২৩/০২/২০১৬-বগুড়ার পথে (২)

বগুড়া যাওয়ার পথে (২য় পর্ব) 

বগুড়া শহরে এই আমার প্রথম আসা নয়। কর্মস্থল হিসাবে আমি এই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ বছর কাটিয়েছি। গ্রামের অধিকাংশ অলি গলি, আনাচে কানাচে ঘুরেছি, কখনো দায়িত্ব পালনের জন্য রাত অবধি জেগে থেকেছি। কখনো আবার নিছক মনের তাগিদে ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য আহরণের জন্য দিকবিদিক ঘুরেছি। কখনো আমি গভির রাতে, কখনো রাতের শেষ প্রহর জেগে থেকে শুক্ল পক্ষের চাঁদ দেখেছি। কখনো আমি দেখেছি অমাবশ্যায় আকাশ তার কি রূপে পৃথিবীর কাছে প্রেম নিবেদন করে। কখনো আবার ঘোর বৃষ্টির রাতে যখন সব মানুসেরা তাদের নিজ নিজ আস্তানায় ফিরে গভির ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, যখন পাখীরাও আর কিচির মিচির করে না, আমি তখনও চাঁদহীন মেঘলা আকাশের মুসলধারে বৃষ্টির চ্ছটায় বারান্দায় বসে দেখেছি গাছগুলো কিভাবে বৃষ্টির জলে একা একা খেলা করে, কিভাবে হেলেদুলে একে অপরের আরও কাছে চলে আসে। কোন কথা নাই, নিঃশব্দে নিরবে অবিরত বৃষ্টি এই ঘুমন্ত ধরাকে কিভাবে স্নিগ্ধ চুম্বনে আলিঙ্গন করে। আকাশ মাটি আর বৃষ্টির এই প্রেমের লীলা এক অদ্ভুত রহস্য ঈশ্বরের। শরৎচন্দ্রের সেই বিখ্যাত শ্রীকান্ত উপন্যাসের কিছু অভিব্যাক্তি আমার মনে পরে। ……”অন্ধকারেরও রূপ আছে” । আসলেই আছে। মানুষ দিনের আলোয় যা দেখে না, অন্ধকারে সে টা উপলব্ধি করে, মানুষ দিনের আলোয় যা বিশ্বাস করে না, অন্ধকারের ঘোর নিশানায় সে সেটা বিশ্বাস করে। এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। গাড়ির আলোতে আমি সামনের রাস্তা দেখছি কিন্তু পাশে ফেলে যাওয়া অনেক কিছুই এখন আর আমার নজরে পরছে না অথচ এই ফেলে যাওয়া রাস্তার ধারেও কতই না সৌন্দর্য পরে আছে। মাঝে মাঝে লাইট পোস্টের কিছু আলোতে কিছু কিছু লোকালয়ের বস্তি চোখে পরে। ওখানেও অনেক অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের অনেক কাহিনি লুকিয়ে আছে যার ইতি বৃত্ত আমাদের অনেকেরই জানা নাই।

অনেক দূর চলে এসছি আমরা। বগুড়া শহর আর বেশি দূরে নাই। গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেছে প্রায়, তেল নিতে একটি তেল পাম্পে ঢোকতেই হচ্ছে। ইচ্ছা না থাকা সত্তেও গাড়ি থামাতে হল। আমি নেমেই একটা সিগারেট ধরালাম। একটি ৬-৭ বছরের বাচ্চা সহ একজন মহিলা আমার কাছে এসে বল্ল, স্যার আমার এই ছেলেটার একটা চোখ অন্ধ, আর একটা হাত অবশ। দিন না আমাকে কিছু। বড় মায়া হল। মা তার অন্ধ এবং পঙ্গু ছেলের জন্য কোথায় না ঘুরছে? আমার মায়ের কথা মনে পড়ল।  মনে হল কতকাল আমার মা আমাকে আর আদর করে না, কতকাল আমার মা আমাকে আর খোকা বলে ডাকে না। আমাকে আর শাসনও করে না। অথচ আমি জানি আমার মা আমার কাছে আছেন, আমাকে দেখছেন। আজ আমি বাবা, আমার মেয়েরা আস্তে আস্তে তাদের আরেক জীবনে প্রবেশ করছে। হয়তবা আমিও আর ওদেরকে আর আগের মত শাসন করতে পারবনা, আমি আর আগের মত বুকে জরিয়ে ধরে বলতে পারব না, মা তোমার কি মন খারাপ? হয়ত বা তার সত্যি মন খারাপ, হয়তবা সেও কোথাও বসে কোন এক অমাবস্যার রাতে বৃষ্টির ঘন চ্ছটায় আমাদের কথা মনে করছে, অথচ আমি তার পাশে নাই। তাই মাঝে মাঝে অদেরকে মিস করব বলে আজ এই দিনে অনেক অগোছালো আব্দার আমি মেনেই নিচ্ছি।

যাই হোক, ছেলেটার জন্য প্রচন্ড মায়া হল। মায়ের জন্য আমার বুকটা কোথায় যেন একটু ব্যাথা অনুভব করলাম। বললাম, এটা কি তোমার একমাত্র সন্তান? মা সময় অপচয় না করে বিনা দ্বিধায় উত্তর দিল, “হ্যা গো স্যার, হামাক একটাই পোলা, হামাক বড় আদরের পোলা গো স্যার।” একটা মা, জাস্ট একজন মা। তার পরিচয়, মা। মাকে নিয়ে অনেক কবিতা পড়েছি, মাকে নিয়ে অনেক ইতিহাস রচিত হয়েছে। মাকে নিয়ে ধর্মগ্রন্থেও অনেক বানি রয়েছে। আমি নিজেও মাকে নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছি যদিও আমি কবি নই। আমার কবিতা কোথাও ছাপা হোক সেটাও আমি চাইনি। তারপরেও মনের আবেগে আমি মাকে নিয়ে অনেক কবিতাও লিখেছি। আজ মনে হচ্ছে মাকে খুব মিস করছি। কোন এক সময় মাকে মিস করে একটা কবিতাও লিখেছিলাম…

আমি এক দস্যুরানীর প্রেমিক
কি এক অদ্ভুদ তার চাহনি, কখন মায়াবতী
কখন বা কঠোর স্পাত কঠিন ভিতি
কি অবাক এক জীবনীযোগে
অতন্দ্র ঘোর অন্ধকারে আমার পানে চাহিয়া সে আলেয়ারে খোঁজে

আবার কখনো টকটকে রৌদ্র স্নানে
কোন এক অজানা ভয়ে কম্পিত হয় শিহরনে
কখনো ভালবাসায় আমাকে ছুরে দেয় অসীম আকাশের দিকে
আবার যদি হারিয়ে যাই এই ভয়ে ঢেকে রাখে তার শারির আচলে

কি অদ্ভুদ সে।
কখনো গাল ভরে চুমু
আবার কখনো ইশা খার মত করা শাসনের ঝুমু
সকাল সন্ধ্যা দিন রাত আমার কোন স্বাধীনতা নাই
আবার আমার কোন কাজে তার কোন বাধাও নাই

মাঝে মাঝে আমার বড় রাগ হয়
আর সে খিলখিলিয়ে হাসে,
আমি যখন হাসি, সে তখন অপরূপ দৃষ্টিতে অশ্রু নয়নে ভাসে
আর বলে, আমি নাকি পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর।
অথচ আমার একটা চোখ নাই, আমি দেখতেও ফর্সা নই।
একদিন অনেক রাতে সেই অমাবশ্যার অন্ধকারে চুপি চুপি আমি তারে প্রশ্ন করেছিলাম

কে গো তুমি আসলে?
সিক্ত নয়নে আমার কাধে হাত রেখে বলেছিল
“তুমি যখন এই পৃথিবীতে প্রথম আস
তখন আমার নতুন পরিচয় হয়েছিল
আমার নতুন নাম হয়েছিল, “মা”

(…… হয়ত চলবে)

১৯/০২/২০১৬-বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট

অনেক অনেক দিন পর বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে এলাম। প্রায় ১২ বছর পর। অনেক পরিবর্তন হয়েছে এর চেহারা। শুধু বগুড়া ক্যান্ট এর চেহারা কেন, পুরু বগুড়া শহরের চেহারাই পরিবর্তন হয়েছে অনেক। কোন কিছুরই প্রতিদিনের পরিবর্তন চোখে পরে না কিন্তু কেউ হটাত করে দেখলে পুরু পরিবর্তনটা এক নিমিষেই বলা যায়। আমার কাছে তাই পুরু পরিবর্তনটাই ধরা পরল।

বগুড়া শহরে আসার আমার একটি মাত্র কারন ছিল- আমার মেয়েকে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজে রেখে যাওয়া। সদ্য বিবাহিতা আমার মেয়ে তার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাসুর, ভাসুরের বউ, এবং আমাদের পরিবার সবাই একসঙ্গে এসেছি। অত্যান্ত চমৎকার একটা সময় কাটাচ্ছি সবার সঙ্গে। গতকাল গিয়েছিলাম আমার মেয়ের মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে। চারিদিকে সব ডাক্তার, কেউ  এক বছরের অভিজ্ঞতার ডাক্তার, কেউ দুই বছরের, কেউ বা বা আবার এক প্রফের অভিজ্ঞ ডাক্তার, কেউ আবার দুই হয় নাই তবে প্রায় দুই প্রফের সমান অভিজ্ঞ ডাক্তার। আমার মেয়ের ব্যাচের সবাই এখন প্রায় পৌনে দুই প্রফের অভিজ্ঞ সব ডাক্তার। আমি আমার মেয়ের মেসে এসেছি পুরু পরিবার নিয়ে। আমার মেয়ের বিয়ের মিষ্টি নিয়ে।

ছেলেদের মেসের পরিবেশ আমার জানা আছে কারন প্রায় দেড় যুগের বেশি আমি মেস লাইফ কাটিয়েছি। কখনো কোন মেস মেম্বার মেসের খাবার খেয়ে খুশি হয়েছে কিংবা মেসের খাবারের উপর মন খারাপ করে নাই, এই ইতিহাস মোঘল আমল থেকে খুজলেও কোন বরাত পাওয়া যাবে না। মেসের আমার মেয়ের বান্ধবিদেরও সেই একই অবস্থা। তাদেরও মেসের খাবারের উপর অনেক অভিযোগ আছে, আছে কতই না কষ্টের মনোভাব। সব কিছুই ভাল এখানে শুধু মেসের খাবার নিয়ে যত কষ্ট। তারপরেও আমি জানি একদিন ওরা এই মেস লাইফটা মিস করবে। আর আজকের দিনের এই মেসের খাবারের কষ্টের বিষয়টিই ভবিষ্যতের মজার কাহিনি গুলর মধ্যে একটা হয়ে উঠবে। কারন আমার এই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি যে, ঐ মেস লাইফটা খুব মিস করছি।

পিচ্চি পিচ্চি আমার সব মেয়েরা সবাই ডাক্তারি পরছে, দেখেই শান্তি লাগে। এক গুচ্ছ ডাক্তার চারিদিকে। হৈ চৈ কিচির মিচির আনন্দের উল্লাস এই সব উঠতি ডাক্তারদের কণ্ঠে। বড় ভাল লাগে এদের বাচ্চামি, এদের চালচলন। একদিন ওরাই দেশের সব স্বনামধন্য ডাক্তারদের সাড়িতে দারিয়ে থাকবে, কারো হাত দিয়ে অনেক মানুষের জীবনের পাল পরিবর্তন হয়ে যাবে, অনেক মানুষের ভরসার স্থান হবে এরা। এতগুলো ডাক্তারদের পেয়ে আমারও খুব ভাল লাগছিল। এদের মাথায় এখন সব এনাটমি, ইত্যাদি সব কঠিন কঠিন সাব্জেক্ট মাথায় ঢোকে যাচ্ছে। খাটের নিচে রাখা ট্রাঙ্ক ভরতি সব বই এর লেখা খাটের নিচ থেকে উবে গিয়ে একেবারে মাথার ব্রেনে চলে যাচ্ছে, বইগুল আবার কদিন পর খাটের নিচেই জমা হয়ে যাচ্ছে।

তোমরা সবাই খুব ভাল। ভাল থেক তোমরা। জীবনে তোমরা সবাই সফল হবে।

১৮/২/২০১৬ গত দুইদিন যাবত আমি আমার বড় মেয়ের সঙ্গে

গত দুইদিন যাবত আমি আমার বড় মেয়ের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটানোর চেষ্টা করছি। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে। এখনো ছেলেমেয়ের মধ্যে কোন রাত যাপনের সুযোগ আমরা দেই নাই যদিও এটা আমাদের ধর্মের রীতির মধ্যে পরে না কিন্তু আমি খুব বিস্ময়ের সহিত লক্ষ করছি আমাদের এই দুইজন সন্তানও কোন প্রকারের দাবি তুলে নাই তাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করছি বলে। ওরা নিষ্পাপ মানুষগুলোর মধ্যে একজন।

কিন্তু আমি একটা জিনিস লক্ষ করছি আমার মধ্যে যে, আমার বুকের ভিতর কোথায় যেন একটা ফাকা ফাঁকা ঠেকছে। অথচ কোন কিছুই আমি হারাই নাই। বরং আমি আরও একজন নতুন মানুষ পেয়েছি, আমি আরও একজন সুসন্তান পেয়েছি, অন্যভাবে বলতে হয় যে, আমার যে একজন ছেলে সন্তানের অভাব ছিল আজ মনে হয় যেন আমি একজন ছেলে সন্তান পেয়েছি। কখনো কোনদিন কোনভাবেই আমার অগোচরেও আমার মনে আমার একজন ছেলে সন্তান দরকার এই ভাবনাটা আসে নাই। আজ আমার মেয়ের জামাইকে পেয়ে মনে হল, আমি যেন আজ নতুন করে বাবা হয়েছি। একজন ছেলের বাবা। যে অভিজ্ঞতাটা আমার কখনো ছিল না। কিন্তু তারপরেও প্রতিনিয়ত আমার কাছে মনে হচ্ছে আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। কি সেই পরিবর্তনটা? কাজের ফাকে কারনটা খুজতে চেষ্টা করেছি, অবসরে খুজতে চেষ্টা করেছি, একাএকা ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি, চোখ বুঝে ভাবার চেষ্টা করেছি, চোখ খুলে দিনের আলোয় বুঝার চেস্তা করেছি, আমার কোথাও কোন কোন হারায় নাই। অথচ ব্যাপারটা ঘটছে আমার মাথার ভিতর, আর ব্যাথাটা পাচ্ছি অন্তরের ভিতর। এরই মধ্যে আমার মেয়ের বিয়ের কারনে আমার যেন নতুন করে একটা আনন্দ হচ্ছে আমার সর্বত্র। তাহলে কি হয়েছে আমার? ইন্ডাস্ট্রি চলছে আগের মত, ব্যবসা চলছে ঠিক আগের মত, আমি অফিসে যাচ্ছি ঠিক সময়মত, আমার কোন কাজেই আমার কোন হেরফের হচ্ছে না। তারপরেও একটা অনুভূতি কাজ করছে। সেই অনুভুতিটা আজ যেন আমার কাছে কিছুটা স্পষ্ট হল। সম্ভবত এই কারনে যে, একদিন কোন এক শরতের সন্ধ্যায় কিংবা বর্ষার এক ঘনমেঘের দিনে আমার এই মেয়ে আমাকে অঝোর অশ্রু জলে ভাসিয়ে আমারই চোখের সামনে পরিবারের অতিতের সমস্ত আদর আপ্যায়ন ভালোবাসা রাগ গোস্যা, অভিমান, ঝগড়া সব ছেড়ে তার দুই নয়ন ভাসিয়ে আমার হাত ছেড়ে আজকের এই নতুন ছেলের হাত ধরে অন্য কোথাও বাসা বাঁধবে। আমার সব অধিকার থাকা সত্তেও, আমার সব ভালোবাসা ঠিক আগের জায়গায় রেখেই আমার মেয়ে তার আরেক নতুন পৃথিবী তৈরি করবে অন্য এক স্থানে। এই ভাবনা আসতেই যেন আমার চোখের পাতা ভিজে আসে কখনো আনন্দে আবার কখনো মিস করার এক কষ্টে।  আমার বুকে একটা সুখের অনুভুতির সঙ্গে আবার একটা অন্য রকম কষ্টের অনুভূতিও অনুভব হয়।  এটা আসলে কষ্ট নয়, এটাও একটা সুখের কষ্ট। ঐ যে ঐ রকম একটা অনুভুতির মত “তোমার মা তার জীবনে তোমাকে কাদতে দেখে একবারই হেসেছিল, যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল।” কি দারুন কথা না!!

আজ আমার মনে হচ্ছে আমিও হয়ত তোমার চলে যাওয়ার সময় তোমার কান্না দেখে আমি অশ্রুজলে হেসে হেসে আমার অন্তরের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে বলব, তুমি সব সময় ভাল থাকবে আমার এই নবাগত ছেলের হাত ধরে। তাকে তুমি শক্ত করে ধরে রেখ মা, আমিও ওর হাত ধরে রেখেছি যেন ও কোথাও হারিয়ে না যায়। আমার কাছে তো আলো আছে মা। আমি তোমাদের জন্য এক বাসযোগ্য পৃথিবীর আবাসস্থল গড়ে দিয়ে যাব, এই আমার প্রতিজ্ঞা ঈশ্বরের কাছে।

১৪/২/২০১৬-আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবস এবং তোমার বিয়ে 

আজ তোমার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যা একজন মেয়ের জীবনের বাকি সব পরিচয় সম্পন্ন করার লক্ষে সামাজিক এক প্রত্যায়ন পত্র আর ধর্মীয় রীতিতে মহান আল্লাহতালার আদেশ পালনের মহাজ্ঞা। আর এই প্রত্যায়ন পত্রের মাধ্যমে তুমি আজ সাধারন এক বাবার মেয়ে থেকে অন্য এক পুরুষের স্ত্রী হয়েছ, একটি পরিবারের বউ হয়েছ, কারো ভাবী, কারো ননদিনী এবং আরও অনেক নতুন সম্পর্কের সৃষ্টি করেছ। সময়ের পরিবর্তনে আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন তুমি মা হবে, তারপর ক্রমান্বয়ে শাশুড়ি থেকে দাদী এবং তারপরে হয়ত বড়মা ইত্যাদি। আর এইসব সার্থক জীবনের জন্য যা প্রয়োজন তারমাত্র একটি সিঁড়ি তুমি আজ পার করলে। বাকি অধ্যায়গুলো পাওয়ার জন্য তোমাকে আরও অনেক কঠিন কঠিন দিন, সময় এবং ক্ষন পার করে এক অনবদ্য এবং নিরবিচ্ছিন্ন জীবন পার করতে হবে এবং তা পার করতে পারলেই কেবল সার্থক মা, সার্থক শাশুড়ি, সার্থক দাদী কিংবা সার্থক বড়মা হওয়ার যোগ্যতা তুমি অর্জন করতে পারবে। আর তার সঙ্গে তুমি পাবে সামাজিক এক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান এবং হয়ে উঠবে সবার কাছে এক দৃষ্টান্তমুলক ব্যক্তিত্ব।  

এখন যে প্রশ্নটা আসে, এই অনবদ্য এবং নিরবিচ্ছিন্ন জীবন বলতে কি বুঝায়? অনবদ্য জীবন মানেই সমস্যাবিহিন জীবন নয়। বরঞ্চ সমস্যা নিরসনকল্পে কিভাবে কখন কোথায় কেমন করে তা সমাধান করা যায় তার হিসাব। এই জীবনে অনেক সমস্যা আসবে, আর এই সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক চেনা-অচেনা মানুষের ভীর তোমার আশেপাশে দেখতে পাবে। কাউকে মনে হবে তোমার অতি পরিচিত এক বন্ধু, কেউ আসবে তোমার জীবনে এমন বেশ ধরে যে মনে হবে তোমার দুঃখে সে অতি দুঃখিত, কেউ আবার এমন করে তার অনুভুতি তোমার কাছে মেলে ধরবে যেন ঠিক এটাই তুমি চাচ্ছ। এই দলটি প্রথমে তোমাকে ভালবাসার কথা শুনাবে, ভাললাগার কথা বলবে, কাজ না হলে নিজেদের চোখের জলে তোমাকে দুর্বল করার চেষ্টা করবে, এমনও হতে পারে তারা তাদের অসহায়ত্তের কথা বলে তোমার কোমল হৃদয়ে জায়গা করার চেষ্টা করবে, আর কিছুতেই কিছু না হলে তখন তোমার মন কিভাবে পিশিয়ে উঠবে সে চেষ্টা করবে। এই দলটি কখনো বালকসুলভ ভদ্র আচরনে আবার কখনো সে অত্যাচারির রুপে তোমাকে দেখা দেবে, এবং তোমাকে বিপথে নিয়ে যাবে। সাবধান থেক এদের থেকে। মনে প্রানে বিশ্বাস রেখ যে, এরা আসলে কেউ তোমার প্রকৃত বন্ধু নয়। একজনও না। আর এটাই এই অদ্ভুত এই পৃথিবীর আচরন। যখনই তুমি এদের সাথে তোমার জীবনের ব্যক্তিগত সমস্যাবলী শেয়ার করেছ, ঠিক তখনি তুমি সমস্যার আরও জটিল গহব্বরে আটকে যাবে। তোমার সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তোমার সমস্যা আরও গভির থেকে গভিরে নিয়ে যাবে এবং এক সময় তোমার জীবনটা এরা কুপরামর্শ দিয়ে এতটাই অতিষ্ঠ করে তোলবে যে, আজ যারা তোমার সত্যিকারের বন্ধু, যারা তোমার জিবনটা সুন্দর হয়ে উঠুক বলে প্রতিনিয়ত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, তাদেরকে তোমার কাউকেই আর বন্ধু মনে হবে না। যেদিন তোমার কাছে এই সব শুভাকাঙ্ক্ষী লোকজনকে আর তোমার আপনজন বলে মনে হবে না, সেদিন তোমাকে মনে রাখতে হবে যে চাটুকারের দল তোমাকে ঘিরে ফেলেছে এবং তোমার জীবনের সব সাধ-আহ্লাদ ধ্বংসের পথে। তোমার আর ঐসব পর্ব, সার্থক মা, সার্থক শাশুড়ি কিংবা সার্থক দাদী হওয়ার পথে এক বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। ঐসব বিপথগামী মানুষরূপী শয়তান গুলো এইটাই চেয়েছে। এর মানে এই যে, তোমাকে প্রতিনিয়ত ঐসব চাটুকার, ঐসব হায়েনা, ঐসব বন্ধুতুল্য অপরিচ্ছন্ন মানুষরূপি খারাপ মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। দূরে থাকতে হবে তোমার নিজের ভাল থাকার জন্য, দূরে থাকতে হবে সামাজিক সম্মান আর পরিচ্ছন্ন জীবনের জন্য। আর ঐসব হায়েনাদের কাছ থেকে দূরে থাকার একটাই পথ, আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজের মানুষদের উপর বিশ্বাস রেখে নিজেকে সঠিক পথে এবং নিজের আত্মবিশ্বাসকে বিশ্বাস করে। তোমার যা আছে, তাতেই তোমাকে সন্তুষ্ট হয়ে থাকতে হবে। তোমার থেকেও অনেক মানুষের অনেক কিছু নাই, কারো হাত নাই, কারো পা নাই, কারো বাবা মা নাই, কারো থাকার ঘর নাই, কারো আবার কিছুই নাই। তোমার তো অন্তত আমরা আছি, তোমার স্বামী আছে, তোমার খুব ভাল শশুর শাশুড়ি আছে, তোমার উকিল বাবা আছে, তোমার জা, ননদিনী, ভাসুর সবাই আছে। তোমার সুন্দর ঘর আছে, তোমার কি নাই? আল্লাহ তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসে বলেই আজ তোমাকে এই রকম একজন সুন্দর মানুষের হাত ধরতে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যাকে তুমি নিজে ভালবেসেছ এবং তুমি তাকেই পেয়েছ। তোমার জন্য এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত ঈশ্বরের কাছে দোয়া করে, তোমার ভাল চায়। তাদের ভালবাসার মুল্য শুধু একটাই, তোমরা সুখে থাক, তোমরা ভাল থাক। আর কিছুই চায় না এই স্বার্থহীন মানুষগুলো। নিজের স্বামীর কাছে তুমি কতটুকু গ্রহনযোগ্য তা নির্ভর করবে তুমি নিজের কাছে কতটুকুন সৎ এবং তুমি কতটুকুন নিজেকে ভালবাস তার উপর।  

মনে রেখ ভয়, ঘৃণা এবং লোভ কখনো মরে না। এটাকে প্রথম থেকে দূরে রাখতে হবে। আর এর প্রধান উপায় হচ্ছে যখনই কোন ভয়ের উদ্রেক হবে, যখনই কোন ঘৃণার কারন সামনে এসে দারাবে, যখনই কোন লোভের বশবর্তী হবে, ঠিক যার কারনে এইসব ভয়, ঘৃণা এবং লোভের উদ্রেক হবে তা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং তার সঠিক ব্যাখ্যা ঠিক লোকের কাছ থেকে সরাসরি জেনে মন পরিস্কার করে নিতে হবে। তাতেই তুমি জয়ি হবে। আর যদি তা না কর, নিশ্চিত জেনো তোমার পরাজয় নিশ্চিত। আর এটাই চেয়েছে ঐসব বন্ধুসুলভ তোমার হায়েনার দল। তুমি যদি জয়ি হওঁ, তবেই তুমি পাবে নিরবিচ্ছিন্ন জীবনের স্বাদ আর তারপরেই পাবে তুমি জীবনের ঐ সব পর্যায়ের সব কিছু। অর্থাৎ সার্থক একজন মা, সার্থক একজন স্ত্রী, সার্থক একজন শাশুড়ি কিংবা দাদির পরিচয়।  

আজ তোমাকে একটি সত্য কথা বলি। তোমার মা আমার জীবনে এক আশীর্বাদ। এটা তুমি নিজেও জানো। এর মানে এই নয় যে তোমার মা একমাত্র সবচেয়ে গুণী ব্যক্তি, তোমার মা একমাত্র সুন্দরী মহিলা। তার মধ্যেও অনেক গুনাবলির অভাব রয়েছে, তার মধ্যেও অনেক দোষ রয়েছে, তার সঙ্গে আমারও অনেক সময় কারনে অকারনে এবং খুব তুচ্ছ জিনিস নিয়েও মনের অমিল হয়। অন্য দিকে আমিও একমাত্র আদর্শবান ব্যক্তি নই, আমারও ১০০% গুনের সমাহার নাই, আমার অনেক ব্যবহারেও তোমার মায়ের রাগ হয়। কিন্তু তারপরের অধ্যায় হচ্ছে যে, আমরা অনেক কিছু কম্প্রোমাইজ করি, আমরা স্বাভাবিক জীবন জাপনের জন্য আমরা উভয়ে কোথায় কোন কারনে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে, কি কারনে আমাদের মনের ভিতরে কষ্ট হচ্ছে তা মিলেমিশে কথা বলে নিজের মন পরিস্কার করি বলেই আজ তোমরা আমাদেরকে এই পর্যায়ে দেখতে পাচ্ছ। আমরা সুখী পরিবাবের অংশ। আমি ও চাই তোমরা সুখী হওঁ এবং সার্থক জীবন পার কর।  

নিজেদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছাড়া দুইজনের মাঝে তৃতীয় পক্ষ যে আসবে সে আর কেউ না, সে হচ্ছে শয়তান। আর শয়তান কখনোই আমার তোমার বন্ধু নয়। সে শুধু ধোঁকা দেয়। সে কখনো আসে বন্ধু হিসাবে, কখনো আসে ঠিক তোমার মন যা চায় সে কথাগুলো নিয়ে, সে আসে এক চতুর বুদ্ধি নিয়ে, যা তোমার আর তোমার পরিবারের শুধু ধ্বংসই চায়, মঙ্গল নয়। তোমার আজকের এই পবিত্র দিনটি মঙ্গলময় হোক, তোমার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক এটাই আমার সব সময়ের জন্য প্রার্থনা। আমরা তোমাকে ভালবাসি। চাঁদ সূর্যের প্রতিস্থাপক নয়, শিশির বৃষ্টির প্রতিস্থাপক নয়, পুকুরের ঘোলা জল নদী বা সাগরের প্রিতিস্থাপক নয়। তোমার স্বামী তোমার কাছে সূর্য, তোমার পরিবার তোমার কাছে সাগর, আর তোমার প্রতি তোমার পরিবারের অফুরন্ত ভালবাসা হচ্ছে তোমার উপর ভালবাসার বৃষ্টি।এদের কোন প্রতিস্থাপিক হওঁয় না। 

শতানের দলমাঝে মাঝে তোমাকে চাদের কথা বলে, শিশিরের কাব্য দিয়ে অথবা কর্দমাক্ত পুকুরের ঘোলা জল দিয়েই বিপথগামী করে দিতে পারে। আমি তোমাদের জন্য ঐসব হায়েনাদের কাছে থেকে আমার ইসসর তোমাদের রক্ষা করুক সেটাই দোয়া করি।   

You were not an accidental baby in my life, you are my wanted girl from the Almighty and I prayed for you for almost 5 long years before you were born and then I was blessed with you from HIM. I always wanted a girl, you are that girl in my life. I love you all the time and with all my breath. May Almighty Allah listen to my prayer for your happiness and prosperity in your life.

০৫/০২/২০১৬-মান্নানের জেল থেকে ফেরার পর ওকে লিখা চিঠি

আমি তোমার উপর রাগ এখনো করি নাই।

কিন্তু আমার জানা ছিল না যে, আমাকে কোন এক সময় তোমার সঙ্গে এইভাবে হিসাব করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমি তোমার জন্য কি করেছি আর আমি কি করি নাই। একটা জিনিস সর্বদা মনে রাখবা যে, ব্রান্ড নামের একটা মুল্য আছে। আমি তোমার জীবনে একটা ব্রান্ড নাম। এটা তোমার বুঝার ক্ষমতা আছে কিনা আমি জানি না। তবে বুঝাটা উচিৎ। মান্নান আমার জীবনে কোন ব্রান্ড নাম নয়। এটা নিশ্চয় তুমি বুঝতে পারবা। আমার জীবনে হাবিবুল্লাহ কিংবা হোসেন মাদবর একটা ব্রান্ড নাম।

আমি খুব অবাক হয়েছি যে, ইদানিং জেল থেকে ফেরত আসার পর তোমার মধ্যে অনেক অবাস্তব চিন্তার উদ্ভব হয়েছে যা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় নাই। এর অনেকগুলো কারন থাকতে পারে, কিন্তু আমার ধারনা ঐ সমস্ত প্রধান কারনের মধ্যে একটা কারন হতে পারে তোমার মেয়ে মাহিদা (সম্ভবত)। তুমি কতটা ভাল বাবা বা কতটা ভাল স্বামী সেটা তুমি ভাল বলতে পারবে, আমি সেটা নিয়ে কখনো তোমাকে সাজেসনও দেব না।  কিন্তু তোমার মেয়ে মাহিদা তোমার জন্য কতটা ভাল মেয়ে সেটা আমি জানি কারন মাহিদা আমাকে তোমার ব্যাপারে কি কি বলেছে সেটা আমি তোমাকে কখনোই বলতে চাই নাই। কারন তোমার মন খারাপ হয়ে যাবে। তোমার সম্পরকে তোমার মেয়ের ধারনা খুব যে ভাল তা আমি বলব না, বরং তার ধারনা যে সম্পূর্ণ ভুল সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু মাহিমা অত্যন্ত একটা ভাল মেয়ে এবং এই কারনেই সব কিছুর পরেও আমি চেয়েছিলাম মাহিমার একটা ভাল ঘরে বিয়ে হোক এবং তোমাদের বলয় থেকে ও বের হয়ে যাক। আর তার জন্যই আমি মাহিমার বিয়েতে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা দিয়ে আমি ওর জীবনটাকে উপহার দিতে চেয়েছিলাম এবং দিয়েছিও। আমি এর আগেও মাহিমার ১ম বিয়েতে গিয়েছিলাম এবং এবার তো আমার যাওয়ার অনেক প্রয়োজন ছিল অবশ্যই। কিন্তু তুমি আমার কিংবা আমার পরিবারের যাওয়ার পথ এমন করে বন্ধ করে দিলে যে আমার সঙ্গে আর যে সব গনমান্য ব্যাক্তিবর্গ যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল আমার না যাওয়ার কারনে সম্ভবত তারাও আর যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে নাই। আমি অবশ্য কাউকে কিছু বলিও নাই। হয়ত কেউ গেছে হয়ত অনেকেই যায় নাই। আমি আর সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই নাই।

মান্নান, একটা কথা মনে রাখা খুব দরকার যে, পরিবারের বা বংশের লোকদের থেকে আপন কেউ কখনো হয় না। হ্যা, হয়ত পরিবারের মধ্যে অন্তরকলহ থাকে কিন্তু সেটা আবার সমঝোতাও হয়ে যায়। আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি যে, তুমি জেলে থাকার সময় থেকে যে কোন কারনেই হোক (সেটা তোমার অনুপস্থিতির কারনেই হোক আর তাদের সাহসের কারনেই হোক) আমাদের সমস্ত বংশের লোকজন সরাসরি আমার এবং হাবিব ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে এবং তার মধ্যে অনেকেই সান্নিধ্যেও আসতে পেরেছে। এতে আমি দেখেছি যে, আমাদের বংশের অনেকেই তোমার উপর ঠিক যথোপযুক্ত সন্তুষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গটা এখন টানছি না, এটা তোমার বা আমাদের নিতান্তই ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যাপার ধরে নিতে পার।

মান্নান, আমি অসৎ নই এটা তুমিও জান। আমি অসৎ এবং আল্লাহ আমাকে কখনো সাহায্য করবে না আর তোমার কারনেই আজ আমি এতদুর পর্যন্ত আসতে পেরেছি ইত্যাদি ইত্যাদি” তোমার এই কথাটা আমার কোনভাবেই ভাল লাগে নাই। আর আমি কারো উপর নির্ভর করে এই পর্যন্ত আসি নাই। এটা আল্লাহ আমাকে করেছেন। এটা নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। আমার সমাজ আলাদা, তোমার সমাজ আলাদা, আমার জগত আলাদা তোমার জগত আলাদা। কে কাকে কিভাবে মুল্যায়ন করবে সেটা যার যার জগতের ব্যাপার। তোমার এসএমএস এর এই ভাবনাটা ভুল। আমি তোমাকে এই ভুল ভাবনা থেকে সরাতেও চাই না, সেটা তোমার হিসাব কিংবা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর তোমার কাছে এটা সত্য বলে মনে হয়েছে বলেই হয়ত তুমি বলতে পেরেছ। এটা নিয়ে আমি তোমাকে আর কৈফিয়তও দিতে চাই না। সৎ এবং অসৎ ব্যাপারটা নিতান্তই নিজস্ব ব্যাপার।  

আমি জানি আমার কি প্ল্যান ছিল তোমাকে নিয়ে আর আমি আমার পুরু প্ল্যানটা আমি তোমাকে বিস্তারিত বলেছিলামও। আমি এটাও বলেছিলাম যে, অচিরেই কোন একটা ছোটখাট ব্যবসা শুরু করতে যেখানে আমি তোমাকে সাহায্য করব আমার সাধ্যমত। আবার এটাও বলেছিলাম যে, যতদিন তোমার কোন গতি না হচ্ছে, আমি মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে তোমাকে দেব যাতে তোমার সংসার চলে।

একটা জিনিস মনে রাখবা মান্নান, কোন কালেই আমার জমির উপর লোভ ছিল না এবং এখনো নাই। তুমি যদি মনে কর যে, কিছু জমিজমা পেয়েই আমি অনেক কিছু হয়ে গেছি সেটা একদম ভুল ধারনা। তুমি কি বলতে পার, আজ পর্যন্ত কোন জমিটা আমার ব্যক্তি জীবনে কাজে লেগেছে? বলতে পার কোন জমিটার উপর ভরসা করে আমি ব্যবসা করছি? একটাও না। আর ভবিষ্যতে ওগুলো কোন কাজে আসবে কিনা তাও আমার জানা নাই। বরঞ্চ আমি তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম যে, একদিন যে মাদবর বাড়ি ম্লান হয়ে গেছে সেই মাদবর বারিটা আমি আবার অমলদের জমির উপর স্থাপন করে তোমাকেই ওখানে স্থাপন করে দিয়ে যাব। আমার যেহেতু কোন ছেলে নাই, আমি সবসময় মনে করেছি তোমরাই আমার ছেলে আর তোমরাই আমার সব ব্যবসা বানিজ্যের তদারকি করবে। কিন্তু ওটা হয়ত হয় নাই আর হবে কিনা ভবিষ্যতে আমার জানা নাই। যাই হোক, তুমি যদি মনে করে থাক যে, আমি শুধুমাত্র কিছু জমি জমার কারনে তোমাকে আমি আমার কাছে টেনে নিয়েছি, সেটা মারাত্মক ভুল ধারনা। আর এই ভুল ধারনাটা তোমার কাছেই থাকুক। আমি তোমার ভুল ধারনাটা ভাঙ্গাতে চাইও না। তোমার যদি এখনো মনে হয় তুমি আমাকে জমি জমা দিয়ে অনেক সাহায্য করে ফেলেছ, তাহলে বিক্রি করে দাও এবং আমার টাকাগুলো প্লিজ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা কর, আমি বরং তোমাকে অনুরোধই করছি। I want to get out of everything in future.

তোমার ধারনা আমি তোমাকে অবিশ্বাস করা শুরু করেছি কিনা। এই ধারনাটা তোমার কেন এসেছে আমি জানি না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে মাহিমার বিয়ের টাকা নেওয়ার আগে ফ্যাক্টরি কর্তৃক মানি ভাউচারে তোমাকে সাইন করতে বলেছে বলে তোমার এই ধারনাটা হয়েছে। আমি অবাক হয়েছি এই জন্য যে, এতদিন যখন তোমাকে আমি টাকা দিয়েছি (সেটা যে কারনেই হোক না কেন), আমি তোমার পক্ষে সাইন করেছি কিন্তু আমাদের সর্বশেষ ফ্যাক্টরি পলিসি মোতাবেক, আমাদের অবর্তমানে যিনি টাকা নিচ্ছেন এখন থেকে উক্ত ব্যক্তিই ফ্যাক্টরি মানি রিসিপ্টে সাইন করে টাকা নিতে হবে, আর এই কারনেই তোমাকে সাইন করতে বলেছে। তাছাড়া তখন আবার অডিট চলতেছিল বলে কোন অবস্থায়ই মানি রিসিপ্ট সাইন করা ছাড়া ফ্যাক্টরি টাকা দিতেও পারতো না। আমার অবাকই লেগেছে যে, মুর্তজা সাহেব যদি টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারে, আমি যদি টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারি, তুমি মুরতুজা ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সময় যদি সাইন করতে পার, তাহলে তুমি কেন টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারবে না? আর সাইন করতে গিয়েই যদি তুমি মনে কর যে, আমি তোমাকে অবিশ্বাস করছি, তাহলে ত আমার কোন কথা থাকে না।

তুমি DBBL ব্যাংক থেকে ৬০ লক্ষ টাকা লোণ নিয়ে ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ। আমি সত্যি সত্যি খুশি হয়েছি যে তুমি একটা ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ এবং নিজের উদ্যোগে তুমি নিজের ফাইন্যন্স দিয়ে ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ, এটা খুবই ভাল পদক্ষেপ। তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে ব্যাংকের লোণ প্রতি মাসে পে করতে পার। আর পদ্মা ব্রিজের বালুর সরবরাহ পাচ্ছ যেনে আমি আরও খুশি হয়েছি যে অন্তত একটা ভাল কাজের অফার পেয়েছ। আমি তোমার জন্য দোয়া করি তুমি নিজের উদ্যগে ভাল থাক। এবং মানুস তোমাকে তোমার নিজের নামে চিনুক। তোমার এসএমএস টাই ঠিক যে একটা পাখি তার নিজের ডানার শক্তিতে বেচে থাকার নামই স্বাধীনতা, গাছের ঢালের উপর নয়। আর তুমি আরও লিখেছ যে, এখন থেকে তুমি আর মেজরের সঙ্গে নাই। আমি কিছু মাইন্ড করি নাই তাতে। এটা নিতান্তই তোমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং অভিলাষ।

আমি জানি তুমি তোমার কথার বরখেলাপ কর না। আর এই জন্যই আমি কখনো তোমাকে নিয়ে কখনো অবিশ্বাস করার কোন কারনও দেখি নাই। তোমার হয়ত মনে হতে পারে যে আমি এমসিসির জমি নিয়ে চিন্তিত কিনা কিংবা হাবিব ভাইয়ের ৪৭ শতাংশ জমি নিয়ে চিন্তিত কিনা ইত্যাদি। হ্যা, আমি এমসিসির ৩৫ শতাংশ জমি নিয়ে চিন্তিত এই কারনে যে, এই ইজিএম এ যদি কোন কারনে পুরু বোর্ড পরিবরতন হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে একটা নতুন করে ঝামেলা হতেই পারে কিন্তু যারা পাওয়ার অফ এটর্নি দিয়েছে সবাই যেহেতু আমার বন্ধু, সেক্ষেত্রে হয়ত অনেক অসুবিধা হবে না। আর তুমি তোমার দায়িত্ব সম্পর্কে যথেস্ট পরিমানে ওয়াকিবহাল। সেটা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলার অবকাশ রাখে না। তবে আমি বুঝতে পারি নাই যে, ঐদিন তোমার আন্টির সামনে তুমি এমন একটা ব্যবহার করবে। শেষ পর্যন্ত আমি তোমার আন্টির কাছে অপদস্থই হয়েছি এই কারনে যে, সে হাস্পাতাল থেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজটা করতে এসেছিল, আর যখন কাজটাই হল না, সে আমাকে চার্জ করতেই পারে। এটা নিয়েও আমি তোমাকে আর বিব্রত করব না। তুমি সৎ, তুমি মানুষের বিচার কর, সমাজ তোমাকে অনেক আদর্শবান ব্যক্তি হিসাবে দেখে, তুমি ন্যায্য বিচার কর বলেই তুমি আমাকে এগুলি জানিয়ে এসছো এবং আমিও তাই জানি। কিন্তু তুমি ঐদিন কতটা ন্যায্য করেছ, কিংবা কতটা বিচারিক হিসাবে কাজটি করেছ তা তোমার কাছেই থাকুক। 

যাই হোক মান্নান, আমি যে কাজটা কখনো করতে চাই নাই, কখনোই চাই নাই,  তুমি আমাকে সেই কাজটাই করতে বাধ্য করেছ। আর সেটা হচ্ছে তোমার রাখা হিসাব অনুযায়িই আমি একটা ক্যাল্কুলেসন করেছি। আমি তোমার ব্যাপারে অনেক হিসাব অনেক সময় লিখে রাখি না কিন্তু আমার ফ্যাক্টরি রাখত, আর তার উপরে বেজ করেই একটা হিসাব আমি তোমাকে পাঠাচ্ছি। সব হিসাবের বিপক্ষে বিস্তারিত এক্সকেল শিট আছে, রেজিস্ট্রি খাতা আছে, তুমি যদি চাও, আমি সেগুল ফটকপি করে দিতে পারব। এর মানে এই নয় যে, আমি তোমার কাছে কোন টাকা পয়সা চাচ্ছি পাওনা হিসাবে। এটা শুধু তোমার জানার জন্য দেওয়া। এই হিসাব দিয়ে আমি তোমার কাছ থেকে কোন কিছুই প্রত্যাশা করছি না। কোন টাকা পয়সাও দাবি করছি না। শুধু তোমাকে জানানোর জন্য এই হিসাব পাঠানো। তুমি মাইন্ড করতে পার কিন্তু যেহেতু তুমি বিচার সাল্লিশি কর, তোমার মধ্যে অন্তত একটা বিচারিক ক্ষমতা আছে বলে আমার ধারনা এবং তোমার মাইন্ড করার কথা নয়।  অন্তত সত্যি  জিনিসটা তোমার জানা থাকল। তোমাকে কিছু দিতে হবে না আমাকে, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাক। আর আমি আমার এই চিঠির উপর কোন মন্তব্য ও আশা করি না। যদি ক্যালকুলেসনে ভুল থাকে শুধু ওটা আমি তোমাকে নিয়ে বসতে পারি, তাছাড়া আমার অন্য কোন মন্তব্যে আমি কোন মন্তব্য আশা করি না। 

 আর একটা ব্যাপার আমার কাছে অবাক লাগছে যে, তুমি আমার এই দুঃসময়েও শুধু নিজের ব্যাপারটাই দেখছ, তোমার কি একটা ফ্রেন্ড ও নাই, একটা কলিগ ও নাই, কিংবা একজন আত্তিয়ও নাই যে তোমাকে কিছু আর্থিক সাহায্য দিয়েও সাহায্য করতে পারে? এই অবস্থাটা ভাল নয়। সব মানুষের বিপদের সময় কেউ না কেউ এগিয়ে আসার জন্য কিছু ফ্রেন্ড, কলিগ, আত্মীয়সজন তৈরি করে রাখতে হয় যারা বিপদের সময় কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে। আমার কাছে মনে হচ্ছে তোমার এই সার্কেলটা তুমি তৈরি করতে পারন নাই। যাই হোক।  

ভাল থেক। চিঠিটা লম্বা করলাম না। দরকার হলে পরে আবার লিখব। রিভার সাইডের লসের ব্যাপারটা নিয়ে আমরা অনেক চিন্তিত এবং এটা নিয়ে আমরা অনেক অসুবিধায় আছি সন্দেহ নাই। তারপরেও আল্লাহ আছেন। ধন্যবাদ। নিচে একটা সামারি করে দিলাম হিসাব নিকাশের। তুমি তোমার অবসর সময়ে দেখে নিও। আমি জানি তুমি বিচার কাজ কর এবং নিরপেক্ষ কাজ কর। নিজের বিরুদ্ধে কোন ইনফরমেশন গেলেও যে তা মেনে নেয় তাকে বলা হয় নিরপেক্ষতা। এটা তোমাকে আমার শিখানোর দরকার মনে করি না। তুমি আমার থেকেও বুদ্ধিমান, সেটা তুমি নিজেই বলেছ। এবং আমারও তাই ধারনা যে, তুমি আমার থেকে বেশি বুদ্ধিমান।

আখতার 

মা ইন্ডাস্ট্রিজে প্রতিদিনের কালেকশন আকারে টাকা জমা হয়েছে মোট (Collection) 48231540
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে মান্নান পেটি ক্যাশ আকারে নিয়েছে (Loan to Mannan) 10004618
মান্নান মা ইন্ডাস্ট্রিজকে ফেরত দিয়েছে (Loan Refunded by Mannan) 5328531
মান্নানের কাছে মা ইন্ডাস্ট্রিজ পাবে 4676087
মেজর আখতার কর্তৃক মান্নানকে রিভার সাইড/ব্যাংক থেকে জমি এবং ব্যক্তিগত খরচের জন্য প্রদান করা হয় 2039919
হাবিব ভাইয়ের ২৪৪ এবং ৫৮ শতাংশ, তানির ২৬ শতাংশ, শওকতের ১ বিঘা জমির মোট মুল্য সমন্নয় পূর্বক মান্নান অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে 438900
১৭/১/২০০৮ থেকে ১৮/১২/২০১২ পর্যন্ত (৬/২/২০০৯ ৯/৬/২০১২ তারিখের হিসাব ছাড়া) মান্নানকে মেজর আখতার বিভিন্ন সময়ে অমলদের জমি, ইদ্রিসের জমি, বেলা বুয়ার জমি, এবং অন্যান্য বাবদ ক্যাশ প্রদান করেন  4241500
নভেম্বর ২০১৫ জেলে যাওয়ার সময় থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত (মাহিমার বিয়ে, মান্নানের স্ত্রীদের জমি রেজিস্ট্রেসন সহ) ইত্যাদি বাবদমেজর আখতার মান্নানের জন্য খরচ করেন 2024000
নোট-১ এখানে উল্লেখ থাকে যে, ফ্যাক্টরির সর্বশেষ বিদ্যুৎ বিল মোট ১৫ লক্ষ টাকা (বিদ্যুৎ লাইন কাটার পর চেকের মাধ্যমে ১১ লক্ষ টাকা এবং জানুয়ারি ২০১৩ মাসের বিদ্যুৎ বিল ৪৪১০০০ টাকা), ফ্যাক্টরির বকেয়া বেতন ২ লক্ষ টাকা, আবু বকরের দানার বকেয়া বাবদ ৩ লক্ষ টাকা (যা এখনো প্রি মাসে দিচ্ছি), ফ্যাক্টরিতে রক্ষিত সর্বশেষ ফিনিসড মালের দাম সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), মার্কেটে বাকি ৫ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), ক্রাশ মাল এর দাম ২ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), কাইউমের লোহা লক্কর বিক্রির প্রায় ১ লক্ষ টাকা,  আল্লার দান দোকানে বাকি ৩০ হাজার টাকা, ফজল সাহেবের বাকি প্রায় ৪৫ হাজার টাকা, সর্ব সাকুল্যে সোয়া ৩৬ লক্ষ টাকা হয়। 3625000
বর্তমানে মেজর আখতার মান্নানের কাছে পাবে 17045406
নোট-২: মান্নান যদি বর্তমানে আমিরদের জমি ২০৪ শতাংশ, বেলা বুয়ার জমি ২৯ শতাংশ, মান্নানের নিজস্ব জমি ৫৪ শতাংশ, এবং ইদ্রিসদের জমি ৬৬ শতাংশ যা মেজরের নামে কেনা হয়েছে, অমলদের ৪০০ শতাংশ মোট প্রায় ৭০০ শতাংশ জমির মুল্য বাবদ হিসাব করে উক্ত পাওনা সমন্নয় করেও তাতে প্রতি বিঘার জমির মুল্য দাড়ায় 803569.14
এখানে উল্লেখ থাকে যে, এক্সেল শিটে কখন কোন জমির জন্য কত টাকা দেওয়া হয়েছে তা বিশদ ভাবে বিবরন দেওয়া আছে।
অন্যান্য হিসাব
মেসার্স রাবেতা থেকে ২৯ কিস্তিতে মান্নান মোট অগ্রিম এবং মালের সমন্নয় পূর্বক টাকা নিয়েছে (রাবেতার কাছ থেকে অগ্রিম ১০ লক্ষ টাকা নেওয়ার কোন হিসাব মা ইন্ডাস্ট্রিজের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ নাই) 305900
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে ৭ কিস্তিতে মান্নান নতুন পিকআপ এর ইন্সটলমেন্ট দিয়েছে 360000
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে মাহিদার জন্য ক্যাম্ব্রিয়ান কলেজের জন্য খরচ করা হয়েছে 347000
দুলালের বিদেশ যাওয়ার জন্য মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে 463000
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে আলি ভাইকে টাকা দেওয়া হয়েছে 60000
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে কন্সট্রাকসন কাজের জন্য ফজল ভাইকে টাকা দেওয়া হয়েছে 76100

২৯/১২/২০১৫-মালয়েশিয়া ভ্রমন

খুব হাপিয়ে উঠেছিল আমার পরিবারের সদস্যরা। কোথাও বেড়াতে চাচ্ছিল সবাই এক সঙ্গে। বিশেষ করে আমার বড় মেয়ে ডাক্তারি বই পড়তে পড়তে তার আর ভাল লাগছিল না। সব বই, প্র্যাক্টিকেল ক্লাস, আর পরীক্ষা টরিক্ষা এক পাশে ঠেলে রেখে একদম নিরিবিলি কোথাও বেরিয়ে আসার জন্য প্ল্যান করতে চাইলে আমার বউ বলল ” চল মালয়েশিয়ায় যাই, ওখানে আমি যেহেতু অনেকদিন ছিলাম, অনেক জায়গা আমার চেনা, গেলে খারাপ লাগবে না”। কোন দেশে যাব, এটাতে আমার কোন বাড়তি চয়েস ছিল না, কোথাও যাওয়াটাই ছিল আমার কাছে মুখ্য ব্যাপার। আমার অনেকগুলু সমস্যা হাতে ছিল যদিও, (আমার বড় ভাই অনেক বছর পর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসবেন ২৬ ডিসেম্বর, আমার ভাইয়ের বউ বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আছেন এবং ২৩ ডিসেম্বর তারিখে আবার চলেও যাবেন, আমি মালয়েশিয়া গেলে ২৩ তারিখে, সেক্ষেত্রে আমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না তার যাওয়ার দিন, আমার মেয়ের দুইটা কার্ড পরীক্ষা মিস হবে, আমার ফ্যাক্টরির উদ্দেশ্যে বায়ার আসবে আমার অবর্তমানে ইত্যাদি ইত্যাদি)। তারপরেও আমি ব্যাপারটা এড়িয়ে প্ল্যানটা জারি রেখেছিলাম কারন, সর্বদা সমস্যা থাকবে আর এই সমস্যা নিয়েই আমাকে কোন না কোন দিন সময় যোগাড় করতেই হবে, আমি অনেক ভেবেচিন্তে ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সে টিকেট কনফার্ম করে ফেললাম।

আমার ছোট মেয়ে কখনো প্ল্যানে উঠেনি, তার যেমন একটা প্ল্যানে উঠার কৌতূহল ছিল আবার কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন মিসিং হওয়ার কারনে সে একটা ভীষণ ভয়ের মধ্যেও ছিল। কি হয় কি হয় না, সে ভীষণ ভয়ের মধ্যে প্লেনে উঠেছিল। তার চিত্তের ভিতরে কতটা ভয় কাজ করছিল সেটা আমি বুঝতে পারলাম যখন আমরা সবাই প্লেনে উঠলাম। আমার ছোট মেয়ে কোন এক অজানা ভয়ে একদম চুপসে যাচ্ছিল, তার বিদেশ যাওয়ার খায়েশ যেন আর থাকছিল না। সে বারবার তার মাকে শক্ত করে ধরেছিল, আমাকেও তার পাশে বসিয়ে আমার কোট আর হাত এমন করে ধরেছিল যেন সে কোন এক উচু পাহারের একদম ধারে গিয়ে দারিয়ে কোন মানুষ যা করে সে তাই করছিল। আমার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা কোন লজিক তার ভয়ের উপশমের লাঘবের উপাথ্য হয়ে কাজ করছিল না। তার চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পরছিল আর মুখটা এতটাই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল যে, আমার বড় মায়া হল। ১৩ বছরের একটা ছোট মেয়েকে আমি কি বললে যে তার চিত্ত ঠাণ্ডা হবে বা ভয় কেটে যাবে তার কোন কিছুই আমার জানা ছিল না। এই ব্যাপারটা যাওয়ার সময়ই শুধু হয়নি, বরং ব্যাপারটা আরও কঠিনরুপ ধারন করল যখন এয়ার এশিয়ার একটি প্লেন ২৫ তারিখে ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে হারিয়ে গেল। আমি আমার পরিবারের সময় বাঁচানোর জন্য যেখানে বাসে বা ট্রেনে গেলেও চলে, তার পরিবর্তে আমি সেখানে প্লেনের টিকেট আগেই করে ফেলেছিলাম। যেমন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউই, লঙ্কাউই থেকে পেনাং, আবার পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর, এই পুরু ভ্রমণগুলোতে আমি বাস বা রিভার ক্রুজ বা ট্রেন বাদ দিয়ে সব স্থান থেকে এয়ারে টিকেট করেছিলাম। এরমধ্যে আবার একটা পরেছে এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট। তো বুঝতে আমার অসুবিধা হল না নেক্সট ভ্রমনগুল আমার ছোট মেয়ের জন্য আনন্দের না হয়ে মোটামুটি কষ্টের সময় পার হবে। ভয় এমন একটা জিনিস যাকে একবার ধরে বসে, সে বুঝতে পারে তার ভিতরে কি হয়। এটা বাইরের কেউ তার পরিধি আঁচ করবার উপায় থাকে না। যাক, তারপরেও আমি সিডিউলগুল প্লেনেই ঠিক রাখার চেস্টা করেছিলাম একমাত্র পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর ছাড়া। শেষ অবধি পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর পর্যন্ত প্লেন বাদ দিয়ে বাসে আসতে হয়েছিল। সেটাও আরেক অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার যাওয়ার প্রথম দিনের ঘটনাটা বলি।

সকাল ১১ টায় ফ্লাইট। সম্ভবত আমরাই সবার শেষে ফ্লাইটে উঠলাম। কুয়ালালামপুর পৌঁছলাম লোকাল টাইমে প্রায় তিনটার দিকে। কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে লোক ছিল। ফলে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। কোন অসুবিধা হয় নাই। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় আমাদের সবার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল একটা কারনে।  আমাদের ঠিক সামনে একজন বাঙালি ছিল যে কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়ায় এসে ইমিগ্রেসন থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারনে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে জানে না কেন তাকে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেসন থেকে মালয়েশিয়ায় ঢোকতে না দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত  পাঠিয়েছিল। ফলে সে ১৫ দিনের তফাতেই আবারো একটা এটেম্পট নিয়েছিল মালয়েশিয়ায় ঢোকার জন্য। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম এবারো তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। নেহায়েত গরিব মানুষ, গ্রাম থেকে বোধহয় মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে। আমি ইমিগ্রেসন অফিসারে সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম এই জন্যে যে কি কারনে তাকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে তা সঠিক তথ্যটা জানার জন্য। ইমিগ্রেসন অফিসার আমাকে জানালেন যে, কিছু সমস্যা আছে, সিকিউরিটির ব্যাপার। আগেরবার তাকে ওই কারনেই ফেরত পাঠানো হয়েছিল, এবারো তাই। লোকটা ভালভাবে তার অবস্থাটা ব্যাখ্যা করতে পারছিল না ভাষার কারনে। বুঝাই যাচ্ছিল যে সে বড় অসহায়। আমাকে দেখে যেন তার আত্মায় পানি এল। বলল, স্যার, আমাকে একটু সাহায্য করেন। অরা কি বলে আমি ঠিক বুঝতে পারি না আর কি বলতে কি উত্তর দিচ্ছি তাও ভাল মত বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমার এই সাহায্যটা ওনার কাজে লাগলো না ইমিগ্রেসন অফিসারের কারনে। অফিসার আমাকে শুধু প্রশ্ন করল, ওই ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গের কিনা। আমি সত্যি কথাই বললাম যে, সে আমাদের সঙ্গের কেউ না। ফলে ইমিগ্রেসন অফিসার আমাকে রিকুয়েস্ট করলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু না বলার জন্য। আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম, তাকে পুনরায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে কিনা এবং কেন। সে আমাকে জানাল যে, তাকে ফেরত পাঠানো ছাড়া কোন বিকল্প নাই। তার সিকিউরিটির সমস্যা আছে। আমরা চলে এলাম কিন্তু আমাদের সবার মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে, নেহায়েত একটা গ্রামের গরিব মানুষ কি কারনে মালয়েশিয়ার কোন নিরাপত্তার হুমকি হয়ে গেল সে নিজেও জানে না অথচ সে হয়ত তার সব কিছু বিক্রি করে তার স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় এসেছে কিন্তু ওই স্বপ্নের দেশে সে ঢোকতে পারছে না। দেশে গিয়ে এখন সে কি করবে বা কি করবে না এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমার মেয়েরা আমাকে করেছিল কিন্তু সে উত্তরগুলু আমার জানা ছিল না। লেখাপড়া করাটা যে কত জরুরি, অন্তত নিজের কথাগুলু অন্যকে বুঝানো এবং অন্যের কথাগুলো সঠিকভাবে বুঝা যে কত জরুরি সেটা তখনই সম্ভব যখন কেউ অন্তত ওই টুকুন লেখাপড়া করা দরকার। হয়ত ইমিগ্রেসন অফিসার এমন কোন প্রশ্ন তাকে করেছিল যার প্রশ্ন সে না বুঝেই হ্যা বলেছে আর সে হ্যা উত্তরটাই তার কাল হয়ে দারিয়েছে। বড় দুঃখের ব্যাপার। আমাদের কিছুই করার ছিল না।

এয়ারপোর্ট থেকে আমরা বেরিয়ে গেলাম। বড্ড সুন্দর একটা দেশ। খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, অনেক ফ্লাই ওভার, অনেক রাস্তাঘাট, সুন্দর সুন্দর দালান কোঠা। অনেক দূর থেকে টুইন টাওয়ার চোখে পরে। যে কোন উন্নত দেশের সঙ্গে মালয়েশিয়াকে এখন তুলনা করা চলে। কোন রিক্সা নাই, বাসও চলে না দিনের বেলায়। চারিদিকে ট্যাক্সি আর প্রাইভেট কারের সমারোহ। কোন হর্ন বাজে না। জ্যাম থাকলেও সেটা সাময়িক। বড় ডিসিপ্লিনড দেশ। রাস্তার পাশের বনজঙ্গল গুলুও বেশ গুছানো। নাপিতের ক্ষুরে যেমন মানুসের অতিরিক্ত চুল ছেটে সুন্দর করে রাখা হয়, মালয়েশিয়ার রাস্তার পাশের ঘাসগুলুও যেন সেভাবে সাজানো। অনেক ক্লিনার কাজ করছে, যার যার কাজ সে সে করছে। তাদের উপর কোন তদারকি করছে না কেউ। খুব গুছানো একটা শহর। প্রায় ৩০ মিনিট গাড়িতে থাকার পর হোটেলে এলাম। খুব বেশি খরচ না। থ্রি স্টার স্ট্যান্ডার্ড। প্রতিটি রুম মাত্র ২০০ রিঙ্গিত এর মধ্যে বা তার থেকে একটু বেশি। আমরা দুই ফ্যামিলি তিনটা রুম নিলাম, মাঝখানে কানেক্টেড। আমার ছোট মেয়ের ভয়টা এখন আর নাই, তার চোখে মুখে হাসি আছে, আর আমার বড় মেয়ে কতক্ষণে মোবাইল সিম কিনবে, ফেসবুক ব্রাউজ করবে, তার মালয়েশিয়ার ভ্রমনের ছবি সম্বলিত ম্যাসেজ ট্যাগ করবে, সেই ভাবনায় বারবার কোথায় মবাইলের সিম পাওয়া যায় তার জন্য অস্থির করে ফেলছে। রাত নয়টায় খেতে বের হয়েছি। আমাদের সঙ্গে ড্রাইভার আছে, গাড়িও আছে। একটা পাকিস্তানি হোটেলে খেতে ঢোকলাম। প্রায় বাঙালি খাবার। আমি স্রেফ ভাত ডাল আর সবজি খেয়েই তৃপ্ত বোধ করলাম। মেয়েরা আধুনিক মানুসের ডিজিটাল ধাচের। মুরগি আর বিরিয়ানি ছাড়া তারা কিছুই পছন্দ করে না। সুতরাং তারা ঐটাই খেল আর আমি আমার মেনু।  খাওয়ার পর একটু আশে পাশের মার্কেটে ঘোরাফেরা করলাম, কিছু কেনাকাটাও করলাম। একটা জিনিস খেয়াল করলাম যে, আমার মেয়েরা যা যা জিনিসের প্রতি কেনার খেয়াল তা হচ্ছে সব গিফট, কোন বন্ধুরে কোন গিফট দেয়া যায় সেটা নিয়ে মহা জল্পনা কল্পনা। আমার মেয়ে এবং বউ সিম কিনতে ভুল করল না। অনেক পদের সিম কার্ড। অফারের ছড়াছড়ি। রাত প্রায় ১ টায় আমাদের হোটেলে পৌঁছলাম। সারাদিন ফ্লাইট আর ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে এসে বড্ড ক্লান্ত মনে হল। বিছানায় যেতেই ঘুমিয়ে পরলাম।

পরদিন ২৪ ডিসেম্বর।

সকালে নামাজ পরে নাস্তা করে বেরিয়ে গেলাম কতগুলো বিশেষ স্থান দেখার জন্য। তার মধ্যে প্রথম ছিল গেন্টিং আইল্যান্ড। গেন্টিং আইল্যান্ড সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২০০০ মিটার উঁচুতে। জায়গাটা সুন্দর। পাহারি এলাকা, তার এক জায়গায় স্ট্রবেরি চাষ হয়। বড্ড সুন্দর। হরেক রকমের স্ট্রবেরি। সবুজ, লাল, মেরুন সাদা আরও কত প্রকারের যে স্ট্র বেরির রঙ। এটাকে একটা স্ট্রবেরির মিউজিয়াম বলা চলে আর কি। ওখানে অনেক বাঙালি ছেলেরা কাজ করে। একটা জিনিস খেয়াল করার মত যে, যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই কোন না কোন বাঙালি লোক পেয়েছি, তাও আবার একজন করে নয়, অনেক বাঙালি। স্ট্রবেরির মিউজিয়ামটা দেখার জন্য আগে থেকে কোন প্ল্যান ছিল না। এটা দেখা হয়েছে গেন্টিং আইল্যান্ডে যাওয়ার কারনে। সারাদিন মেঘে ভরা থাকে জায়গাটা। অনেক দূর থেকে পাহারের কোল ঘেসে মেঘ বলে মনে হলেও কাছে গেলে ওটা কুয়াশাই হয়ে যায়। অত্যন্ত ঘন কুয়াশায় জায়গাটা সারাক্ষন ভিজাই থাকে। খুব সাবধানে গারি চালাতে হয়।  এমনিতেই পাহারি এলাকা, আর তার উপর আবার ভিজা রাস্তা ঘাট। সবার হাতে ছাতি। শুধু আমাদের হাতে কারো কোন ছাতি নাই।

স্ট্রবেরি দেখে পাশেই স্কাই রেল। দারুন জিনিস। শুন্যে ভেসে ভেসে প্রায় কয়েক কিলোমিটার রাস্তা ক্যাবল কার দিয়ে পাহারের উপর দিয়ে উরে যাওয়ার মত। এটাকে ওদের ভাষায় বলে গেন্টিং স্কাই ড্রাইভ। এটাকে আবার “গন্ডলা লিফট”ও বলে। প্রায় ৪ কিলোমিটার লম্বা পথ। এই জায়গাটার নাম করন করা হয় কোন এক প্রাইভেট কম্পানির নামে। ঐ কম্পানির নাম ছিল “গেন্টিং হাই ল্যান্ডস বারহ্যাড” ১৯৬৫ সালে। উক্ত কোম্পানিকে তখন মোট ১৪০০০ হাজার একর জমি ১০০ বছরের জন্য লিজ দিয়েছিল। বেশ মজার একটা ব্যাপার। যাদের হার্টের সমস্যা আছে, বা হাইট ফুবিয়া আছে তাদের না যাওয়াই ভাল, তবে যারা একটু থ্রিল পছন্দ করে, তারা স্কাই ক্যাবলটা আনন্দ পাবে। এই ক্যাবল কারটাকে বর্তমানে “World’s Fastest Mono Cable Car System” নামেও পরিচিত with a maximum speed of 21.6 kilometres per hour (13.4 mph) and the “Longest Cable Car in Malaysia and Southeast Asia maybe”. এখানে 20th Century Fox World কোম্পানির বর্তমানে লোকেশনের কাজ চলছে যা ২০১৬ তে শেষ হবে। তখন দেখা যাবে আরেক চমক। চারিদিকে ঘন জঙ্গল, অনেক উঁচুতে এক একটা ক্যাবল কারে সর্ব মোট চারজন করে করে পাহারের উপর দিয়ে ভেসে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে চলে যাওয়ার যে একটা মজার অনুভুতি, মন্দ না। আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে আবারো একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যাওয়ার সময় সে কিছুতেই চোখ খুলছিল না, কিন্তু আসার সময় মনে হল, একটু সাহস সঞ্চয় করে চোখ খুলে কিছুটা হলেও পাহাড়ের দৃশ্যটা দেখেছে আর কি।  কিন্তু কেউ একটু নড়লেই তার চিৎকার শোনা যায়। “এই বাবা, তুমি নরাচরা করছ কেন? কিংবা ঐ আপি তুমি ছবি তোলার জন্য নরাচরা করছ কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি”। অসংখ্য ছবি আর ছবি তুলেছে আমার বড় মেয়ে, সঙ্গে তাদের মা। ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরাফেরার মধ্যে একটা মজা আলাদা। আমি অনেকবার বিদেশ গিয়েছি কিন্তু তা নিতান্তই ব্যবসার কাজে অথবা চাকুরির কাজে। এবারই প্রথম আমার সপরিবারে সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়া। মেয়েদের উচ্ছ্বাস দেখে আমার বেশ ভাল লাগছিল। অনেকবার সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার প্লান করলেও কারো না কারো স্কুল বা কলেজের বা পরিক্ষার কারনে আমাদের যাওয়া হয় নাই।  

ঐ ক্যাবলকার দেখে আমরা সবাই আবার চলে গেলাম পুত্রজায়া দেখার জন্য।  পুত্রজায়া জায়গাটা দেখার মত একটা জায়গা। পুত্র জায়ার প্রধান কনসেপ্টটা হচ্ছে যে, “City in the garden and Intellegent City” পুত্র জায়ায় এখন সরকারি সব অফিস আদালত ট্র্যান্সফার করা হয়েছে (একমাত্র Ministry of International Trade and Industry, Ministry of Defence and Ministry of Works ছাড়া)। কুয়ালালামপুরে জ্যামের কারনে পুরু প্রশাসনিক অফিসগুলো সব এখন এখানে অবস্থিত। ডঃ মহাতিরের মাথায় প্রথম এই কনসেপ্টটা আসে যে, কুয়ালালামপুর থেকে সর ধরনের অফিস এই পুত্রজায়ায় স্থানান্তর করা হয়। মালয়েশিয়ান ভাষায় পুত্র মানে “প্রিন্স” আর জায়া মানে “সাকসেস”। অর্থাৎ প্রিন্সের সাকসেস বা ভিক্টরিই হচ্ছে পুত্রজায়ার অর্থ। ইন্টেলিজেন্স সিটি বলতে বুঝায় যে, এটা একটা ডিজিটাল সিটি। এখানে বলা বাহুল্য যে, ডিজিটাল সিটি বা স্মার্ট সিটিগুলোর মধ্যে Chicago, Boston, Barcelona and Stockholm রয়েছে। As of 2010 Census the population of Putrajaya is 97.4% Muslim, 1.0% Hindu, 0.9% Christian, 0.4% Buddhist, and 0.3% other or non-religious

পুত্র জায়ায় নিম্ন বর্ণিত অফিসগুলো রয়েছেঃ

পারদানা পুত্র অর্থাৎ office of the Prime Minister

সেরি পারদানা বা official residence of the Prime Minister

শ্রী সাত্রিয়া বা official residence of the Deputy Prime Minister

প্যালেস অফ জাস্টিস

পুত্র জায়া মিনিস্ট্রি অফ ফাইন্যান্স

অইস্মা পুত্র বা Malaysian Ministry of Foreign Affairs.

