১৯/০৫/২০২৬- ভালো মানুষের ব্রেকিং পয়েন্ট

সবচেয়ে বিপজ্জনক রাগ আসে ভালো মনের মানুষের কাছ থেকে; যারা উচ্চকণ্ঠী বা আবেগপ্রবণ নয়, বরং শান্ত, ধৈর্যশীল এবং যাকে খুব বেশি উত্যক্ত করা হয়। তারা শান্ত থাকে, বারবার ক্ষমা করে দেয়। তারা বারবার ক্ষমা করে এ কারনে নয় যে, তারা দূর্বল বা অসহায় বরং তারা বারবার ক্ষমা করেন কারন তারা শান্তি বেছে নেন বলে। তারা সুযোগ দেয়, বোঝে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভার বহন করে। কিন্তু প্রত্যেক নীরব সহনশীলের একটি সীমা থাকে, প্রত্যেক শান্ত আত্মার একটি ভাঙনের মুহূর্ত থাকে। যখন সেই সীমা অতিক্রম করা হয়, তখন তা বিস্ফোরিত হয় না, বরং শেষ হয়ে যায়। কোনো তর্ক নেই, কোনো নাটক নেই, দ্বিতীয় কোনো সুযোগও তারা দেয় না, তারা তখন স্থায়ী দূরত্বে চলে যায়। আর সেটাই চূড়ান্ত। তাই দয়াকে দুর্বলতা বলে ভুল করবেন না। কারণ যে মুহূর্তে একটি ভালো হৃদয় শীতল হয়ে যায়, সেখান থেকে তারা আর ফেরে না।

১৯/০৫/২০২৬- নিজকে মুল্য দিতে

আমি একটা জিনিষ খুব সুক্ষভাবে উপল্বধি করেছি যে, যদি নিজকে মুল্য দিতে হয় তাহলে অবিলম্বে কতগুলি কাজ অভ্যাসে পরিনত করা দরকার। আর সেই অভ্যাশ গুলি

আমি অতীত নিয়ে কখনো অনুশোচনা করি না। যা হয়ে গেছে, তা তো হয়েই গেছে। আমি সেটাকে আবার নতুন করে লিখতে পারবো না। কিন্তু আমি সেই অতীত থেকে শিক্ষাটা গ্রহন করি এবং সামনের দিকে এগুতে থাকি। অনুশোচনা মানুষকে ফাদে ফেলে দেয় কিন্তু প্রজ্ঞা মানুষকে মুক্ত করে।

ভবিষ্যত নিয়েও আমি চিন্তা করি না। কারন জীবন এ পর্যন্ত আমার দিকে যা ছুড়ে দিয়েছে, আমি তার সব কিছুতেই টিকে গেছি। এরপর যা আসবে, তা সামলানোর জন্য নিজের শক্তির উপর আমি ভরষা রাখি। আমি ভয়কে প্রশ্রয় দেই না। ভয় সমস্যাকে কপ্লনা করে নিজের চিন্তার ভার বাড়িয়ে দেয় কিন্তু প্রজ্ঞা আমার সমস্যাকে সমাধান করে দেয়।

আমি কখনো অন্য মানুষের মধ্যে সুখ খুজি না। কারন কেউ আমার মধ্যে বা ভিতরে শান্তি বা সুখ স্থাপন করতে পারবে না। সত্যটা হচ্ছে-যদি আমি নিজেই আমার মধ্যে শান্তি খুজে না পাই, তাহলে আমাকে আজীবনকালই শান্তি খুজতেই থাকবো আর সেতা কখনোই পাওয়া যাবে না।

একটা সময় আমি নির্বিচারে সবার জন্য অনেক কিছুই করতে আগ্রহী হইতাম। কিন্তু একটা সময়ে এসে উপলব্ধি করেছি যে, সীমাহীন উদারতা আত্ম-বিশ্বাসঘাতকতায় পরিনিত হয় এবং যাদের জন্য এই অতিরিক্ত কিছু করার প্রবনতা আমার হৃদয়কে তাদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে। তাদের প্রত্যাশা বেড়ে যায়, আর সেখানেই ঘটে চরম ঘটনাটা। আমি যা দেই বা দিতে পারি সেটা দিয়ে আত্মসম্মান বাড়ায় না। বরং আমি যা সহ্য করতে অস্বীকার করি, সেতায় সম্ভবত আমার আত্মসম্মান বারায়। তাই আমি শুধু নিজেকে বেছে নিয়েছি এবং আমার জীবনের সব কিছু তখন থেকে আরো বেশী বদলে যাওয়া শুরু করেছে। 

২০/৫/২০২৬- উইজডমেটিক কথা

আপনি কি জানেন কে সত্যিই শেষ পর্যন্ত আপনার পাশে থাকবে? যারা আপনাকে ভালোবাসে, তাদের সবাই চিরকাল থাকে না। একটা পর্যবেক্ষন শিখায় যে, “জীবন” মানুষকে আলাদা করে দেয়, “সময়” মানুষের ভূমিকা বদলে দেয়। আপনার বাবা-মার যতই ভালোবাসা থাকুক না কেন, তারা একদিন চলেই যাবে। আপনার ভাইবোনও আপনার পাশে থাকবে না, কারণ সবাই একসময় নিজের নিজের পথেই চলে যায়, আর আপনার সন্তানরাও আপনার পাশে থাকবে না, তারা বড় হয়ে যায়, নিজেদের জীবন গড়ে তোলার জন্য সংগ্রাম সংগ্রাম শুরু করে এবং তাদের তো সেটাই করার কথা।

যে মানুষটি দিনের পর দিন সত্যিই আপনার পাশে থাকে, সে হলো আপনার সঙ্গী; যে আপনাকে ক্লান্ত দেখে, যে আপনাকে নীরবে সংগ্রাম করতে দেখে, যে ধৈর্য ধরে থাকে, যখন “জীবন” আপনার মনোবল ভেঙে দেয়। সে আপনার পাশে বসে থাকে যখন আর আপনার কথাও বের হয় না। সে ঈর্ষা ছাড়াই আপনার বিজয় উদযাপন করে এবং সে পাশে থাকে যখন সবকিছু ভেঙে পড়তে শুরু করে। শেষে যখন দেখা-সাক্ষাৎও বিরল হয়ে যায়, যখন কোলাহল হারিয়ে যায়, যখন উদযাপন ম্লান হয়ে যায়, আপনার পৃথিবী ছোট হয়ে আসে, তখনো সে আপনার পাশেই থাকে যদি আপনি সঠিক সংগী পছন্দ করে থাকেন, যদি আপনি নিজের অহংকারকে প্রশ্রয় না দিয়ে সম্পর্কটিকে রক্ষা করে থাকেন। সেই মানুষটি ভালো দিনে এবং কষ্টের দিনেও পাশে থাকবে। একারণেই আপনার সম্পর্ককে রক্ষা করা উচিত। অহংকার, মনোযোগের অভাব বা ক্ষণস্থায়ী আবেগের বশে কোনো মূল্যবান জিনিস নষ্ট করবেন না। মজবুত সম্পর্ক এমনি এমনি পাওয়া যায় না। এগুলো গড়ে ওঠে বিশ্বস্ততা, ধৈর্য এবং প্রতিদিনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে। আর এখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি, যদি আপনার এমন কেউ থাকে যে আপনার পাশে থাকে এবং আপনার জন্য লড়াই করে, জীবনের কঠিন সময়ে আপনাকে ছেড়ে না যায়, তবে তাকে গভীরভাবে মূল্য দিন, কারণ প্রকৃত বিশ্বস্ততা দুর্লভ এবং শেষ পর্যন্ত আপনার চারপাশের ভিড়ের চেয়ে আপনার পাশের মানুষটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২০/৫/২০২৬- উইজডমেটিক কথা

সচরাচর আমাদের দেখা সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তিটি কে জানেন? তিনি হলে সেই ব্যক্তি যিনি একাই প্রতিকূল অবস্থা থেকে সেরে উঠেছেন। সহিংসতার কারণে তিনি বিপজ্জনক নন, বিপজ্জনক এই কারণে যে, তিনি কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। জীবনের কোনো একটা সময় তিনি নিজেকে একেবারে তলানিতে দেখেছেন এবং কারো কোনো সাহাজ্য ছাড়াই সেখান থেকে আবার উঠে এসেছেন। ফলে অন্যের মতামত তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কারণ তিনি ইতিমধ্যেই নিজের মনের সবচেয়ে খারাপ রূপটির মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি আর পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় পান না। তিনি ইতিমধ্যেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পতিত হয়ে তা থেকে একাই সফল হয়ে ফিরেছেন। তিনি আর অন্যের স্বীকৃতি খোঁজেন না। তিনি কারো অনুমোদন ছাড়াই শক্তভাবে দাঁড়াতে শিখেছেন। তিনি কারো পেছনে ছোটেন না; তিনি জানেন, যা থাকার তা থাকবেই, আর যা থাকার নয় সেটা থাকবেও না। তাকে প্রভাবিত করা যায় না, কারণ তিনি ইতিমধ্যেই নিজের ভেতরের অন্ধকার দিকগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি একাকীত্বকে ভয় পান না কারন তিনি নীরবতার সাথে শান্তি স্থাপন করেছেন এবং সেখানেই শক্তি খুঁজে পেয়েছেন। আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি যে, আপনি এমন কাউকে ভাঙতে পারবেন না যিনি ইতিমধ্যেই ভেঙে গিয়ে নিজেকে আরও শক্তিশালী করে নতুন করে গড়ে তুলেছেন।

২০/৫/২০২৬- মির্জা গালিবের কথা

আমাকে কষ্ট দিয়ে খোদার কাছে সুখ চাও? খোদা কিন্তু আমারো। যাকে কষ্ট দিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা হয় স্রিষ্টিকর্তা কিন্তু তারও। যার হৃদয় ভাংগা হয়, তার দীর্ঘশাসও আকাশে পৌঁছে যায়। নীরবে ঝরে পড়া অশ্রুরও হিসাব থাকে অদৃশ্য খাতায়। কারো রাত অন্ধকার করে নিজের ভোর আলোকিত হয় না কখনো। কারো বিশ্বাস ভেংগে শান্তি কেনা যায় না কখনো। কারন বিচার শুধু মোনাজাতে নয়, বিচার লুকিয়ে থাকে প্রতিটি ভাংগা বিসশাহসে। স্রিষ্টিকর্তা কারোর একার নয়। প্রার্থনার শব্দের চেয়ে ভাংগা হৃদয়ের আর্তনাদকে স্রিষ্টিকর্তা আগে শোনেন।

24.5.2026- সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিশোধ আসলে

সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিশোধ আসলে কোনো প্রতিশোধই নয়। এটি হলো নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং যা আপনাকে টেনে নামাতে চায় তার ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানো। এখানে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই আপনার শত্রুদের পরাজিত সহজ। সেক্ষেত্রে চুপ বা সাইলেন্ট থাকুন। একজন ভালো মানুষ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে তর্ক করে সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নাই। আপনি নিজেই একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠুন, আপনার কথা নয়, আপনার জীবনই কথা বলুক। কখনো নিজেকে সঠিক প্রমাণ করবেন না। শক্তিশালী মানুষেরা ব্যাখ্যা দেয় না। তারা কাজ করে এবং বাস্তবতাকে উত্তর দিতে দেয়। যাদের উপর আপনি প্রতিশোধ নিতে চান, তাদের থেকে সরে যান। আপনার অনুপস্থিতির চেয়ে বেশি আর কিছুই মানুষকে বিভ্রান্ত করে না। দূরত্বই শক্তি। কিন্তু তাদের সাথে সদয়ভাবে সাড়া দিন, কারণ তারা এর যোগ্য বলে নয়, বরং আপনি তাদের মতো হতে অস্বীকার করেন বলে। বড় অস্ত্র হলো-তাদেরকে ছাড়িয়ে যান। এত উঁচুতে উঠুন যে তারা আর আপনার নাগাল পাবে না। উন্নতিই হলো চূড়ান্ত বিচ্ছেদ। তাদের আক্রমণের মুখে শান্ত থাকুন। একটি শান্ত মন অস্পৃশ্য, আর তারা আপনাকে পুড়িয়ে মারলেও আপনি স্থির থাকুন সময়ই তাদের মুখোশ উন্মোচন করবে। সত্য তাড়াহুড়ো করে না, কিন্তু তা ঠিকই এসে পৌঁছায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, আপনি অন্যকে ধ্বংস করে জিততে পারবেন না। নিজেকে আয়ত্তে আনার মাধ্যমেই আপনি জয়ী হন, কারণ যে মুহূর্তে আপনি তাদের ঊর্ধ্বে ওঠেন, আপনার জগতে তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

25.5.2026-এমন কাউকে বিয়ে করবেন না যার সাথে

এমন কাউকে বিয়ে করবেন না যার সাথে আপনি মজা করতে পারেন। তাকেই বিয়ে করুন যার সাথে আপনি কষ্ট ভাগ করে নিতে পারেন। জীবন যখন সহজ থাকে, যখন টাকা-পয়সা আসতে থাকে, যখন ঘর শান্তিতে থাকে, যখন সবকিছু হালকা মনে হয়, তখন যে কেউ আপনাকে ভালোবাসতে পারে। এই ধরনের ভালোবাসা সহজ। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা আরামে প্রকাশ পায় না। এটি প্রকাশ পায় যখন জীবন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, যখন বিল পরিশোধে দেরি হয়, যখন হাসপাতালের ঘরগুলো ঠান্ডা হয়ে যায়, যখন ভয় ঘরে ঢুকে পড়ে, যখন ভবিষ্যৎ আর নিরাপদ মনে হয় না। রোমান্স মানে ছুটি কাটানো নয়, ছবি তোলা নয়, নিখুঁত মুহূর্তও নয়। রোমান্স হলো সে, যে ভোর ৩টায় জরুরি বিভাগে আপনার পাশে বসে থাকে, যে আপনার ভয়ের মুহূর্তে আপনার হাত ধরে রাখে, যে আপনার ক্লান্ত, ভেঙে পড়া, কঠিন রূপটির দিকে তাকিয়েও থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়; সহজ বলে নয়, বরং তার ভালোবাসার শিকড় আছে বলে। আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি, এমন একজনকে বেছে নিন যে জীবন যখন সুন্দর থাকে না, তখন হারিয়ে যায় না। কারণ প্রকৃত ভালোবাসা হাসিতে নিজেকে প্রমাণ করে না, এটি নিজেকে প্রমাণ করে সেই মুহূর্তে, যখন চলে যাওয়াটা সহজতর মনে হয়।

25.5.2026-এটা শিখতে আমার ৬০ বছর লেগেছে।

পৃথিবী আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা বুঝতে সারাজীবন লেগে যায় যে এর বেশিরভাগই কোলাহল মাত্র। এইগুলো সেই সত্য যা শিখতে আমার সাধারণত ৬০ বছর সময় লেগেছে।

১. আত্মস্থ করুন এবং নেতৃত্ব দিন। সময় টাকা নয়। সময়ই জীবন। আপনি সবসময় আরও এক ডলার উপার্জন করতে পারেন কিন্তু একটি সেকেন্ডও ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। গুরুত্বহীন জিনিসের পেছনে আপনার জীবন ব্যয় করা বন্ধ করুন। রাজা যেমন তার ফটক পাহারা দেয়, তেমনি আপনার সময়কে পাহারা দিন। যদি এটি আপনার শান্তি বা উদ্দেশ্য যোগ না করে, তবে এটি আপনার সময় পাওয়ার যোগ্য নয়।

২. স্বাস্থ্য হলো একটি মুকুট যা কেবল অসুস্থরাই দেখতে পায়। আমরা সম্পদ অর্জনের জন্য আমাদের স্বাস্থ্য উৎসর্গ করি এবং সেই সম্পদ ব্যয় করি আমাদের স্বাস্থ্য ফিরে পেতে। পুনর্গঠন শুরু করার জন্য ভাঙনের অপেক্ষা করবেন না। আপনার শরীরই একমাত্র ঘর যেখানে আপনি থাকতে বাধ্য। মন্দিরের মতো একে সম্মান দিন।

৩. আপনার চরিত্রই আপনার প্রকৃত নিয়তি। খ্যাতি হলো মানুষ আপনার সম্পর্কে যা ভাবে, আর চরিত্র হলো আপনি তখন কে যখন কেউ আপনাকে দেখছে না। শেষ পর্যন্ত আপনি সমালোচকদের মনে রাখবেন না কিন্তু আপনাকে আয়নার মানুষটির সাথে বাঁচতে হবে। এমন এক অটল চরিত্র গড়ুন এবং এমন এক নাম রাখুন যার একটি অর্থ আছে।

৪. অনুশোচনার ওজন টন টন, আর শৃঙ্খলার ওজন আউন্স আউন্স। কঠোর পরিশ্রমের কষ্ট ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ‘যদি এমন হতো’ এই ভাবনা চিরস্থায়ী। আজ কঠিন কাজটি করুন, আগামীকাল আপনার ভবিষ্যৎ সত্তা আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে। দক্ষতা হলো বছরের পর বছর ধরে বারবার করা ছোট ছোট সুশৃঙ্খল সিদ্ধান্তের ফল।

৫. সম্পর্কই একমাত্র প্রকৃত সম্পদ। জীবনের শেষে আপনি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের দিকে তাকাবেন না, আপনি আপনার প্রিয়জনের হাত খুঁজবেন। ক্যারিয়ার গড়তে এতটাই ব্যস্ত হবেন না যে একটি ঘর গড়তে ভুলে যান। সাফল্য অর্থহীন যদি তা ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ না থাকে।

৬. ভয় মিথ্যাবাদী, কিন্তু অনুশোচনা হলো সত্য। আমরা যা ভয় পাই তার বেশিরভাগই কখনো ঘটে না। কিন্তু যে জিনিসগুলো চেষ্টা করতে আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম, সেগুলোই বৃদ্ধ বয়সে ভূতের মতো তাড়া করে ফেরে। ভয় কেবল একটি অনুভূতি, কিন্তু নিষ্ক্রিয়তা একটি সিদ্ধান্ত। ঝুঁকি নিন, মহাবিশ্ব সাহসীকে পুরস্কৃত করে, আরামপ্রিয়কে নয়।

৭. নীরবতাই প্রায়শই সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর। আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো প্রতিটি তর্কে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিপক্কতা হলো কোনো কিছু প্রমাণ করার তাগিদ ছাড়াই নাটকীয় পরিস্থিতি থেকে সরে আসতে শেখা। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন, নইলে আবেগই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

৮. জীবন নিজেকে খুঁজে বের করার বিষয় নয়, বরং নিজেকে তৈরি করার বিষয়। প্রতি সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়, কলমটি আপনার হাতেই থাকে।

25.5.2026-মানুষের সাথে আপনার আকস্মিকভাবে দেখা হয় না।

মানুষের সাথে আপনার আকস্মিকভাবে দেখা হয় না। প্রত্যেক ব্যক্তিই একটি উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার জীবনে আসে। কেউ থেকে যায়, কেউ চলে যায়, কিন্তু তাদের কেউই অর্থহীন নয়। আপনার জীবনে মানুষের আগমনের ৫টি কারণ নিচে দেওয়া হলো:

১. কেউ কেউ আসে কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা এবং হতাশার মাধ্যমে আপনাকে একটি শিক্ষা দিতে। আপনি সীমা, আত্মসম্মান এবং শক্তি অর্জন করতে শেখেন। মুহূর্তটি কষ্টদায়ক হলেও শিক্ষাটি থেকে যায়।

২. কেউ কেউ আসে আপনার আসল সত্তাকে প্রকাশ করতে। তারা আপনার ধৈর্য, ​​আপনার মূল্যবোধ, আপনার চরিত্র পরীক্ষা করে। তারা আপনার এমন কিছু দিক উন্মোচন করে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনি নিজেও জানতেন না।

৩. কেউ কেউ আসে আপনার যাত্রাপথে সমর্থন জানাতে। জীবন যখন কঠিন হয়ে ওঠে, তখন খুব কম মানুষই আপনার পাশে দাঁড়ায়। তারা আপনাকে মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বস্ততা এখনও বিদ্যমান।

৪. কেউ কেউ আসে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তারা একটি অধ্যায়ের সঙ্গী হয় এবং তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়। শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত থাকার জন্য সবাই আসে না।

৫. কেউ কেউ আসে আপনার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করতে। একটি কথোপকথন, একটি মুহূর্ত। আপনার পুরো পথ বদলে দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। আর এখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি, যারা চলে গেছে তাদের জন্য অনুশোচনা করবেন না, তারা আপনাকে যা শিখিয়েছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন, কারণ প্রত্যেক ব্যক্তিই হয় আপনার জীবনে নতুন কিছু যোগ করে অথবা আপনাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে। আসলে কোনো কিছুই দৈবচয়নের ফল নয়। জীবন মানুষকে শিক্ষক হিসেবে ব্যবহার করে।

25.5.2026-যে মুহূর্তে আমি পিছু ধাওয়া করা বন্ধ করলাম

যে মুহূর্তে আমি পিছু ধাওয়া করা বন্ধ করলাম, আমার জীবনটা সহজ হয়ে গেল। আর কোনো জোর করা নয়, আর কোনো অনুনয় নয়, একতরফা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিজেকে আর নিঃশেষ করা নয়। যদি সম্পর্কটা খাঁটি হয়, আমি তার সাথে তাল মেলাব। যদি দূরত্ব থাকে, আমি সেই দূরত্বকে সম্মান করব। তুমি আমার সাথে কথা বললে, আমিও তোমার সাথে কথা বলব। তুমি চুপ হয়ে গেলে, আমি পিছু ধাওয়া করব না। শান্তি মনোযোগের জন্য ভিক্ষা করে না। আমি নিজেকে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করা বন্ধ করে দিয়েছি। সঠিক মানুষেরা ধারাবাহিকতা বোঝে, ক্রমাগত কৈফিয়ত দেওয়া নয়। আমি আর জোর করে সম্পর্ক তৈরি করি না। সত্যিকারের আনুগত্য স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠে, জোর করে তৈরি করা যেকোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। আমি আমার ভাবমূর্তির চেয়ে আমার শান্তিকে বেশি রক্ষা করি। প্রতিটি বার্তার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রতিটি নীরবতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করার দরকার নেই। আমি মরা গাছে জল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। প্রচেষ্টাই আসল এবং একতরফা শক্তি সবসময় সত্যকে প্রকাশ করে দেয়। আমি আর দূরত্বকে ভয় পাই না, কিছু মানুষ হারিয়ে যায়, যাতে আপনার জীবন আরও শান্ত, স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী হতে পারে। আমি এখন শক্তিকে প্রতিফলিত করি। সম্মান সম্মান এনে দেয়, দূরত্ব দূরত্ব এনে দেয় এবং আনুগত্য আনুগত্য এনে দেয়। আর এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি, এটা অহংকার নয়, এটা শান্তি। যা আর স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হয় না, তাকে জোর করে টিকিয়ে রাখা বন্ধ করার মুহূর্তেই আপনার কষ্ট থেমে যায়।

11.5.2026 Zarif Files

This content is password-protected. To view it, please enter the password below.

Brexit Part-1

আজ ইংরেজদের ব্রেক্সিটের গনভোটের রায়ের উপর ইত্তেফাকে দারুন একটা নিউজ পরে নিজের কাছে খুব পুলকিত মনে হলো যদিও আমার এই পুলকিত হওয়া মানে আনন্দিত নয়। ইত্তেফাকের নিউজটা ছিলো এই রকম, " ব্রিটিশ ভোটারদের আক্ষেপ!" খবরটার কিছু কথা এই রকম, ..."যেঁ সব ব্রিটিশ এই গনভোটে হ্যা ভোট দিয়েছেন, তারা কি মনে করছেন? তারা কি জেনে শুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন? ব্রিটিশরা যারা অনেকেই ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তারা অনেকেই জানে না কেনো তারা ভোট দিয়েছেন। বরং গনভোটের হ্যা রায়ের বিপরিতে ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে যেঁ ঝুকি সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে এখন সব ব্রিটিশ নাগরিকেরা শঙ্কিত"। এদিকে অন্য আরেকটি পত্রিকা এই একই খবর ভিন্ন ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছে। করেছে এইভাবে, " ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার আশা এখনো জিইয়ে রেখেছে ব্রিটেনের জনগন। ঐতিহাসিক এই বিচ্ছেদ আটকাতে এখন দ্বিতীয়বার গন ভোট চাইছে।" ওদিকে পাশাপাশি আরেকটি খবর ছাপা হয়েছে, যেঁ, "ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়ার ব্যাপারে তুরস্কে গন ভোট হতে পারে।"  

কি আশ্চর্য, একজন ছাড়ার জন্য ভোট দিচ্ছে, আরেকজন যোগ দেওয়ার জন্য ভোট দিচ্ছে। একজন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বুঝেছে যেঁ, তারা ভীষণ ভুল করেছে, এখন আবার ইইউতে থাকার জন্য অনুরধ করছে, আক্ষেপ করছে। এই পরিস্থিতে আমার তর্জমা হচ্ছে, কেউ না কেউ ঐ সব ব্রিটিশদেরকে কোনো না কোনো যুক্তি দেখিয়ে ইইউ ছেড়ে দেওয়াই হবে বেশি লাভ, এই যুক্তি দেখিয়েছিল বা এমন কিছু লোকের পাল্লায় তারা পরেছিল যেঁ, কেউই বুঝে নাই কি করা উচিত আর কি করা উচিত না। দুই পক্ষই ছিল নাদান এবং অপরিপক্ক। এখন যখন বিচ্ছেদের রায় হয়ে গেছে, তখন জিবিনের সব স্বপ্ন, সব আরাম, সব চাহিদার মধ্যে অনেক বেশি গরমিল মনে হচ্ছে বলে নিজেকে নিজেদের অনেক বেশি অপরাধী মনে করছেন। এবং আসলেই তারা অপরাধী। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনেও আমি এমন কিছু লোকের সম্মুখীন হয়েছি, যারা এক ইঞ্চি দুরের লাভটাই দেখেন, কিন্তু দুরের লসের অংশটা চোখে দেখেন না, বুঝেও না। ফলে এক ইঞ্চি পরিশর লাভ নিয়ে যখন রায় দিয়ে উল্লসিত হয় বা জিতে গেছি বলে পুলকিত হয় আর নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমিয়ে যায়। পরদিন ঘুম থেকে উঠে যখন দেখে তাদের সব স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে, সব আরাম ধুলিস্যাত হয়ে গেছে, ঐ দুরের অনেক ক্ষতির আভাস গুলু যখন একে একে উম্মচিত হতে থাকে এবং লসের পরিমান গুলু যখন একের পর এক জমা হতে থাকে, তখন তাদের আত্তা কাপে, ভয় লাগে, সব হিসাব নিকাশ ভুল হয়েছে বলে সারাক্ষন আক্ষেপ করে, তখন যারা এই ধরনের ভুল করতে চায় নাই, তাদের এক প্রকার পুলকিতই হয়। কারন এই ভাবনাটা তারা অনেক আগেই করেছিল কিন্তু বোকার দলেরা বুঝে নাই।     তাই, আগে নিজের ভালোটা বুঝুন। তারপর অন্যের ঘেউ ঘেউ শুনুন। গন্তব্যপথে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ঘেউ ঘেউ করা প্রানিদের প্রতি ঢিল মারতে থাকা মানে খুব দ্রুত গন্তব্যদিক হারিয়ে ফেলা। ঘেউ ঘেউ প্রানি থাকবে, তাদের ঘেউ ঘেউও থাকবে, মাঝে মাঝে বিরক্ত হবেন, মনে হবে উচিত শিক্ষা দেই। কিন্তু না, গন্তব্য স্থানে না পৌঁছানো অবধি ধৈর্য ধরা অত্যান্ত প্রয়োজন। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মত লোকের অভাব নাই, কিন্তু ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে টেনে তোলার লোকের অনেক অভাব আছে। বিচ্যুতিতে সবচেয়ে ক্ষতি নিজের। তৈরি করা সাম্রাজ্যে রাজাগিরি করা যতোটা সহজ, নিজে সাম্রাজ্য তৈরি করা ততোটা সহজ নয়। আজ ব্রিটিশরা বুঝে, তাদের দিন এবং রাত দুটুই খারাপ। কোনো এক ব্রিটিশ পূর্ব পুরুষেরা ব্রিটিশকে উচ্চ শিখরে তুলে দিয়ে গিয়েছিল। ঐ সব ব্রিটিশ রা মুসলমানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে তাদের নিজের ফায়দা লুতার জন্য, অপেক্ষা করেছে বেশ কিছুটা সময় যেনো সব কিছু হাতের মধ্যে এসে যায়। এই অপেক্ষার সময়ে ব্রিটিশদের কে জারজ সন্তানের গালিও খেতে হয়েছে। তো কি হয়েছে? তার উদ্দেশ্য তো ছিল এই বিশ্বকে রোল করা। তারা তাই করেছিল। কিন্তু আজ এই যুগের বলদ কিছু আহাম্মক ব্রিটিশরা সেইদিনের পূর্ব পুরুসদের রচিত সাম্রাজ্য বোকার মত সিদ্ধান্ত দিয়ে তার সমাধি করলো। কারন এই যুগের ব্রিটিশরা সাম্রাজ্য গরে তোলে নাই। তাই ধ্বংস ও তাদের মনে আঘাত হানে না। এখন আঘাত হানে এই কস্টে যেঁ, তারা আর আগের মতো আরাম করতে পারবে না, আগের মতো চাকচিক্য পাবে না। এটা হচ্ছে পাপের ফল। 

Part-1

Part-2

Wedding Ummika Abir

Hall of Fame-Chief of Air Staff Hasan Mahmud

 

River Side River Cruiz-2025

 

 

 

রিভার ক্রুজ-টাচ ১৩ঃ ২০২৫

অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের নেভাল চীফ নাজমুলকে এমন একটা চমৎকার শীপে করে সারাদিন আমাদের পরিবারকে নদীতে ভ্রমন করানোর জন্য।

 

কনিকার বিয়ে-২০২৫

২২/০৩/২০২৬-ঈদের পরেরদিন

যেদিন আমি এই অবিনশ্বর পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেবো, আমার আর কখনো ফেরা হবে না, কোন কিছুই আর আমাকে স্পর্শ করবে না, সেদিন হটাত করেই তোমার হৃদয়ের ভিতরে কন এক অচেনা বেদনায় মনে হবে-আমি তোমার জীবনে কতটুকু গুরুত্বপুর্ন ছিলাম যে প্রতিদিন তোমার খোজ নিতো, প্রতিটি খুচরা মুহুর্তে তোমার কথা ভাবতো। তোমার সেদিন আক্ষরিক অর্থেই মনে হবে, তুমি আমার কাছে কতটা শখের মানুষ ছিলে। সেদিন তুমি বুঝবে এই পৃথিবীতে কেউ তোমার জন্য এতোটা যত্নশিল ছিলো। আমি যেদিন আর এখানে থাকবো না, চলে যাবো, সেদিন তুমি আমাকে কবরস্থানে খুজতে যেও না, আমাকে তুমি খোজো তোমার প্রতিটি শ্বাসরুদ্ধকরী সুর্যোদয়ে। প্রতিটি গানে যা তোমারে অকারনে কাদায়। আমার আত্মারা যেখানেই চলে যাক না কেনো আমি তখনো তোমাকে ভালোবেসেই যাবো। যখন কোনো আত্তা কাউকে এতোটাই ভালোবাসে, সেই আত্মা কখনোই তোমাকে সত্যি ছেড়ে যেতে পারে না। হয়তো তুমি তখন আমার কন্ঠ শুনবে না, তবে মনে রেখো আমার সর্বস্ব দিয়ে আমি তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, মায়ায় জড়িয়ে রেখেছিলাম। আমি তোমাকে এমনভাবে সবার থেকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম যা আমি ভাবিনি আমি অন্য কারো জন্য কখনো করেছি কিনা। আমার সামনে অনেক পথ খোলা ছিলো, অনেক মানুষ হাজির ছিলো, আমি যে কোনো পথ , যে কোন মানুষকে বেছে নিতে পারতাম, কিন্তু এতোসব বিকল্পের মধ্যে আমি তোমাকেই বেছে নিয়েছিলাম। আমি সব সময় তোমার জন্য তোমার পাশে থেকে গিয়েছি। কিন্তু আমি নিয়ম ভাংতে পারিনি। খুব করে তোমাকে চাইলেও আমি চুপ থাকার তাগিদে আর তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি কোনো নিয়ম ভাংতে পারিনি। তীব্র মায়া, তীব্র ভালোবাসা থাকা সত্তেও, একসাথে বুড়ো হবো ভাবলেও কিংবা সমাজ সম্মুক্ষে তীব্র অনুভুতি থাকা সত্তেও আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরার নিয়ম ভাংতেব পারিনি। এই সমাজে জীবনের চেয়ে, জীবনের কষ্টের চেয়ে, গোপন যন্ত্রনার চেয়েও নিয়ম যেনো অনেক বড়। অথচ আমরা বলি জীবনের থেকে মুল্যবান কিছুই নাই। আমরা কে কখন কার কাছ থেকে কিভাবে বিদায় নেবো আমরা সেটা জানি না। হয়তো হতে পারে এটাই তোমার জন্য আমার শেষ বার্তা। আমি জানি না আগামীকাল আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে, কিন্তু আমি শুধু তোমাকে জানাতে চাই যে, তুমি আমার কাছে খুব বিশেষ কেউ ছিলে। হাসিমুখ হোক কিংবা চুপচাপ, তোমার সাথে আমার কাতানো সময়গুলি ছিলো অনবদ্য এবং বাস্তব। যাইই ঘটুক না কেনো, জীবনে সব সময় হাসিখুশী থাকবে যেমন এখন আছো। মনের ভিতরে কখনো কোনো দুক্ষকে বাসা বাধিতে দিও না। মনে রাখবা, আমার মনের ভিতর তোমার জন্য সব সময় একটা স্পেশাল জায়গা ছিলো এবং থাকবে।

শারমিন

This content is password-protected. To view it, please enter the password below.

অরু     

      

অরু নামের কোন চরিত্র বাস্তবে নাই। কিন্তু তার রুপক চরিত্র সর্বদা সমাজের চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। এই অরুদের ইতিহাস খুজতে গেলে অনেক লোমহর্ষক কাহিনী বেরিয়ে আসে। কখনো দেখা যাবে যে, তার জীবন নিয়ে অনেক মানুষ খেলা করেছে, কখনো এদেরকে কেউ তাদের বিশ্বাসের দূর্বলতাকে পুজি করে অতিমাত্রায় ঠকিয়ে অন্য কোথাও সটকে পড়েছে, আবার কখনো কেউ এদেরকে পথ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে পরম যত্নে আদর করে সমাজের ঠিক রেল লাইনটায় উঠিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, অসংখ্য অরুরা তাদের আসল জন্মের কাহিনীই জানে না, কে তারা, কোথা থেকে এসছে, কেমন করে কার কাছে বড় হয়েছে। যৌবন, কৈশোর, কিংবা বৃদ্ধকাল কেনো কার কাছে কিভাবে কাটালো তার কোনো কারনই হয়তো তাদের জানা নাই, এমনকি কেনোইবা তার কাছেই কাটাইলো, এর অনেক ব্যাখ্যা অজান্তেই থেকে যায়। যখন মাঝে মাঝে হটাত কেউ সত্যিটা জানে, তখন তার পায়ের তলার মাটিকে একটা অভিশাপ মনে হয়। মনে হয়, নিজের সমস্ত সত্তা আর সফলতা কিংবা ব্যর্থতার মাঝে কোনো ফারাক নাই। নিজের কাছে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। রাগ হয়। কিন্তু কার উপর রাগ? কিসের ভিত্তিতে রাগ? কোনো উত্তর পাওয়া খুব দুষ্কর। এই জগতে ঈশ্বর একটা রহস্যজনক জালে কত প্রকারের খেলা যে খেলে তার সঠিক ব্যাখ্যা আর কারন কোনো মানুষের জানা নাই। এরই মধ্যে অজস্র ফুলের সমাহারের বাগানে এরা একটা আগাছা হয়ে জন্মালেও তাদের একটা নিজস্ব রুপ আছে, নিজস্ব পরিব্যপ্তি আছে। আগাছা ফুলের সমাহার যখন কেউ ভালোবাসে, তখন সে আর আগাছায় থাকে না, ফুলের মধ্যে নতুন এক প্রজাতীর নাম নিয়ে সুন্দর বাগানে ঠাই করে নেয়। তার তখন নতুন একটা নাম হয়। এইসব অরু নামক ফুলেরও একটা পরিচয় থাকে, কখনো এর নাম হয় মাধুরী, কখনো মেঘলা আকাশের মতো উড়ন্ত কালো জল, আবার কখনো রোজেটা নামের কোনো বিদেশী ফুল। এইসব ফুলেরা কখনো কখনো আমাদের সমাজে অতি আখাংকিত ফুলসমুহ থেকেও অধিক মুল্যাবন হয়ে উঠে। তখন গোলাপ, কিংবা  জুই, অথবা রজনী গন্ধ্যারাও এদের ধারে কাছে থাকে না।  এরা কখনো অভিশাপ হয়ে আসে না, কিন্তু এদের জীবনের মাত্রায় যা দেখা যায়, তার বেশীর ভাগই থাকে অবহেলায় ভরা কানায় কানায় জল। আমি এই রকম একজন অরুর কিছু ব্যক্তিগত উপলব্দি বুঝার চেষ্টা করেছিলাম কোনো এক নামহীন অরুর কাছ থেকে। এই নোটখাতা তেমনি কোনো এক অরুর মনের গোপন উপলব্ধি।তাহলে এখন প্রশ্ন জাগে, অরু নামের কেউ কি আসলে আছেহ্যা, আছে, তবে ইহা তাহাঁর ছদ্ধনামের এক নামকরন। অরুরা অন্য নামেই বেশী বেচে থাকে। এই অরু আমাকেও অনেক উদ্বেলিত করিয়াছিলো সময়ে কোনো এক অধ্যায়ে।  

নীল

This content is password-protected. To view it, please enter the password below.

আমার মা

মিসেস হামিদা খাতুন, স্বামীর নাম-মোঃ হোসেন আলি মাদবর, ঠিকানা-নতুন বাক্তার চর, থানা-দক্ষিন কেরানীগঞ্জ, ঢাকা। তিনি আমার মা। আমার মায়ের বংশ ধারাটা এই রকমের। জনাব আহাদুল এর ছেলে হাজি আসাদ উল্লাহর তিন পুত্র (১) জনাব উম্মেদ আলী মুন্সি (২) হাছান আলী মুন্সী (৩) ছলিম উদ্দিন মুন্সী। জনাব উম্মেদ আলীর ছিলো চার ছেলে সন্তান। তারা ছিলেন (১) কুদরত আলী (২) লস্কর আলী (৩) চেরাগ আলী (৪) কেরামত আলী। এই কেরামত আলী ছিলেন আমার নানা অর্থাৎ আমার মায়ের পিতা। উক্ত নানা কেরামত আলীর কোনো পুত্র সন্তান ছিলো না। তার মাত্র দুইজন কন্যা (১) আমার মা (২) আমার খালা সামিদা খাতুন।

মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এক ছেলের মা হয়ে বিধবা হন। খুব বড় লোকের মেয়ে নন বটে কিন্তু মাঝারী পরিবারের বনেদি ঘরের মহিলা। যেই সময়ের কথা বলছি, তখন ১৫ বছর অতিক্রম করলেই গ্রামের মধ্যে আইবুড়ি হয়ে আছে মেয়ে এই রকম একটা অপবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে যদি আবার নিয়তির কারনে কেউ এতো অল্প বয়সেই বিধবা হন, তার তো জীবনটাই যেনো কি রকম দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা জানে শুধু যে সাফার করে সে আর জানে সেই পরিবার যেই পরিবারে এটা ঘটছে। অতঃপর দ্বিতীয় বিয়ে হয় আমার বাবার সাথে। বিস্তর বয়সের তফাত ছিলো আমার বাবার সাথে আমার মায়ের। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় কি দুই তখন আমার বাবা মারা যান। আমি আমার বাবাকে দেখি নাই, এমন কি আমাদের কারো কাছেই আমার বাবার কোনো ছবিও নাই। আমার মা যখন আমার বাবাকে বিয়ে করেন, তখন তার প্রথম পক্ষের ছেলে বিল্লাল হোসেন কে আমাদের ই গ্রামের পাশের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পালক দিয়ে দেন। আমার মা আমার বাবার এমন একটা সংসারে পদার্পণ করেন যেখানে আমার বাবার আগের পক্ষেরই সন্তান ছিলো গোটা আট জন। তাদের সবার বয়স আমার মায়ের থেকে অধিক। এই সন্তানেরা আমার মাকে কোনদিনই আপন করে ভাবতে পারেন নাই। আমার বাবা ছিলেন মাদবর যিনি সারাক্ষনই গ্রামের মাদবরি আর তার জমিজমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এমনই এক সংসারে মা একটানা সংসার করেছেন। আমাদের এই ঘরে পরপর তিন ছেলে আর পাচ কন্যার জন্ম দেন আমার মা। সবার বড় আমার বোন, যার নাম সাফিয়া, তার ছোট শায়েস্তা, এর পরই জন্ম নেয় আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ, তারপর জন্ম নেয় আমার পর পর তিন বোন যথাক্রমে লায়লা, ফাতেমা আর মেহেরুন্নেসা। এতোগুলি মেয়ের পর আমার মার কোল জুড়ে আসে আরেক পুত্র সন্তান কিন্তু সে এই পৃথিবীতে বেশীদিন টিকে থাকতে পারে নাই। তারপরের মানুষটিই হচ্ছি আমি। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় বা দুই, তারপরে আমার বাবা জান্নাতবাসী হন। ফলে আমিই হলাম আমার পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। আমার মা আর বিয়ের সপ্ন দেখেননি। আমাদেরকে নিয়েই তিনি তার সমস্ত ধ্যান ধারনা আর সপ্ন লালিত করেছেন। আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। আমার মায়ের পরিবারের কাউকেই আমার মনে নাই। বরং বলতে পারেন, আমি কাউকেই দেখি নাই। আমার জন্মের আগেই সব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি না দেখেছি আমার দাদি, দাদা, নানা, বা নানি, কিংবা কোনো মামা, মামিকে। কি আজব, না? আসলেই আজব। এমনটা কি কখনো হয়? কিন্তু হয়েছে। আমাদের আদিবাড়ি আছে মুন্সীগঞ্জ জেলার কয়রাখোলায় যা বর্তমানে সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্গত। আমাদের ঐ বাড়িটি আসলে ছিলো আমার নানার প্রাপ্য জমিটাতে। কিভাবে আমার বাবা আমার নানার জমিতে এতো বড় বাড়ি করলো এবং কেনো উনি তার এতো সম্পদ থাকতেও নিজের সম্পত্তিতে কোনো বাড়ি করেন নাই সেটা আমার আজো জানা হয় নাই। পরবর্তীতে আমরা মাইগ্রেট করে কয়রাখোলা থেকে কেরানীগঞ্জ চলে আসি। ফলে আমাদের এখন দুটু গ্রামের বাড়ি- এক) কয়রাখোলা, ২) কেরানীগঞ্জ। 

রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড

রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড একটি ১০০% রপ্তানীমূলক সুয়েটার্স তৈরির প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সাথে আমি প্রথমে ২০০৫ সালে ৩০% শেয়ার নিয়ে জনাব নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে পার্টনারশীপ ব্যবসা শুরু করি, যদিও অত্র প্রতিষ্ঠান টি ২০০৩ সালে গঠিত হয়। অতঃপর ২০০৬ সালে নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে বাকী ৭০% শেয়ারও ক্রয় করিয়া জনাব নাজিমুদ্দিনকে অব্যাহতি দেই। এই সময়ে জনাব নাজিমুদ্দিনের সাথে আমার হাসনাবাদ সুপার মার্কেটের ভবনের যে স্থানে গার্মেন্টস অবস্থিত, তা ৩ বছরের মেয়াদে ভাড়ায় চুক্তিবদ্ধ একটা চুক্তি হয়। এবং তাহাকে বেশ কিছু বড় অংকের টাকা অগ্রিম প্রদান করি। অতঃপর, ১০০% শেয়ার নেওয়ার সময় আমি বিনা টাকায় জনাব মোহসীন শাহীন নামে এক ভদ্রলোককে আমার পার্টনারশীপ দেই, আর সেটার পরিমান ছিলো ৩০%। তাকে আমি এই ৩০% শেয়ার এই মর্মে বিনা টাকায় দিয়েছিলাম যাতে তিনি গার্মেন্টস ব্যবসাটি সুন্দরভাবে চালান এবং এর উন্নতি করেন। এখানে বলা বাহুল্য যে, জনাব মোহসীন আগে থেকেই এই সেক্টরে কাজ ছিলেন এবং অভিজ্ঞ ছিলেন।

কিন্তু আমার এক্সপেক্টেশনের সাথে জনাব মোহসীন সাহেব গার্মেন্টস এর উন্নতি করতে না পারায় আমি ধীরে ধীরে লস টানতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হবার উপক্রম হয়। একদিকে নিজের সব সঞ্চিত টাকা, স্ত্রীর যত সঞ্চিত টাকা, এবং অনেক আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ৫০/৬০ লক্ষ টাকার দেনার মধ্যে পড়ি। কোনো উপায়ন্তর না দেখে শেষ অবধি আমি ডিসিশন নেই যে, আমি আর অত্র রিভার সাইড ফ্যাক্টরীটি চালাবো না। এতে যেটা হবে তা হচ্ছে, আমি ব্যাংকের লোন টা (প্রায় ৩ কোটির মতো) আপাতত সামাল দিতে পারবো, কিন্তু আমি যে আমার আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছি, সেটা দিতে পারবো না। তার পরেও আমি এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। কারন, যদি আমি ফ্যাক্টরী চালাই, তাহলে প্রতিমাসে লস হচ্ছিলো প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো। আর যদি না চালাই, তাহলে এই লস টা থেকে বেচে যাই। আর আমার পক্ষে লস দিয়ে তাকার যোগা দেওয়া ও আর যাচ্ছিলো না। মোহসীন সাহেব যেহেতু কোনো কন্ট্রিবুসন করেন না বা করতে পারবেন ও না, ফলে তার কোনো চিন্তাও নাই আবার ফ্যাক্টরী বন্ধ হোক এটাও তিনি চাচ্ছেন না। কিন্তু আমি বুঝতেছিলাম, আমার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে।

এমন সময় মিষ্টার মূর্তজা এবং মিষ্টার প্রিয়ান্থা (শ্রীলংকার) এই দুইজন আমাদের ফ্যাক্টরি মাত্র ২ কোটি তাকার বিনিময়ে কিনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। শর্ত থাকে যে, তারা ব্যাংকের লোন রি-সিডিউলিং করে নেবেন, এবং কিস্তিতে তা পরিশোধ করবেন। আমাদের যতো আউট স্ট্যান্ডিং বকেয়া আছে (যেমন শ্রমিকদের বেতন, গ্যাস বিল, কারেন্ট বিল, এবং অন্যান্য) এর বিপরীতে প্রায় ৭০/৮০ লাখের মতো হবে তা দিয়ে দেবেন। আমার যেহেতু এই ফ্যাক্টরী চালানোর কোনো সক্ষমতা ছিলো না, আর চালাইতেও চাচ্ছিলাম না, ফলে যেই রকম ডিল ই হোক, তাতে আমি মেনেই গেলাম।

তারা ধীরে ধীরে ফ্যাক্টরীকে তাদের মতো করে সাজাতে শুরু করলেন, আমি মুটামুটি বেকার। বাসাতেই বেশীর ভাগ সময়কাটাই, কিংবা আশেপাশে ঘুরি। অনেক চিন্তায় ছিলাম, কি করা যায় এটা নিয়ে।

বাইবেলে রঙ এর ব্যাখ্যা

বাইবেলে সাদা, কালো, হলুদ এবং সম্ভবত মিক্সড এই কয়েকটি কালারের কথা বোলা আছে। অনেকদিন আগে আমি বাইবেলের প্রায় ৭টা ভার্সন পরেছিলাম। লুকের, মেথিউজ, আর্কের এবং অল্ড টেস্টামেন সহ নিউ টেস্টামেন্ট।

অল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্ট টা অনেকে হয়ত বুঝবে কিনা আমি জানি না তবে এটা জানা ভাল। তো আমি পড়ে এটা সম্পর্কে একটু ধারনা দেব যদি কেউ জানতে চায়।  

 তো বলি এবার, কালারের কথাগুলো।

বাইবেলের কোন এক জায়গায় লিখা আছে যে, "ইয়াহি অনেক দূর থেকে তোমাদের জন্য এক রাজ্য নিয়ে আসবে যে দেশের লোক হবে খুবই তড়িৎগতি সম্পুন্ন ইগলের মত, যাদের ভাষা তোমরা বুঝতে পারবে না এবং যারা হবে যুদ্ধ প্রিয় মানুষ। তারা বড়দের সম্মান করবে না, এবং ছোটদেরকেও এরা কোন ফেবার করবে না। তারা প্রুচুর মাংশভুজি হবে, তারা তোমাদের জন্য কোন শস্যক্ষেত খালি রাখবে না মদ তৈরির করার জন্য। এদেরকে বোলা হয়েছে হলুদ মানুষ। এখানে আরও একটা কথা বোলা দরকার যে, বাইবেল বলে যে, ঐ সময় জেসাস এসে তোমাদের সাহায্য করবেন এবং নতুন রাজ্য সৃষ্টি করবেন যার নাম হবে মিলেনিয়াম রাজ্য।  

বাইবেলের আরেক ভার্সনে বোলা আছে যে, "তোমার যত পূর্বে যাবে তত হলুদ বিপদের মানুষের সঙ্গে তোমাদের দেখা হবে"। ইন ফ্যাক্ট এই মিথ তাঁর অর্থ অনেক রকমের। কেউ মনে করে এই মিথ টা এসেছে " দি কিংস ফ্রম দি ইস্ট" কনসেপ্ট থেকে। এর মানে এই যে, ইউফ্রেটিস নদির পূর্ব তীরের মানুষ গুলোর কথা বোলা হয়েছে। এর মানে চীন। কিন্তু অনেকে আরও দূর ব্যাখ্যা দিয়ে বলে যে চীনের পর এবং পূর্বেও হচ্ছে আমেরিকা।আবার অনেকে মনে করে যে, ইউফ্রেটিসের পূর্বে বাগদাদ বা তেহরানও আছে যারা ইসলামিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে দিনে দিনে।

 এখানে বাইবেলের অন্যান কালারের ব্যাপারে আরও কিছু মজার মিথ প্রচলন আছে। যেমন, ঈশ্বর যখন প্রথম মানুষ তৈরি করেন, তখন তাঁর কালার খুবই কাল হয়ে গিয়েছিল। তখন তিনি আবার আরও একজন মানুষ তৈরি করেন, তখন সেটা হয়ে ছিল অনেক সাদা। তখন তিনি তৃতীয় বার চেস্টার পর যে মানুষটি তৈরি হল, সেতা না কাল  না সাদা। ওটা প্রায় এসিয়ান টাইপের। এটা অনেকে জোক মনে করেন কারন এই কনসেপ্টটা সব ভার্সনে পাওয়া যায় না।

 তবে অরিজিনাল বাইবেলে মাত্র ৪ বার হলুদ কালারটা ব্যবহার করা হয়েছে। ৩ বার ই ব্যবহার হয়েছে ধর্ম জাজকের দ্বারা রোগ নির্ণয় করার কারনে বা ব্যাপারে। আর ৪র্থ বার ব্যবহার করা হয়েছে ইয়েলো গোল্ড বুঝানোর জন্য।

কোন একটা ভার্সনে (আমার ঠিক মনে নাই এখন) বলা হয়েছে যে, Gold or Yellow: Symbolizes the Glory of God ; divine nature; holiness; eternal deity; the Godhead; Purification; majesty; righteousness; divine light; kingliness; trial by fire; mercy; power; His Deity; Glory. Yellow or Gold is also primary. It always speaks of trial and purging. "That trial of your faith, being much more precious than of gold that perishes, though it be tried with fire, might be found unto praise and honour and glory at the appearing of Jesus Christ"

 বাইবেলের বিশেষ করে লেভিক্টাসে কালারের কিছু মিনিগ সরাসরি বোলা হয়েছিল। যেমন ধরঃ কাল মানে পাপ, মৃত্যু, খোঁড়া, দুঃখ কিন্তু এখানে চুল কে ওর মধ্যে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

নিল কালারকে বোলা হয়েছে যে, পবিত্র জায়গায় যা যা রাখা হবে তাঁর কালার হতে হবে নীল। এটা ধনী ব্যাক্তির জন্য ও ব্যবহার করার রিতি আছে। এটা হচ্ছে হেভেনলি কালার।

সবুজ কালারকে জীবনের কালার বোলা হয় অর্থাৎ যা সবুজ তাতেই প্রান আছে বোলা হয়।

The color red in the Bible means love, forgiveness, or even blood sacrifice. Red in the Bible meant the chosen people whose doors were paintef red were to be kept alive and the doors that were not painted were killed

এবার আসি অল্ড টেস্টামেন্ট এবং নিউ টেস্টামেন্ট কি

একদম সবচেয়ে বিশাল পার্থক্য হচ্ছে অল্ড টেস্টামেন্টে জিশুর আবির্ভাব আর নিউ টেস্টামেন্টে এটার অভাব। The Old Testament provides the history of a people; the New Testament focus is on a Person. The Old Testament shows the wrath of God against sin (with glimpses of His grace); the New Testament shows the grace of God toward sinners (with glimpses of His wrath). The Old Testament predicts a Messiah (see Isaiah 53), and the New Testament reveals who the Messiah is (John 4:25–26). The Old Testament records the giving of God’s Law, and the New Testament shows how Jesus the Messiah fulfilled that Law (Matthew 5:17; Hebrews 10:9). In the Old Testament, God’s dealings are mainly with His chosen people, the Jews; in the New Testament, God’s dealings are mainly with His church (Matthew 16:18). Physical blessings promised under the Old Covenant (Deuteronomy 29:9) give way to spiritual blessings under the New Covenant (Ephesians 1:3). The Old Testament saw paradise lost for Adam; the New Testament shows how paradise is regained through the second Adam (Christ). The Old Testament declares that man was separated from God through sin (Genesis 3), and the New Testament declares that man can be restored in his relationship to God (Romans 3—6). The Old Testament predicted the Messiah’s life. The Gospels record Jesus’ life, and the Epistles interpret His life and how we are to respond to all He has done. In summary, the Old Testament lays the foundation for the coming of the Messiah who would sacrifice Himself for the sins of the world (1 John 2:2). The New Testament records the ministry of Jesus Christ and then looks back on what He did and how we are to respond. Both testaments reveal the same holy, merciful, and righteous God who condemns sin but desires to save sinners through an atoning sacrifice.

অজানা থেকে একজন ডিক্টেটর – হিটলার

১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল সকাল ৬:৩০ মিনিটে অস্ট্রিয়ার কোনো এক নাম না জানা ব্রাউনুন গ্রামে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক এডলফ হিটলারের জন্ম হয়। তার বাবার নাম ছিলো এলুইস এবং মায়ের নাম ছিলো ক্লারা। বাবা মায়ের ৪র্থ সন্তান ছিলেন হিটলার। কিন্তু তার আগের তিনজনই তার জন্মের আগে মারা গিয়েছিলেন। হিটলারের পরে তার আরো দুইজন ভাইবোন ছিলো। তাদের নাম ছিলো এডমাউন্ড এবং পউলা। হিটলারের দাদামহ কে ছিলেন সেটা আজো ইতিহাস সঠিক তথ্য দিতে পারে নাই। তবে বলা হয় যে, হিটলারের বাবা এলুইস ছিলেন মারিয়া আন্না নামের কোনো এক মহিলার সন্তান এবং তারপাশের বাড়ির দুধ বিক্রেতা জোহান জর্জ হেইডলার ছিলেন এলুইসের বাবা। এলুইস যে একজন অবৈধ সন্তান এটা তখনকার দিনে ওই সমাজে খুব একটা অপ্রীতিকর ব্যাপার ছিলো না বলে এলুইস কখনোই তার পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন নাই। কিন্তু তিনি তার মায়ের শেষ নামটাই সবসময় ব্যবহার করতেন। আর সেটা ছিলো সিক্লগ্রুবার। পরবর্তীতে অস্ট্রিয়ায় ১৮৭৬ সালে অফিশিয়াল জন্ম নিবন্ধনের সময় তিনি তার এক চাচার "হেইডলার" নামের সাথে ম্যাচ করে এলুইস হেইডলার নামকরনে অভিষিক্ত হন। তখন তার বয়স ছিলো ৩৯। কিন্তু সরকারী খাতায় "হেইডলার" নামটি ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হয় "হিটলার" হিসাবে। আর পারিবারিক নামের জের ধরেই পরবর্তীতে এই মহানায়কের নামেও এডলফ হেইডলারের পরিবর্তে এডলফ হিটলার হিসাবেই আজ বিশ্ববাসি জানে। 

১৮৯৫ সালে হিটলার তার ছয় বছর বয়সে ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হন গ্রামের কোনো এক স্কুলে। হিটলার সপ্ন দেখতেন তিনি একজন আর্টিস্ট হবেন। ফলে হিটলার ক্লাসিক্যাল কোনো এক স্কুলে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার বাবা এলুইস চাইতেন যে, হিটলার সরকারী কোনো কর্মচারী হিসাবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলক। ফলে তার বাবা হিটলারকে ক্লাসিক্যাল স্কুলের পরিবর্তে টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। হিটলার তার বাবাকে খুব ভয় পেতেন। ১৯০৩ সালে হতাত করে হিটলারের বাবা ফুস্ফুসের ক্যান্সারে মারা যান। তার বাবার মৃত্যুর পর হিটলার পুরুপুরি স্বাধীনতা পেয়ে যান। কোনো দায়িত্ববোধ বলে কিছু ছিলো না তার। এমনকি নিজের জন্যেও না। ফলে বাউন্ডেলে জীবনের মত হিটলার অস্ট্রিয়ার আনাচে কানাচে বিভিন্ন মিউজিয়ামে, অপেরা পার্টির সঙ্গে এখানে সেখানে ঘুরে বাড়াতে লাগলেন। আর এভাবে হিটলার তার লেখাপড়ায় মোটামোটি একটা ইতিই টেনে ফেলছিলেন। এইভাবে করতে করতে, ১৯০৭ সালে হিটলার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি ভিয়েনা একাডেমিতে ফাইন আর্টসে ভর্তি হবেন। কিন্তু তিনি খুব খারাপভাবে ভর্তি পরিক্ষায় ফেল করলেন এবং ভিয়েনা একাডেমিতে আর ভর্তি হতে পারলেন না। মনের দুঃখে তিনি পুনরায় ভিয়েনা থেকে তার নিজের বাড়ীতে মায়ের কাছে ফিরে এলেন। কিন্তু তখন তার মা আন্না ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ১৯০৭ সালের ডিসেম্বরে তার মা আন্না ক্যান্সারে মারা যান। 

  ১৯০৮ সালে হিটলার পুনরায় ভিয়েনা একাডেমিতে আবারো ফাইন আর্টসে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেন, কিন্তু আগেরবারের চেয়ে ফলাফল এবার আরো খারাপ হওয়ায় ভিয়েনা একাডেমি তাঁকে পরবর্তী সব ভর্তি পরীক্ষার জন্য স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেন। হতাশ হিটলারের আর কোনো কিছুই করার ছিলো না। মায়ের সঞ্চিত যা ছিল, তাই দিয়ে হিটলার রাস্তায় রাস্তায় এদিক সেদিক ঘুরে বাড়াতে লাগলেন। কখনো পার্কে, কখনো ষ্টেশনে, কখনো বা গাছের তলায়। আস্তে আস্তে মায়ের রাখা সঞ্চয়ও শেষ হতে থাকে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতেও হিটলার রেগুলার কোনো একটা কাজের সন্ধান করেন নাই। শেষতক, হিটলার কাজ না খুজে মানুষের কাছে হাত পাতা শুরু করলেন, আক্ষরিক অর্থে যাকে বলে ভিক্ষা। এইভাবে আর যখন চলছিলো না, তখন হিটলার ১৯০৯ সালের ডিসেম্বরে "হোমলেস শেল্টার" এ আশ্রয় নেন।  

১৯১৩ সালে অস্ট্রিয়ায় যখন বাধ্যতামুলক সেনাবাহিনীতে ভর্তির আদেশ করা হয়, তখন সেনাবাহিনীতে ভর্তি না হবার জন্য চালাকী করে হিটলার তার পিতৃভুমি জার্মানির মিউনিখে চলে আসেন। কিন্তু অস্ট্রিয়ান সরকার ১৯১৪ সালে তার এই চাতুরী ধরে ফেলেন। চতুর হিটলার তার চাতুরীর জন্য এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলভোগের সাজা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হিটলার অস্ট্রিয়ান কনসুলেটকে তার দারিদ্র্যের বর্ণনা দিয়ে অতি আবেগময় একখানা পত্র লিখেন।  অস্ট্রিয়ান কনস্যুলেট হিটলারের পত্রের আবেগময় ভাষা এবং তার নিবেদন খুব পছন্দ করেন এবং তাঁকে শাস্তি না দিয়ে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেন সেনাবাহিনীতে ভর্তির জন্য। কিন্তু হিটলার ইচ্ছে করে সেনাবাহিনীর লিখিত পরিক্ষায় খুব খারাপভাবে ফেল করেন এবং তাঁকে আর অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনীতে কখনোই যোগ দিতে হয় নাই। 

২৮ জুন ১৯১৪ সালে যখন এক সারবিয়ান আততায়ীর হাতে অস্ট্রিয়ার রাজা ফারদিন্যান্ড মারা যান, তখন জার্মানির চ্যান্সেলর কায়জার অইলহ্যাম অস্ট্রিয়াকে সারবিয়ান্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য চাপ দেন এবং অস্ট্রিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করে। পহেলা আগস্ট ১৯১৪ সালে যখন জার্মান যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন মিউনিখে সবার সাথে হিটলার নিজেও ওই আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন।  

এই সময় রাশিয়া অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে তাদের সৈন্যসামন্ত মোতায়েন করেন, অন্যদিকে জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের সৈন্যসামন্ত মোতায়েন করেন। আবার আরেক দিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড জার্মানির বিরুদ্ধে তাদের সৈন্যসামন্ত মোতায়েন করে বসেন। তার মানে এই দাড়ালো যে, অস্ট্রিয়া ও জার্মানি একদিকে, অন্যদিকে সার্বিয়া, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড।    

অস্ট্রিয়ার রাজা যখন সার্বিয়ার আততায়ীর হাতে খুন হন, তখন হিটলার এতোটাই দেশপ্রেমিক বনে যান যে, তিনি এইবার জার্মানির ভ্যাবারিয়ান রেজিমেন্টে স্ব ইচ্ছায় যোগ দেন। হিটলার সার্বিয়ানদেরকে এবং অন্যান্য বিদেশীদেরকেও জার্মানিতে সহ্য করতে পারছিলেন না। হিটলার সেনাবাহিনীর সদস্য হিসাবে মোটেও একজন খাপ খাওয়ানোর মতো লোক ছিলেন না। ঢিলাঢালা, অলস এবং খুবই অপরিচ্ছন্ন সদস্য হিসাবে গন্য ছিলেন। কিন্তু তার একটা ভালো গুন ছিলো। সে বহুবার অল্পের জন্য মৃত্যু থেকে বেচে গেলেও তার সাহসী কাজে খুব উৎসাহ ছিলো এবং তিনি ওইসব কাজে নিজে থেকেই এগিয়ে আসতে চাইতেন। হিটলার কখনো খাবারের জন্য অভিযোগ করেন নাই, কিংবা ব্যারাকে থাকার অবস্থা ভালো নয় এইজন্য তার কোন অভিযোগ ছিলো না, কিংবা তিনি কখনো মেয়েঘটিত ব্যাপার নিয়ে নাক গলান নাই। আর হিটলার কখনো ছুটির জন্যও আবেদন করতেন না।  

১৯১৬ সালের ৭ অক্টোবরে কোনো এক যুদ্ধে ( ব্যাটল অফ সুম্মি) তে হিটলার গুরুতর পায়ে আঘাত পান এবং জার্মানির এক হাসপাতালে ভর্তি হন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এটাই হিটলারের প্রথম অনুপস্থিতি। আরোগ্য লাভের পর হিটলারকে তখন হাল্কা কাজ দেওয়া হয় আর তিনি তখনো মিউনিখেই থাকেন। এদিক সেদিক ঘুরে বাড়ান, বার্লিনে এই প্রথম হিটলার ঘুরতে যান। ১৯১৮ সালের ১০ নভেম্বরে হিটলার খবর পান যে, জার্মানির পরাজয় হয়েছে। হিটলারের বয়স তখন ২৭। এই টকবগে তরুন হিটলার জার্মানির এই পরাজয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তার বারবার মনে হচ্ছিলো যে, জার্মানির পরাজয় সামরিক বাহিনীর অক্ষমতার জন্য হয় নাই, বরং পরাজয়টা হয়েছে অযোগ্য রাজনীতিবিদদের কারনে, বিশেষ করে ইহুদীদের কারনে। হিটলারের মনে ইহুদীদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ জন্ম নিতে থাকলো।  

১৯১৯ সালের ২৮ জুন জার্মানির পরাজয়ের কারনে মিত্রপক্ষ "ভারসাই চুক্তি" নামে একটি চুক্তি করে যেখানে সম্পূর্ণ দায়ভার জার্মানির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং যুদ্ধে যার যা ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপুরন হিসাবে জার্মানিকে কি কি করতে হবে তা ওই চুক্তির মধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়। এই চুক্তির বলে জার্মানিকে তাদের নিজস্ব কিছু ভূখণ্ডও পোল্যান্ড এবং ফ্রান্সকে দিয়ে দিতে হয়।  শুধু তাই নয়, চুক্তি মোতাবেক বলা হয় যে, জার্মানি তার সেনাবাহিনী কোনো অবস্থাতেই একলাখের বেশী সৈন্য সামন্ত বাড়াতে পারবে না, তাদের কোনো মিলিটারী বিমান থাকতে পারবে না, এমনকি সাবমেরিন জাতীয় কোন নৌজানও রাখতে পারবে না। এটা ছিলো বিশ্ববাসীর সামনে জার্মানির একটা অপমানসুচক চুক্তি।  

হিটলার তখনো জার্মানির গোয়েন্দা বাহিনীতে একজন "ইনফরমার" হিসাবে কাজ করছিলেন এবং তিনি মিউনিখেই থাকতেন। কিছুদিন পর হিটলারকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে "পলিটিক্যাল ইনডক্ট্রিনেসন" কোর্সে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। আর ওখানেই হিটলার তার জীবনের একটা মোড় ঘুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজর কাড়েন। হিটলার তার নিজের লেখা "মেইন ক্যাম্প" এ লিখেছিলেন, "একদিন আমি ওই কোর্স করার সময় অনেক ছাত্রদের মিলিত সভায় ইহুদীদের ব্যাপারে আমার কিছু কথা বলার সুযোগ হয়েছিল যেখানে অধিকাংশ ছাত্ররা আমার মতের পক্ষেই সমর্থন দেয়। আর এর ফলশ্রুতিতেই আমাকে সেনাবাহিনি থেকে মিউনিখ রেজিমেন্টে .এডুকেসনাল অফিসার" হিসাবে প্রেসনে পাঠায়।"  

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে মিউনিখের "জার্মান ওয়ার্কার পার্টি"র কোনো এক ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে হিটলারকে তদন্ত করতে পাঠানো হয়। ওই সময় এই "জার্মান ওয়ার্কার পার্টি"টি ছিলো মুলত একটি ছোট নাম না জানা "আলাপচারিতা দলের" মত। খুব কমসংখ্যক লোক এরসঙ্গে জড়িত এবং এদের কোনো এজেন্ডা ছিলো না। হিটলার সূক্ষ্মভাবে ভাবলেন যে, এই ছোট দলটি দিয়েই একটা কিছু করা সম্ভব এবং একে সাংঘটনিকভাবে সাজাতে হবে। এদের প্রতিটি সদস্যই ইহুদীদের বিপক্ষে। হিটলার নিয়মিত এই "আপালচারিতা দল"টিকে একটা রাজনৈতিক দলের আদলে তৈরী করা শুরু করলেন। এই দলটির পক্ষে মাঝে মাঝে হিটলার বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করলেন যেনো এর পরিচিতি বাড়ে। এমনই এক সময়, ১৬ অক্টোবর ১৯১৯ সালে, হিটলার তার এই ক্ষুদ্র দলের সদস্যদের উদ্দ্যেশে এমন এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেন যে, তার এই বক্তব্য, তার এই ইহুদী বিরোধী মনোভাব অনেক জার্মান নাগরিককে উক্ত দলে এসে হিটলারের ভাষণ শুনার জন্য প্রলুব্ধ করে। আর এই সুযোগ নিয়ে ১৯২০ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারীতে প্রায় ২০০০ হাজার জার্মান নাগরিকের সম্মুখে হিটলার ২৫টি দাবী সম্বলিত এক আশাবাদী এবং জ্বালাময়ী বক্তৃতা রাখেন। এই বক্তব্যে প্রধানত হিটলার ইহুদী বিরোধী বক্তব্যের সঙ্গে "ভারসাই চুক্তি" বাতিল, ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডকে দেওয়া ভুখন্ড ফেরত, প্রতি বছর মিলিওন মিলিওন ডলারের ক্ষতিপুরন বন্ধ, ইহুদীদের অনধিকার অধিকার, জার্মানিদের দুরাবস্থা ইত্যাদি তুলে ধরেন। হিটলার আরো বলেন যে, যুদ্ধের পরে যে সব ইহুদীগন জার্মানিতে বসবাস শুরু করেছে, তাদেরকে যতো দ্রুত সম্ভব বিতাড়িত করতে হবে।  

হিটলারের এই অভিপ্রায়ে জার্মানির অধিকাংশ নাগরিক এমনভাবে সমর্থন দিলেন যে, হিটলার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান নাই। তিনি অতিদ্রুত আগের "ওয়ার্কার পার্টি" নাম বদল করে একে "ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি" হিসাবে নাম পরিবর্তন করেন। যাকে আমরা পরবর্তীতে "নাজি" পার্টি হিসাবে জানি। এই পার্টির তিনি একটি লাল পতাকার মধ্যে সোয়াস্টিকাও লেপ্টে দেন পার্টির সিম্বল হিসাবে।  অবশেষে হিটলার উক্ত পার্টির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন ১৯২১ সালে, যদিও তিনি এক্সিকিউটিভ কমিটির মধ্যে ছিলেন ৭ম।  

হিটলার ভ্যাবারিয়ান সরকারের কিছু রাজনীতিবিদদের সমন্নয়ে ১৯২৩ সালে ৮ নভেম্বরে মিউনিখে একটি আন্দোলনের সুচনা করেন যেখানে পরিকল্পনা ছিলো যে, তৎকালীন বার্লিন সরকারকে উতখাত করবেন হিটলার এবং তার মিত্র লুদেনদ্রফ। কারন বার্লিন সরকারে অধিকাংশই ছিলো ইহুদী এবং কমিউনিস্ট। কিন্তু তাদের ওই আন্দোলন সার্থক না হয়ে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বার্লিন সরকার হিটলার এবং লুদেনদ্রফকে পাচ বছর করে জেল দেন। কিন্তু জার্মানির বিচারক উভয় হিটলার এবং লুদেনদ্রফকে যুদ্ধের সময় জার্মানির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার জন্য ৫ বছরের স্থলে মাত্র ৮ মাস জেল খাটার ব্যবস্থা করেন। জেল থেকে বের হবার পর, হিটলার এইবার আন্দোলনের মাধ্যমে নয়, রাজনীতিকভাবে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করলেন এবং তিনি তার নব্যদলকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

    তার "নাজি" পার্টি ধীরে ধীরে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করলেন এবং ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে হিটলার তার পার্টি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেন। কিন্তু তার প্রতিপক্ষ ১ম বিশ্বযুদ্ধের নামকরা পল ভন হিন্ডেনবার্গকে হিটলার হারাতে পারলেন না। কিন্তু পল ভন হিন্ডেনবার্গও এককভাবে সরকার গঠন করার মতো জয়ী হলেন না। ফলে কোয়ালিসন সরকারের মতবাদে হিটলার পল ভনের সহিত সরকারের সাথে আতাত করলেন যেখানে পল ভন হিন্ডেনবার্গ হলেন জার্মানির চ্যান্সেলর।  

কিন্তু হিটলার বসে থাকার লোক নন। তিনি সময় অসময়, ন্যায়-অন্যায় ভাবে, যেভাবেই খুশী অধিস্টিন চ্যান্সেলরকে ভয় ভিতী, অসহযোগ অনেকভাবেই বিব্রত করতে লাগলেন যাতে তিনি বাধ্য হন হিটলারকে চ্যান্সেলর হিসাবে ডিক্লেয়ার করতে।  

পরিশেষে ১৯৩৩ সালের ৩০ শে জানুয়ারিতে পল ভন হিন্ডেনবার্গ বাধ্য হয়ে হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর হিসাবে মেনে নেন।  

তার পরের কাহিনি তো মাত্র শুরু। হিটলার চ্যান্সেল হওয়ার দিন থেকেই তিনি তার "নাজি" দলের বিশাল প্রচার, তাদের দলের আখাংকা, তাদের করনীয় কাজসমুহ, জনসম্মুখে জাহির করতে থাকলেন। জেনারেল গোয়েব্যালস ছিলেন হিটলারের এইসব প্রচারনার মুল হোতা। আর পুরানো যারা পল ভনের সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন তারা কিছুটা ভয়ে, কিছুটা আতংকে আস্তে আস্তে সরে যেতে থাকেন। এইবার হিটলার তার বহুল আখাংকিত কাজ, "ইহুদী নিধন" শুরু করেন। আর তিনি এই কাজটি শুরু করেন ১৯৩৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে যেদিন তিনি ইহুদীদের কে জার্মানিতে "বয়কট" এর নির্দেশ দিলেন।  

তারপরের কাহিনী আমরা অনেকেই জানি।     

 

       

ফান্ডামেন্টালিজম এবং ওয়্যার এগেইনস্ট টেরর

ফান্ডামেন্টালিজম শব্দটি একটি প্রোটেস্টেন টার্ম। এটি "দি ফান্ডামেন্টালসঃ এ টেস্টিমনি টু দি ট্রুথ" নামক ১৯০৯ সালের একটা পাব্লিকেসন থেকে নেওয়া। আর এই টাইটেলটি বিশেষভাবে ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্টাইন ক্রিশ্চিয়ানদের জন্যই প্রযোজ্য। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের দিকে যখন বিভিন্ন স্পিরিচুয়াল ধর্মজাযকগন তাদের যোগপোযোগী মনগড়া আধ্যাত্মিক বিশ্বাসসমুহকে বাইবেলের মধ্যে একে একে অন্তর্গত করছিলেন, শুধু তাই নয়, ওই সময়ে ডারউইনের থিউরি, এবং তখনকার আধুনিক বিব্লিক্যাল মতবাদ এবং তারসঙ্গে স্পিরিচুয়াল ধর্মযাজকদের আরোপিত এবং রচিত মতবাদে বাইবেলের নিজস্ব স্বকীয়তা অনেকটাই ম্লান হতে বসেছিলো। তখন ক্রিশ্চিয়ানদের এই অংশটি ওইসব বাইবেলের উপর থেকে সরে এসে একটি গোত্র কিংবা অন্য কথায় সাব-কালচার তৈরি করেন আর এদেরকেই তখন "ফান্ডামেন্টাল" নামে মুল্যায়ন করা হয়। তাদের মতে, বাইবেল একটি পবিত্র গ্রন্থ, ঈশ্বরের বানী, তারমধ্যে কোনো কিছুই যোজন বা বিয়োজন করার অবকাশ নাই এবং এটা ভুল থেকে মুক্ত। 

