০৭/০১/২০২২-দ্বৈত জীবন-৩

আমার জীবনেও এমন একটা অধ্যায় আছে, যেটা কেউ জানে না। আর আমি বেচে থাকাকালীন কেউ জানবে না। আমার মৃত্যুর পরেও কেউ সেটা জানতে পারবে না। এ রকমটাই আমি ভাবতাম। কখনো কখনো আমরা শুনি সেটা শুধু গল্পে হয়, বাস্তবে নয়। কখনো কখনো আমাদের চোখে যেটা দেখা যায় সেটা সব সময় সত্যি হয় না। এটাও হতে পারে সেটা সত্যি একটা প্রতিচ্ছবি। যখন নিঃসঙ্গতা কাউকে অনেক বেশী কুড়ে খায়, তখন দরকার হয় একজন সঙ্গীর। যখন ওই সঙ্গীর নেহায়েত প্রয়োজন হয় অথচ তাকে সংগী করা যায় না, তখন সে কিছু একটা তো করেই। আর সেটা যে কেউ শুনলেও কখনো বিশ্বাস করবে না, অথচ ব্যাপারটা সত্যি। আর যখন কেউ সেই সত্যিটা জেনেই যায়, তাহলেও আর সাফাই দেয়া উচিত নয়, অথবা তারপরেও যদি সাফাই দিতেই হয়, তাহলে সাফাইটা হবে ঠিক সেই ব্যক্তিদের মতো যারা পলিটিক্যাল কর্মী আর পলিটিক্যাল নেতার মতো। সবাই হয়তো জানেই না যে, পলিটিক্যাল কর্মী আর পলিটিশিয়ানের মধ্যে কত পার্থক্য থাকে। পলিটিক্যাল কর্মীরা স্রেফ কাজ করে থাকে, কিন্তু রাজনেতা রাজনীতি করে। যদি এর মধ্যে কেউ ফেসে যায়, তাহলে তারা যেনো কেউ কাউকে চিনেই না এমন একটা যোগ বিয়োগের খেলা চলে।

সবাই আসলে সব কিছু জানে না, জানার উপায়ও নাই। বেশীরভাগ সময়ে কোনো মানুষই তার নিজেকেও সে জানে না। তার ক্ষমতা, তার ব্যবহার, তার অন্যান্য বইশিষ্ঠ!! পরিস্থিতি আর সময় অনেক সময় সেটা এমন করে বদলে দেয় যে, যখন কোনো ঘটনা ঘটে যায়, তখন নিজেও বুঝতে পারে না এটা কি করে ঘটলো। কখন এর শুরু হয়েছিলো আর সেটা কিভাবে শেষ করতে হয়। এই পুরু পৃথিবীতে কেউ নিজেকে নিজেই সবটা জানে না। বিশেষ করে সেই মুহুর্ত গুলি যেখানে ঠিক আর বেঠিকের সীমানা, ন্যায় আর অন্যায়ের সীমানা, অথবা সত্য আর মিথ্যার সীমানা। মাঝে মধ্যে এই সীমান অতিক্রম করা হলো নাকি সীমার মধ্যেই আছে, সেটাই নির্ধারন করা সহজ হয় না। তাহলে অন্য কেউ জানবে কিভাবে? যখন শান্ত মনে অন্তর একদম শীতল থাকে, তখন শুধু এটাই মনে হয় যে, কি করছি, কি করছি না, কি করা উচিত আর কি করা উচিত না, এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন জীবনে হাজির হয়। যার সঠিক উত্তর মাঝে মাঝে পাওয়া যায় বটে কিন্তু পরক্ষনেই ওই যে আবার নিঃসঙ্গতা!! সেটা সব উলট পালট করে দেয়। তখন আর উত্তর গুলিকে আর নিজের মনে হয় না।

আমি মানুষকে বুঝতে পারি, কাউকে দেবী বা ডাইনী রুপে ভাবি না। সবচেয়ে কাছের মানুষেরাই নিজের মানুষকে ঠকায়। অপরিচিতরা কখনো ঠকাতে না পারে, না বেঈমানী করতে পারে। তারা হয়তো ক্ষনিকের জন্য কিছু সম্পদের লোভে প্রতারনা করতে পারে কিন্তু কাছের মানুষেরা করে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি যা না চোখে আগে থেকে দেখা যায়, না বুঝা যায়।

এই দ্বৈত জীবনের সবচেয়ে বড় গুন যে, ডান হাত জানে না বাম হাত কি করছে। একটা জীবনের দুটু আলাদা আলাদা অধ্যায়। একে অন্যের অপরিচিত এই অধ্যায় গুলি। এই দুটি জীবনের মধ্যে যখন একটা জীবন অতি দুঃখে কষ্টে ভরে উঠে, তখন এটা কখনোই সম্ভব নয় যে, অন্য জীবনের এর প্রভাব ফেলবে না।

এভাবেই চলে জীবনের সব ধারাগুলি।

৬/০১/২০২২-কনিকা এবং হাবীব ভাই

গত ১১ আগষ্ট ২০২১ তারিখে আমার ছোট মেয়ে কনিকা ইউ এম বি সি তে হায়ার এজুকেশনের জন্য আমেরিকায় গিয়েছে। আজ প্রায় ৫ মাসেরও বেশী পার হয়ে গেছে। একটা ব্যাপার আমি খুব করে ভাবি যে, শেষ মুহুর্তে কনিকার স্টেট সিলেকশনে আমি একটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলাম। প্রথমে আমি আমার বড় ভাই যেখানে থাকেন, বোষ্টন, সেখানকার সব গুলি ইউনিভার্সিটিতে কনিকাকে এপ্লাই করতে উপদেশ দিয়েছিলাম এই ভেবে যে, ওখানে আমার বড় ভাই থাকেন এবং তিনি নর্থ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটির খুবই নামকরা টিচার এবং প্রফেসর। আমার ভাবনা ছিলো যে, ওখানে যেহেতু আমার বড় ভাই আছেন, ভাবী আছেন, সেক্ষেত্রে কনিকার কোনো সমস্যা হলে বা প্রয়োজনে সর্বদা কনিকা ওর চাচাকে পাবে। হতাত একদিন মিটুল, আমার স্ত্রী, বল্লো, আচ্ছা যদি এমন হয় যে, হাবীব ভাই এসব করতে না পারলো কিংবা কনিকা একটা উটকো ঝামেলায় পরিনত হয় ভাইয়ার কাছে, তখন তো একটা বিপদ হবে। ব্যাপারটা আমি মোটেই সহজ ভাবে নেই নাই বরং ব্যাপারটা নিয়ে আমি সিরিয়াসলি ভেবেছি। এর একটা কারন ছিলো। কারনটা হলো, হাবীব ভাই কোনো কিছুর মধ্যেই বেশীদিন স্থির থাকতে পারেন না। যখন কোনো বিষয় নিয়া উনি একবার মাতেন, সেটা প্রথম কয়েকদিন খুব ব্যস্ত থাকেন এবং এক সময় সেটায় তিনি আর ইন্টারেষ্ট পান না এবং সেটা অচিরেই পরিত্যাগ করেন। এতে কার কি হলো আর কি হলো না তাতে তার কিছুই যায় আসে না। ভরষা করার মতো লোক না তিনি।

আমি ততক্ষনাত কনিকাকে বললাম, বাল্টিমোর এরিয়ায় ইউনিভার্সিটি সিলেক্ট করো কারন ওখানে মিটুলের প্রায় শতাধিক মানুষ বাস করে। কেউ না কেউ কোনো না কোনো ইয়পায়ে কনিকাকে কোনো কিছুর জন্যে সাহাজ্য করতেই পারবে। এটা যে কি একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আজ সেটা ভাবতেই ভালো লাগে।

এই পাচ মাসে হাবীব ভাই কনিকাকে একটা ফোন পর্যন্ত করেন নাই। যে লোক কনিকা কেমন আছে, কি করছে, কোনো অসুবিধা আছে কিনা এটা নিয়ে একবারো ভাবেন নাই বা ভাবার সময় পান নাই, সে কি করে আমার মেয়ে কনিকার দেখভাল করবেন বা করতেন? কনিকার গাড়ি কেনার সময় ছোট ভাই যে সাহাজ্যটা করেছেন, এটা হাবীব ভাই কোনোদিন করতেন কিনা আমি জানি না, যদিও আমিই টাকা দিতাম, তারপরেও করতেন কিনা আমার জানা নাই। আল্লাহ সব কিছুর নিয়ন্তা এবং মালিক।

অন্যদিকে, আমার আরেক ভাই, বেলায়েত হোসেন, যিনি আজ থেকে অনেক বছর আগে পরলোক গমন করেছেন, তার ছেলে সেলিম এবং সেলিমের মা বাই দি বাই জেনেছে যে, কনিকা আমেরিকায় গেছে। এটা শুনে অস্থির হয়ে গেছে কখন কনিকাকে তাদের বাসায় নিয়ে যাবে। আমিও কনিকাকে ওদের বাসায়, নেভাদা, তে যেতে বলেছি। কনিকা ১০ দিনের ছুটি কাটাবে সেলিমদের বাসায়। এখন কনিকা সেলিমদের বাসাতেই আছে।

হাবীব ভাই আজ পর্যন্ত যত গুলি মানুষের জন্য ট্রাই করেছেন, সব গুলি ট্রাই ছিলো ‘ফেক’। মানুষদেরকে লোভ দেখিয়েছেন, আশা দিয়েছেন, পরে আশাহত করেছেন। যাদেরকে তিনি আশা দেন, তারা এটাকে অমুল্য অফার হিসাবে নিলেও হাবীব ভাই জানেন ঠিক কোন সময়টায় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। আর এটাই হয়েছে খালেদা, লিজা, লাকী, লিয়াকত, সালমা, এবং আরো কিছু মানুষের ভাগ্যে। উনি এমনটা কেনো করেন? আমি বহুবার এর উত্তর খোজার চেষ্টা করেছি। বার বার মনে হয়েছে আমার কাছে যে, এটা একটা নেশা। প্রথম প্রথম নেশাটা খুবই মাত্রাতিরিক্ত হয়, পরে ধীরে ধীরে সেই নেশা কেটে গেলে জাষ্ট পরিসমাপ্তি।

১৩/১২/২০২১-ইতিহাস থেকে যারা (Taken in Page ফেসবুক)

ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না, তাদের পতন বারবার ইতিহাসের সেই একই ধারায় হয়। ঘসেটি বেগমের কারনে, কিংবা মীর জাফরের কারনে, অথবা সেই মায়মুনা কুটনীর কারনেই এই পৃথিবীর অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর জীবনমান অনেক কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে গিয়েছিলো। তাদের লোভ, তাদের লালসার জিব্বা এতো বড় ছিলো যে, তারা সারাটা দুনিয়া হা করে গিলে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের পেট এতো বড় ছিলো না যে, গোটা বিশ্ব সেই পেটে ধারন করে। ফলে অধিক ভূজনের রসাতলে ন্যয্যভাবে হাতে আসা সব সম্পদ, ক্ষমতা আয়েস করার আগেই তাদের এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে অকালেই প্রান দিতে হয়েছে, অথবা মানুষের হৃদয় থেকে। আর যারা বেচে থাকে তারা ওইসব হায়েনাদের কারো কারো নামের আগে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য যোগ করে দেয়, “নিমকহারামের দেউড়ি”, কিংবা “কুটনা বুড়ী আস্তনা” অথবা “হারামখোরের আস্তানা”। আজো তারা এইসব নামেই পরিচিত। কখনো দেখবেন না যে, মীর বংশের কোন বাচ্চার নাম জাফর রাখা হয়েছে। যদিও জাফর বড্ড সুন্দর একটা নাম। কিন্তু মীরজাফর একটা কুলাংগারের নাম। ওর বংশধরেরা আজো তার নামে কলংকিত বোধ করে।

অথচ যুগে যুগে ভিন্ন রুপে এখনো মীরজাফরের থেকেও খারাপ মানুষ এই সমাজে আছে, ঘসেটি বেগমের থেকেও ষড়যন্ত্রকারিনী এখনো অনেক ঘরেই আছে, মায়মুনা কুটনীর মতো মোনাফেক এখনো আমাদের চারিধারে বিধ্যমান। ওদের চেনা কঠিন কারন এইসব মানুষেরা বর্নচোরার মতো আমাদের চারিদিকে একটা আবরন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ভাল মানুষের মতো। সুযোগ পেলেই ছোবল দেবে এবং দেয়, আর এদের এক ছোবলে ধংশ হয়ে যেতে পারে আমার আপনার বহুদিনের বন্ধন, বহুদিনের সম্পর্ক।

১৩/১২/২০২১-একই খবর কারো কাছে শুভ (Taken in Page)

একই খবর কারো কাছে শুভ আবার কারো কাছে অশুভ হতে পারে। একই জায়গায় মিলিত হওয়া মানুষের রাস্তা আলাদা আলাদা হতে পারে। একই পরিস্থিতিতে একজন জীবনে এগিয়ে চলে, আবার আরেকজন জীবনের অসহায় অবস্থার সাথে বোঝাপড়া করে। কেউ কেউ বিন্দু বিন্দু অর্থ সঞ্চয় করে নিজের সপ্ন পুরন করে, অন্যজন তার গড়া সপ্ন বিন্দু বিন্দু ভুলের কারনে নিরুপায় অবস্থায় জন্য তার সপ্ন ভাংতে শুরু করে।  

কোনো অপরাধই রাতারাতি জন্ম নেয় না। যখন কোনো অপরাধ হয়, তখন আমরা শুধু তার উপরের রুপটাই দেখতে পাই। কিন্তু তার শিকড় অন্য কোথাও অনেক গভীরে হয়। আর শিকড়ের সন্ধ্যান হয় পুলিশ করে অথবা কোনো সচেতন মানুষ। পুলিশ যখন তদন্ত করে তখন প্রতিটি মানুষকে সে যেভাবে দেখে তা হল, সবাই মুখোশ পড়া ক্রিমিনাল। আর তাই সে যখন আসল জিনিষ বের করতে চায়, সে কাউকেই কোনো প্রকার ছাড় দিতে নারাজ। আর এ কারনেই হয়তো অনেকেই বলে- বাঘে ছুলে ১৮ ঘা আর পুলিশ ছুলে ৭০ ঘা!!

বিদ্বেষ হিংসা ভালোবাসা আর ঘৃণা এগুলি এমন কিছু আবেগ যা প্রতিটি মানুষের মাঝে পাওয়া যায়। সুযোগ সন্ধানী হওয়াও একটা আবেগ। সুযোগ সন্ধানী হওয়া কোনো খারাপ বিষয় নয়, কিন্তু তার জন্য কিছু সীমা থাকে, কিছু নীতি থাকে। কারো ক্ষতি করে, কারো অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে মানুষ কখনো সামনের দিকে এগুতে পারে না। বাবলা গাছ লাগিয়ে যদি কেউ ভাবে তাতে ফুল ফুটবে, সেটা কোনো পাগলামোর থেকে কম নয়। অবৈধ কোনো শুরু থেকে কোনো সম্পর্ক কখনো বৈধ হতে পারে না, না পারে সেখানে কোনো বৈধ কোনো ফলাফলের আশা। খারাপ পরিস্থিতি, খারাপ মানুষ আর খারাপ ফল এগুলি থেকে পার্থক্য করা শিখতে হবে যে কোনটা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় আর কোন বিশয়টা ব্যক্তিগত বিষয় থেকে আইনের দরজায় নিয়ে যেতে পারে। যখন কোনো মানুষের পরিস্থিতি ঠিক এটাই হয়, তখন অন্যান্য দিনের মতো সকালটা আর তেমন থাকে না যেমন ছিলো আগের কোনো সকালের মতো, না তার সন্ধ্যাটাও আগের মত পরিচিত মনে হয়। পুলিশের প্রথম কাজ হয় ‘এক শান রিপ্লে তৈরী করা’। যেখানে তারা একে একে ক্রিমিনালের সম্ভাব্য সব ক্রিমিনাল পলিসি বিরুদ্ধে পুলিশের করনীয়। ফলে পুলিশ খুব সহজেই ক্রিমিনাল প্লানের একটু এগিয়েই থাকে।

নিজেদের মধ্যে যখন কেউ হিংসা হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন আসলে সেটাই হয় যা রক্তের সাথে রক্তের পাল্লা। ক্ষতি হয় শুধু নিজেদের রক্তের। তাহলে এই খেলায় কে জিতে? কেউ না।

মহিলাদেরকে আমরা দেবীর সমান তুলনা করে থাকি কিন্তু আফসোস যে, এটা শুধু মন্দির আর পুজার ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। মহিলাদের সাথে লাগাতার অন্যায় আর অপরাধ ঘটে যাওয়া এটাই প্রমান করে যে, আমাদের সমাজে আমরা যে মহিলাদেরকে দেবী বলি তারা এমন অনেক দানব দ্বারা ঘিরে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে নরক করে তুলেছে। প্রকাশ্যে কোনো মিহিলাকে পুড়িয়ে মারা হয়, নির্যাতন করা হয়, ধর্ষন করা হয় অথচ কেউ এগিয়ে আসে না।

আমাদের এ গ্রামে কতজন পুরুষ আর কতজন মহিলা আছে কিংবা কতজন ছেলে আর কতজন মেয়ে আছে এটা কি কোনো প্রশাসন বলতে পারবে? যদি ছেলে আর মেয়ের এই অনুপাত জানা যায়, তাহলে আমাদেরকে নজর দেয়া উচিত সেই জায়গায় যেখানে কতটুকু উন্নতি করা দরকার।

২/১২/২০২১-পায়ের নীচে পাথরহীন

জীবনের কাছে রাখা সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমার জীবনেও এমন একটা সময় এসেছিলো। আমার সব প্রশ্নের উত্তর হয়তোবা কারো জীবনের নাশ হবার সম্ভাবনাই ছিলো, ফলে উত্তরদাতা হিসাবে আমি কোনো উত্তরই দেওয়ার চেষ্টা করিনি। চুপ হয়ে থাকাই যেনো মনে হয়েছিলো-সর্বোত্তম উত্তর। আমি সেই “চুপ থাকা” উত্তরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে এমন পরিবেশটাই তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলাম যেনো “কিছুই না ব্যাপারটা”। কিন্তু “ব্যাপারটা” যতো না সত্য ছিলো তার থেকেও বেশী ছিলো “চাপ” আর এই “চাপ” তৈরী করার পিছনে যারা কাজ করেছিলো তারা আর কেহই নয়, আমার দ্বারা পালিত সেই সব মানুষগুলি যাদেরকে আমি ভেবেছিলাম, তারা আমার সব “ওয়েল উইশার্স”। কিন্তু আমার আরো কিছু মানুষ ছিলো যারা আমার জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে এমন করে জড়িয়েছিলো যারা আমার হাড় আর মাংশের মতো। আলাদা করা দুরুহ। সেই হাড় আর মাংশের মতো একত্রে মিলিত মানুষগুলি একটা সময়ে সেইসব তথাকথিত “ওয়েল উইশার্স”দের চক্রান্তে তাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে বিগড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের “সন্দেহ” টাই যেনো এক সময় তাদের অবচেতন মনে “বিশ্বাসে” পরিনত হয়। আর এই মিথ্যা “বিশ্বাসে” তাদের চারিপাশের শান্ত বাতাসগুলিও যেনো প্রচন্ড ঝড়ের চেহাড়া নিয়ে একটা কাল বৈশাখীতে রুপ নিয়েছিলো। কেউ বুঝতেই চাইতেছিলো না যে, এর শেষ পরিনতি বড়ই ভয়ংকর।

তবে আমি জানতাম সত্যিটা কি। কিন্তু ওইসব পরিস্থিতিতে আমার সব সত্য জানাটাই সঠিক এটা কাউকে যেমন বিসশাস করানো যায় নাই, তেমনি আমিও তাদেরকে বিশ্বাস করাতে চাইওনি। শুধু অপেক্ষা করেছিলাম-কখন ঝড় থামবে, কখন আকাশ পরিষ্কার হবে, আর দিবালোকের মতো সত্যটা বেরিয়ে আসবে। “সময়” পার হয়েছে, ধীরে ধীরে মেঘ কেটে গেছে, আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। গুছিয়েও ফেলেছি সেইসব ক্ষত বিক্ষত আচড়গুলি। কিন্তু আমি এই অযাচিত ঘটনায় একটা জিনিষ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম যে, মনুষ্য জীবনে আসলে কেউ কারোই নয়। আমরা বাস করি শুধু আমাদের জন্য। একা থাকা যায় না, তাই সমাজ, একা থাকা যায় না, তাই পরিবার। একা অনেক অনিরাপদ, তাই সংসার। কিন্তু এই সমাজ, এই সংসার কিংবা এই পরিবার কোনো না কোন সময় ছাড়তেই হয়, আর সেটা একাই। এই মিথ্যে সমাজ, পরিবার আর সংসারের নামে আমরা যা করি তা নিছক একটা নাটক। জংগলে বাস করলে একদিন সেই জংগল ছাড়তেও কষ্ট হয়। এরমানে এই নয়, আমি জংগলকেই ভালোবাসি। কথায় বলে-ভালোবাসা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর অনুভুতি, আর এটা যদি বেচে থাকে তাহলে হিংসা, বিদ্বেষ থেকে মানুষ হয়তো মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যারা এই সমাজ নামে, পরিবার নামে, কিংবা সংসার নামে চিহ্নিত করে ভালোবাসার জাল বুনে থাকি সেটা আসলে কোনো ভালোবাসাই নয়। সেখানে থাকে প্রতিনিয়ত নিজের সার্থের সাথে অন্যের লড়াই। অন্যঅর্থে সেটা একটা পাগলামী, লালসা কিংবা একা বাচতে চাওয়ার অনিরাপদের একটা অধ্যায় মাত্র। অথচ আমরা প্রত্যেক মুহুর্তে আমাদের এই নিজের পরিবারকে নিরাপদে রাখার জন্য অনেক অপবাদ, অনেক ভয়ংকর বাধা আর মৃত্যুর মতো রিস্ককে বরন করে থাকি। এ সবই আসলে নিজের সার্থে।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, আমার সেই ফেলে আসা অভিজ্ঞতার আলোকে আমি ধীরে ধীরে সে সব “ওয়েল উইশার্স” দেরকে নিজের বেষ্টনী থেকে দূরে রাখার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছি। আমি একটা মুহুর্তেও সেই সব দিনের ক্ষত বিক্ষত হবার বেদনার কথা ভুলি নাই। যখনই সেই ব্যথার কথা মনে হয়েছে- আমি বারবার আরো শক্ত হয়েছি। আমি জানি কন এক সময় আবারো তাদের আমার প্রয়োজন হবে, আবারো তারা আমাকে আকড়ে ধরার চেষতা করবে, আবারো তারা তাদের মিথ্যা চোখের পানি ফেলে আমাকে আবেশিত করার চেষ্টা করবে। আমি ততোবার নিজেকে বারন করেছি-আর যেনো সেই একই ফাদে পা না বাড়াই। তাহলে সেটা হবে আমার জীবনের জন্য কালো আধ্যায়।

ওরাও হয়তো ভেবেছিলো- কোনো প্রয়োজন নাই আর আমাকে। আমি কোন দুঃখ পাইনি। শুধু ভেবেছি, খুব ভালো যে, তারাই গুটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এই প্রিথিবীর সবচেয়ে বড় বিপত্তি এই যে, বড় বট বৃক্ষের প্রয়োজন কখনো কোনোদিন কোনো কালেই ফুরিয়ে যায় না। হোক সেটা হাজার বছরের পুরানো কোনো বৃক্ষ।

আজ সেই দিনটা এসেছে। অথচ আজ আমার সব দরজা এমন করে খিল দিয়ে আটকানো যে, না আমি খুলতে চাই, না খোলার প্রয়োজন মনে করি। পৃথিবীতে নিমক হারামের চেয়ে বড় পাপ অথবা বড় বিশ্বাসঘাতকরা আর নাই। যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কেউ আকাশ দেখে, সেই পাথকে যত্ন করে রাখতে হয়। যদি অযত্নে সেই পাথর কোথাও হারিয়ে যায় বা ব্যবহারের আর উপযোগি না হয়, তাহলে আকাশ যতো সুন্দরই হোক না কেনো, তাকে দেখার ভাগ্য আর হয় না। যদি কেউ আজিবন আকাসের জ্যোৎস্না, আকাসের তারা আর নীল আকাশের মধ্যে তারার মেলা দেখার ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাথকে অতোতাই যত্ন করা দরকার যতোটা মনে হবে তার মনের শখের দরকার। তা না হলে চোখের জলে বুক ভাসবে ঠিক কিন্তু কেউ তার নিজের পাথর দিয়ে তার আকাশ দেখা বন্ধ করে অন্যকে পাথর দিয়ে সাহাজ্য করে না। এতাই নিয়ম।

আজ তারা সেই পাথরটাকে হারিয়ে ফেলেছে বন্ধ দরজার অন্ধকার ঘরে। যেখানে না যায় দরজা খোলা, না যায় পাথরে পা রাখা। তোমাদের জন্য নতুন আরেক অধ্যায় শুরু। এবার এই দুনিয়াটাকে বড্ড অসহায় মনে হবে তোমাদের। তোমাদের প্রতিন মনে হবে- তোমরা কোথায় কি পরিমান ক্ষতি নিজেদের করেছো যার সমাধান কখনোই তোমাদের হাতে ছিলো না। তোমরা ভেবেছিলে- তোমাদের জন্য মায়ের চেয়ে মাসির দরদ সম্ভবত অনেক বেশী। কিন্তু এই দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত মায়ের চেয়ে মাসির দরদ কখনোই বেশী ছিল বলে এটা কেউ যেমন প্রমান করতে পারে নাই, আর এতা সত্যও নয়। যদি সেটাই তোমরা মনে করে থাকো- তাহলে আজ তোমাদের সেই মাসির কাছেই তোমাদের সমস্ত কিছু আবদার, চাহিদা, কিংবা সাহাজ্য চাওয়া উচিত যাকে তোমরা বিনাবাক্যে মনে করেছো, লিডার অফ দি রিং। দেখো, সেই লিডার অফ দি রিং তোমাদের জন্য কোনো সাহাজ্য পাঠায় কিনা। আমার দরজা তোমাদের জন্য আর কখনোই খোলা হবে না। আমি শুধু দেখতে চাই, আসলেই তোমরা কাকে চেয়েছিলে? কার উপরে তোমাদের এতো নির্ভরশীলতা ছিলো আর কার গলায় পা রেখে শ্বাস রোধ করেছিলে। আমি তো সেদিনই মরে গেছি যেদিন তোমরা আমাকে আমার অজান্তে পিছন থেকে চিমটি নয় ছুড়ি মেরেছিলে। আহত লোকের কাছে কোনো সাহাজ্য প্রার্থনা করা উচিত না। এটাই তোমাদের শিক্ষা।

২৭/১১/২০২১-পর্ব-২

গত লেখার শেষ ভাগে লিখেছিলাম-তাহলে আরেকটা অনেক বড় প্রশ্ন মনে জেগেই রইলো- আমার স্রিষ্টিকর্তা আমাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তাহলে এই বিশ্ব ভ্রমান্ডে পাঠিয়েছিল? What was the purpose of my life to be created by my Lord?

এই প্রশ্নের একদম সহজ এবং অতি পরিষ্কার করে স্রিষ্টিকর্তা পবিত্র কোর আনে বর্ন্না করেছেন- আমি মানব জাতী এবং জীন সৃষ্টি করিয়াছি আমাকে উপসানা করার জন্য।

মানবজাতী এবং জীন এই দুই সৃষ্টিকে আল্লাহ স্বাধীন সত্ত্বা হিসাবে সৃষ্টি করে তাদের ইচ্ছাশক্তিতে আল্লাহকে মানা আর না মানার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।  আর অন্য সমস্ত স্রিষ্টিকে তিনি শুধু আল্লাহর উপাসনা করার জন্যই বানিয়েছেন, তাদের ইচ্ছাশক্তির কোনো স্বাধীনতা নাই। ফলে পূর্ন স্বাধীনতা দেয়ার পরেও যখন কোনো মানব বা জীন আল্লাহকে মানেন, তার জন্য বেহেস্ত।

একটা ছোট ঘড়ি, কিংবা বড় কোনো মেশিন অথবা একটা দামী গার্মেন্টস যখন কেউ কিনেন, সেখানেও এর জন্য একটা ইন্সট্রাক শনাল ম্যানুয়েল থাকে যাতে ওই মেশিনগুলি কিভাবে রক্ষনাবেক্ষন করতে হবে, কিভাবে ব্যবহার করলে জিনিষটা ভালো থাকে। তাহলে প্রশ্ন একটা আসতেই পারে যে- মানুষ ও কিন্তু একটা যে কোনো জটিল মেশিনের থেকে জটিল। এর কোনো ম্যানুয়েল থাকার ক দরকার নাই? অবশ্যই আছে। আর সেটাই হচ্ছে পবিত্র কোরআন।

২৬/১১/২০২১-মুর্তজা ভাইয়ের নীতি ও আদর্শ (ফলো আপ পর্ব-২)

আমার আগের লেখাটায় একটা কথা লিখেছিলাম যে, কোনো এক সময় হয়তো এমন হতে পারে যে, আমার থেকেও বেশী পরিমান টাকার প্রয়োজনে হয়তো মর্তুজা ভাই আমাদের ফ্যাক্টরী রিভার সাইড থেকে টাকা টান দিতে পারে যখন আমার কোনো টাকাই হয়তো লাগবে না কিন্তু ওনার লাগবে। এ কথাটা আমি মাত্র মাস তিনেক আগে লিখেছিলাম আমার আগের লেখাটায়। অথচ এই মাসেই সেটা প্রমানিত হলো। মর্তুজা ভাই তার সঞ্চিত টাকা অন্য এমন এক জায়গায় ইনভেষ্ট করে ফেলেছেন যে, উনি ওখান থেকে এই মুহুর্তে টাকাগুলি ব্যাক করতে পারছেন না। আবার তার ইচ্ছা যে, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে প্রায় ৪ কাঠার সম পরিমান একটা ল্যান্ড কিনতে ইচ্ছুক। ফলে উনার প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার খুবই প্রয়োজন। এই সাড়ে ৪ কোটি টাকা যদি উনি টান দেন, তাহলে আমিও আমার অনুপাতে পাই প্রায় ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আমার এই মুহুর্তে কোনো টাকার প্রয়োজন নাই। ফলে, আমি যদি এখন মর্তুজা ভাইকে বলি যে, এই সাড়ে ৪ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি আমাকে শেয়ার লিখে দিক, তাহলে আমি কিন্তু মর্তুজা ভাইয়ের থিউরী অনুযায়ী ডিমান্ড করতেই পারি। কিন্তু আমি সেটা করবো না।

মর্তুজা ভাই তার এই সাড়ে ৪ কোটি টাকা দুই পর্বে ফ্যাক্টরী থেকে নিতে চান। প্রথম পর্বে দেড় কোটি টাকা আর ৯০ দিন পরে বাকী টাকা।

আমি পুরু জিনিষটা অব্জার্ভ করছি। আমি আর আগের মতো নাই। এখন প্রতিটা ব্যাপার নিয়ে আমি মাথা ঘামাই যা আগে কখনোই করি নাই। এটা মর্তুজা ভাইও বুঝে গেছেন। তিনিও খুব চালাক মানুষ, ফলে ব্যাপারটা তিনিও খুব সন্তর্পনে হ্যান্ডেল করছে,

গত ২৩ তারিখে তার ১ম পর্বের টাকাটার কথা আমাকে জানালেন। আগে হলে আমি হয়তো এ রকম কোনো ফর্মালিটিজ করতাম না, একবারেই বলে দিতাম যে, আপনি টাকাটা নিয়ে ড্রইংস এর মধ্যে লিখে রাখেন। কিন্তু এবার আমি অন্য পথ অবলম্বন করেছি। আর সেটা কি তার প্রক্রিয়াটা এখানে দিলাম। আমি প্রথমে একাউন্ট অফিসারকে একটা নোট শীট লিখতে বলেছি। তারপর ওই টাকার সম পরিমান আমার কত আসে সেটাও নোট শীটে লিখতে বলেছি। আর এটাকে একটা আলাদা ট্রাঞ্জেকশন হিসাবে দেখতে বলেছি। তারপর বলেছি- আমার এবং মর্তুজা ভাইয়ের নামে মোট কত টাকা হয় সেটা কোন ফান্ড বা সোর্স থেকে দেয়া যেতে পারে একাউন্ট অফিসার যেনো ক্লিয়ারলী উল্লেখ করে। আর সেটা আমরা দুজনেই যদি এক সাথে ড্রইংস করি তাতে ফ্যাক্টরীর কোনো অসুবিধা হবে কিনা সেটাও লিখতে বলেছি। আমি আগের নিয়মে গেলে হয়তো আমার ভাগের টাকাটা আমি এখনই নিতাম না, কিন্তু এবার আমি সেটা করছি না। যেহেতু উনি নিবেন, তাই আমার টাকা লাগুক বা না লাগুক, আমিও নেবো। আগে উনি নিক, তারপর আমি আমারটা নেবো। ফলে একটা অফিশিয়াল নোট শীট করতে বলায় মর্তুজা ভাই যেনো আকাশ থেকে পড়লো। উনি এটা ভাবেন নাই। একটু নার্ভাস ছিলো, আবার মনে মনে রাগের বশে উত্তেজিতও ছিলো। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। ছাড় দিতে ইচ্ছে করছিলো না। আর এটা তো মর্তুজা ভাইই আমাকে শিখিয়েছেন। আমি নিজের থেকে কোনো নিয়ম ও করি নাই, বানাইও নাই। আমি শুধু উনার করা প্রাক্টিস গুলিই ফলো করছি, ফলে উনি আমাকে জোর করেও কিছু বলতে পারবে না। উনি দেড় কোটি টাকা নিলে আমিও নিতে পারি প্রায় ৮১ লাখ টাকা। প্রয়োজনে আমি আমার টাকা তুলে নিয়ে এফডিআর করে রাখবো, অসুবিধা কোথায়? অবশ্য আমি টাকাগুলি পরেও নিতে পারতাম, আর এটাই মর্তুজা ভাই ভেবেছিলেন। কিন্তু এবার আমি সেটা করতে নারাজ। উনি বুঝুক যে, পার্টনারশীপ ব্যবসায় পার্টনার যদি শক্ত হয়, তাহলে আরেক পার্টনার অনেক মজা নিতে পারে না যেটা উনি এতোদিন নিতেন। নোটশীটটা দেখলে বুঝা যাবে, বেশ কঠিন সিচুয়েশন। 

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মর্তুজা ভাই উত্তরা ৪ নং সেক্টরে প্রায় পৌনে চার কাঠা জমিতে চার তলা বিল্ডিং সহ একটা জায়গা কিনার নিমিত্তে তার প্রায় ৬ কোটি টাকার প্রয়োজন। আর সেটার তিনি প্রায় ৫ কোটি টাকা তিনি ফ্যাক্টরী থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্বে দেড় কোটি টাকা নিচ্ছেন, পরবর্তী ৩ মাস পরে ২য় পর্বে বাকী টাকা নিবেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমিও পার্টনারশীপ অংশীদারিত্তে ৩৫% হিসাবে সম পরিমান টাকা নেওয়ার ভাগীদার। আগের নিয়মে থাকলে আমি হয়তো আমার অংশের টাকাটা এখন আমি নিতামই না। এটাই এতোদিন মুর্তুজা ভাই এঞ্জয় করেছে। অনেক সময় আমার মনেও থাকতো না, আমার কত নেয়া উচিত ছিলো, আর সেটা নেয়া হয়েছে কিনা। কিন্তু এখন সেই পলিসিতে আমি আর নাই।

২২/১১/২০২১-এসআইবিএল এর ২৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী (ফেসবুক)

আমার ব্যবসার জন্মলগ্ন থেকেই একটি মাত্র ব্যাংকেই আমি সমস্ত ব্যবসায়ীক লেনদেন করে এসছি। আর সেটা হলো এসআইবিএল ব্যাংক। আমি অবশ্য এসআইবিএল এর প্রধান কার্যালয়ের সাথে ব্যবসায়ীক লেনদেন করলেও হাসনাবাদ সুপার মার্কেটের এসআইবিএল শাখার সাথে আমাদের ফ্যাক্টরীর সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার সাথে আত্মার মতো। ডোর টু ডোর প্রতিষ্ঠান। আমার প্রায় প্রতিটি ষ্টাফ এই ব্যাংকের গ্রাহক।

আজ এই ব্যাংকের ২৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ছিলো। গতকালই আমার খুবই প্রিয় একজন মানুষ  ব্যাংকের ম্যানেজার নিজাম ভাই নিজে এসে আমাকে দাওয়াত করে গিয়েছিলেন যেনো আজকের দিনটায় অন্যান্য দিনের চেয়ে অফিসে একটু আগে এসে তাদের এই মহান দিনটির সাথে আমি শরীক হই।

অনেক চমৎকার একটা বিশাল কেক কেটে এই মহান দিনটাকে এসআইবিএল ব্যাংক স্মরণ করেছে। আমি নিজেও গর্বিত এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যবসায়ীক কার্যক্রম পরিচালনা করায়।

ধন্যবাদ নিজাম ভাই, ধন্যবাদ সব কলিগ ভাইদের।

১৯/১১/২০২১-“পুরুষ মানুষ হলো খেজুর গাছের মতো

“পুরুষ মানুষ হলো খেজুর গাছের মতো। আদর পায় না, যত্ন পায় না, কেউ পানি দেয় না, সার দেয় না, গোঁড়ায় কেউ মাটি দেয় না, আরো বলে নিজের পায়ের তলার মাটি নিজে শক্ত করো! অযত্নে অবহেলায় বেড়ে উঠে! বেড়ে উঠার পর কিন্তু তার কাছে প্রত্যাশা অনেক!

তার ফল খুব মিষ্টি, তার রসের জন্য হাহাকার, তার রসের গুড় চিনির চেয়ে কয়েকগুন বেশি উপকারী। তাকে বছরের পর বছর ক্ষতবিক্ষত করা হয়! যতদিন বেঁচে থাকে তাকে কাটা হয়, তার রস এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে নিগড়ে নেওয়া হয়! রস নেওয়া শেষ হয়ে গেলে আর তার কোন কদর থাকে না, পথে ধারে একাকী অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকে!

তারপরও খেজুর গাছ কোন অভিযোগ করে না, কিছু প্রত্যাশা করে না, ভালোবাসা চায় না। শুধু ফল দিয়ে যায়, রস দিয়ে যায় আর মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকে নিঃস্বার্থভাবে আপনার পরিবারের পুরুষ মানুষটির মতো!” কালেক্টেড

১১-১৫/১১/২০২১ Visit to India

মুলত ব্যবসার কাজেই এবার ইন্ডিয়া আসা। কিন্তু সাথে কোনো ল্যাপ টপ নেই নাই। কোনো ভারী লাগেজ ও নেই নাই। ইচ্ছে ছিলো-একেবারে নিরিবিলি সময় কাটানো। সাথে মুর্তজা ভাই ছিলেন। হোটেল তাজ বেংগলে উঠেছি। খুব সুন্দর একটা হোটেল। অবশ্য খুব এক্সপেন্সিভ ও বটে। তারপরেও সহ্য হচ্ছিলো। কি হবে এতো টাকা পয়সা জমিয়ে?

১১ তারিখ সকাল ১১ টার মধ্যে কলিকাতা পৌঁছে গেলাম। এয়ারপোর্ট থেকেই আমরা চলে গেলাম “আদিত্য বিরলা গ্রুপ” এর উদ্দেশ্যে। মিঃ অর্নব, নভো মন্ডল এবং আরো ষ্টাফরা ছিলো আমাদের জন্য অপেক্ষায়। ভীষন ভালো একটা মিটিং হলো। ওরাই লাঞ্চ হোষ্ট করলো, কিছুক্ষন রেষ্টের জন্য ওরাই ওদের আদিত্য বিরলার এরিয়ায় রেষ্ট হাউজে বেশ সুন্দর একটা রুম দিলেন। আমরা ফ্রেস হয়ে নামাজ পড়ে আবার বিকালে প্রায় ৫ টার দিকে কলিকাতা তাজ হোটেলের জন্য বেরিয়ে গেলাম।

১৫ বছর এক নাগারে (১৯০৬ থেকে ১৯২১) রানী ভিক্টোরিয়ার স্মরণে লর্ড কার্জন এই  হুগলী নদীর ধারে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গড়ে তুলেছিলেন। আসলে এই মেমোরিয়াল তৈরী শুরু হয় রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর প্রায় ৬ বছর পর থেকে। ১৮৪০ সালে ভিক্টোরিয়া প্রিন্স এলবার্টকে বিয়ে করেন। কিন্তু প্রিন্স এলবার্ট টাইফয়েড জরে ১৮৬১ সালে মারা যাওয়ার পর রানী আর কাউকেই বিয়ে করেন নি।  পরবর্তীতে রানী ভিক্টোরিয়া মারা যান ১৯০১ সালে সেরেব্রাল হেমোরেজে। তার মৃত্যুর পর রাজা ৭ম এডওয়ার্ড (তার ডাকনাম ছিলো বার্টি) ক্ষমতা গ্রহন করেন। 

মোট ২৫টি গ্যালারী আছে এর মধ্যে। তার মধ্যে ‘রয়েল গ্যালারী’, জাতীয় নেতাদের গ্যালারী, সেন্টারল হল, আর্মস এন্ড আর্মারী হল ইত্যাদি। সব গুলি গ্যালারীতে সবার প্রবেশের সুযোগ নাই। তবে নীচ তালায় পুরু মিউজিয়াম ভর্তি সুভাস চন্দ্রের তার লাইফ টাইমের বিভিন্ন তথ্য, চিত্র এবং ছবি দিয়ে ভরা।

তারপরেও এখানে বেশ কিছু দূর্লভ ছবি এবং মুল্যবান ভাষ্কর্য আছে যা ইতিহাসের পাতায় বেশ নামিদামী হয়ে আছে। যেমন, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তারা যে মার্চেন্ট শীপে ভারত বর্ষে এসেছিলেন, তার একটা অরিজিনাল রেপ্লিকা আছে। রানী ভিক্টোরিয়া তার ১০ বছর বয়সে তার চাচা ৪র্থ রাজা উইলিয়াম থেকে পেয়েছিলেন সেটা আছে। টিপু সুলতানের গিল্ডেড ডেগার, কর্ন ওয়ালিসের মুর্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজ হাতে লেখা মেনুস্ক্রিপ্ট, পলাশীর যুদ্ধে যে ক্যনন বল ব্যবহৃত হয়েছিল তার একটা নিদর্শন আছে, লর্ড কার্জনের একটা মুর্তি আছে। 

ঘুরার জন্য মন্দ না।

গংগা

জাকারিয়া মসজিদ

সল্ট লেক

১০/১১/২০২১-বিদেশ যামু, খালী কইলেই যাওয়া যায় না। (ফেস বুক)

বিদেশ যামু, খালী কইলেই যাওয়া যায় না। ভিসা পাওয়ার পরে কভিডের কারনে যা ফর্মালিটিজ, তাতেই বিদেশ যাওয়ার খায়েস মিটে যায়। যাই হোক, যেতে তো হবেই, তাই একটা স্বনামধন্য হাসপাতালে কভিড-১৯ টেষ্টে গেলাম, ফর্ম পুরন করলাম, লাইন ধরলাম, টাকা জমা দিলাম, এবার গেলাম স্যাম্পল দেয়ার রুমে। একজন মধ্য বয়সী ভদ্রলোক আর নিম্ন মধ্য বয়সী ভদ্র মহিলা কাচের ওপারে বসে স্যাম্পল নেয়ার জন্য বসে আছেন। আমার জন্য চেয়ার কাচের এপাশে। কোনো অসুবিধা নাই। সম্ভাব্য কভিড কিনা এমন লোকের চেয়ার দূরে থাকাই মংগল। একটু পরে ভদ্রলোক ধীরে ধীরে দুইটা কাঠি বাইর করলেন যার মাথায় স্যাম্পল নেয়ার জন্য তুলার একটা মাথা আছে।

আমি তো কাঠির সাইজ দেইখাই ভয় পাইয়া গেলাম। তিনি আমার গলায় একটা কাঠি ঢোকাইয়া গলা থেকে স্যাম্পল নিলেন। আরেকখান নাকের ভিতর ঢোকাইয়া দিয়া সেখান থেকেও নিলেন। নেওয়ার পর আমি ঊনাকে বললাম-

ভাই, কাঠিটা আরো একটু বড় হইলেই তো একেবারে স্যাম্পল নেয়ার সাথে এন্ডোষ্কোপিকটাও হইয়া যাইতো। ভদ্রলোক হেসে দিয়ে বললেন- ক্যান ভাই, বেশী ভিতরে চলে গেছে? ব্যথা পাইছেন নাকি?

আমিও হেসেই বললাম, নারে ভাই, মজাই লাগছে।

আমি আবার ঊনাকে বললাম- ভাই এখানে তো অনেকেই আসে, যাদের কভিড-১৯ থাকতেও পারে। আপনার কাঠিটা ৬ ফুট লম্বা হইলে কিন্তু এক কামে তিন কাম হইয়া যাইতোঃ (১) এন্ডোষ্কোপি (২) স্যাম্পল নেয়া (৩) আপ্নিও ৬ ফুট দুরুত্তে থেকে নিরাপদে থাকা।

পাশে থাকা ভদ্রমহিলা মনে হয় একট চায়ে চুমুক দিছিলেন। হাসি আর আটকে রাখতে না পেরে মুখে যতুটুকু চা ছিলো, তা বহির্বিসশে চলে এলো।

এর পরের কাহিনীটা আর বললাম না।

৬/১১/২০২১-সেনাকুঞ্জে একটি ভালো মুহুর্ত (ফবু)

অনেকদিন পর ঘরোয়া একটা পরিবেশে আমার ছোটকালের বন্ধু এবং সেনাবাহিনীতে কোর্ষমেট লেঃ জেনারেল ওয়াকার এবং ওর স্ত্রীর সাথে সেনাকুঞ্জে দেখা। নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল শাহীন ইকবাল স্যার এবং প্রাক্তন সেনাপ্রধান লেঃ জেনারেল হারুন অর রশীদ স্যারও এসেছিলেন। অনেক বছর পর তাদের সাথে দেখা। গল্পে গল্পেই কেটে গেছে সময়টা। আমার খুব প্রিয় একজন নেভীর ঊর্ধ্বতন অফিসার (কমোডোর মামুন) এর মেয়ের বিবাহ অনুষ্ঠান ছিলো এদিন। সেনাকুঞ্জে অনেকের অনেক দাওয়াত পেলেও ব্যস্ততার কারনে যাওয়া হচ্ছিলো না অনেকগুলি অনুষ্ঠানে। আজ সময়টা ভালই কেটে গেলো।

ব্যাস্ততা থাকেই। বহুদিন পর আজ সেনাকুঞ্জে কমোডোর মামুনের মেয়ের বিয়েতে দাওয়াতে গিয়ে অনেক পুরানো মুখ গুলির সাথে আবারো দেখা হলো। এই করোনা পরিস্থিতিতে কত যে প্রিয় সিনিয়ার এবং জুনিয়ার মুখগুলিকে হারিয়ে ফেলেছি, ভাবলেও কষ্ট হয় আর নিজের জন্যেও ভাবনা হয়। করোনা অন্তত আমার পুরু জীবনের অনেক পরিকল্পনা উলটে দিয়েছে, প্রাইওরিটি বদলে ফেলেছে, সিডিউলেও অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যাই হোক, যেটা বলছিলাম- এই প্রিয় মুখগুলিকে আল্লাহ এখনো দেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন, বড় আপন মনে হয় দেখলে।

২০০২ সালে আমি যখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে জি এস ও-২ হিসাবে এমটি ডাইরেক্টরেটে কাজ করতাম, তখন আর্মির চীফ ছিলে লেঃ জেনারেল হারুন অর রশীদ স্যার। ২০০২ সালের পরে স্যারের সাথে আর কখনো কোথাও দেখা হয় নাই।

৫/১১/২০২১-প্যারাডাইম শিফট

যখন সাভাবিক কোনো চিন্তাচেতনা কিংবা কার্যক্রম অন্য কোনো নতুন নিয়ম বা চিন্তা চেতনা দ্বারা সম্পন্ন হতে দেখা যায়, তখন এই প্রতিস্থাপিত নতুন পরিবর্তিত চিন্তা চেতনাকেই প্যারাডাইম শিফট বলা যেতে পারে। অন্যঅর্থে যদি বলি- এটা হচ্ছে একটা মডেল, তত্ত্ব, বা দ্রিষ্টিভঙ্গি, ধারনা, কিংবা দৃষ্টান্ত যা প্রকৃত তত্ত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা মডেল থেকে আলাদা। প্যারাডাইমটা আসলেই আসল জিনিষ না, এটা একটা মানষিক ভাবনার সাথে প্রকৃত সত্যের একটা শুধু ছবি। কোনো একটা জিনিষের ব্যাপারে আমরা যা ভাবছি, বা দেখছি এর সাথে সেই জিনিষটার যে রকম প্রকৃত বৈশিষ্ট , এই দুয়ের মাঝেই থাকে প্যারাডাইম তত্তটি। এই প্যারাডাইম দিয়ে মানুষ কোনো একটা ধারনা, চিন্তা চেতনা, কিংবা কোনো একটি জিনিষের ব্যাপারে একটা ধারনা পায়।

কিন্তু প্যারাডাইম শিফট অনেক বড় জটিল। প্যারাডাইম শিফটের মাধ্যমে কোনো একটা তত্ত্ব, চিন্তাচেতনা বা দ্রিষ্টিভঙ্গি পুরুটাই পালটে যায়। একটা উদাহরণ দেই- ধরুন আপনি একটা লোকের চেহাড়া দেখে ভাবলেন যে, সে একটা নিশ্চয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী। আপনার মন তাকে সেভাবেই ট্রিট করছে, সেভাবেই আপনি তাকে ওই খারাপ মানুষদের মধ্যে লিষ্ট করে ফেলেছেন। অনেকপরে যখন জানলেন যে, লোকটা ছিলো খুবই ভদ্র, ভালো ও খুবই অমায়িক এবং পরোপকারী। তখন আপনি অনেক মনোকষ্টে ভোগবেন। আফসোস হবে। এই যে নতুন ভাবনা আপনাকে আগের চিন্তাচেতনা থেকে হটাত করে ১৮০ ডিগ্রী উলটে গিয়ে আরেক নতুন প্যারাডাইমে নিয়ে আসছে, এটাই হলো প্যারাডাইম শিফট।

থমাস কুন তার বিখ্যাত-“দি স্রাইাকচার অফ সায়েন্টিক রেভ্যুলেশন” বই এ প্রথম প্যারাডাইম শিফট শব্দটি চালু করেন। প্যারাডাইম যার যতো বেশি নিখুত, তার প্যারাডাইম শিফট ততো কম। আর যাদের এই প্যারাডাইম কোনো কিছুর ব্যাপারে প্রায় কাছাকাছি থাকে, তারা আসলেই জ্ঞানী এবং বাস্তববাদী। বর্তমান জগতে মানুষের প্যারাডাইম অনেক অনেক সত্যের থেকে বেশী দূরে বিধায়, আমাদের সমাজে গন্ডোগোল বাড়ছে।

আমাদের জন্মের সময়ে আমাদের ব্রেন কিন্তু একদম ফাঁকা থাকে। তারপর আমাদের মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয় স্বজন আমাদের মনের ভেতর (বা পড়ুন ব্রেনের ভেতর) তাদের বিশ্বাস, ভালো লাগা-মন্দ লাগা এইসব ধীরে ধীরে ঢুকাতে থাকেন। একটু বড় হলে স্কুলের শিক্ষকেরা আমাদের ব্রেনের ভেতর নতুন নতুন তথ্য ঢুকাতে থাকেন, সাথে আমাদের আশে পাশের মানুষজনের আচার আচরণ বা ভাবনা, বই পত্রের তথ্য এইসব আমাদের ব্রেনে ঢুকতে থাকে। চারিদিক থেকে আহরণ করা এইসব বিভিন্ন তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকে একরকম ছাপ ফেলে যায়। আমরা আসলে আমাদের আশেপাশের থেকে বিভিন্ন ইনফরমেশন নিয়ে তারপর আমার মতো করে সাজিয়ে আমার ব্রেনে স্থাপন করছি। এইসব ছাপ দিয়েই পরবর্তিতে আমরা লোকভেদে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ডিসিশন নেব।

সাইকোলজিস্টরা এই ছাপকে বলেন ‘প্যারাডাইম’। এই প্যারাডাইমের কি ‘শিফট’ বা পরিবর্তন করানো যায়? বা কখনো সখনো পরিবর্তন করা কি উচিত? 

আপনি যখন আপনার বাসার কাজের মেয়ের বিচার করছেন, আপনি কি তার ‘দৃষ্টিকোণ’ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখেছেন? অথবা আপনার ছেলে বা মেয়ে হঠাৎ করে কেমন খাপছাড়া আচরণ করছে, আপনি কি তার মনের ভেতরটা দেখে নিয়েছেন? আপনারা স্বামী বা স্ত্রী আজকাল এমন আচরণ করছেন কেন? আপনি কি তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা ভেবে দেখেছেন? আপনার বন্ধু আপনাকে আজকাল এভয়েড করছে, কেন করছে তা কি তার মতো করে ভেবে দেখেছেন? আপনি যে লোকটাকে প্রচণ্ড খারাপ বলে মনে করছেন, আসলেও কি সে তা-ই? 

সাইকোলজিস্টরা বলেন, হ্যাঁ, এই প্যারাডাইম শিফট করা যায়, আপনি যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছু বিচার করতে চান, তবে তা পরিবর্তন করাই উচিত। 

প্যারাডাইম শিফটের পরের অবস্থা: অনেক সময়ে মনে হয় যেন ডিমের খোলস ভেঙে মাত্র দুনিয়া দেখছি

The mind that opens to a new idea never returns to its original size.

Albert Einstein

সং গ্রিহীত

পরিচিত এক বড় ভাই বুয়েটে পড়া অবস্থায় ইন্টারে পড়ুয়া এক মেয়েকে টিউশনি করাতো..

ভাই দেখতে হ্যান্ডস্যাম। পড়তো কম্পিউটার সাইন্সে। ছাত্রী তখন তার রঙিন বয়সটা পার করছে। সুতরাং যা হবার তাই হলো।

সে ইনিয়ে বিনিয়ে ভাইকে প্রেম প্রস্তাব দিয়ে বসলো। ভাই এই প্রস্তাবের জবাবে শুধু একটা কথাই বলেছিলো “তুমি সবে মাত্র ইন্টারে পড়। কম্পিউটারটা ঠিকমত চালাতে পারো না। তবুও তোমার একটা লেটেস্ট ল্যাপটপ আর একটা ডেক্সটপ আছে। আমার দুইটা সেমিস্টার পার হয়ে গেল। বাবাকে বলেছি কম্পিউটার সাইন্সে পড়ি। একটা কম্পিউটার দরকার। বাবা দিতে পারেন নাই। বাকিটা তুমি বুঝে নিও। কাল থেকে আর পড়াতে আসবো না” এরপর সেই ছাত্রীর কি হয়েছিলো জানি না।

তবে ভাই আজ বেশ সফল একজন মানুষ।

সেদিন এক বন্ধুর হাতের রান্না খেলাম। খুব সুন্দর রান্না করে। মাংশতে এত ঝাল দিছে যে আমার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছিলো। বন্ধুকে বললাম, ‘এত ঝাল খাস কেন?

“ছোট বেলায় খুব অভাব ছিলো। প্রায়ই শুধু মরিচ দিয়ে ভাত খেতাম। সেই থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে”।

বন্ধুর জবাবটা এমনই ছিলো। আমি চমকে তাকালাম!

অভাব আর পাওয়া না পাওয়ার গল্পগুলো সবাই বুঝতে পারে না; আর বর্তমান জেনারেশনের বেশির ভাগই সব পেয়েছির দল। তাই তাদের কাছে এই কচকচানি বিরক্তিকর মনে হতেই পারে। তবে শুধু এইটুকু বলি- “জীবনটাতে অভাব, টানাপোড়ন, স্ট্রাগল-সংগ্রাম এই জিনিস গুলো বড্ড প্রয়োজন।”

না আমি কারো সামর্থ্য থাকাকে দোষ দিচ্ছি না। সেটা অবশ্যই শুকরিয়া করার বিষয়। তবে কেউ কেউ চাওয়া মাত্র সব পেয়ে জীবনটাকে বিভিন্ন রং এর সাথে গুলিয়ে ফেলে। তাদের কাছে জীবন মানে একটা সেলফি, চেকইন, ডিজে পার্টি, হ্যাং আউট, বারবিকিউ, কিংবা ভার্চুয়াল কিছু অনূভুতি।

তারা কি জানে বাস্তবটা অত সোজা না? যেখানে একটা স্ট্যাটাস কিংবা দুইটা সেলফি দিয়ে সবকিছু আপডেট রাখা যায় না।

বাস্তব জীবনটাকে আপডেট রাখতে হলে ছুটতে হয়। ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়। হোঁচট খেয়ে ব্যাথা পেলে চোখে জল আসে। সেই চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটতে হয়।

-সংগৃহীত

০৯/০৯/২০২১-১০০ বছর পর আগামীকাল

(Purpose of my Life-1)

আজ থেকে ১০০ বছর পর ঠিক এই সময়ে আমাদের যুগের বেশীরভাগ মানুষ আর এই পৃথিবীতেই হয়তো থাকবে না। হয়তো খুবই নগন্য কিছু সৌভাগ্যবান অথবা অন্যঅর্থে দূর্ভাগ্যবানও বলা যেতে পারে, তারা বার্ধক্যের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্ষীনদৃষ্টি আর দূর্বল শরীরে এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে যা কখনোই তারা চায় নাই। যার নাম ‘মৃত্যু’।

এই শতবর্ষে ক্যালেন্ডারের পাতা প্রতিদিন পালটে যাবে, তাঁর সাথে সাথে পালটে যাবে তারিখ, মাস, বছর এবং অতঃপর যুগ। কেউ এটাকে আমরা থামাতে পারিনি, পারবোও না, আর কেউ পারেও নাই। এটাই প্রকৃতি আর এটাই তার সতসিদ্ধ নিয়ম।

এই মুহুর্তে যারা পথেঘাটে আমার পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে, তাদের বেশীর ভাগ মানুষকেই আমি চিনি না। এদের কেউ হয়তো কোটটাই পড়া, কেউ হয়তো ফুটপাতে নোংরা চুলে বসা, আবার কেউ হয়তো আমার মতোই চলমান বা স্থবির। সময়ের পথ ধরে আমরা সবাই পূর্ব পুরুষদের পথ ধরে মহাশ্মশানের সারিসারি পাথরে লুকিয়ে যাবো ঠিক সেইস্থানে যার কথা আমরা আজ ভাবতেও পারি না। সেখানে না আছে কোনো কোট টাই পড়া আধুনিক পোষাক, আর না আছে কোনো আলখেল্লা। অনেকের বেলায় হয়তো সেই নামফলকটাও থাকবে না। কোথায় আছেন তারা, কার জায়গায় আছেন তাঁরও কোনো হদিস পাওয়া যাবে না। আজ যে শরীরটাকে প্রতিদিন নোংরা মনে করে দেশী বিদেশী সাবান শ্যাম্পু দিয়ে সুগন্ধী মাখছি, তখন এই শরীরের মধ্যে হাজারো পোকা মাকড়, কর্দমাক্ত মাটি, নোনা জল, অপরিষ্কার জলের সাথে ভেসে আসা দূর্গন্ধময় আবর্জনায় সারাটা শরীর ভেসে গেলেও তাকে আর সুগন্ধী কেনো, উম্মুক্ত হাত দিয়ে সরানোর মতোও আমাদের কোনো শক্তি থাকবে না। শরীরে মাংশ পচেগলে মিশে যাবে মাটির সাথে। হয়তো কোনো এক কুকুর কিংবা শিয়াল আমাদের শরীরের অবশিষ্ঠ হাড্ডিটি নিয়ে দূরে কোথাও পচে যাওয়া মাংশটুকু খাওয়ার জন্য দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। কার সেই কংকাল, কার সেই হাড্ডি, এই পৃথিবীর কোনো জীবন্ত মানুষের কাছে এর কোনো মুল্য নাই।

যে ঘরটায় আমি সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অবসাদ শরীর নিয়ে মুলায়েম বিছানায় গা হেলিয়ে দিতাম, সেই ঘরটা হয়তো থাকবে অন্য কারো দখলে। কে তারা, কি তার পরিচয়, সেটাও হয়তো আমার জানা হবেনা। যে বাগানটায় আমি প্রায়ই পায়চারী করে আকাশ দেখতাম, গাছগাছালীর মধ্যে উড়ে আসা ভ্রমর কিংবা পোকামাকড় দেখতাম, সেই বাগানের দখল এখন কার দখলে কে জানে। বাগানের গাছগাছালীর পরিচর্যার নামে যে পোকামাকড়গুলিকে আমি বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করতাম, আমি আজ তাদেরই দখলে। যে বাচ্চাদের মুখরীত কোলাহলে আমার ঘর ভরে থাকতো, যাদের আগমনে আমার মন পুলকিত হতো, আজ সেখানে অন্য কেউ মুখরীত হচ্ছে।অথচ  কতই না সাবধানতায় আগলে রেখেছিলাম আমার সেইঘর, সেই লন, কিংবা আমার যতো আয়েশী জিনিষ, আজ সেগুলি আমার কিছুই নয়। আমার সুন্দুরী স্ত্রী যখন তাঁর লাল শাড়িটা পড়ার পর কিংবা আমিই যখন নতুন কোনো একটা ড্রেস পড়ে বারবার আয়নার সামনে গিয়ে কতবার দেখতে চেয়েছি-কেমন লাগে আমাকে দেখতে, আজ সেই আমি বা আমার সেই সুন্দুরী স্ত্রী তাঁর চেহাড়া কেমন দেখায় কাফনের সেই ধবল পোষাকে সেটা দেখার কোনো পায়তারাও আমার নাই। আমি সেই ধবল পোষাকে এতোটাই শংকিত, যা আমি কাউকে বলতেও পারছি না। এখন সেই বৃহৎ আয়নাটার আর কোনো মুল্য নাই আমার কাছে। হয়তো সেখানে অন্য কেউ এখন তাঁর চেহাড়া দেখছে, হয়তো লাল শাড়ির পরিবর্তে নীল বা লাল টাইকোট পড়া কোনো এক পুরুষ একটা ভেষ্ট পড়া ব্যাকব্রাস চুলের মহড়া দিচ্ছে। যে গাড়িটা প্রতিদিন আমাকে মাইলকে মাইল ঠান্ডা কিংবা শীততাপ হাওয়ায় বসিয়ে, মিষ্টি মিষ্টি গান শুনিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে, সেটা আর আমার কোনো প্রয়োজন নাই। না সে আমাকে আর খোজে।

কখন কোথায় কাকে নিয়ে কবে কোথায় কি আনন্দে মেতেছিলাম, সেই ইতিহাস আর কেউ কখনো মনে রাখবে না। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কতটা পথ হেটেছিলাম, আর সেই হাটাপথে আমি কতটুকু ঘাম ঝরিয়ে চূড়ায় উঠে কি তৃপ্তি পেয়ে কি আনন্দে কতটুকু আত্তহারা হয়েছিলাম, সেই তথ্য না কেউ জানবে, না কেউ জানার কোনো আগ্রহ দেখাবে। কার সাথে কি নিয়ে আমার মনোমালিন্য হয়েছিলো, বা কে আমাকে কতটুকু ভালোবেসে কি অবদান রেখেছিলো অথবা কার কোন আগ্রহে আমি কোথায় কি করেছিলাম, কার কারনে আমার অন্তরে জালা উঠেছিলো আর কার কারনে আমার দিন আর রাত একহয়ে গিয়েছিলো, সেই ইতিহাসের কোনো মুল্য আজ বেচে থাকা মানুষগুলির কাছে কোনো অর্থ বহন করেনা। না তাদের কাছেও যাদের জন্য এসব অন্তর্জালা ঘটেছে। নতুন প্রজন্ম নতুন পরিবেশ, নতুন সব কাহিনীতে ভরে থাকবে বর্তমান আর আগামীর প্রজন্ম। সেই পুরাতন পরিবেশের কোনো স্থান থাকবেনা আজকের এই পরিবর্তীত পরিবেশে। হয়তো কোনো এক ছোট বালিকা আমাদের কথা শুনে, অথবা ভালোবেসে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে আমাদের সেই সমাধিতে দাঁড়িয়ে একটু অন্যমনষ্ক হয়ে পুষ্পস্তবক দিতেও পারে কিন্তু সেটা নিছক একটা মুহুর্তের ইমোশনাল কারনে। সবার বেলায় এটা আবার নাও হতে পারে। কিংবা জন্ম জন্মান্তরের শেষে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শেষে আমি এমন করে বিলীন হয়ে যাবো যে, সেই অবুঝ বালিকার পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর একটা বাশী ফুলও নিয়ে আমার সেই সমাধিতে দাঁড়াবে না। কারন আমি তাদের কোনো ইতিহাসের মধ্যেই নাই। চিরতরেই বিলীন।

আজ যে সেলফীটা অনেক যত্ন করে তোলা হয়েছে, হাসিমাখা মুখ, চুলের বাহার, পোষাকের পরিপাটিতা, সবকিছু ধীরে ধীরে সেই শতবর্ষ পরে এমন করে মলিন হয়ে যাবে, হয়তো দেখা যাবে, সেই ছবিটাই পরে আছে এমন এক কোনায় যেখানে থাকে পরিত্যাক্ত কোনো কাগজ বা ময়লার বাক্স। কোনো একদিন সেটা হয়তো অপ্রয়োজনীয় হয়েই বেরিয়ে যাবে আমার সেই শখের ঘরের দরজা পেরিয়ে। আমার প্রতিদিনের নেশা সেই সোস্যাল মিডিয়া, হোয়াটসাপ, ইত্যাদি সবকিছু এক নিঃশ্বাসে বন্ধ হয়ে যাবে আমার সারাদিনের আপডেট আর কাহিনি। যে অর্থের জন্য আমি প্রতিদিন সারাটা সময় শুধু পরিশ্রমই করে গেছি, সেই অর্থ আজ আমার কোনো কাজেই আসবে না। শতবছর পরে তো আমার অর্থে গড়া কোনো এক ইমারতের কোনো একটা ইটের মধ্যেও আমার কোনো নাম বা অস্তিত্ব থাকবে না। হোক সেটা আমার পরিশ্রমে গড়া কিংবা আমার নিজের। সেখানে হাত বদলে বদলে আমার অস্তিত্তের শেষ পেরেগটুকু মেরে সেখানে হয়তো কোনো এক লোকের নাম লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যেটা আজ আমার নামে পরিচিত, শত বছর পর সেটা আমার আর নাই, না সেটা আমার নামেও অহংকার করে।

কি অদ্ভুত না?

শত বছরের হিসাবে যেমন আমি আর নাই, হাজার বছরের হিসাবে তো আমি কখনোই নাই। তারপরেও আজ আমি অনেক ব্যস্ততায় দিন কাটাই আগামিকালের জন্য, প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যের ধন প্রকাশ্যে অথবা গোপনে চুরি করে বিত্তবান হবার পার্থিব জগতে সুখী হবার নিমিত্তে আগামীকালের শান্তির জন্য মগ্ন আমি। অথচ আগামিকালটাই আমার না। এই পৃথিবী আমাকে কখনোই মনে রাখবে না। কারন সে আমাকে ভালোই বাসে নাই। অথচ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম আমার জীবনের থেকেও বেশী। আর এটাই এই পৃথিবী। আমার থেকেও অনেক নামীদামী রাজা, মহারথী সময়ের পথ ধরে বিশ্বকে দাপিয়ে গেছেন, তাদেরকেও এই পৃথিবী মনে রাখে নাই। আসলে এই পৃথিবীর কোনো বর্ষাই আমার না, কোনো শরতই আমার না। এর গাছপালা, এর নীলাকাশ, এর সুগভীর সমুদ্র কিংবা ঘনসবুজ পাহাড় কোনো কিছুই আমার না। আমার ঘরটাও না।

শতবছর পরে, আমি এক অচেনা, নামহীন, অস্তিত্বহীন মানুষ যে আজকের দিনে বহু ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটিয়ে কিছুটা সময় এই নীল আকাশ, ঘন সবুজ পাহাড় অথবা পাখীদের কিচির মিচির শুনেছিলাম। অথচ এই সময়ে এসে কোনো এক সন্ধ্যায় খুব জানতে ইচ্ছে করে-আজ থেকে শত বছর আগে কি ঠিক এখানে কেউ বসেছিলো যেখানে আমি বসে আছি? খুব জানতে ইচ্ছে করে-কে সেই ভাগ্যবান যুবক আজ থেকে ঠিক শতবর্ষ পরে এখানে বসে চা কিংবা কফি পান করছে? হয়তো দেখা হবে সবার সাথে কোনো এক নাম না জানা ময়দানে যার নাম The Final Day.  

এতো কিছুর পরে আজ এই সায়াহ্নে এসে বারবার একটা প্রশ্ন জেগেই রইলো-স্রিষ্টিকর্তা আমাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিশ্ব ভ্রমান্ডে পাঠিয়েছিল?

২০/০৮/২০২১- কফি সরদার ১-আফগানিস্থানের অবস্থা দেখলে যেটা

আফগানিস্থানের অবস্থা দেখলে যেটা মনে হয় সেটা একটা আতংক। নারীরা আতংকে আছে, শিশুরা আতংকে আছে, আতংকে আছে যারা বুড়ো হয়ে গেছেন তারাও। তাহলে আতংকে নাই কারা?

যদি পুরু সিচুয়েশনটা খুব কাছ থেকে দেখা যায়, বুঝা যাবে, যারা গত ২০ বছর যাবত একটা ভিন্ন আদর্শে গড়ে উঠে এক তরফা যে স্বপ্ন দেখেছে ক্ষমতার, তারা আতংকে নাই। কারন আজ তাদের স্বপ্ন সফল হয়েছে। এই যে তরুন যিনি এখন মনের আনন্দে সুখে আছেন, সেইই কি একমাত্র বেচে থাকা তরুন যে স্বপ্নটা দেখেছিলো? নাকি আরো এমন অনেক তরুন ছিলো যারা আজকের এই স্বপ্ন পুরনের পিছনেও ছুটেছিলো?

এক কথায় যদি বলি- আরো অনেক জীবন জড়িত ছিলো যারা প্রতিনিয়ত আজকের দিনের সাফল্যের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু তারা আজ কোথায়? তাদের পরিবার আজ কোথায়? খুব কম মানুষই তাদেরকে মনে রেখেছে। তারা আসলে ছিলো একটা গুটি। এটাও একটা বড় রাজনীতির খেলা। এই রাজনীতির খেলায় কেউ না কেউ এই সব ঝরে যাওয়া তরুনের উপর ভর করেই আজ তারা ক্ষমতার মসন্দে বসেছে। তাদের জন্য হয়তো কিছুক্ষন ‘নীরবতা পালনের” মাধ্যমে কিছুক্ষন গনহারে মনে করা হবে। কিন্তু বেশীরভাগ তরুনেরই কারো নাম মনে রাখার দরকার নাই আজকের শাশকদের। ঠিক এটাই ঘটে যুগে যুগে।

আজকে যে সব রাজনীতিবিদদেরকে কেন্দ্র করে তরুনেরা তাদের শিক্ষা জীবন জলাঞ্জলি দেয়, সময় নষ্ট করে, কিছু ছোট ছোট পদ পাবার জন্য একে অপরের সাথে হানাহানী করে, একটা সময় এরা খুব সহজেই ঝরে যায়। ওদের কেউ মনেও রাখে না।

অথচ যদি সেই হারিয়ে যাওয়া তরুন তাঁর নিজের যোগ্যতায় জ্ঞানে আর শিক্ষায় যদি বড় হতে পারতো, আজ হয়তো সেই তরুনকেই আজকের দিনের রাজনীতিবিদ, কিংবা জনগন খুজে বের করে কোনো না কোনো বড় স্থানে মুল্যায়ন করতো। তাই, নিজেকে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নাই।

আর এটাই হচ্ছে সেই স্বপ্ন যা পুরন করার জন্য দরকার শিক্ষা আর পরিশ্রম। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ বড় কিন্তু সেই দেশকে গড়ে তোলার জন্য আর দলকে সম্রদ্ধ করার জন্য আগে দরকার ভিত্তিকে শক্ত করা। আর সেই ভিত্তি হচ্ছে- ব্যাক্তি। সে যেমন নিজের জন্য শক্তি তেমনি দল বা দেশের জন্য শক্তি।

১৭/০৮/২০২১ রেহালাদের গল্প (রঙ্গে ভরা পাঠক)

(সত্য ঘটনার উপর একটি লিখা)

সাহস ছাড়া মানুষ স্বাধীন হতে পারে না, আর স্বাধীনতা ছাড়া মানুষ জীবিত নয়।

একদমই ভাবী নাই যে আজকে আমার অফিসে এমন কেউ আসবে যাকে আমি একসময় চিনতাম কিন্তু গত ৪০ বছরের মধ্যে আর কখনোই দেখা হয় নাই। ওর নাম ‘রেহালা (এটা একটা ছদ্দনাম, আসল নামটা উল্লেখ করলাম না’)। আমি আর রেহালা একই ক্লাশে পড়তাম সেই প্রাইমারী স্কুলসহ হাইস্কুলে। এরপর আমি হাইস্কুল ছেড়ে অন্য কলেজে চলে আসলাম, আর ওরা গ্রামেই রয়ে গেলো। এতো সুকন্ঠী ছিলো এই রেহালা যে, আমরা ওর গান শুনতাম যেখানে সেখানে, দলবেধে। স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানে কখনো কখনো রেহালার একক সঙ্গীত পর্যন্ত হতো। খালী কন্ঠেও যে গানের একটা মূর্ছনা আছে, সেটা রেহালার গান শুনলে বুঝা যেত। আর যদি রেহালার রূপের কথা বলি, সেটা আরেক বর্ননা। ওর গায়ের রঙ শ্যামলা, একদম ডায়মন্ডের মতো, চোখগুলি বড় বড়, ঠোটে সবসময় একটা হাসি লেগেই থাকতো। রেহালা হাসলে গালে একটা টোল পড়তো। সম্ভবত এই টোল পড়া গালের জন্যই রেহালার হাসিতে একটা আলাদা মাধুর্য ছিলো। বড্ড মিষ্টি ছিলো রেহালার হাসি। ছিমছাম শরীর, আমাদের সাথে গোল্লাছূট, দাড়িয়াবান্দা, মাঝে মাঝে কাবাডিও খেলতো রেহালা। রেহালাকে কাবাডি খেলায় কুকুপাত করলে ইচ্ছামতো মাথায় চুল ধরে ঝাকুনো মারতো। এক সাথে আমরা গ্রামে বড় হয়েছি, পাশাপাশি বাড়ি ছিলো আমাদের। নদীতে ঝাপ দিতাম এক সাথে, আর অন্যের গাছে উঠে পেয়ারা চুরির সময় রেহালা থাকতো লুক আউটম্যানের মতো। যেই না গাছের মালিকের আসার সময় হতো, রেহালা নিরুদ্দেশ, আর আমরা গাছের মধ্যে নিশ্চুপ। বড্ড মজার দিন ছিলো সে ছোটবেলাটা। সেই রেহালা আজ হটাত করেই আমার অফিসে এসে হাজির।

প্রথমে তো আমি রেহালাকে চিনতেই পারিনি। ওর শরীর অনেক মোটা হয়ে গেছে, রেহালা আগেই শ্যামলা ছিলো, আর এখন ওর চেহারা এতো কালো হয়ে গেছে যে, আগের আর সেই ডায়মন্ডের মতো চেহারাটা নাই। মাথায় চুলে পাক ধরেছে। কতই বা বয়স, তারপরেও মনে হচ্ছে বুড়ি হয়ে গেছে রেহালা। কিন্তু হাসলে ওর গালে এখনো টোল পড়ে। চোখ গুলি এখনো ডাগর ডাগর। কন্ঠে আর সেই সুর এখন নাই রেহালার। রেহালা আমার অফিসে একা আসে নাই। ওর সাথে ওর ছোট বোন এসেছে। ওর ছোট বোন কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বল্লো যে, বুজি (মানে আপা) কানে শুনে না। অনেক জোরে জোরে কথা বললে কিছুটা শুনতে পায়। যেহেতু কানে শুনে না, তাই, অন্যের কথাও বুজি ভালোমতো শুনতে না পাওয়ায় কি কথা বলছে কেউ বুঝতে পারে না। তাই সাহাজ্যকারী হিসাবে বুজি কোথাও গেলে আমিই সাথে যাই।

রেহালা আমার অফিসে বসেই কিছুক্ষন যেনো হাপিয়ে উঠেছিলো। রেহালার প্রথম কয়েক মিনিটের কথার অর্থ এমন ছিলো যে, এতোদিন পর রেহালা আমার সাথে দেখা হওয়ায় যেনো সেই ছোট বেলার রাজ্যের গল্পের পশরা নিয়ে হাজির হয়েছে। ওর বলার উচ্ছাস, মুখের অভিব্যক্তি আর অনর্গল কথার মধ্যেই আমি বুঝতে পারছিলাম রেহালা আজ অনেক অনেক খুসি যে, সে আমার সাথে দেখা হয়েছে। কখনো দুই হাত তুলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে, কখনো নিজের অজান্তেই কি যেনো দোয়া দরুদ পাঠ করছে আবার কোনো কারন ছাড়াই হেসে দিচ্ছে। ঝির ঝির বাতাসে তরু পল্লব কিংবা ক্ষেতের দন্ডায়মান ফসলরাজী যেমন হেলিয়া দুলিয়া এদের মনের সুখ প্রকাশ করে, নির্মল নীলাকাশ যেমন তার একখন্ড মেঘের ভেলাকে এদিক থেকে সেদিকে উড়াইয়া লইয়া যায়, রেহেলা তেমনি আমাকে এতো বছর পর পেয়ে যেনো তার সেই দশাই হলো।  রেহালা মাথার বোরখাটা খুলে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলো। রেহালার আগমনে আমার অফিসে কোনরূপ সমারোহ ছিলো না, কিন্তু আজিকার এই মুহুর্তে সমস্ত বিশ্ব ব্যাপারের সর্বাধিনায়িকা যেনো এই রেহালাই হয়ে দাড়াল। রেহালার এমন উচ্ছাসিত আচরনে আমার যেনো বিস্ময়ের কোনো শেষ ছিলো না।

এখানে আরো একটা ব্যাপার আমাকে রেহালা বিস্মিত করলো। রেহালা ছোটবেলায় আমাকে ‘তুই’ বলেই ডাকতো, কিন্তু আজকে খেয়াল করলাম, রেহালা আমাকে আর তুই; বলছে না, কাকা বলে ‘আপনি’ সম্মোধন করছে। গ্রামের সম্পর্কের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে রেহালার সাথে আমার কাকা ভাতিজারই সম্পর্ক। কিন্তু এই সম্পর্ক কিসের ভিত্তিতে সেটা আমার ছোট বেলায়ও জানা ছিলো না, আজ তো সেটা জানার কোনো ইচ্ছাও নাই। আমি রেহালার বাবাকে ‘ভাই’ বলেই ডাকতাম সেটা আমার মনে আছে। আমি রেহালাকে বললাম যে, সে যেনো আমাকে “তুই বা তুমি” করেই বলে।

আমি জানি রেহালার বাবা এবং অন্যান্য ভাই বোনেরা এখনো জীবিত আছে। আর তারা মাঝে মাঝেই আমার অফিসে কিছু না কিছু সাহাজ্য বা পরামর্শের জন্য আসে। কখনো তাদের সাথে আমার দেখা হয়, আবার কখনো কখনো দেখা হয়ও না। ফলে আমি রেহালাকে ওদের ব্যাপারে কোনো প্রশ্নও করতে চাইনি। একমাত্র রেহালার ব্যাপারেই আমার অনেক কিছু জানা ছিলো না। তাই প্রথমেই রেহালাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, রেহালা কেমন আছে। রেহালা কি শুনলো আর কি বুঝলো আমি জানি না কিন্তু রেহালা বলতে থাকে-

কাকা, তোমারে কতবার যে আমি দেখতে চাইছি মনে মনে, আর আফসোস করছি, ইশ যদি মরার আগে তোমার সাথে আমার একবার দেখা হতো। অনেকের কাছেই আমি তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছি, তুমি কই থাকো, কিংবা কোথায় গেলে তোমাকে পাওয়া যাবে ইত্যাদি কিন্তু কেউ আমাকে তোমার আসল ঠিকানাটা দিতে পারে নাই। শুধু এটুকু জানতাম যে, তুমি এই এলাকাতেই বড় ব্যবসা নাকি করো। একবার শুনেছিলাম, তুমি নাকি গ্রামে গেছো। আমি তখন গ্রামেই ছিলাম। কিন্তু আমি লজ্জায় তোমার সাথে দেখা করার সাহস করি নাই। সেটাও আজ থেকে প্রায় বারো বছর আগের কথা। তখন সবেমাত্র আমি আমার জামাইয়েরে নিজের ইচ্ছায় তালাক দিছি। গ্রামে একজন মহিলার সংসার ভেংগেছে, তালাক হয়েছে এটা যে কত বড় কেলেংকারী, সেটা মেয়ে না হলে আসলে কেউ বুঝতে পারে না। 

আমি রেহালাকে জিজ্ঞেস করলাম, স্বামীকে তালাক দিলি কেনো?

রেহালা সহজেই আমার প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছিলো। রেহেলা অনেকক্ষন মাথা নীচু করে কি যেনো ভাবলো। দেখলাম, রেহেলা কাদছে। তাঁর ফুপিয়ে কান্নার একটা শব্দ পেলাম। আমি রেহেলাকে কিছুই বললাম না। রেহেলাকে আমি সময় দিলাম, রেহেলা কাদছে। তারপর টেবিলে রাখা একটি গ্লাস থেকে কয়েক ঢোক পানি গিলে বলতে লাগলো-

কাকা, একটা কথা কি জানেন? বিয়ের সময় খুসি আর ভালোবাসায় এটা প্রমানিত হয় না যে, ভবিষ্যতে এই সুম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বা ঘৃণা আসবে না। মধুর ভালবাসা যেমন একদিন ঘৃণার বিষে রুপান্তরীত হতে পারে, আবার গভীর ঘৃণাও হয়তো সমস্ত বাধা কাটিয়ে পুনরায় চরম ভালোবাসায় পরিনত হতে পারে। কিন্তু কখনো যদি ভালোবাসার মধ্যে ঘৃণা ঢুকে পড়ে, তিক্ততার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে এখন এই সম্পর্ককে শেষ করা উচিত। বুঝে শুনে বেরিয়ে আসা উচিত। যাতে তার আগে কোনো মারাত্তক অঘটন না ঘটে। কিন্তু আফসোস, প্রায়ই তিক্ত সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনা। হোক সেটা সমাজের তথাকথিত লোক লজ্জার ভয়ে অথবা অভিভাবকের অতিরিক্ত চাপের কারনে। তখন এমন হয় যে, সেই দম্পতির যে একদিন ভালোবেসে যারা খুব কাছে এসেছিলো, তারা আজ সম্পর্কের তিক্ততায় একজন আরেকজনকে চাকু, বন্ধুক চালাতে পিছপা হয়না। তখন একজন আরেকজনের প্রান নিতেও দ্বিধাবোধ করেনা অথচ কোনো একদিন তারা তাদেরকে নিজেদের মানুষই ভাবতো। বিয়েটা হয়তো সত্যিই একটা কন্ট্রাক্ট। আর সেই কন্ট্রাক্টের মধ্যে নিহীত থাকে অনেক দায়িত্ব, অনেক কর্ম পরিধি। 

রাহেলার এমন জীবনভিত্তিক কথায় আমিও খুব অবাক হলাম। রাহেলা কি সুন্দর করে তাঁর জীবনের কিছু অভিজ্ঞতার কথা এক নিমিষে বলে গেলো। অনেক পড়াশুনা হয়তো রাহেল করে নাই কিন্তু ওর কথাবার্তা যেনো আমার অন্তরে তীরের মতো বিধে গেলো। আমি রাহেলার কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম।

 রাহেলা বলতে থাকলো-

সেদিন সম্ভবত গুড়িগুড়ি বৃষ্টির দিন ছিলো। আমার স্বামী আমারে বল্লো, চলো, নারায়নগঞ্জ আমার এক বন্ধুর বাসা থেকে বেড়িয়ে আসি। আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসে কিনা তা আমি কখনো বুঝি নাই। বিয়ের পর থেকে যে শ্বশুর বাড়িতে ঢূকেছি, সারাক্ষন স্বামী, সংসার, ছেলে মেয়ে ননদ ননদীনির দায়িত্ব পালন করতে করতেই আমার দিন পার হতো। আর এসব দায়িত্ব পালনে কোথাও কোনো ত্রুটি হলেই আমার উপরে চলতো খড়গের মতো আচরন। আমার স্বামী নেশা করতো। বিয়ের আগে নেশা করতো কিনা জানি না, কিন্তু বিয়ের কদিন পরেই বুঝলাম, সে প্রায় রাতেই নেশা করে ঘরে ফিরে। কি তাঁর দুঃখ, কি তাঁর কষ্ট কখনো সেটা আমি বুঝতে পারি নাই। ফলে, সুযোগ আর কোনো ব্যত্যয় কিংবা তাঁর নেশার জগতে একটু ভাটা পড়লেই কারনে অকারনে আমাকে মারধোর করতো। সেই মারধোরের কারনেই আমি আমার কান হারাই। মার খেতে খেতে কানটা একদিন অকেজোই হয়ে গেলো। গরীব বাবা মা, পয়সাকড়ি নাই, যৌতুক যা দেয়ার সেটা দেয়ার পরেও জামাইয়ের মন ভরে নাই। দিনের পর দিন এই অতিরিক্ত যৌতুক আর টাকার জন্য আমাকে মার খেতে হয়েছে। ঘরে ভালোমতো বাজার হয় না, অথচ কেনো ভালোমতো রান্না হয় না সেটা যেনো আমার অপরাধ। সহ্য করে থেকেছি। মুখ বন্ধ করা ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না। গরীব পিতামাতার সন্তানেরা নাকি “আগুনে পানি দিয়ে” সংসার করে। আমিও তাই করার চেষ্টা করেছি। যাই হোক, যখন আমার জামাই আমাকে বল্লো, চলো এক বন্ধুর বাসায় বেড়াইয়া আসি, ভাবলাম, হয়তো মনটা তাঁর পরিবর্তন হয়েছে। আমারো মনটা ভালো হয়ে গেলো। আনন্দিতই হয়েছিলাম। কারন যে কখনো আমাকে পাশের দোকানে নিয়ে একটা চকলেটও কিনে খাওয়ায় নাই। আজ তার এহেনো অনুরোধে বেশ পুলকিত বোধ করছিলাম। বললাম, চলেন যাই।

আমি আর আমার স্বামী বিকাল ৫টার পরে কাপড় চোপড় পড়ে নারায়নগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমাদের বাড়ি থেকে নারায়নগঞ্জ খুব বেশী দূরে না। ফলে সন্ধ্যার আগেই আমরা ওর বন্ধুর বাসায় চলে এলাম। রাতের খাবার খেয়ে হয়তো আমরা আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে আসবো এটাই ছিলো আমার জানা। আমি আমার ছোট ছেলেকে সাথে নিতে চাইলাম। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে নিতে বারন করলেন। ভাবলাম, ভালোই হবে, আমরা নীরিবিলি দুজনে একসাথে রিক্সায় ঘুরতে পারবো। পাশাপাশি বসে গল্প করতে পারবো। সময়টা ভালোই কাটবে। আমরা যখন তাঁর বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যার একটু আগে। তার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দেখি, বন্ধুর স্ত্রী বাসায় নাই। শুনলাম ছোট বাচ্চাকে নিয়ে নাকি সন্ধ্যার পর আসবে, হয়তো কোথাও কাজে গেছে। চা খেলাম, সাথে কিছু ফলমুলাদি। খারাপ লাগছিলো না। সন্ধার পর হটাত করে আমার স্বামী বাজার থেকে কি জানি আনতে বাইরে যাওয়ার কথা বলে আমাকে একা রেখে চলে গেলেন। একটু ভয় ভয় করছিলো কিন্তু খারাপ কিছু মাথায় আসে নাই। সময় যাচ্ছে, আবারো সময় যাচ্ছে, ঘন্টা, তারপর আরো এক ঘন্টা, কিন্তু আমার স্বামীর ফিরে আসার কোনো লক্ষন দেখলাম না। এদিকে রাত বেশী হয়ে যাচ্ছে, আমি বারবার ওর বন্ধুকে আমার স্বামীর কথা বল্লেও দেখলাম সে খুব একটা কথা আমলে নিচ্ছে না। আমি আমার স্বামীর এই বন্ধুকে আগে থেকে চিনতামও না। রাত প্রায় ১১টার উপরে বেজে গেলো, আমার স্বামীর ফিরে আসার কোনো নামগন্ধও নাই। এবার আমার খুব ভয় করছিলো। জীবনে কোনোদিন শহরেও আসি নাই। আর এখন পুরু একটা অপরিচিত লোকের বাসায় আমি একা। বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা রেখে এসছি। ওদের জন্য ভীষন দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো।

আমি চারিদিকে কান খারা করে সবকিছু খেয়াল করছিলাম। আমার খুব ভয় লাগছিলো। একটু পরে আমি খেয়াল করলাম, এই বাড়িতে কিছু অপরিচিত লোকের আনাগোনা যেনো বেড়ে গেছে। কেউ কেউ বাইরে ফিসফিস করে যেনো কি কি কথাও বলছে। কেউ কেউ আবার আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছেও। বুঝতে পারলাম, তারা হয়তো আমাকে নিয়ে কোনো আলাপ করছে কিন্তু কি আলাপ করছে বুঝতে পারছিলাম না। তখন রাত প্রায় বারোটা বেজে যাচ্ছিলো।

এক সময় ৩০/৩৫ বছর বয়সের একজন পুরুষ আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো- কি নাম তোমার? আসো ওই ঘরে যাই। এই বলে পাশে একটা ঘরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো।

আমি জিজ্ঞেস করলাম- কে আপনি ভাই? আর আমি ওই ঘরেই বা কেনো যাবো? আমার স্বামী কই? সে এখনো আসছে না কেনো? আমার বাড়ি যাওয়া দরকার। আমার বাচ্চারা একা বাসায়। ওরা হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমার কথা শুনে লোকটি পিছনে ফিরে এসে আমাকে সে যা বল্লো, সেটা শুনে তো আমার মাথা খারাপ। আমাকে নাকি আমার স্বামী এখানে দেহ ব্যবসার জন্য বিক্রি করে টাকা নিয়ে চলে গেছে। সে আর ফিরবে না। রাতটা এমনিতেই অন্ধকার ছিলো, লোকটার কথা শুনে এবার যেনো মহাঅন্ধকারের মধ্যে আমাকে আমি মৃত লাশের মতো শ্মশানের মধ্যে দেখতে পেলাম যেখানে আমাকে কিছু জীবন্ত শিয়াল কুকুর তাড়া করছে, অথচ আমার কোনো শক্তি নাই।

চিৎকার করতে লাগলাম, আর বলতে লাগলাম, এটা কি করে সম্ভব? তোমরা আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনো। আমি ওরকম মেয়ে নই যে, তোমরা আমার সাথে এমন আচরন করতে পারো। আমি ভয়ে আরো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে গেলে আমাকে কয়েকজন এসে এমনভাবে জাপটে ধরলো যে, না আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিলো, না আমি কোনোদিকে নড়াচড়া করতে পারছিলাম। কিন্তু আমার চোখ তো আর কোনো কিছুতে বাধা পড়েছিলো না। আমার বাচ্চাদের কথা মনে পড়লো, আমার ছোট ছেলেটা খুব মগা (বোকা), তার কথাই বেশী মনে পড়লো। তার মাত্র ৮ বছর বয়স। সে আমাকে ছাড়া কোথাও যেতে চায় না। ওকে একা ফেলে এসেছি। ছেলেটা মগা হলেও কখনো আমার হাতছাড়া করতো না। ওর মুখটা ভেসে উঠতেই আমার দুচোখ ঝাপ্সা হয়ে আসছিলো। আহা রে বাপ, দেখে যা তোর মা কত অসহায় একটা পরিস্থিতিতে ছটফট করছে। তোর অমানুষ বাবা আমাকে কোথায় ফেলে গেলোরে বাবা।

রেহালা কিছুক্ষন চোখ বুজে থাকল, তার দুচোখের পাশ দিয়ে জলের একটা রেখা যেনো অবিরত জল পড়তেই থাকলো। একটু পর আবার রেহালা বলতে থাকল-

জানো কাকা, কোনো কোনো সময় কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই নাটক তৈরী করা হয়। আমার স্বামীও আমার সাথে ঠিক এমনই একটা ভরষার স্থান তৈরী করেছিলো। আর সেটা ছিলো নিছক একটা নাটক যা আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি। আমি কি এটাই চেয়েছিলাম? আজ দুপুরে যখন সে আমাকে বেড়াতে নিয়ে আসবে বলে জানালো, আমি তো আমার সমস্ত বিশ্বাস নিয়েই তাঁর সাথে অজানা এক বন্ধুর বাড়িতে রওয়ানা হয়েছিলাম। বিকালটা কত সুন্দর ছিলো। চারিদিকের গাছপালা, আশ পাশের দোকানী, মানুষগুলিকে দেখে তো আমার মন অনেক পুলকিতই ছিলো। তাহলে এই হটাত কি গজব আমার উপর আছড়ে পড়লো? আমি কি কখনো আমার স্বামীকে একটিবারের জন্যেও ভালোবাসিনি? কখনো কি আমি ওর বেদনায় কাতর হই নাই? কখনোই কি ও আমাকে স্নেহ কিংবা ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরে নাই? আমি তো আমার জীবনের সবকিছু দিয়ে ওকে ভরষা করেই বাপ মায়ের বাড়ি ছেড়েছিলাম। তাহলে সে এমন নিষ্ঠুর কাজটি কেন আর কিভাবে করতে পারলো? আমি কি ওর বাচ্চার মা নই? আমাকে সে না ভালোবাসুক, ওর বাচ্চাগুলির জন্যেও কি সে আমাকে ছেড়ে দিতে পারতো না? মুখবাধা ঠোট দিয়ে সমস্ত বেদনাগুলি যেনো শুধু গোংগানীর মতোই মনে হচ্ছিলো আমার কাছে। অথচ এই গোংগানির মধ্যে কত যে অস্থিরতা, কত যে আক্ষেপ, কত যে ভালোবাসা আর কষ্ট লুকিয়ে ছিলো তা যেনো আমাকে ঝাপ্টে ধরে রাখা মানুষগুলির কানেই গেলো না।

আমার আল্লাহর কাছে আমি চোখ বন্ধ করে শুধু একটা কথাই প্রার্থনা করলাম, যদি আমি সতীনারী হয়ে থাকি, যদি আমি আমার এক ঈশ্বরকে কখনো কায়মনে ডেকে থাকি, যদি তিনিই হয়ে থাকেন আমার একমাত্র ত্রানকর্তা, যদি আমার প্রভুই হয়ে থাকে সমস্ত বিপদের উদ্ধারকারী, তাহলে আমি আমার সেই একচ্ছত্র প্রভুর কাছে দয়া ভিক্ষা করছি তিনি যেনো আমাকে তাঁর গায়েবী ক্ষমতা দিয়ে এই নরক থেকে বাচিয়ে দেন। হে ঈশ্বর, আমি তোমাকে কখনো দেখিনি, কিন্তু আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছি, তোমার দরবারে আমি প্রতিদিন মাথা নুইয়েছি, তুমি আমাকে বাচিয়ে দাও ঈশ্বর। লোকগুলি ইতিমধ্যে আমার চিৎকার চেচামেচিতে গন্ডোগোল হতে পারে ভেবে, কিংবা আশেপাশের লোকজন কিছু আচ করতে পারে জেনে আমাকে তাদের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলো। আমার চোখ বন্ধ ছিলো, আর আমি গোল হয়ে মাটিতে নিথর দেহে বসেছিলাম। আর আমার চোখ থেকে অনবরত অশ্রু ঝরছিলো।

তারপর কি হয়েছিলো আমি জানি না। কিন্তু ঐ ৩০/৩৫ বছর বয়সের যুবকটি আমাকে ডেকে বল্লো- এদিকে আসো আমার সাথে। কিন্তু কোনো কথা বলবে না। আমি যা বল্বো, সেটাই করবে। আমি বুঝতে পেরেছি তুমি একটা পিশাচের পাল্লায় পড়েছো। সে জানতে চাইলো, আমার সাথে কোনো টাকা পয়সা আছে কিনা। আমি লোকটির চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম, এটাও ভাবছিলাম, সে আমার সাথে এবার অন্য কোনো চাল চালছিলো কিনা। কাউকে বিশ্বাস করা কিন্তু ভুল নয়। তবে চোখ বন্ধ করে কাউকে বিশ্বাস করা একেবারেই ভুল। তাই আমাদের এটা জানা খুব দরকার যে, সামনের মানুষটাকে বিশ্বাস করবো নাকি করবো না।

তাঁর আচার ব্যবহারে আমার কাছে সে রকম মনে হলো না। মনে হলো আসলেই বুঝি তাঁর মাধ্যমে আমার ঈশ্বর আমাকে সাহাজ্য পাঠিয়েছেন। বললাম, আমার কাছে কোনো টাকা পয়সা নাই। সে আমার কানে কানে চুপিসারে শুধু একটা কথাই বল্লো- আসো, আমি তোমাকে এখান থেকে দ্রুত বের করে দেবো। আমি জানি তুমি খারাপ মেয়ে নও। আমিও তোমার কাছে কোনো শরীরের চাহিদায় আসি নাই। আমি এখানকার একজন এজেন্ট মাত্র। আমাকে আর এর বেশী কিছু জিজ্ঞেস করোনা। আর জিজ্ঞেস করলেও আমি সব কিছুই মিথ্যে বল্বো।

রাহেলা এবার একটু থামলো। সামনে রাখা গ্লাস থেকে সে আরো একবার এক ঢোক পানি পান করলো। রাহেলার চোখে মুখে যেনো এখনো সেই অতীতের ভয়টা স্পষ্ট ফুটে উঠছিলো। মাঝে মাঝে সে শিহরিত হয়ে উঠছিলো। বুঝতে পারছিলাম, রাহেলার সেই ভয়টা এখন আবার যেনো নতুন করে তাঁর সামনে জেগে উঠেছে। রাহেলা তাঁর বোরখার একটা আচল দিয়ে মুখটা মুছে নিলো। দেখলাম, রাহেলা একটু একটু ঘেমে গিয়েছে। আমি আমার রুমের এসিটা অন করে দিয়ে বললাম, তারপর?