ম্যালাওাতি জাতীয় প্যালেস

Putrajaya Convention Centre

Perdana Leadership Foundation

Heritage Square

Selera Putra

Souq Putrajaya

Pusat Kejiranan Presint 9

Pusat Kejiranan Presint 16

Putra Mosque

Tuanku Mizan Zainal Abidin Mosque (Iron Mosque (Masjid Besi))

এখানে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক কনভেনশনাল সেন্টার অবস্থিত। লোকেশনটা সত্যি দেখার মত। যেমন সুন্দর তেমনি মনোরম। এখানে অনেক রাজকীয় জায়গা আছে, আছে চমৎকার একটা মসজিদ, আছে লেক, আছে বিশাল বিশাল বিল্ডিং, আর আছে অনেক বিদেশি পর্যটক। প্রতিটি লাইট পোস্ট, প্রতিটি গাছপালা, প্রতিটি বিল্ডিং ডিজাইন, এমন কি প্রতিটি টাইলস প্ল্যান করে সাজানো। যে বা যারাই এর পিছনে কাজ করুক না কেন, তাদের জবাবদিহিতা ছিল এর সৌন্দর্য এবং সমাপ্তির লক্ষে। কোন একটা জায়গা খামাখা ব্যবহার করা হয় নাই, কোন না কোন লক্ষ্য নিয়ে এর নির্মাণ কাজ হয়েছে, আবার যে জায়গাগুলো ব্যবহার করা হয় নাই, সেগুলোও অত্যান্ত প্লান মাফিক খালি রাখা হয়েছে। যত্রতত্র কোন কিছুই করা হয় নাই। স্পেসের সুষম বন্টন, আর রিসোর্সের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার চোখে পরার মত। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে, আমাদের দেশের অনেক নামি দামি মন্ত্রি, মিনিস্টার, অনেক হাই অফিসিয়ায়ালগন কত বার না এদেশ ভ্রমন করেছে কিন্তু ওদের কি ইচ্ছে করে না আমাদের দেশটাকে এইভাবে সাজানোর? খুব অবাক হয়েছি আমাদের দেশের নেতাদের ইচ্ছা শক্তি আর রুচির অভাব দেখে।

পুত্রজায়ায় নামাজ পরে কিছু খাবার খেয়ে আবারো আমরা কুয়ালালামপুরে হোটেলে চলে এলাম। রাতে খাবার খেয়ে কিছু শপিং করে রাতে আবারো কিছুক্ষনের জন্য বিশ্রাম। পরদিন যেতে হবে লঙ্কাউই আইল্যান্ডে। লংকাউই আইল্যান্ডে যাওয়ার আগে আমরা টুইন টাওয়ার দেখে যাবার প্ল্যান, তাই সকাল সকাল খেয়ে দেয়ে ব্যাগ পাট্টা গুছিয়ে প্লেনের টিকিট পকেটে করে টুইন টাওয়ারের চলে গেলাম। কোন টিকিট নাই আগামি ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে টুইন টাওয়ারে উঠতে পারলাম না, বাইরে থেকেই দেখে আর ছবি টবি তুলে বেরিয়ে গেলাম লংকাউই এর উদ্দেশে এয়ারপোর্ট। যাবার আগে ৩০ ডিসেম্বর তারিখের টিকিটটা কিনে নিয়ে গেলাম যেন লঙ্গাকাউই থেকে ফিরে টুইন টাওয়ারের ভিতর ঢুকতে পারি। এখানে একটা জিনিস বলতে ভুলে গেছি যে, এর আগের দিন পুত্রজায়ায় যাওয়ার আগে আমরা বার্ডস মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। এটা একটা চিরিয়াখানার মত।  কিন্তু শুধু পাখিদের। এই জু তে ছোট বুলবুলি পাখি থেকে শুরু করে প্যাচা, ইগল, বক কাক, আরও অনেক নাম না জানা পাখির সমারোহ। পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য বটে। ওরা সুখেই আছে, খাওয়া দাওয়ার চিন্তা নাই, সময়মত খাবার পাচ্ছে, উড়ে বেড়ানোর যথেষ্ট জায়গাও আছে, আর সবচেয়ে যেটা আছে তা হচ্ছে এরা নিরাপদ। হেটে হেটে দেখতে হয়, পা ব্যাথা হয়ে যাচ্ছিল আমার। টুইন টাওয়ার সম্পর্কে কিছু বলি।

টুইন টাওয়ারকে বেসিক্যালি পেট্রনাস টাওয়ার বা পেট্রনাস টুইন টাওয়ার বলা হয়। মালয়েসিয়ান ভাষায় একে বলা হয় মিনারা পেট্রনাস। এটা ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার হওয়ার আগ পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বচ্চ টাওয়ার ছিল। সাত বছর লেগেছিল এটা তৈরি করতে। পুরুটাই রেইনফরসড কনক্রিটে করা। পরে এর বাহিরের দিকে ষ্টীল এবং গ্লাস দিয়ে মোড়া হয়। প্রায় ৬ লক্ষ স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়ে এই টুইন টাওয়ার। ৪১ এবং ৪২তম টাওয়ার দ্বারা দুইটা মিনার এক সঙ্গে যুক্ত। আর এইটাও বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কানেক্টেড ব্রিজ কোন টুইন বিল্ডিং এর মধ্যে। প্রতিদিন ১০০০ জন লোককে এই টুইন টাওয়ার দেখার জন্য টিকেট বিক্রি করা হয়। দর্শকগন এই ৪১/৪২ এবং ৮৬ তলায় শুধু যেতে পারে, আর অন্য গুলোতে যাওয়ার অনুমতি নাই। এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, টুইন টাওয়ারটা কি কারনে করা হয়েছিল। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আম্পাং (যেখানে বর্তমানে টুইন টাওয়ারটা অবস্থিত) থেকে সেলানগর টার্ফ ক্লাব (এখন যেটা কেএল সিটি নামে পরিচিত) পর্যন্ত এতটাই ট্রাফিক জ্যাম হত যে, ঘন্টার পর ঘন্টা কোন গাড়ীঘোরা চলতে পারত না। এই অচলবস্থা নিরসন কল্পে মালয়েশিয়ার ৪র্থ প্রেসিডেন্ট ডঃ মহাতির এই প্রজেক্ট হাতে নেন। সেলানগর টার্ফ ক্লাবটা ছিল একটা রেসিং ক্লাব যা ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল এমেচার রেসিং হিসাবে চালু করেন। এক পর্যায়ে এই রেসিং ক্লাব থেকে মালয়েশিয়া হাজার হাজার মিলিওন ডলার আয় করতে শুরু করে বেদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে। পর্যায়ক্রমে এই সিলানগর টার্ফ ক্লাব হয়ে উঠে রেসিং কাম স্পোর্টস সেন্টার। এমনকি এটা পরবর্তীতে কমনওয়েলথ স্পোর্টস ক্লাব হিসাবে রানি এলিজাবেথ-২ এর সময় চালু হয়। কিন্তু শুধুমাত্র জ্যামের কারনে অনেক অসুবিধা হচ্ছিল এর আয়ের উৎসে। ১৯৯৪ সালে এটা (সেলানগর টার্ফ ক্লাবকে) অফিসিয়াল স্পোর্টস ক্লাব হিসাবে মর্যাদা দেয়া হয় যা এখন বিদ্যমান।  

The entire master plan for KLCC project development around freehold prime property (KLCC: 40.5 hectares – Petronas Twin Towers & Retail: 5.8 hectares with 18,000 m2 each tower – 994,000 m2 total Petronas complex) was focused into seven main sections. i.e. Office Buildings, Hotels, Retails, Convention Centre, Residential, Recreational facilities and Infrastructure. The conceptual redevelopment project was to covert site of the former Selangor Turf Club, a 100-acre horse race track located in the center of Kuala Lumpur’s “Golden Triangle, into an integrated, self-contained modern city as well as creating a new landscape for the capital city of Malaysia

The reallocation of the Turf Club was also occurred back in 1992/3.

Today, Petronas has evolved into a turnover of $25.7 billion with a pretax profit of $9.9 billion for the financial year ended on March 31, 2004 – and it was one of the respectful top Fortune 500 company. Four of its subsidiaries are listed on the Malaysian Stock Exchange (renamed as Bursa Saham Malaysia in 2005).

এই গেল টুইন টাওয়ারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

এখানে একটা জিনিস আমার চোখে পড়ল ভীষণভাবে। সব গুল এক্সিট শেষ হয় গিফট দোকান ঘুরে ঘুরে। কেউ কিনুক আর নাই বা কিনুক, তাকে ঐ সব দোকান দিয়েই বের হতে হবে। এটা একটা বিজনেস চালাকি। ছোট ছোট বাচ্চারা সঙ্গে থাকে, সুতরাং কিছু না কিছু কেনা কাটা তো হয়ই।  আর এই সব জায়গায় দাম একটু চরা থাকে।   

যেটা বলছিলাম। আমরা টুইন টাওয়ার বাইরে থেকে দেখে লংকাউই দেখার উদ্দেশ্যে এয়ারপোর্ট চলে এলাম। এটাও একটা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। বড় সুন্দর। আমার ছোট মেয়ের আবার দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। কারন তাকে আবার প্লেনে চরতে হবে। তবে এবার বেশিক্ষন সময়ের জন্য নয়। মাত্র ৪০/৪৫ মিনিট সময়। দেখতে দেখতেই পার হয়ে গেল। আমরা লঙ্গাউইতে পৌঁছলাম যখন তখন রাত ১০টারও বেশি। এখানে যে কোন লোক যারা গাড়ী চালাতে পারে তারা যে কোন দিনের জন্য গাড়ী ভারা নিতে পারে এবং সেলফ-ড্রাইভিং করতে পারে। সস্তাও বেশ। আমরা দুই দিনের জন্য একটা প্রাইভেট গাড়ী ভারা নিয়ে নিলাম। বেশ ভাল। লংকাউই এর একটা সুন্দর নামকরনের ব্যাখ্যা আছে। কেউ কেউ বলে যে, লঙ্কা অর্থ হচ্ছে “সুন্দর” আর “উই” এর অর্থ হচ্ছে “অফুরন্ত”। এর মানে এই যে, লংকাউই মানে “অফুরন্ত সুন্দরের অধিকারি”। আবার কেউ কেউ বলে যে, এটা প্রাচিন থাইল্যান্ডের কেদাহ সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস ছিল যারা লাঙ্কাসু প্রভিন্সের বাসিন্দা। এই লংকাসু হচ্ছে প্রাচিন থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার আন্তসংযোগ স্থল। বর্তমানে এটা মালয়েশিয়ার অংশ। আবার অনেকে বলে যে, “লাংক” মানে ইগল এবং “উই” মানে মার্বেল। এর মানে হচ্ছে এই লংকাউই তে প্রুচুর পরিমানে ইগল এবং মার্বেল পাওয়া যায়। এখানে লোকমুখে আরও একটা মিথ চালু আছে। আর সেটা হচ্ছে About 200 years ago, according to the folklore, a young woman, name Mahsuri, was accused of adultery and was executed by the people in spite of her earnest innocence. Just before her death, Mahsuri laid a curse on the island that it will remain barren for seven generations.

এই এলাকায় থাই ভাষা মোটামুটি সবাই বলতে পারে। আসলে কোণটা যে কি তা আমার জানার দরকার নাই, আমি আসলে জায়গাটার সুন্দরের কারনে বিমোহিত।

লংকাউই তে আমরা এবি হোটেল নামে একটা হোটেলে উঠলাম। আগে থেকেই বুক করা ছিল। গিয়ে দেখলাম, আমাদের রুমটা একদম বীচের সঙ্গে লাগানো। খুব ভাল লাগলো। প্রায় অর্ধরাত অবধি আমরা ঐ প্রাইভেট কারে করে প্রায় আশেপাশের এলাকাটা ঘুরলাম। কিন্তু আমাদের জানা ছিল না যে, রাত ১১ তার পর সব খাবার হোটেল বন্ধ হয়ে যায়।  “টমেটো” নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, সারারাত খোলা থাকে, প্রায় রাত ১২ টার পরে গিয়ে মোটামুটি আমাদের পছন্দের খাবারগুল খেতে পারলাম। এই টমেটো হোটেলে বাংলাদেশের অনেক লোক কাজ করে, দাম ও প্রায় রিজন্যাবল। প্রথমে মনে হয়েছিল শহরতা মনে হয় ছোট্ট একটা দ্বীপের মত, যেমন আমাদের সেন্ট মারটিন দ্বীপ। ভুলটা ভাঙল তার পরেরদিন।

সকাল থেকে আমরা সারাদিন (অর্থাৎ বিকাল ৩ টা পর্যন্ত) বীচে অনেক আইটেম করলাম, প্যারাসুট দিয়ে এক পাহার থেকে আরেক পাহাড়ে গেলাম, স্পিড বোটে করে রিভার ক্রুজ করলাম, সাতার কাটলাম, সবাই মিলে সত্য দারুন কাটল বীচের সময়টা। বেশ এক্সপেন্সিভ সব আইটেম। বীচের বালুগুলো এত মসৃণ যে মনে হয় সারাক্ষন হাতে নিয়ে পাউডারের মত পিসাপিসি করি। বালুর রঙ খুব সুন্দর।

এখানে একটা মজার কান্ড ঘটলো। আমরা সবাই ব্যানানা বোটে উঠেছিলাম এক সঙ্গে। এটা বেসিক্যালি একটা স্পিড বোট দিয়ে অনেক স্পিডে টেনে আরেকটা ব্যানানা সাইজের ভেলাকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনে। কলার শেপে বানান একটা বোট, প্রায় ৬ জন একসঙ্গে বসতে পারে। আমরা খুব ভাল করে ব্যানানা ট্যুরটা শেষ করেছি মাত্র, পাড়ে এসে নেমে পড়ব পড়ব ভাব। কিন্তু ঠিক শেষ পয়েন্টে এসে হটাত করে সামনের স্পিড বোটটা এমন করে বেঁকিয়ে টান দিল যেন ব্যানানা বোটে যারা থাকে সবাই এক ঝটকায় পানিতে পরে যায়। আমরাও পরে গেলাম। আমার ছোট মেয়ে সাতার জানে না, বড় মেয়ে কিছুটা জানে। কিন্তু সবার লাইফ জ্যাকেট পরা ছিল। এটা আমাদের জানা ছিল না যে ওরা এই এমন একটা কাজ করবে। ওরা অবশ্য এমন একটা জায়গায় এই কাজটা করে যেখানে সাতারের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু হটাত করে ঝটকা দিয়ে ফেলে দেয়ায় সবাই একটা আতঙ্কে পরে যায়। ব্যাপারটা আমিও জানতাম না। আমাদের বেলায় এই কাজতা হওয়াতে আমার ছোট এবং বড় মেয়ে সঙ্গে আমার বউ এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, মনে হয়েছিল এই বুঝি সবাই ডুবে মরছি। কিন্তু ২০-৩০ সেকেন্ড পর যখন পায়ের তলায় মাটি ঠেকে তখন ব্যাপারটা একটা মজার ঘটনায় পরিনত হয়। হটাত আতংক, আবার হটাতই সস্তি।

বিকালের দিকে খেয়ে দেয়ে আমরা “আন্ডার ওয়ার্ল্ড সি” তে গেলাম। এটাও একটা মিউজিয়াম কিন্তু শুধু মাছের। কি নাই এখানে। সব পদের মাছ, গুল্ম, হাঙ্গর, আরও কত কি!! আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এগুলো সব জীবিত। খুবই সুন্দর একটা জায়গা। দেখার মত। এখানে প্রায় ৫০০০ হাজার পদের মাছের প্রজাতি আছে। ১৯৯৫ সালে এটা তৈরি করা হয়েছিল। The concept and theme of Underwater World Langkawi are geared towards Knowledge, Education and Entertainment. It is built to raise awareness on the importance of conserving our precious aquatic life forms, thus creating understanding of the deep and inseparable bond between man and nature.

প্রতিদিন এই একুরিউয়ামের মত জলাধারগুলোতে ৫ লাখ পরিমান পানি ঢালা হয় ফ্রেশ। এখানে ফটো গ্যালারী আছে, বন্য প্রাণীর গ্যালারী আছে, আর আছে মাছের প্রজাতিদের হরেক রকমের গ্যালারী। হেটে হেটে দেখতে হয়। প্রায় ১৫ মিটার চওরা হাটার পথ। খুব সুন্দর। দেখতে দেখতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল, আমরা সময় করে উঠতে পারছিলাম না সবগুলো আইটেম দেখার জন্য। তার মধ্যে আবার শুরু হয়েছে বৃষ্টি। মালয়েশিয়ায় প্রায়ই বৃষ্টি হয়। তবে আবহাওয়াটা শিতের নয়। এটা সামারের মত একটা সময়।

এই আন্ডার ওয়ার্ল্ড সি শেষ করে আমাদের প্ল্যান ছিল ইগল স্কয়ারে যাওয়ার। এই ইগল স্কয়ারটা কুয়া জেলায় অবস্থিত। লংকাউইটা কত বড় এটা ঐ ইগল স্কয়ারে না গেলে হয়ত বুঝতাম না। এটা প্রথম দিন মনে হয়েছিল আমাদের সেন্ট মারটিন দ্বীপের মত, কিন্তু ইগল আইল্যান্ডের জন্য যেতে গিয়ে বুঝলাম এটা নিতান্তই একটা বড় শহরের সমান। প্রায় ১ ঘন্টা গাড়িতে জার্নি করে ইগল স্কয়ারে পৌঁছলাম। দেখার মত একটা স্কয়ার। ওখানে অনেক বড় আকারের (প্রায় ১২ মিটার) একটা ইগলের ভাস্কর্য করা। খুবই সুন্দর। ইগলের ছবিটা দেখলে মনে হবে ঈগলটা উড়ে যাওয়ার জন্য টেক অফ করছে প্রায়। ঐ যে আগেই বলেছিলাম যে, লোক মুখে একটা মিথ চালু আছে যে, এই লঙ্কাউই একটা অভিশাপের রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত আছে কোন এক মহিলার দ্বারা। ডঃ মহাতির এই কন্সেপ্টটাকে ঢেকে দেওয়ার জন্য আর এই শহরটাকে পর্যটকসমৃদ্ধ করার  লক্ষ্যে এই ইগল ভাস্কর্য এবং অন্যান্য সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করে ফেলেন। চারিদিকে বিশাল খোলা জায়গা। আশেপাশে একটা জেটি আছে। এটা জেটি পয়েন্ট নামে পরিচিত। বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু তারপরেও বের হয়ে গেলাম স্কয়ারটা দেখার জন্য। বেশ সুন্দর। আসলে মালয়েশিয়ায় সব কিছু অত্যন্ত প্ল্যান করে সব কিছু করা হয়েছে আর এটা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। কোন কিছুর কমতি নাই। অনেক রাত হয়ে গেল ফিরতে ফিরতে। আগামিকাল আবার যেতে হবে পেনাং আইল্যান্ডে। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি আমরা বিছানায় যেতে চাইলেও পারা গেল না। কারন আবারো মার্কেটিং। অনেক রাত অবধি কেনা কাটায় ব্যাস্ত হয়ে গেল আমার পরিবার। অনেক পদের গিফট আইটেমের মার্কেটিং। ভাগ্যিস সঙ্গে ভিসা কার্ড ছিল। তা না হলে যে কি হত আল্লাহ মালুম। আমার পরিবার তো ধরেই নিয়েছে বিশ্বব্যাংক সঙ্গে আছে, মার্কেটিং এ কোন সমস্যা নাই। আমার কাছে তাই মনে হচ্ছিল আর কি। রাত ২ টা পর্যন্ত যে যেভাবে পারে তাদের পছন্দ মত মার্কেটিং করল, আর আমার পায়ের অবস্থাটা এমন মনে হচ্ছিল যে, “আর পারছি না ভাই, এবারের মত মাফ কর” অবস্থা। সঙ্গে সিগারেট ছিল বলে রক্ষা, অন্তত সিগারেট খেয়ে হলেও কিছুটা সময় কাটাতে পারছিলাম আর আমার পরিবারের পিছন পিছন ওদের মার্কেটিং দেখছিলাম।

পরের দিন সকাল, পেনাং বিমান বন্দর। খুব সুন্দর একটা বিমান বন্দর। বেশ গোছালো। গাড়ীখানা হ্যান্ডওভার করে আমরা আবারও পেনাং আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে বিমানে উঠে গেলাম। পেনাং শহরটির নামকরন আসলে হয়েছে সম্ভবত পেং লাং উ থেকে যার অর্থ হচ্ছে সুপারির আইল্যান্ড। এটা এক সময় যখন ব্রিটিশরা ইন্ডিয়ায় রাজত্ব করছিল, তখন এটা তাদের অধিনে ছিল। পরবর্তীতে এটা সরাসরি ব্রিটিশদের অধিনে চলে যায়। সেথেকে ব্রিটিশরা চলে যাবার পরও এরা সায়ত্তশাসিতই থেকে যায় যদিও এটা এখন মালয়েশিয়ার অধিনে। এই অঞ্চলটা আসলে টিন এবং রাবারের জন্য বিখ্যাত। ১ম এবং ২য় বিশ্ব যুদ্ধে এই পেনাং এর উপর অনেক বড় বড় অপারেশন হয়েছে। জাপান যখন যুদ্ধে জরিয়ে পরেছিল, তখন তারা এই পেনাং এর পোতাশ্রয়গুলো অনেক ব্যবহার করত। আর এই কারনে ব্রিটিশ বাহিনি বারবারই এই পেনাং পোতাশ্রয়ে ঘনঘন আক্রমন চালায়। জাপানিজরা এই অঞ্চল ত্যাগ করার সময় তা ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। পেনাং জেটি হল সেই বিখ্যাত পোতাশ্রয়। ব্রিটিশরা চলে যাবার পর এটা মালয়েশিয়ার অঙ্গরাজ্য হয়ে যায়। যাক ইতিহাস বলে লাভ নেই। আমার ভ্রমন এর অন্যান্য দিকগুলো বলি।

আমার ছোট মেয়ে সব জায়গায়তেই আনন্দ করছিল কিন্তু একমাত্র বিমান জার্নি ছাড়া। প্লেনে উঠতে হবে এই কথা মনে হলেই তার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।  কিন্তু তারপরেও সে চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু তার মুখ, চোখ দেখে বুঝা যায় সে প্লেন জার্নিতে মজা পাচ্ছে না। আমরা প্রায় সকাল ১১ তার দিকে পেনাং আইল্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। অদ্ভুত সুন্দর একটা শহর। চারিদিকে পাহাড়, আর সাগরের পাশ দিয়ে রাস্তাগুলো সাংঘাতিক সুন্দর একে বেকে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। খুবই এক্সপেন্সিভ একটা শহর। তারপরেও দেখার মত। এই শহরটা স্বায়ত্তশাসিত। মালয়েশিয়াতে দুইটা শহর স্বায়ত্ত শাসিত। এক পেনাং আরেকটা হচ্ছে মেলাক্কা।

এখানে দেখার মত অনেক কিছু আছে। তার মধ্যে পেনাং-হিল হচ্ছে একটা। এই পেনাং হিলে উঠতে প্রায় কিছু কিছু জায়গায় একেবারে ৯০ ডিগ্রি খাঁড়া উঠতে হয়। কোথাও কোথাও ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত বাক আছে। ১৯০৬ থেকে ১৯২৩ সাল লেগেছে এই সিস্টেমটা চালু করতে। আর তারপর ১৯২৩ সাল থেকে এই পেনাং হিলে উঠার প্রচলন রয়েছে। ট্রেনের মাধ্যমে উঠতে হয়। দেখার মত একটা ব্যাপার। প্রায় এক হাজার মিটার এর চেয়েও বেশি উচু। উঠতে মোট ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে। একটি ট্রেনে প্রায় ১০০ জন লোক উঠতে পারে। আমার খুব কৌতূহল হয়েছিল কি করে এই কাজটা তারা করল? এত খাঁড়া এবং এত উচু একটা ট্রেন কিসের বলে উঠে যাচ্ছে আসলে? পরে জানলাম যে এটা একটা সায়েন্টিফিক ফর্মুলা। যাকে বলে “ফানিকুলার ট্রেন”। ফানিকুলার ট্রেনটা আসলে কি তাহলে?

The basic idea of funicular operation is that two cars are always attached to each other by a cable, which runs through a pulley at the top of the slope. Counterbalancing of the two cars, with one going up and one going down, minimizes the energy needed to lift the car going up. Winching is normally done by an electric drive that turns the pulley. Sheave wheels guide the cable to and from the drive mechanism and the slope cars.

চুরায় উঠে আমার মনটাই ভরে গেল। ওখানে একটা মসজিদ আছে, মন্দির আছে, অনেক লোকজন ওখানে বসবাস করে। ওদের কোন এসি লাগে না, ফ্যানও লাগে না। পুরু মালয়েশিয়া দেখা যায় ঐ পেনাং হিল থেকে। পেনাং হিলটা  “এয়ার আইটাম (Air Itam) এলাকায় অবস্থিত। Air Itam মানে হল কাল পানি। কেন এটার নাম কাল পানি হল তা আমি জানার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু লোকাল লোকজন খুব একটা বলতে পারেনি।

চুরায় উঠে আমি এক ইন্ডিয়ান মালয়কে পেলাম যিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করে। দুই রিঙ্গিত দাম এক একটা কোন/কাপ আইস্ক্রিমের। বেশ স্মার্ট ছেলে। তার একটা ছেলে আছে, স্কুলে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, কিভাবে ওরা স্কুলে যায়? ওদের জন্য সরকার একটা ভাল ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই ফানিকুলার ট্রেন দিয়ে বাচ্চারা কাছের একটাই স্কুল, সেখানে যেতে পারে, এতে মাসিক একটা ভারা বলে দেওয়া আছে। আর অন্যান্য কাজের জন্য ওরা সরু একটা কংক্রিটের রাস্তা আছে, ওটা দিয়ে শুধুমাত্র গুটিকয়েক রেসিডেন্ট যারা ওখানে বসবাস করে তারাই আসা যাওয়া করতে পারে, কোন টুরিস্ট ঐ রাস্তা ব্যবহার করতে পারে না। ঐ রাস্তা তৈরির আরও একটা কারন আমি মনে করি তা হল, কোন কারনে যদি ইমারজেন্সি যাতায়ত করতে হয়, তাহলে সরকার বাহিনির রেস্কিউ পার্টি ঐ পথ ব্যবহার করতে পারবে।

পেনাং হিল থেকে বেরিয়ে গেলাম এবং হোটেলে চলে এলাম। আসতে আসতে দেখলাম আমাদের হোটেলের ঠিক সামনে অসংখ্য দোকান বসেছে যারা রাত ১ টা পর্যন্ত থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এদের অধিকাংশ ই হচ্ছে বাঙালি। অনেক কথা হল বাঙালি ভাইদের সাথে। অনেক কষ্টের কথা আবার অনেকের সাফল্যের কথা। আমরা সবাই মিলে প্রায় রাত ১ টা পর্যন্তই ওখানে বিভিন্ন প্রকারের শপিং করলাম। শপিং শেষে হোটেলে ফিরে এসে আবারো ব্যাগ গুছায়ে সবাই শুয়ে পরলাম, কারন পরদিন আবার কুয়ালালামপুর যেতে হবে। এবার আর প্লেনে নয়। আমার মেয়ে এয়ার এশিয়া হারিয়ে যাবার পর থেকে সে আর প্লেনেই উঠতে চাচ্ছিল না। অগত্যা আমরা প্লেন টিকিট বাতিল করে বাসে আসার প্ল্যান করলাম। ডাবল ডেকার বাস। বাস ছাড়ার কথা সকাল ১১৩০ মিনিটে আর সেই বাস ছাড়ল গিয়ে দুপুর ২ টায়। সবচেয়ে বিশ্রী ব্যাপার হল, যার যার মাল সে সে লোড করতে হয় এবং কোন টিকিট (লাগেজ টিকিট) দেয়া হয় না। কুয়ালালামপুর পৌঁছানোর কথা বিকাল ৫ টার মধ্যে আর সেই বাস পৌঁছল গিয়ে রাত ১০টায়। মাঝে আবার কোন খাবারের বিরতিও নাই। বাস জার্নিটা ভাল হয় নাই আসলে। বিরক্তি লাগছিল এত লম্বা একটা সময় বসে থাকতে।

ঐ দিন আর আমরা কোথাও বের হই নাই। কারন এক দিকে বৃষ্টি হচ্ছিল আবার রাতও হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং পরেরদিন ২৯ তারিখ ছিল গিয়ে আমাদের আসম শপিং এর দিন। সারাদিন আমার পরিবার এই মার্কেট, ঐ মার্কেট ঘুরে ঘুরে হরেক রকমের গিফট আইটেম কিনছে। ব্যাপারটা এমন যেন আমরা অন্য কারো জন্য মার্কেটিং করতে এসেছি। আমার ছোট মেয়ের আগে থেকেই বায়না ছিল সে একটা ট্যাবলেট কিনবে। এবং কোন কনফিগারেশনের ট্যাবলেট কিনবে তাও সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল। সারাদিন ঘুরলাম, এর পরেরদিন ছিল ৩০ ডিসেম্বর। মানে আমাদের টুইন টাওয়ার ভিজিটের দিন। ডঃ মহাতির তার ২২ বছরের শাসনামলে সে মালয়েশিয়ার জন্য যা করে গেছে, এই অকল্পনীয় কাজ আর কেউ করতে পারবে কিনা আমার জানা নাই। সম্ভবত এই টুইন টাওয়ারের জন্যই সারা বিশ্ব বারবার মালয়েসিয়াকে স্মরণ করবে। ১৯৮১ থেকে মালয়েশিয়া নতুন এক মালয়েশিয়া হিসাবে ২০০৩ পূর্ণ সুন্দররুপ পেয়েছে। ব্যাক্তি মহাতির তার পারিবারিক জিবনে কত টুকুন সার্থক টা আমার জানা নাই তবে দেশের একজন নেতা হিসাবে তাকে আজিবন স্যালুট না করে কোন মালয়েসিয়ানকে উপায় নেই। কোন একটা কাজও সে অপূর্ণ রাখে নাই। সব কিছু করে দিয়ে তারপর সে নিজ ইচ্ছায় প্রধান মন্ত্রী থেকে বিদায় নিয়েছে। সারা বিশ্ব তার এই ক্ষমতা হস্তান্তরের পালা টা দেখেছে। যে দেশে এই মহাতিররা জন্ম নেয়, সেদেশ ধন্য।

এবার এই ভদ্র লোক সম্পর্কে আমি কিছু বলি। আমার দুইজন বিশিষ্ট পছন্দের ব্যাক্তিদের মধ্যে মহাতির একজন। তিনি আসলে জন্ম গ্রহন করেছিলেন কেদাহ শহরের আলোর সেতার নামে এক গ্রামে ১৯২৫ সালে। তিনি মালয়েশিয়ার ৪র্থ প্রেসিডেন্ট। মোট ২২ বছর তিনি রাজত্ব করে সেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে বের হয়ে যান যার ক্ষমতা হস্তান্তর লাইভ টেলিকাস্ট করেছিল সমস্ত বিশ্ব ২০০৩ সালে। তার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষিক। তিনি বাস্তব জিবনে ছিলেন ডাক্তার এবং আর্মির ডাক্তার। ওনার প্রথম জিবনে তিনি যখন রাজনিতিতে প্রবেশ করেন, তখন কয়েকটা বই লিখে সাং ঘাতিক বিতর্কিত হয়ে যান এবং তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান তার সব গুলো বই ব্যান্ড করে দিয়ে রাজনিতিতে তাকে নিষিদ্ধ ঘসনা করেন। ১৯৭০ সালে মিঃ রাজ্জাক প্রধান মন্ত্রী হলে পুন্রায় তিনি মহাতির কে পার্টি তে নিয়ে নেন। এর পর সম্ভবত ১৯৮১ সালে থেকে তিনি কোন প্রতিযোগিতা ছারাই পর পর ৫ বার প্রেসিডেন্ট নিরবাচিত হয়েছিলেন যেটা একটা ইতিহাস। তার প্রথম ইলেকসনে তিনি তদানিন্তর প্রেসিডেন্ট হোসেন কে মাত্র ৫০ ভোটের ও কমে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট হন। প্রকৃত পক্ষে এই বিজয়টা কোর্ট করত্রিক ফয়সালা হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট হবার পর, তার ৯ম দিনে একটা দারুন কাজ করে ফেললেন। নতুন একটা পার্টি ফর্ম করে ফেললেন যার কোন ম্যান্ডেট পাব্লিকের কাছ থেকে ছিল না। তার নতুন পার্টি র নাম হল, ইউএনএমও (বারু)।  তার প্রথম কয়েকটা কাজের মধ্যে একটা ছিল, সব সরকারি সংস্থা গুলোকে তিনি প্রাইভেট সেক্টরে হস্তান্তর করেন এবং এতে দারুন ফলাফল আসে। ১৯৯০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ার পার ক্যাপিটা ইনকাম প্রায় ডাবল হয়ে যায়। মহাতির কে প্রধানত আমেরিকা এবং ব্রিটিশ রা একেবারেই পছন্দ করছিল না, ফলে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রকায় তার নামে অনেক নেগেটিভ মন্তব্য করার কারনে তিনি সারা দেশে এই দুইট পত্রিকা সারা জিবনের জন্য ব্যান্ড করে দেন। তার ভিসন-২০২০ এর মধ্যে প্রথম তিনটা ফরমুলার কথা বলি।

(১) মহাতির তার প্রথম ক্ষমতার সময় যত সংখ্যক লোক তিনি পেরেছিলেন, বাইরে পাঠিয়েছেন উচ্ছ শিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে এই সর্তে যে, ঐ লোকগুলো পরবর্তীতে মালয়েশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে লোকাল মালয়েসিয়ান্দেরকে পরাবেন এবং ফারদার কোন লোক আর বিদেশ পাঠানো হবে না। ফলে যদি তোমরা খেয়াল কর দেখবা, ১৯৯০ দসকে অনেক মালয়েসিন রা আমাদের দেশেও এসেছিল উচ্চ শিক্ষা নিতে যেটা এখন অনেক কম রেসিও তে আছে এখন।

(২) তার এই প্ল্যানের পাশাপাশি তিনি যে কাজটা করলেন তা হল, দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার কাজ। তিনি মালয়েশিয়ার প্রতিটি আনাচে কানাচে, দোকানে, মাঠে ঘাটে, বাজারে, স্যালুনে, বাসে, ট্রেনে, বাসার অয়ালে অয়ালে, সর্বত্র একটা শ্লোগান লিখে রাখতে হবে যে, “আমি মালয়েশিয়ান, আমি মালয়েশিয়ান”। এটা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার জন্য প্রযোজ্য যে যে যেই ধর্মেরই হক, সে শুধু মালয়েশিয়ান। সবার কানে কানে, মনে প্রানে, দিলে হৃদয়ে শুধু “আমি মালয়েশিয়ান” এই কথাটা মনে রাখতে বললেন।

একে বলে জিকিরের মত দেশ প্রেমের ছবক। ঐ সময় ই অনি বললেন, দেশের অর্ধেক লোক বিশেষ করে মহিলারা কাজ না করার কারনে ওরা বাকি অর্ধেক লকের রোজগারের উপর নির্ভরশীল এবং এটা তিনি বুঝাতে সক্ষম হলেন যে মহিলারা কাজ করলে সংসার এবং ব্যাক্তিগত জিবনে ও সচ্ছলতা আসবে। ফলে সর্বত্র যেমন অপারেটর হিসাবে, দোকানি হিসাবে বা সেলস গার্ল হিসাবে, গ্যাস ষ্টেশনে, ক্লিনার, মানে যেখানে যেখানে মেয়েরা কাজ করতে পারে সর্বত্র ওদের অগ্রাধিকার দেয়া হল। একটা রেভুলিসনের মত শুরু হয়ে গেল পুরু ব্যাপারটা। মালয়েশিয়ানরা ও পছন্দ করলেন।

(৩) কিন্তু তিনি আরেকটা জিনিষ নিশ্চিত করতে চাইলেন যে, প্রতিটি হোটেল, দোকান, বাস, বাজার সর্বত্র আরেক টা শ্লোগান লিখার জন্য বাধ্য করলে, ” We will not talk about three things in public place: Woman, Politics and Religion” যে কেউ এই গুলো নিয়ে আলাপ করবে পাব লিক প্লেসে, তার শাস্তি হবে।

বাইরে থেকে যত পদের ইনভেস্টর আছে সবার জন্য দ্বার উম্মুক্ত করে দিলেন।

মহাতির মোহাম্মাদ মালয়েশিয়ার যত পদের করাপসন ছিল সেগুলোর মধ্যে থেকেই তিনি নিজে ডেভেলপ মেন্টের কাজগুলো করিয়ে নিয়েছেন। তার নামে যে খালি ভাল ভাল খবর আছে তা কিন্তু নয়। তার নামে অনেক বিপদ জনক তথ্যও আছে। যেমন, সবাই মনে করে তার পরিবারের কাছে ৩ বিলিওন রিঙ্গিত পরিমান সম্পদ গচ্ছিত আছে। তার তিন ছেলে প্রায় ২০০ টি কোম্পানির মালিক যেখান থেকে তারা প্রায় বছরে কয়েক বিলিওন রিঙ্গিত কামাই করে। তার ২য় ছেলে একাই প্রায় আরাই বিলিওন রিঙ্গিতের মালিক।

শুধু এখানেই শেষ ছিল না। তার প্রথম ৯ দিনের মাথায় তিনি যে পার্টি টা ফর্ম করেছিলেন, সেটা কোর্টের কাছে তার পক্ষে রায় টা হয়ত যাচ্ছিল না। মহাতির এই একটা জায়গায় দারুল বোল্ড এক সনে গেলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচার পতিকে এবং পুরান সব জাদ্রেল রাজিনিতি বিদ যারা তার পার্টিতে ছিল সব গুলোকে বহিস্কার করে দিলেন। বিতর্কিত হয়ে গেলেন মহাতির। কিন্তু দমে জায় নাই ব্যাটা। তার সবচেয়ে ট্রাম কার্ড টা ছিল, ১৯৯৭ সালে যখন এশিয়ায় অর্থনৈতিক মন্দার সুচনা হল, মহাতির তখন এমন একখান চাল দিলে যে, মালয়েশিয়ার অর্থনিতিতে এশিয়ার কোন মন্দা ভাব পরল না। তিনি যে কাজটা করেছিলেন তা হচ্ছে ডলার রেট ফ্লাকচুয়েট করা যাবে না, স্থিতি থাকতে হবে। আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক এটাকে নিন্দা করলেও পরে তারা বুঝেছিল মহাতির ঠিক ছিল। মালয়েশিয়া ঠিক এই সময়টায় ই উত্থান করল। পাব লিক তাকে তার সব প্লান কে ধরে নিল মহাতির যা করছে ঠিক করছে।

এর পরেও অনেক স্ক্যান্ডেল আছে মহাতির সম্পর্কে, যা শুনলে অনেকের ই ভাল লাগবে না। সে যত টা ভাল মানুসের মত কাজ করেছে, তার ভিতরে ও অনেক সেলফিস ইচ্ছা টা ও ছিল। বিশেষ করে তার ডেপুটি আনোয়ার এর ব্যাপারে। তাকে নারি কেলেংকারিতে পাওয়ার থেকে নামান হয়েছিল যা প্রকৃত পক্ষে সত্য ছিল না। এটা ইন্দনেশিরার সুহার্থ কে দেখে তার এই ভয় টা আসলে হয়েছিল যে ডেপুটি তাকে হয়ত তার পাওয়ার থেকে বিতারিত করতে পারে, তাই আনয়ারকেই বিতারিত হতে হয়েছিল।

তার শেষ টেনিউরটা আরও ১৮ মাস ছিল, ওনি ইচ্ছে করলে থাকে পারতেন কিন্তু তিনি তা আর করতে চান নাই। কেউ কেউ বলে যে, এটাও একটা রাজনিতির দর্শন। For many younger voters, Mahathir was like a voice from another generation. For many non-Malays, he was the leader of the right-wing brigade and a reminder of all the excesses of the Mahathir era.

যাক এ নিয়ে পরে আরও বিস্তারিত আলাপ করা যাবে।

অনেকক্ষণ বসে ছিলাম এই টুইন টাওয়ারের পাশে। বড় ভাল লাগছিল।

আজ ৩০ তারিখেই আবার ব্যাক করতে হবে। এখন ও আমার দোস্ত নওরোজের বাসায় যাওয়া হয় নাই। বিকাল ৭ টায় ফ্লাইট। এখন বাজে প্রায় বিকাল ২ টা। নওরোজের বাসা সেন্টুলে, যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্সট্রাকশন নওরোজ ফোনে আমাকে দিয়ে দিয়েছে এবং আরও সহজ করার জন্য মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের আগেই কিভাবে বোর্ডিং করে নিতে হয় এয়ারপোর্টে না গিয়ে, সেই বুদ্ধিটাও ও আমাকে দিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক কাজ সহজ হয়ে গিয়েছে।

আমরা বিকালের মধ্যেই আমাদের সব লাগেজ পত্র মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সে দিয়ে নওরোজের বাসায় গেলাম। নওরোজই আমাদেরকে কেএলসিটি থেকে নিয়ে গেল।

আমি নওরোজের অপেক্ষায় কে এল সিটির লবিতে অপেক্ষা করছিলাম। আর দেখছিলাম কখন আমার বন্ধুটি আসে। নও রোজ ও মনে হয় আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য একটু ক্যামুফ্লাজ করার চেষ্টা করেছিল এবং খুব সন্তর্পণে লোকদের ভিরের মধ্যে দিয়ে আমার পিছন থেকে আমাকে “হাই” বলার জন্য আসতেছিল। কিন্তু নও রোজ তা আর পারে নাই কারন এর আগাএই আমি অকে দেখে ফেলেছিলাম।

নওরোজের সঙ্গে আমার আর্মির জিবনে খুব বেশি ঘনিস্টতা হয়ত বেশি ছিল না কারন ও ছিল ইনফ্যান্ট্রি তে আর আমি ছিলাম আর্টিলারিতে। তারপরেও কোর্সম্যাট হিসাবে ওর সঙ্গে আমার অন্যান্য ইনফ্যান্ট্রি বন্ধুদের থেকে অনেক বেশি ঘনিস্টতা ছিল। আমি ওকে দেখে মনে হল কত দিন পর যে একজন আপনজনকে দেখলাম। মনে হল পথ হারা শিশুর মাকে খুজে পাওয়ার মত আর কি। আমি কবি নই, বা সাহিত্যক ও নই। কিন্তু মানুষ মাঝে মাঝে ঐ ধরনের কোন একটা ভাবের মধ্যে চলে আসে। আমার ও মনে হয়েছিল, If I were a poet, I woiuld write a poem standing on the platform of KLCC regarding a feelings of meeting someone who has the same pulse and nurves of my mind and heart. অনেক বাঙালি দেখেছি, অনেক বন্ধুদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কিন্তু নও রোজের বাসায় যাওয়ার জন্য আমি আসলেই উদগ্রীব ছিলাম।

কিন্তু কবিতাটা লিখা হল অনেকক্ষণ কোলাকোলির ভাষায়। পরে ওকে নিয়ে ওর বাসার দিকে রয়ানা হলাম। কমুতার ট্রেন। নওরোজের বাসায় যাওয়ার উছিলায় কমুটার ট্রেনেও চড়া হল। সাংঘাতিক সময় মেইন্টেইন করে চলে এই কমুটার ট্রেন অথচ ভারা মাত্র ১ রিঙ্গিত। কাটায় কাটায় আমরা প্রায় ২৫ মিনিট থাকতে পেড়েছিলাম নওরোজের বাসায়। খুব সুন্দর একটা বাসা। আধুনিক এবং চমৎকার। বাচ্চাদের জন্য প্রিথক প্রিথক রুম, সুন্দর। খুব নিরাপদ, সব কিছুই আছে ওখানে। দেখলাম গার্ড আমার বন্ধুকে খুব ভাল করেই স্যালুত করে আমাদের সবাইকে সাদন সম্ভাসন জানাও। খুব ভাল একটা সময় কেটেছে নওরোজের বাসায়। অদ্ভুত একটা ফিলিংস হয়েছিল আমার। অনেক বছরের বন্ধুত্ব। খুব কাছের না হয়ে কি পারে? অনেক দিন পর বাংলাদেশি স্টাইলে ডাল খেলাম, ভাত খেলা, দেশি মুরগি খেলাম, অদ্ভুত পাক করেছিল নওরোজ ভাবি। আর সবচেয়ে ভাল লাগছিল এই জন্যে যে, ওরা খুব ভাল আছে মালয়েশিয়ায়। যে কারনে দেশ ছেড়ে এত দূর যাওয়া, সেটাই যদি না হয় তাহলে কষ্টের আর সীমা থাকে না। ওদের বেলায় এটা ঘটে নাই, ওরা ভাল আছে এটাই সবচেয়ে ভাল লাগলো।  নওরোজ ভাবি আর নওরোজ আমাদেরকে কে এল সিটি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। মনে হল খুব একজন আপনজনকে ছেড়ে যাচ্ছি। আমার প্রায়ই ঐ পোস্টমাস্টার গল্পটা মনে পরছিল, আমরা কমুটার ট্রেনে উঠে গেছি, নওরোজ আর নওরোজ ভাবি কে এল সিটি তে একা বসে আছে, মনে হল আরও একদিন থেকে যাই। অনেক গল্প করতে পারব, একটু আড্ডা মারতে পারব। কিন্তু আমার তো টিকেট করা হয়ে গেয়েছে। চেঞ্জ করার সময়ও পেরিয়ে গেছে। দেখলাম, আমাদের কমুটার ট্রেনটা অনেক স্পিডে সামনের দিকে শত শত যাত্রি নিয়ে কুয়ালালামপুর এয়ার পোর্টের দিকে দ্রুত গতিতে চলছে। তার সময় মত পৌছাতে হবে, তা না হলে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সের অনেক যাত্রি ও আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। কারন আমাদের বোর্ডিং পাশ তো আমাদের হাতে। আমরা না গেলে তো প্লেনটাও ছারতে পারবে না। আর অনেক বেশি দেরি হয়ে গেলে হয়ত আমরাও প্লেনে করে দেশে ফিরে আসতে পারব না। সময় বড় আজব জিনিষ। সময় কারো জন্য কখনো অপেক্ষা করে না, সে তমার সঙ্গে থাকবে অতক্ষণ যতক্ষন তুমি তার সঙ্গে আছ। টা না হলে সে একাই চলতে থাকে, তার কোন সঙ্গির প্রয়োজন নাই।

ওর ছেলেমেয়রা অনেক বাস্তববাদি হয়ে উঠেছে। নিজেদের কাজ ওরা নিজেরাই করে এবং সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে যে, ওরা এখন বুঝতে পারে পরিবার কি জিনিষ। এই জিনিসটা আমরা এখনও আমাদের বাচ্চাদেরকে শিখাতে পারি নাই যা ওরা শুধুমাত্র বিদেশে থাকার কারনে জানে, কোনটা নিজেদের কাজ আর কোন কাজটায় বাবা মা কে সাহায্য করার দরকার। ওরা খুব ভাল ভাবে গরে উঠছে। কত টাকার মাইনে পাবে কিংবা কোথায় কত বড় অফিসার হবে সে ভবিষ্যৎ আমাদের কারোই জানা নাই কিন্তু যারা বাস্তবকে চিন্তে শিখছে তাদের কোথাও কোন সমস্যা হবার কথা নয়। ওর বাচ্চারা ঠিক সেভাবেই বড় হচ্ছে। ওরা আসলে একদিন অনেক বড় হবে ইনশাল্লাহ। আমি কুয়ালালামপুর এসে নামাজ পরে সবার জন্য দোয়া করেছি এবং বাই নেম আমি অর পরিবারের জন্য এবং যারা ঐ কুয়ালালামপুরে আছে, সবার জন্য আল্লার কাছে দোয়া করেছি। আল্লাহ আমার দয়া নিশ্চয় কবুল করবেন।   

তারপরের কাহিনি তো বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট। এতা আর নাই বা বললাম। যেখানে সর এয়ারপোর্টে আমরা পৌছার আগেই বেল্টে মাল চলে এসেছিল, সেখানে আমরা বাংলাদেশ এয়ারপোর্টে এসে প্রায় আড়াই ঘন্টা অপেক্ষার পর ও বেল্টে মাল পাই নাই। কাকে বলব এই ব্যর্থতার কাহিনি? এটা আমার জন্মভুমি বাংলাদেশ। এখানে মানুষ আছে, মনুষ্যত্ব নেই, অফিসার আছে, দায়িত্ত জ্ঞ্যান নেই, স কিছু আছে এখানে, কিন্তু নাই শুধু ভাল হবার লক্ষন। আমরা সবাই বলি, ক্যান দেশটা ভাল হচ্ছে না? কিন্তু আমি ভাল হতে হবে এই কথাটাই কেউ বলে না।তারপরেও এই দেশ টা আমার এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের।

কাস্টম অফিসার প্যাসেঞ্জার দেখলে তার পকেট চুল্কায়, পুলিস অফিসারের দায়িত্ত যেন অনেক বেরে যায় যাতে বেশি বেশি তার ইউনিফরমের পকেত ফুলে উঠে। কিন্তু ওরা জানে না কোন একদিন এই সব অপকরমের হিসাব দিতে হবে নিজকে একা। ডুবন্ত টাইটানিকের পাশে দারিয়ে যে লোক ঘুস খেতে চায়, ও ঐ ডলার নিয়ে মরে কিন্তু ঐ ডলারে কোন কাজ আর হয় না।

২৫/০৫/২০১৫-তোমাদের জন্য

আমার কোন ইচ্ছাই ছিল না এই চিঠিটি তোমাদেরকে লিখিবার জন্য। কোন দরকার ছিল কিনা  সেই ভাবনাটা ভাবিবার সময় অবশ্য এখন নয়। উহা তোমরা ভাবিয়া দেখিবে। সময়ের বিবর্তনে হয়তোবা ইহা তাহার জায়গা দখল করিয়া লইবে তাহার কতটা দরকার ছিল, আর কতটা দরকার ছিল না। তবুও আমার মনে হইল, মাঝে মাঝে বেশ কিছু অবসর সময় পাই, কিছুতো একটা করি। তাই উপন্যাস না লিখিয়া, গ্লোবাল ইস্যু সম্পর্কে না লিখিয়া কিংবা ধর্মীয় কোন বই না লিখিয়া নিজের পরিবারের সাথে যদি সময়টা কাটাই!! তাই, আমি সময় টুকুন ব্যয় করিতে চাহিলাম এমন কিছু বিষয়ের উপর যাহা আমাকে প্রতিনিয়ত মনে করাইয়া দিয়াছে, আহা যদি এমন কিছু কেহ আমার জন্য লিখিয়া যাইত, অথবা এমন কিছু যাহা আমি প্রায়শই জানিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু কোথাও উহার কোন অস্তিত্ত পাই নাই। তাহলে উহ কি এমন জিনিস যাহা আমার মধ্যে প্রায়শই মনে আসিত, খুজিতাম কিন্তু কোথাও তাহা আমি পাইয়াছি বলিয়া মনে হইতেছে না। আমি মাঝে মাঝেই ভাবিতাম, আমার পূর্বে যাহারা আমার বংশে আসিয়াছিলেন,তাদের অনেকেই হয় বা ছিলেন জমিদার, কেউ বা ছিলেন অনেক উচ্চ স্তরের ব্যক্তিকর্তা, হয়তা আবার কেউ এমনও থাকিতে পারেন যাহাদের জীবন লইয়া এখন অনেক বড় বড় লোমহর্ষক কাব্য লিখা যাইত অথবা এমন কেউ থাকিতে পারেন যাহাদের অতিষ্ঠে মানুস প্রতিনিয়ত কায়মনে তাহাদের মৃত্যু কামনাই করিতেন, আবার এমনও হইতে পারে যে, কাহারো কাহারো জীবননাশের কারনে কোন এক সমাজ ব্যবস্থা হয় ভাঙ্গিয়াই পড়িয়াছিল, কে যানে এই সব কথা বা কাহিনি?

মাঝে মাঝে আমার খুব জানিতে ইচ্ছে করিত, এইসব তাহার কেউ কি আমাদের কথা কখনও এমন করে ভাবিয়াছিলেন যে, কোন একদিন হয়তবা কেউ তাহাদের স্মরণ করিয়া তাহাদের ব্যাপারে আরও অধিক জানিবার জন্য আকুপাকু করিবেন? হয়ত কেহ কেহ করিয়াছিলেন, কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারনে তাহারা তাহাদের কোন কথাই আমাদের জন্য রাখিয়া যাইতে পারেন নাই, হয়তোবা আবার করেও নাই। বহুদিন আগে আমি একখানা ছায়াছবি দেখিয়াছিলাম, কালো মানুষের কাহিনী। সম্ভবত ছবিটির নাম ছিল “রুটস”। আলেক্স হেলির বানানো। তিনি অনেক বছর গবেষণা করিয়া করিয়া যতদুর সম্ভব তাহার পূর্বপুরুসের ইতিহাস লইয়া তাহার অই অনবদ্য কঠিন জিবনের কাহিনী পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। কিন্তু আমার আলেক্স হেলির মত অত ধৈর্য নাই যে আমি বছরের পর বছর আমার পূর্ব পুরুসের নাম গবেষণা করিয়া করিয়া এক একটা অধ্যায় লিখিব। সে সাধ্যও আমার নাই। কিন্তু আমি একটা কাজ করিতে পারি অনায়াসে। আর তাহা হইল, আজ হইতে হাজার বছর পরে যদি কেউ আমার কথা জানিতে চায়, আমার সম্পর্কে ভাবিতে চায়, কিংবা আজ এই বিংশ শতাব্দিতে বসে আমি কি ভাবিতেছি, কি ভাবিতেছি না, কিংবা আমি আজ থেকে আরও শত বছর পর, অন্তত এই ভাবনাগুলি তো আমি আমার ঐসব পরবর্তী বংশধরদের জন্য লিখিয়া যাইতেই পারি। তাহাতেই বা কম কিসের? তাই ভাবছি, আমি সারাদিন কি করি, কি ভাবি, কেমন করিয়া ভাবি, আমার কি ইচ্ছা আমার বংসধরদের লইয়া, যদি আমি এক টুকরো কাগজের মধ্যে লিখিয়া রাখি, হয়ত বা কোন একদিন আমারই কোন উদাসীন এক বংশধর এই লেখাটা পড়িয়া জানিতে পারিবে , তাঁহারও আগে কেউ একদিন কি করেছিল।

আমি আমার বাবাকে দেখি নাই। আমি যখন মাত্র দুই কি আড়াই বছরের, তখন তিনি জান্নাত বাসি হয়েছেন। ফলে ঊনার কোনো ছবি, কিংবা কোনো স্মৃতি আমার কাছে নাই। শুনতাম, তিনি ছিলেন অত্যান্ত নামীদামী মানুষ। মাদবর মানুস। অনেক সম্পত্তি ছিলো তার। ওই সময় যে কয়জন মানুষ ধনীদের কাতারে ছিলেন, তার মধ্যেয়ামার বাবা একজন। আমি যখন মাত্র ক্লাস ফাইভে বা সিক্সে পড়ি, তখন আমাদের বাড়িতে কোনো এক বাক্সে আমার বাবার হাতের লিখা কিছু পত্র দেখিয়াছিলাম। খুব সুন্দর হাতের লেখাছিলো। আমি তখন ছোত ছিলাম, বুঝি নাই এই সব স্ম্রিতিগুলি রক্ষনাবেক্ষন করা উচিত কিনা।আমি বা আমরা কেহই ওইসব হাতের লিখা চিঠিপত্র গুলিও সংরক্ষন করি নাই। আজ আমার কাছে মনে হচ্ছে ওই গুলি অনেক দামি বস্তু ছিলো। 

আমাদের গ্রামের বাড়ি দুই জায়গায়। একটা মুন্সিগঞ্জের কয়রা খোলায়, আরেকটা হচ্ছে কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। ওই মুন্সিগঞ্জের বাড়িতে থাকেতো আমাদের আগের মায়ের সন্তানেরা আর আমরা থাকতাম কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর। আমার বাবা কোনো এক সময় তার জীবদ্দশায় ভীছিলেন যে, আমরা কোনো ভাবেই তার আগের সন্তানদের কাছে নিরাপদ নই এবং আমাদের জীবন নাশ হবার সম্ভাবনা আছে। ফলে আমার বাবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসাবে তিনি আমাদেরকে মাইগ্রেট করে মুন্সিগঞ্জ থেকে কেরানীগঞ্জ আমার আপন খালুদের এলাকায় রিহেবিলেট করার পরিকল্পনা করেন। আমার বাবার পরিকল্পনা একদম ঠিক ছিল বিধায় তিনি মারা যাবার আগে আমাদেরকে এই কেরানিগঞ্জের এলাকায় স্থানান্তর করে গিয়েছিলেন। আচ্ছা, আমার বাবার আর কি কি প্ল্যান ছিলো যা তিনি শেষ করে যেতে পারেন নাই? অথবা তার কি কি শখ ছিল যা আমাদের পরবরতী জেনারেশনের উচিত তার বাস্তবায়ন করা? কিছুই জানি না। আর এখানেই আমার দুঃখ।

আমি এখানে শুধু আমার বাবার প্রসঙ্গ টাই তুলেছি কারন আমার কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় নাই আমার বাবার আগের জেনারেশনের কি অবস্থা ছিলো বা কে কি করতেন। আমার জানার কোনো ত্রুটি ছিলো না কিন্তু কেহই তাদের ব্যাপারে আমাকে কোনো তথ্য বিস্তারিত ভাবে দিতে পারেন নাই। যাই হোক, এবার তোমাদের পালা। তোমরা অন্তত একটা বেস হিসাবে আমার লেখাএই ডায়েরী বা এই ওয়েব সাইট পেয়েছো যেখানে আমাদের ফ্যামিলির কিছু তথ্য রেডিমেট পেয়েছো। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার মতো ইচ্ছুক হও, তাহলে আমার এই তথ্যাবলী সামনে রেখে আমাদের ফ্যামিলী ওয়েব সাইটটি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারো।

আর এটাই হবে আমার কাম্য। 

৯/০৪/২০১৫-ওমরা

গত ২৬ মার্চ ২০১৫ তারিখে আল্লাহর নাম নিয়ে আমি আর আমার স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করার জন্য সরাসরি প্রথমে মদিনা এবং পড়ে মক্কা শরিফের উদ্দেশ্যের ওয়ানা হয়েছিলাম। যদিও আনি ২০০৬ সালে যখন হজ্জ করেছিলাম, তখন প্রথমবার হজ্জ করার কারনে অনেক কিছু দেখার সুযোগ হয় নাই কারন হজ্জের অনেক ফরমালিটিজ থাকে যা পালন করতে গিয়ে ইসলামের অনেক আনুষঙ্গিক ব্যাপার গুলো দেখার বা মনোসংযোগ করার সময় থাকে না বা আমি নিজে পাইনি। এবার নিয়ত করেছিলাম যে, আমি ওমরার পাশাপাশি আরও বেশি কিছু দেখবো এবং ওগুলো নিয়ে পরাশুনা করব।আল্লাহ অনেক সহায়তা করেছেন এবং মন ভরে তা করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

নবী করিম (সঃ) এর নামে দরূদ শরিফ পড়লে কি হয় তা আমি জানতাম। যেমন, আবু বকর (রাঃ) বলেছেন যে, দরূদ শরীফ পড়লে পানি যেমন আগুনকে ক্রমাগত দুর্বল করতে করতে এক সময় আগুনকে নিভিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি, দরূদ শরীফ পড়লে আমাদের পাপেরও তা ক্রমাগত মুছন শুরু হয়। যতবার এই দরূদ শরীফ পড়া হবে ততবার আমাদের পাপের বিরুদ্ধে এই দরূদ শরীফ পাপ মুছনের কাজ করতে থাকে। তাই বেশি বেশি করে দরূদ শরীফ পরতে হবে। এটা একটা দাসকে মুক্ত করার চেয়েও বেশি সম্মানিত আল্লাহর কাছে। আরেকটা হাদিসে আছে যে, শুক্রবার দিন দরূদ শরীফ পড়ার আরও কিছু বেশি লাভ আছে। আর তা হচ্ছে, বেহেশত থেকে কিছু ফেরেশতার উপর এই নির্দেশ দেয়া আছে যে, যারা যারা আমাদের নবীর নামে দরূদ শরীফ পরবেন, তাদের নাম সোনার কলমে সিলভারের কাগজের উপর তারা লিখে রাখবেন এবং তা আল্লাহর কাছে পেশ করবেন। আমি আমাদের নবীর রওজা মোবারক দর্শন করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্রমাগত দরূদ শরীফ পড়ে যাচ্ছিলাম। অবশেষে আমাদের নবীর রওজায় এসে পৌঁছলাম। মদিনায় তখন সন্ধ্যা। মাগ্রেবের আজান চলছে। 

নবীর রওজা মোবারক

আমাদের নবীকে মা আয়েশা (আঃ) এর ঘরেই শায়িত করানো হয়েছে। ওটা ছিল মা আয়েশার ঘর। এবার এটার কিছু তথ্য বলি।

আমাদের নবী যখন ওফাত হলেন, তখন অনেকেই তাঁকে জান্নাতুল বাঁকিতে কবর দেওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু আবু বকর (রাঃ) বললেন যে, তিনি আমাদের নবীর কাছে শুনেছিলেন, রাসুলগন যেখানে ওফাত হন, তাঁদেরকে সেখানেই কবর দেওয়ার নির্দেশ। ফলে মা আয়েশার ঘরেই তার কবর দেওয়া হয়।নবীর ওফাত হওয়ার ২ বছর পর (সম্ভবত) আবু বকর (রাঃ) মারা যান এবং তিনি তখন তার মেয়ে আয়েশাকে অনুরোধ করেন যেন তাঁকে নবীর পাশে কবর দেওয়া হয়। মা আয়েশা তার অনুরোধ রেখেছিলেন।মা আয়েশার ইচ্ছে ছিল যে আমাদের নবীর কবরের পাশে যেন তার কবর হয় এবং সে মোতাবেক তিনি তার কবরের স্থান নির্ধারণ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওমর (রাঃ) যখন এক ক্রিস্টিয়ান দ্বারা তার নাম ছিল ফিরোজ, (আবু লুলু) স্টেবড হন তার ঠিক মৃত্যুর আগে তিনি তার ছেলে আবদুল্লাহকে পাঠান মা আয়েশার কাছে এই বলে যে তাঁকে যেন আমাদের নবীর পাশে কবর দেওয়া হয়। ওমরের এই অনুরোধ তিনি রেখেছিলেন মা আয়েশার নির্ধারিত কবরটা তার জন্য ছেরে দিয়ে। তিনি মোহররমের ১ তারিখে মারা যান। ঠিক তার পরপরই মা আয়েশা তার ঘরের সঙ্গে সব কবরের মাঝে একটা পারটিশান দেন। কারন ওমর তার কাছে গায়েরে মোহররম ছিলেন।

এখানে একটা ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আবশ্যক। আমাদের নবী প্রতিদিন আসর নামাজের পর সব স্ত্রীদের কাছে তাঁদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য যেতেন। কিন্তু তার ৪র্থ স্ত্রী মা জয়নবের কাছে গেলে মা জয়নব তাঁকে তার প্রিয় মধু খেতে দিতেন। ফলে কিছুটা সময় বেশি কাটাতেন তিনি তার ঘরে। এই ব্যাপারটা মা আয়েশা এবং মা হাফসা পছন্দ করতেন না। ফলে তারা একদিন পরামর্শ করলেন যে, নবী যখন মা হাফসার ঘর থেকে তাঁদের ঘরে আসবেন, তখন তারা বলবেন যে, তার (আমাদের নবীর) মুখ থেকে ভাল গন্ধ আসছে না। এই কথা শুনে নবী বুঝতে পেরেছিলেন তাদের মনের ইচ্ছা এবং প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি আর মধু খাবেন না। এটা আল্লাহ তালাহ পছন্দ করেন নি। তার ঠিক এর ফলে কোরআনে এক আয়াত নাজিল হয়েছিল যার অর্থ এই রকমঃ

O Prophet! Why holdest thou to be forbidden that which Allah has made lawful to thee? Thou seekest to please thy consorts. But Allah is Oft-Forgiving, Most Merciful.

Allah has already ordained for you, (O men), the dissolution of your oaths (in some cases): and Allah is your

Protector, and He is Full of Knowledge and Wisdom.

—Quran, surah 66 (At-Tahrim), ayat 1-2[51]

Word spread to the small Muslim community that Muhammad’s wives were speaking sharply to him and conspiring against him. Muhammad, saddened and upset, separated from his wives for a month. ‘Umar, Hafsa’s father, scolded his daughter and also spoke to Muhammad of the matter. By the end of this time, his wives were humbled; they agreed to “speak correct and courteous words”[52] and to focus on the afterlife.[53]

চার নম্বর কবরটি এখন খালি আছে, এবং বলা হয় যে, ওখানে ইশা (আঃ) কে কবর দেওয়া হবে।

আমার দেখা এবারের কিছু জায়গার বর্ণনা দেই।

মদিনায় আমি মোট পাঁচ ছয় জায়গায় ভিজিট করেছি। তারমধ্যে ওহুদের পাহাড় যেখানে হামজা (রাঃ) শহিদ হয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ঐ যুদ্ধে মোট ৬৯ জন সাহাবা শহিদ হয়েছিলেন এবং হামজার কলিজা খেয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ। মোট ৬৭ সাহাবারগন কবর এক জায়গায় এবং মাত্র ২ জনের কবর (একজন হামজা এবং অন্য জন আরেক সাহাবা) একটু দূরে।পুরু জায়গাটি চারিদিকে ওয়াল দিয়ে ঘেরাও করা এবং কবরগুলো শুধুমাত্র কয়েকটি পাথর দিয়ে মার্ক করা। এটা ঠিক যেখানে যুদ্ধটা হয়েছিল ওহুদের সময়, সেই জায়গায় করা হয়েছে। স্থান পরিবর্তন না করে। জায়গাটা দেখলে মন কম্পিত হয়ে উঠে। পরবর্তীতে কিন্তু আবু সুফিয়ান এবং তার স্ত্রী হিন্দ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন কিন্তু আমাদের নবীর একটা অনু রোধ ছিল হিন্দের প্রতি যে, কখন যেন হিন্দ তার জীবদ্দশায় আমাদের নবীর সামনে না আসেন। কারন হিন্দকে দেখলে আমাদের নবীর কষ্ট হত তার চাচা হামজার কলিজা খাওয়ার ঘটনা মনে করে।

ওইখান থেকে আরও ২০-২৫ মেইল দূরে গেলে একটা জায়গা পাওয়া যায় যার নাম হচ্ছে ওয়াদি-ই-জীন। বলা হয় যে, ঐ এলাকাটা জীনদের বসত করার জায়গা হিসাবে পরিচিত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, ওখানে গেলে গাড়ি কোন পাওয়ার ছাড়া এবং কোন গিয়ার ছাড়া ব্রেক ছেরে দিলে প্রায় ৯০-১২০ কিমি স্পীডে পাহাড়ের আপহিলেও গাড়ি চলে। ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না। অনেকভাবে পরিক্ষা করে দেখেছি যে ব্যাপারটা সত্য। প্রায় ৭ কিমি কিংবা আরও বেশি মেইল এই ব্যাপারটা ঘটে। ওটা শুধু একদিকে ঘটে, অন্যদিকে হয় না। তাও আবার আফিলের দিকে হয়।ব্যাপারটার মধ্যে বৈজ্ঞানিক কোন থিওরি কাজ করে কিনা আমি জানি না। তবে ব্যাপারটা নিয়ে আমি সারাক্ষনই ভেবেছি। ব্যাপারটা কি আসলেই মিরাক্যাল? সম্ভবত না। এখানে কোন বিজ্ঞানভিত্তিক কোন লজিক থাকতে হবে। সবাই বলে, জীন গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যায়। আমি যেহেতু ব্যাপারটা সুরাহা করতে পারি নাই, তাই কোন মন্তব্যও করছি না। তবে আমি দেখেছি যে, কোন পাওয়ার ছাড়া এবং গাড়ি একদম অফ করে দিয়ে নিউট্রালে রেখে গাড়ি প্রায় ৯০ থেকে ১২০ কিমি স্পীডে চলছে। এবং এটা আপহিলেই শুধু যাচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু এখন আমি জানি কেন এটা হয়। এটা আসলে আপহিল নয়, আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় এটা আপহিল, কিন্তু আসলে এটা প্রায় ১১ ডিগ্রি ডাউনহিল। আর এ কারনেই আপাতত দৃষ্টিতে যেটা আপফিল মনে করা হচ্ছে সেটা আসলে ৭ কিমি পরিধি নিয়ে ১১ ডিগ্রি ডাউন হিল। আর এ কারনেই গাড়ি, পানির বোতল কিংবা পানি সব আপহিলে যায় বলে মনে হয়। বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য পড়ে আলাপ করা যাবে। আমি এইটার পুরু ব্যাখ্যা এখন জানি। এটা কোন জিনের কাজ নয়।

ঐখান থেকে আমরা খন্দক পাহাড়, এবং মক্কায় এসে আমাদের নবী প্রথম যেখানে মসজিদ করেন তার স্থানটি দেখলাম। ওটার নাম “তুবা” মসজিদ। ৩৫০ কিমি পথ আমাদের নবী শুধুমাত্র রাতে রাতে ভ্রমন করে মাত্র ৮ দিনে মদিনায় পৌঁছেন। এর মধ্যে আরও একটা জায়গা আমি দেখতে গিয়েছিলাম। সেটা হচ্ছে, মক্কার উদ্দেশ্যে অপারেশন করার পূর্ব মুহূর্তে আমাদের নবী কর্তৃক ব্যবহৃত অপারেশন ব্রিফিং রুমের স্থানটি। এই স্থানটি আগে আবিষ্কৃত হয়নি কিন্তু মিনায় নতুন করে স্থাপনা করতে গিয়ে পাহাড় কাটার সময় এটা আবিষ্কৃত হয়। ঘরটির কোন ছাদ নাই বর্তমানে এবং শুধু ঐতিহাসিক কারনে এটা এখন একইভাবে সংরক্ষন করা হয়েছে। এক তলা একটি বাড়ীর সাইজ। এটা এখন open-roofed mosque in Muzdalifah  নামেপরিচিত।প্রকৃতনাম Masharul Haram (the Sacred Grove).

খন্দকের যুদ্ধটা কেন হয়েছিল তা আমরা অনেকেই জানি। এট লিস্ট প্রমোশন পরিক্ষার আগে এই ব্যাপারে অনেকেই আমরা পরাশুনা করতে হয়েছে। তবু একটু হিন্টস দেই। বলব?

