর্তি করে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ জন প্রতি ক্যাডেট কলেজে। তখন দেশে মাত্র চারটি ক্যাডেট কলেজ ছিলো। মেয়েদের জন্য কোনো ক্যাডেট কলেজ ছিলো না। ৪০ বা ৫০ জন সাফল্যবান ছাত্র এক বা দুই লাখ ছাত্রের মধ্যে কত অনুপাত তাহা আমার জানা ছিলো না, কিংবা ইহা কতটা কঠিন কাজ তাহাও আমার বুদ্ধিতে নাই, ফলে ইহা লইয়া আমার কোনো মাথা ব্যথাও ছিলো না। ভাইয়ার একটা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, আমি যদি ইচ্ছা করি, এবং নিজে চেস্টা করি তাহা হইলে যে কোন কাজ আমার দ্বারা সাফল্য আসিবে। আমার উপর ভাইয়ার এই আত্মবিশ্বাসটা অনেক গভীরে পোতা ছিলো যা আমি নিজেও কোনোদিন জানিতাম না। তবে এইটা বুঝিতাম যে, আমি পারবো ইনশাল্লাহ। আমার আত্মবিশ্বাস আমার থেকে আমার উপর আমার বড় ভাইয়ের বেশী ছিলো।

আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য আমাকে কি কি করিতে হইবে? ভাইয়া অতি আদরের সহিত আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভর্তি পরীক্ষা হইবে, মেরিট লিস্ট অনুযায়ী ছাত্র ভর্তি করা হয়। যারা ভালো করিবে এবং পাশ করিবে এবং এই সীমিত সংখ্যক সিটের জন্য কোয়ালিফাই করিবে তাহারাই ভর্তি হইতে পারিবে। কোনো রিকুয়েস্ট বা তদবির চলে না এই ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হবার জন্য।

আমি ভাইয়াকে কি ওয়াদা করিয়াছিলাম, আমার আজো স্পষ্ট মনে আছে। বলিয়াছিলাম, ভাইয়া, যদি পরীক্ষা দিয়া ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়া যায়, তাহা হইলে আমি ভর্তি হইতে পারিবো। ভাইয়া বলিলেন, ইনশাল্লাহ বল। আমি বলিলাম, ইনশাল্লাহ। আমি ছোট, ইনশাল্লাহ বলিলে কতটুকু সাফল্য আসে, তাহা আমার জানা নাই, তবে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসেঅনেক কাজ তিনি সহজ করিয়া দেন, ইহাই আমার গুরুজনেরা আমাকে শিখাইয়া দিয়াছেন। 

আসলে আমি কি কারনে এতো জোর দিয়া সাফল্যের কথা বলিয়াছিলাম, আমি আজো জানি না কিন্তু আমার মনে হইয়াছিলো, এইটা কোনো ব্যাপারই না। ভাইয়া শুধু আমার কথাতে খুশীই হইলেন না, তিনি জানিতেন, আমি পারবো। এখন শুধু আমাকে পারার জন্য সুযোগ করিয়া দিতে হইবে।

ভাইয়া আরো বলিলেন, দেখ, ভর্তি পরীক্ষার সময় আছে আর মাত্র ৩৯ দিন। বিশাল সিলেবাস, কোথা থেকে কি আসিবে পরীক্ষায় কেউ জানে না, কিন্তু এরই মধ্যে পাশ করিতে হইবে। এখানে পাশ করিবার কোনো নম্বরের লিমিট নাই। প্রথম হইতে মাত্র ৪০/৫০ জন। মেধা তালিকার এই একটা অসুবিধা।  

আমার প্রস্তুতির মধ্যে প্রথম ধাপ শুরু হইলো আমার হাতের লেখার অনুশীলন দিয়া আর তাহার সাথে ক্লাস সিক্স, সেভেন এবং এইটের সব বই পড়িয়া ফেলা দিয়া। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম হইতে শুরু করিয়া রাস্ট্রপ্রধানদের নাম, মুদ্রার নাম, আরো অনেক কিছু। তাহার মানে সাধারন জ্ঞ্যান বলিতে যাহা বুঝায় তাহা আয়ত্ত করা। আমি আজো বুঝি না, এই বয়সে ঘিনির রাস্ট্রপ্রধান ইয়াসিন সাহেব না হইয়া আলিম সাহেব হইলেই বা কি আর লন্ডনের মুদ্রার নাম পাউন্ড না হইয়া টাকা হইলেই বা কি? তাহাতে ক্যাডেট কলেজের মেধার সহিত কি পার্থক্য হয়? তাহা হইতে যদি বলিতো, লও একটা ফুটবল, দেখি কত জোরে লাথি মারিয়া কত দূর নিয়া যাইতে পারো, অথবা একটা গাছে উঠিয়া চড়ুই পাখীর বাসা হইতে একটা আস্ত ডিম পারিয়া কত তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিতে পারো দেখাও দেখি? সেইটাই হোক তোমার পরীক্ষা। অথবা যদি বলিতো যে, দেখি দম বন্ধ করিয়া কে কতক্ষন থাকিতে পারো? কিংবা যদি বলিতো, বৃষ্টিতে কে কতোক্ষন ভিজিয়া চুপচাপ বসিয়া থাকিতে পারো, এইটাই তোমাদের পরীক্ষা। যাই হোক, ভর্তি পরীক্ষার গুরুজনগন আমাদের থেকে বেশি মেধাবি বলিয়া তাহারা ফুটবল খেলিতে পছন্দ করেন না, তাই ফুটবল ১০০ গজ গেলেই কি আর ৫০০ গজ গেলেই কি। অথবা তারা বয়স্ক হইয়া যাওয়াতে বৃষ্টিতে ভিজার নাম শুনিলেই তাহাদের যাহার কথা প্রথমে স্মরণ হয় তিনি হচ্ছেন ডাক্তার। অহেতুক এই মেধা পরীক্ষা লইতে গিয়া ডাক্তার বাবুদের টানিয়া আনা খুব সমিচীন বলিয়া মনে হয় না। ফলে এইসব বিষয় সিলেবাসে সংযোগ করিয়া নিজেদের ক্ষতি করিবার কোনো কারন তাহারা দেখেন না। যাক, সিলেবাসের মধ্যে এখানেই শেষ নয়। ইংরেজীতে কথা বলার অনুশীলন করা, ইহার সাথে প্রতিদিন সকালে শারীরিক ব্যায়াম করা এইগুলাও নাকি আছে। এতোসব তো আর গ্রামে বসিয়া করা সম্ভব নয়। তাই আমার ট্রান্সফার হইয়া গেলো গ্রাম হইতে শহরে, খোদ ঢাকা ইউনিভার্সিটির চত্তরে, শহিদুল্লাহ হলে। আমার ভাই শহিদুল্লাহ হলে থাকিতেন, সেখানে। ভাগ্যের কি পরিহাস, ক্যাডেট কলেজে পরীক্ষা দিতে গিয়া প্রথমেই ইউনিভার্সিটিতে পদার্পন।

আমি যেইখানে ভাইয়ার সাথে থাকিতাম, সেইখানে তখন আমার ভাইয়ের সব কলিগরা থাকিতেন। সেকুল ভাই (ঢাকা ইউনিভারসিটির এপ্লাইড ফিজিক্সের লেকচারার, আমি জানি না তিনি এখন কোথায় আছেন, আবু সুফিয়ান ভাই, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ম্যাথ লেকচারার সম্ভবত, তাহার সাথেও আর কখনো যোগাযোগ হয় নাই আমার, এবং আরো অনেকে)। পাশেই ফ্যামিলি কোয়ার্টারে থাকিতেন সেই বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন ভাই (রসায়নের লেকচারার) গুলতেকিন ভাবি সহ। সন্ধ্যা হইলেই এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির কিছু শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রী (তাহাদের মধ্যে সুবর্ণ মুস্তফা, কেমিলিয়া মুস্তফা, আফজাল ভাই এবং আরো অনেকেই আসিতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কিভাবে করিবেন তাহা আলাপ করার জন্য, আড্ডা দেওয়ার জন্য। আমিই হইলাম গিয়ে একমাত্র অসম বয়সী এক কিশোর যাহাকে সবাই খুব আদর করিয়া কেউ পিচ্চি, কেউ বালক, কেউ আবার নিজের দেওয়া যে কোনো মিস্টি নাম, কেউ আবার আমার নাম ধরিয়াই ডাকিতেন। আমাকে যে কেউ যে নামেই ডাকিতেন, আমি তাহাতেই উত্তর করিয়া সময়টাকে প্রানবন্ত করিয়া রাখিতাম।   

আমার কোনো বন্ধু ছিলো না এই শহরে। আমি সকালে আলুর ভাজি দিয়া পরোটা খাই, তারপর পড়িতে বসি, আবার দুপুরের দিকে গোসল সারিয়া দুপুরের খাবার খাই, ঘুমাই, বিকালে সবার সাথে বোবা মানুষের মতো আড্ডা দেই, সন্ধ্যা হইলেই আবার পড়িতে বসি। এর মধ্যে বেগমের মা ই একমাত্র মহিলা যিনি সব লেকচারারদের জন্য তিন বেলা রান্না করিয়া দেয় আর আমার সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়। ঢাকা শহরের একমাত্র মহিলা যাহাকে আমি গ্রামের মানুষদের মতো করিয়া পাইয়াছিলাম। আরেকজন ছিলো মুন্সি নামে একজন পুরুষ যিনি চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী হইয়াও রাজনীতির অনেক খবর রাখিতেন এবং খুব ভালোভাবেই অংশ গ্রহন করিতেন। আজ এই মানুসগুলি কোথায় আছে আমার জানা নাই, কিন্তু মিস করি।

শহিদুল্লাহ হলে আমার পড়াশুনা খুব ভালোভাবে চলিতেছে। কিন্তু গ্রামের জন্য আমার খুব মন খারাপ হয়। বিছানায় শুইলেই আমি আমার সেই গ্রামের পথ দেখি, মায়ের জন্য মন খারাপ হয়, আমার বন্ধুদের জন্য মন খারাপ হয়, আর মনে হয় কাউকে না জানাইয়া গ্রামে পালাইয়া যাই। কিন্তু আমি এই শহরের কোনো রাস্তাঘাট আমি চিনি না, কাউকে চিনি না, হাতে কোনো টাকা তো দুরের কথা পয়সাও নাই। আর থাকিলেও কিভাবে কাকে কি বলিয়া আমাদের গ্রামে যাওয়া যায়, তাহার কোনো পথ লিঙ্ক আমার জানা নাই।

দিন যায়, রাত যায়, আমার আমার সব কাজ ঠিক ঠাক মতো চলছে। বিশেষ করে পড়াশুনা। শুধু পড়াশুনাই ভালোভাবে চলিতেছে বলিলে ভুল হইবে, পড়াশুনার পাশাপাশি সকাল হইলেই আমার বড় ভাই আমাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে পাঠাইয়া দেন। সেখানে সব সিনিয়র সিনিয়র ভাইয়েরা শরিরচর্চা করেন। আমিই একমাত্র সবচেয়ে কনিষ্ঠ অনুশীলনকারি যে এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে আসি। কেউ কিছু বলে না, মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমার গালে হাত দিয়া আদর করিয়া দেয়। আবার কেউ কেউ খুব খুশি হয় এই ভাবিয়া যে, এই অল্প বয়সেও আমি এতো সাস্থ সচেতন!! যখন জানিতে পারে আমি ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য চেস্টা করিতেছি, আর এই জিমে আসার পিছনে আমার সাস্থ সচেতনার থেকে সিলেবাস পুরা করাই মুখ্য, তখন অনেকেই আরো মিস্টি মিস্টি করিয়া আমার পড়াশুনার কতটুকু হইতেছে তাহা জানিতে আগ্রহী হয়। কয়েকদিনের মধ্যে অনেকের সাথে আমার অসম বয়সী বন্ধত্ত হইয়া উঠে। এখন আর খারাপ লাগে না। অনেকেই আমার পরিচিত।

দিন ঘনাইয়া আসে পরীক্ষার। আমার মধ্যে যতোটা না টেনসন তাহার থেকে বেশী টেনসন দেখিতে পাই আমি আমার বড় ভাইয়ের চোখেমুখে। একটা সময় আসে, আমার সব সিলেবাস শেষ হইয়া যায়, সবকটি রচনা বইয়ের যে কয়টি রচনা লেখা রহিয়াছে তাহা তোতা পাখির মতো মুখস্ত হইয়া যায়, তিন ক্লাস মিলিয়া যতো অংক আছে তাহা আমার নখ দর্পণে। সুত্র আমি ভালো বুঝি, নিজে নিজেই অনেক সুত্র যেন আবিস্কার করিয়া ফেলিতে পারি এমন একটা অবস্থা। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম আমার জানা। কোনো এক দেশের কোনো ছোট বালক হয়ত তাহার দেশের রাজধানীর নাম বলিতে না পারিলেও আমি তাহার দেশের রাজধানীর নাম অনায়াসেই বলিয়া দিতে পারি। সুরিনামের রাজধানী প্যারামারিবো এইটা হয়তো আজো অনেকেই জানে না। আর এই প্যারা দিয়া কেনো রাজধানীর নামকরন হইলো সেইটা লইয়া আমার কোনো কৈফিয়তও নাই। সুরিনামের রাজধানী “প্যারামারিবো” বা “পারা মারিবো” না হইয়া যদি “গুতা মারিবো” কিংবা “ঘুসি মারিবো”ও হইতো তাহাতেও আমার কোনো অসুবিধা হইতো না, আমি সেইটাও মুখস্ত করিতাম।

দিন যায়, পরীক্ষার তারিখ ঘনাইয়া আসে, আর আমার সিলেবাস শেষ হইতে থাকে। একদিন ভাইয়াকে বলিলাম, ভাইয়া, আমার তো সব পড়া শেষ। আর কোনো রচনাও বাকী নাই কোন বইয়ের। তাহা হইলে আমি এখন কি করিবো? ভাইয়া বলিলেন, তাহা হইলে এক কাজ কর, প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর পরে যে স্বপ্ন দেখিস, সেইটা সকালে উঠিয়া রচনা আকারে লিখিয়া ফেল। এইটাই তোর সিলেবাস। কি ভয়ংকর কথা। ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিচারদের মাথায় এতো বুদ্ধি? এখন আবার স্বপ্ন মনে রাখিতে হইবে? কিন্তু আমি তো শুধু একটাই সপ্ন দেখি, আর তাহা হইতেছে ওই যে, গ্রামের মেঠো পথ, ডাংগুলি খেলা, আমার বন্ধুদের লইয়া হইচই করিয়া মাঠে ফুটবল খেলা, সারাদিন চরকির মতো ঘুরিয়া বেড়ানো। কিন্তু তাহাতেও আমার রচনা শেষ হয় না। কখনো আমি আমার মাকে দেখি, দেখি আমাদের উঠোনে বাড়িয়া উঠা বরই গাছে ছোট ছোট বরই এর কলি আসিয়াছে, দেখি আকাশের শেষ প্রান্তে লাল সূর্য এক সময় সন্ধ্যা নামাইয়া সারা গ্রামকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করিয়া দিতাছে। আর ইহার সাথে রাতের তারা আর গোলাকার চাক্টির মতো চাদনী রাত উপহার দিতাছে। আমার রচনায় আমার মন খারাপের একটা পরিস্কার আভাস ফুটিয়া উঠিতেছে বুঝিয়া আমার ভাই মাঝে মাঝে আমাকে লইয়া পাশেই দোকানের গরম জিলাপি খাওয়ানোর চেস্টা করেন। মিস্টি জিলাপী খাওয়ার সাথে মন ভালো হইবার একটা যোগ সুত্র নিশ্চয়ই আছে। তাহা না হইলে, অন্তত ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন মেধাবী লেকচারার এই কাজটি করিতেন না।  

সপ্ন হইতে রচনা লিখতে গেলে যেহেতু আমার মন খারাপের একটা আভাস তিনি পাইতেছিলেন, তাই এইবার আমার বড় ভাইয়ের মাথায় আরেক নতুন ফন্দি এলো। বিকালে যে সব বড় ভাইয়েরা আড্ডা দিতে আসেন, তাহাদের মধ্যে হুমায়ুন ভাই একজন উঠতি লেখক হিসাবে পরিচিত হইতেছিলেন। তিনি নন্দিত নরকের মতো একটা উপন্যাস ইতিমধ্যে লিখিয়া নাম করিয়া ফেলিয়াছেন। শঙ্খ নীল কারাগারও ইতিমধ্যে নাম করা হয়ে উঠিতেছে। ইহা আবার টিভিতে প্রচারিতও হইয়াছে। হুমায়ুন ভাই তাহার উপন্যাশের মুল কাহিনী লিখার আগে বা পরে তিনি তাহার লেখাগুলি এই আড্ডায় শেয়ার করিতেছেন। আমি ছোট একজন মানুষ এইসব বড় বড় মানুষদের কাছে বসিয়া শুধু হাই তুলিতেছি। আমি কি তাহাদের এই উপন্যাশের চরিত্রের বৈশিষ্ট খন্ডন করিয়া রচনা আকারে লিখিতে পারি? তাই, শহিদুল্লাহ হলের ডাইনিং হলের উপরের তালায় এক মাত্র সাদা কালো টিভির নাটক আর বিদেশি কিছু ইংরেজী সিরিয়াল দেখার অনুমতি আমার মিলিয়া গেলো। কিন্তু অসুবিধা হইলো আরেক জায়গায়। এতো ছাত্র এবং ছাত্রীরা এই সাদা কালো টিভির দর্শক ছিলেন, যে, তাহাদের গল্পের ডায়ালগ শুনিতে শুনিতে টিভির কোনো ডায়ালগই আমার কানে আসিত না।

এখানে আরো একটা কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। আমার হাতের লেখা অনুশীলন করিতে করিতে আমার হাতের লেখা মুক্তার মতো ঝকঝকে হইয়া গেলো। একেবারে কার্বন কপি আমার বড় ভাইয়ের হাতের লেখার সাথে। শুধু তাই নয়, আমি যে কোনো স্টাইলে হোক সেটা সোজা করিয়া, বাকা  করিয়া, তেরা করিয়া, সব স্টাইলেই আমার হাতের লেখা এ ওয়ান।

অবশেষ ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষা আগামিকাল। সিট পড়েছে ঢাকা কলেজে। কি বিশাল সেই কলেজ। আমার জীবনেও এতো বড় কলেজ দেখি নাই। কতগুলি বিল্ডিং, কতগুলি রাস্তা, মাথা খারাপ হয়ে যায়। পরীক্ষার উত্তর প্রশ্নপত্রেই লিখিতে হইবে, ফলে খুব সাবধানে না লিখিলে উত্তরের জন্য অতিরিক্ত কাগজ লইবার কোনো অপশন নাই। আমার অবশ্য তাহাতে কোনো সমস্যা নাই কারন আমি অতি ছোট অক্ষরেও অলপ বিস্তর জায়গায় অতি সুন্দর করিয়া কাটাকাটি না করিয়া অনেক বেশী কিছু বেশ লিখিতে পারি।  

প্রশ্নপত্র হাতে পেলাম। প্রথমেই কি রচনা আসিয়াছে সেইতা খোজ করিতে গিয়া আমার এতো হাসি পাইয়াছিলো যে, আজো আমার ঠোট হাসে। এত রচনা পড়িলাম, এতো রচনা স্বপ্ন দেখিয়া দেখিয়া নিজে রচনা তৈরী করিলাম, এতো বড় বড় সাহিত্যিকদের সাথে নাটক উপন্যাসের চরিত্র ব্যাখ্যা করিয়া আমি নিজেও একজন সেমি সাহিত্যিক হইয়া যাইবার উপক্রম হইলো, আর সেখানে কিনা রচনা আসিয়াছে “আমার জুতার ফিতা”, আর “আমার কলমের নিপ”? তাও আবার দশ লাইন। ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রকারীরা আসলে অন্য গ্রহে বাস করিতেন বলিয়া আমার বোধগম্য হইল, অথবা তাহার রচনা নির্বাচন করিবার জন্য হয়তো কিছু দুই বা তিন বছরের বাচ্চাদের লইয়া একটা বোর্ড গঠন করিয়াছিলেন, যাহারা জুতার ফিতা আর কলমের নিপ ছাড়া আর কিছুই তাহাদের জ্ঞ্যানে ছিলো না। যাক, আমি “কলমের নিপ” রচনাটাই লিখিলাম। আমিও কম চালাক নই। দশ লাইন লিখিতে হইবে, আমি দশ লাইন ই লিখিবো। লিখিলাম।

আমার একটি কলম আছে যাহার আগায় একটা নিপ আছে।

নিপটি শক্ত।

মনে হয় টিনের তৈরী।

নিপটি খোলা যায়।

আবার লাগানোও যায়।

মাঝে মাঝে নিপটি খুলিয়া ধুইতে হয়।

নিপ ভেংগে গেলে নতুন নিপ লাগানো যায়। ।

নিপের জন্য একটা ক্যাপও আছে।

নিপ কলমের মাথার মতো।

আমি নিপটিকে খুব ভালোবাসি।

আমি কখনো নিপটিকে এমন করিয়া ভালোবাসিয়াছি কিনা আজো জানি না। কিন্তু লিখিয়া তো দিয়াছি যে, আমি নিপটিকে ভালোবাসি। আসলে ভালোবাসার জন্য শুধু প্রান থাকিতে হইবে এমন বস্তুই নয়, প্রান নাই এমন সব বস্তুকেও আমরা অনেক ভালোবাসি। হয়ত এই নিপের জন্য কেউ এমন করিয়া এমন ভালোবাসা প্রদর্শন করিলো।

পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি একে একে সবগুলির উত্তর দিতে থাকিলাম। অংক, ইংরেজী আর সাধারন জ্ঞ্যান এর পরীক্ষা। বাংলা কি ছিলো কিনা এখন আর মনে করিতে পারিতেছি না। মনে হয় ছিলো না। আমি যখন পরীক্ষা দিতেছিলাম, লক্ষ্য করিলাম, একজন মোটা টিচার প্রায়ই আমার পাশে আসিয়া দারাইতেন। আর বলিতেন, তোমার হাতের লেখা তো খুব সুন্দর!! মাত্র এক ঘন্টার পরীক্ষা। এই এক ঘন্টায় নির্ধারিত হইয়া যাইবে কে বা কাহারা এইসব ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হইবে। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় ক্যাডেট কলেজের ছেলেগুলি কি ভাগ্যবান নাকি ছেলেগুলি ক্যাডেট কলেজকে ভাগ্যবান করিয়াছে? হয়ত দুইটুই সত্য।

পরীক্ষা সেসের ঘন্টা বাজিয়া গেলো। আমার পরীক্ষা খুব ভালো হইয়াছে। জানামতে কোন ভুল করি নাই। আমি তৃপ্ত পরীক্ষা দিয়া। খাতা লইয়া যাইতেছেন টিচাররা। আমার খাতা নিতে আসিলেন ওই মোটা টিচার। আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, পরীক্ষা কেমন হইয়াছে? আমি স্যারকে বলিলাম, স্যার যদি একজন চান্স পায়, তাহা হইলে আমি পাবো। এবার আর ইনশাল্লাহ বলিতে ভুল করি নাই। স্যার নিজেও সম্ভবত আমার উত্তরগুলি লিখার সময় পড়িয়াছিলেন। তাই হয়তো বুঝিয়াছিলেন, আমার কথায় একটা সত্যতা আছে। তিনি আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভাইভা পরীক্ষাটা ভালো করিয়া দিবা, দেখা হইবে কলেজে। পরে আমি কলেজে গিয়া এই স্যারের নাম জানিয়াছিলাম, মোহশীন স্যার, আমাদের বাইওলোজির টিচার।

লিখিত পরীক্ষা তো শেষ। এখন যাহারা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করিবে তাহাদের মধ্য হইতে আবার ভাইভা নেওয়া হইবে। ভাইবায় যাহারা মেধাবী হিসাবে প্রমান করিতে পারিবে, তাহারাই সেই গুটিকতক ভাগ্যবান যারা সপ্নের ক্যাডেট কলেজে পড়িতে যাইবে। বয়স মাত্র ১২, যেই সব পরীক্ষা দিতেছি, আমেরিকার প্রেসিডেন্টরাও মনে হয় এই বয়সে এমন পরীক্ষা দেয় নাই। এদিক হইতে আমরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হইতেও উত্তম।  

পরীক্ষার পর যেনো আমার আর কোনো কাজ রহিলো না। কিন্তু আমার না হয় কাজ নাই, কিন্তু যিনি কাজ জোগাড় করিয়া দেওয়ার লোক আমার সেই ইউনিভার্সিটির ভাই, তাহার হাতে তো আমার জন্য অনেক কাজ জমা হইয়াই ছিলো। ভাইয়া ভাবলেন, কি জানি যদি ক্যাডেট কলেজে না চান্স পাই তাহাহলে কি হবে? ফলে বিকল্প হিসাবে তিনি আরো একটি কলেজের জন্য আমাকে প্রস্তুতি নিতে বলিলেন। আর সেইটা হইতেছে ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল। ক্যাডেট কলেজের প্রস্তুতি আমার এমন ছিলো যে, ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের জন্য ইহাই ছিলো ঢের। ফলে খুব অনায়াসেই আমি ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের ভরতি পরীক্ষায় টিকে গেলাম।

দিন যায় মাস যায়, ভাইয়া আমার ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন আর আমি অপেক্ষায় থাকি কবে গ্রামে যাবো, আবার বৃষ্টিতে ভিজবো, গ্রামের বন্ধুদের লইয়া আমি কবে আবার সেই আগের দিনের মতো হই হুল্লুর করিবো। 

আমি রীতিমতো ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে ক্লাস শুরু করিয়া দিয়াছি। নতুন নতুন কিছু বন্ধু জুটিলো। ভালো লাগিতে শুরু করিলো আমার শহরের জীবন। আমি শহিদুল্লাহ হল হইতে হাটিয়া হাটিয়া সেই আজীম্পুর ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে যাই ক্লাস করিতে। ফিরিতে ফিরিতে বাজিয়া যায় প্রায় পাচটা।

হটাত একদিন সকাল বেলায় আমাকে আমার ভাই কাছে ডাকিলেন, পাশে বসাইলেন, আর আমার মাথায় হাত দিয়া বলিলেন, ‘তুই জানিস না তুই কি করেছিস। তুই ক্যাডেট কলেজের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিস। কত যে আমি খুশী হয়েছি তোকে বুঝাতে পারবো না’। আমি পাশ করেছি এই উপল্বধিটা আমার মধ্যে কোনো কিছুই পরিবর্তন করিলো না কিন্তু ভাইয়ার খুশী দেখিয়া আমার অনেক আনন্দ হইয়াছিলো। আমাকে ভাইয়া ওইদিন সন্ধ্যায় কোথায় যেনো লইয়া বেশ মজার মজার খাবার খাওইয়াছিলেন। ঢাকা শহর ঘুরাইয়া ছিলেন। আমি ভাইয়ার হাত ধরে এক রিক্সায় বেড়াইয়াছি। খাওয়া দাওয়ার পর ভাইয়া হুমায়ুন স্যারের বাসায় এই সুখবরটা দিতে আমাকে লইয়া গেলেন। রাতে হুমায়ুন স্যারের বাসায়ই খাওয়া দাওয়া করিলাম। গুলতেকিন ভাবি খুব ভালো মহিলা ছিলেন, আমাকে আদর করিয়া বলিলেন, এই যে মেধাবী ছেলে, আসো তোমাকে মিস্টি খাইয়ে দেই। এই বলে তিনি আমাকে এক বাটি পুডিং ধরিয়ে দিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি পুডিং খুবই অপছন্দ করি। বলিলাম, পেটে একটু জায়গাও নাই যে খাই। তারপরেও খাইলাম। ভালোবাসায় যে যাই কিছুই দিক, তাহাতে ভালোবাসার সাথে যাহা থাকে তাহা হচ্ছে স্নেহ আর মায়া। এই মায়ার কারনেই কেউ এই পৃথিবীকে ছাড়িতে চাহে না।  

কিছুদিন পরই ভাইভার তারিখ পড়িয়া গেলো। আমি এই ভাইভাটাকে এতো ভয় পাই যে, মাঝে মাঝে আমি তোতলাতে থাকি যদি উত্তর না পারি। তারপরেও তো ভাইভা দিতে হইবে। আমার যেইদিন ভাইভা পরীক্ষা সেইদিন আমার সিরিয়াল পড়িলো একবারে শেষ ছাত্র হিসাবে। শেষ ছাত্রের ভাইভা দেওয়ার বিরম্বনার আর শেষ নাই। যেই পরীক্ষা দিয়া বের হয়, অমনি আমরা হুম্রী খাইয়া তাহাকে ঘিরিয়া প্রশ্ন করিতে থাকি, তাহাকে কি জিজ্ঞাসা করিয়াছে, আর সেইটার উত্তর কি দিয়াছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের প্রাননাশ। আর টেনসন তো আছেই। আমরা যাহারা তখনো পরীক্ষার সিরিয়ালে বসিয়া আছি, তাহারা ফাকে ফাকে অনেক প্রশ্ন নিয়ে আলাপ আলোচনাও আবার করিতেছি। একসময় (নাম বল্বো না আমার এক বন্ধু যে পরে আমার সাথেই ক্যাডেট কলেজে পড়েছে) এক ছাত্র আরেক ছাত্রকে প্রশ্ন করিলো, জানো, গাড়ি চলার সময় কয় চাক্কা সাম্নের দিকে ঘুরে? আমিও মনোযোগ সহকারে প্রশ্নটি শুনিলাম, কিন্তু যেহেতু কোনোদিন আমার পরিবার গাড়ির মালিক ছিলেন না, তাই আমি নিজেও জানি না আসলে কোন কোন চাক্কা গাড়ি চলার সময় সামনে যায় আর কোন চাক্কা পিছনের দিকে যায়। আমার প্রশ্নকারী বন্ধু খুব গম্ভীরভাবে উত্তর দিলো, গাড়ির সামনে চলার সময় তিন চাক্কা নাকি সামনে ঘুরে আর এক চাক্কা নাকি পিছনের দিকে ঘুরে। আমি বিশ্বাসও করিয়াছিলাম। হইতেও পারে, কারন ওরা তো গাড়িতেই ঘুড়াঘুড়ি করে। আমি এরপর অনেকবার পরিক্ষা করে দেখার চেস্টা করিয়াছি, আসলে কোন চাক্কাটা পিছনের দিকে ঘুরে? এইটা খুজিতে গিয়া বারবার আমার মাথাই খালি চক্কর দিয়াছে কিন্তু কোন চাক্কা পিছনে চক্কর দেয় সেটা আজো বুঝি নাই।

অবশেষে ভাইভার জন্য আমার ডাক পড়িলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা। শেষ ছাত্রের ভাইভার যেমন সারাদিন টেনসনের জন্য মাথা খারাপ থাকে, আবার শেষ ছাত্র হইলে একটু লাভও আছে। টিচাররা তখন বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির থাকেন, মোটামুটি প্রশ্ন করিয়াই ছাড়িয়া দেন। বাড়ী যাওয়ার তাড়া। আমার বেলায়ও তাহাই হইলো।

চল্লিশোর্ধ্ব বিজ্ঞ পাচ ছয়জন ব্যক্তিবর্গ মাত্র বারো বছরের বালকের মেধা যাচাই করিবার লক্ষে চারিদিকে এমন করিয়া বসিয়া আছেন যেনো গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ হইতেছে। একজন আমাকে প্রশ্ন করিলেন, তুমি কেনো ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাও? আমি বললাম, আমি পাশ করিয়াছি বলিয়া ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাই স্যার। সবাই আমার এই উত্তরে কেমন জানি যেনো হচকচিয়া গেলেন। একি কথা !! আরেকজন বলিলেন, তুমি কি আর্মি হইতে চাও? আমি বললাম, স্যার আর্মি কি? এবার আরো অবাক স্যারেরা। কি জানি কি বলাবলি শুরু করিলো ওনারা। আমি ভয় পাইয়া গেলাম। এইবার একজন আইনস্টাইনের মতো বুড়োলোক আমাকে একটা সাদা পাতা হাতে দিয়া একটা অংক করিতে বলিলেন। সময় দিলেন দুই মিনিট। আমি কয়েকবার অংকটা করে দেখিলাম। এক্স এর মান নির্ণয় করিতে হইবে। ইহা আমার জন্য পান্তা ভাতের মতো। কিন্তু বারবার অংক তা করিবার পরও দেখিলাম, ব্যাপারটা মিলিতেছে না। আমি খুব ভয়ে ভয়ে বলিলাম, স্যার অংকটা মিলছে না, এক্স এর মান কি ভুল আছে?

এইবার তাহারা আর অবাক হইলেন না। একেবারে আমার পিঠে একজন চাপড় মারিয়া বলিলেন, হ্যারে বাবা, এইটাই তো উত্তর!! যাও, তোমার পরীক্ষা শেষ। আমি তো অবাক। অংক স্যারের ভুল দিয়াছেন, আমি নাকি সঠিক উত্তর দিয়াছি। ক্যাডেট কলেজের স্যারেরা সব মনে হয় পাগল। মেধাবী ছেলেদের পড়াইতে পড়াইতে স্যারেরাও আধা মেধাবী থেকে পুরুটাই পাগল হইয়া যাইতেছেন। শুনেছি, বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরা নাকি পাগল হয়।

ভাইয়াকে সব আদোপান্ত বলিলাম। ভাইয়া আমার কথাগুলি দাড়ি কমা সহকারের গলদ করন করিতেছিলেন। যেনো আমি কোনো ভুতুরে গল্প বলিতেছি। সব শুনিবার পর ভাইয়া একটু কেমন জানি করিলেন। বাতাশ ভর্তি বেলুন হতাত করিয়া মুখ খুলিলে যেমন নিমিসের মধ্যেই তাহা আর পেট ফোলা মাছের মতো মনে হয় না, তেমনি আমার ভাইয়ার চোখ মুখ দেখিয়া আমার বড় ভয় হইতে লাগিলো। অনেক্ষন পর এক্তা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়া বলিলেন, বোকার মতো কেনো বলিতে গিয়াছিস যে, আর্মি কি তা জানিস না বা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেছি বলে ক্যাডেট কলেজে পড়তে চাই। বুদ্ধি করে অন্য কিছু বলতে পারলি না? বুঝলাম, আমি আসলে বোকাই।

যাই হোক, ভাইভা বোর্ডের সদস্যগন হয়ত আমাকে বোকা মনে করেন নাই, তাহারা হয়ত আমাকে বোকা না ভাবিয়া সহজ সরল ভাবিয়াছিলেন, তাই ফেল করাইয়া দেন নাই। আমি পাশ করিয়াছিলাম। সেই ৪১ বছর আগে সমস্ত পরীক্ষায় পাশ করার কারনে আজ ১৯ শে জুন এই দিনে কিছু অজানা মেধাবী ছেলেদের সাথে পড়াশুনা করিতে যাইতেছি আমি ক্যাডেট কলেজে। ঢাকা থেকে বহুদুর। সেই টাঙ্গাইল। ঢাকাই আমার কাছে সাত সমুদ্র তের নদীর পথ মনে হইতো আমার গ্রাম থেকে, আর আজ যাচ্ছি চৌদ্দ সমুদ্র ছাব্বিস নদীর দুরুত্তে।

সকাল সকাল ভাইয়া আমাকে কালো প্যান্ট আর সাদা ফুল শার্ট পড়াইয়া কোরবানীর গরুকে যেমন আদর করিয়া বাজারে দামী খদ্দেরের কাছে হাতছাড়া করিয়া দেন, ভাইয়াও আমাকে তেমনি সুদুর প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়া মির্জাপুরের কোনো এক বনবাসে ক্যাডেট কলেজ নামক বহুল আলোচিত এবং সপ্নের জগতে রাখিয়া আসিলেন। হাসের বাচ্চাদের মতো আমরা ৫৪ জন সমবয়সী কিশোর পিতামাতাহীন হইয়া মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে থাকিয়া গেলাম। প্রথম দিন একটা জেল খানা বলিয়া মনে হইল। আরো মনে হইলো যে, এতো কষ্ট করিয়া শেষ পর্যন্ত জেলে আসার জন্য ব্যতিব্যস্ত হইয়া ছিলাম?

মন খারাপ হইতেছিলো। এমন সময় পিছন হইতে কে জানি খুব আলতো করিয়া আমার ঘাড়ে হাত রাখিলো। তাকাইয়া দেখিলাম, ওই মোটা স্যার। খুব আপনজন মনে হইলো। আমার চোখ ছল ছল করিয়া উঠিলো। স্যার আমার চোখে চোখ রাখিয়া বলিলেন, মন খারাপ হইতেছে? আমরা আছি তো।

আজ এতো বছর পর মনে হইতেছে, হ্যা স্যার, আপ্নারা তো ছিলেন। আমার সেই প্রিয় ক্যাডেট কলেজ, বড় সুন্দর একটি স্থান আমার অন্তরে। আর সেই সব স্যার যাদেরকে আমি মিস করি নিঃশ্বাসের প্রতিটি ক্ষনে কারন তারা আমাদের শুধু স্যার ছিলেন না, ছিলেন কখনো ভাই, কখনো গুরুজন, কখনো পিতামাত আবার কখনো একেবারেই বন্ধু। আজো স্যার দের কে আমার পায়ে স্পর্শ করিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে ইচ্ছা করে, স্যার আমি আপনাদেরকে অনেক অনেক ভালোবাসি। আপ্নারা যে যেখানেই থাকুন, আমরা আপনাদের দোয়ায় বাচিয়া থাকিতে চাই।

বেচে থাকুক আমার ক্যাডেট কলেজ। বেচে থাকুক আমার পরবর্তী ভাইয়ের মতো বংশধর ছাত্রগন। আর বাচিয়া থাকুক আমার সেই প্রনাম ধন্য গুরুজনেরা।    

১৭/০৬/২০১৮-ব্রাক এর সিডিএম

(সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট) এ একদিন

আজ গিয়েছিলাম ব্রাক এর সিডিএম (সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট) এ। আমার জানা ছিলো না যে, এতো কাছে এতো সুন্দর একটা জায়গা। চারিদিকে সবুজ বনায়ন, এক পাশে মস্ত বড় একটা পুকুর। পুরু ক্যাম্পাসটা ওয়াল দিয়ে ঘেরা একটা সুরক্ষিত চত্তর। নামাজের জায়গা, থাকার জায়গা, খাওয়ার জায়গা, শরীরচর্চা, সবকিছুই একটা পরিকল্পনায় করা। কোনো কোলাহল নাই, পরিবার নিয়ে বেড়ানো যায় এমন জায়গায়ই এটা। খুবই ভালো লেগেছে। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ১৫ তম ব্যাচের কয়েকজন (আওলাদ ভাই, মুস্তাক আহমেদ রিজভী ভাই, আফরোজা আপা, রোজ, হাসান ভাই, নেসার) ভাইদের সাথে বড্ড একটা ভালো সময় কাটালাম।

আমি জাহাঙ্গীরনগরের কেউ না, কিন্তু আমার স্ত্রীর সুবাদে মূটামুটি তার সব বন্ধুদের সাথেই আমার একটা আলাদা বন্ধুত্ত তৈরী হয়ে গিয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা অনেক বছর পর কোনো অনুষ্ঠানে আসে আর আমাকে হতাত তাদের কোন অনুষ্ঠানে দেখে, প্রায়ই বলে শুনি, দোস্ত তোমার চেহারা আমার মনে নাই কেন? কি জানি তোমার নাম ছিলো ইউনিভার্সিটির লাইফে? আমি মুচকি মুচকি হেসে বলি, আমি তো ফিজিক্সে ছিলাম। আর অন্য বাকীরা যারা আমাকে চিনে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে। মন্দ লাগে না।

যাই হোক, আজকে খুব বেশী বন্ধু বান্ধব এই অনুষ্ঠানটায় আসে নাই। গোটা পাচ ছয় জনার একটা দল। সবার সাথে আমি খুব ফ্রি ভাবেই মেশার চেস্টা করি। চেস্টা করি যাতে কেউ না ভাবে যে, প্রথমত আমি একজন সামরীক বাহিনীর অফিসার, এবং দ্বিতীয়ত আমি একজন ব্যবসায়ী। আর ভালো মানুষদের সাথে ভালো থাকাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। জাহাঙ্গীরনগর এর অনেকেই ব্যবসায়ী, কেউ কেউ ব্যাংকার, কেউ কেউ আবার প্রোফেসর। সব সেক্টরেই আছে। এটা একটা ভালো মিশ্রনের গ্রুপ। প্রায়শ ই যেহেতু আমি এই সব বন্ধুদের সাথে বেড়াতে আসি বা তাদের নিজস্ব অনুষ্ঠান গুলিতে আমি পারটিসিপেট করি, ফলে ব্যক্তিগত অনেক ভিউজ এবং মতামত আদান প্রদান করা হয়। সে রকমই আজো তার ব্যতিক্রম হয় নাই।

আজকের দলটির মধ্যে বেশীরভাগ সময়ে কথাবার্তা হলো হাসান ভাইয়ের সাথে। হাসান ভাই ইঞ্জেক্সন মোল্ডিং এর ব্যবসা করেন। প্লাস্টিক লাইনে। তারও দুটি মেয়ে। একটির বিয়ে হয়েছে প্রায় এক বছর হলো। হাসান ভাইয়ের সাথে একান্ত সময়ে অনেক কথাবার্তা হলো। বেশ ভালো লেগেছিলো তার সাথে অনেক বিসয়ে কথা বলে। আমি যে জিনিসটা নিজে সাফার করে বুঝেছি বা কেউ বুঝে, হাসান ভাই সেটা আগে থেকেই সাফার না করে বুঝেছেন। খুব ইন্টারেস্টিং। কথা হল মেয়েদের নিয়ে, সংসার নিয়ে, ব্যবসা নিয়ে, বুড়ো বয়সের অভিজ্ঞতা নিয়ে, আত্মীয়তার প্রসঙ্গ নিয়ে। অনেক বাস্তবসম্মত চিন্তা ভাবনা হাসান ভাইয়ের। তার সাথে আমার অনেক কিছুই মিলে যাচ্ছিলো এবং আমার মনে হয়েছে তার কথাগুলির মধ্যে কোনো রকমের ভনিতার আশ্রয় নাই। আমাদের আলাপের কিছু চুম্বক অংশ আজ আমার ডায়েরীর পাতায় লিখে রাখার চেস্টা করছি।

তার বক্তব্যটা আমি তুলে ধরিঃ

মেয়ের জামাই (Son in Law) বা তাদের শশুড় বাড়ির প্রসংগে হাসান ভাইয়ের বক্তব্যঃ

…শুনেন আখতার ভাই, মেয়ের জামাই যাকে সান ইন ল (Son in Law) বলা হয়, সে কখনোই সান (Son) হতে পারে না। সে সান (Son) বাই (By) ল (Law)। আমার মা বলতেন, এক গাছের বাকল আরেক গাছে কখনোই লাগে না। এটা যেমন চিরন্তন সত্য, তেমনি সান এবং সান ইন ল কখনোই এক হতে পারে না, এটাও চিরন্তন সত্য। আমি আমার মেয়েদেরকে প্রায়ই বলে থাকি যে, শোন মা, আর যাই হোক, অন্তত আমি আমার কোনো ব্যবসায় আমার কোনো মেয়ের জামাইকে অংশীদার করবো না। না তার কাছে ব্যবসার কোনো কর্তৃত্ব ছেড়ে দেবো। আমার যদি ১০০টি বাড়িও থাকে তারপরও আমি আমার কোনো কিছুই আমি আমার সান ইন ল (Son in Law) কে দিবো না বা দিতে চাই না। আমার নামেই সব থাকবে, বা আমার অবর্তমানে আমার মেয়েদের নামে সব থাকবে। যদি আমার মেয়েরা সব নস্টও করে ফেলে, তারপরেও আমার একটা সান্তনা থাকবে যে, আমার মেয়েরাই নস্ট করেছে। যদি আমার আবার সামর্থ্য থাকে, আমি তাদের জন্য আবার গড়ে দিবো। কিন্তু আমার সান ইন ল (Son in Law) এরা কখনোই আমার তিলে তিলে গড়ে উঠা সম্পদের মাহাত্য বুঝবে না। কেনো বুঝবে না সেটার ব্যাখ্যাও তিনি দিতে ভুলে গেলেন না। আমি যে পরিশ্রম করে, আমার সমস্ত মেধা আর ইমেজ দিয়ে আমার ছোট ব্যবসা আজ একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছি, সেখানে হটাত করে বিনা পরিশ্রমে অন্য বাড়ির একজন অপরিপক্ক মানুষ না বুঝবে এর দরদ না বুঝবে এর বেড়ে ঊঠার ইতিহাস। ফলে চুন থেকে পান খসলেও ব্যবসার প্রয়োজনীয় কিছু কিছু ব্যক্তি বা এলিমেন্টকে তার নিজের ইগোর কারনে নিমিসের মধ্যেই বহিস্কার করতেও বুক কাপবে না। কাকে দরকার, কাকে দরকার নাই, কোন কাজ টি করলে ব্যবসার বা প্রতিষ্ঠানের মংগল হবে সে ধার বা বিচার তার কাছে থাকে না। ফলে পরের ধনে পোদ্দারীর মতো বা স্ত্রী কপালে ধন পাওয়ার কারনে এইসব সম্পত্তির উপর তার শুধু আরামের স্থানটি রচিত হয়, তাকে ধরে রাখার প্রবনতা খুব কম ছেলের থাকে। এক সময় যদি বেশী চালাক হয়, স্বার্থের কারনে নিজের নামে সব পাকাপোক্ত করার বাহানা খুজে। এতে সবচেয়ে যারা বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা হচ্ছে যার নিজের ব্যবসা তার এবং তার পরিবারের। ইতিহাস সেটাই বারবার প্রমান করেছে। ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। কিন্তু সেটাও খুব চোখে পড়ার মতো নয়।  

আমিঃ আপনার অবর্তমানে তো মেয়েরাই তথা মেয়ের জামাইরাই মালিক। তাহলে ওদের দিতে অসুবিধা কই?

হাসান ভাইঃ সাথে সাথে তিনি একটা বাস্তব একটা উদাহরন দিলেন। নামটা এখানে গোপনীয়তা রক্ষা করার কারনেই উল্লেখ করছি না। ধরুন তার নাম মিস্টার এক্স। ভদ্রলোক বেশ নামীদামী ব্যবসায়ী। তার দুটি মেয়ে ছিলো। অতি আদর করে মিস্টার এক্স তার বড় মেয়েকে বিয়ে দিলেন এক সুন্দর রূপসী ছেলের সাথে। ছেলে নাই। আর তিনি নিজে দেশের প্রতিষ্ঠিত একজন মস্ত বড় ব্যবসায়ী হবার কারনে সম্পদের কোনো অভাব নাই। অন্য আরেক কথায় বলা চলে যে, তিনি দেশের অর্থনীতি কন্ট্রোল করে যারা তাদের মধ্যে একজন। ছেলে নাই, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে যেনো তিনি একজন ছেলে পেলেন। ভালোবাসায় তাকে এমন সিক্ত করলেন যে, শ্বশুরের অর্ধেক ব্যবসার মালিক হয়ে রীতিমত বড় বড় দৈনিক পত্রিকা গুলিতে নিউজ হয়ে গেলেন। শ্বশুর মহাশয় তার মুল ব্যবসার অর্ধেক মালিকানা হস্তান্তর করে নিজের সাথে যোগ করে দিলেন। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, চালাক ছেলে। ধীরে ধীরে ছেলেটি শ্বশুরের ব্যবসায় বসে বসে সুযোগটা কাজে লাগাতে শুরু করেন। মেয়ের জামাইও তার মেধা কাজে লাগিয়ে পৃথকভাবে আরো একটা ব্যবসা শুরু করলেন। শশুড়ের তাতে কোনো আপত্তি ছিলো না। তার মেয়ের জামাই আআরো বড় হোক সেটাও তিনি চান। সাথে শ্বশুরের সাথে তো অংশীদারিত্ত আছেই। মাস ঘুরে বছর যায়, দিন পালটাতে থাকে। টুকটাক ছোট খাটো খুনসুটি লাগতে থাকে স্বামী স্ত্রীর মাঝে। সময়ের স্রোতে এই খুন্সুটি আরো জোরালো পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মনমালিন্য থেকে এক সময় মুখ চাওয়া চাওয়ি পর্যন্ত দেখা বন্ধ হয়ে যায়। একটা সময় আসে যখন সম্পর্কটা যেনো আর টিকানোই যাচ্ছিলো না। এতো আদরের মেয়ের জামাইকে যেনো শশুড় আর চিন্তেই পারছেন না। তার ব্যবহার, আচরন, কথা বলার হাবভাব এতোটাই বেপরোয়া যে, তাকে আদর তো দুরের কথা সহ্যই করতে পারছিলেন না তার নিজের মেয়ে এবং শশুড়। এদিকে শুরু হয়েছে আরেক যন্ত্রনা যে, শশুড় তো ইতিমধ্যেই তার মেয়ের জামাইকে তার ব্যবসার অর্ধেক শেয়ার হস্তান্তর করে পাকাপোক্ত করে মালিক বানিয়ে দিয়েছেন, ফলে তার নিজের ব্যবসার মধ্যে সব সিদ্ধান্তে এখন তার মেয়ের জামাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে যেখানে তিনি একা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন না। ধীরে ধীরে তার ব্যবসার অধোপতন শুরু হতে লাগলো। অন্যদিকে মেয়ের জামাইয়ের নিজস্ব যে ব্যবসা তিনি ইতিমধ্যে বিস্তার করে ফেলেছেন, তা ধীরে ধীরে শশুড়ের টাকাতেই দেশের নামীদামি একটা প্রতিষ্ঠানে রুপ নিতে শুরু করেছে। এখন শশুড় মহাশয় না পারছেন জামাইয়ের কাছ থেকে তার দেওয়া শেয়ার ট্রান্সফার করে ফিরিয়ে আনতে না পারছেন জামাইকে বশে আনতে। বছর ঘুরতেই যা হবার তাই হলো। মেয়ের সাথে জামাইয়ের তালাক হয়ে গেলো। অথচ জামাই তখনো তার নিজের ব্যবসার একজন অংশীদার এবং জামাইয়ের নিজের ব্যবসাও রমরমা। না পারছেন জামাইকে নিয়ে একসাথে ব্যবসা করতে, না পারছেন তাকে তার থেকে আলাদা করতে। অতি আদরের জামাই তার চিরশত্রু হয়ে গেলো। এ যেনো নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরে নিজেকে ধংশ করে দেওয়ার মতো অবস্থা।

এই পর্যায়ে হাসান ভাই বললেন, দেখেন, যদি আদরের বশে শশুড় এই ব্যবসার অংশীদার না করতেন, তা হলে আজ শ্বশুরের এই অবস্থা হতো না। হ্যা, জামাইকে জামাইয়ের জায়গায় ভালোবাসেন, তাকে তার নিজের যোগ্যতা দিয়ে বড় হতে দিন। সাহায্য করবেন কিন্তু এই রকম নয় যে, শেষতক নিজের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানিতে পড়েন। জামাই আরেকটা বিয়ে করেছে, অথচ এখনো সে প্রাক্তন শশুড়ের সব ব্যবসায় সমান অংশীদার অথচ জামাইয়ের কোনো কিছুই এখানে ছিলো না। হাসান ভাই আরো বললেন, হ্যা এটা যদি নিজের ছেলে এমনটা করতো, তাহলে কোনো দুঃখ ছিলো না। নিজের ছেলেই তো। আর বাবার অনুপস্থিতিতে নিজের ছেলেই তো এইসব সম্পত্তির মালিক হতো। দুক্ষটা অনেক কম হতো।

হাসান ভাই বলতে থাক্লেন, এই ঘটনা থেকে তিনি শিখেছেন যে, পরের ছেলে কখনো নিজের ছেলে হয় না। আর শশুড় যতো ভালো মানুসই হোন না কেনো, জামাই তাকে নিজের বাবা মনে করে না। যদি কেউ এই সত্য অস্বীকার করে প্রকৃতির নিয়মের বাইরে যায়, তাদের পরিনতি এই রকমই হয়। হ্যা, এটা ঠিক, যে, কোন বাবা চায় না যে তার মেয়ে সুখি হোক? কোন পিতামাতা চায় না তার সন্তানের জন্য এই পৃথিবীকে আরামদায়ক হোক? আর এই কারনে জামাইদেরকে অতোটুকু দিতে হয় যতোটুকু সে প্রাপ্য। এর মানে এই নয় যে, শশুড় তাকে ভালোবাসবে না। জামাই জামাইয়ের জায়গায়, ব্যবসা ব্যবসার জায়গায়, মেয়ে মেয়ের জায়গায়। সব কিছুতে তার নিজের জায়গায় রাখতে হয়। লিমিট অতিক্রম করলেই প্রচন্ড রকমের একটা ভারসাম্যতা হারিয়ে যাবার ভয় থাকে। আর ভারসাম্যহীন যে কোনো জিনিসই খারাপের দিকে যায়।

আমিঃ (আমি হাসান ভাইয়ের কথাগুলি শুনছিলাম। তারপর আমি বললাম), হাসান ভাই, আমার জীবনেও আমি এমন একজন মেয়ের জামাইকে দেখেছি যিনি তার শশুড়কে নিজের বাবার চেয়েও বেশি মহব্বত করেন। শ্বশুরের অনেক     সব এমন করে ধরে রেখেছে যেনো সব কিছু তার সম্পদ, আবার কোনো কিছুই তার নয়। ঢাকা শহরেই তার বাড়ি আছে এই রকম ৭/৮ টা, ব্যবসা আছে, উত্তরায় অনেক জমি আছে যার দাম কয়েক কোটি টাকা। তার একটা মাত্র মেয়ে। ছেলে ছিলো দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ছেলের দুইটা বাচ্চা আছে। মেয়ের জামাই পুরু পরিবারটাকে এক করে ধরে রেখেছে। আমি নিজে দেখেছি যে, এই জামাই তার শহুড়কে গোসল করিয়ে দেয়, খাইয়ে দেয়, সারাক্ষন সংগি দেয়। পেপারটা পড়ে পড়ে শুনায়। জামাইয়ের নিজস্ব ব্যবসা ছিলো, স সব কিছু ছেড়ে এই বুড়া বয়সে শশুড়কে দেখভাল করে। তাহলে এইগুলা কি মেকী?

হাসান ভাইঃ (হাসান ভাই এবার আরো বললেন), না আখতার ভাই, এইগুলা মেকী নয়। তবে এই ধরনের মানসিকতার জামাই লাখেও একটা পাবেন না। আর যেটা স্বাভাবিক নয়, সেটা উদাহরন হতে পারে না। হাসান ভাই বলতে থাকলেন,

…আখতার ভাই, আমি বা আপনি মেয়ের বাবা বলে এমন তো নয় যে, ছেলে বা জামাই বা শশুড় বাড়ির লোক এমন কোন পুন্য করে ফেলেছে যে, আমরা ছোট আর তারা আমাদের পুজনীয়। হ্যা, পুজনিয় হবে তাদের ব্যবহারের কারনে, মানসিকতার কারনে, এই কারনে নয় যে, ছেলের বাবা বা জামাই হবার কারনে। ঈদ পরবনে আমি মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে প্রথমেই গরুর রান টা পাঠাতে চাই না। অডেল গিফট আর পন্য নিয়ে তাদের খুশী করতে চাই না। আমি চাই এতা দুই পক্ষ থেকেই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী হোক। আর এই করার মধ্যে সবচেয়ে বেশী থাকতে হবে মানসিকতা আর রিস্পেক্ট। একটু এদিক সেদিক হলেই সতর্ক হওয়া খুব জরুরী। যদি সম্পরকটা লম্বা সময়ের জন্য টেনে নিতে হয়, সেখানে ধীরে ধীরে এগুনোই মংগল। আবেগের কোনো স্থান দেওয়া উচিত নয়। বেশী আবগে সম্পর্ক নষ্ট করার চেয়ে বাস্তব্বাদী হয়ে সুখে থাকা মংগলজনক। নিজের করপোরেট অফিসে মেয়ের জমাইকে ঘরে তোলার আগে সে করপোরেট কালচার শিখেছে কিনা তা যাচাই করা অনেক বেশী জরুরী। একটা করপোরেট কালচার এক্তা প্রতিষ্ঠানের স্তম্ভ। আর এই স্তম্ভকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য একটা মানুষই যথেষ্ট। যদি বেশী আবেগী হয়ে থাকেন, তাহলে সেই এক ই ব্যক্তিকে অন্য আরেক টি করপোরেট কালচারে অধিষ্ঠিত কনো অফিস থেকে তাকে শিখিয়ে নিন। কিন্তু কখনোই নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নয়। একবার ছাপ লেগে গেলে তার থেকে বের হয়ে আসা যায় না। বের হতে গেলেই পরিবারে, নিজের জিবনে এবং নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এমন ভাবে আচড় কাটবে যেখানে জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গনের রেখা দেখতে পাবেন। সৃষ্টি কর্তা যখন আপনাকে নিজের ছেলে দেন নাই, তাহলে নিজের ছেলে পাবার জন্য অন্য আরেকজনের কাছ থেকে ধারে নেওয়া ছেলেকে নিজের ছেলে বানিয়ে নিয়ে বিরম্বনায় পড়তে চান কেনো?  

আমিঃ (ভাবিয়ে তোলেছে আমাকে। আমি খেয়াল করে দেখেছি, হাসান ভাই অনেক বাস্তব মানুষের মধ্যে একজন। আপাতদৃষ্টিতে হাসান ভাইয়ের কথাগুলি অত্যান্ত নিষ্ঠুর মনে হতে পারে কিন্তু এটাই বাস্তবতা।) তারপরেও আবার প্রশ্ন করলাম, আপনি ও তো কারো না কারো সান ইন ল, তাহলে সেক্ষেত্রে যদি আপ্নার শশুরের ও ঠিক আপনার মতো এই আইডিয়া থাকে বা এক ই পলিসি অনুসরন করেন, তাহলে জামাই হিসাবে আপনার কাছে খারাপ লাগবে না?

হাসান ভাইঃ না আখতার ভাই, আমার খারাপ লাগবে না কারন, আমিও যেহেতু সেই এক ই পলিসি সেই ছোট বেলা থেকে অনুসরন করছি, ফলে আমার খারাপ লাগার কোনো কারন আমি দেখি না। আমি আজ পর্যন্ত কখনো শশুর বাড়ির থেকে আমাকে কি দিলো বা কি দিলো না, বা কি দেওয়া উচিত ছিলো আর কি দেওয়া উচিত ছিলো না, অথবা কোনো পরবনে আমাকে তারা কি দিয়ে খুশী করলো বা করলো না, এই চিন্তাটা কখনো আসে নাই। আমি তাদের কোনো যৌতুক বা উপঢৌকন দিতে চাইলেও নিতে চাই নাই বা নেইও নাই। কারন আমি মনে করি, আমার সংসার আমি আর আমার স্ত্রী মিলে সাজাবো। এর প্রতিটি জিনিস হবে আমার এবং আমাদের। এতে আমার এক্তা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আছে। কেনো আমি ছট লোকের মতো আরেকজনে দেওয়া গাড়ী, বা ফ্রিজ, বা টিভি, বা অন্যান্য সামগ্রি নেবো? যদি নিজেই এইসব নিজে করতে না পারি, তাহলে আমার অইসব জিনিস উপভোগ করার মানসিকতা ত্যাগ করা উচিত। পরের ধনে বাহাদুরী যারা করে তারা আর যাই হোক পুরুস নয়। আমি পুরুসের মতো আচরনে বিশ্বাস করি।

আমিঃ তাহলে যদি কোনো শশুড় আদর করে তার নিজের মেয়ের জন্য এইসব জিনিস দিতে চায় যেনো তার নিজের মেয়ে একটু ভোগ করুক, তাহলে?

হাসান ভাইঃ আখতার ভাই, আমি যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি, সে যদি আমাকে ভালোবাসে, তাহলে সে আমাকে ছোট করা উচিত নয়। সে যদি মনে করে আমার পছন্দের চেয়ে তার বাবার বাড়ির জিনিস আমার সংসারে এনে উপভোগ করে সে সুখী থাকবে, তাহলে তো সে আমাকে আমার মতো করে সংসার সাজানোর সুযোগ দিলো না। সংসারে এক্তা না গাড়ি থাকা, এক্তা এসি না থাকা, বা ৪০/৭০ ইঞ্চি এল ই ডি টিভি না থাকার নাম অসুখী পরিবার নয়। অসুখী পরিবার হচ্ছে সেটা যেখানে নিজেদের পারস্পরিক সৌহার্দ না থাকে, পারস্পরিক রিস্পেক্ট না থাকে, এবং যেখানে  শসুর বাড়ি থেকে কিছু পেলাম না কেনো অথবা নিজের স্ত্রীর আয় কেনো আমার হাত দিয়ে দেয় না এই সব মানসিকতার স্বামী বা তার পরিবারের মধ্যে যদি থাকে তাহলে বুঝবেন আপনি ভুল নৌকায় উঠে পড়েছেন।  আর যদি আপনি নিজে কিছু দিতে চান, সেতাও হতে হবে তারা নিতে চায় কিনা তার সম্মতির উপর। আপনার আছে বলেই তারা কেনো নিবে? এটাই তো ব্যক্তিত্ব!! আমি অন্তত তাই মনে করি। আপনার মেয়েকেও এই একই প্রকার মানসিকতা থাকতে হবে যে, আমি আমার বাপের কোনো জিনিস নিয়ে কেনো শশুর বাড়ীর লোক গুলিকে ছোট করবো?

আমিঃ তাহলে আমি কখন আমার মেয়েদের সুখের জন্য আমার সম্পত্তির কিছু উপহার সুবিধা দিবো? যদি আমার কোনো সম্পত্তি বা আমার আছে সেসবের কোনো কিছুই আমার মেয়েদের কাজে না লাগেবা আমার আছে এমন জিনিসে ওদের উপভোগ ই না করে, সেক্ষেত্রে আমার এতো কিছু করে লাভ কি?

হাসান ভাইঃ আখতার ভাই, আপনি মনে হয় আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি কিন্তু মেয়েদেরকে বা মেয়েদের জামাইক দিতে না করি নাই। একটা জিনিস তো আপনি মানবেন যে, দাম্পত্য জীবন আসলে শুরু হয় বিয়ের পাচ ছয় বছর পর থেকে। যখন স্ত্রী পুরানো হয়ে যায়, তার দেহের প্রতি আর বিশেষ কোনো আকর্ষণ থাকে না। তখন ছোট খাটো জিনিস থেকেই কিন্তু বড় বড় মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। যখন এই সময়টা অবতীর্ণ হয়, তখন আপনি বুঝবেন আসম মানসিকতা গুলি কি। তখ টেস্ট হয় একচুয়ালি সম্পর্কটা কিভাবে এগোচ্ছিলো। আপনার সম্পদের উপর যদি এই সম্পরক গড়ে উঠে, তাহলে পাচ ছয় বছর ও যাবে না সম্পর্ক টা নস্ট হতে। এর আগেই আপনি টের পেয়ে যাবেন। ওয়েট করেন, দেখেন, বুঝেন, তারপর সব দিন। যেদিন দেখবেন, আপনার শরীর খারাপ হয়েছে, তারা দৌড়ে আপনার হাত ধরেছেন, যেদিন দেখবেন, আপনার বাড়ির মেহমান মানে তারা মনে করবে এটা তাদের বাড়ির মেহমান, যেদিন দেখবেন, আপনার দাওয়াতের অপেক্ষা না করে তারা আপনার বাড়িতে ডাল ভাত দিয়ে ভালো একটা সময় কাটাচ্ছে, যেদিন দেখবেন তারা সমস্যায় আছে জেনেও আপনার কাছ থেকে কোনো কিছু নিতে তাদের আত্মসম্মানে বাধছে, যেদিন দেখবেন যে আপনার কোনো ব্যক্তিগত আচরনে কষ্ট পেয়ে তারা তার প্রতিশোধ আপনার মেয়ের উপর নিচ্ছে না বা তাকে এমন কোনো কথা শুনাচ্ছে না যাতে মনে হবে যে, মেয়েটি শুধু আপনারই নয় , তাদের বউ এর আদলে তাদের নিজস্ব সদস্য, সেদিন বুঝবেন, এবার আপনার পালা তাদেরকে বুকে নিয়ে নিজের মানুষ বলে ধরে নেওয়া। ওই পর্যন্ত টেস্ট না করে যাই করবেন, হারবেন। আর একবার হেরেছেন তো আপ্নিই শুধু হারলেন, তারা নয়। আপনার দেওয়া সেই যে উদাহ র ন দিলেন, পরীক্ষা করে দেখেন যে, ওই ভদ্রলোক হয়ত এটাই করেছেন এবং শেষ তক এই টেস্টে তার একমাত্র মেয়ের জামাই এবং জামাইয়ের পরিবার টিক্তে পেরেছে বলেই আজ সেই জামাইয়ের সব নিজের হয়েছে। শশুর মহাশয় নিজেও মনে করেছে তার যোগ্য উত্তরসুরী সে পেয়েছে। আর এটাই ব্যতিক্রম আখতার ভাই।

বৃদ্ধ বয়সের আলোচনাঃ

সারাদিন আমরা একসাথে ছিলাম। খাওয়া দাওয়া করলাম। জীবন নিয়ে আরো অনেক কথাবার্তা হলো। বৃদ্ধ বয়সের কথাও আলাপ হলো।

হাসান ভাই বলতে থাকলেন, চারিদিকে যেভাবে আধুনিককালের সন্তানেরা তাদের বাবা মায়ের প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছ, তাতে এই দেশে একটা সময় আসবে, বয়স্ক মানুষের একমাত্র স্থান হবে বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রমে গেলে ওই বৃদ্ধ মানুসগুলির জীবনের কাহিনী শুনলে গা শিহরিয়া উঠে। তারা অনেকেই দেশের অত্যান্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন। কেউ সচীব, কেউ বড় বড় ব্যবসায়ী, কেউ বা আবার প্রোফেসর ইত্যাদি। তারা তাদের সন্তানদের মানুস করার জন্য আজীবন পরিশ্রম করেছেন, সম্পদ গড়েছেন, ভাগ করে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন, এখন আর সন্তানেরা তাদের জন্য কিছুই করেন না। ফলে শেষ আশ্রয়স্থল ওই যে বৃদ্ধাশ্রম।

হাসান ভাই এই বৃদ্ধ বয়সের পরিনতির রুখে দাড়ানোর একটা বেশ চমকপ্রদ কৌশল বললেন যেটা তিনি করছেন এবং করবেন। আর সে মোতাবেক তিনি তার কাজ অব্যাহত রাখছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কি সেই কৌশল?

হাসান ভাই বলতে লাগলেন,

-শোনেন আখতার ভাই, বৃদ্ধ বয়সে আপনার আসলে কি দরকার? আপনার দরকার কেউ আপনার খাবারটা সময়মত রান্না করে আপনার সামনে দিক, মেডিসিনগুলি সময়মত আপনাকে খাইয়ে দিক, বাইরে যেতে হলে একটা গাড়ি আর একজন ড্রাইভার থাকুক, রাতে শোবার সময় আপনার মশারীটা টাংগিয়ে দিক। ময়লা কাপড় চোপড়গুলি সময়মত ওয়াস করে দিক। আর এই কাজগুলি করার জন্য আপনার মাত্র গোটা তিনেক লোক হলেই হয়। একজন রান্নাকারী, একজন ড্রাইভার, একজন কাজের ছেলে যে আপনাকে সংগ দেবে সারাক্ষন। আর গোটা এই কয়জন মানুস রাখতে আপনার সর্বসাকুল্যে মাত্র হাজার বিসেক টাকা হলেই হয়। নিজের যদি একটা বাড়ি থাকে বা ফ্ল্যাট, তাহলে অনেক উত্তম। থাকার জন্য আর টেনশন করতে হয় না। এই রকম একটা আয়ের পথ খোলা রেখে অথবা তার থেকে বেশি কিছু সঞ্চয় রেখে অতঃপর সন্তানদের সম্পত্তি ভাগ করা যেতে পারে। তবে, হাসান ভাইয়ের পরিকল্পনা হচ্ছে, তিনি কোনো অবস্থাতেই তার সম্পদ তার জীবদ্দশায় তাদের সন্তানদের ভাগ করে তিনি নিঃস্ব হবেন না। তাতে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনার শামিল হবে। নিজে আয় করেছেন, নিজে ভোগ করবেন। নিজে ভোগ করার পর যদি অবশিষ্ট থাকে সেটা তার সন্তানরা তার অনুপস্থিতিতে এমনিতেই ভাগ করে নেবে। সন্তানদের উপর তিনি নির্ভরশীল হতে চান না। তার থেকে উত্তম কিছু কাজের মানুষের উপর নির্ভরশীল হওয়া। দিন কাল যা পড়েছে তাতে নিজের সন্তানদের উপর আর ভরসা করা যায় না। এই বুড়ো বয়সে এসে আপনার জীবনে সবচেয়ে ভালো বন্ধু যিনি তিনি হচ্ছেন আপনার স্ত্রী। ওই বুড়ো বয়সেও সে আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে। কারন সেও আপনার মতোই একা। আপনাকে ছাড়া তার যেমন কেউ তার পাশে নাই। সে ছাড়াও আপনার জীবনে আপনার আর কেউ নাই।

হাসান ভাইয়ের কৌশলটা আমার ভালো লেগেছে। হাসান ভাইয়ের এই কৌশলটা হয়তো অনেক মধ্যবয়সী মানুষকে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বাচিয়ে দেবে।

আমার কাছেও তাই মনে হয়েছে যে, (১) নিজের উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তানও পরের বাড়ির ছেলে যে মেয়ের জামাই হয়ে নিজের বাড়িতে আসে তার থেকে উত্তম। (২) নিজের কোনো সম্পত্তি নিজের জীবদ্দশায় ভাগ বাটোয়ারা না করাই উত্তম। (৩) আর যদি করাও হয় তাহলে এমন কিছু অংশ নিজের হাতে রাখা উচিত যা নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে। (৪) আর বৃদ্ধবয়সে একজনই সবচেয়ে কাছের বন্ধু হোক সে নিজের মতো বয়স্ক, আর সেটা হচ্ছে নিজের স্ত্রী। সেও নিজের মতোই অসহায়।

ধর্ম নিয়ে আলোচনাঃ

যেহেতু মুসলমান, ফলে আল্লাহকে বিশ্বাস করি, আর আখেরাতকেও বিশ্বাস করি। হাসান ভাই বলতে থাকলেন, আমাদের মরনের পরে আমাদের পরবর্তী জেনারেসন কিভাবে আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইবে, আদৌ চাইবে কিনা সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। আমাদের মরনের পর তারা আমাদের মনে না রাখলেও কোথায় কোথায় আমাদের সম্পত্তি আছে সেতা খুজে খুজে বের করবে। সেই সম্পদ দিয়ে হয়ত কেউ আমাদের নামে এক্তা মিলাদ ও পরাবেন কিনা তার কোনো গ্যারান্টি নাই। এই অবস্থায় সারাটি জীবন কস্ট করে সম্পদ উপার্জন করলাম, অথচ আমার নিজের জন্য আমি কিছুই নিতে পারলাম না, এটা বড় অন্যায়। তাই আমি ভাবছি-

এক্তা বৃদ্ধাশ্রম করবো যেখানে অসহায় কিছু বৃদ্ধ মানুষ বাস করবে কিন্তু তাদের খাওয়া দাওয়ার কোন কমতি থাকবে না। আরাম আয়েশের ব্যবস্থা থাকবে। নামাজ রোজা করবে, আল্লাহর কাছে তাদের প্রার্থনা করবে। আর পাশাপাশি যদি ছোট ছোট কিছু এতিম ছেলেমেয়ে থাকে যাদেরকে কোর আন হিফজু করানো হবে, হুজুর থাকবে, একটা মসজিদ থাকবে, তাতে বুড়ো মানুসগুলি ছোট ছোট বাচ্চা পাবে, আর ছোট ছোট বাচ্চাগুলি পাবে বয়স্ক মানুসগুলিকে। একটা পরিবার বনে যাবে। যেহেতু মসজিদ থাকবে, হিফজু করার সুযোগ থাকবে, ফলে ফোর ইন ওয়ান নামে একটা ভালো কাজের প্রতিস্টহান গড়ে উঠবে। এইখান থেকে যদি কোনো সওয়াব আল্লাহ দেন, তাহলে তার কিছু অংশ হলেও আমার মরনের পরে আমার কবরে যাবে। আমার সন্তান কিছু না করুক, এরাই হয়তো আমার জন্য দোয়া করবে। আর এই কাজটি করার জন্য খুব বেশি টাকা পয়সারও প্রয়োজন নাই। প্রায় লাখ পঞ্চাশেক টাকা কোনো একটা ব্যংকে ওয়াকফ করলেই ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এই কাজগুলি খুব দরদ দিয়ে আজীবনকাল করবে।

– আখতার ভাই, জীবনের অনেক তা সময় পার হয়ে গেছে। আনন্দ করার জন্য ভেবেছেন, হয়ত সময় আছে। আর এই সময় আছে করে করেই কিন্তু জীবনের প্রায় ৫০ বছর পার করে দিয়েছেন। এবার আর সময় আছে সময় আছে বলে সময় নস্ট করার কোনো অবকাশ নাই। বেরিয়ে যান নিজের বউকে নিয়ে। যেখানে খুশী। বিদেশ যেতে হবে এমন না। কোনো এক্তা গ্রামের পুকুরের পাড়ে বসে এক মুঠি বাদাম খেতে খেতে নীল আকাশ দেখুন, মাছের সাতার দেখুন। দেখবেন, বড্ড মিস্টি এই পৃথিবী। বৃষ্টিতে ভিজে গেলে সর্দি কাশি হয়ে যাবে এই বয়স আসার আগেই বৃষ্টিতে ভিজুন, দেখবেন, শরীর শীতল হয়ে আপনাকে ভালো ঘুম পাড়িয়ে দেবে।

বিকাল হয়ে এসেছে। দুজনেই ক্যাফেটেরিয়ায় নাস্তা করতে গেলাম। চারিদিকে কাচের দেওয়ালে ঘেরা একটি কাফেটেরিয়া। ভিতর থেকে সব দেখা যায়,কিন্তু বাইরের কোনো কিছুই ছোয়া যায় না। আমরা এখন একটা কাচের দেওয়াল দেওয়া ঘরে বসে দূরে নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ দেখছি। আমি ভাবছি, হাসান ভাই কোনো কথাই অযুক্তিক বলেন নাই। জিবনের মানে বুঝতে বুজতে আমরা এক সময় জীবন থেকেই হারিয়ে যাই। তখন জীবন টা কেমন করে গড়তে চেয়েছিলাম সেই অধ্যায়টা আর মনে থাকে না।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাসায় ফিরতে হবে। আমার এক্তা বাসা এখনো আছে যেখানে আমি নিজের মতো করে থাকি।

ধন্যবাদ হাসান ভাই।

১৪/০৫/২০১৮-মা

মাকে নিয়ে অনেক লেখা হয়, মাকে নিয়ে হাজার হাজার কাহিনী এবং ইতিহাস রচিত হয়। পৃথিবীর সারা বুকে বিভিন্ন ভাষায় কতভাবে যে রচিত হয়েছে এই মায়ের উপর কাহিনী বা সত্য ভাষণ, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিটি ফিলিংস বা অনুভুতি একেকটা মোউলিক রচনাই বটে।

পৃথিবীর সব ভাষায় সব বাচ্চারা প্রথম যে শব্দটি শিখে তা হচ্ছে “মা” বা এর প্রতিস্থাপক কোনো শব্দ। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, সব ভাষায় এই “মা” শব্দটি প্রায় কাছাকাছি তার উচ্চারন। কোথাও মা, কোথাও মাম্মি, কোথাও আম্মু, কোথাও মাম এই রকমের। গত পরশু ছিলো “মা” দিবস। এতা একটা রুপক দিন। “মা” দিবসের কোনো দিন হয় না তার পরেও বছরেরেক্টি দিন “মা” এর জন্য উৎসর্গ করা একটি দিন। প্রানীকুলের মধ্যে সব “মা”ই এক রকমের। সেটা কোনো সিং হীর ই হোক, অথবা কোনো হরিনের কিংবা মানুষের। কোনো তফাত দেখা যায় না। কিভাবে ঈশ্বর এই মাতৃত্ব বোধ কে ঈশ্বর প্রতিটি মায়ের বুকে ছাপ মারিয়া একেবারে খাটি মা বানাইয়া দিয়াছেন তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কারো কাছে নাই।

তিনি আমার মা। মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এক ছেলের মা হয়ে বিধবা হন। খুব বড় লোকের মেয়ে নন বটে কিন্তু মাঝারী পরিবারের বনেদি ঘরের মহিলা। যেই সময়ের কথা বলছি, তখন ১৫ বছর অতিক্রম করলেই গ্রামের মধ্যে আই বুড়ি হয়ে আছে মেয়ে এই রকম একটা অপবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে যদি আবার নিয়তির কারনে কেউ এতো অল্প বয়সেই বিধবা হন, তার তো জীবনটাই যেনো কি রকম দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা জানে শুধু যে সাফার করে সে আর জানে সেই পরিবার যেই পরিবারে এটা ঘটছে। 

আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। আমার মায়ের পরিবারের কাউকেই আমার মনে নাই। বরং বলতে পারেন, আমি কাউকেই দেখি নাই। আমার জন্মের আগেই সব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি না দেখেছি আমার দাদি, দাদা, নানা, বা নানি, কিংবা কোনো মামা, মামিকে। কি আজব, না? আসলেই আজব। এমন্তা কি কখনো হয়? কিন্তু হয়েছে। 

আমার মা কে আমি দেখেছি যে, তিনি তার বড় বোন যার নাম সামিদা খাতুন, তাকে তিনি কতটা ভালোবাস্তেন। আর ওই খালাও আমার মাকে তার নিজের মেয়ের মতোই দেখতেন। 

এতো ধৈর্য, এতো বুদ্ধিমতি আর এতো নিরহংকার মানুষ ছিলেন তিনি, যার কোন তুলনা হয় না। আমার মায়ের সারাটি জীবন কেটেছে কস্টের মধ্যে।যখন তিনি একটু সুখের মুখ দেখবেন বলে আশা করেছিলেন, তার আগেই তিনি ২০০২ সালে জান্নাত বাসি হয়েছেন। 

আমার মায়ের জীবনের গল্পটা তাহলে বলিঃ 

আমার বয়স যখন মাত্র দেড় কি দুই তখন আমার বাবা মারা যান। আমি আমার বাবাকে দেখি নাই, এমন কি আমাদের কারো কাছেই আমার বাবার কোনো ছবিও নাই। আমার মা যখন আমার বাবাকে বিয়ে করেন, তখন তার প্রথম পক্ষের ছেলে বিল্লাল হোসেন (ওরফে ডাঃ বেলায়েত হোসেন) কে আমাদেরই গ্রামের পাশের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পালক দিয়ে দেন। আমার মা আমার বাবার এমন একটা সংসারে পদার্পণ করেন যেখানে আমার বাবার আগের পক্ষেরই সন্তান ছিলো গোটা আট জন। তাদের সবার বয়স আমার মায়ের থেকে অধিক। এই সন্তানেরা আমার মাকে কোনদিনই আপন করে ভাবতে পারেন নাই। 

আমার বাবা ছিলেন মাদবর যিনি সারাক্ষনই গ্রামের মাদবরি আর তার জমি জমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। (চলবে) 

০৭/০৫/২০১৮-কনিকার এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্ট

গতকাল আমার ছোট মেয়ের এসএসসি এর পরীক্ষার রেজাল্ট বাহির হইয়াছে। তো গত পরশুরাতে ওর মা খুব টেনশানে ছিলো কি ফলাফল করে মেয়ে সেটা ভাবিয়া ভাবিয়া। কিছু কিছু মানুষের টেনশন তাহার চেহারার মধ্যে একদম ফুটিয়া উঠে। তাহার মুখের অবয়ব দেখিয়া বুঝা যায় যে, শরীরের হরমুন ঠিক মতো কাজ করিতেছে না বলিয়া মুখে একটা ছাপ পড়ে। খাবার দাবারে অনীহা আসে, কথাবার্তায় খিটখিটে মেজাজ ফুটিয়া উঠে। ফোনে অধিক অধিক কথা বলে, কেউ কেউ আবার ফোন থেকেই বিরত থাকে। এইসব আর কি। আমার বউ সুন্দরী বলিয়া তাহার চোখ মুখ দেখিয়া বুঝিবার উপায় নাই সে টায়ার্ড কিনা কিন্তু সে যে টেনশনে আছে ইহা বুঝা যায়।

জিজ্ঞাসা করিলাম, খুব টেনশনে আছো নাকি? উত্তরে যা শুনিবার তাই শুনিলাম, “তোমার আবার টেনশন আছে নাকি? তোমার মতোই তো মেয়েগুলি হয়েছে। না আছে কোনো টেনশন, না আছে কোন আগ্রহ। ঐ যে বাপের মতন সব। এমতাবস্থায় আমার কি আর কিছু বলিবার আছে? এক কথাতেই তো শেষ- বাপের মতো সব অভ্যাস হইয়াছে মেয়েদের।

ঈশ্বর এইদিক দিয়া বউগুলোকে একদম নিস্পাপ করিয়া রাখিয়াছেন, সব বাচ্চাদের দোষ তো বাপের দোষ। আরে বাবা, বাচ্চাগুলিতো তার মায়েদের মতোও হইতে পারিতো, নাহ? যাক, সংসারে সুখ চাই, ঝগড়া চাই না। তারমধ্যে এখন তাহার টেনশনের মাত্রা মনে হইতেছে একটু বেশি। হাতে তসবিহ, মুখে বিড় বিড় করিয়া কোন এক দোয়া হয়তো সে পড়িতেছে। জিজ্ঞেস করিতে ভয় পাই কোন দোয়াটা পড়িতেছে। ব্যাঘাত ঘটিলে ভেজাল আছে। শান্ত থাকাই ভালো। কে খামাখা নীরব পুকুরে খামাখা ঢিল ছুড়িয়া সাপের লেজে আঘাত করে!! পরে দেখা যাইবে, শক্ত পরোটা খাইতে হইবে। এই মুহূর্তে দাত ব্যথা আছে। আমি দাতকে বেশী কস্ট দিতে চাই না। পড়ুক সে যে দোয়া পড়িলে টেনশন কমে সেটাই পড়ুক। কোনো কথা না বলে বললাম, হ্যা মেয়েগুলার আর কাজ পাইলো না। সব বাপের গুনগুলি পাইয়া বাপের সর্বনাশ করলো আর কি।

এই কথা বলিয়াও যে আমি তাহাকে খুব একটা খুশী করিতে পারিলাম সেটাও ওর মুখ দেখিয়া বুঝা গেলো না। মনে হইলো এই বুঝি নীরব আকাশ হটাত করিয়া কোন মেঘবৃষ্টি ছাড়াই গর্জন করিয়া উঠিবে। ভাগ্যিস ঈশ্বর প্রসন্ন হইয়া এই যাত্রায় আমাকে কোনো রকমে বাচাইয়া দিলেন। খুব বেশি ঝড় উঠিলো না। শুধু ঘাড় ঘুরাইয়া এমন একটা ভাব করিয়া গিন্নি অন্যরুমে পরোতা বানানোর জন্য চলিয়া গেলো তাতে বুঝিলাম, আমার শেষ কথাটিকে তিনি ব্যাঙ্গ ভাবিয়া একটু হুম করিয়াই ছাড়িয়া দিলেন। ঈশ্বর বড় রসিক। সাংসারিক জীবনে কিছু কিছু ছোট ছোট তর্ক-বিতর্ক এমন করিয়া লাগাইয়া রাখেন তাতে না ঝড় শুরু হয়, না অশান্তি। একটু ঘূর্ণিপাক খাইয়াই আবার পরিবেশ ঠান্ডা করিয়া দেন। যাই হোক, আমি গর্বিত যে, বাচ্চারা আমার জিদ, আমার সভাব পেয়েছে। আলসেমীটাও পেয়েছে ঠিক আমার মতোই।

তো মেয়েকে জিজ্ঞেস করিলাম, মা, তোমারো কি ফলাফলের জন্য টেনশন হচ্ছে? মেয়ের উত্তর- বাবা, আমার তো কিছুই মনে হচ্ছে না। আর টেনসন করে এখন কি আর কিছু করতে পারবো? বললাম, তাতো ঠিকই কিন্তু পরীক্ষার আগেও তুমি টেনশনে ছিলা না, এমন কি পরীক্ষা চলাকালীন সময়েও তো আমি বুঝি নাই যে, তুমি একজন পরীক্ষার্থী। মেয়ে মুচকি হাসি দিয়া বলিলো, চলো, ক্রাইম পেট্রোল দেখি। ও জানে আমি ক্রাইম পেট্রোল দেখিতে খুব পছন্দ করি। এই হলো আজকের দিনের যেনারেসন। এই সময়ের জেনারেশন কতটা ইন্টেলেকচুয়াল যাহারা তাহাদের হ্যান্ডেল করেনা, তাহাদের কোনো আইডিয়া নাই। তাহাদের কাছে কোনো পরামর্শ চাইলে তাহার আপনাকে দুই যুগ আগের কোনো এক পুরানো পরামর্শ দিয়া আপনাকে এমন এক ফন্দি দিয়া বিপদের মধ্যে ফেলিবে, যে, তখন না  আপনি সমস্যা হইতে বাহির হইতে পারিবেন, না বুঝিতে পারিবেন আরো কোনো বিপদ ঘনাইয়া আসিলো কিনা। তাই যদি পরামর্শ নিতে হয়, আমার কাছ হইতে নিবেন। এই জাতীয় পরামর্শ আমি বিনা পয়সায় দিয়া থাকি। কাজ হইলে জানাইয়া দিবেন, কাজ না হইলে দিতিয়বার আর আসিবেন না।

যাক, ফলাফল দিলো। আমার বউই আমাকে প্রথম খবরটা দিলো যে, মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। ফোনে তার কথার সুরেই বুঝিতে পারিলাম, সে এক প্রশান্তিতে আছে। এই সকালেও যিনি আবহাওয়ার ১০ নম্বর বিপদ সংকেতের মতো রুপ ধারন করিয়াছিলেন, কোনো রুপ তান্ডব ছাড়াই মনে হইলো, হ্যা, আকাশ বড় পরিস্কার। সমস্ত ঝড় আর কালোমেঘ সব কোথায় কোন অঞ্চলে উড়িয়া চলিয়া গিয়াছে বুঝিতেই পারিলাম না। আমার বউ বড় খুশী। বলিলাম, খুব খুশী মনে হইতেছে তোমায়? এবার তার আরো চমকপ্রদ উত্তরে আমি ফোনের এপ্রান্তে বসিয়া হাসি। “তোমার তো কোনো সাধ আহ্লাদই নাই, মেয়ে এতো ভালো ফলাফল করিলো , কই তুমি মেয়েটাকে একটা ধন্যবাদ দিবা, তা না করিয়া ফোনে বকর বকর করিতেছো। আরে বাবা, আমি আবার কখন ফোনে বকর বকর করিলাম? মাত্রতো ফোন শুরু হইল!! বুঝলাম, এবার আর বাপের মতো হইয়াছে মেয়েগুলি এইটা অন্তত শুনিতে হইবে না। তাহার প্রশান্ত হাসিতেই আমার মন ভালো হইয়া গেলো। হাতের পাশে বেনসন সিগারেটের প্যাকেট হইতে একটা আস্ত সিগারেট লইয়া তার মাথায় আগুন ধরাইয়া নাসিকা ভর্তি ধোয়া ছাড়িয়া বউকে বলিলাম, দাও , মেয়েকে দাও। একটু কথা বলি।

মেয়ে মোট নম্বর পেয়েছে ১৩০০ মধ্যে ১১৭৪। কম না কিন্তু? প্রায় গড় নম্বর ৯০.৩১%। এই নম্বরে আমাদের সময় বোর্ডে স্ট্যান্ড করতো ছাত্র-ছাত্রীরা। তখন বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ছাত্রদেরকে পাড়ার লোকজন নিজেরাই মিষ্টি নিয়ে এসে গালে হাত বুলিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে যেতো। যারা পরবর্তী বছরের ছাত্রদের অভিভাবক, তারা হয়তো একটু বলেও যেতো, আমার বাচ্চাটাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেবো, একটু গাইড লাইন দিয়ে দিও কেমন করে ভালো ফলাফল করতে হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আজ আর এইসব নাই। আজকাল অভিভাবকগন খবর নেয়, কোথায় কোচিং করিয়েছেন, কোন স্যার কোচিং এ ভালো। কোচিং হয়ে গেছে এখন একটা লাভজনক ব্যবসা।

চলুন একটা কোচিং এর স্কুল দিয়া দুইটাই লাভ করি। নাম এবং অর্থ। কে বলিলো যে, এই দেশে ব্যবসা নাই? কোচিং এর থেকে ভালো ব্যবসা তাও আবার বিনা পুজিতে, আর একটাও নাই।

১০/০৪/২০১৮-শুধুই ঠকি

কেন জানি মাঝে মাঝে মনে হয় আমি শুধু ঠকি। ঠকাই যেনো আমার কাজ। আমি কেনো মানুষ কে ঠকাতে পারি না? আমি কেনো সবার মতো এতো কঠিন হতে পারি না? যেই কঠিন হতে চাই, তখনই মনে হয়, আহা, থাকনা, কি হবে যদি আমিই কিছু ছাড় দেই? আর এই ছাড় দেওয়াটাতেই মানুষ

০৯/০৪/২০১৮-থানচি ভ্রমন

আবারো চলে এলাম থানচিতে। এবার পরিবার নিয়ে নয়, আমি আর মুর্তজা ভাই। জানজটের শহরের ভ্রমনের সময় যেভাবে জানজটের কারনে সময় নষ্ট হয়, সেটা এবার হয় নাই। বিকেল সাড়ে চারতায় বাংলাদেশ বিমানে সোজা চলে এলাম শাহ আমানত ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। মাত্র ৩০/৩৫ মিনিট লাগলো। সন্ধ্যার আগেই চট্টগ্রাম।

আমাদের সাথে আরেক বন্ধু যোগ হয়েছিলো এয়ারপোরট থেকে। এই তিনজনে মিলে একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে সোজা চলে এলাম বান্দরবান। পথে হোটেল হিল ভিউ ম্যানেজারকে ফোন করে একটা রুম নিয়ে নিলাম। মোটামূটি রাত নটার আগেই হোটেলে ঢোকে গেলাম। তিনজন মিলে খাওয়া দাওয়া করে পায়ে হেটে আশেপাশের জায়গা গুলি দেখলাম। বড্ড সুন্দর রাতে বান্দরবান।

পরদিন আমরা সবাই আরেকটা প্রাইভেট কার নিয়ে সোজা চলে গেলাম নীলগিরিতে। এবার আমার দেখার সাধ ছিলো থানচি আর বড় পাথর এলাকা। নীলগিড়িতে আমরা সবাই মোটামুটি কয়েকঘন্টা সময় কাটালাম। মুর্তজা ভাইয়ের এটাই প্রথম আসা নীলগিড়িতে। ঊনিও খুব পছন্দ করছিলেন জায়গাগুলি। যেহেতু আমাদের গন্তব্য স্থান ছিলো থানচি, তাই বেশীক্ষন দেরী করার অবকাশ ছিলো না। দুপুরের আগেই আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম থানচির উদ্দেশ্যে।

পথে বলিপাড়া ক্যাম্প বা জোন যেটাই বলি না কেন, সেখানে কর্নেল হাবীবের সাথে একসাথে নাস্তা করলাম। শুক্রবার ছিলো বিধায় হাবীবের ব্যাতালিয়ানে জুম্মার নামাজটা পড়লাম। অতপর আবার থানচির উদ্ধেস্য যাত্রা।

থানচি পৌঁছলাম প্রায় বিকালের দিকে। বিজিবি অবকাশ রিসোর্ট। খুব সুন্দর। আমাদের জন্য কর্নেল হাবীব আগে থেকেই তার অধিনে বিজিবি অবকাশে আমাদের জন্য রুম রেখে দিয়েছিলো। অনেকদিন পর মেসে থাকা। বেশী দেরি করলাম না। ওখানকার হেডম্যান, কারবারিকে সাথে নিলাম। আশ্রাফ ভাই সাথে ছিলেন। সবাইকে ঊনি চিনেন এবং সবাইও ঊনাকে চিনে। দারুন মানুষ আশ্রাফ ভাই। চলে গেলাম ডিম পাহাড়ে, মুন পাহাড়ে। ভীসন উচু একটা পাহাড়। গাড়ি উঠতে বুঝা যায় কি পরিমান শক্তির দরকার এইসব ডিম পাহাড়ে উঠার জন্য।  প্রায় সন্ধ্যার দিকে ফিরে এলাম। অনেক বৃষ্টি হলো। থানচিতে এই বছরে নাকি এটাই প্রথম বৃষ্টি।

পরের দিন খুব ভোরে আমরা সবাই বড় পাথর এলাকায় রওয়ানা হলাম। বিজিবির সৈনিকগন সাথে ছিলো। আমার জীবনে এতো বড় বড় পাথর আর কখনো দেখি নাই। কোনো কোনো পাথরকে আদিবাসিরা রাজা পাথর, কোনো কোনো পাথরকে তারা রানী পাথর হিসাবেও পুজা করে। বড় পাথর এলাকায় গিয়ে ওখানে এক আদিবাসির দোকানে গরম গরম ভাত, আর সাঙ্গু নদীর তাজা মাছের ঝোল দিয়ে নাস্তা করলাম।

০৮/০৪/২০১৮-পরিবার নিয়ে  কক্সবাজার…

গত ২৬ মার্চ ২০১৮ তারিখ থেকে আমি আমার পুরু পরিবার নিয়ে  কক্সবাজার, হিমছড়ি, নাইক্ষংছড়ি, আলিকদম, ফসিয়াখালি, বান্দরবান, বে ওয়াচ বিচ, ইনানী বিচ, স্বর্ণ মন্দির, ১০০ ফুট বৌদ্ধ মূর্তি, সাঙ্গু নদি ভ্রমন, নীলগিরি, মেঘলা, নীলাচল, শইল্ল্যকুপা ঘুরে এলাম। প্রায় ২৮ বছর পর আমি আবার হিল ট্র্যাক্স এলাকায় গেলাম। আমার কাছে প্রতিটি জিনিষ নতুন মনে হচ্ছিলো।

একটা সময় নব্বই এর দশকে আমরা যখন হিলে চাকুরী করতাম, তখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হেটে হেটে পেট্রোলিং করে করে যেতাম। হোক সেটা ছুটির জন্য নেমে আসা, অথবা ছুটি থেকে আবার ক্যাম্পে যাওয়া, অথবা খাবারের রেশন আনা। এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যেতে সময় লাগতো প্রায় ছয় সাত দিন। ২০/২৫ জনের একটা পেট্রোল নিয়ে অস্ত্র হাতে অতি সন্তর্পণে প্রান বাচিয়ে বাচিয়ে ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যেতে হতো। একদিকে মশার কামড়, ম্যালেরিয়ার ভয়, আরেক দিকে শান্তি বাহিনীর অতর্কিত হামলার ভয়। খুব সহজ ছিলো না জীবন। অথচ আজ এবার গিয়ে দেখলাম, প্রতিটি জায়গায় গাড়ি যায়। স্থানে স্থানে বিশাল আকারের রিসোর্ট হয়ে গেছে। মানুষ এখন হিলে যায় সময় কাটাতে, আনন্দ করতে, ফুর্তি করতে। আর আমাদের সময় আমরা প্রতিদিন আতংকে কাটিয়েছি কখন শান্তি বাহিনীর সাথে আমাদের গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। কে কখন জীবন না নিয়ে ফিরে আসে এই ভয়ে।