কাকা, কিভাবে কি হয়ে গেলো আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। লোকটি আমাকে একশত টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বল্লো, শীঘ্রই এখান থেকে এই দরজা দিয়ে বের হয়ে যাও। আমি পাহারায় আছি। এই গোপন দরজাটা দিয়ে আমরা বিপদের সময় পালিয়ে যাই। এটাকে আমরা কোডে বলি- (রেহালা নামটা মনে করতে পারলো না।)

এতো অন্ধকার রাত, তারপর গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, অনিশ্চিত একটা পলায়নে আমি কোথায় যাচ্ছি সেটাও আমি জানি না। এটা কি গরম তেল থেকে লাফিয়ে উনুনে নাকি হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে বাচার তাগিদে নীচে পতন আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তারপরেও আমি সেই দরজা দিয়ে বের হয়েই পাগলের মতো ছুটছিলাম। কোথায় ছুটছিলাম, কোনদিকে ছুটছিলাম আমি নিজেও জানি না। অনেক রাত, রাস্তায় বেশী লোক ছিলো না। আধো আলয় ভরা শহরের রাস্তার কিছু লাইট পোষ্ট এমন করে রাস্তাকে আলকিত করেছিলো যেনো সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে কন এক ভুতুরে পল্লির মতো দেখাচ্ছে। এম্নিতেই মনে আকুন্ঠ ভয়, তারমধ্যে অজানা এক দুসচিন্তা, তার উপরে রাতের এতো ভয়ংকর রুপ। কিছু লোকজন এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখা যাচ্ছিলো বটে কিন্তু যারাই ছিলো তারা আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলো, হয়তো ওরা ভাবছিলো, এতো রাতে আমি দৌড়াচ্ছি কেনো, বা আমি কি পাগল কিনা, অথবা রাতের কোনো চোর কিনা ইত্যাদি। কে কি ভাবলো, আর কে কিভাবে আমার দিকে তাকালো সে ব্যাপারে আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। আমি শুধু দৌড়াচ্ছিলাম আর দৌড়াচ্ছিলাম।  অবশেষে আমি একটা পানবিড়ির দোকানে এসে থামলাম। কয়েকটা উঠতি বয়সের ছেলে ওখানে চা খাচ্ছিলো।

আমি হাপাতে হাপাতে বললাম-

বাবারে আমি খুব বিপদে আছি। আমার স্বামী আমাকে বেড়ানোর নাম করে নিয়ে এসে আমাকে খারাপ জায়গায় বিক্রি করে দিতে এসছিলো। আমি পালিয়ে এসছি। আমার বাড়ি, নগরঘাট (নামটা ছদ্দনাম)। আমি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, এই জায়গাটা আমি চিনিও না, আর এখান থেকে আমি আমার গ্রামের বাড়ি কিভাবে যাবো, তাও আমার জানা নাই। আমার ছোট ছোট বাচ্চারা হয়তো এখন আমার জন্য কান্নাকাটি করছে। তোমরা আমাকে একটু সাহাজ্য করো বাবারা। আমি ওদের এটাও বললাম, আমার কাছে একশত টাকা আছে। আমাকে সাহাজ্য করো তোমরা।

জানো কাকা, আসলে এই দুনিয়ায় নরপিশাচ যেমন আছে, তেমনি ভালো মানুষও আছে। সেদিন আমি বুঝেছিলাম, মানুষ কি আর নরপিশাচ কি। ছেলেগুলি আমার কথা শুনে খুব উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বল্লো- কে সে, কই সে। চলেন আমরা ওকে এখন ধরবো। আমি বললাম, কিছুই দরকার নাই বাবারা। তোমরা শুধু আমাকে আমার বাচ্চাদের কাছে দিয়ে চলো। আমি তোমাদের মায়ের মতো, আমি আজিবন তোমাদের জন্য আমার সেই পরম ঈশ্বরের কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে দোয়া করবো। আমাকে তোমরা আমার সন্তানের কাছে নিয়ে চলো বাবারা। বলেই আমি দোকানের সামনে ভেজা মাতিতে বসে পড়েছিলাম। আমার পায়ে কন শক্তি ছিলো না, আমার সারা গা বৃষ্টির পানিতে ভিজে গিয়েছিল, আমার দম প্রায় বন্দ হয়ে এসছিলো। তারপরেও আমার হৃৎপিণ্ড সচল ছিলো, আমার প্রানটা জীবিত ছিলো।  

ছেলেগুলি আমাকে টেনে তুলে দোকানের ঝাপের ভিতর নিয়ে গেলো। সব সন্তানের চেহাড়া মনে হয় একই। বিশেষ করে মায়েরদের জন্য। ওরা আমাকে এক কাপ গরম চা দিল, মাথা মুছার জন্য কয়েকটা পুরান পেপার দিলো। আমি যেনো একটু স্থির হচ্ছিলাম। ছেলেগুলির মধ্যে দুইজনের দুইটা হুন্ডা (বাইক) ছিলো। চা খাওয়ার পর, ওরা একটা হুন্ডায় আমাকে আর আরেকটা হুন্ডায় ওরা তিনজন উঠে আমার বাসার অতি নিকটে ছেড়ে গেলো। যেখানে ওরা আমাকে ছেড়ে গেলো, সেই জায়গাটা আমি চিনতাম। সেখান থেকে আমি অনায়াসেই আমার বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমি যখন আমার বাড়িতে আসি, তখন রাত বাজে প্রায় আড়াইটা। সব বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে শুধু আমার মগা ছেলেটা বারান্দায় বসে আছে। মশার কামড়ে সে জর্জরীত কিন্তু আমাকে না পেয়ে কখন আমি ফিরবো তারজন্যে একাই বাইরের বারান্দায় বসে আছে। বৃষ্টি হচ্ছিলো, ফোটা ফোটা বৃষ্টিতে ছেলেটার সারা শরীরই প্রায় ভেজা। আমি ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাদলাম। আমার ছেলেটা আমাকে এমন করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাদতে লাগলো যে, আশেপাশের মানুষগুলি যারা ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো তারাও সজাগ পেয়ে ছুটে এলো। আমি শুধু কাদছি, কিন্তু কেনো কাদছি, কিসের কষ্টে কাদছি, সেটা আর কাউকেই বলতে পারি নাই। কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট যে কষ্টের কোনো নাম নাই, যে কষ্টের রুপ কাউকে দেখানো যায় না। আমি শুধু কেদেই যাচ্ছিলাম। কষ্টটা ছিলো আমার মনের অনেক গভীরে।

অনেকেই অনেক প্রশ্ন করছিলো, এতো রাতে আমি কোথা থেকে এলাম, কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরও আমার দিতে ইচ্ছে করছিলো না। আমার স্বামী কই, কিংবা সেতো আমার সাথেই সন্ধ্যার দিকে বেরিয়েছিলো, তার হদিস অনেকেই জানতে চাইলেও আমার কোনো কিছুই বলার মতো অবকাশ তো ছিলোই না বলতেও ইচ্ছে করছিলো না। শুধু আমি আমার সেই এক এবং অদ্বিতীয় আল্লাহকে আকাশের দিকে হাত তুলে বললাম- মহান তুমি, তুমি আছো সর্বদা সবার সাথে, দূর্বলের সাথে, অসহায়ের সাথে। আর তুমি সত্যিই সব পারো মাবুদ। কে বলে ঈশ্বর নাই? যে বলে ঈশ্বর নাই, সে বোকা, আর যিনি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন সে জানে ঈশ্বর কোথায় কিভাবে তার হাত প্রসারিত করে। ঈশ্বর বসবাস করেন সর্বত্র। শ্মশানে, আকাশে, পাহাড়ে, জলে অন্তরীক্ষে, আর থাকেন মনের একেবারে অন্তস্থলে। কান্নায় আমার শুধু বুক ভেসে যাচ্ছিলো।

রাহেলার এমন একটা অতীত জীবনের ইতিহাস শুনে আমি হচকচিয়ে উঠেছিলাম। মহিলাদেরকে আমরা দেবীর সমান তুলনা করে থাকি। কখনো কখনো আমরা তাদেরকে মায়ের আসনে বসিয়ে পুজার বেদী রচনা করে থাকি। কিন্তু আফসোস যে, এটা শুধু মন্দির আর পুজার ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। মহিলাদের সাথে লাগাতার অন্যায় আর অপরাধ ঘটে যাওয়া এটাই প্রমান করে যে, আমাদের সমাজে আমরা যে মহিলাদেরকে দেবী বলি তারা এমন অনেক দানব দ্বারা ঘিরে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে নরক করে তুলেছে। প্রকাশ্যে কোনো মহিলাকে পুড়িয়ে মারা হয়, নির্যাতন করা হয়, ধর্ষন করা হয় অথচ কেউ এগিয়ে আসে না। এই সমাজে কেনো মানুষের রক্ত ততক্ষন পর্যন্ত গরম হয় না যতক্ষন না অবধি কোনো সমস্যা তাদের ঘরের ভিতরে চলে না আসে।  হিন্দু শাস্ত্রে নাকি একটা কথা আছে-ইয়ত্রা নারায়স্ত পুজায়ান্তে রামাতে তাপ্তা দেবতা অর্থাৎ  যেখানে নারির পুজো হয়, সেখানে দেবতা বসবাস করে। এটা আসলে শুধু কথার কথা সত্যিটা অন্যকিছু। কোথাও কখনো কোনো নারীর পুজা হয়নি। না হিন্দু শাস্ত্রে, না আমাদের ধর্মে, না অন্য কোথাও।

রেহালা আবারো বলা শুরু করল-

কাকা-সেই সারারাতে আমি একটুও ঘুমাতে পারি নাই ভয়ে। আমার শরীর ভেংগে গিয়েছিলো, অনেক জ্বর এসছিলো, মাথা ব্যথায় আমার মনে হচ্ছিলো মাথাটাই যেনো আমার সাথে নাই। আমার সেই মগা ছেলেটা সারারাত আমার মাথায় পানি ঢেলে আমার মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর খালী একটা কথাই বলে যাচ্ছিলো-মা আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেও না। তোমাকে ছাড়া আমি ভয় পাই। যতোবার সে আমাকে এই কথাগুলি বলছে, ততোবারই যেনো আমার ভিতরে কে যেনো এক কঠিন হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে আর বলছে- এই স্বাধীনতার মুল্য কি যেখানে খাচায় বন্দি আমি? এই জীবনের কি অর্থ আছে যেখানে আমি কলা, মুলা আর পন্যের মতো অন্যের ইচ্ছায় বিক্রি হয়ে যাই? এই দাম্পত্য জীবনের কি মাহাত্য যেখানে প্রতিদিন আমাকে শুধু অন্যের মন জোগানর জন্য নিজেকে সপে দিতে হয় পিশাচের কাছে? আমার ভিতরে তখন যেনো রাগ, ঘেন্না আর প্রতিশোধের ইচ্ছাতা বেরিয়ে আসছিলো। আমি হিংস্র হয়ে উঠছিলাম।  

রাহেলার এই কথাগুলির সাথে আমি একমত ছিলাম। সত্যি তো। গরীব হওয়া পাপ নয়, উচু সপ্ন দেখাও পাপ নয়, বড় হবার চেষ্টা করাও অপরাধ নয়, কিন্তু অন্য কারো জীবনকে এরুপ নষ্টের দিকে ঠেলে দিয়ে কিংবা অন্যের কোনো আত্মসম্ভরনকে বিকিয়ে দিয়ে কিংবা অন্যের জিনিষকে অন্যায়ভাবে নিজের সার্থের জন্য টাকা রোজগার করা চেষ্টা করা একটা অপরাধ। এই অপরাধের একটা খেসারত আছে। কেউ সাথে সাথে পায়, আর কেউ একটু দেরীতে। কিন্তু প্রাপ্যটা আসেই। লাইফটা কোনো ষ্টক মার্কেটের কোনো শেয়ার নয় যে প্রতিদিন এটার দাম উঠানামা করবে। এটা আসলে সেটা যা একবার উঠে গেলে আর পড়ে না, আবার পড়ে গেলে আর উঠে না।

রাহেলা বলতে থাকে তাঁর সেই রাতের বাকী কথাগুলি।

সকালে আমি উঠানে গেলাম, বসে রইলাম কখন আমার সেই নরপিশাচ স্বামী বাড়িতে আসে। সে হয়তো ইতিমধ্যে জেনে গেছে-আমি আর ঐ নারায়নগঞ্জে নাই। পালিয়েছি। কিছুই খেতে পারলাম না সারাদিন। আর খাওয়ার কিছু ছিলোও না। বমি বমি আসছিলো। দুপুরের দিকে একটু শুয়ে ছিলাম। কিন্তু ঘুমিয়ে ছিলাম না। সেই দুপুরের দিকে আমি ওর পায়ের আওয়াজের সাথে মুখের আওয়াজও শুনলাম। সে ঘরে ঢোকেই চোখ লাল লাল করে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করলো আর আমাকে মেরেই ফেলবে এমন হুংকার দিতে থাকলো। বড় বড় বিস্ফোরণের আগে ছোট ছোট ফুলকীর দিকে নজর দিতে নেই। তাতে বড় বিস্ফোরণের জন্য ব্যাঘাত হয়। আমি একটা শব্দও করলাম না, কোনো উত্তরও করলাম না। কোনো এক শক্তিশালী ঝড়ের আগে যেমন আকাশ থম্থমে হয়ে যায়, গাছপালারা স্থির ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, একটা পাতাও নড়ে না, খালী মাঝে মাঝে গুরুম গুরুম কিছু শুষ্ক ঠাটা পরার মতো আওয়াজ ভেসে আসে কোনো এক দূরবর্তী আকাশ থেকে, ঠিক এমন একটা পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো আমার ঘরে সাথে মনের ভিতরেও। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম এমন একটা সুযোগের জন্য যাতে আমি আমার বাড়ির পুতাটা দিয়ে ওর মাথায় একটা আঘাত করতে পারি। ওর উপর আমার কোনো প্রকার ভালোবাসা নাই, শ্রদ্ধাবোধ নাই। আমি ওকে যেনো আর চিনি না। কোনো এক সময় যে আমি অর বুকে শুয়েছিলাম সেটাও আমার মনে পড়ল না। সে যে আমার সন্তানের বাবা সেটাও আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে নাই। বারবার মনে হয়েছিলো, এদের বেচে থাকার কোনো মানে হয়না। এরা সর্বদা মানুষের শান্তির জন্য হুমকী, সমাজের জন্য হুমকী। পুতাটা আমি রেডিই করেই রেখেছিলাম আগে।

আমার সেই সুযোগটা এক সময় এলো। আমি একটু সময়ও নষ্ট করিনি। একটা আঘাতই আমি ওর মাথায় করেছিলাম। ও অজ্ঞান হয়ে গেলো। একবার ভাবলাম, ওর গলাটা কেটে দেই, আবার ভাবলাম, না, ওকে এমনভাবে মারবো যাতে সারাজীবন আর সোজা হয়ে দাড়াতে না পারে। আমি ইচ্ছে মতো ওর হাটু আর কোমড়ে পুতা দিয়ে আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে থেতলা করে দিয়েছিলাম। আমার কোনো দুঃখ হয় নাই।

আমি রাহেলাকে জিজ্ঞেস করলাম, ও কি মরে গিয়েছিলো?

না কাকা- এই পিচাশটাকে আমি প্রানে একেবারে মেরে ফেলতে চাইনি, আর ও মরেও নাই। কিন্তু ও বেচে গিয়েও আর বেচে থাকবে না এটা আমার বিশ্বাস। তার কয়েকদিন পর আমি ওকে তালাক দিয়ে ওখানেই ছেলেদের সাথে রয়ে গেলাম। কিন্তু বাপের বাড়ি ফিরি নাই। সে এখন পংগু। এটাই ওর বিচার। কিসের সমাজ, কিসের আদালত, কিসের হিউমেনিটি? আমার কোনো আফসোস নাই। একা জীবন অনেক ভালো এসব নরপিশাচের সাথে থাকার চেয়ে। ওকে এভাবে মারার কারনে কেউ আমাকে বাধা দেয় নাই। কারন সবাই জানতো ওর ব্যবহার, আর ওর চরিত্র। তার উপরে যখন সবাই জেনেই গিয়েছিলো গতকাল রাতে সে আমার সাথে কি করেছিলো, ফলে কেউ আমাকে একটু বাধাও দেয় নাই, কোনো থানা পুলিশও করে নাই। ওর নিজের ভাইবোনেরাও এগিয়ে আসে নাই। নরপিশাচেরাও অনেক সময় নরপিশাচের জন্য অনুভুতি প্রকাশ করে না। সে একটা নর পিশাচের থেকেও অধম। একটা কথা বলি কাকা- যে যেমন কর্ম করবে, সে তেমন ফল পাবে এটাই আসল কথা। যে বীজ তুমি আজ বুনবে, সেই বীজের ফল তোমাকেই খেতে হবে। আর সেটা যদি কোনো অপরাধের বীজ হয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে যে গাছে রুপান্তরীত হয়, তার নাম “প্রতিশোধ”। আর প্রতিশোধের গাছের কোনো না হয় আকার, না হয় ছায়া। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে যায় তখন তার পরিনতি তো এটাই হয়। আর ওর সেটাই হয়েছে।

আমি স্বাধীন হয়ে গেলাম। আমার আর কোনো পিছুটান রইলো না। আমার পরিবার ভেংগে গেলো। যখন কোনো পরিবার ভাংগে, তার সাথে ভাংগে সবকিছু যা পরিবারকে বেধে রাখে, আর সেগুলি হচ্ছে বিশ্বাস, আদর, আবেগ, মায়া, ভালোবাসা এবং সবকিছু। একটা পরিবার তৈরী করতে অনেক বছর লেগে যায়, পরিবার আমাদের বেচে থাকার কারন হয়ে দাঁড়ায়, যখন ভাংতে শুরু করে পরিবার তখন সেই পরিবারকে আমরা সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করতে থাকি। যে পরিবারের আনন্দ আমাদের বাচার রশদ হয়ে উঠে, রাগ এবং প্রতারনার যন্ত্রনা সেই পরিবারকে আঘাত দিতেই বাধ্য করে তোলে। মানুষ যখন আপনজনকেই ঘৃণা করতে থাকে। আমার সেই স্বামীর বাড়ির প্রতিটি মানুষকে আর কখনো আপন মনে করতে পারিনি। শুধু আমার সন্তানদের ছাড়া।

অপমান আর অবসাদে অবনত হয়ে একদিন আমি আমার স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করে বাপের বাড়িতে এসে পড়ি। আমার বাবা মা বিয়ের আগে যে পরিমান কাছের ছিলো, স্বামীর বাড়ি থেকে চলে আসার পর তাদেরকে আর আমি ততোটা কাছে পেয়েছি বলে মনে হলো না। আমি তাদেরকেও এ ব্যাপারে খুব একটা দোষারুপ করি না। তারাও দরিদ্র, আমিও। আমরা হয়তো একই বৃন্তে ঝুলে ছিলাম। সময়ের স্রোত ধরে এক সময় বুঝতে পারলাম, আমাকে একাই চলতে হবে। এখন একাই থাকি, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, নামাজ পড়ি, কোরআন পড়ি, তসবিহ গুনি আর ভাবি, জীবন বড় রহস্যময়। হয়তো আমি আজ থাকতাম এমন এক জীবনে বন্ধী যেখানে মানুষ আর মানুষ থাকে না।

ঠিক ওই সময়ে কাকা আপনি গ্রামে গিয়েছিলেন শুনেছিলাম। একবার ভেবেছিলাম, আপনার সাথে একবার দেখা করি, আবার ভাবলাম, আপনি কি না কি ভাবেন কে জানে। লজ্জা এমন এক জিনিষ, যাকে না লুকানো যায়, না কাউকে বুঝানো যায়। ভিতরটা কেউ দেখে না যদিও সত্যিটা ভিতরেই থাকে। একটা কথা আছে না কাকা- আয়নায় চেহারা দেখা যায় কিন্তু কষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু আমি আমার ভিতরের এই কষ্টটা কাউকেই বুঝাতে পারিনি। না আমার বাবাকে, না আমার মাকে, না আমার আশেপাশের কাউকে। কিন্তু ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কোনো ব্যক্তিত্ত বেশীদিন অসহায় থাকে না। আমি যতটুকুই লেখাপড়া করেছিলাম, সেটা দিয়েই কিছু করার চেষ্টা করছিলাম, বিশেষ করে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ানো। কিন্তু খুব একটা এগুতে পারিনি। পরে একটা সেলাই মেশিন নিয়ে মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কিছু কাপড় বানিয়ে নিজের সন্তানের ভরন পোষনের চেষ্টা করেছি। প্রায় এক যুগ পার হয়ে গেছে। আমার মগা ছেলেটা এখনো বিয়ে করে নাই। ভারায় গাড়ী চালায়, যা রোজগার করে তা দিয়াই আমাদের সংসার কোন রকমে চলে যায়।

এতোক্ষন ধরে আমি রেহালার সবগুলি কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। ওর কথার রেশ ধরে আমার সারা শরীর কখনো শিহরিত হয়ে উঠিছিলো, কখনো ভয়ে আবার কখনো রেহালার স্বামীর এহেনো পৈচাশিক কাজের উপর রাগে। সমুদ্রে ভাসমান কোনো নাবিকের কাছে দূরের কোনো তটভুমি যেমন একটা আকর্ষনের বিষয় হয়ে দাড়ায়, রেহালার জীবনে তেমন কোনো কিছুর উপর আকর্ষন আর বাকী আছে বলে আমার মনে হলো না। রেহালা আমার সম্মুক্ষে বসে আমার বিস্তর প্রকান্ড কাচের জানালা দিয়া দূরের নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বটে কিন্তু ওই নীল শান্ত আকাশের মতো রেহালার অন্তরে তেমন হয়তো শান্তির নীরবতা বিরাজ করছে না। হয়তো ওর মাথা, বুক আর অন্তর একসাথে এমন এক ঘূর্নীঝড়ের মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছিল যার আভাষ ওর চোখের নোনাজলেই বুঝা যাচ্ছে। আমি রেহালাকে আর কোন প্রশ্ন করলাম না। কিছুক্ষন পর রেহালা একটু শান্ত হলে আবার বলতে শুরু করলো-

কাকা-এখন অনেক বয়স হয়ে গেছে। আমার সারা শরীর যেনো রোগের একটা আবাসভুমিতে তৈরী হয়েছে। ডায়াবেটিস, প্রেসার, কানের, চোখের, হার্টে কোনো রোগের যেনো কমতি নাই। মগা ছেলেটা যা কামায়, তাতে হয়তো আমাদের দুজনের খাবার জুটে যায় কিন্তু আমার এই বাড়তি রোগের খরচ, কিংবা পর্বনের কোনো ব্যয়ভার চলে না। রোগটাকে এখন আমার নিত্যসংগী মনে করে কখনো সেই ঈশ্বরের কাছে রোগ মুক্তির দোয়া করি, আর যদি অতিরিক্ত খারাপের দিকে যাই, তখন এই আমার বোনেরা, কিংবা পাড়াপ্রতিবেশীরা হয়তো কিছু দান করে, তাঁর থেকেই কিছু পথ্য কিনে খাই। আগুনের ফুলকী যেমন কীট পতঙ্গকে দূরের আকাশের নক্ষত্র রাজীর লোভ দেখিয়ে আকর্ষন করে, অতঃপর তারা মৃত্যুবরন করে, আমি এখন অদৃশ্য ঈশ্বরের কাছে একটাই প্রার্থনা করি যেনো মরনের লোভ দেখিয়ে ঈশ্বর আমাকে দ্রুত এই জীবনের যবনীপাত করান। সেই ছোটবেলায় কত স্বপ্ন দেখেছি সংসার হবে, স্বপ্ন দেখেছি স্বামীর বুকে মাথা রেখে কত গান শুনাবো, বাচ্চাদের কলকাকলীতে আমার উঠোন ভরে উঠবে আরো কতকি? অথচ আজ শুধু এইটুকুই মনে হয়, জীবন বড্ড জটিল।  এখন শুধু মৃত্যুর ক্ষন ছাড়া আমার যেনো কোনো কিছুর জন্যই আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নাই। গভীর রাতে একা ঘুমহীন বিছানায় বসে মাঝে মাঝে জীবনের হিসাব মিলাতে চেষ্টা করি, আখাংকা আর কল্পনার রাজ্যে কত মায়াজাল তৈরী করিয়া কত মায়াপুরীর হিসাব করেছিলাম, কিন্তু আজ প্রায়ই মনে হয় যে, আমার জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত, জীবন যৌবন, সুখ দুঃখ, একাল সেকাল সবকিছুই মোমবাতির মতো পুড়িয়া শেষ প্রান্তে এসে হাজির হয়েছে। আমার এই ক্লান্তি, কষ্ট, গ্লানি কিংবা প্রানক্ষয়কর দাহ হয়তো আর বেশিদিন থাকবে না।

আমি রেহালার সাথে আর অনেক কথা বাড়াই না। আমি যাহা বুঝবার সব বুঝে গিয়েছিলাম। শুধু বারবার একটা কথাই ভাবতেছিলাম, আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে আমি আর রেহালা একসাথে একই স্কুলে পড়াশুনা করেছি। তখন রেহালা যে স্বপ্ন দেখেছিলো, তার ভবিষ্যৎ জীবনের, তার সংসার জীবনের, আজ এতো বছর পর এসে রেহালা দেখতে পেলো তার সেই সপ্নগুলি আসলে সব সপ্নই থেকে গেছে। খুব কষ্ট লাগতেছিলো আমার। আমাদের এই সমাজ, আমাদের নীতি নির্ধারকেরা আজো প্রতিটা মেয়েকে বোঝাই মনে করে। সবাই মনে করে-তাদের লেখাপড়ার দরকার নাই, তাদের প্রেমের কোনো মুল্য নাই, তাদের বাকস্বাধীনতা নাই, তাদের নিজস্ব কোনো পছন্দ অপছন্দও নাই। ওরা জন্মায় শুধু কাউকে নিজের অনিচ্ছায়ই হোক আর সেচ্ছাতেই হোক বিয়ে করা। আর সেই বিয়ে টিকার দায়িত্ব শুধু তাদের। ওরা জামাইয়ের মার খাবে, স্বামীরা ওদেরকে নিজের থালা-কলসীর মতো কিছুদিন ব্যবহার করে আবার অন্য কোথাও বিক্রি করে দিবে। অথবা কোনো দায়িত্ব না নিয়াই অন্য আরেকজনের সাথে ফষ্টিনষ্টি কিংবা ঘর করবে। আর মাঝখানের সময়টায় ওরা বছর বছর বাচ্চার জন্ম দিবে। এটাই যেনো ওদের একমাত্র কাজ। রেহালা আমার সামনে বসে আছে বটে কিন্তু ওর দৃষ্টি আমার জানালার বাইরে অনেক দূরের আকাশে। তার মনে কি চলতেছে আমি জানি না, তবে সেই দূরের আকাশে কোনো নতুন স্বপ্ন যে নাই, সেটা স্পষ্ট বুঝা যায়। সে তার এই জীবনের সুখ কিংবা আদর আর প্রত্যাশা করে না। শুধু সময় গুনছে কবে মৃত্যু তাকে লইয়া যাবে। আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই, আমরা আজীবন বাচতে চাই, কেউ এই দুনিয়া ছেড়ে মৃত্যুর মতো একটা অজানা জীবনে যেতে চায় না। অথচ রেহালার ভাষায়, সে প্রতিদিন নামাজ পড়ে সেই স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করে যেনো মৃত্যু এসে রেহালাকে নিয়ে যায়।

অনেকক্ষন আমার অফিসে একটা নীরবতা চলছিলো। রেহালার জীবনের কাহিনী বলবার পর যেন সে নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার ভাবনা ভুল প্রমান করে রেহালা আবারো বলিতে থাকে-

-কাকা, আজ অনেক কষ্টের কথা আপনাকে বলতে পেরে নিজেকে অনেক অনেক হালকা মনে হচ্ছে। আমি জানি না, কেনো আমাদের মতো মানুষের এই পৃথিবীতে জন্ম হয়। মা হিসাবে আমরা যেমন অসফল, স্ত্রী হিসাবেও তেমনি অসফল। এই সমাজ আমাদেরকে না কখনো মুল্যায়ন করে, না নিজের ঘরের পিতা মাতা আমাদেরকে বুকে আগলে ধরে রাখে। আমরা যেনো সমাজের সেই প্রানিগুলির মতো, যারা একবার জন্ম নিয়াছে বলে শুধু মৃত্যু না আসা অবধি দেহত্যাগ করে না আবার নিজেরাও নিজেকে শেষ করতে পারে না কারন আত্তহত্যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। অথচ দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অবহেলায় কচূরীপানার মতো আমরা এককুল হতে আরেককূলে শুধু ভেসেই যাই, না কেউ আমাদেরকে তুতুলে নেয়, না কেউ আশ্রয় দেয়। তারপরেও আমরা বেচে থাকি। এখন সত্যিই আর বাচতে ইচ্ছা করে না। আজ আপনার সাথে দেখা হলো-মনটা বড় ভালো লাগলো। মনেই হয় না এর মধ্যে ৪০ বছর পার করে দিয়েছি। মনে হচ্ছে, এই তো সেদিনের কথা। সেই শীতের দিনে জড়োসড়ো হয়ে গায়ের পথ ধরে হেটে বেড়াইতাম, স্কুলে গিয়া একসাথে কত মজা করতাম, বৃষ্টির দিনে ভিজতাম, আজ মনে হয়-আহা যদি আরো একবার আবার সেই পুরান দিনে ফিরে যেতে পারতাম। আহা যদি এই পিশাচের মতো কেউ আমার জীবনে না আসতো, আহা-যদি এমন কেউ আসতো যে আমার সেই গানগুলি শুনে শুনে পাশে বসে হাততালি দিতো। আসলে জীবন মনে হয় এমনই, আবার কেনো জানি মনে হয়, সব জীবন এমন নয়। তাহলে আমাদের জীবন এমন কেনো?

আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু রেহালাকে বললাম, পৃথিবীটা এমন নয় যা দেখছিস। এই পৃথিবী অনেক অনেক সুন্দর। হয়তো ভুল সময় ভুল মানুষের পাশে গিয়ে ভুলভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছিলি। আর সেই ভুল মানুষটাই তোকে ভুল পথের দিকে তোর নিজের অজান্তে নিয়ে গিয়েছিলো। ভুলে যা সব। বললাম, আজ থেকে বহু বছর আগের আমার গ্রামের একমাত্র মেয়ে খেলার সাথী তুই। তোকে দেখেও আমি অনেক খুশি হয়েছি রেহালা। আসিস যখন মন খারাপ হয়, যখন কোনো রাস্তা না দেখা যায়। আমি তোর কাকাই বলিস আর বন্ধুই বলিস, আসিস। রেহালা তার শাড়ির আচলটা টেনে চোখ দুটি মুছে বের হবার উপক্রম হলো। যাওয়ার সময় হটাতই রেহালা আমার পায়ে সালাম করার জন্য উদ্যত হলে আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, তুই আমার শুধু বন্ধু না রেহালা, তুই আমার বোনও। আমার কি হলো জানি না, আমার চোখটাও কেনো জানি ঝাপ্সা হয়ে গেলো।

রেহালা তার চোখ মুছতে মুছতে বের হয়ে গেলো। আমি শুধু ওর যাওয়াটা দেখলাম। আর ভাবিলাম,

প্রতিটা মেয়ে মানুষের উচিত নিজের পায়ের উপর দাঁড়ানো। যতোদিন তারা নিজেরা সাবলম্বি না হবে, তারা আজীবন ভুল সময়ে ভুল মানুষের কাছেই হস্তান্তর হতে থাকবে। হয়তো কতিপয় কিছু অধীক ভাগ্যবান মেয়েরা ছাড়া যাদের সংখ্যা অতীব নগন্য। দোয়া করি-রেহালারা ভালো থাকুক। আর দুঃখ হয় সেইসব বাবা মায়ের জন্য যারা নিজের মেয়ে সন্তানকে তাদের ছেলে সন্তানের মতো একই সাড়িতে ভাবেননা। অথচ দুটাই তাদের সন্তান। কে জানে, সেই বাবা মায়েরও কোনো একদিন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যখন এইসব মেয়েদের ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার পথ খোলা হয়তো থাকবে না।

আমি রাহেলার জন্য একটা টাকা প্রতিমাসের জন্য বরাদ্ধ করলাম যাতে অন্তত রাহেলা তার ঔষধগুলি কিনে খেতে পারে। রাহেলার জন্য হয়তো এটা একটা অনেক বড় সাহাজ্য হবে। রাহেলা এখন প্রায় প্রতিমাসেই আমার একাউন্ট অফিসারের কাছ হতে সেই টাকাটা নিতে আসে। কখনো ওর সাথে আমার দেখা হয়, কখনো দেখা হয় না। তারপরেও আমি শান্তি পাই যে, রেহালারা এখনো বেচে আছে।

রেহালার স্বামী এখন পুরুই পংগু। কোনো রকমে ভিক্ষা করে জীবন চালায়। তার পাশে এখন আর কোনো রেহালারা নাই, না আছে তার কোনো মগা সন্তান।

(লেখাটা সুফিয়ার নামে উতসর্গ করা)

১২/০৮/২০২১-মেধা পাচার নাকি মেধা বিদায়?

গতকাল আমার ছোট মেয়েকে বিদায় জানাতে গিয়েছিলাম এয়ারপোর্টে। কভিডের কারনে এয়ারপোর্টে ঢোকা প্রায় নিষিদ্ধের মতো কিন্তু মেয়ে একা যাচ্ছে, অনেক দূর, ভয় পাচ্ছিলাম, ফলে যেভাবেই হোক পুরু পরিবারের জন্য প্রায় বেশ অনেকগুলি”পাস” জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমি ওইসব বন্ধু আর সহযোগীদেরকে আন্তরীক ধন্যবাদ জানাই যারা আমাকে আর আমার পরিবারকে এয়ারপোর্টে প্রবেশের জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন।

এয়ারপোর্টে যাওয়ার পর আমি যে জিনিষটা খুবই খেয়াল করলাম হলো, প্রায় ৮০% পেসেঞ্জারদের বয়স ১৬ থেকে ২২ এর মধ্যে। খুব কম লোক দেখেছি যারা একটু বয়স্ক। আমি কয়েকজন ইয়াং পেসেঞ্জারের সাথে খুব নিরিবিলি কথা বলেছি- তাদের প্রত্যেকেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, কেউ চাকুরী নিয়ে, কেউ স্কলারশীপ নিয়ে কোনো ইউনিভার্সিটিতে, কেউ আবার ১০০% স্কলারশীপে, কেউ আবার নিজেদের খরচে। তাদের সবার ভাষ্যই যেনো একটা- ভয়ংকর দিন সামনে আমাদের জন্য। এ দেশে কোনো ভবিষ্যৎ নাই। এর থেকে যে কোনো ভিন্ন দেশে অন্তত কিছু একটা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। তাই আগেই চলে যাচ্ছি। 

ব্যাপারটা আতংকের। দেশ কি তাহলে মেধাশুন্য হয়ে যাচ্ছে? কারা আমাদের ভবিষ্যৎ তাহলে? যারা এদেরকে পাবে, তারা কি লোড নিচ্ছে নাকি আমরা এদেরকে ছেড়ে দিয়ে লোডমুক্ত হচ্ছি? যারা ওদেরকে সুযোগ দিয়ে এই করোনাকালেও নিয়ে যাচ্ছে, তাদের কি মনে হয় এরা তাদের দেশের জন্য বাড়িতি লোড নিচ্ছে আর আমরা মনে করছি, যাক হাফ ছেড়ে বাচা গেলো!!

আজ টিভির একটা  টক শোতে দেখলাম, ৯৬% ছেলেমেয়েরা দেশের ভিতর অনিশ্চয়তার কারনে দেশ ছাড়ছে। আসলেই একটা ভয়ানক ভাববার বিষয়।

১১/ ০৮/২০২১-রক্তক্ষরন

শরীরের কোনো কাটাছেড়া, কোনো বাহ্যিক জখম চোখে দেখা যায়, ক্ষুধা হলে খাবারের অভাবে পেট গুর গুর করে, কিংবা জ্বর সর্দি, কাশি কিংবা মাথা ব্যথা হলে তার সিম্পটম অনায়াসেই বুঝা যায় কিন্তু অন্তরের জখম কি কখনো চোখে পড়ে? অন্তরে কি কখনো জখম হয় আদৌ? আর এই অন্তরটাই বা শরীরের কোন অংগ? এটা কি এমন কোনো জিনিষ যা মাংশ বা হাড় কিংবা এমন কিছু দিয়ে এর গঠন কাঠামো?

সমস্তটা হৃদপিণ্ড তার স্টকে থাকা রক্ত যখন শরীরের সর্বত্র তার নিয়মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সেটাকে বলে সুস্থ্যতা। কিন্তু সেই একই রক্ত যখন তার নিয়মের বাইরে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে সেটাকে হয়তো বলে দূর্ঘটনা। কিন্তু একই ধমনী, একই শিরায় যখন সেই একই রক্ত একই নিয়মে প্রবাহ হয়, তারপরেও মনে হয় কোথায় যেনো একটা ক্ষরন হচ্ছে, তাহলে এটাকে কি বলে? হয়তো সাহিত্যিকরা বলবেন- এটাকে বলে কষ্ট, এটা হয়তো বেদনা কিংবা হয়তো কেউ বলবেন এটা একটা খারাপ অনুভুতি। তাহলে এই রক্তক্ষরন হয় কোথায়? শিরায়? ধমনীতে? শরীরের কোনো অংগে? আর এই ক্ষরণ হলে কি হয়? আসলে রক্তক্ষরনটা হয় অনুভুতির ভিতরে, ওই সেই অন্তরে যার উপস্থিতি আজো কেউ খুজে পায়নি, বা হাত দিয়ে ধরে দেখেনি। একেবারে ভিতরে, অদৃশ্য। অথচ অনুভুতির এই ভিতরটা কেউ দেখে না। বাইরের চোখে যা দেখা যায়, সেটা ভিতরের অবস্থা না। সত্যটা সবসময় থাকে ভিতরে। আর এই সত্যকে মানুষের কোনো অংগ, না তার হাত, না তার পা, না তার শরীর প্রকাশ করে। এই অদেখা রক্তক্ষরনে হাত অবশ হয়ে যায় না, পা নিস্তব্ধ হয়ে উঠেনা বা কান বধির হয় না। শুধু চোখ সেটাকে লুকাতে পারে না বলে অনবরত সেই নোনা জল দিয়েই হয়তো বলতে থাকে, কোথাও কিছু জ্বলছে, কোথাও কিছু পুড়ছে, কোথাও কিছু ক্ষরন হচ্ছে। না ঠান্দা জল, না কোনো বেদনানাশক ঔষধ না কোনো থেরাপি এই ক্ষরনকে থামাতে পারে। কিন্তু যার চোখ নাই, তারও কি এই ক্ষরন হয়? হ্যা, হয়। তারও এই রক্তক্ষরন হয়। হয়তো তার ভাষা একটু ভিন্ন, স্থিরচিত্তে ক্রয়াগত নীরবতা। তাহলে এই রক্তক্ষরনের সময়কালটা কত? বা কখন এর জন্ম আর কখন তার ইতি? বলা বড্ড মুষ্কিল।

যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আরো বেশী করে দুশ্চিন্তায় ভোগায় যখন এটা জানা যায় যে, যে মানুষটি চলে গেছে সে সবদিক থেকে অশান্তিতেই ছিলো। এমন অবস্থায় এমনটাই বারবার মনে প্রশ্ন আসে, যে, জীবনের কাছে হেরে যাওয়া মানুষটি আবার মনের কষ্টে কোনো ভুল পদক্ষেপ না নিয়ে বসে। শুরু হয় রক্ত ক্ষরনের প্রক্রিয়া। এই ক্ষরণ অজানা আতংকের।

আবার যখন কোনো মানুষ সবার সামনে থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে চিরতরে ভিন্ন জগতে চলে যায়, তখন দুসচিন্তার প্রকারটা হয়তো অন্য রকমের কিন্তু তারপরেও রক্তক্ষরন হয়। আর সেই ক্ষরণ কখনো ভরষার অভাবের অনুভুতি কিংবা মাথার উপরে থাকা কোনো বট বৃক্ষের অথবা কখনো এটা হয় নিঃসঙ্গতার।

কিন্তু জেনে শুনে, প্রকাশ্যে সবার সামনে দিয়ে যখন বড় কোনো সাফল্যের উদ্দেশ্যে নিজের অতীব প্রিয়জন জীবন্ত চলে যায়, হাসিখুশির অন্তরালে তখন যেনো চলতে থাকে মেঘ-বৃষ্টির খেলা। চলতে থাকে দোদুল্যমান এক অনুভুতি। হাসিখুশি চোখের পাতায়ও তখন দেখা যায় সেই রক্তক্ষরনের এক বেদনাময় কষ্টের অনুভুতি। এই রক্তক্ষরনের প্রধান কারন হয়তো শুন্যতা। তখন যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন, সব কিছু ঠিক আগের মতোই আছে, শুধু নাই সেখানে যে বিচরন করতো সেই মানুষটা। তার ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, ওই তো মানুষতা গতকাল ও ওখানে বসেছিল, ওই যে কাপড় টা বাতাসে ঝুলছে, সেটা এখনো সেখানেই ঝুলছে, অথচ সেই মানুষতা আজ ঠিক ওইখানে নাই। আছে অন্য কোথাও, চোখের দৃষ্টির অনেক বাইরে। আর এই দোদুল্যমান অনুভুতি নিয়েই আমি বিদায় জানাতে এসেছি আমার অতীব আদরের ছোট মেয়েকে আজ। বুঝতে পারছি, কোথায় যেনো পূরছে আমার অন্তর, কোথায় যেনো জ্বলছে আমার অনুভুতির সমস্ত স্নায়ুগুলি।

আমি যুদ্ধ দেখেছি, যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছি, আগুনে পূড়ে যাওয়া নগরী দেখেছি, ঘনকালো নির্জন রাতে কোনো পাহাড়ি রাস্তা ধরে একা একা হেটে পার হয়েছি। ভয় আমাকে কাবু করেনি। অথচ আজকে আমি এই শান্ত সুষ্ঠ পরিবেশে নির্মল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে যখন আমার ছোট মেয়েকে সুদুর আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে বিদায় জানাচ্ছি, তখন সারাক্ষন রক্তক্ষরনের পাশাপাশি একটা ভয়, একটা আতংক, একটা শুন্যতার অনুভুতিতে ভোগছি। কেনো জানি মনে হয়, আমার ভয় লাগছে। অথচ আমার শরীর সুস্থ্য, আমার ক্ষুধা নাই, তারপরেও কেনো জানি মনে হচ্ছে- কি যেনো আমি ভালো নাই।

আমার মেয়েটা চলে গেলো আজ। বায়না ধরেছিলো-আমেরিকা ছাড়া সে আর কোথাও পড়াশুনা করবে না। সন্তানরা যখন বায়না করে, জেদ ধরে, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা বাবা সেটাকে পুর্ন করার জন্য দায়িত্ত পালন করেন। আমিও সেই বায়নাটা হয়তো পুরন করছি আজ। কিন্তু সেই জিদ বা বায়না আদৌ ঠিক কিনা বা বায়নাটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা অনেক ক্ষেত্রে আমরা মা বাবা সেটা বিচার করি না। সন্তান কষ্টে থাকুক বা দুঃখ নিয়ে বড় হোক অথবা তার নির্দিষ্ট পথ থেকে হারিয়ে যাক, তাতে মা বাবা এক মুহুর্ত পর্যন্তও শান্তিতে থাকে না। মা বাবা সবসময় তার সন্তানদেরকে সবচেয়ে ভালোটাই দেয়ার স্বপ্ন দেখে। আসলে সন্তান যতো বড়ই হোক আর বৃদ্ধ, মা বাবার ভুমিকা থেকে আজ অবধি কোনো মা বাবা অবসর গ্রহন করেন নাই। কিন্তু তাদেরও কিছু আশা থাকে, স্বপ্ন থাকে এই সন্তানদের কাছে। আমরা বাবা মায়েরা সন্তানদের কাধে শুধু স্কুল ব্যাগ নয়, বরং মা বাবার অনেক আশা ইচ্ছাও ঝুলিয়ে দেই। হয়তো এটাও সেই রকমের একটা বায়না থেকে আমার দায়িত্ব পালনের পর্ব যেখানে একটা সফল, উজ্জ্বল আর সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য আমি অন্তরের রক্তক্ষরনের মতো বেদনাটাও ধারন করছি। আমি জানি, সব সাফল্যের একটা মুল্য থাকে যেটা কাছের মানুষকেই জোগাতে হয়। আর হয়তো এটা সেটাই।

তবে একটা কথা ঠিক যে, আজকের এই অদেখা কষ্টের রক্তক্ষরনের ইতি বা যবনিকা হয় তখন যখন যে মানুষটির জন্য রক্তক্ষরনের জন্ম, সে যখন জীবনের পাহাড় বেয়ে জয় করে সামনে দাঁড়ায়। তখন আজকের দিনের রক্তক্ষরনের সাথে মিশ্রিত হাসিটায় শুধু ভেসে থাকে হাসিটাই। যেমন পানি আর তেলের মিশ্রনে শুধু ভেসে থাকে পানির চেয়ে দামী সেই তেল। তখনো এই চোখ জলে ভিজে উঠে হয়তো কিন্তু তখন চোখ এটা জানান দেয় না, কোথায় যেনো কি পূরছে, কি যেনো জ্বলছে বরং প্রতিটি উচ্ছল হাসিতে ভরে উঠে আনন্দ ধারা।

আমি সেই প্রত্যাশা নিয়েই আজকের এই রক্ত ক্ষরনের অধ্যায় যাকে আমি যেই নামেই ডাকি না কেনো, বেদনা, শুন্যতা কিংবা আতংক তা শুধু নীরবে মেনে নিয়েই রক্ত ক্ষরনের সেই পোড়া যন্ত্রনাকে বরন করছি। তোমরা সব সময় ঈশ্বরকে মনে রেখো, নীতির পথে থেকে আর মানবতার থেকে বড় কোনো সম্পদ নাই এটা জেনে সর্বদা সেই মানবিক গুনেই যেনো থাকো, এই দোয়া রইলো।

শরতচন্দ্রের সেই বিখ্যাত উক্তিটাই আজ তোমাদেরকে বলি- ভালোবাসা শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। ‘যেতে নাহি দিবো’ মন বল্লেও বাধা দেয়ার কোনো শক্তি তখন থাকে না, না বাধা দিতে কোনো পথ আগলে রাখি, বরং মনের ভিতরের ‘যেতে নাহি দেবো জেনেও যাওয়ার সব পথ খুলে দেই সেই সাফল্যের জন্য, যা আমার চোখের মনির ভিতরে খেলা করে সারাক্ষন।

কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। হয়তো অচিরেই আমিও সেই পরিবর্তনের মধ্যে নিজেকে সামলে নেবো।

ওর ব্যাপারেও এই পরিবর্তন হতে পারে, ওদের ও হয়তো অনেক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু যা হারিয়ে গেছে, সেটা তো আর ফিরে আসবে না। সবাই তখন (যারা দায়িত্তের ব্যাপারেও উদাসীন ছিলো) সবাই কাজেই মন দেয়। অথচ এই মন দেওয়াটা দরকার ছিলো তখন যখন হারিয়ে যায় নাই কিছুই। কি করত্রব্য, কি দায়িত্ত, তখন বুঝা যায় কি করা হয় নাই বা কি করা উচিত ছিলো।

জীবনের পাহাড় কারো পক্ষেই জয় করা সহজ কাজ নয়। গোটা পরিবারের দায়িত্ত, সবার ভবিষ্যতের প্ল্যানিং, নিজের বয়সকালের জন্য সঞ্চয়, এইসব করার পর একজন বয়স্ক মানুষ কি চায়? শান্তি, সুরক্ষা আর সুখ। সন্তানের সুখের জন্য আমরা আমাদের অনেক কিছু ত্যাগ স্বীকার করি।

পৃথিবীতে বাস করলে পৃথিবীটাকে চিন্তেও শিখতে হয়।

বাপের বাড়ি বাপের বাড়িই হয়, আর সেটা আজীবন তোমার নিজেরেই বাড়ি। সেই বাড়িটার সব কিছু তোমার, তোমাদের। এটা জন্মগত অধিকার, দেশের কোনো আইন বা আদালত সেই অধিকার থেকে তোমাদেরকে বঞ্চিত করতে পারবে না, পারেও নাই।

আনন্দ, মনের আনন্দ। নেশার আনন্দ, মন এমন এক জায়গায় চলে যায় যেখানে কোনো বাধা নাই। যেনো সুধু সাধীনতা।  বড় শহরের অনেক অন্ধকার গলিতে প্রতি রাতে একটা নেশার জগত গড়ে উঠে। সেখানে সমাজের অনেক শ্রেনী থেকে অনেক যুবকরা এসে থাকে।  যারা সবাই নিজেদের আত্মীয়স্বজন ছেড়ে নিজেদের নেশায় ভেসে থাকে। সভ্য সমাজ এদের দেখেও উপএক্ষা করে যায়। খুব বেশী হলে হাইউজিং কমিটির মিটিং এ সামান্য বিরোধিতা, কিন্তু এদেরকে আটকানো বা শোধ্রানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এই নীরবতা অপরাধকে আমন্ত্রন জানায়। এই নীরবতার সাথে সাথে আমরা একতা সত্যিকেও উপেক্ষা করে যাই, যে, একতা অপরাধ বেড়ে উঠছে। এমন একটা অপরাধ যে, এই নেশয় আধমরা হয়ে থাকা যুবকদের সাথে অন্যান্য সাধারন মানুষের ও প্রান চলে যেতে পারে।

ব্যবসার ক্ষেত্রেও তাই। বিষেশ করে পার্টনারশীপ ব্যবসায় তো এটার মুল্য আরো অনেক বেশী। ব্যবসায় লাভ লোকসান হবেই, এটা ব্যবসায়ীরা জানে আর জেনেই ব্যবসায় আসে। কিন্তু যখন এই ব্যবসায়ীক পার্টনারশীপে একবার বিশ্বাস আর ভরষা উঠে যায়, তখন আর কাউকেই পার্টনার হিসাবে নেয়া সহজ হয় না। এ জন্য বিশ্বাসকে “টেকেন ফর গ্যারান্টেড” ভাবাই যাবে না। যুগের পর যুগ ব্যবসা করেও এই কথা সত্য যে, বিশ্বাস যে কোনো মুহুর্তে অবিশ্বাসে পরিনত হতে পারে।

গরীব হওয়া পাপ নয়, উচু সপ্ন দেখাও পাপ নয়, বড় হবার চেষ্টা করাও অপরাধ নয়, কিন্তু অন্য কারো জিনিষকে অন্যায়ভাবে নিজের করার চেষ্টা করা অপরাধ। এই অপরাধের একটা খেসারত আছে। কেউ সাথে সাথে পায়, আর কেউ একটু দেরীতে। কিন্তু প্রাপ্যটা আসেই। লাইফটা কোনো ষ্টক মার্কেটের কোনো শেয়ার নয় যে প্রতিদিন এটার দাম উঠানামা করবে। এটা আসলে সেটা যা একবার উঠে গেলে আর পড়ে না, আবার পড়ে গেলে আর উঠে না।

জীবন একটা নদী। আপনি একই নদীতে দুবার পা দেওয়া যায় না।

বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ তৈরী করা কোনো ব্ল্যাক মেইল নয়।

একটা বাবা মা যখন সন্তানের জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এটা বুঝতে না পারে, তাহলে সেই পরিবারে সেই সন্তান একটা অসুস্থ্য পরিবেশেই বড় হতে থাকে। আর অসুস্থ্য পরিবেশ শুধু সাস্থ্যইকেই ক্ষতি করে না, মনকেও। নিজের মনের আওয়াজ শুনুন।

বেশীর ভাগ মানুশের সব সময় একটা সফল, উজ্জ্বল আর সুরক্ষিত ভবিষ্যতের খোজে থাকে। তারা বংশানুক্রমে একটা জীবন মন্ত্র পায় নিজের বর্তমানকে বলীদান করলে ভবিষ্যতে সর্গ পাবে। আজ যদি প্রশ্রম করো, কাল নিসচয়ই সাফল্য আসবে কিন্তু যদি কেউ এই খোজা আর বুঝার তলে চাপা পড়ে এইটা মানতে থাকে যে সুন্দর ভবিষ্যত শুধুই একটা মিথ্যে তাহলে একটা বদ্ধ খাচার মধ্যে তা চিরতরে হারিয়ে যায়।

০৯/০৮/২০২১-পরিকল্পনার ডেবিট-ক্রেডিট

জীবনকে যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছিলাম, যখন থেকে এটা বুঝেছিলাম যে, পরিবারের সবার জন্য এমন একজন মানুষ থাকে যার কাছে প্রয়োজনেই হোক, অপ্রয়োজনেই হোক, কিংবা আবদারের আবেগেই হোক অথবা বিনা কারনেই হোক তার কাছে সবকিছু চাওয়া যায়। সে দিতে পারুক বা না পারুক সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু মনের চাহিদার কথা তো কাউকে জানানো যায়। আর তার নাম ‘বাবা’। আমি আমার বাবাকে দেখেছিলাম কিন্তু তার কোনো স্মৃতি আমার কিছুই মনে নাই। না তার চেহারা, না তার রঙ, না তার কোনো আচরন। কারন আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র ছিলো দেড় কি দুই। ফলে ‘বাবা’ নামক সেই মানুষটি আমার বেলায় প্রজোজ্য না। আমার বেলায় যা ছিলো সেটা আমার বড় ভাই। ‘বাবা’ আর ‘ভাই’ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক। ফলে সেই ছোটবেলা থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, যখন মন যা চায়, সেটাই আমার পাওয়ার কথা না। তাই নিজের চাহিদার ব্যাপারে আমি সবসময়ই ছিলাম অতিমাত্রায় কন্ট্রোল্ড। অর্থাৎ যা না হলেই নয়, হয়তো সেটাও যদি কোনোভাবে ম্যানেজ করা যায়, তাহলে আর কারো কাছে এটা নিয়ে আর হাত পাতার দরকার মনে করতাম না। এরই ফলশ্রুতিতে আমি যেটা আমার মধ্যে দেখেছি সেটা হচ্ছে, নিজের চাহিদার ভারসাম্যতার সাথে পাওয়ার নির্ভরতা। কোনো কিছুর উপরেই আমার কখনো লোভ, সাধ আহলাদ কিংবা চাহিদা খুব একটা ছিলো না, এমনকি খাবার দাবারের বেলাতেও আমি ছিলাম অতিমাত্রায় অতীব সাধারান। কোনো কিছুই আমাকে আকর্ষন করতো না। এতা খেতে ভালো লাগে না, ওইটা চাই, কিংবা ওইটা খেতে পারছি না বলে অন্য আরেকটা খাবার না দিলেই নয়, এমন কখনোই ছিলো না।

মাত্র ১২ বছর বয়সেই আমি বাড়িছাড়া হই। আর সেটা হয়েছিলো একটা খুব ভালো অরগ্যানাইজেশনের কারনে। তার নাম ‘ক্যাডেট কলেজ’। ক্যাডেট কলেজে যারাই ভর্তি হয় অন্যান্য ছাত্ররা, তার বেশীর ভাগ ছাত্ররাই সবাই বেশ বড় বড় পরিবারের সন্তান। তাদের আচার আচরন, তাদের চাহিদা, তাদের কথাবার্তার সাথে আমার অনেক পার্থক্য ছিলো। আমি কাউকেই চিনি না, কেউ আমার খুব কাছের বন্ধু হবে এটাও ভাবি নাই, কারন ওদের মধ্যে ওদেরই সখ্যতা বেশী। ওদের আচরনে বুঝতাম, ওরা অনেকেই অনেককে চিনে আগে থেকে। গুটিকতক আমরা ছিলাম নিতান্তই অজপাড়াগা থেকে উঠে আসা কিছু ছাত্র। এই গুটিকতক আমরাও আসলে আমাদের কাউকে চিনি না। গ্রামের ছাত্রদের একটা ব্যাপার হলো, তারা খুব ছোট গন্ডি থেকে আসে বলে নিজের থেকেও কেউ মন খোলে একে অপরের সাথে কথাও বলে না, বা বলতে সংকোচ বোধ করে। আমাদের এই গুটি কতক গ্রাম্য ছাত্রদের ও বেলায় এই ঘটনাটা ঘোতে গেলো। আমরাও উপযাযক হয়ে কেউ কারো সাথে খুব একটা ঘনিষ্ঠ হবার পথ খুজে বের করি নাই। যার ফলে একাকীত্তের কারনে মন খারাপ হওয়া শুরু করতো মাঝে মাঝে। বয়স মাত্র ১২ আমার, কিই বা বুঝি জীবন সম্পর্কে? খালী মায়ের কথা মনে পড়তো, গ্রামের কথা মনে পড়তো, গ্রামের বন্ধু বান্ধবদের কথা মনে পড়তো আর নিদ্রাবিহীন সকাল হয়ে যেতো আমার। আমি জানতাম, আমার মা, আমার সেই পাড়াগা, আমার সেই অজপাড়াগায়ের বন্ধুদের কথা মনে পড়লেও তারা যে আমার মনের কোনো কষ্ট, বেদনা কিংবা হতাশা লাঘব করতে পারবে সেটা কখনোই হবে না কিন্তু একাকী জীবনে অবুঝ কোনো শিশু অথবা বোবা কোনো প্রানী যার সাথে মনের কোথায় যেনো একটা সখ্যতা আছে তাদের সান্নিধ্য কিংবা মনের ভিতরের কল্পনার সেই বিচরন হয়তো ক্ষনিকের জন্যে হলেও মন ভালো হয়ে যেতো। মনে হয়- আছে তো ওরা। এমন একটা পরিবেশে কিছুতেই আমার এই সখের ক্যাডেট কলেজ আর ভালো লাগছিলো না। আসলে ক্যাডেট কলেজে পড়ার আমার কোনো শখ ও ছিলো না। আমি তো এর নামই জানতাম না। এটা ছিলো আমার বড় ভাইয়ের জন্য একটা আশির্বাদ যাতে তিনি আমাকে কোনো একটা সেফ জায়গায় রেখে স্কলারশীপে কানাডায় যেতে পারেন, তার একটা বিকল্প ব্যবস্থা। আমার এই একাকীত্ব আর মন খারাপের কথা বলে আমার বড় ভাইকে আমি একটা চিঠি লিখলাম। কিন্তু চিঠিটা পোষ্ট করা হয় নাই আমার। কেনো করি নাই সেটাও আমার মনে আছে। কারন, আমি তখনো জানতেই পারি নাই কিভাবে ক্যাডেট কলেজ থেকে কার মাধ্যমে কোথায় চিঠি পাঠালে চিঠি যায়। ফলে ওই চিঠিটা আজো আমার কাছে রয়ে গেছে। আজ আমি এখানে সেই চিঠিটার কিছু অংশ লিখছি-

ভাইয়া, কিছুই ভালো লাগছে না আমার। না পড়াশুনা, না খাবার, না খেলাধুলা। বারবার গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি আপনাকে ভয় পাই সব কিছু বলতে কিন্তু আপনাকে না বলা ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ও নাই। এখানের সিনিয়ার ভাইয়েরা বড় নির্দয় এবং শাসক শ্রেনীর। কারনে অকারনে চোখ রাঙ্গায়, মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হয় যেনো জেল খানার কোনো কয়েদি আমি। কলেজের স্যারেরা ভালো কিন্তু তাদের কাছে কোনো কথা বলার মতো এতটুকু সাহস আমি আজো সঞ্চয় করতে পারিনি। বন্ধুবান্ধব যারা আছে, তারা সবাই যেনো কোনো এক গ্রহ থেকে এসছে। ওরা ওরাই কথা বলে, হাসে, খেলে আড্ডা দেয় কিন্তু আমি ওদের সাথেও খুব ভালো করে মিশতে পারি না। আমার কথার সুরে গ্রামের টান আছে, অনেকেই এটা নিয়ে হাসে। আমি বুঝতে পারি না, কোথায় আমার সমস্যা। এতো সব সমস্যা নিয়ে আমার পড়াশুনাতেও আমি খুব ভালো করছি বলে মনে হয় না। একটা রুমে মোট দশ জন ছাত্র থাকি, সবাই যার যার বিছানায় থাকি বটে কিন্তু মনে হয় আমিই এক মাত্র যে কিনা রুমে শুয়েও রুমে নাই। আমাএ সেই গ্রামের স্কুলই ভালো ছিলো। অন্তত বন্ধু বান্ধব দের সাথে স্কুলে হৈ হুল্লুর করে আর পড়াশুনা করে সময় কেটে যেতো। খুব ভোরে উঠতে হয়, মাঝে মাঝে বাথ রুমের সল্পতার কারনে অথবা অন্যান্য ছাত্রদের আধিপত্যতার কারনে আমি সব সময় বাথ রুমে গিয়েও পিছিয়ে যাই। কেনো জানি মনে হয়, আমি শুধু আমার স্যারদেরকেই ভয় পাই না, আমি সম্ভবত এই শহুরে ছাত্রদেরকেও কিছুটা ভয় পাই।

………… মার কথা মনে পড়ে, আপনার কথা মনে পড়ে, বোনদের কথা মনে পড়ে, আর সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে স্কুল শেষে স্কুলের মাঠে খেলার কথা, রাতের বেলায় উচ্চস্বরে বই পড়া আর তালে তাল দিয়ে কবিতা মুখস্থ করা। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের হেড স্যার অনেক রাগী হলেও তার মধ্যে একটা আদরের ভাব ছিলো। কিন্তু এখানে স্যাররা আমাদের আদর করেন কিনা সেটা আমি বুঝতে পারি না।

………… আপনি আমাকে ৫০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। তার থেকে আমি ৫ টাকা খরচ করে ফেলেছি।  

আমার বড় ভাই একটা ব্যাপার খেয়াল রাখার চেষ্টা করতেন যদিও সেই যুগটা আজকালের মতো ছিলো না। মোবাইল ছিলো না, সহজেই এক জায়গা থেকে সল্প সময়ে অন্য জায়গায় যাওয়া যেত না। এরপরেও আমি কেমন আছি, আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, সেটার ব্যাপারে আমার বড় ভাই তার এক বন্ধুর মাধ্যমে খবর নেয়ার চেষ্টা করতেন, তার নাম ছিলো-রফিক কায়সার। রফিক কায়সার আমাদের বাংলা টিচার ছিলেন আর আমার বড় ভাইয়ের ক্লাশমেট ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। ক্যাডেট কলেজে তিনি ছিলেন আমার হাউজের হাউজ টিউটর। বিল্ডিং এর একদম উপরে চিলে কোঠায় থাকতেন একা। অবিবাহীত মানুষ। একদিন তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন জানার জন্য আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। সবসময় খুব ভয়ের মধ্যেই থাকতাম। আমি রফিক স্যারকে বললাম, আমার ক্যাডেট কলেজে থাকতে ইচ্ছে করছে না। আমি চলে যেতে চাই। উনি হেসে দিয়ে বললেন- ঠিক আছে, কয়দিন পর চলে যেও। আপাতত এই টার্মটা যাক। আমি খুশী হয়েছিলাম, কিন্তু এটা বুঝি নাই যে, ‘এই টার্মটা যাক’ মানে আমি যে ধীরে ধীরে এডাপ্টেশনে চলে যাবো এটা তিনি জানতেন। তখন হয়তো আমি ‘চলে যেতে চাই’ এই কথাটাই আর বল্বো না। আর হয়েছিলোও তাই।  

তারপর যখন আরো একটু বড় হলাম, (এই বড় হওয়া মানে আমি যখন কলেজ পাশ করলাম তখনকার কথা বলছি, সেটা ১৯৮৩ সাল) তখন আরো একটা কঠিন বাস্তবতা আমার সামনে এসে হাজির হয়েছিলো। এই কলেজ অবধি ‘কঠিন বাস্তবতার’ ব্যাপারটা আমার মনে কখনো জাগ্রত হয় নাই কারন, ক্যাডেট কলেজের আর্থিক যোগান এতোটাই কম লাগতো যে, এটা হয়তো আমার বড় ভাইয়ের উপর কোনো চাপ পড়তো না। মাত্র ১৫০ টাকা মাস। তাতেই খাবার, পোষাক, বইপত্র, থাকা, এবং সব কিছু। আমার বড় ভাই আমেরিকা থাকতেন, ফলে এই ১৫০ টাকা প্রতিমাসে দেয়া খুব একটা চাপের বিষয় ছিলো না। কিন্তু আমি যখন কলেজ পেড়িয়ে সবেমাত্র এই বিশাল উম্মুক্ত দুনিয়ার জগতে পা রাখলাম, তখন যেটা আমার চোখের সামনে এসে ভর করেছিলো সেটা হচ্ছে, আমার ব্যক্তিগত আর্থিক সচ্ছলতার ব্যাপারটা। এতোদিন তো কলেজের মধ্যে সরকারী খরচে ছিলাম, এখন আর সেই সুযোগ নাই। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে হবে, নিজের খরচ, ইউন ইভার্সিটির খরচ ইত্যাদি সব এখন আমার নিজের। বড় ভাই এর পক্ষে এতো খরচ বহন করা সংগত হবে কিনা, তিনি করবেন কিনা সব যেনো এখন একটা শংকা হয়ে উঠলো।  ইউনিভার্সিটির খরচ, ঢাকায় থাকার খরচ, খাওয়া দাওয়ার খরচ আর তার সাথে বইপত্র, কাপড় চোপড় এবং হাত খরচের ব্যাপারটা আমাকে প্রায় বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলো। নেহায়েত এটা কম ছিলো না। যার ফলে সবদিক ভেবেচিন্তে আমার কাছে আর্থিক সমস্যাটা একটা জটিল আর ভারী মনে হচ্ছিলো। সম্ভবত এটাই ছিলো আমার প্রথম কারন যার জন্যে আমাকে আবারো সমস্ত ধ্যান ধারনা আর সক্ষমতাকে  বারবার হতাশ করছিলো।

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সব শাখায় আমি ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেও সম্ভবত এই আর্থিক সচ্ছলতার ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম যে, সম্ভবত আর্মিতে যাওয়াই হচ্ছে আমার বেষ্ট অপশন। আমি দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে আর্মিতে আসি নাই। কিংবা আমি দেশের জন্য প্রান উতসর্গ করে দেবো এই ব্রত নিয়েও আর্মিতে যোগ দিতে চাই নাই। সম্ভবত এ রকম অনেকেই থাকবে যারা আজীবন লালন করেছে আর্মিতে আসার কিন্তু আমি এটা ধারন করি নাই। অনেকে পড়াশুনা করতে হবে না আর এই রকম চিন্তাধারায়ও ছেলেমেয়েরা আর্মিতে আসে। সেটা হয়তো আমার ছিলো না। পড়াশুনা নিয়ে আমার কোন সমস্যা ছিলো না। তাহলে ব্যাপারটা এমনই দাড়িয়েছিলো যে, আমি আমার কাছেই একটা আর্থিক বোঝা হয়ে দাড়িয়েছিলাম। লজ্জা, বেদনা, কষ্ট কিংবা অপমান এসবের কোনো ইরেজার নাই। কিংবা এগুলি কোন কিছু দিয়েই দূর করা যায় না। আমার কোনো ব্যাকওয়ার্ড ইন্ট্রিগেশন ছিলো না। ফলে আমার ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই ক্যাপাসিটির মধ্যে অনেক ফারাক ছিলো। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হবার পর নিজকে খুব একা আর ভিতর থেকে শুন্যতায় ভুগছিলাম। কিন্তু তারপরেও আমার কারো উপর রাগ কিংবা অভিমান ছিলো না। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম কিভাবে কি করা যায় আর সেটা নিজের ক্যাপাসিটিতে এবং সৎ ভাবে। সব কিছু ভেবে চিনতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার খুব তাড়াতাড়ি একটা জব দরকার। ডাক্তারী পড়তে গেলে কম পক্ষে ৫/৬ বছর লাগবে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলেও ব্যাপারটা প্রায় একই। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার পর কোথায় চাকুরী পাবো আর কাকে বল্বো সে পথ ও আমার খুব একটা জানা নাই। এর ফলে যেটা হলো- শেষমেশ আমি আর্মিতেই ভর্তি হয়ে গেলাম। দু বছরের ট্রেনিং, ট্রেনিং এর সময় সরকার একটা হাত খরচ দেবে আর আমার ভরন পোষন তো সরকারের দায়িত্ব। এর থেকে সেফ কোনো উপায় আমার কাছে ছিলো না। আর্মিতে গিয়ে আমার যেটা লাভ হয়েছিলো সেটা হলো যে, আমি আমাকে চালাতে পারছিলাম, কারো উপরে আমার নির্ভরতার দরকার ছিলো না। যদিও সেই আর্থিক জোগানটা ছিলো হ্যান্ডস টু মাউথ অবধি। তারপরেও আমি কারো উপরে নির্ভর করতে চাই নাই। আর তেমন কেউ ছিলোও না নির্ভর করার মতো। আমার ভাই ভাইয়ের মতো, তার হিসাব কিতাব তার মতো। আর সেই বা কেনো আমার জন্যে কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করবে? সে হিসাবে আমি মনে মনে হলেও একটা সাধীনতায় ভোগতাম। কিন্তু আর্মিটা আমার জীবনের চয়েজ ছিল না।

ক্যাডেট কলেজে থাকাকালীন এই ৬ বছরে আমার মোট ৪৫ জন বন্ধুওই ছিলো। তারা সবাই আবার আমার যে খুব কাছের তাও না। তবে খারাপ বন্ধু ছিলো না ওরা। বাইরে এসে তো আমার আরো বন্ধু কমে গেলো। যারা ছিলো তারা বেশীরভাগ আমার ‘মেট’। কেউ ‘ক্লাশমেট’, কেউ ‘কোর্ষমেট’, কেউ ‘ইয়ারমেট’। হাতেগোনা কয়েকজন ছিলো আমার হয়তো কাছের ‘মেট’ যাদের সাথে হয়তো আমার মনের কিছু আবেগ, কিছু কথা বলতাম। কিন্তু আমার মনে পড়ে না আমি কারো কাছে আমার কষ্টের কথা, বেদনার কথা বলেছি। কেনো বলতাম না, বা কেনো বলা হয় নাই, এটা কোনো পরিকল্পনা করে করা নয়। আসলে হয়তো শেয়ার করার প্রবনতাই ছিলো না। কিন্তু মনের ভিতরে একটা বাস্তবতা আমার সারাক্ষন জাগ্রত ছিলো-আমি একা, আমাকে সাপোর্ট দেয়ার মতো কোনো মানুষ নাই। অন্তত আর্থিক সাপোর্ট।

আর্মির দু বছর ট্রেনিং করার পর ২ লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন পেলাম। এটা একটা জব। যদিও বেতন মাত্রে সারে আট শত টাকার বেসিক স্কেল। সব মিলিয়ে হয়তো পাই ১৪/১৫ শত টাকা। মেসের খরচাদি দিয়ে সিগারেট বিড়ি খেয়ে মুটামুটি চলে যায় কিন্তু মাকে হাত খরচ দেবার মতো আমার সাধ্য ছিলো না। মাকে আমার বড় ভাইই চালাতেন। প্রতিমাসে ১২০০ টাকা দিতেন। মায়ের ও যে খুব ভালো চলছিলো তাও না। তবে মা ম্যানেজ করে নিতেন। আমার মাঝে মাঝে খুব আফসোস হতো, ইশ যদি অনেক টাকার চাকুরী করতাম, তাহলে আমিই মাকে সব খরচ দিতে পারতাম। এই কষ্টটা থেকেই সম্ভবত আমি যখন ছুটি পেতাম, আমি মাকে যতটুকু পারতাম, ভালো মন্দ করতাম। বাজার করতাম, ফল মুল আনতাম, মা খুশী হতেন। কিন্তু মার খুব একটা আফসোস ছিলো আমার বড় ভাইয়ের উপর যে, তার বড় ছেলে আমেরিকায় কম পয়সা কামাচ্ছে না, তারপরেও মায়ের মাসিক টাকার পরিমানটা কখনো বাড়ে নাই।

আমি যখন সবেমাত্র লেফটেন্যান্ট, মিটুলের সাথে আমার পরিচয়। ওর সাথে যখন আমার সখ্যতা হয়, সম্ভবত আমি এটাই ধরে নিয়েছিলাম, কেউ কিংবা কারো সাথে যদি আমার অপারগতার কথা, আমার ব্যক্তিগত কোনো কথা কিংবা এমন কিছু যা একজন আরেক বন্ধুকে শেয়ার করে সে রকমের ব্যাপার শুধু ওর সাথেই করা যায়। আসলে ঐ আমার জীবনের প্রথম বন্ধু। ওর ব্যাপারটাও প্রায় আমার মতোই ছিলো। অষ্টম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় মিটুল ওর বাবাকে হারিয়েছে। ৮ জন বোন আর ৩টা ভাইয়ের সংসার খুব যে একটা শক্তিশালী সেটাও নয়। ফলে ওর মানসিক, আর্থিক কিংবা অন্যান্য চাহিদার রশি মিটুল নিজেই টেনে ধরেছিলো। প্রায় আমার মতো একই মানষিকতায় মিটুলও গড়ে উঠছিলো। অল্পবিত্ত মানুষের একটা গুন থাকে-আর সেটা হলো, অল্পতেই তারা সবকিছুতে মানিয়ে নেয়। আশেপাশের অনেক লোভনীয় কিছু থাকলেও চোখ সেটা দেখেও না দেখার ভান করে। আর এর প্রধান কারন-সেসব তো না যায় ধরা, না যায় ছোয়া। তাহলে আর সেগুলি নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই। তবে হ্যা, একটা বিশ্বাস তো থাকেই যে, কোনো একদিন, হয়তো আমার সেগুলি আসবে, আর তারজন্যে দরকার নিজেকে তৈরী করা। আর এই তৈরী করাই হলো সেই স্বপ্ন যা তাদেরকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়। ওরা পারে। 

মিটুলের সাথে পরিচয় হবার পর, মাত্র এক বছরের মাথায় ওকে আমার বিয়ে করতে হয়। সেটা ছিলো একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি। মিটুলের তখনো ইউনিভার্সিটির কোনো ডিগ্রী শেষ হয় নাই। মাত্র ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়ে। এর মধ্যে যখন ওর আমেরিকা প্রবাসী একজন ভদ্রলোক ওকে দেখে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্থাব দিলো, ওর পরিবার সেই প্রবাসীকে হাতছাড়া করতে চাইছিলো না। কিন্তু আমার আর মিটুলের সম্পর্ক ভাঙবার ছিলো না। কিন্তু এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য আমাকে বিয়েই করতে হয়েছিলো। প্রচন্ড রিস্ক নিয়েছিলাম কারন আর্মিতে আর্লি ম্যারেজের একটা শাস্তি আছে। সেটা জেনেও আমি পিছপা হইনি। বিয়ে করে ফেলি। এমনিতেই আমাকে আমি খুব সচ্ছল্ভাবে চালাইতে পারছিলাম না, এর মধ্যে ঢোকে গেলো আমার নব বিবাহিতা মিটুল। আমি কোনোভাবেই চাইনি যে, আমার বউ এর পড়াশুনার খরচ ওর পরিবার দিক কিংবা ওকে বিয়ে দেবার পরেও মিটুল ওদের পরিবারের আর্থিক সাহাজ্যে চলুক। আমার রোজগারের প্রতিটি টাকার হিসাব আমি করতাম। কোনো ভাবেই আমি বেহিসাবী ছিলাম না। এমন একটা পরিস্থিতি কাউকে বুঝতে দিতেও চাইনি। না আমি কারো উপজাজক হয়ে সাহাজ্য পেয়েছি। ফলে যখন আমি বিয়ে করি, তখন যেটা আমার মাথায় সর্বোপ্রথম সর্বদা জেগেছিলো যে, আমার পরিবারের আমাকে ছাড়া অন্য কারো উপরে তাদের নির্ভর করার উপায় নাই। আমার এই ধারনাটাই আমার অনুপস্থিতিতে ওরা কেমন থাকবে, কিভাবে চলবে, কৈ গিয়ে দাঁড়াবে, এসব আমি সবসময় মনে রাখতাম। আর এর সহজ সমাধান ছিলো একটাই। আর সেটা হলো ওদেরকে সাবলম্বি করে তোলা। তাহলে কিভাবে সেই সাবলম্বি করা যায়? আমি এটা ভাবতাম আর ভাবতাম। এই ভাবনা থেকেই আমি কিছু হোম ওয়ার্ক করি। তারমধ্যে সর্বো প্রথম যেটা আমার মাথায় এসেছিলো সেটা হলো-ওদের থাকার জায়গাটা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় ভাবনাটা ছিলো যে, আমার অনুপস্থিতিতে ওদের প্রতিমাসে সচ্ছল্ভাবে চলার জন্য যে টাকা লাগবে সেটা সর্বদা একটা স্থায়ী উৎস থেকে ওদের হাতে আসা। তৃতীয় ভাবনাটা ছিলো-আমার জীবদ্ধশায় আমার সন্তান এবং আমার স্ত্রীকে নিজের পায়ে দাড় করানো। এটাই ছিলো আমার একমাত্র এবং শুধুমাত্র ভাবনা। আমি আমার এই ভাবনাটা থেকে কখনো কোনোদিন এক মূহুর্তের জন্যেও পিছিয়ে যাই নাই।  

ক্যাডেট কলেজ ছাড়ার পর প্রায় ৩৭ বছর পর এসে আমি আমার সেই ভাবনার প্রতিফলনটা যদি বলি, তাহলে আমি অনায়াসেই আমার ব্যালান্স শীট কি সেটা বুঝতে পারি। আজকে আসলে আমি লিখতে বসেছি আমার সেই ভাবনার ব্যালান্স শীট নিয়ে যে আমি আসলে এ ব্যাপারে কতটুকু করতে পেরেছি। আমার এই লেখা অন্য কারো জন্য নয়, এটা নিতান্তই একটা সেলফ অডিটের মতো। কেউ জানুক আর নাইবা জানুক, আমি তো নিজেকে বলতে পারবো-আমার সাফল্য আর ব্যর্থতা কি ছিলো আর কি পাই না।

এবার যদি আরো একটু বিস্তারীত বলি তাহলে কথাগুলি হয়তো এ রকমের হবে যে,

খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলাম, মাত্র ২২ বছর বয়সে, আর চাকুরীটাও ছিলো খুব অল্প বেতনের। মাত্র সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, বেতন ৮৫০ টাকা। মিটুলকে আমি সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সময় একটা কথাই বলেছিলাম, নিজের পায়ের উপরে দাড়াতে হবে। মিটুল সেটা করেছে। ইউনিভার্সিটি পাশ করে বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকুরীতে জয়েন দিয়েছে। আজ সে ফুল প্রোফেসর। তার মাসিক একটা ইনকাম আছে, আবার পেনশনের পরেও একটা থোক টাকা পাবে। ঠিক এই মুহুর্তে মিটুলের মাসিক বেতন প্রায় ১ লক্ষ টাকা। এই টাকাটা থেকে আমি কখনো হাত দেই নাই। এখনো না। ওর টাকা বিশেষ বিশেষ জরুরী টান দেয়া ছাড়া প্রায় সব টাকাই সঞ্চিত থাকে। ফলে ওর একটা ক্যাশ ব্যালেন্স আছে। সেটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটা একটা সাপোর্ট অবশ্যই।

আমার বড় মেয়ে ইতিমধ্যে ডাক্তারী পাশ করেছে। বর্তমানে সে ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতালে চাকুরী করে। বেতন যদিও সামান্য, মাত্র ২৮ হাজার টাকা, কিন্তু ওর যে প্রোফেশন তাতে অন্তত সে তার নিজের সংসার চালানোর মতো ক্যাপাসিটি আছে। এ ছাড়া ওর নামেও প্রায় লাখ ত্রিশের টাকার একটা সঞ্চয় করা আছে যা বিপদের সময় ওকে সাহাজ্য করতে পারবে।

ছোট মেয়ে আমেরিকায় চলে গেছে পড়াশুনার জন্য। ওর আগামী এক বছরের সমস্ত খরচ আমার অগ্রীম দেয়া আছে। ফলে আগামী বছরে গিয়ে ওর আবার টাকা লাগবে। এর মধ্যে কনিকা আমেরিকার লাইফ বুঝে যাবে, হয়তো সে নিজেই নিজের খরচটা জুগিয়ে ফেলতে পারবে।

চমৎকার পরিবেশে থাকার জন্য আমার একটা বাড়ি করা আছে। যার দোতালায় ওরা আজীবন নিজের বাড়িতে থাকতে পারবে। আর বাকী ফ্ল্যাটগুলি থেকেও প্রতিমাসে অন্তত ৬০/৭০ হাজার টাকা ভাড়া আসে। বাসাবোতে আমার একটা ফ্ল্যাট রয়েছে যেখান থেকেও একটা প্রায় ১৫ হাজার টাকার মতো ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া মিটুল কিছুদিন আগে নিজেদের অন্যান্য সঞ্চয় দিয়ে তিনবোন মিলে নিজদের বাপের বাড়িতে একটা বিল্ডিং করেছে যার মধ্যে তার নিজের আছে ৭টি ফ্ল্যাট। এখনো ভাড়া শুরু হয় নাই কিন্তু যখন এই ফ্ল্যাটগুলি ভাড়া শুরু হবে, তখন কম করে হলেও প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া আসবে।

এখন যদি আমি হিসাব করে দেখি, দেখা যাবে যে, মিটুলের মাসিক বেতন, আমার বাড়ির থেকে ভাড়ার আয়, বাসাবো থেকে বাড়ি ভাড়া আর মানিকগঞ্জের বাসা থেকে আয় মিলে প্রায় দুই লাখের উপরে টাকার জোগান হয়ই। এ ছাড়া নিজেদের থাকার জন্য কোনো বাসা লাগছে না কারন মীরপুরের বাসায় আমরা দোতালার পুরুটাই থাকি। যদি কখনো ক্যাশ টাকার দরকার হয়, মিটুল, উম্মিকার আর কনিকার যে সঞ্চয়পত্রগুলি কেনা আছে তাতে প্রায় এক কোটির উপরে সেভিংস আছে। নিজেদের তিনটা গাড়ি আছে। আমার অনুপস্থিতিতে ওদের হয়তো তিনটা গাড়ির দরকার হবে না। আমার জীপ গাড়িটা হলেই হবে। আর নিদেনপক্ষে যদি দুটু গাড়িও ওরা রাখতে চায়, তাতেও কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। সেক্ষেত্রে তিন নম্বর গাড়িটা বিক্রি করে দিলেও কিছু ক্যাশ টাকা হাতে আসবে।

আমি বর্তমানে ব্যবসা করছি। আর্মির চাকুরীটা ছেড়ে দিয়েছিলাম আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে। এই ১৬ বছরে আমার ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান আল্লাহর রহমতে প্রায় ৫০/৬০ কোটি টাকার মুল ধনে পৌঁছেছে। এর ৩৫% শেয়ার আমার নিজের। প্রতিমাসে অনারারিয়াম হিসাবে ২০২২ সাল অবধি আমি নিজেই নিচ্ছি তিন লাখের উপর। গাড়ির খরচ, ড্রাইভারের খরচ ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান থেকেই আসে। আমার একজন ব্যবসায়ীক পার্টনার আছে যার শেয়ার ৬৫%। ব্যবসায় ভবিষ্যত কি হয় সেটা আগে থেকে বুঝা যায় না। তবে যেভাবে চালাচ্ছেন আল্লাহ, ভালো যাচ্ছে। তারপরেও আমি আমার অনুপস্থিতিতে ব্যবসায়িক লাইনের উপর কোনো নির্ভরতা করি না। আমার ব্যবসায়ীক লাইন থেকে যদি কখনো কোনো টাকা নাও পায় আমার পরিবার, আজ যেভাবে তারা লাইফ লিড করছে, আমার ধারনা ইনশাল্লাহ ওরা কারো কাছে আর হাত না পেতেই ঠিক এভাবেই ওরা তাদের লাইফ লিড করতে পারবে ইনশাল্লাহ। আর আমি ঠিক এটাই চেয়েছিলাম। আর যদি আমার অনুপস্থিতিতে আমার পার্টনার আমার শেয়ার বিলুপ্ত করে আমার পরিবারকে বিদায় করতে চান, তারপরেও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান থেকে শেয়াএর অনুপাতে কম করে হলেও আমার পরিবার ১০/১৫ কোটি টাকা নগদ পাবে। সেই টাকা যদি আমার পরিবার শুধু ব্যাংকেই রেখে দেয়, তারপরেও প্রতিমাসে তারা নুন্যতম হলেও ৬/৭ লাখ টাকা পাবে। আমাদের পারিবারিক সঞ্চয় আর ব্যবসায়ীক টাকার লাভ মিলে আমার পরিবার প্রায় ৭/৮ লাখ টাকা প্রতিমাসে পাওয়ার কথা। আর এই পরিমান টাকায় যে কোনো পরিবার খুব ভালোভাবেই চলতে পারবে ইনশাল্লাহ।

আল্লাহ যদি আমাকে বাচিয়ে রাখেন, তাহলে এর মধ্যে আমি চিন্তা করছি যে, আমার যে সব জায়গা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সবগুলি বিক্রি করে দেবো। কারন আমার সেসব সম্পত্তি আসলেই আমার স্ত্রী বা মেয়েরা কখনোই খুজে বের করে তার তদারকী করবে না বা করতে পারবেও না। ফলে তাদের জামাইয়েরা যখন দেখবে অনেক জায়গায় জমিজমা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তখন ওরা যা করবে সেটা হচ্ছে ৫ টাকার মাল ২ টাকায় বিক্রি। যদি সেটাই হয়, তাহলে আমিইবা কেনো ৫ টাকার জিনিষ এই মুহুর্তে ৩ টাকায় বিক্রি করি না? তাই ওই সব জমিজমা আমি ভেবেছি বিক্রি করে দিয়ে ক্যাশ করে ফেলবো। তাতে দেখা যায় যে, আমার হাতেও প্রায় দুই তিন কোটি টাকা ক্যাশ থাকবে যা একটা এসেটের মতো। রিভার সাইড সুয়েটার্স ব্যবসাটা তো আছেই। তাহলে আমি কি এটা বলতে পারি না যে, আজ থেকে ৪৫ বছর আগে যে দুঃস্বপ্নটা আমি দেখেছিলাম, আজ সেই খারাপ অনুভুতিটা আমার অনেকাংশেই কমে গেছে? অর্থাৎ আমি ঠিক পথেই ছিলাম আমার পুরু পরিকল্পনাটা নিয়ে।

মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমি চালাতে পারিনি। এটা ব্যবসায়ীক সাফল্য দেখেনি। উপরন্ত মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমার অনেক লাভ, অনেক সঞ্চয় কেড়ে নিয়েছে। আমি আমার চেষ্টার কোনো প্রকার ত্রুটি করিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজকে রক্ষা করার জন্য কিন্তু যেভাবেই হোক যে কারনেই হোক, মা ইন্ডাস্ট্রিজ বারবার ভুল মানুষের হাতেই পড়েছে আর বারবার শুধু ক্ষতির সম্মুক্ষিণই হয়েছে। অবশেষ আমি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে, আর কখনোই এই মা ইন্ডাস্ট্রিজকে সচল করে চালানোর দরকার নাই। সেই ২০১০ সাল থেকে মা ইন্ডাস্ট্রিজ চালানোর পর কম করে হলেও ৪/৫ কোটী টাকা আমি লস করেছি। কিন্তু মা ইন্ডাস্ট্রিজ এক জায়গায় আমাকে সেটা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। আর সেটা হচ্ছে জমির ভ্যালু।

মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জায়গায় আমার মোট জমি আছে (২২ + ৪৬ + ২২.৫ +২৬ ) শতাংশ। আমি ২২ শতাংশ জমি বিক্রি করে দিয়ে মা ইন্ডাস্ট্রিজের লোন অবমুক্ত করার পরেও আমার কাছে বাকী জমিগুলি রয়ে গেলো। যার দাম নেহায়েত কম নয়। সব মিলিয়ে কম করে হলেও এর দাম প্রায় ৩ কোটী টাকা। সাউথ টাউনের প্রায় ৪১ শতাংশ জমি এখনো ডিস্পিউট অবস্থায় আছে। পেলে ভালো, আর পেলেও আফসোস করবো না। তবে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। আর ধলেশ্বরী গ্রীন ভিলেজে আমার নিজের সম্পত্তি আছে প্রায় ২৮ বিঘার মতো। এতো কিছু সব তো আমিই করেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

আজ প্রায়ই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। আজ যদি আমার মা বেচে থাকতেন, যেটা আমি করতাম সেটা হলো- মাকে ইচ্ছে মতো যত খুশী টাকা দিতাম আর বলতাম, যা খুশী করেন। যদি টাকা পূড়িয়েও আনন্দ পান, তাহলে টাকাও পুড়িয়ে দেন। হয়তো সেটাই আমার হতো আনন্দ যে, মা আনন্দ পাচ্ছেন। কিন্তু তিনি আজ বেচে নেই।

০৮/০৮/২০২১-What If I were not Born

মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহন করার থেকে এতো সম্মান নাকি ঈশ্বর তার পাপমুক্ত ফেরেস্তাদেরকেও দেন নাই। সৃষ্টির সেরা জীবদের মধ্যে এই মানুষই নাকি সেরা। এই মানুষের জন্যই ঈশ্বর আকাশ তৈরী করেছেন, সেই আকাশ থেকে তিনি জল-বৃষ্টি বর্ষন করেন, জমির নির্মল গাছ গাছালীকে তিনি সবুজ সতেজ করে রাখেন। তিনি এই মানুষের জন্যই পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, দিন আর রাতের তফাত করেছেন, ভালোবাসার মতো সংগী তৈরী করেছেন, অতঃপর তিনি জীবিনের বিভিন্ন স্তরে স্তরে নানাবিধ উপলব্দির জন্য সন্তান, নাতি নাতকোরের মতো মিষ্টি মিষ্টি ফুলের সংসারও তৈরী করেছেন। কি অদ্ভুত ঈশ্বরের সব সাজানো এই পরিকল্পনা। নীল আকাসের দিকে তাকিয়ে কখনো সাদা ফেনার মতো ভেসে যাওয়া মেঘ, কখনো উত্তাল মেঘের অবিরাম বৃষ্টিবরন, হেমন্তে বা শরতের দিনে বাহারী ফুলের সমাহার, পাখীদের কিচির মিচির, শিল্পির গানের মূর্ছনা, সবকিছু যেনো বিমোহিত করার মতো একটা সময়। অথচ এসব কিছু কোনো না কোনো একদিন ছেড়ে আমাদের সবাইকে চলেই যেতে হয়।

আবার অন্যদিকে যদি দেখি, দেখা যায়, এই বাহারী জীবনের সব সুখ আর আস্বাদন ছাড়াও আমাদের এই জীবনে ছেকে বসে দুঃখ বেদনা, হতাশা আর কষ্ট। জীবনের গাড়ি আমাদের জীবন-যানবহনের চাকার উপর টানতে টানতে এক সময় অনেকেই আমরা হাপিয়ে উঠি। বেদনায় ভরে উঠে কষ্টে, দুঃখে ভেসে যায় চোখের জল অথবা রাগে, অভিমানে একে অপরের হয়ে উঠি চরম থেকে চরম শত্রুতায় যেনো ভালোবাসা কোনোকালেই ছিলো না, হোক সেটা বিবাহ বন্ধনের মতো কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে, অথবা ব্যবসায়ীক কোনো অংশীদারিত্তে অথবা ক্ষমতার লড়াইয়ের কোনো যুদ্ধমাঠে।

অনেক সময় আমাদের মুখ দেখে এটা বুঝা যায় না কে সুখের বা কষ্টের কোন স্তরে আছি। ভিতরের সুখ কিংবা যন্ত্রনার উপলব্ধিকে আমরা একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করলেও সঠিক স্তরটা কখনোই প্রকাশ করা যায় না। পাখীদের বেলায় কিংবা অন্য কোনো প্রানীদের বেলায় এটা কতটুকু, সেটা আমরা না কখনো ভেবে দেখেছি, না কখনো উপলব্ধি করেছি। ওরা দিনের শুরুতে আহারের খোজে বেরিয়ে যায়, পেট ভরে গেলে কোনো এক গাছের ডালে বা পাহাড়ের কোনো এক ছোট সুড়ঙ্গে রাত কাটিয়ে দেয়। তাদের অট্টালিকার দরকার পড়ে না, ওরা ওরা কেউ কারো শত্রুতা করে না, কোন পর্বনে বিশেষ কোনো কিছুর আয়োজনেরও দরকার মনে করেনা। কবে ছুটির দিন, কবে ঈদের দিন কিংবা করে কোন মহাযুদ্ধ লেগেছিলো সে খবরেও ওদের কিছুই যায় আসে না। ওদেরও সন্তান হয়, ওরাও দলবেধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, ওদের কোনো ভিসা বা ইমিগ্রেশনেরও দরকার পড়ে না। টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী ওদের জন্য কোনোদিন দরকার পড়ে নাই, আগামীতেও দরকার পড়বে না। ওরাও কষ্টে কিছুক্ষন হয়তো ঘেউ ঘেউ করে, কিংবা চিন্তিত হয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়, কিন্তু তাকে আকড়ে ধরে বসে থাকে না। ওদের সারাদিনের কর্মকান্ডের জন্য না কারো কাছে জবাব্দিহি করতে হয়, না কারো কাছে ধর্না দিতে হয়, এমনকি ওরা ঈশ্বরের কাছেও তাদের অপকর্মের কিংবা ভালোকর্মের কোনো জবাব্দিহিতা করতে হয় না। কোনো ট্যাক্স ফাইল নাই, কোনো ভ্যাট ফাইল নাই, না আছে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, না দরকার তাদের গাড়িঘোড়ার। তাহলে তো ওরাই আসলে শান্তিতে থাকে, মানুষের থেকে অধিক।

মানুষ ছাড়া অন্য সব প্রানীকুল প্রত্যেকেই নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস রাখে কিন্তু মানুষ তার নিজের একক ক্ষমতার উপর কখনোই সে বিশ্বাস রাখে না বা থাকে না। তার দল লাগে, তার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড লাগে, তার আরো বিস্তর আয়োজন লাগে। এতো কিছুর উপরে তার আস্থা রাখতে গিয়ে মাঝে মাঝে সে নিজের উপরেও আস্থা হারিয়ে ফেলে। অথচ সে একা বাস করতে পারে না, না আবার সবাইকে নিয়েও বাস করতে চায়। অদ্ভুত এই মনুষ্যকূলের মধ্যে আমি জন্মে দেখেছি- এতো কিছুর বিনিময়ে অথচ কোনো কিছুই আমার না, এই শর্তে জন্ম নেয়াই যেনো একটা কষ্টের ব্যাপার। যদি কেউ এই পৃথিবীতেই না আসতো, তাহলে হয়তো বিধাতার কাছে এই ক্ষনিক সময়ে এতো কিছুর মাঝে পরিবেষ্ঠিত থেকে আবার চলে যাওয়া, কইফিয়ত দেয়া, ইত্যাদির দরকার হতো না, ক্ষমতার লড়াইয়ে হানাহানি, কারো বিয়োগে মন এতো উতালাও হতো না।

আজ থেকে বহু শতাব্দি আগে কিংবা অদুর অতীতে যারা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে, তারা আসলে আমাদেরই লোক ছিলো। তারা চলে গিয়েছে চিরতরে। কোথায় গেছেন, আর কি অবস্থায় আছেন সে সম্পর্কে আজো কেউ কোনো সম্যখ ধারনা কারো কাছেই নাই। অথচ যখন বেচে ছিলেন, প্রতিটি মুহুর্তে তারা ছিলেন সময়ের থেকেও অধিক ব্যস্ততায়। যখন তারা চলে যান, তারা আমাদের কাছে এমন কোনো ওয়াদাও করে যায়নি যে, তাদের ফেলে যাওয়া সব সম্পত্তির জন্য আবার ফিরে আসবেন, কিংবা এমনো নয় যে, তারা তা আর কখনো দাবী করবেন। এটা না হয় চিরতরে চলে যাওয়ার ব্যাপার হলো। কিন্তু এই জীবনে তো এমনো বিচ্ছেদ হয় যেখানে তারা আছেন কিন্তু আবার নাইও। জীবনের প্রয়োজনে ভউগুলিক বাউন্ডারীর অন্য প্রান্তে যখন কেউ অনেক দিনের জন্য চলে যান, আর তার ফিরে আসার ওয়াদা ভেংগে যায়, তখন আর তার উপরেও আস্থা রাখা যায়না। এমনি কষ্টে মানুষ ভোগের সমস্ত আয়োজনের উপরে থেকেও সেই আপনজনদের জন্য প্রতিনিয়ত হাহুতাশ করতে থাকেন। মনের কোথায় যেনো কি একটা সারাক্ষন খসখস করতেই থাকে। সেই যন্ত্রনায় তখন এমন মনে হয় যেনো- একটা দিনও ঠিকঠাক মতো কাটে না, এমন কি একটা রাতও না। তখন জেগে থাকে শুধু কিছু সদ্য জন্মানো কান্না। আর কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট। আর সেই কষ্টের কোনো নাম থাকে না, না থাকে তার কোনো বর্ননা বা রুপ। আর এই ভিতরের যন্ত্রনাটা কাউকেই দেখানো যায় না অথচ সত্যিটা থাকে এই ভিতরেই। আসলে পৃথিবীতে সম্পর্কের চেয়ে বড় কোনো সম্পত্তি নাই। এতো সুখের জীবনেও যখন এমন অনেক কষ্টের আর বেদনার নীল ছড়িয়েই থাকে, তাহলে কি দরকার জন্মের?