খন্দকের যুদ্ধটাকে বলা হয় সবচেয়ে বেশি ট্যাক্টিক্স সমৃদ্ধ যুদ্ধ। এখানে ডিপ্লোম্যাসি, রিউমার, এবং ফলস তথ্য দ্বারা যুদ্ধ জয় হবার ন্যায় সঙ্গতা রয়েছে। যুদ্ধটা হয়েছিল ত্রিপক্ষ বেসিস। মানে হল এই যে, আমাদের নবী যখন ইহুদী বংশের নেতাদেরকে (বনু নাদির গোত্র) মদিনা থেকে খায়বারে বিতাড়িত করেন তখন এই নেতাগন (তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সালাম বিন আবু হুকায়েক, সালাম বিন মিশকাম,  কিন্নাহ বিন আর রাবি) মক্কায় কুরাইশ বংশের বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে হাত মিলান নবীকে পরাস্ত করার জন্য।একই ভাবে এই ইহুদীগন গাতাফান ট্রাইবদের কাছেও তাঁদের সাপোর্ট এর কথা জানিয়ে আমাদের নবীর বিরুদ্ধে প্রলুব্ধ করেন। তারা সবাই এক হয়ে যায়। আবু সুফিয়ান এই যুদ্ধে লিড দেন। সালমান আল ফার্সি এই প্ল্যানের (অর্থাৎ ট্রেঞ্চ) উদ্যক্তা। মদিনাকে পূর্ব পাশ থেকে ডিচের মাধ্যমে আইসোলেট করা হয়, ডিচের মাধ্যমে শত্রু পক্ষের পানির সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মদিনা তখন মহিলাদের দ্বারা নিরাপত্তা দেওয়া হয়। যুদ্ধে যারা অংশ নেয় তারা হচ্ছেন, বনু নাদির, বনু ঘাতাফান, বনু সুলাইমান, বনু মোররা, বনু সুজা, বনু খোজা ইত্যাদি। বনু কোরায়জা যদিও শত্রু পক্ষের লোক ছিল কিন্তু তারা ইসলামের প্রতি কিছুটা ঝোঁক ছিল বিধায় তারা আমাদের নবীকে সাপোর্ট করেছিলেন। তাছারা বনু কোরায়জার সাথে আমাদের নবীর একটা গোপন প্যাক্টও হয়েছিল যে তারা আমাদের নবীকে সাপোর্ট দেবেন। আর এই দলটি ছিল মদিনার ভিতরে একেবারে ডিফেন্সিভ লাইনের ভিতরে। মদিনার রক্ষার জন্য এরাও একটা অংশ পাহারা দিচ্ছিল।

এখানে আমাদের নবী আগে থেকেই একটা জিনিষ আল্লাহ তাঁকে জ্ঞ্যান দিয়েছিলেন যে, মদিনায় যে সময় শস্য হয় তার আগেই তিনি লাগিয়েছিলেন যেন, শত্রু পক্ষ মদিনায় এসে কোন খাবার না পায়। সব শস্য ইতিমধ্যে মদিনাবাসি ঘরে তুলে ফেলেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে কোরায়েশরা যখন তাঁদের ঘোড়ার কোন খাবার যোগাড় করতে পারছিলেন না এবং ঘোড়াগুলো খাবার না পেয়ে দুর্বল হয়ে পরছিল, তখন এই ডিচ কোরায়েশ বংশের আমর বিন উদ (যাকে একাই ১০০ সৈনিকের শক্তির সমান মনে করা হত) এক মাত্র কোনভাবে ঐ খন্দক অতিক্রম করেন কিন্তু তিনি ল্যান্ড করেন জলাভুমির মত এক জায়গায় যার নাম ছিল “সালা” পাহাড়ের পাদদেশ। যেহেতু তিনি গুটি কতক সইনিক নিয়ে ঐ খন্দক অতিক্রম করেন, ফলে আমাদের নবীর বাহিনির সঙ্গে যুদ্ধ করার অবকাশ ছিল না। তাই, আমর বিন উদ মল্য যুদ্ধ্যের আহ্বান করেন। তখন আমাদের নবী আলিকে মল্য যুদ্ধে পাঠানোর মনঃস্থির করেন। যখন মল্য যুদ্ধ শুরু হয়, তখন এক বিশাল ধুলি ঝড়ের আবির্ভাব ঘটে এবং কে যুধ্যে জিতছেন আর কে হারছেন বুঝা যাচ্ছিল না। হতাত করে যখন “আল্লাহু আকবার” শব্দ আসে তখন দেখা গেল হযরত আলি আমর বিন উদকে পরাস্ত করেন। আর ঠিক এই ধ্বনিতে শত্রু বাহিনী পিছু হটে যায়।

এবার শত্রু পক্ষের নজর চলে যায় এই বনু কোরায়জার দিকে যাআরা মদিনার ভিতরে নিরাপত্তায় লিপ্ত ছিল।। কোনভাবে যদি বনু কোরায়জাকে কনভিন্স করা যায় যে তারা আর আমাদের নবীর পক্ষে কাজ করবে না, তাহলে আবার শত্রু পক্ষ জিতে যাবে। এই ধারনা থেকে খায়বারিয়ান নেতা এবং বনু নাদিরের গোত্রের হুয়ায় ইবনে আখতাব কোরায়জার কাছে আসেন। রিউমার ছড়ানো হয় যে কোরায়জা বংশ এখন আমাদের নবীর পক্ষে নাই আর। আসলেও তারা নবীর বিপক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছিল মদিনার ভিতরে। এই খবরে আমাদের নবী শঙ্গিত হয়ে উঠেন। তার কারন হল তিনি তাঁদের উপর নির্ভর করে ঐ অংশে কোন প্রকার ডিফেন্সিভ পেরিমিটার গরে তুলেন নাই। চারিদিকে রিউমার ছড়িয়ে পড়ে যে, কোরায়জারারা মদিনায় আমাদের নবীর বিপক্ষে কাজ শুরু করেছেন এবং এতে মদিনাবাসি খুব বিপদের মধ্যে পড়ে যায়। এর বিপক্ষে আমাদের নবী ১০০ সাধারন আনসার এবং ৩০০ ঘোড়াবিহিন আনসার মোট ৪০০ জন আনসার মদিনায় মোতায়েন করেন যারা রাত্রে বেলায় অতি উচ্স্বরে নামাজ পরতেন যাতে এটা প্রমানিত হয় যে অনেক অনেক আনসার ইতিমধ্যে মদিনায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু সত্য বলতে কি আমাদের আনসারগন ইতিমধ্যে তাঁদের শারীরিক কার্যক্ষমতা অনেকটা হারিয়ে ফেলছিলেন ক্রমাগত যুধ্যের কারনে। আমাদের নবী তখন ঘাতাফানকে এই মর্মে একটা চুক্তিতে আহবান করেন যে, তারা যদি মদিনা থেকে চলে যায়, তবে মদিনায় যে পরিমান খেজুর উৎপন্ন হবে তার তিন ভাগের এক ভাগ তাদেরকে ক্ষতিপুরন দেয়া হবে। কিন্তু মদিনার নেতারা আমাদের নবীর এই শর্ত মানতে রাজি হলেন না এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অটল থাকলেন। এই সময় এক অভুতপূর্ব ঘটনা ঘটে গেল।

আরবের একজন নেতা যাকে সবাই খুব সমিহ করতেন এবং মানতেন তার নাম নয়াম ইবনে মাসুদ। তিনি গোপনে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে যা কেউ জানত না শত্রুপক্ষ। সাবার কাছে তিনি একজন গ্রহনযোগ্য মানুষ ছিলেন। তিনি প্রথমে গেলেন বনু কোরায়জার কাছে এবং বললেন, শত্রুপক্ষ (অর্থাৎ যারা আমাদের নবীর বিপক্ষে যুদ্ধ করছেন তারা), যদি কোন কারনে হেরে যায় তাহলে বনু কোরায়জাকে মোহাম্মাদের (সঃ) কাছে ফেলে রেখেই চলে যাবে এবং সেক্ষেত্রে সব কিছু যা মোহাম্মাদ (সঃ) বলবেন তাই হবে। তখন মদিনাবাসি শুধু বনু কোরায়জাকেই শাস্তি প্রদান করবে। সুতরাং বনী কোরায়জার উচিৎ অন্যান্য বংশের নেতাদেরকে এখন বনী কোরায়জার কাছে হস্টেজ হিসাবে রাখা যাতে যদি কোন কারনে তারা হেরে যায়, ঐ গোত্ররা বনী কোরায়জার লোকদের বিপদে ফেলে চলে যেতে না পারে।  একই ভাবে তিনি শত্রু পক্ষের লোকদেরকেও এই বলে খবর দিলেন যে, বনী কোরায়জার লোকজন তাঁদের কিছু গোত্র নেতাদেরকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হস্টেজ হিসাবে চাইতে পারে এবং না দিলে তারা মদিনার সাপোর্ট হিসাবেই থাকবে। এই তথ্য কাজে লাগল, যদিও কোন তথ্যই সত্য নয়। এই দিকে আমাদের আনসারগন ধিরে ধিরে বনু কোরায়জার দলকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলল। ইতিহাস বলে যে, বনু কোরায়জাকে আমাদের দল প্রায় ২৫ দিন ঘিরে রেখেছিল এবং শেষমেশ তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং শত্রুপক্ষের জন্য আর কাজ করে নাই। কিন্তু চুক্তি ভাঙ্গার কারনে বনু কোরায়েজের নেতাদেরকে হত্যা করা হয় এবং মহিলা ও শিশুদেরকে দাস হিসাবে গ্রহন করা হয়।

যাক সে ইতিহাস। সবাই আমরা তা জানি। এখন আর নাই বা বললাম আর।

তারপর আরাফায় গিয়েছিলাম। অবাক হওয়ার মত ব্যাপার যে, আমাদের নবী যেখান থেকে তার বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটা একটা উচ্চ পাহাড় আর নাম হচ্ছে জাবালে রাহমাহ। অর্থাৎ রহমতের পাহাড়। প্রথমবার হজ্জের সময় আমার এই জায়গাটা দেখার সুযোগ হয় নাই কারন অনেক ভীর ছিল এবং আমি আরাফার দিন যেখানে ছিলাম তার থেকে এই জাবালে রাহমাহ অনেক দুরেও ছিল। এবার হেটে হেটে ঐ জাবালে রাহমাতে উঠলাম। শরির শিউরে উঠে ঐ সময়কার কথা মনে করলে। কারন আমাদের নবী ঠিক যে জায়গাটায় দারিয়ে এই মানব উদ্দেশ্যে তার শেষ বিদায়ি ভাষণ দিয়েছিলেন তার স্থান দেখা এবং ঐ ভাষণ সম্পর্কে ভাবা একটা অদ্ভুত শিহরণ জাগে মনে। জানা যায় যে, প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল ঐ ভাসনের সময় অথচ কোন মাইক ছিল না, এরপরেও সবাই আমাদের নবীর প্রতিটি কথা স্পষ্টভাবে শুনেছিলেন। এবার ওখানে গিয়ে আরও নতুন একটা তথ্য জানলাম। নবী করিম (সঃ) এর আগমনের বহু পূর্বে প্রায় হাজার বছর পূর্বে বাদশাহ হারুনের স্ত্রী একবার এই আরাফার ময়দানে এসেছিলেন কোন এক ধর্মীয় কারনে। তখন ঐ অঞ্চলে পানির খুব অভাব ছিল। বাদশাহ হারুনের স্ত্রী যখন এই পাহারে এলেন তখন ঐ এলাকার বাসিন্দারা তাঁকে পানির ব্যবস্থার কথা জানালে তিনি তার স্বামী বাদশাহ হারুনকে পানির ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বাদশা হারুন তার স্ত্রির এই অনুরোধ রক্ষার জন্য সুদুর ইরাক থেকে পানির লাইন টেনে এনে এই এলাকায় পানির ব্যবস্থা করেন যা এখন অবধি লাইনটা রয়ে গেছে। ওটা ছিল এক বিশাল কাজ কিন্তু বাদশাহ কাজটি করেছিলেন। বিকল্প পানির ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই পানির সাপ্লাই জারি ছিল এবং বর্তমানে ইরাক থেকে পানি আসছে না বটে কিন্তু ঐ একই পানির লাইন সউদি সরকার ব্যবহার করে সউদি থেকেই পানির সরবরাহ করে থাকে। বলা হয় যে, এই আরাফার ময়দান নাকি হাশরের ময়দানের সঙ্গে যুক্ত একটা ময়দান। হজ্জের সময় আরাফার ময়দানে থাকা ফরজ এবং মাগ্রেব পর্যন্ত এখানে অবস্থান করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু মাগরেব নামাজ এখানে পোড়া নিষেধ। এই মাগ্রেব নামাজ পরতে হয় মুজদালেফায় এশার নামাজের সঙ্গে একত্রে। আমি আমর পুরান এক মেইলে হজ্জের বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখেছিলাম কেন কোন রিচুয়াল কিভাবে করা হয়। এখন আর এগুলো এখন লিখছি না।

জাবালে রাহমাহ থেকে আমরা চলে গেলাম মিনায়। যেখানে শয়তানের উদ্ধেস্যে পাথর মারা হয়। আমি জায়গাটা আগেই দেখেছিলাম হজ্জের সময় কিন্তু এবার যে দুইটা জায়গা নতুন করে দেখলাম তা হচ্ছে আবাবিল পাখির দ্বারা পাথর মারার স্থানটি। আবাবিল পাখির ঘটনাটি নিশ্চয়ই আমরা সবাই জানি। তারপরেও আমি একটু পিছনের কাহিনি টানতে চাই সবার মেমোরি ফ্রেশ করার জন্য। ঘটনাটির অবতারনা ঘটে এইভাবে। বলব? 

আমরা জানি আবু তালিব যদিও শেষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন নাই কিন্তু তিনি ইসলামের অন্যতম একজন প্রটেক্টর ছিলেন। তিনি আমাদের নবীকে সর্বত্র সাহায্য করেছেন এই ইসলাম সম্প্রসারণের জন্য। একদিন তিনি তার এই ভাতিজাকে বললেন, হে ভাতিজা, তুমি কি শুধুমাত্র আমাদের কুরাইশ বংশের জন্য প্রেরিত হয়েছ নাকি সমগ্র মানব জাতির জন্য? আমাদের নবী বললেন, আমি সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছি হোক সে সাদা, বা কালো, বলুক সে আরবি ভাষা অথবা অন্য কোন ভাষা, থাকুক সে পাহারে বা সমুদ্রের নিচে, হোক সে বিধর্মী বা না কোন ধর্মের, হোক সে ধনী বা গরিব, আমি সবার জন্য প্রেরিত হয়েছি। এই কথা শুনে কুরাইশ এক সদস্য আবু তালিবকে বললেন, শুনেছ তোমার ভাতিজার কথা? যদি এখন পার্সিয়ান বা রোমের লোকজন এই কথা শুনে তাহলে তো এখনই তারা আমাদের সবকিছু ধংশ করে নিয়ে নিবে এবং তারা আমাদের এই কাবা ঘর যাকে উদ্দেশ্য করে আমাদের ব্যবসা পরিচালিত হয় তারা তা ভেঙ্গে দিবে। তখন এই সুরার আবির্ভাব হয় এবং তার ইতিহাস জানানো হয়।ইতিহাসটাএইরকমঃ

আমাদের নবীর জন্মের কিছুদিন আগে এই হাতি এবং আবাবিল পাখীর ঘটনাটি ঘটে।

ইয়েমেনের আশেপাশের এক রাজা যার নাম ছিল ঢু-নয়াজ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বদমেজাজি এক রাজা এবং জুলুমকারী। তিনি ছিলেন ইহুদী ধর্মের। তিনি চেয়েছিলেন যে, তার রাজ্যে সব অধিবাসী যেন ইহুদী ধর্মে দিক্ষিত হয়। আর যারা দিক্ষিত না হবে, তাদেরকে তিনি বিখন্ডিত করেন। এর মধ্যে ছোট এক বালক যার বাড়ি ছিল ইয়েমেনেরই দেশে নাজরান প্রদেশে। পিতামাতা তাঁকে যাদুবিদ্যা শিখার জন্য এই ছোট বালককে নাজরান থেকে ইয়েমেনের শহরে পাঠাতেন প্রতিদিন। পথিমধ্যে এই বালক ক্রিস্টিয়ান এক বৃদ্ধের দেখা পান যিনি খুব ভাল যাদুবিদ্যা জানতেন এবং সব ধরনের রোগ মুক্তির মন্ত্র জানতেন। ফলে ঐ বালকটি গোপনে ঐ বৃদ্ধার কাছে যাদুমন্ত্র এবং রোগমুক্তির বিদ্যা অর্জনে ক্রিস্টিয়ানিটিতে দিক্ষিত হওয়া শুরু করে। এই খবর দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যায়, ফলে রাজা ঢু নুঅয়াজ অতি দ্রুত ঐ বৃদ্ধাকে বিখন্ডিত করেন এবং এই ছোট বালকটিকেও বিখন্ডিত করার আয়োজন করেন। বালকটিকে বাঁধা হয় এবং তীরন্দাজ দ্বারা তাঁকে তির মারা শুরু হয় কিন্তু কোন তীরই তাঁকে স্পর্শ করতে পারছিল না। ওখানে যতলোক জড় হয়েছিল, এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেল, সঙ্গে রাজা নিজেও।তখন বালকটিকে জিগ্যেস করা হল, কেন তাঁকে তীর দিয়ে মারা যাচ্ছে না। বালকটি তখন উত্তর করেছিল যে, তাঁকে মারা একমাত্র সম্ভব যদি ক্রিস্টিয়ান লর্ডের নাম ধরে তাঁকে মারা হয় এবং রাজ্যের অধিকাংশ লোক যদি তার এই তীর মারার দৃশ্য অবলোকন করে তাহলেই তাঁকে মারা সম্ভব।তার এই নির্দেশনা মোতাবেক প্রায় ২০ হাজার লোক অবলোকন করে এবং যারা যারা এই দৃশ্য অবলোকন করে তারা প্রায় সবাই এক সঙ্গে বালকটির নতুন ধর্ম ক্রিস্টিয়ানিটিতে রূপান্তরিত হয়। রাজা ঢু নুঅয়াজ ক্ষিপ্ত হয়ে ঐসব ২০ হাজার মানুষকেই একসঙ্গে গর্ত করে মেরে ফেলেন। কোরআনে এই “People of the Ditch” উপাখ্যানেএকটিআয়াতআছে।এই সময় একলোক ঐ স্থান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং সে রোমের রাজার কাছে আশ্রয় চান। রোমের রাজা ছিলেন ক্রিস্টিয়ান। তিনি এই তথ্য জেনে খুব রাগান্বিত হন এই জন্য যে, শুধুমাত্র ক্রিস্টিয়ান ধর্মে দিক্ষিত হওয়ার কারনে রাজা ঢু নুঅয়াজ এতগুলো লোককে মাটিতে পুতে মেরে ফেললেন?তিনি আবিসিনিয়ার রাজাকে চিঠি (তিনিও ক্রিস্টিয়ান ছিলেন) লিখেন যাতে তিনি রোমের সঙ্গে এক হয়ে ইয়েমেনকে আক্রমন করে প্রতিশোধ নেয়। তাই হল। আবিসিনিয়ার রাজা (আবিসিনিয়া বর্তমানে ইথিওপিয়া নামে পরিচিত) নাজাশি এবং রোমের রাজা একত্রে ইয়েমেন আক্রমন করার পরিকল্পনা করেন। এই কম্বাইন্ড যুদ্ধের জেনারেল ছিলেন রোমের জেনারেল আরিয়াত। আক্রমণ ঠেকাতে না পেরে ইয়েমেন হেরে যায় এবং রাজা ঢু নুঅয়াজ নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন।জেনারেল আরিয়াতের (রোম জেনারেল) দখলে চলে আসে ইয়েমেন। রোমের এই জেনারেল ছিল অত্যন্ত কঠিন লোক এবং তিনি ইয়েমেনের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলেন। কিন্তু আবিসিনিয়ার আরেক জেনারেল যিনি এই যুদ্ধে রোমের জেনারেল আরিয়াতের সঙ্গে যুদ্দ করেছেন তিনি জেনারেল আরিয়াতের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয়ে উঠেন, তার নাম আব্রাহা। তিনি রাজা নাজাশির লোক। পুরু সেনাবাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং প্রায় আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই আত্মঘাতী পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য জেনারেল আরিয়াত এবং জেনারেল আব্রাহা মল্য যুদ্ধে রাজি হন। শেষ পর্যন্ত আব্রাহা জয়ী হয়। কিন্তু রাজা নাজাশি তার জেনারেল আব্রাহার এই কর্মে খুশি হননি এবং নিজে আরও বেশি সেনাবাহিনী নিয়ে জেনারেল আব্রাহা উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।রাজা নাজাশি বার্তা পাঠালেন যে, যখন তিনি জেনারেল আব্রাহার সঙ্গে দেখা হবে, তখন তিনি তার মাথার চুল ছেটে দেবেন এবং ইয়েমেনের রাজা হওয়ার শখ তিনি মিটিয়ে দেবেন ইয়েমেনের মাটিতে তার মাথা পুতে। জেনারেল আব্রাহা ছিল খুব বুদ্ধিমান। তিনি এই খবর শুনে তিনি নিজেই আগে ভাগে তার মাথার চুল ছেটে ইয়েমেনের মাটি তার মাথায় মেখে একটি ছোট বার্তা পাঠালেন যে তিনি সব সময় রাজা নাজাশির অনুগত আছেন এবং তিনি যা বলবেন সেটাই চূড়ান্ত।এই বার্তায় রাজা নাজাশি খুব খুশি হলেন এবং রাজা নাজাশি জেনারেল আব্রাহাকে ইয়েমেনের শাসক বানিয়ে দিলেন। রাজা নাজাশিকে জেনারেল আব্রাহা খুশি করার জন্য নতুন শাসক জেনারেল আব্রাহা ঘোষণা করলেন যে, তিনি ইয়েমেনে রাজা নাজাশির নামে এক নতুন কাবা ঘর তৈরি করবেন (বহু বছর যাবত আমাদের এই কাবা ঘর ছিল সব ধর্মের কেন্দ্রস্থল এবং ব্যবসার কেন্দ্র)।  ইয়েমেনের নতুন রাজা জেনারেল আব্রাহা নতুন এক কাবা ঘর তৈরি করলেন এবং সব ধর্মের লোকদেরকে এই নতুন কাবা ঘরের মধ্যে তাদের উপাসনালয় স্থাপন করে দিলেন এবং এটা হয়ে উঠল ব্যবসার আরেক কেন্দ্রস্থল। এতে আরববাসি খুব খুশি হলেন না।

এই অখুশির জের ধরে এক আরব একদিন ঐ নতুন চার্চের ভিতরে পায়খানা করে তার প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করলেন। রাজা আব্রাহা এতে এতটাই ক্ষিপ্ত হলেন যে, তিনি আরবের পুরাতন কাবা ঘর ভেঙ্গে দেবার পরিকল্পনা করলেন। তিনি বিরাটকায় হাতিসমেত (এই হাতিগুলোর নাম ছিল “মামুদ”) পুরাতন কাবা শরীফ ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে মক্কায় রওয়ানা হলেন এবং কোন শক্তিই তাঁকে থামাতে পারছিল না। কিন্তু কাবা এলাকার কাছাকাছি এসে তিনি কাবাবাসির কাছ থেকে কোন প্রকার সাহায্য পেলেন না। এবং তিনি কাবার প্রকৃত লোকেশনও জানতেন না। শেষে তাইফের এক বাসিন্দার সাহায্য নিয়ে তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাইফের এই বাসিন্দার নাম ছিল আবু রজাল। তাঁকে নিয়ে যখন আব্রাহা মক্কার দিকে আসছিলেন, পথিমধ্যে আবু রজাল মারা যায় এবং তাঁকে মক্কা ও তাইফের মাঝামাঝি জায়গায় কবর দেয়া হয়। বর্তমানে যে কোন লোক যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে আবু রজালের ভাই বলে আরবে সম্বোধন করা হয়। আমাদের মিরজাফরের নামের মত।

যে কোন ভাবেই হোক, আব্রাহা মক্কার কাছাকাছি চলে আসেন এবং প্রায় ৬-৭ কিমি দূরে তিনি তার ক্যাম্প স্থাপন করেন রাত্রি যাপনের জন্য। এবং তিনি আদেশ দেন যে, তাদের খাবার মজুত করার জন্য মক্কার আশেপাশের যত হাস মুরগি, উঠ, গরু, ছাগল আছে তা হস্তগত কর। এই হস্তগত অপারেশনের জেরে আমাদের নবীর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ২০০ উঠও আব্রাহার বাহিনী ক্যাপচার করেন। আব্দুল মুত্তালিব তার ২০০ উঠ ফিরে পাবার জন্য আব্রাহার ক্যাম্পে যান।আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন দেখতে খুব সুন্দর, লম্বা এবং ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক। তাঁকে দেখে আব্রাহার মধ্যে একটা সম্মান দেখানোর মনোভাব তৈরি হল এবং আব্রাহা তার রাজ আসন থেকে নেমে এসে মাটিতে বসে আব্দুল মুত্তালিবের সঙ্গে কথা বললেন। আব্রহা জানতে চাইলেন কি কারনে আব্দুল মুত্তালিব তার কাছে এসেছে।আব্দুল মুত্তালিব বললেন যে, আব্রহার লোকজন তার ২০০ উঠ নিয়ে এসেছে, সেটা তিনি ফেরত চান। এটা শুনে আব্রহা খুবই অবাক হলে এই কারনে যে, এত ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে আব্দুল মুত্তালিব তার কাছে এসেছে? যেখানে এতলোক কাবাঘর রক্ষার প্রানপন চেষ্টা করছে আর সেখানে আব্দুল মুত্তালিব কাবা ঘর নিয়ে কোন প্রকার অনুরোধ বা সংশয় প্রকাশ না করে শুধুমাত্র তার ২০০ উঠের জন্য অনুরোধ করছে? আব্রহা আব্দুল মুত্তালিবকে বললেন, আমি খুব অবাক হচ্ছি যে, সবাই যেখানে কাবাঘর রক্ষায় মারা যাচ্ছে, সেখানে আব্দুল মুত্তালিব কাবাঘর রক্ষার কোন অনুরোধ করলেন না কেন? আব্দুল মুত্তালিব বললেন, আমি ২০০ উঠের মালিক, ঐ ২০০ উঠের নিরাপত্তা আমার উপর বর্তায়। আর কাবাঘরের মালিক “লর্ড” নিজে। লর্ড যদি তার কাবাঘর রক্ষা করতে না পারেন, আমার কি করার আছে? আব্রহা তার ২০০ উঠ ফেরত দিলেন এবং বললেন যে, সবাইকে বলে দিন, আগামিকাল আমি কাবা ঘর গুরিয়ে দেব, কেউ যেন আশেপাশে না থাকে।

আব্দুল মুত্তালিব তার ২০০ উঠ নিয়ে ফিরে এলেন এবং সবাইকে আব্রাহার ঘোষণা শুনিয়ে নিকটবর্তী পাহারে আশ্রয় নিলেন পরদিন কি হয় দেখার জন্য। পরদিন আব্রাহা তার হাতিগুলোকে কাবাঘরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন কিন্তু হাতি সামনের দিকে এক কদমও এগুলো না। সবদিকে হাতি যেতে পারছে কিন্তু কাবার দিকে অগ্রসর হতে চাইছিল না। অনেক চেষ্টা করার পরও যখন হাতি নরছিল না। তখন হাতিগুলোকে আব্রাহা পাথর দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল, তাতেও কোন কাজ হচ্ছিল না।দুপুরের দিকে হতাত করে আবাবিল পাখি মেঘের মত উরে এল, সবার দুই পায়ে দুইটা এবং ঠোটে একটা করে মাটির ঢিলা। এই তিনটা করে মাটির ঢিলায় সমস্ত হাতি এবং সৈন্য সামন্ত পরজদুস্থ হয়ে উঠল। শুধু তাই নয়, তারপর শুরু হল বৃষ্টি। মাটি গলে গিয়ে সবাই কাদামাটিতে পুতে গেল এবং তারা আর ওইখান থেকে ফিরে আসতে পারেনি। আব্রাহাসহ সব বাহিনী মারা যায়। আমাদের নবী যখন মাতৃগর্ভে দুই মাসের বয়স, তখন এই ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে মিনায় যাওয়ার পথে এই জায়গাটা পড়ে এবং একে অভিশপ্ত জায়গা বলে উল্লেখ করা হয়। সাধারনত কেউ ঐ জায়গা দিয়ে যাতায়ত করতে চায় না। আর অগত্যা করলেও খুব ভয়ে এবং ঘৃণায় যায়। ঠিক এর পরেই ইয়ামেনকে দখল করে পার্সিয়ানরা। 

মদিনা থেকে ৩০ তারিখে আমরা মক্কায় চলে গেলাম। ঐ রাতেই আমি ওমরা শেষ করেছি। মদিনা থেকে এহরাম বেঁধে নিয়েছিলাম।  আমি খুব ভাগ্যবান যে আমার হোটেলটি ছিল, সেটা মক্কার সঙ্গে একদম লাগোয়া। মানে আমার রুম থেকেও মক্কার জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা যায়। হোটেল জমজম। আমার রুম থেকে কাবার ঘর সরাসরি দেখা যেত। এরজন্য আমাকে একটু বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমি খুব আনন্দে ছিলাম এই জন্য যে, হারাম ভিউ পেয়ে।খুব বেশি নড়াচড়া করিনি, সবগুলো নামাজ মক্কা শরিফে গিয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। মোট পাঁচ বার ওমরা করেছি এই সময়ে। আর প্রতিদিন কয়েকবার করে তাওয়াফ করেছি পবিত্র কাবাঘরকে। মন ভরে এবাদত করেছি যতক্ষন মন চেয়েছে। সবার জন্য দোয়া করেছি।

একদিন শুধু বের হয়েছিলাম মক্কায় বিখ্যাত ইসলামিক জায়গাগুলো দেখার জন্য। তার মধ্যে ছিল আরাফার ময়দান, মুজদালিফা, মিনা, তায়েফ শহর, হেরা গুহা। ইত্যাদি। তায়েফ শহরে গিয়ে আমি ঐ জায়গাগুলো দেখার চেষ্টা করেছি যেখানে ঐ বুড়ি যিনি আমাদের নবীর পথে কাটা বিছিয়ে রাখতেন, ঐ মসজিদ যেখানে আমাদের নবীকে আহত হতে হয়েছিল।

তায়েফের ঘটনা আমরা সবাই হয়ত জানি। সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন আমাদের নবী এই তায়েফ শহরে ইসলামকে প্রচার করতে গিয়ে। তার সঙ্গে তার পালক পুত্র জাইদ (রাঃ) ছিলেন তায়েফে ইসলাম প্রচারের জন্য। তায়েফের লোকজন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিলেন আমাদের নবীকে। তার সাড়া শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, তার দন্ত মোবারক শহিদ হয়েছিল এই তায়েফে। তার কষ্ট দেখে জিব্রাইল (আঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি শুধু প্রকাশ করেন এবং অনুমতি দিন, আমি আল্লাহর কাছ থেকে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছি, আপনার অনুমতি পেলে আমি নিমিষের মধ্যে এই তায়েফের লোকজনসহ তায়েফ নগরীকে ধ্বংস করে দেই। তখন আমাদের নবী জিব্রাইলকে বলেছিলেন, যদি সব মানুষদেরকে ধংশই করে দেই, তাহলে আল্লাহকে এবাদত করবে কে? একদিন এই তায়েফ নগরির সব মানুষ ইসলাম গ্রহন করবে। তায়েফ শহরটি খুব সুন্দর এবং সত্যি দেখার মত। পাহাড়ের উপরে একটা চমৎকার শহর। 

মক্কায় অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া (কবর স্থান) দেখলাম। হজ্জের সময় খুব ভাল করে দেখার সুযোগ হয় নাই। এখন বর্তমানে অনেক কিছু পরিবর্তন এসেছে। মহিলাদের যাওয়ার সুযোগ নাই। কবর গুলোর ব্যাপারে কিছু বলি।

এখানে যাদের কবর দেওয়া হয় তাদের জন্য আগে থেকেই ইটের কবর বানানো আছে। প্রতি ওয়াক্তেই দাফন করার কাজ চলে। আমি যেটা শুনেছি যে, এক তা কবর প্রায় এক বছর পর্যন্ত ইন ট্যাক্ট অবস্থায় রাখা হয়। পরের বছর ঐ কবরটা আবার খোলা হয়। যদি কোন লাশ অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তাহলে ঐ কবরটা একেবারে শিল্ড করে দেওয়া হয়, ঐ কবরের মধ্যে আর কোন লাশ দাফন করা হয় না। ধরে নেওয়া হয় তিনি শহিদ বা তাঁকে আর কোন ডিস্টারবড করা যাবে না। আর যেগুলো তে লাশ পচে যায়, শুধু সেগুলো তে আবার নতুন লাশ দাফন করা হয়। এই ভাবে অনেক কবর এক দম বন্ধ করে দেওয়া হয়ে গেছে।  আমি কয়েক্তা ছবি দেখাই। তাহলে বুঝতে পারবে। কোন কবরের কোন প্রকার ডেকোরেশন নাই।

৮ তারিখে আমরা ঢাকায় ফিরে আসার জন্য জেদ্দায় রওয়ানা হলাম। দুপুরের দিকে জেদ্দায় আমার এক বন্ধুর বাড়িতে উঠলাম। সে খুব সাদরে আমাদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখাল তার গাড়ি দিয়ে। তাঁকে আমি আগে থেকে চিনতাম না। ঢাকার উত্তরার মসজিদের খতীব জনাব মামুন সাহেবের পরিচিত। আমাদেরকে ঐ ভদ্র লোক তার নিজের গাড়ি পাঠিয়ে মক্কা থেকে নিয়ে গেলেন। তিনি বিন লাদেন কোম্পানির একজন এনলিস্টেড কনট্রাক্টর ইঞ্জিনিয়ার।অনেক জায়গা দেখালেন। শেষমেশ নিয়ে গেলেন মা হাওয়ার কবর স্থানে। বিশাল একটা কবরস্থান।খুব ভাল লাগলো দেখে। জেদ্দায় যেখানে শিরচ্ছেদ করা হয় কোন আসামির, সেই মসজিদে নিয়ে গেলেন এবং যেখানে শিরচ্ছেদ করানো হয় সেই জায়গাটা দেখালেন। ভয় লাগছিল ভাবতে। প্রতি শুক্রবারে এই স্থানে কোন আসামিদের শিরচ্ছেদ করার রেওয়াজ আছে এখানে এবং প্রকাশ্যে।

রাত ৩;৪৫ মিনিটে আমরা এয়ারপোর্ট আসলাম এবং তারপর ঢাকায়। আলহামদুলিল্লাহ।    

১২/১১/২০১৪-লুতফর আমার বন্ধু

বৃহস্পতিবার, গোলারটেক, মিরপুর

গত তিন চার দিন আগে আমার ক্যাডেট কলেজের এক বন্ধুর জন্মদিন ছিল। ওর নাম লুতফর রহমান। আজকাল মেইল থাকার কারনে কেউ আর জন্মদিনের কার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানায় না, মেইল বা এসএমএস দিয়েই কাজটা শেষ করে ফেলে। অত্যাধুনিক সিস্টেম। কুলজাত দুটুই রক্ষা হয়। কুলজাত দুটুই রক্ষা হলেও বন্ধুত্তের মাঝে এই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে আগের মত আর আবেগের স্থানটুকু থাকে না। কেউ ফিরতি একই ম্যাসেজ দিয়ে দায়িত্তটা পালন করে বড় একখান থ্যাংস জানিয়ে এমন একটা ভাব প্রকাশ করে যেন না জানি কত খুশি হয়েছি। যাক সে কথা, যুগ পাল্টেছে, যুগ আরও পাল্টাবে, ভবিষ্যতে আরও কি হবে তা আর গবেষণার প্রয়োজন বোধ করি না আমার এই লিখার ভিতরে। কিন্তু লুতফরের জন্মদিনে ওকে মেইল করলেও ও আর এগুলোর ধার ধারে না। ও মেইল খুলে না, মেইল পাঠায় না, মেইল পরেও না। ও আর জন্মদিনই পালন করে না। ও পালন করে মৃত্যু দিন। ও হয়ত তাও করে না।

বিডিয়ারের সেই ভয়াবহ এক নৃশংস হত্যাকান্ডে ওর মধ্যবয়সী জীবনটা বলি দিতে হয়েছে। সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখ ২০০৯ সাল। আমি যথারীতি অন্যান্য দিনের মত মাত্র ফ্যাক্টরিতে এসেছি। অন্যান্য দিনের মত আমার পিওন এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে বলল, “স্যার, আজকে কি আপনার মেহমান দুপুরে খাবে নাকি সন্ধ্যায় নাস্তা খাবে, কোনটা?” আমি কিছুটা কনফার্ম না করেই বললাম, “দুটুই মাথায় রাখ”  আসলে মেজর হায়দার আমার এখানে আসবে, আজ ওদের দরবার আছে, দরবার শেষ করেই হয়ত আমার এখানে আসার কথা। 

সকাল নয়টার দিকে আমার আরেক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানতে চাইল পিলখানায় বিডিআর হেডকোয়ার্টসের ভিতর কিছু হচ্ছে নাকি? ব্যাপারটা আমারও জানা ছিল না। আমি জেনে জানাচ্ছি বলে ফোন কেটে দিয়ে অনেককেই ফোন করলাম। কিন্তু কারো কোন ফোনের মধ্যে ঢোকতে পারছিলাম না। লুতফরকে ফোন করলাম, আবতাবকে ফোন করলাম, না পেয়ে ১৯ লং কোর্সের মেজর হায়দারকেই ফোন করলাম, কারো ফোনই খোলা নাই। একটু অবাক হচ্ছিলা, আবার একটু শঙ্কিতও হচ্ছিলাম। কাউকে না পেয়ে আবার আমি আমার ঐ বন্ধুকেই ফোন করলাম যে একটু আগে আমাকে ফোন করেছিল। ওকেই জিগ্যেস করলাম, আসলে কি শুনেছে ও। ও যা বলল, তাতে আমার একটুও ভাল লাগলো না বরং একটা সাংঘাতিক শঙ্কায় পরে গেলাম। বিডিআর পিলখানায় নাকি সৈনিক আর অফিসারদের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। একি কথা!! কি করে সম্ভব এটা? মাঝে মাঝে যে কি হয় মানুষগুলোর, কি কারনে যে হটাত করে সব ভেঙ্গেচুরে তছনছ করে একে অপরের উপর এমন আচরন করে যে, গতকাল যে মানুষটির সঙ্গে এক সাথে চা খাওয়া হয়েছিল, যার সঙ্গে এক বিছানায় বসে গল্প করা হয়েছিল, যে তাঁর নিজের সুখের বা দুঃখের কতই না কথা একে অপরের কাছে অকপটে ভাগীদার করেছিল, সে আজ কেন বা কি কারনে একেবারে অচেনা হয়ে হিংস্র বাঘের মত, উম্মাদ সিংহির ন্যায় উম্মত্ত আচরনে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়ে একে অপরের প্রান নিতেও অনুশচনা করছে না। মানুষ এমনি এক প্রানি যার পাশে একটা মাত্র “অ” যোগ করলেই তাঁর আমুল সব চরিত্র বদল হয়ে যায়। সে আর মানুষ থাকে না, হয়ে উঠে “অমানুষ” যার সংজ্ঞা প্রানিকুলের কারো কাছেই নাই।

বিডিআর এর হেডকোয়ার্টার এর ভিতর সৈনিক বনাম অফিসারের মধ্যে প্রানঘাতি সংঘাত হচ্ছে বলে টিভির স্ক্রলে দেখাচ্ছে কিন্তু কি হচ্ছে, কার কি অবস্থা, তাঁর কেউ সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারছে না। সবাই তো স্বসস্ত্র, সবাই তো ট্রেনিংপ্রাপ্ত। আমার খুব টেন্সন হতে লাগলো। এই তো গত ২৩ তারিখে আমি বিডিআর এর ভিতরে গিয়েছিলাম। দেখা হয়েছে লুতফরের সঙ্গে। ওর অফিসে চা খেলাম, গল্প করলাম। আমি গরম গরম পুড়ি পছন্দ করি, তাই কোথা থেকে যে ঐ অবেলায় পুড়ি নিয়ে এলো, ভাবাই যায় না। লুতফরের ভবিষ্যতের কত প্ল্যান শুনলাম। সঙ্গে মেজর হায়দার ছিল। এই ছেলেটি কখনো আমাকে স্যার বলত না। বলত “বড়দা”। এক সঙ্গে ৭ ফিল্ড রেজিমেন্টে কাজ করেছি প্রায় দুই বছরের বেশি। সাভারে থাকাকালীন আমি ৬ ফিল্ডে আর হায়দার ১৫ ফিল্ডে। সিনিয়রদের সঙ্গে ন্যায় অন্যায় নিয়ে তর্কের কোন শেষ ছিল না তাঁর। কিন্তু জুনিয়রদের বেলায় ঠিক আমার মতই উদার, সেই উদারতার কোন শেষ লিমিট ছিল বলে আমার জানা ছিল না। গল্পের টেবিলে হায়দার আমাকে বলল, “বড়দা, এই পাসিং আউট প্যারেড শেষ হলেই আমার চাকুরির জীবন ইতি করবো, অফিসে আমার জন্য একখান চেয়ার রাখবেন।” আমি এই ছেলেটাকে যা বলতাম, কোন প্রশ্ন ছাড়া, কোন তর্ক ছাড়া, কোন লজিক ছাড়া মানতে কখনো দিধাবোধ করত না। আমার বড় প্রিয় একজন অফিসার ছিল এই হায়দার। আমাদের আর্ট টিচার শুজা হায়দার স্যারের ছেলে।

সারাদিন খুব টেনশনে থাকছি আর ক্ষনেক্ষনে এখানে সেখানে ফোন করছি জানার জন্য কোথায় কি হচ্ছে। শুনলাম, বিডিআর এর ভিতর সৈনিকেরা অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। অনেক অফিসারদেরকে নাকি জিম্মি করে তাঁদের পরিবারের উপর নির্যাতন করছে। কোন কিছুই ভাল লাগছিল না। দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পেলাম। মেজর হায়দারের ফোন থেকে। ”স্যার, মাফ কইরা দিয়েন”। আমার সারা শরীর একটা কাপুনি দিয়ে উঠল। আমি যেন কিছুই পরতে পারলাম না। কি লিখেছে হায়দার? ও কি বলতে চেয়েছে? আমি ফোনব্যাক করলাম। কোন রিস্পন্স পেলাম না, ফোনটা বন্ধ আবারও। বড় অসহায় মনে হল আমাকে। কোথায় যেন একটা ভীষণ ব্যাথা অনুভব করছি। কাকে বলব? কি বলব? কেউ তো কিছুই বলতে পারছে না। এই টেনশনের মধ্যেই আমি আমার অফিসিয়াল কাজের জন্য সেই গাজীপুর আছি। প্রায় রাত হতে যাচ্ছে। কোন খবর পাচ্ছি না।

হায়দারের প্রসংগটা পরে আসি। যা বলছিলাম তা হচ্ছে লুতফরের জন্মদিনের মেইল। আমার এক বন্ধু তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে একটা মেইল করেছে, “লুতফর, আমি জানি তুমি ভাল আছ, ঈশ্বরের কাছে আছ, তারপরেও আজ তোমার এই জন্মদিনে তোমাকে জানাই একরাশ শুভেচ্ছা। ভাল থেক। আমরা সবাই ভাল আছি।” লুতফর আদৌ এই মেইলটা পরার আর কোন সুযোগ বা অবকাশ আছে কিনা আমার জানা নাই তবে ওর জন্মদিনে আমারও খুব ওকে শুভেচ্ছা জানাতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু সেটা হবে নিতান্তই একটা লেখা, ও ওটা পরার কোন অবকাশ আর নাই।

জীবন যখন বিদ্রোহি মৃত্যুর কাছে পরাজয় বরন করে, তখন স্বপ্ন গুলি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠে না। তাদের কবর রচিত হয় সেই অপ মৃত্যুর সাথে যা কেউ কখনো ভাবে নাই, বা কোনো হোমওয়ার্কও করে নাই। আমরা সবসময় হোম ওয়ার্ক ছাড়াই দিন শুরু করি।

১১/০৫/২০১৪-হাসনাবাদ, ইকুরিয়া

অনেকদিন পর আবার একটু ডায়েরি লিখতে ইচ্ছে হল। এই অভ্যাসটা আমার এক কালে ছিল এবং প্রায়ই ডায়েরি লিখতাম। কিন্তু ইদানিং কাজের চাপে, কম্পিউটার যুগে আর ঘটা করে ডায়েরি লিখা হয় না।

আজ সারাদিন মোটামোটি বেকারের মত দিনটা কাটাচ্ছি। কাজ আছে কিন্তু ঐ রকম প্রেসার নেই। খবরের কাগজ বাসায় ও পরেছি আবার অফিসে এসে অন্য একটি খবরের কাগজও পড়লাম। সামনে অডিট, অনেকগুলো অডিট। কুয়ালিটি অডিট, ACCORD এর অডিট, আবার SGS অডিট। কোনটাই কারো থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আজ মুর্তজা ভাই অফিসে আসেন নাই। ওনি এলে কথাবার্তা বলা যায়, আবার অনেক কাজও হয়। একা একা আসলে কাজে মন জুড়ে না। মুর্তজা ভাই ইদানিং শারীরিক ভাবে একটু অসুস্থ থাকছেন প্রায়ই। এটা ভাল লক্ষন নয়। তবে খুব গুরুতর কিছু না মনে হয় ইনশাল্লাহ, ঠিক হয়ে যাবে।

লাক্সমা নিয়ে একটু ঝামেলায় আছেন, আমরা আবার রিভার সাইড নিয়েও বেশ ঝামেলায় আছি। আমার সবচেয়ে বেশী চিন্তা হয় লাক্সমাকে নিয়ে। মুর্তজা ভাই যাদের কে নিয়ে লাক্সমায় ব্যবসা করেছিলেন, তিনি হয়ত তাদেরকে পূর্বে ভাল করে স্টাডি করতে পারেন নি, এখন টার বুঝার কোন বাকী নেই কখন একজন মানুষ হটাত করে অমানুষ হয়ে যেতে পারে। আমি সর্বাত্মক চেস্টা করছি যেন, মুর্তজা ভাই এই অনাকাঙ্ঘিত সমস্যা থেকে দ্রুত রেহাই পান।     

০৩/০৯/২০১৩-মাসুদ এবং রিমুনাকে লিখা চিঠি

Dear Masud and Rimona

It was indeed a great time for me and my family to have you within us even for a short time. We thank Almighty that we had the blessings to have kid like you in our family who gave us peace in mind with your good gestures and attitudes. Definitely it was a nice and remarkable tour that you presented us. In fact, after all this hassle and many disturbances in your present tour in Bangladesh, I will like to address it as a big lessons both for you and us. Let this mail be read by your great mom and Dad whom I always wanted as part of my souls and in deed they are.

Masud, this mail is very important to let you know about yourself from me and as well as from my family though I didn’t talk to other members while writing this mail on behalf of them. But I know if they read my mail, they will never accuse me about what I posses inside me. Before I write you anything, let me write something about my own experiences in my life.

I told you that after I married your aunty, literally I broke up with whole of my family and it was the most crucial event in my life because in one side I was loving them and in another side I was unable to let your aunty go away from my life. It was a state of anxiety both in mental and physical. I didn’t know if I am taking the right decision. I wasn’t sure if I was in the right path. Constantly I was monitoring myself both from a perspective of Major Akhtar and from the perspective of non-Major Akhtar.

I clearly understood that many people love me for many reasons, and not only for beauty or anything. Some loved me fearing God, someone loved me as I was a good person, someone loved me because I help them, and some one loved me because I was a loveable person. All these loves were no meaning to me except the love I always wanted from your Dad and from my family. Still I had the prayer for them to God that I get back the love from them. It took almost 25 years time to understand that they truly loved me even they never expressed it open. I have no confusion now about their loves and sympathy. But within these time frame, I learnt something. , my life had changed; I learnt growing experience for me. It posed as opportunity for learning and growing coz I learned to do things by myself. I learned to have fun by myself. I discovered things I like doing and ways I could be of help to others. And I had been able to distinguish my priorities. The most wonderful thing that happened was that I learned how to be a whole person. I was able to find meaning in life. I learned my lessons well and I believed that when we’ve learned our lessons well, we moved on to higher or more advanced stages of development. Those events lead me to where I am now. But I was never a complete man without a family where there is a brother for whom I am here, there are sisters for whom I grew well, there is a village from where I stood up. After all this, I felt truly alone. Even many are beside me but still I was alone. A surge of fear gripped me. I was scared to be alone because I was used always to of having them around me all the way, in dreams, in thoughts, in imagination and what not. I didn’t know how I would be able to cope life without them. I didn’t know what life would be without them especially my mother and your dad and his family where you were also a part, Yusuf is also a part.  I felt like something had been torn from me, like I was no longer whole because I always found my other half when I was with my family. I was hurting so bad. But I had faced the reality knowing that I will, possibly, never again share a joke with them, ask a question only that they can answer, talk to then, be with them or even make loving smile with them. I had faced those things in order to survive and cope life even if it was utterly heart-wrenching.

Through that event, I realized that life is unstable. That life is unsure because I never thought I would be able to survive and cope. I never thought I would be able to overcome that crisis. I never thought that it would lead me to where I am now. It made me aware that I am not in control of all the situations in life. It made me realized that I am capable of being hurt. I was able to understand that life does not totally consist of happiness and unhappiness. Life is unfair as they say because I realized that the more I try to be happy, the more it eludes me. I realized that life is really uncertain; we’ll never know what will happen next. It leads me to a realization to the confrontation of fundamental problem of human existence in a way that I had been able to survive the crisis in the event of my life. I had been able to surpass the critical points because I was determined, strong-willed and had strong faith in God to re-direct my life. I had been able to confront the need of power to defend my life’s purposes because I was able to change my life. It brought new meaning to my life. I realized that there was more meaning to it than just a mere experience of hurt and pain.

You know Masud?  The ultimate measure of a man is not where he stands in moments of comfort and convenience, but where he stands at times of challenge and controversy. It’s easy to say sorry for what we have done. It’s also easy to forgive and forget, but one thing will never be easy, is to trust again after the disappointment. I learnt that happiness comes to those who give love freely and who don’t demand that others love them first. It’s like the sun that is just generous which shine without asking first whether people deserve their warmth or not. I got it from your dad and Mom. They are like Sun and give people lights the way they gave you everything you and me needed even we didn’t know their hearts and their pains but they did their parts.

The definition of love is so varieties and so much big in horizon that many things can be derived from single word “LOVE”. Great love can make a weak man strong. True love can make a brave man fall to his knees. But if I like to define its opposite side, it has tremendous set back also. Failure in Great Love can make strong man weak and brave man as apathy in life. No one is important to him then. In such dismissal courses I learnt Masud that LIFE in this world is the hardest course we could ever take and we need someone or bunches of people who loves us unconditionally without any returns. Its hard to judge them always but they are there. Its our responsibility to find them in right time. And most sad part is that to judge and find them is not easy when we are emotional or outraged. But it is always there. Frankly speaking Masud, it could only be taken once. No review, no masteral, no doctorate. We don’t have any other DEAN or GOD to find them but heart and soul. And once we have graduated from this school, we are done and gone. Only eternity can tell our rating: PASSED or FAILED. So I will advice you to judge them correctly and also advice you to live each day as if it’s your baccalaureate service, because in this course we’ll never know the exact date of our closing ceremony. There were hundreds of YESTERDAYS that passed and more TOMORROWS still to come but there’s only one TODAY to enjoy. I always live for TODAY Masud and I will advice you to live for only TODAY with whom you are always missing out. You must figure it out whom we miss constantly and truly. I always miss your dad though he is the only person with whom I can be an arrogant and also submissive. I am thankful to Almighty to have your Dad and Mom in my life.

You know Masud? Any relationship apart from what God had planned for us is like the beautiful horizon. It may appear that the sea and the sky meet at some point but we know they are not. You think you are meant for each other only to find out that you are not and you will never be. It is nothing but a mere appearance of an illusion–beautiful yet deceiving… That’s how now I take this relationship Masud. Its like if you paint a good painting, others will enjoy looking at it, but you in painting it, will have learned how to paint. I am just painting everything in my imagination and I have all the choices how I wanna see them and paint. Everything is a trial where a trial can be a success or a failure both. But remember Masud, trials are not reasons to give up or live with, but a challenge to improvement or rejects. Life at times are like a mountain. You know Masud? Mountains aren’t easy to climb, but the view from the top is usually the best. I am not mountain or you but within our altitudes of attitudes, we both are like a mountain. A mountain never climbs another mountain, they stay side by side and never meet unless someone bridges them in between. May be your Dad is that bridge where we are both connected. I always consider and ponder to see as a fresh beginning for everthing. Why go on thinking about what had happened, or about what we did yesterday? Life is a river, flowing constantly onward. No drop of it will ever pass the same bridge twice. Now is your chance to do things in new ways, better than ever before. I am doing my best. We always look at our scars as ugly marks. But sometimes, let’s try to consider it as a nice thing, as a symbol that something painful in the past had been healed. Do you understand what I meant all through Masud? To be more clear about what I want to mean is that always remember that two things we define our successful life, the way we manage when we have nothing and the way we behave when we have everything. I appreciate your dad when he managed everything well when he had nothing but its your or my turn to manage things well when we have everything ready-made.

Let me cut a joke at the end to flare a smile in your lips, eyes and motions.

There were two friends from Philippines and China. But the Philippines man never speaks Chinese and the Chinese man never speaks English or tagalong. But they were very good friends indeed. With their body language, they could express many feelings. At one time, the Chinese friend got sick and the Phil man went to see him. When the Phil man saw the Chinese friend, he found his condition was really bad with oxygen tube in his nose, many needles in his body and with life support. The Phil friend sat beside the Chinese friend when the Chinese friend was in hospital with such a disastrous condition of health. Suddenly the Chinese friend told him, “ “Li kay wang ki guan” and died. The Phil friend didn’t understand what the Chinese friend meant. So the Phil friend tried to find out actually what his best friend Chinese man wanted to mean. After many years, the Phil friend found another Chinese man and wanted to know what his BEST friend told him before he died. The new Chinese man translated that his friend told him, “Please you are seating on my oxygen tube and I cant breath, Remove yourself from the tube.”

So let we understand our minds and body languages of the family where we all are the BEST friends of everyone. I miss you Masud and I felt truly sad when you left Bangladesh. I am not your biological father but I know you are just like my son masud. My family thinks you are my next kin and you have lots of responsibilities to perform in absence of me and your dad. You are our boy no matter who loves you more but we love you more than anything and without any conditions Masud.

Keep always link and make two steps forward towards the bed where you had lots of memories you left that you will never remember because you were so small to remember those times.

Akhtar

প্রিয় মাসুদ এবং রিমুনা

এটা আমার জন্য খুব ই ভালো সময় ছিল যখন থেকে তোমরা অল্প সময়ের জন্য হলেও বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলে এবং আমাদের সাথে সময় কাটিয়েছো। মহান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যে তিনি তোমাদের মতো বাচ্চাদেরকে আমাদের পরিবারে ব্লেসিং হিসাবে দিয়েছেন। তোমার এই অল্প সময়ের সান্নিধ্য টা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ছিলো। তবে, এই অল্প সময়ের ভ্রমনের উপর ভিত্তি করেই আজকে …

(চলবে)

১০/০৫/২০১৩-এ জার্নী বাই কার চ্যাটিং ঊইথ বকসি ভাই… 

“এ জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা“।

তাহলে আমার জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা লিখে ফেলি. এই মাত্র পাসপোর্ট অফিস ক্রস করলাম, খুব একটা জ্যাম মনে হচ্ছে না। রাস্তা ফাকা ফাকা মনে হচ্ছে। রাস্তা ফাকা ফাকা দেখলে আবার মাঝে মাঝে ভয় করে, এমন ফাকা ক্যান? হরতাল মরতাল নাই তো? অথবা সামনে কোন অঘটন>?ফৌজি মানুষ তো!! বেশি ভয় পাই। সাধারন পাবলিকের একটা ভুল ধারনা আছে, সবাই ফৌজকে খুব সাহসি মনে করলেও আসলে ফৌজ কিন্তু খুব ভিতু। এই গোপন রহস্যটা জানে খালি ফৌজ নিজে আর কেউ না। যাক, এখন একটু জ্যাম দেখতে পাচ্ছি, মনে শান্তি লাগলো, কোন হরতাল মরতাল নাই মনে হয়। গুড। অন্তত হরতালের থেকে জ্যাম ভাল। আমার পাশে একটা ছোট এক্স করলা গাড়ী দারিয়ে আছে। জ্যাম সবাইকে দারাতেই হবে। ভিতরে একটা অবুঝ এক দেড় বছরের বাচ্চা। একটু একটু দারাতে পারে মনে হয়। গারির বাইরে উকি ঝুকি দিচ্ছে।খুব সুন্দর তার আচরন। মনে হয় সব কিছুতেই তার চিত্তাকর্ষণ। কিছুই বুঝে না। আর কি যে বুঝতে চাচ্ছে তাও বুঝে না। ওর মা মাঝে মাঝে কোন কারন ছারাই একটা করে চুমু দিচ্ছে। ব্যাপারটা মজার। একটু হাত নাড়বো নাকি? বাহ, ভালই তো। হেসে দিল। একখান দাতও উঠে নাই। ছোট বাচ্চাদের দন্ত বিহিন হাসি খুব মজার কিন্তু বুড়াদের দন্ত বিহিন হাসি অন্য রকম। বাহ বাচ্চাটা আমার হাত নারাতে মনে হয় একটা খেলনা পেয়ে গেল, ও কিন্তু আমারে চিনে না। কিন্তু ভাবখানা এই রকম, আমি আরও অনেক দিনের চেনা। কেন যে আমরা বাচ্চাদের মত হই না। আহারে জ্যামটা কেটে গেল। একটানে চলে এলাম  র‍্যাংস। আমি প্রাইম মিনিস্টার অফিসের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাব কারন এই রেংসের ভিরটা অনেকক্ষন ধরে রাখে পুলিস। পুলিশ তো আর মানুষ না। ওরা বুঝে না কোনটা মানুষের গাড়ী আর কোনটা প্রাইম মিনিস্টারের গাড়ী। ওরা খালি বুঝে প্রাইম মিনিস্টারের পথ ক্লিয়ার রাখতে হবে সে যেই যাক। আমার সামনে একটা লেগুনা। প্রায় সবগুলো পুরুষ মানুষ, একজনকে দেখা যাচ্ছে মহিলা। বেচারির অনেক অসুবিধা হচ্ছে বলে আমার ধারনা, আর সব পুরুষ গুলো কিন্তু সবাই এখন মনে মনে নিজেকে রুমিও ভাবতাছে। এই মুহূর্তে কোন গারমেন্টের কর্মীকে রাস্তায় পাওয়া যাবে না। এটা তোমার ভুল।

তুমি সময় মত অফিস কর আর না কর, প্রাইম মিনিস্টার সময় মত অফিস করুক আর নাই করুক, ওরা সময় মত অফিসে যায়।পার হয়ে গেলাম সে বিখ্যাত রেংস। আমি এখন ফার্ম গেটের পুলিস ফারির সামনে। সমরেশ পুলিস আমার পাশে ডিউটি করছে ট্রাফিকের। চোখে একটা নকল রেবনের সানগ্লাস। এখন আমি আনন্দ সিনেমার বরাবর। আসতে আসতে গাড়ীর গতি থেমে গেল। সামনে অনেক হাইলাক্স, পাজেরো, নুহা গাড়ী। আমি এখন ঠিক তেজগাও সরকার বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে।ডানে একটা মিল্ক ভিটার জরুরি শিশু খাদ্য নিয়ে বিপাকে পরেছে মনে হয়। কারন ড্রাইভার ঘন ঘন বিরি ফুকছে। তার ঠিক পিছনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ী। নিশ্চয়ই চারিদিকে গন্ধ ছরাচ্ছে। আশপাশে লোক জনের নাকে ধরা দেখে মনে হয় তাই। অসুবিধা নাই, আমরা এই গন্ধে অভ্যস্ত। গন্ধের শহর ঢাকা শহর। ঢাকা শহরের অনেক বৈশিষ্ট আছে যেমন, গন্ধের শহর ঢাকা শহর, রিক্সার শহর ঢাকা শহর, জ্যামের শহর ঢাকা শহর, ইয়াবার শহর ঢাকা শহর। ১০০% স্বাধীনতার সহর ঢাকা শহর (এখানে যার যা খুশি করতে পারে, কোন আইন মানার দরকার নাই, বাম লেন বন্ধ করলে ট্রাফিক পুলিস ধরে না, উলটা পথ দিয়ে গাড়ী এলে কেউ কিছু বলে না ইত্যাদি)। ঢাকা শহরে অনেক ভবন আছে যারা এক কালে প্রাচ্যর সভ্যতার মত সভ্য কালচার গুলোর যেমন সাক্ষী আবার এই যুগে এসে আধুনিক আইন না মানা যুগেরও সাক্ষী। ভবনের ইটেরা কথা বলে না। তাই অনেক ইতিহাস আমাদের জানা হয় না। যেমন ধর, হোটেল সুপার স্টার (যার পাশে আমি এখন দারিয়ে আছি) ৫০ বছর আগে নিশ্চয়ই এখানে এই হোটেলটা ছিল না। হয়ত বা ডাহুকের পদচরন ছিল এখানে। সেই ডাহুকের হয়তা বা মৃত্যু হয়েছে আরও ৪০ বছর আগে, তার সন্তান সন্ততিরা ইচ্ছে করলেই আর তাদের দাদা নানা দেড় এই জায়গায় পুনর্মিলনের কোন সুযুগ নাই, কারন এখানে এখন কপোত কপোতীর মত জুগল মানব বসে সুপার স্টার হোটেলে সময় কাটাচ্ছে।কিংবা ধর, TK ভবন (যার পাশে এখন আমি দারিয়ে) এটা নিশ্চয়ই ১০০ বছর আগে ছিল না। অথবা আজ থেকে আরও ২০০ বছর পর এটা থাকবেও না। সময় শুধু বয়ে যায়, কি থাকবে আর কি থাকবে না, সময় শুধু বলে দেবে। সময়টা এমন এক অদ্ভুত জিনিস কোথায় যেন পরেছিলাম যে, এটা সবার সঙ্গে হাটে কিন্তু সে কারো বন্ধু নয়। সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না, তুমি তার সঙ্গে যাবে কি যাবে না, তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সময়ের পিতার নাম সময়, মাতার নাম সময়, সন্তানের নাম ও সময়। এ এক অদ্ভুত পরিবার। তার কোন দিক জ্ঞ্যান নাই, তার কোন বংশ পরিচয় নাই, তার না আছে ক্লান্তি, না আছে অবসর, সে শুধু চলেই যায়, শুধু রেখে যায় কিছু ফুট প্রিন্ট। কেউ তার থেকে কিছু শিখে আবার কেউ এর তোয়াক্কাও করা না। যেমন এই মুহূর্তে আমি কিছু ফুট প্রিন্ট রেখে গেলাম।

আমি এহন হোটেল সোনারগাঁও। এর কত যে ইতিহাস আছে ভিতরে ভিতরে কে জানে। কত মানুষের আশা, হতাশা, সম্ভ্রম, কষ্ট, কত কিছুই না এর ভিতরে জমা হয়ে আছে কে জানে!! কারো কারো ইতিহাস এখান থেকে হয়ত রচনা হয়েছে আবার কারো কারো ইতিহাস এখানেই শেষ হয়ে গেছে। কেউ হয়ত এর পাশ দিয়ে যাবার সময় মুচকি মুচকি হাসে আবার কেউ হয়ত চোখের পানি ফেলে। কিন্তু এই ভবন যে নামেই ডাকা হোক, সাক্ষী সে রয়েই যাবে।আমি এখন প্রধান বিচাপতির বাস ভবনের সামনে । একে বাসভবন না বলে সরাইখানা বললেই যেন ভাল হত।কত বিচারপতি এখানে থেকেছেন, কত বিচারপতিগন আবার এখানে থাকবেন, তার কোন ইয়ত্তা নাই। এই সরাইখানা এমন জিনিস যখন যে আসে সবাই একে নিজের মনে করলে ও এটা তার নয়। তাকে একদিন না একদিন ছেরে যেতেই হবে। কেউ সেটিছফেক সন নিয়ে বের হয় আবার কেউ বের হয় নেক্কার জনক ভাবে। বিচার পতিদের কে নাকি আল্লাহ দুই বার বিচার করবে, আল্লাহ কি করবেন এটা অবশ্য বিচার পতিরা ভাবেন না। তারা ভাবেন, প্রাইম মিনিস্টার কি করবেন। মরার পর কি হবে এটা ভাবার জন্য এখনো কোন আইন করা হয় নাই বলেই হয়ত তারা এটা ভাবতে পারেন না।কবে যে এই আইন টা করা হবে যে মরার পর কি হবে। তাহলে মনে হয় কিছু কিছু আইন আর দরকার পরত না যেমন ঘুস খাওয়ার কারনে শাস্তি, র্যাপ করার কারনে শাস্তি, কারো হোক কেরে নেওয়ার জন্য শাস্তি ইত্যাদি। আচ্ছা আমি এই বিচারপতিদের নিয়ে কেন মন্তব্য করছি? আমি তো লিখছি ঢাকা কাহিনি তাও আবার এ জার্নি বায় কার ফ্রম মিরপুর তো পোস্তগোলা। বিচারপতিরা জানলে আবার কোর্ট অবমাননা করার কারনে আমার এই রাস্তাটা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।যাক বিচারপতিদের আবাস স্থল পার হয়ে এসেছি ভাই, এবার আমি কাকরাইল তব্লিক অফিস। বকসির প্রিয় জায়গা।

তবলিক করে বহু মানুষ উপকৃত হয়েছ নিজে নিজে। তবে শুনেছি এতে ব্যক্তিগত ভাবে উপকৃত হলেও অনেক পরিবার এতে উপকৃত হয় নাই। তারা কিভাবে চলবে, কিভাবে চলছে, এটা অনেকেই ভেবে দেখে না। কোন টা যে কার হক অনেকেই তার সঠিক মানে বুঝে না।যাক এটা আমার গবেষণার বিষয় নয় এখন। আমি চলছি ঢাকার রাস্তায়। আমি ঠিক বকসির অফিসের সামনে। কিন্তু ঘুরে আসার জন্য সাহস পাচ্ছি না । অনেক জ্যাম।

ইশা খা হোটেল। আমি তো ঢাকার রাস্তায় দোস্ত। আমি শুধু রাস্তার চারিপাশের বর্ণনা দিচ্ছি আর মাঝে মাঝে কমেন্ট করছি দোস্ত। এটা কি আঙ্গুল ঢোকানো বলে? তবে তাই হোক। রাজমনি সিনেমা হল, বাহ, বিশাল পোস্টার। “ভালবাসার তাজমহল”। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম, দেখলেই ভয় লাগে। এখানে নাকি সব বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে। আচ্ছা বেওয়ারিশ লাশ কি? যার কোন পরিচয় নাই সে? এই পৃথিবীতে কে এমন আছে যার কোন পরিচয় নাই? বাপ মা নাই? ভাই বোন নাই? কে যে কেমন করে কখন বেওয়ারিশ হয়ে যায় বা কেন হয়ে যায়, আমি বুঝতে পারি না।আমি জানি আমার পরিচয় আছে, আমার বাবা ছিল , আমার মা ছিল, আমার পরিবার আছে, আচ্ছা আমি কি কখনো বেওয়ারিশ হতে পারি? হয়তবা…… কারন আমি বেওয়ারিশের সংজ্ঞা এখনো বিঝি না।আচ্ছা কেউ কি এখন ভাইবারে নাই? খালি আমি ই কথা বলে যাচ্ছি!! আমার এখন অফুরন্ত সময়।

তুমি আজ হারিয়ে গেলে আমরা তোমারে খুজব, কিন্তু তুমিও কোন একদিন বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যেতে পার,। অথচ আমরা তোমারে খুজছি। তবে বেওয়ারিশ লাশ না থাকলে অনেক অসুবিধা হত। যেমন আমার মেয়ে ডাক্তারি পড়ে, তার একটা কঙ্কাল দরকার। কে দেবে এই কঙ্কাল? বেওয়ারিশ লাশ । কে জানে হয়তবা আমারই কোন এক জেনারেসন আমার কঙ্কাল নিয়েই হয়ত পরাশুনা করবে, সে জান্তেও পারবে না, কোন একদিন আমি ওদের পরিবারের একজন ছিলাম। আমার হাড়ের কোন এক অংশই হচ্ছে সে। মানুষ কখনো মানুষ, কখনো লাশ, আবার কখনো কঙ্কাল , কি আজব না?

আমি এখন প্রেসিডেন্টের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছি। পাশে নবনির্মিত হানিফ ফ্লাই অভার। অনেক পুলিশ পাহারায় থাকে প্রেসিডেন্ট সাহেবের জন্য। অনেক বড় জায়গা। আচ্ছা কবরের মাপ কি সবার জন্য সমান? তাহলে অনারা ওই ছোট্ট কবরে সখিনার সমান মাপের কবরে কেমন করে ঘুমাবেন? সখিনা, তোমার জন্য সুখবর আছে, তোমার কবরের মাপ আর আমাদের প্রেসিডেন্ট সাহেবের কবরের মাপ নাকি সমান। তখন তোমার উপর কেউও ন্যায্য কাজ করতে পারবে না। না বিচারপতিরা, না দেশের স্বাধীনতা, না সময় না কেউ। আমি এখন “দয়া গঞ্জের” মোড়।

কয়েকদিন আগে এখানে আগুন লেগেছিল, অনেকগুলো বস্তিবাসী মারা গিয়েছিল।পরেরদিন খবর হয়েছিল, “বস্তিতে আগুন লেগে ৫ বস্তিবাসি পুরে ছাই”। আমি ওদেরকে চিনি না। কিন্তু যেহেতু আমি প্রতিদিন এইখান দিয়ে যাই, কে জানে হয়তা বা আমি ওদের কোন একজনের সঙ্গে হয়তবা আমার দেখা হয়েছিল!! এই ইতিহাসটা আমার জানা নাই। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে এই স্থানটা পার হবার সময় আমার এই কথাট প্রায়ই মনে পড়ে। হয়তবা কোন একদিন আমিও আর এই স্থানটি দিয়ে আর কখনো আসব না। আমার এই গারিটিতে অন্য একজন বসবে, আমি আর এই রাস্তার উপর দিয়ে যাব না। আমার এই রাস্তার উপর দিয়ে যাওয়ার অধিকার হারিয়ে যাবে। আমার স্থান হবে এই রাস্তার মাটির নিচে। খুব কস্টের না? আর এভাবেই শেষ হয়ে যায় আমার “এ জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা”। নাহ বকসি ভাই, আমি শুধু আমার আজকের দিনের পার্থিব কিছু ফিলিংস এর কথা বললাম। এর মাঝে অনেক আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে, অনেক অবিচারের কোথা আছে, অনেক ন্যায্য তার কোথা আছে, অনেক হতাশার কথা আছে। কিন্তু এর প্রতিটি কথার অনেক বিশ্লেষণ আছে যা আমি এই মুহূর্তে করতে চাইনি বকসি ভাই। চলে এসেছি। আমার সেই পুরানো ফ্যাক্টরিতে। এখানে আমি বড় সাহেব। আমাকে হাসতে হয় মেপে মেপে, কথা বলতে হয় অনেক ভেবে চিনতে। আমি এখানে সাধিন নই কন্তু আমাকে কেউ কমান্ড করে না।

দেখা হবে পড়ে আবার। ভাল থেক সবাই।

১৩/০৪/২০১৩-প্রধান মন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

মীরপুর, গোলার টেক, পাল পাড়া রোড, ঢাকা-১২১৬ 

প্রধান মন্ত্রী,

তুমি নিশ্চয়ই ভগবানের থেকে বড় না। আমি ভগবানকে তুমি করে বলি। আমি তোমাকেও তুমি করে বলতে পারি। তুমি খুব ভাগ্যবতি, কারন তুমি দেশের প্রধানমন্ত্রী । ভগবান তোমাকে সুস্হ করে বানিয়েছেন, তোমার কোন অঙ্গহানি নাই, তুমি সবল। তুমি কথা বলতে পার, তুমি প্রিথিবির রূপ দেখতে পার, তুমি সূর্য দেখতে পার, তুমি চাঁদ দেখতে পার, তুমি একা একা চলতে পার, তুমি হাযার হাযার মানুষের থেকেও ভাল আছ।  তুমি মেয়ে মানুষ অথচ তুমি অনেক ছেলেদের থেকেও পাওয়ারফুল। তুমি এতিম কিন্তু তুমি এতিমের মত না, তোমাকে মানুষ সম্মান করে, তুমি এদেশের সবচে সিনিওর। ভাবত একবার প্রধানমন্ত্রী! অথচ তুমি অনেক মানুষের সপ্ন বাস্তব দিতে পারছ না।  কেন? তুমি কি চোর? তুমি আমাকে বল তুমি যদি চোর না হও তবে কেন তুমি চোর পাল? কি তোমার ভয়? তুমি হ্মমতা হারাবে? নাহ। তুমি হ্মমতা হারাবে না। এদেশের মানুষ অনেক চালাক, তারা  বুঝতে পারে কি হচ্ছে  কোথায়। তোমাকে আমি মাঝে মাঝে বুদ্ধিমতি বলে মনে করি কিন্তু অনেক সময় তুমি বুদ্ধিমানের মত কাজ কর না। কি তোমার সমস্যা? বলনা  দেশবাসিকে? ওরা তোমাকে ভালবাশে, তুমি কি এটা জান? তুমি কেন হিটলার হতে পার না? তুমি কেন স্তালিন হতে পার না? তুমি কেন আরেকটা মুজিব হতে পারনা? মুজিব তো বলেছিল, আমার কম্বল কই? তুমি কি সে কোথা ভুলে গেছ? মুজিব তো বুলেটের সামনে এসে বলেছিল, কিরে তোরা কি চাস? আহ কি দারুন কথা। তুমি কি তার মেয়ে নও? তুমি বল না আমাদেরকে যে, তোমার পরনে কাপড় নাই, আমরা আমাদের কাপড় তোমাকে দিয়ে দেব, তুমি বলনা, তোমার ঘরে খাবার নাই, আমি  তোমাকে বলছি, আমি খাব না, আমার খাবার আমি তোমাকে দিয়ে দেব। সুধু দেশটাকে বাচাও প্রধানমন্ত্রী । তুমি সমুদ্র জয় করেছ, এর জন্য তোমাকে আমরা পুজা করব, এর জন্য তোমাকে অনুস্টান করে মালা নেবার দরকার নাই। তুমি এত বোকা কেন? তুমি প্যাপার পরনা? তুমি দেখ না যুবক সমাজ কি বলছে? সময় পাল্টে যাচ্ছে, চোখকান খোলা রাখ প্লিয। আমার জীবনে আমি কখন ভোট দেই নাই, এবার প্রথম আমি সুধু তোমার জন্য ভোট দিয়েছি। আমি কি ভুল করেছি ? আমি জানি, আমাদের ভালবাসা তোমার আয়ুস্কাল নির্ভর করে না, কিন্তু  তোমার ভালবাসায় আমদের আয়ুস্কাল নির্ভর করে । তুমি কি ভাল আছ?  তুমি ভাল নাই। কেন তুমি এমন কিছু লোক নাওনা যারা দেশের ভাল করবে, হোক না তারা তোমার শত্রু, কিন্তু তারা যদি দেশটাকে ভালবাসে, নাও  না ওদের। তুমি কেন নেলসন মেনডেলার মত একটা ইতিহাশ তৈরি করনা? তুমি ইতিহাশ হয়ে যাও। তোমার পথ ধরে তোমার সন্তানরা আসবে, তোমার পথ ধরে আমরা আসব, কেন, কেন তুমি পারনা? 