সময় কি জিনিষ। সব কিছুর সাক্ষী। সময় পালটে দেয় যুগ, যুগ পালটে দেয় মানুষ, মানুষ পালটে দেয় সভ্যতা। আর সব কিছুই হচ্ছে ইতিহাস। আমি যেনো সেই আদিম কালের সভ্যতার সাথে বর্তমান কালের সভ্যতাটাকে তুলনা করছিলাম আর অবাক হচ্ছিলাম। যে পথ দিয়ে আমার শরীরের ঘাম ঝরেছে হেটে হেটে, সেই পথ এখন পিচ ঢালা। যে পথে যেতে আমি সর্বদা আমার ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে পার হয়েছি, কোনো লোকারন্য ছিলো না, মানুষ জনের চলাচল ছিলো না, সেখানে এখানে নতুন টেকনোলজি এসেছে, নতুন সভ্যতা এসেছে, মানুষের কোলাহলের সেস্নাই। এখানে জীবন আর আগের মতো নাই। এসি বাস চলে, বিদ্যুৎ আছে, নানা রকমের ফল মুল অনায়াসেই পাওয়া যায়, যখন তখন বের হওয়া যায়, কি অদ্ভুত পরিবর্তন। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগের তোলা ছবির সাথে আজকে তোলা ছবির কতইনা তফাত অথচ জায়গাটা এক, গাছগুলিও এক, পাহাড়গুলিও এক। যে ঝর্নাটা আজ থেকে ৩০ বছর আগেও যেভাবে পানির ধারা প্রবাহিত করতো, সেই একই ঝর্নাটা আগের মতোই পানির ফোয়ারা দিয়ে যাচ্ছে। যে মেঘ মালা পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে এক স্থান্থেকে উরে উরে আরেক পাহাড়ের গায়ে গিয়ে থমকে যেতো, সেই এক ই মেঘের ভেলা আজো সেই রকম করেই আক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে থমকে যাচ্ছে, কিন্তু আগে সেই নিঃশব্দে বহমান ঝর্নার পানি, অথবা মেঘের সেই অদ্ভুত পাগ লামী যার অপূর্ব শোভা দেখার কেউ ছিলো না, আজ হাজার হাজার দর্শনার্থী ঐ ঝর্নার পাশে, ঐ পাহাড়ের মেঘের সাথে কতইনা অঙ্গভঙ্গি করে স্মৃতি করে রাখছে। ঝরনার মধ্যেও যেনো একটা প্রান এসেছে। আজো মশারা আছে, হয়তো আমার মতো সেইসব জোয়ান মশারা আজকে বুড়ো হয়ে শেষ হয়ে গেছে, তাদের কাছেও হয়ত পাহাড় আর আগের মতো নাই। অনেক মানুষের গায়ে তারা তাদের ইতিহাস লিখে দিচ্ছে।

একটা সময় ছিলো, হাতে গোনা কিছু মানুষ এই অঞ্চলে ঘোরাফেরা করতো, তাও আবার সেনাবাহিনীর সহায়তায় যারা কাজ করতো তারা। অথচ এখন বড় বড় বিজনেসম্যান, চাকুরীজীবি, সবাই পরিবারসহ নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কত হোটেল হয়েছে, রিসোর্ট হয়েছে, রেস্টুরেন্ট হয়েছে, কত যে গাড়ি চলাচল করছে তার কোনো ইয়াত্তা নাই। আর এর মাঝখানে আমার বয়স পার হয়ে গেছে আরো ৩০ বছর। নতুন কমান্ডারগন এসেছে, নতুন জোয়ানরা এসেছে, তাদের হাতে এখন আর আগের দিনের অস্ত্র থাকে না, থাকে আধুনিক কালের টেকনোলজি। তারা তাদের আপন জনের কাছ থেকে দূরে নয়। নিমিষেই সবাই সবার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। অথচ আমরা আজ থেকে ৩০ বছর আগে কিছুই করতেপারতাম না। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে একদিনের লেখা চিঠি পনেরো দিন পরে হয়তো পেতাম। জরুরী কোনো ব্যাপারে যখন আমাদের কাছে আপনজনেরা চিঠি পাঠাত, তখন ইতিমধ্যে ব্যাপারটা তার জরুরীতা হারিয়ে ফেলেছে। তাতে কত লোকের যে প্রান হানী হয়েছে, কত সম্পদ যে হাত ছাড়া হয়ে গেছে, কত জীবন যে কত কষ্টে লালিত হয়েছে তার কোনো হিসাব নাই। এখানে এখন রাজনীতি ঢোকে গেছে, মানুষ অধিকারের কথা বলে, সাম্যের কথা বলে, একজন আরেক জনের কথা শুনে। এখানে এখন আদিবাসি, বা পাহাড়ি বা বাঙালি সব এক সমাজের। এখন আর এক সেনাবাহিনির কোন সদস্যকে দেখে কোনো পাহাড়ি যেমন ভয় পায় না, তেমনি কোন সেনাবাহিনীর সদস্য ও কোনো পাহাড়িকে দেখে আতংকের মধ্যে থাকে না। ভালো লেগেছে দেখে ব্যাপারটা। ইতিহাস যখন বদলায়, মানুষ তখন ইতিহাসের সাথেই বদলায়। আমি এতো বছর পর এসে ইতিহাস বদলের পালাটা দেখলাম। হয়ত অনেকেই বিশ্বাস করবে না আজ থেকে ৩০ বছর আগের সেই পরিস্থিতি, সেই ইতিহাস। আলম গীর টিলা কেনো নাম হলো, লুকু পাহার কেনো নাম দেওয়া হলো, এই ইতিহাস এখন শুধু ইতিহাস। কিন্তু আমরা যারা ঐ সময় ছিলাম, তখন হৃদয়ের অন্তরস্থল থেকে কি পরিমান রক্ত ঝরেছিলো তার সাক্ষী কেবল আমরা। দেশ স্বাধীন হয়, অধিকার আদায় হয়, কিন্তু যারা এই স্বাধীনতার জন্য প্রান দেয়, এই অধিকারের জন্য রক্ত দেয়, তারা শুধু দিয়েই যায়। তাদেরকে কেউ মনে রাখে না। হয়ত বার্ষিকী পুজা হয় কিন্তু তার অবদানের কথা কেউ মনে রেখে তার ফেলে যাওয়া পরিবারকে কেউ বুকে টেনে নেয় না। এটাই ইতিহাস।  যাই হোক…

আমার মেয়েরা, আমার স্ত্রী পুরু ভ্রমনটা আনন্দ করেছে পাহাড়ের সুন্দরতম দৃশ্যগুলি দেখে দেখে। আর আমি আনন্দ করেছি সময়ের স্রোতে পেরিয়ে যাওয়া সময়ের সাথে বর্তমান হিলের সুন্দরতম দৃশ্যগুলি যা আগের মতোই হয়ত আছে কিন্তু এর যে সৌন্দর্যটা ছিলো যা কখনো আগে দেখার সুযোগ হয় নাই, সেটা দেখে দেখে। তুলনা করে করে। নস্টালজিক হয়ে যেতাম মাঝে মাঝে। যে মেঘ একবার আমাকে আলিঙ্গন করেছিলো আজ থেকে ৩০ বছর আগে, হয়ত সেই মেঘ এতোদিন পর তার সেই পুরানো বাসিন্দাকে পেয়ে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আমাকে ভিজিয়ে দিয়েছে। আমার চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে, আমার গায়ের গন্ধ শুকে নিয়েছে। যে পাহাড়ের পাশ দিয়ে আমি নিরবিক পথিকের মতো ধুরু ধুরু মন নিয়ে গোটা বিশেক জোয়ান নিয়ে রাতের কোনো এক আধারে হেটে গিয়েছি, ঘাম ঝরিয়েছি, হয়ত সেই ঝরানো ঘামের গন্ধে পাহাড় গুলি তার পুরানো সেই অতিথিকে চিনে নিতে পেরেছে। দুপাশের ভগ্ন পাহাড়ের পাথর গুলি হয়তো আমাকে স্থিত ভাবে দেখে দেখে চিৎকার করে বলেও থাকবে, “এতোদিন কোথায় ছিলেন”?।

বয়স হয়ে গেছে, তাই উঠতি বয়সের মেয়েদের সাথে আমার হাটাহাটি হয়ত অনেক ধীর গতি ছিলো কিন্তু চেষ্টা করেছি পুরু সময়টা ওদেরকে দিতে। ওরা কখনো এই পাহাড়তা বেশী সুন্দর, দৌড়ে চলে গেছে ক্যামেরা নিয়ে। ছবি তুল্বে। কখনো বলেছে, বাবা, দেখো, ঐ পাহাড়তা আরো সুন্দর। আমি শুধু হাসি। আর বলি, সব পাহাড় সুন্দর মা। সবগুলি পাহাড় আমার বন্ধুর মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে যার যার জায়গায়। আজ এতো বছর পর মনে হলো, পাহাড়্গুলি আমাকে দেখছে আর আনন্দে উদ্বেলিত হচ্ছে। অথচ এই পাহাড় গুলিই একদিন আমার কাছে কতই না বিরক্তিকর ছিলো। ভয়ানক আতংকের মতো ছিলো। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে, আমি ওদের অনেক আপন জন। পাহাড় আমাকে ডাকে, পাহাড় আমাকে শুভেচ্ছা দেয়। মেঘের আভায় আমার চোখ ভিজে যায়। কোনটা  জল আর কোনটা অশ্রু, সব এক হয়ে যায়। ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ি কোনো এক পাহাড়ের ঢালুতে, বড় আপন মনে হয়। 

আমার পরিবার বেশ আনন্দ করেছে। আর এই আনন্দের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিয়েছে আরো বেশী আমার খুব কাছের বন্ধু মেজর জেনারেল মাকসুদ। প্রথম দিন থেকেই মাকসুদ তার নিজের পাজেরো গাড়িটা আমাদের জন্য স্পেয়ার করে দিয়েছে যেনো যেখানে খুশী যেতে পারি, সাথে ছিলো সেনাবাহিনীর কিছু লোক। অসম্ভব আপ্যায়ন করেছে আমার দোস্ত। জেনারেল মাকসুদ বর্তমানে ১০ ডিভিশনের জিওসি। ওর এডিসি ক্যাপ্টেন গালিব খুব অমায়িক ছেলে। ভালো লেগেছে। মাক সুদের মতো জেনারেলের কাছে গালিবের অনেক কিছু শিখার যেমন আছে, তেমনি, গালিব একটা চৌকস জেনারেলের সাথে আছে বলে সে একটা গার্জিয়ানও পেয়েছে।

নীলগিরিতে গেলাম। ওখানে আকাশ আর পাহাড় এক সাথে খেলা করে। দিনের নীল গিড়ি আর রাতের নীল গিরি এক নয়। মেঘেরা শরীর ছুয়ে যায়, রঙ ধনুরা তার সব কটি রঙ মেলে ধরে ময়ুরের মতো পেখম মেলে অভিনন্দন জানায়। বড্ড মিষ্টি মনে হয় তখঞ্জীবন টাকে। মনে হয়, এতো অল্প সময় নিয়ে কেউ পৃথিবীতে আসে? নীল গিরিতে একদিকে আকাশ, আরেকদিকে দূরে সাগরের প্রবাহমান দৃশ্য, আর তার উপরে বিশাল আকাশ যেনো ছাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে। এক সময় এই নীল গিরিতে আসার কথা মনে হলে মনে আতংক আর শারীরিক পরিশ্রমের কাস্টে মাথা ব্যথা করতো, অথচ আজ হাজার হাজার মানুষ কয়েক ঘন্তার জন্য সেই বান্দরবান থেকে গাড়িতে করে এসে আবার ফিরেও যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার রাত্রিজাপন ও করছে নিমিষেই।

এই নীল গিরিতে এসে দেখা হয়েছে একজন চমৎকার মানুষের সাথে। তার নাম আশ্রাফ ভাই। অনেক আলাপ করলাম, মজা করলাম। তিনি আর্মির কন্সট্রাক্সন কাজগুলি করেন। খুব ক্রিয়েটিভ মানুষ এবং অনেক মিশুক মানুষ। সমাজ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হলো তার সাথে, সাথে সাথে এই হিলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলাপ হলো। আমাদের থাকার জায়গা ছিলো নীল গিরিতে, কিন্তু আল তাফ সাহেব যিনি অনেক পুরানো সৈনিক, কিছুতেই আমাকে অন্য কোনো রুমে থাকতে দেবেন না। খুব পরিস্কার মানুষ মনের দিক থেকে। এরাই সেনাবাহিনীর সেই প্রাথমিক সময়ের সব কিছুর সাক্ষী। তিনি আমাকে এবং আমার পরিবার কে ভি আই পি রুম, “মেঘদূত” বরাদ্দ করে দিলেন। অত্যান্ত ভালো একটা কটেজ। মাঝে মাঝে প্রধান মন্ত্রি, প্রেসিডেন্ট সাহেব এই কটেজে থাকেন। রাত ভরে পরিবারকে নিয়ে নীল গিরির সেই মেঘ, আলোছায়া, আর শীতল বাতাস আমাদের সবাইকে বড্ড আপন করে নিলো। আমার ছোত মেয়ের কত যে আবিস্কারের পালা। মেঘের মধ্যে তার ছায়া পড়া, লাইটের মধ্যে তার রঙ ধনুর মেলা, সব কিছুই যেনো তার কাছে নতুন নতুন আবিস্কার।

আমার পরিবারকে নিয়ে থানছি এবং ডিম পাহাড়, মুন পাহাড় দেখার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু সময়ের অভাবে আর ওইদিকে যাওয়া হলো না। থানচিতে জোন কমান্দার হিসাবে আছেন লেঃ কঃ হাবিব। থানচি শব্দের অর্থ হচ্ছে ডোন্ট গো। আর যেও না। অর্থাৎ এটাই বাংলাদেশের শেষ উপজেলা এবং শেষ গ্রাম। জোন কমান্দার লেঃ কঃ হাবীব আমাদের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছেলে। শেষমেস নীলগিরি থেকে ব্যাক করে বান্দরবানে এসে রাতের বেলায় সোজা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম।

২২/০৩/২০১৮-যেদিন আমি বুড়ো হয়ে যাবো…

আমি জানি যেদিন আমি বুড়ো হয়ে যাবো, আমি জানি সেদিন আমাকে একাই সব কাজ করতে হবে। সিড়ি বেয়ে অতি ধীরে ধীরে একাই আমাকে পায়ে পায়ে আমার ছোট সেই ঘরে এসে পৌঁছতে হবে। আমার যখন পানির পিপাসা লাগবে, তখন জানি আমাকেই হেটে হেটে খাওয়ার টেবিলে গিয়ে কাপা কাপা হাতে পানির জগ থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পান করতে হবে। অতি বয়সের কারনে এমনো হতে পারে হাতের গ্লাসটি নীচে পরে ভেঙ্গেও যেতে পারে। ভাঙ্গা কাচ পরিস্কার করার কোন লোকও হয়ত কাছে থাকবে না। আমাকেই রান্না ঘরের কোনো এক কোনা থেকে খুজে খুজে ঝাড়ুটি খুজে বের করে আস্তে আস্তে ঝাড়ু দিয়ে ভাঙ্গা কাচগুলি পরিস্কার করতে হবে।

আমি জানি, আমার সাথে গল্প করার কোন মানুষও হয়ত থাকবে না। কে বুড়ো মানুষদের সাথে বসে গল্প করে বলো? সরাজীবন যাদেরকে মানুষ করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছি, যাদের সুখের জন্য আমার সমস্ত সুখ, আমার সমস্ত আরাম আয়েশ বিসর্জন দিয়ে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন ব্যস্ত থেকেছি, তারাও আজকে আমার পাশে এসে একটু সময় ব্যয় করে বলবে না, চলো তোমার হাত ধরে ধরে তোমাকে শিশু পার্ক দেখিয়ে নিয়ে আসি, অথবা বলবে না, চলো কোথাও একটু ঘুরে আসি।

যদি আমি আমার সন্তানদের এই কথাগুলি বলতে পারতাম-

দেখো, বুড়ো হয়ে যাবার পর আমি যদি আর তোমাদের মতো করে চলতে না পারি, আমার উপর তোমরা একটু সদয় হইও। যদি বলতে পারতাম, কখনো যদি তোমরা আমাকে কয়েকবার ডাকাডাকি করার পরও শুনতে না পাই, আমার প্রতি তোমরা একটু সদয় হইও কারন আমার হয়ত শ্রবন শক্তি লোপ পেয়েছে। 

আমি জানি, তোমরা আমাকে হয়তো উপহাস করছো না কিন্তু আমার তো আর সেই আগের মতো শক্তি নাই যাতে আমি তোমাদের মতো করে সব কিছু করতে পারবো। আমি যেদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঈশ্বরের দেখা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবো, তখন্তোম্রা আমার পাশে এক্তূ থেকো।

আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। আমি প্রথম এবং শেষবারের মতো যেদিন ঈশ্বরের সাথে দেখা করবো, সেদিন আমি ইসসরের কানে কানে এই কথাটিই বলবো যেনো ঈশ্বর তোমাদেরকে মঙ্গল করেন।

আমি আসলেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।

১৩/০২/২০১৮-কনিকার জন্মের সময় আমার লিখা

আমার ছোট মেয়ের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে। একটা জিনিষ আমি লক্ষ করছি যে, কনিকা কোনো কিছুতেই টেনশানে থাকে না। সবাই যেখানে পরীক্ষার টেনশানে বিভোর, কনিকা এখনো পড়তে বসলে তার টেবিলের চারিদিকে পুতুল, ছোট ছোট খেলনা, কিংবা তার আইপড অথবা নেইল কাটারের সেট অথবা ছোট কোন এক সুন্দর বোতলের ক্যাপ ইত্যাদি সাজিয়েই বসে। মনোযোগ দিয়ে পড়ে কিনা তাও আমি জানি না। 

পরীক্ষার একদিন আগে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাল থেকে তো তোর মেট্রিক পরীক্ষা। সে মুচকী হেসে দিয়ে বল্লো, হুম, কিন্তু ২২ তারিখে তো শেষ। কি অবাক। সে শেষ কবে সেটা নিয়ে খুশী। এটাই হচ্ছে কনিকা। অথচ আমার বড় মেয়ে উম্মিকা, তার পরীক্ষার আগে বা সপ্তাহে ঘুম হারাম, খাওয়া দাওয়াও কমে যায়। সে এখন ডাক্তারী পড়ছে। এখনো সে পরীক্ষার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। মাশআল্লাহ সে ভালো করছে এটাই আমার প্রাপ্য। 

একচুয়ালী আমার মেয়েদের থেকে সবচেয়ে বেশি টেনসনে থাকে ওদের মা। সারাক্ষন নামাজে থাকে, দোয়াদরুদ পড়ে। এবার দেখলাম, এক হুজুরকে ডেকে সে আমার ছোট মেয়ের কলমে দোয়া পরিয়ে দিচ্ছে। সারাদিন টেনসনে থাকে, মনে হয় পরীক্ষাটা ওই দিচ্ছে। 

কনিকার জন্মের সময় আমি ওর ব্যাপারে একটা লেখা লিখেছিলাম আমার ডায়েরীতে। সেই মেয়েটা আজ পরীক্ষা দিচ্ছে এসএসসি। তাহলে, আজ আমি ওই ডায়েরীর পাতাটা এখানে যোগ করি কি লিখেছিলাম। 

০১/০২/২০১৮-কনিকার এস এস সি পরীক্ষা শুরু

আমার ছোট মেয়ে, সানজিদা তাবাসসুম কনিকা। দেখতে দেখতেই বড় হয়ে গেলো মাশাল্লাহ। আজ ওর এসএসসি পরিক্ষার ১ম দিন। পরিক্ষার ব্যাপারে ওর কখনোই কোনো টেনশন ছিল না। কিন্ত গতকাল রাতেই দেখলাম যে, সে একটু টেনশনে আছে।

বললাম, কাল থেকে তোমার পরিক্ষা শুরু। ও হাসতে হাসতে বল্লো, ২২ তারিখে তো সেস। এই হল তার ফিলিংস।

২৮/০১/২০১৮-খারাপ সময়

বেশ কয়েকাস যাবত প্রতিনিয়ত খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একদিকে ব্যবসা একদম ভাল যাচ্ছেনা, অন্য দিকে বড় বড় লোনের চাপ, আবার একদিকে প্রায় প্রতিনিয়ত পরিচিত কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন এবং খারাপ খারাপ অসুস্থতার খবর পাচ্ছি।

গত ৮ ডিসেম্বর মারা গেলেন নুরজাহান আপা, তার একমাস পর মারা গেলেন বেলি আপা, গত শুক্রবারে মারা গেলো আমার আসার তিন তলার পাপ্পু স্যারের মা, এদিকে নাসির দুলাভাই ল্যানিটিস প্লাস্টিকায় ভুগছেন, যে কোনো সময় মারা যাবেন। আজ মারা গেলেন বদি ভাই।

কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বড় ভাই হাবিব ভাই ওপেন হারট সারজারি করিয়েছেন, দুই তিন মাস আগে আমি নিজে দুটু রিং পড়েছি ব্লকের কারনে।

সড়ক ও জনপথ আমাদের গার্মেন্টস এর বিল্ডিং ভাংগার কারনে বায়ারদের এবং একরডের কাছে খুব চাপে আছি। মুর্তজা ভাইয়ের শরিরও খুব ভাল না।

আমারো মরনের ভয় চেপে আছে মাথায় অথচ লোনের চাপ কমাতে পারছি না। যদি মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রি হয় জমিজমা সহ, মান্নানকে যে রেটটা দিয়েছি, সেটা যদি হয় তাহলে সব কিছু পরিশোধ করে আমার হাতে কিছু ক্যাশ টাকা থাকবে, ভাবছি, ইনশাল্লাহ মিতুলকে নিয়ে ওমরা করতে যাবো। আল্লাহর ঘরে গিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবো যে, আমাকে যেনো আর পরিক্ষার মধ্যে না ফেলেন। আমি পরিক্ষায় পাশ করার ক্ষমতা রাখি না।

মুর্তজা ভাই নিজেও চেষ্টা করছেন একা একা কোনো ব্যবসা করতে। আমি নিজেও জানিনা, মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রির পরে আর কোনো সাধিন ব্যবসা করতে পারবো কিনা। যদি করি এবার, এমন একটা ব্যবসা ধরতে হবে যেটা আমি নিজে তদারকি করে চালাতে পারি।

ভাবছি, শেয়ারের ব্যবসা করবো কিনা। কিন্তু এদেশে শেয়ারের ব্যবসাও বেশি ভাল নয়। আসলে এদেশে কোনো কিছুই ভাল নয়। তারপরেও হয়ত লাখ দশেক টাকায় যে ব্যবসা করা যায় সেটা একবার চেষ্টা করবো। গার্মেন্টস যতোদিন ইকুরিয়ায় আছে, ততোদিন হয়ত একটা অফিস থাকবে, তারপর আমি নিজেও জানিনা কি করবো। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।

২৮/০১/২০১৮-মন খারাপ

বড্ড মন খারাপ হচ্ছে আজ। আমি সব সময় মানুষ চিনতে শুধু ভুলই করি। যাকেই আপন মনে করি, সেইই আমাকে ঠকিয়ে গেছে। সেটা মোহসিন থেকে শুরু করে তারিক, রানা, মুবীন, রউফ কিংবা আমার বর্তমান পার্টনার অবধি। আমি যদি একটু সতর্ক হতাম, তাহলে আমি যে টাকা পয়সা আয় করেছিলাম, সেটা ভুল পথে কিংবা অতি উদাশিন না হতাম, তাহলে আজ আমার হাতে কম করেও হলে কয়েক কোটি টাকা ক্যাশ থেকে যেতো। যাই হোক, এবার আর নয়, ব্যবসা যেটুকু আছে, এখন আমাকে সেখানেই থামা দরকার। কাউকেই আর বিসসাস করা মানে আমার হাত শুন্য হয়ে যাওয়া। এটা আর করা যাবে না। মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রি করে দিচ্ছি। এই সম্পদ থেকে যেটুকু পাবো, সেটা এবার হবে ক্যাশ ডিপোজিট। আর কোনো ব্যবসা নয়। আজ আমার আরেক প্রকারের অভিজ্ঞতার জন্ম হলো। মুর্তজা ভাই আমাকে বললেন যে, রিভার সাইডের সেকেন্ড ইউনিট করতে চান কিন্তু একা। অথচ আমি লোনের ভাগিদার অথচ শেয়ারের ভাগিদার নই। একটু অবাক হয়েছি। আমি অবশ্য ঊনাকে বলেছি যে, এটা কি যুক্তিযুক্ত কিনা। আমি বুঝতেছি যে, ঊনি আর আমার সাথে ব্যবসা করতে চাচ্ছেন না। আমিই হয়ত একটু ব্যতিক্রম। দেখি, আমি যদি মা ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রি করার পর যদি দেখি যে, হাবীব ভাইয়ের লোন, সোনালি ব্যাংকের লোন, রানাদের টাকা এবং অন্যান্য লোন সেস হয়ে যায়, তাহলে আমি ধীরে ধীরে রিভারসাইড থেকেও আস্তে আস্তে সরে যাবো। আমি জানি যে, যে মুহুরতে আমি রিভারসাইড থেকে সরে যাবো, ঠিক সেই মুহুরত থেকে এই হাস্নাবাদে অন্তত খুব ঠান্ডা পরিবেশে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। হতে পারে এই ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারছেন না। বেশি কিছু না, জাস্ট ব্যালেন্স এক কোটি টাকা আমার হাতে থাকলেই আমি একেবারে ঠান্ডা মাথায় সরে যাবো। ব্যাপারটা বুঝানো দরকার। ইজি নয় কারো জন্য। আমার নামের যে ইমেজটা আছে, এই ইমেজেই অনেকে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। এবার যুদ্ধ আমার সাথে আমার। অন্তত আমি চাই আমি নিজের জন্য বাচবো। ২৮/১/২০১৮

২৭/০১/২০১৮-বদি ভাই অসুস্থ্য

এইমাত্র মান্না, সাদি এবং মিটুলের কাছ থেকে ফোন পেলাম যে, বদি ভাই স্ট্রোক করেছেন এবং সবাই মিলে ওনাকে প্রথমে শ্যামলি ইবনে সিনায় নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু শ্যামলির ইবনে সিনা ওনাকে ওখান থেকে শিফট করে মোহাম্মাদপুর শাখায় নিতে বলেছে। বদি ভাইকে এখন আউ সি ইউ তে নেওয়া হচ্ছে। বদি ভাই বেশ অনেকদিন যাবত খুব অসুস্থ অবস্থায় আছেন। মাঝে মাঝে দেখতে গিয়েছি কিন্তু ঊনার শারিরীক অবস্থা উন্নত করার জন্য আমাদের কিছুই করার নাই। এক সময়কার খুব অনেস্ট সরকারি করমকরতা যিনি ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারতেন কিন্তু কখনো তা তিনি করেন নাই। অবসরের পরে শুধুমাত্র বাড়িভাড়ার উপর যা পেতেন সেটা দিয়েই নিজের ঊসধ এবং সংসার চালানোর চেষ্টা করেছেন।। ছেলেগুলি শহরে থেকেও নিজেদেরকে যোগ্য করে তুলতে পারে নাই।।অথচ ইচ্ছে করলে অনেক কিছুই হতে পারতো। ছেলেগুলির অবস্থা এই রকম যে, তারা নিজেদের সংসার চালাইতেই হিমশিম খাচ্ছে, বাবা মাকে আধুনিক চিকিতসা দেওয়ার সামর্থ্য কই। আমি এখন বসিলার রাস্তায় আছি, বেশ জ্যাম। রাত বাজে নয়টা বিশ। ভাইয়াকে দেখতে যেতে হবে কিন্তু কখন গিয়ে পউছতে পারি বুঝতে পারছি না। এই মুহুরতে ঊনার জন্য ফাইনানশিয়াল সাহাজ্য ও লাগবে। অথচ আমাদের ফ্যাক্টরিগুলির অবস্থাও খুব ভাল নয়। বেশ বড় বড় বিপদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এই লাস্ট কয়েক মাস যাবত। আল্লাহ যে কিসের পরীক্ষা নিচ্ছেন বুঝতে পারছি না। আমরা আল্লাহর কোনো পরীক্ষায়ই পাশ করার ক্ষমতা রাখি না যদি না তিনি আমাদেরকে রহমত না করেন। আল্লাহ আমাদেরকে সাহাজ্য করো।

০২/০১/২০১৮-জীবনের হিসাবটাই পালটে গেছে।

হাসনাবাদ, কেরানিগঞ্জ, ঢাকা-১৩১১

এম ডি অফিস, দুপুর- ৩টা ২২ মিনিট-

এই কয়দিন যাবত আমার জীবনের হিসাবটাই পালটে গেছে। নুরজাহান আপা মারা গেলেন মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে। দুলাভাই এখনো আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসেন নাই। ঊনি এখন হয়ত আপার মৃত্যুর ধকলটা সামলে উঠতে পেরেছেন কিনা আমি জানি না। তবে যতো বয়সই হোক আর যত কম ভালোবাসাই বিদ্যমান থাকুক স্বামী স্ত্রির মধ্যে, একজনের অনুপস্থিতিতে আরেকজনের উপস্থিতি, যে মুল্যায়ন তা হয়ত বুঝা যায়। যাক যেটা বলছিলাম, আপার মৃত্যুর পর সপ্তাহ দুয়েক পার হতে না হতেই গতকাল শুনলাম আমার বউয়ের একটা আলাপ আলোচনা। যা আমাকে অনেক ব্যথিত করে তুলছে।

আপার ছেলেমেয়েরা তাদের বাড়ির অংশ ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে কেচাল শুরু করে দিয়েছে। কে কোন তালা নিবে, কিংবা কার কোন তালার উপর ইচ্ছা ইত্যাদি। হায়রে জগত, এটাই বাস্তবটা। কেউ আপার মৃত্যুর সময়টা মাসখানেকও পার হতে দিলো না। এর থেকে আমি শিক্ষাটা নিচ্ছি, তা হচ্ছে, ঠিক আমার বেলাতেও এটাই ঘটবে। আমার মেয়েরা হয়ত এটা নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে না কারন তাদেরকে আমি এই রকম করে বড় করি নাই। কিন্তু তাদের স্বামী বা শাসুড়িরা একটা সময় আমার মেয়েদেরকে ধীরে ধীরে পুশ করবেই যে, বাপের ওইটা নাও, ওইটা নাও ইত্যাদি। আমার জন্য কি করা উচিত বা কি করা উচিত না, বা আমার আত্তা মাগফেরাতের জন্য কোনো কছু করার দরকার হবে কিনা সেই বিষয়ে কেউ কথা বলবে না। কথা বলবে শুধু ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে।

এখানে আরেকটা জিনিস লক্ষনীয়। আপার বাড়ির বিপরীতে কিন্তু লোন আছে। এই লোন নিয়ে কেউ কথা বলছে না। তাদের দরকার ফ্লাট, লোনের টাকাতো শোধ করবে আপার স্বামী যিনি এখনো জীবিত আছেন। কোথা থেকে করবে কিভাবে করবে সেটা তাদের জানার দরকার নাই।

তাহলে তো আমার ব্যাপারটা আরো বেশি ভাবা দরকার। আমার ব্যবসায় লোন আছে, আমার ব্যক্তিগত লোন আছে। ওইসব লোনের মধ্যে আবার আমার স্ত্রীর সায় দেওয়া আছে যে, আমার অনুপস্থতিতে আমার স্ত্রী সেইসব লোনের জন্য দায়ি থাকবে। অথচ আমার বউ কিন্তু এর কোনো কিছুই জানে না বা জানলেও তারপক্ষে এইসব লোন শোধ করা সম্ভব নয়। সে সরকারী চাকুরী করে, আরো ১০ বছর বিনা বাধায় সরকারি চাকুরি করতে পারবে। চাকুরীর পর সে প্রায় তিন সারে তিন কোটি টাকা পেনসন পাবে। আমাদের বাড়ি ভাড়া থেকে টাকা আসে প্রায় লাখ টাকার উপর। বাসাবো থেকে আসে প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকা। ওর বেতন আসে প্রায় লাখ টাকার সমান। আমার কোনো ব্যবসা থেকে টাকা না পেলেও কিন্তু আমার পরিবার এখন যেভাবে চলছে ইনশাল্লাহ সেভাবেই চলতে পারবে। কিন্তু যদি আমার ব্যবসার লোন তাদের ঘাড়ের উপর চেপে বসে আমার অনুপস্থিতিতে, তাহলে না তারা তাদের জীবনকে উপভোগ করতে পারবে, না আরাম করতে পারবে। তাহলে, কেনো আমি এই লায়াবিলিটিজ বাড়িয়ে যাচ্ছি? হ্যা করতে পারতাম, যদি আমার প্ল্যান মোতাবেক রানা (আমার বড় মেয়ের এখন পর্যন্ত স্বামী) যদি লোভি না হতো, চালাক হতো, কর্মঠ হতো। আমার ব্যবসা ধরে রাখতে পারতো। কিন্তু সে নিজেই তো আমার ব্যবসার উপর হুমকি। তাহলে কার ভরসায়, কিসের জন্য, আর কার জন্য আমি আমার সাম্রাজ্য লোনের উপর দাড় করিয়ে যাবো?

তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিঃ

(১) কোন কিছুই রেখে যাবো না কারো জন্য। মেয়েদেরকে সুশিক্ষা দিয়েছি। তারা নিজেদের শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের জীবন গড়বে।

(২) নিজের বাড়ি আছে, সেখানে অন্তত মেয়েরা ঠাই করে বসবাস করতে পারবে। অন্য কোথাও থাকার জন্য টেনসন করতে হবে না।

(৩) কোনো লোন নাই মানে কোনো টেনসন ও নাই।

(৪)      আমি আমার সব ব্যবসা গুটিয়ে দিয়ে সব লোন পরিশোধ করে দিয়ে আমার পরকালের জন্য কিছু ছদ্গায়ে জারিয়া তৈরী করে দিয়ে নিজের বউকে নিয়ে বাকী জীবনটা একটু আরাম করে কাটাতে চাই। তাতে আমার যতটুকু ব্যবসা রাখা দরকার, যতোটুকু জমি জমা থাকা দরকার সেই টুকুই রাখবো। আমার মৃত্যুর পর যেনো আমার সম্পত্তি লইয়া কেই ভাগ বাটোয়ারা করার জন্য আর কোনো মানসিকতা না থাকে। এটাই সত্য।

(৫)      বর্তমানে রিভার সাইড সুয়েটারস লিমিটেডের নিজস্ব লোন আছে প্রায় ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকা। যা আমাদের পরিশোধ করতে হবে। এই বিশাল লোন খুব সহজ নয়। আমার ৩৫% শেয়ারের বিনিময়ে আমার ভাগে লোন দাড়ায় প্রায় ১৮ থেকে ১৯ কোটি টাকা। আমি এই টাকা পরিশোধ করতে পারবো না যদি কোনো কারনে রিভার সাইডের সমস্যা হয়। অন্য কোনো সোর্স কিন্তু নাই। মুর্তজা ভাইয়ের ৬৫% শেয়ারের বিপরিতে ওনার লোন দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ কোটি টাকা। ঊনি সাহস করতে পারছেন মনোবল আছে কিন্তু আমার মনোবল নাই। তাই আমি ভাবছি, আমার অন্তত ১৫% শেয়ার সম পরিমান শেয়ার আমি মুর্তজা ভাইকে দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে নেবো (যদিও টাকাটা রিভার সাইড থেকেই মুর্তজা ভাই দিবেন তার লভ্যাংশ থেকে, অসুবিধা নাই) এবং ওই নগদ টাকা আমি আমার অন্যান্য লোন পরিশোধ করে ফ্রি হয়ে যাবো। অন্তত ২০% শেয়ার দিয়ে আমি ব্যবসায় থাকবো তাতে মাসিক সেলারী এবং অন্যান্য খরচাদি চলবে। অন্যদিকে মা ইন্ডাস্ট্রিজ যদি লোন বিহিন অবস্থায় নিজেকে নিজে চালাতে পারে, তাতেও লাভ। মাঝে মাঝে ওই খান থেকে প্রয়োজনে আমি টাকা টান দিতে পারবো।

(৬) আমার কিছু জমি আছে, যা আপাত দৃষ্টিতে অনে হচ্ছে বেশ চমকপ্রদ। কিন্তু আমি জানি, এই সব জমি আমার অনুপস্থিতিতে আমার মেয়েরা কেনো আমার মেয়ের স্বামীরাও এটার ব্যাপারে কোনো প্রোটেক্সন দিবে না। বরং যা পাবে তাইই নিয়ে জমিজমা বিক্রি করে দেবে। যদি তাই হয়, তাহলে আমার জীবদ্দোশায় কেনো আমি তা করছি না? তাই, আমি ভাবছি, আমার যতো জমিজমা আছে, সেই জমিজমার মধ্যে মা ইন্ডাস্ট্রিজ বাদ দিয়ে বাকি জমি বিক্রি করে দিয়ে ক্যাশ করে ফেল্বো, তাতে যাই পাই। কারো জন্য কিচ্ছু রেখে যাওয়ার কোনো দরকার নাই। অন্তত আমি এসেট করেছি, আমি নিজে ভোগ করে যাবো।

০১/০১/২০১৮-আজ বহুদিন পর মনে হইলো যে, আমি যাদের জন্য

পহেলা জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার, এমডি অফিস।

আজ বহুদিন পর মনে হইলো যে, আমি যাদের জন্য ভোর সকাল হইতে কস্ট করিয়া শারীরিক পরিশ্রম করিয়া প্রায় সারাদিন খাটিয়া রাতের অর্ধেক সময় পার করিয়া যখন বাসায় ফিরিয়া  আসি, তখন আসলে আমি কি করিলাম আর কি করা উচিত ছিল এই হিসাবটাই মিলাতে পারিনা। তখন মনে হয় – কি লাভ করিতেছি?

আসলে আমি নিজে কোনো কিছুই লাভ করিতেছি না। গত বছর হইতে এই বছরের প্রান্তিক হিসাব করিয়া আমি দেখিয়াছি, আমার ব্যবসায় উন্নতি হইয়াছে বটে কিন্তু আমার সাস্থ্য খারাপ হইয়াছে। যে অনুপাতে আমার ব্যবসা উন্নতি হইয়াছে তার অধিক অনুপাতে আমার শরীর খারাপ হইয়াছে। আমার চারিদিকে আমার অনেক পরিচিত বন্ধু বান্ধব, আমার আত্মীয়সজন কিংবা আমার পরিচিত মানুষ অনেকেই না ফেরার দেশে চলিয়া গিয়াছে। কাহারো কাহারো বয়স আমার থেকেও কম কিন্তু তাহারা চলিয়া গিয়াছেন সবাইকে ছেরে। তাহারা জীবীত অবস্থায় কতই না হায় হুতাশ, কিংবা টেনসন করিয়া রাতের ঘুম হারাম করিয়াছিলেন, তাহারা আজ কাহারো জন্যই হা হুতাশ করিতেছেন না। এমন কি অধীক গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত থাকা অবস্থায়ও তাহারা এখন আর কোনো কর্ণপাত করিতেছেন না। তাহা হইলে কিসের মায়া আর কিসের জন্য কি?

আমার জীবদ্দশায় আমি দেখিয়া গেলাম, অধিকাংশ লোকেরা এমন কি আমার মেয়ের স্বামীরাও আমাকে ভালোবাসে আমার সম্পত্তিকে, তারা আমাকে না যতোটা ভালবাসিয়াছে, তাহার থেকে অধিক নজর আমার সম্পত্তির উপর। এটা শুধু মেয়েদের স্বামীর নজরই নয়, আমি লক্ষ করেছি, এটা আমার মেয়েদের শাশুড়িদেরও নজর এই সম্পত্তির উপর। লোভ জিনিসটা মারাত্তক খারাপ। ইহাতে সম্পর্ক নস্ট হয়, আপদ বাড়ে আর আপনজনার লিস্ট থেকে ক্রমে ক্রমে বহি স্কার হয়।

নতুন বছর শুরু হইয়াছে আজ। গত ২০১৭ বছরটি ছিলো আমার জীবনের নতুন কিছু অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে যোগ হয়েছিলো নতুন কিছু মানুষের। আমার ক্যাল্কুলেসন সাধারনত ভুল হয় না। আর যদি ভুল হয়ও তা এমনভাবে নয় যে, আমাকে ধুলিস্যাত করে নাস্তানাবুদ করে ফেলে। কিন্তু এবার কিছু হায়েনাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল আর আমি তাদেরকে মানুষ ভেবেছিলাম। আমার জিবনের যতো বিশ্বাস, যতো কনফিডেন্স, যতো সাবলম্বি জোর একেবারে হতাত করে ছদ্দবেশি কিছু মানুষ এমনভাবে অভিনয় করে কাছে এসেছিলো যে, আমার সকল ইন্দ্রিয় অবশ হইয়া তাহাদেরকে নিতান্তই আপন মনে করিয়া বুকের এতো কাছে আশ্রয় দিয়াছিলাম যে, এক সময় মাকড়শার পরবর্তী জেনারেসনের মতো আমার হৃদপিণ্ড খাইয়া পরিশেষে বাহির হইল।

শুভ সংবাদ এইটাই যে, অবশেষে আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম তাহারা আমার সাথে লম্বা রাস্তা পাড়ি দেওয়া জন্য যোগ্য নহে। আর এই অযোগ্য হায়েনা টাইপের মানুস রুপী প্রানিগুলিকে নিজের বলয় থেকে অবমুক্ত করিতে পারিয়াছি, ইহাই আমার সুখ।  একটা সময় আসিবে যখন এই প্রানিগুলি তাদের নিজের বুক কিলাইয়া কিলাইয়া বিলাপ করিবে আর বলিবে কে আছো আমাকে উদ্ধার করো, আমি বড় ভুল করিয়াছি। তাহাদের কেউ কেউ কাদিবে উচ্চস্বরে আর কেউ কাদিবে গোপনে। কিন্তু কাদিবে। কাদিবে এই কারনে যে, ভাগ্যের কারনে যুগে যুগে ভগবান আমার মতো মানুষকে কারো কারো ভাগ্যে জোটায়, এটা আমার মন্তব্য নহে, ইহা তাহাদের মন্তব্য যাহারা আমার সান্নিধ্যে আসিয়াছে। হয়ত এই আপন করে নেওয়ার মানুষ গুলি বুঝতেই পারলো না, কি তাহার হারাইলো আর কি তাহারা পাইলো না।

মা কুল্পা মা কুল্পা, এটা কোনো এক দেশের বুলি যার অর্থ আমি ভুল করেছি আমি ভুল করেছি। এইটা তারা বলে আর বুক কিলায়।

২০/০৯/২০১৭ অগ্নিশর্মা বাবু

অগ্নিশর্মা বাবু সুদুর আফ্রিকার জঙ্গলে ভ্রমন করিতে গিয়া অনেক সুন্দর একখানা ফলের চারা দেখিয়া সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিলেন। ভাবিলেন, আহা, আমার বাগানে ইহা লালন পালন করিয়া আরো সুন্দর করিয়া তুলিবো। জঙ্গলে অপরিচর্যায়ই যখন এতো সুন্দর করিয়া উহা বাড়িয়া উঠে, পরিচর্যা পাইলে না জানি আরো কতো সুন্দর করিয়া আপনার বাগানকে আরো সৌন্দর্য বর্ধন করিবে। কতলোক দেখিতে আসিবে, কতলোক ইহার কাহিনী শুনিয়া তাহাকে পাইতে স্বপ্নে বিভোর হইয়া থাকিবে। কিন্তু উহা আর কারো কাছেই নাই শুধু তাহার বাগান ছাড়া। ইহাই যেনো অগ্নিশর্মা বাবুর একটি অতীব শান্তি।

-আনিলেন।
-লাগাইলেন
-শখের চারা। মালির পরিবর্তে তিনি নিজেই উহার পরিচর্যার ভার নিলেন

-প্রতিদিন উহার বাড়িয়া উঠার সব রকমের উপকরন রীতিমতো দিতে থাকিলেন। কখনো দুস্টু লোকের হাতছানীর হাত হইতে রক্ষার জন্য খাচা বানাইয়া, কখনো বৃষ্টির কবল হইতে বাচাইবার জন্য ছাউনী দিয়া, কখনো আবার উলুপোকার উপদ্রব হইতে বাচাইবার জন্য চারার গায়ে সুই ফুটাইয়া ঔষধ লাগাইয়া দিলেন।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, অগ্নিশর্মা বাবু দেখিলেন, উহা বাড়তির দিকে না যাইয়া শুধু অধোপতনের দিকে যাইতে লাগিলো। তিনি চিন্তিত হইয়া গেলেন। তাহার ঘুম নষ্ট হইতে লাগিলো, ঘুম নষ্ট হইবার সাথে সাথে সপ্নও ভাঙিতে লাগিলো। তাহার বাগানের অন্যান্য অনেক সুন্দুরী ফলের গাছ, ফুলের চারার উপর অগ্নিশর্মা বাবুর মনোযোগ ক্রমশ কমিতে লাগিলো। তাহার এই অমনোযোগের কারনে বাগানের শ্রী যেনো ধীরে ধীরে আরো খারাপ হইতে লাগিলো। সাজানো বাগানে যেনো ইদুর মরার গন্ধ বাহির হইতে লাগিলো। মরা গাছের ঢাল ক্রমেই বাড়িতে লাগিলো। কি সর্বনাশ!! এই এক আফ্রিকার চারার জন্য অগ্নিশর্মা বাবুর এতো দিনের বাগানের হাল কি হইতে কি হইয়া গেলো?

তাহার পরেও মন বলিয়া কথা। অনেক উচ্ছাস আর আবেগ লইয়া যে চারাটি অগ্নিশর্মা বাবু রোপন করিয়াছিলেন।  উহার এমন অকাল মৃত্যু হইতেছে ইহা তিনি কখনো ভাবিতে পারেন নাই। এমন নয় যে, চাড়াটিতে তিনি কম জল ঢালিয়াছেন, কিংবা তাহার তাহার যত্ন কম নিয়াছেন, কিংবা এমন নয় যে, সময়ের সাথে সাথে উহার কোনো পরিচর্যার অভাব হইয়াছিলো তবুও চারাটি মরিতে শুরু করিয়াছে। কি হইতে পারে উহার এই রকমের পতনের কারন? মনের এই খুতখুতি হইতে রেহাই পাইবার জন্য অগ্নিশর্মা বাবু অনেক গবেষণাও করিলেন।

কি কারনে ইহার অধোপতন হইতে পারে তাহার সবরকমের সম্ভাব্য কারন লইয়া ভাবিতে লাগিলেন। টব পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর টবের মধ্যে তিনি তাহা রাখিয়াছিলেন। সুতরাং টব উহার মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়। মালী যত্ন নেয় নাই এইরূপ দোসারূপ তিনি করিতে পারিবেন না কারন মালী তিনি নিজেই ছিলেন। তদারকীর কোনো গাফিলতি ছিলো না। বিজ্ঞ নার্সারির একদল বিশিষ্ট গবেষকের দ্বারা পরীক্ষা করাইয়া দেখিলেন, উহা যেই জাতের চারা, তাহার সব কিছুই ঠিক আছে বলিয়া মন্তব্য করিলেন। তবে তাহার মন্তব্যের নীচে একটি ছোট নোট লিখিতে ভুলিয়া যান নাইঃ

“অধিককাল উহা স্বাভাবিক আলো–

বাতাস বিবর্জিত এমন এক স্যতস্যাতে গোমট ছায়াতল পরিবেশে বড় হইয়াছে, ফলে ঊহার ভিতরের শিরা উপশিরা, জীবন প্রনালীর ধারা স্বাভাবিক ধারা হইতে পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। ফলে চারাটি আর বর্তমান সুস্থ পরিবেশের সহিত খাপ খাওয়াইয়া চলিতে অপারগ। ইহার বনজ গুনাবলী পুরুপুরি পরিবর্তিত হইয়া বন্য গুনাবলিতে রুপান্তরীত হইয়া গিয়াছে বিধায় সার্বক্ষণিকপরিচর্যায়ও আর কোনো লাভ হইবে বলিয়া মনে হয় না। উহার সমগোত্রীয় চারার জন্য যে আদর্শিক পরিবেশ দরকার তাহা উক্ত চারাটির জন্য প্রযোজ্য হইবে না। তবে যদি পুনরায় উহাকে আলো–বাতাস বিবর্জিত, স্যাতস্যাতে গোমটযুক্ত পূর্বেকার পরিবেশে ফেলিয়া রাখা যায়, উহা অতি তাড়াতাড়ি বাড়িয়া উঠিবে। ইহার জন্য স্বাভাবিক বাগানের পরিবেশ প্রযোজ্য নহে।

 তবে সেক্ষেত্রে ইহার উপর কোনো ভার, কিংবা কোন কোন লতাপতার ভর দেওয়া যাইবে না কারন উহা এইরূপ কোন ভাড় নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে নাই। “

–মন্তব্য পড়িয়া অগ্নিশর্মা বাবু বুঝিলেন, চারাটিকে আর তাহার বাগানের অন্যান্য ফল, ফুলাদি কিংবা অন্যান্য চারাদের সাথে রাখা সম্ভব হইবে না। আর শুধুমাত্র এই চারাটিকে বাচাইয়া রাখার জন্য বাকী সব চারাদের মুল উৎপাটন করা তাহার পক্ষে সম্ভব হইবে না। রাগে দুঃখে টব সমেত অগ্নিশর্মা বাবু অগ্নিরূপ ধারন করিয়া সেই সুদুর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা দেখিতে সুন্দর কিন্তু বিষাক্ত চারাটিকে তিনি বাগানের বহুদূরে নিক্ষেপ করিয়া রাগ সামাল দিলেন। একবার ফিরিয়া তাকাইবার ইচ্ছা হইতেছিলো বটে কিন্তু উহাকে আর দেখিতেও মন চাহিলো না। উহার আফ্রিকার জঙ্গল হইতে আনিবার পর এই বাগানের চত্তরের ইতিহাস চিরতরে নির্মূল করিয়া মালিকে উচ্চস্বরে আদেশ করিলেন, আর বলিলেন, বাগানের প্রবেশ পথে ” আফ্রিকার যতো সুন্দর গাছ কিংবা চারা, কিংবা ফল অথবা ফুলের যে কোনো চারাই হোক না কেনো, ইহা এই বাগানে প্রবেশ নিষিদ্ধ” লিখিয়া দাও।

মালি কোনো কথা না বলিয়া শুধু অবাক হইয়া অগ্নিশর্মা বাবুর দিকে তাকাইয়া তাহার প্রস্থানের দৃশ্য অবলোকন করিলেন। বাবু যাওয়ার পর মালি একটু পরে হাতের কাছে জলের বালতি লইয়া অন্যান্য গাছের গোড়ায় জল ঢালিতে লাগিলেন আর ভাবিতে লাগিলেন, আফ্রিকার জঙ্গলটি কোথায়? জঙ্গলে কি বাগান চাষ হয়?  

১০/০৯/২০১৭-পাপ্পু স্যারের মা

প্রায় ৯৫ বছর বয়সী একজন অতি সাধারন কিন্তু অসামান্য ব্যক্তিত্তের অধিকারীনি বাঙালি মহিলা যিনি প্রতিক্ষনে শুধু ধন্যবাদ নন, সম্মানও প্রাপ্য। গত কয়েকদিন আগে তিনি হতাত করে শরীরের ব্যাল্যান্স ঠিক রাখতে না পেরে তার রুমে পা পিছলে পরে যান এবং মাথায় বেশ বড় ধরনের আঘাত পান। খবর পেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, তিনি আমার বাসার ঠিক উপরের তালায় থাকেন। ওনাকে দেখলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। অবিকল আমার মায়ের মতো চেহারা এবং ঠিক সেই রকমের ধৈর্য। অসম্ভব প্রকারের আত্মনির্ভরশীল এবং আদর পরায়ন। কেউ তার জন্য বিরক্ত হোক তিনি তা চান না। ফলে যতোটুকু সম্ভব এই বয়সে নিজের কাজটা, পরিবারের অনেক ছোটখাটো কাজ যা তিনি করতে পারেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করেন। যদিও ওনাকে কেউ কোনো কজ করতে দিতে চান না। বাসার সবাইকে নিয়ে তিনি অনেক ভালো একজন সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেন। এমন কি কাজের মেয়ের প্রতিও তিনি এতোটাই সহানুভুতিশীল যে, কাজের মেয়েও সে এই পরিবারের একজন মুল্যবান সদস্য হিসাবে মনে করে।

তার যোগ্যসন্তান পাপ্পু স্যার। আর আরেক যোগ্য বৌমা, পাপ্পু স্যারের স্ত্রী। মায়ের প্রতি ভালোবাসা কার নাই? কমবেশী সব সন্তানই মাকে ভালোবাসে কোনো শর্ত ছাড়া। আর এই ভালোবাসা দিনে দিনে স্থায়ীই হয় যদি মা তার নীতির মধ্যে তার সন্তানকে লালন করে থাকেন। পাপ্পু স্যার ওই ধরনের একজন সন্তান। যে মা সন্তানকে ভালোবাসেন, সে মা তার সন্তানের সংসারকেও ভালোবাসেন। সে মা তার সন্তানের স্ত্রীকেও ভালোবাসেন, পরের বাড়ির মেয়েকে সন্তানের স্ত্রী হিসাবে এনে নিজের মেয়ের মতো আদর করেন, তাকে তার কোলে মাথা রাখার অধিকার দেন। ছেলেকে মা যদি ভালোবাসেন, সেই মা তার ছেলের বউকেও ভালোবাসার কথা ঠিক তার ছেলেকে যেভাবে তিনি ভালোবাসেন সেইভাবে। ছেলেকে যদি মা ভালোবাসেন, ছেলের সন্তান, ছেলের স্ত্রী, ছেলের প্রতিটি সদস্যকে ভালোবাসেন ঠিক একই রকমভাবে যেভাবে তিনি ভালোবাসেন তার ছেলেকে। আর এখানেই রহস্যটা লুকিয়ে থাকে মা-সন্তানের সংসারের বন্ধনটা। ছেলে যদি একটা নেড়ী কুকুরকেও ভালোবাসে, তাহলে দেখা যাবে, সেই ভালো মা সেই নেড়ি কুকুরটাকে অতি আদরের সাথে যত করছেন। কারন তার ছেলে ওই নেড়ি কুকুরটাকেও ভালোবাসে। এই হলো প্রক্রিত মা। পাপ্পু স্যারের মা ঠিক এই রকমের একজন আদর্শ মা। এর মানে এই নয় যে, ছেলের অলসতাকে তিনি প্রশ্রয় দিয়ে, অথবা তার অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে নৈতিকতার বাইরে লালন করে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন। সেটাকে ভালোবাসা বলে না। পাপ্পু স্যা্রের মা ঠিক দায়িত্তটা তার ছেলের উপর পালন করেছেন বলেই পাপ্পু স্যার আজকে অনেকের কাছেই একজন আদর্শ টিচার এবং ব্যক্তিত্ত। সকালে উঠার অভ্যাস করিয়েছেন, সৃষ্টি কর্তার নাম দিয়ে দিনের কাজ শুরু করার শিক্ষা দিয়েছেন, কোথায় কি কার দায়িত্ব কিভাবে পালন করতে হবে সেই শিক্ষা দিয়েছেন। সময়কে কিভাবে কাজে লাগাইতে হবে তার পুরু দিক্ষা তিনি তার সন্তানকে দিয়েছেন। আদরের পাশাপাশি শাসন করেছেন। অন্ধ ভালোবাসা দিয়ে তার জীবন গড়িয়ে দেন নাই। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনো তাকে আদর্শের কাছে হেরে যেতে দেন নাই।

আমি পাপ্পু স্যারকে দেখেছি, মায়ের জন্য কি পরিমান পাগল। আমি এটাও দেখেছি, পাপ্পু স্যারের স্ত্রীও তার শাসুড়ির জন্য একই পরিমানে পাগল। আমি জানি না তিনি তার নিজের মাকে কতোটা তুষ্ট করেন, কিন্তু শাসুড়ির বেলায় পাপ্পু স্যারের স্ত্রী যতোটা হওয়া দরকার কখনো কখনো তার থেকেও বেশি করেন। তার শাশুড়ি তাকে যতোটা আদর করেন, তার থেকেও বেশী শাসুড়িকে তিনি সম্মানের সহিত লালন করেন। মিস্টি একটা বন্ধন। আর এই বন্ধন তৈরিতে কারিগড় হচ্ছেন পাপ্পু স্যারের মা নিজে। তিনি যেমনটি চেয়েছেন, একটি সুখি পরিবার, তিনি তেমনটি দিতে পেরেছেন বলেই আজ তিনিও তার ফলভোগ করছেন এই ৯৫ বছর বয়সে। এই রকমের একটি সন্তানই যথেষ্ট কোনো মা তার শেষ বয়সে শান্তিতে থাকার জন্য।

আমিও আমার  মায়ের জন্য এমনই পাগল ছিলাম। পৃথিবী একদিকে, আর মা যেনো আরেক দিকে। আমি ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় মাইলের পর মাইল মাকে কোলে করে গ্রামের রাস্তায় মাকে না হাটিয়ে গ্রামে নিয়ে গেছি। আমার মনে হয়েছে, মায়ের কস্ট হবে হেটে যেতে। মাকে কোলে নিয়ে হাটার কারনে আমার কম্বেট ইউনিফর্ম আমার ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যেতো আর আমার মা আমার গলা ধরে আমার মুখের দিকে তাকিয়েই থাকতেন। কি জানি কি দেখতো আমার মা আমার মুখে এইভাবে তাকিয়ে থেকে? আমি মাঝে মাঝে মুচকি হেসে বলতাম, মা, কি দেখছো এইভাবে? মনে হতো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোনো জিনিস আমি বইয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমার একটুও ক্লান্তি লাগে নাই। আমার মা যতোদিন বেচে ছিলেন, আমি এমন কোনো রাত কাটাই নাই যেই রাতে মায়ের ঘরে মা কিভাবে আছেন, ঘুমিয়েছেন কিনা, বা মায়ের কিছু লাগবে কিনা তা দেখার জন্য গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠি নাই এবং মায়ের রুমে যাই নাই। যদি দেখতাম, মা কোনো কারনে ঘুমিয়ে নাই, মায়ের পাশে বসেই মায়ের সাথে অনেক কথা বলতাম। মায়ের সেই ছোট বেলার মজার মজার কাহিনি। মায়ের সাথে আমার বাবার প্রেমের কাহিনি। মায়ের সাথে আমাদের গ্রামের কাহিনি। মায়ের সাথে আমাদের পুরু পরিবারের কাহিনি। মা বলতেন, মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি আমাদের পরিবারে এসেছিলেন। কখনো মা তার কাহিনী বলতে বলতে খিল খিল করে হাসতেন, আবার কখনো কখনো কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে ঢোকরে ঢোকরে কাদতেন। আমি মায়ের অন্তরটায় পৌঁছে যেতাম সেই ছোট একটা বালকের মতো। মা আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে খুব আদর করতেন আর বলতেন, অনেক বড় হবি তুই। আমি তখন সেনাবাহিনীতে মাত্র মেজর। মাকে বলতাম, মা, আমার কেনো জানি মনে হয় আসলেই একদিন আমি অনেক বড় হবো, আমার অনেক টাকা হবে কিন্তু আমি সম্ভবত ওই দিন তোমাকে আর পাবো না। আমার লিমিটেড আয়ের মধ্যে আমি চেষ্টা করেছি মাকে সবচেয়ে ভালো জিনিসটা দিতে। আমি কখনো মনে পড়ে না যে, মাকে ছাড়া অফিস থেকে এসে একা লাঞ্চ করেছি। অনেক অনেক দিন আমি মাকে আমার নিজ হাতে খাইয়ে দিতাম। মা বড্ড মজা করে খেতো আমার হাতে। আজ মা নেই, কিন্তু আমি তার ভালোবাসা আজো অনুভব করি। পাপ্পু স্যারের মাকে দেখে আমার ঠিক সেই রকম একজন মহিয়সীর কথাই বারবার মনে পড়ে। আর পাপ্পু স্যারকেও আমি দোয়া করি তিনি যেনো ঠিক যা করছেন তাই করে যান মায়ের শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত।

পাপ্পু স্যারের স্ত্রীর শাশুড়ির প্রতি ব্যবহার দেখে আমার স্ত্রীর আমার মায়ের প্রতি ব্যবহারের কথাই মনে পড়ে বারবার। আমি যেদিন প্রথম মাকে আমার ভালোবাসার মেয়েটির কথা জানিয়েছিলাম, মা মেয়েটি কেমন, কই থাকে, তার বাবা মা কি করে, তাদের সাংসারিক অবস্থা কি রকম কিছুই জিজ্ঞেস করেন নাই। শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। কে আগে ভালোবেসেছি। আমি নাকি মেয়েটি। বলেছিলাম, মেয়েটি সম্ভবত। কারন আমিও ভালোবেসেছি কিন্তু প্রথম চিঠিটি এসেছিলো ওর কাছ থেকে। মা আর কিছুই জানতে চান নাই। শুধু বলেছিলেন, সুখি হবি। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিভাবে এতো কনফিডেন্টলি এই কথা মা আমাকে বলতে পারলেন? মা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন ব্যখ্যায়, যে তোমাকে ভালোবাসে, সে তোমাকে ছেড়ে যাবে না যদি তুমি না ছেড়ে যাও। সে তোমাকে ভালোবাসে।

অন্যদিকে, আমি আমার এই ছোট্ট জীবনে এমন মাকেও দেখেছি যে, তিনি ছেলেকে ভালোবাসেন, কিন্তু ছেলের বউকে হিংসা করেন, ছেলের সন্তানকে হিংসা করেন, তাদেরকে আদর করে কাছে টানেন না। ভাবেন, পরের বাড়ির মেয়ে, বেশী প্রশ্রয় দিলে যদি মাথায় উঠে যায়? ওইসব মায়েরা ভুলে যান তাদের অতিতের সেই দিনের কথা যেদিন তিনিও তার শশুড় বাড়িতে পরের বাড়ির মেয়ে হয়েই এসেছিলেন। এই সব মায়েরা ছেলে আর তার স্ত্রী, সন্তানের মধ্যে একটা ফারাক সৃষ্টি করে রাখতে পছন্দ করেন। আর শেষ বয়সে এসে এই সব মায়েরাই কোনো না কোনো ভাবে তার আদরের সন্তানদের কাছ থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়েন আর বলেন, তার সন্তানেরা মানুস হয়ে উঠে নাই। 

আবার এমন মাকেও দেখেছি, ছেলেকে তারা মুলধন মনে করে ছেলের বিয়েটাকে একটা ইনভেস্টমেন্ট মনে করেন। মনে করেন যে, পরের বাড়ির মেয়েটা হচ্ছে একটা শিকার, আর নিজের ছেলেটা হচ্ছে একটা শিকারী, আর বিয়েটা হচ্ছে একটা হাতিয়ার। এই সব মায়েরা না জানেন ছেলেদেরকে সপ্ন দেখাতে, না পারেন নিজেরা সপ্ন বুনতে। তারা একটা সময় বালুচরে অট্টালিকা বানানোর দিবা স্বপ্নে দিনশেষে শুধু একটি জিনিসই দেখতে পান, আর তা হলো, উত্থাল ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাওয়া বালুর তট। 

পাপ্পু স্যারকে আমি অনেক অনেক দোয়া করি যেনো এখন যা আছেন, তাই যেনো থাকেন। আর দোয়া করি তার মহিয়সি মাকে যিনি সংসারের লক্ষি বউমাকে পরের বাড়ি থেকে এনে নিজের মেয়ের আসনে বসিয়ে চমৎকার একটি সংসার উপহার দিয়েছেন তার সন্তানকে। এমন মায়ের পায়ের তলেই হচ্ছে আসল স্বর্গ। স্বর্গটা আসলে মরনের পরে নয়। মায়ের পায়ের তলে সন্তানের স্বর্গ শুরু হয় মায়ের জীবদ্দশায়।

০৯/০৯/২০১৭-একটা সময় ছিলো, ভাবতাম

একটা সময় ছিলো, ভাবতাম, আহা কবে বড় হবো? কবে নিজের ইচ্ছেমতো যা খুশী তাইই করবো? তখন আমার বয়স হয়ত ছিলো ১০ কি ১২।

আজ আমার বয়স ৫২ পেরিয়ে গেলো, ৫৩ তে পা রাখলাম। এখন আর ওই প্রশ্নটা করি না, কবে বড় হবো? কবে আমার সব থাকবে? টাকা পয়সা, গাড়ি বাড়ী সব। ভাবতাম, কবে আমি স্বাধীনভাবে যা আমার ইচ্ছে তাইই করতে পারব? সম্ভবত আজ থেকে কয়েক দশক আগে আজকের এই দিনের কথাটাই আমি ভেবেছিলাম।

আজ সেইদিন গুলি আমি অতিবাহিত করছি। কিন্তু!

আমি কি সব আমার ইচ্ছে মতো যা খুশী তাই করতে পারছি? আমার তো এখন আমি যা চেয়েছিলাম, সবই আছে। গাড়ী আছে, বাড়ী আছে, টাকাপয়সা যা আছে তাতে অন্তত আমার ইচ্ছেগুলি পুরন করার মতো সামর্থ্যও আমার আছে। তাঁরপরেও কি আমি স্বাধীন? আমি কি ইচ্ছে করলেই কয়েকদিন উধাও হয়ে যেখানে খুসী চলে যেতে পারি? আমি কি ইচ্ছে করলেই যা মন চায় করতে পারি?

আমি আজকে আরো পরাধীন। এই পরাধী এমন নয় যে, কেউ আমাকে বেধে রেখেছে। এমন নয় যে, আমি জেলখানার চার দেয়ালের মধ্যে বন্ধী হয়ে আছি। অথচ আমি বন্ধী আমার জাগ্রত বিবেকের কাছে, আমি বন্ধী আমার নীতির কাছে, আমি বন্ধী সমাজের নিয়ম কানুনের উপরে। এইখানে যখন যা খুশী সামর্থ্য থাকলেও করা যায় না।

আমি এখন আর বয়স্ক হতে চাই না। আমার ভয় লাগে। আজ যারা আমাকে ঘিরে নৃত্য করছে, যারা আমাকে নিয়ে তোষামোদি করছে, আজ যারা আমাকে স্বপ্নের সিড়ি হিসাবে ব্যবহার করে তাদের আখের গুছাচ্ছে, একদিন হয়ত তারাই আমাকে এমন একটা পরিস্থিতির সামনে দাড় করাবে, যখন মনে হবে, আজকের দিনের এইসব মানুষগুলির চেহারা আমার কাছে কোনোদিনই পরিচিত ছিলো না। তখন সময়টাশুধু আমার, আর আমার অতীতের।

আজ যাকে আমি হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছি, আজ যারা আমার কাধে ভড় করে পাহাড়ের ওই চুড়ায় উঠতে সহযোগিতা নিচ্ছে, আমি যদি আমার বয়সের ভারে আর ওই পাহাড়ের চুড়ায় আর উঠতে না পারি, আমি যত বড় অনুপ্রেরণার ব্যক্তিত্বই হই না কেনো, আমার স্থান আমি নিশ্চিত যে, পাহাড়ের ঢালেই হবে।

তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই পাহাড়ের চুড়ায় নয়, পাহাড়ের ঢালেই হোক আমার একাকিত্তের একটি ছোটনীড় যেখানে আর কেউ না থাকুক, কিছু অপরিচিত পথিক তো আশেপাশে থাকবে। হয়ত তারাই হবে আমার ওই সময়ের কিছু কথাবলার সাথী যারা ইতিহাস না জেনেই হয়ত আমাকে সঙ্গ দেবে।

সময় কাউকে ছাড় দেয় নাই এবং দেয়ও না। আর আগামিতে কখনো সে কাউকে ছাড় দিবেও না।  

২৮/০৮/২০১৭-একটা শিশু বড় করতে একটা গ্রাম লাগে

একটা শিশু বড় করতে একটা গ্রাম লাগে। কথাটা বলেছিলেন আমার বড় ভাই কোনো এক সময়। তখন কথাটার অর্থ ভালো মতো বুঝতে পারিনি। আজ প্রায় দেড় দশক পরে এসে মনে হলো, কথাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং এর অর্থ অনেক বিশাল। আমার একটা ব্যাখ্যা আছে। একটা ছোট ছেলে শিশুকে দিয়েই একটা উদাহরন টানি।

যেমন ধরুন, একদিন বয়সের একটা ছেলেশিশু সে কথা বলতে পারে না কিন্তু সে ভালো ব্যবহার, আদর, আপ্যায়ন, মুখের অভিব্যক্তি, রাগ ইত্যাদির ইঙ্গিত খুব ভালো করে বুঝে। ফলে দেখবেন, আপনি হাসলে সেও হাসে, আপনি রাগ করলে সেও ভয় পেয়ে যায় ইত্যাদি। কিছু বাচ্চা কয়েক মিনিটের মধ্যেই অপরিচিত এক লোকের কোলে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠে আবার কিছু কিছু লোকের কাছে যেতেই চায় না বা কান্নাকাটি করে। ওই অবুঝ বাচ্চাটির কাছে কোন যুক্তি খাটে না, কে কি ভাবলো সে তাঁর পরোয়া করে না, তাঁর গলা ফাটিয়ে চিতকারে সে লজ্জাও পায় না। সে একেবারে খাটি অনুভুতি প্রকাশ করে।

সেই বাচ্চাটি ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে মায়ের সাথে, ঘরের অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের মধ্যেই বেশীর ভাগ সময় অতিবাহিত করে বলে যেহেতু বাচ্চারা খুবই সংবেদনশীল এবং অনুকরনপ্রিয়, ফলে অনেক অভ্যাস, অনেকগুন, অনেক বদগুন এবং অন্যান্য অনেক গুণাবলী এই বাসার লোকজনের কাছ থেকেই পেয়ে থাকে। স্বার্থপরতা, লোভ, দয়াশীলতা, রাগ, অভিমান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতাও এই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই পায় বেশি। তারপরে সে যখন আস্তে আস্তে বাইরে যেতে থাকে, বন্ধুবান্ধব জোটে, ওই বন্ধুবান্ধবদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তাদের পরিবারের থেকে পাওয়া ওইসব বাচ্চাদের অনেক গুনাবলীও এই বাচ্চাটি কিছু আমদানি করে ফেলে, রপ্ত করে ফেলে।। ফলে নেশাখোর বন্ধুর সাথে মিশলে, নেশায় পড়ে যায়, আবার ভালো বন্ধুদের সাথে মেলামেশায় অনেক উন্নত চরিত্রের অধিকারী হয়।

এখানে আরেকটা বিসয় খুব লক্ষ করা দরকার যে, আলোচ্য শিশুটির পারিবারিক সচ্ছলতার কিছুটা টানাটানিতেও শিশুটির অবুঝ মনে তাঁর অনেক আশা এবং প্রাপ্তির ঘাটতি থেকে যায় বলে তাঁরমধ্যে অন্য শিশুদের চাহিদা এবং তাদের প্রাপ্তির সাথে তুলনা করে সে নিজে নিজেও কিছুটা হতাশ গুণাবলীতে পেচিয়ে যায়। কেনো অন্য বাচ্চাদের এইটা আছে আমার নাই, কেনো অন্য বাচ্চারা যা চাইবে তাই পাবে অথচ আমি কেনো পাবো না ইত্যাদি। তাঁর এই হতাশ গুনাবলী একসময় বাড়তে থাকে এবং সে অন্যান্য শিশুদের তাদের চাহিদা মোতাবেক প্রাপ্তিকে নিজের বা নিজেদের না পাওয়ার ক্ষমতাকে অন্য বাচ্চাদের উপর তাঁর এক ধরনের ক্ষোভ, জিদ, ঘৃণা, কিংবা অপছন্দের কারন হয়ে দাঁড়ায়। তাতে নিজেদের অক্ষমতাকে না বুঝে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবনতাও বাড়তে থাকে। সমাজের উপর তাঁর ক্ষোভ, বাবা মায়ের উপর তাঁর রাগ, অথবা অপছন্দ কিংবা অশ্রদ্ধাবোধও বলতে পারেন বাড়তে থাকে। ব্যাপারটা এই রকম যেনো, কেনো অন্যবাচ্চারা সব পাবে আর আমি পাবো না। কেনো তাদেরই সব থাকবে আর আমার থাকবে না। কেনো আমার পরিবার আমার চাহিদার মতো সব কিছু দিতে পারবে না যেখানে তাঁরই সমবয়সী আরেক বাচ্চার সব কিছু থাকবে। এটা একটা স্যাডিস্ট ভাবধারা এবং এটা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। হয়ত সে নিজেও জানে না যে, এটা একটা খারাপ লক্ষন।

সচ্ছল বন্ধু বান্ধব্দের সাথে মেলামেশার সময় তাঁর মধ্যে না পাওয়ার প্রতিনিয়ত এই গোপন একটা রহস্যময় জিদ, রাগ কিংবা আচরন এক অন্যরকম চরিত্রে রুপান্তরীত করে ফেলে। আর এটা খুব সুপ্ত অবস্থায় তাঁর ভিতরে প্রতিনিয়ত স্থায়ী হতে থাকে। ইনফেরিওর কমপ্লেক্সে ভোগতে থাকে। ইনফেরিওর কমপ্লেক্স একটা রোগ। তাঁর সবকিছু পাবার একটা সুপ্ত বাসনা সবসময়ই মনের ভিতরে লালিত হয়। যারা নিজের চেস্টায় এই সুপ্ত বাসনাকে বাস্তবে রুপ দেওয়ার চেস্টা করে, তারা হয় পরিশ্রমী, কর্মঠ, এবং খুব হিসেবী। অনেকে এই হিসেবী গুনটাকে কেউ কেউ কিপ্টে বলেও ধরে নেয়। যাই হোক, এই নিজ চেষ্টায় সাধ পুরনের মানুষগুলির প্রতিটি ধাপে লক্ষ্য থাকে কিভাবে এই ঘাটতি নিজের চেষ্টায় পূর্ণ করবে। একসময় তারা সমাজের অনেক বড় একটা জায়গায় নিজেরদের জায়গা করে নেয়। কারন, তাঁর এতোদিনের পরিশ্রমের নীতীটা ইতিমধ্যে অভ্যাসে পরিনিত হয়ে যায় বলে সবসময় সে একই প্রকার পরিশ্রম করতেই থাকে। তাকে আর আটকানো যায় না। সে উঠতেই থাকে। পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি এটাই সে আবারো প্রমান করে দেয়। আর যারা এই সপ্ন লালন করে কিন্তু নিজের মেধা, পরিশ্রম দিয়ে এই বাসনা পূর্ণ করতে অলসবোধ করে, তারা সবসময় শর্ট খাট রাস্তা খুজে বেড়ায়। বিকল্প টার্গেট খুজতে থাকে। তারাই এক সময় নীতির বাইরে গিয়ে কাজ করে। অল্প পরিশ্রমে কিভাবে কোথা থেকে কি করলে বাসনাও পূর্ণ হবে আবার কস্টও করতে হবে না এই জাতীয় একটা সুযোগ খুজতে থাকে। এদের কিছুটা লজ্জা কম থাকে, এরা যে কোনো সময়ে নিজেদের স্বার্থে আচার আচরন পাল্টে ফেলতে পারে, এরা স্ট্যাবল থাকে না। যখন সে সুযোগ পায় বা টার্গেট পেয়ে যায় বলে ধারনা করে, তখন যতটা পারা যায়, ততোটাই তাঁর সদব্যবহার করার প্রবনতা থাকে।

এই টার্গেট খোজার ব্যাপারে সবচেয়ে সহজ পন্থা হচ্ছে, সচ্ছল পরিবারে কোনো না কোনো ভাবে ঢোকে পড়া।  অথবা কোনো না কোনোভাবে এমন একটা জবে ঢোকে পড়া যেখানে জবের দোহাই দিয়েই অন্যকে ব্যবহার করা যায়। যদি সচ্ছল পরিবারকে টার্গেট করে এই বাসনা পূর্ণ করার প্রয়াশ থাকে, তখন ব্যাপারটা দাঁড়ায় এই রকম যে, চাইনা কিন্তু না দিলে মেজাজ খারাপ থাকে, চাই না কিন্তু দিলে কি হতো? চাইবো না কিন্তু দিবেন না কেনো ইত্যাদি। আর যদি জবে ঢোকে, তাহলে তো ব্যাপারটা যেনো তাঁর মামার বাড়ির হাড়ি পাওয়ার মতো। অন্যকে জিম্মি করে ফেলা এবং তাঁর থেকে ফায়দা লুটা। এই সব ব্যক্তিত্তের সবচেয়ে প্রধান বাহ্যিকপ্রকাশ যে, তারা তাদের সামর্থ্যের বাইরে  নিজেকে জাহির করে, রাগ করার যথেষ্ট কারন থাকা সত্তেও রাগ করে না (কারন রাগ করলে সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে একটা ভয় থাকে), খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারে, মিথ্যাটাকে সাবলিলভাবে উপস্থাপন করতে পারে যাতে মনে হবে সত্যি বলা হচ্ছে, স্বার্থের কারনে যুক্তির সাথে কথা বলতে পারে , বেশভুষা থাকে সুন্দর ফিটফাট, আর নিজের যা নাই, তাঁর থেকে বেশী দেখানোর প্রবনতা, সেটা যেভাবেই হোক। দেখা যায়, বাড়ির অনেক সমস্যা কিন্তু আইফোন চাই, সামর্থ্য নাই কিন্তু গাড়ি বাড়ি চাই। যোগ্যতা নাই কিন্তু সব পাবার আশা। এরা ধার করে হলেও অন্যকে আকৃষ্ট করার জন্য চাকচিক্য প্রদর্শন করে। এটা দরিদ্র আর ধনীর বাচ্চা বলে কথা নাই। এটা একটা ওরিয়েন্টেসনের অভাব। আর এই ওরিয়েন্টেসনটা প্রথমে আসে পরিবার থেকে। কিছুটা আসে সমাজের কিছু কিছু লোকের কাছ থেকে যাদের সাথে এই বাচ্চাটি ঘনঘন মেলামেশা করে। কিছুটা আসে পরিবেশ থেকে যে পরিবেশে সে চলাফেরা করে। আর এই পুরু ঘর থেকে শুরু করে অন্যান্য পরিবেশটাই আসলে একটা গ্রাম, একটা সমাজ।

এইসব মানুষগুলি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে মন থেকে শ্রদ্ধা করে না, কাউকে অন্তর থেকে সম্মান করে না, কাউকে আপন ভাবে না। এমন কি আজীবন কাল যে মাতাপিতা এদেরকে লালিত পালিত করেছে, তাদের প্রতিও এদের সম্মানবোধ থাকে না। তাদের কাছে প্রাপ্তিটাই বড়। সেটা যেখান থেকেই আসুক সেইই তাঁর কাছে প্রিয়, আর যখন দেখবে যে, কিছু পাবার আর আশা নাই, তখন তাদের চরিত্র আকস্মিকভাবে বদল দেখা যায়। তখন তাদেরকে আর আগের রুপে চেনা যায় না। এরা সব সময় সুযোগ খুজতেই থাকে। আর মজার ব্যাপার হলো, এরা সুযোগ পায়ও।  কারন মানুষের অভিজ্ঞতা সবার একরকম থাকে না বলে বারবার কিছু মানুষ সবসময়ই এই জাতীয় লোভী মানুষের খপ্পরে পড়েই যায়।

২৮/০৮/২০১৭-আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না

আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না, আমরা মানুষের ভিতরের চরিত্রকে সরাসরি আয়নার মতো করে দেখতে পাই না। এমন কি আমরা নিজেরাও নিজেদের অনেক সময় চিনতে পারি না। আর এই কারনেই প্রতিবার আমরা প্রেডিকসন অর্থাৎ একটা স্যামপ্লিং এর উপর ভিত্তি করে বারবার সিদ্ধান্ত নেই। শতভাগ সাফল্য আসবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। আজকে যে বস্তুটি আপনার হাতে আসায় আপনি মনে করছেন, এটাই ঠিক যেটা আপনি চেয়েছেন, বা এটাই আপনি খুজছেন, সেটা সঠিক নাও হতে পারে।  আর যদি সঠিক না হয় তখন সংস্কার বা এজাস্টমেন্ট দরকার হয়ে পড়ে।  কখনো কখনো এই এডজাস্টমেন্ট এতো বড় যে, পুরু পরিকল্পনাটাই বদলাতে হয়। আর যারা এই পরিকল্পনাটা পাল্টানোর হিম্মত রাখেন, বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত রাখেন, তাদের জন্যই সুন্দর ভবিস্যত। সমাজ তারাই তৈরী করে, সমাজ তাদেরকেই কন্ডারী বলে। এডাপ্টেসন এর মুল থিউরী আসলে তাই। ডাইনোসোর এডাপ্টেসন করতে পারে নাই বলেই সে আজ পৃথিবীতে ইতিহাস কিন্তু তেলাপোকা সর্বত্র সব কিছুতেই এডজাস্ট করতে পারে বলেই এরা বেচে থাকে ৪৬ কোটি বছর। সম্ভবত এই তেলাপোকাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আয়ুধারী কোনো প্রানী। এরা ওদের বাল-বাচ্চা নিয়ে ওদের মতো করে বেচে থাকে। ভালোই থাকে।

আজকে আমি বা আপনাকে কেউ ভুল বুঝতেছি বলে যে অভিযোগ করে, এটা হয়ত ঠিক এই রকম নয়। হতে পারে এই রকম যে, এখন আমি বা আপনি ভুল বুঝতেছি না, সময়ের ব্যবধানে, স্যামপ্লিং ভুলের কারনে আগেরবার ভুল হয়েছিলো, কিন্তু অন্যান্য স্যামপ্লিং, চারিপাশের অবস্থা, বেশী ফ্যাক্টর সমন্নয়ে আমি বা আপনি বর্তমানটাই ঠিক বুঝতেছেন। ফলে যারা অভিযোগ করছে, তারা ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন না। আবার এমনো হতে পারে যিনি আমাকে বা আপনাকে “ভুল বুঝতেছি” বলে অভিযোগ করছেন, তার এক্সপেকটেশন অনুযায়ী সেও আমাকে বা আপনাকে আগেরবার ঠিক বুঝেছেন কিন্তু এখন তার এক্সপেক্টেসনের সাথে ক্যাল্কুলেসনে তারতম্যের কারনে আমরা বা আপ্নারা বদলে গেছি বা বদলে গেছেন এই চিন্তায় আমরা ভুল বুঝতেছি বলেই তাদের ডিডাক্সন তৈরী হচ্ছে।

কিন্তু যেটাই হোক, কে ভুল আর কে ঠিক, এই তর্ক, এই যুক্তি, এই ব্যাখ্যা করার সময় মানুষের হাতে খুব বেশি থাকে না। একটা সাব জেক্ট নিয়ে এতো গবেষণা করতে থাকলে, বাকী সাবজেক্ট এর জন্য তো সময় ই দেওয়া যাবে না। জীবনে সময় বড় সীমিত। হয় এডজাস্টমেন্ট করে বেচে যাবেন, নয় খপ্পর থেকে বেড়িয়ে যাবেন। দ্বিধার কোনো কারন থাকলে সবার প্রতিভা যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ক্ষতি হবে বিকাশের।

ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তে ভুল হলে যখনই মনে হবে এখনই সময় সিদ্ধান্ত পাল্টে জীবন সুন্দর করার, তাহলে “এখনি” সেটা। শুধু একটা জিনিষ মনে রাখা দরকার, ঈশ্বর সব ভুলের মধ্যে বড় সাফল্যের ফলাফল নির্ধারণ করেন। তিনি কারো সাথে মস্করা করেন না। তাঁর উপর ভরসা রাখুন। জয় আপনার। এটা দু পক্ষের জন্যই উপদেশ কারন, যার যার গন্ডি থেকে তাঁর তাঁর জন্য ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করেন। কেউ কারো সীমানা অতিক্রম করলেই এই বিপত্তি হবে। নদীর জলের মধ্যেও ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিঠা পানি এবং নোনা পানিও তাদের সীমা অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মিশার অনুমতি ঈশ্বর দেন নাই।

১০/০৮/২০১৭-সন্তান চেনা

কোথায় যেনো একবার পড়েছিলাম, ছেলেকে চেনা যায় যখন সে বিয়ে করে, মেয়েকে চেনা যায় যখন সে যুবতী হয়, বউকে চেনা যায় যখন স্বামী দরিদ্র অবস্থায় পতিত হন, আর স্বামীকে চেনা যায় বউ যখন গুরুতর অসুস্থ হন। আর সন্তানকে চেনা যায় যখন আপনি বৃদ্ধ হবেন। কিন্তু এই চেনা জানা করতে করতে আমাদের জীবনে আর সময় বেশি বাকি থাকে না। সৌভাগ্যের কাঠি নিয়ে যারা এই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহন করে, তাদের বেশীর ভাগ মাতাপিতাই ধনী গোত্রের, কিন্তু সুখি জীবনের অধিকারী মানুষ গুলি সচরাচর মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ গুলিই ভোগ করে। এর কারন, তারা একে অপরের জন্য দুঃখ, ভালবাসা, হাসি, কান্না, অপেক্ষা, যন্ত্রনা, আনন্দ সব কিছু ভাগ করে নেয়।

অনেক মানুষকে বলতে শুনেছি, জীবনতো একটাই। একটা মানুষের একের অধিক গাড়ি থাকতে পারে, একের অধিক বাড়ি থাকতে পারে, একের অধিক ব্যাংকে টাকা পয়সা থাকতে পারে, এমন কি একের অধিক জীবন সাথীও থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন তো একটাই। আনন্দ করুন, মন যা চায় তাই করুন, তারপর মরুন। আমার তখন জানতে ইচ্ছে করে, আনন্দ কোনটা? রাত জেগে জেগে টিভির পর্দায় একা একা নাটক, সিনেমা দেখাই কি আনন্দ? কিংবা ডিজিটালের যুগে সারাদিন ফেসবুক, চ্যাট, ইমু, গেমস, ভাইবার ইত্যাদি নিয়ে বসে থাকাই কি আনন্দ? কিংবা এসি রুমে মন খারাপ করে একা একা বসে থাকাই কি আনন্দ? কিংবা এসি গাড়িতে বসে দুরের কোনো পার্কে অপরিচিত কোন এক যুবক কিংবা যুবতীর জন্য ডেটিং করাই কি আনন্দ? অথবা আনন্দ কি এমন যে, সারাদিন হাসতে হাসতে সময় কাটানো? আর সেটাই যদি হয়, কতক্ষন? আনন্দ কি এটা যে, অন্যায় করে ভুল পথে অনেক টাকা রোজগার করা? কিংবা ব্যাংকে অনেক টাকা আছে, তো যখন তখন বিদেশে গিয়ে কোথাও লাঞ্চ, কিংবা কোথাও ডিনার, অথবা অন্য কোনো দেশে রাত যাপন করা? অথবা আনন্দ কি এইটা যে, গরীব মানুষদের সাথে, কিংবা নিজেদের থেকে একটু নীচের ক্লাসের পাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের সাথে না মিশে শুধুমাত্র দেখে দেখে বড় লোকদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করা? আনন্দ কি এটা যে, ঈশ্বরকে মানলাম না, বিজাতীয় কালচারে যা খুশি করা? আনন্দ কি এইটা যে, পরিবারের কোনো সদস্যদের সাথে কম্প্রোমাইজ আর এডজাস্টমেন্ট না করে শুধু নিজের যা খুসি ইচ্ছে মতো করা? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। আসলে আনন্দটা কি? কোনো কিছু আমার মনের মত হল না, আমি মানতে পারলাম না, আর আমি মানতেও চাই না, আমার যা মনে ধরবে সেটা করতে পারাই কি আনন্দ তাহলে? এ অদ্ভুত এক হিসাব।

আমার কাছে আনন্দে থাকাটা ঐ রকমের কিছু মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়, যখন কোন এক দুঃস্থ পরিবার লজ্জায় কারো কাছেই হাত পাততে পারে না অথচ তার সমস্যার অন্ত নাই, তখন আমার কোনো একটা হাসি, কোনো একটা হাত বারানর সাহাজ্য, কিংবা তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তার দুঃসময়ের একটু সাথি হতে পারার মধ্যে যে আনন্দ, সেটাই আনন্দ। কিংবা অসচ্ছল কিংবা টেনেটুনে কোনো রকমে নিজের সৎ রোজগারের মধ্যে সীমিত আয়ের মধ্যে সবাইকে নিয়ে ভাগাভাগি করে একটা পর্ব পালন করার যে আনন্দ, সেটাই আনন্দ। অথবা হেটে হেটে রোদে ঘেমে, কিংবা ভিজে ভিজে দুই হাতে বাজার নিয়ে আপন জনের জন্য কিছু বহন করে বাসায় গিয়ে সবাই মিলে এক সাথে আনন্দ করে খাওয়ার যে ত্রিপ্তি সেটাই আনন্দ।

মানুষ কেনো কষ্ট পায়? টাকার অভাবে মানুষ কষ্ট পায়? কিংবা অনেক সম্পদ নাই, এইজন্য কি মানুষ কষ্ট পায়? অথবা কষ্টটা কি এই জন্য যে, সে যার যা খুশি সে মোতাবেক মনের আনন্দে কিছুই করতে পারে না? অথবা এমনকি যে, ঈদে, জন্ম বার্ষিকীতে, বিবাহ অনুষ্ঠানে, অথবা বড় বর শপিং সেন্টারে গিয়ে অনেক অংকের বাজার সদাই না করতে পারায় মনে কষ্ট? আমার কাছে এই রকম মনে হয় না। যদি তাই হতো, তাহলে যারা বিশ্ববিখ্যাত ধনি, যাদের অনেক টাকা আছে, সম্পত্তি আছে, যাদের এইগুলি বাস্তবায়ন করতে কোন বেগ পেতে হয় না, তারা সবাই সব সময় খুশি এবং সুখিই হতো। কিন্তু তারাও তো অনেক কষ্টে থাকে। কখনো পারিবারিক কষ্টে, কখনো শারীরিক কষ্টে, কখনো মনে আনন্দ নাই এই কষ্টে।

০৫/০৮/২০১৭-একটা সময় আসে, যখন

একটা সময় আসে, যখন মানুষ একা থাকতে চায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ যখন একাকীত্বকে ভয় পায়। আবার একটা সময় আসে মানুষ বুঝতেই পারে না সেকি একা থাকতে চায় নাকি মানুষের ভীড়ে থাকতে চায়? মানুষ তখন থাকে খুব ঘোরের মধ্যে। ঘোরের মধ্যে থাকা অবস্থাটা একটা বিপদজনক। এটা পশুদের বেলায় হয় না। তাদের পেট ভরা তো সব কাহিনী শেষ। সে তখন কোনো এক নির্জন জঙ্গলে গাছের নীচে একাই ঘুমিয়ে যায় যতোক্ষন তার পেট আবার ক্ষুধার ইঙ্গিত না দেয়। তাদের কাছে কৃষ্ণচূড়ার পাতার রঙ অথবা গোলাপের গন্ধ অথবা মরা জীবের কোনো অসহ্য ঘ্রান কোনো কিছুই বদল করে না। শীত এলে তারা গুহা খোজে, আশ্রয় চায়। বর্ষায় ওরা ভিজে ভিজে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পায়েপায়ে অনেক দূর চলে যায়। কোথা থেকে এলো আর কোথায় গিয়ে থামবে, এটা নিয়ে ওদের কোনো মাথা ব্যথা নাই।

কিন্তু মানুষের বেলায়, সে সমাজ চায়, সে মানববসতি চায়। সে নদীর কুল চায়, চায় নদীর সাথে সাথে সভ্যতাও। এই সভ্যতার রেস ধরে মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসার কথা বলে। একজন আরেকজনের থেকে সুখি, আর খুসি হতে চায়। প্রতিযোগিতা বাড়ে। পছন্দ অপছন্দের হরেক পদের বং বাহারের যুক্তি তুলে কত যে নাটক, সিরিয়াল করে, তার কোনো ইয়ত্তা নাই। সুন্দর থেকে সুন্দরতমের তপস্যা চলে এই মানুষদের। আর এই তপস্যার অন্তরজালে কত কিছুই যে ব্যতিক্রম হয়, কেনো হয় কিভাবে হয় সে রহস্য সন্ধানেও আমরা বেশীরভাগ সময়ে ব্যর্থ হই। প্রতিযোগিতায় সুন্দুরী মেয়েরা সুখের ঘর হারায়, আবার সবচেয়ে অসুন্দর কোনো এক পঙ্গু মহিলা দিব্যি সুখে সংসার করে বেড়ায়। অশিক্ষিত কোনো এক মায়ের কোল ঘেঁষে দুনিয়া কাপানো সন্তানের জন্ম হয়, আবার সবচেয়ে পরিকল্পিত শিক্ষিত মায়ের কোলেই হয়ত বেড়ে উঠে সমাজের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটি। কেউ ভালোবাসে, অনেক সপ্নের ভিতর ডুব দিয়ে দিঘির জলের ভেসে বেড়ায়। কেউ কেউ আবার ঐ দিঘির জলের নীল চ্ছটায় কল্পনাকে ভাসিয়ে দিয়ে আকাশের নীলাভ মেঘ দেখে হয়ত ভাবে, কেউ কি তার জন্য অনেকদিন বাচতে চায়? কিংবা এমন কি কেউ আছে যে, তার সমস্তটা দিয়ে নিজের করে ভালোবাসে? সবুজ ক্ষেতের ধারে বসে কোন এক কল্পনায় কোনো এক অপরিচিত রাজপুত্রের সাক্ষাতে কত কথাই না বলাবলি করে। কিন্তু তা নিছক কল্পনার রাজ্যেই থেকে যায়। হয়ত কাউকে রাজপুত্র ভেবে মিথ্যা কোন প্ররোচনায় আবদ্ধ হয়ে সারাটি জীবন মিথ্যার মধ্যেই বসবাস করে। জানে, মনে কষ্ট, জানে হেরে গেছে, জানে এই পথ থেকে বেড়িয়ে যাবার আর কোনো রাস্তা নাই, তারপরেও জীবন তো, চলতেই থাকবে। কিন্তু কোথায় সে রাজপুত্র আর কোথায় গিয়ে এর শেষ? জোছনা রাতের চকচকে আকাশের তারার মেলায় পাখা মেলে ঝি ঝি পোকার মতো করে একগুচ্ছ ঝিনঝিন আওয়াজের মতো কতই না সঙ্গিত রচনা হয়ে আছে বুকের পাজরের মাঝে। যত্ন করে ধরে আছে ভালোবাসা। কিন্তু ঐ ভালোবাসা তো এক তরফা। যন্ত্রনা শুধু বাড়েই। ওটাই কি শেষ? এই মিথ্যা ভালোবাসায় কোনো অংশিদারিত্ত নাই, কম্প্রোমাইজ আছে কিন্তু এডজাস্টমেন্ট নেই, কান্না আছে অনুতাপের কিন্তু শান্তনা নাই, ব্যথা আছে কিন্তু বলার লোক নাই, এই ভালোবাসা শুধু খুসি রাখা আর কিছুই নাই। এখানে ভালোবাসার নির্ঘাত ভালোবাসার পচন ধরেছে। আর এই পচন শুরু হয়ছে অন্তর থেকে, তারপর শরীরে। আর যেদিন থেকে এই পচন শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই অস্থিত্তের পচন ধরেছে। এখন নিজের বাড়িতে, নিজের সমাজে, নিজের গন্ডিতে কেউ তার সাথে থাকতে চায় না। পরাজয় হয় সারা জীবনের।

যে ভালোবাসায় জিততে চায়, তাকে ভালোবাসা দিতে জানতে হবে। আর যে ঘৃণাকে জিয়িয়ে রাখতে চায়, তাকে সাফল্য এনে সেই জায়গায় যেতে হবে যেখানে তাকে স্পর্শ করার আর কারো ক্ষমতাও নাই। দুটুই কঠিন কাজ। কিন্তু এমনো কেউ আছে, যে ভালবাসল, সে হয়ত ভালবাসায় জিততেই পারলো না। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, সে ভালোবাসায় হেরে গেলো। হয়ত সে ভুল জায়গায় ভুল জিনিসের সন্ধান করেছে। আজ কোনো এক ভাগ্যের গুনে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা ফেরত যায়, কাল সে ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়েই হারে। অথচ এমনো মানুষ আছে, কখনোই ভালোবাসা কি জিনিস নিজেও জানে না কিন্তু নিজের অজান্তেই সে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এমন করে স্থান নিয়ে আছে যে, চারিদিকে ভালোবাসা শুধু মৌ মৌ করে বেড়ায়। এরা এক সময় সমাজ নিয়ন্ত্রন করে, এরা এক সময় সবাইকে নিয়ন্ত্রন করে। আর যখন এটা কেউ মানতে নারাজ হয়, তখন মনে হয়, ঐ যে একবার চুপি চুপি ভালোবাসা এসেছিলো, সেটাই ছিলো জীবনের সবচেয়ে সস্থির সময় যা দেমাগ আর অশালীন ব্যবহারে মানুষ দূরে ঠেলে দিয়েছে। অনুতাপের আর শেষ থাকে না তখন।

আসলে এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নাই। আবার সব কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। কেউ কবি হতে চায়, কেউ বৈজ্ঞানিক হতে চায়, কেউ অনেক ধনী হতে চায়, কেউ রাজনীতিক হতে চায়। আসলে এইগুলি ইচ্ছের উপর কিছুই নিরভর করে না। আবার এইগুলি যে ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না, তাও ঠিক নয়। কারন কোথাও না কোথাও এর একটা রদ বদলের পালা আছে। কোথাও না কোথাও এই যোগসূত্রের একটা টার্ন আছে। যা কিছুদুর পর্যন্ত দেখা যায়, আর বড় অংশটাই আমাদের নজরের মধ্যে নাই। সবচেয়ে ট্যালেন্টেড ছাত্রটি আজ হয়ত কোথাও কোনো এক বড় অফিসের কেরানীর চাকুরী করে। অথচ যে সময়ে তাকে ট্যালেন্টেড ভাবা হয়েছিলো, সেটার গতিপথ পাল্টে আরেক দিকে টার্ন নেওয়ার কারনেই আজ সে সাফল্যের যে চূরায় উঠার কথা ছিলো তার থেকে অনেক দূরে। আবার এমনো হতে পারে, ব্যাকবেঞ্চে বসে থাকা সবচেয়ে নিরীহ ছাত্রটি আজ বিসসের কাছে এতোটাই সমাদৃত যে, কোনো সুত্রই মিলছে না। এই সুত্রটাই মিলাতে হবে। কারন কোন কিছুই হতাত করে হয়ে উঠে না। প্রকৃতি তার ধর্ম কখনোই পাল্টায় না। সেই একইভাবে, যে বালকটি একদিন কবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ সবচেয়ে বড় সমাজসেবি, যে একদিন সমাজসেবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ কারো কারো জন্যে ত্রাস। যা ঘটে তা সময়ের বিবর্তনের পালাক্রমে কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই ঘটে। আজ যে রুপের কারনে আমি আপনি অহংকারী, মনে হয় পৃথিবী বুঝি আমার চরনতলে আছড়ে পড়লো। শত শত হিরো, শত শত সুশ্রী মানবীগন না জানি কতদিন কতরাত তাদের ঘুম হারাম করে রাত জেগে জেগে আমার কথা ভাবছে। এটা ভাবা সহজ। হয়ত এমনো হতে পারে, আমাদের এই আজকের দিনের সম্ভাব্য সবকিছু দেখেই কারো চোখ, কারো বুক, কারো লালসার অন্তরালে এমনই ভালবাসার জাল বানিয়ে অক্টোপাসের মতো ঘিড়ে ফেলেছে, যে, কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা ছলনা, বুঝাই দায়। যাকে তোমার আরধ্য, হয়তো দেখা যাবে তোমার চেয়েও অতি কুৎসিত কোনো রমনী তোমার আরধ্য কোনো পুরুষ তার শয্যাশায়ী। ব্যাপারটা হারজিতের নয়, ব্যাপারটা মতবাদেরও নয়, ব্যাপারটা অনেকাংশেই বৈষয়িক, আর কিছুটা তপ্ত বাসনা। ব্যাপারটা পছন্দেরও না অনেকাংশে । যে জামাটি আমি অপছন্দ করে দোকানে রেখে দিয়েছি, হয়তো ওই জামাটাই আরেকজন হন্যে হয়ে খুজছেন।

আজকে যে ট্রেনটায় আপনি উঠেছেন, সে ট্রেনের যে ব্যক্তিটি আপনার হাত ধরে তুলে নিলো, হয়ত সেই ছিলো আপনার সেই আরধ্য মানুষ। আপনি তাকে দেখেছেন কিন্তু হয়তো চিনতে পারেন নাই। কাল যখন আবার ট্রেনে উঠবেন, আপনি সেই ব্যাক্তিকে হয়ত আর কখনোই খুজে পাবেন না। সে অনেক দূর চলে গেছে।

৩/৮/২০১৭-সন্তান

পৃথিবীতে সকল সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক হচ্ছে সন্তানের সহিত বাবামায়ের। আবার কখনো কখনো এই সম্পর্কটাই সবচেয়ে বোরিং অথবা খুব বিপদজনক হয়ে যায়। বোরিং বা বিপদজনক হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে, তিলেতিলে গড়ে উঠা দিনের পর দিন এই সম্পর্কটা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, পিতামাতা না পারেন তার সন্তানকে বুঝতে না পারে সন্তান পিতামাতাকে বুঝতে। পিতামাতা কি চায়, আবার সন্তানও ঠিক কি করলে কি হবে সেটাও বুঝাতে পারে না। কিন্তু এটা ঠিক, এই অবস্থায় সন্তানরা তাদের প্রেক্ষাপট থেকে যেটা বুঝায়, তাতে অনেক ভয়ংকর এমন কিছু থাকে যা পিতামাতার সবধরনের আশঙ্কা শুধু বাড়তেই থাকে। তারা শিহরিত হন সমাজের মানুষগুলোর কাছে মাথা হেট হয়ে যাবে এই আশঙ্কায়, তারা অস্থির হয়ে যান সন্তানের অমঙ্গল হবে এই আশঙ্কায়, তারা ভাবনার চরম দুশ্চিন্তায় হামাগুড়ি দিয়ে শুধু ভাবতে থাকেন এই অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় কি ইত্যাদি।  

এমন একটা পরিস্থিতিতে মাতাপিতা থাকেন একটা মানসিক কস্টের মধ্যে। একদিকে আদর করে কথা বললেও সন্তানের মেজাজের কাছে হেরে যান, আবার শাসন করে কথা বললেতো ব্যাপারটা আরো সিরিয়াস দিকে টার্ন নিতে থাকে। সম্পর্কে একটা উত্তেজনা তৈরী হয়। ধৈর্যহারা পিতামাতা যেমন সন্তানের উপর থেকে তাদের আদর, মহব্বত, স্নেহ তুলে নিতে পারেন না, আবার সন্তানের উপরও ভরসা করতে পারেন না। আবার অন্যদিকে তারা না পারেন তাদের উপর পিতামাতার দায়িত্ব পালনে বিরত থাকতে। সন্তানের একগুয়েমী যখন চরমে উঠে, তখন পিতামাতা এক সময় হাল ছেড়ে দেন। সম্পর্কটা ধীরে ধীরে এমন জায়গায় গিয়ে দাড়ায় যা ক্রমাগত দূর থেকে দুরেই যেতে থাকে। 

যে সন্তানের জন্য পিতামাতা দিনের পর দিন অমানসিক, শারীরিক, দৈহিক সব ধরনের কষ্ট খুব হাসিমুখে সয্য করতে পেরেছেন, যে পিতামাতা নিজের আনন্দের জন্য কিছুই না রেখে সন্তানের জন্য সব অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন, বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সুন্দর সময়টা, সুন্দর ক্যারিয়ারটা। যে সন্তানের জন্য নিজে না খেয়ে, নিজের আহ্লাদ, স্বপ্ন কোনো কিছুই পূর্ণ না করে জমিয়ে রেখেছেন নিরাপদ সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, যখন এই পিতামাতাই দেখেন তার সন্তানেরা তাদের জন্য একবিন্দু পরিমান মহব্বত, ভালোবাসা তাদের অন্তরের মধ্যে নাই, তাদের কথাবার্তায় এমন কিছু ফুটে উঠে যা ভয়ঙ্করের চেয়ে আরো কষ্টের, তখন মনে হয় জীবন পরাজয় বরন করেছে। তখন পিছনের সব কষ্ট, ত্যাগ, আহ্লাদ, অপূর্ণ ইচ্ছেগুলি একসাথে চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়ে শুধু বলতে থাকে, তোমরা কোনো ইতিহাস থেকেই শিক্ষা গ্রহন করো না। তোমরা এই শিক্ষাটা ভুলে গেছো যে, মানুষ একা এই পৃথিবীতে এসেছে, এবং তাকে একা চলার জন্যই ঈশ্বর সেইভাবে গড়ে তোলছেন। তোমাদের এতো কিছুর ত্যাগের কোনো প্রয়োজন ছিলো না। গোস্যা হয় তখন নিজের কাছে, বুকের কোথায় যেনো চিনচিন করে ব্যথা হয় তখন। চোখ ভিজে আসে। কিন্তু কারো উপর রাগ হয় না, রাগ হয় শুধু নিজের উপর। কোথায় যেনো একবার পড়েছিলাম, ছেলেকে চেনা যায় যখন সে বিয়ে করে, মেয়েকে চেনা যায় যখন সে যুবতী হয়, বউকে চেনা যায় যখন স্বামী দরিদ্র অবস্থায় পতিত হন, আর স্বামীকে চেনা যায় বউ যখন গুরুতর অসুস্থ হন। আর সন্তানকে চেনা যায় যখন বাবা মা বৃদ্ধ হবেন। কিন্তু এই চেনা জানা করতে করতে আমাদের জীবনে আর সময় বেশি বাকি থাকে না। এই ধরনের একটা পরিস্থিতি প্রতিটি মানুষের জীবনে হয়ত কখনো কখনো আসেই। এটা একটা চক্রের মতো। কারন, দশ বছর বয়সী কোনো সন্তানকে যদি জিজ্ঞেস করেন, সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি কে? সে বলবে, মা বাবা। যখন তার বয়স চৌদ্দ, সেই বাবা মাই তার কাছে খুব বিরক্তিকর মনে হয়। যখন তার বয়স আঠারো, সে আর বাসার পরিবেশটাকেই আর সহ্য করতে পারেনা, বেরিয়ে যেতে চায়, স্বাধীন জীবনের আশায়। বয়স যখন পচিশ, তখন সে বুঝতে পারে, হয়ত বাবা মাই ঠিক ছিল। ত্রিশ বছর বয়সে এসে অন্তরে এইটা ধীরে ধীরে প্রোথিত হতে থাকে, আহা, আমার ভুলের জন্য যদি বাবা মাকে সরি বলতে পারতাম। পঞ্চাশ বছর বয়সে, বাবা মাকে হারাতে খুব ভয় করে সন্তানের। সত্তর বছর বয়সে এসে বাবা মাকে খুব মিস করে এই সন্তানেরা। কিন্তু তখন আর তারা কেহই এই পৃথিবীতে বেচে নেই। সন্তানের বয়স যতই হোকনা কেনো, কখনো কখনো মনে হয়, বাবা মাকে খুব প্রয়োজন। এটা শতবছর বয়সী কোনো সন্তানের জন্যও প্রযোজ্য। সন্তান বুড়ো হয়ে গেলেও সে বাবা মায়ের কাছে শিশুই থেকে যায়। একমাত্র সন্তানই বুঝতে পারে মায়ের অন্তরের ভিতরে তার অন্তর কিভাবে প্রতিক্রিয়া করে। কারন সে সেখানে অনেক গুলি সময় অতিবাহিত করেছে। জীবনে একটা সময় আসে যখন সন্তানেরা বাবা মায়ের উপদেশকে আর বেদবাক্য মনে করে না বরং বাবা মাই হয়ে যান তাদের জীবনের আদর্শ। সেই সময় অবধি তখন আর বাবা মা তাদের পাশে বেচে নেই।   

মাঝে মাঝে ঐ কথাটা মনে পড়ে যে, সন্তানদেরকে ধনী হবার জন্য কোনো শিক্ষা দিতে নাই, সন্তানদেরকে শিক্ষা দেওয়া দরকার তারা যেনো বুঝে কোনটায় সুখি হওয়া যায়। আমরা এখানেই যেনো বারবার ভুল করি। আমরা সন্তানকে একাধারে কিভাবে ধনী হয়ে নিরাপদ জীবন পায় সেটাও দেখি আবার এটা দেখতে গিয়ে কিভাবে সুখি হওয়া যায় এই বিসয়টা অনেকাংশেই অবহেলা করি। আমাদের উচিত সন্তানদেরকে তাদের চেলেঞ্জগুলোকে মুখোমুখি হতে দেওয়া, তাদেরকে কোনো চেলেঞ্জ থেকে বের করে আনা কোনো মাতাপিতারই সঠিক সিদ্ধান্ত হয়ত নয়। পিতামাতারা তখনই নিজেদেরকে ধন্য মনে করবেন যখন তাদের হাত খালি থাকা সত্তেও তাদের সন্তানেরা দৌড়ে এসে তাদের বুকের মধ্যে আছড়ে পড়বে। এর থেকে আর কি ভালো হতে পারে কোনো পিতামাতার জন্য?  