তারপরেও আমরা মানুষ হয়ে সৃষ্টির সেরা জীব হয়েই জন্ম নেই, নিয়েছি যেখানে অবারিত সবুজ ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার দোলা আমাদের মুখে পরশ জোগায় আবার তেমনি কখনো বিচ্ছেদের মতো যন্ত্রনা, মৃত্যুর মতো বেদনা, আবার কখনো অনিশ্চিত যাত্রার মতো দুশ্চিন্তা নিয়েই আমাদেরকে বাচতে হয়। কেউ যখন চিরতরে জীবনের নিঃশ্বাসকে স্তব্ধ করে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন, তারজন্য যতোটা না দুশ্চিন্তা আমাদেরকে গ্রাস করে, তার থেকে যখন কোনো প্রিয়জন হটাত করে সেই চেনা পরিচিত আবাসস্থল থেকে কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে যান আর ফিরে না আসেন, তারজন্য আরো বেশী দুশ্চিন্তা আর অমঙ্গল চিন্তা মাথা ভনভন করতে থাকে। কিন্তু এরই মতো যখন কোনো প্রিয়জন জেনেশুনে জীবনের প্রয়োজনে অথবা বড় সাফল্যের আশায় একে অপরের থেকে এমন একটা বিচ্ছেদে আপোষ করেন যেখানে টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী আমাদেরকে প্রায় স্থায়ী বিচ্ছেদের স্তরে নিয়ে যায়, তখন আমাদের হাসির অন্তরালে যে বেদনা লুকিয়ে থাকে, তা তুষের অনলের মতো সারাক্ষন তাপদাহে অন্তরে প্রজ্জলিত হতেই থাকে। আশা আর সাফল্যের মতো জল হয়তো সাময়ীকভাবে তা নিবারন করে কিন্তু এই ছোট ক্ষনস্থায়ী জীবনে বারবার এটাই মনে হয়- কি দরকার ছিলো এসবের? তাকে কি আটকানো যেতো না? নাকি আটকানো হয় নাই? আসলে কোনো কিছুই দরকার ছিলো না যদি না আমার জন্মই না হতো এই মানুষ হিসাবে। তখন না দরকার হতো এই বিচ্ছেদের, না প্রয়োজন হতো এই দিনরাতের কষ্টের অথবা না দরকার পড়তো অন্তর জালার তাপদাহের অনুভবতার। তখন কেনো জানি বারেবারেই মনে হয়- What If I were not born? 

করোনার প্রাদূর্ভাবে চেনা পরিচিত সব মানুষ যেনো ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে একে একে যেনো বিনা নোটিশে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। এই সেদিন যার সাথে এক টেবিলে বসে হাসাহাসি, আড্ডা, কথা কাটাকাটি, অথবা দল বেধে গায়ের কোনো মেঠো পথে বাচ্চাদের মতো হাটাহাটি করেছি, তার কিছু মুহুর্তের পরই সংবাদ আসে, আর নেই। চলে গেছে। ব্যাংকের টাকা, বিশাল ব্যবসা, কিংবা গাড়ি বহরের সব যাত্রা কোনো কিছুই যেনো তার সামনে দাড়াতে পারছে না। অথচ তাকে না দেখা যায়, না ছোয়া যায়। কখন সে কার সাথে একান্তে বাস করা শুরু করে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আতংকে আছে মন, অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে শরীর, ভাবনায় ভরে যাচ্ছে সারাটা মাথা। অথচ দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, মনের আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে পাখীরা, শুধু বন্দি হয়ে আছি আমি “মানুষ”। বারবার মনে হচ্ছে- কোথায় যেনো কি ঠিক নেই, কি যেনো কোথায় একটা গড়মিল হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে না। কেনো এমনটা হচ্ছে বারবার?

আসলে কোন কবি যেনো একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন- মানুষ হয়ে জন্মই যেনো আমার আজীবনের পাপ। তাই আমারো মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে- What If I were not even born!!

০৮/০৮/২০২১-সন্ধ্যা ৮ টা ৩২-খুব ভালো একটা খবর পেলাম আজ

খুব ভালো একটা খবর পেলাম আজ। আমার বন্ধু উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছিলাম, যেভাবেই হোক এয়ারপোর্টের জন্য আমাকে যেনো কয়েকটা ‘পাশ’ এর বন্দোবস্ত করে দেয়। কভিডের কারনে প্যাসেঞ্জার ছাড়া অন্য কোনো দর্শ্নার্থীকে এয়ারপোর্টের ভিতরে প্রবেশ করতেই দেয় না। কনিকার সাথে যাওয়ার জন্যে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ইউএস এম্বেসী সব ধরনের ভিসা (শুধু মাত্র স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়া) বন্ধ রেখেছে, ফলে আমরা কনিকার সাথে যেতে পারছি না। এদিকে আবার কভিডের কারনে এয়ারপোর্টের ভিতরেও প্রবেশের সুযোগ নাই। যাক, শেষ পর্যন্ত আজকে আমার দোস্ত মাসুদ আমাকে ফোন করে জানালো যে, এভিয়েশনের সিকিউরিটি ডাইরেক্টর আরেক উইং কমান্ডার আজমকে বলা আছে সে আমাদের জন্য ‘পাশ’ এর ব্যবস্থা করবে। আজমের সাথে কথা বললাম, আজম খুব সমীহ করেই জানালো যে, আগামী ১০ তারিখের রাত ৯ টায় যেনো আমি ওকে ফোন দিয়ে একটা কন্ট্যাক্ট নাম্বার সংগ্রহ করি যে কিনা আমাদেরকে এয়ারপোর্টে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। এই মুহুর্তে এর থেকে আর ভালো খবর আমার কাছে কিছুই নাই। খুব ভালো লাগলো যে, কনিকাকে আমি আর আমার স্ত্রী (উম্মিকাসহ) এয়ারপোর্টে সি-অফ করতে পারবো, ওর লাগেজ পত্রগুলি ঠিকমতো বুকিং করে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারবো। মেয়েটা আমেরিকায় চলে যাচ্ছে ৫ বছরের জন্য, পড়াশুনার খাতিরে। ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টিমোর কাউন্টি) তে যাচ্ছে।

আমার মনে পড়ছে যে, আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগেও আমার ভর্তি হয়েছিলো কার্স্কভাইল ইউনিভার্সিটিতে যেখানে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ চেয়েছিলেন আমি আমেরিকায় গিয়ে পড়াশুনা করি। কিন্তু যে কোনো কারনে হোক, আমার আর যাওয়া হয় নাই, আমি চলে গিয়েছিলাম আর্মিতে। আমার যে আমেরিকায় যাওয়া হয় নাই এটা বল্বো না, আমি তারপরে ১৯৯৫/৯৬ সালে হাইতির জাতিসঙ্ঘ মিশন থেকে একমাসের জন্য আমেরিকায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। তারপরে পর পর দুবার ভিসা পেয়েছিলাম মোট ৬ বছরের জন্য কিন্তু আমাকে আমেরিকা টানে নাই। আগামী ১১ তারিখে আমার ছোট মেয়ে চলে যাচ্ছে সেই সুদুর আমেরিকায়। একটু খারাপ লাগছে কিন্তু সন্তানদের সাফল্যের জন্য তাদেরকে ঘর থেকে ছেড়েই দিতে হয়, এটাই নিয়ম।

কনিকা যাতে কোনো প্রকারের আর্থিক সমস্যায় না থাকে সেজন্য আমি অগ্রিম ওর এক বছরে সমস্ত খরচ (বাড়ি ভাড়া, খাওয়া দাওয়ার খরচ, ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি, হাত খরচ, যাতায়ত খরচ, ইন্স্যুরেন্স খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে ৩৫ হাজার ডলার দিয়ে দিলাম যাতে আমিও আর এই এক বছর ওকে নিয়ে চিন্তা করতে না হয়। সাথে সিটি ব্যাংকের একটা এমেক্স কার্ড ও দিয়ে দিচ্ছি ২ হাজার ডলারের মতো যাতে খুবই জরুরী সময়ে সে এটা খরচ করতে পারে। আগামীকাল কনিকার কভিড-১৯ টেষ্ট করাতে হবে। ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে কভিড টেষ্ট করে ফ্লাইটে উঠতে হয়। পজিটিভ এলে ফ্লাই করতে পারবে না। দোয়া করছি, আল্লাহ যেনো সব কিছু সহী সালামতে এটাও ইনশাল্লাহ নেগেটিভ করে দেন।

বড় মেয়েকেও ইন্সিস্ট করছি সে যেনো কনিকার মতো দেশের বাইরে (পারলে একই ইউনিভার্সিটি, ইউএমবিসি) আমেরিকায় চলে যায়। কিন্তু কোথায় যেনো উম্মিকার একটা পিছুটান অনুভব করছি। তার শখ লন্ডনে যাওয়া। যদি তাও হয়, তাতেও আমি রাজী। ওরা ভালো থাকুক, সেটাই আমি চাই।

আমি জানি একটা সময় আসবে, আমি আসলেই একা হয়ে যাবো। এমন কি আমি মিটুলকেও ধরে রাখতে পারবো কিনা আজানি না। কারন যখন দুই মেয়ে দেশের বাইরে থাকবে, আমার ধারনা, মিতুলও প্রায়ই দেশের বাইরে থাকবে তার মেয়েদের সাথে। যদি দুইটা আলাদা আলাদা দেশ হয়, তাতে ওর বাইরে থাকার সময়টা বেড়ে যাবে, আর যদি একই দেশে হয়, তাহলে এক ছুটিতেই দুই মেয়ের সাথে হয়তো সময়টা কাটাবে। আমি ব্যবসা করি, আমাকে দেশেই থাকতে হবে, আর আমি দেশে থাকতেই বেশী পছন্দ করি।

বাকীটা আল্লাহ জানেন।  

০৭/০৮/২০২১-কনিকার আর মাত্র ৩ দিন বাকী

প্রায় সবগুলি কাজ শেষ। ভিসা আগেই হয়ে গিয়েছিলো, টিকেটও কেনা আছে, টিউশন ফি গতকাল পাঠিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। ভ্যাক্সিনেশন যা যা নেয়া দরকার ছিলো, সবই সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যাগপত্র, মালামাল সব কিছুই প্যাকড হয়ে গেছে, আগামী এক বছরের আর্থিক জোগানও শেষ, এখন বাকী শুধু করোনা টেষ্ট আর ফ্লাইটে উঠা। আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত অর্থাৎ ১১ আগষ্ট এর ভোর বেলায় কনিকার ফ্লাইট। মাত্র তিনদিন বাকী। কনিকার চলে যাওয়ার শুন্যতাটা এখন মাঝে মাঝে অনুভব করছি, উম্মিকা রীতিমত প্রায় প্রতিদিনই কান্নাকাটি করছে কনিকা চলে যাবে বলে। কনিকা এখনো খুব একটা মন খারাপ করছেনা তবে বুঝা যায় সে একটা দুদোল্যমান অনুভুতিতে ভোগছে। কারন একদিকে কনিকা আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারে বেশ খুসী, অন্যদিকে বাড়ি ছাড়ার কষ্ট। মিটুলের অবস্থাটাও প্রায় ওই একই রকমের। আর আমার? আমার শুধু একটাই ভয়, ওরা যেনো ভালো থাকে যেখানেই থাকুক। মন তো খারাপ হচ্ছেই। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। আমি মেনে নিয়েছি বাস্তবতা।

বাড়িটায় সারাক্ষন কনিকাই মাতিয়ে রাখতো, বাসায় যতো কথাবার্তা, যতো হইচই কনিকাই করতো। এই পরিবেশটা মিস করবো আমরা। অফিস থেকে আমি বাসায় আসার পর প্রথমেই আমি ঢোকি সাধারনত কনিকার রুমে আর তার সাথে উম্মিকার রুমে। ইদানিং উম্মিকা ডেল্টা মেডিক্যালে জব করে বলে, প্রায়ই আমি খবর নেই মেয়েটা লাঞ্চে খাবার খেয়েছে কিনা বা রাত সাড়ে আটটা বাজলেই মনে করিয়ে দেই, উম্মিকাকে আনতে গাড়ি গেছে কিনা।

আমি জানি, কনিকা যেদিন আমেরিকার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হবে ইনশাল্লাহ, সেদিন আমার ভিতরে কি কি ঘটবে কিন্তু মনকে সক্ত করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। যতোক্ষন না কনিকা তার ডেস্টিনেশনে গিয়ে পৌছায় ততোক্ষন আমি জানি ওর ফ্লাইট মনিটর করতে থাকবো। যখন আল্লাহর রহমতে কনিকা আমেরিকায় ওর ডেস্টিনেশনে পৌঁছাবে, হয়তো তখন একটু ভালো লাগবে যে, ওখানেও অনেক আত্তীয় স্বজনেরা আছেন যারা কনিকাকেও অনেক ভালোবাসে, তারা দেখভাল করবে।

কনিকা অনেক খুতখুতে। কিন্তু গোছালো। ওর কোনো কিছুই অগোছালো থাকে না। কোন একটা জিনিষ এদিক সেদিক হলেই ওর সেটা ভালো লাগে না। মেজাজ খারাপ করে। ফলে ভয় পাচ্ছি, নতুন পরিবেশে কতটা দ্রুত কনিকা এডজাষ্ট করতে পারে। ওখানে কনিকাকে সব কিছুই নিজের হাতে করতে হবে। পারবে কিনা জানি না। তবে প্রথম প্রথম কনিকা হোমসিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। এটা কাটিয়ে উঠতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

আমি কনিকা যেনো আমেরিকায় অন্তত টাকা পয়সা নিয়ে কোনো রুপ সমস্যায় না পরে, সেইটা শতভাগ নিশ্চিত করেছি (আলহামদুলিল্লাহ)। আসলে আমি ইদানিং আমার জীবনের মুল পলিসিটাই বদল করে ফেলেছি। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। যাতে আমি না থাকলেও আমার সন্তানেরা কোথাও কোন সমস্যায় না পড়ে, বাকীটা আল্লাহ ভালো জানেন। আমার জমি জমা, টাকা পয়সার এসেটের থেকে বড় এসেট আমার মেয়েরা। এদের জন্য পয়সা খরচে আমার কোনো কার্পন্য নাই। যতোটুকু আমার সক্ষমতা আছে, আমি ওদেরকে ততোটাই দিতে চাই।

গতকাল রাতে প্রথম দেখলাম, উম্মিকা কনিকা দুজনেই বেশ ইমোশনাল ছিলো। ব্যাপারটা ঘটছে কারন সময়টা খুব কাছাকাছি কনিকার চলে যাওয়ার। ফলে উম্মিকাও অনেকটা খুব বেশী মন খারাপ করে আছে। চৈতী এসছে কনিকার যাওয়ার কারনে। ওরা সবাই খুব কাছাকাছি ছিলো সব সময়। ওদের বয়সের তারতম্য থাকলেও কনিকাই ছিলো যেনো ওদের সবার মধ্যে নেতা। ওর আবদার কেউই ফেলতো না।

বিমানবন্দর ঢোকার জন্য পাশ এর অবস্থা এখন খুব কড়াকড়ি। কোথাও থেকে কোনো পাশ পাচ্ছি না। ব্যাপারটা একটু হতাশার। অনেককেই বলেছি কিন্তু সব জায়গা থেকেই নেগেটিভ ফলাফল আসায় একটু আরো ভয়ে আছি। আমার দোস্ত উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছি যে, সিভিল এভিয়েশন আসোশিয়েসন অফ বাংলাদেশ থেকে অন্তত কয়েকটা পাশ জোগাড় করতে। ওই সংস্থার চেয়ারম্যান হচ্ছে এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান। সে আমাদের থেকে এক কোর্ষ সিনিয়ার কিন্তু আমার সাথে কখনো পরিচয় হয় নাই। যেহেতু মাসুদ এয়ার ফোর্সের, তাই একটা ভরষা মাসুদ দিয়েছে যে, সে পাশ জোগাড় করতে পারবে। কিন্তু ব্যাপারটা আমি এখনো সিউর হতে পারছি না আসলেই মাসুদ পাশ জোগাড় করতে পারবে কিনা।

কনিকা হয়তো ওর বাড়ি ছাড়ার অনুভুতিটা ঠিক এই মুহুর্তে ততোটা উপলব্ধি করতে পারছে না। কিন্তু যেদিন কনিকা স্টেপ আউট করবে, আমি জানি, ওর সবচেয়ে বেশী মন খারাপ থাকবে। যদি এমন হয় যে, পাশ একটাও পাওয়া গেলো না, তাহলে কনিকাকে একাই সব সামাল দিতে হবে। লাগেজ বুকিং, বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ, চেক ইন, ইত্যাদি।  আর যদি একটা পাশও পাই তাহলে শুধু মাত্র আমি ভাবছি মিটুলকে দিয়ে দেবো যাতে মিটুল সবকিছু ম্যানেজ করে মেয়েকে যতোদূর পারে উঠিয়ে দিতে। আর যদি দুটু পাই, তাহলে সাথে উম্মিকাকে দিয়ে দেবো। আর যদি বেশী ভাগ্যবান হই, আমিও পাই, তাহলে তো আল্লাহর রহমত, আমরা অকে সবাই এক সাথে বিমানে তুলে দিতে পারবো। কনিকা কাতার এয়ার ওয়েজে যাচ্ছে ইনশাল্লাহ।

আজ শুক্রবার। ভেবেছিলাম, বাইরে কোথাও যাবো। কিন্তু কনিকাকে এই মুহুর্তে বাইরে বের করতে চাই না। চারিদিকে করোনার প্রভাব খুব বেশী। কনিকার করোনা টেষ্ট করাতে হবে ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে। তাই খুব একটা বের করতে চাই না কনিকাকে। তাই সবাই চিন্তা করছি- আমাদের ছাদের উপরে ঘরোয়া একটা পার্টি করবো যেখানে শুধুমাত্র আমরাই থাকবো। জাষ্ট একটা আউটিং এর মতো আর কি।

একটা সময় আসবে যেদিন আজকের এই অনুভুতিটা হয়তো আমি আগামী ৪ বছর পর যখন পড়বো, তখন আমার অনুভুতি হয়তো হবে পুরুই ভিন্ন। সফলতার গল্পে আমি হয়তো অনেক গল্প করবো এই কনিকাকে নিয়ে। আমি সব সময় উম্মিকাকেও বলে যাচ্ছি, সেও চলে যাক আমেরিকায়। তাহলে দুই বোন এক সাথে থাকলে আমিও কিছুটা ভরষা পাই। কিন্তু উম্মিকার যাওয়ার ব্যাপারটা খুব ধীর। সে মনে হয় বাইরে মাইগ্রেশন করতে চায় না।

দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোথায় আমাদেরকে নিয়ে যায়। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদেরকে ভালোবাসেন।

০৫/০৮/২০২১-অদ্ভুত একটা স্বপ্ন

সকালে ঘুম ভাংগার সাথে সাথে রাতের একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। কি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম যার মানেটা আমি বুঝার চেষ্টা করেছি বটে কিন্তু এর কোনো কুল কিনারা পাই নাই। মাঝে মাঝে আমি খুব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি- কিছু স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমি অনেক অনেক বছর পর মিলিয়ে দেখলে কিছুটা বাস্তবে মিল পাই, অধিকাংশ স্বপ্নের কথা আমার আর মনে থাকে না বটে কিন্তু মনের ভিতরে কিছু একটা খস খস করতে থাকে। আমি প্রায় ভোর রাতের দিকে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তার কিছুক্ষন পরেই আমার ঘুম ভেংগে যায়। স্বপ্নটা ছিলো এ রকম-

আমার পার্টনারের মেয়ে আনিকা বিদেশ থাকে, সে কি কারনে অথবা কোনো উদ্দেশ্যে কাউকে সে খুন করে ফেলে। খবরটা আমার কাছে যখন আসে, তখন আমি খুব চমকে চাই যে, মেয়েটা খুবই শান্ত শিষ্ট যাকে দিয়ে এমন একটা কাজ কখনোই সম্ভব না। তারপরেও ব্যাপারটা ঘটেছে। সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমার পার্টনার এই বিষয়টা নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন বলে মনে হলো না, না তার মেয়ে। সে দেশে ফিরে এসেছিলো ঘটনাটা ঘটার পর পরই। আমিও আর ওকে জিজ্ঞেস করি নাই, আসলে ঘটনাটা জানার পর ওর সাথে আমার আর দেখাও হয় নাই। এর মধ্যেই আমার ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো। আমি একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছিলাম যে, ব্যাপারটা অন্য কারো সাথে ঘটেছে বলে আমিও যেনো একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম না এই ভেবে যে, এটা তো আমার পরিবারের বা আমার কোনো সমস্যা না। যাদের সমস্যা তারাই এটা নিয়ে সামাল দেবে।

আমার ঘুম ভাংগার পরেই আমি ব্যাপারটা নিয়ে বেশ অনেক ক্ষন ভেবেছি যে, এমন একটা স্বপ্ন তো আমার দেখার কন কারনই নাই। তাহলে কেনো এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম? বারবার মনে পড়ছিলো যে, আমার ছোট মেয়ে কনিকা আগামী ১১ তারিখে আমেরিকা যাচ্ছে। এমন কোনো সংকেত না তো যা আমাকে স্বপ্নের মধ্যে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হলো? আল্লাহর কাছে আমি এমন কোন খবর কাউকেই পেতে দিতে চাই না, হোক সেটা আমার বা আমার পরিচিত কোনো লোকের। আল্লাহ আমাদের সমস্ত বালা মুসিবত দূর করে দিক, এই দোয়া করছি।

কনিকার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি আমেরিকায় চলে যাওয়ার। ব্যাপারটা এখনো উপলব্ধিতে আসে নাই যে, সে অনেক বছরের জন্য আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। আমি জানি, যেদিন সত্যি সত্যিই কনিকা চলে যাবে আমেরিকায়, সেদিন আমার স্ত্রী, উম্মিকা বা ওর সাথে যারা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত, তাদের সবার মন খারাপ হবে, কান্নাকাটি করবে। কনিকা নিজেও মন খারাপ করবে। কিন্তু নিয়তির এটা একটা চক্র যে, সন্তানেরা বড় হলে পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সাথে পিতামাতার সম্পর্ক থাকে বৈ কি কিন্তু তারা তাদের কাছে খুব কমই থাকে। কনিকা যেখানেই থাকুক, বা উম্মিকা, তারা যেনো ভালো থাকে আমি সব সময় এই দোয়াই করি।

০২/০৮/২০২১-কফিনের আয়না

সবার মুখে সব সময় আমি একটা কথা শুনি- কেনো পৃথিবীটা এ রকম করে বদলে যাচ্ছে? কেনো সবাই ভালো হয়ে যায় না? কবে ভালো হবে আমাদের মানুষের স্বভাব চরিত্র? কেনো কোনো কিছুই ঠিক নাই চারিদিকে?

আসলে এই প্রশ্ন গুলি আমারো।

আমিও অনেক সময় ভেবে দেখেছি- আসলেই কোথায় গন্ডোগোলটা?

তাই আমি একবার একটা এক্সপেরিমেন্ট চালালাম। বেশ অনেক গুলি লোককে ডেকে বললাম-আপ্নারা কি দেখতে চান কাদের কারনে আমাদের এই সমাজ টা বদল করা যাচ্ছে না। কারা এই পুরু সমাজের অধোপতনের জন্য দায়ী?

সবাই এক কথায় সেই সব লোকদের চেহাড়া দেখার জন্য উৎসুক হয়ে উঠলো।

আমি যাদেরকে ডেকেছিলাম, তাদের মধ্যে কেউ ছিলো যুবক, কেউ ছিলো পুলিশের কিছু লোক, অনেকে ছিলেন সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা আবার কেউ ছিলেন বেশ নীচু স্তরের কিছু শ্রমিক বৃন্দ।

আমি বললাম, আপ্নারা যদি সবাই তাদের দেখতে চান তাহলে আমার রুমে টেবিলের উপর যে ল্যাপ টপ টা আছে, সেখানে একে একে ওই সব লোকদের দেখতে পাবেন কিন্তু যেহেতু ব্যাপারটা বেশ স্পর্শ কাতর, তাই আমি সবাইকে এক সাথে দেখাতে চাই না। এক জন একজন করে আমার রুমে এসে দেখতে পারেন।

আমি আসলে যে কাজটা করেছিলাম সেটা হচ্ছে- ল্যাপ টপের আদলে আমি আমার টেবিলের উপর একটা আয়না ফিট করে রেখেছিলাম। যখনই কেউ দায়ী লোকদের দেখার জন্য ওই ল্যাটপের দিকে তাকান, তখন সে আসলে তার নিজের ছবিটাই দেখতে পাচ্ছিলেন।

(চলবে)

০১/০৮/২০২১-মুর্তজা ভাইয়ের নীতি ও আদর্শ

এই লেখাটা আমার লিখা দরকার ছিলো আরো আগে। কিন্তু যে কোনো কারনেই সময়মত লিখাটা শুরু করতে পারিনি। লেখাটা আমার ব্যবসায়িক পার্টনার মুর্তজা ভাইকে নিয়ে।

আজ থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে আমি মুর্তজা ভাইয়ের সাথে রিভার সাইডের মাধ্যমে ব্যবসায়ীক পার্টনারশীপ শুরু করি। আমাকে পার্টনার হিসাবে ওনাদের নেয়ার কোনো কারন ছিলো না। কারন আমি ২০০৮ সাল অবধি যদিও গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ শুরু করেছি কিন্তু আক্ষরীক অর্থে আমি তখনো কোনো মুল্যবান বায়ার কিংবা এই জাতীয় মানুষদের সাথে যেমন ভালো রকমের বন্ধন তৈরী করতে পারিনি, তেমনি গার্মেন্টসের প্রোডাকশনের ব্যাপারেও খুব একটা মাষ্টারী আয়ত্ত করতে পারিনি। অন্যদিকে ২০০৮ সালেই মুর্তজা ভাই এবং তার সাথে আসা শ্রীলংকার প্রিয়ান্থা দুজনেই এই সেক্টরে বেশ জোরালো অভিজ্ঞতা নিয়েই বসে আছেন। তারপরেও কেনো তারা আমাকে কিছু অংশ দিয়েও পার্টনারশীপ করে রেখেছেন সে ব্যাপারটা ইতিমধ্যে আমি আমার পূর্বের লেখায় বিস্তারীত আলাপ করেছিলাম। ফলে আমি জানতাম আমার ভূমিকা আসলে ফ্যাক্টরীতে কি এবং কতটুকু। আমি ইচ্ছা করলে এই সেক্টরেও অনেক ভালো একজন অভিজ্ঞ মাষ্টারপিস এমডি হিসাবে নিজেকে তৈরী করতে পারতাম। কিন্তু কেনো জানি আমার এই ট্রেডের কোনো কিছুই নিজের কাছে ভালো লাগতো না। তাছাড়া যেহেতু মুর্তজা ভাই এবং প্রিয়ান্থা দুজনেই কাজগুলি বেশ ভালোভাবেই হ্যান্ডেল করছেন, সেখানে আমার আবার উপজাজক হয়ে নাক গলানোর কোনো কারন দেখি নাই। আমার কাজ ছিলো লোকাল প্রশাসন ঠিক রাখা, শ্রমিকদের ব্যাপারে নজর রাখা আর কমপ্লায়েন্স বিসয়ক কাজগুলি করা। এটাও অনেক বড় একটা কাজ। পেটি ক্যাশ, পারচেজ, এ সবই আমার দায়িত্তে ছিলো।

প্রিয়ান্থা মারা যাওয়ার পর আমার শেয়ার বেড়ে গিয়েছিলো, অন্যদিকে মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ারও বেড়ে গিয়ে আমাদের অনুপাতটা দাড়িয়েছিলো ৬৫/৩৫, বা ৩৫/৬৫। অর্থাৎ আমার ৩৫ আর মুর্তজা ভাইয়ের ৬৫। আমার এ ব্যাপারে আসলে কোনো চাহিদা বা বিড়ম্বনাও ছিলো না। একটা চাকুরী করে এসেছি প্রায় ২০ বছর। প্রাইভেট কোনো চাকুরী করতে চাই নাই। ফলে এখানে একটা সম্মানজনক পদবী নিয়ে (এমডি) নিজের মালিকানার ফ্যাক্টরিতে যাইই পাই, তাতেই আমি খুসি ছিলাম। অন্তত আমার একটা অফিস আছে, মাসে যে কয় টাকা অনারারিয়াম পাই তাতে আমার সংসারের সব খরচ পুষিয়ে যায়। আর তো কিছু আমার আসলে লাগেও না। আমি আমার ফ্যাক্টরীর কাজগুলি করে প্রচুর বই পড়ি, লেখালেখি করি। সময়টা ভালোই কাটছে আমার। ফাইনান্সিয়াল বেশীর ভাগ সিদ্ধান্ত মুর্তজা ভাই যেটা নেন, তিনি আমাকে জানান এবং আমি প্রায় সময়ই সে সিদ্ধান্তে পজিটিভ বলে দেই। এভাবেই চলছে গত প্রায় ১২/১৩ বছর। আমরা ফ্যাক্টরীর কোনো প্রোফিট নেই না, কিন্তু যখন যার যা লাগে, ফ্যাক্টরী থেকে লোন হিসাবেই আমরা তা ড্র করি। বছর শেষে গিয়ে আমরা কে কত টাকা ড্র করি সেটা লিপিবদ্ধ থাকে। যেমন একটা উদাহরণ দেই-

ধরুন আমি সারা বছরে ড্র করেছি ৫ টাকা, আর মুর্তজা ভাইও ড্র করেছেন ৫ টাকা। ফলে সারা বছরে আমরা দুজনে ড্র করেছি মোট ১০ টাকা। অতঃপর আমরা এইভাবে কাউন্ট করতাম যে, এই ১০ টাকা মোট ড্র করার মধ্যে আমার করা উচিত ছিলো ৩৫% হিসাবে সাড়ে তিন টাকা আর মুর্তজা ভাইয়ের ড্র করা উচিত ছিলো ৬৫% হিসাবে সাড়ে ছয় টাকা। ফলে আমি যেহেতু ৫ টাকা ড্র করেছি, তাই আমি বেশী ড্র করেছি দেড় টাকা আর মুর্তজা ভাই ড্র কম করেছেন দেড় টাকা। সুতরাং আমি এই দেড় টাকা আসলে মুর্তজা ভাইয়ের কাছে পরোক্ষভাবে ঋণী।

কিন্তু হিসাবটা এভাবে হওয়া উচিত ছিলো না। উচিত ছিলো, সেই বছরে আমাদের ফ্যাক্টরী মোট কত টাকা লাভ বা প্রোফিট করেছিলো, তার থেকে ৩৫/৬৫ হিসাবে ড্র করা। তাতে হিসাবটা হতো পারফেক্ট। যাইই হোক, হয়তো আমরা আমাদের প্রোফিট সম্পুর্ন তুলে নিতাম না বলেই আমাদের ফ্যাক্টরীর এসেট বেড়েছে, মেশিন কিনে সেই লোন শোধ করতে পেরেছি ইত্যাদি। হিসাবটা এভাবেই চলছিলো প্রায় ১২ বছর। আমাদের চাহিদা খুব একটা বেশী ছিলো না। তাই আমাদেরকে অনেক টাকাও ড্র করতে হয় নাই। কিন্তু এক্সিটিং হিসাব মতে যখন আমরা হিসাব টান দিলাম, দেখলাম, আমি প্রায় ৮০ লাখ টাকা বেশী ড্র করে ফেলেছি আর মুর্তজা ভাই সেই একই পরিমান টাকা কম ড্র করেছেন।

এখানে আরো একটা কথা বলা দরকার যে, আমি ফ্যাক্টরীর অগ্রিম ভারার জামানত হিসাবে এক কোটি টাকা বিল্ডিং এর মালিককে দিয়ে রেখেছিলাম ২০১৪ সালে। সেই টাকাটার প্রতিমাসে ১ লক্ষ করে টাকা এডজাষ্ট করা হয়। কিন্তু আমি কখনো টাকাটা নেই নাই। কারন আমি জানি যে, যেহেতু কিছু টাকা আমি বেশী ড্র করেছি, এক সময় এই অতিরিক্ত ড্র এর সাথে ভাড়ার অগ্রিম টাকাটা আমি হয়তো এডজাষ্ট করে দেবো। অন্যদিকে ২০১৯ সালে যখন ফ্যাক্টরির ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসে পড়েছিলো, তখন মুর্তুজা ভাই নিজে আবার এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে লোন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আমার লোন দেয়া ছিলো ফ্যাক্টরিতে এক কোটি টাকা জামানত হিসাবে ২০১৪ সাল থেকে, আবার মুরতজা ভাইয়ের লোন দেয়া ছিলো এক কোটি আশি লাখ টাকা ২০১৯ সাল থেকে। অন্যদিকে আমি যা ড্র করেছি আর মুর্তজা ভাই যা ড্র করেছেন, তার ফারাক হলো প্রায় ৮০ লাখ টাকা।

একদিন হটাত করে মুর্তজা ভাই আমাদের একাউন্ট অফিসারকে নির্দেশ দিলেন যে, আমাদের পুরু ফ্যাক্টরীর এসেট ভ্যালু বের করতে। অর্থাৎ মেশিনারিজ লোন, সান্ডে ক্রেডিটরস লোন, অন্যান্য আনুষঙ্গিক সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে একচুয়াল কত টাকার মালিক রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড। সালটা তখন ২০১৯। দেখা গেলো যে, আমাদের প্রতিটি শেয়ার ভ্যালু দাড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তেরো লক্ষ টাকা। অর্থাৎ ১০০ পার্সেন্ট ভ্যালু প্রায় সাড়ে তেরো কোটি টাকা। আমি অতো চালাক মানুষ নই, আর টাকা পয়সা আমার কাছে কখনোই খুব বড় একটা বিষয় হিসাবে ছিলো না। আমার যতটুকু লাগে, তা পেলেই আমি খুসী এবং সুখী। আর এর বাইরে কার কি থাকলো আর কি থাকলো না, আমি সে ব্যাপারে কখনো মাথা ঘামাই নাই। আর রিভার সাইড নিয়ে তো আমার ধারনা শতভাগ যে, মুর্তজা ভাই সব সময় সঠিক কাজটাই করেন। কিন্তু মুরতজা ভাই এর মাথায় সব সময় অসংখ্য বুদ্ধি কাজ করে আর খুব দ্রুত তিনি একটা জটিল জিনিষ বুঝে ফেলেন। আমি সেগুলি বুঝতে গিয়ে অযথা মাথা নষ্ট করার পক্ষে না।

যে কারনে আজকের এই লেখাটা সে ব্যাপারে এখন আসছি। গত এপ্রিল মাসে (২০২১) তারিখে হটাত করে মুর্তজা ভাই আমাকে বললেন যে, আমি যে ৮০ লাখ টাকা বেশী ড্র করেছি ফ্যাক্টরী থেকে, আর সেই একই পরিমান ৮০ লাখ টাকা যে মুর্তজা ভাই ড্র কম করেছেন, সে টাকাটা আমি যেনো প্রতি শেয়ার বাবদ সাড়ে তেরো লাখ টাকা হিসাবে ওনার স্ত্রীর নামে প্রায় ৬% শেয়ার দিয়ে দেই। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অপছন্দ হয়েছিলো দুটি কারনে- (ক) উনি কি চান না যে আমি শেয়ার হোল্ডার হিসাবে থাকি? কারন যদি এভাবে আমরা অতিরিক্ত টাকা ড্র করার কারনে একজন আরেকজনের কাছ থেকে শেয়ারের বিনিময়ে টাকা শোধ করতে থাকি, তাহলে তো এক সময় হয় আমি শেয়ারবিহীন হয়ে যাবো অথবা উনি শেয়ারবিহিন হয়ে যাবে। (খ) দ্বিতীয় কারন হলো- আমার কাছে টাকা পাবে রিভার সাইড আর উনি টাকা পাবে রিভার সাইড থেকে। তাহলে আমি সরাসরি আমার শেয়ার উনাকে দেবো কেনো?

আমি তখন আমার একাউন্ট অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা যে পদ্ধতিতে কে কত টাকা উত্তোলন করি, আর তার ভিত্তিতে যে কম বেশী ড্র এর কথা বলি, এটা কি ঠিক? আমরা তো ড্র করবো একটা সার্টেন প্রোফিট থেকে। আমরা যেটা দুইজনে ড্র করি, আসলে সেটা তো একচুয়াল প্রোফিট নয়!! তাহলে আমরা সেটাকেই ফাইনাল প্রোফিট ধরে কেনো কম বেশী বলছি? একাউন্ট অফিসার আমার সাথে একমত। কারন ড্রইংস এর ব্যাপারটা অবশ্যই কোনো একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট থেকে হতে হবে। যেমন বাৎসরিক প্রোফিট। যেমন-

উপরের উদাহরনটায় আবার আসি। আমি যদি ৫ টাকা ড্র করে থাকি আর মুর্তজা ভাইও যদি ৫ টাকা ড্র করে থাকেন। আর আমাদের সেই বছরে যদি ২০ টাকা লাভ হয়ে থাকে, তাহলে ৩৫% হিসাবে আমার ড্র করার কথা ৭ টাকা আর মুর্তজা ভাইয়ের ড্র করার কথা ১৩ টাকা। কিন্তু আমি ড্র করেছি ৫ টাকা আর মুর্তজা ভাই ড্র করেছেন ৫ টাকা। না আমি অতিরিক্ত ড্র করেছি, না মুর্তজা ভাই। আমরা দুজনেই ফ্যাক্টরি থেকে যথাক্রমে আরো ২ টাকা এবং উনি আরো ৮ টাকা ড্র করতে পারবেন। এটাই হবার কথা। আর এটাই আসল হিসাব। যদি এভাবে আমরা গত ১২ বছরের লস এন্ড প্রোফিট টান দেই, দেখা যাবে, আমরা আক্ষরীক অর্থে যে টাকা ড্র করেছি, তার থেকে আরো অনেক বেশী টাকা ড্র করতে পারতাম। আমরা কেউ ফ্যাক্টরীর কাছে লোনে তো থাকতামই না, বরং ফ্যাক্টরীর কাছ থেকে আমরা আরো টাকা নিতে পারি।

মুর্তজা ভাইয়ের এমন একটা প্রোপোজালের কারনে আমার মনে হলো যে, উনি সার্থপরের মতো কথা বলেছে যা আমার কাছে কখনোই ঠিক মনে হয় নাই। আমিও যদি মুর্তজা ভাইয়ের মতো এমনভাবে বুদ্ধি করতাম, তাহলে ২০১২ সালে যখন মুর্তজা ভাই তার পরিচালিত লাক্সমা ফ্যাশন নিয়ে ভীষন বিপদের মধ্যে পরেছিলো, আর লাক্সমার মালিক রানা শফিউল্লাহ্র কাছে প্রায় ৪/৫ কোটি টাকার একটা ঋণে পড়ে গিয়েছিলো, তখন আমিই সবসময় এই ফ্যাক্টরী থেকে অনেক অনেক টাকা আপাতত তার সমস্যা দূরীকরনের জন্য লোন নিতে বলেছিলাম। অথচ আমার তখন কোনো ড্রইংসই ছিলো না। আমিও কিন্তু তখন মুর্তজা ভাইকে বলতে পারতাম যে, অতিরিক্ত ড্রইংস এর কারনে তিনি যেনো আমাকে কিছু শেয়ার লিখে দেন। এটা তো আমার মাথাতেই আসে নাই। আর আসলেও আমি কখনোই এটা করতাম না। সবকিছু ভেবে আমার একটা জায়গায় আমার মাথা স্থির হয়ে গেলো যে, মুর্তজা ভাই আসলে আমাকে হয়তো তার সত্যিকারের পার্টনার হিসাবে কখনোই মন থেকে মেনেই নেন নাই। অথচ আমি সব সময় তাকে মনে করেছি একটা ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ আর আমার যদি কেউ থেকে থাকে মুর্তজা ভাই হচ্ছেন সে লোক। আমার ধারনাটা ভুল বলে প্রমানিত হলো আজ।

যাই হোক, আমি একাউন্ট অফিসারকে নির্দেশ দিলাম যে, গত ২০১২ সাল থেকে আমাদের প্রতি বছরের লস এন্ড প্রোফিট বের করো যাতে আমরা বুঝতে পারি আমরা কে কত টাকা ফ্যাক্টরী থেকে ড্র করতে পারি আর কত টাকা ড্র করেছি। সে অনুপাতে যদি আমি বেশী ড্র করে থাকি তাহলে আমি যে ১ কোটি টাকা ভাড়ার জামানত হিসাবে দিয়েছি সেটা থেকে সমন্নয় করো। আর যদি সমন্নয় করার পর মনে হয় আমি আরো অতিরিক্ত টাকা নিয়েছি, সেটা আমি ক্যাশ পে করে দেবো ফ্যাক্টরীকে, মর্তুজা ভাইকে নয়।

আমার এই ব্যাপারটা মুর্তজা ভাই কিছুতেই পজিটিভভাবে নিলেন না। উনি যে এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে লোন দিয়েছিলেন ২০১৯ সালে, সেটা তিনি আমার কাছে চেয়ে পাঠালেন। আমি একাউন্ট অফিসারের সাথে বসে আমার অগ্রিম টাকার সাথে আমার ড্রইংস ইত্যাদি মিলিয়ে দেখলাম যে, আমি আরো ৪ লাখ টাকা ফ্যাক্টরীর কাছ থেকে পাই। অতিরিক্ত তো নাইই। এখন শুধু থাকে মুর্তজা ভাইয়ের দেয়া এক কোটি আশি লাখ টাকার লোন। আমি আরো হিসাব করে দেখলাম, যে, মুর্তজা ভাই এর টাকা পুরুটাই ফ্যাক্টরী থেকে এককালীন দেয়া সম্ভব। আমি চেক কেটে দিয়েও দিলাম। ফলে, আমিও কোনো টাকা আর পাই না ফ্যাক্টরী থেকে, মুর্তজা ভাইও আর কোনো টাকা পান না ফ্যাক্টরী থেকে। আমাদের কারো কোনো লোনও নাই, আবার আমরা পাইও না।

কিন্তু বুদ্ধি যার অনেক, তার কাছে পথ অনেক খোলা। মুর্তজা ভাই একাউন্ট অফিসারকে জানালেন যে, উনি যে ২০১৯ সাল থেকে এক কোটি আশি লাখ টাকা ফ্যাক্টরীকে দিয়ে রেখেছেন, এর লাভের অংশ কৈ? অন্তত উনি তার ইন্টারেষ্ট চান। মুর্তজা ভাইই ইন্টারেষ্ট হিসাব করে একাউন্ট অফিসারকে জানালেন যে, এক কোটি আশি লাখ টাকার এই কয়েক বছরে (২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত) মোট ৫৩ লক্ষ টাকা ইন্টারেষ্ট আসে। সেটা উনি চান। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এই কারনে যে, উনি তো ফ্যাক্টরীর মালিকও বটে। তাই বলে কি নিজের ফ্যাক্টরি থেকে নিজে সুদ নেয়া যায়? কিছুই বললাম না, আমি মেনে গেলাম আর মুর্তজা ভাইকেও আমি তার এক কোটি আশি লাখ টাকার ইন্টারেষ্ট হিসাবে আরো ৫৩ লাখ টাকার চেক কেটে সমুদয় হিসাব ক্লিয়ার করে দিলাম।

আমার একাউন্ট অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, স্যার আপনি যে এক কোটি টাকা ২০১৪ সাল থেকে ফ্যাক্টরীর জন্য জামানত হিসাবে দিলেন, সেটার সুদ আপনি নিবেন না? আমি বললাম, মুর্তজা ভাই নিতে পারে, কিন্তু আমি নেবো না। আমি যদি ইন্টারেষ্ট নেই, তাহলে ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল মোট ৮ বছরে ইন্টারেষ্ট আসবে আরো প্রায় দেড় কোটি টাকা। সেটা আমার দরকার নাই। আমি ফ্যাক্টরীর মালিক। যদিও মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ার আমার থেকে বেশী কিন্তু তার থেকে আমার কলিজা আরো বড়। আমার দরকার নাই কোনো লাভের বা সুদের।

এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়। মুর্তজা ভাই যখন তার ফ্ল্যাট কিনেন, তখন তিনি কোনো একটা ব্যাংক থেকে প্রায় কোটি টাকার লোন নিয়েছিলেন। সম্ভবত স্ট্যান্ডার্ড চেটার্ড ব্যাংক থেকে। যখন তিনি আমাকে জানালেন যে, অনেক টাকার সুদ দিতে হয়। তাই ফ্যাক্টরী থেকে উনি এককালীন ৯০ লক্ষ টাকার একটা ক্যাশ নিয়ে তার ফ্ল্যাটের টাকাটা পরিশোধ করতে চান। আমি সাথে সাথেই ইয়েস বলে দিয়েছিলাম। মুর্তজা ভাই কিন্তু ওই টাকাটা পরে আর ফেরত দিয়েছিলো কিনা সেটাও আমি যাচাই করি নাই। হয়তো দিয়ে থাকবেন। কিন্তু অবশ্যই ইন্টারেষ্টসহ তিনি আমাদেরকে ফেরত দেন নাই এটা সিউর। উনি আদৌ ওই টাকাটা ফেরত দিয়েছিলেন কিনা সেটাও আমি জানি না। কারন আমার জানার কোনো আগ্রহ ছিলো না। তবে যদি সুক্ষভাবে আমি পুরু হিসাব টান দেই, আমি শতভাগ না হলেও প্রায় নিশ্চিত যে, উনি টাকাটা দেন নাই। আজ এটা নিয়েও আমি কোনো কথা বলতে চাই না কারন এটা বলতে গেলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে আমাদের ফ্যাক্টরী।

আমি জানি আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজে একটা লোন আছে প্রায় সোয়া কোটির মতো। এটা যদি মুর্তজা ভাইয়ের হতো, তিনি ঠিকই ফ্যাক্টরী থেকে কোনো না কোনো কায়দায় হয়তো আমার কাছে এটা পাশ করিয়ে নিয়ে লোনটা শোধ করে দিতেন। আমি অনেকবার এই ব্যাপারটা নিয়ে ওনার সাথে কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমার ব্যাপারটা কিন্তু ফয়সালা হয় নাই। আসলে মুর্তজা ভাই আমার লোক নন এটা এখন আমার কাছে খুব ভালোভাবে ক্লিয়ার। উনি রিভার সাইডে ভালো ব্যবসা করতে পারছে আর সেটা অনেকটা আমার কারনে, সেই সুযোগটা তিনি শুধু কাজে লাগাচ্ছেন।

আমি বুঝে গেছি, আমার অবস্থানটা কোথায় মুর্তজা ভাইয়ের মনের ভিতর। এটা শুধুই পার্টনারশীপ। যদি সেটাই হয়, তাহলে আমার তো প্রতিটা বিশয়েই এখন থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যেমন হিসাব নেয়া দরকার, তেমনি মাসিক প্রোফিটটাও আমার তুলে নেয়া দরকার। আমার টাকা লাগুক বা না লাগুক, সেটা আমি এখন থেকে করবো। উনি তার টাকা তুলে নিক বা না নিক, সেটা তার ব্যাপার, কিন্তু আমি আমারটা তুলে নেবো। আরেকটা  মজার বিষয় হলো, উনি মাঝে মাঝে দাইয়ু কিংবা সন্দীপ দাদা কিংবা নাইম ভাইয়ের জন্য লোন নেন। কিন্তু নিজের নামে নেন না। ফলে যখন ব্যক্তিগত ড্রইংস এর হিসাবটা আসে, তখন এসব লোন গুলি তার নামে আসে না অথচ লোন গুলি তিনিই নিচ্ছে তাদের নামে। অন্যদিকে আমি যখন মা ইন্ডাস্ট্রিজের নামে লোন নেই, তখন আমি ব্যক্তিগত ড্রইংস হিসাবেই উল্লেখ করি। ফলে একদিকে ওনার ব্যক্তিগত লোন বাড়ে না আবার আমার ব্যক্তিগত লোন বেড়ে যায়। তাই, আমি এবার থেকে মনস্থ করেছি যে, ওইসব ব্যক্তি কিংবা সংস্থা তো আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে কোনোভাবেই লোন নেয়ার ইখতিয়ার নাই। সেক্ষেত্রে ওইসব লোন আমি মুর্তজা ভাইয়ের নামেই দেখাবো। আর যতোদিন তারা লোন ব্যাক করতে না পারবে, ইন্টারেষ্ট উঠতেই থাকবে কারন শিক্ষাটা তো মুর্তজা ভাইই আমাকে শিখিয়েছেন। অন্তত ব্যাপারটা তো আমি তাকে মনে করিয়েই দেবো যাতে তিনিও বুঝেন যে, লাভ শুধু একদিকে নয়, লাভ দুই দিকের অংশেই কাউন্ট করা নীতিবানের কাজ।

এই সব ব্যাপার গুলি নিয়ে মুর্তজা ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা আগের মতো আর নাই। আমি এটা কখনো ভাবিই নাই যে, এমন একটা পরিস্থিতি মুর্তজা ভাই তৈরী করবেন নিজের সার্থে আর নিজের লাভে। যে আইন তা আজ তিনি আমার কাছে এপ্লাই করলেন, বা যে নিয়মে মুর্তজা ভাই ফ্যাক্টরী থেকে ইন্টারেষ্ট সহকারে আদায় করলেন, কিংবা অতিরিক্ত টাকা ড্রইংস করলে যে শেয়ার দিয়ে দিতে হয়, এইসব যদি কোনো একদিন মুর্তজা ভাইয়ের জীবনে ওই লাক্সমার মতো পরিস্থিতিতে উনি পড়েন, আমি সব কিছু মনে করিয়ে দেবো একদিন। সেদিন শুধু দেখবো ওনার চোখে কোন ব্লিক পড়ে কিনা। 

মুর্তজা ভাইয়ের আরো কিছু  নীতির কথা আমি এই মুহুর্তে বলতে চাচ্ছিও না কারন তার নীতি তার কাছে আর আমারটা আমার কাছে।

(ক)    পলাশ পুরের তার ভাইয়ের জমির ব্যাপারটা

পলাশপুরে মর্তুজা ভাইকে আমি কিছু জমি কিনে দিয়েছিলাম। তার সাথে তার বড় ভাই এবং এক বন্ধু ও উক্ত জমি কিনেছিলেন। বহুদিন যাবত আমরা ওই পলাশ পুরের জমি গুলি বিক্রি করার চেষ্টা করেও পারছিলাম না। অবশেষে খান মুজিবুর রহমান নামে এক ভদ্রলোক জমি গুলি তার ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের জন্য কিনতে রাজী হলেন। খান মুজিবুর রহমান সাহেন শেষ পর্যন্ত প্রতি শতাংশের দাম নির্ধারন করলেন সাড়ে পাচ লাখ টাকা করে শতাংশ। একটা সময় ছিলো যখন মর্তুজা ভাইয়ের বড় ভাই জনাব মোস্তফা সাহেব ও তার টাকার প্রয়োজনে তার অংশ বিক্রি করতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। তখন দাম উঠেছিলো দুই লাকগ ৪০ হাজার করে শতাংশ। এখন যখন নতুন দাম নির্ধারিত হলো খান সাহেবের সাথে (সাড়ে পাচ লাখ টাকা প্রতি শতাংশ) তখন মর্তুজা ভাই ভাবলেন যে, যদি তিনি নিজে তার ভাইকে আগের দুই লাখ ৪০ হাজার করে দিয়ে পুরু তার বড় ভাইয়ের জমিটা কিনে নেন, তাহলে মর্তুজা ভাই খুব সহজেই এখন খান সাহেবের কাছে আরো বেশী দামে বিক্রি করে লাভ করতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা শুধু জানি আমি আর উনি। এমতাবস্থায় মর্তুজা ভাই তার বড় ভাইকে সত্যি সত্যিই মাত্র ২ লাখ ৪০ হাজার দরে ২৭ শতাংশ জমি ক্যাশ টাকায় কিনে নিলেন। অথচ তখনই যদি মর্তুজা ভাই সত্যিকারের ভালো লোক হতেন, তাহলে তার বড় ভাইকে তিনি প্রতি শতাংশ জমি খান সাহেবের ফিক্সড করা সাড়ে পাচ লাখ টাকা করেই দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করেন নাই।

(খ)       ফ্ল্যাট এর টাকাটা উনি পরিশোধ করেছিলেন কিনা আমার জানা নাই। দেখতে হবে। লোনের ড্রিংস এর খাতায়ও সেটা উঠানো হয় নাই। কেনো উঠানো হয় নাই সেটাও আমি কখনো চেক করি নাই। আমি এতোটাই বোকা।

(গ)       এ যেড ফ্যাসনের নিমিত্তে প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকার যে প্রোফীটটা উনি নেন, এখন নেয়াটা কতটা যুক্তি সংগত, সেটা আমার মাথায় আসে না। ব্যাখ্যাটা এ রকম যে,  মর্তুজা ভাই এক সময় নিজের ব্যবসা আলাদা করার জন্যই হোক কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যেই হোক এ জেড নামে একটা ফ্যাক্টরী লাইসেন্স করিয়েছিলেন। তখন ম্যানুয়েল মেশিনের যুগ ছিলো। একদিন মর্তুজা ভাই আমাকে জানালেন যে, আমরা যদি এ জেড কে আমাদের রিভার সাইডের সাথে আত্তীকরন করি, তাহলে এ জেড আমাদের হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এ জেড শুধুমাত্র আমাদের কাজই করবে। কিন্তু বিনিময়ে আমরা রিভার সাইড এ জেডের সমস্ত সেলারী, কারেন্ট বিল, এবং অন্যান্য সমস্ত খরচাদি বহন করবো। শুধু মর্তুজা ভাই এর বিনিময়ে প্রতিমাসে আড়াই লাখ টাকা প্রোফিট নিবেন। যেহেতু মেশিন তার, ভাড়া তার, এবং সবই তার ছিলো, আর আমারো কোনো অসুবিধা ফিল করি নাই, সে ক্ষেত্রে আমিও এ ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনাই। আমি তাকে অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলাম। পরবর্তিতে ২০১৮/২০১৯ সালে এসে যখন আমরা সমস্ত ম্যানুয়েল মেশিন গুলি বাদ দিয়ে জ্যাকার্ড মেশিন নিয়ে এলাম, তখন এ জেডের সব মেশিন তিনি বিক্রি করে দিলেন। জেনারেটর আমাদের রিভার সাইড থেকে দেয়া হয়, কারেন্ট বিল দেয়া হয়, বেতন দেয়া হয়, পেটি ক্যাশ, নাইট বিল, এবং অন্যান্য সব খরচই আমরা রিভার সাইড থেকে দেই। কিন্তু আগের নিয়ম অনুসারে মর্তুজা ভাই এখনো প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা করে প্রোফিট নেয়া অব্যাহত রাখেন যদিও ওই এ জেড ফ্যাশনে এখন তার কিছুই অবশিষ্ট নাই। এটা আমার জানা আছে, আমিও তাকে দেই। কিন্তু এটাও জানি যে, এটা তাকে দেয়া আমার উচিত না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে- আমি জেনেশুনে কেনো তাকে এই লাভটা দিচ্ছি। এর প্রধান কারন হলো- আমি এখনো পুরুপুরি বিপদ মুক্ত না। আমার লোন আছে মা ইন্ডাস্ট্রিজে, আমার অন্য কোথাও আর চাকুরী করতে ইচ্ছে নেই, আর আমি চাইও না। এখন যদি এগুলি নিয়ে আমি বেশী নাড়াচাড়া দেই, তখন দেখা যাবে- মর্তুজা ভাই আবার অন্যভাবে এমন কিছু করে ফেলবে যে, শেষে গিয়ে হয়তো রিভার সাইডটাই টিকবে না। উনি হউয়তো অন্য কোথাও কারো সাথে টাই আপ করে ঠিকই গার্মেন্টস ব্যবসা করবে, মাঝখান থেকে আমি ছিটকে পড়বো। যা আমার জন্য ভালো নয়। তার থেকে উনাকে এই মুহুর্তে নারাচাড়া না দেয়াই ভালো। উনি যে টাকাটা নিচ্ছে সেটাও যে ঠিক না এটা মর্তুজা ভাই জানেন। কোনো একদিন হয়তো এটা  নিয়েও আমি কথা বল্বো।

২১/০৭/২০২১-ঈদুল আজহা

আজ পালিত হলো ঈদুল আজহা।

এই দিনটা এলে সবচেয়ে আগে যার কথা আমার বেশী মনে পড়ে তিনি হচ্ছেন-আমার মা। মা বেচে থাকাকালীন আমি কখনো শহরে ঈদ করিনি কারন মাও ঈদের সময় গ্রাম ছাড়া ঈদ করতেন না। মা যেহেতু ঈদে গ্রামে থাকতেন, আমিও গ্রামেই ঈদ করতাম। আমি সব সময় ভাবতাম-একটা সময় আসবে, মাকে ছাড়াই আমার ঈদ করতে হবে জীবনে, তাই যে কতগুলি সুযোগ পাওয়া যায়, মায়ের সাথে ঈদ করাটা ছিলো আমার সুযোগের মতো। বাড়িতেই কুরবানী করতাম। ঈদের আগে আমি ইসমাইল ভাই অথবা রশীদ ভাইকে টাকা পাঠিয়ে দিতাম যাতে আগেই গরু কিনে রাখেন। ফাতেমার স্বামী সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু ভাইকে আমি কখনোই কুরবানীর গরু কেনার দায়িত্তটা আমি দিতাম না কারন তার উপরে আমার টাকা পয়সা নিয়ে আস্থা ছিলো না। কেনো তার উপরে আস্থা ছিলো না, সে কাহিনী বিস্তর, আজ না হয় এখানে নাইবা বললাম। গরু কেনার ব্যাপারে আমার একটা পলিসি ছিলো যে, মেহেরুন্নেসা (অর্থাৎ আমার ইমিডিয়েট বড় বোন সব সময় গরু পালতো। আমি ইচ্ছে করেই রশীদ ভাইকে বলতাম যাতে ওর গরুটাই আমার জন্যে রেখে দেয়। আমি কখনোই সেটার দাম করতাম না। এই কারনে করতাম না, মেহের যে কয় টাকায় বিক্রি করলে খুশী হয় সেটাই হোক আমার আরেকটা সাহাজ্য। মেহের খুব ভালো একটা মেয়ে।

আজ সেই কুরবানীর দিনটা চলে গেলো। শুনেছিলাম, একটা গরু মোট সাত জনের নামে কুরবানী দেয়া যায়। ফলে আমি সব সময় এই সু্যোগে যে কাজটা করি, তা হলো- এক ভাগ দেই আমি আমার প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মাদ (সঃ) এর নামে, আর বাকী ৬ ভাগ দেই-আমার, মিটুল, আমার ২ মেয়ে, আমার বাবা আর আমার মায়ের নামে। এটাই আমার কুরবানী দেয়ার পলিসি। আজো তাইই করলাম। গরু জবাই, মাংশ কাটাকাটি আর বিলানোর কাজটা আমি নিজ হাতে করি। ৩ টা ভাগ করি, একটা ভাগ নীচেই বিলিয়ে দেই, বাকী ২ ভাগের এক ভাগ আমি রাখি আলাদা করে সমস্ত আত্তীয় সজন আর পাড়া পড়শীর জন্য, আর এক ভাগ থাকে আমার পরিবারের জন্য।

এই কুরবানী এলে আমার আরো একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সেই ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা। আমাদের তখন কুরবানী দেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিলো না। আমি মাত্র ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ি, আমাদের বাড়িতে ৫ বোন আর মা আর আমি। আমার বড় ভাই তখন সবেমাত্র আমেরিকা গেছেন। আমাদের সব ভরন পোষনের দায়িত্ত আমার বড় ভাইই করেন। কিন্তু শেয়ারে কুরবানী দেয়া কিংবা আলাদা কুরবানী দেয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিলো না। ফলে এই কুরবানীর দিন আমার খুব অসস্থি হতো। অসস্থি হতো এই কারনে যে, আমরা না কারো কাছ থেকে মাংশ চেয়ে আনতে পারতাম, না আমাদের সামর্থ ছিলো কুরবানী দেয়ার। ফলে দিনের শেষে যখন সবাই যার যার বাড়িতে গরুর মাংশ পাকে ব্যস্ত, খাওয়ায় ব্যস্ত, আনন্দে ব্যস্ত, তখন হয়তো আমাদের বাড়িতে ঠিক তেমনটা নাও হতে পারে। আমি এই ঈদের দিনের দুপুরের পর আর কোথাও যেতাম না, কারন আমার কেম্ন জানি নিজের কাছে খুব ছোট মনে হতো। কুরবানী দেয়াটা ধর্মের দিক দিয়ে কি, আর কি না, সেটা আমার কাছে হয়তো অনেক বড় মাহাত্য ছিলো না, কিন্তু আমি যখন দেখতাম, আমার বন্ধুদের বাড়িতে সবাই কুরবানীর গরু নিয়ে কাটাকাটিতে ব্যস্ত, বিকালে মাংশ বিলানোতে ব্যস্ত, আমার তখন মনে হতো, আমিই ব্যস্ত না। গরীব হয়ে জন্ম নেয়াটা একটা অসস্থিকর ব্যাপার।

তারপরেও অনেকেই আমাদের বাড়িতে কুরবানীর পর মাংশ পাঠাইতো। বিকালে বা সন্ধ্যায় দুদু ভাই, ইসমাইল ভাই, আমাদের খালাদের বাড়ি থেকে, কিংবা জলিল মামাদের বাড়ি থেকে অথবা পাশের কোনো বারি থেকে অনেকেই মাংশ পাঠাইতো যেটা আমার কাছে একটু খারাপ লাগলেও মা নিতেন। কুরবানী বলে কথা। সবাই মাংশ খাবে, আমাদের বাড়ির মানুষেরা একেবারেই কিছু খাবে না, মা হয়তো এটা ভেবেই মাংশ গুলি রাখতেন। দিনটা চলে যেতো, আমার অসস্থির ভাবটাও ধীরে ধীরে কেটে যেতো। আবার এক বছর পর হয়তো এই অসস্থিটা আসবে।

যেদিন আমার ক্ষমতা হলো কুরবানী দেয়ার, আমি সব সময় গ্রামেই কুরবানী দিয়েছি। আর সব সময়ই আমার সেই দিনগুলির কথা মনে করেছি। আমাদের দিন পাল্টেছে, আমাদের পজিসন পাল্টেছে। মা যখন জীবিত ছিলেন, এমনো হয়েছে মাঝে মাঝে আমি দুটু কুরবানীও করেছি একা।

আজ মা নাই, আমার গ্রামে যাওয়া হয় না। কুরবানী নিয়ে এখন আমার তেমন কোনো আগ্রহও নাই। তবে সবসময় ঢাকাতেই আমি কুরবানী দেই, একা। যদি আমি কখনো কুরবানী নাও দেই, কেউ আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করবে না কারন সবাই জানে আমার একটা না, অনেকগুলি কুরবানী দেয়ার সক্ষমতাও আছে। হয়তো কোনো কারনে আমি ইচ্ছে করেই কুরবানী হয়তো দেই নাই। কেউ এটা ভাববে না যে, আমার টাকা নাই তাই কুরবানী দেই নাই। “সময়” এমন জিনিষ। সব কিছু পালটে দেয়।

১৯/০৭/২০২১-ঈদুল আজহার ২দিন আগে

এই কয়েকমাসে এতো বেশী অভিজ্ঞতা হলো যা আমার জীবনের অনেক প্রাক্টিস আর বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যাদেরকে আমি মনে করি সবাই আমার মতো। অথবা আর যার সাথে আমরা যাইই করি না কেনো, অন্তত আমরা আমাদের সাথে সেই একই প্রাক্টিস গুলি কখনো করতে পারি না। কিন্তু আমার এই ধারনা সমুলে আঘাত খেয়েছে অনেক গুলি কারনে। তাহলে একা একা বলিঃ

(১) মান্নানের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়েঃ মান্নান যে আমার সাথে লুকুচুড়ি করে সেটা আমি জানি। অনেক সময় ভাবি যে, হয়তো সে একটু ভালো থাকতে চায়, তাই একটু আধটু লুকুচুরি করে। আমার অনেক ক্ষতি না হলেও অর্থের দিক দিয়ে একটু তো লাগেই। কিন্তু যেহেতু আমি সামলে নিতে পারি, তাই অনেক সময় কিছু বলি না বা বলতে চাইও না।

আমি যখনই কোনো জমি কিনেছি, মান্নান সেখানে জমির দামটা এমন করে বাড়িয়ে বলতো যাতে আমার টাকা দিয়েই মান্নান ও কিছু জমি সেখান থেকে কিনতে পারে। আমি সেটা বুঝি কিন্তু কিছু হয়তো বলি না। এভাবে মান্নান অনেক জমি শুধু হয়তো আমার টাকা দিয়েই কিনেছে আর সেটা আমার ক্রয় করা জমির সাথেই। কিন্তু এবার যেটা করেছে সেটা মারাত্তক।

মুজিবুর রহমান খান নামে এক ভদ্রলোক আমাদের পলাসপুরের জমিটা কিনতে আগ্রহী হলে আমিও বিক্রি করতে তৈরী ছিলাম। আমার জমির সাথে আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের জমি আছে। ফলে আমার জমি আর মুর্তুজা ভাইয়ের জমি সহ একটা রফাদফা হয়েছিলো। এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, মুজিবুর রহমান খান সাহেবের আরো জমি দরকার যা সেলিম নামে এক জন লোকের জমি আমাদের জমির পাশেই আছে কিন্তু ওর জমিতে যাওয়ার রাস্তা না থাকায় যদি আমাদের জমির সাথে টাই আপ করে খান সাহেবের কাছে বিক্রি করি তাতে আমাদের লাভ হবে। কারন সেলিকমে জমির মুল্য দিতে হবে খান সাহেবের দেয়া জমির দামের অর্ধেক প্রায়। সেলিমদের মোট জমি ছিলো ৩২০ শতাংশ।

এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, আমরা সেলিমদের জমি থেকে পানি ব্যতিত মোট ১৫১ শতাংশ জমি খান সাহেবকে দিতে পারবো। বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি আসলে নদীর পানির মধ্যে যদিও জমিটা রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত। আমি যখন সেলিমদের জমিটা বিনা পরীক্ষায়, বিনা নীরিক্ষায় খান সাহেবকে রেজিষ্ট্রি করে দিলাম, পরে জমি মাপ্তে গিয়ে দেখি যে, মাত্র ৯৮ শতাংশ জমি আছে যা নদীর মধ্যে না। অনেক রাগারাগি আর চাপাচাপির মধ্যে আমি যখন সেলিমদের ধরলাম, শুনলাম আরেক বিরাট ইতিহাস। মান্নান, সেলিম এবং সেলিমের এক চাচাতো ভাই মিলে মোট ৩২০ শতাংশ জমিই কিনে নিয়েছে সেলিমদের আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে অই টাকায় যে টাকা হয় ১৫১ শতাংশের দাম। খান সাহেবকে ১৫১ শতাংশ জমি দেয়ার পর বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি ধান্দা করে মান্নানের নামে আর সেলিমের নামে একা পাওয়া অফ এটর্নী নিয়েছে। এর মানে হলো, আমি কোনো লাভ করি নি , লাভ করছিলো মান্নান। যদি অদুর ভবিষ্যতে পানি শুকিয়ে চর জাগে, তাহলে মান্নান এই জমি গুলি চড়া দামে বিক্রি করতে পারবে। অথচ টাকাগুলি খান সাহেবের এবং আমার। খান সাহেব যখন নদীর মধ্যে কোনো জমি নিতে নারাজ হলেন, তখন আমার চর গল্গলিয়া মৌজা থেকে এই বাকী ৫৩ শতাংশ জমি পুরা করে দিতে হবে যার দাম প্রায় তিন কোটি টাকা। এটা কোনোভাবেই আমার সম্ভব হচ্ছিলো না। আমি কেনো এতো গুলি জমি খান সাহেবকে লিখে দেবো যার দাম তিন কোটি টাকার উপরে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখেই দিতে হবে জেনে আমি পলাশপুরের আক্কাসকে ধরে মান্নান আর সেলিমের কাছ থেকে পরবর্তীতে ওই ১৬৯ শতাংশ জমি ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার নিজের নামে নিয়ে নিলাম। জানি আমার ক্ষতি পুরন হবে না যতোক্ষন পর্যন্ত ওই নদীর জমি শুকিয়ে আসল চেহারায় জমি ভেসে না উঠে। আমি মান্নানকে বারবার এই অ বিশ্বাসের কাজটা কেনো করেছে জিজ্ঞেস করলে তার একটাই উত্তর- ভুল হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই ভুল হতে পারে না। আমি কখনো ভচাবি নাই যে, মান্নান ও আমাকে এভাবে এতো ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।

পলাশপুরে আমার আরো একতা জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া ছিলো। আর যেহেতু ওই লিজটা আনতে হয় কোনো দুস্ত মানুষের নামে, তাই আমি মান্নানের ভাই নাসিরের নামেই ১০০ শতাংশ জমি আমার টাকায় লিজ নিয়ে এসেছিলাম। মান্নান আমাকে না জানিয়ে হালিম নামে এক লোকের কাছে ২০ লাখ টাকায় জমিটা গোপনে টাকা নিয়ে নিলো। এটা একটা অসম্ভব ঘটনা বলে আমার কাছে মনে হয়েছিলো। কিন্তু মান্নান কাজটা করেছে আমাকে একটু ও জানতে দেয় নাই। যখ ওরে আমি প্রশ্ন করেছি- মান্নানের একটাই উত্তর যে, আমার নাতির অসুখ ছিলো, টাকার দরকার ছিলো, তাই আমি বিক্রি করে দিয়েছি। আমাকে জানানোর কোনো বাধ্য বাধকতা মনে করলো না।

খান ভাই আমাদের পলাশ পুরের জমিটা কিনার সময়ে মোট ৬৩১ শতাংশ জমির বায়না করেছিলো যার মধ্যে মান্নানের ছিলো ৫১ শতাংশ। আমি খান ভাইকে বারবার বলেছিলাম, কখনো আমাকে ছাড়া টাকা পয়সার লেন দেন করবেন না। কিন্তু ওই যে বললাম, সবাই লাভ চায়!! খান সাহেব মান্নানকে মাঝে মাঝে আমাকে না জানিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হ্যান্ড ওভার করে। একদিন খান সাহেব আমাকে জানালো যে, মান্নান জমিটা কাগজে কলমে কোনো বায়নাও করছে না আবার টাকাও চায়। আমি যখন ব্যাপারটার ভিতরে প্রবেশ করলাম, দেখলাম, ওই খানে মান্নানের জমি আছে মাত্র ৪ শতাঙ্ঘস, আর ওর বোন আর ভাই মিলে আছে আরো ৫ শতাংশ, মোট ৯ শতাংশ। বাকী জায়গাটা আক্কাস নামে ওর এক আত্তিয়ের। কিন্তু আক্কাসকে মান্নান উক্ত ৩৫ লাখ টাকা থেকে কখনো ১ টাকাও দেয় নাই, না মান্নান ওনার কাছ থেকে কোনো পাওয়ার অফ এটর্নী কিংবা অগ্রিম কোনো বায়নাপত্র করেছে। আক্কাস সাহেব যখন জানলো যে, মান্নান ইতিমধ্যে ৩৫ লক্ষ টাকা নিয়ে ফেলেছে, সে তখন (৫১ মানাস ৯) ৪২ শতান্সগ জমির বায়না করে ফেল্লো উক্ত খান সাহেবের সাথে। অর্থাৎ মান্নান জানেই না যে, উক্ত জমি মান্নান আর কখনোই খান সাহেবের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। আমি যখন আজকে মান্নানকে বললাম, খান সাহেবকে ৫১ শতাংশ জমি লিখে দিচ্ছিস না কেনো? তার অনেক উচা গলায় বল্লো, সে আগামীকালই জমিটা লিখে দিতে পারে। যখন বললাম যে, আক্কাস জমিটা অন্য খানে বিক্রি করে দিয়েছে- তখন দেখলাম ওর মুখের ভাব অনেক রক্তিম। কিন্তু লজ্জায় পড়লো কিনা জানি না। ওর আসলে এগুলিতে কোনো খারাপ লাগে না মনে হয়। টাকাটাই ওর কাছে সবচেয়ে বড় মনে হয়। ভাগ্যিস আমি এই ৫১ শতাংশের ব্যাপারে কাহ্নের সাথে কোনো প্রকার কথা বলি নাই। তাহলে এই ৫১ শতাংশ নিয়েও খান আমাকে চাপ দিতো।

মান্নানের এখন টাকা প্রাপ্তির প্রায় সব গুলি রাস্তাই বন্ধ। কোটি কোটি টাকা আমি ওর হাত দিয়ে খরচ করিয়েছি। বারবার বলেছি, অন্য কোনো একটা সোর্স কর যাতে বিপদের সময় একটা ইন কাম আসে। কখনো ব্যাপারটা আমলে নেয় নাই। এবার মনে হয় খুব হারে হারে টের পাচ্ছে যে, ওর টাকার সব গুলি সোর্স প্রায় একেবারেই বন্ধ। দেখা যাক কি করে। আমার কাছে অনেক গুলি কারন দেখিয়ে কিছু টাকা খসানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু এবার আমি অনেক টাইট হয়ে গেছি। কোনো কিছুতেই কোনোভাবেই আর টাকা দেয়া যাবে না। মান্নানের পিঠ প্রায় দেয়ালের মধ্যে ঠেকে যাচ্ছে। তবে এখান থেকে কিছুটা উত্তোরন হয়তো হবে যদি ধলেশ্বরী গ্রীন ভিলেজ প্রোজেক্ট শুরু হয়। কারন ওখানে আমি ওকে ইন করিয়েছি। কিন্তু ওটার ইন কাম বড্ড স্লো।

এবার আসি আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের কাছ থেকে আম্নার তিক্ত অভিজ্ঞতার ব্যাপারটাঃ

৯/৭/২০২১-কনিকার আগাম জন্মদিন এবং দাওয়াত পার্টি

পড়াশুনার জন্য কনিকার বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি ধীরে ধীরে প্রায় সমাপ্তির দিকে। ভিসা হয়ে গেছে, টিকেট হয়ে গেছে, ইউএমবিসি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে সব ফরমালিটিজ শেষ হয়ে ভর্তিও হয়ে গেছে, ওর জন্য এক বছরের আগাম টিউশন এর নিমিত্তে ১৪ হাজার ডলারের মধ্যে ১৩ হাজার ডলার ফিও আমি ছোট ভাই (মোস্তাক আহমেদ) এর কাছে রেখে দিয়েছি, ভ্যাক সিনেশনের সব কটা টীকাও প্রায় নেয়া শেষ। যাওয়ার সময় যে কতগুলি ডলার ওর হাতে দিয়ে দেবো সেটার ও প্রায় ব্যবস্থা করে রেখেছি। এখন শুধু আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত মানে ১১ অগাষ্ট ২০২১ তারিখে ভোর ৪ টায় ওর কাতার এয়ার ওয়েজে উঠা বাকী ইনশাল্লাহ। একাই যাবে কারন এই করোনাকালীন সময়ে আমরা কেহই ভিসা পাচ্ছি না বিশেষ করে ভিজিটিং ভিসা আবার ব্যবসায়ীক ভিসার জন্য যিনি আমাকে আমেরিকা থেকে ইনভাইটেশন পাঠাবেন, তাদের পক্ষেও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বিধায় কনিকাকে একাই যেতে হবে।

কনিকার জন্ম দিন আসলে এই সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে হবার কথা। কনিকার আফসোস থাকবে যে, ওর এ বছরের জন্মদিন টা সে আমেরিকায় থাকায় সবার সাথে পালন করা সম্ভব না। মন খারাপ করবে, তাই আমরা ওর আগাম জন্মদিন এবং ওর বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে সবাইকে একবার দাওয়ার করে খাওয়ানোর জন্য যে অনুষ্ঠান টা করার প্ল্যান করেছিলাম, সেটা এক সাথেই করলাম আজ। প্রায় ৫০/৫৫ জন্য গেষ্ট এসেছিলো, আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার মুর্তজা ভাই এবং তার স্ত্রীও এসেছিলেন। সময়টা ভালোই কেটেছে।

চৈতীর কয়েকদিন আগে বিয়ে হয়েছিলো। তার জামাই, ননদ, দেবরও এসেছিলো। মান্নাদেরকে আমি সব সময়ই আমাদের যে কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেই। এবারো তার ব্যতিক্রম হয় নাই। মান্নার জামাই বাবু খুব ভালো একটা ছেলে। আগে সিটি ব্যাংক এন এ তে চাকুরী করতো, কাল শুনলাম, হাবীব ব্যাংকে নতুন চাকুরী নিয়েছে। অত্যান্ত ম্যাচিউরড একটা ছেলে। ওর বিয়েটা আমিই দিয়েছিলাম মান্নার সাথে। ওর বিয়ে নিয়ে চমৎকার একটা উপাখ্যান তৈরী হয়েছিলো, সেটা আরেকদিন লিখবো।

সাজ্জাদ সোমা ওর বাচ্চারা আর সনি এবং তার জামাই সহহ বাচ্চারা সব সময়ই আমাদের বাসায় আসতে পছন্দ করে, ওরাও বাদ যায় নাই। কনিকার জন্য ভালো একটা সময় কেটেছে সবার। এমন ঘটা করে হয়তো আগামী ৫ বছর আর ওর জন্মদিন পালন করা হয়তো সম্ভব হবে কিনা জানি না।

কভিড-১৯ এর প্রভাব হতাত করে দেশে মহামারীর লক্ষন দেখা দিচ্ছে বলে সরকার কঠিন লক ডাউন দিয়েছে। যদিও আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য এটা বাধ্যতামূলক নয়, তারপরেও আমি ইচ্ছে করেই এই কয়দিন ফ্যাক্টরীতে যাচ্ছি না। বাসায় বসে ডায়েরী লিখি আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ব্যাপারে অনেক পড়াশুনা করছি। সাথে ইউ টিউব থেকে সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভিডিও ফুটেজ গুলিও দেখার চেষ্টা করে ঐ সময়টাকে বুঝবার চেষ্টা করছি। আনার ডায়েরীর উপর একটা মুভি হয়েছে, সেটাও দেখলাম। আইখ ম্যানের উপর প্রায় শতাধিক ট্রায়াল হয়েছে, সেগুলিও দেখলাম। খুব কঠিন সময় ছিলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়টা।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, কনিকার পর্ব। কনিকা তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে প্রায় লাখ খানেক টাকার ক্যাশ গিফট পেয়েছে। আমি চাই নাই কেউ ওকে গিফট করুক কারন এসব গিফট আসলে কনিকার জন্য এখন আর খুব একটা প্রযোজ্য নয়, সে এগুলি বিদেশ নিতেও পারবে না আর আমরাও এগুলি আগামী সময়ে সংরক্ষন করতে পারবো না। তাই গেষ্ট যারা এসেছিলো, তারা সবাই কনিকাকে ক্যাশ টাকাই গিফট করেছে। আর এ কারনেই ওর গিফট এর টাকা এতো বেশী উঠেছিলো।

কনিকা খুব ফুরফুরা মেজাজে আছে। কারন ও যা যা চেয়েছে যেমন দেশের বাইরে ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার, সেটা সে একাই ম্যানেজ করেছে, কোনো কিছুতেই কোনো বাধার সৃষ্টি হয়নি, এটা আল্লাহর রহমত, বাকীটা ভালোয় ভালোয় সব হলেই আলহামদুলিল্লাহ।

৮/৭/২০২১-জীবনে হতাশ হওয়ার

জীবনে হতাশ হওয়ার কোনো কারন নাই। একদিন নিজেকে নিজেই বলেছিলাম যে, ভগবান মানুষের জন্য প্রতিটি দিন একই রকম করে কাটাতে দেন না। আজ যে রবিবার আপনি হাসছেন, আগামী রবিবার আপনি নাও হাসতে পারেন, হয়তো সেদিন আপনি হাসিতে আপনার প্রতিটি মুহুর্ত ভরে থাকবে। এই সপ্তাহটা হয়তো আপনার জন্য ভয়ানক অস্থির যাচ্ছে, কে জানে আগামী সপ্তাহটা হয়তো হবে একেবারেই সুন্দর। তাই হতাশ হবার কোনো কারন নাই। প্রতিটি ঝড় কিংবা বিপদের মাঝেও কিছু না কিছু সুসংবাদ থাকে, কিছু না কিছু ভালো জিনিষ আসে। একটা মৃত ঘড়ির দিকে তাকান, দেখবেন নষ্ট ঘড়িটাও দিনে দুবার একদম সঠিক সময় প্রকাশ করে। অপরিষ্কার জল খাবারের অনুপোযোগী হলেও সেটা আগুন নেভানোর কাজে লাগে। বোবা কিংবা বোকা বন্ধুও আপনার অন্ধ জীবনে রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারে।

তারপরেও একটা সময় আসে যখন শুধু নিজের জন্যেই নিজেকে বাচতে হয়। অন্য কারো জন্যে নয়। আমরা সামাজিক কিংবা পারিবারিক জীবনের কথা বলি। ওটা একটা শুধু কন্সেপ্ট যেখানে মানুষ একা থাকতে পারে না বলে সে এই দলবদ্ধ জীবন বা পারিবারিক জীবনটাতে থাকতে চায়। কিন্তু একটা সময়ে সবাই এই জীবনেও হাপিয়ে উঠে। সন্তান, স্ত্রী কিংবা আশেপাশের সবাই যেনো তখন এক ঘেয়েমীতে ভরে যায়। তখন কেউ কারো আদর্শ কিংবা অভিজ্ঞতাকে আর কাজে লাগাতেও চায় না, বরং যেটা নিজেরা ভাবে সেতাই যেনো পরিশুদ্ধ, আর সেটাই করতে চায় সবাই। সন্তানেরা যখন বড় হয়ে যায়, তখন তাদেরকে তাদের মতো করেই ছেড়ে দেয়া উচিত। তাদের চিন্তা ধারা, তাদের পছন্দ কিংবা আশা নিরাশা সবন কিছু তাদের মতো। তাই, আমরা যারা বড়রা তাদের জন্যে দুশ্চিন্তা করি, এটা হয়তো আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবি যে, ওরা ভুল করছে বা যা করছে সেটা ঠিক নয়। আর এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা আমাদের কিছু কন্সেপ্ট বা ধারনা বা উপদেশ ওদের উপর চালাতে চাই যা অহরহই ওরা মানতে চায় না। যখন এমন একটা কনফ্লিক্ট সামনে আসে, তখন আমাদের উচিত আর না এগোনো। সবাইকে যার যার পথে চলতে দিয়ে ঠিক ঐ জায়গাটায় দাড় করানো উচিত যাতে ওরা বুঝতে পারে, আমাদের উপদেশ ঠিক ছিলো কিংবা আমরাই ঠিক ছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ঐ সময় কোনো কিছুই আর পিছনে গিয়ে সঠিকটা করা যায় না বলে মনে কষ্ট লাগে বা খারাপ লাগে। কিন্তু ওটা ছাড়া তো আর কিছুই করার নাই। চেয়ে চেয়ে ধ্বংস দেখা ছাড়া যদিও কোনো উপায় নাই, তারপরেও সেটাই করতে দেয়া উচিত যাতে ওরা এটা বুঝতে পারে যে, বড়দের অভিজ্ঞতার দাম ছিলো, উপদেশ গ্রহন করা উচিত ছিলো। তাহলে হয়তো আজকের দিনের এই অধোপতন কিংবা ছেড়াবেড়া জীবনে পড়তে হতো না।

লাইফটায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছি আমি নিজেও। নিজের ঘরে যখন কেউ একাকিত্ত বোধ করে সেখানে সময় একেবারেই স্থবির। সেখানে যেটা চলে সেটা হচ্ছে- সময় মত খাওয়া, আর নিজেকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখা। এটা একটা সময়ে সবার জীবনেই আসে। আমি যদি বলি, এটা ইতিমধ্যে আমার জীবনেও শুরু হয়ে গেছে, ভুল বলা হবে না।

কেনো বললাম কথাটা। এর নিশ্চয় কোনো কারন তো আছে। আজকের যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা আমার কাছে কাম্য নয়। না আমি আশা করেছি। আমার সন্তানদের জন্য আমার থেকে বেশী কেউ ভাবে এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু সেই সন্তানেরা যদি কখনো বলে, যে, আমরা তাদের জন্য অভিশাপ, এর থেকে বড় পরাজয় আর কিছু হতে পারে না। তবে আমি জানি, জীবনে এ রকমের অনুভুতি সবারই আসে। যখন এই অনুভুতি ভুল প্রমানিত হয়, তখন বেলা এতোটাই বেড়ে যায় যে, কারো কারো জীবনের রাত শেষ হয়ে আরো গভীর রাতে অন্য কোনো জগতে সে চলে যায়।

৩/৭/২০২১-বাগান

বাগান বড় অদ্ভুত। চারিদিকে প্রানের ছড়াছড়ি। কেউ কোনো কথা বলে না কিন্তু তাদের নীরব একটা ভাষা আছে। খুব কাছ থেকে দেখলে আর শুনলে এদের সব ভাষা পরিষ্কার বুঝা যায়। মুক, বধির কোনো মানব সন্তান যেমন তার শান্তি-অশান্তির কথা ব্যক্ত করলে মায়ের বুঝার কোনোই অসুবিধা হয় না, তেমনি বাগানের যিনি প্রকৃত পরিচর্যাকারী তার ও এই বধির এবং মুক ভাষাহীন উদ্ভিদের শান্তি-অশান্তির ব্যাপারগুলি বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। ভালো পরিচর্যায় এসব গাছগুলি সব সময় ফল দেয়, সময় কাটানোর জন্য সংগ দেয় আর দেয় প্রচুর পরিমানে অক্সিজেন। অক্সিজেন যখন দেয় কিংবা সংগ, তার ছবি থাকে দেহে, আত্তায় আর অন্তরে। শুধু ফলটা দেখা যায়।

আমাদের বাসার ছাদের মধ্যে আমার এই ছোট একটা বাগান। তাদের নিত্য সহচর চড়ুই, শালিক আর কাকের জন্য কোনো বীজই চারায় রুপান্তর করা সহজ হয় না। সারাদিন টবগুলির পাশেই বসে থাকে কখন একটা অংকুর ফুটবে আর অমনি টুপ করে খেয়ে ফেলবে। নেট দিয়েছি যাতে আর এই দুস্টুমীটা করতে না পারে। আমি এদেরকে কোনো বকা দেই না। ওরাও ব্যাপারটা বুঝে গেছে। আমি দেখেছি, বাগানে আমি এলেই যেনো এদের ভীড় বেড়ে যায়। ভালোই লাগে। বাগানে সময় কাটানো মানে কিছু জীবন্ত প্রজাতীর সাথে থাকা। Trees are so friendly and someone can spend time as much as he wants. আমার খুব শখের এই বাগান আমাকে সত্যিই সংগ দেয়।

আমার মত যারা ছাদে বাগান করেন, তারা হয়তো বাগানের ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। বীজ লাগানো, পানি দেওয়া,পাখীর উতপাত থেকে বাচার জন্য নেট দেয়া, বৃষ্টি থেকে ছোট চারা গুলিকে বাচানোর জন্য পলিথিন দেইয়া, পোকা মাকড় থেকে রক্ষার জন্য কীটনাশক দেয়া একটা নেশা। প্রতিদিন পিচ্চি পিচ্চি চারাগুলি একদিন ডাল পালা ছড়িয়ে গাছ হয়ে উঠা দেখুন। বাতাসে ওদের পাতার হেলাদোলা দেখুন। ওরা মানুষের সাথে বন্ধুত্ত করে, রাগ করে না, ডিস্টার্ব করে না। কিন্তু সিজনের শেষে আপনাকে হরেক রকমের ফল মুলাদি উপহার দিবে। ওরা আপনাকে ফ্রেস অক্সিজেন দিয়ে শরীর চাংগা করে দেয়, শিশির কিংবা বৃষ্টির ফোটায় ভেজা পাতা আপনাকে প্রশান্তি দিবে। এর থেকে ভাল কিছু আমি পাই নাই। বড় নেশা এই বৃক্ষ প্রেম। যিনি করেন নাই, তিনি এর কিছুই বুঝবেন না। মনে হবে- অযথা। কিন্তু এটাই সত্য।

০২/০৭/২০২১-বজলু

কম্পিউটার সার্ফ করছিলাম। হার্ড ডিস্ক ক্লিন করার সময় হটাত করে একটা অনেক পুরানো ছবির সন্ধান পেলাম। অনেকক্ষন তাকিয়ে ছিলাম ছবিটার দিকে। মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। একটা ছবি অনেক কথা বলে। একটা ছবি একটা সময়ের ইতিহাস বলে। একটা ছবি না বলা অনেক স্মৃতি মানষ্পটে জাগিয়ে তোলে। আজকের এই ছবিটাও তেমনি একটি ছবি।

আজ থেকে প্রায় ৪০/৪১ বছর আগের কথা আমি যখন গ্রামে ছিলাম সেদিনের কথাগুলি যেনো একে একে স্পষ্ট জেগে উঠতে থাকলো আমার স্মৃতির পাতায়। আমরা কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক ক্লিন করি, তারমধ্যে আবার নতুন কোনো তথ্য লোড করি, পুরানো তথ্যগুলি অনেক সময় আর খুজে পাওয়া যায় না। হয়তো বিশেষ কায়দায় কোনো ছায়া-মেমোরি থাকলেও থাকতে পারে যা থেকে হয়তো আবার সেই ডিলিটেড কোনো তথ্য বিশেষ কায়দায় ডিস্টর্টেড অবস্থায় কিছু পাওয়া গেলে যেতেও পারে কিন্তু আমাদের ব্রেনের মধ্যে সেই শিশুকাল থেকে যতো স্মৃতি এই মেঘা হার্ডডিস্কে লোড হয়েছে, সেটা কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে আবার জেগে উঠে অবিকল ঠিক সেই বিন্যাসে যা ক্রমান্নয়ে ঘটেছে বা ঘটেছিলো। এমনি একটা স্মৃতির পাতা আজ আমার মন আর ব্রেনের কোনে ঠিক জাগ্রত হয়ে জীবন্ত আমার দৃষ্টির মধ্যে চলে এলো- বজলু, আমার সেই ছোট বেলার অনেক প্রিয় একজন বন্ধু।