খোদ আমেরিকার দুইভাই কার্টিস লি এবং মিল্টন স্টুয়ার্ড উভয়ে যৌথভাবে উক্ত ফান্ডামেন্টালিস্ট দলটিকে একত্রিভুত করেন। তাদের প্রথম এবং প্রাইমারী দায়িত্ব ছিলো পবিত্র বাইবেলের স্বকীয়তাকে বিকৃত হওয়া থেকে রক্ষা করা। অতঃপর ১৯৬০ সালে ভেটিকান-২ সম্মেলনে এই ক্রিশ্চিয়ানদেরকে স্থায়ীভাবে "ফান্ডামেন্টালিস্ট" হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই মূল শব্দটি অথবা অন্য কথায় যারা ফান্ডামেন্টালিস্ট, তাঁরা পাঁচটি ব্যসিক বিশ্বাসের উপর দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলো। সেগুলু হচ্ছেঃ (১) The Virgin Birth (2) The Physical Resurrection of Jesus (3) The Infallibility of the Scruptures (4) The Substitutional Atonement (5) The Physical Second Coming of Christ. ফান্ন্ডমেন্টালিস্টরা মনে করেন যে, ধর্মচ্যুত করা বা ধর্মচ্যুত হওয়া অন্যায় এবং তাদের ধর্মের বাইরে অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদ বিশ্বাস করাও অন্যায়। অন্য কথায় এরা গোঁড়া। 

এখন ক্রিশ্চিয়ান ধর্মাবলম্বীদের না হয় আমরা ফান্ডামেন্টালিস্ট নামে অভিহিত করলাম, অন্যধর্মে তাহলে কি এই জাতীয় রক্ষণশীল ধার্মিক গোত্র নাই? তাহলে তাদেরকে কি বলা হয়? তারাও কি "ফান্ডামেন্ডালিস্ট"? যেমন, হিন্দুদের বেলায় বলা হয় "হিন্দুৎভা" বা "হিন্দুইজম"। কিন্তু "হিন্দুৎভা" মতবাদে Hindutva is understood as a way of life or a state of mind and is not to be equated with or understood as religious Hindu fundamentalism তাদের "হিন্দুৎভা"র নিজস্ব স্বকীয়তা রক্ষার জন্য পৃথক কোনো রক্ষণশীল গোত্র সৃষ্টি হয় নাই। তাদের বেলায় যা হচ্ছে তা নিতান্তই ধর্মপালনকে একটা রীতিনীতির মধ্যে সিমাবদ্ধ। যেমন, কেউ যদি হিন্দুত্ব ছেড়ে অন্য কোনো ধর্মকে আলিঙ্গন করতেও চান, তাতে তাদের ধর্মের মধ্যে কোনো বড় ধরনের আইনগত বাধা নাই। কিংবা হিন্দুধর্মের একক কোনো ঈশ্বরও নাই। একেক বিষয়ে তাঁরা একেক জনকে প্রধান ঈশ্বর মেনে থাকেন। অন্যদিকে The importance of Hindu fundamentalism lies in its very contemporary and nationalistic scope, compared to other, more regional expressions 

ইহুদিদের বেলায় ধর্মের নামে এই রক্ষণশীল ফান্ডামেন্টালিজম এর সংজ্ঞা আবার ভিন্ন। ইহুদিরা বিশ্বাস করে যে, তাদের ধর্মবচন "টানাক" বা ট্রেডিসনালি যাকে আমরা "ওল্ড টেস্টামেন্ট" বলি তার অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা বা শিক্ষাই হচ্ছে মুখ্যবিষয়। অল্প কিছু ইহুদি (যেমন কেরাইটেস গোত্র) যারা তাওরাদ ধর্মগ্রন্থের বানীসমুহ সরাসরি "টানাক" ধর্মবচনের মত অবিকল ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী নয়। কেউ কেউ হয়ত ভাবেন যে, অর্থোডক্স বা হাছিডিক ইহুদিরা এক ধরনের ফান্ডামেন্টালিস্ট। তারপরেও তাঁরা ক্রিশ্চিয়ান ফান্ডামেন্টালিস্টদের মতো অতোটা গোঁড়া নয়। তাঁরা মনে করে, তাওরাতে মোট ৬১৩টি ভিন্ন পথের মাধ্যমে ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব বলে পথ বাৎলে দিয়েছে। আবার যারা ইহুদি ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাসী নয় তাঁরাও অন্যপথে ঈশ্বরকে খুজে পাবেন বলে বিশ্বাস করেন। ওদিকে বৌদ্ধধর্মের মধ্যে ধর্মের চেয়ে জাতিভিত্তিক বা গোত্র বা এলাকাভিত্তিক দলবদ্ধটাই বেশি চোখে পড়ে। তার অর্থ দাড়ায় তাদেরকে ধর্মের পরিপ্রেক্ষিতে ফান্ডামেন্টালিস্ট হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা সঠিক কাজ হবে না। এইটুকু আলোচনা থেকে কিন্তু আমরা এই ধারনা পাই যে, শুধুমাত্র ধর্মের পবিত্র গ্রন্থের স্বকীয়তাকে বজায় রাখার জন্যই শুধু ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি পৃথক রক্ষণশীল গোত্র তৈরি হয়েছিলো যারা ফান্ডামেন্টালিস্ট নামে পরিচিত এবং অন্য কোনো ধর্মে এই প্রবনতাটা ছিলো না।  

এবার যদি ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম সম্পর্কে বলি, তাহলে Fundamentalist Islam is simply the conservative wing of Islam, just as fundamentalist Christianity is the conservative wing of Christianity. এই দুইটি দলই কিছুটা ধার্মিক প্রকৃতির গোঁড়া। ক্রিশ্চিয়ানদের বেলায় যেমন উপরে উল্লেখিত পাঁচটি মূলস্তম্ভ অনুসরন করে, ইসলামের বেলায়ও এই রক্ষণশীল মুসলমানেরা এক আল্লাহকে বিশ্বাস করেন, হজরত মুহাম্মাদ (সঃ) কে নবী মানেন, তাঁকে অনুসরন করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য প্রতিনিয়ত মসজিদে যাতায়ত করেন, রোজা, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি মূলস্তম্ভ হিসাবে অপরিহার্য হিসাবে পালন করেন। কোরআন এবং নবী যা যা করতে বলছেন, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলার রীতিই হচ্ছে মুসলমানদের জন্য সঠিক ধর্মপালন। এই মুসলমান সম্প্রদায়টি তাদের পবিত্রগ্রন্থ আল কোরআন বিকৃতি হওয়ার বা একে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, কিংবা যোজন- বিয়োজন, পরিবর্ধন করার কোনো প্রকার চেষ্টা যেমন কখনো কেউ করার চেষ্টা করেন নাই বা করার প্রয়োজনও মনে করেন না। ব্যসিক মূলমন্ত্র গুলি পালনই হচ্ছে মুসলমানদের জন্য সত্য ধর্মপালনকারী। কেউ স্ট্রিক্টলি পালন করেন আবার কেউ ঢিলেঢালাভাবে। কিন্তু মূলমন্ত্র এক। তাহলে কেউ শুদ্ধভাবে এবং স্ট্রিক্টলি প্রতিনিয়ত মূলস্তম্ভ সমুহের পালনকারী ধার্মিক হলেই কি তাদেরকে ফান্ডামেন্টালিস্ট নামে অভিহিত করা হবে? ব্যাপারটা আসলে কখনোই এই রকম নয়। সঠিকভাবে ইসলামের সব আদব কায়দা পালনকারী মুসলমান কখনো ফান্ডামেন্টালিস্ট নন এবং তিনি গোঁড়াও নন। তাঁরা অন্য কারো ধর্ম নিয়েও বাধা নিষেধ দেন না। কারন খোদ ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতিনিধিকে যথারীতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনা দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রকৃত মুসলমান পূর্ববর্তী সব প্রধান ধর্মগ্রন্থসমুহকে না মানলে বরং তিনি সহিহ মুসলমান হিসাবে গন্য হবেন না এটাই ইসলাম শিক্ষা দেয়। তারমানে তাওরাদ, জবুর, ইঞ্জিল, এবং কোরআন সব আল্লাহর পবিত্রগ্রন্থ যা পূর্ববর্তী নবীসমুহের উপর অবতীর্ণ হয়েছে এটা সয়ং কোরআন নিজে সাক্ষী দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ওইসব পবিত্র গ্রন্থ গুলি এখন আর অরিজিনাল ভাবে নাই। অনেকাংশেই পরিবর্ধন, পরিবর্তন হয়ে গেছে।  

এখানে একটি সুক্ষ বিষয় মাথায় রাখা দরকার। বিশেষ করে মুসলমানদের বেলায়। প্রতিটি মুসলমান তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন এবং তৎসংলগ্ন পাঁচটি মূলমন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই মুলস্তম্ভের মধ্যে কোনো প্রকারের দ্বিধা নাই। তাহলে মুসলমানদের মধ্যেই এতো গোত্রের আবির্ভাব হল কেনো? আর এই গোত্রগুলিই বা কারা? যেহেতু পবিত্র কোরআন একটি বৈজ্ঞানিক এবং আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জন্য পুরনাংগো জীবন ব্যবস্থা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। (তাহলে প্রশ্ন আস তে পারে যে, পূর্ববর্তী আল্লাহ প্রদত্ত গ্রন্থ গুলি কি কোর আনের মতো মানুষের জন্য পুরনাংগ জীবন ব্যবস্থা ছিলো না? হয়ত ছিলো কিন্তু তা আর আমাদের কাছে অরিজিনাল হিসাবে না থাকায় তার সত্যতা নিরুপন সম্ভব নয়)। ফলে ব্যক্তি জীবনে, সমাজ ব্যবস্থায় তথা রাষ্ট্রীয় বিধি ব্যবস্থায় সর্বত্র এই রিলিজিয়াস আইনসমুহকেই (যাকে আমরা শারিয়াহ আইন বলি) মেনে চলার বিধান বলা হয়েছে, সেকুল্যার আইনকে নয়। আর এই শারিয়াহ আইন সমুহগুলি হচ্ছে ওই সময়ের যা আমাদের নবীজির আমলে বা তাঁর আমলে পালিত হওয়া বিধিমালা অর্থাৎ সালাফি নামে আমরা যা বুঝি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুর পর এই সালাফি আইনসমুহই কিছু কিছু রি-ফরম হয়েছে যার কারনে বিভিন্ন গোত্রের বা দলের সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাদের সবারই কিন্তু মূলমন্ত্র বা স্তম্ভসমুহ এক। অর্থাৎ এখানে সঠিক কিছু সালাফি আইনের ব্যাখ্যার কারনে বা পার্থক্যের কারনে ব্যক্তি, সমাজ ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় আইন কানুনের বিধি নিষেধের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদের সৃষ্টি হয়। যেমন, শিয়া, সুন্নি, কাদিয়ানী, ইত্যাদি। কিন্তু তাদের মূলস্তম্ভ ঠিক থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই পরিবর্তনগুলি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী শুধুমাত্র ইসলামপন্থীদের মধ্যেই সিমাবদ্ধ না, এই ট্রেন্ডস সব ধর্মের মধ্যেই ধীরে ধীরে অন্তরভুক্তি হতে শুরু করে এবং এখানে আরো মজার ব্যাপার হলো, এটা আবার আর শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নাই। প্রতিনিয়তই বিবর্তনের মতো সর্বত্র একটা পরিবর্তন আসতে থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্মের স্বকীয়তা রক্ষার নামেই নয়, ধর্মের বাইরে গিয়েও এই পরিবর্তনটা কেনো আসে, সেটা নিয়েও গবেষণা হয়।  

অবশেষে, The American Academy of Arts and Sciences সাড়া পৃথিবী থেকে অধিকস্তর বিশিষ্ট স্কলারদের সমন্নয়ে একটা গবেষণামুলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সেই গবেষণামুলক পরিক্ষায় তাঁরা তথাকথিত ফান্ডামেন্টালিজম এবং ফান্ডামেন্টালিজমের বাইরে পরিবর্তনের পক্ষে-বিপক্ষে যেসব তথ্য পেয়েছেন তাঁর সারমর্মে দেখা যায় যে, উক্ত ফান্ডামেন্টালিজম চিন্তাধারাটি শুধুমাত্র আর ধর্মের গোঁড়ামির উপর স্থায়ী হয়ে রয় নাই। তাদের মতে,  

(১) তাঁরা আধুনিক কালচারকে পছন্দ করেন না। কারন তারা মনে করেন ধর্ম দ্বারা যা পালিত হওয়ার কথা, অথবা যে রীতিনীতিগুলি ধর্মগ্রন্থ থেকে চালিত হওয়ার কথা তা না হয়ে স্যাকুলার কিছু মনগড়া বৈষম্যমুলক আইনের মাধ্যমে চালিত হচ্ছে বিধায় ধর্মের সঠিক কাজটি পালিত হচ্ছে না এবং এইভাবে একদিন ধর্মটাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই আশংকা করেন। তার উপর আধুনিক কালচারের সমাজ ব্যবস্থায় তাঁরা মনে করেন যে, একটা বৈষম্যমুলক সমাজ ব্যবস্থার প্রচলন হচ্ছে যেখানে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত, কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্নবিত্ত সমাজের মানুষেরা তাদের ন্যায্য মুল্যায়ন, অধিকার, সুযোগ, সুবিধা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।  

(২) এই মধ্যবিত্ত, কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের মানুষদের ন্যায্য মুল্যায়ন, অধিকার, সুযোগ, সুবিধা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হওয়ার চিন্তাধারায় রিলিজিয়াস আইডোলোজির পাশাপাশি তখন ব্যক্তিগত এবং কম্যুউনাল আইডেন্টিটিও কাজ করে। এই ব্যক্তিগত এবং কম্যুউনাল সত্ত্বা কাজ করার কারনে পলিটিক্যাল উচ্চাকাখাংকাও জড়িয়ে যায়। আর যখন এই পলিটিক্যাল উচ্চাকাখাংকা বেড়ে যায়, তখন দলভিত্তিক রাজনীতিকিকরনের কাজটি আরম্ভ হয়ে যায়, তখন শুরু হয় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের অনুপ্রবেশ যেখানে কমন কিছুর মিল থাকতে হয়, যেমন প্রথমে ধর্ম, পরে একই ধর্ম পালনকারী জাতী বা দেশ ইত্যাদি। এইগুলি তখন হয়ে উঠে একটা পারস্পরিক যোগাসুত্রের মাধ্যম কিন্তু উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতা বা প্রভাব খাটানোর একটা অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া। আর যখন ক্ষমতা বা প্রভাব খাটানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, তখন বিশ্বরাজনীতিতে একটা সক্রিয় ভুমিকা তৈরি হয় যেখানে প্রধান নিয়ামকের দায়িত্ব পালনে অনেক প্রভাবশালী দেশ, দল যুক্ত হয়ে যায়। তখন আর এটা রিলিজিয়াস ফান্ডামেন্টালিস্ট বা ফান্ডামেন্টালিজমের মধ্যে থাকে না। তখন এটা হয়ে যায় আন্তর্জাতিক একটা বহুমাত্রিক পরিকল্পনা। তখন ক্ষেত্রটা ভিন্ন। কিন্তু তাঁর এজেন্ডায় তখনো রিলিজিয়াস লেভাসটা থেকেই যায়। আর এই লেভাসের পিছনে যা থাকে তা হচ্ছে They are ‘reactive’, ‘they are dualist’, ‘they believe in Holy Book’, ‘they are selective’, and ‘they are millennialist’  

বর্তমানে এই ফান্ডামেন্টালিস্ট শব্দটি বহুলঅংশে ব্যবহৃত হয় ধর্মের নামে আধিপত্য বিস্তারের নিমিত্তে গোঁড়া কিছু স্প্লিনটার গ্রুপকে বুঝানোর জন্যই। কখনো এটা ইসলামিক টেরোরিস্ট, কখনো রিলিজিয়াস টেরোরিস্ট, কখনো রিভাইভালিস্ট (যখন বৌদ্ধ, মুসলিম, কিংবা হিন্দু সম্প্রদায়ের বেলায়) ইত্যাদি। কিন্তু পিছনের উদ্দেশ্য একেবারেই আলাদা, আর সেটা নিতান্তই প্রভাব বিস্তার।  

প্রাথমিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীসমুহ যারা উক্ত লেভাসের নাম দিয়ে কিছু ফায়দা লুটে নিতে চেয়েছিলেন, হয়ত তা পেয়েছেনও কিন্তু ইতিমধ্যে এই লেভাসে মোড়া শক্তিশালী টুলসটি অর্থাৎ গোষ্ঠীটি ইতিমধ্যে প্রাপ্ত শিক্ষা আর প্রশিক্ষনের দ্বারা তারাই এখন নিজের নিয়ন্তা হিসাবে এমনভাবে আবির্ভূত হয়েছেন যে, অন্যের জন্য নয় শুধু নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্তা হিসাবে কাজ করছে। এখানে ধর্মটাই এখন আর মুখ্যবিষয় নয়, মুখ্যবিষয় হয়ে দাড়িয়েছে প্রভাব খাটানো এবং আধিপত্য বিস্তারের। এদেরকে আর নিয়ন্ত্রন করবার জন্য অন্য কোনো অপসন পূর্ববর্তী চালকদের হাতে নাই। তাঁরা এখন টেরর। যে নামেই আমরা একে এখন ডাকি না কেনো। ফলে এখন যেটা দাড়িয়েছে তা হচ্ছে, ওয়্যার এগেইনস্ট টেরর।

একটাই পথ এখন ......

উত্তরসূরি নির্বাচন

জীবনের সব অধ্যায় এক রকম নয়। এটা আমার হয়ত বুঝতে দেরী হয়েছে কিন্তু এই সব তত্ত্বকথা মনিষীরা যুগে যুগে বলে গেছেন। মনিষীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক তত্ত্বকথাই বলে গেছেন বটে কিন্তু কেউ সে সব তত্ত্বকথা মানে না। হ্যা, মানে তখন যখন কারো জন্য সেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের জন্য প্রযোজ্য হয়। সেই সুবাদেই বলছি যে, আমি আপনি ততোক্ষন সবার কাছে যত্নশীল যতোক্ষন আপনি নিঃস্বার্থভাবে দিতে পারবেন কিন্তু পাওয়ার আশা না করবেন। আশা করলে আপনি হেরে যাবেন। এটা নিজের স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই সত্য।

এর থেকে যে শিক্ষাগুলি নেওয়া দরকার তা হচ্ছে, যা কিছু করবেন জীবনে, নিজের জন্য করুন, নিজে সুখী সময় কাটানোর জন্য আয় করুন এবং তা দুইহাত ভরে খরচ করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানগন কিভাবে চলবে কিংবা তারা কোথায় কিভাবে বাস করবে তা আপনার চিন্তা থাকতে পারে বটে কিন্তু তারজন্য অনেক কিছু আয় করে সঞ্চয় করে তাকে পঙ্গু করে রেখে যাওয়ার কোনো দরকার আমি মনে করি না। বরং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিন, তাতেই সে এই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে ঠাই করে নেবে। এই পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষের জন্য সুখের আবাস্থল। অলসদের জন্য এখানে সব কিছুই নাগালের বাইরে। পূর্ববর্তি জেনারেশনের আহরিত সম্পত্তি উত্তরসূরিদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক হলেও একটা সময় আসে, কোনো না কোনো উত্তরসুরীর মাধ্যমেই তা বিনাশ হয়। এই বিনাশটা হয়ত এক জেনারেশনের মধ্যে ঘটে না। কারো কারো বেলায় এক জেনারেশনেই শেষ হয়ে যায় আবার কারো কারো বেলায় এটা ক্ষয় হতে কয়েক জেনারেশন পার হয়। কিন্তু ক্ষয় হবেই। এর প্রধান কারন, যিনি সম্পদ করলেন, তার যে দরদ, আর যারা বিনা পরিশ্রমে পেলো তাদের যে দরদ তা কখনোই এক নয়।

আরেকটা কারনে নস্ট হয়। তারা হলেন যাদের বংশ ধরের মধ্যে ছেলে রি-প্রেজেন্টেটিভ নাই। ওইসব লোকের বেলায় তাদের কস্ট করা সম্পত্তি নিজের ছেলে সন্তানের পরিবর্তে চলে যায় অন্য বাড়ির আরেক ছেলের হাতে যিনি সম্পদের মালিকের নিছক মেয়ের স্বামী হবার কারনে। এরা দ্রুত সম্পদ হাত ছাড়া করে কারন তারা একদিকে এটাকে ফাও মনে করে, অন্যদিকে যতো দ্রুত সম্ভব সব সম্পত্তিকে নিজের নামে রুপান্তরিত করতে চান। এই মন্তব্য টা ঢালাও ভাবে করলে অনেক মেয়ের স্বামীরা হয়ত মনে আঘাত পেতে পারেন, কারন সবাই হয়ত এক নয়। তবে অভিজ্ঞতা আর পরীক্ষায় দেখা গেছে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই রকমটা হয়েছে। তারা স্ত্রী কপালে ধন পাওয়া মনে করেন। তাদের বেলায় বিনাশ হতে সময় লাগে অতি অল্প সময়। এই সব ছেলেদের কাছে কোনো সম্পদ এমন কি স্ত্রীও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। 

ফলে যেহেতু আপনি পরিশ্রম করছেন, সুখটা আপনিই করুন। যদি ভাবেন যে, আগে সঞ্চয় করে স্তূপ করি, বাড়ী গাড়ি করি, ব্যাংকে একটা মোটা টাকা সঞ্চয় হোক তাহলে আপনার হাতে একটু সময়ও নেই সকালের সূর্য দেখার অথবা রাতের জ্যোৎস্না দেখার। আপনার ভাগ্যে আছে শুধু বাদরের মতো এইস্থান থেকে অন্যস্থানে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় ফল পাওয়া যায় তার সন্ধান করা, অথবা পালের বলদের মতো সারাজীবন হাল চাষের মতো চাষির হাল বেয়ে যাওয়া যাতে চাষিই শুধু লাভবান হয়, আর নিজে শুধু জাবর কাটবেন।

এ কথাগুলি কেনো বলছি?

আমার চোখে দেখা এই ছোট্ট জীবনে অনেক ঘটনা। কস্ট করে সম্পত্তি বা এসেট রেখে গেছেন, কিংবা ব্যবসা রেখে গেছেন, জাস্ট তার মরনের পর ওই সব সম্পত্তি কত তাড়াতাড়ি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়া যায়, তার জন্য তর সয় না। অথচ ওই সব উত্তরসুরীরা একটিবারও আপনার রুহের মাগফিরাত বা ধর্মীয় কোনো উৎসবের মাধ্যমে একটুও পয়সা খরচ করবে না। তারা ঐ খরচ টাকেও অপচয় মনে করে নিজের জন্ময অ্রআনন্দ করবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারাও সেই একই ফাদে পা দিয়ে তাদের উত্তরসুরীদের জন্যই সঞ্চয় করে জমা করে যান এবং নিজেরা ভোগ করেন না।   

অপ্রিয় সত্যের মুখুমুখি দাঁড়ানো সাহসের প্রয়োজন

কখনো যদি তোমরা দেখো যে, তোমার অপ্রিয় সত্য কথায় কেউ কোনো উত্তর করছে না, কিন্তু তোমার অগোচরে মুখ ভেটকাচ্ছে, তাহলে বুঝবে যে, তোমার আশপাশ চাটুকারে ভরে গেছে। তুমি বিপদের মধ্যে আছো।  এ অবস্থায় তোমার যা করনীয়, তা হচ্ছে, তুমি একা চলার অভ্যাস করো। এই একা চলার মধ্যে যদি কাউকে রাখতে চাও সাথে, তাহলে এমন কিছু মানুষকে রাখো যারা প্রাইমারী স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক। তারা নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না আর হবেও না। তবে তাও নির্বাচন করার জন্য সময় নিও।

আর কোনো কিছুই যদি মনে হয় ঠিক নাই, তাহলে, নিজেই নিজের জন্য এমন কিছু করে যাও, যাতে তোমার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো ধাতব্য প্রতিষ্ঠান তোমার কাজগুলি তোমার ই আহরিত সম্পদের লভ্যাংশে করতে পারে। পরিচিত মানুষ গুলিই তোমার বিপদের কারন। সব সময় মনে রাখতে চেষ্টা করো যে, বেঈমান অপ্রিচিত লোক থেকে তৈরী হয় না, তারা সব পরিচিত মানুষের দল। 

আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না, আমরা মানুষের ভিতরের চরিত্রকে সরাসরি আয়নার মতো করে দেখতে পাই না। এমন কি আমরা নিজেরাও নিজেদের অনেক সময় চিনতে পারি না। আর এই কারনেই প্রতিবার আমরা প্রেডিকসন অর্থাৎ একটা স্যামপ্লিং এর উপর ভিত্তি করে বারবার সিদ্ধান্ত নেই। শতভাগ সাফল্য আসবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। আজকে যে বস্তুটি আপনার হাতে আসায় আপনি মনে করছেন, এটাই ঠিক যেটা আপনি চেয়েছেন, বা এটাই আপনি খুজছেন, সেটা সঠিক নাও হতে পারে।  আর যদি সঠিক না হয় তখন সংস্কার বা এজাস্টমেন্ট দরকার হয়ে পড়ে।  কখনো কখনো এই এডজাস্টমেন্ট এতো বড় যে, পুরু পরিকল্পনাটাই বদলাতে হয়। আর যারা এই পরিকল্পনাটা পাল্টানোর হিম্মত রাখেন, বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত রাখেন, তাদের জন্যই সুন্দর ভবিস্যত। সমাজ তারাই তৈরী করে, সমাজ তাদেরকেই কন্ডারী বলে। এডাপ্টেসন এর মুল থিউরী আসলে তাই। ডাইনোসোর এডাপ্টেসন করতে পারে নাই বলেই সে আজ পৃথিবীতে ইতিহাস কিন্তু তেলাপোকা সর্বত্র সব কিছুতেই এডজাস্ট করতে পারে বলেই এরা বেচে থাকে ৪৬ কোটি বছর। সম্ভবত এই তেলাপোকাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আয়ুধারী কোনো প্রানী। এরা ওদের বাল-বাচ্চা নিয়ে ওদের মতো করে বেচে থাকে। ভালোই থাকে।

আজকে আমি বা আপনাকে কেউ ভুল বুঝতেছি বলে যে অভিযোগ করে, এটা হয়ত ঠিক এই রকম নয়। হতে পারে এই রকম যে, এখন আমি বা আপনি ভুল বুঝতেছি না, সময়ের ব্যবধানে, স্যামপ্লিং ভুলের কারনে আগেরবার ভুল হয়েছিলো, কিন্তু অন্যান্য স্যামপ্লিং, চারিপাশের অবস্থা, বেশী ফ্যাক্টর সমন্নয়ে আমি বা আপনি বর্তমানটাই ঠিক বুঝতেছেন। ফলে যারা অভিযোগ করছে, তারা ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন না। আবার এমনো হতে পারে যিনি আমাকে বা আপনাকে "ভুল বুঝতেছি" বলে অভিযোগ করছেন, তার এক্সপেকটেশন অনুযায়ী সেও আমাকে বা আপনাকে আগেরবার ঠিক বুঝেছেন কিন্তু এখন তার এক্সপেক্টেসনের সাথে ক্যাল্কুলেসনে তারতম্যের কারনে আমরা বা আপ্নারা বদলে গেছি বা বদলে গেছেন এই চিন্তায় আমরা ভুল বুঝতেছি বলেই তাদের ডিডাক্সন তৈরী হচ্ছে।

কিন্তু যেটাই হোক, কে ভুল আর কে ঠিক, এই তর্ক, এই যুক্তি, এই ব্যাখ্যা করার সময় মানুষের হাতে খুব বেশি থাকে না। একটা সাব জেক্ট নিয়ে এতো গবেষণা করতে থাকলে, বাকী সাবজেক্ট এর জন্য তো সময় ই দেওয়া যাবে না। জীবনে সময় বড় সীমিত। হয় এডজাস্টমেন্ট করে বেচে যাবেন, নয় খপ্পর থেকে বেড়িয়ে যাবেন। দ্বিধার কোনো কারন থাকলে সবার প্রতিভা যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ক্ষতি হবে বিকাশের।

ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তে ভুল হলে যখনই মনে হবে এখনই সময় সিদ্ধান্ত পাল্টে জীবন সুন্দর করার, তাহলে "এখনি" সেটা। শুধু একটা জিনিষ মনে রাখা দরকার, ঈশ্বর সব ভুলের মধ্যে বড় সাফল্যের ফলাফল নির্ধারণ করেন। তিনি কারো সাথে মস্করা করেন না। তাঁর উপর ভরসা রাখুন। জয় আপনার। এটা দু পক্ষের জন্যই উপদেশ কারন, যার যার গন্ডি থেকে তাঁর তাঁর জন্য ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করেন। কেউ কারো সীমানা অতিক্রম করলেই এই বিপত্তি হবে। নদীর জলের মধ্যেও ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিঠা পানি এবং নোনা পানিও তাদের সীমা অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মিশার অনুমতি ঈশ্বর দেন নাই।

কি কারনে এই ডায়েরী?

আমার কোন ইচ্ছাই ছিল না এই চিঠিটি তোমাদেরকে লিখিবার জন্য। কোন দরকার ছিল কিনা  সেই ভাবনাটা ভাবিবার সময় অবশ্য এখন নয়। উহা তোমরা ভাবিয়া দেখিবে। সময়ের বিবর্তনে হয়তোবা ইহা তাহার জায়গা দখল করিয়া লইবে তাহার কতটা দরকার ছিল, আর কতটা দরকার ছিল না। তবুও আমার মনে হইল, মাঝে মাঝে বেশ কিছু অবসর সময় পাই, কিছুতো একটা করি। তাই উপন্যাস না লিখিয়া, গ্লোবাল ইস্যু সম্পর্কে না লিখিয়া কিংবা ধর্মীয় কোন বই না লিখিয়া নিজের পরিবারের সাথে যদি সময়টা কাটাই!! তাই, আমি সময় টুকুন ব্যয় করিতে চাহিলাম এমন কিছু বিষয়ের উপর যাহা আমাকে প্রতিনিয়ত মনে করাইয়া দিয়াছে, আহা যদি এমন কিছু কেহ আমার জন্য লিখিয়া যাইত, অথবা এমন কিছু যাহা আমি প্রায়শই জানিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু কোথাও উহার কোন অস্তিত্ত পাই নাই। তাহলে উহ কি এমন জিনিস যাহা আমার মধ্যে প্রায়শই মনে আসিত, খুজিতাম কিন্তু কোথাও তাহা আমি পাইয়াছি বলিয়া মনে হইতেছে না। আমি মাঝে মাঝেই ভাবিতাম, আমার পূর্বে যাহারা আমার বংশে আসিয়াছিলেন,তাদের অনেকেই হয় বা ছিলেন জমিদার, কেউ বা ছিলেন অনেক উচ্চ স্তরের ব্যক্তিকর্তা, হয়তা আবার কেউ এমনও থাকিতে পারেন যাহাদের জীবন লইয়া এখন অনেক বড় বড় লোমহর্ষক কাব্য লিখা যাইত অথবা এমন কেউ থাকিতে পারেন যাহাদের অতিষ্ঠে মানুস প্রতিনিয়ত কায়মনে তাহাদের মৃত্যু কামনাই করিতেন, আবার এমনও হইতে পারে যে, কাহারো কাহারো জীবননাশের কারনে কোন এক সমাজ ব্যবস্থা হয় ভাঙ্গিয়াই পড়িয়াছিল, কে যানে এই সব কথা বা কাহিনি?

মাঝে মাঝে আমার খুব জানিতে ইচ্ছে করিত, এইসব তাহার কেউ কি আমাদের কথা কখনও এমন করে ভাবিয়াছিলেন যে, কোন একদিন হয়তবা কেউ তাহাদের স্মরণ করিয়া তাহাদের ব্যাপারে আরও অধিক জানিবার জন্য আকুপাকু করিবেন? হয়ত কেহ কেহ করিয়াছিলেন, কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারনে তাহারা তাহাদের কোন কথাই আমাদের জন্য রাখিয়া যাইতে পারেন নাই, হয়তোবা আবার করেও নাই। বহুদিন আগে আমি একখানা ছায়াছবি দেখিয়াছিলাম, কালো মানুষের কাহিনী। সম্ভবত ছবিটির নাম ছিল “রুটস”। আলেক্স হেলির বানানো। তিনি অনেক বছর গবেষণা করিয়া করিয়া যতদুর সম্ভব তাহার পূর্বপুরুসের ইতিহাস লইয়া তাহার অই অনবদ্য কঠিন জিবনের কাহিনী পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। কিন্তু আমার আলেক্স হেলির মত অত ধৈর্য নাই যে আমি বছরের পর বছর আমার পূর্ব পুরুসের নাম গবেষণা করিয়া করিয়া এক একটা অধ্যায় লিখিব। সে সাধ্যও আমার নাই। কিন্তু আমি একটা কাজ করিতে পারি অনায়াসে। আর তাহা হইল, আজ হইতে হাজার বছর পরে যদি কেউ আমার কথা জানিতে চায়, আমার সম্পর্কে ভাবিতে চায়, কিংবা আজ এই বিংশ শতাব্দিতে বসে আমি কি ভাবিতেছি, কি ভাবিতেছি না, কিংবা আমি আজ থেকে আরও শত বছর পর, অন্তত এই ভাবনাগুলি তো আমি আমার ঐসব পরবর্তী বংশধরদের জন্য লিখিয়া যাইতেই পারি। তাহাতেই বা কম কিসের? তাই ভাবছি, আমি সারাদিন কি করি, কি ভাবি, কেমন করিয়া ভাবি, আমার কি ইচ্ছা আমার বংসধরদের লইয়া, যদি আমি এক টুকরো কাগজের মধ্যে লিখিয়া রাখি, হয়ত বা কোন একদিন আমারই কোন উদাসীন এক বংশধর এই লেখাটা পড়িয়া জানিতে পারিবে , তাঁহারও আগে কেউ একদিন কি করেছিল।

আমি আমার বাবাকে দেখি নাই। আমি যখন মাত্র দুই কি আড়াই বছরের, তখন তিনি জান্নাত বাসি হয়েছেন। ফলে ঊনার কোনো ছবি, কিংবা কোনো স্মৃতি আমার কাছে নাই। শুনতাম, তিনি ছিলেন অত্যান্ত নামীদামী মানুষ। মাদবর মানুস। অনেক সম্পত্তি ছিলো তার। ওই সময় যে কয়জন মানুষ ধনীদের কাতারে ছিলেন, তার মধ্যেয়ামার বাবা একজন। আমি যখন মাত্র ক্লাস ফাইভে বা সিক্সে পড়ি, তখন আমাদের বাড়িতে কোনো এক বাক্সে আমার বাবার হাতের লিখা কিছু পত্র দেখিয়াছিলাম। খুব সুন্দর হাতের লেখাছিলো। আমি তখন ছোত ছিলাম, বুঝি নাই এই সব স্ম্রিতিগুলি রক্ষনাবেক্ষন করা উচিত কিনা।আমি বা আমরা কেহই ওইসব হাতের লিখা চিঠিপত্র গুলিও সংরক্ষন করি নাই। আজ আমার কাছে মনে হচ্ছে ওই গুলি অনেক দামি বস্তু ছিলো।

আমাদের গ্রামের বাড়ি দুই জায়গায়। একটা মুন্সিগঞ্জের কয়রা খোলায়, আরেকটা হচ্ছে কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। ওই মুন্সিগঞ্জের বাড়িতে থাকেতো আমাদের আগের মায়ের সন্তানেরা আর আমরা থাকতাম কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। আমার বাবা কোনো এক সময় তার জীবদ্দশায় ভেবেছিলেন যে, আমরা কোনোভাবেই তার আগের সন্তানদের কাছে নিরাপদ নই এবং আমাদের জীবননাশ হবার সম্ভাবনা আছে। ফলে আমার বাবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসাবে তিনি আমাদেরকে মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানীগঞ্জ আমার আপন খালুদের এলাকায় রিহেবিলেট করার পরিকল্পনা করেন। আমার বাবার পরিকল্পনা একদম ঠিক ছিল বিধায় তিনি মারা যাবার আগে আমাদেরকে এই কেরানিগঞ্জের এলাকায় স্থানান্তর করে গিয়েছিলেন। আচ্ছা, আমার বাবার আর কি কি প্ল্যান ছিলো যা তিনি শেষ করে যেতে পারেন নাই? অথবা তার কি কি শখ ছিল যা আমাদের পরবরতী জেনারেশনের উচিত তার বাস্তবায়ন করা? কিছুই জানি না। আর এখানেই আমার দুঃখ। এখানে একটা গল্প (বাস্তব) না লিখলেই নয়। এটা আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা। আমার বাবা কিভাবে বুঝবেন যে, আসলেই তিনি যা ভাবছেন সেটা সঠিক কিনা। তার এই সিদ্ধন্ত কতটাঠিক তা যাচাইয়ের জন্য একদিন ঠিক করলেন, তিনি কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যাবেন। তার এই প্ল্যানটা  শুধুমাত্র জানালেন আমার বড় ভাইকে। আমার বড় ভাই তখন জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে কলেজে পড়ছেন। বাবা সবার অজান্তে হতাত করে নিখোজ হয়ে গেলেন, তিনি আর বাড়ি ফিরলেন না। একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিন দিন যায়। এক মাস, দুই মাস, এইভাবে প্রায় ছইয় মাস। সবাই ধরে নিলেন, বাবা হয়তো কোথাও দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিলো না যে কন্ট্যাক্ট করা যাবে। বাবাকিন্তু প্রতিদিন আমার বড় ভাইয়ের সাথে সদরঘাটের নব কুমার শরীর চর্চা কেন্দ্রের ঘাটে ভাইয়ের সাথে দেখা করতেন আর প্রতিদিনের ফিডব্যাক নিতেন কি হচ্ছে গ্রামে তার অনুপস্থিতিতে। ধীরে ধীরে বাবার আইডিয়াটাই যেনো সঠিক প্রমান হচ্ছিলো। আমাদের স্টেপ ব্রাদাররা, বোনেরা, স্বৈরাচারের মতো আমাদের উপর ব্যবহার করা শুরু করছিলো, জমিজমার সব ফসল একে একে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো, আমাদেরকে প্রাননাশের হুমকী দিচ্ছিলো। এমন কি আমাদের এই পক্ষের স্ব সদস্যদেরকে অত্যাচার আর নীপিড়নে মেরেই ফেলার চেষ্টা করছিলো। সবাই ধরেই নিয়েছিলো যে, হোসেন মাদবর মারা গেছে এবং তার থেকে আর ভয়ের কোনো কারন নাই। অত্যাচার যখন তুঙ্গে, তখন একদিন হতাত করে বাবা সশরীরে এসে হাজির। সবাই অবাক, কোথায় ছিলো এই হোসেন মাদবর? তিনি সত্যিটা লুকিয়ে শুধু বললেন, চট্টগ্রামে তার চোখের অপারেসন হয়েছিলো বলে কাউকে কোনো খবর দিতে পারেন নাই। আর শরীর ভালো না অবধি ডাক্তাররা তাকে ছাড়েনও নাই। তিনি বুঝে গেলেন, তার কি করা উচিত এবং তার সিদ্ধান্ত যে সঠিক সেটা তিনি পরীক্ষা করেই নিলেন। 

অতঃপর বাবা আমার খালুর সাথে অতি গোপনে পরামর্শ করলেন, কিভাবে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে এবং দ্রুত সেই মুন্সিগঞ্জ থেকে খালুর এলাকায় আমাদেরকে মাইগ্রেট করবেন। আমার খালু ছিলেন তার এলাকায় একজন অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী মানুষ। মাঘে মহিসে একসাথে জল খাওয়ার মতো। বাবা তার দিক থেকে প্রায় ৪০০ লোকের আয়োজন করলেন, আর খালু তার এলাকায় এই রকমের ই প্রায় ৪০০/৫০০ লোকের আয়োজন করলেন। মাঝে নদী থাকায় আরো কয়েক শত কলা গাছের ভেলা বানিয়ে নদীর উপর দিয়ে মুটামুটি একটা রাস্তা করে ফেললেন। মুন্সিগঞ্জের আমাদের বাড়িটা না ভেঙ্গে বাবা আস্ত বাড়িটাকে ঐ লোকজন দিয়ে মাথায় করে এইপাড়ে নদী পাড় করে দিলেন। আর খালু এই পারে তার লোক দিয়ে সেই আস্ত বাড়িটা এক রাতের মধ্যে বসিয়ে দিলেন। বাবা কাজটি এমন এক দিনে করলেন যেদিন আমাদের ঐ পক্ষের সদস্যরা কোনো এক অনুষ্ঠানের জন্য গ্রামের বাইরে কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলেন। ব্যাপারটা আলাদিনের চেরাগের গল্পের মতো ঘটে গেলো। আমরা মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানিগঞ্জে চলে এলাম চিরতরে। সব কিছু রয়ে গেলো ঐ মুন্সিগঞ্জে। নিজেদের স্মৃতি, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, ক্ষেত খামার সবকিছু।  

আমি এখানে শুধু আমার বাবার প্রসঙ্গ টাই তুলেছি কারন আমার কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় নাই আমার বাবার আগের জেনারেশনের কি অবস্থা ছিলো বা কে কি করতেন। আমার জানার কোনো ত্রুটি ছিলো না কিন্তু কেহই তাদের ব্যাপারে আমাকে কোনো তথ্য বিস্তারিত ভাবে দিতে পারেন নাই। যাই হোক, এবার তোমাদের পালা। তোমরা অন্তত একটা বেস হিসাবে আমার লেখাএই ডায়েরী বা এই ওয়েব সাইট পেয়েছো যেখানে আমাদের ফ্যামিলির কিছু তথ্য রেডিমেট পেয়েছো। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার মতো ইচ্ছুক হও, তাহলে আমার এই তথ্যাবলী সামনে রেখে আমাদের ফ্যামিলী ওয়েব সাইটটি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারো।

আর এটাই হবে আমার কাম্য। 

শেষ বিদায়

আজকে সেই দিন যেদিন সবাই আমার কারনেই সবাই একত্রে মিলিত হয়েছে। মিলিত হয়েছে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে। কিন্তু এখন আমি সম্পূর্ণ স্থবির আর শান্ত। বাড়িঘর সব ভড়ে গেছে একের পর এক চেনা জানা এবং অচেনা অনেক লোকের ভীড়ে। উজ্জ্বল দিবালয়ে, অথবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে অশান্ত হৃদয়ে কেহ কেহ লাল নীল জামা পড়ে মাথায় টুপি পড়ে, কেহ আবার হাতে তসবিহ নিয়ে মুখে দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে হাহুতাশ করছে, কেউ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জ্ঞান হারাচ্ছে, কেউ আবার মনে মনে যার যার মিশ্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। কেহ কেহ আমাকে কোথায় দাফন করবে, কে বা কারা সে দাফনের নিমিত্তে কোথায় আমার কবরখানা রচিত হবে এই ব্যস্ততায় এদিক সেদিক ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ আমাকে পেয়ে হারালো, আবার কেউ আমাকে না পেয়েই হারালো। কেউ কেউ আবার অধিকার নিয়ে মনে মনে ছক কষে অশান্ত রুপ ধরিয়া বিলাপ করবে, কেউ আবার অধিকার পুনরুদ্ধার হবে এই আশঙ্কায় প্রহর গুনবে। কারো জন্য আমার এই প্রস্থান হবে মর্মান্তিক আবার কারো জন্য হবে অতীব সুখের।

এদিনে সমস্ত সিডিউল মোতাবেক সব ঠিক থাকলেও আমার জন্য আর কেউ অপেক্ষা করবে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ক্যালেন্ডারটি আর আগের মতো সরব হয়ে উঠবে না। ঘরির কাটায় কমবেশি হলেও তাতে কিছুই যাবে আসবে না আজ আমার, আজ আমার কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়াও থাকবে না। সারাবিশ্ব যেইভাবে চলতেছিলো ঠিক আগের মতোই এ জগতের সব কিছুই চলবে। এক মুহূর্তের জন্যও দিনের সময়কাল পরিবর্তিত হবে না, না চাঁদ তার উদিত হবার বা ডুবে যাবার কোনো ব্যতিক্রমী নিদর্শন প্রকাশ করবে। না নদীর জোয়ার ভাটার কোনো দিক বা গতি পরিবর্তন হবে। না সুর্য এক সেকেন্ড পরে বা আগে উত্থিত হবে। পাখিরা সময় মতোই নিজের নীড় হতে খাদ্যানেসে বের হয়ে যাবে, রাখালগন তাদের গরূ বাছুর নিয়ে ভাটিয়ালী গান গাইতে গাইতে কোনো এক মেঠো পথে হারিয়ে যাবে। এমনটিই তো হয়ে এসছে বরাবর প্রতিটি মানুষের জীবন সায়াহ্নে।

যে সম্পদ আমি আমার সারাজীবন ধরে আহরন করেছি, যা প্রতিনিয়ত রক্ষা করবার জন্য চারিপাশে সতর্ক দ্রিস্টি দিয়া পাহাড়া দিয়াছি, তা ওইদিন অন্য কারো হাতে চলে যাবে। সেটা নিয়ে বা কে নিলো, কেনো নিলো এই নিয়ে আমার কোনো কিছুই করবার থাকবে না। আমাকে যারা কখনোই ভালোবাসে নাই, যারা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্টে দেখার পায়তারা করত, তাদের উদ্ধত চাহনী কিংবা দ্রিস্টিভঙ্গি আমাকে আর কোনোভাবেই আজ আহত করবে না। না আমি তাদের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করবো। যে তর্কে জিতবার জন্য আমি খন্ড খন্ড যুক্তি প্রকাশ করে আত্মতৃপ্ত হয়ে হাসিমুখে চারিদিকে বীরের মতো চলমান থাকতাম, সেই তর্ক এখন আর আমার কোনো কিছুই আনন্দ দান করবে না। আমার প্রতিদিনের জরুরি মেইল কিংবা টেক্সট ম্যাসেজের প্রতি আমার আর কোনো তাড়াহুড়া থাকবে না। যাদের বিরুদ্ধে আমার কতইনা রিগ্রেটে ছিলো, জিদ ছিলো, প্রতিশোধের আগুনে যা আমি বহুকাল নিদ্রাবিহিন রাত কাটিয়ে দিয়েছি, সেটার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে না, না আমার মনের মধ্যে এইসবের কোন প্রভাব ফেলবে।

আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে, আমার ওজন বেড়ে যাবে এই ভেবে আমার রোজকার দিনের খাদ্যাভ্যাসে কোন পরিবর্তন কিংবা আমার সাদা চুলে কালো করবার বাসনা এসব কিছুর আর কোনো প্রয়োজন হবে না, না এসব আমাকে আর বিচলিত করবে। আমার ব্যবসা, আমার সম্মান, আমার প্রতিপত্তি যার জন্য আমি প্রতিনিয়ত ভাবিয়া ভাবিয়া, নিদ্রাবিহিন কষ্ট করেছি, কিংবা কিভাবে কি করলে আমার সব কলেবর বৃদ্ধি হবে ইত্যাদির জন্য প্রানপন চেষ্টায় লিপ্ত ছিলাম, সেই ব্যবসা, সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি আজ হতে রহিত হয়ে তা অন্যের হাত ধরেই চলতে থাকবে। ছোট কিংবা বড় যতো বড়ই অনুশোচনা হোক না কেনো, ক্লান্তি কিংবা কষ্ট যাই হোক না কেন, তাহা আজ আর কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। না আমাকে আর রাত জাগাইয়া তা নিয়া ভাববার কোন অবকাশ দিবে। জীবনের রহস্যময়তা, কিংবা মৃত্যুর উদাসিনতা যা আমার মন বহুবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তা আজ এক নিমিষের মধ্যেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। জীবন কি, মৃত্যু কি, জিবনের পরে মৃত্যুর কি গন্তব্য যা নিয়া আমি বহুবার তর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম, যুক্তি খুজেছিলাম, আজ সব কিছুর সঠিক তথ্য আমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। ঈশ্বর কি, ঈশ্বর আদৌ আছেন কিনা, ধর্ম কি, এ জগত কি, কিসের উপর এই বিশ্ব ভ্রমান্ড দাঁড়িয়ে আছে, কি তার রহস্য, কি তার পরিচালক, আমার জীবনের মুল কি উদ্দেশ্য ছিলো যার জন্য এই প্রিথিবীতে আসা, আজ সব কিছু আমার কাছে দিনের আলোর মতো ফকফকা হয়ে যাবে।

আমার অনেক অসমাপ্ত কাজ যা করবার জন্য আমি জল্পনাকল্পনা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, তা আজ সব কিছুর ইতি টানিয়া আমাকে নিয়ে যাবে কোনো এক সুদুর অজানা একস্থানে যা আমি এর আগে একবারের জন্যও বিচরন করি নাই।

আজ এই শান্ত শরীরে আমার চারিপাশের সবাইকে যেনো অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করতেছে কিন্তু আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়েছে, আমার কণ্ঠনালি রুদ্ধ হয়ে গেছে, আমার বাহু, আমার পা, আমার চোখ, আমার যাবতীয় ক্ষমতা আজ রহিত হয়ে একটি ছোট খাটিয়ায় আমি এমন করে পংগু বোবা হয়ে শুয়ে আছি যা অবশ্যই হবে বলে আমি একদা জানতাম কিন্তু ইহা যে আজই তা আমি কখনো মনে মনে কিংবা শারীরিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। অথচ আমার এই দিনের জন্য একবারের মতোও কি প্রস্তুতু নেয়া দরকার ছিল না? বা আমার কি কি করনীয় ছিলো সেই ব্যাপারে আমি কখনোই নিজেকে তৈরী করি নাই কেনো? যে সব সম্পত্তি, যশ, সম্পদ অথবা লোভ যাই বলি না কেনো, সেইসব  কারনে আজকের দিনের কোনো প্রুস্তুতি  আমার নেয়া হয় নাই, অথচ এইসব সম্পত্তি কিংবা সম্পদের বিনিময়েও আজ আমি এই পরিস্থিতি হইতে মুক্ত হতে পারছি না, পারবোও না।

যে ঘরটিতে একচ্ছত্র আমার অধিকার ছিলো, যার প্রতিটি কোনায় কোনায় আমার হাতের স্পর্শ, আমার পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিলো, তার থেকে আজ আমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আমি জুতা মাড়িয়ে, সিগারেট ফুকে পায়ে দলিয়া পিছনে ফেলে ফেলকনি খাটে বসে আরাম করে বসতাম, আজ সেই ফেলকনি খাট আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ওই জুতা মাড়ানো স্থানটিই আমার জন্য বরাদ্ধ হয়ে রয়েছে। আমি আমার নামটিও আজ হারিয়ে ফেলেছি। আমাকে আর কেহই আমার সেই প্রিয় নামটি ধরে, কিংবা আমার ছোট মেয়ের অতি আদরের ডাকটি ধরে আমাকে গলা জড়িয়ে সম্বোধন করবে না। আমি নিতান্তই একটি লাশের নামে পরিচিত হয়ে এই উজ্জ্বল নীলাকাশ সমৃদ্ধ প্রিথিবী হতে সবার আড়ালে চলে যাবো।

অফিসে যাবার প্রাক্কালে যে সুন্দরী বউটি বারবার জিজ্ঞাসা করত কখন আবার বাসায় ফিরবো, কিংবা আজ অফিস হতে ফিরতে দেরী হবে কিনা, অথবা বিদেশে যাত্রাকালে মেয়েদের এই আবদার, ওই আব্দারের লিস্ট সম্বলিত দাবীনামার মতো আজ আর কেহই আমাকে কিছুই জিজ্ঞেসা করবে না, কখন আবার বাসায় ফিরে আসবো, কিংবা কেহ আমার সাথে যাবার জন্যও বায়না ধরবে না। ইহা এমন এক যাত্রা যেথায় কেহই কাহারো সাথী হতে ইচ্ছুক নহে।

যারা আমাকে অনেক ভালোবেসেছে, আর যারা আমাকে ঘৃণা করেছে, তাদের উভয় পক্ষই আজ আমার এই শেষ যাত্রায় হয়ত শামিল হয়ে যার যার ভাবনায় লিপ্ত থাকবেন। পাড়া প্রতিবেশিরা অনেকেই বিলাপ করে, কেউ আবার ফিস ফিস করে কত অজানা তথ্য নিজ থেকে মনগড়া কাহিনী বলে আত্মতৃপ্তি পাবেন, যার প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমার আর থাকবে না। অনেক মনগড়া কাহিনী সুর আর তাল হয়ে বাতাসের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে আবার অনেক বীর বাহাদুরের মতো অনেক কল্পকাহিনীও তার সাথে মুখে মুখে প্রচারিত হবে, হয়ত তার কোনোটাই আমার প্রাপ্য নয়। মজার ব্যাপার হলো যে, দিনের আলো অন্যান্য দিনের মতোই সঠিক নিয়মে তার সিডিউল চলতে থাকবে, পাখিরা সন্ধ্যায় যার যার নীড়ে ফিরে আসবে, পথিক তার নিজ গন্তব্যে সঠিক সময়েই ঘরে ফিরে যাবে, শুধু আমার বেলায় আর কোনো কিছুই আগের মতো চলবে না। এক সময় সবাই আমাকে কাধে করে, ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে কোনো একস্থানে মাটির তলে পুতে এসে চা চক্রে লিপ্ত হবেন। এক সময় রাত ঘনিয়ে আসবে, চাঁদ উঠবে, হয়ত বৃষ্টিও হতে পারে। আমি বৃষ্টির পানিতে গলিয়া যাওয়া মাটির সাথে মিশিয়া একাকার হয়ে যাবো। তখন হয়ত কেউ টিভির সামনে বসে কোনো এক আনন্দঘন সিরিয়াল দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়বেন। আর আমি একা অন্ধকার একটি মাটির গর্তে সারা জীবিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকবো। সময়ের আবর্তে এক সময় আমি যে ছিলাম এই পৃথিবীতে সেটা সবার মন এবং মস্তিস্ক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এটাই যদি হয় জীবন, তাহলে কিসের নেশায় আমি এতো মসগুল? সব কিছুই ভুল এই পৃথিবীর। একাই এসেছি, একা যাওয়ার জন্যই এসেছি। মাঝে যাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, তারাও একাই এবং তারা আমার মতোই একদিন ভুলের ইতিহাসে বিলীন হয়ে যাবেন।  

আমি জানি আমি তোমাদেরকে আর কিছুই বলতে পারব না। যদি ইহাই হয়ে থাকে, তাহলে আজ আমার জীবনের শেষ বার্তাটুকু তোমাদের বলে যাই, আর ক্ষমা প্রার্থনা করি যে, যদি কারো মনে, অন্তরে, শরীরে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, স্বার্থের কারনে বা বিনা স্বার্থে আমার অগোচরে কোনদিন আঘাত করে থাকি, যদি আমার দ্বারা এমন কোনো কাজ হয়ে থাকে যা উচিত ছিলো না, যা অধিকার খর্ব হয়েছে বলে মনে হয়, কিংবা আমার দ্বারা জুলুম হয়েছে বলে মনে মনে অনেক অভিশাপ দিয়াছেন, আমাকে সবাই খাস হৃদয়ে অনুশোচনাপূর্বক ক্ষমা করে দিবেন। আমিও আপনাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি আমার দায়িত্ত কতটুকু পালন করতে পেরেছি,, সেই বিশ্লেষণ আমার উত্তরসুরী, আমার পরিবার, আমার সমাজের উপর। আমার পরিবার, আমার সমাজ আমাকে কতটুকু দিয়াছিলো সেই বিশ্লেষণ আমার কাছে আর নাই তবে আমি আপনাদের সহিত ভালো একটা সময় কাটিয়ে গেলাম এটাই আমার জন্য অনেক ছিলো। 

যুগে যুগে এই প্রিথিবীতে আমার মতো সব উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, রাজা বাদশা, হুজুর কামেল কিংবা দস্যু সবাই খালি হাতেই কেউ ভালবাসায় সিক্ত হয়ে কেউ আবার করুনার জল নিয়েই এই অসীম নীলাকাশ, গভীর সমুদ্র কিংবা পাহারের ঘন শ্যামল সুন্দর ছবি বুকেই নিয়া একাই সব ছেড়ে চলে গেছেন। এই শ্যামল ভালোবাসা, সম্পদ, সম্মান, কিংবা যশের জন্য কোনো রাজা, সম্রাট কিংবা শাসক কখনোই আর ফিরে আসে নাই। আমিও আর তোমাদের এই সমাজে ফিরবো না। তবে জায়গাটা ছেড়ে যেতে আজ আমার বড্ড মায়া আর কষ্ট হচ্ছে। ভালো থেকো তোমরা।

এটা কি শুধুই কলম বন্ধু?

WAS IT ONLY A PEN FRIENDSHIP?

Mandy and Ali had been sitting face to face without any talk for a quite long time as if both of them are thinking something very deeply about themselves connecting together. They might be calculating something. What they are thinking? They may think so many things, days, or many moments, or so many stories...

Mindy broke the silence.

-How is your conjugal life passing Ali! It might be very enjoyable, romantic and very emotional! It has to be. Carla also used to tell me like that and she was very much greedy for it.

-What Carla used to tell more? Ali wanted to know very reluctantly, as if he knows everything what Carla used to think but it will be very interesting to know from someone other than Carla. Ali had been looking to Mindy with a far eye. He has gone back to somewhere beyond Mandy's visual distance.

-Whose picture is this, Habib?

-My younger brother. Very nice a boy.

-What does he do now?

-Just going to school like you go.

-Can I write to him?

- You may try, Habib replied back.

And I am writing you now Ali.

This was her first introduction in her first letter. Ali was recollecting his memories. He took a big breath. He was only class nine then. An unbounded life, listening none and doing whatever wishes. Whenever getting time, trying to play in the field. Replying to Carla's letter was not a big issue, Ali thought. He dropped it aside. But next day when Ali was standing in the House line, enjoying the beauty of the nature, got second letter. This time it seemed to be a very weightfull one. Might have been full of photographs. And it was.

Ali, after his lunch, opened the letter and found variety types of photographs. Carla wrote, she was counting the days when she would be getting his reply. Ali looked at the pictures for quite long time one after another. Ali was very considerated. But to tell you frankly no pictures could wave him. Ali was not impressed. She was not looking that pretty. May be his choice was more higher than what she was. Ali kept all the pictures under his mattress and tried to sleep. But Carla was some kind of special character who did not lay herself in the mass believed concept of society. Rather had been waiting to choose someone as a personal choice. She kept on writing to Ali till reply reached to her. She was not sure about anything. So why to be puzzled unnecessarily.  Ali got the third letter. It was a very interesting one!

-Don't you get my letters Ali? She wrote. If you get, please write me even informing you won't write.

Ali, this time, became a little bit serious. Ali decided to write that he would be very busy and would not be able to write her.

When he was preparing to write like this. He got the next letter. Ali now could not track the number of the letters. She wrote a very interesting story.

She had a cousin named John. He was disturbing her a lot, telling that he loved her. But she did not like the proposal. Everyday she was been criticized by her schoolmates except Mindy. Carla did not hide anything from Mindy. Mindy used to know all about Carla and her stories. Others used to criticize because everybody used to go out with their girlfriends and boyfriends. But Carla did not go. She used to wait for the reply of her letters. Yesterday John had stolen her fifty-dollar from her bag. She felt bad but again got pleasure thinking it happened because she loved Ali.

Ali deeply was thinking about the matter. Should it be told through his bother, Habib that he was not thinking about Carla? Nothing he could decide nor could stand on his decision. He could not write that he would be busy and could not write to her.

Ali mailed a new letter expressing, he was very happy receiving her letter.

Ali thought let he continued for some time and one-day when opportunity would come he would just write it. It is not the right time to say No, then she would get very big hurt.

Carla's next letter surprised Ali more. Everyday and everyday Ali was getting letters. Some day he was getting more than one letter. America became local place for Ali. At least in the case of mail. She wrote -

She read his reply more than sixty times. She could tell the contents of the letter as it was without opening. She expressed her feelings very boldly that she knew reply would come. Her belief could not be wrong. She was created for only Ali and so on...

 Ali felt more sympathy for Carla. What would he reply to her! Would he tell that he would not continue or he should respond? Both of the options were dangerous. Ali, thinking about Carla's determination, could not say No.

Ali replied,

He was also waiting for her letter. In addition to give her feelings, Ali wrote he was interested to know about her habits, liking disliking, boyfriends, etc.

It continued for long time. Ali was then in class twelve. Going out from the college very soon. Ali's all higher secondary examinations were over and their batch was given farewell from the college. Ali came back from the college campus to their village house directly. Everyone he met enroute gave him the message about his elder brother, Habib, who recently came back from America after six years. He was surprised that only Ali did not know anything about his elder brother's return from America. Habib was Ali's elder brother who was doing Ph.D. in USA. Carla's father was in the same university where Habib was doing this research works. With this connection Habib and Carla's family had easy go in each other's house. One day Carla came to Habib's apartment and

saw Ali's picture. That very day Carla asked Habib the first question-Whose picture was this?

Ali reached to his house in the afternoon. The day was about to set to the west. All his sisters and other relatives were giving a shining look and smiling face. Every body was happy on Habib's arrival. Today they have filled up their joy after Ali's arrival. It became then hundred percent presence of all family members. But Ali noticed some abnormalities amongst his relatives. It seemed everyone was hiding some interesting news from Ali. What was the story? Ali questioned himself. Ali could not find out the hidden story.

Ali met his brother at night when he returned home from outside. It was a very happy moment. Very less they could talk. They were extremely happy. There was no language between them. After a long time they could meet together. When Ali was in grade seven, Habib left the country. Ali now passed higher secondary examination. It was time for him to go for the university now. Quite a long time. Both of them had long talk. Habib narrated lot of story about America, its beauty and the cultures of the society. Sometimes Ali had been asking few questions. Sometimes he had been laughing like a small boy hearing his brother's experiences.  They woke upto midnight. Before finally going back to sleep, Habib told Ali that he had left something very expensive at Dhaka Teachers' Students Center (TSC). Next day early in the morning Ali should see once how it was without anybody's supervision. Ali should take the key and check it before the sun rose.

Ali got up from the bed early in the morning and started for Dhaka, TSC. When Ali reached at Dhaka, there were none in the street. A very few birds and crows were found around. There was hardly anyone walking in the main street. It seemed everyone was still sleeping. A few old guys having heart problem and needed short walk, only these kinds of people were found mostly. And its numbers were also very few. There were some young boys found passing by who wanted to be a professional foot baller going for practice in the far field. One-day his dream might come true. Ali found some smart girls too walking with very ugly looking guys. May be she needed some money for herself. She gave a company to the man at night. The earth does not give always a good look at all the morning.

Ali entered inside TSC and turned left. He had something to check in room number six. Ali brought out the key handed over by his elder brother, Habib. He tried to open the door of number sixth room.

But what is this! The key could open the room but it seemed someone was inside it. How it was possible? The room was locked from outside and someone was inside! He might

be doing mistake. He again locked the door and checked for the next door, seven then five. But that key could open none of the doors. Ali this time opened the sixth number room and started pushing inside. Very politely but anxiously asked whether anyone was inside the room or not. A lady voice replied back.

-Please hold for a minute dear, I am coming.

Ali was waiting with quick heartbeats. He was hearing the sound of her footsteps inside and opening sound of the first door.  The lady opened the last door too.

Ali was not only surprised but it deemed that he was falling on the ground. What was he seeing in front of him? Why Habib did not tell him anything about her! Was it preplanned to surprise him? He was guessing things quickly and story became very clear what everybody was hiding from him!

Carla was shouting with top of her voice.

-Oh Jesus! At last you have come! I was just waiting for you whole night!

Ali could not say anything. First reason Ali was not at all prepared to see Carla. And second reason, Ali was not fluent in English, as Carla was being American. Carla did not know Bengali. Ali kept standing for few moments. Carla again shouted and held Ali's hand. Pulling him inside the room.

Carla was putting on sleeping gown. Very transparent. Did Carla decided  that deliberately? Ali set down in the chair. He was feeling very shy. With very poor English Ali informed Carla that he was not good at English. He only could catch slow speedy conversation. Carla understood him very closely. Carla smiled very nicely and looked at Ali.

- I am very sorry dear. I was extremely happy when I have seen you. Carla replied.

She pulled another chair and set in front of Ali. Keeping her two hands in her chicks, she just keep on looking at Ali.

-What a beautiful morning today, is not it Ali?

How are you, Carla? Ali inquired. Giving no reply to Carla's question.

Carla leaned against Ali thighs. Her beautiful white body was emanating beautiful light, her breasts were visible partially but it was not looking ugly.

-I don't know how I am now, but there is none who is more happier than me at this moment. Carla whispered.

Ali touched Carla. Carla was whipping and her eyes were full of tears.

Carla was not looking like those pictures he saw in the photographs. She was much better looking and beautiful. Carla was exactly like what Ali was thinking for. Ali kissed her head and hairs. Both of them became normal.  The language of love is not either

Bengali or English. It is something beyond the sound. There was very little tension, anxiety and unknowingness  amongst them.

-What you ate last night Carla? Asked Ali..

-Just nothing but mango. Habib stored some dry food for me and some seasonal fruits.

-What you like to have in breakfast? Ali asked.

-You would be coming early in the morning and Habib told you would be deciding what we should take in lunch and dinner. I think you have also not eaten anything in the morning! Carla inquired him and got up to bring some grapes.

Ali was looking at Carla. Ali seemed to be very happy to get Carla. He really loved Carla Dorain Wilson.   They had lots of talk. They talked about love, exchanged lots of feeling for each other. Carla stayed here for next twenty-two days.

During this long stay, both of them had been visiting many places. People also became very surprised and inquisitive to see both of us together. One Bengali boy was roaming around with one white girl holding the hands together. Naturally it was a rare scenario.

There was a study excursion arranged from her school. It was scheduled for Australia. But Carla gave the option for Bangladesh. Habib was coming back to Bangladesh to meet his family and in the same time he would be looking for getting married. Carla wanted to join Habib to visit Bangladesh to meet Ali during her study excursion. Habib did not inform this message to Ali at all to make a big surprise for him, his younger brother. Ali was really surprised.

The first night's story was very romantic.

 Whole day Ali was waiting for his brother, if he comes. But he did not turn up. It was evening. Ali was thinking time and again  that there was only one bed in the room. All the items given in the room were for single man. If he goes back at night, how she will be staying here alone? Will she allow Ali to go back leaving her? If she does not allow, than where he will be sleeping? Moreover, Ali was not interested to leave the company of Carla.

Even though Ali informed Carla that he would be right back in the next morning.

Carla looked at him astonishingly and said-

-What are you talking? You will be going back tonight? No baby, we will stay here together. Don't you know that I had been waiting since long!

-But there is no bed for two men. Ali said.

-Nothing worries! We will be sharing it together. Otherwise we will be sharing our lives together for whole life! Carla was very determined. She hugged Ali warmly.

None could sleep that night. Carla could not sleep because the day-night system in Bangladesh was absolutely reverse than that of America. Night in Bangladesh is the day

for America. It was a problem for Carla. But Ali could not sleep because Carla was awaking. Whole night passed without sleep. But Ali was not feeling any tiredness at all too. They shared one pillow together, shared one bed cover together, and what else they shared? They shared their life, they made a basement of the building, two men dream. A single dream which was dreamt together.

-It was very nice night I had ever in my life. Ali thought.

Was it called wedding night? They did not had any sex, did not had any violation anytime. But every time Ali thinks now, seemed to him that it was a wedding night for him.

-Several times we hugged together, I felt her warm hearts, beautiful breasts. But never ever I felt it to be touched. It was very pious relation, sacred love. Ali was thinking.

Next early in the morning, they both entered into the wet room, washed their hands and mouths though it was not necessary. Carla was laughing and telling Ali,

-How beautiful people you are!

-Why? Ali asked.

-It can not be thought that an American adult boy stayed night with an adult American girl and there was no sex between them. I can feel very much safe in the hands of man

like you people. I did not do the mistake Ali! I always wanted someone who will love me and care me. Only physical sex should not be the basis of love. Love should be such so that even when I will be an old lady having hundred years' ages, still my husband will love me as he used to do from the beginning. Carla stated.

- Can I kiss you on your forehead Ali? Carla asked Ali through the mirror.

Ali extended his hand towards Carla and hugged her. Both of them were looking through the mirror. A beautiful pair submerging together.

Carla was very depressed for last few days. Everyday it passed everyday she used to tell- she does not want to go back to America. She would not feel comfortable in USA. Ali used to give her consolation only that one-day they would meet together forever. But Ali knew there could nothing be more attractive consolation than that of saying, please do not go and stay with me.  Ali was also not feeling comfortable as the days had been passing very fast.

Night before her departure, both could not sleep for a single moment. All Ali's relatives intentionally did not disturbed them. Most probably they also had wanted Ali to make permanent friendship with Carla. Besides they had tremendous trust on him about his dealings with Carla. But Ali could not keep his trust to them.

-Why should I deprive my lady from her rights? Is religion the main bondage between two human being? I did not believe. Ali was questioning himself.

-We were lying together. Carla kept her head on my chest and kept mum. I hold her head and brought more close to my eyes. She was crying. Her eyes were shining with tears. The lights helped her tears to be more pathetic. I kissed Carla, my beloved lady. I don't want to leave you, I want you to stay here, I want to share my everything with you. No secret no religion no law is bigger than the love. He held her tightly.

Ali peeled off her gown. God created woman with special attention. Ali imagined. The creation was not simple. The art of the body of the woman is not geometric rather it is artistic. The eyes tells about love, the nose, the lips, the breast all that a woman has tell the music of immortal love. Ali touched her breast with his wild lips. Carla holds Ali's head with her two beautiful hands tempting his hairs.

Ali lied over Carla.

Carla was just breaking with my kisses, with my movements and my every touch. Her tip of the nipple was very hard. Her eyes were closed, mouth was shut but making the noise of the image of love. Her legs were moving apart from each other.

Did we talk anything then? I can not remember what was the subject we discussed. Was it love? Was it anything like science or literature? We had been crossing the ocean of love, may be interchanging the waves of new generation. I opened my two eyes. I saw my Carla's full nude body. How beautiful breast a lady can possess? Is it more beautiful than that of Carla? How beautiful a design of figure God can create? Was it more flawless? I do not have any idea. I have seen only Carla. Carla was the best.

After a long time, Carla got up and sat down nude. Ali marked himself, was he greedy for her sex anytime?  Ali thought.

After that visit, Carla used to be more aggressive on expressing love. Ali understood it by her last letters. Ali also became more aggressive. In every moment they remember each other.

Carla was mentally preparing to leave America and settle down with Ali. She was doing some small job. She added all the salary and one day bought an air ticket for Bangladesh. She wrote one letter too to mail Ali informing about her plan. She kept all these in her table and forgot to hide from other members of the family. Her father saw these two things. He was terribly shocked and equally sad. He took away her passport including the air ticket. Father charged her for doing so. She was warned by her father not to think like that anymore. If she does so she will be sent to the hostel at her own cost.

Carla agreed to the last proposal. She left the house. Her mother was also not favoring her. She was driving the car. It was a very foggy and snowing day. Carla thought she

should immediately inform Ali what she did. She requested her brother, Roy, to mail the letter that she wrote before.

Roy went to the post box and Carla was waiting in the car on. All on a sudden, a big lorry hit the car from the back. Carla with her car went out of the road. Both of them had a fall of fifty feet with number of summersaults. Carla lost her senses, got number of injuries, she was almost dead. Roy and others took her in the hospital.

-Is Carla dying, doctor? Daisy, Carla's mother, asked doctor.

-We are not yet sure about her condition but it is critical no doubt. Doctor replied.

After few hours, Carla could say something but not readable.  Out of all talks, she could only tell twice "Ali". The doctors were not also very much confident what was to be done.  Neither they could find out the meaning of this word "Ali".

Carla's mother thinking nothing but ultimately made a phone call to Ali in Bangladesh.

- Ali, can you come to USA right now? Carla got accident and she is in comma. She wants to see you. She is only uttering your name. Please arrange to come as quickly as possible. I promise you, I will honor Carla, if she survive this time.

Ali could not say anything. Because Ali knows that he can not afford to go to USA right now because of lots of factors. Money was the acute problem for Ali now. Moreover his office will not permit him to go to USA for this reason. What a nation.  One man is taking farewell forever but the law does not permit other to see her. Ali took breath deeply.

Carla died after nine days. In between this she did not wake for a single time. How can she talk? She was busy with me here. No body knew. I gave her my last minutes. She uttered number of times-

-I wanted an Indian husband. I got it but I could not enjoy it. If I could enjoy it I could tell you how beautiful these Indian husband! You will have full freedom of power in the family. You may have different views but husband will not deprive you from love. They will never say, go out of my house.

Ali, after eighteen days, received the letter written by Carla, mailed by Roy. In that she wrote,

She will be coming to me in the next summer. I should be prepared myself for receiving her in the airport. She will be putting on red skirt matching with blue magenta color headgear. She will have a very beautiful rose in her hand.  She will mind if I do not kiss her in open mass. So what this is not in our Bengali tradition but I have to do it for her.  I had visited numbers of time the airport. But I never found this combination with anyone. Ali loved Carla so much. Ali promised if anytime he meets Carla, he would hug Carla in mass and had a kiss in public. No matter who thinks what. There is lot of time the earth has rotated the full rotations. Every time summer came but Carla did not come.

Today Ali has come to USA for a visit. Since the year Carla died in 1981 and today, there is seventeen years gap. Everything might have changed. Ali could not differentiate. If Carla would remain beside him, he could ask Carla about it. Ali does not get any attraction in USA because Ali knows without Carla in USA it will have no meaning.

Ali made a phone call to Mindy. His brother Habib gave Ali the phone number of Mindy's house.  Mindy was very happy.

Today, the X-MAS day we all family members always want to meet together. I considered Carla was my family member. You are that man to whom my one of the best friend used to love so much, should I not invite you in my house! Mindy stated to Ali.

Ali taking a long breath replied Mindy.

-Mindy.

-Continue. Mindy replied.

-How many days a man can wait? Ali questioned Mindy.

- As long as someone can pull on alone? Mindy replied, you did not do wrong by getting married someone. If I would be in your position I would do the similar action too.

-I might get marry someone but I did not forget Carla at all .My lady Arundhuty is just like Carla. What I wanted from Carla, I am now getting it from Arundhuty too. Everyday I remember Carla by loving Arundhuty. Ali answered back very nicely to Mindy.

Mindy was also sitting the same way Carla used to sit in the table.

Mindy stated, Carla and Arundhuty both of them are lucky. I had also same mentality like Carla. I also wanted an Indian husband. Look if I would had an Indian husband, he would not leave me like this! We might have temporary emotions but not permanent separation.

Ali felt Mindy very deeply. Mindy is alone. She wants love. But what he can do for her? Mindy does not know that everybody may be Indian but everybody is not Ali. There is a big difference between these two.

After one-month stay, when Ali was leaving USA, Mindy requested Ali to stay at her residence. Mindy directly ensured Ali, she knows the customs of Bangladesh. Ali kept her request and went to her house. Mindy dressed her with Shari and blouse, sat in front of the mirror.

She said,

-Can I give you a kiss on your forehead, Ali?

Ali told nothing.