তুমি অগ্নিকন্যা কিন্তু তোমার অগ্নি মানুষকে পোড়ায় না। তাহলে তুমি কেমন আগ্নিকন্যা? আমি রাজনীতি করি না কিন্তু আমি রাজনীতির সব খবর রাখি, আমার ব্যথা লাগে, আমার কষ্ট হয়, তুমি দেখনা প্রধানমন্ত্রী, তুমি পারবে না? তুমি পারবে। তুমি আমাকে খুজনা, আমি রাজনিতিকে ভয় পাই, আমি সুধু চাই আমি অনেক লোকের ভার নিতে চাই না। ওরা তোমাকে চায়, অথচ আমরা তোমার হয়ে কাজ করছি। আমরা তোমাকেও কষ্ট দিতে চাই না। তুমি অনেক ব্যস্ত। সধু তুমি সৎ থাক। এ দেশের মানুষগুলো ভাল, ওরা বাচতে চায়, ওরা তোমার কাছ থেকে টাকা চায় না, ওরা তোমার কাছ থেকে করুনা চায় না, ওরা চায়, ওদের কাজে বাধা দিও না, হরতাল, অবরোধ, ওরা ভয় পায়, তুমি জান এটা? আমি বিরোধী দলকেও ভয় পাই। ওরা আরও অনেক কঠিন কাজ করতে পারে। কিন্তু ওরা কি আমাদের ভালবাসে না? ওরা কার জন্য রাজনীতি করে? যদি রাজনিতি হয়ে থাকে আমাদের জন্য তবে আমদের কথা শোন। আমি অনেক দেশ ঘুরেছি, দেখেছি, নেতা অনেক বড় জিনিস। আমি তোমাদেরকে নেতা মানতে চাই। কে জয়, কে তারেক, এতে আমার কোন  দুঃখ নাই, আমি সুধু চাই, শান্তি আর উন্নতি। তোমারা দুইজন এক সংগে বসনা প্লিয। দেখেবে দেশটা ভাল হয়ে যাবে। এ কাজটা তোমার। ওরা বসবে না, তুমি ওদের বস্তে বাধ্য করবে। না বসলে ওদের লাভ, বসলে তোমার লাভ। 

   মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তুমি কি বোঝতে পারছ দেশের মানুষের কথা? এ দেশের ৫৫% শতাংস লোক তোমাকে ভোট দেয় নাই, কিন্তু তুমি এখন তাদের ও প্রধানমন্ত্রী। তুমি এখন আর তোমার পার্টির কেও নও। তুমি এখন জনগনের সম্পদ। তোমার শরীর খারাপ হলে দেশের প্রত্যেকে জানবে, বিশ্ব জানবে। তুমি কি এটা বুঝ? তাহলে দেশের লোকের শরীর খারাপ হলে, তাদের মন খারাপ হলে, তুমি জানবে না কেন? মানুষ এখন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। ঘরে নিরাপত্তা নাই, রাস্তায় নিরাপত্তা নাই, অফিসে নিরাপত্তা নাই। যে কোন লোক যখন তখন কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ওরা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী? তুমি কি কিছু জান? আর না জানলে কেন জানার চেষ্টা করছ না? আর জানলে কেন একসান নিচ্ছ না? কি হল তোমার? সাগর-রুমি মরে গেল, ইলিয়স মিয়া লাপাত্তা, বাসে বাসে রাজনিতির লাশ, বিশ্বজিত সবার সামনে কিভাবে খুন হয়ে গেল, হাজার হাজার কোটি টাঁকা মানুষ লোটপাঁট করে ফেলছে, সবাই তোমার ছাত্রলীগের নামে কলংক দিচ্ছে। তুমি কি পেপার পর না? তুমি কি কিছুই বুঝতেছ না? তুমি আমলাদের, মন্ত্রীদের কথা বলার লাগাম টেনে ধর, ওরা যা তা বলে। মানুষ বিরক্ত হয়। মাঝে মাঝে তুমি ও কথার বেলেন্স হারিয়ে ফেল। আরও সাবধান হওয়া দরকার। সামনে তো তোমার বিরাট পরিক্ষা!! এ দেশের মানুষ বড় বিচিত্র। এরা সময় মত ছুরি মারে। আর একবার ঠিক মত ছুরি মারতে পারলে উঠতে সময় লাগে। তুমি কি ভুলে গেছ যে, ২১ বছর লেগেছিল তোমার উঠতে, এবার কিন্তু আরও বেশি সময় লাগতে পারে। কারন যুবক সমাজ যুদ্ধ দেখেনি, মুজিবকে দেখেনি, এদের মায়া মহব্বত কম। বাপমাকেই এরা জবাব দেয় আর তুমি তো প্রধানমন্ত্রী।   

১৬/০২/২০১৩-রাজপুত্রের “প্রজন্ম চত্বর”

গোলার টেক, পাল পাড়া রোড,  মীরপুর–১২১৬

আমি খুব ভয়ে আছি এই কয়েকদিন যাবত। আর এই ভয়টা জাগিয়ে তুলেছে শাহ্‌বাগের “প্রজন্ম চত্বর”।  কি সুন্দর নাম “প্রজন্ম চত্বর”।

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই বীরবাঙ্গালী জাতী যতবার আন্দোলন করেছে, যতবার ঘর থেকে রাস্তায় নেমেছে, সবসময় সুফল নিয়েই ঘরে ফিরেছে বারবার। আর এই জন্য আমরা একটা স্বাধীন ভাষা পেয়েছি, একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি। বিশ্বময় আমরা মাথা উচু করে বলতে পারি, আমি বাংলাদেশের ছেলে। আমার দেশের রাজধানীর নাম ঢাকা। কিন্তু ১৯৭১ সলের পর থেকে যতবারই যে কোন আন্দোলন হয়েছে, কোন না কোন ভাবে সেটা কোন না কোন ব্যক্তি বা দলের দখলে চলে গেছে এবং সেটা আবার ছিনিয়ে আনতে নতুন করে আন্দোলন করতে হয়েছে।

১৯৭১ থেকে ২০০০ এর পর যতসব ঘটনা সবার চেহারা এক। আশা ভাঙতে ভাঙতে এখন আর আশাহত হইনা, আশাহীন হয়ে পরেছি। সবসময় ভেবেছি, মিশর বদলিয়ে দিল একদল তরুন, ৪২ বছরের ইতিহাস এক বছরে পাল্টে গেল, লিবিয়া স্বৈরশাসক মুক্ত হয়ে গেল কয়েক দিনের মধ্যে। সিরিয়া, তিউনেসিয়া, আরও অনেক দেশ এখন পাইপ লাইনে চলে এসেছে, সেখানে গনতন্ত্র ছাড়া আর অন্য কোনভিত্তিক শাসন দিয়ে সারা দেশ চালানো সম্ভব নয়। বিশ্ব এখন শুধু হাওয়া বইছে পজিটিভ পরিবর্তনের। অথচ আমরা শুধু “খবর” হয়েছি সারা বিশ্বে হয় বন্যা, না হয় দুর্নীতি, না হয় ক্রসফায়ার, না হয় আভ্যন্তরিন রাজনীতির হিংসাত্তক কর্মকাণ্ডের কারনে। যদিও নোবেল বিজয়ের মত ঘটনাও এ দেশে ঘটেছে, বিজ্ঞান বিষয়ক নতুন উদ্ভাবনী হয়েছে, গারমেন্টস শিল্প  অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু একই সময় আবার এক পদ্মা সেতু সব অর্জন যেন এক নিমিষে সারা পৃথিবীতে আমাদেরকে আরও এক ধাপ পিছিয়ে দিয়ে গেছে। পিছিয়ে দিয়ে গেছে দেশের উন্নতির একটা ধারাবাহিক স্বপ্নের, পিছিয়ে দিয়ে গেছে সারা  বিশ্বের কাছে আমাদের মাথা উচু করে দাঁড়াবার প্লাটফর্মটা। এটা শুধু একটা লোণ নয়, এটা একটা কলঙ্ক জনক ঘটনা। এটা একটা দেশের চরিত্র, এটা একটা দুঃস্বপ্ন। এই স্বপ্ন ভঙ্গের ব্যথায় কেউ সোচ্চার হলনা, অথচ আমি জানি এটা নিয়ে দেশের ১ম মানুষ থেকে শুরু করে আপামর সব চেয়ে ছোট মানুষটারও বুকে কস্ট আছে। আমি জানি না কেন এমন হল, আমি জানি না কি করলে কি হত। আমার জানা নাই এখানে কার কতটা দোষ বা কার কতটা গাফিলতি। শুধুজানি, স্বপ্নটা সার্থক হতে আরও অনেক সময় পেরিয়ে যাবে। উদ্ধারকারী খুব কাছে কেউ নেই আমাদের।

ঘর থেকে বের হই খুব ভয়ে ভয়ে। এ ঘরে আবার ফিরে আসা হবে তো? নাকি পথে কোন কারন ছাড়া আমি হয়ে যাব লাশ বা বিশ্বসন্ত্রাসী? উচিত কথা বলবার আমার সাহস নাই, এটা আমার দুর্বলতা নয়, এটা আমার একাকিত্তের ফসল। আমি যেন একা। আমার মত সবাই যেন একা। সবাই যেন কোন এক উদ্ধারকারীর অপেক্ষায় আছে, কবে আসবে সেই বীরপুরুষ? আর কেই বা সেই বীর পুরুষ? চারিদিকে নৈরাজ্য, মারামারি, দুর্নীতি, চাপাবাজি, অবিশ্বাস, চারিদিকে হাহাকার, এখানে একটা লাশ এক ভাগ পুঁটি মাছের দামের থেকেও কম, এখানে একটা যুবতির সম্ভ্রম শকুনের ভাগাভাগি করে খাওয়া গলিত শিয়ালের লাশের থেকেও কম গুরুত্তপূর্ণ।

এমন একটা কঠিন সময়ের মধ্যে হটাত করে শাহ্‌বাগের “প্রজন্ম চত্বর” যেন গহিন সমুদ্রের মধ্যে একছটা আলোর মত মনে হয়। আমার মন আবেগে ভরে উঠে। আশায় ভরে উঠে। দেশের আনাচে কানাচে ভিয়েনামের যুদ্ধের মত সব যৌবন আজ জেগেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের মত সব যৌবন আজ টগবগ করে ফুটছে, এখানে ভোর, সকাল, দুপুর, রাত যেন এক হয়ে গেছে। সময় থেমে গেছে। এখানে আজ ৯০ বছরের থুরথুরে বুড়িও যেন আর বুড়ি নয়, এখানে সব দাত পরে যাওয়া ১০০ বছরের দৃষ্টিহীন বুড়ো যেন তোমাদের স্পর্শে ২৫-৩০ বছরের যুবক বনে গেছে। আমি এখন রাস্তায় বেরোলে আমি জানি তোমরা পাহারায় আছ, আমি জানি তোমাদের সামনে কোন বাধায়ই বাধা নয়। কে আছে আমাকে এখন কটু কথা বলবে? কার এমন দুঃসাহস আছে আমাকে ভয় দেখাবে? আমার পাশে তো “প্রজন্ম চত্বর” আছে। তোমরা তো এখন আমার ক্যাপ্টেন। তোমরাই কি সেই বীর পুরুষ নও? মিশরের মত? লিবিয়ার মত? চেগুভার এর মত? নাকি আবারো হতাশায় ভোগাবে? কোনো উদ্আদেশ্মিয নিয়ে এই প্রজন্ম চত্তর নামে সবার হৃদয়ে আবার শুল চালাবে না তো?

আর কাঁদতে চাই না, আমাকে আর আশাহত কর না, আমি বিশ্বাস করতে চাই, ওই আলো আমাদের, ওখানে কোন আর হায়েনারা নাই, দল নাই, ব্যক্তি নাই, তোমরা জেগে থাক একটা একটা সপ্ন নিয়ে, তোমাদের আর ঘুমিয়ে থাকার অবকাশ নেই। তোমরা কি সেই আলো?  তোমরা কি সেই উদ্ধারকারী? হয়ত বা তাই, আমি তাই বিশ্বাস করতে চাই।  এখন আমাকে তোমরা প্রশ্ন করতে পার, তাহলে আমি ভয় পাই কেন? আমি ভয় পাই এই ভেবে যে, যে আলো তোমরা দেখাচ্ছ, সে আলো কি তোমরা ধরে আছ কিনা, যে আলোর তাপ তোমরা বিকিরন করছ, সে আলোর মিছিল একান্তই আমাদের কিনা। আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমার মাথা আঁচড়ানোর সময় নাই, আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমার গায়ে ঘামের গন্ধ, আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমরা যা অ-গ্রহনযোগ্য তা নিমিষে বর্জন করতে পার এবং সত্যিটাকে আগলে রাখ। কিন্তু ভয় লাগে যখন দেখি দেশি-বিদেশি বর্ণচোরা হায়েনারা তোমাদের পাশে ঘুরঘুর করে সুযোগ খুজছে, আমার ভয় করে যখন দেখি তোমার মাথার চুল আর এবড়ো থেবড়ো নয়, বেকব্রাশ করা পরিপাটি চুল, আমার ভয় করে যখন দেখি তোমার ঘর্মাক্ত সার্ট  আর ঘামে ভিজে নেই, অনেক অসাধু সুযোগ সুন্ধানী হায়েনাদের মত ইস্ত্রি করা। আমি তোমাদের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে চাই, তোমাদের অনেক কাজ। একটা একটা করে করতে হবে, এখানে আশা ভঙ্গ করা মানে, শেষ তলয়ার শেষ হয়ে যাওয়া। তোমরা কি শুনতে পাও ঐ স্বামীহারা স্ত্রীর কান্না যে একা একা গত ৪০ বছর ধরে পরাধীনের মত গ্লানি টেনেছে?  তোমরা কি শুনতে পাও ঐ স্বামীহারা স্ত্রীর স্বামীহীন অসহায় জীবনের একাকীত্ব? তোমারা কি শুনতে পাও কত বিরঙ্গনার আর্তনাদ যারা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে মরনের আগে শুধু তার সতিত্তের বিচার পাওয়ার জন্য? এরা কেউ তোমার মা, কেউ তোমার বোন, কেউ তোমার মেয়ে। ওরা কারো কাছেই কোন বিচার পাবে বলে আর আশা করে না। আর যারা ঐ ৩০ লাখ তরুন মানুষ তোমাদের ভবিষ্যৎ সুখের জন্য তাদের যৌবন ত্যাগ করেছে, বর্তমান ত্যাগ করেছে, তাদের জন্য কি সুসংবাদ দিবে তোমরা? তোমরা শুধু একটা কাজ করে যাও, তোমরা তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর বাংলাদেশ রেখে যাও যা তোমাদের পুর্বসূরিরা তাদের জীবন ত্যাগ করে তোমাদের জন্য করে গেছেন। 

আমি ৭১ দেখেছি কিন্তু ৭১ কি আমি তখন কিছুই বুঝিনি। আমি দেখেছি আমার মা শুধু রাত জেগে বসে থাকতেন কখন আমার বাবা চুপে চুপে রাতের আধারে মার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, দিন পার হয়ে গেছে, মাস পার হয়ে গেছে, বাবা আর ফিরে আসেন নি। আমার ভাই কতই বা বয়স তার, ১৯ কি ২০ ! কি অদম্য সাহসের সাথে কোন এক রাতে মাকে না বলেই চলে গেলেন ৭১ এর যুদ্ধে। কি হয়েছিল তার? দেশ তো স্বাধীন হয়েছে, কই আমার ভাই কি আর ফিরে আসবে না? হয়ত বাবা আর আমার ভাই এখন এক সঙ্গেই আছেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমার বাবা কি আমাকে মিস করে? আমার ভাই কি আমাকে মিস করে? আমি তাদের খুব মিস করি। আমার মা আমাকে প্রতিদিন হাতির গল্প, ভুতের গল্প, রাজা রানীর গল্প শুনাতেন। ৭১ এর পর আমার মাকে আর কখন কোন দিন আর হাতির গল্প, ভুতের গল্প বলতে শুনিনি। আমার মাকে গল্প বলতে বল্লে শুধু একটা গল্পই বলতেন, “এক ছিল এক রাজা, রাজার ছিল রানী। রাজা-রানির ছিল এক রাজপুত্র। এক দিন রাজা যুদ্ধে মারা গেলেন, রানীও কয়েক বছর পর মারা গেলেন রাজার শোকে। বেঁচে রইল রাজপুত্র”। মা এখনেই গল্পটা শেষ করে দিতেন। আমি বলতাম, তারপর কি হল মা? মা বলতেন, “রাজপুত্র বড় হবে, সেও যুদ্ধ করবে রাজার মত কারন রাজার রক্ত যে রাজপুত্র বহন করে”। আমি বলতাম, কোথায় মা সেই রাজপুত্র? মা কিছুই বলতেন না। আমি আজ তার উত্তরটা জানি। সে এখন “প্রজন্ম চত্বরে”।  

আবার আমার শতভাগ ভুল হলেও হতে পারে। হতেও পারে, যা দেখছি, পুরুটাই ভুল। 

বাঙালি বড় অসহায়।  

১১/০৪/২০১২-সন্দেহ

মীরপুর, গোলারটেক

ঢাকা-১২১৬ –

মনটা ভাল নেই। ও খালিখালি আমাকে সন্দেহ করে। আমি জানি মদ খাবার পর আমি অনেক উলটা পাল্টা বলি কিন্তু আমি আজো খারাপ হয়ে যাই নাই। মাথার উপর কত চাপ, অথচ ও গুলো বুজতেই চায় না। কি হবে আমি মরে গেলে? মিতুল কিছুতেই আমর এই সাম্রাজ্জো বাচাতে পারবে না। আমার মা পারে নাই, মিতুলও পারবেনা।  আমি একটা প্রদিপের মত। আমি জলছি, কিন্তু সবাই আমার কাছ থেকে আলো নিচ্ছে। কিন্তু আমি যে শেষ হয়ে যাচ্ছি সেটা কেউ দেখে না। একদিন ওরা সবাই জানবে আমার অনেক আলো ছিল, আমি আরও অনেক আলো দিতে পারতাম কিন্তু দেবার জন্য যে সাপোর্ট দরকার ছিল সেটা আমি পাই নাই।  আমি এখনো কোন ভুল কিছু করিনি, কিন্ত আমি সম্বভত ভুল করতে যাচ্ছি। কি করে ঠেকাবা যদি না  জান কি ভুলটা আমি করছি? আমি খুব ব্যথিত। ২২ বছর একত্রে থেকে বুজতে পারলে না? আর বুজতে পারবে না। আমি এই রকমই।

১৮/০৩/২০১২-ব্যবসায়ী হিসাবে আরেকবার রাশিয়ায় ভ্রমন

সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে স্টল গুছিয়ে ভাবলাম আবারেকবার রাশিয়া ঘুরে যাই। ফলে আমি, রাজীব ভাই (ওরফে সজীব ভাই) আর মূর্তজা ভাই তিনজনেই আমরা ট্রেনে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে সরাসরি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে র ওয়ানা হলাম। এমন একটা সময় যে, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্যে খুব ভালো ট্রেন সূচী তো নাইই, বরং মারাত্তক ট্রেন বিপর্যয় হয়েছে এই সময়। তারপরেও বিদেশী হিসাবে অনেক কষ্ট করে আমরা তিনটা টিকেট জোগাড় করতে পারলাম। এখানে একটা জিনিষ খুব নজরে পড়লো যে, এমন কি যারা রাশিয়ার নাগরীক, সবাই রাশিয়ায় যেতে পারেন না, আর পারলেও তারা কয়েকদিনের জন্য এমন ভাবে সরকারী অনুমতি লাগে যে, তিন দিন বা চারদিনের জন্য। ফলে রাশিয়ায় প্রবেশ করার এবং বের হবার সময় এটা খুব কড়াকড়িভাবে সরকারী কর্মচারীরা চেক করেন যেনো কেউ অনির্দিষ্ট কালের জন্য রাশিয়ায় থাকা চলবে না। এটা সম্ভবত রাশিয়ায় যাতে অন্য শহরের মানুষ এসে অযাচিত ভীর না করে এবং ঘন বসতির সৃষ্টি না করে সেজন্য। ব্যাপারটা আমার কাছে কিছু মন্দ লাগে নি। আমাদের ঢাকা শহরের জন্যেও এমন ব্যবস্থা হলে অন্তত ঢাকা একটা বসবাসের শহর হিসাবে গড়ে উঠতো।

যাই হোক, আমরা একটা হোটেল খুজতে গিয়ে খুবই বিড়ম্বনায় পড়লাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার একবার এই হোটেলে, আরেকবার ওই হোটেলে নিয়ে যেতে লাগলো, কোথাও ভালো রুমের হদিস পাচ্ছিলাম না। অনেক পর্যটক সম্ভবত এই সময়, কোথাও খালি পাচ্ছিলাম না। অতঃপর একতা স্বাভাবিক মানের হোটেলেই উঠলাম। আমরা তিনজনেই এক রুমে উঠলাম। রাত তখন প্রায় ৩টা। কিছু খাবার সাথেই ছিলো, সেটাই আমরা তিনজনে ভাগ করে খেয়ে নিলাম। তারপর ঘুম। আগামীকাল এই রাশিয়ান এয়ারপর্ট থেকেই আমরা ফিরে যাবো ঢাকায়, বিকেল ৪ টায় ফ্লাইট। এর মধ্যেই যতোটুকু রাশিয়ার আশেপাশে দেখা যায় সেটাই ভালো।

সকালে রাজীব ভাই অন্যত্র চলে গেলেন। আমি আর মূর্তজা ভাই পায়ে হেটে অদূরে ক্রেমলিন দেখতে যাবো। যেহেতু ভালো মতো চিনি না, তাই একতা গাড়ি ভাড়া করলাম। পরে দেখলাম, আসলে আমাদের হোটেল থেকে ক্রেমলিন অতো কাছে নয়। আমরা যখন ক্রেমলিনের চত্তরে পৌঁছলাম, তখন মাত্র সকাল ১০ টা হবে। বিশাল চত্তর সামনে। অনেক নাম শুনেছিলাম এই ক্রেমলিনের, আজ নিজের চোখে দেখে মনে হলো, এতা পরাশক্তির একটা হেড কোয়ার্টার। জীবনে আল্লাহ অনেক কিছু দেখালেন। আমেরিকা দেখেছি, এবার রাশিয়ার ক্রেমলিনও দেখলাম।

ক্রেমলিনের সামনে অনেক সিকিউরিটির লোক থাকে, কিন্তু তারা কাউকে কিছুই বলেনা। যারা দর্শানার্থী, তারা নির্বিঘ্নে ক্রেমলিনের বাইরের বিশাল চত্তরে আনাগোনা করছে। মনে মনে ভাবলাম, এদের অনেকেই আছে গুপ্তচর যাদের হয়তো আমরা চিনি না কিন্তু তাদের কাজের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা।

অনেক ক্ষন থাকলাম, দেখলাম, ছবি নিতে কোনো বাধা নাই তবে মাঝে মাঝেই লেখা আছে, ‘এই এলাকায় ছবি তোলা নিষেধ”। খুব গোপনেই কয়েকটা ছবি নিলাম, বলা যায় না কোথায় কোন ক্যামেরা ফিট করা আছে, আবার কেউ আমাদের সন্দেহ করে ধরেও নিয়ে যেতে পারে এই ছবি তোলার জন্য। আশেপাশে কোনো দোকান পাট নাই, ভীষন পানির পিপাসা লেগেছিলো, সাথে অল্প একটু পানি ছিলো, তাতেই পানির পিপাসা মিটাতে হলো।

ক্রেমলিন থেকে আমরা পায়ে হেটে আশেপাশে বেশ দূরে কিছু শপিং মলা আছে। সেখানে গেলাম। মূর্তজা ভাই একতা স্পোর্টস দোকানে ঢোকলেন, তাঁর বাচ্চাদের জন্য কিছু স্পোর্টস গিয়ার কিনবেন। আমিও ভাবলাম কিছু কিনি। ওরে ভাই, এতো দাম? তারপরেও পকেটে ডলার ছিলো বেশ, আর এগুলি ঢাকায় ফিরিয়ে নেবার ইচ্ছা ছিলো না। তাই প্রায় ১৫০০ ডলার দিয়ে আমিও কিছু স্পোর্টস গিয়ার কিনলাম মুর্তজা ভাইয়ের দেখাদেখি। হয়তো আমার পরিবার এ গুলি ব্যবহার করে কিনা জানি না, আবার করতেও পারে। ব্যবহার করলে ভালো লাগবে আর না করলে পুরা টাকাটাই গচ্চা।

একটা রেষ্টুরেন্টে ঢোকে আমরা কিছু খেয়ে নিলাম। বিকাল ৩ তাঁর দিকে এয়ারপোর্টে গেলেই হবে। ওই সময় রাজীব ভাইও আমাদের সাথেই ঢাকায় ফিরবেন। আমরা খাওয়া দাওয়া করে বিকাল তিনটার আগেই এয়ারপোর্টে চলে এলাম, বিশাল এয়ারপোর্ট। চমৎকার জায়গা। খুব ভালো লাগলো। অনেক দেশ ঘুরে একটা জিনিষ বুঝেছি যে, আমাদের দেশের এয়ারপর্ট বিদেশের লোকাল এয়ারপোর্টের থেকেও খারাপ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায়, ডেকোরেশনে, সুযোগ সুবিধা সব কিছু মিলিয়ে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল এউয়ারপর্ট কোনো অবস্থাতেই ইন্তারন্যাশনাল পর্যায়ে পড়ে না। যাই হোক, আমরা চেকিং করে ফেললাম। আমাদের সাথে যে স্যাম্পল গুলি সেন্ট পিটার্সবার্গে নিয়ে এসেছিলাম, সেগুলি আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গেই দান করে এসেছিলাম। ওগুলি আর দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো মানে হয় না। কারন তাতে আমাদের অনেক লাগেজ খরচ বহন করতে হতো।

একটা কথা না বললেই নয় যে, আমরা যে উদ্দেশ্যে এই সেন্ট পিতার্সবার্গে স্টল খুলেছিলাম, আসলে এতার কোনো সাফল্য আসে নাই। আমরা ভেবেছিলাম যে, এখানে বায়াররাও আসে। ফলে আমরা অনেক অর্ডার পাবো দেশ বিদেশ থেকে। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম যে, আসলে এখানে খুচরা ক্রেতা বেশী। অর্থাৎ এক পিস দুই পিচ কেনার ক্রেতা। আমরা তো এটা চাই নাই। পুরুটাই আসলে একটা অসফল ফেয়ার ছিলো। আমি মুর্তজা ভাইকে বললাম, যে, এর পরে এভাবে আর আমরা কোনো স্টল দেয়া উচিত না। তাতে খুব লাভ হয় না।

আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম।

১৭/০৩/২০১২-সেন্ট পিটার্সবার্গ

গত কয়েকদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম এই সেন্ট পিটার্সবার্গে ফ্যাশন মেলায় আসার জন্য। 39th International Exhibition of Textile and Light Industryএর মেলাটার সময়কাল ১৫ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত।  কোনো পরিকল্পনা ছিলো না আগে থেকে। হতাত করেই মূর্তজা ভাই বললেন, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে একটা মেলা হচ্ছে, বাংলাদেশের অনেকেই যাবে, আমরা যাবো কিনা?

সেন্ট পিটারসসবার্গের কথা অনেক পড়েছিলাম আমাদের বই পুস্তকে সেই ছোট বেলা। যখন ছাত্র ছিলাম তখন আবার রাজপুটিনের গল্প শুনতে শুনতে এই সেন্ট পিটার্সবার্গের ব্যাপারে অনেক বাসনা ছিলো মনে। আমাদের ক্লাস এইটের একটা বইয়ের মধ্যে একতা ছোট বালকের গল্পপড়েছিলাম যে, তাঁর বাবাকে রাশিয়ার কোনো এক রাজা শাস্তি সরুপ এই সেন্ট পিটার্সবার্গে পাঠিয়েছিলো। কারন সাইবেরিয়ার মতো নাকি এখানে প্রায় সারা বছর বরফ থাকে আর যাতায়তের তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থা নাই। তারপর সেই বাবাকে দেখার জন্য তাঁর ছোট ছেলে একাই পরিকল্পনা করে যতো বরফই থাকুক আর যতো খারাপ রাস্তাই হোক, সে তাঁর বাবার সাথে দেখ করবেই। যখন গল্পটা পড়েছিলাম, তখন আমার ও একবার এই সাইবেরিয়া অথবা সেন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার খুব শখ হয়েছিল।

মূর্তজা ভাই যখন আমাকে ব্যাপারটা বললেন, আমি যতোটা না ব্যবসার প্রসার হবে তাঁর থেকে বেশী আগ্রহী ছিলাম এই সেন্ট পিটার্সবার্গ দেখার ব্যাপারে। খরচ কত হবে সেটা জিজ্ঞেস করতেই পুরু প্যাকেজের দাম পড়বে প্রায় লাখ বিশেক টাকা ভেন্যু ভাড়া, এয়ার টিকেট, হোটেল ভাড়া, অন্যান্য সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখের মত। কম না। তারপরেও আমরা আমাদের ফ্যাক্টরীর বাজেট পর্যালোচনা করে দেখলাম, সম্ভব প্ল্যান করা। ব্যবসা কতটুকু পাবো জানি না, কিন্তু যাওয়া যেতেই পারে।

গতকাল আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গে অনেক স্যাম্পল নিয়ে এসেছি। সারাদিন বুথ সাজানোর কাজে ছিলাম। প্রুচুর ঠান্ডা। তবে দেশটা এতো সুন্দর, সেতা আমার কল্পনায়ও ছিলো না। সারাদিন কাজের শেষে আমি আর মুর্তজা ভাই সাথে বাংলাদেশের আরেক জন সজীব ভাই, এক সাথে বের হলাম। আমরা বাংলাদেশ থেকে অনেকেই এখানে এসেছি। কেউ জ্যাকেটের ব্যবসা, কারো শার্ট প্যান্টের ব্যবসা, কারো আমাদের মতো সুয়েটার্স এর ব্যবসা।

সারাদিনই গুড়ি গুড়ি বরফ পড়ছে বাইরে। এটা অনেকটা গুড়ি গুড়ি বরফ পরার বৃষ্টির মতো। রাস্তাঘাট সারাক্ষনই ভিজা, গাছের পাতাগুলি ঝরে পড়ে পড়ে গাছের নীচে একটু একটু পচন ধরায় কেমন জানি একটা গন্ধ আসে। রাস্তায় সবাই গাড়ি, কিংবা বাইক বা স্কুটি নিয়ে চলে। সবার হাতেই ছাতা আছে। রাশিয়ান মেয়েরা অনেক সুন্দর হয়, সেন্ট পিটার্সবার্গ সে রকম।অনেক লম্বা হয় এদেশের মেয়েরা।

এসেই একটা মোবাইল ফোন কিনেছিলাম। খুব ছোট একটা মোবাইল ফোন, দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। আসলে আমার কেনার দরকার ছিলো না, কনিকা ছোট ছোট জিনিষ পছন্দ করে, তাই এটা কেনা। রাতের সেন্ট পিটার্সবার্গ দেখতে গিয়ে যা চোখে পড়লো, সেটা অভাবনীয়। প্রতিটি রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে লাইট। মানুষ জন খুব কম কিন্তু যারা বাইরে বেরিয়েছেন, তাদের বেশীরভাগ মানুষই পর্যটক। লোকাল লোকজন বেশ কম। প্রচন্ড বাতাস। সন্ধ্যা হলেই সব অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু সব গুলি বিল্ডিং এর বাইরের দিকে এমনভাবে আলকিত যে, মনে হয় অভিনব রকমের সুন্দর। যেখানেই তাকাই, সব কিছুই এতো চোখ জুরানো সুন্দর, ভাবাই যায় না। যে সব জায়গায় পার্ক আছে সে গুলিত গাছে গাছেও বেশ চমৎকার করে আলোকিত করা। গাড়ির তেমন ভীড় নাই, আবার কিছু কিছু ট্যাক্সি ক্যাব আছে, যারা ছোট ছোট ট্রিপ দেয়।

আমরা একটা নদীর ধারে দাড়ালাম। নদীর দূর প্রান্তের ওপারে যে ছোট শহরের মতো দেখা যায়, মনে হচ্ছে একটা ছবি। আমরা গুড়ি গুড়ি বরফের কুচিতে ভিজে যাচ্ছিলাম বটে কিন্তু আশ্রয় নিতে ইচ্ছে করছিলো না। সিগারেট ধরিয়েছি, খুব সাবধানে টানছি যাতে সিগারেট ভিজে না যায়। সজীব ভাই আর মূর্তজা ভাই একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছেন। আমিও মাঝে মাঝে তাদের সাথে জয়েন হচ্ছি কিছু ছবি তোলার জন্যে। বেশ ভালো সময় যাচ্ছে।

রাত প্রায় বারোটা বাজে। সাথে আমাদের গাড়ি নাই। যখন বেরিয়েছিলাম, সাথে গাড়ি ছিলো, ভারা করা গাড়ি। এবার হোটেলে ফিরে যাবো, এমন সময় একটা ট্যাক্সী ক্যাব আমাদের সামনে এসে দাড়ালো। যুবক একটা ছেলে। ভালো ইংরেজি বলে। জিজ্ঞেস করলাম, সে ভাড়ায় যাবে কিনা। সে বেসিক্যালি ভাড়ায় যায় না, এমনিতেই সে ঘুরতে বেড়িয়েছিলো। আমাদের এতো রাতে এই নির্জন জায়গায় দেখে গাড়ি থামিয়েছে। সে একজন আই টি বিভাগের লোক। ব্যক্তিগত একটা ছোট ফার্ম আছে। সে বল্লো যে, সেন্ট পিটার্সবার্গে অধিক রাত নিরাপদ নয়। আমাদের হোটেলে ফিরে যাওয়া উচিত। কারন এখানে অনেক খারাপ লোক রাতে বিচরন করে। আমরা সবাই একটু ভয় পেয়ে গেলেও যেহেতু সবাই একসাথে আছি, ফলে মনে সাহস ছিলো।

বললাম, কি নাম তোমার?

সে তাঁর নাম আলেক্স বল্লো।

আমরা বললাম, আলেক্স, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিতে পারবা? আমরা তোমাকে যা ভাড়া আসে সেটাই দিয়ে দেবো। সে একটু হেসে দিয়ে বল্লো, তাঁর ভাড়া লাগবে না, কিন্তু সে যে ইংরেজীতে আমাদের সাথে কথা বলতে পারছে এটাই তাঁর লাভ। কারন এখানে সে কারো সাথে ইংরেজিতে কথা বলার মানুষ পায় না। অতচ সে ভালই ইংরেজী বলতে পারে। আমরা তাঁর গাড়িতে উঠে গেলাম, অনেক ফান করলাম তাঁর সাথে, সেও খুব মজা পেলো বলে মনে হলো। সে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে বল্লো যে, যদি তারা আগামীকাল আরো সুন্দর সুন্দর জায়গায় যেতে চায়, তাহলে তাঁর নাম্বারে ফোন দিলে বিনে পয়সায়ই সে আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে। আলেক্স ছেলেটাকে ভালো লাগলো। বললাম, ঠিক আছে, আগামী কাল বিকাল পাচতার পর আমরা ফ্রি হবো, আলেক্স যদি ফ্রি থাকে সে যেনো আমাদেরকে আবার এইখান থেকেই পিক করে নিয়ে যায়। কথামতো সে রাজী হলো।

পরেরদিন ঠিক সময়েই আলেক্স চলে এলো। আমরা আলেক্সকে বললাম, কোথায় কোথায় যাওয়া যায় সে যেনো আমাদেরকে নিয়ে যায়। আলেক্স বল্লো, বেশি জায়গা হয়তো সে ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে না, তাহলে অনেক রাত হয়ে যাবে তবে দিনের আলোয় যে কয়টা দর্শনীয় স্থান দেখা সম্ভব সেটা সে প্ল্যান করে রেখেছে, আর রাতে একটা ব্রিজ দেখাতে নিয়ে যাবে যা দেখার জন্য অনেক মানুষ এখানে আসে। ব্রিজটা রাত দেড়তার পরে খোলা শুরু হয় আর ভোর পাচটার আগেই আবার বন্ধ করে দেয়া হয় যাতে স্বাভাবিক গাড়ি ঘোড়া আবার চলতে পারে। মানে ব্রিজটা দিখন্ডিত হয়ে যায় রাত দেড়টার পর। আমি কখনো এই ধরনের ব্রিজ দেখি নাই। ব্রিজটি নেভা রিভারে।

আলেক্স আমাদেরকে প্রথমেই নিয়ে গেলো, সেন্ট আইজাক ক্যাথেড্রালে, ভীষন সুন্দর দেখতে। তারপর গেলাম চার্চ অফ দি সাভিউর অন স্পিল্ড ব্লাড এ, তারপর নিয়ে গেলো আলেক্সজান্ডার কলাম ইন পেলেস স্কোয়ারে। প্রতিটি জায়গা সুন্দর। এর মধ্যেই রাত প্রায় আটটা বেজে গিয়েছিলো।

সেন্ট আইজাক ক্যাথেড্রালঃ 

আলেক্সজেন্ডার-১ এর আমলে, সেন্ট আইজাক ডালমাটিয়ার নামে উতসর্গকৃত এই ক্যাথেড্রালটি ‘পিটার দি গ্রেট’ এর চীফ পেট্রোন ‘সেন্ট আইজাক’ এর নামে করা। এটা বর্তমানে মিউজিয়ামে রুপান্তরীত করা হয়েছে। ১৮৫৮ সালে তৈয়ারি করা এই ক্যাথেড্রালটি সন্ধ্যার পরে বন্ধ হয়ে যায় বিধায় আমরা এর ভিতরে ঢোকতে পারি নাই কিন্তু বাইরেও বহু দর্শানার্থির জন্য দেখার বেশ কিছু আছে। আমরা বেশীক্ষন এখানে থাকতে পারি নাই কারন আমরা এমনিতেই বেশ দেরী করে বের হয়ে আরো বেশ কিছু জিনিষ দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। আর আমরা এই সেন্ট পিটার্সবার্গে দিনের বেলায় বের হবার সম্ভাবনা নাই কারন আমাদের মেলায় আমাদের সারাক্ষন থাকতে হয়। কিছু ছবি তুলে বেরিয়ে গেলাম আলেক্সজেন্ডার পেলেসের উদ্দেশ্যে। কারন ওখানে আবার বেশী রাতে ঢোকার অনুমতি নাই।

আলেক্সজেন্ডার কলাম ইন প্যালেস স্কোয়ার দর্শনঃ

ফ্রান্সের নেপোলিয়ানের সাথে যুদ্ধবিজয়ের পর আলেক্সজেন্ডার-১, এটা তৈরী করেন। প্রায় ১৫০ ফুট উচু এই কলামের উচ্চতা। এতো বিশাল খালি জায়গা এর সামনে, দাড়ালেই মন ভরে যায়। খুব পরিষ্কার করে রাখা জায়গাটি। একদম উপরে একটা এঞ্জেল একটা ক্রস ধরে আছে। কেনো এই ক্রস কিংবা কিসের কারনে এই সিম্বল দেয়া, সেতা আমাদের গাইড আলেক্স ভালো বলতে পারলো না। তবে একটা কথা আলেক্স বল্লো যে, এঞ্জেলের মুখখানা আলেক জেন্ডার-১ এর মুখের আকৃতি স্বরূপ করা। কিছুক্ষন থাকার পর আমরা আরেকটি দর্শনীয় জায়গার জন্য র ওয়ানা হয়ে গেলাম। আসলে কোনো স্থানই আমাদের ভালো করে দেখা হচ্ছিলো না কারন এমনিতেই রাত হয়ে যাচ্ছিলো আবার আমাদের হাতে দিনের বেলাতেও সময় নাই। অন্যদিকে আর এখানে এসেছি মাত্র ৪/৫ দিনের জন্য।

চার্চ অফ দি সেভিউর অন স্পিল্ড ব্লাডঃ প্রকৃত পক্ষে এটা একটা ইমোশনাল জায়গা রাশিয়ানদের জন্য। আলেক্সজেন্ডার-২ কে হত্যা করা হয়েছিলো তারই কোনো প্রতিপক্ষের মানুষ। ‘নিহিলিস্ট’ মুভমেন্টের সময় আলেকজান্ডার-২ কে হত্যা করা হয় যার কোনো বেসিক ভিত্তি ছিলো না। এই সেই একই জায়গায় রুমানভ ইম্পেরিয়াল পরিবার আলেকজান্ডার-২ এর স্মৃতি রক্ষায় একটি মনুমেন্ট তৈরী করেন যা এখন চার্চে পরিনত হয়েছে।

নেভা রিভার ব্রিজঃ

এই নদীতে একটা ব্রিজ রয়েছে যা গভীর রাতে বড় বড় শিপ, একপাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়ার জন্য খুলে দেয়া হয়। স্বয়ংক্রিয় ভাবে এটা খুলে যায় দুইধারে। আবার ভোর পাচটার আগেই পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয় যাতে দিনের বেলায় স্বাভাবিক গাড়ি ঘোড়া চলতে পারে। আমরা যখন এই নেভা নদীর তোরে এলাম, দেখালম, প্রচুর লোকজন এই ব্রিজ কখন খুলবে সেটা দেখার জন্য বেশ ভীড়। আমরা প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে দাড়িয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বৃষ্টি বা গুড়ি গুড়ি বরফের কোনো কুচি ছিলো না। অনেক শীত। প্রায় রাত দুটুর দিকে একটা বেশ বড় সড় সাইরেন বাজলো। বুঝলাম এখন হয়তো ব্রিজ খুলবে। ব্রিজ খোলার আগে তারা একতা জিনিষ নিশ্চিত করেন যে, দুই পারের কোনো গাড়ি আছে কিনা বা ব্রিজের উপরে কোনো গাড়ি আটকা পড়লো কিনা। ব্রিজ খোলার আগে তারা সমস্ত এন্ট্রি বন্ধ করে দেয় এবং একটা সাইরেন বাজানো হয়। যদি কোনো গাড়ি খুব কাছাকাছি থাকে যাদের পার হবার জন্য ব্রিজের দিকে আসবে, তারা ওই সাইরেন বাজার ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে এসে গেলে পার হবার সুযোগ পাবে আর এর পরে ভোর পর্যন্ত গাড়ি পারাপারের কোনো সুযোগ নাই। এই টাইম টেবিলটা এখানকার মানুষজন জানে বিধায় সেভাবেই চলাফেরা করেন। দেখলাম, ব্রিজটা খুব ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যস্থল থেকে দিখন্ডিত হয়ে দুই পাশে একদম প্রায় ৬০/৭০ ডিগ্রী খারা হয়ে যায়। ফলে যে কোনো বড় বড় শীপ ও এই দুই ফাক দিয়ে ক্যানাল্টায় প্রবেশ করতে পারে। অদ্ভুদ টেকনোলোজি। আমরা বন্ধ্যের ব্যাপারটা আর দেখতে চাই নাই কারন তাতে প্রায় রাত পার হয়ে যাবে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় তিনটা বেজে গেলো।

পুটিনের বাবার বাড়ি পরিদর্শনঃ

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্লাদিমির পুতিন আসলে এই সেন্ট পিটার্সবার্গের ছেলে। সেন্ট পিটার্সবারকে বলা হতো এক সময় লেনিনগ্রাড। এটাই এখন সেন্ট পিটার্সবার্গ। ব্লাদিমির পুতিনের বাড়িতা খুব সাধারন গোছের একতা বাড়ি। চারিদিকে বেশ গাছপালা, পাশেই নদী। ভাবছিলাম, দুই পরাশক্তির একজন এই ব্লাদিমির পুতিনের আজ থেকে প্রায় ৪০/৪৫ বছর আগেও এই এলাকার অনেকেই ভাবেন নাই যে, পুতিন একটা সদাহারন বালক এই রকমের পরাশক্তির চেয়ারে বসে দুনিয়া কাপিয়ে তুলবেন। অনেক কিছুর সাক্ষি এই সব জায়গার মানুষ গুলি। ব্লাদিমির পুতিনের বাবা ছিলেন একজন অতি সাধার ফোরম্যান, আর মা ছিলেন গৃহিণী। ভাবাই যায় না এই রকমের একটা পরিবার থেকে ব্লাদিমির পুতিনের মতো এতো বড় পরাশক্তির হেড হয়। তারপরেও ইতিহাস বলে কথা। আর এটাই বাস্তবতা। পুতিন এখানে থাকেন না, তিনি এখন মস্কোর বাসিন্দা।

২৯/০৩/২০১২-মূর্তজা ভাই এর সাথে চীন ভ্রমন

বৃহস্পতিবার, ১৫ চৈত্র ১৪১৮

গত ২০  মার্চ আমি পঞ্চম বারের মত চীন গিয়েছিলাম। চীন দেশটা বড় সুন্দর, রাস্তা ঘাঁট খুব সুন্দর, মানুষ গুলো ভাল, সারকার খুব কঠিন বলে মনে হল। ঢাকা এয়রপোর্ট থেকে রাত ১২৪০ মিনিটে সাউদারন বিমানে ফ্লাইট । ২০ মার্চ বাংলাদেশ আর ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা ছিল, বাংলাদেশ জিতল। ২২ তারিখে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান ফাইনাল খেলা খেলবে। আর সেদিন বাংলাদেশ মাত্র ২ রানে হেরে গেল।

আমি  চীনে এসে HUA CHEN BUSINESS HOTEL এ উঠেছি। RUIN CITY  র Wenzhou town এ ।এবারই এই হোটেলে প্রথম ওঠলাম। খুব ভাল না  ভেবেছিলাম প্রথমে কিন্তু পরে দেখলাম, হোটেল তা একেবারে Mr Zhang Xuan এর office এর কাছে এবং হোটেলের কর্মচারী গুলো খুব ভাল। এখানে মনে রাখার মত অনেক কিছু আছে। এই হোটেলের একজন মেয়ে (চাইনিজ) রিসেপসনিস্ত হিসাবে কাজ করে। আমার রুমটা ঠিক তার উল্টা দিকে। আমার একটা সুবিধা হয়েছে। যখনি যা লাগে, শুধু ডাক দিলেই হয়। কিন্তু সে ইংরেজি ভাষা কিছুই বুঝে না। আবার আমি তাদের চাইনিজ ভাষা কিছুই বুঝি না। তারপরেও একটা ভাষা আছে, সেটা বডী লেঙ্গুয়েজ। ও আমাকে ভীষণ আদর করল। ও আমাকে খুব পছন্দ করেছে। অথচ আমি ওর নামটাই জনি না। আবার যদি আমি কখন চায়না যাই আমি আবারো এই হোটেলেই উঠবো। আর উঠবো শুধু ওর জন্য। 

  Auto Bricks Industry করার কাজে এসেছি। এর আগে Mr Zhang Xuan এর কাছ থেকে মা পলাস্তিক ইন্ডাঁশ্রি করার কাজে এসেছিলাম। আমার গার্মেন্টস এর পারটনার মুরতুজা ভাই ও এসেছে কিন্তু ওঁনি হংকং থেকে চীনে এসেছে। Mr Zhang Xuan আমাকে যেঁ পরিমান সমীহ করে এবং ভালবাসে আমি তার এক অংশ ফেরত দিতে পারব না । সব সময় সে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে আমাকে এখানে ওখানে নিয়ে যাচ্ছে, কোন খাবারের বিল দিতে দেয় না, কি যেঁ কারবার !

২১ তারিখে চীন পৌঁছেছি, ২১ তারিখেই HUA CHEN BUSINESS HOTEL এ মনে রাখার মত ঘটনা ঘটল। ভাল লেগেছে। ২২ তারিখে আগে  Mr Zhang Xuan এর office এ অনেক কাজ করলাম,  Auto Bricks Industry র জন্য অনেক খবর নিলাম, আজ  মুরতুজা ভাই আসবেন। ২২ তারিখে মুরতুজা ভাই আসলেন, খুব ভাল লাগল।

২২ তরিখে আমি, মুরতুজা ভাই, কেরল এবং Mr Zhang Xuan সবাই মিলে HANZHOU গেলাম। হাই স্পীডট্রেন। কত সুন্দর ওদের ট্রেন বেবস্থা।  HANZHOU শহরটাও সুন্দর। রাত হয়ে গেল ওখানে পৌছতে। বেশ শীত।  রাতে খাবারটা  খেলাম।  চাইনিজ খাবার, মাফ চাই, প্রায়ই কাচা। আমি যেহেতু আরও কয়েকবার এসেছি, তাই আমি বেশি করে সুধু  সবজি খেলাম।  অন্তত সবজী কাচা হলে ও খাওয়া যায়। খাবার পর  মুরতুজা ভাই একটু মার্কেটে যেতে চাইলেন। গেলাম। কিছুই কেনা হল না।  ফিরে এলাম রুমে, ঘুম আসছিল না। তাই, আমি আর মুরতুজা ভাই মিলে একটা সিনেমা দেখলাম টিভিতে Inkheart. মজার সিনেমা। বেশ রাত হল ঘুমাতে। সকালটায় ওঠতে হবে, একটা প্রজেক্ট দেখতে যেতে হবে।  ঠিক   যা ভেবেছিলাম, তাই হল, আমরা ঘুম থেকে ওঠতে দেরি হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি Restaurant এ  গেলাম খেতে, নাশতা শেষ।  Restaurant এর মহিলা যেভাবেই হোক নাস্তার  ব্যবস্তা করলেন। নাস্তার পর আমরা চলে গেলাম প্রজেক্ট দেখতে।

26/04/2011-তিনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন

গতকাল রাতে দশটার দিকে আমার পাশের মসজিদ থেকে মাইকে একটা ঘোষণা এল।

“একটি শোক সংবাদ…গোলারটেক নিবাসী জনাব অমুকের মা জনাবা অমুক আজ রাত আটটার দিকে ইনেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমার নামাজে জানাজা আগামিকাল সকাল দশটায় গোলারটেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।” ঘোষণাটা কয়েকবার দেওয়া হল।

আজ হরতালের দিন। আমি অফিসে যাই নাই। বাসায় বসেই অফিসের যতগুল কাজ করা যায় তাইই করছি। এখন বাজে দুপুর দুইটা। আবারও একটা ঘোষণা এল, ” “একটি শোক সংবাদ…গোলারটেক নিবাসী জনাব অমুকের ভাই জনাব অমুক আজ সকাল এগারটায় ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমার নামাজে জানাজা আগামিকাল বিকাল চারটায় গোলার টেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।”

সকালের জানাজাটা কখন হয়েছিল আমার মনেও নাই। আবারও একটা জানাজার সংবাদ।

আমার বাসায় আমি প্রায় প্রতিদিন না হলেও প্রায় প্রতিনিয়ত এই মসজিদের ইন্তেকালের ফরমায়েশটা প্রায়ই শুনি। ভয় লাগে। হয়ত বা কোন একদিন এমন একটা শোক সংবাদ অনেকেই পাবে যে, ” “একটি শোক সংবাদ…গোলারটেক নিবাসী জনাব মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন আজ রাত আটটার দিকে ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমের নামাজে জানাজা আগামিকাল সকাল দশটায় গোলার টেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।” তখন হয়ত অনেকেই আসবে, হয়ত অনেকেই আসবে না। জানাজার নামাজটা ঈশ্বর ফরজে কেফায়া হিসাবে নির্দেশ করেছেন অর্থাৎ এটা সবার জন্য ফরজ কিন্তু যদি জানাজার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে লোক আসে তাহলে যারা আসে নাই তারা এই আদেশের বলে অন্যায় হয়েছে বলে দোষী সাব্যস্থ হবেন না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সাহেলের (১২ লং কোর্সের কিন্তু এমসিসির) জানাজার কথা মনে পড়ল।

আমি যখন আর্মি সিগন্যাল ব্রিগেডের মাঠে গেলাম সাহেলের জানাজা নামাজের জন্য। গিয়ে দেখি সাহেল শুয়ে আছে একটা খাটিয়ায়। নাকে ওর সুগন্ধি দেয়া তুলা, সারা শরির একটা সুন্দর চাদর দিয়ে ঢাকা। আমি একদম কাছে গিয়ে ওর ঠিক মুখের উপর দাড়িয়ে মনে মনে জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম, “সাহেল, আমি জানি তোমার এখন নরন চড়নের উপায় নাই। কিন্তু তুমি কি কিছু উপলব্ধি করতে পারছ? তুমি কি দেখতে পাচ্ছ কারা কারা এখানে এখন তোমাকে শেষ বিদায় দেওয়ার জন্য এসছে? অথবা তুমি কি কাউকে ডাকছো এই মুহূর্তে? কিংবা তুমি কি তোমার অসমাপ্ত কোন কাজের পরবর্তী নির্দেশনাগুলো কাউকে দিয়ে যেতে চাচ্ছ? অথবা এমন কি কোন অনুসুচনা হচ্ছে যে কারো কাছে কোন ক্ষমা চাওয়ার? বা এমন কোন বানী যা তোমার পরবর্তী বংশধরদের বলতে চাচ্ছ? আমি অনেকক্ষন তোমার দিকে চেয়ে আছি, মনে পড়ছে আমার সঙ্গে তোমার ১৯৭৮ সালের ঐ রুম নম্বর ১০ এর কথা। তুমি প্রথম ভুতের গল্প বলে সবাইকে এমন একটা আচ্ছন্নতায় ভরিয়ে রেখেছিলে যে সারারাত আমরা কেউ ভয়ে বাথরুমে গিয়ে প্রশাবও করতে যেতে পারিনি। তুমি কি এখন কোন ভুতের ভয় পাচ্ছ? এমন কোন ভুত যা তোমার গল্পের মধ্যে ছিল না!! অথবা এমন কোন বিষয় যা তোমার গল্পের মধ্যে ছিল না যা এখন তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছো?

হটাত যেন সাহেল আমার সঙ্গে কথা বলা শুর করল।

দেখ আখতার, আমার একটা শখ ছিল, আমি আবার সেই ছোট্ট শ্যামলিময় গ্রামে চলে যেতে চাই, সেটা আমি তোমাকে গত পরশু ও বলেছিলাম। আমি আর এই যান্ত্রিকতার মধ্যে বাস করতে চাই না। আমি হাপিয়ে উঠেছি। আমার আর এই যান্ত্রিক মেইলের চিঠি পড়তে ভাল লাগে না। তোমরা আমাকে চিঠি লিখবে সেই পুরানো পোস্ট অফিসের ধারনায়। হাতে লেখা নীল রঙের খামে ভরা চিঠি। ষাট দিন লাগবে আমার হাতে পৌঁছতে, আমি আস্তে আস্তে ভাজটা খুলবো আর ভাববো তোমার চিঠি, তোমাদের চিঠি। সেই ঢাকা থেকে এসেছে। সারাদিন আমি আমার মেঠোপথের অকারন ক্লান্তি দূর করে সন্ধায় হারিকেনের বাতি জ্বালিয়ে আবার তোমাদের চিঠিটা পড়বো আর একে একে লিখে যাব আমার সারাদিনের ব্যস্ততার কথা। আমার পুকুরের মাছগুলোর কথা কিভাবে ওরা সকালে খামাখা কোন কারন ছাড়া ছুটাছুটি করে আবার কোন কারন ছাড়াই দুপুরের দিকে শিক্ষানবিস সাতারুর মত নাক উচু করে ভেসে থাকে এক স্তর পানিতে। আমি ঢিল ছুড়ি, প্রথম প্রথম ওরা আমার এই ঢিল ছোড়াকে ভীষণ ভয় পেত কিন্তু এখন আর করে না। ওরাও আমাকে আর শহরের মানুষ মনে করে না। মনে করে আমি বুঝি মাছ হয়ে গেছি। অথবা লিখব আমার সেই পালের গরুগুলিকে নিয়ে। কে যেন এক অহেতুক কারন ছাড়া ছোট্ট অবুঝ বাছুরটি কথা থেকে দ্রুত দৌড়ে এসে প্রচন্ড রক গতিতে তাঁর মায়ের বানে টান দিয়ে আবার আরেক দিকে ছুট। কি অবাক না? ওরাও হয়ত আমাদের শিশুদের মত খেলা করে কিন্তু ওদের খেলনা নেই, ওদের খেলনা শুধু ওদের পরিবার আর পারিপার্শ্বিক জগত নিয়ে। বৃষ্টি এলে ওরাও বুঝে বের হওয়া যাবে না। কোন কাজ নাই তাই অলস সময়ে যাবর কাটে। মাঝে মাঝে ডাক দেয়…হাম্বা হাম্বা। ওদের সব ডাকের উচ্চারন এক কিন্তু তাঁর মিনিং এক নয়। আমরা যেমন কখনো রাগ করলে চোখ দেখলে বুঝা যায়, হাতের নড়াচরা দেখলে বুঝা যায় আমাদের মানসিক অবস্থা কিন্তু ওদের ভাষার কোন পরিবর্তন নাই। ওরা রাগ করলে গুতা দেয়, অথবা ভয় পেলে কোন দিক না দেখেই দৌড় দেয়। অথবা লিখবো আমার মন খারাপের কথা, আমার মন ভাল লাগার কথা। তোমরা হয় ভুলেই যাবে আমার চিঠির উত্তরের কথা। হটাত কোন একদিন অলস পোস্ট মাস্টার অনেকদিন পর যেন একখান দায়িত্ব পাওয়া গেল এই মর্মে আনাচে কানাচে অনেক উল্টা পালটা গলি পার হয়ে অবশেষে তোমার বাড়ির ঠিকানা পেয়ে আমার সেই চিঠিটা তোমার হাতে পৌঁছে দেবে।

সাহেল আমাকে যেন একটা নাড়া দিয়ে বলল, “ঐ কাজল আসে নাই? কাজল কি জানে যে আমি মারা গেছি?” আমি হাসি সাহেলের কথায়। আমি জিজ্ঞ্যেস করি সাহেলকে, আচ্ছা সাহেল মরার পর তোর অনুভুতি কি? তোর ক্যামন লাগছে মরার পর? সাহেলের সহজ সরল উত্তর-ব্যাপারটা আমি এখনো ভালমত বুঝতে পারছি না। নড়াচরা করতে পারছি না। পাটা যেন অবশ হয়ে আছে, কানের কাছে কি একটা তোরা গুজে দিয়েছিস, ভাল মত শুনতেও পারছি না। হাতের কব্জির উপর একটা মশা বসেছে, বেশ লাগছে, মারতে পারছি না। নাকের কাছে এক অসহ্য দুর্গন্ধময় একটা তুলা দিয়ে তোরা আমার শ্বাস ভারি করে রেখেছিস। তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?