বজলু আমার খুব ভালো একজন বন্ধু ছিলো। আমাদের গ্রামের প্রায় শেষ পশ্চিম প্রান্তে ওদের বাড়ি। একই ক্লাসে পড়তাম, এক সাথে মাঠে খেলাধুলা করতাম। ওরা তিন ভাই ছিলো, বজলুই ছিলো সবার বড়। ওর বাবা ছিলো ধনী কৃষক। ওদের সামাজিক অবস্থা গ্রামের অন্যান্যদের থেকে বেশ ভালো। বজলুর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো যে, ও খুবই তোতলা ছিলো কিন্তু আমার কাছে এটা কোনো ব্যাপার ছিলো না। মজার ব্যাপার হলো, বজলু আমার সাথে যখন থাকতো, আর কথা বলতো, সে প্রায় তোতলামী করতোই না। কিন্তু যেই না অন্য কারো সাথে কথা বলতো, তার তোতলামীটা বেড়ে যেত। আমার সাথে বজলু স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতো। ও খুব ভালো গান গাইতো। লেখাপড়ার প্রতি টান থাকলেও কেনো জানি বেশী দূর এগুতে পারে নাই। এমন না যে টাকা পয়সা টানাটানির কারনে বা অভাবের সংসারে ওকে হাল ধরতে হয়েছিলো যার কারনে লেখাপড়া করতে পারে নাই। আমাদের গ্রামের মানুষগুলির বড় সমস্যা হচ্ছে-তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠায়, কিন্তু খবর নেয় না তারা স্কুলে কি পড়ছে, কেমন করছে, কিংবা সন্তানদের কোনো গাইড লাইন দেয়ার দরকার আছে কিনা।

আমার মনে আছে যে, আমি আর বজলু ওদের বাসায় একসাথে পড়াশুনা করতাম। ওর মা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অনেক সময় দুপুরে খাওয়া দাওয়াও করাতেন। আসলে পৃথিবীর সব মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য সব কিছু করতে পারে। তারা সব সন্তানদেরকে একই রকম করে ভাবেন। আমি বজলুকে অংক শিখাতাম কারন বজলু অংকে আর ইংরেজীতে কাচা ছিলো। ১৯৭৭ সালে আমি ক্লাস সেভেন থেকেই গ্রাম ছাড়ি। তার কারন আমি ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে বজলুর সাথে আর আমার স্কুলে পড়া হয় নাই। ক্যাডেট কলেজে বাধাধরা নিয়ম, মাঝে মাঝে ছুটি পাই, তখন বেশীরভাগ সময় আমি গ্রামেই কাটাতাম। বজলু তখনো স্কুলেই পড়ে। ছুটিতে আমার কোনো কাজ থাকতো না, কিন্তু বজলুর থাকতো। ক্ষেতে কাজ করতো, গরুগুলিকে নদীতে নিয়ে গোসল করাতে হতো। ওর বাবাকে সাহাজ্য করতে হতো, ক্ষেতে আলু কিংবা অন্যান্য শশ্য লাগাতে হতো। আমিও ওদের সাথে ওইখানে বসেই আড্ডা দিতাম। কারন গ্রামে আমার বন্ধুর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিলো।

রাতেও আমি ওদের বাসায় অনেকদিন আড্ডা দিতাম। তোতলা হলেও গান গাওয়ার সময় বজলু কখনো তোতলামী করতো না। প্রচন্ড মায়া ছিলো ওর অন্তরে সবার জন্য। কারো সাথে ঝগড়া করেছে এমনটা দেখি নাই। পড়াশুনার চাপে আর ক্যাডেটে থাকার কারনে ধীরে ধীরে আমার এসব বন্ধুদের থেকে যোগাযোগটা আমার কমে গিয়েছিলো। প্রায় বছর তিনেক পরে আমি যখন একবার ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জ যাবো বলে গুলিস্তান থেকে একটা বাসে উঠেছি, হটাত কে যেনো আমার নাম ধরে ডাক দিলো। ড্রাইভার সিটে বসা একজন লোক। তাকিয়ে দেখি-বজলু। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম বজলুকে দেখে। বল্লাম-কিরে তুই ড্রাইভারি করিস নাকি?  বজলু আমার হাত টেনে ধরে বল্লো, আমার পাশে বস। নারায়নগঞ্জ যাবি? বল্লাম-হ্যা। খুব ভালোই হলো। তোর সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। আমার জীবনে এইই প্রথম আমার কোনো খুব কাছের মানুষ ড্রাইভার। খুব আপন মনে হচ্ছিলো। বজলু বলতে থাকলো-

তোরা সব চলে যাবার পর আমার আর পড়াশুনা হয় নাই। গ্রামে আসলে পড়াশুনার পরিবেশও নাই। বাড়ি থেকে বারবার চাপ আসছিলো কিছু একটা করার। গ্রামের বেশীরভাগ ছেলেরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছিলো। আমিও সেই লাইনেই ছিলাম। বিদেশ চলে যাবো। তাই ড্রাইভারি শিখতে হলো। লাইসেন্স পেয়েছি। ঘরে বসে না থেকে হাত পাকা করছি আবার কিছু পয়সাও কামাচ্ছি। পড়াশুনা তো আর হলোই না।

সম্ভবত সেটাই ছিলো বজলুর সাথে আমার সর্বশেষ একান্তে কথা বলা। পরে শুনেছি বজলু জাপান চলে গেছে। সেখানে অনেক বছর চাকুরী করে আবার গ্রামে এসেছিলো। আমাদের গ্রামে আমাদের সাথে পড়তো সুফিয়া নামে একটি মেয়ে ছিলো। ওর বোন সাহিদাকেই বজলু বিয়ে করেছে। তিনটা মেয়ে আছে ওর। আমার সাথে ওদের কারো কোনো যোগাযোগ ছিলো না। মাঝে মাঝে গ্রামে যেতাম ঠিকই কিন্তু ওরা দেশে না থাকায় কারো সাথেই আমার যোগাযোগ হতো না। মা যতোদিন বেচে ছিলেন, গ্রামে যাওয়া হতো কিন্তু মা ইন্তেকাল করার পর গ্রামে যাওয়াটা আমার প্রায় শুন্যের কোটায় পরিনত হয়।

২০১৮ সালে হটাত একদিন আমার ফোনে একটা ফোন এলো। আমি অপরিচিত নাম্বার সাধারনত ধরি না। কিন্তু কি কারনে হটাত করে আমি সেই ফোনটা ধরেছিলাম। অন্য প্রান্ত থেকে দেখি বজলুর কন্ঠ।

কিরে দোস্ত, কেমন আছিস? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-বজলু?খুব ভালো লাগলো ওর কন্ঠ শুনে এতো বছর পর। বজলু বল্লো, সে দেশে এসেছে। বেশ কয়েকদিন থাকবে। তারপরেও বছর খানেক তো থাকবেই। বজলু ওর পরিবারের অনেক খবর দিলো। ওর স্ত্রী সাহিদা আমাদের প্রাইমারী স্কুলে মাষ্টারী করে। তিনটা মেয়ে, সম্ভবত মেয়েদের বিয়ের আয়োজন করছে। ওর শরীরটা নাকি ইদানিং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। অনেক কথা মনে পড়লো-

সেই প্রায় ৪০/৪১ বছর আগে এক সাথে মাঠে খেলা করতাম, এক সাথে নদীতে গোসল করতাম, বাজারে যেতাম, মাছ ধরতাম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চলে যেতাম, রাত হলে কখনো স্কুলের মাঠেই জ্যোৎস্না রাতে আমরা অনেকে মিলে গান গাইতাম, বজলুই ছিলো প্রধান ভোকালিষ্ট। ওর একটা জাপানিজ গিটার ছিলো, একটা সিন্থেসাইজার ছিলো, জাপান থেকে এনেছিলো। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, আমিই ওদের বাড়িতে থেকে যেতাম ঘুমানোর জন্য। একটা ভীষন মিষ্টি সময় কেটেছে।

বজলু বল্লো- আমি আগামি কয়েকদিন পর তোর অফিসে আসবো। চুটিয়ে গল্প করবো। তোর সাথে খাবো। সারাদিন থাকবো আমি তোর অফিসে। এনামুল, ওয়ালী, মুসা সবাইকে নিয়ে আসবো। সেদিন আমরা সবাই তোর অফিসেই খাবো। খুব ভালো লাগলো ওর কথায়। আমি এখন বড় একটা ব্যবসায়ী, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, আমার কোনো তাড়া নাই, কোনো চাপ নাই। ভালই হবে ওরা এলে। কিন্তু বজলু কোনো তারিখ দেয় নাই কবে আসবে।

বজলুর সাথে কথা বলার পর আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, বজলু আমার অফিসে আসবে কিন্তু কবে কিংবা কখন সেটা আমার মাথাতেই ছিলো না। মনে হয়েছিলো, আসবেই তো। আমি তো অফিসে প্রতিদিনই আসি। আর আমার গ্রাম কিংবা ওরা যেখানে থাকে সেখান থেকে আমার অফিসে আসতে লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। ওরা যে কোনো সময় নিজের সময়ে এলেই আমাকে পাবে।

এমনি এক অবস্থায় আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আমাকে কথায় কথায় ফোনে জানালো যে, বজলু নাকি অসুস্থ্য। হাসপাতালে ভর্তি। ছোট খাটো ব্যাপার মনে করতে আমিও আর ওকে দেখতে যাইনি। ভেবেছিলাম, কয়দিন পর তো দেখাই হবে। তখন জেনে নেবো ওর কি হয়েছিলো। কিন্তু তার ৩/৪ দিন পর আমার কাছে এমন একটা ব্রেকিং এবং হার্ট টাচিং নিউজ এলো যা আমি কল্পনাও করতে পারি নাই। বজলু নাকি মারা গেছে।

এই সংবাদটা আমাকে এতোটাই মর্মাহত করেছিলো যে, কেউ যেনো আমার দরজার একদম কাছে এসেও আমার সাথে দেখা করতে পারলো না। অথবা এমন একটা পীড়া যা আমাকে এমনভাবে নাড়া দিলো যা কিনা আমার নজরেই ছিলো না। বজলুকে আমি যেমন ভালোবাসতাম, তেমনি বজলু সর্বদা আমাকে মনে রাখতো। বন্ধুরা কেনো জানি ধিরে ধীরে সব হারিয়ে যাচ্ছে।

২৯/০৬/২০২১-সফুরা খালা

জীবন যেখানে যেমন। জে শিশুটি আজ জন্ম নিলো কেউ জানে না তার জন্য এই পৃথিবী কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা এই প্রিথিবীকে সে কি দিয়ে যাবে। হতে পারে আজকে এই শিশুটি হয়তো এই পৃথিবীকে কোনো এক সময় নাড়িয়েও দিতে পারে বা এই পৃথিবী তাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু এমন অনেক শিশুই এই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় না তারা কোনো ভূমিকা রাখে, না পৃথিবী তাদেরকে মনে রাখে। এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। যুগে যুগে তার পরেও অনেক শিশু গোপনে পৃথিবীতে আসে, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় আর একদিন সব কিছু ফেলে সবার থেকে আলাদা হয়ে আবার কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঝখানের এই সময়টায় খুব গুটুকতক মানুষ হয়তো নিজের মতো করে কাউকে কাউকে মনে রাখে কিন্তু তাও এক সময় মনের স্মৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। আমার সফুরা খালা, সামিদা খালা কিংবা আমার শায়েস্তা বুজি, বা সাফিয়া বুজিরা সম্ভবত এই রকমের কিছু মানুষ যারা সেই বহু বছর আগে শিশু হয়ে জন্ম নিলেও কোনো লাভ হয় নি কারো। তারা আজীবন যেনো এই দুনিয়ার বুকে একটা বোঝা হয়েই ছিলো। অতচ তারা হাজারো মানুষের থেকে অনেক ভালো মানুষ ছিলেন।

প্রায় দু বছর আগে আমি আমার পরিবার নিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে বেশ দূরে একতা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বেশীক্ষন দেরী করি নাই কারন পরিবেশটা ঐ রকমের ছিলো না। কোনো রকমে আনুষ্টানিকতা শেষ করে ভাবলাম, যেহেতু গ্রামের পথেই আছি, যাই আমাদের গ্রামের বাড়িটা ঘুরেই যাই। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, আলো বেশ কমে গিয়েছিলো। অনেকেই আমাকে চিনে না যদিও আমি এই গ্রামেরই একজন পুরানো বাসিন্দা। কিন্তু সময়ের সাথে আমার অনুপস্থিতি আমাকে আজ এই গ্রামে একজন নবাগত অতিথির মতোই মনে হচ্ছিলো। যারা আমার সম বয়সী ছিলো, তারাও অনেক বুড়ো হয়ে গেছে, অনেকেই চিনতেও ভুল করছিলো, আমি তো ওদের কাউকেই এখন চিনি না। ওদের চেহারা সুরুতে এমন বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে জে, জোয়ান কালে আমি যাদেরকে দেখেছি, তারা এখন দাদা নানার পর্যায়ে। না চেনারই কথা। তারপরেও কাউকে কাউকে আমি চিনতে পারছিলাম। গ্রামের বাড়িতা খা খা করে, কেউ থাকে না এখানে। আগে মা থাকতেন, এখন থাকে আমার এক ভাগ্নে জে সারাদিন গাজা খায়।

ভাবলাম, আমার এক খালা ছিলো। নাম সফুরা বেগম। উনি কি জীবিত আছেন নাকি আর জীবিত নাই সেই খবরটাও আমার জানা নাই। তাঁকে খুব দেখতে মন চাইলো। মিটুলকে বললাম, চলো একটা বাড়িতে যাই। যদি উনি বেচে থাকেন, তাহলে মায়ের অভাবটা কিছুটা হয়তো পুরন হবে। আর যদি জীবিত না থাকেন, অন্তত জানতে পারবো, কবে থেকে আর তিনি এই পৃথিবীতে নাই।

আলুকান্দা তার বাড়ি। অনেক খোজাখুজির পর শেষ অবধি সফুরা খালার বাসায় যেতে পারলাম। তিনি অসুস্থ্য। জর। একটা কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। চার পাঁচ দিন নাকি তিনি কিছুই খাচ্ছেন না। অনেক বয়স হয়ে গেছে। আমার মা যখন বেচে ছিলেন, তখন আমার এই খালা প্রায়ই আমার মায়ের সাথে দেখা করতেন, গল্প করতেন। আমাকে খুব আদর ও করতেন। আসলে আমার মা, আমার সামিদা খালা আর এই সফুরা খালা এতোটাই ভালো আর নীরিহ মানুষ ছিলেন জে, তাদের ব্যাপারে আজ অবধি কেউ কোনো অভিযোগ করেছে সে ঘটনা ঘটে নাই। খালাকে ডাকা হলো। উনি ভালো মতো চোখে দেখেন না। এম্নিতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, তার মধ্যে আবার আকাসগ ছিলো খুব মেঘাচ্ছন্ন। বিদ্যুৎ ছিলো না। কোন রকমে খালাদের বাসায় যাওয়ার পর, আমি খালার বিছানায় গিয়ে বসলাম। খালাকে তার পুত্র বধুরা ডেকে তোলার চেষ্টা করলেন। আমাই যাওয়াতে সবাই অনেক খুশী হয়েছে। কি থেকে কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না।

খালাকে যখন আমি বললাম, আমি মেজর আখতার এসছি। খালা এম্নিতেই কানে কম শুনে মনে হয়, তার মধ্যে আমার নাম শুনে যেনো একটা অদ্ভুত মিথ্যা কথা শুনলেন এমন হলো। বল্লো-

কে? হামিদার ছেলে?

বললাম, হ্যা খালা।

উনার জর ছিলো প্রায় ১০৩ ডিগ্রী। আমার কথা শুনে তিনি বিছানা থেকে উঠে বসলেন। খালা প্রায় গত চার পাঁচ দিন বিছানায় উঠে বসতে পারেন না। কিন্তু আজ যেনো কোন অলৌকিক শক্তিতে তিনি একাই বিছানায় উঠে বসে পড়লেন। আমি খালাকে জড়িয়ে ধরলাম, খালাও আমাকে এমন করে জড়িয়ে ধরে কাদতে পাগলেন যেনো এই মাত্র বাইরের আকাশটা ঘন কালো মেঘ বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিলো সারাটা উঠান।

কতটা আদর? কিভাবে আদর করলে ভালোবাসা হয়মায়েদের? আমার সেটা জানা ছিলো। আমার মা ও ঠিক এভাবেই আমাকে আদর করতেন। মুখে দুই হাত দিয়ে একদম চোখের কাছে আমার মুখটা নিয়ে পান ভর্তি মুখে ভিজা ভিজা চোখে ফিক করে হেসে দিয়ে বলতেন, অনেক বড় হ বাবা। আমার দোয়া আর দোয়া রইলো। সফুরা খালার ভাষাও এক। কি অদ্ভুদ। আমি তাঁকে কতোক্ষন জড়িয়ে ধরেছিলাম, আমার জানা নাই। সারাটা শরীর হাড্ডি, মাংশ বলতে কিছুই নাই। গরীব ছেলে পেলেরা যতোটা পারে তাদের মায়ের যত্ন নেয় বটে কিন্তু অন্তরের ভালোবাসায় হয়তো অনেক ঘাটতি আছে। তারপরেও তিনি বেচে আছেন যেটুক পান সেটা নিয়েই।

আমার মায়ের বাবার নাম ছিলো কেরামত আলী। আমার মায়ের কোনো ভাই ছিলো না। মাত্র দুই বোন- হামিদা খাতুন আমার মা আর সামিদা খাতুন আমার আপন খালা। কিন্তু সফুরা খালার বাবার নাম ছিলো চেরাগ আলি। তার ও কোনো ভাই অথবা কোনো বোন ছিলো না। তিনি একাই এক মাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন চেরাগ আলীর। এই চেরাগ আলি এবং কেরামত আলি (মানে আমার নানারা) ছিলেন চার ভাই। অন্যান্য আর দুই ভাই ছিলেন সাবেদ আলি এবং লষ্কর আলী। উম্মেদ আলী ছিলেন এই চার ভাইয়ের বাবা। অর্থাৎ আমার মা খালাদের নানা।

আজ তারা কেহই বেচে নাই। শুধুমাত্র আমার সফুরা খালাই বেচে আছেন কালের সাক্ষী হয়ে।

খুব ভালোবাসি আমি তোমাদের।

নোটঃ

আজ আবার গেলাম খালার কাছে। ওনার বয়স ১১০। সবচেয়ে সিনিয়ার মানুষ আমাদের পরিবার আর বংশের মধ্যে।

২৯/০৬/২০২১-আমার গ্রাম

অফিসেই ছিলাম। কেনো জানি হটাত করে খুব গ্রামে যেতে ইচ্ছে করলো লায়লা আর সফুরা খালাকে দেখার জন্য। বহুদিন গ্রামে যাই না। প্রায় এক যুগ অথচ মাত্র ১৫ মিনিট লাগে গ্রামে যেতে। মা যখন বেচে ছিলেন, তখন গ্রাম আমাকে চুম্বকের মতো টানতো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার হলেই আমি গ্রামে ছুটতাম মাকে দেখার জন্য যখন মা গ্রামে থাকতেন। কোনো ঈদই আমি শহরে করতাম না। মাকে দেখার সুবাদে আমার গ্রামের সেই পরিচিত মানুষগুলির সাথে আমার দেখা হতো। মানুষগুলি আমাকে বুক ভরা শ্রদ্ধ্যা আর মোহনীয় একটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ করতো। আমি যখন গ্রামে যেতাম, মায়ের সাথে বসে গল্প করতাম, বাড়িটার অবস্থা কি সেটা ভালো করে পরীক্ষা করতাম যাতে ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে মায়ের কোনো ভয় না থাকে। মা ঝড়কে খুব ভয় পেতেন। আকাশে ঝড়ের আভাষ দেখলে প্রথমেই আমার মনে পড়তো মায়ের কথা। মা বোধ হয় এখন ভয় পাচ্ছে। সেই ২০০২ সালের কথা। এখন ২০২১ সাল। এর মাঝে দু একবার গ্রামে গিয়েছি নিতান্তই একটা অতিথির মতো। এখন গ্রামে গেলে লায়লার বাসা পর্যন্ত গিয়ে ওর সাথে কথাবার্তা বলেই মনে হয় আমার গ্রামের ভ্রমন শেষ। অনেকবারই একেবারে বাড়ির আস্তানা থেকে ফিরে এসেছি, হয়তো বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছেও হয় নাই। এখন বাড়িটাতে থাকে আমার এক অবিবাহিত ভাগ্নে যে সারাদিন শুধু গাজা খায়। গাজায় কি সুখ সেটা আমি জানি, তবে বেশীদিন গাজা খেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে তখন নিজেই গাজায় পরিনত হয়। যেতে ভালো লাগে না। চুরি ওর অভ্যাস, গাজা ওর খাবার আর মথ্যা কথা বলা ওর স্বভাব। ফলে ওখানে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, যেতে ইচ্ছে করে না।

আজ হটাত করেই আবার ইচ্ছে করে গ্রামে আসলাম। গ্রামটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। অসংখ্য বাড়িঘর যত্রতত্র এখানে সেখানে উঠে গেছে। পায়ে চলার রাস্তাটাও আর আগের মতো নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ১৯৭৮/৭৮ সালের আমার গ্রামের বিন্যাশ। গ্রামের একেবারে পুর্ব পাশে ছিলো দৌলত মেম্বারদের বাড়ি যেখানে একটা গুচ্ছ পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই ছিলো ওহাবদের বাড়ি। পরে শুনেছি এই ওহাব নাকি মেম্বার হয়েছিলো তাই ওদের বাড়ির নাম এখন ওহাব মেম্বারদের বাড়ি বললেই সবাই চিনে।  ওহাবদের বাড়ি পার হয়ে আরো পশ্চিমে এলে পড়ে সেকান্দরদের বাড়ি। সেকান্দরকে আমি মামু বলে ডাকতাম। এই সেকান্দর মামু এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সবার সাথেই তিনি মিশতে পারতেন। বেশ গরীব হলেও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না। প্রতিদিন আমরা স্কুলের মাঠে খেলতে গেলে, তাঁকে সেখানে পাওয়া যেতো। স্কুলের মাঠ ছিলো বড়দের তাশ খেলার আড্ডা আর ছোটদের বল খেলার প্রতিযোগিতা। সরগরম হয়ে উঠতো স্কুলের মাঠ। যারা খেলতেন না, তারাও কেউ কেউ হুক্কা বিড়ি নিয়ে মাঠের চারিদিকে খেলা দেখতো যেনো প্রতিদিনই ম্যারাডনার আর মেসির খেলা হচ্ছে। এই ফুটবল খেলায় আমি আর মুসা একটা ট্রিক্স সব সময় করতাম যাতে আমি আর মুসা সব সময় একই টিমে থাকি। সেটা পরে বলি। যেই না মাগরেবের আজান পড়লো, সবাই যার যার বাড়িতে যাওয়া। অদ্ভুত একটা সময় পার হয়েছে তখন।

সেকান্দর মামুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো আরজুদের বাড়ি। আরজুদের পেশা ছিলো মাছ বিক্রি করা। আরজুরা আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ মানুষেরই পেশা ছিলো মাছ ধরা আর মাছ বিক্রি করা। কিন্তু কোনোভাবেই এটা জেলেপাড়ার মতো না। আরজুদের বাড়ির উঠোন ছিলো অনেক বড় আর এই উঠোনের চারিদিকে ছিলো ওদের অন্যান্য পারিবারিক বাড়িঘর। আরজু মাঝে মাঝে এমন করে মদ খেতো যে, বাড়ির বড়রা ওকে অনেক মারলেও আরজু বেহুশ অবস্থায় উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজতো। সবাই ভাবতো মদ খেয়ে বেহুস হলে উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় মনে হয়। আরজু তখনো বিয়ে করে নাই। আরজুদের বাড়িকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন দিকে একটু এগুলেই নতুন একটা বাড়ি উঠেছিলো। ওরা আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সবেমাত্র এই গ্রামে এসেছে। সে পেশায় ছিলো গ্রাম্য ডাক্তার, নাম নুরু ডাক্তার। বর্তমানে সেই নুরু ডাক্তারের বাসা রাজেন্দ্রপুর এবং তার এক ছেলে শাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে রাজনীতি করে। যাই হোক, আরজুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো ফুল্মতি আপারদের বাড়ি। ফুল্মতি আপা আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িটা ফজলুদের বাড়ি নামে পরচিত ছিলো। ফজলুরা তিন ভাই ছিলো। এখন তারা আর কেউ বেচে নাই। তাদেরও পেশা ছিলো মাছ বিক্রি তবে কৃষি কাজও করতো ওরা। ফুল মতি আপার জামাই এর একটা নেশা ছিলো। মাঝে মাঝেই অন্য মাইয়া লোক নিয়া মসকরা করতো। খারাপ জায়গায় ও মনে হয় যেতো। সবাই ওকে একটু অন্য নজরেই দেখতো বলে আমার ধারনা। ফজলু ভাইদের বাড়ির পশ্চিমে বেশ কিছুটা জায়গা খালি ছিলো। হেটে হেটে এলে প্রথমেই পড়তো জামাল, শাখাওয়াতদের বাড়ি। জামালকে আমি খুব বেশী দেখি নাই। জামাল ১৯৭২ সালের পরে আমাদের গ্রামে আর দেখা যায় নাই। জামাল ছিলো আসল মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে জামাল যুদ্ধে গিয়েছিলো। সম্মুখ সমরে সে অংশ নিয়েছিলো। দেখতে খুব সুন্দর ছিলো জামাল। আর স্বাস্থ্য ছিলো একদম সঠিক যুবকের মতো। অনেকে বলে যে, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছে অথবা জামাল ইচ্ছে করেই আর এই গ্রামে ফিরতে চায় নাই। আমার ধারনা, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছিলো কারন ১৯৭২ সালে তাঁকে এক পরদেশী মেয়ের সাথে একবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গিয়েছিলো। জামালের ভাই শাখাওয়াত, করিম (ডাক নাম বাছন), রুপচান এরা গ্রামেই থাকতো। বর্তমানে রুপচান বিদেশ থাকে, শাখাওয়াত মারা গেছে। করিম )বাছন)ও মারা গেছে। করিমকে সবাই বাছন বলেই ডাকতো। তিনি আমাদের থেকে অনেক বইয়সে বড় ছিলো। বাছনকে আমি কাকা বলে ডাক্তাম। আমি যখন আর্মিতে চাকুরী করি কমিশনডঃ অফিসার হিসাবে, হটাত একদিন দেখলাম বাছন কাকা ক্যান্টনমেন্ট কর্পোরেট ব্রাঞ্চে সিকিউরিটির কাজ করেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলো যে, তারই এক পরিচিত মানুষ আর্মিতে অফিসার এবং সেই সেনানীবাসেই তার চাকুরী। খুবই সমীহ করতেন আমাকে। আমিও কাকা বলতাম, উনিও আমাকে কাকা বলতেন।

এই জামালদের বাড়ির উত্তর দিকে জরাজীর্ন একটা বাড়ি ছিলো জামালদেরই এক আত্তীয়ের, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে। সম্ভবত শাখাওয়াতদের বাড়ি ছিলো ওটা। খুব গরীব ছিলো শাখাওয়াতরা। জামালদের বাড়ি আর ঐ শাখাওয়াতদের বাড়ির মাঝখান দিয়েই গ্রামের হেটে চলা রাস্তাটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। জামালদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো রফিক মাষ্টারদের বাড়ি। রফিক মাষ্টারকে আমি ভাইও বলতাম আবার স্যারও বলতাম। কারন তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমসাময়ীক আবার আমার প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একটু তোতলা ছিলেন কিন্তু খুব ভালো মানূশ ছিলেন। তার একটা ছেলে ছিলো নাম, কাজল, আর একটা মেয়ে ছিলো। রিফিক ভাইয়ের স্ত্রী খুব মিষ্টি চেহাড়ার ছিলেন। বর্তমানে কাজল একটা দূর্ঘটনায় পড়ে প্রায় প্যারালাইসিস। হামদর্দে চাকুরী করতো। রফিক ভাই চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। অনেক বয়ষ্ক মানুষ, আমার অফিসে প্রায়ই আসেন এবং গল্প হয়, ভালো লাগে। রফিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো আরদশ আলীদের বাড়ি। ওরা চার ভাই এবং কোনো বোন নাই ওদের। রফিক ভাইদের বাড়ি থেকে শুরু হয় “বড় বাড়ি”। এই আরদশ আলীর অন্যান্য ভাইয়েরা হলো সার্থক আলী, মোনজর আলী, সুন্দর আলী আর একজন, নামটা মনে পড়ছে না। এই বাড়ির সব বউরা প্রায় আসর নামাজের পর ধান বারা বানতো। ওরা বেশ সচ্ছল ছিলো। এদের বাড়ির দুই ধার দিয়া উত্তর দিকে যাওয়া যেতো। রফিক ভাইদের বাড়ি আর আরদশ আলীদের বাড়ির মাঝে দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেত আবার আরদশ আলীদের বাড়ির পশ্চিম ধার দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেতো। এই দুই ধারের যে কোনো রাস্তা দিয়েই উত্তর দিকে প্রায় ২০০ গজ হেটে গেলে দুটু বাড়ি পড়তো। একটা আমাদের বাড়ি আর তার সাথে আম্বর আলী কাকাদের বাড়ি। এই দুটু বাড়ি আসলে গ্রাম থেকে একটু আলাদা থাকায় সবাই “টেক্কা বাড়ি” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে তাকাইলে গ্রামের পুব পাশ থেকে শুরু করে পশ্চিম পাশের বাড়ি পর্যন্ত সব দেখা যেতো। যাই হোক, এই আরদশ আলিদের বাড়ির উঠোন ছিলো বেশ বড়। আমরা ওখানে “কুতকুত” খেলতাম। আর উঠোনের ঠিক দক্ষিনে একটা দোকান ছিলো। এই দোকানে কেউ চা খেতে বসতো, ক্রেউ বিড়ি খাইতো, আর আমি মাঝে মাঝে শুধু মানুষদেরকে লক্ষ্য করার জন্য বসে থাকতাম কারন কোন মানুষ কি কারনে বসে থাকে, বসে বসে কি কথা বলে, কেনো বলে, কার বাড়িতে কি সমস্যা, কার সাথে কার ঝগড়া, কার সাথে কে কি মজা মারতাছে, কোথায় কার কি পরিকল্পনা সব জানা যেত। আমি বেশ ছোট ছিলাম বলে আমাকে একটা বোকা বা আহাম্মক মনে করে আমার সামনেই সবাই সব কথা বলতে পারতো। আমি মনে মনে এসব ভাবতাম আর মানুষ গুলিকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। এটা আমার এক প্রকারের নেশাই ছিলো বলা যায়।  দোকানটার লাগোয়াই হলো পায়ে চলা গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে চলা পথ। রফিক ভাইদের বাড়ির দক্ষিনে গেলে পড়তো বাহারউদ্দিনদের বাড়ি। বাহার উদ্দিন আমার ক্লাসে পড়তো। ওর বাবারা তিন ভাই ছিলো। আক্কেল আলী, বাহারের বাবা আর আলমাস। আক্কেল আলীর পেশা ছিলো “চুরি” করা, আলমাসের পেশা ছিলো “চুরি”র সাথে মাছ ধরাও। শুধু বাহারের বাবাই ছিলো ভালো মানুষ। শুনেছি আক্কেল আলীর সব ছেলেরাই নাকি এখন চুরিই করে। তার মধ্যে হাতিম আলি একজন। আলমাস, আক্কেল আলী এবং বাহারের বাবা কেউ এখন আর বেচে নাই। ওরা রফিক ভাইয়ের চাচাতো ভাই।

আরদস আলীদের বাড়ির পশ্চিম লাগোয়া যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ির দিকে সেই রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো অরিজিনাল “বড় বাড়ি”। অর্থাৎ গনি মাদবরের বাড়ি। বেশ বড় পরিবার। গনি মাদবরেরাই আসলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রন করতো। জমিদার স্টাইলে। গনি মাদবরেরা মোট চার ভাই ছিলো। গনি মাদবর, সিদ্দিকের বাবা (নামটা মনে নাই) হাকিমের বাবা (নামটা মনে নাই), সাত্তারের বাবা (নামটা মনে নাই), ল্যাংরা রফিকের বাবা আর কাদেরের বাবা আজিজ খালু। আজিজ খালু মসজিদে মাঝে মাঝে ইমামতি করতেন। কিন্তু তার ঘরেই সব ছিলো জালিমের মতো সন্তান। কাদের, ইনসান, কুতুব, আরো একজন (নাম মনে নাই) এরা ছিলো আজিজ খালুর পোলা। এই বড় বাড়িটা ছিলো জোয়ান ছেলে দিয়ে ভর্তি। এদের মধ্যে যিনি কাদের নামে পরিচিত ছিলো, সে ছিলো বেশ শ্যামলা কিন্তু ভীষন সুইট চেহারার লোক। সরাসরি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ছিলো। আমি সাধীনতার পরেও দেখেছি তাঁকে হাতে অস্র নিয়ে ঘুরতে। খুবই সাহসী ছেলে ছিলো। এই কাদের ভাই, সামসু ভাই, রফিক (ল্যাংরা রফিক), মাষ্টার রফিক, এরা সবাই সমসাময়িক ছিলো। সাধীনতার ঠিক পর পরই কাদের ভাই একটা ডাকাতী দল গঠন করে ফেলেছিলো। ওরা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অস্র দিয়ে ডাকাতি করা শুরু করেছিলো। ওদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। আমার ভাই হাবীবুল্লাহ সব সময়ই ওদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতো এবং তিনি কখনো এসব কাজকে সাপোর্ট করতেন না। তখন দেশে একটা দূর্ভিক্ষ চলছিলো কিন্তু বড় বাড়ির কখনো দূর্ভিক্ষে সাফার করতে হয় নাই বরং ওদের কাছে সব কিছুই থাকতো সারপ্লাস। এই আজিজ খালু আবার বিয়ে করেছিলো গ্রামের পুর্ব প্রান্তে বসবাসকারী দৌলত মেম্বারের বোন। দৌলত মেম্বারের সাথে এই “বড় বাড়ির” সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো সাপে নেউলের মতো। একটা শক্তি আরেকটা শক্তিকে কখনোই মূল্যায়ন করতো না বরং যখনই সুযোগ পায় তখনই এক পরিবার অন্য পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করতো। এই রেষারেষির ফলে দৌলত মেম্বারের ইমিডিয়েট আপন ছোট ভাই অর্থাৎ মুসার বাবা আর মুসার ছোট ভাই মাসুদকে প্রান দিতে হয়েছিলো। মানে হত্যা। মুসার ভাই মাসুদ ছিলো আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। একদিন কোনো এক বর্ষাকালে মাসুদকে কুকুরে কামড়ে দিয়েছিলো। ঐ সময় খুব নামকরা ডাক্তার ছিলো একজন হিন্দু লোক, যাকে সবাই “বগা” ডাক্তার নামে চিনতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই বগা ডাক্তারকে। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কিন্তু উনি বাস করতেন বিবির বাজার এলাকায়। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩/৪ কিলমিটার দূরে। তখন বিবির বাজার ছিলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। রবিবার আর বৃহস্পতিবার বসতো বাজার। মাসুদকে কুকুরে কামড়ানোর কারনে মাসুদের বাবা মাসুদকে নিয়ে বিবির বাজারের দিকে একটা ছোট কোষা নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বর্ষা। পথের মধ্যে হটাত করে বড় বাড়ির সামসু, কাদের আর ল্যাংরা রফিকের সাথে দেখা। ওরাও অন্য নৌকায় ছিলো। তখন সকাল প্রায় ১০ টা। প্রকাশ্য দিবালোক। এই প্রকাশ্য দিবালোকে হটাত করে নদীর মধ্যে সামুসু ভাই এর লিডারশীপে মাসুদের বাবাকে জবাই করা হয় আর মাসুদকে পানিতে আছাড় মারতে মারতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে ওদেরকে রক্ষা করতে গিয়েও আর পারে নাই। এর মধ্যেই এরা পালিয়ে যায়। এবার “বড় বাড়ি”র সাথে দৌলত মেম্বারদের বাড়িত শত্রুতাটা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে তীব্র আকার ধারন করে। এর ফলশ্রুতিতে মামলা হয়, কেস হয়, বড়রা গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে বাস করতে শুরু করে, আরো অনেক প্রানহানী হয়, সেই সাথে কাদেরও খুন হয়। কাদেরের খুন এখনো একটা রহস্যজনক অবস্থায় আছে। কিভাবে কাদের খুন হলো সেটা পরে বল্বো। এই “বড় বাড়ী’তে তাদের নিজস্ব মসজিদ এবং নিজস্ব করবস্থান ছিলো যা এখন মসজিদটা আরো বড় হয়েছে বটে কিন্তু কবরস্থানটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বিলীন। ঐ কবরস্থানেই শুয়ে আছেন আমার মা আর আমার খালা। এটা সিদ্দিকদের বাড়ির একেবারেই লাগোয়া আর আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০/৬০ গজ দূরে।

সিদ্দিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই লাগোয়া ছিলো পিয়ার আলী নামে ওদের বাড়ি। লম্বা মানুষ, কোনোদিন শার্ট পরেছে কিনা আমার চোখে পড়ে না। মাছ বিক্রি করতো। গ্রামের মধ্যে যে কয়জন গরীব হালের মানুষ ছিলো, পিয়ার আলিরা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো রকমে বেচে ছিলো। ঘরটাও খুব জরাজীর্ন ছিলো। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলো অত্যান্ত ভালো। খুব সকালে দেখতাম পিয়ার আলী, মাথায় মাছের খাড়ি নিয়ে খালী গায়ে মাছ নিয়ে সদরঘাট বা শ্যামবাজারে যেতো। আমাদের গ্রামে আসলে যে কয়জন খুব সকালে দল বেধে মাছের খাড়ি নিয়ে হু হু করে খালী গায়ে ছুটতো শ্যমবাজারের দিকে তারা সবাই আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতো। আম্বর আলী কাকা, পিয়ার আলী, আরজু, আরদস আলীর বড় ভাই, আরো অনেকে। ওরা ফিরে আসতো প্রায় দুপুরের দিকে। তারপর আর ওদের কোনো কাজ থাকতো না। ফলে এই দলটা মাঝে মাঝেই বাঙলা মদ খেতো।

এই পিয়ার আলীদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো মংগল মাদবরের বাড়ি। খুব সুশ্রী একজন সুন্দর মানুষ। তার কোনো সন্তান ছিলো না। বড় বউ ছিলেন বাঞ্জা, তাই তিনি সন্তানের আশায় মংগল মাদবর আরেকবার বিয়ে করেন। দুটু বউই ছিলো অসধারান সুন্দুরী। দুই বউ ই পান খেতো। সুন্দুরী মেয়েরা পান খেলে আরো সুন্দর লাগে। গ্রামে যে কয়টা টিউব ওয়েল ছিলো গ্রামের মানুষের পানি নেয়ার জন্য, এই মংগল মাদবরের বাড়িতে ছিলো একটা। আমরা সবসময় এই বাড়ি থেকেই মাটির কলসীতে করে পানি আনতাম। বড় বউ তার সন্তান হবে না জানার পর একটি পালক ছেলে নিয়েছিলেন, যার নাম ছিলো শহীদ। শহীদ আমার ক্লাসেই পড়তো। মংগল মাদবর একবার মেম্বার পদে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু তিনি পাশ করেন নাই। মংগল মাদবরের নির্বাচনী ক্যাম্পাসে আমরা শহিদ সহ স্লোগান দিতাম টিনের চোঙ্গায় করে। তখন শহীদ নিজেও বলতো- আমার ভাই তোমার ভাই, মংগল ভাই মংগল ভাই। আমরা শহীদকে বলতাম, ঐ মংগল মাদবর না তোর বাপ? ও বলতো, হ আমার বাপই তো। এতো বোকা একতা ছেলে ছিলো যে অনেক মায়া হয় এখন ওর জন্য। কার যে ছেলে ছিলো শহীদ আমরা জানতেই পারতাম না। যাইই হোক, মেম্বার পদে মংগল মাদবর পাশ করে নাই কিন্তু পাশ করেছিলো খুনের চরের লালচান ভাই যিনি পরে লালচান মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। মংগল মাদবর নিজেও একজন সচেতন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। ছোট বউ এর ঘরে পর পর চার জন মেয়ে হয়েছিলো, পরীর মতো সুন্দুরি মেয়েগুলি। তারমধ্যে নাজমা, সালমা অন্যতম। আজ ওরা কোথায় আমি জানি না। নাজমা আমার থেকে প্রায় ৩/৪ বছরের ছোট ছিলো। মংগল মাদবর আর বাহারের বাবা, রফিক মাষ্টার, আক্কেল আলী, আলমাস, বাছন, জামাল, এরা এক বংশের লোক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মংগল মাদবর ঐ সব লোকদের থেকে একটু দূরে বাড়ি বানিয়েছিলেন (প্রায় ২০/২৫টা বাড়ির পরে পশ্চিম দিকে)। ফলে বেশীরভাগ সময়ে তাদের বংশের সাথে মংগল মাদবরের অনেক কিছুই বনিবনা ছিলো না। শুনেছি, শহীদ মারা গিয়েছিলো হার্টের কারনে। সে বিয়ে করেছিলো কিনা আমার আজ মনে নাই। কারন আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম সেই ১৯৭৭ সালে যখন আমি ক্যাডেটে ভর্তি হই। এর পরে অনেকের সাথেই আমার আর যোগাযোগ ছিলো না

অফিসেই ছিলাম। কেনো জানি হটাত করে খুব গ্রামে যেতে ইচ্ছে করলো লায়লা আর সফুরা খালাকে দেখার জন্য। বহুদিন গ্রামে যাই না। প্রায় এক যুগ অথচ মাত্র ১৫ মিনিট লাগে গ্রামে যেতে। মা যখন বেচে ছিলেন, তখন গ্রাম আমাকে চুম্বকের মতো টানতো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার হলেই আমি গ্রামে ছুটতাম মাকে দেখার জন্য যখন মা গ্রামে থাকতেন। কোনো ঈদই আমি শহরে করতাম না। মাকে দেখার সুবাদে আমার গ্রামের সেই পরিচিত মানুষগুলির সাথে আমার দেখা হতো। মানুষগুলি আমাকে বুক ভরা শ্রদ্ধ্যা আর মোহনীয় একটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ করতো। আমি যখন গ্রামে যেতাম, মায়ের সাথে বসে গল্প করতাম, বাড়িটার অবস্থা কি সেটা ভালো করে পরীক্ষা করতাম যাতে ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে মায়ের কোনো ভয় না থাকে। মা ঝড়কে খুব ভয় পেতেন। আকাশে ঝড়ের আভাষ দেখলে প্রথমেই আমার মনে পড়তো মায়ের কথা। মা বোধ হয় এখন ভয় পাচ্ছে। সেই ২০০২ সালের কথা। এখন ২০২১ সাল। এর মাঝে দু একবার গ্রামে গিয়েছি নিতান্তই একটা অতিথির মতো। এখন গ্রামে গেলে লায়লার বাসা পর্যন্ত গিয়ে ওর সাথে কথাবার্তা বলেই মনে হয় আমার গ্রামের ভ্রমন শেষ। অনেকবারই একেবারে বাড়ির আস্তানা থেকে ফিরে এসেছি, হয়তো বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছেও হয় নাই। এখন বাড়িটাতে থাকে আমার এক অবিবাহিত ভাগ্নে যে সারাদিন শুধু গাজা খায়। গাজায় কি সুখ সেটা আমি জানি, তবে বেশীদিন গাজা খেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে তখন নিজেই গাজায় পরিনত হয়। যেতে ভালো লাগে না। চুরি ওর অভ্যাস, গাজা ওর খাবার আর মথ্যা কথা বলা ওর স্বভাব। ফলে ওখানে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, যেতে ইচ্ছে করে না।

আজ হটাত করেই আবার ইচ্ছে করে গ্রামে আসলাম। গ্রামটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। অসংখ্য বাড়িঘর যত্রতত্র এখানে সেখানে উঠে গেছে। পায়ে চলার রাস্তাটাও আর আগের মতো নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ১৯৭৮/৭৮ সালের আমার গ্রামের বিন্যাশ। গ্রামের একেবারে পুর্ব পাশে ছিলো দৌলত মেম্বারদের বাড়ি যেখানে একটা গুচ্ছ পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই ছিলো ওহাবদের বাড়ি। পরে শুনেছি এই ওহাব নাকি মেম্বার হয়েছিলো তাই ওদের বাড়ির নাম এখন ওহাব মেম্বারদের বাড়ি বললেই সবাই চিনে।  ওহাবদের বাড়ি পার হয়ে আরো পশ্চিমে এলে পড়ে সেকান্দরদের বাড়ি। সেকান্দরকে আমি মামু বলে ডাকতাম। এই সেকান্দর মামু এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সবার সাথেই তিনি মিশতে পারতেন। বেশ গরীব হলেও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না। প্রতিদিন আমরা স্কুলের মাঠে খেলতে গেলে, তাঁকে সেখানে পাওয়া যেতো। স্কুলের মাঠ ছিলো বড়দের তাশ খেলার আড্ডা আর ছোটদের বল খেলার প্রতিযোগিতা। সরগরম হয়ে উঠতো স্কুলের মাঠ। যারা খেলতেন না, তারাও কেউ কেউ হুক্কা বিড়ি নিয়ে মাঠের চারিদিকে খেলা দেখতো যেনো প্রতিদিনই ম্যারাডনার আর মেসির খেলা হচ্ছে। এই ফুটবল খেলায় আমি আর মুসা একটা ট্রিক্স সব সময় করতাম যাতে আমি আর মুসা সব সময় একই টিমে থাকি। সেটা পরে বলি। যেই না মাগরেবের আজান পড়লো, সবাই যার যার বাড়িতে যাওয়া। অদ্ভুত একটা সময় পার হয়েছে তখন।

সেকান্দর মামুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো আরজুদের বাড়ি। আরজুদের পেশা ছিলো মাছ বিক্রি করা। আরজুরা আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ মানুষেরই পেশা ছিলো মাছ ধরা আর মাছ বিক্রি করা। কিন্তু কোনোভাবেই এটা জেলেপাড়ার মতো না। আরজুদের বাড়ির উঠোন ছিলো অনেক বড় আর এই উঠোনের চারিদিকে ছিলো ওদের অন্যান্য পারিবারিক বাড়িঘর। আরজু মাঝে মাঝে এমন করে মদ খেতো যে, বাড়ির বড়রা ওকে অনেক মারলেও আরজু বেহুশ অবস্থায় উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজতো। সবাই ভাবতো মদ খেয়ে বেহুস হলে উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় মনে হয়। আরজু তখনো বিয়ে করে নাই। আরজুদের বাড়িকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন দিকে একটু এগুলেই নতুন একটা বাড়ি উঠেছিলো। ওরা আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সবেমাত্র এই গ্রামে এসেছে। সে পেশায় ছিলো গ্রাম্য ডাক্তার, নাম নুরু ডাক্তার। বর্তমানে সেই নুরু ডাক্তারের বাসা রাজেন্দ্রপুর এবং তার এক ছেলে শাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে রাজনীতি করে। যাই হোক, আরজুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো ফুল্মতি আপারদের বাড়ি। ফুল্মতি আপা আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িটা ফজলুদের বাড়ি নামে পরচিত ছিলো। ফজলুরা তিন ভাই ছিলো। এখন তারা আর কেউ বেচে নাই। তাদেরও পেশা ছিলো মাছ বিক্রি তবে কৃষি কাজও করতো ওরা। ফুল মতি আপার জামাই এর একটা নেশা ছিলো। মাঝে মাঝেই অন্য মাইয়া লোক নিয়া মসকরা করতো। খারাপ জায়গায় ও মনে হয় যেতো। সবাই ওকে একটু অন্য নজরেই দেখতো বলে আমার ধারনা। ফজলু ভাইদের বাড়ির পশ্চিমে বেশ কিছুটা জায়গা খালি ছিলো। হেটে হেটে এলে প্রথমেই পড়তো জামাল, শাখাওয়াতদের বাড়ি। জামালকে আমি খুব বেশী দেখি নাই। জামাল ১৯৭২ সালের পরে আমাদের গ্রামে আর দেখা যায় নাই। জামাল ছিলো আসল মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে জামাল যুদ্ধে গিয়েছিলো। সম্মুখ সমরে সে অংশ নিয়েছিলো। দেখতে খুব সুন্দর ছিলো জামাল। আর স্বাস্থ্য ছিলো একদম সঠিক যুবকের মতো। অনেকে বলে যে, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছে অথবা জামাল ইচ্ছে করেই আর এই গ্রামে ফিরতে চায় নাই। আমার ধারনা, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছিলো কারন ১৯৭২ সালে তাঁকে এক পরদেশী মেয়ের সাথে একবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গিয়েছিলো। জামালের ভাই শাখাওয়াত, করিম (ডাক নাম বাছন), রুপচান এরা গ্রামেই থাকতো। বর্তমানে রুপচান বিদেশ থাকে, শাখাওয়াত মারা গেছে। করিম )বাছন)ও মারা গেছে। করিমকে সবাই বাছন বলেই ডাকতো। তিনি আমাদের থেকে অনেক বইয়সে বড় ছিলো। বাছনকে আমি কাকা বলে ডাক্তাম। আমি যখন আর্মিতে চাকুরী করি কমিশনডঃ অফিসার হিসাবে, হটাত একদিন দেখলাম বাছন কাকা ক্যান্টনমেন্ট কর্পোরেট ব্রাঞ্চে সিকিউরিটির কাজ করেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলো যে, তারই এক পরিচিত মানুষ আর্মিতে অফিসার এবং সেই সেনানীবাসেই তার চাকুরী। খুবই সমীহ করতেন আমাকে। আমিও কাকা বলতাম, উনিও আমাকে কাকা বলতেন।

এই জামালদের বাড়ির উত্তর দিকে জরাজীর্ন একটা বাড়ি ছিলো জামালদেরই এক আত্তীয়ের, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে। সম্ভবত শাখাওয়াতদের বাড়ি ছিলো ওটা। খুব গরীব ছিলো শাখাওয়াতরা। জামালদের বাড়ি আর ঐ শাখাওয়াতদের বাড়ির মাঝখান দিয়েই গ্রামের হেটে চলা রাস্তাটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। জামালদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো রফিক মাষ্টারদের বাড়ি। রফিক মাষ্টারকে আমি ভাইও বলতাম আবার স্যারও বলতাম। কারন তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমসাময়ীক আবার আমার প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একটু তোতলা ছিলেন কিন্তু খুব ভালো মানূশ ছিলেন। তার একটা ছেলে ছিলো নাম, কাজল, আর একটা মেয়ে ছিলো। রিফিক ভাইয়ের স্ত্রী খুব মিষ্টি চেহাড়ার ছিলেন। বর্তমানে কাজল একটা দূর্ঘটনায় পড়ে প্রায় প্যারালাইসিস। হামদর্দে চাকুরী করতো। রফিক ভাই চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। অনেক বয়ষ্ক মানুষ, আমার অফিসে প্রায়ই আসেন এবং গল্প হয়, ভালো লাগে। রফিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো আরদশ আলীদের বাড়ি। ওরা চার ভাই এবং কোনো বোন নাই ওদের। রফিক ভাইদের বাড়ি থেকে শুরু হয় “বড় বাড়ি”। এই আরদশ আলীর অন্যান্য ভাইয়েরা হলো সার্থক আলী, মোনজর আলী, সুন্দর আলী আর একজন, নামটা মনে পড়ছে না। এই বাড়ির সব বউরা প্রায় আসর নামাজের পর ধান বারা বানতো। ওরা বেশ সচ্ছল ছিলো। এদের বাড়ির দুই ধার দিয়া উত্তর দিকে যাওয়া যেতো। রফিক ভাইদের বাড়ি আর আরদশ আলীদের বাড়ির মাঝে দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেত আবার আরদশ আলীদের বাড়ির পশ্চিম ধার দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেতো। এই দুই ধারের যে কোনো রাস্তা দিয়েই উত্তর দিকে প্রায় ২০০ গজ হেটে গেলে দুটু বাড়ি পড়তো। একটা আমাদের বাড়ি আর তার সাথে আম্বর আলী কাকাদের বাড়ি। এই দুটু বাড়ি আসলে গ্রাম থেকে একটু আলাদা থাকায় সবাই “টেক্কা বাড়ি” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে তাকাইলে গ্রামের পুব পাশ থেকে শুরু করে পশ্চিম পাশের বাড়ি পর্যন্ত সব দেখা যেতো। যাই হোক, এই আরদশ আলিদের বাড়ির উঠোন ছিলো বেশ বড়। আমরা ওখানে “কুতকুত” খেলতাম। আর উঠোনের ঠিক দক্ষিনে একটা দোকান ছিলো। এই দোকানে কেউ চা খেতে বসতো, ক্রেউ বিড়ি খাইতো, আর আমি মাঝে মাঝে শুধু মানুষদেরকে লক্ষ্য করার জন্য বসে থাকতাম কারন কোন মানুষ কি কারনে বসে থাকে, বসে বসে কি কথা বলে, কেনো বলে, কার বাড়িতে কি সমস্যা, কার সাথে কার ঝগড়া, কার সাথে কে কি মজা মারতাছে, কোথায় কার কি পরিকল্পনা সব জানা যেত। আমি বেশ ছোট ছিলাম বলে আমাকে একটা বোকা বা আহাম্মক মনে করে আমার সামনেই সবাই সব কথা বলতে পারতো। আমি মনে মনে এসব ভাবতাম আর মানুষ গুলিকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। এটা আমার এক প্রকারের নেশাই ছিলো বলা যায়।  দোকানটার লাগোয়াই হলো পায়ে চলা গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে চলা পথ। রফিক ভাইদের বাড়ির দক্ষিনে গেলে পড়তো বাহারউদ্দিনদের বাড়ি। বাহার উদ্দিন আমার ক্লাসে পড়তো। ওর বাবারা তিন ভাই ছিলো। আক্কেল আলী, বাহারের বাবা আর আলমাস। আক্কেল আলীর পেশা ছিলো “চুরি” করা, আলমাসের পেশা ছিলো “চুরি”র সাথে মাছ ধরাও। শুধু বাহারের বাবাই ছিলো ভালো মানুষ। শুনেছি আক্কেল আলীর সব ছেলেরাই নাকি এখন চুরিই করে। তার মধ্যে হাতিম আলি একজন। আলমাস, আক্কেল আলী এবং বাহারের বাবা কেউ এখন আর বেচে নাই। ওরা রফিক ভাইয়ের চাচাতো ভাই।

আরদস আলীদের বাড়ির পশ্চিম লাগোয়া যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ির দিকে সেই রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো অরিজিনাল “বড় বাড়ি”। অর্থাৎ গনি মাদবরের বাড়ি। বেশ বড় পরিবার। গনি মাদবরেরাই আসলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রন করতো। জমিদার স্টাইলে। গনি মাদবরেরা মোট চার ভাই ছিলো। গনি মাদবর, সিদ্দিকের বাবা (নামটা মনে নাই) হাকিমের বাবা (নামটা মনে নাই), সাত্তারের বাবা (নামটা মনে নাই), ল্যাংরা রফিকের বাবা আর কাদেরের বাবা আজিজ খালু। আজিজ খালু মসজিদে মাঝে মাঝে ইমামতি করতেন। কিন্তু তার ঘরেই সব ছিলো জালিমের মতো সন্তান। কাদের, ইনসান, কুতুব, আরো একজন (নাম মনে নাই) এরা ছিলো আজিজ খালুর পোলা। এই বড় বাড়িটা ছিলো জোয়ান ছেলে দিয়ে ভর্তি। এদের মধ্যে যিনি কাদের নামে পরিচিত ছিলো, সে ছিলো বেশ শ্যামলা কিন্তু ভীষন সুইট চেহারার লোক। সরাসরি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ছিলো। আমি সাধীনতার পরেও দেখেছি তাঁকে হাতে অস্র নিয়ে ঘুরতে। খুবই সাহসী ছেলে ছিলো। এই কাদের ভাই, সামসু ভাই, রফিক (ল্যাংরা রফিক), মাষ্টার রফিক, এরা সবাই সমসাময়িক ছিলো। সাধীনতার ঠিক পর পরই কাদের ভাই একটা ডাকাতী দল গঠন করে ফেলেছিলো। ওরা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অস্র দিয়ে ডাকাতি করা শুরু করেছিলো। ওদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। আমার ভাই হাবীবুল্লাহ সব সময়ই ওদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতো এবং তিনি কখনো এসব কাজকে সাপোর্ট করতেন না। তখন দেশে একটা দূর্ভিক্ষ চলছিলো কিন্তু বড় বাড়ির কখনো দূর্ভিক্ষে সাফার করতে হয় নাই বরং ওদের কাছে সব কিছুই থাকতো সারপ্লাস। এই আজিজ খালু আবার বিয়ে করেছিলো গ্রামের পুর্ব প্রান্তে বসবাসকারী দৌলত মেম্বারের বোন। দৌলত মেম্বারের সাথে এই “বড় বাড়ির” সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো সাপে নেউলের মতো। একটা শক্তি আরেকটা শক্তিকে কখনোই মূল্যায়ন করতো না বরং যখনই সুযোগ পায় তখনই এক পরিবার অন্য পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করতো। এই রেষারেষির ফলে দৌলত মেম্বারের ইমিডিয়েট আপন ছোট ভাই অর্থাৎ মুসার বাবা আর মুসার ছোট ভাই মাসুদকে প্রান দিতে হয়েছিলো। মানে হত্যা। মুসার ভাই মাসুদ ছিলো আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। একদিন কোনো এক বর্ষাকালে মাসুদকে কুকুরে কামড়ে দিয়েছিলো। ঐ সময় খুব নামকরা ডাক্তার ছিলো একজন হিন্দু লোক, যাকে সবাই “বগা” ডাক্তার নামে চিনতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই বগা ডাক্তারকে। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কিন্তু উনি বাস করতেন বিবির বাজার এলাকায়। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩/৪ কিলমিটার দূরে। তখন বিবির বাজার ছিলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। রবিবার আর বৃহস্পতিবার বসতো বাজার। মাসুদকে কুকুরে কামড়ানোর কারনে মাসুদের বাবা মাসুদকে নিয়ে বিবির বাজারের দিকে একটা ছোট কোষা নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বর্ষা। পথের মধ্যে হটাত করে বড় বাড়ির সামসু, কাদের আর ল্যাংরা রফিকের সাথে দেখা। ওরাও অন্য নৌকায় ছিলো। তখন সকাল প্রায় ১০ টা। প্রকাশ্য দিবালোক। এই প্রকাশ্য দিবালোকে হটাত করে নদীর মধ্যে সামুসু ভাই এর লিডারশীপে মাসুদের বাবাকে জবাই করা হয় আর মাসুদকে পানিতে আছাড় মারতে মারতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে ওদেরকে রক্ষা করতে গিয়েও আর পারে নাই। এর মধ্যেই এরা পালিয়ে যায়। এবার “বড় বাড়ি”র সাথে দৌলত মেম্বারদের বাড়িত শত্রুতাটা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে তীব্র আকার ধারন করে। এর ফলশ্রুতিতে মামলা হয়, কেস হয়, বড়রা গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে বাস করতে শুরু করে, আরো অনেক প্রানহানী হয়, সেই সাথে কাদেরও খুন হয়। কাদেরের খুন এখনো একটা রহস্যজনক অবস্থায় আছে। কিভাবে কাদের খুন হলো সেটা পরে বল্বো। এই “বড় বাড়ী’তে তাদের নিজস্ব মসজিদ এবং নিজস্ব করবস্থান ছিলো যা এখন মসজিদটা আরো বড় হয়েছে বটে কিন্তু কবরস্থানটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বিলীন। ঐ কবরস্থানেই শুয়ে আছেন আমার মা আর আমার খালা। এটা সিদ্দিকদের বাড়ির একেবারেই লাগোয়া আর আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০/৬০ গজ দূরে।

সিদ্দিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই লাগোয়া ছিলো পিয়ার আলী নামে ওদের বাড়ি। লম্বা মানুষ, কোনোদিন শার্ট পরেছে কিনা আমার চোখে পড়ে না। মাছ বিক্রি করতো। গ্রামের মধ্যে যে কয়জন গরীব হালের মানুষ ছিলো, পিয়ার আলিরা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো রকমে বেচে ছিলো। ঘরটাও খুব জরাজীর্ন ছিলো। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলো অত্যান্ত ভালো। খুব সকালে দেখতাম পিয়ার আলী, মাথায় মাছের খাড়ি নিয়ে খালী গায়ে মাছ নিয়ে সদরঘাট বা শ্যামবাজারে যেতো। আমাদের গ্রামে আসলে যে কয়জন খুব সকালে দল বেধে মাছের খাড়ি নিয়ে হু হু করে খালী গায়ে ছুটতো শ্যমবাজারের দিকে তারা সবাই আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতো। আম্বর আলী কাকা, পিয়ার আলী, আরজু, আরদস আলীর বড় ভাই, আরো অনেকে। ওরা ফিরে আসতো প্রায় দুপুরের দিকে। তারপর আর ওদের কোনো কাজ থাকতো না। ফলে এই দলটা মাঝে মাঝেই বাঙলা মদ খেতো।

এই পিয়ার আলীদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো মংগল মাদবরের বাড়ি। খুব সুশ্রী একজন সুন্দর মানুষ। তার কোনো সন্তান ছিলো না। বড় বউ ছিলেন বাঞ্জা, তাই তিনি সন্তানের আশায় মংগল মাদবর আরেকবার বিয়ে করেন। দুটু বউই ছিলো অসধারান সুন্দুরী। দুই বউ ই পান খেতো। সুন্দুরী মেয়েরা পান খেলে আরো সুন্দর লাগে। গ্রামে যে কয়টা টিউব ওয়েল ছিলো গ্রামের মানুষের পানি নেয়ার জন্য, এই মংগল মাদবরের বাড়িতে ছিলো একটা। আমরা সবসময় এই বাড়ি থেকেই মাটির কলসীতে করে পানি আনতাম। বড় বউ তার সন্তান হবে না জানার পর একটি পালক ছেলে নিয়েছিলেন, যার নাম ছিলো শহীদ। শহীদ আমার ক্লাসেই পড়তো। মংগল মাদবর একবার মেম্বার পদে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু তিনি পাশ করেন নাই। মংগল মাদবরের নির্বাচনী ক্যাম্পাসে আমরা শহিদ সহ স্লোগান দিতাম টিনের চোঙ্গায় করে। তখন শহীদ নিজেও বলতো- আমার ভাই তোমার ভাই, মংগল ভাই মংগল ভাই। আমরা শহীদকে বলতাম, ঐ মংগল মাদবর না তোর বাপ? ও বলতো, হ আমার বাপই তো। এতো বোকা একতা ছেলে ছিলো যে অনেক মায়া হয় এখন ওর জন্য। কার যে ছেলে ছিলো শহীদ আমরা জানতেই পারতাম না। যাইই হোক, মেম্বার পদে মংগল মাদবর পাশ করে নাই কিন্তু পাশ করেছিলো খুনের চরের লালচান ভাই যিনি পরে লালচান মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। মংগল মাদবর নিজেও একজন সচেতন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। ছোট বউ এর ঘরে পর পর চার জন মেয়ে হয়েছিলো, পরীর মতো সুন্দুরি মেয়েগুলি। তারমধ্যে নাজমা, সালমা অন্যতম। আজ ওরা কোথায় আমি জানি না। নাজমা আমার থেকে প্রায় ৩/৪ বছরের ছোট ছিলো। মংগল মাদবর আর বাহারের বাবা, রফিক মাষ্টার, আক্কেল আলী, আলমাস, বাছন, জামাল, এরা এক বংশের লোক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মংগল মাদবর ঐ সব লোকদের থেকে একটু দূরে বাড়ি বানিয়েছিলেন (প্রায় ২০/২৫টা বাড়ির পরে পশ্চিম দিকে)। ফলে বেশীরভাগ সময়ে তাদের বংশের সাথে মংগল মাদবরের অনেক কিছুই বনিবনা ছিলো না। শুনেছি, শহীদ মারা গিয়েছিলো হার্টের কারনে। সে বিয়ে করেছিলো কিনা আমার আজ মনে নাই। কারন আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম সেই ১৯৭৭ সালে যখন আমি ক্যাডেটে ভর্তি হই। এর পরে অনেকের সাথেই আমার আর যোগাযোগ ছিলো না।

২২/০৬/২০২১-দিমুখী জীবন

এই পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষই কোনো না কোনো সময়ে দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করে। কেউ জেনে করে, কেউ না জেনে। এই দিমুখী জীবনের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে এর কোনটা আগা আর কোনটা মাথা তার হদিস পাওয়া যায় না। কখনো এর শেষ থেকে শুরু আবার কখনো মাঝপথ থেকে। যাদের দ্বিমুখী জীবন জীবনের প্রারম্ভেই শুরু হয় তাদের বেলায় এটা বলা অনেক কঠিন তাদের আসল অবয়াবব টা কি। এই দ্বিমুখী জিবনের মানুষগুলি সর্বদা একটা বর্নচোরা রুপে এই সমাজে, এই সংসারে এমন করে বাস করেন যাদের মুখ এবং মুখোস কোনোটাই আলাদা করা যায় না। তাদের প্রতিটি দৃষ্টি ভংগীতে থাকে আবছা আবছা কিংবা পরিকল্পিত কোনো ছায়ার রুপ রেখা যেখানে সামনে থাকা মানুষগুলিকে তারা কখনোই সাধারন মানুষ হিসাবে দেখেন না। তারা যা দেখেন আর যা দেখান পুরুটাই একটা মাস্ক। যেদিন এই মাস্ক আলাদা করার মতো পরিস্থিতি আসে, তখন হাজারো রকমের প্রশ্ন মনে জেগে উঠে- কেনো, কিভাবে, কার জন্যে কিংবা কি প্রয়োজনে এই দ্বিমুখী জীবনের আবশ্যকতা। অনেকেই তখন মাস্ক পরিহিত মানুষটাকেই আসল মনে করে আসল মানুষটাকেই আর চিনতে পারেন না। পাশাপাশি কয়েক যুগ একত্রে বসবাস করার পরেও অনেক ক্ষেত্রেই এই দ্বিমুখী জীবনের সন্ধান পাওয়া যায় না অথচ ব্যাপারটা ঘটছে। ঘটছে প্রকাশ্যে, দিবালোকে আর সবার অজান্তেই। এটা যেনো সেই কচুরীপনা যা স্রোতের মধ্যে স্রোতের বিপরীতে চলমান। হতাত করে চোখে পড়ে না কিন্তু যখন নিজের অবস্থান থেকে সেই কচুরীপানা অনেক দূর অবধি চলে যায়, তখন হয়তো ব্যাপারটা দৃশ্যমান হয় বটে কিন্তু সেই কচুরীপানা আর হাতের বা দৃষ্টির মধ্যে থাকে না। সে চলতেই থাকে তার মতো। চলমান সমুদ্রে কিংবা ভরা নদীর বুকে ভেসে থাকলেও এই কচুরীপানা তার নিজের প্রয়োজনে এক পেট জল সর্বদা নিজের করে ধরে রাখে যা তার হয়তো প্রয়োজনই নাই। কিন্তু দ্বিমুখী জীবনের মানুষ গুলির এই প্রয়োজন আছে বলেই তারা কোনো সুযোগ নেয় না, তারা তাদের প্রয়োজনটাই আগে বিবেচনা করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। পিছনে কার কি হলো, তাতে তাদের ভাবার কোনো আবশ্যকতা মনে করে না। দ্বিমুখী জীবনের ভালোবাসায় প্রচুর খাদ থাকে কিন্তু এই খাদের উপরের চাকচিক্য এমনভাবে প্রতিফলিত হয় যা আসল সোনার রং টাকেই আরো আসল বানিয়ে চোখ ঝলসে দেয়, অন্যের মন আকর্ষন করে তাঁকে আরো কাছে আসার সুযোগ করে দেয়। আর এটাই সেটা যেখানে সমাজের মানুষ গুলি প্রতিদিন প্রতারিত হয়।

দ্বিমুখী জিবনের সত্তা দ্বিধা বিভক্ত। তাদের দুটুই পাশাপাসি বিচরন করে- ঘৃণা আর মাত্রাতিরিক্ত ভরষা, সত্যতা আর মিথ্যার বেশাত, কঠিনতা আর দূর্বলতা, মায়া এবং হিংসা। এই দ্বিমুখী জিবনের সময় আর অসময় বলে কিছু নাই। যখন প্রয়োজন তখন তারা উভয়ই ব্যবহার করতে কোনো দিধাবোধ করেন না। ফলে দেখা যায় যে, যাকে কেউ কোনোদিন এমন কোনো কাজ, এমন কোনো ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতে পারে বলে ভাবেন ও নাই, তারাই সেটা করে ফেলে। তখন তারা সবাইকে এমনভাবে তাক লাগিয়ে দেয় যে, সবার মনে এই প্রশ্ন জাগে এটা কিভাবে সম্ভব সেই তার দ্বারা যে কিনা একটা তেলাপোকা দেখলেও ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে থাকতো।

দ্বিমুখী জীবন শুধু গোপন আর প্রকাশ্যেই নয়, আসলে এই দ্বিমুখী সত্তা প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনেই মানুষ তথা অন্যান্য জীবেরাও বহন করে। যে মানুষটি ঘরের মধ্যে একজন খাব ভালো বাবা, কিংবা যে মা বাইরে অনেক সমাজ মুখীতা, যে বাচ্চাটা তার বন্ধুর কাছে সমানভাবে গৃহীত, সেই বাবাই অফিসে তার পুরুদস্তর চেহাড়া অন্য রকমের, সেই মা ই ঘরের ভিতরে আরেক সাজে থাকেন কিংবা সেই বাচ্চাটা হয়তো তার নিজের বাড়িতে এতোটাই চুপচাপ যা বাড়ীর লকের ধারনাই নাই সে কত টা সতষ্ফুর্ত তার বন্ধুদের মাঝে। একটি বাঘ যখন হরিন শিকার করে, তখন বাঘিনীর মধ্যে যে মাতৃত্ব বোধ, সেটা হরিনের বাচ্চাদের কাছে কোনো প্রমান নাই। অথচ এক বাঘিনী মা তার নিজের বাচ্চাদের জন্য আরেক হরিনী মাকে মেরে ফেলতে একটুও দিধাবোধ করে না। ভালোবাসার এই দ্বৈত রুপের নামই হচ্ছে কখনো কখনো দ্বিমুখী স্বভাব।

এখন প্রশ্ন জাগে, যদি সবাই তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময়ে এই দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করেই থাকেন, তাহলে দ্বিমুখী না কারা? আসলে এর উত্তর খুব কঠিন নয়। সবার দ্বিমুখী জীবনের সংগা এক নয়। কেউ কেউ অতি অল্প বিশয়েই তার দ্বিমুখী জীবনের শুরু আর শেষ আবার কারো কারো এই বৈশিষ্ট এমন যে, প্রতিটি বিশয়েই তারা দ্বিমুখী। কারো দ্বিমুখী জীবনের ধারা শুধু মাত্র বৈষয়িক, আবার কারো কারো দ্বিমুখী জীবন ব্যক্তিগত। কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষ্মুক্ত করেন, আবার কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষিত করেন। দুটু দ্বিমুখী জীবন একসাথেও চলতে পারে যদি তাদের সেই দ্বিমুখী জিবনের গতিপথ হয় একই রেলের উপর। যখন এই দ্বিমুখী জীবনের সাথে ভিন্ন ধারার দ্বিমুখী জীবনের সংযোগ হয়, তখন ভয়ংকর পরিনতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না।

দাম্পত্য জীবনেও এমন কিছু সময় আসে যখন মানুষ পরিস্থিতির কারনে কখনো কখনো দ্বিমুখী চরিত্রে ঢোকে যায়। যখন কোনো মহিলার স্বামী তার স্ত্রীর প্রয়োজনটা বুঝতে না পেরে বড় গাড়ি, বড় বাড়ি বড় বড় সপ্নে বিভোর হয়ে সার্বোক্ষন তার নিজের সংসার থেকে উদাসীন থাকে আর অন্যত্র ব্যতিব্যাস্ত হয় সময় কাটাতে থাকে, তাহলেই তার নিজের স্ত্রীর দ্বিমুখী জীবনে প্রবেশ করার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায় আর সেই মহিলাও দ্বিমুখী জীবনে তার নিজের অজান্তেই ঢোকে যায়। কারন, যখন একটা মেয়ে একা হয়ে যায়, নিজের ঘরে স্বামীর সংস্পর্শও ধীরে ধীরে অবহেলায় পরিনত হয়, যখন সারাদিন কাজকর্ম করার পর যখন মনে হয় কেউ শুধু হাতটা ধরুক। অথচ কেউ আর পাশে থাকে না, তখন তার একাকিত্ত বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন তার চলাফেরা, আচার আচরন, মনোভাব দেখে কারো সন্দেহ থাকে না যে, সে একা। এরপরেই শুরু হয় ভয়ংকরতা। সমাজ তাঁকে স্পর্শ করার জন্য মুখিয়ে থাকে। আর সে যতোদূর সম্ভব  সেই স্পর্শ তাঁকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা তাও একা একাই। একা থাকা একটি মেয়ে সমাজে সস্তায় পাওয়া লটারীর টিকেটের মত হয়। সবারই মনে তাঁকে পাওয়ার একবার ইচ্ছা হয়। কিন্তু যে পেয়ে যায় সেই রাজা। তাই প্রত্যেকেই সেই ভাগ্যটা একবার ছুয়ে দেখতে চায়। আর সেই ব্যক্তি তখনি রাজা বনে যায় যখন কোনো মহিলা সমস্তা চেষ্টা করার পরেও আর একাকিত্তে বসবাস না করতে পেরে দ্বিমুখী চরিত্রে প্রবেশ করে ফেলে।

এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই যে, আজকের এই সমাজে মহিলা এবং পুরুষদের সমান দ্রিষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু এই কথাটাও খুবই সত্যি যে, মহিলাদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টি ভংগীর পরিবর্তনের অনেকটা পথ বাকী রয়েছে। আজ কোনো পুরুষ তার অফিসে মহিলা বস এর আদেশ পালন করা অতোটা সমস্যার বিষয় মনে করে না কিন্তু নিজের ঘরে নিজের স্ত্রীকে নিজের সমান মর্যাদা দেয়া সে এখনো মানতে পারে না। 

বড় বড় গাড়ি, বড় বড় বাড়ির শখ খারাপ কিছু না কিন্তু যেটা নেই সেটা পাওয়ার জন্য যেটা আছে সেটা হারিয়ে ফেলা না বুদ্ধিমানের কাজ আর না সঠিক। সেজন্য ভালোবাসায় সময় দিন, ছোট ছোট খুশী গুলি পরিবারে ভাগ করে নিন, সময় দিন পরিবারকে। দাম্পত্য জীবনে কোনো মহিলার বা কোনো পুরুষের দ্বিমুখী চরিত্র স্রিষ্টির পিছনে আমরাই অনেকাংশে দায়ী থাকি।

২১/০৬/২০২১- মৃত্যু

মৃত্যুকে মানুষ আধারের সাথে তুলনা করে থাকে। কিন্তু এই আধার কোনো কালো রাত কিংবা অমাবশ্যার নিশি বা দিনের আলোর অভাবে নয়। যা চোখে দেখা যায় না, যার ব্যাপারে আমাদের মন এবং মস্তিষ্ক কোনো ধারনা করতে পারে না, আমাদের কাছে সেটাই একটা আধারের মতো। এই আধার কিন্তু অন্ধকার নয়, এটা এমন একটা আধার যার কোনো রং নাই, যার কোনো বর্ননা আজো কেউ দিতে পারে নাই। মানুষের হাজারো শখ থাকে। বেচে থাকার শখ, সম্পদশালী হবার শখ, অনেক ক্ষমতাধর হবার শখ, কিন্তু আজো পর্যন্ত কেউ এটা শখ করে নাই যে, সে মরতে চায়। যারা আত্তহত্যা করে, তারা ইমোশনাল, তারা শখের বশে মরনকে বরন করে না। মৃত্যু কোনো ইচ্ছে নয় যে, পুরন হবে কি হবে না, মৃত্যু তো একটা সত্য, একটা লক্ষ্য যেখানে সবাইকে যে কোনো মুল্যেই পৌছাতে হবে। আর ওখানকার সমন, গাড়ি অথবা বাহক কখন আসবে, সেটা তো কেহই বলতে পারে না। এই মৃত্যু অনেক সম্পর্ক ছেদ করে আবার এই মৃত্যুই অনেক নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কখনো কখনো মৃত্যুটাই যেনো অনেক সমস্যার সমাধান নিয়ে আসে। যদিও যার বেলায় ঘটে সে সমস্যা ছিলো না।

মৃত্যুর কারনে এমনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যেখানে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয় অথবা মেনে নিতে শিখতে হয়। হোক সেটা ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আরো বেশী করে দুশ্চিন্তায় ভোগায় যখন এটা জানা যায় যে, যে মানুষটি চলে গেছে সে সব দিক থেকে অশান্তিতেই ছিলো।

কিন্তু কোনো মানুষ যখন কাউকে না বলে চিরতরে আমাদের জীবন থেকে চোখের সামনে মৃত্যুর থাবায় হারিয়ে যায়, আর আমরা তাকে চোখের জলে ভিজিয়ে বিদায় জ্ঞাপন করি, তখন হয়তো তার দ্বারা কোনো ভুল পদক্ষেপের দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করে না, কিন্তু তার চলে যাওয়ায় যারা বেচে থাকেন তাদের জীবনে আমুল পরিবর্তন নেমে আসে বলে মাঝে মাঝে মনে হয় রাস্তাটা অন্ধকার, জীবনটা ভয়ংকর এবং আমরা সর্বত্রই একা। তখন একটা দিনও যেনো আমাদের ঠিকঠাক কাটতে চায় না। এমন কি একটা রাতও না। এই সময়ে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। অন্যদিকে দিনের আলোতে এই পার্থিব জগতে বসে মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো ধারনাই করা সম্ভব হয় না আমাদের অথচ মৃত ব্যক্তির যাত্রার শুরু থেকে শেষ অবধি রাস্তাটা তার কাছে হয়তো আমাদের থেকেও ভয়ংকর আর বিভীষিকাময়আরো অন্ধকার। এটা যেনো তার কাছে ঠিক একটা অন্ধকার টানেল, যেখানে মাঝে মাঝে আলো আসে হয়তো কিন্তু সে আলোয় কোনো কাজ হয় কিনা জানা যায় নাই।

এমন অনেক মিথ্যে মৃত্যু আসে কারো কারো জীবনে যেখানে তারা এই পার্থিব জীবনের সাথে সাময়িক সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আরেক কোনো এক অচেনা জগতে বিচরন করতে থাকে। তখন তার আশেপাশে কি হচ্ছে, কারা কি করছে, কিছুই আর তার কাছে পৌছায় না অথচ তার দেহ, তার শরীর পুরুটাই রয়েছে এই পার্থিব জগতে। এই প্রকারের মৃত্যু থেকে ফিরে আসাকে হয়তো বলা যায় কোনো মতে বাচা, হয়তো বা বলা যেতে পারে জীবনের কাছে নিশ্চিত মৃত্যুর পরাজয়, অথবা বলা যেতে পারে যে, জীবনের বেচে থাকার সময়টা এখনো শেষ হয় নাই। যখন এমনটা হয় তখন আমরা কি বলতে পারি যে, সাক্ষাত ম্রতুকে আমরা দেখতে পেয়েছি? এমন অনেক প্রশ্ন থাকতেই পারে কিন্তু আসল মৃত্যু আর মিথ্যা মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চয় এমন কোনো ব্যতিক্রম আছে যা প্রকারান্তে একটা মায়াজালের কিংবা মেঘলা আকাশের পিছনে আবছা নীল আকাসের মতো। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারে, যদি অন্তরের দৃষ্টি খুলে যায় তখন জীবিত অবস্থায় মৃত্যুকে দেখা যায়। এটা অনেক বড় স্তরের একটা ধ্যান কিংবা আরাধনা। যারা এটাকে লালন করতে পারেন, তারা স্বাভাবিক মানুষ নন। জীবনটা কিভাবে বাচবে সেটা আমাদের হাতে, আমরা জীবনটাকে দেখতে পাই, কিন্তু এটা কিভাবে দেখবো যে, মৃত্যু কখন আর কিভাবে আসবে? সেটা আজ অবধি কেউ বলতে পারে নাই।

অফিসে যাওয়ার সময় যে মানুষটার উপর নির্ভর করে আমার সকাল হতো, রাতে ঘুমানোর আগে যে মানুষগুলির উপর ভরষা করে আমার ভালো ঘুম হতো। কারনে অকারনে যখন তখন আমাদের মেজাজ কখনো ক্ষিপ্ত কিংবা বিক্ষিপ্ত অথবা উদবেলিত হতো, যখন সে আর কাছে থাকে না, তখন অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ে। অনেক মায়া লাগে। মনে হয়, সব কিছু থাকা সত্তেও যেনো কোনো কিছুই নাই। এই মায়া, এই ভরষা কিংবা এই বিক্ষিপ্ত চঞ্চলতার আর কোনো মুক্যই থাকে না সেই ব্যক্তির কাছে যে এই মাত্র সবার গোচরেই উধাও হয়ে গেলো চিরতরে। এই পরিবর্তনশীল সময়ে, অনেকেই হয়তো কথায় কথা বলে তারা ভালো আছেন, আমরা ভালো আছি কিন্তু তারা কিংবা আমরা জানিই না যে, আমাদের সময়টাই যে খারাপ যাচ্ছে। খুব মায়া হয় তখন। কিন্তু কেনো মায়া হয়, তার উত্তর আজো জানি না। যা হাতের মুঠোয় নাই, যা চিরতরে হারিয়ে যায়, অথচ একদিন হাতের কাছেই ছিলো, সেটার জন্য কেনো মায়া হয়, কেনো কষ্ট হয়, কেনো আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে হয়, তার ব্যাখ্যা নাই আমাদের কাছে। এর কিছু ব্যাখ্যা হয়তো দাড় করানো যায় যে, হয়তো পুরানো অভ্যাসে বন্দি মন বারবার আবার সেই পুরানো খাচায়ই ফিরে আসতে চায়।  অথবা এমনো হতে পারে যে, কেউ যখন আর কাছে থাকে না, তখন হয়তো এটা পরিষ্কার বুঝা যায় নিজের কতগুলি স্বকীয়তা, অভ্যাস আর পছন্দ কতো নিঃশব্দে সেই চলে যাওয়া মানুষটি নিয়ে অন্তর্ধান হয়ে গেলো, সাথে নিয়ে গেলো তার থেকে ধারে নিয়ে বেচে থাকার আমাদের অনেক পরনির্ভরশীলতার অভ্যাসগুলিও। আর সেটা যখন পরিষ্কার হয় তখন অভাবগুলির সংকট দেখা দেয়। আমরা বিচলিত হই, ভয় পাই, কষ্টে থাকি আর তখনই তার অভাবে আমরা তার উপর মায়ায় চোখ ভিজিয়ে দেই।

 তবে আজীবন একটা সত্য বচন এই যে, জীবন মানেই যাত্রা, আর এই যাত্রার শেষ প্রান্তেই থাকে মৃত্যু। অর্থাৎ জীবনের অবসানেই মৃত্যুর যাত্রা শুরু। এই নতুন পর্বের যাত্রা কখন কার কোন সময় শুরু হবে, এটা কোনো বিজ্ঞান, কোনো ডাক্তার, কোনো ধর্ম পুস্তক কিংবা কোনো ধ্যান কখনোই বলতে পারে না।

১৪/৬/২০২১-কনিকার আমেরিকার যাওয়ার ভিসা এপ্রোভড

অনেক জল্পনা কল্পনা আর প্রচেষ্টার পর আজ কনিকার ইন্টারভিউ ছিলো আমেরিকান এম্বেসী অফিসে ভিসার জন্য। খুব সকালে উঠেছি কারন সকাল ৮ টার মধ্যে ওর ভিসা অফিসে রিপোর্ট করার করহা। সাথে মিটুল ছিলো। মিটুল এম্নিতেই খুব তাড়াতাড়ি অস্থির হয়ে যায়। কিন্তু কনিকা কোনো কিছুতেই অস্থির প্রকৃতির নয়। আমার ভরষা ছিলো ইন্টারভিউতে কনিকা ভালো করবে।

আমরা ওকে এম্বেসী অফিসে সামনে নামিয়ে দিয়ে পাশেই গাড়ি পার্ক করে অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু মিটুলের যেনো এম্বেসী অফিসের গেটেই অপেক্ষা করতে বেশী সাচ্ছব্দ্য বোধ করছিলো। ফলে মিটুলকে আমি ওখানে নামিয়ে দিয়ে আমি আবারো পার্কিং লাইনে চলে এসছিলাম। বেশ কিছুক্ষন পর দেখালাম কনিকা চলে এসছে কিন্তু একা।

১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকা চুরি-২

আমরা যখন জীবিত অর্থাৎ যখন জীবন আছে আমাদের, তখন আমাদের কাছে জীবন এমনভাবে চলতে থাকে যেনো আমাদের জীবনের সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্কই নাই। কিন্তু যখন মৃত্যু একেবারেই কাছে চলে আসে, তখন এ রকম মনে হয় যেন জীবনের কোনো গুরুত্বই নাই। এক নিমিষে, চোখের পলকে সব শেষ হয়ে যায়। এই মৃত্যু না সময় দেখে আসে, না জায়গা দেখে। যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থানে সে চলেই আসে। তখন আশেপাশের সবাইকেই চমকে তো দেয়ই উপরন্ত আশেপাশের সবাইকে নাড়িয়েও দেয়। আর এর রহস্যও কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু যখন মৃত্যু নিজে আসে না, তাকে ডেকে আনা হয়, তখন তার সময়, জায়গা এবং কারন এই তিনটাই মানুষ ঠিক করে দেয়। আজ আমি এমনি একটা ট্র্যাজেডির কথা বলবো যা ঘটেছিল রস্তম নামে এক লোকের সাথে।

রুস্তম আমার ড্রাইভার ছিলো। প্রায় বছর পাচ বা তারও বেশী একনাগাড়ে রুস্তম আমার ব্যক্তিগত গাড়ী ড্রাইভিং করতো। তাহলে এখানে রোস্তমের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরি।

রুস্তম ড্রাইভার হিসাবে ততোটা অশিক্ষিত ছিলো না যা সচরাচর ড্রাইভারেরা হয়ে থাকে। পুরানো দিনের সাহিত্যিকদের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস ছিলো তার। একটু আধটু ডায়েরীও নাকি লিখতো। ভাল পল্লীগীতি গাইতে পারতো রোস্তম। গলার সুরও ভালই ছিলো। মাঝে মাঝেই আমি ওকে গারি চালানর সময় রেডিও না শুনে ওর নিজের গলায় গান শুনতাম। বিবাহিত ছিলো বটে কিন্তু মাঝে মাঝে নেশা করার কারনে রোস্তমের প্রথম স্ত্রী তাকে একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা রেখে লন্ডনে চলে যায়। রোস্তম কখনোই তার স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করতো না। সে খুব মিস করতো তার স্ত্রীকে। গাড়ী চালাতে চালাতে রোস্তম প্রায়ই সে তার স্ত্রীর কথা বলতো। বলতে বলতে কখনো সে খিলখিল করে হেসে উঠত, কখনো কখনো খুব উদাসিন হয়ে যেতো আবার কখনো কখনো চুপ থেকে চোখের জলও ফেলতো। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একবার আমি রোস্তমকে দ্বিতীয় বিয়ের তাগিদ দিলে সে আমার কথা মেনে বিয়েও করেছিল। কিন্তু এবার স্ত্রীটাই খারাপ ছিল। বিয়েটা টিকে নাই। রুস্তম খুব বিশ্বস্ত ছিলো। চুরি চামারীর কোন অভ্যাস ছিলো না। তবে মাঝে মাঝেই রোস্তম দরকারে আমার কাছে এমনভাবে টাকা চাইতো যে, আমি কখনো ওকে না করতে পারিনি। দিতাম। রোস্তম ছিলো খুবই বিশ্বস্ত ছিলো। এমনি বিশ্বস্ত ছিলো যে, মাঝে মাঝে এমনো হতো, শুধু ওকে একা গাড়ি পাঠিয়েই আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে অন্য ফ্যাক্টরীতে কোটি টাকাও পাঠিয়েছি। আর রুস্তম সেটা জানতো। কখনোই সে এদিক সেদিক করে নাই।

কিন্তু একদিন………

একদিন রুস্তম আমার অন্য আরেকটি ফ্যাক্টরির মাত্র তিন লাখ টাকার শ্রমিকদের সেলারি নিয়ে গাড়ী রেখে কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেলো। বিকেল থেকে রাত অবধি কোথাও খুজে না পেয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, রুস্তম তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। ওর মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিলো। টাকাটা চুরি করে রুস্তম পালিয়েছে এই কষ্টে যতোটা না কষ্ট পেয়েছি, তার থেকে বেশী কষ্ট লেগেছে রুস্তমের কাছ থেকে এটা আমি কখনোই আশা করিনি। রুস্তমকে আমি সেলারীর বাইরেও যে কতটাকা দিতাম সেটা আমি কখনো হিসাব করিনি। ওকে আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সব খরচপাতিও দিয়েছি;লাম। রুস্তম গাড়ি চালালে আমি নিশ্চিন্তে মনে গাড়িতে ঘুমাতে পারতাম। কারন জানি, রুস্তম যেমন ভালো ড্রাইভার ছিলো তেমনি আমি ঘুমিয়ে পড়েছি দেখে আমার শরির যেনো ঝাকুনি না খায় এবং ঘুম ভেংগে না যায় সেটাও সে নজরে রাখতো।

রুস্তম আমাদের এলাকায় প্রায় ৩০ বছর যাবত বাস করতো। চুরির পরে রুস্তম সেই পুরাতন জায়গায় আর কখনো ফিরে আসেনি। আমি অনেক খুজতাম ওকে, আশেপাশের লোকজন এমনিতেই জেনে গিয়েছিল যে, রস্তম আমার কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। ফলে আমি জানতাম, কেউ ওকে কোথাও দেখলে খবরটা আমার কাছে আসবেই। কিন্তু সে রকমের কোন খবর আমি আর কখনো পাইনি।

অনেকদিন পর, প্রায় মাস চারেক হবে। হটাত করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে আমার কাছে একটা চিঠি আসে। বেশ বড় একটা চিঠি। প্রায় ২২ পাতার। চিঠিটি খুলেই আমি কে লিখেছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য চিঠির শেষে কার নাম লেখা পড়তে গিয়েই আমি থমকে গিয়েছিলাম। রুস্তমের চিঠি। হটাত করে বুকটা আতকে উঠেছিলো। রুস্তমের চেহারাটা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার ভেসে উঠলো। মুখ ভর্তি পান, কালো ঠোট, বেটে মানুষ, মাথায় হালকা চুল, মুখে হাসি। এটাই রুস্তম ছিলো। ওর পুরু চিঠিটা এখানে লিখলাম না কিন্তু ওর কিছু চুম্বকঅংশ এই রকম ছিলোঃ (বিশেষ দ্রষ্টব্য যে, রুস্তম বেশ গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারতো, আর যুক্তির কথাও বলতো)।

আমার প্রিয় স্যার,

…………………… জীবনে সে সব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিঃস্বার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাদের সাথে আমাদের করা এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দাড়ায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা আজীবন দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে কেউ ঘৃণা করতে শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুৎসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোনো সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের তিরোধানে সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।

আমার প্রিয় মেজর স্যার,

আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা সময় পার করছি। আমি আপনার কাছ থেকে যে তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছিলাম, টাকাগুলি আমার কোনো কাজেই লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না।

(রোস্তমের চিঠির ১৩ তম পাতার কিছু অংশ)…………

জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার, সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, একসময় দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।

৯১৬ তম পাতার কিছু অংশ……………)

আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না। খুব বেকুফ মনে হয়েছে আমাকে।

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। রোস্তমের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিলো। আমি আসলে রোস্তমকে খুব স্নেহই করতাম। যাই হোক, অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-

আমার স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কোনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন-বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না-সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে-কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষপান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনারও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না। কিন্তু আমি জানি, আপনার সাথে আমার আর কখনো দেখা হবে না। আমার জিবনে সত্যি বলতে আপনি ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আপনি গাড়িতে ঘুমালে আমি আয়নায় দেখতাম, কি অসম্ভব একটা রাগী মানুষ কত নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ঘুমুচ্ছেন, খুব মায়া হতো আমার। আমার উপরে ভরষা করে আপনি ঘুমুচ্ছেন ভেবে আপনার ঘুম ভেংগে যাবে এই ভয়ে আমি গাড়ির স্পীডকে রিক্সার পিছনেও চালিয়ে নিতাম। আমি আপনাকে অনেক মায়া করি, ভালবাসি। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়েন।

ইতি- আপনার স্নেহের অপরাধি রোস্তম।

চিঠিটা পাওয়ার পর আমি রোস্তমের ব্যাপারে তারই এক আত্তীয়ের কাছে (যিনি ভাড়া থাকেন আমার মহল্লায়) জানতে পেরেছি যে, রোস্তম পথের ধারে কাটা তারের বেড়া থেকে তার কেটে গলায় পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মৃত্যুর তারিখটা জেনে আরো খারাপ লেগেছিলো। রস্তম তার মৃত্যুর চারদিন আগে সে আমাকে এই চিঠিটা পোষ্ট করেছিল।

খবরটা শুনে মনের ভিতরে অসম্ভব ব্যথা অনুভুত হয়েছিলো। খুব করে ভাবলাম, ইশ যদি রোস্তম একবার সাহস করে আবার আমার সামনে আসতো, ইশ যদি রোস্তমকে আমি আবারো খুজে পেতাম, আমি আবার ওকে আমার ড্রাইভার হিসাবেই রাখতাম। রোস্তম আমার বাসা চিনতো, আমার অফিস চিনতো, সে আমাকেও চিনতো। অথচ মনের ভিতরের সাহসটাকে সে একত্রিত করে আমার সামনে আসার মনোবলটা ছিলো না। আমি আজো মাঝে মাঝে রোস্তমের কথা ভাবি। আর ভাবি, কতটা যন্ত্রনা নিয়ে রোস্তম কাটাতার পেছিয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর কতোটা যন্ত্রনায় সে মারা গেছে। খুব ভাবি যে, কাটাতারে যখন রোস্তম মারা যাচ্ছিল, তখন কি সে আবারো বাচতে চেয়েছিল?