Logan airport. A big gathering of people. Everybody was busy either for clearing his or her goods or saying good-byes to his or her beloved man. Ali was boarding the plane. It was early in very morning. Mindy came upto the last place from where we can see together. I took my seat and looking at Mindy. Mindy kept on looking till the plane took off in the sky. Ali left USA forever. Mindy was kept on looking in the sky till the plane became very blurred. Her eyes might be full of tears. Johan, her only son five years old, pulled her hand and might inquire,

-Mom, will uncle come back soon!

Mindy could not reply back to Johan. She just holds him in her lap and hugged very tightly. Mindy did not wan to cry but her eyes could not control the wave of the tears.

 What Ali could do? Ali could do three things. What Ali did, he did the right thing. Or he could take her in Bangladesh along with him. Or Ali could stay back in USA with Mindy. But what would be for Carla and Arundhuty?

The plane was above fifty thousand feet in the sky. The sky was full of white cloud, there are many passengers trying to sleep and Ali was kept on looking towards white clouds outside. So many things Ali was passing by but many of them were not visible to him. Some were not correctly identified. Ali might be thinking about Carla, Arundhuty and Mindy together.

There are so many things happened in this earth. Many of them remain untold, hidden and unseen. Very few lucky or unlucky people might meet them en-route but hardly anyone cares them. Those who cares they don’t get it’s head or tail nor the start or end. Even some one runs agter the blind zone but God is always mysterious and keeps some mystery always hidden to open. Only God knows what is the mystery lied here. Ali saw the old passenger, a man of seventy years old, sitting beside him sleeping like a small baby.

বোদার গল্প

আলমাসের উপর দায়িত্ব পড়েছে বোদার

১৯৯১-৯২ সাল।

আলমাসের উপর দায়িত্ব পড়েছে বোদার। আলমাস সহজ সরল ছেলে। এখনো মুছ-দারি ভালমত গজায় নাই, তাঁর উপর ব্যাচলর। কোন কিছুই করার নাই, বোদার কাজ আলমাসের। আলমাস প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফৌজ সামন্ত, গাড়ি সব কিছু নিয়া আলমাস রেডি হচ্ছে বোদার কাজে।

গরম মৌসুম, চারিদিকে গরম হাওয়া। বোদায় নাকি বাতাস কম, যাও আছে তাও আবার যথেষ্ট পরিমান অক্সিজেন নাই, একবার যদি কেউ বোদার বাতাস নাকে নেয়, তাঁর নাক নাকি বাতাসের আর অন্য কোন গন্ধ বুঝে না।

আলমাস বোদাটা দেখল, এর একটা ম্যাপও একে ফেলল। জায়গায় জায়গায় গর্ত, কোন জায়গা দিয়ে কি করা যায়, সারারাত আলমাস ঐ বোদাকে নিয়াই থাকল। সব জায়গা দিয়ে সব কিছু নিয়া ঢোকা যাবে না বলে আলমাস বোদার কোথাও কোথাও টিপে টিপে, কখন বা পায়ে চাপ দিয়ে দিয়ে পরিক্ষা করে দেখে নিল বোদার কোন জায়গাটা শক্ত আর কোন জায়গাটা নরম। নরম জায়গায় সৈনিকদেরকে যেতে নিষেধ করে দিলেন আলমাস সাহেব। নরম জায়গায় কাজ করার আগে আলমাস সাহেবকে আগে থেকেই জানাতে হবে বলে আলমাস তাঁর সুবেদারকে বলে দিলেন।

আলমাসের ওসি হচ্ছেন মেজর ইকবাল সাহেব। নিতান্তই ভদ্রলোক। তিনি বিবাহিত। তাঁর একজন মেয়ে আছে। ওনি সব সময় মুচকি মুচকি হাসেন। কথা কম বলেন, কিন্তু আলমাসের সঙ্গে খুব খাতির। আলমাস ওসি সাহেবকে নতুন বোদা দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। ওসি সাহেব এর আগেও বোদা দেখেছেন কিন্তু বোদা দেখা আর বোদা সার্ভে করা এক জিনিষ নয়। তাই ওসি সাহেব নতুন উদ্যমে বোদা সার্ভের কাজ আলমাস কেমন করে করবে তাঁর পরিকল্পনা দেখার জন্য তিনিও বোদায় এলেন।

ওনি যখন বোদায় পা রাখলেন, তখন ভরদুপুর। বোদার বাতাস খুব গরম, খরখরা বোদার আশপাশ। জঙ্গল খুব একটা নাই, মনে হয় কে বা কারা যেন বোদাকে একেবারে ক্লিন শেভের মত পরিস্কার করে রেখেছে। মাঝে মাঝে দু একটা খালের মত আঁকাবাঁকা শুকনা কিছু দেখা যায় কিন্তু বহুদিন কেউ ওখানে পানি দেয় নাই বলে মরা জঙ্গলগুলু হলদে বা তামাটে রঙ ধারন করে আছে। ঐ হলদে বা তামাটে জায়গায় বসলে পাছার চামড়ায় চুলকানি লাগে।

ওসি সাহেব আলমাসকে নিয়ে বোদার চারিদিক দেখলেন। আলমাসের আকা বোদার ম্যাপে ওসি সাহেব তাঁর নিজের মত করে লাল ওএইচপি মার্কার দিয়ে আরও কিছু একেঝুকে দিলেন। বোদা নিমিষেই লাল হয়ে গেল। আর অনেক কাটাকুটিতে বোদার ওরিজিনাল চেহারা পালটে কি যেন হয়ে গেল।

যাক, সন্ধ্যে হয়ে গেল। আলমাস আর ওসি সাহেব বাংলোয় ফিরে এলেন। বোদার বাইরের বাতাস আর বোদার বাংলোর বাতাসে অনেক তফাত। বাংলোর ভিতরে বোদা অনেক ঠাণ্ডা, বেশ গোছালো, আবার বেশ পরিস্কার। অনেক নামি দামি লোকেরা এই বোদা দেখতে আসে। আলমাস আর তাঁর ওসি নামিদামি মানুসের মধ্যেও একজন, তাই বোদার এডিসি সাহেব এই দুইজনকে বোদার সবচেয়ে সুন্দর স্থানে জায়গা দিয়ে বললেন, “স্যার, বোদা দেখতে হলে এই জায়াগায় থাকেন। এখানে বোদার আসল মজা পাবেন। বোদার এখানকার পানি মিস্টি কারন পাশে চিনির কল আছে, বোদার বাতাস এখানে খুব সুইট কারন ডিসি সাহেব এইখানে বোদার এস্পেসাল সুগন্ধি গাছ লাগিয়েছেন। নাক পরিস্কার হয়ে যাবে বোদার গন্ধে। এখানে একটা ফল আছে যার নাম একেবারে ভিন্ন। নামটা হচ্ছে “কন্যাকুমারি”। আসলে বোদার পুরান নাম কিন্তু এই “কন্যা কুমারি”। তাঁর মানে হচ্ছে “কন্যাকুমারী” বোদার ফল। একবার বোদার ফল খেলে আপনার জিহবা বার বার বোদার ফল খেতে মন চাইবে। ইচ্ছে করলে আপনি কিছু বোদার ফল সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন, বন্ধুবান্ধব্দের দেবেন। তারাও বোদাকে মনে রাখবে। বোদা আমার বড় প্রিয় স্যার।” এই বলে এডিসি সাহেব আলমাস আর ওর ওসিকে বোদার খাস জায়গায় রাত কাটানোর জন্য রেখে গেলেন।

ওসি সাহেব আলমাসকে জিজ্ঞেস করলেন, আলমাস , বোদা তোমার কেমন লাগে? আলমাস সহজ সরল ভাবে উত্তর দেয়, স্যার বোদা আমার কাছে ভাল লাগে। ওসি সাহেব, মুচকি মুচকি হাসেন। ওসি সাহেব খুব মজার লোক। আবারও আলমাস কে জিজ্ঞেস করেন, বোদার কোন জায়গাটা তোমার খুব পছন্দ? আলমাস নিতান্তই সহজ সরল ছেলে, উত্তর আসে, স্যার বোদার সব জায়গায় পানি পাওয়া যায় না, যেখানে একটু ভিজা ভিজা থাকে ঐ জায়গায় আমার থাকতে ভাল লাগে, শরির ঠাণ্ডা হয়, মনভরে যায়। ওসি সাহেব, আবার মুচকি মুচকি হাসেন।

ওসি সাহেব কয়েকদিন বোদার আনন্দ শেষ করে তিনি ফিরে যান তাঁর নিজের কর্মস্থলে। আর এদিকে আলমাস প্রতিদিন বোদার প্রতিটি স্থানে পায়ে পায়ে চলে, কখন স্পিড বেশী থাকে আবার কখন একেবারে থিতিয়ে যায়। যেদিন আলমাস বোদার ফলটা বেশী খায়, সেদিন আলমাসের স্পিড ভাল থাকে। আলমাস দিনের পর দিন বোদায় থাকে। আলমাস বড় ভাল লোক। ও কখন বোদার ক্ষতি করে নাই। বোদা আলমাসকে আজিবন মনে রাখবে।

আলমাসের ঐতিহাসিক ভাষণ

যে কয়টি ভাষণ পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছে, যেমন, আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবারগের স্পিচ, কিংবা মুজিবের ৭ই মার্চ এর ভাষণ কিংবা ঐ কালো লোকটির “আই হেভ এ ড্রিম” ইত্যাদি। আলমাসের এই ভাষণটাও বিখ্যাত হয়ে থাকতে পারত কিন্তু এটা মিডিয়ার পাল্লায় পড়ে নাই বিধায় জগতজুরে আলমাসের এই বিখ্যাত ভাষণটি আর বিখ্যাত হয়ে উঠে নাই। তবে আমার ধারনা, অন্তত টাচ ১৩ ফোরামে এই ভাষণটি বিখ্যাত হয়ে থাকবে। অনেকেই আলমাসের সেই বিখ্যাত ভাষণটি শুনে নাই কিন্তু আমি সরাসরি ঐ ভাষণ যখন ইতিহাস সৃষ্টি করছিল আমি সেখানে ছিলাম। আমি তোমাদের জন্য আলমাসের সে ভাষণটির অনুলিপি তোমাদের জ্ঞ্যাতারথে জানাব।

তারিখঃ
লিঙ্গপুর স্কুল

উপস্থিত সুধিজন, ভাই, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীগন, আসসালামুয়ালাইকুম।

আপনারা জানেন যে, আমি প্রায় গত ছয় মাস যাবত আপনাদের বোদা নিয়া একাগ্র চিত্তে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি কিভাবে আপনাদের বোদার উন্নতি করা যায়। আমার বলতে দ্বিধা নাই আজ যে, আমি যেদিন প্রথম আপনাদের বোদাকে দেখি, তা ছিল সত্যি এক নোংরা, অপরিস্কার এবং দুরগন্ধময় এক বোদা। আপনাদের এই বোদার কোন ডিসিপ্লিন ছিল না, না এর রুপে, না এর গুনে। তারপরেও আমি দমে যাইনি। আমি আমার এই টিমকে নিয়ে রাত দিন আপনাদের বোদাকে নিয়া কাজ করার চেষ্টা করেছি।

আজ আপনারা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, কি সুন্দর হয়েছে আপানাদের এই বোদার চেহারা। বোদার সব কিছু এখন পরিস্কার, কোথাও পানি জমে নাই, আর যেখানে পানি থাকার কথা সেখানেই পানি আছে, অহেতুক এর চারিধারে স্যাঁতস্যাঁত হয়ে থাকে না। বোদার এবড়ো থেবড়ো স্থানগুলো আমার সোনার ছেলেরা নিজের হাতে সেগুলো ঠিক করে দিয়েছে। বোদার যত ময়লা আবর্জনা ছিল, তা আমরা নিজ হাতে পরিস্কার করে দিয়েছি।

আমরা আজ চলে যাচ্ছি। এখন দাতিত্ত আপনাদের। আপনাদের বোদা আপনারা পরিস্কার রাখবেন। বোদার যে কোন জায়গায় থুথু ফেলবেন না। বোদার যত্ন নিবেন। ভবিষ্যতে এই বোদা থেকে অনেক সোনার ছেলেরা বের হবে, এদের সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার জন্যই বোদার যত্ন নেওয়া একান্ত কর্তব্য। বোদার যাকে তাকে বোদার ব্যাপারে মাথা ঘামাতে দেবেন না। বোদার ক্ষতি হয় এমন অনেক লোক আছে। যাকে তাকে বোদায় ঢোকাবেন না। বিশেষ করে রাতে বোদার ব্যাপারে আরও অধিক সতর্ক থাকবেন। প্রয়োজন হলে বোদার প্রবেশ পথে লাঠি রাখবেন যেন প্রয়োজনে লাঠি ব্যবহার করতে পারেন।

ভাইসব, আপনাদের বোদার কথা আমার মনে থাকবে। আজ আমি যে বোদা রেখে যাচ্ছি, আশা করি, আমার পরবর্তী বংশধররা যদি কখন এই বোদা দেখতে আসে, আমি যেন বলতে পারি, বোদা বড় সুন্দর।

সাদ্দাম হোসেনের ছেলে উদয় এর সত্যি কাহিনী

কয়েকদিন আগে নেট জিওতে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলাম ইরাকের উপর, প্রোগ্রাম টার নাম হল Escape to Freedom. এটা মুলত সাদ্দামের ছেলে উদয় সাদ্দামের কার্যকলাপের উপর। লোমহর্ষক। সাদ্দামের পতনের পিছনে অনেক কারনের মধ্যে ওর পরিবারের অনেক ভুমিকা ছিল। সাধারন মানুষের যখন আর কোথাও কোন বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, এবং চারিদিকে সর্বত্র যখন অবিচার আর জুলুমের রাজত্ত কায়েম হয়ে যায়, তখন আল্লাহ যে কোন বিধর্মীর মুনাজাতও কবুল করেন যদি তা সত্য হয়, তখন তাঁর আবদার হয়ে উঠে সৃষ্টিকর্তা আর সৃষ্ট জিবের। ওখানে তখন আর ধর্ম কোন বড় ইস্যু হয়ে উঠে না। ধর্ম মানছি কি মানছি না এটা নিতান্তই ব্যক্তি এবং সৃষ্টিকর্তার মাঝে ফয়সালা। কিন্তু যখন সমাজকে গননা করা হবে তাঁর মধ্যে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন কালচার, ভিন্ন মতবাদ সব বিচার্য। সাদ্দামের ছেলে উদয় সাদ্দামের কাহিনি ঐ রকম একটা সমাজ বিরুদ্ধ। আমি শেষ পর্যন্ত প্রগ্রামটা দেখেছি এবং আমি উদয় সাদ্দমের শেষ পরিনতিটাও দেখলাম, আমার মধ্যে মনে হয়েছে ভগবান, আল্লাহ, ঈশ্বর বা রাম যাই বল না কেন, কেউ আছে।

১৯৮৭ সালে যখন ইরাক ইরান যুদ্ধ হচ্ছিল, তখন ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধে থাকা এক সৈনিকের কাছে সরাসরি চিঠি আসে, তাঁর নাম লতিফ। তাকে সাদ্দামের প্রাসাদে যেতে হবে, কেন যেতে হবে, কি কারনে যেতে হবে কেউ জানে না। লতিফ কিংবা যুদ্ধে থাকা কমান্ডার কিংবা লতিফের পরিবার কেউ আচ করতে পারছিল না কেন হটাত করে এই নিরিহ সৈনিকের কাছে সাদ্দাম হোসেন সরাসরি অফিসিয়ায়ল চিঠি পাঠিয়ে তাকে সাদ্দমের প্রাসাদে আসতে বলা হয়েছে।

সৈনিক ভয়ে ভয়ে প্রাসাদে গেলেন, সৈনিক লতিফ এর আগে কখন সাদ্দামের প্রাসাদ এত কাছে থেকে দেখার সুযোগ পায় নাই, অথচ আজ সৈনিক লতিফ সরাসরি সাদ্দামের প্রাসাদে ঢুকে, সাদ্দামের সাথে একত্রে বসে কথা বলবেন যেখানে সাদ্দাম ছাড়া আর কেউ নাই। ভীষণ ভয়ে আছে সৈনিক লতিফ। তাঁরপরেও তো সাদ্দামের তলব। না গেলে আগেই মরন, গেলে হয়ত মরলেও কিছুদিন পড়ে মরতে হবে। কি এক অজানা ভয়, গা শির শির করছে, কত বড় প্রাসাদ!!!! কি রঙিন কি সুন্দর, লতিফের কাছে এটা কোন বাড়ি, বা প্রাসাদ বা অন্য কিছু মনে হয় নাই, মনে হয়েছে এটা একটা স্বপ্ন যা ও কোনদিন ভাবে নাই, বা ভাবার শক্তিও রাখে নাই। এটা সাদ্দামের প্রাসাদ। চারিদিকে সুনশান, নিরাপত্তার বাহিনি, যেন মশারাও শঙ্কিত। গাছের পাতা বিবর্ণ হলে যেন গাছেরও শাস্তি হতে পারে এই ভয়ে কোন পাতাও তাঁর রং পরিবর্তন করে না। সবাই সাদ্দামকে মানে। এই মানার মধ্যে কোন আইন আছে তা কেউ জানে না, শুধু সবাই জানে ওরা আর কিছুদিন এই পৃথ্বীর চাঁদটা দেখতে চায়, সূর্য কখন কোথায় থাকে সেই দৃশ্যটা আরও কিছুদিন দেখতে চায়। সাদ্দাম বিশাল এক অবর্ণনীয় সুন্দর একটা সোনালী রঙের টেবিলে বসে আছে। তাঁর অবধি পৌছাতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ গজ মার্বেল খচিত ফ্লোর পারি দিতে হয়।

তিনি সাদ্দাম হোসেন, ঐ যে সাদ্দাম হোসেন বসে আছে। লতিফের মাথা ঠিক কাজ করছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না, বিমোহিত, শঙ্কিত, আশ্চর্য এক অনুভূতি। লতিফ কি তাকে সালাম করবে? নাকি স্যালুট করবে, নাকি পায়ে পড়ে যাবে? কি করবে সে এখন? কি করলে লতিফ ঠিক কাজটা করবে এটাই সে বুঝে উঠতে পারছে না। তাঁরপরও সে হেটে যাচ্ছে সাদ্দামের দিকে। এখন লতিফ আর তাঁর বুকের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছে না। হয়ত একটু পড়ে আর কখনই সে তাঁর বুকের স্পন্দন শুন্তেই পারবে না। কি অসহনিয় এক মুহূর্ত।

সাদ্দাম ঘার বাকিয়ে লতিফের দিকে তাকালেন। লতিফ আর হাটতে পারলেন না, কি কারনে থেমে গেল তা সে বুঝে উঠতে পারল না। এবার সাদ্দাম হাটছে লতিফের দিকে………

লতিফ, হতভাগা লতিফ এখন ঠিক সাদ্দামের সামনে দাড়িয়ে। চমৎকার গোঁফ, সুঠাম দেহ, পলিশড করা ইউনিফর্ম, বিশাল ঘরের মধ্যে বাতাসও প্রবেশ করে না, ঠাণ্ডা একটা শিতল আবহাওয়া, হয়তো নিঃশব্দ এসির পারফিউমড বাতাস। এই বাতাস ইরাক-ইরান যুদ্ধের খোলা বাতাসের মত নয়। বারুদের কোন গন্ধ নাই, মুহুর্মুহু আর্টিলারি শেলের বিকট শব্দ এর ভিতরে ঢুকে না। সাদ্দাম শান্ত পরিবেশে কাজ করতে পছন্দ করেন, দেশে যত অশান্ত পরিবেশই বিরাজ করুক না কেন। দেশের ইন্টারেস্ট আর সাদ্দামের ইন্টারেস্ট এক হতে হবে এই বিশ্বাস সাদ্দাম করবে কেন? সাদ্দাম কি একাই দেশ প্রেমিক হবেন? কেন পুরু ইরাক হবে না? তাই, দেশের লোককে প্রকৃত দেশ প্রেমিক বানানর জন্য তিনি ইরানের সঙ্গে এক কারনবিহীন যুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন যেখানে অধিকাংশ ইরাকি যানে না কেন তারা ফ্রন্ট লাইনে ইরানের সঙ্গে যুদ্দ করছে। যাক, সেটা দেশের নাগরিকরা বিবেচনা করবে। এখন লতিফের সামনে আমাদের সাদ্দাম দাড়িয়ে আছেন, এটাই বাস্তবতা।

সাদ্দাম তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তার বা হাত উচিয়ে লতিফের কাধে রাখলেন, সাদ্দামের চোখ লতিফের চোখে, লতিফ যেন সাদ্দামের নিঃশ্বাসের গন্ধও পাচ্ছিলেন।

“লতিফ, ঈশ্বর আমাকে দুটু ছেলে দিয়েছেন, আমি খুশি, আর তুমি এখন আমার তিন নম্বর ছেলে।” সাদ্দাম লতিফের কাধে হাত রেখে বললেন।

লতিফ বুঝে উঠতে পারছিল না কি তাঁর বলা উচিৎ। লতিফ কি খুশিতে হেসে দেবেন নাকি আত্মহারা হয়ে তাঁর নতুন বাবাকে জরিয়ে ধরবেন? লতিফ শুধু এক অজানা ভয়ে আরও সংকিত হয়ে কুচকে যেতে লাগলেন যেমন করে অনেক শক্তিশালি আগুনের কাছে একখন্ড প্লাস্টিক নিমিষেই গলে তাঁর অস্তিত্ব হারিয়ে শুধু এক তরল বর্জ্য পদার্থে পরিনত হয়।

‘লতিফ, তুমি আজ থেকে আমার আরেক উদয়। উদয়ের প্রতিচ্ছবি। কারন তোমার সঙ্গে আমার উদয়ের চেহারা অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। আজ থেকে তুমি উদয়ের বিকল্প হবে।’ সাদ্দাম বললেন।

লতিফ জানত, সারা ইরাকের মানুষ ভগবানকে ভয় না পেলেও উদয়কে ভয় পায় না এমন লোক তাঁর জানা নাই। উদয় যখন যাকে খুশি খুন করতে দ্বিধা করেন না। মদ আর নারীর মধ্যে তিনি কোন ভেদাভেদ করেন না। তিনি টাকার লোভী নন, তিনি শুধু যখন যা খুশি করতে ইচ্ছে করেন তাই করেন। এতে রাজ্য গেল নাকি কারো প্রান গেল, সেটা দেখা তাঁর দায়িত্ত নয়। তাঁর ইচ্ছা আর অনিচ্ছাই প্রধান। লতিফ এখন উদয় হয়ে যাবেন। পৃথিবীর সব চেয়ে ঘৃণিত ব্যাক্তির প্রতিচ্ছবি। তাও আবার জীবন্ত।

মুনায়েম উদয়ের পিএস। তিনি সাদ্দামের ঘরে ঢুকে লতিফকে নিয়ে গেলেন। নিয়ে গেলেন উদয়ের নিজ ঘরে। এ আরেক রাজ্য? এখানে দেয়ালগুলো হরেক কালারের। কোনটা উৎকট লাল, কোনটা গাড় সবুজ, উপরে ঝারবাতিগুলো কেমন যেন। বাহিরে যাবার পথ মাটির নিচ দিয়ে, কেন যে সরাসরি উপর দিয়ে না, এটা লতিফ বুঝে কিন্তু লতিফ উদয় হয়ে গেলে তাঁর জন্য অনেক পথ খোলা হয়ে যাবে, ঐ গোপন রাস্তাগুলো তাঁর নিজের হয়ে যাবে। এটা কি ভাগ্যবানের লক্ষন না অশুভ তা লতিফ মেলাতে পারছিল না। কোন জনমে ওর পিতা মাতা বা পিতামহরা এত পুন্য করেছিল যে রাজকিয় রক্ত না বহন করেও আজ লতিফ রাজার ছেলে হয়ে গেল? অংকটা মেলান বড় কঠিন হয়ে গেল লতিফের জন্য। তাঁর পরেও বাস্তবতা হচ্ছে এখন লতিফ স্বয়ং সাদ্দামের ছেলে উদয়ের ঘরে বসে আছে। তাঁর গায়ে সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের খসখসা ইউনিফর্ম। লতিফ এত শিতল ঘরেও একটু একটু করে ঘামছেন।

“হা হা হা” বিকট এক কর্কশ হাশি, হাসিও এত কর্কশ হয় তা লতিফের জানা ছিল না। ঘার ঘুরিয়ে লতিফ দেখল, উদয় একহাতে এক শক্ত লোহার বার এবং অন্য হাতে চুরুট নিয়ে বুকের তিনটা বুতাম খোলে হেলেদুলে তাঁর নিজের রুমে ঢুকছেন আর লতিফকে দেখে খুব মজা করে এই কর্কশ হাসিটা দিচ্ছেন। লতিফ এই প্রথম সাদ্দামের এত প্রতাপশালি ছেলে উদয়কে এত কাছে থেকে দেখলেন। লতিফের বুকে যেটুকু সাহস এতক্ষন ছিল তা নিমিষেই করপুরের মত উবে গেল।

লতিফ দেখল তাঁর সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতাপশালি রাজার এক যুবরাজ ‘উদয়’ তাঁর সামনে উদিয়মান। লতিফ নিজেও এখন যুবরাজ কিন্তু আসল যুবরাজ নন, তাতে কি? তাঁর দাতগুলোও তো আসল যুবরাজের মত, তাঁর হাত পা, তাঁর চুল, তাঁর মুখের অববয়বও তো এই আসল যুবরাজের মতই ঠিক ছবিতে যেমন দেখেছেন তাকে ঠিক তাই। খোচা খোচা দাড়ি, ঠোটের নিচে একটা কাটা দাগ, অবশ্য লতিফের ঠোটের নিচে এই দাগটা নাই, হয় তো অচিরেই এটা তাঁর ঠোটে লাগিয়ে দেয়া হবে। কি অদ্ভুত না? লতিফ কিছুই ভাবতে পারছে না।

আহহহহহ……

শক্ত একটা লোহার দন্ডে তাঁর কাধটা যেন অবশ হয়ে গেল আর সম্বিত ফিরে এল লতিফের, উদয় তাঁর হাতে থাকা লোহার রডটি দিয়ে লতিফের ঘারে একটা বাড়ি দিয়ে বল্ল, “আজ থেকে তুমি হবে আমার জীবন্ত শিল্ড। হিউম্যান শিল্ড। মুনায়েম, লতিফকে শিখিয়ে দাও আমি কিভাবে হাটি, কিভাবে চুরুট টানি, কিভাবে মানুষের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ি, কিভাবে গাড়ি চালাই, কিভাবে গাড়িতে বসি, সব শিখিয়ে দাও।”

লতিফ তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে এবার প্রথম কথা বলার চেষ্টা করল। “স্যার আমি তো অভিনেতা নই, আমি আপনি হতে পারব না। আমার পরিবার আছে, আমার মা আছে, আমার বোন আছে, আমার বাবা আছেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি নিতান্তই একজন সাধারন মানুষ। আমি বাচতে চাই স্যার।”

মানুষ যখন অতল সমুদ্রে পড়ে হাবুডুবু খায়, তাঁর তখন হিতাহিত জ্ঞ্যান থাকে না। লতিফেরও ছিল না। কিন্তু তাঁরপরেও লতিফের যতটুকু জ্ঞ্যান অবশিষ্ট ছিল, হয়ত ঐ অবচেতন মনই লতিফকে এই দুঃসাহসী কথাগুলো উদয়ের কাছে বলতে পেরেছিল। কিন্তু উদয় তো আর যে সে যুবরাজ নয়। ৪০ বছর রাজত্ত করা এক রাজার ছেলে। যার জন্ম হয়েছে প্রাসাদে, যার প্রতিটি ক্ষন কেটেছে প্রাসাদের কৃত্তিম বাতাস আর চির ধরা ঠোটের মেকি হাসির পরিবেশে। সে কি করে বুঝবে পরিবার কি? সে কি করে বুঝবে ভাইয়ের কাছে একটা বোনের মর্যাদা কি? সে কি করে বুঝবে বাবার সাথে ছেলের কি কারনে ঝগড়াও হয় আবার কারনে অকারনে বাবা-পুত্র মিলে নিঃশব্দে কেদে বুকের জামা ভিজে যায়? উদয় শুধু জানে সুন্দর কিছু নারী মুখের পিছনে শুধু আছে নির্লজ্জ ধর্ষণ, আছে পরিত্যাক্ত ঘৃণার কিছু নোনা জল। আর আছে মদের নেশায় এক উন্মত্ত বর্বরতা। ওর কাছে ঐ নারীর চোখের ভাষার কোন দাম নাই, বোনের মমতার কোন মুল্য নাই, বাবা-মার আদর আর পরিবারের যে বন্ধন সেটা তাঁর জিবনে কোন ভগবানই রাখেন নাই। হতভাগা যুবরাজ।

“নিয়ে যাও ওকে ওখানে যেখানে মানুষ তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে নত শিকার করে, নিয়ে যাও ওকে ঐখানে যেখানে কুকুর এবং মানুষের বসবাস একই দেয়ালের মধ্যে।” যুবরাজ উদয় মুমেনকে বলে দিলেন আর মনের সুখে আরও কয়েক প্যাগ মদ তাঁর উদরে ঢেলে দিলেন।

লতিফের স্থান হল ১ মিটার বাই ১ মিটার এক রুমে। পুরু দেয়ালটা উৎকট লালরঙ্গে রাঙা। চোখ ঝলসে আসে, মাথা ধরে যায়, কোন ভেন্টিলেটার নাই, বাতাস ঢুকবার কোন প্রবেশ পথ নাই। প্রতি ঘন্টায় শুধু ৫ মিনিটের জন্য ফ্রেশ বাতাস আসার ব্যাবস্থা করা হয়। লতিফ যুবরাজ না হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করায় এখন তাঁর মরার প্রস্তুতি চলছে। আর যদি এর মধ্যে লতিফ তাঁর শির নত না হয় তাহলে লতিফের বাবার প্রান যাবে, বোন ইজ্জত হারাবে, মাকে আর বাঁচানো যাবে না, লতিফ তো আর থাকবেই না। কে বলে ঈশ্বর আছে? লতিফ উচ্চস্বরে ঐ ১ বাই ১ মিটার রুমের মধ্যে গলা ফাটিয়েই তাঁর ঈশ্বরের কাছে বলতে থাকে, “কই তুমি হে ঈশ্বর? কে বলে তুমি আছ? কোথায় তুমি এখন তাহলে? আমার এ জনমের সব প্রার্থনা তাহলে কি সব মিথ্যা? তুমি কাকে ভয় পাও? তোমার কি চোখ নাই? আমার ঈশ্বর কি এতটাই অন্ধ যে সে ১ বাই ১ মিটারের রুম দেখতে পায় না? হে ঈশ্বর আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমার সাহায্য চাই, তুমি আমাকে রক্ষা কর।” কিন্তু ঈশ্বর আসেন না। ঈশ্বর তাঁর কথার কোন উত্তর করেন না, শুধু লতিফের কথাগুলোই ঐ ছোট্ট ১ বাই ১ মিটার রুমের দেওয়ালে আঘাত খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার ফেরত আসে। সঙ্গে ফেরত আসে উদয়ের পিএস মুনায়েম।

লতিফ শেষমেশ রাজী হল সে উদয় হবে। লতিফ রাজী হয়েছে। এই সুখবরে উদয় আরও কয়েক জোড়া সুন্দরি রমনি নিয়ে মদের আড্ডায় বসে গেল আর দেখতে থাকল লতিফ কিভাবে উদয় হয়, কিভাবে লতিফ উদয় হবার প্রশিক্ষন নেয় তা দেখার জন্য।

উদয়ের হাটার ভঙ্গি, চুরুট খাওয়ার স্টাইল, কারো সঙ্গে কথা বলার স্টাইল, মানুষদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ার স্টাইল ঘার বাকিয়ে কাউকে দেখার কৌশল, গাড়ি চালানোর কৌশল, ইত্যাদি সবই ভিডিও করা আছে, তা লতিফ শিখে নিচ্ছে আর কোথাও ব্যাতয় হলে প্র্যাক্টিকেল দেখিয়ে দিচ্ছে জনাব স্বয়ং আসল যুবরাজ উদয়। এই প্রশিক্ষন যতটা সহজ মনে হয়েছিল অতটা সহজ হয়নি। আসলে ট্রেইনিং কখন সহজ নয়। এর মধ্যে শাস্তি আছে, আছে চরম লাঞ্ছনা, আছে নিপীড়ন, আছে ভয় মৃত্যুর। লতিফের বেলায়ও এর কোন ব্যাতিক্রম হয় নাই। তবে এর মধ্যে যে কাজগুলো লতিফকে অত্যান্ত পীড়া দিয়েছিল তা হচ্ছে লতিফকে উদয় হতে গিয়ে তাঁর ঠোট কাটতে হয়েছে, তাঁর দাতগুলো চাঁচতে হয়েছে, তাঁর কানের কাছে ড্রিল মেশিন দিয়ে একটা কালো কালো ফুটু করতে হয়েছে। লতিফের এই সুন্দর অবয়বের প্রতি কোন মোহ ছিল না শুধু তাঁর কষ্ট হচ্ছিল এই সুন্দর অবয়ব করতে গিয়ে লতিফের শারিরিক কষ্টটা।

নয় মাস পেরিয়ে গেছে ট্রেনিং এর। লতিফ অনেকটা উদয় হয়ে গেছে। কিন্তু এক জায়গা ছাড়া। উদয় লতিফকে এক সুন্দরি মেয়ে ধরিয়ে দিয়ে বল্ল, যাও, তুমি এখন উদয়, ওকে নিয়ে ঐ ঘরে যাও। কিন্তু লতিফ তো লতিফ , সেতো আর উদয়ের মত রক্তে পরিবর্তন হয়ে যায় নাই। লতিফ পারেনি নিরিহ এক নিস্পাপ মেয়েকে নিয়ে ফস্টিনস্টি করতে। আসল যুবরাজ অত্যান্ত রাগ লতিফের উপর। আর এইটা কিভাবে করতে হয় তাঁর ডেমো দেখাতে গিয়ে আসল যুবরাজ উদয় তৎক্ষণাৎ পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া দুই দিনের এক দম্পতির মেয়েটিকে সবার সামনে বলাৎকার করলেন, পাশে লতিফ, উদয়ের বডিগার্ড, তাঁর পিএস, এবং মহামুল্যবান রাজপ্রসাদ। সবাই এর সাক্ষী। সাধারন মানুষ তো আর উদয়ের সাথে পেরে উঠবে না আর বিচারের কথা বললে তো হবে না। উদয় নিজে যা করে সেটাই বিচার। কিন্তু সাধারন মানুষের কাছে আরও একটা পথ খোলা ছিল। তা হচ্ছে বিচারবিহীন আত্মহত্যা। আর সেটাই করে গেল ঐ সাধারন দম্পতির অসহায় মেয়েটি। এতে উদয়ের কি আসে যায় আর রাজপ্রাসাদেরই বা কি আসে যায়। এমন কত নারী এখানে গলা ফাটিয়েছে, কত নিরিহ প্রান এখান থেকে পালানর জন্য আত্মাহুতি দিয়েছে। রাজপ্রাসাদের ইটের কোন ভাষা নেই, ওরা নিরব সাক্ষী থাকে, কথা বলার জন্য দরকার একজন লেখকের। উদয়ের প্রাসাদে কোন লেখক প্রবেশ করে না।

১৯৮৮ সাল। ইরাক ইরান যুদ্দ শেষ হয়ে গেছে। ইরাকে বিশাল এক ফুটবল খেলার সমাপ্তি ঘোষণা আজ। সঙ্গে পুরুস্কার বিতরণী। আর আজই হবে লতিফের প্রথম টেস্ট। আজ লতিফকে যুবরাজ উদয় সেজে জনসম্মুখে ফুটবল খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করতে হবে এবং নকল যুবরাজ আসল যুবরাজের হয়ে পুরুস্কার বিতরন করবে। যদি ভালোয় ভালোয় লতিফ পাশ করে যান, তো টিকে গেলেন আর যদি পাশ না করেন লতিফ তাঁর পুরু পরিবার নিয়ে সকাল আর সূর্যের মুখ দেখতে পারবেন না। ———

অনুষ্ঠান শুরু হল, লতিফ রাজকিয় গাড়ি আর চৌকশ সিরিমনিয়াল প্যারেডের মধ্য দিয়ে উদয় সেজে ফুটবল সমাপ্তি অনুষ্ঠানে হাত নেড়ে, ঘার বাকিয়ে ডায়াসে আসলেন। মনে তাঁর অনেক দ্বিধা, অনেক চঞ্চলতা, সবচেয়ে শক্তিশাললি আসন অথচ সবচেয়ে দুর্বল মন নিয়ে লতিফ একে একে সবাইকে পুরুস্কার দিলেন, মনের আনন্দে নয় অধুম্পায়ি লতিফ ধুম্পায়ি উদয়ের চরিত্রে একের পর এক চুরুট টেনে যাচ্ছেন। অন্যদিকে লাইভ ক্যামেরায় আসল যুবরাজ পাশে কতক নবান্নের আউসের মত আধা পাকা কিছু লাজুক এবং ভীত সন্ত্রস্ত তরুনিকে নিয়ে অনেক দূরে এক প্রাসাদে বসে আসল যুবরাজ উদয় ভোগে লিপ্ত রয়েছেন আর লতিফের অভিনয় দেখছেন।

লতিফ পাশ করেছে।

দিন যায় মাস যায়। ১৯৯১ সাল। গালফ ওয়ার শুরু। সাদ্দাম হোসেন তাঁর ছেলে উদয়ের জীবননাসের আসংকা করছে ইরানিয়ান এবং আমেরিকান উভয়ের কাছ থেকেই। সিদ্দান্ত হল, আসল যুবরাজ উদয় সুইজারল্যান্ডে চলে যাবেন আর নকল যুবরাজ ইরান-ইরাক বর্ডারে গুলিতে মারা যাবে। এই সিদ্দান্তটা আসল যুবরাজ জানলেও নকল যুবরাজ জানলেন না।

আসল উদয় সুইজারল্যান্ডে যাবার আগে ও ওর মৃত্যু সংবাদ আন্তরজাতিক পত্রিকাগুলোতে দেখে তারপর সুইজারল্যান্ডে যেতে চান। তাই, প্রথমে নকল যুবরাজকে ইরান-ইরাক বর্ডারে পাঠানো হল কিন্তু খবরটাও দেয়া হল যে উদয় দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে বর্ডার পারি দিয়ে। সন্ধায় খবর এল, উদয় গুলি খেয়েছে কিন্তু মরেন নাই।

হাসপাতালে নকল যুবরাজ তাঁর একটা আঙ্গুল হারান, কিন্তু নকল যুবরাজকে আঙ্গুল হারালে যে আবার আসল যুবরাজেরও একটা আঙ্গুল কেটে ফেলতে হবে তাই আসল যুবরাজ ডাক্তারদেরকে জানালেন, ঐ আঙ্গুল না লাগান গেলে ডাক্তারদের কল্লা যাবে।

এইভাবে ২০০৩ পর্যন্ত লতিফ আসল যুবরাজের মুখুস পড়ে অনেক অত্যাচার আর নিপিরনের মধ্য দিয়ে নিজ পরিবার ছেড়ে কোন এক প্রাসাদে নিতান্তই জাজাবরের মত নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে লাগলেন যেখানে তাঁর কোন কিছুরই অভাব ছিল না, শুধু অভাব ছিল জিবনের নিরাপত্তা আর ছিল নিসসঙ্গতা।

সবশেষে ২০০৩ সালের কোন এক সময় আসল যুবরাজ আর নকল যুবরাজ মুখুমুখি দাড়িয়ে যান। দুজনের হাতেই সেম পিস্তল, দুজনেই উদয়, দু জনেই প্রাসাদে, কিন্তু একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

চলল গুলি, দুজনেই আহত, নকল উদয় আসল উদয়ের গাড়ি, চুরুট আর পিস্তল নিয়ে কোন রকমে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গিয়ে বর্ডার ক্রস করে পারি দিলেন তুরস্কে। আর আমাদের আসল যুবরাজ ইরানিয়ান/আমেরিকানদের হাতের পড়ে মারা যান।

পৃথিবী এক জঘন্য পিচাশকে হারাল। লতিফ এখন ইউরপে তাঁর পরিবার নিয়ে ব্যবসা করছে। তিনি জীবিত আছেন,

(Posted in FB)

একটি মায়ের কাছে মেয়ের চিঠি

Dear Mama

Mama, in this strange world, I met multifarious categories and different types of people with different characteristics altogether. Many of the people seem to be similar and behave similarly. Their starts and endings look alike. Someone begins with charismatic start and ends with volatile situation; someone starts with confused situation and ends with futile consequences. That’s my experiences Mama in so far with such a little age to leave away in the past.

With my little experience, I don’t clearly understand a person instantly what he wants and what he runs ultimately for. But at times what my sixth sense tells me that many of the eyes speak distinct to its hunger ness and covetousness with lustful desire, many of those hearts don’t even speak anything but express many things in one look, and many souls are really so strong enough to be judged all over the time passed along with. Many factors get visible at times, the social amenities, social customs, human bondages, and others. Out of these what I understood one very distinct feature is the social amenities, which is only the clad of the these so called society but their dialects, customs and practices look alike to unholy ness, dirty, vile and despicable.  But Mama, there happens so many things in our area that cannot be even defined with the existing definitions also. I will tell you such an unveiling situation today and I need your guidance in literal voice.

Mama, I met a person, still unidentified, recently here in my world. She came all on a sudden from an unknown world and disarrayed my gardens, my thinking, and my pattern of behaviors that I settled it down with all my concentrations. Now it seems, I am influenced, I am affected seriously, and confused too in the order of the day.  She comes to me when I am alone, she appears to me when I am distressed, and she speaks to me with the same language the way I understand the ideas to be discussed. She exactly speaks the way you nourished me when I was a child, she looks very known person to me and it seems to me that I saw her somewhere sometimes. But Mama it frightens me also and it moved me from the point of impact. It always hunts me like a professional gun-man. Can you tell me Mama, what she wants from me, or who is she and what she looks from me? I don’t know it what is her demand and how to tackle her. This is the first instance that I am encountering a person like her. I am confused to look at her eyes, I am confused to look at her mortifications, and I am undone to her envious weal. She seems sometimes looking like a usual people around me, sometimes I find her some how different, a different person who has no agitations, has no demand but maximum time I feel I am judging her wrong. Her eyes do not speak vile, her eyes don’t show aggressiveness, and her eyes seem to be very cold indeed Mama. Can you tell me Mama, is there any place where people do not have any cohabitations, has no enamours? Is there anywhere humankind who do not exchange for his efforts? If there was none, then what this person wants to get from me? She might be the most venereal one whom people should worship her and have confident with devotion or she might be one of the most evil creatures that I never encountered before. But I don’t want to be surprised another time. If I would know things certainly what is in her, she could be one of the most ecstatically joyful event in your son’s life or I could make a decision to reject with violent forces and finish her forever. Your prayer for your son’s longevity would be successful but I am in a state of wearied, tired and exhausted stage Mama. I cannot take a chance at this time of my full moon night. The judgment I made against her in one moment proves to be a mistake in the next time and I again start afresh. But every time I am lost in the state of confusion.

Mama: she shows me the way of going alone in a serious turning points, she insists me to take an adventure along the road of the Caucasus mountain that I never travel, she wants me to experience a life with deity and humanity together. But how it can be possible Mama? How a person can be a God and a human in the same time? I cannot pull things alone anymore. My silence punishes me, my ignorance beats me up there, my affection takes me somewhere I can’t return it back again. What I should do Mama? It seems to me an ordeal test and I cannot be free from angularity anytime because it creates a dilemma between true and false, right and wrong all the time.  Someone must not be hurt without any reason, someone should not be rejected without any good cause and someone should not be punished for another person’s prediction too.

Mama, she tells the story that you told me once, he delineates the path that I wanted to follow, she exactly tells me to do things what nobody told me before that I cherished in my life, she creates an environment that I wanted to preserve in my memory but every time I am afraid because I don’t know how she came to know all these ? I don’t know how to honor her nether I know how to leave her. My past haunts me to take revenge for all those souls that went without any reason, I want to go alone and take the adventure of taking the risk of either victory or defeat alone, none and none to share it. I know that none will be able to agree with such a condition of leaving this beautiful world so early in a n encounter. Mama, you know those entire stories and you apprised me such feelings of those events mama.

Mama, This strange lady dements me in the moment of my leisure time, she intoxicates me when I am alone and she enrages me when I am with your heart totally. She seems to be a wild wind that excited me when I had calm and quite nights, she overwhelmed me in a critical position to decide either to leave or to be with her as one of the member of a family. But is it too easy to get a family member like you and me? A family has a different definition and identity Mama! It is not that I agree and it goes. Hi my mama, I know vilification and animadversion is a sin in my religion but don’t you think we all do so many vilifications all the time against a person who in fact doesn’t deserve such? How a person like this, should be treated Mom? Mama, you never told me a subject, called decision at confusion, which people suffer from indecision and confusion in the same time and in the same area. This lady is confusion in my life. I don’t understand her, I don’t understand the consequences of the events and I don’t know the conclusion of this relationship Mama. He is not navigable and seems a new appearance and revelation in my life. No body showed me the path of the light, no body told me about the consequences of the life and no body told me about my strength and weaknesses that I posses. She told me once. I want to discover her Mama. But how? In what way? In which capacity?

I know, this particular person might disappear when I would come to know that she was the right woman to whom I needed, I know the time will not wait for me and the deity will go away from me when I will be needing her much. She seems to be  an angle or a devil in both cases. Sometimes you need devil also in your life in different situation to be more experience and be stronger at the moment of the break-even-point. It seems, she loves me like a small boy at times with all apology, she loves me like an unbounded wild man whom she wants to sacrifice things on behalf of me and he respects me the way you taught me to respect a person. But I don’t know the result of such confidence on this unknown lady came from a different planet. Is she a human, a devil, a ghost, or a goddess!  She is a total confusion at the moment Mama.

Right at this moment, the logical fallacy seems to be un-ruled in my mind, a holy bed of logic seems to be undetermined in my life, a holy thread slung over the shoulder may be unnoticed within me but I am not atheistical Mama, thus the heavenly dome seems to be under a throb greatly, the sudden bustle of the heart looks like stopping in the middle of it‘s palpitation and trepidations.  I have no instruments to devise a plan to dismiss her unnecessarily, to in-contrive her illogically and finish her in stray.  Mama, will you tell me the ways that saves me from this ignorance?  You know your Babu and his mind in terms of spick and span. I need someone to guide me in the right directions and ways to follow, Mama. It has become a twisting, revered, and twirled circumstance in my world. I need your suggestions and advices. I am utterly harried into a motionless life. Let me not be a subject to the prey of the legacy of unsoundness, let me not be a subject to be referred as a culprit to be known by the people around me, and, Mama, let me not be the only person to be blamed who refused the deity that came alone the line of a humankind from the God as usual to your Babu’s life.

I tried to explain the strange lady within the religion also. The strange person seems to have no similar religion that I believe, but Mama, can you tell me what is called religion? A religion to her is a scuffle fight and has no effect on human bondage at all. But to me my religion is having a great influence over the total human life. The answers that I was looking for and rom a long time in my previous religion, I was unable to delve out, but here what I received is something untold and authentic. What your religion says about Beautification of woman body, Laws regarding menstruation, false menstruation, the laws But to me my religion is having a great influence over the total human life. The answers that I was looking for and from a long time in my previous religion, I was unable to delve out, but here what I received is something untold and authentic. What your religion says about Beautification of woman body, Laws regarding menstruation, false menstruation, the laws pertaining to woman’s dress and hejab, laws pertaining to marriage and divorce, and many laws pertaining to protect nobility and chastity of woman etc and many other questions I was looking for. Even the incident of birth of Jesus, what not!!!!  Now the most important things came into the barrier of my decision: RELIGION. Sometimes I want to feel, a dead man has no religion. But we are not dead. Don’t you believe that one? Mama, the insolence of Glory and the divinity is alone defined by people but not the God. God is for every body. No matter how he practices it. If some one has profound love and conjurors to God, HE understands the mind of his creatures. He or she does not need to explain the modalities of her actions to Him. He is not a fool and HE commands the whole universe without any difficulties.  HE commands my strange lady also. But at the end of all logics, still certain rituality has to be graved and performed in person. Those are not similar to us. My religion strictly prohibits me to go forward but allows with a condition to convert her too. It is not an impossibility but unwise unless it happens within own self. Then what would be the mixing factor into next generation Mama? So confusing at this moment mama. I am getting sick of the reality everyday…..

The strange lady calls me sometimes her family, sometimes as a glaring minion; sometimes she breaks to me like a small girl as if to her mother. Sometimes she hits me and hits very harder. I can return the hit but I can’t. Why I can’t? I have no relationship with her yet. Even though I keep silent. Because she cares me always. I noticed, my silence again makes her desperate. She seems to be a crazy person altogether. Mama, I always wanted to avoid such person but I am unable to avoid her. I am breaking every moment and everywhere. I am breaking faster than she breaks to me. But I am not putting them in public. When I find her in pensive, it pails me out, it strikes my heart. I cannot say to her. Neither I can accept her too. In which category I will carry her Mama. She is not my sister, she is not my mother, she is not my wife, nor she is my girl friend in truest sense of a girl friend. She is just a stranger, and I know I will miss her soon.  I have nothing to present her except my memory, except my loneliness and sadness………….The stranger will remain as stranger to me whole life I think, Mama. Because we have so much of barrier in religion, culture, environments, social and attitudes. A candle-blaze is needed when we require them but a blaze into a hut is not accepted by any one. One blaze facilitates our life and another takes our life. I am the second category may be mama. I will burn it always but alone…..

৩১/০৫/২০১৬- সন্ধার গল্প

১ম পর্ব

মাঝে মাঝেই আমি তার চোখের কোনায় অশ্রু দেখতে পাই। মাঝে মাঝে আবার আমি তাঁকে অন্যমনস্কও হতে দেখি। নাম ধরে ডাকলে সে হটাত যেন কোন এক ভাবনার জগত থেকে সম্বিত ফিরে পেয়ে আতকে উঠে জিজ্ঞেস করে, কিছু বললাম কি? আমি যখন তাঁকে অনেক আদর করি, আমি যখন তাঁকে অনেক অনেক সপ্নের কথা বলি, তখনো দেখি তারমধ্যে কোথায় যেন একটা নির্বিকার ভাব। আমি যখন তাঁকে অতি আদরের সহিত আলিঙ্গন করে বুঝবার চেষ্টা করি কি হয়েছে তার, তখন বুঝি আখি তার আরও ভেজা, নিঃশ্বাস তার প্রবল ধীর, অথবা পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল মুক্ত পরিবেশের চেয়েও সে আরও চুপচাপ। মনে হয় মনের ভিতরের কোন এক ব্যাথায়  কান্নায় রুপান্তরিত হয়ে কান্নাটা আরও গভীর থেকে ঢেউয়ের মত উপচে পরছে আমার দুই কাধের শিরা দিয়ে, আমার বুকের চারিধার দিয়ে। 

ভয় হয় আমার, চিত্ত শঙ্কিত হয়ে উঠে কোন এক অজানা ভয়ে। নিজেকে প্রশ্ন করি, এমন কিছু কি আছে যা আমার কাছে নাই? এমন কি কিছু আছে যা আমি তাঁকে দিতে পারিনি অথচ সেটা তার অনেক দরকার অথচ সে মুখ ফুটে বলতে পারছে না? এমন কি কিছু আছে যা বলার জন্য সে বুকে সাহস জুগিয়ে উঠতে পারছে না অথচ বুক ব্যাথায় টনটন করছে? এমন কি কিছু হচ্ছে যা মানতে হচ্ছে অথচ মানা যাচ্ছে না? অনেক অজানা প্রশ্ন জাগে মনে। মাঝে মাঝে নিজেকে বড় দোষী মনে হয়। 

অনেক প্রশ্ন করেছি আমি তাঁকে। উত্তরে কখনো শুধু তার নির্বিকার আর নির্লিপ্ত চোখ আবারো জলে ভেসে গেছে, অথবা আরও নির্লিপ্ত হয়েছে বোবা এক অশরীরী জিবের মত। আবার কখনো উচ্ছল তরঙ্গের ন্যায় আমাকে অভাবিত এক ধাক্কায় নিমিষে ‘কিছুই না’ বলে ধর্তব্যের মধ্যেই বিষয়টি পরে না বলে তা উরিয়ে দিয়েছে। তারপরেও আমি তাঁকে পুনরায় সেই আগের মতই দেখেছি বারংবার, নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন নিথর কোন এক পাথরের মত।

আজ তার কথা শুনে শুধু তারই না, আমারও চোখ ভিজে এল শ্রাবনের ধারার মত।………

” আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। আমার বয়স তখন তের কি চৌদ্দ। সবে মাত্র স্কুল পাশ করে হাই স্কুলে পা রেখেছি। 

” আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। আমার বয়স তখন তের কি চৌদ্দ। সবে মাত্র স্কুল পাশ করে হাই স্কুলে পা রেখেছি। প্রতিদিন আমি স্কুলে যাই চোখের কোনায় অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখি, অনেক বড় হওয়ার আশা নিয়ে আমি দুরু দুরু পায়ে স্কুলের দিকে হেটে চলি। আমি কখনো স্কুল কামাই করেছি এমন রেকর্ড আমার ছিল না। আমার গন্ডি শুধু স্কুল আর আমার পরিবার, আমার ছোট্ট সে ঘর, যেখানে আমি বাস করি আমাকে নিয়ে আর আমার সাথে থাকে আমার ছোট ছোট কয়েক ভাই বোন।বেশ ভালই কাটছিল আমাদের সংসার।

একদিন আমি স্কুলে ক্লাসে স্যারের পড়া নিয়ে অনেক জটিল অংকের ফরমুলা নিজের মাথায় আটিসাটি করে বুঝার জন্য যখন অনেক মগ্ন, তখন হটাত করে আমার বাবা আমার ছোট ভাইকে দিয়ে স্কুলে খবর পাঠালেন বাড়ীতে যেতে হবে। মনে ভয় হল, কি হয়েছে বাড়ীতে? কারো কোন দুসসংবাদ নাতো? গুটিগুটি পায়ে ছোট ভাইয়ের হাতধরে কাছেই আমার বাড়ীতে পৌঁছে দেখি দলবেধে অনেকলোক আমাদের বাড়ীতে বসে কেউ পান খাচ্ছেন, কেউ আবার খোশ গল্প করছেন। মনটা যে অজানা ভয়ে এতক্ষন সংকিত ছিল তা আর রইল না। খারাপ কিছু হয় নাই তাহলে। কিন্তু আমি অনেক বোকা। আমার জানা ছিল না যে, আমার জন্য আরও কঠিন একটা সংকাজনক অধ্যায় অপেক্ষা করছিল।

আমি বাড়ীতে পা রাখতেই মনে হল, আমাকে নিয়ে যেন সবার একটা বাড়াবাড়ি, সবাই কি নিয়ে যেন কানাঘুষা করছে, মিটিমিটি হাসছেও। কেউ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে অথচ আমি তাদেরকে চিনি না, কেউ আবার আমার গালে হাত দিয়ে একটু আলতো করে টিপে দিয়ে বলছে, বাহ কি সুন্দর দেখতে। ইত্যাদি। মাকে বললাম, মা এরা কারা? মা মুচকি মুচকি হেসে দিয়ে বললেন, মা, তোমাকে ওরা দেখতে এসেছে। তাদের ছেলের জন্য।

নিমিষের মধ্যে আমার বুকের চারিপাশটা একটা ওসয্য যন্ত্রনায় আমাকে মুচড়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার পায়ের তল থেকে সবগুলো মাটি একসঙ্গে সরে যাচ্ছে। আমার চোখ সামনের কিছুই দেখছে না, সব ঝাপসা মনে হচ্ছে। মাকে বললাম, মা আমার পরাশুনা?

মা শুধু বললেন, দেখরে মা, আমরা অনেক বড়লোক নই। আমাদের এতো পরাশুনা করে কি হবে? কে আছে আমাদের? নিজেকে বড় অসহায় মনে হতে লাগলো। আমার বুকে জগদ্দল পাথরের মত একটা বিশাল পাথর এমনভাবে চেপে বসলো যে মনে হল আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কেউ আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। আমি আর নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমি দুর্বল নই কিন্তু আমি এখন প্রতিবাদ করার মত সাহস ও আমার নাই কিন্তু এটা বুঝতেছিলাম যে, আমাকে এই রাহু গন্ডি থেকে বের হতে হবে যে কোন উপায়ে।

লোকজন আমাকে দেখে গেলো। আমাকে নাকি খুব পছন্দ হয়েছে তাদের। এই কথার মধ্যেই তারা যাওয়ার সময় আমার বাবা মাকে বলে গেলেন, অচিরেই সম্ভাব্য সব কিছু তারা করে ফেলতে চান। শুভ কাজে নাকি বিলম্ব করতে নাই। কি আমার ভাগ্য। আমি কি চাই, আমার কি স্বপ্ন আর আমাকে নিয়ে সবাই কি স্বপ্ন দেখছে। নিজেকে মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে আমি ভগবানের কাছে অনেক কাদলাম সেই রাতে। আমার ভাল ঘুম হয় নাই। যেটুকু ঘুম আসে, শুধু দেখতে পাই চারিদিকে মানুষগুলো আমাকে ঠাট্টা তামাশা করছে, আর দেখতে পাই আমার সেই সখের স্কুল বেঞ্চ গুলো যেখানে আমার অনেক সপ্নের কথা লেখা আছে আমার কাঠ পেন্সিলের দাগে দাগে।

রাত পোহাতেই আমি বাবাকে বললাম, বাবা, আমাকে তুমি এখন বিয়ে দিও না। আমি পরতে চাই। বাবা খুব সহজ সরল মানুষ। কোন কিছুই অনি কারো উপর জোর করে চাপিয়ে দেন না আবার কেউ তার উপর কেউ কিছু জোর করে চাপিয়ে দিলেও তার প্রতিবাদ করতে শিখেন নাই। অনেক্ষন চুপ করে দাড়িয়ে থেকে বাবা বললেন, আচ্ছা দেখি আমার এক খুব পরিচিত আপন জন আছে তার কাছ থেকে আমি শলা পরামর্শ করে জানাবো। তিনি আমাদের পরিবার কে খুব ভাল করে চিনেন আর খুব জ্ঞ্যানি মানুষদের মধ্যে একজন।

বললাম, তাহলে আমাকেও নিয়ে চল।

বাবা তাই করলেন। ভদ্রলোক খুব বেশি বয়সের নন। খুব বেশি হলে হয়তবা সাতাইশ কি ত্রিশ বছরের হবেন। অসম্ভব ধিরস্থির মানুষ। অনেক লেখাপড়া করেন তার বইয়ের স্তর দেখলেই বুঝা যায়। হাতে চমৎকার একটি সোনালী রঙের ঘড়ি, তার বসার ঘরটাও বেশ সাজানো।

বাবাকে দেখেই বললেন, কি চাচা কেমন আছেন? হটাত কোন আগাম বার্তা না দিয়েই কি জন্য চলে এলেন? আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, কি নাম তোমার?

এমন করে নাম টা জিজ্ঞেস করলেন যেন তিনি আমাকে আরও কয়েকবার দেখেছেন কিন্তু এখন আর মনে করতে পারছেন না।

তিনি আর কেউ নন, তিনি সেই আপনি।

আমার বিয়ের কথা শুনেই আপনি আমার বাবাকে এমন করে ধমক দিলেন যে, আমার বাবার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না আপনার কথার বাইরে কিছু করেন।

আমার আবার স্কুলের দরজা চালু হয়ে গেল। খুব ভাল লেগেছিল আপনাকে। পায়ে ধরে আপনাকে আমার সালাম করতে ইচ্ছে করেছিল সেদিন। তারপরের কাহিনী আপনি আর জানে না। কারন সবাই ধরে নিল, আপনাকে দিয়ে আমাদের বাড়ীর আর যাই হোক বেশি উপকার হবে না কারন আপনি একাই সব সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারেন, সে ক্ষমতা আপনার আছে ছিল এবং সেটা আমি দেখেছি।

দিন যায় মাস যায়, আমি তখন মেট্রিক পরীক্ষার ছাত্রী। ইতিমধ্যে অর্ধেক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আর মাত্র দুইটা পরীক্ষা বাকি। ভাল পরীক্ষা হচ্ছে। তারপরেই আমি কলেজে ভর্তি হয়ে যাব। নতুন স্বপ্ন, নতুন দিগন্ত, নতুন ইচ্ছা। ঠিক পরীক্ষার আগের দিন সকাল হতে না হতেই আবার আরেক নতুন দল এসে হাজির আমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার সারা শরীর ভয়ে হিম হয়ে আসছিল, একটু পরে আমার পরীক্ষা। যাকেই বলি, সে ই বলে, পরীক্ষা দিতে যেতে হবে না। ভাল পাত্র, সারা বছর ঘরের ধানের ভাত খায়। বাড়ীতে পাকা বিল্ডিং আছে। কত কিছু। আমি ঈশ্বরকে শুধু ডাকলাম। আমার মাথা কোন কিছুতেই কাজ করছিল না। কি হবে আমার পরীক্ষার, কি হবে আমার জীবনের? কেন কেউ আমাকে একটুও বুঝতে চাইছে না? আমার চোখ ভোরে শুধু কান্না পাচ্ছিল।

আমার শুধু আপনার কথা মনে হচ্ছিল সারাক্ষন। কিন্তু আমার কাছে না আছে আপনার কোন নাম্বার, না আছে কোন মাধ্যম যোগাযোগের।

মানুষ যখন খুব অন্তর দিয়ে ঈশ্বর কে ডাকে তিনি তার সারা দেন। আমি বাথ রুমের নাম করে কোন কাপড় চোপর না পাল্টিয়ে জুতা ছেড়ে খালি পায়ে সোজা পিছনের দরজা দিয়ে দৌর আর দৌর দিতে থাকলাম। আমার লক্ষ ঐ পরীক্ষার হল। যে করেই হোক আমাকে ই পরীক্ষার হলে পৌঁছতে হবে। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। আমি যখন পৌঁছলাম, তখন ইতিমধ্যে দের ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমাকে দেখে আমার সব শিক্ষকরা এতটাই অবাক হলেন আর আমার চেহারা, চোখের পানিতে ভেজা আমার নয়ন দেখে তারা এতটাই উদ্বিগ্ন হলেন যে, আমাকে অন্তত আদর করে প্রধান শিক্ষকের রুমে নিয়ে পরীক্ষা তা দেওয়ার সুযোগ করে দিলেন।

আর ওদিকে আমাকে কোথাও না পেয়ে আমি পলায়ন করেছি এই মর্মে সবাই আমাকে প্রচন্ড দোষারোপ করতে কেউ একটুও পিছপা হলেন না। পরীক্ষা দিয়ে আমি আর আমাদের বাসায় ফিরে না গিয়ে আমার এক বন্ধুর বাসায় দুই দিন থেকে পরিক্ষাটা শেষ করলাম। মনে হল অন্তত একটা ধাপ তো পার করলাম?

এবার শুরু হল আরেক নতুন বিপদ। পরীক্ষার ফল বের হয়েছে কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে কলেজে ভর্তি করতে নারাজ কারন আমার পরিবারের কেউ আমাকে আর পরাবেন না এবং অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করছেন এই মর্মে কলেজ কর্তৃপক্ষকে সাফ জানিয়ে রেখেছেন। যাতে আমার কোন ভর্তি না করানো হয়। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হল। আজ মনে হল, আমি অসহায় নই আমি মানুষের অত্যাচারের কাছে জিম্মি। আমিও সেদিন শপথ করেছিলাম, আমি আমার ইচ্ছাকে অকালে মৃত্যু বরন করতে দেব না। কিন্তু কিভাবে? খুব খুজেছি আমি আপনাকে। কত জায়গায় যে আমি আপনাকে খুজেছি, কত মানুষের পিছন থেকে চেহারা দেখে মনে হয়েছে এই বুঝি আপনি। কত দিন যে আমি ঐ রাস্তার ধারে অপেক্ষা করেছি যদি কোনদিন আপনি ঐ রাস্তায় কখনো আসেন। আপনি কখনো আসেন নাই।

আমি এই ভাবে কতবার যে আমার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের আসর ভেঙ্গে বার বার পলায়ন করেছি তার কোন ইয়ত্তা নাই। আর এভাবেই আমার মনে বিয়ে নামক জিনিসটা একেবারে বিরক্ত আর ঘৃণায় ভোরে গেলো। কেউ আমাকে দশ ভরি সোনা দেবে, করো বিয়া, কেউ আমাকে দুই লাখ টাকার কাবিন করবে , তো করো বিয়া, কেউ আবার আমাকে রাজ রানী করে রাখবে, করো তাঁকে বিয়া, কেউ আবার একেবারে বকলম কিন্তু চেহারা সুন্দ, তো করো তাঁকে বিয়া। কি এক অসজ্য যন্ত্রণায় আমি আর পেরে উঠতে পারছিলাম না। তারপরেও আমি আমার সাথে প্রতারনা করতে পারিনি। আমি কলেজের পড়াটাও শেষ করতে পারলাম।

গল্পটা এখানেই শেষ নয়, মাত্র শুরু…

তারপর ……

কলেজের কেউ আমাকে ভর্তি করছে না। যখনই যাই, তখনই শুনি হয় অমুক স্যার নাই, আজ হবেনা, পরের দিন গেলে বলে আজ ফর্ম নাই, দুইদিন দেরি হবে। আবার যাই, তো শুনি ঐ কাগজ লাগবে তো ঐ কাগজ লাগবে। অনেক বিরম্বনা। মনে হল, কোথায় যেন কি ঠিক নাই। কলেজে ভর্তি হতে কি এমন হয়? তাহলে অন্য সব ছেলেমেয়েরা কি করে এতো সহজে ভর্তি হতে পারল? অথচ আমার বেলায় হচ্ছে না কেন? মন টা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল প্রতিদিন। প্রায় প্রতিদিন যাই, আর প্রতিদিন ই মন খারাপ করে ফিরে আসি। একদিন আমার এক ম্যাডাম আমাকে কাছে ডাকে নিয়ে বললেন, শুন সন্ধ্যা, তুমি এই কলেজে ভর্তি হতে পারবেনা কারন কয়েকদিন আগে এখানকার নেতা গোছের একলোক এসেছিল আমাদের কলেজে। এসে বলে গেছে তোমাকে সে ভালবাসে, তোমার সাথে ওর বিয়ে হবে, আর তাই তোমাকে আর তারা পরাতে চায় না। তাই কলেজ থেকে কেউ সাহস করছে না তোমাকে ভর্তি ফর্ম দিতে। আমি যে তোমাকে এ কথাগুলো বললাম, তুমি আমার নাম বল না। যদি সত্যি সত্যি ভর্তি হতে চাও, এমন কাউকে নিয়া আস যাকে এই সব লোকেরা ভয় পায়।

মনটা আমার এতো খারাপ হয়ে গেলো যে, আমার দুচোখ দিয়ে শুধু পানি পরতে লাগলো আর আমার বাবা মার উপর রাগ হতে লাগলো। আমার বাবা বা মা কি কখনোই আমাকে বুঝার চেষ্টা করবে না? আমি কি এতই বোঝা হয়ে উঠেছি তাদের উপর? নিজের কাছে নিজেকে একটা অমানুষ মনে হল আমার। আমার প্রচন্ড রাগ হতে লাগলো। মনে মনে ভাবলাম, কে আছে এমন যে এই কঠিন একটা বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করতে পারে? আমি আমার জগতের সব আনাচে কানাচে সমুদের সুই খোঁজার মত করে খুজতে লাগলাম, কে আছে এমন সেই ব্যাক্তি? আমাদের কেউ আত্মীয়? বা আমার কোন পরিচিত মানুষ? নাহ, আমি কোথাও ভরসা করার মত কাউকে খুজে পেলাম না। আর যার কথা আমার বহুবার মনে হয়েছে সে আপনি। যখনই আমি কোন বিপদে পরি, আমি শুধু আপনার নামটাই মনে করি। আর ভাবি, কোথায় এই লোকটাকে পাব? আমি তো তার কোন সন্ধান জানি না। সন্ধান যে করি নাই তা নয়।

আমি আপনার অফিসে অনেকবার এসেছিলাম একা একা। কয়েকবার। কিন্তু আমার কি কপাল, কখনোই আমি আপনার নাগাল পাই নাই। হয় আপনি এইমাত্র বের হয়ে গেছেন না হয় ঐদিন আপনি অফিসেই আসেন নাই। ফিরে যেতে যেতে আমি শুধু কেদেছি আর ভেবেহি, আমার কি কেউ নাই? আপনার উপর আমার অহেতুক খুব রাগ হত। মাঝে মাঝে আমি আপনার উপর খুব অভিমান করতাম। মাঝে মাঝে আমি আপনার কাছে মিথ্যা মিথ্যা চিঠি লিখতাম আবার ছিরে ফেলতাম। কেন জানি মনে হত, আপনাকে আমার খুব দরকার। কলেজের ভরতির দিন প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এমন সময় আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সবাইতো আপনাকে চিনে। আর সবাই আপনাকে যে মানে এটা আমি জানতাম। আমি কম্পিউটারে কম্পোজ করে প্রিন্সিপ্যালের নামে একটা চিঠি লিখলাম আপনার নাম দিয়ে। যেখানে বলা ছিল যে, একজন ছাত্রীকে পাঠালাম, আপনার কলেজে ভর্তি করিয়ে নেবেন। বিস্তারিত পরে আলাপ  ইতি আপনার নাম।  

মধুর ন্যায় চিঠিটা কাজে লাগলো। আমি তো অবাক। প্রিন্সিপ্যাল সাহেব শুধু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি আপনাকে কেমন করে চিনি। আমি বেশি কথা না বলে শুধু বললাম, আমি তার আত্মীয়। ঠিক ঐ মুহূর্তে আমি যেন তার কাছে অতি ভক্তির একজন লোক হয়ে গেলাম। আমার ভর্তি হয়ে গেলো। মনটা তৃপ্তিতে ভরে উঠল, আমাদের পরিবারের কেউ জানল না যে আমার কলেজে ভর্তির সব কিছু হয়ে গেছে।

এতদিন যে অভিমান তা আপনার উপর আমার ছিল আজ যেন তা এক ভালবাসায় রূপ নিল। আমার বড্ড ভাল কাটল দিনের বাকি অংশটা। একটা মানুষের মিথ্যা এক খানা চিঠি এতো কাজ করে, তা আমার জানা ছিল না। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করল না আসলেই এই চিঠি তার লেখা কিনা। হয়ত কারো মাথায় এটা আসেই না যে, কেউ তার নামে মিথ্যা একটা পত্র নিয়ে এমন জালিয়াতি করতে পারে। আর হতেও তো পারে চিঠিটি অনিই লিখেছে। জিজ্ঞেস করলে যদি আবার তিনি মনে কিছু করেন, তাই হয়ত কেউ জিজ্ঞেস করার সাহসই হয় নাই। কিন্তু ব্যাপারটা ঘটলো।

কলেজ শুরু হতে হতে কয়েক মাস বাকি। এরমধ্যে আমি কদিন পরপরই বিয়ের সাজে বসি আর আমার সাধ্যমত বিয়ে ঠেকাই। কখনো কান্নাকাটি করে, কখনো বাড়ি থেকে পালিয়ে, আবার কখনো অত্যন্ত বাজে ব্যবহার করে আবার কখনো বড় কে নাজেহাল করে। কি যে এক পরিস্থিতি আমার। এরই মধ্যে গ্রামে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। আমাদের বাড়ীর পাশে প্রিয়াংকা নামের একটি মেয়েকে জোর করে বিয়েতে রাজি করানোর কারনে রাতে কাউকে না বলে সে আত্মাহুতি দিয়ে লিখে গেলো, ……আমি পরতে চেয়েছিলাম, আর তোমরা আমাকে পরতে না দিয়ে বিয়ে দিতে চেয়েছিলে। আমিই যদি ভাল না থাকি তাহলে আমার বিয়ে দিয়ে তোমরা কি সুখে থাকবে? তাই আমি তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে একেবারে সবার থেকে দূরে চলে গেলাম। তোমরা ভাল থেক। তোমরা আমাকে কেউ ভালবাসনি।”

ঘটনাটা গ্রামের চারিদিকে এতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে, আমি এই ফাকে কিছুদিন যত পদের বিয়ের আয়োজন ছিল তা বন্ধ রইল। শুধু তাই নয়, গ্রামে একটার পর একটা যুবতি মেয়েদের সংসার শুধু ভাঙতে শুরু করল। কেউ স্বামীর অত্যাচারে, কেউ যৌতুকের অত্যাচারে, কেউ শ্বশুর বাড়ীর অত্যাচারে, কেউ অন্য কারনে। আমার ক্লাসে পরত এমন চেনা কয়েক জন স্বামীর ঘর ছেড়ে একেবারে বাপের আগের আস্তানায় ফিরে এল। কেউ সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে কেউ আবার একা। বাল্য বিবাহের অনেক দোষ। কনে জানে না কি করে সংসার রক্ষা করতে হয় আবার বরের পক্ষ জানে না এই নিষ্পাপ কনেকে কিভাবে নিজের বাড়ীতে নতুন একজন আদুরে সদস্য করে মানিয়ে নিতে হয়। কেউ ছাড় দেয় না।

আমি আমার কলেজের পরাশুনা চালাতে লাগলাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার শুরু হল, সেই পুরানো উপদ্রব। বিয়ে কর আর বিয়ে কর। আমি এই বিয়ে নামক ঘটনাটা আমার মাথায় একটা বিষ ফোড়ার মত ঘুরতে লাগলো। বিয়ে জিনিস টা আমার কাছে এখন আতঙ্কের মত মনে হতে লাগলো। কি হবে এ রকম বিয়ে করে যেখানে একটা মেয়ে তার নিজের কোন দাম নাই, তার নিজস্ব কোন সত্তা নাই? 

বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমি এইবার লাগামহীন ভাবে শক্ত হয়ে গেলাম। আমি বিয়ে করব না, আমি জীবনেও বিয়ে করব না এই প্রতিজ্ঞা সবাইকে জানিয়ে দিলাম। আর মনে মনে ভাবলাম, আমি আসলেই বিয়ে করব না।

পরীক্ষার ঠিক কয়েকদিন আগে আমার বড় জ্যাঠা আমাকে এইবার বিয়ে দিয়েই ছারবেন বলে মনঃস্থির করলেন। বাবাকে খুব অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করলেন। বাড়ীর অন্যান্য মানুষগুলো যেন শিকা ছিরে দই পরলে যেমন কুকুর আনন্দ করে ঠিক তার মত মনে হল। আমি ঠায় আমার রুমে দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম। আমি কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম ঠিক বুঝতে পারি নাই। হটাত একটা অদ্ভুত শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। দরজার খিল খুলতেই দেখি আমার জ্যাঠা, কাকি, মামি সবাই দরজার সামনে দাড়িয়ে। কাজি এসেছে, আজকেই আমার বিয়ে। আমার আর কোন কিছুই সয্য হচ্ছিল না। নিপীড়নের একটা সিমা থাকে। ওরা সবাই অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে।

কিছুই বললাম না। আমি জানি এখন আমার কথা কেউ শুনবে না। বাড়ীতে বিয়ের সরঞ্জামাদি চলতে থাকল, পান পাতা দিয়ে ঢালি সাজানো হল, মাছ, দাব, ফল মুল কত কিছু সব তৈরি করা হল। আমি জানি না কে আমার বড়, কোথায় আমার বিয়ে, ছেলে কি করে। আমাকে কোরবানির পশুর মত ঝাপ্টে ধরে গায়ে হলুদের জায়গায় নিয়ে বসান হল। আমার গায়ে হলুদ হয়ে গেলো। সারা শরীরে হলুদের গন্ধ। মনে হচ্ছে মরা মানুষের গায়ে থেকে যেমন গন্ধ আসে, আমার গায়ে হলুদের গন্দে যেন আমার তাই মনে হচ্ছিল। প্রতিটি মুহূর্তে আমি আমার জীবনের কি হতে যাচ্ছে তা কল্পনা করেও কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। আর ভাবছিলাম কি করে এখান থেকে পালানো যায়। আমি শান্ত হয়ে বসে ছিলাম কিন্তু ভিতরে আমার অশান্ত ঝড় চলছে। আমাকে শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে বাড়ীর সবাই মনে করল, আজ আমার কোন সমস্যা নাই। আমি সব কিছুতেই সহজ করে মেনে নিয়েছি। আর এই সুযোগ টাই আমি নিতে চেয়েছিলাম। আমি বিয়ের আসর থেকে পলাইলাম।

আমার কেউ নাই। কোথায় যাব, কার কাছে যাব। শেষ পর্যন্ত আমি আমার নানিদের বাসায় নানিকে আমার সমস্ত কষ্টের কথা বললাম। নানি আমাকে তাদের ছোট একটা জায়গায় সারাদিন বন্দি থাকতে বললেন আর আমিও তাই করলাম। ছেলেপক্ষ মেয়েকে না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, অনেক আজেবাজে অপবাদ দিয়ে, চরিত্রের সবগুলো কালিমা লেপন করে যা মনে আসে তাইই বলে একেবারে বিদায় নিলেন। আমি পনের দিন পর ঐ গোপন আস্তানা থেকে বের হলাম। কোথায় ছিলাম, কার সঙ্গে পালিয়েছি, কেমন করে পালিয়েছি তার অনেক বিস্তারিত ইতিহাস অনেকেই জানতে চাইলেও আমি আর ঐসব নিয়ে কথা বলার কোন রুচি মনে করি নাই।

কোন রকমে কলেজ পাশ করেছি। এইবার তো আমার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির পালা। কিন্তু এটা তো আর আমাদের গ্রামের কলেজের মত নয় যে আবারো আমি আপনার নাম ভাঙ্গিয়ে সরাসরি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাব। এটা আমার জন্য বিশাল পাহারের মত মনে হল। কাউকেই কিছু বলার অবকাশ নাই, কেউ যে আমাকে একটা উপদেশ দিবে সেই মানুষটিও নাই। অথচ আমার কাউকে খুব দরকার। তারপরেও মনে হল, আপনাকে আমি খুজে বের করবই। আপনিই পারবেন এখন আমাকে এই স্থূল এবং বিরাটকায় সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু কোথায় আপনি?

ভাগ্য যখন সুপ্রসন্ন হয়, ভাগ্যদেবি তখন ঘরে পদার্পণ করে। কি আশ্চর্য, গ্রামের চারিদিকে একটা খবর ব্রেকিং নিউজের মত ছরিয়ে পড়ল। আপনি গ্রামে আসবেন। গ্রামের কার কি লাভ হবে আমি জানি না, কিন্তু আমি ঈশ্বরকে এই বলে কত যে প্রনাম করলাম যে, এইবার আমি আপনার সঙ্গে দেখা হবেই।

আপনি আমাদের গ্রামে এলেন এবং খুব ঘটা করেই এলেন। চারিদিকে পোস্টার, চারিদিকে চিঠি বিলি, আপনি আসছেন। গ্রামের কত লোক যে আপনার আসার অপেক্ষায় আছে। কেউ অপেক্ষায় আছে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য, কেউ অপেক্ষায় আছে রাজনৈতিক লাভের জন্য, কেউ অপেক্ষায় আছে শুধু আপনাকে ভালবাসে বলে। আমিও তাদের মধ্যে একজন। মনে হল, আমি আপনাকে কত যুগ ধরে চিনি, কত কাছ থেকে চিনি অথচ আপনি আমাকে কখনো মনেও রাখেন নাই।

আপনি এলেন। সঙ্গে কত লোক আপনার। সারিসারি গাড়ি। কেউ নোট বই, কেউ ছাতা ধরা, কেউ আবার আপনার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য এক মুহূর্ত অপেক্ষা। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি ঐ সভাস্থলে। কখন আমি আপনাকে পাই।

আপনার কাজ শেষ। খাওয়া দাওয়া শেষ। আমার বুকের ভিতর কম্পন হচ্ছিল এই বুঝি আমি এতদিনের অপেক্ষার পালাটাকে হারিয়ে ফেলতেছি। আমার বুকে তখন দুরুদুরু কম্পন কিন্তু আমাকে যে পারতেই হবে। সাহস করে আমি আপনার একেবারে কাছে চলে এলাম। আপনি আমাকে দেখলেন। কাছে ডাকলেন। আমার বুক তখন ভুমি কম্পনের মত কাপছে।

আনার চোখে চোখে আমার চোখ পড়ল। আমি মুষড়ে যেতে থাকলাম। আপনি জান্তেও পারলেন না আমার ভিতরে কত বেগে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। আমার দিকে কিছুক্ষ তাকিয়ে থেকে নিজ থেকেই আমাকে ডেকে বললেন, কোথায় যেন আমি তোমাকে দেখেছিলাম?

আমার দুচোখ ভরে শুধু পানি শ্রাবনের ধারার মত ঝরতে লাগলো। আমি বললাম, আমি আপনার অমুক চাচার মেয়ে।

ও আচ্ছা, হ্যা তুমি তো একবার আমার কাছে গিয়েছিলে? কি করছ এখন? কোথায় পরাশুনা করছ? আর তুমি কাদছ কেন?

আমি শুধু কম্পিত গলায় এইটুকু বলতে পেরেছিলাম, আমি পরতে চাই, আমি বিয়ে করতে চাই না। অসংখ্য মানুষের ভিরে আমি কি বলেছি আর কি বলতে চেয়েছি, আমার মনে নাই। অনেক বার আমি বাড়ীতে একা একা কি বলব তা নিজে থেকে অনুশিলনও করেছিলাম কিন্তু সেই অনুশিলন কিছুই কাজে লাগে নাই আপনার সামনে এসে। সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। আমি মাথা নিচু করেছিলাম। বুদ্ধিমান মানুষদের সবকথা বলতে হয় না। আপনি এই দুই কথায় আমার অনেক কথার উত্তর যেন পেয়ে গেলেন। আপনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ঠিক আছে, আমি তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব। আপনি আমাকে আপনার ফোন নাম্বারটা দিলেন। কি অদ্ভুদ আমার শিহরন। আমার মনে হয়েছিল, আমাকে আজ পর্যন্ত এই ভাবে কেউ ছুয়ে দেয় নাই। আমাকে আজ অবধি কেউ বলে নাই, ঠিক আছে আমি তোমার কথা শুনব। আজ মনে হল, আপনি আমাকে ছুয়ে দিয়েছেন, আমাকে আদর করেছেন, আমাকে শুনবেন এই আশ্বাস দিয়েছেন। একটা ফোন নাম্বার আর কিছুই না। আমি আপনার ফোন নাম্বার টা যে কতবার লিখেছি, আপনার নাম টা যে আমি কতবার লিখেছি। আমি সেই রাতে ঘুমুতে পারি নাই। শুধু আমার কাছে ঐ যে শিহরন, ঐ যে স্পর্শ, ঐযে চোখের চাহনি, আমাকে অনেক অনেক রাত অবধি জাগিয়ে রেখেছিল। আমি কি আপনাকে ভালবাসি? আমি কি আপনাকে দেবতা বলে জানি? আমি কি কারনে আপনাকে এক মুহূর্তে জন্য ও ভুলতে পারছি না? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? আমি কি কোন অলিক কিছু ভাবছি? আমার বাবা মা, জ্যাঠা, গ্রামের অনেকেই আমার এই অসভ্যতা পছন্দ করে নাই। আমাকে টার জন্য অনেক যন্ত্রনা সজ্য করতে হয়েছে বেশ কয়েকদিন। গ্রামের মানুষ অন্য সব কিছু ফেলে দিয়ে যেন আমার এই ঘটনাতাই আলাপের বস্তু হয়ে দারিয়েছিল। আমি তাতে কিছুই মনে করি নাই। পৃথিবীতে এতো মানুষ, চারিদিকে এতো জন মুখর পরিবেশ, কিন্তু কাউকে কিছু বলবার মত মানুষ পাওয়া বড়ই দায়।

আমি আপনার ফোন নাম্বার পেয়েছি কিন্তু আমার কোন ফোন নাই। তাই আমি একদিন অনেক সাহস করে পাশে বাজারের এক ফনের দোকান থেকে আপনার নাম্বারে আমি ফোন দিলাম। আমি জানি না ঐ সময়ে আপনাকে ফোন দেওয়া ঠিক ছিল কিনা। অনেক্ষন রিং হল কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ আমার ফোনটা ধরল না। মনে মনে একটা কি ধরনের যেন ভয়-কম্পিত অনুভুতি কাজ করছিল আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু ফোনটা না ধরাতে আবার মনে হল, ভালই হয়েছে।

তারপরের দিন আবার আমি আপনাকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আপনি এবারও ফোন ধরলেন না। প্রথমদিন ফোন না ধরাতে বিশেষ কিছু মনে হয়নি কিন্তু দ্বিতীয় দিন ফোন না ধরাতে আমার কাছে ব্যাপারটায় একটু খটকা লেগেছিল। আমি আবারো ফোন দিয়েছিলাম। অনবরত রিং হচ্ছে কিন্তু পাশে কি কেউ নাই যে ফোনটা ধরে?

এইভাবে আমি আপনাকে দিনের পর দিন অন্তত প্রতিদিন একবার করে ফোন করতে লাগলাম আর বিফল মনোরথে বাড়ীতে ফিরে এলাম। বাজারের ফোনের দোকানদারও একটু বিরক্ত হতে শুরু করলেন। কাকে ফোন দিচ্ছেন যে ফোন ধরে না সে? আমি দোকানদারকে কিছুই বলতে চাইনি কাকে ফোন দিচ্ছি। কারন নাম বললেই দোকানদার তাঁকে চিন্তে পারবে।

এমন করে প্রায় দু সপ্তাহ পার হয়ে গেলো। একদিন দোকানদার আমাকে একটা পরামর্শ দিলেন।

‘দেখুন, এমনও হতে পারে যে তিনি অপরিচিত নাম্বার ধরেন না। তার থেকে একটা এসএমএস করে দিন। ধরলেও ধরতে পারে।

ব্যাপারটা খুব কাজে লাগলো। আমি সংক্ষিপ্ত একটা এসএমএস দিলাম, “আমি সন্ধ্যা, অমুক চাচার মেয়ে”।

ম্যাসেজটা বুলেটের মত কাজ করল। ঠিক কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনি আমাকে ফোন করলেন ঐ বাজারের নাম্বারে। আমি আপনার ফোন পেয়ে আত্তহারা হয়ে গেলাম। এই যে গত কয়েকদিন আমি আপনাকে চেষ্টা করেও পাচ্ছিলাম না, তার সবগুলো কষ্ট আমার এক নিমিষের মধ্যে শেষ হয়ে গেলো।

মনে হল আপনি ব্যাস্ত ছিলেন। আমাকে শুধু বললেন, আগামি অমুক দিন তুমি আমার অফিসে এতটার মধ্যে চলে আস। আমি থাকবো।

আমি আপনার অফিস চিনি। কিন্তু জানি নাই কখন আপনি অফিসে থাকেন। এবার আর মিস হবে না আমি জানি। আমার চিত্ত বিকশিত হয়ে উঠল। দোকানদারকে আমি অনেক অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ভাই, অনেক উপকার করলেন।

আমার আর দিন কাটে না, রাত কাটে না। কবে আসবে সেইদিন। আমি যাব আপনার কাছে। দেখা হবে আপনার সাথে। কথা হবে মুখুমুখি বসে। আমার যত কথা, সব বলব আপনাকে। পারবো তো? (চলবে)

নির্দিষ্ট দিনটি অবশেষে এলো। খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেছি। আকাশটা আমার মনের মতো ফুরফুরা নয়, একটু মেঘলা। যে কনো সময় ঝুপ করে বৃষ্টি হতে পারে। আমি আমার সব গুলি কাজ যথাসময়ে শেষ করে কাউকে কিছুই না বলে নিজের মতো করে সকাল সকালই বের হয়ে গেলাম। ছাতাটি সঙ্গে নিতে চেয়েছিলাম কিন্তু যখন পুনরায় মনে হলো, তখন আমি বাড়ী থেকে অনেক দূর হেটে চলে এসেছি। ফিরে গেলে হয়ত দেরী হয়ে যাবে এই আশঙ্কায় আর ছাতার জন্য ফেরা হল না।

প্রায় আধাঘন্টা ধরে আমি একটা রিক্সায় চড়ে আমি আপনার অফিসের সামনে এলাম। আজ আর আপনাকে না পাওয়ার আশংকা আমার ছিলো না। আমি আজ আপনাকে পাবো, সেটা আমার মন নিশ্চিত ছিলো। আমি আপনার অফিসের গেটে …………(চলবে)

৬/৫/২০১৬-রুনার গল্প 

সেদিন সমস্ত দিন বাহিরে ঝড় বৃষ্টি হইতেছিল। কিন্তু বিকালে আকাশ বড় পরিস্কার নীলদিগন্ত লইয়া, পৃথিবী তাহার সবুজ গাছপালার ঢালপালা সাজাইয়া খুব শান্ত হইয়া বসিয়াছিল। এই ঋতুতে কখন আকাশ মেঘলা হইয়া যায় আবার কখন ঝরঝর করিয়া আগাম কোন সংকেত না দিয়া অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়, তাহার কোন হদিস থাকে না যদিও আজ এই পরন্ত বিকালে কোন সংকেতবিহিন এইরূপ অঘটন ঘটিবে বলিয়া মনে হইতেছে না।   

এমনি এক বিকালে "সুখালয়" এর প্রকান্ড বাড়িটার সামনে সবুজ লনের মধ্যে মা শেলি আর তার অষ্টাদশী রুনা চুপচাপ বসিয়া আছে। কাহারো মুখে কোন কথা নাই। অনেক্ষন ধরিয়াই শেলি কোন কথা না বলিয়া দুরের আকাশের দিকে আনমনে তাকাইয়া কি যেন গভিরভাবে ভাবিতেছে তাহার মুখ দেখিয়া তাহা বুঝিবার উপায় নাই। তবে তাহার মনটা যে বড় বিষণ্ণ এ ব্যাপারে নিশ্চিত করিয়া বলা যায়। পাশেই একটা মেলামিনের কাপে গরম কিছু চা লইয়া তারই অষ্টাদশী চঞ্চলা রুনা মায়ের কথা শুনিবার জন্য বসিয়া আছে। তাহারও মন খুব একটা শান্ত কিংবা চঞ্চলা কিনা বুঝা যাইতেছে না। তবে দুইজনের মনের অবস্থা নিরিক্ষা করিয়া এইটুকুন উপলব্ধি করা যায় যে, কোন এক ঝড়ের পূর্বের থমথমে মেঘময় নীলিমার মত, অথবা ঝড়ের প্রাক্কালে বাতাসেরা যেমন তাহাদের পরবর্তী গতিপথের নিশানা ঠিক করিবার জন্য শল্য পরামর্শ করার তাগিদে একেবারে নিসচুপ হইয়া যায়, অথবা ভুতলের সব বৃক্ষরাজিরা ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার লক্ষে পূর্বপ্রস্তুতিমুলক যতসব কার্যপ্রণালী আছে তাহার ব্যাপক আয়োজন চালায়, ঠিক ঐ রকম একটা থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হইয়াছে।   

রুনা শেলির একমাত্র মেয়ে। বড় চঞ্চল এক চপলা কিশোরী। কিন্তু পিতার অভাবে বড় আদুরের রুনাকে শেলি কখনো কোন কষ্টের ভার নিতে দেয় নাই। এই সমাজ সংসারে যাহা কিছু সম্মান আর আনন্দের সহিত ভোগ করা যায়, তাহার কোনকিছুই শেলি রুনার জন্য কমতি রাখে নাই। একইসঙ্গে শেলি রুনার মা এবং বাবার দায়িত্ব পালনে কখনো ব্যর্থ হন নাই। ভাল স্কুল, দামী গাড়ি, প্রকান্ড বাড়ি, সুন্দর সুন্দর পোশাক-আসাকে শেলি রুনার জীবন একেবারে ভরিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু আজ শেলি রুনার কাছে বড় অসহায়। তাহার অষ্টাদশী রুনা আজ শেলিকে এমন কিছুর সামনে আনিয়া দাঁড় করাইয়াছে যেখানে শেলি না পারিতেছে তাহার অতীত জিবনের কাহিনী শুনাইতে, না পারিতেছে তাহার সেই অতীত কাহিনী কোনভাবে লুকাইতে। রুনা পন করিয়াছে, সে তাহার পূর্বপুরুষের ইতিহাস, বিশেষ করিয়া তাহার জন্মদাতা পিতা, পিতামহির কথা তাহাকে জানাইতেই হইবে। না জানিতে পারিলে তাহার এই সমাজে এই সংসারে থাকিবার মত আর কোন গতিও নাই, কাহারো কাছে তাহার মুখ দেখাইবার মত পরিস্থিতিও নাই। আর তাহা না হইলে অচিরেই হয়ত রুনা তাহার যাহা আছে সব কিছু ছারিয়া অন্য কোথাও মুখ লুকাইয়া বাচিয়া যাইবে। এমন একটা পরিবেশে শেলির কাছে সমস্ত মানবজীবন আর বিশ্বরচনা এক দুর্ভেদ্য বলিয়া মনে হইতে লাগিল। কি দিয়া কোথা হইতে কি শুরু করিবে আর কোথায় গিয়া তাহার এই দুর্ভেদ্য রচনা শেষ করিবে, তাহার আগাগোরা কিছুই শেলির মাথায় আসিতেছিল না। 

চায়ের কাপে চুমু দিতে দিতে রুনা মায়ের দিকে কয়েকবার আড় চোখে তাকাইল। মায়ের এই অতিব নিসচুপ বৈশিষ্ট রুনার কাছে আজ প্রথম নয়। মাকে যখন হইতে রুনা বুঝিতে শিখিয়াছে, তখন হইতেই সে দেখিয়াছে তিনি কোথাও বেড়াইতে যান না, তাহার কোন একান্ত বন্ধু বা বান্ধবি আছে তাহাও না, কাহারো সঙ্গে মা খুব একটা মিশেনও না। চাপরাশি, আর্দালি, পিয়ন সবাই যার যার কাজ করিয়া দিয়া যায়, এত বড় ব্যবসার কোথায় কি হইতেছে তাহার প্রতিদিনের হিসাব মা না রাখিলেও ব্যবসা যে ঠিকমতই চলিতেছে মা তাহার হিসাব হয়ত রাখেন। দিনের অধিকাংশ সময়ে মা ঘরেই থাকেন, শুধুমাত্র বিকালে একবার পারভিনের মাকে লইয়া ছাদের ঐ চিলে কোঠায় উঠিয়া বিশাল আকাশের দিকে তাকাইয়া শুধু সূর্যাস্ত দেখেন। এই সময় মায়ের সঙ্গে শুধু পারভিনের মা তাহার একান্ত সঙ্গিনী, আর কাউকেই মা তাহার কাছে রাখিতে পছন্দ করেন না। পারভিনের মা আমাদের বাড়ীতে অনেককাল ধরিয়া আছে, তখনো পারভিনের জন্ম হয় নাই। এখন পারভিন তাহার সংসার লইয়া অনেক দুরের এক শহরে স্বামীর সংসার করিতেছে। পারভিনের বাবাকেও আমি কখনো দেখি নাই। কোন এক অজ্ঞাত কারনে তিনি নিখোঁজ হইয়া রহিয়াছে। এইটুকুই আমি জানি। আমি আমার বাবাকেও দেখি নাই। যতবার মাকে জিজ্ঞসা করিয়াছি, মা কোন না কোনভাবে তাহা এরাইয়া গিয়াছেন। খুব বেশি পিড়াপীড়ি করিলে হয়ত তিনি "তোঁর বাবাকে আমি ..." এইটুকু বলিয়াই অন্য কোন এক প্রসঙ্গ টানিয়া আনিতেন। আমার বাবা কি জিবিত আছেন না মারা গিয়াছেন, তাহার কোন সদুত্তর আমার এখনো জানা নাই। মাকে আমি কখনো বিধবার মত শাড়ি পরিতে দেখি নাই, মাকে আমি বাবার কোন মৃত্যুবার্ষিকী পালন করিতেও দেখি নাই। আমি মাকে কখনো বাবার প্রসঙ্গে কোন কথা বলিতেও দেখি নাই। কি হইয়াছে তাহলে আমার বাবার? আমাদের সারা বাড়ীতে বাবার কিংবা দাদাদাদির কোন একটা ছবিও নাই। আমার মা সবার হইতে এমন আলাদা এক জগত লইয়া যেন বসবাস করিতেছেন। অথচ তিনি এই সমাজেরই একজন অতি গনমান্য মানুষদের মধ্যে একজন। অনেক মানুষের তিনি অসময়ের বন্ধুও বটে।  

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমার মা এত উদাসিন কেন? কি নাই তাহার? বাড়ি, গাড়ি, মানসম্মান, প্রতিপত্তি, যশ, টাকাপয়সা, ব্যবসা-বানিজ্য, সবই আছে তাহার। এই বয়সেও তিনি অনেক সুন্দরি মায়েদের থেকে অধিকতর সুন্দর।  অনেক দামী শাড়ি হয়ত পরেন না কিন্তু দামী শাড়ি পড়িবার জন্য তাহার আয়েরও কোন কমতি নাই। আজ আমি মাকে বড় ভয় পাইতেছি। কারন আমি মাকে এমন কিছু কথা শুনাইয়া দিয়াছি, হয় মা আমাকে ছারিবেন, না হয় আমি মাকে ছারিব। কিন্তু আমাকে আমার পরিবারের ইতিহাস শুনাইতেই হইবে। তাহা না হইলে আমি কি করিয়া ঐ অপূর্বের বাসায় আমার বংশপরিচয় দেব? আমি তো অপূর্বকে ভালবাসি। আমার বারংবার শুধু এই কথা মনে করিয়া ভয় হইতেছিল যে, মা কি আমাকে এমন কিছু বলিবার জন্য প্রস্তুত যাহা আমি শুনিবার জন্য প্রস্তুত নই? ভয় যখন মানুষের উপর ভর করে, তখন তাহার রক্তের শিরায় শিরায় এক অজানা শিহরন তোলে, মনে হয় বুকের ভিতর কি যেন নাই, বা কি যেন দ্রুত হারাইয়া যাইতেছে। মাথা ভনভন করিতে থাকে, স্বাভাবিক আচরন আর স্বাভাবিক মনে হয় না। 

মা নিরবতা ভাঙ্গিয়া আমার দিকে তাকাইয়া একটু মুচকি হাসিয়া আমার কাছে একটু আগাইয়া আসিয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন আর বলিলেন, 'তুমি অপূর্বকে ভালবাস?'

আমি বলিলাম, হ্যা, আমি অপূর্বকে ভালবাসি মা।

-অপূর্ব কি তোমাকে ভালবাসে?

আমিও মাকে জড়াইয়া ধরিয়া হাতের কাপটি মাটিতে রাখিয়া শুধুমাত্র ঘাড় নাড়াইয়া এই বলিয়া সংকেত দিলাম যে, মা যাহা জানিতে চাহিয়াছেন, তাহা সত্য এবং ইহার বাহিরে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। 

মা আমাকে এইবার তাহার বাহুবল হইতে ছাড়িয়া তাহার চেয়ারে হেলান দিয়া জিজ্ঞেস করিলেন, 'রুনা মা, তুমি আমার কাছ হইতে কি জানিতে চাও?'

বুঝিলাম, শতবার এরাইয়া যাওয়ার যে উত্তর আমি জানিতে চাহিয়াছিলাম, আজ মা তাহার সব উত্তর দিতে হয়ত নিজেকে প্রস্তুত করিয়া আমার সামনে হাজির হইয়াছেন। আজ হয়ত তিনি কোন কিছুই এরাইয়া যাইবেন না। হয়ত অন্যদিনের মত বলিবেন না যে, ;আমি তোঁর বাবা...' ইত্যাদি। 

-মা, আমি আমার পরিবারের ইতিহাস জানিতে চাই। আমি আমার পূর্বপুরুষের ইতিহাস জানিতে চাই, আমি আমার বাবার ইতিহাস জানিতে চাই। কথাগুলি বলিতে আমার বুক কাপিতেছিল, আমার হাত কাপিতেছিল, আমার গলা ধরিয়া আসিতেছিল। আমি স্বাভাবিক নই এখন আমার মায়ের সামনে। অথচ এই মা আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাহাকে আমি কোন কিছুই বলিতে সংকোচবোধ করি না। কিন্তু আজ আমার অনেক ভয় করিতে লাগিল। 

মা অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাহার দুইখানা হাত তাহার বিসন্ন মুখে একবার বুলাইয়া চোখের চশমাটা খুলিয়া শাড়ীর আচল দিয়া মুছিতে মুছিতে দূর আকাশের দিকে তাকাইয়া শুধু বলিলেন,-'মানুষের অনেক পুরানো ইতিহাস না জানাই বর্তমান সময়ের জন্য মঙ্গলকর, তারপরেও যদি কেহ তাহা জানিতে পন করিয়া বসে, তাহা হইলে তাহাকে তাহার অতীত জীবনের সত্যের মুখুমুখি দারাইবার যে জীবনীশক্তি দরকার, তাহা আছে কিনা জানা খুবই প্রয়োজন। তাহা না হইলে বর্তমানকে মানিয়া লইয়া বাচিয়া থাকিবার যে অনুশোচনা তৈরি হইবে তাহার থেকে পরিত্রান পাওয়া বড়ই দুস্কর। আমি তোমাকে এই উভয় সংকট পরিস্থিতে ফেলিতে চাহি নাই। তারপরেও যখন তুমি এতটাই পন করিয়া বসিয়া আছ, তোমার জীবনের কাহিনী তোমাকে আজ আমি শুনাইব। জানিতে পারা আর মানিয়া লইতে পারা সব তোমার উপর নির্ভর করে'। 

আমার বড় ভয় করিতে লাগিল। 

-আজ হইতে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমি তোমার মতই একজন চঞ্চলা যুবতি মেয়ে ছিলাম। কত হইবে আমার বয়স তখন? হয়তবা বাইশ কিংবা তেইশ। আমাদের গ্রামে তখনো বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল। অনেক চরাইউৎরাই পার হইয়া সেই অজপারাগায়ের সমস্ত বাল্যবিবাহের আইন কানুন ভাঙ্গিয়া আমি সবেমাত্র ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইয়াছি। গ্রামে আমার বাবা অতি ধনি না হইলেও আমরা দরিদ্র ছিলাম না। আমরা তিনবোন, একভাই আর মাকে লইয়া আমার বাবা বেশ ভালই জীবনযাপন করিতেছিলেন। স্কুলের গন্ডি হইতে শুরু করিয়া ঐ ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত আসিতে আমি অনেকবার বিবাহের সম্বন্ধ লইয়া অনেক পেরেশানিতে ভুগিয়াছি। দাদা দাদির ধমক হইতে শুরু করিয়া, জ্যাঠা জ্যাঠির, ফুফা ফুফির সবারই কম বেশি ধমক আর মানসিক নির্যাতন খাইয়াছি। কিন্তু আমার বাবা আমার মনের ইচ্ছার কথা জানিতেন। তাহার হয়ত অনেক সাহস ছিল না কিন্তু তিনি আমাদের সব ভাইবোনদের মধ্যে আমাকে বিশেষ নজরে দেখিতেন বলিয়া আমার ইচ্ছার বাহিরে কখনো মতামত দেন নাই। বিশেষ করিয়া আমার বিবাহের বেলায় তো কখনই জোরাজোরি করেন নাই। গ্রামের পঞ্চায়েত, মুরিব্বিগন, এমন কি আমার দাদা দাদিদের কাছেও আমার বাবাকে আমার এই বিবাহ লইয়া অনেক কঠোর কথা শুনিতে হইয়াছিল। তখন সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হইয়াছে, ফলে দেশে খুব একটা আইন শৃঙ্খলা নাই এবং একটা অরাজকতার বিশৃঙ্খলা বিরাজ করিতেছিল। যাহারা দেশ স্বাধীন করিয়া জীবিত ফিরিয়া আসিয়াছে, তাহাদের হইতেই এখন আমাদের সবচেয়ে বিপদের আশংকা বেশি মনে হইতেছিল। কোন এক অমাবশ্যার রাতে আমাদের গ্রামের নদীর ধারে আমার বাবার মৃত দেহখানি পাওয়া গেল।' কে বা কাহারা এই হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত ছিল তাহা আজো অবধি তাহার কোন কূলকিনারা হয় নাই।  

এই বলিয়া মা কিছুক্ষন চুপ করিয়া থাকিলেন। আমার এতক্ষন যে ভয়টা আমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়াছিল, তাহা আরও বেশি করিয়া চাপিয়া ধরিল। আমি কি কোন লোমহর্ষক ইতিহাস শুনিতে যাইতেছি? নাকি কোন এক রূপকথার গল্প শুনিতে যাইতেছি? ইহার পরে কি শুনিব যে আমার বাবাও আমার দাদার মত কোন এক অমাবশ্যার রাতে খুন হইয়া লাশ হইয়া গিয়াছিল? আমার শরীর হিম হইয়া আসিতে লাগিল। 

মা বলিতে শুরু করিলেন, 'জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হইল, সে একদিন মরিবেই। বিধাতাকে কেহ মানুক আর নাইবা মানুক, বিধাতা মানুষের জন্মের দ্বারা একটা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন, আর তাহা হইল, সে একদিন এই সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করিয়া, সমস্ত লোভ লালসা পিছনে রাখিয়া, সমস্ত ধন দৌলত হাত হইতে ছাড়িয়া দিয়া একা একা নিঃসঙ্গভাবে সবার চোখ হইতে চিরতরে আড়াল হইয়া যাইবেই। সময়টা হয়ত কারো শতবছর পর আবার কারো তারও আগে। কয়েকদিন অতি প্রিয়জনেরা তাহাকে লইয়া কান্নাকাটি করিবেন বটে কিন্তু সময়ের স্রোতে একদিন সব বিবর্ণ হইয়া কালের অতল গভীরে হারাইয়া যাইবে। তাহাকে আর কোথাও খুজিয়া পাওয়া যাইবে না। না তাহার উত্তরসূরিদের কণ্ঠে, না পূর্বসূরিদের। ইহাই এই জীবনের তথা পৃথিবীর সরল সমিকরন। বাবার মৃত্যুর পর আমাদের সংসারটায় যেন অকস্মাৎ ছাদ ভাঙ্গিয়া মাথায় পড়িল।  তিন বোন, এক ছোট ভাই আর মাকে লইয়া আমি যেন দেখিতে পাইলাম, এতদিন যাহারা বিনা দ্বিধায় আমাদের পরিবারে অন্নগ্রাস করিত, আজ তাহারা তাহাদের নিজ নিজ স্বার্থ লইয়া অতিশয় ব্যস্ত, দাদার সম্পত্তি লইয়া ভাগ বাটোয়ারা করিতে চারিদিকে পাঁয়তারাসমেত গোপনে একা কিংবা প্রকাশ্যে দল বাধিয়া শল্যপরামর্শ করিতেছে। পরিশেষে আমাদের ভাগ্যে যাহা জুটিল তাহা দিয়া আর যাহাই হোক, আমাদের লেখাপড়া, সংসার খরচ চলিতে পারে না। আমার মা হিমশিম খাইয়া দিশেহারা হইয়া দিক্বিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন। আর এরই মধ্যে আরও একটা নব্য উৎপাত শুরু হইল। আমার বিবাহের সম্বন্ধ পাকাপাকি করা। আমার দাদা দাদিরা, ফুফা ফুফিরা, সবাই শক্ত করিয়া আমাদের কি প্রকারে বিশেষ উপকার করা যায় তাহার বুদ্ধি বাহির করিতে লাগিল। ফলশ্রুতিতে যাহা দারাইল, তাহা হইল, সবাই এবার আমার মাকে ঝাঁকিয়া ধরিল যে, এত লেখাপড়া করাইয়া কে কবে কোন লাট সাহেবের বউ হইয়াছিল? ধীরে ধীরে একে একে আমাদের সবার বিবাহ সম্বন্ধ ঠিক করিবার জন্য দিনের পর দিন মানসিকভাবে চাপের মুখে পরিতে হইল। আমরা যেন আর অধিক চাপ বহন করিবার মত শক্তি পাইতেছিলাম না।  

কোন উপায়ন্তর না দেখিয়া একদিন আমি আমার মাকে বলিলাম, 'মা, শুনেছিলাম আমার বাবার এক অতি পরিচিত এক বাল্যবন্ধু আমাদের এই মহল্লায় বাস করত। তার অনেক ব্যবসা ছিল, অনেক দানখয়রাতও করতেন বলে তার সুনাম আজো এই মহল্লায় রয়েছে। তিনি যদিও আর এই মহল্লায় বাস করেন না কিন্তু শুনেছি তিনি নতুন রাস্তার পাশে বিরাট বাড়ি করে ওখানেই বসবাস করেন। খুজে পেতে খুব অসুবিধা হবে বলে তো আমার মনে হয় না। একবার কি তার সাথে দেখা করব?' 

যাহাদের পেটে ক্ষুধা, যাহাদের আশ্রয়স্থল বলিতে এক ভগবান ছাড়া আর কেহ থাকে না, যাহাদের চারিদিকে হায়েনাদের মত অসংখ্য পিশাচ বসবাস করে, যাহাদের সাহায্য করা উতিচ অথচ তাহারাই যদি অত্যাচারি হইয়া যায়, তখন মানুষকুলে যদি এমন কাহারো একবার ক্ষিন সন্ধানের ছিটেফোঁটাও থাকে, যাহাকে ধরিয়া একবার নিরাপদ আশ্রয় পাইতে পারে, তাহা হইলে চেষ্টা করিয়া দেখিতে আপত্তি কি? আমার মা কিছুক্ষন ভাবিয়া আমার হাত ধরিয়া বলিলেন, 'চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।' 

পরদিন আমি আর আমার মা সকাল সকাল ঐ নতুন রাস্তার ধারে আসিয়া হাজির হইলাম। আমাদের ইহাই প্রথম শহরে আসা নয় তারপরেও মনে হইতে লাগিল আজিকার আসা আর আগের বহুবার আসার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রহিয়াছে। শহরের রাস্তায় অসংখ্য মানুষের যাতায়ত, আমাদের গ্রামের দুই একজনের সহিতও আমাদের দেখা হইয়া গেলো। বিশেষ কোন কারন না দেখাইয়া আমরা তাহাদেরকে এক প্রকার এরাইয়াই গেলাম। অনেক খুঁজাখুঁজির পর বাড়িটির সন্ধান পাইলাম বটে কিন্তু তাহার সহিত দেখা করিবার যে তরীকা, তাহাতে আজ ফিরিয়া যাইতেই হইবে বলিয়া আমাদের আশংকা হইল। তিনি বাড়ি নাই বলিয়া গার্ডের সংক্ষিপ্ত উত্তরে আমাদের নতুন করিয়া আরেক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলিয়া দিল। দারোয়ান গেট বন্ধ করিয়া দিল, ভিতরে প্রবেশের কোন সুযোগ রইল না। 

বাড়ি ফিরিয়া যাইবার অপেক্ষায় মা আর আমি দাঁড়াইয়া আছি, এমন সময় কালো একখানা গাড়ি বাড়ীর সুম্মুখে আসিয়া কিঞ্চিত একটি হর্ন বাজাইয়া গেট খুলিবার অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া গেল। কালো গ্লাস দিয়া ঢাকা থাকায় ভিতরে কে বা কাহারা বসিয়া আছেন আমরা কিছুই দেখিতে পাইলাম না। দারোয়ান দ্রুত গেট খুলিতে গিয়া গেটের পাশে আমাদের দেখিয়া মনিবের সামনে অতি উচ্চকন্ঠে দূর দূর করিতে লাগিলেন। একটু অপমান বোধ হইতে লাগিল যেন আমরা কোন এক নমশূদ্রের দল এই ব্রাহ্মণ বাড়ীর গেটে আসিয়া দারায়াছি বলিয়া সমস্ত বাড়ীটি অপবিত্র হইয়া গেল। নিজের উপর নিজের খুব রাগ হইতে লাগিল।

     

মনের রাগ, আর অপমানে 'কেন আসিয়াছিলাম' এই অনুশোচনা লইয়া মা মেয়ে ধির পদক্ষেপে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হইয়াছি, এমন সময় দারোয়ান আবার হন্তদন্ত হইয়া পিছন হইতে আমাদের ডাকিয়া বলিলেন,-'এই যে শুনছেন? সাহেব আপনাদেরকে ডাকছেন'। এই কথা শুনিয়া মনের ভিতর যেমন একটা আশার সঞ্চার হইল, তেমনি আবার সংশয়েরও সৃষ্টি হইল। কি জানি আবার কোনো অপরাধ হইল কিনা, কিংবা সাহেব আবার কি বলিয়া আমাদের নতুন করিয়া অপমান করিবেন কিনা ইত্যাদি। 

এবার সাহেব নিজেই আগাইয়া আসিলেন এবং জিজ্ঞেস করিলেন, কোথা হইতে আমরা আসিয়াছি। মা তাহার ঘোমটাখানি সরাইবামাত্র মাকে দেখিয়াই সাহেব চিনিতে পারিলেন। অতি উচ্ছ্বসিত হইয়া মায়ের একেবারে কাছে আসিয়া সহাস্যে বলিলেন, 'আরে, এ যে আমাদের বৌদি? কি ব্যাপার এতদিন পর আমাদের মনে পড়ল?' 

আমি লোকটিকে আগে কোথাও দেখিয়াছি কিনা মনে পরিতেছে না কিন্তু কোথাও তাহাকে দেখিয়াছি তাহা আমি নিশ্চিত। তাহার বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ কি তাহার কাছাকাছি হইবে। সুঠাম দেহ, পরিপাটি চুল, সাদা চেকের উপর ফোঁটা ফোঁটা কালো রঙের চেকে পরিহিত একটা শার্ট, হাতে সোনালী রঙের একটি ঘড়ি, বেশ মানাইয়াছে। মাথা ভর্তি চুল। মুচকি হাসিলেও ভাল লাগে আবার অট্টহাসিতেও বেমানান লাগে না। দুই চোখের মাঝখানে একটা কাল তিলক। বেশ হাসিখুশি একজন মানুষ বলিয়া মনে হইল। সাহেব মাকে একরকম পিঠে হাত দিয়া তাহার সহিত তাহাদের অন্দরমহলে লইয়া গেলেন। আমি মাকে শুধু অনুসরন করিয়া আমিও পিছুপিছু অন্দর মহলে প্রবেশ করিলাম। সাহেব বলিলেন, 'তোমরা একটু বস, আমি কয়েক মিনিট পর এসে তোমাদের সাথে কথা বলব'। এই বলিয়া তিনি তাহার ঘরে চলিয়া গেলেন। 

আমরা তাহার ড্রইং রুমে বসিয়া আছি। বিশাল ঘর, চারিদিকে বিদেশী টাইলসের দেয়াল, সাজানো ঘরের মত আঙ্গিনা। পর্দাগুলি এসির বাতাসে ঝিরঝির হাওয়ায় অল্পঅল্প নরিতেছে, ঘরের একপাশে বিশাল একটা একুরিয়াম। রঙ বেরঙের মাছ তাহার ভিতরে খেলা করিতেছে। একুরিয়াম হইতে কখনো কখনো বুদবুদ উঠিতেছে, মনে হইতেছে মাছগুলি ডুবুরিদের মত নিঃশ্বাস ছারিতেছে। দেয়ালের এক কোনায় একটি মহিলার বিশালকায় একটি ছবি টাঙ্গানো আছে। শরীর ভর্তি গহনা। কানে গহনা, গলায় গহনা, নাকে গহনা, মাথার চুলের ঠিক মধ্যিখানে একটি মাথলা টিকি। মনে হইতেছে গহনাগুলি যেন ঠিক জায়গা মত বসিয়া মহিলার রূপ আরও শতগুনে বৃদ্ধি করিয়া দিয়াছে। 

-এটা পারুলের ছবি। মা বলিলেন। 

পারুল সাগর সাহেবের স্ত্রী। অনেক বছর আগে তিনি গত হইয়াছেন। পারুলের মৃত্যুর পর সাগর আর বিয়া করেন নাই। তাদের কোন সন্তানাদিও হয় নাই। পারুল যে বছর মারা গিয়াছে, তাহার পরের বছরই সাগর সাহেব আমাদের মহল্লা ত্যাগ করিয়া নতুন জায়গায় চলিয়া আসিয়াছেন। পারুল আমাদের গ্রামের মেয়ে ছিল। তবে পারুলের বয়স আমাদের হইতেও কম ছিল। 

-'কিভাবে মারা গিয়াছিল'? আমি মাকে প্রশ্ন করিতেই মা বলিলেন, পারুলের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় পারুল দেহত্যাগ করে। এই পারুলের নামেই পরবরতিতে সাগর সাহেব একখানা দাতব্যালয় দিয়াছিলেন আর ঐ দাতব্যালয় হইতেই তিনি অনেক দান খয়রাত করিতেন। কি কারনে কেন তিনি তার সেই দাতব্যালয় আর চালাইলেন না তাহা আমরা ভাল করিয়া বলিতে পারিব না। কিন্তু তিনি আর বিয়াথাও করেন নাই শুনিয়াছি।    

-'এই যে বৌদি, কি মনে করে আজ এত বছর পর আমাদের মনে পড়ল? তোমরা একা আসলে কেন? দেওয়ান ভাই আসে নাই যে?' 

বলিতে বলিতে আমাদের সামনের সোফায় আসন গ্রহন করিলেন। সাগর সাহেব ইতিমধ্যে তাহার একটু আগে পরিহিত জামা প্যান্ট পাল্টাইয়া একটা সাদা পাঞ্জাবির সঙ্গে মেরুন রঙের স্যালয়ার পড়িয়াছেন, হাতের ঘড়িটি এখন আর নাই। মনে হইল তিনি এইমাত্র স্নান করিয়া আসিয়াছেন। চুলগুলি এখনো ভিজা, গা হইতে একটা পারফিউমের গন্ধ আসিতেছে, তাহার আগমনে ঘরটি যেন সুগন্ধিতে ভরপুর হইয়া গেলো 

তাহার প্রশ্ন শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম, তিনি এখন আর আমাদের মহল্লার খবর রাখেন না। আমার বাবা দেওয়ান যে অপঘাতে মৃত্যুবরন করিয়াছে, সেই খবর তাহার জানা নাই। মা নিসচুপ হইয়া বসিয়া আছেন। ক্ষনিকপর মা তাহার জীবনের সমস্ত ঘটনা একে একে খুলিয়া বলিলেন। সাগর সাহেব অনেক্ষন ধরিয়া আমাদের সমস্ত ইতিহাস শুনিলেন। মাঝে মাঝে কিছু প্রস্ন করিলেন বটে কিন্তু তাহা নিতান্তই কিছু না। একসময় সাগর সাহেব আমার দিকে তাকাইয়া যা বলিলেন, তাহা এইরুপ- 

-'তোমার বাবা আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। আমরা ছোট বেলায় একসঙ্গে একই গ্রামে মানুষ হয়েছি। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে কোনও রকমে একমুঠো ভাত খেয়ে নদীতে গিয়ে ইচ্ছামতো ঐ ধলেশ্বরী নদীতে ডুব পারতাম, কখনো কখনো সন্ধ্যা নাগাদ মাছ ধরতাম। কোন কোন দিন নদীতে না যেয়ে একেবারে স্কুলের মাঠে গিয়ে ভররোদে মেন্ডা গাছের মেন্ডা দিয়ে ফুটবল বানিয়ে দুইজনে ফুটবল খেলতাম। কখনো আবার বড়দের সঙ্গে খেলায় অংশ নিতে গিয়ে আমরা দুজনে শুধুমাত্র গোল কিপার ছাড়া আর কোনখানেই খেলত পারতাম না। যদিও আমার থেকে তোমার বাবা প্রায় তিন চার বছরের বড় হবে কিন্তু তিনি ছিলেন আমার নিত্যদিনের একজন সঙ্গি। তোমার বাবার যখন বিবাহ হল তখন আমার বয়স হইবে বড়জোর চৌদ্দ কি পনের। তার কয়েক বছর পর আমি চলে আসি শহরের এক নামিদামী স্কুলে কিন্তু ছুটির দিনগুলুতে আমি গ্রামের ঐ আমাদের বাড়ীতে তোমার বাবার সঙ্গে সময়টা কাটাতে আমার বড় ভাল লাগত। তোমার বাবার আর পরাশুনা হল না। সারাদিন ক্ষেতের কাজ, খামারের কাজ, অনেক গরু পালত তোমার দাদা, তাদের নিত্যদিনের খাবার যোগার করা, নদীতে নিয়া গোসল করানো, বিকালে আবার তাদের খাবার খাওয়ানো, এসব নিয়ে তোমার বাবা এতটাই সময় কাটাত যে, আমিও একসময় আর ভাল করে সেই স্কুলের মাঠে খেলা করতে পারতাম না, ইচ্ছে করলেই আগের মত আর নদীতে গিয়ে অধিক সময় ধরে ডুবসাতার কাটতে পারতাম না। আস্তে আস্তে আমার কাছে গ্রামটা আর আগের মত মনে হচ্ছিল না। একদিন শুনলাম, আমার বন্ধু বাবা হয়েছে।' এই বলিয়া সাগর সাহেব মুচকি একটু হাসিয়া আমার দিলে আঙ্গুলি তুলিয়া বলিলেন, 'সেই বাচ্চাটি সম্ভবত তুমি। কি নাম তোমার? তোমার তো নাম জানাই আমার হল না।'

আমি এতক্ষন অবাক দৃষ্টিতে সাগর সাহেবের দিকেই তাকাইয়াছিলাম আর তাহার সেই ছোটবেলার আমার বাবার সাথে তাহার শৈশব কালের দিন গুলির কথা শুনিতেছিলাম।

আমার মনে পড়ে, আমি শুধু তাহাকে আমার নামটাই বলেছিলাম, - 'শেলি'।   

  

সাগর সাহেব আবারো তাহার সেই হারানো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন,

-'এত অল্প বয়সের বাবার কি দায়িত্ব, কি করতে হবে বাবা হিসাবে, তা সে হয়ত জানতই না। কত হবে তখন তার বয়স? হয়ত ষোল কিংবা সতের? তাহার আরও ব্যস্ততা বেড়ে গেলো। আমি গ্রামে গেলে আর আগের মত দিন কাটত না। যাক, সেসব কথা এখন বলে আর কি হবে? অনেক বছর পর আবার যখন তোমার বাবার সঙ্গে আমার দেখা হল, তখন আমি সবেমাত্র বিদেশ হতে পরাশুনা শেষ করে গ্রামে গিয়েছি। অনেক প্রতিবেশিকেই তখন আমি চিনি না। অনেকে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন, গ্রামটা আমুল পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল।'  

-আচ্ছা যাক সে ইতিহাস আজ আর না বলি। সাগর সাহেব আমাদের সবকথা শুনিয়া মাকে শুধু এইটুকু আশ্বাস দিলেন যে, তাহার অতিপ্রিয় বন্ধুর দেওয়ান পরিবারের জন্য তাহার যাবতীয় সাহায্য এবং সহযোগিতা যাহা কিছু লাগিবে, তিনি তাহার জন্য কোন কার্পণ্য করিবেন না। একে একে তিনি আমাদের সবার নাম জিজ্ঞাসা করিলেন, কে কোন ক্লাসে অধ্যায়ন করে, কিভাবে কখন কাহার কি লাগে সব আদ্যপান্ত জানিয়া লইলেন।  তিনি আরও বলিলেন যে, যেহেতু তিনি সব সময় নিজে হাজির থাকিয়া সব দেখভাল করিতে পারিবেন না, ফলে লোক মারফত যাহা লাগিবে, তাহা তাহাকে জানাইয়া দিলেই বাকি সব ব্যবস্থা তিনি করিতে পারিবেন। এ ব্যাপারে আর কোন সন্দিহান রহিল না। 

শেলী এই পর্যন্ত বলিয়া রুনার দিকে চাহিয়া এক্তা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, আমাদের কষ্টের দিনগুলির সমাপ্তি হইলো, আমাদেরকে সাহাজ্য করার একজন মানব উপস্থিত হইলেন, আর কোনো সমস্যা রইলনা। গল্পটা এইখানে শেষ হইয়া গেলেই ভালো হইতো। কিন্তু গল্পটা আসলে এইখান থেকেই শুরু। 

সাগর সাহেব আমার মাকে কিছু উপার্জনের রাস্তা বাহির করিয়া দিলেন। আমার মা হাতের কাজ জানিতেন বলিয়া কয়েকটি শেলাই মেশিন কিনিয়া দিলেন, বাড়িতে কয়েকটা গাভী কিনিয়া দিলেন যেনো আমরা সবাই মাঝে মাঝে দুধ খাইতে পারি। সবাই ছাত্র তাই তিনি ভাবিলেন আমাদের পুষ্টিকর খাবারের দরকার। আর প্রতি মাসে একটা অনুদানের ব্যবস্থাও করিয়া দিলেন। আমার মা অনুদানের ব্যবস্থাটা গ্রহন করিতে চাহিলেন না, কয়েকটা শেলাই মেশিন আর গাভীর ব্যাপারটাতেই আমাদের সংসার চালাইয়া নিতে পারিবেন বলিয়া আমার মায়ের ধারনা ছিলো কিন্তু সাগর সাহেবের মমতার কোনো কমতি ছিলো না, আর তার এই দানে কিছু কমিয়া যাইবে সেইটাও নয়। ফলে আমার মায়ের অগ্রাজ্য কোনো কাজে আসিলো না। 

আমি আমার ভাইবোনদের লইয়া, আমার মাকে লইয়া আমাদের পরাশুনা লইয়া নতুন এক উদ্যমে আবার নতুন করিয়া জীবনের স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম। ভাবিলাম, এইবার আর এই সুযোগ হারাইলে চলিবে না, সয়ং বিধাতা আমাদের একটা কুলে আনিয়া রাখিয়া গেলেন। শ্রদ্ধায়, বিনয়ে সাগর সাহেবকে আমার দেবতার মত মনে হইতে লাগিল। কচি মন, তার উপর দারিদ্র্যের উপদ্রপ, সব মিলিয়া মনে হইতে লাগিল, পৃথিবীতে ভালোলকের অভাব ঈশ্বর কম রাখেন নাই। তিনি তাহাদেরকে মাইলস্টোনের মতো এমন এমন জায়গায় রাখিয়া দিয়াছেন যেনো কেউ পথ হারাইয়া গেলে ওই মাইলস্টোন দেখিয়া আবার যাত্রা শুরু করা যায়। 

এই বলিয়া মা অনেকক্ষন নিরব হইয়া রহিলেন। পারভীনের মা আসিয়া আমার মায়ের নীরবতা ভাঙ্গিয়া জিজ্ঞেস করিল- দিদি, আজ চিলে কুঠিতে বেড়াইতে যাইবেন? এই সময়তায় মা আর পারভীনের মা যতো কাজ কর্মই থাকুক, মা আমাদের বাড়ির ছাদের উপর বসিয়া সন্ধ্যার আগের সূর্যাস্ত দেখেন। আমি আজো জানি না, ওই একই জিনিসের উপর মায়ের কি আকর্ষণ, কি সেই অমোঘ টান যে, আজ পর্যন্ত কখনো আমার মাকে অই সূর্যাস্ত দেখা হয় নাই এমন হইয়াছে। চিলে কোঠায় ছোট এক্তা বেলকনি আছে, তাহার উপর টিনের একটা চাল আছে, বৃষ্টিরদিনে ওই চিলে কোঠায় মা আর পারভিনের মা একা বসে বসে তখন হয়ত সূর্যাস্ত দেখেন না কিন্তু বৃষ্টির শব্দ শুনেন। মানুসের জীবনের অনেক রহস্য আছে যা তাহার একান্ত ব্যক্তিগত। হয়ত ইহা কাহারো কাজে লাগিবে কি লাগিবে না তাহার কিছুই যায় আসে না কিন্তু যাহার এই সম্পদ তিনি হয়ত বুঝিয়া থাকিবেন ইহার ভিতরে কি শান্তি আর কি মহিমা। ঈশ্বর মানুষকে অনেক রহস্য রাখিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। কাহারো সূর্য ভালো লাগে, কাহারো চন্দ্র ভালো লাগে, কেউ আবার চৈত্রের দুপুর ভালো লাগে আবার কারো শিতের সকাল।

(অসমাপ্ত)...

যদি তুমি কখনো মনে করো

যদি তুমি কখনো মনে করো যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি নাই, তুমি ঠিক। আবার যদি কখনো মনে করো যে, আমি তোমাকে খুব ভালোবেসেছি, আমি বলবো আবার যে, তুমি এবারো ঠিক। যদি তুমি মনে করো যে, আমি স্বার্থপরের মতো তোমার কাছ থেকে এমন কিছু চেয়েছি যা তোমার কাছে অত্যান্ত মূল্যবান, কিংবা সেটা দেওয়া তোমার জন্য অনেক ভয়ংকর, আমি বলবো  যে, তুমি ঠিক। যদি তুমি মনে করো, আমি তোমাকে ইগনোর করেছি, হ্যা আবারো তুমি ঠিক। তুমি যদি কখনো কনফিউজড হয়ে থাকো যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি কি বাসি না, সেটা তুমি বুঝতেই পারছো না, হ্যা, এবারো তুমি ঠিক। 

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সব গুলিই ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আসল সত্য কি? বা আসলে ঠিক কোনটা? আমি বলবো যে, উপরের সবগুলি ই ঠিক। কারন, সত্য ভালোবাসা এমনই যে, কখনো মনে হয় খুব ভালোবাসি,কখনো মনে হয় পুরু সম্পর্ক টাই ঘৃণার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কখনো কখনো খুব সন্দেহের মধ্যেই দিন কেটে যেতে থাকে। 

ঈশ্বর প্রত্যেক কেই স্পেশাল করেই বানিয়েছেন। কারো কারো মধ্যে অথবা প্রতি জনের মধ্যেই ঈশ্বর আলাদা আলাদা গুনাবলী দিয়েই পাঠিয়েছেন। এই ঈশ্বর এমন এক শক্তি যাকেয়াপ্নি, আমি সবাই সব কিছুতেই দায়ী করতেপারি। আবার তার কাছেইখুব গোপনে কাদতেও পারি। আর আমি এই জন্যই ঈসশরকে খুব ভালোবাসি যে, সেয়ামাকে তাকে সব কিছুর জন্য দায়ী করলেও সে কিছুই বলে না। আমি তাকে ঘ্রিনা করলেও সে আমাকে শেষ করে দেয় না। আমি যেমন্তার সাথে যুদ্ধ করতেপারি, তেমনি আমি তার কাছে পুরুপুরি সারেন্ডার ও করতে পারি।

আমাদের জীবনে সবচেয়ে যে জিনিষটা ভালো বা খারাপ হয়ে আসতে পারে তা হচ্ছে, ঈশ্বরের করুনা। আমি ব্যাপারটা যদি এইভাবে বলি যে, তিনি জানেন আমাদের জন্য সবচেয়ে কোনটি সবচেয়ে মঙ্গল। ফলে আজকে কোন কাজটি আমার জন্য দৃশ্যমান খারাপ মনে হলেও হতে  পারে কিন্তু বলা যায় না যে, হয়ত এই দৃশ্যমান খারাপটাই হয়ত ভবিষ্যতের কোন এক ভালোর জন্য। অথবা আজকের দিনের কোনো এক দৃশ্যমান মঙ্গল হতে পারে আগামিকালের কোনো এক ভয়ংকর বিপদের কারন। ফলে ঈশ্বরের করুনাটাই সবচেয়ে বড়। হতে পারে আজকে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি, এটাই ভালো আমাদের জন্য। আমি তোমাকে আর তুমি আমাকে মুক্ত মনে মুক্তি দিয়ে রাখো, দেখো ঈশ্বর কোথায় আমাদের নিয়ে যায়। যদি মন ফিরে আসে, যদি প্রান কাদে, তাহলে আবারো আমরা এই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তই থাকি না কেনো, আবারো আমরা এক সাথে হবো। হয়ত তখন আর এইভুল বুঝাবুঝি গুলি হবেনা।  

বদি ভাই-এখন তিনি ছবি

১৯৬৮ থেকে ২০১৮, মোট ৫০ বছর।

এই পঞ্চাশ বছরের আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের মধ্যে যে ব্যক্তিটি আমাদের পরিবারের কেউ না হয়েও পরিবারে সবচেয়ে বেশি ভুমিকা পালন করতে এক্যটু ও দ্নিবিধা করেন নাই, তিনি হচ্ছেন বদ্রুদ্দিন তালুকদার ওরফে বদি ভাই। আমার বয়স তখন মাত্র ১০ কি বারো যখন আমি প্রকৃত পক্ষে এই বদি ভাইকে জ্ঞ্যানের মাধ্যমে চিনি। কিন্তু তার আগে থেকেই এই বদি ভাই আমাদের পরিবারের সাথে যুক্ত ছিলেন।

আমার বাবা কবে কিভাবে কি কারনে মারা গেলেন তা আমার কোনো ধারনা নাই। আমার বয়স তখনহয়ত ২ কি আড়াই হয়ত হবে। আমার বাবা ছিলেন অনেক ধনি মানুস, মাদবর মানুস। সমাজে তার গ্রহনযোগ্যতা ছিল অনেক অনেক বেশি। কিন্তু তার শত্রুও ছিল অনেক। বিশেষ করে আমাদের পরিবারের ভিতরেই অনেক শত্রু ছিল। আর তারা হচ্যাছেন আমার সতালু ভাই বোনেরা। বিশেষ করে তাজির আলি নামে যে ভাইটি ছিলেন, সে ছিলো চারিত্রিকভাবে একজন খারাপ মানুষ।  যাই হোক। বাবা মারা যাবার পর আমাদের যাবতিয় জমিজমার আধিপত্যতা এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে ক্যাশ টাকা না থাকায় আমাদের পরিবার অনেক সমস্যার মধ্যে পরে। আমার বড় ভাই সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভারসিটিতে ভরতি হয়েছেন। ঢাকায় থাকার কোনো জায়গা নাই, মাথার উপর কোনো অভিভাবক নাই এবং তার মধ্যে পাচ বোন এক ভাই এর বোঝা তার উপর। কিভাবে সংসার চালাবেন, কোথা থেকে টাকা আসবে কিংবা নিজেই কিভাবে চলবেন এই চিন্তাই আমার ভাইকে অতিস্ট করে তুল্লো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ভাবছেন কি করা যায়, কিভাবে করা যায়।

এই সময় কোনো এক কাকতালিয় ভাবে দেখা হলো এই বদি ভাইয়ের সাথে। তার জীবনটাও এই একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেটেছে অথবা কাটছে। ওনাকে আর পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করে বেশি বুঝাতে হয় নাই। বদি ভাই চাকুরি করেন ওয়াব্দা অফিসে মাত্র সেক্সন অফিসার হিসাবে। অল্প আয়, বিয়ে করেন নাই। তিনিও একইভাবে তার ভাই বোন মাকে সাপোর্ট করছেন। থাকেন তিনি ১২৪ নং আগাসাদেক রোড। ছোট্ট একটা রুম, তাতে ইতিমধ্যে তিনজন গাদাগদি করে কোনো রকমে থাকেন আর এক বুয়া প্রতিদিন দুপুর আর রাতের জন্য যত সামান্য বেতনে তাদের ভাত তরকারি পাক করে দেন। বদি ভাই হাবিব ভাইকে ওই ১২৪ নং আগাসাদেক রোডে নিয়ে এলেন। সবাই বদি ভাইকে ভাই বলেন না, সম্মানের সহিত তাকে সবাই স্যার বলেন।

যারা এই রুমে থাকেন, তারাসবাই গ্রাজুয়েট এবং জীবন যুদ্ধে লিপ্ত। একে অপরের জন্য যত টুকু দরকার সাপোর্ট করেন। সবার রোজগার যেনো কম্বাইন্ড রোজগার। একসাথে থাকে সব টাকা, যার যখন যত টুকু দরকার সে ততো টুকুই নেন। কিন্তু হিসাব থাকে। আমার মনে আছে ওই একটা ছোট রুম থেকে বদি ভাইয়ের তত্তাবধানে প্রায় ১০/১২ জন গ্রাজুয়েট বের হয়েছেন যারা পরবর্তী সময়ে দেশের শিরশ স্থানে বসেছিলেন। কেউ ইউনিভারসিটির অধ্যাপক, ডিন, কেউ আরো বড়। দেশে এবং বিদেশে।

এভাবেই বদি ভাই হয়ে উঠেন এক কিংবদন্তি স্যার। সব প্রোটেনশিয়াল মেধাবি হেল্পলেস মানুসগুলিকে বুদ্ধি, যতসামান্য চাকুরির পয়সা দিয়েই এইসব মানুসগুলিকে সাহাজ্য করেছেন। বদি ভাই তার চাকুরি জিবনে ডেপুটি ডাইরেক্টর পর্যন্ত উঠেছিলেন। ওয়াব্দায় চাকুরি করলে দুই নম্বরি করলে ছোট কেরানিও কোটিপতি হয়ে যায় কিন্তু বদি ভাই তার জিবনে দুই নম্বরিতো করেনই নাই, তার দ্বারা দুই নম্বরি হবে এটাও তিনি করতে দেন নাই। ফলে একটা সময় এইসব চোর বাটপারদের আমলে চাকুরির পদবির সামনে এগুতে পারেন নাই। অবসর নিয়ে বাসাতেই ছিলেন।

গ্রাজুয়েট মানুষগুলি তাদের যোগ্যতা অনুসারে ধীরে ধীরে সবাই বেশ ভালো ভালো জায়গায় সেটেল হয়ে গেছেন। সবার সাথেই বদি ভাইয়ের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু কাজের চাপেই হোক আর ব্যস্ততার কারনেই হোক ধীরে ধীরে এইসব যোগাযোগও কমে আসে। কিন্তু আমার ভাইয়ের সাথে অন্য একটি কারনে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগটা ছিলই। আর সেটা হচ্ছে আমার মা। আমার ভাই যখন উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ গেলেন, তখন আমার মাকে দেখভাল করার কোনো লোকই ছিলো না। আর এর ই মধ্যে আমারো ক্যাডেট কলেজের সুযোগ হ ওয়ায় আমার পক্ষেও মাকে কোন অবস্থায় ই কিছুই করার সুযোগ ছিলো না। আমার মাকে বদি ভাই খুব ই ভালো বাস্তেন। নিজের মায়ের মতো করেই দেখতেন। আমার মায়ের জন্য কোনো কাজ করতে বদি ভাইয়ের কখনো ক্লান্ত হন নাই। 

আমি ধীরে ধীরে ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে ফেললাম, আর্মিতে গেলাম, আমি মাক্যের দায়িত্ত নিলাম। এই সময় বদি ভাই একটু অবসর পেলেন। ফলে এই দীর্ঘ প্রায় দেড় যোগ বদি ভাইয়ের সাথে আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তার কাছ থেকে আলাদা হতে পারি নাই। এমন নয় যে বদি ভাইয়ের এখানে কোন স্বার্থ কাজ করেছে। হ্যা, একটা স্বার্থ কাজ করেছে অবশ্য ই। আর সেটা হচ্ছে, বদি ভাই ও তার ভাইদের থেকে অনেক আলাদা ছিলেন। তার পাশে কেউ আসলে ছিলো না। ঊনি ভাবতেন, আমি বা হাবিব ভাই বা আমরা ই তার আপন জন এবং আপদে বিপদে আমরাই তার পাশে আছি। কথাটা ঠিক। কিন্তু পরবর্তীতে যত টুকু আমাদের পাশে থাকার দরকার ছিলো, আমরা আসলে ততো টুকু পাশে থাকতে পারি নাই। এর কারনও হচ্ছে আমাদের বুঝাপড়ার তফাত। হয়ত এটাই এই স্বার্থপর পৃথিবীর নিষ্ঠুর নিয়মের একটি। 

বদি ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম মনোমালিন্য টা হয় আমার বিয়ে নিয়ে। এটা মানতে মানতে আমাদের মধ্যে একটা বিস্তর গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো। কখনো নরমাল, কখনো আধা নরমাল, আবার কখনো মনে হয়েছে সব ঠিকই আছে। আরেকটা কারন ছিলো যে, হাবীব ভাইয়ের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল মানসিকতা। একবার এটা বলেন তো আরেকবার তার সিদ্ধান্ত বদলে অন্য আরেকটি বলা বা আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়া। এইরুপ একটা পরিস্থিতিতে বদি ভাইও আর হাবীব ভাইয়ের ইপর নির্ভর করতে পারছিলেন না। 

একটা সময় চলে এসেছিল যে, আমরা যে যার যার মতো করেই চলছিলাম। ব্যাপারটা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, সাভাবিক অন্য দশ জনের সাথে আমরা যেভাবে চলি, ঠিক সেভাবেই চলছিলাম। সম্পর্ক খারাপ নয় কিন্তু আমরা খুব ঘনিস্ট কেউ আমরা। হাবীব ভাই বদি ভাইকে সব সময় ই শ্রদ্ধা করতেন এবং শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধাই করতেন। কিন্তু বদি ভাইয়ের জন্য হাবীব ভাইয়ের আরো অনেক কিছুই করার ছিলো। সেটা হয়ত হয় নাই। 

আজ বদি ভাইয়ের মৃত্যুতে একটা বড় অধ্যায় শেষ হলো। আমি তাকে মিস করবো সব সময়। যত কষ্টেই তিনি থাকতেন না কেনো, আমি যখন বদি ভাইয়ের কাছে যেতাম, আমি দেখতাম, তার মধ্যে একটা জীবনী শক্তি ফিরে আসতো। অনেক কথা বলতেন। অতীতের কথা, তার সাফল্যের কথা, তার দুঃখের কথা। আমিও শুনতাম। আজ আর তিনি নেই। তাকে আল্লাহ বেহেস্ত নসীব করুন। 

হোড়লে বাড়ি

অষ্টাদশ পার হইলে আমরা বলি আশি বা আশি পার হইয়া যাইতেছে এমন কিছু। কিন্তু যিনি নব্বই পার হইয়া শতায়ুর দিকে প্রতি মুহূর্তে একএক করিয়া প্রহর কাটাইয়া তাহার বয়স বিধাতা ক্রমাগত বাড়াইয়া চলিয়াছেন, তাহাকে আমরা আর যাহাই বলিয়া সম্বোধন করি না কেন, তাহার সঙ্গে ভালবাসিয়া মনের মাধুরী লাগাইয়া ছুটির দিন পরিত্যাগ করিয়া ঘটা করিয়া কোন এক শীতের সকাল কিংবা চৈত্রের কোন এক নির্জন দুপুর বরাদ্ধ করিয়া মনে আলপনা মাখিয়া কেহ তাহার সহিত গল্প করিতে ছুটিয়া আসিবেন তাহা হয়ত খুব স্বাভাবিক নয়। অথচ কোন একটা সময় ছিল, যখন এই শতায়ুর কাছাকাছি বৃদ্ধারও একটা যৌবন ছিল, তাহাকে দেখিবার জন্য কোন না কোন এক পুরুষের হৃদয়ে বসন্তের হাওয়া লাগিয়াছিল, তাহাকে নিয়া হয়ত অনেকেই কতই না অপ্রকাশিত প্রেমের কবিতা লিখিয়া যাইত, সহপাঠীদের মধ্যে হয়ত কেউ কেউ আবার তাহাকে অতি আপনজন মনে করিয়া কিংবা মনে মনে শুধুই আমার নিজের সম্পত্তি মনে করিয়া গুনগুন করিয়া গানের কলি গাহিত কে বা জানে। আমি আজ এমনি একজন অতি বৃদ্ধার সামনে হটাত করিয়া বসিয়া আছি। 

তাহার দেখিয়া বুঝা যায় অতি অল্পবয়সে তাহার গায়ের রঙ কাচা হলুদের মত ছিল, তাহার মুখের গড়ন, চোখের পাপড়ি, নাকের আকার দেখিয়া বুঝা যায় তাহার শৈশবকালে তাহার মাতাপিতা তাহাকে লোক চক্ষুর কুদৃষ্টির আড়াল হইতে বাচাইয়া রাখার জন্য কতই না প্রানান্ত চেষ্টা করিতেন হয়ত বা। এই শেষসময় আসিয়া প্রায় একশত বছরের আগের কোন এক রূপসীর মত দেখিতে ক্ষনসুন্দরের প্রতিক যুবার সহিত আমার দৈবাৎ দেখা হইয়া গেল। কিভাবে দেখা হইল সেটা আমি কিঞ্চিত খোলাসা করিয়া বলিতেও চাহি না। তবে ইহা নিতান্তই ঠিক যে, আমিও তাহাকে দেখিবার জন্য আমার মহামুল্যবান সময় নষ্ট করিয়া ছুটির দিন পরিত্যাগ করিয়া গাড়ি হাকাইয়া এতদূর অবধি আসি নাই।  কোন এক সন্ধ্যা বেলা বউ বাচ্চা নিয়া অলস কিছু সময় কাটাইবার জন্য আমি আমার বন্ধু আলালের সঙ্গে তাহাদের গ্রামের একটি গৃহস্থালি বাড়ীতে বেড়াইতে আসিয়াছিলাম। আর ওইখানেই আমার সঙ্গে এই প্রউরার দেখা।

আমি যাহার সঙ্গে ঐ গ্রামের বাড়ীতে গিয়াছিলাম, ঐ আলাল, তিনি তাহারই মা।  আলালও  বয়স্ক মানুষদের মধ্যে একজন। তাহারও মুখের দাঁড়ি পাকিতে শুরু করিয়াছে, তিনিও কম হলে ষাট বছর ধরিয়া এই পৃথিবীর আলো বাতাস গ্রহন করিতেছেন। এখন তাহাকেও আর যুবক বলিয়া কেহই গননা করিবে না।

তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। গ্রামের চারিদিকে ঘনকালো অন্ধকার। রাস্তায় আশেপাশে কয়েকটা বাতি জ্বলিতেছে বটে কিন্তু ঐ ক্ষীণকায় বাতির আলোতে এত সুবিশাল বৃক্ষরাজীর অন্ধকার আলোকিত করিতে পারে এমন সাধ্য তাহাদের নাই, ফলে বড় বড় কৃষ্ণকলি গাছগুলো আশেপাশের লতাগুল্মের অযাচিত ভালোবাসার জড়াজড়িতে আলো অন্ধকারের ন্যায় এক ভুতুরে পরিবেশ সৃষ্টি করিয়া রাখিয়াছে। এই অঞ্চলে খুব একটা জোনাকি পোকা দেখা যায় না, তাই জোনাকির ঝি ঝি শব্দটা কানে আসে না বলিলেই চলে, তবে আশেপাশের ছেলেমেয়েদের কিছু কিছু কলকাকলি শোনা যায় না এমন নয়।

এই আলো অন্ধকার ভুতুরে আবৃত গায়ের মেঠো পথ পার হইয়া আমরা আলালের বাড়ীতে পৌঁছাইলাম। বাড়িটা বেশ সুন্দর। প্রশস্ত উঠান, সেই মান্দাতা আমলের ধাঁচে করা সিঁড়ি সম্বলিত একটা স্কুল ঘরের মত পাকা বিল্ডিং। বিল্ডিং ঘরখানা পার হইয়া আরও একখান ছোট উঠান, সেই উঠান পার হইলেই চোখে পড়ে ঘোর কালো অন্ধকার। এই ঘোর অন্ধকার উঠানের চারপাশে কয়েকটি গাছ ঠায় অন্ধকারকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া আকাশের তারাগুলিকে নিশানা করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। হটাত করিয়া আলো হইতে আসিয়া যেন কালো অন্ধকার উঠানটিকে আরও কচকচে কালো রঙের মত সীমাহীন অন্ধকার বলিয়া মনে হইল, আর আমি ঠায় চোখে কিছু না দেখিতে পাইয়া দাঁড়াইয়া গেলাম। সামনে কিছুই দেখিতে পাইতেছিলাম না কিন্তু আমার বন্ধুটি অতি অনায়াশেই এই কালো অন্ধকার ভেদ করিয়া অতি সহজেই আরেকটি আধা পাকা বিল্ডিং এর দরজার সামনে আসিয়া হাজির হইয়া গেলেন। আমি কোন রকমে হামাগুড়ি দিবার মত ভঙ্গিতে পায়ে পায়ে টিপিয়া টিপিয়া এক কদম এক কদম করিয়া আগাইয়া আসিয়া তাহার কাছে পৌঁছলাম। বাড়ীর ভিতরে কেউ আছেন বলিয়া মনে হইল না। বারান্দায় একটি ছোট পাওয়ারের বাল্ব জ্বলিতেছে। গ্রিল দেওয়া একটি ঘর। ঘরটির কাছে আসিয়া আমার ঐ বন্ধু আলাল 'মা' বলিয়া দুইবার ডাকিলেন। চারিদিকে কোন সারাশব্দ নাই, বেশ গরম পড়িয়াছে, কোন বাতাসও বহিতেছে না। আমার বন্ধুটি আবারো শব্দ করিয়া 'মা' বলিয়া ডাকিলেন।

রাত্রির নিস্তব্দতা ভাঙ্গিয়া, ক্যাচ করিয়া লোহার একখান দরজার খিল খুলিলে যেই ধরনের শব্দ হয় তাহার মত শব্দ করিয়া কোন একজন তাহার দরজা খুলিলেন। দরজা খুলিতেই দেখিতে পাইলাম, অতি বয়স্ক একজন মহিলা তাহার শরিরের কাপড় গুছাইতে গুছাইতে শরিরের ভারসাম্য রক্ষা করার নিমিত্তে কাপিতে কাপিতে দরজার হেসবলটি খটাশ করিয়া খুলিয়া ফেলিলেন। খুলিয়াই বড় আদরের সহিত অস্ফুট স্বরে বলিলেন, ও তুই বাবা? এত রাতে কথা হইতে আইলি?