একজন মা সন্তান জন্ম দেওয়ার বহু আগেই তার সন্তান আসুক এই প্রত্যাশায় বুকভরে শ্বাস নেয়। আর যখন সে পেটে আসে, তখন থেকেই একজন নারী মা হয়ে যান আর ঐ মুহূর্ত থেকেই সে তার অনাগত সন্তানের প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকেন। আর সন্তান জন্ম নেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে সেই মা তার সন্তানের জন্য মরতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। আর এটাই হচ্ছে মা যিনি নয় মাস সন্তানকে পেটে ধরেছেন, তিন বছর তাকে তার বাহুতে রেখেছেন আর সারাজীবন তার অন্তরের ভিতরেই রাখেন। একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মা পৃথিবীর যে কোন গোয়েন্দা সংস্থার থেকেও সাফল্যবান কারন তিনি যা করেন সবটুকু কোনো শর্ত ছারাই তার সন্তানের জন্য করেন। তাতে কোনো খাদ নাই। যেদিন কোল ঘেসে সন্তান আসে, তখন তার নতুন আরেক নাম হয়। তার নাম হয় “মা”। মা ই একমাত্র মানুষ যে, সন্তানের কোনো না বলা কথা বলার আগেই বুঝে নেয়। একটা কৌতুক পড়েছিলাম, মায়েরা সবসময় চান, তার আদরের মেয়ে যেন তার থেকে ভালো স্বামী পায়, আর ছেলের বেলায় মা মনে করেন, ছেলে যেনো তার মতো একজন বউ পায়। এটা কৌতুক শুনালেও এর মাহাত্য একটাই, মা সব সময় সন্তানের সবচেয়ে মঙ্গলটাই চান। আমি বাবাকে উপেক্ষা করছি না। বাবা অন্যরকম এক চরিত্র। প্রতিটি বাবার কাছে তার মেয়েরা একজন প্রিন্সেস, আর ছেলে সন্তানেরা একেকজন প্রিন্স। একজন মেয়ে হয়ত তার জীবনে প্রিন্সেস পাবে কিন্তু বাবা আজীবন কাল তার কাছে রাজা হিসাবেই থাকেন। বাবা হচ্ছেন সন্তানের কাছে সেই ব্যাক্তি যার সুত্র ধরে অন্য কোন পুরুসকে মেয়ে বুঝতে পারে কতটা তফাত বা উন্নত। ছেলে সন্তানের কাছে বাবা হচ্ছেন একজন হিরো, আর মেয়ের কাছে প্রথম ভালোবাসা। আর এটাই হচ্ছে বাবা। একটা সময় হয়ত আসবে যখন “আয় তো মা, কাছে বস”, এই কথাটা শুনার জন্যও মন ব্যাকুল হয়ে কোনো কারন ছাড়াই চোখ বিনা দিধায় অশ্রু বিসর্জন দিবে। “লাভ এট ফার্স্ট সাইট” এই আদর্শ বানীটি একমাত্র প্রযোজ্য শুধুমাত্র বাবা মায়ের আর সন্তানের ক্ষেত্রে। পঙ্গু, কালো, নাক বোচা, বেটে বোবা যেমনই হোক না কেনো, বাবা মা ই একমাত্র ব্যক্তিত্ত যারা সন্তানের আগমনে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে। সন্তান জন্ম দেওয়া পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ, বাবা মা হওয়াও খুব সহজ কিন্তু সেই বাবা মা হওয়া খুব কঠিন যা সন্তানের জন্য প্রয়োজন। আজ হয়ত আমাদের সন্তানেরা এই ভালোবাসা উপলব্ধি করবে না, কিন্তু যখন করবে, তখন তারা ইতিমধ্যে পিতামাতা। প্রতিটি সাফল্যবান সন্তানের পিছনে আছেন প্রথমে তার মা, পরেরজন তার বাবা। আমাকে কোনো সন্তান যদি কখনো প্রশ্ন করত, কি করে আমি খুব ভাল একজন সন্তান হবো? আমি হয়ত বলতাম, এই প্রশ্নটা তুমি তোমার দাদা-দাদি অথবা নানা নানিকে করো। হয়ত তারা এই প্রশ্নের উত্তর আমার থেকে ভালো দিতে পারবেন।  

লেখাটা একটা কৌতুক দিয়ে শেষ করিঃ 

মা যখন রান্না ঘরে রাতের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত, এমন সময় তার ছোটছেলে এসে তাকে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিলো। তাতে লেখা ছিলোঃ

গতকাল বাগানে ঘাস কাটার জন্য পাওনা – ৫ টাকা

আমার রুম পরিস্কার করার জন্য পাওনা – ১ টাকা

পাশের দোকান থেকে মায়ের আদেশে ডিম কিনে আনার জন্য পাওনা – ১ টাকা

আমার ছোট বোনকে ১ ঘন্টার জন্য একা বাসায় পাহারা দেওয়ার জন্য পাওনা – ৫ টাকা

ময়লাওয়ালাকে ময়লা তুলে দেওয়ার জন্য পাওনা  – ২ টাকা

স্কুলে ভালো মার্ক শীট পাওয়ার জন্য পাওনা  – ৫ টাকা

টেবিল চেয়ার মুছে দেওয়ার জন্য পাওনা  – ২ টাকা

সর্বমোট ২১ টাকা 

মা চিড়কুটটি পড়ে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন এবং হাতমুছে একটা কলম নিয়ে লিখলেন 

৯ মাস গর্ভে ধারন করার জন্য – নো চার্জ (ফ্রি)

সারারাত তোমার জর আর কাশির জন্য একা একা যখন জেগে থাকা – নো চার্জ (ফ্রি)

খাবার বানানো- নো চার্জ (ফ্রি)

খেলনা কিনে দেওয়া- নো চার্জ (ফ্রি)                                  

নাক পরিস্কার করা, গোসল করান, পায়খানা প্রশ্রাব পরিস্কার করা ইত্যাদি- নো চার্জ (ফ্রি)

বিছানা ভিজিয়ে দেওয়ায় সারারাত নিজে ভিজা জায়গায় শুয়ে তোমাকে শুকনা জায়গায় রাখা  – নো চার্জ (ফ্রি)

এ ছাড়া আমার ভালোবাসা – নো চার্জ (ফ্রি) 

এই লিখে মা তার ছোট ছেলেটির হাতে চিড়কুটটি দিলেন। ছোট ছেলেটি যখন এই চিরকুটটি পড়ছিলো, তখন তার গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিলো। সে নিসচুপ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে একবার ভাষাহীন চোখে সরাসরি মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু এটাই বলতে পারলঃ 

মা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। 

এরপর সে একটা কলম নিয়ে চিড়কুটিতে লিখলোঃ  

পেইড ইন ফুল

১৩/০৭/২০১৭-পাওলো কোয়েলহো তার বিখ্যাত why do we shout in anger?  

ব্রাজিলের বিখ্যাত এবং বেস্টসেলার লেখক পাওলো কোয়েলহো তার বিখ্যাত why do we shout in anger? একটি লেখায় লিখেছিলেন, আমরা যখন রাগ করি, তখন এতো কাছাকাছি দুরুত্তে দাঁড়িয়ে থেকেও চেচিয়ে কথা বলি কেনো? তার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় তিনি একটা ব্যাখ্যা দাড় করিয়েছিলেন যদিও ব্যাপারটায় শারীরিক অনেক হরমুনাল ব্যাপার স্যাপার থাকতে পারে। আর ওইটাই সম্ভবত অনেকটা বৈজ্ঞানিক কারন কেনো আমরা উত্তেজিত হলে কেউ কাছাকাছি থাকলেও আমরা চেচিয়ে কথা বলি। কিন্তু লেখক আরেকটি যুক্তি দাড় করিয়েছেন, সেটাও খুব অযৌক্তিক বলে ফেলা যাবে না। 

“দুটো মানুষ যখন একে অপরের উপর রেগে যায় তখন তারা একে অন্যের অন্তর থেকে দূরে সরে যায়। এই রাগ তাদের অন্তরের মাঝেও দুরত্ব সৃষ্টি করে। সেই দুরত্ব একটু একটু করে যত বাড়তে থাকে ততই তাদের রাগ বা ক্রোধ বেড়ে যায় এবং তখন তাদেরকে আরও চিৎকার করতে হয়, আরও জোরে তর্ক করতে হয়।”

-“আবার যদি আমরা ভেবে দেখি, দুজন মানুষ যখন একে অন্যের প্রেমে পড়ে বা ভালোবাসে তখন কী হয়? তখন ভালোবাসার বন্ধনে থাকা মানুষ দুজন একে অন্যের সাথে ধীরে ধীরে নরম স্বরে, আবেগ নিয়ে কথা বলে। কারণ যারা ভালোবাসে তারা একে অন্যের অন্তরের খুব কাছে থাকে। আর যারা অন্তরের কাছে থাকে তাদের কথা শুনতে হলে চিৎকার করার কোন প্রয়োজন পড়ে না। এমনকি শুধুমাত্র ফিস্ ফিস্ করেও তারা তখন কথা বলতে পারে।”

“যারা আরও বেশি গভীরভাবে একে অন্যকে অনুভব করতে পারে, ভালোবাসতে পারে তখন কী হয় তা কি আমরা জানি?”-“অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার হলো, তাদের তখন ফিস্ ফিস্ করেও কথা বলতে হয় না। তারা দুজন যখন একে অন্যের চোখের দিকে তাকায় তখনই অন্তরের অনুভূতি, কথা, শব্দমালা সব অনুভব করে ফেলতে পারে। কারণ তখন তাদের অন্তর তাদের কে এক করে ফেলে। তাদের কথা হয় তখন অন্তরে অন্তরে।” 

২৭/০৬/২০১৭-বিংশ শতাব্দির চেহাড়া

এই বিংশ শতাব্দির আইটির দ্বারপ্রান্তে বসে যখন আমরা ডিজিটাল পৃথিবীর কথা বলছি, তখন আসলে আমরা এই ডিজিটাল বিশ্ব বলতে কি বুঝতেছি সেটা কি আদৌ কেউ সঠিকভাবে উপলব্দি করতে পারছি? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যানে যা মনে হয় তা হচ্ছে, এই পৃথিবী আইটির বদৌলতে অনেক এগিয়ে যাবে ঠিকই কিন্তু মানুষকে সেই আগের দিনের অনেক সিস্টেমে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আগেরদিন বলতে আমি বলতে চাচ্ছি, ঠিক ঐ আগের দিনের কৃষকের চরিত্রে। (আমি এই কৃষক চরিত্রটি বলছি রূপক অর্থে প্রোডাকসন ইউনিটের মালিক হিসাবে)। সম্ভবত সমাজ ঐ দিকেই ধাবিত হচ্ছে। এবং বর্তমান আইটি সেটাই সংকেত দিচ্ছে।

ব্যাপারটা একটা উদাহরন দিয়ে যদি আরো খোলাসা করে বলি।

ব্যাপারটা এইরকম যে, আগেকার দিনে একজন কৃষক তার জমিতে সব ধরনের ফসল ফলিয়ে তাদের অধীনে কর্মরত কিছু লোকবল দিয়ে সরাসসি তার প্রোডাক্ট মার্কেটে অন্য ভোক্তার কাছে বিক্রি করতো। ফলে এই প্রোডাকসন ইউনিট (অর্থাৎ কৃষক আর ভোক্তাবর্গ সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, কিছু কিছু মধ্যসত্ত্ব দালাল হয়ত এর মাঝে কাজ করেছে কিন্তু সেটা হয়ত একধাপ বা সর্বচ্চ দুইধাপ। অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যসত্ত দালালী একেবারেই থাকতো না।) এর ফলে কি হয়েছে যে, কৃষক তার আইটেমের ন্যায্য মুল্যের কিছুটা বেশি হলেই ভোক্তার কাছে সরাসরি তুলে দিতে পারতেন। যদি মধ্যসত্ত্ব দালাল যোগ হতোও, তাহলে ভোক্তাকে কিছুটা হলেও বেশি দাম দিতে হতো কিন্তু সেটা সহনীয় পর্যায়েই ছিলো। কিন্তু যখন দালাল, মধ্যসত্ত্বভোগী কিছু সিন্ডিকেট এর মাঝে জড়িয়ে পরলো, ধাপে ধাপে পন্যের মুল্যও বাড়তে থাকলো এবং যত বেশি মধ্যসত্ত্ব দালাল, কিংবা যতো বেশি ইন্টারমিডিয়ারী কর্মচারী এই কৃষক আর ভোক্তার মাঝে যোগ হতে থাকলো, প্রতিটি আইটেমের মুল্য ক্রমেই বেড়ে চললো। আর ভোক্তাও বেশি চড়া দামে তা কিনতে বাধ্য হলো। এইসব সিন্ডিকেটের ফলে কোথাও মজুত এবং তারপরে চড়া দাম ভোক্তাকে গুনতে হলো। এর ফাকে আবার কোথাও কর্পোরেট অফিস স্থাপিত হলো যেখানে পন্যের মুল্য কোনো না কোনোভাবে বাড়ানোর পায়তাড়া শুরু হলো। কর্পোরেট অফিসের কারনে কেনো পন্যের দাম আরো বেড়ে গেলো? কারন কর্পোরেট অফিসের স্টাফদের পোষা অনেক খরচ। আর এই খরচতো ঐ ভোক্তাদের কাছ থেকেই আদায় হয়। কোনো কিছুতেই এই সব জাল, সিন্ডিকেট, গ্রুপ, কর্পোরেট কনসেপ্ট থামানো যাচ্ছিলো না। এখনো না।

কর্পোরেট অফিসগুলি কিভাবে কাজ করে? তারা অতি এক্সপার্ট কিছু জানেওয়ালা স্টাফ নিয়োগ করেন ধাপে ধাপে বা স্তরে স্তরে। একজনের থেকে আরেকজন, আরেকজনের থেকে আরেকজনের ধাপ। শ্রমিককে কন্ট্রোল করার জন্য ম্যানেজার, ম্যানেজারকে কন্ট্রোল করার জন্য এজিএম, এজিএমকে কন্ট্রোল করার জন্য ডিজিএম, ডিজিএম এর উপর আবার ইডি, ইডির উপরে ডিএমডি, এছাড়া তো কমারশিয়াল, মার্কেটিং, হিউম্যান রিসোর্স, কমপ্লায়েন্স, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি আছেই। ফলে প্রতিটি ধাপের স্টাফদের ভরন পোষণ তো ঐ পন্যের মুল্য থেকেই আসে। ভোক্তা যখন পন্যটি হাতে পান তখন কৃষকের উদপাদন মুল্য কিংবা তার দ্বারা বিক্রিত মুল্যের অনেক বেশি পরিশোধ করতে হয় ভোক্তাকে। আমের বাগান থেকে শুরু করে কসমেটিক্স সব কিছুতেই এখন কর্পোরেট ফর্মুলা চালু রয়েছে। কোনো সরকারপ্রধান ইচ্ছে করলেও এই পুরু সিন্ডিকেটটিকে চাপের মধ্যে রাখতে পারছেন না। দামও কমাতে পারছেন না। 

কিন্তু আইটির জগতে এই কাজটি একেবারে সহজভাবেই সমাধান হচ্ছে বলে আমার ধারনা। আর এই আইটি এই সিন্ডিকেটটিকে হাত কড়া পড়িয়ে তাদের একচ্ছত্র মনোপলি ব্যবসা থেকে বের করে দিতে পারছে বলে আমার ধারনা। যদিও ব্যাপারটা ঘটছে খুব ধিরে ধিরে কিন্তু প্রতিনিয়তই ঘটছে। এক সময় এটাই হবে সিস্টেম।

বর্তমানে আইটির কারনে এই প্রোডাকসন ইউনিটের মালিকগন সরাসরি ভোক্তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন যেটা এর আগে সম্ভব হচ্ছিলো না। মজার ব্যাপার হলো, যখনই প্রোডাকসন ইউনিটের মালিকগন সরাসরি ভোক্তার সাথে যোগাযোগ হয়, তখন প্রতিটি পন্যের মুল্য অবধারিত ভাবে কমে যায়। সেটা কিভাবে, আমি আরো সাধারন উদাহরন দিয়ে ব্যাপারটা বলি।

একটা সময় ছিলো(ছিলো বলছি কেনো, এখনো আছে),  আমাদের সমাজে ট্যাক্সি ক্যাব চালানোর জন্য অনেক অনেক এজেন্ট নিয়োগ থাকতো যারা মানুষের ব্যবহারের জন্য ট্যাক্সি ক্যাবের ব্যবসা করতো। ভোক্তা একটি গাড়ী ভাড়া করবেন, তো প্রথমে ট্যাক্সি ক্যাবের এজেন্টের কাছে তাদের ডিম্যান্ড প্লেস করবেন। এজেন্ট কিছু গাড়িওয়ালাদেরকে একত্রি করে একটা এসোসিয়েসন করবেন, সেই এসোসিয়েসনের লোকেরা আবার তাদের দ্বারা নিয়োজিত কিছু কর্মচারী নিয়োগ দেবেন ইত্যাদি। ফলে যার ট্যাক্সি, তিনি যা পাবেন, তার থেকে আরো বেশি হয়তো পাবেন এই মধ্যসত্ত্ব দালা বাহিনি বা এজেন্টগন। কিন্তু পরিশেষে কিন্তু এই সার্ভিসের পুরু মুল্যটা জোগান দিচ্ছে ভোক্তা নিজে। কিন্তু এই আইটির যুগে এসে “ঊবার” একেবারে অনলাইনে এইসব ট্যাক্সি ক্যাবের কন্সেপ্ট বা ব্যবসায় নিদারুন ধশ নামিয়ে দিলো। উবার হচ্ছে আইটির বদৌলতে একটি অন লাইন ট্রান্সপোর্ট সরবরাহকারী সিস্টেম। উবারের মালিক নিজেও জানেন না কে বা কারা এই সব গাড়ির মালিক। কিন্তু তারা এক্তি সিস্টেম। পুরুটাই অনলাইন ভিত্তক। যারা উবার সম্পর্কে জানেন, তারা আজকাল আর কোন ট্যাক্সি ক্যাবের জন্য কোন ভোক্তা এজেন্ট খোজ করার চেষ্টা করছেন না। শুধু ঊবারের নাম্বারটা থাকলেই হলো। গাড়ীওয়ালা আর ব্যবহারকারী সরাসরি যোগাযোগ। মাঝখানে অনেক এজেন্ট না থাকায়, অনেক স্টাফ নিয়োজিত না থাকায় শুধুমাত্র ঊবার এর তৈরী একটা আইটি ভিত্তিক সিস্টেমের কারনে ভোক্তা সল্প একটা পারসেন্টেজ উবারকে দিয়ে অনেক সহজে এবং তাড়াতারি আগের থেকে অনেক কমমুল্যে গাড়ির প্রয়োজনীয়তা মিটিয়ে ফেলতে পারছেন। তাহলে এতো ঘটা করে শতশত স্টাফ নিয়োগ করে ট্যাক্সি ক্যাবের এজেন্টগুলি ব্যবসা চালাবে কেনো? ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ওইসব ট্যাক্সি ক্যাবের ব্যবসা। উবারের কারনে আজকাল সবাই যারা ট্যাক্সি চালান, সবাই ট্যাকিক্যব এজেন্ট।

আরো একটা উদাহরন দেই, আজকাল অনলাইন মার্কেটিং চালু হওয়াতে অনেক মানুষ আর দোকানে গিয়ে পিজা হাটের পিজাই হোক আর ঈদের জামাকাপর, কোরবানীর গরু মহিষ, কিংবা ব্রান্ডের গাড়ি, অথবা নিত্য নৈমিত্তিক বাজার সদাইও কিনতে যান না। অনলাইনে অর্ডার দিচ্ছেন, দোকানদার গুটি কতক নিম্নবেতনের কর্মচারী দ্বারা তা ক্রেতার বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে যেমন সময় বাচে, পরিশ্রম বাঁচে, বাঁচে মাঝখানের দালালীর খরচ। এতে দুই পক্ষেরই লাভ। আর লাভ বেশি ব্যবহারকারীর।

এখানে আরো একটা মজার ব্যাপার ঘটছে অহরহ। আগে মানুষের চাহিদা ছিলো এক রকম। এখন চাহিদা অন্যরকম। গাড়ীটা পুরানো হয়ে গেছে? তো নতুন মডেলের আরেকটা গাড়ি কিনার শখ। একটা জামা ছয় মাস পড়েছেন? তো আরেকটি জামা না হলেই নয়। ফলে কোয়ালিটির পাশাপাশি পরিবর্তনের চাহিদাটাও বেড়েছে। একটি পন্য বেশীদিন ভোক্তা ব্যবহারও করতে চান না। তিনি চান নতুনত্ব। তাই ভোক্তা চান, কমমুল্যে ভালো একটা পন্য। আগে একটি পন্যের দাম নির্ধারণ হতো এর প্রোডাকশন খরচের সাথে মালিকের কিছু লাভের পারসেন্টেজের যোগে। এইসব সিন্ডিকেট, কর্পোরেট সিস্টেমের কারনে প্রতিটি ধাপেই লাভ এবং খরচ যোগ হয়, ফলে কয়েক দফায় যেমন খরচ বাড়ে, তেমনি কয়েক দফায় লাভের হারও বাড়ে। ফলে বর্তমানে এই প্রক্রিয়ায় প্রোডাকসন খরচের উপর লভ্যাংশ ধরে এবং মধ্যসত্ত্ব দালাল, কর্পোরেট সিস্টেম ইত্যাদির বাড়তি খরচ যোগান দিতে গিয়ে কোনো পন্যের মুল্য নির্ধারণ অনেকাংশে খুব সহজ মনে হচ্ছে না বরং রিস্কের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। ফলে, বর্তমানে সরবরাহকারীগনও ক্রেতার পন্য ক্রয়ের ক্রয়ক্ষমতা এবং চাহিদার উপর মুল্য নির্ধারণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিভাবে? একদিকে কর্পোরেট সিস্টেমে দাম কমানো যাচ্ছে না তাদের ওভারহেড খরচ বেড়ে যাওয়াতে, আবার অন্যদিকে কোথাও কোথাও ভোক্তা এবং ক্রেতা সরাসরি সমন্নয় হবার কারনে একই পন্যের মুল্যে বেশ তারতম্য দেখা দিচ্ছে। যেখানে পন্যের মুল্য কম, ভোক্তা সেখানেই ঝোঁকে যাচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, যে পন্যটি বাংলাদেশের এক দোকানদার ভারত থেকে কিনে এনে এদেশের ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেন, তখন তার মুল্য বেড়ে দাড়ায় প্রায় তিন থেকে চার গুন। ভোক্তা যখন তার হিসাব কিতাব করে দেখেন যে, যদি ভোক্তা নিজেই ভারতে গিয়ে পন্যটি কিনেন তাহলে তার যাতায়ত ভাড়া, থাকা খাওয়ার সব খরচ বাদ দিয়েও লাভে থাকেন। তাহলে কেনো ভোক্তা এদেশে বসে এদেশের বিক্রেতার কাছ থেকে বেশি দামে পন্যটি কিনবেন? তিনি নিজেই পাড়ি দিবেন ভারতে। অথবা এই আইটির বদৌলতে যদি তথ্যটি ভোক্তা পান এবং অনলাইনে পন্যটি হাতে পাবার সুযোগ পান, তাহলে তো আর শারীরিক কষ্টও করতে হবে না। সরাসরি নিজের ঘরে পৌঁছে যাবে তার পন্যটি। যার ফলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের বিক্রেতা তার পন্যের মুল্য আগের তুলনায় কমাতে বাধ্য হবেন। কিন্তু কিভাবে কমাবেন? বিক্রেতা দাম কমানোর জন্যে মাঝখানের যেসব স্টাফ, দালাল, কিংবা ওই যে এক্সপার্ট লোকবলের ব্যয়ভার, সেখানে তিনি হাত দিবেন। আর যখনই ওখানে হাত দিবেন, সরাসরি কিছু ইন্টারমিডিয়ারী লোকবল, স্টাফের চাকুরী যাবে। তিনি পর্যায়ক্রমে ধাপ কমিয়ে দিবেন। দুইটা অফিসের জায়গায় যদি একটা অফিস দিয়েই ব্যবসা কিংবা অফিস চালানো যায়, কিংবা দশজনের জায়গায় যদি পাঁচজন দিয়ে কাজ চালানো যায়, কিংবা জোনাল অফিস, এরিয়া অফিস ইত্যাদি বাদ দিয়েও যদি খরচ কমানো যায়, তিনি তাই করবেন। কারন পন্যের দাম কমাতেই হবে। তাহলে এখানে প্রশ্ন আসে, এইসব ইন্টারমিডিয়ারী লোকবল ছাটাইয়ের কিংবা সেটআপ কমানোর ফলে শতভাগ কাজ চলবে কিভাবে? তাহলে কি এক্সপার্টদের আর প্রয়োজন নাই? না, এক্সপার্টদের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। এর বিকল্প হিসাবে হয়ত দেখা যাবে একজন অতি গুরুত্তপূর্ণ এক্সপার্ট দিয়েই অনেকগুলি কর্পোরেট অফিস চলবে। অথবা হয়তো এই এক্সপার্ট লোকজন ফ্রি ল্যান্স হিসাবে কাজ করবেন সাব কন্ট্রাক্ট হিসাবে অনেক গুলি লোকের জন্য এক সাথে। আর এদের সংখ্যা খুব বেশি হবে না। ফলে বর্তমানে নিয়োগকৃত নিজস্ব এক্সপার্টের আর প্রয়োজন রাখার যুক্তিযুক্ত মনে করবেন না কর্পোরেট অফিসগুলি।

এখানে আরো একটা উদাহরন দেই ব্যাপারটা সহজ করে বুঝানর জন্য।

একটা সময় হয়ত খুব বেশি দেরী নাই যখন মানুষজন আর মোবাইল ফোনের কোম্পানী গুলিকেও টাকা দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন না। কারন যে হারে ভাইবার, হোয়াটস আপ, স্কাইপ কিংবা অন্যান্য সোস্যাল মিডিয়া চালু হয়েছে এবং হচ্ছে সারা বিশ্বব্যাপি, তাতে আর মোবাইল ফোন অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন পড়বে না। যে কাজটি আমি ভাইবার দিয়ে, স্কাইপ দিয়ে, কিংবা ফেসবুকের সিস্টেম দিয়ে অথবা হোয়াটস আপ দিয়ে সমাধা করতে পারছি, কেনো আমি অযথা মোবাইল ফোনে টাকা খরচ করে সেই একই কাজটি করবো? কে তখন আর ইন্টারনেট কিনবেন, কিংবা মোবাইল ব্যালান্স কিনবেন, যেখানে একটা এমএমএস দিয়েই ভাইবার কিংবা হোয়াটস আপ কিংবা স্কাইপ দিয়ে সেই একই কাজটি করতে পারে! আপাতদৃষ্টিতে কিন্তু এর প্রভাব ইতিমধ্যে মোবাইল কোম্পানিগুলিতে পড়তে শুরু করেছে। একটার পর একটা মোবাইল কোম্পানি তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন, অথবা কয়েকটি মোবাইল কোম্পানি মিলে একসাথে মিলিত হয়ে, যুগ্ম এক্সপার্ট নিয়োগ করে তাদের ব্যবসায় অনেক স্তরের কর্মচারী ছাটাই করছেন বা গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের ব্যবস্থা করে লোকবল কমিয়ে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াবে যে, গ্রামীনফোনের এক্সপার্ট দিয়েই কম্বাইন্ডলি রবি মোবাইল চলবে, কিংবা একজন এক্সপার্টই দুই কোম্পানীর জন্য ফ্রিল্যান্সার হিসাবে কাজ করবেন। তখন আর ইন্টারমিডিয়ারী স্টাফ, ইঞ্জিনিয়ার, এডমিন কিংবা সিস্টেম ম্যানেজারের কোনো পদও থাকবে না। ফলে কর্পোরেট ইউনিটের মাঝখানের অধিকাংশ ইন্টেলেকচুয়ালস, বা এক্সপার্ট বর্গবৃন্দের সংখ্যাটা অনেক অংশে হ্রাস পাবে। কস্টিং মুল্য অনেক কমে যাবে। আজ যারা এসি রুমে বসে বুয়েট পাশ করে, কিংবা বিদেশী ডিগ্রী নিয়ে সাহেব হয়ে নামীদামী অফিসগুলোতে টাই পড়ে হাতের ইশারায় কিংবা নাক উচু করে পায়ের উপর পা তুলে কাজ করছেন, তখন ছাটাই করা এইসব লোকগুলি কোথায় যাবে? তারা তো আর কৃষকের মতো হাটে ঘাটে, এসি বিহীন রুমে কাজ করতে অভ্যস্থ নন। কিংবা তিনি যেই বিষয়ে ডিগ্রী নিয়েছেন, তার বাইরে তো আর কোন কাজও শিখেন নাই!! তাহলে তাদের গন্তব্য কি? আসলে, তাদেরকেও কোনো না কোন প্রক্রিয়ায় একটা সময় কোনো না কোনো প্রোডাক্টিভ ইউনিট খুজে বের করতে হবে যেখানে ওইসব ঘর্মাক্ত গন্ধের মানুষগুলির সমপর্যায়ে এসে দাড়া করাবে তাদের এবং এদেরকে প্রোডাকসন ইউনিটের সেইসব করমচারীর মর্যাদায় নামিয়ে দেবে যারা টাই পড়ে কাজ করেন না অথবা সকাল আত তায় অফিসে আসেন ঠিকই কিন্তু কখন বাসায় যাবেন তার সঠিক সময় তারা জানেন না। কারন ওটা প্রোডাকশন ইউনিট।   

এই ব্যাপারটা সর্বত্র ঘটবে। ঘটবে কৃষি খাতে, ঘটবে শিল্প খাতে, ঘটবে সব জায়গায়।

এইভাবে আস্তে আস্তে মানুষের বিদেশ ভ্রমনও কমে যাবে। এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়ও অনেক প্রভাব পড়বে। যেমন ধরুন, যেই কাজটা করার জন্য আমাকে ব্যংকক, সিঙ্গাপুর যেতে হতো, সেটা আর না করে তথ্য আদান প্রদান, ফাইল চালাচালি, তার উপরেই সিদ্ধান্ত গ্রহন অনেক দ্রুত এবং সহজ হয়ে যাবে। তাহলে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে কেনো এয়ারলাইন্সের অফিসে লাইন দিয়ে লোকজন টিকেটের ধান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে? এরমানে এই নয় যে, সবকিছুই বন্ধ হয়ে যাবে। আমি বলতে চাচ্ছি যে, সিস্টেম পালটে যাবে। মধ্যসত্ত্ব স্তরের কর্মীবাহিনী অনেক অংশে হ্রাস পাবে। সবই থাকবে কিন্তু তখন সবাই হয় ভোক্তা আর না হয় সরবরাহকারী। আর এইসব সম্ভব হবে শুধুমাত্র ডিজিটাল যুগের যখন একচ্ছত্র লিডারশীপ চলবে। তখন কৃষক তার ধানবিক্রির  জন্য আর মাঝখানের দালালদের সাহাজ্যের প্রয়োজন মনে করবে না সিন্ডিকেট থাকবে না, ইন্তারমিডিয়ারী লোকবলও থাকবে না। সে নিজেই মালিক, নিজেই জি এম, নিজেই কমার্শিয়াল, নিজেই মার্কেটিং অফিসার এবং তার সাথে কিছু হেল্পিং হ্যান্ডস। এতে যেমন উৎপাদনকারী তার ন্যাজ্য মুল্য পাবেন, আবার ভোক্তাও পন্যটি অনেক কমদামে ভোগ করতে পারবেন। আর ঠিক এটার মাধ্যমেই কস্টিং কমিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। এতে করে কি হবে সেই সব কর্পোরেট অফিশিয়ালদের? কি হবে জব মার্কেটের?

কর্পোরেট অফিসগুলি এখন যেসব এক্সপার্ট ইন্টেলেকচুয়ালগুলি নিজস্ব অর্থায়নে লালন পালন করছেন, সেইসব ইন্টেলেকচুয়াল গুলির সাপোর্ট নেবার জন্য কর্পোরেট পলিসি করবেন। হয়ত দেখা যাবে কয়েকটা কোম্পানি মিলে একটি বিসেস এজেন্টের কাছ থেকে সাবকন্ট্রাক্ট বেসিস সাপোর্ট নেবেন। থার্ড পার্টি সোরসিং হবে বেশি বেশি। হাইলি কোয়ালিফাইড ব্যক্তি না হলে আজকাল কর্পোরেট অফিসগুলুতে যেসব এক্সপার্ট চাকুরি করছে তারা চাকুরী হারাবেন। আর এই চাকুরী হারানো ব্যক্তিগুলি তখন কি করবেন? তারা শেষমেস কোনো না কোনো প্রোডাক্টিভ ইউনিটেই কাজ নিতে বাধ্য থাকবেন যেখানে আজকের পরিবেশ আর পাওয়া যাবে না। হোক সেটা কোন মুজার কারখান, বা হোক সেটা কোন রুমালের কারখানা, কিংবা হক সেটা কোনো আম বাগানের আমের ফলনের ব্যবসা। যার ফলে এখন এইসব স্টাফদের উচিত শুধুমাত্র কর্পোরেট অফিসে এক্সপার্ট হিসাবে নিজেকে নিরাপদ মনে না করে বর্তমান কাজের পাশাপাশি এমন কিছু স্কিল তৈরী করা যাতে টাই না পড়ে একেবারে লেবার শ্রেনিতে গিয়ে কাজ করার ক্ষমতা রাখা। সবাইকে শ্রমিক হতে হবে। হাইলি কোয়ালিফাইড এবং সবচেয়ে ভালো র‍্যাংকে না থাকতে পারলে কেহই কাউকে কর্মসংস্থানে আপ্যায়ন করবেনা। তখন একমাত্র ভরসা শ্রমিক হিসাবে কাজ করার মানসিকতা। এই পর্বটি ঠিক এখনি বুঝা যাবেনা। হয়ত এটা ২০২০ সালের মধ্যে ঘটবেই। জব মার্কেট বলে কিছু আর থাকবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। আর যারা জবে থাকবেন, তারা হচ্ছেন এতোটাই কোয়ালিফাইড যে, তাদের ছাড়া এই তথ্যলাইনের কাজও হয়তো হবে না। আর তারা হচ্ছেন ভোক্তা এবং সরবরাহকারীগনের সমন্বয়ক এবং সিস্টেম চালু রাখার একমাত্র বাহক। তাদের লাগবেই। ওটা জব নয়, ওরা সিস্টেম।

একটা সময় হয়ত আসবে যে, পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রীধারী একজন মানুষ হয়ত নিজেই একটা গাড়ি কিনে ট্যাক্সি ক্যাবে চালকের ভুমিকায় আছেন, অথবা বুয়েট থেকে পাশ করে হয়ত দেখা যাবে তিনি তার ক্ষুদ্র কোনো একটি প্রোডাক্টিভ ইউনিট চালাচ্ছেন।

ওইসময় যা ঘটবেঃ

(১)  ডিজিটাল যুগে প্রোডাক্টিভ ইউনিটগুলির মালিকগন হোক সেটা ধান চাষ করার কৃষক, অথবা অতি বড় মাপের কোনো গারমেন্টস ব্যবসায়ীই, তারা মার্কেটিং এ একই কাতারে চলে আসবেন। কোনো দ্বিতীয় মাধ্যম কাজ করবে না।

(২)   ভোক্তা এবং সরবরাহকারী সরাসসি যোগাযোগের কারনে দালালবাহিনী বিলুপ্ত হবে। পন্যের দামও কমে  আসবে।

(৩)   আইটির কারনে অনেক কিছুর বিলুপ্ত হবে যেমন বিলুপ্ত হয়ে গেছে ডিভি, ফ্লপি, সিডি, ক্যাসেটপ্লেয়ার, ক্যামেরা, ইত্যাদি পন্য। আজকাল রেডিও একটা ইতিহাস, আজকাল হাতের ঘড়িও হয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের মতো।    লাইব্রেরী হয়ে যাচ্ছে কম্পিউটার।

(৪)  ইনফরমেসন একেবারে হাতের মুঠোয় সবসময় মজুত থাকায় মার্কেটিং কন্সেপ্ট আর লোকাল এলাকা ব্যপ্তি না  হয়ে গ্লোবাল এরিয়াতে চলে যাবে। তখন চাঁদপুরের এক কৃষক নাইজেরিয়ার আরেক ধান আমদানী ব্যবসায়ির কাছে সরাসরি তার পন্য বিক্রিতে জড়িয়ে পড়বেন।

(৫)   মধ্যসত্ত্বভোগী এজেন্ট বা দালাল কিংবা কর্পোরেট অফিসের বর্তমান কন্সেপ্ট পুরুপুরি বদলিয়ে আরেক ধাপে উন্নিত হবে। তখন যারা থাকবে তারা সবাই মালিকপক্ষের লোক আর তাদের সাহাজ্য করবে  একদল থার্ড পার্টি।

(৬) বেকার লোকের সংখ্যা সাময়িক সময়ের জন্য বেড়ে যাবে বটে কিন্তু অচিরেই লোকজন এই সিস্টেমের সহিত   খাপ খাওয়ানোর জন্য সবাই প্রোডাক্টিভ কন্সেপ্টে এডজাস্ট করবে। যারা এখনি শুরু করেছেন,  তারা অনেক দূর এগিয়ে যাবেন, আর যারা শুরু করেন নাই বা ভাবছেন না, তারা অনেক চড়াই উতরাই দিয়ে পার হবেন।

(৭)  ব্যাংকিং সেক্টরে অভুত পরিবর্তন আসবে। সেটা কিভাবে? সেটা হচ্ছে কারেন্সি কন্সেপ্ট। এই কারেন্সি কনসেপ্টে কারেন্সির পরিবরতে পন্য হয়ে উঠবে প্রধান আদান প্রদানের মাধ্যম। এক দেশের তেল দরকার, আরেক দেশের ধান দরকার। জাস্ট বিনিময় হয়ে যেতে পারে পন্যটি। মাঝখানে শুধু পন্য বিনিময়ের মুজুরীটুকু থাকতে পারে।

(৮)  নারী পুরুসের ভেদাভেদে অনেক পার্থক্য কমে আসবে। কারন এখন যেমন ব্যবসা কিংবা এই জাতীয় কোন  সেক্টরে পুরুষের আধিপত্য বেশি কারন সর্বত্র কোথাও না কোথাও নারীদের জন্য সবকিছু সহজ  মনে হয় না। কিন্তু তখন এই কঠিন পরিবেশটি নারীদের জন্য সহজ হয়ে আসবে। 

তাহলে কি করা উচিত?

(১)  প্রতিটি মানুষের উচিত এখন জাপানের মতো প্রোডাক্টিভ ইউনিটে কাজ করা যায় সেই মোতাবেক শিক্ষা ব্যবস্থায় দেশের আইন তৈরী করা।

২)  দেশ করুক বা না করুক, প্রতিটি পরিবারের উচিত তার সদস্যদেরকে এমন কিছু কিছু সেক্টরে প্রশিক্ষন দেওয়া যাতে ভবিস্যতে শুধু করপরেট সংস্থায় কাজ করার জন্য তৈরী না করে নিজেরা নিজেরা কিছু   কিছু প্রোডাক্টিভ ইউনিটের ব্যবস্থা করা অথবা প্রোডাক্টিভ ইউনিটে কাজ করতে পারে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেদের সদস্যদের তৈরী  করা।

(৩) একের অধিক লাইনে এবং পুরুপুরি ভিন্ন প্রকৃতির কাজের জন্য নিজেকে তৈরী করা। আজ কর্পোরেটে আছে, আগামিকাল শ্রমিক হতে তাতে কোনো বাধা থাকবে না এবং সেটা করতে পারার সক্ষমতা।

(৪)   বর্তমানের কর্পোরেট অফিস গুলোর দিকে চাকুরীর জন্য না তাকিয়ে নিজেরা কিছু করা।

 সত্যি সত্যি জব মার্কেট ছোট হয়ে আসছে। এর পরিবর্তন বুঝা যাবে আগামি কয়েক বছরের মধ্যেই।

২৫/০৬/২০১৭-আমার জীবনে এমন একটা সময় আসিবে (রঙ লেপা)

আমার জীবনে এমন একটা সময় আসবে একদিন যেদিন আমার জন্যই সবাই একত্রে মিলিত হবে। মিলিত হবে আমাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে। কিন্তু আমি থাকবো সম্পূর্ণ স্থবির আর শান্ত। বাড়িঘর সব ভরে যাবে একের পর এক চেনা জানা এবং অচেনা অনেক লোকের ভীড়ে। উজ্জ্বল দিবালয়ে, অথবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে অশান্ত হৃদয়ে কেউ কেউ লাল নীল জামা পড়ে মাথায় টুপি পড়ে, কেউ আবার হাতে তসবিহ নিয়ে মুখে দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে হাহুতাশ করবে, কেউ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জ্ঞ্যান হারাবে, কেউ আবার মনে মনে যার যার মিশ্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। কেউ কেউ আমাকে কোথায় দাফন করবে, কে বা কারা সেই দাফনের নিমিত্তে কোথায় আমার কবরখানা রচিত হবে এই ব্যস্ততায় এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াবে। কেউ আমাকে পেয়ে হারাবে আবার কেউ আমাকে না পেয়েই হারাবে। কারো অধিকার নিয়া মনে মনে ছক কসিয়া অশান্ত রুপ ধরে বিলাপ করবে, কেউ আবার অধিকার পুনরুদ্ধার হবে এই আশঙ্কায় প্রহর গুনবে। কারো জন্য আমার এই প্রস্থান হবে মর্মান্তিক আবার কাহারো জন্য হবে অতীব সুখের।

এইদিনে আমার সমস্ত সিডিউল মোতাবেক আর কেউ অপেক্ষা করবে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ক্যালেন্ডারটি আর আগের মতো সরব হইয়ে উঠবে না। ঘড়ির কাটায় কমবেশি হলেও আমার তাতে কিছুই যাবে আসবে না, আর তাতে আমার কোনো তাড়াহুড়াও থাকবে না। সারাবিশ্ব যেইভাবে চলতেছিলো ঠিক আগের মতোই এই জগতের সব কিছুই চলবে। এক মুহূর্তের জন্যও দিনের সময়কাল পরিবর্তিত হবে না, না চাঁদ তার উদিত হবার বা ডুবে যাবার কোনো ব্যতিক্রমী নিদর্শন প্রকাশ করবে। এমনটিই তো হয়ে আসছে বরাবর প্রতিটি মানুষের জীবন সায়াহ্নে। আমি আমার সারাজীবন ধরে যা আহরন করেছি, যা প্রতিনিয়ত রক্ষা করবার জন্য চারিপাশে সতর্ক দ্রিস্টি দিয়া পাহাড়া দিয়াছি, তা ওইদিন অন্য কারো হাতে চলে যাবে। সেটা নিয়া আমার কোনো কিছুই করবার থাকবে না। আমাকে যারা কখনোই ভালোবাসে নাই, যারা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্টে দেখার পায়তারা করত, তাদের উদ্ধত চাহনী কিংবা দ্রিস্টিভঙ্গি আমাকে আর কোনোভাবেই আহত করবে না। না আমি তাদের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করবো। যে তর্কে জিতবার জন্য আমি খন্ড খন্ড যুক্তি প্রকাশ করে আত্মতৃপ্ত হয়ে হাসিমুখে চারিদিকে বীরের মতো চলমান থাকতাম, সেই তর্ক এখন আর আমার কোনো কিছুই আনন্দ দান করবে না। আমার প্রতিদিনের জরুরি মেইল কিংবা টেক্সট ম্যাসেজের প্রতি আমার আর কোনো তাড়াহুড়া থাকবে না। যাদের বিরুদ্ধে আমার কতইনা রিগ্রেটে যা আমি বহুকাল নিদ্রাবিহিন রাত কাটিয়ে দিয়েছি, সেটার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে না, না আমার মনের মধ্যে এই সবের কোন প্রভাব ফেলবে। কারন আমি স্থবির।

আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে, আমার ওজন বেড়ে যাবে, এই ভেবে আমার রোজকার দিনের খাদ্যাভ্যাসে কোন পরিবর্তন কিংবা আমার সাদা চুলে কালো করবার বাসনা এসব কিছুর আর কোনো প্রয়োজন হবে না, না এসব আমাকে আর বিচলিত করবে। আমার ব্যবসা, আমার সম্মান, আমার প্রতিপত্তি যার জন্য আমি প্রতিনিয়ত ভভেবে ভেবে, নিদ্রাবিহিন কষ্ট করেছি, কিংবা কিভাবে কি করলে আমার সব কলেবর বৃদ্ধি হবে ইত্যাদির জন্য প্রানপন চেষ্টায় লিপ্ত ছিলাম, সেই ব্যবসা, সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি আজ হতে রহিত হয়ে তা অন্যের হাত ধরে চলতে থাকবে। ছোট কিংবা বড় যতো বড়ই অনুশোচনা হোক না কেনো, ক্লান্তি কিংবা কষ্ট যাই হোক না কেন, তা আজ আর কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। না আমাকে আর রাত জাগাইয়া তা নিয়া ভাববার কোন অবকাশ দিবে। জীবনের রহস্যময়তা, কিংবা মৃত্যুর উদাসিনতা যা আমার মন বহুবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তা আজ এক নিমিষের মধ্যেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। জীবন কি, মৃত্যু কি, জীবনের পরে মৃত্যুর কি গন্তব্য যা নিয়া আমি বহুবার তর্কে লিপ্ত হইতাম বা হয়েছি, যুক্তি খুজেছি, সব কিছুর সঠিক তথ্য আজ আমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে।

আমার অনেক অসমাপ্ত কাজ যা করবার জন্য আমি জল্পনা কল্পনা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, তা আজ সব কিছুর ইতি টেনে আমাকে নিয়ে যাবে কোনো এক সুদুর অজানা একস্থানে যা আমি এর আগে একবারের জন্যও বিচরন করি নাই।

আজ এই শান্ত শরীরে আমার চারিপাশের সবাইকে যেনো অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করতেছে কিন্তু আমার শ্বাস রুদ্ধ করা হয়েছে, আমার কণ্ঠনালি রুদ্ধ করা হয়েছে, আমার বাহু, আমার পা, আমার চোখ, আমার যাবতীয় ক্ষমতা আজ রহিত হয়ে একটি ছোট খাটিয়ায় আমি এমন করে শুয়ে আছি যা অবশ্যই হবে বলে আমি একদা জানতাম কিন্তু ইহা যে আজই তা আমি কখনো মনে মনে কিংবা শারীরিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। অথচ আমার এই দিনের জন্য একবারের মতোও কি প্রস্তুতি নেয়া দরকার ছিল বা আমার কি কি করনীয় ছিলো সেই ব্যাপারে আমি কখনোই নিজেকে তৈরী করি নাই। আমার যতো সব সম্পত্তি, যশ, সম্পদ সমস্ত কিছুর বিনিময়েও আজ আমি এই পরিস্থিতি হইতে মুক্ত হতে পারবো না। আমার সর্বত্র এবং সবকিছুতেই খাচায় বন্দি করা হয়ে গেছে।

যে ঘরটিতে একচ্ছত্র আমার অধিকার ছিলো, যার প্রতিটি কোনায় কোনায় আমার হাতের স্পর্শ, আমার পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিলো, তা থেকে আজ আমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আমি মেজর সাহেব বীরদর্পে হেটে যেতাম, যে জায়গাটা জুতা মাড়িয়ে, সিগারেট ফুকিয়ে পায়ে দলিয়া পিছনে ফেলে ফেলকনি খাটে বসে আরাম করে বসতাম, আজ সেই ফেলকনি খাট আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ওই জুতা মাড়ানো স্থানটিই আমার জন্য বরাদ্ধ হয়ে রবে। আমি আমার নামটিও আজ হারিয়ে ফেলবো। আমাকে আর কেউই আমার সেই প্রিয় মেজর সাহেব নামটি ধরে, কিংবা আমার ছোট মেয়ের অতি আদরের ডাকটি ধরে আমাকে গলা জড়িয়ে সম্বোধন করবে না। আমি মেজর আখতার নিতান্তই একটি লাশের নামে পরিচিত হয়ে এই উজ্জ্বল নীলাকাশ সমৃদ্ধ পৃথিবী হতে সবার আড়ালে চলে যাবো।

অফিসে যাইবার প্রাক্কালে যেই সুন্দরী বউটি বারবার জিজ্ঞাসা করত কখন আবার বাসায় ফিরবো, কিংবা আজ অফিস হতে ফিরতে দেরী হবে কিনা, অথবা বিদেশে যাত্রাকালে মেয়েদের এই আবদার, ওই আব্দারের লিস্ট সম্বলিত দাবীনামার মতো আজ আর কেউই আমাকে কিছুই জিজ্ঞেসা করবে না, কখন আবার বাসায় আসবো, কিংবা কেহ আমার সাথে যাবার জন্যও বায়না ধরবে না। ইহা এমন এক যাত্রা যেথায় কেহই কাহারো সাথী হতে ইচ্ছুক নহে।

আমি জানি আমি তোমাদেরকে আর কিছুই বলতে পারব না। যদি এটাই হয়ে থাকে আমার জীবনের শেষ বার্তাটুকু তোমাদের জন্য, তাহলে আমি আজ তোমাদের কাছে এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করতেছি যে, যদি কারো মনে, অন্তরে, শরীরে, ইচ্ছায়  বা অনিচ্ছায়, স্বার্থের কারনে বা বিনা স্বার্থে আমার অগোচরে কোনদিন আঘাত করে থাকি, যদি আমার দ্বারা এমন কোনো কাজ হয়ে থাকে যা উচিত ছিলো না, যা কারো অধিকার খর্ব হয়েছে, কিংবা আমার দ্বারা জুলুম হয়েছে বলে মনে মনে অনেক অভিশাপ দিয়াছেন, আমাকে সবাই খাস হৃদয়ে অনুশোচনাপূর্বক ক্ষমা করে দিবেন। আমিও আপনাদের সবাইকে ক্ষমা করিয়া দিলাম। আমি আমার দায়িত্ত কতটুকু পালন করতে পেরেছিলাম, সেই বিশ্লেষণ আমার উত্তরসুরী, আমার পরিবার আর আমার সমাজের উপর। আমার পরিবার, আমার সমাজ আমাকে কতটুকু দিয়াছিলো সেই বিশ্লেষণ আমার কাছে আর নাই তবে আমি আপনাদের সহিত ভালো একটা সময় কাটিয়ে গেলাম এটাই আমার জন্য অনেক ছিলো।

সবার শেষে আমি তোমাদের জন্য এই কথাটাই বলতে চাই-

যদি আমি কখনো আমার জানা অজানায় তোমাদেরকে ইগনোর করে থাকি, আমি দুঃখিত।

যদি কখনো আমি তোমাদের খারাপ লাগার কারন হইয়া থাকি, আমি দুঃখিত।

যদি আমি কখনো তোমাদেরকে কারো কাছে অপদস্থ করে থাকি, আমি দুঃখিত।

যদি আমি কখনো দাম্ভিকতার পরিচয় দিয়ে আমি তোমাদের থেকেও উত্তম বা বড় ভেবে থাকি, আমি ক্ষমা প্রার্থী।  

তোমরা কখনো এটা ভেবো না যে, আমি তোমাদের ভালোবাসি নাই, আমি তোমাদের সব সময় ভালোবাসিয়াছি।

যদি কখনো তোমরা ভাবো আমি তোমাদের দুঃসময়ে পাশে ছিলাম না, সেটা হয়তো আমারো ক্ষমতা ছিলো না, তারপরেও, আমি দুঃখিত।

যতো অপরাধ বা ভুল করিয়াছি, যাহার প্রতিই করিয়াছি, তোমরা আমাকে ক্ষমা করিয়া দিও।

কেনো আমি আজ তোমাদেরকে এই সব কথা বলিতেছি?

হতে পারে, আমার আর এইসব কথা বলার জন্যে আগামিকালটা আসবেই না।

হতেও তো পারে, আজকের পরে আমার জীবনে আর কোনো আগামীকালই নাই!!

এমনো তো হতে পারে, তোমাদের কাছে হাত জোর করে আমি তোমাদের কাছে আর ক্ষমা চাওয়ার দিনটাই আমি পাবো না!!

কোথায় যেনো একবার পড়িয়াছিলাম, All that Glory leads but to the grave……

১১/০৫/২০১৭-অনেকদিন পর লিখতে বসেছি

অনেকদিন পর লিখতে বসেছি। মনটার চেয়ে শরীরটা আরো বেশি খারাপ বলে মনে হচ্ছে। অধিক পরিশ্রমের চেয়ে মানসিক টেনসনের কারনেই শরীরটা বেশি খারাপ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সারাদিনই ক্ষুধা থাকে, কিন্তু ভালো খেতে পারছিনা, সিগারেট খাওয়ার পরিমানটা অনেক অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

জীবনের এতোগুলো বছর চারি পার্শের সমস্ত কুরুক্ষেত্র জয় করে যখন একটা জায়গায় স্থির হয়েছি, ঠিক সেই সময়ে ইদানিং মাঝে মাঝে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে এমন কোনো জায়গায় হারিয়ে যাই, যেখানে আমাকে কেউ চিনবেনা, আমিকে, কোথা থেকে এসেছি, কেউ জানবে না আমার আসল পরিচয় কি। আমিও আমার আগের সব স্মৃতি, পজিসন, জীবনধারা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব ভুলে গিয়ে কোথাও একদম একা একা বাকি সময়টা কাটিয়ে দেই। না থাকুক আমার চাকুরি কিংবা ব্যবসা, না থাকুক আমার এসিরুম, না থাকুক আমার বসগিরি, কি যায় আসে? হয়ত কারো বাসায় দিন মজুর হিসাবে খেটে দেওয়ার বদলে তিনবেলা খাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেলেই হলো। অন্তত রাতে মানসিক যন্ত্রনা ছাড়া ঘুমাতে পারবো। নাহোক সেটা কোন খাট অথবা তোষকেমোড়ানরম বিছানা। হোক না সেটা পরিত্যক্ত কোনো গ্যারেজের অংশ। হয়ত মনিব জান্তেই পারবেনা, কি মানুষটি কি অবস্থায় কি কারনে কেনো এইভাবে দিনযাপনে জীবনটাকে বেছে নিয়েছেন। কোন দুঃখ নাই। কারন, কোনো দায়িত্ব নাই মনে করে আমি পরেরদিনের শুধু আকাশটাতো নিরিবিলিতে বিকালের কোন এক মেঘলা দিনে দেখতে পারবো। তৃতীয় নদীর ধারে বসে আমি অন্তত “নদীর তৃতীয় তীরের” ওপারের নীলদিগন্ত তো দেখতে পাবো। আমার কোনো কিছুই মনে পড়বেনা যে, কেউ আমার জন্য বসে আছে, কেউ আমাকে মিস করছে ইত্যাদি। এই ভাবনা থেকে আমি যখন অনেক দূরে বসে কচিকচি পাতার শিশির বিন্দুর ছোঁয়ায় পায়ের পাতা ভিজিয়ে দেবো, কিংবা উত্তরের হাওয়ায় ভেসে আসা ছাই রঙের মেঘ যখন আমার মুখাবয়ব ভিজিয়ে দিয়ে যাবে, আমার অতিতের কথা মনে করে গড়ে পড়া চোখের পাতার জল আর কারো চোখে পড়বে না। আমার দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, আমার কাছে মানুষের চাহিদা, আর ঐ চাহিদাপুরনে আমার ব্যর্থতার জল আমাকেও আর পীরা দিবেনা যে, কেনো আমি এতোকিছুর পরে হেরে গেলাম। মানুষ নিজের কারনেই শুধু হেরে যায় না, মাঝে মাঝে নিজের সামর্থ্য থাকাসত্তেও মানুষ হেরে যায়। আর তার এই হেরে যাওয়া যখন শুরু হয়, তখন নিজের চোখের সামনে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। এই অসহায়ত্ব একটা শাস্তি। নিজের কাছে নিজের শাস্তি। ছায়ার মতো সারাক্ষন লেগে থাকে। যার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া বড় কঠিন।

ইচ্ছে ছিলো, অনেক বড় হবো, ইচ্ছে ছিলো আমার চারপাশের আপনজনদেরকে নিয়ে হৈ হুল্লুর করে নেচে গেয়ে শ্রাবনের বৃষ্টিতে কাক ভেজায় ভিজবো, ইচ্ছে ছিলো শীতের কোন এক সকালে দল বেধে পিঠে ব্যাগ নিয়ে কোন এক পাহাড়ের চুড়ায় বসে প্রাকৃতিক বনজংগলে বসে গরম গরম পিঠা খাবো। এতা একটা স্বপ্ন। কিন্তু এই সপ্নটা একা সপ্ন দেখলেই হবেনা। এই সব সপ্ন দলবদ্ধ সপ্ন। এই সব স্বপ্ন একে অপরের সাথে একটা চেইনের মতোবাধা। কোথাও ছিড়ে গেলে এর আর কোনো বাস্তবায়ন থাকেনা। পুরুটাই শিশিরবিন্দুর মতো উবে যায়। তখন আর বুঝা যায় না এইখানে কোনো একজলের বিন্দু থেকে কখনো শিসির জমে ছিলো কিনা।

জীবনটা এতো ছোট যে, এক জিবনে মানুষ তার কোনো কিছুই শেষ করতে পারে না। কিন্তু মানুষ যখন হেরে যায়,  তখন সে আরেকটি জীবনের জন্য আশা করেনা। উত্থানের থেকে পতনের গতি সবসময় বেশি। ফলে জীবনের অধিকাংশ সময় ধরে যখন কেউ শুধু উত্থানের দিকে যেতে থাকে, পতনের সময় তার তখন কোন কিছুতেই ভারসাম্য থাকে না। একদিকে ভারসাম্য রক্ষায় চেষ্টা তো, আরেক দিকে ভারসাম্য হারিয়ে যায়। ওইদিকে নজর দিলে, অন্যদিকে আবার ভারসাম্য হারিয়ে যায়। আর এভাবেই দ্রুত ভারসাম্য হারাতে হারাতে হটাত নিজেকে খাদের অনেক নীচে দাঁড়িয়ে আছি বলেই আবিস্কার করে। তখন আশেপাশে যারা থাকে, তারা হয় সবাই অচেনা, নয় প্রানিকুলের কেউনা। নিজের আপনজনদেরকেও তখন বড় অপরিচিত বলে মনে হয়। উত্থানের ভারসাম্য আর পতনের ভারসাম্য একনয়। তাদের মিলিত বিন্দু একজায়গায় নয়। তাদের ভারসাম্যের কেন্দবিন্দুও একনয়। উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু যদি হয় আকাশের চুরায়, পতনের কেন্দ্রবিন্দু হয় পাতালের নীচে।

২০/০৩/২০১৭-একা থাকা

মাঝে মাঝে আমি যখন একা থাকি, তখন ভাবি, কিভাবে এতোবড় সাগরের মতো সমস্যাগুলি আমি সামাল দিচ্ছি? কোনো সমস্যাই কারো থেকে কম ছোটনা। কিন্তু কনো না কনভাবে আমি সামাল দিচ্ছি। কোনো সমস্যা বিশাল টাকার, কোনো সমস্যা বিশাল ভাবে রাজনীতির, কোনো সমস্যা আবার নিছক ব্যক্তিগত। এতো সমস্যায় জর্জরিত থেকেও আমি একটা জিনিষ বুঝতে পেরেছি, আমার পাশে আসলে কেউ নাই। যে যাই কিছু বলুক, আমি আসলে একা। আমার পরিবার আমার সাথে আছে কিন্তু তারা কি আমার সমস্যায় চোখের জল ফেলাছাড়া আর কিছু করতে পারবে? আমি তাই মাঝে মাঝে ভাবি, আমার অনুপস্থিতিতে ওরা ভালো থাকবেতো? আমার সব কিছুর উপরে আমার পরিবার। এই জায়গায় আমি চরম স্বার্থপর। এখানে আমি কোনো ছাড় দিতে ইচ্ছুক নই।

আমি যেভাবে এগুচ্ছি, তার বেশীর ভাগ সাহসিকতার কারন আমার ইচ্ছাশক্তি আমাকে আমার পরিবারের জন্য কাজ করে। কখনো ওরা আমাকে ভুল বুঝে কিন্তু আমি জানি ওদের ঐ ভুল বুঝাবুঝির কারনে আমি ছেলেমানুষিকরলে ওরা সময়ের স্রোতে ভালো থাকবেনা। তাই সব রাগ, ঝগড়া, বিবাদ নিমিষেই অবুঝ বালকদের বাচ্চামি মনে করে ঝেড়ে ফেলে দেই আর সামনের দিকে এগুনোর চেষ্টা করি। আমি সফল হচ্ছি কিনা আমি জানি না তবে আমার উপর থেকে ধীরে ধীরে যে বিশাল বিশাল বোঝা নেমে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারি। আর এখানেই আমার সার্থকতা।

১৭/০৩/২০১৭-জীবন একটাই

জীবন একটাই। সবাই জীবনে সুখী হতে চায়, আরাম আয়েস চায়, চায় সম্মান নিয়ে নিরাপদে সুখী পরিবার নিয়ে বেচে থাকার। আর এই সুখ, আরাম, সম্মান, নিরাপত্তা কোনোটাই সহজলভ্য ব্যাপার নয়। এর পিছনে থাকে হাড় ভাঙ্গা খাটুনী, অসহনীয় ধকলেরধাক্কা, আরো অনেক কিছু। তাতেই কি সব পাওয়া যায়? মোটেইনা। অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তিটা মোটেই আনুপাতিক নয়। ফলে মানুষ তার আখাংকার তীব্রতার কাছে ক্রমাগত হেরে যেতে থাকে, আর এই হার থেকে মানুষ অনেক সময়ই ভুলরাস্তা বেছে নেয়, সহজ পথ আঁকড়ে ধরে। যখনই এই ঘটনাটা ঘটতে থাকে, তখন ব্যক্তি আর ব্যক্তিত্বর মধ্যে একটা কনফ্লিক্ট তৈরী হয়। ব্যক্তিত্ব যদি হয় নীতির পরিমাপের একটা আদর্শ, ব্যক্তিত্ব যদি হয় ব্যক্তির সততার একটা মাপকাঠি, ব্যক্তিত্ব যদি হয় নিরপেক্ষতার একটি ইউনিট, তাহলে যখনই এই হারের ঘটনাটা ঘটতে শুরু করবে, তখন ব্যক্তির আখাংকার তীব্রতার কাছে এইসব ব্যক্তি আদর্শ, নীতী, নিরপেক্ষতা হারাতে থাকে। এই উপাদান গুলি আর তখন খুব জোরালো হয়ে কাজ করেনা। যে নীতিসমুহ একজন ব্যক্তিকে ভুলরাস্তা থেকে সরিয়ে নিতে পারতো, তখন সেই নীতিগুলোর অনুপস্থিতে নিমিষের মধ্যেই ব্যক্তি ভুল একটা রাস্তায় প্রবেশ করে ফেলে। আর এই নীতির অনুপস্থিতিটাই হচ্ছে দুর্নীতি। আর একবার যখন কেউ এই ভুল রাস্তায় প্রবেশ করে ফেলে, তখন তাকে আর ফেরানো যায়না। হোক সেটা প্রেমের বেলায়, হোক সেটা অর্থনীতির বেলায়, আর হোক সেটা কোনো সামাজিক কর্মকান্ডের বেলায়। ব্যক্তিটা তখন সবার বেলায় একই আচরন করে। বন্ধু পালটে যায়, সমাজের গন্ডি পালটে যায়, পালটে যায় তার দৃষ্টিভঙ্গির।

যখন কারো দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যায়, তখন তার কাছে অনেক কিছু আর স্বাভাবিক মনে হবে না। লাল কাচের ভিতরে রাখা সাদা গোলাপকে সে লাল রঙের গোলাপই মনে করবে, নীল আলোর চত্তরে সে সবুজ গাছের পাতাকে আর সবুজ দেখতে পাবে না। তখন তার স্বাভাবিক চোখ তার মেধার সঙ্গে একাকার হয়ে বাস্তব কিছু থেকে অনেক দূরে সরতে থাকবে। সরতে থাকা প্রেক্ষাপটে তখন অনেক কিছুই সাফল্য বলে মনে হয়। প্রাপ্তির অনুপাতটা মনে হয় শ্রমের থেকে একটু বেশি। দিন মাস, বছর ধরে যদি ক্রমাগত এই পরিবর্তন ঘটতে থাকে, তখন একসময় তার কাছে কোনো কিছুই আর অসম্ভব বলে মনে হয় না। সে হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। আর অপ্রতিরোধ্য চরিত্রগুলোই হচ্ছে অন্য সবার জন্য বড় একটা সমস্যা। এই সমস্যা হয়ে উঠে তখন সামাজিক ব্যধির মতো। কারন সে নিজে পালটেছে, সঙ্গে আরো কিছুকে পাল্টায়। এই পাল্টানোর হার যদি বাড়তেই থাকে, তখন পুরু সমাজটাই হয়ে উঠে বিসাক্ত। স্বাভাবিক কোনো কিছুরই আর তখন গ্যারান্টি থাকে না। নারী তখন অসহায় হয়ে উঠে। সব নারীরাই তখন শুধু নারী। মা, বোন স্ত্রী, মেয়ে, কিংবা দাদীর মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকে না। কিছু পুরুষ তখন হয়ে উঠে অত্যান্ত দুর্দান্ত, আর কিছু পুরুষ হয়ে উঠে নিতান্তই দুর্বল। আইন তখন নীরব থাকে, আইনের রক্ষকেরা তখন নিজেরাই বিভিন্ন চরিত্রে উপনীত হয়।

এখানে একটা জিনিষ খুব ভালোভাবে বুঝা দরকার যে, ভুল করে ভুল রাস্তা বেছে নেওয়ার ব্যক্তিকে ভুল থেকে শোধরানো যায় কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছে করে ভুল রাস্তার সন্ধান খুজে নেয়, তাকে সরানো কঠিন। আর সেই ভুল্টা হচ্ছে অন্যায়। ভুল করে ভুল করার পর হয় আফসোস কিন্তু অন্যায় করে ভুল করার কারনে মানুষ হয়ে উঠে মানসিকভাবে দুর্বল। ভুল রাস্তায় জীবন জাপন করে কেউ অধিক কাল বেচে থাকতে পারে নাই, এতে যার যতো সম্পদ, টাকাপয়সা কিংবা যশই থাকুক না কেনো। কারন প্রকৃতি তার নিজের নিয়ম ভেঙ্গে কখনো অন্য কোন নিয়মকে মেনে নেয় নি। ফলে এই সুন্দর পৃথিবীটাকে অধিককাল দেখার সৌভাগ্য হয় শুধু তাদেরই যারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে এক সঙ্গে চলতে পেরেছেন। তাহলে প্রকৃতির সেই প্রাকৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা কি? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে-পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি।

এর বিসদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

২০/০২/২০১৭-ছবি

ছবি দেখিলেই যেনো বুক ধক করিয়া উঠে। অতীতের ছবি তো আরো ধকের মাত্রা বারাইয়া দেয়। অতীতে যে ছবিটা ভালো হয় নাই বলিয়া ছিড়িয়া ফেলিয়াছিলাম, আজ সেই অস্পৃশ্য, ঝাপসা স্যাতস্যাতে ছবীতা দেখিলেও ভালো লাগে। একাগ্রচিত্তে ছবিগুলি দেখিলে বারবার শুধু ইহাই মনে হয়, দিন ফুরাইয়া যাইতেছে। সময়ের ক্রমাগত টিকটিক শব্দে আমার দিনও টিকটিক করিয়াই ফুরাইয়া যাইতেছে। ইহাকে কোন বাধনেই আর থামাইয়া রাখা সম্ভব নয়, আর কেউ পারিয়াছে বলিয়াও আজ পর্যন্ত কোনো দলিল নাই, এবং আগামিতেও কেহ পারিবে ইহার স্বপক্ষে কোনো বিজ্ঞান কিংবা দর্শন আবিষ্কৃত হয় নাই। সময়ের এই টিকটিক শব্দ আমি আমার বুকের প্রতিটি ধুকধুক আওয়াজের মধ্যে, ঘুমের ঘোরে, নিশিথে কিংবা যখন একা থাকা হয় তখনো শুনিতে পাই। যখন একা থাকি, তখন “সময়” যেনো আমার কানে কানে ফিসফিস করিয়া বলিয়া যায়, পিছনে তাকাইয়া দেখিয়াছ কত বেলা পার করিয়া আসিয়াছো? তুমি তোমার জন্মেরক্ষন পাড় করিয়া আসিয়াছো, দুরন্ত শৈশব পার করিয়া আসিয়াছো, তোমার অনেক বেলা পার হইয়া গিয়াছে, এখন আর তোমার জন্য সকাল বলিয়া কোন কাল নাই, বিকালের রোদের আমেজ কি তুমি বুঝিতে পারিতেছো? যদি তুমি ইহা অনুধাবন করিতে না পারো, তাহা হইলে, আয়নার সামনে গিয়া দাঁড়াইয়া এক পলক তোমার চোখের নিচে তাকাইয়া দেখো, অথবা হাত পায়ের রক্ত প্রবাহের ধমনীগুলির দিকে তাকাইয়া দেখো। ইহারা অনেক সময় ধরিয়া অবিরাম কাজ করিতে করিতে প্রায় অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। তোমাকে দেখিয়া কি রাস্তার ঐ অবুঝ বালক আর “ভাই” বলিয়া সম্বোধন করে? না করেনা। এখন তোমাকে অনেকেই “চাচা” বা আংকেল” বলিয়া ডাকিতে পছন্দ করে। আর কয়েকদিন অতিবাহিত হোক, দেখিবে, তুমি এই “চাচা” কিংবা “আংকেল” উপাধিটাও ধরিয়া রাখিতে পারিবেনা। তখন কেউ তোমাকে দাদা কিংবা নানা বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিবে। তোমার এখন পা কাপিতেছে, হাত কাপিতেছে, চোখেও খুব ভালো করিয়া সব দেখিতে পাওনা। বৃহৎ অট্টালিকায় উঠিতে এখন তোমার সাহস আর আগের মতো কাজ করেনা, সমুদ্রে ঝাপ দেওয়ারও আর মন টানেনা। তুমি আস্তে আস্তে নির্জীব পদার্থের ন্যায় হইয়া যাইতেছো। এখন একটুতেই বর্ষার পানিতে সর্দিকাশি বাধিয়া বসে, শীত আসিলেই মনে হয়, এই বুঝি রাজ্যের সব ঠাণ্ডা তোমার সারা শরীরের উপর দিয়া বহিয়া যাইতেছে।

ছবি দেখিতে দেখিতে মনটাই খারাপ হইয়া যায়। মনে হয়, আমি কি সত্যি সত্যি একদিন এই নীল আকাশটা আর দেখিতে পারিবো না? এই ফুলগাছ, এই রাস্তার ধার, এই নদীর ঢেউ, এই শীতের হাড়কাঁপুনি ঝাঁকুনি, কিংবা বৃষ্টির শীতল জলেরচ্ছটা কোণো কিছুই কি আমি আর উপভোগ করিতে পারিবো না? সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর রাতে বাড়ি ফিরিবার আনন্দটা কি আর পাওয়া যাইবে না? অথবা পরিবারের সঙ্গে, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে চুটিয়ে ঝগড়া কিংবা হৈচৈ করার অবকাশ কি আর কখনোই আমার হইবে না? মন বড় বিষণ্ণ হইয়া উঠে। মনে হয় এই জনমটা কেনো হাজার বছরের জন্য হইলো না? ভগবান বড় নিষ্ঠুর। কেহ হয়ত ভগবান কে বিশ্বাস করিয়া ইহাই মানি নেন, আবার কেহ ভগমান আছে ইহাই বিশ্বাস করেন না। ভগমানকে অবিশ্বাস করিয়া যদি হাজার বছরের অধিক বাচিয়া থাকা যাইতো, তা না হইলে একটা যুক্তি থাকিত, কিন্তু ভগমান আছে বানাই, এই বিশ্বাসের উপর পৃথিবীতে অধিককাল বাচিয়া থাকিবার কোনো উপায়ও নাই।

শৈশবের উচ্ছল চঞ্চলতা, যৌবনের অদম্য বন্যতা আর এখনকার বৈষয়িক ব্যস্ততার মাঝে কখনোই মনে হয় নাই যে, একদিন আমার এই সাম্রাজ্য, আমার এই আধিপত্যতা, কিংবা এই বাহাদুরী, অহংকার একদিন কোনো একটা ছোট বিন্দুর মধ্যে আটকাইয়া যাইবে যেখানে আমার শ্বাস নীরব, আমার মস্তিষ্ক নীরব, আমার হাত নীরব, আমার শরীর নিথর। আমার সবকিছুই নীরব। আমার চারিধারের কোনো কিছুরই পরিবর্তন হইবে না। তখনো ঠিক সময়েই সূর্য উঠিবে, পাখীরা ঠিক সময়েই কিচিরমিচির করিয়া ভোরের আলোকে জাগাইয়া তুলিবে, প্রাত্যাহিক কাজে সবাই যার যার কাজে ঠিক সময়েই ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া আবার ঠিক সময়েই ঘরে ফিরিয়া আসিবে। ঠিক সময়েই সবাই তাহাদের প্রতিদিনের সকালে নাস্তা, দুপুরের খাবার, কিংবা পরিবার পরিজন লইয়া বিকালে শরতের কোন একসন্ধ্যায় বাহির হইয়া পড়িবে, শুধু আমি ছাড়া।

আজ হইতে শতবছর আগেও কেউ না কেউ হয়ত এইভাবেই তাহারা আজকের দিনটার কথা ভাবিয়া ভাবিয়া তাহাদের ঐ সময়ের ব্যথার কথা, এই পৃথিবী ছাড়িয়া যাওয়ার আক্ষেপের কথা, এই পৃথিবী ছাড়িয়া না যাওয়ার আকুতির কথা বলিয়াছিলেন। তাহাদের কেউ হয়ত এই পৃথিবীতে অনেক প্রতাপশালী রাজা ছিলেন, কেউ হয়ত ক্ষমতাশিল সেনাপতি ছিলেন, কেউ হয়ত কোটিপতি ধনকুবের ছিলেন, কিন্তু কেহই এই প্রস্থানের রাহু গ্রাস হইতে মুক্তি পায় নাই। আমার কোন পূর্বসুরী যেমন পায় নাই, আমিও পাইবো না আর আমার পরের কোনো উত্তরসুরীও পাইবে না। আজ যতো সুখ নিয়াই এই পৃথিবীতে বিচরন করি না কেনো, যত অভিযোগ নিয়াই বাচিয়া থাকি না কেনো, কিংবা যত কষ্ট নিয়াই দিন যাপন করিনা কেনো, যখন কেউ থাকে না, তখন তাহার প্রতি মুহূর্তের হাসি, উচ্ছ্বাস, মহব্বত, গালি কিংবা মেজাজের প্রতিধ্বনি শুনিতে পাওয়া যায়। এই প্রতিধ্বনি কখনো কাউকে কাদাইবে, কখনো কাউকে একা একাই হাসাইবে, আবার কাউকে এমন এক জায়গায় নিয়া দাড় করাইবে যেখানে মনে হইবে, হয়ত আমার বাচিয়া থাকাটা তাহাদের জন্য খুব প্রয়োজন ছিলো। হয়ত সব রাগ, অভিমান, অভিযোগ সত্তেও মনে হইবে আমার চলিয়া যাওয়ার কারনে এই শুন্যস্থানটা কেহই পুরন করিবার মতো নয়। তখনো এই ছবিগুলিই নীরবে কথা বলিবে।

কিন্তু তাহার পরেও সবচেয়ে সত্য উপলব্ধি হইতেছে, একদিন, সবাই আমরা একে অপরের হইতে আলাদা হইয়া যাইবো। কেউ আগে আর কেউ পড়ে। আমরা সবাই একদিন একজন আরেকজনকে হারাইয়া ফেলিবো, মিস করিবো। দিন, মাস, বছর কাটিয়া যাইবে, হয়ত কাহারো সাথে আর কাহারো কোনো যোগাযোগ থাকিবে না। একদিন হয়ত আমাদের সন্তানেরা, নাতি নাতিনিরা আমাদের অতিতের সব ছবি দেখিয়া কেহ কেহ তাহাদেরই সাথী লোকেদের প্রশ্ন করিবে, “কে এটা? কে ওটা?” তখন হয়ত অনেকেই চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু অশ্রুজলে অদৃশ্য কোনো এক মুচকি হাসি দিয়া বলিবে, “এরা ছিলো ওই সব লোকজন যাদের সঙ্গে আমি আমার সবচেয়ে ভালো কিছু সময় কাটিয়েছি। আজ ওরা কেউ নাই।” এরই নাম ছবি। কথা বলেনা কিন্তু সময়ের ইতিহাস হয়ে থাকে।

আমি কি কেবলই ছবি? তারা কি কেবলই ছবি যারা আজ থেকে শত বছর আগে এই পৃথিবীতে এসেছিলো এবং এখন যারা আর কোথাও নাই? কেউ কেউ তো আবার কোথাও ছবি হিসাবেও নাই? অথচ তারাও এক সময় আমার মতো এই পৃথিবীর আলো বাতাসে বড় হয়েছে, তাদের মধ্যেও প্রেম এসেছিলো, মহব্বত এসেছিলো। তারাও সংসার করেছে, জীবনের প্রয়োজনে এক জায়গা থেকে অন্যত্র সঞ্চালিত হয়েছে। তারাও নীল আকাশ দেখে, নদীর পানি দেখে, বসন্তের ফুল আর ফুলেল পরিবেশে কখনোকখনো কবিতাও লিখেছে। গ্ন গুন করে গান গেয়েছে। পাখির কোলাহলে তারাও কখনো কখনো আপ্লুত হয়েছে। তাদের সময়েও শীত বসন্ত, বর্ষা, সব ই এসেছে। তারাও কারো না কারো সাথে হাত হাত ধরে জীবনের অনেক পথ পড়ি দিয়েছে। এদের অনেকেই হয়ত আজিকার আমাদের থেকেও অনেক নামি দামী নামুসের মতো ছিলেন। আরো কত কি? কিন্তু ওই সব গুনীজনেরা, মানুষ গুলি আজ কোথাও নেই। কেউ হয়ত কারো কারো ড্রইং রুমে ছবি হয়ে আছে, কিন্তু তার দেহ পচতে পচতে মাটির সাথে মিশে দেহ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। যেই হাড় গুলি ছিলো, সেগুলিও এদিক সেদিক হতে হতে ও গুলো আর কোথাও খেজে পাওয়া যাবে না। যে কবরে একদিন তাদেরকে শুইয়ে হাজার হাজার লোক, আত্মীয় সজনেরা বিলাপ করেছিলো, সেই সব আত্তীয় সজনেরাও আজ কোথাওহয়ত নাই। ওই কবরেই হয়ত একে একে শুইয়ে আছেন। ওই কবরটাও কারো একচ্ছত্র নয়।

এই পরিসংখ্যানে আমি ও তাহলে নিছক একটা ছবি এবং কোনো এক সময় এই ছবি থেকেও আর কোথাও নাই। আমার ইতিহাস এই পৃথিবীর কেউ মনে রাখবে না। আমার আজকের দিনের এই রাজত্ব, আমার সাম্রাজ্য, আমার রেখে যাওয়া সব সম্পদ আর সম্পুতি হয়ত হাত বদলের মাধ্যমে আমার বংশ পরম্পরায় কারো হাতে সেটা পৌঁছেযাবে কিন্তু আমার নাম, আমার আজিকার দিনের পরিশ্রম, আমার আজিকার দিনের কোনো কিছুই তার কাছে পৌঁছে যাবে না। সে হয়ত জানবেই না, কার সিঙ্ঘাসনে বসে তিনি কার উপরে প্রতিনিধিত্ব করছেন। হয়ত তিনি জান্তেও চাইবেন না।

তাহলে কিসের জন্য? কার জন্য? 

আজ যারা তোমরা আমার এই মন্তব্য গুলি পড়ছো আর ভাবছ, তাহলে কি আমরা সবাই হাত গুটিয়ে কোনো কিছুই ক্করবো না? হ্যা, করবো। শুধু নিজের জন্য আর নিজের আরামের জন্য।

তোম্রাও এক সময় আসবে, আমার মতোই চিন্তা করে আমাকে সালাম জানবেই।

চলো আমার ডায়েরীতে

১৯/০২/২০১৭-রিলেশনশীপ রুলস

পৃথিবীটা অদ্ভুত একটা অদৃশ্যমান সম্পর্কজনিত তত্ত্বে একে অপরের সাথে এমনভাবে জরিয়ে পেচিয়ে আছে, যা কোনো থিউরী বা সংজ্ঞা মেনে চলে না। প্রতিটি সম্পর্ক একেকটা একেক ধরনের। বৈশিষ্ট আলাদা, এর সাধ আলাদা, মাহাত্য আলাদা, সংজ্ঞা আলাদা, এবং তাদের যন্ত্রনাও আলাদা। মায়ের সাথে বাবার, বাবার সাথে ছেলেমেয়েদের, ছেলেমেয়েদের সাথে পরিবারের, স্বামীর সাথে স্ত্রীর, এক বাড়ির সাথে আরেক বাড়ির, এক পাড়ার সাথে আরেক পাড়ার, এক সমাজের সাথে আরেক সমাজের, দেশ থেকে দেশান্তরের, এমন কি মানুষের সাথে অন্য প্রানীকুলের, জীবিতদের সাথে মৃতদের, শত্রুর সাথে মিত্রের, কিংবা মিত্রের সাথে মিত্রেরও, আরো কতোই না সম্পর্ক। বিধাতার সাথে তার সৃষ্টির সম্পর্কও আরেক পদের। সব সম্পর্কের জন্য একই রুল হতে পারে না, এবং হবেও না। সময়ের পথ ধরে মানুষ এইসব সম্পর্কগুলো নিয়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের জন্য একেকবার একেক রকমের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে কেউ বানী দিয়েছেন, কেউ তত্ত্ব দিয়েছেন, কেউ বা আবার তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনেক থিউরীও দিয়ে গেছেন। সবার জ্ঞ্যান, বয়ান, অথবা থিউরী যে সবসময় কোনো একটা নির্দিষ্ট “সম্পর্কের” ক্ষেত্রে সঠিক, সেটাও যেমন শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না আবার একেবারে সঠিক নয়, এটাও বলা যায় না। যে পরিস্থিতিতে যে সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে কোনো এক ভোক্তভুগী আজ যে ব্যর্থতার মন্তব্য করে গেলেন, ঠিক সেই পরিস্থিতিতে সেই একই প্রকার সম্পর্কের উপর আরেক ভোক্তভুগী হয়ত সাফল্যের কথা বলে যাবেন। অথবা এমনো হতে পারে, আজ যে পরিস্থিতিতে কোনো এক সম্পর্কের মধ্যে ফাটল হয়েছে বলে বলা হলো, হয়তবা সেই ফাটল থেকে ভাঙ্গন-রক্ষার বিকল্প তরিকা আরোপ করে আরেকজন অনায়াশেই উতরে যেতে সক্ষম হন। তাহলে প্রশ্ন আসে, “রিলেসনশীপ রুলস” বলে কি কিছু আছে? কিসের উপর দাঁড়িয়ে একই প্রকার একটা সম্পর্ক সম্বন্ধে সাফল্যের কথা বলে আর কিসের উপর ভিত্তি করে আরেক জন ব্যর্থতার কথা বলে?