সম্ভবত, বাচতে চেয়েছিল কিন্তু তখন মৃত্যু তার এতোটাই কাছে ডেকে আনা হয়েছে যে, তার আর ফিরে যাবে কোন অবকাশ ছিলো না। রস্তমকে নিয়েই যমদূত এই দুনিয়া থেকে চলে গেছে।

১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকাচুরি-২

আমরা যখন জীবিত অর্থাৎ যখন জীবন আছে আমাদের, তখন আমাদের কাছে জীবন এমনভাবে চলতে থাকে যেনো আমাদের জীবনের সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্কই নাই। কিন্তু যখন মৃত্যু একেবারেই কাছে চলে আসে, তখন এ রকম মনে হয় যেন জীবনের কোনো গুরুত্বই নাই। এক নিমিষে, চোখের পলকে সব শেষ হয়ে যায়। এই মৃত্যু না সময় দেখে আসে, না জায়গা দেখে। যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থানে সে চলেই আসে। তখন আশেপাশের সবাইকেই চমকে তো দেয়ই উপরন্ত আশেপাশের সবাইকে নাড়িয়েও দেয়। আর এর রহস্যও কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু যখন মৃত্যু নিজে আসে না, তাকে ডেকে আনা হয়, তখন তার সময়, জায়গা এবং কারন এই তিনটাই মানুষ ঠিক করে দেয়। আজ আমি এমনি একটা ট্র্যাজেডির কথা বলবো যা ঘটেছিল রস্তম নামে এক লোকের সাথে।

রুস্তম আমার ড্রাইভার ছিলো। প্রায় বছর পাচ বা তারও বেশী একনাগাড়ে রুস্তম আমার ব্যক্তিগত গাড়ী ড্রাইভিং করতো। তাহলে এখানে রোস্তমের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরি।

রুস্তম ড্রাইভার হিসাবে ততোটা অশিক্ষিত ছিলো না যা সচরাচর ড্রাইভারেরা হয়ে থাকে। পুরানো দিনের সাহিত্যিকদের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস ছিলো তার। একটু আধটু ডায়েরীও নাকি লিখতো। ভাল পল্লীগীতি গাইতে পারতো রোস্তম। গলার সুরও ভালই ছিলো। মাঝে মাঝেই আমি ওকে গারি চালানর সময় রেডিও না শুনে ওর নিজের গলায় গান শুনতাম। বিবাহিত ছিলো বটে কিন্তু মাঝে মাঝে নেশা করার কারনে রোস্তমের প্রথম স্ত্রী তাকে একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা রেখে লন্ডনে চলে যায়। রোস্তম কখনোই তার স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করতো না। সে খুব মিস করতো তার স্ত্রীকে। গাড়ী চালাতে চালাতে রোস্তম প্রায়ই সে তার স্ত্রীর কথা বলতো। বলতে বলতে কখনো সে খিলখিল করে হেসে উঠত, কখনো কখনো খুব উদাসিন হয়ে যেতো আবার কখনো কখনো চুপ থেকে চোখের জলও ফেলতো। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একবার আমি রোস্তমকে দ্বিতীয় বিয়ের তাগিদ দিলে সে আমার কথা মেনে বিয়েও করেছিল। কিন্তু এবার স্ত্রীটাই খারাপ ছিল। বিয়েটা টিকে নাই। রুস্তম খুব বিশ্বস্ত ছিলো। চুরি চামারীর কোন অভ্যাস ছিলো না। তবে মাঝে মাঝেই রোস্তম দরকারে আমার কাছে এমনভাবে টাকা চাইতো যে, আমি কখনো ওকে না করতে পারিনি। দিতাম। রোস্তম ছিলো খুবই বিশ্বস্ত ছিলো। এমনি বিশ্বস্ত ছিলো যে, মাঝে মাঝে এমনো হতো, শুধু ওকে একা গাড়ি পাঠিয়েই আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে অন্য ফ্যাক্টরীতে কোটি টাকাও পাঠিয়েছি। আর রুস্তম সেটা জানতো। কখনোই সে এদিক সেদিক করে নাই।

কিন্তু একদিন………

একদিন রুস্তম আমার অন্য আরেকটি ফ্যাক্টরির মাত্র তিন লাখ টাকার শ্রমিকদের সেলারি নিয়ে গাড়ী রেখে কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেলো। বিকেল থেকে রাত অবধি কোথাও খুজে না পেয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, রুস্তম তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। ওর মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিলো। টাকাটা চুরি করে রুস্তম পালিয়েছে এই কষ্টে যতোটা না কষ্ট পেয়েছি, তার থেকে বেশী কষ্ট লেগেছে রুস্তমের কাছ থেকে এটা আমি কখনোই আশা করিনি। রুস্তমকে আমি সেলারীর বাইরেও যে কতটাকা দিতাম সেটা আমি কখনো হিসাব করিনি। ওকে আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সব খরচপাতিও দিয়েছি;লাম। রুস্তম গাড়ি চালালে আমি নিশ্চিন্তে মনে গাড়িতে ঘুমাতে পারতাম। কারন জানি, রুস্তম যেমন ভালো ড্রাইভার ছিলো তেমনি আমি ঘুমিয়ে পড়েছি দেখে আমার শরির যেনো ঝাকুনি না খায় এবং ঘুম ভেংগে না যায় সেটাও সে নজরে রাখতো।

রুস্তম আমাদের এলাকায় প্রায় ৩০ বছর যাবত বাস করতো। চুরির পরে রুস্তম সেই পুরাতন জায়গায় আর কখনো ফিরে আসেনি। আমি অনেক খুজতাম ওকে, আশেপাশের লোকজন এমনিতেই জেনে গিয়েছিল যে, রস্তম আমার কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। ফলে আমি জানতাম, কেউ ওকে কোথাও দেখলে খবরটা আমার কাছে আসবেই। কিন্তু সে রকমের কোন খবর আমি আর কখনো পাইনি।

অনেকদিন পর, প্রায় মাস চারেক হবে। হটাত করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে আমার কাছে একটা চিঠি আসে। বেশ বড় একটা চিঠি। প্রায় ২২ পাতার। চিঠিটি খুলেই আমি কে লিখেছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য চিঠির শেষে কার নাম লেখা পড়তে গিয়েই আমি থমকে গিয়েছিলাম। রুস্তমের চিঠি। হটাত করে বুকটা আতকে উঠেছিলো। রুস্তমের চেহারাটা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার ভেসে উঠলো। মুখ ভর্তি পান, কালো ঠোট, বেটে মানুষ, মাথায় হালকা চুল, মুখে হাসি। এটাই রুস্তম ছিলো। ওর পুরু চিঠিটা এখানে লিখলাম না কিন্তু ওর কিছু চুম্বকঅংশ এই রকম ছিলোঃ (বিশেষ দ্রষ্টব্য যে, রুস্তম বেশ গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারতো, আর যুক্তির কথাও বলতো)।

আমার প্রিয় স্যার,

…………………… জীবনে সে সব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিঃস্বার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাদের সাথে আমাদের করা এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দাড়ায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা আজীবন দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে কেউ ঘৃণা করতে শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুৎসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোনো সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের তিরোধানে সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।

আমার প্রিয় মেজর স্যার,

আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা সময় পার করছি। আমি আপনার কাছ থেকে যে তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছিলাম, টাকাগুলি আমার কোনো কাজেই লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না।

(রোস্তমের চিঠির ১৩ তম পাতার কিছু অংশ)…………

জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার, সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, একসময় দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।

৯১৬ তম পাতার কিছু অংশ……………)

আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না। খুব বেকুফ মনে হয়েছে আমাকে।

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। রোস্তমের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিলো। আমি আসলে রোস্তমকে খুব স্নেহই করতাম। যাই হোক, অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-

আমার স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কোনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন-বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না-সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে-কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষপান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনারও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না। কিন্তু আমি জানি, আপনার সাথে আমার আর কখনো দেখা হবে না। আমার জিবনে সত্যি বলতে আপনি ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আপনি গাড়িতে ঘুমালে আমি আয়নায় দেখতাম, কি অসম্ভব একটা রাগী মানুষ কত নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ঘুমুচ্ছেন, খুব মায়া হতো আমার। আমার উপরে ভরষা করে আপনি ঘুমুচ্ছেন ভেবে আপনার ঘুম ভেংগে যাবে এই ভয়ে আমি গাড়ির স্পীডকে রিক্সার পিছনেও চালিয়ে নিতাম। আমি আপনাকে অনেক মায়া করি, ভালবাসি। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়েন।

ইতি- আপনার স্নেহের অপরাধি রোস্তম।

চিঠিটা পাওয়ার পর আমি রোস্তমের ব্যাপারে তারই এক আত্তীয়ের কাছে (যিনি ভাড়া থাকেন আমার মহল্লায়) জানতে পেরেছি যে, রোস্তম পথের ধারে কাটা তারের বেড়া থেকে তার কেটে গলায় পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মৃত্যুর তারিখটা জেনে আরো খারাপ লেগেছিলো। রস্তম তার মৃত্যুর চারদিন আগে সে আমাকে এই চিঠিটা পোষ্ট করেছিল।

খবরটা শুনে মনের ভিতরে অসম্ভব ব্যথা অনুভুত হয়েছিলো। খুব করে ভাবলাম, ইশ যদি রোস্তম একবার সাহস করে আবার আমার সামনে আসতো, ইশ যদি রোস্তমকে আমি আবারো খুজে পেতাম, আমি আবার ওকে আমার ড্রাইভার হিসাবেই রাখতাম। রোস্তম আমার বাসা চিনতো, আমার অফিস চিনতো, সে আমাকেও চিনতো। অথচ মনের ভিতরের সাহসটাকে সে একত্রিত করে আমার সামনে আসার মনোবলটা ছিলো না। আমি আজো মাঝে মাঝে রোস্তমের কথা ভাবি। আর ভাবি, কতটা যন্ত্রনা নিয়ে রোস্তম কাটাতার পেছিয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর কতোটা যন্ত্রনায় সে মারা গেছে। খুব ভাবি যে, কাটাতারে যখন রোস্তম মারা যাচ্ছিল, তখন কি সে আবারো বাচতে চেয়েছিল?

সম্ভবত, বাচতে চেয়েছিল কিন্তু তখন মৃত্যু তার এতোটাই কাছে ডেকে আনা হয়েছে যে, তার আর ফিরে যাবে কোন অবকাশ ছিলো না। রস্তমকে নিয়েই যমদূত এই দুনিয়া থেকে চলে গেছে।

১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকা চুরি-১

আমার ড্রাইভার ছিলো রুস্তম। একবার রুস্তম আমারে বল্লো যে, ওর কাছে যদি ৩ লাখ টাকা থাকে তাহলে ওর জীবন নাকি সে বদলিয়ে ফেলবে। খুব ভালো কথা। বললাম, ৩ লাখ টাকা যদি পাস, তাহলে কি করবি? রুস্তম বল্লো যে, সে ২টা পুরানো সিএনজি কিনবে। একটা নিজে চালাবে আরেকটা ভাড়ায় চালাবে। তাতে প্রতিদি সে পাবে ১২০০ টাকা। তারমানে মাসে ৩৬ হাজার টাকা। ওর খরচ লাগে মাসে ১৬ হাজার টাকা। তারমানে মাসে সে ২০ হাজার সেভ হবে। বছরে সেভ হবে আড়াই লাখ টাকা। সেই আড়াই লাখ টাকা দিয়া সে আরেকটা পুরানো সিএনজি কিনবে। এভাবে ২/৩ বছর পর সে গাড়ি কিনবে। যদি গাড়ি কিনে, তাহলে ওর প্রতিদিন লাভ হবে ২ হাজার টাকা। এভাবে সে হিসাব করে দেখলো যে, ৫ বছর পর তার হাতে আসবে প্রায় ২০ লাখ টাকা, ৩ টা সিএনজি আর একটা গাড়ি। হিসাবটা একদম ঠিকঠাক ছিলো। কিন্তু শুধু একটা জায়গায় হিসাবটা শুরু করা যাচ্ছিলো না। প্রাথমিক ৩ লাখ টাকা সে পাবে কোথায়?

রুস্তম আমার অনেক দিনের ড্রাইভার। প্রায় ৭ বছর। এই বছর গুলিতে আমি এমনো হয়েছে যে, ব্যবসার জন্য কোটি কোটি টাকাও ওকে দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠিয়েছি। ফ্যাক্টরীর সেলারী আনার সময় কিংবা সাব কন্ট্রাক্ট ফ্যাক্টরীতে ইমারজেন্সী ভাবে টাকা অয়াঠানোর জন্য। কোনোদিন রুস্তমের মধ্যে কোনো গড়বড় দেখি নাই। কিন্তু একদিন-সে আমার ব্যাগ থেকে ৩ লাখ টাকা চুরি করে পালালো।

 চুরি করার পর এক মাস পালিয়ে পালিয়ে থাকলো। অনেক খুজাখুজি করেছি, ওর গ্রামের বাড়ি, ওর বর্তমান শশুর বাড়ি, কিংবা ওর প্রাক্তন শশুড় বাড়িতেও। কিন্তু রুস্তমের কোনো হদিস পাওয়া যায় নাই। অগত্যা মনের রাগ মিটানোর জন্য ওর নামে একটা চুরির মামলাও করেছিলাম। কোথাও না পেয়ে আমি ওকে খোজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম এই কারনে যে, রুস্তম যদি ঐ ৩ লাখ টাকা কাজে লাগিয়ে কিছু করতে পারে, তাহলে করুক। ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর কোনো আক্ষেপ বা রাগ রাখতে চাইনি।

 

 অতঃপর প্রায় ৫ মাস পরে একদিন আমি একটা বিশাল চিঠি পেলাম। ২২ পাতার চিঠি। চিঠিটা আমি পড়তে চাইনি কিন্তু চিঠিটার প্রথম লাইনেই যে কথাটা লিখা ছিলো, তার জন্যই আমি পুরু চিঠিটা পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। আর সে লাইনটা ছিলো- “যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন”।

 যেদিন আমি চিঠিটা পাই, তার প্রায় ৪ দিন আগে রুস্তম তারের কাটা গলায় ফাসি দিয়ে আত্তহত্যা করেছিলো। আমার প্রায়ই ওর কথা মনে পড়ে। আমি ভাবি যে, যদি রুস্তম সাহস করে আবার আমার কাছে আসতো, আমি ওকে আবার রাখতাম আমার ড্রাইভার হিসাবে। আমি ওরে ক্ষমা করে দিছি। আমিও ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার ভালোবাসা ওকে ঠেকাতে পারে নাই। এটা আমার ব্যর্থ তা নাকি ওর ভীরুতা আজো আমি বুঝতে পারি নাই। কিন্তু এটা ওরও ব্যর্থতা।

 রুস্তম মাঝে মাঝে খুব ভালো কবিতা লিখতো। আর ড্রাইভিং করার সময় আমাকে মুখস্ত ওর লেখা কবিতা শুনাতো। আমি অবাক হতাম, রুস্তম খুব ভালো কবিতা লিখে। প্রথম প্রথম ভাবতাম, সম্ভবত রুস্তম কারো কবিতা চুরি করে, কিন্তু পরে বুঝেছি- রুস্তম আসলেই লিখে।

 রুস্তমের লেখা ২২ পাতার চিঠির কিছু চুম্বক অংশ আমি তুলে ধরি।

 জীবনে সেসব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিসসার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাহাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাহাদের সাথে এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দারায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় যা হয়, তা হচ্ছে, হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তাহার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুসচিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর নিজেকে ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে নিজে ঘৃণা করতে কেউ শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুতসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোন সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের জন্য সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।

স্যার, আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা কাল পার করছি। টাকাগুলি আমার কোনো কাজে লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না। আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না।

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-

স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন- বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না- সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংগকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে- কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষ পান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনার ও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না।

আমি রুস্তমের চিঠিটা পড়ছি, আর খুব ভয় পাচ্ছিলাম। রুস্তম তার চিঠির ২১ পাতায় লিখেছে-

জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার,  সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, এক সময় দেহ দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।

————————————————————————————

চোখ দিয়ে কখন যে পানি পড়ছিলো, বুঝি নাই। আমিও রুস্তমকে স্নেহ করতাম, ভালোবাসতাম। কিন্তু ওকি একবার সাহস করে আবার ফিরে আসতে পারতো না? আমি ওর শেষ ঠিকানাটা জানলে হয়তো নিজেই ডেকে নিতাম। ভুল তো মানুষ করেই। কিন্তু সেটা জীবন দিয়ে মাশুল দেয়ার মতো শাস্তিতে নয়।

 (আমি রুস্তমের চিঠিটা ছিড়ে ফেলিনি। আজ আমার সব পরিত্যাক্ত কাগজপত্র ড্রয়ার থেকে পরিষ্কার করতে গিয়ে রুস্তমের সেই ২২ পাতার চিঠিটাও পেলাম। সেটা আজ আমি ছিড়ে ফেললাম।)

১১/৬/২০২১-কালো

কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু এমন কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? আসলে কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। কিন্তু এই কালোই যখন কোনো মানুষের গায়ের রং হয় তখন এটা সবচেয়ে বিড়ম্বনার একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কালো মানুষের গল্পের কাহিনী যদি কেউ শোনেন, দেখা যাবে গায়ের রং এর কালো মানুষের গল্পটা সবার থেকে আলাদা বিশেষ করে সেই ব্যক্তিটি হয় কোনো মেয়ে মানুষের গল্প। কালো মেয়েদের অনেক কথা তাদের মনেই রয়ে যায়। কাউকে তারা বলতেও পারে না। কে শুনবে তাদের কথা? মেয়েরা কালো হলে সেই ছোট বেলা থেকেই সমাজের সবার আকার- ইংগিতের ভাষায় তারা এটাই মনে করতে থাকে যে, কালো মুখ একটা অপয়ার ছায়া যেনো। আর এই অপবাদ থেকেই তাদের মনে এবং মস্তিষ্কে হীন মন্যতা বাসা বাধে। তাদের নিজের উপর নিজেদের কনফিডেন্স কমতে থাকে। অথচ এই কালো হয়ে জন্মানোর পিছনে তাদের না আছে কোনো হাত, না আছে তাঁকে পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা। কালো রং, বা শ্যামলা রং যদি অভিশাপই হতো তাহলে “কৃষ্ণের” কালো রং কোনো অভিশাপ নয় কেনো? এই কালো ক্রিষনকে তো তার সমস্ত কালো রং নিয়েও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তাঁকে সম্মান করে, ভালোবাসে, পুজা করে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার এটাই যে, কৃষ্ণ ছাড়া পৃথিবীর তাবদ মেয়ে মানুষকে এই কালো রং কে মানুষ তাদের ঘাটতি হিসাবেই দেখা হয়। ফলে নিজের কালো রং এর কারনে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে সমাজের সবার কাছেই তাচ্ছিল্যের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এমনো ধারনা করা হয় যে, ফর্সা মানে সুন্দর আর কালো মানে কুৎসিত। ছেলে সে যতোই কুৎসিত হোক না কেনো তার ও ফর্সা মেয়ে চাই, আর যদি কোনো মেয়ের গায়ের রং হয় কালো, তার তো এম্নিতেই হাজার সমস্যা, তার আবার কালো আর ধলা ছেলে পাওয়ার কোনো স্প্রিহাই তো নাই।

কালো পোষাক পড়লে আমরা নিজেকে সুন্দর মনে করি, কালো টিপকে আমরা শুভ বলে মানি। কথায় আছে কালো টিপ কুনজর থেকে বাচায়। মুখের উপর কালো তিলে আমাদেরকে সুন্দর দেখায়। কিন্তু কোনো মানুষের গায়ের রং যদি কালো হয় তাহলে তাঁকে আমরা কুৎসিত বলতে দ্বিতীয়বার ভাবি না। খুবই আসচর্জ চিন্তাধারা।

সউন্দর্জ আসলে কোনো রং নয়। অথচ এই সউন্দর্জ যেনো সব নির্ভর করে কালো ছাড়া অন্য আর সব রং এর উপরে। কেনো? এর উত্তর একটাই- আমরা কালো আর সুন্দর্জের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না। যখন চোখ শরীর থেকে মনের ভিতরে যায়, তখন মানুষের মনের ভিতরের সউন্দর্য দেখা যায়। আমাদের এই ক্ষমতা সবার থাকে না কিভাবে আমাদের চোখ শরীর থেকে মনের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। আমাদের নিজের এই গুনের অভাবেই আমরা কোনো কালো মেয়ের ভিতরের রুপ দেখতে পাই না আবার এটাও পাই না যে, কোনো ফর্সা মেয়ের মনের ভিতরে কতটা কুৎসিত চরিত্র রয়েছে। আর দেখতে পাই না বলেই কোনো কালো মেয়ে কারো জীবনে অন্ধকার মনে হয় আর কারো কাছে সে আলোর দুনিয়ার মতো একেবারে পরিষ্কার। আসলে গায়ের রং নয়, যার কর্মকান্ড কালো, সেইই কালো। কালো গায়ের রং কোনোভাবেই দুনিয়ায় অশুভ হতে পারে না।

এটা খুবই জরুরী যে, আমরা এই রং বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসি, নিজের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসি যাতে প্রকৃতির তৈরী সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি মানুষ তাঁকে দেখতে যেমনি হোক না কেনো তাঁকে সম্মান করি।

১০/৬/২০২১-কনিকার জন্য লিখা

নতুন জায়গায় নতুন দেশের নতুন নিয়মে তুমি সম্পুর্ন আলাদা পরিবেশে একটা নতুন জীবন ধারায় নতুন ক্যারিয়ার তৈরী করার জন্য দেশ ছেড়ে সুদূর আমেরিকায় যাচ্ছো। তুমি এদেশের কোন চাপ, কোনো বিরহ নিয়ে ওখানে বাস করবে না, না কোনো কারনে মন খারাপ করবে। একদম ফ্রেস মাইন্ডে যাবে আর ফ্রেস করে শুরু করবে সব। মন দিয়ে নিজের সপ্ন পুরু করার চেষ্টা করবে কিন্তু সব সময় শরীরের দিকে যত্ন নিতে হবে। আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ।

গল্পটা তোমার, সপ্নটা তোমার। এই আজ থেকে তুমি একটা জার্নি শুরু করলে যার একমাত্র যাত্রী তুমি নিজে। জীবনের মজাটা হচ্ছে- কিছু কিছু জিনিষ এমন হয় যেটা অবিশ্বাস্য লাগে কিন্তু তুমি বুঝতে পার- হ্যা এটা হয়েছে। তখন নিজের থেকেই বিশ্বাস হয়ে যায়।

নতুন কাজ, নতুন পরিবেশ, কিন্তু নিজেকে বদলে ফেলো না। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। তুমি চলে যাবার পর হয়তো আমাদের এখানে অনেক কিছুই পালটে যাবে। পালটে যাবে কোনো এক সন্ধ্যায় পিজা খাওয়ার কিছু আনন্দঘন মুহুর্ত, পালটে যাবে কোনো এক ছুটির দিনে দল্বেধে বাইরে গিয়ে খেতে যাওয়ার আসর কিংবা পালটে যেতে পারে আমাদের অনেক দইনিন্দিন কিছু কর্ম কান্ড ও। আমাদের এই পরিবর্তন কোনো নতুন কিছু হয়তো নয়, এটা একটা এডজাষ্টমেন্ট, যা তোমার অনুপস্থিতিতে আমাদের আনন্দের সাথে বেচে থাকার নিমিত্তে। কিন্তু তোমার বদলে যাওয়া অন্য রকম। তুমি বদলাবে সেটা যাতে তোমার ভালোটা হয়।

আমি তোমাকে কোনো কিছুতেই কখনো আটকাই নাই, না কখনো আটকাবো। কিন্তু তুমি আমার নিজের মেয়ে, আমার বহু আদরের সন্তান। যদি এমন কখনো হয় যে, আমি তোমাদের কারনে দুশ্চিন্তায় থাকি, তখন হয়তো সমস্ত আবেগ, মায়া আর ভালোবাসা উপেক্ষা করেই হয়তো আমি তোমাকে আটকাবো। সেটা যেনো আমাকে করতে না হয়। প্রাইওরিটি ঠিক করতে হবে জীবনে। সব সময় আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবে। জীবনে ব্যস্ততা থাকবে কিন্তু এতোটা না যাতে ফ্যামিলি ডিপ্রাইভড হয়। তুমি যদি ভালো ফলাফল করতে না পারো, এর মানে এই নয় যে, আমার ভালোবাসা তোমার উপর কমে যাবে। তুমি যদি তোমার ডিজায়ার্ড রেজাল্ট না করতে পারো শত চেষ্টা করার পরেও, আমি তোমাকে কখনোই দোষারুপ করবো না। বরং আমি তোমাকে সারাক্ষন সাহস দেবো, সহযোগীতা করবো কিভাবে তুমি সবার থেকে ভালো ফলাফল করতে পারো। আর ওটাই তোমার বাবা।

একটা জিনিষ সারাজীবন মনে রাখবা যে, সোস্যাল মিডিয়া একটা মেনিপুলেটেড মিডিয়া। এর বেজ মোটেই সত্য নয়। বরং এটা সাজানো সত্যি। কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। এই সোস্যাল মিডিয়ায় সেটাই তারা জানাতে চায় যেটা তারা তোমাকে জানাতে চায় কিন্তু তোমার উচিত সেটা জানা যেটা আসল সত্যি। কারন অনেক বড় অপরাধের শিকর অনেক গভীরে থাকে। এই সোস্যাল মিডিয়ার ব্যক্তিত্তরা সবাই মেনিপুলেটেড চরিত্র। এরা ডিটেইল্ড মিথ্যা কাহিনী খুব নিখুতভবে বানায়। তাই কোনো কিছুর ফেস ভ্যালুতে না গিয়ে ডাবল ভেরিফিকেশন জরুরী। জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিজের চারিদিকে সবসময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এই কথাটা খুব জরুরী মনে রাখা যে, প্রকৃতির ইশারার প্রতি সর্বদা সেনসিটিভ থাকা। যেদিন সুনামী হয়, তার আগের দিন জংগলের সমস্ত প্রানিকুল সবাই জাত নির্বিশেসে উচু জায়গায় স্থান নিয়েছিলো, কারন তারা প্রকৃতির সেন্সটা বুঝতে পেরেছিলো। যা মানুষ বুঝতে পারে নাই। ফলে সুনামীতে বন্য প্রানীদের মধ্যে যতো না ক্ষতি হয়েছিলো তার থেকে শতগুন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো মানুষ। ঠিক এই কারনেই  সব সময় মনে রাখা দরকার যে, অপরাধের সুনামী একটা নয়, অনেক সংকেত দেয়, হওয়ার আগে এবং অপরাধ হওয়ার সময়। শুধু সেটা ধরতে হয়।

মানুষের শরীরে একটা জিনিষ থাকে যা পোষ্টমর্টেম করেও পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো সাফল্যে সব থেকে জরুরী হয় সেই জিনিষটার। সেটা “কনফিডেন্স”। এই কনফিডেন্স মানুষকে তৈরী যেমন করতে পারে, তেমনি ভেংগেও দিতে পারে। যখন এটা ভেংগে যায় বা হারিয়ে যায়, তারপরে আর কিছু কাজ করে না। তখন যেটা হয়, তুমি ঠিক করছো নাকি ভুল করছো কিছুই বুঝতে পারবে না। আর যখন কনফিডেন্স চলে যায় বা হারিয়ে যায়, সেই জায়গাটা দখল করে নেয় “কমপ্লেক্স”। এই কমপ্লেক্স যখন গেথে বসে যায় কারো জীবনে, তখন সিম্পল একটা ছবি তুলতেও খারাপ লাগে। কারন কে আপনাকে নিয়ে মজা করবে, কে লেগ পুলিং করবে এই সব ভেবে।

জিবনে এমন কোনো অধ্যায় তোমার থাকা উচিত নয় যা তুমি আর অন্য কেউ শুধু জানো অথচ আমরা জানি না। আমাদের মান, সম্মান, পজিশন, সমাজে মাথা উচু করে বেচে থাকার জন্য শুধু আমাদের গুনাবলীইই যথেষ্ঠ নয়, সেখানে তোমরাও আমাদের সেই জীবনের সাথে জড়িত। ফলে, যেটাই হোক সবকিছুতেই আমাদের কথা মাথায় রাখবে। বাবা মায়ের থেকে বড় ভরষা আর কিছু নাই। আমরা যদি আগে থেকেই জানতে পারতাম আমাদের কর্মফলে কি ফলাফল হয়, তবে কতই না ভালো হতো। কিন্তু সেটা আমাদের স্রিষ্টিকর্তা সুযোগ দেন নাই। তাই সতর্ক থাকাটা খুব দরকার। সতর্ক হওয়া মানে এই নয় যে আমরা শুধু মাত্র পরিনতির বিষয় ভাববো, সতর্ক থাকার অর্থ হলো সঠিক সময়ে নেয়া সেই পদক্ষেপ যা আগামী সমস্যাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। বিশেষত এটা জানা সত্তেও যে আমাদের আগামী কর্মফল খারাপ।

মনে রাখবা এক বন্ধুই আরেক বন্ধুর ক্ষতি করে। তাতে তোমাকে সাহাজ্য করতে আমাদের অনেক অসুবিধা হবে। তুমি শুধু ফোকাস করবে তোমার ক্যারিয়ারে আর সপ্ন পুরনে। তোমাদেরকে নিয়ে আমার সারাটা জীবন অন্য রকমের একটা সপ্ন আছে। আরেকটা কথা মনে রাখবে- ভালোবাসায় অনেক শক্তি থাকে। যদি হতাতই মনের অনিয়ন্ত্রনের কারনে কাউকে ভালোই লেগে যায়, সেখানে নিজের সাথে নিজের বুঝাপড়া করো। সব ভালোবাসার রুপ এক নয়। কেউ ভালোবাসে তোমার শরীরকে, কেউ ভালোবাসে তোমার দূর্বলতাকে, কেউ ভালোবাসে তোমার মেধাকে, আবার কেউ ভালোবাসে তোমার তথা তোমার পরিবারের সম্পদ কিংবা তোমার অস্তিত্বকে। কে তোমাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোবাসলো, এই দৃষ্টিকোণ টা খুব ভালো করে বুঝা তোমার দায়িত্ব। কেউ যদি তোমাকে আসল রুপে ভালোবাসে, কখনো সে তোমাকে জোর করবে না কারন সে জানে যদি তুমি তার হও, তুমি যেভাবেই হোক সেটা বুজতে পারবে আর তুমি তার কাছে বিলম্ব হলেও ফিরে যাবে অথবা সে দেরী করে হলেও তোমার কাছেই ফিরে আসবে। যদি সে ফিরে আসে বা তুমি ফিরে যাও, তাহলে বুঝবে এটা সত্যি ছিলো। নতুবা কিছুই সত্য ছিলো না। যা ছিলো সেটা হলো একটা মোহ। মোহ আর ভালোবাসা এক নয়। একটা বাস্তব আর আরেকটা মিথ্যা। এই মিথ্যা ভালোবাসায় পতিত হয় হয়তো মনে অনেক কষ্ট জমা হতে পারে। কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। এটা অনেক জরুরী একটা ব্যাপার। সব কিছুরই প্রথমবার আছে। এটা যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রেও। যৌবন হলো অসহায় এবং শক্তির দ্বিতীয় নাম। অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার হয় কিন্তু যৌবনের ভালোবাসার প্রতারনায় নিজের অসহায়ত্তের বিচার নিজেকে করতে হয়। তখন নিজের বিরুদ্ধে রায় দেয়া সহজ হয় না। তাই আমি সব সময় একটা কথা বলি- টাইম হচ্ছে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভিলেন। তার কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। আবার এই টাইমই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বন্ধু। তুমি এই টাইমকে কিভাবে ব্যবহার করবে সেটা তোমার বিবেচনা। একবার মনে কালো দাগ পড়ে গেলে তা আজীবন নিজেকে কষ্ট দেয়। ব্ল্যাক কফি, ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেক, ডার্ক চকোলেট, ঘন জংগল অন্ধকার রাত, সবই কালো কিন্তু সে কালো কোনো কষ্টের নয়। কিছু কালো জীবনের অভিশাপ। কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? বিশেষ করে সেই কালো যা জীবনের ধারাবাহিকতায় অভিশাপের মতো রুপ নিয়েছে? তাই, আমি প্রতি নিয়ত তোমাকে নিজের হাতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে ছেড়ে দিতে ভয় করলেও তোমার উপর আমার আলাদা একটা ভরষা আছে- তুমি পারবে ঠিক সে রকম করে চলতে যা আমি তোমার জন্য করতে চেয়েছিলাম। এই ভরষায় আমি তোমাকে অনেক দূরে পাঠাতেও দ্বিধা করছি না।

আমার আশা, তোমার মায়ের সপ্ন আর আমাদের পরিবারের সব সম্মান তোমার হাতে দিয়ে এটাই বলতে চাই- আমরা তোমাদের পরিচয়ে সমাজে আরেকবার সম্মানীত হতে চাই। বাকীটা আল্লাহ মালিক জানেন।

২৬/০৪/২০২১-কভিড-১৯ এর টীকা গ্রহন

কভিড-১৯ মহামারী যদিও এই বিসশে প্রথম পদার্পন করে ডিসেম্বর ২০১৯ এ কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রথম সনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০। পৃথিবীর তাবদ মানুষ যেখানে এই কভিড-১৯ কে নিয়ে জল্পনা, কল্পনা আর হিমশিম খেতে খেতে শ্মশানে চলে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের পলিসি মেকাররা যেনো বড়ই উদাসীন। মুজিববর্ষ পালনে কোনো দিধা নেই, হাসপাতালের যতটুকু বেশী প্রয়োজনীয়তা তার থেকে সবার যেনো এর উছিলায় টাকা কামানোর ধান্দাই বেশী। এটা আগেও যেমন লক্ষ্য করা গেছে, এই মহামারিতে যেনো আরো কাড়াকাড়ি আর লুটের ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। সারাটা দুনিয়া যেখানে মৃত্যুর সাথে কিভাবে জয় হওয়া যায় সেই ভাবনায় মগ্ন আর সেখানে আমার দেশ কিভাবে রাজনীতিতে আরো শক্ত গিট বাধা যায় সেটা নিয়ে ব্যস্ত।

রাস্তায় পুলিশের দৌরাত্ব, অফিসে কর্মচারীদের থাবা, বাজারে ব্যবসায়ীদের মরন কামড়, কোথাও এই কভিডের জন্য কারো কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আমরাও সেই তালের সাথে ড্রাম পিটিয়ে একাত্ততা ঘোষনা করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। আমি হয়তো জুলুম করছি না কিন্তু জুলুমের শিকার তো হচ্ছিই। এই এতো শত কষ্টের মাঝেও আজ আমি আর আমার স্ত্রী মিটুল চৌধুরী কভিডের জন্য ২য় ডোজের টিকাটা গ্রহন করতে সক্ষম হয়েছি। অফিসে চলে গিয়েছিলাম। মাত্র অফিসের কাজে মনোযোগ দিয়েছি, এমন সময় মিটুল আমাকে ফোন দিয়ে জানালো যে, তার মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা এসছে আজ সকালে যে, আজই আমাদেরকে টিকার ২য় ডোজ নিতে বলা হয়েছে। বাচতে কে না চায়?

তাই অফিসের সব কাজ ফেলে আমি আবার রওয়ানা হয়ে গেলাম বাসার উদ্দেশ্যে। টীকা নিতে হবে। আমি সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, তাই সিএমএইচ আমার জন্য ফ্রি এবং নির্ধারিত। সকাল ১২ টার দিকে আমাদের টীকা নেয়া শেষ হলো। আমার কোনো পার্শ প্রতিক্রিয়া আগেরবারও হয় নাই, এবারো হলো না। কিন্তু মিটুলের উভয়বারেই পার্শ প্রতিক্রিয়ায় ভুগছে।

কভিড মহামারী সব কিছুকে পালটে দিয়েছে। পালটে দিয়েছে পরিবারের ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা, আর পরিবর্তন করে দিয়েছে পুরু দুনিয়াকে যেখানে মানুষ শুধু একটা জিনিষ নিয়েই ভাবে- ধর্ম নিয়ে বারাবারি, কিংবা জাত অথবা ঈশ্বর, কোনোটাই স্থায়ী নয়। তাই যার যার চিন্তায় সে সে মশগুল।

কভিড আমাদের দেশে এখনো অনেক হারে ছড়ায়নি বলে মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে এখনো অনেক উদাসিন। কিন্তু কভিডের সংক্রমন গানিতিক হারে না হয়ে এটা জ্যামিতিক হারে বাড়বে কোনো একদিন। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার, চার থেকে আট, আর আট থেকে ষোল এভাবেই বাড়তে বাড়তে কভিড সবার ঘরে ঘরে গিয়ে হাজির হবে একদিন। এর মধ্যে যখন সারা দুনিয়া উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে, আমরা তখন আষ্টেপিষ্টে ধরা খাবো। ব্যবসা বন্ধ হবে, আন্তর্জাতিক মহলে ব্ল্যাক লিষ্টেড হবে, পন্য কেউ কিনতে চাবে না। আমরা একঘরে হয়ে যাবো। আর এর জন্য দায়ী সব সময় সাধারন নাগরিককেই দেয়া যাবে না। একবার ভাবুন তো-যে দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুরী হয়, যেখানে দূর্নীতি চরম আকারে ধারন করেছে, যেখানে উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষের পকেটে চলে যাচ্ছে সেখানে সরকার যদি আমাদের এই ষোল কোটি মানুষকে এক মাসের জন্য শুধু খাবার আর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সমুহ নিশ্চিত করতে পারতো, ভিয়েত্নাম বা ভুটানের মতো দেহের অবস্থা আমরাও ভোগ করতে পারতাম অর্থাৎ কভিড ফ্রি দেশ। এই ষোল কোটি মানুষের এক মাসের জন্য শুধু ২০০ কোটি টাকার বাজেটই যথেষ্ট ছিলো। সরকার যে চেষ্টা করে নাই তা নয় কিন্তু তার অধিনে যতো কাউন্সেলর, কমিশনার কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গরা রয়েছেন, সাধারন জনগনের নামে দেয়া এসব প্রনোদনা গেছে সব তাদের পকেটে। ফলে মানুষ করোনায় বেচে থাকার চেয়ে অথবা করোনায় মরে যাওয়ার চেয়ে না খেয়ে মরতে চায় নি, তাই তাদের গন্তব্য সব সময় ছিলো ঘরের বাইরের মুখী। আর এই বাহির মুখী মানুষের ঢল যতোদিন ঠেকানো না যায়, এদেশের করোনা পরিস্থিতি কোনোদিনই উন্নতি হবে না। একটা সময় আসবে যখন প্রতিটি ঘরে ঘরে, গ্রামে গঞ্জে, শহরে, বাড়িতে বাড়িতে করোনার উপস্থিতি থাকবে। পরিচিত মানুষের মৃত্যুয় সংবাদে ফেসবুক ভরে উঠবে, কান্নার আহাজারি শোনা যাবে চারিদিক থেকে।

এর থেকে আপাতত বাচার প্রথম শর্ত হচ্ছে সাস্থ্য সচেতনতা আর টীকা। সেই টীকার কর্মসূচীর আওতায় আজ আমরা দুজনেই টীকার প্রোগ্রাম শেষ করলাম। এখন বাকী শুধু সচেতনতা। যেটা শুধুই আমাদের হাতে।

২১/০৪/২০২১-রাত

সময়ের স্রোতে যখন দিনের আলো নিভে যায়, মানুষ দ্রুত নিস্তেজ হয়ে দ্রুত ঘরে ফেরার তাগিদ অনুভব করে, পাখীরা যখন আর কোথাও ঘুরতে চায় না, গাছেরা যখন নতুন খাবারের আস্বাদনে কার্বনের পরিবর্তে অক্সিজেনের জন্য উম্মুখ হয়ে থাকে, ঠিক সে সময়েই ধীরে ধীরে দিনের আলোকে নিভিয়ে রাতের প্রবেশ। যেমন ঈশ্বর বলেন, “আমি দিনকে সরিয়ে নেই, রাতকে আনার জন্যে”। তাহলে কি আছে এই রাতের অধীনে?

এই রাত সবাইকে পরিবর্তন করে দেয়। কেউ হতাশার রাজ্যে ভেসে যায়, কেউ সুখের রাজ্যে হামাগুড়ি দিয়ে নির্ঘুম জেগে থাকে, কেউ নিশাচর পাখীর মতো নিশাচরদের সাথে দিকবিদিক এদিক সেদিক ঘুরতে থাকে, কেউ পররবর্তী দিনের আলোর অপেক্ষায় বসে থাকে, কেউ আবার পরম ঈসশরকে নিকটে পাওয়ার জন্য অঘোর ঝরে চোখ ভাসিয়ে প্রার্থনা করে। যে দিনের আলোকে সহ্য করতে পারে না বলে দিনে বের হয় নাই, সে রাতের অন্ধকারে মাথা উচু করে দুনিয়াটাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবার যারা দিনের আলোতে ভীতু হয়ে চুপসে গিয়ে লুকিয়ে ছিলো, সে প্রানের স্পন্দনে সবার অলক্ষ্যে রাতের অন্ধকারকেই বেছে নিয়ে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দেয়। রাত নিস্তব্দতার প্রতিক, রাত কালোর প্রতিক, রাত এই দুনিয়ার আরেক রুপের প্রতিক যা দিনের বেলায় কোনভাবেই দেখা যায় না। রাত  অদ্ভুত একটা অধ্যায়।

এই রাতের সাথে মহাশ্মশানের কোথায় যেনো একটা মিল আছে। সবাই পাশাপাশি থেকেও সবাই একা। সবাই চুপ কিন্তু সবাই সরব। তাদের কারো কোনো কিছুর চাওয়া নাই, আবদার নাই, কারো কোনো অভিযোগ নাই, না আছে কোনো পার্থিব কোনো অহংকার বা লালসা। রাতের অন্ধকারে জোনাকীর আলোই যেন মহাপ্রদীপের মতো কাজ করে, আর অমাবশ্যা হলেও কোনো ক্ষতি নাই। অমবশ্যার রাতই হোক কিংবা অন্ধকার রাতই হোক, সব কিছুর এই রুপ আলাদা আলাদা।

রাতকে কি “কালো” বলা যায়? ব্ল্যাক কফি, ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেক, ডার্ক চকোলেট, ঘন জংগল অন্ধকার রাত এদের প্রত্যেকের একটা নিজস্ব রুপ আছে। আর সেটা “কালো”। কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? যদি অন্যভাবে দেখা যায় বা ভাবা যায়, দেখা যাবে যে, কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। এই আলোটা সবাই দেখতে পায় না। তখনি সে শুধু দেখে অন্ধকার, দেখে অমাবশায়র রাত। সেই সুদূর জোজন দূরের কোনো নক্ষত্রের মীটমীটে আলোও তখন আর চোখে পড়ে না। রাতের এই কালোকে মানুষ কখনো কখনো ভয় পায় অথচ “কালো” কোনো ভয়ংকর রুপ নয়। মানুষ যা দেখে না, যা দেখতে পায় না, তখনই মানুষ তাঁকে কালো বলে আর কালো হয়ে উঠে মনের ভিতরে এক আতংকের নাম।

১৭/০৪/২০২১-ধনী-গরীবের সৃষ্টি কেনো

সারা দুনিয়া রীতিমত কেপে উঠেছে গত প্রায় এক বছরের বেশী। অথচ যিনি কাপাচ্ছেন, তাঁকে কেউ আজো দেখেনি। প্রতিটা দেশ, মহাদেশ, গরীব কিংবা ধনী কেহই রেহাই পাচ্ছে না তার কবল থেকে। সে কোনো সম্পদ দখল করতে আসে নাই, না এসেছে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে উৎখাত করতে। তার কোনো মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি নাই, তার কোনো লাভ লস নাই, তার কোনো শ্রেনীভেদে কোনো টার্গেটও নাই। তার একটাই লক্ষ্য–যতো পারো লাশ সংগ্রহ করো। আর এই অচেনা, অজানা এবং অদৃশ্য শত্রুর নাম “কভিড-১৯” যাকে সবাই করোনা নামে চিনে।

এই করোনা ধনীর গদি নাড়িয়ে দিয়েছে, আর গরীবকে আরো গরীব করে দিয়েছে। সারা দুনিয়ার সরকারগন লক ডাউন কিংবা আইসোলেশন পদ্ধতি অবলম্বন করেও একে কিছুতেই ঠেকাতে পারছে না। আবার লক ডাউনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেও অর্থনীতির চাকা ক্রমশই এমন দূর্বল হতে চলছে যে, কলকারখানা এই মৃত্যু ঝুকির মধ্যেও খোলা রাখতে হচ্ছে। আর এই কলকারখানা খোলা নিয়ে এবং তার পাশাপাশি সাধারন কর্মী জীবনকে প্রতিহত করে মাঝে মাঝে লক ডাউনের কারনে বিভিন্ন পেশার মানুষ জন এমনভাবে সোস্যাল মিডিয়াতে মন্তব্য করছেন যার অর্থ এই রকম যে, ধনীরা ধনী হয়ে যেনো পাপ করেছে অথবা অপরাধ। এই মনতব্য কারীদের সাথে আমি প্রায়ই ভিন্ন মতের কারনে আমিও টার্গেট হচ্ছি অনেক সমালোচনার।

আমি একটা জিনিষ ক্লিয়ারলী বুঝতে পারছি কেনো স্বয়ং স্রিষ্টিকর্তা তার পুরু জগতে একটা ধনী গরীবের সমাজ সৃষ্টি করেছেন। যদি তিনি এই পার্থক্যটা সৃষ্টি না করতেন, তাহলে পুরু জগত কয়েক দিনের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতো, জীবন থেমে যেতো আর অরাজকতার সৃষ্টি হতো। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বলি তাহলে-

ধরুন সবার কাছে সমপরিমান সম্পদ রয়েছে। সবচেয়ে বড় লোকের কাছে যদি ৫ কোটি টাকা থাকে, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে গরীব লোকের কাছেও তাহলে ৫ কোটি টাকাই রয়েছে। যদি এটাই হয় তাহলে কি কি দাঁড়াবে, আসুন সেটা দেখিঃ

ক।      যে কৃষক সারা বছরের জীবিকার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে মাঠে ধান কিংবা অন্যান্য ফসল ফলাতেন এবং নিজেরা একটু ভালো থাকার জন্য আরো কিছু বাড়তি রোজগারের জন্য কাজ করতেন, সেই কৃষক আর পরিশ্রম করবেন না। কারন তার কাছে অঢেল টাকা আছে।

খ।       যে পরিবহন কোম্পানী তার আরো টাকা আয় করার জন্য দিনরাত অনেক লেবার, গাড়ি এবং সরঞ্জাম নিয়ে প্রতিনিয়ত সাধারন পাবলিক নিয়ে ব্যবসা করতেন, লাভের আশায় আরো বেশী মুলধন খাটিয়ে একটার পর একটা পরিবহন তার ষ্টকে যোগ করতেন, তিনি আর এই কাজটি করবেন না। কারন তার কাছে অঢেল টাকা আছে।

গ।       হোটেল রেস্তোরায় যারা ব্যবসা করেন, তারাও আর ওই ব্যবসাটা করবেন না, কারন তার ব্যবসা করে লাভের কোনো দরকার নাই। তার কাছেও অঢেল টাকা আছে।

ঘ।       কোনো ইয়াং জেনারেশন কখনো কোনো চাকুরী করার মনোবৃত্তি থাকবে না, জবও খুজবে না, কারন তার কাছেও অঢেল টাকা আছে।

চ।        খুচরা বিক্রেতা যেমন সব্জীওয়ালা, ফুস্কাওয়ালা, মুড়িওয়ালা, আলু বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতাও আর ফেরি করে করে দ্বারে দ্বারে সেইসব সব্জী, মাছ কিংবা তরিতরকারী নিয়ে ফেরীও করবেনা। কারন তার কাছে অঢেল টাকা আছে।

চ।        মেডিসিন কোম্পানীগুলি মেডিসিন তৈরী এবং বিক্রি করে মুনাফার জন্য তারাও আর কোনো প্রকার গবেষনা কিংবা বড় বড় কোম্পানী তৈরী করবে না। কারন তাদের কাছেও অঢেল টাকা আছে।

জ।      গার্মেন্টস শিল্পরা যেমন কোনো কর্মচারী পাবেন না, তেমনি লাভের জন্য তারাও আর কোনো গার্মেন্টস তৈরী করবেন না, কারন তাদের কাছেও অঢেল টাকা আছে।

ট।        স্কুল কলেজ, ইউনিভার্সিটি কিছুই নাই, কারন যারা এসব করবেন, আর মুনাফা করবেন, তাদের হাতেও অঢেল টাকা আছে।

ফলে ব্যাপারটা কি দাড়াবে? দাঁড়াবে এই যে, বাজার নাই, ফসল নাই, উতপাদন নাই, হোটেল রেস্তোরা নাই, পরিবহন চলবে না, গার্মেন্টস কোম্পানী নাই, মেডিসিন কোম্পানী নাই, ব্যাংক নাই, জেলে নাই, স্কুল কলেজ নাই, কিছুই নাই। অথচ সবার কাছে আছে অঢেল টাকা আর টাকা। কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদার জন্য যা দরকার, সেগুলিও নাই। খাবার নাই, মেডিসিন নাই, কাপড় চোপড় নাই, থাকার জায়গা নাই, অথচ টাকার কোনো অভাবও নাই। তাহলে মানুষ কি বেচে থাকতে পারবে? কিভাবে বাচবে এই জনগোষ্টী? কৃষক মাঠে যায় না, ফসল ফলায় না, ফসল তুলে না, ফলে মানুষ না খেয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বে। মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়বে, কোথাও কোনো হাসপাতাল নাই, ডাক্তার নাই, না আছে কোনো নার্স। স্কুল কলেজ না থাকায় কেউ পড়তেও যাবে না, আর পড়বেই বা কেনো? সবার হাতে তো অঢেল টাকা আছে। ফলে ডাক্তার, নার্স কিংবা হাসপাতাল ছাড়া অসুস্থ মানুষেরা কোথায় যাবে? নিসচিত মরন।

শিশুরা দুধের ক্ষুধায় মরবে, অন্যরা খাবার না থাকার কারনে মরবে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্যে পরিবহন না থাকায় কোথাও যেতে পারবে না। পুরু প্রিথিবী একটা সময় সম্পুর্ন স্থবির হয়ে একটা নির্জীব শ্মশানে পরিনত হবে।

এটাই কি আমরা সবাই চেয়েছিলাম?

না, আমরা এটা কখনো চাইনি। আর ঠিক তাই দুনিয়াকে সচল করার জন্য, চলমান রাখার জন্যে সমাজে একটা ধনী গরীবের ব্যবধান রাখতে হবে যেখানে কেউ জীবিকার জন্য লড়বে, আর কেউ মুনাফার জন্য টাকা ইনভেষ্ট করবে।

বিধাতার নিয়ম এতো সহজ নয়। এটা তারই একটা পলিসি যেখানে ব্যবধান থাকতে হবে, রাখতে হবে, আর সব কিছু চলমান রাখতে হবে। আর ধনী-গরীবের ব্যবধানটা এই সমস্যার একমাত্র উপায়।

==========================================

সংগ্রিহীত

মোবাইলে একটা SMS এলো। তাকিয়ে দেখি..

“সরকারের তরফ থেকে আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে” আমার মন খুশিতে ভরে গেল। ঘর থেকে বের হলাম আর চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে বলছি…. “সবাই শোনো, দিন বদলে গেছে, আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা এসে গেছে”। রুম থেকে বউ বেরিয়ে বললো, “অত খুশির কি আছে, আমার এ্যাকাউন্টেও ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে। এই যে মেসেজ দেখ।”

একটু অবাক হলাম, ভাবলাম আশেপাশে সবাইকে গিয়ে বলি। বাড়ির পাশের লোক আমায় বলছে, “বেশি উত্তেজিত হয়ো না, আমাদের এ্যাকাউন্টেও ৫০ লাখ জমা হয়েছে।” আমার খুশি সব উড়ে গেল। ভাবলাম যাই, বাজার থেকে কিছু মিষ্টি নিয়ে আসি। বাজারে গিয়ে দেখলাম, দোকান বন্ধ। পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “ও ভাই এই মিষ্টির দোকান বন্ধ কেন?” সে বললো, “মিষ্টি দোকানদারের আর দোকানদারি করার কি দরকার। তার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ এসে গেছে।” তাই ভাবলাম একটু নিউ মার্কেটে যাই, সেখান থেকে কিছু নিয়ে আসি। সেকি! কোনো দোকান পাট খোলা নেই। ওনাদের এ্যাকাউন্টেও নাকি ৫০ লাখ এসে গেছে…..। প্রচন্ড খিদে পেয়েছে ভাবলাম এখানে তো দোকান পাট বন্ধ। সামনের দিকে যাই, ভালো কোন হোটেলে তৃপ্তি করে খাওয়া যাবে।

সামনে যতই যাই সবই দেখি ফাঁকা। হোটেলের বাইরে দাড়িয়ে থাকা স্বাগত জানানোর সেই লোকও নেই, যে কাস্টমার দেখলেই সালাম ঠুকে ওয়েলকাম করেন, শপিং মলের সিকিউরিটিও নেই। সবার এ্যাকাউন্টেই ৫০ লাখ এসে গেছে। মার্কেটে কেউ নেই। সবজি ওয়ালা, চা ওয়ালা, সরবতওয়ালা ফাস্টফুড ওয়ালা কেউ নেই। সব কিছুই বন্ধ। সকলের ঠিকানা এখন ব্যাঙ্কে ৫০ লাখ টাকা তোলার জন্যে। কেননা এখন আর কারো কাজ করার দরকার নেই, সবার কাছেই ৫০ লাখ আছে। আমার এক বন্ধু ফোন করে বললো, “আমি জব ছেড়ে দিয়েছি, আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা আছে” আমার এক বড় ভাই ফোন করে বললো, “আমার আর্ট স্কুল অফ করে দিয়েছি” “আমার আশেপাশের ছোট বোন আর স্কুলে যাচ্ছে না” “আমার এক বন্ধু টিউশন পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে” “নিপা নামের মেয়েটিও আর কলেজে যায় না” “ইভান আর জব খু্ঁজে না” ‘শ্রমিকরা আর কারখানায় যায় না, কলকারখানা সব বন্ধ”।

সবার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা জমা আছে। সবাই এখন বড়লোক। সবাই সুর তুলছে, গান করছে, নৃত্য করছে….. বিকেলে হাটতে হাটতে মাঠের দিকে গেলাম, কৃষকরা সবাই কাজ ছেড়ে বাড়িতে। কেউ নেই জমিতে। এখন তাদের রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করার আর দরকার নেই। তারা সবাই বড়লোক হয়ে গেছে। সবার এ্যাকাউন্টেই ৫০ লাখ টাকা। 

৭ দিন পর দেখা গেল খিদের জ্বালায় লোক কাঁদছে। কেননা, জমি থেকে কেউ ফসল তুলছে না, সমস্ত দোকানপাট বন্ধ, হোটেল, মেডিক্যাল সব বন্ধ। অসুস্থ হয়ে মানুষ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কেননা, খাবার নেই, ডাক্তার নেই। পশুরাও না খেতে পেয়ে মরছে। জমিতে সবুজ ঘাস নেই, সোনালী ফসল নেই। শিশুরা খিদের জ্বালায় কাঁদছে, গোয়ালা দুধ দিচ্ছে না বলে। মানুষ এখন ছুটছে মুঠো মুঠো টাকা নিয়ে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে পকেটে টাকা নিয়ে।

কাঁদছে মানুষ লক্ষ টাকা হাতে নিয়ে আর বলছে, “এই ভাই নাও ১০ হাজার টাকা, আমাকে ২০০ গ্রাম দুধ দাও। দুদিন বাচ্চাটা না খেয়ে আছে।

১০ দিন বাদে মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে। কিছু কিছু লোক টাকার ব্যাগ নিয়ে ঘুরছে রাস্তায়। এই নাও ভাই ৫ লাখ টাকা, “আমাকে ৫ কেজি চাল দাও। ১০ দিন থেকে না খেয়ে আছি।” সব বাজার হাট বন্ধ হয়ে গেছে। শাক সবজি খাবার দাবার কারো কাছেই নেই। সবদিকে শুধু মৃত্যুর ছবি দেখা যাচ্ছে।

আমিও আমার ৫০ লাখ টাকা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি, নাও ভাই নাও ৫০ লাখ নিয়ে নাও, তবুও কিছু খাবার দাও”। কে কার টাকা নেবে, খাবার কারো কাছেই নেই। মানুষ মানুষের দিকে তেড়ে আসছে হিংস্র সিংহের মত। মনে হচ্ছে, মানুষ মানুষকে খাবে। অচেনা একলোক তাড়া করেছে আমাকে, চিবিয়ে খাবে বলে।

ছুটছি আমি। আমি ক্ষুধার্ত মানুষ, কতটা আর ছুটব? পড়ে গেলাম হোঁচট খেয়ে. ..মা গো করে চিৎকার করে উঠলাম….. বউ তখন ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে “কি হলো তোমার ? সকাল হয়ে গেছে, ঘুম থেকে উঠো, চোখে মুখে পানি দিয়ে আসো। এই তুমি বাচাঁও বাঁচাও বলে চেঁচাচ্ছিলে কেন? কোন খারাপ স্বপ্ন দেখছিলে নাকি ?” আমি বললাম, “না, খারাপ নয়, ভালো দিনের স্বপ্ন। “

গরিব আমরা, কিন্তু ঘরে “দুমুঠো খাবার তো আছে” “তৃষ্ণার পানি তো আছে” “শিশুরা খেলছে” “পশুরা মাঠে ঘাস খাচ্ছে” “দোকানে ভিড় আছে” “যানবাহন চলছে তো চলছে” “মানুষের সমাগম চলছে” “বাগানে ফুল ফুটছে” প্রকৃতি হাসছে…..

অনেকে ভাবে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কেন ধনী গরীব সুষ্টি করছে ? সবাইকেতো চাইলে ধন সম্পদ দিতে পারতো।সবাইকে সুখ শান্তি দিতে পারতো।

বাস্তবতা হল ধনী গরীব বৈশম্য আছে বিধায়

১৫/০৪/২০২১-মিথ্যা

কথায় বলে- মিথ্যাও নাকি কখনো কখনো সত্যি হয়ে যায়। কোনো একটা মিথ্যাকে হাজার বার বললে নাকি মিথ্যাটা ফ্যাকাশে হতে হতে এক সময় মিথ্যাটাই সত্যি হয়ে যায়। পরিপূর্নি সত্যিতে পরিনত না হলেও আসল সত্যটা অনেকাংশেই ঢাকা পড়তে পড়তে মরচে ধরে যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ একটা মিথ্যা বারবার এতোবার বলে যে, মিথ্যেটাই সত্যি হয়ে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে এমন একটা মিথ্যে যা ব্যথা লুকুনোর জন্য বলা হচ্ছে।

ব্যাপারটা আসলে কখনোই এ রকম না। অনেক সময় সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হয় না বটে কিন্তু ভিত্তিহীন আর অকারন গুরুত্বহীন কথা প্রথমবার শুনেই বুঝে ফেলা সেটা একটা বিশেষ গুন। যা সতর্ক থেকে আর নিজের চেতনাকে বাচিয়ে রেখে অর্জন করা যেতে পারে।  কিন্তু যদি মিথ্যের বোঝা বুদ্ধিমত্তার উপর চেপে বসে তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে চোরাবালির বাকে আটকে পড়ে। যেখানে আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

মিথ্যে যে বলে সে নিজের সাথেই সে ছলনা করে থাকে। সে ভাবে যেই মানুষটাকে সে ঠকাচ্ছে বা মিথ্যের জালে ফাসিয়ে দিচ্ছে, তারা হয়তো বোকা, কিংবস সহজ সরল যাদেরকে সহজেই বোকা বানানো যায়। কিন্তু মিথ্যাবাদী কখনোই ভাবতে চায় না যে, মিথ্যে হলো সেই জাল যা একটা মানুষ তার নিজের অজান্তেই সে নিজের জন্য বিছায়। যখন মানুস নিজের কিছু লুকায় তখনই তাকে সতর্ক হওয়া উচিত। কারন যখন সত্যির সীমানা পার হয়ে যায়, তখনই মিথ্যার জাল বিছানো হয়। যাকে ভাগ্য তাকে নির্দয় ভাবে ফাসিয়ে দেয়।

কোনো কোনো সময় কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই এই সমস্ত নাটক তৈরী করা হয়। আর এই সব ভরষার জায়গায় এমন এমন কিছু মিথ্যা চরিত্রও তৈরী হয় যারা আজীবন কাল হয় “মুখেস” না হয় “স্যার” হিসাবে পরিচিত হন। এরা অর্থাৎ নাম সর্বসশ অস্তিত্তহীন এই সব মেকি চরিত্রগুলি একটা ভরষার স্থান তৈরী করেন। সময়ের স্রোতে কিংবা তদন্তের খপ্পরে যখন এই মেকি মিথ্যা ভরষার স্থান উম্মোচিত হয়ে চোখের সামনে ভয়ংকর এবং আসল চেহাড়া টা বেরিয়ে আসে, তখন নিজের কাছে নিজকে বড় বোকা মনে হয়। আর এর প্রধান কারন এই যে, মিথ্যা ভরষায় ভর করে কেউ যখন নিজের ইচ্ছায় সেই জায়গায় চলে আসে যেখান থেকে আর কেউ ফিরে যেতে পারে না।

সত্যকে যেমন বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না, তেমনি মিথ্যাকেও বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। মিথ্যাকে লুকাতে বহু পরিশ্রমের দরকার। আর সেই পরিশ্রম কখনোই কাজে দেয় না। কারন সত্যের একটাই চেষ্টা থাকে-বাইরে এসে আলোয় দারানো, আর মিথ্যারও একটা চেষ্টা থাকে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার। মিথ্যের রাত যতো লম্বাই হোক না কেনো, সত্যের সুর্জ ঠিক উঠবেই।

এখানে আরো একটা ব্যাপার বুঝা খুব দরকার যে, মিথ্যা, লুকুচুরি কিংবা বিভ্রান্ত করা এই গুটি কতক জিনিষের মধ্যে পার্থক্য আছে। লুকানো এক জিনিষ, আর বিভ্রান্ত করা আরেক জিনিষ। সত্যিটাকে যেমন লুকানো যায় না, তেমনি একে বেশীক্ষন বিভ্রান্তির মধ্যেও রাখা যায় না। কারন সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না, আবার কোনো কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব।  আর ঠিক এ কারনেই ট্রাষ্টের উপর কোনো ইনভেষ্টিগেশন হয় না, ইনভেষ্টিগেশন হয় ডাউটের উপর।

সত্যিটা যখন কেউ জেনেই যায়, তখন মিথ্যার গল্পটা বলে তখন শুধু সময়ই নষ্ট হয় কিন্তু কোনো কাজে আসে না।

০৮/০৪/২০২১-তোমাকে ছাড়া আমি  (ছোট ভাবী আর ছোট ভাইকে উতসর্গ করা লেখাটা)

যেদিন প্রথম আমি তোমার সাথে জীবন বেঁধেছিলাম, সেদিন বুঝি নাই আমার কতটা নিয়ে গেলে তুমি। একাই এসেছিলাম যেমন কেউ পালিয়ে যায় তার সেই চেনা শিশুকাল, চেনা শৈশব, আর চেনা সব ভালোবাসার জগত ছেড়ে। আমার সেই নতুন জগতে তোমাকে জুড়েই আমার সময় পেরিয়ে গেছে দিনগুলি একটা একটা মুহুর্ত করে, পেরিয়ে গেছে মাস একটা একটা সপ্তাহ শেষে। এরপর বছর পেরিয়ে গেছে মাস শেষে, আর যুগ পেরিয়ে গেছে বছরান্তে। তোমাকে কেন্দ্র করেই আমার জীবনের অনেক অভ্যাস, অনেক শখ আমুল বদলে গেছে চিরতরে, আমি বুঝতেই পারিনি কখন কবে কোন ক্ষন থেকে আমার প্রিয় সবুজ রংটা থেকে তোমার প্রিয় নীল রংটা আমার প্রিয় হয়ে গেছে। এভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে আমার অনেক অভ্যাস যা কখনোই আমার ছিলো না, ছিলো শুধু তোমার নিজের। আমি দিনে ঘুমাতে পছন্দ করতাম, আমি ঝাল খেতে পছন্দ করতাম, আমি মিষ্টি একেবারেই খেতে চাইতাম না, অবিরত টেলিভিশনের সামনে আমার পছন্দের সিরিয়ালগুলি দেখতেই থাকতাম। অথচ সেই আমি কত বদলে গিয়েছিলাম তোমার সংসারে এসে। আমাকে আর সেই ঝাল আর নেশা ধরায় না, টিভির সেই সিরিয়ালগুলি আমাকে হয়তো খুব মিস করে, দিনের শখের ঘুমটা যে কবে বিদায় নিয়েছে তার দিনক্ষনও আমার আর আজ মনে না। কবে যে তোমার মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসটা আমার ঝাল খাওয়ার নেশাকে অতিক্রম করে আমাকেও মিষ্টি খাওয়ার নেশায় বদল করে ফেলেছে, আমি নিজেও জানি না। শীতের সকালে কাকডাকা ভোরে গরম আমেজের বিছানা ছেড়ে সেই কখন থেকে যে আমি অধীর আগ্রহে সেই পিঠাটাই বানাতে শুরু করেছিলাম যেটা তুমি খেতে ভালোবাসতে। আর এভাবেই পার হয়ে গেছে আমার সবকটি ঋতু। আমার সব আগ্রহ আর অভ্যাস যেনো গড়ে উঠেছিলো তোমাকে ঘিরেই।

আজ এতো বছর পর, আজ কেনো সব উলট পালট হয়ে গেলো? সূর্য ঠিক সময়মত উঠে আজও তো সকাল হয়েছে। মনেও পড়েছিলো তুমি অফিসে যাবে। কিন্তু আজ আমার কেনো তাড়া নাই তোমার জন্য নাস্তা বানানোর? সকালের হকার তো সেই আগের মতো পত্রিকাটাও দিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো তো পত্রিকার ভাজটা পর্যন্ত খোলা হলো না! চকলেটের সিরিয়ালটা তো টেবিলের উপরেই আছে, অথচ আমি কেনো ব্যস্ত হই নাই গরম দুধে তোমার খাবারের জন্য সিরিয়ালতা বানানোর জন্য? অফিসে যাওয়ার আগে হাত মুখ ধুতে যাবার আগে কতবার শুনেছি তোমার ওই কন্ঠটা- ওই, রেডি হচ্ছি, নাস্তাটা বানাও, কিংবা বলতে ‘ড্রাইভারকে বলো ব্যাগটা নিয়ে যেতে’। খুব ধাক্কা দেয় বুকে। তুমি ছাড়া সকালটা কত আলাদা। রুমভর্তি তোমার সিগারেটের গন্ধটাও আজ নাই। রান্নাঘরের দিকে যেতেই তোমার ঘরটা চোখে পড়ে, ইশ, ওই খানে তুমি বসে থাকতে, পেপারটা পড়তে, সিগারেট টানতে, খালী পেটে কফি খেতে। কি অবাক। সেই সোফাটা আজো আছে, এস্ট্রেটা আগের জায়গাতেই আছে, শুধু তুমি ওখানে নাই। তুমি আজ নাই। আমি তোমাকে আজ ইচ্ছা করলেই সেই আগের মতো স্পর্শ করতে পারছি না।

অফিস শেষে সন্ধ্যায় বা রাতে ঘরে ঢোকে আমাকে না দেখতে পেলে সারাটা বাড়িতে তুমি আমাকে খুজতে। আর মেয়েদের জিজ্ঞেস করতে-আরে তোর মা কই? যেনো আমি হারিয়ে গেছি। রান্নাঘরে কাজে থাকলে তুমি রান্নাঘর পর্যন্ত চলে যেতে। বলতে-কি করো? হয়তো এটুকুই। অথচ আজ তুমিই হারিয়ে গেলে। আজ আর আমাকে কেউ বলে না-আরে কোথায় গেলা বা কি করো? রান্নাঘরে তোমার পছন্দের খুব ছোট স্টীলের পাতিলটা আজ আর কফির পানির জন্য গরম করার দরকার হয় না, ছোট কাপটাও আজ একেবারেই শুষ্ক। ওগুলি হাতে নিলেই খুব ভারী মনে হয়, মাটিতে বসে যাই, বুকের ভিতর কি যেনো কঠিন একটা চাপা ব্যথা অনুভব হয়।  

ছুটির দিনটা এতো লম্বা মনে হয় আজ। ছুটির দিনে তোমার পান্তা ভাত আর ডিম ভাজীর কথা মনে হলেই চোখ ভিজে আসে। তোমার বাগান আজ তোমাকে খুব মিস করে। বাগানের প্রতিটা গাছ যেনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তোমার অপেক্ষায়। ওরা হয়তো কথা বলতে পারে না কিন্তু ওদের হেলে দুলে ভালোবাসার প্রকাশটা যেনো আজ আর নাই। কি অদ্ভুত নিরবতা চারিদিকে।

আমি জানতাম, জীবনের কোনো না কোনো সময় এমন একটা সময় আসবেই। একমাত্র সহমরন আর দূর্ভাগ্যক্রমে কোনো দূর্ঘটনা ছাড়া কেউ কেউ সেই ভাগ্যবান হয় যখন একসাথে পৃথিবী-বিচ্ছেদ হয়। কি অদ্ভুত একটা জীবন, তাই না? একা বেচে থাকা যেমন কষ্টের, আবার  তেমনি সাথী নিয়ে বেচে থাকার পর আবার একা হয়ে যাওয়া আরো অনেক বেদনাদায়ক। কেউ চলে যাবার পর বুঝা যায় সব কিছু আমার ছিলো না।

এতোটা বছর ধরে একসাথে চলার মধ্যে কখনো একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের নিঃশব্দে  ভালোবাসাটাই একসময় মায়ায় পরিনত হয়ে গিয়েছিলো আমাদের। তখন এই মায়াটাই ছিলো আমাদের পূর্ন ভালোবাসা। ভাবতেই পারি না, তোমার টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন আমার কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, তোমার ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ তো মনে হয় নাই আমার, বরং বড্ড মায়ায় যেনো ঘামে ভিজা গন্ধতা আরো জড়িয়ে ধরতাম। খুব মায়া লাগতো, আহা, কত কষ্ট করো, ঘামে শরীর ভিজে যেতো, তার সেই সাক্ষী এই গন্ধওয়ালা গেঞ্জীটা। অনবরত মমতায় আমি সেটা ভালোবাসায় ধুয়ে দিতাম।

আমি জানি, আমার ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্ধ যখন তোমার কাছে একদিন অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধাভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন তোমার নাক বুঝে আসতো, সময়ের এতোটা পথ পেরিয়ে কোনো একদিন তুমিও সেই নাকডাকা, সেই তেলেভেজা চুলের সোদা গন্ধ তোমারও ভালোবাসার একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো। যেমন আমার অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো তোমার রাগ, তোমার অভিমান। আজ এইক্ষনে তোমার সেইসব রাগ অভিমান আমাকে কাদায়, আজ কেনো জানি মনে হয়, খুব মিস করছি সেই রাগ, অভিমান, আর মমতা। বড্ড একা লাগে এখন। সবাই চারিপাশেই আছে অথচ কি ভয়ংকর শুন্যতায় আমি দিন কাটাই যেনো আমি শক্তিহীন এক নির্জীব প্রানী। সবাই তোমাকে মিস করে, কাদে, কষ্ট পায়, কিন্তু আমি আমার কষ্টটা কাউকে বুঝাতে পারি না। চোখের জলের রঙ এক হলেও এই জলে ভেসে থাকা  কষ্ট, ব্যাথা, বেদনা আর হাহাকারের রঙ হয়তো সবার এক নয়। আমার কষ্টের রঙ হয়তো আরো নীল।

আজ তোমা বিনে এই একটা কথাই বারবার মনে জাগে- তুমি ছিলে আমার ভরষা, ছিলে আমার নিরাপত্তা, আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই ছিলে আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কেপে উঠতো, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যেতো। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে ছিলে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে। নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করতে আমার  অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার ছিলো না। অথচ দেখো, সেই তুমি কি অবলীলায় কোনো কিছু না বলেই আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গেলে।

সেই কোনো এক সময় জেনেছিলাম, মানুষ ভালবেসে নাকি খিলখিল করে হাসে, মেঘলা আকাশ দেখে নীল আকাশের কথা ভাবে, কবিতা লিখে। আজ এই একা জীবনে এসে বুঝলাম, ভালোবাসায় অনেক বেদনাও থাকে, থাকে চাপা কান্না আর বিরহের অসহায়ত্ত। শরীর খারাপ হলে এখন বড্ড তোমার কথা মনে পড়ে, মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে গেলে তোমার কথা মনে পড়ে, সন্ধ্যা হলেই তোমার বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে। ছুটির দিনে কেমন যেনো পুরু ঘরটাই ফাকা লাগে। অদ্ভুত না জীবন? স্মৃতিগুলি আরো ভয়ংকর মনে হয় এখন।

আমি জানি, এ জীবনে আর কেউ আমাকে তোমার মতো আদর, ভালোবাসা, অভিমান কিংবা মমতা দিয়ে না মন ভরাতে পারবে, না ভরষা দিতে পারবে, না পারবে সেই যাদুকরী কথায় আমার অভিমানগুলি কোনো এক তপ্ত ললাশীর মতো হাস্যোজ্জল করাতে। আসলে যেদিন প্রথম আমি তোমার কাছে এসেছিলাম, তখন আমি ছিলাম একজন উচ্ছল মায়াবতী সবেমাত্র পা রাখা এক কুমারী আর তুমি ছিলে কিশোর থেকে পা দিয়ে সবেমাত্র যৌবনে পা রাখা টকবকে এক যুবক। সেই বয়সটা পার করে অর্ধ শত বছর পার করেও আমি যেনো সেই ষোড়শী যুবতীর মতই আর তুমি সেই টকবগে যুবকের মতোই সময়টা কাটিয়েছি। যেনো দিনগুলি শুধু রাত আর দিনের মধ্যেই পার হয়ে, মনের দিক থেকে নয়। আমি তো সারাটা জীবন তোমার সাথেই থাকতে এসেছিলাম। আমি কল্পনার কোনো রাজকুমারী ছিলাম না, তেমনি তুমিও আমার কাছে কোনো কল্পনার পুরুষ ছিলে না। যতোক্ষন অবধি একটা কাল্পনিক নাম অন্য কারো সাথে যুক্ত হয়, ততোক্ষন সেটা হয়তো হাওয়াই থাকে। কিন্তু তুমি আমার জীবনে কোনো কাল্পনিক নাম ছিলে না। আমি তোমাকে স্পর্শ করেছি, ভালোবেসেছি, সবই ছিলো প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য আর জাগতিক। অথচ আজ তুমি আমার সামনে দিয়ে এতো জোরে দৌড়ে চলে গেলে, আমি আর তোমাকে নাগালই পেলাম না। মনে হচ্ছে আজ, তুমি আমার কল্পনার কোনো সুপুরুষ আর আমি কল্পনার কোনো রাজমুকারী। জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা দেখে কখনো বুঝা যায় না বা মন বুঝতে চায় না কোনটা সত্যি আর কোনটা সত্যি নয়। আমাকে এই একা ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনাটা আমার কাছে যদি মিথ্যা হতো, যদি এটা নিছক একটা সপ্ন হতো! কিন্তু এটাই সত্যি যে, ঘটনাটা সত্যি। তুমি নাই এই মিথ্যার পর্দাটা যখন আমি খুলে দেই, তখন তুমি আছো এটাই সত্যি হয়ে চারিদিকে প্রকাশিত হও আমার রক্ত নালির প্রতিটি ফোটায়, আমার নিশ্বাসের প্রতিটি শ্বাসে, আমার বিশ্বাসের প্রতিটি বিন্দুকনায়। তুমি আজ আসলেই আমার সামনে আর নাই। কিন্তু অন্তর, আত্তা আর মনে কোথাও তোমার অনুপস্থিতি আমি দেখি না। তুমি ছিলে, তুমি আছো আর সারা জীবন থাকবে আমার। তুমি মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাইনি। হয়তো আমি জামিনের মতো একটা মুক্ত জীবন ভোগ করছি যেখানে প্রতিনিয়ত আমাকে তাড়া করে তোমার সেই আদর আর মমতা। এখন আমাকে শুধু কিছু অভ্যাস পাল্টাতে হবে যা তুমি আমাকে দিয়েছিলে।

আসলে এটার নামই জীবন যার উপলব্ধি শুরু হয় মৃত্যুর মতো কোনো এক অফেরতযোগ্য বিচ্ছেদের শুরুতে। আর শেষ হয় নিজের বিচ্ছেদের মুহুর্তে। আমি এখন বেচে আছি সেই মুহুর্তটির জন্য যার নাম ‘জীবন-বিচ্ছেদ’। আর সেটা শুধুই আমার জন্য বিচ্ছেদ।  

(ছোট ভাবী আর ছোট ভাইকে উতসর্গ করা লেখাটা)

৪/৪/২০২১-রিভার সাইডের ইতিকথা

সনটা ছিলো ২০০৪। 

তখন মীরপুর সেনানীবাসে ৪ ফিন্ড আর্টিলারিতে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কর্মরত আছি।  আমার প্রমোশন হবার কথা মেজর থেকে লেফটেনেন্ট কর্নেল পদে। কিন্তু মামুলি একটা কারন দেখিয়ে তারা আমাকে প্রমোশন দিলো না। স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, ডিভ লেভেলে জিএসও -২ (অপারেসন) হিসাবে কাজ করেছি, আর্মি হেড কোয়ার্টারে ও জি এস ও-২ হিসাবে কাজ করেছি। প্রমোশনের জন্য কোনো প্রকার কমতি আমার নাই। কিন্তু তারপরেও আমাকে প্রমোশন না দিয়ে আমার জুনিয়র ১৪ লং কোর্সের মেজর মজিস, যে কিনা ক্যাটেগরি-সি , স্টাফ কলেজ ও করে নাই, গানারী স্টাফ ও করে নাই, সে আমার বদলে প্রমোশন পেয়ে ৪ ফিল্ডে পোস্টিং এসেছে। এটা শুধু মাত্র সে খালেদা জিয়ার সাথে কোনো না কোন ভাবে পরিচিত। শোনা যায় যে, মজিদের বাবা খালেদা জিয়ার বাসায় নাকি মালীর কাজ করতো। আর সে সুবাদেই এই নেপোটিজম। এর কোনো মানে হয়? সিদ্ধান্ত নিলাম, এপেন্ডিক্স-জে (ইচ্ছেকৃতভাবে অবসর নেওয়া) দিয়ে আর্মি থেকে চলে যাবো।  সাথে সাথে এটাও ভাব লাম যে, বাইরে গিয়ে কোনো চাকুরী ও করবো না। কিন্তু কি ব্যবসা করবো সেটা তো কখনো শিখি নাই। একচুয়ালি, আর্মির অফিসার গন, সারাজীবন তাদের ডেডিকেসন থাকে আর্মির যাবতীয় কাজে, সে আর কোনো বিকল্প কাজ শিখেও না। ফলে আমারো তাই হয়েছে। অনেক ভাবছিলাম, কি করা যায়। কিন্তু কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। 

ঠিক এই সময় একটা ঘটনা ঘটে গেলো। কোনো এক কাকতালীয় ভাবে একদিন আমার সাথে  নাজিমুদ্দিনের পরিচয় হয় মীরপুর সেনানীবাসে। আমিই তাকে মীরপুর সেনানিবাসে দাওয়াত করেছিলাম কারন সে আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো। আমি কখনোই নাজিমুদ্দিনকে সামনাসামনি দেখিও নাই, কথাও বলি নাই যদিও সে আমাদেরই এলাকার লোক। নাজিমুদ্দিন এলাকায় একজন খুব প্রতাপশালী খারাপ মানুষের মধ্যে একজন ছিলো। ধর্মের কোনো বালাই ছিলো না, সারাদিন মদের উপর থাক্তো, আর নারী ছিলো তার প্রিয় ভোগের মধ্যে একটি। সিনেমার জগত থেকে শুরু করে, সঙ্গীত রাজ্যের সব নারীদের এবং সাধারন মেয়েরা কেউ তার হাত থেকে রেহাই পায় নাই। তার টাকা ছিলো, ফলে টাকার জন্য ই সব ক্লাসের অর্থলোভী মেয়েগুলি তাকে দিনে আর রাতে সঙ্গ দিতো। সে বসুন্ধরার প্রোজেক্ট সমুহে মাটি সাপ্লাই দেওয়ার বৃহৎ একচ্ছত্র সাপ্লাইয়ার ছিলো। জমি দখল, অবৈধ ভাবে মাটি কাটা, অন্য মানুষের জমি কম দামে ক্রয় করে বসুন্ধরাকে দেওয়া, এই ছিলো তার কাজ। কিন্তু তার একটি জায়গায় সে কখনো ই বুদ্ধিমান ছিলো না। সে সব সময় পাওয়ার অফ এটর্নি বা আম মোক্তার নিয়ে জমি ক্রয় করত। সেই রকম ভাবে আমাদের গার্মেন্টস বিল্ডিংটা যে জমির উপর অবস্থিত, সেটা জনাব আব্দুল বারেক এবং তার পরিবারের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলো। হয়ত কিছু টাকা বাকী থাকতে পারে। কিন্তু সে জমিটা রেজিস্ট্রি করে নেয় নাই। পরিবর্তে সে বারেক সাহেব এবং তার পরিবারের কাছ থেকে পাওয়ার অফ এটর্নি নিয়ে এখানে দশ তালা ফাউন্ডেসন দিয়ে হাসনাবাদ সুপার মার্কেট নামে আপাতত তিন তালা বিল্ডিং (সাথে একটি বেসমেন্ট) তৈরী করে। 

প্রাথমিকভাবে সে নিজেই একটা গার্মেন্টস দিয়েছিল এবং এর নাম রেখেছিলো “রিভার সাইড সুয়েটারস লিমিটেড”, বেশ সুন্দর নাম। নাজিমুদ্দিন সাহেব গার্মেন্টস চালানোর জন্য যে জ্ঞ্যান, যে বিদ্যা থাকা দরকার সেটা তার কিছুই ছিলো না। কিন্তু তার অনেক টাকা ছিলো। ফলে গার্মেন্টস এর জন্য তিনি যাদেরকে অংশীদারী দিয়েছেন, তারা সবাই ছিলো নিজেদের আখের গোছানোর ধান্দায়। ফলে ধীরে ধীরে অত্র গার্মেন্টস শুধু লোক্সানের দিকেই যাচ্ছিলো। এই লোক্সান এক সময় নাজিমুদ্দিনের কাছে খুব বিরক্তিকর মনে হচ্ছিলো বটে কিন্তু সে অন্য দিকে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীটা রাখতেও চাচ্ছিলো। 

অনেক কথাবার্তার পর, নাজিমুদ্দিন আমাকে একটা অফার দিলো যে, যদি আমি চাই তাহলে আমি তার রিভার সাইড সুয়েতারস ফ্যাক্টরী টা চালাইতে পারি। তিনি আমাকে ৩০% শেয়ার দিবেন আর তিনি ৭০% শেয়ার নিজে রাখবেন। এদিকে আমি কোনো কিছুই বুঝি না কিভাবে কোথা থেকে গার্মেন্টস এর অর্ডার নিতে হয়, কিভাবে ব্যাংকিং করতে হয়, কোনো কিছুই না। কিন্তু সাহস ছিলো অনেক। পরের দিন আমি রিভার সাইড সুয়েতারস দেখতে গেলাম। প্রায় বন্ধ অবস্থায় আছে ফ্যাক্টরীটা। মাত্র ১৮ জন অপারেটর কাজ করছে। কারেন্ট লাইন বন্ধ কারন প্রায় ৪ মাসের অধিক কারেন্ট বিল বাকী আছে। গ্যাস লাইন ও বন্ধবিল পরিশোধ না করার কারনে। ব্যাংকে প্রায় তিন কোটি টাকা লোনা আছে। ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ না করার কারনে কোন এল সি করা যায় না, সি সি হাইপোর কোনো সুযোগ নাই। এর মানে ফ্যাক্টরীটা একেবারেই লোকসানের প্রোজেক্ট। ব্যাংক ম্যানেজার ছিলেন তখন মিস্তার তাহির সাহেব এবং সোস্যাল ইস লামী ব্যাংকের এম ডি ছিলেন তখন মিস্তার আসাদ সাহেব। ঊনারা দুজনেই একটা উপদেশ দিলেন যে, যদি আমি নিতে চাই, তাহলে ব্যাংক রি সিডিউলিং করতে হবে। ব্যাংক রিসিডিউলিং কি জিনিষ তাও আমি জানি না। যাই হোক, শেষ অবধি আমি রিস্ক নেওয়ার একটা প্ল্যান করলাম। 

ফ্যাক্টরীটা তখন চালাচ্ছিলো জনাব লুতফর রহমান নামে এক ভদ্রলোক। এরও স্বভাবের মধ্যে অনেক খারাপ কিছু ছিলো। সে রীতিমতো জুয়া এবং নারীঘটিত ব্যাপারে খুব আসক্ত ছিলো। সাবকন্ট্রাক্ট করে যে টাকা পেতো, সেটা শ্রমিকদের মুজুরী না দিয়ে জুয়ার আসরেই বসে হেরে আসতো। ফলে প্রতিনিয়ত শ্রমিকগন সবশেষে সেই আবারো নাজিমুদ্দিনের বাসার সামনে গিয়েই বেতনের জন্য আন্দোলন করা ছাড়া কখনো বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা থাক্নতো না। নাজিমুদ্দিন এতোটাই বিরক্ত ছিলো যে, কোনোভাবে এটা অন্য কারো হাতে দিতে পারলে সেও যেনো বেচে যায়।

ব্যাংক রিসিডিউলিং করার জন্য মোট ৪০ লাখ টাকার প্রয়োজন। আমার কাছে এতো টাকা ছিলোও না। ফলে আমি আমার পরিচিত কিছু সিনিয়র আর্মি অফিসারদের সাথেও কথা বললাম যারা খুব তাড়াতাড়ি আর্মির চাকুরী ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু সবাই লাভ চায়, আনসারটেনিটিতে কেউ ইনভেস্ট করতে চায় না। ফলে আমার পরিচিত আর্মি অফিসার গন ক্রমে ক্রমে পিছু হটে গেলেন।

কোন উপায়ন্তর না দেখে আমি আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ যিনি আমেরিকায় থাকেন, তার কাছ থেকে তখন ৪০ লাখ টাকা ধার নিলাম এবং বাকী সব রি সিডিউলিং করে নিলাম। সাথে ৩০% শেয়ারের সমান টাকা আমি নাজিমুদ্দিন কেও দিয়ে দিলাম (কিছু জমি দিয়ে আর কিছু ক্যাশ দিয়ে)।

এতে আরেকটি সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিলো। আমি ছিলাম রিভার সাইড সুয়েতারস এর চেয়ারম্যান আর নাজিমুদ্দিন ৭০% নিয়ে থাক্লেন এম ডি হিসাবে। কিন্তু নাজিম ভাই অফিশিয়াল কোনো কাজেই ইনভল্ব হলেন না। তার দস্তখত লাগ্লেও তাকে কোথাও খুজেই পাওয়া যায় না। তাছাড়া রুগ্ন এই ফ্যাক্টরিতে অনেক প্রয়োজনেই টাকাও লাগতোকিন্তু নাজিমুদিইন ভাই তার কোন ভাগ ই নিতেন না। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে সার্বক্ষণিক টাকা ধার করে করে চালাইতে শুরু করলাম বটে কিন্তু একটা সময় আমার পক্ষে আর চালানো সম্ভব হচ্ছিলো না।

উপান্তর না দেখে একদিন আমি নাজিমুদ্দিন ভাইকে বললাম যে, হয় আমার ৩০% শেয়ার আবার তিনি নিয়ে আমার ইনভেস্টমেন্ট ফেরত দিক অথবা বাকী ৭০% শেয়ার একেবারে আমার নামে ট্রান্সফার করে দিক যেনো আমি আমার মতো করে চালাইতে পারি। তখনো ব্যাংকে প্রায় তিন কোটি টাকার মতো বাকী। কিস্তি দিতে পারছি না। এল সি করতে পারছি না। শুধু নিজের পকেট থেকেই টাকা খরচ হচ্ছে। নাজিম ভাই চালাক মানুষ। তিনি সব লোন আমার নামে ট্রান্সফার করে আর কিছু টাকা ক্যাশ নিয়ে পুরু ৭০% শেয়ার বিক্রি করতে রাজী হয়ে গেলেন। ফ্যাক্টরীর এসেট, লায়াবিলিটিজ হিসাব কিতাব করে শেষ পর্যন্ত আমি বাকী ৭০% শেয়ার নিয়ে আরেকবার রিস্ক নেওয়ার সাহস করলাম। আমার সাথে নতুন লোক মিস্তার মোহসীন (যিনি এক সময় এই ফ্যাক্টরীর ডি এম ডি হিসাবে কাজ করতেন) যোগ হলেন। তাকে আমি খুজে বের করেছি এই কারনে যে, তিনি গার্মেন্টস লাইনে বেশ পাকা, বায়ার দের সাথে তার পরিচয় আছে, ব্যাংকিং বুঝে। আমি তাকে বিনে পয়সায় ৩০% শেয়ার লিখে দিয়ে তাকে চেয়ারম্যান করলাম আর আমি এম ডি হয়ে গেলাম।

নতুন করে আবার ইনভেস্টমেন্ট এর পালা। আমি আমার আত্মীয় জনাব মুস্তাক আহ মেদ (আমার স্ত্রীর ছোট ভাই, যিনি আমেরিকায় থাকে) কে গার্মেন্টস এর শেয়ার চায় কিনা জানালে তিনি ২৫% শেয়ার নেওয়ার একটা ইন্টারেস্ট দেখান এবং তিনি প্রায় ৪৫ লাখ টাকা যোগান দেন। এইভাবে আমি আরো অনেক স্থান থেকে ফান্ড যোগার করে করে ফ্যাক্টরীটি চালানোর চেষ্টা করছিলাম। প্রচুর সময় দিচ্ছি, রাত ফ্যাক্টরীতেই কাটাই প্রায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, ফ্যাক্টরিটা ঘুরে দারাচ্ছিলো না। এক সময় আমার মনে হলো, মোহ সীন সাহেব নিজেই ফ্যাক্টরীর উন্নতির জন্য মন দিয়ে খাটছেন না। তিনি যেহেতু নিজে কোনো টাকা ইনভেস্ট করে নাই, ফলে তার সিন্সিয়ারিটি আমার কাছে একটা প্রশ্নের উদ্রেক করলো। সেলারীর সময় তিনি ট্যাব লিকে চলে যান, খুব কম রেটে অর্ডার নেন, কস্টিং প্রাইসের চেয়েও কম রেট। ফলে আমি লোনে ডুবে যাচ্ছিলাম। কিছুতেই আর সামাল দিতে পারছিলাম না। 

অবশেষে ২০০৭ এর শেষে আমি ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিলাম যে, যা লস হবার হয়ে গেছে, এবার আর লস দিতে চাই না। আমি ফ্যাক্টরী বিক্রি করে দেবো এবং ব্যাংকের টাকা শোধ করতে পারলেই হবে। কারন ব্যাংক লোন তো এখন আমার উপরেই একা। যদিও মোহসীন সাহেন ৩০% এর মালিক কিন্তু তার কোনো টাকা নাই এবং তিনি এই ব্যাপারে কোনো সংকিতও নন। আমি মোহসীন ভাইকে বললাম যে, আমি ফ্যাক্টরী বিক্রি করতে চাই। তিনি একজন গ্রাহক আনলেন, নাম মিস্টার মুরতুজা আর শ্রীলংকান এক ভদ্রলোক নাম প্রিয়ান্থা। ঊনারা এমন একটা প্রপোজাল দিলেন, আমি হিসেব করে দেখলাম যে, আমি লোন থেকে বেরিয়ে যেতে পারি।

মিস্টার মুরতুজা এবং মিস্টার প্রিয়ান্থা দুজনেই গার্মেন্টস লাইনে বেশ পাকা এবং তারা প্রফেসনাল। তারা নতুন করে ফ্যাক্টরীটা আবার তাদের মতো করে সাজিয়ে ব্যবসা করবেন এবং এটা সম্ভব।

মুর্তজা ভাই এবং মিস্টার প্রিয়ান্থা ধীরে ধীরে এলাকা সম্পর্কে জানতে জানতে একটা জিনিষ বুঝলেন যে, এই এলাকাটি সভ্য কোনো জায়গা নয় এবং এখানে ব্যবসা করতে গেলে লোকাল সাপোর্ট ছাড়া কোনোভাবেই ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এই ফিডব্যাকটা তারা লোকাল এলাকা, বিভিন্ন বন্ধুবান্ধব, এবং স্টাফদের ছাড়াও ব্যাংক থেকে পেলেন যে, হয় মিস্টার নাজিমুদ্দিন অথবা মেজর আখতারকে সাথে না নিলে নিরাপদে এখানে ব্যবসা করা সম্ভব না। এই এলাকাটি আবার আমার নিজের। সবাই আমাকে চিনে। তারমধ্যে আমি একজন আর্মি অফিসার হওয়াতে সবাই আমাকে একটু ভয়েও থাকে।

হতাত করে একদিন মুরতুজা ভাই এবং প্রিয়ান্থা আমার মিরপুরের বাসায় রাত ১১ টায় এসে হাজির। তারা আমাকে এইমর্মে জানালেন যে, তারা ১০০% শেয়ার কিনবেন না। ৯০% শেয়ার কিনবেন এবং ১০% শেয়ার আমাকে রাখতেই হবে। আমি আমার সময়মতো ফ্যাক্টরীতে আসতে পারবো এবং আমি আমার এমডি পোস্টেই থাকবো। সম্মানি হিসাবে আমি তাদের সমান সম্মানিই পাবো। ব্যাপারটা আমি সবশেষে মেনেই গেলাম। অর্থাৎ আমি ১০%, মুরতুজা ভাই ৪৫% আর প্রিয়ান্থা ৪৫% শেয়ার নিয়ে আবার ফ্যাক্টরী রান করতে শুরু করলো। এবার এটা প্রান ফিরে পেলো।

২০১০ সালে প্রিয়ান্থা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৪১ বছর বয়সে মারা যান। ইতিমধ্যে মুরতুজা ভাই আমি কেমন লোক, কেমন চরিত্রের মানুষ, সেটা বুঝে গিয়েছিলেন। আমি আসলে মাত্র ১০% শেয়ার নিয়ে কোনো হস্তক্ষেপই করছিলাম না। কারন ঊনারা ৯০% এর মালিক, সেখানে আমার  মন্তব্য কিংবা আমার কোনো সাজেশন খুব একটা মুল্যায়ন করা হবে কি হবে না সেটা নিয়ে আমি একটু তো সন্দিহান ছিলামই। ফলে আমি জাস্ট নামেমাত্র এমডি হিসাবেই ছিলাম আর লোকাল কোনো সমস্যা হলে সেটা আমি সামাল দিতাম। কোথায় কোন বায়ারের অর্ডার, কিংবা কবে কোন শিপমেন্ট এগুলো নিয়ে আমি কখনো মাথা ঘামাইতাম না।

আমার যখন এই রকম এক্টা অবস্থা, আমি তখন নিজে নিজে কিছু করা যায় কিনা সেটাও ভাবছিলাম। ফলে ডেভেলপারের কাজেও একটা চেষ্টা করছিলাম, যার ফল হচ্ছে বাসাবোতে একটা প্রোজেক্ট। সেটার ইতিহাস অন্য রকম। এটা না হয় পরেই বলবো।

প্রিয়ান্থা মারা যাবার পর, মুরতুজা ভাই প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ারের মধ্যে তিনি নিলেন ২০% আর আমি নিলাম ২৫%। এতে আমার শেয়ার দাড়ালো ৩৫% আর মুরতুজা ভাইয়ের শেয়ার দাড়ালো ৬৫%। ২৫% শেয়ার নেবার জন্য আমি মুরতুজা ভাইকে ৫৮ শতাংশ জমি লিখে দিতে হলো। এভাবেই বর্তমান পর্যন্ত চলছে। ফ্যাক্টরি ধীরে ধীরে বেশ উন্নত করতে লাগলো। কিন্তু আমার ভিতরে একটা আনসারটেনিটি সবসময় কাজ করতো যে, একটা সময় আসবে যে, মুরতুজা ভাই কোনো না কোনো সময় এর বিকল্প হিসাবে অন্যত্র বেরিয়ে যাবেনই। ফলে আমি নিজেও রিভার সাইড সুয়েটারস এর পাশাপাশি আরো কোনো ব্যবসা করা যায় কিনা আমি একটা বিকল্প খুজছিলাম। হয়ত তার ই একটা বিকল্প প্রোডাক্ট ব্যবসা হিসাবে মা ইন্ডাস্ট্রিজের  জন্ম। ওটাও আরেক ইতিহাস। এটাও পরে বলবো। 

গত ৮ জানুয়ারী মাসে সড়ক ও জনপথ আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীটির কিছু অংশ ভেঙ্গে দিয়ে যায় কারন আমাদের ফ্যাক্টরী বিল্ডিংটি বিল্ডিং এর মালিক জনাব নাজিমুদ্দিন সাহেব গায়ের জোরে সরকারী জায়গায় কিছুটা অংশ বাড়তি তৈরী করেছিলেন। বর্তমানে পদ্মা সেতু বানানোর কারনে সরকার তার নিজের জায়গা দখল করতে গিয়ে আমাদের বিল্ডিং ভেঙ্গে দিয়ে গেলো। তাতে আমাদের কোন সমস্যা ছিলো না। সমস্যাটা হয়েছে গার্মেন্টস বায়ারদের আসোসিয়েসন একরড আমাদের বিল্ডিংটা আন্সেফ করিয়ে দিলে আর কোনো বায়ার এখানে অর্ডার প্লেস করবেনা। তাতে আমাদের ব্যবসা লাটে উঠবে। আমরা এখানেই পথে নেমে যেতে হবে।

যেদিন সড়ক ও জনপথ আমাদের ফ্যাক্টরী বিল্ডিংটা ভেঙ্গে দিয়ে যায়, সেদিন ছিলো আমাদের জন্য একটা মারাত্মক বিপর্যয়। একদিকে উক্ত বিল্ডিং এবং জমির মালিকানা নিয়ে কয়েকটি দলের সাথে কোন্দল, মামলা, মারামারি এবং সন্ত্রাসী হুমকী ইত্যাদি, অন্যদিকে সড়ক ও জনপথের নিজস্ব জায়গাউদ্ধারের কারনে ভাঙ্গাভাঙ্গি, ফলে মাঝখানে আমরা যারা অনেক টাকা এই বিল্ডিং এ ব্যবসার কারনে ইনভেস্ট করে ফেলেছি সেটা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। 

যেদিন থেকে জনাব নাজিমুদ্দিন মারা গেলো, তার পরের থেকেই একের পর এক বাহিনী এই জমি এবং বিল্ডিং দখল করে ফেলার জন্য পায়তারা করছে। জনাব বারেক আমাকে উকিল নোটিশ দিয়েছে যেনো তাকে ভাড়া দেওয়া হয়, আবার নাজিমুদ্দিনের তিন বউ সরাসরি ভাড়া চায়, অন্যদিকে জরীফ নামে আরেক লোক পুরু জমি এবং বিল্ডিং এর মালিকানা দাবী করছে। আমার এইখানে এডভান্স দেওয়া আছে প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। ফলে আমার এই অগ্রিমের টাকাকে ফেরত দেবে তার কোনো দায়ভার কেউ নিতে চাইছে না। তাহলে আমার এতোগুলি টাকার কি হবে? আমি কাউকেই আর ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নই। আজ প্রায় ৩৮ মাস হয়ে গেছে আমি কোনো ভাড়া দিচ্ছি না। 

জমি এবং বিল্ডিং নিয়ে নাজিমুদ্দিনের তিন বউ আরেক বাহিনী জনাব বারেক সাহেবের সাথে কখনোই সমঝোতায় পৌছতে পারছিলো না। মিস্টার বারেক, নাজিমুদ্দিনের পরিবার কিংবা বারেকের অন্যান্য পরিবারের সদস্যরা ও আমাকে অফার করেছে যদি আমি কিছু টাকা দিয়ে উক্ত বিল্ডিং এবং জমি বারেক সাহেব্দের কাছ থেকে কিনে নেই কিংবা নাজিমুদ্দিনের পরিবার ও আমাকে এক ই ধরনের অফারকরেছিল।  কিন্তু আমি কোনো ভাবেই প্ররোচিত হইনাই। এর বদলে, আমি চেষ্টা করছিলাম যে, কোনোভাবে মিস্টার বারেক এবং নাজিমুদ্দিনের পরিবারের মধ্যেকোনো ভাবেই সমঝোতা করা যায় কিনা। কেউ ইসমঝোতার কাছাকাছি ছিলেন না। ফলে এটা এভাবেই স্ট্যাল্মেট অবস্থায় চলছিলো, আমিও কোন ভাড়া দিচ্ছিলাম না। কারন আমার অগ্রিম টাকা শোধ করতেই হবে। অনেক টাকা , প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। 

প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে এইওবস্থার। হতাত করে শুনলাম যে, সাইফুল ইসলাম নামে চাদপুরের কোনো এক ৬৯ বছরের মানুষ গত ২০০৭ সালে নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে এই জমি এবং এই বিল্ডিং কিনে নিয়েছিলো। এটা একটা অবাস্তব ঘটনা। কারন আমি গত ২০০৬ থেকে এই ফ্যাক্টরিতে আছি। কখনো বারেক সাহেব কিংবা ওই সাইফুল ইসলাম কখনো এখানে আসে নাই। আর আমার সাথে সর্বশেষ ফ্যাক্টরী চুক্তি হয়েছিলো ২০০৯ সালে। তাহলে নাজিমুদ্দিন কিভাবে ২০০৭ সালে বিক্রি করে? আর আমি তো ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ফ্যাক্টরীর ভাড়া দিয়ে আসছিলাম। তাহলে এতোদিন সাইফুল ইসলাম সাহেব কেনো  ভাড়া নিতে এলেন না? 