বললাম, সাহেল তুই কোন ভাষায় কথা বলছিস এখন? আমি তো তোর কোন কথাই বুঝতে পারছি না। মনে হল সাহেলের চোখের দুই পাশে একটু ভেজা ভেজা। সাহেল, তুই কি কাদছিস? নারে ভাই আমি কাদছি না। আমার খুব মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না আর কখনো তোদের সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা, আমি জানি না আমার সেই মাছগুলুর সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে কিনা। আমার জানা নাই, আর কখনো আমি তোদের মত এমন করে আমার সেই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে আদর করতে পারব কিনা। তুই কি দেখতে পারছিস না ওদের? ওরা কারা? ওরা সবাই আমাকে এভাবে ঘুরে আছে কেন? কেন ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্চে? কথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমার এই বড় রুম, আমার এত কাপর চোপড় কিছুই নিতে দেবে না? কি খাবো আমি ওখানে? কে আছে ওখানে? আমার ভয় করছে ভাই। তোরা কেউ যাসনে প্লিজ।

 আমি সাহেলের কোন কথাই আর বুঝতে পারছিলাম না। পাশে নাজমুল দাড়িয়ে ছিল। বলল, কিরে কি দেখছিস এমন করে? আমার সম্বিত ফিরে এল। দেখলাম অনেকে চলে এসেছে। হুজুরও চলে এসেছে। সবাইকে সারি সারি হয়ে জানাজা নামাজের জন্য হুজুর তাড়া দিচ্ছে। এক সময়, হুজুর সবাইকে জিজ্ঞ্যেস করলে, “তিনি কেমন মানুষ ছিলেন? সবাই যেন গদবাধা একখান উত্তর করল, “খুব ভাল মানুষ ছিল”

মরার আগে যিনি এই খেতাবটা শুনে যেতে পারেনি, আজ তাঁর খেতাবের মধ্যে একটা হল ,”তিনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন”

তারপর? তারপরের অনুভুতিটা আমি বাসায় গিয়ে আমার ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। শুনতে চাও? তাহলে আরেকদিন………।      

১৮/০৩/২০১১-প্রিয়ান্থার শেয়ার হস্তান্তর

প্রায় এক বছর। আমি, মুর্তজা ভাই আর প্রিয়ান্থা এক সাথে কোনো রকমে কাজ করছিলাম। তারাই ফ্যাক্টরীর একাউন্ট হ্যান্ডেলিং, অর্ডার নেয়া, শিপমেন্ট করা, সবকিছু করেন। আমি জাষ্ট থাকি। কোনো প্রশ্নও করি না। আর করিই বা কিভাবে? আমার শেয়ারে থাকাটা তো ছিলো এক প্রকার দয়ার মতো। কিন্তু এরমধ্যে আমি একটা কাজ করতে পেরেছিলাম যে, আমি পার্টনার হিসাবে অতোটা ক্রিটিক্যাল নই। মানুষ হিসাবেও সহজ সরল। তাই ওনারা আমাকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করতেও পারছিলেন না। আমি ফ্যাক্টরীর এমডি হিসাবেই ছিলাম।

প্রিয়ান্থা ২০০৯ সালে হার্ট এটাকে মারা গেলেন। মাত্র ৪১ বছর বয়সে। প্রিয়ান্থার শেয়ার ছিলো ৪৫% আর মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ার ছিলো ৪৫%। আমার ১০%। প্রিয়ান্থার মৃত্যুর কারনে প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ার এখন অন্য কারো নেয়ার কথা। কিন্তু মুর্তজা ভাই চালাক মানুষ, তিনি চান নাই যে, অন্য আরো কেউ এই ফ্যাক্টরিতে ডাইরেক্টর হয়ে আসুক। ফলে মুর্তজা ভাই একটা প্রোপোজাল দিলেন যে, প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ার আমরা ভাগ করে নিতে পারি কিনা, বিনিময়ে প্রিয়ান্থার ইনভেষ্টেড প্রায় ৭৫ লাখ টাকা তার স্ত্রীকে ক্যাশ প্রদান করতে হবে। আমার তো আর কোনো টাকাই ছিলো না। কিভাবে আমি শেয়ার নেবো? শেষতক আমি মুর্তজা ভাইকে পলাশপুরের ৫৮ শতাংশ জমির বিনিময়ে যার দাম ধরা হলো ৫০ লাখ টাকা, এর বিনিময়ে আমি ২৫% শেয়ার নিলাম আর মুর্তজা ভাই নিলেন ২০% শেয়ার। তাতে এটা দাড়ালো যে, আমার হয়ে গেলো ৩৫% আর মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ারে দাড়ালো ৬৫%। এখন কেনো যেনো মনে হয় যে, সম্মান জনক একটা পজিশনে আছি শেয়ারের কথা ভেবে। আমি এমডিই রয়ে গেলাম আর মুর্তজা ভাই হয়ে গেলেন ফ্যাক্টরীর চেয়ারম্যান।

২০/০৪/২০০৯-বাসাবোতে ডেভেলোপারের কাজ

রিভার সাইডে আমার বিলুপ্তির শেষের দিকে আমি যখন অন্য আরেকটি বিকল্পের কথা চিন্তা করছিলাম, তখন বাসাবোতে তারেক নামে এক ভদ্র লোকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো। আর সেটা মোহসীন সাহেবের মাধ্যমেই। তারেক সাহেব আমাদের ফ্যাক্টরিতে এক্সেসরিজ সাপ্লাই দিতেন। বরিশালের মানুষ, খুব চালাক। তার মাধ্যমে আমি বাসাবোতে আরাই কাঠার একটা প্লট বায়না করেছিলাম এবং যেভাবেই হোক, টাকাটাও এক প্রকার পরিশোধ করেই দিয়েছিলাম। পাটোয়ারী নামে এক লোকের জমি যিনি নিজেও গার্মেন্টস লাইনে ছিলেন। পাটোয়ারী সাহেবের স্ত্রীর নামেও আরো আড়াই কাঠা জমি ছিলো একই দাগে। ফলে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ডেভেলোপারের কাজের একটা বুদ্ধি করলেও পাটোয়ারী সাহেব থাকতে পারেন নাই। ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে কিস্তি কিস্তি করেই টাকা নিয়ে গার্মেন্টস চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এক পর্যায়ে গিয়ে আমি পুরু ৫ কাঠা জমিই নিয়ে নেই আর সেখানে হাউজিং করার জন্য উদ্যোগ নেই।

এতো চড়াই উতড়াই যাচ্ছিলো আমার জীবনের উপর দিয়ে। তারপরেও কিভাবে যে আল্লাহ আমাকে এসব বীভৎস পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছেন, ভাবলেও শরীর কেপে উঠে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি। আমার মাথায় একটা বিষয় সব সময় কাজ করতো যে, যে কোনো মুল্যে আমার পরিবার যেনো সাফার না করে। আমি ওদেরকে বুঝতেই দেই নাই আমার ভিতরে কি চলছে বা আমি কি অবস্থায় আছি। 

সারাক্ষন চিন্তায় থাকি, কিভাবে মানুষের লোন গুলি শোধ করবো, কিভাবে সম্মানের সাথে একটা ব্যবসায় টিকে থাকবো। যার কেউ নাই, আসলে তার মতো মানুষের অনেক বড় সপ্ন দেখা অপরাধ। কিন্তু আমার তো সামর্থ না থাকলেও যোগ্যতা ছিলো। আর সেই যোগ্যাটা গুলি আমি আমার সহজ সরল মনের কারনে হারিয়ে ফেলেছিলাম এই সিভিলিয়ানদের ভীড়ে। একটা সময় ভাবলাম, বাসাবোর ৫ কাঠার উপরে যদি বিল্ডিং বানাই আর সেই ফ্ল্যাট গুলি বিক্রি করি, তাতে হয়তো একটা সেক্টর খুলবে। তারেকের এক বন্ধু হারুন নামের এক ভদ্র লোক সামিল হলেন। ভালো মানুষ। বুদ্ধি দিলেন যে, তার এক পরিচিত ভাই আছে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনে। লোন নিয়ে হয়তো কাজে হাত দেয়া যায়। হাউজ বিল্ডিং ফাইনেন্সে গিয়ে জানতে পারলাম, গ্রুপ লোনে বেশী টাকা পাওয়া যায়। ফলে আমার টাকায় কেনা ৫ কাঠা জমি আমি নির্ভয়ে মোট পাচ ভাগে সাক কবলা করে গ্রুপ লোন হসাবে ৬০ লাখ টাকা নিয়ে নিলাম। তাদের মধ্যে একজন লেঃ কর্নেল ফেরদৌস, আমার ভাতিজা মান্নান, আমার স্ত্রী মিটুল চৌধুরী, হারুন সাহেব আর আমি। মোট ৫ জন, ৫ কাঠা। এটাও একটা ভালো বুদ্ধি ছিলো না। কিন্তু আমাকে হয়তো আল্লাহ ভালোবাসেন, তাই মাথায় একটা বুদ্ধি এটে দিলো যে, সাব কবলা করার সাথে সাথে আমি সবার কাছ থেকে আম মোক্তার নিয়ে নিলাম যাতে কেউ আমার সাথে আবার ছল চাতুরী করতে না পারে।

০৫/০৪/২০০৮-প্রিয়ান্থা আর মুর্তজা ভাইয়ের অংশী দারিত্ত

মোহসীন সাহেবের সাথে অনেক ভেবে চিনতে আমি পার্টনারশীপ করি নাই। ব্যবসায়ীক জগতে যেহেতু আমার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না, আর ২০ বছরের অধিক কাটিয়েছি সেনানীবাসে, ফলে খুব যে মানুষ চিনতে পারি সে রকমও নয়। সবাইকেই বিশ্বাস করি, সবাইকেই আপন মনে হয়। কিন্তু মানুষগুলি আমার এই সরলতা আর বিসশাসকে পুজি করে বারবার ঠকিয়েই যায়। ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই আমার যা হারাবার তা নিঃশেষ হয়ে যায়। রিভার সাইডের ব্যবসাটাও প্রায় এমনই মনে হলো। ডিপিএস, সঞ্চয়, অন্যদের কাছে লোন নিতে নিতে আমি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলাম। অন্যদিকে মোহসীন সাহেব যে খুব একটা সিরিয়াসভাবে ব্যবসাটা করছেন, তা মনে হলো না। একটা সময় এলো আমি বুঝতে পারলাম, মোহসীন সাহেবকে দিয়ে আমার এই গার্মেন্টস ব্যবসা হবে না। এরমধ্যে প্রায় কোটি টাকার উপর ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছি। ছোট ভাই (মোস্থাক ভাই) এর কাছে একাই লোন নিয়েছিলাম প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্যবসাটা আর করবো না। এর থেকে বেরিয়ে যাওয়াই উত্তম।

ক্লায়েন্ট খুজতে থাকলাম যদি অন্য কারো কাছে রিভার সাইড হস্তান্তর করে অন্তত যেটুকু লোন আছে সেটুকু দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়, বিশেষ করে ব্যাংকের লোন। শ্রীলংকান অধিবাসি প্রিয়ান্থা আর তার বাংলাদেশী বন্ধু মুর্তজা ভাই আমাদের ফ্যাক্টরী ২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১০০% কিনে নিতে আগ্রহী হলেও পরবর্তীতে এলাকার সিচুয়েসন এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তারা অন্তত ১০% শেয়ারের বিনিময়ে হলেও আমাকে রাখতে চান। প্রাথমিকভাবে আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু বের হয়ে যাচ্ছি, তাহলে আর থাকা কেনো? আমি অন্য অনেকগুলি সেক্টরে ব্যবসার লাইন খুজলেও টাকা পয়সার টানাটানিতে আসলে কোনোটাতেই প্রবেশ করতে পারছিলাম না। খুব রাগ হচ্ছিলো নিজের কাছে। ডেভেলোপারের কাজে হাত দিলাম। কুমা নামে একটা কোম্পানিও ফর্ম করলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, মুর্তজা ভাই আর প্রিয়ান্থা আসলে আমাকে পার্টনার হিসাবে নন, একটা নিরাপত্তার চাদর হিসাবে ব্যবহার করে তাদের ব্যবসাটা নির্বিঘ্নে চালাতে চাচ্ছিলেন। যার কেউ নাই, যার হাতে কিছু নাই, তার কোনো চয়েজ থাকে না। ভাবলাম, এই ১০% নিয়েও যদি আমি মাসিক একটা সেলারী পাই, আর একটা অফিস পাই, তাতেই বা কম কিসের? শেষ অবধি সিদ্ধান্তটা মেনে নিয়েছিলাম। কখনো আসি, কখনো আসি না। আসলে আমার আসা যাওয়া নিয়েও তাদেরও কোনো মাথা ব্যথা ছিলো না। তাদের শুধু একটাই চাওয়া ছিলো, আর সেটা লোকাল কোনো ঝামেলা না থাকা যেটা আমি পারি।

খুব চুপচাপ একটা লাইফ লিড করছি, পরিবারের কাউকেই বুঝতে দেই না আমি কোন অবস্থায় আছি। আমি শুধু এইটুকু নিশ্চিত করতে চাই যে, ওরা যেনো ভালো থাকে। মীরপুরে বাড়িটা সম্পন্ন হওয়াতে একটু স্বস্তি পাচ্ছিলাম যে, অন্তত বাড়ি ভাড়া লাগবে না। মিটুলের চাকুরী আছে, হয়তো না খেয়ে তো আর মরবো না। তদুপরি, ১০% শেয়ার নিয়ে হলেও তো আছি একটা ব্যবসায়, মন্দ কি? মুর্তজা ভাই, আর প্রিয়ান্থা যেনো এক বোটায় দুটি ফুল, একে অপরের উপর খুবই ডিপেন্ডেন্ট। কিন্তু আমার সাথে চলমান একটা সম্পর্ক রাখেন। আমিও তাদের ব্যবসায়িক কোনো কাজে নাক গলাই না। দরকারও মনে করি না। আমি জানি কি ভুমিকা নিয়ে আমি এই রিভার সাইডে আছি। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, তারাও আমাকে ছাড় দেন নাই। যতটুকু ব্যবসায়ীক ফায়দা লুটার বা দরকার পুরুটাই তারা আমার কাছ থেকে করে নিয়েছেন। তাতে আমার কত লস হলো বা কি কারনে আমি এমন একটা ফ্যাক্টরী দিয়ে দিলাম, সেটা তাদের কাছে বিবেচ্য ছিলো না বা থাকার কথাও না। ফ্যাক্টরীর অডিট, কাষ্টম ক্লিয়ারেন্স, অন্যান্য দেনা পাওনা, সবই তারা আমাকে ঐ ১০% এর শেয়ারের মুল্যের উপর আর কিছুটা আমার উপর লোন লিকঝে কাজগুলি সমাধা করে নিয়েছেন। কিছু বলার অবশ্য আমার ছিলো না।

মোহসীন সাহেবকে আমি বিনা পয়সায় শেয়ার দিলেও যখন শেয়ারটা ফেরত চাইলাম, দেখলাম, কেউ নিজের সার্থের উর্ধে নয়। তিনিও আমাকে এক প্রকার জিম্মির মতো করে ফেলেছিলেন শেয়ার ফেরত না দেয়ার কথা বলে। খুব কঠিন একটা পরিস্থিতিতে ছিলাম। কিন্তু যেভাবেই হোক, আমি শেষ পর্যন্ত ছলে বলে কৌশলে মোহসীন সাহেবের কাছ থেকে শেয়ারগুলি লিখিয়ে নিতে পেরেছিলাম।

২৬/০৫/২০০৭-মোহসীন সাহেব এবং রিভার সাইড

মোহসীন সাহেব আমার গার্মেন্টস এর পার্টনার। আমার এই লেখাটা লিখার আগে মোহসীন শাহীন সাহেব সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। তিনি অত্যান্ত ধার্মিক একজন মানুষ। সারাদিন পবিত্র কোরআন শরীফ তার সাথে থাকে, তার হাতে তসবিহ থাকে, মাথায় টুপী আর গায়ে আলখেল্লা। মুখভর্তি দাড়ি। খুব ভালো ইংরেজী বলতে পারেন। দেখতে বেশ সুদর্শন। আমি যখন প্রথম রিভার সাইড সুয়েটার্স ফ্যাক্টরিটা জনাব নাজিম উদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে নেই, তখন পর্যন্ত আমার জানা ছিলো না কিভাবে একটা ইন্ডাস্ট্রি চালাতে হয়, তাও আবার গার্মেন্টস এর মতো একটা ঝুকিপুর্ন ইন্ডাস্ট্র। যেহেতু আর্মির মতো এমন একটা প্রেস্টিজিয়াস চাকুরী নিজ ইচ্ছায় ছেড়ে চলে এসেছি, ফলে আমার জিদ ছিল, আর কোনো চাকুরী নয়, এবার নিজের জন্য নিজে কিছু করবো। আল্লাহ আমার সহায় ছিলেন সব সময়। যখন চাকুরী ছেড়ে দেবার কথা ভাবছিলাম, তখন এই জনাব নিজাম উদ্দিন কোনো একটা উছিলায় আমার মীরপুর সেনানীবাসে নিজের থেকেই এলেন দেখা করতে। আমি তাকে জীবনেও দেখি নাই। কিন্তু উনি আমাদের এলাকার একজন নামী মানুষ, যদি তার ট্র্যাক রেকর্ড যথেষথ পরিমান খারাপ। কোনো এক কালে তিনি নাইজ্যা ডাকাত নামে নাকি পরিচিত ছিলেন। এখন তিনি কোটিপতি, লেখাপড়ার কোনো বালাই নাই। একটা নিরক্ষর টাইপের মানুষ।

যাই হোক কিভাবে নাজিম সাহেবের সাথে আমার ব্যবসায়ীক লেনদেন শুরু হয় সেটা আরেক পাতায় লেখা আছে। এখন মোহশীন সাহিনের ব্যাপারেই যখন বলছি, সেটাতেই থাকি। আমি যেহেতু গার্মেন্টস বুঝি না, তাই ফ্যাক্টরী নেয়ার আগে মনে মনে ভাবলাম যে, এই ফ্যাক্টরিতে সফল্ভাবে কাজ করেছে এমন একজন লোক খুজে বের করা। আর সে সুবাদে আমি মোহসীন শাহিনের খবর পাই। আমি মোহসীন শাহীন সাহেবকে খবর দেই যে, উনি গার্মেন্টস করতে চান কিনা। কালের এবং সময়ের বিবর্তনে মোহসীন শাহীন ও বড্ড অসহায় হয়ে সব কিছু হারিয়ে এখন সমাজ সংসার, পরিবার বর্গ ছেড়ে একা একা তাবলিগ করে বেড়ান। ফলে আমার এই সংবাদে তিনি অনেক খুশি হয়েই যতো দ্রুত পারেন চলে এলেন আমার সাথে কথা বলার জন্য। আর এ কাজে সবচেয়ে বেশী সাহাজ্য করেছে হাসনাবাদ এলাকার একটি ভদ্র ছেলে তৌহিদ। ছেলেটা ভালো পরিবারের ছেলে এবং তখন পর্যন্ত তৌহিদ রিভার সাইড সুয়েটার্সেই কাজ করে, বলা যায় কোনো রকমে সে ফ্যাক্টরিটা ধরে রেখেছে।

মোহসীন সাহেব, তৌহিদ এবং আমি এক নাগাড়ে কয়েকদিন এই ফ্যাক্টরীর ভুত-ভবিষ্যত নিয়ে বিস্তর আলাপ করলাম। ফ্যাক্টরিতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার একটা লোন আছে। এই লোনটা ব্যাংকের মাধ্যমে রি-সিডিউলিং করেই চালানো যায়। আমি তখনো রি-সিডিউল কি, গার্মেন্টস কি, অর্ডার কি, এল সি কি, ব্যাক টু ব্যাক কি, নিটিং কি ইত্যাদির কিছুই জানি না। আমি শুধু মোহসিণ শাহীন সাহেবকে বললাম যে, যদি আমি অর্থ এখানে ইনভেষ্ট করি, তাহলে এর ভবিষ্যত কি। মোহসীন সাহেব কিছুক্ষন খাতা কলমে কি কি ক্যাল কুলেশন করলেন, সাথে তৌহিদ নিজেও হ্যা হু করলো, এরপর তারা উভয়েই আমাকে জানান দিলো যে, ছয় মাসের মধ্যে এই ফ্যাক্টরী থেকে প্রতি মাসে যা আয় হবে সেতা এতো বেশী যে, আর কোনো চিন্তা নাই। কিন্তু এর জন্য প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ইনভেষ্ট প্রয়োজন।

আমি যেভাবেই হোক এই টাকার একটা দায়িত্ত নিলাম। মোহসিন সাহেবকে আমি নিঃশর্তভাবে বিনা টাকায় ৩০% শেয়ার হোল্ডার হিসাবে মালিকানার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চেয়ারম্যান বানিয়ে নিলাম। শর্ত ছিলো, গার্মেন্টস তিনিই চালাবেন, আমি প্রশাসনিক দিকটা দেখবো। কোথা থেকে অর্ডার আনা হবে, কিভাবে অর্ডার নেগশিয়েট করা হবে সব করবেন মোহসিন সাহেব। ফ্যাক্টরী শুরু হল। আমি ধীরে ধীরে ব্যবসাটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু আমি একটা ব্যাপার বুঝি নাই যে, মোহসীন সাহেব সব কিছু আমাকে শেয়ার করেন না। আর করতেও চান না সম্ভবত। কিন্তু বছর খানেকের মধ্যে আমি আমার সমস্ত পুজি খালি করেও এটাকে টেনে তুলতে পারছিলাম না। বিভিন্ন জায়গায় এতো লোন হয়ে যাচ্ছিলো যে, আমার একসময় মনে হলো যে, আমার এ যাবত সব সিদ্ধান্ত ভুল। আমার এটা করা ঠিক হয় নাই। মোহসিন সাহেবের মধ্যে একটা উদাসীন ভাব সব সময়ই ছিলো, যেনো কনো কিছুই তাকে স্পর্শ করে না, না ওয়ার্কারদের বেতনের চিন্তা, না অর্ডারের সুরুতহাল, কোনো কিছুই না। এতার একতা কারন অ ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, তিনি তো কোনো ইনভেষত মেন্ট করেন নাই। লস যদি হয়, তাতে ওনার কি? কিন্তু আমি তো ওনার মতো উদাসিন হয়ে শান্ত হয়ে থাকতে পারি না।

এরই মধ্যে মোহসীন সাহেব আবার ঘন ঘন তাবলিগ, ইস্তেমা ইত্যাদির সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেলেন যেনো ওটাই আসল কাজ, গার্মেন্টস কোনো কাজই না। ঠিক এই সময় মোহসিন সাহেব ৪০ দিনের বৈদেশিক একটা দলের সাথে চাঁদ (Chad) নামক একটি দেশে পাড়ি জমালেন। আর আমাকে একটা নোট দিয়ে গেলেন যে, জিএমসি নামক একটা বায়িং হাউজ থেকে আমরা স্কিভা নামের বায়ারদের কাছ থেকে বেশ অর্ডার পেয়েছি, সেগুলি টাইম মতো শিপমেন্ট করতে হবে। সবকিছু তিনি এরেঞ্জ করে দিয়ে গেলেন। কোনো কিছুই বাদ রেখে যান নাই। যেহেতু আমি ব্যাপারটা আগে কখনো হ্যান্ডেল করিনি, তাই ব্যাপারটা বুঝিও নাই। আমিও তাকে এলাউ করলাম। অথচ এখন গার্মেন্টের পিক আওয়ার চলছে। এ সময় যতো জরুরীই থাকুক, কোনো গার্মেন্টসের মালিক অর্ডার না কমপ্লিট করে বাসায়ও যেতে চান না, আর তিনি চলে গেলেন সুদুর চাদে। আমি যখন ব্যাপারটা একা হাতে হ্যান্ডেল করতে গেলাম তখন যা বুঝলাম যে, আমি শুধু নদীতে না, সাগরের মাঝখানে হাবুডুবু খাচ্ছি। কোনো কিছুই ঠিক নাই। ইন্টারনেট খোলা, তাই আমি মোহসীন সাহেবকে একটা মেইল পাঠালাম। মেইলটা ছিল এই রকমেরঃ

মোহসিন ভাই,

এ কয়দিন সমস্ত ব্যাপার, ডাটা এনালাইসিস করে আমি যেটা বুঝতে পারছি যে, আমি খুব একটা ভাল পরিস্থিতিতে নাই। আপনি আমার এই মেইল পাওয়ার পর অবশ্যই অবশ্যই জরুরী ভিত্তিতে সবগুলি পয়েন্টের উপর একে একে ব্যাখ্যা করবেন। ব্যাপারটা অতীব জরুরী।

ক।      আপনি জিএমসির মোজাম্মেল সাহেবের বায়িং হাউজ এর মাধ্যমে যে অর্ডারগুলি নিয়েছেন, সেটার ব্রেক-ইভেন-পয়েন্টের অনেক নীচে। এফওবি প্রাইস মাত্র ২২ ডলার যেখানে আমার ফ্যাক্টরীর ওভারহেড কস্ট প্রায় ২৩ ডলার। এই অর্ডারগুলি থেকে সিএম টিকে মাত্র ৯ ডলার। বর্তমানে গার্মেন্টসে পিক আওয়ার চলছে, এবং এটা অফ সিজন নয়। সেক্ষেত্রে কি দেখে আপনি মাত্র ৯ ডলারে কাজগুলি নিলেন? যদি আপনি বলেন যে, জিএমসি এই অর্ডারগুলির মাধ্যমে আমাদেরকে সারাবছর কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই প্রতিশ্রুতির এগ্রিমেন্ট কই? আর যদি প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর তারা যে তাদের প্রতিশ্রুতি ভেংগে আবার অন্য কোথাও অর্ডার প্লেস করবে না তার কি গ্যারান্টি আছে? আর এই সময়ে আমিই বা কিভাবে ২৩ ডলার ওভারহেড নিয়ে মাত্র ৯ ডলারের কাজ করে শ্রমিকদের বেতন ইউটিলিটি বিল ইত্যাদি সামাল দেবো?

খ।      আপনি তাবলিগে যাওয়ার সময় আমাকে যে নোটটা দিয়ে গেছেন, সেখানে আপনি ক্লিয়ারলি লিখেছেন যে, গার্মেন্টস রিলেটেড সমস্ত ব্যাক টু ব্যাক, এক্সেসরিজ, এপ্রোভাল, স্যাম্পল সবকিছু ওকে করেই আপনি তাবলিগে গেলেন, কিন্তু এখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, না কোনো স্যাম্পল এপ্রোভাল করা আছে, না কোনো এক্সেসরিজের ফয়সালা দেয়া আছে। এলসি মোতাবেক আমাদের শিপমেন্ট তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০০৭, আর এখন ২০ মে ২০০৭, তারপরেও কোনো কিছুই আমি সমাধান করতে পারছি না। সেক্ষেত্রে আপনি আমাকে এই ধরনের একটা মিথ্যা ঝুকির মধ্যে রেখে তাবলিগে গেলেন কেনো? আর এর মধ্যে আমিই বা আগামী ১৫ তারিখের মধ্যে ওয়ার্কারদের বেতন দেবো কিভাবে? আপনি কি জানেন না, এখন গার্মেন্টস সেক্টরে ওয়ার্কারদের কি তান্ডব চলছে?

গ। জিএমসির মোজাম্মেল আমাকে জানালো যে, এই অর্ডারের তাদের কমিশন ৪৯৫০০০ টাকা। আর সেটা অর্ডার শিপমেন্ট হোক বা না হোক, আগেই তাদের পে করতে হবে। এটা কোন ধরনের সিস্টেম? যেখানে আমি শিপমেন্টই করতে পারছি না, সেখানে মোজাম্মেল সাহেব প্রতিনিয়ত তাদের কমিশনের জন্য গন্ডোগোল করছে? আমি কি শিপমেন্ট করেছি মাল? যদি বায়ারদের কাছ থেকে টাকাই না পাই, আমি মোজাম্মেলকে কমিশনের টাকা দেবো কোথা থেকে?

ঘ। মোহসীন ভাই, আমি ব্যাংকে গিয়েছিলাম গতকাল। ওখানে গিয়ে দেখলাম যে, আপনি কোনো একটা এক্সেসরিজ কোম্পানির নামে ২০ হাজার ডলারের এক্সেসরিজের ব্যাক টু ব্যাক দিয়েছেন। আমি যখন তাদেরকে ফোন দিলাম, কেউ কোন রিস্পন্স করলো না। পরবর্তীতে আরো অনুসন্ধান করে দেখলাম যে, জিএমসির এমডি মোজাম্মেলকে আপনি ইতিমধ্যে ৪৯৫০০০ টাকা কমিশন দিয়েই দিয়েছেন (?), তাহলে আর বাকী টাকাগুলি কই? যাদের নামে আপনি ব্যাক টু ব্যাক করেছেন, ওই নামের কোনো সংস্থার অস্তিতই নাই। এটা কিভাবে সম্ভব? আপনি যখনই আমাকে কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক সাইন করতে বলেছেন, আমি সেটা অতি বিশ্বাসের উপর কোনোদিন সন্দেহ অনুভব করি নাই কেনো ব্ল্যাঙ্ক চেক সাইন করবো। অথচ আজ দেখলাম যে, তারা আমার এই চেকগুলি দিয়ে এখন সবাই টাকার জন্যে হন্যে হয়ে আমার অফিসে ছুটছে। কি করে এ কাজটা আপনি আমার পার্টনার হয়ে করতে পারলেন? আমি তো আপনাকে আপনার লস্ট ইমেজ আবার পাওয়ার জন্য একটা চেয়ারম্যানের স্ট্যাটাস পর্যন্ত দিয়েছি যেটা আপনার আপন ভাইও করবে না। তাহলে আপনি এগুলি করতে গেলেন কেনো?

চ।       এসবের বাইরেও আমার আরো অনেক কিছু জানার আছে। প্লিজ, আপনি আমার সবগুলি প্রশ্নের উত্তর যতো দ্রুত পারেন, জানান। আর সেগুলি হচ্ছে- আমি আপনাকে টেন্ডেম বায়ারের সাথে এয়ার শিপমেন্ট এর ব্যাপারে সবকিছু সেটেল করে যাবেন বলে বলেছিলাম। আপনি আমাকে বারবার আশ্বস্ত করেছেন যে, এ ব্যাপারে তারা আমাকে নক করবে না। এতা তো পুরুতাই মিথ্যা কথা। আজ আমি আমার অফিসে ওদের এয়ারওয়ে বিল না পাওয়ার কারনে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। টেন্ডেম বলেছে, এ ব্যাপারে আপ্নার সাথে ওদের কোনো কথাই হয় নাই। কেনো এসব মিথ্যা কথা বলেছেন আমাকে?

ছ। আরএমএম এর মতো ভালো একটা কোম্পানির সাথেই বা আমরা এমন ব্যবহার কেনো দেখালাম যেখানে ওরা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে সাহাজ্য করে যাচ্ছে? রায় ভাই আর মাহিন ভাই তো আমাদের বন্ধুর মতো। তো তাদের সাথে এ রকম একটা ফলস কন্ট্যাক্ট শো করে ব্যাংক থেকে তাকা নেয়ার কি দরকার ছিল? কি মনে করছে তারা এখন? আপনি না ইসলামের নীতিকথা বলেন, তাহলে এখন আবার এসব কেনো? কাকে খুসি করার জন্য সুদুর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ইসলাম প্রচার করতে গেলেন চাদে? কি প্রচার করবেন ওখানে গিয়ে? নীতি নাকি দূর্নীতি? পোল্যান্ডের বায়ার লিঞ্জেন গার্ল এর মালিক টম এতো খারাপভাবে কেনো আমাদের ফ্যাক্টরী সম্পর্কে কথা বলবে? টম তো ভালো মানুষ। সেতো আমাদেরকে ভালো দামেই অর্ডার প্লেস করেছে, আর প্লেস করেই কিন্তু টিটি দিয়েছে। তাহলে ওর সাথে আমরা এভাবে আচরন করলাম কেনো? ও তো একতা মাল ও নিতে পারছে না সুতার সমস্যার কারনে আর বুতাম লাগে না এর কারনে। এই গার্বেজ কে কিনবে এখন?

জ। আপনি তাবলিগে যাওয়ার প্রাক্কালে আগের ইয়ার্ন কন্ট্রোলার মান্নানকে বাদ দিলেন, আমাকে জানালেন না। তার পরিবর্তে ইউসুফ নামে একজনকে ইয়ার্ন কন্ট্রোলার বানালেন। কে এই ইউসুফ? তার কি কোনো জ্ঞান আছে সুতার ব্যাপারে? না সে জানে লট কি, না জানে ইনভেন্টরী কি। ইয়ার্ন কন্ট্রোলার মান্নান ব্যাংকের ওয়ালি সাহেবের আত্তীয় বলেই কি আপনি তাকে তার পোষ্ট থেকে সরিয়ে দিলেন? আর আপনি কি জানেন যে, এই ইউসুফ বর্তমানে সুতার লট এবং ইস্যু নিয়ে কি তালগোলটা পাকিয়েছে? একতা গার্মেন্টসও ঠিক লট দিয়ে করা হয় নাই। এতো গুলি পিস এখন আমি কি করবো?

ঝ। মিজান হুজুর তো আপনাকে দেবতার মতো ভক্তি করে। মিজান হুজুর তার সমস্ত তল্পিতল্পা নিয়ে একটা হালাল কাজের উদ্দেশ্যে আপনার কাছে এসেছে। তাহলে কেনো তার কাছ থেকে এরুপ লাখ লাখ টাকা নিয়ে তাকেই কাজতা দিলেন না? তিনি তো কাজের জন্যই আপনাকে টাকাগুলি দিয়েছে। কি ইসলামীক নিদর্শন দেখালেন আরেকতা হুজুরের কাছে?

ট। উলসীর আরেক মোহসিন ভাই কি আমাদের জন্য এতোটাই জরুরী যে, যেখানে আমাদের ওয়ার্কাররা কাজ পায় না, অথচ আপনি আমাদের ৩ গেজ মেশিন দিয়ে দিলেন, আবার কাজও দিলেন। কেনো? উলসির মোহসিন ভাই আপনার আত্তিয় আমি জানি, তাই বলে কি নিজের ফ্যাকটরীর ওয়ার্কারদের বাদ দিয়ে অন্য আরেকজনকে এভাবে সাহাজ্য করতে হবে? এটা আপনার ফ্যাক্টরী না? আমি অবাক হচ্ছি মোহসিন ভাই।

মনে রাখবেন, আপনার এই ছলচাতুড়ির জন্য কোনো এক সময় আপনি আপানার কপাল থাপরাবেন। এভাবে ব্যবসা হয় না। সম্ভবত আমার অনেক ভুল ছিলো। আপনি যদি পারেন, তাবলিগ বাদ দিয়ে দেশে চলে আসেন। অনেক ব্যাপার স্যাপার আছে। এমনো হতে পারে, আমি আর ব্যবসাটা চালাবো না। যা লস হবার তো হয়েছেই। কোনো না কোনোভাবে হয়ত আমি উতড়ে যাবো। কিন্তু আপনি কি এই ব্যবসায় আর দাড়াতে পারবেন?

১০/০৮/২০০৬-ভারতে ব্যবসায়ীক ভ্রমনের অভিজ্ঞতা

গত ২৮শে জুলাই দ্বিতীয় বারের জন্য ভারত যাচ্ছি। প্রথমবার গিয়েছিলাম ষ্টাফ কলেজ থেকে জাতীয় প্রোটোকলে ডিপ্লোমেটিক ভিসা নিয়ে। কিন্তু এবার যাচ্ছি বেসামরিক হয়ে এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে। আগেরবার ভিসা নিয়ে কোনো সমস্যা হয় নাই। কিন্তু এবার ইন্ডিয়ান ভিসা পেতে বেশ জটিলতায় পড়েছিলাম, খোদ ইন্ডিয়ান হাই কমিশনারের সাথে আমাকে ইনটারভিউ দিতে হয়েছিল। বিনা সিক্রী হাই কমিশনার হিসাবে আছেন বাংলাদেশে। ভিসা ইস্যু করার আগে আমাকে এম্বেসী অফিস থেকে জানানো হলো যে, আপনার ভিসা পেতে হাই কমিশনার এর সাথে ইন্টারভিউ দিতে হবে। ব্যাপারটা সাভাবিক না। তারিখ দেয়া হলো, আমি সময় মতো পৌঁছে গেলাম এম্বেসী অফিসে। কিন্তু উনি সরাসরি আমার ইন্টারভিউ নিতে পারেন নাই কারন যেদিন আমার তারিখ পড়েছিলো, সেদিন তিনি কোনো এক জরুরী কাজে হটাত অফিসের বাইরে ছিলেন। ফলে হাই কমিশনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেব আমার ইন্টারভিউটা নিলেন। বেশ মজার একটা সাব্জেক্ট নিয়ে তার সাথে আলাপ হয়েছিলো।

বাংলাদেশে এখন গার্মেন্টস সেক্টরে বেশ আন্দোলন চলছে। শ্রমিকরা অযথাই ফ্যাক্টরীগুলিতে আন্দোলন করছে কিছু খুচরা কারন নিয়ে। যেমন, তাদের বেতন বাড়াতে হবে, কারো কারো দাবী, ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে হবে, আবার কারো কারো সরাসরি দাবী যে, পিস রেট এর কাজ আগে থেকেই তাদের বলে দিতে হবে, যদি পছন্দ হয়, করবে আর যদি পছন্দ না হয়, করবে না। এই রকম আরো অনেক অযুক্তিক দাবীও তারা করছিলো। ধারনা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ এই সেক্টরে বেশ ভালো করায় পার্শবর্তী দেশগুলি বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে একটা গন্ডোগোল পাকানোর চেষ্টা করছে। এর আরেকটা প্রধান কারন আছে। সেটা হলো, বাংলাদেশ সব বায়ারদের জন্য জিএসপি (Generalized System of Preferences) ইস্যু করে। এই জিএসপিটা আসলে কি? যার জন্য বায়াররাও এদেশে কাজ করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

জি এস পি টা একটু ব্যাখ্যা করিঃ

যারা রপ্তানীমুখী শিল্প চালান, তারা যে র মেটেরিয়াল বাইরে থেকে আমদানী করেন, সেটার উপর সরকার কোনো ট্যাক্স নেন না যদি সেই রপ্তানী শিল্প পুনরায় উক্ত র মেটেরিয়াল দিয়ে বানানো মাল আবারো রপ্তানী করেন বাইরের কোনো দেশে। তাতে রপ্তানী কৃত মালটির সর্বশেষ মুল্য বেশ কম থাকে। এই সুবিধা বিশেষ করে পান, যারা এদেশ থেকে মাল কিনেন তারা। একটা উদাহ রন দেই, ধরুন, আমি সুতা আনবো বাইরে থেকে। সুতা এনে আবার শার্ট বানিয়ে সেই শার্ট বাইরেই রপ্তানী করবো। তাহলে এই সুতার উপর কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না, আবার শার্ট রপ্তানিতেও আমাকে কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না। এর ফলে যারা বায়ার, তাদের তৈরী মুল্য কম হয়। ভারতে এই সুবিধাটা নাই। ফলে ট্যাক্স যখন যখন যোগ হয়, যে শার্ট টা আমি ১০০ টাকায় বায়ারকে দিতে পারবো, সেটা ইন্ডিয়া ট্যাক্সের কারনে হয়তো গিয়ে দাঁড়াবে ১২০ টাকা। এই যে ২০ টাকা বেশি দিতে হলো বায়ারকে, সে এটা বিক্রি করে লাভ করতে হলে কমপক্ষে ১২০ টাকার বেশী মুল্য ধরতে হবে যখন ইন্ডিয়া থেকে শার্টতা সে নেবে। কিন্তু এদেশ থেকে নিলে তাকে কম্পক্ষেব ১০০ টাকার মুল্য এর বেশী হলেই তার লাভ হবে। এ কারনে বহু দেশ জি এস পির সুবিধার কারনে আমাদের দেশকেই পছন্দ করে অর্ডার দিতে। আবার যে কেউ জি এস পি চালু করতে পারেন না। যে দেশে র মেটেরিয়াল আছে, অর্থাৎ লোকালী পাওয়া যায়, তারা জি এস পির প্রবর্তন করতে পারে না। ফলে ইন্ডিয়া ইচ্ছে করলেও জি এস পি সুবিধা দিতে পারে না। তাই যদি এই জি এস পি এর নীতি পরিবর্তন করা যায় বা বাংলাদেশ থেকে জি এস পি তুলে দেয়া যায়, তাতে অন্যান্য দেশ একই কাতারে চলে এলে বাংলাদেশ চলমান প্রতিযোগীতায় টিকে না থাক্রই কথা। হয়তো এতাই কারন হতে পারে যে, একটা আন রেষ্ট চালিয়ে এই খাতকে সমুলে ধংশ করে দেয়া যাতে বায়াররা আর এদেশে এই ঝুকির কারনে অর্ডার না প্লেস করেন।   

যাই হোক, আমি ইন্ডিয়ান এম্বেসিকে এসব ব্যাপারে খুব একতা বিশ্লেষনে গেলাম না। খালি ভাসা ভাসা কিছু হাই হ্যালোর মধ্যেই থেকে গেলাম। অবশেষে আমার ভিসা হয়ে গেলো।

এখানে একটা ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয় যে, কি কারনে আমি ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি। আমি গার্মেন্টস করছি বিধায় আমাকে মিঃ মুরাদ নামের এক ভদ্রলোক ফ্যাক্টরীতে এসে দেখা করলেন। তাকে আমি আগে থেকে চিনি না। কিন্তু আমার পার্টনার মিঃ মোহসীন শাহিন তাকে চিনেন। আমার অফিসে তিনি এসে বললেন যে, ওয়ার্লড ব্যাংক থেকে বিনা সুদে বেশ একটা লোন পাওয়া যায়, যা আমার মতো একজন ব্যবসায়ী অনায়াসেই গ্রহন করতে পারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেনো ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আমাকে এই সুযোগটা দেবে? উত্তরে তিনি বললেন যে, ইন্ডিয়ার উড়িষ্যার যিনি কংগ্রেস (আই) এর মহাসচীব, তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিনিধি (তিনি একজন অবসর প্রাপ্ত কর্নেল)। তিনি মুজিব সরকারের সময়ে শেখ মুজিবের একজন খুব কাছের মানুষের একান্ত পরিচিত। এই পরিচিত মানুষটি কখনো কোনো সুবিধা নেন নাই কিন্তু তিনি এখন আর্থিক দিক দিয়ে খুব ভালো অবস্থানে নাই। তাকে উক্ত কংগ্রেস নেতা সাহাজ্য করতে চান। আমি বললাম, কিভাবে? তিনি বললেন, যে, যদি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক লোন পাশ করে, তাহলে এর একটা অংশ উনি নিবেন, আর বাকী অংশ আমাদেরকে ৮ বছরের কিস্তিতে শোধ করে দিলেই হবে। কোনো ইন্টারেষ্ট হবে না। বস্তুত ব্যাপারটা এই দাড়ায় যে, এই ৮ বছরে যে ইন্টারেষ্ট হবে তার তুলনায় মুজিব সরকারের সময়ের এই গুরুত্তপুর্ন ব্যক্তির (নামটা বলা ঠিক হবে কিনা জানি না, তবু বলি, তার নাম মুসা সাহেব) নিয়ে যাওয়া টাকাও অনেক অনেক কম। তা ছাড়া বেশ বড় অংকের টাকা আমরা লোন নিতে পারবো যার কোনো ইন্টারেষ্টই নাই। হিসাব করে দেখলাম, লাভ আছে। তাই ওখানে বিস্তারীত আলাপ হবে।

আসলে আমি বিস্তারীত অনেক কিছুই জানি না এই লোনটা কিভাবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আমাকে দিতে চায়। একটু রহস্য তো লাগছেই। আবার মজাও লাগছে। দেখি ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়। অন্তত ইন্ডিয়া তো বেড়ানো হলো, লোন হোক বা না হোক। আমি আর মুরাদ বাসে করে ইন্ডিয়ার জন্য রওয়ানা হয়ে গেলাম। মুরাদ বাংলাদেশে কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং এর উপর ছোট খাটো একটা ল্যাব চালায়। এ কয়দিনে মুরাদের সাথে আমার ঘন ঘন দেখা হওয়াতে অনেক বেশী ফ্রি হয়ে গিয়েছিলাম।

আমরা বেনাপোল বিডিআর ক্যাম্পে গিয়ে প্রথমে যখন থামলাম, তখন বেলা প্রায় ১১ টা। ওখান থেকেই আমাদের বর্ডার ক্রস করতে হবে। আমার বন্ধু মেজর মাহফুজ তখন বেনাপোল বিডিআর এর দায়িত্তে নিয়োজিত। আগেই ফোন করে রেখেছিলাম। আমি ওখানে যাওয়ার পর দেখলাম যে, বন্ধু মাহফুজ বেশ ভালো খাবার দাবারের আয়োজন করে রেখেছে কিন্তু ওর বিশেষ তাড়া থাকায় ক্যাম্পে থাকতে পারেনি। আমি বিডিআর ক্যাম্পে উঠে একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম। সৈনিক সাত্তার এসে বল্লো যে, স্যার আপনাদের পাসপোর্টগুলি দেন, আমি ইমিগ্রেশন করিয়ে নিয়ে আসি, আর এরমধ্যে আপ্নারা একটু চা নাস্তা খেয়ে রেষ্ট করেন। প্রচুর লোকের ভীড়। আমার ধারনা ছিলো না যে, কত মানুষ বেনাপোল দিয়ে এভাবে ইন্ডিয়ায় যায়। প্রায় ঘন্টাখানেকের মধ্যে আমাদের ইমিগ্রেসন হয়ে গেলো। লাগেজ তেমন ছিলো না। তাই আমরা অনায়াসেই বর্ডার পার হয়ে ওপাড়ে চলে এলাম, অর্থাৎ ইন্ডিয়া।  আমরা শ্যামলী বাসে চড়েছিলাম। বাংলাদেশের থেকে যে বাসটি বেনাপোল পর্যন্ত ঢাকা থেকে গিয়েছিল, সেটা বেনাপোলে গিয়েই শেষ। ইমিগ্রেশনের পরে ইন্ডিয়ার পার্টে আবার নতুন শ্যামলী বাসে উঠতে হয়। ইমিগ্রশনের ঠিক পরেই যে জায়গায়টায় আমরা বাসে উঠলাম, তার নাম আসলে বিস্তরভাবে বললে পেট্রোপোল হিসাবে ধরা যায়। বাংলাদেশের এপাড়ের সাথে ওপাড়ের মানুষের বৈশিষ্ঠের কোনো তফাত নাই। যদি কেউ না বলে দেয় যে, এই পার্টটা ইন্ডিয়া আর ওই পার্টটা  বাংলাদেশ, কারো বুঝার সাধ্যি নাই। মানুষের যেনো হুরাহুড়ি, কে কার আগে বাসে উঠবে। তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখলাম। মনে মনে ভাবলাম, সবার জন্য কিন্তু সিট রিজার্ভ করা আছে, তারপরেও কেনো যে মানুষগুলি এ রকম তাড়াহুরা করে বাসে উঠছে আমার বোধগম্য হচ্ছিলো না। এরমধ্যে চায়ের হকার, পানের হকার, সিগারেটের হকার, কেউ কেউ আবার ঘাড় টিপাবেন কিনা, কান খোচাবেন কিনা এই জাতীয় হরেক হরেক পদের সার্ভিসদাতার কোনো অভাব নাই। মুরাদ বল্লো, স্যার, পকেট সাবধান। এখানে যতো না ভালো মানুষের দেখা পাবেন, তার মধ্যে অর্ধেক পাবেন চোর।

আমরা বাসে চলছি, আর মাঝে মাঝে কোন জায়গা ক্রস করছি সেটা পড়ছি। বেনাপোল থেকে কলিকাতা পর্যন্ত যে সব প্রমিনেন্ট জায়গার নাম মনে আছে তার মধ্যে হল- সুবাসনগর, গোলকনগর, মন্দালপাড়া, বকচড়া, গাইঘাটা, ধর্মপুর, হাবরা, বামনগাছি, দমদমের কিছু অংশ এবং শেষে কলিকাতা। পথিমধ্যে আমাদের বাস ধর্মপুরে আধা ঘন্টার জন্য একটা হল্ট দিয়েছিলো। কলিকাতা যখন পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় তিনটা বাজে। কি যে এক অবস্থা। পুরাই গুলিস্থান। মানুষের ভীড় আর দোকানপাটের এমন হযবরল, কোনো তফাত নাই আমাদের ঢাকা শহরের গুলিস্থান আর কলিকাতার মধ্যে। আমরা একটা হোটেলে উঠলাম। হোটেলে উঠে আমি আমার ব্যাগ একটা টেবিলে রেখে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হবো বিধায় লুংগি পড়ে বাথরুমে ঢোকলাম। মুরাদ রুমেই ছিলো। আমি বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে যখন বের হলাম, মুরাদের এক কথায় আমি হচকচিয়ে গেলাম।

মুরাদ বল্লো, আখতার স্যার, আমার মোবাইলটা পাচ্ছি না। আমি আমার মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখি, আমার মোবাইলটাও খুজে পেলাম না। কি তাজ্জব ব্যাপার!! বললাম, রুমে কি কেউ এসেছিলো?

মুরাদ বল্লো, হ্যা, একটা ক্লিনার বয় এসেছিলো।

সাথে সাথে ম্যানেজারকে জানালাম, কিন্তু ম্যানেজার আমাদের এমন কথা বললেন যে, আমরা একটা সহি পবিত্র হোটেলে উঠেছি, এখান থেকে কখনো কোনো কিছুই হারানোর রেকর্ড নাকি নাই। এর মানে হল আমরা অন্য কোথাও মোবাইল হারিয়ে এসেছি অথবা আমাদের কাছে কোনোকালেই কোনো মোবাইল ছিলো না। কিছুই বলার নাই। আমার সাধের ফোল্ডেড নকিয়া মোবাইল্টা হারিয়ে এখন সে অন্য কারো বাসর করছে। দুক্ষটা এখন অন্যটা। আমার সব কন্ট্যাক্ট নাম্বার গুলি হারিয়ে ফেললাম।

মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। কলিকাতায় আমাদের থাকা হবে না। আমরা আসলে যাবো, উড়িষ্যায়। তাই এক রাত থাকা হবে এই কলিকাতায়। আবার যাওয়ার সময় আমরা উড়িষ্যা থেকে পুনরায় কলিকাতায় আসতে হবে ঢাকার বাস ধরার জন্য। তখন আরেক রাত থাকা হবে।

আমি আর মুরাদ সন্ধ্যায় বের হলাম। একটা মোবাইল কিনতে হবে, সাথে ইন্ডিয়ার সিম। মুরাদ বহু বছর ইন্ডিয়ায় ছিলো, বাংগালুরে ওর শিক্ষা জীবন কাটিয়েছে। ফলে ও বেশ ভালো হিন্দি বলতে পারে এবং তার ইন্ডিয়া মানুষদের ব্যাপারে একটা ভালো ধারনাও আছে। শুধু তাইই নয়, ও ইন্ডিয়ার কোন শহর থেকে কোন শহরে কিভাবে কখন যেতে হয়, এ ব্যাপারে বেশ ভালো আইডিয়া আছে বলে আমি মুটামুটি আরামেই ছিলাম। মুরাদ জানালো যে, আগামীকাল সকাল ৮ টায় আমরা কলিকাতা থেকে ট্রেনে উড়িষ্যায় যাবো। ট্রেন স্টেসন এখান থেকে বেশি দুরেও নয়। সকালে সাতটায় বের হলেই নগদে টিকেট কেটে আমরা উড়িষ্যায় পৌছতে পারবো। কলিকাতা থেকে উড়িষ্যায় যেতে ট্রেনে প্রায় ৬/৭ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। মানে আমরা হয়তো দুপুরের পরে গিয়ে হাজির হবো।

আমরা দুজনেই একেবারে সস্তায় দুটু মোবাইল কিনলাম। সাথে দুটু সিম। রাতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। সম্ভবত কোনো পর্ব হচ্ছে এখানে। রাস্তাঘাট বেশ আলোকিত। রাতে ঢোষা আর সবজি খেয়ে ডিনার শেষ করলাম। যেহেতু ইন্ডিয়া, তারা হালাল হারাম বুঝে না, তাই সাধারনত আমি এসব দেশে কোনো মাংশ খেতে নারাজ। মাছ, ডিম, ডাল আর সব্জি দিয়েই আমি চালিয়ে নেই। এগুলিতে হারাম হালালের কোনো বালাই নাই। রাত ১০টার দিকে রুমে এসে ঢাকায় বাসায় কল করলাম, তারপর ঘুমিয়ে গেলাম।

পরেরদিন বেশ সকালেই ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো। হাতমুখ ধুয়ে নামাজ পড়লাম। মুরাদ নামাজ পড়ে না সম্ভবত। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ধর্ম যার যার। ঈশ্বরের কাছে জবাব্দিহিতা যার যার তার তার। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, যদিও ইন্ডিয়ানরা মুসল্মানদেরকে পছন্দ করে না, কিন্তু ব্যবসার খাতিরে কিছু কিছু নর্ম মানতেই হয়। আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেটা কোনো স্টারওয়ালা হোটেল না। তারপরেও দেখলাম, ছাদের এক কোনায় কোন দিকে কিবলা, সেটা মার্ক করা আছে। এরমানে হলো, এখানে বহু মুসলমান ব্যক্তিরা হয়তো আসে, আর তারা বারবার কিবলার দিক জানতে চায় বলে হোটেলওয়ালারা ব্যবসার সার্থে কিবলার দিকটা একটা এরো মার্ক দিয়ে ইন্ডিকেট করে রেখেছে। সাথে একটা জায়নামাজও রেখে দিয়েছে। অনুভুতিটা ভালো লাগলো।

আমি আর মুরাদ উড়িষ্যায় যাওয়ার জন্য সকালেই বের হয়ে গেলাম। ট্রেন স্টেসনে গিয়ে নাস্তা করলাম। এখানকার ট্রেন ষ্টেশনগুলি বাংলাদেশের ট্রেন ষ্টেসন গুলি থেকে অনেক পরিষ্কার এবং প্লাটফর্মটাও অনেক প্রশস্থ। তাছাড়া সকাল বেলা হওয়াতে হয়তো ক্লিনাররা পরিষ্কার করে গেছে, তাই আরো পরিষ্কার লাগছে। লোকজনের সমাগম খুব বেশী না। আমরা দ্রুতই টিকেট পেয়ে গেলাম। ট্রেন ছাড়বে সকাল সোয়া আটটায়। হাতে তখনো প্রায় ২০ মিনিট বাকী। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসেও নাই।

ঠিক সময়ে ট্রেন চলে এলো। আমরা ট্রেনে উঠে গেলাম। এবার লম্বা একটা জার্নি। উড়িষ্যায় আমি কখনো যাই নাই। ফলে ট্রেন জার্নিতে আমি যতোটুকু মজা করা যায়, সেটা উপভোগ করছিলাম। মানুষের হাবভাব দেখছিলাম, হকার এসব ট্রেনেও উঠে। চায়ের কেটলী নিয়ে চা ওয়ালাও উঠে। বাংলাদেশের ট্রেনগুলির মতোই। তবে একটা জিনিষ যে, এদের ট্রেনের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আমাদের দেশের ট্রেনের চেয়ে একটু ভালো। আমরা যখন উড়িষ্যায় পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় ৩টা বাজে। ভুবনেশ্বর ট্রেন স্টেসনে নামতে হয় উড়িষ্যায় যেতে হলে। কলকাতা থেকে কেশবপুর- কসবা- নারায়নগড়-বালাসুর-ধর্মশালা-কুরুমিতা-ভুবনেশ্বর। একনাগাড়ে ছুটে চলল ট্রেন। মাঝে মাঝে কিছু কিছু বড় বড় ষ্টেসনে ট্রেন থামলো বটে কিন্তু খুব বেশী নেয় না। টাইম মেইন্টেইন করে বুঝা যায়। ভুবনেশ্বর থেকে মুরাদ একটা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করলো, কিভাবে কিভাবে কি বলল হিন্দিতে আমি সবটা বুঝতে না পারলেও বুঝলাম যে, আরো প্রায় ৩০/৪০ মিনিট লাগবে। ক্যাবওয়ালা আমাদেরকে ইনিয়ে বিনিয়ে হরেক রকম রাস্তা দিয়ে শেষতক সেই কর্নেল সাহেবের বাসায় নিয়ে হাজির।

বেশ বিশাল বাড়ি। এটা সরকারী বাড়ি, কংগ্রেসের উড়িষ্যার মহাসচীবের বাসা বলে কথা। আমরা যখন তার বাসায় পৌঁছলাম, তখন প্রায় ৪টা বাজে। মাঝে কোথাও খাওয়া হয় নাই। ভীষন ক্ষুধা লেগেছিলো। আমাদের আসার কথা দুপুরের মধ্যে। কিন্তু আমাদের কোনো গাফিলতি ছিলো না, তারপরেও প্রায় ঘন্টাদুয়েক দেরী হয়ে গেছে। কর্নেল বাসায়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমরা তার বাসার ড্রইংরুমে অপেক্ষায় আছি, তার সাথে দেখা হবে। প্রায় ২০ মিনিট পর কর্নেল আসলেন। এর মধ্যে কর্নেলের ওয়েটার আমাদেরকে একজগ পানি আর দুটু গ্লাস দিয়ে গেছেন। ইন্ডিয়ানদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ওরা বেশীর ভাগ মানুষ কিপটা। এক কাপ চা পাঠাবেন, সেই খরচটাও তারা ব্যয় মনে করেন। কিন্তু পানি তো পানিই। অসুবিধা নাই।

কর্নেল এলেন। তার সাথে প্রাথমিকভাবে আর্মি নিয়েই কথা হলো। তিনি আর্টিলারীর অফিসার, আমার মতো। অবসরের পর তিনি রাজনীতি বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি কংগ্রেস (আই) এর উড়িষ্যার মহাসচীব। অনেক বড় পোষ্ট এবং মর্যাদা। কিন্তু তার এই পোষ্টের মর্যাদা আমার কাছে একেবারেই ছোটলোক মনে হলো কারন আমরা সেই সুদুর বাংলাদেশ থেকে এসেছি তার সাথে দেখা করার জন্য, তাও আবার তারই দাওয়াতে। অথচ এককাপ চা অফার করার মতো সৌজন্যতাবোধ দেখতে পেলাম না। অবশেষে তার ওয়েটার গুনেগুনে ৪টা বিস্কুট নিয়ে এলেন। খুব হাসি পেলো। হায় রে আমার কর্নেল ভাই। যাই হোক, মেজাজ একটু খারাপ হচ্ছিল, আবার একটু অপমানবোধ করছিলাম।

কথায় আসি, বলে বললাম, স্যার, আমাদেরকে আপনি এখানে কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে আলাপের জন্য দাওয়াত করেছিলেন। আমরা কি সে ব্যাপারে বিস্তারীত কথা বলতে পারি? উনি প্রথমে আমাকে বাংলাদেশে সিমেন্টের ব্যবসা করলে কি রকম লাভ হতে পারে, আমার কোনো সিমেন্ট ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় আছে কিনা ইত্যাদি নিয়েই প্রথমে আলাপ শুরু করলেন। আসল কথা ছেড়ে উনি আমাকে যা নিয়ে আলাপ করা শুরু করলেন, আমি তার আগা মাথা কিছুই বুঝতেছিলাম না। আমি বাংলায় মুরাদকে বললাম, মুরাদ, কি ব্যাপার নিয়ে আসলে আমরা এখানে এসেছি, উনি কি এটা জানে?

মুরাদ বল্লো, স্যার জানে তো। নিশ্চয়ই তিনি এ ব্যাপারে আলাপ তুলবেন। শেষ পর্যন্ত তুল্লেন। আলাপের সার্মর্মটা বলি-

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে তারা আমাকে ৭ মিলিয়ন ডলার লোন নিয়ে দিতে পারবেন। এটা একটা প্রনোদনা ফান্ড। যেহেতু তিনি উড়িষ্যার কংগ্রেস (আই ) এর মহাসচীব, ফলে তার পদমর্যাদায় তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যংকের সাথে একটা ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ আছেন। তার কিছু প্রভাব রয়েছে। এই ৭ মিলিয়ন ডলার যদি আমরা নেওয়ার জন্য এপ্লাই করি, তাহলে এটা তিনি পাশ করিয়ে দিতে পারবেন। ইন্ডিয়ায় কেনো করছেন না তিনি এ প্রশ্নে জানালেন যে, এটা ইন্ডিয়ার কোনো ব্যবসায়ীর জন্য প্রযোজ্য হবে না, দিতে হবে ইন্ডিয়ার বাইরে যে কোনো মুসলিম দেশে। এই ফান্ডটা বেসিক্যালি কোনো আরব কান্ট্রি করছে এবং শর্ত হচ্ছে এটা কোনো মুস্লিম কান্ট্রিকে দিতে হবে। তো খুব ভালো কথা। আমি দুটু বিষয়ে কোয়ালিফাই করি। প্রথমত আমি ব্যবসায়ী এবং দ্বিতীয়ত আমি মুসলমান কান্ট্রি রিপ্রেযেন্টেটিভ করি। কথার দ্বিতীয় ভাগে উনি আমাকে মোটামুটি চমকে দিলেন। বললেন যে, এই ৭ মিলিয়ন ডলার যদি আমাকে তিনি পাইয়ে দেন, তাহলে ডলার পাওয়ার পর ২ মিলিয়ন ডলার উনি কেটে রাখবেন। আর বাকি ৫ মিলিয়ন ডলার আমি ইচ্ছে করলে মেরে দিতে পারবো। সে ব্যবস্থাও উনি করে দেবেন। এর মানে হলো নির্ঘাত চুরি। আমি এতোক্ষন খুব মনোযোগ সহকারে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম। উনি বললেন যে, এই যে ৫ মিলিয়ন ডলার আমি মেরে দেবো, এটা পুরাটাই আমার নয়। এর থেকে ২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে মুসা সাহেবকে যার থেকে মুরাদও কিছু পাবে আর বাকি ৩ মিলিয়ন আমার একার। আমি কর্নেল সাহেবকে একটা সিগারেট অফার করলাম। যে কোন দেশের যে কোন আর্মির এই একটা গুন আছে, জুনিয়র সিনিয়রের সামনেও সিগারেট ফুকতে পারে যদিও অনেক সময় সিনিয়রার সিগারেট খায় না। কিন্তু এই কর্নেল সাহেব সিগারেট খান, ফলে আমরা দুজনেই সিগারেট ফুকতে শুরু করলাম।

আমি বললাম, স্যার, আপনার অফারটা বেশ লোভনীয়। যে কেউ এটা লুফে নেওয়ায়র কথা। কিন্তু সম্ভবত আমি এই অফারটা নিতে পারবো না। আমি কোনো ডলার চুরীর মধ্যে নাই। আমি ভেবেছিলাম, এটা লোন, ব্যবসা করবো, লাভ করে আমি লোন ফেরত দেবো। কিন্তু এখন যা দেখছি যে, এটা আমার সেই স্বপ্নের পুর্বাভাষ যে, পানিটা পরিষ্কার কিন্তু এটা শোধন করা হয়েছে পায়খানার কোনো জলের ভান্ডার থেকে। আমি এভাবে কোনো ফায়দা চাই না। আপনি অন্য কোনো পার্টনার দেখতে পারেন। কর্নেল খুব মর্মাহত হলেন। বললেন, তিনি যদি এই অফার অন্য যে কোন মুসলিম কান্ট্রিতে যে কোনো ব্যবসায়ীকে অফার করতেন, নিঃসন্দেহে এটা তারা গ্রহন করতেন। আমার মতো তারা এভাবে প্রত্যাখান করতো না। আর যদি প্রত্যাখান করতোও তাহলে কিছুটা সময় নিতো ভাবার জন্য। আমি বললাম, আমি অন্য ১০ জনের মতো নই স্যার। এটা আমার কাছে অপরিষ্কার প্রপোজাল মনে হচ্ছে। এটা আমার কাছে হারাম মনে হচ্ছে। আমি হারাম খেতে চাই না।

আর বেশীক্ষন কথা বলার প্রয়োজন আমি মনে করিনি। প্রায় ৩০ মিনিট পর আমি আর মুরাদ বেরিয়ে গেলাম। আমি মুরাদকে বললাম, মুরাদ, আমি যদি জানতাম, ব্যাপারটা এ রকম, আমি তাহলে ঢাকা থেকেই এখানে আসতাম না। তোমার কি মন খারাপ আমার নেগেটিভ হওয়ায়? মুরাদ ভিতরে ভিতরে কি ভেবেছে জানি না, কিন্তু আমার কাছে এটা স্বীকার করলো যে, সেও এই রকম একটা প্রপোজাল সম্পর্কে জানতো না, আর জনলে মুরাদ আমাকে এখানে আনতো না।

আমাদের ক্যাব বাইরে দাড়িয়েই ছিলো। কথাশেষে আমরা পাশেই একটা হোটেলে একরাত থাকার জন্য একটা রুম বুকড করলাম। খুব শান্তি লাগছে যে, আমি একটা অপরাধ করলাম না। কার না কার টাকা, কার না কার হক, আমি এভাবে কিভাবে করবো? টাকাটাই সবচেয়ে বড় নয়। আমাকে এক সময় এসব টাকা পয়সা ছেড়েই দুনিয়া ত্যাগ করতে হবে। আমি অবৈধ কোনো কাজ করতে চাই না।

অতঃপর, উড়িষ্যায় এক রাত থাকার পর আবারো ফিরে এলাম কলিকাতায় তার পরেরদিন। এবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পালা।

এখানে কিছু কথা না বললেই নয়। দেশ বিদেশে অনেক রাগব বোয়াল আছে, যারা আসলেই কেউ আছে বলে কোনো অস্তিত্ব নাই, তারা অনেক সময় শধু একটা ছদ্ধনামেই বিচরন করে। আসলে এই মুখুশওয়ালা মুখেশ নামধারী মানুষগুলির আদৌ কোনো চরিত্রই নাই। অথচ এদের  দোউরাত্ত আছে, প্রভাব আছে। এরা দেশের ভিতরে এবং বাইরে এমনকি বহির্দেশেও এই মুখেশরা ততপর, এক্সটরশন, স্মাগ্লিং সবই চলে এই মুখেশদের নামে। এই কথাটা রক্ত দিয়ে লিখে দিলেও কিছু যায় আসে না। মুখেশ একটা ধোকা দেওয়ার নাম। মনগড়া একটা চরিত্র। মুখেশ একটা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই না। মাঝে মাঝে ক্ষেত্র বিশেষে এই মুখেশরা চরিত্র খোজে। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি হচ্ছি সেই খুজে পাওয়া বা বানানো আরেক কোনো মুখুশওয়ালা চরিত্র। যা কাজের শেষে আমার নিজের কোনো অস্তিত্তই রবে না। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন জবাব্দিহিতার দরকার হয়। কিভাবে কখন জল মাথার উপর উঠে যায়, কেউ জানে না। হোক সেটা নিজের কাছে, হোক সেতা সমাজের কাছে কিংবা ঈশ্বর। ওই সময় কথা বা সত্য প্রকাশের নিমিত্তে উগলে নেওয়ার সময় হয়ে উঠে। হতে পারে আমি হয়তো একটা বলীর পাঠা। যখন কেউ বলির পাঠা হয়, তখন সে হয়ে উঠে বিষাক্ত খাবার। আর সেই খাবার যতো দামিই হোক, তা ফেলেই দিতে হয়। যদি তা গোড়া থেকে উপড়ে  ফেলে না দেওয়া যায়, তখন তার মুল্য শুধু বিপদের আশংকাই বাড়িয়ে দেয়। সব সময় বাজীতে জিতবেন, এটা কিন্তু ঠিক না। এখানে আরো একটা কথা থেকে যায়, কর্নেল সাহেব একটিভ রাজনীতিতে জড়িত। রাজনীতিতে কোনো কিছুই সারা জীবনের জন্য হয় না। না বন্দধুত্ত না শত্রুতা। যখন প্রয়োজন হয় তখন মিডিয়া আর পলিটিশিয়ান একে অপরের বন্ধু হয়ে যায়।

আমি যতোক্ষন এই কর্নেল সাহেবের মুল প্ল্যান জানতে পারি নাই, ততোক্ষন একটা স্বপ্নের মধ্যে ছিলাম। আমার ধারনা, মুরাদ বা মুসা সাহেব পুরু ব্যাপারটাই জানতেন। কিন্তু তারা আমাকে আগবাড়িয়ে কিছু বলেন নাই। একটা তাসের খেলার মতো কৌশল নিয়েছিলেন। ফলে কিছু তাস প্রকাশ্যে এসেছিলো, আর কিছু তাস তখনো আমার কিংবা তাদের জানা ছিলো না। ফলে এই খেলায় প্রত্যেকেই ভাবছিলো, হয়তো খেলাটার তুড়ুকের তাস তাদের কাছেই আছে। কিন্তু ধীরে ধীরে হলেও একেকটা তাস ভুল প্রমানীত হলো। তারপর হটাত করে সব তাস চারিদিকে প্রকাশ্য হয়ে চোখের সামনে চলে এল। ব্যাপারটা আর সাফল্যের মুখ দেখলো না। তাতে তাৎক্ষনিক কষ্ট পেলেন এই কর্নেল সাহেব। তার মধ্যে অনেক কিছুর অভাব ছিলো। রাজনীতিতে যদি মানবিকতা আর সচ্ছতা থাকতো তাহলে কেহই এই রাজনীতি করতে আসতো না। তিনি কোনো অবস্থাতেই আমার নজরে একজন ভালো, মানবিক এবং সচ্ছলোক ছিলেন না। কোনো কোনো সময় কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই নাটক তৈরী করা হয়। আর এখানেও তাই ঘটেছিলো।

যাই হোক, হয়তো ঈশ্বর আমাকে দিয়ে এমন কোনো কাজ করাতে চান নাই, যা তিনি চান না।   

০৩/০৩/২০০৬-মানবতা ও নিষ্ঠুরতা

মানবতা এবং নিষ্ঠুরতা তাদের নিজস্ব নিজস্ব ক্ষেত্রে তারা তাদের একটা রুপ নিয়ে অবস্থান করে। একটা বাঘ যখন কোনো একটা হরিনকে শিকার করে, তখন এর দুটু দিক আছে। এর একদিকে আপনি পাবেন বড় নিষ্ঠুরতার চিত্র আরেক দিকে পাবেন বড্ড মমতার দৃশ্য। আপনি যদি ভাবেন যে, একটি বাঘ তার ছোট ছোট বাচ্চাদের খাদ্য অন্বেষণে হরিন শিকার করে, তখন্তাকে আদর্শ মা হিসাবেই দেখবেন। বাঘের বাচ্দেচারা তাদের মায়ের উপর অনেক খুশী। এক্ষেত্রে দেখবেন এর ভিতরের মমতাবোধ। অন্যদিকে, যদি দেখেন যে, আহা, ওই হরন শিকার করে হরিনের বাচ্চাদেরকে এতিম করে দিলো। হরিনের বাচ্তচাদের কাছে বাঘ একটা নিষ্ঠুর কোনো প্রানি ছাড়া আর কিছু নয়। সেখানে দেখবেন এর নিষ্ঠুরতার চিত্র।

যদিও এটা প্রাকৃতিক নিয়মের একটা অংশ। আবার এটাও ঠিক যে, প্রকৃতি একদিকে মানবতা এবং নিষ্ঠুরতা দুটুই একই সময়ে তার নীতিরমধ্যে লালন করে। এখানে কেউ এই নীতি ব্রেক করে না। এখানে আরো একটি নীতি কাজ করে। যেমন ধরুন, কোনো একটি বাঘ যদি শিকার করে তার পেট ভরে যায়, সে পরবর্তী ক্ষুধা না লাগা অবধি ওই বাঘটি আরেকটি হরিন শিকার করে না। বরং শিকার এবং শিকারী তখন পাশাপাশি বিচরন করে। নির্বিঘ্নে পাশাপাশি বসবাস মিত্র এবং শত্রুর।  এটাই প্রকৃতির এক অদ্ভুত নীতি।   

কিন্তু এই প্রাকৃতিক নীতিটার মধ্যে ব্যাঘাত কিংবা আইন ভঙ্ঘ করে একমাত্র মানুষ। আমরা যখন একজনকে ভালোবাসি, আমাদের নজর থাকে আরেক জনের উপরও। আমরা একজনকে দেখি আরেক জনের সত্তায়ও। ফলে যখনই একজনের উপর আমাদের মন অতৃপ্তিতে ভরে যায়, সাথে সাথে আমরা আমাদের নজর পরবরতী চরিত্রের উপর ফোকাস করে তৃতীয় কোনো মনোবাঞ্চার দিকেও রিজার্ভ করে রাখি। আমরা একই সাথে সুখি নই আবার খুশীও নই। আমরা মানুষের দল একই খাবারে, একই পোষাকে, কিংবা অল্পতেই সুখি নই। আর এখানেই আমাদের মানুসদের ওই বন্য প্রানীদের কাছে অনেক কিছু শিখার আছে। বন্যপ্রানিরা কোনো বাড়িঘড় ছাড়া, টাকা পয়সা ছাড়া, কিংবা রিজার্ভ ফুড ছাড়া সব ঋতুতেই সুখি।  

আজ আমি এই স্থান ছেড়ে চলে যাচ্ছি। যাওয়ার প্রাক্কালে শুধু আমি একটা কথাই বলে যাই যে, এই স্থানটি আমার জন্য একদিকে যেমন বড্ড ভালো লাগার আবার অন্যদিকে অতি ঘৃণারও বটে। চলে যাচ্ছি চিরকালের জন্য এমন কিছুমানুসদের ছেড়ে যারা আমাকে কখনো কখনো ভালোবেসেছিলো  আবার কখনো কখনো তারা আমাকে ভালো তো বাসেই নাই বরং ঘৃণার চোখেই দেখেছিলো। এখানে কেউ কেউ আমাকে ভালোবেসেছে শুধুমাত্র কিছু অর্থকরী মুনাফার জন্য।

(চলবে) 

০১/০৮/২০০৫-৩য় বারের মতো সুপারসিডেড

আমার এপেন্ডিক্স-জে লঞ্চ করার কারনে এবার আমার প্রোমোশন হবার কথা না। আর সেটাই হয়েছে। আমি এবার প্রোমশনের ব্যাপারটা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাই নাই। কারন আমি ব্যক্তিগতভাবে আর চাচ্ছিলাম না যে, আমার প্রোমোশনটা হোক আর আমি আবার আর্মিতেই থেকে যাই। এবার আমার কমান্ডার আগেরজন নাই, ফার্ষ্ট লং কোর্সের সোর্ড প্রাপ্ত অফিসার আমাদের ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার, ব্রিগেডিয়ার মাহফুজ স্যার। আমি যেহেতু আর ইন্টারেস্টেড না প্রোমোশনের ব্যাপারে, ফলে মজিদ কিংবা অন্যান্য অফিসাররাও আমাকে মূটামূটি ধরেই নিয়েছে যে, আমি আর থাকছি না। মজিদ আমার সাথে বেশ অন্তরঙ্গভাবে অনেক কথাই বল্লো। এটাও বল্লো যে, স্যার আপনি যদি এপেন্ডিক্স-জে টা সাবমিট না করতেন, খুব ভালো হতো। এবার আপনার প্রোমোশনটা হতোই।

আমার এমনিতেই এই ব্যাপারে মন ভালো ছিলো না, তারপর আবার আদিখ্যেতাভাব। বললাম, মজিদ, আমি জানি আমি বাইরে গিয়ে কি করবো। যে আমি আর্মিতে আর্মির জন্য এতো শ্রম দিতে পেরেছিলাম, সেই আমি এবার বাইরে গিয়ে নিজের জন্য শ্রম দেবো। আজীবন তো আর আর্মিতে থাকা যাবে না। যদি সেটাই হয়, দেখি না বাইরে গিয়ে কি করা যায়। তবে একটা জিনিষ আমি হলফ করে বলতে পারি যে, আজ যারা আমাদের মতো অফিসারদেরকে মুল্যায়ন করে নাই, কোনো এক সময় এই রাজনৈতিক দল আমাদের অনুপস্থিতির জন্য আফসোস করবে। আফসোস করবে এই কারনে যে, আমরা কোন রাজনৈতিক দল করতাম না। আমরা ছিলাম সত্যিকার অর্থে প্রোফেশনাল আর নিরপেক্ষ। তোমরা যারা পদ দখল করে আছো, তারা একসময় হয়তোবা এই কথাটা অক্ষরে অক্ষরে ফিল করবা যে, আজ যারা তোমরা দলের জন্য অনুপ্রানিত, কোন এক সময় অন্য দলের জন্যেও অনেক অফিসাররা অনুপ্রানিত হবে না এটা ভাবা উচিত নয়। তখন আর যোগ্য অযোগ্য বলে কোনো কথা থাকবে না। তোমরাই তো শিখিয়ে দিলা যে, আর্মিটাকে দলীয়করন করা যায়। আজ তোমরা ক্ষমতায় আছো, এমনো হতে পারে যে, যখন ক্ষমতা হাত ছাড়া হয়ে যাবে, তখন ওইসব অনুপ্রানিত দলকানা অফিসারদের জন্য তোমরা আর ঢোকতেই পারবা না। তখন মনে হবে শিড়দাড়াওয়ালা কিছু নীতিবান অফিসারদের দরকার ছিলো যারা ভোট কারচুপি করবে না, অন্যায় কাজ করবে না, এবং ন্যায় কাজ করার কারনেই হয়তোবা তোমরা আবার ক্ষমতায় আসতে পারতা। এর মাশুল তোমার দলকে দিতেই হবে। আমরা কোন না কোনোভাবে টিকে যাবো, বিলিন হয়ে যাবা তোমরা আর তোমাদের দল। আমি যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছের কেউ হতাম, আমি তাকে ঠিক এই কথাগুলিই বলে পরামর্শ দিতাম যে, কোয়ালিফাইড লোক যখন থাকে না, তখন সাফার করে সবাই, আর সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় দল। মাননিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আপনার ভবিষ্যত খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। মাসুলটা হয়তো অনেক বড় আকারের দিতে হতে পারে। এটা বাংলাদেশ। তাই ন্যায় কাজ করে কোয়ালিফাইড অফিসারদেরকে এই আর্মিতে রাখুন। এতে আপ্নাদেরই লাভ বেশি হবে।

যাক, চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী। আমি এবার সুপারসিডেড হবার কারনে ঠিক জবাব দিয়ে দিলাম, আমি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে যেতে চাই। আমাকে ছেড়ে দেয়া হোক। মজিদকে বললাম, অন্তত এইটুকু উপকার আমার করে দাও তোমার দলিয় প্রধানকে বলে। মজিদ, রাজী হলো।  

মজিদ প্রধান মন্ত্রি খালেদা জিয়ার এডিসি ছিলো এবং সেই সুবাদে ক্যাটেগরি সি, এবং মেডিক্যালি আনফিট হওয়া সত্তেও উপরন্ত কোনো ষ্টাফ কোর্ষ বা গানারী ষ্টাফ না করেও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে আমার ৭ ফিল্ডের সিও হয়েছে।   

০৫/০৭/২০০৫-মাসুদ ইকবাল এবং অন্যান্যদের সাথে আলোচনা

আমি যখন প্রায় সব কিছু ফাইনালাইজ এর পথে, তখন একদিন আমার দোস্ত মাসুদ ইকবালের সাথে রিভার সাইড নিয়ে বিস্তারীত আলাপ আলোচনার জন্য ওর অফিসে গেলাম। আমি ওকে প্রথমে বললাম, যে, মাসুদ রিভার সাইডের নাম শুনেছে কিনা। রিভার সাইডের নাম শুনেই ইকবাল বলে দিলো যে, ওটা একটা খুব খারাপ ফ্যাক্টরী এবং ওটা না নেওয়াই উত্তম। ইকবাল এমনো বল্লো যে, নাজিম সাহেব যদি ইকবালকে রিভার সাইড সুয়েটার্স বিনে টাকাতেও দিতে চায়, তারপরেও ইকবাল এটার ব্যাপারে উতসাহী নয়। জিজ্ঞেস করলাম, এর কারন কি? উত্তরে ইকবাল বল্লো যে, এই ফ্যাক্টরীতে সাবকন্ট্রাক্ট কাজ দিলে ওরা সুতাও বিক্রি করে দেয়। মাল তো দেয়ই না, বরং লায়াবিলিটিজে পড়তে হয়। আমি ইকবালকে বললাম, আরে, এটা তো বর্তমান ম্যানেজমেন্টের সমস্যা। আমরা যদি চালাই, তাহলে আমরা তো আর সুতা বিক্রি করে দেওয়ার কোনো কারন নাই। এরপরেও ইকবাল এটার ব্যাপারে কোনো উতসাহ দেখালো না। একটু খারাপ লাগলো। বললাম, এমনো তো হতে পারে যে, আমরা ভালো করবো। যেহেতু ইকবাল অনেকদিন যাবত গার্মেন্টস লাইনে আছে, ওর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা এই ফ্যাক্টরী দাড় করাতে পারবো বলে আমার ধারনা। কিন্তু ইকবাল তাঁর সিদ্ধান্তে একেবারেই অনড়।

একটু খারাপ লাগলো ইকবালের কথায় কিন্তু আমি দমে যাই নাই। বাসায় এলাম। তারপর আমি কয়েকজন অফিসারের সাথে একে একে কথা বললাম। তাঁর মধ্যে একজন ফেরদৌস স্যার, তারপরে কথা বললাম কেএম সাফিউদ্দিন স্যারের সাথে। আর বেশ রাতে কথা বললাম ফারুক স্যারের সাথে। সবাই এখনো পজিটিভ মুডেই আছেন বলে মনে হলো। ওইদিন মোহসীন সাহেবের সাথে মিটিং করার পর আমি সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে একটু খোজ খবর নিতে গিয়েছিলাম তউহিদকে নিয়ে। ওখানে গিয়ে জানলাম যে, ব্যাংক রিসিডিউলিং করতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার দরকার। রিসিডিউলিং মানে হচ্ছে রিভার সাইডের লোনটাকে আবার রেগুলারাইজেশন করা। এখন কিস্তি না দেয়ার কারনে এটা একটা খারাপ লোনে পরিনত হয়েছে। খারাপ লোন হলে সেসব কারখানায় ব্যাংক সাপোর্ট পাওয়া যায় না, আবার কোনো এলসিও খোলা যায় না। কাজও করা যায় না।

এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি একটা আইডিয়া করলাম যে, আমাকে এই মুহুর্তে প্রায় লাখ ৫০ টাকার মতো নিয়ে মাঠে নামতে হবে। কিন্তু দূর্ভাগ্য হচ্ছে যে, আমার কিন্তু এতো টাকা নাই। আমি হয়তো পেন্সনের টাকা পেলে সর্বোচ্চ লাখ ২০ টাকা ইনভেস্টমেন্ট করতে পারবো। কিন্তু বাকীটা? ফলে আমি ধরে নিলাম, যদি ফেরদৌস স্যার, সাফি স্যার আর ফারুক স্যার জয়েন করেন, আমরা সবাই যদি ২০ লাখ করে টাকা ইনভেস্ট করি, তাতে টাকার সমস্যাটা আর থাকে না। আমি এই তথ্যটা উক্ত তিন অফিসারকে জানালাম। এবং আমাদের পরিকল্পনা হলো যে, আগামি বন্ধের দিন সবাই ফ্যাক্টরী দেখতে যাবো। তাঁর আগে কারো যদি কোনো অভিজ্ঞ গার্মেন্টস মালিক কিংবা কর্তার কাছে পরামর্শ নিতে হয়, আমরা নেবো।

খুব ভালো লাগছে এটা ভেবে যে, আমার সপ্নটা বাস্তবায়ন হচ্ছে ইনশাল্লাহ।

০৮/০৪/২০০৫-বাড়ির কাজ চলছে পুরুদমে।

বাড়ির কাজ চলছে পুরুদমে। প্রতিদিন মীরপুর গোলারটেক আমি যাই। বড্ড ভালো লাগে যখন দেখি একতা একটা করে ইটের গাথনীতে আমার একটা একটা করে তালা সম্পন্ন হচ্ছে। ঠিক যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবেই যাচ্ছে। হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন থেকে ১৫ লাখ টাকার লোন ইতিমধ্যে পেয়ে গেছি। প্রতিমাসে কিস্তি প্রায় ১৮০০০ টাকা করে দিতে হবে। ১৫ বছর। অন্যদিকে আমার পেনসন কমুটেশন থেকেও লোন পেয়েছি ১০ লাখ টাকার। হাতে যে টাকা ছিলো, তাঁর সাথে এই লোনগুলি পাওয়াতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, চারতালা পর্যন্ত আমি একনাগাড়ে করে ফেলতে পারবো। আমার বাড়ির ডিজাইন করে দিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ইঞ্জিনিয়ার রফিক ভাই। অত্যান্ত অমায়িক লোক। উনি সাধারনত কারো ব্যক্তিগত বাড়ির ডিজাইন করে দেন না কিন্তু বন্ধুত্তের খাতিরেই তিনি আমার জন্য কাজটা করে দিলেন।

এপেন্ডিক্স জে সাবমিট করে দিয়েছি। যেকোনো মুহুর্তে আমার ডাক পড়তে পারে হাইয়ার হেড কোয়ার্টারে। অপেক্ষা করছি তাঁর জন্য। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছেও একটা ডিও পাঠিয়েছি। একই প্রকারের ডিও পাঠিয়েছি চীফের কাছেও। লেঃ জেনারেল হাসান মাশউদ। কেনো জানি লোকটাকে আমার পছন্দ নয়। আমি এই ভদ্রলোককে কমান্ডেন্ট হিসাবে পেয়েছিলাম এসআই এন্ড টি তে (স্কুল অফ ইনফ্যান্ট্রি এন্ড ট্যাক্টিক্স) সিলেটে। উনি বিএনপি ঘরোয়ার লোক।

আমার মা বেচে নেই কিন্তু শাশুড়ি মা বেচে আছেন। আমার খুব শখ ছিলো মা যদি দেখে যেতে পারতেন আমার একটা স্থায়ি ঠিকানা হচ্ছে ঢাকায়, খুব ভালো লাগতো। আমার শাশুড়ি আমার সাথেই থাকেন মীরপুরে। তাঁর ও খুব শখ আমার নতুন বাড়িতে তিনি থাকবেন। আমার খুব একজন মানুষ তিনি। দোয়া করি যেনো এই সব মা গুলিকে অনেক হায়াত দেন।

ইদানিং যেনো সব কিছু খুব ফাস্ট মুভ করছে। রিভার সাইড সুয়েটার্স এর ব্যাপারেও অনেক এগিয়ে গিয়েছি। কথাবার্তা চলছে বটে কিন্তু নাজিম সাহেবের মতিগতি খুব একটা স্টেবল মনে হচ্ছে না। আসলে তাঁর কাছে কয়েক কোটি টাকা লস কোনো ব্যাপারই না। মাঝে মাঝেই আমি নাজিম উদ্দিন সাহেবের আস্তনায় যাই। কিন্তু তাঁর সব সাংগ পাংগরা এতোটাই দুর্ব্রিত্ত যে, ওদের সাথে আমার যায় না। তারপরেও আমি বিশেষ কারনেই তাঁর সাথে একটা ভালো সম্পর্ক রাখছি।

তৌহিদের সাথে আমার প্রতিনিয়ত যোগাযোগ অব্যাহত আছে। সে চায় আমি ফ্যাক্টরীটা নেই। তৌহিদ আমাকে জানালো যে, এই ফ্যাক্টরীতে জনাব মোহসীন নামে একজন ডিএমডি হিসাবে কাজ করতেন। গার্মেন্টস লাইনে তিনি এতোটাই পাকা যে, যদি তাকে খুজে পাওয়া যায়, তাহলে আমার জন্য খুবই ভালো হয়। কারন তিনি মার্কেটিং জানেন, কষ্টিং জানেন, প্রোডাকসন জানেন এবং অত্যান্ত ভালো একজন মানুষ। আমি মীরপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকেই সবকিছু তৌহিদের মাধ্যমে ফ্যাক্টরীর সব বিষয়ে আপডেট নেই। লুতফর রহমান সাহেব কি করছেন, তাঁর মোটিভ কি, ইত্যাদি।

এর মধ্যে আমি ফা এপারেলস এ ভিজিটে গিয়েছিলাম, সাভারে, দেখেছি যে, প্রায় সব ওয়ার্কাররা বসে আছে। এখন নাকি কাজ নাই। জাবের জানালো যে, এটা একটা অফ সিজন, আর অফ সিজনে ওয়ার্কারদের কাজ না থাকলেও ছাটাই করা বুদ্ধিমানের কাজ না। কারন পিক টাইমে আবার ওয়ার্কার পাওয়া যায় না। সাথে লিখনকে নিয়ে গিয়েছিলাম। লিখনও আমাকে খুব একটা ভালো ফিডব্যাক দিতে পারলো আসলে একটা ভাল ফ্যাক্টরীর কি ক্রাইটেরিয়া থাকে। শুধু একটা কথা বল্লো যে, কমপ্লায়েন্স এর ব্যাপারে আরো কিছু কাজ করতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কমপ্লায়েন্স আসলে কি? এই কমপ্লায়েন্স মানেও আমাকে লিখন ভালো করে বুঝাতে পারলো না। হয়তো আমি বুঝবো না বলেই খোলাসা করে বলে নাই।

যাই হোক, আমি বারবার কেনো জানি রিভার সাইড সুয়েটার্স এর দিকে ঝুকে যাচ্ছি। তউহিদকে বললাম, মোহসীন সাহেবকে খুজে বের করো, আমি তাঁর সাথে কথা বল্বো। দেখি কোনো আইডিয়া দিতে পারেন কিনা।

০৬/০১/২০০৫-মিলিটারী সচীব মেজর জেনারেল শফিক এর সাথে ইন্টারভিউ

আমার ব্রিগেড কমান্ডার আমার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি বুঝতে পারছি তিনিও খুব আপসেট। যখন কোনো ব্রিগেড লেবেলের অনুষ্ঠান হয়, তিনি আমাকেও সিওদের সাথে একতা চেয়ার রাখেন, কিংবা যখন সিওদের একান্ত কোনো মিটিং করেন বা এই জাতীয় কিছু এরেঞ্জ করেন, তিনি আমাকেও ডাকেন। অনেক সময় মজিদকে ডাকেন না। কারন তিনি এইটুকু জানেন যে, আল্টিমেটলী মজিদকে বল্লেও মজিদ শেষ পর্যন্ত আমাকে এসেই বলবে। তাঁর থেকে ভালো অন্যান্য সিওদের সাথে কমান্ডার আমাকেই ডাকেন, মজিদকে নয়। ব্যাপারটা ভালো লাগে, কিন্তু তারপরেও মনের ভিতরে একটা কি যেনো খস খস করতেই থাকে। কমান্ডারকে বললাম, স্যার, আমি কি এম এস এর সাথে দেখা করতে পারি? আমার জানার খুব শখ আসলে আমার প্রোমোশন না হবার পিছনের রহস্য টা আসলে কি? এটা কি ১৩ লং কোর্সের অফিসার আমি এই জন্য? যদি সেটাই হয় তাহলে এই প্রোমোশন বোর্ডে কিছু কিছু ১৩ লং কোর্সের অফিসারদের কিন্তু প্রোমোসন হয়েছে। তাহলে ওরা কি বিএনপি ঘেষা? আমি তো কোনো রাজনীতি করি না। এমন কি আওয়ামিলীগও করি না। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় লুকিয়ে আছে রহস্যটা? কমান্ডার শেষ পর্যন্ত এম এস জেনারেল সফিকের সাথে আমাকে দেখা করিয়ে দিলেন। সকালেই আর্মি হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলাম। অনেকদিন পর আসলাম আবার আর্মি হেডকোয়ার্টারে। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নতুন অফিসার, নতুন নতুন মুখ।

স্যার দেখা দিলেন। প্রথমেই আমার কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন, আমি স্যারকে চিনি আগে থেকেই, কিন্তু খুব একটা ব্যক্তিগত সখ্যতা নাই। অনেক কিছু নরম্যাল কথা বলার পর স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো কি কারনে আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছো? আমি বললাম যে, স্যার বেসিক্যালি আমি অনেক বছর আগে থেকেই একটা বিকল্প অপসন খুছিলাম কিভাবে আমার চাকুরীর ফিল্ড চেঞ্জ করা যায় কিন্তু সেটা যেভাবেই হোক ব্যাটে বলে মিলছিলো না। কিন্তু পর পর দুবার সুপারসিডেড হবার কারনে প্রক্রিয়াটা এবার আমি শুরু করতে চাই। কিন্তু তাঁর আগে আমার খুব জানার ইচ্ছা যে, আসলে কোন কারনে আমার বা আমার মতো আরো কিছু অফিসারের প্রোমোশন হয় নাই। এটা তো আমাদের জানার একটু ইচ্ছে হতেই পারে স্যার। আপনি যদি আমাকে খোলামেলা বলতেন, হয়তো নিজের কাছে একটা জবাবদিহিতার সুযোগ পেতাম।

স্যার খুব মুচকী হেসে বললেন, দেখো আখতার, আমি আসলে প্রোমোশন দেওয়ার মালিক নৈ, আমার কাজ তোমাদের ফাইলগুলি ঠিকঠাক মতো বোর্ডে দেয়া আর বোর্ডের কাজ সেগুলি বিশ্লেষন করে কাকে কিভাবে কি করবেন সেটা করা। হ্যা, প্রতিটা ফাইলে অনেক মন্তব্য থাকে, অনেক অব্জারভেশন থাকে, সেগুলি কাউকে কাউকে আবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়, বা কন্সার্ন কমান্ডাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে জানানো হয় যাতে ওই অফিসারকে তারা জানাতে পারেন। তবে তোমার ব্যাপারে পার্টিকুলার কোনো বড় ধরনের অভিযোগ বা অব্জারভেশন ছিলো না। একটা পি ই টি তোমার এ সি আর থেকে মিসিং আছে, সেটা ছাড়া আর তেমন কোনো অব্জারভেশন পাওয়া যায় নাই। কিন্তু এসব হচ্ছে মামুলি ব্যাপার, বোর্ডে অনেক জেনারেল গন আরো কিছু উত্থাপিত হয়তো করেন যা সব সময় ফাইলে লিপিবদ্ধ করেন না, হোয়াইট, গ্রে বা ব্ল্যাক মন্তব্য থাকে যা আমি তোমাকে এই মুহুর্তে সেসব বলতে পারবো না। তোমার কোর্স মেট আছে মেজর ওয়াকার। সেটা নিয়ে এক সময় সম্ভবত তুমি ওর ফাইলটা নিয়ে কাজ করেছিলা, যেখানে বেশ কিছু মন্তব্য তুমি লিখেছো।

আমি হাসলাম। আর বললাম, স্যার, এই আর্মির জন্য আমি আমার পরিবারকে পর্যন্ত সময় দিতে পারি নাই। জীবনের এই ১৮/১৯ বছরের মধ্যে প্রায় সময়ই শুধু আর্মির সার্ভিস দেয়ার জন্য ম্যারেড ব্যচলর হিসাবেই মেসে মেসে কাটিয়েছি। আজ এতো বছর পর বুঝলাম, আসলে এটা আমার কখনো আপন ছিলো না। যাই হোক, আমি আজো জানতে পারলাম না কি কারনে আসলে আমার প্রোমোশনতা হলো না। আমি স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, জি এস ও -২ (অপ্স) ছিলাম, আর্মি হেড কোয়ার্টারে কাজ করেছি, সি জি এস এর সাথে কাজ করেছি, চীফের সাথে কাজ করেছি, অন্তত ৫ থেকে ৬ টা জেনারেলের সাথে ডাইরেক্ট কাজ করেছি, বিপসটের মতো একটা জায়গায় একা প্রায় ৩৫ টা দেশের সাথে ট্রেনিং কোওর্ডিনেট করেছি একা। আসলে এসবের কোনো মুল্য ছিলো না। কিন্তু যারা সারা বছর ক্যাটেগরি সি হয়ে আরাম আয়েস করেছে, কাজে ফাকি দিয়েছে, ওরা অপদার্থ বলে কোনো সিনিয়ররা পর্যন্ত ওদেরকে কোনো কাজ দিতে চাইতো না, তারাই সময় মতো আমাদের মাথায় বসে অধিনায়কগিরি করে আর আমরা তাদের অধীনে উপ অধিনায়ক, কিংবা বড় জোড় কোনো একটা ইউনিটে বা সংস্থায় পার্মানেন্ট সুপারসিডেড হয়ে কলুর বলদের মতো কিছু বেতনের জন্য কাজ করে যাই। আমার এই বেতনের অর্ধেক তাকাই তো খরচ হয়ে যায় আমার সিগারেটের পিছনে। আর্মির বাইরের দুনিয়াটা আমি দেখি না, কিন্তু ওটা যে এই আর্মির থেকেও অনেক বড় একটা পরিসর সেটা আমার জানা। আমি স্যার এপেন্ডিক্স যে সাবমিট করলে কাইন্ডলী আমার এপ্লিকেশনটা ফরোয়ার্ড করবেন। আমাকে অন্তত এই উপকারতা করবেন। আমি আপনার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ থাকবো। সবাই এই আর্মিতে আজীবন থাকবে না। হয়তো আবার আমাদের দেখা হবে বাইরের কোনো বড় পরিসরে যেখানে আমার আপনার চেয়ারের লেবেল সমান। আমি স্যার চীফকেও বলে যাবো কিছু কথা। উনাকে একটা ডিও লিক্ষেছি, প্রধান মন্ত্রীকেও। দেশের একজন নাগরীক হিসাবে তিনি আমার প্রধান মন্ত্রী, তাঁর কাছে আমার কষ্টের কথা বলাই যায়। যদি উনি সময় দেন, তো ভালো, না দিলে হয়তো আমার কিছু করার নাই।

সফিক স্যার আমাকে শান্তনার বানী দিয়ে বললেন, দেখো আখতার, সময় পালটায়, সময় সব সবার সময় এক রকম যায় না। আরেকতা বার সুযোগ নাও, দেখো কি হয়। দুবার যখন হয় নাই, তৃতীয় বার তো হতেও পারে। কিন্তু তুমি যদি এপেন্ডিক্স-জে দাও, তখন তোমার এপ্লিকেশন থাকাকালে আমরা ইচ্ছা করলেও তোমার ফাইল পরবর্তী বোর্ডে পাঠাতে পারবো না। সেক্ষেত্রে তোমার প্রোমোশন হয়তো কন্সিডার করবে না যা একটা সুযোগ ছিলো, সেটাও তুমি হারাবা। আমি বললাম, স্যার, অফিসে যেতেই ভালো লাগে না। এতো লম্বা সময় কাটাবো কিভাবে? জুনিয়র আন কোয়ালিফাইড একজন ছেলে আমার অধিনায়ক হিসাবে মাথায় ছড়ি ঘুরাবে, আর আমি প্রতিটি মুহুর্ত এটা হজম করে করে বেচে থাকতে হয়তো পারবো না।

যাই হোক, চলে এলাম। কিন্তু জানা হলো না আমার প্রোমোশন না হবার মুল রহস্য কি। 

২২/১২/২০০৪-কোর্সমেট জাবেরের সাথে বৈঠক

আমি রীতিমত হন্যে হয়ে একটা ব্যবসার কথা চিন্তা করছি। রিভার সাইড সুয়েটার্স যদি শেষ পর্যন্ত না নেয়া হয়, সেক্ষেত্রে আমি আরো কিছু বিকল্প চিন্তা করছিলাম। এই চিন্তা থেকে আমার কোর্সমেট জাবেরের সাথে ফোনে কথা বলি। কারন জাবের নিজেও একটা ফ্যাক্টরী চালায়, নাম “ফা এপারেলস”, সাভার। জাবের আমার ব্যবসার চিন্তাভাবনা শুনে বল্লো যে, আমি ওর সাথেও ফা এপারেলসে পার্টনারশীপ করতে পারি যদি চাই। ওখানে ইতিমধ্যে আমার আরেক কোর্সমেট মেজর বশীর আছে, আর তাছারা আরো বেশ অনেক গুলি কোর্সমেট ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাজেট ইনভেষ্টমেন্ট করেছে। তাঁর মধ্যে আছে মেজর সালাম, মেজর জসীম, মেজর নওরোজ, আরো অনেকে। অনেকেই নাকি প্রায় প্রত্যেকেই কমপক্ষে ১০ লাখ করে টাকা ইনভেষ্ট করেছে। কেউ কেউ বেশীও করেছে। ফলে আমি যদি চাই, তাহলে আমিও ওখানে ওদের মতো ইনভেষ্ট করতে পারি। জাবের রাতে আমার বাসায় এলো। সাথে বশীর। মীরপুরের বাসায় আমরা সবাই প্রায় ঘন্টা দুয়েক আলাপ করলাম। কিন্তু আলাপের মধ্যে আমি কিছুটা বিভ্রমের গন্ধ পাচ্ছিলাম।

বিভ্রমটা তাহলে কি? আমাকে জাবের আর বশীর প্রোপোজাল দিলো যে, লাভে টাকা খাটাইতে। যদি লাভ হয় তাহলে পার্সেন্টেজ অনুযায়ী আমাকে লাভ দেয়া হবে। আমি তখন জাবেরকে বললাম যে, যদি লাভ না হয় এবং লস হয় তখন কি হবে? জাবের আমাকে বল্লো যে, লসের ভাগিদার ওরা, কিন্তু লাভের ভাগিদার থাকবো আমরা। আর এভাবেই নাকি অন্যান্য কোর্সমেটরা টাকা খাটিয়েছে। ব্যাপারটা আমার কাছে বিশেষ সুবিধার মনে হলো না। আমি জাবেরকে বললাম, আমার ইনভেষ্টমেন্টের সমান পরিমান শেয়ার দিতে আপত্তি কি? কিন্তু সেটা তারা রাজী নয়। আমি ব্যবসা বুঝি না কিন্তু হালাল হারাম বুঝি। আমার কাছে মনে হলো, জিনিষটা হালাল নয় যে, শুধু লাভ নেবো, লস নেবো না। আবার আমি এক অর্থে পার্টনার কিন্তু আবার শেয়ার হোলডার না। কনফিউজিং একটা স্টেট।

আমি জাবেরকে রিভার সাইড সুয়েটার্স এর কথা বললাম যে, আমি একটা ফ্যাক্টরী নিয়ে কথা বলতেছি। যদি ওটা হয়ে যায়, তাহলে আর জাবেরদের সাথে আমি যাচ্ছি না। জাবের আমাকে ডিসকারেজ করলো যে, তুই আগে আমার ফ্যাক্টরিটা দেখ, তারপর অন্য ফ্যাক্টরী নিয়ে ভাবিস। বললাম, আমি এম্নিতেও জাবেরে ফ্যাক্টরীতে ভিজিট করতে যাবো, টাকা ইনভেষ্ট করি আর নাইবা করি, অন্তত একটা অভিজ্ঞতা তো হবে। ডেট ঠিক করলাম যে, আমার এক আত্তীয় আছে, বেক্সিমকোতে চাকুরী করে, ওকে নিয়ে আগামী বন্ধের দিন ফা এপারেলস ভিজিটে যাবো। জাবের এবং বশীর চলে গেলো। আমি রিভার সাইডের মধ্যে বেশী টান অনুভব করলাম। অনেক রাত অবধি আবার তৌহিদের সাথে ফ্যাক্টরী নিয়ে কথা বললাম।

কথা বললাম, কিভাবে শেয়ার ট্রান্সফার করতে হয়, জয়েন্ট স্টক কি, ইত্যাদি। তৌহিদ বলল যে, হিরু নামের এক ভদ্রলোক আছে, যে এই সব শেয়ার ট্রান্সফার কাজগুলি করে। ওর সাথে বসে আলাপ করলেই আরো ব্যাপারটা ক্লিয়ার হবে।

২০/১২/২০০৪-রিভার সাইড সুয়েটার্স ভিজিট

রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড ভিজিট করলাম। অনেক সুন্দর একটা ফ্যাক্টরি। আমি গার্মেন্টসের কিছুই বুঝি না। কিন্তু ওভারঅল পরিবেশ, স্পেস, মেশিনারিজ, সেটআপ দেখে মনে হলো, জিনিষটা সুন্দর। ফ্যাক্টরীর বিভিন্ন সেকসন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তৌহিদ আমাকে দেখালো। সাথে আনসার নামে একজন লোক ছিলো যে, সিকিউরিটি ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে, লোকাল। তৌহিদ যেখানেই যায়, এই আনসারকে নিয়েই যায়। শুনলাম, আনসার নাকি তৌহিদের একজন আত্তীয়ও বটে। ফ্যাক্টরীতে ঘুরে দেখার সময় বুঝলাম, কারেন্ট লাইন কাটা। প্রায় ৭/৮ মাসের কারেন্ট বিল না দেয়ায় বিদ্যুৎ অফিস লাইন কেটে দিয়েছে। ফলে কয়েকটা মেশিন চলে জেনারেটর দিয়ে। এদিকে গ্যাস লাইনও বিচ্ছিন্ন কারন গ্যাস বিল দেয়া হয় না প্রায় ৫/৬ মাস যাবত। আজিম গ্রুপের কিছু কাজ চলছে সাবকন্ট্রাক্ট হিসাবে। দেখলাম মোট ১২ থেকে ১৫ জন ওয়ার্কার নীচ তলায় কাজ করছে অথচ এখানে একসময় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করতো।  লুতফর রহমান সাহেব ফ্যাক্টরীতে ছিলেন না। উনি হয়তো জানেন না যে, আমি এটার উপর গবেষনা করছি।

ফ্যাক্টরী ভিজিট করার সময় আমি অনেক নতুন নতুন মেশিনারিজ দেখলাম, এটাই আমার ব্যবসায়ীক কোনো প্রতিষ্ঠানে এই প্রথম ভিজিট। ফলে আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, যে, এই ফ্যাক্টরী যদি আমি চালানোর জন্য নেই, তাহলে কত টাকা নিয়ে নামতে হবে, আর কিভাবে কিভাবে অর্ডার পাবো, কিভাবে কোথায় বায়ার পাবো ইত্যাদি। মনে মনে এটাও ঠিক করলাম যে, আমার মতো অনেক আর্মি অফিসাররাই বিকল্প কিছু ব্যবসার কথা ভাবছেন এই মুহুর্তে। অনেকের প্রোমোশন হয় নাই, অনেকেই চাকুরী থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পায়তারা করছে। যদি বাজেটের সমস্যা হয়, তাহলে তো আমি ওইসব অফিসারদের সাথে সমন্নয় করে একটা পার্টনারশীপ করেও ব্যবসাটা চালাইতে পারি। ফলে এ মুহুর্তে যাদের নাম আমার মাথায় এসছিলো তারা হচ্ছেন- ফেরদৌস স্যার, ১০ লং কোর্সের ফারুক স্যার, ১০ লং কোর্সের কে এম সাফিউদ্দিন স্যার। কারন উনারা এক সময় আমাকে ব্যবসার কথা বলেছিলেন। দ্বিতীয় যে পয়েন্টটা আমার মাথায় আসলো, তা হলো, আমার এক আর্মির বন্ধু আছে মেজর মাসুদ ইকবাল। ১৩ লং কোর্সের, তানির হাসবেন্ড। আমার খুব ভালো বন্ধু। ও এখন কোনো গার্মেন্টেসে চাকুরী করে, নাম অর্নব সুয়েটারস। ওরেও তো আমি একটা প্রোপোজাল দিতে পারি যদি আমার সাথে পার্টনারশীপ করে মন্দ কি। তাছাড়া আমাদের এক আত্তীয় লিখন তো বহুদিন যাবত গার্মেন্টস লাইনে আছে, ওর কাছ থেকেও একটা বুদ্ধি পরামর্শ নিতে পারি। লিখন বেক্সিমকোতে আছে। পয়েন্টগুলি আমি লিখে নিলাম।

আজ আরেকটা কাজ করে এসছিলাম যে, আমি পরপর দুটু ডিও লেটার ড্রাফট করে এসছি। একতা সেনাপ্রধানের জন্য, আরেকটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য। বাসায় গিয়ে এগুলি আবার আরেকবার চেক করে আমি সরাসরি এই দুইজনকে অফিশিয়ালী পাঠাইতে চাই।

রিভার সাইড সুয়েটারস ফ্যাক্টরীটা আমার গ্রামের পাশে। কিন্তু কোনোদিন আমার চোখে পড়ে নাই যে, এখানে এমন একটা রপ্তানীমুখী কারখানা আছে। অথচ এই পথ দিয়েই আমি আমার গ্রামে যাই। আজ মনে হলো, এতা আমার এতো কাছের একটা ফ্যাক্টরি, হলে তো খুব ভালো হয়। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনাই করে ফেললাম যে, আল্লাহ যেনো আমাকে রক্ষা করেন। আর্মির চাকুরীটা আর ভালো লাগছে না। আমি এর থেকে পরিত্রান চাই।

১৮/১২/২০০৪-মীরপুর সেনানিবাসে নাজিমুদ্দিনের সাথে বৈঠক

একটা অদ্ভুদ ঘটনা ঘটে গেলো আজ। লোকটাকে আমি চিনি না, কখনো দেখিও নাই। অথচ আজ আমার সাথে এমন একটা বৈঠক হলো তাঁর সাথে, যা আমি এতোদিন মনে মনে খুবই আশা করছিলাম। একটা ব্যবসা। আমি যেনো আজ সেটার একটা আলো দেখতে পেলাম। ব্যাপারটা কাক্তালীয়ভাবে ঘটে গেলো। মান্নান আমার ভাইতিজা। ও কিছুই করে না। অথচ সংসারটা বেশ বড়। আমাকে মান্নান গত কয়েকদিন আগে একটা ব্যাপারে ফোন করে বল্লো, কাকা, আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। বললাম, তাহলে শুক্রবার দিন আসো মীরপুর যেখানে আমি বাড়ি বানাচ্ছি সেখানে। মান্নান আমার কন্সট্রাকসন সাইটে এলো দুপুর বারোটার দিকে। মান্নান যেটা বলতে এসেছিলো সেটা হলঃ

নাজিমুদ্দিন নামে আমাদের ইকুরিয়ায় একজন চেয়ারম্যান আছে যিনি বসুন্ধরা গ্রুপের সাথে জড়িত। নাজিমুদ্দিন আমাদের ওখানে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে জমি ক্রয় করেন, তারপর ওই জমি বসুন্ধরাকে লাভের উপর বিক্রি করে দেয়। তাতে প্রতি শতাংশে নাজিমুদ্দিন পাবলিককে দেয় এক লাখ টাকা, আর বসুন্ধরাকে বিক্রি করার রেট পায় সে আরো ত্রিশ হাজার টাকা বেশি। ফলে প্রতি বিঘায় সে নয় লাখ টাকার মতো লাভ করে। যেহেতু প্রতিটি লোকের কাছে নাজিমুদ্দিনের যাওয়া সম্ভব না, ফলে নাজিমুদ্দিন লোকালি কিছু এজেন্ট রেখেছে যারা প্রতি শতাংশে হাজার দশ টাকা কমিশন পায়, তারাই পাবলিকের কাছ থেকে জমি কিনে নাজিমুদ্দিনকে দেয়। তাতে নাজিমুদ্দিনের আসলে কোনো কাজই করতে হয় না কিন্তু ফাক দিয়ে প্রতি শতাংশ জমিতে বিশ হাজার টাকা লাভ পায়। বসুন্ধরা এখানে প্রায় কয়েকশত একর জমি ক্রয় করার কথা ভাবছে একটা হাউজিং করবে বলে। মান্নান চাচ্ছিল নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে এমন একটা এজেন্টগিরি যেনো পায়। মান্নানের পক্ষে এটা কিছুতেই সম্ভব না, কিন্তু আমি যদি নাজিমুদ্দিনকে বলে দেই, তাহলে এটা অনেক সহজ এবং নাজিমুদ্দিন মান্নানকে এজেন্ট করবে বলে ওর ধারনা। মান্নানের সাথে শামসুদ্দিন এবং জয়নাল নামের আরো দুজন ভদ্রলোক আছেন, যারা মান্নানের সাথে চলে আর এই বুদ্ধিটা আসলে এই দুই ভদ্রলোকই মান্নানকে দিয়েছে বলে মান্নান আমাকে জানালো। মান্নান আরো জানালো যে, সামসুদ্দিন সাহেব নাকি কোনো এক সময় আমার বড় ভাই হাবীব উল্লাহ্‌র সাথে ছোট বেলায় একসাথে কেএল জুবিলী স্কুলে পরাশুনাও করতো। যাই হোক, তিনি হাবীব ভাইয়ের সাথে পড়তো কিনা সেটা আমার যাচাইয়ের বিষয় নয়, আমার বিষয় হচ্ছে নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে মান্নানকে একটা এজেন্টশীপ নিয়ে দেওয়া।

আমি প্রাথমিকভাবে প্রথমে শামসুদ্দিন সাহেব এবং জয়নাল সাহেবের সাথে ব্যাপারটা বুঝার জন্য আমার বাসায় দাওয়াত করি। দেখলাম, ব্যাপারতা সত্য। তাদের কাছ থেকে এতা জানলাম যে, নাজিমুদ্দিন উক্ত এলাকায় একজন অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী এবং পয়সাওয়ালা লোক। কিন্তু একেবারেই অশিক্ষিত। তাঁর অক্ষরজ্ঞান বলতে কিছুই নাই। আর সারাক্ষন মদ আর মেয়ের নেশায় থাকে। বিএনপি র রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাদের কাছে সব কথা শুনে আমারো নাজিমুদ্দিনের সাথে দেখা করার একতা ইচ্ছা জেগেছিলো। সেই সুবাদে আমি গত মিটিং এ এই সামসুদ্দিন এবং জয়নাল সাহেবকে বলেছিলাম, নাজিমুদ্দিন সাহেবকে আমার অফিসে দাওয়াত দেয়া যায় কিনা। তারা একতা আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং নাজিমুদ্দিন সাহেবকে আমার অফিসে নিয়ে আসবেন বলে কথাও দিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে আজ নাজিমুদ্দিন সাহেব আমার অফিসে এসেছিলেন। বিকেল তিনটায় মীরপুর এম পি গেট থেকে আমাকে এম পি ফোন দিয়ে জানালো যে, বেশ কয়েকজন গেষ্ট এম পি চেক পোষ্টে আমার কাছে আসতে চায়, তাদের একজনের নাম জনাব নাজিমুদ্দিন। আমি কাল বিলম্ব না করে বললাম, উনাদের আসতে দিন, আমারই গেস্ট।

উনারা আমার অফিসে এলেন, আমি ইউনিফর্ম পড়াই ছিলাম। ফিল্ড মেসে লুচী, মাংশ আর অন্যান্য ফলের অর্ডার দিয়ে বললাম, যতো তাড়াতাড়ি পারে যেনো সার্ভ করে। আমরা অফিসে আলাপে মগ্ন হলাম। জনাব নাজিমুদ্দিন, সামসুদ্দিন, জয়নাল সাহেব, মান্নান আর আরো একজন তাঁর সাথে ছিলো। বুঝলাম, নাজিমুদ্দিন সব সময় একতা দল নিয়ে চলে। ভীষন কালো রঙ এর চেহাড়া, বয়স প্রায় ৫০ এর উপর। লাল লাল চোখ। কিন্তু আদব কায়দা বেশ বুঝে। আমি কুশল বিনিময় করে উনার কথা শুনতে চাইলাম। কিছু বলার আগেই নাজিমুদ্দিন তাঁর কি কি আছে, কি করে, কোথায় আরো কি কি করবে লম্বা একটা ইতিহাস বলা শুরু করলেন। আমারো প্ল্যান ছিলো লোকটা সম্পর্কে জানা এবং বুঝা আসলে তাঁর কি ক্ষমতা আছে আর কি কি করতে পারে সেটা জানা।  কথায় কথায় জানলাম যে, উনার অনেক ব্যবসা আছে। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবসা হচ্ছে বসুন্ধরার সাথে উনার পার্টনারশীপ। বসুন্ধরার যে মালিক জনাব শাহ আলম (আকবর সোবহান) তাঁর সাথে প্রায় হাজার কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট। তাঁর আরো গার্মেন্টস ব্যবসা আছে, ঢাকা টাওয়ারের মালিক উনি, শ্যামলী টাওয়ারের ও মালিক উনি। এটা আমাদের শ্যামলী তে অবস্থিত, যা এখনো আন্ডার কন্সট্রাকসন অবস্থায় আছে। এটার দেখভাল করেন বাবুল ভাই। যিনি আমার অফিসে বর্তমানে হাজির আছেন। বাবুল সাহেব আবার কেরানীগঞ্জের শাখা বিএন র সভাপতিও। এ ছাড়া উনার আরেকতা ব্যবসা আছে পাক-বাংলা সিরামিক। আছে একটা ফিল্ম স্টুডিও, যার নাম নাফিম নাদিম। সারোয়ার নামে এক ভদ্রলোক এই ফিল্ম স্টুডিওটার দেখভাল করেন। তিনিও আমার অফিসে আজ হাজির ছিলেন। গল্প করতে করতে নাজিমুদ্দিন সাহেব বললেন যে, যদিও তিনি একতা গার্মেন্টস ইন্ডাষ্ট্রিজের মালিক কিন্তু এটা এখন ভালো চলে না। প্রতিমাসেই শ্রমিকরা বেতনের জন্য আন্দোলন করে আর তাঁর বাসায় গিয়ে ঝামেলা করে। লুতফর রহমান নামে এক ভদ্রলোক ফ্যাক্টরীটা চালান কিন্তু সে ভদ্রলোক একজন জুয়ারী বলে যেমন কোনো মাল শিপমেন্ট করতেও পারেন না, আর যে সাব কন্ট্রাক্ট করেন সেই টাকা শ্রমিকদের না দিয়ে নিজেই নিয়ে নেন। কারেন্ট বিল পেন্ডিং, গ্যাস বিল পেন্ডিং, শ্রমিকদের সেলারী পেন্ডিং। বেশ লসে আছেন। তাঁর মধ্যে আবার সোসাল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংকে বড় একটা লোন রয়ে গেছে যেটা গার্মেন্টস চালিয়ে পরিশোধ করার কথা কিন্তু তারা কেউ এটা করছে না। তিনি চাচ্ছেন এখন এই গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিটা কাউকে দিয়ে দেবার জন্য। আমি তাঁর কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম আর অন্য কিছু মনে মনে ভাবছিলামও। 

বুঝলাম, নাজিমুদ্দিন সাহেব গল্প করার মানুষ, খারাপ না তবে তাঁর সাংগপাংগরা একেবারেই যে ভাল মানুষ নয় সেটা বুঝতে আমার সময় লাগে নাই। নাজিমুদ্দিন সাহেব আমার উপর একদিনেই মনে হলো খুব খুশী। কথায় কথায় বলেই ফেললেন, মিয়া ভাই, দেখেন না আপনি ফ্যাক্টরিটা চালাইতে পারেন কিনা। শুনলাম, আপনি নাকি আর চাকুরী করতে চান না, যদি মনে করেন যে, আমার এই ফ্যাক্টরিটা চালাইতে পারবেন, তাহলে নিয়াই নেন। আমিও বেচে যাই।

আমি আসলে এমন একটাই পথ খুজতেছিলাম মনে মনে।  কিন্তু পাচ্ছিলাম না। আমি নাজিমুদ্দিন সাহেবকে বললাম, যদি আমি নেই তাহলে কিভাবে আপনি দিতে চান? নাজিম ভাই আমাকে জানালেন, আপনি একাও চালাতে পারেন আবার আপনি আমাকে রেখেও চালাতে পারেন। সেক্ষেত্রে ব্যাংকে অনেক কিস্তি পেন্ডিং হয়ে আছে, সেটা রিসিডিউল করতে হবে। রিসিডিউল কি আমি সেটাই তো বুঝি না। এটা একটা ব্যাংকিং টার্ম ব্যবসার সাথে জড়িত। হয়তো ব্যাংকে গেলে এ ব্যাপারে আরো বিস্তারীত জানা যাবে। আমরা যারা আর্মিতে চাকুরী করি বা যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করি তারা ব্যবসার সাথে জড়িত অনেক ব্যাংকিং ফর্মালিটিজ আসলেই বুঝি না। এগুলি বুঝে তারা যারা সরাসরি ব্যবসার সাথে জড়িত।

আমি নাজিম ভাইকে বললাম, তাহলে আমি ফ্যাক্টরীটা সরে জমিনে দেখতে হবে। কি অবস্থায় আছে, কি করা দরকার, ব্যাংকিং সেক্টরে কি কি সমস্যা আছে, সব জেনে আমি জানাতে পারবো আসলে আমি চালাতে পারবো কিনা। তিনি আমাকে বললেন যে, এখন বর্তমানে জনাব লুতফর রহমান চেয়ারম্যান হিসাবে ফ্যাক্টরী চালায়, আর সেটা পুরুটাই সাব কন্ট্রাক্ট বেসিসে। কিন্তু লুতফর রহমান সাহেব নাজিম ভাইকে এ ব্যাপারে কিছুই জানায় না। ব্যাংকের লোন গুলিও পরিশোধ করে না, আবার সময় মতো শ্রমিকদের বেতন ভাতাও দেয় না। এই মিলে প্রতিমাসেই শ্রমিকরা আন্দোলন করতে করতে তাঁর বাসায় গিয়া হাজির হয়, অপারগ হয়ে শেষ পর্যন্ত নাজিম ভাইকেই তাঁর অন্য সোর্স থেকে তাদের পারিশ্রমিক দিতে হয়। ওখানে লুতফর রহমানের সাথে নাজিম ভাইয়ের একজন আত্তীয় তৌহিদ নামের একটি ছেলে প্রোডাক্সনের কাজ করে। তাঁর সাথে কথা বললে হয়তো আরো বিস্তারীত জানতে পারবেন।

আমি নাজিম ভাইকে বললাম, যে, আমার যেহেতু এই মুহুর্তে গাড়ি নাই, আগামীকাল যদি কাউকে দিয়ে আমাকে একতা গাড়ির লিফট দিয়ে ফ্যাক্টরী পরিদর্শন করানো যেতো, হয়তো আমি ব্যাপারটা নিয়ে আরো একটু সিরিয়াসলী ভাবতে পারতাম। তিনি রাজী হলেন পরেরদিন গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন বলে।

নাজিম উদ্দিন ভাইয়ের সাথে কথা বলার পর রাতে আমি তৌহিদের সাথে অনেক ক্ষন টেলিফোনে কথা বললাম, জানলাম, বুঝলাম যে, ফ্যাক্টরিতে এক সময় কারা কারা ছিলো, তখন কত লাভ হতো, অনেক ভালো একটা পজিসনে ছিলো, আর এর মধ্যে অনেক শেয়ার হোল্ডার মালিকগন ছিলেন, যারা ধীরে ধীরে সরে গেছে। বর্তমানে শুধু লুতফর রহমান আর তাঁর ভাই বাবলুর রহমান ১৫% করে মোট ৩০% শেয়ার নিয়ে চেয়ারম্যান-ডাইরেক্টর আর নাজিমউদ্দিন সাহেব ৭০% শেয়ার নিয়ে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসাবে আছেন। তৌহিদের ভাষ্য অনুযায়ী যা বুঝলাম যে, যদি আমি আগে যারা এখানে মার্কেটিং এর কাজ করতো তাদের কাউকে আনা যায়, তাহলে এই ফ্যাক্টরী পুনরায় চালু করা কোনো ব্যাপার না। তাছারা নাজিম ভাইয়ের টাকার কনো সমস্যা নাই, সে যদি থাকে তো কোনো সমস্যাই না। নাজিম ভাইয়ের দরকার শুধু ঠিক মতো ফ্যাক্টরীটা যেনো চলে। তাকে লাভ দিতে হবে এমন নয়। আর সবচেয়ে আরেকটা বড় ব্যাপার হচ্ছে যে, ফ্যাক্টরীর ভাড়া দিতে হয় না যেহেতু এটা নাজিম সাহেবের নিজস্ব বিল্ডিং। তৌহিদের সাথে কথা বলে আগামীকালের সময়টা ঠিক করলাম, কিভাবে কিভাবে আগানো যায়। একতা পরিকল্পনাও কাগজের মধ্যে লিখে নিলাম।

১৫/১১/২০০৪-মীরপুর “গোল্ডেন ইন” বাড়ির কাজ শুরূ

গত পহেলা সেপ্টেম্বরে আমি আমার মিরপুরের বাড়ির কাজ শুরু করেছি। আমার কেনো যেনো বারবার মনে হয়েছিলো যে, আমার আর বেশীদিন এই আর্মিতে থাকা হবে না। তাই আমার ওই দুইটা ভাবনার সমস্ত কাজ খুব জোরেসোরে শুরু করেছিলাম। আমার হাতে মিশন থেকে প্রাপ্ত টাকা আছে ১১ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা। আর মিটুল মালয়েশিয়ায় ট্রেনিং করার কারনে কিছু টাকা সেভ করতে পেরেছে, তাঁর পরিমান নেহায়েত কম না, প্রায় চার লাখ টাকা। মোট পনেরো লক্ষ টাকা দিয়ে ভাবলাম যে, অন্তত একতলা একটা বাড়ি করলেও আমার থাকার ব্যবস্থাটা হয়ে যায়। মনে অনেক সাহস ছিলো, জোরও ছিলো। আর যেহেতু সিদ্ধান্ত প্রায় চুড়ান্ত করে ফেলেছিলাম যে, আমি আর থাকবো না আর্মিতে, ফলে আমার পিঠ প্রায় দেয়ালেই ঠেকে গিয়েছিলো। অফিসে যেতে ভালো লাগে না, কোথাও কোনো দাওয়াত খেতে যেতে ভালো লাগে না, অফিসাররা বাসায় এলে তাদের সাথেও আগের মতো আর গল্প করতে ভালো লাগে না। এটা একটা অত্যান্ত খারাপ সময় পার করছি।

একদিন শুনলাম যে, পেনশনের টাকা থেকে আগাম নাকি কমুটেশন করে কিছু লোন নেয়া যায়। যোগাযোগ করলাম এফসি আর্মিতে। ব্যাপারটা সত্য। আমি কালবিলম্ব না করে, তাড়াতাড়ি ১০ লক্ষ টাকার একটা লোনের দরখাস্ত করে দিলাম। টাকাটা পেলে আমার বাড়ি করতে খুব কাজে লাগবে। এখানে একটা কথা বলে রাখা খুব দরকার যে, যে জায়গায় আমি বাড়ি বানাচ্ছি, সেই জমিটা আমি কিনেছিলাম আমাদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে। উনি যখন আমেরিকায় ছিলেন, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত জনাব আজাদের মাধ্যমে আমমোক্তার বলে আমি তদানিন্তত প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের কাছ থেকে পৌনে তিন কাঠা জমি সর্বোমোট ১০ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছিলাম। এই সংযোগটা হয়েছিলো আমাদের মীরপুর এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হোসেন খানের মাধ্যমে। এখন আমি সেই পৌনে তিন কাঠা জমির উপর আপাতত চার তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে আপাতত একতলা বাড়ি বানানোর নিয়ত করেছি। কারন বাকী তালা করার জন্য আমার কাছে বাজেট নাই।

আমি প্রতিদিন বাড়ির কাজ তদারকী করতে অফিসের পরে আর্মির জীপ নিয়ে, আর্মির ড্রেস পড়েই চলে আসি। বাড়ির কাজ দেখতে ভালো লাগে। অনেক রাত হয়ে যায় ফিরতে ফিরতে। আমি ক্যান্টনমেন্টের বাসায় থাকি। কিন্তু মন পড়ে থাকে এই নতুন বাড়ির কন্সট্রাকসনে। বদর ভাই একদিন বাসায় আসলেন, বদর ভাই হচ্ছে মিটুলের কলিগ, সিংগাইর বাড়ি। নিতান্ত ভদ্রলোক। কথাত কথায় জানালেন যে, উনার এক আত্তীয় আছেন হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনে। ওখান থেকেও বাড়ি বানানোর জন্য সহজ কিস্তিতে লোন নেয়া যায়। তাঁর নাম সিদ্দিক সাহেব। বদর ভাইকে নিয়েই গিয়েছলাম ওই অফিসে, ভাগ্য খুব ভালো। একতা এপ্লিকেশন করতে বললেন। দুই মাসের মধ্যে নাকি ১৫ লক্ষ টাকার একটা লোন দেয়া সম্ভব। এবার আমার বাজেট দারালো (হাতে ছিলো ১৫ লাখের মতো, পেনসন কমুটেশন থেকে পাবো ১০ লাখ টাকা আর হাউজ বিল্ডিং কর্পোরেশন থেকে পাবো আরো ১৫ লাখ টাকা) মোট ৪০ লাখ টাকা। এই টাকায় আমি একেবারে এক নাগাড়ে  চার তলা পর্যন্ত করে ফেলতে পারবো ইনশাল্লাহ। ঠিক ৪০ লাখ টাকায় হবে না জানি, কিন্তু দোকানে আরো লাখ দশেক তাকার মেটেরিয়াল বাকীতে নিলে হয়েই যাবে। আর সেই বাকীর তাকাগুলি আমার পেনসনের পর যে টাকা পাবো তা দিয়ে শোধ করা সম্ভব। অন্তত একটা কাজ হয়ে যাচ্ছে। একটা ফ্লোর নিয়ে যদি আমি আমার পরিবার নিয়ে থাকি, তাহলে বাকী ফ্ল্যাট গুলি থেকে একটা ভালো ইনকাম আসবে যা আর্মির বেতন থেকেও ডাবল। তাঁর উপরে মিটুল চাকুরী করে। আমার চলায় কোনো অসুবিধা নাই।

এখন পরবর্তী যে জিনিষটা দরকার, তা হচ্ছে একটা ব্যবসার প্ল্যান করা। আমি এই ব্যাপারে চারিদিকে খোজ খবর নিচ্ছি। দেখা যাক, কি হয়।

১১/১১/২০০৪-নতুন সিও লেঃ কর্নেল আব্দুল মজিদ

ফেরদৌস স্যারের পোষ্টিং হয়ে গেলো, তাঁর পরিবর্তে ৪ ফিল্ডের সিও হিসাবে পোষ্টিং হয়েছে প্রধান মন্ত্রীর এডিসি হিসাবে কাজ করতো ১৪ লং কোর্সের আব্দুল মজিদের। এবার মজিদ সম্পর্কে কিছু বলি। আমি যখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে কাজ করছিলাম, তখন একটা রিউমার উঠলো যে, খালেদা জিয়া তাঁর এডিসি হিসাবে মেজর আব্দুল মজিদকে চান। এমএস ব্রাঞ্চে তখন আমার দোস্ত মেজর আকবর ডিএমএস হিসাবে কাজ করছে। আমরা তখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে প্রায় সাতজন কোর্সমেট একসাথে কাজ করছি। আমি এমটি ডাইরেক্টরে, ওয়াহিদ এমটি ডাইরেক্টরে, মেজর মতি, মেজর সালাম আর মেজর চৌধুরী সবাই এমটি ডাইরেক্টরেটে। মানে আমরাই ৫ জন কোর্সমেট এমটি ডাইরেক্টরেটে কাজ করছি। পুরু সেনাবাহিনীর ট্রেনিং কোনো না কোনোভাবে আমাদের হাতে। মেজর শহীদুল (যাকে আমরা চাচা বলে ডাকি) সে কাজ করে আর্টিলারী ডাইরেক্টরেতে, এমএস ব্রাঞ্চে কাজ করে মেজর আকবর, পিপি এন্ড পি তে কাজ করে মেজর আলমগীর। অন্যান্য ডাইরেক্টরেটে যারা কাজ করে তারাও আমাদের হয় এক কোর্স জুনিয়র বা এক কোর্স সিনিয়র। ফলে পুরা আর্মি হেড কোয়ার্টারের মধ্যে কোথায় কি হচ্ছে তা আমরা দিনের কোনো না কোন সময় একে অপরের কাছ থেকে জেনেই যাই।

ঠিক এমন সময় একটা খবর চাউড় হলো যে, ১৪ লং কোর্সের মেজর মজিদের জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চেয়েছেন যেনো মজিদকে তাঁর ব্যক্তিগত এডিসি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। এটা কোন বিস্ময়কর খবর না আসলে, এটা হতেই পারে যে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজস্ব একজন পরিচিত মানুষকে তাঁর ব্যক্তিগত এডিসি হিসাবে চান। কিন্তু বিস্ময়কর খবরটা হলো যে, যখন কোনো অফিসারের এই ধরনের পোষ্টিং হয়, তখন একটা প্যানেল হয়। সেই প্যানেলে চৌকস অফিসারদের নামের তালিকা থাকে। সেখান থেকে মেধা, শারীরিক যোগ্যতা, ক্ষিপ্রতা, আপটেক, ডিপ্লোমেটিক ভদ্রতা, কিংবা আরো অনেক কিছু বিবেচনা নেয়া হয়। বেষ্ট অফিসারটাই আসলে এতো বড় লেবেলের একটা পদে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। এটা তো শুধু দেশের ভিতরেই নয়, যখন প্রধান্মন্ত্রী দেশের বাইরে যাবেন, এই এডিসিরাই অন্যান্য দেশের বড় বড় জেনারেলদের সাথে ইন্টারেকশনে আসবেন। ফলে মেধাবী, শারীরিক যোগ্যতা, প্রেজেন্টেবল, মেধাশীল, ডিপ্লোমেটিক না হলে তাকে তো নেয়াই ঠিক না।

মেজর মজিদ মেধাশীল নয়, ষ্টাফ কলেজ করে নাই, নিজের আর্মসের আর্টিলারীর গানারী ষ্টাফ কোর্সটাও করতে পারে নাই, কোনো একটা কোর্সে যে টপ করেছে সে রেকর্ডও নাই, তাঁর কোর্স ১৪ তম লং কোর্সের মধ্যে সে একজন শেষের দিকের অফিসার, শারীরিকভাবে সে মেডিক্যালি ফিট নয় কারন সে ক্যাটেগরি “সী’ একজন অফিসার। ক্যাটেগরি সি মানে তিনি মেডিক্যালী আনফিট, এবং কোনো কাজের জন্যই তিনি ফিট নন। তাঁর মধ্যে তাঁর আছে ডায়াবেটিস। এমন একটা অফিসারকে হটাত করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কেনো চয়েজ করলেন? সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো। খোজখবর নিয়ে যখন জানা গেলো, সেটা আরো স্বজনপ্রীতি ছাড়া আর কিছুই না। মেজর মজিদের বাবা খালেদা জিয়ার বাড়িতে মালির কাজ কিংবা কেয়ার টেকারের কাজ করেন বহুবছর যাবত। মজিদের বাবা সেই সুবাদে খালেদা জিয়ার সাথে ব্যক্তিগতভাবে জানা এবং চেনা, এবং বহুবছর যাবত আছেন। খালেদা জিয়া যখন গৃহিণী, অর্থাৎ জেনারেল জিয়া যখন বেচে ছিলেন, মজিদের বাবা তখনো তাদের বাড়িতে মালীর কাজই করতেন। মজিদের বাবা এখন খালেদা জিয়াকে অনেকভাবে অনুরোধ করেছেন যেনো তার ছেলেকে একটা ভাল পোষ্টে রাখেন, পারলে তাঁর এডিসি করে নেন। ব্যাপারটা হয়তো মজিদ নিজেই তাঁর বাবাকে এই রকমের একটা কথা বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদার কাছে পাঠিয়েছেন। হয়তো খালেদা জিয়া আপাতত “এইটা আর কি এমন রিকুয়েষ্ট” মনে করে সেনাপ্রধানকে ব্যাপারটা কার্যকরী করার জন্য বলেছেন। তারপর আর যায় কই। প্রধানমন্ত্রীর একটা কথা সেনাপ্রধানের জন্য আদেশেরই নামান্তর।

সেনাবাহিনীর সমস্ত নর্ম ভেংগে, সমস্ত প্রথা অমান্য করে, পলিসি ব্রেক করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন কাউকে একটা সুযোগ করে দেন, তখন আর বেশী করে ভাবা দরকার হয় না যে, তিনি কতটুকু দেশনেত্রি বা কোনো বাহিনীকে তিনি কতটা সম্মান করেন। বুঝলাম, দূর্নীতির শেকর খুব উপরে। হয়তো কোনো এক সময় এই দলই তাঁর নিজের এ রকম দুর্নীতির কারনে এমন জায়গায় পা আটকে যাবে যখন দাপটওয়ালা অফিসার তাদের আশেপাশে খুজে পাওয়া যাবে না। যখন এই দলের জন্য কোনো চৌকস অফিসার লাগবে, তখন এই মজিদেরা না পারবে হাল ধরতে, না পারবে পুরা ক্রিটিক্যাল সময়ে অন্য কোন অফিসারদেরকে হাতে নিতে। এই দলের ভাগ্যে চরম দূর্ভোগ আছে অদুর ভবিষ্যতে। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিএনপিই একমাত্র প্রথম দল যেখানে দলীয় বিবেচনায় যোগ্ কে বাদ দিয়ে অযোগ্য কোনো অফিসারকে পদায়ন করেছে, আর যোগ্য ব্যক্তিদেরকে অসম্মান করেছে। এর মাশুল হয়তো এই রাজনৈতিক দলকে খুব বেশী ভোগাবে একদিন। সেদিন পর্যন্ত বেচে থাকলেই হয়।

মজিদ ইউনিটে এলো, ফেরদৌস স্যারের সাথে হ্যান্ডিং টেকিং হয়ে গেলো। আমি উপঅধিনায়কই রয়ে গেলাম। কিন্তু আমি এবার এডামেন্ট যে, যতো তারাতাড়ি সম্ভব, আমাকে আর্মি থেকে বের হতেই হবে। মজিদ পরেরদিন ইউনিটের দরবার নিবে। রাতে আমার সাথে একান্তভাবে কথা বল্লো। কি কথা হলো এবার বলিঃ

মজিদ আমাকে ওর অফিসে নিয়ে খুব সমাদর করে বল্লো, স্যার, আপনি যেমন আমাকে চিনেন, আমিও আপনাকে খুব ভালো করেই চিনি। আমি জানি আমার প্রোমোশন হবার কোনো কারন নাই। কিন্তু যেহেতু সুযোগ ছিলো, এটা পেয়েছি। আমি হয়তো ইউনিটের অধিনায়ক কিন্তু আপনি আমার সিনিয়র মানুষ এবং আপনার কোয়ালিফিকেশনের কোনো কমতি নাই। আমি সিও হলেও ইউনিট চালাবেন আপনি, আমাকে শুধু গাইড করবেন আমাকে কি করতে হবে, আর কি করলে ভালো হয়। আপনি আপনার মতো করে অফিস করবেন, ব্রিগেড থেকে যদি কোন অব্জারভেশন না আসে এমন কোনো কাজ ছাড়া আপনি সাধীনভাবে যা খুশী আপনি করবেন, আমার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপ নাই। কিছু কিছু প্রোটকল হয়তো আমাদের মানতে হবে কিন্তু সেটা শুধুমাত্র প্রোটোকলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, আমি মন থেকে আপনাকে জানাচ্ছি যে, আসলে আপ্নিই আমার সিও। আর আমি আপনাকে একটা কথা বলে রাখি, যদিও এবার আপনার প্রোমোশন হয় নাই, কিন্তু আগামিবার আমি নিজে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে আপনার ব্যাপারে জানাবো যাতে আপনি আপনার ডিও প্রোমোশন পান। আসলেই তো আপনার প্রোমোশন হওয়া দরকার ছিলো।

আমি সেদিন মজিদকে কিছুই বলি নাই। মজিদের কি দোষ। দোষ তো আমাদের সিস্টেমের। যে সিস্টেম তাঁর নিজস্ব আইন, নিজের পলিসি, কিংবা ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে জানে না। আর এই কারনেই বারবার অনেক যোগ্য অফিসাররা ঝরে যাবে, আর অযোগ্য অফিসাররা আর্মিতে থেকে যাবে। এই অযোগ্য আর্মি অফিসাররাই একদিন জেনারেল হবে, শিরদাড়া না থাকলেও কাধে চমকপ্রদ স্টার নিয়ে গাড়িতে স্টারপ্লেট নিয়ে, হাতে ছড়ি ঘুরাতে ঘুরাতে বলবে আমি সেনাপ্রধান, আমি অমুক, আমি তমুক। হতভাগ্য জাতি এভাবে পতনের মুখ দেখে।

আমি মজিদকে বললাম, মজিদ, আমি চাই না এই কয়দিনের জন্য আমার অন্য কোথাও ঢাকার বাইরে পোষ্টি হোক, আর আমি চাই, প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা ডিও (ডেমি অফিশিয়াল লেটার) লিখতে। কারন আমি সত্যিই সুপারসিডেড হয়ে আর আর্মিতে চাকুরী করতে চাই না। এই একটা  ব্যাপারে তুমি আমাকে সাহাজ্য করলেই হবে। আমাদের মধ্যে আর বেশী কথা হলো না।

আমি এবার নিজের বাড়ি বানানোর জন্য মনযোগ দিলাম। আর আর্মি থেকে বের হয়ে গেলে কি ব্যবসা করবো সেটা নিয়ে একদম সিরিয়াস হয়ে গেলাম। আর এরসাথে আমি একটা এপয়েন্টমেন্ট চাইলাম এমএস (মিলিটারী সেক্রেটারী) এর সাথে দেখা করতে। বর্তমানে এমএস হিসাবে দায়িত্তে আছেন মেজর জেনারেল সফিক স্যার। তিনি সিগন্যালের লোক।  আরেকটা  ডিও চিঠি লিখলাম, সেনাপ্রধানকে যেনো আমি তাঁর সাথে একটা এক্সক্লুসিভভাবে সাক্ষাত করতে পারি। আমার কিছু কথা বলার আছে, তাই।

অপেক্ষায় আছি, কবে এমএস এবং সেনাপ্রধান আমাকে সাক্ষাত দেন। আমি এর মাঝে প্রধানমন্ত্রীকেও ডিও লেটার লেখার ড্রাফট করতে বসে গেলাম। আর্মি থেকে বের হয়ে যাবার আগে আমি আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা এসব রাঘব বোয়াল টাইপের অফিসারদেরকে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলে যেতে চাই। আর এটা আমার বলার হক আছে।   

১০/০৯/২০০৪-২য় বারের মতো প্রোমোশন হলো না।

৪ ফিল্ডের মেইন বডি এরই মধ্যে মীরপুর চলে এসেছে। লেঃ কর্নেল ফেরদৌস অন্যান্য বাকী অফিসারদেরকে নিয়ে মীরপুরে চলে এসেছিলেন। ইউনিটে মেজর আলি, মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, তাহমিনা এবং অন্যান্য সবাই চলে এসছে। ভরপুর ইউনিট। ৪৬ ব্রিগেডের দায়িত্ব অনেক, তারমধ্যে সেনাপ্রধানের বাসভবনের পাহাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের পাহাড়া ছাড়াও ঢাকায় যতো প্রকারের ইন এইড অফ সিভিল পাওয়ারের কাজ হয়, তাঁর সিংহভাগ কাজ আমাদের দায়িত্তের মধ্যে পড়ে। মেজর আলী আমার ৬ ফিল্ডের অফিসার। আমার হাত দিয়েই ওর রেজিমেন্টেশন হয়েছিলো। অমায়িক ছেলে। তাঁর উপর আবার আমার সাথে হাইতিতে মিশন করেছে। এখন আমার ইউনিটে আবার ব্যাটারী কমান্ডার। আমি ওদের সাথে একেবারেই মিলিটারী কমান্ড প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। অন্যদিকে মেজর হায়দার তো পোলাপানের মতো, সারাক্ষন ‘বড়দা” বড়দা” বলেই কথা বলতে থাকে কারন মেজর হায়দার আমার মীর্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছোট ভাই। ওর বাবা সুজা হায়দার ছিলেন আমার আর্টের শিক্ষক। ফলে ওর প্রতিও আমি কিছুইতেই উপ অধিনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। আরো দুইজন মেজর আছে, ওরাও আমার সাথে এমন একটা সম্পর্ক করে ফেলেছে যে, এখন মনে হচ্ছে, আমি একটা হাসের মা। যেখানেই যাই, ওরাও দল বেধে আমার পিছু পিছুই যায়। খারাপ লাগে না। ভালই লাগে।

 বাসা পাই নাই। তাই অফিসার্স মেসের তিন তলার ব্যারাকে আমরা সবাই অর্থাৎ বিবাহিত অফিসারগন দুইটা করে রুম নিয়ে নিয়ে থাকি। ফেরদৌস স্যারের পরিবার থাকে দোতালায়, আমি তিনতালায়, মেজর আলী আর মেজর হায়দার বাসা নেয় নাই কারন ওদের বাসা ঢাকায় আছে। অন্যান্য অফিসাররাও আমাদের বিল্ডিং এর মধ্যেই থাকে। প্রায়ই আমরা ওদেরকে ডেকে ডেকে দাওয়াত করে একসাথে খাই। কখনো আবার তরকারী কিংবা ভালো খাবার পাক করলে পাঠিয়ে দেই। ইউনিট হলো আসলে একটা পরিবার। আমাদের অফিস একদম আমাদের বাসার সাথে লাগোয়া। প্যারেড গ্রাউন্ডও একদম লাগোয়া। ব্যাপারটা এই রকম যে, ১০০ গজের মধ্যে সবকিছু। অনেক ব্যস্ত থাকতে হয় অফিশিয়াল কাজে কিন্তু তারপরেও একটা ভালো সময় যাচ্ছে।

প্রোমোসন বোর্ড শুরু হয়েছে। বেশ ৪/৫ দিন লাগবে। ৪৬ ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ স্যার অনেকবার আমাকে ডেকেছিলেন। আমার সাথে কথা বলেছেন। একটা জিনিষ কমান্ডার বুঝেছিলেন যে, আমাকে হয়তো এর আগেরবারই প্রোমোশন দেয়াটা উচিত ছিলো, কিন্তু কেনো দেয় নাই, এ ব্যাপারে তিনি অনেকবার আমাকে প্রশ্ন করলেও আমি আসলে ভালো কোনো উত্তর দিতে পারি নাই কারন আমাকে কখনো আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে লিখিত কিছুই জানানো হয় নাই কেনো আমার প্রোমোশনটা হয় নাই। ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের প্রায় সব সিও, উপঅধিনায়ক, বিএম, ডিকিঊ, এবং অন্যান্য আশেপাশের ইউনিটের অফিসারগন ইতিমধ্যে আমার ডিভিশনাল লেবেলের এক্সারসাইজ, টিউট (TEWT, Technical Exercise Without Troops), মডেল ডিস্কাসনে মেধা আর যুক্তি দেখে, আমার শিক্ষার যোগ্যতা দেখে এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, আমি একজন যোগ্য কোয়ালিফাইড শিক্ষিত অফিসার যাকে প্রথমবারই প্রোমোশন দেয়াটা জরুরী ছিলো। যাই হোক, এবার সবাই আশা করছেন যে আমার প্রোমোশনটা হবে। কিন্তু আমার মন বলছিলো অন্য কথা।

প্রোমোশন বোর্ড আরম্ভ হবার আগে আমাকে অনেকেই একটা পরামর্শ দিয়েছিলো যে, আমার উচিত কিছু কিছু পরিচিত জেনারেল সাহেবদের বাসায় ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার। কিন্তু আমার কাছে এটা খুব অপমানজনক মনে হচ্ছিলো। কারন, প্রোমোশন হবে আমার যোগ্যতা দিয়ে, আমার মেধা দিয়ে, আমার পারফরমেন্স দিয়ে, আমি কেনো বিভিন্ন জেনারেলদেরকে পটাতে যাবো বা অনুরোধ করতে যাবো? ফলে আমি কারো সাথেই দেখা করার অভিপ্রায় হলো না। যদি আমাকে এই আর্মি যোগ্য মনে না করে, যদি এই আর্মি মনে করে যে, আমার থেকেও আরো কেউ যোগ্যতা রাখে আমাকে টপকিয়ে প্রোমোশন পাবার, তাতে আমার কোনো কৈফিয়ত নাই বা দুঃখও নাই। কিন্তু কাউকে আগে থেকে আমি অনুরোধ করবো, তারপর তাদের দয়ায় আমার প্রোমোশন হবে এটা আমি চাই না।

বোর্ডের প্রথম দিন শেষে আমার সিও সাহেব ফেরদৌস স্যার বললেন যে, আজ যাদের নাম পর্যন্ত বোর্ডে আলাপ হয়েছে, সে পর্যন্ত নাকি আমাদের নাম আসে নাই। বোর্ড আরো ৩ দিন চলবে, হয়তো আলাপ হয়ে যাবে, ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে বুঝলেন যে, আমাদেরটা হয়ে যাবে? ফেরদৌস স্যার আমাকে জানালেন যে, তিনি নিজ উদ্যোগে জেনারেল আমিনুল করিমের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন, এবং জেনারেল আমিনুল করীম আমাকে খুব ভালো করেই চিনেন, আমার ব্যাপারটা নাকি খুব স্ট্রং ভাবে দেখবেন। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব জোরালো মনে হয় নাই, তারপরেও ফেরদৌস স্যারের কথা আমি বিশ্বাস করি।

বোর্ডের দ্বিতীয় দিন পার হয়ে গেলো, কোনো খবর পেলাম না। রাতে ব্রিগেড কমান্ডারকে দিনের শেষের ফলাফল জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, যে পর্যন্ত নাম মুটামুটি ড্রাফট হয়েছে সেখানে আমার নাম আছে। অর্থাৎ আমার আপাতত প্রোমোশন বোর্ডে নাম পাশ হয়েছে। কেনো জানি একটু সস্থি পাচ্ছিলাম না যদিও কমান্ডার আমাকে অযথা মিথ্যা কথা বলবেন না। আর মোশাররফ স্যারের সাথে আমার সম্পর্কটা অত্যান্ত ফ্রেন্ডলী। আমি কাউকেই কোনো আগাম খবর দিতে চাই না। আমি আমার বউ মিটুলকেও কোনো খবর দিলাম না। কারন এখন যদি একটা আশা দিয়ে রাখলাম, আর পরে যদি সেটা নেগেটিভ হয়, তাহলে একটা ভালো সংবাদের যে আনন্দ সেটা থেকে বিচ্যুত হয়ে আরেকটা নেগেটিভ খবরের কারনে মনের ভিতর যে বেদনার সৃষ্টি হবে, সেই চাপ মিটুল নিতে পারবে কিনা সন্দেহ। ফলে আমি ওকে না ভালো, না খারাপ কোনোটাই দিতে চাই নাই ফ্রেস এবং চুড়ান্ত ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত।

এভাবে ৩/৪ দিন পেরিয়ে প্রোমোশন বোর্ড পার হল। প্রোমোশন বোর্ড শেষ। এবার ফলাফল প্রকাশিত হবে। সেই চুরান্ত ফলাফলে আমাকে জানানোও হলো যে, আমার এবারো কোনো প্রোমশন হয় নাই। তবে আগেরবারের মতো আমাকে অন্ধকারে রাখা হলো না। আমি কমান্ডারের কাছে জানতে চাইলাম, আমার কোথায় ঘাটতি ছিল? তিনি উত্তরটা দিতে গিয়ে নিজেও খুব লজ্জিত বোধ করছিলেন। কমান্ডার আমাকে জানালেন যে, ১৯৮৮ সালে কোনো এক ষান্মাসিক পিইটি (ফিজিক্যাল এফিসিয়েন্সী টেষ্ট) তে নাকি আমি জয়েন করি নাই। তাই আমার প্রোমোশন হয় নাই। কমান্ডার বোর্ডকে বলেছিলেন যে, যদি মেজর আখতারের একটা পিইটি ঘাটতি থাকে, তাহলে ওকে ডেকে আনি, সে ওই ঘাটতিটা এখন পুরা করে দিক, তাই বলে আজ থেকে ১৬ বছর আগের একটা পিইটির দোহাই দিয়ে এ রকম একটা চৌকষ অফিসারকে প্রোমোশন না দেয়াটা অন্যায়। এতে অনেক বদনাম হবে এই আর্মির প্রোমোশন বোর্ডের চেহারার। তাছাড়া উনি আরো নাকি বলেছিলেন যে, এই গত এক বছরে তাহলে উনাকে কেনো জানানো হয় নাই যে, মেজর আখতারের একটা পিইটি ঘাটতি আছে? তাহলে তো আমিই সেটা নিয়ে নিতে পারতাম? কিন্তু সেই গল্পের মতো বলতে হয় যে, যদি কারো দোষ ধরতে চান, তাহলে লক্ষাধিক কারন তো খুজেই পাওয়া যায়। আর সেই লক্ষাধীক দোষের যে কোনো একটা আপাতত এপ্লাই করলেই তো হয়। তাতে বোর্ডের তো আর দোষ দেয়া যাবে না। বাঘ আর হরিনের সেই পানি খাওয়ার গল্পের মতো।

বাঘ হরিন দুটুই একটা ঝর্নার মধ্যে পানি পান করছিলো। হরিন ভাটার দিকে আর বাঘ উজানের দিকে। বাঘের মনে হলো হরিনের একটা দোষ বের করে সেই দোষে ওকে ভক্ষন করা। তাই বাঘ হরিনকে বল্লো, ওই বেটা হরিন, পানি খাইতেছিস তো ঘোলা করতেছিস ক্যান? তোর ঘোলা পানি তো আমার দিকে আসতেছে। তখন হরিন বল্লো, বাঘ মামা, আমি তো ভাটায়, আর আপনি তো উজানে। পানি তো আপনার দিকে থেকে আমার দিকে আসতেছে। আমি আবার ঘোলা জল আপনার দিকে দিলাম কিভাবে? বাঘ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বল্লো, আরে বেটা তুই না হয় ঘোলা জল দিচ্ছিস না, কিন্তু তো আগে তোর দাদা একবার এই রকম করছিলো, তাই তোর দাদার দোষ মানে এখন তর দোষ। এই বলে হরিনকে ঘায়েল করে দিলো বাঘ মামা।

বোর্ড যে কোনো কারনেই আমাকে বা ১৩ লং কোর্সের অফিসারদেরকে প্রোমোশন দেবে না, তাই আজ থেকে ১৬ বছর পূর্বের কোনো এক পিইটি দেয়া হয় নাই, এই দোহাই দিয়ে আমার প্রোমোশন বন্ধ। কি তাজ্জব ব্যাপার।

বাসায় এলাম অফিস থেকে। বউ জিজ্ঞেস করলো, তোমার মন খারাপ দেখলেই বুঝা যায়, বুঝেছি, তোমার প্রোমশন হয় নাই। মিটুলেরও খুব মন খারাপ হলো। আম মিটুলকে শান্তনা দিলাম না। ফেরদৌস স্যার বাসায় এলেন। অন্যান্য অফিসাররাও বাসায় এলেন। আমার মন এম্নিতেই ভালো ছিলো না, তারপরে আবার অফিসাররা এসেছেন আমাকে শান্তনা দিতে। কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য বোর্ডের সিদ্ধান্ত মনে হয় নাই, আমি মেনে নিতে পারি নাই।

আরো খারাপ সংবাদ পেলাম যে, আমার ইউনিটের সিও হিসাবে যে আসতেছে, সে হচ্ছে ১৪ লং কোর্সের মজিদ যে কিনা কোনো ষ্টাফ কলেজ করে নাই, গানারী ষ্টাফও করে নাই, অন্যদিকে মেডিক্যালী সে ক্যাটেগরী সি। অর্থাৎ আনফিট। এমন একটা অফিসারের প্রোমোশন হয় কিভাবে? সে কথা আরেকদিন বল্বো।

০৫/০৭/২০০৪-মীরপুরে ৪ ফিল্ড নিয়ে এডভান্স পার্টিতে আমি

মিটুল মালয়েশিয়া ট্রেনিং করে দেশে ফিরে এসছে। অনেক অসুবিধার মধ্যে ছিলাম মিটুলের এই দীর্ঘ সময়ে অনুপস্থিতির কারনে। তারপরেও কোনো রকমে মানিয়ে চলার চেষ্টা করেছি। আমার মেয়েরাও লক্ষী মেয়ের মতো ওরাও বুঝতে পেরেছিলো কিভাবে মাকে ছাড়া চলা যায়। শুধু মাকে ছাড়া নয়, বাবাকে ছাড়াও। এর মধ্যে আমার আরেকটা ভালো খবর ছিলো যে, ৪ ফিল্ড খোলাহাটি থেকে মীরপুর পোষ্টিং হয়ে আসবে এই সুবাদে আমি এডভান্স পার্টি নিয়ে আর কোয়ার্টার মাষ্টার রাকিবকে নিয়ে মীরপুর এসছি কয়েকদিন যাবত। তাতে যেটা হয়েছিলো যে, অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও আমার মেয়েরা আর আমি একসাথে বাসায় থাকতে পেরেছিলাম। মিটুল এখন দেশে চলে আসাতে আমি হয়তো এই বাসাটা ছেড়ে মীরপুর সেনানীবাসের একটা অস্থায়ী অফিসার্স ফ্যামিলী কোয়ার্টারে চলে যাবো। বাসা পেতে অনেক দেরী হবে কিন্তু মীরপুরের যেখানে অফিসারগন পরিবার নিয়ে থাকে সেটা ও একটা অফিসার্স মেস কিন্তু সেখানে কিছু কিছু অফিসার দুইটা মাত্র রুম নিয়ে পরিবার নিয়ে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে স্থানীয় কমান্ডার। ৪ ফিল্ড ১২ ফিল্ড রেজিমেন্টকে প্রতিস্থাপন করছে। আমরা সমস্ত কিছু হস্তান্তর করছি। ১২ ফিল্ড চলে যাচ্ছে হিল ট্র্যাক্সে। ১২ ফিল্ডের সিও হিসাবে আছে ১২তম লং কোর্সের লেঃ কর্নেল বশীর। আমরা এক্সাথেই বেসিক কোর্স করেছিলাম। একটু কনফিউজড টাইপের অফিসার। কিন্তু মানুষ হিসাবে খারাপ না, সৎ বটে।

মীরপুরের ফিল্ড আর্টিলারী ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্রিগেডের অধীনে। এর আগেও আমি একবার এই মীরপুর সেনানীবাসে ৭ ফিল্ডের সাথে চাকুরী করেছিলাম। তখন কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমামুজ্জামান। তাঁর সাথে আমি আরো একবার কাজ করেছিলাম বগুড়ায়। আমি আমার জিএসও-২ (অপ্স) এর শেষ প্রান্তে আর তিনি বগুড়ায় পোষ্টিং হয়ে আসলেন। আমি তাঁর সাথে মাত্র সপ্তাহ খানেক কাজ করেছিলাম। তারপর চলে গিয়েছিলাম গানারী ষ্টাফ কোর্সে। এবার ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার আছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ স্যার। বিএনপির বনমন্ত্রীর ছোট ভাই বলেই সবাই জানে।  আমার সাথে প্রায়ই ইউনিটের হ্যান্ডিং টেকিং নিয়ে কথা হয়। খুব ঝামেলা হচ্ছে বশীরের সাথে আমার। আমরা যদিও ১২ এবং ১৩ লং কোর্সের অফিসার কিন্তু আমি বশীরকে তুই বা তুমি সম্বোধনই করি কারন আমরা ক্যাডেট কলেজের একই ব্যাচ। তবে বশীর ফৌজদার হাট ক্যাডেটের আর আমি মীর্জাপুর ক্যাডেটের। বশীরের ইউনিটের অনেক কিছুই বিশেষ করে হস্তান্তরযোগ্য আইটেমের সঠিক ইনভেন্টরী নাই। এর কোথায় কি তাঁর ও সঠিক ব্যাখ্যা নাই। আমি আবার সব কিছু বুঝে না নিলে পরবর্তীতে সব কিছুর ব্যাপারে আমাকেই জবাব্দিহি করতে হবে বিধায় কোনো ছাড় দেওয়ার ও কোনো অবকাশ নাই। ফলে নিত্য নৈমিত্তিক একটা খারাপ সম্পর্ক সৃষ্টি হচ্ছিলো। তারপরেও আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যে করেই হোক কন্ট্রোল আইটেম গুলি ছাড়া অন্যান্য আনকন্ট্রোল আইটেমে ছাড় দেয়ার। ১২ ফিল্ড যাওয়ার পরেই আমরা ওদের খালী হ ওয়া ব্যারাক গুলি এবং অফিসার্স কোয়ার্টার গুলিতে উঠতে পারবো। তাঁর আগে আমি ওই কচুক্ষেতেই পরিবার রাখতে হবে।

আমি প্রতিদিনই কউক্ষেত বাসায় যেতে পারি। সকালে অফিসে চলে আসি আর সন্ধ্যায় আবার কচুক্ষেত বাসায় চলে যাই। এর মধ্যে কমান্ড নেটে আমি খোলাহাটিতে ফেরদৌস স্যারের সাথে কথা বলে তাকে প্রায়ই আপডেট দেই। ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্রিগেডের কমান্দার থেকে শুরু করে বিএম, ডিকিউ সবাই আমাকে যথেষ্ট পরিমান সমীহ করেন। সময়টা ভালই যাচ্ছে।

সামনে আরো একটা প্রোমোশন বোর্ড আছে। আমার মনে এবারো একটা সন্দেহ জাগছে যে, এই বি এন পির আমলে আমাদের হয়তো আর প্রোমোশন হবে না। একটা বোর্ডে তো প্রোমোশন হয় নাই, এবার যে হবে সেতার ও কোনো নিশ্চয়তা নাই। তবে যেটাই হোক, যদি এবার প্রোমোশন না হয়, আমি ৩য় বারের জন্য কোনো চান্স নেবো না। এই চিন্তায় আমার কয়েকটা কাজ খুবই বাস্তবায়ন করা জরুরী হয়ে পড়েছিলো। তাঁর প্রথম কাজতা ছিলো, আমার একতা স্থায়ী বাড়ি বানানো যেখানে আমি সেনানীবাস থেকে বেরিয়ে গেলে নিজের বাড়িতে থাকতে পারি। দ্বিতীয় কাজটি ছিলো যে, যদি আর্মির চাকুরী ছেড়েই দেই, আমি কনো প্রাইভেট চাকুরী করতে চাই না। ফলে চাকুরীর বাইরে কি কি ব্যবসা করা যায় সেটা ভাবা। এই দুটু বিষয় আমার মাথায় সর্বক্ষন ছিলো।

১৯/০৫/২০০৪-মোহসীন সাহেবের সাথে বৈঠক

শেষ পর্যন্ত রিভার সাইডে ডিএমডি হিসাবে কাজ করেছেন যে মোহসীন সাহেব, তাকে পাওয়া গেলো। বয়স প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ এর মতো হবে। বেশ ফর্সা করে লোকটি। পাঞ্জাবী পরিহিত, মাথায় একটা গোল টুপী এবং হাতে সব সময় তসবীহ থাকে। আমার বাসায় তৌহিদ, মোহসীন সাহেব আর আনসার এলো রাত ৮ টার দিকে। মোহসীন সাহেবের বাড়ি বরিশাল। বেশ ভালো ইংরেজী বলতে পারেন। অনেকক্ষন আলাপ করলাম। আসলে এবারই প্রথম আমি মোহসীন সাহেবের সাথে রিভার সাইড সুয়েটারস নিয়ে বিস্তারীত আলাপের একটা সুযোগ পেলাম। আমার যে জিনিষগুলি তাঁর কাছ থেকে জানার ছিলো সেটা এ রকমেরঃ

(১)      ফ্যাক্টরী চালাতে মোট কত টাকা প্রাথমিকভাবে ইনভেস্টমেন্ট করা লাগতে পারে।

(২)     এটার ফিউচার প্রোস্পেক্ট কি?