প্রত্যেকটি সম্পর্ক একটি স্বাধীন সত্ত্বার মধ্যে, নিজের কাল্পনিক গন্ডির মধ্যে বসবাস করে। মা হবার আগে, মেয়েদের মা হওয়ার কল্পনা আলাদা, বিয়ের আগে যুবতীদের তাদের স্বামীর সাথে কি রকম সম্পর্ক হবে তার ভাবনা আলাদা। কিংবা শাশুড়ি হবার আগে প্রতিটি মেয়েদের একটা নিজস্ব এই কাল্পনিক গন্ডির উপাদানগুলি প্রকৃতপক্ষে সবই অদৃশ্যমান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কল্পনার জগতের সাথে এই বাস্তবের সম্পর্কগুলির মিলমিশের মধ্যে অনেক ফারাক। আর এই ফারাক থেকেই শুরু হয় যতো অঘটন। যদি অন্যভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, দেখা যাবে, এর মধ্যে আছে প্রতিটি সত্ত্বার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ, আছে শালিন-অশালীনতার সীমাবদ্ধতা, আছে ইচ্ছা-অনিচ্ছার গ্রহনযোগ্যতার মাপকাঠি, আছে মেজাজ-মর্জির একটা রুপরেখা ইত্যাদি। যেমন, কেউ লাল রঙ পছন্দ করে, আবার তার সাথে এমন একজনের সম্পর্ক হয়েছে যিনি লাল পছন্দ করেন না, তিনি পছন্দ করেন নীল কিংবা সবুজ। কেউ ঝাল খেতে পছন্দ করেন কিন্তু তার সাথে এমন একজনের সম্পর্ক হয়েছে যিনি ঝাল তো পছন্দ করেনই না, হয়ত পছন্দ করেন কড়া মিষ্টি। সারাক্ষন ঘুরতে পছন্দ করা কোনো এক সুন্দরী রমনীর হয়তো স্বামী জুটেছে অলস এক কালো মানুষের যিনি সময় পেলেই হয়ত ঘুমাতে পছন্দ করেন। স্ত্রী ভেবেছিলেন তার স্বামী হবে এইরকম, কিন্তু হয়ে গেছে অন্যরকম, স্বামী ভেবেছিলেন, তার স্ত্রী হবে এই রকম, কিন্তু হয়ে গেছে দাপটে। দুই বন্ধু এক সঙ্গে কতই না দিন রাত এক সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন ছোটবেলায়, এখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর থেকে অনেক উচু স্তরের বাসিন্দা। এখন দেখা করতেও প্রোটোকল লাগে। মা ভেবেছিলেন, সন্তান বড় হয়ে তার সব দুঃখ ঘুচে দেবেন, কিন্তু ছেলে বড় হয়ে এখন আর মায়ের সেই গ্রামিন হাতে ভাত খেতেও পছন্দ করেন না, সঙ্গে জুটেছে আবার আধুনিকা বউ। বউ মনে করে, ঐ গ্রাম্য অশিক্ষিত মায়ের আবার এতো যত্নপাতি করার কি আছে? এই যে অসম চাওয়া এবং পাওয়া, এরই মধ্যে প্রকৃতপক্ষে লুকিয়ে আছে সম্পর্কের যত অঘটন। তাহলে এই অসমগুনের অধিকারী মানুষগুলির মধ্যে কি সব সম্পর্ক সব সময়ই ভেঙ্গে যাবে? তাইতো যাওয়ার কথা। ঘুমে নাক ডাকেন এমন স্ত্রীর স্বামী তো তাহলে কখনোই একসাথে নির্ভেজাল ঘুমে আচ্ছন্ন হতে পারবেন না। শিক্ষিত আধুনিকা বউ যেমন অশিক্ষিত গ্রাম্য শাশুড়িকে শামাল দিতে পারছেন না, তাহলে তো সব কিছুই ভেঙ্গে যাওয়ার কথা! ফলে কিছু কিছু সম্পর্ক ভেঙ্গেই যায় আবার কিছু কিছু সম্পর্ক টিকে থাকার জন্য লড়াই করে যায়। আবার এরই মধ্যে কিছু কিছু সম্পর্ক কোনো অঘটন ছাড়াই জীবনের শেষ অবধি টিকে যায়। তাদের এই এহেনো পরিস্থিতিতে তাদের কিছু অভিজ্ঞতার আলোকে এই সব সম্পর্কের জন্য “রিলেসনশীপ রুলস” নামে কিছু তত্ত্ব, তথ্য, থিউরী দিতেই পারেন। হোক সেটা সাফল্যের বা ব্যর্থতার। তাদের এইসব অভিজ্ঞতার থিউরী তাহলে কি আমরা সর্বত্র এই জাতীয় সম্পর্কের বেলায় শতভাগ কার্যকরী এবং নিয়ম বলেই মেনে নেবো?

যদি তাইই হতো, তাহলে নব্বই বছরের বৃদ্ধ মানুসটি কোন কারনে আশি বছরের থুড়থুড়ে মহিলার প্রেমে তখনো হাবুডুবু খাচ্ছেন? ঐ আশি বছরের মহিলার তো আর রূপ, যৌবন, প্রজনন ক্ষমতার কিছুই বাকী নাই। তার উপর তারও তো এমন অনেক কিছুই ছিলো যা তারসাথে এতো বছর ধরে ঘর করা মানুষটির অনেক কিছুই মিল ছিলো না। তাহলে কেনো টিকে গেলো ঐ সম্পর্ক? কিংবা এমন এক যুগল দম্পতির বন্ধন যেখানে স্ত্রী কিংবা স্বামী দিনের পর দিন পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন, অথচ ভালোবাসার মহব্বত দিয়ে স্বামী কিংবা তার স্ত্রী তাদের সংসার, পরিবার একত্রে ঐ অবস্থায়ই আগলে রেখেছেন। সেটা কিসের আশায়? নিশ্চয় এমন কিছু কারন থাকে যেখানে কম্প্রোমাইজ নামক বস্তুটি কিংবা এডাপ্টেসন নামক তত্ত্বটি খুব জরুরী। তা না হলে কানা এক কালো মহিলার সাথে বোবা এক স্বামীর ঘরতো কখনোই টিকে থাকার কথা নয়! অথবা যদি অন্যভাবে বলি, কি কারনে পঞ্চাশ বছর বৃদ্ধার সাথে ভাষাহীন এক বছরের কচি ছোট শিশুর কি কথা হয় যেখানে দুজনেই আনন্দে ফেটে পরেন? অথবা কোন রিলেসনশীপ রুলের আওতায় একটি বন্য প্রানির সাথে একজন মানুষের সখ্যতা হয়? প্রেম ভালোবাসা সবসময় একই ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে একজনের সাথে আরেকজনের সম্পর্ক গড়ে উঠে না। একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের মিলের থেকে অমিলটাই বেশি, তারপরেও বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে একে অপরের জন্য কোনো না কোনো একটা মাত্র ফ্যাক্টরের উপরও সম্পর্কটা টিকে রাখা যায়। যারা পারে না, তাদের ইতিহাস কেউ মনে রাখে না। আর যারা পারে, তারাই হন এই সমাজের একেকজন প্রতিনিধি যারা “রেলেসনশিপ রুল” শাসন করেন। যে ঘর একবার ভাঙ্গে, তা বারবার ভাঙ্গার প্রবনতার মধ্যে থাকে। যে সম্পর্কের ভীত একবার নড়ে যায়, তার ভীত বারবার নড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাহলে এখন বিশাল এক প্রশ্ন মানবকুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। আর তা হলো, তাহলে কি “রিলেশনশিপ রুলস” বলতে কিছুই নেই? অথবা রিলেশনশীপ রুলসটা কি? আমার মতে, এটা হচ্ছে নিজের সাথে নিজের সমঝোতা। এই সমঝোতার কথা বললে আরেক ধাঁধা সামনে আসে, কি সেই সমঝোতা?

কোনো এক লেখায় আমি একবার বলেছিলাম, “সময় পাল্টায়”, এখন বলছি, সময় পালটায় না, সময় চলে যায়। আর এই চলে যাওয়া সময়ের প্রেক্ষাপটে অনেক কিছু পাল্টায়। পাল্টায় মানসিকতা, পাল্টায় বোধ, পাল্টায় দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। আর এই পাল্টানোর মধ্যেই আমরা বলি, সময় পালটেছে বলে এটা হয়েছে। সময়ের প্রতিটি ক্ষনের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিচক্ষনতার পরিবর্তন হয়, ধৈর্যের পরিবর্তন হয়, সাথে সাথে নিজের আত্মম্ভরিতাও বদলে যায়। এই পরিবর্তনের জন্য সময়ের দরকার। কারন সময় মানুষকে নিয়ন্ত্রন করে ইমোশনালী, সময় মানুষকে বুঝতে শিখায় কোনটা বন্য, আর কোনটা অদম্য। সময়ের সাথে সাথে মেধার বিকাশ ঘটে। আর এই মেধাই হচ্ছে সমঝোতার প্রথম নিয়ন্ত্রিত রেখা যার মাধ্যমে অন্যান্য অনিয়ন্ত্রনযোগ্য উপাদানগুলিকে নিয়ন্ত্রন রেখে আপাতদৃষ্টির অনিয়ন্ত্রিত আরেকজনের অদম্য বন্য উচ্ছ্বাসকে মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে প্রতিকুল পরিবেশের বিরুদ্ধে পজিটিভ চিন্তাশীল মন তৈরী করে। আর এই চিন্তাশীল মন নিয়ে কারো জন্যই কখনো দ্বার রুদ্ধ না করে প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টার নামই হচ্ছে সমঝোতা। এখানে সবার দেওয়া উপদেশ বা বয়ান করা “রিলেশনশীপ রুলের” কথা শুনার দরকার আছে, বুঝতে হবে কিন্তু সব সময় তা মেনে নিয়ে ঐ মোতাবেক কাজ করতে হবে এমন যেন না হয়। একটা কথা সব সময় মনে রাখা দরকার, অন্যের দেওয়া থিউরী যে আপনার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে, অন্যের দেওয়া উপদেশটাই যে সঠিক উপদেশ সেটা আজ পর্যন্ত কেউ গ্যারান্টি দিতে পারে নাই আর পারবেও না। জীবন একটাই। আর এই জিবনে সব বন্ধুরুপী মানুসগুলিই আপনার সব সময়ের বন্ধু, তা ঠিক নয়। মনে রাখা দরকার যে, সপ্তাহের সবদিবসই আপনার জন্য হাসি নিয়ে আসার কথা নয়, সব ঋতুই আপনার জন্য নীল আকাশ নিয়ে আসার কথা নয়। এখানে যেমন কান্না থাকে, তেমনি থাকে হাসিও। কেউ কান্না নেবেন না, শুধু হাসিটুকুন নেবেন, তার জন্য ঐ হাসি সঠিক আনন্দের নাও হতে পারে।

পরাজিত কমান্ডারের অপারেসনাল প্ল্যান যতোই ভালো থাকুক, আর জয়ী কমান্ডারের পরিকল্পনা যতোই খারাপ হোক, পৃথিবী সবসময় জয়ী কমান্ডারের পক্ষেই ইতিহাস লিখে। আর সেটাই হয় বেস্ট প্ল্যান। পরাজিত মানুষের কথা কেউ শুনে না, সেটা আপনি যেভাবেই যাকেই বলুন না কেনো।

ফলে কখনো কোনো দ্বার রুদ্ধ করবেন না। খোলা রাখুন সব দ্বার। হতে পারে, এই খোলা দ্বারের মাধ্যমেই একদিন সেই আলো এবং বাতাস প্রবেশ করবে যা আপনি অনেকদিন আগে চেয়েছিলেন। আজকে যাকে আপনি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী বলে তার হাত ধরে বসে চোখের জল ফেলছেন, হয়ত সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে দেখবেন, সেই আসলে আপনার আজকের দিনের সব সম্পর্কের ছেদনের মুল হোতা। মানুষকে ঈশ্বর এমন করে বানিয়েছেন, মানুষ এবং অমানুষের সব কিছু দেখতে এক রকমের, শুধু বুঝার জন্য মেধার প্রয়োজন। আর এই মেধা আসে সময়ের পরিবর্তনের সাথে। অপেক্ষা করুন, সময় পাল্টাবে। কারন সময় পিছিনে ফিরে না, কিন্তু সম্পর্ক যেখান থেকে তাল কাটে, তার থেকে আবার পিছনে ফিরে আসতেই পারে। ধৈর্য ধরুন, পুরু ব্যাপারটা নিয়ে নিজে ভাবুন, অনেক জটলা খুলে যাবে। দর কষাকষির মতো নিজের সাথে সম্পর্ক টিকে রাখার জন্য যুক্তি চালাচালি করুন। নিজেকে উভয় পক্ষের লোক হিসাবে ভাবুন। দেখুন, যে ব্যাপারটা আপনি ছাড় দিচ্ছেন না, সেটা অন্য পক্ষে আপনি থাকলে ছাড় দিতেন কিনা। যাদের আপনি কখনো দেখেন নাই, এমন কিছু ভাল বয়স্ক মানুষের সাথে ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা বলুন। দেখবেন, কোথায় ছাড় দেওয়া যায়, আর কোথায় কম্প্রোমাইজ করা যায়। উদ্দেশ্য একটাই, লক্ষ ঠিক রাখুন যাতে একবার সম্পর্ক করে ফেলার পর ভাঙতে না হয়। প্রয়োজনে সম্পর্ক করার আগে সম্পর্ক ভাঙ্গার কারন গুলি সাব্যস্থ করুন যেনো সম্পর্কই তৈরী না হয়। আর একবার তৈরী হয়ে গেলে তাকে বাচানোর চেষ্টা করুন। কারন, আপনি সম্পর্ক ত্যাগ করলেও কেউ না কেউ তার সাথে আবার নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠবেই, আর যদি ঐ সম্পর্ক টিকে যায়, তবে বলতে হবে, আপনার মধ্যেই ভুল ছিলো।

তবে এখানে আরো একটা বিশেষ কথা না বললেই নয়। যখন এতো কিছুর পরও মনে হবে, না, এই সম্পর্কটা রাখা যাবে না। যেটুকু সময় অপচয় করলে সম্পর্কটা টেস্ট করা যেতো বলে সাব্যস্থ্য হচ্ছে, সেইটুকু সময় আপনার হাতে নাই। আর সেই সময়ের মধ্যে এটারও কোনো গ্যারন্টি নাই যে ব্যাপারটা সাফল্যের মধ্যেই সমাপ্ত হবে। অথবা এমন একটা আভাস থেকেই যায় যে, সম্পর্কটা বিফলেই যাবে, সেক্ষেত্রে যতো দ্রুত সম্ভব এই ব্যর্থ সম্পর্ক থেকে মুক্তির যতোগুলি পথ খোলা আছে, অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে সেগুলিকে বাস্তবায়ন করে এই ব্যর্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়া। তাতে মুক্ত পরিবেশে, মুক্তমনে নতুন করে চিন্তা করার অবকাশ থাকে। শুধু একটা নতুন পরিবেশে, ভেঙ্গে যাওয়া মানসিক পরিস্থিতিতে কাউকেই দোসারুপ না করে পুনরায় এই ভুল সম্পর্ক যেনো না হয় তার জন্য অনেক বেশি সতর্ক থাকা এবং চারিপাশ বিবেচনা করে পুনরায় নতুন কোনো আবেগী সম্পর্কে জড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। হুট করে কোনো আবেগী সম্পর্ক করা থেকে বিরত থাকা খুব জরুরী। এছাড়া আরো একটি বিষয়ে খুব সতর্ক থাকা জরুরী যে, ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক নিয়ে আর নতুন করে কোনো প্রকারের ভাবা উচিত না। “যদি” দিয়ে আর কোনো উপসংহার টানা উচিত হবে না। কে ঠকেছে আর কে জিতেছে এর কোনো তুলনা করা যাবে না। কোনো সম্পর্ক নষ্ট হলে দুই পক্ষই হারে বা ঠকে এটাই ফলাফল।

রিলেসনশীপ রুলস বলতে আসলে কিছু নাই। যেটা আছে, সেটা হচ্ছে আপনি কি চান। আর কিভাবে চান। যদি আপনার স্বাধীন চিন্তা করার শক্তি না থাকে, যদি এমন কোনো ব্যক্তির প্ররোচনায় আপনি আপনার সম্পর্ক কে মুল্যায়ন করেন, কিংবা যদি এমন হয়, আপনি কি করবেন, কিভাবে করবেন, কার সাথে কত টুকু করবেন, এই আশায় আপনার নিজের সম্পর্কের উপর অন্যের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন, তাহলে আপনি নিসচিত থাকুন, আপনার কোনো সম্পর্কই কখনো ভালো যাবে না। সেটা আপনার বন্ধুর বেলায়ই হোক, নিজের স্ত্রীর বেলায়ই হোক, অথবা মা বাবা ভাইবোনের বেলায়ই হোক। সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকে।

খোলা হাতে বেচে থাকার চেয়ে কারো হাত ধরে বেচে থাকার নাম হচ্ছে জীবন। ঝগড়া করার জন্য হলেও একজন মানুষ লাগে। একবার যদি সব শেষ করে দেওয়া হয়, হয়ত অনেকদিন পর নিজে কে নিজে প্রশ্ন করবেন, আহা “যদি” এমনটি না করে এমন টি করতাম, “যদি” আরেকটু নমনীয় হয়ে প্রকৃত জিনিষটা বুঝার জন্য সময় নিতাম, “যদি” এইটা না ভেবে ঐটা ভাবতাম, “যদি” ঐ লোকগুলি আমার জীবনে না এসে অন্য কেউ আমার জিবনে আসতো। অথবা “যদি” আমি ঐ সব লোক গুলিকে না শুনতাম ইত্যাদি।

কিন্তু তখন এই “যদি”র উত্তর আর কেউ দেবার জন্য বসে নাই। কিন্তু সেই ঝগড়া করার মানুসটি যদি আপনাকে প্রতি নিয়ত শুধু ঝগড়াই দিয়ে জীবন আরম্ভ করে আর ঝগড়া দিয়েই জীবন শেষ করে, তাহলে বুঝবেন, সম্পর্কটা ভুল। তখন শুধু একটা কথাই মনে হবে, আহা, যদি এই সম্পর্কটা নাহতো, যদি ওই মানুসটির সাথে কখনোই দেখা না হতো, আহা যদি আরো আগে সব বুঝতে পারতাম, তাহলে হয়তো সম্পর্কটাই করা হতো না। কিন্তু আম্রা দেবতা নই, আমরা ভুল করি, ভুল হাত ধরার চেয়ে ভুল হাত ছেড়ে দেওয়া অনেক উত্তম। আর ভুল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নামই হচ্ছে প্রানি।

১৮/০২/২০১৭-নদীর তৃতীয় তীর নাকি তৃতীয় নদীর তীর?

আমার বন্ধু মেজর আসাদের একটা নতুন বই এই বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। “অন্য ভুবন”। বইটি আমি এখনো পরার সুযোগ হয় নাই তবে আমি না পড়েই বুঝতে পারছি, বইটা একটা চমৎকার লেখনীর প্রকাশ হবে। আমি আসাদের লেখার খুব ভক্ত। আমার এই বন্ধুর লেখা আমার আরেক বন্ধু প্রয়াত মেজর সাহেলকে উদ্দেশ্য করে তার একটা লেখা “নদীর তৃতীয় তীর” পড়তে পড়তে মন বড় আবেশিত হয়ে আছে এই কয়েকদিন যাবত। তারই লেখার কিছুচুম্বক লাইন এইরকম। … “মৃত্যু যখন এসে আমার এই শরীরটাকে স্পর্শ করবে তখন তোমরা সবাই আমার শরীরটাকে একটা ছোট্ট নৌকোয় করে ভাসিয়ে দিয়ো। জলস্রোতে ভেসে যাবে অনাদিকাল ধরে। নদীর নিঃসীম উপকূল ছাড়িয়ে আমি যাব, নদীর ভেতরে, নদী থেকে দূরে, নদীতে।” – (নদীর তৃতীয় তীর, হুয়াও হুইমারেস রোসা), বড় রহস্যভিত্তিক। দক্ষিণ আমেরিকার একজন বিখ্যাত ছোট গল্পকারের নাম হুয়াওহুইমারেস রোসা। ‘THE THIRD BANK OF THE RIVER’ (নদীর তৃতীয় তীর) নামে তাঁর লেখা একটা ছোটগল্প। এই গল্পে এক পরিবারের খুব দায়িত্বশীল একজন পিতা একদিন একটা ডিঙি নৌকা তৈরি করেন। ছোট ডিঙি। গলুইতে শুধুমাত্র এক চিলতে জায়গা। একজনের বেশি মানুষ সেখানে বসতে পারবেনা। বিশাল এবং সুগভীর একটা নদীর তীরে পরিবারের বসতি। নদীটা এতই বিশাল এবং প্রশস্ত যে, অন্য তীর দেখাই যায়না। অতঃপর একদিন তিনি নদী পারের বাড়িতে তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিশাল, সুগভীর নদীতে তার ডিঙি ভাসিয়ে দিলেন। কোন খাবার বা অন্য কোন রসদও সঙ্গে নিলেন না। এমনকি শেষ বারের মত পরিবারের কাউকে কোন উপদেশও দেবার চেষ্টা করলেন না। অদ্ভুত ব্যাপার হল তিনি আর কখনও ফিরে আসলেন না। কিন্তু আবার কোথাও চলেও গেলেন না! মাঝ–নদী বরাবর অনির্দিষ্টভাবে ঘোরাফেরা করতে লাগলেন। কখনও উজানে। কখনও বা ভাটিতে। কিছু কিছু সময়ে তিনি দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যান। কিন্তু কখনই এমন দূরে নয় যে তার উপস্থিতিটা পরিবারের সদস্যরা অনুভব করতে সক্ষম হবে না। … মৃত্যুই কি নদীর তৃতীয় তীর?

আসলে এই তীর কি, কোথায় তার অবস্থান, কিংবা এটা কি এমন কোনো নদী যার তীর সচরাচর গোচরীভুত হয় না, অথচ আছে? অথবা এই নদীর কি আরো তীর আছে যার নাম হয়ত চতুর্থ তীর? সবুজ গাছ-পালা, আকাবাকা মেঠোপথের শেষপ্রান্তে প্রাকৃতিক বড়সৌন্দর্য পরিবেষ্টিত বিশাল জলাধারের চলমান স্রোতের প্রাবাহমান যদি কোন নদী হয়, সেই নদীর তীর হয়তোবা কখনো এই বিশাল জনরাশির সবার কমন। এখানে সবার রোমাঞ্চ, আশা, বেদনা, সবার কাহিনীর এক মহাপুস্তকের মতো। হয়তোবা এটা কখনো সভ্যতার জীবনধারার বাহকরুপী কোনো সময়ের রাজত্ব হলেও হতে পারে কিংবা কখনো সেই দৃশ্যমান নদী অতীত বর্তমানের সুখ দুঃখের এই বিশ্বভ্রমান্ডের সাক্ষীর ধারকবাহক হলেও হতে পারে। আর সেটাকেই আমরা কখনো নদী, কখনো উপসাগর অথবা কখনো সাগর থেকে মহাসাগরের স্তরে বিন্যাস করে কতোই না উপমা করে থাকি। এই নদীর স্রষ্টা আছে, এর নিয়ন্ত্রণকারী আছে, আর তার উপর সমগ্র মানবকুল একটা মিশ্র বিশ্বাস নিয়েই কেউ এর স্রষ্টাকে পুজা করে, কেউ তাকে অস্বীকার করে আবার কখনো কখনো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মায়াজালে আশা-নিরাশার ভারদন্ড নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। হয়ত এরই নাম “জীবন”, হয়তবা এরই নাম “সভ্যতা”। এই নদীর কিনারা থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানে এই নয় যে, জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো, সভ্যতা থেকে হারিয়ে যাওয়া। এই বিশ্বভ্রমান্ডের কোথাও না কোথাও আরেক নদীর তীর আছে যেখানে তার কিনারা পাওয়া যায়। সেখানেও নতুন করে সভ্যতা, জীবন এবং নতুন কাহিনীর রচনা হতে পারে এবং হয়।

কিন্তু সমগ্র বিশ্ব থেকে যখন আমরা মানবকুল সবকিছু ছেড়ে ছোট একটা গন্ডি শুধুমাত্র গুটিকতক আপনজনের পরিসীমায় আবদ্ধ করে একটা মায়াজাল আবিষ্ট করি, তখন দিনের সবকাজ শেষ করে যখন নীড়ে ফিরে এসে হিসাব কষি, তখন সামনে এসে দাঁড়ায় আরেকটি নদী। হয়ত তাঁর নাম “মন-নদী’। এই নদীতে চলমান জলের প্রবাহ নেই, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার নেই, পাহাড় নেই, আকাশ নেই, কিন্তু তারও আছে অনেক তীর। যা কখনো শান্তির মহাখুশিতে জলের ধারা বইয়ে চিকচিক করে জানান দেয়, ‘যা চেয়েছি তাই পেয়েছি’। আবার কখনো কখনো দুঃখের সীমাহীন যন্ত্রনায় সেই একই নদী তার দুই তীর জলের ধারায় শিক্ত করে নীরবে বলে যায়, ‘বড় যন্ত্রনায় আছি’। হয়ত তখন আমরা বলি, দুই নয়নের ধারা। নিজস্ব গন্ডির এই পরিসীমায় এই নদীর একক ধারক বাহক শুধু কিছু আপনজন, নিজে আর ব্যক্তিসত্তার অজানা উপাদানের সব সমীকরন। এখানে ঈশ্বর বাস করেন ক্ষনেক্ষনে, আবার ঈশ্বর উধাওও হয়ে যান ক্ষনেক্ষনে। এখানে ছোট গন্ডির গুটিকতক আপনজনের সার্থকতা, ব্যর্থতা, ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা, নির্ভরতা সবকিছু একেবারেই নিজস্ব। সমগ্র মানবকুলের হিসাব কিতাবের সাথে, সুখ দুঃখের সাথে, চাওয়া পাওয়ার সাথে, লাভ লোকসানের সাথে সব কিছু মিশে থাকে।

এই নদীতে বাস করে “আমি”, আমার আমিত্ত আর আমার চারিধারের সব আমারত্ত। আর কেউ নেই। এখানে ঈশ্বর আমি, এখানে নিয়মের কোন বালাই নেই। এখানে আকাশের রঙ আমার নিজের মতো করে বানানো, আমার নদীর জল আমার ইচ্ছায় যখন যেভাবে খুশি প্রবাহিত হয়। এখানে আমার ইচ্ছাটাই সব। এখানে আমার ছোট ডিঙ্গী কখনো উজানে, কখনো ভাটিতে, কখনো নিরুদ্দেশে, কখনো জনসম্মুখে, কখনো কাছে কখনো দূরে যেথায় খুশী সেখানে আমার বিচরন। কাউকে আমার কিছু যেমন বলার নেই, কারো কোনো কিছুই আমার পরোয়া করারও কোন প্রয়োজন নেই। এখানে আমার কোন দায়িত্ববোধ নেই, আমার দায়িত্বও কারো উপর নেই। এখানে আমার সব নদীর উপস্থিতি যেমন আছে, তেমনি কোনো নদীর উপস্থিতিও আমাকে বিচলিত করে না। একদিক থেকে দেখলে এই নদীর কোন তীর নেই আবার আরেক দিক থেকে অনুধাবন করলে হয়ত দেখা যাবে এর আছে অজস্র তীর। কখনো উল্লাশের তীর, কখনো আনন্দের তীর, কখনো ব্যর্থতার তীর, কখনো সব হারিয়ে এক অবসন্ন জীবনের তীর। এখানে এই তীরে কেউ প্রবেশের অধিকারও নেই। এখানে আমার রশদের কোনো প্রয়োজন নেই, এখানে সর্বত্র আমি। আমি কি করতে পারতাম, কি করা উচিত ছিলো, কে কি করতে পারতো, কোথায় আমি ভুল করেছি, কোথায় আমার সার্থকতা ছিলো, কি আমার ভুমিকা হতে পারতো, কিংবা কি কারনে আমি আমার সবকিছু নিঃস্বার্থভাবে ছেড়ে আমি আমার তৃতীয় এই নদীতে একা পড়ে আছি, তার কোনো ব্যখ্যা আমি আর খুজতে চাই না। হয়ত কেউই এর কোনো উত্তর মেনেও নিবে না।

এখন আরেকটি প্রশ্ন মনে আসে। তা হলো, এই তৃতীয় নদীটি কোথায়? কারো কাছে এই তৃতীয় নদীটি হয়ত বাস্তবের কোনো এক বিশাল জল প্রবাহমান নদীর বুক, কারো কাছে হয়ত বা ঘন গাছপালায় পরিবেষ্টিত এক নির্জন জঙ্গল, কারো কাছে হয়ত বা এই বিশাল মানবকুলের ঘনবস্তির মধ্যেও একা কোনো জগত। কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক, এই নদী সবার আছে, কেউ তাকে গ্রহন করে, কেউ এর সন্ধান জানেও না। এই নদীতে ঝাপ দেওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। কারন এর যেমন কোনো দৃশ্যমান তীর নেই, আবার সব তীরের ঘাটও এক রকম নয়। এর জলের রঙ সবনদীর মতো নয়। এর কোনো ঋতু নেই, যখন তখন বৃষ্টি, ঝড়, উল্লাস, আনন্দ, কান্না, পরিহাস সবকিছু ঘটে। আর এর একচ্ছত্র অনুভুতি, আস্বাদ, ইতিহাস শুধু নিজের আর কারো নয়। এই তৃতীয় নদীর কিনারে বসে শতবর্সী বয়োবৃদ্ধা তাঁর বাল্যকালের স্বপ্ন দেখেন, আবার কারো কারো অজান্তেই এই নদীর বালুচরে হেটে হেটে কোনো এক উদাসীন কিশোর তাঁর কল্পনার জগত পেরিয়ে শত বর্স পেরিয়ে কোনো এক জন বসতীর সপ্নজাল বুনন করেন। কেউ ফিরে আসে, কেউ আর ফিরে না। এই নদীর তীরে বসা সবাই একা, সবাই সুখী, আবার সবাই বিরহীর মতো। অথচ এতো কাছাকাছি থেকেও এদের মধ্যে কেউ সখ্যতা করেন না, কেউ কাউকে সম্মোহনও করেন না। যেদিন এই মন-নদী অবশান হয়, সেদিন সব তীরের ধারা একসাথে মন-নদীর সাথে তিরোধান হয়। হয়ত তখন হুয়াও হুইমারেস রোসা্র লেখা “নদীর তৃতীয় তীর”টি আর কারো গোচরীতভুতও হয় না। সময়ের বিবর্তনে আমরা সবাই ঐ জেলের মতো হয়ত কোনো কোনো তীর থেকে খসে পড়ি। বৃন্তচ্যুত কলির তীরখসা জীবনের অজস্র তীরের যখন একচ্ছত্র ভিড় ঘনীভুত হয় মহামিলনে বা মহাবেদনায় অথবা মহাপ্রলয়ে, তখন চৈত্রমাসের তাপদাহের পর বৈশাখের কালো হিংস্র ঝড়ে তান্ডবের মতো আমরা শুধু সেটাই দেখি যা শ্রাবনের অঝরধারায় এই মাটির ধরায় সবার পায়ে, মনে, ঘরে বা মানসপটে ভেসে উঠে।  

হুয়াও হুইমারেস রোসা্র লেখা নদীর তৃতীয় তীর, হয়ত সেই নদীর কথাই বলেছেন

১৩/০২/২০১৭-যদি

“যদি” এমন একটি শব্দ যা অতীত, ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান এই তিনকালের সব কৈফিয়তের এক আওয়াজ। কোনটা কি করা হলে কি হতে পারতো, কোনটা কি না করা হলে কি না হতে পারতো, এটা না ওটা অথবা ওটা নয় এটা করা হলে ফলাফল কি দাড়াতো ইত্যাদির একটা হতাশার প্রয়াস মাত্র। এই “যদি”তে অতীত বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ কোনোকালের জন্যই বিশেষ কিছু পরিবর্তন আনেনা। তবে এই “যদি” থেকে কেউ যদি শিক্ষা নেয়, অন্য কেঊ উপকৃত হতে পারে তাতে অনেক কিছুর দ্বন্দ্ব মিটে যায়। আসলে “যদি” একটা অভিজ্ঞতার নাম, “যদি” একটা সময়ের নাম। “যদি” একটা অধ্যায়ের নাম। এই “যদি” থেকে অনেক কিছু শেখার যেমন আছে, তেমনি, এই “যদি” থেকে অনেক ভোগান্তিও আছে।

সময়ের স্রোত ধরে মানুষ যখন আজকের বর্তমানকে পেরিয়ে আগামীকালের বর্তমানে পদার্পণ করে, তখন এই “যদি” এসে সামনে দাঁড়ায়। সাফল্য আর ব্যর্থতার মাঝামাঝিতে দাঁড়িয়ে “যদি” শুধু এটাই বুঝাতে চায় যে, “যদি” এইটা এইভাবে না করে ঐভাবে করা হতো, “যদি” অমুকের সাথে ঐ সময় দেখা না হতো কিংবা “যদি” অমুকের সাথে দেখা না হয়ে অন্য কারো সাথে দেখা হতো? “যদি” আরেকটু সাবধান হওয়া যেতো? “যদি” আরো বেশী মনোযোগী হয়ে ঐ কাজটা না করে সেই কাজটা করা যেতো? “যদি” এটা না করে ওটা করা হতো ইত্যাদি ইত্যাদি তাহলে হয়ত আজকে যা ঘটছে বা ঘটেছে, সেটা থামানো যেতো কিংবা ফলাফল আরো ভালো হতো। এই “যদি” বড় কঠিন সেতু যাকে ভর করে আর কখনোই সামনে যাওয়া যায় না। অথচ এই “যদি” যদি ঐ সময় ভাবা হতো, তাহলে জীবনের অনেক কিছুই পালটে যেতো। আমরা সবাই এই “যদি”র কাছে সব সময় হেরে যাই।

আজকে মনের ইমোশনাল বিচারে যা করতে হয়েছে, বা করে ফেলা হয়েছে, তখন মনে হয়, আহা “যদি” ঐ সময় এই ইমোশনালটা না হতাম, যদি ঐ কাজটায় আমি বা আমরা আরো কিছু সময় দিয়ে একটা উপায় বের করতাম, যদি আরেকটু সহনশীল হয়ে এইটা না করে ওইটা করতাম, তাহলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। হয়তো এখন যা হয়েছে, তার আর কিছুই হতো না। হয়ত জীবনটাই পালটে যেতো। আজকে যাকে আমার একেবারেই সহ্য হচ্ছে না, যাকে নির্মুল করার জন্য আমি প্রানপনে চেষ্টা করছি, আহা, ‘যদি” ঐ সময়ে ঐ মানুষটির সাথে আমি আরো গভীরভাবে সবকিছু শেয়ার করে সব মিটিয়ে নিতাম, হয়তবা আরো কতই না ভালো হতো। আর এটাই হচ্ছে এই “যদি”র চরিত্র। “যদি”টা সব সময় “যদি”র মধ্যেই থাকে। যারা এই “যদি”কে কাজে লাগায়, তারা ভিন্ন ভিন্ন পথে এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অনেক নতুন নতুন পথের সন্ধান পায়।

“যদি” একটা কম্প্রোমাইজের নাম। “যদি” দ্বারা কেউ যদি কম্প্রোমাইজ করে, সেটা ভবিষ্যতের বড় হারের চেয়ে লাভজনক। “যদি” একটা বিকল্পের নাম। এই যদি দ্বারা অনেক কিছুই শামাল দেওয়া সম্ভব। আর শামালের আরেক নাম “সময়কে ঠেক দেওয়া”। সময় পাল্টায়, আর সময় যখন পালটে যায়, তখন এই অনেক কিছুই আর আগের মতো থাকে না। আজ যে পরিবেশটা অনেক অসহনীয় মনে হয়, সময়ের সাথে সাথে এই পরিবেশ অনেক সহনীয় হয়ে উঠে। আর সহনীয় সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। “যদি” থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষ ধৈর্যশীল হতে শিখে। আর ধৈর্যশীলরাই জয়ী হয়।

“যদি” যেমন একটা সাফল্যের নাম হতে পারে, এই “যদি” একটা ব্যর্থতার নামও হতে পারে। “যদি” শুধু অতীত কোনো ব্যাপার না, “যদি” একটা সম্ভাবনার নামও বটে। যে কোনো পরিকল্পনায়, কাজে কিংবা সিদ্ধান্তের আগে যদি আমরা এই “যদি”কে বেশী বেশি ভাবি, হয়তোবা কোনো না কোনো “যদি” আমাদের সাফল্যের পথ দেখাতে পারে। অতীতের “যদি” একটা শিক্ষা কিন্তু আগামির “যদি” একটা সম্ভাবনা।

১৩/০২/২০১৭-ফাল্গুন মাসের মাহাত্য

ফাল্গুন মাসের কোনো মাহাত্য আমি আজো খুজে পাই নাই। কেনো এই ফাল্গুন মাসবাঙ্গালীর জীবনে অনেক অতিশায়ী আদরের একটা মাস, তাও আমার মনে কখনো জেগে উঠেনাই। ফলে ফাগুনের আগমনে আমার মন কখনো পুলকিত হয়ে জেগে উঠে নাই। কবিদের কথাআলাদা।

বাংলার অন্যান্য মাসের মতোই এই ফাল্গুন মাস আমার কাছে একটাস্বাভাবিক মাসের চেয়ে আর বেশী কিছু নয়। তবে যখন ছোট ছিলাম, বৈশাখ মাসটাকিছুটা হলেও আমার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতো, কারন এই বৈশাখ মাসেআমাদের গ্রামে মেলা হতো, মেলায় হরেকপদের জিনিসের কেনাবেচা হতো। পকেটে পয়সাথাকুক আর নাই বা থাকুক, দলবেধে অন্তত ঐ মেলায় গিয়ে কিছুটা সময় হলেও আনন্দকরতে পারতাম। অন্যদিকে কালবৈশাখী ঝড়ের কারনেও মাঝে মাঝে কালো আকাশের চেহারাদেখে নিজে আতংকিত না হলেও বড়দের চোখে ঝড়ের আতংক দেখে ভয় পেতাম। কখনো কখনোঝরের তান্ডবলীলায় কচিকচি আম কুড়াবার যে একটা হিরিক পরতো সেটা একেবারেনেহায়েত মন্দ না। হয়ত এইসব কারনেই বৈশাখ মাসটি আমার কাছে ফাল্গুনের থেকেওবেশি মনে পড়ে।

বর্ষাকালও ফাল্গুন মাসের থেকে আমার জীবনে অনেক বেশীমনে রাখার মতো অনেক কারন ছিলো। আমাদের নৌকা ছিলো না, স্কুলে যেতে হতো হাটুপানি ভেঙ্গে। কখনো কখনো পলিথিনের ভিতরে বইপত্র ঢোকিয়ে বৃষ্টির মধ্যে একগাদাকচিকচি পোলাপান মাইল কে মাইল ভিজে স্কুলে যেতে হতো। কখনো কখনো তুমুলবৃষ্টির মধ্যে নাড়ার আটি দিয়ে পেচিয়ে নকল ফুটবল বানিয়ে ইচ্ছেমতো ফুটবলখেলতাম। বকা খেয়েছি বড়দের, শাসন করেছে বারংবার এই বৃষ্টিতে ভিজে খেলার জন্যকিন্তু কে শুনে কার কথা। আর শীতকালের কথা তো সব সময়ই মনে পড়ে। এখনো মনে পড়ে।

এতোকিছুর পরেও আমি কখনো ফাল্গুন মাস যে একটা আলাদা কোন মাস এবংএটা যে একটা আলাদা কোন বিশিষ্ট আছে তা আমি খুব আলাদা করে কখনো বুঝি নাই।হতে পারে এই মাসে গ্রামের সেই চিরাচরিত সর্ষেফুলের বাহার, জংলীফুলেরসমাহার, কাশবনের সাদা ফুলের প্রাকৃতিক বাহার বড় সুন্দর কিন্তু এইগুলিতোছিলো গ্রামের নিত্যদিনের সৌন্দর্য। যা সবসময় চোখে পড়ে সেটা আর নতুন কি।কবিদের মন আলাদা। তারা বিড়াল দেখলে কবিতা লিখে, গ্রামের মেয়ে কলশী কাঁখেনদী থেকে পানি আনা দেখলেই কবিতা লিখে কিংবা টিনের চালে টাপুর টুপুর বৃষ্টিহলেই কবিতা লিখে। কিন্তু আমি কবি ছিলাম না। বৃষ্টির দিনে আমাদের টিনেরচালের সেই টাপুর টুপুর শব্দ তো আমার কানে লাগতোই না বরং আমাদের চালের কোনফুটা দিয়ে অনর্গল বৃষ্টির পানি ফোটায় ফোটায় পরে ঘরের মেঝ নষ্ট করে দিচ্ছে, কিংবা কাথা বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে বলে হাড়ি দিতেই দিতেই সময় কেটে যেতো। এদিকদিয়ে পানি পড়ে তো এইদিকে হাড়ি লাগাও, ওইদিক দিয়ে পানি পড়ে তো ওইদিকেও হাড়িলাগাও, হাড়ি নাই তো বদনা, বালতি যা আছে তাই লাগাও ইত্যাদি। একদিকে হাড়িদিলে আরেক দিকে হাড়ি দেওয়ার হাড়ি অবশিষ্ট থাকে না। এই অবস্থায় কি আরবৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দ কানে আসে? অথবা ঋতুর চাকচিক্য নিয়ে কি কবিতালিখার বা পুলকিত হবার কোনো কারন থাকে? ফলে আমারও ছিলো না, আবার কখনোউপলব্ধিও করি নাই।

এখন বয়স হয়েছে। গ্রামের সেই ফুটা টিনের বাড়িতেআর থাকা হয় না। ফলে বৃষ্টির দিনে বাড়ির সেই ফুটা দিয়ে পানি যে ঘরের খাট, বইয়ের তাক, মেঝের মাটি ভিজে যাবে সেই ভয়ও নাই, আর ভাঙ্গা হাড়ি ধরার আর কোনঅবকাশও নাই। টিনের চালের টাপুর টুপুর শব্দটা হয়ত এখন মনে নাই। তবে এইঅট্টালিকায় বসে কখনো মনে হয়, আহা, যদি আবার সেই কালবৈশাখী ঝড়টায় আরো কিছুকচি আম গাছের নীচে পড়ে থাকতো, আহা, যদি এমন হতো যে, সেই বৃষ্টির দিনেহাফপ্যান্ট ভিজিয়ে আবার যদি সেই কচি বেলার বন্ধুদের নিয়ে হাটু পানি ভেঙ্গেমাইল কে মাইল পার হতে পারতাম। যে ফাগুন মাসের সেই প্রাকৃতিক কাশবনেরসাদাফুল, জংলিবাহার কিংবা সর্ষেফুলের মনমাতানো হলুদ ক্ষেত কখনো ই আমার চোখেধাধা মিশায় নাই, সেই সৌন্দর্য যদি এখন আবার ফিরে আসতো!! হয়ত এখন তা আমারচোখে পড়তো।

মনে হয় যদি আবার সেই জগতে চলে যেতে পারতাম, হয়ত এখন আমিঅন্যমনস্ক হয়ে ভাবতাম, পরুক না হয় কিছু বৃষ্টির পানি, ভিজিয়ে দিক না আমারকাচা মাটির মেঝ। হয়তো আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে আমার সেইটিনের চালের ঢেউ দিয়ে গড়িয়ে পরা পানির সাথে আমার ভিজে আসা চোখের পানিও নাহয় আমার কাচা মাটির মেঝ একটু ভিজিয়ে দিয়ে যাক। আজ আমি শহরের কোনো একঅট্টালিকায় বসে সববয়সি মেয়েদের হলুদ শাড়ির বাহার দেখে বুঝতে পারি, আমাদেরগ্রামে এখন সর্ষেফুল চারিদিকে বাতাসে দোলা খাচ্ছে, আমাদের বাড়ির পাশে সেইজংলীফুল গুলিও বাতাসে নেড়ে চেড়ে উঠছে। হয়ত এখন সেখানে ফাগুন মাস। কিন্তুআমি নেই। তাই এই বিশাল পৃথিবীর অগনিত মানুষের থেকে একেবারে নেই হয়ে যাবারআগে কাল বৈশাখী ঝড়ের মাস, বৃষ্টির মাস, শিটের মাসের মতো আজ এই ফাগুন মাসকেওআমার বড় আপন মনে হলো।

স্বাগতম তোমায় হে ফাগুন মাস। তুমি আমারজিবনে প্রায় ৫০ বছর পর আবির্ভূত হতে পেরেছো। আজ মনে হয়, ফাগুন মাসটাও একটামাস, যাকে আমি কখনো দেখি নাই।

আচ্ছা, ফাগুন মাসে কি চোখ ভিজে? কি জানি, হয়ত ভিজে না। কারো কারো চোখ হয়ত এমনিতেই ভিজে।

০৪/১২/২০১৬-ইমোশনাল ম্যানেজমেন্ট

আমি ঠিক জানি না ইমোশনাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে মন্তব্য করাটা কতটুকু যুক্তি আছে বা আদৌ কোন যোগ্যতা আমি রাখি কিনা। কিন্তু প্রতিদিন আমার চারিপাশে যা দেখছি, যা ঘটছে, যে ভাবে ঘটছে আর এর বিপরীতে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবার, তথা সামাজিকভাবে প্রতিটি স্তর যেভাবে সাফার করছে, তাতে মনে হয়, কোথাও কিছু অসঙ্গতিমুলক রীতি, নীতি এবং সর্বোপরি কিছু বাহ্যিক আচরন কাজ করছে। ফলে প্রতিনিয়ত যারা এর প্লেয়ার এবং যারা এর ভিক্টিম তারা উভয়ই নিজ নিজ চেষ্টায় পরিত্রান পাওয়ার আশা করলেও আশারুপ কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছেনা। আর এ কারনে প্রতিনিয়ত ছোট বালক থেকে শুরু করে প্রবীন বয়স্ক মানুষটিও ক্রমাগত অস্থিরতায় ভোগছেন, সংসারে শান্তি নষ্ট হচ্ছে, পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যাচ্ছে, আর বাড়ছে ক্রমাগত সামাজিক ক্রাইম এবং জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। এর থেকে কি পরিত্রানের কোনো উপায় নেই? এই আপদ কি তাহলে হুট করে সৃষ্টি হয়েছে? নাকি এই আপদ আগেও ছিলো, তবে তা নিয়ত্রনে ছিলো বিধায় চোখে পড়ে নাই? অথবা এমন কি কিছু যে আধুনিক সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি এটা ধ্বংসের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে?

বিষয়টি আলোকপাত করার আগে আমি “ইমোশনাল” অনুভুতিটি নিয়ে একটু সংক্ষিপ্ত ভাবতে চাই। এই “ইমোশনাল” বিষয়টি আসলে কি? সবাই মাঝে মাঝে কথায় কথায় কাউকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুনা যায়, বলেন যে, লোকটি “ইমোশনালি বায়াসড” কিংবা ছেলেটি একটু বেশী “ইমোশনাল”।  এটা কি এমন যে, নদী দেখলেই উদাসীন হয়ে যাওয়া, কিংবা সবুজ ঘাসের মাঠ দেখলেই অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া, কিংবা এটা কি এমন যে, বাবা তার কোন সন্তানের জন্য একটা উপহার নিয়ে আসলেন তো আরেকজনের জন্য আনতে পারলেন না বলে, যে পেলো না সে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে মন খারাপ করে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকা? অথবা এটা কি এমন কিছু যে, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করার কারনে মন খারাপ করে আত্তহত্যা করা? অথবা এটা কি এমন কিছু যে, আমার ভালো লাগলো না বলে আমি অন্য কারো মতামতের তোয়াক্কা না করেই উলটা পালটা ব্যবহার করা?

ব্যাপারটা মনে হয় ঠিক এই রকম নয়। আমি ব্যাপারটাকে যেভাবে দেখি সেটা হচ্ছে, “ইমোশনালী বায়াসড” বলতে যেটা বুঝি তা হচ্ছে, যেই বয়সে যে মানুষটি যেভাবে কোনো একটা বিষয় যতটুকু বাস্তবতার সাথে তার বুদ্ধি বিবেচনায় বুঝে তা মেনে নেওয়া দরকার বলে একটা মানদণ্ড থাকে কিংবা সেই মানদণ্ড মোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে সবাই মনে করেন, সেটা না করে কেউ যদি যুক্তির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তার স্বার্থের জন্য, লোভের জন্য, আনন্দের জন্য, কিংবা যে কোনো মুল্যেই হোক সেটা তার পেতে হবেই বলে ঘাট বেধে বসে থাকেন, তাহলেই আমি ধরে নেবো সে ইমোশনালী বায়াসড হয়ে আছেন। মানতে চাইছে না, শুনতে চাইছে না, কিংবা বাস্তবতা বুঝতে চাইছে না। তার মানে কি দাড়ালো? এটা কোন বয়সের মধ্যে পড়ে না। এটা যে কারো ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে। হতে পারে পাচ বছরের বাচ্চার ক্ষেত্রে, হতে পারে বারো বয়সের কোন উঠতি বয়সের যুবক- যুবতীর ব্যাপারে, হতে পারে প্রবীন কোনো বয়স্ক লোকের ব্যাপারেও। স্থান কাল পাত্র ভেদে এবং বিষয়ের উপাদানের উপর বিভিন্ন বয়সের মানুষদের জন্য এই ইমোশনাল শব্দটি খাটে।

একটা উদাহরন দেই। ধরুন, আপনি একজন মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ। মাসের উপার্জন আপনি প্রতিটি বিষয়ে এমনভাবে হিসাব করে করতে হয় যে, কোন কারনে যদি কখনো তার বাইরে কোন ইভেন্ট চলে আসে, তাহলে আপনার পুরু সংসারের হিসাবে একটা আমুল পরিবর্তন করতে হয়। পরিকল্পনা করেছিলেন, আপনার বারো বছরের ছোট বাচ্চার এ মাসে জন্মদিনের পার্টিটা কিছু খরচ করে কিছু লোক দাওয়াত করে নিজের বাড়িতে খাওয়াবেন। হয়ত একটা নতুন উপহারও দিবেন ভেবে রেখেছেন। এটা আপনার ছোট বাচ্চাটিও হয়ত জানে এবং সে সে মোতাবেক মনে মনে খুশীতেই আছে। কিন্তু হটাত করে আপনার পরিবারে এমন কিছু ঘটনার আবির্ভাব হলো যেখানে আপনার ছোট বাচ্চার জন্মদিনের বাজেটটাই হয়ত সেই অনাখাঙ্গিত খাতে খরচ করতে হতে পারে এবং ওই মাসে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান আর পালন করা হয়ত সম্ভবই নয়। এ ক্ষেত্রে কি কি হতে পারে?

হতে পারে-

(১) আপনার ছোট বাচ্চাটি খুব মন খারাপ করবে। আর মন খারাপ করে এমন গো ধরবে যে, তাকে শান্ত করাই খুব কঠিন কাজ। সে হয়ত ঠিকমতো কারো সঙ্গেই ভালো ব্যবহার করবে না, নাওয়া খাওয়া করবে না, পড়াশুনা করবে না, কারো সঙ্গে ভালো ব্যবহারও হয়ত করবে না। সারাক্ষন তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকবে ইত্যাদি।

(২) আপনার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও এমন একটা পরিকল্পনায় ব্যাঘাত হওয়ায় মন খারাপ করতে পারে। একদিকে নিজেদের মন খারাপ, অন্য দিকে আদরের কনিষ্ঠ সদস্যের মন খারাপ হওয়ার কারনে আরো অধিক মন ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে। তারা হয়ত আপনার ফাইনান্সিয়াল ক্ষমতার পরিধি জানেন বলে হয়ত বাস্তবতা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করবেন বা করার চেষ্টা করছেন। আদরের ছোট মানুষটিকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন ইত্যাদি।

(৩) আপনার নিজেরও কিন্তু বড্ড মন খারাপ হচ্ছে আপনার আদরের ছোট বাচ্চাটির জন্মদিনটা আপনার সামর্থ্যের মধ্যে করতে না পারার কারনে। কিন্তু বাস্তবতা এইরকম যে, জন্মদিন করতে গেলে ওই আকস্মিকভাবে আবির্ভূত ঘটনা সামাল দেওয়া সম্ভব নয় আবার ওই আকস্মিক ঘটনা সামাল না দিলেও অনেক বড় ক্ষতির সম্ভাবনা। এই অবস্থায় আপনি ভাবছেন, আপাতত আকস্মিক ঘটনাটাকেই প্রথমে সামাল দেওয়া অতিব জরুরী, তাই আপাতত জন্মদিন পালন সাময়িকভাবে বন্ধ কিন্তু মনে মনে আছে, যেভাবেই হোক, অতিদ্রুত অন্য কোনো উপায়ে কিংবা অন্য কোন পরিকল্পনায় কাটছাট করে অচিরেই জন্মদিনটা পালন করার চেষ্টা করবেন।

এইপুরু পরিস্থিতিটা যদি আপামোর সব সদস্যরা (আপনার ছোট বাচ্চা, অন্যান্য সদস্যরা) সবাই খুব পজিটিভলী নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে থাকেন, তাহলে আমি বলবো, খুবই আউটস্ট্যান্ডিং একটি পরিবার। ইমোসন আছে কিন্তু বাস্তবতার নিরীখে সবাই সবার লেবেলে যথেষ্ট পরিপক্ক।

কিন্তু যদি উল্টোটা হয়? কেউ মানতেই চাইছে না, অস্বাভাবিক ঘটনা কিভাবে টেক্যাল দিবেন আর কিভাবে দিবেন না, সেটা আপনার ব্যাপার, বাচ্চার জন্মদিন পালন করাই চাই। তাহলে বলবো, আপনি অনেক গুলি ইমোশনাল বায়াসড কিছু সদস্যদের নিয়ে বসবাস করছেন।

ইমোশনাল বায়াসড পরিবারের লোকজন একে অপরের যুক্তি অযুক্তির পন্থায় মানতে থাকেন। পাশের বাড়ির ঐশ্বর্যকে নিজেদের না থাকার সামর্থ্যকে ছোট করে দেখেন, বিশ্বাসের ঘাটতির সৃষ্টি হয়, কখনো কখনো তা সমাজের নীতির বিরুদ্ধেও কাজ করে। আকাশ দেখে ইমোশনাল হওয়া আর মেঘ দেখে ইমোশনাল হওয়া অথবা কোন একটি সিনেমা দেখে ইমোসনাল হওয়ার মধ্যে হয়ত কোনো বড় রকমের দোষ নাই কিন্তু এই অভ্যাস টা ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যখন ব্যক্তিত্ব আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের একটা কনফ্লিক্ট কাজ করে।  

০২/১২/২০১৬-সময়

 “সময়” এমন একটি জিনিষ যে এটি প্রতিটি মানুষ, বস্তু, এবং প্রতিটি ইভেন্টের সঙ্গে প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনে সে জড়িত, কিন্তু সে কারোরই বন্ধু নয়। সে টিক টিক করে সবার সঙ্গে বয়ে বেড়ায় কিন্তু সে কারো সঙ্গেই সখ্যতা গড়ে তোলেনা। সে সবার সঙ্গে আছে আবার অন্যদিকে সে কারো সঙ্গেই নাই। সে যেমন কারো জন্যই অপেক্ষা করে না, আবার কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে বলে সে তড়িঘড়িও করে সামনে এগিয়ে আসেনা। বাজারের পন্যের মতো তাকে কোথাও কম বা বেশী দরে কিনে যেমন সঞ্চয় করা যায় না, তেমনি, অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের কারনে সেই অপচয় করা “সময়”টি আর ফিরেও পাওয়া যায়না। সময়ের কোন বিকল্প নাই। কারো কাছ থেকে ধার করেও এই “সময়” নামক জিনিষটি কখনো পাওয়াও যায়না। এটা এমন এক জিনিষ যে, কেউ তার নিজের তহবিল থেকে ধারও দিতে পারে না। তার গতি সর্বদা সামনের দিকে, কারো জন্যই সে পিছনে ফিরে আসেনা। আজকের সূর্যাস্ত যদি আপনি না দেখে থাকেন, আর কখনোই আজকের চলে যাওয়া সূর্যাস্ত আপনি আর দেখতে পাবেন না। আপনি হয়ত কোনো একটি “সময়ের” ফ্রেম ক্যামেরায় বন্ধি করে রাখতে পারবেন, কিন্তু ওই সময়ের ওইপরিবেশ, ওই আমেজ, ওই আস্বাদন, ওই অনুভুতি সেটা আপনি কখনোই ফিরে পাবেননা। এটা যেনো সেই জলবিন্দু মতো, যে একবার কোন একস্থান বয়ে সামনে চলে গেছে, সে আর দ্বিতীয়বার ওই স্থানে ফিরে আসার সম্ভাবনা নাই, আর আসেও না। Same drop of water never passes twice through a same bridge.

সময় এমন একটা জিনিষ, যাকে সর্ব পরিস্থিতির মহৌষধও বলা যায়। যার ফলে ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে, Time is the panacea of all situations. কেউ কেউ আবার একে অন্যভাবেও বলে যে, Time is the panacea of all diseases. কথাটা সত্য। যেমন ধরুন, আজকে অতি আদরের কেউ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কারনে মাঝে মাঝে কারো কাছে মনে হবে, সব বুঝি শেষ। দুঃখের আর শেষ নাই, কিংবা কারো এই অসময়ের প্রস্থানে অনেকেই ভেঙ্গে পড়েন, অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিংবা এমন হয় যে, আজকে যে অশান্তি পরিবেশ মানুষকে কাবু করে ফেলেছে, হয়ত সময়ের অবগাহনে সে আবার সব ভুলে, সব কিছু আবার নতুন করে ধীরে ধিরে সাজিয়ে তোলেছে। সময়ের ব্যবধানে শান্ত হয়ে আসে পরিবেশ, শান্ত হয়ে আসে জীবনের অনেক কিছুই। এই “সময়”ই মানুষকে সাবলম্বি করে তোলে, আরোগ্য করে তোলে। “সময়ের” স্রোতে মানুষ আবার ঠিক হয়ে যায়। ক্ষন যায়, দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, মানুষ “সময়ের” স্রোতে আবার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠে। হারিয়ে যাওয়া বেদনার কথা ভুলে যায়, ব্যথার কথা ভুলে যায়, চোখের জল মুছে যায়। আর এজন্যই হয়ত বলা হয় “সময়” মানুষকে বদলে দেয়।

“সময়” মানুষকে অভিজ্ঞ করে তোলে। একই সমস্যা, একই ব্যক্তি, বিভিন্ন সময়ের ব্যবধানে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমাধান করেন। আর এর কারন একটাই, আর সেটা হচ্ছে, “অভিজ্ঞতা”। যে সমস্যাটা আজ আপনি একভাবে সমাধান করেছেন, সেই একই সমস্যা আগামিকাল একই পদ্ধতিতে আপনি সমাধান নাও করতে পারেন। অথবা সময়ের ব্যবধানে অভিজ্ঞতার কারনে আপনি নিজেও হয়ত সেই একই সমস্যা ওই একই পদ্ধতিতে সমাধান করতে চাইবেন না। আর এটাই হচ্ছে পরিপক্কতার লক্ষন।

“সময়” সবকিছু পালটে দেয়। পালটে দেয় পরিস্থিতি, পালটে দেয় মানসিকতা, পালটে দেয় ব্যবহার, অভ্যাস। এমনকি পালটে দেয় মানুষের পছন্দ, অপছন্দ, এমনকি পালটে দেয় সম্পর্ক পর্যন্ত। আজ আপনি যে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন, হোক সেটা সুখের বা কষ্টের, সময়ের ব্যবধানে সেটা পালটে যেতে পারে। আজ আপনার যে মানসিকতা, “সময়ের” ব্যবধানে আপনার মানসিকতা পুরুটাই পালটে যেতে পারে। যে বয়সে আপনি অনেক দুরন্তপনা করেছেন, কিংবা যে “সময়ে” আপনি আবেগের বশে অনেক কঠিন কঠিন শপথ করে কালবৈশাখী ঝড় মাথায় নিয়ে একা সাহস করে অনেক কিছু মোকাবেলা করেছেন, জীবনের কোনো এক সময়ে এসে মনে হবে, হয়ত সেটা করাই ঠিক হয় নাই,  আবার মনে হতে পারে আজ এই বয়সে ওই একই পরিস্থিতিতে আপনি ওই রকম কোনো কিছুই হয়ত করবেননা। হয়ত আপনিই উপদেশ দিবেন, ধৈর্য ধরতে। কারন, আপনি এখন জানেন, আবেগের বশে অনেক কিছু করা যেতে পারে বটে কিন্তু সবশেষে যা অপেক্ষা করছে তার পরিনতি ঠিক যা আশা করছেন তা হয় নাই বা হয়না। তাই উপদেশ হবে হয়ত “ধৈর্য” ধরুন। আর একেই বলে “অভিজ্ঞতা”। অভিজ্ঞতার সঙ্গে “সময়” একটা যোজন। “সময়” যত পেরুবে, অভিজ্ঞতা তত ভারি হবে। আর অভিজ্ঞতা যত ভারি হবে, আপনি তত শান্ত হয়ে যাবেন। বয়স্ক সবচেয়ে বোকামানুষটিও অল্পবয়সের কোন তথা কথিত চালাক মানুষের থেকে বেশি অভিজ্ঞ। আর তার এই অভিজ্ঞতার কারনে এই বোকামানুষটিও ওই অল্প বয়স্ক মানুষটির থেকে ঢের বেশি জ্ঞ্যান রাখেন। এটা অনেকেই হয়ত মানবেন না কিন্তু এটাই সত্য কথা।

“সময়ের” ব্যবধানে বন্ধু পর্যন্ত পালটে যায়। কখনো কখনো বন্ধু পালটে শত্রু হয়ে যায়, আবার “সময়ের” প্রেক্ষাপটে বাব্যবধানে শত্রু একদিন মিত্র হয়ে যায়। আজ যাকে আপনি আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ বলে মনে করছেন, হয়ত “সময়ের” ব্যবধানে কাল সে আপনার অনেক দুরের বলে মনে হবে। কিংবা আজ যাকে আপনি সবচেয়ে দুরের কাউকে মনে করছেন, “সময়ের” ব্যবধানে হয়ত সেইই আবার সবচেয়ে কাছে মানুষদের মধ্যে একজন বনে যেতে পারে। আর এটাই বাস্তবতা। তাই আজকের “সময়”টাই শেষ কথা নয়। অপসন খোলা রাখুন যেন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে শত্রুকে মিত্র, আর মিত্র থেকে সতর্ক থাকার ক্ষেত্র খোলা থাকে। আজ যে আপনার কষ্টে আপাতদৃষ্টিতে বুক ভাসিয়ে চোখের জল ফেলছে, কাল হয়ত এই চরিত্রটিই আপনার সর্বনাশের জাল বুনছে। আজ যাকে আপনি হৃদয়ের সবটুকু অবিশ্বাস দিয়ে যোজন মাইল দূরে সরিয়ে রাখতে সাচ্ছন্দ বোধ করছেন, হয়ত আগামীকাল মনে হবে, তার কোনো বিকল্পই নাই।

“সময়” বড্ড বেরশিক জিনিষ। সে কাউকে আপন মনে করে না, সে কাউকে পরও মনে করেনা। আসলে “সময়” কারো সঙ্গেই তার সম্পর্ক রাখেনা। সে একা, সবাই তার সঙ্গেই চলার চেষ্টা করে। যে পিছিয়ে যায়, সে পিছিয়েই থাকে, আর যে তার সঙ্গে চলতে চায়, “সময়” তার সঙ্গেই কাধে কাধ মিলিয়ে সামনে এগিয়ে চলে। আপনি আজ হেরে গেছেন? এমনও হতে পারে আগামি কাল আবার আপনি জিতে যাবেন। শুধু “সময়ের” ব্যবধান। “আজ” আর “আগামিকাল”। “সময়ের” ব্যবধানে একদিন হেরেছেন আর আরেকদিন জিতে গেছেন।

আজ থেকে শত বছর আগেও এটাই ঘটেছে, আজো এটাই ঘটছে, এবং আগামি শতকের পর শতক অবধিতাই ঘটবে। এটাই সময়ের নিতি। সে কখনই তার নিতি পরিবর্তন করেনা। সে শুধু তার চারিপাশে যারা আছে, শুধু তাদের পরিবর্তন করে দিয়ে চলে যায়।

“সময়” দুর্বলকে সবল করে, সবলকে দুর্বল করে, শক্তিশালীকে পরাভূত করে, নিষ্পেষিতকে শাসক বানায়। “সময়” এমন এক জিনিষ যে, সে গরীবকে ধনী বানায়, ধনীকে গরীবের কাতারে দাড় করিয়ে দেয়। “সময়’ এমন এক অপ্রতিরোধ্য জিনিষ যে, সে ভালোবাসাকে ঘৃণার স্তরে নিয়ে আসতে পারে, আবার ঘৃণার স্তর থেকে ভালোবাসায় পরিবর্তন করাতে পারে। “সময়” কচি খোকাকে পুরুষে পরিনত করে, ছোট্ট ফুটফুটে একটি মেয়েকে জটিল সংসারের হাল ধরতে শিখায়। “সময়” মানুষের সব কিছু পালটে দিয়ে এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে দাড়া করাতে পারে যেখান থেকে বের হয়ে আসার মতো কোন পথও খোলা না রাখতে পারে। আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি অন্যের পরিস্থিতি উপভোগ করছেন, হয়ত আগামিকাল ঠিক সেখানে দাড়িয়েই অন্য একজন আপনার পরিস্থিতি উপভোগ করবে। “সময়” কখন কার সঙ্গে থাকে, কেউ জানে না।

কোনো একসময় “সময়” চলেছিলো রোমের জন্য, রোম শেষ হয়েছে। তারপর “সময়” চলেছে স্পেনের জন্য, স্পেন শেষ হয়েছে। তারপর “সময়” চলেছে রাশিয়ার জন্য। এখন “সময়” চলছে আমেরিকার জন্য। হয়ত একদিন, এই “সময়”টাও শেষ হয়ে যাবে, হয়ত অন্য কারো জন্য সে আবার চলবে।

০১/১২/২০১৬-ধৈর্য

আমরা কথায় কথায় একটা উপদেশের বানী বলে থাকি, “ধৈর্য ধরুন” কিন্তু কেউ বলছি না, কিভাবে “ধৈর্য” ধরতে হবে। কিংবা “ধৈর্য” ধরার প্রক্রিয়াটা কি। এটা কি এই রকম যে, চুপচাপ বসে থাকার নাম “ধৈর্য”? নাকি এমন কিছু যে, প্রতিবাদ না করার নাম “ধৈর্য”? অথবা এমন কিছু যে, শুধু সব কিছু মেনে নেওয়ার নাম “ধৈর্য”? প্রকৃতপক্ষে এগুলোর হয়ত কোনোটাই না আবার অন্যদিকে এইসবগুলোই হয়ত একত্রে “ধৈর্যের” উপাদান। “ধৈর্য” ধরার প্রক্রিয়াটাও “সময়” বলে দেয় কিভাবে তার শুরু আর কিভাবে তার শেষ। তবে এইটা ঠিক যে, ধৈর্যের সাথে “সময়” নামক জিনিষটা জড়িত। সমাধান পাচ্ছেননা, তো, ধৈর্য ধরুন। কিভাবে? অপেক্ষা করুন, মানে “সময়” নিন। যুক্তির সাথে পরিবেশ ব্যখ্যা করুন, নিরপেক্ষ বিচারে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করুন, সবার কথা শুনুন, কিন্তু সবার কথা মানতে হবে এমন চিন্তা থেকে বিরত থাকুন। সম্ভাব্য সমাধানে পজিটিভ চিন্তা করুন। সম্ভাব্য সমাধানের পরবর্তী প্রতিটি কার্যকলাপের বিপরীতে তার সম্ভাব্য ফলাফলের কতটা আপনার ভালো হয় বা কতটা আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন তার পূর্ণ একটা চিত্র নিজে নিজে ভাবুন। আর ভাবুন, কে আপনার জন্য আর কে আপনার জন্য নয়। সময়ের সাথে সাথে মানুষের যেহেতু আচার আচরন পরিবর্তন হয়, প্রতিটি মানুষের ভুমিকা বিচার করুন। হতে পারে আপনি ভুল মানুষকে বেশি মুল্যায়ন করছেন অথচ যাকে আপনার মুল্যায়ন করার দরকার সবচেয়ে বেশি, তাকেই আপনি দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। প্রি-কন্সিভ আইডিয়া থেকে সরে আসুন, প্রো-একটিভ কাজ থেকে বিরত থাকুন। নিজের সাথে অন্যের আইডিয়ার মধ্যে কোথায় কি কারনে ব্যবধান হচ্ছে, তার সম্ভাব্য কারন গুলি সনাক্ত করার চেষ্টা করুন। হতে পারে আপনি কিছু মিস করে যাচ্ছেন। আর এই মিসিং জায়গাগুলি পূর্ণ করার জন্য “সময়” নিন। অযথা খাম খেয়ালী করেও কোনো মন্তব্য না করাই মঙ্গল। কারন, “ধৈর্যের” মধ্যে এই সহিষ্ণতাও একটা উপাদান। আমি এভাবেই ব্যাপারগুলি চিন্তা করি। এটাই যে একমাত্র পদ্ধতি সেটাও হয়ত সঠিক নয়, হয়ত আপনার কাছে আরো অন্য ভালো কোন পদ্ধতি থাকতে পারে। সেটা নিয়ে স্টেজ বাই স্টেজ বিশ্লেষণ করুন। ধাপগুলি নিয়ে ভাবুন। কার পরে কি হচ্ছে, কোন কোন পদক্ষেপে কি কি ফলাফল হতে পারে, সব কিছু মিলিয়ে একটা ডিসিসন মেকিং পদ্ধতিতে এগিয়ে যান, দেখবেন, যথেষ্ট স্বচ্ছ একটা চিত্র আপনার কাছে ভেসে উঠছে। এটা একটা পথের মতো। পুরু পথটা দেখার চেষ্টা করুন। আপনার থেকে ভাল বিচারক অন্য একজন নয়। এটা ভাবুন।

০৮/০৯/২০১৬-শুভ জন্মদিন তোমায়

সকাল বেলায় অনেকগুলি এসএমএস দেখে নিজেই খুব মনে মনে হাসছিলাম। কোন এক পল্লিগ্রামে আজ থেকে প্রায় ৫১ বছর আগে আমি আমার এক গ্রাম্য মায়ের কোল জুড়ে নাকি মানিকসোনা হয়ে জন্ম নিয়ে সবার মনে হাসি ফুটিয়েছিলাম। আমি কত জোরে কেদেছিলাম, আর কে কত জোরে হেসেছিল, সেটা আমার কস্মিনকালেও মনে নাই, কিন্তু যারা তখন অনেক অনেক খুশীতে খুশিতে আটখানা হয়ে পুরু গ্রাম, সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলেছিলেন, তাদের অনুভুতি আজ এতো বছর পরে এসে আমার বুঝতে একটুও বাকি নাই। ওই যে বিখ্যাত মানুষ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম সাহেব বলেছিলেন, “যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল, সেইদিনই নাকি তোমার মা তোমার কান্নায় শুধু হেসেছিলেন”। মায়েরা সন্তানের কান্নায় কখনো হাসেন না, কিন্তু সন্তানের জন্মেরদিন সন্তানের কান্নায় নাকি মায়েরা আনন্দে হাসেন। কি অদ্ভুদ কথা। তাদেরকে আমি আমার অন্তর থেকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাই। দোয়া করি যেনো তারা স্বর্গীয় হন। 

তাদের অনেকেই আজ এই মিস্টি পৃথিবীতে নাই, কিন্তু আমার সেইদিনের জন্ম নেওয়াক্ষনটিকে আমার উত্তর সুরীরা, আশে পাশের বন্ধুবান্ধবরা, আমার অনুজ, আমার সন্তান, বা সন্তান তুল্য মিস্টি মিস্টি দুষ্টু পোলাপান গুলু বড় মজা করে পালনের নিমিত্তে কেউ গোচরে, কেউ অগোচরে, কেউ এসএমএস দিয়ে, কেউ কেক নিয়ে বসে থেকে আমার অখ্যাত এইজন্মদিনটাকে এমন করে সাজিয়ে দিল যে, বড় আনন্দ হল। আনন্দ করার জন্য কোনো উপলক্ষ লাগে না, আনন্দ পাওয়ার জন্য অনেক পয়সাও খরচ করতে হয়না। কিন্তু একটা নিছক উপলক্ষ থাকলে মানুষগুলুকে কাছে পেতে সুবিধা হয়। আজ সেটাই হল।

আমি যখন বাসায় ফিরেছিলাম, তখন জন্ম তারিখটা পার হয়ে পরের দিনের তারিখ চলে এসেছিলো। কাজের চাপ ছিলো অনেক। জন্মদিন পালনের চেয়ে বাস্তব কাজের চাপে সারাদিন আর মনেই ছিলো না ব্যাপারটা। অত্যন্ত ক্লান্ত শরিরে, ঘুম ঘুম চোখে যখন রাত সারে বারোটায় বাসায় পৌঁছলাম, দরজা খুলতেই হতাত করে একগুচ্ছ মিস্টি কচিকণ্ঠে সুর বেজে উঠলো, “হ্যাপি বার্থ ডে বাবা”। আমার মেয়েরা আর মেয়ের জামাই। সারপ্রাইজ দেওয়ার চোখের মধ্যে চিক চিক করা একটা ভাব থাকে। আমি সেটাই দেখলাম এই পিচ্চিগুলির মধ্যে। মানুষ যখন একটা ধাপ পার হয়ে অন্য ধাপে বিচরন করে, তখন সেই ছোট বেলায় ঘুড্ডি, লজেন্স, চকলেট, কিংবা ফেলে দেওয়া কোনো নিছক পাথর খন্ড অথবা নিজের জন্ম দিন যা এক সময় নিজের কাছে সম্পদ মনে হত, নিজের কাছে একটা বিশাল আবেগের অনুষ্ঠান মনে হত, সেটা আর মাথায়ও থাকে না। কিন্তু সেই এক ই অনুভুতির যখন পুনরাবৃত্তি ফিরে আসে আমাদের উত্তরসুরী প্রজন্ম থেকে, তা দেখে মনে হয়, আমিও তোমাদের মতো একদিন এই রকম উচ্ছল, আবেগতাড়িত বয়স তা পার করে এসেছি। ভাবতে বড্ড ভালো লাগে। ওরা আজ তাই করলো। 

আর রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার বউ, মিটমিট করা চোখে, মোনালিসার হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে বল্লো, “হ্যাপি  বার্থডে মনি।” কিছুই না কিন্তু। কিন্তু মনে হলো, বাহ, কি আনন্দ, কি প্রশান্তি।

ক্লান্ত শরীর, চোখ ভর্তি ঘুম, রাত অনেক, পেটে ভীষণ ক্ষুধা, কিন্তু তারপরও মনে হলো, মন ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। এটাই আসলে “পরিবার”। “পরিবার” মানুষের জীবনে বড় একটা আশ্রয়স্থল এবং শান্তির প্রয়াশ।

এই ক্লান্ত শরীরেও ওদের আনন্দটাকে ধরে রাখতে চাইলাম। কেক কাটলাম, কেক পাঠিয়েছেন আমার মেয়ের শাশুড়ি। ব্যাপারটা দেখলে কিচ্ছু মনে হবে না, আবার ভাবলে অনেক কিছু। কোনো বড় কিছু আয়োজন নাই, অনেক মানুষের ভিড়ও নাই, মাত্র দুইমেয়ে, মেয়ের জামাই আর আমার বউ। তাতেই মনে হলো, একটা আয়োজন।

পরেরদিন শুক্রবার। জন্মদিন পেরিয়ে একদিন চলে গেছে। মনে হলো, আরো কিছু মানুষ তো আছে, যাদেরকে নিয়ে এই ছোট আনন্দটা বড় করা যায়। সোমা এসেছে শুনলাম, রাজুও এসেছে। মেয়েটা দেশের বাইরে থাকে। ও আমার মেয়ের ননদিনী আর ননদিনীর স্বামী। আমার পরিবারের একটা অংশ এবং আমার ভাল লাগার মানুষগুলুর মধ্যে একজন। খুব শীঘ্রই ওরা আবার বাইরে চলে যাবে। সুতরাং ওদের সঙ্গে ঘরোয়া পরিবেশে দেখা হওয়ার সুযোগ কম। ভাবলাম, হয়ে যাক না একটা ছোট খাটো গেট টুগেদার। সেই গেট টুগেদারের অংশই হচ্ছে আজকের এই ছবিগুলুর ইতিহাস। এটা আমার জন্মদিনের পার্টি কিনা আমি জানি না, কিন্তু এটা একটা ফ্যামিলি গেট টুগেদার বললেই আমি অভিহিত করতে চাই। দিনটা বেশ কেটেছে।

ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে, আর ধন্যবাদ ওই দুইজন মানুষকে, (আমার বিয়াই আর বিয়াইন) যারা সবসময় আমাকে খুশীতে অনেক আনন্দিত হন। সবাইকে আমার প্রাণঢালা ভালোবাসা। অনেক অনেক ভাল রাখুক আমার এই অনবদ্য, ছোট পরিবারের সব সদস্য গুলিকে। আমি তোমাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। 

১৯/০৮/২০১৬-পৃথিবীকে বদলে দাও

উত্তর থেকে দক্ষিন, পূর্ব থেকে পশ্চিম, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য কিংবা গ্রিস থেকে অন্য কোথাও, ছোট কিংবা বৃহৎ যেদিকেই তাকাবেন কিংবা যেখানেই যাবেন, সর্বত্র একটা লিখিত-অলিখিত শ্লোগান দেখবেন কিংবা শুনবেনঃ পৃথিবীকে বদলে দাও। অথবা চা স্টলে বসলে আলাপ আলোচনায় শুনবেন, “আচ্ছা, মানুষ গুলি বদলাচ্ছে না কেনো?” ইত্যাদি।

আমি মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করিঃ কি বদলাতে হবে? কি পরিবর্তন হয়েছে যা বদলানো দরকার? এই পরিবর্তন কি আগের কোনো এক জমানায় ফিরে যাওয়ার আকুতি? নাকি ভবিষ্যতের কোনো এক নাম না জানা টেকনোলোজির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি?

যদি বলি, আগের জামানাই অনেক ভালো ছিলো, যেখানে সব সম্প্রদায় একই জনগোষ্ঠীর আওতায় একে অপরের সঙ্গে মিলে মিশে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলেছিলেন এবং সৌহার্দমুলক এক সমাজে বাস করতেন। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে কুশল বিনিময় করতেন, ভালো মন্দ যা কিছু আছে তার খোজখবর নিতেন, এক বাড়ির মেয়ে আরেক বাড়িতে গিয়ে কোন এক বিয়ের আসরে বসে গ্রাম্য নৃত্যর সাথে নাচানাচি করতেন। হিন্দু মুসলমান, খ্রিষ্টান কিংবা যে যেই ধর্মেরই হোক না কেনো, তাদের মধ্যে একটা সৌহার্দপূর্ণ সদ্ভাব ছিলো। সত্যকে মিথ্যার সাথে, কিংবা আরালে আবডালে একে অন্যের সমালোচনা না করার মানসিকতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশির একটা বন্ধুত্তপূর্ণ অনুভুতি ইত্যাদি দেখা যেত। আমরা কি সেটার কথা বলছি? তাহলে তো বলবো, তখনো তো পাথরযুগও ছিলো যেখানে জীবন্ত মানুষকে মানুষ মেরে ফেলতো, কিংবা মোঘল সম্রাটদের আমলে তো মানবাধিকারের কোনো বালাইই ছিল না অথবা নীল চাষদের আমলে তো মানুষ আরো খারাপ অবস্থায় না খেয়ে খেয়ে ছিলো। তাহলে কি সেই আগের জমানায় ফিরে যাওয়াই কি বদল হওয়ার কথা বলছি? অথবা এমন কিছু নতুন নতুন টেকনোলোজি যা আগামি প্রজন্মের জন্য ধীরে ধীরে উদ্ভাবিত হচ্ছে যেখানে পুরানোদের নতুনদের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত?

আসলে ব্যাপারটা সম্ভবত এই রকম নয়। অনেক জটিল, শুধু জটিল নয়, সময় সাপেক্ষও বটে।

জটিল কতটুকু সেটা না হয় পড়ে ভাবা যাবে কিন্তু সময় সাপেক্ষ ব্যাপারে বলতে পারি যে, আমার এই অল্প আয়ুর জীবনের মধ্যে দেখেছি, আমরাই এক সময় শীতের মৌসুমে ঈদ পর্ব পালন করেছি আবার বর্ষার সময়ও ঈদ পালন করেছি। কারন, ঋতুর পরিবর্তনের ফল, সময়ের তারতম্যের কারনেই এই পরিবর্তনটা হয়। আর এই পরিবর্তন নিছক এক বছর বা দুই বছরের মধ্যেই ঘটে যায় না। তারজন্য যুগের পর যুগ কেটে যায়। ছোট এই উদাহরন দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি যে, পরিবেশ বদল হতেও যুগের পর যুগ লেগে যায়। আর মানুষের সভ্যতা তো আরো সময়ের ব্যাপার। এতে জেনারেশন থেকে জেনারেশন পার হয়ে যায়। ফলে বদল বা পরিবর্তন জিনিসটা একা একটা ফ্যাক্টর নয়। এরসঙ্গে জড়িত সময়, মানুষ, সভ্যতা, মানুষের শিক্ষা, উদ্ভাবনীর সাফল্য, নতুনত্তকে গ্রহন করার মানসিকতা ইত্যাদি। আর পরিবর্তনের জন্য এইসব ফ্যাক্টরগুলি একসঙ্গে হতে হবে। সময়ের সঙ্গে মানুষ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সভ্যতা, সভ্যতার সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে উদ্ভাবনির আবির্ভাব, আর সেই উদ্ভাবনীর সঙ্গে পুরানো রীতিনীতি ছেরে মানুষের নতুন কিছু গ্রহনের আন্তরিকতা ইত্যাদি মিলে আসে এই বদল। এর কোনো একটায় যদি বাধ সাধে, তাহলেই বাধাগ্রস্থ হয় বদল হওয়ার প্রক্রিয়া। আর যখন বদল হওয়ার মানসিকতা তৈরি না হয়, শুরু হয় বদলা নেওয়ার প্রক্রিয়া। সেটাও এক প্রকার বদল কিন্তু তা আমরা কখনোই চাই না।

প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ এই বদল হওয়ার শ্লোগান দিয়ে আসছে। বদল যে হয় নাই তা কিন্তু না। পাথর যুগের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ্য, মোঘল সম্রাটদের একচেটিয়া শাসনতন্ত্র, ইংরেজদের দস্যিপনা, বর্গিদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে “বদল” হওয়ার নিমিত্তে সব আমলেই কিছু না কিছু সাহসী মানুষ কিংবা গোত্র আন্দোলন করেছিলো এবং তার সুফল যে হয় নাই তা নয়। সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়েছে, সহমরন প্রথা বন্ধ হয়েছে, জীবিত কন্যা সন্তান হত্যা করা বন্ধ হয়েছে, বাকস্বাধীনতার উন্নতি হয়েছে, ন্যায়নীতির আইন প্রনয়ন হয়েছে, সামাজিক মুল্যবোধের পরিবর্তন হয়েছে, আরো অনেক কিছু। এগুলু হচ্ছে বৈশ্বয়ীক পরিবর্তনের বড় বড় আলোচনা। কিন্তু এই বড় বড় বৈশ্বয়ীক পরিবর্তনের সুচনা প্রকৃতপক্ষে আরম্ভ হতে হয় একেবারে ছোট ছোট পরিবার থেকে, প্রতিটি মানুষের ব্যবহার থেকে, অথবা অন্য অর্থে যদি বলি, এই পরিবর্তনগুলির প্রারম্ভিক ভিত্তি হচ্ছে প্রতিটি মানুষ। আমরা এই প্রারম্ভিক ভিত্তিতে “বদল” চাই। তাহলেই প্রকারান্তে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বয়ীক পরিবর্তন বা “বদল” কার্যকরী হবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোঃ এই প্রারম্ভিক ভিত্তি অর্থাৎ মানুষের পরিবর্তন কিভাবে হবে সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়।

রিক্সায় উঠেছেন? দেখবেন, গল্পের ছলে হয়ত রিকশাওয়ালা বলছে, স্যার দেশটার কি কোনো পরিবর্তন হবে না? চা স্টলে বসেছেন? শুনবেন, তুমুল কথাবার্তা হচ্ছে, সমাজটা কি অধঃপতনে চলে যাচ্ছে? স্কুল কলেজে, মিটিং সেমিনারে বসেছেন? দেখবেন, একদল শিক্ষিত লোক দেশের আইন-শৃঙ্গলা, শিক্ষা-ব্যবস্থা, ছাত্র-ছাত্রদের, শিক্ষক-শিক্ষিকার আদর্শ, যোগ্যতা, ইত্যাদি নিয়ে কথা বলছেন। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে সর্বচ্চ আদালত প্রাঙ্গনে বসেছেন? শুনবেন, ন্যায় নীতির পদস্খলনের অনুতাপ। কোনো বাড়িতে বেড়াতে গেছেন? দেখবেন, প্রতিটি অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়ে বিব্রতবোধ করছেন। কেউ অভিযোগ করছেন, তাদের সন্তানগন কথা শুনছে না, কেউ কথা রাখছে না, কেউ আদব-কায়দা শিখছে না, কেউ কেউ আবার তাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝার চেষ্টা না করে বিপথে চলে যাচ্ছে, ইত্যাদি। কারো অভিযোগ স্কুল কলেজের বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ সমাজের বিরুদ্ধে, আবার কারো অভিযোগ নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে। আর এই অভিযোগকারীগন সবাইকে আমরা চিনি। যিনি অভিযোগ করছেন এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, সবাই কোনো না কোনভাবে আমরাই। আমার সবাই অভিযুক্ত। আবার অন্যদিকে, আমরাই আবার এই অভিযোগগুলির সমাধান, পরিবর্তন চাই। সবাই চাচ্ছি পরিবর্তন, সবাই চাচ্ছি সস্থি, সবাই চাচ্ছি একটা “বদল”। তাহলে পরিবর্তনটা আসছে না কেনো? কোন জায়গাটায় সমস্যা তাহলে?

সমস্যা আসলে শুধু এক জায়গায়। আমরা সবাই বলছি, সব ভালো হয়ে যাক, সবাই বলছি পরিবর্তন হোক, সবাই বলছি “বদল” হোক, শুধু “আমি ছাড়া”। প্রকৃত সমাধান আসলে এই “আমি”র মধ্যে।

যখন কোনো বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কোনো এক শাশুড়ির এই কথা শুনবেন যে, আমার মেয়ের স্বামীটা অনেক ভালো, সে আমার মেয়ে যা বলে, যা আবদার করে, আমার মেয়ের স্বামী সবকিছু শুনে এবং মেনে চলে। কি লক্ষি মেয়ের স্বামী। কিন্তু আমার নিজের ছেলেটা এতো খারাপ যে, সে বউয়ের কথায় নাচে, উঠে আর বসে। তাহলে আপনি এই শাশুড়ির কাছ থেকে কিভাবে “বদল” চাইবেন? কোনো একটা বিয়ের আসরে গেছেন? পুরানো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সে কোনো এক স্কুল কিংবা কলেজে চাকুরী করেন, কিন্তু তার সন্তান তার স্কুলে বা কলেজে পড়েন না। কারন সেখানে খুব ভালো পড়াশুনা নাকি হয় না। তাই তিনি তাদেরকে স্কুল বা কলেজে নিজের সন্তানকে পড়ান না। কিন্তু তিনি অন্যের সন্তানদেরকে ওখানে পড়ান। অন্যের সন্তানকে নিয়ে তার চিন্তা নাই, একরকম করে দিন কাটিয়ে দিলেই হল। তিনি তার সন্তানদের পড়াচ্ছেন এমন এক স্কুল বা কলেজে যেখানে ওই স্কুল কলেজের মাসিক বেতনই হাজার হাজার টাকা। ফলে এই অতিরিক্ত টাকা আয় করার জন্য তো তাঁকে বিকল্প পথ বের করতেই হবে। আর এই বিকল্প পথে টাকা আয় করার জন্য তো তাঁকে তার চাকুরীর সময় থেকেই নিতে হবে। তার সময় কই তার অধীনে অধ্যায়নরত ছাত্রকে সময় নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার? আবার তিনিই “বদল” চান এই সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার। তাহলে আপনি কিভাবে কার “বদল” চাইবেন?

পাশের বাড়ির মেধাবী সন্তান জিপিএ-৫ পেয়েছে, সরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং, সরকারী মেডিক্যাল কিংবা ভালো ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু ফাঁকি দিয়ে লেখাপড়া না করা আমার সন্তান ভালো ফলাফল করতে না পারায় হয়ত নামকরা কোনো ইন্সটিটিউটে ভর্তি হতে পারছে না, তাতে কি? প্রাইভেট ইন্সটিটিউট তো আছে? শুধু টাকা হলেই সম্ভব। কোথা থেকে আসবে এই অতিরিক্ত টাকা? আমাকে তো ভিন্ন পথে যেতেই হবে, হোক সেটা ন্যায় কিংবা অন্যায়। আমার সন্তান কে তো আর যেই সেই ইন্সটিটিউটে পড়ালে চলবে না। আমার এই অতিরিক্ত টাকার সংস্থান করতে আমাকে অন্যায় কিছু করতেই হবে, হোক সেটা ঘুষ কিংবা অন্য কিছু। আবার এই আমিই ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলছি। তাহলে পরিবর্তনটা আসবে কিভাবে? বৃদ্ধ বাবা বা মাকে নিয়ে বাসে উঠেছেন? সিট খালি নাই। পাশে এক তরুন সিট দখল করে বসে আছেন। কোনো মায়া মমতা, কোনো আদব কায়দা, কিংবা কোনো দয়া দাক্ষিন্যতা দেখিয়েও এই বৃদ্ধ মানুষটির দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টের কথা চিন্তা করেও তরুন তার নিজের সিটটা ছেড়ে দিতে নারাজ। কিন্তু এই তরুনই যখন তার নিজের বৃদ্ধ বাবা বা মাকে কোনো একদিন ওইরকম এক পরিস্থিতির সম্মুক্ষিন হবেন, তিনি আক্ষেপ করে বলবেন, দেশটা যাচ্ছে কই? কোনো আদব কায়দা কি কিছুই নাই? এবার আসি পরিবারের ভিতরে। আমি রিপাবলিকান দল করি, কেনো আমার স্ত্রী বা ছেলেমেয়ে রিপাবলিকান দল করবে না? আমারটা খাবে, আমারটা পড়বে, অথচ আমার দল করবে না, তাতো হবে না। আমার দলের বিরুদ্ধে কথা বলবে, এটাতো হবেই না। ছেলে ভালো আর্ট করতে পারে, কিংবা খুব ভালো অংক বুঝে, তাতে কি? আমার খুব শখ আমার সন্তান ডাক্তার হবে। কেনো আমার ছেলের কথায় আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং বানাতে হবে তাঁকে? আপনি কোনো এলাকায় নাম করেছেন, হোক সেটা গ্রাম্য বিচারের বেলায়, কিংবা সালিশীর বেলায়। আপনার গ্রামে করিমুদ্দিনও আপনার মতো আরেক নামীদামী গ্রাম্য বিচারক। করিমুদ্দিন কোনো বিচারে গেলে সেখানে আপনার না যাওয়াই শ্রেয় মনে করছেন কারন দুই নামীদামী বাঘ একসঙ্গে থাকে কিভাবে? কিংবা যদি রায়ের এদিক সেদিকে আপনার মতামতের মুল্যায়ন না থাকে সেই ভয়ে আপনি ন্যায় কিংবা অন্যায় যাই হোক না কেনো, আপনি পুরু বিচার কাজটাকেই অস্বীকার করে ফেললেন। তাহলে পরিবর্তনটা আসবে কিভাবে? আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আপনার মতাদর্শের কোন এক কর্মীকে অন্যায় কাজের জন্য ধরে নিয়ে গেছে? কোনো ব্যাপার না। আপনি সরকারী দল করেন, সব কিছুর উর্ধে আপনি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনিকে প্রলুব্ধ করে ছারিয়ে নিয়ে এলেন কয়েক ঘন্টার মধ্যে। আবার যখন আপনার বিরোধী দল সরকারী দল হয়ে যাবে, আপনি যখন সেই একই প্রক্রিয়ায় নিষ্পেষিত হবেন, সেই আপনিই বলবেন, দেশে কি কোনো আইনকানুন নাই? তাহলে পরিবর্তনটা হবে কিভাবে? আজ আমি “বদল” হচ্ছি না অথচ কাল আমি সবাইকে “বদল” হতে বলছি। লাভের আশায় আপনি খাদ্যে ভেজাল মিশাবেন, ফরমালিন দেবেন, মরা মুরগী রেস্টুরেন্টে সাপ্লাই দেবেন? দিন। কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু আগামিকাল আপনার সন্তান সেই ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে কিডনী নষ্ট করবে, মরা মুরগির রোষ্ট খেয়ে লিভার নষ্ট করবে। তার শরির খারাপ করবে, অসুস্থ হবে, যাবেন ডাক্তারের কাছে, গিয়ে দেখবেন, প্রশ্নপত্র ফাস করে পাশ করা ডাক্তার, ভেজাল ঔষধ সব আপনার সামনে একত্রে হাজির। অসুখ নিরাময় হবে না। একদিন আপনার আদরের সন্তান আপনার চোখের সামনে মারা যাবে। আর এভাবেই আমরা সবাই ঠকছি। কাকে আসলে ঠকাচ্ছি?