মামলা হয়েছে, বারেক সাহেব করেছে, আবার এদিকে সাইফুল ইসলাম সাহেবের দেওয়া পাওয়া অফ এটর্নি পেয়েছে সোহাগ গ্রুপের সাথে জড়িত মালিবাগের জাহাঙ্গীর হাসান মানিক। আর ঊনার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছে এলাকার জরীফ নামে এক লোক। সে আমাদের প্রতিনিয়ত খুব ডিস্টার্ব করছিলো এই বলে যে, সে এবং জাহাঙ্গীর হাসান মানিক যেহেতু নতুন মালিক, ফলে তাকে ভাড়া দিতে হবে , তা না হলে এখানে খুবই অসুবিধা। আজকে পানির লাইন বন্ধ করে দেয় তো কাল কারেন্টের লাইন নিয়ে ঝামেলা করে। অথচ আমি জানি সত্যটা কি। কিচ্ছু করার নাই। আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই কে বা কারা মালিক এই বিল্ডিং বা জমির। আমার ইন্টারেস্ট হলো আমার ব্যবসা, আমার অগ্রিম টাকা এবং পিস্ফুল সমাধান। 

আমি এবং মুরতুজা ভাই মেন্টালি খুব ডিস্টারবড হচ্ছিলাম। কিছুতেই ভালো একটা সমাধান করতে পারছিলাম না। 

ঠিক এই সময় সড়ক ও জনপথের অফিসাররা পদ্মা সেতুর কারনে আমাদের ফ্যাক্টরীর প্রায় ১৫-২০ ফুট ভাঙ্গার জন্য বুল ডোজার নিয়ে হাজির। আমরা কেহই ফ্যাক্টরীতে ছিলাম না। আমি যখন এলাম, তখন ইতিমধ্যে প্রায় ৫ থেকে ৭ ফুট ভেঙ্গে ফেলেছে। খুবই ভয়ংকর একটা অবস্থা। আমাদের ফ্যাক্টরীটা একরড সারটিফায়েড। এখন যদি কোনো কারনে একরড জানতে পারে যে, আমাদের ফ্যাক্টরীতে ভাঙ্গা পড়েছে, কোনোভাবেই আমরা একরডের সারটিফিকেট রিটেইন করতে পারবো না। আর যদি সারটিফিকেট রিটেইন করতে না পারি, তাহলে কোনো অবস্থায়ই  আমাদের বায়াররা আমাদের অর্ডার প্লেস করবে না। 

সড়ক ও জনপথের অফিসারদেরকে অনুরোধ করা হলে তারা মালিকপক্ষ ছাড়া কোন কথাই বলবেন না বলে ভাংতেই থাক্লেন। বারেক সাহেবকে ফোনে জানালে ঊনি এমন একটা ভাব করলেন যে, ভাংতে থাকুক। যেটুকু থাকে সেটুকু নিয়েই ঊনি পরবর্তীতে জড়িফের সাথে ফাইট করবেন। জরীফের সাথে কথা বলা হলো, সে মালিকের পক্ষে যেভাবেই হোক একটা প্রক্সি দিলো। বারেক সাহেব অনেক পরে যদিও স্পটে এলেন কিন্তু তিনি জরীফের ভয়েই হোক আর তার অনিহার কারনেই হোক কারো সাথেই আলাপ করলেন না, আবার সড়ক ও জনপথের ম্যাজিস্ট্রেট এর সাথেও কোনো কথা বললেন না। 

আমি বুঝতে পারলাম, এখন ব্যবসা করতে গেলে আমাকে জরীফের লোকজনকেই মালিক বলে মেনে নেওয়া উচিত। মামলার ফলাফল দিবে আদালত। যদি জরীফ গং মামলায় জিতে আসে তাতে আমার কোনো সমস্যা নাই, আবার বারেক জিতে আসে তাতেও আমার কোনো সমস্যা নাই। আমি শেষ পর্যন্ত জরীফের দলের সাথে একটা চুক্তি করেই ফেললাম। অন্তত তারা আমার অগ্রিম টাকাটার একটা দায়িত্ত নিয়েছেন। যদিও পুরুটার নয়। আমার প্রায় ২৫/৩০ লাখ টাকার লস হবে। 

(চলবে)

০৪/০৪/২০২১- অনলাইন দুনিয়া\

অনলাইন দুনিয়া এখন মানুষের জীবনে একটা অভিন্ন অংশ হয়ে গেছে। এই দুনিয়া কখনো কখনো একদম অপরিচিত দুজন মানুষকে খুব কাছে নিয়ে আসে, বন্ধু বানায়। যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, একাকিত্ত বোধ করে, কিংবা খুব খুশীতে থাকে, সে অন্য কারো সাথে তার এই অনুভুতিগুলি শেয়ার করতেই চায়। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই কষ্টের ব্যাপারগুলি শেয়ার করার খুব দরকার মনে করে। তখন দরকার হয় এমন কেউ যারা খুব কাছের বন্ধু কিংবা তার থেকেও কাছের কেউ। এই বন্ধুত্ব আমাদের জীবনের একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। আমরা আমাদের ভাল বা খারাপ সময়ের সময় আমরা এই বন্ধুগুলির মাঝেই থাকি। কিন্তু এই বন্ধুত্ব যদি এই অনলাইন দুনিয়ার কারনে কোনো ভুল মানুষের সাথে হয়ে যায়, তাহলে আমরা বিপদে মধ্যেও পড়তে পারি। কারন খারাপ সঙ্গের ফল খারাপই হয়।

অনেকের জীবনের অনেক কাহিনী আছে যা রহস্যে ঘেরা থাকে। যখন কেউ এই রহস্য ঘেড়া চাদর সরাতে যান, তখন এমন এমন কিছু প্রশ্নের উদয় হতে পারে যা সাভাবিক জীবনের ভীত নড়ে যেতে পারে। এইসব রহস্য ঘেরা প্রশ্ন জানলেও অসুবিধা আবার না জানলেও জীবন সাভাবিক হয়ে উঠে না। এক্ষেত্রে কি জানা উচিত আর কি জানা একেবারেই উচিত না, সেটাই নির্ভর করে পরবর্তী সুখী জীবনের জন্য। তাই এই অনলাইন দুনিয়ার অপরিচিত মানুষগুলির কতটা কাছে যেতে হবে, কতটা তথ্য শেয়ার করতে হবে, কাকে কতটা জায়গা দিতে হবে এটা খুব জরুরী। কাউকে নিজের সম্পকে কতটা জানাতে হবে এই সিদ্ধান্ত হুজুগের বশে নয় ঠান্ডা মাথায় নেয়া উচিত। ইন্টারনেটে কোনো অচেনা মানুষের সাথে বন্দধুত্ত করতে হলে সবার আগে সবচেয়ে যেটা করা উচিত তা হলো নিজের সুরক্ষা। আর বিপদের আচ পাওয়ার সাথে সাথেই  নিজেকে বাচানোর জন্য তৈরী থাকা। ইন্টারনেটের আরেকটি নাম হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব, একে ওয়েব এই জন্য বলে, কারন এটা মানুষকে, কিছু ইনফর্মেশনকে একটা ওয়েবের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়। কিন্তু এই ওয়েবও একটা ফাদ হতে পারে। একটা জাল, একটা ট্র্যাপ।

এই অনলাইন দুনিয়ায় বেশীরভাগ বিশ্বাস আসে একটা অন্ধ বিশ্বাস থেকে। কোনো কিছু না জানা থেকে। আর এই অন্ধ বিশ্বাস এমন এক চোরাবালী, যার না আছে একুল, না আছে ওকুল। সেখানে না কোনো জ্ঞানের আলো পৌছতে পারে, না সেখানে তর্কের কোনো জায়গা আছে। এখানে অনেক মিথ্যা বারবার উচ্চারন হয়। ভরষার স্থান তৈরী করা হয়। মজার বিষয় হলো- একটা মিথ্যাকে যখন কেউ বারবার মিথ্যে বলা হয়, তাহলে সত্যিটা কিছুটা হলেও ফেকাশে হয়ে যায়। বাস্তব জীবনে আমরা যেমন সিরিয়াল কিলারের সন্ধান পাই, তেমনি এই অনলাইন দুনিয়ায় সিরিয়াল ঠকবাজও হয়। এরা নিজেদের নেশায় এতোটাই মশগুল হয়ে থাকে যে, ও শিকারের আওয়াজটা শুনতেই পায় না। সে কতটা ক্ষতি বা আঘাত করছে সামনের মানুষটাকে, সে সেটা দেখতেই পায় না। কিন্তু যে আঘাত পায় সে প্রত্যেকটা জিনিষ দেখতে পায় আর শুনতেও পায়। আর মনেও রাখে। ফলে এই অনলাইন দুনিয়ার সব কাহিনীর সামনে যা দেখা যায়, তার থেকে অনেক বেশি ঘটনা লুকিয়ে থাকে না দেখার পিছনে।

কারো অতিতকে ঘেটে বর্তমানকে বিচার করাই হয়তো ঠিক কাজ নয়, কিন্তু ভরষা হলো এমন একটা কথা যা বর্তমান আর অতীতের মধ্যে মেল বন্ধন করে, ভবিষ্যতের দিকে অনুমান করে। কোন ব্যক্তি কি করেছিলো, কি করতে চলেছে, এটা নির্ভর করে সে ভবিষ্যতে কি করতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে , যখন কারো সাথে কোনো সম্পর্ক হয়, হোক ব্যবসায়িক বা নিজস্ব, ঐ ব্যক্তির সম্পুর্ন জীবন একটা দলিল হিসাবে সামনে আসে। তখন বিচার বিশ্লেষন করে আমরা বিচার করতে পারি যে, সম্পর্ক রাখা উচিত নাকি রাখা উচিত নয়। এটা কোনো চরিত্র বিশ্লেষনের ব্যাপার না, শুধু একটা সম্পর্ক জোড়ার লাভ এবং ক্ষতির প্রশ্ন। ঠিক সেভাবে যেভাবে মানুষের অতীতের প্রশ্ন উঠে, তবে তাকে এই ব্যাপারটা বুঝতেই হবে আজকে সম্পন্ন হওয়া ভুল কাজ, আগামি দিন উম্মোচিত হবে সেটাই নিশ্চিত। অপরাধ কোনো ফল দেয় না, আর যদিও দেয়, সেই ফল একটা বিষাক্ত ফল।

তাই জীবিনকে তর্ক, জ্ঞান আর বিবেকের মাধ্যমেই চালানো উচিত, অন্ধ বিশ্বাসে না।

৪/৪/২০২১-বিকাল ৫টা, ছোটভাবী মারা গেলেন

বিকেল ৩ টায় মিটুল আমাকে ফোন করে জানালো যে, ছোট ভাবী হটাত করে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন এবং এইমাত্র ওনাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। মাত্র ২ ঘন্টার ব্যবধানে আরেকটা খবর পেলাম যে, ছোট ভাবী ক্লিনিক্যালি ডেড। ঠিক সাড়ে ৫ টায় জানলাম, ছোট ভাবী আর নাই।

বড্ড আফসোস হচ্ছিলো ছোট ভাবীর জন্য। মানুষটা যতোটা না চালাক ছিলো, তার থেকে বেশী ছিলো সহজ এবং বোকা। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান ছিলো না যা তিনি প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে এমন কিছু হতে পারতেন যা একটা মহিলার জীবনের জন্য অপুরনীয় পাওয়া। তার সবচেয়ে বড় যে গুনটা আমি দেখেছি, তিনি যাকে পছন্দ করতেন, তার ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন নাই। সে একেবারে অনেক ঊর্ধে রাখেন তাঁকে।

ছোট ভাবীর সাথে আমার অনেক ভালো একটা সম্পর্ক ছিলো যা হয়তো এই পৃথিবীর অনেক মানুষের ছিলো অজানা। তিনি এখন আর এই দুনিয়ায় নাই, তাই তাঁকে আমি আমার অন্তর থেকে ভালোবেসে মন থেকে জান্নাতের সুপারিশ করে বিদায় দিলাম। যদি কখনো আমার কারনে আপনার কোনো বিচারের সুম্মুক্ষিন হতে হয়, আমি সেদিন কোনো প্রশ্ন ছাড়া এই সুপারিশ হয়তো করবো মহান আল্লাহর কাছে-তাকে মুক্তি দিন। একটা নিস্তব্ধ অপরাধ অথবা  যাইই বলি সেটা তো হয়েছেই।

০৩/০৪/২০২১-কি এটা?

ইহা এমন একটা জিনিষ যাহা স্বাভাবিক চোখে দেখা যায় না। প্রতিটি জীব এটাকে এমনভাবে লুকাইয়া রাখে যাতে সহজেই কারো চোখে না পড়ে। তারপরেও অনেকে ফাক ফোকর দিয়া এটাকে দেখার চেষ্টা করে। এটা যখন ছোট অবস্থায় থাকে, তখন এর রুপ একরকম, আবার একটু বয়স হলে এর রুপ একটু ভিন্ন। এটা যখন পরিপক্ক হয়, এটা ছোট বেলার মতো আর মনে হয় না। শিশুকালে এর প্রতি কারোই তেমন কোনো প্রিতি নাই, সময়ের পরিবর্তনে এর চাহিদা জনে জনে বৃদ্ধি পায়। এর মুখ আছে, পাতা আছে, ঢালা পালা না থাকলেও চারিদিকে প্রায়ই ঘন জংগলের মতো আগাছা গজাইয়া উঠে। সময়ে সময়ে এটা রক্ষনাবেক্ষন না করলে এর চারিদিক এক সময় আগাছায় ভরে উঠে, আর চারিদিকে দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটা যখন অন্যের কাছে স্থায়ীভাবে বিক্রি করে দেয়া হয়, তখন নিজের সম্পদ হলেও ক্রেতাই হন এর প্রকৃত মালিক। তখন এই ক্রেতা ছাড়া আসল মালিক এটাকে আর কারো কাছে হস্তান্তর করতে পারেন না। এটাকে রক্ষনাবেক্ষন করার জন্য খুব বেশী কিছু লাগে না।

কেউ কেউ আবার এর মধ্যে বীজ লাগিয়ে রাখে। ফল সব সময় হবে এমন না। পরিপক্ক হলে এর ভিতরেই অংকুর হয়, প্রায় বছর খানেক পরে এর ফলাফল বুঝা যায়। চাষের সময় অনেকেই এর প্রতি যত্নবান হলেও এক সময় চাষের পরে আর কোনো রক্ষনাবেক্ষন করেন না। তবে যার সম্পদ সে মাঝে মাঝে অন্যত্র লিজ দিয়ে দেন। লিজের ব্যাপারটা কখনোই গ্রহনযোগ্য নয়, তারপরেও অনেকে ভালো খদ্দর পেলে লিজ দিয়ে দেন।

নতুন লিজ নেওয়ার সময় ঘন ঘন হালচাষ হয়, অতিরিক্ত হাল চাষের কারনে অনেক সময় সার বেশী পড়ে যায়। ক্ষতিও হয় কিন্তু দ্রুত আবার আগের জায়গায় এটা ফিরে আসে। এটার আরেকটা গুন হলো, ফল যখন আসে, মুরগীর ডিম যেমন তার ভিতর থেকে মুরগী বের করে দেয়, তেমনি এর ফলও এর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে। এই ফল সব সময় নাজুক। যদি সঠিক লিজের মাধ্যমে হয়, তাহলে ফলের যত্ন মালিক ভালো করে নেয়, আর যদি অবৈধ লিজিং এর কারনে মালিক ফসল ফলায়, সে নিজেও আর ফসল ঘরে নিতে চায় না। এই ধরনের ফসল অনেকে আবার বছরের পর চাষ করেও পায় না, আবার অনেকে কোকিল ছানার মতো কাকের বাসায় অনায়াসেই পয়দা করে ফেলে যায়। এটা মারাত্তক খারাপ একটা চাষ।

যে ক্ষেতে এটা ফলানো হয়, তখন এই ক্ষেতেরও অনেক ক্ষতি হয়।

এটা সব প্রানীর বেলায় এক রকম না।

০২/০৪/২০২১-কামুক সিরিয়াল কিলার

একটা ইংরেজী মুভি দেখছিলাম। মুভিটা ছিলো একটা কামুক সিরিয়াল কিলারের উপর। আমি এই জাতীয় মুভি খুব একটা দেখি না। কিন্তু ট্রেইল দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলাম, পরে পুরু ছবিটাই দেখলাম। ছবিটা দেখে কিছু লিখতে ইচ্ছে করলো। তাঁরই উপর ভিত্তি করে আজকে আমার এই লেখাটা।

কামুক সিরিয়াল কিলারের লোকগুলি এক ধরনের পাগল, খানিকটা অবসেসড। এদেরকে কোনোভাবেই এবনরম্যাল ভাবা যায় না। এরা সমাজে সব খানে খুব স্বাভাবিক গতিতে এবং নীতিতে সবার সাথে বসবাস করে। ওদের দেখে পাশের কোনো ব্যক্তি কখনোই বুঝতে পারবে না, তার মনের ভিতরে কি চলছে আর তার পরবর্তী মুহুর্তে কি পরিকল্পনা। এরা সারাক্ষন ওদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্যই বাচে। এদের নির্দিষ্ট একটা প্যাটার্ন থাকে। খুব যত্ন করে এরা নিখুত কাজ করে। ওদের পরিকল্পনায় একটা ধরন হচ্ছে, এরা সব সময় চায় প্রোটেক্টেড সাইট, যেমন নিরাপদ কিলিং জোন, কিংবা সেক্সের সময় নিরাপদ থাকার নিমিত্তে কন্ডোম ব্যবহার। ওদের টার্গেটেও বিশেষ ধরনের প্যাটার্ন থাকে। ওরা একটা নির্দিষ্ট প্রোফাইলের টার্গেটকে বেছে নেয়। ওদের টার্গেট করারও একটা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে। এইসব বৈশিষ্টগুলি কেউ খুব সুক্ষভাবে পর্যালোচনা না করলে তাদের এবনরমালিটিগুলি চোখেই পড়ে না। তাই সিরিয়াল কিলারদের ব্যাপারে ছোট একটা লিড থাকলেও তা গুরুত্তের সাথে বিবেচনা  করা উচিত।  

এই সিরিয়াল কিলাররা বা কামুক সিরিয়াল কিলাররা কিছু কিছু ড্রাগের ব্যাপারে খুব নলেজে রাখে। যেটা ওরা সব টার্গেটের উপর ইউজ করে। আর বারবার ওরা একই ড্রাগস ইউজ করে। খুব কদাচিত তারা তাদের এই ড্রাগস পরিবর্তন করে। আবার এই ড্রাগসটা পরিবর্তনের নিমিত্তে কিছু নীতিও ফলো করে, যেমন, যখন পরিচিত ড্রাগসটা আর তার কাছে থাকে না বা পাওয়া যায় না বা তার হাতে টার্গেটকে খতম করার সময় খুব কম থাকে, তখন ঐ একই কাজ করে এমন কিছু নতুন ড্রাগস সে ব্যবহার করে।  

সিরিয়াল কিলাররা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় চিন্তা করে। তাই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ওরা টার্গেটকে খতম করে দেয় বটে কিন্তু এটাও দেখা গেছে যে, সবসময় এরা সব টার্গেটকে মেরে ফেলে না। যদি সরিয়াল কিলার অতিরিক্ত কামুক হয়, তাহলে খুনটা হয় শুধু ওর বেচে যাওয়ার জন্য একটা পন্থা। কিন্তু এই কামুক সিরিয়াল কিলারের অব্জেক্টিভ থাকে শুধু সেক্স। এটা তো সার্বোজনীন যে, সেক্সের চাহিদা একটা বদ অভ্যাস, বিশেষ করে যখন অনঅনুমোদিত সেক্সের উৎস হয়। আর এটাই ওদের অবসেসন। এটা একটা লাগামহীন ঘোড়ার মত। কিন্তু এখানেই ওদের চাহিদাটা মিটে না। ইনভেষ্টিগেশনকে বিভ্রান্ত করার জন্যেও ওদের একটা প্যাটার্ন থাকে। ওরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আশেপাশের লোকগুলিকেও বিভ্রান্ত করার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এই সিরিয়াল কিলারকে কোথায় কোথায় খুজবে সেটা তারা আগে থেকেই জানে বা সেই মোতাবেক পরিকল্পনা করে রাখে।

এটা একটা নিশ্চিত যে, এরা নির্দিষ্ট কোনো পরিচয় নিয়ে থাকে না। তারা নাম বদল করে, তারা পোষাক বদল করে, তারা পেশা বদল করে। এরা একটা স্প্লিট পারসোনালিটি। এরা সব সময় আইডেন্টিটি লুকিয়ে রাখে প্রতিটি টার্গেটের কাছে। ফলে কোনো একটা টার্গেট যদি বেচেও যায়, সেই টার্গেটের বর্ননা দিয়ে খুব সহজেই এই সব কামুক সিরিয়াল কিলারের পর্যন্ত সহজে পৌঁছানো যায় না।

ওরা যখন সেক্স করে, ওরা এই জন্য কন্ডোম পরে না যে, পুলিশ তার সিমেন ট্রেস করতে পারে। সে আসলে সচেতন থাকে যাতে কোনো ছোয়াচে রোগে সে না ভোগে। এরা পরিষ্কার থাকার একটা অবসেসন থাকে। এরা ততোটাই নিজের খেয়াল রাখে যতোটা ভিক্টিমের। ওরা ক্রাইম সিনে কোনো প্রমান রাখতে চায় না বরং কিছু প্রমান ইচ্ছে করে রেখে যায় যা সবাইকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

সিরিয়াল কিলাররা পরিকল্পনাটা এমন নিখুতভাবে করার চেষ্টা করে যেখানে কোনদিন, কোন জায়গায়, বা কখন কাজটা করবে তার পুরু পরিকল্পনাটা মাথায় রাখে। এমন কি ওরা যে জায়গায় ঘটনাটা ঘটাবে, সে পুরু এলাকাটা ভালো করে স্টাডি করে। মজার ব্যাপার হলো, ওরা একই শহরে বা এলাকায় একটার বেশী টার্গেট চয়েজ করে না। বিভিন্ন শহর বা এলাকায় তারা এটা করে থাকে। ওদের প্রমান যা ভিক্টিমের পাশে রাখতে হবে এসব দ্রব্যাদি সংগ্রহের জন্য ওরা পরিকল্পনা করে চুরিও করে। ওরা যদি চুরিও করে, সেখানেও একটা প্যাটার্ন ইউজ করে। সে আলাদা আলাদা জায়গায় চুরি করে। ফলে তারা শুধু খুন করার জন্যই ট্রাভেল করে না। এরা চুরি করার জন্যেও ট্রাভেল করে। এরা অনেক দূর দূর পর্যন্ত যায় এই চুরির উদ্দেশ্যে। চুরি করার টার্গেটকেও এরা অনেক জেনে বুঝে বাছাই করে। যাদেরকে সে চুরি করবে তাদের সাথে ওরা ভাব করে, বন্ধুত্ব করে, তারপর চুরি করে। তারা এটা নিশ্চিত করে যে, ঐ সব লোকেরা যাদের কাছে কিছু চুরি করবে, ওইসব লোকগুলি ঐ এলাকায় যাচ্ছে না বা থাকে না যেখানে সে কাউকে খুন করবে বা ভিক্টিম চয়েজ করবে। এখানে আরো একটা মজার ব্যাপার হলো যে, এই সিরিয়াল কিলাররা সবসময় ভিক্টিমের সব কিছু চুরি করে না। তারা সেইসব জিনিষগুলিই ভিক্টমের কাছ থেকে চুরি করে যার দ্বারা সে ডিজিটালী ধরা পড়বে না। যেমন ফোন, ল্যাপটপ, কিংবা এই জাতীয় জিনিষ তারা সাথে করে নিয়ে যায় না। অর্থাৎ ট্রেস হতে পারে এমন সব জিনিষ সে সাথে করে নিয়ে যায় না।

তারা টার্গেট সিলেক্ট করার সময় এমনসব টার্গেট সিলেক্ট করে যাদের আসলে খুব বেশী দূর পর্যন্ত যাওয়ার সম্ভাবনা নাই কিংবা একাই থাকে বা ছিন্নমুল মানুষ অথবা পরিবার থেকে আলাদা থাকে। কামুক সিরিয়ালদের চরিত্রের একটা লক্ষনীয় ব্যাপার হলো, তাদের ব্যবহারে, আচার আচরনে এমন একটা প্রকাশ থাকে যেখানে মহিলারা ওর সাথে কম্ফোর্টেবল ফিল করায়। বা ফাসায়। তারপরেও হয়তো অনেক মহিলারা তাদের নিজস্ব চারিত্রিক কারনে অন্তত সেক্সুয়াল এফেয়ার্স থেকে দূরে থাকে। আবার কেউ কেউ সহজেই এসব সিরিয়াল কামুক দের কাছে সহজে ধরা দেয়। ঘটনার বিবরনে দেখা যায় যে, এই কামুক সিরিয়াল কিলাররা ওদের সেক্সুয়াল ডিজায়ারটা সরাসরি বলতে পারে না বা ইঙ্গিত না বুঝার কারনে হয়তো অনেক মহিলারা চট করে সপর্পন করে না। এই সব মহিলাদের জন্যই তারা বেশীরভাগ সময়ে ড্রাগস ইউজ করে, সেক্স করে তারপর মেরে ফেলে।

এদের সেক্সুয়াল নিড গুলি নরম্যাল নয়। এরা রেড লাইট এরিয়ায় যায় কারন রেড লাইট এরিয়ায় টাকার বিনিময়েই ওরা সেক্সটা পেয়ে যায়। ফলে ওদের ওখানে ওরা কাউকে খুন করার মানসিকতাই দেখায় না। এরা রোল প্লে করায়, এর মানে এমন হয় যে, এমন কিছু মহিলার প্রতি আসক্ত যাদের জন্য ওরা খুব ছটফট করে, কিন্তু হাতের নাগালের বাইরে। তাই ওরা ওইসব জায়গায় গিয়ে ওইসব আসক্তিওয়ালা মহিলার রোল প্লে করায় যেনো সেই সেক্স ওয়ার্কারই তার আসক্তির সেই মহিলা। এসব কামুক সিরিয়াল কিলাররা ঐসব রোল প্লে করা মহিলাদেরকে সেই আসক্তওয়ালা মহিলার নামেই মাঝে মাঝে সম্মোধন করে। ওদের ফ্যান্টাসিগুলি অবসেসড মাইন্ডে সেক্স ওয়ার্কারদের দিয়ে পুরন করায়।

এসব কামুক সিরিয়াল কিলাররা দেখতে অনেক ভয়ংকর হয় না। এরা মার্জিত, পরিশোধিত এবং ভদ্রভাবে চলাফেরা করে। যাতে মহিলারা দেখে ভয় পায় না বরং কাছে আসে। ধীরে ধীরে সে অনেকের মধ্যে হয়তো একটা দুইটা মহিলাকে টার্গেট করে। একই জায়গায় আবার এরা একটার বেশী মহিলাকে টার্গেট করে না।

কিছু মহিলাদেরকে ওরা মেরে ফেলে আর কিছু মহিলাদেরকে ওরা ছেড়ে দেয়। কেনো? গবেষনায় দেখা গেছে যে, তারা ঐসব মহিলাদেরকেই মেরে ফেলে যারা সিরিয়াল কিলারের কাছে সারেন্ডার করে না। হয়তো সেক্সের বদলে ওরা একটা সম্পর্ক চায়। কিন্তু এরা কোনো সম্পর্কে জড়াতেই চায় না। যদিও জড়ায়, খুব বেশীদিন একসাথে থাকে না।  ওরা কোনো ইমোশনাল রিলেশন চায়ই না। আর এর প্রধান কারন হলো, একবার শারীরিক সম্পর্ক হয়ে গেলে ঐ মহিলা আর তাদের কাছে কোনো গুরুত্তই রাখে না। সেটা তাদের কাছে একেবারেই বর্জ।

মাঝে মাঝে আবার এসব সিরিয়াল কিলাররা কোনো কোনো ভিক্টিমকে সেক্স না করেই মেরে ফেলে। এর ও একটা কারন আছে। এরা মহিলাদেরকে একটা জেতার বস্তু মনে করে। যদি একবার জিতে যায়, তাহলে আরো এগিয়ে যায়। আর ঠিক এ কারনেই তারা সেক্স ওয়ার্কারদেরকে খুন করে না। কারন টাকা দিয়েই তারা তাদেরকে পেয়ে যায়। কোনো চেলেঞ্জ থাকে না। কিন্তু যাদেরকে টাকা দিয়েও পায় না, এক সময় তারাই হয়ে উঠে এসব কামুক সিরিয়াল কিলারের প্রধান লক্ষ্যবস্তু যেখানে আর সেক্স নয়, ঐ মহিলাদের উপর জিতবার নেশা।

এসব কামুক সিরিয়াল কিলারদেরকে যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ট্রেক করে, আসলে তখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এইসব সিরিয়াল কিলারদের এই উপরোক্ত ভাবনাগুলিকে ট্রেক করে ইনভেষ্টিগেশনে আগায়। অনেক কঠিন একতা কাজ। শেষ মেষ যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এদের কাউকে ধরতেও পারে, ওরা সব কিছু অকপটে স্বীকার করে। এদের মরবার বা শাস্তির ভয় অনেক কম।

এই পৃথিবীতে ঈশ্বর কত প্রকারের মানুষ যে সৃষ্টি করেছেন তার কোনো ইয়াত্তা নাই। আমরা মানুষ রুপী হায়েনাদের সাথেও বাস করি, আবার ঈশ্বরের ভয়ে প্রকম্পিত অনেক ভালো মানুষের পাশেও বাস করি। কার মনে কি পরিকল্পনা রয়েছে, তা আমাদের কখনোই জানা সম্ভব নয়। তাই, আমাদের উচিত, প্রতিটি মুহুর্তে কোন কিছুই উপেক্ষা না করা আর সেটা যতো ছোতই হোক বা তুচ্ছ। মানুষের থেকে ভয়ংকর কোনো প্রানি ঈশ্বর তৈরী করেন নাই।

১/৪/২০২১-সত্য মিথ্যা ষড়যন্ত্র আর প্রতারনা

কথায় বলে, মিথ্যাও কখনো কখনো সত্যি হয়ে যায়। কোন একটা মিথ্যাকে হাজার বার বললে নাকি মিথ্যাটা সত্য হয়ে যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ একটা মিথ্যা বারবার এতোবার বলে যে, মিথ্যেটাই সত্যি হয়ে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে এমন একটা মিথ্যে যা সত্য লুকুনোর জন্য বলা হচ্ছে। কিন্তু কথাটা কোনো কালেই সত্য নয়। যদিও সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা সবসময় সহজ হয় না। মিথ্যা হচ্ছে এক প্রকার ছলনা, মিথ্যে যে বলে সে নিজের সাথেই ছলনা করে থাকে। মিথ্যে হলো সেই জাল যা একটা মানুষ তার নিজের অজান্তেই সে নিজের জন্য বিছায়। কিন্তু সে ভাবে যে, সে সামনের মানুষটাকে ঠকাচ্ছে, বা বোকা বানাচ্ছে। যখন মানুস নিজের কিছু লুকায় তখনই তার সতর্ক হওয়া উচিত। কারন যখন সত্যির সীমানা পার হয়ে যায়, তখনই মিথ্যার জাল বিছানো হয়। সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না। আর কোনো  কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব। মেকী চোখের জল ফেলেও সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। একটা সময় আসে, মিথ্যে চোখের জল আর কাজে লাগে না। সে সময় যেটা হয় সেতা হচ্ছে, মিথ্যা প্রকাশের ব্যক্তিকে মানুষ গিরগিটির চরিত্রের মতো বিশ্লেষন করে, বিচার করে। গিরগিটির উপর কেউ দয়া দেখায় না। সত্য লুকিয়ে মিথ্যাকে স্থাপন করার চেষ্টায় কারো বিশ্বাসের খুন যখন হয়, তখন শারীরিক খুনের আর কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

মিথ্যা একটা প্রতারনাও। আর এই প্রতারনা- এটা মানুষের প্রকৃতি। কিন্তু এটা একজন মানুষ একা করতে পারে না। এই প্রতারনার সাথে অনেক কিছু জড়িয়ে থাকে, থাকে পূর্ব প্রস্তুতি, থাকে দলবদ্ধ একাত্ততা আর এক যোগে কার্যসম্পাদনের হিসাব নিকাশ। কোনো কোনো সময় এই প্রতারনার নিমিত্তে কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই নাটক তৈরী করা হয়। যখন এই কৃত্রিম ভরসার স্থান উম্মোচিত হয়ে চোখের সামনে বড্ড ভয়ংকর এবং আসল চেহাড়াটা বেরিয়ে আসে, তখন নিজের কাছে নিজকে বড় বোকা মনে হয়। কারন মিথ্যে ভরসায় ভর করে কেউ যখন নিজের ইচ্ছায় সেই জায়গায় চলে আসে যেখান থেকে আর কেউ ফিরে না, তখন, বাকী ইতিহাস শুধু নীরব ইতিহাসই হয়ে থাকে। কখনো তা বাইরে আসে না।

এসব পরিস্থিতি আমাদের জীবনে প্রায়ই ঘটে থাকে। আমরা সত্য আর মিথ্যাকে অনেক সময় আলাদা করতে পারি না। ভিত্তিহীন আর অকারন গুরুত্তহীন কথা শুনবার সময়ে যদি নিজের বিবেচনায় সেটা বুঝে ফেলা যায়, তাহলে বুঝতে হবে তারা একটা গুনের অধিকারী তাদেরকে সতর্ক করে দেয় আর নিজের চেতনাকে বাচিয়ে দেয়। কিন্তু যদি মিথ্যের বোঝা বুদ্ধিমত্তার উপর চেপে বসে তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে চোরাবালির বাকে আটকে পড়ে। সেখান থেকে সময় মত আর বেরিয়ে আসতে পারে না। তখন আফসোস ছাড়া আর কিছুই থাকে না। ঠিক এসময়েই ভোক্তভোগী মনে করে এটা তার জন্য ছিলো একটা ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্র প্রতারনার চাইতেও ভয়াবহ আঘাত।

ষড়যন্ত্র যখন শুরু হয়, তখন এর ডান দিক, বাম দিক, সামনে পিছে সব জায়গা থেকেই কিছুটা নোংড়া গন্ধ আসতে থাকে। যারা এই দূর্গন্ধ সম্পর্কে একটু খেয়াল করেন তারা হয়তো ষড়যন্ত্রের আভাষটা বুঝতে পারেন। অনেক সময় এই গন্ধ কোনো বড় নাটকের ছোট অংশের আভাষ দেয়। অনেক সময় এই ষড়যন্ত্র হয় লোভের, ক্ষিদের, রাজনীতির অথবা অন্য কিছু। তখন দাবার গুটির মতো চেকমেটকেও চেকমেট করা হয়। এখানে তখন ইদুর বিড়ালের খেলাও বলা চলে। যদিও এই ইদূর বিডালের খেলায় অন্য রাঘব জানোয়ারগনও জড়িয়ে থাকে। ষড় যন্ত্রের এই অধ্যায়ে সবচেয়ে বেশী নজর থাকা উচিত নিজের নিরাপত্তার উপর। কারন, যখন কেউ প্রথমবার আঘাত করে, তখন সে অনেক পরে বুঝতে পারে যে, যাকে আঘাত করা হয়েছিলো, পালটা আঘাতটা সেও করবে। যন্ত্রনার বদলায় যন্ত্রনা, আঘাতের বদলায় আঘাত। এতদূর অবধি যদি কেউ না সতে চায়, তাহলে তাকে সবচেয়ে বেশী সতর্ক থাকতে হবে সেই সব জিনিশ থেকে যার নাম লুজ টক, কিংবা ভিত্তিহীন আড্ডার রাজত্ব। লুজ টক, গল্প সল্প, বা গুজব এসব চলতেই থাকবে, কিন্তু যে শুনে তাকে তার বুদ্ধি আর বিবেচনার মাধ্যমে সেই সব কথা এক কান দিয়ে শুনে অপর কান দিয়ে বের করে ফেলাই হচ্ছে সমাধান।

৩০/০৩/২০২১-মানুষের মন

মানুষের মন দূর অনন্ত ছড়ানো এক অদ্ভুত দুনিয়া। এই মন কখনো কখনো আমাদেরকে ভুল পথে চালিত করে, ভুলকে ঠিক আর ঠিক কে ভুল বলে দেখায়। মনে লালিত বন্ধু আর বাস্তবে চোখের সামনের বন্ধুকে কখনো কখনো সে প্রতিসরনের অংকের মতো প্রতিফলন করে। চোখ যা দেখে মন তা দেখে না, মন যা দেখাতে চায়, চোখ তাকে চিনতে পারে না। আমরা প্রতিনিয়ত বা কখনো কখনো এ কারনে দ্বিমুখী স্বত্বায় দোদুল্যমানে ভাসি। নিজের ভিতরে প্যারাডিম শিফট তৈরী হয়। আর এই প্যারাডিম শিফটের প্রভাব থেকে মন যখন বিলুপ্ত হয়, তখন চোখ এবং মন দুটুই ব্যার্থতার গ্লানী নিয়ে অসহায় হয়ে আমাদের অস্তিত্তের সামনে এসে দাঁড়ায় এই কারনে যে, এতোদিন যা দেখে এসেছি, আর এখন যা বুঝে পাচ্ছি তার মধ্যে এক বিস্তর ফারাক। আমরা তখন নিজেরা সত্যিই বেসামাল হয়ে উঠি। অনেক “যদি”র মাঝে আটকে পড়ি। এই দোদুল্যমান উঠা-নামা ভারসাম্যের দন্ডে মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া একটা দূর্ঘটনা তার নিজের জীবনের সাথে সাথে বাকী সবার জীবন পালটে দেয়, সপ্ন তছনছ করে দেয়। কোনো বেপরোয়া ঘটনায় অন্য সবার জীবন বিধ্বস্ত হয়ে যায়। মানুষ চরম অসহায় হয়ে যায়। গতকাল যে সময়টায় আনন্দ ছিল, তারপরের দিন সেই সময়টায় মানুষ চোখের জলে ভাসতে থাকে। সেই জলে ভাসতে থাকা কঠিন সময়টা পার করতে করতে আরো অনেক কঠিন পথ সামনে এসে হাজির হয়। তখন শুধু মনে হয় কি যেনো ঠিক নাই, কোথায় যেনো ভুল হয়েছে। তখন কেউ আর কোনো উপায় খুজে দিতে চায়ও না, পারেও না। ব্যাপারটা তখন এমন দাঁড়ায় যে, যে বাড়িতে সবাই একজনকে মেরে ফেলতে চায়, সে বাড়িতে কাউকেই কিছু বলে লাভ হয়না। যে সমাজে সবাই অনৈতিক কাজে অভ্যস্থ, সে সমাজে নীতির কথা বলে কোনো লাভ হয় না। যে দেশ আকুন্ঠ বর্বরতায় নিমজ্জিত, সেখানে বিচার বিভাগ, আইন শৃঙ্খলা বাহিনি কিংবা উপদেশদাতা কেহই দূর্নীতির বাইরে গিয়ে কোনো সঠিক কাজ করার উপায় থাকে না। কেউ তখন কারো কথা শুনে না। কোনো আওয়াজও বাইরে যায় না। ঘুরে ঘুরে সেই আওয়াজ আবার নিজের কাছেই ফিরে আসে। একে প্রতিধ্বনি বলে না, একে বলে মৃত্যুর অগ্রিম বার্তা।

এমন অবস্থায় আমাদের জ্ঞান আর বিবেক আমাদের সবচেয়ে কাছের সংগী। তারা আমাদের এটাই পরামর্শ যে, মনের কথা শুনুন কিন্তু মাথার রাস্তায় চলুন। তা না হলে খারাপ পরিস্থিতি অনির্বার্য।

২৭/০৩/২০২১-সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের সাথে একদিন

যেদিন ষ্টাফ কলেজ করতে আসি সেই ১৯৯৭ সালে মীরপুরে, তখন আমরা প্রায় ৯০% অফিসারই মেজর পদবীর। সেনাবাহুনীর কিছু কিছু কোর্ষ আছে যেখানে জুনিয়ার আর সিনিয়ার মিলে কোর্ষ মেট হয়ে যায়। এই ষ্টাফ কলেজ সে রকমের একটা কোর্ষ। জেনারেল আজিজ আমাদের সাথে ২৩ ডি এস সি এস সি (ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কোর্ষ) করেন। খুবই সাদামাতা ক্যালিভারের একজন অফিসার। এটা বল্বো না যে, গননায় নেয়া যাবে না, কারন যারাই ষ্টাফ কলেজ করতে আসেন, তারা অনেক মেধার পরীক্ষা দিয়েই আসেন। কিন্তু এই মেধাবী অফিসারদের মধ্যে যখন তুলনা করা হয়, তখন সাদামাটা বলা চলে। আমরা একই সিন্ডিকেটে ছিলাম।

কালেভদ্রে আমরা যে কোনো কারনেই আর আর্মিতে থাকতে পারি নাই। এতার প্রধান কারন বাংলাদেশের রাজনীতি। এই অপরাজনীতি দেশের অনেক তুখুর মেধাবী ছেলেদেরকে দেশের অনেক কাজে লাগায় নি, লাগাতে দেয়া হয়নি। যারা বেশী তোষামোদি করতে পেরেছে, তারা হয়তো রয়ে গেছেন, আবার যারা মেনে নিতে পারেন নাই, তারা অকালেই সেচ্ছায় চলে গেছেন, আবার অনেকে বের হয়ে কি করবেন এই ভেবের যাতনাটা সহ্য করেই দাতে দাত লাগিয়ে রয়ে যায়।

১৯/০৩/২০২১-প্রত্যেকের মাথায় অসংখ্য চিন্তাভাবনা ঘুরে

প্রত্যেকের মাথায় অসংখ্য চিন্তাভাবনা ঘুরে। কেউ খুশী থাকে, কেউ অখুসী, কেউ হুসে থাকে, আবার কেউ বেহুসে, কেউ সন্তুষ্ট আবার কেউ অসন্তুষ্ট। কারো মুখ দেখে কার মাথায় কি চলছে তা কি কখনো জানা সম্ভব? কার মনে কি চলছে, কিংবা তার পরের মূহুর্তে সে কি করতে চলছে, এটা কি কেউ এতো সহজে বুঝতে পারে? কে কি ভাবছে, কি বুঝছে, তার প্রতিক্রিয়াই বা কি হবে, এটা কি আগে থেকে জানা সম্ভব? আমাদের সামনে নিসচুপ ভাবে ঘুরে ফেরা বা বসে থাকা সেই অতি সাধারন মানুষটার মাথায় কি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, সে কি চাচ্ছে, তার মধ্যে কতটা ঘৃণা, কতোটা রাগ, কতটা আবেগ ইত্যাদি তার অনুমান কি কেউ করতে পারে? আসলেই পারে না। আজ পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাষের মতো মানুষের মনের পূর্বাভাষ কখনোই কেউ দিতে পারে না। সিসিটিভি অথবা সার্টিফাইড সিকিউরিটি এজেন্সীগুলি শুধু মানুষের কাজকর্মের উপর নজর রাখতে পারে কিন্তু মানুষের মনের উপর বা পটেশিয়াল অপরাধীর মনের পরিকল্পনার উপর কোনো কিছু রেকর্ড করতে পারে না। ফলে, অনেক অপরাধ খুব সাধারন ভাবে ঘটে যায়, আর খুব সাধারনভাবেই সবার অলক্ষ্যে অপরাধী বেরিয়েও যায়। কখনো কখনো সেই অপরাধী আবার অনুশোচনাকারীদের মধ্যেও এমনভাবে ঢোকে যায় যে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিকারের দুক্ষে ভারাক্রান্ত মানুষটার ও জানতে পারে না, খুনী বা অপরাধী ঠিক তার থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে। তবে যেটাই হোক না কেনো, অপরাধ কোনো সমস্যার সমাধান নয়। একটা রোগ, প্রত্যেক স্টেজে এটা একটা সিম টপ দেখায়, তেমনি একটা অপরাধ সং ঘটিত হবার আগেও সতর্কবার্তা শোনা যায়। এজন্য, প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের চারপাশে কি ঘটছে, কিভাবে ঘটছে, কেনো ঘটছে এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বুঝতে না পারলেও মনের ভিতরে উকি মারা কোনো অযাচিত প্রশ্নকেও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। তল্লাসীতে হয়তো নিজেরা অনেক কিছু খুজে পায় না কারন তল্লাসির সফর লম্বাই হয়। সেই লম্বা সফরের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হয়তো আমাদের নাই কিন্তু মানুষের মন যখন কিছু আচ করে, সেটাই হচ্ছে তল্লাশীর প্রথম ধাপ। কোনো আওয়াজকেই হেলাফেলা করবেন না। ব্ল্যাক মেইল, সাধুবাদ, অতিরিক্ত লয়ালটি, কিংবা হোচট খাওয়ার মতো কোনো ইংগিত, কোনো কিছুই ঝেড়ে ফেলে দেয়া উচিত নয়। সবচেয়ে জরুরী বিষয় মনে রাখা উচিত যে, ব্ল্যাক মেইলের মতো কোনো ইংগিত বা এর আওয়াজ পাওয়ার সাথে সাথেই যারা বড়, সিনিয়র, তাদের সাথে এসব ব্যাপারগুলি পরামর্শ করা উচিত। হোক সেটা কোনো কারনে অথবা নিজের দোষেই। তারপরেও বড় ধরনের বিপদ থেকে হয়তো নিজে এবং আশেপাশের সবাই বেচে যেতে পারেন।

এক তরফা ভালোবাসার মতো এক তরফা শত্রুতাও হয়। আর এই শত্রুতা থাকে খুব গোপনে। এখানে চুপিসারে শত্রুকে মেরে ফেলা হয়। প্রতিশোধের আগুন কয়েক প্রজন্ম জলতে থাকে। এই জলন্ত অগ্নিশিখা মানুষের বংশ পরম্পরায় কখনো ফুলের উপর দিয়ে আবার কখনো ছুড়ির উপর দিয়ে যায়। তাই, সাবধানতা, নিজের নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা সর্বত্র এমন একটা হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে যেখানে অনেক বড় অঘটন থেকে মানুষ বেচে যায়। তারপরেও নিজের অজান্তে অপরাধ তো হয়েই থাকে। 

এসব অপরাধের পিছনে থাকে অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা যা মানুষ প্রায়ই সিরিয়াসলী ভাবে না কিন্তু সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা অনেক সময় খুব শক্ত ইংগিত দেয় যা হয়তো আমাদের সাধারন মস্তিষ্ক আমলেই নেয় না। আমাদের মস্তিষ্ক আর তাদের তৈরী হওয়া চিন্তাভাবনা একদিক দিয়ে আমাদের এভাবেই ভাগ্য লিখে দেয় যেখানে কেউ হুসে থাকে, আবার কেউ বেহুসে থেকে সারাজীবন কাতরাতে থাকে।

অপরাধী ভাবে যে, সময়ের সাথে সাথে অপরাধের ভার লঘু হয়ে আসে এবং হয়তো এক সময় সেটা একেবারেই হালকা থেকে হালকা হতে হতে আর এটা কোনো অপরাধের মধ্যেই থাকে না। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় যে,  পারফেক্ট ক্রাইম বলতে কিছু নাই। পারফেক্ট ক্রাইম তখনি হয় যখন ক্রাইমের ব্যাপারে সঠিক তদন্ত না।

১৮/০৩/২০২১-করাপশন বা দূর্নীতিঃ

দূর্নীতি কোনো একজনের কাজ নয়। দূর্নীতি আসলে একটি গোষ্টীর কাজ। আর নীচের লেবেলের মানুষগুলিই এর স্বীকার। অথচ এদের থেকে আবার আকাশ ছোয়ার আশা করা হয়। এরা যে টাকা পায়, তা অনেক ফিল্টার হয়ে নীচে নামে। আর দূর্নীতির মূল ঐ ছাকনীতেই থাকে। ছাকনীই যদি খারাপ হয়, দেশ থেকে কখনোই দূর্নীতি নির্মুল করা সম্ভব না। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ সবাইকে সমান করে ভাগ করে দিলেও দেখা যাবে, দূর্নীতির কারনে হয়তো কারো না কারো কাছে আরেকজনের থেকে বেশী সম্পদ পাওয়া যাবে।

অনেকে হয়তো বলতে পারেন যে, করাপশন কোনো গুন্ডামী নয় যে কারো গলায় ছুড়ি ধরে, দূর্নীতি কোনো শত্রুর নাম নয় যাকে আমরা হারাতে পারি, করাপশন আমাদের কাছে একটা ভয়ংকর রোগ, যতোদিন মানুষ থাকবে ততোদিন করাপশন থাকবে। কিন্তু আমি এই থিউরীর সাথে একমত হতে পারি না। ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, মানুষ কত ঔষধ বের করেছে, বড় বড় রোগকে হারিয়েছে, করাপশন যদি একটা রোগ হয়, তাহলে কোনো না কোনো রকমের চিকিৎসাও থাকবে। হ্যা, হয়তো কোনো এমুনিশন বা ইঞ্জেকশন তৈরী হবে না কিন্তু একটা সিস্টেম তো তৈরী হবে যে দূর্নীতি হতেই দেবে না।

আমরা যখন আমাদের সন্তানদের জন্য স্কুল খুজি, তখন একটা জিনিষ খুবই গুরুত্ত পায়, আর সেটা হলো সংস্কার, ভ্যালু। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে চাই সৎ শিক্ষা পাক, নীতির মধ্যে থাকুক, দূর্নীতির বাইরে থাকুক। কিন্তু বড় হবার পর এই সংস্কার, ভ্যালুজ, সততা, নীতিগুলি কি আর ব্যবহার করা হয়? ছাত্রজীবন শেষ করার পর যখন মানুষ কর্মিজীবনে প্রবেশ করে, তখন এই সংস্কারের অগ্নি পরীক্ষা হয়ে থাকে। সোজা রাস্তা বানানো আর সোজা রাস্তায় চলা দুটুর পার্থক্য আছে। যদি সততা নিজের কাছে মুল্যবান হয়, তাহলে এই দুইটার মধ্যে পার্থক্য নিজেই বুঝে যায়। সোজা রাস্তায় অনেক কাটা, ক্ষতবিক্ষত হতে হয়, অনেক রক্তপাত হয়।

একজন তরুন শিক্ষিত ছেলে বা মেয়ে অথবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় না শিক্ষিত হয়েও অনেক মানুষ ভালো সপ্ন দেখেন, সুস্থ্য সমাজের সপ্ন দেখেন, তারাও তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটা ভালো পরিবেশ উপহার দিতে চান যাতে আজকের প্রজন্মের পরবর্তী সময়ে তাদের রেখে যাওয়া আদরের প্রজন্ম নিরাপদ থাকে, ভালো থাকে। কিন্তু এমন একটা প্রিথিবী যেখানে সর্বদাই তার নৈতিক মুল্যগুলুকে কেউ না কেউ পিষে ফেলে দিচ্ছে। আর তারা অনেক উচু ক্লাশের মানুষ। তারপরেও অনেক মানুষ সপ্ন দেখে। সপ্ন পুরন করা খুব সহজ নয়, না কখনো সহজ ছিলো। আর ভবিষ্যতেও সহজ হবে না। আসলে ভালো সপ্ন দেখাই তো কঠিন। অথচ এই সপ্নই আমাদেরকে জোড়া লাগিয়ে রাখে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, আমরা এই সপ্ন নিয়েই বাচি। নিজের সপ্নকে কখনো ভাংতে নাই।

সুস্থ্য সমাজ গড়ে তোলতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুস্থ মানসিকতা, দূর্নীতিমুক্ত চিন্তা এবং চেতনা, সাথে এর কঠিন প্রয়োগ। আর এই প্রয়োগকারী হিসাবে প্রথম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ত রাষ্ট্রের নেতার, দেশের কর্নধার, প্রশাসনের। আর এদের মৌলিক ইউনিট হচ্ছে সেসব মানুষগুলি যারা করাপশন করেন না, এবং করাপশনকারীকে তারা নিজেদের প্রানের বিনিময়ে হলেও পাকড়াও করেন। যারা করাপশন করে না, তাদের কাছে টাকা আর সম্পদের কোনো মুল্য থাকে না। তারা শুধু বেচে থাকতে চান মানুষের উপকার করার জন্য। কিন্তু তাদের জন্য প্রতিনিয়ত রয়েছে মৃত্যুফাদ আর হুমকি। যখন কোনো নেতা, বা কোনো বড় মানুষকে প্রানে মেরে ফেলার হুমকী দেয়া হয়, তখন তাকে পুলিশের সুরক্ষা দেয়া হয়। ভালো রাষ্ট্র তা দেয়। 

কেনো?

কারন তারা দেশের সেবক। যে একনিষ্ঠ এবং সৎ মানুষটি দূর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে, তাকে করাপ্টেড লোকেরা প্রানে মেরে ফেলার হুমকী সব সময়ই দিয়ে থাকে। তাই, এইসব ভালো মানুষগুলিকেও পুলিশের সুরক্ষা দেয়া উচিত। তারা দেশের সম্পদ। তাদের প্রান বাচানো দেশেরই উচিত। দেশের জন্য তারা অনেক মুল্যবান সম্পদ। যখন এইসব জ্ঞানী, গুনী, সৎ মানুষগুলির প্রান চলে যায় আর সমস্ত আনাচে কানাচের প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দায়সারা গোছের একটা তথাকথিত ইনভেষ্টিগেশনের নাটক সাজিয়ে গোলেমেলে একটা সমাধান দিয়ে দেয় এবং আসল সত্যকে অনুসন্ধানে বিরত রাখে, তখন এইটা বুঝতে আর কোনো অসুবিধা হয় না যে, রাষ্ট্রের অনেক উচু স্তরে এর জন্ম। তারাই কোনো না কোনোভাবে করাপশনের নিমিত্তে ঘটিত কেস ডিসমিস করে দেন নিজের মুখোশ আড়াল করার জন্য। কিন্তু আসলেই কি কেস ডিসমিস হয়ে গেলো বলে মনে হয় তখন? সর্বোচ্চ মহল যখন এই কথিত ইনভেষ্টিগেশনে খুসী হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন, তখন কারোই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ইনভেষ্টিগেশনে বানানো স্টোরি আসলে কি।  

আর এভাবেই দেশের সম্পত্তি লুট আর তার বিরোধিতা করা মানুষের খুন কোনোটাই এদেশে শেষ হয় না। পত্রিকা খুলুন, টিভিতে নিউজ দেখুন, বড় বড় হেড লাইনসে রোজ একটা নতুন স্ক্যাম। কিন্তু ভিতরের পাতায় রোজ একজন সাধারন মানুষের, দিন মুজুরের খুনের নিউজ অতিশয়ই কিঞ্চিত। সাধারন জনতা, আপনি, আমি আজ থার্ড ক্লাস রোডের জন্য টোল ট্যাক্স দিয়ে থাকি। ওইসব রাস্তায় সফর করতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে থাকি। এই রাস্তাগুলি হয়তো কখনোই ভালো হবে না। হয়তো কোনো স্ক্যামে অভিযুক্ত কোনো ঠিকাদারেরও আজীবন সাজা ভোগের কোনো নথি নাই, উদাহরনও নাই। হয়তো বিদেশী ব্যাংকে গচ্ছিত কালো টাকাও কখনো এদেশে ফেরত আসবে না, আসেও না। তাহলে উপায়? উপায় একটাই। আমাদের সবাইকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা।

করাপশন দূরারোগ্য ব্যাধি নয়। করাপশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রথম হাতিয়ার হিসাবে আমাদের উচিত, করাপশনের বিরুদ্ধে লড়াই করা নিহত বা মৃত বীর মানুষগুলির কাহিনী শুধু কাগজ আর ইন্টারনেটে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং বাচ্চাদের টেক্সট বুকে জায়গা দেয়া, তাদের বুনিয়াদ তৈরী করা। আমাদের এটা দায়িত্ত যে, আমরা যেনো আগামী প্রজন্মকে করাপশন সম্পর্কে অবগত করি যেটা আমাদের মজবুত আর উন্নত দেশ বানাতে বাধা দেয়। দিতীয় ধাপের হাতিয়ার যদি বলি সেটা হচ্ছে-সমাজকে সর্বোচ্চ স্তর থেকে ভয় দূর করা, সুশাসন দেয়া। যদি সেটা না হয়, তাহলে করাপশন কোনোদিনই দূর তো হবেই না, ধীরে ধীরে এর প্রভাব এতোটাই বিস্তার হবে যার ফলে প্রতিটি মানুষ একে একে এর নেতিবাচক দিক পাবেন, হোক সেটা অনেক পয়সাওয়ালা বা দরিদ্র। বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই এই ব্যাধি থেকে পরিত্রানের অবস্থানে নাই আমরা, না দেশ। ছোট একটা গল্প দিয়ে শেষ করি লেখাটা-

একজন রাজা ছিলো। খুবই শয়তান আর নিষ্টুর রাজা। সে নিজের সভাসদ আর প্রজাদের খুব ভয় দেখিয়ে রাখতো। একবার সেই রাজা তার নিজের দর্জিকে বল্লো, আমাকে এমন একটা পোষাক বানিয়ে দাও যেটা কারোর কাছে নেই। আর সাথে এটাও বল্লো, যদি আমি জানতে পারি, এ রকমের পোষাক অন্য কারো কাছে আছে, তাহলে তোমার গলা কেটে দেবো। দর্জি খুব ভয় পেয়ে গেলো, বাড়ি ফিরে দুসচিন্তার মধ্যে পড়লো কিভাবে একটা উপায় বের করা যায়। সকালে উঠে সে রাজার জন্য একটা স্যুট তৈরী করে ফেল্লো, “হাওয়ার স্যুট”। দর্জি ঐ ‘হাওয়ার স্যুট’ রাজার উলংগ শরীরে পড়িয়ে দেয়। রাজা খুব খুশী হলো। সভাসদরাও খুব বাহবা দিলো। ঐ ‘হাওয়ার স্যুট’ পড়ে উলংগ রাজা নিজের প্রজাদের মাঝে যায়, তাদের মতামত জানার জন্য। প্রজারাও সবাই খুব বাহবা দিলো। কারোর এটা বলার সাহস হলো না যে, রাজামশাই, আপনি নিজের তামাশা নিজেই বানাচ্ছেন। সারাদিন উলংগ রাজা তার নগরে ঘুরে বেড়ালো। তারপর একটা ভবঘুরে বাচ্চা এগিয়ে এলো। আর জোরে জোরে হেসে বল্লো, “রাজা তো উলঙ্গ!!”

আমরা এই গল্পের শেষটুকু এখনো জানি না। কিন্তু নিশ্চয় ঐ ভবঘুরে বাচ্চাটা বাচেনি হয়তো।

এখন প্রশ্ন এটাই, করাপশনের বিরুদ্ধে গিয়ে ঐ জ্ঞানী সৎ মানুষগুলি কতদিনই বাচে যদি এই উলংগ অত্যাচারী রাজার মতো হয়? কারন তারা উলংগ রাজাকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ওরা উলংগ। তাই তাদের মরাই জরুরী।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, আমায় মনে রেখো না, বা আমার কাজকেও মনে রেখো না। শুধু এইটুকু আশা রাখি যে, শুধু বার্তাটা মনে রেখো।

১৮/০৩/২০২১ ফিডব্যাক ফর্ম- আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা

আজকাল যে কোনো সার্ভিস প্রোভাইডার, তা সে হোটেলই হোক, রেষ্টুরেন্টই হোক বা ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা যে কোনো পন্য, তারা ফিডব্যাক চেয়ে থাকে। তারা জানতে চায় যে, তাদের কাষ্টোমার তাদের সার্ভিসে খুশী হয়েছে নাকি হয়নি। এই ফিডব্যাকের মাধ্যমে প্রত্যেকে তারা জানতে পারে আরো ভালো সার্ভিস দেয়ার জন্যে তারা কি করতে পারে। অনেক সময় কাষ্টোমারের এই ফিডব্যাক দেয়া ডেটাবেজ অন্য মার্কেটিং কাজেও ফিড ব্যাক দেয়া কাষ্টোমারের অজান্তে অন্য আরেকটি সার্ভিস প্রোভাইডারের সাথে কানেক্ট করে তারাও আমাদের ফোন, ই মেইল আইডি ব্যবহার করে অন লাইনে ফিড ব্যাক চাওয়া শুরু করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-ফিড ব্যাক সিস্টেমের মাধ্যমে কাউকে এমন ব্যক্তিগতভাবে তথ্য দেয়া কখনো কি কোনো বিপদের কারন হতে পারে?

কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য যেমন তাদের ফোন নাম্বার, ইমেইল আইডি, কিংবা ঠিকানা সবই খুব মুল্যবান তথ্য। কারন এই থথ্যগুলির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে মানুষের নিরাপ চলাচল আর নিরাপত্তা। কোনো কাষ্টোমার ফিডব্যাকের মাধ্যমে দেয়া তার কোনো তথ্য কোনো কোম্পানীকে দেয়া আর তার পরিবর্তে ওইসব কোম্পানী কাষ্টোমারের এই তথ্যসমুহ একে অপরের কাছে আদান প্রদান করা কি বেআইনী নয়? অথচ সব সার্ভিস প্রোভাইডার এটাই করে থাকে। যদিও ফিড ব্যাক ফর্মের মধ্যে ষ্পষ্ট করে এটা দাবী করা হয় যে, কাষ্টোমারের ব্যক্তিগত তথ্য তারা গোপনী এবং সুরক্ষিত রাখবে। অথচ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সেটা তারা রক্ষা করে না। ফলে যারা আমাদের ফোন নাম্বার কিংবা ইমেইল আইডী পাওয়ার কথা না, তারাই প্রতিদিন আমাদেরকে ফোন করে করে, মেইল করে করে হয়রান করতে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবি, তারা আমার নাম্বার বা আইডি পেলো কিভাবে? ক্রেডিট কার্ড, বিভিন্ন পন্যের বাজার কিংবা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী কতই না বিরক্ত করতে থাকে আমাদের প্রতিদিন। আমরা হয়তো কোনো এক জায়গায় বিশ্বাস করে কোনো একটা ফিডব্যাক ফর্মে আমাদের ব্যক্তিগত নাম্বার, বা মেইল এড্ড্রেস দিয়ে থাকি বটে কিন্তু হাজার হাজার কোম্পানী থেকে প্রতিনিয়ত কল আসতেই থাকে যাদের সাথে আমাদের কোনো কালে কোনো যোগাযোগই ছিলো না। কোনো একটা প্রয়োজনীয় বিষয়ে ইনকুয়ারী করা কল, আমাদের জন্য নিয়ে আসে হাজারটা অপ্রয়োজনীয় কল। এম্নিতেই তো “ডু নট ডিস্টার্ব ফ্যাসিলিটি” আছে, তবু আমাদের শান্তি ভাংতে কল এসেই যায়। কেউ কেউ এটা বলতে পারেন যে, কঞ্জিউমারের কালচারে এসব তো চলতেই পারে, কিন্তু এই কালচারে সবাই বিশেষ করে সার্ভিস প্রোভাইড করেন যে সব ষ্টাফ, তারা তাদের ক্রেডিবিলিটি দেখাতে কিছু না কিছু ব্রেক থ্রো পেতেই চায়, তাই এই বিনা অনুমতিতে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে অন্যকে তারা টার্গেট করে নতুন বাজার তৈরী করতে চায়। ফলে ফিডব্যাক ফর্ম এমন একটা কালচার তৈরী করে ফেলেছে যে, কোম্পানীগুলি মিলে যেনো একটা কর্পোরেট বাজার আর আমরা তাদের পৃথক পৃথক গ্রাহক হয়ে দাড়িয়েছি। বাধা দেয়ার মতো কোনো সিস্টেম আমাদের হাতে অন্তত নাই হোক সেটা আমার দরকারী বা বিরক্তিকরের। আর এই সার্ভিস প্রোভাইডারের নাম করে কখনো কখনো কোনো না কোনো ব্যক্তি আমাদের জীবনে তার নিজের সার্থে বা প্রয়োজনে মারাত্তক একটা হুমকী হয়ে দাড়াতে পারে ব্ল্যাক মেইলিং এর মতো কোনো জালে ফাসিয়ে দিয়ে।

তাই, যতোটুকু পারা যায়, আমাদের উচিত আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য কোথাও লিক না করতে দেয়া। সেটা ফিড ব্যাক ফর্মই হোক কিংবা অন্য কিছু। পরিবারের নিরাপত্তার চেয়ে বড় আর কোনো নিরাপত্তা নাই। পরিবারের নিরাপত্তা মানেই সমষ্টিগতভাবে সার্বিক দেশের নিরাপত্তা।

১৭/০৩/২০২১-স্ত্রী (এই পোষ্ট শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত স্বামীদের জন্য)-পর্ব ২

আগের বার একটা পোষ্টে বলেছিলাম যে, আমার মতো সব ভাগ্যবান স্বামীদের জন্য আমার কোনো উপদেশ নাই কিন্তু যাহারা আমার মতো এইরুপ সুপ্রশন্ন ভাগ্য লইয়া জীবন সুখে অতিবাহিত করিতে চাহেন কিন্তু এখনো সেই সোনার হরিন হাতে পাইতেছেন না বা হন্যে হইয়া খুজিতেছেন, তাহাদের জন্য আমার কিছু উপদেশ আছে বৈ কি।

যেমন ধরুন, আমি আমার স্ত্রীর কাছে আজ থেকে ২০ বছর আগে ১০ হাজার টাকা কোনো কারনে লোন নিয়েছিলেম। এই ২০ বছরে কতবার এটা শোধ করেছি সেটা আর বলার কোনোই দরকার নাই। আমার জানাই ছিলো না যে, স্ত্রীর কাছ থেকে লোন নেয়া টাকা কখনোই পরিশোধ হয় না। তার পাওনা টাকা আপনি ফেরত দিবেন না কেনো? তিনি কি আপনার পর মানুষ? আপনজনের বিশেষ করে স্ত্রীর কাছে পাওনা টাকা সব সময় অপরিশোধিতই থাকে। মাঝে মাঝে আবার ঐ টাকা থেকে আমার স্ত্রীও লোন হিসাবে এডভান্স নেয়, কিন্তু সেটা সব সময় অফেরতযোগ্য। যদি আপনি সুখী সমৃদ্ধ থাকতে চান, লোন নেয়াটা মনে রাখবেন, লোন পরিশোধ করলেন সেটা মনে রাখার কোনোই দরকার নাই। আর যদি এইটা নিয়ে বারবার মনে করাইয়া দেন, তাহলে আপনার রাতের পরোটাতে একটু হলেও পোড়া গন্ধ পাইবেন। পোড়া পরাটা খাইতে গিয়া আবার কৈফিয়ত চাইয়েন না, কারন এটা চুলার দোষ মনে কইরা স্ত্রীর সহিত সহমর্মিতা প্রদর্সন করা ভালো স্বামীর গুনাবলীর মধ্যে একটা।

আর আপনি যদি মাসের সাংসারিক খরচের সব টাকা একবারে স্ত্রীর কাছে দিয়া নিজেরে সংসারের খরচের দায়িত্ত হইতে খালাস মনে করেন, আপনি নির্ঘাত ভাবিয়া নিতে পারেন, আপনার বিয়ের বয়স হয় নাই। সবসময় মানিব্যাগে পর্যাপ্ত পরিমানে ক্যাশ টাকা মজুত রাখিবেন। স্ত্রীর সংসারের খরচ সবসময় তার হাতে থাকে না। আপনার মানি ব্যাগ সব সময় তার জন্য পুর্ন রাখবেন। হিসাব নিতে যাইয়েন না কত নিলো, যদি নিতে চান, আরো যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর একান্তই যদি হিসাব যদি নিতে চান, তাহলে অন্তত দুই মাসের এডভান্স টাকা দিয়া আশেপাশে আরেকটা ব্যাচলর মেসে একটা সিট বুক করিয়া রাখিবেন। যদি কোনো কারনে ঘরের দরজা বন্ধ হইয়া যায়, তাহলে অন্তত ব্যাচেলর মেসে আপনার জায়গা হইলেও হইতে পারে। অন্তত কাটাইতে পারিবেন। যদি এহেনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আগে থেকেই বাসাটা স্ত্রীকে চিনাইয়া রাখিয়েন। তা না হইলে পুলিশ আবার স্ত্রীদের চোখের পানিতে স্বামীদেরকে ধরার জন্য একটু বেশী আগ্রহ থাকে। আরেকটা খুবই গুরুত্বপূর্ন তথ্য মাথায় রাখা দরকার-তার টাকা তার টাকা, আপনার টাকাও তার টাকা। এটার উলটা আবার ভাবতে যাইয়েন না।   

১৭/০৩/২০২১-স্ত্রী (এই পোষ্ট শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত স্বামীদের জন্য)

আমার স্ত্রীর এই কথাটা বড়ই সত্য যে, তাহার মতো বউ আমার কপালে জুটিয়াছিলো বলিয়া এতোদিন সংসার টিকিয়া আছে। অন্য কোনো স্ত্রী হইলে আমার কপালে কত যে বিরম্বনা বাধিত তাহার কোনো ফর্দ থাকিতো না। আমি অনেক হিসাব করিয়া দেখিয়াছি, ঠিকই তো বলিয়াছে। তাহার কথা একেবারে ভগমানের অস্তিত্তের মতো সত্য। কারন, আমি কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়ীক হিসাব অনায়াসে করিতে পারিলেও সংসারের চাল, ডালের হিসাব, কিংবা কোন শব্জিতে কতটুকু তেল ঢালিলে কি পরিমান সাধ হইবে, কিংবা ডিমটা কতোক্ষন গরম পানিতে সিদ্ধ করিলে উহার খোষা ছাড়াইতে আর বেগ পাইতে হইবে না, এইসব ব্যাপারে আমার থেকে নাদান মনে হয় আর একটাও এই দুনিয়ায় আল্লাহ সৃষ্টি করিয়াছেন কিনা আমার জানা নাই। আমি স্রিষ্টিকর্তার কাছে অতিশয় বিনয়ের সাথে কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করি যে, তাহার মতো একজন রুপবতী, গুনবতী এবং মাতৃসুলভ একজন স্ত্রী দান করিয়াছেন। হে ঈশ্বর, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

মাতৃসুলভ কেন বলিলাম?

এই বয়সে আসিয়া আমরা প্রায় ভাইবোনের মতোই যেনো হইয়া গিয়াছি। আবার তিনি যখন আমাকে কোনো কিছু আদেশ করেন কিংবা কোনো ব্যাপারে জ্ঞান দান করা শুরু করেন, তিনি সেই বিষয় সম্পর্কে এমন করিয়া আমাকে বুঝাইয়া দেন, যেনো তিনি মায়ের মতোই ৭ বছরের কোনো বালককে কিছু বুঝাইতেছেন অথবা ক্লাসে কোনো নির্বোধ ছাত্রকে কঠিন কোনো থিউরী পড়াইতেছেন। কাগজে আকিয়া, হাত নাড়াইয়া, তথ্যবহুল উদাহরনের মাধ্যমে তিনি আমাকে ব্যাপারটা যুতসই জ্ঞান দিয়া একেবারেই সহজ করিয়া আমার ঘিলুতে প্রবেশ করাইয়া দেন। তাহার পরেও যদি তাহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকিয়া যায় যে, আমার মতো একটা নির্বোধ মানুষ পুরু ব্যাপারটা বুঝিয়াছে কিনা কে জানে? তাই আবার ফোনে কিংবা ডিজিটাল মেসেজেও পুনরাবৃত্তি করেন। আমি সতর্ক মানুষ, তাই একবার বুঝিয়া থাকিলেও যেনো কিছুটা বুঝিবার বাকী ছিলো এই ভান করিয়া অতি মনোযোগের সহিত কানের কাছে ফোনটা ধরিয়া বোবা প্রানীর মতো পুলকিত ভাব দেখাইয়া, “এইবার ব্যাপারটা বুঝিয়াছি” বলিয়া উচ্ছাসিত আবেগ প্রকাশ করি। তিনি খুশী হন। আমিও মনে মনে হাসি যে, ব্যাপারটা বুঝিয়াছি।

আমার মতো সব ভাগ্যবান স্বামীদের জন্য আমার কোনো উপদেশ নাই কিন্তু যাহারা আমার মতো এইরুপ সুপ্রশন্ন ভাগ্য লইয়া জীবন সুখে অতিবাহিত করিতে চাহেন কিন্তু এখনো সেই সোনার হরিন হাতে পাইতেছেন না বা হন্যে হইয়া খুজিতেছেন, তাহাদের জন্য আমার কিছু উপদেশ আছে বৈ কি।

যেমন ধরুন, তিনি আপনার মোবাইল ফোনটা ব্যবহার করতে চান। কোনো দ্বিধা করিতে পারিবেন না। হাসিমুখে দিয়ে দিন। আর তিনি আপনার মোবাইল ফোন ব্যবহার করিবেন না কেনো? অবশ্যই করিবেন। তাহার বন্ধু বান্ধবীদের সাথে অনেক জরুরী খোশগল্প করার জন্য তাহার মোবাইলের টাকা খরচ তিনি কেনো করিবেন? তিনি তো আপ্নাকেই ফোনে এতো উপদেশ, বুদ্ধি, পরামর্শ দিয়া থাকেন, তাহাতেই তো তাহার ফোনের ব্যলান্স অর্ধেক হইয়া যায়। আপনার নাদানত্তের কারনেই তাহাকে অনেক মোবাইল বিল ছাড় দিতে হয়। এখন তিনি তাহার বন্ধু বান্ধবীর সাথে এই অল্প কয়েক ঘন্টা কথা বলিয়া মনের ভাবটা পুরন করিবেন, তাহার জন্য তাহার মোবাইলের টাকা খরচ করিবেন কেনো? ইহা বড়ই অন্যায়। ফোনটা তাহার হাতে তুলিয়া দেন। রাগ করিবেন না। আপনার জরুরী ব্যবসায়ীক কথাবার্তার চেয়ে তাহার মন ভালো রাখাটা অতীব আবশ্যক।

যদি রাগ হইয়া থাকে আপনার, ভুলেও উহা তাহার সামনে প্রকাশ করিবেন না। তাহা হইলে যেটুক আরাম করিয়া নাক ডাকিয়া ঘুমাইতে পারিতেন, সেইটুকুও আর আপনার কপালে জুটিবে না। এমনো হইতে পারে, আপনার উপর অসন্তুষ্ঠ হইয়া মনের আবেগী কষ্টে তিনি তাহার ফেসবুক আইডিতে এমন কিছু মন্তব্য করিয়া ফেলিতে পারে, যাহার কারনে তাহার অন্যান্য ফেসবুক বন্ধু বান্ধব্দের অতিরিক্ত ভালোবাসায় আর উদারতার কমেন্টে আপনার জীবন যতোটুকু স্থিত হইয়াছিলো, ইহা আবার অস্থিতিশীল হইয়া আরব বসন্তের মতো আপনার সিংহাসন তো কাপিবেই, আপনার বুকের ভিতরের ছোত হৃদপিণ্ডটাও কাপিয়া উঠিতে পারে। কারন তাহাদের “কিরে কি হইলো আবার?”, “তোর মন খারাপ? আরে দুনিয়াটাই এই রকমেরই, কেউ বুঝতে চায় না রে বইন”, কিংবা এমনো কমেন্ট পাইতে পারেন, “উফ আপু, আপনার কষ্টে আমারো বুক ফাটিয়া যাইতেছে, সব পুরুষ মানুষ এক রকমের” অথবা আরো উচ্ছসিত হইয়া কোনো একসময় বাসে একত্রে যাতায়ত করিতে গিয়া কয়েক মিনিটের পরিচয়ী বান্ধবী এমন কমেন্টও করিতে পারেন যে, “আরে আপু, বেটারে ছেড়ে দিয়ে শিক্ষা দেন, দেখবেন, কত কাঠালে কত বিচি” ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই রাগ দমাইয়া রাখেন। তাহার পরেও যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করিতে না পারার কারনে রাগ করিয়াই থাকেন, তাহা হইলে অতিসত্তর রাগ কমিলে তাহাকে ভাই বোনের মতো আদর করিয়া ইহা বলুন, “আরে, মাথা ঠিক ছিলো না, দোষ তো তোমার না, দোষ ঐ পল্টু মিয়ার। সেইই তো আমার মাথাটা অফিসের সময় বিগড়াইয়া দিয়াছিলো, আর সেই কারনেই তো আমার রাগ হইয়াছিলো”। এই সময়ে কিছু কঠিন কথা শুনিবার জন্য মন প্রস্তুত রাখিবেন। যেমন ধরুন, “তোমার এই সংসারে আইস্যা আমার জীবন তেজ পাতা হইয়া গেলো, কি পাইলাম এই জীবনে হায় ভগবান?, কিংবা আমাত্রে সোজা পাইয়া যা খুশী কইরা গেলা, অন্য কেউ হইলে দেখতা কবে তোমারে ছাইরা যাইতো গা? ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পর্যন্ত হইলে আপনি নিছক অতশয় ভাগ্যবান। আপনার চৌদ্দ গোষ্টির কেউ বাচিয়া থাকুক আর নাইবা থাকুক, তাহারা এই সময়ে জীবিত হইয়া আপনার মতো অকর্মন্য লোকের কারনে তাহারাও কিছু কঠিন মধুর কথা শুনিতেও পারেন। ভাগ্যিস, তাহারা এখন বধির এবং পরকালে থাকায় কোনো শক্তি খাটাইতে পারেন না, তাহা না হইলে, এই সময়ে আপনার স্ত্রীর কথায় আপনার কান ঝালাপালা না শুধু, সেইসব চৌদ্দ গোষ্ঠির এক থাপড়ে আপ্নিও বধির হইবার সম্ভাবনা থাকিতো।

(চলবে)

১২/০৩/২০২১-ওরা চলে যাবার পর

বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, তখন ওদেরকে কখনো হাতছাড়া করবো এটা মাথাতেই আসে নাই, কারো আসেও না। তখন সময়টা এক রকমের। হোক সেটা ছেলে বা মেয়ে।

যখন ওরা মাত্র বেবি, ওরা যখন কথা বলাও শুরু করে নাই, কিন্তু ঝড়ের গতিতে হাত পা নাড়তো, খুব মজা লাগতো দেখে, ওটাই ছিলো বেবিদের ভাষা। তখন তো মনে হতো, আহা, কি মিষ্টি বাচ্চারা। কথা নাই অথচ হাত পা নেড়েই যেনো সব কথা বলে। এই ভাষাতেই ওরা জানান দিতো, ওদের হাসি, আহলাদ, কিংবা কষ্টের ইংগিত।

ওরা যখন হাটতে শিখলো, তখন তো ওরা যেনো আরো সাধিন। যেখানে খুসী হাটা ধরে, যেনো সারা প্রিথিবী ওদের জন্য। ওরা হয়তো জানেই না কোনটা ওদের জন্য বিপদ আর কোনটা ওদের জন্য ফ্রেন্ডলী। আর এই পার্থক্যটা আমরা পেরেন্টসরা বুঝি বলে সারাক্ষন আমরা আমাদের বাচ্চাদের আগলে রাখি, ধমক দেই, শাসন করি।

ওরা অনেক সময় আমাদের এই শাসনের ভাষা হয়তো বুঝতে পারে না বলে মনের আবেগে চোখের পানি ফেলে, রাগ করে না খেয়ে থাকে, অভিমান করে কথা বলা বন্ধ করে, ডাকলেও শুনে না, আরো কতকি?

টাইম মতো ওরা না ঘুমালে আমরা ওদেরকে হয়তো বকা দেই, গোসল ঠিক মতো করেছে কিনা, ঠিক সময়ে খাবারটা খেলো কিনা, সব বিষয়েই আমরা সর্বদা সজাগ থাকি। জোর করে করাই আর ওরা হৈচৈ করে। অনেক সময় পুরু বাড়িটা হই চই এর মধ্যে রাখে, সরগোল আর চেচামেচিতে বাড়িটায় যেনো একটা শব্দদূশনে পরিনত হয়, চারিদিকে ছেড়া কাগজ, ঘরে বইপত্র অগোছালো করে দিশেহারা করে রাখতো। ওরা মাঝে মাঝে কত আবদার করতো, অনেক আবদার নিছক শখে কিংবা অনেক আবদার না বুঝেই। আর সেটাই হয়তো ওদের সারা রাতের খুসী অথবা কষ্টের কারনে ঘুম নষ্ট হতো। যদি পেতো, সারাটা রাত না ঘুমে আবার যদি না পেতো তাতেও সারা রাত না ঘুমে কাটিয়ে দিতো অভিমান করে।

এই বাচ্চারাই যখন আর ধীরে ধীরে সমাজের বিভিন্ন কর্মকান্ডে ঢোকে যায়, ঘর থেকে বেরিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, আমরা এই ভাগ্যবান পিতামাতা অভাগার মতো একা হয়ে পড়ি। মন খারাপ হয়, স্মৃতি পাহাড়ের মতো স্তুপ হয়ে যায়। তখন, এই সব আদুরে বাচ্চাদের ফেলে যাওয়া খেলনা, পরিত্যক্ত হাতের লেখার খাতা, কিংবা তার ব্যবহৃত কোনো পোষাক দেখলেই আমাদের বুকে হটাত করে ধক করে উঠে ব্যথায়। তখন তাদের অতীতের পদচারনা আমাদের কানে ঝুমকোর মতো বাজে, ওদের অতীতের একগুয়েমী রাগ কিংবা আব্দারের কথা কিংবা অযথা রাগ অভিমানের স্মৃতির কথা মনে করে আমার চোখের কোন ভিজে উঠে। মনে হয় মাঝে মাঝে, আহা, ঘরটা একসময় কত ভর্তি ছিলো, আজ একেবারেই শুন্য। ঘরকে নোংরা করার জন্য কত বকা দিয়েছি, বাথরুমের সেন্ডেল পড়ে সারা ঘর ঘুরে বেড়ানোর জন্য কত বকা দিয়েছি। অযথা রাগ অভিমান করে খাবার না খাওয়ার জন্য রাগ করেছি, শাসন করেছি, অথচ আজ, আমার বাড়ির প্রতিটি ঘর শুন্য, একদম পরিপাটি যা সব সময় রাখতে চেয়েছিলাম ওরা যখন ছিলো। আজ আর কেউ বাথ রুমের সেন্ডেল পড়ে ঘুরে না, আজ আর কেউ আমার কাছে অনলাইনে শপিং করার জন্য একশত টাকা আবদার করে না, কিংবা হটাত করে পিজার অফার থাকলেও আর অফারের জন্য বায়না ধরে না। সব যেনো নীরব। আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যখন ওরা সাথে ছিলো? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘরে সবাই শান্ত হয়ে থাকে? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘর নোংরা না করে সারাক্ষন পরিপাটি করে রাখুক? অথচ আজ ঠিক তেমনটাই তো আছে। কেউ ঘরে নাই, কেউ ঘর নোংরা করে না, কেউ হৈচৈ করে না। কিন্তু তারপরেও কেনো মনে শান্তি নাই? কেনো মনে হয়, ঘরটা নয়, অন্তরটা শুন্য? যেখানেই তাকাই সব ঠিক আছে, শুধু ঘরটাই খালী।

আজ কেনো জানি বারবার মনে হয়, ওরা আবার ফিরে আসুক, ওরা আবার আমার সাথে আবার ঝগড়া করুক, ওরা আবার আমার কাছে অহেতুক বায়না ধরুক, আমি আর কখনো ওদের বকা দেবো না, সব বায়না আমি মেনে নেবো। খুব মনে পড়ে আজ যে, যখন অফিস থেকে এসেই মেয়ের রুম খুলে বলতাম, কিরে মা, কি করিস? হয়তো তখন মেয়ে রুমেও নেই, হয়তো অন্যঘরে আছে বা রান্নাঘরে কিংবা বাথরুমে কিন্তু জানতাম বাসাতেই আছে। আজ যখন অফিস থেকে বাসায় এসে মেয়ের রুমে যাই, মুখ দিয়ে বলতে চাই, কি রে মা কোথায় তুই? কিন্তু ভিতর থেকে অন্তরের কষ্টে আর কথাটাই বের হয় না। জানি, মেয়েটা আর বাসায় নাই। ওর টেবিল, টেবিলের উপর সেই ঘড়িটা, ওর আলমারী, ওর চেয়ার, সবই তো আছে। কিন্তু মেয়েটাই নাই। প্রতিটা টেবিল, বই, খাতা, আল্মারী, সেই পুরানো ঘড়ি কিংবা বিছানার চাদরটায় হাত দিয়ে আমি অনুভব করি আমার সন্তানদের শরীরের সেই চেনা গন্ধ। খুব করে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে সব কিছু।

ভালোবাসি।

সব সময়।

সর্বদা।

চোখের পানির ফোয়ারা দিয়ে যে ভালোবাসা বেরিয়ে আসে, সেখানে রাগটাও হয়তো ছিলো আমার ভালোবাসার আরেক রুপ। হয়তো বকাটাও ছিলো আমার মায়ার আরেক রুপ। দম বন্ধ হয়ে আসে যেনো তোমাদের ছাড়া।

এখন প্রায়ই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে আবার বাবার কথা। হয়তো তারাও একদিন আমাকে খুব মিস করেছে, আমি বুঝি নাই। আর আজ আমি তাদেরকে মিস করি কিন্তু ওরা কেউ নেই এই মায়াবী পৃথিবীতে। আজ হয়তো আমিও আমার সন্তানদের মিস করছি। হয়তো কোন একদিন ওরাও আমাকে অনেক মিস করবে। সেদিন হয়তো পৃথিবীতে আরেকটা নতুন ক্যালেন্ডারের “সময়” চলছে।

“সময়” কারোই বন্ধু নয়, অথচ সে সবার সাথে আছে। কিন্তু সময়ের স্মৃতি মানুষকে সব সময় নষ্টালজিক করে রাখে। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে আমি তোমাদের সাথে আছি আর থাকবো।

উতসর্গঃ

(কনিকার ইউএমবিসিতে (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি) ভর্তির চুড়ান্তে আমার কিছুটা নষ্টালজিকতা)

০৮/০৩/২০২১-টাকা

টাকা যদি কাছে থাকে, তখন জীবনটা খুব সহজ হয়। মানুস নিজের সব সপ্ন পুরন করতে পারে। সেটা যেমন করেই হোক, সব সুখ আদায় করে নেয়। টাকা যদি কাছে থাকে তাহলে দুক্ষ অনেক পিছনে পড়ে থাকে। আর আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারি। তাই শুধু টাকা থাকা দরকার।  টাকা সবার চাই। যতো বেশী টাকা, তাকে পাওয়ার চাহিদাও ততো বেশী। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি যে, টাকা গাছে হয় না। কিন্তু অনেকেই এই সপ্ন দেখেন যে, যদি টাকা গাছে হতো!! আর সেই গাছটা নিজের হতো। টাকা আসে অনেক পথে, চুরি, লোপাট, ডাকাতি, ক্ষেত বা চাষবাস অথবা ভাগ্যবসে কোনো লটারী বা বিজনেস।

যে বিজনেজ আপনি বুঝবেন না, তাতে ইনভেষ্ট করবেন না। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হলো যে, মানুষ প্রতিদিনই শিকার হয় একটি সপ্নের যে, টাকা গাছে ফলতে পারে। একজন বুদ্ধিমান ভালো মানুষও এই সপ্নের ছায়ায় অন্ধ, কালা, বোবা হয়ে যান। কোনো প্রশ্নই করতে পারেন না। আর ফ্রড নিজের চোখের সামনে হচ্ছে দেখেও তার ইংগিত শুনতে পান না। ফ্রড তার চালাকী খুব চালাকীর সাথেই করে। সে তার জাল অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। তারপর তার পরিকল্পনা মানুষের কাছে এতো মিষ্টি করে বিক্রি করে যে, তারা জানতেই পারে না যে তাদের ফাসানো হচ্ছে। পায়ে পায়ে বেনিফিট। যখন কোনো মানুষ এটা বলে যে, সে এই স্কীমে এতো টাকা পেয়েছে, এতো বেনিফিট পেয়েছে, তখন অন্যরা ভাবে যে, এই স্কীমে নিশ্চয়ই কোনো সোনার খনি আছে। যদি সে পেয়ে থাকে তাহলে আমরাও পাবো। প্রতারকরা সেইসব মানুষের সুযোগ নিয়ে থাকে যারা তাদের মিথ্যা স্কীমকে সত্য বলে ধরে নেয়। প্রায়শই শিক্ষাদীক্ষা করা মানুষেরা এই ধরনের প্রতারনার শিকার হয়ে যান। কারন টাকার গাছ হবে, এই সপ্নটা সবাই দেখে। এই যে ‘যুবক’, ‘ইউনিপেটু’, কিংবা ডেস্টিনি ইত্যাদি এই ফ্রড কোম্পানীগুলির মূলনীতি সাধারনত একই রকম ছিলো। মুলনীতিটা যেনো এরুপ ছিলো- ইনভেষ্টরদের আসল টাকার প্রথম সুদের কিস্তি দিয়ে দাও, নতুন সদস্য আনার জন্য বোনাস দাও, আর তারপর ইনভেষ্টদের বিনিয়োগের বাকী টাকা লুট করে নাও। যেটা হয় যে, ২য় রাউন্ডের ইনভেষ্টদের ১ম জন অনেক টাকা কামিয়েছে, আর সেই লোভে পড়ে সেও অনেক টাকা ইনভেষ্ট করে। পুরু দেশ থেকে যখন কোটি কোটি টাকা কোম্পানীগুলির কাছে চলে আসে, তখন এই ফ্রড কোম্পানীগুলি এক রাতের মধ্যে সমস্ত টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ভুয়া কোম্পানী, জাল ঠিকানা, ফ্রড ফ্রন্ট অফিস, আর দেশের বাইরে থেকে অপারেশন হলো এইসব কোম্পানির আসল মুলমন্ত্র। ফিনান্সিয়াল করাপ্সন জব্দ করা খুবই কঠিন কাজ, আর সবচেয়ে বেশী কঠিন হয় ইনভেষ্টদের টাকা রিকভার করা।

সাধারন মানুষের কাছে টাকা আয় করা রাস্তা একটাই আছে, আর সেটা হলো সততার সাথে পরিশ্রমের রাস্তা।

০৮/০৩/২০২১-হীরা   

হীরা একটি খুবই মুল্যবান জিনিষ। আর এর ব্যবসা!