বুকটা ধক করিয়া উঠিল যেন। আমার মাও থক এমন করিয়াই আমাকে সম্বোধন করিত। অনেক দিন হইয়াছে আমার মা প্রয়াত হইয়াছেন। মাকে মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। কিন্তু এই বয়সে আসিয়াও আমার মাকে আমি খুব কাছে থেকে মিস করি এই ভাবনা অনেকেই মানিয়া লইতে পারেন না। আমি মানিয়া লইয়াছি। কি মিষ্টি সেই সম্বোধন। মাকে নিয়া পৃথিবীতে এত বেশি গল্প রচিত হইয়াছে, এত গান, এত বায়স্কোপ, এত উপন্যাস রচিত হইয়াছে যে, তারপরেও মাকে নিয়া আরও হাজার হাজার কবিতা, হাজার হাজার উপন্যাশ রচনা করিবার অবকাশ রহিয়াছে। মায়ের কথার সুর আলাদা, তার চাহনি আলাদা, তাহার হাতের স্পর্শ আলাদা, তাহার শাসন আলাদা, তাহার আদরের ভাষা আলাদা। তাহার অনুপ্রেরনার শক্তি আলাদা, তাহার ভালোবাসার মহব্বত আলাদা। কোন কিছুই তাহার সহিত পারিয়া উঠিবে বলিয়া আমার মনে হয় না আর হইবেও না। আমার সামনে যিনি দাঁড়াইয়া আছেন, তিনি আলালের মা। আমারও মা।

আমাকে দেখিতে পাইয়াছে বলিয়া মনে হইল না। ঘরের বাতির আলো হইতে বাহির হইলে স্বাভাবিক কারনেই বাহিরের অন্ধকার আরও বেশি ঘুটঘুটে অন্ধকার হইয়া চোখে এমন ধাধার সৃষ্টি করে যে, বাহিরে কি আছে বা কাহারা আছে তাহা হটাত করিয়া চোখে না পড়ারই কথা। উম্মুক্ত দরজা ধরিয়া আমি আর আমার বন্ধু আলাল ঘরে ঢোকিলাম। বৃদ্ধা অনেক ধীরে ধীরে তাহার বিছানায় গিয়া উঠিয়া বসিলেন। আমরা তাহার পাশে অদুরে রক্ষিত দুইটা চেয়ার খরখর শব্দ করিয়া টানিয়া বসিলাম।

তাহার ঘরের মধ্যে অনেক আসবাবপত্র নাই তবে কমও নাই। একটা ড্রেসিং টেবিলের মত একটা টেবিল। তার কিয়ত অংশ জুরিয়া একটি ছোট আয়না। দেখিয়াই বুঝা যায় অনেক দিন এই আয়নায় কেউ দাঁড়াইয়া তাহার মুখখানা দেখিয়াছে কিনা সন্দেহ আছে। আয়নার ঠিক উপরে একখানা ছোট গামছা যার সারা শরীরব্যাপী অনেক ধুলা জমাইয়া ফ্যানের বাতাসে মনের আনন্দে একটু একটু ঘুরপাক খাইতেছে। বৃদ্ধার খাটখানা বেশ প্রশস্থ, তোষকের জাজিম, তাহার উপরে একখানা চাদর। মনে হইতেছে চাদরখানা বেশ কয়েকবার ব্যবহার করিবার কারনে কিছুটা দুমড়ে মোচরে আছে। খাটের পাশেই পরপর দুইখানা কাঠের আলমারি সটান হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। উপরে একটি ফ্যান চক্রাকারে ঘুরিতেছে। খাটের একদম লাগোয়া ছোট একটি টেবিল রহিয়াছে। তাহার উপরে এবং নিচে কয়েকটি অতি পুরাতন টিনের অথবা ম্যালামাইনের বাসন, বাসনগুলির উপর কয়েকটি গ্লাস উপুড় করিয়া রাখা আছে। সম্ভবত এইসব বাসন আর গ্লাস বৃদ্ধার খাবারের জন্য ব্যবহৃত হয়। ঘরের আলমারি, খাট, টেবিল চেয়ার সবগুলিতেই ভ্রাম্যমাণ ধুলাবালিতে এক প্রকার দাগ পরিয়া আছে। কেহ তাহা পরিস্কার করিয়া দিবার নাই। আর পরিস্কার করিলেও দায়সারা ভাবে যে পরিস্কার করিয়াছে তাহা স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে। দেয়ালের একপাশে একটি মশারি তাহার দুই কোনা লোহার দুইটি প্যারেকের মধ্যে গাঁথিত হইয়া নৌকার পালের মত ফ্যানের বাতাসে ক্রমাগত একবার এদিক একবার ওদিক হেলিতেছে।

বৃদ্ধার সঙ্গে আমার গল্প করিতে খুব ইচ্ছা হইতে লাগিল। কিন্তু তাহার কোমরে ব্যথা বলিয়া বারংবার উল্লেখ করিতেছেন বলিয়া আমারও এক প্রকার সংকোচ বোধ হইতে লাগিল। সংকোচবোধ হইতেছিল এই কারনে যে, আমরা কি এই অসময়ে আসিয়া বৃদ্ধার বিশ্রাম নষ্ট করিয়া দিলাম? আমি তারপরেও তাহাকে অতি আপনজনের মত প্রশ্ন করিলাম, কিছু খাইয়াছেন কি? আমরা আসিয়া কি আপনাকে বিরক্ত করিলাম কিনা ইত্যাদি।

তিনি অতি বিচক্ষন মহিলা বলিয়া আমার মনে হইল। তিনি বলিলেন, আমি এখনো বাচিয়া আছি বলিয়াই তো তোমরা আসিলা। কেউ আসিলে আমার খারাপ লাগে না। বরং কিছুটা সময় কিছু মানুষের সঙ্গে কাটিয়া যায় বলিয়া আমার সস্থি লাগে। এখন তো আর কাহারো সময় নাই আমাদের মত মানুষের সঙ্গে সময় কাটাইবার। আজকাল যুগের ছেলেমেয়েরা, তাহাদের পিতা মাতারা স্নতান সন্ততিরা কেহই আর আগের দিনের পিতামাতার মত নয়। অতি অল্পতেই তাহারা ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে, বিরক্ত হইয়া উঠে, কোন কিছুতেই তাহারা সন্তুষ্ট নহেন। আদব কায়দার ধার ধারে না। সত্য মিথ্যার ধার ধারে না। লাভের হিসাবটা যেখানে বেশি, তাহাকেই তাহারা নীতি বলিয়া মানিয়া লইয়া আপাতত লাভের আশায় যাহা কিছু করিতে হয় তাহাই তাহারা করিতে ইতস্তত বোধ করে না।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমরা কতই না আমাদের দাদা দাদিদের সঙ্গে গল্প করিতাম। ভুতের গল্প, সেই রাজরানির গল্প, পড়া ফাকি দিয়া কখন দাদুর কোলে মাথা রাখিয়া নাম না জানা পরীদের গল্প শুনিতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা ভুত আছে বলিয়া বিশ্বাস করে না কিন্তু ভুতের গল্প শুন্তেও ভয় পায়। আমাদের সময় আমরা পাশের বাড়ীর বরই গাছের আধাপাকা বরই, পেয়ারা, কচি কচি আম চুরি করিয়া আনিয়া দাদুর পানের বাটিতে লুকাইয়া রাখিতাম, আর এখনকার নাতি নাতকুরেরা দাদা দাদির পানের বাটি হইতে সুপারি পর্যন্ত না বলিয়া লইয়া যায়। ইহাকে চুরি বলে কিনা আমি বলিতে পারিব না কিন্তু যখন দেখি আমার আচলে রাখা কয়েকটা ছোট বড় নোট যখন কোথায় হাওয়া হইয়া অদৃশ্য হইয়া যায় তাহা যখন আর বুঝিতে পারি না, তখন মনে হয় সময়টা পাল্টাইয়া গিয়াছে, অথচ কাহাকেও কিছু বলিবার আমার যোগার নাই।

বুড়ি আরও গল্প করিতে লাগিলেন, যেন মনে হইল তিনি আস্তে আস্তে তাহার শৈশবকালে ফিরিয়া যাইতেছেন।

-আমি যেদিন এই বাড়ীতে বউ হইয়া আসি, তখন আমার কতইবা বয়স। হয়ত আট কিংবা নয়। স্বামী কি জিনিস, শাশুড়ি কি জিনিস, কিংবা ভাসুর, কিংবা শ্বশুর, কাহাকে কেমন করিয়া সামলাইতে হইবে আমরা কিছুই জানিতাম না। বাবার বাড়ীতে যে ছোট মেয়েটি সকাল অবধি ঘুমাইত, সেই ছোট বালিকাটি হটাত করিয়া শ্বশুর বাড়ীতে আসিয়া এক রাতের মধ্যে মহিলা হইয়া জন্মিল। যেন তিনি আর ছোট বালিকাটি নন। তাহার অনেক দায়িত্ত। স্বামীর দায়িত্ত, পরিবারের ঘর ঘুছানো , উঠোন পরিস্কার করা, গোয়াল ঘরে গরুর খাবারের জন্য গাদা গাদা পানি দেওয়া, শাশুড়ির জন্য শীতের দিনে ওজুর গরম পানি করে বদনা দিয়ে রাখা, কত কি। ঐ ছোট বয়সে আমার শরিরের থেকে দায়িত্তের পরিমান অনেক ঢের বেশিই ছিল, তারপরেও বাবাকে খুশি রাখিবার জন্য, মাকে আনন্দে রাখিবার জন্য আমার এই ছোট হাতগুলি দিয়া যতটুকুন পারিতাম সংসারের গুরু লঘু সব দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকিতাম। পাছে আমার শশুর কোন কাজ ঠিক মত হয় নাই, কিংবা কোন কাজ করিতে ভুল হইয়া গেছে এই লজ্জায় পড়ি, সেই ভয়ে নিজে দুপুরের খাওয়া, দিনের নাওয়া কোনকিছুই সময় মত করিতে পারিতাম না। দিনশেষে যখন একটু বিশ্রাম করিবার সময় হইত, আমার অতিপ্রিয় এই খাটের পাশে আসিয়া বসিতাম, তখন তোমাদের জামাই বাবুর মন জয় করিবার জন্য আমাকে আবার নতুন বউয়ের মত মুখে হাসি ফুটাইয়া, চোখে প্রেমের চাহনি দিয়া চাঁদনী রাতের আকাশের মত আমাকে রাঙ্গা বউ সাজিতে হইত। এভাবেই আমার দিনকাল কাটিয়া একদিন দেখিলাম আমি মা হইয়াছি। একে একে আলাল, জালাল, শাহিদা, রোকেয়া, সখিনা, সবাই আমার ঘর আলোকিত করিয়া আমার সংসার ভরিয়া তুলিল।

সংসার বড় কঠিন এক কর্মক্ষেত্র। স্বামীর মন যোগাইয়া, শাশুড়ির সব কাজ শেষ করিয়া, শ্বশুরের ঘর ঘুছাইয়া, দিনের কাজ সব শেষ করিয়া ছেলেপুলেদের সব হিসাব নিকাশ, আবদার মিটাইয়া যখন আমি প্রায় এক রকম অভ্যস্থ হইয়া দিনের কর্ম ব্যস্ততায় সময় কাটাইতেছি, তখন আমার বয়স গুনিয়া দেখিলাম, আমি নিজেও এখন শাশুড়ি হইবার সময় হইয়াছে। কিন্তু যাহার শশুর হইবার কথা তিনি সবাইকে তাক লাগাইয়া, গ্রামের সব প্রিয় বন্ধু বান্ধব্দের রাখিয়া আমাকে শ্রাবনের অজশ্র বারিধারার মত চোখের জ্বলে ভাসাইয়া তিনি এই পৃথিবীর সমস্ত বন্ধন শেষ করিয়া আমাদের হইতে অনেক দূরে চলিয়া গেলেন। কি তার অভিমান, কি তার কষ্ট, কি তার চাহিদা কিছুই আর অবশিষ্ট না রাখিয়া সংসারের সমস্ত দায়ভার আমার কাঁধে তুলিয়া দিয়া স্বার্থপরের মত আমাকে একা রাখিয়া বহুদুর চলিয়া গেলেন। আজ অনেকদিন পর মনে হইল, আমি শুধু এই বাড়ীর বউ হইয়াই আসি নাই, আজ মনে হইল, আমি আজ সংসারে মা আর তার উপর বাবার দায়িত্বও পালন করিতে এই সংসারে ঢুকিয়াছিলাম। শুধু তাই নয়, যে ননদিনীকে আমি আমার সই বলিয়া মনে করিতাম, আমি আজ তাহারও মা হইয়া বসিয়াছি। যে দেবরকে আমি আমার ছোট লক্ষি ভাই বলিয়া আদর করিয়া শাসন করিতাম, আজ আমি তাহার মা বলিয়া অনুভব হইতেছে। উহারা সবাই আমার অতিপ্রিয় সন্তানের মত আমাকে আরও নিবির করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিল। আমার আর কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা রহিল না। না বাপের বাড়ি, না পৃথিবীর মায়া কাটাইয়া আমার স্বামীর দেশে। আমি বাড়ীর প্রতিটি অংশ, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি প্রাণীর মা হইয়া গেলাম। চুলায় কখন আগুন ধরাইতে হইবে, কখন কাহাকে কোথায় পাঠাইতে হইবে, কখন ধান কাটার মৌসুম হইলে কোথা হইতে কতজন কামলা নিতে হইবে, মটরশুটি পাকিয়াছে কিনা, পাকিলে কখন কাটিতে হইবে, সব হিসাব আমাকেই রাখিতে হইত। বাড়ীর উঠোন কখন ঝারু দিতে হইবে, রাতে কাহাকে কখন কি ঔষধ খাওয়াইতে হইবে তার সবদিক আমাকে অতি সূক্ষ্মতার সহিত হিসাব করিয়া পালন করিতে হইতেছিল।

এই যে বাড়িটা দেখিতেছ? এখানে এত ঘর বাড়ি ছিল না। বড় একটা উঠান ছিল, পাশে হরেক রকমের গাছগাছালি ছিল। ঐ যে আমাদের দক্ষিন পাশটা আছে, সেখানে অতি মস্তবড় একখানা গাব গাছ ছিল। অতি গরমের সময় আমার স্বামী কড়া দুপুরে একখানা মাদুর বিছাইয়া হাতে একখানা তালপাতার পাখা লইয়া তাহার হরেক পদের ব্যবসার হিসাব লইয়া বসিত। আরও কত কি! তখন ক্যালকুলেটর ছিল না, বাঁশের কঞ্চিতে কালি মাখাইয়া দিস্তা কাগজের মোড়ায় একখানা খাতা লইয়া তাহার ব্যবসার লেনদেনের অনেক হিসাব কষিয়া লাভ ক্ষতির বিবরন লিখিয়া রাখিতেন। গাব গাছটার দিকে তাকাইলে আমার এখনো তাহার কথা মনে পড়ে। মনে হয়, এই বুঝি তিনি আসিয়া আমার কাছে পান আছে কিনা জিজ্ঞেসা করবেন। হয়তবা কোন এক পলকে আসিয়া বলিবেন, কই গো শুনছো, আমি একটু বাজার হইতে ঘুরিয়া আসি। কিছু আনিতে হইবে কি? আমি অপলক দৃষ্টিতে ঐ গাব গাছটির দিকে তাকাইয়া থাকি আর তাহার কথা মনে করি। গাছের কোথা বলিবার ভাষা নাই। থাকিলে হয়ত আমাকে প্রশ্ন করিত, কি গো তাহার কোথা মনে পরিতেছে? আমার ও তাহার কথা মনে পরিতেছে। মন তা খারাপ হইয়া যায়। সে আমাক্র কথা হয়ত ভাবে না, হয়ত বা ভাবেও।

আমি তাহার গল্পের বর্ণনা শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম, তিনি এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও তার ঐ সময়ের সব স্মৃতি দিনের আলোর মত ফকফকা হইয়া তাহার চোখে পরিতেছে আর তিনি ঐ দৃশ্য অনাবিল ভঙ্গিতে আজ এই ঘনকালো অন্ধকারের মধ্যে অকপটে বলিয়া যাইতেছেন। আমি যেন তাহার চোখের এই দিবাকালিন অতীত বর্তমানের বর্ণনা নিজের চোখে দেখিতে পাইতেছি।  তাহার গল্প শুনিতে আমার বড় ভাল লাগিতেছিল।

আমি বলিলাম, তারপর কি হইল?

তিনি আমার প্রশ্ন শুনিতে পাইলেন কিনা আমি বুঝিতে পারিলাম না, কিন্তু তিনি তাহার গল্পের কোন ছেদ না করিয়াই বলিতে লাগিলেন, এরই মধ্যে আমার এই আলালের বিয়া হইয়া গেল। আমাদের সংসারে কোন অভাব ছিল না কিন্তু আমার স্বামীর অন্তর্ধানের পর অনেক হিসাব কিতাবই আর আগের মত চলিতেছিল না। যাহাদের কাছে আমরা টাকা পয়সা পাইতাম, তাহারাও আর আগের মত বন্ধুসুলভ নাই, আবার যাহারা আমাদের কাছে টাকা পয়সা পাইত, তাহারও আমাদের দয়া করিয়া যে ছাড় দিবে তাহাও হইল না। ফলে একদিকে প্রাপ্য টাকা না পাইয়া হাত শুন্য হইয়া বসিয়া আছি, অন্যদিকে ঋণগ্রস্থ হইয়া আমাদের সংসারে একটু ভাটা পরিল বলিয়াই আমার মনে হইল। আলাল কোন রকমে একটা সরকারি চাকুরী সন্ধান করিয়া সংসারের হাল ধরিলবটে কিন্তু তাহাকে সোজা করিয়া দাড়া করাইয়া রাখা যেন কঠিন হইতে কঠিনতর হইয়া উঠিল। অনেক ঈদ পর্বন, অনেক মেলা, অনেক শখের আহ্লাদ আমাদের আর আগের মত করিয়া উৎযাপন করিতে পারি নাই। মনে হইয়াছে ছেলেমেয়েরা বড় হউক, একদিন আমার এই সব দুঃখের দিন শেষ হইবে। তখন নায় নাতকুর লইয়া আবার আমি আগের মত হই চই করিয়া বেড়াইব, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের লইয়া আনন্দে গ্রাম ঘুরিয়া বেড়াইব। কত কি? 

এই বলিয়া বুড়ি অনেক্ষন চুপ থাকিলেন। মনে হইল আজ এত বছর পর তাহার সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত কাহিনী তাহার মনের অতি গোপন স্থান হইতে উকি দিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ হইবার জন্য এক লম্বা লাইন ধরিয়া আছে। বৃদ্ধার গলা ধরিয়া আসিতেছিল, তাহার চোখের কোনা হয়ত ভিজিয়া আসিতেছিল, তিনি আর বেশিক্ষন আবেগ ধরিয়া রাখিতে পারিতেছেন না। আমার বন্ধু আলালের চোখেও একটু একটু অশ্রুর রেখা দেখা যাইতেছিল। রাতের এই ছোট পাওয়ারের আলোতে হয়ত আমি পুরু চোখ দেখিতে পাইতেছিলাম না তবে এইটুকু আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আলালের আধাপাকা দাঁড়ি গড়াইয়া তাহার চিবুক ঘেঁষিয়া হয়ত কয়েক ফোঁটা জল পরিয়া থাকিবে। বৃদ্ধার গল্প থামিবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল এখানে হটাত আলো থামিয়া গিয়াছে, এখানে ভাষা থমকে দাঁড়াইয়াছে, শুধু উপরে ফ্যান খানা নীরস যন্ত্রের মত চারিদিকে অসম্ভব দ্রুত গতিতে ঘোরপাক খাইতেছে।

আলালের বউ যখন আমাদের বাড়ীতে আসিল, আমার সেই ছোট বেলার বউ সাজিবার সবঘটনা মনে পরিতে লাগিল। লাল টুকটুকে শাড়ি, হাতে মেন্দি, মাথায় সব সময় বড় বড় ঘোমটা, আরও কত কি। আমি কোথায় কোথায় কি অসুবিধার মধ্যে পরিয়া কি কি কারনে মনে কষ্ট পাইতাম, কি করিয়া আমি আবার ঐ মনের কষ্ট দূর করিবার জন্য কি করিতাম, সব মনে পরিতে লাগিল। আলালের বউয়ের কার্যকলাপ দেখিয়া মাঝে মাঝে আমি খিল খিল করিয়া হাসিতাম, আবার মাঝে মাঝে খুব লক্ষির মত তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতাম, আমরা মেয়ের জাত, সংসার আমাদের ধর্ম, ইহাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া স্বামীর ভিটায় লাশ হইয়া বাহির হইতে পারিলেই আমাদের মেয়ে জীবন সার্থক। আর যদি ইহার কোথাও কোন ব্যত্যয় ঘটে, তখন আর কোন কাজেই আসিবে না। এইরূপ, এই যৌবন একদিন শেষ হইয়া যাইব। সংসার ছাড়া মেয়েদের আর কিছুই নাই। ইহাকে আপন করিয়া ধরিয়া রাখ।

আলালের বউকে পাইয়া আমি যেন আবার আমার সেই ছোট বেলার একজন সাথী পাইলাম এমন একজন মানুষ হইয়া গেলাম, আবার আমি তাহার শাশুড়ি এই কথাটাও ভুলিয়া গেলাম না। আলালের বউ যখন ভুল করিত, আমি তখন মনে মনে হাসিয়া ভাবিতাম, আহারে, আমিও কি তোমার মত এই ভুলগুলি করি নাই? করিয়াছি তো। কখনো কৃত্রিম রাগবর্ষণ করিয়া ভতরসনা করিতাম কিন্তু অধিক রাগ করিতাম না। ক্রমেক্রমে ও আমার একজন ভাল বন্ধু হইয়া উঠিল। সরকারী চাকুরী, আলালকে তাই কখনো অনেক দুরের শহরে থাকিতে হয়। আবার কখনো দুই একদিনের জন্য বাড়ীতে আসিতে হয়। নতুন বউ, আমি বুঝিতে পারিতাম তাহাদের মনের আকুতির কথা, তাদের মনের কথা। কিন্তু বাস্তব যখন ঘরের কাছে আসিয়া নিজের পেটের ক্ষুধার কথা স্মরণ করাইয়া দেয়, তখন প্রেমের কথা আর বেশি করিয়া মনে করিয়াও কোন লাভ হয় না। বিরহ তখন নিত্যদিনের সঙ্গি হিসাবে মানিয়াই নিতে হয়। এখনকার দিনের মত যুগ ছিল না তখন যে মন খারাপ হইয়াছে তো একখান মোবাইলে টিপ দিলেই মনের মানুষের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘণ্টা আলাপ করিয়া মনের কথা বলিয়া একটু সস্থি পাওয়া যাইবে। তখন পোস্ট অফিস ছিল, আবার হাতে লিখিয়া চিঠি পাঠাইতে গেলেও অনেক সময় লোক মারফত চিঠি পোস্ট করিবার লোক পাওয়া যাইত না, নিজে হাটিয়া গিয়াও চিঠিখানা পোস্ট করিবার উপায় ছিল না। তাই যোগাযোগটাও ছিল বেশ কঠিন আর যখন একবার দেখা হইত, তখন প্রেমের কথা বলিবার চেয়ে সংসারের সমস্যা সমাধানের জন্যই সময়টা কাটিয়া যাইত বেশি। যেদিন আলাল তাহার বউকে নিয়া তাহার কর্মস্থলে যাইত কিছুদিন থাকিবার জন্য, আমার বড্ড মন খারাপ হইত। একা একা বোধ হইত। মনে হইত কি যেন আমার সঙ্গে নাই, কে যেন আমার কাছ হইতে হারাইয়া গিয়াছে।

এইবার বৃদ্ধা নড়িয়া চড়িয়া বসিলেন। মাথা একটু উচু করিয়া আমাদের দিকে তাকাইয়া মুচকি হাসিয়া বলিলেন, একদিন আলাল মিষ্টি লইয়া বাড়ীতে আসিয়া আমার হাতে মিস্টির একটি প্যাকেট দিয়া বলিল, তোমার বৌমা অসুস্থ। আমি হচকচিয়ে উঠিলাম, একটু ভয়ও পাইলাম।  ওমা, কি রে কি হইয়াছে? লাজুক আমার আলাল কিছুই না বলিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়া উঠানের গাব গাছটির তলায় গিয়া সবার কাছ হইতে যেন পালাইয়া বাচিল। আলালের বউ সঙ্গে আসিয়াছিল। কাছে তানিয়া বুকে লইয়া জিজ্ঞাস করিলাম, কি হইয়াছে তোমার? শিক্ষিত নেয়ে, অবুঝ নয়, মুচকি হাসিয়া যাহা ইঙ্গিত করিল, বুঝিলাম, আমি দাদি হইতে চলিয়াছি। আমার চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। ঘরের প্রতিটি কাপ, গ্লাস, জানাল দরজা যেন খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। আমার উঠানের গাছগুলিও যেন বাতাসের দোলায় নাচিয়া বলিতে লাগিল, তুমি আরও এক ধাপ আগাইয়া জিবনের আরেক দায়িত্ব পালনে তৈরি হইয়া যাও। আমার বড় ভাল লাগিল।

সময় বড় নিষ্ঠুর, সে সবার সাথে চলিয়া বেড়ায় বটে কিন্তু কাহারো সঙ্গে সে সখ্যতা করে না। সে কাহারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাহার তারা নাই কিন্তু তাহার দেরি করার সময়ও নাই। সে কাহারো হাত ধরিয়া সামনে আগাইয়া চলে না, সে তাহার নিজ গতিতে বহমান। তাহাকে তুমি বশ করিতে পারিবে না। সে কাহাকেও বশ করে না। তাহার সহিত কেহ চলতে চাহিলে সে তাহার সহিত যুগযুগ ধরিয়া একত্রে চলিতে পারে আবার কেহ যদি তাহার সহিত চলিতে না পারে, তাহাতে তাহার কোন বিপত্তি হয় হয় না। সে একাই আপন গতিতে চলিতে থাকে। আর এই বহমান সময়ের স্রোত ধরিয়া আলালের ঘরে সোমা আসিল, রুবেল আসিল, জালালের ঘরে তিন্নি, মিন্নি সবাই আসিল, আর ঘর হইতে আমার সব প্রিয় মেয়েরা অন্য পুরুষের স্ত্রী হইয়া চোখের জ্বলে নিজেরা ভাসিয়া আর আমাকেও কাদাইয়া যে যার যার সংসারে চলিয়া গেল।

এখন তাহারা যার যার সংসার লইয়া, নিজেদের পরিকল্পনা লইয়া, শহর বন্দর খুজিয়া খুজিয়া নিজেদের আশ্রয়স্থল লইয়া নিজ নিজ সংসার পাতিয়া বসিয়াছে। একটি ঘর হইতে দুইটি, দুইটি হইতে চারটি, ঘর বাড়িয়াছে। বাড়ি বাড়াইতে গিয়া অনেক গাছ গাছালির জীবন দিতে হইয়াছে। আগের গোহাল ঘর সরাইয়া আরও দূরে লইয়া যাইতে হইয়াছে, এক বাড়ীর সীমানা আলাদা করিবার জন্য আরেক বাড়ীর সীমানা প্রাচির তৈরি হইয়াছে। ভাইয়ে ভাইয়ে আলাদা আলাদা প্রাচির ঘেরা বাড়ি বানাইয়া একে অপরের হইতে অনেক কিছু গোপন রাখিয়া দূরত্ব বজায় রাখিয়া চলিতেছে। তাহারা আর আগের মত এক সঙ্গে নদীর ধারে গলাগলি করিয়া গোসল করিতে যায় না, ঐ গাব গাছের তলে বসিয়া গল্প করে না। আগে এক হাঁড়িতে ভাত পাক করিলে সবাই মিলিয়া কাড়াকাড়ি করিয়া খাইয়া ফেলিত, কখনো তরকারীর জোগান কম হইয়া যাইত, আবার কখন মেহমান আসিলে শেষে যিনি খাইতে বসিতেন তাহার ভাগে কমই জুটিত। তারপরেও আনন্দ ছিল অঢেল, হাসি ছিল অফুরন্ত। এক ঘরে জায়গা না হইলে ছেলেরা মেয়েরা ভাগাভাগি করিয়া শুইয়া পরিত। নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুন্টুশি যে হইত না তাও নয়, কিন্তু তাহাও ছিল এক আনন্দের অফুরন্ত ভান্ডার। আজ সবার সংসার হইয়াছে, সবার হাঁড়িপাতিল আলাদা। কেহ মুরগীর তরকারি খাইয়া ঢেকোর তুলিতেছে, কেহ আবার নিছক শাকপাতা খাইয়া পেটের পীড়ায় ভুগিতেছে। একজনের সন্তান দেশ বিদেশ ঘুরিতেছে, আরেক জনের সন্তান মাঠে কঠিন রোদে পুড়িয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া সারা বছরের ফসল ফলাইবার জন্য প্রানান্ত চেষ্টা করিতেছে। বউদের যেমন সময় নাই, তাহাদের সন্তানদেরও সময় নাই। আমরা যারা আজ অনেক বুড়া হইয়া গিয়ছি, আমরা যখন আর আগের মত আর চলিতে পারি না, আমাদের দেখার জন্য তাহাদের হাতে ওত সময় কই?

আজ যখন দেখি সারা উঠোন গাছের মরা পাতায় এখানে সেখানে ছরাইয়া ছিতাইয়া এলোপাথাড়ি পড়িয়া আছে, হাটিবার রাস্তাটাও অনেক ময়লায় ভরিয়া আছে। তখন মনে হয়, আমার সংসার আলাদা হইয়া গিয়াছে, যার যার জায়গায় তারা শুধু গাছের পাতা, ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করিয়াই খালাস। আমার শাশুড়ি বলিতেন, সকাল বেলায় পরিবারের সদস্যরা ঘরের বাহির হইবার আগেই যে একবার ঘর বাড়ি উঠোন ঝাউ দিতে হয়, তা না হলে অলক্ষুণেরা ভর করে, সেই ভয়ে আজও আমি সকাল হলেই একটা ঝারু লইয়া সবার আগে ঘুম হইতে উঠিয়া সমস্ত বাড়ীটি কল্যাণময় করিয়া তুলি। এটা আমারই তো সংসার, তাহারা হয়ত নিজেদের জায়গা সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করিয়া আপন মনে করিয়া সাজাইয়া লয়াছে, কিন্তু এক সময় তো তাহারা সবাই একই হাঁড়ির ভাত খাইয়াছে, একই ছাদের তলায় গাদাগাদি করিয়া ঘুমাইয়াছে। তাহারা সবাই তো আমারই রক্তের মধ্য হইতে তিলে তিলে আজ এত বড় হইয়াছে। তাহার আমাকে মানুক আর নাই বা মানুক, তাহারা আমাকে যত্ন করুক আর নাই বা করুক। এটা তো আমার স্বামীর ভিটা। আমার দ্বিতীয় জন্মের বাড়ি। আমি তো আর তাহাদের আলাদা করিয়া ভাবিতে পারি না। আজকাল আমাদের নায়নাতকুরেরা আর আগের মত বড়দের সঙ্গে সম্মানের সহিত কথা বলে না, একে অপরের সহিত আদবের সহিত মন খুলিয়া কথা বলে না। কাহাকে আমি কি বলিব? আজ এত বছর পর আমার মনে হইতেছে, আমি এখানে আজ শুধু আমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করিয়া আছি। আমি অপেক্ষা করিয়া আছি কখন আমি আমার সেই প্রিয়তম স্বামীর সঙ্গে দেখা করিব। কখন আবার আমার সেই শাশুড়ি মা আমাকে জরিয়ায়া ধরিয়া বলিবে, হোরলে বাড়ি, আর পিরনে নারী। অর্থাৎ বাড়ি চিনিবে ঝারু দেওয়া দিয়া আর নারী চিনিবে তাহার পিরনের কাপড় দেখিয়া। তাই এখনো আমি এই বয়সে সবার মঙ্গলের কোথা ভাবিয়া সকালে সবার উঠার আগেই এক খানা ঝারু লইয়া আমার সব উঠোন পরিস্কার করিয়া লই, আর তাহাতেই আমার কোমর খানা প্রতিনিয়ত ব্যাথায় ভরিয়া উঠে। হয়ত আমাকে এই কাজ করিয়াই যাইতে হইবে আমার শেষ নিঃশ্বাস থাকা অবধি। এটা যে আমার বাড়ি, আমার স্বামীর বাড়ি। এখানে আমার শাশুড়ি শুইয়া আছেন, এখানে আমার শশুর ঘুমাইয়া আছেন। কি বলিব আমি যখন আমার সাথে তাহাদের দেখা হইবে? জানো তো একটা জিনিস, অনাদরে মানুষ বাচিলে তার একটা গুন আছে। আর তাহা হইল তাহাকে ব্যমোও ধরিতে আসে না। মরার সদর রাস্তা গুলি একেবারেই বন্ধ হইয়া যায়। সবার কাছেই তখন নিজেকে আপদ বলিয়াই মনে হয়। এই আমার আলাল তাহার সব টুকু শক্তি দিয়া আমাকে আগলাইয়া রাখিয়াছে বটে কিন্তু আর বাকি সব যে যাহার হিসাব লইয়া এত টাই ব্যস্ত হইয়া আছে যে তাহাদের ভবিষ্যৎ কি হইবে তাহারা আজ না বুঝিলেও হয়ত কোন একদিন আমার আজকের এই দিনের কষ্টটা হয়ত বুঝিবে। এই বলিয়া তিনি আলালের হাতটি ধরিয়া অনেক্কখন চুপ থাকিয়া বসিয়া রহিলেন।

অনেক রাত হইয়া গিয়াছে। বুড়ি আর কোন কথা বলিতে পারিতেছিলেন না। আমি তাহার আরও কাছে গিয়া বসিলাম। তাহার গায়ে হাত রাখিয়া তাহাকে জরাইয়ায়া ধরিবার আমার খুব ইচ্ছা হইল। মনে হইল তিনি ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাদিতেছেন। কেহই তাহাকে বকা দেয় নাই, আমারাও তাহাকে এমন কোন কথা বলি নাই যাহাতে তাহার মন খারাপ হইতে পারে, কিন্তু জিবনের সব পাওয়া যখন নিরাশায় পতিত হয়, যখন এত কষ্টের পরিশ্রমে গড়া নিজের সংসার আর নিজের আয়ত্তে থাকে না, যখন সেই সব ছেলেমেয়েদের লইয়া কোন একদিন ভবিষ্যতের সুখের জন্য আজিকার সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়া এতগুলি বছর পার করিয়া জিবনের বেলাশেষে হিসাব নিকাশ করিয়া কোন কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না বলিয়া মনে হয়, তখন চোখের জল ছাড়া প্রতিবাদ করার আর কোন ভাষা থাকে না। নিজের সংসার কে আর নিজের বলিয়া মনে হয় না। তাহা অন্য কেহ দখল করিয়া লইয়াছে। আমি সেখানে শুধু একজন প্রাণী যার জীবন আছে কিন্তু জিবনের কোন মুল্য আছে বলিয়া মনে হয় না। কেউ কেউ এখনো আঁকড়াইয়া ধরে বটে কিন্তু সমস্ত সংসারটা আর আগের মত মনে হয় না।

আজ হইতে হয়ত আরও অনেক বছর পর আবার যখন আমার এই বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা হইবে, আদৌ দেখা হয় কিনা আমি জানি না, তখন হয়ত আমার এই আজকের রাতটির কথা বারবার মনে পরিবে যে এইখানে একশত বছর পুরানো কোন এক কাহিনী আমি শুনিয়াছিলাম, যার ইতিহাস লিখার কোন প্রয়োজন নাই, আর সে ইতিহাস সমাজের, দেশের কিংবা রাষ্ট্রের কোন কাজেও আসিবে না। হয়তবা আজ হইতে আরও একশত বছর পর আজকের এই কান্নাজরিত সুর কোন একদিন আজ যারা নিরবিকার হইয়া বসিয়া প্রাচির দেওয়া দেয়ালের মধ্যে নিসচুপ হইয়া বসিয়া আছেন, তাহারাও অনুভব করিবেন কিন্তু তাহাদের ইতিহাস শুনিবার জন্য, তাহাদের অশ্রুভেজা চোখের পাতা দেখিবার জন্য আর কেহই অবশিষ্ট থাকিবে না।

খুব ভারাক্রান্ত মন লইয়া আমি আমার বউ বাচ্চাদের নিয়া বাসায় ফিরিলাম। বিকালে একটা অলস সময় কাটাইতে গিয়াছিলাম কিন্তু সময়টা ভাল কাটিলেও মনের ভিতরে কোথায় যেন একটি বেদনার কিন্তু কষ্টের অনুভুতি আমাকে বার বার তারা করিয়া বেড়াইতেছিল। রাতে কোন কিছু আর খাওয়া হইল না। ক্ষনে ক্ষনেই আমার বারংবার মনে হইতেহিল 'হোরলে বাড়ি, আর পিরনে নারী'।

আইন্ডেন্টিটি (পর্ব-১)

২৪ বছর পর মনিকা জানতে পারলো যাকে সে বাবা বলে চিনত, যাকে সে আদরের ছোট ভাই বলে জানতো, যাকে সে বোন, চাচা, দাদা, জেঠা ফুফু ইত্যাদ বলে জানতো, তারা আসলে মনিকার কেউ না। বাবা বাবা না, দাদা দাদা না, ভাই ভাই না, বোন বোন না, জেঠা, চাচা, এরা ওর কেউ দাদা, ভাই বা বোন কেউ না। অথচ কাকের বাসায় কোকিলের ছানার মতো তার জন্ম হয়েছে, শৈশব কেটেছে, বাল্যকাল কেটেছে, আর এখন সে একজন পুর্ন বয়ষ্ক যুবতী। তাহলে এই ২৪ বছর ধরে যে মনিকা তিলে তিলে তার অন্তর, আত্মা আর মানসিকতা দিয়ে কিসের বালুর এক প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলো যা আজ হটাত করে সমুদ্রের এক জলোচ্ছাসে নিমিষের মধ্যে তছনছ করে মিলিয়ে গেলো?

সব মিথ্যা। এ যাবত মনিকা যা পেয়েছে, যা দেখেছে, যা শুনেছে, আজ সব তার কাছে মিথ্যা বলে সামনে এসে সত্য হাজির হয়েছে। মনিকা কাকে এই প্রশ্নের উত্তর জানাতে বলবে? মিথ্যে হলো সেই জাল যা একটা মানুষ তার নিজের অজান্তেই সে নিজের জন্য বিছায়। কিন্তু মনিকা তো নিজে কোনো মিথ্যার জাল বুনে নাই!! তাহলে তার ব্যাপারে এমনতা হলো কেনো? কথায় বলে, মিথ্যাও কখনো কখনো সত্যি হয়ে যায়। মনিকা আজকের এই মিথ্যাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। কোন একটা মিথ্যাকে হাজার বার বললে নাকি মিথ্যাটা সত্য হয়ে যায়। কিন্তু মনিকা জানে, তার এই মিথ্যা বা সত্য যেটাই হোক হাজারবার কেনো আজীবন কাল ধরে আওড়ালেও আর সত্যিটা মিথ্যা আর মিথ্যাটা সত্যি হয়ে যাবে না। হয়তো মিথ্যাটা এ যাবত কাল পর্যন্ত যেভাবে চাপা পড়েছিলো, আজো হয়তো সেটা চাপা দিয়েই মিথ্যাটাকে সত্য বলে চাপিয়ে জীবন চালাতে হবে অথবা, সমস্ত জগত সংসার ছেড়ে আকাশের পানে চেয়ে কোনো এক নামহীন গন্তব্যে সারাজীবনের জন্য হারাইয়া যেতে হবে। কারন সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা সব সময় সহজ হয় না।

মনিকা তার পড়ার টেবিলে জল ছাড়া মাছের মতো ছটফট করছে আর বসে  শুধু একা নীরবে এটাই ভাবছিলো তার ভবিষ্যত কি আর তার বেচে থাকার অর্থই কি। ভালোবাসায় যেমন অনেক শক্তি থাকে, তেমনি বদনামেরও একটা ভয় থাকে। সকাল থেকে এই সন্ধ্যা অবধি মনিকা তার সারা জীবনের গল্পটা আর এখন যেনো মিলাতে পারছিলো না। বারংবার মনে হচ্ছিলো, মনিকা, তার বাবা, তার মা, তার পরিবার যেনো একটা মুখোশ পড়েই এই সংসারে চলমান ছিলো। আজ সেই মুখোশ খসে পড়েছে বটে, কিন্তু মনিকা এটাও বারবার ভেবে কোনো কুল কিনারা পাচ্ছিলো না যে, মুখ আর এই মুখোশ তার আলাদা করা কতটা  বুদ্ধিমানের কাজ হলো

মনিকার প্রতিনিয়ত এটাই মনে হচ্ছিলো, এইতো গতকাল রাত পর্যন্ত তো সবই ঠিক ছিলো। অথচ আজ এতোদিনের একটা সম্পর্ক একটা মাত্র 'হ্যা' বলার মধ্যে সব তছনছ হয়ে গেলো? জীবন দাঁড়িয়ে গেলো কোনো এক মুল্যহীন ঘাটের ধারে যেখানে না আছে পারের কোনো খেয়া, না আছে ঘাটের কোনো মাঝি!

এই মর্মান্তিক ঘটনা হটাত করে কেমন করে মনিকার জীবনে ঘটে গেলো? এটাও একটা রহস্যের ব্যাপার ছিলো। জীবনের অনেক কাহিনী আছে যা রহস্যে ঘেরা থাকে। যখন কেউ এই রহস্য ঘেড়া চাদর সরাতে যান, তখন এমন এমন কিছু প্রশ্নের উদয় হতে পারে যা সাভাবিক জীবনের ভিত নড়ে যেতে পারে। এইসব রহস্য ঘেরা প্রশ্ন জানলেও অসুবিধা আবার না জানলেও জীবন সাভাবিক হয়ে উঠে না। এক্ষেত্রে কি জানা উচিত আর কি জানা একেবারেই উচিত না, সেটাই নির্ভর করে পরবর্তী সুখী জীবনের জন্য। মনিকার প্রায়ই মনে হচ্ছিলো যে, অন্য আর ভাই বোনদের সাথে ওর বাবা মার আচরন, ব্যবহার আদর আপ্যায়ন অনেক কিছুই গড়মিল। আর্থিক সচ্চলতার সাথে পরিবারের এই জন্মগত ব্যবহারগুলির মধ্যে কোনো তারতম্য থাকার কথা না। কারন তারা একই গোত্রের, একই পরিবারের। কিন্তু মনিকার মধ্যে এই প্রশ্ন বহুবার মনে উদয় হয়েছিলো, আসলেই এ রকম তারতম্য কেনো? সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। কোনো একদিন মনিকার মনে হচ্ছিলো, মনের দুক্ষে অনেক কাদবে সে মার সাথে বাবার সাথে। সে রকমেরই একটা পরিস্থিতি গতকাল সৃষ্টি হয়েছিল। কথায় কথায় মনের দুক্ষে আর রাগে যখন মনিকা তার মাকে এই অদ্ভুদ প্রশ্নটি করেই ফেল্লো, "মা, আমি কি তোমাদের আসলেই আসল মেয়ে? নাকি আমাকে তোমরা কোথাও থেকে কুড়াইয়া এনেছো?"

মনিকার এমন প্রশ্নে মানসিকভাবে দূর্বল মা, একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলেন, আর তার মনের অজান্তেই সব সত্যি কথা বলে দিলেন। মনিকা তার বাবার আসল মেয়ে নয়।

ঝড়টার আভাষ অনেক আগেই ছিলো, কিন্তু এবার শুরু হয়ে গিয়েছিলো। আজ এতো বছর পর তাহলে মনিকা কে? আচমকা এই সত্যের মুখুমুখি দাঁড়িয়ে ক্ষনিকের জন্য হলেও মনিকার জ্ঞান হারিয়েছিলো বটে কিন্তু অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। আজ নিশ্চিত জানলো মনিকা যে, জীবনের যাত্রার শুরু থেকে শেষ অবধি মনিকার রাস্তাটা একটা অন্ধকারই ছিলো, ওর জীবনটা ছিলো একটা অন্ধকার টানেল, যেখানে মাঝে মাঝে আলো আসে বটে কিন্তু সে আলোয় কোনো কাজ হয় নাই।  আজ সত্যটা একদম নাকের ডগায় বসে মনিকাকে এমনভাবে চুরমার করে দিলো যে, টাইম টাকে মনে হলো সবচেয়ে বড় ভিলেন। মনিকা  সামনে যা দেখছিলো, তার থেকে অনেক বেশি ঘটনা লুকিয়ে ছিলো তার না দেখার পিছনে। মনিকা এখন এমন একটা বয়সের দ্বার প্রান্তে দাড়িয়েছিলো, যার নাম যৌবন। আর এই যৌবন হলো এমন এক প্রাকৃতিক উপাদান যার দ্বিতীয় নাম শক্তি কিন্তু বড় অসহায়।

কারো পরিবার যখন নিমিষের একটা তথ্যের সার্টিফিকেটে অপরিচিত হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে কাছে যে আসে, সে হলো বন্ধুত্তের শক্তি। বন্ধুত্ব আমাদের জীবনের একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। মনিকারও এমন একজন বন্ধু ছিলো, যার না ছিলো কোনো সামাজিক প্রতিপত্তির অভাব, না ছিলো কোনো যশের কমতি। এই গত কিছু বছর যাবত মনিকার সাথে এই প্রতিভাযশি বন্ধুত্বটা এমনভাবে তার জীবনে এসেছিল, মনিকার কখনো মনে হয়েছে সে তার মা, তার বাবা, আবার কখনো মনে হয়েছে সে তার প্রিয়তম। মনিকার কাছে তার এই বন্ধুটি যেনো কোনো এক শিল্প। প্রায়শই মনিকার কাছে এ প্রশ্ন কুরিকুরি অংকুরের মতো উদয় হতো, জীবন শিল্পকে নকল করে নাকি শিল্প জীবনকে নকল করে? ব্যাখার কোনো আর আজ প্রয়োজন পড়লো না। ভঙ্গুর চিত্তে, হতাশ মনিকা, কিছুক্ষন গলা ফাটিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে বাক্রুদ্ধ হয়ে বসে রইলো। মিথ্যে চোখের জল একটা সময় আর কাজে লাগে না।মনিকার কাছে আজকের দিনের চোখের জলকে পুরুই মিথ্যা মনে হতে লাগলো। যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, সে সব সময়ই চাবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুক্ষটা, কষ্টটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই কষ্টের ব্যাপারগুলি শেয়ার করার দরকার। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে।

অবশেষে মনিকার যার চেহারাটা প্রথম মনের মানস পটে ভেসে উঠেছিলো, সে আর কেউ নয়, আকাশ। যে আকাশকে একদিন মনিকা তার ঘরের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে পলায়ন করেছিলো, আজ যেনো মনে হলো, এই আকাশই যেনো তার সুরক্ষার ছাদ। ঘরের দরজা বন্ধ হবার সাথে সাথে সবসময় মনের দরজা যে বন্ধ হবে এমন কোনো কথা নাই। একটা ভরষা ছিল ক্ষীন। অবশেষে মনিকা আকাশকেই ফোন করে এটাই বলার চেষ্টা করলো যে, যে বিষয়টায় আশংকা ছিলো, ভয় ছিলো, দুশ্চিন্তা ছিলো সেটাই হয়ে গেলো আজ। মনিকা আজ এক নামবিহীন কোনো এক পরিচয়হীন বেওয়ারিশ মুন্ডুহীন জীবন্ত লাশ। এখন যদি তার কিছু অবশিষ্ঠ থেকে থাকে, তা হল একটা শরীর, কিছু মাংশ আর সমস্ত জীবনভর অনিশ্চয়তা।  মনিকার আর কোথাও যাবার দরজা নাই। মনিকার জীবন হাপিয়ে উঠেছে। কোথাও কেউ নাই। জীবন যেনো একটা নদী।

তারপরেও আবার বারবার মনিকার মনে হচ্ছে, আকাশ নদীটা কি তার জীবনের লক্ষ্য পার হবার জন্য সঠিক নদী? মনিকা বারবার একই প্রশ্ন নিজেকে করেছিলো, কিন্ত কোনো উত্তর আসছিলো না। কারন, আপনি একই নদীতে দুবার পা দিতে পারেন না, দেওয়া যায় না। কিন্তু মনিকার জীবন নদীতে এখন বান ডেকেছে। এই কয়টা মাস খালী জল জমতেই থেকেছে, জমতেই থেকেছে, আর এখন সে জল প্রায় মাথার উপর উঠে গেছে, এখন এই জলের বানেই হয়তো মনিকা ডোবে যাবে। মনিকা হাপিয়ে পড়েছিল। ভয় পেয়েছিলো। মনিকার বারবার এটাই মনে হচ্ছিলো, এখন দরকার তার একটা সেটেলমেন্ট। আকাশের উপর কিছু ঘৃণা জমেছিলো বটে, কিছু রাগ হয়েছিলো বটে কিন্তু আজ মনিকার মনে এটাই বারবার উদিত হচ্ছিলো, অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে তারা হয়তো ঠিক লোক। আকাশের ঠিকানাটা মনিকার জন্য এইমুহুর্ত শুধু নয়, আজীবনের জন্যই হয়ত ভুল, কিন্তু আকাশ ভুল ছিলো না। পরিত্যক্ত ঘুনে ধরা কিছু জরাজীর্ন অন্ধ ভালোবাসার থলিটা নিয়ে মনিকা বুকের পাজরে শক্ত করে ধরে আজকের পরিত্যক্ত নিজের পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে গেলো কোনো এক অজানা গন্তব্যের পথে যেখানে হয়তোবা আকাশ নীল রংগের চাদর বিছিয়ে কিছু মেঘমালা সাজিয়ে দিনের শেষে সুর্যের লাল আভায় তারই আরাধনায় ভজনে লিপ্ত। বারবার মনিকার মনে হয়েছে, এ লোকগুলি আমাকে একের পর এক ঠকিয়েছে। বারবার ঠকিয়েছে। এই ঘরে আমার সমস্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমি এদের আর কেউ নই।

কিন্তু আকাসই বা কেনো মনিকার জন্য এভাবে জজ্ঞ করবেন? আবার বিশ্বাস হয়েও ছিলো। অন্ধ বিশ্বাস এমন এক চোরাবালী, যার না আছে একুল, না আছে ওকুল। সেখানে হয়তো কোনো জ্ঞানের আলো পৌছতে পারে, কিন্তু কোনো তর্ক বিহীন আশ্বাস ভর্তি থাকে। মনিকার এবার একটা কথা মনে হলো, বিশ্বাসভাজন হবার জন্য দরকার সেক্রেফাইস, দরকার একনিষ্টতা। আর দরকার নিজের সাথে নিজের সৎ হওয়া। আজ যেখানে মনিকা হারিয়ে গেলো, সেখান থেকেই মনিকাকে আবার নতুন জীবন নিয়ে বেচে উঠতে হবে এই জগত সংসারে। প্রথমবার যখন সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিলো আকাশের সাথে, তখন প্রয়োজন ছিলো সাময়িক। কিন্তু এবার মনিকার কাছে মনে হলো, সম্পর্কটা জীবনে বাচার সাথে এই সম্পর্কটা জরুরী। ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দেয়। প্রথমবার যেটা মনে হয়েছিল। কিন্তু এটা আজ আর কোনো ভয়ংকর মনে হলো না। আজ এটাই বারবার প্রমান হচ্ছে যে, সময় নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। আকাশ আমার পরিবার।

সব কিছুরই প্রথমবার আছে। এটা যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রেও। আমি প্রথমবার অপরাধ করেছিলাম আকাশকে ছেড়ে দিয়ে, কিন্তু এই প্রথমবার মনিকার মনে হলো, মনিকা আকাশকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। প্রথমবার মনিকা আকাশের সাথে ক্লোজ হয়েছিল একটা দন্ধমুলক সার্থ নিয়ে। কিন্তু আজ ক্লোজ হয়েছে জীবনকে ভালোবেসে। ক্লোজ হওয়া আর এফেয়ার্স থাকার মধ্যে যথেষ্ঠ পার্থক্য আছে। এবার মনিকা আকাশের এতো কাছে চলে আসে যেখানে এফেরার্স এর জন্ম। আর এই এফেয়ার্স কখনোও খোলাখুলি, কখনো বন্ধ দরজার ভিতরে।

আকাশ অন্য দশজন মানুষের থেকে আলাদা। কারো অতিতকে ঘেটে বর্তমানকে বিচার করাই হয়তো ঠিক কাজ নয়, এটা আকাশ নিজে যেমন মানে, সে অন্যের বেলাতেও বিশ্বাস করে। কিন্তু ভরষা হলো এমন একটা কথা যা বর্তমান আর অতীতের মধ্যে মেলবন্ধন করে, ভবিষ্যতের দিকে অনুমান করে। কোন ব্যক্তি কি করেছিলো, কি করতে চলেছে, এটা নির্ভর করে সে ভবিষ্যতে কি করতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, যখন কারো সাথে সম্পর্ক হয়, ব্যবসায়িক বা নিজস্ব, অই ব্যক্তির সম্পুর্ন জীবন একটা দলিল হিসাবে সামনে আসে। তখন আমরাই বিচার করতে পারি যে, সম্পর্ক রাখা উচিত নাকি রাখা উচিত নয়। এটা কোনো চরিত্র বিশ্লেষনের ব্যাপার না, শুধু একটা সম্পর্ক জোড়ার লাভ এবং ক্ষতির প্রশ্ন। মনিকা কোনো কিছুই আর না ভেবে ফিরে এলো সেই পুরানো চৌকাঠের ভিতর যেখান থেকে একদিন আকাশকে না বলে ভোরের অন্ধকার পেরিয়ে সেই পরিবারের কাছে ফিরে গিয়েছিলো, যেটা তার কোনোকালেই ছিলো না, আর আজ তো একেবারেই নাই।

(চলবে)

ভিন্ন প্রসঙ্গ – সবার জন্য 

একটা জিনিষ ইদানিং খুব বেশী করে অনুভুত হয় যে, জীবনের সব অধ্যায় এক রকম নয়।  এটা আমার হয়ত বুঝতে দেরী হয়েছে কিন্তু এই সব তত্ত্বকথা মনিষীরা যুগে যুগে বলে গেছেন। মনিষীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক তত্ত্বকথাই বলে গেছেন বটে কিন্তু কেউ সে সব তত্ত্বকথা মানে না। হ্যা, মানে তখন যখন কারো জন্য সেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের জন্য প্রযোজ্য হয়। সেই সুবাদেই বলছি যে, আমি আপনি ততোক্ষন সবার কাছে যত্নশীল যতোক্ষন আপনি নিঃস্বার্থভাবে দিতে পারবেন কিন্তু পাওয়ার আশা করবেন না। আশা করলে আপনি হেরে যাবেন। এটা নিজের স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই সত্য।

এর থেকে যে শিক্ষাগুলি নেওয়া দরকার তা হচ্ছে,যা কিছু করবেন জীবনে, নিজের জন্য করুন, নিজে সুখী সময় কাটানোর জন্য আয় করুন এবং তা দুইহাত ভরে খরচ করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানগন কিভাবে চলবে কিংবা তারা কোথায় কিভাবে বাস করবে তা আপনার চিন্তা থাকতে পারে বটে কিন্তু তারজন্য অনেক কিছু আয় করে সঞ্চয় করে তাকে পঙ্গু করে রেখে যাওয়ার কোনো দরকার আমি মনে করি না। বরং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিন, তাতেই সে এই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে ঠাই করে নেবে। এই পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষের জন্য সুখের আবাস্থল। অলসদের জন্য এখানে সব কিছুই নাগালের বাইরে।  পূর্ব বর্তি জেনারেশনের আহরিত সম্পত্তি উত্তরসূরিদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক হলেও একটা সময় আসে, কোনো না কোনো উত্তরসুরীর মাধ্যমেই তা বিনাশ হয়। এই বিনাশ টা হয়ত এক জেনারেশনের মধ্যে ঘটে না। কারো কারো বেলায় এক জেনারেশনেই শেষ হয়ে যায় আবার কারো কারো বেলায় এটা ক্ষয় হতে কয়েক জেনারেশন পার হয়। কিন্তু ক্ষয় হবেই। এর প্রধান কারন, যিনি সম্পদ করলেন, তার যে দরদ, আর যারা বিনা পরিশ্রমে পেলো তাদের দরদ এক নয়। আরেক টা কারনে নস্ট হয়। তারা হলেন যাদের বংশ ধরের মধ্যে ছেলে রি-প্রেজেন্টেটিভ নাই। ওই সব লোকের বেলায় তাদের কস্ট করা সম্পত্তি নিজের ছেলে সন্তানের পরিবর্তে চলে যায় অন্য বাড়ির আরেক ছেলের হাতে যিন সম্পদের মালিকের নিছক মেয়ের স্বামী। এরা দ্রুত সম্পদ হাত ছাড়া করে কারন তারা একদিকে এতাকে ফাও মনে করে, অন্যদিকে যতো দ্রুত সম্ভব সব সম্পত্তিকে নিজের নামে রুপান্তরিত করতে চায়।

যেহেতু আপনি পরিশ্রম করছেন, সুখটা আপনিই করুন। যদি ভাবেন যে, আগে সঞ্চয় করে স্তূপ করি, বাড়ী গাড়ি করি, ব্যাংকে একটা মোটা টাকা সঞ্চয় হোক তাহলে আপনার হাতে একটু সময়ও নেই সকালের সূর্য দেখার অথবা রাতের জ্যোৎস্না দেখার। আপনার ভাগ্যে আছে শুধু বাদরের মতো এই স্থান থেকে অন্য স্থানে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় ফল পাওয়া যায় তার সন্ধান করা, অথবা পালের বলদের মতো সারাজীবন হাল চাষের মতো চাষির হাল বেয়ে যাওয়া যাতে চাষিই শুধু লাভবান হয়, আর নিজে শুধু জাবর কাটবেন।

এ কথাগুলি কেনো বলছি?

আমার চোখে দেখা এই ছোট্ট জীবনে অনেক ঘটনা। কস্ট করে সম্পত্তি বা এসেট রেখে গেছেন, কিংবা ব্যবসা রেখে গেছেন, জাস্ট তার মরনের পর ওই সব সম্পত্তি কত তাড়াতাড়ি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়া যায়, তার জন্য তর সয় না। অথচ ওই সব উত্তরসুরীরা এক্টিবার ও তার রুহের মাগ ফিরাত বা ধর্মীয় কোনো উৎসবের একটু ও পয়সা খরচ করতে চায় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারাও সেই এক ই ফাদে পা দিয়ে তাদের উত্তরসুরীদের জন্য ই সঞ্চয় করে জমা করে যান এবং নিজেরা ভোগ করেন না।

অপ্রিয় সত্যের মুখুমুখি দাঁড়ানো সাহসের প্রয়োজন

কখনো যদি তোমরা দেখো যে, তোমার অপ্রিয় সত্য কথায় কেউ কোনো উত্তর করছে না, কিন্তু তোমার অগোচরে মুখ ভেটকাচ্ছে, তাহলে বুঝবে যে, তোমার আশপাশ চাটুকারে ভরে গেছে। তুমি বিপদের মধ্যে আছো।  এ অবস্থায় তোমার যা করনীয়, তা হচ্ছে, তুমি একা চলার অভ্যাস করো। এই একা চলার মধ্যে যদি কাউকে রাখতে চাও সাথে, তাহলে এমন কিছু মানুষকে রাখো যারা প্রাইমারী স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক। তারা নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না আর হবেও না। 

আগামিকালটা কত দিনের?

অনেকেই বলেন, ঈশ্বর বড় উদাসীন। আসলেই কি তিনি উদাসিন? না, তিনি উদাসিন নন। তিনি তার কাজ ঠিক সময় মত করেন, তার কোন কিছুই ঊলট পালট নয়, ঊনি আমগাছে জাম ফল দেন না, কিংবা কাঁঠাল গাছে আনারস ফলান না। বৈশাখ মাসে তিনি কনকনে শীত প্রচলন করেন না, আবার কড়া ভর চৈত্র মাসে তিনি শীতের প্রবাহ করান না। তারপরেও আমরা তাকে অনেক সময় কোন কিছুই বিবেচনা না করে বলে থাকি, ঈশ্বর বড় উদাসিন, ওনি উদাসীন শুধু তাঁর বিশ্বকে নিয়ে। কিন্তু কখনো আমরা নিজেকে প্রশ্ন করি না, আমরা কি উদাসিন? আর আমরা উদাসীন আমাদের অতিত নিয়ে। কেউ অতিত নিয়ে ভাবতে চাইনা, ভাবি শুধু আগামিকালের কথা। কিন্তু এই আগামিকালটা কত দিনের?

গত সপ্তাহে আমি একটি পার্টিতে গিয়েছিলাম বেরাতে। অনেক নামিদামি মানুষজন এসেছিল। কেউ সচিব, কেউ পুলিশের বড় কর্মকর্তা, কেউ আবার ব্যবসায়ী, আবার কেউ সাধারন মানুসদের মধ্যে অনেকে। তাহলে এখন আবার প্রশ্ন করে বসবে, সাধারন মানুষ আর ঐ ক্লাসিফাইড ব্যক্তিগুলোর মধ্যে পার্থক্য কি? ব্যবসায়ী কি সাধারন মানুসের মধ্যে পরে না? কিংবা পুলিশের বড়কর্তা, সচিব ইত্যাদি মানুষগুলো কি সাধারন মানুষ নয়? আমার কাছে এর উত্তর একদম সহজ এবং সরল। না, ওরা সাধারন মানুসের মধ্যে পরে না। তাঁদের সমাজ আলাদা, কথাবার্তা আলাদা, লাইফ স্টাইল আলাদা। সাধারন মানুসের জীবন আর তাঁদের জীবন এক কাতারে পরে না। একজন সাধারন মানুষ তাঁর অপকর্মের কথা ফাস হয়ে গেলে তাঁর আর জীবনের মুল্য থাকে না। সে কোন অন্যায় কাজ করে ফেললে প্রতিনিয়ত তাঁর ভিতরে একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে, সে নিজে নিজে একা একা দহিত হতে থাকে, লোক লজ্জার ভয়ে কেমন যেন নিজের মধ্যে সুপ্ত হয়ে থাকে, আর তাতেই সে অসুস্থ হয়ে জীবননাস হতে পারে। কিন্তু ঐ ক্লাসিফাইড লোকগুলো খুব স্পস্টবাদি, তারা তাঁদের অনেক অপকর্ম প্রকাশ্যে একে অন্যের সঙ্গে খুব সহজেই শেয়ার করে। মাঝে মাঝে ঐ অপকর্মগুলো একটা গুনের বহিরপ্রকাশ হিসাবেও নিজেদের অহংকার হিসাবে ধরে নেয়। এই যেমন, একজন আইনজ্ঞ সাহেব সেদিন পার্টিতে খুব ফলাও করে বলছিলেন, তিনি প্রতিদিন প্রায় লক্ষ টাকার উপর আয় করেন। আমি তাকে খুব ভাল করে চিনি না। আমার একবন্ধু তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললেন, বন্ধু, ওনি হচ্ছেন ডিস্ট্রিক্ট জজ লুতফুল কবির। খুব মাই ডিয়ার লোক। অনেক পয়সার মালিক। ধান্মন্ডিতে দুটু বাড়ি আছে, সাভারে কয়েক একর জমি আছে, নিজের জন্য একটা গাড়ি, বউয়ের জন্য একখান গাড়ি। আশুলিয়ায় প্লট কিনেছেন দশটার উপরে। সব ক্যাশ টাকা দিয়ে। আল্লাহ তাকে তিনখান বাচ্চা দিয়েছেন। দুইজন তো খুব ভাল করছে পরাশুনায়। অনেক মানুষের উপকার করেন তিনি, সমাজে বেশ দান খয়রাত করেন, শুধু তাই নয়, তিনি আগামিতে এমপি ইলেকশনেও দাঁড়াবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝখানে ১/১১ তে খামাকা দুদক তাকে অনেক হয়রানি করেছিল। আয় বহির্ভূত নাকি অনেক আয়ের তিনি বৈধ না হওয়ায় প্রায় মাস খানেক এদিক সেদিক থাকতে হয়েছিল। আইনজীবী হয়েও আইনের পাল্লায় পরে গিয়েছিলেন। তবে ওটা বেশিদিন লুতফুল ভাই জিইয়ে রাখেন নাই। একেবারে মাল পানি ঢেলে বীজ উপড়ে ফেলেছেন। এখন একদম ক্লিন আমাদের এই লুতফুল ভাই।

শুনে আমার খুব ভাল লাগলো। পরিচয় হয়ে আমারও খুব ভাল লাগলো। তিনিও মনে হল আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে প্রীত হলেন। একসময় কফি খেতে খেতে বললাম, আইন ব্যবসা ছাড়া আর কোন ব্যবসা করেন নাকি লুতফল ভাই? তিনি অত্যন্ত মৃদু ভাষায় বললেন, না ভাই, এই একটার জন্য সময় দিতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছি, আবার অন্য ব্যবসা কেমন করে করি? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করল, তাহলে আপনি প্রতিদিন কি এমন করেন যে, প্রায় এক লাখ টাকার আয় হয়?

লুতফুল সাহেব ভাল মানুষ। ওনি কথা বলেন সরাসরি। কোন রাখঢাক নাই। বললেন, আমার কোর্টে আমি কাউকে জামিন দেই না। সে যেই মামলাই হোক। “বেলএব্যাল” কেস হলেও আমি জনা প্রতি বিশ হাজার আর হেভি টার্গেট হলে তো কথাই নাই। খাসা পাঁচ লাখ। মাসে সব মিলিয়ে গরপরতা ত্রিশ পয়ত্রিশ লাখ টাকা থাকে। ভাই, নিবই যখন, তখন আর রাখঢাক করে লাভ কি? মাঝে মাঝে কিছু মিথ্যা কেস কেউ কেউ নিয়া আসে। আমি বুঝতে পারি। ঐ কেসগুলোর জন্য পয়সা বেশী পাওয়া যায়। সবসময় ওগুলো পাওয়া যায় না, তবে একবার পেলে সোনারখনি হাতে পাওয়ার মত। ঝুলিয়ে রাখবেন, আবার পয়সা নিবেন। পয়সা দিবে না? কোন অসুবিধা নাই। অপোজিট পার্টিকে  হাত করে ফেলার একটা হুমকি দিয়ে রাখবেন। জানেন ভাই, মানুসের একটা দুর্বল পয়েন্ট আছে, তারা হুজুরদেরকে বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করে আর করে এই আইনজীবী লোকদেরকে। ডাক্তারকেও তারা এতটা বিশ্বাস করে না। আর এই দুর্বলতার সুযোগটাই আমরা অনেকে নেই। এটা তো আমার কাজ, তাই না ভাই? ঘুস তো আর খাই না, আমি মুজুরি নেই। কাজের মুজুরি। এতে তো আর দোষের কিছু নাই।

ঠিক কথা বলেছেন লুতফুল সাহেব। নেবেনই যখন, তখন আর রাখঢাক করে লাভ কি? আর ওনি তো কাজের মুজুরি নিচ্ছেন। আর সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের জায়গা তো একটাই, আদালত। আর এই আদালতেই তো তিনি কাজ করেন। অন্যায় যে করে আর সত্যের পথে যে আছে, তাঁদের মধ্যে বিবাদ হলে তো দু পক্ষেরই আইনজীবী লাগবে। লুতফুল সাহেব কেসটা না নিলে তো আরেকজন নিবেই। তাহলে ওনার নিতে অসুবিধা কই?

অনেক কথা হল লুতফুল ভাইয়ের সঙ্গে। আমার মনে হল, লুতফুল ভাই যে মানসিকতায় বেড়ে উঠছেন, আর যে উপলব্ধি থেকে সমাজে তিনি আজ অনেক বড় একজন বিত্তশালি হয়ে উঠছেন, তাঁর অনেক গলদ রয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর চারিপাশের কোন বন্ধু, বা আত্মীয়সজন, কিংবা সহকর্মী কিংবা তাঁর খুব কাছে কোন লোক কেউ তাকে শুধরানোর পথ বলে দিচ্ছেন না। একটা সময় আসে, যখন পয়সা মানুসের জিবনে সৎ উপদেশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। তখন শুধু চাটুকারদের দল কাছে ভিরে তাকে আরও গভির থেকে গভিরে নিয়ে যায় যেখান থেকে ফিরবার আর কোন পথ থাকে না। লুতফুল সাহেবের অবস্থা দেখে আমার তাই মনে হল।

পার্টি প্রায় শেষ। আরেক কাপ কফি খাচ্ছি আমরা সবাই মিলে। আমি লুতফুল ভাইকে কফি খেতে খেতে বললাম, লুতফুল ভাই, একটা প্রশ্ন করি?

ওনি মাই ডিয়ার লোক, বললেন, আরে ভাই, করেন না, করেন। যদি বলেন কি রঙের আন্ডারওয়ার পরে এসছি, সেটাও বলে দেব। খালি জিজ্ঞেস করে দেখেন না…… বড় মজার লোক।

বললাম, লুতফুল ভাই, আজ থেকে ৫০০ বছর আগের আপনার বংশের কারো নাম জানেন?

প্রশ্ন শুনে ওনি এমন করে হেসে উঠলেন যে তাঁর হাতে থাকা কফি কাপটা প্রায় আমার উপর পরতে যাচ্ছিল আর কি। হাসতে হাসতেই বললেন, কি করে সম্ভব আখতার ভাই যে ৫০০ বছর আগের বংশের কারো নাম মনে রাখা? আপনি কি বলতে পারবেন ৫০০ বছর আগের কারো নাম?

বললাম, আমার প্রশ্নটা শেষ হয় নাই লুতফুল ভাই। ওনি আমার কথার আওয়াজ শুনে গম্ভির হয়ে গিয়ে আবার প্রশ্ন শুনতে চাইলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, থাক, ৫০০ বছর দরকার নাই, ৪০০ বছর আগের কেউ? বা ৩০০ বছরের আগের কেউ, অথবা ২০০ বছর আগের কেউ? কারো কথা কি আপনার মনে আছে?

এবার তিনি হাসলেন না। বললেন, না আখতার ভাই, ঐ অতো বছর আগের ফ্যামিলির কারো নামই আমি জানি না। তবে আমার দাদার বাবার নাম আমার জানা আছে। ওনি প্রায় আজ থেকে ৬০ বছর আগে মারা গেছেন।

আমি কফিতে চুমু দিতে দিতে বললাম, তাঁর মানে প্রায় ৬০ বছর আগের ইতিহাস। কিছুটা এখনো জেগে আছে। আচ্ছা লুতফুল ভাই, আজ থেকে ২০০ বছর পরে তাহলে কেউ কি আপনার কথা মনে রাখবে? বা ৩০০ বছর পর? অথবা ৪০০ বছর পর? আজ আমি আপনে এবং সবাই যে এমন একটা চাঁদনী রাতে কি মজা করে কফি খাচ্ছি, কত সুন্দর টাই-স্যুট পরে এখানে সমাবেশ করছি, এই কি বিশাল সুন্দর বিল্ডিং করেছি, এসি গাড়িতে চরছি, এর কোন কথাই কেউ জানবে না বা মনে রাখবে না আজ থেকে ১০০ বছর পরে। লুতফুল সাহেব খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথাগুলো শুনছিলেন বটে কিন্তু ওনার যে মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারছিলাম।

আমি বলতে থাকলাম, “অথচ জানেন লুতফুল ভাই, আপনার আমার মরার ৫০০ বছর পরেও আমাদের রেখে যাওয়া এই সাভারের জমি, ধানমণ্ডির বাড়ি, আশুলিয়ার প্লট এইসব নিয়ে আমাদের সব পর্যায়ের জেনারেশনরা একে একে দাবিদার হয়ে মারামারিও করতে পারে। কিন্তু কেউ ঐ সম্পত্তি বিক্রি করে বা তাঁর একটা আয় থেকে কখনও আমাদের আত্তার মাগফেরাত কামনা করে একবেলা মিলাদ পরাবে কিনা সন্দেহ আছে। আয় করে যাবেন আপনি, এর সব দায়দায়িত্ব (ন্যায় পথে অথবা অন্যায় পথে আয় যাই হোক না কেন) আপনার, অথচ, আপনার কোন কাজেই তা লাগবে না। তাহলে এই সম্পত্তির কি ভ্যালু আছে? কার জন্যে রেখে যাচ্ছেন এই দায় দায়িত্ব?

লুতফুল ভাই এতক্ষন চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলেন। মনে হল তিনি এখন কিছুটা অসস্থিবোধ করছেন। ওনার হাতে ধরা কফির কাপটায় যে কফিগুলো এতক্ষন গরম একটা সুগন্ধি ছরাচ্ছিল, এখন তা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

আমি আমার কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম।

এই দেখেন লুতফুল ভাই, সামান্য এক কড়া শাসক নামে পরিচিত ১/১১ এর সরকার। তাঁর কাছেই আমরা আমাদের সম্পদের হিসাব সম্পূর্ণ তুলে ধরতে না পারার কারনে কতই না এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়ানো। হয়ত ঘুষ পয়সা দিয়ে আপাতত ম্যানেজ করা গেছে। সামান্য এক কেয়ার টেকার সরকারের কাছেই আমরা আমাদের সত্যকারের হিসাবটা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। আর এই বিশাল জগতের যিনি মালিক, যার আওতার বাইরে যাওয়ার আমাদের কোন শক্তি নাই, যিনি কোন টাকা-পয়সা, ক্ষমতা বা এই জাতিয় কিছুই পরোয়া করেন না, তাঁর কাছ থেকে আমাদের এই অঢেল দুই নম্বরি সম্পত্তির হিসাব কিভাবে দেব? আর এই সম্পত্তির হিসাব শুধু আমাকে আপনাকেই দিতে হবে। এর জন্য আমার কোন উত্তরসুরি, আমার কোন প্রিয় মানুষ তাঁর উত্তরের জন্য বা জবাব্দিহিতার জন্য দায়ি নন। যদি তাইই হয়, তাহলে কি আমার আজকের এই বাহাদুরি করে করা সম্পদ আমার জন্য কোন সুখের বিষয়? আমি তো এগুলোর এক কানাকড়িও সঙ্গে নিতে পারব না!! প্লট পরে থাকবে আশুলিয়ায়, জমি পরে থাকবে সাভারে, ধান্মন্ডির বাসায় আমার লাশটা শুধু গ্যারেজের মধ্যে একদিন রেখেই পুতে দেওয়া হবে ঐ জঙ্গলটায় যেখানে আমি এখন ভুলেও পা রাখি না।

লুতফুল ভাই কোন কিছুই বললেন না। রাত অনেক হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে হবে। আমরা যার যার কাছে বলে কয়ে যার যার বাড়ি ফিরে এলাম। লুতফুল ভাই আমার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে আমার সাথে হাত মেলালেন। কোন কথা বললেন না। শুধু বললেন, আমার ছোট মেয়েটার জন্য দোয়া করবেন। ও ক্যান্সারে ভুগছে।

তাঁর এই ছোট মেয়ের ক্যান্সারের কথা তা আমি আগে জানতে পারিনি। আমার বন্ধুটিও বলে নাই। আর জানলেও হয়ত এটা নিয়ে আমি কোন কথা বলতাম না। কিন্তু, আমার কেন যেনো মনে হল লুতফুল ভাই যদি আজ সৎ মনে সৎ রোজগারে সৎ পথে ঈশ্বরকে ডেকে বলতে পারতেন, হে ঈশ্বর, আমি তো তোমার কোন আদেশ অমান্য করি না, আমি তো তোমার দেওয়া হালাল রিজিক খাই, আমি তো কোন অন্যায় পথে আমার রিজিক উপার্জন করি না, আমি তোমার সব আদেশ, নিষেধ যেভাবে পালন করতে বলেছ, সেভাবেই করছি, তাহলে তুমি আমার এই ছোট মেয়ের ক্যান্সার দিয়ে আমার মনকে এতটা উতলা করে দিলে কেন? কেন তুমি আমার নিস্পাপ এই ছোট আদরের মেয়েটিকে তুমি এমনভাবে কষ্ট দিচ্ছ যার ভার আমি বহন করতে পারছি না? তুমি তো সবচেয়ে বড় ইন্সাফ কর্তা, তুমি তো সবচেয়ে বেশী আছানদাতা, তাহলে তুমি আমাকে কেন এই রকম একটা কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছ?