একজন চোরও আরেকজন চোরকে পছন্দ করে না, একজন ঘুষখোরও আরেকজন ঘুষখোরকে পছন্দ করে না। মেয়ে বিয়ে দেবেন, ভালো বংশ চান, ছেলে বিয়ে করাবেন? ভালো মেয়ে এবং ভালো পরিবার চান। আমরা সবাই তাই চাই। কিন্তু আমি আমার নিজের পরিবারকে ভালো একটি পরিবার হিসাবে গড়ে তূলতে পারছি না। আমি আমার সন্তানকে ভালো নীতির শিক্ষা দিচ্ছি না। তাহলে আমি কাকে বলছি, “বদল” হউন? ঘরে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরন করবো অথচ সামাজিক সেমিনারে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলবো, নিজে বন্ধুবান্ধব্দের নিয়ে নেশা করবো কিন্তু নিজের সন্তানকে নেশা করতে বারন করবো, নিজে ঘুস নেবো কিন্তু অন্যের বেলায় প্রতিক্রিয়া দেখাবো, তাতে তো “বদল” হবে না কিছুই। আমি কারো ফেলে যাওয়া কলার খোসায় পা পিছলে তার গুষ্ঠি উদ্ধার করবো কিন্তু আমি কলা খেয়ে একটু দূরে ডাস্টবিনে না ফেলে রাস্তায় তা ফেলে যাবো, তাতে তো “বদল” কিছুই হলো না। আমি নিশ্চিত জেনেও যখন কোন অন্যায়কারীর পক্ষে ওকালতি করবো, নিশ্চিত জানবেন, অন্য কেউ আমার উপর অন্যায় করলেও আরো ভুঁড়ি ভুড়ি আইনসেবক পাওয়া যাবে যারা আমার ন্যায়কে অন্যায়ভাবে একই প্রক্রিয়ায় রায় ঘুরিয়ে দিয়ে আমাকে পরাজিত করবে। বৃষ্টির দিনে এসি গাড়ির ভিতরে বসে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে পাশে পায়ে হাটা এক পথচারীর জামা কাপর ভিজিয়ে দেবো, অথচ তারজন্য আমি অনুতপ্তও বোধ করবো না, বরং তার দিকে তাকিয়ে মুচকি তাচ্ছিলের হাসি দিয়ে অথবা “ছোট লোকের দল” বলে গাড়ী হাকিয়ে চলে যাবো, তাহলে তো কোনোদিনই “বদল” বলে কিছু আসবে না।

তাহলে এখন আরো একটি প্রশ্ন আসে। আমরা এখন সত্যি সত্যিই “বদল” হতে চাই। কিভাবে? সহজ পথ। আমরা সবাই সেটা জানি। এক কথায় যদি বলি। তাহলে সেটা দাড়ায় “ইনসাফ”। নিজের প্রতি নিজের ইনসাফ। আর এটাই করতে বলেছে ধর্ম। সেটা যার ধর্মই হোক। কোনো ধর্মই বে-ইনসাফি কাজ করতে আদেশ দেয় নাই। কোনো ধর্মই অন্যায় কাজকে প্রলুব্ধ করে নাই। কোনো ধর্মই মানুষের অধিকারকে হরন করতে বলে নাই। সব ধর্মের নিগুড় উপদেশঃ হত্যা, নিপীড়ন, ঘুষ, সুদ, অপহরণ, অন্যায়, গিবত, অহংকার, মারামারি, লোভ, অশ্লীলতা, নেশা, চুরি ডাকাতি, ভেজাল, ঠকবাজী, হটকারিতা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। আর মানুষের মঙ্গল হয় এমন কাজ করুন। আপনি করুন, মানুষ উপকৃত হবে, মানুষ করবে, আপনি উপকৃত হবেন। এই অভ্যাস এবং কাজগুলি একদিনে হয়ে উঠবে না। আবার আপনি করছেন, কিন্তু অন্য এক জন করছে না দেখে আপ্নিও বিরক্ত হবেন, কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি আপনারটা করুন। একদিন এই সংখ্যাটা বাড়বেই। প্রতিদিন এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। A smile can be a charity. তাই দিয়েই শুরু করুন।

কেউ কেউ হয়ত আবার প্রশ্ন করবেন, আমরা তো ধর্মকে পালন করছি। আমরা তো জানি ধর্ম কি কি বলেছে। তাহলে এর পরেও বদল হচ্ছে না কেনো? এর বিকল্প কি? এর উত্তর একটাই।

জানার নাম ঈমান নয়, মানার নাম হচ্ছে ঈমান। যদি জানার নাম ঈমান হতো তাহলে ইবলিশই হতো সবচেয়ে বেশী ইমানদার। ইবলিশ জানতো অনেক কিছু, সে মানে নাই, কিন্তু আদম অনেক কিছুই জানতেন না, তিনি মেনেছেন। আমরা ধর্ম মানছি, আমরা ধর্মের সব কিছু পালন করছি না।

সময় শেষ হয়ে যায় নাই। “বদল” সম্ভব। আজ থেকেই সম্ভব।   

১৮/০৮/২০১৬-এইচ এস সি পরীক্ষার ফলাফল

শুনলাম, আজ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে। সবাই (ছেলেমেয়ে, পিতামাতা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যগন) একযোগে টেনসনে আছেন। যার পরীক্ষা ভালো হয়েছে, সেও টেনসনে আছে, যার পরীক্ষা একটু মনপুত হয় নাই, সেও টেনসনে আছে। আর এটাই হবার কথা। তাই তোমাদের এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমিও কিছু মুরুব্বিপনা করতে চাই, হয়ত ভালো লাগতেও পারে।

আজ থেকে প্রায় ৩৩ বছর আগে আমি তোমাদের মতই একজন পরীক্ষার্থী ছিলাম। তখন এই যুগের মত জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন-৫ নামক কোনো কিছু ছিলো না। তখন ছিল “স্টার মার্ক” আর বোর্ডে “স্ট্যান্ড” করার মাত্র ২০ জনের তালিকা। কে বা কারা এই দুর্লভ ফলাফলের অধিকারী হন, তাদের অনেককেই অনেকে চিনেন না। কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে, তখনকার সময়ে ঢাকা বোর্ডে যে ২০ জন তালিকাভুক্ত মেধাবী ছাত্র ছিলো তাদের ১৮ জনই ছিল আমাদের ক্লাসমেট এবং আমাদের কলেজের। পরবর্তীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এই ১৮ জনই আবার ঘুরে ফিরে মেধা তালিকার মধ্যে বা তার আশেপাশে ছিলো। কেউ বা ডাবল স্ট্যান্ড আবার কেউ একটা। আমি তার কোনোটার মধ্যেই ছিলাম না।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর আমরা ক্যাডেট কলেজ থেকে বিভিন্ন সেক্টরে যে যেখানে যোগ্যতা মতো চান্স পেয়েছি ঢোকে গেছি, কেউ মেডিক্যাল, কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং, কেউ বা আর্মিতে, কেউ বা মেরিনে, কেউ ইউনিভার্সিটিতে ইত্যাদি। তখনো ক্যারিয়ার গড়ার জন্য লেখাপরার মধ্যেই ছিলাম। কে কোনটায় ভর্তি হয়েছি, কিংবা কে কোনটায় গিয়ে কতটুকুন লাভ হয়েছে, তার হিসাব বা পরিসংখ্যান নেবার মতো তখন আমাদের যেমন পরিপক্কতা ছিলো না আবার যাচাই করার সুযোগও ছিলো না। কিন্তু আমরা আমাদের সুযোগ কাজে লাগানোর চেস্টা করেছি যার যার লেবেল থেকে। আজ এই বয়সে এসে কেউ আমাকে Aim in Life রচনা লিখতে বলবে না। বা বলার কারনও নাই। আজ সেগুলো ইতিহাসের মতো। চাকুরী নেবার জন্য আজ আমাকে আর কোথাও ইন্টারভিউ দেওয়ার দরকার পরে না বলে হয়ত কেউ আমাকে আমার লেখাপড়ার যোগ্যাতা নিয়েও প্রশ্ন করবে না। তারপরেও আমরা আমাদের লেখাপড়ার উচ্চতা বাড়ানোর চেষ্টা সব সময়ই করেছি। ওটাও একটা নেশার মতো। যাই হোক।  

আজ প্রায় ৩৩ বছর পর যখন পিছনে তাকাই, তখন একটা মুল্যায়নের কথাই সামনে ভেসে আসে। ৩৩ বছর আগে যারা খুব ভালো করেছিলো তারা যেমন বর্তমানে ভালো জায়গায় আছেন, ভালো চাকুরী করেন, সম্মানের সহিত আছেন, আবার যারা তুলনামূলকভাবে একটু কম ভালো ফলাফল করেছিল (মানে স্ট্যান্ড বা স্টার মার্ক পায় নাই), তারাও খারাপ অবস্থায় নাই। এই দ্বিতীয় দলের অনেকেই আবার প্রোফেসনাল লাইফে হয়ত আরো অনেক বেশি সাফল্য লাভ করেছে প্রথম দলের থেকে বেশী যদিও তারা ওই সময় বোর্ডে স্ট্যান্ড করে নাই কিংবা স্টার মার্ক পায় নাই। আবার এমনও দেখা গেছে যে, অনেক ভালো ফলাফল করেও মধ্যম গোছের যে ছাত্রটি যে কাজে আজকে অধিষ্ঠিত আছেন, সেই একই জায়গায় ওই সময়ে তুলনামুলকভাবে খারাপ ফলাফল করেও সেই ছাত্রটি আজ একই স্তরে অধিষ্ঠিত আছেন। তারমানে এই যে, স্কুল কলেজের ক্যারিয়ার আর প্রোফেসনাল লাইফের ক্যারিয়ার দুটি একেবারে ভিন্ন জিনিষ। প্রোফেসনাল লাইফের ক্যারিয়ারের সাফল্য একমাত্র শুধু পড়াশুনার ফলাফলের উপরই নির্ভর করে না। তারসঙ্গে সুযোগ, পরিস্থিতি, পারিবারিক প্রচেষ্ঠা, নিজের বুদ্ধিমত্তা, ম্যাচিউরিটি, আর তারসঙ্গে লাগে লেখাপড়ার মিনিমাম যোগ্যতা। আজ যারা জিপিএ-৫ বা গল্ডেন-৫ পেয়েছো তারা তো অবশ্যই ভালো একটা যোগ্যতা অর্জন করেছো তাতে কোনো সন্দেহ নাই, তারজন্য তোমাদেরকে সাধুবাদ না জানালে কৃপণতাই হবে, কিন্তু যারা চেষ্টা করেছো কিন্তু জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন-৫ পাও নাই, তাদেরও কোনো রকম মন খারাপ করার অবকাশ নাই। কারন প্রোফেসনাল লাইফে সাফল্য পাওয়ার জন্য মিনিমাম যে যোগ্যতাটা দরকার তা ইতিমধ্যে তোমরা অর্জন করেছো অবশ্যই। এমনও অনেক উদাহরন আছে, যে, মিনিমাম কোয়ালিফিকেসন (অর্থাৎ ফলাফলের দিক দিয়ে) ধারি কোনো এক ছাত্র অনেক মেধাবী ছাত্রকে টপকিয়েও সমাজের অনেক উচূ স্তরের সিড়িতে আসীন আছেন। প্রোফেসনাল ক্যারিয়ার একটা বহুমাত্রিক যোগ্যাত্র বহিরপ্রকাশ। সেখানে নিজের মেধার সাথে নিজের চরিত্র, চালচলন, আচার ব্যবহার, বুদ্ধি বিবেচনা, পরিস্থিত সামাল দেওয়ার ক্ষমতা, ইনোভেটিভ আইডিয়া ইত্যাদির সংমিশ্রণ থাকে। পড়াশুনার মেধার সাথে যখন এই আনুষঙ্গিক মেধাগুলি মিলিত হয়, তখন সে হয়ে উঠে একজন অতি উচ্চমানের প্রোফেসনাল। কিন্তু যারা শুধু পরাশুনার মেধাটাই প্রাধান্য দিয়ে অন্যান্য মেধাগুলিকে চর্চা না করেন, তাদের বেলায় সর্বদা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য নাও আসতে পারে। আবার এই তথ্যটাই সব সময় যে ঠিক তাও নয়। কারন, পরিস্থিতি এবং সুযোগও অন্যান্য মেধাবলির সাথে ম্যাচ করতে হবে। সুযোগ এলো না, পরিস্থিতি ও অনুকুলে নাই, এই অবস্থায় অনেক মেধাবী ছাত্রও ক্যারিয়ার নির্মাণে হেরে যান। আর এইজন্য দরকার স্রষ্টার কাছে সর্বদা সাহাজ্য প্রার্থনা করাও। পৃথিবীর নাম করা নাম করা অনেক মানুষের জীবনী অধ্যায়ন করলে যা দেখা যায় যে, সাফল্য আসে পরিশ্রমের হাত ধরে। পরিশ্রমই আসলে সুযোগ তৈরী করে দেয়। অলস মানুষের জন্য সুযোগ সবসময় আসে না। তারা মিস করে।

আজ যারা জিপিএ-৫ পাও নাই অথচ আশা করেছিলে, অথবা আজ যারা একটুর জন্য জিপিএ-৫ মিস করেছো, তাদের জন্য বলছি সেই কথাটা যা আমি একবার কোথায় যেনো পড়েছিলাম যে, “জীবনে তুমি কতবার ফেল করেছো সেটা দিয়ে সাফল্য নির্ভর করে না, সাফল্য নির্ভর করে তুমি কতবার ওই ফেল করা পরিস্থিতি থেকে সাফল্যের সহিত বের হয়ে আসতে পেরেছো তার উপর।”

১৮/০৮/২০১৬ আইনিস্টানিক আই কিউ

১১ বছরের একটি ছেলে তার আইনিস্টানিক আইকিউ এর মতো বুদ্ধিমত্তার কারনে সব স্কুল কলেজ বাদ দিয়ে সরাসরি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো। বাচ্চা ছেলে, মা অনেক চিন্তিত ছেলেকে নিয়ে। দূরদেশ, কিভাবে থাকবে, কিভাবে খাবে, কিভাবে নিজের যত্ন নিবে, সবভেবে মা অনেক পেরেশানি।

মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মা অতি যত্ন করে ছেলের কোটের পকেটের ভিতরের দিকে একটা ২৫ সেন্টের মুদ্রা সেলাই করে দিয়ে বললেন, “বাবা, যদি ঐখানে গিয়ে তোমার ভালো না লাগে, মন খারাপ থাকে কিংবা তোমার আর পড়তে ইচ্ছে না হয়, আমার কথা মনে হয়, তাহলে এই ২৫ সেন্ট মুদ্রাটা বের করে ট্রেন ভাড়া দিয়ে আমার কাছে চলে এসো”। ট্রেনভারা ২৫ সেন্টই লাগে বলে মা ২৫ সেন্টই গোপন পকেটে সেলাই করে ছেলের জন্য দিয়ে দিলেন যাতে কোনো কারনে ছেলের মন খারাপ, কিংবা মায়ের কাছে আসতে চাইছে কিন্তু তার কাছে ভাড়া নাই, তাই তিনি ট্রেন ভাড়া হিসাবে অগ্রিম ২৫ সেন্ট গুজে দিলেন তার কোটের পকেটের ভিতরে।

কোনো এক শীতের মৌসুমে ছেলেটি ইউনিভার্সিটিতে চলে এলো। সবাই তাঁকে অনেক অনেক আদর করে, অতি কনিষ্ঠ একজন ছাত্র কিন্তু খুবই মেধাবী। সব শিক্ষকরাও তাঁকে পেয়ে অনেক খুশী এবং তারা সবাই ছেলেটিকে অনেক আদর করেন। তার কথা অনেকেই মনোযগ সহকারে শুনেন। তিনি অনেক কঠিন কঠিন সমস্যার অল্প সময়েই উত্তম সমাধান দিয়ে দিতে পারেন। এমনই মেধাবী সে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো এক স্যারের বেলায়। সে তার ক্লাস টিচার।

তার ক্লাশ টিচার তারসাথে এমনভাব করেন যে, এই ছাত্রটি তার ক্লাশের সবচেয়ে অপ্রিয় একজন ছাত্র এবং তার মতো আহাম্মক আর একটাও নাই, তার কোনো মেধাও নাই। যেই এসাইন্মেন্টই দেওয়া হোক না কেনো, সে যদি সবচেয়ে ভালোও লিখে, তাতেও ক্লাশ টিচারের মন ভড়ে না, গলেও না, তার মেজাজ যেনো সব সময় ছাত্রটির উপর চড়া। কখনো ক্লাশ টিচার তার খাতাপত্র ছিড়ে ফেলেন রাগে, কখনো আবার এসাইন্মেন্ট না পড়েই “কি লিখেছো এসব” বলে সবার সামনে ছুড়ে ফেলে দেন ইত্যাদি।

ক্লাশ টিচারের এইরকম একটা আচরনের কোনো কারন কেউ খুজে পান না। আবার ক্লাশ টিচারের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করবেন, তার সাহসও কারো নাই। ক্রমে ক্রমে দিনে দিনে এই নাবালক ছাত্রটি ইউনিভার্সিটির পড়াকে একটা দুঃসহ জীবনের অভিজ্ঞতার মতো মনে করতে লাগলো। তার মন খারাপ হতে থাকে, শরির খারাপ হতে থাকে, পড়াশুনার উপর তার বিতৃষ্ণা গড়ে উঠতে থাকে।

একরাতে, তার খুব মন খারাপ হয়, মায়ের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মায়ের দেওয়া ওই ২৫ সেন্টের কথা। বাচ্চা ছেলে, হয়ত আইকিউ বেশি কিন্তু পরিপক্কতা তো আসে নাই। সে তার সব কাপর চোপড় গুছাতে থাকে, বইপত্র ব্যাগে ঢোকাতে থাকে। আজ রাতেই ট্রেন। ট্রেনে করে মায়ের কাছে চলে যাবে। আর ফিরবে না। কাউকেই সে এ কথা বল্লো না। সব গুছানো শেষ। এবার ট্রেনের উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হবার পালা।

যেই না ছেলেটি তার ব্যাগসমেত রুম থেকে বের হবে, ঠিক ওই মুহূর্তে তার ক্লাশ টিচার তার রুমের সামনে এসে হাজির। ক্লাশ টিচারকে দেখে তো ছেলেটির অন্তরাত্মা চমকে উঠলো। গায়ের রক্ত যেনো হিম হয়ে আসতে লাগলো। শীতের ওই রাতেও ছেলেটির মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করতে লাগলো। ভয়ে তার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছিলো না।

-“কি চলে যাচ্ছো নাকি? কোথায় যাচ্ছো? মায়ের কাছে?” ক্লাশ টিচার খুব সহজ করে প্রশ্ন করলেন ছেলেটিকে।

কোনো উত্তর না দিয়ে ছেলেটি শুধু কিছুটা ভয়ে, কিছুটা আবেগে শুধু মাথা নেড়ে “হ্যা সুচক” উত্তর দিলো।

-“চলো, ভিতরে চলো। তোমার সঙ্গে গল্প করি”। বলে ক্লাশ টিচার ছেলেটিকে অতি আদরের সহিত বুকে জড়িয়ে রুমে বসালেন। তারপর বল্লেনঃ

-তোমার কি খুব মন খারাপ? আমার উপর তোমার খুব রাগ? কিন্তু আমি তো তোমার উপর কখনো রাগ করি নাই। তাহলে শুন।

-আজ থেকে বহু বছর আগে, তোমার থেকেও ছোট একটা বয়সে আমি একটা নামীদামী ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার আইকিউও তোমার থেকে বেশি ছিলো। আমিও তোমার মতো সব সমস্যা অনেক দ্রুত এবং সঠিকভাবে সমাধান করতে পারতাম। আমার ক্লাশ টিচার, আমার সহপাঠী সববন্ধুরা, আমার পরিবার, আমার আশেপাশে যারা ছিলেন, তারা আমাকে এতোটাই সমিহ করতেন যে, আমার ভিতরে একটা জড়তার মতো শক্তি কাজ করতে থাকলো। আমার যত ইনোভেটিভ আইডিয়া, আমার যতো মেধা এবং যতোটুকু আমার আরো দেবার দরকার ছিলো তাতে আলসেমির একটা ভাব চলে আসে। মনে হতো, আমি তো সবই জানি, সবই করতে পারি। ফলে আমার চিন্তাশক্তি, চিন্তার মননশীল প্রবাহ স্লথ হয়ে আসে। যতোটুকুন আমি এগিয়ে যেতে পারতাম, তার থেকে আমি অনেক গুন কম অগ্রসর হতে পেরেছি কারন আমার পাশে শুধু চাটুকারের মতো অবুঝ লোকজনই বেশি ছিলো। আমি যখন এটা বুঝতে পারি, তখন নিজের কাছে আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়েছে এই কারনে যে, আমি আমার মেধার যথেষ্ট প্রতিফলন ঘটাতে পারি নাই, আমার মেধার চর্চা হয় নাই। এই সব লোকদের অহেতুক ভালোবাসা আর নির্বোধ স্নেহের কারনে আমি ধীরে ধীরে সাধারন একটা মানুষের সাড়িতে দাড়িয়ে ছিলাম। আজ যখন আমি তোমার দিকে তাকাই, তখন আমার কাছে মনে হয়েছে, তুমি নিজেও ওই সব চাটুকারদের ফাদে আটকে যাচ্ছো যেখান থেকে তুমি তোমার পুরু মেধার ফলাফল পাবে না। আমি ওইসব লোকদের কারনে ঠকেছি কিন্তু আমি তোমাকে ঠকতে দিতে চাই নাই। তাই আমি সবসময় আরো বেশী চাই, আরো বেশী করে তুমি তোমার মেধার শক্তি প্রয়োগ করো সেটাই চেয়েছি। ফলে আমি তোমাকে সবার মত তোমার কৃতকর্মের ফলাফলে তোষামোদি না করে, অহেতুক বাহবা না দিয়ে তোমার ভিতরের মেধাশীল আত্মাটাকে আরো নেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমি আমার ওই ব্যবহারের মাধ্যমে এটা বুঝাতে চাই নাই যে, আমি তোমাকে স্নেহ করি না, ভালোবাসিনা কিংবা আমি তোমার উপর বিরক্ত। আমি তোমাকে সবার থেকে বেশী ভালোবাসি, এটা আমি তোমাকে বুঝতে দিতে চাই নাই। আমি চাই নাই, আমার অতি আদরের মতো একটা শিশু যে অসামান্য মেধা নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছে , সে অন্যসব লোকদের তোষামোদিতে গা ভাসিয়ে দিয়ে মেধার বিকাশ থামিয়ে দিক। আমি যা হতে পারি নাই, আমি তোমার মত একজন অসামান্য সন্তানের কাছ থেকে সেটাই পেতে চেয়েছি। এইটুকু বলে ক্লাশ টিচার থামলেন।

তারপর তিনি আবারো বলতে লাগলেন,

-আজ তোমাকে একটা বাস্তব উপদেশের কথা বলি। যা তুমি বাস্তবে দেখছো, তা তুমি সত্যি দেখছো না সবসময়। যে আজ তোমাকে নিয়ে অনেক গল্প করে, সেই কোনো একদিন তুমি খসে গেলে অন্য রকমের গল্প করবে। যে আজ তোমার অনেক কাছের বন্ধু বলে মনে হবে, সে আসলে তোমার বন্ধু নয়। এর মধ্যে অনেকে আছে যারা তোমার সত্যিকারের বন্ধু বটে কিন্তু তোমার মেধাকে জাগ্রত করতে তাদের মেধা নেই। হয়ত তারা তোমার কোনো ক্ষতি চায় না। কিন্তু তাদের অহেতুক বাহবা কিংবা তোমার মেধা যে বিকশিত হচ্ছে না এটাই হয়ত তারা বুঝতে পারে না। ফলে তাদের অতিরিক্ত স্নেহশীলতা, অতিরিক্ত ভালোবাসা তোমার মেধাশীল চিত্তের ক্ষতি নিশ্চয়ই হবে যা তারা নিজেরাও জানেন না। অন্যদিকে, যাকে তুমি আজ মনে মনে অপছন্দ করছো, হয়তবা সেই তোমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু যাকে তুমি চিনতে পারছো না। চোখ সবসময় সঠিক জিনিষ দেখে না, আর সঠিক জিনিষ না দেখার কারনে মুল্যায়নটাও সঠিক হবে না। তোমাকে আমার মত করে বড় করার জন্য কখনো তোমাকে আগুনের তাপের মত কষ্ট, আমার রাগের মত হিংস্রতা, আমার নির্দয় ব্যবহারের মত মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হবে। যদি সহ্য করতে না পারো, তাহলে আমার দেখানো পথে তুমি কিভাবে আরো বড় হবে? তাহলে আমি আমার এই জ্ঞ্যানের সাম্রাজ্য কিভাবে তোমার কাধে দিয়ে যাবো? ওস্তাদের কাজ শাগরেদ গড়ে তোলা, আর সাগরেদের কাজ ওস্তাদের সব কিছুকে পজিটিভভাবে নেওয়া। ব্রুসলী একদিনে তৈরি হয় নাই, নবাব সিরাজ একদিনে সৃষ্টি হয় নাই, অলিম্পিকের একটা গোল্ড মেডাল একবার দৌর দিয়েই পাওয়া যায় না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস তাঁকে চর্চা করতে হয়েছে ঘাম, পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে। সাফল্য চুপে চুপে এসেছে এই তথ্য কেউ কখনো দিতে পারবে না। তারজন্য অনেক ধৈর্য আর সঠিক গুরুর দরকার। এতো অল্পতেই হেরে গেলে চলবে? আমি তো আছি তোমার পাশে।   

এই বলে ক্লাস টিচার ছেলেটিকে বুকে নিয়ে কিছুক্ষন ধরে থাকলেন, তিনি শুনতে পেলেন, তার বুকে মাথা রাখা এক অবুঝ কিন্তু অসামান্য মেধাশীল বালকের ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তার জামা ভিজে যাচ্ছে বালকের অশ্রুসিক্ত জলে। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, এই অসামান্য মেধাশীল বালককে আর নতুন করে কিছুই বলার নাই। মেধাই তাঁকে সব অজানা না বলা কথা তার অন্তরে অন্তরে গেথে দিচ্ছে।

ক্লাশ টিচার বালককে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে বুকে আগলে ধরে রাখলেন চরম মমতা দিয়ে। হয়ত তারও এক ফোটা  জল গড়িয়ে পড়ছিল বালকের ক্ষুদ্র কেশবি মাথায়। রাতের ক্ষিন আলোছায়ায় হয়ত তার কিছুই দেখা গেলো না।

সিনেমাটা এখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো।

মোরালঃ মেধাশীল হলেই সাফল্য পাওয়া যাবে তা সঠিক নয়। মেধাশীলদের মেধা চাটুকারদের কিংবা অবুঝদের ফাদে পড়ে সাফল্য বাধাগ্রস্থ হয়, সেটাই সঠিক। কিন্তু যোগ্যব্যক্তির সব ব্যবহার বুঝতে না পাড়লেও কিংবা পছন্দ না হলেও তার আশেপাশে থাকাই হচ্ছে সাফল্যের সোপান। দেখুন, শিখুন এবং বুঝুন কোন ব্যবহার কি কারনে সাফল্যধারি মেধাশীল ব্যক্তি করেন। আর এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে অভিজ্ঞতার ভান্ডার। নিতে পারলে ভালো, আর না নিতে পারলে ক্ষতি তার, যে নিতে পারে নাই।

(এইরুপ একটা জ্ঞ্যানি ব্যক্তি কে তার কাহিনি আমাদের পবিত্রগ্রন্থ “আহজাবে কাহাফ” (সম্ভবত) নামক সুরায়ও বর্ণিত আছে সেখানে হযরত মুসা (আঃ) অবলোকন করেছেন কোনো এক জ্ঞ্যানি ব্যক্তির অনেকগুলি ব্যবহার দেখে, যেখান থেকে তিনি পরবর্তীতে বুঝেছিলেন যে, ওই জ্ঞ্যানি ব্যাক্তি সবগুলি কাজ ভালো নিয়তেই করেছিলেন কিন্তু হযরত মুসা তার মেধার ভিত্তিতে বুঝতে পারেন নাই। পরবর্তীতে তিনি অধৈর্য হয়ে যাওয়াতে ওই জ্ঞ্যানি লোকের সহচর্জ ছাড়তে হয়েছিলো তাঁকে)

১৪/০৮/২০১৬- ৯/১১ এর ফল রাইস ভুইয়া

৯/১১ এর আসল হোতা কে বা কারা, এই তথ্যটা আজো পর্যন্ত জানা না গেলেও বিশ্ববাসী জানে যে, এটার পিছনে মুল পরিকল্পনাকারি যিনি তিনি একজন মুসলমান নামধারি ব্যক্তি। ফলে, ৯/১১ এর পরে হতাৎ করে সারাবিশ্ব মুসলমানদের প্রতি একটা খারাপ ধারনা করে নেয়। কেউ এটাকে কিছু বিচ্যুত ধার্মিক লোকের কাজ বলে মনে করেন, কেউ আবার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এটাই ইসলাম সমর্থন করে বলে মনে করেন ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, ৯/১১ এ যারা প্রান দিয়েছেন, তারা আর যাই হোক, তারা নিরীহ এবং শান্তিপ্রিয় মানুষ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তারা তাদের নিজের ধর্ম নিজের মত করেই পালন করতেন, সেখানে কারো সঙ্গে কারো বিরোধ ছিলোনা। ওইসব নিরীহ মানুষগুলুর অসময়ের প্রানত্যাগ আমাদের সবাইকে অনেক অনেক ব্যথিত করে তুলেছিল এবং এখনো ব্যথিত করে। যারা ওইসব মানুগুলুর নিকটাত্মীয় ছিলেন, বন্ধু বান্ধব ছিলেন, যাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিলো তাদের কাছে ওইসব মানুসগুলুর প্রানত্যাগ তো কোনোভাবেই সহ্য করার মত ছিলো না। ফলে কারো মনে ঘৃণা, জিদ, আক্রোশ যে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর এই আক্রোশ, ঘৃণা, কিংবা জিদ যাইই বলি না কেনো, তার থেকেই ঘটনা পরবর্তী অনেক কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন, মার্ক স্ট্রুম্যানের কিলিং মিশন।

৯/১১ এর ১০ দিন পর, রাইস ভুইয়া মার্ক স্ট্রুম্যানের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন এবং মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে থাকেন। এখানে রাইস ভুইয়া সম্পরকে কিছু না বললে ভুল হবে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন নাগরিক। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে বাংলাদেশ এয়ার ফোরসেও যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কম্পিউটার টেকনোলোজি পড়ার জন্য আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। প্রথমে তিনি নিউইয়র্ক পরে তুলনামূলকভাবে কম খরচের স্ট্যাট ডালাসে চলে যান এবং সেখানে তিনি তার এক বন্ধুর গ্যাস স্ট্যাসনে পার্টনারশিপ ব্যবসায় যোগ দেন।

এবার আসি, মার্ক স্ট্রুম্যান সম্পরকে কিছু কথা। মার্ক স্ট্রুম্যান একজন দৈনিক শ্রমিকের কাজ করতেন ওই ডালাস শহরেই। ৯/১১ ঘটনার পরে মার্ক স্ট্রুম্যান এতোটাই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন মুসলমানদের উপর যে, তিনি আরব বংসোউদ্ভুত কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, কিংবা মুসলমান যে কোনো দেশের অধিবাশিই হোক, তাদেরকে খুন করাই ছিলো তার নিশানা।

এই কিলিং মিশন এর এজেন্ডা হিসাবে মার্ক স্ট্রুম্যান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে ডালাসের এক শব্জি দোকানে ওয়াকার নামে এক পাকিস্থানিকে এবং তার ৬ দিন পর রাইস ভুইয়াকে সরাসরি গুলি করেন। ভাগ্য চরম ভালো যে, জনাব রাইস ভুইয়া প্রানে মারা যান নাই কিন্তু তার ডান চোখের দৃষ্টি হারিয়ে যায় এবং এখনো তার দেহে প্রায় ৩৫টি প্যালেট বিদ্যমান যা অস্ত্রপ্রচারেও বের করা সম্ভব হয় নাই। অবশেষে মার্ক স্ট্রুম্যানকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং বিচারের সম্মুখীন করে।

সবশেষে মার্ক স্ট্রুম্যান এর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু জনাব রাইস ভুইয়া এই মৃত্যুদণ্ডের বিপরিতে আপীল করেন যাতে মার্ক স্ট্রুম্যানকে হত্যা না করা হয়। জনাব রাইস ভুইয়া টেক্সাস এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর ডেথ পেনাল্টি আবোলিসন ক্যাম্পেইন এর মাধ্যমে, কোর্টের মাধ্যমে, এমনকি নিজে সশরীরে আদালত প্রাঙ্গনে হাজির হয়ে মার্ক স্ট্রুম্যানের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করানোর জন্য দাঁরে দাঁরে ঘুরেছেন। এইভাবে প্রায় ১০ বছর পার হয়ে গেছে মার্ক স্ট্রুম্যানের বিচার কার্যকরী করতে।

বিশ্বের সবাই অবাক হয়ে শুধু একটা প্রশ্নই জনাব রাইস ভুইয়াকে করেছেন, কেনো তিনি তার ঘাতককে ক্ষমা করে দিচ্ছেন, শুধু ক্ষমাই না, তাকে মুক্তজীবন দান করতে চাচ্ছেন? জনাব রাইস ভুইয়া যা বলেছেন তা আমি হুবহু লিখছি যাতে কোনো কিছু ব্যত্যয় না ঘটে।

Q: Mr. Stroman has admitted trying to kill you. Why are you trying to save his life?

A: I was raised very well by my parents and teachers. They raised me with good morals and strong faith. They taught me to put yourself in others’ shoes. Even if they hurt you, don’t take revenge. Forgive them. Move on. It will bring something good to you and them. My Islamic faith teaches me this too. He said he did this as an act of war and a lot of Americans wanted to do it but he had the courage to do it — to shoot Muslims. After it happened I was just simply struggling to survive in this country. I decided that forgiveness was not enough. That what he did was out of ignorance. I decided I had to do something to save this person’s life. That killing someone in Dallas is not an answer for what happened on Sept. 11.

প্রশ্ন ছিলোঃ মার্ক স্ট্রুম্যান স্বীকার করেছেন যে তিনি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনি কেনো তাকে বাচাতে চাইছেন?

জনাব রাইস ভুইয়ার উত্তর ছিলো; আমি আমার পিতামাতা এবং শিক্ষকদের দ্বারা অতি উত্তম শিক্ষায় মানুষ হয়েছি। তারা আমাকে নীতির মধ্যে এবং শক্ত বিশ্বাসের উপর মানুষ করেছেন। তারা আমাকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে তাদের দিকটা বিবেচনা করার শিক্ষা দিয়েছেন। তারা আমাকে শিখিয়েছেন, কেউ যদি তোমাকে দুঃখ দেয়, প্রতিশোধ নেওয়ার দরকার নাই, এবং নিও না। তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। সামনে এগিয়ে চলো। এতে তোমার এবং অন্যের উভয়ের মঙ্গল হবে। আমার ধর্ম ইসলামও তাই শিক্ষা দেয়। মার্ক স্ট্রুম্যান যা করেছে, তা একটা যুদ্ধের পরিস্থিতির মতো মনোভাব এবং এই মনোভাবটা অনেক আমেরিকানরাই মনে মনে পোষণ করে যা স্ট্রুম্যান করেছে। হয়ত তারা (আমেরিকানরা) করার সাহস পাচ্ছিলো না কিন্তু মার্ক স্ট্রুম্যান করার সাহস পেয়েছিলো। এই ঘটনা ঘটার পর আমি শুধু নিজেকে এই দেশে বেচে থাকার জন্য সামলে নিয়েছি, অনেক কস্ট করেছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, শুধু তাকে ক্ষমা করাই একমাত্র সমাধান নয়, মার্ক স্ট্রুম্যান যা করেছে তা সে তার নির্বুদ্ধিতার কারনে করেছে, সে বুঝে নাই। এখন আমার কাজ তাকে বাঁচানো। ডালাসে বসে কাউকে খুন করাই সেপ্টেম্বর ১১ তে কি হয়েছে তার সমাধান হবে না।

শেষ পর্যন্ত আদালত মার্ক স্ট্রুম্যানের পূর্বের রেকর্ড, তার চরিত্রের বৈশিষ্ট সবকিছু চুলচেরা বিস্লেসন করে মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখেন এবং ২১ জুন ২০১১ তে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করেন। মৃত্যুর আগে মার্ক স্ট্রুম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিলোঃ

Q: How are you doing, Mr. Stroman?

A: “I ’ve only 25 days left until Texas Straps me to a gurney and pumps me full of toxic bug juice, But then again, we all face an ending at some time or another. All is well, Spirits are high, I sit here with a cup of coffee and some good ole classic rock playing on my radio, how Ironic, the song ‘Free Bird’ by Lynyrd Skynyrd…”

Q: What do you think of Rais Bhuiyan’s efforts to keep you from being executed? A: “Yes, Mr Rais Bhuiyan, what an inspiring soul…for him to come forward after what I’ve done speaks volume’s…and has really touched my heart and the heart of many others World Wide…especially since for the last 10 years all we have heard about is how evil the Islamic faith can be…its proof that all are Not bad nor evil.”

Q: Tell me what you are thinking now, a few weeks before your scheduled execution.

A: “Not only do I have all my friends and supporters trying to save my life, but now I have The Islamic Community Joining in…Spearheaded by one very remarkable man named Rais Bhuiyan, who is a survivor of my hate. His deep Islamic beliefs have gave him the strength to forgive the un-forgiveable…that is truly Inspiring to me, and should be an example for us all. The Hate, has to stop, we are all in this world together. My jesus faith & Texas Roots have deepened my understanding as well. Its almost been 10 years since the world stopped turning, and we as a nation will never be able to forget what we felt that day, I surely wont, but I can tell you what im feeling today, and that’s very grateful for Rais Bhuiyan’s efforts to save my life after I tried to end his. A lot of people out there are still hurt and full of hate, and as I sit here on Texas Death watch counting down to my own death, I have been given the chance to openly express whats inside this Texas mind and heart, and hopefully that something good will come of this. We need more forgiveness and understanding and less hate.” Mr. Stroman signed off, “Texas Loud & Texas proud…TRUE AMERICAN…. Living to Die – Dying to Live.”

বাংলায় অর্থঃ

মৃত্যু পথযাত্রি মার্ক স্ট্রুম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো,

(১) আপনি এখন কেমন আছেন?

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “টেক্সাস আদালতের রায় অনুযায়ী বিষ প্রয়োগ করে আমাকে মেরে ফেলার আর মাত্র ২৫ দিন বাকি আছে। সবাই মরবে, আজ অথবা কাল। সব কিছুই ভাল, বিধাতাও ভালো। আমি এখন এখানে এক কাপ কফি আর কিছু খেলার সরঞ্জামাদিসমেত কিছু কিছু রক মিউজিক শুনছি রেডিওতে। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে একটা গানের কলি শুনি, আর তা হচ্ছে, পাখিকে মুক্ত করে দাও……”

(২) মার্ক স্ট্রুম্যানকে ২য় প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, আপনাকে বাচিয়ে রাখার জনাব রাইস ভুইয়ার আপ্রান চেস্টা আপনাকে কি মনে করিয়ে দেয়? বা আপনি কিভাবে ভাবছেন জিনিষটা?

উত্তরে মার্ক স্ট্রুম্যান বলেছে, “হ্যা, সত্যি কি স্পিরিচুয়াল (আধ্যাত্মিক) একজন মানুষ। আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা তিনি জেনেও কি অবাক যে তিনি আমাকে বাচানোর জন্য আপ্রান চেস্টা করে যাচ্ছেন যা আমাকে এবং আমার মত অনেক আমেরিকানদের তথা বিশ্বাসীর হৃদয় পর্যন্ত ছুয়ে যাচ্ছে। এই গত দশ বছরে আমরা যত খারাপ খবর কিংবা মিথ্যা দর্শন শুনেছি ইসলাম সম্পরকে এবং ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের সম্পরকে, তা আসলেই সঠিক নয়। এখন এটাই প্রমান হয় যে, সবাই খারাপ না, সবাই শয়তান নয়।

মার্ক স্ট্রুম্যানকে ৩য় প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, তিনি মৃত্যুর এই কয়েক সপ্তাহ আগে কি ভাবছেন?

উত্তরে মার্ক স্ট্রুম্যান বলেছিলেন, ” এখন শুধু আমার আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধু বান্ধবই আমাকে বাচানোর চেস্টা করছে না, বরং আমার ঘৃণার কারনে আমার দ্বারা গুলিবিদ্ধ এবং গুলিবিদ্ধ মৃত্যু থেকে বেচে আসা জনাব রাইস ভুইয়ার মাধ্যমে পুরু ইস্লামিক কমিউনিটিকে সঙ্গে পাচ্ছি যেনো আমি আমার জীবন আবার ফিরে পাই। তার(জনাব রাইস ভুইয়ার) ধর্মের পরম যে শিক্ষা যে, ক্ষমা করো এমন কি তাকেও যে ক্ষমার জন্যও যোগ্য নয়, তার এই বিশ্বাস আমাকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছে এবং এটা পৃথিবীর কাছে একটা উদাহরন হয়ে থাকবে। এখন আর ঘৃণা নয়, এটাকে থামাতে হবে। আমরা সবাই একই পৃথিবীর লোক। যীশুর এবং টেক্সাস রুটের উপর আমার বিশ্বাস আরো গভির হয়েছে। আজ থেকে ১০ বছর আগে যা ঘটেছিলো তা আমি এবং আমার দেশ কেহই হয়ত কখনো ভুলে যাবে না। এটাও ঠিক যে, ওই সময় আমরা নাগরিক হিসাবে কি ভেবেছি তা এই মুহূর্তেও বলা কঠিন কিন্তু এটা ঠিক যে, আজ এই মুহূর্তে আমি জনাব রাইস ভুইয়ার কাছে কৃতজ্ঞ যাকে আমি ঘৃণার কারনে মারতে চেয়েছিলাম। আমি এটাও জানি যে, আজো অনেক দেশবাসীর মনে কষ্ট আছে, দুক্ষ আছে, যন্ত্রনা আছে, ঘৃণাও আছে। কিন্তু এই ঘৃণা কমাতে হবে, আমাদের আরো সহনশীল হতে হবে। আমি খুব ভাগ্যবান যে, আমি মৃত্যুর আগে অন্তত আমার মনের কথাগুলি এই টেক্সাসবাসিকে বলতে পারলাম। আমি চলে যাচ্ছি। Living to Die – Dying to Live.”

জনাব রাইস ভুইয়ার সঙ্গে আমার কয়েকবার ফেসবুকে কথা হয়েছে। খুব ভালো লেগেছে তার এই মনোভাবের জন্য। তিনি একটা ওয়েব পোর্টাল খুলেছেন, নামটাও সুন্দর, WORLD WITHOUT HATE. আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার ওই ওয়েবপোর্টালের পাচ আঙুলের আইকন দিয়ে তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন। মিনিংটা আরো সুন্দর। আমি অবশ্য এখন তার ওয়েব পোর্টালের একজন সদস্য বটে। সবশেষে তিনি গত রোজায় ওভাল অফিসে দাওয়াত খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামার দাওয়াতে। বিশেষ ইফতারির আয়োজন করা হয়েছিলো জনাব রাইস ভুইয়ার সম্মানে। শুনেছি এখন তাঁকে নিয়ে এই প্রেক্ষাপটে একটা বিশ্বব্যাপি ম্যাসেজ দেওয়ার জন্য ছবি বানানো হবে যেখানে আমাদের রাইস ভুইয়া নিজেই থাকবেন। আমি তার একজন প্রাক্তন সিনিওর ক্যাডেট ভাই হিসাবে নয়, বাংলাদেশী হিসাবে বড় গর্ববোধ করি। আমি তার সুস্বাস্থ্য কামনা করি।

(নোটঃ রাইস ভুইয়াকে বলছি, তোমার অনুমতি ছাড়াই আমি এই কথাগুলি আমার ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। আশা করি অপরাধ মার্জনীয়। আর তুমি এটাই করো)।

১৪/০৮/২০১৬-সেই ছোটবেলা

ছোট বেলায় মনে করতাম, আহা, স্কুল ছুটি হবে, ক্লাশ থাকবে না, টিচারদের কাছে আর জ্ঞ্যানগর্ব লেকচার শুনতে হবে না, ইচ্ছেমতো নদীতে গিয়ে বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে লাফঝাপ মারবো, সারাদিন মাঠে গিয়ে যখন তখন খেলাধুলা করবো। সন্ধ্যা হলে আর পড়ার টেবিলে বসতে হবে না, সকাল সকাল আর ঘুম থেকে উঠতে হবে না, আরো কত কি!! মাঝারী বেলায় মনে করতাম, আহা, অফিস ছুটি হলে সারাদিন বাসায় বসে টিভি দেখবো, ঘুমাবো, সন্ধ্যায় আড্ডা দেবো। কি মজা হবে। কোনো অফিস নাই, বসের আদেশ পালনের তারাহুড়া নাই। সকাল সকাল উঠে তাড়াহুরা করে অফিসের জন্য রওয়ানা হতে হবে না। অনেক অনেক মজা করে সময়টা পার হবে। এই বয়সে এসেও মনে হয়, আহা এইবার ছুটিতে অনেক অনেক সময় পাওয়া যাবে। স্টাফদের ফোন আসবে না, সাপ্লাইয়াদের হিসাব কিতাব নিয়ে বসার দরকার হবে না। বাসায়, আত্মীয় স্বজনদেরকে সময় দিতে পারবো, বেশ জমজমাট একটা সময় পার হবে।

অথচ আজ কয়েকদিন যাবত আমি ছুটিতে আছি। কাজ নাই, অফিস নাই, তাড়াহুড়াও নাই। বড়দের চাপ নাই, শিক্ষকদের শাসন নাই, স্টাফদের ফোন কল নাই, সাপ্লাইয়াদের কোনো চাপ নাই, কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছে কি যেনো নাই। আচ্ছা, কি নাই? আমি তো ইচ্ছে করলে এখন পুরানো সেই বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে নদীতে যখন তখন ঝাপ দিতে পারি কারন শাসন করার কেউ নাই, ইচ্ছে করলেই সারাদিন টিভি দেখতে পারি, ইচ্ছে করলেই সারাদিন ঘুমাতেও পারি, কিন্তু তারপরেও আমি তা করতে পারছি না। কি অদ্ভুত!!

এখন মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু সময় আছে, সেই সময়ের সঙ্গে আমাদের ছুটির একটা বড় রকমের যোগসুত্র আছে। আজ এই ৫০ বছর বয়সে আমি আর আগের সেই ১২ বছরের বালকের ন্যায় উচ্ছাস নদীতে তরঙ্গলম্ফ দিতে পারি না, ইচ্ছেও করে না। অথবা সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবলের অভাবে নারার-খেরের বল বানিয়ে গুটিকতক অদম্য পোলাপানের মতো গ্রামের সেই স্কুলের মাঠে হৈচৈ করে ভরদুপুরে দৌড়াদৌড়িও করতে পারি না। হয়ত মানায় না। অথবা পাশের বাড়ির পেয়ারা গাছের আধাপাকা পেয়ারাগুলি আর এখন আমাকে লোভ দেখায় না। বয়সটা পেড়িয়ে গেছে। আর তাই বড় আফসোস লাগে, আহা যদি আবার সেই বাল্যকালের শিক্ষকদের শাসনটা ফিরে আসতো! আহা, যদি আবার সেই পুরানো বন্ধু বান্ধবরা আগের রুপে ফিরে আসতো! মাঝে মাঝে আজ খুব হাসি আসে সেই বাচ্চা বয়সের কথা মনে করে। কতই না রাগ করেছি সবচেয়ে ভালো বন্ধুর সাথে। কত যে ঝগড়া করেছি ওদের সাথে। কখনো কারনে, কখনো অকারনে। কখনো আমি দোষ করেই উলটা আমি রাগ করেছি, আবার কখন ওদের দোষের কারনেও রাগ করেছি। এক মিনিট সময় লাগেনি তাকে বলতে যে, আমি তাকে ঘৃণা করি কারন সে আমাকে তার লাল পেন্সিলটা একদিন ব্যবহার করতে দেয় নাই, অথবা নদীতে আমার আগে সে লাফ দিলো কেনো এই কারনে আমি তার সাথে জিদ ধরে কয়েকদিন হয়ত কথাই বলিনি ইত্যাদি। জিদ ধরেছি একে অপরের সঙ্গে, কখনো কখনো আড়ি হয়েছে, কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে, আরো কত কি?

আজ বড় নস্টালজিক মনে হয়, আহা, এমন একটা বয়স যদি আবারো ফিরে আসতো! আমার সেই বন্ধুরাতো আজো আছে, আশেপাশেই আছে। কিন্তু বাল্যকালের সেই উচ্ছ্বাস, সেই অদম্য দুস্টুমিপনা, সেই আবেগ আর নাই। বয়স একধাপ থেকে উঠে আরেক ধাপে চলে গেছে। আগের ধাপের স্মৃতি ধরে রেখেছে কিন্তু কার্যপ্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কথা হয় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে, জিবনের উৎকণ্ঠা নিয়ে, পরিবারের ভালমন্দ নিয়ে, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংস্কৃতি নিয়ে। এখন আর বৈশাখী মেলায় মাটির ব্যাংক, বাঁশের বাঁশী, ভাজা বুট, চালতার আচার, ইত্যাদি নিয়ে কোনো আবেগ আসে না। অফুরন্ত সময় আছে, খেলার মাঠও সেখানেই আছে, নদীও আগের জায়গায়ই আছে, কিন্তু সেই ফেলে আসা বাল্যকালটা নাই। নদি দেখলে এখন মন চায় যদি ঝাপ দিতে পারতাম, কিন্তু দেওয়া হয় না। সবুজ ধানক্ষেত দেখলে ক্ষেতের আইল ধরে কচিকচি পায়ে দৌর দিয়ে কোথাও হারিয়ে যেতে মন চায় কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হয় না। মন মনের জায়গায়ই আছে কিন্তু মনের সঙ্গে শরীর আর শরীরের সঙ্গে মনের মধ্যে এখন বিস্তর ব্যবধান বনে গেছে। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে “সময়” নামক এক বিশাল অদৃশ্য দেওয়াল। পাশে থাকা বাল্য বয়সের ছেলেমেয়েরা যখন তাদের ইচ্ছার কথাগুলি বলতে থাকে, আমি বুঝতে পারি ওরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে আর কি বলছে। বড্ড ভাল লাগে। মাঝে মাঝে ধমক দেই, মাঝে মাঝে বারন করি, কখনো কখনো রাগও করি। আবার এও জানি, এটাই তো করার কথা ওদের। কিন্তু ওরাও একদিন এই সময়টা হারিয়ে ফেলবে। আজ ওদেরকে শাসন করি, একদিন আমাদেরকেও আমাদের অভিভাবকরা শাশন করতো। অভিভাবকদের ওই শাসনে কখনো মন খারাপ হয়েছে, অনেক আনন্দ মাটি করে ফেলেছি রাগে, দুঃখে মনের কস্টে। জিদ ধরে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। সারাদিন না খেয়ে কষ্ট হচ্ছে দেখে হয়ত মাও খান নাই, বাবা ছেলের অহেতুক জিদে, মায়ের মনের কষ্টে তার সব শাসন ভুলে হয়ত আমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন, আর আমি সেটাই আমার বীরত্বই বলি, আর আমার জয়ই বলি, গর্বে আরো ঘাড় বেকে বসে থাকতাম খাবো না বলে। একদম অবুঝের মতো। আজ ওইগুলু মনে পড়লে বড্ড মন খারাপ হয়। আজ ঐ শাসনগুলি খুব মিস করছি। চোখের পাতা ভিজে আসে। কোথায় হারিয়ে গেলো ওইসব?

যখন ছোট ছিলাম, সবচেয়ে অপছন্দের চিঠি ছিল আমার অভিভাবকদের। সেই একই কথা। কোনো চিঠি না খুলেই বলে দিতে পারতাম, বাবা কি লিখেছে বা মা কি বলতে চেয়েছে। একদিন খুব দুস্টুমি করে আমি আমার অভিভাবককে বলেছিলাম, আচ্ছা, কস্ট করে বারবার একই চিঠি লেখার দরকার কি? একটা চিঠি ফটোকপি করে রাখলেই তো হয়। কদিন পরপর শুধু ওটা পোস্ট করে দিবা! কারন কথা তো একই থাকে। কেমন আছো তুমি, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করবে, সন্ধ্যা হওয়ার আগে ঘরে ফিরে আসবে, বেশী রাত জাগবে না, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে ভালোভাবে মিলেমিশে থাকবে, বড়দেরকে সম্মান করবে, আমাদের জন্য মন খারাপ করো না। এই তো? তাহলে আর বারবার লেখার দরকার কি? অথচ আজ এতো বছর পর মনে হচ্ছে, আমি ওই কথাগুলিই খুব মিস করছি। খুব করে মনে হয়, তোমরা আবারো আমাকে এই একই কথাগুলি লিখে পাঠাও না বাবা! আমি জানি, আজ আমার সন্তানেরাও ঠিক একই কথা বলবে। হয়ত কোনো একদিন আজকের এই দিনের মতো তারাও হয়ত আমার সেই একই কথা শুনার জন্য তাদের মন খারাপ করবে। সব বাবাদের কথা এক হয়, সব মায়েদের সন্তানের জন্য চিন্তা এক হয়। তোমরা যখন বাবা মা হবে, সেদিন হয়ত বুঝবে, আজ আমি কি বলতে চাচ্ছি।

আমি বাসায় আজ একা। আমার মেয়েরা তার মাকে নিয়ে নানি বাড়ি বেড়াতে গেছে। আজই চলে আসার কথা ছিলো কিন্তু রাতে নাকি বারবিকিউ করবে। আমি সবসময় ওদের সঙ্গে যাই কিন্তু আজ যাওয়া হল না। যেতে ইচ্ছে করলো না। না যাওয়ার অনেক ব্যাখ্যা আছে, নাইবা বললাম। যেতে ভালো লাগছিলো না। ওদেরকে মিস করছি। বাসায় থাকলে যে বউ ছেলেমের সঙ্গে অনেক গল্প হয়, কিংবা সারাক্ষন বসে আড্ডা দেই, কিংবা সময় কাটাচ্ছি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু ওরা বাসায় নাই বলে মনে হচ্ছে পুরু বাসাটা খালি, কথা বলার লোকজন নাই। উচ্ছল একটা পরিবেশ নাই। আমার শাশুড়ি যখন বেচে ছিলেন, তখন সেখানে যাওয়ার জন্য আমার একটা টান ছিলো। অনেক বয়স্ক একজন মহিলা ছিলেন। আমার ভালো লাগা মানুসগুলুর মধ্যে ওনি একজন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমার বাসায় ছিলেন, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিলো। আমি জানতাম, একসময় আমি এই চমৎকার মানুসগুলুকে খুব মিস করবো, তাই আমার সাধ্যির মধ্যে যতটুকু সম্ভব ছিলো করার চেষ্টা করেছি, আর যেটুকু পারি নাই, সেটুকু করেছি আমার ভালোবাসা দিয়ে। ঈদ চলে গেছে একদিন হলো। এই ঈদ পর্বগুলুতে আমি শুধু একজনের কাছ থেকেই ঈদের সালামি পেতাম, তাও আবার ১০ টাকা। আর সেটা সবসময় আমার এই শাসুড়ির কাছ থেকে। আমি এমনিতেই তাদেরকে সালাম করতাম, কারনে-অকারনে সালাম করতাম কিন্তু ঈদের দিনে আমি তাকে সালাম করতাম আর ভাবতাম, কোনো একদিন এই ১০ টাকার সালামিটা বন্ধ হয়ে যাবে। আজ সত্যি সত্যি সেই সালামিটা আমি মিস করি। সালামিটা নেওয়ার সময় তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, তারপর তিনি আমার কপালে চুমু খেতেন। বড্ড মিষ্টি একটা চুমু। তিনি জান্নাতবাসী হয়েছেন কিন্তু প্রতি ঈদে আমি তাকে আমার অন্তর থেকে স্মরণ করি। তিনিও আমার মা ছিলেন। সালাম করতে ইচ্ছে করে আজ। আস্তে আস্তে আমার সালামের মানুষগুলিও কমে যাচ্ছে। একদিন আমাকে আর “তুই” বলে সম্বোধন করার লোকও কমে যাবে এবং যাচ্ছেও। কিংবা আমার সালামের জায়গাগুলি একেবারে শুন্য হয়ে যাচ্ছে। আমি জানিনা তার সন্তানেরা তাকে প্রতিদিন মনে করেন কিনা কিন্তু আমি তার কথা প্রতিদিন মনে করি। এর একটা প্রধান কারন আছে। কারনটা বলতে চাইনা কিন্তু আমার কাছে এমন একটা জিনিষ তিনি রেখে গেছেন যেটা তিনি ব্যবহার করতেন কিন্তু আমি এখন সেটা ব্যবহার করি। আর এই বস্তুটিই আমাকে তার কথা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়।

যে বালকটি আজ থেকে ৪০ বছর আগে উচ্ছল, চঞ্চল, দুরন্তপনা, অদম্য সময় কাটিয়েছিলো, ওই সময় যে তোমাদেরকে অনেক কঠিন দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে রাখতো, সময়-অসময় তোমাদের মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়াতো, আজ সেই একই বালক ৪০ বছর পর শান্ত, ধীর এবং অভিভাবকরুপে রূপান্তরিত হয়ে শুধু একটা আবেগের কথাই বলতে চাই, ফিরে এসে দেখে যাও, সে আর আগের মতো দুস্টুমি করে না, হতাত বৃষ্টিতে তোমাদের অগোচরে ভিজে আর অসময়ে জ্বর বাধিয়ে ফেলে না, কিংবা তোমাদের না বলে হতাত করে কিছু দুষ্টু বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় না। তোমরা যে ছেলেকে সারাক্ষন ঘরের মধ্যে শান্ত হয়ে থাকতে বলতে। বলতে আর কতজল ফেলবি আমাদের চোখে? আর কত দুসচিন্তায় ফেলবি আমাদের? আজ এই বয়সে এসে আমি তোমাদের শুধু একটা কথাই বলতে পারি, এখন এসো আমার ঘরে, দেখে যাও, তার এখন অফুরন্ত সময় এবং সে এখন সত্যিই শান্ত একটি মিষ্টি ছেলে। এখন আর তোমাদেরকে আমি কোনো দুসচিন্তায় ফেলবো না। আজ আমার ছুটি। লম্বা ছুটি। আমি তোমাদের একজন লক্ষি ছেলে হয়েই ঘরে বসে আছি। কিন্তু তোমরা কই? তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাও? আমি তোমাদের খুব ভালবাসি। 

১৩/০৮/২০১৬-কুরবানীর গরু

গত পরশুদিন অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখেই আমাদের কুরবানীর গরুটি কেনা হয়েছিলো। আমার মেয়ের জামাই গরু দামদর করা থেকে বাসায় আনা পর্যন্ত এই কঠিন কাজটি আমার জন্য সহজ করে দিয়েছিলো। খুব একটা সময় পাই নাই ফ্যাক্টরির কাজের জন্য। অবশেষে গতকাল রাত ১০টার পর কুরবানির গরুটাকে নিরিবিলি দেখার সুযোগ হলো।

বেশ সুন্দর একটি গরু। মধ্যবয়সী। বুঝাই যায়, অতি যত্ন করে গরুর মালিক একে বড় করেছেন। পালা গরু। দেশের অনৈতিক প্রচলন হিসাবে গরুর মালিক নিজে কোন অনৈতিক ঔষধ দিয়ে গরুটাকে বড় করেন নি। বেশ মিশুক। মিশুক কথাটা মানুষের জন্যই শুধু প্রযোজ্য নয়, এটা যে কোনো প্রানির জন্যই প্রযোজ্য। আমি কাছে গিয়ে গরুটার মাথায় একটু আলতো করে হাত বুলাতেই সে বুঝতে পারলো, আমি ওকে আদর করছি এবং আমি ওর ক্ষতিকারক কেউ নই। সব প্রানীই ভালোবাসা বুঝে, আসলে ভালোবাসার ভাষা সবার জন্য এক। ভালোবাসা বহিরপ্রকাশের জন্য কোনো ভাষা লাগে না। হোক সেটা মানুষ, হোক সেটা কোনো ভাষাহীন প্রানি। 

গরুটি আমার হাতের পরশে তার শিং আর মাথার তালু দিয়ে আমার হাতটাকেও এমনভাবে স্পর্শ দিচ্ছিলো যে, আমার মনের ভিতরে তারজন্য একটা মহব্বত, একটা স্নেহ, একটা অনুভুতির পরশ বইয়ে যাচ্ছিলো। কিছু ধানের খের দিতেই দেখলাম, অতি আনন্দের সহিত তা খাওয়া শুরু করলো। মনে হলো ওর ক্ষুধা লেগেছে। আমি কয়েক কেজি ভুষি, পানিতে লবন মেখে একটা বালতিতে রাখলাম। মনে হলো, অনেক দিন পর যেন সে তার চেনা পরিচিত একটা খাবার পেলো। ফলে খের খাওয়ার পাশাপাশি ভুষিগুলুও খেতে থাকলো। ওর খাওয়া দেখে আমারই বড্ড ভালো লাগলো।

রাত প্রায় ১১টা। সবাই প্রায় ঘুমের আয়োজন করছে, আশেপাশের মানুষজনও নিস্তব্ধ। আমি গরুটার পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছি। গরুটা কি পরিবেশে বড় হয়েছে, কতগুলু গরু একসঙ্গে বড় হয়েছে, কি তাকে খেতে দেওয়া হত, কিভাবে তাকে খেতে দিলে ও সবচেয়ে বেশী আনন্দ করে খেতো, খাওয়ানোর সময় ওর মালিক কিভাবে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো কিংবা আদৌ পাশে থাকতো কিনা, তার কোনো কিছুই আমার জানা নাই। কিন্তু এই মুহূর্তে এই ভাষাহীন একেলা নিঃসঙ্গ প্রানিটির পাশে আমি আছি। আমি তার শরীরে, মাথায়, গলায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আর ওর ভুষি, খের খাওয়া দেখছি। মাঝে মাঝে ও আমাকে আলতো করে আমার হাতের তালুতে গুতা দিচ্ছে, কিন্তু ব্যাথা দিচ্ছে না। বুঝতে পারছি, আমি ওর বন্ধু হয়ে গেছি।

অনেক সময়ধরে গরুটি অনেক ভুষি আর খের খেলো। তারপর ধীরে ধীরে একটা জায়গায় গিয়ে পিছনের দুই পা সামনের দিকে ভাজ করে আর সামনের দুই পা পিছনের দিকে ভাজ করে ঠিক আমাকে দেখা যায় এমনভাবে শুয়ে পড়লো। জাবর কাটছে গরুটি আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটা চেয়ার নিয়ে খুব কাছেই বসেছিলাম। আমাদের ভাষা ভিন্ন, আমরা আমাদের ভাষায় ওকে কোন কথা বললেও তার বুঝার কোনো ক্ষমতা নেই। মাঝে মাঝে আমি ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আর ও তার মাথা আর শিং দিয়ে এমনভাবে সারা দিচ্ছিলো যেনো আমরা কথা বলছি।

এইভাবে কতক্ষন বসে ছিলাম, আমার মনে নাই, কিন্তু এই বসে থাকা অবস্থায় আমি ভাবছি, আগামিকাল সকালে এর জীবননাশ হয়ে যাবে, একে আমি কুরবানী দিবো। এটা ভাবতেই এখন আমার কষ্ট লাগছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার সান্নিধ্য, তাতেই ওর প্রতি আমার একটা মহব্বত, একটা মায়া জন্মেছে। কাল থেকে আর ওকে আমি দেখতে পাবো না কিংবা ও আর এই প্রিথিবীর আলো বাতাশ দেখতে পাবে না, এটা ভাবতেই আমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমার বিধাতার নির্দেশ, সক্ষম ব্যক্তিদের কুরবানী ওয়াজিব। এখানে আমার মহব্বত কত গভীর, আর আমার কষ্ট কতো প্রকট, সেই আবেগের কোনো স্থান নেই।

একটা সিগারেট ধরিয়ে গরুটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিলাম, আজ থেকে অনেক বছর আগে আল্লাহ ইব্রাহিম (আঃ) কে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিষ, তার ছেলে, ইসমাইল (আঃ) কে কুরবানি করতে বলেছিলেন। তখনো ইসমাইল (আঃ) একজন অপরিনত সুন্দর, নিস্পাপ এবং কচি একটি শিশু। পিতা নিজের আদরের সন্তানকে তার গলায় ছুড়ি দিয়ে জিবন্ত কুরবানী দিবেন, এটাই ছিলো আল্লাহর নির্দেশ। অনেক অনেক কঠিন একটা নির্দেশ। আল্লাহর প্রতি ইব্রাহিম (আঃ) এর ভালোবাসা কতটা গভীর তার প্রমান হিসাবেই আল্লাহ তাকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমন একটা পরীক্ষার কথা ভাবতেই তো গা শিউরে উঠে। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ, অমান্য করার কোন অবকাশ নাই। কিন্তু মানুষের হৃদয় বলে তো একটা জায়গা আছে। মানতে পারা আর মেনে কাজটা করা যেমন দুরূহ, তেমনি সুযোগ্যও হতে হবে। আর এই কাজটাই আল্লাহ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মাধ্যমে আমাদের বাধ্য-অবাধ্যতার পরীক্ষায় ফেলে দিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তার ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সঙ্গে তার কচি নিস্পাপ ছেলে হযরত ইসমাইলও (আঃ)। 

গরুটার দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, আল্লাহ কত মহান, তার কি অদ্ভুত পরিকল্পনা, আর কি উদার তিনি যে, তিনি তার রহমত দিয়ে ঐদিন ইব্রাহিম (আঃ) কে তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তানটিকে কুরবানী দিতে নির্দেশ দিলেও মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আঃ) এর অগোচরে ইসমাইল (আঃ) এর পরিবর্তে একটি পশু প্রতিস্থাপন করে কুরবানীকে গ্রহন করেছিলেন এবং প্রতিকী হিসাবে ওই একই কাজ আল্লাহ আমাদেরকে করার নির্দেশ দিয়েছেন। আজ যদি মহান আল্লাহ এই প্রতিকী কুরবানী না জারি রাখতেন, তাহলে আজ আমরা যারা লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে পশু কিনছি, তার আর কোনো প্রয়োজন হতো না। কারন নির্দেশমাফিক, আমাদের পরিবারের সন্তানদেরকে একে একে প্রতি বছর কুরবানী করতে হতো। কতই না কষ্টের কাজটি আমাদের করতে হতো। কুরবানীর ঈদ মানে হয়ে যেতো তখন পরিবারের জন্য একটা ভয়ংকর শোকের দিন, হাহাকারের দিন। সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে শোনা যেতো আজ কান্নার চিৎকার। আমার সামনে বসে থাকা ভাসাহীন গরুটিকে দেখছি আর ভাবছি, এই কিছু অল্প সময়ের মধ্যেই এই বোবা প্রানিটির সঙ্গে আমার কতই না খাতির হয়ে গেলো, মায়া জন্মে গেলো। অথচ এই মায়ার বন্ধন, মহব্বতের বন্ধন, আবেগের বন্ধন ছিন্ন করে হলেও আগামিকাল আমি ওকে কুরবানী করবো। ওকে আমি ওর জন্ম থেকে আদর দিয়ে বড় করিনি, ওর কোনো কিছুই আমি জানি না। কখন ওর অসুখ হয়েছে, কখন ও কার ক্ষেতে ফসল খেয়ে কোথায় কতদিন খোয়ারে আটক খেয়েছে, কিংবা কতগুলু চটির আঘাত সে সহ্য করেছে। এ সবের আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু কিছু টাকা খরচ করে ওই পালক মালিকের কাছ থেকে নগদ কিনে নিয়ে চলে এসছি মাত্র। ওকে প্রতিটি ক্ষনেক্ষনে যে লোকটি ঘাস খাইয়ে, ভুষি খাইয়ে, পানি খাইয়ে, যতন করে গোসল করিয়ে দিনের পর দিন বড় করেছে, এই ভাষাহীন প্রানিটিও তার কাছে তার সন্তানের মতোই। আমি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য ওকে কাছে পেয়েছি। তাতেই আমার ভিতর অজানা এক মায়ার উদ্রেক হয়েছে। এই সামান্য আবেগেই ওকে কুরবানী দিতে আমার মনে কেমন যেনো একটা কষ্ট অনুভুতি লাগছে। আমি আরো ভাবছি, আজ যদি এটা ভাসাহীন প্রাণী, গরু কিংবা ছাগল কিংবা কোনো দুম্বা না হয়ে আমার আদরের সন্তানটি হতো, তাহলে কি আমি পারতাম ঠিক এভাবে এতো নীরবে, আগামিকালের কুরবানীর নির্দেশটি পালন করতে? পারতে তো হতোই। এটাই তো পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়ত আজ আমাদের পরিবারে এতোক্ষন কান্নার রোল পড়ে যেতো, সমাজে প্রতিটি ঘরে ঘরে আজ হতো সবচেয়ে দুক্ষের দিন হতো। আর যিনি কুরবানি হবেন, তারই বা কি হতো মনের অবস্থাটা? আমার ভাবতেই সারা শরীর শিউরে উঠছে। 

অনেক রাত হয়ে গেছে। বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়ার মত। কিন্তু আমি একা বসে আছি গরুটার পাশে। ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। এমন নয় যে, গরুটি কোন জ্বালাতন করছে কিংবা ডাকাডাকি করছে কিংবা অজানা কোন ভয়ে সে অস্থির। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। জাবর কাটছে প্রতিদিনকার মত। ও হয়ত জানেই না যে, আজ রাতটাই হচ্ছে ওর জীবনের শেষ রাত। ও আর কখনোই এই পৃথিবীর আলো বাতাস উপলব্ধি করতে পারবে না। কারন কাল ওকে আমি সবার সামনে, জোর করে আস্টেপিস্টে বেধে গলায় ছুড়ি দিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য কুরবানি করে ফেলবো। কত টাকায় আমি আমার এই ভালোবাসাটা কিনেছি, তার জন্য আমার আল্লাহ বসে নাই, তিনি শুধু বসে আছেন এইটা দেখার জন্য যে, আমি আমার ভিতরের ভালোবাসাটা, আমার অতি আদরের সন্তানের পরিবর্তে প্রতিকী এই প্রানীটিকে কতটা মহব্বত করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে এবং তার আদেশ পালন করে তারজন্য কুরবানী করতে প্রস্তুত আছি কিনা। এই গরুটি হচ্ছে আমার সন্তানের বিকল্প একটি প্রাণী। শয়তান আমাকে ধোকা দিচ্ছে বারবার, ধোকা দিচ্ছে অনেকভাবে। কখনো লোক দেখানো, কখনো ধনে-মানে পয়সায় আমি কত বড় তা মানুষের কাছে জাহির করার নিমিত্তে, কখনো অহংকারের নেশায়। অথচ আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে হাসিল করার জন্য যে ওয়াদা, সেটা আজ প্রায় ভুলতেই বসেছি আমরা সবাই।

সকালে নামাজ পড়ে এসেই অনেক্ষন গরুটার কাছে ছিলাম। আদর করেছি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে, শিংগুলুতে হাতের পরশ বুলিয়ে। আবারো খের ভুষি খাওয়ানোর চেষ্টা করলাম। খুব বেশী খেতে চাইলো না কিন্তু তারপরও সে আমাকে নিরাশ করেনি। আমার শরীর পবিত্র, মাত্র নামাজ পড়ে এসেছি। গরুটাকে আমি ওর গলায় জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষন থাকলাম। গরুটাও মনে হলো আমার এই আলিঙ্গন খুব আদর করে অনুভব করছে। হুজুর চলে এসেছে। এখনই কুরবানী হবে। মনটা বড্ড নাড়া দিচ্ছিলো। আশেপাশের অনেক উৎসুক জনতা কেউ গরুটার চামড়া কত দিয়ে বিক্রি করা হবে তার খবরে অস্থির, কেউ কত টাকায় গরুটা কিনেছিলাম, তার দাম দস্তর জিজ্ঞেস করতে অস্থির, কেউ আবার কিভাবে গরুটা জবাই করা হবে সেটা দেখার জন্য ভিড় করে আছে। কিন্তু আমার ভিতরে প্রচন্ড একটা ব্যথা অনুভব করছি। আমি আবারো গরুটাকে একটু আদর করার জন্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম, মনে হচ্ছে যেনো আমার অতি আপন একজন কেউ আমার থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। আমার চোখের পাতা ভিজে আসছিলো, গরুটার মুখের দিকে তাকাতেই আমার মনে হলো, আমার শরীরের সঙ্গে এটে থাকা এই ভাষাহীন প্রানিটিরও চোখের পাতা ভিজে এসেছে। ডাগর ডাগর দুটি চোখ আমার দিকে তাকিয়েই থাকলো।

১২/০৮/২০১৬-কেনো জেনারেশ গ্যাপ হচ্ছে?

জেনারেশন গ্যাপ কেনো হচ্ছে এটা জানতে পারলে আমাদের সমাজের সব শ্রেনির বাবা মায়েরা অন্তত তাদের কি করা উচিত সে ব্যাপারে একটু সচেতন হতে পারতেন। আমরা যারা বারবার বলছি যে, পরিবারে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, তাহলে সেই কিসের উপর সচেতনতা বাড়াতে হবে জানা দরকার, তাহলেই সচেতনতাটা বাড়বে। চলুন দেখি তাহলে জেনারেশন গ্যাপ কি কি কারনে হচ্ছে সেটা আগে খুজে বের করি। তারপর এর বিপরিতে আমাদের কি করা উচিত, সেটা বের করা যাবে, হোক সেটা পরিবারের জন্য, হোক সেটা সামাজিকভাবে আর হোক সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে। সেই কার্যপ্রণালী বের করা কঠিন হবে না।

প্রকৃতপক্ষে মোদ্দা কথায় যদি বলি, তাহলে ব্যাপারটা আর কিছুই না, মানুষের পৃথক পৃথক ইন্টারেস্টের কারনে, তাদের নিজস্ব ভ্যালু বিশ্লেষণের কারনে, বয়সের তারতম্য, বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার প্রসার, লাইফ স্টাইল, এস্পিরেসন, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাব্যবস্থা, সাইকোলোজিক্যাল ডেভেলপম্যান্ট, ফিজিক্যাল পরিবর্তন, ইত্যাদি সবের কারনেই এই জেনারেশন গ্যাপটা তৈরি হয়। আর এইটা একদিনে বা এক সপ্তাহে বা এক মাসের মধ্যেই ঘটে না। এটা ঘটে ধিরে ধিরে, সামস্টিকভাবে, লম্বা সময় ধরে।

ব্যাপারটা আরো সহজ করে যদি বলি, যেমন ধরুন, ৪০ কিংবা ৬০ এর দশকে এমন কি ৭০ কিংবা ৮০ এর দশকেও শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন ছিলো যেখানে চরিত্র গঠন, ডিসিপ্লিন এবং ইউনিফর্মিটি ছিল মুখ্য বিষয়। মুখস্থবিদ্যা দিয়ে অনেকে না বুঝেই অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছেন। তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা বিকশিত হতে হতে ইতিমধ্যে তারা একটা এডাল্ট মানুসের রূপ নিয়ে নিয়েছেন। যে সময়টায় এখন ইয়াং জেনারেশন বিপথগামিতে হাটছেন, ওই সময় তারা এই কঠিন ডিসিপ্লিন, নিয়মানুবর্তিতার কারনে সময়টাই পার করে দিয়েছেন। কিন্তু আজকাল শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র গঠনের কিংবা ডিসিপ্লিন তথা ইউনিফর্মিটির ব্যাপারটা আর মুখ্য নাই। এখানে মুক্তচিন্তা ধারায় এক ধরনের বিশ্লেষণধর্মী স্বাধীনতা এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আদলে সে নিজে যা সেন্সিব্যাল মনে করে সেটাই শেষ কথা। ফলে সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে আগের যুগের মানুষের থেকে বর্তমান যুগের ইয়াং জেনারেশনের কাছে মেথডটাই আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ইয়াং জেনারেশনের ভিসন আর ওল্ড জেনারেশনের ওই একই বয়সের তুলনায় ভিসনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বনে যাচ্ছে। এটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ত্রুটি বলতে হবে। এই ব্যাপারে হয়ত আমরা রাষ্ট্রীয় সচেতনতার কথা মাথায় আনবো পরবর্তী পর্বে।

আরেক দিক দিয়ে বলি, ধরুন, ওয়ার্ক প্যাটার্নে ওল্ডার জেনারেশন তাদের সময়ে জব সল্পতার কারনেই হোক আর কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই হোক, তাদের জবটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন এবং সততার সহিত দিনের পর দিন অফিস সমুহের যাবতীয় আইনকানুন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও মেনে শেষতক চালিয়ে গেছেন যা আজকালকের ইয়াং জেনারেশন এটার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। ফলে আইনের বাধায় তারা খুব একটা বিদ্ধ হতে চায় না। তারা স্বাধীন, ইচ্ছে হলো কাজ করবেন, ভালো লাগলো তো থাকবেন, আর পছন্দ হয় নাই, কিচ্ছু যায় আসে না, পরের দিনই জব ছেড়ে দিলেন। এই যে একটা খামখেয়ালীপনার মতো স্বাধীনতা, একটা ছিঁড়া ছিঁড়া ভাব, তাতে অনেক কিছুই আর সংঘবদ্ধ থাকে না। না কর্মক্ষেত্রে না বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে না পারিবারিক দায়িত্ববোধে। ধিরে ধিরে এই কোহেসিভনেসটা কমতে থাকে। বন্ধন কমতে থাকে। এর মধ্যে আবার যোগ হয়েছে হাই-টেক। এই হাই-টেকের জন্য ইন্টার-পারসোন্যাল রিলেসনটা হিউম্যান এলিম্যান্ট থেকে আরো দূরে চলে গেছে। এতে বড়দের সাথে গ্যাপটা আরো বেশি বেড়েছে। পরামর্শের জায়গাটা কিংবা মতাদর্শের আদান-প্রদান গুলি আস্তে আস্তে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এই সচেতনতার বিরুদ্ধে হয়ত আমরা পরবর্তীতে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে সচেতনতার কথা বলবো।

আরেকটা বিষয় না বললেই না। আর সেটা হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়ার মাধ্যমে যদিও আজকালকের ইয়াং জেনারেশনকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়ে মার্কেটে কম্পিটিটিভ করে তুলছে কিন্তু অন্যদিকে তাকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে আনপ্লিজেন্টও করে তুলছে। ইয়াং জেনারেশন সবাইকে এই মিডিয়া এক কাতারে নিয়ে এসে প্যারেন্টাল গাইডেন্সের থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়ে একই সমসাময়িক বয়সের গাইডেন্সে আবেশিত করে দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। ফলে ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে ইয়াং জেনারেশন গ্লোবাল হাইপোথিসিসে বা কন্সেপ্টে বেশি করে ঝুকে পড়ছে। আর যখনই ইয়ং জেনারেশন তাদের ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখনই হচ্ছে বেশি করে বিপত্তি। কালচার, সামাজিক আস্থা, পারিবারিক অবস্থান, নিজস্ব ক্যাপাবিলিটি ইত্যাদির উপর তার তখন নিয়ন্ত্রণ লোপ পেতে থাকে। আর এই লোপ ধিরে ধিরে তাকে তার অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরিয়ে প্রতিনিয়ত বিপথগামি অথবা অবাস্তব একটা কোহেলিকার দিকে ঠেলে দেয় যা সে নিজেও বুঝে না।

এর মধ্যে যোগ হয় আবার পরিবারের ইরেসনাল এক্সপেকটেশন। আর এই ইরেসনাল পারিবারিক এক্সপেক্টেসনটা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে জেনারেশন গ্যাপের বেলায়। আর এটা শুরু হয় একেবারে ছোট বয়স থেকেই। যেমন ধরুন, পিতামাতার স্বপ্নের চাহিদা তারা তাদের সন্তানের ইচ্ছা বা খুশির বিনিময়ে হলেও তা তাদের উপর চাপিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেন না। সন্তানের চাহিদার থেকে অভিভাবকের চাহিদা পুরুন করতেই ইয়াং জেনারেশনের জীবন হিমসিম খেতে হচ্ছে। তার ইচ্ছা থাকুক আর নাই বা থাকুক, সে পারুক আর নাই বা পারুক। তার ভাল লাগুক আর নাই বা ভালো লাগুক। সন্তান আর্ট করতে ভালবাসেন, তাকে ডাক্তারি পড়তেই হবে, সন্তান গান শিখতে ভালোবাসেন, তাকে জিওগ্রাফী নিয়ে পড়তেই হবে। পিতামাতারা ভুলেই যান যে, তাদের সন্তানের একটা এস্পিরেসন আছে, তার একটা ভাল লাগার ব্যাপার আছে কিংবা তার নিজস্ব একটা পরিমন্ডল আছে। আর যখনই কোন ইয়াং জেনারেশন তাদের ইচ্ছার এই প্রতিফলনের জন্য বেকে বসবে, তখনই শুরু হবে দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট। গ্যাপ তো তখনই সৃষ্টি হয়ে গেলো। এই গ্যাপ থেকে তৈরি হয় আরো গ্যাপের। যেমন, পিতামাতা মনে করেন যে, তারা এই বয়সে তাদের বাবা মায়ের সঙ্গে কিভাবে আচরন করেছেন তার তুলনা, তারা এই বয়সে ঐ সময়ে কি ধরনের কাপড় পরিধান করেছেন তার তুলনা, তারা কি কি স্বাধীনতা পেয়েছেন তার একটা খতিয়ান, কিংবা সপ্তাহান্তে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে যেয়ে রাত্রি যাপনের অনুমতি দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে তুলনা, এমন কি কি ধরনের হেয়ার কাট নিতেন আমাদের ওল্ডার জেনারেশন ইত্যাদি যখন পিতামাতা দিতে শুরু করেন, তখন এই দুই জেনারেশন এমন একটা অবস্থায় দাড়ায় যে, মনে হয় একে অপরের বিপরিতে অবস্থান নিয়েছেন, মনে হয় তারা একে অপরের ভাষাই বুঝতে পারছেন না। ফলে পরিবারে সমঝোতা নষ্ট হচ্ছে, শান্তি নষ্ট হচ্ছে আর বেড়ে চলছে একে অপরের থেকে দুরত্ত।

সামাজিক ক্লাস বিভক্তিও কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে গ্যাপ তৈরির একটা ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। একটা সময় ছিলো যে, আমাদের দেশে বিখ্যাত গায়িকা রুনা লায়লা আর সাবিনা ইয়াসমিন কখনো একসঙ্গে এক স্টেজে গান করতেন না। কারন কে কার থেকে বড় সেটা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে? ঠিক এমনিভাবে, নিম্নক্লাসের বা গরিব মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে উচ্চবিত্ত ক্লাসের সঙ্গে একটা ক্ল্যাশ সবসময়ই ছিলো। কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই ক্লাসভিত্তিক শ্রেনিবিন্যাশ এর প্রবনতাটা অনেকটাই কম। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একজন ছাত্র যদি ভাল ফলাফল করে বা একজন ভাল গীটার বাজাতে পারে তাকে গানের দলের মধ্যে নেওয়ার মধ্যে কোণ দ্বিধাবোধ করে না। কারন ওল্ডার জেনারেশনের মতো ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত সংস্কারে তাদেরকে কোন নেগেটিভ অনুভুতির খোরাক জোগায় না। এই জায়গাটা থেকে ওল্ডার জেনারেশন এখনো সরে আসতে পারে নাই। ফলে ছেলেমেয়ের প্রেম ঘটিত এফেয়ারস নিয়ে, বন্ধুত্ত তৈরি করতে গিয়ে কিংবা একই টেবিলে তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়া নিয়ে পরিবারে ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে তার ওল্ডার জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট তো বাধতেই পারে আর বাধেও।

এই রকম হাজারো হাজারো উদাহরণ টানা যাবে যেখানে খুব সুক্ষ কিন্তু গ্যাপ তৈরির জন্য ঐগুলু যথেষ্ট ভুমিকা রাখে। ধরলাম যে, এই গ্যাপগুলু দুই জেনারেশনের মধ্যে তৈরি হলো। তাতে কি হয়েছে? দেশ নষ্ট হয়ে যাবে? পরিবার নষ্ট হয়ে যাবে? কিংবা সমাজ? কি হবে যদি দুই জেনারেশন আলাদা আলাদা বাস করে? কেউ তো কাউকে ডিস্টার্ব করছে না। তাহলে কি দরকার দুই জেনারেশনের মধ্যে জোর করে আবার মিল করার? ওল্ডার জেনারেসন মরে গেলে তো আর কোনো কনফ্লিক্ট থাকে না। তখন তো শুধু ইয়াং জেনারেশনই থাকলো। তাহলে এতো কথা কেনো?

আছে, কথা আছে। কারন এই গ্যাপের কারনে কি কি ইমপ্যাক্ট হয় তাতো সার্বজনীন। সুদূরপ্রসারী। আর ওখানেই তো সব বিপত্তি। চলুন, আমরা সবাই এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলু ধিরে ধিরে বের করি। সবাই কন্ট্রিবিউট করি আমাদের প্রয়োজনে। আমরা এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলি বের করতে পারলেই আমরা সহজে বের করতে পারবো আমাদের কোথায় কোথায় সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং কাকে কাকে এই কাজে অংশ গ্রহন আবশ্যক।

 ……… (চলবে পরবর্তী ইমপ্যাক্ট অনুসন্ধানে, আপনিও কন্ট্রিবিউট করুন মতামত দিয়ে)

১০/০৮/২০১৬-জেনারেশন গ্যাপ

আমি একটা জার্নালে একবার একটা আরটিক্যাল লিখেছিলাম, “জেনারেশন গ্যাপ” এর উপর। আজ মনে হচ্ছে, এই জেনারেশন গ্যাপটা আমাদের অনেকদূর নিয়ে যাচ্ছে এবং খুব দ্রুত। আমি আমার সেই আরটিক্যালটার কিছু চুম্বক অংশ আজ আমাদের বন্ধু ফোরামে তুলে ধরতে চাই।

…… জেনারেশন গ্যাপটা আসলে হচ্ছে আধুনিক সময়ের ইয়াং বয়সের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের ওল্ড জেনারেসনের মানুষগুলুর মধ্যে চিন্তাধারা, জীবনযাত্রা, অভ্যাস, এবং দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্যগুলি। এই জেনারেশন গ্যাপ থাকবেই, আগেও ছিল এবং এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু ভয়ংকর বিষয়টি হয়ে দাড়ায় যখন এই জেনারেশন গ্যাপটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, কালচার, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, এবং সাধারন দৃষ্টিভঙ্গিটায় একটা বিস্তর জাম্প করে। তখন যেটা হয় তা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যুবক বয়সের জেনারেসনের সাথে ওল্ড জেনারেশনের মধ্যে মিসম্যাচ, এডজাস্টম্যান্ট, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইত্যাদির সবকিছুতেই কনফ্লিক্ট করে। অতিতে এই গ্যাপটা ছিলো এবং মাঝে মাঝে যে বিস্তর জাম্প করে নাই তা কিন্তু নয়। সেই পরিস্থিতিতেও জেনারেশন গ্যাপটা কোনো না কোনোভাবে সহনীয় পর্যায়ে সামাল দেওয়া গেছে কারন তখন দুইপক্ষই একটা জায়গায় এসে এডজাস্টমেন্টের মধ্যে সহঅবস্থান করতে চেয়েছিলো এবং পেরেছিল।

এখানে আরো একটা তথ্য সহজ করে বলা ভাল যে, এই জেনারেশন গ্যাপটার মানে কি দাদাদের বয়সের সঙ্গে নাতীদের বয়সের যুগের পার্থক্য? অথবা এইটা কি ৩০ বছর সময়ের কোনো পার্থক্য? কিংবা ৫০ বা ৭০ বছরের সময়ের? আসলে তা না। এটা পিতামাতার এবং সন্তানের তাতক্ষনিক সময়ের মধ্যেও হতে পারে আবার দাদাদের বয়সের সঙ্গে নায়-নাতকুরের বয়সের ফারাকের মধ্যেও হতে পারে। এটা একটা স্পেসিফিক জেনারেশন থেকে আরেকটা স্পেসিফিক জেনারেশনের মধ্যেও হতে পারে।

যেমন উদাহরনসরুপ যদি বলি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পরে এবং রিপাবলিক অব জর্জিয়া যখন স্বাধীনতা পেলো, তখন সোভিয়েত আমলের বাবামায়ের সঙ্গে তাদের ঘরের সন্তানদের মধ্যে বিশাল একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর তফাত সৃষ্টি হলো। জর্জিয়ার উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা পুরুটাই পাশ্চাত্য ধাঁচের আদলে বদল হয়ে গেলো কিন্তু তাদেরই পিতামাতারা আগের দিনের সোভিয়েত কালচার, সভ্যতা নিয়ে ধরে থাকলো। এদের মধ্যে সময়ের পার্থক্যটা ছিলো মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধান। হয়ত ৫ থেকে ১০ বছরের। অথচ কিন্তু এতো অল্প সময়ের ব্যবধানের দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা বিস্তর জেনারেশন গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে গেলো। এবং দেখা গেলো, একই পরিবারের মধ্যেই এই ঘটনাটা ঘটে গেলো। এই দুই জেনারেশনের মধ্যে তাদের চিন্তাধারা, জীবনযাত্রার দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাদীক্ষার লেবেল, আচরন, ভবিষ্যৎ চিন্তাধারা, আর্থসামাজিক ভাবধারা সবকিছুই আমুল পালটে গেলো। বর্তমান জেনারেশনের জীবন যাত্রায় চলে এলো মুক্তধারার স্বাধীনতার শক্তি, স্বাধীন চলাফেরা, নাইট ক্লাব, ইন্টারনেট, কম্পিউটার গ্যাম, বিনোদন, মুক্ত-রাজনীতির চর্চা এমন কি বিয়ে সাদির ব্যাপারেও আধুনিক কালের যুবকদের চিন্তাধারা অনেক পার্থক্য। তাদের চাকুরী পছন্দের বিষয়ে, চাকুরি ছাড়ার বিষয়ে, এমন কি অবসর প্লানের বিষয়ে কোনো কিছুই ঘরের পিতামাতাদের সহিত মিলছে না। অন্যদিকে পুরানো দিনের অভ্যাসে গড়া বাবা মায়েরা ধরে থাকলেন ট্র্যাডিসনাল সমাজ ব্যবস্থা। তারা বর্তমান যুগের ছেলেমেয়েদের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গেই একমত হতে পারছে না, তাদেরকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে চাইছেন না কিংবা দিতে চাইছেন না বলে বললে ভুল হবে, তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, তাদের সন্তানেরা ঠিক হ্যান্ডেল করতে পারবেন কিনা, কিংবা শেষতক আবার তাদের সন্তানেরা দিশেহারা হয়ে যায় কিনা ইত্যাদি।

এর ফলশ্রুতিতে যা হচ্ছে তা হলো বিশাল এক গ্যাপ। আর এই গ্যাপের কারনেই একই পরিবারের মধ্যে যুবক এবং মধ্যবয়সী সদস্যদের মধ্যে বিশাল গ্যাপের সৃষ্টি হচ্ছে। আর সৃষ্টি হচ্ছে ফাটল, সৃষ্টি হচ্ছে সন্দেহ, তিক্ততা ইত্যাদি। ফলে কিছুতেই সুতা এক জায়গায় আবদ্ধ হয়ে নতুন জাল তৈরি না করে শুধু নৈরাজ্যসরুপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবারে কোনো কিছুই অভাব নাই আবার কোনো কিছুতেই ইয়াং বয়সের সদস্যদের মন টানছে না। তারা সস্থিতে নাই। তারা বিসন্ন। যাদের কাছ থেকে সহযোগিতার হাত পাওয়ার কথা তাদের সাথেই তাদের বিরোধ। যাদের কাছে তারা অসহায় মনের ভাব শেয়ার করবে, তারাই তার অসহয়ের কারন। সে কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? ফলে একই মানসিকতার বন্ধু, বান্ধবি, কিংবা তাকে বুঝতে চেস্টা করছে এমন কেউ, সেখানেই সে পায়ে পায়ে হেটে চলে যাচ্ছে তার অভাবহিন ঘর ছেড়ে, তার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে কোনো একটা জায়গায় যেখানে সে আর কিছুই না পাক, পাচ্ছে মানসিক শান্তি। সেটা ভুল না ভালো না শুদ্ধ, তা তার জানার অপেক্ষা করছে না। আমরা বারবার বলছি পরিবারের সচেতনার কথা, বারবার বলছি কিছু একটা করা দরকার, বারবার বলছি সরকার কেনো দেখছে না, বারবার বলছি কেনো এই রকম এয়াবনরমাল অবক্ষয় হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটার ভিতরে কেউ প্রবেশ করছি না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, সমস্যাটা আসলে কোনো রাজনৈতিক কিংবা পার্শ্ববর্তি দেশ, কিংবা কোনো একটা বিশেষ মতবাদের উপর দোষ চাপিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। কিংবা চাপিয়ে দিয়েও কোনো লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না যতক্ষন না পর্যন্ত এই সুক্ষ কিন্তু বিস্তর গ্যাপটা সমাধান হচ্ছে।

আমার মনে হচ্ছে এই জেনারেশন গ্যাপটাই এখন আমাদের অত্যান্ত বুদ্ধিমানের সহিত হ্যান্ডেল করে পরিস্থতি আয়ত্তে আনা সম্ভব। এখন কথা হচ্ছে কি কারনে এই জেনারেশন গ্যাপটা হচ্ছে আর কিভাবে এই দুই জেনারেশনের গ্যাপ কমিয়ে এনে সার্বজনীন মতাদর্শ, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, ইত্যাদি একটা প্লাটফর্মে আনা যায় তার হিসাব করা। বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা আসলে আমাদের পরিবার থেকে শুরু করে যার যার আওতায় বাধতে হবে। কিছু পরিবারের পক্ষে, কিছু সরকারের, কিছু সমাজের কিছু আমাদের চারিপাশের জনগনের। কেউ দায়িত্ব এরাইয়া যাওয়ার কোনো স্কোপ নাই। (চলবে…)

২৮/০৫/২০১৬-আশ্বিন মাসের ভোরবেলায়

আশ্বিন মাসের ভোরবেলায় অতি ঈষৎ নবিন শীতল বাতাশে নিদ্রোত্থিত দেহে তরুপল্লব যেমন শিহরিত হয়, ভরা গঙ্গার উপর শরত প্রভাতের কাচা সোনা রোদ যেভাবে চাপা ফুলের মত ফুটে উঠে, আজ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার দুরন্ত যৌবন জোয়ারের জলের মধ্যে রাজ হাসের মত ভেসে উঠেছে। আপনি এতদিন হয়ত দিনের আলো কিংবা রাত্রির ছায়ায়তা  দেখতে পান নাই, কিন্তু আজিকার এই বর্ষণ আপনার পঞ্জরে পঞ্জরে ঘৃতকুমারি নৌকার মত চারিদিকে ঘুরপাক খেয়ে আপনার চারিগাছি মল অনবদ্য এক প্রেমের সুচনা করেছে। অপেক্ষা করুন সে আসবে, আর সে আপনার জন্যই আসবে। যখন সে আসবে, দেখবেন ঐ দুরের ঘাটে যে ফিঙেটি বাসা বেধেছে সে কোন এক ভোরে উসুখুসু করে জেগে মৎস্যপুচ্ছের ন্যায় তার জোড়াপুচ্ছ দুই চারিবার দ্রুত নাড়াইয়া শিস দিয়া আকাশে উড়িয়া যাইবে। অথবা পাশের বাসায় কোন এক কোকিল উচ্চস্বরে ডাকিয়া কুহু কুহু গানে কলরব করিবে। তখন আপনার এই ইচ্ছা, এই সাধ বৃষ্টিতে ভিজার জন্য আর অপূর্ণ থাকবে না। 

১৬/০৭/২০১৬-মিস ক্যালকুলেশন?