রহস্যে আবৃত চুপিসারে হয়ে চলা কোটি কোটি টাকার বিজনেস। এই হীরে এমন এক জিনিষের নাম যা সৌভাগ্য আর দূর্ভাগ্য দুটুই আনতে পারে। নিখুত নিরাপত্তা আর কঠিন শততাই এই হীরে ব্যবসার প্রধান স্তম্ভ। কে কখন বেইমানী করবে তার কোনো ভরষা নাই। এসব ব্যবসাতেই সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক অবিশ্বাসের কাজটা করে থাকে। অথচ এই ব্যবসাটা শুধুমাত্র বিশ্বাস আর কাজের পারদর্শিতার উপরই চলে। মজার ব্যাপার হলো, আনপলিসড হীরাও হীরা। তার ও একটা মুল্য আছে যা সোনার থেকেও দামী। আর যদি সেই হীরা পলিসড করা হয়, তাহলে সেটার চাহিদা হয় অনেকগুন বেশী। হীরে চিনতে মানুষের ভুল হতে পারে। কিন্তু খারাপ হীরে, অচল পয়সা, আর ধুর্তলোক একদিন না একদিন ওদের সত্যতা বেরিয়ে আসেই। আর ধরা পড়ে যায়। একটা সময় আসে, যখন এই নকল হীরা, অচল পয়সা কিংবা ধুর্তমানুষগুলি কানাগলিতেই হারিয়ে যায়। ওদের ব্যাপারে কেউ আর মনে রাখতে চায় না। এমনকি নিজেদের লোকেরাও না। যাই হোক, যাকে এই ব্যবসায় কাজ দেয়া হয় তার উপর কনফিডেন্স থাকাটা নির্ভর করে যিনি কাজটা নেন তার চরিত্র আর স্বভাবের উপর। আগে থেকে জানলে কেউ আর ঠকবাজী করতে পারে না, অথবা একবার যদি কোনো কারনে কারো উপরে এমন সন্দেহের উদ্রেক হয় যে, ন্যনুতম কোনো আচ পাওয়া যায় যেখানে বিশ্বাস নিয়ে খেলা হয়, তখন দ্বিতীয়বার আর ভরষা করা কখনোই সম্ভব না কারন এখানে বিশ্বাসের মুল্য এতো বেশী যা কল্পনা করা যায় না। দ্বিতীয়বার ঠকার মুল্য এতো বেশি যে, হয় এটা জীবনকে শেষ করে দেয়, নতুবা জীবনকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। এ জন্য যতো ধরনের যাচাই বাছাই দরকার, কমিটমেন্ট করার আগেই সেটা করতে হয়। যদি সেই যাচাই বাছাইয়ের মধ্যে কোনো গাফিলতি থাকে তখন যেদিন কোনো ঘটনা নিজের সাথে হবে সেদিন আফসোস ছাড়া আর কোনো কিছুই অবশিষ্ঠ থাকে না। কিন্তু একটা মজার ব্যাপার হলো, এই ঠকবাজগুলি বোকা। এদের ব্যাপারে অনেকে অনেক বড় বড় সুযোগের সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা করলেও ওরা শুধু বর্তমানটা নিয়ে বাচে। আর ভবিষ্যত নিয়ে অলীক কল্পনা করে থাকে যে কল্পনা শুধুই মরিচিকা। কোনো কাজে আসে না সেটা। তাদের উন্নতি করার ইচ্ছা থাকে, করতেও পারতো, কিন্তু নিজেদের বোকামীর জন্য ওরা সেই উন্নতির রেল লাইনটায় এমন একটা দেয়াল তুলে যেখানে নিজেরাই ফেসে যায়।

মানুষের চরিত্র এই হীরের থেকেও অধিক মুল্যবান। যদি হীরে সম্পর্কেই আমাদের নীতি এমন হয়, তাহলে মানুষের চরিত্র, সততা আর একনিষ্ঠতার উপর কি নীতি হওয়া উচিত? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত এই আমরা আমাদের মুল্যবোধ, চরিত্র, সততা এবং একনিষ্ঠতা নিয়ে মামুলী খেলা খেলতে থাকি। একজন মহিলার কাছে এই সততা যুগ যুগান্তরের, আর একজন পুরুষের কাছে এই সততা জীবনে সার্থকতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছোবার একমাত্র উপায়। যে যতো বেশী সফল, সে ততো বেশী মুল্যবান।

০২/০৩/২০২১-ব্লাকমেইল-রিভার্স ব্লাকমেইল

সায়েন্সেরই হোক আর কমার্শিয়াল সাব্জেক্টেই হোক, বিজ্ঞবান হোক আর যতো চালাকিই হোক, ব্ল্যাক মেইলের মতো কোনো বিষয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা কখনোই কারো উচিত না। কারন এই সব এক্সপেরিমেন্ট সব সময় বাজে ভাবেই ফেল করে। আর যখন ফেইল করে, তখন মানুষ পিছলা পথের মতো অনেক দূর পিছিয়ে যায়। একবার পিছলে গেলে আবার উঠে দাড়াতে পারবে, কেউ এটা সবসময় ভাবা উচিত নয়। হয়তো সেই একবার পিছলে যাওয়ার কারনেই সারাটা জীবন নষ্ট আর ধ্বংসই হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার হয়তো আর কোনো সুযোগ আসেই না।

বেশীরভাগ মানুষ এই সব এক্সপেরিমেন্ট কিংবা অন্য অর্থে যদি বলি, “প্রতিশোধ” কোনো না কোনো অতীতের ঘটনা থেকেই প্রভাবিত হয়। আসলে, পাষ্ট পাষ্টই হয়। অতীত অতীতেই হারিয়ে যায়। ভালো থাকার জন্য আমাদের সবার আজকের দিনের তথা আগামী দিনের কথাই ভাবা উচিত। অতীতকে ভোলা হয়তো কঠিন হতে পারে কিন্তু অসম্ভব না। কিন্তু কেউ যদি সেই অতীত কোনো অপরাধ আর দুক্ষবোধকে জাগিয়ে হিংসার রুপ দেয়, তাকে থামিয়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, তা না হলে সেই অতীত আজকের দিনের শান্তি আর ভবিষ্যত দিনের আশার মৃত্যু হতে পারে। কেউ যদি মনে করে যে, অতীতের কোনো ঘটনা কারো মাথায় বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে, ব্যক্তিত্তের উপর আঘাত হেনেছে, তাহলে এটা বিপদের আভাষ দেয়। অতীতের ভার অপশনাল,  বইতে গেলে এটা আসলে ভারী, কিন্তু যদি মন থেকে ঐ বোঝা সরিয়ে ফেলা যায়, তা তুলোর থেকেও হালকা, চট করে হারিয়ে যায়।

আমাদের আজকের দিন তথা ভবিষ্যতের সুখের কথা মাথায় রেখে সব সময় সতর্ক থেকে এমন কিছু করতে হবে যাতে এটা মনে না হয় বা না হয়ে যায় যে, এক জনের শিকল থেকে বেরিয়ে গিয়ে শান্তির আশায় আরেকজনের কাছে এটা উনুন মনে হয়। যদি এটা হয়ে যায়, তখন মনে হয় পুল থেকে বেরিয়ে গিয়ে খাদে পরার মতো অবস্থা।  ব্লাকমেইল কিংবা রিভার্স ব্ল্যাকমেইল সব কিছু থেকে দূরে থাকা খুব জরুরী। একটা জিনিষ বারবার মনে করতে থাকুন যে, হাজার হাজার সম্পর্ক ভেংগে যায়, তারপরেও আবার মানুষ নতুন সম্পর্ক করে। আর এই নতুন কোনো সম্পর্ক হয়তো আগামী দিন গুলিকে আসলেই সুন্দর করে তুলতে পারে। 

২৮/০২/২০২১-সম্পর্ক ত্রিভুজের আরেকটি চতুর্থ কোন

মানুষ তার জীবনকে সুন্দর আর শান্তিময় করার জন্যই সমাজ সৃষ্টি করেছিলো যা অন্য বেশীরভাগ বুদ্ধি সম্পন্ন প্রানীরা করে না। আর সেই সমাজ চালানোর জন্য কিছু নিয়ম ও তৈরী করা হয়। এই নিয়ম কানুন এইটা ভেবেই করা হয়েছিলো যে, মানুষ একে অপরের সাথে মিলে মিশে সুন্দরভাবে জীবন কাটাতে পারে। একে অপরের সুখ দুঃখের ব্যাপারে এগিয়ে আসে। তাই, সব সমাজই অনেক শর্ত আর নীতির শিকল দিয়ে মানুষের কল্যানের জন্য অনেক প্রকারের সম্পর্কের ভিত তৈরী করে থাকে। জাত, ধর্ম আর বর্নের স্তর গুলি ঠিক রেখেও কিছু কিছু সমাজ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে হরেক রকমের এই সম্পর্কের বেড়াজালের শর্ত জূড়ে দিয়েছিলো যাতে সামাজিক নিয়মের মধ্যে সবাই যার যার গন্ডির মধ্যে সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে এই সম্পর্কগুলি কিছু কিছু প্রতাপশালী শাসক, ব্যক্তি আর ধর্মজাযকদের প্ররোচনায় তাদের আরাম আয়েশের জন্য, তাদের খায়েস মেটানোর জন্য তারা সুক্ষ থেকে সুক্ষতমভাবে আইন কানুনের কিছু বন্ধন শিথিল করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে গিয়ে প্রথাগুলি এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, প্রথা থেকে যায় ঠিকই, রীতি রয়ে যায় ঠিকই কিন্তু যে মানুষগুলির জন্য সম্পর্কের এই ভীত তৈরী করা হয়েছিলো, তারাই বদলে যায়, আর সেই আইনী আর শর্তাবতাবলীর ফাক দিয়ে অনেক সম্পর্কের পরিবর্তিত আদলে মানুষের কল্যান তো দূরে থাকুক, তা কেড়ে নেয় মানুষের সুখ আর জীবনও।

একটা সময় আসে যখন শুধু প্রথার নামে অনেক অশ্লীল আর বেপরোয়া কাজের বৈধতা পায়। এর প্রেক্ষাপটে উদাহরণসরুপ দেখা যায় যেমন বিয়ের প্রথা। বিয়ে নামক প্রথা থেকে মানুষ সরে আসতে আসতে এটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, বিয়ের বদলে সহঅবস্থান, সহঅবস্থান থেকে লিভিং টুগেদার, পার্ট টাইম স্টেইং টুগেদার এর মতো প্রথা হয়ে গেছে। এ সবই আসলে টাকা আর লোভের কারনেই হয়। কিন্তু মানুষ সবসময় ভুলে যায় যে, টাকা আর লোভ কোনো সম্পর্ককেরই শক্ত ভীত তৈরী করে না যতোক্ষন এটার মধ্যে সমঝোতা আর শ্রদ্ধাবোধ না থাকে। কিছু মানুষ সম্পর্ক তৈরী করার আগে সবসময় পরিকল্পনা করতে থাকে যে, ভবিষ্যতে তৈরী হওয়া সম্পর্ক থেকে কিভাবে ফায়দা লুটা যায়। এই যে লুকানো একতা লোভ বা বিশ্বাসঘাতকতা, এর আড়ালে যে এফেয়ার্সের জন্ম, কারো কাছে এটা ভালোবাসা আবার কারো কাছে এটা কামনা। আর কারো কাছে এটা একটা চুক্তি। সম্পর্কের দাম যখন টাকার মুল্যে বিচার করা হয়, সেটা একটা ইংগিত যে, এফেয়ার্সের এই গাড়িটা ব্ল্যাক মেইলের লাইনে চলে যাচ্ছে। ভালোবাসার নেশায় কেউ চাদতারা এনে দেয়ার প্রতিশ্রতি দিতে পারে বটে কিন্তু সেই ভালোবাসা বা এফেয়ার্স চাদতারা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত কিনা তা খতিয়ে দেখাটা সব পক্ষেরই উচিত। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল আমরা অনেক সময় বুঝেও না বুঝার ভান করি। আবার অনেক সময় বুঝতে চাইলেও বুঝি না। কিন্তু ভুলটা ভুলই। সময়ের স্রোতে এই ভুলটা আমাদেরকে প্রমান করে দেয় যে, আমরা ভুল ছিলাম, এবং বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক আমরা ভুল কাজটাকেই পছন্দ করেছি এবং সেটাই করেছি সম্পর্কের নামের অযুহাতে। অনেক সময় আমরা প্রোফেশনাল আর পার্সোনাল দুটুর সীমাই লংঘন করে ফেলি যখন এই ভুলের মধ্যে থাকি। যখন আমরা এই ভুলটা বুঝতে পারি, তখন অনেক দেরী হয়ে যায় আর কিছু বাকী থাকে না। বাকী থাকে শুধু ভুলের জন্য মাশুলটা। কারন তখন একটা ক্রাইমের সৃষ্টি হয়ে গেছে। ক্রাইম জগতে প্রত্যেক জিনিষের সাথে অন্য জিনিষের লেনদেন থাকে। সত্যিটাকে কখনোই লুকিয়ে রাখা যায় না। সত্য জিনিষটা একটা গন্ধ্যের মতো, এটা বাতাসে বের হয়ই।

এর বাইরে আরো অনেক প্রকারের সম্পর্ক থাকে। কিছু সম্পর্ক ঈশ্বর তৈরী করেন যা রক্তের সম্পর্কের সাথে বাধা থাকে, কিছু সম্পর্ক এই যে একটু আগে বলেছি, সমাজ তৈরী করে যা সমাজের নিয়মের আইন কানুনের শিকলে বাধা থাকে, আর এমনো কিছু সম্পর্ক থাকে যা হৃদয়ের তরীতে সওয়ার হয়ে আকাংখার মাঝ নদীতে সাতার কাটতে থাকে। ঈশ্বর প্রদত্ত সম্পর্কের বেলায় আজো অনেক কিছু যেভাবে চলার কতাহ সেভাবে চলে হয়তো, কিন্তু সমাজ কর্ত্রিক অথবা এই দুই রীতির বাইরে যে সম্নপর্ক গোপনে বা আধা প্রকাশ্যে অথবা প্রকাশ্যেই হোক তৈরী হয় তাদের মধ্যে অনেক কিছুই ধীরে ধীরে খুব ধোঁয়াশা এবং জটিল আকার ধারন করে কারন এই সপর্কগুলি যেখানে খুশী টেনে নেয়া যায়। কখনো তা তীরেও পৌছতে পারে আবার কখনো তা ডুবেও যেতে পারে। তীরে পৌছা অথবা ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনার বেড়াজাল একটা সুপ্ত এঙ্গেল বা কোনের উপর নির্ভরশীল যার নামঃ ত্রিভুজের চতুর্থ কোন।

এই কোন বা এঙ্গেল যেমন দৃশ্যমান থাকে না কিন্তু হিসাবে আনতে হয়। তেমনি এর মান ত্রিভুজের সব কোনের সমষ্টির যোগফলের থেকেও অধিক অথবা শক্তির তৃতীয় সুত্রের মতোই ঋণাত্মকও হতে পারে। এই চতুর্থ কোনের প্রভাব ত্রিভুজের সমষ্টিগত মুল্যায়নে এমন একটা নতুন আদল তৈরী করে যেখানে কবর খুড়ে লাশ বের হয়ে আসা প্রবাদটি পালটে হয়ে যায় কবর খুড়ে লাশ নয়, লাশের ভিতরের কংকালকে বের করে আনা। যেখানে ঐ কংকালের প্রতিটি হাড়ে লেখা থাকে তার ফেলে আসা অনেক না বলা কথা, বেদনা আর ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের টেবিল অফ কন্টেন্টের প্রথম অধ্যায়েই থাকে রোমাঞ্চকর প্রেমের উপখ্যান। কিন্তু যে প্রেমকে যুগে যুগে মানুষ রক্ত, জল, গোলাপের ঘ্রান হিসাবে আখ্যায়িত করতো, সেই প্রেম আসলে শুরু থেকেই ছিলো একটা কলশির দুধের মতো। দুধকে যেমন বেশী করে আচে বসালে উতলে অর্ধেক হয়ে যায়, তেমনি আবার কম আচে বসালেও সেটা আরো গাঢ় হতে থাকে। এক সময় তা গাঢ় হতে হতে পুড়ে সব শেষ হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, এই কাহিনীর শেষ অধ্যায়ে প্রথম জীবনের প্রেমের দুধ কাহিনী থেকে তখন সবাই একে একে বের হয়ে যাওয়ার আপ্রান চেষ্টা করলেও সবাই সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না। এর প্রধান কারন, যখন কোনো সম্পর্ক ভিতর থেকে ভেংগে যায় কিন্তু ছিড়ে যায় না, তখনি এই দুটু সম্পর্কের পরিভাষাও হয় দুই রকমের। আর এই পরিভাষার নাম; অপরাধের ভাষা।

অপরাধের ছায়া যখন কোনো সম্পর্কের উপর পতিত হয়, পৃথিবীর কোনো শক্তি আর তাকে জোড়া লাগাতে পারেনা।  মনের জ্বালা বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে রিভার্স ব্ল্যাক মেইলের মাত্রা। ঈশ্বর মানুষের মনের ভিতরের এই সুপ্ত কাহিনী জানেন, বুঝেন এবং তাকে একটা নির্দিষ্ট লিমিট পর্যন্ত যেতে দেন এই কারনে যদি মনুষত্ত্য কিংবা বাস্তবতার নিরীখে কোনো মানব তার এই রিভার্স ব্ল্যাক মেইল তথা মনের অপরাধের আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে নেয় তো সে হয়তো ডুবতে ডুবতে কিনারায় উঠে যায় কিন্তু যদি সেটা না হয় তার অবস্থা এমন হয় যেনো সে দুটু ফুটূ নৌকায় পা রাখার সামিল। ডোবা তখন গ্যারান্টেড। আজ পর্যন্ত এমন কোনো ডিগ্রী তৈরী হয় নাই যেখানে প্রেমের জ্বালাই বলি আর রিভার্স ব্ল্যাক মেইলই বলি, সেটা নিরুপিত করতে পারে। যখন এই রিভার্স ব্ল্যাক মেইল শুরু হয়, তখন ওখানে হয় অপরাধের পিএইচডি। যখন পিএইচডি শেষ হয়, তখন দেখা যায়, কখন কবে কিভাবে কবরের লাশের কংকাল কোনো এক গাছের সাথে লম্বা হয়ে ঝুলতে আছে। আর যখন কোনো কংকাল নিজে নিজে গাছের সাথে ঝুলতে থাকে, ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের একটুও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই গাছে কংকাল উঠার পিছনে কারো না কারো হাত তো আছে, তার সাথে আছে অনেক রাত জাগা পরিকল্পনাও।

একটা সম্পর্ক যখন গড়ে উঠে, তখন গানিতিক বিশ্লেষনে এর দুটু কম্পোনেন্টই আসলে কাজ করে, একটি হলো “সময়”  আরেক”চাহিদা”। সময় একটা যেমন আপেক্ষিক জিনিষ না হয়েও মানুষের অভিলাষের কাছে এটা আপেক্ষিক, তেমনি চাহিদা নিজেই আমৃতকাল পর্যন্ত একটা পরিবর্তনশীল ফ্যাক্টরই ছিলো। সময়ের নিরিখে কারো উপর যখন কারো লোভ তৈরী হয়, চাহিদার মান ততো বেড়ে যায়, আর এই চাহিদাই সেটা যা মানুষের মৌলিক স্বভাবকে আমূল পরিবর্তন করে ত্রিভুজের চতুর্থ কোনে নিয়ে হাজির করায়, যা কখনো দেখা যায় না।   

সম্পর্কের গ্রাফের এই স্তরে এসে, একটি শেষ হয়ে যাওয়া সম্পর্ক কিংবা পূর্ব থেকে ঈসশরের দেয়া আইন কানুনে বাধা কোনো সম্পর্ক আরেকটা তৃতীয় চরিত্রের ধারায় এমন কিছু রসায়ন তৈরী করে যা জীবনকে শেষ করেই তারপর শেষ হয়ে যায়।  সম্পর্ক যখন ফাপা হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে অনেক দূষিত বাতাস ঢোকে যায়, আর দূষিত বাতাসে অক্সিজেনের অভাবে ভরে থাকে শুধু বিষাক্ত গ্যাস। যা শুধু মরনের কারন হয়। আবার এমনো হতে পারে, সম্পর্কটা প্রথম থেকেই ফাপা থাকে কিন্তু হয় কোনো পক্ষ বুঝে অথবা কোনো পক্ষই টের পায় না। তিলে তিলে এই ফাপা জায়গাটা আরো বড় হয়ে আরো বেশী দূষিত বাতাসের ঘনত্ত বেড়ে যায়। দূষিত বাতাসের ছোয়ায় আর সময়ের অবহেলায় এই সম্পর্ক তখন সিমেন্টের গাথুনীর বধলে আজীবন নরম মাটির মতো নরম ভীতে দাঁড়িয়ে থাকে। যখন কোনো সম্পর্ক নরম মাটি দিয়ে গাথা হয়, তখন এটা ভাংতে বেশী সময় লাগে না। ছোট ছোট ঢেউয়ে খুব তারাতাড়ি ধস নামে।

তখন যেটা হয়, যে, ঈশ্বর কর্ত্রিক প্রদত্ত সম্পর্ক, কিংবা সামাজিক রীতিতে বন্ধন কৃত সম্পর্ক অথবা গোপনে তৈরী ব্যক্তিগত সম্পর্ক বলতে আর কোনো কিছুই ফারাক থাকে না। মান ইজ্জত, অভিলাষ, পজিশন, কিংবা ভালোবাসা, আহলাদ, মায়া কিংবা বন্ধন সব টুটে একেবারে ছিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ে ঐ সমুদ্রে যার গভীরতা মাপার কোনো যন্ত্র আজো মানুষ সৃষ্টি করতে পারে নাই।

এভাবেই চলমান থাকে আইনের কাজ, শাসনের অপব্যবহার আর মনুষত্ত্যের বিলোপ। একদিন এই অবলুপ্তির বিকাসেই মানুষ হারিয়ে ফেলবে তার আসল মনুষত্ত্যের নীতিকথা। প্রতিটি জীবই ধ্বংস হয়ে যাবে নিজেদের কারনে।  

২৪/০২/২০২১-মিটুলের পোষ্টিং অর্ডার

মুদ্রার এক পিঠে যদি থাকে আফসোস, হতাশা, মানসিক যন্ত্রনা আর না পাওয়ার বেদনা, ঠিক তেমনি সেই একই মুদ্রার আরেক পিঠে থাকে সাফল্য, পাওয়ার আনন্দ আর খুশীর জোয়ার। মুদ্রার এক পিঠের দিকে তাকাইলে যেমন বুক ধড়ফড় করিয়া হার্টবিট বাড়াইয়া দেয়, নীল আকাশকেও মনে হয় ধূসর মেঘাচ্ছন্ন, তেমনি মুদ্রার আরেক পিঠে তাকাইলে মনে হয় মেঘলা আকাশও ভারী মিষ্টি। আশার জগত যখন নিরাশার বেড়াজাল কাটাইয়া প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে আসিয়া এই কথা কানে কানে বলে-” আমি আসিয়াছি, যাহা আপনি অনেক দিন ধরিয়া খুজিতেছিলেন, এই সেই আমি”। এই কাঙ্ক্ষিত ঘটনা যখন নিজের চোখের সামনে দাড়াইয়া আলিঙ্গন করে, তখন ইহাকে তো অবশ্যই, যাহারা যাহারা এই কাঙ্ক্ষিত শুভসংবাদ কিংবা সাফল্যমন্ডিত করার পিছনে ভালোবাসায় শ্রম দিয়াছে, তাহাদেরকেও মনে হয় খুব করিয়া বলি- আমি আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ, সবাইকে আমার অন্তর হইতে হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধ্যা আর ভালোবাসা।

এমনি একটা কাঙ্ক্ষিত সংবাদ- আমার বউ এর পোষ্টিং। আজ আমার বউ এর পোষ্টিং হইলো, সরকারী বাঙলা কলেজ, অর্থনীতি বিভাগ, অধ্যাপক হিসাবে। অজস্র শুভাকাঙ্ক্ষী আমার জন্য আর আমার বউ এর জন্য দোয়া করেছেন, কেউ আবার সাহাজ্যও করেছেন, কেউ মনে প্রানে চেয়েছেন, আমাদের ইচ্ছাগুলি পুর্ন হোক। সেটাই অসীম দয়াময় আল্লাহতালাহ এমন একটা শুভ সংবাদ দিয়ে আমাদের সবার মনকে শান্ত আর সুখী করিলেন। (আলহামদুলিল্লাহ)

(মিটুলের পোষ্টিং অর্ডার বাহির হইবার কারনে “অধ্যাপিকা মিটুল চৌধুরী ওরফে আমার বউ” কে উতসর্গ করা।)

১০/০২/২০২১-অসহায় সিনিয়র সিটিজেন

একজন অভিভাবক, কিংবা পিতামাতা তার জীবনের সমস্ত আনন্দ, আরাম, আয়েস, শখ আহলাদ বিসর্জন দিয়ে তার সন্তান মানুষ হোক এটাই মনে প্রানে চায় এবং সে মোতাবেক তার ক্যাপাসিটি অনুযায়ী সব কিছুই করে। কিন্তু যখন এই সন্তান বড় হয়, যোগ্য হয়, সমাজের বড় পরিসরে উঠে আসে, গর্বে পিতামাতার বুক ফুলে উঠে ঠিকই কিন্তু সেই সন্তান অনেক সময়ই বাবা মার এই ত্যাগ, এই বিসর্জন সঠিকভাবে মুল্যায়ন করেন না। এটা সব সন্তানের বেলায় যদিও সত্য নয় তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আজকাল এটা যেনো প্রায় একটা রীতি হয়ে যাচ্ছে। এই রীতির আবর্তে পড়ে দেখা যায়, প্রায়শই সেই বৃদ্ধ বাবা মা সন্তানবিহীন একাই দূর্বিসহ জীবন যাপন করেন। তারা একাই থাকেন, কিংবা তাদের কারো কারো আশ্রয় হয়ে যায় সেই নতুন রীতির আবর্তে গড়া ব্রিদ্ধাশ্রম। যারা বৃদ্ধাশ্রমে যান, তারা হয়তো কারো পরোক্ষ যত্নে কিছুটা ভালো থাকেন, কিন্তু যারা সেই ভাগ্য নিয়েও আসেন নাই, তারা পরিপূর্ন একা জীবন যাপন করেন। কেউ তাদের অনেক সময় খোজখবরও নেন না। ফলে একাকীত্ব দূর করার লক্ষ্যে অনেক বয়ষ্ক মানুষেরা এমন কিছু মানুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেন যারা কষ্মিঙ্কালেও তাদের বংশের কেউ ছিলো না কিংবা তারা তাদের কেউই না। তারপরেও মরুভূমির মধ্যে শুষ্ক কোনো পাতাবিহীন গাছকেও একটা অবলম্বন মনে করে এই অসহায় মানুষগুলি জীবনের তাগিদে সেই অপরিচিত আপাত বন্ধুসুলভ মানুষগুলিকেই আপন ভাবতে থাকেন। একটা কথা ইদানিংকালের জন্য ঠিক যে, শহরের মধ্যে যতো দ্রুত মানুষ বাড়ছে, ততো দ্রুতই মানুষের মধ্যে মানুষের দূরত্ব বেড়ে চলছে। আমরা প্রায়শই জানতে পারি না যে, আমাদের পাশের বাড়িতে কি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সেইসব বয়ষ্ক মানুষেরা যারা একা থাকেন তারা অপরাধীদের কাছে সহজেই শিকার হয়ে যান। আর যদি সেই অপরাধী কাছের কোনো মানুষ হয়, কিংবা কাছের মানুষের মতো মনে হয়, তাহলে বিপদ আরো বেড়ে যায়। আমাদের একাকী বয়ষ্ক মানুশেরা হয়তো তাদের হতাশা আর একাকীত্বের কারনে তারা তাদের সুখ বেদনার কথা যে কোনো অচেনা মানুষের সাথে ভাগ করে নেয়, কাউকে আপন করে নেন, এটা তাদের দোষ নয়। কিন্তু এত অন্ধবিশ্বাস মাঝে মাঝে খুবই প্রানঘাতিও হয়। ফলে দেখা যায়, সিনিয়র সিটিজেনরাই সমাজে ইদানিং সবচেয়ে বেশী অপরাধের শিকার হচ্ছেন। সমাজের এই অবক্ষয় দ্রুত বেড়ে চলছে আমাদের দেশে।

আমরা যে কথাটা প্রায়ই ভুলে যাচ্ছি যে, যে মা বাবা আমাদের জীবন তৈরী করার জন্য তারা তাদের সারাজীবন উজার করে দিয়ে, সমস্ত আনন্দ, শখ বিলিয়ে দিয়ে জীবনের এই পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছেন। সন্তানরা যখন বায়না ধরেছে, জেদ করেছে, আরএইসব মা বাবা সেটাকে পুর্ন করার জন্য দায়িত্ত হিসাবে আপ্রান চেষ্টা করেছেন, তাদের জীবন দেখভাল করা কি আমাদের সন্তানদের কর্তব্য নয়? আমরা যেনো এটা না ভুলে যাই যে, জীবনের এই অধ্যায়ে একদিন না একদিন আমাদেরকেও দাড়াতে হবে।

০৪/০২/২০২১-“আর একবার যদি”  একটা অনুশোচনার নাম।

আমরা যখন ভুল করতে থাকি, আমরা যখন নিজেদের সার্থের উপর দাঁড়িয়ে কোনো একটা সিচুয়েশনের অবমুল্যায়ন করতে থাকি, আর সেই অবমুল্যায়নের পথ ধরে যখন একটা এমন সিদ্ধান্ত নেই যেখানে যাওয়ার পর মনে হয়, আহা, ব্যাপারটা ঠিক হয় নাই, ঠিক তখনই শুরু হয়, “যদি আর একবার” এর মতো অনুশোচনা। এই ” যদি আর একবার” অনুশোচনা এমন একতা অনুশোচনা যেখানে নিজের হাতে আর কিছুই থাকে না, তাহকে পুরুটাই ভাগ্যের উপর। এই “আহা, যদি আর একবার” সুযোগটা খুব কম ভাগ্যবানের কপালে ফিরে আসে। বেশীর ভাগ সময়েই এটা আর ফিরে আসে না। কিন্তু এর অনুশোচনা, এর বোকামীর ফল কিংবা এর ফলে সৃষ্ট মনোবেদনা আজীবন কাউকে গোপনে বা প্রকাশ্যে মেনে নিয়ে একটা হতাশার সৃষ্টি করেই থাকে। তখন এই হতাশা তাকে বারবার এটাই মনে করিয়ে দেয়, “আহা যদি এই রকম না করতাম তখন”, “আহা যদি আরেকটু চুপ থাকতাম”, “আহা, কি দরকার ছিলো ঐ সময় এমনটা করার” ইত্যাদি। এই অনুশোচনা তাদের বেশী হয় যারা একটা সুযোগ হারিয়েছেন, যারা কোনো না কোনো ভাবে এই সুযোগ আর ফিরে পাবে না বলে নিশ্চিত থাকেন। তখন নিজেকে পৃথিবীর সব বোকা আর অবুঝের মতো মনে হয়। এই অনুশোচনা আরো বেশী করে প্রতিনিয়ত মানুষকে বেদনায় ফেলে যখন দেখা যায় যে, ফেলে আসা সুযোগটিই আসলে দরকার ছিলো, কিংবা এটাই আসলে তার জীবনের মোড়টা ঘুরিয়ে দিতে পারতো কিন্তু ব্যাপারটা না বুঝার কারনে ঘরে কাছে এসেও ভাগ্য তাকে এমনভাবে বিতাড়িত করেছে যার জন্য দায়ী সে নিজেই।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেনো আমরা এমন পরিস্থিতিতে পড়ি।

অনেক সময় কড়া কৈফিয়তকে মানুষ অপমান মনে করে। হোক সেটা কোনো চাকুরীর ক্ষেত্রে, কোনো কিছু কেনা কাতার ক্ষেত্রে, কোনো দায়িত্তিয়ের ক্ষেত্রে, কিংবা কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে। কিন্তু মানুষ প্রায়ই ভুলে যায় যে, সবাই যার যার হিসাবটা যখন নিজেরাই কড়ায় গন্ডায় সে নিজেই বুঝে নিতে চায়, কিন্তু অন্য কেউ যখন এই একই কাজটা নিজের উপরে করতে চায়, তখন সেটাকে নিজে বড় অপমান মনে করে, কিংবা অবিশ্বাস মনে করে। ভাবে, কেনো আমার কাছ থেকে এতো শক্ত করে কৈফিয়ত চাইতে হবে? কিংবা কেনো আমার উদাসিনতার কারনে এতো জবাব্দিহি করতে হবে? আমি তো তার অমুক, আমি তো তার তমুক, কিংবা আমি তো অনেক বড় আত্তিয় কিংবা আমি তো এটা সেটা ইত্যাদি। আমার তো এতো কৈফিয়ত দেওয়ার কথা না। আর এই অবাস্তব চিন্তা মানুষকে প্রায়ই একটা ভুল সংবাদ দেয় যে, তার এগুলি সহ্য করতে কেনো হবে? আর এই “কেনো সহ্য করতে হবে” এই ভুল ভাবনাটাই তাকে এমন একটা পরিস্থিতিতে নিয়ে হাজির করে যার নাম “ইগো”। আর এই ইগো থেকেই তারা ভাবে যে, কি হবে এইসব মানুষের থেকে সরে গেলে? ফলে, তারা অনেক সময় এই “ইগো”র কারনে হয় তারাই ক্রমশ সেইসব মানুষের থেকে, যারা বন্ধু, যারা আত্তীয়সজন কিংবা কাছের মানুষগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অথবা তারাই তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রাথমিকভাবে এটাই মনে হয় যে, ছেড়ে গেলে যেনো কিছুই যায় আসে না। এই যে ছেড়ে দেয়া বা ছেড়ে ফেলার পর কি হতে পারে, সেটা ঐ মুহুর্তে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উভয়েই না করে বিশ্লেষন, না করে এর বাস্তব প্রতিফলন। কিন্তু এর একটা প্রতিক্রিয়া সবসময় থাকে যা সময়ের আবর্তে উম্মোচিত হয়। যখন উম্মোচিত হয় তখন একটা জিনিষ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। আর সেটা হলো, যিনি সুপেরিয়র, তার যতোটা না ক্ষতি হয়েছে, তার থেকে অনেক অনেক বেশী ক্ষতি হয়েছে যিনি ইনফেরিয়র। দেখা যায় যে, ছেড়ে আসার ফলে যা ক্ষতি যাকে ছেড়ে আসা হয়েছে তার থেকে বেশী নিজের, তখনই শুরু হয় এই আহাজারি, “আহা, যদি আবার” আরেকটা সুযোগ পাই, “আহা, যদি আবার আমাকে ডাকা হতো” আমি কোনো প্রশ্ন ছাড়া সেই আগের জায়গায় চলে আসতাম। তখন মনে হয়, যে কোনো শর্তেই আমি আবার সেই আগের জায়গাটা ফিরে পেতে চাই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, কদাচিত সেই সুযোগটা কারো জীবনে ফিরে আসে। বিশেষ করে যিনি সুপেরিয়র, সে যদি আর সুযোগটা না দেয়, তাহলে ইনফেরিয়রের জন্য এটা আর কখনোই ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না।

অনেক সময় লোভ মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে যতটুকু পাওয়ার জন্য আমরা যোগ্য, তার থেকে যখন আমরা বেশী পেতে চাই কিন্তু কোনো কারনে সেটা আমাদের জীবনে বা হাতে না আসে, তখন রাগ হয়, জিদ হয়, মনে হয় যেনো কেউ আমাদেরকে ইচ্ছে করে ঠকাচ্ছে। এই যে পরের ধনের উপর আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত লোভ, এটা মানুষকে এমন একটা জায়গায় উপনীত করে যে, মনে হয় ঐ মানুষগুলি আমার কেউ না। নিজের অভিমান, নিজের চাওয়ার মধ্যে পাওয়ার যে ব্যবধান, এই সুত্রটাই আমাদেরকে একে অপরের থেকে ছিটকে পড়তে সাহাজ্য করে। যখন কেউ ছিটকে যায়, তখন যিনি লোভ করেছিলেন, তিনি বুঝতে পারেন, তার এই অযাচিত লোভই তাকে এমন এক কুড়েঘরে নিক্ষেপ করেছে যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। তখন সে নিজেই তার মুল্যবোধ বুঝতে পারে আর ভাবে, “আহা যদি আর একবার” সুযোগটা পেতাম, তাহলে অন্তত আমার জীবনটা আরো সুন্দর হতো। চোখের সামনে যখন দেখা যায় যে, যে আয়েশী জীবনটা আমার হাতের পাশ থেকে ছুটে গেলো আর যেটা অন্য আরেক জন উপভোগ করলো, তখন সেই নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে বড্ড অসহায় আর বোকাই মনে হয়। কিন্তু তার মন জানে কোথায় সে ভুলটা করেছে। যখন সে একা থাকে, তখন সে ঠিক এটাই ভাবে, আবার যদি এ রকম একটা সুযোগ আসে, আমি আর একই ভুল করবো না। কিন্তু সেটা শুধুই ভাগ্যের উপরে নির্ভরশীল একটা ইচ্ছা। বাস্তব আর নাও হতে পারে।

অপরিপক্ক বয়সের কারনেও এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আজকে কোনো এক দৈবচক্রে কারো ভাগ্য এমনভাবে খুলে যেতে পারে যা তার জীবনে দ্বিতীয়বার না হবারই কথা। যেমন ধরুন, কোনো এক মধ্যবিত্ত অপরিপক্ক যুবকের ভাগ্যে এমন এক প্রতাপ্সহালী আর ধনাঢ্য পরিবার সম্পর্ক করে ফেলতে পারে। অকালে এতো বিত্ত আর ক্ষমতার সহচার্য্যে নিজের যোগ্যতাকে যুবক এমন কিছু ভাবা শুরু করতে পারে যার কারনে সেই ধনাঢ্য পরিবার বারবার বিব্রতকর পরিবেশে পড়ে এবং তার লোভের নেশার কারনে সমুলে ছেড়ে দিতে পারে। যখন কোনো একদিন যুবক বুঝতে পারবে কি হারালো সে, তখন তার কাছে বারবার মনে হবে, “কি বোকাটাই না ছিলাম, কি প্রয়োজন ছিলো আমার এই সুযোগ হাতছাড়া করার?” ইত্যাদি। কিন্তু এই অবস্থায় দ্বিতীয়বার আর কোনো সুযোগ আসার কোনোই সম্ভাবনা থাকে না কারন Once fortune comes with luck but when lost, same fortune would come after lots of vigorous testing, and may not even come again. তখন হতাশাটা আরো ব্যাপক। অনুশোচনাটাও শুধু নিজের জন্যেই।

কারো প্ররোচনায়ও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

নিজেদের অলসতার কারনেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

০২/০২/২০২১-কনিকার আমেরিকার ভর্তির নোটিশ (UMBC)

ইন্টার পরীক্ষার ফলাফলের আগে থেকেই কনিকা আসলে এদেশে পড়বেনা বলে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলো। কনিকার সমস্যা হচ্ছে, ও যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত আমি বদল করতে পারি না, মাঝে মাঝে বদল করতেও চাইনা আসলে। ইন্টার ফলাফল পাওয়ার পর দেখা গেলো কনিকা সবগুলি সাব্জেক্টেই এপ্লাস মানে গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। এতে আরো সুবিধা হয়ে গেলো যে, ওর পরীক্ষার ফলাফলে যে কোনো ইউনিভার্সিটিতেই ভর্তি হবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলো। এর মধ্যে অনেকগুলি ইউনিভার্সিটিতে এপ্লিকেশন করেছে। কোনো ইউনিভার্সিটিই ওকে রিজেক্ট করে নাই বরং কনিকা ফাইনান্সিয়াল এইডের কারনে সে নিজেই বেশ কিছু ইউনিভার্সিটির এক্সেপ্টেন্স রিজেক্ট করেছে।

প্রথমে কনিকা সবগুলি ইউনিভার্সিটি চয়েজ করেছিলো বোষ্টন বেজড। কারন আমার বড় ভাই বোষ্টনে থাকেন। একটা সময় আমার মনে হলো যে, আসলে আমার বড় ভাইয়ের উপরে নির্ভর করে কনিকাকে এতোদূরে পাঠানো ঠিক হবেনা। প্রায়শ ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি যে, আমার বড় ভাইয়ের উপর অনেক ব্যাপারে ভরষা করা যায় না। কোনো কিছুতেই আমার বড় ভাই না করেন  না বটে কিন্তু ঠিক শেষ মুহুর্তে এসে দেখা যাবে তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। বিশেষ করে যখন কোনো ফাইনান্সিয়াল কোনো ব্যাপার থাকে সেখানেই তার সব বিপত্তি। তাই ভাইয়ার উপরে আমার ভরষা আমার ছোট মেয়েকে পাঠানো উচিত হবেনা বলে আমার কাছে মনে হলো। দেখা গেলো যখন কনিকার কোনো প্রয়োজন হবে ঠিক তখন কনিকার জন্য সাহাজ্য আর আসছে না।

আমি মতামত চেঞ্জ করে কনিকাকে বললাম যে, তুমি শুধু বোষ্টনের জন্য এপ্লাই না করে আমাদের আরো আত্তীয়সজন যেখানে বেশী আছে, সেখানেও এপ্লাই করো। আমেরিকাতে বাল্টিমোরে থাকে লুসিরা, ছোটভাই, এবং আরো অনেকেই। ফলে আমি কনিকাকে বাল্টমোরের জন্যেও এপ্লাই করতে বললাম। আজই উনিভারসিটি অফ বাল্টিমোর থেকে সরাসরি ওর ভর্তির ব্যাপারে চিঠি এসছে যে, ওরা কনিকাকে নিতে আগ্রহী এবং যত দ্রুত সম্ভব ওরা আই-২০ ফর্ম পাঠাতে চায়। শুনলাম, ওখানে লুসির ছেলেও আবেদন করেছে। লুসিরা খুব খুসিযে, কনিকা ওখানে পড়তে যাবে।

আপডেটঃ ১১ মার্চ ২০২১

আজ কনিকার আই-২০ ফর্ম এসছে ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, বাল্টমোর কাউন্টি) থেকে। ইউ এম বি সি বাল্টিমোরের সবচেয়ে ভালো একটা ইউনিভার্সিটির মধ্যে একটি। আর সবচেয়ে এক্সপেন্সিভও বটে। আমি খুশী যে, কনিকা নিজে নিজেই সব গুলি কাজ করেছে এবং খুবই স্মার্টলী ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করেছে। এবার ওর দূতাবাসে দাড়ানোর পালা। যদি ইনশাল্লাহ সব কিছু ঠিক থাকে, তাহলে আগামী জুলাই মাসে কনিকা আমেরিকায় চলে যাবে। এটা যেমন একদিকে আমার জন্য ভালো খবর, অন্য দিকে একটু কষ্ট ও লাগছে যে, মেয়েতা অনেক দূর চলে যাবে। ইচ্ছা করলেই আর ওর সাথে রাত জেগে জেগে আলাপ করা যাবে না। বাচ্চারা এভাবেই কাছ থেকে দূরে বেরিয়ে যায়। 

২৯/০১/২০২১-নাফিজের বিয়ে

নাফিজ হচ্ছে আমার এক বোনের মেয়ের ছেলে। আমার বোনের নাম শায়েস্তা খাতুন। সেই শায়েস্তা খাতুনের মেয়ে শেফালী। নাফিজ শেফালীর ছেলে। নাফিজের বাবার নাম নেওয়াজ আলী মোল্লা। সে গত ——তারিখে মারা গেছে। নাফিজ জাপানে থাকে, ওখানেই কোনো রকমে কাজ করে যতোটুকু পারে পরিবার এবং নিজের ভবিষ্যত গরার চেষতা করছে। নাফিজ যখন বিদেশ যায়, তখন আমিই ওকে স্পন্সর করেছিলাম। প্রায় ৩/৪ বছর পর নাফিজ দেশে এসছে। কিন্তু কবে দেশে এসছে, আর কোথায় কিভাবে বিয়ে করছে সেটা নিয়ে সে আমার সাথে কোনো পরামর্শ যেমন করে নাই, তেমনি ও যে ঢাকায় এসছে সেটাও আমাকে জানায় নাই। এগুলি নিয়ে আমার তেমন কোনো মাথা ব্যথাও নাই।

আজকে শুনলাম যে, আজ নাফিজের বিয়ে। এটা শুনলাম আমি মিটুলের কাছ থেকেই। ব্যাপারটা নিয়ে আমি একেবারেই সময় কিংবা মাথা খাটানোর চিন্তাও করি নাই কারন যার যার লাইফ তার তার। কে কিভাবে তাদের লাইফ উপভোগ করলো সেটা নিতান্তই তাদের ব্যাপার। আমি সাধারনত এ ব্যাপারে কারো জীবনেই হস্তক্ষেপ করি না কিংবা করতে পছন্দও করি না।

আমি ২০১৭ সাল থেকেই শেফালী মেয়েটাকে আর পছন্দ করি না। এই না পছন্দ করার পিছনে অনেক কারন আছে। সেটা পরে বলছি। শেফালী আর নাফিজ আজকে মিটুলকে নাকি ফোন করে বলেছে যে, নাফিজের বিয়েতে যেতে হবে। আমি মিটুলকে বললাম, নাফিজ ঢাকায় কবে এসছে? মিটুল নিজেও বলতে পারলো না।

আমি বললাম, আমি জানি, নাফিজ প্রায় ১ মাস আগে ঢাকায় এসছে। বাক্তার চর থেকে ঢাকায় যেতে সব সময় আমার অফিস পার হয়েই তারপর ঢাকায় যেতে হয়, নাফিজ যদি আমাকে ইম্পর্ট্যান্ট মনে করতো যে, আমি ওদের বড় কেউ গার্জিয়ান, তাহলে ঢাকায় আসার পরেই হয় আমাকে একটা ফোন করতে পারতো অথবা আমার অফিসে এসে দেখা করতে পারতো। এর মধ্যে আবার ওর কোথায় বিয়ে ঠিক হচ্ছ্যে, কার কি সমস্যা ইত্যাদি নিয়েও সে আমাকে নক করে নাই কিন্তু আমি জানি ওর বিয়ে নিয়ে ওর এক্স গার্ল ফ্রেন্ডদের মধ্যে বিশাল একটা ঝামেলা চলছে। আমি সব খবর পাই কিন্তু যেহেতু আমাকে কেউ কিছু বলছে না, ফলে আমি উপজাজক হয়ে এদের মধ্যে ঢোকতেও চাই না।

আমার করোনা পজিটিভ থাকায় আমি এম্নিতেও নাফিজের বিয়েতে যেতাম না, হয়তো আমার অন্যান্য সদস্যদেরকে পাঠিয়ে দিতাম। কিন্তু আমি চাই না যে, আমি বা আমার পরিবারের কেউ ওর বিয়েতে যাক। আমি জানি আমি না গেলে কি পরিমান প্রশ্নের সম্মুখীন হবে শেফালী এবং নাফিজ। ওরা জানেই না যে, পায়ের তলার মাটি সরে গেলে নিজের শরীরের ওজনটাকেও ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এটা আমি ওদের বুঝিয়ে দিতে চেয়েছি এবার। শেফালীর বাবা ছিলো না, মা ছিলো না, শেফালির বোন নুরুন্নাহারের থেকে শুরু করে জমজ দুই ভাই লিয়াকত আর শওকাত এদেরকে সেই দুই মাস বয়স থেকে আমরাই লালন পালন করেছি। ওদের বাবার নাম ওরাও হয়তো ভালোভাবে বলতে পারবে না। গ্রামের মানুষ, আশেপাশের মানুষ ওদেরকে এই নামেই চিনে যে, ওরা মেজরের ভাইগ্না ভাগ্নি। আর এটাই ছিলো ওদের সবচেয়ে বড় শিল্ড। আর ওরাই কিনা আজকে আমাকে ইগনোর করার চেষ্টা করেছে।  আমার খারাপ লাগে নাই ততোটা কারন আমি বুঝে গেছি যে, ওরা আসলে নিমক হারামের জাত।

বিয়েতে গেলাম না। আমি না যাওয়াতে কি হলো সেটা আমি জানি। শেফালীকে হাজার প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়েছে কেনো মামা এলো না। আমাদের গ্রামের মানুষ অনেকেই আমাকে দেখে নাই কিন্তু নাম শুনেছে। আবার অনেক পুরানো দিনের মানুষেরা আমার সান্নিধ্যে আসতে চেয়েও আমার অফিস পর্যন্ত আসার স্কোপ না থাকায় দেখাও করতে পারে না। আবার আমার পজিশনাল ফ্যাক্টরের কারনে অনেকে ভয়েই আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা থাকলেও দেখা করতে পারে না। এমন একটা পরিস্থিতিতে যখন কেউ শুনে যে, আমার কোনো আত্তীয়ের কোনো অনুষ্ঠান, তারা ভাবে যে, এবার নিশ্চয়ই মেজরের সাথে দেখা হবে। ফলে কেউ দাওয়াতে আসে আমার সাথে দেখা হবে বলে, কেউ আবার অপেক্ষা করে আমার সাথে দেখা হবে বলে। কিন্তু যখন আমার আর ওখানে যাওয়া হয় না, তখন কেনো যাই নাই, কি কারনে যাই নাই এই প্রশ্নে জর্জরীত হতে হয় তার যার বাড়িতে অনুষ্ঠান।

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর যখন আমার সেই আত্তীয় দিতে পারে না, তখন এতোদিন যে নামের ক্ষমতায় সারা গ্রাম চষে বেড়িয়েছে, যে লোকটির ক্ষমতায় সারাটা গ্রামকে ভয়ের মধ্যে রেখেছে, অনেকেই শুধু এই নামটার জন্যই যখন তাদেরকে তোষামোদি করেছে, তারা তখন এই প্রশ্নটাই করে- কই এতোদিন যাদের জোরে এতো তাফালিং, তারা তো আপনাদের কোনো অনুষ্ঠানেই আসে না, তাহলে কিসের এতো বাহাদুরী?

ক্ষমতার রেশ ছুটে যাচ্ছে, অপমানে মুখ দেখানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই যে অসহায় একটা পরিস্থিতি, এটা কিন্তু আমি তৈরী করি নাই, করেছে ওরা নিজেরাই। ওদের আর কোনো মনোবল নাই আমার সামনে এসে কোনো দাবী নিয়ে জোর দিয়ে বলতে পারে, যে, আপনি অবশ্যই আসতে হবে আমাদের অনুষ্ঠানে। একদিকে আমাকে না নিতে পারার কষ্ট আর অন্যদিকে মানুষের কাছে হেয় হবার অপমান কোনোটাই কম না।

আজকে আমার বউ আমার কাছে এসে বল্লো, যে, সেফালি অনেক কান্নাকাটি করেছে যে, মামা যদি নাও আসতে পারে, অন্তত আপনি ১০ মিনিটের জন্য হলেও একবার গ্রামে নাফিজের বিয়েতে ঘুরে যান, অন্তত আমি মানুষকে বলতে পারবো যে, মামা অসুস্থ তাই মামী এসেছেন। তা না হলে আমার আর অপমানের শেষ নাই। আমি সবার কাছে যেমন ছোট হয়ে যাবো, তেমনি আমি পরিবেশগতভাবেও অনেক দূর্বল হয়ে যাবো।

আমি শুধু মিটুলকে বললাম, যদি তুমি যেতে চাও, যাও, আমাকে কোনোভাবেই কনভিন্স করার চেষ্টা করো না যে, আমাকে নাফিজের বিয়েতে যেতে হবে। যে ছেলেটা একটা ফোন করেও আমাকে যেতে বলে নাই, তাদের আবার এতো অপমানের ভয় কিসের? তুমি যেতে চাও, যাও, দরকার হলে আমার যে কোনো গাড়ি নিয়েও তুমি যেতে পারো।  

আসলে আমি একটা পানিশমেন্ট দিতে চেয়েছি এই শেফালীকে। আর এখন তার সেই শাস্তিতাই পাচ্ছে। আমার ধারনা, সেফালী আরো বড় শাস্তির অপেক্ষায় আছে। তাহলে সেই শাস্তিটা কি? ব্যাপারটা হয়তো এভাবে ঘটবে- 

আমি নাফিজকে চিনি। অত্যান্ত দূর্বল চিত্তের একজন মানুষ, ইমোশনাল একটি ছেলে। শক্ত করে কোনো কিছুর প্রতিবাদ করার সাহসও এই ছেলেটার মধ্যে আমি দেখি নাই। সবসময়ই একটা ভাবুক উপলব্ধির মধ্যে থাকে। আজ যে বাড়িতে নাফিজ বিয়ে করছে, সেফালীর ধারনা যে, তার থেকে একটু উচ্চবিত্তের বাড়িতে সম্পর্ক করলে হয়তো বা সমাজে তাদের একটা আলাদা প্রতাপ বাড়বে কিংবা কোনো এক সমস্যায় হয়তো ওরা হাত বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু কুইনিন জ্বর সারালেও কুইনিন সারাবে কে এটা ওদের মাথায় নাই। অর্থাৎ যেদিন এই পরিবারটা নিজেই সেফালীর জন্য একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, তখন তাদেরকে প্রতিহত করার উপায় কি? লোহাকে লোহা দিয়ে পিটাতে হয়, কাঠ দিয়ে লোহাকে পিটিয়ে কোনো আকারে আনা যায় না। শুনেছি নাফিজের নবাগত স্ত্রী একজন ডাক্তার কিংবা নার্স বিষয়ক সাব্জেক্টে পরাশুনা করে।  ডাক্তার যে না এটা আমি সিউর কারন কোনো এমবিবিএস পড়ুয়া মেয়ে অন্তত নাফিজের মতো ছেলেকে বিয়ে করার রুচী বা পছন্দে আনতে পারে না। হয়তো নার্স হবে। সাধারনত যেটা হয় যে, গ্রাম্য এসব মেয়েগুলি একটু শিক্ষিত হলেই ভাবে যে, তারা অনেক ক্ষমতাশীল এবং ডিমান্ডেড। ফলে ওরা ওদের অনেক কিছুই চাহিদার বাইরে আব্দার বা দাবী করার প্রয়াশ পায়। আর এই কারনেই এই মেয়েটা একদিন ওর যা খুসী তাইই করার স্বাধীনতা রাখবে। ভাববে যে, সে তো নাফিজের থেকেও বেশী যোগ্য। তাই ওর যা দাবী সেটা তো নাফিজকে মানতেই হবে। নাফিজ তাকে তার অক্ষমতার কথা কিংবা দূর্দশার কথা কিংবা কোনো অন্যায় আব্দারের ব্যাপারে রাজী না হয়ে বাধা প্রদান করলে নাফিজের সব কথা সে নাও শুনতে পারে। আর যদি নাফিজ তাকে শাসন করতে যায়, তখন এই নবাগত স্ত্রী তার পরিবার মিলে নাফিজকেই শায়েস্তা করে ফেলবে। এমনো হতে পারে যে, অচিরেই নাফিজের স্ত্রী তার শাশুড়ির সাথে ধীরে ধীরে সম্পর্কটা অনেক দূরে নিয়ে যাবে, আর সেই দূরে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে শুধু সে নিজেই দূরে চলে যাবে না, সাথে নাফিজকেও দূরে নিয়ে যাবে। নাফিজের এতোটা মনোবল শক্ত নয় যে, নাফিজ বউকে ছেড়ে বা বউকে কড়া ভাষায় কথা শুনিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াবে। ফলে এমন একটা সময় আসবে যে, নাফিজের দেয়া মাসিক ভাতাটাও একদিন সেফালির জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। এই নাফিজের স্ত্রীই করাবে বন্ধ। এবার আসি সেফালীর আরেক ছেলের কথা। সেফালীর অপর ছেলে নাহিদকে দেখে আমার প্রতিবন্ধী মনে হয়। সারাদিন ঘর থেকে বের হয় না। কারো সাথেই সে কোনো কথাবার্তাও বলে না। শুধু রাতের বেলায় উঠোনে নাকি বের হয় আর রাতেই সে গোসল করে। এই এমন একটা ছেলের কাছ থেকেও সেফালির কিছু আশা করা উচিত না। নাহিদ একদিন নিজেকেই নিজে চালাতে পারবে না। যখন নাফিজের দেয়া ভাতা, বা টাকা সেফালীকে দেয়া কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিন এই নাহিদ এমনো হতে পারে নিজের জীবন নিজেই নিয়ে নিবে। কারন সে বেশীরভাগ সময়ে এই পৃথিবীর মানুষের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখে না। সমাজের মানুষ যেমন তাকে সচরাচর দেখে না, তেমনি সেও সমাজের সবাইকে ভালমতো চিনেও না। শুধু মুখ দেখে নাম বলতে পারাটাই চিনা নয়। যখন এই পরিস্থিতি আসবে, নিজেকে খুবই অসহায় মনে করবে নাহিদ আর ভাববে- ওর চলে যাওয়াই উচিত। আর থাকলো সেফালির মেয়ে। মেয়েরা যতোক্ষন পর্যন্ত নিজেরা নিজের পায়ে না দাড়ায়, ততোদিন সে না পারে নিজেকে সাহাজ্য করতে, না পারে তার আশেপাশের কাউকে সাহায্য করতে। ফলে ওর মেয়েরও একই অবস্থা হবার সম্ভাবনা আছে। হয়তো নিজের জীবন না নিলেও শুধুমাত্র বেচে থাকার তাগিদে কোনো এক ছেলেকে বিয়ে করে জীবনটা পার করে দেবে। সেখানে কিছুদিন হয়তো সেফালির ঠাই হবে কিন্তু স্থায়ী হবে না।

নাফিজের থেকে সেফালির দূরে চলে যাবার কারন হবে দুটু। (ক) নাফিজের স্ত্রীর সাথে সেফালির শাশুড়ি বনাম পুত্রবধুর সম্পর্কটা সেফালী নিজেই তৈরী করতে পারবে না বা পারার কথা নয়। সেফালীর যে চরিত্র সেটাই আমাকে এ কথা বলার কারন বলে মনে হয়েছে। আর এই শাসুড়ি বনাম পুত্রবধুর সম্পর্ক ভালো না হওয়ার কারনে সারাক্ষন নাফিজের স্ত্রী নাফিজের মার সম্পর্কে কটু কথা, কান কথা লাগাতেই থাকবে। আর সব শেষে গিয়ে নাফিজের স্ত্রী নাফিজকেই দায়ী করতে থাকবে সব কিছুর জন্য এবং একসময় নাফিজ তার মায়ের উপর এতোতাই বিরক্ত হবে যে, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা সেটা যাচাই করার আর কোনো মানসিকতা নাফিজের থাকবে না। ফলে যেতা হবে তা হচ্ছে- নাফিজ তার স্ত্রীর পক্ষ নিয়াই কথা বলবে। যেহেতু নাফিজ তার স্ত্রীকে কঠিন ভাষায় মায়ের পক্ষে ওকালতি করতে পারবে না, অথবা উচ্চবিত্ত শশুড়ের মুখের সামনেও দাড়াতে পারবে না, ফলে সে তার মাকেই সে ত্যাগ করবে। সেটাই নাফিজের জন্য সহজ পথ। সেফালি একদিন সত্যিই একা হয়ে যাবে আর সে একাকিত্তে নিজের জীবন নিজেই চালাতে গিয়ে ওর মা আজ থেকে ৪৫ বছর আগে যেভাবে জীবনযাপন করেছে, সেফালিকেও ঠিক সেভাবেই জীবনযাপন করতে হতে পারে। অর্থাৎ পরের ক্ষেতে ধান কাটার পর মাঠ ঝারু দিয়ে পরিত্যক্ত ধান কুড়িয়ে ধান আনা, কিংবা অন্যের ক্ষেতে বদলীগিরি করে, কিংবা এই জাতিয় কাজ করেই ওকে নিজের জীবন নিজেকে চালাতে হবে। (খ) আর দ্বিতীয় কারনটি হলো- লিয়াকত। যতোদিন লিয়াকত নিজের পায়ে দাড়াতে না পারবে, সে ততোদিন সেফালির ঘাড়ের উপরে বসেই জীবন বাচাতে হবে। কিন্তু লিয়াকতের বয়স এখন প্রায় ৩৮। সে লেখাপড়াও করেছে। কিন্তু জীবনমুখী নয়। ওর মতো বয়সের একটা ছেলে কোনো না কোনোভাবে নিজের জীবনসহ একটা সংসার চালাতে পারা সক্ষম হওয়া উচিত ছিলো। অনেকভাবে আমিও চেষ্টা করেছি, হাবীব ভাইও চেষ্টা করেছেন, এমন কি আমি ওকে গাজীপুরে একটা কম্পিউটার ট্রেনিং ইন্সটিটুটের মধ্যে লাগিয়েও দিয়েছিলাম, কিন্তু কোথাও সে এডজাষ্ট করতে পারে নাই। শেষতক আবার সেই সেফালির ঘাড়েই গিয়ে পড়েছে। যতোদিন নাফিজ বিয়ে করে নাই, ততোদিন লিয়াকতের হয়তো ততোটা সমস্যায় পড়তে হয় নাই। কিন্তু নাফিজের বিয়ের পর নাফিজের বউ সেফালির বাসায় থাকতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে নাফিজ দেশে নাই। অথচ লিয়াকত একই বাড়িতে থাকে। এটা কোনোভাবেই হয়তো নাফিজের স্ত্রী আরামবোধ করবে না। এই যে নাফিজের স্ত্রীর ভাষায় সে “আরাম বোধ করছি না” এর মানে একটাই- লিয়াকতকে সেফালির বাড়ি থেকে হটাও। সেফালির বাড়ি থেকে যখন লিয়াকত চলে যেতে বাধ্য হবে, তখন হয়তো সেফালি কিছুটা হলেও তার ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে চাইবে। আর এক কথা বলা চাওয়ার মধ্যেই সেই “দূরে” চলে যাওয়ার ব্যাপারটা লুকায়িত। তবে চুড়ান্ত কথা একটাই- যে কোনোভাবেই হোক, সেফালিকে শেষতক একাই থাকতে হবে, নিজের জীবনের জীবিকা তাকে একাই জোগাড় করতে হবে। এটাই হয়তো শেষের অধ্যায়।

এই যে সেফালিকে নাফিজের স্ত্রি ধীরে ধীরে পছন্দ করছে না এতা বুঝার কিছু উপায় আছে। দেখা যাবে যে, মাসের পর মাস নাফিজের স্ত্রী সেফালির বাসায় আসবে না। কারন দেখাবে যে, সে লিয়াকতের কারনে বিব্রত। সে ফ্রি না লিয়াকতের উপস্থিতিতে ইত্যাদি। ফলে লম্বা সময়ের জন্য সেফালির সাথে বিচ্ছেদ। কিংবা যদি সেফালি অসুস্থ্য হয়ে যায়, তখনো নাফিজের স্ত্রী সেফালিকে দেখভাল করতে আসবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। হয়তো কারন দেখাবে- করোনা কিংবা তার নিজের অসুস্থতা। যদি এমন কিছু ঘটতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যে, প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এটার ভাঙ্গন শুরু। 

অন্যদিকে, যদি নাফিজ আমাকে গার্জিয়ান হিসাবে সামনে রেখে ও ওর বিয়ের সমস্ত তদারকি করাতো, আর যাইই হক, নাফিজের শশুর বাড়ির মানুষের যে বাগাম্বর ভাবটা এখন আছে উচ্চবিত্তের ধারনায়, সেটা আর থাকতো না। কারন সে আমার তুলনায় কিছুই না। আমার মতো এমন একটা গার্জিয়ানের সামনে না নাফিজের স্ত্রী, না নাফিজের শশুড়বাড়ির কোনো লোক মাথা উচু করে কথা বলতে পারতো। সেফালিও তার গলা উভয়ের সামনে ঠিক আগের মতোই ধরে রাখতে পারতো। আমি একদিক থেকে একটা ব্যাপার নিয়ে শান্তিতে আছি যে, আমাকে আর এসব উটকো ঝামেলা আর পোহাতে হবে না।

এখানে আরেকটা কথা না বললেই নয়। কোনো একদিন নাফিজের শশুরবাড়ির লোকেরাও আমাকে হারিকেন জালিয়ে হন্যে হয়ে খুজবে যখন নাফিজের সাথে, নাফিজের স্ত্রী, কিংবা সেফালির সাথে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা তৈরী হবে। তখন তারা খুজবে কাকে ধরলে সমস্যা সমাধান হবে। আর সেই “কাকে ধরলে” খুজতে খুজতে ঠিক আমার আস্তানায় চলে আসবে এসব ‘উচ্চবিত্তরা”। আমি আসলে সেদিনটার জন্য অপেক্ষা করছি। শাস্তিটা আমি তখন দেবো ঠিক এভাবে যে- Who are you people? Do I know you?

২৯/০১/২০২১-হোসেন আলী মাদবরের সাময়ীক তিরোধ্যান

আমার বাবা যদিও অত্র কয়রাখোলা এলাকার খুবই নামীদামী এবং প্রতাপ শালী একজন মাদবর ছিলেন কিন্তু তিনি তার ঘরের মধ্যে একটা বিষয় নিয়ে খুবই অসফল লোক ছিলেন। আর সেটা হলো তারই নিজের ১ম পক্ষের ছেলে মোঃ তাজির আলীকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাজির আলী ছিলেন আমাদের স্টেপ ব্রাদারদের মধ্যে ২য় ভাই। প্রথম জনের নাম ছিলো নজর আলী, ২য় জনের নাম এই তাজির আলী এবং ৩য় ভাইয়ের নাম ছিলো মোহসীন আলী। তাজির আলী ভাইয়ের সবচেয়ে বেশী রাগ ছিলো আমার মায়ের উপর। কারন তিনি আমার মাকে কোনোভাবেই তার ২য় মা হিসাবে মেনেই নেন নাই। তার মধ্যে আমাদের এই পক্ষে আরো গোটা ৫ বোন আর ২ ভাই ইতিমধ্যে জন্ম গ্রহন করে ফেলেছি। আমার বাবার ছিলো অঢেল জমিজমা। আর বিশাল বাড়ি। তাজির আলী যখন বিয়ে করে, তখন থেকেই সে অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো। এর কারন হলো তাজির আলীর শশুড় বারীও ছিলো একটা খারাপ বংশের মানুষ। তারা মানুষের কাছে ডাকাতের সমপর্যায়ের শ্রেনী হিসাবেই গন্য হতো। এমতাবস্থায় শশুড় বাড়ির আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে তাজির আলী এতোটাই উছ্রিখল হয়ে উঠেছিলো যে, এক সময়ে সে এটাই ভেবে নিলো যে, ২য় পক্ষের আমাদের সবাইকেই সে হত্যা করবে। যদি দরকার হয়, সে তার বাবা অর্থাৎ আমার বাবাকেও হত্যা করে সমস্ত সম্পত্তি তাদের নামে লিখে নেয়া। আমরা তখন খুবই ছোট ছোট। শুধুমাত্র আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ সবেমাত্র ইন্টার পাশ করছেন। হাবীব ভাইয়ের এই ইন্টার পাশ করাও যেনো তার অনেক হিংসা এবং রাগ। বাবা ব্যাপারটা কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলেন না। আমার বাবা ছিলেন আসলেই খুব জ্ঞানী মানুষ। তিনি জানতেন, তাজির আলী যতোই হামকি ধামকি দিক, বাবার জিবদ্দশায় যে তাজির আলী কিছুই করতে পারবেন না সেটা তিনি নিসচিত। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তাজির আলীর কিংবা আমাদের অন্যান্য স্টেপ ব্রাদারদের কার কি ভুমিকা হবে এটা নিয়ে তার অনেক শংকা ছিলো। তাই তিনি দেখতে চাইলেন, তার অনুপস্থিতিতে কার কি ভুমিকা হয়। এতা তার একটা টেষ্ট করা দরকার।

বিশয়টা নিয়ে বাবা আমার ভাই হাবীবুল্লাহ্র সাথে বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার ভাইয়ের সাথে আমার বাবার ছিলো খুবই বন্ধুত্তের সম্পর্ক। ফলে, তারা দুজন মিলে একটা বুদ্ধি করলেন। বুদ্ধিটা এরকমের যে, হতাত বাবা উধাও হয়ে যাবেন। তখনকার দিনে তো আর মোবাইল ছিলো না, আবার ল্যান্ড লাইনের ফোন ও ছিলো প্রায় দুষ্কর, তাই বাবা যদি হটাত করে কোথাও কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যান, তাহলে সবাই ধরে নিবে যে, বাবা হয়তো কোথাও গিয়ে দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। এই সময়টায় কাদের কি কি ভুমিকা হয় সেটার আপডেট বাবা ভাইয়ার কাছ থেকে নিবেন। ব্যাপারটা জানবে শুধুমাত্র আমার ভাই আর বাবা। এমনকি আমার মাও জানবেন না। খুবই একটা গোপন বিষয়। আমার ভাই তখন সবেমাত্র ইন্তার পাশ করে জগন্নাথে ভর্তি হয়েছেন। বাবা ঢাকাতেই থাকবেন, কিন্তু কারো কাছেই প্রকাশ্যে আসবেন না। আমার ভাই মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ব্যাপারতা কে কিভাবে নিচ্ছে সেটা অব্জার্ভ করবেন এবং বাবাকে ফিডব্যাক দিবেন।

প্ল্যান মোতাবেক, বাবা একদিন সুদুর চট্টগ্রামে যাবেন বিধায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রাম ছাড়লেন। কিন্তু আর তিনি ফিরে এলেন না। একদিন যায়, বাবা আসেন না, দুইদিন যায় বাবা আসেন না। এভাবে সবাই খুব দুসচিন্তা করতে লাগলো। বাবাকে খোজা শুরু হলো। কোথাও বাবাকে পাওয়া গেলো না। আসলে যিনি লোক চক্ষের আড়ালে পালিয়ে থাকতে চান, তাকে যেভাবেই খোজা হোক, তাকে তো প্রকাশ্যে পাওয়া যাবেই না। কিন্তু বাবা আছেন, সুস্থই আছেন। আর এ খবরটা জানেন শুধু আমার ভাই। তারা প্রতিদিন শ্যাম বাজার শরীর চর্চার ঘাটে দেখা করেন। ভাইয়া বাবাকে তার তরোধানের পর গ্রামের খবরাখবর দেন। বাবা সেই খবরের উপর ভিত্তি করে তিনি তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আটেন।

দিনের পর দিন দিন যখন বাবা আর গ্রামে ফিরে এলেন না, মা খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমার অন্যান্য ভাওবোনেরাও চিন্তা করতে লাগলেন। গ্রামের গনমান্য ব্যক্তিরাও কোনো কিছু আছ করতে না পেরে প্রায় মাস তিন চার পর ধরে নিলেন যে, বাবা হয়তো কোথাও দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। খবরতা এবার বেশ পাকাপোক্ত হয়ে গেলো। আর অরিজিনাল প্ল্যানের কার্যক্রমটা যেনো এখান থেকেই শুরু।

তাজির আলি ভাইয়ের দাপটের চোটে, তার সাথে আমার অন্যান্য স্টেপ ব্রাদার এবং বোনদের দাপট এতোটাই চরমে উঠলো যে, আমাদের ২য় পক্ষের সব ভাই বোনেরা এখন জীবন নিয়ে শংকিত। বাবা প্রতিদিন তার বাড়ির খবর পেতে থাকলেন এবং মনিটর করতে লাগলেন যেনো ব্যাপারটা কোনো অবস্থাতেই অনেক খারাপের দিকে না টার্ন নেয়।

তারপর……

তারপর একদিন বাবা সব বুঝে যাওয়ার পর ভাবলেন, ওনার যা বুঝার তিনি বুঝে গেছেন যে, তার মৃত্যুর পর আমাদের ২য় পক্ষের ভাইবোনদের কি অবস্থা হবে। তিনি হটাত করে গ্রামে এসে হাজির হলেন। সবাই তো অবাক। কোথায় ছিলো এতোদিন এই হোসেন আলী মাদবর? বাবা কাউকেই কিছু বললেন না, শুধু বললেন যে, সুদুর চট্টগ্রামে গিয়ে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন। যেহেতু কারো মাধ্যমেই খবর দেয়া সম্ভব হয় নাই, তাই আর বলা হয় নাই। কিন্তু তিনি মনে মনে জানেন কি হয়েছে আর এখন তাকে কি করতে হবে।

বাবা ভাবলেন, আমাদেরকে আর মুনশীগঞ্জে রাখাই যাবে না। আমাদেরকে মাইগ্রেট করে অন্যত্র নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে যে কোনো সময়ে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যাবে। বাবা আমার খালু গনি মাদবরের সাথে ব্যাপারটা বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার খালু গনি মিয়া ছিলেন আরেক মাদবর এবং খুবই প্রতাপ শালী মানুষ। যার অঢেল সম্পত্তিও ছিলো কিন্তু সবই কেরানীগঞ্জ। বাবা ভাবলেন আমাদেরকে খালুর দেশেই নিয়ে আসবেন।

কিন্তু বিপত্তি হবে যখন আমার স্টেপ ব্রাদার এবং বোনেরা জানবে যে, বাবা আমাদেরকে মুনশীগঞ্জ থেকে কেরানিগঞ্জে নিয়ে আসবেন তখন। তাতে মারামারি কাটাকাটিও হতে পারে। এই ব্যাপারটা নিয়েও বাবা ভাইয়ার সাথে আর খালুর সাথে আরেকটা বিস্তারীত পরিকল্পনা করলেন কিভাবে সব মারামারি, কাটাকাটি হানাহানি পরিত্যাগ করে নির্বিঘ্নে মুনশী গঞ্জ থেকে একদিনের মধ্যে কেরানীগঞ্জে আনা যায়। কিন্তু এইটা ঠিক যে, আমাদেরকে খালুর দেশে কেরানীগঞ্জে আনতেই হবে আমাদের নিরাপত্তার জন্য।

২৯/০১/২০২১-কয়রা খোলা থেকে কেরানীগঞ্জে মাইগ্রেশন

আমার বাবা যখন শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, আমাদেরকে যে কোনো ভাবেই হোক, যতো দ্রুত আদি নিবাস মুনশিগঞ্জ, সিরাজদিখানের কয়রাখোলা থেকে কেরানিগঞ্জে স্থান্তান্তর করতেই হবে। আমার খালুর সাথে আমার বাবা অতি গোপনে বিস্তারীত ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এই স্থানান্তরের সবচেয়ে কঠিন বিষয়টা হচ্ছে গোপনীয়তা রক্ষা এবং কাজটা করতে হবে কেউ বুঝে উঠার আগেই। যদি ১ম পক্ষের কেউ বিন্দুমাত্র আভাষ পায়, তাহলে তাজির আলী, কিংবা অন্যান্যরা কিছুতেই আমাদেরকে কেরানিগঞ্জে আস্তে দিবে না, বাধা দিবে এবং এটা একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির স্রিষ্টি করবে যা ভাবাই যায় না।

আমার খালু ছিলেন কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর এলাকার অনেক প্রতাপশালি একজন ধনাঢ্য মাদবর। আমার খালু (গনি মাদবর) এবং আমার বাবা হোসেন আলী মাদবর দুজনে একটা ব্যাপারে একমত হলেন যে, যেদিন তাজির আলী কয়রাখোলার বাইরে থাকবে, হোক সেটা কোনো এক রাতের জন্য বা দুই রাত, সেই সময়ে পুরু বাড়িটা না ভেংগে কয়েক শত লোক নিয়ে এক রাতের মধ্যে বাড়িটা কেরানীগঞ্জে শিফট করা। এদিকে খালু তার নিজের একটা জমিতে আমাদের কয়রাখোলার বাড়ির অবিকল মাপে মাপে সব কিছু খুড়ে রাখবেন যাতে এক রাতের মধ্যেই পুরু বারিটা স্থাপন করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা হলো কয়রাখোলা থেকে বাক্তার চরে আসার মাঝপথে একটা নদী আছে। সেই নদী এতো বড় আস্ত একটা বাড়ি কিভাবে পার করা সম্ভব? এটার ও একটা বিহীত হলো। পরিকল্পনা হলো যে, খালু ২/৩ শত কলা গাছ দিয়ে নদীর উপর ভেলা বানিয়ে রাখবেন যাতে ঘর সমেত লোকজন পার হতে পারে।

এবার শুধু অপেক্ষার পালা, কবে তাজির আলী অন্য কোথাও বেরাতে যায়। ব্যাপারটা বেশীদিন সময় নিলো না। সমস্ত লোকজন ঠিক করা ছিলো, ভেলার জন্য কলা গাছ ও রেডি করা ছিলো, শুধুমাত্র আদেশের অপেক্ষা। তাজির আলী তার শশুড় বাড়িতে তিন চারদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার আওয়াজ শুনা গেলো। এদিকে বাবা এবং খালু সেই সময়তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

ঠিক যেদিন তাজির আলি তার শশুড় বাড়ি চলে গেলো, ওই দিন রাতেই একদিকে আমার বাবা তার দলবল নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়ি তুলে ফেলার ব্যবস্থা করলেন, খালূ নদীর উপর ভেলা সাজিয়ে ফেললেন, আর এদিকে আমার ভাই বাক্তার চরে পুরু বাড়িটা প্রতিস্থাপনের জন্যে দায়িত্তে থাকলেন।

মাত্র একটি রাত।

আর এই রাতের গহীন অন্ধকারেই আমার বাবা তার চার শতাধিক কর্মীবাহিনীকে নিয়ে, আমার খালু আরো দুই শতাধিক কর্মীবাহিনী নিয়ে আর অন্য দিকে আমার ভাই আরো প্রায় গোটা বিশেক পচিশেক লোক নিয়ে পুরু বাড়িটা ভোর হবার আগেই বাক্তার চরে সেট করে ফেললেন। গ্রামের মানুষ যখন ঘুম থেকে উঠলেন, তখন তারা একটা জিনিষ দেখলেন যে, কয়রাখোলায় আর বাড়ি নাই, অথচ বাক্তার চরে নতুন একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো। এটা কোনো আলাদিনের দৈত্যের কাহিনীকেও হার মানিয়েছে।

আমরা নতুন ঠিকানায় চলে এলাম। অন্যদিকে যখন তাজির আলীরা এই সংবাদ পেলো, তারা অনেক হৈচৈ লরেছে বটে কিন্তু ততোক্ষনে সব কিছু ওদের হাতের বাইরে চলে গেছে। এই নতুন ঠিকানায় এসে সবচেয়ে বড় কষ্টে ছিলেন আমার বাবা। তার সাম্রাজ্য ছেড়ে এখন তিনি নতুন এলাকায় কোনো কিছুই না। ভাগ্যের কি পরিহাস। গতকালের রাজা আজ অন্য কোথাও আরেকজনের প্রজা।

এখানে আমার (মেজর আখতার) একটা কমেন্ট করার খুব ইচ্ছে হলোঃ

শুধুমাত্র একটা বাড়ি তুলে আনাই কি মাইগ্রেশন? আর বাড়িতা তুলে না এনে কেনো আমার বাবা তার অর্থ খরচ করে বাক্তার চরে আরেকটা বাড়ি করলেন না? একটা নতুন বাড়ি করার পরেই তো তিনি আমাদের সবাইকে বাক্তার চরে মাইগ্রেট করাইতে পারতেন। এই জায়গাটায় আমার সাথে আমার বাবার বা খালুর বুদ্ধির সাথে এক হলো না। নিশ্চয়ই এর ভিতরে আরো কোনো মাহাত্য ছিলো যা এই মুহুর্তে আমার জানা নাই।

২৯/০১/২০২১-আমার বাবার আমলে মাদবরী স্টাইল -২

আগেই বলেছিলাম যে, আলী হোসেন সরকার আর আমার বাবা কন টেম পোরারী সময়ে প্রায় একই পর্যায়ের মাদবর ছিলেন। কেউ কাউকে হেয় না করলেও তারা কখনোই এক সাথে কাধে কাধ লাগিয়ে চলতেন না। কে সুপেরিয়র আর কে সুপেরিয়র নন এটা বুঝানো যাবে না আবার কেউ কারো থেকেও কম না এটাই আসলে তাদের মধ্যে ছিলো একতা অলিখিত দন্ধ। আলী হসেন সরকারের বাড়িতে কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে হোসেন আলী মাদবরে যেমন দাওয়াত থাকতো তেমনি হোসেন আলী মাদবরের বাড়িতেও কোনো অনুষ্ঠান হলে আলী হোসেন সরকারের ও দাওয়াত থাকতো। কিন্তু তারা কখনোই একে অপরের দাওয়াতে আসতেন না। এটাও এক রকমের গ্রাম্য রাজনীতর একটা বড় ঢং বলা যায়।

তো একবার আমার বাবা আসলেই চেয়েছিলেন যে, আলী হোসেন সরকার যেনো আমাদের বাড়িতে কোনো একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াতে আসেন। আমার বাবা জানতেন যে, তথাকথিত দাওয়াতে আলী হোসেন সরকার না আসারই কথা। তাই বাবা যা করলেন তাতে আলী হোসেন সরকারের না এসেও পারেন নাই। বাবা তার ইগো ঠিক রাখার জন্যেও তিনি নিজে আলী হোসেন সরকারের বাড়িতে গিয়ে তাকে দাওয়াত দিলেন না। যদিও তিনি সেটা করতে পারতেন। যাই হোক, বাবা, তার নিজের হাতের লাঠিটা এক পত্রবাহককে দিয়ে তার সাথে একটা চিরকুট লিখলেন-

জনাব আলী হোসেন সরকার, আমার সালাম নিবেন। আমার বাড়িতে আপনার দাওয়াত ছিলো। আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করছি আপনি আজ আমার বাড়িতে দাওয়াতে আসবে। আমি আমার হাতের লাঠিটি পাঠালাম, সাথে এই পত্রটি। ধরে নিবেন, লাঠিটি আমি নিজে এবং পত্রটি আমার কথা। আপনি আসবেন।

আলী হোসেন সরকারও সেই লেবেলের বুদ্ধিমান লোক, তিনি বুঝলে এর মর্মার্থ। তিনি বাবার হাতের লাঠিটি পত্র বাহকের কাছ থেকে রেখে দিলেন, সাথে পত্রটিও। তিনি রীতিমত পরিপাটি সাজগোছ করলেন। তারপর ঠিক সময় মতো বাবার হাতের লাঠিটি সাথে নিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে র ওয়ানা হলেন। আলী হোসেন সরকার যখন প্রায় আমাদের বাড়ির ঘাটে, আমার বাবা হোসেন আলী মাদবর নিজে ঘাটের কাছে গিয়ে আলী হোসেন সরকারকে অভ্যর্থনা জানালেন আর আলী হোসেন সরকার ও তার সেই অভ্যর্থনায় কোলাকুলি করে একটা যুগান্তকারী ব্যাপার ঘটিয়ে দিলেন।

আসলে তাদের মধ্যে সব সময় বন্ধুত্বই ছিলো, কোনো রেষারেসি ছিলো না। তারা কারো সম্পদ হজম করতেন না, গ্রাম বাসী ও তাদেরকে যথেষ্ঠ সম্মান করতেন। তারা জানতেন এই সব মাদবরদের একটা ওজন আছে, তাদের কথার ভ্যালু আছে, তাদের নীতি আছে। হ্যা, একে অপরের সিদ্ধান্ত সব সময় মেনে নেবেন সেটা হয়তো ছিলো না কিন্তু গ্রাম একটা সঠিক নেত্রিত্তের মধ্যে ছিলো।

আজো তারা সবার মুখে মুখে আছেন। প্রায় ৫০ বছর পার হয়ে গেছে, তাদের কথা আজো গ্রাম বাসী মনে রেখেছেন। আমরা আজো তাদের হেরডিটি উপভোগ করি। যখন কেউ জানে যে, আমরা হোসেন আলী মাদবরের বংশধর, মানুষ এখনো অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন আর বলেন তাদের সেই পুরানো ঐতিহ্যের কথা। ভালো লাগে।

২৯/০১/২০২১-আমার বাবার আমলে মাদবরী স্টাইল-১

সিরাজদিখানে যতোগুলি মাদবর আমার বাবার আমলে প্রতাপ শালী ছিলেন, তার মধ্যে আমি প্রায়ই যার নাম শুনেছি তার নাম আলী হোসেন সরকার। আমার বাবার নাম ছিলো হোসেন আলী মাদবর, আর ওই ব্যক্তির নাম ছিলো আলী হোসেন সরকার। তারা সরকার বাড়ির লোক। ভাইয়ার কাছ থেকে শুনেছিলাম যে, সরকার বাড়ির মানুষেরা কোনো না কোনোভাবে আমাদের বংশেরই আওতাধীন ছিলো। যাই হোক সেটা এখন আর বড় ব্যাপার নয়।

এই আলী হোসেন সরকার আর আমার বাবা হোসেন আলী মাদবরের মধ্যে গ্রাম্য পলিটিক্সের বেড়াজালে একটা অলিখিত আক্রোশ ছিলো। কিন্তু সেই আক্রশ তা এমন নয় যে, কোনো জমি জমা নিয়ে, বা পারিবারিক কোনো কোন্দল নিয়ে। এটা ছিলো নিতান্তই পাওয়ার পলিটিক্স। যেখানে হোসেন আলী মাদবর কোনো শালিসীতে থাকতেন, সেখানে আলী হোসেন সরকার থাকতেন না। আবার যেখানে আলী হোসেন সরকার থাকতেন সেখানে হোসেন আলী মাদবর থাকতেন না। প্রকৃত পক্ষে ওনারা ওনাদের কোনো সিদ্ধান্তে কেউ বাধা হয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রোশে সম্পর্কটাকে বিপদজনক করেন নাই।

এখানে মজার একটা ব্যাপার চলছিলো এই দুই পরিবারের মধ্যে। শুধুমাত্র আলী হোসেন সরকার আর হোসেন আলী মাদবরের মধ্যে যাইই থাকুক না কেনো, এই দুই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা খুব মিলেমিশেই থাকতেন। একজনের ভাতের হাড়ির কিছু অংশ যে আরেক জনের বাড়িতে যেতো না এমন নয়। এরা আবার আসলেই একে অপরের বন্ধুও ছিলো। কিন্তু সেটা প্রকাশ্যে নয়। কি রকমের একটা সম্পর্ক সেটা একটা উদাহরণ না দিলে ব্যাপারটা ঠিক বুঝা যাবে না।

আমার ভাই হাবীবুল্লাহ যখন লেখাপড়া করছিলেন, তখন আমার অন্য পক্ষের ভাইয়েরা এটাকে কোনোভাবেই ভালো লক্ষন হিসাবে নেন নাই। বিশেষ করে তাজির আলী ভাই। তার সব সময় টার্গেট ছিলো যে কোনো মুহুর্তে হাবীব ভাইয়াকে ক্ষতি করা, বিপদে ফেলা কিংবা মেরে ফেলা। এটা আমার বাবা খুব ভালো করে জানতেন। একদিন, আমার বাবা আলী হোসেন সরকারকে ব্যাপারটা শেয়ার করলেন যে, তিনি হাবীব ভাইয়ার জীবন নিয়ে তাজির আলির থেকে শংকিত। কি করা যায় পরামর্শ দরকার।

কি অদ্ভুত!!

হোসেন আলী সরকার কোনো কিছুই চিন্তা না করে আমার বাবাকে বললেন, শোনো হোসেন আলী মাদবর, তোমার ছেলে আর আমার ছেলের মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না এবং রাখীও না। আমার বাড়ি তোমার ছেলের জন্য ১০০% নিরাপদ। আগামীকাল থেকে তোমার ছেলেকে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। এখানেই খাবে, এখানেই পড়বে, এখানেই ঘুমাবে। তোমার যখন দরকার তখন আসবা, ওর যখন যেখানে যাবে ওর সাথে আমার ছেলেরা থাকবে।

সেই থেকে আমার ভাই আলী হোসেন সরকারের বাড়িতে থেকেই  অনেক দিন পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। এরাই আসলে মাদবর, এরাই আসলে বুদ্ধিমান। এরা যখন কোথাও শালিসিতে যেতো সেদিন ওনারা কারো পক্ষের বাড়িতে পানিও খেতেন না, কারন কোনো পক্ষপাতিত্ত তারা করতেন না।

মন্তব্যঃ

আজকাল গ্রামের উঠতি মাদবরদের বয়স দেখলে মনে হয় ওদের এখনো মোছ দাড়িও গজায় নাই। কেউ আওয়ামীলীগের সভাপতি, কেউ ছাত্রনেতা, কেউ এটা কেউ সেটা। এরাই মাদবর। এরা না করে বড়দের সম্মান, না করে ছোটদের আদর। ওরা প্রতিনিয়ত ঘুষের টাকায় চলে, ঘুষের কারনে ওরা রায় বদলায়। এদেরকেও কেউ সম্মান করে না।

২৯/০১/২০২১- নূরজাহান আপা

নুর জাহান আপা আমার জেঠস ছিলেন। অর্থাৎ আমার স্ত্রীর আপন বোন। তিনি একজন শিক্ষিকা ছিলেন, মীরপুরের সিদ্ধান্ত স্কুলের শিক্ষিকা। আমি নুরজাহান আপাকে চিনি আমারও বিয়ের প্রায় অনেক বছর আগ থেকে কারন আমরা গোলারটেকেই থাকতাম পাশাপাশি। আমি যেহেতু সবার সাথে খুব একটা মিশতাম না তাই বিয়ের আগে ঊনাদের সাথেও আমার খুব বেশি ঊঠানামা ছিল না। জাস্ট  চিনতাম, ঊনারাও আমাকে চিনতেন। তার স্বামীর নাম জয়নাল চৌধুরী, তিনি প্ল্যানিং কমিশনে চাকুরী করতেন এক সময়। বর্তমানে অবসর নিয়েছেন। ভালো মানুষ একজন।

নুর জাহান আপা অনেকদিন যাবত লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। আপা নিজে খুব পহেজগার মহিলা ছিলেন। তার দুই মেয়ে, সোমা এবং সনি আর এক ছেলে, নাঈম আহমদ। দুইজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছেলে থাকে আমেরিকায়। সেও বিয়ে করেছে।

আপার শরীরটা আস্তে আস্তে খারাপ হবার সাথে সাথে তিনি প্রথমে ইন্ডিয়া যান চিকিতসা করাতে। ওখানকার ডাক্তাররা বলেছিলেন যে, তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করাতে হবে, তানা হলে তাকে আর বেশিদিন বাচানো যাবে না। ব্যাপারটা প্রায় ঠিকই ছিলো। ইন্ডিয়া থেকে আসার পর আপা দ্রুত খারাপের দিকে যেতে শুরু করলেন। শেষে তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করাবেন এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হলো। কিন্তু জটিল ইন্ডিয়ান সিস্টেমের কারনে ইন্ডিয়া গিয়েও তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করা সম্ভব হয় নাই। 

অতঃপর আপা আবারো আমেরিকায় তার নিজের ছেলের কাছে গিয়ে আমেরিকার উন্নত মানের চিকিতসার জন্য। কিন্তু আমেরিকায় যাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। তার মৃত দেহ আমেরিকায় সতকার করা হয়। তার মানে নূরজাহান আপাকে আমরা দেশে কবর দিতে পারি নাই।

২৮/০১/২০২১-কনিকা, আমার ছোট মেয়ে

সানজিদা তাবাসসুম কনিকা আমার ছোট মেয়ে। জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ২০০০।

ভাবলাম, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাসায় আছি, সময়টা কাটছে না খুব একটা। সবার ব্যাপারে কিছু লিখতে থাকি।

কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমি জানতাম না যে, আমার আরেকটি মেয়ে হচ্ছে। আমি জানতেও চাই নাই। এটার পিছনে বেশ একটা কারন ছিলো। আর সেটা হচ্ছে যে, আমার শখ ছিলো আমার প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। আল্লাহ সেটা আমার বড় মেয়ে উম্মিকাকে দিয়ে সেই শখ পুরা করেছেন। তারপরের সন্তান আমার ছেলে চাই না মেয়ে চাই এটা নিয়ে আমার কোনো কৈফিয়ত কিংবা কোনো প্রকারের হাহুতাশ ছিলো না। শুধু চেয়েছিলাম যেনো আমার সন্তান সুস্থ্য হয়।

মেয়ে হয়েছে, এই খবরটা দেয়ার আগে ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমার প্রথম সন্তান কি? আমি উত্তরে বললাম, যেটাই হোক, মেয়ে হলেও আমি কিছুতেই অখুসি নই। দুটুই আমার সন্তান। এবারো সিজারিয়ান বেবি। মিটুলের অনেক কষ্ট হয়েছে এবার। আমার মা ঢাকার বাসাতেই ছিলেন, আমার মেয়ে হয়েছে শুনে, আমার মায়ের খুব মন খারাপ। আমি হেসেই বাচি না। আমি প্রথমে ব্যাপারটা মজা মনে করে মাকে কিছুই বলি নাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখলাম, আমার মা আমার ছোট মের‍্যেকে একেবারেই পছন্দ করেন না। বারবার শুধু একটা কথাই বলে- ওই ত্যুই ছেলে হইতে পারলি না?