কিন্তু আজ লুতফুল ভাই হয়ত সেই ঈশ্বরের কাছে কিছুই বলতে পারবেন না। কারন ঈশ্বর তাকে যা যা করতে বলেছেন, তাঁর অনেক ন্যায় কাজই লুতফুল সাহেব করেননি। ঈশ্বরের সাথে তর্ক করবার সাহস আজ লুতফুল সাহেব হারিয়েছেন। তারপরেও হয়ত আমি বলতে পারতাম, লুতফুল ভাই, হয়তোবা সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আপনি ঈশ্বরের কাছে দেখা করুন। তাঁর দেখা পাওয়ার রাস্তা তিনি বাতলে দিয়েছেন অনেক আগেই। লুতফুল সাহেবের জন্য সময় এখনো হাতে আছে যদি তিনি তাঁর ঈশ্বরের কাছে আবার নতজানু হয়ে সব অবৈধ সম্পদ ত্যাগ করে পুনরায় ঈশ্বরকে সাহায্য করতে বলেন, হয়তা তাঁর ঈশ্বর তাকে ক্ষমা করে দিয়ে সব শান্তির মত আরামদায়ক করে দেবেন। কতটা আরামদায়ক করবেন, সেটা নির্ভর করে এখন লুতফুল সাহেব কতটা আত্মসমর্পণ করেন ঈশ্বরের কাছে তাঁর উপর। ঈশ্বর খুবই দয়াশিল এবং ক্ষমাশিল। তিনি উদাসীন নন।

ভারত বর্ষের জনাব আগন্তক

আমি খুব খুশি হয়েছি যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কোন এক বাদশার পাশে আপনি এসে কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলেন এবং আপনি আমাকে অনেক গুলো প্রশ্নও করে গেছেন। আমি জানি না কিভাবে আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর গুলো দেব কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন আপনার কাছে ছিল।

আমি কিভাবে দেশ চালিয়েছি সেটা আপনার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল বলে আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জনাব, আমি কি আপনাকে উল্টো একটা প্রশ্ন করতে পারি? এখন আপনাদের সময়ে দেশ কিভাবে চলে সেটা কি আপনি জানেন? আমাদের সময় গনতন্ত্র বলতে কিছু ছিল না, সংবিধান বলতে কিছু ছিল না সেটা আমি মানি। বরং আমি যা বলতাম তাই ছিল সংবিধান। হয়ত এটা ছিল অটক্রাটিক একটা সময়। সেটা তো ঐ সময়ের নীতিই ছিল এটা। তাই বলে কি আমরা একটুও মানবাধিকারের কোন কাজ করি নাই? আমার সময়ে রাজত্ব ছিল বিশাল, মোবাইল ফোন ছিল না। বিশ্বাস ঘাতকের দল ছিল আরও বেশি শক্তিশালি। যে কোন সময় যে কোন রাজা দেশের যে কোন অংশ দখল করে নিয়ে নিতে পারত। আমরা তো তার প্রতিরক্ষা দিয়েছি। কই তার পরেও তো আমাদের সময় ব্যবসায়িরা আপনাদের সময়ের মত এত অসৎ ছিল না। এখন এক জন ব্যবসায়ী নিজেই রাজ্য চালাতে চান পর্দার আড়াল থেকে। আমাদের সময় ক্ষমতা ছিল আমার হাতে, আর এখন? আপনাদের সময় তো ক্ষমতা কার হাতে তাও তো জানেন না। 

আমি খুব খুশি হয়েছি যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কোন এক বাদশার পাশে আপনি এসে কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলেন এবং আপনি আমাকে অনেক গুলো প্রশ্নও করে গেছেন। আমি জানি না কিভাবে আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর গুলো দেব কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন আপনার কাছে ছিল।

আমি কিভাবে দেশ চালিয়েছি সেটা আপনার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল বলে আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জনাব, আমি কি আপনাকে উল্টো একটা প্রশ্ন করতে পারি? এখন আপনাদের সময়ে দেশ কিভাবে চলে সেটা কি আপনি জানেন? আমাদের সময় গনতন্ত্র বলতে কিছু ছিল না, সংবিধান বলতে কিছু ছিল না সেটা আমি মানি। বরং আমি যা বলতাম তাই ছিল সংবিধান। হয়ত এটা ছিল অটক্রাটিক একটা সময়। সেটা তো ঐ সময়ের নীতিই ছিল এটা। তাই বলে কি আমরা একটুও মানবাধিকারের কোন কাজ করি নাই? আমার সময়ে রাজত্ব ছিল বিশাল, মোবাইল ফোন ছিল না। বিশ্বাস ঘাতকের দল ছিল আরও বেশি শক্তিশালি। যে কোন সময় যে কোন রাজা দেশের যে কোন অংশ দখল করে নিয়ে নিতে পারত। আমরা তো তার প্রতিরক্ষা দিয়েছি। কই তার পরেও তো আমাদের সময় ব্যবসায়িরা আপনাদের সময়ের মত এত অসৎ ছিল না। এখন এক জন ব্যবসায়ী নিজেই রাজ্য চালাতে চান পর্দার আড়াল থেকে। আমাদের সময় ক্ষমতা ছিল আমার হাতে, আর এখন? আপনাদের সময় তো ক্ষমতা কার হাতে তাও তো জানেন না। 

কোর্সম্যাট জাহাঙ্গীর এর জন্য

জাহাঙ্গীর, আমি তোমার আর বকসী ভাইয়ের চ্যাট গুলো পরছিলাম। তোমার দৈন্যদশার কথা তুমি অকপটে স্বীকার করেছ। এটা স্বীকার করতে হয়ত সবাই পারে না। আর বাস্তব তাকে মেনে স্বীকার করাটা হচ্ছে একটা সাংঘাতিক গুনের পরিচয়। আমি জানি না তোমার আয়ের উৎস কি বা তুমি এখনো ইউএন এর ভাতা পাও কিনা। একটা সময় ছিল আমি তোমার ব্যাপারে অনেক বেশি জানতে ইন্টারেস্টেড ছিলাম যখন তুমি ইসলামিক আদল থেকে ক্রমাগত একটা ভুল দর্শনের দিকে ধাবিত হচ্ছিলে। তোমার তিন খন্ডে ধারন করা একটা ভিডিও সিডি আমার কাছে এখনো আছে। হয়ত খুজলে পাওয়া যাবে আমার স্টকে।

তোমার উপরে আমার কিছু রাগও ছিল এই জন্য যে, আমি তোমার ট্যালেন্টের ভক্ত ছিলাম এবং এই ট্যালেন্টের কিছু কাজ আমি বাস্তবে হোক সেটা আমি সত্যই চেয়েছিলাম। আমার অনেক ফোরামে আর্মি অফিসারদের কে নিয়ে কথা উঠলে অথবা ট্যালেন্ট কি জিনিস তাঁর সম্পর্কে কথা উঠলে অথবা আমি অফিসারদের যোগ্যতা নিয়ে কথা উঠলে আমি তোমার রেফারেন্স টানতাম। কিন্তু ঐ আশাটা সম্ভবত তুমি ঠিক জায়গা থেকে পালন করতে পার নাই। একটা ট্যালেন্ট মানুষের দ্বারা সমাজের অনেক কিছু পরিবর্তন সম্ভব। আমার ধারনা ছিল যে, তুমি ইচ্ছে করলেই সমাজের বা সংস্থার কিছু কিছু ইস্যু এড্রেস করতে পারতে তোমার ট্যালেন্টের দ্বারা। তুমি কত টুকু করেছ বা করতে পারতে তা তুমি ভাল জান কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে তুমি পুরু জিনিষটাই সাংঘাতিকভাবে মিস হ্যান্ডেল্ড করে ফেলেছিলা। এ ব্যাপারেও এখন আর তোমার উপর আমার কোন রাগ বা গোস্যা নেই। যেটা হয়েছে, সেটা তুমি দেরি করে হলেও বুঝেছ যে, কিছু কিছু জায়গায় তোমার ভুল ছিল। এই যে ভুল ছিল এবং তুমি বুঝতে পেরেছ, এটা ছিল তোমার ভাল দিক এবং তুমি তা সংশোধন করে ঠিক জায়গায় থাকতে পেরেছ। তুমি জাহাঙ্গীরই আছ, শুধু পালটেছে তোমার মতবাদটা। ভুল থেকে সঠিক পথে। এই জায়গা থেকে তোমার একটা বিশাল শিক্ষণীয় ব্যাপার ছিল। যা তুমি করতে পারতে কিন্তু সব কিছু তুমি হ্যান্ডেল করার ক্ষমতা রাখতে পারনি। কারন তোমার ধৈর্যটা ছিল সরু পথের আইলের মত। গ্রামের সরু পথের আইল দিয়ে কখনো হেটেছ? দেখবা, আইল্টা সোজা কিন্তু হাটতে গেলে পা এদিক ওদিক সরে যাচ্ছে এবং দেখবে তুমি মাঝে মাঝে আইল থেকে ক্ষেতে পরে যাচ্ছ। এটা আইলের দোষ না, এটা তোমার পা কে তুমি ঠিক কন্ট্রোল করতে না পাড়া কারনে।

আমি তোমার ইনিসিয়াল লাইফ স্টাইলটা দেখেছি। আমি তোমার ১ম স্ত্রিকে খুব ভাল করে চিনতাম। তোমাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন কম ছিল না। আমি জানি না সে এখন বিয়ে টিয়ে করেছে কিনা। সেই প্রসঙ্গে আমি যাব না। আমার কাছে একটা বিষয় খুব অবাক লাগে, সমাজের প্রতিটি ইস্যু আসলে প্রতিটি পরিবারের ইস্যুর সমষ্টিমাত্র। তাঁরমানে এই যে, যে ব্যাক্তি পরিবারের ইস্যুটাকে সঠিক ভাবে এড্রেস করতে পারছে, সে অন্য পরিবারগুলর ইস্যুও এড্রেস করার ক্ষমতা রাখে। একটা পরিবারে দাম্পত্য কলহ হতে পারে, একটা পরিবারে উছশৃঙ্খল সন্তান থাকতে পারে, একটা পরিবারে আর্থিক সমস্যা থাকতে পারে, আর এইসব সমস্যাগুলো কিন্তু বিগার পারস্পেক্টিভে একটা সমাজ। আমি অনেক অভিজ্ঞতা সমপন্ন লোক নই কিন্তু আমার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যানে বলে যে, এই সমস্যাগুলো দুই ধরনের লোক দুইভাবে সমাধান করে। (১) সমস্যা হয়েছে, তো এটাকে ছেটে ফেল। এটা হচ্ছে স্মার্ট মুভ কিন্তু এরোগ্যান্ট মুভ। আরেকটা হচ্ছে (২) সমস্যার একদম রুটে গিয়ে রুট থেকে টেনে নিয়ে এসে তাকে রেইলে নিয়ে আসা। সেটা হচ্ছে লংটার্ম সলিউসন। এই দুই নম্বর পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি লাগে ধৈর্য। আবার লাভটাও বেশি। কারনটা হল, কোন সাব্জেক্টই তাঁর স্থান পরিবর্তন করে না কিন্তু চরিত্র পাল্টায়। পরিবার পরিবার হিসাবেই টিকে যায়, শুধু মানুষগুলো তাঁর ব্যবহার পাল্টায় সামস্টিক ভাবে।

আমি অনেক সময় বাজারে একটা শার্ট পছন্দ করতে গিয়ে দেখেছি, দোকানদার এমন কিছু শার্ট আমাকে দেখাচ্ছে, যেটার কালার আর ডিজাইন আমার কাছে অত্যন্ত অপ্রিয়। মনে হয়ছে এগুলো কি কেউ কখনো কিনে? কিন্তু তারপরেই আবার মনে হয়েছে, হয়ত ঐ শার্ট টাই বা ঐ কালার টাই আরেক জোন কিনার জন্য হন্যে হয়ে খুজছে। এটা দেখবার বিষয় আর ভাব বার বিষয়। পৃথিবীতে ঈশ্বর সব মানুষকে কোন না কোন ভাল গুন দিয়ে তাকে ইউনিক করে পাঠিয়েছেন। আমরা তাদের ঐ ইউনিক গুনগুলো আবিস্কার করতে মাঝে মাঝে ব্যর্থ হই বলে কখন কখন জাস্ট যেটা পেতে চেয়েছি সেটা পেয়েও হারিয়ে ফেলছি। রবিন্দ্র নাথের গল্প গুচ্ছের কোন এক ছোট গল্পের মতন যে, বংশে নতুন অথিতির আগমনের জন্য সাড়া গ্রাম শুদ্ধ বড় কর্তা যেফতখানা করছেন, কিন্তু তারই এক বংশ ধর বড়কর্তার না জানার কারনে সে অবহেলিত হয়ে যেফতখানার খাঁবারের থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। 

আজকে তোমার আগের স্ত্রীর প্রতি তোমার হয়ত খুব একটা এট্রাক্সন নাও থাকতে পারে কিন্তু প্রায় অনেক বছরের একত্রে বাস করার ফলে যে মিশ্রিত একটা সময় তোমরা নিজেরা বুনেছিলে, সেটা কি আদৌ কখনো জিরো করে দেয়া সম্ভব? তোমার সন্তানদের কাছে কিন্তু তোমাদের এই ভাগাভাগির ইতিহাস কোনভাবেই সুখের নয়। তোমার বেলায় যদি এটা তোমার পূর্বপুরুষেরা বিশেষ করে তোমার শ্রদ্ধেয় বাবা এই একই কাজটা করতেন তোমার মাকে নিয়ে বা তোমাকে নিয়ে, তোমার বর্তমান জগতের সঙ্গে কি কখনো এটা সাংঘরসিক (অন্তত একটু হলেও কি প্রভাব ফেলত না) হত না? কখনো কি ঐ পারস্পেক্টিভ থেকে দেখেছ? আমাদের পরিবারে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে ৪৫ বছর আগে। আমি যখন ছোট ছিলাম এবং এই ঘটনাটা জানতে পারলাম, সম্ভবত আমরাই প্রথম যারা এমন একটা সম্পর্ক কে অত্যন্ত সাভাবক ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এমন একটা পরিবার সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম যে, অবশেষে সে মেয়ে মানুষ বলে হয়ত ইমোশনাল অবস্থাটা তুমি দেখেছ তাঁর চোখের জল দিয়ে। কিন্তু আমিও হলফ করে বলতে পারি, তোমার চোখে জল না এলেও অন্তত ক্ষনিক সময়ের জন্য তোমার চিন্তায় কখন ব্যাঘাত হয়েছেই। আর তোমার ঐ ঘোরের সন্তানেরা এই ব্যাঘাত টাতে অভ্যস্থ হচ্ছে প্রতি নিয়ত। আর এই জায়গাটাই হচ্ছে আমার এত কথা বলার কারন। উপরে বলা (১) নং পদ্ধতিতে নতুন করে সব কিছুই শুরু করা যায় কিন্তু তাতে মানুষ শধু পিছিয়েই যায়। কারন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিনিশিং পয়েন্টে আসতে হলে ঐ একই সময় বরাদ্ধ নিয়ে বারবার নতুন করে কোন কিছু শুরু করা বারবারই বকামি। এতে টিমের সবার ক্ষতি হয়।

তখন টিম লিডার হিসাবে নিজকে বড় অসহায় মনে হওয়া ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আর একবার যদি টিম লিডারের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়, তখন ঐ টিম টা কোথায় কিভাবে যে ডি-রেইল্ড হওয়া শুরু করে, তাঁর রক্ষক শুদু সয়ং সৃষ্টি কর্তা। কথাগুলো তোমাকে বললাম বলে কি তুমি মাইন্ড করলা? এটা আমার জন্য ও প্রযোজ্য জাহাঙ্গীর, যদি আমি টিম লিডার হয়ে থাকি। তুমি বুদ্ধিমান, তোমার কথাগুলো বুজবার কথা।

বন্ধু সাকুদা কে চিঠি

সাকুদা

সাকিরের চিঠিটি পরে বেশ মজা তো পেলামই তার সঙ্গে আমারও যেন আজ হইতে বহু বছর আগের কোন এক উচ্ছল এবং অফলদায়ক কর্মদীপ্ত সময়কার কথা মনে পরিতেছিল। সেই ১৯৮৩ সালের কথা সম্ভবত।

পরিবারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে পরিক্ষা দিয়া ১২ লং কোর্সে সিলেক্ট হইয়া ২৭ শে জুলাই ১৯৮৩ তে সবার সঙ্গে বিএমএ তে যোগ না দিয়া বর্ষার ঝমঝম বৃষ্টির অসাধারণ একটি দিনে সবুজে ঘেরা এবং অগোছালো গাছপালার সাড়ির মধ্যে গরে উঠা ঢাকা ইউনিভার্সিটির শহিদুল্লাহ হলের সেই টিচার্স কোয়ার্টারে অত্যন্ত মন খারাপ করে একা রবি ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ বইটা নিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। কখনো কয়েক ফোটা এলোপাথাড়ি বৃষ্টির ছটা জানালা ভেদ করে আমার রবিঠাকুরের গল্পগুচ্ছ আবার কখনো আমার মুখের উপর আছড়ে পড়ছিল। আমার মন খারাপ কিনা কিংবা আমার ভিতরের কষ্টের শেষ অভিব্যাক্তি চোখের জলে বেরিয়ে যাইতেছিল কিনা তা নীরস বৃষ্টির ফোঁটার কারনে কারোরই বুঝবার অবকাশ হইতেছিল না। আজকের দিনের ডিজিটাল কোন যন্ত্রের কেরামতি থাকিলে হয়ত বুঝা যাইত যে, ঐ রোমান্টিক একটি বৃষ্টির দিনে কতটা অ-রমান্টিক পরিস্থিতি আমার ভিতরে খেলিয়া যাইতেছিল। আর আমার কষ্টের একটাই কারন ছিল যে, আমি সেনাবাহিনীতে আমার অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে ১২ লং কোর্সে যোগদান করিতে পারি নাই। কারন আমার পরিবার আমার জন্য স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় ইতিমধ্যে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করিবার জন্য কোন এক সনামধন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যবস্থা করিয়া ফেলিয়াছেন।

পরবর্তীতে পরিবারের উপর রাগ করিয়া আর কোন ভর্তি পরিক্ষা না দিয়াই আমি পরের কোর্স ১৩ বিএমএ তে যোগদানের গোপন কাগজখানা যোগাড় করিয়া ফেলিলাম। বলা যাইতে পারে সবার অজান্তে আমি যেন সেনাবাহিনীকে রেজিস্ট্রি মেরেজ করিয়া বসিলাম। কাউকেই আমার এই গোপন অভিসারের মত “সেনাবাহিনি-প্রেমের সাদির” কথা অথবা কাবিননামার মত “যোগদানের পত্রখানার” কথা কাউকেই বলিলাম না। শুধু দিন গুনিতেছিলাম কবে “শ্বশুর বাড়ীর মত” এক আস্তানা সেনাবাহিনির কোলে গিয়া নিশ্চিত হইব। কাউকেই কিছু বলছি না, ফুরফুরা মেজাজ আমার এখন, মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর কিছু নজরে আসিলে মনে হইত এইটা আমার, কিংবা মাঝে মাঝে আবার এও মনে হইত আমি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিখ্যাত লোক কিংবা আকাশচুম্বী অনেক আষাঢ়ে গল্পের কাহিনির মত ইত্যাদি। কিন্তু সব কিছু চলছিল অতি গোপনীয়ভাবে। এই অভিসারের সময়ের মধ্যে আমি বেশ কিছু ব্যক্তির সঙ্গে (ব্যক্তি বলা ভুল হইবে কারন তখনও তারা ব্যক্তির পর্যায়ে পরে বলিয়া মনে হয় না, তারা সবাই ১৯ কি ২০ বছরের বালক)।  পরিচয় ঘটিল। আকবর (বর্তমানে মেজর জেনারেল আকবর), হুমায়ূন (মেজর জেনারেল), মুক্তার (ইঞ্জিনিয়ার) এবং আমাদের সাকুদা। কি কারনে বা কোন উপলক্ষে বা কার অন্বেষণে  তারা ঐ শহিদুল্লাহ হলের ভিতর দিয়া যাইতেছিল তা আজ হয়ত তাদের জিজ্ঞেস করিলেও তাহাদের মনে পরিবে কিনা আমার সন্দেহ আছে।

সাকুদার সঙ্গে আমার এই প্রথম পরিচয় কিন্তু ঘনিষ্ঠ পরিচয় বলা যাইবে না। তারপরের কাহিনী তো বিএমএর ভিতরের। ওটা যে শ্বশুরবারি নয় আদৌ, সেটা প্রথম দিনেই আমি বুঝিয়া ফেলিলাম। মনে হইল শত সতিনের সংসার, কেউ কাউকে ছাড়িয়া দিবার নহে। সে এক আরেক রাজপরিবারের মত বটে কিন্তু সেখানে গুটিকতক নারায়ণের বাস আর বাকি সবাই অ্যালেক্স হ্যালির কুন্টাকিন্তির মত।

সাকুদার সঙ্গে আমার অনেক জায়গায় অনেক পরিস্থিতিতে দেখা হইয়াছে, কখনো কোন এক সভায়, কখনো সেনাবাহিনীর কোর্স করার জন্য, কখনো বন্ধু ফোরামে, আবার কখনো হটাত অসময়ে।  আমি সাকুদা সম্পর্কে নতুন কিছু বলিতে চাই না কারন সাকির যা বলিয়াছে তা নিতান্তই বাড়াইয়া কিছু বলে নাই। বরং সাকুদা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু বলার পরিধি আছে বৈকি। আমি আর সাকুদা একসঙ্গে একত্রে কখনো কোন গ্যারিসনে কাজ করিবার অবকাশ হয় নাই। তারপরেও আমি সাকুদার একজন ভক্ত। ভক্ত এই কারনে যে, সাকুদা যখন বালক ছিল তখন সে গ্রামে ছিল। আর সেটা এমন এক গ্রাম যা আমার গ্রামের মত মিষ্টি, বন্ধুসুলভ যেখানে বৃষ্টির দিনে ৮-১০ বছরের যুবক শিশুরাও  উলঙ্গ হয়ে বৃষ্টির জলে নাচিয়া বেড়ায়, পাশের বাড়ীর বিজয়া নিজের বোন না হইয়াও বোনের অধিকার হইতে কম যায় না, নিজের সহপাঠির সঙ্গে সারাদিন মারামারি করিয়াও পরের দিন তাহার সঙ্গে দেখা না হইলে মন খারাপ হইয়া যায়। সাকুদার জীবন বারিয়া উঠিয়াছে ঠিক এমন একটি গ্রামে। সাকুদার সঙ্গে এই খানে আমার অনেক মিল রহিয়াছে বৈ কি। সাকুদা যখন শৈশব পার করিয়া যুবক হইল, তখন সে রাষ্ট্রের অনেকের চেয়ে অনেক উপরে পদার্পণ করিল বটে কিন্তু সাকুদা হটাত করিয়া ভারসাম্যহীন হইয়া পরে নাই, কৌতূহল বারিয়াছে বটে কিন্তু সীমানা অতিক্রম করিয়া জলে ভাসিয়া যায় নাই। কিন্তু সাকুদা তাহার এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও পরিবর্তন হইতে পারিত। কিন্তু সাকুদা তার ঐ বালক বয়সের চরিত্রটুকুন ধরিয়া রাখিয়াছিল। রবি ঠাকুরের মত বলিলে বলিতে হয় যে, একেবারে পাকা আম্রের মধ্যেই যে পতঙ্গ জন্মলাভ করিয়াছে যাহাকে কোন কালে রস অন্বেষণ করিতে হয় নাই, অল্পে অল্পে রসাস্বাদ করিতে হয় নাই, তাহাকে একবার বসন্ত কালের বিকশিত পুস্পবনের মধ্যে ছাড়িয়া দেওয়া হউক দেখি- বিকচোন্নুখ গোলাপের আধখোলা মুখটির কাছে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহার কি আগ্রহ।  সাকুদা যেন ঠিক এই জায়গায় একই ভাবে রহিয়াছে। এক যে ছিল রাজা, বলিয়া গল্প শুরু করিলে কোন দেশের রাজা আর কোন রাজা, সেটা সাকুদার জানার কোন কালেই আগ্রহ ছিল না এবং এখনও তাহার ঐ অনাবশ্যক খবরদারীতে আগ্রহ নাই। সাকুদা আগে যেমন ছিল, বয়সের তারতম্যে তাহার মধ্যে কোন ঘাটতি হইয়াছে বলিয়া আমার মনে হয় নাই। সেই হাসি, সেই অস্থিরতা, আবার সেই স্থিরতা কিংবা সে মায়াবিনী লক্ষি পেচার মত লক্ষ্মী বালকের চরিত্রে তার কোন পরিবর্তন হয় নাই। আর এটাই হচ্ছে সাকুদার সবচেয়ে বর একটা গুন যেখানে আমি তার চরম ভক্ত।

আজ সাকুদা সত্যি অর্থেই  অনেকের কাছে “দা”। তার মুখাবয়ব বয়সের ভারে আধাপাকা দাঁড়ি, চিন্তার ভারে মাথার চুল খালিপ্রায়, আর কর্ম পরিসরের কঠিন পরিশ্রমের পর তার এখন অবসরের সময়। তিনি গতকাল তার চিরাচরিত কর্মস্থল হইতে ছুটি পাইয়াছেন। হয়ত বা তাহার কিছুটা মন খারাপ হইয়া থাকিবে তার সেই চেনা পরিচিত টেবিলে আর কখনো আগের মত বসিতে পারিবেন না এই ভাবিয়া, কিংবা সকালে অফিসের ব্যস্ততা থাকিবে না এই ভাবিয়া। কিন্তু জগত সংসার এমনই এক পরিসর যেখানে বেকার মানুসেরা আরও অধিক ব্যস্ত, আর ব্যস্ত মানুসেরা আরও  বেশি অবসর কাটান। এ এক গোলক ধাঁধাঁর মত বৃত্ত।

আমি সাকুদাকে আমার অন্তর হইতে অভিনন্দন জানাই আমাদের এই গোলক ধাঁধাঁর মত বৃত্তে পুনরায় প্রবেশ করিবার জন্য। আবারো বলি, ১৯৮৩ সালে যেদিন রাগ করিয়া আমার নিজের পরিবারের সমস্ত সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করিয়া যেই সেনাবাহিনীতে আমার আশ্রয় করিয়া নিয়াছিলাম, আবার সেই আমি পুনরায় ২০০৪ সালে সেনাবাহিনীর উপর রাগ করিয়া আমি আমার পূর্বের জগতে ফিরিয়া আসিয়া দেখিয়াছি, যত তারাতারি নিজের ঘরে ফেরা যায় ততই মঙ্গল। এই জগত টা আমার, আমার পরিবারের এবং এই জগতটা আমার পূর্বসুরিদেরও ছিল। এই জগতে ভয়ের অনেক কিছু আছে কিন্তু সেই ভয়ংকর পরিবেশে যারা পাশে আছে তারা সবাই আমাদের কেউ বন্ধু, কেউ আত্মীয়, কেউ বা আবার কেউনা কিন্তু তারা অনেকেই আমাদের মঙ্গল কামনা করে। শুধু একটাই অনুরোধ, মগজ আর “দিল” এক সঙ্গে একই কাজে লাগাইতে হইবে, সাফল্য তাহলে নিজের।

আমরা তোমার পাশে আছি সাকুদা। পাশে আছি অনেক ভালবাসা নিয়া, পাশে আছি তোমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য যখন তোমার মন খারাপ হইবে, পাশে আছি যখন তুমি মনে করিবে তোমার কাউকে প্রয়োজন।

ভাল থাকিও

মেজর আখতার (অবঃ)

তোমার বন্ধু 

আমার খালা

সামিদা খাতুন

স্বামীঃ আব্দুল গনি মাদবর

তিনি আমার একমাত্র আপন ফার্স্ট জেনারেশন খালা। আমার মায়ের একমাত্র আপন বোন যাকে আমার মা বোন মনে করেন নাই, করেছেন নিজের মায়ের মতো। আমার খালার সাথে কারো কোন বিবাদ হয়েছে এই রেকর্ড সারা গ্রামের মধ্যে নাই। তিনি অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী গনি মাদবরের স্ত্রী। এখানে বলা দরকার যে, গনি মাদবরকে ভয় পায় না এমন কন লক আমাদের গ্রামের মধ্যে ছিলো না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তিনি সন্ত্রাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যান্ত ন্যা পরায়ন একজন মাদবর। খুব বুদ্ধিমান। অত্যান্ত অহংকারী এবং একটা ইগো নিয়ে চলতেন। 

আমার খালা শেষ বয়সে কুজো হয়ে হাটতেন। যখন ই শুনেছেন যে, আমি শহর থেকে গ্রামে গিয়েছি, তখনি তিনি কস্ট হলেও খুব সকালে আমাকে দেখার জন্য আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন। আমার খালা ও কোন ছবি নাই কিন্তু কোন একদিন আমার ছোট ক্যামেরা দিয়ে একটি মাত্র ছবি তুলেছিলাম যা আমার কাছে একটা অমুল্য রতনের মতো মনে হয় এখন। 

আমার খালা যেদিন মারা যান, আমি এই খবরটা জানতেও পারি নাই। অনেকদিন পর যখন আমি গ্রামের বাড়িতে গেছি, খালার সম্পরকে জানতে চেয়েছি, শুনলাম যে, আমার খালা মারা গেছেন। আমার খুব আফসোস লেগেছিলো। 

আমার খালার ভাগ্য ভালো যে, ঊনি অনেক কস্টে পরার আগেই জান্নাতবাসী হয়েছেন। আমি মাঝে মাঝে খালাকে গোপনে কিছু টাকা দিতাম কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে কোনো কিছু কিনতে পারতেন না, ফলে ঊনি টাকা দিয়েও তার মনের মতো কোন কিছু কিনে খেতে পারতেন না। এর আগেই তার অন্যান্য নাতি পুতেরা তার হাতের টাকাগুলি কোনো না কোনো ভাবে ছিনিয়ে নিতেন। বড্ড নিরীহ মানুষ বলে কারো উপর তার কমপ্লেইনও ছিলো না। খুব নামাজি মানুষ ছিলেন আমার খালা। তার কোন ছেলেরাই তাকে ঠিক মতো ভরন পোষণ করার দায়িত্ত নেন নাই। এক সময়ের প্রতাপ্সহালি মাদবরের স্ত্রী শেষ জীবনে কস্টের মধ্যেই জীবন তা অতিবাহিত করছিলেন কিন্তু আমাদের কিছু সাহাজ্য আর তার নিজের স্বামীর যেটুকু আয় ছিলো তার উপর নির্ভর করেই শেষ জীবন তা অতিবাহিত করেছেন। 

আমার স্ত্রী–মিটুল চৌধুরী আসমা

মিটুল চৌধুরী আসমা তার নাম। তার মুল জন্মস্থান মানিকগঞ্জ। জন্ম ৩১সে ডিসেম্বর ১৯৬৮। মিটুলের বাবার নাম- আলাউদ্দিন চৌধুরী, মায়ের নাম- জেবুন্নেসা চৌধুরী। তারা আট বোন এবং তিনভাই। সে সবার ছোট ভাইবোনদের মধ্যে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে র্অথনীতিতে অনার্স পাশ করে মাস্টার্স করে পরবর্তীতে ১৪বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে জয়েন করেন। প্রথমে তিনি মাইমেন্সিং এর মোমেনুন্নেসা মহিলা কলেজে জয়েন করেন, অতঃপর ঘিউর সরকারী কলেজ, অতঃপর ঢাকা কমার্শিয়াল কলেজ থেকে রাজবাড়ি কলেজ , মাদারীপুর কলেজ ইত্যাদি হয়ে এনসিটিবি এবং তারপর সরকারী বাঙলা কলেজে চাকুরী করেছেন। তিনি বর্তমানে প্রোফেসর  এবং ডিপার্ট মেন্টাল হেড হিসাবে বাঙলা কলেজ, মীরপুরেই কর্মরত আছেন। 

দুই মেয়ের মা। বড় মেয়ে আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা বগুড়া (শহিদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজে) মেডিক্যাল থেকে এম বি বি এস পাশ করেছে। ছোট মেয়ে সাঞ্জিদা তাবাসসুম কনিকা এবার শহীদ আনোয়ারা গার্লস কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ইউ এম বি সি (ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি) তে ভর্তি হয়েছে, তার ক্লাশ আগামী আগষ্ট মাস ২০২১ থেকে শুরু হবে। মিটুলের স্বামী সেনাবাহিনীর অফিসার ছিলেন। মেজর হবার পর স্বইচ্ছায় অবসর নেন এবং নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। তাদের দুটু এক্সপোর্ট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী (সুয়েটার্স ইউনিট) আছে, ওয়ান টাইমের একটা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি আছে, আন-নূর কন্সট্রাকশন নামে একটি কন্সট্রাকশন কোম্পানী আছে। মানিকগঞ্জে আল-আব রার মেডিক্যাল ডায়গনোসিস সেন্টার নামে একটি মেডিক্যাল ইউনিটে পার্টনারশীপ ব্যবসা আছে।   

মিটুল চৌধুরী তার নিজস্ব বাড়ি মীরপুরে থাকেন। এ ছাড়া তাদের বাসাবোতেও কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে। এই গত এক বছরে মিটুল চৌধুরী তার আরো দুই বোনের সাথে জয়েন্ট পার্টনারশীপে তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি মানিকগঞ্জে ৬ তালা একটি বিল্ডিং করেছে। আমি জানি সেটায় ওরা কেউ থাকবে না, তার পরেও বড় একটা ইনভেষ্টমেন্ট।

মিটুল চউধুরীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইতিহাসটা হচ্ছে তার বিয়ের ঘটনা। আর এই বিয়ের ঘটনাটা বিস্তারীত বর্ননা আছে Diary 2 March 2021 datewise.docx#৩০/০৫/১৯৮৮- বিবাহ

অধ্যায়ে।

(চলবে)  

হোসেন আলী মাদবর

আমি আমার মাদবর বাড়ীর সব প্রকারের ঐতিজ্য নিয়ে সবসময় গর্ববোধ করি। একটা বাড়ি একটা সমাজ হতে পারে, মাদবর বাড়ি একটা তার প্রমান। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মাদবর বাড়ীর তথ্য, অজানা ইতিহাস ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে কে বা কারা এই পরিবারের সদস্য বা তারা কে কোথায় আছে, এর ইতিহাস আজনেকেই জানে না বিধয় মাদবর বাড়ীর সেই পুরানো বংশ আভিজাত্যের ধারা মুছে যেতে চলেছে।হয়ত একসময় এই মাদবর বাড়ি সদস্যগনই জানবে না তারা কে বা কারা। বাংলাদেশ  আমেরিকা নয় যে, কোনো এক ওবামা, বা কোন এক ট্র্যাম্প পৃথিবীর কোনো একস্থান থেকে উদয় হয়ে আমেরিকার মতো বিশাল এক রাজকীয় পরিবেশে উড়ে এসে জুড়ে বসে একেবারে টপ পজিশন ধরে প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন। সেটা আমেরিকায় হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সব পরিচয় জেনেও কাউকে যদি হেয় করতে মন চায়, তাহলে তার কোনো কিছুই জানার প্রয়োজন হয় না, সে শুধু তার ইচ্ছেটাই প্রকাশ করবে। কিন্তু যদি কেউ আপনার আমার বংশ পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিয্য সব কিছু জানে, তাহলে যে যাই কিছু করুক বা বলুক, অন্তত এইটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে, অহেতুক আপনাকে কেউ হয়রানী হয়ত করবে না। কোনো মৃত ব্যাক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই যায় আসে না, কিন্তু তারপরেও মানুষ ইতিহাস পড়ে আর ইতিহাস লিখে। একমাত্র ইতিহাসটাই সত্য। আর যতো আগামি, বর্তমান, কিংবা সব “যদি” কোনোটাই শতভাগ সত্য নয়। তাই নিজের ইতিহাস টুকু তো জানুন। মনে নাই? আলেক্স হ্যালির সেই রুটস কাহিনীটি? সেটাই ইতিহাস।

আমাদের পরিবার “মাদবর” পরিবার হিসাবে পরিচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই এই পদবীটা কেনো জানি নামের পাশে ব্যবহার করতে একটু দ্বিধা বোধ করছি। যেমন আমি নিজেও আমার নামের পাশে মাদবর পদবীটা উল্লেখ করি না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, কেনো করছি না, আমার কাছে একটা যুক্তি তো অবশ্যই আছে। আর সেটা হচ্ছে-

আমি যখন গ্রামে থাকতাম, তখন দেখেছি যে, আমাদের গ্রামের অনেকেই অনেক প্রকারের মাদবর সেজে আছেন। কেউ বাচ্চু মাদবর, কেউ আজগর আলি মাদবর, কেউ আক্কাস আলি মাদবর ইত্যাদি। এই মাদবর গুলিকে দেখে আমার গা এক প্রকার রি রি করতো কারন তাদের না ছিলো কোনো ইথিক্স, না ছিলো কোনো গুনাগুন। অথচ শুনেছি, আমার বাবা যখন মাদবরি করতেন, তখন তিনি নাকি কারো বাড়িতে গিয়ে এক কাপ চাও খেতেন না। যদি কারো বিচারের বেলায় পক্ষপাতিত্ব হয়ে যায়, তাই! কিন্তু আমার বাবা, বা দাদা কি ধরনের মাদবর ছিলেন আর এখনকার মাদবরগন কি প্রকারের মাদবরি করছেন এই পার্থক্য টা আমার ঐ ছোট বয়সে যেমন বুঝবার ক্ষমতা ছিলো না, তাই আমার বংশের পদবীটা যে এতো মানসম্মানের, সেটা আমার আসলে বুঝার জ্ঞ্যানও ছিলো না। ফলে এই মাদবর উপাধিটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হইতো এবং কিছুটা নিম্নজাতীয় উপাধি বলিয়াও মনে হইতো, বিশেষ করিয়া শহুরে সমাজের কাছে। তাই আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার সমস্ত স্কুল কলেজের সার্টিফিকেট সমুহের এই নামের পাশের মাদবর পদবীটা একেবারে রহিত করিয়া দিয়াছি।

আমার বড় ভাই জনাব ডঃ মহাম্মাদ হাবিবুল্লাহও কেনো যে এই পদবীটা নিলেন না সেটা আমার বোধ গম্য নয়।

যাক সে কথা।

এবার আসি আমাদের বংশের সংক্ষিপ্ত একটু ইতিহাস নিয়ে।

হিসাব্দি মাদবর ছিলেন আমার দাদা। এই দাদার থেকেই আমার ইতিহাস আমি শুরু করিবো। তিনি ছিলেন অনেক বিচক্ষন একজন ব্যক্তি। তার আমলে তিনি অনেক সম্পদ এবং বুদ্ধির মালিক ছিলেন। আমার দাদির নাম আমি জানি না। জানতে ইচ্ছে করে। হয়ত আমার বড় ভাই জানবেন।

আমি আমার বাবাকে কখনো দেখিনি এবং তার চেহাড়া কেমন ছিলো, খাটো নাকি লম্বা, যুবক না বৃদ্ধ, ফর্সা নাকি কালো কোনো কিছুই আমার জানা নাই। তবে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে আমি আমার বাবার অনেক গল্প শুনাতেন যার থেকে আমি বাবার একটা কাল্পনিক চরিত্র মনে গেথে গেছে। আমার দাদার নাম ছিলো হিসাবদি মাদবর। আমরা মাদবর বংশের লোক।

বাবার সম্পর্কে আমি অনেক চমৎকার চমৎকার গল্প শুনেছি ভাইয়ার কাছে। তবে তার প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে জরুরী তথ্য হলো যে, আমার বাবার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আমার মাকে বিয়ে করেন। বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ঘরে মোট তিন জন ছেলে সন্তান আর তিনজন কন্যা সন্তান ছিলো। এই মোট ছয় সন্তান থাকার পরে আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। তখন আমার মায়ের বয়স ছিলো বেশ কম। আগের সব সন্তানেরাই আমার মায়ের থেকে বয়সে বড় ছিলো। কেউ কেউ আবার ইতিমধ্যে বিয়েও করে ফেলেছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমার মা যেমন একটু অসুবিধায় ছিলেন, তেমনি আমার বাবাও বেশ অসুবিধায় ছিলেন।

কিভাবে আমার বাবা এই দুমুখী অসুবিধাগুলি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাধান করেছিলেন, সেই গল্প গুলিও আমি হোসেন আলী মাদবরের পর্বসমুহে একে একে লিখবো।

জেবুন্নেসা চৌধুরী (আমার শাসুড়ী)

তিনি আমার শাশুড়ি। মোট আট মেয়ে আর তিন ছেলের সার্থক মা। অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আমার কাছে তিনি আমার আপন মায়ের মতোই ছিলেন। আমার মাকে আর আমার এই শাশুড়িকে আমি কনোদিনই পার্থক্য করি নাই। তিনি আমাকে প্রতি ঈদে ১০ টাকার সালামি দিতেন। কি যে ভালো লাগতো ঊনার কাছ থেকে এই ১০টাকা সালামি নিতে।

চলবে…

আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী

তিনি আমার শ্বশুর।

আমি আমার শ্বশুর কেও জীবিত অবস্থায় দেখি নাই। আমার স্ত্রী যখন অষ্টম ক্লাসে পড়ে, তখন তার বাবা মারা যান। আমি যখন আমার স্ত্রীকে বিয়ে করি, তখন আমার স্ত্রী সবে মাত্র ইন্তারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির তোড়জোর করছেন। ফলে আমার বিয়ে হবার প্রায় ৪/৫ বছর আগে আমার শ্বশুর মারা যান। আমার শ্বশুরের প্রাথমিক তথ্য গুলি এ রকমেরঃ

নামঃ আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী

পিতাঃ সোনাম উদ্দিন চৌধুরী (সোনাম উদ্দিন চৌধুরীর পিতার নাম ছিল, ফাজেল আহম্মদ চৌধুরী)

স্ত্রীর নামঃ জেবুন্নেসা চৌধুরী

আমার শ্বশুরের ছিল আট কন্যা সন্তান এবং তিন পুত্র সন্তান।

আমার স্ত্রী ছিলো তাদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ।

তাদের ওয়ারিশ নামা যদি লিখি তাহলে দাঁড়ায় এ রকমেরঃ

ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী

তিনি আমার চাচা শশুড় ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের আপন ভাই। আমার শশুড়েরা ছিলেন তিন ভাই, (১) আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী (২) ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং (৩) নিজাম উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদকেও আমি দেখিনি কিন্তু যতটুকু আমি শুনেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি যে তিনি ছিলেন এ দেশের গোটা কিছু প্রোফেশনাল মানুষদের মধ্যে একজন। ডাক্তার হিসাবে যেমন তিনি খুব নামীদামী ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসাবেও ছিলেন খুব ভালো। তিনি সর্বশেষ জীবনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রোফেসর ছিলেন। তার একটি ছেলে (১) মকবুল আর একটি মেয়ে (নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।)। তার স্ত্রীর নাম ছিলো মেহেরুন্নেসা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নার্সের কাজ করতেন কিন্তু এই চাচার সাথে বিয়ে হবার পরে মেহেরুন্নেসা আর নার্সের জব করেন নাই। চাচী অত্যান্ত চালাক আর সার্থপর ছিলেন। তিনি চাচার বাড়ির কোনো মানুষকে তার বাসায় এলাউ করতেন না এবং এমনকি চাচার কথাও শুনতেন না। সারাক্ষন ঘরের মধ্যেই থাকতেন দরজা জানালা বন্ধ করে। এটা একটা রোগ। তার মেয়েটাকে বিয়ে দেয়ার পর মেয়েটা যেহেতু মায়ের স্বভাব পেয়েছিলো, ফলে তার ঘরে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হবার পরেই মায়ের মতো আচরন শুরু করে এবং সেখানে আর থাকতে পারে নাই। পরবর্তীতে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি তার মেয়েকে নিয়ে আজীবনকাল একটা টিনের ঘরের ভিতরে এমনভাবে বন্দি হয়ে রইলো যে, কখনো তাঁকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় না শুধুমাত্র কিছু খাবার দাবার কেনা কাটা ছাড়া। তার বাতিক হচ্ছে সে চাউলকে পাক করার আগেও সাবান দিয়ে ধোয়ে নিবে। এর মানে এই নয় যে, সে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। তার মেয়েটিকে আমরা ঘরের বাইরে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মেয়েটা সারাদিন ঘরের মধ্যে একটা অলিক ভাবনা নিয়ে কল্পনার রাজ্যে বসবাস করতে করতে এখন সেও প্রায় পংগু। তার যেহেতু কোনো আয় রোজগার নাই, ফলে সবাই জাকাত কিংবা দান করা টাকা দিয়েই তার জীবন চলে। তাতে তার কোনো আক্ষেপ নাই। মজার ব্যাপার হলো এই যে কেউ তাঁকে দান করছে বা টাকা দিচ্ছে, এতেও তার কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই। তাঁকে ডাকলেও ঘর থেকে বের করা সম্ভব না। ডাঃ কুতুব উদ্দিন মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা তার লাশ দেখতেও ঘর থেকে বের হন নাই। আমার ধারনা, চাচা এই মহিলাকে বিয়ে করে আজীবন অনুশোচনাই করেছেন সম্ভবত। শেষ জীবনে চাচা অত্যান্ত অসুখী জীবন জাপন করেছেন। প্রায় ৪ বছর আগে স্ত্রী মেহেরুন্নেসাও ইন্তেকাল করেছেন। ডাঃ কুতুব উদ্দিন চাচার ছেলে মকবুল নিজেও খুব একটা কাজের মানুষ না। সবকিছু রেডিমেট পেতে চায়। চৌধুরী বাড়ির ওয়ারিশদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সম্পদের ভাগ মকবুল পায়, যেহেতু ওয়ারিশ মাত্র ২ জন। চাচার বাবা সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফ-এ-আওলাদ করে গেছেন বলে কোনো সম্পত্তিই বিক্রি যোগ্য নয়। কিন্তু এর মাঝেও অনেক সম্পত্তি আছে যা ওয়াকফ-এ-আওলাদের বাইরে। আমি প্রায় ২ মাস নিজে কষ্ট করে সমস্ত জমি-জমার কাগজপত্র ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম জমিগুলির দেখভাল করতে আর কিছু জমি বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করতে। কিন্তু মকবুল সেটাও করতে নারাজ। সোনাম উদ্দিন চৌধুরী কোনো কারনে যখন আমার শশুরের উপর অহেতুক মেজাজ খারাপ করে প্রথমে তাঁকে ত্যাজ্য করার মতো একটা বুদ্ধি করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলো, এই কুতুব উদ্দিন চাচাই শেষ পর্যন্ত তার বাবা (সোনাম উদ্দিন চৌধুরী) কে বুঝিয়ে সুজিয়ে পরবর্তীতে প্রথম ওয়াকফ দলিল সংশোধন করে পুনরায় আলাউদ্দিন চৌধুরীকে তার সন্তানের প্রাপ্য অংশে বহাল রাখেন। আল্লাহ নিশ্চয়ই সব কিছুর খবরজান্তা। এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, এই সোনাম উদ্দিনের মতোই কিছুটা চরিত্র পেয়েছে হাসান আহমদ লিখন কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে- সোনাম উদ্দিন গেম প্লে করেছে তার নিজের সম্পদ আর সিদ্ধান্ত নিয়ে কিন্তু লিখন গেম প্লে করেছে পরের সম্পদের উপর অন্যায় করে মাদবরী করতে গিয়ে। এটা আরো জঘন্য।

হাসান আহমদ চৌধুরী

ওর ডাক নাম লিখন। নূর আহমদ চৌধুরীর বড় ছেলে। ওরা মোট ৫ ভাই কিন্তু কোনো বোন নাই। প্রাতমিক জীবনে লিখন অনেক আর্থিক চাপে ছিলো বিশেষ করে ১৯৮৮-১৯৮৯ সালের দিকে। ওর সাথে আমার পরিচয় হয় বিয়ের পরেই। অনেক ইন্টিলিজেন্ট ছেলে কিন্তু মাঝে মাঝে ওর এই বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু ব্যাপারে কাজে লাগায় যা স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে। যেমন একটা উদাহরন দেই, চৌধুরী বাড়ির সব সম্পত্তি সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার জিবদ্দশায় ওয়াকফ-আওলাদ করে যাওয়ায় তাদের মানিক গঞ্জের বাড়িটাও সেই ওয়াকফ-আওলাদের অন্তর্ভুক্ত। ওখানে কেউ থাকেন না শুধু লিজি আপা (আমার আরেক জেঠস) থাকেন। তিনি শারীরিকভাবে একেবারেই পংগু। লিখনের বদবুদ্ধির কারনে লিখন চেয়েছিলো পুরু বাড়িটা যেভাবেই হোক সেটা আত্মসাৎ করা। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সব ভাইবোনেরা লিজি আপাকে অত্যান্ত স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তারা এটাই চেয়েছিলো যেনো লিজি আপা কোনো রকমে মানিক গঞ্জের ঐ দাদার বাড়িতে একটা ছোট জায়গায় একটা ঘর তোলে আজীবন থাকতে পারেন। কিন্তু লিখন এটা কোনোভাবেই চায় নাই। মজার ব্যাপার হলো যে, ঐ দাদার সম্পত্তিতে লিখনের পিতার ওয়ারিশ সুত্রে সে নিজে ২ কাঠার ৭ ভাগের এক অংশের মালিক। সে হিসাবে লিখন পায় ২ কাঠার মধ্যে ৭ ভাগের এক ভাগ। অথচ লিজি আপা নিজেই ঐ সম্পত্তির পিতার ওয়ারিশ সুত্রে ১ কাঠার বেশী মালিক। অর্থাৎ লিখনের থেকে ঢেড় বেশী। আর এই লিখন চায় না লিজি আপা ওখানে থাকুক। উদ্ভট ভাবনা। এখানে আরো একটা ব্যাপার কাজ করছিলো যে, চৌধুরী বাড়ির মানুষেরা পরোক্ষ ভাবে লিখনকে তাদের অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতো। ফলে তার একটা অলিখিত দাপট ছিলো। সম্ভবত সেই দাপটের কারনেই লিখন একচ্ছত্র এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার হিম্মত করেছিলো। পর্দার বাইরে থেকে আমি পুরু ব্যাপারটা এমনভাবে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করেছিলাম যেনো লিজি আপা তার ন্যায্য অংশ পায় এবং সেখানে তার যা খুসি করতে পারে। এখন ওখানে লিজি আপার জন্য ৬ তালা বিল্ডিং হয়েছে যা লিখনের নিজেরো নাই। এই ধরনের কাজ করাটা ওর কোনোভাবেই ঠিক হয় নাই। যাই হোক, লিখন লটারীর মাধ্যমে আমেরিকার একটা ইমিগ্রেশন পেয়েছিলো। সরকারী আইন মোতাবেক ওকে ওখানে ৫ বছর এক নাগাড়ে থাকতে হবে বিধায় আমেরিকার সরকার ওকে এবার আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে আটকে দিয়েছে যেনো সে আর দেশে ফিরতে না পারে। সব আল্লাহর ইচ্ছা। ওকে আমি সত্যিই একটা পজিটিভ বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে ভেবেছিলাম যা আসলে ওর মধ্যে বেশ ঘাটতি আছে। ভালো জব করতো আর্গন ফ্যাশনে, পারভেজ ভাইয়ের অধীনে। যাই হোক, ওর উপরে অনেকের ভরষাটা এখন প্রায় শুন্যের কোঠায়। ওর উপরে আমার কখনো রাগ ছিলো না। আমি ওর উকিল বাবাও বটে।

নূর আহমদ চৌধুরী

আমার বড় সমন্ধী অর্থাৎ আমার স্ত্রীর সবচেয়ে বড় ভাই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হাইকোর্টে স্ট্যাম্প রেকর্ডার হিসাবে কাজ করতেন। এই স্ট্যাম্প রেকর্ডার কি জিনিষ আমি জানি না। তবে ব্যক্তিগত জীবনে অনেক সৎ এবং ধইর্যশীল মানুষ ছিলেন। হাসমত আরা ছিলেন তার স্ত্রী। এই দম্পতির কোনো মেয়ে সন্তান ছিলো না। ছিলো ৫ ছেলে। হাসান আহমদ লিখন তার বড় ছেলে। হাসান আহমদ লিখনের ব্যাপারে বিস্তারীত আমি কিছু তথ্য লিখেছি ওর অধ্যায়ে। নূর ভাই আমার খুব প্রিয় মানুষদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করতাম, তিনিও আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। সহজ সরল মানুষ ছিলেন। সবাই বলে নূর আহমদ চৌধুরী নাকি তার বাবার মতো দায়িত্তশীল ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের মতো। আমি আমার শশুড়কে দেখি নাই ফলে তুলনাটা আমি করতে পারি নাই। বিয়ের আগে আমার তার একবারই দেখা হয়েছিলো বগুড়ায় কিন্তু বিয়ের পরে তার সাথে আমার অনেক শখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। তিনি তার সংসারের জন্য এবং চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার অবদান চৌধুরী বাড়ির সব সদস্যদের জন্য অনেক ছিলো। সব সময় তিনি চাইতেন যেনো সবাই ভালো থাকে। এই ভালো থাকার চাওয়ার কারনে তিনি একবার আমাকে একটা প্লট দেয়ার নামে তারই কোনো এক কলিগের পাল্লায় পরে আমার বেশ কিছু টাকা নষ্ট করলেও তার উপর আমার কখনো কোনো রাগ হয় নাই। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে তিনিও ঠকেছেন কাউকে বিশ্বাস করে। তার এক ছেলে মানিক গঞ্জে কোনো এক বন্ধুকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে খুন করে ফেলেছিলো। খুব সমস্যায় পড়েছিলেন। কোথাও লুকানোর জায়গা ছিলো না। আমি জানি এই খুনের ব্যাপারটা আমার সাপোর্ট করার কোনো কারন নাই কিন্তু শুধুমাত্র নূর ভাইয়ের কারনে আমি তাঁকে সহ তার সেই খুনী ছেলেকে প্রায় ২ মাস আমার বগুরার ক্যান্টনমেন্টে রাখতে হয়েছিলো কারন ক্যান্টনমেন্টে কোনো পুলিশ রেইড করে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে আজীবন আক্ষেপে থাকবো কারন আমি একটা অপরাধকে লুকানোর সাহাজ্য করেছিলাম। নূর আহমদ ভাই ২০১২ এর দিকে মারা যান। মানিকগঞ্জেই তার দাফন হয়েছিলো।

কার্লা ডরাইন উইলশন

কার্লা ডরাইন উইলশন তার পুরু নাম। আমার এই ওয়েব সাইটের মধ্যে আমার সাথে এক মাত্র খুব অন্তরের সম্পর্ক ছিলো এই একটি মাত্র বিদেশী মানুষের। ওর সাথে আমার যখন পরিচয় হয়, তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র ১৪ কিংবা ১৫। আমি তখন ক্যাডেট কলেজে ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় আসলে আমাকে কেউ খুব একটা চিঠিপত্র লিখতো না, কেউ প্যারেন্টস ডে তেও আসতো না। কেউ ছিলো না আসলে। মা থাকতেন গ্রামে, অভাবী মানুষ, রাস্তা ঘাট চিনেন না, বোনেরাও সেই রকম কোনো অবস্থানে ছিলো না যে, ছোট ভাইয়ের জন্য তারা কিছু করবে, তাদের ও সাংসারিক অবস্থা তেমন ছিলো না। একদিন আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ আমাকে জানালেন যে, তার এক বন্ধুর মেয়ে নাম, কার্লা আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। চিঠি লিখলে যেনো আমি তার উত্তর দেই। সেই থেকে হটাত করে কার্লা আমাকে চিঠি লিখা শুরু করে। হাতের লেখা অত্যান্ত খারাপ, এক পৃষ্ঠা চিঠিতে মাত্র ৫/৬ লাইনেই পাতা ভরে যায় এমন এক অবস্থা, ফলে ওর চিঠির ভলিয়ম হতো কয়েক পাতা করে। একটা সময় এলো আমি প্রতিদিন ওর চিঠি পাওয়া শুরু করলাম। প্রথম প্রথম আমি বুঝতেই পারি নাই যে, কার্লা আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্রমেই ওর চিঠির মধ্যে ভালোবাসার কথা, ভালোবাসার সিম্বল, ইত্যাদি ফুটে উঠতে শুরু করলো। টিন এজার প্রেম। আমিও এক সময় যেনো ওর চিঠির প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম। ওর চিঠি না পেলে ভালো লাগতো না, আবার আমি চিঠি না লিখলেও ভালো লাগতো না। আমার সাথে সুত্র ধরেই কার্লা আমেরিকায় আমার ভাইয়ের সাথে, হাবীব ভাইয়ের বউ এর সাথে রীতিমত একটা সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছিলো। পাশাপাশি বাড়ি ছিলো কার্লাদের আমার ভাইয়ের বাড়ির লাগোয়া। ফলে হাবীব ভাইয়ের বউ কার্লাকে আমাদের দেশীয় কালচার, পোষাক আষাকের মধ্যেও ঢোকিয়ে দিয়েছিলো। কার্লা আমাকে এক সময় “হাসবেন্ড” হিসাবেই চিঠিতে সম্বোধন করা শুরু করলো। প্রতি চিঠিতেই আমি ওর প্রত্যাহিক জীবনের ঘটনা, তার ভাবনা, তার শখ, কিংবা কষ্টের কথা জানতে থাকলাম। প্রচুর ছবি পাঠাতো আমাকে। আজ আমার কাছে কার্লার কোনো ছবি নাই। কেনো নাই সেটাও বলি। আমি কারো কোনো কিছুই ফেলে দেই না। কার্লার চিঠি, ছবি সব কিছু আমি আলাদা করে একটা বাক্সে ভরে রাখতাম। আমার সেই বাক্সটা রেখেছিলাম বর্তমানে আমার এক জেঠষের বাসায় খুব যত্ন করে। কোনো একদিন আমি ঐ বাক্সটা আনতে গেলে শুনলাম, ওনারা ঐ বাক্সটা খুব জরুরী কোনো বিষয় না বলে তার ভিতরের সব কাগজ পত্র সহ ফেলে দিয়েছে। খুব কষ্ট লেগেছিলো, কিন্তু বলতে পারি নাই কি তারা ফেলেছিল। কার্লার এক বন্ধুর নাম ছিলো মিন্ডি। মিন্ডি সম্পর্কেও কার্লা অনেক কথা লিখতো। আমার এই ডায়েরিতে একটি মাত্র লেখা আছে যার নাম WAS IT PENFRIENDSHIP?  এটা আসলে এই কার্লাকে নিয়েই লেখা। এই লেখাটা কোনো কাল্পনিক নয়। এটা নিছক একটা এমন লিখা যা বাস্তবে ঘটেছিলো। অনেক কিছুই লিখার ছিলো কিন্তু আজ যেহেতু সে কাছেও নাই, পাশেও নাই, সেটা রহস্য হয়েই থাকুক। 

আমার স্টেপ ভাইবোনগন

আগেই বলেছিলাম যে, আমার বাবার আগের একটা সংসার ছিলো। আমার প্রথম মা মারা যাওয়ার পরেই আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমার মায়ের বয়সের থেকেও আমার বাবার আগের সন্তানদের বয়স অনেকেরই বেশী ছিলো। আমার স্টেপ ব্রাদারদের সংখায় ছিলো তিন- নজর আলী ভাই, তাজির আলী ভাই আর মোহসীন ভাই। শোনা যায় যে, ইউনুস নামেও নাকি আমার আরেক স্টেপ ব্রাদার ছিলো কিন্তু সেটা সম্ভবত আমার মায়ের বিয়ের পর পরই তার মৃত্যু হয়। আত স্টেপ বোন ছিলো ৪ জন- জামিনা, লজ্জুতন, বেলাতন, আরাদন আর আরাফান আপা। তারা এখন আর কেউ বেচে নাই। আমার এই স্টেপ ভাই বোনদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশী যেই জনের সাথে আমার ব্যক্তিগত খাতির ছিলো সেটা নজর আলী ভাইয়ের সাথে। আর এর একটা কারনও ছিলো। নজর আলী ভাই আমাদের বাক্তার চর বাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার আর রবিবার কাচা বাজারের দোকান দিতেন। আর আমি যখন বাজারে যেতাম, তখন তার সাথে আমার সপ্তাহে দুইদিন দেখা হতোই। নজর আলী ভাইয়ের ছিলো দুই ছেলে-তালেব আর ঈমান আলী। মেয়ে ছিলো দুইজন, রাশেদা আর অন্য আরেক জন। এই মুহুর্তে নামটা মনে করতে পারছি না তবে তার একটা মেয়ে আছে যিনি নার্স শেফালী। তাজির আলী ভাইয়ের ব্যাপারে “আমার বাবার মাদবড়ি স্টাইলের” মধ্যে বিস্তারীত লেখা আছে। সেই তাজির আলীর অনেক গুলি সন্তান ছিলো। তার মধ্যে বর্তমানে মান্নানই এখন আমার সাথে অনেক বছর যাবত যুক্ত আছে। মোহসীন ভাইয়ের সন্তান্দের সাথে এক সময় কিছুটা যোগাযোগ ছিলো কিন্তু এখন কে যে কোথায় কিভাবে আছে আমার সে ব্যাপারে কোনো ধারনা নাই। 

শায়েস্তা খাতুন

সবাই তাঁকে শায়েস্তা নামেই চিনতো। সে আমার বোনদের মধ্যে ছিলো ২য়। শায়েস্তার জীবন একটা দুখী মানুষের কাহিনী ছাড়া আর কিছুই না। তার গায়ের রং ছিলো বেশ কালো কিন্তু খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে ছিলো আমার এই বোন শায়েস্তা খাতুন। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহই আসলে পুরু ৫ বোন আর আমি সাথে মায়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে এতোটাই হিমশিম খাচ্ছিলেন যে, এতা ছিলো আমার ভাইয়ের জন্য অতিমাত্রায় একটা চাপ। তার উপর সবে মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে, চারিদিকে মানুষ যেমন বেকার তেমনি শুরু হয়েছে দূর্ভিক্ষ। এর মাঝেই আমার বড় ভাই যতোটা পেরেছে তার সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে আমরা কিছুটা হলেও ভালো থাকি। অভাবের সংসারে আসলে কোনো কিছুই নিজেদের নিয়ন্ত্রনে থাকে না। মায়ের উপর চাপ যেনো আরো বেশী ছিলো। ৫ টাই প্রায় বিবাহ যোগ্য মেয়ে, আমিই এক মাত্র ছোট। দেশের অবস্থ্যা শোচনীয়, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই। যখন তখন যে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। ফলে মা নিজেও চাচ্ছিলেন মেয়েগুলির তারাতাড়ি বিয়ে হয়ে যাক। ঠিক এই সময়ে বরিশাল বাড়ি একটা ছেলে শায়েস্তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়। নাম সুলতান আহমদ। মা শায়েস্তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। এই বিয়েতে হাবীব ভাই রাজী ছিলেন না। কেনো ছিলেন না, বা কেনো মা ই বা রাজী ছিলেন এই অংক আমার কাছে পরিষ্কার ছিলো না আর না আমার বুঝবার বয়স ছিলো। শায়েস্তার কোলে একটা কন্যা সন্তান আসে। ওর নাম রাখা হয় শেফালী। একদিন সুলতান তার নিজের বাড়ি বরিশাল যাওয়ার জন্য গেলে সুলতান আর কখনোই ফিরে আসে নাই। কি হয়েছিলো, কোথায় উধাও হয়ে গেলো, নাকি রাস্তায় মারাই গিয়েছিলো কিছুই আর জানা যায় নাই। আজ অবধি আমাদের কারোই জানা নাই এই সুলতান কি বেচে আছে নাকি মরে গেছে। দিন যায়, মাস যায়, বছর শেষ হয়ে যায়, শায়েস্তা সুলতানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক সময় আমরা ধরে নেই যে সুলতান হয়তো আর ফিরে আসবে না অথবা তার মৃত্যু হয়েছে। এমনি অবস্থায় ১৯৭৮ সালে আমার বড় ভাই আমেরিকায় স্কলারশীপ পান। কিন্তু তখন সবেমাত্র লায়লার বিয়ে হয়েছে, ফাতেমার ও বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো, সাফিয়া তো আর ছিলোই না। বাকী ছিলো শায়েস্তা আর মেহের। একদিন ঢাকা থেকে একটা বিয়ের সমন্ধ আসে শায়েস্তার জন্য, নাম আলি আহমদ। উর্দু রোডে থাকে, কুট্টি পরিবার না হলেও কুট্টিদের সাথে থাকতে থাকতে প্রায় কুট্টি দের মতোই আচরন ছিলো। বিগ হার্টেড ম্যান কিন্তু সামর্থের বাইরে খরচের অভ্যাষ। কিন্তু আলী আহমদের৪ স্ত্রী বিয়োগ হয়ে গিয়েছিলো। সেই ঘরে একটা মাত্র মেয়ে ছিলো নাম লায়লুন্নাহার। খুবই সুন্দর একটা মেয়ে ছিলো। প্রায় ১৫ বছর বয়সের। শায়েস্তার সাথে আলী আহমদের বিয়ে হবার পর শাতেস্তারা উর্দু রোডে চলে আসে। এই আলি আহমদের৪ ঘরেই শায়েস্তা ৪ টি সন্তান জন্ম দেয়- ফারুক, নুরুন্নাহার, লিয়াকত আর শওকাত। লিয়াকত আর শওকাত জমজ।  লিয়াকত আর শ ওকাতের বয়স যখন মাত্র ৫ মাস, তখন শায়েস্তার মৃত্যু হয়। আর ওর মারা যাওয়ার কারনে আলী আহমদ সব বাচ্চাদেরেকে  এক সাথে আমার মায়ের কাছে রেখে চলে আসে। একদিকে শেফালি ছিলো মায়ের ঘাড়ের উপর, অন্যদিকে শায়েস্তার আরো ৪ টি সন্তান গিয়ে পড়লো মায়ের উপরেই। অসহায় মার কিছুই করার ছিলো না। শুরু হলো মার আরেক স্ট্রাগলের অধ্যায়। আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দিয়েছিলো শায়েস্তার সব সন্তানরা। 

সাফিয়া খাতুন

সাফিয়া খাতুন আসলে আমাদের বোনদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে সাফিয়া খাতুন মারা যায়। সাফিয়া খাতুন প্রথমে একটা বিয়ে করার পর তার স্বামী মারা গেলে পরবর্তীতে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে। কিন্তু সেটাও বেশীদিন টিকে নাই কারন সাফিয়াই মারা গিয়েছিলো। আমি তখন সবে মাত্র ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজ থেকে ছুটিতে এসেছিলাম। বর্ষার দিন, ঝড়ও ছিলো। আমার যাওয়ার কথা ছিলো সাফিয়ার বাসায়। কিন্তু আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম বালুচর এলাকায়। ঝড়ের কারনে আমার আর গ্রামে ফেরা হয় নাই। সেদিন রাতেই সাফিয়ার শরীর খারাপ হয়ে যায় এবং রাতেই সাফিয়া মারা যায়। ছোট মেয়ে মাত্র, বয়স তিন মাস। সাফিয়ার চেহারা ছিলো খুব সুন্দর। সাফিয়া যখন মারা যায় তখন রাত প্রায় ১০ টা। ঝড়ের কারনে খবরটা আমাদের বাসায় আসতে আসতে সকাল হয়ে যায়। আমি বালুচর থেকে গ্রামে আসতে আসতেই ওর শশুড় বাড়ির লোকজন ওকে দাফন করে ফেলে। তারপর আমি গেলাম সাফিয়ার বাসায়। গিয়ে দেখলাম সাফিয়ার মেয়ে শান্ত ভাবে যেনো ঘুমিয়ে আছে। আমার মনটা খুবই খারাপ ছিলো। কোথায় কবর দেয়া হয়েছে সেটা দেখার জন্য আমি সাফিয়ার কবরের কাছে গেলাম। সারারাত বৃষ্টি আর ঝড় থাকলেও শিয়াল কুকুরের কাজ থেমে ছিলো না। এই সব প্রানীগুলি সাফিয়ার কবরে হানা দিয়েছিলো। কিন্তু যে কোনো কারনেই হোক সাফিয়ার লাশটা আস্ত অবিকল ছিলো। কবরের পাশে গিয়ে দেখলাম যে, কবরের মুখটা খোলা। বাশ আর চটি গুলি সরে গেছে। সাফিয়ার লাশের উপরের সাদা কাফনের কাপড়টা একদিকে একটু সরে গেছে আর ওর মুখটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চুল গুলি ছিলো একেবারেই অগোছালো। আমি মাথা নীচু করে যখন সাফিয়ার মুখটা দেখতে গেলাম, আমি ভীষন ভয় পেয়েছিলাম লাশ দেখে। কেনো ভইয় পাইলাম, আর কি হলো আমি কিছুই বুঝ্যি নাই কিন্তু বাড়িতে আসার পর আমার অনেক জ্বর হয়েছিলো। আমার কাছে সাফিয়ার কিংবা ওর মেয়ের কোনো ছবি নাই। পরবর্তীতে সাফিয়ার তিন মাসের বাচ্চাতাও মায়ের অভাবেই হোক আর অযত্নেই হোক সেও বাচে নাই। সাফিয়ার কোনো বংশধর এই পৃথিবীতে নাই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুক। 

ফাতেমা

ফাতেমা বর্তমানে আমার জীবিত বোনদের মধ্যে ২য়। তার স্বামী মোঃ সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু মিয়া। দুদু মিয়ার ব্যাপারে এখানে আগেই বিস্তারীত বলা হয়েছে। ওর স্বামী মারা যাওয়ার পরে ওর বড় ছেলে ফরিদের সাথে জাপানেই আছে। ফাতেমার দুটু মেয়ে আর ৪ টি ছেলে। মেয়ের মধ্যে বড় হচ্ছে সালেহা। সালেহার স্বামী আইনুল মোটামুটি ভালো অবস্থাএই আছে। ঈটের ভাটার মালিক। কিন্তু ছোট মেয়ে খালেদার প্রেমের মাধ্যমে বিয়েটা খুব একটা ভালো পরিনতি হয় নাই। মিজান খালেদার স্বামী। ইনকাম ট্যাক্সের অফিসে চাকুরী করে। তার যেমন ঘুষের বাহার তেমনি নারিদের প্রতি চরম ভালোবাসা। ফলে নিজের স্ত্রীর প্রতি তার ততোটাই অনীহা। খালেদার বাসায় আজ পর্যন্ত আমি পানিটুকু পর্যন্ত খাই নাই কারন সবই অবৈধ রোজগার। 

লায়লা

বর্তমানে যে কয়জন আমার বোন জীবিত আছেন, তাদের মধ্যে লায়লা সবার বড়। গ্রামেই থাকে। তার স্বামীর নাম মোঃ ইসমাইল হোসেন যিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। বয়স প্রায় এখন ৭০ এর কাছাকাছি। সর্বশেষ মুসলিম নগর প্রাইমারী স্কুল থেকে হেড মাষাটার হিসাবে রিটায়ার করার পর তিনি আমার সাথেই আছেন। আমি চেষ্টা করেছি এই দুলাভাইকে কোনো আর্থিক সাহাজ্য না করে কোনো কর্ম সংস্থানের মাধ্যমে সাহাজ্য করা যায় কিনা। তাতে তিনি একটু সুস্থ যেমন থাকবেন তেমনি আর্থিক ভাবে একটু সচ্ছলতাও থাকবে। দুলাভাই আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজেই আছেন প্রায় ১০ বছর যাবত। ফ্যাক্টরীটা বন্ধ করার পরেও আমি উনাকে ওখানেই রেখে দিয়েছি যাতে ফ্যাক্টরীর দেখভাল এবং নিজেও ভালো থাকেন। খুবই চরিত্রবান লোক এই দুলাভাই। লায়লার ৪ ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে মাহবুব একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং সরকারী চাকুরীজীবি। বর্তমানে মাহবুব কর্নফুলি পেপার মিলস এ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছে। লায়লার অন্য এক ছেলে জাপানে থাকে আর বাকী ২ জন দেশেই আছে। লায়লার মেয়ের নাম জেসমিন। অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছে। নিজেই নিজের সংসার চালায়। সারাজীবন কষ্টেই জীবন পার করেছে আমার এই সব বোনেরা। এখন যে সুখে আছে এমনটা নয়। ডায়াবেটিসে ভুগছে আমার বোন। বেশীরভাগ সময় অসুস্থই থাকে। খুব একটা যাওয়া হয় না আমার গ্রামে। তাই খুব একটা দেখাও হয় না। আমি চেষ্টা করি দুলাভাইকে কিছু টাকা বেশী দিয়ে ইন্ডাইরেক্টলী আর্থিকভাবে ওর সংসারে সাহাজ্য করতে। লায়লার যে ছেলে জাপানে থাকে তার নাম স্বপন। মাহবুবের মতো সেও ম্যারেড। আসলে লায়লার সব ছেলেমেয়েরাই ম্যারেড। কিন্তু এতোগুলি সন্তানের বয় থাকার পরেও লায়লাকে একাই নিজের দেখভাল করতে হয়। এটা খুব একটা সুখের খবর না। স্বপনের বিয়েটা হয়েছিলো “টেলিফোনে” জাপানে থেকে বাংলাদেশে। আমি সে বিয়েতে ছিলাম। মেয়েটা আমাদের হাসনাবাদ ইকুরিয়ার মেয়ে। সম্ভবত প্রেমের বিয়ে। আমি সপরিবারে ওর বিয়েতে ছিলাম কিন্তু বর স্বপন ছিলো জাপানে। এই জাতীয় বিয়ে আমার পছন্দ নয় যেখানে বর বাইরে আর কনে দেশে অথচ বিয়ে করতেই হবে। এটা আজকালকার দুনিয়ায় যেনো ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। লায়লা ছোটবেলায় ভীষন সুন্দুরী ছিলো আর ছিলো খুব ট্যালেন্ট। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর পড়াশুনা করতে পারে নাই। এর মধ্যেই ওকে বিয়ে করতে হয়েছিলো। মাওহবুব আর স্বপনের কয়েকটি ছবি এখানে আপলোড করা হলো। সাথে স্বপনের স্ত্রীর ছবিও। আমার কাছে এই মুহুর্তে লায়লার অন্যান্য সন্তানের কোনো ছবি নাই বিধায় আপলোড করতে পারলাম না। পরে আপডেট করা হবে। 

সবচেয়ে বামের লোকটি হচ্ছেন লায়লার স্বামী ইসমাইল ভাই। এই ছবিটা প্রায় ৭/৮ বছর আগে তোলা। তিনি সপ্তাহের ৬ দিন পলাশপুরেই ফ্যাক্টরীতে থাকেন, আর একদিন গ্রামে যান। তবে যখনই দরকার হয়, তিনি যখন তখন বাড়িতে গেলেও আমার পক্ষ থেকে কখনো কোনো না ছিলো না। অত্যান্ত অমায়িক আর সহজ সরল মানুষ। আমাদের পরিবারের সেই ১৯৭৬ সাল থেকেই তিনি সাথে আছেন এবং সব সময় পাশেই পেয়েছি। তিনি আমার প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষকও ছিলেন। সৎ মানুষ এবং ঝামেলাবিহীন মানুষ। অল্পতেই তুষ্ঠ থাকেন। 

এই ছবিটায় আমার মেয়ে উম্মিকার সাথে স্বপনের স্ত্রী যেদিন তার বিয়ে হয় সেদিন তোলা। মেয়েটার মধ্যে একটা জিনিষ লক্ষ করেছি যে, গরীব মানুষের মেয়ে বলে হয়তো একটু সাংসারীক চিন্তাভাবনা আছে। বাকী ভবিষ্যত বলবে আগামীকালের সময় আর তার ভাবনার মধ্যে। 

এই ছবিটা লায়লার বড় ছেলে মাহবুবুর রহমানের। ৭ ই নভেম্বর ১৯৭৬ সালে ওর জন্ম। তখন দেশে প্রচন্ড দূর্ভিক্ষ চলছিলো। ওর বাড়তি দুধের ব্যবস্থা করতেই আমার দুলাভাই আর বোনের হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে। ঐ সময়ে শুধু লবনের দামই উঠেছিলো ১০০ টাকার উপর প্রতি কেজি। বর্তমানে মাহবুব তিন সন্তানের বাবা। আর সরকারী ভালো অফিসেই কাজ করে। মাহবুবের শশুড় মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মানুষ। কোনো রকমে বর্তমানে সংসার টিকে রেখেছেন আর্থিক দিক দিয়ে। মাঝখানে প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ চলাকালে তিনি আমার ফ্যাক্টরিতেও ইসমাইল ভাইয়ের সাথে কাজ করেছেন কিন্তু বয়সের ভাড়ে লোড নিতে পারছিলেন না বলে কাজটা ছেড়ে দিতে হয়েছিলো। মাহবুব তাদেরকে আর্থিকভাবে সাহাজ্য করে কিনা আমার জানা নাই। 