আমার একটা জায়গায় কিছুতেই ক্যাল্কুলেসন মিলছে না। মনে হচ্ছে, কোথায় যেনো একটা ভুল হচ্ছে। তার আগে একটা গল্প বলি। বহুদিন আগে আমি একটা সিনেমা দেখেছিলাম, সম্ভবত পোলিশ সিনেমা। এটা প্রায় ৯০ দশকের দিকে। সিনেমাটার কাহিনি এই রকম যে,

সিনেমাটায় মোট ১২ জন লোক খুন হয়। ১২তম ব্যক্তি খুন হয় ১১তম ব্যক্তির দ্বারা, ১১তম ব্যাক্তি খুন হয় ১০তম ব্যক্তির দ্বারা, ১০তম ব্যক্তি খুন হয় ৯ম ব্যক্তির দ্বারা এবং এইভাবেই খুনগুলু চলতে থাকে এবং সর্বশেষ ২য় ব্যক্তিটি খুন হয় ১ম ব্যক্তির দ্বারা। অথচ এই ১২ জনই ছিলো একটা সংস্থার অধীনে এবং কেউ আড়াল থেকে এই ১২ জনকেই পৃথক পৃথক ভাবে নির্দেশনা দিত। মজার ব্যাপার হলো এই ১২ জনের মধ্যে কেউ কাউকে কখনোই চিনতো না। আর খুন গুলু হয়েছে বিভিন্ন বিভিন্ন কারনে। কোনো খুন কোণ খুনের কারনের সঙ্গে এক ছিলো না। যখন ১২ থেকে খুন হতে হতে ১ম ব্যক্তিটি খুন হয়ে যায় তখন স্ক্রিনটা একেবারে ব্ল্যাক হয়ে যায়। ভাবলাম, মনে হয় স্ক্রিনে কোনো সমস্যা হয়েছে বা সিনেমার রিলে কোন সমস্যা হয়েছে। কিন্তু না, একটু পরে দেখা গেলো, স্ক্রিনে একটা মেসেজ এসেছে, Cycle will continue and The End. জানা গেলো না, কে সেই অদৃশ্য নির্দেশনাকারী। ওরা অনেক বড় এবং অদের ব্যাপারে কেউ কখনো জানতেও পারবে না।

আজকে বিশ্ব ব্যাপি যে সমস্ত খুন, টেরোরিস্ট এটাক, কিংবা ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, কখনো কারন হিসাবে দেখছি ধর্ম, কখনো দেখছি পাওয়ার পলিটিক্স, কখনো দেখছি বিশ্বায়ন, কখনো দেখছি গনতন্ত্র, রাজতন্ত্র আরো অনেক বিষয়। আসলে হচ্ছেটা কি?  এটা যুদ্ধ নয় আবার যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। পূর্বে একদেশ আরেকদেশ দখল করার জন্য সৈন্যসামন্ত, হাতি ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিমান বাহিনি, নৌ বাহিনি, স্থল বাহিনি সব নিয়ে একে অপরকে এটাক করতো, কিন্তু এই কয়েক বছর যাবত দেখছি, কোন দেশ নয়, কিছু ইন্ডিভিজুয়াল চরিত্র একা একাই পুরু পৃথিবীর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। যেমন লাদেন একাই যেনো একটা সংস্থা, কিংবা আইএস, ইত্যাদি। এখন কোনো ইন্সটিটিউশন দরকার পরছে না, জাস্ট নিছক ব্যক্তি পর্যায়ের মধ্যে যুদ্ধটা চলে এসেছে। একটা লোকই এনাফ একটা চরম আকারের কেওয়াস তৈরি করার জন্য। এইটাকে সামাল দেওয়া খুব সহজ বলে মনে হচ্ছে না। আজকে আমরা যখন আমাদের দেশে আক্রান্ত হচ্ছি, কেউ কেউ পাশের দেশকে ব্লেম করছি বা আমাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছি, আবার যখন পাশের দেশ আক্রান্ত হচ্ছে অথবা আমাদের প্রতিপক্ষ আক্রান্ত হচ্ছে, তখন তারা আরেক দেশকেবা তাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছে, আবার ওই দেশও যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তারা তাদের পাশের কোন দেশ বা গোত্রকে ব্লেম করছে, ঠিক যেনো ওই সিনেমার মত। কিন্তু আসলে এইসব কিছুর নেপথ্যে কে বা কারা? খুব গভিরভাবে ভাবা দরকার। সবার শেষ কি ওই ব্ল্যাক স্ক্রিন যা আমরা কখনো জানতে পারবো না বা জানা সম্ভব না?

আরেকটা বিষয় চোখে পড়ছে। ইন্সট্রাকশনটা যেনো এমন নয় যে, Do or Die, ইন্সট্রাকশনটা যেনো এই রকম যে, Do and Die.

খুব আতংকের ব্যাপার আসলে।

১৩/০৬/২০১৬-সরল রেখার হিসাব

কোন একটা কারনে আমি আজ একটু মর্মাহত। মর্মাহত এই জন্য যে, আমি একটা সরলরেখার হিসাব বুঝতে পারি নাই। আমি বুঝতে পারি নাই যে, আমি একটা অবিভক্ত সরলরেখার অংশ যাকে ভাঙবার চেষ্টা চলছে। আমি বুঝতে পারি নাই যে, শত্রু বন্ধুর মত ব্যবহার করলেই সে বন্ধু হয়ে যায় না। বুঝতে পারি নাই যে, শত্রুর শত্রুরাও একসময় তাদের বড় শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য একজোটে বন্ধু হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি নাই যে, নিজের ইচ্ছাগুলো, শখগুলো রক্ষা করার জন্য কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয়। আমি এখন বিছানায় শুয়ে আছি আর ভাবছি। মনে হচ্ছে আমি কষ্টে আছি, যত না শারীরিক কষ্ট, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট মনের ভিতরে। নিজের কাছে নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে এইজন্য যে, কেন আমি এতোটা অবুঝ ছিলাম, কেন আমি ঐ হায়েনাটাকে এতোটাই কাছের লোক বলে মনে করেছিলাম, কেন মনে হয় নাই, সে ওঁত পেতে আছে। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে আজ, নিজের কাছে লজ্জাবোধও কম মনে হচ্ছে না। এই পৃথিবীতে আমি আজ অন্তত একটা মানুষরূপী হায়েনাকে তো চিনতে পারলাম যে আমারই আস্তানার কাছে ঘুপ্টি মেরে বাস করে, সাধু হয়ে চলাচল করে অথচ সে হায়েনার চরিত্র লুকিয়ে রাখে।   জীবনের মানে বুঝবার জন্য অনেক দূর যাওয়ার প্রয়োজন নাই। এই হায়েনাটাকে দেখলেই সব বুঝা যাবে। এই হায়েনারা বন্ধু হয়ে অন্তরের ভিতরে কোকিলের কণ্ঠের মত সুর নিয়ে প্রবেশ করে, সে আসলে সুর নিয়ে নয়, সে জহর নিয়ে প্রবেশ করে। এদেরকে বুঝবার জন্য একটু গভীরে যাওয়া দরকার। তা হলে জীবনের মানে কি তার হিসাব বুঝা যাবে। জন্মের পর যাদের আস্তানার কোন হিসাব ছিল না এবং এখনো নাই, কে বা কারা তার অভিভাবক কিংবা কি নিয়ে তারা পরিচিত হতে হবে এই জনসম্যখ পৃথিবীতে, তাই যখন তাদের নাই। বস্তির ঐ অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে যাদের শ্বাসপ্রশ্বাস চলে, জীবনের মুললক্ষ্য ঠিক করার জন্য অপরের সাহায্য লাগে, পেট পুরে খেতে না পেরে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে জীবন চলে, রাত নামলেই কোথায় একটু ঘুমানো যাবে সেই ভরসায় পরিচিত কারো বাড়ীর পরিত্যাক্ত ঘরে, বা বারান্দায়, কিংবা ঝুল বারান্দায় থাকতে পারলেই নিজেকে বড্ড সুখি মনে করে, তাদের আবার স্তর কি? ল্যাবেল কি? স্ট্যাটাস কি? তারা আর যাই হোক, কারো বন্ধু হতে পারে না। আর বন্ধু হলেও তাদের বন্ধু তাদের স্তরেরই। আমাদের স্তরের তো নয়ই। এদের প্রতিটি চিন্তায়, প্রতিটি অনুভবে, আর সমগ্র ভাবনায় থাকে কিভাবে কোথায় কি ফায়দা লুটা যায়। তাই তারা কখনো চোখের জলে মানুষকে দেখিয়ে একটা সহানুভুতি, কখনো অতি বন্ধুভাবাপন্ন চরিত্রের রূপধরে মনের খুব কাছাকাছি আসার আকুতি, আবার কখনো সাধু সন্নাসির মত গোবেচারা সেজে মানুষের মনের ভিতরে ঢোকার প্রাণান্ত চেষ্টা, এটাই এদের চিরাচরিত অভ্যাস। এরা ভিক্ষা করে না কিন্তু ভিক্ষার টাকায় চলে, যাকাতের টাকায় চলে, এরা পরিত্যাক্ত কিন্তু ভাবে ভাবে চলে, এরা নামহীন, বংশহীন, গোত্রহীন, কিন্তু এরা বড়বড় নামের লোকের দোহাই দিয়ে চলে, অথচ যাদের নামে ওরা চলে, সেই ওরা এই বংশহীন, নামহীন, গোত্রহীন উচ্ছিষ্ট মানুসগুলকে হয়ত চিনেই না। হয়ত বাপের নামটা পর্যন্তই এরা জানে তাদের আদি এবং শেষ পরিচয় হিসাবে। পিতৃকুলের না আছে কেউ, মাত্রিকুলের না আছে কেউ। এদের রূপ যাই হোক না কেন, এদের অন্তরের ভিতর থাকে সর্বদা জহর। এই জাতীয় মেরুদণ্ডহীন হায়েনারা রাগের চেয়ে হাস্যুজ্জল থাকার চেষ্টা করে থাকে বেশি, অপমানেও ওদের দাতকপাটি বন্ধ হয় না, অপমানিত বোধ না থাকায় নির্লজ্জ তোষামোদি লক্ষণীয়। আর অন্তরের ঐ জহরেই অন্যের সব কিছু নস্ট করে মানসিক শান্তিতে থাকতে চায় এই বিকৃতি মানুষগুলো।  

আমিও আজ এমনি একটা বন্ধুরুপে পাশে থাকা হায়েনার জহরসমেত দংশনের জর্জরিত ব্যথায় কাতরাচ্ছি। আমি বুঝতে পারি নাই আমার পাশে দাড়িয়ে থাকা এই হায়েনাকে। এরা সবাই হায়েনার বংশধর। ছেলে হোক মেয়ে হোক, হোক ওদের পরবর্তী বংশধর, সবাই মানুষের অববয়ব কিন্তু হায়েনার আদর্শ ছাড়া কিছুই নাই তাদের মধ্যে। এটা আমার জন্য একটা শিক্ষা হয়ে রইল। তবে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমি কেন আমার অবিভক্ত সরলরেখার ঐ প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা আমার প্রানপ্রিয় শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে এই নিয়ে আলাপ করি নাই? আমি সেটাও বুঝতে পারি নাই। কি চক্রাকার বিপদের সঙ্গে আমি বসবাস করছিলাম। তবে শান্তিরবার্তা এই যে, কিছুটা রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিছুটা আঁচর তো লেগেছেই, কিন্তু আজ অন্তত কিছুটা হলেও জীবনের সাথে জীবনের কোথায় অমিল, সেটা বুঝতে পেরেছি। ফারা কেটে যাবে, আবার বর্ষা আসবে, আবার শরত আসবে, শুধু আসবে না হায়েনাদের জন্য সুজুগের সংবাদ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হিসাব থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি। আমাকে শিক্ষা নিতে হয়েছে, যদি শিক্ষা না নেই, তাহলে জীবনের আরও অনেক পর্ব আসবে, যেখানে মনে হবে ঐ পথ আরও কঠিন এবং উত্তরনযোগ্য নয়। পতন নির্ঘাত নিশ্চিত।  

আজ যারা আমার সঙ্গে অসঙ্গতিমুলক আচরন করেছে, তারা ভাল কি মন্দ এই বিচার হবে সময়ের পথ ধরে ভবিষ্যতে। আমি তৈরি হচ্ছি। আপনারাও তৈরি হউন। আর ঐ হায়েনাটাকে বলছি, তুমিও তৈরি হও। তুমি আর যাই কিছু করো না কেন, তোমার রক্তের পরিচয়, বংশ, সেটা আর নতুন করে গজিয়ে তুলতে পারবে না। তুমি এর চেয়ে ভাল কিছু করে দেখাতেও পারবে না তোমার পরবর্তী হায়েনাদের কাছে। হায়েনা হায়েনাই। আর তৈরি হও ঐদিনের জন্য, যেদিন তুমি তোমার চোখের জলের সব ভান্ডার ঢেলে দিয়েও আমার রোষানল থেকে বেচে যাবার কোন সম্ভাবনাই নাই, আর সমস্ত সুরালয়, কিংবা জরালয় দিয়েও প্রমান করতে পারবে না যে, তুমি হায়েনার বংশধর নও। তুমি আমার কাছে বিষধর সাপের চেয়েও খারাপ।

০৭/০৬/২০১৬ আমার লাল পিকান্ত

বহুদিন পর হটাত করে আজ ওর সঙ্গে আমার দেখা। বুকটা আঁতকে উঠল ওকে দেখেই। আমাকে ও প্রথম দেখতে পায় নাই, ও খুব দ্রুত চলে যাচ্ছিল। আমি ওর পিছন থেকে এক নজর দেখেই চিনতে পেরেছিলাম, কারন ওর একটা পরিচয় বহঙ্কারি কোড নাম্বারটা আমার আজীবন কালের চেনা। আমি ওকে ধরার জন্য ওর পিছন পিছন ছুটছিলাম। দেখলাম আমি যেদিকে যাচ্ছি, ও ঐ দিকেই থামল। আমি ওর কাছে গেলাম, দেখলাম ওর কোলে ভীষণ সুন্দর একটি ফুটফুটে বাচ্চা বসে আছে। পাশে একজন মধ্য বয়সী যুবক। বাচ্চা মেয়েটি সম্ভবত ঐলোকটারই হবে। অবিকল বাবার চেহারা পেয়েছে। মেয়েটিকে ওর কোল থেকে নিয়ে লোকটি পাশের এক বইয়ের দোকানে ঢুকে গেল।

আমি এই ফাকে একটি সিগারেট ধরিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। ও মুচকি হেসে দিয়ে বলল, এখনো সিগারেট ছাড়নি? তোমার এই সিগারেটের গন্ধটা আমার খুব পরিচিত। আজও মনে পড়ে তুমি যখন আমার কাছে বসতে, তোমার মন ভাল থাকলেও তুমি একটার পর একটা সিগারেট টানতে আবার মন খারাপ থাকলেও  তুমি একটার পর একটা সিগারেট ফুকতে। তাঁরপরেও আমি তোমার এই সিগারেটের গন্ধটা অপছন্দ করতাম না। আফটার অল তুমি আমার জিবনে প্রথম পুরুষ। তুমি কি এখনো আগের মত করে অনেক রাতে বাড়ি ফির? নাকি অভ্যাস টা কিছু পরিবর্তন হয়েছে?

নাহ, আমার যে ব্যস্ততা, তাতে মনে হয়না যে অচিরেই আমার এই রাতে বাড়ি ফিরার অভ্যাসটা পরিবর্তন হবে। তবে ছুটির দিনে এখন আর কোথাও যেতে মন চায় না। বললাম, তুমি যখন আমার কাছে ছিলে, তখন ছুটির দিনেও তোমাকে নিয়ে কোন কারন ছাড়া আমি বহুবার বহুদিন এখানে সেখানে ঘুরেছি বটে তবে এখন নতুন সঙ্গী থাকলেও আর যাওয়া হয় না।

“আমার কথা মনে পড়ে?” জিজ্ঞ্যেস করল ও ।

“কি মনে হয় তোমার?” আমি উত্তর করি। 

কি জানি, হয়ত মনে পড়ে হয়তবা না। এখন তো তোমার নতুন সঙ্গী হয়েছে আমার থেকেও সুন্দর, আমার থেকেও অনেক বড়। কি জানি মনে নাও পরতে পারে। তবে আমি তোমার কথা সব সময় মনে করি। সবচেয়ে বেশি মনে হয় আমার সঙ্গী যখন তোমাদের ঐ ক্যান্টনমেন্টের পথ দিয়ে কখনো আসা যাওয়া করে। তোমার সঙ্গে থাকার সময় আমি কখনো সাধারন পাবলিকের রাস্তায় ঢোকতে হত না। তুমি সঙ্গে আছ আর সাই সাই করে ক্যান্টনমেন্টের লেন ধরে তুমি হাত নাড়িয়ে পরিচয় দিলেই কর্তব্যরত এম পি সাহেব কড়া একটা স্যালুট দিয়ে সসম্মানে চলে দিতে দিত। আমি কত সাহেব, কত ভ আইপি পাবলিকের গাড়ির পিছনে এসেও শুধু তোমার কারনে সবার আগে তা টা বাই বাই দিয়ে চলে যেতাম। নিজকে সাংঘাতিক ভগ্যবান মনে হত। আর এখন? ঘন্টার পর ঘন্টা ঐ সব রিক্সা, ঠেলাগাড়ি, কি সব গাড়ীঘোড়া সবার পিছনে জ্যামের মত ঐ এম পি সাহেবের ক্লিয়ারেন্সের জন্য বসে থাকতে থাকতে আমার আর জান সয় না। আমাকে যেন ঐ এমপি সাহেবও আর চিনতে পারে না। তোমার নতুন সঙ্গী নিশ্চয় এখন এই মজাটা পায়, আমি সেটা জানি।

আমি ওর কথায় হাসি।

“আচ্ছা তোমার চোখের কোনায় এই কাল দাগটা কিসের গো?” আমি ওকে প্রশ্ন করতেই ও চুপ হয়ে গেল।

“কিছু হয়েছে নাকি ওখানে?”

“আর বল না। আমার নতুন সাহেব একদিন খুব মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফিরছিল। রস্তা ঘাট ফাকাই ছিল। হটাত কি হল তাঁর, আল্লাহ ই জানে, ঘ্যাঁট করে এমন করে সে টার্ন নিল যে, পাশের এক ইলেকট্রিক খাম্বার সঙ্গে দিল লাগিয়ে। আর যায় কোথায়। তখন আমার বাম চোখের পাশে আমি এই ধাক্কাটা খাই, হাসপাতালে যাওয়ার সময় নাই, কারন আঘাতটা গুরুতর বলে মনে হয় নাই বলে আমার সাহেবের ধারনা। সেই থেকে এই ক্ষত নিয়েই চলছি সবার মাঝে।

“তোমার নতুন সঙ্গির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে না?” বলে যেন সে খিল খিল করে হাসতে থাকল। কি অদ্ভুত লাগলো আমার কাছে।

আমি বললাম, “নিশ্চয় পরিচয় করিয়ে দেব”। তবে আজ নয়। ওরা আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে নিউ মার্কেটের এক তা রেস্টুরেন্টে গেছে।

তোমার সাহেব কি করে? বলতেই আরেকবার চুপ হয়ে গেল বলে মনে হল।

সে আমার উত্তর না দিয়ে আমাকে উল্টো প্রশ্ন করে বসে। “আচ্ছা, তুমি কি আমাকে না ছারলেই কি পারতে না? অন্তত সেই লক্ষি বড় মেয়েটির জন্য!!?” ও কতদিন আমার কোলে বসে সুন্দর সুন্দর গান শুনত। কি মিস্টি মেয়ে। লক্ষি মেয়ে বটে। কি করে এখন ও? শুনেছি ও নাকি এখন মেডিক্যাল কলেজে পড়ছে। অনেক বড় হয়ে গেছে না? আমার কথা কি ওর মনে পড়ে? 

আমি বললাম, হ্যা, ও এখন ডাক্তারি পড়ছে। আমাদের কাছে থাকে না। মাঝে মাঝে আমি নতুন সঙ্গিকে নিয়ে ওর ওখানে যাই। আমার বড় মেয়ে প্রায়ই তোমার কথা বলে।

এমন সময় দেখা গেল তাঁর সঙ্গী আবার সেই ফুটফুটে মেয়েটিকে নিয়ে চলে এসেছে। আমারও প্রায় সিগারেট খাওয়া প্রায় শেষ। কোন ফুরসুত না দিয়ে তিনি আমার এই সেই পুরান বন্ধুটিকে নিয়ে চলে গেলেন। আমার আর তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেয়া হল না।

দেখলাম, সেই পুরান চেহারায় লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ির রঙে রাঙ্গানো আমার সেই ১০৮৬ সিসির পিকান্ত গাড়িটি ধুলা উড়িয়ে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি ওর ঠিকানাটা আবারও হারিয়ে ফেললাম। আমার প্রথম জীবনের সঙ্গী সে। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে আমি ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে তাকিয়ে মনে মনে শধু বললাম, I loved you always and I will always love you.       

০৬/০৬/২০১৬-কবর

নতুন ভাড়াটিয়া

অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে ভাড়ার জন্য একটা ঘর পাওয়া গেল। কি অবস্থা চারিদিকে। অনেক দিন হয়ত কেউ এখানে আসে নাই। বারির মালিকও মনে হয় অনেকদিন পর্যন্ত এই জায়গাটায় আসে নাই। চারিদিকে ঘাস জঙ্গল হয়ে একাকার। বারির কেয়ার টেকারেরও যেন জায়গাটা পরিস্কার করে রাখার জন্য  খুব একটা খেয়াল আছে বলে মনে হয় আন। চারিদিকে দুর্গন্ধ, মশা, মাছি, সাপ, তেলাপোকা কোনটা নাই। সবই আছে।

কাল বিকালে নতুন ভারাটিয়া আসবে, তাই কিছুটা হলেও ঘরটা পরিস্কার করা দরকার। সকাল থেকেই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু আকাসে বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব আছে, বৃষ্টি নামার আগেই ঘরটা পরিস্কার করে ফেলতে হবে, তানাহলে আবার ব্রিস্টির মধ্যে ঘরে পানি ঢোকে যেতে পারে। আসেপাশের ভাড়াটিয়াদের কারো কোন কৌতূহল আছে বলে মনে হচ্ছে না। সবাই যার যার ঘরে যেন ঝিমুচ্ছে। কোন ছোট ছোট বাচ্চা কাচ্চাদেরও খুব একটা আনাগোনা মনে হচ্ছে না। বেশ নির্জন এলাকাটা।

ও মা, একই! এখানে দেখি প্রায় সবার বারির সামনে তাঁদের নাম লেখা!! আর এদের অনেকের সঙ্গেই তো তাঁর মোটামুটি পরিচয় ছিল। ঐ যে, কাসেমের বাবার ঘর দেখা যাচ্ছে, তাঁর পরেই দেখি আমাদের মেয়রের বাসাটা। অনেক দিন দেখা হয় নাই কাসেমের বাবার সঙ্গে অথবা মেয়র জনাব আলমের সঙ্গে। ভালই হল, একই এলাকায় থাকা যাবে।

একে একে সবাই চলে গেল। বাসাটা খুব বেশি বড় মনে হচ্ছে না। একটু হয়ত গুছিয়ে নিতে হবে। দিনের আলোয় ব্যাপারটা বুঝা যায়নি। এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। যাক, বাতিটা জ্বালিয়ে ঘরটা গুছান দরকার।

কই, বাতির সুইচটা জানি কোথায়? একই!! কোন বাতি নাই? সুইচ? দরজাটা আবার বন্ধ করল কে? কি ব্যাপার, আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না ক্যান? হটাত করে শরির টা ভিজে গেল কেন? ছাদ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। মনে পরেছে কিছুক্ষন আগে বৃষ্টির লক্ষন দেখেছিলাম। এখন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ছাদের উপর থেকে ক্রমাগত পানি আমার ঘরে পড়ে ভরে যাচ্ছে। কি পোকা মাকর!! একদিকে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আবার অন্য দিকে এই সব পোকা মাকর এল কোথ্যেকে? কি বড় বড় মশা রে ভাই।

উচ্চস্বরে নাসিমার মাকে ডাকতে থাকি। কোথায় গেলে গো তোমরা। কি ব্যাপার কেউ আলোটাও জালালে না, ডাকও কেউ শুনছো না, এদিকে আমি ভিজে চুপসে যাচ্ছি, আমার আর কাপর চোপড় কই?

হটাত বিকট এক শব্দে আমার যেন মাথা ঘুরে গেল। দেখলাম আমার সামনে দুইজন দৈত্যের মত বিরাটকায়  কেউ দাড়িয়ে। শুধু বলল, আপনি কি এখানে নতুন ভাড়াটিয়া? আমরা ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে এসেছি। আপনার ফাইল্টা আমাদের কাছে। আপনার সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত কথা বলা দরকার।

০৫/০৬/২০১৬-বেলাশেষে

“বেলাশেষে” একটা বাংলা ছায়াছবির নাম। অনেকবার দেখেছি ছবিটা। মন ছুয়ে যায় যেমন তেমন এই বয়সে এসে অনেক কিছুর হিসাবটাও মেলানো যায়। সুযোগ হলে দেখতে পারেন। সংক্ষিপ্ত কাহিনীটা এই রকম-

৬৫ বছরের স্বামী আর ৬০ বছরের স্ত্রীর গুরুতর এক সমস্যা নিয়ে তাদের নাতি-নাত্নি, মেয়ের জামাই, ছেলেরা মেয়েরা সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়েছেন। সমস্যাটা হল, স্বামী বলেছেন তিনি এই বয়সে এসে তার স্ত্রীর সঙ্গে পৃথক হতে চান এবং আরেকটি বিয়ে করতে চান। এই বুডো মানুষটির সিদ্ধান্তে পরিবারের অনেকেই হতবাক হলেও কেউ কেউ রাজি আবার কেউ কেউ রাজি নয়। যারা এই সিদ্ধান্তে রাজী না, তারা হতবাক হচ্ছেন, এই বয়সে কেন তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আবার তিনি বলছেনও না কেনো তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন, কারনটা অজানা। ফলে নায়নাতকুর, ছেলেমেয়ে, মেয়ের জামাই সবাই মিলে একটা পরিকল্পনা করলেনঃ ব্যাপারটার গোপন রহস্য জানতে হবে। তাই সবাই মিলে ঠিক করলেন এই দুই বুড়া বুড়িকে একান্তে কোথাও একঘরে কয়েকদিন রাখতে হবে। তারা একদিকে যেমন নিজেরা নিজেরাই আলাপ আলোচনা করতে পারবে, ভাবতে পারবে আবার অন্যান্যরাও গভীর গোপন কারনটা জানতে পারবে। দুজনে ভাবুক, দেখুক তারপর নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক কোনটা করা উচিৎ। বুড়া-বুড়িও সম্মতি দিলেন, ঝগড়াতো আর হয় নাই, স্বামী স্ত্রীই তো। তাদের জন্য আলাদা ঘর দেওয়া হলো, একদম নিরিবিলি পরিবেশ। কেউ তাদেরকে বিরক্ত করার নাই। এই বতসে হয়তো যৌবন কালের সেই উচ্ছল রোমান্টিকতা না থাকলেও যেটা থাকে তা হচ্ছে মায়া, বিশ্বাস আর ট্রাষ্টেড ভালোবাসা।  এই দুই বুড়া বুড়ির অজান্তে সবাই একটা কাজ খুব গোপনে করে রাখলো। আর তা হচ্ছে তাদের রুমে গোপন একটা সিসি ক্যামেরা আর অন্য বাড়িতে মনিটর যাতে এই দুই বুড়া বুড়ি কি কথা বলে তা দেখার এবং শোনার জন্য। যখনই এই দুই বুড়া বুড়ি একা তাদের কথাবার্তা বলেন, তখনই দলবেধে অন্য বাড়িতে থাকা মনিটরে সবাই মিলে ভিডিওতে তা প্রত্যক্ষ করেন।

পঞ্চাশ বছরের বিয়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা, ভাল লাগার কথা, একসঙ্গে কষ্টের কথা, দুঃখের কথা, তাদের মিল অমিলের কথা, রাগের কথা, ভালোবাসার কথা একের পর এক তারা দুইজনে নিরিবিলি একত্রে বসে আলাপ করেন। আর সবাই তাদের এইসব অভিজ্ঞতার কথা শুনে কখনো কেউ হাসেন, কখনো চোখ মুছেন, কখনো অবাক হয়ে চুপ করে থাকেন। তারা সবাই একটা জিনিষ বুঝতে পারেন যে, সব স্বামীর কাছে তার সংসারটা এক রকমের, আর স্ত্রীর কাছে তার সংসারটা আরেক রকমের। কিন্তু কেউই যে ভুল নন তা ঠিক। স্বামীর কাছে দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসাটা এক রকমের আর স্ত্রীর কাছে স্বামী আর সংসারের জন্য ভালোবাসাটা আরেক রকমের। একজন মায়াবী স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন, তার অবর্তমানে তার আদরের স্ত্রীর যেনো কোনো কষ্ট না হয়, স্ত্রী যেনো কারো কাছে হেয়ালীর পাত্র না হন, তার আদুরী স্ত্রী যেনো কোনো অর্থকরী কিংবা সুন্দর জীবন চালানোর জন্য কারো কাছে হাত না পাতেন। সেই দিকটা খেয়াল করে এই ভরষাযুক্ত স্বামী সবসময় চান তার স্ত্রীকে সাবলম্বি করে তুলতে। ফলে স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন তার স্ত্রী এটা জানুক যে, তার স্বামী কোথায় কিভাবে কত রোজগার করেন, কত সঞ্চয় করেন, আর কিভাবে সেই কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে কিভাবে তিনি তার স্ত্রীর মংগলের জন্য কি করছেন এবং তার পুরুপুরী এই পরিকল্পনার অংশ হয়ে যেনো তার স্ত্রী এটা খেয়াল করে সে মোতাবেক প্রস্তুতি নেন এবং তার উপর পারদর্শী হন।

স্বামী যা ভাবছেন, করছেন কিন্তু তিনি অন্যদিকে স্ত্রীর বেলায় দেখছেন অন্যটা। তার স্ত্রী তার এইসব হিসাব নিকাশ, ভবিষ্যৎ জল্পনা কল্পনায় একেবারেই উদাসীন বরং স্ত্রী তাদের সংসারে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়ে, নাতি নাতকুর কিভাবে মানুষ হবে, কিভাবে আরামে থাকবে, কিভাবে নিরাপদ থাকবে ইত্যাদি নিয়েই বেশি নজর। স্বামীর কাছে ভালো লাগা ছিল বউকে নিয়া কোথাও রোমাঞ্চের উদ্দেশ্যে একা একা বেরিয়ে পড়া, কিন্তু স্ত্রীর কাছে যেনো সেই রোমাঞ্চের থেকে বেশী জরুরী ছিলো ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, তাদের কোচিং ক্লাস, তাদের স্বাস্থ্য, তার নিজের ঘরকন্নার কাজ, আত্মীয় সজনদের সেবা শশ্রুসা ইত্যাদির মধ্যে একটা বন্ধন স্রিস্টির লক্ষে সবাই মিলে পারিবারিক সময় কাটানো।

স্বামী চেয়েছেন স্ত্রীর কাছ থেকে অনেকটা সময় যে সময়টা তারা ভালোবাসার কথা বলবে, পুরানো দিনের কথা বলবে, কোনো একটা সিনেমা দেখতে দেখতে মন ভরে আনন্দ করবে, বিখ্যাত কোনো কবির কবিতা পড়ে পড়ে তার অন্তর্নিহিত ভাবধারায় সিঞ্চিত হবেন। কিন্তু স্ত্রী তার পরিবারের সবার দিকে একসঙ্গে খেয়াল রাখতে গিয়ে, ছেলেমেয়েদের পরাশুনার দেখভাল করতে গিয়ে, অসুস্থ শ্বশুর শাশুড়ির দিকে নজর দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়টাই চলে গেছে অকাহ্নে, স্বামীর জন্য অফুরন্ত সময়টা আর তিনি বের করতে পারেন না।

কেউ দুষী নন, কারো চাওয়ার মধ্যেই অতিরঞ্জিত ছিলো না। অথচ তারা যেনো কোথায় সুখি নন। তারপরেও তারা বহুকাল এই কম্প্রোমাইজের মধ্যেই একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের ভালোবাসাটা এক সময় অভ্যাসে পরিনত হয়, তখন অভ্যাসটাই যেনো ভালোবাসা। স্বামীর টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন স্ত্রীর কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, স্বামীর ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ মনে হয় না। অন্যদিকে স্ত্রীর ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্দ যখন কোনো একদিন এতোটাই অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধা ভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন স্বামীর নাক বুজে আসতো, সময়ের এতোটা পথ বেয়ে যখন সবগুলি ভালোবাসা একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায়, তখন স্ত্রীর সেই নাক ডাকা, আধাভেজা চুলের গন্ধ যেনো একটা সুখের পরশ মনের ভিতর প্রবাহিত হয়ে যায়। যেনো, এইতো সেতো কাছেই আছে।

৯০ বছরের কোনো এক প্রোড় বুড়ো, ৮৫ বছরের কোনো মহিলার সাথে যখন এক সাথে স্বামী স্ত্রী হিসাবে বসবাস করেন, তখন তাদের এই বয়সে এসে আর সেই যুবক যুবতীর মতো শরীরের চাহিদা, রুপের চাহিদা আর কাজ করে না। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসাটা একটা বিশাল আকার পাহাড়সম ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে সেখানে কি ফ্যাক্টরটা কাজ করে? কাজ করে নির্ভরতা, কাজ করে একে অপরের উপর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, মায়া আর মহব্বত। কাপা কাপা হাতে যখন ৮০ বছরের বুড়ি এক কাপ চা নিয়ে ৯০ বছরের তার স্বামীর কাছে কাপখানা হাতে দেন, কিংবা পানের বাটিতে পান আর সুপারী ছেচে যখন একখিলি পান স্বামী তার ৮০ বছরে সংগিনীর মুখে তুলে দেন, আসলে তিনি শুধু এক কাপ চা কিংবা এক খিলি পানই দেন না, দেন সারা জীবনের মহব্বত আর ভরষা যে, তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বড় বন্ধু নাই।

তুমি আমার ভরষা, তুমি আমার নিরাপত্তা, তুমি আমার স্বামী, কিংবা স্ত্রী, তুমি আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কাপে, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যায়। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে থাকা আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করো আমার  অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার নাই।

বেলাশেষে তুমিই আমার আর আমি সেই তোমার।

০৪/০৬/২০১৬-ভিক্ষুকের পাল্লায় আরেক দিন

আমি জুরাইন রেলগেটের কাছে ট্রেন পাশ দেয়ার জন্য গাড়ীতে বসে আছি। অনেক গাড়ি থেমে আছে, কেউ কেউ আমার ও অনেক আগে থেকেই থেমে আছে। আমার লাইন অনেক পরে। আমি ঠিক যেখানে গারিতে বসে আছি, তার ডান দিকে গুটি কতক হাত দূরে রাস্তার আইল। অখানে এক আখ বিক্রেতা তার চিকন চিকন আঁখগুলো অনেক যত্ন করে খোসা ছারাচ্ছে, তারপর কচি কচি কঞ্চির মত করে একটা তিনের পাতায় এক এক করে সারি দিচ্ছে। তার পাশে ছোট একটা মেয়ে হাপ প্যান্ট পরা অবস্থায় বাবার আখ কাটা দেখছে। তার হাতেও একটা আখের কঞ্চি। আখ বিক্রেতার পাশে এসে এক ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতাও বসে আছে। ওর সব মিলিয়ে দুটু সম্বল, একটা সম্ভবত ফ্লাক্স আর আরেক্তি বিস্কুতের একটি জার। এটা দিয়েই হয়ত ওর সারাদিনের রোজগার, সংসার চলে।

আমার বা পাশ দিয়ে খুব ব্যাস্ত একটি সাইকেল আরোহী উল্টো পথ ধরে পার হবার চেষ্টা করছে, কোন তাড়া আছে হয়ত কিন্তু ওর বয়স আর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে না যে ট্রাফিক আইন ভেঙ্গে অন্যান্য গাড়ি গুলো বিপদজনক ভাবে টপকিয়ে এভাবে যাওয়ার মানুষ, তারপরে তিনি করছে, অল্প বয়স, বয়সের একটা গরম আছে। পিছন থেকে অযথা একটি গাড়ি হর্ন বাজিয়ে উঠল যেন বিরক্ত কারো উপর। আমার ড্রাইভার নিজে নিজেই অনেক কথা বলে ফেলছে, ‘কেন কোন সেন্স নাই এত আগে রেল গেত ক্লোজ করে সবাইকে দাড় করাইয়া রাখবে, কি হয় ঠিক টেন আসার আগে দাড় করাইলে? দেশ তারে কেউ ভালবাসে না, কেউ তাদের ডিউটি ঠিক মত করে না। কি হবে এদেশের? বুঝলাম এবার আমার ড্রাইভার দেশ প্রেমিক হয় উঠেছে। অথচ আমার এই ড্রাইভারকেই রঙ সাইড দিয়ে না যাওয়ার জন্য আমাকে অনেক বার বকাও দিতে হয়। সুযোগ পেলেই আমার ড্রাইভার চান্স নেয়।

বাইরে বেশ গরম, বুঝা যাচ্ছে। ঐ অদুরে সারি সারি দোকানে দোকানদার কেউ কেউ হাত পাখা নিয়ে নিজেকে বাতাস করার চেষ্টা করছে, বুঝলাম এলাকায় বিদ্যুৎ নাই। তা না হলে হাত পাখার ব্যবহার হত না এখন। এরই মধ্যে বাস আসার অপেক্ষায় কিছু সাধারন যাত্রি প্রচন্ড খরার মত রৌদ্রে দাড়িয়ে আছে কখন তাদের বাস আসবে। যারা একটু যুবক, তাড়া আবার কেউ কেউ হাতে সিগারেট ধরিয়ে সময়টা কাটানোর চেষ্টা করছে। আমার ড্রাইভার গাড়ির রেডিও তা অন করতেই কোন এক জকির ম্যাকি সুরে কত কথা শুনা গেল।

ঠিক এমন সময় একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে আমার গাড়ীর সামনে এল এবং ভিক্ষা চাইল। আজকাল অনেক পদের ভিক্ষুকের সমাহার এদেশে। কেউ খুরিয়ে খুরিয়ে হাটে, কেউ আবার কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে, পয়সার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে এই সার্টিফিকেট নিয়ে রাস্তায় নামে তার টাকা জোগাড়ের জন্য। কেউ আবার পুরু শরীর উদম করে আসে কোথায় তার ক্ষত আর কোথায় তার শারিরিক সমস্যা মুখে না বলে যেন যিনি ভিক্ষা দেবেন তিনি তাকে দেখেই বুঝে ফেলতে পারেন তার ভিক্ষা চাই। কেউ আবার অনেক প্যান্ট শার্ট পরে খুব ভদ্র ভাবে সামনে এসে চুপি চুপি বলবে যে, তার সব খুইয়ে এখন এমন অচেনা শহরে একা, তার বাড়ীতে যাওয়ার পয়সা নাই কিন্তু তিনি ভিক্ষুক নন। নতুন কৌশল।

যাক গে, আমার সামনে এই মুহূর্তে যে ভিক্ষক টি দাড়িয়ে তাকে দেখেই আমার ভিক্ষা দেয়ার ইচ্ছে হল না। কারন তার যে বয়স, তাতে সে অনেক বাসায় কাজ করতে পারে, কিংবা গার্মেন্টসেও কাজ করতে পারে কিংবা অন্য যে কোন পরিশ্রমের কাজ তার দ্বারা করা সম্ভব। তার ভিক্ষা করার প্রয়োজন হয় না আসলে।কিন্তু নাছোড়বান্দা। বারবার আমার গাড়ীর কাচে নক করছিল। বিরক্ত হয়ে বললাম, প্লিজ মাফ কর। আমার বিরক্তে তার কিহু যায় আসে না। সেও বিরক্ত। এত দেরি করে কেন কাচ খুললাম এই জন্য।

মহিলা রেগে গিয়ে বল্ল, এতক্ষন না করলেন না ক্যান, আমারে খামাখা দাড় করাইয়া রাখলেন? আগে বললেই তো পারতেন?

অবাক হইলাম তার রাগের কারনে। আমি তার সময় নষ্ট করে দিয়েছি বলে। তো, আবার ডাকলাম, ভাব্লাম কিছু কথা বলি।

বললাম, কোলের বাচ্চাটা কে বা কার? অনেকে আবার বাচ্চা ভাড়া করে নিয়ে আসে এবং ভিক্ষা করে। এতে হয়ত অনেক মানুষের একটু বেশি সিম্পেথি পাওয়া যায়, আর ভিক্ষাটাও জমে উঠে হাতে পায়সার ভারে।

মহিলা বল্ল, আমার বাচ্চা। বুঝলাম, তার রাগ কমে নাই, সব ভিক্ষুকেরা সাধারনত স্যার বলে সম্বোধন করে। হয়ত সেও করে কিন্তু সে আমার উপর রাগ।

বললাম, কাজ করোনা কেন?

উত্তরে সে যা বলল সে এক লম্বা ফিরিস্তি। নাই বা বললাম।

আমি আবার বললাম, কয় টাকা পাও প্রতিদিন ভিক্ষা করে? এবার মনে হল, সে আমার কোথায় একটু হলেও রাগ কমেছে অথবা চিন্তা করছে যে সাহেব মনে হয় কিছু বেশি সাহাজ্য করতে পারে ইত্যাদি। ভিক্ষুকরাও কিন্তু সাহেব্দের সাইকোলজি বিশ্লেষণ করে।

সে আমতা আমতা করে বল্ল, হয় স্যার প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পাই প্রতিদিন। এবার সে আমাকে স্যার বলে সম্বোধন করল। বুঝলাম, অনেক্তাই রাগ কমেছে আমার উপর।

আমি আবার বললাম, গতকাল কত টাকা পেয়েছ?

সে বল্ল, স্যার গতকাল প্রায় ২০০ টাকার মত পাইছি।

আমি বললাম, তাহলে তোমার মাসিক ইনকাম প্রায় ৬০০০ টাকা। তোমার তো মাসে ৬০০০ টাকা লাগে না। কয় টাকা হলে তোমার সংসার চলে?

সে কিহুক্ষন চুপ থেকে একবার আকাশের দিকে, একবার আমার দিকে, আবার একটু নিরব থেকে, হাতের কড়া গুনে গুনে বল্ল, স্যার, মোটামোটি হাজার ৫ হলেই আমাদের ছোট সংসার চলে যায়। 

আমি বললাম, ধরো, আমি যদি তোমাকে আজকে ৫০০০ টাকা দেই, তাহলে কি তুমি এখন বাড়ি চলে যাবা? যদি বল, যে, তুমি বাড়ি চলে যাবা, এবং তুমি আর এই মাসে ভিক্ষা করবা না, তাহলে আমি তোমাকে এখনই ৫০০০ টাকা দেব। কিন্তু আমি তোমার উপর লক্ষ রাখব তুমি ভিক্ষা করছ কিনা। সে নিসচুপ হয়ে কিছুক্ষন দারিয়ে থেকে আমার গাড়ীর সামনে থেকে চলে গেল। মনে হল তার এই আয়ে পোষাবে না। তার মানে এই যে, সে ভিক্ষাটা ছারবে না। অথবা এমনও হতে পারে যে, সংখ্যাটা কম বলে ফেলেছে।

………… তার বেশ কয়েক মাস পর,

আমি আবার গুলিস্থানের জিপিও এর সামনে গাড়ীর জ্যামের মধ্যে বসে আছি। হটাত দেখলাম, ঐ সেই একই মহিলা। কোলে একটা বাচ্চা, তবে আজকে ছেলে বাচ্চা নয়, মেয়ে বাচ্চা। আমি মহিলাকে দেখেই চিনতে পেরেছি। কিন্তু মহিলা আমকে দেখে চিনতে পারে নাই। আমার গাড়ীর সামনে এসে সেই একই ভঙ্গিতে ভিক্ষা চাইল। আমি এবার আবারো সেই একই প্রশ্ন গুলো করলাম।

আমি বললাম, তোমার কয় বাচ্চা?

সে বল্ল, স্যার, এই একটাই। বুঝলাম, সে মিথ্যা বলছে। এটা আসলে ওর ভাড়া করা বাচ্চা মনে হয়।

 তারপর আমি শুরু করলাম আমার সে আগের প্রশ্নগুলো।কয় টাকা পায়, কয় টাকা লাগে প্রতিমাসে। কেন কাজ করতে চায় না ইত্যাদি।

এবার মহিলা কিন্তু কম করে ফিগারটা বলে নাই। সে বল্ল, স্যার আমার মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা লাগে। স্বামী অসুস্থ ঘরে। আমার বোনের এক বাচ্চা স্কুলে পরে, তাকেও আমার টানতে হয়, নিজেও অসুস্থ, সঙ্গে শ্বশুর শাশুড়িকেও টানতে হয়ইত্যাদি। বুঝলাম, ১৫ হাজারের হিসাবটা তার আগে থেকেই করা।

আমি এবার অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, তোমার সঙ্গে একবার আমার দেখা হয়েছিল জুরাইন রেলগেটে। তখন আমি তোমাকে এই প্রশ্নগুলো করেছিলাম এবং তুমি মাসে ৫০০০ টাকা হলে তোমার হয়ে যায় বলেছিলে, আজ আবার তা ১৫০০০ হাজার টাকা হয়ে গেল ক্যান?

মহিলাটি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমারে এক ঝারি দিয়ে বল্ল, ধুত মরার, খালি আপনার লগেই আমার দেহা হয় ক্যান? অন্য রাস্তা দিয়া যাইতে পারেন না? তারপরযত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার গাড়ী পার হয়ে আরেক জনের কাছে চলে গেল।

মনে হইল, ভিক্ষা যার পেশা, ভিক্ষা তার নেশাও বটে। নেশা আর পেশা যখন এক হয়ে যায়, তখন আর তাকে ঐ কাজ থেকে সরিয়ে নেয়া সম্ভব না। একজন ভিক্ষুক যত ধনিই হোক না ক্যান, স্বয়ং বিধাতা তাকে সবার সামনে প্রকাশ্যে ফকির বানিয়ে রেখেছে, তাকে বিধাতা দিনের সূর্যের প্রখর তাপে শাস্তি দিচ্ছেন, আবার শীতে কষ্ট দিচ্ছেন, বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখছেন, অথচ হয়ত তার একটা সুন্দর বাড়ি আছে, তাকে বৃষ্টিতে ভিজতে হত না, শীতে কাঁপতে হত না যদি ভিক্ষা না করতে হত। কিন্তু সে তো ভিক্ষা করবেই। এটা তো পেশা। ভিক্ষুক হয়ত আনন্দ পায় তার সঞ্চিত টাকার সংখ্যা দেখেই। তার ভোগ করার সময় কই? সেটা তো বিধাতা দেবেন না। তার কাছে পূর্ণিমার রাত যা, অমাবস্যার রাতও তা, ওর কাছে বৃষ্টির ঝন ঝন শব্দ কানে ভাসে না, ওর শুধু নজর কখন একটা গাড়ী আসবে আর তার সামনে গিয়ে সে কাতর হয়ে মুখের সবটা যন্ত্রনার অভিব্যক্তির অভিনয়টা করে একটা হাত পেতে বলবে, দেন গো স্যার, আমারে কিছু দেন, দুইদিন কিছু খাই নাই। হয়ত পুরুটাই মিথ্যা কথা।

আর এইসব ভিক্ষুকের জন্য যারা সত্যি ভিক্ষা করে একটু সস্থি পেতে চায়, তাদের কপাল পুড়ে। শুনেছি, ভিক্ষুকদের এসোসিয়েশন আছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট আছে, সেক্রেটারি আছে, সেখানে লাখ লাখ টাকা দিয়ে ইলেক্সন হয়, এবং একদিন তারা আবার এমপি মিনিস্টার পদেও কন্টেস্ট করে।

তখন আমরা তাদের স্যার বলি।  তারপরের কাহিনী অন্য রকম।

০৪/০৬/২০১৬-ভিক্ষুকের পাল্লায়

প্রতিদিন এই পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার হিসাব সবসময় কেউ রাখে না আর রাখাও দরকার আছে বলিয়া কেউ মনে করেনা।অনেক সময় অনেক অতিকায় বৃহৎ জিনিস নজর এড়াইয়া যায় আবার অনেক সময় অতিকায় তুচ্ছ জিনিসও আমাদের চোখ না এড়াইয়া উহা এমন আবেগের সৃষ্টি করে যা মন এবং হৃদয় উভয়কেই প্রভাবিত করে। আজ এমনই কয়েকটা দৃশ্যের কথা বলছি।

পরিবার নিয়েগ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। দুইদিন পর সবাইকে নিয়া আবার ঢাকায় ফিরছিলাম। আগে গ্রামে যাইতে হইলে বৃষ্টিতে ভিজিয়া, রোদে পুড়িয়া, কিছু দূর হাটিয়া, আবার কিছুদূর কোন এক বটবৃক্ষের তলে জিরাইয়া, পথ হইতে সঙ্গি পাওয়া কিছু হরেক পদের বন্ধু পথচারী লইয়া ঘন্তার পর ঘন্টা হাটিয়া বাড়ি যাইতে হইত। শহর হইতে যদিও খুব দূরে নয় এই আমাদের গ্রামের বাড়ি কিন্তু তাতেই তিন হইতে চার ঘন্টা লাগিয়া যাইত। যখন গ্রামে পৌঁছাইতাম, তখন অনেক দিনের বন্ধু বান্ধব, পারা প্রতিবেশি, এমন করিয়া প্রশ্ন করিত যেন শহরের একজন অতি উচ্চ দরের বাসিন্দা গ্রামে আসিয়াছে। আমাদের সময় শহর ছিল এক ধরনের বিদেশের মত। যেন বিদেশ হইতে আসিয়াছি। আমার মেয়েরা এই শহর আর গ্রামের যে বিস্তর একটা পার্থক্য তাহা তাহারা কখনো বুঝিবে না আর আমিও অনেকবার গ্রামের কথা বলিতে গিয়া দেখিয়াছি, তাহাদের গ্রামের কথা শুনিবার মানসিকতা খুব একটা নাইও। এখন আমি গ্রামে যাই গারিতে চরিয়া, সঙ্গে ড্রাইভার থাকে, আমি অনেক বড় সাহেব। এখন যদিও সেই চেনা পরিচিত লোকগুলো শহরকে আর বিদেশ বলিয়া মনে করে না, তারাও এখন আমি গ্রামে গেলে অতিব খুশি হয়। কারো কারো অনেক অভিযোগ আছে আমার বেশি বেশি গ্রামে না আসার কারনে, কেউ আবার আমার অফিসে দেখা করাই সম্ভব হয় না, দিনের পর দিন অপেক্ষা করিয়াও তাহারা আমার দর্শন পায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। সব অভিযোগ যে মিথ্যা তা আমি বলব না কিন্তু অনেক অভিযোগ আছে যা আমার কখনো শুনিতেও ভাল লাগে আবার কিছু কিছু অভিযোগ আছে যাহা সত্যিই সত্য নয়। কিন্তু তাহাতে আমার কিছু যায় আসে বলিয়া আমার মনে হয় নাই। 

এতক্ষন গাড়ী ভালই চলিতেছিল, কোথাও কোন জ্যাম বা রাস্তায় দাঁড়াইতে হয় নাই কিন্তু শাহবাগে আসিয়া দেখি লম্বা এক গাড়ীর সারি। কতক্ষন যে লাগিবে এই জ্যাম শেষ হইতে তা অনুমান করিতে পারতেছিলাম না। রাস্তার জ্যামে সবচেয়ে বড় অসুবিধা যেটা হয় তাহা হইল, কিছুক্ষন পর পর হরেক পদের গল্প লইয়া অতিশয় ক্ষুদ্র বয়স হইতে থুরথুরে বুড়িও আসিয়া গাড়ীর কাঁচ নক করিতে থাকে। নিজের বিরক্ত হইলে তারাও আরও বেশি করিয়া বিরক্ত হয় এবং কখনো কখনো এমন মন্তব্য করিয়া মুখ ভেংচি কাটিয়া চলিয়া যাইবে যেন আমি ই অপরাধ করিয়াছি তাহাকে কোন ভিক্ষা না দিয়া। আজও তার ব্যতিক্রম হইল না। একজন ৪০ কিংবা ৪৫ বয়সের মহিলা আমাদের গাড়ীর সামনে আসিয়া দারাইল। রবি ঠাকুরের মত লিখিলে বলিতে হয় যে, “অতি কাতরতার সহিত তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করিয়া “কিছু দেন স্যার গো” বলিয়া এমন একখান মুখাবয়ব করিল যেন পৃথিবীতে তাহার হইতে আর কোন মানুষ অসহায় নাই আর আমি ছাড়া তাহাকে উদ্ধার করিবার ও যেন আর কেহ নাই।”

আমি সাধারণত সবাইকে ভিক্ষা দেই না। ভিক্ষুকের শারিরিক অবস্থা, মানসিক বিকাস, বয়স কিংবা তার কাজ করিবার ক্ষমতা-অক্ষমতা অনেক কিছু বিবেচনা করিয়াই আমি ভিক্ষা দিতে পছন্দ করি। অনেকে হয়ত বলিবেন, দিবেন তো এক টাকা বা দুই টাকা, তারপরে আবার এত সব কাহিনী বিবেচনা করিয়া ভিক্ষা দিতে হইবে? আসলে ব্যাপারটা ঐ রকম নয়। আমি ভিখা বৃত্তিকে সমর্থন করি না। তারপরেও অনেক ভিক্ষুককে আমি ভিক্ষা দেই। তাতে যে সব সময় আমার ঐ বিবেচনা গুলি থাকে তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো আমার মানসিক অবস্থা, আমার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি, কিংবা আমার ভাবের উপরও আমি অনেক অযোগ্য ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেই। “ভিক্ষুকের আবার যোগ্যতা”, এই কথা অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করিতে পারেন, কিন্তু সত্যি ভিক্ষা করিবার জন্যও কিন্তু যোগ্যতা লাগে। সবাই ভিক্ষুক হইতে পারে না। শুনেছি, অনেক ভিক্ষুক নাকি অনেক বড় লোক, তারাঅত্যাধুনিক গাড়ী চালায়, বিশাল অট্টালিকায় তাহারা শীততাপ বাড়ীতে ঘুমায়। তাহাদের সেবা করিবার জন্য দাস, চাকরানী সবাই আছে। শুধুমাত্র ভিক্ষা করিবার নিমিত্তে তাহার তাহাদের নির্দিষ্ট এলাকায় গিয়া আবারো সেই পুরানো পোশাক পরিয়া মুখের হাবভাব পরিবর্তন করিয়া মানুষকে ধোঁকা এবং বোকা বানাইয়া সেই একই ভিক্ষা ব্রিতিতে সামিল হন। দিনশেষে আবার তাহারা তাহাদের ঐ বৃহৎ অট্টালিকায় সাহেব বেশে ফিরিয়া আসেন। ইহা একটা ইনভেস্টমেন্ট বিহীন লাভজনক ব্যবসা। যাই হোক, কে ভিক্ষা বৃত্তি করে কত টাকা লাভ করিল বা কে সত্যি সত্যিই ভিক্ষুক এবং জিবিকা নির্বাহের জন্য যে তাহার ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কোন গতি আছে কিনা, এই সব তাত্তিক বা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার জন্য আমি এই লেখাটি লিখছি না।

আমি এখন শাহবাগে জ্যামের মধ্যে গাড়ীতে বসিয়া আছি এবং ঐ ৪০-৫০ বয়সের মহিলা ভিক্ষুকের দিকে তাকাইয়া আছি। আমার ছোট মেয়ে তার অতি প্রিয় আই প্যাডে এক নজরে কি যেন করিতেছে আর আমার বড় মেয়ে তার কানে হেড ফোন লাগাইয়া কোন দেশের কোন সঙ্গিত শুনিতেছে, তা আমার বা আমাদের গাড়ীতে যাহারা বসিয়া আছি কেহই শুনিতে পাইতেছি না। শুধু মাত্র মেয়ের মাথা নারা দেখিয়া বুঝিতেছি যে আমার বড় মেয়ে সঙ্গিত শুনিয়া সঙ্গিতের জগতে ডুবিয়া আছে। পাশের ভিক্ষুক, আর জ্যামের জন্য তাহার কোন কাজে ব্যঘাত হইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে না। আমার প্রিয়তমা পত্নী একটু একটু তন্দ্রা আবার একটু একটু জাগ্রত ভাবে বসিয়া আছে। ড্রাইভার সাহেব অতি সুক্ষ মনোযোগের সহিত কোন ফাক ফোঁকর পাওয়া যায় কিনা এই চিন্তায় গাড়ির স্টেয়ারিং ধরিয়া বসিয়া আছে। আশেপাশের অন্যান্য গারি গুলির অবস্থাও আমার মত।

আমি নরিয়া চরিয়া বসিলাম, আর আমার মানি ব্যাগে হাত দিয়া ঐ মহিলা ভিক্ষুককে কিছু টাকা দিতে উদ্যত হইলাম। আমার এই নড়াচড়ায় আমার ছোট মেয়ে তাহার আই প্যাড হইতে নজর ফিরাইয়া আমার দিকে তাকাইল, আমার বড় মেয়ের এতক্ষন বুঝা চোখ একটু খানি আড় চোখ হইল, আমার পত্নিও একটু নরিয়া বসিল। তাহার সবাই হয়ত এই ভাবিল যে, আমি তো সাধারনত সব ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেই না, এমন কি হইল আজ যে, অতি কর্মক্ষম একজন মহিলা, যাহার কাজ করিবার ক্ষমতা আছে তবুও আমি ভিখা দিতে উদ্যত হইলাম?   

আমি মেয়েদের মনভাব বুঝিতে পারিলাম। বলিলাম,  দেখ , আমি একটা সাইকোলজিক্যাল কাজ করিবার চেষ্টা করিতেছি এইবার। বলিয়াই আমি আমার মানি ব্যাগ হইতে নতুন একটা পাচশত টাকার নোট বাহির করিয়া ঐ মহিলা ভিক্ষুকটির হাতে এমন ভাবে দিলাম যেন, এটা কিছুই না। মহিলা ভিক্ষুকটি প্রথমে টাকাটা হাতে লইল, এবং পরক্ষনেই আমার দিকে তাকাইল। পরক্ষনেই আবার সে তাহার হাতে দেওয়া নোটটির দিকে তাকাইল আবার আমার দিকেও তাকাইল। আমি শুধু তাহার মুখের ভাবটা পরিবর্তনের ব্যাপারটা লক্ষ করিতেছিলাম। হটাত কয়েক মুহূর্তের পর মহিলা ভিক্ষুকটি পিছন ফিরিয়া সোজা দৌর দিল।  যেহেতু সব গারি গুলি জ্যামের মধ্যে দারাইয়া ছিল, ফলে অল্প সময়ের মধ্যে সে বেশ খানিক টা পথ কোন বাধা ছারাই পার হইয়া গেল আড় ইতিমধ্যে সে রাস্তার ঐ পাড়ের ফুটাপাতে পৌঁছাইয়া গেল। ফুতপাতে পৌঁছাইয়া ও সে দৌড়াইতে লাগিল কিন্তু একবার সে আমার দিকে পরক্ষনেই সামনের দিকে দৌড়াইতেছিল। এক সময় মহিলা ভিক্ষুকটি আমাদের চোখের আড়াল হইয়া হাজার মানুষের ভিরে হারাইয়া গেল। 

এতক্ষন আমার ছোট মেয়ে, বড় মেয়ে কেহই কোন কথা বলিতেছিল না। এইবার আমার ছোট মেয়ে আমার দিকে তাকাইয়া আমাকে প্রশ্ন করিল, বাবা, মহিলাটা এমন করিয়া দৌড় দিল ক্যান? ওকি ভয় পাইয়াছে?

আমি বলিলাম, না মা, ও ভয় পায় নাই। এতক্ষন তুমি যাহা যাহা দেখিলে, সেটা একটা সাইকোলজিক্যাল গেম ছিল। সাইকোলজিটা কি তুমি বিঝিতে পার নাই? আমি ব্যাপারটা আমার ছোট মেয়েকে বুঝাইয়া বলার শুরু করিলাম।

মহিলা ভিক্ষুকটি যখন ৫০০ টাকার নোটটা হাতে পাইল, সে তখন বুঝিতে পারে নাই যে, কেউ তাকে ৫০০ টাকার নোট দিয়া ভিক্ষা দিতে পারে। (যদিও অনেকে দেয়, কেউ দেয় না এমন নয় কিন্তু তাহা একটা ব্যতিক্রম ধর্মী ব্যাপার)। কেউ হয়ত দেয় ৫ টাকা, ১০ টাকা, ৫০ টাকা কিংবা ১০০ টাকা কিন্তু একবারে ৫০০ টাকা হয়ত সে কখনই ভিক্ষা পায় নাই। ফলে সে প্রথমে মনে করিয়াছিল যে, আমি ভুল করিয় ৫০০ টাকার একটা নোট দিয়াছি। তাই সে বারবার একবার আমার দিকে আরেকবার ৫০০ টাকার নোটের দিকে তাকাইতেছিল। সে ভাবিতেছিল, সাহেব কি ভুল করিয়া ছোট নোট মনে করিয়া তাহাকে ৫০০ টাকার নোটটি দিয়া দিল নাকি আসলেই সাহেব তাহাকে ৫০০ টাকার নোটটাই ভিক্ষা দিল? এটা কি ভুল নাকি আসল। ভিক্ষুক তাহার নিজের ভিতরে ডিসিসন ম্যাকিং প্রসেসে খুব দ্রুত কি করিবে আড় কি করিবে না এই নিয়া দোলায় ছিল। সে হয়ত ভাবিতেছিল, আমি কি খুব তাড়াতাড়ি আমার ভুলটা বুঝিয়া আবার না ঐ ৫০০ টাকার নোটটা মহিলার কাছ হইতে চাহিয়া লই। অথবা ভাবিতেছিল যে, মহিলা নিজেই কি আমাকে জানাইবে যে, আমি ৫০০ টাকাই দিতে চাহিয়াছি কিনা। তাহার ভিতরে তখন একটা সাইকোলজিক্যাল যুদ্ধ চলিতেছিল এই রকম যে, সে এই ৫০০ টাকার ভিক্ষার ব্যাপারটা যদি নিজে থেকে ক্লিয়ার করে তাহা হইলে সে হয়ত ৫০০ টাকা থেকে বঞ্চিত হইবে। আবার যদি না জানায় তাহলে ব্যাপারটা ঠিক হইতেছে কিনা ইত্যাদি। তাই সে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিল না কি করিবে। তাহার এই কিঞ্চিত দুরাবস্থার ইঙ্গিত টা যদিও আমি বুঝিতে পারিতেছিলাম কিন্তু আমি তাহাকে আমার মানসিকতার কোন পরিবর্তন না করিয়া যেন আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না বা আমি ইচ্ছা করিয়া কোন ভুল করি নাই বা করিলেও আমাই তখন ব্যাপারটা বুঝিতে পারিতেছি না। আমার মুখের ভাবের মধ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন না দেখিয়া সে আমি বুঝিতে পারিয়াছি কিনা তাহা সে বুঝিতে পারিতেছিল না। লাভ আড় লোকসানের হিসাব করা তাহার ইতিমধ্যে শেষ হইয়াছে, তাই আর কোন রিস্ক না নিয়া নতুন কোন খদ্দরের কাছে আড় কোন ভিক্ষা না চাহিয়া সে যত তাড়াতাড়ি পারিল  আমার কাছ হইতে ছুটে দৌড় দিল যাহাতে আমি আর তাহাকে নাগাল না পাই। সে দৌড়াইতেছিল বটে বটেকিন্তু তখনও সে নিশ্চিত হইতে পারিতেছিল না, যদি আবার আমি তাহাকে ডাক দেই!! টাই সে একবার সামনের দিকে আবার পরক্ষনেই আমার দিকে তাকাইতেছিল।

কিন্তু আমি জানি আমি তাহাকে ৫০০ টাকাই দিয়াছি।  আমার মধ্যে কোন সন্দেহ ছিল না, আমি শুধু দেখিতে চাহিতেছিলাম, ৫০০ টাকা একসঙ্গে পাইলে একজন ভিক্ষুক কি করে। প্রতিদিন হয়ত ও ৫০০ টাকার চেয়েও বেশি কামাই করে কিন্তু একবারে কারো কাছ হইতে ৫০০ টাকা হয়ত ও জিবনে কখনই পায় নাই। ফলে ওর ভিতরে নানা প্রকার সাইকোলজিক্যাল কেল্কুলেসন খেলিতেছিল।  মানুসের মন বড় বিচিত্র। সে যেই হোক। ৫০০ টাকা দিয়া আমার ভালই লাগিয়াছিল এই ভাবিয়া যে, আজ যদি সারাদিন সে অন্য কাহারো কাছ হইতে ভিক্ষা নাও পায়, তাহাতেও ওর কয়েকদিন চলিয়া যাইবে।

দেখিলাম, আমার ছোট মেয়ে অতি দ্রুত ইহারই মধ্যে ভিক্ষুক সমাচার লইয়া একটা ফেসবুকে স্ট্যেটাস দিয়া ফেলিল। ইতিমধ্যে জ্যাম ছুটিএ শুরু করিয়াছে। ড্রাইভার গাড়ি আঁকাবাঁকা করিয়া ফাক ফোঁকর দিয়া কিভাবে আরও দ্রুত চালানো যায় সেইদিকে মনযোগী হইয়া গেল, আমার বড় মেয়ে কোন কিছু না ভাবিয়া আবারো গানের কলি শুনিতে লাগিল। আমি শুধু এই ভিক্ষুকের ঘটনাটা মনে মনে ভাবিতে লাগিলাম।

মানুষ বড় বিচিত্র।

০৩/০৬/২০১৬ আকাশের চিঠি

প্রিয় মাধুরী 

শরতের শিশিরাপ্লুত বৃন্তচ্যুত কোন শেফালীর গল্প তোমার জানা আছে মাধুরী? ঐ ফুল দেবতার পূজার কোন কাজে লাগে না, কাজে লাগে না কোন বাসরঘরের ফুলশয্যার শোভাবর্ধনেও। অথচ ঐ শেফালি ফুলেরও এককালে অনেক কদর ছিল, তার গন্ধ ছিল, ছিল একটা সম্ভাবনাময়য় প্রস্ফুটিত আগামিদিন। রবিঠাকুর বেঁচে থাকলে অকালে বৃন্তচ্যুত এই শেফালী ফুলের অসময়ের পতনের উপর হয়ত একটা বিখ্যাত কবিতা বা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন অথবা এই পরিত্যক্ত ফুলের একটা যৌবনময় ছোটগল্পও লিখে ফেলতে পারতেন কিন্তু আমি তো আর রবিঠাকুর নই যে, আমি নিজের আবেগ দিয়ে পার্বতী নদির মত বেগবান কোন এক স্রোতধারার মত হর্ষবোধক, লোমহর্ষক অথবা উচ্ছ্বাসময় কাব্য লিখে ফেলব। জীবনের সঙ্গে গল্পের এই এক জায়গায় বিস্তর ব্যবধান। লেখকগন চুপি চুপি তার অক্ষরসমৃদ্ধ লেখনীতে যত না আবেগ আর কষ্ট দিয়ে ভালবাসার কাহিনী রচনা করেন, বাস্তবে ঐ চরিত্রগুলুর আবেগ, কষ্ট আর ভালবাসা তারথেকেও অনেক বেশি গভীরের এবং মর্মস্পর্শী। লেখনীর কলমের অমোচনীয় কালীর অবগাহনে চরিত্রগুলুর কষ্টের চোখের অশ্রু হয়ত শুস্ক পাতার গল্পের লাইন ভেদ করে গড়িয়ে পরে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না কিন্তু বাস্তবে ঐ চোখের পাতা যথার্থই অস্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টিগোচরীভূত হয়। কারো চোখে এরা ধরা পরে আবার শতব্যস্ত পারিপার্শ্বিক অসামঞ্জ্যস্যতায় তা আবার কারো কারো চোখ এড়িয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এদের পরিসংখ্যান নিতান্তই কম নয়।

তুমি মেয়ে হয়ে জন্মেছ বলে তোমার অন্দর মহল আর আমার অন্দর মহলের গল্প এক নয়। কিন্তু তোমার জন্য আমার অন্দর মহিল যেমন অরক্ষিত ছিল না তেমনি আমার জন্য তোমার অন্দর মহলে প্রবেশের সুযোগও তেমন রক্ষিত ছিল বলে আমি মনে করি না। তার মধ্যে তুমি ছিলে আমার ধর্মীয় অনুশাসনের দিক থেকে আলাদা আরেক মানবী।

হ্যা,  আমার স্পষ্ট মনে পরে ঐ দিনের কথা, ২৯ শে বৈশাখ। তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হইয়াছিল। তুমি বিদেশ পাড়ি দেবার কোন এক অজানা সুখানুভূতিতেই হোক অথবা নির্মলা শান্তির খোঁজেই হোক, বেনি দুলাইয়া, চোখের পাতা অশ্রুসিক্ত করিয়া কোন প্রকার ঘটা না করিয়া আমাদের উঠানের সুবিস্তৃত শ্যাম চিত্রপটটি দিনের আলোকউজ্জ্বল স্পর্শে তোমার বিদায় ঘন্টায় ধূসর শ্যামল পাণ্ডুবর্ণ করিয়া একটি ক্ষুদ্র জীবন নাট্যের ইতি টানিয়া সবাইকে ফাকি দিয়া কোন এক নাম না জানা ঠিকানায় হারিয়ে গেলে। আমি জানি না আমার কি অপরাধ ছিল অথবা আমার কি করিলে কি হইতে পারিত। তোমার চলিয়া যাইবার পর আমি অনেক কিছুই বুঝিতে পারিলাম বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও বুঝিলাম যে, আমার স্বর্গীয় মা তার ছেলের সুখের খোঁজে আমাদেরই ঐ পাকা ঘরের তক্তপোষে বসিয়া কোন এক অজানা কুমারী সুন্দুরির মুখখানা মনে ছাপিয়া কোন কোন অলঙ্কার পরিলে তাকে পরিদের মত দেখাইবে বা কোন রঙের শারি পরিলে তাকে গ্রামের আর দশটি গৃহবধু থেকে অতুলনীয় দেখা যাইবে তার হিসাব নিকাস করিতে ব্যস্ত। অথচ তিনি একবারের জন্যও বুঝিতে চাইলেন না, এইমাত্র বৃষ্টিশেষে ক্ষান্তবর্ষণ প্রাতকালের ম্লান রৌদ্র আর খন্ড মেঘের আড়াল করিয়া যে মানুষটি চিরতরে হারিয়ে গেল তার কাছ থেকে আরও নতুন কোন সুখের সন্ধান পাওয়া যাইত কিনা। সুখ বড় রহস্য ঘেরা সোনার হরিন, যিনি পান তিনি জানেন না কেমন করে পাইলেন আর যিনি পান নাই, তিনি জানেন না কোথায় এর প্রাপ্তিস্থান। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল, হরিনেরা কখনো কোন সোনারখনির সন্ধান দিতে পারিয়াছিল কিনা আমি জানি না, তবে এই সোনার হরিনের সঙ্গে বাস্তবের নিরিহ এই প্রানিকুল হরিনের কোন মিল নেই। এরা নিজেরাও কোন বংশের সঙ্গে যুক্ত নয়।

মানুষ যখন প্রতিশোধ নিতে না পারে, তখন সেই প্রতিশোধ অপমান আকারে এমন বৃহৎ আকারে আবির্ভূত হয় যে, হয় সে নিজের কাছে নিজেই দুরূহ হইয়া পরে অথবা জরাজীর্ণ ইষ্টক প্রাচীরের মত শত খন্ডে বিধ্বস্ত হইয়া নেহাত মাটির ঘরের মত অব্যবহারযোগ্য হইয়া পরে। আমি তোমার বেলায় এর কোনটাই দেখি নাই। শুধু মনে হইয়াছে, হয়ত বা আমার আর যাই থাকুক না কেন, তোমাকে ঠেকাইবার মত শক্তি বা ক্ষমতা অন্তত ঐ সময়ে আমার ছিল। সেটা আমি করিতে পাড়ি নাই। কারন আমি অন্ধ ছিলাম। রবি ঠাকুরের কথাই ঠিক, অন্ধের কাছে অভিমানের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা অতিব দুরূহ।

সবেমাত্র এমন একটা কঠিন অসুস্থতা হইতে পরিত্রান পাওয়া আমার মা হটাত করে নিজকে অতিশয় সুস্থ এবং সবল মনে করিয়া যারপর নাই অনেকগুলু গুরুতর কাজের ভার নিয়া সামলাইতে না পারিয়া পরদিন আবারো অসুস্থ হইয়া পুনরায় আগের ক্যাবিনেই ভর্তি হইয়া গেলেন। এ যাত্রায় আমি কোন মুখে যে তোমাকে আনিতে যাইব, সে ভরসা আর সাহস আমার এই ক্ষুদ্র হৃদয় শক্তি সঞ্চার করিতে পারে নাই। অগত্যা বাড়ির কাজের বুয়া আর গ্রামের দুঃসম্পর্কের নানির উপরই ভরসা করতে হইল। কিন্তু এবার যমদূত আমার স্বর্গীয় মাকে সঙ্গে না নিয়া একা যাইতে চাননি, ফলে একটানা এক মাসের অধিক সময় বাড়ির সবাইকে সময় অসময় অধিক পরিমান নিপীড়ন করিয়া, গ্রাম শুদ্ধ হইচৈ করাইয়া, সমস্ত ডাক্তারি বিদ্যা মিথ্যা প্রমান করিয়া পৃথিবীর সব সুখ, আলো বাতাস, বাড়ির প্রকান্ড মায়া মহব্বত ছিন্ন করিয়া আমার মা স্বর্গীয় দেবতার কাছে এক নিশ্বাসে হাজির হইয়া গেলেন আর আমাদের সবাইকে চোখের জলে ভাসাইয়া পুরু বাড়িটাকে একটা অরক্ষিত জলাধারে রূপান্তরিত করিয়া নিরব করিয়া দিলেন। আমার আর সুখের ঘর করা হইল না। স্বপ্নের মাধুরী স্বপ্নেই রইয়া গেল, তার আর আমাদের চৌকাঠ পার হইয়া আমাদের সংসারে আসা হয় নাই। তখন মনে হইল আমার যে কয়জন অতি প্রিয়জন ছিল, যারা আমাকে কারনে অকারনে জবাবদিহিতা করিত, যাদের অতিশয় আপ্যায়নে আমার মাঝে মাঝে নিজেকে খুব বিরক্ত মনে হইত, তাদের কেউ আজ আর আমার আশেপাশে রইল না, সেটা আজ নিঃশেষ হইয়া শুন্যে পরিনত হইল। একবার মনে হইয়াছিল যে, তোমার ইউনিভার্সিটিতে গিয়া তোমার খোঁজ করিলেই আমি তোমার ঠিকানাটা পাইব, কিন্তু পরে আবার কি মনে করিয়া আর খোঁজ নেয়া হইল না। আর এই খোঁজ না নিতে নিতেই তো প্রায় ত্রিশ বছর পার হইয়া গেল। আজ এই পঞ্চাশ বছর পর হটাত করিয়া তোমার কথা বারবারই মনে পরিতে লাগিল। তুমি কি আশেপাশে কোথাও আছ? আর থাকিলে কিভাবে আছ? নিশ্চয় এখন তোমার জীব পরিবেশে অনেক শেফালির আরাধনা হয়, নিশ্চয় এখন আর তোমার সেই চিরাচিত কোলাহল নাই, কোমল কোমল শিশুদের আনন্দে তোমার চারিপাশ ভরপুর। আজ আমার অনেক কথা মনে পড়ে। থাক সে কথা। কখনো যদি আবার তোমার সন্ধান পাই, না হয় আবারো আমার এই হারানো বা ক্ষয়ে যাওয়া ত্রিশ বছরের না বলা কাহিনীগুলু তোমাকে বলব। তবে, তোমার ভাল লাগা রবিঠাকুরের সেই “মেঘ ও রৌদ্রের” কিছু কথা লিখে আমার আজকের এই ডায়েরিটা শেষ করবঃ

“………………আকাশে মেঘ রৌদ্রের খেলা যেমন সামান্য, ধরাপ্রান্তে এই দুটি প্রাণীর খেলাও তেমনি সামান্য, তেমনি ক্ষণস্থায়ী। আবার আকাশে মেঘ রৌদ্রের খেলা যেমন সামান্য নহে এবং খেলা নহে, কিন্তু খেলার মত দেখিতে মাত্র। তেমনি এই দুই অখ্যাত্নামা মনুস্যের একটি কর্মহীন বর্ষা দিনের ক্ষুদ্র ইতিহাস সংসারের শত শত ঘটনার মধ্যে তুচ্ছ বলিয়া প্রতিয়মান হইতে পারে কিন্তু ইহা তুচ্ছ নহে………………”

(চলবে……)  

০২/০৬/২০১৬ মাধুরীর চিঠি

তোমাকে কি নামে যে সম্বোধন করি তাই বুঝে উঠতে পারছি না এখন। কি লিখব তোমায়? প্রিয় বন্ধু নাকি শুধু প্রিয়? অথবা শুধু তোমার নাম অথবা কিছুই না !! তোমাকে আমি যেই নামেই ডাকি না কেন, তুমি আমার একান্ত প্রিয়জন। কে জানি বলেছিল, বন্ধুর নাম ভুলে গেলেও সমস্যা নেই, কিন্তু শত্রুর নাম ভুলে যাওয়া যাবে না। তোমার বেলায় আমার এই নীতিটা হয়ত সঠিক নয়। আমি তোমার নাম ভুলে গেলে আমার আর কোন কিছুই হয়ত অবশিষ্ট থাকবে না। যাক, তোমাকে আমি কোন সম্বোধন ছাড়াই চিঠিটি লিখছি।

অনেকদিন ভেবেছিলাম তোমার সাথে আমি আর কখনো যোগাযোগ করব না। আর যোগাযোগ করে কি ই বা হবে বল? তোমার হয়ত এখন সংসার হয়েছে, বাচ্চাকাচ্চা আছে, অনেক উচু স্তরের মানুষদের মধ্যে এখন তুমি একজন। তুমি ভালই আছ।

তোমার এই শরতবেলার বেলাভুমির প্রাতভ্রমনে আমি হটাত করে সেই পুরানো দিনের কোন এক বর্ষার কাকভেজা বৃষ্টির সন্ধ্যাকালীন শ্বাসরুদ্ধকর রোমাঞ্চের কথা নিয়ে যদি আমি হাজির হই, কি ই বা লাভ হবে, তুমিই বল? মাঝখানে হয়ত যেটুকু তুমি আমাকে করুনা করে হলেও মনে রেখেছ, তাও হয়ত আমার ভাগ্যে আর থাকবে না, অকারনে সেটাও হয়ত হারাতে পারি। অনেক কিছু হারিয়ে যদিও এখন হারাবার ভয় আমি করি না কিন্তু স্মৃতির পাতা ধরে স্থান কাল সময় গুনে গুনে যে কয়টা জিনিস আমি এখনো হারাতে চাইনি তার মধ্যে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় একটা। ভেবনা আমি আজ তোমাকে এই পত্র দিয়ে আবার নতুন করে কোন এক সম্ভাবনাময়কে জাগিয়ে তুলছি কিনা। অন্তত আমি তাঁর কোন সম্ভাবনা দেখছি না।

আমি জানি পাহারের নিচে দাড়িয়ে যত জোরেই কেউ তাঁর কথা বলুক না কেন, সেই একই সুর, একই শব্দ, সেই একই বানী পাহারের চারিদিকে বাতাসে বাতাসে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে আবারও নিজের কাছে তা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। অবুঝেরা এটাকে বিধাতার উত্তর হিসাবে ধরে নেয়, আর যারা অবুঝ নয়, তারা জানে প্রকৃতির অবজ্ঞা করে এই সব কিছু ফিরিয়ে দেওয়া কত বড় নির্মম সত্য। এটা কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক, অন্তত আজ এতটা বছর পর নতুন করে হিসাব করার প্রয়োজন বলে মনে করছি না। আর যখন ঐ নিষ্ফল প্রতিদ্ধনির আওয়াজ ফিরে আসে, তখন যেন তা আরও শতগুনে কঠিন এবং করুন করে কানে বাজে।

কেউ কারো কোন কথা রাখে না, মনে হয় কেউ কারো জন্য কখন অপেক্ষাও করে না। এর মানে আমি তোমাকে এই বলে যুক্তিও দেখাচ্ছি না যে, আমি কি বলতে চেয়েছিলাম, আর আমি তাঁর প্রতিধ্বনিতে কি পেয়েছি। সময় এমন এক জিনিস, সে সবার সঙ্গে আছে, সবার সঙ্গে থাকে অথচ সে কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না। কেউ তাঁর সঙ্গে থাকুক আর নাই বা থাকুক, সে তাঁর নিজ গতিতে নিজ আবেশে তাঁর ঠিক গন্তব্যে সবাইকে ছেরে একা একাই চলতে থাকে। কোথাও তাঁর বিন্দুমাত্র অলসতা হয় না, কোথাও তাঁর কোন গড়মিল হয় না। পৃথিবীর সব চাইতে সস্তা যেমন সময়, তেমনি সবচেয়ে দামিও বটে। ইচ্ছে করলেই একে হেলাফেলা করে যেখানে সেখানে খরচ করা যায় আবার ইচ্ছে করলেই আবার এক আনা দুই আনা দিয়ে কেনাও যায় না। প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা সময়, আর সেই সময়ের চাওয়া-পাওয়ার সাথে হিসাব নিকাশের দেনা পাওনাটাও এই খরচের বিচারয্য বুদ্ধিচনায় পরে। চৈত্রের গরমের জন্য কেউ হেমন্তের দুপুরকে দায়ি করে না, কিংবা বর্ষার একটানা বৃষ্টির জন্য কেউ শীতের কনকনে সকালকে দায়ি করে না।

এই চিঠি পরে তোমার হয়ত মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমি কেন তাহলে আমার সেই পূর্বেকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তোমাকে আবার আজকে লিখতে বসলাম। আমার আসলে আর কোথাও কেউ নেই, কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই, যেটুকু আছে তা শুধু তুমি। এত বিশাল পৃথিবীর মাঝে কত মানুষ যে কতভাবে অসহায়, আমি নিজেকে দেখে তা বুঝতে পেরেছি।

প্রথম যেদিন আমি তোমাকে দেখেছিলাম, মনে পরে তোমার সেই দিনের কথা?  আমি জানি না আমাকে দেখে তোমার কি মনে হয়েছিল, কিন্তু আমার কাছে সমুদ্রের গভীরতার চেয়ে তোমার চোখের ভাষা আরও বেশি দুর্গম মনে হয়েছে, অথচ আমার কেবলই মনে হয়েছে ঐ আখির ভাষা আমার পরিচিত। তোমার কোমল কঠিন দেহখানি আমার কাছে পাহাড়ের শিলাভুমির প্রস্তরখন্ড থেকেও কঠিন মনে হয়েছিল কিন্তু তাঁরপরেও আমার কেবলই মনে হয়েছে কোথায় যেন আমি তোমাকে দেখেছি।

আমি আর পাঁচটি মেয়ের মত নই, সেটা তুমিও জান, আমিও জানি। নীল আকাশের ছায়াপরা কোন এক চকচকে পুকুরের মাঝখানে নীলপদ্ম দেখলেই আমি সবার মত উল্লসিত হয়ে চারিদিক চমকিয়ে দেই না হয়ত কিন্তু আমার ভিতরে যে কোন সাড়াশব্দ হয় না তা নয়। আমার অনেক রাত কেটেছে কোন কিছু ভাবা ছাড়াই, আমার অনেক দিন হয়ত নাওয়াও হয় নাই শুধুমাত্র এই ভেবে, কে তুমি? যেদিন বুঝেছি তুমি কে, সেদিন উপলব্ধি করেছি, আমি স্রোতের বিপরিতে নৌকার গুন টানছি, বুঝতে পেরেছি আমি উল্টো পথে রথে উঠেছি। তারপরেও আমি রয়ে গেছি, আর রয়ে গেছি তোমাকে পাবার জন্য নয়, তুমি আমার কাছাকাছি আছ, এই ভরসায়। এটাই বা কম কিসের? এতসব অপরিচিত মানুষদের মাঝে অন্তত আমি তো একজনকে হলেও চিনি, তোমাকে চিনি, তুমি আছ। তুমি কি কখনো জানতে পেরেছ যে, পৃথিবীর সমস্ত মানবকুলের মধ্যে আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইতাম, এর মানে এই নয় যে তুমি ভয়ংকর। আমার ভয়ের কারন একটাই। তোমার নির্লিপ্ততা। তোমার কোন কষ্টের কারন যেন আমি কখনো না হই সেই ভয়ে আমি সর্বদা ভীত থেকেছি। অথচ আজ আমার ভিতরে কোন প্রকার ভয় নেই, কারন তুমি আমার পাশে কোথাও নেই। আর কোথায় আছ তাও আমি সঠিকভাবে আন্দাজ করতে পারি না। জীবনের এই সায়াহ্নে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তোমাকে। মনে হয়েছে যদি একদিন বা কোথাও একবার আবার তোমার চোখে চোখ রেখে বলতে পারতাম, আমি হারিয়ে যাইনি, অথবা আমি হারিয়ে যেতে চাইনি, আমার কুরেঘরের সদর দরজার মেঠো পথ তোমার জন্য সব সময় খোলা ছিল এবং এখনো আছে। যদি কখনো দৈবাৎক্রমে আমার এই জলেশিক্ত লেখাটা তোমার হাতে পরে আর যদি তখনো আমার এই দেহে টিমটিম করে হলেও একটু প্রানশক্তি থাকে, তবে জেনে রেখ, আমি তোমাকে হয়ত বলতে চেয়েছি, তুমি এস একবার যদি কখন তোমার ভিতরটায় শুন্যতায় ভোরে গিয়ে হাপিয়ে উঠো। এসে একবার আমার চোখের জলের সাথে তোমার সেই বেদনাবিধুর চোখের অসমাপ্ত কান্নাগুলো দিয়ে বল, তুমি ভাল আছ। আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমার সেই ক্লান্ত আঁখির শিশিরের টিপ টিপ করা ব্যাথাকনাগুলো বয়ে নিয়ে আখি বন্ধ করে দেব। তুমি এক ফোটা জলও দেখতে পাবে না।

আজ এই অবেলায় তোমাকে কত কথা লিখতে ইচ্ছে করছে যেন।

মনে পরে তোমার সেই কাকডাকা ভোরে একবার আমি আর তুমি হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই শাওতালদের গ্রামে? ট্রেন আটকা পড়েছে কোন এক বনের ধারে। ট্রেন আবার কখন চলা শুরু করবে কেউ বলতে পারছে না। একেক জনের কাছ থেকে একেক ধরনের খবর পাচ্ছি ট্রেন নষ্ট হবার কারন জানতে গিয়ে। আসলে কেউ বলতে পারছিল না কি কারনে ট্রেন এই মাঝপথে হটাত করে এতগুলো যাত্রি নিয়ে অজানা সময়ের জন্য বিশ্রামে গেল। অনেক যাত্রি ট্রেন থেকে নেমে এদিক সেদিক ঘোরাঘরি করছে। আমরাও এক সময় সবার দেখাদেখি ট্রেন থেকে নেমে ঘুরতে বেরিয়ে গেলাম। গল্প আর গল্পে কখন যে কোন রাস্তায় হাঁটছিলাম, আমরাও তাঁর রেখাপথ মনে রাখিনি।

শেষমেশ এক শাওতালদের গ্রামে গিয়ে হাজির হয়ে গেলাম। কি অদ্ভুদ এক সমাজ। সবাই সবার আপনজন। সবাই যেন সবার জন্য। সবাই যেন এক পরিবার। গ্রামটা ঘুরতে ঘুরতে কোথাও এক কাপ চা খাওয়ার জন্য একটা দোকান পর্যন্ত পেলাম না। আসলে সাওতালদের কোন পৃথক দোকান নেই ঐ গ্রামে। গ্রামের সরু পথ দিয়ে আমরা দুজনে হাঁটছি, সব ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঘর দুয়ার, এলোপাথারিভাবে সাজানো বাড়িঘর। গরু ছাগল গুলোও যেন স্বাধীন। কোনটাই খোয়ারে বাঁধা নেই। কুকুর, গরু ছাগল, হাস মুরগি মানুষ সব স্বাধীন। গাছ গাছালি ভর্তি পুরু গ্রামটা। কোথাও কাদা পেরিয়ে এই বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি যেতে হয়। পানির মটকা গুলো একদম উদোম। কয়েকটা পাখী বসে আছে মটকা গুলোর উপর। পাখীগুলোও জানে এখানে কোন সমস্যা নাই। ওরা বরং আমাদের দেখে একটু শঙ্কিত হয়ে এদিক সেদিক উড়াল দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে মোরগগুলো উচ্চ স্বরে অন্যদেরকে জানান দিচ্ছিল এখানে আগন্তক এসেছে, যেনো মোটিভ বুঝা যাচ্ছে না বোধহয়। কয়েকটা বাচ্চাওয়ালা মুরগি তরিঘরি করে বাশঝাড়ে লুকিয়ে গেল। আমরা এদের কারো কাছে পরিচিত নই। প্রকৃতির প্রতিটি বস্তু তাঁদের স্বকীয়তায় ব্যতিক্রম পছন্দ করে না। বড় ভাল লাগছিল ব্যাপারটা উপভোগ করতে। কতক্ষন কেটে গিয়েছিল আমরা বুঝতেই পারিনি, হটাত অল্প দূর অপেক্ষামান ট্রেনের সচল হবার সংকেত দিয়ে আমাদের চারিদিকে ছরিয়ে থাকা যাত্রিদেরকে মনে করিয়ে দিল আমরা ট্রেনে ছিলাম এবং এখন আবার সেখানে যেতে হবে। তা না হলে ঐ যে বললাম, সময়ের সাথে সাথে এবার ট্রেন হাত জুটি বেধে পুনরায় তাঁর সেই গন্তব্যের দিকে ছুটে যাবে। যারা তাঁর সাথে নেই, তারা থেকে যাবে যেখানে সে আছে সেখানেই।

ফিরতে গিয়ে আমরা বুঝলাম, আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। কোন রাস্তায় এই শাওতাল গ্রামে ডুকেছিলাম, এখন আর সেই আগের রাস্তাটা পরিচিত মনে হচ্ছেনা, মনে হচ্ছে ভুল পথে ট্রেনের দিকে যাচ্ছি, আদৌ ট্রেনের দিকে যাচ্চি কিনা তাও বুঝতে পারছি না। ট্রেনের হুইসেলটা মনে হচ্ছে আরও দূর থেকে কানে আসছে। দ্রুত হাটতে হবে, তা নাহলে নির্ঘাত ট্রেন মিস করব। আর ট্রেন মিস করলে এর পরের অধ্যায়টা আমার অন্তত জানা নাই। তুমি দ্রুত হাঁটছ, আমি তোমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অত দ্রুতও হাটতে পারছি না। রাস্তাটা আমার কাছে অমসৃণ গিরিপথের মত মনে হতে লাগলো। আমার সাড়া শরীর ঘামে যেন ভিজে আসছিল। চুলের ভিতর থেকে কেমন একটা গরম আভা বের হচ্ছিল। আমার কপাল দিয়ে শিশিরের ফোটার মত করে একটু একটু ঘাম বেরিয়ে চোখের জলের ফোটার মত আমার কানের পাশ দিয়ে বুকের ওড়নায় পড়ছিল। আমি যেন আর হাটতে পারছিলাম না। তুমি আমার হাত ধরলে।

এই প্রথম তুমি আমার হাত ধরলে। আমি তোমার হাতের অনুভুতিটা তখন কিছুই বুঝতে পারিনি, শুধু মনে হয়েছে, আমি যেন একটা অবলম্বন পেয়েছিলাম শক্ত করে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। অনেক ক্লান্ত অবশ দেহ আর ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে কোন রকমে যখন আমরা ট্রেনের ধারে ফিরে এলাম, তখন ট্রেন প্রায় ছাড়ি ছাড়ি ভাব। ট্রেনের সিটে বসে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে আমার ক্লান্ত শরিরের সমস্ত পরিশ্রম যখন বিশ্রামে নিমগ্ন, তখন বুঝলাম, একটু আগে তোমার হাতের যে পরশটা আমার শরিরের বাহুতে লেগেছিল, তা এখন আমার অনুভুতিতে আরেক স্বর্গীয় ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। আমার আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল, শাওতাল গ্রামের ঐ মানুষগুলোর সঙ্গে হারিয়ে গেলেই তো ভাল ছিল। প্রতিনিয়ত আমার মনে হচ্ছিল, ট্রেন চলছে, আমার মন চলছে না। বাইরে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। বহুদুরের ঐ গ্রামগুলো কতই না গতিতে আমার দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে নিমিষে। এখন আর সবুজ গ্রাম ভাল লাগছে না, নীল আকাশের খন্ড খন্ড মেঘ গুলোও আর আমার কাছে কাব্যিক মনে হচ্ছে না। অথচ একটু আগে এর সবকিছুই ছিল আমার কাছে আমার অনন্তময়ি প্রেমের এক আবেদনের মত। ঐ যে বহু দূর অবধি দেখা যায় আকাশ যেখানে আকাশ আর মাটি দুজনে এক হয়ে গেছে, অথবা এই যে ট্রেনের দুই সমান্তরাল সারি যারা একে অপরের পাশে অনন্ত কাল ধরে পাশাপাশি বয়ে যাচ্ছে অথচ কখনই তারা একে অপরের নয়, এমন একটা সম্পর্ক যার ঠিকানা কারো জানা নাই। হয়ত তুমি আর আমি ঠিক তাই। আমরা একই ট্রেনের যাত্রি অথচ গন্তব্য এক নয়, আমরা একই আকাশের নিচে চলছি কিন্তু আমার দিগন্ত আর তোমার ভেজা মেঘ এক নয়। মনটা ভারি হয়ে উঠেছিল সারাটা রাস্তা।

আজ কত কথা মনে পড়ছে আমার। তোমার কি মনে পরে আরও একদিনের কথা?