আমার মেয়ে তো কিছুই বুঝে না। সে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে আর দাদির লগ্না হচ্ছে। কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমার বুকে একটা ধক করে উঠেছিলো। এতো অবিকল চেহারা হয়? একদম আমার মায়ের চেহারা। তার চোখ, মুখ, নাক , কান, মুখের আকৃতি সব কিছু আমার মায়ের চেহারা। আমি মনে মনে ভাবলাম, হে আল্লাহ, তুমি আবার এই ছোট মাকে আমার কোলে দিয়ে আমার বড় মাকে নিয়ে যেও না।

মাকে বললাম, মা , ছোট মেয়ে একেবারে তোমার অবিকল চেহারা পেয়েছে। তুমি যখন থাকবা না, এই মাইয়াটাই আমার কাছে তুমি হয়ে আজীবন বেচে থাকবা। অনেক দিন ছোট মেয়ের নাম রাখা হয় নাই। আমি মাকে দায়িত্ত দিয়েছি মা যেনো ছোত মেয়ের নাম রাখেন। যা খুশী সেতাই রাখুক। অবশেষে একদিন মা, ছোট মেয়ের নাম রাখলেন- কনিকা।

উম্মিকা ছোট অবস্থায় আমার সাথে থাকতে পারে নাই কারন আমি তখন বিভিন্ন সেনানীবাসে খালী পোষ্টিং আর মিশনের কাজে বিদেশ করে বেড়িয়েছি। কিন্তু কনিকার বেলায় বেশ লম্বা একতা সময় এক সাথে থাকার সুযোগ পেয়েছি।

তারপরেও বেশ অনেক গ্যাপ হয়েছে আমার ওদের সাথে থাকার। কনিকা বড় মেয়ের মতো সেও প্রথমে মেথোডিস্ট স্কুল মিডিয়ামে, তারপর মোহাম্মাদপুর প্রিপারেটরী এবং অতঃপর বিআইএস থেকে শহীদ আনোয়ারা গার্লস কলেজে পরাশুনা করে এস এস সি পাশ করেছে। সাংঘাতিক টেনসনবিহীন একটি মেয়ে। অল্পতেই খুব খুতখুতে কিন্তু খুব বুদ্ধিমতি। কনিকা উম্মিকার থেকেও একটু বেশি চালাক কিন্তু ধূর্ত নয়। আমার ইচ্ছে যে, কনিকা এডমিন ক্যাডারে চাকুরী করুক এবং সচীব হয়ে অবসর নিক। অথবা ব্যারিস্টার হোক। তাতে নিজের ব্যবসা নিজেই করতে পারবে, কারো সরনাপন্ন হতে হবে না। 

কিন্তু আমার ইচ্ছাটাই সব কিছু নয়। এই করোনা পেন্ডেমিকের সময় সরকার কর্তৃক অটোপাশের মাধ্যমে কনিকা ইন্টার পাশ করে ফেল্লো। কনিকার দেশে থাকার কোনো ইচ্ছা নাই। এই যে, সবাই আগামীতে কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, কোথায় ভর্তি হবে ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত আর কনিকা সারাদিন ইন্টারনেটে বিদেশের কোনো ইউনিভার্সিটিতে সে পড়বে সেটা খুজতে খুজতে ব্যস্ত। সে মনে প্রানে আর দেশে নাই। অনেক গুলি ইউনিভার্সিটিত থেকে কনিকা ইতিমধ্যে অফার লেটার পেয়েছে। আমি জানি আগামী বছরের মধ্যে কনিকা আর দেশে নাই। বাকী কি হয় কে জানে?

২৮/০১/২০২১-উম্মিকা,আমার বড় মেয়ে

আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা আমার বড়মেয়ে। জন্ম তার ১৬ জানুয়ারী ১৯৯৪ সাল।

তার জন্মের আগে আমার বড় ইচ্ছে ছিলো যে, আমার যেনো একটা মেয়ে হয়। আমি কখনোই ছেলে হোক চাই নাই। আল্লাহ আমার মনের আশা পুরন করেছেন উম্মিকাকে আমার ঘরে দিয়ে। সে খুব ভালো একটা মেয়ে। কিন্তু সে খুব সিম্পল। 

উম্মিকার জন্মের আগে (সম্ভবত ৪/৫ দিন আগে) আমি একটা সপ্ন দেখেছিলাম। তাহলে সপ্নটা বলিঃ

ঢাকা সেনানীবাসের মেস বি তে আমি একটা রুমে আছি। আমার পোষ্টিং ছিলো খাগড়াছড়িতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অধীনে। মিটুল পোয়াতি অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। যে কোনো সময় আমার বাচ্চা হবে। আমি ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসেছি শুধু আমার অনাগত বাচ্চার আগমনের জন্যই। নামাজ পড়ি, খাই দাই, আর সারাদিন হাসপাতালে মিটুলের সাথে সময় কাটাই।

একদিন রাতে (ডেলিভারির ৪/৫ দিন আগে) আমি সপ্নে দেখলাম যে, আমি আমাদের গ্রামের কোনো একটা দোকানে বসে আছি। ওখানে আরো অনেক লোকজন ও আছে। হতাত করে সবুজ একটা সুতী কাপড় পড়ে একজন মহিলা কোনো একটা ঘরের ভিতর থেকে বাইরে এসে আমাকে বল্লো, আমাকে আপনি কি চিনেন? আমি তাকিয়ে তাকে বললাম, জী না আমি আপনাকে কখনো দেখি নাই। উত্তরে মহিলাটি আমাকে বললেন, যে, তিনি হযরত আছিয়া বেগম অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর মা। আমি তো অবাক। কি বলে এই মহিয়সী মহিলা?

আমি ততক্ষনাত উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে তো আপনার কাছে আমাদের নবীজির অনেক চিঠি থাকার কথা! মহিলা বললেন, হ্যা আছে তো।

এই কথা বলে তিনি আবার ঘরের ভিতরে চলে গেলেন চিঠিগুলি আনার জন্য। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। আমি তখন সময়টা দেখলাম, রাত প্রায় শেষের পথে কিন্তু তখনো ফজরের আজান পড়ে নাই।

পরদিন ছিলো শুক্রবার। আমি জুম্মা নামাজ পড়ে ইমামের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললাম। তিনি প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবনা কিনা। আমি বললাম, আমরা খুব শিঘ্রই বাচ্চার আশা করছি। তিনি বললেন, আপনার মেয়ে হবে এবং খুব ভালো একজন মেয়ে পাবেন আপনি।

তার ৪/৫ দিন পর আমি আসর নামাজের পর কোর আন শরীফ পড়ছিলাম। এমন সময় আমার মেস ওয়েটার তড়িঘড়ি করে আমার রুমে নক করে বল্লো যে, স্যার আপনাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেছে। আমি তখন যেখানে কোর আন আয়াত পড়ছিলাম, ঠিক সেখানেই মার্ক করে কোর আন বন্ধ কত্রে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। মিটুলকে ওটিতে নেয়া হচ্ছে, সিজারিয়ান করতে হবে।

প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার মিষ্টি মেয়েটার জন্ম হলো এই পৃথিবীতে। কি নাম রাখবো সেটা আমি ঠিক করেছিলাম যে, আমি যেখানে কোর আন শরীফ টা পড়া বন্ধ করেছি, আর যে আয়াতে, আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ঠিক সেই আয়াত থেকেই কোনো একটা শব্দ দিয়ে নাম রাখবো। অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে- আমি ওই সময়ে হজরত মুসা (আঃ) এর উপরেই আয়াতগুলি পড়ছিলাম। সেখানে আয়াতে লিখা ছিলো- ইয়া হাইলা আলা উম্মিকা মুসা। অর্থাৎ হে মুসা, আমি তোমার মাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।

আমি ঠিক এই শব্দতটাই আমার মেয়ের নাম রাখার সিদ্ধান্ত নেই যে, ওর নাম হবে উম্মিকা। অর্থাৎ মা।

আমার সেই উম্মিকার প্রথম শিক্ষা শুরু হয় মীরপুর স্টাফ কলেজের টর্চ কিন্ডার গার্ডেনে। অতঃপর মেথোডিস্ট ইংলিশ মিডিয়াম, তারপর শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ এবং সেখান থেকে হলিক্রস। হলিক্রস থেকে উম্মিকা এইচএসসি পাশ করে ডাক্তারী পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে শহীদ জিয়া মেডিক্যালে আল্লাহর রহমতে ইন্টার্নী করে ২০২০ সালে ডাক্তারী পাশ করলো। এটা আমার একটা স্বপ্ন যে সে ডাক্তার হোক। আমার আরেকটা স্বপ্ন হচ্ছে, সে যেনো সেনাবাহিনীর ডাক্তার হয়। তাতে যে লাভটা হবে তা হচ্ছে, বাবার সেনাবাহিনীর জব ছিলো। রাজনীতির প্রতিহিংসায় সে ইচ্ছে করে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলেন, জেনারেল পর্যন্ত যেতে পারেন নাই। আমি চাই আমার মেয়ে সেটা হোক। আর ২য় কারন হচ্ছে, আজীবন কাল সে সেনাবাহিনীর সব বেনিফিট গুলি যেনো পায়। কিন্তু বাবাদের সব সপ্ন তো আর সার্থক হয় না। আমার মেয়ে চায় বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সে বেসামরীক লাইফেই থাকে।

২৭/০১/২০২১-আমার এবং বড় মেয়ে-করোনা পজিটিভ

কোনো কিছুই কোনো কারন ছাড়া ঘটে না, এটাই সত্য। যে ঘটনাটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিলো কেনো গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেললাম বলে, আজ সেটা পরিষ্কার হলো। আমার করোনা টেষ্টে পজিটিভ এসেছে। আমার বড় মেয়েরও করোনা পজিটিভ। ছোট মেয়ের করোনা নেগেটিভ। উম্মিকার মার তো আগেই একবার করোবা ধরা পড়েছিলো, তাই আর করাইতে দেই নাই। এর মানে হলো, শুধু ছোট মেয়ে ছাড়া আমাদের বাসায় সবার করোনা ধরা পড়লো। আল্লাহ যা করেন নিশ্চয় মংগলের জন্যই করেন। করোনা ধরা পড়ায় একটা জিনিষ মনে হলো যে, আমাদের আর টিকা নেওয়ার দরকার পড়বে না হয়তো।

দেশে টিকা এসেছে, সবাই টিকা নিতে ভয়ও পাচ্ছে, আবার এই টিকা নিয়ে যে কত রাজনীতি হয় তাও দেখা যাবে। এদেশে প্রতিটি জিনিষ নিয়েই রাজনীতি হয়। টিকা নিয়েও লম্বা সময় ধরে রাজনীতি হবে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যারা একবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এসছেন, হয়তো তারা আর টিকার ব্যাপারে কোনো মাথা ঘামাবে না, তারপরেও হয়তো টিকাটা নেয়া দরকার হতে পারে যেহেতু এটা একটা ভ্যাকসিন।

বাসায় আছি কদিন যাবত। করোনা হবার কারনে আমার শরীরে কোনো প্রকার আলাদা কোনো সিম্পটম নাই। সুস্থই আছি। বড় মেয়ের ঠান্ডাটা একটু বেশি। আমি প্রতিদিন ছাদে রোদে প্রায় ঘন্টা ২/৩ পুড়ি। ভালোই লাগে। কিন্তু বড় মেয়ে বি সি এস পরীক্ষার প্রিপারেশনে রাত জেগে পরাশুনা করে বলে দিনের অর্ধেক সময় পর্যন্ত ঘুমায়।

চারিদিকে বেশ ঠান্ডাও পড়েছে ইদানিং। এবারের ঠান্ডাটা একটু বেশী মাত্রায় পড়েছে বলে মনে হয়।

২৭/০১/২০২১-বড় ভাবীর দাফন সম্পন্ন (৮”৩০সন্ধ্যা)

আমি গত কয়েকদিন যাবত করোনায় ভুগছি। সাথে আমার বড় মেয়েও। কিভাবে ঘটনাটা হলো তা আমার এখনো জানা নাই। সে ব্যাপারটা পরে আসছি। বড় ভাবী (অর্থাৎ লিখনের মা) গতকাল ইন্তেকাল করেছেন। আজ তাকে মানিকগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়েছে মানিকগঞ্জ গোরস্থানে দাফন করার জন্য। আমি যেতে চেয়েছিলাম কিনা জানিনা, যেহেতু করোনায় ভুগছি, তাই কেহ আমাকে যেতেও বলে নাই। আর আমি যাওয়ার কোনো কারনও দেখিনা।বড় ভাবীর মৃত্যুর ঘটনায় আমার বেশ কিছু অব্জারভেশন চোখে পড়েছেঃ

ক।      লিখন আমেরিকায় ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে আছে যে, লিখন ইচ্ছে করলে ওর মাকে দেখতে আসতে পারতো ঠিকই কিন্তু হয়তো আর আমেরিকায় ফিরে যেতে পারবে না। এই ভয়ে লিখন ওর মাকে আর দেখতেই এলো না। ওর মাকে দেখার চেয়ে হয়তো ওর আমেরিকায় থাকাটা জরুরী মনে হয়েছে বিধায় লিখন আর ওর মাকে শেষবারের মতো দেখতে আসে নাই। প্রথিবীটা অনেক ছোট, আর কে কখন কোথায় থাকবে এটার ফয়সালা আল্লাহর হাতে। আমেরিকাতেই থাকতে হবে আমি এটা বিশ্বাস করি না। এই বাংলাদেশেও অনেক বিখ্যাত মানুষেরা বাস করে এবং অনেক পয়সা ওয়ালারা বাস করে। আমেরিকা কোনো সর্গরাজ্য নয় যে ওখানেই সেটেল হতে হবে সব আত্তীয়সজন বাদ দিয়ে। এই যে, আজকে লিখন তার মাকে শেষবারের মতো ও দেখতে পারলো না, ওর মা লিখনের হাতের মাটিও পেলো না, এর কোনো মানে হয় না। আমি জানি না আমার মৃত্যুর সময় আমার বাচ্চারাও আমাকে দেখতে আস্তে পারবে কিনা কিংবা আমি ওদের হাতে মাটি পাবো কিনা, তবে আমি মনে করি এমন কোনো জটিল পরিস্থিতিতে যেনো আল্লাহ আমাকে বা আমার সন্তানকে না ফেলেন যে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় আমি আমার সন্তানদের কাছে না পাই।

খ।      বড় ভাবী যখন করোনায় আক্রান্ত, তখন দেশে তার সব ছেলেরা ছিলো। মারুফ ছিলো, তুহীন ছিলো, মুবীন ছিলো, ইমন ছিলো, সবাই ছিলো। একমাত্র মুবীন সারাক্ষন হাসপাতালে ওর মার জন্য ডিউটি করেছে। আর বাকী ছেলেরা খুব একটা দেখতেও যেত না আবার হাসপাতালেও ছিলো না। যেহেতু মায়ের করোনা, তাই সবাই দূরে দূরেই ছিলো। খুবই হতাশার কথা হচ্ছে, যখন বড় ভাবী মারা গেলেন, তখন মানিকগঞ্জে তার লাশের সাথে কে যাবে, বা কারা যাবে এটা নিয়েও একটা কনফিউশন ছিলো। ইমন, তুহীন কিংবা মারুফ তারা ওর মায়ের সাথে যাবে কি যাবে না তারা ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। লিখন দেশে থাকলে লিখন কি সিদ্ধান্ত নিতো সেটা আমি জানি না, তবে, খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা হতো বলে আমার জানা নাই। বড্ড খারাপ লাগলো কথাতা শুনে যে, যে মা আজীবন ছেলেদের জন্য জীবন দিয়ে দিলো, যে মা এতোটা বছর ওদেরকে বুকে পিঠে মানুষ করলো সেই মাকে করোনায় মারা যাওয়ার কারনে মানিকগঞ্জে গোরস্থানে একমপ্যানি করবে কি করবে না সেটাই এখন সবচেয়ে যেনো বড় প্রশ্ন। আসলেই পৃথিবীটা খুবই সার্থপর একটা জায়গা। এখানে মানুষ নিজেকে ছাড়া আর কারো কথাই সে ভাবে না।

গ।      লিজি আপা যখন বিল্ডিং বা বাড়ি বানানোর জন্য তার বাবার সম্পত্তির উপর সবার কাছে অনুমতি চাইলেন, তখন সব ভাইবোনেরা রাজী থাকলেও শুধুমাত্র লিখনদের পরিবার লিজি আপাকে তার বাবার সম্পত্তি থেকে উতখাত করার জন্য একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিলো। লিখনের সাথে একজোট হয়েছিলো ওর স্ত্রী শিল্পীও, যদিও শিল্পি লিজি আপার আপন বোনের মেয়ে। লিজি আপার এই বাড়ি বানানো নিয়ে লিখন এবং তার পরিবার (বড় ভাবী সহ) এমন একটা সিচুয়েশ তৈরী করে ফেলেছিলো যে, তুহীন বলেছিলো- যদি লিজি ওখানে বাড়ি বানায়, তাহলে লিজিকে সে খুন করে ফেলবে, মারুফ বলেছিলো যে, লিজিকে সে লাথি লাথিতে ওখান থেকে বের করে দেবে, আর অন্যান্রা বলেছিলো, তারা কখনোই আর মানিকগঞ্জে যাবে না। ইত্যাদি। আমি আর মিটুল সব সময় চেয়েছি যে, লিজি আপা যেনো ওখানে বাড়িটা করে। এর জন্য আমি নেপথ্যে থেকে যতো প্রকার সাহাজ্য করার দরকার, আমি সেটাই করেছি। আজ ঠিক এই মুহুর্তে মানিকগঞ্জে লিজি আপার ৬ তালা বিল্ডিং সায় দাঁড়িয়ে। বড় ভাবীর মৃত্যু দিয়ে আল্লাহ এমন সময় ওদেরকে মানিকগঞ্জে নিয়ে গেলেন যখন ওরা সবাই দেখল লিজি আপার ৬ তালা বাড়ি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, আজ সেই লিজি আপার বাড়িতেই সবার আশ্রয়। কি অদ্ভুদ না? আল্লাহ জুলুমকারীকে এবং অহংকারীকে কিছুতেই পছন্দ করেন না। সমস্ত দম্ভ ভেংগে দিয়ে আজ আল্লাহ এইসব সদস্যদেরকে একেবারে সেই লিজি আপার বাড়িতেই উঠাইলো। কিছু কি শিখতে পারলো ওরা?

ঘ।       মজার ব্যাপার হলো, যেদিন লিজি আপা মানিকগঞ্জে বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলেন, ঠিক সেই সময়ে লিখন আমেরিকায় গিয়েছিলো রুটিন ভিজিটে। কি এক অদৃশ্য শক্তিতে আল্লাহ লিখনকে ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে দিলো যে, লিখন আর বাংলাদেশেই আসতে পারলো না। লিখন বলেছিলো যে, সে যদি দেশে থাকে তাহলে লিজি আপা কিভাবে বাড়ি বানায় সেটা সে দেখে নেবে। লিজি আপার পিতার ভিটা, তার নিজের হকের জমি, লিখনের জমিও না, অথচ লিখনের এই রকম দাম্ভিকতা আল্লাহ নিশ্চয় পছন্দ করেন নাই। কোনো না কোনো অজুহাতে আল্লাহ ঠিক তার ম্যাকানিজমে একেবারে সুদুর আমেরিকায় এমন করে বন্দি করে দিলো যে, ওর বাংলাদেশের চাকুরীটাও আর নাই, আর আমেরিকায় ৭/১১ দোকান গুলিতে খুবই সস্তায় একটা জব করতে বাধ্য হলো। এই ঘটনাটা আর যে কেউ যেভাবেই দেখুক, আমি দেখি আল্লাহর ন্যায় বিচারের নমুনা।

ঙ।      এখানে একটা কথা না বললেই না। মারুফের ছেলের বয়স মাত্র ৩ বছর। বড় ভাবী তার নায় নাতকুরের জন্য ছিলেন ডেডিকেটেড। সারাক্ষন তাদেরকে খাওয়ানো, পরানো, বাইরে নিয়ে গুরিয়ে আনা, কোথাও বেড়িয়ে আনা ইত্যাদি কাজগুলি খুব আদরের সাথে করতেন। আর তার নাতি নাতকুরেরাও বড় ভাবীর প্রতি খুবই ভক্ত ছিলো। কিন্তু যেদিন বড় ভাবীর করোনা ধরা পড়লো, ঠিক সেদিন থেকে মারুফের ৩ বছরের ছেলে মশারী তাংগীয়ে যে এক ঘরে বসে গেলো, ভুলেও সে আর তার দাদীর কাছে আসে নাই। সে বারবার বলতো যে, সে করোনায় ভয় পায় এবং সে তার দাদীর কাছে আসতে চায় না। বড় ভাবীর মরার আগ পর্যন্ত এই অবুঝ বাচ্চাটাও আর ভাবীর কাছে আসে নাই। কি নির্মম তাই না?

যাই হোক, আমি এই কথাগুলি বলে কাউকে ছোট করতে কিংবা আল্লাহ ওদেরকে শাস্তি দিয়েছেন এটা ভাবি না। শুধু ভাবী যে, মানুষের উচিত বান্দার হক সব সময় ফিরিয়ে দেয়া। এ জগতে কেউ থাকে না, থাকবেও না। কিন্তু আজ যে কর্মগুলি আমরা রেখে গেলাম, সেটার ফলাফল সে পাবেই।

এইমাত্র মিটুল বড় ভাবীর দাফনের পর বাসায় এলো। বেশ কিছু জানতে ইচ্ছে করল। যেমন, লিখন আমেরিকায় আছে, ওর মা মারা গেলেন, লিখন কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, ছটফট করেছে কিনা, না আসার কারনে, কিংবা অনেক মন খারাপ করে ওর মার জন্য কান্নাকাটি করছে কিনা ইত্যাদি। মিটুল জানালো যে, যখন ভাবীকে দাফনের নিমিত্তে কবরে নামানো হবে, তখন অনেকেই ভাবীকে দেখার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো। কেউ কেউ আবার ভিডিও ও করেছিলো। ওই সময় নাকি ইমন এবং মুবীন লিখনকে ফোন করে জানিয়েছিলো লিখন ভাবীর ভিডিও দেখতে চায় কিনা, কিংবা কিছু বলতে চায় কিনা। লিখন নাকি উত্তর দিয়েছিলো যে, সে কনো কিছুই দেখতেও চায় না, না ওর ছেলেমেদেরকে দেখতে দিতে চায়। এই ব্যবহারের অর্থ শুধু জানে লিখন। যাই হোক, ইতিহাস এটাই।

আজ থেকে হাসমত আরা (ভাবীর নাম) নামে কোনো মহিলার আনাগোনা এই দুনিয়া থাকলো না। কয়েকদিন সবাই তাকে নিয়ে হয়তো গল্প করবে, হাহুতাশ করবে, কেউ কেউ হয়তো তার অভাব ফিল করবে, কেউ আবার তার কথা ভুলেই যাবে। সময় তাকে আরো বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এক সময় হাস মত আরা নামে কোনো মহিলা এই দুনিয়ায় ছিলো এটাই কেউ জানবে না। মানিকগঞ্জের বাড়িই বা কি, সন্তানই বা কি কোনো কিছুই আর নাই।  এটাই জীবন। জীবন সব সময় মৃত্যুর কাছেই পরাজয় বরন করেছে, আর করবেও। বড় ভাবী এখন ৩ হাত মাটির নীচে অন্ধকার কবরে একা এবং তার সাথে আর কেহই নাই। না তার সাধের বিছানা, না নায় নাতকোর, না আমেরিকার কোন সুসংবাদের কাহিনী।

আমি সব সময় মৃত মানুষের জন্য দোয়া করি।  ভাবীর জন্যেও আমি দোয়া করি। তার উপরে আমার কোনো রাগ নাই।

২৬/০১/২০২১-আমার নিজের করোনা

গত ২৩/০১/২০২১ তারিখের সকাল ৮ টার সময় হটাত করে মনে হলো কোনো গন্ধই পাচ্ছি না। এর ২/৩ দিন আগে থেকে একটু একটু শরীর খারাপ ছিলো। দূর্বল লাগছিলো, ঘুম ঘুম ভাব ছিলো। একটু একটু ঠান্ডাও ছিলো। গন্ধ না থাকার কারনে ভাবলাম, করোনা কিনা। এর মধ্যে আবার জিহবায় একটা ছোট দাগ ছিলো যেটা আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো ঘা। ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম, উনি বললেন ভিটামিন সি খান। হয়তো ভিটামিন সি এর অভাব। ব্যাপারটা আমলে নিয়েছিলাম বটে কিন্তু গত কয়েক মাস আমি যেভাবে ভিতামিন সি খেয়েছি, তাতে আমার মনে হয়েছিলো আমার ভিটামিন সি সারপ্লাস হবার কথা। তারপরেও আরো বেশী করে লেবু প্লাস ভিটামিন সি ট্যাবলেট খাইতে থাকলাম। কিন্তু ঘা টার কোন কমার লখন দেখি নাই। এর মধ্যে হটাত করে গন্ধ না পাওয়ার কাহিনী। একটু ভয় তো পাইলামই কিন্তু শরীরে অন্য কোনো উপসর্গ নাই। যেমন, কোনো কাশি নাই, গলা ব্যথা নাই, জর নাই, অক্সিমিটারে অক্সিজেন লেবেল ৯৯% দেখায়। গায়ে কোনো ব্যথাও নাই। তারপরেও সেফ এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট, প্যারাসিটামল, আর ম্যাগ্নেশিয়াম ট্যাবলেট খাইলাম বেশ কয়েকদিন। অফিসেও গেলাম না। একই কাহিনী আমার বড় মেয়ের উম্মিকা। সেও কোনো গন্ধ পায় না কিন্তু রুচী আছে। অবশ্য ওর একটু ঠান্ডার ভাব আছে। সেটাও মারাত্তক না। তাই আমি , উম্মিকা আর কনিকার করোনার স্যাম্পল টেষ্টের জন্য প্রভা হেলথ কেয়ারকে বাসায় এনে স্যাম্পল দিলাম। এই তিন দিন যাবত ছাদে প্রায় ২/৩ ঘন্টা করে রোদ পোহালাম। রোদ পোহাইতে ভালোই লাগে।

একটু আগে ছাদ থেকে বাসায় এসে গোসল করলাম। আমি সাধারনত গোসলের পর পারফিউম দেই। হটাত খেয়াল করলাম, আমি পারফিউমের গন্ধটা পাচ্ছি। যেটা আগে একেবারেই পেতাম না। কি হলো?

কেদনোই বা গন্ধের সেন্সর আউট হয়ে গেলো আবার কেনোই বা গন্ধের সেন্সর আবার ফিরে এলো এটা আমার কাছে একটা গবেষনার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। যাই হোক, অন্তত খারাপ কিইছু সম্ভবত হয় নাই। বাকীটা আল্লাহ ভরসা।

২৬/০১/২০২১-বড়ভাবী (লিখনের মা) মারা গেলেন (রাত৮ঃ৩০মিনিট)

সারাদিন বাসাতেই ছিলাম। এ কদিন বাসাতেই ছিলাম আসলে কারন আমি কোনো কিছুতেই গন্ধ পাচ্ছিলাম না। দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিলো। ফলে অনেকেই ফোন করেছিলো বুঝতে পারি নি। এই মাত্র ১০ মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠে কিছু নাস্তা করলাম। দেখলাম অনেকক্ষন যাবত মিটুল ওর ভাই বোনদের সাথে কথা বলছিলো। বিষয় ছিলো ‘বড় ভাবীর অসুস্থতা”। বড় ভাবী বেশ কয়েকদিন যাবত করোনার কারনে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। লাইফ সাপোর্টে ছিলো। হটাতই মিটুলের চিৎকার শুনলাম। বুঝলাম, ভালো খবর নাই।

কানতে কানতেই ড্রইং রুম থেকে আমার রুমে এসে বল্লো যে, “বড় ভাবী আর নাই”। ইন্না নিল্লাহে পড়ে বললাম, ভাবীর জন্য দোয়া করো, এ ছাড়া তো আর কারো কিছুই করার নাই।

মৃত মানুষের উপর কোনো রাগ রাখতে নাই। এই মুহুর্তে বড় ভাবীর উপরেও আমার কোনো রাগ নাই। তবে যতোদিন উনি জীবিত ছিলেন, তার উপর আমার একটা প্রচ্ছন্ন রাগ ছিলো। আর রাগটা নিতান্তই আমার কারনে নয়। মানুষ যখন জেনে শুনে ইনসাফ করে না, তার জন্য আমার রাগ হয়। বড় ভাবীর উপরেও আমার এই একটা কারনে বেশ রাগ ছিলো।

বড় ভাবীর ছেলে লিখন ভালো চাকুরী করে। কিন্তু তার চাকুরীর সমমর্যাদার মতো তার মধ্যে ইনসাফের অনুপাতটা একই রকম ছিলো না। লিজি আপা যিনি কিনা বাবার হক প্রাপ্য এবং লিজি আপাকে এই লিখন এবং তার পরিবার যে কোনো ভাবেই হোক, তার সেই বাবার হক থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করা যায়, সেটাই করার চেষ্টা করেছিলো। আমি এই অন্যায়টা যেনো না হয় তার ১০০% বিপরীতে দাড়িয়েছিলাম। শেষ অবধি লিজি আপারই জয় হয়েছিলো আল্লাহর রহমতে। কোনো একদিন আমি বড় ভাবীকে একটা কথা বলেছিলাম যে, যেদিন মারা যাবেন, সেদিন যেনো সবার হক সবাই পেয়েছে কিনা সেটা মন থেকে জেনে তারপর মারা যান। তানা হলে এর কৈফিয়ত দিতে দিতে আল্লাহর কাছে ঘেমে যাবেন। যদি লিখন কোনো অন্যায় করে থাকে, তাহলে মা হিসাবে লিখনকে বুঝানো দরকার যে, এটা অন্যায়। এটুকু বল্লেও আপনার পক্ষে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হয়, আপনি বেচে যাবেন।

আজ বড় ভাবীর সমস্ত ফাইল ক্লোজড। উনি মাত্র ১০ মিনিট আগে ইন্তেকাল করলেন। (রাত সাড়ে আটটায়)। লিখনকে কোনো প্রতিবাদ করেছিলেন কিনা জানি না। তারপরেও আমি তার জন্যে দোয়া করি তিনি যেনো জান্নাতবাসী হোন।

লিখন আমেরিকায় ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে আছে যে, না সে ঢাকায় আসতে পারতেছে, না ওখানেও ভালো কোনো জব করতে পারতেছে। ছেলেটার মধ্যে ভীষন রকমের খারাপ কিছু এটিচুড আছে যা ওর সাথে মানায় না। যাই হোক, যে যেভাবে চলে হয়তো ঈশ্বর তাকে তার পূর্ন প্রতিদান সেভাবেই দেন। কারো জন্য বদদোয়া আমি করি না। কিন্তু আমি সবার জন্য ইনসাফ করতে সর্বদা আগ্রহী।

আল্লাহ ভাবীকে জান্নাত বাসী করুন।

২৬/০১/২০২১-বড় ভাবীর শেষ অনুষ্ঠান আমাদের বাসায়

(Our Days are Numbered)

গত ১/১২/২০১৯ তারিখে কোরবানীর পরপরই আমাদের বাসায় একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান ছিলো। সেদিনই ছিলো বড় ভাবীর জন্য তার জীবনে আমাদের বাসায় শেষ অনুষ্ঠান। আর আজ ২৬/০১/২০২১ তারিখ। এই দুইটি তারিখের মধ্যে মোট দিন ছিলো ৪২২ দিন অর্থাৎ ১ বছর ১ মাস ২৫ দিন।

আমরা প্রায়ই বলি, আমাদের আয়ুষ্কাল নাম্বারড। কিন্তু কোন তারিখ থেকে এই নাম্বারটা কাউন্ট ডাউন হচ্ছে সেটা আমাদের কারোরই জানা নাই। সেদিন ১/১২/২০১৯ তারিখে বড় ভাবীকে আমরা খুব স্বাভাবিক একজন সুস্থ্য মানুষ হিসাবেই আনন্দে মেতেছিলেন দেখেছিলাম। উনি আসলেন, সভাবসুলভভাবেই সবার সাথে কথা বললেন, দেখা করলেন, খাওয়া দাওয়া করলেন, সবার সাথে ছবি তুল্লেন, একসময় সবার সাথে বাসায়ও চলে গেলেন।

উনি কেমন মানুষ ছিলেন সেটার বিবেচনার ভার আজকের দিনের প্রতিটি মানুষের কাছে ভিন্ন। কারো কাছে তিনি দেবীর মতো, কারো কাছে তিনি অতি প্রিয়জন, কারো কাছে আবার অপ্রিয় মানুষের মতো কিংবা কারো কাছে হয়তো কিছুই না। আমি তাকে সব সময়ই পছন্দ করতাম। কিন্তু একটা জিনিষ আমার কাছে সারা জীবন ঈসশরের কাছে রহস্যের মতো প্রশ্ন থেকেই ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, কেনো ঈশ্বর কোনো অবলা মেয়ে মানুষকে তার সংগীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেকদিন বাচিয়ে রাখেন? এর উল্টাটা তো হতে পারতো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে? এসব মহিলাদের অনেক কষ্ট থাকে একা একা বেচে থাকার। কেনো বলছি এ কথাটা?

এর কারন, যখন কোনো অবলা নারী তার সংগীর বা স্বামীর অনেক পরে তার জীবন অবসান ঘটান, তাদের অনেক বেদনা থাকে, অনেক চাওয়া থাকে কিন্তু তার সেই বেদনার অংশীদার তিনি কাউকে না দিতে পারেন, না বলতে পারেন। নিজের মনের মধ্যেই সব চেপে রাখেন। তার সংগী যখন আর বেচে থাকে না, তখন তার অনেক ইচ্ছা অনিচ্ছার মুল্যায়ন আর প্রাধান্য থাকে না। আমি এই তথ্য কথাটা বড় ভাবীর ব্যাপারে বলছি না। আমি আমার মাকেও দেখেছি। আমার বাবার অনুপস্থিতিতে আমার মাকেও কারো না কারো উপরে এমনভাবে নির্ভরশীল হতে হয়েছিলো যেখানে নিজের বাক স্বাধীনতা কিংবা ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন না। তাই, একটা বিধবা মহিলার থেকে অসহায় আর কোনো মানুষ হয় না। এই অসহায়ত্ত খাবারের জন্য নয়, এই অসহায়ত্ত কোনো স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নয় যে, তিনি তার ইচ্ছেমতো যেখানে সেখানে ঘুরে ফিরতে পারেন না এমন। এই অসহায়ত্ত অন্য রকমের। অনেক কিছুই আর নিজের থাকে না যা এক সময় ছিলো। সংগীর অবর্তমানে যেনো সব কিছু হারিয়ে যায়। চাপিয়ে রাখে নিঃশ্বাস, দমন করে রাখেন আশ্বাস, কিংবা অন্ধ হয়ে থাকেন তার নিজের বিশ্বাস থেকে অথবা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধেও। কিন্তু সব কিছু তারা বুঝেন, জানেন, ভাবেন কিন্তু বলার শক্তি থাকে না।

যাক যা বলছিলাম, সেই ১/১২/২০১৯ থেকে ভাবী কি জানতেন যে, তার দিনগুলি ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে? তিনি যদি জানতেন যে, আজ এই ১৬/১/২০২১ তারিখের পর আর এই পৃথিবীর কোনো কিছুই তার থাকবে না, তাহলে হয়তো তিনি গুনতেন একটি একটি করে দিন, ক্ষন সেকেন্ড আর মুহূর্ত যে, তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন শেষ দিনটার জন্য। ঈশ্বর এই দুটু তারিখ মানুষের বা প্রানীর জীবন থেকে এমনভাবে লুকিয়ে রেখেছেন যে, আজ অবধি কারোরই, হোক সে ক্ষমতাধর কোনো সম্রাট, কিংবা অতি জাদরেল বিচারপতি কিংবা সম্পদের অঢেল মালিক, জানার কোনো উপায় নাই। ভাবীও জানতেন না যে, গত ১/১২/২০১৯ তারিখে যে, ভাবীর আর মাত্র ৪২২ দিন ব্যালেন্স ছিলো।

হয়তো এমনি একটা মুহুর্ত আমার জীবনেও আসবে যার ইতিহাস এবং আমার জীবনের নাম্বারটা আজ থেকে কত ব্যালেন্স আছে বা ছিলো সেটা হয়তো কেউ লিখবেন।

(বড় ভাবীর জন্য জান্নাত কামনায় তাকে উতসর্গ করা এই লেখা)

২১/০১/২১-তারিখটা চোখে পড়তেই খুব একটা খটকা লাগল

তারিখটা চোখে পড়তেই খুব একটা খটকা লাগল। ২০২১ সাল।

যখন এই তারিখটা এমন হবে ২১২০ সাল, তখন প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে। আমার বয়সের আর কারোরই সম্ভবত এই দুনিয়ায় বেচে থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নাই। আজকের দিনের এমডির চেয়ারটায় আর আমি বসে নাই, আজকের দিনে আমার ব্যবহৃত গাড়িটি হয়তো অন্য কেউ ব্যবহার করছে অথবা আর এটা কোনো রাস্তাতেই নাই, অনেক পুরানো বলে। আমার সাধের বাড়িটায় হয়তো অন্য কেউ তার মতো করে বাস করছে, কিংবা কোনো ভাড়াটিয়াও হতে পারে। যে যত্ন করে আমি আমার ছাদ বাগানটা প্রতিদিন যত্ন করি, পানি দেই, গাছগুলির পাতায় হাত বুলিয়ে দেই, সেখানে আর কোনো ছাদ বাগান আদৌ আর থাকবে কিনা কে জানে। ছাদের কোনায় যে পাখীটা বাসা বেধেছিলো, সেটা কবেই মরে গেছে, হয়তো অন্য কোনো পাখী এসে তার জায়গাটা দখল করেছে। অথবা সেখানে আর কোনো বাসাই নাই।

একশত বছর পর, সেই সময়ে চলমান আমার বংশধরেরা বেচে থাকবে, কিন্তু হয়তো আমি ওদের মধ্যে আর বেচে থাকবো না। যেমন বেচে নাই এখন আমার মধ্যে আমার সেই নাম না জানা পূর্বপুরুষেরাও। মাঝে মাঝে আমি তাদের কথা জানতে চাই, তাদের সবার নামও জানতে চাই, তাদের জীবনধারার ধরন জানতে চাই, নিশ্চয়ই তারাও অনেক ব্যস্ত ছিলো, নিশ্চয়ই তারাও প্রাত্যাহিক জীবনে অনেক গল্পগুজব করতো, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দিত, হয়তো কখনো জীবনের সমস্যায় জর্জরীত হয়ে মানসিক কষ্টে কিংবা জীবনের কোনো সাফল্যে আনন্দিত হয়ে হয়তো অতিশয় খুশীতে কোনো এক বিকালে গোল করে কোনো অনুষ্ঠান করতো। আর এটাই তো হবার কথা। যেমন হচ্ছে ঠিক আমার এই সময়টায়। খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন ছিলো আমার দাদীর দাদীমা? অনেক সুন্দুরী? কিংবা অনেক মায়াবী? অথবা কেমন সুপুরুষ ছিলেন আরো একশত বছর আগের আমার দাদার দাদারা? কে কোন মাছ খেতে পছন্দ করতো? বা কার সপ্নের বাসনা কেমন ছিলো? খুব জানতে ইচ্ছে করে, কি ছিলো তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা যা পূর্ন হয় নাই অথচ শখ ছিলো?

সেই একশত বছর আগে হয়তো অনেক জনপদ ছিলো যা কালের বিবর্তনে সব কোথায় যেনো হারিয়ে নতুন জনপদ তৈরী হয়েছে। হতে পারে যে জায়গাটায় আমার পূর্বসুরী কোনো এক দাদা তার প্রেয়সীর টানে হয়তো কোনো এক রাস্তার ধারে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিলো, আজ সেই জনপদ কোথাও নাই, হয়তো তলিয়ে গেছে কোনো এক নদীর ভাংগনে, অথবা সেই জনপদ বিলুপ্ত হয়ে হয়তো তৈরী হয়েছে আজকের কোনো অসাধারন অট্টালিকা। আজ যদি সেই সব মানুষ গুলিকে আবার ফিরিয়ে আনা যেত, হয়তো বলে উঠতো, ‘ওই যে দেখছিস ওই বড় বিল্ডিংটা, ওখানে ছিলো এক প্রকান্ড খাল, ওখানে আমরা সাতার কাটতাম। ওই যে দেখছিস বড় রাস্তাটা, ওটা ছিলো তখনকার প্রতাপ্সহালী সগীর মিয়ার হারিয়ে যাওয়া কোনো এক প্রাসাদ। আরো কত কি’।

তাদের কারো কথাই আজ কেউ মনে রাখে নাই। মনে রাখার দরকারও মনে করে না। আসলে সময় কাউকেই আজীবন মনে রাখতে দিতে চায় না। কত শতক প্রজন্মকে যেমন টপকে আমরা আজ এই শতকে নিজেদের নিয়ে মশগুল আছি, তেমনি আরো অনেক শতক প্রজন্মও আমাদেরকে টপকে তাদের সময়ে তারা তাদেরকে নিয়ে মশগুল থাকবে এটাই তো হবার কথা। অথচ আজ কতই না ব্যস্ত আমি, আমরা। কতই না প্রতিযোগীতা আমাদের মধ্যে। সম্পদের পাহাড় গড়েও যেনো শান্তি নাই। তারপর?

তার আর পর নাই। আসলেই আর কোনো পর নাই।

২১২০ সালে আমরা এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আর দেখার সৌভাগ্য হবে না। অথচ তখনো সূর্য যেভাবে উঠার কথা সেভাবেই উঠবে, সেদিকে ডোবার কথা সেদিকেই ডববে। শুধু আমরা আর কোনো সুর্যদোয় কিংবা সুর্যাস্ত দেখতে পাবো না। পর্যন জায়গা গুলি অন্য কেউ উপভোগ করবে, শীতকালের আমেজ, কিংবা নতুন মহামারীও তাই।

জীবনটা আসলে মানুষের কল্পনার থেকেও ছোট।

১০/০১/২০২১-আজ থেকে শত বছর পর আমার এই লেখা

আজ থেকে শত বছর পরে আমার এই লেখাটা যারা পড়বেন তাদের মধ্যে আজকের দিনের আর কেউ বেচে নেই। অথচ আজকের দিনের জীবিত মানুষগুলি কিংবা আমার আগের শতবছরের মানুষগুলি যে বিষয়গুলি নিয়ে একে অপরের সাথে পরস্পরে বিবাদ, মনোমালিন্য, যুদ্ধ, অভিমান, মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি করেছি, সেগুলি আর আমরা কেহই মনে রাখতে পারবো না, আমরা একেবারেই ভুলে যাবো। পুরুটাই ভুলে যাবো। এসবের আর কোনো মাহাত্য আমাদের কাছে কোনো কিছুই আর অবশিষ্ঠ থাকবে না। 

আমরা যদি আরো শতবছর আগে ফিরে যাই, ধরি সেটা ১৯২২ সাল। সেই দিনের পৃথিবী কেমন ছিলো আর সেই পৃথিবীর মানুষের মধ্যে কি নিয়ে ভয়, শংকা, মারামারি, হানাহানি নিয়ে তাদের মস্তিষ্কে কি ভাবনার খেলা চলছিলো, তাদের মুখের চাহনীতে কি চিত্র ফুটে উঠেছিলো সেই চিত্র কিন্তু আজকের দিনের কোনো মানুষের মাথায় বা মস্তিষ্কেও নাই। আর ইতিহাসের কল্পনায় থাকলেও সেই বাস্তবতার নিরিখে তার আসল চিত্রের ধারে কাছে আমরা তা আচ করতে পারি না।  

জাষ্ট একবার ভাবুন তো! সেই অতীত দিনের কোনো এক পরিবারের সদস্যগন হয়তো তাদের পারিবারিক জমাজমি, কিংবা সম্পদের রেষারেষিতে যখন এক ভাই আরেক ভাইকে, কিংবা এক বোন আরেক ভাই বা বোনের বিরুদ্ধে চরম রেষারেষিতে একে অপরকে খুন, জখম বা আঘাত করেছে, কিংবা নিজের লোভের কারনে অন্যের কোনো সম্পত্তি দখল করার জন্য চরম আঘাত করেছে কিংবা এক অংশীদার আরেক অংশীদারকে সমুলে বিনাশ করতে মরিয়া ছিলেন, সেই সম্পদ কিংবা সেই অর্থ এখন কার কাছে? আর সেই বা কোথায়? পাহাড় পরিমান সম্পদ গড়া হয়েছিলো, ব্যাংক ভর্তি টাকা, সোনাদানা হয়তো জমা করা হয়েছিলো, সেই হিসাবের খাতা এখন আর কোনো গোপন নাই, না আছে তাকে যক্ষের মতো ধরে রাখার কোনো আকুতি বা পেরেসানি। কারন আমি সেই জগতেই নাই। আমাদের গড়ে যাওয়া সম্পদ যেখানে, তার থেকে আমরা এত দূর যে, তাকে কোনো অবস্থাতেই আর স্পর্শ পর্যন্ত করার কোনো অলৌকিক শক্তিও নাই। এটাই মানুষের জীবন। সে যাইই কিছু আকড়ে ধরুক না কেনো, সময়ের কোনো এক স্তরে গিয়ে সে আর কোনো কিছুই নিজের জন্য আজীবন আগলে রাখতে পারে না। যদি বলি-সেগুলি পরিবার পাবে, পরিবারের পরিবার বংশ পরম্পরায় পাবে, সেটাও সঠিক নয় কারন পরিবার গঠন হয় অন্য পরিবারের মানুষ নিয়েই যারা পিউর পরিবার বলতে কিছুই থাকে না। এটা অনেকের কাছে শুনতে অবাক বা যুক্তিহীন মনে হলেও এটাই ঠিক যে, আত্মকেন্দ্রিক এই পৃথিবীতে নিজের সন্তানও নিজের মতো না, নিজের পরিবারও নিজের মতো না। আমাদের নিজের চিন্তাভাবনা নিজের সন্তানের চিন্তাভাবনা, বা নিজের পরিবারের চিন্তাভাবনা কখনোই একই সমান্তরালে বহমান নয়। আর ঠিক তাই, এক পরিবার আরেক পরিবারের সাথে মিশ্রন হতে হতে প্রাচীন পরিবারটিও একদিন তার নিজের সত্ত্বা হারিয়ে খান বংশের মানুষেরা, সৈয়দ বংশ, সৈয়দ বংশ বঙ্গানুক্রমে মাদবর কিংবা চৌধুরী বংশে রুপান্তরীত হয়ে যায়। আমাদের আমিত্ব পর্যন্ত আর কেউ রাখতে পারেনা।  

যাক যেটা বলছিলাম শত বছরের বিবর্তনের কথা।

ছোট একটা উদাহরন দেই। আজ থেকে সবেমাত্র ৩০/৪০ বছর আগের কথা যখন আমরা বা আমি ছোট ছিলাম, স্কুলে লেখাপড়া করতাম। তখনো স্কুলের ক্লাস ক্যাপ্টেন হবার জন্য কিংবা কলেজের ফুটবল টীমে নাম লিখার জন্য এক সহপাঠির সাথে আরেক সহপাঠির মধ্যে কতই না কোন্দল কিংবা বিরুপ সম্পর্কে পতিত হতাম, আজ প্রায় সেই ৩০/৪০ বছর পর সেই স্কুলের কেইবা মনে রেখেছে কে স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলো বা সেই দিনের সেই ফুটবল টীমের আমি একজন সদস্য ছিলাম? আজব ব্যাপার হচ্ছে-আমি যে সেই স্কুলের একজন দাপুটে এবং অতীব জনপ্রিয় ছাত্র ছিলাম, সেটাই বা কয়জন এখন আবিষ্কার করতে গিয়ে তাদের সময় অপচয় করছে কিংবা মনে রাখার চেষ্টা করছে? যদি সেটাই হয়, ভাবুন তো আজ থেকে শতবছর পর তাহলে আমার বা আমাদের অস্তিত্বটা কোথায়? কোথাও নাই। আর এই শতবছর পেরিয়ে যখন আরো শতবছর পেরিয়ে যাবে, তখন যেটা হবে সেটা হলো-আমি যে এই পৃথিবীতে ছিলাম, সেটাই বিলীন হয়ে যাবে। এখন আমরা যারা যাদেরকে এই পৃথিবীতে গর্ব করে মনে রাখি তারা হয়তো অতীব ব্যতিক্রম। তারা তাদের সময়ে সম্পদের কারনে নয়, কর্মের কারনে ‘সময়’টাকে আলাদা করে যুগে যুগে সেই কর্মের ফল ভোগ করতে পারে এমন কিছু কর্ম হয়তো পিছনে ফেলে গিয়েছেন বিধায় হয়তো শতবছর পরেও আমরা তাদের সেই কর্মফল ভোগকারীরা কিছুটা মনে রাখি। এটার হার অতীব এবং নিছক খুব বেশী না। আমরা সেই তাদের দলে পড়ি না। 

হয়তো অনেকেই বলবেন, আজকের দিনের ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা আমাদের আজকের দিনের সমস্ত মেমোরী সংরক্ষন করে রাখতে পারি যা যুগে যুগে আমাদের বংশ পরম্পরায় এর সংরক্ষন করে আমাদেরকে জীবিত রাখবেন। এটা কোনোভাবেই সত্য না। এ ব্যাপারে একটা আরো ছোট উদাহরন দেই- জগত বিখ্যাত সঙ্গীতরাজ মাইকেল জ্যাকসন যিনি ২০০৯ সালে মারা যান। খুব বেশীদিন নয়, এটা মাত্র ১৩ বছর আগের কথা। এই মাইকেল জ্যাকসন সারা দুনিয়ায় এমন কোনো জায়গা ছিলো না যে যুবসমাজ, কিংবা শিক্ষিত সমাজ তাকে না চিনতো। তার বিচরন ছিলো সর্বত্র। তার চলাফেরা, পোষাকাদি, তার অঙ্গভঙ্গিও তখনকার দিনের প্রতিটি যুবক যেনো মডেল হিসাবে নিয়ে নিজেরাও সে রকমের পোষাক, আচরন ভঙ্গীতে অনুসরন করতো। একবার ভাবুনতো, এ যুগের কতজন যুবক আজ সেই মাইকেল জ্যাকসনের নামটা পর্যন্ত জানে? তাহলে আজ থেকে শতবছর পরের চিত্রটা কি হবে? হতে পারে, এই মাইকেল জ্যাকসনের নামটা সারা সঙ্গীত শুধু নয়, আর কোথাও হয়তো প্রতিধ্বনিতে বেজে উঠবে না। অথচ এক সময় সেইই ছিলো ঐ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটা ইমেজ। আরো খুব কাছের একটা উদাহরন দেই।

প্রতিদিন আমরা অসংখ্য ছবি তুলছি, আমরা তা আমাদের ফেসবুক, সোস্যাল মীডিয়ায় তা প্রতিদিন পোষ্ট করছি। আমরাই গত পাচ বছরের আমাদের ছবিগুলিই পুনরায় রিভিউ করে দেখার সময় পাই না নতুন নতুন ইভেন্টের ছবির কারন। যা একবার তোলা হয়েছে, যা একবাএ দেখা হয়েছে, তার আর খুব একটা সংরক্ষন করে বারবার দেখার স্পৃহাই আমাদের নাই, তাহলে আমার এসব স্মৃতিময় ইভেন্টের সেই স্মৃতি অন্য আরেকজন রাখবে এটা ভাবা বোকামি। হতে পারে আমার বা আমাদের অন্তর্ধানে সাময়িকভাবে সেগুলি খুব কাছের কিছু লোক একবার দুইবার দেখে কিছু স্মৃতি রোমন্থন করবেন। আর ব্যাপারটা এখানেই শেষ।

আর এটাই জীবন। আমাদের এই ছোট আধুনিক জীবনে আমরা আসলে একে অপরের সাথে হয়তো কন্টাক্টে আছি, কিছু সেই কন্ট্যাক্ট মানে কিন্তু এটা নয় যে, আমরা একে অপরের সাথে কানেক্টেড। একই ঘরে বসবাস করে, কিংবা একই প্লাটফর্মে একসাথে থাকার নাম হয়তো কন্ট্যাক্ট, কিন্তু এর মানে কানেকশন নয়।  আমরা ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে কানেকশনবিহীন হয়ে পড়ছি। আর এমন একটা কানেকশনবিহীন সম্পর্কে কেনো আমরা একে অপরের সাথে বিদ্বেষ নিয়ে বেচে থাকছি?

এটাই যদি হয় আমাদের জীবনের চিত্র, তাহলে পরিশেষে চলুন আমরা আমাদের জীবনটাকে একটু অন্যরকম করে ভাবী। জীবনটাকে একেবারে সহজ করে ফেলি। কেউ এই পৃথিবী থেকে জীবন্ত ফিরে যেতে পারবো না। কেউ জীবন্ত ফিরে যেতে পারেও নাই, না আজীবনকাল এই প্রিথীবিতে থাকতে পেরেছে। আজকের দিনের যে গাড়িটা কিংবা অত্যাধুনিক ফোনটা আমরা ব্যবহার করছি সেটাও একদিন জাংক হিসাবেই শেষ হবে। কোনো কিছুই আর রিলেভেন্ট মনে হবে না। তাই যে সম্পদের জন্য আমরা আজ এতো হাহাকার করছি, একে অপরের উপর ক্ষিপ্ত হচ্ছি, এইসব কিছুই আসলে নিরর্থক, অকেজো। হ্যা, জীবনের চাহিদার অতিরিক্ত কোনো কিছুই আমাদের দরকার নাই। আমাদের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রন করা আবশ্যিক, একে অপরের ভালোবাসার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে তুলি, কারো উপর কারো বিদ্বেষ না রাখি, কারো সম্পত্তির উপর কিংবা কারো হকের উপর আমরা কেউ লোভ না করি। না কারো উপর কোনো জুলুম করি, না কাউকে নিজের সার্থের কারনে কোনো ক্ষতি করি। যতক্ষন আমরা অন্যের সাথে নিজের সাথে তুলনা না করি, ততোক্ষন পর্যন্ত সম্ভবত আমরা নিজের লোভের কাছে পরাভূত হবো না।

আমাদের সবার গন্তব্য স্থান পরিশেষে একটাই-কবর। কেউ হয়তো আগে কেউ হয়তো পরে। হোক সে মসলমান, হোক সে অন্য কোনো ধর্মের। কোনো কিছুই সাথে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। শতবছর পরে এমনিতেও আমরা হারিয়েই যাবো। যখন নিজেরাই হারিয়ে যাবো, তাহলে আমাদের অসাধু উপায়ে হানাহানি, মারামারি কিংবা জোর করে ছিনিয়ে নেয়া গড়ে তোলা সাম্রাজ্যই বা রাখবো কার জন্যে আর কেনো? কিছুই থাকবে না, রাখতেও পারবো না।

শতবছর পরেও এই আকাশ নীলই থাকবে, পাহাড় সবুজই থাকবে, সাগর সেই শতবছর আগের মতোই কখনো কখনো উত্তালই হবে। শুধু আমাদের নামের সম্পদগুলি অন্য আরেক নতুন নামে লিপিবদ্ধ হবে, আমার শখের সব কিছু অন্য আরেকজন তার নিজের মতো করে ব্যবহার করবে। আমার বলতে কিছুই নাই। আজ যে ক্ষমতার মসনদে বসে আমি হাতের ইশারায় জুলুম উপভোগ করছি, সেই ক্ষমতার মসন্দে বসেই হয়তো অন্য কোনো এক সময়ে আমারই বংশধর কারো দ্বারা শাসিত হচ্ছে, কে জানে। এর পার্থিব অনেক নমুনা আমরা দেখেছি মীর জাফরের বংশে, হিটলারের পতনে, কিংবা মুসুলিনি বা অনেক রাজার জীবনে। আজ তারা সবাই এক কাতারে।

এটা যেনো সেই বাল্ব গুলির মতো-কেউ শত ওয়াটের বাল্ব, কেউ হাজার পাওয়ারের বাল্ব, কেউবা কয়েক হাজার ওয়াটের বাল্ব কিন্তু ফিউজ হয়ে যাওয়ার পরে সবাই সেই ডাষ্টবিনে একসাথে। সেখানে কে শ ওয়াটের আর কে হাজার পাওয়ারের তাতে কিছুই যায় আসে না। না তাদেরকে আর কেউ খুজে দেখে।  

৯/১/২০২১-আন-নূরের ইতিহাস

অবাক করার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে এ কয়দিন। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কি হচ্ছে আসলে। গত ৯ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে একটা ফোন কল এলো আমার এক পরিচিত নেভী অফিসার ফারুকের কাছ থেকে। ছেলেটাকে আমি চিনতাম প্রায় বছর দুয়েক আগে কোনো একটা ব্যবসায়ীক আলাপের মাধ্যমে। সে এসেছিলো আমার কাছে ম্যাগপাই নামে কোনো একটা কোম্পানীর জন্য পলাশপুরে আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজের খালী স্পেসটা ভাড়া নেয়ার জন্য। সম্ভবত মোট দুদিন দেখা হয়েছিলো। এরপরে আর কখনোই দেখা হয় নাই। পরে শুনেছিলাম যে, ফারুক আর ওই ম্যাগপাই কোম্পানীতে নাই, সে তার শেয়ার বা মালিকানা ব্যাক করে নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।

এর মধ্যে ওর সাথে আর আমার কোনো কথাবার্তা হয় নাই, না দেখা হয়েছে। খুব একটা ভালো মতো ওকে চিনি বলেও মনে হয় না কিন্তু যেটা বুঝেছিলাম সেটা হলো যে, ছেলেটার মধ্যে একটা জিদ আছে। এর মধ্যে আমিও ওকে ভুলে গিয়েছিলাম, আর ফারুক নিজে থেকেও আর কখনো যোগাযোগ করে নাই। ফারুকের সাথে সেদিন আরেক ভদ্রলোক এসেছিলেন মিষ্টার কাম্রুজ্জামান, তার সাথে আমার এখনো যোগাযোগ আছে কারন ম্যাগপাই কোম্পানীটা এখন তিনিই চালাচ্ছেন আর সেটা আমার পরিত্যাক্ত মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কমপ্লেক্সেই। অনেকবার আমি নিজে থেকেই ফারুকের ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খুব বেশী একটা তথ্য কাম্রুজ্জামান সাহেব হয় দিতে চান নাই অথবা যে কোনো কারনেই হোক ফারুক সম্পর্কে তিনি খুব একটা আগ্রহ দেখান নাই।

যাই হোক, অবশেষে, অনেকদিন পর সেদিন ৯ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে হটাত করে ফারুক আমাকে ফোন করেছিলো। ওর ফোন নাম্বারটা আমার কাছে সেভ করা ছিলো, তাই বুঝতে অসুবিধা হয় নাই ফারুকের কল। সাধারনত, আমাকে যারা ফোন দেয়, হয় তারা কোন কাজ চায় অথবা কোনো ধরনের সাহাজ্য বা বুদ্ধিই চায়। অনেক সময় আমি ফোন ধরি, অনেক সময় ফোন ধরিও না। ঠিক একইভাবে সেদিন ৯ ডিসেম্বরে ফারুক যখন সকাল ১১ টার দিকেব আমাকে ফোন করলো, আমি প্রথমে ভাবলাম, হয়তো কোনো সাহাজ্যের জন্যই ফোন করেছে। দিনটায় খুব ব্যস্ত ছিলাম, ভাবলাম, ব্যস্ততা শেষ হলে ফোন ব্যাক করবো। তাই ততক্ষনাত আর ফোনটা ধরতে চাই নাই।

দুপুর পার হয়ে গেলো। আমি একটু ফ্রি হলাম। মোবাইলটা হাতে নিতেই ফারুকের মিস কলটা চোখে পড়লো। একবার ভাবলাম, ওকে একবার ফোন ব্যাক করি। এমনো তো হতে পারে যে, ওর কোনো বিপদ যেখানে হয়তো আমার সাহাজ্য আসলেই দরকার, আবার এমনো তো হতে পারে সে আমাকে এম্নিতেই কেমন আছি জানার জন্য ফোন করেছে কুশল বিনিময় করার জন্য। আবার এমন তো হতে পারে যে, এই ফোন কলটা আমার জন্যই জরুরী!

ফোন দিলাম, ফোনে শুধু ফারুক আমাকে বল্লো যে, স্যার আমার কিছু আত্তীয় আমার বাসায় এসেছে। বাচ্চা মানুষ, কিন্তু বিশাল একটা কাজ হাতে নিয়ে ফেলেছে চায়নীজদের কাছ থেকে, কন্সট্রাকশন রিলেটেড। জিজ্ঞাসা করতে করতে জানলাম যে, যে কোনোভাবেই হোক, ওরা চাইনীজ কোম্পানী “চাইনীজ কন্সট্রাকশন সেভেন্থ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন কর্পোরেশন লিমিটেড” থেকে বড়সড় একটা ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছে বালু আর ইট সাপ্লাইয়ের কাজে। কিন্তু ওদের টাকা নাই তাই কাজটা করতে পারছে না। ওয়ার্ক অর্ডারের ভ্যালু প্রায় হাজার কোটি টাকার উপরে।

ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লেগেছে আমার কাছে। আর অদ্ভুত লাগার অনেকগুলি কারনও আছে। বহুদিন যাবত আমি আর মূর্তজা ভাই এই কন্সট্রাকশন লাইনে কিভাবে ঢোকা যায় সেটার একটা হোমওয়ার্ক করছিলাম। মীর আখতার হোসেন গ্রুপের কর্নধার জনাব মীর নাসিরব আমার আত্তীয়। তার কোম্পানীর মাধ্যমে আমি আর মূর্তজা ভাই কয়েকবার কয়েকটা বড় কাজের সন্ধানেও বেরিয়েছিলাম কিন্তু খুব একটা কাজ হয় নাই। কিন্তু এটা বুঝতেছিলাম যে, সারা ওয়ার্ল্ডে এই কন্সট্রাকশন কাজই একমাত্র ব্যবসা যারা উচু কোনো স্তরে পৌঁছে যেতে পেরেছে। কিন্তু এর জন্য সর্বোচ্চ মহলের অনেক প্রকার আশীর্বাদ যেমন লাগে তেমনি লাগে স্পীড মানির ক্ষমতাও। আমাদের দুটুরই কিছু কিছু সুবিধা ছিলো বটে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কেনো জানি ব্যাপারটা ব্যাটে-বলে সংযোগ হচ্ছিলো না। অনেকবার আমরা আমরাই বেশ কিছু হোম ওয়ার্ক করেছিলাম কিন্তু ব্যাপারটা হোম ওয়ার্কের পর্যায়েই ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের বুরুক্রেটিক সিস্টেমের জন্য আমরা কিছুতেই বুঝতেছিলাম না কিভাবে বড় বড় কন্ট্রাক্ট গুলি ধরা যায়।

ফারুকের ফোনের বিষয়টা মুর্তজা ভাইকে বলার সাথে সাথে ব্যাপারটা বিদ্যুত গতিতে যেনো এগিয়ে যেতে থাকলো। আমার পরিকল্পনা ছিলো, ফারুকের কাছ থেকে ওর আত্তীয়ের কাজের বিষয়টা এর পরেরদিন আমরা দুজনে বসে জেনে নেবো কিন্তু মূর্তজা ভাই যেনো আমার থেকেও বেশী স্পীডি। মূর্তজা ভাইয়ের অনুরোধে আমরা সেদিন রাতেই ফারুক এবং ওর টিমের সাথে মিটিং করলাম মীরপুর ক্যান্টন মেন্টের সিএসডির অভ্যন্তরে। রাত তখন প্রায় ১০টা। । ফারুক নিজে এবং তার দুই আত্তীয় আরিফুজ্জামান রুবেল আর দুলাল মোল্লা নামের দুই জনকেই সেখানে নিয়ে এলো। আরিফ আর দুলালকে দেখে আমার খুব অদ্ভুত লেগেছিলো যে, ওদের বয়স নিতান্তই কম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা ওই রকমের না যার মাধ্যমে এমন সব কাজ হাতে আসবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ওরা সেই কাজটাই করতে পেরেছে যেটা আমরাও পারি নাই। আমি আর মূর্তজা ভাই ওদের কাছে থাকা চায়নীজদের ওয়ার্ক অর্ডারটা নেড়েচেড়ে দেখলাম, পড়লাম, সবই ঠিক মনে হচ্ছিলো। আবার পরক্ষনেই এটাও উড়িয়ে দিচ্ছিলাম না যে, এটা আবার কোনো ফাদ না হয়ে উঠে। ফারুকের উপর আমার কোনো নেগেটিভ ধারনা ছিলো না। ফলে আমি ফারুককে সরাসরি একটা প্রশ্ন করলাম, কেনো ফারুক এই কাজের সাহাজ্যের জন্য আমাকে সে ফোন করলো বা বেছে নিলো। সেতো ইচ্ছে করলে আরো কাউকে বেছে নিতে পারতো। এই কাজ গুলি করার জন্য হয়তো আরো অনেকেই রাজী হবে এবং হতো। ফারুক সেতা না করে, সে আমাকেই কেনো ফোন করলো?

ফারুক জানালো যে, ফারুক নিজেও কোনো কন্সট্রাকশনের কাজে জড়িত নয়। কিন্তু রুবেল এবং দুলাল তারা ওর শশুড় বাড়ির তরফ থেকে আত্তীয়। ওরাই মাঝে মাঝে জীবন ধারনের জন্য ছোট খাটো ঠিকাদারী, কখনো আবার কোনো সাইটে আবার কখনো কোনো বড় কোম্পানীর জন্য টুক টাক সাপ্লাইয়ের কাজ করে থাকে। এসব করতে গিয়ে যেভাবেই হোক, কিছু কিছু মানুষের সাথে ওদের উঠাবসা আছে। আর এই সুবাদে ওরাও চেষ্টা করেছে তারা নিজেরাই কোনো একটা কাজ বাগিয়ে নিতে পারে কিনা।

বাংলাদেশটা এমন এক দেশ যেখানে পয়সার মান সাদাই হোক আর কালোই হোক, বেশীরভাগ মানুষ আজকাল শুধু টাকার পিছনেই ঘুরে। যখন টাকার গন্ধ চারিদিকে মুর মুর করতে থাকে, তখন কে সচীব আর কে মন্ত্রী এর কোনো লেবেল থাকে না। তাদের সবার উদ্দেশ্য একটাই-টাকাটা ধরা। আর এই ধরাকে বলে কালো টাকার বেসাতী। আমরা আজ অবধি কালো টাকার ধারে কাছেও যেতে চাই নাই আর যেতে চাইও না। তাই হয়তো এই গোপন ব্যাপারটা আমাদের ক্ষমতায় ছিলো না। আর যেহেতু আমাদের যপগ্যতা থাকা সত্তেও আমরা কালো টাকার ধারে কাছে যাই না, ফলে এই দেশের বৃহৎ কোনো প্রোজেক্ট আমাদের হাতে আসেও না। যাইই হোক, আমি ফারুকের সাথে বিস্তারীত কথা বলে জানলাম যে, ফারুকের অন্যত্র যাওয়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছা থাকলেও সে চেয়েছিলো এমন একজন মানুষ যারা মিথ্যার বেসাতী করেন না আবার ইন সাফের মুল মন্ত্র নিয়ে কাজ করেন। ফারুকের মনে হয়েছে, আমিই সেই ব্যক্তি যার কাছে পুরু ব্যাপারটা শেয়ার করা যায়। আমি একটা কথা প্রায়ই বলে থাকি-I feel safe in the hands of a pious and justified man. চোর ও কিন্তু চোরকে বিশ্বাস করে না, চোর ও কিন্তু চোরকে পছন্দ করে না। চোর নিজেও চায় একজন ভালো মানুষের সাথে কাজ করুক, সম্পর্ক করুক ইত্যাদি। ফারুক চোর নয়, রুবেল কিংবা দুলাল তারাও চোর নয়, কিন্তু আমাদের আশেপাশে এতো বেশী মুখোশ ধারী চোর রয়েছে যে, তাদের বাজ্যিক চেহাড়া দেখে বুঝবার কোনো উপায় নাই, তারা ইন সাফ করে কিনা। কিন্তু মুখে সারাক্ষন হাদিস কালামের কথা উচ্চারিত হতেই থাকে। কিন্তু এই হাদিস শুনে ভরষা করার কোনো সুযোগ নাই। ঠকবার সম্ভাবনাই বেশী। ফারুকের মনে হয়েছে, আমরা সেই ক্যাটেগরির মানুষ যারা ইন সাফ নিয়ে চলেন, কাউকে ঠকাবার কোনো মানসিকতা কখনোই নাই।

প্রাথমিকভাবে আমি আর মূর্তজা ভাই ওদের কাছ থেকে ইনিশিয়াল তথ্য জেনে বেরিয়ে এলাম। আর বললাম যে, যদি সব কিছু সথিক থাকে, তাহলে হয়তো আমরা ওদেরকে নিয়ে কাজ করবো। ওদের টাকা নাই, কিন্তু আমাদের যা আছে তা দিয়ে তাদের পাওয়া ওয়ার্ক অর্ডারের কাজ করা সম্ভব। হয়তো ৩/৪ কোটী টাকার দরকার। আর সেটা আমাদের আছে। কিন্তু কিভাবে করবো, কাজের ধারা কি হবে, কে কিভাবে পার্টনারশীপ করবে তার একটা বিস্তারীত প্রোফেশনাল গাইড লাইন থাকা দরকার।

ওই যে বলেছিলাম একটু আগে যে, বহু আগে থেকেই কন্সট্রা ক শন কাজের ব্যাপারে আমাদের একটা সুপ্ত বাসনা ছিলো, আর সে মোতাবেক একটা হোম ওয়ার্ক করাই ছিলো। এখন ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, তাহলে সিদ্ধান্তটা নিতে খুব বেশী একটা সময় ক্ষেপন হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস ছিলো। বাসায় এসে আমি আর মুর্তজা ভাই ফোনে আলাপ করলাম যে, এর পরেরদিন অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে  ফারুক এবং তার টিমের সাথে আমাদের বিস্তারীত আলাপের দরকার। পরেরদিন আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী হাসনাবাদে একটা সম্মিলিত মিটিং এর দিন ধার্য্য করা হলো।

পরদিন ১০ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে ফারুক, রুবেল আর আমি (মাঝে মাঝে মুর্তজা ভাই) এক সাথে বিস্তারীত আলাপ করে জানলাম যে, বড় বড় টেন্দার গুলির মধ্যে সরকারী অফিসের ছোট ছোট কর্ম কর্তাদের মাধ্যমে বড় বড় কর্মকর্তারা একটা সিশটেম করে রেখেছে এমনভাবে যে, বড় বড় নামীদামী কোম্পানিগুলিকে তারা এখন আর পারসেন্টেজে বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রায়ই তারা তাদের ন্যয্য কালো টাকার ভাগে কম পড়ছে। আর যেহেতু ব্যাপারটা কালো টাকার খেলা, ফলে সেসব কর্মকর্তারা এমন একটা নতুন পলিসি উদ্ভাবন করেছেন যেখানে তাদের ভাগ নিশ্চিত হয় আবার কাজটাও হয়। এতে প্রোজেক্ট ভ্যালু বেড়ে যায়, তাতে কিছুই যায় আসে না। টাকা তো আসবে গৌরী সেনের পকেট থেকে, অসুবিধা কি? এই সিস্টেমে কেউ কাউকে ঠকায় না। আমাদের রুবেল আর আরিফ সে রকম একটা সিশ্তেমের খোজ জানে। এই সিস্টেমে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদুত থেকে শুরু করে দেশের প্রধান হোমরা চোমড়ারাও আছেন। যাক সে কথা এখানে আর না বলি।

রুবেল গত প্রায় ১ বছর যাবত এই সব সিস্টেমের সাথে চলাফেরা করে করে সেও কিছু কাজ হাতে নিতে পেরেছে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সমস্যা দাড়িয়েছে তারদের হাতে ওয়ার্কিং কোনো ক্যাপটাল নাই। ব্যাপারটা খুব মনোযোগ সহকারে বুঝলাম।

এবার আমাদের পক্ষ থেকে কিছু শর্ত জুড়ে দিলাম যে, আমরা কাজ করতে পারবো যদিঃ

ক।      কোনো টাকার মধ্যে অর্থাৎ আমাদের পক্ষে আসা কোনো টাকায় কোনো কালো টাকা না আসে। যেমন কাজে ফাকি দিয়ে অযথা বিল না করা হয়। কিংবা দুই নম্বরী করে কোনো কাজ না করা হয়। আমরা আল্লাহকে ভয় পাই। টাকার অতো বেশী আমাদের দরকার নাই কিন্তু সৎ থাকতে চাই নিজের কাছে, নিজের দেশেরর কাছে আর হালাল টাকা কামাই করতে চাই।

খ।      যে সব কাজ ইতিমধ্যে রুবেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নামে বরাদ্ধ হয়ে গেছে, সে সব কাজ গুলি পুনরায় একটা নতুন কোম্পানী (যেটা আমরা সবাই মিলে ফর্ম করবো) তার নামে আনতে হবে। যদি কোনো কাজ রুবেল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক্স থেকে ট্রান্স ফার না করা যায়, তাহলে রুবেল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক্স ও আমাদের সবার মালিকানা থাকতে হবে যাতে সেটাও আমাদের পলিসিতে চলে।

গ।      আমরা সব ফাইন্যান্স করবো, এবং এই ফাইন্যান্স কোম্পানীকে আপাতত লোন হিসাবে প্রদান করা হবে যা কোম্পানী তার লভ্যাংশ থেকে আমাদেরকে পুনরায় পরিশোধ করে দেবেন।

ঘ।       কোম্পানীর একটা নাম ফিক্সড করা হলো। আমি সাথে সাথেই বললাম, এই নতুন কোম্পানীর নাম হ ওয়া উচিত আল্লাহর নামে। যেমন- আন নূর।

সবাই এক সাথে নামটা খুব পছন্দ করলেন। আমরা এই নামের বরকতেই ইনশাল্লাহ সৎ ভাবে সঠিক কাজ গুলি করতে পারবো। আন নূরের জন্ম হয়ে গেলো। এই নতুন কোম্পানীর মধ্যে আমরা নতুন এক ব্যবসায়ীক দরজায় দাঁড়িয়ে গেলাম যার-ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আমি নিজে, চেয়ারম্যান আমার প্রিয় মূর্তজা ভাই, ডাইরেক্টর হিসাবে ফারুক এবং রুবেল আর শেয়ার হোল্ডার হিসাবে থাকলো দুলাল মোল্লা।

জয়েন্ট স্টক থেকে এর নতুন জন্ম শুরু আলহামদুলিল্লাহ।

০১/০১/২০২১-ঠিক এই সময়টায়

০০:০০ রাত

ঠিক এই সময়টায় পৃথিবীর কোনো না কোনো জায়গায় হয়তো এমন কেউ আছে যে বিগত বছরের কোনো এক অশান্তির জের অন্তরে নিয়ে আজকের বছরের প্রথম প্রহরে পা রাখছে, কেউ বা আবার এই কনকনে শীতে আর সব দিনরাত্রির মতো এই রাতেও নির্জীব রাস্তায় একা কোনো এক গাছের নীচে আশ্রয় নিয়ে ক্ষুধা পেটে বসে আছে, কেউ হয়তো হাস্পাতালের বিছানায় শুয়ে জীবনের শেষ সময়টা কখন ফুরিয়ে যাবে সেই শংকায় নিঃশ্বাস নিচ্ছে, হয়তোবা কেউ তার অতি প্রিয়জনকে হারিয়ে বিগত বছরের শেষ সেকেন্ড পার করে আজকের নতুন বছরের প্রথম সেকেন্ডে ভেজা চোখে ঠায় নীর্জীব আপন মানুষটির পাশে বসে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবছে। ঠিক এই মুহুর্তে হয়তো কোনো এক নাবিক মহা সমুদ্রের জলরাশীতে ঘোরপাক খেয়ে নিশানা হারিয়ে কোনো এক অচেনা গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে, কিংবা এমনো কেউ আছে হয়তো নতুন জীবনের প্রত্যাশায় যুগলবন্দী হচ্ছে। হয়তোবা কোথাও অঝর ধারায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে, আবার এমনো হতে পারে কোনো এক অজানা দেশে ঘর্মাক্ত গরমে মানুষেরা দিকবিদিক হয়ে কিছুটা পরশের আশায় কোনো এক ব্রিক্ষের নীচে গোল বেধে বসে আছে।

অথচ আমার এখানে অসীম দয়ালু স্রিষ্টিকর্তা আমাকে তোমাকে আর আমাদের সাথে থাকা পরিবারকে কতই না হাসিখুসীতে বছরের শেষ দিনের সাথে আগত বছরের প্রথম মুহুর্তে আনন্দের সাথে মিলন করাইলেন। কোনো কষ্ট নাই, কোনো দুসচিন্তা রাখেন নাই, কোনো আপদ কিংবা বিপদের মধ্যে রাখেন নাই। সুস্থতায় আর মনের পরম শান্তিতে সংযোগ করালেন আরো একটি বছরের সারিতে।

জানি, ঠিক এই মুহুর্তে আমি সবখানে নাই যাদের সাথে আমার থাকার দরকার। ঠিক এই মুহুর্তে আমি আছি কারো একান্তই কাছে, নিকটে। আবার কারো সাথে আছি আমি মনের মাঝে, কাউকে আমি চোখের সামনে রেখে দেখছি, আবার কাউকে আমি মনের চোখে দেখছি। শারীরিক উপস্থিতি যেমন সত্য, তেমনি মানসিক উপস্থিতিও সত্য। এই দুইয়ের মধ্যে তারাই উপলব্ধিটা করতে পারেন যারা এই সত্যতার মধ্যে বাস করেন। চোখ বুঝে যদি আপনি ওইসব মানুষের মুখ আপনার চোখের সামনে একেবারে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠে, তারাও আপনাকে ঠিক আপনার মতো করেই আপনাকে দেখতে পান, আর এই দেখা-অদেখার নামই হলো সত্য ভালোবাসা। আর এখানেই অনুপস্থিতির পরাজয় হয়। এখানেই পরাজয় হয় মৃত্যুর মতো কোনো এক চরম সত্য। চোখের আড়াল হলেও তারা থাকেন সবার মাঝে। আজ এই প্রথম প্রহরে যারা আমার সুম্মুখে নাই অথচ মনের ভিতরে আছেন, যতদূরেই তারা থাকেন না কেনো, তারা আমার সাথেই আছেন। আমি তাদের সবাইকে নিয়াই এই তাবত মানুষকে জানাই শুভ নববর্ষ। ২০২১ বর্ষ হোক সবার জন্য উম্মুক্ত সেই আনন্দের, যে আনন্দে মানুষের চোখ ভিজে আসে ভালোবাসায় আর খুশীতে।

০১/০১/২০২১-দুই মেয়েই বগুড়ায়–ফাকা পরিস্থিতি সময়

আজ থেকে প্রায় ৫৪ বছর আগে, আমার বাবা বুঝতে চেয়েছিলেন, তার অবর্তমানে তার পরিবার কিভাবে থাকবে, কে কিভাবে আচরন করবে, কার চেহারা কি হবে ইত্যাদি। আর এ কারনে তিনি একবার ৬ মাসের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার মাও জানতেন না আমার বাবা কোথায় আছে কেমন আছে। শুধু জানতেন আমার বড় ভাই। আর বাবা আমার বড় ভাইয়ের আশেপাশেই ঢাকায় গোপনে ছিলেন। আমার ভাই প্রতিনিয়ত বাবাকে গ্রামের, বাড়ির, এবং অন্যান্য সদস্যদের আচার ব্যবহার আপডেট দিতেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, বাবা হয়তো কোথাও মারা গিয়েছেন, অথবা আর কখনোই ফিরে আসবেন না। তাতে যেটা হয়েছে সেটা হলো, সবাই তার নিজ নিজ চেহারায় আবর্ভুত হয়েছিলো। ফলে ৬ মাস পর যখন বাবা ফিরে এলেন তার গোপন আস্তানা থেকে, তখন তিনি বুঝলেন, কে আমাদের আপন, কে আমাদের পক্ষের আর কে আমাদের বিপক্ষের। শুধু তাইই নয়, আমাদের পরিবারের মধ্যেও তিনি বিভিন্ন সদস্যদের চরিত্র সম্পর্কে একটা নিখুত ধারনা পেয়েছিলেন। অন্তর্ধানের পরে আমার বাবা আরো বেশী বাস্তববাদী হয়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আমাদের জন্য ছিলো যুগান্তকারী এবং পারফেক্ট।

এই ঘটনাটা এখানে বলার অন্য কোনো কারন নাই। নিছক একটা সমকালীন ভাবনার মতো। আমার ছোট মেয়ে মানসিকভাবে আসলে আর এদেশেই নাই। তার ভাবনা কবে কোথায় কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, তাও আবার আমেরিকার কোনো এক ইউনিভার্সিটিতে। সারাক্ষন তার এই একই চিন্তা, আর এই চিন্তার রেশ ধরে সারাক্ষন তার সেই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য এখানে এপ্লিকেশন, ওখানে এপ্লিকেশন, স্যাট পরীক্ষা, আইএলটিএস ইত্যাদি। আমরা ধরেই নিয়েছি, যে, আগামী বছরের শেষের দিকে আমরা আমার ছোট মেয়েকে আর পাচ্ছি না। সে বিদেশের মাটিতে পড়াশুনা করবে। এটা যেনো এক প্রকার মেনেই নিয়েছি। আর কনিকা তো শতভাগ সেভাবেই ভাবছে। বাকীটা আল্লাহর রহমত।

বড় মেয়েও বিসিএস পরীক্ষায় যদি চান্স না হয়, তারও পরিকল্পনা প্রায় একই রকমের। সেও সেই সুদূর আমেরিকার উদ্দেশ্যেই হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাবে। এই যে, একটা ভ্যাকুয়াম, মানে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার একটা আভাষ, তখন আমাদের জীবন কি হবে, কেমন কাটবে, সেই ভাবনাটা যেনো আজ পেলাম। কারন আজকে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে বগুড়ায় আছে। বাড়ি একেবারেই খালি। একদম ফাকা। এ যেনো সেই পরীক্ষাটা যখন ওরা কেউ আর আমাদের সাথে থাকবে না, তখন কেমন হবে আমাদের জীবনটা।

আজ বুঝলাম, কেমন হবে জীবনটা। সারাটা বাড়ি ফাকা। সবই আছে, চেয়ার টেবিল যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছে। উম্মিকার ঘরের কোনো কিছুই এদিক সেদিক হয় নাই, কনিকার ঘরেরও। ডাইনিং টেবিলে সব কিছু আগের মতোই আছে, ড্রইং রুমটাও তাই। খাবার টেবিলে সবসময় যে মেয়েরা আমার সাথে খেতে বসে, সেটাও না। কিন্তু তখন হয়তো ওরা ওদের রুমেই থাকতো। কিন্তু আজকে মনে হলো, ওরা বাসায় কেহই নাই মানে আমার খাবার টেবিলের খাবারের সাধটাও ভিন্ন। ওদের ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষগুলি এখানে বসতো, এখানে কম্পিউটারে কাজ করতো, ওইখানে ওরা পায়ে পায়ে হাটতো। ওদের মা কারনে অকারনে কখনো ডাকাডাকি, কখনো না খাওয়ার কারনে রাগারাগি, কখনো আবার একসাথে বসে হাসাহাসি করতো। আজকে কিন্তু ওরা আছে কিন্তু কাছে নাই। এতো ফাকা লাগছে কেনো?

ওদের বগুড়ায় যাওয়ার মাধ্যমে আমি যেনো ওদের আমেরিকা যাওয়ার একটা প্রক্সি অনুভব করলাম। এটাই হবে যখন ওরা সত্যি একদিন আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে থাকবে। আজকে একটা কথা প্রায়ই মনে পড়লো-

তাহলে আমার এতো বড় ব্যবসা, এতো বড় বানিজ্য, আমার এতো বড় বড় প্রোজেক্ট নিয়ে কি হবে যদি ওরাই আর এখানে না থাকে? কে দেখভাল করবে আমার অনুপস্থিতিতে এই বিশাল সাম্রাজ্য? কোথায় যেনো একটা খটকা লাগলো। দরকার আছে কি এতোসবের?

অনেক ভাবনার বিষয়।

২২/১১/২০২০-বুড়োবেলায় আমার সেই ছোটবেলা

ছোট বেলায় মনে করতাম, আহা, স্কুল ছুটি হবে, ক্লাশ থাকবে না, টিচারদের কাছে আর জ্ঞ্যানগর্ব লেকচার শুনতে হবে না, ইচ্ছেমতো নদীতে গিয়ে বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে লাফঝাপ মারবো, সারাদিন মাঠে গিয়ে যখন তখন খেলাধুলা করবো। সন্ধ্যা হলে আর পড়ার টেবিলে বসতে হবে না, সকাল সকাল আর ঘুম থেকে উঠতে হবে না, আরো চার আনা, আট আনা দিয়ে চালতার আচার যতো খুশী কিনে খাবো। কত কি!!

মাঝারী বেলায় মনে করতাম, আহা, অফিস ছুটি হলে সারাদিন বাসায় বসে টিভি দেখবো, ঘুমাবো, সন্ধ্যায় আড্ডা দেবো। বন্ধু বান্ধদের নিয়ে রাতভর গল্প করবো। লম্বা লম্বা ঈদের ছুটিতে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবো। কি মজা হবে। কোনো অফিস নাই, বসের আদেশ পালনের তাড়াহুড়া নাই। সকাল সকাল উঠে তাড়াহুড়া করে অফিসের জন্য রওয়ানা হতে হবে না। অনেক অনেক মজা করে সময়টা পার হবে। এই বয়সে এসেও মনে হয়, আহা এইবার ছুটিতে অনেক অনেক সময় পাওয়া যাবে। স্টাফদের ফোন আসবে না, সাপ্লাইয়াদের হিসাব কিতাব নিয়ে বসার দরকার হবে না। বাসায়, আত্মীয় স্বজনদেরকে সময় দিতে পারবো, বেশ জমজমাট একটা সময় পার হবে।

অথচ আজ এই ৫৫ বছর বয়সে আমার নিজের অফিস আছে, অফিসে দেরী করে গেলেও কেউ কৈফিয়ত চাবে না জানি, অফিসে না গেলেও কারো কাছে জবাব্দিহি করার নাই, যখন যেথায় খুশী যেতে চাইলেও কেউ আমাকে বাধা দেয়ার নাই। এই কয়দিন যাবত আমি ছুটিতেই আছি। কাজ নাই, অফিস নাই, তাড়াহুড়াও নাই। বড়দের চাপ নাই, শিক্ষকদের শাসন নাই, স্টাফদের ফোন কল নাই, সাপ্লাইয়াদের কোনো চাপ নাই, কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছে কি যেনো নাই। আচ্ছা, কি নাই? আমি তো ইচ্ছে করলে এখন পুরানো সেই বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে নদীতে যখন তখন ঝাপ দিতে পারি কারন শাসন করার কেউ নাই, ইচ্ছে করলেই সারাদিন টিভি দেখতে পারি, ইচ্ছে করলেই সারাদিন ঘুমাতেও পারি, ইচ্ছে করলেই হাড়ি হাড়ি চালতার আচার, কিংবা বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে রাত ভত আড্ডা, গল্প করতে পারি কিন্তু তারপরেও আমি তা করতে পারছি না বা করতে ইচ্ছে করছে না। কি অদ্ভুত না ব্যাপারটা!!

এখন মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু সময় আছে, সেই সময়ের সঙ্গে আমাদের ছুটির একটা বড় রকমের যোগসুত্র আছে। আজ এই ৫৫ বছর বয়সে আমি আর আগের সেই ১২ বছরের বালকের ন্যায় উচ্ছাস নদীতে তরঙ্গলম্ফ দিতে পারি না, ইচ্ছেও করে না। অথবা সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবলের অভাবে নারার-খেরের বল বানিয়ে গুটিকতক অদম্য পোলাপানের মতো গ্রামের সেই স্কুলের মাঠে বৃষ্টি বাদলের মধ্যেও হৈচৈ করে, ভরদুপুরে দৌড়াদৌড়িও করতে পারি না। অথবা পাশের বাড়ির পেয়ারা গাছের আধাপাকা পেয়ারাগুলি আর এখন আমাকে লোভ দেখায় না। বয়সটা পেড়িয়ে গেছে। আর তাই বড় আফসোস লাগে, আহা যদি আবার সেই বাল্যকালের শিক্ষকদের শাসনটা ফিরে আসতো! আহা, যদি আবার সেই পুরানো বন্ধু বান্ধবরা আগের রুপে ফিরে আসতো! মাঝে মাঝে আজ খুব হাসি আসে সেই বাচ্চা বয়সের কথা মনে করে। কতই না রাগ করেছি সবচেয়ে ভালো বন্ধুর সাথে। কত যে ঝগড়া করেছি ওদের সাথে। কখনো কারনে, কখনো অকারনে। কখনো আমি দোষ করেই উলটা রাগ করেছি, আবার কখনো ওদের দোষের কারনেও রাগ করেছি। এক মিনিট সময় লাগেনি তাকে বলতে যে, আমি তাকে ঘৃণা করি কারন সে আমাকে তার লাল পেন্সিলটা একদিন ব্যবহার করতে দেয় নাই, অথবা নদীতে আমার আগে সে লাফ দিলো কেনো এই কারনে আমি তার সাথে জিদ ধরে কয়েকদিন হয়ত কথাই বলিনি ইত্যাদি। জিদ ধরেছি একে অপরের সঙ্গে, কখনো কখনো আড়ি হয়েছে, কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে, আরো কত কি? ইশ, কি মিষ্টি ছিলো দিনগুলি!!

আজ বড় নস্টালজিক মনে হয়, আহা, এমন একটা বয়স যদি আবারো ফিরে আসতো! আমার সেই বন্ধুরাতো আজো আছে, আশেপাশেই আছে। কিন্তু বাল্যকালের সেই উচ্ছ্বাস, সেই অদম্য দুস্টুমিপনা, সেই আবেগ আর নাই। বয়স একধাপ থেকে উঠে আরেক ধাপে, আরেক ধাপ থেকে আরো আরেক ধাপে চলে গেছে। আগের ধাপের স্মৃতি ধরে রেখেছে কিন্তু কার্যপ্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কথা হয় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে, জীবনের উৎকণ্ঠা নিয়ে, পরিবারের ভালমন্দ নিয়ে, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংস্কৃতি নিয়ে। এখন আর বৈশাখী মেলায় মাটির ব্যাংক, বাঁশের বাঁশী, ভাজা বুট, চালতার আচার, নাগরদোলা, ফোটকা বেলুন, বাশের কঞ্চিতে বানানো বাশি ইত্যাদি নিয়ে কোনো আবেগ আসে না। অফুরন্ত সময় আছে, খেলার মাঠও সেখানেই আছে, নদীও আগের জায়গায়ই আছে, কিন্তু সেই ফেলে আসা বাল্যকালটা আর নাই। নদী দেখলে এখন মন চায় যদি ঝাপ দিতে পারতাম, কিন্তু দেওয়া হয় না। সবুজ ধানক্ষেত দেখলে ক্ষেতের আইল ধরে কচিকচি পায়ে দৌড় দিয়ে কোথাও হারিয়ে যেতে মন চায় কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হয় না। মন মনের জায়গায়ই আছে কিন্তু মনের সঙ্গে শরীর আর শরীরের সঙ্গে মনের মধ্যে এখন বিস্তর ব্যবধান বনে গেছে। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে “সময়” নামক এক বিশাল অদৃশ্য দেওয়াল। পাশে থাকা বাল্য বয়সের ছেলেমেয়েরা যখন তাদের ইচ্ছার কথাগুলি বলতে থাকে, আমি বুঝতে পারি ওরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে আর কি বলছে। বড্ড ভাল লাগে। মাঝে মাঝে ধমক দেই বটে, মাঝে মাঝে বারন করি, কখনো কখনো রাগও করি। আবার এও জানি, এটাই তো করার কথা ওদের। কিন্তু ওরাও একদিন এই সময়টা হারিয়ে ফেলবে। আজ ওদেরকে শাসন করি, একদিন আমাদেরকেও আমাদের অভিভাবকরা শাসন করতো। অভিভাবকদের ওই শাসনে কখনো মন খারাপ হয়েছে, অনেক আনন্দ মাটি করে ফেলেছি রাগে, দুঃখে মনের কষ্টে। জিদ ধরে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। সারাদিন না খেয়ে কষ্ট হচ্ছে দেখে হয়ত মাও খান নাই, বাবা ছেলের অহেতুক জিদে, মায়ের মনের কষ্টে তার সব শাসন ভুলে হয়ত আমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন, আর আমি সেটাই আমার বীরত্বই বলি, আর আমার জয়ই বলি, গর্বে আরো ঘাড় বেকে বসে থাকতাম খাবো না বলে। একদম অবুঝের মতো। আজ ওইগুলু মনে পড়লে বড্ড মন খারাপ হয়। আজ ঐ শাসনগুলি খুব মিস করছি। চোখের পাতা ভিজে আসে। কোথায় হারিয়ে গেলো ওইসব?

যখন ছোট ছিলাম, সবচেয়ে অপছন্দের চিঠি ছিল আমার অভিভাবকদের। সেই একই কথা। কোনো চিঠি না খুলেই বলে দিতে পারতাম, বাবা কি লিখেছে বা মা কি বলতে চেয়েছে। একদিন খুব দুস্টুমি করে আমি আমার অভিভাবককে বলেছিলাম, আচ্ছা, কস্ট করে বারবার একই চিঠি লেখার দরকার কি? একটা চিঠি ফটোকপি করে রাখলেই তো হয়। কদিন পরপর শুধু ওটা পোস্ট করে দিবা! কারন কথা তো একই থাকে। কেমন আছো তুমি, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করবে, সন্ধ্যা হওয়ার আগে ঘরে ফিরে আসবে, বেশী রাত জাগবে না, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে ভালোভাবে মিলেমিশে থাকবে, বড়দেরকে সম্মান করবে, আমাদের জন্য মন খারাপ করো না। এই তো? তাহলে আর বারবার লেখার দরকার কি? অথচ আজ এতো বছর পর মনে হচ্ছে, আমি ওই কথাগুলিই খুব মিস করছি। খুব করে মনে হয়, তোমরা আবারো আমাকে এই একই কথাগুলি লিখে পাঠাও না বাবা! আমি জানি, আজ আমার সন্তানেরাও ঠিক একই কথা বলবে। হয়ত কোনো একদিন আজকের এই দিনের মতো তারাও হয়ত আমার সেই একই কথা শুনার জন্য তাদের মন খারাপ করবে। সব বাবাদের কথা এক হয়, সব মায়েদের সন্তানের জন্য চিন্তা এক হয়। তোমরা যখন বাবা মা হবে, সেদিন হয়ত বুঝবে, আজ আমি কি বলতে চাচ্ছি।

যে বালকটি আজ থেকে ৫৫ বছর আগে উচ্ছল, চঞ্চল, দুরন্তপনা, অদম্য সময় কাটিয়েছিলো, ওই সময় যে তোমাদেরকে অনেক কঠিন দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে রাখতো, সময়-অসময় তোমাদের মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়াতো, আজ সেই একই বালক ৫৫ বছর পর শান্ত, ধীর এবং অভিভাবকরুপে রূপান্তরিত হয়ে শুধু একটা আবেগের কথাই বলতে চাই, ফিরে এসে দেখে যাও, সে আর আগের মতো দুস্টুমি করে না, হটাত বৃষ্টিতে তোমাদের অগোচরে ভিজে আর অসময়ে জ্বর বাধিয়ে ফেলে না, কিংবা তোমাদের না বলে হটাত করে কিছু দুষ্টু বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় না। তোমরা যে ছেলেকে সারাক্ষন ঘরের মধ্যে শান্ত হয়ে থাকতে বলতে। বলতে আর কতজল ফেলবি আমাদের চোখে? আর কত দুসচিন্তায় ফেলবি আমাদের? আজ এই বয়সে এসে আমি তোমাদের শুধু একটা কথাই বলতে পারি, এখন এসো আমার ঘরে, দেখে যাও, তার এখন অফুরন্ত সময় এবং সে এখন সত্যিই শান্ত একটি মিষ্টি ছেলে। এখন আর তোমাদেরকে আমি কোনো দুসচিন্তায় ফেলবো না। আজ আমার ছুটি। লম্বা ছুটি। আমি তোমাদের একজন লক্ষি ছেলে হয়েই ঘরে বসে আছি। কিন্তু তোমরা কই? তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাও? আমি তোমাদের খুব ভালবাসি।