এই ছবিটার মধ্যে যে মহিলাটি সর্ব ডানে গোলাপী ড্রেস পড়া, সেটা লায়লার একমাত্র মেয়ে জেসমীনের। জেসমিনের মেয়েরাও এই ছবিতে আছে। জেসমীনের স্বামীর নাম ছিলো খোকন। খুব একটা দায়িত্তশীল ছিলো না। কোনো এক সময়ে খোকন সাভারে কাজ করার সময় কাউকে না জানিয়ে আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করে। কোনো এক ঈদের দিন খোকন হার্ট ষ্ট্রোক করে মারা যায়। জেসমীনের স্বামী মারা যাওয়ার পরেও জেসমীন তার শশুড় বাড়িতেই বাচ্চাদের নিয়ে থেকে যায়। পিছনে দাঁড়ানো বাম থেকে ২য় মেয়েটি জেসমীনের মেয়ে। 

মেহেরুন্নেসা

উনি আমার বোন। আমার ৫ বোনের মধ্যে সেইই সবার ছোট কিন্তু আমার ইমিডিয়েট বড়। নাম-মেহেরুন্নেসা। তার স্বামীর নাম আব্দুর রশীদ। ইন্টার পর্যন্ত পাশ করেছিলো রশীদ ভাই। একবার বিদেশেও গিয়েছিলো কাজের খোজে কিন্তু বেশীদিন টিকতে পারে নাই। অতঃপর বহুদিন পোষ্ট মাষ্টার হিসাবে কাজ করেছেন। কোনো কিছুতেই খুব একটা সুবিধা করতে পারেন নাই। অতঃপর ব্যবসা শুরু করেন-ইটের ভাটার। সেটাতে মুটামুটি ভালো করেছেন। তার দুই ছেলেকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন, তারা এখন অবধি বিদেশেই আছেন। সচ্ছল অবস্থা এখন। কিন্তু আমার বোনের সুখের মুখ আসে নাই। সারাদিন কাজের মধ্যেই থাকে। আসলে লেখাপরা করার মতো সুযোগ তাদের ছিলো কিন্তু পরিস্থিতির কারনে সেটা হয় নাই। ১৯৭৭ সালে তার বিয়ে হয়। তারা জানতো তাদেরকে যেভাবেই হোক স্বামীর ঘর করতেই হবে ফলে যতো কষ্টই হোক তাদেরকে সেটা মেনেই চলতে হয়েছিলো। ভীষন পরিশ্রমী একজন মানুষ। একটাই মেয়ে আর সেও অবিকল মায়ের মতো দেখতে। তার বিয়ে হয়ে গেছে, ভালো আছে। 

যখন আমি ছোট ছিলাম, এক সময় যে কোনো কারনেই হোক আমার এই বোন একবার আমার সাথে ঢাকায় কিছুদিন বদি ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করেছিলো। খুব একটা সুখকর পরিস্থিতি হয় নাই সে বাড়িতে। অবশেষে মেহেরুন্নেসা শেষ পর্যন্ত গ্রামেই ফিরে গিয়েছিলো। গরীব মানুষের আসলে বন্ধু থাকে না। তাদের থাকে মনীব। আমার এই বোনের চেহারা দেখলেই কিন্তু বুঝা যায় তার মনের ভিতরে কষ্ট আছে, যন্ত্রনা আছে কিন্তু যখন কোনো মেয়েদের বাবা থাকে না, তাদের কষ্টের কথাও বলার কোনো লোক থাকে না। আমি তাই সব সময় দোয়া করি ওরা যেনো অন্তত ভালো থাকে। ওরা আসলেই খুব ভালো মানুষ। মা যতোদিন বেচে ছিলো, প্রায় প্রতিদিনই মেহের মায়ের কাছে আসতো কিন্তু মা মারা যাওয়ার পরে সম্ভবত আর আসা হয়নি ওর। 

আলাউদ্দিন চৌধুরী

আলাউদ্দিন চৌধুরী আমার শশুড়। আমি তাঁকে দেখিনি কারন তিনি আমার বিয়ের প্রায় ৫ বছর আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। আমার শশুড়ের আব্বার নাম চিলো সোনাম উদ্দিন চৌধুরী। অত্যান্ত এক রোখা মানুষ ছিলেন তিনি। তার মোট তিন পুত্র আর এক মেয়ে ছিলো। তিন পুত্রের  নাম জনাব আলাউদ্দিন চৌধুরী, ডাঃ কুতুব উদ্দিন চৌধুরী এবং নিজাম উদ্দিন চৌধুরী।

আমার শশুড়ের তিন ছেলে আর আট জন মেয়ে ছিলো। তারা হচ্ছে জনাব নূর আহমদ চৌধুরী, সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, এবং মুস্তাক আহমদ চৌধুরী। মেয়েরা হচ্ছেন- মিসেস জায়েদা খাতুন, নূর জাহান, শেলিনা, সামসুন্নাহার, মিটুল চৌধুরী,

আলাউদ্দিন চৌধুরীর বংশের উপরে আমার এই ডায়েরীতে একটা রুপক গল্প আকারে লেখনী আছে যার নাম দিয়েছি- চৌধুরী বাড়ীর অসমাপ্ত গল্প”। গল্পটার শেষ আমি জানি না কিন্তু একটা ব্যাপার আমি বাস্তবে লক্ষ্য করেছিলাম যে, সোনাম উদ্দিনের মতো আরেক জন তার বংশধর এই যুগেও তৈরী হয়েই ছিলো, যার নাম হাসান আহমদ লিখন। অনেক গুনাবলী (বিশেষ করে আগ্রাসন নীতি এবং অন্যের হক নষ্টের নমুনা) তার মধ্যেও আমি দেখেছি।

আমি এই “ আলাউদ্দিন চৌধুরীর” অংশে চেষতা করেছি যতোটুকু বস্তুনিষ্ঠ ইনফর্মেশন দেয়া যায়, সেতা দেয়ার। মূল্যায়ন সব পাঠকের উপর। কাউকে ছোট করার কোনো অভিলাষ আমার কোনো কালেই ছিলো না, আর এ রকম করার কোনো কারনও আমার নাই। আমি শুধু সময়ের সাথে সাথে কি ঘটেছে সেগুলু লিখে রাখার চেষতা করেছি।

আমার শাশুড়ি মিসেস জেবুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। তিনি শেষ বয়সে এসে প্যারালাইসিস ছিলেন। খুড়ুয়ে খুড়িয়ে হাটতেন। আমার বাসাতেই তিনি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তার শেষ সময়টুকু আমার সাথেই আমার বাসায় কাটিয়েছেন। তিনি আমার বাসা থেকেই বেহেস্তবাসী হয়েছিলেন।

প্রোটেক্টেড ডকুমেন্টস ভূমিকা

মানুষের জীবনের সব কিছুই খোলাশা নয়। কিছু কিছু ঘটনা আছে, কিংবা বিষয় আছে অথবা মুহুর্ত আছে যা শুধুমাত্র নিজের এবং আর কারো না। যদি এসব কাউকে বলতেও চাই, সেগুলি না বিশ্বাসযোগ্য, না বলার মতো বলে মনে হয় অথচ ঘটেই যায়। এটা সবার জীবনেই ঘটে, হোক সে যুবক কিংবা বৃদ্ধ। যদি যুবক বয়সে ঘটতে থাকে, তখন বৃদ্ধ বয়সে এসে তা জাবর কাটে, আর যদি বৃদ্ধ বয়সে ঘটতে থাকে, তখন অনেকেই এটাকে না মানতে চায়, বা মানাতে চায়। তখন এর নাম হয় ভীমরতি।

কিন্তু একটা কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, মানুষ যখন কষ্টে থাকে তখন তার দরকার পড়ে একজন সাথীর, আবার মানুষ যখন ফুর্তিতে থাকে, তখনো দরকার হয় তার সাথী, অথবা মানুষ যখন নিজে নিজে একা হয়ে যায়, তখনো দরকার হয় তার একজন সাথীর। একজন স্ত্রীর অথবা একজন স্বামীর জন্য স্বামী বা স্ত্রীই যে সর্বদা ম্যাচিং সাথী হবে এমনটা কখনোই না। সারাজীবন এক ছাদের তলায় বসবাস করেও একজন স্ত্রী হয়তো কোনো এক সময়ে এসে সে তার স্বামীকে হয়তো বুঝতেই পারে না, আবার যুগের পর যুগ একসাথে একই বিছানায় ঘুমিয়েও একজন স্বামী তার স্ত্রীকে হয়তো হারিয়েই ফেলে কোনো এক সময়ে। তখন না স্বামী, না স্ত্রী কেহই একে অপরের যোগ্য সাথী হয়।

অন্যদিকে, আজকের দিনে জয়েন্ট ফ্যামিলি যেনো অনেকটা সপ্নের মতই মনে হয়। অথচ একটা জয়েন্ট ফ্যামিলির কেউ না কেউ কারো না কারো সাথীর ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে তাদের শুন্যতাকে ভরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ আজকাল এতোটাই ব্যস্ততায় নিজেকে নিয়ে থাকে যে, নিজের অভাব পুরন করতে করতেই তার সময় শেষ হয়ে যায়, অন্যের জন্য খরচ করার সময় তার নাই। হয়তো এর মধ্যেই জুটে যায় অপরিচিত কোনো এক সত্তা যিনি হয়তো সাময়িকভাবে দিতে পারে দুদন্ড শান্তি সেই বনলতার মতো। এই বনলতারা হটাত করেই উদয় হয় একেবারে কোনো এক অজানা জায়গা থেকে। ওরা আসলে এই সমাজেই থাকে কিন্তু কখন যে এরা সবার আড়ালে বনলতা কিংবা পুরুষলতা হয়ে উঠে কেউ জানে না। একেবারে অতি সংগোপনে এরা একে অপরের সাথী হয়ে যায়। কনো ব্যারিয়ার থাকে না এদের মাঝে। শারিরিক, দৈহিক কিংবা আর চরম গোপনীয়তাও এদের মাঝে আর কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। অবশ্য বনলতারা সব সময় থাকেও না, একটা সময় আসে তারাও এক বৃক্ষ থেকে আরেক বৃক্ষে, এক সমতল থেকে আরেক মালভূমিতে কিংবা কোন এক জনপদ থেকে আরেক জনপদে তারা একেবারেই হারিয়ে নতুন কারো সাথে জোড়া বাধে। এই বনলতারা কেউ কাউকেই আঘাতে বিশ্বাস করে না আবার কেউ আজীবন তাদের জীবনটাকেই বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে।

আমার জীবনেও এমন কেউ এসেছিলো বা আসতে চেয়েছিলো। অরু, মেঘলা, সন্ধ্যারানি, রেনু কিংবা শারমিন অথবা সানা এরা এ সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রেস্ট্রিক্টেড প্রানী যাদের মুখাবয়ব সমাজে পুরুপুরি উম্মুক্ত নয় কিন্তু সবার সামনেই ওরা চলাচল করে। এরা সবাই কোথাও না কোথাও অসুখী মানুষ। আবার কেউ কেউ অসুখী কিনা সেটাও বুঝতে পারেনা, ভাবে ঠিকই তো আছে। ফলে এদের মধ্যেও একতা শ্রেনীভাগ আছে। কেউ সাহসী, কেউ একেবারেই ভীতু, কেউ ধর্ম ভীরু, কেঊ সমাজভীরু, কেউ ব্যক্তিভীরু আবার কেউ পরিবারের জন্য ভীতু। অরুরা ছিলো ডেস্পারেত, মেঘলারা ছিল মডারেত, সন্ধ্যারানীরা ছিলো আত্তগোপনের মতো কেউ, রেনুরা সমাজের কোথাও না কোথাও রাজত্ব করতে গিয়ে পারায় বড় আপু হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকাএ মানুষের মত, শারমিনেরা অদ্ভুত আচরনের ধারায় সবাইকে হতাশ করে আবার অন্যত্র বাসা বাধে। কিন্তু সানারা সুখী না হলেও কোনো রিস্ক নিতে ইচ্ছুক না। তাই এই সানারা সব সময় থাকে একা। তবে যাইই হোক, অনেক অসুখী মানুষেরা যখন একত্রে যাত্রা করে, তাদের আর অসুখী মানুষের দল হিসাবে ভাবা যায় না। তারা সবাই একটা মানের মধ্যে পরিপুর্ন। যেমন অরুর কথাই বলি-সে প্রথম জীবনে যা পেয়েছে, তার মধ্য জীবনে পেয়েছে গোলাভরা ধান আর মাঠ ভরা ফসলের মতো প্রচুর ধন সম্পদ। দুহাতে বিলিয়েও সেটা শেষ করা যায় নাই। আবার অরু যখন সেই পর্যাপ্ত সুখের জীবনে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলো, তখন তার কাছে সেই জীবনটাই আবার একঘেয়েমিতে ভরে উঠেছিলো। তার অন্তর সন্ধ্যান করতে চেয়েছিলো এমন এক সমতল যেখানে সে নিজেই একজন অপরিচিত মানুষ বা আগন্তক। কেউ তো ছিলো যে তাকে হাতছানী দিয়েছিলো কোনো এক অলৌকিক আনন্দের ভরষায়। অতঃপর সে দল ছেড়েছিলো। এরপর তার কি হয়েছিলো, সেটা আমার এ জীবনে জানা হয়নি।

যখন অরুলতা প্রস্থান করে, প্রকৃতির নিয়মে সেই স্থান দখলে চলে যায় ভীরুলতার কাছে, আর সেটা সানা নাম ধরে বিচরন করে সমাজে। কিন্তু ভীরুলতা সেই অরুলতার মতো এতো এগ্রেসিভ ছিলো না যে, তার স্থান দখল করলেও একই প্রভাব রাখতে পারেনি। এই দুই লতার, ভীরুলতা আর অরুলতার মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ধর্মালয়ের ন্যাচারীক রকম মনে হলেও একজন আরেকজনের প্রায় বিপরীত ছিলো। অথচ দুজনেই চেয়েছিলো অসীম কোন আনন্দের ফোয়ারা। পেয়েছিলো কি?

হয়তো পেয়েছিলো কিন্তু সেটা অন্তত আমার এই জীবনে জানা যায়নি। কিন্তু জানা হয়েছিলো কিছু “হ্যাপি” মানুশের কিংবা জ্যোৎস্না কাননের একচ্ছত্র মালিকের জীবনী থেকে যে, ওরা কোনো রকমে জীবনের সবগুলি অংশ পার হয়ে যেখানে থিতু হয়েছিলো সেটা এক রকমের বেচে থাকার মতো। ফলে ওরাও সুখের হাতছানীতে এমন কিছু বাস্তবিক কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলো এবং গিয়েছিলো যা প্রকাশের বহির্ভুত কিন্তু সেটাও বাস্তব। কোথায় যেনো জীবন শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো পরিস্থিতির কাছে পরাস্ত হয়ই। কেউ আসলে সুখী নয়, টাকাওয়ালা, স্বামীওয়ালা, স্ত্রীওয়ালা, সুন্দুরী, কিংবা রাজ্যের প্রতাপ্সহালী কেউ, কেউ সুখী নয়। আমরা যা দেখি সেটা ভুল। যা দেখি না, সেটাই সত্য কিন্তু রেস্ট্রিক্টেড ইভেন্টস। ভীরুলতাকে অনেক বার হাতছানিতে ডাকলেও সে ছিলো প্রান্তি চাষির মতো। সে কখনোই তার ক্ষেত থেকে বেরিয়ে আইলে উঠতে চায় নাই। কিন্তু ক্ষেতে বসেই আইলে গজানো মিষ্টি কলার সাধটা চেয়েছিল। কিন্তু কলা গাছের একটা বাহ্যিক বৈশিষ্ট ছিলো যে, সে যতোক্ষন না তার সাথে লেপ্টে থাকে, তার মিষ্টি কলার ভাগ সে কাউকে দিতে নারাজ। তাই ভীরুলতা যা পেতে চেয়েছিল-হটাতই সেটা হাতছাড়া হয়ে উঠে। 

প্রতিটি মানুষের একটা ইতিহাস আছে। সে পাগল হলেও তার একটা ইতিহাস আছে। কেনো পাগল হল, কিসের কারনে সে পাগল, কিংবা কে তারে পাগল করলো অথবা তার পাগলামীর কি রহস্য অথবা অর্থ সেই সবকিছুর একটা ইতিহাস কোথাও না কোথাও তো আছেই।

একটা ব্যাপার আমার প্রায়ই মনে আসে, আমরা কেমন একটা যুগে বেচে আছি? উত্তর খুব কঠিন না। দূর্ভাগ্যবশত আমরা আসলে এমন একটা যুগে পদার্পন করে বেচে আছি যেখানে জঘন্যতম অপরাধও স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে আর গভীরতম সম্পর্কগুলি হয়ে যাচ্ছে মুল্যহীন। আর এসব চরমপন্থী যুগ আর বৈষম্য মুলক সমাজ ব্যবস্থায় আমরাও মানুষেরা নিজেদের আচরনে স্বাভাবিকতাকে ঝেড়ে ঝুড়ে এমন কিছু ঘটনায় আকড়ে যাচ্ছি যা আসলে অন্যের কাছে ভাগাভাগি করে নেয়া যায় না। অথচ ব্যাপারগুলি ঘটছে। কিছু কিছু ঘটনা থাকে যার কোনো প্রমান থাকে না, কোনো সাক্ষী নাই, কোন প্রত্যক্ষ মানুষের চোখে পড়ে নাই, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। এটা যদি ক্রাইম হয়, তাতেও পারফেক্ট ক্রাইম বলা যাবে না কারন পার্ফেক্ট ক্রাইম বলতে কিছুই নাই। হয়তো ইনভেষ্টিগেশন তাকে ছুতে পারেনি। এর মানে এটা আন্সল্ভড কেস নয়। আর যদি এসব কাহিনি হয়ে থাকে কোন যুগপদ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত চেষতায় তাহলে সেখানে ইনভেষ্টিগেশন খুব একটা পৌঁছায় না। আর এই গোপন ব্যাপারগুলিই মানুষের জীবনে কনো না কোনো সময় রেষ্ট্রিক্টেড ঘটনা হয়ে পড়ে থাকে একেবারেই আন্সল্ভড ফাইলের কেসের মত।

ব্যাপারটা অনেকটা মিসিং কেসের মতো। একজন মিসিং হলোকিন্তু কেউ মিসিং কেস করলোই না। হয়তো কেউ তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। অথবা কেউ জানেই না তাদের কেউ মিসিং হয়েছে। অথবা হয়তো জানে কিন্তু কেউ মিসিং কমপ্লেইন করলোই না। একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষ মাঝে মাঝে জিক্স পাজেলের মতো এদিক সেদিক ক্ষনে ক্ষনে ঘুরে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে, অথবা লোক চক্ষুর আড়ালে। তার আশেপাশের মানুষ এমন কি তার পরিবারের মানুষেরাও জানে না আসলে গল্পটা কি। তারা হয়তো জানেই না এই হারিয়ে যাওয়ার পিছনের গল্পটা কি এবং কোথায় শুরু।

ইদানিং খুব বেশী বেশী মন খারাপ হয়

ইদানিং খুব বেশী বেশী মন খারাপ হয়। প্রায়শই ম্যাসেজ আসছে আমারই সমবয়সী কোনো না কোনো এক অফিসার বা চেনা জানা  কেউ আগাম সিম্পটম ছাড়াই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে। অথবা এমন সিম্পটম যা বিসশাস করা যায় না যে, সেই মামুলী সিম্পটমের কারনে তারা আর নাই এই দুনিয়ায়। ম্যাসেজটা পড়ি, বারবার পড়ি আর ভাবী, আহা, এই গতকালও তো মানুষটি সবার সাথে ছিল। আকাশ দেখেছে, নদী দেখেছে, সূর্য উঠা দেখেছে, রাত দেখেছে, সবার সাথে আড্ডা দিয়েছে, অথচ মানুষটি আজ নাই। আর কখনো ইচ্ছে করলেও ছুটে আসতে পারবে না। ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেট এক্টিভেট হয়ে গেছে। ভাবতেই যেনো বুকটা মুচড়ে আসে। সবার হাতেই একটা করে ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেট রয়েছে, এটা শুধু মেয়াদ উত্তীর্ন হতে বাকী শুধু। যে কোনো সময়ে আমিও আর এইসব প্রকৃতি, আকাশ, বাতাস, নদ নদী, মানুষের কোলাহল, গাড়ির প্রতিযোগীতা, মানুষের সাথে মানুষের বিভেদ, ভালবাসা, পাখিদের কিচির মিচির, কাজের ব্যস্ততা সব ছেড়ে হুট করে ওয়ান ওয়ে জার্নির টিকেটের এক্টিভেশনে পড়ে যাবো, আমিও তখন হুট করে নাই হয়ে যাব। আমার আর দেখা হবে না আগামিকালের সকাল, কিংবা আজকের কোনো সন্ধ্যা বা জ্যোৎস্না রাত। কি ভয়ানক নিস্তব্দতায় আমি হয়তো ছুটে চলবো কোনো এক অজানা দুনিয়ায় আমি নিজেও জানি না। সাথে কেউ নাই, একেবারে একা, ভীষন একা। খুব ভয় লাগে ভাবতে। সব কিছু ছেড়ে, অফিস, বাড়ী, নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সব ছেড়ে নিমিষেই আমি হারিয়ে যাবো সেখানে যেখানে কেউ আমার সাথে যেতে রাজী নয়। সেদিনও তোমাদের এই পৃথিবীতে সুর্য উঠবে, আকাশ আলোকিত হবে, সকালের ভোরের আজান চারিদিকে প্রতিদ্ধনিত হবে, সবাই শুনতে পাবে সেই আজানের সুর, অথচ আমি সেই আজানের শব্দ হয়তো শুনবো না। আমি থাকবো একদম মাটির নীচে অন্ধকারে। সবাই তাদের নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবে, হাসবে, খেলবে, আর আমি শুয়ে থাকবো একদম একা চুপচাপ।

এই দিনটায় তোমরা এবেলা হয়তো অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলছো। হয়তো আমার অনুপস্থিতি অনুভব করবে, হয়তো আমার সবগুলি স্মৃতি বিজড়িত সয় সম্পদ তোমাদেরকে আরো বিষন্ন করবে। সদ্য বিভাজিত এই জীবনের সাথে আমরা হয়তো সবাই আবার খুব দ্রুতই কোলাহলে মেতে উঠবো শুধু আমি ছাড়া।আমার কাপড়তা হয়তো তখন অন্য কেউ ভাগাভাগি করে পরবে, আমার ঘরটা অন্য কেউ নতুন করে সাজাবে। দিনের সকালটা কারো জন্যই যেহেতু অপেক্ষা করে না, রাতের চাঁদও যেহেতু কারো জন্যই আর থেমে নেই, ফলে সবার সব উৎসব যথারীতি চলবে শুধু আমার পুঞ্জতালিকা ছাড়া। কি অদ্ভুত না? এই কালের বিবর্তনে এবেলার সবার কান্নাটা ওবেলায় গিয়ে কোনো একদিন থেমে যাবে। মাঝে মাঝে মন উতালা হলেও, কিংবা মাঝে মাঝে কখনো অনুভবে আমার স্মৃতি চোখের বা মনের সামনে হাজির হলেও আবার পরক্ষনেই তা ম্লান হতে বেশি সময় লাগবে না। তারপর একদিন, আর কেউ মনে রাখবে না, কারো মনেও থাকবে না যে, কোন এক সময়ের স্তরে আমি ছিলাম, তোমাদের সাথে, অনেক যতনে আর ভালোবাসায়।

আমি হীনা তোমরা কতটা কষ্টে থাকবে, সেটা আমি জানি না, আর জানলেও অসীম কোন যোজন যোজন দূর থেকে তোমাদের প্রতি আমার ভালবাসার টানে আমার কখনো ফেরা হবে না। আমি কতটা বেদনা নিয়ে কোথায় আছি, কিংবা কতটা আনন্দ নিয়ে কতটা সুখে আছি সেই গোপন রহস্যে ঘেরা তথ্য আমি কোনোকালেই তোমাদের জানাতে পারবো না।

খুব আফসোস হয় মাঝে মাঝে, জীবনটা এতো ছোট কেনো? আমার অনেক অনেক দিন বাচতে ইচ্ছে করে প্রতিদিন। আমি থাকবো না এই প্রিথিবীতে, এটা ভাবলেই আমার সব কিছুর প্রতি আকর্ষন থেমে যায়। থেমে যায় অভিসার, থেমে যায় সব সুখের অনুভুতি, মনের কোথায় যেন একরাশ বেদনা পুঞ্জিভুত হয়ে আমাকে ভিজিয়ে দেয় দুঃখের এক নোনাজলে। আমি প্রতিদিন খুব আনন্দে থাকি এবং আনন্দে থাকতে চাই এ কারনে যে, দুঃখ আমাকে স্পর্শ না করুক, হতাশা আমাকে না ঘিরে ফেলিক, যা পাইনি সেটা নিয়ে কোনো প্রকার আফসোস নাই আমার, আর যা পেয়েছি সেটা দিয়েই সর্বাত্তক আনন্দে থাকতে চেয়েছি আমি। আমি জানি আমি তো আর বেশীদিন নাইই, তাহলে কার সাথে কি নিয়ে কতটুকু ঝগড়া, বিবাদ কিংবা জুলুম করবো? এই প্রিথিবীর কোন কারনে আমি দুঃখিত থাকবো!! এই ভাবনায় যাকেই দেখ, তাকেই আমার বন্ধু মনে হয়, মনে হয়, কি জানি যদি ওর সাথে আবার দেখা না হয়!! তাই আমার হাত প্রসারিত হয়ে যায় সব সময় সবার জন্য। শুধু বেচে থাকতে ইচ্ছে করে মরে যাবার পরেও মানুষের অন্তরে। হয়তো আমি দেখবো না, কিন্তু কেউ তো আছে যারা আমাকে মিস করবে, কেউ তো আছে হয়তো কোনো এক অবসরে আমার কথা ভেবে একটা দীর্ঘশাস নিয়ে বল্বে-আহা, উনি আমার জিবনে একটা প্রদীপ হয়ে এসেছিলেন। এটাই বা কম কিসের?  

১৬/১২/২০২৫-কনিকার বিয়ের পর দেশে ফিরে এলাম

গত ৯ ডিসেম্বর স্কাল বেলায় ঘুম থেকে উঠেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমি যত দ্রুত সম্ভব আমেরিকায় যাবো এবং কনিকা এবং ব্রেডির বিয়েতে আমি থাকবো। ৭/১২/২০২৫ তারিখে ত মুল কাহিনীটি বিস্তারীতভাবে লিখেছিলাম, তারপরেও আবার একটু রি-ক্যাপ করি।

রিক্যাপঃ

কনিকা ২০২১ সালে আমেরিকায় গিয়েছিলো পড়াশুনা করতে। গ্রাজুয়েশন শেষ করে কনিকা ওটিপি এর আন্দারে ১ বছরের মতো ফ্রি এবং বইধভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে। কিন্তু তার আগে আমি কনিকার ছোট মামার মাধ্যমে বৈধ ওয়ার্ক পার্মিতের জন্য প্রায় সবকিছু আয়োজন শেষই করে ফেলেছিলাম। ফলে কনিকার থাকার কন অসুবিধা ছিলো না।

একটা প্রবাদ আছে-জন্ম, ম্রত্যু আর বিয়ে নাকি আল্লাহর চয়েস এবং হুকুম ছাড়া হয় না। কনিকা এর মধ্যে খৃষ্টান একটা ছেলের সাথে ওর এফেয়ার্স হয়ে যায় যার নাম “ব্রেডি এন্ড্রিউ স্মিথ”। আমি এবং কিনিকার আম্মু যখন এই বছরের জুনে আমেরিকায় গিয়েছিলাম, তখনই ছেলেতাকে, ছেলের মায়ের সাথে আমাদের বিস্তারীত পরিচয় পর্বটা শেষ হয়েছিলো। কিন্তু তখন ব্রেডির সাথে কনিকার বিয়ের জন্য আমি একটাই শর্ত দিয়েছিলাম যে, ব্রেডিকে মুসলমান হতে হবে। আর আমার এই শর্তে ওদের কন আপত্তি ছিলো না। সে মোতাবেক, কনিকা এবং ব্রেডি ভাবল, যেহেতু ওরা একে অপরকে বিয়ে করবেই, তাহলে ২০২৫ সালেই বিয়ে করে না কেন? আর ২০২৫ সালে বিয়ে করলে ওদের অনেক কিহু সুবিধা আছে মনে করেই ওরা ১১।১২।২০২৫ তারিখে বিয়ের ডেট ফাইনাল করে ফেলে।

আমার এবং কনিকার আম্মুর ভিসা আগে থেকে করা ছিলো। কিন্তু কনিকার আম্মুর ভিসার সাতে সরকারী আদেশ যাকে আমর বলি জিও, সেটাও লাগে। আর বাংলাদেশে জিও করতে কমপখহে ১৫ দিনের আগে হয় না। ফলে ১১ ডিসেম্বর কিনু=ইকার আম্মুকে আমেরিকায় যেতে হলে এর মধ্যে জিও করা সম্ভব না যদিও তার ভিসা আছে। তাই আমাকেই যেতে হবে। ফলে কোনো কিছুই ভাবাভাবির দর নাই মনে করে আমি ৯ ডিসেম্বর তারিখে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। অফিসে ফোন করে এডমিন অফিসার সাকেরকে বললাম, এয়ার টিকেটের ব্যবস্থা করতে, একাউন্ট অফিসার ফারুককে বললাম ১০ হাজার ডলার কিনে আনতে, কনিকার আম্মু, আবির আর উম্মিকাকে বললাম, যত দ্রুত হোক আমার জন্য সংক্ষিপ্ত বাজার করে যেনো ব্যাগ গুছিয়ে রাখে। সবকিছু এতো দ্রুত এবং এতো পারফেক্টলী হয়েছিলো যে, এই একই প্রিপারেশন নিতে হয়তো লাগতো ১৫ দিন সেটা হয়েছে মাত্র কয়েক ঘন্টায়।

কনিকা আমাকে আমেরিকায় যেতে না করেছিলো। অনেক গুলি কারন ছিলো কনিকার আমাকে আমেরিকায় না যাওয়ার ব্যাপারে সাজেশন দেয়ার আবার আমারো অনেকগুলি কারন ছিলো আমেরিকায় যাওয়ার। মেয়েরা ছট, হয়তো ইমোশনালঅ বটে কিন্তু আমি তো ছোত বালক নই আর ওদের মতো এতো ইমোশনাল নই। ফলে আমাকে অনেক কিছু ভেবেচিন্তে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেটা সবার বিরুদ্ধে গেলেও। তাই আমি আমেরিকায় যাওয়ার জন্যই শতভাগ মানসিকভাবে রেডি হয়েছিলাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল-আমার ছট মেয়েও শেষ পর্যন্ত এতা স্বীকার করেছে যে, আমার যাওয়াটা খুবই দরকার ছিলো।

যাই হোক, ব্রেডি তো আগেই (৭/১২/২০২৫) তারিখে আমাদের ইসলামিক কায়দায় মসজিদে গিয়ে হুজুরের কাছে শাহাদা নিয়েছে অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছে। সে নাম পরিবর্তন করতে চায়নি, আর নাম পরিবর্তন ইসলামে কনো জোরজবরদস্তি নাই।

মুল কাহিনিঃ

আমি ৯ ডিসেম্বর তারিখে এমিরেটস ফ্লাইটে সন্ধ্যা পৌনে সাততায় ফ্লাইটে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। হুইল চেয়ারের অপশন খোলা ছিলো আমার যাতে এয়ারপোর্টে হাতাহাটিতে আমার কষ্ট না হয় আর গেট খুজতে না হয়। এতে আমার ভ্রমনের বেলায় এতোটাই আরাম হয়েছিলো যে, আমার তখন আফসস হয়েছিল, আগের সব গুলি ভ্রমনে আমি হুইল চেয়ার কেনো নেই নাই। যাই হক, যাওয়ার সময় বা আসার সময় আমার ততোটা বেগই পেতে হয় নাই। আরামে আরামে যেতেও পেরেছি, আসতেও পেরেছি।

আমেরিকান টাইম সকাল সোয়া আটটায় আমি ডুলাস এয়ারপর্টে হাজির হয়েছিলাম। কনিকার, ব্রেডির রীতিমত অফিস ছিলো বিধায় ওরা কেউ আমাকে নিতে আসতে পারছিলো না। ওদিকে ছত ভাইয়ের ছেলে ফয়সালকে আসতে বলা হয়েছিলো কিন্তু ওর পরিবর্তে জান্নাহ আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে পিক করতে এসেছিলো। জান্নাহর সাথে আমার অতটা সখ্যতা ছিলো না কিন্তু এবার আমি জান্নাহকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। মেয়েটার ব্যাপারে অনেকে অনেক কথা বল্লেও আমার কাছে মনে হয়েছে-জান্নাহ আমাদের আর অনেক আত্তীয়ের চেয়ে অনেক গুনে ভাল। আমি জান্নাহর বাসাতেই ২ রাত ২ দিন কাটিয়েছিলাম। মেয়েটি আমার অনেক দেখভাল করেছে, গাড়ির সাপোর্ট দিয়ে এবং আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে জান্নাহর সব কিছু। মেয়েটার জন্য মায়া ল্রগেছে আমার যে, অনেক বড় একটা বাসায় একদম একা থাকে। ওর মেয়েটাও আবার বাংলাদেশ রয়েছে। আমি জান্নাহকে পরামর্শ দিয়ে এসছি যে, সে যেন দ্রুত বিয়ে করে সেটেল হয়ে যায়।

যাই হোক। কনিকার সাথে আমার জান্নাহর বাসায় দেখা হলো ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭ টায়। ব্রেডিও সাথে এসেছিলো, আমিই ব্রেডিকে কনিকার সাথে আসতে বলেছিলাম। কনিকার বিয়ে নিয়ে এই সময় জান্নাহর বাসায় আমাদের মধ্যে অনেক গুরু গম্ভীর আলোচনা হয়েছিল। প্রথমে প্রোগ্রামটা সেট করা ছিল এভাবে যে,

১১ ডিসেম্বর ২০২৫- ১টা ৩০ মিনিটে কোর্টে গিয়ে বিয়ে

                                        - ৩টায় আমন্ত্রিত গেস্টদের সহ জাপানিজ একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার

                                        - অতঃপর যার যার বাসায় গমন।

১২ ডিসেম্বর ২০২৫ -ব্রেডি এবং কনিকা অফিস করবে। আমি রেস্ট নেবো জান্নাহর  বাসায়

১৩ ডিসেম্বর ২০২৫- ফয়সালের বাসায় মুসলিম রীতিতে আবারো বিয়ে, কাবিন এবং খাওয়া দাওয়া

সে মোতাবেক আমি লিখনকে দিয়ে বাকী দাওয়াত পর্বটা করাচ্ছিলাম। লিখন কনিকার ওয়েডিং নিয়ে পরিবারগুলির মধ্যে একটা ওয়েডিং গ্রুপ তইরি করে ফেলেছিলো যাতে কোন ফ্যামিলি থেকে কতজন আসবে সেটা বুঝা যায়। দাওয়াত পর্বতায় মেসেজগুলি আপাতত লিখন এবং মিটুলই পরিচালনা করছিলো এভাবে-

আসসালামু আলাইকুম! আল্লাহর রহমতে এবং আপনাদের দোয়ায় ১১ ডিসেম্বর কোর্টে কণিকার বিয়ের ফরমালিটিজ শেষ হবে, ইনশা'আল্লাহ্‌! আমার ওখানে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। কণিকার আব্বু পৌছে গেছে। আগামী শনিবার ১৩ ই ডিসেম্বর হুজুরের মাধ্যমে কণিকা ও ব্রেডির কাবিন কবুল হবে। কাবিন কবুলের পরে আপনারা সবাই এক সাথে হয়ে ওদের দুজনের জন্য দোয়া করবেন। ফয়সালের বাসায় শনিবার দুপুরে  আপনারা ফ্যামিলীর সবাইকে নিয়ে আসবেন। আমি ও আখতারের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে আন্তঅরিকভাবে আশা করছি। আমি উপস্থিত না থাকলেও আপনাদের উপস্থিতি ও দোয়া একান্তভাবে প্রত্যাশা করছি।

Venue (Faisal's House):

6104 Syracuse Court

Clarksville, Maryland 21029

USA

Date- 13-Dec-25

Time- 2:00 pm

Will highly appreciate your presence and confirmation here, please.

আর এতে প্রায় ৪০/৫০ জনের বড় একটা গ্রুপ দাওয়াতে আসবে বলে সম্মতি জ্ঞাপন করে ফেলেছিল। কিন্তু কনিকা (ব্রেডিসহ) এই পর্বে ওর বিশাল একটা নেগেটিভ মাইন্ড ছিলো। সে চাচ্ছিলো না কিছু কিছু মানুষকে দাওয়াত করতে। আর সে মানুষগুলিকে ইতিমধ্যে দাওয়াত করা হইয়েই গিয়েছিলো। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমি বুঝতেছিলাম যে, আমি যদি জোর করে অনুষ্ঠানটা করতে চাই, তাহলে কনিকা আর ব্রেডি অনুষ্ঠানে নাও আসতে পারে। ফলে পুরু ব্যাপারটা একটা সাংঘাতিক ভিন্ন নেগেটিভ দিকে টার্ন নিবে। একদিকে মিটুল তার পরিবারকে সামাল দিতে পারছিলো না, এবং পারহেও না, অন্যদিকে চউধুরী পরিবারকেও আমি ইগনোর করতে পারছিলাম না। আবার অন্যদিকে আমি তো কনিকাকে খুব ভালো করেই চিনি, যদি বেশি রাগ করি বা ডমিনেট করি, সে ব্রেডিকে নিয়েই বের হয়ে যাবে। আর আমি সেটা কিছুতেই করতে দিতে চাইনি। যদিও ব্রেডি মুসলিম হয়েছে, কিন্তু এটাকে আমার সম্মান করেই সম্মাঞ্জনকভাবে বাবা হিসাবে ব্যাপারটা আমার সুন্দরমতো সামাল দেয়া জরুরী ছিলো। লিখনকে দিয়েই আবার শনিবারের দাওয়াতটা পুনরায় বাতিল করার অনুরোধ করলাম। লিখন খুব পজিটিভ ছিলো কিন্তু কি বলে অনুষ্ঠানটা বাদ দেয়া হবে সেটার খুব ভালো গ্রাউন্ড খুজে পাচ্ছিলো না। তাই লিখন আপাতত মিটুলের সাথে পরামর্শ করে হোয়াটসআপ গ্রুপেই একটা ম্যাসেজ দিলো যে,

Assalamu Alaikum!

Dear Families

Me and Akhter deeply regret that we could not convince our beloved daughter Konika to organize a post marriage ceremony without me and her sister Ummika.

That is why, despite of inviting all of you and organizing the ceremony, we had to postpone the ceremony on 13th December, Saturday, at Faisal's house.

In Sha Allah! We will try to come as early as possible to USA and then will meet all together and arrange her post marriage ceremony and take the opportunity to wish betterment of the couple.

Again I regret and apologize for the inconvenience.

Asma & Akhter

কিন্তু আমি মিটুলকে জানালাম যে, আমার একটা ভিন্ন আইডিয়া আছে। আর সেতা হলো- শনিবার ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে যেই মুসলিম রীতিতে ঘরোয়া পরিবেশে খুব কম সংখ্যক মানুষ নিয়ে ফরমালিটিজ করবো, তার থেকে বরং ১১ ডিসেম্বরই তো আমি সেই একই প্রোগ্রামটা সেরে ফেলতে পারি। এতে একটা ম্যাসেজ দেবো যে, শনুবারের পুরু প্রোগ্রামটাই বাতিল, কিন্তু কর্টের বিয়ে শেষ করেই আমরা যারা যারা পারি সবাই ফয়সালের বাসায় এসে মুসলিম রীতিতে কনিকা আর ব্রেডির বিবাহ কার্যক্রমটা করে ফেলব এবং ছট খাটো একটা পার্টি দিয়ে দেব। কনিকা এবং ব্রেডি আমার কথায় খুব খুশী হলো এবং এটাই ভালো হবে এই ব্যাপারে সায় দিলো।

যাই হোক, ব্যাওয়ারটা সবার কাছেই খুব পজিটিভ মনে হলো। সে মোতাবেক প্রোগ্রামটা ঠিক হলো এভাবে-

১১/১২/২০২৫-কোর্টে ১ তা ৩০ মিনিটে বিয়ে

                     -বিয়ের পর পরই আমরা সবাইকে নিয়ে জাপানিজ রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া

                    - সেখান থেকে সবাই ফয়সালদের বাসায় আগমন।

                    - সন্ধ্যায় ৭টায় মুসলিম রীতিতে আবারো বিয়র

                    - বিয়ের পর ছোট খাটো একতা খাওয়াদাওয়ার অনুষ্ঠান

১২/১২/২০২৫-শুক্রবার আমার সারাদিন রেস্ট।

১৩/১২/২০২৫- শনুবার আমি কনিকা আর ব্রেডির সাথে সময় কাটানো।

১৪/১২/২০২৫- আমার বাংলাদেশের জন্য ব্যাক।

সে মোতাবেক সব পরিকল্পনা সেট করা হলো। ফলে অটোমেটিক শনিবারের প্রোগ্রামটা ক্যান্সেল হয়ে গেলো। এখন কেউ আর বলতে পারবে না যে, আমাকে দাওয়াত দিলো না বা অমুককে বাদ দেয়া হল ইত্যাদি।

বাবু আর ফয়সালকে দেয়া হলো পুরু দায়িত্ব। বাবু কাজ ছিলো হুজুরকে সময় মতো আনা। ফয়সালকে দেয়া হল সমস্ত খানাপিনার আয়োজন করা। এখানে একজনের কথা ন বললেই নয়। আর সেতা হলো তামান্ন। প্রথমে ফয়সাল কিছুতেই ওর বাসায় প্রোগ্রামটা করতে পারবে না বলে আমাকে জানাইলো। এমন কি ফয়সাল নিজেও আসতে পারবে না কারন ওদের দোকানের কর্মচারি অসুস্থ্য বিধায় দোকানেই থাকতেনহবে বেচাকেনার জন্য। ছোট ভাই অথবা ফয়সাল যে কন একজন আসতে পারবে কিন্তু যেহেতু ছট ভাই সারা দিন ডিউটি করেছে ফলে রাতেও ওনার পক্ষে ডিউটি করা সম্ভব না বিধায় ছোট ভাই তার বাসায় চলে যাবে আর ফয়সাল থাকবে দোকানে। তাই ফয়সাল অনুষ্ঠানে থাকতেও পারবে না আবার এরেঞ্জমেন্টঅ করতে পারবে না। ঠিক এই মুহুর্তে তামান্নার ভুমিকা ছিল দূর্দান্ত সাহসি। সে মিটুলকে ঢাকায় ফোন দিয়ে বলেছিল-কে পারবে আর কে পারবে না ফুফু বাদ দেন, আমি তামান্না সব ব্যবস্থা করতেছি আর সেতা আমার বাসাতেই হবে। তামান্নার এই কথায় সব কিছু পালটে গিয়েছিলো।

তামান্না এক রাতের মধ্যে খাবারের সব আয়োজন করে ফেল্লো। বাবু হুজুরকে ম্যানেজ করলো, ফয়সাল ঠিকই সন্ধ্যায় এসেছিলো এবং ফয়সালই হুজুরকে নিজে গিয়ে নিয়ে এসছিলো। হুজুরের নাম ছিলো আব্দুল হামিদ।

আল্লাহর রহমতে সব কিছু খুব সুন্দর মতো হয়ে গেলো। হুজুর সময় মতো এলেন। ইসলামেরন্রীতি অনুযায়ি আবারো কনিকা আর ব্রেডির বিয়ে হলো। দুপুরে বিয়ে হয়েছিলো আমেরিকান নিয়মে কোর্তে, সেখান থেকেই ম্যারেজ সার্টিফিকেত দিয়ে দিয়েছিলো। এখন সন্ধ্যায় হলো ফয়সালের বাসায়। একবার আমাদের মুসলিম রীতিতে কাবিন করতে চেয়েছিলাম কিন্তু এতার না আছে কোনো ভ্যালু, না আছে কোনো প্রয়োজনিয়তা। তারপরেও আমি হুজুরকে বলে দিলাম একটা কাবিন নামা করে রাখেন। পরে আমাকে দিয়ে দিলেই হবে ইনশাল্লাহ।

খুব সুন্দর মতো কনিকার আর ব্রেডির বিয়ে পর্বটা শেষ হলো।

বাবা হিসাবে আমার সমস্ত দায়ীত্ত শেষ হল। এখন কনিকার হাজবেন্ড আছে, সে তার নিজের নিয়মে স্বামী নিয়ে সুখে বাস করুক। আগামি কোনো এক সময়ে ব্রেডি, তার মা বাবা বোনকে নিয়ে বাংলাদেশে এলে বড় করে একটা অনুষ্ঠান করবো ইনশাল্লাহ।

হতে পারে কোনো এক সময় আমার এই প্রজন্ম আমেরিকায় কন না কোন রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ভালো বর কাজে নাম রেখে যাবে ইনশাল্লাহ।

বাংলাদেশে থাকলো উম্মিকা আর আবির, আমেরিকায় থাকলো কনিকা আর ব্রেডি। কোনো এক সময় দেখা যাবে ইনশাল্লাহ যে, কনিকার কাছেই উম্মিকার সব বাচ্চারা গিয়ে হহাজির হবে উচ্চতর পড়াশুনার জন্য। আল্লাহ যে কার রিজিক কোথায় কিভাবে রেখেছেন, কেউ জানে না।

আমরা শুধু দোয়া করতে পারি।  

৭/১২/২০২৫-ব্রেডি একজন নিষ্পাপ সন্তান

কোথায় যেনো আমি পড়েছিলাম বা কেউ আমাকে শুনিয়েছিলো যে, আমাদের নবীর জামানায় অর্থাৎ যখন আমাদের নবী বেচে ছিলেন তখনকার সময়ে যদি কেউ তার নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্মকে গ্রহন করেন, তার যে সঅয়াব বা মোজেজা তিনি পাবেন, তার থেকে অনেক বেশি গুন সওয়াব বা মোজেজার অধিকারি হবেন সেই ব্যক্তি যে কিনা হুজুরকে না দেখে, আল্লাহকে না দেখে শুধুমাত্র ইসলামের বিশ্বাস কে ধারন করে ইসলাম গ্রন করেন। এতার একটাই কারন যে, তিনি না দেখলেন আমাদের নবীকে, না দেখলেন আল্লাহকে অথচ তাদের উপর বিশ্বাস করে পড়ে নিলেন- লা ইলাহা ইল্লালাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

আজ সেই রকম একটা দিন যেখানে ব্রেডি একজন খ্রিষ্টাণ ছেলে হয়েও ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছে আমার মেয়ে কনিকাকে ভালোবেসে যেহেতু কনিকা একজন মুসলমান সন্তান। আলহামদুলিল্লাহ।

 

মূল কাহিনীঃ

আমার ছোট মেয়ে সানজিদা তাবাসসুম কনিকা ২০২০ সালে আমেরিকা গিয়েছিলো পড়াশুনা করার জন্য। সে ২০২৪ সালের মে মাসে অনার্স শেষ করে চাকুরীতে ঢোকে যায়। ওর জন্য আমরা ওয়ার্কিং ভিসার জন্য ওর মামার দোকান থেকে একটা স্পন্সরশীপের ব্যবস্থা করছিলাম। এটা প্রায় শেষের পথে। কিন্তু মানুষের মন, কোথায় যে কি হয় সেতা বুঝা বড় অসুবিধা। কনিকা ভালোবাসার ফাদেই বলি আর মায়াতেই বলি আমেরিকার এক খ্রিষ্ঠান ছেলে যার নাম ব্রেডি স্মিথ এর প্রেমে পড়ে যায়। কনিকা সব সময়ই আমার কাছে ফ্রি এন্ড সৎ ছিলো বিধায় ব্রেডির ব্যাপারটা আমার কাছে কখনো গোপন করেনি। কনিকার উপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে, ছিলো এবং ইনশাল্লাহ থাকবে। আমি যখন ২০২৫ সালের জুনের দিকে আমেরিকায় বেড়াতে যাই, কনিকা ব্রেডিকে এবং তার মা রবার্টাকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো।

ব্রেডির মা ব্যাসিক্যালি জার্মান অরিয়েন্টেড, ব্রেডির বাবার প্রেমে পড়ে ব্রেডির মা রবার্টা বিয়ে করেছিলো। ২০০০ সালে যখন ব্রেডির জন্ম হয়, তার আগে পিছের ব্রেডির বাবার কাহিনী খুব একতা ভাল মনে করেনি রবার্টা। ফলে ২০০৩ সালে রবার্টা ব্রেডির বাবার কাছ থেকে পৃথক হয়ে যায় মানে ডিভোর্সড নিয়ে নেয়। সেই থেকে রবার্টার বড় মেয়ে রিচেল এবং ছেলে ব্রেডিকে নিয়ে আলাদা বসবাস করতে থাকে। এখনো তারা একই সাথে থাকে। মেউএ রিচেলের এখনো বিয়ে হয়নি, রবার্টাও আর কখনো বিয়ে করেনি। ব্রেডি আর রিচেলকে নিয়ে ভালই আছে।

রিচেল এবং ব্রেডি একই অফিসে কাজ করে। মা রবার্টা অন্য অফিসে কাজ করে। ছোট পরিবার, বেশ ভাল লেগেছে আমার ওদের সবাইকে যদিও আমি এখন অবধি রিচেলকে চোখে দেখিনি।

আমেরিকায় থাকতে আমি রবার্টার সাথে আর ব্রেডির সাথে দুই তিনবার রেষতুরেন্টে দেখা করেছি, অতঃপর রবার্টাকে কনিকার বাসাতেও আনিয়ে দেখা করেছিলাম। রবার্টাকে যথেষ্ট মাদারলি মনে হয়েছে, দায়িত্বশিল মনে হয়েছে, ব্রেডিকেও একজন ফ্যামিলি বয় হিসাবে মনে হয়েছে। ফলে ব্রেডিকে আমার অপছন্দ হয়নি।

কিন্তু আমার একতাই শর্ত ছিলো যে, আমাদের ধর্মীয় ভাবে যদি ব্রেদির সাথে কনিকার বিবাহ বন্ধনে আমার রাজি হতে হয়, তাহলে ব্রেদিকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। এটা নিয়েও ব্রেডির এবং রবার্তার কন অবজেকশন ছিলো না বরং তারা এতে রাজিও আছে বলে আমাকে জানালো।  আমি মনে প্রানে ব্রেডিকে নিয়েই কনিকার লাইফ স্তাইল চিন্তা ভাবনা করছিলাম। আমার পরিকল্পনা হল-আমেরিকায় আমি কনিকাকে একটা বাড়ি কিনে দেবো যাতে ওরা সুন্দরভাবে একত্রে থাকতে পারে। সে মোতাবেক ইতিমধ্যে আমি কনিকার একাউন্টে ৫৮ হাজার ডলারও দিয়ে রেখেছি। আরো ২০ হাজার ডলার পাঠানর প্রক্রিয়ায় আছে।

হতাত করে গত ৪ ডিসেম্বর তারিখে কনিকার একটা ম্যাসেজ আমাকে অনেক অনেক দূর্বল করে দেয়। আর ম্যাসেজটা হচ্ছে যে, আব্বু, আমরা আগামি ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কর্টে গিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবং ব্রেডি মুসলমান হতে চায় না, এতে আমার কন সমস্যা নাই। আমি যেনো হতাশ হয়ে গেলাম। কেনো ব্রেদি হটাত করে ১৮০ ডিগ্রী ইউ তার্ন নিয়ে নিল? ওদিকে আমি আমার মেয়ে কনিকাকে চিনি, ওকে জর করে কন কিছু থেকেই বের করে আনা সম্ভব নয়। কনিকা যেটা ভাল মনে করবে, সে তার সিদ্ধান্তে সর্বদা অটল থাকে। আমি নিশ্চিত আমার পরাজয় আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার বউ মিটুলের চোখের পানির যেনো শেষ নাই। আমি পুরুষ মানুষ, আমার চোখের পানি হয়তো কেউ দেখছইলো না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে কনিকাকে হারিয়ে ফেলার যে একটা যন্ত্রনা আর রক্ত ক্ষরন, সেই ব্যথাটা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতেছিলাম। আমি প্রতিটা নামাজে আমার আল্লাহর কাছে শুধু একটা প্রার্থনাই করছিলাম যে, হে আল্লাহ, হয় তুমি কনিকাকে এই পথ থেকে সরিয়ে আনো যা তোমার পথ না, আর না হয় তুমি ব্রেডিকে তোমার পথে নিইয়ে আস। যেতা আমার মেয়ের জন্য সবচেয়ে মংগল, তুমি সেতাই করো মাবুদ।

মেয়ের উপর বারবার রাগ হচ্ছিলো আবার ওকে বেশি করে শাসন করলে যদি বেকে বসে তখন আর কোনো অবস্থাতেই আর বাগে আনতে পারবো না আমি। ফলে আমি লাগাতার কনিকাকে এবং ব্রেডির মাকে কয়েকটা ম্যাসেজ পাঠাতে বাধ্য হলাম। সেই ম্যাসেজ গুলি ছিলো এ রকমঃ

মেয়েটার কোনো দোষ ছিলো না। ব্রেডিরও কোন দোষ নাই। একটা এতো অল্প বয়সের একটা খ্রিষ্ঠান ছেলের পক্ষে ধর্মান্তরিত হবার সিদ্ধান্ত এত সহজ না। নাম পরিবর্তন হয়ে যাবে, সমাজ পরিবর্তন হয়ে যাবে, পাসপর্ট পরিবর্তন হয়ে যাবে। কর্মক্ষেত্রেও একতা প্রভাব পরতেই পারে ইত্যাদি।

অন্যদিকে আমার মেয়ে কনিকাও ব্রেডিকে ছেড়ে আসতে পারছিলো না। মায়া, মহব্বত, প্রেম তো ছেড়ে দেয়া আরো কষ্টের। এই বয়সে ধর্মকে কজন পারে নিজের জীবনের পাথেয় করে তুলতে? আবার ব্রেডিকে পাইতে গিয়া আমাকেও তার ছাড়তে হতে পারে, ওর মাকে ছাড়তে হতে পারে, ওর বোন আর বোনের স্বামী আবিরকেও ছারতে হতে পারে যা অর পক্ষে হৃদয়বিদারকই না শুধু রীতিমত ভয়ংকর। আমি কনিকার অবস্থান্টাকে খুব মনের ভিতরে আচ করতে পারছিলাম। কষ্ট হচ্ছিল মেয়েটার জন্য। কি একটা কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছে আল্লাহ আমার মেয়েকে। আমার মেয়ে তার সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে, আবেগ দিয়ে, ব্রেডিকে বুঝাইতে সক্ষম হয়েছিল যে, সে কাউকেই হারাইতে চায় না, না ব্রেডিকে, না বাবাকে, না মাকে, না অন্য কাউকে। আল্লাহ ব্রেডির অন্তরে কি এক প্রশান্তি এনে দিলেন যে, ব্রেডি রাজি হল মুসলমান হবে। কিন্তু নাম পরিবর্তন করা ওর সম্ভব না। আমিও বললাম, এতে কন অসুবিধা নাই। নাম পরিবর্তন কন ইস্যু নহে। ইস্যু শুধু একতা-এক আল্লাহলে নিজের ইচ্ছায় মেনে নেয়া এবং হজরত মোহাম্মাদ (সঃ) কে আল্লাহর শেষ নবি এবং রাসুল হিসাবে মেনে নেয়া। ব্রেডির জন্য আল্লাহ কাজটা একেবারে সহজ করে দিয়েছেন। অতঃপর আমার মেয়ে আবার আমাকে ম্যাসেজ দিলঃ

আমার মনতাই ভরে উঠল এবং অনেকটাই শান্ত হয়ে গেল। এখানে আরো একতা ম্যাসেজের কথা না লিখলেই নয়, আমি পাশাপাশি রবার্টাকেও ফেসবুকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলাম। আর সেতা হচ্ছে-

রবার্টা আমাকে কোনো উত্তর করেনি। এর কারনটা আমি পরে জেনেছিলাম যে, রবার্টা কনিকা আর ব্রেডির কোনো পরিকল্পনাই জানতো না। বেচারী আমার কাছ থেকেই প্রথম এ ধরনের বার্তা পেয়ে নিজেও অবাক। ফলে সে আর আমাকে কি বার্তা দিবে? বরং ওদের কাছ থেকে কোনো বার্তা না পাওয়ায় অনি ওদের সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিলো অভিমানে। কিন্তু আমার ম্যাসেজ ওদেরকে পাঠাইতে ভুল্লেন না। আমি আবার এই তথ্যটা জানতেও পারিনি যে আসলে রবার্টা জানে না আবার অভিমান করেও বসে আছে। এটা জেনেছি অনেক পরতে।

যখন ব্রেডি ইসলাম গ্রহন করতে রাজি হল, আমার মনটাই ভালো হয়ে গিয়েছিলো। অতঃপর আমি কনিকাকে আরো কিছু মেসেজ পাঠিয়েছিলাম। সেগুলি এমনঃ

কনিকার মেসেজের কথা মতো বাংলাদেশ টাইম রাত ১ টায় ব্রেডির ইসলাম গ্রহনের কথা। তাই আমি জেগে থাকবো এটা জানিয়েছিলাম। কিন্তু ওদের নেটের সমস্যার কারনে আমি লাইভ শপথ গ্রহনটা দেখতে পারিনি। কনিকা আমাকে ব্রেডির শপথ গ্রহনের রেকর্ড করা ভিডিও পাঠিয়েছিল। আর সেই ভিডিওটা এ রকমেরঃ

আল্লাহর অশেষ রহমত।

অতঃপর আমি সকালে রবার্টা এবং কনিকাকে অনেক গুলি মেসেজ পাঠিয়েছিলামঃ

আর রবার্টাকে পাঠিয়েছিলাম নীচের ম্যাসেজটাঃ

আগামি ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কনিকা আর ব্রেডি কোর্টে গিয়ে ইনশাল্লাহ বিবাহ বন্ধনে মুসলিম রীতিতে আবদ্ধ হবে। ইনশাল্লাহ আমি দোয়া করি যেন ওরা ভাল থাকে, শান্তিতে থাকে।

৩/১২/২০২৫-দুনিয়া তোমাকে কতক্ষন মনে রাখবে?

একটা মানুষের ক্রমাগত উর্ধগতির উত্থান তার আশেপাশের সবাইকে প্রায় মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। তখন শহরের বিলবোর্ড, গ্রামের চায়ের দোকান, কিংবা ম্যাগাজিনের কাভার পোষ্টে সে উজ্জ্বল জলজ্যান্ত মহানায়কের মতো বিচরন করে বেড়ায়। চেনা জগতটার মধ্যে হাজার হাজার অচেনা বন্ধুদের ভীরে চেনা জগতটাই যেনো অচেনা হয়ে যায়। মনে হয় তখন দুনিয়ার স্বর্ণদুয়ার খুলে যায়। তার নাম সর্বত্র উচ্চারিত হতে থাকে প্রশংসায় আর ঈর্ষায়।

যখন কনো না কোনো কারনে এই মানুষটার দূর্দিন শুরু হয়, হোক সেটা যে কন কারনেই। হয়তো রোগভোগে, হয়তো কোনো কঠিন দূর্ঘটনায়, কিংবা কোন অকস্মাৎ অকল্পনীয় অঘটনে। তারপর সমস্ত কিছু পালটে যায়। তখন দেহ চুরমার হয়ে যায়, স্বপ্ন ভেংগে যায়, স্পটলাইট সরে যেতে থাকে, ক্যামেরার ক্লিক বন্ধ হতে থাকে, মোবাইলের রিংটোন কমতে থাকে, মনে হয় কেমন যেন নীরবতা। এই নিস্তব্দতা কান ফাটা হাততালির থেকেও যেন ভয়ংকর। কেমন যেন শরীর অবশ হতে থাকে, আয়ু কমতে থাকে, একই অনুপাতে পাশে দাড়ানর মানুষের সংখ্যাটাও কমতে থাকে।

বন্ধুরা সরে পড়ে, পরিচিত কিংবা অপরিচিত মানুষ গুলির আনাগোনা কমে যেতে থাকে, এমন কি পরিচিত মানুষগুলির ফোনও আনরিচেবল হয়ে যায়। একদা পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছবির পোজ নেয়ার জন্য অনুনয় করা মানুষগুলিও হাওয়া হয়ে যায়। যারা একান্ত বাধ্য হয় পাশে থাকতে, তারাও এক সময় বিরক্ত হয়ে উঠে। এই হৃদয় ভাংগা সময়ে, এতোসব মুখোশের ভীরে নীরবে তারপরেও কেউ না কেউ থাকে যারা আমাদের সেই উচ্ছল উজ্জ্বল সময়ে পাশে রাখা হয়নি। তখন সেই আলোকউজ্জল সময়ে আমরা ভুলে যাই-

এ দুনিয়া তোমাকে ততোক্ষনই ভালোবাসবে, যতোক্ষন তোমার সম্ভাবনা আছে কাউকে কিছু না কিছু দেয়ার এবং যে মুহুর্তে আমাদের পতন হবে, আশেপাশের কেওই আর থাকবে না।

সাফল্য দৃশ্যমান, কিন্তু অবহেলা অদৃশ্য। আলোর চারপাশে প্রচুর পোকামাকড় থাকে বটে, আলোটা নিভে যাওয়া মাত্রই ওগুলি অন্য আলোর সন্ধানে চলে যায়। তবুও সেই অন্ধকারের সময়ে কেউ না কেউ হয়তো থাকে। হোক সেটা কারো মা, বাবা বা খুব ভালো বন্ধু। সেই অন্ধকার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় –কে মুখোশ, কে মুখ, আর কে মায়াভরা মুখ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

কিছু গল্প আমাদেরকে ভেঙ্গেচূড়ে দেয়, কিছু গল্প আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, আর কিছু গল্প আমাদেরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যাকে আমরা বলি ঈশ্বর।

আমার জীবনের গল্পে সবগুলিই আছে। কিন্তু সবগুলি দৃশ্যমান নয়।

২২/১১/২০২৫-বিশ্বাস

বিশ্বাস একটা আয়না, এটা ভাংলে আর জোড়া লাগে না। আর যিনি ভাংলেন আসলে তিনিই তার প্রতিচ্ছবি হারান। মানুষের বিশ্বাস হারানো মানে শুধু একটা সম্পর্ক হারানো নয়, এটা আত্তার একটা অংশ মরে যাওয়া। বিসশাসঘাতকেরা কখনোই বুঝতে পারে না-তারা যে বিশ্বাস নষ্ট করে সেটা আব্র তাদের জীবনেই বিষের মতো ফিরে আসে।

ভালোবাসা দিয়ে শুরু সম্পর্ক যখন মিথ্যায় ভরে যায়, তখন প্রতিটি নিঃশ্বাসই যন্ত্রনার গল্প বলে। বিশ্বাস ঘাতকের নিঃশ্বাস সবচেয়ে ভয়ংকর। কারন সে মিষ্টি কথা বলে, অথচ সে পিছনে বিষ ছড়ায়। বিশ্বাস ভাঙ্গার শব্দ কেউ শুনতে পায় না, কিন্তু সেই নীরবতার প্রতিদ্ধনী সারা জীবন কানে বাজে। যখন কেউ তোমার বিশ্বাস ভাংকে সে আসলে তোমাকে নয়, সে তার মর্যাদাকেই হত্যা করে।

২১/১১/২০২৫-সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০২৫

প্রতি বছরই এই দিনটায় দাওয়াত পাই। এবার দাওয়াত পেলাম প্রধান উপদেষ্টা থেকে। যখন সেনাবাহিনীতে ছিলাম, পারতপক্ষে এই দিনটায় যাতে যেতে না হয় তাই ফাকী দিতাম বিভিন্ন অজুহাতে। ওটার একটা কারনও ছিলো। এসডি পড়ে যেতে হতো, মানে সিরিমুনিয়াল ড্রেস। খুব ভেজাল মনে হতো আমার কাছে। কিন্তু অবসর নেয়ার পর (যদি কোনো জরুরী ইভেন্টের কারনে যেতে না পারি সেটা ভিন্ন কথা, তা না হলে) যাওয়ার চেষ্টা করি এই কারনে যে, অনেক সিনিয়ার জুনিয়ার এবং গনমান্য ব্যক্তিদের সাথে দেখা হয়। ব্যাংকে গেলে, সিএমএইচ এ গেলে কিংবা সিএসডি তে গেলে ফাকফোকর দিয়ে সিনিয়ার জুনিয়ারদের সাথে যেমন দেখা হয়, তেমনি ২১ নভে,বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে মুটামুটি প্রায় সবার সাথেই একসাথে দেখা হয়। এই কারনেই আমি এখন এই দিনের দাওয়াতে মিস করতে চাই না।

এবারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে অনেক সিনিয়ারদের কিছু পরিচিত মুখ অনেকদিন পরে আবারো দেখা হলো। মেজর হাফিজ (বিএনপি)  স্যারের সাথে প্রায়  দেড় যুগ পর দেখা, হাফিজ স্যারের সাথে ছবি তোলার পরই বিএনপির আরেক পরিচিত মুখ মির্জা আব্বাস ভাই কাছেই ছিলেন, সাথে সাথে বললেন, ছবি তুলবা? স্মৃতিটা থাকলো। উনার সাথেও এই রকমই প্রায় দেড় যুগ পর দেখা হলো।

আমাদের বর্তমান উপদেষ্টা ফওজুল স্যারের সাথে আমার কখনো আগে দেখা হয়নি। আমি উনাকে খুব পছন্দ করি সৎ মানুষের কাতার থেকে। আমি নিজে গিয়েই ওনার সাথে ছবিটা রাখলাম আমার স্মৃতিতে।

এরপরে প্রচুর সিনিয়ারদের সাথে দেখা হলো। জেনারেল আনোয়ার স্যার (আমরা একই ইউনিটে চাকুরী করেছি কিন্তু আমি যখন জিএসও-২ (অপ্স), উনি তখন আবারো আমার সেই একই ইউনিটের সিও ছিলেন)। খুবই প্রফেশনাল একজন অফিসার। বিপদজনক সময়ে হিলট্র্যাক্সে একসাথে কাজ করেছি আমার আরেক সিও শেখ নুরুল আমিন স্যারের সাথে। ভাবীর সাথেও দেখা হল প্রায় ৩৩ বছর পর।

কোর্সমেট, জুনিয়র এবং আরো অনেক প্রিয় অফিসারদের মিলনমেলা যেন এই ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তিন বাহিনীর প্রধান  জেনারেল ওয়াকার (সেনাপ্রধান), এডমিরাল নাজমুল (নেভাল চীফ), এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ (এয়ার চীফ) হচ্ছে আমার ব্যাচমেট। এদের সাথেও আজকে আবার এক ঝলক দেখা হলো।

সময়টা খুব ভালো কাটলো।

০৯/১১/২০২৫-শাহরিয়ারের আগমনে আমি দাওয়াত করা শেরাটনে

কোথায় যেনো শুনেছিলাম যে, আমরা আত্মীয়তার জেরে দাদা, নানা, খালা ফুফু ভাই বোন পাই, কিন্তু সেটা আমরা তৈরী করি না, এই সম্পর্কের তৈরী ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ক্রেডিট নাই। আমরা এগুলি বংশ পরম্পরায় পাই। কিন্তু আমাদের জীবনে আসা বন্ধুদের আমরা নিজেরা তৈরী করি। একজন ভালো বন্ধু চকচকে আয়নার মতো, কখনো তারা নিজের গোপন সহচর, মনের খোরাকের মত। সুখে দুখে এই বন্ধুরা জীবনের সবচেয়ে বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে।

ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের মধ্যে বন্ধুত্বটা একটা অন্য রকমের ধাচে তৈরী হয় যেখানে ওরা জীবনের সবচেয়ে কাচা সময়টায় ২৪ ঘন্টাই একসাথে থাকে, খায়, খেলে, ঘুমায়, হাসে, কাদে। পরিবারের চেয়েও বেশী কাছে থাকে ওরা। ওদের বন্ধুত্বটা পারিবারিক শক্ত বন্ডের থেকে বেশী। শুধু এখানেই শেষ নয়, এক ক্যাডেট কলেজের সাথে আরেক ক্যাডেট কলেজের ব্যাচমেট বন্ধুরাও আজীবন না দেখে, না চিনে, নাম না জেনেও যেনো জন্ম জন্মান্তরের বন্ধু হয়েই থাকে। অদ্ভুত এই সর্গীয় বন্ধন। আমরা এই বন্ধুত্বকে আজীবন লালন করি।

আমাদেরই ব্যাচের আমাদের বন্ধু শাহরিয়ার গত ২/৩ দিন আগে সেই সূদুর কানাডা থেকে বাংলাদেশে এসেছে। মাত্র সপ্তাহ খানেক থাকবে ওর আব্বার সাথে। আমাকে ফোন করার পর আমি শাহরিয়ারকে ফোনেই বললাম, অনেকদিন ক্যাডেট বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না। তোমার এই আগমন উছিলায় চলো আমি একটা একটা আড্ডার ব্যবস্থা করি যেখানে সবার সাথে দেখা হবে, কথা হবে, আবার হারিয়ে যেতে পারবো আজ থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগের শৈশবের সেই অনুভুতিতে। শাহরিয়ার রাজী হলো।

আমার আরেক প্রিয় বন্ধু মাহমুদকে (বর্তমানে বিটিআরসি এর একজন উর্ধতন কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করছে) ব্যাপারটা বললাম যে, আমি স্পন্সর/হোষ্ট করবো, তুমি বাকী এরেঞ্জমেন্টটা করে দাও শেরাটনকে কেন্দ্র করে। সবাইকে দাওয়াত করো, হোটেল বুক করো। মাহমুদ এ ব্যাপারে আমাদের ব্যাচের মধ্যে সর্বদা একটা সচীবের দায়িত্ব পালন করে। মাশআল্লাহ, আমার ১৭ জন ক্যাডেট বন্ধু গল্পের ভান্ডার আর একরাশ মিষ্টি ভালোবাসার হাসি নিয়ে রাত ৮ টায় হাজির।

ভীষন মিষ্টি এবং চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটলো আমাদের সবার। রাশেদের অন্যত্র আরো দুইটা মিটিং ছিলো, তারপরেও সেগুলি একদিকে শিফট করে আড্ডায় হাজির হলো। বন্ধুদের আড্ডা মানে জীবনীশক্তি বেড়ে যাওয়া, শরীর আবার চঞ্চলতায় ভরে উঠা। দ্রুত সময়তা যেনো হাওয়া হয়ে গেলো গল্পে গল্পে। যারা আসতে পারেনি, তাদের অনেক মিস করেছি।

ধন্যবাদ আমার প্রিয় বন্ধুদের। সবাইকে অনেক ভালোবাসি। ধন্যবাদ শাহরিয়ারকে।

৩০/১০/২০২৫-হল অফ ফেম, CNS, COAS

গত বছরের নভেম্বর মাসে অর্থাৎ নভেম্বর ২০২৪ এ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের জন্য বি এম এ তে হল অফ ফেম অনুষ্ঠান হয়েছিলো। কিন্তু আমি হার্টের সমস্যার কারনে, মিটুল এবং কনিকা গিয়েছিলো, আমি যেতে পারিনি। এবার অর্থাৎ আজ ৩০ অক্টোবর ২০২৫ এ সেই একই প্রোগ্রামটা হলো নেভীর এবং এয়ার ফোর্সের প্রধান যথাক্রমে নাজমুল এবং হাসানের জন্য অনুষ্ঠানটা হলো। এবার অনুষ্ঠানে যেতে কোনো সমস্যা হয় নি।

যেহেতু তিন বাহিনীর অর্থাৎ আর্মির চীফ, নেভাল চীফ এবং এয়ার ফোর্সের চীফ, তিনজনেই আমার কোর্ষ্মেট, ফলে একদিকে যেমন এটা গর্বের বিষয়, অন্যদিকে এই অনুষ্ঠাটিতে তিন বাহিনীর চীফই তাদের পছন্দমতো কোর্ষ্মেটদেরকে সিলেক্ট করে কারা কারা এই অনুষ্ঠানে জয়েন করবে, সেদিক থেকে কোন ভাবেই ওরা আমাকে আউট অফ সিলেবাসে রাখে না এতেও নিজের কাছে ভালো লাগে। এই সিলেবাসে রাখা আর না রাখা নিয়ে অনেক মনোমালিন্য, অনেক গোস্যা কিংবা অনেক বিতর্ক আছে, সেদিকে আর যাচ্ছি না।

গত কয়েকদিন আগে ক্যাপ্টেন রাশের নামে এক আর্মি অফিসার আমার ফোনে ফোন করে জানালো যে, আগামি ৩০ অক্টোবর দুই চীফের হল অফ ফেম অনূষ্ঠান হবে, আমি পরিবার সহ যাবো কিনা। আমার যেতে কোন অসুবিধা ছিলো না বিধায় সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে মিটুলের নাম্বারটা দিয়ে দিলাম, যেনো যাবতীয় বাকী ফর্মালিটিজ গুলি ওর সাথেই করে। ক্যাপ্টেন রাশেদের কাজ ছিলো শুধু ইনভাইটেশন কার্ড গুলি বিতরন করা। অতঃপর আমাদের ২ জনের জন্য কন্ডাক্টিং অফিসার হিসাবে নিয়োজিত ছিলো ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। অত্যান্য অমায়িক ছেলে এবং দায়িত্তশীল অফিসার।

ওরাই এয়ার টিকেট পাঠিয়েছিলো, বাংলাদেশ বিমান। আমরা মাস্কাট গামি বাংলাদেশ বিমানে উঠেছিলাম সকাল সাড়ে আটটায়, চট্টগ্রাম হযরত শা আমানত বিমান বন্দর থেকে আমরা সরাসরি ভেন্যু পৌঁছে গিয়েছিলাম সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে। ১১ টায় প্রোগ্রাম শুরু হয়েছিলো।  আর্মির চীফ ওয়াকার, নেভাল চীফ নাজমুল, এবং এয়ারফর্সের চীফ হাসান সঠিক সময়েই এসে উপস্থিত হলো, আমার কোর্সের ৩ বন্ধু, তাদের জন্য আমাদের এই ন্যাশনাল অনুষ্ঠান সেই জায়গাতে যেখানে আমরা ২ বছর একসাথে অত্যান্ত কঠিন ট্রেনিং লাইফ কাটিয়েছি। ভাবতেই ব্যাপারটায় অনেক নস্টালজিক মনে হচ্ছিলো।

একসাথে লান করলাম, ভালো লাগলো।

আমার এই পর্বে যেতা আমি আসলে লিখতে চেয়েছি সেটা হল-বিএমএ এর ট্রেনিং। আমরা যখন ট্রেনিং করেছি, তখনকার বি এম এ এর সেট আপ আর প্রায় ৪১ বছর পরের বি এম এ এর সেট আপের মধ্যে তুমুল তফাত। আমাদের সময়কার যেখানে যেখানে জি সি অফিস, বারবার শপ, কোম্পানী বিল্ডিং গুলি, ড্রিল গ্রাউন্ড, রগড়া প্যারেডের গ্রাউন্ড ছিলো সেগুলিও প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে কোনোটা অন্যত্র শিফট হয়ে গেছে, আবার কোনোতা ছোট হয়ে গেছে, আবার কোনোটা এতো বিশাল হয়ে গেছে যা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। অফিস গুলি খুবই অত্যাধুনিক্তায় ভরপুর, প্রচুর নতুন নতুন ভবন হয়েছে যেগুলি আসলেই দরকার ছিলো কিন্তু সেই প্রায় অর্দ শতাধিক আগে এগুলি বানানো কিংবা বাজেটে হয়তো কুলায় নি বলে বানানই হয় নাই। কিন্তু এখন ১০০ অফিসার মেস, সুইমিং পুল, ক্যাডেট ডমিটরীর পাশাপাশি আরো অনেক কারিকুলাম করা যায় এমন বিল্ডিং, কনভেনশন হল, মিটিং রুম, ক্যাফেটেরিয়া, ইনডোর খেলাধুলা করার প্রভিশন, জীম, আরো কত কিছু যে নতুন যোগ হয়েছে, বি এম এ এর সব জায়গা ঘুরলেই মনটা ভাল হয়ে যায়।

বি এম এ এর যে রাস্তাটা আজ থেকে ৪১ বছর আগে শুধু মাটির রাস্তা ছিলো, সেটা এখন বিশাল হাই ওয়ে হয়ে গেছে, সেখানে সানসেট পয়েন্ট, গলফ গ্রাউন্ড, আরো কতই না সুন্দর সুন্দর স্থাপনা তৈরী হয়েছে। বেশ ভালো লাগলো ব্যাপারটা।

আমাদের টার্ম কমান্দার ৯ডুজনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফিজ এবং ব্রিগেডিয়ার তালেব স্যার) এবাব্রের অনুষ্ঠানে আমাদের সাথে বন্ধুর মতো ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তালেব স্যার বেসিক্যালী আমাদের কোর্সের সাথে একেবারে প্তোপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন। সবার সব অনুষ্ঠানে তিনি আসেন।

২৭/১০/২০২৫-কথা একটা মারাত্তক অভ্যাস

মানুষ বড্ড অদ্ভুত প্রানী। অন্যান্য প্রানীদের মতো সে জন্ম নিয়েই দৌড়াতে বা সরাসরি হাটতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশের জন্য সাথে সাথে ভাষা জানে না, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ভয় কিংবা ভীতি কিংবা মনুষ্য রচিত কোনো আনন্দের ফোয়ারা তৈরী হলেও মানুষের অনুভুতিতে তার কোনোতাই জন্মের সাথে সাথে হয়ে উঠে না। মানুষ বড় হয়, হাটতে শিখে, কথা বলতে শিখে, অনুভুতির স্রিষ্টি হয়, এবং এ রকম আরো হাজারো ছোট বড় অভ্যাস গড়ে উঠে। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস হচ্ছে-কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস, এইটা সব অভ্যাসের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্তক অভ্যাস। আর এই অভ্যাসটা হটাত করে দু একদিনের মধ্যে হয়ে উঠে না। নিয়ম করে, হাতে সময় নিয়ে রোজ একটু একটু করে কথা হয়। আর এই কথা হতে হতে আস্তে আস্তে একটা মায়ার জন্ম নেয়। এই মায়া জন্মাতে জন্মাতে এক সময় এটা নেশায় পরিনত হয়, আর ঠিক তখনই তা কেবল অভ্যাসে পরিনত হয়। এই যে কারো সাথে কথা বলার অভ্যাস আমাদের অজান্তেই স্রিষ্টি হয়ে গেলো, তখন আমাদের ভালো থাকার সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রন আমরা হারিয়ে ফেলি তখন। একদিন কোথাও অন্যত্র কেউ চলে গেলে, শরীর কাহ্রাপ হতে থাকে, খাবারের রুচীতে ঘাটতি দেখা দেয়, অন্য কারো সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না, ভালো ঘুম হয় না, সময়টা যেনো থেমে থাকে। কথা হওয়ার মুহুর্তে হটাত কথা না হওয়া চরম ডিপ্রেশনে ফেলে দেয়। তখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কোনো কিছুই আর ভালো লাগতে চায় না, হটাত করে মন খারাপ হয়, একাকী পায়চারী করতে মন চায়। মনে হয়-কি যেনো ঠিক নাই। একা হয়ে যায় মানুষ।

তারমানে এই নয় যে, কথা বলা খারাপ অভ্যাস। কারো সাথে কারো কথা বলতে কখনো কখনো ভাল লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সেটা যদি নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিনত হয় এমনভাবে যে, হটাত কোনো কারনে কথা না বললে মন শরীর চিন্তা ভাবনা সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে, তাহলে কষ্মিঙ্কালেও আমাদের ভালো থাকা হয়ে উঠবে না।

কথায় মায়া বাড়ে, আর মায়ায় লেপ্টে থাকে যন্ত্রনা, একাকীত্ব, বিষাদ। যদি কখনো মনে হয়, এক তরফাভাবে আপনি ডুবে যাচ্ছে, তবে এখনই নিজে সংবরন করুন, থামান। নিজেকে ততটুকি নিয়ন্ত্রের মধ্যে রাখুন যতটুকু নিয়ন্ত্রন রাখলে হুট করে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলেও অন্তত নিজেকে নিঃস্ব মনে হবে না।

২৭/১০/২০২৫-তোমারে যে পাইলো

শরৎচন্দ্র বাবুর একটা উপন্যাসে তিনি লিখেছিলেন-“তাহাকে ধরিয়া রাখিতে চাহিলে হয়তো ধরিয়া রাখিতে পারিতাম। কিন্তু সেই চেষ্টা করিলাম না। সেও আর ফিরিয়া আসিলো না। আমারো যতক্ষন না ঘুম আসিলো, শুধু এ কথাই ভাবিতে লাগিলাম। জোর করিয়া রাখিয়া লাভ হইতো কি? আমার পক্ষ হইতে তো কোনোদিন জোরই ছিলো না। সমস্ত জোরই আসিয়াছিলো তাহার দিক হইতে। আজ সেইই যদি আমাকে বাধন থেকে মুক্তি দিয়া আপনাকে মুক্তি দিতে চায়, তাহা হইলে আমি ঠেকাইব কি করিয়া?”