সেদিন ছিল বর্ষার প্রথম সপ্তাহ। চারিদিকের আকাশ মেঘে ভরা, গুরগুর মেঘের আওয়াজ। থেকে থেকে হাল্কা বৃষ্টি আবার ক্ষনেক্ষনে রোদ। হুমড়ি ধুমড়ি খেয়ে যেন তুমি উচ্ছল হরিন শাবকের মত মেঘলা সেই দুপুরে অস্থির চিত্তে ঘন ঘন দরজার করা আর কলিং বেল টিপে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করলে যেন, আর কয়েক সেকেন্ড দেরি করে দরজা খুললে না জানি কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে, অথবা কোন এক রাজ্যের রামায়ন তাঁর অপ্রতিরোধ্য মেঘবদের যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। তোমার সাড়া শরীর ভেজা, চুলগুলো মনে হল কতকাল চিরুনি পরেনি, তারপরেও তোমাকে বড্ড সুন্দর দেখাচ্ছিল। যতবার আমি তোমাকে দেখেছি, আমি ততবারই যেন কোন এক নতুন মানুষকে দেখেছি। সকালের তুমি বিকালের মত নও, বিকালের তুমি আর পরেরদিনের তুমি সম্পূর্ণ আলাদা এক মানুষ। কখনো তুমি হিমালয়ের মত স্থবির, আবার কখনো তুমি উস্রিংখল ডাহুকের মত জ্বালাময়ী, কখনো তোমাকে দেখেছি আমি এতটাই নির্লিপ্ত যেন পানকুড়ির মাছধরার ধ্যানের মত স্থির। কখনো দেখেছি আমি অতিশয় ক্ষুদ্র বিষয়ে তুমি অতটাই উত্তেজিত অথচ অতিকায় হস্তিসমেত বিষয়ে তোমার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ভগবান মানুষকে দিয়ে কি পরীক্ষা করান তা আমার জানা নাই তবে তোমার বেলায় ভগবান সর্বদা কৃপাশীল ছিলেন অনেকের চেয়ে বেশি। ভালবাসার হৃদয় ভগবান তোমাকে দিয়েছেন কিনা আমার জানা নাই, তবে তোমাকে ভালবাসবে এই এমন কিছু একটা ভগবান তোমার মধ্যে সে চিরস্থায়ী প্রথা হিসাবে নিশ্চয় দান করেছেন। তোমার ভেজা চুলেও যেমন মাদকতা আছে, চিরুনির আচরনে শুকনা চুলেও মাদকতা আ ছে। য়ব যেমন মনকে উতালা করে দিতে পারে, তেমনি তোমার অবসন্ন দেহ ও মনকে  ভেঙ্গে খান খান করে দিতে পারে। তোমাকে এই প্রথম আমি যেন আরেক তোমাকে আবিস্কার করলাম। তুমি অতিশয় অস্থির, তোমার কথাবার্তায় কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব। অধিক কথা বলার যেন সময় নেই। কোথায় কি কারনে যেন তুমি আর তোমার মধ্যে নেই। অবশ্য ব্যাপারটা একটুপরেইবুঝতে আমার আর বাকি ছিলনা।তোমার মা অসুস্থ।

আমি তোমার একটা জিনিষ সেই প্রথম দিন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। পৃথিবীর যাবতীয় উচ্ছ্বাস, সুখ, দুঃখ, আর আবেগ যদি হয় একদিকে, তোমার মার জন্য তোমার এই উচ্ছ্বাস, সুখ, দুঃখ, আবেগ অথবা যাই কিছু থাকুক না কেন, তিনি আরেকদিকে। তোমার মায়ের জন্য তুমি সত্যকে মিথ্যা, বা মিথ্যাকে সত্য অথবা ন্যায়কে অন্যায়, বা অন্যায়কে ন্যায়ের দিকে নিয়েও যদি মনে হয় তোমার মা তাতে খুশি, হয়তবা তুমি তাই করার জন্য শারীরিক এবং মানসিকভাবে সর্বদা, সর্বত্র সব কিছুর বিনিময়েও করতে তোমার কোন প্রকার দ্বিধা হবে না। এ এক ব্যাতিক্রমি চরিত্র আমি তোমার মধ্যে প্রকটভাবে দেখেছি। কোন কিছুর সঙ্গেই তাঁর কোন তুলনা তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর আমার এখানেই সবচেয়ে বেশি ভয় হত যদি কখনো কোন কারনে আমি তোমার এই সবচেয়ে দুর্বল স্থানে একটু হলেও ছোঁয়ার কারনে আমার সমস্ত আরাধনা, আমার ভাললাগার ব্যাক্তিত্ত তোমার কাছে আমি এক নিমিসেই অপরিচিত হয়ে যাই। তোমার সেই মা অসুস্থ। তুমি ঠিক নাই বুঝতেই আমার মনের গভিরে এক চরম উৎকণ্ঠা বোধ হতে লাগলো। দুর্ঘটনা আভাস দিয়ে আসে বটে, কিন্তু সুভাগ্য কোন আগাম সংকেত দিয়ে আসে না। তোমার এই দুর্ভাগ্যে যেন আমার সুভাগ্য খুলে গেল। তোমার মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে থাকার মত নির্ভরশীল কোন মানুষ তুমি তোমার জগতের চারিপাশে খুজে পেলে না, প্রথম যার কথা মনে হয়েছিল তোমার, সে আমি। আমি ভাগ্যবতী। তুমি আমাকে কোন সময় না দিয়ে, কোন রকমে কোন প্রকার প্রস্তুতি হওয়ার সময় না দিয়ে এক প্রকার বিদ্যুৎ গতিতেই বের করে নিয়ে হাজির করলে সেই অসামান্য মানুষটির কাছে যার সমতুল্য এই পৃথিবীতে তুমি আর কাউকেই জানোনি।

তুমি চলে গেলে আমাকে রেখে। নিস্তব এক ক্যাবিন। ডাক্তাররা আসছে ঘন ঘন, নার্স, আয়া, সবাই ব্যাস্ত এই ঘুমন্ত শিশুর মত মানুষটির যত্নে। আমি কে, কি তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তারা অনেকেই জিগ্যেস করলেও আমার বলতে কোন অসুবিধা হয় নাই, কারন তিনি আমার মায়ের মতই একজন মানুষ। আমি তাকে আমার মায়ের সঙ্গেই মিল রেখে পরিচয়টা দিয়েছিলাম যে, আমি তাঁর মেয়ের মতই। আমি এছাড়া আর কি বলতে পারতাম বল? কি অদ্ভুত এক ব্যাপার। তোমার সাথে তোমার মায়ের কোথাও কোন গড়মিল নেই। সেই ঠোঁট, সেই নাক, সে মুখাবয়ব, চোখের ভ্রুটা পর্যন্ত একদম মিল। আমি বসে আছি তাঁর পাশে। প্রতিনিয়ত আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন তমাকেই দেখছি। এত কাছ থেকে এত নিরিবিলিতে আমি কখনো তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকিনি। আজ যেন মনে হচ্ছিল আমার সেই না দেখা তোমাকে এত কাছে থেকে দেখছি। কখনো আমি তাঁর হাত দুটো ধরছি, কখনো তাঁর ভ্রুটা, আবার কখনো তাঁর কানের কাছে গিয়ে তাঁর মসৃণ চুলের গন্ধ শুকছিলাম। কখন কিভাবে কি মনে করে জানি না, দেখেছিলাম আমার দুচোখ বেয়ে কয়েক ফোটা জল আমার নিজের অজান্তেই এই ঘুমন্ত মানুষটির বুকের উপর পরেছিল। আমি কি কেদেছিলাম? কোন কিছু ভেবে কি আমার মনে কোন কস্টের উদ্রেক হয়েছিল? না, আমার তা মনে নেই। শুধু মনে হয়েছিল, একবার বুক ভোরে যদি আমি এই মানুষটির বুকে পরে অনেক্ষন কাদতে পারতাম, হয়ত আমি আরও শান্ত হয়ে কিছু তা দিন কাটাতে পারতাম। আমি আমার মায়ের অনেক স্মৃতি মনে নেই। একজন মা একজন সন্তানের জন্য কি করে আমার জানা নাই। তবে আমি জানি একজন সন্তান তাঁর মায়ের অভাবে কি কি মিস করে। তোমার কথা মনে হল। আমি আমার ঈশ্বরের কাছে প্রান ভোরে আরাধনা করলাম, হে ভগবান, তুমি যাকে ভাগ্যবান করে রেখেছ, তাকে আবার হতভাগা কেন করবে? কি নেই তোমার যে, সামান্য একজন মানুষের অনুপস্থিতি দিয়ে তোমার আরেক প্রিয় একজন আদমকে চোখের জলে ভাসাতে চাও? তোমার হিসাব-কিতাব, তোমার চাওয়া-পাওয়ার মাঝে আমার কোন কৈফিয়ত চাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই কিন্তু আমার আরাধনা যদি কখনো মঞ্জুর কর, তাহলে আজ এই দিনে তুমি এই ঘুমন্ত মানুষটিকে তোমার মত করে আরোগ্য করে দাও। আজ এই প্রথম আমার মনে হল, ঈশ্বর আছেন, ঈশ্বরের কাছে বলার অনেক কিছু আছে। আজ কেন যেন মনে হল, আমি ঈশ্বরকে ভালবাসি কারন ঈশ্বর আমাকে তাকে ভালবাসবার এবং তাঁর সাথে রাগ করার ইচ্ছাশক্তি আমাকে দিয়েছে। তোমার ঐ কথাটিই আজ আমার কাছে বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল যেতা তুমি প্রায়ই বলতে, “আই লাভ গড বিকজ হি হ্যাজ গিভেন মি দি পাওয়ার টু হেট হিম”। কি অদ্ভুত তোমার বলার সাহস আর দাপটতা। তুমি তোমার ধর্মের উপর কিভাবে বিশ্বাস রেখেছ তা আমার বিশদ জ্ঞ্যান হয়ত নাই কিন্তু আজ আমি হাসপাতালের এই নিরব ক্যাবিনে একজন ঘুমন্ত মানুষের সামনে বসে বুঝতে পারছিলাম, ভগবান যেই ধর্মেরই হোক, তিনি সবার জন্য সমান। এই বিশ্বভ্রমান্ডে যা কিছু আছে সব তাঁর। এর রূপ, গন্ধ, এর প্রকৃতির সৌন্দর্য, এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট সবকিছু তিনি তাঁর নিজের মত করে সাজিয়েছ। এর থেকে আরও সুন্দর কিছু হতে হয়ত পারে না। গোলাপের রং শুধু গোলাপিই নয়, এর স্থান কাল তাপমাত্রা ভেদে সে তাকে আরও অনেক রূপে আকার দান করেছে। আকাশ শুধু নীলই হয় নাই, এ কখনো কাল, কখন সাদা, আবার কখনো কতই না রঙে তিনি সাজিয়েছেন। কি দরকার ছিল ঐ আফ্রিকার জঙ্গলে অত সুন্দর একটা লাল গোলাপ ফুটিয়ে রাখবার? কার জন্য কেউ জানে না অথচ তা আছে, বাস্তবেই আছে। কি প্রয়োজন ছিল এরিজোনা নদীর তিরে কোন এক ইউকেলিপ্টাস গাছে চুরায় সুন্দর সবুজ টিয়ার বাসা করে দেয়ার? কি প্রয়োজন ছিল ঐ গহিন সমুদ্রে পানির শতশত ফুট নিচে লাল নীল, বিভিন্ন রঙের সারি সারি দুবলা গাছ সৃষ্টি করবার? সবই রহস্য। তাঁর এই রহস্য সন্ধানে আমার শক্তি নাই। আরেক জলজ্যান্ত রহস্য তো এখন আমার সামনে। তিনি তোমার মা। সারাটি বিকাল আমার কেটে গেল কোন এক ঘোরের ভিতর। তুমি এলে সন্ধ্যার পর। ধুপ জ্বালাবার কোন কায়দা নেই এখানে, প্রভুর কাছে রিতি মোতাবেক প্রার্থনা করবার কোন প্রসাদ নাই এখানে। এখানে যার যার ভগবান তাঁর তাঁর অন্তরের একান্ত ভিতরে। এখানে জীবনের আরাধনা চলে, হোক সেটা মৃত্যুর অথবা জন্মের। কেউ হাসিমুখে বাড়ি ফেরে আবার কেউ অশ্রুসিক্ত নয়নে। কি অবাক না!! চোখের জলের ভাষা দুটুইঃ আনন্দের অথবা কষ্টের।

-মাধুরী, মা কি কোন সাড়া শব্দ করেছিল এরই মধ্যে? তোমার তো আজকের দিনটা এখানে মায়ের সঙ্গে থাকতে হবে, আমি তোমার হোস্টেল সুপারকে খবরটা দিয়ে এসেছি যে তুমি আজ আসছ না। আমি তোমার বন্ধুদেরকেও খবরটা দিতে বলেছি। তুমি দুশ্চিন্তা কর না। আমি হয়ত কাল থেকে মায়ের সঙ্গে থাকতে পারব। আমার পরিবর্তে আমার এক খালা আসবে কাল গ্রাম থেকে। তখন তুমি আবার তোমার হোস্টেলে চলে যেতে পারবে।

কথাগুলো তুমি এমন করে বললে যেন, আমি আজকের দিনের জন্যই শুধু প্রয়োজন, কাল থেকে আমার কোন দরকার হবে না। তোমার মন খারাপ হবে ভেবে আমি তোমাকে কিছুই না বলে শুধু বলেছিলাম, আমাকে নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা। যতদিন মা এখানে থাকবে, আমি থাকতে পারব। শুধু আমার কিছু পরিধেয় কাপড়চোপড় বাসা থেকে নিয়ে আসতে হবে। আমি আসলে এই অসামান্য মানুষটির পাশে থাকতে চেয়েছিলাম।

অনেক রাত অবধি তুমি ছিলে ওখানে। যাওয়ার সময় মনে হল, তুমি যেন শরীরটা নিয়ে বাসায় যাচ্ছ আর মনটা দিয়ে গেলে আমার হাতে। তোমাকে আমার বড্ড মায়া করতে ইচ্ছে করেছিল। আজকের তুমি কত ভিন্ন। আমি তোমার এই রূপটা কখনো দেখি নাই। কখনো দেখেছি তোমার গলা ধরে এসেছে মায়ের কথা বলতে বলতে, কখনো দেখেছি তোমার চোখের পাপড়ি গুলো ভিজে যাচ্ছে চোখের অসংবরিত নোনা জলে, আবার কখনো দেখেছি তুমি কতটা উদার আমার প্রতি যাতে সব কিছুর বিনিময়ে হলেও যেন আমি তোমার মায়ের সমস্ত দেখভালটা করি। কখনো মনে হয়েছে তুমি কতটা স্বার্থপর। শুধু তুমি তোমাকে নিয়েই ভাব। একবারও ভাব নাই যে আমিও তো এখানে তোমার মায়ের কষ্টে ব্যথাতুর হয়ে আছি।

তুমি চলে গেলে। আমি একা বসে আছি মায়ের পাশে। দেয়ালে থাকা ফ্লরসেন্ট বাতিটা নিভিয়ে দিয়েছি। টেবিল ল্যাম্পটা জলছে আধোআধো ভাবে। হটাত দেখলাম, মা নরতে শুরু করেছেন। মনে হল তিনি জেগে উঠছেন। যতই তিনি নড়াচড়া করছেন, আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন ততই কেঁপে কেঁপে উঠছে। কখনো মনের আনন্দে, আবার কখনো অজানা এক ভয়ে। আনন্দ এই কারনে, তাঁর নড়াচড়া আরোগ্য লাভের জন্য ভাল লক্ষন, কিন্তু ভয় এই কারনে তিনি কখন আমাকে দেখেন নাই। আমি মায়ের ডান হাতটি আলতো করে চেপে ধরলাম। মনে হল একটা অবলম্বন ধরেছি। উত্তাল সমুদ্রে যখন প্রকান্ড জাহাজটি ভেঙ্গেচূরে খান খান হয়ে আশ্রয়ের সমস্ত ভরসা উবে যায়, কেউ যখন আর কোন আশ্রয়ের অবলম্বন না পেয়ে প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর ভয়ে আতংকিত হয় উঠে, তখন কোন অজানা দূর থেকে ভেসে আসা হয়ত ঐ জাহাজেরই ছোট্ট একটা কাষ্ঠ খন্ডও আতঙ্কের নিরাময় হয়ে স্বস্থির আভাষ হয়ে উঠে। মায়ের হাত ধরাটাও যেন আমার কাছে তাই মনে হল। 

মা বেশ কিছুক্ষন পর যেন তাঁর অসম্ভব ক্লান্তি ছাড়িয়ে চোখ মেললেন। তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। অপলক দৃষ্টিতে তিনি আমাকে দেখছেন। আমিও। কি সুন্দর তাঁর চোখ। কি অদ্ভুত তাঁর চাহনি। আমার ভিতরে কাল বৈশাখী ঝরের মত দিক বিদিক শুন্য এক তান্ডব বয়ে যাচ্ছিল। আমি শুধু তাকিয়েই ছিলাম মায়ের দিকে। মা শুধু অপলক পলখিন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার হাতে ধরা তাঁর হাতটি আরও শক্ত করে ধরে থাকলেন। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, আমি আর তাকে ভাল ভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কখন যে আমি তাঁর বুকে মাথাটা রেখে জরিয়ে ধরেছিলাম আমার কোন কিছুই মনে পরে না। শুধু মনে পরে, কর্তব্যরত নার্স এসে আমাকে বললেন, আপা, আপনি ইচ্ছে করলে পাশে বিছানায়ও কিছুক্ষন বিস্রাম করতে পারেন। আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আমি আর তাকে এটা বলার কোন প্রয়োজন মনে করলাম না যে, আমি ক্লান্ত নৈ, আমি ভাল আছি, কারন মা ভাল আছে। আর মা ভাল থাকলে তুমি ভাল থাকবে। ভগবান বড় রসিক। তাঁর রসিকতায় চোখের জল আর মনের আনন্দ সব একাকার হয়ে যায়।

যে কয়টা দিন আমি মায়ের সঙ্গে থেকেছিলাম, আমার জীবনে ওটা ছিল শ্রেষ্ঠ সময়। আমি জানিনা মা আমাকে কতটা আপন করে নিয়েছিলেন, কিন্তু আমার কাছে মা ছিল একটা শ্রেষ্ঠ উপহার। তুমি ঠিকই বলতে, তোমার মা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম একজন মা। তাঁর তুলনা তিনি নিজে। সকালে উঠে তিনি প্রতিদিন আমাকে বুকে জরিয়ে চুমু খেয়েছেন। রাতে শোবার সময় বলতেন, আমাকে জড়িয়ে ঘুমাবে। আমার কাদতে ইচ্ছে করত এইভেবে যে, এই একান্ত সময়টা আমার খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। মা আমাকে কখনো কিছু জিজ্ঞ্যেস করতেন না কে আমি বা কি বা আমার সম্পর্ক তোমার সাথে। শুধু প্রথম দিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার পরিবারের কথা। হয়তবা আমার মা স্বর্গীয় হয়েছেন, বাবা তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সুখে আছেন, আমি একটা মহিলা হোস্টেলে থাকি, এই জেনে আর কিছুই তাঁর জানার প্রয়োজন ছিল না। তোমার মা আমাকে আদর করে কি এক অদ্ভুত নামে ডাকতেন যার অর্থ আমি কখনই হয়ত জানব না কিন্তু আমার তাঁর এই দেয়া নামতায় কোন আপত্তি ছিল না বরং আমার খুব মনে ধরেছিল। তোমাকে আজ ঐ নামটা মনে করিয়ে দিতে চাই না কারন তুমি সেটা যে ভুলে যাও নি তা আমি জানি।

মা সেরে উঠলেন চারদিন পর। আমি এই কয়দিনে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি হোস্টেলে থাকি, আমাকে আবার হোস্টেলে ফিরতে হবে। মা আমাকে তোমাদের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। মা আমাকে জোর করেন নি, আমাকে যেতে হবে মায়ের সঙ্গে তোমাদের বাসায়, এই কথাটা এমন করে বলেছিলেন যে, আমার সাত জনমেরও সাধ্যি ছিল না এর কোন ব্যাতিক্রম হয়। হাসপাতালের আয়া থেকে শুরু করে নার্স, পাশের ক্যাবিনের রোগীরাও মায়ের এই প্রত্যাবর্তনে যতটা না খুশি হয়েছিল তাঁর থেকে বেশি যেন কষ্ট পেয়েছিল এই ভেবে যে, তারা সবাই মাকে মিস করবে। মাকে দেখে বুঝলাম, মানুষকে আপন করে নেওয়ার জন্য অধিক সময়ের দরকার হয় না। দরকার শুধু মানবিকতা আর নিঃস্বার্থ ভালবাসা।

মাকে নিয়ে তুমি তোমাদের বাসায় এলে। সঙ্গে আমি। এই প্রথম আমি তোমাদের বাসায় এলাম। রবিন্দ্রনাথের জমিদার বাড়ির মত না হলেও দেখলাম বাড়িটা অনেক বড়। তোমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে একটা পুকুর ঘাট আছে। পুকুর ঘাটের সামনের রাস্তাটা তোমাদের বাড়ির সদর দরজার ঠিক উল্টো দিকে গিয়ে মিশেছে। কেউ রাতে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও অসুবিধা নাই, পুকুর ঘাট থেকে সোজা বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছতে পারবে। মাঝে দুইটা সেই পুরানো মডেলের রাজা বাদশার আদলে বাতি আছে। মোটা মুটি তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট উচ্চতা। পুকুরের চারিধারে বসবার জন্য কয়েকটি আধা পাকা বেঞ্চের মত করে দেওয়া আছে। প্রতিটি বেঞ্চই কোন না কোন একটা গাছে নিচে। বাড়ির সামনে একটা ছোট বাগান। অনেকদিন এই বাগানে মালির হাত পরেনি বুঝা যাচ্ছে। তাঁর মধ্যে বৃষ্টির সিজন। বর্ষার পানি আর যথেষ্ট পরিমান আলো বাতাস পেয়ে বাগানের আগাছাগুলো লিক লিক করে সবার অন্তরালে অল্প সময়ের মধ্যে যার যার স্থান করে নিয়েছে। বুঝা যায়, বাগানে অনেক অতিথি পোকাদের আনাগোনা হয়েছে। এরাও এই জায়গাটাকে প্রান মুখর করে রেখেছে। বাড়ীটার উত্তর ধারে আছে প্রকান্ড একটা জাম গাছ। এখন ফলের সিজন শুরু হয় নাই কিন্তু পাপড়ি, কুড়ি গজানোর সময়। তাই জাম গাছেও থোকায় থোকায় কিছু নতুন কুড়ি এসেছে। আর এদের সঙ্গে চিরাচরিত পরকিয়া প্রেমিকের মত কিছু মধু আহরণকারী পোকা মাকরের সর্বদা ভীর রয়েছে। জাম গাছটিও আর একা নয়। তাঁর উপরের মগ ডালে নিতান্তই সাধু বাবার মত, ভদ্র পরিবেশ বানিয়ে কয়েক জোড়া বাবুই পাখী তাঁর সুনিপুণ কৌশলে বানান ঝুলন্ত কয়েকটি বাসা মোটা মুটি পাকা পোক্ত করেই যেন চিরস্থায়ি বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। এক পাশে অনেক পুরানো দিনের পরিত্যাক্ত একটা ডোবা। বুঝা যাচ্ছে এই ডোবাতে কেউ নামে না। এলোপাথাড়ি কচুরিপানা, কিছু গাছের মরা ঢাল, বর্জ্য পদার্থ, অনেক কিছুই চোখে আসে। আর এই ডোবাটার ঠিক আশেপাশে কিছু দস্যুপনা পাখির সারক্ষন আনাগোনা থাকে কখন ছোট্ট একটা নলা মাছ, বা কচি প্রানের একটা ব্যাঙের ছানা যেই না উকি মারে অমনি ছো মেরে ঘপ করে মুখে পুরে নেয়। পুরু বাড়িটার মধ্যে একটা প্রানের লক্ষন আছে। সবচেয়ে বেশি লক্ষ করলাম, বাড়িটা নীরবতায় পরিপূর্ণ কিন্তু নিরব নয়। দুদিন থাকতে হল।

আমার কোন বাড়ি নাই। আমার পৈত্রিক বাড়িতে আমার বিশেষ কোন কদর ছিল কিনা আমি জানি না কিন্তু আমার ঐ পৈত্রিক বাড়িটায় আমার কোন নিজস্ব নেশাও জন্মে নি। সেই ছোট বেলায় আমি যখন শেষ বার গিয়েছিলাম, তাঁর স্মৃতি আমি আজও ভুলি নাই। সেটা ছিল এক দুঃসহ এবং ভয়ংকর অনুভুতি। আমরা সবাই সন্ধ্যা পূজায় বসেছি মাত্র। এমন সময় গ্রামের কিছু লোক আর তাঁদের সঙ্গে কিছু বিশ পঁচিশ বছরের যুবক আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। লোকগুলোকে দেখে বেশ উত্তেজিত বলে মনে হল। আমার মা পুজা ছেড়ে সদর দরজার কাছে এসে একজনকে তাঁদের আগমনের কথা জিজ্ঞ্যেস করতেই পিছন থেকে এক যুবক উত্তেজিত কোথায় মাকে গালিগালাজ করতে লাগলেন। যেন ব্যাপারটা এই রকম , মা কোন অন্যায় করেছেন, তাঁর বিচার চাওয়া হচ্ছে। মা কোন প্রতিবাদ  না করে আগত এক বৃদ্ধ মুরুব্বীকে খুবই   বিনিত স্বরে কিযেন বললেন। কিন্তু ব্যাপারটা তাতেই মিটে গেল বলে মনে হলনা। হটাত হট্টগোল শুরু হয়ে গেল, আগত যুবকদের মধ্যে একঅল্প বয়েসি তরুন আমাদের বাসার দরজা আর জানালা উদ্দেশ্য করে এলোপাথাড়ি ঢিল ছুরতে আরম্ভ করল। আমার মা যথেষ্ট পরিমানে আহত হলেন, আমরা এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, পুজামন্ডপ ছেড়ে আমরা সবাই আমাদের ঘরের এককোনে ঝুপটি মেরে বসেছিলাম। অনেকরাতে বাবা বাড়ি ফিরলেন। আমার মা বাবার সঙ্গে কোন কথাই বলার প্রয়োজন মনে করলেন না। আসলে কি জন্য কি হয়েছিল আমরা কেউ কিছুই জানতে পারলাম না। শধু পরের দিন মা বললেন, আমরা সবাই নানু বাড়ি যাচ্ছি। নানু বাড়ি যাচ্ছি শুনে আমার খুব ভাল লাগছিল কিন্তু আমার মায়ের খুব মন খারাপ, ব্যাপারটা আমাকে দোটানায় রেখেছিল, একদিকে নানু বাড়ি যাওয়ার আনন্দ আবার আরেল দিকে মায়ের মনের অবস্থা। ঐ যে শেষ বারের মত আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে গিয়েছিলাম, আর যাওয়া হয় নাই। আমার বাবাও আর নানুর বাড়িতে কখনো আসেন নাই। আমরা বাবাকে খুব ভয় পেতাম, তাই কি কারনে বাবা আসেন না, তাও আমরা কেউ জানতে পারিনি। মাকে জিজ্ঞ্যেস করলে মা শুধু অন্য প্রসঙ্গে এরিয়ে যেতেন। অনেক বছর জেনেছিলাম, বাবা অন্য এক নারির সঙ্গে ঘর বেধেছেন।

তোমাদের বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। সকালের রোদ যেমন অকাতরে তোমাদের পূর্ব উঠোনে এসে আছড়ে পরে, তেমনি বিকালের পড়ন্ত রোদেরও কোন কমতি নেই পশ্চিমের পুকুরঘাট থেকে শুরু করে সদর দরজার আঙ্গিনা পর্যন্ত।

যে কয়টা দিন আমি তোমাদের বাসায় থেকেছিলাম, ঐ কয়দিনের মধ্যেই শুধু তোমাদের বাড়ি নয়, আশেপাশে লোকজনের সঙ্গেও তোমার মা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সামনে পরীক্ষা, তাই কয়েকদিন পরই আমি চলে এলাম। বলতে পার তুমি, আমি কি বিদায় নিয়ে এসেছিলাম? আমার মনে পরে না এখন। সেদিন আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, আমি ঐ বাড়িটার প্রতিটি মুহূর্ত মিস করব। আমি সকালের রোদটা মিস করব, পুকুরঘাট, ঐ ডোবা, বাগান, কাকাতুয়া, বাবুই পাখী, ব্যাঙের ছানার অকি মারা, কিংবা সদ্য প্রস্ফুটিত হওয়া জামের কুড়ি সবই মিস করব। আর এগুলো কে জড়িয়ে যার সংসার, তোমার মা, তাকে আমি মিস করব আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে। আমার বুক ভরে কান্না আসছিল। তোমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে এই প্রথম তাঁর ডাকা নামতায় আজ আর ডাকলেন না, শুধু বুকে চেপে ধরে আমাকে বললেন, “তুমি আবার এসো মা,”। এতক্ষন কান্নাটা চেপে রাখতে পেরেছিলাম, এখন তোমার মায়ের মুখে আমাকে “মা” সম্বোধন তা আমার বুকে কষ্টে জমিয়ে রাখা ব্যাথাটা ভেঙ্গে শ্রাবনের বারিধারার মত আখির  অজস্র নোনাজলে এর বহিরপ্রকাশ ঘটল।

আমি যতক্ষন প্রশমিত হইনি, তোমার মা আমাকে অতক্ষনই তাঁর বুকে জড়িয়ে রাখলেন। অনি কেদেছিলেন কিনা আমাই জানি না, কিন্তু আমি যখন তাঁর বুক থেকে মাথা সরিয়ে মাকে তাকালাম, দেখলাম তাঁর মিষ্টি একটা হাসি। প্রান্টা যেন এবার সত্য জুরিয়ে গেল। বুকের ভিতরের ব্যাথাটা এখন অনেক হাল্কা লাগছে, আমি মায়ের পা ছুয়ে আশীর্বাদ নিলাম,। তারপর আমি আমার সেই চিরচরিত হোস্টেলে চলে এলাম। আবারও সেই অগোছালো এক বসবাস, একই ধাঁচের সেই নিয়মের বাড়াবাড়ি। কিন্তু কোন উপায় নেই। জীবনের অনেক কিছুই আমাদের ভাল লাগবে না , তাই বলে এই নিয়মগুলো কেটে বের হয়ে যাওয়ারও কোন উপায় নাই, যারা নিয়মগুলো বানায়, তারা নিয়মগুলো হয়ত মানার দরকার নাই বলে এর সংস্কার করারও কোন প্রয়োজন মনে করে না। কে কার জন্য কি পালটাবে বল?

তোমার সাথে আমার যথারীতি দেখা হয়, কথা হয়, তোমার মায়ের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করি, বেশ চলে যাচ্ছে আমার সেই নিঃসঙ্গ একাকী জীবনের কিছুটা সময়। বন্ধুবান্ধব ছিল কিন্তু তারা সব বন্ধুর গন্ডিতেই ছিল। অনেকে আরও গভীর ভাবে আমাকে জানতে চেয়েছিল হয়ত, আমি কেন যেন কোন কিছুই বুঝতে চাই নি। আমার সহপাঠী অনেক মেয়েবন্ধুরা এরই মধ্যে বিয়েথা করে সংসার পেতে ফেলেছে, কখনো কারো সুখের কাহিনি শুনে মুগ্ধ হয়েছি আবার কখনো কারো করুন কাহিনি শুনে বড্ড অসহায় মনে হয়েছে। আমরা মেয়ে মানুষ, পুরুসের মন জুগিয়ে চলাই আমাদের প্রধান কাজ। শুধু পুরুষ কেন, তাঁর সঙ্গে শ্বশুর, শাশুড়ি, আয়া, জায়া, দেবর ননদ সব। এমন কি বাড়ির কাজের মানুষগুলোও অনেক সময় যা পারে আমরা বউরা ঐ কিঞ্চিত ছাড় পাওয়ার আশা করাও অনেক সময় দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। এ দেশের মায়েরা আর শাশুড়িরা এক বংশের নয়। মায়েরা মনে করে, তাঁদের মেয়েটা শ্বশুর বাড়িতে জামাইকে নিয়ে খুব ভাল আছে কারন তাঁর মেয়ে যা আদেশ করে বা বায়না করে তাঁর স্বামী সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। কিন্তু তাঁর ছেলেটা একেবারে উল্টো। বউ যা আদেশ করে বা বায়না ধরে তা সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। কেন বাবা, পরের মেয়ের এত আবদার, এত কথা কেন শুনতে হবে? যেন তাঁর চেলেটা উচ্ছন্নে গেছে অথচ তাঁর মেয়ের জামাইটা কি সুবোধ বালকের মত। যা আদেশ করা হবে সব সে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। এই হচ্ছে আমাদের সমাজ। যেখানে আমরা পরিবর্তনের কথা বলি সবাইকে কিন্তু নিজে পরিবর্তন হই না। আমরা প্রত্যেককেই বলি, কেন সবাই পরিবর্তন হয় না? শধু বলি না, কেন আমি পরিবর্তন হচ্ছি না। যাক, হয় ত এটাই সামাজিক রীতি। কেউ বদল করে কেউ বদল হয়। আমারও কিছু জিনিসের বদল হল। শেষ করে ফেললাম আমার শিক্ষার জীবন। হোস্টেল জীবন বদল হয়ে গেল ছাত্রি হিসাবে। আমি জানি না কোথায় এখন আবার আবার নতুন জায়গা হবে। তুমিও কোনদিন আমাকে এই প্রশ্নটা করনি এর পর কি আমার প্ল্যান, বা কি করলে কি হবে। ছাত্রি থাকা অবস্থায় একবার ফ্রান্সে স্কলারশিপের আবেদন করেছিলাম, এর কি অবস্থা একটু খুটিয়ে দেখার ইচ্ছে হল। আমি জানি এটা আমার হবে না। আমার জাঁদরেল কোন মামা নেই, আমার বাবার এমন কোন বন্ধু নেই যার কাছে আমি গিয়ে বলতে পারি আমার সাহায্যের প্রয়োজন। অথবা আমার এমন কোন ব্যাক্তির সঙ্গে সখ্যতা নেই যাকে ধরে আমি আমার এই অবৈতনিক ধূসর গণ্ডী পার হতে পারি। তাঁর পরেও একবার খোঁজ নিতে গেলাম ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার অফিসে যদি কোন কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়। আমি আশাবাদি নৈ কিন্তু একেবারে অবসর, তাই কিছু একটা করা আর কি। একটা পানির বোতল সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম রেজিস্টারের অফিসের উদ্দেশে।

ভগবান যখন রশিকতা করেন, তাঁর রসিকতায় একটা অদ্ভুত আবেগময়ি স্পর্শ থাকে। আমার বেলায়ও হয়ত তাই হল। কি করে কি হল? আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে শুনলাম, গতকালই নাকি আমার ফ্রান্সে যাবার স্কলারশিপটা মঞ্জুর করেছে। আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না এই খবরটায়। মোট জনাদশেক আবেদন করেছিল, তাঁর মধ্যে শুধুমাত্র আমাদের দুজন এই স্কলারশিপটা পেয়েছে। তাঁর মধ্যে আমি একজন। আনন্দে আত্মহারায় আমার শরীর কাপছিল, আমি কাকে এই খবরটা দেব? কি বলব? কিভাবে বলব? এটা কি আদৌ কোন বড় খবর নাকি কোন খবরই না? আমি আমার পানির বোতলের সবটুকুন পানি খেয়েও যেন আমার তৃষ্ণা মিটছিল না। সত্যি ভগবান বড় রশিক। যখন কারো আর কোন পরিকল্পনা জানা থাকে না, তাঁরজন্য হয়ত ভগবান বিশেষ কিছু করে থাকেন যা সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে এবং সঠিক ব্যাক্তিকে তিনি দান করে আশ্বস্ত করেন। আমার এই অপরিকল্পিত জীবনে এই প্রথম মনে হল, “কোথাও কেউ নেই” এই কথাটা সত্য নয়। অন্তত ভগবান আছেন। তিনি সবাইকে তাঁর অফুরন্ত আলো বাতাসের ভান্ডার দিয়ে, এই বিশাল জলরাশির আধার দিয়ে, কোন না কোন অসহায় জীবকে নিজের পরম মমতায় অতি যত্নে সোহাগ করে তুলে নেন আর এমন স্থানে তাকে জায়গা করে দেন যা অতিশয় আরামদায়ক এবং সৌভাগ্যের। হয়ত ভগবান তাঁর নজর আমার কাছ থেকে এখনো সরিয়ে নেন নাই।

আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি, তুমি ছাড়া আর এখন তোমার পরিবার ছাড়া আমার আর কেউ নাই। আমার পৃথিবীর গোটা অঞ্চল ভাগ করলে সেই অঞ্চলে শুধু তোমাদের বাড়িটা ছাড়া আর কোন অঞ্চল এই অংশে দেখা যাবে না। আর সম্ভতবত এই কারনেই খবরটা নিয়ে আমি প্রথম যেখানে দৌরে গিয়েছিলাম, সেটা তোমার বাসায়। জীবনের মুহূর্তগুলো কিভাবে বদলে যায়, জীবনের আগমুহূর্তটা তাঁর পরের মুহূর্তের মত নয়। প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর নিজ নিজ স্বকীয়তায় পূর্ণ। একটু আগেও আমি ছিলাম ধিরস্থির, আমার কোন নিশানা ছিল না, আমার গন্তব্যের কোন আবাস স্থল ছিল না, অথচ এই মুহূর্তে আমি আর আগের মুহূর্তের মত নৈ। এখন আমি এক চঞ্চলা। মনে মনে গুন গুন করে গান গেতে ইচ্ছে করছে। কোন বিষণ্ণ ধরনের গান নয়। মনে হচ্ছে আমি নিজেই একটা গান নিজের সুরে গাইতে থাকি, “আমি যেন আজ আমি নেই, কোন এক বিশাল জগতের অম্পরা সরীসৃপ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষ কত অদ্ভুত। হয়ত এই কারনেই ভগবান তাঁর অদ্ভুত আচরনে মুচকি মুচকি হাসেন আর তাঁর রসিকতার মজা নেন।

বিকাল চারটার দিকে আমি তোমাদের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। আমি জানি এই সময় তুমি বাসায় থাক না। তোমার মা হয়ত এই সময় দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নেন। কিন্তু আমার সময় কাটছিল না। আমি হাজির হয়ে গেলাম তোমাদের বাসায়।   

অবাক হলাম মাকে দেখে। মা অন্য দিনের মত আজ দুপুরের পর খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম নেন নি। কি যেন নিয়ে খুব ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আমি ঢোকতেই একটা সুন্দর মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “এস মা এস, ভালই হল, তুমি এসেছ”। আমি মাকে প্রনাম করে তাঁর পাশে গিয়ে বসতেই আমাকে একটা এ্যালবাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখত মা, মেয়েটা কি রকম দেখতে?” ধক করে উঠল যেন আমার বুকটা। আমার এতবড় একটা আনন্দের দিনে, মনভরা এতটা সুখি বুকে হটাত করে যেন পিছন থেকে শতটনি একটা গাড়ী আমার পাজরের সব গুলো হাড় চুরমুর করে বাকিয়ে দিচ্ছে। বুঝতেই পারলাম না কোথা থেকে কখন ঐ শত সহস্র ওজনের একটা দানব আমার অজান্তে আমার এত কাছে এসে কত বত ধাক্কাটা দিয়ে গেল। সামলাতে একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেও ব্যাপারটা নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখতে পারলাম। “আকাশের জন্য মেয়ে দেখছি, এগুলো ঐ মেয়েটারই ছবি। দেখত মেয়েটা কেমন দেখতে?” আমি ছবি গুলো দেখতে দেখতে মা কথাগুলো বলছিলেন। বড্ড সুন্দর একটা মেয়ে। ঠোটে লাল লিপিস্টিক এর পাশ দিয়ে চমৎকার লাইনার টানা। মনে হয় কোন আর্টিস্ট যেন খুব সন্তর্পণে তাঁর ঠোঁটের ঐ লিপিস্টিকগুল অতিশয় যত্নের সহিত একে দিয়েছেন। মাথার চুলগুলো পরিপাটী করে সাজানো। ক্যামেরার আলো প্রতিফলিত হয়ে চুলের এক অংশে একটা আলোর ঝলকানির সৃষ্টি করেছে। কানের দুলটি গ্রীবার পাশ পর্যন্ত ঠেকে আছে। তাঁর মধ্যে অসংখ্য যাদুকরী কারুকার্য। চোখ দুটো নিরব চাহনি দিয়ে তাঁর মাদকতার রূপ জাহির করছে। অদ্ভুত সুন্দর সে চাহনি। মিস্টি মুখের একটা ছাচ। গোলগাল কিন্তু অপূর্ব মায়াবতী। যে কারোরই পছন্দ হবে মেয়েটিকে। কয়েকটি ছবি পূর্ণ অবয়বে তোলা। বেশ লম্বা বুঝা যায়। আকাশের সঙ্গে মানাবে। একটা ছবিতে একটা ছোট গাছের আড়ালে দাড়িয়ে। আরাল করে দারালেও তাঁর রুপের কোন অংশই লুকানো সম্ভব হয় নাই। পিছনের সবুজ ঘাসের সঙ্গে আর অপরূপ কিছু রঙ্গিন পাতাগাছের পাশে তাঁর সবুজাভাব শাড়ির অদ্ভুত একটা মিল রয়েছে। নারীরা আসলে সুন্দরের প্রতিক। ভগবান এদের বানিয়েছেন অতি আদর করে , মায়াবতী রূপ দিয়ে। কেউ এদের নোনাজলে ভাসিয়ে কর্দমাক্ত করে দিলেও তাঁর অন্তরের রুপ্টা হয়ত একেবারে বিলিন হয়ে যায় না। এর শ্মশানের মত পাসান নয়, আবার মমের থেকেও নরম। এদের গলিয়ে আরেক রূপ দেওয়া যায় আবার শুকিয়ে গেলে বর্জ্য ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

বললাম, “মেয়েটি দারুন দেখতে। আকাশের সঙ্গে মানাবে।”

তোমার মা আমাকে চুমু খেয়ে বললেন, “দেখিস, তোর আকাশ সুখি হবে।”

আমার চোখ ভিজে এল মায়ের কথায়। “আমার আকাশ”। হ্যা, তাই তো, তুমি তো আমারই আকাশ। ঐ আকাশেই তো আমার সর্বদা বিচরন। আমি যখন খুশি উরতে পারি, আবার আমার যখন মন খারাপ থাকে, ঐ আকাশ থেকেই তো বৃষ্টি আসে। আবার কখনো কখনো ঐ আকাশের মাঝে জলন্ত সূর্যটাই তো আমাকে পুরিয়ে ছারখার করে দেয়। অনেকক্ষন মায়ের সঙ্গে কাটালাম। আমি আমার খবরটা তখনো মাকে দেই নাই। কি বলব মাকে? আমি চলে যাচ্ছি? আমি কোথায় যাব?

সন্ধে হয়ে এল। হোস্টেলে ফিরতে হবে। অনেক কাজ হয়ত বাকি। রেজিস্ট্রার সাহেব আমাকে একখানা ফর্দ হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। অনেক কাগজপত্র যোগার করতে হবে। আমি ফিরার পথে মাকে বললা, “মামা, আমারহয়েছে  স্কলারশিপ আমার  ফ্রান্সে। খুব  খুব শিগ্রই  হয়ত যেতে হবে। তুমি দোয়া কোর।”

“সে কিরে? আকাশের বিয়েতে তুই থাকবি না?” মা আমার এই খবরটায় যতটা না খুশি হলেন, মনে হল তাঁর থেকে বেশি বিচলিত হলেন আমার চলে যাবার কারনে হয়ত আকাশের বিয়েতে আমার ভুমিকা নিয়ে।

আর যাই হোক মা তো। মায়েরা নিজের সন্তানের অন্তর যত টা বুঝে তারা অন্য সন্তানের অন্তর অতটা হয়ত বুঝেন না। ওনি তো আকাশের মা।

আমি চলে এলাম আমার হোস্টেলে। মনটা আজ নানা কারনে এতটাই আলোড়িত ছিল যে কখনো উত্তপ্ত টাইফুনের মত আবার কখনো ধুম্রজাল নাটকের মত খসখসে, আবার কখনো বৈশাখীর পড়ন্ত বিকালের আমেজের মত, কখন জানি কেমন বুঝা যাচ্ছে না। আমার স্কলারশিপ আমাকে অতিশয় আবেশিত করে ফেলেছিল, আবার আকাশের বিয়ের পাত্রি দেখে আমার মন যেন কোথায় স্থির হয়ে গিয়েছিল। টিভি অন করে মনটা বদলের চেষ্টা করলাম। প্রথমেই একটা গানের কলি শুনে মনটা আরও বিষণ্ণ হয়ে গেল, নজরুলের ঐ বিখ্যাত গান, “আমার যাবার সময় হল, দাও বিদায়…” পৃথিবীর কোন একটা মুহূর্ত আরেকটি মুহূর্তের মত কখনই নয়। এরা সবায় যার যার বেদনায় বা উল্লাশে ভরপুর। খেতে ভাল লাগছিল না। না খেয়েই শুয়ে পড়লাম।

একটানা এগার দিন আর আমি তোমার সঙ্গে অথবা তোমাদের বাড়ির সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখিনি। সত্যি আমি আমার স্কলারশিপের যাবতীয় কাগজাদির জন্য হন্যে হয়ে এক প্রান্ত ঠেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেরিয়েছি। মনে হয়েছে শধু আমার হাতে সময় অনেক কম, কেন জানি মনে হয়েছে আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। যে করেই হোক আমি তোমার বিয়ের আগে এই সমাজ, এই দেশ, এই রীতিনিতি, এই শাশনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাব। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

আমার স্পষ্ট মনে আছে। দিন্টি ছিল ইংরেজির ১৮ তারিখ আর বাংলায় ২৯ শে বৈশাখ। আমার সব কিছু ঠিক হয়ে গেল। আমি চলে যাচ্ছি সেই সুদুর অপরিচিত কোন এক মহলে যেখানে আমি কারো ভাষা বুঝি না, আমার কেউ পরিচিত নাই, আমি ইচ্ছে করলেই মন খারাপ থাকলে তোমার মায়ের মত এমন একজন মানুষের কাছে আমি ছুটে যেতে পারব না। তারপরেও আমি সস্থি পাচ্ছি এই ভেবে, আমার নতুন জীবনে কেউ আমাকেও চিনে না। আমি শেষ বারের মত তোমার কাছে এসেছিলাম তোমাদের বাসায়।

মাকে প্রনাম করলাম, বড্ড কান্না পাচ্ছিল। মা আমাকে কত কথা বললেন। খুব আদরে আদরে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

তোমাদের বাসা থেকে বের হবার সময় তোমাকে একবার প্রনাম করতে খুব মন চাইছিল। মন যা চাইল, আমি তাই করলাম, এই প্রথম আমি তোমাকে প্রনাম করতে গেলে তুমি আমাকে বারন করতে গিগে জড়িয়ে ধরলে। আমি অবশ শরিরে শুধু কান্নাই করে যাচ্ছিলাম। তুমি আমাকে কখনই এই ভাবে জড়িয়ে ধর নাই। তুমি আমার আকাশ, এই প্রথম আমি আমার আকাশকে এত কাছ থেকে বুকের মাঝে ধারন করতে পারলাম। তুমি কি আমার ভিতিরের কোন কম্পন অনুভব করনি? তুমি কি কখনই বুঝতে পারনি যে আমার ভিতরের মাধুরী আজ তোমার আকাশ থেকে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? হয়ত বা পেরেছ, হয়ত বা পারনি।

বিশাল এয়ারপোর্ট। আমি কখনো এই এয়ারপোর্টে আসি নি। আসার দরকার হয় নাই। কত লোক এই এয়ারপোর্ট দিয়ে তাঁদের গন্তব্য পরিবর্তন করে, আমিও আজ আমার জীবনের আরেক গন্তব্যের উদ্দেশে নিজে দেশ ছেড়ে, নিজের সমস্ত স্মৃতি পিছনে ফেলে, যত মায়া মহব্বত, ঘৃণা, আক্রোশ, ক্রোধ, অবিচার, অন্যায়, কিংবা ভাল বাসা, আবেগ, অথবা মনের সব জালা জন্ত্রনা ছেড়ে আমি পারি দিচ্ছি অন্য আরেক অপরিচিত দেশে যেখানে আমার কেউ নেই।

প্ল্যান টেক অফ করেছে। দ্রুত স্থান পরিবর্তন হচ্ছে, ঘাস, গাছ পালা, বিশাল অট্টালিকাগুলো নিমিসের মধ্যেই আমার থেকে পিছনে পরে যাচ্ছে। আমার মনটা একেবারে শান্ত, কিন্তু কোথায় যেন চিন চিন করে ব্যাথা অনুভুত হচ্ছে। আমার পাশে বসা একজন ষাট বছরের বৃদ্ধা তাঁর সিটে আরাম করে বসবার জন্য ঘন ঘন নারাচরা করছেন। আমরা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের মাটি ছেড়ে অনেক উপ্রে উঠে গেছি। আমি এখন আকাশে। এই আকাশ আর শে আকাশ এক নয়। আমি ইচ্ছে করলেই এই আকাশে ঝাপ দিয়ে বুকে পরতে পারি না, তারপরেও এর নাম আকাশ। আকাশ কত বিশাল, চারিদিকে শুধু সাদা মেঘের আভা। মনে হয় যেন সাদা মাটির এক দেশ। কেউ কোথাও নেই, শুধু সাদা মাটি। 

০১/০৬/২০১৬-গল্পটা যদি এমন হতো?

এক যে ছিল রাজকুমার, আর এক যে ছিল রাজকুমারি। রাজকুমার রাজকুমারিকে আর রাজকুমারি রাজকুমারকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু হটাত করে কোন এক দিন রাজকুমার হারিয়ে যায়। দিন যায়, রাত যায়, মাস যায় বছর আসে, বর্ষা যায় শিত আসে, রাজকুমারি পথ চেয়ে বসে থাকে। কিন্তু রাজকুমারের কোন হদিস মেলে না। চোখের সবগুলো স্বপ্ন নিয়ে আর অশ্রুভরা নেত্রে রাজকুমারি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জস্না দেখে, চাদের পানে চেয়ে ঐ চাদের বুরির সঙ্গে একাই কথা বলে।  কত রাজ কুমার এলো গেলো। কিন্তু রাজকুমারীর কোন রাজকুমারের প্রেমেই পরতে পারলেন না। তার রাজ্য চাই না, জহরত চাই না, সোনার পালঙ্ক চাই না। তিনি শুধু রাজকুমারের জন্য পথ চেয়ে থাকেন।

একদিন হটাত কোন এক বসন্তের সকালে মাথা ভর্তি এলো মেলো চুল নিয়ে, উসুখুসু খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে রাজকুমার এসে হাজির। রাজকুমারি তার জীবনের সব আনন্দ আর ভালবাসা দিয়ে রাজকুমারকে জরিয়ে ধরে শুধু বললেন, আমাকে একা ফেলে তুমি কোথায় গিয়েছিলে রাজকুমার? আমি তো তোমার পথ চেয়েই এতটা দিন, এতটা সময় পার করে দিয়েছি, একবারও কি মনে পরে নাই আমায়? তুমি কি আমার ভালোবাসার স্নিগ্ধ ঘ্রান কখনোই পাও নাই রাজকুমার? এই বুকে কান পেতে দেখ, কি উত্তাপ আর কি যন্ত্রনা নিয়ে আমি এই এতগুল বছর তোমার প্রতিক্ষায় অপেক্ষা করে আছি! আমাকে তুমি তোমার বুকের ভিতরে একটু জায়গা দাও রাজকুমার। আমি বড় ক্লান্ত, আমি আজ অনেক অবসন্ন। আমাকে জোর করে ধরে রাখ এবার। আমি তোমাকে আর কখনো হারাতে চাই না কুমার।

রাজকুমার তার পকেট থেকে একটি ছোট ঘাস ফুল বের করে রাজকুমারির ঘন কালো চুলের খোঁপায় গুজে দিয়ে বললেন, এই হোক সাক্ষী আজ তোমার আর আমার প্রেমের আলিঙ্গনের। আমাদের সুতীব্র ভালোবাসার।

দিন যায়, রাত যায়, বড় ভাল জীবন কাটছিল রাজকুমারের আর রাজকুমারির। একদিন হটাত রাজকুমারের অন্তর্ধান হয়। রানী আবারো একা বসে থাকেন ঐ বেলকনির রেলিং ধরে। সন্ধায় চিল কাতুরের ডাকে তার মন ভারি হয়ে আসে। জোনাকির ডাকে তার সব অতিতের কথা মনে হয়। মনে হয় রাজকুমার তার পাশেই হাত ধরে বসে আছেন। কিন্তু না। সব আশা, আহ্লাদ, সব স্মৃতি মলিন করে দিয়ে তার গরভের অনাগত সন্তানের নড়াচড়ায় সম্বিত ফিরে আসে।

আজ নতুন রাজকুমার এসেছে তার জীবনে। হাটি হাটি পা পা করে ছোট রাজকুমার বড় হতে থাকে। একদিন সে কথা বলতে থাকে। ছোট রাজকুমার কে মা রাজকুমারি কতই ই না গল্প শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে দেন। কিন্তু রাজকুমারি সব সময় একই গল্প বলতে থাকে……… এক যে ছিল রাজা আর এক যে ছিল রানী। তাদের ছিল এক রাজপুত্তর। রাজপুত্রকে নিয়ে রাজা আর রানী বড় ভালবাসায় জীবন কাতাইতেছিলেন। একদিন হটাত করে রাজা হারিয়ে যান কোন এক গহিন জঙ্গলের ভিতর। রাজপুত্র ধীরে ধীরে বড় হয়। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, মা আমার বাবা কই? রানী চোখের জল মুছে ছোট রাজপুত্রের কপোলে চুমি খেয়ে বলেন, তোমার বাবা একদিন ঘোড়ায় চরে টকবক করে ঐ গহিন জঙ্গল থেকে আমাদের নিতে আসবেন। তুমি বড় হও। রাজা ফিরে না এলে আমরাই তাঁকে খুজে আনবো। ছোট রাজপুত্র ঐ গহিন জঙ্গলের রহস্য বুজে উঠতে পারেন না। শুধু মাকে জরিয়ে ধরে থাকে আর বলে, মা আমি তোমায় খুব ভালবাসি।

৩১/০৫/২০১৬-যেদিন দেখবেন আকাশের মেঘ মালা

যেদিন দেখবেন আকাশের মেঘ মালা আপনার জগতের কাছে শেষ বর্ষণ হয়ে আপনার পায়ের কাছে টাপুর টুপুর করে লাফিয়ে পরছে, যেদিন দেখবেন ঐ পাশের জঙ্গলের ভিতর অবহেলায় কোন এক রজনি গন্ধার সুবাস আপনার নাশারন্দ্রে ভেসে আসছে, যেদিন দেখবেন চারিদিকের মানুষ গুলো আপনাকে দেখে কোন কারন ছারাই আর আপনাকে সেই আগের মত করে দেখছে না কিন্তু মিটি মিটি করে হাসছে আপনার নতুন ভালোবাসার অববয়বে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীতে আরও অনেক বছর বাচতে ইচ্ছে করবে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীর সব রঙ সুন্দর, যেদিন মনে হবে আপনার হাসতে ভাল লাগে, কাদতে ভাল লাগে, একাকী বসে জানালায় পাখি দেখতে ভাল লাগছে, অথবা যেদিন দেখবেন চোখের জলের মধ্যে অফুরন্ত কষ্টের মাঝেও মন বড় উতালা হয়ে আছে কোন এক অস্পৃশ্য মানুষের জন্য, যেদিন দেখবেন সোনালী রোদ আপনাকে উদ্ভাসিত করে, যেদিন দেখবেন জোড়া শালিক না দেখেও আপনার মনে হবে এই বুঝি আজকে ও আসবে, সেদিন আপনার এই অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে দেখবেন মাঘের পরে ঐ দিগন্তে দাড়িয়ে আছেন তিনি যাকে আপনি এতদিন ধরে খুজছেন। আপনার আর কোন কিছুর জন্যই কাউকে কিছুই বলার নাই। শুধু আপনি আর থাকবে বনলতা সেনের মত সেই মানুষটি, বলবেন তখন, ………এতদিন কোথায় ছিলেন? 

বলুন না কোথায় তাঁকে দেখেছেন প্রথমবার?

৩০/০৫/২০১৬-অপেক্ষার অনেক নাম

অপেক্ষার অনেক নাম। কখনো কষ্ট, কখনো সুখ, কখনো উদাসীনতা আবার কখনো শুধুই ভালবাসা। আজ আপনার এই অপেক্ষার নাম কি সুখ আর ভালবাসা? সার্থক হোক সে মিলন, আর সার্থক হোক আপনার চিত্ত। অহংকারীরা দেখুক আপনার দিবসের মুখদ্ধকর সীমাহীন আনন্দের চ্ছটা আর নিন্দুকেরা জ্বলে পুড়ে মরুক নিজ দাবগাহনে। আপনার ইচ্ছাই আপনাকে নিয়ে যাবে স্বর্গের ঐ নীল জানালায় যেখানে বসে আপনি রাতের কালো আকাশে ধ্রুবতারা দেখবেন আর নিজেকে অস্পৃশ্য কোন এক মানুষের পাশে ঠায় দাড়িয়ে অরুন্ধতী হয়ে কাল পুরুষকে ছারিয়ে সকালের লাল সূর্যের দিগন্ত রেখা ছুয়ে দেবেন। আমার সকল শুভ কামনা রইল আপনার জন্য। আপনার সবার জন্য।

২৭/০৫/২০১৬-বিশ্ব রাজনিতিক এর সাথে

আমার একবার এক বিশ্ব রাজনিতিক এর সাথে খুব কাছ থেকে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তিনি এই বিশ্ব রাজনীতির সব সমস্যা, সব পলিসি, রাজনৈতিক লীলাখেলার সবগুলুর সঙ্গেই কোন না কোনভাবে জরিত থাকেনই। কোন এক অবসর মুহূর্তে আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কখনো কষ্টে থাকেন কিনা। আমার এই প্রশ্ন করার কারন ছিল। তার কোন কিছুর অভাব নাই, তার সম্পদের অভাব নাই, তার মানসম্মানের কোন কমতি নাই, তাকে অন্যান্য বিশ্ব রাজনীতিবিদরা কাছে পেলে তাদের নিজের জীবনও ধন্য হয়ে যায় এমন একটা ব্যাপার। তারজন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নামিদামী ডাক্তাররা সবসময় স্ট্যান্ডবাই থাকেন, এমনকি এয়ারফোর্স ওয়ানের মত বিমানও স্ট্যান্ডবাই থাকে। তারজন্য তো কোন কষ্ট থাকার কথা নয়।

তিনি বড্ড রসিকলোক কিন্তু খুব জ্ঞ্যানি লোকও বটে। অনেক্কখন ভেবে চিন্তে এক কাপ কফি নিজের হাতে বানিয়ে আর আরেক কাপ কফি আমার জন্য নিজেই বানিয়ে নিয়ে বললেন-তুমি কি কষ্টে আছো? বললাম, না, ওতটা কষ্টে নাই তবে আজকাল অনেক এই যুগের ছেলেমেয়েদের কথা শুনে মনে হয় তারা অনেক কষ্টে আছে। আপনি তো এই যুগেই এখন বাস করেন, আপনি কোন কারনে কষ্টে আছে কিনা।

একটু মুচকি হেসে বললেন, কয়টা যুদ্ধ দেখেছ জীবনে? আফগানিস্থান দেখেছ, ইরাক দেখেছ, কসভ দেখেছ, কিন্তু কখনো কি নিজের ঘরের পাশে ঐ বস্তির ছেরা কাপড় পড়া এতিম কোন বাচ্চার অথবা পিতামাতার বিচ্ছেদজনিত কারনে কোন শিশুর একাকীত্ব অথবা নিছক পয়সাকরির অভাবে সামাজিক দুর্বল কোন পরিবারে বেড়ে উঠা মানুষদের ভিতরের অনুভুতি দেখেছ? সেটা কোনো যুদ্ধের থেকে কম নয়।

আজ থেকে বহু বছর আগে আমি এই এমন একটা পরিস্থিতিতে তিলে তিলে বড় হয়েছি। কখনো মনে হয়েছে আমার কেউ নাই, কখনো মনে হয়েছে যারা আছে তারা আমাকে কিছুই বুঝে না। একবেলা খাবারের জন্য আমাকে যেমন নিজে উপার্জন করতে হয়েছে কখনো মুটে হয়ে, আবার কখনো পাশের বাড়ীর কোন ফরমায়েশ খেটে। আবার জীবনে বড় হতে হবে এই আখাংখায় আমি স্কুলেও অনুপস্থিত না থাকার চেষ্টা করেছি প্রতিনিয়ত। আমি যাদের সঙ্গে স্কুলে যেতাম, আমি তাদের সৌখিন কাপড় চোপর পড়া দেখে নিজেকে কখনো মনে হয়েছে, আমার এই জন্মের জন্য তো আমি দায়ি নই, অথবা আমার এই দৈন্যের জন্য তো আমি দায়ি নই। আমিও তো হতে পারতাম তাদের কোন এক ধনাঢ্য পিতার একমাত্র সন্তান। কিন্তু না, আমি কোন ধনাড্য বাবার সন্তান ও নই, আবার আমার কোন ধনি আত্মীয়ও নাই। আমাকে দেশ ছারতে হয়েছে কপাল ফেরানোর আশায়। আমি পরভূমে বড় হয়েছি অনেকের ছত্রছায়ায়। এমন কি আমি আমার ধর্মটাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে কোন এক উচু ধাপের সিরিতে উঠার আশায়।

প্রেম কি জিনিস, একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের যে প্রেমের অনমদনা তা যে আমার ছিল না তা নয় কিন্তু আমার সেই সাধ্য করার মত পরিস্থিতিও ছিল না। মনে হয়েছে সত্যি কষ্টে আছি।

আজ আমার সব হয়েছে। কোন কিছুর কমতি নেই আমার। আমি যা চাই না, তাও আমি পাই। এর থেকে বেশি কেউ পায় তা আমার জানা নাই। কিন্তু হ্যা, এই যে বললে, আমি কখনো কষ্টে থাকি কিনা? আমি যখন কোন এক পল্লিগ্রামে যাই, আমি যখন কোন এক এতিমখানার বস্তিতে যাই, আমি যখন কোন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় যাই, আমার তখন ঐ যে ফেলে আসা আমার অতীত জীবনের যে কষ্ট, যে অনুভুতি আমার এই সারা জীবনের স্মৃতির মধ্যে জমা হয়ে আছে, তারা আবার উঁকি দেয়, আমি তখন সত্য সত্যি কষ্টে থাকি। কিন্তু এ অনুভুতি আমার প্রকাশের কোন ভাষা নাই শুধু কিছু সাহায্যের হাত বারিয়ে দেয়া ছাড়া।

তোমরা এখন কষ্টে থাক এই কারনে যে, হয়ত কোন এক ছেলে কোন এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, হয়ত কষ্টে থাক পিতামাতার অনুশাসনের কারনে, হয়ত তোমরা কষ্টে আছো পরিশ্রম করতে না চাওয়ার ইচ্ছায় অথচ কোন পরিশ্রমের কষ্টের কারনে, হয়তবা কষ্টে আছো তোমরা বেশি ইমোশনাল ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারছ না বলে। তোমরা অভিমানি, তোমরা অভিমান করতে পার তাই কষ্টে আছো। স্বাধীনতা কি হয়ত তোমরা জানো না বলে আমি স্বাধীন নই এই মনে করে কষ্টে আছো। একটা গান তোমাদের কষ্টকে বারিয়ে দিতে পারে, একটা মুভি তোমাদের মনকে কয়েকদিন আবেগের বশে কষ্টে রাখতে পারে, একটা পরীক্ষার খারাপ ফলাফল তোমাদের মনকে কষ্টে রাখতে পারে। তোমার ছোটভাই কিংবা বোনের সাথে তোমার বনিবনা হচ্ছে ভেবেও তোমরা আজ অনেক কষ্টে আছো বলে মনে হতে পারে। এগুলু আসলে কোন কষ্টই না। তোমরা অবাধ স্বাধীনতার নামে নিজেদের সতীত্বকে অকালে বিসর্জন দিয়ে কষ্টে থাক, তোমরা সময়ের কাজ না করার কারনে তোমাদের পিতামাতারা তোমাদেরকে একঘরে করে রাখছে বলে কষ্টে আছো। তুমি অঢেল পয়সা খরচ করতে পারছ না বলে হয়ত কষ্টে আছো। তোমার পাশের বন্ধুর দামী জামা দেখে তোমার মন খারাপ হয় বলে তোমরা কষ্টে আছো। কখনো মেঘলা আকাশ দেখলে কষ্টে থাক, আবার ভরা পূর্ণিমায়ও তোমরা কষ্টে থাক। বন্ধুদের সঙ্গ না পেলে কষ্টে থাক আবার বন্ধুদের সঙ্গ পেলেও কষ্টে থাক। কাউকে ভালবেসে কষ্টে থাক আবার ভালবাসা না পেলেও কষ্টে থাক। কোন কিছুতেই তোমরা সুখি নও। সব কিছুতেই তোমরা কষ্টে আছো। কষ্টে আছো এতা বলতেই যেন তোমরা ভাল মনে করো। 

কিন্তু কখনো কি একবারও ভেবেছ যে, কি করা উচিৎ ছিল আর কি করা হচ্ছে? তাহলে এই কষ্টে থাকার জন্য তো তুমি অন্য কাউকেই দায়ি করতে পার না। তোমার এই কষ্ট একটা আধুনিক কালের হতাশা ছাড়া আর কিছুই না। অথচ জীবনে কষ্ট লাঘব করার জন্য তুমি কিছুই করছ না।

তোমার এই কষ্টের জন্য আমি একটুও অনুশোচনা করি না। শুধু আমার কষ্ট হয় তোমরা তোমাদের কষ্টের লাঘবের কোন প্রতিশ্রুতির কথা বল না বলে। আমি অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকলাম তার এই ভাবনার জন্য। কত উচুতে বসে তিনি কত নিচু স্তরের ভাবনার কথা গুলো বলছেন।

আমার আর কিছুই বলার ছিল না।

১৫/০৫/২০১৬-রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে

রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে মৃন্ময়ীর বাল্য আর যৌবনকাল কিভাবে দ্বিখণ্ডিত হইয়া গিয়াছিল তার চমৎকার একটা বর্ণনা করিয়াছিলেন ঠিক এইভাবে-” নিপুন অস্ত্রকার এমন সূক্ষ্ম তরবারি নির্মাণ করিতে পারে যে, তদ্বারা মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করিলেও সে জানিতে পারে না, অবশেষে নাড়া দিলে দুই অর্ধখন্ড ভিন্ন হইয়া যায়। বিধাতার তরবারি সেইরূপ সূক্ষ্ম, কখন তিনি মৃন্ময়ীর বাল্য ও যৌবনের মাঝখানে আঘাত করিয়াছিলেন সে জানিতে পারে নাই। আজ কেমন করিয়া নাড়া পাইয়া বাল্য- অংশ যৌবন হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িল এবং মৃন্ময়ী বিস্মিত হইয়া ব্যথিত হইয়া চাহিয়া রহিল।”

আমিও যেদিন এই অস্পৃশ্য পুরুষটাকে প্রথম আমার অন্তরদৃষ্টি দিয়া দেখিয়াছিলাম, তখন আমিও ব্যথিত হৃদয়ে বুঝিতে পারিলাম, আমার আর বাল্যকাল বলিয়া কিছুই অবশিষ্ট নাই। আমার বাল্যকাল আমার অজান্তেই আমা হইতে কবে বিদায় নিয়া চলিয়া গিয়াছে, আমি বর্ষার কিংবা শরতের অথবা শীতের কোন ঋতুতেই তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যখন বুঝিতে পারিলাম, তখন আমার শুধু এইটুকু মনে হইল আম্র কাননের শুভিত কোন পুস্পের জন্য যখন মৌমাছিরা দূর দূরান্ত হইতে উড়িয়া আসে, আমিও তাই। কিন্তু আমার ভ্রম কাটিতে বেশি সময় লাগিল না। আমি যাহাকে পুস্প বলিয়া এতদূর উড়িয়া আসিয়াছি, উহা আসলে অন্য কাহারো বাগানের মৌমাছিমাত্র। সেই বাগানে পুস্প আছে, তাহার সহিত মৌমাছির সঙ্গে তাহার দলবলও আছে। বাগানের মালিও আছে, মালিকও আছে। আমি উহাতে বিচরন করিতে পারি কিন্তু উহা আমার নয়। আমি তাহাকে দূর হইতে আপন ভাবিতে পারি কিন্তু কাছে গিয়া বলিতে পারি না, ইহা আমার। আমি ইহাকে অনুভব করিতে পারি কিন্তু জড়াইয়া ধরিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে পারি না, এই পৃথিবীতে আমি আসিয়াছি শুধুমাত্র ইহার পাজর হইয়া।

আমি যাহা দেখিতে পাইতেছি জগতে তাহা হইতে আরও অধিক সৌন্দর্যের আর অধিক আকর্ষণীয় হয়ত কিছু আছে কিন্তু যাহাকে একবার মনে ধরিয়াছে, তাহা হইতে আরও কোন দামী, আকর্ষণীয় অথবা মূল্যবান হাতের কাছে আনিয়া দিলেও মনে হইবে, আমি উহা চাই নাই। আমি চাহিয়াছি শুধু উহা যাহা আমার কাছে এখন অস্পৃশ্যই। তারপরেও সে আমার। মনের ভিতরের যে জগত সেখানে তো আর এই বায্যিক পৃথিবীর কোন আইন বা আদালতের অস্তিত্ব নাই। তাই নীলিমার আকাশের দিকে তাকাইলেও আমি তাহাকে দেখি আবার ঘন বর্ষার বৃষ্টির ছায়াতলেও আমি তাহাকে দেখি। কখনো সে আমাকে জলের মত ভাসাইয়া লইয়া যায় অতল সমুদ্রের গহিনতলে আবার কখনো সে আমাকে জলের স্রোতে ভাসাইয়া দেয় আমার দুই নয়নের ধারা।    

১৪/০৫/২০১৬-আজ থেকে বহু বছর আগে যখন

আজ থেকে বহু বছর আগে যখন তোমার এই পৃথিবীতে আগমন হইয়াছিল, তারও অনেককাল পরে আমি এই পৃথিবীর নীল আকাশ দেখিয়াছিলাম, লাল সূর্য দেখিয়াছিলাম, বাতাসের গন্ধ শুকিয়াছিলাম। কিন্তু তখন আমার কাছে ঐ নীল আকাশ শুধু নীলই ছিল, সূর্য তখন একটা জলন্ত অগ্নিপদার্থ হিসাবেই ছিল, বাতাসের গন্ধ আমি ভাল করে মনেও করিতে পারি নাই। কিন্তু যেদিন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হইয়াছিল, আমি নীল আকাশের মাঝে নীলমেঘ দেখিয়াছিলাম, ঐ মেঘেরা কিভাবে একস্থান হইতে ভাসিয়া ভাসিয়া অন্যত্র চলিয়া যায় তাহা দেখিয়াছিলাম, ঐ প্রখর সূর্যের আলো আমার অপেক্ষার পালাকেও যন্ত্রনা দিতে পারে নাই, বাতাসের গন্ধের সঙ্গে আমি আরও একটা গন্ধ শুকিয়াছিলাম। আর সেটা তোমার গায়ের গন্ধ, তোমার সুগন্ধির গন্ধ, তোমার ক্লান্তির ঘর্মাক্ত শরীরে গন্ধ।

আজ অনেক বছর হইয়া গেলো, আমি এখনো সূর্যকে দেখি, আমি ঐ নীলাকাশ দেখি, ঐ নীলাকাশের নীল মেঘগুলি দেখি, দক্ষিনা বাতাসের গন্ধও শুকি। সবকিছু আগের মতই আছে বলিয়া মনে হয়। শুধু মনে হয় ঐ বাতাসের সাথে তোমার গায়ের গন্ধটা নাই, তোমার সুগন্ধির গন্ধটা নাই, তোমার গায়ের সেই ক্লান্তির ঘর্মাক্ত গায়ের গন্ধটাও নাই।

আমি অনেক খুজেছি তোমায়, ” শিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে…… “

আচ্ছা তুমি কি কোথাও নাই?

১৩/০৫/২০১৬-কোন একরাতে হটাত

কোন একরাতে হটাত যদি বাইরের আকাশের মুষলধারার বৃষ্টির শব্দে কখনো ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি আমার বেলকনিতে এসে দারাই। উম্মুক্ত সেই বেলকনি, বৃষ্টিরচ্ছটা আমার মুখের চারিদিকে এসে আমাকে ভিজিয়ে দেয়। চোখের চশমাটা ঝাপ্সা হয়ে আসে। আমি মুছতে চাইনা সেই কাচের চশমাটা। আকাশের বিদ্যুৎ ঝলকানিতে আমি অন্ধকারে গাছের ঢালগুলি দেখি, পাতাগুলি দেখি, ভিজে ওরা শিতল হচ্ছে ধরণির তটে। গাছের মগঢালে বাবুই পাখির বাসাগুলি অনবরত এদিক সেদিক হেলেদুলে ঢুলছে। পাখিরা নিশ্চিতে হয়ত জেগে আছে তাদের ছোট ছোট কচি কচি বাচ্চাদের নিয়ে। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হয়ত এখন বৃষ্টি নাই, আবার কোথাও না কোথাও হয়ত আরও অঝোর ধারায় ঘূর্ণিপাক হচ্ছে। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি আমার এই ছোট্ট বেলকনির একেবারে কার্নিশের কাছে। সব মানুষেরা এখন ঘুমিয়ে আছে। আমি জেগে আছি। মনে পরছে আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কোন একদিন তোমার সঙ্গে আমিও এমন একরাতে ঘনকালো আকাশের এই বৃষ্টির ধারা দেখেছিলাম। তখন তুমি ছিলে আমার পাশে আমাকে জরিয়ে ধরে বলেছিলে, আমি সব সময় থাকবো ঠিক এমন করে এই জলের ধারার সঙ্গে।

আজ আমি কিন্তু একা।

…………… তুমি কি আছো এখানে?  

২১/০৪/২০১৬-নবাবের কবরের সামনে কল্পনায় একদিন

হ্যালো নবাব

তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। তুমি যখন এই পৃথিবীতে জন্মেছিলে তখন আমার পূর্ব পুরুষেরাও হয়ত জন্মগ্রহন করে নাই। কি করে তাহলে তোমার সাথে আমার দেখা হত? তারপরেও আজ আমার সঙ্গে তোমার দেখা হল। আমি দাড়িয়ে আছি ঠিক তোমার কবরের পাশে, তুমি শুয়ে আছ একদম একা। তোমাকে একা পাব এবং তোমার মত মানুষের সাথে একা দেখা করা যায় এটা আমার কেন এই ভারতবর্ষের কোন জনগনই তো বিশ্বাস করবে না। তোমার রানী(দের) যেখানে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুমতি লাগতো সেখানে আমরা কোন ছাড়! কিন্তু দেখ, অদৃশ্য বিধাতার কি ক্ষমতা, তিনি সব পারেন।  তাও আবার প্রায় চারশত বছর পর আমার সঙ্গে তোমার দেখা। আমি জিবিত আর তুমি মৃত।

যেহেতু তোমার সঙ্গে আমার আজ দেখাই হয়ে গেলো, আমার কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল তোমাকে নবাব। তোমাকে সব কিছুর উত্তর দিতে হবে এমন কোন কারন নাই, কারন তুমি নবাব, অনেক কিছু তুমি আমাদের মত সাধারন মানুষকে নাও জানাতে পার। তবুও যদি সম্ভব হয় শুনতে পারলে হয়ত ভাল লাগবে।

আমি তোমাদের উপমহাদেশের রাজনীতি বুঝি না, আমি কিভাবে দেশ চালাতে হয়, তাও আবার এই উপমহাদেশের মত একটি সাম্রাজ্য, তারও কোন আইডিয়া আমার নাই। তারপরেও আমি খুব অবাক হই কি করে তুমি এতবড় একটা উপমহাদেশ কন্ট্রোল করেছ? তুমি কি কোন ক্যাডার বা রাজনৈতিক দলের মত কোন দল করতে যারা তোমার এইসবে সাহাজ্য করত? তোমার কোন বিরুধি দল ছিল না নবাব? তোমার সম্পদের হিসাব আমি জানি না কিন্তু শুনেছি তোমার নাকি অনেক সম্পদ ছিল। তুমি কি কোন ব্যবসা করতে নবাব? তুমি কি কখনো কোন বেতন নিয়েছ? আর নিলে কত টাকা করে নিতে নবাব? আচ্ছা নবাব, তোমার কি কোন ব্যাংক একাউন্ট ছিল? সুইস ব্যাংক বা বিদেশী কোন ব্যাংক? নাকি ‘নবাব’ এইটাই তোমার ব্যবসা বলে চালিয়ে দিয়েছ? প্রজারা কি তোমাকে খুব ভালবাসত? তোমাকে কি কেউ ঘৃণা করত কখনো? আর কেউ যদি তোমাকে কখনো ঘৃণা করত তাহলে তুমি তাকে কি করতে নবাব? তোমাদের সময় কি কোন টক শো হত? নাকি সভাসদ পরিষদে তুমিই শুধু একা কথা বলতে? তুমি কি কখনো ভেবেছিলে তুমি একদিন এই পৃথিবীতে থাকবে না? কখনো কি তোমার এই উপলব্দি হয়েছিল যে তোমার মরনের পর তোমাকে নিয়ে জনগন সমালোচনা করবে? কখনো কি ভেবেছিলে যে, তোমার গড়া এই অট্টালিকা, এই সাম্রাজ্য, তোমার চেয়ার, তোমার খাট, তোমার সবকিছু অন্য একজন ব্যবহার করবে আর তুমি অন্য সবার মত এই ভিজা মাটির নিচে স্যতস্যতে জায়গায় কোন এক অন্ধকার পরিবেশে শুয়ে থাকবে? কখনো কি তোমার জীবদ্দশায় এই উপলব্ধিটা হয়েছিল যে, তুমি আর কখনই এই পৃথিবীর আলো বাতাস, গাছ, ফল মুলাদি, আতর সুগন্ধি, রানী রমণী, সোনা দানা, ক্ষমতা, কোন কিছুই উপভোগ করতে পারবে না? এমন কি তুমি আর ফিরেও আসতে পারবে না? এমন কখনো কি তুমি একবারের জন্যও কি ভেবেছিলে?

তুমি কি এখনও আগের মত দেশি বিদেশী অনেক পানীয়, রাজ্যের সব সুন্দরীদের সমন্নয়ে বাইজীর আসর, শ্বেত পাথরের কিংবা কষ্টি পাথরে গড়া মোজাইক ফ্লোর, সোনার পালঙ্ক, অনেক মহামুল্যবান হিরের আংটি, জহরতের মালা, আর্দালি, পাইক পেয়াদা যে সব তোমার এখানে একসময় ছিল, তা পাও ওখানে নবাব? তোমার আশেপাশে কি তোমার অতি প্রিয় সেনাপতি, মন্ত্রী মহোদয়, উজির নাজির আছে নবাব? তোমার একা থাকতে এখন কষ্ট হয় না? তোমার কি আবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে তোমার সেই রাজকীয় প্যালেসে কিংবা ঘুমাতে ইচ্ছে করে ঐ সোনার খাটে যা তুমি পারস্য রাজ্য থেকে ছিনিয়ে এনেছিলে একদিন? আমাত খুব জানতে ইচ্ছে করে নবাব।

জানো নবাব, আমার মাঝে মাঝে তোমাকে বেশ বোকা বোকা বলে মনে হয়। তুমি এত কিছু বুঝতে পেরেছিলে, উপমহাদেশ কিভাবে চালাইতে হয় সেটা বুখতে পেরেছিলে, কিভাবে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্য দখল করতে হয় সেটা বুঝতে পেরেছিলে, কেমন করে বিনা ব্যবসায় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিজের করে নিতে হয় সেতাও বুঝতে পেরেছিলে, অমর হয়ে থাকার জন্য কত বিশাল বিশাল প্যালেস বানাতে হয়, তুমি তাও করেছিলে কিন্তু তোমার মরনের পর তোমাকে কে দেখভাল করবে, তোমার এই সিংহাসনে যেন কেউ না বসতে পারে, শুধু তোমার আদেশই যেন আজিবন চলে, সেই ব্যবস্থাটা কেন করে যেতে পারলে না নবাব? বিধাতার দেওয়া ধর্ম পাল্টে তুমি ‘দ্বীনে এলাহি’ও করে ফেললে, কোন পরোয়া করলে না। তার সমকক্ষ ভাবতে পারলে, অতচ তুমি তার সঙ্গে আরও একটু সমঝোতা করলেই কিন্তু তুমি অনেক কিছু করতে পারতে।

ন্যায় অন্যায়, সৎ অসতের ব্যবধান করলে না, মানবাধিকার, ভদ্রতা, সৌজন্যতা, বিচার-অবিচারের মধ্যে তুমি কিছুই ফারাক করলে না, তোমার যা ইচ্ছে তাই তুমি করতে পারলে কিন্তু তুমি কি একবারও ঐ অদৃশ্য বিধাতে কিছু ঘুস দিয়ে তুমি অমরত্ব নিতে পারলে না নবাব? তোমার তো কোন কিছুর কমতি ছিল না। কি হত যদি উপমহাদেশের কিছু জায়গা, জমি, অথবা সোনা দানা, জহরত, হিরা, সুন্দরি কিছু রমণী দিয়ে ঐ অদৃশ্য ভগবানকে বশ করতে? তাহলেই তো তুমি আজও বেচে থাকতে পারতে, তোমার সঙ্গে আজ আমার সরাসরি জীবন্ত শরীরে দেখা হত।

আচ্ছা নবাব, তুমি তো প্রায় চারশত বছর আগে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছ। তুমি দেখতে কি এখনো আগের মত আছ? তোমার গলায়, তোমার হাতে যেসব সোনা দানা হীরা জহরত ছিল সেগুল কি তোমার সেনাপতিরা, তোমার উপদেষ্টারা তোমার সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিল? তুমি কি ওগুলো এখনো হাতে গলায় মাথায় পড়ে থাক? নাকি খুলে রেখেছ? কোথায় রেখেছ এখন এগুলো? তুমি কি আরও বৃদ্ধ হয়েছ? নাকি যেহেতু কোন টেনশন নাই, ফলে তুমি আরও সুন্দর হয়েছ? তোমার সেনাপতিরা, তোমার সুন্দুরি রমণীরা তোমার অসংখ্য ছেলেপুলেরা, নাতি নাতকুরেয়াও আজ অনেকেই এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে যাদেরকে তুমি খুব ভালবাসতে। তোমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে?

জানো নবাব, আমি মাঝে মাঝে খুব অবাক হই এই ভেবে যে, তোমার অনেক বংশধরেরা কিন্তু এখনো এই পৃথিবীতে বেচে আছে। কিন্তু কে কোথায় কিভাবে বেচে আছে তাদের কোন হিসাবও আমরা জানি না। আর তারাও যে কেন বলে না যে তারা তোমার নবাবের বংশের লোক! কেন নবাব? কি জানি হয়ত তোমার বংশের লোক বলে জানাজানি হয় গেলে না জানি আবার কি বিপদ হতে পারে এই ভেবে হয়ত বলে না। হয়ত এমনও হতে পারে, তুমি জনগনের উপর টর্চার করেছ বলে তারা এখন তোমার বংশের উপর খুব রাগান্বিত, হয়ত এমনও হতে পারে যে তোমার অবিচার, অন্যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন, তোমার বেহিসাবি খরচের তালিকা ইত্যাদির কৈফিয়ত তারা দিতে পারবে না বলেই এখন নিসচুপ জীবন বেছে নিয়েছে। আবার এমনও হতে পারে তোমার অন্তর্ধানের পর তোমার এই বিশাল সাম্রাজ্য ধরে না রাখার কারনে হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধিন হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় অগোচরে থাকাই ভাল এই যুক্তিতে প্রকাশিত হয় না, আবার এমনও হতে পারে আসলেই কেউ আর বেচে নেই তারা। বড় অবাক লাগে যে, এক কালের এত প্রতাপশালী নবাবেরা এভাবেই বংশসহ হারিয়ে যায় এই পৃথিবীর বুক থেকে। ওদের শুধু ইতিহাস বেচে থাকে কিন্তু বংশ বেচে থাকে না। অথচ তোমার আশেপাশে যারা ছিল তাদের অনেকের বংশধরেরা এখন অনেক বড় লোক, কেউ আবার রাজনীতি করে, কেউ বড় বড় ব্যবসায়ী, ওদের অনেক টাকা, সুইস ব্যাংকে, বিদেশী ব্যাংকে, আরও অনেক দেশের ব্যাংকে। ওরা এক দেশের সরকারের আরেক দেশের সরকারের সঙ্গে বসে গল্প করে, তাস খেলে, মদ খায়, ফুর্তি করে, আরও কত কিছু? কিন্তু তোমার বংশের কোন লোককেই আমি চিনি না নামও জানি না আদৌ অরা কেউ আছে না নাই।

যাক, নবাব, আমাকে এখানে অনেক সময় থাকতে দিবে না কারন তুমি নবাব, তোমার পাশে অনেক্ষন দাড়াতেও আমাকে দিবে না। আবার কখনো যদি তোমার এখানে আমার আসা হয়, তোমার সঙ্গে আমার আবার কথা হবে, যদি পার আমাকে একটু জবাব গুলো দিও নবাব।

তুমি ভাল থাক নবাব।      

২০/০৪/২০১৬-দিন যাচ্ছে আর মনের আকুতি

দিন যাচ্ছে আর মনের আকুতি ততই বেড়ে উঠছে। সারাদিনের কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকি বটে কিন্তু তারপরেও ব্যস্ততার মধ্যে সব সময় তোমার কথা মনে পরে। মনে পরে অনেক কিছু। কখনো অনুভুতি হয় কি হচ্ছে এইসব? আর কেন হচ্ছে এইসব? বিশাল এই পৃথিবীর চারপাশে এত সব ঘটনা ঘটে যার হিসাব মিলানো যায় না, মনে হয় এটা হবার কথা নয় তারপরেও হয়। কেন হয়? কে করায়? (চলবে)

১৫/০৪/২০১৬-পহেলা বৈশাখের উপলব্ধি

মীরপুর গোলারটেক, ঢাকা 

শহরের পহেলা বৈশাখ আমার কাছে ভাল লাগুক আর নাই বা লাগুক, যখন দেখি আমার সন্তানেরা তাদের ভাই বোনদের নিয়ে, কাজিনদের নিয়ে কিংবা ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এক আনন্দের পরিবেশে হৈচৈ করছে, মনে হয় পহেলা বৈশাখই হোক আর চৈত্র মাসের গরমের অনুষ্ঠানই হোক অথবা কারো জন্ম-বিবাহ কিংবা ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করার উপলক্ষই হোক, খারাপ কি? অন্তত পরিবারের মানুষগুলো তো আনন্দ করছে। সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। মন ভাল হয়ে যায়, যাই রান্না হোক তৃপ্তির সাথে ভাগাভাগি করে হৈহুল্লুর করে সময়টা কেটে যায়। অনেক ব্যস্ততার মধ্যে সবাই কিছুক্ষন সময়ের জন্য হলেও একসঙ্গে থাকা যায়।

আমাদের এই ব্যস্ত সময়ের মধ্যে তিন চার বছরের বাচ্চাটাও তার লেভেলে ব্যস্ত। অংক কোচিং, বাংলা কোচিং, ইংরেজি কোচিং, ক্লাস পরিক্ষা, ফাইনাল পরীক্ষা, পরাশুনা, রুটিন ক্লাস, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, আহ আরও যে কত কিছু। সবাই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মাঝে তবুও তো ভেলেন্টাইন্স ডে এর নামে, ফাদারস ডে নামে, মাদারস ডে নামে, যেই নামেই হোক না কেন, কিছু তো সময় পরিবারের মানুষগুলো একটা সময় বেছে নেয় যেন পরিবারের সবার সঙ্গে একসাথে একটা সময় কাটানোর উপলক্ষ নিয়ে ছুটে চলে আসে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, দেশ থেকে অন্য দেশে, নিজের মানুষদের দেশে, নিজের পরিবারের দেশে। আগে তো আমরা বড়দের সালাম করতাম আর সালামের জন্য মনে একটা বাসনা থাকতো সালামি পাব, আদর পাব, আদরটা তখন খুব বেশি বুঝতাম না, সালামিটাই ছিল মুখ্য বিষয়। আজ আমি সালামি কেউ না চাইলেও সালামি দিতে পছন্দ করি। আমি আমার সেই ছোট বেলার অনুভুতি গুলোকে মনে করে বিষণ্ণ হলেও মনে এক আনন্দ পাই।

আজকে আমাকে ‘তুই’ বা ‘তুমি’ করে বলার লোকজনও কমে যাচ্ছে, এক সময় হয়ত আসবে ‘তুই’ করে বলার লোকগুলো আর কাছাকাছি থাকবেই না। হয়ত এই ইলিশওয়ালা পহেলা বৈশাখের জন্যই হোক আর যে কোন ডে এর উপলক্ষেই হোক, এইসব আপনজনগুলো তো একটা সময় করে কাছে আসে। আর এই কারনেই কোন ডে এর বিপক্ষে আমি না। নির্মল আনন্দটাই আমি খুজে নিতে চাই এইসব উপলক্ষগুলোর মধ্য থেকে। কোনটা ক্রিস্টিয়ান আর কোনটা এরাবিক কিংবা কোনটা হিন্দুয়ানী আর কোনটা বাঙ্গালির সেভাবে আমি দেখতে চাই না। আমি চাই এই ছবিগুলোর মধ্যে সবার মনে যে আনন্দ, যে ভালবাসা আর যে তৃপ্তির চেহারা ফুটে উঠেছে, সেটাই সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান আমার কাছে। এরা কেউ বিদেশ থেকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য সময় বেছে নিয়েছে, কেউ পরাশুনা আগে থেকেই শেষ করে নিরঝলা আনন্দের জন্য ভাইবোন, শ্বশুর শাশুড়ি, খালা, খালু, ননদ ননদিনী, দুলাভাই, শ্যালক, সব বয়সের এক অপরূপ পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে ছুটে এসেছে। এর থেকে আর বড় কি অনুষ্ঠান হতে পারে? হোক সেটা পান্তা ইলিশের পহেলা বৈশাখ অথবা হোক সেটা ভ্যালেন্টাইন্স ডে। বেলা শেষে এই আনন্দটুকুই দরকার। সবার জন্য আমার ভালবাসা। 

১৪/০৪/২০১৬-পহেলা বৈশাখ

৬৮/৬, মীরপুর গোলারটেক, ঢাকা-১২১৬ 

আজকাল পহেলা বৈশাখ আমাকে খুব বেশি পুলকিত করে না। কিংবা পহেলা বৈশাখের জন্য আগের দিন বাজার ঘুরে ঘুরে দেশি বা বিদেশী ইলিশ কিনে এনে পরের দিন পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত খেতে হবে এই অনুভুতিতে আমার মনে খুব আনন্দের শিহরন জাগায় না। কিংবা লাল বা হলুদ পাড়ের শাড়ীর অপরূপ সৌন্দর্যে শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা রমণীদের দলবেঁধে হাটাহাটি, পার্কে ময়দানে মেলায় ঘুরাঘুরি আমার মনকে যে পুলকিত করে তাও না। এর মানে এই নয় যে পহেলা বৈশাখ আমি মানি না বা কেউ মানলে সেটা আমার পছন্দের নয়। কিন্তু আমি যা মিস করি তা হচ্ছে-পহেলা বৈশাখের দিনে আমার সেই ছোট বেলার আনন্দের মেলার অনুভুতি, মেলার সকালের আয়োজন আর হৈচৈয়ের মুহূর্ত গুলো। হতে পারে এই কারনে যে, এখন বয়স হয়ে গেছে, আমাদের সেই পহেলা বৈশাখের মেলার অনুভুতি এখন আর সেই অনুভুতি নাই কিংবা মেলার ধরন পালটে গেছে এই কারনে।

সকাল থেকে মেলার জায়গায় হরেক রকমের দোলা, কাছের নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন, হাটে হাটে মাঠে ময়দানে মাটির তৈরি পুতুল, বাঁশি, খেলনা, আরও যে কত কিছুর আয়োজন দেখেছি তার কোন পরিসীমা নাই। সকাল হতেই আমরা যারা ছোট ছিলাম, মেলায় যাব এই আনন্দে নদীতে গিয়ে কেউ উলঙ্গ হয়ে কেউ বা আবার কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে কিছুক্ষন কি যে লাফালাফি করতাম এখন ভাবলে সত্যি হাসি পায়। আমার মনে পরে না পহেলা বৈশাখের জন্য আমরা বাসায় ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা খেয়েছিলাম কিনা। জীবনের অনেকগুলো বছর আমি আমার গ্রামে কাটিয়েছি কিন্তু কোনদিন দেখি নাই ইলিশ মাছ পহেলা বৈশাখের একটা প্রধান উপকরন হয়েছিল। বরং পুটি মাছের শুটকি দিয়ে মা ঝাল ভর্তা বানাতেন, গরম গরম দেশি চালের ভাত রাঁধতেন, আলু ভর্তা কিংবা ঘরের চালে, গাছের ঢালের ফলন্ত কিছু সবজি কেটে গরম গরম ভাজি দিয়ে মা আমাদের নাস্তা করিয়ে দিতেন। সারাদিন কোথায় থাকি কি খাই, কখন খাই, এই চিন্তায় মা আমাদেরকে পেট পুরে খাওয়াইয়া দিতেন যাতে আনন্দের ছলে কোথাও কিছু না খেলেও ক্ষুধা না লাগে। পান্তা ভাত তো সব সময়ই খাই, এটা কোন বিশেষ উপকরন নয় যে, ঘটা করে পান্তা পেতে রাখতে হবে আর সেই ভাত পহেলা বৈশাখে খেয়ে মেলায় যেতে হবে। চাইনিজ নববর্ষে যেমন চাইনিজরা চাইনিজ তৈরি করে পহেলা চাইনিজ পালন করে না, ইংরেজি নববর্ষে যেমন ইংরেজরা ইংলিশ খাবার তৈরি করে পহেলা জানুয়ারি পালন করে না, তেমনি বাংলাদেশের মুল ধারার বাঙালিরাও পান্তা ভাত খেয়ে পহেলা বৈশাখ পালন করতে আমি দেখি নাই।

এই দিনে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পন্য নিয়ে আমাদেরই গ্রামের চেনাজানা লোকেরা মাথায় বেতের ঝুরি নিয়ে হরেক রকমের মাটির খেলনা, বেতের খেলনা, প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে মেলার মাঠে চলে আসতেন। দেখা যেত আমাদেরই ক্লাসে পরে কোন এক বন্ধু তার বাবার সঙ্গে অই সব সামগ্রী নিয়ে দোকানে বসে গেছে। আমরাও তার সঙ্গে ক্রেতা বিক্রেতা হয়ে যেতাম। বাড়ীর গিন্নীদের বাড়িতে তৈরি গাছের বিভিন্ন ফল মুলাদি দিয়ে বানানো মিস্টি আচার, তেঁতো আচার, কিংবা ঝাল ধরনের আচার বানিয়ে মহিলারাও কেউ কেউ মেলায় নিয়ে আসতেন। আমাদের পকেটের বাজেট হয়ত বা চার আনা, আট আনা, কিংবা বেশি হলে এক টাকা দু টাকাই থাকতো। সেতা আবার পহেলা বৈশাখের অনেক আগে থেকেই বরদের কাছ থেকে চেয়ে কিংবা মায়েদের কাছ থেকে অনুনয় বিনয় করে নিতে হত। নাগরদোলায় উঠার জন্য কত যে লাইন ধরে থাকার অপেক্ষা। পরিচিত কোন এক বড়রা হয়ত আদর করে কাউকে কাউকে বিনা পয়সায়ই দু একবার নাগর দলায় আমাদেরকে সুযোগ করে দিতেন। কোন পয়সা নিতেন না।

চারিদিকে বাঁশীর উচ্ছৃঙ্খল শব্দ, যার যার মত করে যা খুশি বাজিয়েই চলছে, হৈচৈ এর শেষ নাই। যে বাচ্চাটি এক বছরেরও বয়স, পহেলা বৈশাখ না বুঝলেও সেও হয়ত তার বাবা, মা কিংবা বোনের ভাইয়ের কোলে চরে মেলায় চলে এসেছে। হারিয়ে যাওয়ার ভয় নাই, বাড়ীতে ফেরার জন্য পরিচিত লোকের কোন অভাব নাই, চুরি ডাকাতির বালাই নাই, ছিনতাইয়ের কোন মনোভাব নাই, এক অনাবিল আনন্দ আর মেলা।

মেলাশেষে ঘরে ফেরার আরেক রূপ। দলবেধে পাশাপাশি গ্রামের আইল ধরে বাড়ি ফেরা। হাতে হাতে বাঁশি, পুতুল কিংবা অতি নগন্য অথচ মনে হয় অতি প্রিয় কিছু খেলনা হাতে নিয়ে নিয়ে গ্রামের মেঠো পথ ধরে দিনের শেষ বিকালে কিংবা সন্ধার আবছা আলোছায়ায় ঘরে ফেরা, ঘরে ফিরে একে অপরের নব্য কেনা সরঞ্জামাদি দেখাদেখি করে কখনো মন খারাপ করার মত অনুভুতি, যেন, আহা আমি কেন ঐ জিনিসটা কিনতে পারি নাই, কিংবা আহা আমি কেন দেরি করে মেলায় গেলাম যে আমার বন্ধু রহিমের কেনা বাশিটা আমি কেনার আগেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

বোনদের কেনাকাটা একরকম, আমাদের ছেলেদের কেনাকাটা ছিল অন্য রকমের। বোনেরা কেউ লিপিস্টিক, মাথার ফিতা, তিব্বত ব্রান্ডের স্নো পাওডার, আলতাও মিস যায় নাই। কেউ কেউ আবার কাছে হরেক রকমের চুড়ি, পায়ে পরার অদ্ভুত ডিজাইনের পায়রা কত কিছুই না কিনত আমাদের বোনেরা। আমার মনে পরে মেলা থেকে কেনা সরঞ্জামাদি আমরা কেউ কেউ ঘুমানোর সময় পাশে বালিশের কাছেই রেখে ঘুমাতাম যেন কতই না মুল্যবান সম্পদ। আবেগটাই আলাদা।

বড়রা কেউ কেউ পাঞ্জাবি পরে একে অপরের সঙ্গে চা বিড়ি টানতে টানতে দিনের অনেকটা সময় পার করে দিয়েছেন। দিনশেষে তারাই হয়তা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেনা কাটার সামগ্রীর আনন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামের কিছু জোয়ান ছেলেপেলের দ্বারা আয়োজিত কোন এক গানের আসর কিংবা মল্লযুদ্ধের অনুষ্ঠান করতেন। নৌকা বাইচের শেষে উঠতি বয়সের ছেলেরা পাড়ার মুরুব্বিদের সঙ্গে জিতে আনা পুরুস্কারের সঙ্গে বীর বীর অনুভুতির একটা ভাব থাকতো। এ এক মেলা যার মাধ্যমে এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের ভাবের সৃষ্টি হত, বন্ধন মজবুত হত, নতুন নতুন সম্পর্কের হাল ধরে আরেক বছরের হালখাতা তৈরি হত। হালখাতা তৈরি হত ব্যবসার, হালখাতা তৈরি হত নতুন নতুন সম্পর্কের। এভাবেই আমি আমার সেই ছেলে বেলার বৈশাখী মেলার আনন্দটা উপভোগ করেছিলাম।

আজ আমি সেটা খুব মিস করি।

১২/০৪/২০১৬-সাফল্য এবং তার পথ নির্দেশনা

সাফল্যের পথ কখনোই ইস্পাতের মতো এতো নিখুত নয়। এই সাফল্যের দরজায় যেতে হলে অনেক কঠিন দূর্গম পথ বেয়ে বেয়েই উপরে উঠতে হয়। আর এটা একদিনেই হয়ে যাবে এটা আশা করা শুধু বোকামিই নয়, এটা একটা মূর্খতাও। সাফল্যের শেষ প্রান্তে যেতে যেতে পথে কত যে কুকুর, কত যে হিংস্র পশু, কত যে দাবানলের মতো অগ্নিজলা বন, আর প্রাকৃতিক ঝড় পেরুতে হয়, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। যারা আজ বড় হয়েছে, তাদের প্রতিটি জীবনের কাহিনী কোথাও না কোথাও এক। সাফল্যের এই গন্তব্যপথে যেতে যেতে একটা কথা মনে রাখা অতীব বাঞ্চনীয় যে, কেউ বন্ধু হয়ে শত্রুর আচরন করতে পারে আবার কেউ শত্রু হয়েও শত্রুর মতো আচরন নাও করতে পারে। অনেক কুকুররুপী মানব, কিংবা অনেক মানরুপী কুকুরও সারাক্ষন ঘেউ ঘেউ করতেই পারে, কিন্তু এসব কুকুরদেরকে, হায়েনাদেরকে প্রতিটি ক্ষেত্রে পাথর মেরে মেরে যদি সামনে এগুতে হয়, তাহলে সাফল্যের গন্তব্যপথের নিশানা ভুলে যাবার সম্ভাবনা থাকে। থাকে দিক নির্দেশনা হারিয়েও যাওয়ারও। তাই, কুকুর থাকবে, কুকুরের ঘেউ ঘেউ থাকবে, তার মানে এ নয় যে, প্রতিটি কুকুর, আর প্রতিটি বাধাকে মনোযোগ দিতে হবে। জানতে হবে ঠিক সথিকভাবে, কোন বাধাকে সরাতে হয়, আর কোন বাধাকে কোনো মনোযোগ দেবার কোনই প্রয়োজন নাই। 

সাফল্যের এই চাবিকাঠির আরেকটা প্রধান দিকনির্দেশনা হচ্ছে, নিজের মুখকে নিয়ন্ত্রন করা। মুখ এবং এর দ্বারা ছুড়ে দেয়া ভাষা এমন এক অস্ত্র যা একবার ছোড়া হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। আর এর ফলে টার্গেটে কতটা ক্ষতি হলো তার থেকে বেশি ক্ষতি হয়ে আসে নিজের ফলাফল। যে কোন পরিস্থিতিতেই কেউ যখন এমন এক অবাধ্য যন্ত্রের মতো মুখের বুলি বুলেটের মতো কেউ ছুরে দিয়ে ভাবে, সে অনেক ভাল কাজ করে ফেলেছে, এটা হয়তো মনের শান্তনার জন্য যথেষ্ট কিন্তু সাফল্যের বড় অন্তরায়। ফিরিয়ে নেয়ার কোনো পথা খোলা থাকে না বলে হয় তার জন্য ক্ষমা চাওয়া নতুবা ব্যর্থতার গ্লানি মাথায় নেয়ার সামিল হয়ে উঠে। শুধু তাইই নয়, এটা চিন্তা করাও বোকামি যে, সবাই ছুড়ে দেয়া পরিত্যক্ত বানীর বিপরীতে ক্ষমা মেনে নেবে বা ক্ষমা করে দেবে। এ চিন্তাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই এই সুলভে পাওয়া যন্ত্র দ্বারা অসুভ কোন নির্মম কথাও আমাদের চিরদিনের স্বপ্নের উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে অনেক ভেবে চিনতে এর প্রয়োগ করা উচিত।

সাফল্যের পথে যতো বেশী পরিমান বিশ্বস্ততা অর্জন করা যায়, ততো সহজ হয়ে উঠে দূর্গম গিরিপথের সেই সাফল্য ভ্রমন। আর এই বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশী যা কার্যকরী ভুমিকা রাখে তা হল, প্রতিনিয়ত সত্যকে আকড়ে ধরে থাকা। একটা মিথ্যা বা একটা অর্ধ মিথ্যাই যথেষ্ট সব বিশ্বস্ততা হারিয়ে ফেলার জন্য। আর একবার যদি এই মিথ্যার জালে কেউ বাধা পড়ে, তখন আর যাইই হোক সাফল্যের দেখা পাওয়া অনেক আওহজ হয়ে উঠে না।  

আরো একটা অদৃশ্য শক্তি সবার অগোচরে প্রতিনিয়ত কাজ করে। আর সেই মহাশক্তিধর গোপন শক্তিটি হচ্ছে, নিগূড় ভালবাসার বহিরপ্রকাশ। ভালোবাসা হচ্ছে একটা আংটির মতো। এর যে কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ কেউ বলতে পারে না কিন্তু এর উপস্থিতি সার্বোক্ষনিক উপলব্দি করা যায়। ভালোবাসার বহিরপ্রকাশ যতো বেশী প্রখর, বিশ্বস্ততা অর্জন ততো সহজ, বিশ্বস্ততা যতো বেশী সহজ অনিয়ন্ত্রিত ভাষা ততো নিয়ন্ত্রিত। আর এই ভাষা যতো নিয়ন্ত্রিত, ভালো বন্ধুর সংখ্যা ততো বেশী। ভালো বন্ধুর সংখ্যা যতো বেশী, দূর্গম গিরিপথে সহচর ততো বেশি। দূর্গম পথে যতো বেশি ভাল সহচর, পথ ততো সহজ। আর এখানেই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।  তবে একটা ভয়ের মতো উপসর্গ থেকেই যায় এখানে। কেউ কেউ ভাল বন্ধু হতে পারে বটে কিন্তু সবাই ভাল ভ্রমনসংগী হয় না। এই সংগী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ক্রাইটেরিয়া জানা থাকা বড্ড বেশী জরুরী। যেমন, সৌন্দর্য এবং সুন্দর চেহারার সব মানুষই ভাল হবে এই কথাটা ঠিক নয় কিন্তু সব ভাল মানুষই সুন্দর মনের।

সাফল্য যখন ধীরে ধীরে কাছে আসতে থাকে, এর একটা রুপ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। আর সেটা হচ্ছে ক্ষমতা। সাফল্যের ওজন যতো বেশী, ক্ষমতার ভার ততো বেশী। তাই, যখন ক্ষমতার ধার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রন যদি ততোতা না রাখা যায়, এক সময় অনিয়ন্ত্রীত ভারে তা চুরান্ত রুপ পাবার আগেই ভুমিতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য সবসময় মনের মধ্যে এই ভাবনা থাকা খুব জরুরী যে, ক্ষমতা শুধু মানুষকে ক্ষমতাই দেয় না, এটা দিয়ে মানুষকে ক্ষতিও করা যায়। তাই ক্ষমতার সাথে ভালবাসার শক্তিকে বেধে ফেলা অনেক দরকার। কারন ভালবাসা দিয়ে কোনো মানুষের কখনো ক্ষতি হয়েছে এমন নিদর্শন ইতিহাসে নাই। তাই শুধু ক্ষমতা নয়, ভালবাসার ক্ষমতা প্রয়োগ হচ্ছে সাফল্যের সেই গোপনশক্তি যার দ্বারা জগত সুন্দর হয়। এর দ্বারা সুখী আর আরামদায়ক ফলাফল হাতের মূঠোয় আসে। তাতে আনন্দের সাথে আসে সুখ। সুখী হতে গেলে তাই জীবনে এমন অনেক অপ্রয়োজনিয় জিনিষ ভুলে যেতে হয়।

আমি সব সময় সক্রেটিসের সেই কথাটার সাথে একমত হতে পারি নাঃ যার কাছে টাকা আছে তার কাছে আইন খোলা আকাশের মত আর যার কাছে টাকা নাই তার কাছে আইন মাকড়শার জালের মত। এটা হয়তো কিছু সাময়িক সময়ের জন্য ঠিক কিন্তু লম্বা ইতিহাসে এর সত্যতা অনেকাংশেই বিলুপ্ত হয়েছে। এমন কি সক্রেটিসের বেলায়ও।

০৭/০৪/২০১৬ -ফাঁসি

রাত প্রায় বারোটা। ঘরের কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলিতেই দেখিলাম ১৭-১৮ বয়সের একটি মেয়ে, কাঁধে একটা ঝুলানো ব্যাগ লইয়া দরজার সামনে দাঁড়াইয়া আছে। তাহাকে আমি চিনি না কিন্তু কোথায় যেন তাহাকে দেখিয়াছি আমার ঠিক মনে পরিতেছে না, আবার তাহাকে আমার অপরিচিত বলিয়াও  মনে হইল না। বাসায় কেউ নাই, আমার মেয়েরা তাহাদের খালার বাসায় মানিকগঞ্জে বেড়াইতে গিয়াছে, সঙ্গে তাহাদের মাও আছেন, আমার অফিসে অনেক কাজ জমা হইয়া গিয়াছিল বলিয়া রাত জাগিয়া জাগিয়া গুটিকতক কাজ শেষ করিতে হইতেছে। তাই আমার পরিবারের সঙ্গে আমার আর বেড়াইতে যাওয়া হয় নাই। ছেলেপুলে আর ঘিন্নি ছাড়া আমার কোন কিছুই চলেনা। তাহাদের অবর্তমানে আমার এই সময়টা আমি হারে হারে টের পাই। আমি অলস মানুষের মধ্যে একজন। একগ্লাস পানি খাইতেও তাহাদের প্রয়োজন পড়ে। ঘরের মধ্যে যখন ওরা থাকে তখন তাহাদের উপস্থিতি টের পাইনা কিন্তু তাহারা যখন থাকেনা তখন তাহাদের অনুপস্থিতি খুব নজরে আসে বইকি। বাসায় কেহ আসিলে সাধারনত আমার গিন্নিই দরজা খোলার কাজটি করিয়া থাকেন। বাসায় যতো কর্মীবাহিনী আসে, কেহ তাহার রান্নার বুয়া, কেহ আবার পাশের বাসার গিন্নি, কেহ আবার আমাদের ভারাটিয়ার মধ্যে একজন। হয়ত সময়মতো ভাড়া পরিশোধ করিতে পারিবেন না বলিয়া একটু আবদার, কেহ আবার দান দক্ষিনার জন্য আসে, এইসব। ফলে আমি সবাইকে চিনিও না আর তাহা জানার আমার কোন প্রয়োজনও মনে করি না। আজ তাহারা কেহ বাসায় নাই, তাই আমাকেই এই কর্মটি করিতে হইতেছে।

রাত এগারোটা বাজিলেই আমার গিন্নি ঘরের সব দরজা বন্ধ করিয়া, জানালার পর্দাসমুহ একেবারে আঁটসাঁট করিয়া লাগাইয়া দিয়া, ঘরের যাবতীয় ছিটকানি বন্ধ করিয়া তাহার পর কি দোয়া পড়িয়া হাতে তিনখান হাততালি দিয়া সম্পূর্ণ ঘরটাকে নিরাপদ করিয়া তাহার পর শুইতে যায়। গিন্নি না থাকিলে আমাকে অবশ্য দোয়াদরূদ পড়িতে বলেনা কিন্তু ঘরের ছিটকানীসমুহ ভালো করিয়া লাগাইয়া যেনো ঘুমাইতে যাই, সেই নির্দেশাবলী দিতে কখনই ভুলিয়া যায়না। আর যদি ছিটকানি লাগাইতে ভুলিয়া যাই, সেইজন্য আগেভাগেই ঘরের স্বয়ংক্রিয় তালাখানা যেনো লাগাইতে ভুলিয়া না যাই তাহা নিশ্চিত করিয়া তারপর ফোন রাখেন। সে জানে আমি অলস মানুষ, তাই মাঝে মাঝে মনে করাইয়াও দেয়। কারন ভুলিয়া যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অন্তত এইদিক দিয়া আমার উপর তাহার আত্মবিশ্বাস একেবারেই নাই।

দরজা খুলিয়া অপরিচিত এই অল্প বয়সের মেয়েটিকে দেখিয়া দরজার পাশে দাঁড়াইয়াই জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কাকে চাই?’