(৩)     গার্মেন্টস উনি আমাকে নিয়ে চালাইতে পারবেন কিনা।

(৪)     লাভ হবার সম্ভাবনা কেমন।

এই সব প্রশ্নের উত্তর মোহসীন সাহেব দিতে গিয়া একটা নোট খাতায় তৌহিদ আর তিনি একটা ক্যালকুলেশন করলেন। এবং পরিশেষে আমাকে জানালেন যে, মোহসীন সাহেব আমার সাথে জয়েন করলেও তিনি কোনো অর্থ ইনভেস্টমেন্ট করতে পারবেন না। আর তাঁর যে অভিজ্ঞতা আছে, তাতে ছয় মাসের মধ্যে এই ফ্যাক্টরি থেকে কয়েক লাখ টাকা প্রোফিট করা সম্ভব। কিন্তু এর জন্য যা করতে হবে সেটা হচ্ছে, প্রথমে সাবকন্ট্রাক্ট করা, এবং পরবর্তীতে সরাসরি এলসি এর মাধ্যমে বায়ারদের কাজ করা। আর এসব তিনি অনায়াসেই করতে পারবেন। এই ফ্যাক্টরী নাকি প্রাথমিক সময়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকা করে লাভের মুখ দেখেছিলো। কিন্তু এতো বেশী শেয়ার হোল্ডার ছিলো, তাদের ব্যক্তিগত কোন্দলের কারনে পরে মোহসীন সাহেবকে তারা স্কেপগোট বানিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলো। আর মোহসীন সাহেব চলে যাবার পর থেকেই এই ফ্যাক্টরীর দূর্দশা শুরু হয়। এটা তৌহিদও আমাকে জানালো, আনসারও সায় দিলো এবং মোহসীন সাহেব নিজ থেকে কিছু না বল্লেও ব্যাপারটা যে এ রকমেরই, সেটা বুঝালেন। আমি এম্নিতেই রিভার সাইড ফ্যাক্টরীটা নেয়ার পক্ষে ছিলাম, এখন তো ব্যাপারটা যেনো আরো পাকা পোক্ত হয়ে গেলো।

অনেক রাত পর্যন্ত মোহসীন সাহেবের সাথে আমার মিটিং হলো। মনটা চাংগা হয়ে গিয়েছিলো। এবার আমার কাজ হবে নাজিম সাহেবকে কিভাবে কনভিন্স করা যায়। কিন্তু নাজিম সাহেবকে পাওয়াই যায় না। আমি কিভাবে আগাবো এবার তৌহিদের সাথে মোহসীন সাহেবও একজন গাইড হিসাবে যোগ হলেন।

১৮/০৩/২০০৪ -মিটুলের মালয়েশিয়ায় ট্রেনিং প্রজ্ঞাপন

আজ আমি ঢাকায় এলাম একটা বিশেষ কাজে। কাজটা হলো আমার স্ত্রী আগামী কয়েকদিন পরে বিদেশ চলে যাবে ট্রেনিং করতে। তাকে সব কিছু ঠিক ঠাক করতে হলে আমাকে অনেকগুলি এক্সট্রা ব্যবস্থা করা দরকার।

এম্নিতেই আমি থাকি খোলাহাটি, ঢাকা থেকে অনেক দূর। এর মধ্যে আমার স্ত্রী মিটুলের আবার বৈদেশিক একটা ট্রেনিং এর নাম এসছে মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ায় সে ট্রেনিং এ যাবে কিনা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো। আমি এক কথায় বলে দিয়েছি যে, তাঁর মালয়েসিয়ায় ট্রেনিং এ যাওয়া উচিত। মিটুলের সেই ১৯৮৮ সাল থেকে যা যা ক্যারিয়ারে দরকার সাহাজ্য করা তাতে আমার কখনোও কোনো কার্পন্য ছিলো না। আর এর প্রধান কারন হলো, মিটুলকে সাবলম্বি করে তোলা। আমি জানি, আমার আসলে সাহাজ্য করার মতো আশেপাশে কোনো হোমরা চোমড়া নাই। না আছে আমার বাবার দিক থেকে কোনো সাহাজ্য, না আছে আমার শ্বশুর বাড়ির দিক থেকে কোনো সাহাজ্য। ফলে যদি আমাকে কেউ সরাসরি সাহাজ্য করার কেউ থাকে সেতা হচ্ছে আমার স্ত্রী মিটুল। আর সেইই যদি ওই অবস্থায় না থাকে বা নিজের পায়ে দাড়াতে না পারে, তাহলে আমাকে বা আমার পরিবারকে অথবা আমার অনুপস্থিতিতেই বা মিটুল কিভাবে সাহাজ্য করবে? এই চিন্তা ধারা থেকেই আসলে আমি সব সময় চেয়েছি মিটুল গড়ে উঠুক।

মিটুলের মালয়েশিয়ার কোর্স টা শুরু হবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে। প্রায় ছয় মাসের মতো একটা কোর্স। সমস্যা দাঁড়াবে যে, আমিও ঢাকায় আমার বাচ্চাদের কাছে নাই আবার এবার মিটুল ও থাকবে না। উম্মিকার বয়স মাত্র আট বছর আর কনিকার বয়স মাত্র তিন। এই দুইজনের জন্য দেখভাল করার কোনো লোক ও নাই। বাজার করার লোক, রান্না বান্নার লোক, যদি মেয়েরা অসুস্থ হয়, তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়ারও কোনো লোক নাই। তারপরেও আমি মিটুলকে মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্তে আওটল থাকলাম। সব কিছু নির্ভর করে আল্লাহর উপর। বাড়িওয়ালা মেজর (অবঃ) ফেরদৌস স্যার ভালো মানুষ। অন্তত দরকারী প্রয়োজনে তাঁর ডাইরেক্ট সাহাজ্য পাওয়া যাবে এটা একটা ভরষার স্থান ছিলো।

নসিরন নামে আমার বাসায় যে কাজের মেয়েটি আছে, সে অত্যান্ত ভালো একজন মেয়ে। তাঁর কোনো আত্তীয় স্বজন নাই, আমরাই তাঁর বাবা, আমরাই তাঁর মা, আমরাই তাঁর সব। আর নসিরন নিজেও এটা জানে আর এতাও জানে আমাদের বাসা ছাড়া ওর আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। সে আমার মেয়েদের কাছেও অনেক প্রিয় একজন নসি আপু। সমস্ত কাজ কর্ম নসি করতে পারে। কিন্তু কথা বলে খুবই কম। সে নিজে অসত নয় এবং তাঁর চাহিদাও অনেক বেশী নয়। আমি যেভাবে মিটুলের অনুপস্থিতিতে ব্যাপারটা সামলাবো বলে ভাবছি সেতা হলো যে, আমি প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় এসে নিত্য নৈমিত্তিক শুকনা বাজার গুলি করে দিয়ে যাবো। আর ডেইলী বাজার যদি লাগে, পাশেই দোকান পাট আছে, তাদের কে বলে দিলে ওরাই বাসায় পৌঁছে দেবে। দোকানদারদের সাথে আমার সম্পর্কটা আমি এমনভাবে তৈরী করেছিলাম যাতে আমার বাসা থেকে একটা চিরকুট দিলেও দোকানদারগন মালামাল বাসায় কাউকে দিয়ে পৌঁছে দেন। যদি বাকীতেও হয়, তাতেও যেনো সবাই মালামাল দিয়ে দেন এবং আমি ঢাকায় এসে সমস্ত টাকা পয়সা দিয়ে দেবো।

মিটুলের খুব মন খারাপ। কারন সে অনেকদিন থাকবে না, একটা মানসিক টেনসনে আছে বাচ্চাদের জন্য। এই টেনসনটা হয়তো থাকতো না যদি আমাদের বাসায় এমন কেউ থাকতো মুরুব্বি টাইপের যারা অন্তত বাচ্চাদেরকে আগলে রাখতে পারবে। আমার মন খারাপ নয়, আমি অনেক টেনসনেও নাই কারন আমি এভাবেই জীবনে বড় হয়েছি। যাদের জীবনে অনিশ্চয়তা সব সময়ই থাকে, তারা অনিশ্চয়তাকে জীবনের স্বাভাবিক দোসর হিসাবেই ধরে নিয়ে জীবন চালাতে থাকে। আমিও ঠিক সে রকমের একজন মানুষ।

১৫/১১/২০০৩-খোলাহাটি সেনানীবাসে এটাই আমার প্রথম আসা নয়,

খোলাহাটি সেনানীবাসে এটাই আমার প্রথম আসা নয়, এর আগেও একবার এসেছিলাম ২০০১ সালে যখন আমি আর্মি হেডকোয়ার্টারে কর্মরত ছিলাম। তখন এসেছিলাম আমি ক্যাপ্টেন টু মেজর পরীক্ষার একটা গোপন প্রশ্নপত্র নিয়ে। আর এখন এলাম একেবারে পোষ্টিং নিয়ে। অনেক পরিবর্তন হয়েছে এলাকাটার। আগে তেমন গাছপালা ছিলো না, ফ্যামিলী কোয়ার্টারগুলি তখনো নির্মানাধীন ছিলো, এখন সেই গাছগুলি অনেক বড় হয়ে গেছে, বিল্ডিংগুলি যে নতুন সেটাও বুঝা যাচ্ছে আবার অনেক বিল্ডিং রঙ করা দরকার সেটাও বুঝা যাচ্ছে। আমি পরিবার নিয়ে আসি নাই, ফলে অফিসার মেসেই আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আজ পর্যন্ত যেখানেই পোষ্টিং হয়েছে, আমি আমার পরিবার নিয়ে কখনো থাকি নাই, শুধুমাত্র যখন বগুড়ায় লোকেটিং ইউনিটে চাকুরী করেছিলাম ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত, তখন কয়েক মাসের জন্য আমি আর আমার স্ত্রীকে নিয়ে জাহাংগিরাবাদ সেনানীবাসে কোয়ার্টার নিয়ে থেকেছি। তখন কোনো বাচ্চা কাচ্চা হয় নাই, আমি আর মিটুলই ছিলাম। এবার আমি আমার দুই মেয়ে আর মিটুলকে ঢাকায় রেখেই আমি নিজে ব্যাচলর লাইফ লিড করার জন্য এই খোলাহাটিতে এলাম। মন ভালো নাই, প্রোমশনটা হয় নাই, কোনো কিছুতেই আর আগের মতো সিরিয়াসলি কাজ করতে মন চায় না। অনেক আগে থেকেই এই চাকুরীটা করবো না করবো না করছিলাম, কিন্তু সেটা অনেক কারনেই বাস্তবায়ন হয় নাই, কিন্তু এবার মনে হচ্ছে হয়তো আর থাকা যাবে না। এর আগে চাকুরী থেকে বের হতে পারি নাই অনেকগুলি কারনে যে, আবার নতুন একটা চাকুরী খুজতে হবে, নিজের বাসা নাই স্থায়ীভাবে, কোথায় থাকবো, কোথায় কি ধরনের আবার চাকুরী পাই সব মিলিয়ে আর্মির চাকুরীটাই ভালো মনে হয়েছে বিধায় আর যাওয়া হয় নাই। কিন্তু এবার প্রোমোশন না হওয়াতে আমার জুনিয়াররা যদি আমার সিনিয়র হয়ে আমার থেকেও কম কোয়ালিফাইড হয়ে আমাকে কন্ট্রোল করতে চায়, এটা আমি মানতে পারবো না। শেষ পর্যন্ত অবস্থা যেমনই হোক, আমাকে বেরিয়ে যেতেই হবে।

খোলাহাটি সেনানীবাস রংপুর সেনানীবাসের অধীনের একটা ব্রিগেড। কিন্তু রংপুর থেকে খোলাহাটি অনেক দূর বিধায় সেনানীবাসের সাভাবিক কার্যক্রমের মধ্যে কিংবা রুটিন অনেক দেখভালের মধ্যে এটা পড়ে না। এটা একটা লোকাল গ্যারিসন হিসাবে অনেকটাই আরামদায়ক। তাং কম।

সিও ফেরদৌস স্যারের সাথে যেহেতু ক্যাডেট কলেজে অনেক লম্বা সময় ধরে পরাশুনা করেছিলাম, ফলে, আমার সাথে তাঁর সখ্যতা অনেক ফ্রেন্ডলী। তিনিও আমার প্রোমোশন না হওয়াতে খুব আপসেট। আমরা একই সাথে স্টাফ কলেজ করেছি। খুব বেশী দরকার না হলে ফেরদৌস স্যার আমাকে অনেক চাপ দেন না কিংবা আমাকে অযথা হয়রানী করেন না। জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে যারা আছে তারাও খুব ভালো। লেঃ মাহফুজ বর্তমানে এডজুটেন্টের কাজ করছে, লেঃ রাকিব করছে কোয়ার্টার মাষ্টারের কাজ। অনেক পরিশ্রমী ছেলেগুলি। আমি চেষ্টা করি যাতে ওরা আরো ভালো কিছু করতে পারে। ওরাও বুঝে যে, আমার লেঃ কর্নেল হবার কথা থাকলেও যে কোনো কারনেই আমার প্রোমোশন না হওয়াতে ওরাও কিছুটা মনক্ষুন্ন কারন এতো যোগ্যতা রেখেও যখন প্রোমোশন হয় না, এতে ওদের মধ্যেও ক্যারিয়ার গড়ার যে একটা অনুপ্রেরনা থাকার কথা তাতে মনে হচ্ছে ঢিলেমী এসছে।

নতুন মহিলা অফিসার নিয়োগ হয়েছে। আমাদের এই খোলাহাটিতে দুইজন মহিলা অফিসারের পোষ্টিং হয়েছে। আমার ইউনিটে এসছে ২লেঃ তাহমিনা আর পাশের ৮ ফিল্ডে এসছে ২লেঃ নাজনিন। দুজনেই খুব ভালো মেয়ে। তাহমিনার বাবা একজন অবসর প্রাপ্ত জেসিও। হয়তো একটা সময় আসবে যে, ওরা ইউনিট কমান্ড করবে, ব্রিগেড কমান্ড করবে। আমি যখন আর্মি হেড কোয়ার্টারে এমটি ডাইরেক্টরে ছিলাম, তখন মহিলা অফিসার নেয়া হবে কিনা এটার তোড়জোড় শুরু হয়। আমি মহিলা অফিসার নেওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্তক পজিটিভ ভুমিকা রেখেছিলাম। আজ সেই ভুমিকার অংশ নিজের চোখে দেখে গেলাম। মহিলা অফিসারের কমিসন হয়েছে।

আমি প্রায়ই ঢাকায় যাই পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য। ঢাকা থেকে একটি মাত্র বাস খোলাহাটিতে আসে আর তাঁর নাম হচ্ছে, “হক বাস সার্ভিস”। অন্যান্য বাসগুলি রংপুর পর্যন্ত এসেই থেমে যায় কিন্তু “হক” বাসটি খোলাহাটি পর্যন্ত আসে। খুব ভাল সার্ভিস না কিন্তু অন্তত এটা খোলাহাটি পর্যন্ত আসে বিধায় আমি সবসময় “হক” বাসের মাধ্যমেই ঢাকা থেকে আসি এবং যাই। এসি নাই।

আসলে আমি প্রতিদিন নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করছি।  কয়েকদিন আগে নতুন অফিসার হিসাবে আসা অফিসারদের জিওসির একটা সাক্ষাতকার ছিলো। আমারো উনি সাক্ষাতকার নিলেন। মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার। বাংলাদেশ আর্মির একজন ডেসিং এবং স্মার্ট অফিসার। উনার সাথে যখন আমার সাক্ষাত হয় বা ইন্টারভিউ হয়, আমি বেশ কিছু উত্তর জানার চেষ্টা করেছিলাম। সেটা আমি ছোট করে লিখছিঃ

জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় আমার সাথে অত্যান্ত চমৎকার ব্যবহার করলেন। উনি নিজেও আমার সব কোয়ালিফিকেশনগুলি দেখে একটা মন্তব্য করলেন যে, আমি আসলেই দুঃখিত যে, তোমার প্রোমোশনটা হয় নাই। আমি স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে, উনি তো আমাদের প্রোমোশন বোর্ডে ছিলেন, কোথায় আমার কি সমস্যা ছিলো যার কারনে আমার প্রোমোশনটা হয় নাই। সে ব্যাপারে কি আমি কিছু জানতে পারি? উনি তাঁর একটা ছোট নোটবই (নোট খাতা) বের করে কিছুক্ষন কি যেনো দেখলেন, পড়লেন, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে একটা কথাই শুধু বললেন যে, শোন মেজর আখতার, সবসময় যোগ্যতাই প্রোমোশনের জন্য ক্রাইটেরিয়া নয়। যখন কোনো সিনিয়র অফিসার মনে করে যে, সে তাঁর অধস্তন কর্মকর্তার থেকে কম কোয়ালিফাইড, তখন ওই জুনিয়ার অফিসারকে নিয়ে কাজ করতেও অনেকেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করে গানার জেনারেলদেরকে জিজ্ঞেস করো কেনো তারা তোমাকে ভয় পায়। জিজ্ঞেস করলাম, কে আমার নামে ভেটো ভোট প্রদান করেছে স্যার সেটা কি আমি জানতে পারি? উনি সরাসরি আমাকে বললেন না কিন্তু বুঝলাম, আরেক মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (আর্টিলারী) আর মেজর জেনারেল শাহাবউদ্দিন হয়তো এই ব্যাপারে কোন মন্তব্য রেখেছেন। বড্ড খারাপ লাগল শুনে।

আমি জিওসিকে বললাম, স্যার, আমি সম্ভবত এপেন্ডিক্স যে লঞ্চ করতে পারি ভলান্টিয়ারভাবে আর্মি থেকে সুবিধা নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার জন্য। জিওসি বললেন, দেখো গানার, সময় সব সময় তোমার অনুকুলে হয়তো থাকবে না। একটু ওয়েট করো, হয়তো পরেরবার তোমার প্রোমোশন হবেই।

আমি বললাম, স্যার, যে আমি গত ১৮ বছরে কোয়ালিফাই করতে পারলাম না, কি এমন আমি করে ফেলবো যে, আগামি এক দুই বছরের মধ্যে আমার প্রোমোশন হয়ে যাবে?  তারপরেও উনি আমাকে অনেক এডভাইস করলেন। আমি জিওসিকে বললাম, স্যার, আমার কোনো কাজ করতে ভালো লাগে না আর। সকাল থেকে শুরু করে যে আমি এতো পরিশ্রম করতাম, এখন কেনো জানি মনে হয়, এসবের কোনো দরকার ছিলো না। এখানে পরিশ্রমের আর যোগ্যতার মুল্য আসলেই নাই। যখন ডিভিশনে বড় বড় কাজের জন্য দায়িত্ত দেয়ার ব্যাপারে অফিসার খুজে বেড়ায়, তখন খুজে খুজে আমাকেই বের করা হয়, যখন স্টাডি পিরিয়ড করার জন্য দিনে রাতে আমাকে স্ক্রিপ্ট তৈরী করে আর্মি হেডকোয়ার্টারে প্রেজেন্ট করতে হয়, তখন সবাই বাহবাই দেয় কিন্তু যখন প্রোমোশনের টেবিলে বসে, তখন আমাদের এই পরিশ্রমের কথা তারা ভুলেই যায়। তাহলে আর পরিশ্রম করার দরকার কি? জিওসি রেজ্জাকুল হায়দার আমাকে বুঝলেন। বললেন, আমার ডিভিসনে তোমার কোনো অবমুল্যায়ন হবে না। তুমি তোমার মতো করে চলো।

জিওসি অনেকবার কাউকে না জানিয়ে খোলাহাটিতে পিটি প্যারেডের সময় চলে আসতেন। আমি প্রায়ই এই পিটি প্যারেড মিস করতাম, কিন্তু জিওসি কখনো আমাকে কেনো মিস করছি, কেনো সময় মতো পিটিতে যাচ্ছি না, এ ব্যাপারে কোনোদিন প্রশ্ন করেন নাই। একসাথে মেসে নাস্তাও করেছি যখন ইউনিটে পিটি প্যারেড হচ্ছিলো। কথা হতো এই জেনারেলের সাথে। ভালো লাগতো।

এভাবে সময় যেতে থাকে, মন ভালো আর খারাপের মধ্যে আমি অনেক সময় পার্থক্য বুঝি না।

১৫/১০/২০০৩-১ম বার সুপারসিডেড, খোলাহাটি পোষ্টিং

জর্জিয়ার মিশন শেষ করে ঢাকায় ফিরে এসেছি। ঢাকায় ফিরে এসেই শুনলাম আমাদের প্রোমশন কনফারেন্স হচ্ছে। মেজর থেকে লেঃ কর্নেল। আমি এখনো ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসায় আছি। যখনই কেঊ বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসে, তখন অনেকগুলি ফর্মালিটিজ করতে হয়। মেডিক্যাল চেক আপ, ক্লিয়ারেন্স, যদি মিশনে যাওয়ার সময় কোনো কিছু ইস্যু করে থাকি সেতা জমা দেয়া, আবার যদি কোনো পোষ্টিং হয় তাহলে তো আরো অনেক ফর্মালিটিজ। আমরা লগ এরিয়ার আন্ডারে আপাতত সুপার নিউমিরাল স্ট্যাটাসে আছি। প্রোমোশন কনফারেন্সে আমাদের প্রোমশন হবার কথা। অনেক রিউমার শুনছি, কেউ বলছে আমাদের অনেকের প্রোমশন হয়েছে আবার কেউ বলছে এখনো ফাইনাল নয়। টেনসনে তো অবশ্যই আছি কিন্তু আমার প্রোমশন না হবার কোনো কারন আমি দেখিনা। স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, ভালো ভালো জায়গায় পোস্টিং ছিলো, পদাতিক ডিভিসনের জিএসও-(অপারেশন-২) ছিলাম, আর্মি হেডকোয়ার্টারেও জিএসও-২ (ট্রেনিং) ছিলাম। মিশন করলাম দুইবার, কোথাও কোনো কিছুর ঘাটতি নাই। প্রোমোশন বোর্ডে আমাকে চিনে এ রকম অন্তত বেশীরভাগ জেনারেলরা আছেন। যেমন, জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া (আমি যখন জিএসও-২ অপারেশন পদাতিক ডিভিসনে কর্মরত ছিলাম, তখন তিনি ছিলেন কর্নেল স্টাফ), জেনারেল মুবিন (আমি যখন এমটি ডাইরেক্টরে ছিলাম, তখন তিনি ছিলেন ডিএমটি), জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (আমার ইউনিটের টুআইসি এবং সিও উভয়ই ছিলেন), জেনারেল সাহাব (আমরা বগুরায় একসাথে পাশাপাশি ইউনিটে কাজ করেছিলাম, তখন উনি ছিলেন ১ ফিল্ডের সিও আর আমি ছিলাম লোকেটিং ইউনিটের টুআইসি, একসাথে হাট হাজারীতে ফায়ারিং করেছি, প্রতিদিন প্রায় দেখা হতো), জেনারেল মইন ইউ আহমেদ (স্টাফ কলেজে উনি ছিলেন আমার ডিএস), সিজিএস জেনারেল ইকরাম (আমি যখন আর্মি হেডকোয়ার্টারে কাজ করেছি, তখন উনি আমার সিজিএস ছিলেন, বহুবার তাঁর সাথে আমার ইনটারেকসন হয়েছে), আছেন জেনারেল মুনিরুজ্জামান (আমার ৪ মর্টারের টুআইসি এবং সিও), মেজর জেনারেল রফিক (সিগ ন্যাল) এর সাথে আমি কাজ করেছি দুবার। একবার আমি স্টাফ কলেজ করার সময় তিনি ছিলেন আমার ডাইরেক্ট ডি এস আবার উনি যখন ৪ সিগ ন্যালের সিও ছিলেন বগুড়ায়, তখন আমি জি এস ও-২ (অপারেশন), এই রকম আরো অনেকগুলি জেনারেলের সাথে আমার ডাইরেক্ট কর্মজীবন পার হয়েছে। ফলে আমাকে বোর্ডে চিনবেন না এমন কেউ নাই। আর যারা চিনবেন না, তারাও আমার প্রোফাইল দেখলে অন্তত ভাববেন যে, আমার কোয়ালিটির কোনো কমতি নাই। ফলে আমি প্রোমোসন পাবো না, এটা আমার মাথায় আনতে চাই না।

কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই নাকি রাত হয়। বিএনপির রাজনৈতিক আমল। আমাদের ১৩ লং কোর্সের অনেক প্রবাব্যাল অফিসারকে টাচ করলো না। প্রোমশন কনফারেন্সের পর প্রায় ২ দিন হয়ে গেল, কিংক্রিত কোনো তথ্য পেলাম না। অবশেষে খবর পেলাম যে, আমাদের প্রোমশন হয় নাই। প্রায় শতভাগ ১৩ লং কোর্সের কারোরই প্রোমশন হয় নাই। এর প্রধান কারন, আমাদের একজন কোর্সমেট আছে মেজর ওয়াকার। সে আগের সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজের মেয়ের জামাই এবং আওয়ামীলিগের ঘরনার। সবার মন খারাপ। কেনো এই পলিটিক্স? যখন ফাইনাল প্রোমোশন তালিকা বের হলো, দেখলাম, আমাদের আর্টিলারীর কেউ প্রোমশন পায় নাই বটে কিন্তু আমাদের জিনিয়র ১৪ লং কোর্সের অন্য আর্মস এর অফিসারদের প্রোমোশন হয়েছে। এর মানে হলো, আমরা এবার সুপারসিডেড হয়ে গেলাম। আমার পোষ্টিং হয়ে গেলো খোলাহাটি, সইদপুর সেনানিবাসে ৪ ফিল্ডের টুআইসি হিসাবে। ওখানে আমার সিও হবেন আমাদেরই ক্যাডেট কলেজের আমার এক বছরের সিনিয়র ভাই লেঃ কর্নেল ফেরদৌস, ১০ম লং কোর্সের।  ভালো মানুষ। কিন্তু আমার মেজাজ ভাল নাই। ঢাকার বাসা ছাড়তে হবে। আমি আবার আমার পরিবারকে খোলাহাটিতে নিতে ইচ্ছুক না কারন মিটুলের কর্মস্থল ঘিওর ঢাকার এনসিটিবি (ন্যাশনাল কারিকুলাম টেক্সট বুক বোর্ড) তে।

এমতাবস্থায় নিরাপত্তার খাতিরেই আমাকে আমার পরবারকে এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে মিটুল বাচ্চাদের নিয়ে একা থাকতে পারে। তাই, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসা ছেড়ে দিয়ে কচুক্ষেতে একটা বাসা ভাড়া করলাম, বাড়িওয়ালা অবসর প্রাপ্ত ফেরদৌস স্যার। আমাকে চলে যেতে হবে খোলাহাটিতে। 

০৮/১০/২০০৩- জর্জিয়া ত্যাগ

সেই পহেলা অক্টোবর ২০০২ তারিখে আমি জর্জিয়ার জাতীসংঘ মিশনে এসেছিলাম। আজ সেই জর্জিয়া থেকে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছি। আর কখনো এই দেশে ফিরে আসা হয় কিনা জানি না। যেদিন প্রথম এদেশে ল্যান্ড করেছিলাম, সেদিন দেশটাকে যতোটা না আপন মনে হয়েছিলো, আজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছে, কিছুটা মায়া ধরেছে, অনেক লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে, অনেক পরিবারের সাথে অনেক সখ্যতা হয়েছে, তাদের কারো কারো মুখখানা একেবারে চোখের সামনে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলজ্বল করছে। এদের সাথে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না।

সোরেনা গামছাখুরদিয়ার পরিবারটা ছিলো আমার সবচেয়ে কাছের একটি পরিবার। ওর সাথে দেখা হলো না। দেদুনা বুকিয়া, রুসুদিন, কিংবা ওদের আরো অন্যান্য সদস্যরাও যেমন সালোমী, তামারা সবাই জানে আজ আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু দেখা করবার মতো কোনো উপায় নাই। ওরা কেউ কেউ থাকে সেই সুদূর টিবলিসিতে, কেউ আবার জুগদিদিতে, আবার কেউ গালীতে। যুদ্ধ বিপর্যস্ত এলাকায় আসলে কোনো কিছুই সঠিক নিয়মে চলে না।

এদেশের মানুষগুলি খুব ভালো ছিলো। ছোট ছোট বাচ্চারা বেশ মিশুক, মেয়েগুলি ওয়েষ্টার্নদের মতো ড্রেস পড়লেও উচ্ছৃঙ্খল নয়। তারা আমাদের দেশের মেয়েদের থেকেও অনেক রুচিশীল এবং পরিবারকেন্দ্রিক। এরা একটি মাত্র বিয়েতেই সুখী। পরিবার নিয়ে সুখে বসবাস করার জন্য যেভাবে স্বামীকে মেনে চলতে হয়, যেভাবে বাচ্চাদের নিয়ে চলতে হয়, ঠিক সেটাই করে। মেয়েরাই বেশীরভাগ সময় সংসারের হাল ধরে রাখে, আর পুরুষগুলি মদের নেশায় পড়ে থাকে।

একটা সময় ছিলো, রাশিয়ার আমলে এরা খুবই সাবলীল এবং বিলাসবহুল লাইফ লিড করেছে। কিন্তু পোষ্ট কোল্ড ওয়ার এর পরে রাশিয়ার অর্থনইতিক বিপর্যয়ের সাথে সাথে ওরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো হয়ে গেছে কিন্তু আচার ব্যবহার রয়ে গেছে সেই আগের বিলাসবহুল পর্যায়ের। জুগদিদিতে থাকার সময় আমার ল্যান্ড লেডি ছিলো জুলি। তার দুইটা ছেলে আছে, নাম গোগা আর লেবানী। জুলির স্বামী আলেক একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু একটু ট্রিকি। একসময় প্রুচুর পয়সাকড়ি ছিলো। এখন হাতে কোনো পয়সাকড়ি আসে না। আমরা যে ভাড়াটা দেই, তাতেই ওদের সংসার চলে। গালী সেক্টরে থাকার সময় ল্যান্ড লেডি ছিলো মানানা। আর তার স্বামী ছিলো জামাল। ওদের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জরিয়ে আছে। জুলির বয়স প্রায় পঞ্চাশ। মায়ের মতো। একদম ইংরেজী পারে না কিন্তু যেভাবে ইংরেজী বলে তাতে ওর কথা বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না।

এইতো গত ৪ অক্টোবর ২০০৩ তারিখে আমি আবারো জুলির বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। এক রাত থাকলাম। জুলি জানে আমি এক সপ্তাহ পরেই দেশে ফিরে আসবো। রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। খুব সকালে ঘুম ভাঙ্গলো একটা চমৎকার ছোয়ায়। আমি চোখ খুলতেই দেখলাম, জুলি আমার কপালে ঘুমন্ত অবস্থায় চুমু খেলো। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। চোখ মেলতেই দেখলাম, জুলি আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখ তার ছলছলে। আমি তার দিকে তাকাতেই সে ফিরে যাচ্ছিলো। আমি বললাম, মামা, এদিকে আসো। মামা মানে মা, জুলি আমাকে জড়িয়ে ধরে একেবারে কান্নায় ভেংগে পড়লো। বল্লো, নো সি, নাহ? কাম এগেইন সন। অর্থাৎ তোমার সাথে আর কখনো কি দেখা হবে না? আবার এসো আমার ছেলে। কিছুই বলা গেলো না। সকালটাই একটা কষ্টের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো। ওরা খুব ভালো মানুষ। আমি আমার অনেক মালামাল কিছুই আনলাম না। একটা টেপ রেকর্ডার কিনেছিলাম, দিয়ে এলাম, অনেকগুলি গিফট কিনেছিলাম দেশে আনবো বলে। সব কিছু দিয়ে দিলাম। ওরা এক সময় অনেক ধনী ছিলো, ওদের এসবের কোনো প্রয়োজন ছিলো না রাখার, কিন্তু আমিই জোর করে দিলাম। খুব খুসি হলো। জুলি তার আলমারী থেকে ৬ টা গ্লাস সেট বের করে অতি যত্নের সাথে একটা পুরানো পেপারে প্যাক করে আমাকে দিয়ে বল্লো, “ওয়াইফ, গিভ, আই গিভ ওয়াইফ, লাভলু” অর্থাৎ এর মানে হলো, এটা তুমি তোমার বউকে দিবা। বল্বা আমি দিয়েছি। আর বল্বা, আমি তাকে ভালবাসি। কি অদ্ভুদ ফিলিংস। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য অনেক ভাষা জানার দরকার নাই। মানুষের ভালবাসা কথা বলে চোখ, কথা বলে মুখ, কথা বলে অন্তর। আর তার বহির্প্রকাশ সারাটা শড়ির তার নিজের ভাষায় প্রকাশ করে।  

আজ এই চলে যাওয়ার দিনে মনটা ভীষন খারাপ হচ্ছে। সকাল থেকেই সমস্ত জিনিষ্পত্র গুছিয়ে রেখেছিলাম। আমি গালীতে আছি, আমাকে যেতে হবে প্রথমে জুগদিদি সেক্টরে। ওখানে জাতীসংঘের প্রশাসনিক দপ্তর থেকে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নিয়ে, মালামাল ট্রান্সপোর্ট সেকসনে হস্তান্তর করে শুধুমাত্র আমার একটা হ্যান্ডব্যাগ সাথে নিয়ে সুখুমী থেকে আমাদের নিজস্ব প্লেনে তুরষ্কের এয়ারপোর্টে আসতে হবে।

গালীতে আমি যে রুমটায় থাকতাম, তার ঠিক পাশের রুমেই থাকতো মানানার স্বামী জামাল। অত্যান্ত ভালো একজন মানুষ। মানানাও খুব ভালো একজন মহিলা। সারাক্ষন কাজ করে। আমাদের জন্য রান্না করে, বাজার করে, কাপড় চোপড় ধুয়ে আবার ইস্ত্রী করে রাখে। জামাল কোনো কাজ করে না। ওদের একটা ছেলে আছে। আমি কখনো দেখি নাই। সে থাকে বাকুতে, তার স্ত্রীসহ। মাকে ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু কখনো আসে না। না আসার কারন একটাই, ওর পাস্পোর্ট নাই।

(চলবে)  

০২/০৮/২০০৩- জর্জিয়ার টিবলিসিতে ভ্রমন

গতকাল ২০ দিনের ছুটিতে টিবলিসিতে এসেছি। টিবলিসি শব্দের অর্থ গরম জল। কেনো এই নাম দেয়া সেটা জানা গেলো সোরেনার কাছ থেকে। এখানে প্রচুর সালফিউরিক স্প্রিং আছে। আর এই সালফিউরিক স্প্রিং গুলির কারনে সারা বছরই এলাকাটা গরম থাকে। এই সালফিউরিক স্প্রিং এর কারনেই আসলে টিবলিসির নামকরন। যাই হোক, আমি এখানে কোনো হোটেলে উঠি নাই। যদিও প্রচুর হোটেল আছে।

সোরেনা আমাদের সেক্টরের একজন দোভাষী। ওর সাথে আমার অন্যান্য দোভাষীদের থেকে একটু আলাদা সম্পর্ক। খুবই ভালো একটা মেয়ে। আমি যখন সোরেনাকে বললাম, যে, আমি টিবলিসিতে বেড়াতে যাবো, তখন সোরেনাই আমাকে প্রপোজাল দিলো যে, তার এক খালার বাসা আছে টিবলিসিতে। যদি আমি কিছু মনে না করি, তাহলে আমি ওদের খালার বাসায় থাকতে পারি। রাশিয়ান মানুষেরা খুবই অতিথি পরায়ন। আমি রাজী হলাম। কিন্তু সোরেনা আমার সাথে যেতে পারবে না, ওর ছুটি নাই। ফলে আমাকেই একা যেতে হবে ওর খালার বাসায়। অনেকদিন পর্যন্ত জর্জিয়ায় আছি, ফলে আমি মানুষগুলির স্বভাব, আচরন, ব্যবহার ইত্যাদি সম্পর্কে বেশ জানা আমার। আমার যে কোনো অসুবিধা হবে না, এ ব্যাপারে আমি মূটামুটি নিশ্চিত ছিলাম।

ফলে, টিবলিসি যেতে প্রথমে আমাকে আমার কর্ম ক্ষেত্র গালী সেক্টর থেকে জুগদিদি সেক্টরে আসতে হয়েছে। জুগদিদিতে আমাদের ইউ এন এর জন্য নির্ধারিত এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের নিজস্ব ফ্লাইট দিয়ে সরাসরি টিবলিসিতে এসেছি। আমাদের নিজস্ব প্লেনে আসা যাওয়ায় কনো ভাড়া লাগে না। প্রায় আড়াই ঘন্টা ফ্লাইট। ছোট আন্তোনোভ প্লেন। মাত্র ৪ জন পেসেঞ্জার আমরা। নেমে গেলাম টিবলিসি এয়ারপোর্টে।

সোরেনা আগে থেকেই আমাকে একটা গাইড লাইন দিয়ে রেখেছিলো, কিভাবে টিবলিসি এয়ারপোর্টে নেমে কোনো কোন ইমিগ্রেশন পয়েন্ট দিয়ে বেরিয়ে কোথায় যেতে হবে। এটাও গাইড লাইনে ছিলো যে, এয়ারপোর্টের বাইরে একজন মেয়ে থাকবে আমার জন্য, যাদের বাসায় আমি উঠবো। মেয়েটির নাম দেদুনা বুকিয়া।

আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আমার জন্য অপেক্ষারত মেয়েটির সন্ধান করছিলাম। একটা প্লেকার্ড থাকলে ভালো হতো। কিন্তু সম্ভবত প্লেকার্ডের ধারনাটা ওর নাই। আর আমি মেয়েটাকে চিনিও না। জর্জিয়ার সব মেয়েরাই সুন্দর আর সবাই দেখতে প্রায় একই রকমের। ভাবলাম, আমি তো আর জর্জিয়ানদের মতো নই। ফলে হয়তো মেয়েটা আমাকে দেখলে বুঝতে পারবে।

ঠিক এই সময় ২২/২৩ বয়সের একটি চমৎকার নীল নয়না যুবতী মেয়ে সেন্ডু একটা গেঞ্জি পড়ে আমার সামনে এসে বল্লো, তুমি কি মেজর আখতার?

বুঝলাম, এটাই সেই মেয়ে যার জন্য আমি অপেক্ষা করছি।

আমি হেসে দিয়ে বললাম, হ্যা, আমিই মেজর আখতার। তোমার নাম কি?

সে উত্তরে বলল, তার নাম দেদুনা বুকিয়া। সোরেনার খালাতো বোন।

মেয়েটি অসম্ভব সুন্দুরী, কোকড়ানো চুল, আর তার চোখ সত্যি সত্যিই একদম নীল রঙ এর।

বললাম, চলো।

দেদুনা একতা ট্যাক্সি ভারা করলো, কি যেনো বল্লো, তারপর আমি আর দেদুনা একসাথে ওদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। দেদুনা বল্লো, ওখান থেকে প্রায় ৪০/৪৫ মিনিটের পথ। একটা পাহাড়ি বা মাল্ভুমিতে ওদের বাসা। ওটা একটা সরকারী কন্ডোমুনিয়াম, থাকতে খারাপ লাগবে না।

কথা হচ্ছিলো দেদুনার সাথে। সুন্দর ইংরেজী বলে। সে আসলে একজন সাংবাদিক। অবিবাহিত।

বললাম, দেদুনা, তোমার চোখের দিকে তাকালেই তো ট্যাক্সী ভারা মাফ হয়ে যাবার কথা। কারন লন্ডনে যাদের চোখের রঙ নীল, তাদের জন্য সবকিছু মাফ। কারন তারা মনে করে, ওরা রয়েল ফ্যামিলির সদস্য। এভাবেই ওর সাথে বেশ অনেকক্ষণ কথা বিনিময়ের পর, একটা মালভুমির মতো এলাকায় গাড়ি ঢোকে গেলো।

জর্জিয়ার সব গুলি বাড়ি প্রায় একই রকম। রাশিয়ার ধাচেই করা। জায়গাতা আমার ভালো লাগলো। এতা একতা সরকারী কোয়ার্তার। দেদুনার মা একটা সরকারী স্বাস্থ্য বিভাগের কনো একটা ডিপার্ট্মেন্টে রেডিওলোজিষ্টের কাজ করেন। অত্যান্ত অমায়িক মহিলা।

বাসায় ঢোকেই দেখলাম, আমার জন্য একতা আলাদা রুম দেয়া হয়েছে। আমার রুমের পাশেই বড় হাইওয়ে রাস্তা দেখা যায়। আমার রুম থেকে বের হলেই দেদুনাদের ড্রইং রুম, সেখানে ২০ ইঞ্চির একতা টিভি আছে, সোফাসেট আছে। সরকারী কোয়ার্তার সব সময়ই বড় সাইজের হয়। আমার পাশেই একটা কমন টয়লেট, তারপাশে থাকে দেদুনা আর ওর আরো দুইবোন, তামারা আর সালোমি। তামারা বড় আর সালোমী ছোট। আমি তো প্রথমে সালোমীকে দেখে বুঝতেই পারি নাই যে, ও ছেলে না মেয়ে। কারন ছোট ছোত চুল, গড়ন দেখে মেয়েলী বুঝা যায় না। সবাই খুব মিশুক। সোরেনা আগে থেকেই সম্ভবত ওদের বলে রেখেছিলো আমার খাবারের অভ্যাস গুলি কি। তাই আমি যখন বাসায় পৌঁছলাম, তখন প্রায় দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছিলো। ওরা বেগুন আর ভাত পাক করেছিলো। বাংলাদেশের মতো তো আর খাবার হবে না, কিন্তু খেতে পারলাম।

রাশিয়া বা জর্জিয়ার একটা কথা আগেই বলেছিলাম যে, এরা যে কোনো অতিথিকে “চা চা” নামের এক প্রকার এল্কোহল দিয়ে আপ্যায়ন করে। আমরা যেমন কেউ এলেই চা দেই বা কফি দেই, ওরা দেয় “চা চা” প্রায় ৭৫% এল্কোহল। নিজেরাই বানায়।

আমি ওদের সাথে প্রায় কয়েকদিন থাকার যেহেতু প্ল্যান করেছি, ফলে আমিও চাইছিলাম যে, আমি ওদের মতো করে একেবারে মিশে যাবো। দেদুনাকে বললাম, দেদুনা, একটা সিডিউল করো, আমরা প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাবো, ঘরে থাকবো শুধু রাতের বেলায়। ওরা অনেক ভ্রমন পিয়াসু, খুব পছন্দ করলো। প্রথম দিন আমরা টিবলিসির একটা “ঈগল” রেষ্টুরেন্টে সবাই ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করতে গেলাম। আন্টি গেলেন না। এখানে আমাদের সাথে আরো একজন সাথী জয়েন করেছিলো, সেও দেদুনার খালাতো বোন, নাম রুসুদিন। সে ডাক্তার। কারোরই বিয়ে হয় নাই।

আমরা যেখানেই যাই দল বেধে এই কয়জন যাই। খেতে গেলেও এক সাথে, ঘুরতে গেলেও এক সাথে, গল্প করলেও এক সাথে। অনেক রাতে বাসায় ফিরলাম।

পরদিন খুব ভোরে আমার ঘুম ভাংগলো। দেখলাম, এতো ভোরে ঘুম ভাংগ্লেও সবাই জেগে গেছে। আমি জাগার পর দেদুনা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, নাস্তা খাবো কি খাবার। বললাম, তোমরা যা খাও আমিও সেটাই খাবো। দেদুনা বল্লো, আমরা তো পাউরুটি খাবো।

ওরা একটা পিপায় পাউরুটি রাখে, সাথে একতা ছোট কুড়াল। কারন পাউরুটি গুলি প্রিজার্ভেশনের নিমিত্তে এমন করে বানানো হয় যে, পাউরুটির উপরিভাগ অনেক শক্ত রাখে যা সাধারন হাতে ছিড়া যায় না, একটা ছোট কুড়াল লাগে। যেই পাউরুটির উপরিভাগ কেটে ফেলা হয়, ভিতরের পাউরুটি একদম ফ্রেস থাকে এবং নরম।

দেদুনাকে বললাম, ডিম ভাজি করতে পারো? বল্লো, হ্যা পারি তো।

আমি দেদুনার সাথে রান্না ঘরে গেলাম, দেখলাম কিভাবে ওরা ডিম ভাজে। খুব মজার একটা জিনিষ শুখলাম। ওরা তেল খায় না। প্রায় খায় না বললেই চলে। তাহলে ডিম ভাজে কিভাবে? ওরা যে কাজতা করে, করাইয়ের মধ্যে একটু দুধ দিয়ে দেয় যেটা তেলের কাজ করে। এই দুধের করাইতে ওরা ডিম ভাজে। ব্যাপারটা খারাপ না।

এভাবেই দুইদিন কেটে গেলো।

আমি ভাবলাম, পরোটা খেতে পারলে ভাল হয়। কিন্তু ওরা পরোটা কি তাইই জানে না। আমি বিকালে কিছু ময়দা নিয়ে এলাম, সাথে সোয়াবিন তেল। আমিই সকালে দেদুনাকে নিয়ে আর সালোমিকে নিয়ে ময়দা ছানলাম, তেল দিয়ে করাই গরম করলাম, তারপর কোনো রকমে বিচ্ছিরী সেপের একটা পরোতা বানালাম। কারন পরোতা বানানোর কোনো বেলুনি ছিলো না। যখন আমি তেলের ভেজে পরোটা বানালাম, ওরা ব্যাপারটা খেয়ে খুবই মজা পেলো। শুরু হয়ে গেল পড়োটার নাস্তা প্রতিদিন। এই সময়ে আমার মাথায় একতা বুদ্ধি এলো, আর বুদ্ধিতা হচ্ছে, আমি যদি কিছু বাংলাদেশী খাবার বানাই, তাহলে ওরা হয়তো পছন্দ করতেও পারে। আমি রান্না জানি না, কিন্তু যেহেতু এতো বছর ধরে বাংলাদেশী খাবার খাচ্ছি, ফলে একতা ধারনা তো আছেই।

পরদিন বললাম, তোমরা কি খিচুড়ি খেতে পছন্দ করো? খিচুড়ি কি, সেটা তো ওরা জানে না। কিন্তু এবার ওরা ভাবছে, পরোটা খেয়ে যেহেতু ওরা খুব মজা পাচ্ছে, খিচুড়ি নিশ্চয় আরো কোনো ভাল খাবার হতে পারে। ভাবলাম, খিচুড়িতে কিছু গরুর মাংশ দিলে মন্দ হয় না। কিনে আনলাম কিছু গরুর মাংশ। আমি মুটামুটি তেল আর কিছু মসল্লা (আমি সাথে করে কিছু মসল্লা নিয়ে এসেছিলাম) মেখে মাংশটা কসিয়ে নিয়ে নরম করে তরকারীর মতো করে ফেললাম। তারপর খিচুড়ি পাক করা তো কোনো ব্যাপার না। একটু ঝাল হয়ে গিয়েছিলো। সবাই খেয়ে আরো মজা পেলো কিন্তু ঝালের ব্যাপারটা ওরাই বুঝে নিলো কতটুকু ঝাল দেয়া দরকার।

দেদুনাদের বাসায় আমার খাবার নিয়ে কোনো প্রকারের আর ঝামেলা রইলো না।

আমি প্রতিদিন সবাইকে নিয়ে কখনো পার্কে, কখনো রেষ্টুরেন্টে, কখনো কোনো ঐতিহাসিক স্পটে আবার কখন মার্কেটে, আবার কখনো বীচে যাই। বিকিনী পরা আমার এই বন্ধু গুলিকে আমি কখনো অশ্লীল চোখে দেখার মনোভাব খুজে পাই নাই। এমনো হয়েছে, গলায় গলায় ধরে, আমরা হেটে গিয়েছি, বীচে শুয়েছি, খেলা করেছি। অদ্ভুদ সময়টা কেটেছে। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি এখানে একজন অতিথি।

৫/৬ দিন পর সোরেনা এলো। আরো ভালো সময় কাটলো।

যেদিন আমি চলে আসবো, ওরা আমাকে কাদিয়েছিলো বিরহে। একটা গাড়ি নিয়ে সেই টিবলিসি থেকে সরাসরি আমি যুগদিদিতে এসেছিলাম। কিন্তু আমি সরাসরি আমার বাসায় এলাম না। দেদুনা যুগদিদিতে ওর এক খালার বাসায় আমাকে নিয়ে গেলো। প্রথমে বুঝতে পারি নি ওরা যে এতো গরীব। ওরা আসলে কাউকেই বুঝতে দেয় না ওদের আর্থিক অবস্থার কথা। আমি আর ওর খালু এক রুমে থাকলাম, দেদুনা আর ওর অন্যান্য সব বোনেরা থাকলো আরেক রুমে। রাতে সবার সাথে খাওয়া দাওয়া করলাম। খুব মজা হলো। পরেরদিন সকাল ১০ তাঁর দিকে আমি আমার ২০ নম্বর বাংলাদেশী বাসায় যুগদিদিতে চলে এলাম। সবার কথা আজো আমার খুব মনে পড়ে।

২৪/০২/২০০৩-স্ট্যালিন ঢাছা   

আবখাজিয়ার রিটসা লেকের ধারের সেই “স্ট্যালিন ঢাছা”- একটি মর্মান্তিক ইতিহাস

আবখাজিয়ায় আমার নতুন পোষ্টিং বেশ মাস খানেক হলো। আসার পর অনেকবার যেতে চেয়েছিলাম “গোরি”তে যেখানে স্ট্যালিন জন্ম গ্রহন করেছে। এখন জায়গাটা আর আগের মতো নাই। এটা এখন মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। গিয়েছিলাম কয়েকদিন আগে। কিন্তু আরেকটা জায়গা দেখার খুব শখ হচ্ছিলো- স্ট্যালিন ঢাছা।

স্ট্যালিনের শিশু জীবন কেটেছে খুবই অনিরাপদ এবং গরীব এক পরিবারে। এই অনিরাপদ পরিবেশে তিন ভাই বোনের মধ্যে স্ট্যালিনই একমাত্র বেচেছিলো। তার পিতা ছিলো একজন জুতা মেরামতকারী কিন্তু প্রচন্ড মদ্যপানকারী বদরাগী মানুষ যে প্রতিদিন সে তার সন্তান স্ট্যালিনিকে কারনে অকারনে মারধোর করতেন। স্ট্যালিনের বয়স যখন ১০, তখন তার পিতা মারা যায়। তার মা ছিলো হাউজ ওয়াইফ। তার মা স্ট্যালিনের বুদ্ধিমত্তা দেখে তিনি তাকে এক সেমিনারীতে ভর্তি করে দেন এবং তিনি চেয়েছিলেন স্ট্যালিন প্রিস্ট হিসাবে বড় হোক।

স্ট্যালিন খুব মেধাবী ছাত্র ছিলো এবং প্রায় ৮ বছর পড়াশুনা করে স্ট্যালিন তার ভিন্ন মার্ক্সিজমের মতাদর্শের কারনে স্কুল তাকে বহিষ্কার করে দেয়। এরপর স্ট্যালিন একটি রেভুলুসনারী গ্রুপে তদানীন্তন জারের বিরুদ্ধে জয়েন করেন এবং রেভুলিউশনারী গ্রুপের হয়ে স্ট্যালিন নিজ হাতে তার মতের বাইরের লোকদেরকে একের পর এক হত্যা করতে শুরু করেন। এরপর বলসেভিক গ্রুপ। স্ট্যালিনের একচেটিয়া মনোভাব আর হত্যার মতো দুধর্ষ কাজের মাধ্যমে তিনি বলসেভিক গ্যাং এর খুব প্রতাপশালী নেতা হয়ে উঠেন। শুরু হয় ব্যাংক ডাকাতি, গ্রামে আগুন লাগানো, লোকদেরকে হত্যা করা ইত্যাদি।  

যখন বলসেভিক ক্ষমতায় এলো, তখন  বলসেভিক পার্টির নেতা লিউনার্দো তাকে বলসেভিক পার্টির অন্যতম একজন নেতার পদ দেন। কিন্তু লিউনার্দো পরবর্তিতে তার মৃত্যুর আগে এটা বুঝে গিয়েছিলেন যে, স্ট্যালিনকে আর বেশী ক্ষমতা দেয়া যাবে না কারন সে ডেস্ট্রাকটিভ এবং অত্যান্ত উগ্রপন্থির মানুষ এবং এতোটাই যে, তাকে সর্বনয় ক্ষমতায় তিনি তাকে দেখতে চাননি। কিন্তু তারপরেও সেটা হয়েছিলো।

রাশিয়ান রেভুলিউশনের সময় “স্ট্যালিন” এই নামটি নিজেই গ্রহন করেন যার অর্থ স্টিলম্যান বা ম্যান অফ স্টিল। তার আসল নাম ছিলো ভিসারিউনভিচ। স্ট্যালিন চেয়েছিলো আল্টিম্যাট টোটালেরিয়ান ডিকটেটর হিসাবে পরিচিত হতে এবং সেটা কমিউনিজমের মাধ্যমে। তার ধারনা ছিলো কমিউনিজমের মাধ্যে সে তার দেশের সমস্ত মানুষকে ডিসিপ্লিন্ড, শক্তিশালী , ওবিডিয়েন্ট এবং সভ্য মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা আর তার আদেশ অন্ধভাবে পালন করা। এই প্রোজেক্ট সফল করার জন্য স্ট্যালিনকে যা যা করা দরকার সেটাই সে একচ্ছত্রভাবে এগিয়ে গিয়েছিলো যেখানে পুরানো সব ভিন্ন মতাদর্শকে সমুলে খতম এবং তার মতাদর্শকে আরোপ করা। সে মনে করতো তার এই প্রোজেক্ট সফল করার জন্য যদি দেশের অর্ধেক মানুষকেও হত্যা করতে হয়, তাতেও তার করতে হবে এটাই ছিলো তার একমাত্র সপ্ন। স্ট্যালিন এই প্রোসেসকে সফল করার জন্য প্রায় দেড় বছর এক নাগাড়ে নীরবে এবং গোপনে একটা ‘গ্রেট পার্জ’ নামে সায়েন্টিফিক এবং মেটিকুলাস মেথড ব্যবহার করেছেন। ‘গ্রেট পার্জ” এর জন্য তার প্রয়োজন ছিলো এমন একজন লোক যিনি স্ট্যালিনের সমস্ত আদেশ অন্ধভাবে বিসশাস করবে, পালন করবে এবং তা পালন হয়েছে কিনা নিশ্চিত করবে। আর এর জন্য তিনি বেছে নেন নিকোলাই ইয়েজভ নামে একজন তিন ক্লাশ পর্যন্ত পড়ুয়া মানুষকে। যাকে পরবর্তিতে মানুষ চিনতো “ব্লাডি ডয়ার্ফ” নামে। এই নিকোলাই ইয়েজভ ছিলো স্ট্যালিনের সিক্রেট পুলিশের চীফ। সে নিজে সাত লক্ষ সত্তুর হাজার নীরীহ এবং ভিন্ন মতালম্বী মানুষকে স্ট্যালিনের “গ্রেট পার্জ” এর আওতায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

জুলাই ১৯৩৭ থেকে নভেম্বর ১৯৩৮ এর মাঝখানে স্ট্যালিন প্রায় ৮ লক্ষ মানুষকে এভাবে হত্যা করেন। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৫০০ মানুষ অথবা প্রতি ৫৭ সেকেন্ডে একজন। আর এভাবেই স্ট্যালিন নভেম্বর ১৯৩৮ এর শেষের দিকে মনে করেন তার আর কোনো কাল্পনিক বা দৃশ্যমান কোনো প্রতিদন্ধি থাকলো না এবং “এবসিউলুট পাওয়ার” এর অধিকারী হন স্ট্যালিন। আগেই বলেছিলাম, স্ট্যালিন ছিলো অত্যান্ত মেধাবী এবং হিসাবী। তিনি তার এই হত্যার কৃত কর্মের ভার কখনোই নিজের ঘাড়ে নিতে চান নাই। তার সেটাও পরিকল্পনায় ছিলো। এ ব্যাপারে একটু পরেই আমরা আলোচনা করবো।

স্ট্যালিনের ১ম স্ত্রী ছিলেন একাতেরিনা যিনি অসুস্থতার কারনেই যুবতী অবস্থায় মারা যান। তার ২য় স্ত্রী ছিলো নাদিয়া। ১৩ বছর স্ট্যালিনের সাথে সংসার করার পর ১৯৩২ সালে নাদিয়া নিজে আত্তহত্যা করেন। স্ট্যালিনের সাথে ১৩ বছর সংসার করার পর নাদিয়া একটা জিনিষ বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্ট্যালিন একজন স্বাভাবিক মানুষ নন যা তিনি বিয়ের সময় ভেবেছিলেন। কারন নাদিয়া দেখতে পাচ্ছিলো যে, স্ট্যালিন নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য নিজের আপন মানুষদেরকেও তার হত্যা করতে কোনো দিধাবোধ নাই। এরই ধারাবাহিকতায় নাদিয়া দেখছিলেন, তার সমস্ত আত্তীয়স্বজন, তার স্বামীর বাড়ির আত্তীয় স্বজনেরা একে একে কোথায় যেনো গুম হয়ে যাচ্ছে আর কেউ ফিরে আসছে না। নাদিয়ার বোন এভগেনিয়ার স্বামীকে স্ট্যালিন বিষপানে, এভগেনিয়াকে এবং তার আরেক বোন মারিয়াকে স্ট্যালিন সাইবেরিয়ার “গুলা” তে ডিপোর্টেশনে পাঠান। “গুলা”র তাপমাত্রা শীতকালে যা থাকে মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মতো। শুধু তাইই নয়, স্ট্যালিন নাদিয়ার ছোট ভাই পাভেলকে ২ নভেম্বর ১৯৩৮ সালে বিষপানে হত্যা করেন। এভগেনিয়ার মেয়ে “কিরা”, তার বড় বোন আনাকেও স্ট্যালিন “গুলা”তে নির্বাসনে পাঠান। এভাবেই ‘আনা’র স্বামী স্ট্যানিস্লাভ, ১ম স্ত্রীর ভাই আলেক্সজান্ডারকেও স্ট্যালিন গুলি করে হত্যা করেন। নাদিয়া এসবের চাপ আর নিতে পারছিলেন না। ফলে সে স্বামীর আনুগত্য হারিয়ে ফেলে। নাদিয়া তার গর্ভের তিন বাচ্চা, ছেলে ইয়াকভ, মেয়ে ভ্যাসিলি আর এসভেটলানাক পিছনে রেখে আত্তহত্যা করেন। আত্তহত্যার পুর্বে নাদিয়া তার এক ভাইকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলো যে, সে কেনো আত্তহত্যা করতে যাচ্ছে। কারন নাদিয়ার পালানোর কোনো জায়গা ছিলো না। নাদিয়া পালিয়ে অন্য কোথাও গেলেও স্ট্যালিন তাকে যেভাবেই হোক খুজে বের করে আনতে সক্ষম। আত্তহত্যাই ছিলো তার মুক্তির একমাত্র পথ। স্ট্যালিনকে বাইরে থেকে মানুষ যা দেখে চোখের অন্তরালে স্ট্যালিন আরেক মানুষ যা মানুষ দেখে না। তাই, নাদিয়া নিজে নিজে তার পথ বেছে নেয়।

নাদিয়ার মৃত্যুর পর স্ট্যালিন আরো নিষ্ঠুর হয়ে উঠে কিন্তু স্ট্যালিন সবার থেকে একেবারে আলাদা হয়ে যান। সবসময় সবার থেকে আলাদা হয়ে একা বসবাস করার পরিকল্পনা করেন। স্ট্যালিন দক্ষন মস্কোর কয়েক কিলোমিটার দূরে এক বিশাল গহীন জংগলের ভিতর রাজ প্রাসাদ বানান যার নাম দেন “স্ট্যালিন ডাচা”। এই স্ট্যালিন ডাচা সুরক্ষার জন্য এক কোম্পানী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং ৩০০ এর অধীক সৈনিক মোতায়েন থাকতো। ‘শট্যালিন ডাচা’য় স্ট্যালিনের নিজের অনুমতি ছাড়া অন্য কারো প্রবেশের অনুমতি ছিলো না। তিনি শুধু একাই সেখানে থাকতেন। আর থাকতো তার গভর্নেস “ভ্যেলেন্টিনা”। ভেলেন্টিনাই স্ট্যালিনের সমস্ত কাজ করতো, খাওয়া দাওয়া, দেখভাল, কুরিয়ারের কাজ এমন কি তার সাথে রাতের সংগী হিসাবে। ভেলেন্টিনাকে স্ট্যালিন সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস করতেন। ভ্যালেন্টিনাই শুধু ক্রেমলিন থেকে আসা কাগজপত্রগুলি গ্রহন করতেন এবং ভোর বেলায় তা স্ট্যালিনকে হস্তান্তর করতেন। স্ট্যালিন সারা রাত কাজ করতেন এবং তার ঘুমের সময় হতো সকাল ৭ টা থেকে সকাল ১০ পর্যন্ত।

সারারাত স্ট্যালিন একটা কাজ একেবারে নিজের হাতে করতেন কারো কোনো পরামর্শ ছাড়া। আর সেটা হচ্ছে তার কাল্পনিক এবং দৃশ্যমান শত্রুদেরকে ডেথ সেন্টেন্স দেয়ার অনুমতি। তিনি সারারাত বাছাই করতেন কাকে কখন মারা হবে অথবা সাইবেরিয়ায় বা গুলাতে ডিপোর্টেশনে পাঠানো হবে। কাজটা খুব সহজ ছিলো না। কিন্তু স্ট্যালিন এই কাজটা খুব মনোযোগের সাথে করতেন এবং নামের পাশে একের পর এক টিক দিতেন কার ভাগ্যে মৃত্যু আর কার ভাগ্যে ডিপোর্টেশন। স্ট্যালিন যখন কোনো মানুষকে মেরে ফেলার জন্য আদেশ দিতেন, তখন তার সাথে তার গোটা পরিবারকেও তিনি খতম করে দিতেন।  ৬০ বছর বয়সে স্ট্যালিন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হন যেখানে তার আর কোনো বিপক্ষের লোক ছিলো না। স্ট্যালিন মাঝে মাঝে ‘স্ট্যালিন ডাচা” থেকে বেরিয়ে এসে ক্রেমলিনেও অফিস করতেন যেখানে তার চার জন মহিলা সেক্রেটারী ছিলো। কিন্তু এই সেক্রেটারীদেরকেও স্ট্যালিন কখনো বিশ্বাস করতো না। শুধুমাত্র একজন সেক্রেটারী (একাতেরিনাও তার নাম) ছাড়া সবাই স্ট্যালিনের রোষানলে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু স্ট্যালিন তার এই মহা হত্যার জজ্ঞ নিজের ঘাড়ে যেহেতু নিতে চান নাই আর তার কাজ প্রায় শেষের পথে। তাই তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৮ তারিখে তার সর্বশেষ নিধন লিষ্ট অনুমোদন দেন।

আজ সেই ঐতিহাসিক ২৪ ফেব্রুয়ারী আবারো ফিরে এসছে ১৯৩৮ থেকে ২০০৩ এ। এদিন অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৮ তারিখে স্ট্যালিন  তার “গ্রেট পার্জ” এ নিধন হত্যার সর্বশেষ লিষ্ট অনুমোদনে তার অন্যায় এমন এক লোকের উপর অর্পিত করেন, যার নাম “ব্লাডি ডয়ার্ফ” বা সিক্রেট পুলিশ চীফ নিকোলাই ইয়েজভ। এই নিকোলাই লুবিয়াংকা জেল খানায় সে নিজেই প্রায় লক্ষাধিক মানুষকে গন হত্যা করেছেন।

স্ট্যালিন সকাল সাড়ে সাতটায় নিকোলাইকে তার ‘স্ট্যালিন ডাচ’য় ডেকে পাঠান। আজকের দিনে স্ট্যালিন সেই তাকেই সবার কাছে কালার করে প্রচার করে দিলেন যে, সব গন হত্যার পিছনে ছিলো এই চীফ এবংতিনি জাপানিজ, ব্রিটিস এবং আমেরিকান স্পাই হিসাবেও কাজ করছেন। তাকে মরতেই হবে। আর নিকোলাই জানতেন এর থেকে কোনো পরিত্রান নাই। তার ভাগ্য ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। সে শুধু তার একমাত্র ১০ বছরের মেয়ের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলেন যার নাম নাতালিয়া। নাতালিয়াকে স্ট্যালিন শেষ পর্যন্ত মারেননি একশর্তে যে নাতালিয়া আর কখনো তার বাবার নামের “ইয়েজভ” উপাধিটি ব্যবহার করতে পারবেন না। নিকোলাই ইতিহাসের পাতায় একজন ক্রিমিনাল হয়েই বেচে রইলেন।

নোটঃ ১লা মার্চ ১৯৫৩ তারিখে স্ট্যালিন সারাদিন কারো সাথেই কোনো কথা বলেন নাই, কোথাও বেরও হন নাই। আর তাকে কেঊ ডাকবে, কিংবা তিনি কি করছেন এটা দেখার মতো কারো সাহসও নাই। অবশেষে যখন ক্রেমলিন কুরিয়ার তার অফিসে ঢোকলেন, তখন দেখা গেলো স্ট্যালিন হার্ট স্ট্রোক করে মেঝেতে পড়ে আছেন। তখন তার বয়স ৭৫।

স্ট্যালিন যেভাবে রাজ্য পরিচালনা করতেন তিনি ঠিক সেভাবেই মারা গেলেন। ২০ মিলিয়ন মানুষকে তিনি তার শাসনামলে হত্যা করেছিলেন।  প্রায় ৩০ বছর এককভাবে রাজত্ত করেছেন স্ট্যালিন। স্ট্যালিন ৩০ বছর ইউএসএসআর পরিচালনা করেছেন যেখানে ১৫ টি ছিলো রিপাব্লিক। পৃথিবীর ৬ ভাগের এক ভাগ ছিলো এই ইউএসএস আর। সে সময়ে মোট ১১টি টাইম জোন ছিলো। Biggest Empire of all times.