কি অদ্ভুত হৃদয় ছেড়া অনুভুতি!! এই যে ছেড়ে দেয়া আর ছেড়ে যাওয়া-এর মধ্যে অনেক তফাত আছে, অনেক অনেক বিস্তর পার্থক্য আছে। ছেড়ে যাওয়া মানে-আমি তোমাকে আর চাই না। এক সময় কি ছিলাম, আর কি ছিলে, এসব কিছু মেপে, বুঝে শুনে অতএব সিদ্ধান্ত আসে-আমি ছেরে দিচ্ছি। এটা এক ধরনের প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশন। এর মানে তোমার আর আমার প্রয়োজন নাই। তোমার সব প্রয়োজন আমার কাছে ফুরিয়ে গেছে।

আর ছেড়ে দেয়া মানে আমি তোমাকে খুব করে পেতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমাকে আমি পাইলাম না। হাত বাড়ালেই যাকে পাও, সে হয়তো তোমার ভালোলাগা। আর খুব করে চেয়েও যাকে তুমি পাও না, তবুও তুমি যাকে চাও, বা মনে রাখো, হয়তো সেটাই ভালবাসা। ভালোবাসা মানেই সব সময় মানুষটাকে পাওয়া নয়। কখনো কখনো না পাওয়া, ছাড় দেয়া কিংবা অপেক্ষা করাও ভালোবাসা। হয়তো মানুষটাকে তুমি কখনোই পাবে না। অনেক আরাধনা করেও তুমি পাইলে না। হয়তো আরেকজন কোনো আরাধনা না করেই তাকে সে নিজের করে পেয়ে গেলো। তোমার তখন বড্ড কষ্ট হতে পারে, দুঃখ হতে পারে আর মনের মধ্যে বারবার নাম না জানা লেখকের সেই কথাগুলিই ঘুরে ফিরে আছড়ে পড়তে পারে যে, ………শেষ পর্যন্ত তোমারে যে পাইলো, তার লাইগা আমার আফসোসই লাগে। কারন সে জানলো না তোমারে হারাইলে কেমন লাগে।  কেমন লাগে তুমি ছাড়া রাইত জাগনের যন্ত্রনা। সে জানলো না, ভাত খাইতে বইসা তোমার প্রিয় তরকারী দেখার পর গলা দিয়া ভাত না নামার বেদনা।

 নাহ সে এটাও জানলো না, তোমাকে আরেকবার দেখতে চাওয়ার আকুতি কেমন হয়। সে জানলো না, তোমার সাথে স্মৃতিগুলি জড়াইয়া বাচার কষ্ট। সে জানলো না, তোমারে পাইয়া হারানোর পর দুনিয়া কেমনে ফাকা হইয়া যায়। সে জানলো না, তোমার স্পর্শ ফিরা পাওয়ার লাইগা পরান কেমন ছটফট করে। সে তোমারে পাইলো, কিন্তু তোমারে হারানোর ব্যথা পাইলো না। সে বিরহ চিনলো না, সে প্রেমের দুঃখ কেমন তা বুজলো না। সে জানলো না, একটা ছারখার হওয়া জীবন টানতে কেমন লাগে। সে সুখ ঠিকই পাইলো, কিন্তু তোমারে হারাইয়া  শক্ত হইলো না। এই যে তোমারে হারাইয়া ফেলার পর কোনো কষ্টই আর আমার গায়ে লাগে না। সে তোমারে পাইয়া আমার মতন পাথর হইতে পারলো না।

 অবশেষে যে তোমারে সারা জীবনের জন্য পাইলো, সে যেনো তোমারে আগলে রাখে অনেক যতনে। আমি ভাঙাচোরা মানুষ, তোমারে ছোয়ার সাধ্য আমার কখনোই ছিলো না। তবু সপ্ন দেইখা গেছিলাম তোমারে পাওয়ার জন্য। আমি হতভাগা এতই কমদামি সপ্ন কেনার দামদরেতে তোমারে হারাইয়া ফেলেছি। যে তোমারে জিতে নিলো, সে যেনো তোমারে ভালবাসার কমতি বুঝতে না দেয়। আমি চাই না ভালোবাসার কমতি পড়লে তুমি আমারে মনে করো। তুমি যখনই আমারে মনে করবা, তোমার দুঃখ হইবো আমার জন্যে। আমি চাই তুমি সুখী থাকো আজীবন। দুঃখ তোমারে মানায় না। যার কাছেই থাকো, ভালো থাইকো। কারন তুমি ভালো না থাকলে আমার এত বিসর্জন, আমার এত দীর্ঘশাস সব বিফলে যাইবো।

১২/১০/২০২৫-Lawful Command and Unlawful Command

Lawful Command and Unlawful Command এর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য একটা পরিষ্কার সাংবিধানিক এবং বিচারিক ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কারন:

(১) পরাজিত শক্তির কাছে যেটা আন ল ফুল, বিজয়ী শক্তির কাছে হয়ত সেটাই ল ফুল কমান্ড। অথবা পরাজিত শক্তির কাছে যেটা ল ফুল কমান্ড, বিজয়ী শক্তির কাছে সেটা হয়ত আন ল ফুল কমান্ড বলে মনে হয়ে পারে।

(২) ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের ৭১ এর মত। ৭১ ছিলো আমাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তানের কাছে আমাদের মুক্তিবাহিনী ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠী। মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছিল ল ফুল কিন্ত পাকিস্তানের পক্ষে এটা ছিল আন ল ফুল।

(৩) এক দেশের একজন দেশপ্রেমিক অন্য আরেকটি দেশের জন্য সে স্পাই হিসাবে গন্য হয়। দেশপ্রেমিক একটা ল ফুল ব্যাপার। কিন্তু স্পাই? অবশ্যই ল ফুল নয়।

(৪) সামরিক বাহিনীতে এমবিএমএল এ যাইই লেখা থাকুক না কেনো, জুনিয়ার লেবেল অফিসারদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ল ফুল আর আন ল ফুল কমান্ড খাটে না। যদি খাটতো তাহলে, সামরিক বাহিনীতে ডিসিপ্লিন রাখা যেত না। প্রত্যেকটা ক্রিটিক্যাল অপারেশনে অফিসার, নন কমিশন্ড অফিসাররা একের পর এক কোনটা ল ফুল আর কোনটা আন ল ফুল কমান্ড এগুলি করতে করতেই অপারেশন ফেইল করতো। তবে সিনিয়ারদের বেলায় যারা কমান্ড লেবেলে থাকে, তাদের এটায় আর্গুমেন্ট করার অপশন থাকে।

(৫) গত ১৭ বছরে এবং তার আগে, এবং তারও আগের রিজিম গুলিতে এদেশে সামরিক এবং বেসামরিক স্তরে অসংখ্য আন ল ফুল কমান্ড জারী হয়েছে, আন ল ফুল কর্ম করতে দেখা গেছে সরকারি পৃষ্টপোষকতায়, কতজন মানুষ সে সবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো? এটাও একটা বড় প্রশ্ন। যদি সোচ্চার হত, তাহলে তার জীবন শেষ। আর যদি সোচ্চার না হয়, বলা হবে আন ল ফুল কমান্ডের দোসর। যাবেন কই? আর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তো আরো অসহায়। তারা কমান্ড মানতে বাধ্য।

০১/১০/২০২৫-অধ্যাপক হামিদুর রহমান স্কুল এন্ড কলেজ

আমি যখন এই স্কুলে পড়তাম, তখন সালটা ছিল ১৯৭৬। টিনের স্কুল, চারিদিকে মুলির বেড়া, আর এই মুলির বেড়ার বেশিরভাগ ছিল নীচ দিয়ে ভাঙ্গা। মুরগী, কুকুর, বিড়াল এমন কি চোরেরাও মুলির বেড়ার নীচ দিয়ে স্কুলের ক্লাশের ভিতরে ঢোকে যেতো। পরদিন আমরা যখন ক্লাশে আসতাম, এসে মুরগী ইয়াড়াইতাম, কুকুরকে তাড়াইতাম, বেঞ্চ আর চেয়ার গুলি ধুলোয় এমন হয়ে থাকতো যে, এগুলিকে মুছে পরিষ্কার করতেই সময় লাগত আধা ঘন্টা। ক্লাস রুমের দরজাগুলি এমন ছিল যে, কেউ জোরে ধাক্কা দিলেই খুলে যেতো, তালা লাগাওনর কনো ব্যবস্থাই ছিলো না। বৃষ্টির দিনে মাঠে বৃষ্টির পানি পরার আগে যেন ক্লাশ রুমে পড়তো আগে। এতোই ফুটাফাটা ছিলো টিনের চালগুলি। ছাত্ররা বা ছাত্রীরা আসতো তাদের নিজের উদ্যোগে, স্যারেরা আমাদের পরাতেন ঠিকই কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা আমাদের নিচের ক্লাসের ছাত্রদেরকে ক্লাস নিতাম। কারন সব ক্লাসে টিচার ছিলো না। আমি তো রেগুলার ক্লাস নিতাম। একটু একতু গর্বও হত যে, আমি না ছাত্র আবার না টিচার অথচ আমি কিন্তু ছাত্র।

এই স্কুলটা তখন ক্লাশ এইট বা অষ্টম পর্যন্তই ছিল অর্থাৎ হাইস্কুল। খুব যে ভাল স্কুল ছিলো সেটাও নয় কিন্তু এই এলাকায় এটাই ছিলো একমাত্র হাইস্কুল। আলাউদ্দিন ভাই আসতেন, আমাদেরকে খুব আদর করতেন। অসম্ভব অমায়িক মানুষ ছিলেন তিনি। এই স্কুল থেকেই আমরা ২ জন (আমি এবং ডাঃ শফিক ভাই, আলুকান্দার) ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম। এর পরে আরো অনেক মেধাবি ছাত্ররা দেশের বিভিন্ন সেক্তরে খুব ভাল ভাল জায়গায় কাজ করছেন এবং করেছেন। স্কুলটা ছিল তখন এলাকার প্রানকেন্দ্র। প্রায়ই বিকালে ফুটবলের প্রতিযোগীতা হত, গ্রামবাসিরা মাঠের চারিদিকে বসে যেনো ওয়ার্ল্ডকাপ খেলা হচ্ছে এমন একটা পরিবেশ হতো, মাঝে মাঝেই নাটক বা কালচারাল অনুষ্ঠান হত। ছেলেরাই মেয়ে সেজে নায়িকা হতো। কি যে একটা রমরমা সময় ছিল।

আজ এতো বছর প্পতে স্কুলটার চেহাড়া দেখলে মনে হয় কি সুন্দর। এতো বড় মাঠ, চার তলা করে অনেক গুলি বিল্ডিং। অনেক ছাত্র আর টিচার গন। রম রম করে পরিবেশ কিন্তু সবচেয়ে দুঃখ আর কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে-এই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে পাশের হার মাত্র ১০%। তাও আবার খুব লো গ্রেদিং দিয়ে পাশ। এটা কনো কথা?

মাষ্টারদের কাছে কেউ কৈফিয়ত চায় না গার্জিয়ানরা, গার্জিয়ানরা কেউ সপ্ন দেখে না তাদের সন্তানদের নিয়ে, কনো ছাত্র জানে না তার ভবিষ্যত কি। সে কি হতে চায়। কেউ তাদের মাথায় সপ্ন বুনন করে না। অথচ সব উপাদান আছে এই স্কুল এন্ড কলেজে। যারাই এই স্কুল এন্ড কলেজের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন, তারাই এতাকে নিয়ে হয় রাজনিতি করেছেন, অথবা এর থেকে ফায়দা লুটেছেন অথবা লাভ করেছেন। কেউ ছাত্রদের ভাল হক, ছাত্ররা নামকরা কেউ হক, এ অঞ্চলতাকে ছাত্ররা সমৃদ্ধ করুক কেউ চেষ্ঠা করেনি। চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা প্রশাসক এমন কি এম পি ও এর পিছনে কখনো কনো সময় দিয়ে এটাকে কিভাবে ভাল একতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা যায় তার জন্য চেষ্টা করেনি।

এখনো এখানকার যুবকেরা জানে না যে, অতি শীগ্রই ওরা এমন কিছু মানুষের অধীনে চলে যাবে যারা বেই এলাকার কেউ নন। …।।

৩০/০৯/২০২৫-অবহেলা

কেউ কি তোমাকে ভালবেসেছিলো? কতটুকু কতক্ষন কি পরিমান কিভাবে কেনো ভালবেসেছিল সেটা কি কখনো অনুধাবন করে বিশ্লেষন করেছো? ভালোবাসাটা একটা চরম আবেগী জিনিষ, যে ভালবাসায় মজেছে, তার কাছে আর অন্য কোন কিছুই জরুরী নয়। আর যার ভালবাসায় সে মজেছে, সেটা যেমনই হোক, কারো সাথে কিংবা কোনো কিছুর সাথেই তার তুলনা করা যায় না। কালো, ধলা, ল্যাংড়া, কিংবা বিদেশি, বা অন্য কোন প্রানী সবার বেলাতেই ব্যাপারটা এমনই ঘটে। কিন্তু মজার ব্যাপার কিংবা কষ্টের ব্যাপার হল, এক সময় এই ভালোবাসায়অ ঘুন ধরে, যে কোনো কারনেই এর মিষ্টতা বা আবেগী মনটা স্তিমিত হয়ে আসতে পারে। তখন একটা নতুন জিনিষ শুরু হয়। আর তার নাম অবহেলা।

কাউকে অবহেলা করার সবচেয়ে উত্তম কৌশল হচ্ছে-ব্যস্ততা দেখানো। বাহ্যিকভাবে কেউ কতটা ব্যস্ত সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু কারো সাথে সম্পর্কের মধ্যে ঢীলা দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে-বহুবিধ কাজের বাহানায় ব্যস্ততা জড়িয়ে দেয়া। কিন্তু একটা সম্পর্কে ব্যস্ততার শব্দটার কোনো স্থান নাই আসলে। সত্যিকারের প্রিয় মানুষটার শত সহস্র ব্যস্ততার মাঝেও খোজ খবর নেয়া সম্ভব এবং নেয়ও। শুধু খোজ খবরই না, সে তোমাকে সময় দেবে। কি করছো, কখন কোথায় কি ভাবে তোমার সিডিউল যাচ্ছে, দুপুরে, সকালে, কিংবা খাওয়ার সময়ে তুমি খেয়েছো কিনা সব সময় না হলেও মাঝে মাঝেই সে খবরটা নিবে।

কেউ যদি বলে- কথা বলার সময় পাইনি, হতেই পারে। কিন্তু ‘আমি একটু ব্যস্ত আছি, সময় পেলে পরে কথা বলব। তুমি অন্যান্য কাজ সেরে ফেল’ কিংবা একটা ম্যাসেজ কিংবা পাচ সেকেন্ডের একটা ছোট কলও হতে পারে অনেক ব্যস্ততার মাঝে একটা যোগাযোগ। আর এই ছোট ম্যাসেজটা লিখতে রাস্তার ধারে বসে, একটা সিগারেট খাওয়ার সময়েও এই ছোট ম্যাসেজটা করা যায়। যখন এগুলির কোনোটাই হয়ে উঠে না, অথচ যদি কেউ বলেই থাকে যে, কথা বলার সুযোগ হয়নি, বা সময় পাইনি, তাহলে বুঝে নিও সে ঠিকই সময় পেয়েছিলো কিন্তু সে তোমার জন্য সময় নষ্ট করতে চায়নি, সে তোমাকে এভয়েড করেছে। তোমার মুল্য তার কাছে অনেক কমে গেছে। মানুষ কেবল সেটার জন্যই তার মুল্যবান সময় নষ্ট করে যেটা তার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট। তুমি হয়তো ইম্পর্টেন্সি হারিয়ে ফেলেছো। ভালোবাসাটা অনেক দূর চলে গেছে। একদিন সে আরো দূরে চলে যাবেই এবং কনো এক সময় সে তোমার কাছ থেকে হারিয়ে যাবেই। তুমি এই পরিস্থিতিটা বুঝো বা না বুঝো, যদি এটা এক তরফা আকড়ে থাকো, তাহলে আজিবন তুমি কষ্ট পাবে।

ব্যস্ততা কখনই ভালোবাসাকে থামাতে পারেনা। যে সত্যিই তোমাকে ভালবাসে, সে শত ব্যস্ততার মধ্যেও একবার হলেও মনে করবে। আর যদি সেই ভালোবাসাতা হয়ে থাকে নিছক কিছুর বিনিময়ে বা অন্য কোনো কারনে, সেখানে কখনোই ভালোবাসা ছিল না। ওটা ছিল অবহেলার ভালোবাসা।

সত্যিকারের ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যেটা না বলা কথাও অন্তরে যেনো পরিষ্কার অনর্গল কথা বলে যায়, ভালোবাসার মানুষটাকে কিভাবে ভালো রাখা যায়, কিভাবে তার মনকে প্রশান্ত করা যায়, তার ইচ্ছাগুলি, আবদার গুলি, আখাংকা গুলি নিজের সামর্থের মধ্যে লালন করা যায়। ভালোবাসায় ভাষার দরকার পড়ে না। এটা অনুভবের ব্যাপার। মন থেকে ভালোবাসলে মানুষটা ছাড়া একদমই থাকা যায় না। আর যারা দিনের পর দিন মানুষটা ছাড়া অনায়াসে থাকতে পারে, তারা কখনো ভালোবাসে না। I

ভালোবাসার মানুষকে মানুষ সব সময় মনে রাখে, মনে করে। এমন কি মৃত্যুর সময়ে বা আগে যে মানুষতারে মানুষ সবার অগোচরেই স্মরণ করতে চায় সেটা তার ভালোবাসার মানুষ। গভীর ঘুম থেকে ঘুম ভাঙ্গার পর যার কথা মনে পড়ে সেতা তার ভালবাসার মানুষ। এই ভালোবাসার মানুষটার কারনে সুখকে সুখী মনে হয়, তার কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে হয়। ভালোবাসার মানুষের শরীরের ঘামের গন্ধও মিষ্টি মনে হয়।

২৯/৯/২০২৫-দূর্গা পুজা

আমি যে কোনো অনুষ্ঠানে সাধারনত অনেক কারনেই যেতে ইচ্ছুক হই না। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে-অনুষ্ঠানের রিচ খাবার আমাকে আকর্ষন করে না এবং আমি সাধারনত সেই রিচ ফুডগুলি এভয়েড করি। কিন্তু যদি কোথাও যেতে চাই, আমি আগে থেকেই আমার খাবারের মেন্যুটা একটু সম্মানের সহিত তাদের জানিয়ে দেই যে, আমার জন্য একেবারে প্লেইন রাইস, ডাল এবং কিছু শব্জি হলে ভাল হয়। এখন অবশ্য প্রায় অনেকেই জানেন আমার খাবারের সাধারন মেন্যুটা, ফলে আর বলতে হয় না। কিন্তু আমার কিছু কিছু খুব কাছের মানুষ আছেন যারা দাওয়াত দিলে খাই বা না খাই আমি যাবোই এটা নিশ্চিত। গয়েসশর দাদা আমার সে রকমের একজন মানুষ।

আমি রাজনীতি করি না কিন্তু আমি গয়েসসর দাদার একজন কাছের মানুষ। উনি সর্বদা আমাকে কিছু কিছু উৎসবে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দেন। কখনো কখনো কার্ড পাঠিয়ে, আর বেশীরভাগ সময়ে টেলিফোনে। এবারের দূর্গা পুজাতেও উনি দাওয়াত দিয়েছেন এবং ঘোষকান্দায় তার নিজের বাড়িতে যাওয়ার সময়ে ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় আমি যেন অফিসের কাজ দ্রুত শেষ করে অনুষ্ঠানে যাই সেটাও নির্দেশনা দিইয়েছিলেন। খুবই ব্যস্ত ছিলাম মিটিং নিয়ে ফলে প্রায় দুপুর প্রায় একটা বেজে গিয়েছিলো ওনার বাসায় যেতে যেতে।

আমি যখন ওনার বাসায় গেলাম, উনি তখন প্রচুর লোককে নিয়ে মিটিং কিংবা আলাপে/গল্পে মত্ত ছিলেন, আমি যাওয়ার পরই দাদা আমাকে নিয়ে কোলাকুলি করে তার নিজস্ব কামরাতে এসে বসলেন। অনেক আলাপ হলো, চা সিগারেট খাওয়া হলো, ভালো লাগছিলো। চলে আসতে চাইলাম কারন ফ্যাক্টরীতে বায়ার চলে এসছিলো কিন্তু দাদার আমন্ত্রনে না খেয়ে আসা হলো না। খেতেই হলো।

দাদার সবচেয়ে আমার ভাল লাগার জিনিষটা হল-উনি নিজ হাতে আমাকে খাবার পরিবেশন করেন। সেই ছোটবেলা থেকেই উনি আমাকে চিনেন যখন আমার বয়স মাত্র ১০। আমার বড় ভাই (এখন তিনি আমেরিকায় বোষ্টনে প্রফেসর হিসাবে আছেন) ওনার খুব কাছের বন্ধু হওয়ায় ভাইয়ের সুবাদে আমার বড় ভাই, গয়েসশর দাদা, আলিমুল্লাহ কাকা, আলাউদ্দিন মাষ্টার ভাই, আনোয়ার ভাই (ঢাকা ইউনিভার্সিটি), রহমান ভাই, নসরুল হামিদ বিপুর আব্বা হামিদ ভাই এরা তখন একটা খুব শক্তিশালি বন্ধু সংঘটন ছিলেন আর আমি সেই ১০ বছরের ছোট একটা পিচ্চি এই ইয়াং বন্ধু মহলের মধ্যে জড়িত ছিলাম কোনো কারন ছাড়াই। ওনাদের সাথে ঘুরতাম (আমার ভাই আমাকে নিয়ে নিয়ে ঘুরতেন তাই আমিও তাদের সাথে থাকতাম)। আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার অনুপ্রেরনার পিছনে এইসব শক্তিশালি ব্যক্তিরাও অনেক অনুপ্রেরনা জুগিয়েছিলেন।

গত ২৯/৯/২০২৫ তারিখে দাদার বাসায় দূর্গা পুজা উপলক্ষ্যে দাদার সাথে কিছুক্ষন সময় কাটানর কিছু মুহুর্ত।

ধন্যবাদ দাদা।

২৫/৯/২০২৫-মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাডেমি

এই শাখাটা আমরা চালাচ্ছি। মুলত আমি, কর্নেল মাহমুদ এর প্রধান উদ্যোক্তা। মাহমুদের মিসেস নুরজাহান ভাবী এর প্রিন্সিপ্যাল। যথেষ্ঠ কোয়ালিটি পুর্ন শিক্ষার মান এখানে দেয়া হয় বলে গার্জিয়ানরা প্রায়ই এই শাখাটাকে সাধীন ক্যাম্পাস হিসাবে দেখতে চান এবং মনে করেন এটাকে আবাসিক করা গেলে প্রচুর ছাত্র ছাত্রী এখানে ভর্তি হবে। কিন্তু আমি এখনো সাধীন ক্যাম্পাস করার জন্য কন পদক্ষেপ নেইনি। তবে অদূর ভবিষ্যতে এটা যে একতা হবে তাতে কন সন্দেহ নাই ইনশাল্লাহ।

মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাডেমি মুলত একটা ফ্রান্সাইজিং শাখা। কিন্তু এর অন্তরালে আমাদের নিজস্ব একটা স্কুল চালু আছে যার নাম Bangladesh International School of Excellency (BISE). কন্সেপ্টটা হচ্ছে, যারা ক্যাডেট কলেজে চান্স পাবে না, তারা আমাদের স্কুলেই পরবর্তী স্কুলিং চলমান রাখা। যাত্র ছাত্রদের কোনো সময় ক্ষেপন না হয়। স্কুল অফ প্যারাডাইস হচ্ছে আমাদের অরিজিনাল স্কুলের একটা সেক্টরাল শাখা। এ রকমের আরো সেক্টোরাল শকাহা রয়েছে এর মধ্যে।

অনেকদিন যাওয়া হচ্ছিল না মোহাম্মাদপুর শহীদ ক্যাডেট একাদেমিতে। প্রায় ৮/৯ মাস পর আজকে গেলাম। প্রিন্সিপ্যাল তার শিক্ষক বৃন্দকে নিয়ে স্কুলের মান এমন পর্যায়ের নিয়ে গেছেন, দেখে মনটাই ভরে গেলো। ছাত্ররা, অভিভাবকগন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট লোকাল যারাই আছেন সবাই খুব খুশি।

অনেক ধন্যবাদ মাননীয় প্রিন্সিপ্যাল এবং শিক্ষকবৃন্দ। আমার দোয়া এবং আশীর্বাদ রইলো।

৮/৯/২০২৫-জন্মদিন

পছন্দ আর ভালভাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। পছন্দ হলো রেডিমেড একটা ফুল গাছ থেকে একটা ফুল ছিড়ে নেয়ার মতো, আর ভালবাসা হচ্ছে সেই ফুলগাছটায় আপনি প্রতিদিন পানি দিয়ে তাকে সতেজ রাখার মতোন। পছন্দ জিনিষটা যখন প্রতিদিন চর্চা হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে সেই পছন্দ একদিন ভালোবাসায় রুপান্তর হয়। যখন ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে আরো গার হয়, তখন জন্ম নেয় মায়া। মায়া একটা মারাত্তক জিনিষ। একবার কেউ মায়ায় জড়িয়ে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া মানুষগুলি কখনোই কারো জীবন থেকে হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যেতে দেয়া হয় না।

যাইই হোক, কথাগুলি বললাম এ কারনে যে, বহুবছর আমার নাড়ির টানের বন্ধনের এলাকা, এই বাক্তার চর, নিয়মিতভাবে আসা হয়নি। কাজের জন্যই হোক আর ব্যস্ততার জন্যই হোক, আসা হয়ে উঠেনি। কিন্তু একটা টান অবশ্যই ছিল। ইদানিং এলাকার কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসাবে আমি ঘন ঘনই এলাকায় আসছি। গ্রাম এবং এলাকার প্রতি আমার মায়া সেই জন্মলগ্ন থেকেই সুপ্তিত ছিলো কিন্তু উদগীরিত হয়নি বা প্রকাশ পায়নি। যার কারনে অনেককেই এখন আর আমি ভালোভাবে চিন্তেও পারিনা। পুরানো জেনারেশনের মানুষগুলিকে যেমন বর্তমান চেহাড়া থেকে চেনার উপায় নাই আবার নতুন জেনারেশনের ইয়াং ছেলেমেয়েদেরকেও আমার ভালোভাবে জানা বা চেনা হয়নি। ওরা হয়তো আমাকে নামে চিনে কিন্তু ওদেরকে আমার ভালোভাবে বা ন্যুনতম্ভাবেও চেনা হয়ে উঠেনি। কিন্তু পুরানো সেই মায়া থেকে আমি ওদের উপরেও যেন কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছি দ্রুত। ওরাও যে আমাকে আমার থেকে দ্রুত কঠিন ভালবাসায় জড়িয়ে ফেলতেছে সেটা আমার ইন্দ্রিয় আমার বুঝবার চেয়েও দ্রুত উপলব্ধি করছে।

কদিন আগে কলেজে এক মিটিং এ হটাত মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল আমার জন্ম দিনের তারিখটা। তখন প্রায় সন্ধ্যা। কলেজের প্রিন্সিপ্যালের রুমে গুটিকতক জেন জি ইয়াং স্টারদের নিয়ে মিটিং করছিলাম। শেষ হতে না হতেই দেখি কোথা থেকে একটা কেক, কেক কাটার ছুড়ি এবং মোমবাতিসমেত হাজির। সব কিছু বুঝবার আগেই জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা ঘটা হয়ে গেল। বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া হলেও অন্তরে খেলছিল এক ভালোবাসার বসন্ত প্রবাহ। অনেক আনন্দিত হয়েছি।

ধন্যবাদ ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম, সানাউল্লাহ, কাইয়ুম, শাহীনুর, মুজিবুর কাকা, অধ্যক্ষ মহোদয় এবং অন্য সব আদরের ছেলেরা। অনেক দোয়া রইলো তোমাদের প্রতি এবং অবশ্যই তোমরা আমাকে অনেক খুশী করেছো। আমি আমার আন্তরীক ভালবাসা জানাই তোমাদের সবাইকে।ো

২৬/০৮/২০২৫-জীবনকে বদলে দেয়ার মতো ইন্সপিরেশনাল গল্প

জীবনকে বদলে দেয়ার মতো ইন্সপিরেশনাল গল্প হাজার মানুষের কাছ থেকে হাজার রকমের গল্প হয়তো আপনি শুনবেন। কিন্তু আপনি কিভাবে আপনার জীবন বদলে দেবেন, সেই গল্পটা জরুরী। অন্যের ইন্সপিরেশনাল গল্প থেকে আপনি হয়তো মোটিভেশনাল সাহস নিতে পারেন, কিংবা প্রতিজ্ঞা করতে পারেন, কিন্তু যখন আপনি আপনার জীবনটাকে বদলাতে যাবেন, সেই কারো গল্পের সাথেই হয়তো আপনার গল্পটা মিলবে না। তবুও আপনার গল্পটাও কারো গল্পের থেকেও কম ইউনিক না। সবসময় একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, রাজাও একদিন প্রজা ছিলো, আবার সেই রাজাও কোনো একদিন আবার সেই পুরান দিনের প্রজার মতোই প্রজা হয়ে যান। তবে সেখানে একটা শুধু পার্থক্য থাকতে পারে যে, রাজা হবার আগে সেই রাজা প্রজা অবস্থায় হয়তো কারো কাছে হাত পাতলেও রাজা থেকে প্রজা হয়ে সাধারনত সে আর কারো কাছে হাত পাততে চায় না। ভিক্ষা তো করেই না। হয়তো না খেয়ে মরে যাবে কিন্তু অতটা নীচে সে নামে না। যেমন মানতে পারে না ঈগল পাখি। সে সারাদিন না খেয়ে থাকবে হয়ত কিন্তু পচা মৃতপ্রানির মাংশ সে খায় না। এটাকে হয়তো অনেকে ইগোতে নিয়ে যাবেন, এটা ইগো নয় আসলে এটা সম্ভবত আত্তসম্মানবোধ বা শক্ত মেন্টালিটির সাথে তার ব্যক্তিগত পার্সোনালিটির বহির্প্রকাশ। তাই জীবনকে পার্সোনালিটিতে রুপান্তরিত করুন, সময়কে সবচেয়ে বেশি মুল্যায়ন করুন, সুযোগকে সঠিক মত কাজে লাগান, সম্ভবত জীবন দ্রুত বদলে যাবে। পার্সনালিটিতে সবচেয়ে বড় নির্দেশনা হচ্ছে- মেপে কথা বলার সাথে মেপে চলা। শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা। সব সময় সব কিছুর উত্তর দেয়া জরুরী নয়, অনেক সময় শুধু শোনাই হচ্ছে সবচেয়ে একতা বড় শক্তি। মিনিমালিজমে অভ্যস্থ হয়ে কথা কম বলুন, কম ব্যাখ্যা দিন, কম অজুহাত দিন, অপ্রয়োজনীয় শব্দ, ব্যস্ততা্‌ এড়িয়ে যান। অযথা অধিক আগ্রহে মানুষের গুরুত্ত কমে যেতে পারে। আর কখনো যদি বুঝেন-আপ্নার গুরুত্ত কমে গেছে বা যাচ্ছে-সাহস করে সেখান থেকে সরে পড়ুন। নতুন করে দিগন্ত প্রসারিত করুন। নতুন করে আবারো সীমানা নির্ধারন করুন। নতুন সম্পর্কের মধ্যেও সীমানা নির্ধারন করে মেপে ধীরে ধীরে আগাবেন। ঈগল পাখী থেকে আমাদের নতুন করে অনেক কিছু শেখার আছে। এতো উচুতে উঠেও ঈগল তার মানসিক চাপকে সাভাবিক রাখে। প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যেও সে মনোবল না হারিয়ে বরং ঝড়ের শক্তিকে সে নিজের অনুকুলে নিয়ে আরো দ্রুত গতিতে ভেসে চলে। জীবনটাকে বদলাতে সবচেয়ে বড় দরকার-সংকল্প। পরিকল্পনা করার আগেও একটা প্রি-পরিকল্পনার দরকার হয়। যদি একা চলতে ভয় পান, তাহলে নিশ্চিত থাকুন যে, আপনি অর্ধেক হেরে বসে আছেন। কেউ আপনাকে জিতিয়ে দিতে এগিয়ে আসবে না কখনো। তাই, একা চলবার মানসিকতায় ভরষা করুন। যদি প্রচেষ্টার বনাম পারফেক্ট চাই, তাহলে লাগাতার না থেমে সমস্যার মোকাবেলা করুন। সমস্যার সামনে হাটু গেড়ে আত্তসম্পর্পন না করে সেগুলিকে ভিত্তি করে সমাধানের পথ খুজে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যান।

ছোট ছোট সাফল্যের দিকে হাটুন, প্রতিদিন সাফল্যের দিকে নজর রাখুন। হয়তো অনেকদিন কোনো ভালো খবর পাবেন না, মনে হবে থেমে গেছেন, মনে হবে কিছুই হচ্ছে না, তবুও হাল ছাড়বেন না। লেগে থাকুন। জট খুলবেই। আর একবার যখন জট খুলে যায়, পরপর সব জট খুলতে থাকে। বারবার ওপিনিয়ন পালটাবেন না। তাতে স্ট্যাবিলিটি থাকে না। একই সাথে কয়েকটা সেক্টরে মনোযোগী হবার দরকার নাই, তাতে কোনোটাই সাফল্যমন্ডিত হয় না। আগে একটাকে সফল করুন, হোক সেটা নিতান্তই কোনো ছোট ব্যবসা বা কর্ম। সব সময় সেভিংস মুডে থাকুন, আপনি লক্ষ্যে পৌছবেনই। যতটুকুতে আপ্নার চলা সম্ভব, ততটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুন। অযথা খরচ বাড়িয়ে অসমতা আনবেন না। প্রতিদিন লেগে থাকুন, লস বা লাভ যাইই হোক। কেনো লস হবে আর কেনো লাভ হচ্ছে, এর মধ্যে অবস্থার বিশ্লেষণ করুন।

আপনার উন্নতি হবেই। আর যখন একবার উন্নতি হওয়া শুরু করে, ছাড়বেন না, লেগে থাকুন আরো কঠিনভাবে। আপনার গল্প পরিবর্তন হওয়া শুরু করবেই। অতঃপর একদিন, গল্পটা আপনার শুধু।

২৪/০৮/২০২৫-ডিপ্রেশন ছাড়া কেউ নাই

অতীব সুখী মানুষও কখনো কখনো ডিপ্রেশনে ভোগে। ডিপ্রেশন ছাড়া কোনো মানুষ নেই। কেউ না কেউ কোনো না কোনো ধরনের ডিপ্রেশনে কোনো না কোনো সময় ভোগেই। কিন্তু কেনো এই ডিপ্রেশন?

পছন্দ আর ভালভাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। পছন্দ হলো রেডিমেড একটা ফুল গাছ থেকে একটা ফুল ছিড়ে নেয়ার মতো, আর ভালবাসা হচ্ছে সেই ফুলগাছটায় আপনি প্রতিদিন পানি দিয়ে তাকে সতেজ রাখার মতোন।

মানুষকে চেনা আর জানার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে. মানুষ চেনার সহজ উপায় হচ্ছে- তার মুল্যটা বুঝা। মানে পয়েন্ট অফ ইন্টারেস্ট বের করা।

কোনো কোনো ঘটনা মাঝে মাঝে মানুষ মনে করে-জীবনটা বুঝি বরবাদ হয়ে গেলো, জীবনটা মনে হয় তছনছ হয়ে গেলো। কিন্তু মানুষ কখনোই এটা ভাবে না যে, সামনের দিনগুলি হয়তো আরো কঠিন থাকতে পারে। ফলে কেউ কেউ আজকের দিনগুলিকে ইনভেষ্ট করে এমনভাবে যেনো সামনের দিনগুলিকে মোকাবেলা করতে পারে। যদি সত্যিই কঠিন হয়, তাহলে তো মোকাবেলা করলোই, আর যদি কঠিন সময় না আসে, লাইফ আরো সুন্দর, আরো বিচিত্রময়।

কেউ কখনোই মানুষকে এটা বলতে চায় না, “চিন্তা করো না, আমি আছি তো!!”। একটা মানুষের জীবনে গোপনে হোক, প্রকাশ্যে হোক, ” আমি আছি তো” এমন একটা বন্ধু যে কত জরুরী। এই জরুরী বন্ধুটার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে তখন যখন মানুষের আর কিছুই থাকে না। রুপ, যৌবন, কাম, ভালোবাসা, কিংবা লুকুচুরির ভালোবাসা আর তখন কিছুই এসেট বলে মনে হয় না। অথচ তখনই ওই মানুষটার প্রয়োজন।

স্বামী বা সন্তান, স্ত্রী বা মেয়ে/ছেলেই যে আজীবন পাশে থাকবে এতার কোনো গ্যারান্টি নাই। থাকেও না। এমন কেউ হয়তো হতে পারে, যার কাছে আমরা কখনো দায়বদ্ধ নই আবার দায় বদ্ধও বটে।

২২/০৮/২০২৫-ধনী কিংবা গরীব, কোনো মেয়ের একবার যদি বিয়ে

ধনী কিংবা গরীব, কোনো মেয়ের একবার যদি বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে সমাজ তার কাছ থেকে বাচ্চা হবার একটা সুখবর পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে যায়। স্বামী কিংবা স্ত্রী তাদের এই সময়ে সন্তান চাই বা না চাই সেটা যেনো কোনো মুখ্য ব্যাপার নয়। আর যাদের সন্তান হয় না তাদের কষ্টটা শুধু তারাই বুঝেন যাদের এই কষ্টটা হয়েছে। বিধাতারও এই রীতিটা এমনভাবে তিনি জাল পেতে রেখেছেন যে, মানব-মানবী না চাইলেও অনাগত মানব সন্তান (অন্য প্রানির বেলাতে আমি কিছু বলছি না) এই পৃথিবীতে আসবেই। তা না হলে জীবন চক্রটাই হয়তো একদিন থেমে যাবে। বিধাতা সেই চক্রকে কখনো থামাতে দেবেন না, এতাই তার রুলস।

কিন্তু এই সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয়, পিতা মাতা তাদের সমস্ত আদর, কলিজার সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রানপন চেষতা চালিয়ে যান যেনো তার সন্তান থাকে হেফাজতে, দুধে ভাতে এববগ গড়ে উঠে সমাজে একজন সেই মানুষ হিসাবে যা দেখে অন্যরা পুলকিত হয়, সমাজ আলকিত হত হয় আর ধরনী হয় বিকশিত। কিন্তু বাস্তবে সেটা সব সময় পরিলিক্ষিত হয় না।

এমনই একটা জীবন নিয়ে চলে গেছে জলীল মামা, এই কয়েকদিনের মধ্যে হয়তো চলে যাবেন তার স্ত্রী তাহেরা বেগমও। ১৮ জন সন্তানের বাবা মা তারা। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশী সন্তানরা থাকেন দেশের বাইরে, জিবিকার প্রয়োজনে। তাদের সেই জীবিকার প্রয়োজন কতটা মিটছে সেটা তারাই ভাল বলতে পারবেন কিন্তু যখ তাদের বৃদ্ধ বাবা মায়ের দেখভালের ব্যাপারটা সামনে আসে, তখন যে চিত্র ফুটে উঠে তাতে এটাই মনে হয় যে, তারা অন্যকে সাহাজ্য করবে কি তো দূরের কথা, তাদেরই এখন আরো বেশি সাহাজ্য লাগবে। তারা কোনোভাবেই তাদের বাবা মাকে সাহাজ্য করতে পারেন না। ফলে এই বৃদ্ধ বয়সে এসে জলীল মামা বা মামী কখনো অর্ধহারে, কখনো অনাহারেই দিন গুলি পার করেছেন। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে খাবারের কারনে ভাগাভাগি হয়েছে জীবন সন্তানদের কাছে। আজ ওর বাড়িতে বাবা, মার খাবার হয়তো অন্য ছেলের ঘরে। যখন অসুস্থ্য হয়, তখন জীবন হয়ে উঠে আরো দূর্বিসহ। কে কাকে কখন কোথায় নিয়ে যাবে, তার কনো ধরাবাধা নিয়ম নাই। মার চিকিৎসায় বেশী টাকা লাগবে বলে বাবার সমান চিকিতসার খরচে যতটুকু রোগ সারে সেতাই যেনো বাস্তবতা।

যদি এটাই হয়, তাহলে এতো আদর করে, এতো চাহিদার আক্ষেপে কেন সন্তান নেওয়া? এই সন্তানদের জন্য নিজেদের যৌবন নষ্ট করেছেন, এই সন্তানদেরকে সাবলম্বি করার জন্য নিজেদের সবটুকু চাহিদা বিসর্জন দিয়েছেন, অথচ আজ সেই সন্তানরা তাদের জন্য কিছুই করার দরকার মনে করে না? অসময়েই তারা চলে যায় এই দুনিয়া থেকে।

জীবন খুব ছোট। এটার দ্বিতীয়বার পাওয়ার আর কোনো প্রকারের সুযোগ নাই। এই ছোট একটা জীবনে মানুষ বেশিরভাগ আনন্দ, ইচ্ছাপুরন ছারাই বিদায় নেয়। একদিন নিশ্চয়ই আমি আনিন্দ করবো, একদিন নিশ্চয়ই আমি জীবন উপভোগ করবো, এই আশায় প্রতিদিন মানুষ বেচেছিলো বটে কিন্তু কখনই তার সেই কাংখিত আশা পুরন হয়নি। কিছু পুরন হয়নি টাকা পয়সার অভাবে, কিছু পুরন হয়নি সঠিক মানুষের অভাবে, কিছু পুরন হয়নি সঠিক পরিস্থিতির অভাবে। যার টাকা ছিল, তার সঠিক মানুষ হয়তো ছিলো না, যার সথিক মানুষ ছিল, তার হয়তো পরিস্থিতি অনুকুলে ছিলো না। এভাবেই সময়তা পার হয়ে গেছে।

২১/০৮/২০২৫-ভুল পথে গিয়ে

ভুল পথে গিয়ে ফিরে আসারও একটা সময় থাকে। সেই সময়টাকে যদি কেউ গুরুত্ব না দেয়, আর তাতে কেউ যদি ভুল পথ থেকে ফিরেও না আসে, তাহলে পরিনতি ভয়াবহ খারাপ হয়। একটা ভুল পথে যাওয়া মানুষকে সমাজ, পরিবার কিংবা দেশ ভুল পথ থেকে ফিরে আসার কারনে অভিনন্দন জানিয়ে গ্রহন করলেও তাকে সর্বদা একটা নির্দিষ্ট সময়কাল অবধি আড়চোখে রাখতেই পারে। কেননা খুব সহজেই মানুষ আবারো সেই ভুল পথে ধাবিত হতেই পারে ভেবে মানুষ ভয় পায়।

২০/৮/২০২৫-ক্যাডেট ৭৯২ আমজাদ মারা গেলো

সেই ১৯৭৭ সালের কথা। আমরা ১৯ শে জুন কতিপয় নাবালক কিছু বালক (৫৫ জন) মোমেমশাহি পরবর্তীতে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পদার্পণ করেছিলাম। এই ৫৫ জন বন্ধুরা হয়ে উঠেছিলাম যেনো একেকটা একেকজনের জন্য নিবেদিত প্রান। সময়ের স্রোতে আমরা প্রায় ৬ বছর একসাথে থাকার পর ১৯৮৩ সালে ক্যাডেট কলেজের শিক্ষাক্রম শেষ করে বৃহত্তর জীবনে বেরিয়ে গিয়েছিলাম দেশের আনাচে কানাচে। কেউ সামরীক বাহিনী তে কেউ মেডিক্যাল, কেউ বুয়েট, কেউ নেভী, কেউ বা ইউনিভার্সিটিতে। কখনো কখনো কারো সাথে দেখা হয়েছে আবার কখনো কখন দলবদ্ধভাবে আমরা নির্দিষ্ট দিনকাল ঠিক করে একত্রে আড্ডা দিয়েছি। আমাদের ব্যাচের প্রথম ক্যাডেট ছিলো আমজাদ। যথারীতি আমরা গুটিকতক ক্যাডেট মুটামুটি সব সাবজেক্টেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সেই মোতাবেক আমজাদ চান্স পেয়েছিলো মেডিক্যালে। আমিও পেয়েছিলাম কিন্তু পড়তে ইচ্ছে করে নাই বিধায় আর মেডিক্যাল পড়া হয় নাই। আমাদের ব্যাচ থেকে আমজাদ হোসেন (৭৯২, জাহিদ হোসেন (৭৯৩), বাহাদুর আলী (৭৯৪), আফজাল হোসে (৮১৪), হাসান আশরাফ মামুন (৮৩৬), মামুন (৮৩৮), সাইফুল ইসলাম (৮৩৯), মনজুর মাহমুদ (৮৪৪) এরা মেডিক্যালে পরাশুনা করা শুরু করে।  আর বাকীরা বিভিন্ন ক্যাটেগরীতে বিভক্ত হয়ে যার যার ক্যারিয়ার তৈরী করে।

আজ আমাদের সেই প্রথম ক্যাডেট আমজাদ হোসেন ইন্তেকাল করলো।

আমজাদের সাথে আমার সেই ১৯৮৩ সালের পরে আর কখনো দেখা হয় নাই। ওর মৃত্যুর খবর যখন আমাদের হোয়াটসআপ গ্রুপে এলো, তখনই আমি আমজাদের লেটেষ্ট ছবিটা দেখলাম। অদ্ভুত পরিবর্তন আমজাদের। দেখেই ওকে রোগা মনে হচ্ছিলো। তাহলে আমজাদ কি ওর জীবনে সুখী ছিলো না? কিংবা আমজাদ কি কোন কারনে অসুখী ছিলো?

আমজাদ বরাবরই খুব চাপা স্বভাবের ছিলো। কলেজেও খুব একটা কথাবার্তা বলতো না। খুব বেশী একটা এম্বিশনওয়ালা মানুষ ছিলো না আমজাদ। শুনেছি ওর দুটু সন্তান আছে। একজন মেয়ে আর আরেকজন ছেলে। আমি আজই প্রথম জানতে পারলাম আমজাদের ছেলে একজন ইঞ্জিনিয়ার আএ মেয়েও টেকশটাইল ইঞ্জিনিয়ার। ওর মেয়ের নাম কনা আর ছেলের নামটা আমি এখনো জানি না। আমজাদ নাকি কদিন যাবত বুকে ব্যথা নিয়ে ছিলো। নিজে ডাক্তার, তাই আজই সে হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি হয়েছিলো বুকে ব্যথা নিয়ে কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

আমাদের ব্যাচের মোট ৫৫ জন ছাত্রের মধ্যে আমজাদকে সহ ইতিমধ্যে মোট ৫ জন ক্যাডেট বন্ধু এই দুনিয়া ত্যাগ করেছে। আর এরা হলো

আমজাদ, আফজাল, লুতফর, সাহেল এবং শাহিন।

সর্ব প্রথম ইন্তেকাল করে শাহি, আমেরিকায়, তারপর ইন্তেকাল করে আফজাল, অতঃপর ইন্তেকাল করে সাহেল, লুতফর মারা যায় বিডিআর কিলিং এ, আর এখন মারা গেল আমজাদ। এভাবেই আমরা একে একে এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলে যাব। আর ফিরে আসা হবে না।

৭/৮/২০২৫-ফরিদ ভাই মারা গেলেন

আমেরিকায় বেরাতে গিয়ে ভার্জিনিয়ায় ফরিদ ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম আর সেই কাহিনীর কিছু অংশ ৪/৭/২০২৫ তারিখে আমার ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করেছিলাম। সেই ফরিদ ভাই গতকাল বাংলাদেশ টাইম সন্ধ্যা ৫ টায় আর আমেরিকার টাইম ভোর ৪ টায় মারা গেছেন (ইন্না নিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহির রাজেউন)। বাংলাদেশে তিনি আমার প্রতিবেশী ছিলেন। এটাই মানুষের জীবন। সবার চেয়ে সত্য যে, মানুষ একদিন এই পৃথিবী ছাড়বেই। সে যেইই হোক, যত ক্ষমতশীলই হোক আর যত প্রতিপত্তী থাকুক তার, কোনো কিছুর বিনিময়েও সে এই দুনিয়ায় থাকতে পারবে না। নির্ধারীত সময়ে তাকে চলে যেতেই হবে।

মানুষ কত অসহায়। ভূমিষ্ঠ হবার পর যেমন মানুষ অসহায় থাকে, কোনো কিছুই করার তার ক্ষমতা থাকে না। গরু ছাগলের বাচ্চারা তবু ভূমিষ্ঠ হবার পর পরই নিজের পায়ে দারাতে পারে, মায়ের দুধের বোটা গুলি কই খুজে বের করতে পারে, কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকলে একাই দৌড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে পারে কিন্তু মানুষের সন্তান কন কিছুই বুঝে না, করতে পারে না। সে এতোতাই অসহায়। সেই মানুষগুলিই আবার সময়ের স্রোত পার করে করে শিশু থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যুবক এবং অতঃপর ক্ষমতাধর মানুষে পরিনত হয়। অথচ আবারো সময়ের স্রোত ধরেই সে একদিন এমন একটা সময়ে এসে হাজির হয় যে, তখনো সে একেবারেই অসহায় বনে যায়। কাইট্টা লামু, মাইরা লামু, দেইখ্যা লমু কিংবা কাউকে ঠকিয়ে বিশাল প্রতিপত্তওয়ালা হলেও সেই অসহায় সময়টায় মানুষ একেবারে একা। কোনো সম্পদ, কোনো পতিপত্তি কিছুই আর কাজে লাগে না। মানুষ অবশেষে সব ছেড়ে চলেই যায়। এটার থেকে এতো কষ্টের কাহিনী আর কিছুই নাই।

ফরিদ ভাইয়ের পরিবারটা অনেক ভালো মানুষ ছিলো। আমার সবচেয়ে কাছে প্রতিবেশি ওনারা। ফরিদ ভাই, মিজানুর রাহমান ভাই, ভাবীরা, তাদের বাচ্চারা অত্যন্ত ভাল একটা পরিবার। ফরিদ ভাই সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন।

কখন আমরাও চলে যাই তার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। আল্লাহ ফরিদ ভাইকে জান্নাতবাসী করুন।

৬/৮/২০২৫-গুছিয়ে আসছে প্রায়

প্রায় ২ বছর আগ থেকে আমি প্রিপারেশন নিচ্ছি, গুছাচ্ছি। আমার এই বয়সের অনেকেই, এমন কি আমার থেকেও অনেক কম বয়সী মানুষেরা, বন্ধু বান্ধবেরা কিংবা চেনা পরিচিত লোকেরা এই দুনিয়ার মায়া চিরতরে ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন। তাদের কতটুকু প্রিপারেশন ছিলো আমার জানা নাই, তবে যেটা মনে হয় সেটা হলো তারা হয়তো বেশীরভাগ মানুষেরাই সুস্থ্য পরিকল্পনামাফিক কোনো গুছানোর কাজগুলি করে যেতে পারেন নাই। আমি গুছানো বলতে যেটা বুঝাচ্ছি সেটা হল-

(ক)      আমি চলে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম আমার সাথে জড়িত মানুষগুলি, যেমন আমার পরিবার, পরিবারের সদস্যগুলির জন্য আমি কি সেইসব কাজগুলি করে গেলাম কিনা যাতে ওরা আমার অনুপস্থিতিতেও কারো কাছে হাত না পাতে, অসহায় ফিল না করে, মানুষের কাছে অসম্মান না হয়? বা এমন কোনো লায়াবিলিটিজ কি রেখে গেলাম যাতে ওরা আমার কারনে সমাজে হেয় হয় কিংবা আমার বোঝা তাদের উপর পড়ে? আমি এগুলি নিয়েই সর্বপ্রথম প্রিপারেশ নিয়েছি। আমি প্রিপারেশন নিয়েছি যাতে আমার কারনে কিংবা আমার ব্যবসার কারনে কিংবা ওদেরকে সাবলম্বি করতে গিয়ে ওদের উপর কোনো প্রকার বোঝা না দিয়ে যাই বা বোঝা না পড়ে, ওরা যেনো একদিকে সাবলম্বি হয়, আবার অন্যদিকে ওরা যেনো আমার অনুপস্থিতিতেও ঠিক থাকে ঠিক সে রকম যে রকম আমি ওদেরকে আমার জিবদ্দশায় রেখেছিলাম। ইতিমধ্যে আমি সব কিছু হিসাব করে দেখেছি যে, ব্যাপারটা আমি প্রায় ইনশাল্লাহ গুছিয়ে ফেলেছি।

কিভাবে গুছিয়ে ফেলেছি বা ফেলছি সেটা হল-

(ক)      উম্মিকার শশুড় বাড়ির তাদের নিজেদের সবগুলি লোন ক্লিয়ার করে দিয়ে মাছের ব্যবসাটায় একটা বড় ধরনের মুলধন জোগান দেয়া হয়েছে, যা দিয়ে উম্মিকার শশুড় বাড়ির মানুষেরা ভালোভাবে চলতে পারবে। তাছাড়া ওদের বাড়িটারও কিছু কাজ করে দেয়া হয়েছে যতটুকু ওদের দরকার। এতে উম্মিকার শশুড় বাড়ির সবাই নিরাপদ একতা সোর্স অফ ইনকামের মধ্যে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

(খ)       আবিরের জন্য আর উম্মুকার জন্য দুটু হাসপাতালের শেয়ার নেয়া হয়েছে। লাল্মাটিয়া শিশু হাসপাতাল এবং শ্যামলিতে বেবী কেয়ার ইউনিট। আপাতত জবের পাশাপাশি ওরা এই দুটি হাস্পাতাল নিয়ে ভালই চালাচ্ছে। সাভার ডিওএইচএস এ ২টি ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে দুই মেয়ের নামে। যদি কোন কারনে ওদের এক্সট্রা টাকা পয়সাও লাগে, নিজেদের বাড়ি (গোলারটেকের) বাইরে ওই ২টি ফ্ল্যাট ইচ্ছে করলে বিক্রি করে লিকুইড মানি করতে পারবে। এ রকম আরো আছে যেমন ফ্যাক্টরী শেয়ার, এম্ব্রয়েডারীর আলাদা ব্যবসা, মা লিমিটেডের ভাড়া, চান্দের চরের জমি, মোহাম্মাদপুরের শহীদ ক্যাডেট একাডেমি ইত্যাদি সবই এসেট হিসাবে থাকলো। আমার মেয়েদের এবং স্ত্রী কোনো অসুবিধা হবার কথা নয় ইনশাল্লাহ।

(গ)       কনিকার ব্যাপারে আমি যেটা করেছি সেতা হলো ওকে আমেরিকায় ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করিয়েছি। ইতিমধ্যে কনিকা একটা জব করছেভ আমেরিকায়। বেতন ভালই পায়। এখন সমস্যা হচ্ছে-কনিকা আমেরিকায় পার্মানেন্টলী থাকতে পারবে কিনা। এটা একটা আন্সার্টেন বিশয় কিন্তু সে যদি জব বেজড ভিসা পেয়ে যায় তাহলে থাকা নিয়ে কোনো ঝামেলা নাই। আর যদি জব বেজড ভিসা না পায় তাহলে কনিকাকে বিয়ে করে থাকতে হতে পারে। জব বেজড ভিসার জন্য আমি ছোট ভাইকে সররপ্রকার ডলার জোগান দিয়েছি যাতে ছোট ভাই তার দোকানের মারফত কনিকাকে জব বেজড ভিসার ব্যবস্থা করতে পারে। ব্যাপারটা প্রক্রিধীন আছে। জানিনা ট্রাম প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কোথায় কোন পলিসি কিভাবে বাস্তবায়ন করে। দ্বিতীয় বিকল্প বিষয়টা হচ্ছে-কনিকা একটা ছেলেকে পছন্দ করে। আমেরিকান কিন্তু ক্রিষ্ঠান। নাম ব্রেডি স্মিথ। ছেলেটার সাথে, ওর মা রবার্থার সাথে আমেরিকায় যাওয়ার পর কয়েকবার একসাথে কথা হয়েছে, খাবারও খেয়েছি। খারাপ লাগেনি। যতগুলি শর্ত দিয়েছি, সব গুলি শর্তই ওরা মেনে নিয়েছে। মুসলমান হতে হবে এটাও মেনে নিয়েছে (আলহামদুলিল্লাহ)। যদি ব্রেডির সাথে কনিকার বিয়ে হয়, তাহলে কনিকা আমেরিকায় থেকে যেতে পারবে ইনশাল্লাহ। সেক্ষেত্রে কনিকার জন্য আমার একতা কাজ থাকবে, তা হলো-কিনিকার বাড়ি কেনার জন্য একটা এমাউন্ট ডলার দেয়া। এর মধ্যে কনিকার কাছে আমার ৪০ হাজার ডলার দেয়া আছে, আমি আরো ৬০ হাজার ডলার দিতে চাই কনিকাকে। যদি সেতা হয়ে যায় ইনশাল্লাহ, তাহলে কনিকার ব্যাপারটাও আমার আর চিন্তা করার কোনো দরকার পড়বে না। আমার কাছে ওই পরিমান টাকা এখনই আছে যা আমি কনিকাকে দিতে পারি। যেহেতু কনিকার বিয়ে হয় নাই, তাই বিয়ের খরচ এবং কনিকার জন্য বরাদ্ধ টাকা আমি কনিকার বিয়ের পরেই দিতে চাই ইনশাল্লাহ।

মিটুলের জন্য আমার অতিরিক্ত কিছু করার দরকার নাই আপাতত। মিটুলের নিজের কাছে বেশ কিছু টাকা জমানো আছে, তাছাড়া ওর পেনসনের পর বিশাল একটা টাকা সে পাবে। বাড়ি আছে, ভাড়া পাবে, মিটুল ইনশাল্লাহ ভালোভাবেই চলতে পারবে, কোনো অসুবিধা হবে না।

আমার কোথাও কোনো ঋণ নাই, কোথাও কোনো লায়াবিলিটিজ নাই। বরং আমার কাছে অনেকেই ঋণী হয়ে আছে। যদি তারা সেসব ঋণ আমার পরিবারের কাছে পরিশোধ করে, সেটা উত্তম। আর যদি না করে, আমি দাবী ছাড়ছি না, এটা তাদেরকে পরকালে সুদে আসলে আমাকে পে করতে হবে।

(খ)       দ্বিতীয় প্রিপারেশনটা হচ্ছে, আমার ম্রিত্যুর পর আমি জানি হয়তো কিছুদিন কিছু সংখ্যক মানুষ, আত্মীয়স্বজন কিংবা খুবই কাছে কেউ আমার জন্য হয়তো দোয়া করবে, আমার নামে আল্লাহর কাছে সদ্গায়ে জারিয়া হিসাবে বছরে ভরে কিছু দান খয়রাত কিংবা মিলাদ মাহফিল করবেন। এই ব্যবস্থাটা খুব শক্তিশালী নয়, কারন এটা খুব অচীরেই এক সময় ম্লান হয়ে যাবে এবং তার কিছুসময় পরে একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। একটা সময় আসবে, যে, আমি যে এই পৃথিবীতে ছিলাম, এই কথাটাই মানুষ ভুলে যাবে। আর ভুলে যাওয়া মানুশের জন্য অন্যরা কেউ কিছু করেনা। এটা মানুষের দোষ না। আমিইবা আমার পরিবারের শতবর্ষের আগের কোন মহিয়সীকে মনে রেখেছি? আমি তো তাদের কারো নামই জানি না। আমি কি তাদের কারো নামে স্পেশাল জোর দিয়ে কোনো মিলাদ, দোয়া মাহফিল করেছি? করি নাই। তাহলে আমি কিসের জোরে বা কিসের কারনে এটা আশা করতে পারি যে, শতবর্ষ পরে আমার কনো জেনারেশন আমার জন্য এ রকমের মিলাদ মাহফিল কিংবা দোয়া দরুদ পড়বে? পড়বে না। অথচ আমার কিয়ামাত আসার আগ পর্যন্ত আমার নেকী চাই। কিন্তু আমার মৃত্যুর পরে তো আমার নেকী কামানোর সিস্টেমই বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে আমার মৃত্যুর পর আমি অতিরিক্ত নেকী পাব কই? আর ঠিক এ কারনেই আমি মনোস্থির করেছিলাম যে, আমি এমন একটা এমাউন্ট টাকা ওয়াকফা করবো যেখান থেকে প্রতিমাসে একটা লাভ আসে এবং সেই লাভ গুলি বিভিন্ন মাদ্রসা, এতিমখানা, কিংবা জন কল্যানে ব্যয় হয়। আর এই কাজটা আমাদের পরিবারের কেউ করার সময় তারা পাবে না। এজন্য আমি ভেবেছি এটা করবো কোন ব্যাংক মারফত। তাতে আজীবনকাল এই লাভ গুলি নির্দিষ্ঠ জায়গা মতো চলে যাবে আমার মৃত্যুর পরেও।

আমি এখন যেভাবে কাজ করে যাচ্ছি-যেমন রিভার সাইডে, সমস্ত কার্যকলাপ আমি শতভাগ মনিটর করি। আগে যেটা আমার পার্টনার মূর্তজা সাহেব করতেন, সেটা এখন আমি করছি। আসলে মূর্তজা সাহেব আমাকে সম্ভবত কখনোই বিশ্বাস করতেন না, আর তিনি ভাবতেন, আমি কিছুতেই ফ্যাক্টরী চালাইতে পারবো না। ফলে একচ্ছত্র একটা ক্ষমতার পাওয়ার হাইউজ মনে করতেন তিনি। আর এই পাওয়ার হাউজ থেকে তিনি ভাবতেন-যা খুশী করা যায়, আর সেটাই উনি করেছেন। তার মধ্যে সব সময় একটা খাই খাই ভাব ছিল। পুরু রিভার সাইড ফ্যাক্টরীটা উনারা মনে করতেন যে, এটা ওনাদের বাপের সম্পত্তি। মিযান ব্যবসা করতো এক্সেসরিজের আর লাভ করতো বছরে এক কোটির উপরে। যেটা আমিও পেতাম না। তার মামাতো ভাই লাদেন (মামুন) এক নাগাড়ে অযথাই টাকা নিতো ফ্যাক্টরী থেকে ভুয়া একতা লিংকিং ইউনিট সাজাইয়া এবং লেফট ওভারের ব্যবসা করে। তার দুলাভাই আরো একটা ব্যবসা করতো যেটার কোনো কন্ট্রোল ছিলো না। তার বড় ভাই মোস্তফা দাদা আমাদের ফ্যাক্তরিতে ক্যামিকেল সাপ্লাই দিতো যা শুধু পানিই ছিলো অথচ প্রতিমাসে সে লাভ নিতো প্রায় ৬ লাখ টাকা। তার চাচা শশুর সাঈদ কাকু একজন সার্জেন্ট পদমর্যাদার। ফ্যাক্টরিতে জিএম পদে কাজ করে জাষ্ট নামেমাত্র। বেতন পায় প্রায় ৮০ হাজার। তার শ্যালক একটা ছত খাটো লিংকিং ফ্যাক্তরী দিয়ে নন কোয়ালিটি কাজ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তার স্কুল শিক্ষকের ছেলে নাহিদকে পারচেজ অফিসার হিসাবে নিয়গ দিয়ে ফ্যাক্টরিতে একটা সিন্দিকেট বানিয়ে ফেলেছে। শুধু তাইই না, তার প্রতিবন্ধী শ্যালক এজেড এ কাজ করে ঊন্ডিং এ, তার আপন ভাইগ্না মারজান কাজ করে মার্চেন্দাইজার হিসাবে, তার আরেক রিলেটিব দিদার কাজ করে এডমিনে, প্রোগ্রামিং সেকসনে কাজ করে ওনার চাচা শশুরের ভাতিজা। এ রকম আরো অনেক আত্মীয় সজনে ভর্তি এই ফ্যাক্তরি। আবার নিজের শেয়ার থেকে ১৫% শেয়ার তার স্ত্রীকে দিয়ে স্ত্রী অফিসে আসবে না, তারপরেও তাকে মাসে ৩ লাখ টাকা করে বেতন নিতেছিলো। এ জেড এ তার কিছুই নাই এখন, এক সময় সেই এ জেড তার কিছু ম্যানুয়েল মেশিনারিজ দিয়ে আমাদের রিভার সাইডের সাথে মার্জ করেছিলো বিধায় প্রতি মাসে আরাই লাখ করে লাভ নিতো। পরবর্তীতে এ জেডে সব অটোমেটিক মেশিনারিজ দিয়ে সাজানো হলে উনি ওনার সব পুরানো মেশিনারিজ বিক্রি করে দেন। তখনো উনি সেই আড়াই লাখ করে প্রোফিট নিতেই থাকেন। কি একটা অবস্থা। শুধু তাইই না, ঊনার ফ্ল্যাট কেনা বাবদ রিভার সাইড এক কালিন ৬০ লাখ টাকা পে করেছিল, সেই টাকাটাও আজ অবধি উনি পে ব্যাক করেনি। পলাশ পুরে উনি জমি কিনেছিলেন, সেই টাকাটাও উনি রিভার সাইদ থেকে নিয়েছিলেন। সেটাও পে ব্যাক করেন নি। লাক্সমা ফ্যাশনে আমরা রিভার সাইড থেলে অনেক টাকা পে করেছিলাম, আমার মনে নাই উনি সেই টাকাগুলু আজো হয়তো পে ব্যাক করেন নাই। তবুও তার ক্রিতজ্ঞতা নাই। সে নিজেও বেনামিতে সে কিছু ব্যবসা করা শুরু করেছিল, যেমন ২২ ফ্রেশ, স্তায়ল্টেক্সের সাথে কমিশন বানিজ্য ইত্যাদি।

এই সব কিছু বন্ধ করে দিয়েছি শুধু ফ্ল্যাট আর পলাশপুর জমির টাকাটা এখনো পে ব্যাক করাইতে পারিনি। এগুলি থাক হাতে, গুছিয়ে ফেলবো ইনশাল্লাহ।

৩/৮/২০২৫-প্রাত্যাহিক জীবনের পরিবর্তন

গত জুন ২০২৫ মাসে আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পর আমি আমার গত ২০ বছরের প্রাত্যাহিক জীবনের অনেকগুলি রুটিন একেবারেই পরিবর্তন করে ফেলেছি। জীবনের মুল্যবোধ, জীবনের চাহিদা, আশা আখাংকার মধ্যে একটা ব্যারিয়ার তৈরী করে এতে নতুন কিছু শর্তাবলী যোগ করে ফেলেছি। আমার এখন সবচেয়ে বড় চাহিদাটা হচ্ছে-একটা সার্টেন এমাউন্ট অফ টাকার ব্যালেন্স এমনভাবে তৈরী করা যাতে ব্যবসা, কিংবা অন্য কোনো সোর্স থেকেও যদি টাকা না আসে, তারপরেও আমার সেই সার্টেন এমাউন্ট অফ টাকার লভ্যাংশ থেকে এমন কিছু টাকা আসবে যেটা দিয়ে আমার সবকিছু খুব সহজে সামাল দেয়া সম্ভব। এ ব্যাপারে অনেকটাই সাফল্য চলে আসছে ইনশাল্লাহ আমার। হয়তো এই বছরের শেষের দিকে আমার এই পরিকল্পনার ৬০% সমাপ্ত হয়ে যাবে।

ছোট মেয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্তটা যেহেতু ফাইনাল করেই ফেলেছি যে, ব্রেডির সাথে ওর বিয়ে দেবো, সেক্ষেত্রে এখন পরবর্তী পরিকল্পনাটা হচ্ছে-আগামি ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ব্রেডির সাথে কনিকার বিয়েটা সম্পন্ন করা। এতে যে খরচটা হবে সেটা প্রায় ৫০% আগানো আছে। ডিসেম্বরের আগেই আমি ভাবছি পুরু ফাইন্যান্সটা আমি ইনশাল্লাহ জোগাড় করে কনিকার একাউন্টে পাঠিয়ে দিতে পারবো।

উম্মিকার বেলায়ো মুটামুটি ঠিক পথেই চলছে। ওদের ইন্ডিয়ায় ট্রিটমেন্টের জন্য প্রায় সবকিছুই চুড়ান্ত। এখন আল্লাহর রহমতে ওদের ঘরে একটা সুস্থ্য বাচ্চা হলেই আমার মনের সব নিয়ত আপাতত পুরা হয়। বাকিটা আল্লাহ জানেন। আবির আর উম্মিকার জন্য আপাতত বড় ধরনের কোনো বাজেটের দরকার নাই। মেডিক্যাল ইউনিট গুলি চলছে, মনে হয় আবির ভালো করবে। আবিরের বাবাও মাছের খামার নিয়ে আপাতত টেনশন ফ্রিতে আছে, ওদের বাড়িটাও করা হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে কেউ অশান্তিতে নাই (আলহামদুলিল্লাহ)।

ফ্যাক্টরীতে আমার কন্ট্রোল এখন শতভাগ। মুর্তজা ভাই সম্ভবত আমাকে এবং তার সাথে ফ্যাক্টরীর অনেক স্টাফ (যেমন মার্চেন্ডাইজার, একাউন্টস, প্রোডাকশন স্টাফ ইত্যাদি) রা মনে করতো যে, আমি নাকি শুধু যাই আর আসি। কোনো কাজই সম্ভবত আমার নজরে নাই কিংবা বুঝি না। গত এক বছরে এই ফ্যাক্টরীতে যেসব পদ্ধতিগত পরিবর্তন এনেছি, সেটা মুর্তজা ভাই গত ২০ বছরেও আনতে সক্ষম হয় নাই।