আমি প্রশ্ন করিলেও মেয়েটি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়া ঘটঘট করিয়া খোলা দরজা দিয়া আমার ঘরে প্রবেশ করিল। আমি অগত্যা কিছু না বলিয়া অদুরে ডাইনিং চেয়ারটা টানিয়া দিয়া বলিলাম, তুমি কি আমাদেরকে চিন বা আমি তোমাকে চিনি?

মেয়েটি হ্যাঁ বা না কোন উত্তর না দিয়া আমাদের ঘরের চারিদিকে যে কয়টা ছবি ফ্রেমে টাঙ্গানো আছে তা দেখিতে থাকিল। আমি তাহার ছবি দেখার ভঙ্গি দেখিয়া কিছু প্রশ্নের আশা করিতেছিলাম বটে কিন্তু সে ইহার কোন কিছুই বলিল না। ছবি দেখা হইয়া গেলে, বেশ খানিক্ষন পর মেয়েটি নিজেই ডাইনিং চেয়ারে আসিয়া বসিল এবং টেবিলের উপর রাখা এক যগ পানি হইতে এক গ্লাস পানি ঢালিয়া লইয়া ঢকঢক করিয়া পান করিয়া ঠাস করিয়া হাতের গ্লাসখানি টেবিলে শব্দ করিয়া নামাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস এমন করিয়া ছাড়িলো যেনো পানি খাইতে গিয়া তাহার অনেক পরিশ্রম হইয়াছে অথবা কতজনম ধরিয়া যেনো পানির আশায় বুক ধরফর করিতেছিলো।

– না, আমি আপনাকে চিনি না, কিন্তু আপনি হয়তবা আমাকে চিনিতে পারেন। আসলে আমাকে এখন অনেকেই চিনে, পুরু কাহিনি বলিলে হয়ত আপনিও আমাকে চিনিতে পারিবেন। এই পথ দিয়া যাইতেছিলাম, অনেকরাত, কোথাও কেহ জাগিয়া নাই, দেখিলাম আপনার ঘরে আলো জ্বলিতেছে, তাই এখানে আসা। আমি আপনার কোন ডিস্টার্ব করিবার মতলবে আসি নাই। কিংবা আপনার কোন ক্ষতিও করিতে আসি নাই। আপনি বিরক্ত হইতেছেন কি? আর ডিস্টার্ব হইলেইবা কি, এখন তো ভিতরে চলিয়াই আসিয়াছি। একনাগাড়ে এতগুলি কথা বলিয়া মেয়েটি আবার আরেক গ্লাস পানি ঢগঢগ করিয়া পান করিয়া লইল।

কি তাজ্জব ব্যাপার। চিনি না, জানি না, কি কারনে আসিলো, তাও আবার এতোরাতে। আমি একটু নড়িয়া চড়িয়া বসিলাম আর বলিলাম, পুরু কাহিনীটা কি তাহলে? আমিও জানার জন্য উৎসুক হইয়া বলিলাম। আর এতোরাতেই বা তুমি কাহার সাথে কি কারনে বাহির হইলে, আর তোমার পিতামাতাই বা কি রকম যে, এইরকম একটা যুবতীমেয়ে কে রাত গভীরে ঘর হইতে বাহির হইবার দয়া করিলেন?

-আরে সাহেব, ভয় পাইতেছেন নাকি? ভয়ের কোনো কারন নাই। আমার নাম শিমা। নিশ্চয় এই নামটা আপনার শুনিবার কথা। ঐ যে মেয়েটি,যে তাহার বাবামাকে রাতের আধারে একসঙ্গে খুন করিয়াছিল? পরেরদিন বড়বড় করিয়া দেশের সব কয়টা পত্রিকায় তাহার লোমহর্ষক গল্প লিখিয়া নাম প্রকাশ হইয়াছিল। আপনি পড়েন নাই সে খবর? যাইহোক, আমি আপনাকে খুন করিতে আসি নাই।

নামটা শুনিয়াই যেনো আমার গলা পর্যন্ত শুকাইয়া গেল। শরিরের শিরায় শিরায় যেন বিদ্যুতের মত এক অনুভূতি খেলিয়া গেল আর পশমের যে কয়জায়গায় অনুভূতি আঘাত করিতে পারিল না, সব কয়টাই যেন খারা হইয়া আমাকে এই সংবাদ দিয়া গেল, কেন তুমি না জানিয়া এমন একটি মেয়েকে তোমার ঘরে ঢুকিতে দিলে? তুমি তো আর পুলিশের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চে কাজ করোনা যে, এখন একটা ফোন করিলেই তোমার সাহায্যের জন্য গোটাবিশেক পুলিশ আসিয়া তোমাকে উদ্ধার করিবে। নিজেকে একটু আহাম্মক বলিয়া মনে হইতে লাগিল। কিন্তু পরক্ষনেই আবার মনে হইল, আচ্ছা ও তো আর পিস্তল, ছুরি লইয়া আসে নাই যে, আমাকে খুন করিয়া ফেলিবে, আমার সঙ্গে ও জোরেও পারিবেনা, আবার আমার আশেপাশে আরও লোকজন তো আছে, বিপদ দেখিলে গলা ফাটাইয়া চিৎকার দিলেইতো আর কোন অসুবিধা নাই। পুলিশ না আসুক, অন্তত কিছু মানুষ জন তো আসিবেই ।মনে একটু বল সঞ্চার হইল।

-তোমার না ফাঁসির আদেশ হইয়াছে? তাহা হইলে তুমি এই ভাবে এত রাতে কেমন করিয়া ঘোরাফেরা করিতে পারিতেছ? তুমি কি জেল হইতে পালাইয়া আসিয়াছ? দেখ শিমা, তুমি এখানে আসিয়া আমাকে কোন বিপদের মধ্যে ফেলিবার কোন পরিকল্পনা করিতেছ না তো?

মেয়েটি, যেন মজার একটা কথা বলিলাম, এইভাব করিয়া অট্টহাসিতে লুটাইয়া পরিবার উপক্রম হইল। ঘরের ভিতর তখন রবিন্দ্রসঙ্গিত বাজিতেছিল… মম চিত্তে … কেযে নাচে তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ… কিন্তু তাহার অট্টহাসিতে রবীঠাকুরের গানের কলিগুলি যেনো গুরুম গুরুম শব্দে কি এক অদ্ভুত আওয়াজে ঘরের চারিদিকে বিহব্বল বাতাশের মতো ঘূর্ণিপাক খাইয়া প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করিলো। তাহাতে আর যাই হোক, চিত্ত নাচিবার কোনো কারন দেখিতেছি না। বরং এক অজানা ভয়ে চিত্ত শুকাইতেছিলো। ইহার পরে আবার আরেক অজানা ভয় ঢোকিতেছিলো যে, এতোরাতে আমার ঘরে একজন মেয়েলী কণ্ঠে হাসির তামাশা আমাকে আরো শঙ্কায় ফেলিয়া দিলো। আমি ভদ্রমানুষ, সমাজে আমার নামডাক আছে, আমি সমাজের একজন ক্লিন মানুষের মধ্যে একজন। এই এতো রাতে আমার বাসায় কোনো এক অপরিচিত যুবতি মেয়ের প্রবেশ কোনোভাবেই আমি ব্যখ্যা করিতে পারিবো না। অন্তত আমার বউ, আমার পরিবার-পরিজন বিশ্বাস করিলেও অন্যকেউ ইহা সহজে বিশ্বাস করিবে তাহার কোন যুক্তি আমি খুজিয়া পাইতেছিলাম না। শঙ্কায় পরিয়া আমি মেয়েটিকে একটু শান্ত হইয়া বসিয়া তাহার যাহা বলিবার তাহা যেনো কণ্ঠ সংযত করিয়া বলিতে অনুরোধ করিলাম। এতো অট্টহাসি হাসিতে আমার ঘরের লক্ষ্মী পরিবেশকে সংকিত করিতে মানা করিয়া বলিলাম। অনেকটা আদরের সহিতই বলিলাম,  “মা তুমি আমার মেয়ের বয়সের সমান, আমি অপদস্থ হই, এমন কোনো প্রতিক্রিয়া করিও না।”

-আরেনা বাপু, এতো অস্থির হইবার কোনো কারন নাই। আর আমাকে কেউ জেলখানা হইতে বাহির হইতে দেখেও নাই আবার সকাল না হইতেই আমি আবার আমার কন্ডেমসেলে ঢুকিয়া পরিব। তোমার কোন ভয় নাই। আমি মাঝে মাঝেই এই রকম রাতে বাহির হইয়া থাকি। আজই প্রথম নয়। কয়দিনই বা আর এই পৃথিবীতে বাঁচিব বল, এত ভয় করিবার তো কোন কারন দেখিনা। জেলেই তো আছি, জেলের আবার ভয় কিসের? তবে আমার ফাঁসি হওয়াতে আমার মনের অনেক কষ্ট লাঘব হইয়াছে বলিয়া আমি মাঝে মাঝে মনের আনন্দে ঘুরিয়া বেড়াইতে পারিতেছি। অন্তত একটা সুরাহা তো হইয়াছে। পাপীর তো শাস্তি হইয়াছে।

মেয়েটি আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন না করিয়া  সরাসরি ‘তুমি’ এবং এমন ভাবে ‘বাপু’ শব্দটি উচ্চারন করিল যেনো হটাত করিয়া আমার বুকের কোনো এক জায়গায় একটি মানবিক সম্পর্ক টানিয়া আনিয়া জোড়া লাগাইয়া দিলো। মনে হইলো, আমি বুঝি সত্যিই তাহার ‘বাপু’। অন্তরে একটা শীতলপরশ একঝলকের জন্য বিদ্যুতের ন্যায় আচমকা একটা সাড়া দিয়া নড়িয়া উঠিল। আমি মেয়েটির দিকে অনেক্ষন চাহিয়া থাকিলাম, যেনো কোনো এক সুদূর অচেনা এক দেশ হইতে মেঘের ভেলায় ভাসিয়া আসিয়া আমাকে এক খন্ড শিক্ত জলে ভিজাইয়া দিলো। তাহাকে এখন আর আমার আগের মুহূর্তের মতো ভয়ঙ্কর এবং অস্বাভাবিক মনে হইলো না।মনে হইল মেয়েটি আমার পরিবারের যেনো কেহ।

-তোমার ফাঁসি হইয়াছে এই খবরে তুমি এত আনন্দিত কেন?

শিমা এইবার আর হাসিল না। অনেকক্ষন চুপচাপ থাকিয়া তাহার ছোট গালের দুইপাশে তাহার দুইহাত ঠেস দিয়া কাধের ব্যাগখানি টেবিলের উপর রাখিয়া আমার চোখের দিকে তাকাইয়া প্রশ্ন করিলঃ তুমি কি কখনো কোন ফাঁসির আসামীর সঙ্গে ফাঁসীর আগের রাতে গল্প করিয়াছো?

-আমি বলিলাম, না, সে সুযোগ আমার আসে নাই। তবে জানিতে অনেকবার মন চাহিয়াছিল তাহাদের মনের অবস্থা কি, জীবন সম্পর্কে তাহাদের উপলব্ধি কি, কিংবা তাহার ওই সময়ের ভাবনা কি, কি নিয়ে তাহারা কিভাবে কি ভাবে বা কাউকে কি কোন কিছু বলিয়া যাইতে ইচ্ছা করে কিনা ইত্যাদি। অথবা এমন কোনো ভাবনা কি আসে, আহা যদি আরেকবার সুযোগ আর স্বাধীনতা পাইতাম, তাহা হইলে ফাসি হয় এমন কোনো কাজ আমি করিবো না, অথবা, আহা এমন কি কোন জায়গা আছে, যেখানে আমি লুকাইয়া গেলে আমাকে আর কেহই খুজিয়া পাইবে না? 

– তাহা তো ঠিকই। যুগেযুগে প্রতিদিনই তো আর ফাঁসির কাজটা হয়না যে, আজকে সুযোগ পাইলাম না বলিয়া আগামিকালের ফাঁসিটায় তা উপভোগ করা যাইবে। এইটাতো আর পুকুরপাড়ে গিয়া বরশি দিয়া মাছ ধরিবার মতো ঘটনা না যে, আজ পাইলাম না তো কাল পাইয়াই যাইবো। আর পাইয়া গেলে ওই ধরাশায়ী মাছকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লইবো, সে পানির ভিতরে কিভাবে সাতার কাটিতে কাটিতে হতাত করিয়া মানবের বরশির ফাঁদে পা দিয়া তাহার অনবদ্য জলীয় জীবন হইতে এক নিমিসে স্থলের মুক্ত বাতাসে আসিয়া প্রানবিনাস করিয়া পগারপার হইয়া গেলো। মৎস্যদের সাহিত্যক কেহ থাকিলে হয়ত তাহার কোন এক কাব্যগ্রন্থে লিখিত, “স্থলের মুক্ত বাতাস শুধু প্রানের জিবনীশক্তিই জোগায় না, ইহা কখনো কখনো কিছু কিছু প্রানীর প্রানের নাশের কারনও হইয়া দাড়ায়”।

মেয়েটি অনেক সুন্দর করিয়া গুছাইয়া কথা বলিতে পারে বুঝিতে পারিলাম। “স্থলের মুক্তবাতাস শুধু প্রানের জীবনিশক্তিই জোগায় না, ইহা কখনো কখনো প্রাননাশের কারনও হইয়া থাকে” কথাটা আমার খুব মনে ধরিলো। সে কি মনে করিয়া এই রকম একটা তত্ত্ব কথা বলিল তা আমার বোধগম্য হইলো না তবে বাচিয়া থাকিবার জন্য যাহার যেখানে যাহা প্রয়োজন, সে তাহাই সম্ভবত বুঝাইয়া দিলো। আমি এতোক্ষন অফিসের জটিল একটা একাউন্টিং নিয়া কাজ করিতেছিলাম কিন্তু এই মেয়েটি আসিয়া এখন আমাকে আরো জটিল সময়ের মধ্যে ফেলিয়া দিলো বলিয়া আমার মনে হইতে লাগিলো। কিন্তু খারাপ লাগিতেছিলো না। তাই, অফিসের কাজ একপাশে রাখিয়া তাহার সাথে গল্প করিতেই মন চাইলো।

আমি এইবার তাহাকে কিছু খাইবে কিনা জিজ্ঞাসা করিতেই বলিয়া উঠিল যে, “জেলখানায় না গেলে সে বুঝিতে পারিতো না, চার দেওয়ালের ভিতরেও কতো ধরনের নীতি আর কত আকারের দুর্নীতি রহিয়াছে। যাহাদের টাকা আছে, তাহাদের জন্য নীতি এক রকমের, যাহারা বিখ্যাত, তাহাদের জন্য পলিসি আরেক রকমের, যাহাদের কেউ নাই, তাহারা তো কোনো প্রানিকুলের মধ্যেই গন্য হয়না। যাকগে সেইসব কথা, তোমরা থাকিবে এই পৃথিবীতে, যেইভাবে তোমরা আরাম আয়েশ করিতে চাও, সেইভাবেই পলিসি করো কিংবা নিতী পাল্টাও তাহাতে আমারই কি আর আমি বা কে তাহার বিরুদ্ধে নালিশ করিবার?আমি ভালো খাইতে পারিতেছি, আমার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা আছে, ইহাতেই আমি খুশি। এই যেমন, আজ আমি খাইয়াছি ইলিশের তরকারী, ঘনডালের চর্চরী, সঙ্গে ডিমের হালুয়া ছিল। খাওয়ার পর আবার আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলো, আমি আরো কিছু খাইতে চাহি কিনা। আমি আইসক্রিম খাইতে খুব পছন্দ করি, বলিতেই দেখি, একটু পরে খুব মজার আইসক্রিম চলিয়া আসিলো। আমি তো ভালোই আছি। একটা জিনিস জানো? কোরবানীর পশুকে তাহাদের মালিক কোরবানী করিবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত অনেক আদর যত্ন করিয়া, ভালো ভালো খাবার খাওয়াইয়া, গোসলপাতি করাইয়া ঠিক সময়মত তাহাকে হুজুর কিংবা পাগড়ীপরা মুসুল্লী দিয়া গলায় ছুরি দিয়া একনিমিসে কতল করিয়া দেয়। আমি হয়তবা সেই রকমের একজন কোরবানীর পশুর গননায় আছি। কোরবানীর পশুকে জবাই করিতে কাহারো হৃদয়ে কোন কম্পন সৃষ্টি হয়না। বরং দল বাধিয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েসহ সব মুরুব্বীরা ঈশ্বরের নাম জপিতে জপিতে তাহাকে প্রানে মারিয়া ফেলে।

আমি একটা সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিলাম, তুমি কি সিগারেট খাও?

-দাও একটা। খাওয়ার অভ্যাস তো ছিলোই, জেলে যাওয়ার পর আর খাইতে পারি নাই। আমি বুঝি না, জেলের মানুসগুলি যাহা চাই, তাহাই আমাকে দেয় কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাকে একটা সিগারেটও দিলো না। অথচ নেশার জগতের সবচেয়ে বড় আভাসভুমি হচ্ছে জেলখানা। দল বাধিয়া সবাই নেশা করে। ঐখানে নেশা করিবার কারনে পুলিশ কখনো কাউকে গ্রেফতার করে না। অবশ্য আমি কখনো সিগারেট চাইও নাই।

শিমা আমার সিগারেটের প্যাকেট হইতে একটা সিগারেট লইয়া আগুন ধরাইয়া একমুখ ধোয়া পুরা রুমের ভিতর ছড়াইয়া দিয়া একটা হাসি দিয়া বলিল- আহ কতোদিন পর এমন করিয়া সিগারেট ফুকি নাই। হয়ত এই সিগারেটের জন্যই তোমাকে আমার মনে থাকিবে। আমার আর মনে থাকিবে কি, আমি তো মরিয়াই যাইবো, বরং মনে থাকিবে তোমার। ওই একই হইলো। তুমি আমাকে মনে রাখিবে না আমি তোমাকে মনে রাখিবো, ইহাতে কোনো কিছুই পরিবর্তন হইবে না। না পরিবর্তন হইবে তোমার অফিসের কাজের, না সমাজের, না অন্য কাহারো। এই পরিবরতনের সাথে আমাদের প্রিথিবী অনেক পরিচিত। ইহাকে আমাদের এই পৃথিবী সাধারন ঘটনার মধ্যে গন্য করিয়াই তাহার মনুস্যকুলকে এক প্রজন্ম হইতে আরেক প্রজন্মে লইয়া যায়। ইহাকেই হয়ত আমরা ইতিহাস বলিয়া চালাইয়া দেই।

এতোক্ষন আমি যেই ভয়টা পাইতেছিলাম, সেই ভয়টা এখন আর নাই। মনে হইতেছিলো শিমা আমার পরিচিত কেউ। বলিলাম, তোমার জেলের ভিতরের অভিজ্ঞতা, ফাঁসির খবরে তোমার প্রতিক্রিয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি বলো তো দেখি শুনি।

-আচ্ছা, তোমার বাসায় কি কফি আছে? খুব কফি খাইতে ইচ্ছা করিতেছে। এই বলিয়া শিমা নিজেই আমাদের রান্না ঘরের ভিতরে ঢূকিয়া গ্যাসের চুলা জ্বালাইয়া দুইকাপ ব্ল্যাক কফি বানাইয়া এককাপ আমাকে আর এককাপ সে নিজের জন্য রাখিয়া গল্প করিতে আরম্ভ করিলো।

-গল্পটা শুরু কবে হইতে শুরু হইয়াছিলো তাহা আমার জানা নাই। তবে আমার জীবনে আদর আর আহ্লাদের কোন কমতি ছিলো না। যখন যাহা চাহিয়াছি, তখনই তাহা আমি আমার মতো করিয়া পাইয়াছি। সুখেই দিনগুলি কাটিতেছিলো। সচ্ছল পরিবার, ছোট পরিবার। খুব একটা বিড়ম্বনা নাই। বন্ধুবান্ধব যাহারা ছিলো, তাহারাও আমার অবস্থা বুঝিয়া মানিয়া চলিতো। লেখাপরা করিতেছিলাম কিন্তু খুব ভালো লাগিতেছিলো না। বাবা সরকারী চাকুরী করেন কিন্তু সময় যতোটা পাইতেন, তাহা হইতে বেশি বাহিরে থাকিতে পছন্দ করিতেন। মা গৃহিণী মানুষ, অতো চালাক চতুর নহেন, সামান্যতেই তিনি সুখি। আমাদের যত্ন আদিতে তাহার কোন কমতি ছিল না। তারপরেও আমার মাকে মনে হইতো তিনি সংসারে একা। কখনো কখনো মা বাবার সাথে কথা কাটাকাটি করিতো বটে কিন্তু মা ইচ্ছা করিয়াই হারিয়া যাইতেন। সংসারের শান্তি থাকুক এই ভাবিয়াই চুপ থাকিতেন। তাহার সাধ আহ্লাদের মধ্যে যাহা ছিলো তা নিতান্তই কয়েকটা টিভি সিরিয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মাকে আমি খুব ভালোবাসিতাম কিন্তু মায়ের এই কম্প্রোমাইজের গুনটি আমি কখনোই মানিয়া লইতে পারিতাম না। ফলে, বাবার সাথে আমার প্রায়ই খিটখিটে ঝগড়া লাগিয়া থাকিতো। বাবাও আমাকে ভালোবাসিতেন বটে কিন্তু আমার পরাশুনা লইয়া, আমার আচার আচরনে তিনি মাঝে মাঝে এতোই বাড়াবারি করিতেন যে, মনে হইতো এই লোকটি আমার অপছন্দের তালিকায় শীর্ষে রহিয়াছেন কিন্তু তাহাকে তাহা আমি বুঝাইতে চাহি নাই।

এইভাবেই আমার দিনগুলি কাটিয়া যাইতেছিলো। মাঝে মাঝে বন্ধুদের বাসায় বিশেষ বিশেষ উৎসবের বাহানায় আমি বাসার বাহিরে থাকিতে পছন্দ করিতাম, নাইট ক্লাবে ঘুরিতাম, অনেকরাত পর্যন্ত আড্ডা দিতাম। আমার মা কিছু বুঝিতে পারিলেও খুব একটা উচ্চবাচ্য করিতেন না। করিলে আবার খামাখা সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয় এইভয়ে বাবাকেও মা খুব একটা কানে দিতেন না। বিশেষ করে আমার নেশা করিবার ব্যাপারটা তো তিনি বেমালুম চাপিয়া থাকিতেন। মা আমার অনেকদিন অনেকভাবে একা গায়ে হাত বুলাইয়া, আদর করিয়া, মা-সোনা বলিয়া নেশা না করিবার জন্য অনেক জ্ঞ্যানদান করিতেন কিন্তু নেশা এমন এক জিনিস, একবার শুরু করিলে, শেষে নেশাই তোমাকে টানিয়া লইয়া যাইবে। ঐখান হইতে আর বাহির হইবার জোগার থাকে না। আমারো ঠিক তাহাই হইয়াছিলো। আমি প্রায় প্রতিদিন নেশা করিতাম। আমি যে একটা মেয়ে, আমার যে অনেক কিছু লুকাইবার আছে, এইগুলি আমাকে কখনই বাধা দেয় নাই, না আমার বিবেক না আমার বন্ধুবান্ধব। মায়ের বাধা আমার কাছে কোনো বাধাই মনে হইতো না। ফলে নেশারই জয় হইয়াছিলো।

আমি অনেক্ষন ধরিয়া শিমার কথাগুলি শুনিতেছিলাম। এইবার আমি তাহাকে প্রশ্ন করিলাম, ‘আচ্ছা কে তোমাকে এইরুপ সঙ্গ দিতো?’

– অসৎ সঙ্গ দেওয়ার জন্য মানুষের অভাব হয় না। শুধু টাকা হইলেই চলে। দেখিবে, তোমার আশেপাশে এমনসব মানুষের ভীড় জমিয়া গিয়াছে যাহা তোমার মাথাটাকে, তোমার আত্মসম্মানবোধটাকে ভূলুণ্ঠিত করিতে একটু সময়ও অপচয় হয় না। নেশার রেশ ধরিয়া প্রথমে একঘর হইতে আরেকঘর, তাহার পর একবাড়ি হইতে আরেকবাড়ি, এবং ধিরে ধীরে ধিরে একপাড়া হইতে আরেকপাড়ায় এই বদনাম ছড়াইতেই থাকিবে। আর যদি একবার এই বদনাম ছরাইতে থাকে আর মন তাহা গ্রাহ্য না করিয়া আরো অদম্য গতিতে তাহার শাখা প্রশাখা বাড়াইতে থাকে তখন বিনাশ ছাড়া আর কিছুই নিজের জন্য বহিয়া আনে না। তখন শুধু চাহিয়া চাহিয়া নিজের সর্বনাশ অবলোকন করা ছাড়া আর কিছুই করিবার থাকে না। আমারো তাহাই হইয়াছিলো। আমি আমার জীবনে যাহা করিয়াছি, এখন ভাবিলে আমার নিজেরও মনে হয়, আমি ইহা কিভাবে করিতে পারিলাম? ইহা করা আমার কখনোই উচিত হয় নাই। কিন্তু যে সাপ একবার তাহার বিষদাত ফুটাইয়া তাহার সমস্ত বিষনালী খালি করিয়া সর্বনাশের কামড় মারিয়া দিয়াছে, তাহা হইতে পরিত্রান পাওয়ার জন্য সাপের হইতে সাপে যাহাকে কামড় দিয়াছে তাহার চিকিৎসা অনেক জরুরী হইয়া ওঝার প্রয়োজন হইয়া পরে। আমি ওঝার সাহায্য নিতে হইবে ইহাও বুঝিতে পারি নাই। 

এইভাবে আমি যেনো আস্তে আস্তে কোন এক অন্ধকার জীবনের শহরে ঢোকিয়া গেলাম। অন্ধকার আর কালোর মধ্যে একটা তফাত আছে। কালোর একটা রঙ আছে কিন্তু অন্ধকারের কোনো রঙ নাই, আছে অনিশ্চয়তা আর প্রতিনিয়ত বিপদের হাতছানি। কিন্তু বয়স বলে একটা কথা আছে। এই বয়সে তাহার মন আর যুক্তি বাস্তবের সাথে কতটা যে ফারাক, তাহাতে আর যাই হোক তাহার আত্মার শান্তি হয় না। আত্মা, মন, আর যুক্তি যখন একই সুতায় থাকে না, তখন প্রতিনিয়ত শুরু হয় অন্তর্দাহ, আর এই অন্তর্দাহ হইতে শুরু হয় কলহ। আর একবার যদি কলহ বাধিয়া যায়, তাহা আর  নিভিবার উপায় থাকে না। অন্তর্দাহ নিভাইবার জন্য জলভর্তি কলশী কিংবা তীরভর্তি নদীর প্রয়োজন নাই, প্রয়োজন সময়ের সাথে পরিবর্তনের ইচ্ছা। ইহা আমার ছিলো না। ফলে অন্তর্দাহ যেমন নিভিতেছিল না, তেমনি বাতাসের স্পর্শ পাইয়া উহা আরো তীব্র দাবদাহে পরিনত হইতেছিলো। আমাদের পরিবারেও তাহাই ঘটিতে লাগিলো।

প্রতিদিন সকাল হইলেই আমি কেনো দেরি করিয়া ঘুম হইতে উঠি, কেনো আমার ক্লাশের ফলাফল ভালো নয়, কেনো আমাকে প্রতিদিন বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় যাইতে হইবে, আর তাহাদের সঙ্গে আড্ডায় যাইয়া কেনো রাত অবধি থাকিয়া বাসায় ফিরিতে হইবে, এইসব ব্যাপারে কথা শুনিতে হইতো। বাবার সব কথায় আমি প্রতিবাদ করিতাম না কারন আমি জানিতাম, আমার প্রতিবাদে বাবার কাছ হইতে আমার সাহাজ্য বন্ধ হইয়া যাইবে, আর আমার মায়ের এমন কোনো গুপ্ত তহবিলও ছিলো না যেখান হইতে বাবার সাহাজ্য ছাড়াই আমি আমার যাবতিয় শখের মনোবাঞ্চনা পুরুন করিতে পারিবো। তাই মাঝে মাঝে আমি বাবার অকথ্য গালিগালাজের ব্যাপারটা অনেকটা উপেক্ষা করিয়াই আমি বাবার সাথে এমন ব্যবহার করিতাম যেনো, বাবা ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে আর কাউকে আমি বেশী ভালোবাসিনা। আর আমার বাবা হইতে আরো ভালো বাবা এই পৃথিবীতে আর একটাও সৃষ্টি হয় নাই। তিনিই যেনো সর্বশ্রেষ্ঠ বাবাদের মধ্যে একজন। ইহা ছিলো একটা নকল ভালোবাসা। হইতে পারে, বাবারা বা মায়েরা নকল ভালোবাসা বুঝিতে পারেন না। তাহাদের ভালোবাসায় কোনো খাদ নাই।

এইভাবেই আমার দিন চলিতেছিলো। আমার রুপের কথা যদি তোমাকে বলিতে যাই, সেই টা মনে হয় আর দরকার নাই। আমিতো তোমার সামনেই এখন বসিয়া আছি। আমি দেখিতে কেমন, কেমন আমার চোখ, নাক, গাল কিংবা আমার মুখমন্ডল, ইহা তোমাকে আর বিশেষণ দিয়া বুঝাইতে হইবেনা। অনেক ছেলেবন্ধুরা আমার এই চেহারার প্রতি অনেক আকৃষ্ট হইয়া হয়ত অনেকে অনেক কবিতা, গল্প লিখিয়া থাকিতে পারে, তাহা আমার জানা নাই। তবে অনেকের রাতের ঘুম যে অনেকাংশেই বিঘ্নিত হইতো সেটা আমি জানিতাম। আমাকে নিয়া ছেলে মহলে অনেকের  সঙ্গে অনেকের দুই একবার অনেক যুদ্ধও যে হয় নাই তাহা নয়। কিন্তু আমি প্রকৃতভাবেই কাউকে এমন করিয়া ভালোবাসি নাই যাহাকে তোমরা আধুনিক কালের ছেলে মেয়েদের মধ্যে ভালোবাসার সীমানা টানিয়া থাকো। তবে এইটা ঠিক যে, মনুষ্যকুলে আমি যাহাকে সবচেয়ে বেশী আদর করিতাম তাহা হইলো আমার ছোটভাই। বড় মিস্টি করিয়া আমাকে আপু বলিয়া ডাকে, বড্ড দুস্টুমী করিয়া আমার পাশে আসিয়া তাহার যতো আবদার আছে সব খুলিয়া বলে। আমি তাহাকে কখনো গাল টিপিয়া, কখনো বুকে চাপিয়া ধরিয়া, কখনো আবার মিথ্যা ভয় দেখাইয়া বলিতাম, আমি তোমাকে ছাড়িয়া অনেক দূর চলিয়া যাইবো, তখন দেখিবো তুমি কাহাকে এতো কস্ট দাও। আসলে আমার ভাইটি আমাকে কখনো কষ্ট ও দেয় নাই। নিছক মজা করিবার জন্য তাহাকে আমি মিথ্যা ভয় দেখাইতাম। বুঝিতে চাহিতাম, আমার অই কথায় সে কতটুকু বিচলিত কিংবা মন খারাপ করে। অনেকদিন হইলো আমি আমার সেই ছোট ভাইটিকে দেখিতে পাই না।

এই বলিয়া শিমা একটু থামিলো বটে কিন্তু পরক্ষনেই বুঝিলাম, সে ফুপিয়া ফুপিয়া কাদিতেছে। নিঝুমরাতে এই অসম বয়সী দুই মনুষ্য যুগলের মধ্যে কোনো ভাষার আদান প্রদান হইতেছিলোনা বটে কিন্তু দুইজনের অন্তরের ভিতরে যাহা ঘটিয়া যাইতেছিলো তাহা অদৃশ্য ঈশ্বরের অজানা ছিলনা। চিনি না, জানি না, কখনো দেখি নাই, এমন একজন মানুষের গল্প শুনিয়া আমার মনের ভিতরেই বা কেনো ব্যথায় একটু মোচর দিয়া উঠিতেছে? আমি তাহার ভাইয়ের ভালোবাসার কথা মনে করিয়া আমি যেনো তাহার ওই ছোট ভাইটিকেও চোখে দেখিতে পাইতেছি। মনে হইতেছিলো, আহা, আমারও যদি এমন একটা ছোট ভাই থাকিতো? সিমার ছোট ভাইয়ের প্রতি এতো ভালোবাসার অনুভুতি দেখিয়া আমার দুই মেয়ের ছবি ভাসিয়া উঠিল। কি অদ্ভুদ এই ভাইবোনের সম্পর্ক। কখনো ঝগড়া, কখনো হাতাহাতি, কখনো খুব ক্ষুদ্র একটা জিনিষ লইয়া তাহাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি আবার কখনো একসঙ্গে এক টেবিলে বসিয়া রাজ্যের হাসাহাসি, আরো কতো কি? ভালোবাসার মানুষ যখন কাছে থাকে, তখন তাহাকে যতটা না আপন মনে হয়, যখন সে কাছে থাকে না, তখন তাহার জন্য প্রান বড় আনচান করে। মনে হয়, একবার যদি আবার কাছে পাইতাম, তাহা হইলে অনেক আদর করিয়া সব ব্যাথা বেদনার জল তাহার কাছে সমর্পণ করিয়া আরেক বার ক্ষমা চাহিয়া বলিতাম, তোমাকে ছাড়া আমার চলিবেনা। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি।

রাত অনেক হইয়াছে। কেহ জাগিয়া আছে বলিয়া আমার মনে হয়না। মাঝে মাঝে ঐ দূরে নাইট গার্ডের চিৎকার শুনা যায়, কিংবা অনেক রাতের বিমান যাত্রিদের নিয়া কিছু কিছু বিমান নিশাচরের মতো আমাদের এলাকা দিয়া উড়িয়া যাইবার সময় বিকট একটা শব্দ করিয়া কোনো এক অজানা অন্ধকারের রাস্তা ধরিয়া একদেশ হইতে আরেক দেশে মিশিয়া যায়, সেই চেনা শব্দ দূর হইতে ভাসিয়া আসিতেছে। কিন্তু ইহাতে আমাদের মধ্যে কোন বিরক্তবোধ হইতেছে না। দেখিলাম, সিমার চোখে একটু একটু জলের আভা ঘরের আলোতে চিক চিক করিতেছে। চোখের জল যখন পরি পরি করিয়াও পরিতেছে না, তখন তাহা চোখের পাপড়ির সঙ্গে এক হইয়া এমন একটা বিন্দুর সৃষ্টি করে যে, মনে হইবে চোখের দুই ধারে যেনো একটা স্বচ্ছ হিরার খন্ড ঈশ্বর বসাইয়া দিয়াছেন। সিমার চোখের কোনায় তাহার দুঃখের বহিরপ্রকাশ যেনো এমন করিয়াই ঐ একখন্ড হিরার জল চিকচিক করিয়া ফুটিয়া উঠিতেছিল। 

সিমা তাহার চোখের জল আমার কাছ হইতে লুকাইবার কোনো চেষ্টাই করিলো না।আমার দিকে ছলছল নেত্রে তাকাইয়া, দুই হাত দিয়া চোখের জল মুছিয়া অতি সাধারন ভঙ্গিতে বলিল,

– আরেক কাপ কফি খাই? তুমিও কি কফি খাবে?

আমি কফি খাইবো কি খাইবো না, ইহার প্রতি উত্তোরের জন্য কোন অপেক্ষা না করিয়াই সিমা চেয়ার ছাড়িয়া নিজেই আমাদের রান্নাঘরে কফি বানাইতে চলিয়া গেলো। সিমা একটা নীল ওড়নার সহিত হলুদের কামিজ পড়িয়াছে। কম্বিনেসন করিয়া হয়ত সাদা স্যালয়ার পরিয়াছে কিন্তু খারাপ লাগিতে ছিলো না। আর জেলখানায় তো নিজের আলমারী থাকে না, হয়ত এইকয়টা জামাই তাহার কাছে রহিয়াছে। কতই বা বয়স তাহার। আমার মনটা বড্ড কেমন কেমন যেনো করিতেছিলো। আঘাত করিলেই শুধু অন্তরে ব্যথা হয় এমন নয়। আমাদের চারিদিকে অহরহ এমন কত কিছু ঘটিতেছে যাহার ইতিহাস শুনিলে আঘাত যিনি পাইয়াছেন, তাহার হইতেও আঘাত বেশী প্রতিয়মান হয় যিনি ঐ ইতিহাস শুনিতেছেন। আমারও তাহাই হইতেছিল। আমিও যেনো কোথায় বিনা কারনে আঘাতপ্রাপ্ত হইতেছিলাম।

অনেক্ষন হইয়া গিয়াছে সিমা কফি বানাইতে গিয়াছে, এতক্ষনে কফি বানানো হইবার কথা। দেরী দেখিয়া আমিও রান্নাঘরে ঢুকিলাম। দেখিলাম, এক হাতে সিমা একটি ছোট চামচ লইয়া কফির কাপের মধ্যে কফি শুধু নাড়াচাড়াই করিতেছে, অথচ আর নাড়িবার প্রয়োজন নাই। বুঝিলাম তাহার মনোযোগ ঐ কফির কাপের মধ্যে নাই। সে যেনো কোথায় হারাইয়া গিয়াছে। সে যে একটা অপরিচিত বাসায় এতো রাতে কাহাকেও না বলিয়া আসিয়াছে, তাহার যে অতি তারাতাড়ি এইখান হইতে আবার চলিয়া যাইবার তাড়া থাকিবার দরকার, আমি তাহার চোখে মুখে, চেহাড়ায় ইহার কোনো চঞ্চলতা দেখিতে পাইলাম না।

আমার উপস্থিতি টের পাইয়া সিমা যেনো সম্বিত ফিরিয়া পাইলো। বুঝিলাম, এতোক্ষন সময়টা সিমার কাছে থামিয়াই ছিলো। একটু লজ্জা পাইলো বটে কিন্তু মুচকী হাসিতেও হাসিলো না। কফি বানানো হইয়াছে। আমরা যার যার কফি হাতে নিয়া আবারো আমাদের ডাইনিং চেয়ারে বসিলাম।

আরো একটা সিগারেট ধরাইয়া আমি সিমাকে জিজ্ঞাসা করিলাম

-সিমা, শুধু কি বাবা মার প্রতি রাগের কারনেই তুমি তাহাদের খুন করিলে? কিভাবে খুন করিলে? খুন করিবার সময় কি তোমার মন একটুও বিচলিতবোধ করে নাই? তোমার মধ্যে কি একবারের জন্যও মায়া, মহব্বত, তাহাদের আদর, কিংবা এমন কিছু মনে পড়ে নাই যাহাতে তুমি চিরতরে তাহাদের খুন না করিয়া তাহাদের ক্ষমা করিয়া দিয়া অন্তত প্রানে বাচাইয়া দিতে পারিতে? অথবা খুন করিবার পর তোমার মনের অবস্থা কেমন হইয়াছিলো? তুমি কি একটু সময়ের জন্যও কাদিয়াছিলে? অথবা এমন কিছু কি ভাবিয়াছো যে, আহা, আমি ইহা কি করিলাম ইত্যাদি?

সিমা আমার সিগারেটের প্যাকেট হইতে আরো একটি সিগারেট লইয়া ম্যাচের কাঠি কয়েকবার চেষ্টা করিয়া জালাইতে না পারিয়া আমার জলন্ত সিগারেটের আগুন হইতে তাহার সিগারেটখানা ধরাইয়া একগাল ধুয়া ছাড়িয়া বলিতে লাগিলো,

– মানুষ যখন নেশায় থাকে তখন তাহার অবস্থা এক, আর যখন নেশা কাটিয়া যায়, তখন তাহার অবস্থা থাকে অন্য রকম। তুমি কি কখনো নেশা করিয়াছো? নেশা মানুষকে শুধু স্বার্থপরই বানায় না, তাহাকে নেশা এমন করিয়া চাপিয়া ধরে যে, তখন তাহার কাছে অন্য আর কিছুই বাস্তব বলিয়া মনে হয় না। সে হয়ে উঠে এক অদম্য অপ্রক্রিস্থিত প্রানি যাহার না আছে কোনো সমাজ, না আছে কোনো বন্ধন, না আছে কোন মহব্বত, না আছে কোনো সংসার। হয়ত বা আমিও সেই রকম একটা ঘোরের ঘরেই ছিলাম। তাহাদেরকে আমার আপনজন বলিয়া একটুও মনে হয় নাই। আমার ছোট ভাইটিও তাহাদের পাশেই ছিলো, আমি একবারের জন্যও মনে করিতে পারি নাই যে, আমি না হয় তাহাদের হারাইবো, কিন্তু আমার ছোটভাই যাহাকে আমি আমার প্রানের চেয়েও বেশী ভালোবাসি, সে কেনো তাহার বাবা মাকে হারাইবে? আমার শুধু মনে হইতেছিল যে, তোমরা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়াছো, আজ তাহার পরিনাম ভোগ করিবে। এই পরিনাম তাহাদের অপরাধের তুলনায় কত বড় শাস্তি, কিংবা এই পরিনাম আদৌ শাস্তি কিনা অথবা এই পরিনাম প্রকারান্তে আমি আমাকেই আরো অধিক শাস্তি দিতেছি কিনা তাহা আমার মনের অজান্তেও আবির্ভাব হয় নাই। ঈশ্বর যখন কাউকে শাস্তি দিতে চাহেন, তখন তাহার দ্বারাই তাহার শাস্তির পথ প্রসারিত করিয়া দেন। ঈশ্বর সব সময়ই নির্দোষ থাকেন।

-কিভাবে তুমি এমন কাজটি এতো সহজে করিলে? আমি সিমাকে প্রশ্ন করিলে, এইবার সিমা আমার দিকে একটু রাগের সহিতই আচরন করিলো।

-আমার আর এই প্রসঙ্গে কোনো কথা বলিতে ভালো লাগিতেছে না। অন্য কথা বলো।

বুঝিলাম, সিমা বিরক্ত হইতেছে। ওকে আমার বিরক্ত করিবার কোন ইচ্ছাই নাই। শুধু জানিতে মন চাহিতেছিলো, তাই জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। এখন আমার জানিলেও যাহা হইবার তাহাতে কোনো রুপ পরিবর্তন হইবে না, আর না জানিলেও ঘটনার কোনো ব্যতয় হইবে না।

– আচ্ছা, আচ্ছা সিমা, তোমাকে আর আমি এই ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করিবো না। তবে তোমার যাহা বলিবার ইচ্ছা হয় তাহাই আমাকে বলো। তোমার কথা শুনিতে আমার ভাল লাগিতেছে।

সিমা এইবার আপন মনে বলিতে লাগিলো-

– জেলখানায় বসিয়া আমি অনেকবার অনেক কিছু ভাবিয়াছি। মায়ের কথা ভাবিয়াছি, বাবার কথা ভাবিয়াছি, আমার ছোট ভাইয়ের কথা ভাবিয়াছি, আমার বন্ধু বান্ধব্দের কথা ভাবিয়াছি, আরো ভাবিয়াছি আমার আত্মীয়স্বজনের কথা। বারবার শুধু এইটুকুই মনে হইয়াছে, আমি যাহাদেরকে শাস্তি দিবার জন্য এতোসব পন করিয়াছিলাম, আসলে তাহারা কেহই শাস্তি পান নাই, শাস্তি পাইয়াছি আমি নিজে। আমি জানি, আমাকে আজ মুক্ত পৃথিবীর আলোবাতাসে ছাড়িয়া দিলেও আমি আর আগের অবস্থানে ফিরিয়া যাইতে পারিব না। যাহারা আমার জীবনের সব আনন্দ, সব সমস্যা সমাধানের জন্য তাহাদের প্রানের ঝুকি পর্যন্ত নিতে প্রস্তুত ছিলেন, আমি তাহাদেরকে নিজহাতে চিরতরে বিদায় করিয়া দিয়াছি। এখন কেনো জানি বারবার সকাল হইলেই মনে হয়, আহা যদি বাবা আমাকে আবার বকা দিতে আসিতো, আহা যদি মা এসে বলিতো, ‘সিমা এবার বিছানা ছাড়ো, উঠো, অনেক বেলা হইয়াছে, নাস্তা খাবে’। কিংবা আমার ছোট ভাইটি যদি আমার ওরনা টানাটানি করিয়া আমাকে জালাতন করিয়া অতিষ্ঠ করিয়া তুলিত? কিন্তু আমি জানি, আজ আর কেহই নাই। চোখে জল আসে, কিন্তু মুছিয়া দিবার মানুষ নাই। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অসহায় বলিয়া মনে হয়, কিন্তু আদর করিয়া কাছে টানিয়া ভরসার কথা শুনাইবার কোন মানুষ নাই। জেলখানায় বসিয়া যখন পূর্ণিমার আকাশ দেখি, অথবা ঘোর বৃষ্টি নামা দেখি, তখন আমার বাড়ির কথা মনে হয়। মনে হয়, কতদিন নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়াইয়া আকাশ দেখা হয় নাই, কতদিন দাদুর বাড়ির টিনের চালে টিপটিপ বৃষ্টির ঝনঝন শব্দ শুনা হয় নাই। কষ্ট হয় না বলিলে মিথ্যা বলা হইবে কিন্তু কি আরো এক অদ্ভুত কারনে জানি দুই চোখ ভিজে আসে। এখন আর নেশা করিতে ইচ্ছা করে না। নেশার প্রতি আর আমার কোন আকর্ষণও নাই। তাহার পরেও মনে হয়, মায়ের বকুনির জন্য আমি আজ নেশাগ্রস্থ, বাবার ধমকের জন্য আজ আমি নেশাগ্রস্থ। জানো? যা হারাইয়া যায়, আর যাহার সব কিছু হারাইয়া যায়, সে জানে কি হারাইয়া গিয়াছে আর কাকে হারাইয়া নিঃস্ব হইয়া গেছে।

আজ শুধু মনে হয়, যদি আমি উহা না করিতাম, যদি এমন কিছু করিতাম যাহা আবার ফিরিয়া পাইতাম, অথবা এমন কিছু যাহা আবার ফিরিয়া আসে। তাহা হইলে আজ শরতের সকাল, শিতের পিঠা, মায়ের অযথা বকুনী, ভাইয়ের অযাচিত আবদার, সেই দাদু বাড়ির আঙ্গিনায় বসিয়া একগুচ্ছ দুরন্ত বালক বালিকার সঙ্গে হৈচৈ, কোনো কিছুই জীবন হইতে হারাইয়া যাইতো না। তোমরা বাচিয়া থাকিবে, হয়ত একদিন সময়ের রেশ ধরিয়া তোমরাও আমার মত এই পৃথিবী হইতে বিদায় লইবে। অনেকেই তোমাদের জন্য কাদিবে, কেউ চিৎকার করিয়া বলিবে, তোমাকে ছাড়িয়া যাইতে আমার বড় কষ্ট। কিন্তু আমি যেদিন বিদায় হইবো, তখন সারা পৃথিবীর মানুষ জানিবে, আমি কোনো এক জঘন্য পাপ কাজ করিয়া এই পৃথিবী হইতে বিদায় নিলাম। আমার জন্য কাদিবার কোনো লোক খুজিয়া পাওয়া যাইবে না। আসলে এই পৃথিবী আমার জন্য নয় বিধায় আমাকে তাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। বড় বড় অক্ষরে তাহার পরের দিন প্রতিটি খবরের কাগজে তোমরা পড়িবে, “বাবা মাকে একসঙ্গে জোড়া খুনের দায়ে আমার ফাসি হইয়াছে”। কেহ কেহ আমাকে ঘৃণা করিবে, কেহ আবার ‘মাফ করিয়া দিলেই পারিত’ বলিয়া মন্তব্য করিবে। আর আমার ছোট ভাইটি যেদিন বুঝিতে পারিবে, তাহার পিতামাতা তাহার বোনের কারনে মৃত্যুবরন করিতে হইয়াছে, সেদিন হয়ত সেও আমাকে আর ক্ষমা করিবে না। অপরাধ একখন্ড জমি নয় যে, কাহারো নামে লিখিয়া দেওয়া যায়। রক্ত চোখের জলের থেকেও বেশী ঘন, তাহার পরেও চোখের জলের বেদনা রক্ত ঝরার থেকেও কষ্টের। আমি তাহাদের রক্ত ঝরাইয়াছি বটে কিন্তু কষ্টটা রহিয়া গিয়াছে আমার চোখের জলে।

আমি যেদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় লইবো, জল্লাদ যখন আমাকে আমার শেষ ইচ্ছার কথা জানিতে চাহিবে, জানো আমি কি বলিতে চাইবো? হয়ত মুচকি হাসি দিয়া বলিবো, “আমি পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়া মরিতে চাহি না, আমি এই পৃথিবীর কোনো আলো বাতাস লইয়া কথা বলিতে চাহি না, আমি জীবনের চরম সুখ বা দুঃখের কথা বলিয়াও কাউকে চমক দিতে চাহিবো না। আমি শুধু একটিবার সবার সামনে উচ্চস্বরে চোখের জল ভাসাইয়া বলিতে চাইবো, “মা আমি তোমাকে ভালোবাসি। বাবা, এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে আর কোনো এমন বাবার জন্ম হইবে কিনা আমি জানি না, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ বাবাদের মধ্যে একজন। আমি তোমাদের কাছে চলিয়া আসিতেছি। আমার ফাঁসির দড়িটা একটু তাড়াতাড়ি বাধিয়া দাও”।

এই বলিয়া সিমা তাহার মাথাটা নুয়াইয়া টেবিলের উপর রাখিয়া ফুপিয়া ফুপিয়া কাদিতে লাগিলো। আমি নিরন্তর কোনো ভাষাবিহীন এক শ্রোতার মতো শুধু সিমার কথাগুলি শুনিতেছিলাম। আমার চোখের পাতাও ভিজিয়া আসিতেছিল। মনে হইতেছিলো, এই ছোট মেয়েটি যেন তাহার বাবার সামনে বসিয়া তাহার জীবনের সমস্ত কস্তের কথাগুলি বলিয়া বাবাকে আরেকবার ভিজাইয়া দিয়া অস্থির করিয়া তুলিতেছে।

-এই যে শুনছো, এইভাবে টেবিলের উপর ঘুমাইতেছো কেন? কোনো এক হটাত শারীরিক ধাক্কায় আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেলো। দেখিলাম, অনেক বেলা হইয়াছে। আমার গিন্নি তাহার দল লইয়া মানিকগঞ্জ হইতে সকাল সকাল রওয়ানা হইয়া ইতিমধ্যে বাসায় চলিয়া আসিয়াছে। তাহার সহিত ঘরের চাবি ছিলো, অনেক্ষন কলিং বেল টিপার পরেও যখন আমার ঘুম ভাঙ্গাইতে পারে নাই, তখন তাহার ভ্যানিটি ব্যাগে রক্ষিত আরেক গোছা চাবি দিয়া ঘরের দরজা খুলিয়া ঘরে প্রবেশ করিয়াছে। আমি আশেপাশে কি যেনো খুজিতে লাগিলাম। সিমা কি এখনো আছে নাকি চলিয়া গিয়াছে? যদি মেয়েটি আসিয়াই থাকে তাহলে ঘরের চাবি লাগাইয়া আবার কিভাবে চলিয়া গেলো? তাহার কাছে তো কোনো চাবি ছিলো না? তাহলে কি কেহই রাতে আমার সঙ্গে গল্প করে নাই? আমার টেবিলের উপর তো এখনো দেখিতেছি দুইটা কাপ রহিয়াছে। তাহলে কি সিমা আসিয়াছিলো?

আমার গিন্নি, আমি কি খুজিতেছি জিজ্ঞাসা করিতেই বলিলাম, “সিমা……”

আর শেষ করিতে পারিলাম না। গিন্নি বলিয়া উঠিল, জানো? আজকের পত্রিকায় প্রথম পাতায় ঐ যে মেয়েটি যে তার বাবা মাকে খুন করিয়াছিলো, সিমা, তাহার ব্যাপারে বড় বড় করে সংবাদ আসিয়াছে যে, গতকাল রাত বারোটার পর সিমার ফাসি কার্যকর হইয়াছে”।

বুকটা ধক করিয়া উঠিল।

পত্রিকাটি হাতে লইয়া অনেক্ষন ধরিয়া খবরটি পড়িলাম। কিছুতেই মিলাইতে পারিতেছিলাম না। পত্রিকার সংবাদে সিমার শেষ ইচ্ছা জানিতে চাহিলে সিমা নাকি বলিয়াছিলো, “আমার কোনো কিছুই আর কাহারো কাছ হইতে চাহিবার নাই, শুধু আমার ফাঁসির দড়িটা একটু তাড়াতাড়ি বাধিয়া দাও। আমি আমার বাবা মায়ের কাছে যাইবো। তখন নাকি সিমা অতি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করিয়া বলিতেছিলো, “মা আমি তোমাকে ভালোবাসি। বাবা, এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে আর কোনো এমন বাবার জন্ম হইবে কিনা আমি জানি না, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ বাবাদের মধ্যে একজন। আমি তোমাদের কাছে চলিয়া আসিতেছি। আমার ফাঁসির দড়িটা একটু তাড়াতাড়ি বাধিয়া দাও।”

(আজ দুপুরে খাওয়ার সময় প্লেটের নিচে যে পত্রিকাটি দেওয়া হয়েছিলো, তাতে একটি জোড়া খুনের খবর ছিলো। খেতে খেতেই খবরটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম সংবাদটা নিয়ে। বাসায় যাচ্ছি, গাড়িতে আছি, অনেক সময় লাগবে, তাই কল্পনায় একটা গল্প লিখে ফেললাম। এই গল্পের সাথে কারো কোনো মিল নাই, এটা নিছক একটা গল্প।)

২৪/০২/২০১৬-আমার প্রিয় মা জননীর দল,

আমার প্রিয় মা জননীর দল,

আমি জানিনা যখন তোমরা আমার এই পত্রখানা পড়িবে তখন তোমাদের কত বয়স হইবে কিংবা আদৌ তোমরা এই পত্রখানা পরিতে পারিবে কিনা কিংবা পড়িলেও কখনো এর মর্মার্থ তোমরা বুঝিতে পারিবে কিনা। আর বুঝিতে পারিলেও কিভাবে এর অর্থ বুঝিবে তাও আমি জানি না। তবুও আজ মনে হইল তোমাদের উদ্দেশে আমার কিছু কথা বলা দরকার যাহা আমার মা আমাকে প্রায় দুই যোগ আগে বলিয়াছিলেন। আমি আমার  “উচ্ছিষ্ট সময়ের ডায়েরি” নামক ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এই মুহূর্ত গুলি লিখিয়াছিলাম। তাহা আমি আজ তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করিতে চাই।

“…………আজ হইতে প্রায় দুইযুগ আগে আমি যখন আমার মাকে আমার প্রথম ভালবাসার মেয়ের কথা জানাইয়াছিলাম, তখন তিনি মুচকি হাসিয়া আমাকে বলিয়াছিলেন, কে কাহাকে কত বেশি ভালবাসে তাহা কি তুমি ভাবিয়াছ? তুমি কি তাহাকে বিবাহ করিতে চাও? নাকি শুধু মনের আবেগে তোমার একাকীত্বকে দূর করিবার আখাংকায় তাহার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাইতে চাও? মজার ব্যাপার হইল, আমার মা মেয়েটি কতখানি সুন্দর, তাহার বাবার কি পরিমান সম্পদ বা সম্পত্তি আছে, তাহারা কয় ভাইবোন কিংবা তাহার পারিবারিক আর কোন তথ্য উপাত্ত কিছুই জানিবার জন্য আমাকে প্রশ্ন করিলেন না। শুধু বলিলেন, ব্যাপারে আমি কাল তোমার সঙ্গে আবার কথা বলিব এবং তোমার মনোভাব জানিব

আমার মায়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল এবং আমি তাহার সঙ্গে সব কথাই অকপটে বলিতে পারিতাম। মা কথাগুলি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলিয়া আমাকে আমার মত করিয়া ভাবিবার সময় দিলেন আমার মা।  আমার মা শিক্ষিত নন। তিনি হয়ত তাহার জীবনে প্রাইমারী স্কুল পার করিয়াছেন কিনা তাহাও আমার জানা নাই। কারন তাহার বিয়ে হইয়াছিল যখন তাহার মাত্র ১০ বছর বয়স। নিতান্তই একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে।  কিন্তু তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমতী এবং প্রাক্টিক্যাল একজন মা। আমার বড় প্রিয় মানুষ তিনি

 পরেরদিন আমি আর আমার মা আমাদের বাড়ির আঙিনায় বসিয়া আছি। বিকালের রোদ অনেকটাই কমিয়া গিয়াছে। সন্ধ্যা হইতে আরও কিছু বাকি। আমাদের বাড়ির বড় বরই গাছের মাথায় অনেক পাখির বাসা আছে। পাখিদের কিচির মিচির শব্দ হইতেছে অহরহ। কিচির মিচির করিয়া পাখিদল যে কি কথা কাহাকে বলিতেছে তাহা বুঝিবার ভাষা বা ক্ষমতা আমাদের কাহারো নাই। এইদিক সেইদিক উরাউরি করিতেছে আর যার যার বাসায় তাদের স্থান করিয়া নিতেছে।  দূরে গাছ গাছালিগুলি আস্তে আস্তে সন্ধ্যার ক্ষিন আলোতে ধুসর থেকে আরও কালো বর্ণের রঙ ধারন করিতেছে, বাড়ির গৃহস্থালিরা তাহাদের নিজ নিজ গরু ছাগল ভেড়া লইয়া গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিতেছে। কেউ কেউ আবার মনের আনন্দে সেই আব্দুল আলিমের ভাটিয়ালী কিছু গানের সুরে গানও গাইতেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠ হইতে খেলা ছারিয়া কেউ জোড়ায় জোড়ায় আবার কেউ দল বাধিয়া বাড়ির অভিমুখে হারাইয়া যাইতেছে। কিছু বয়স্ক মানুষ মাথায় কিছু মাল সামানা লইয়া হয়ত বা শহর কিংবা কাছের বাজার হইতে সদাই করিয়া তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়া যাইতেছে। দিনের শেষলগ্নে গ্রামের কিছু উঠতি বয়সের বধুরা অদুরে আমাদের ধলেশ্বরী নদী হইতে কাঁখে জল তুলিয়া কলসি ভরতি পানি লইয়া, ভিজা কাপড়ে হেলিয়া দুলিয়া মুচকি মুচকি হাসিতে আবার কখনো কখনো উচ্চস্বর আওয়াজে নিজেদের ঘরে আগমন করিতেছে। অদুরে কোন এক সদ্য প্রসব করা গাভি তাহার অবুঝ বাছুরটির সন্ধান না পাইয়া অবিরত হাম্বা হাম্বা করিতেছে। এমন একটি পরিবেশে আমি আর আমার মা মুখুমুখি বসিয়া আছি। বেশ সময় কাটিতেছে আমার। 

 মা সর্বদা পান খান, মায়ের পানের বাটি যেন তাহার দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মত একটি অংশ। যেখানে যাইবেন, সেখানেই তিনি তার এই অতিব প্রয়োজনীয় সম্পদটি সঙ্গে রাখিবেন। পানের বাটিটি ব্যতিত যেন মায়ের কোন কিছুই আর এত মুল্যবান সম্পদ আমাদের ঘরের মধ্যে নাই। পানের বাটিতে মা তাহার ছোট পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষিতেছেন, যেন অনেক যত্নের সহিত তিনি একটি খাদ্য রিসিপি বানাইতেছেন। পানের বাটির সঙ্গে পিতলের ডান্ডাটি ঠক ঠক আওয়াজে এক রকম টুং টাং শব্দ হইতেছে। এই রকম একটি পরিবেশে মা আমার দিকে না চাহিয়াই প্রশ্ন করিলেন, “কে আগে ভালবাসার কথা বলিয়াছিল? তুমি না সে?” মা আমাকে নিতান্ত সহজ সুরে যেন কিছুই হয় নাই এমন ভাব করিয়া প্রশ্নটি করিলেন। আমি বলিলাম, “কে আগে ভালবাসার কথা বলল, এতে কি আসে যায় মা? আমরা দুজন দুজনকেই তো ভালবাসি? সে আমাকে ভালবাসে আর আমিও তাকে ভালবাসি”। মা বলিলেন, আমার উপর ভরসা রাখ। আমি তোমাদের দুইজনকেই ভালবাসি যদিও আমি তাহাকে দেখি নাই কিন্তু তুমি তাহাকে ভালবাস। আর তুমি তাহাকে ভালবাস বলিয়াই আমি তাহাকেও ভালবাসি। কিন্তু তুমি তো আমার প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাইতেছ বলিয়া আমার মনে হইল।”

আমি বললাম, “না মা। আমি তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি না। তবে আমি প্রথম তার কাছ থেকে পত্র পাইয়াছিলাম সেইটা বলিতে আমার কোন দ্বিধা নাই। আমি পত্র পাইয়া বুঝিয়াছিলাম, যে, আমি ওকে ভালবাসি কিন্তু আমি বলিতে পারি নাই। সে বলিতে পারিয়াছিল। তাহার মানে এই নয় যে, আমি তাহাকে কম ভালবাসি  বা আমি তাহাকে ভালবাসি নাই।”

মা আমার মাথায় হাত বুলাইয়া, আমার পিঠে তাহার একটি হাত চালাইয়া আমার নাকের ডগায় আলতো করিয়া টীপ দিয়া বলিলেন, “তুমি তোমার জায়গায় ঠিক আছ তো? যদি ঠিক থাক, আমি চাই তুমি তাহাকে শাদি কর। তুমি সুখী হইবে”। 

 আমি অবাক বিস্ময়ে আমার মায়ের দিকে তাকাইলাম, সন্ধ্যার অল্প অল্প আলোতে আমি তাহার চোখে মুখে যেন এক প্রশান্তির ছায়া দেখিতে পাইলাম, তিনি একদিকে তাহার ঘাড় বাকা করিয়া পানের বাটি হইতে পান লইয়া কিছু পিষিত পান নিজের মুখে পুড়িয়া আর বাকি কিছু পান আমার গালে পুড়িয়া দিয়া বলিলেন, “নে পান খা, ভাল লাগিবে। মায়ের দোয়ায় সন্তান সুখী হয়, তুইও জীবনে সুখী হইবি।” 

আমি পান মুখে লইয়া অবাক দৃষ্টিতে মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, তুমি কিভাবে আমার পছন্দের মেয়েকে না দেখিয়া, তাহার পরিবারের কারো কোন তথ্য না শুনিয়া, তাহার পরিবারের কোন ইতিহাস না জানিয়া এই সন্ধ্যায় এক নিমিষে জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিয়া আমাকে সুখী হইবে বলিয়া আশীর্বাদ করিলে?”

মা পানের পিক ফালাইতে ফালাইতে আমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন, ” ভালোবাসার স্থায়িত্ব তাহার উপর নির্ভর করেনা, যাহাকে সে ভালবাসে, নির্ভর করে তাহাকে যে ভালবাসে তাহার উপর। সে তোমাকে ভালবাসিয়াছে প্রথম, তোমাকে ছাড়িয়া যাওয়ার কোন কারন না থাকিলে সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিবে এইটাই হওয়ার কথা। তুমি যাহাকে ভালবাস তাহাকে নয়, তোমাকে যে ভালবাসে তাহাকে তুমি তোমার জীবন সঙ্গিনী কর। তাহা হইলেই তুমি সুখী হইবে। আর ইহাই হইতেছে দাম্পত্য জীবনের সত্যিকারের রূপরেখা।’

আমি আমার মায়ের এত বড় দর্শন শুনিয়া খুব অবাক হইয়াছি। কি অদ্ভুত দর্শন।

মা বলিতে থাকিলেন, কাউকে কখনো তুমি তোমাকে ভালবাসার জন্য জোর করিবে না, বরং তোমাকে কেউ ত্যাগ করুক সেই ব্যাপারে কাউকে জোর করিতে পার। যখন জোর করিয়াও তাহাকে তুমি ত্যাগ করাইতে পারিবে না, নিশ্চিত থাকিবে যে, সে তোমাকে সত্যি ভালবাসে। তাহাকে তুমি তখন আরও বেশি করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিবে কারন সে তোমাকে ভালবাসে। যে তোমাকে সত্যিকার ভাবে ভালবাসে, শত কারন থাকা সত্তেও সে তোমাকে কোনদিন ছাড়িয়া যাইবে না। বরং সে একটিমাত্র কারন খুজিবে যে কারনের দ্বারা সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিতে পারে, ত্যাগ করিবার জন্য নয়। আর ইহাই হইতেছে প্রকৃত ভালবাসার দুর্বলতা। তুমি তাহার সঙ্গে জীবনে সুখী হইবে।

আজ এত বছর পর আমি উপলব্দি করিতে পারিতেছি যে, আজ হইতে প্রায় দুই যুগ আগে আমার সেই অশিক্ষিত মা যে দর্শন শুনাইয়াছিলেন, তাহা কতখানি সত্য এবং খাটি। আজ আমি আমার জীবনে এক অদ্ভুত সুখ আর আনন্দ লইয়া প্রতিটি দিন অতিবাহিত করি। কারন আমার সঙ্গে আছে সেই মানুষটি যে আমাকে ভালবাসিয়াছিল এবং আমিও তাহাকে ভালবাসিয়াছিলাম। কিন্তু সে আমাকে প্রথম ভালবাসার কথাটি বলিয়াছিল।

মা আরও একটি আস্ত পান তাহার অতি প্রিয় পানের বাটিতে সুপারি আর মশলা দিয়া পিষিতে লাগিলেন। আমার দিকে না তাকাইয়াই তিনি বলিতে থাকিলেন, তুমি নিশ্চয় জানো, একটা ব্রিজ বানাইবার জন্য যা যা লাগে আর একটা দেওয়াল বানাইবার জন্য যা যা লাগে তা একই উপকরন। কিন্তু একটি ব্রিজ দুইটি প্রান্তকে সংযোগ করে আর একটি দেওয়াল দুইটা প্রান্তকে পৃথক করিয়া দেয়। তোমাদের এই যুগলমিলন হইতে হইবে একটি ব্রিজের সমতুল্য। দেওয়াল নয়। এখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হইবে তুমি কোনটা চাও এবং কিভাবে চাও আর কখন চাও। দাম্পত্য জীবনে এমন কিছু সময় আসিবে যখন তোমার কাছে মনে হইবে, সবাই ভুল আর তুমি ঠিক। হয়ত বা তুমিই ঠিক আবার তুমি ঠিক নাও হতে পার। তোমারও ভুল হইতে পারে। মা পানের বাটিতে তাহার পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষানো একটু সময়ের জন্য থামাইয়া আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, একটা হাদিসের কথা বলি, ‘যে ভুল করে সে মানুষ, আর যে ভুল করিয়া তাহার উপর স্থির থাকে সে শয়তান, আর যে ভুল করিয়া আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে মুমিন। ফলে অন্যের কোন কথা শুনিবামাত্রই তাহার উপর উত্তেজিত হইয়া কোন কিছু করিতে যাইও না। কারন, তাহার কথার সত্যতা যাচাই করা তোমার কাজ। তোমার জানা উচিৎ সে তোমাকে ঠিক কথাটিই বলিয়াছে কিনা। সে তোমাকে প্ররোচিতও করিতে পারে। কোন কিছুই বিচার বিবেচনা না করিয়া কোন মন্তব্য করা হইতে সবসময় বিরত থাকিবে। মনে রাখিবা, একবার একটা কথা কিংবা মন্তব্য বলিয়া ফেলিলে উহা আর ফেরত নেওয়ার কোন অবকাশ নাই। তখন শুধু হয় নিজেকে অপরাধী হিসাবে ক্ষমা চাইতে হইবে আর অন্যজন তোমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখিবে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ। নিজের শক্তিকে বিশ্বাস কর। নিজের মানুষদের উপর বিশ্বাস রাখ। বিশ্বাস কর যে, তুমি পার এবং তুমি যা পার তা অনেকেই পারে না। আর অনেকেই যা পারে তুমিও তা পার।

আমার মায়ের কথাগুলি আমার কাছে এক অসামান্য দর্শনের মত মনে হইতেছিল। এত কথা মা কোথা হইতে জানিল, বা কে তাহাকে এইসব দর্শনের কথা বলিল আমি আজও ভাবিয়া কুল পাই না।

অনেক্ষন হইল সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। কিন্তু পশ্চিমের আকাশে এখনো লাল আভা দেখা যাইতেছে। খোলা উঠানে বসিয়া আছি বলিয়া চারিদিকের অনেক মশারাও তাহাদের উপস্থিতির কথা জানাইয়া দিতাছে। আমার মা তাহার দ্বিতীয় পানটি মুখে লইয়া কিছুক্ষন চাবাইয়া লইলেন। এবং তাহার চর্ব্য পান হইতে একটু পান বাহির করিয়া আমার মুখে গুজিয়া দিলেন। আমার মায়ের চাবানো পান আমার বড় প্রিয়।   

মা আজ অনেক কথা বলিতেছেন যা আমার কাছে এক নতুন অধ্যায়।

মা বলিতে থাকিলেন, শোন বাবা, জীবনে বড় হইতে হইলে জীবনের সব কয়টি কুরুক্ষেত্রকে তোমার মুখুমুখি হইতে হইবে। তুমি তো অনেক বড় বড় মানুষের জিবনি পড়িয়াছ, তাহাদের দর্শন তথ্য পড়িয়াছ।  আজ তাহলে তোমাকে একটা গল্প বলি। একদিন এক ঈদের দিনে আমার বাবা আমাকে একটা নতুন ফ্রক কিনিয়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি তা আমাকে আর দিতে পারেন নাই। হয়ত তাকা পয়সা ছিল না। তাই। আমার খুব মন খারাপ হইয়াছিল। সারাদিন আমার মন আর ভাল হইতেছিলনা। আমার মন খারাপ হইয়াছে দেখিয়া আমার বাবারও মন খারাপ হইয়াছিল। হয়ত তাহারও আমার মত ভিতরে ভিতরে একটা কষ্ট হইতেছিল তাহার এত আদরের মেয়ের মন খারাপ বলিয়া। কি জানি কি হইল আমি জানি না, আমার বাবার এক বন্ধু বিকাল বেলায় আমাদের বাসায় বেড়াইতে আসিলেন। হয়ত বাবাই নিমন্তন্ন করিয়াছিলেন। তিনি আমার বাবার খুব কাছের মানুষের মধ্যে একজন। হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি আমাকে অনেক আদর করিলেন, কেন আমার মন খারাপ তাহা জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি মুচকি হাসিয়া এক বিখ্যাত লেখকের উদ্দ্রিতি দিয়া আমাকে বলিলেন, “আমরা অনেক সময় একজোড়া জুতা না পাওয়ার বেদনায় চোখের পানি ফেলি কিন্তু কখনো কি একবার ভেবে দেখেছ যে, অনেকের তো পা ই নেই?” বলিয়া তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া খুব আদর করিয়া দিলেন। বলিলেন, কালই তিনি আমার জন্য নতুন একটি ফ্রক কিনিয়া দিবেন। তিনি এমন করিয়া আমাকে এই কথাটি বলিলেন, যে, আমি যেন ঐ পা বিহিন মানুষটির চেহারা দেখিতে পাইলাম।  তাই তো, কথাটা আমার খুব মনে ধরিয়াছিল। আমার আর মন খারাপ হয় নাই। আমি আর নতুন ফ্রকের জন্য কখনো মন খারাপ করি নাই। আমি বুঝিতে পারিলাম আমার নিজের অবস্থানটা নিয়ে সন্তুষ্ট না হইলে পৃথিবীর কোন কিছুই আমাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না। আমি আমার বাবাকে জরাইয়া ধরিয়া অনেক কাদিয়াছিলাম। দুঃখে নয়, এতক্ষন যে বেদনাটা আমাকে খুব কষ্ট দিতেছিল, সেইটা যে বাবার বাবার বুকের ভিতরে গিয়া বাবাকেও কষ্ট দিতেছিল এই মনে করিয়া আমার চোখ আরও আবেগপ্রবন হইয়া উঠিতেছিল। আমার ছোট্ট বালিকা হৃদয়ের এই অফুরন্ত নিস্পাপ সাবলিল ভালবাসার চোখের জলে আমি আমার বাবাকেও কাদিতে দেখিয়াছিলাম। তাহার কান্নাও কোন কষ্ট হইতে নয়। নিছক ভালবাসার। এইটার নামই পরিবার। এইটার নামই হচ্ছে ভালোবাসা। নিজকে লইয়া সন্তুষ্ট থাক। ইহাতে সুখের পরিমান বাড়িবে। সবসময় একটা উপদেশ মনে রাখিবা যে, নিশ্চয় তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে কোন উদ্দেশ্যবিহিন এই পৃথিবীতে প্রেরন করেন নাই। তার উদ্দেশ্য আমাদের স্বপ্নের চেয়ে অনেক উত্তম এবং তাহার রহমত আমার হতাশার থেকেও অনেক বেশি। ঈশ্বরকে বিশ্বাস কর। তিনি তোমাকে কোন কিছুই না থেকে অনেক কিছু পাইয়ে দেবেন, যা আমার তোমার চিন্তা জগতেরও বাইরে। আর কাউকেই অবহেলা কর না। তোমার অবহেলা করার একটাই অর্থ দাঁড়াইবে, আর সেটা হচ্ছে তুমি তাহাকে তোমাকে ছাড়া চলিতে পারার অভ্যস্থ করিয়া তুলিতেছ। সবাই তোমার মতবাদ পছন্দ নাও করিতে পারে, সবাই তোমার মত করিয়া ভাবিতে নাও পারে। তুমি যে শার্টটা পছন্দ কর, সেই শার্টটা অন্য একজনের পছন্দ নাও হইতে পারে। এই পৃথিবীতে কিছু কিছু লোক তোমার জীবনে আসিবে আশীর্বাদ হইয়া, আবার কিছু লোক আসিবে শিক্ষণীয় হইয়া। আর এইটাই জীবন। তুমি আমাকে কিছুক্ষন আগে একটা প্রশ্ন করিয়াছিলে না যে, আমি তোমার পছন্দের মেয়েটির কোন কিছুই না জানিয়া, তাহার পরিবারের কি আছে আর কি নাই এই সব কিছুই না জানিয়া কিভাবে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিলাম? জীবনে শুধু টাকা পয়সা দিয়াই সব কিছুর মাপকাঠি হয় না। টাকা পয়সা সব কিছু কিনিতে পারে না। টাকায় তুমি আচরন কিনিতে পারিবে না, টাকায় তুমি সম্মান কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি চরিত্র কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি বিশ্বাস, ধৈর্য, শ্রদ্ধা, বিনয় এইগুল কিছুই কিনিতে পারিবা না। টাকা দিয়া তুমি ভালবাসাও কিনিতে পারিবা না। আর এইসব গুণাবলীগুলো তো আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের সবচেয়ে জরুরী বিষয়। যে ভালবাসিতে জানে, তাহার টাকার দরকার হয় না। আধামুঠো অন্ন খাইয়াই তাহার মন ভাল থাকে, তাহার দেহ ঠিক থাকে, তাহার আত্মা তৃপ্ত থাকে। ইহার পরেও আরও কথা থাকে। তোমার এই তৃপ্ত জীবনে তোমার পথে অনেক ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মত মানুষজনও পাবে। জীবনে যদি বড় হইতে চাও, এই সব চরিত্র হইতে সাবধান থাকিতে হইবে। কারন সব কুকুরকে তোমার মনোযোগ দেওয়ার সময় তোমার নাই। এরা শুধু তোমার মনোযোগই নষ্ট করিবে না, তোমার বড় হওয়ার পথে এরা সবচেয়ে বড় বাধা হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে। ইহাদের মধ্যে অনেকেই এই সমাজের কেউ কর্ণধার বলিয়া মনে হইবে, কাউকে আবার সমাজের বিবেচক বলিয়া মান্য করিবে, কেউ আবার প্রথম সারির লোক বলিয়াও গর্ব করিয়া এইদিক সেইদিক প্রচারনা করিয়া বেড়াইবে। উহারা কেউই তোমার শুভাকাঙ্ঘি নহে। শুভাকাঙ্ক্ষী শুধু তোমার একান্ত পরিবার যাহারা তোমার ব্যথায় ব্যথিত হয়, তোমার আনন্দে আনন্দিত হয়, আর তুমি যখন দিশেহারা হইয়া সঠিক সিদ্ধান্ত লইতে অপারগ হওঁ, তখনো তাহারা তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না।

তোমাদের জন্য রইল আমার অফুরন্ত ভালোবাসা আর দোয়া।

২৩/০২/২০১৬-বগুড়ার পথে

বগুড়া যাওয়ার পথে

দুরন্ত গতিতে কখনো আমাদের গাড়ি ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত বেগে চলছে, আবার কখনো কখনো অধিক গাড়ির জটিলতায় একেবারে থেমেই যাচ্ছে। থেমে গেলেও খারাপ লাগছে না। কারন আমি রাস্তার দুই ধারে গ্রামের কি এক অপূর্ব সবুজের রাজত্ব, অনেক দূরে গ্রামের কিনারা দিয়ে বয়ে যাওয়া চিকন চিকন খালের ধারে হরেক রঙের গরু ছাগল, ভেড়া, কচি কচি ঘাস খাওয়ায় মগ্ন, ঐ খালের নোংরা জলে কিছু দুর্দান্ত বালক বালিকা কেউ কাপড় পরে আবার কেউ একেবারে দিগম্বর হয়ে খালের কিনারা থেকে লাফ দিয়ে তাদের বীরত্ব দেখানোর তাগিদে কে কত টুকু দূরে লাফিয়ে পরতে পারে তার প্রাণপণ চেষ্টা করছে ইত্যাদি দৃশ্য আমার মনে এক আনন্দের জয়ার দিচ্ছে। আমি দেখছি, ঐ সব ছোট ছোট বালক বালিকাদের মধ্যে মাঝে মাঝে মধ্য বয়সী কোন অভিভাবক সন্তানের অনিষ্ট না হয় এমন লাফের পায়তারা থেকে উচ্চস্বরে ধমকও দিচ্ছেন। কিন্তু কে কার কথাই বা শুনে। এদের যে বয়স, তাতে দুরন্তপনাই হচ্ছে মূললক্ষ। আমি অনেকক্ষন ধরেই এই অভাবিত দৃশ্য গুলো দেখছি আর আমার সেই শৈশবকালের একই প্রকৃতির দুরন্তপনাগুলো মনে করছি। আহ কি সুন্দর ছিল সেই সব দিনগুলো।

আমার সঙ্গে আমার মেয়েরা আছে। ওরা আধুনিককালের প্রজন্ম। এরা এই সব দৃশ্যের আনন্দের মুহূর্তগুলো বুঝে না। ওরা গাছের সবুজের নিচের আলো বাতাসের খবর রাখে না। ওরা চৈত্রের দুপুরে হেটে হেটে স্কুল থেকে এসে পান্তা ভাতের স্বাদ বুঝে না। ওরা কালবৈশাখী ঝড়ের দিনে আধাপাকা আম কুড়ানোর মজাটা বুঝে না। কিংবা শিলা বৃষ্টির মধ্যে অযথা ছোটখাট বরফের মত শিলা কুড়ানোর মজাটা বুঝে না। ওরা সারাক্ষন ট্যাব আর মোবাইল ফোন নিয়ে রক মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত কিংবা কম্পিউটারে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে গ্রামের কিছু কিছু অতি সুন্দর পোট্রেট দেখেই মুগ্ধ। কিন্তু সত্যিকারের গ্রামের গা থেকে সোঁদা মাটির যে গন্ধ, পচা বাঁশ পাতার যে একটা টক টক ঘ্রান, কিংবা সন্ধ্যায় শিয়ালের যে ডাক, তারা ওগুলোর কোন স্বাদ বুঝে না। গ্রামের রাস্তা ধরে ক্ষেতের আইল ভেঙ্গে হাটার যে এক অদ্ভুদ রোমান্স, আধাকালো সন্ধ্যায় ভয় ভয় হৃদয়ে শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়ার যে অনুভূতি তার কোন কিছুই এদের ইন্দ্রিয় বুঝে না। ওরা সুকান্তকে চিনে না, ওরা রবিন্দ্রনাথকে চিনে না, ওরা নজরুলের প্রেমের কবিতা পরেনা। ওরা অনেক কিছুই জানে না। ওরা টাইটানিক দেখে অভিভুত হয় কিন্তু ওরা জ্যাকের ঐ ঐতিহাসিক কথাগুলো বুঝে না যখন সে বলে, “পার্টি? পার্টি যদি মজা করতে হয় তাহলে আস আমার সঙ্গে আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর কামরায়, দেখ কিভাবে পার্টির স্বাদ গ্রহন করতে হয়।” রোজ বুঝেছিল কিন্তু আজকের দিনের “রোজেরা” এটা বুঝে না, বুঝতেও চায় না।

যাই হোক, আমরা চলছি আর আমি দেখছি দুই প্রজন্মের মধ্যে কত ফারাক হয়ে যাচ্ছে এই পৃথিবী। আমার কাছে এখনো ঢেঁকি ছাটা চাল খেতে মন উতলা হয়ে উঠে, আমার এখনো বরই গাছের নিছে এবড়ো থেবড়োভাবে পরে থাকা আধাপাকা বরই একদম একটু লবন দিয়ে আবার লবন পাওয়া না গেলে খালি খালিই খেতে মন চায়, আমার কাছে কয়েক টুকরা ধনিয়া পাতা হাত দিয়ে মুচড়ে কাচা মরিচ দিয়ে এক প্লেট পান্তা ভাতের আনন্দ এখনো পেতে ইচ্ছে করে। কি সব দিনগুলো আমি হারিয়ে ফেলেছি, ভাবতেই আমার মন যেন একেবারে ব্যথায় মুচড় দিয়ে উঠে। আমি কি বলি আমার সন্তানেরা বুঝে না, আমার সন্তানেরা কি বলে আমার বুঝতে ভাল লাগে না। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা এখন আর আজকের দিনের ছেলেমেয়েদের কাছে কোন কাব্যই মনে হয় না। রক্তকরবি দেখে ওদের মনে হয় কি সব আবোল তাবোল লেখা লিখে রবিন্দ্রনাথ এত বিখ্যাত হয়ে গেলেন? নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ যেন এক কাল্পনিক কথা, এর কোন রোমান্স আজকের দিনের প্রজন্মের কাছে কোন স্বপ্নই মনে হয় না। ম্যাক্সিম গোরকির “মা” উপন্যাশটি পরার জন্য আমি কতবার পরিক্ষার পড়ায় ছেদ দিয়েছি তার কোন ইয়ত্যা নেই, অথচ আজ যখন আমি আমি আমার প্রজন্মের কাছে এই সব উপন্যাশের কথা বলতে চাই, তারা ম্যক্সিম গরকিকে তাই জানে না।

গান বাজছে আধুনিক। কি সব কথাবার্তা, কোন ভাব গম্ভীরতা নাই, সুর আছে ড্রাম পিটানোর মত, বুকে লাগে এর প্রতিটি আছাড়। কিন্তু হৃদয় ছুয়ে যায় না। (…চলবে)