২৮/০১/২০০৩-রাশিয়ার সচি ভ্রমন

বেশ অনেকদিন হয়ে গেলো জর্জিয়ায় এসেছি। গত অক্টোবর মাসে জর্জিয়াতে জাতীসংঘের মিশনে এসেছি। আশেপাশে সারাটা দেশ ঘুরলাম। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, তারপরেও বেশ সুন্দর। বুঝা যায় যে, সোভিয়েট ইউনিয়নের সময় দেশের অবস্থা যথেষ্ঠ পরিমান মজবুত আর শক্ত ছিলো। বেশ গাছ গাছালী আছে সব জায়গায়। মাঝে মাঝে আমার একটা কথা মনে হয় যে, আমরা যারা বাংগালী নিজের দেশের সবুজ বনায়ন দেখে কত গান, কত কবিতা লিখি যেনো আমাদের দেশটাই শুধু সবুজ গাছগাছালী দিয়ে ঈশ্বর সাজিয়েছেন। কিন্তু সেটা মোটেও সত্য নয়। বিভিন্ন দেশ ঘুরে তো দেখলাম, যে, বরং আমাদের দেশটাই পিছিয়ে আছে। এমন কি এই সবুজ বন্যায়নের দিক দিয়েও। কয়েকদিন যাবতই ভাবছিলাম, পাশেই রাশিয়া, ঘুরে আসি। আমাদের জাতীসংঘের সেনাবাহিনীর কোনো জায়গাতেই যাওয়া আসার জন্য কোনো রেস্ট্রিকসন নাই। ইচ্ছে করলেই ইউনিফর্ম পড়েই যেতে পারি, জাতীসংঘের গাড়ি সেলফ ড্রাইভিং করেই যাওয়া যায় একদেশ থেকে আরেকদেশে। তেলের খরচ লাগে না, গাড়ির জন্য কোনো আলাদা পয়সা লাগে না। বেশ ভালো।

কোনো বাংলাদেশীদের সাথে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। তাদের সাথে গেলে যেটা হয়, হয় বেশি আতেল্গিরি না হয় একটা বোঝা হয়ে দাড়ায়। আনন্দের চেয়ে হয় বিরক্ত আসে অথবা মেহনত বাড়ে। কিন্তু কোনো বিদেশীদের সাথে একোম্পানি করলে ব্যাপারটা অনেক সাচ্ছন্ধবোধ লাগে। এখানে অনেকের সাথেই আমার খুব ভালো খাতির। বিশেষ করে পর্তুগাল, পোল্যান্ড কিংবা তুরুষ্কের অফিসারদের সাথে। জার্মানীর সবার সাথেই আমার বেশ ভাল একটা ফ্রেন্ডশীপ আছে। অনেকেই বেড়াতে যাওয়ার সময় আমাকে সংগী করে নিতে চাইলেও কেনো জানি আমার যাওয়া হচ্ছিলো না। তাই এবার ভাবলাম, রাশিয়া থেকে ঘুরে আসি। জর্জিয়া থেকে সবচেয়ে কাছের যে পোর্ট সিটি তার নাম সচী। আমাদের মিশন এলাকা থেকে বেশীর ভাগ অফিসাররা এই সচীতে গিয়েই সপ্তাহান্তের ছুটিগুলি কাটিয়ে আসে। কেউ যায় সস্তা রাশিয়ান মেয়েদের সাথে সেক্স করতে আবার কেউ যায় জাষ্ট একটা বিনোদনের উদ্দেশ্যে। আমার কোনো শখ নাই রাশিয়ান মেয়েদের সাথে কোনো প্রকার দৈহিক আনন্দের, আর এটা আমি মোটেও পছন্দ করি না। তাই আর যাওয়াও হচ্ছিলো না।

উরুগুয়ের এক বিমান বাহিনীর অফিসার, নাম লিওনার্দো, আমার খুব ভালো বন্ধু। সে একদিন এসে বল্লো, আখতার চলো সচী থেকে ঘুরে আসি। ভাবলাম, যাওয়া যেতে পারে। আমাদের সচী যাওয়ার জন্য যা লাগবে তা হলো একটা গাড়ি, আর অনুমতি। দুটুই সহজ এখানে। সেভাবেই আমি আর লিউনার্দো পরিকল্পনা করলাম ২৪ তারিখেই সচী যাবো। তিনদিনের ছুটিই যথেষ্ট। আমি রাশিয়ান ভাষা একদম বুঝি না, এদিকে আবার লিউনার্দো উরুগুয়ের বাসিন্দা বলে অনর্গল পারুস্কি বা রাশিয়ান ভাষাটা তার দখলে। ফলে আমরা তারিখ করেই ফেললাম যে ২৪ তারিখে আমরা রাশিয়ার সচিতে বেড়াতে যাবো। আমি আর লিউনার্দো খুব ভোর বেলা রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমরা দুজনেই ড্রাইভিং জানি। সুতরাং কিছু সময় আমি আবার কিছু সময় লিউনার্দো ড্রাইভ করতে করতে সচীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তাটা বেশ লম্বা। প্রায় আরাই শ কিলোমিটার। আমাদের রাস্তাটা ছিলো প্রায় এই রকম-

জুগদিদি-গালি-অচামছিড়া-লাব্রা-সুখুমি-গুদাউটা-ঘাগ্রা-সিনাতলে-গান্দিয়াদি-খিবানি-আডলার-খোসতা-খোস্টিনিস্কি হয়ে সচী। পুরু রাস্তাই এ-১৪৭ নামে পরিচিত। খুব সুন্দর রাস্তা।

আমরা যখন সচী পৌঁছলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয় হয়। পথে অনেকবার থেমেছিলাম, কখনো কফির জন্য, কখনো এম্নিতেই ছবি তোমার জন্য। আবার কখনো কারো সাথে রাস্তার ডাইরেকশন জানার জন্য। শীতকাল। ফলে দ্রুত বেলা পড়ে আসছিলো। আমরা তখনো জানি না কোন হোটেলে যাবো। কিন্তু আগে থেকেই একটা ধারনা ছিলো যেহেতু অনেকেই এখানে আসেন। আমাদের অন্যান্য অফিসাররাও এখানে আগে আসায় তাদের কাছ থেকে আমরা একটা আইডিয়া করে এসছি।

প্লেহানোভা স্ট্রীটে ইম্পেরিয়া নামে মূটামুটি ভালোমানের একটা হোটেল আছে যেখানে অনেক অফিসাররাই এসছিলো, ফলে আমরা সেটার খোজই নিচ্ছিলাম। হোটেলে যাওয়ার পর দেখলাম একেবারে মন্দ না। দামও মুটামুটি সস্তাই। রুমভাড়া মাত্র ২৫ ডলার করে। ডাবল বেড। আমার আর লিউর তাতে হয়ে যায়। আমরা ব্যাগ রুমে পাঠিয়ে দিলাম, আর গাড়িটা হোটেলের গ্যারেজেই দেওয়ার জন্য একটা দরখাস্ত করে ফেললাম। রিসেপসনে যে ভদ্র মহিলা বসেছিলেন, তার বয়স প্রায় ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, খাবারের ব্যবস্থা কি। আমরা আসলে হোটেলের খাবারের উপর নির্ভর করতে চাই নাই। ফলে আমরা আগেই হোটেল রুম ভাড়া নেওয়ার সময় ফুড পোর্শনটা বাদ দিয়ে ভাড়ার ব্যাপারটা মিটিয়ে নিয়েছিলাম। যেহেতু আমাদের সাথে গাড়ি আছে, ফলে, যে কোনো লং ডিসটেন্সে গিয়েও আমাদের চয়েজ মতো খাবার খেতে পারি।

হোটেলে ঢোকার পর একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম। তারপর আবার বেরিয়ে গেলাম বাইরে। লিউ যেহেতু রাশিয়ান ভাষাটা বুঝে ফলে আমার খুব একটা বেগ পেতে হয় নাই। রাশিয়ায় খুবই কম লোক ইংরেজীতে কথা বলতে পারে কিংবা বলে। ফলে আমি কতটুকু ইংরেজীতে দক্ষ তাতে কিছুই যায় আসে না। বরং পুরা বাক্য না বলে যদি কেউ ভেঙ্গে ভেঙ্গে গুটিকতক ইংরেজি শব্দ বলতে পারা যায়, তাহলে হয়তো কেউ কেউ কিছু ইংরেজী ভাষা বুঝতে পারে। গ্রামার দিয়ে শুদ্ধরুপে যেই ইংরেজী বলবেন, সব তালগোল পাকিয়ে ওরা আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যদি কাউকে বলেন, ডু ইউ নো হাউ টু স্পিক ইংলিশ? কিছুই হয়তো বুঝবে না। তাকে যদি বলেন, স্পিক স্পিক ইংলিশ? তাহলে হয়তো কাজে দিতেও পারে।

প্রথম দিন সচীতে। রাতের বেলায় বেরিয়ে কোনো একটা মার্কেট খুজতেছি। ভালো মার্কেট যে কোথায় সেটা পাওয়া খুবই জটিল মনে হলো। রাত প্রায় ৯টা বেজে গেছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা কোনো রকম রেষ্টুরেন্টে আমি আর লিউনার্দো কিছু একটা আপাতত খেয়ে নিলাম। লিউকে দেখে অনেকটা রাশিয়ান রাশিয়ান মনে হলেও আমি যে এখানে বিদেশী এটা ওদের কারোরই বুঝার বাকী ছিলো না। রাস্তাঘাট বেশ ফাকা। একটা বয়স্ক মহিলা আমাদের কাছে এসে বল্লো, “তেবে নুঝনা দেবুস্কা?” লিউনার্দো আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিয়ে বল্লো, বুঝতে পেরেছো, মহিলা কি বলছে? আমি বললাম, নাহ। লিউনার্দো বল্লো, তোমার কোনো মেয়ে চাই কিনা। তার কাছে ভালো আনাড়ি সুন্দুরী মেয়ে আছে, এবং যুবতী। বুঝলাম, সচী এমন একটা জায়গা যেখানে বেশ্যাবৃত্তি হচ্ছে প্রধান ব্যবসা। একটু পরপরই কেউ না কেউ এসে সেই একই কথা বলে যাচ্ছে, আমাদের কোনো মেয়ে চাই কিনা। কি তাজ্জব।

যাই হোক, আমি আর লিউনার্দো হোটেলে চলে এলাম। আমি লিউকে বললাম, লিউ বেশীদিন তো আর এখানে থাকতে আসিনি, চলো, রাতের রাশিয়া দেখে আসি। লিউ আমার খুব ভক্ত। বল্লো, চলো যাই তাহলে। আমরা গাড়ি নিলাম না। পায়ে হেটেই বেশ কিছুদুর এগুলাম। শুনশান রাস্তা, লাইট পোষ্টগুলি জলছে। কুয়াসায় রাস্তা প্রায় ঢেকে যাচ্ছে। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে লিউকে নিয়ে সচী রিভারের কাছাকাছি চলে এলাম। প্রচুর মানুষ নদীর পারে। দেখলাম, প্রায় সবগুলি মানুষই মাতাল। ছেলেমেয়েরা একে অপরের সাথে প্রেম করছে, মাতামাতি করছে। আর পাশে এক বেহালাবাদক নিজের মনের সুখে বেহালা বাজিয়ে যাচ্ছে। এই বেহালার সুরে আবার কোনো কোনো মাতাল কিছু একটা দিয়ে বাদ্য যন্ত্রের মতো ঢোল পিটাচ্ছে। আর এই ঢোলের তালে তালে আবার কেউ কেউ এমন নাচনী দিচ্ছে, মনে হয় না কোনো কালে সে নাচ শিখেছে। এই নাচ দেখে আবার কেউ কেউ তাকে উতসাহও দিচ্ছে। মানুষ যখন মাতাল হয়, পাশে বসা কুকুরের আওয়াজ ও মধুর সুরের মতো হয়তো মনে হয়। মাতাল অবস্থা একটা দেখার মতো অভিজ্ঞতা।

রাত প্রায় বারোটার দিকে আবার আমি আর লিউনার্দো হেটে হেটেই আমাদের হোটেলে চলে এলাম। এই আসার পথে কমপক্ষে তিন থেকে চার জন আমার কাছে সিগারেট চেয়ে নিলো। এখানে সিগারেট চাওয়া যেনো একটা মামুলি ব্যাপার, হোক সে পরিচিত বা অপরিচিত। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, রাস্তায় অনেক লোক নেশা করে হেটে বেড়ায় কিন্তু অসভ্যতা করে না। আমাদের দেশ হলে তো ব্যাপারটা হতো ভয়ংকর। এখানে মাতালেরও একটা নীতি আছে।

হোটেলল রুমে ঢোকেই দেখি দরজার নীচ দিয়ে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬টা ভিজিটিং কার্ড পড়ে আছে। সবগুলি কার্ড সেক্স গার্লদের। রুম সার্ভিস সহ অফার। কি তাজ্জব। সেক্স এখানে এতো জনপ্রিয় আর সস্তা? অনেক রাস্তা আজ ড্রাইভিং করেছি, আবার রাতও কম হয় নাই। টায়ার্ড লাগছে, তাই আমি আর লিউ পাশাপাশি বেডে শুয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন, প্রায় অনেক বেলা হয়ে গেলো ঘুম থেকে উঠতে উঠতে। আমরা যখন ঘুম থেকে উঠলাম, বেলা তখন প্রায় ১১ টা সকাল। প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। আমার আসলে ভাত না হলে চলেই না। লিউকে বললাম, লিউ চলো, ভাতের কোনো রেষ্টুরেন্ট পাও কিনা। লিউ আবার এইসব ভাত খেতে পছন্দ করে না। আমাদের ইম্পেরিয়ার পাশেই একটা ছাউনীওয়ালা লোকাল রেষ্টুরেন্ট ছিলো। আমার মনে হলো, সেখানে হয়তো ভাত পাওয়া যেতে পারে। লিউ যেতে চাইলো না। ওর নাকি ক্ষুধা নাই। সে একটা বিয়ার নিয়ে জানালার পাশে বিয়ার খেতে থাকলো। আমি একাই বেরিয়ে গেলাম। বেশী তো আর দূর নয়, এই পাশেই তো। প্রচুর লোক তখনো খাচ্ছে। একটা গমগম ভাব। আমি ঢোকলাম, আমি জানিনা কিভাবে ‘ভাত খাবো এটা বলতে হয়’। তো, ওখানে একটা ২০/২২ বছর বয়সী ছেলে খাবার সার্ভ করছিল। আমি ইশারা করতেই সে আমার কাছে এসে, ওদের ভাষায় কি খাবো হয়তো জিজ্ঞেস করলো। আমি আসলে বুঝতে পারি নাই। বললাম, মেন্যু কার্ড?  ছেলেটা আমার কথা বুঝলো। একটা মেন্যু কার্ড নিয়ে এলো। বেশীর ভাগ লেখা রাশিয়ান ভাষায়। এম্নিতেই ভাষা বুঝিনা, তাও আমার লেখা। এটা আমার কাছে থাকা যা, আর না থাকা একই। ছেলেটাকে বললাম, ‘রাইস?”

ছেলেটা কি বুঝলো বুঝলাম না, সে একটু পড়ে ফিস কাটলেট নিয়ে হাজির। আমি খুব বিরক্ত হলাম, কারন, আমি ভুলেও ফিস উল্লেখ করি নাই, সে কেনো ফিস নিয়ে এলো? আমার মুখের অভিব্যক্তিতে ছেলেটা বুঝতে পেরেছিলো। সে “প্রোস্তিতে” প্রোস্তিতে, বলতে বলতে আবারো ভিতরে চলে গেলো। এবার কোনো খাবারই সে আনে নাই। এদিকে আমার ক্ষুধায় পেট চু চু করছে। একটু বিরক্তও হচ্ছিলাম। লোকজন তাদের খাবার খেয়ে একে একে বের হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি খাবারের অর্ডারই দিতে পারলাম না।

আবারো আমি ছেলেটাকে বললাম, রাইস রাইস? সে যেন আমার কথা কিছুই বুঝলো না এবার। মাথা নেড়ে যা বল্লো সেটার অর্থ, সে আমার কথা বুঝতে পারছে না। আমি এতোটাই বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, যে, ভাবলাম, এখানে খাওয়ারই দরকার নাই। আমি উঠতে যাচ্ছিলাম। একটু রাগ আমার চোখে। প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিলাম, এমন সময় খুব চমৎকার ইংলিশে পিছন থেকে একটা ২৪/২৫ বছরের ইয়াং মেয়ে বল্লো, এক্সকিউজ মি স্যার!!

আমি পিছনে তাকিয়ে দেখলাম, মেয়েটার গায়ে একটা এপ্রোন পরা। সম্ভবত রান্না ঘর থেকে এসছে। আমাকে ক্লিন ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, ক্যান আই হেল্প ইউ? মনে মনে খুব আশ্বাস পেলাম যে, মেয়েটা মনে হয় ইংরেজী বুঝে।

আমি বললাম, আমি ভাত খেতে চাই, আছে?

মেয়েটা আমার হাত ধরে টেনে রান্না ঘরের দিকে নিয়ে গেলো। সম্ভবত সে ‘রাইস’ কথাটা বুঝে নাই। অথবা বুঝলেও কেনো আমাকে রান্না ঘরে নিয়ে গেলো সেটা আমার মাথায় আসলো না। রান্না ঘরে যাওয়ার পর সে একেএকে তার ডেকচিগুলি খুলে আমাকে দেখাচ্ছে, কোন খাবারটা আমি খেতে চাই। আমি একটা ডেকচিতে দেখলাম, ভাত আছে। বললাম, এইটা।

মেয়েটা হেসে দিয়ে বল্লো, অহ রিস? বুঝলাম, ওরা রাইস বলে না, বলে রিস।

সে আমাকে আবারো টেবিলে বসতে বল্লো, আর বল্লো, ফাইভ মিনিটস।

বসে আছি, প্রায় ১০ মিনিট পর মেয়েটা শুধুমাত্র এক কাপ ভাত আর একটা খালি প্লেট নিয়ে আমার টেবিলে রাখলো। আমি তো অবাক।

আরে ভাই, ভাতটা খাবো কি দিয়ে?

যাই হোক, মেয়েটা আমার অসহায়ের অবস্থাটা বুঝতে পেরে, প্রথমে ছেলেটা যে ফিসকাটলেটটা নিয়ে এসছিলো, সেটা দিয়ে বল্লো, আপাতত এটা দিয়ে খাও। আমি তোমাকে পরে ভাল খবর দেবো। তুমি কি ইন্ডিয়ান?

মেয়েটি আমাকে তার একটা ভিটিং কার্ড দিয়ে বল্লো, রাখো এটা, কাল আবার তোমার সাথে ঠিক এই সময় এস, কথা বল্বো। কার্ড তা হাতে নিয়ে পড়ে দেখলাম, ওর নাম, এলিজাবেথ (লিজা), ৪র্থ বর্ষ, হোম আর্টস, ইউনিভার্সিটি অফ রাশিয়া।

১২/১০/২০০২-ট্র্যাবজন থেকে জর্জিয়া

ট্র্যাবজনে যখন পৌছলাম, তখন রাত প্রায় দশটা। ছোট একটা এয়ারপোর্ট। একেবারেই নিস্তব্ধ। গুটি কতক লোক যেনো পুরু এয়ারপোর্ট টাকে আগলে রেখেছে। দোকান পাট যাও আছে, খদ্দরের অভাবে সে গুলিও প্রায় বন্ধের মতো। এয়ারপোর্ট যতোই নিস্তব্ধ হোক, এর ভিতরের একটা  রুপ আছে। সুন্দর, পরিপাটি ফ্লোর, দোকান পাট বন্ধ থাকলেও এদের বাইরের সাইন বোর্ড আর বিজ্ঞাপন চোখে পড়ার মত। এখানে যে সব দোকান পাট খোলা, তারা যেনো নিরাপত্তার মতো ব্যাপারটা মাথায়ই নাই, কোনো চোর ডাকাতের ভয় নাই। এটা একটা  আরেক জগত।

এয়ারপোর্টের ভিতরেই টাকা ভাঙ্গানোর এক্সচেঞ্জ গুলি বসে আছে। সুদুর ঢাকা থেকে ডলার নিয়ে এসেছি কিছু। কোথাও কিছু খেতে গেলে বা কিনতে গেলেও লোকাল কারেন্সি লাগবে। তাই মেজর ইরশাদ বল্লো, স্যার, কিছু দলার চেঞ্জ করে নেই। খারাপ বলে নাই, ভাবলাম, শ পাছে ডলার ভাংগিয়ে নিয়ে যাই। আবার ভাবলাম, আগামী কালই তো চলে যাবো তুরস্ক ছেড়ে, এতো ডলার এক্সচেঞ্জ করা কি ঠিক হবে? যাই হোক, সিদ্ধান্ত নিলাম, তিনশত ডলার আপাতত এক্সচেঞ্জ করি। বাকিটা জর্জিয়া গেলে তো ওখানকার লোকাল কারেন্সি লাগবে।

এখানে একটা মজার ব্যাপার ঘটে গেলো যা আমার বা মেজর ইরশাদের অভিজ্ঞতার বাইরে। ডলার ভাঙ্গাতে গিয়ে হতবাক হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। এদের মুদ্রার নাম লীরা। আর এখানে এক ডলার দিয়ে প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার লিরা পাওয়া যায়। তার মানে আমি যদি এখন ৫০০ ডলার ভাঙ্গাই, তাহলে কত লীরা হবে বুঝতে পারছিলাম না। একি দেশ?  তারপরেও, নিলাম। এখন কত পাইলাম, আর কত পাওয়া উচিত ছিলো, আদৌ সব ঠিক মতো পাইলাম কিনা এই অবেলায় ক্ষুধার্থ পেটে আর মাথা কাজ করছিলো না। সারাদিনের প্রচন্ড জার্নীতে শরীর প্রায় অবশ। এখন তাড়াতাড়ি কোনো একতা হোতেলে গিয়ে উঠতে পারলেই যেনো বাচি। প্রায় এক ব্যাগ লীরা নিয়ে এয়ারপোর্ট ছেড়ে ট্র্যাবজন শহরের দিকে ছুটলাম। তখন রাত প্রায় ১১ টার কাছাকাছি। শহরও প্রায় নির্জন হয়ে এসছে।

একটা ভাড়া করা গাড়িতে আমি আর মেজর ইরশাদ ট্র্যাবজন শহরে চলে এলাম, পথে ঘাটে লোকজন নাই বললেই চলে। গাড়ির ড্রাইভার আমাদেরকে একতা সাধারন হোটেলের সামনে এনে কাকে যেনো উচ্চস্বরে ডাক দিলো। যেহেতু আমরা ওদের ভাষা বুঝি না কিন্তু আকার ইংগিতে এটা বুঝলাম যে, সম্ভবত হোটেলের কোনো এক কর্মচারীকে নতুন খদ্দর নিয়া এসেছি এটা জানান দিলো।

একটু পর মধ্য বয়সী একজন লোক এসে তাদের মধ্যে কি কি কথাবার্তা জানি হলো, আমাদেরকে একতা ক্যাল্কুলেটরের মাধ্যমে বুঝাইলো যে, হোটেল ভাড়া এক রুম প্রতি দিনের জন্য প্রায় ৫০ ডলারের সমান। কিছু করার ছিলো না। কারন রাত অনেক, শরীরের উপর অনেক ধকল, এদিকে আবার অন্য কোথাও গিয়ে রুম পাই কিনা, পাইলেও এর থেকে ভালো এবং সস্তায় হবে কিনা জানি না, তাই রাজী হয়ে গেলাম। ড্রাইভারকে ভাড়া দিতে গিয়াও কারেন্সীর হিসাব নিয়া বড় বেসামাল। একেকতা নোত এক লক্ষ লীরার সমান। নোটের মধ্যে এতো বড় বড় সংখ্যা যে, পড়তে গেলে এক দুই তিন করে করে খালী শুন্যই গুনতে হয়।

আমি আর ইরশাদ মালামাল নামিয়ে হোটেলে উঠে গেলাম। শীত টা ঝাকালো না কিন্তু আবার কম ও না। ল্যাপ কম্বল সব বুঝে নিলাম। আমরা হাত মুখ ধুয়ে বাইরে খাওয়ার জন্য বেরিয়ে গেলাম। পাশেই একতা ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে এমন একতা রেষ্টুরেন্ট আছে। আমরা বেশি ঘুরাঘুরি না করে পাশের রেষ্টুরেন্টেই খাওয়ার জন্য ঢোকে গেলাম।

রেষ্টুরেন্টের ভিতরে মাত্র দুজন মানুষ বসে আছে। একজন মহিলা আর আরেক জন পুরুষ। এ গুলি নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা নাই। কিন্তু পরে অনুভব করলাম, আমাদের যদিও তাদের নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নাই, কিন্তু তাদের মাথা ব্যথা ছিলো আমাদের নিয়ে। তাদের মধ্যে পুরুষ ব্যক্তিটি আমাদের টেবিলে এসে বসলেন। ভালো ইংরেজী বলতে পারেন। সালাম দিয়ে আমাকেরকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে এসেছি।

এখানে একতা কথা বলে রাখা ভাল যে, মিশনে আসার আগে আমরা তুরস্ক নিয়েও একতা ফিডব্যাক নিয়ে এসছিলাম। এখানকার লোক গুলি নাকি অনেক ফ্রড, সুযোগ আর সময় পেলেই বিদেশি পর্যটকদের ঠকাইতে ছাড়ে না। আমাদের মাথায় এতা ছিলো। ফলে, খুব সহজেই কারো ট্র্যাপে পড়ে যাবো এতা ভাবি না। যাই হোক, লোকটার আমাদের টেবিলে বসার উদ্দেশ্য নিয়ে আমার এবং মেজর ইরশাদের দুজনের মধ্যেই একই রকম সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিলো। আমরা মোটামুটি একতা সাধারন খাবারের অর্ডার দিয়ে খাবারের জন্য অপেক্ষা করছি, আর এই ফাকে ভদ্রলোক আমাদের বিনোদনের জন্য এমন কিছু লাগবে কিনা জানালেন। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝি নাই।

বললাম, সিগারেট দরকার। কোথায় পাই?

লোকটি হেসে দিয়ে বললেন, আরে সিগারেট পাওয়া যাবে, সাথে কোনো সাথী লাগবে কিনা, লাগলে বলেন।

বুঝলাম, এরা মেয়ে ঘটিত কোনো ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছে।

বললাম, না ভাই, আমরা মুসলমান, এসব ব্যাপারে আমরা আলাপ করতে চাই না। তারপর আগাইয়া এলেন সেই ভদ্র মহিলা। ব্যাপারটা ভালো ঠেকছিলো না। আর হোটেলটার মধ্যে লোক জন একেবারেই নাই। একটু নার্ভাস লাগছিলো যে, এরা আবার কোনো সংঘবদ্ধ গ্যাং কিনা কে জানে। ঠি এই সময়ে তৃতীয় একজন খদ্দর এলেন খাবারের জন্য। মনে হলো তিনীও আমাদের মতো এখানে নতুন।

আমাদের সালাম দিয়ে বললেন, আনারা কি এখানে আজই এসেছেন? বললাম, জী, আমরা জাতী সংঘের লোক। জর্জিয়ায় যাচ্ছি কাল ভোরে। কি মনে হলো, আর কি জানি হলো, আগের দুইজন লোক (মহিলা আর পুরুষটী০ এই নতুন লোকটিকে দেখার পর চলে গেলো।

আমরা মোটামুটি খেয়ে হোটেলে চলে এলাম।

আগামীকাল খুব ভোরে আমাদের ফ্লাইট, তাই কোনো বাক্সই আর খুললাম না। বাথ রুম করে শুয়ে পড়বো, কিন্তু বাথ রুমে গিয়ে দেখি পানি নাই। অনেক দাকাডাকি করেও কাউকে পেলাম না। ফোন আছে রুমে, কাউকে ফোন করেও পাওয়া গেলো না। রিসেপ্সন একটা আছে, কিন্তু কোনো লোক নাই। এয়ারপোর্ট থেকে দুই বোতল পানি কিনেছিলাম, আপাতত সেই পানি দিয়াই সব কাজ সারা হল। মেজাজ খারাপ করার কোনো উপায় নাই। একদিকে ভাষা বুঝি না। অন্যদিকে কেউ নাই যার সাথে রাগ দেখাতে পারি। ফলে আমি আর মেজর ইরশাদ তুরুষ্কের সরকারকে কিছুক্ষন গালাগালি করেই মনের শান্তি লাভ করিয়া ল্যাপ গায়ে দিয়া ঘুমাইয়া পড়িলাম।  

১০/১০/২০০২-জর্জিয়ায় আগমন

গত ৪ অক্টোবর ২০০২ তারিখে আমি দ্বিতীয় বারের মতো জাতীসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষা বাহিনীর অধীনে  মিশনে এলাম। এবার মিশন এককালে রাশিয়ার অধীনে থাকা জর্জিয়ায়। ইউরেশিয়ার ককেশিয়ান রিজিয়নের মধ্যে ওয়েষ্টার্ন এশিয়া আর ইষ্টার্ন ইউরোপের মধ্যে অবস্থিত এই দেশটি। পশ্চিমে ব্ল্যাক সি, উত্তরে রাশিয়া আর দক্ষিনে আছে তুরস্ক আর আর্মেনিয়া। দক্ষিন পূর্বে আছে আজারবাইজান।

৪ অক্টোবর ২০০২ এ ঢাকা থেকে সুদুর জর্জিয়ায় কিভাবে কিভাবে এলাম, এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা। রোজার দিন। আমি আর মেজর ইরশাদ (আমার জুনিয়ার, ১৭ লং কোর্ষের) আমরা একসাথে মিশনের উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়েছিলাম দুপুরের দিকে। আমি কর্মরত আছি আর্মি হেডকোয়ার্টারে এমটি পরিদপ্তরে আর মেজর ইরশাদ কর্মরত ছিলো এএফডি তে (আর্ম ফোর্সেস ডিভিশন)। দুটুই পাশাপাশি অফিস।

গত কয়েকদিনে মিশন এলাকার ব্যাপারে ওখানে থাকা মেজর আখতার শহীদের সাথে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। মিশন এলাকায় সিএমও (চীফ মিলিটারী অবজারভার) হিসাবে আছেন আমাদের বাংলাদেশের জেনারেল আশফাক। স্যারের সাথেও অনেকবার মেইলে চিঠি আদান প্রদান হয়েছে। একটা আভাষ পাওয়া গেছে মিশন এলাকার ব্যাপারে। সে মোতাবেক মোটামুটি প্রিপারেশন নিয়ে বাক্স পেটরা গুছিয়ে নিয়েছি।

আমাদের ফ্লাইটটি ছিল ঢাকা থেকে ইস্তানবুল (তুরষ্ক) হয়ে, তুরষ্কেরই আরেকটি প্রদেশ ট্রাবজনে যাওয়া। সেই ট্রাবজনে আমাদের জন্য স্পেশাল ফ্লাইট থাকবে জাতীসংঘের। সেটা দিয়ে আমরা পরেরদিন জর্জিয়ার রাজধানী টিবলিসি শহরে পৌছব। টিবলিসি থেকে আরেকটি ফ্লাইটে আমরা পরের কয়েকদিন পর জর্জিয়ায় যাবো। এই পুরু ভ্রমনটা ঢাকা থেকে জর্জিয়ায় পৌঁছানোর সময় ছিলো মাত্র দুইদিন। অর্থাৎ ৬ তারিখের মধ্যেই আমাদেরকে আমাদের মিশন এরিয়াতে হাজির হইতে হবে।

আমরা যথারীতি রওয়ানা হয়ে গেলাম। পরিবারের সবার কাছ থেকে একটা আবেগঘন বিদায় হলো। আমার দুই মেয়ে ঊম্মিকা আর কনিকা। উম্মিকার বয়স সবেমাত্র ৮ বছর হয় নাই, আর কনিকার বয়স তো মাত্র ৩ ও হয় নাই। আমি জানি মিটুল দায়িত্তশীল মহিলা, সব সামাল দিতে পারবে। বাসা সেনানীবাসের ভিতরেই স্টাফ রোড ১৪৯/৪ নং বাসা। ফলে ওদের নিরাপত্তা নিয়া আমি চিন্তিত ছিলাম না। তারপরেও প্রায় এক বছরের জন্য যাচ্ছি, একটু তো মন খারাপ হবেই, তাইই হয়েছিলো আমার।

রোজা ছিলাম বলে প্লেনের ভিতরে কোনো কিছুই খেতে পারি নাই। প্লেন প্রায় ৫ ঘন্টা উরে গিয়ে সন্ধ্যার দিকে ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে নামলো। তুরুষ্কে এটাই আমার প্রথম পদার্পন। বিশাল একটা এয়ারপোর্ট। প্রুচুর লোকের আনাগোনা, কেউ ল্যান্ড করেছে, কেউ আবার ফিরে যাওয়ার জন্য লবিতে বসে আছে, ছোট বড় সব বয়সের মহিলা পুরুষের বিস্তর একতা ভদ্র মেলার মতো। কোনো কোনো সৌখিন মহিলারা ট্যাক্স ফ্রি পছন্দের সই কেনা কাটা করছে, কেউ আবার কেনার সামর্থ না থাকলেও দেখাদেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বার, মদের দোকান, সবই আছে। নেশাখোরদের জন্য এটা একতা ভালো ব্যবস্থা। প্রকাশ্যে নেশা করলেও কেউ কিছু বলবে না বিধায় পেটপুরে যতটুকু পানিয় খেলে কন্ট্রোলে থাকা যায় তাতেই বেশ আনন্দ সহকারে খেয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ আবার ফ্লাইট দেরীর কারনে অলস ভাবে কোন এক লোহার চেয়ারে হেলান দিয়ে, কেউ আবার দুই পা তুলে সঠান হয়ে লম্বা একখান ঘুম দিয়ে নিচ্ছে। যারা পেটুক স্বভাবের, তারাও কম যায় না, পেটে জায়গার অভবে যেনো সব কিছু খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও খাওয়া যাচ্ছে না ভেবে আফসোস করছে। কেউ কেউ আবার কম্পিউতার যন্ত্রের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেনো ইহাইয়া তাহার একমাত্র সাথী আর সংগী। যাই হোক সব কিছু মিলে কিছু কোলাহল, কিছু নীরবতা মিলে বেশ সুন্দর। বাংলাদেশের এয়ারপর্ট দেখলে এয়ারপোর্ট সম্পর্কে যা ধারনা হয়, এই এয়ারপোর্ট দেখলে নিজের দেশের দুরাবস্থার কথা মনে হয়। অথচ দুটুই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে আমাদের একটা কানেক্টিং ফ্লাইট ছিলো সরাসরি ট্রাব্জন এয়ারপোর্টের জন্য। আমি আর ইরশাদ দ্রুত সেই কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার জন্য এখান থেকে সেখানে, লাগেজ নেওয়া ইত্যাদি করতে করতেই আর ইফতারির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। অথচ তখন রাত বাজে প্রায় নয়টা। এখানে একতা কথা জানিয়ে রাখা ভালো যে, আমরা সূর্যের অপোজিটে যাচ্ছিলাম বলে যদিও আমরা লোকাল টাইমে রাত নয়টা দেখছি কিন্তু বাংলাদেশ টাইমে আসলে ওটা ছিলো আরো বেশি। ফলে আমাদের রোজার সময়তা এতো বেশি বড় হয়ে গিয়েছিলো আর এতো ধকল যাচ্ছিলো যে, পেটের ক্ষুধায় মনে হচ্ছিলো আর পারছিলাম না। তারপরেও কাজের কারনে বিশেষ করে কানেক্টিং ফ্লাইটের কারনে আমাদের খাওয়া হয় নাই।

আমরা কানেক্টিং ফ্লাইটে উঠে গেলাম ট্রাবজনে যাবো। ছোট একটা তুর্কী বিমান। বেশ লোকজন আছে। একটা জিনিষ খুব খেয়াল করলাম যে, তুরষ্ক একটা মুসলমান দেশ, তার মধ্যে এখন রোজার মাস কিন্তু মেয়েদের কাপড় চোপরের স্টাইল একেবারেই ওয়েষ্টার্ন দেশের মতো। কিছুইতেই বুঝা যাচ্ছিলো না যে, এরা মুসল্মান কালচার ধারন করে।

কিছুক্ষন পর, আমাদের কানেক্টিং ফ্লাইট উড়ে চল্লো ট্রাবজনের উদ্দেশ্যে।

২৬/০৩/২০০২-মা আর নাই

জন্মঃ তারিখ জানা নাই

মৃত্যুঃ ১৮ মার্চ ২০০২, ১০ মোহররম, সোমবার

স্থান_ নতুন বাক্তার চর

সেনানীবাসের ৪৯/৪ ষ্টাফ রোডে আমার বাসা। আর্মি হেডকোয়ার্টারে মিলিটারী ট্রেনিং ডাইরেক্টরেটে আমি জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ হিসাবে কর্মরত আছি। প্রচুর কাজ থাকলেও এখানে একটা ভালো বিষয় হচ্ছে, অফিস আওয়ারের পর খুব বেশী একটা অফ টাইমে অফিসে যেতে হয় না। সাধারনত বিকালের দিকে বেশ ফ্রি থাকি। এই ফাকে আমি নিবাইস ইন্সটিটিউটে এমবিএ এর সন্ধ্যাকালীন কোর্ষে ভর্তি হয়েছি। আমার সাথে আমার কোর্ষমেট মেজর সালাম, মেজর জাবের, মেজর মাসুদ ইকবালও ভর্তি হয়েছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রোফেসর আব্দুল মান্নান নিবাইশ এর মালিক এবং তিনি কয়েকদিন আগেই সবেমাত্র নিবাইশ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি হিসাবে চাউ করেছেন। তিনি আমাদের পেয়ে বেশ উৎফুল্ল মনে হয় কারন আমরা ইতিমধ্যে তার নিবাইস ইন্সটিটিউটে একটা সারা জাগাতে পেরেছি। সপ্তাহে দুইদিন ক্লাস হয়। শুক্রবার আর শনিবার। তাই শুক্রবারটা আমার খুব ব্যস্ত সময় যায় দুটু কারনে, এক, নিবাইশে ক্লাস আর ২য় টা হচ্ছে- আমি প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার মাকে দেখার জন্য গ্রামে যাই।

মাকে ঢাকায় রাখতে চাইলেও মা ঢাকায় থাকতে সাচ্ছন্ধবোধ করেন না। যতোদিন আমার কাছে থাকেন, ভালোই লাগে, কিন্তু যখনই গ্রামে চলে যান, আমি প্রতি সপ্তাহে মাকে দেখার জন্য গ্রামে যাই। নিজের গাড়ি নাই তাই, সকাল বেলা একটা সিএনজি সারাদিনের জন্য ভাড়া করি, সরাসরি গ্রামে যাই, মায়ের সাথে এক বেলা সময় কাটাই, তারপর দুপুরে মায়ের সাথে খাওয়া দাওয়া করে বিকালে ওই একই সিএনজি নিয়ে সরাসরি নিবাইসে ঢোকি ক্লাসের জন্য। রাত ১০টা অবধি ক্লাস চলে। মায়ের সাথে আমার সময়টা কাটাতে বেশ লাগে। গ্রামে যখন হাজির হই, মা জানে আজ আমি যাবো, কিভাবে জানে জানি না। মাকে কখনো আগাম জানিয়ে আমি গ্রামে যাই না। যখনই সময় পাই, চলে যাই। মা আমার আসার কথা ভেবে, দুপুরে বেশ ভালো তরকারী আগে থেকেই রান্না করে রাখেন। আমি আর মা একসাথে খেতে বসি, কিন্তু মা খান না, আমার খাওয়া দেখেন আর সারাক্ষন আমার শরীরে হাত বুলাতে থাকেন। মাঝে মাঝে মাকে আমি প্রশ্ন করি, আচ্ছা মা, আমি কি এখন ছোট যে, তুমি এভাবে সারাক্ষন আমার পিঠে, মাথায়, মুখে হাত বুলিয়ে আদর করো যেনো আমি একটা ছোট বাচ্চা। মা কিছুই বলেন না, হাত বুলাতেই থাকেন, আমার ভালোই লাগে।

এবার গ্রামে গিয়েছিলাম মাকে দেখতে গত ৮ মার্চ ২০০২ তারিখে। বেলা তখন প্রায় ১১ টা বাজে। মাকে দেখলেই আমার প্রান জুড়িয়ে যায়, মন ভালো হয়ে যায়। অনেক গল্প হয় মার সাথে। গ্রামে ঘটে যাওয়া গত সাতদিনের সব খবর আমি মার কাছ থেকে পাই। গল্প করতে করতে দুপুর হয়ে যায়। কখনো কখনো দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর, আমি আর মা এক সাথে গল্প করার জন্য বাইরের বাতাসে আমাদের পুর্ব পাশে রান্না ঘরের বাইরে মাদুর নিয়ে বসি। এবারও তাই হলো। দুপুরটা বেশ সুন্দর কিন্তু রোদের তেজ এতো বেশি যে, ভাবলাম, একটু বেলা পড়ে গেলেই রওয়ানা হবো, ক্লাশ আছে। এই সময়টা মার সাথে গল্প করি। অন্যান্য বারের মতো মা আজো আমাকে তার মুখ থেকে চিবানো পান দিয়ে বল্লো, আগামী সপ্তাহে আবার কবে আসবা? বললাম, আমার তো মা, শুক্রবার ছাড়া আসা হয় না, সারা সপ্তাহ কাজ থাকে। কিন্তু এই আগামী সপ্তাহে ১৫ মার্চ শুক্রবারে মনে হয় আসতে পারবো না। কারন বগুড়া সেনানীবাসে একটা কনফিডেনশিয়াল চিঠি নিয়ে আমাকেই যেতে হবে। কিন্তু ১৫ তারিখের পর ১৮ মার্চ তারিখে আশুরার জন্য সোমবার ছুটি আছে, সেদিন ইনশাল্লাহ চলে আসবো।

মা, আমার খালী পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে একটু নীচু স্বরে কি যেনো বললেন, ভালো বুঝা গেলো না কিন্তু এটা যেনো স্পষ্ট শুনতে পেলাম যে, মা বললেন, ওইদিন আমাকে পাও কিনা, কে জানে?

আমি মায়ের দিকে তাকালাম। বললাম, মা তুমি কি বল্লা?

মা বল্লো, না তেমন কিছু না, তবে গত কয়েকদিন যাবত আমি তোমার বাবাকে বারবার স্বপ্ন দেখছি। তোর বাবা আমাকে বারবার তার সাথে দেখা করতে বলছে। আমিও জানি কেমন করে বলে দিলাম, আমি আসতেছি।

খুব অবাক হলাম মায়ের এরকম বিশ্বাস আর কনফিডেন্স দেখে। বললাম, আপনি কি এগুলি বিশ্বাস করেন? হতে পারে কোনো কারনে আপনার মন খারাপ ছিলো, একাকিত্ত থেকে মানুষ অনেক সময় তার আপনজনকে খুব মিস করা থেকে হয়তো এ ধরনের স্বপ্নের উদ্ভব হয়, তাই হয়ত বাবাকে মনে পড়ছে তোমার। এগুলি বিশ্বাস করা ঠিক না মা। আপনার কিছুই হবে না ইনশাল্লাহ।

মা কিছুই বললেন না বললেন, আমি যখন তোর বাবাকে খুব একটা সপ্নে দেখিনা, কিন্তু যখন সত্যি এমন কিছু আমার জানা দরকার অথচ আমি জানি না, সে রকম কিছু সময়ে আমি তোর বাবাকে সপ্নে দেখি। এটা আমার জীবনে অনেকবার ঘটেছে। সেটা আসলে স্বপ্ন নয়, সেটা আসলেই বাস্তব, হয়তো ব্যাপারটা সপ্নে ঘটে। কিন্তু ব্যাপারটা বাস্তব। মন খটকা লাগলো। মা সাধারনত এ রকমের কথা প্রায়শই বলেন না। কিন্তু যখন বলেন, আমি দেখেছি ব্যাপারটা সত্য হয়। যেমন, আমি যখন খুব গোপনে সবার অগোচরে আর্মিতে পরীক্ষা দিয়ে প্রায় চলে আসবো, ঠিক সে সময় মা কোথা থেকে প্রশ্ন করে বললেন, তুমি কি আমাদেরকে ছেড়ে এমন কোথাও যাচ্ছো যা আমরা কেউ জানি না? আমি অবাক হয়েছিলাম। মা জানলো কিভাবে? আমি মাকে উলটা প্রশ্ন করেছিলাম, কি বলো মা? মা তখন ঠিক আজকের মতো এ রকম কনফিডেন্স নিয়েই বলেছিলো, তোর বাবা সপ্নে আমাকে এ রকমই একটা মেসেজ দিলো যে, “তোর ছোট ছেলে তো কোথাও চলে যাচ্ছে, ওকে ঠেকাও”। যাই হোক, আমি চলে এলাম ঢাকায়। কাউকে কিছুই বলি নাই ব্যাপারটা নিয়ে। আমি আসলে ব্যাপারটা সিরিয়াসলী নেইও নাই।

মাকে নিয়ে আমি সবসময় টেনসনেই থাকি। মা ঝড়কে ভয় পায়, মা রাতে একাকী থাকতে ভয় পায়, মা তার কষ্টের কথা কাউকে বলতে ভয় পায়। মার সাথে আমার টানটা একদম নাড়ির সাথে। দেশে বর্তমানে মোবাইল সবেমাত্র চালূ হয়েছে। গ্রামীন একটা মোবাইল অনেক দাম দিয়ে হলেও কিনেছি। এর প্রধান লক্ষ্য ছিলো যে, মায়ের সাথে আমার যোগাযোগ রাখা। আমাদের পাশের গ্রামে একজন মহিলা আছেন যার নাম্বারে কল দিলে তিনি তার মোবাইলটা নিয়ে আমাদের বাড়িতে যায়, এবং আমি তখন মায়ের সাথে কথা বলতে পারি। যাই হোক, আমি আমার আগের পরিকল্পনা মাফিক, আমি আসলেই এবার শুক্রবারে ব্যস্ততার কারনে গ্রামে যেতে পারি নাই। তাই আগামী সোমবার আশুরার দিনে মাকে দেখতে যাবো এটাই ছিলো আমার পরিকল্পনা। কিন্তু সে দিনটা আর আমার জীবনেই আসে নাই যেখানে মাকে সত্যি সত্যিই জীবিত পাবো।

১৮ মার্চ ২০০২। আশুরা এবং সরকারী ছুটির দিন। সকাল ৯ টার দিকে গ্রামে যাবো মাকে দেখতে এটা ভেবেই গতকাল রাতে মোটামুটি প্রিপারেশন নিয়েছিলাম। বেলা যখন প্রায় সকাল ৮ টা। আমার পাশের বাসায় মেজর জামাল, এএসসি থাকেন। তিনি নক করলেন আমার বাসার দরজায়। ঘুমিয়ে ছিলাম, ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতে স্যার আমাকে জানালেন যে, আর্মি এক্সচেঞ্জ থেকে আমাকে কি একটা জরুরী মেসেজ দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু আমার ফোনের ক্রেডেলটা সম্ভবত ডিস্প্লেস অবস্থায় আছে, তাই এক্সচেঞ্জ ঢোকতে পারছে না। বললাম, কি ব্যাপারে জরুরি মেসেজ স্যার? ওরা কি কিছু বলেছে আপমাকে? তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। মনে খটকা লাগলো।

তাড়াতাড়ি ফোন করলাম আর্মি এক্সচেঞ্জে। আর্মি এক্সচেঞ্জ থেকে আমাকে জানালো যে, বাক্তার চর থেকে মোল্লা নামের এক ভদ্রলোক কি জানি একটা জরুরী মেসেজ দেওয়ার জন্য আমাকে আমার মোবাইল এবং ল্যান্ড লাইন ফোনে চেষ্টা করেছে কিন্তু পাচ্ছে না। আর্মির এক্সচেঞ্জে ফোন অপারেটরকে মোল্লা সাহেব একতা মোবাইল নাম্বার ও দিয়েছে। আমি আরো ঘাবড়ে গেলাম, মার কিছু হয় নাই তো? মোল্লা হচ্ছেন আমাদের ঘরের পাশে প্রতিবেশী। তাকে আমরা কাকা বলে সম্বোধন করি। আমাদের ঘরের সাথে উনার ঘর।

আমি আমার মোবাইল চেক করে দেখি যে, মোবাইল চার্জে দেওয়া ছিলো ঠিকই কিন্তু প্লাগটা অন করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই সারারাত চার্জ না হয়ে বরং চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষন চার্জ দিয়ে আমি গ্রামে মোল্লা কাকাকে ফোন করলাম। ফোনে যেটা উনি বললেন, তাতে আমার আরো সন্দেহ তৈরী হলো। মোল্লা কাকা বললেন যে, আমার মা খুবই অসুস্থ। তার অবস্থা ভালো না। আমি মোল্লা কাকাকে বললাম, কাকা, ঠিক কথাটা বলতে হবে। মা কি অসুস্থ্য নাকি মা আর নাই? আমি শক্ত মানুষ, আমাকে সত্যটা বলতে হবে কারন যদি মা অসুস্থ্য হন, তাহলে আমার গ্রামে যাওয়ার প্রিপারেশন এক রকম, আর যদি মা আর জীবিত না থাকেন, তাহলে আমার প্রিপারেশন অন্য রকম। আমাকে সত্যিটা বলেন।

এবার মোল্লা কাকা বললেন যে, দাদী মারা গেছেন। তুমি আসো।

আমার সারা শরীর কেপে উঠলো। আমার সেদিনের মায়ের কথাগুলি একদম স্পষ্ট মনে পড়লো যখন মা আমাকে বলেছিলেন যে, মাকে আমি আর জীবিত দেখতে পাই কিনা সন্দেহ আছে। কারন, বাবা নাকি মাকে যেতে বলেছেন। তখন কথাটা একেবারেই আমলে নেই নাই, কিন্তু কথাটা কতটা সত্য ছিলো সেটা আজ যেনো আমার কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে উঠলো। আমি দ্রুত মিটুলকে বললাম, মা আর নাই। আমরা দুজনেই হত বিহব্বল হয়ে গেলাম এই আচমকা শোকে। আমি মিটুলকে তাড়াতাড়ি রেডি হতে বললাম। গ্রামে যেতে হবে।

নিজের কোনো গাড়ি নাই। সেদিন আবার সোমবার। সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী সোমবারে গাড়ির লে অফ অর্থাৎ জরুরী এডমিন কাজ ব্যতিত কিংবা ট্রেনিং সঙ্ক্রান্ত কোনো জরুরী বিষয় না হলে আর্মির কোনো গাড়িই সেনানীবাস থেকে বের করার বিধান নাই। মায়ের এ রকম অসময়ের মৃত্যুর কথায় আমার নিজের মাথাও ঠিকমতো কাজ করছিলো না। কোথা থেকে একটা গাড়ি পাওয়া যায় সেটা ভাবতে লাগলাম। হটাত মনে হলো যে, পাশেই মেজর খিজির স্যার (ইএমই) ওয়ার্কশপের ওসি। আমরা এক সাথে হাইতিতে মিশন করেছি। উনাকে বলে দেখি কোনো সাহাজ্য পাই কিনা। যেই আমি মেজর খিজির স্যারকে ব্যাপারটা খুলে বললাম, তিনি ওয়ার্কশপ থেকে একটা ভালো গাড়ি আমাকে দিয়ে বললেন, আগে যাও মাকে দেখার জন্য, পরে দেখা যাবে আইনে কি বলে। গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেলে আমি দ্রুত গোসলে ঢোকি।

কদিন আগে আমি মায়ের একটা ডে লং ভিডিও করেছিলাম। সেখানে আমি মাকে অনেক প্রশ্ন করে করে মায়ের মনের ভিতরের কথা জানার চেষ্টা করেছিলাম। আমি মাকে তার ছোট বেলার কথা, মার সাথে বাবার প্রেমের কথা, মার বিয়ের পর তার শসুর বাড়ির কথা, বাবার মৃত্যুর পর মার মনের কথা, তারপর আমাদের কথা, তার কোন ছেলেমেয়ে তার কাছে কোন পর্যায়ে আছে তার অনেক খবর আমি জানার চেষ্টা করেছিলাম। সেদিন ভিডিও করার সময় আমি মাকে এই প্রশ্নটাও করেছিলাম, যে, মার শেষ ইচ্ছা কি। তার মৃত্যুর পর তিনি কোথায় সমাহিত হতে চান, ইত্যাদি। মায়ের এই তথ্যগুলি আমি এম্নিতেই জানতে চেয়েছিলাম। ভিডিও করার সময় মা কখনো হাসতে হাসতে বিগলিত হয়ে গেছেন আবার কখনো কখনো কষ্টের কথাগুলি বলার সময় তার দুই চোখ দিয়ে অবিরত জল পড়েছিলো। আমি মাকে না হাসায় না কাদায় কোনো বাধা দিয়েছিলাম। বলুক মা।

আজ মাকে কোথায় সমাহিত করতে হবে এই তথ্যটা আমার মাথায় যেনো আসছেই না। এদিকে গ্রাম থেকে বারবার ফোন আসছিলো মাকে কোথায় সমাহিত করা হবে সেটা জানার জন্য। কারন কবর করতে হবে। জায়গাটা না বললে কাজে কেউ হাত দিতে পারছে না। আমি ওয়াসরুমে মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালতে ঢালতে বারবার মনে করার চেষ্টা করছিলাম মায়ের শেষ সমাহিত হবার ইচ্ছেটার কথা। কিন্তু আমার মাথা কিছুতেই আমাকে সাহাজ্য করছিলো না। গোসল শেষ করে আমি ফজরের কাজা নামাজটা পড়তে পড়তে হটাত মনে হলো, হ্যা, মনে পরেছে এবার। আল্লাহই আমাকে মায়ের শেষ ইচ্ছেটা স্মরণে আনতে সাহাজ্য করেছেন। মা বলেছিলেন যে, তিনি তার একমাত্র বোন আমার খালার কবরের পাশে যেনো সমাহিত করি। আমার খালা ছিলো একাধারে আমার মায়ের মার মতো, দিদির মতো, তার একটা বন্ধুর মতো। আমি নামাজ পড়েই মোল্লা কাকাকে ফোন করে বললাম, আমি দ্রুতই গ্রামে আসতেছি, আর মায়ের কবরট যেনো হয় আমার খালার কবরের পাশে। এটা মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিলো।

আমি রওয়ানা হয়ে গেলাম গ্রামের উদ্দেশ্যে। অন্য সবসময় যাই, মাকে জীবিত দেখার জন্য, আর আজ যাচ্ছি মাকে সমাহিত করার জন্য। মনটা বড় কষ্টে আছে। সারাক্ষন মার জন্য তাসবিহ পড়ছি, আর মার জন্য দোয়া করছি। একসময় ভাবলাম, আমি কি ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করবো নাকি মাকে সমাহিত করবো? ভাইয়াকে ফোন করলাম। পেলাম না। তার ফোন এনসারিং মেশিনে দেওয়া। ভাইয়া আমেরিকায় থাকেন। ভাবলাম, ভাইয়া আমাকে ফোনব্যাক করবেন নিশ্চয়ই। আমি যখন ভাইয়াকে ফোন করেছি, তখন আমেরিকায় রাত বেশী না, হয়তো ১০ টা বাজে। এই সময় ভাইয়ার কল ধরার কথা। ভাইয়া কল না ধরার কারনে আমি আমার জেঠস যিনি আমেরিকায় থাকেন, শেলি আপা, তাকে ফোন করে বললাম যে, আমার মায়ের মৃত্যুর খবরটা যে করেই হোক ভাইয়াকে জানান।

আমি গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম যখন তখন বেলা প্রায় ১১ টা সকাল। অনেক লোকের সমাগম। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকেই লোকজন এসেছে। মা শুয়ে আছেন একটা নামাজী পাটির মধ্যে কাত হয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে মা মারা গেলেন। নুরুন্নাহার আমাকে যেটা বলল তার সার্মর্ম এ রকম যেঃ

মা ফজর নামাজের সময় নামাজে ছিলেন। নামাজের মধ্যেই মা মারা গেছেন। আর উঠেন নাই। নুরুন্নাহার মনে করেছিলো, যে, মা মনে হয় নামাজ পরার পর এম্নিতেই নামাজের পাটিতে শুয়ে আছেন। কিন্তু সকাল ৭টা অবধি যখন মা আর পাটি থেকে উঠছেন না, তখন নুরুন্নাহার মাকে জাগাতে গিয়ে দেখে যে, মার কোনো শ্বাস চলছে না। এরপরেই নুরুন্নাহার পাশের বাসার মোল্লা কাকাকে ব্যাপারটা জানায়।

আমি মায়ের শান্ত বডিটাকে কয়েকবার নাড়া দিয়ে মা বলে ডাকলাম, কানের কাছে গিয়েও ডাকলাম। মা কোনো উত্তর করলেন না। আমি মার হাতের পালস চেক করলাম, তখনো মনে হচ্ছে শরীরটা গরম, ঠান্ডা হয়ে যায় নাই। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো মা নাই। সন্দেহ হলো একবার যে, মা কি আসলেই নাই নাকি ক্লিনিক্যালী কোনো এক অবস্থায় আছেন? আমাদের বাড়িতে পাশেই একজন ডাক্তার ছিলেন। তাকে বললাম, ভালো করে একটু দেখবেন মার অবস্থাটা কি? ডাক্তার সাহেব আমাকে টেনে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে বললেন, আখতার ভাই, খালাম্মা আর বেচে নেই। আমি অনেকভাবেই চেক করে দেখেছি। আপনি ঠান্ডা হোন। এখন খালাম্মাকে সমাহিত করার যাবতীয় ব্যবস্থা নিন। জানি আপনার কষ্ট হচ্ছে কিন্তু এটাই বাস্তবতা যে, খালাম্মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

আমার অন্যান্য বোনেরা, মায়ের নায়-নাতকোরগন অনেকেই বিলাপ করে কাদছেন। কিন্তু আমি কাদতে পারছি না। কেনো যেনো আমার কান্নাই পাচ্ছে না। আমি খুব সাভাবিকভাবেই মাকে সমাহিত করার জন্য গোসলের ব্যবস্থা করতে বললাম, কবরের জন্য লোক লাগিয়ে দিলাম। আমার বোন ফাতেমা আর আরেকজন মিলে মাকে গোসল করিয়ে দিল। গোসলের সময়ও আমি কয়েকবার তদন্ত করেছি মা কোন প্রকার নড়াচড়া করেন কিনা। আমার বারবার মনে হচ্ছিলো মা মারা যান নাই। এ রকম সুন্দর একটা নিষ্পাপ মুখ, শান্ত আর সাভাবিক চেহারা যাকে দেখলে মনে হবে তিনি ঘুমিয়ে আছেন। মার চেহাড়াটা আগের থেকে অনেক উজ্জ্বল। মার এই রকম সুন্দর চেহারা আমি কখনই দেখি নাই। গোসলের পর মাকে কাপড় পরানো হবে, আমি আবার মাকে জোরেই ডাক দিলাম। কিন্তু মা আমার ডাকে কোনো সারা দিলেন না। মাকে কাপড় পরানো হলো। সাদা দাফনের কাপড়। মাকে জানাজা পরানো হবে, অনেক লোক অপেক্ষায় আছেন। মাকে জানাজার স্থানে আনা হলো। আমি আবার ওই অবস্থাতেই মাকে ডাকলাম। যদি আবার মা নড়েচড়ে উঠে! এ সময় মোল্লা কাকা আমাকে ধরে বললেন, কাকু, তুমি অস্থির হইও না। দাদি আসলেই মারা গেছেন। তুমি খালি দোয়া করো। তোমাকে দাদি অনেক ভালবাসতো আর ভরষা করতো। তুমি এমন করলে উনি তো আরো কষ্ট পাবেন!!

জানাজা পরানো হয়ে গেল। আমি তখনো ভাইয়ার একটা ফোনকলের জন্য অপেক্ষা করছি, যদি ভাইয়া আমাকে ফোন করেন। ভাইয়াকে আবারো আমার মোবাইল থেকে ফোন করলাম, কিন্তু এবার ভাইয়ার ফোন আর এনসারিং মেশিনে ছিলো না। রিং হচ্ছিলো। কিন্তু যে কোনো কারনেই হোক, ভাইয়া ফোনটা ধরলেন না। আমি আবার শেলী আপাকে ফোন করলাম যদি এরই মধ্যে শেলী আপার সাথে ভাইয়ার কোনো কথা হয়ে থাকে আর ভাইয়া মার মৃত্যুর খবরটা জেনে থাকে সেটা জানার জন্য। শেলী আপা ফোন ধরলেন। আর আমাকে জানালেন যে, ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে। মার মৃত্যুর সংবাদ ভাইয়াকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ভাইয়া নাকি বলেছেন, উনি আসতে পারবেন না। খুব বিরক্ত হয়েছিলাম এমন একটা খবরে। ভাইয়ার উপর আমার শ্রদ্ধাবোধটা নিমিষেই শুন্যের কোঠায় চলে এলো। ভাবলাম, আজ যদি উনি শুনতেন যে, উনার শাসুড়ি মারা গেছেন, হয়তো ঠিকই চলে আসতেন।

কাউকে কিছু বললাম না। জানাজার পর মাকে কবরে সমাহিত করা হবে। আমি সবার উদ্দেশ্যে একটা এনাউন্সমেন্ট করলাম যে, আমার মা আজ চলে যাচ্ছেন, কিন্তু আমি রয়ে গেছি মার ছেলে। যদি কখনো আমার মা কাউকে জানা বা অজানা মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, তাহলে যেনো কেউ তার দাবী না রাখেন। মাকে মাফ করে দিবেন। আর যদি কেউ মার কাছ থেকে কোনো পাওনা থাকে, নির্ধিধায় আমাকে জানাবেন, আমি কোনো প্রকার ভেরিফাই করবো না, আমি মায়ের সব দেনা শোধ করে দেবো। আর যদি মা কারো কাছ থেকে কিছু পাবেন বলে জানেন, আজ আমি তার ছেলে হিসাবে সবকিছু মাফ করে দিলাম। শুধু আমার মার জন্য আপ্নারা খাস মনে দোয়া করবেন।

আমরা সবাই মাকে কাধে করে কবরের কাছে নিয়ে গেলাম। আমার এখনো মন মানছে না যে, মা নাই। মাকে যে আমি সত্যি সত্যিই গোরস্থানে সমাহিত করতে যাচ্ছি এটা বিশ্বাসই করতে পারছি না। কবরে শোয়ানোর ঠিক আগমুহুর্তেও আমি মাকে জোরে আরেকবার ডাক দিলাম। কিন্তু মা তো আমার কথা নিশ্চয়ই শুনছেন কিন্তু কোনো সাড়া দিলেন না। খালার কবরের পাশেই মাকে সমাহিত করা হল।

বেলা তখন প্রায় ৩টা যখন সমস্ত আয়োজন শেষ হয়। মাকে কবর দেয়া হয়ে গেছে। আমি বাড়িতে সব বোনদেরকে নিয়া একসাথে বসলাম। সবার মন খারাপ। কেউ কেউ তখনো কাদছে। আমার চোখে এক ফোটা পানিও নাই। যেনো কিছুই হয় নাই। বিকাল হয়ে গেছে। আর্মির গাড়ি নিয়ে এসেছি, আমাকে আবার সন্ধ্যার আগেই ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। গাড়িটা পার্ক করা আছে প্রায় ১ মাইল দূরে। আমাদের বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি আসে না তাই। আমার যাওয়ার সময় হয়ে এলো। আমি মিটুলকে বললাম, চলো, ঢাকায় যেতে হবে। আমি আগে আগে হাটছি, মিটুলও বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। আমি হাটতে হাটতে প্রায় ৩০০ গজ যাওয়ার পর ভিতর থেকে এতো কষ্ট আর কান্না আসছিলো যে, আমি আর একটি পাও আগাইতে পারছিলাম না।

প্রতিবার যখন আমি গ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই, আমার মা বাড়ির পিছনে বসে থাকেন যতোক্ষন আমাকে দেখা যায়। আমি মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকাই আর দেখি, মা বসে আছেন, হাত নাড়েন। আমিও হাত নাড়ি। মাকে ফেলে যেতে আমার সবসময় মনে কষ্ট হতো। কিন্তু আজকে আমার মনে বারবার এই ভাবনাটাই আসছে, আজ মা বাড়ির পিছনে বসে নাই, আমি পিছন ফিরে তাকাই, মা নাই। আমার গলা ফাটিয়ে কাদতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু আমার গলা দিয়ে একটু আওয়াজও বের হলো না। আমার চোখ জলে এতোটাই ভরে উঠছিলো যে, আমি এক হাত দূরের রাস্তাটাও দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি বসে গেলাম বিস্তর খালী জমিনে। আমার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিলো। মা আমাকে আজ আর দেখছে না। আমাকে খালী জমিনের উপর বসে পড়তে দেখে আমার বাড়ি থেকে কয়েকজন দৌড়ে এলো। মিটুলও এলো। আমার চোখের পানিতে আমি কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার শরিরে কোন শক্তি ছিলো না উঠে বসবার। বুঝলাম, এতোক্ষন যে কষ্টটা আমার বুকের ভিতর শক্ত হয়ে চেপেছিলো, এখন সবগুলি কষ্ট আমাকে চারিদিক থেকে এমন করে ঝাপটে ধরেছে যে, আমার চোখ, আমার কন্ঠ, আমার পা, আমার হাত, আমার মাথা, আমার কান কোনোটাই আর সাভাবিক অবস্থায় নাই। আমি কতোক্ষন চুপ করে বসেছিলাম, আমার মনে নাই।

শক্তি নাই ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কিন্তু আমাকে তো ফিরতেই হবে। মা নাই, কোথায় ফিরে যাবো? এখন এই শুন্যঘরে গিয়ে তো মাকে পাবো না, মায়ের চিবানো পান খাওয়ার আর আমার হলো না। মা বাবার সাথে দেখা করার জন্য চলে গেছেন। আজ হয়তো বাবা অনেক খুসী তার সেই প্রায় ৩০ বছর আগে একা ফেলে যাওয়া প্রেয়সীকে কাছে পেয়ে।

ঢাকায় ফিরতে ফিরতে আমার প্রায় রাত ৮টা বেজে গেলো। মেজর খিজির আমাকে ফোন করে শুধু বললেন যে, খালাম্মার জন্য দোয়া করো। তিনি জান্নাতবাসি হয়েছেন। তিনি আল্লাহ্‌র পাটিতে বসেই জান্নাতে চলে গেছেন, এর থেকে পুন্যের কি হতে পারে? খিজির স্যারকে আমি কখনো তার এই দয়ার ঋণ শোধ করতে পারবো না।

ঢাকায় এসে আমি আমার কম্পিউটারটা খুললাম। মার সেদিনকার ভিডিওটা অন করলাম, উফ, এই তো মা ঠিক আমার সামনেই। তিনি কখনো হাসছেন, কখনো কাদছেন, কখনো আমার দিকে তাকিয়েই আছেন। অনেক রাত অবধি আমি আমার মার ভিডিও টা কয়েকবার আগে পিছে টেনে আবার রিওয়াইন্ড করে করে দেখলাম। অনেক রাত, চারিদিকে শুনশান নীরবতা। কেবল আমার মনের ভিতরেই অত্যান্ত প্রবল আর্তনাদ আমার বন্ধ কবাটির ভিতরে ঘুরপাক খাইতে লাগলো। আমি স্তব্দ তপতীর মতো আমার চেয়ারে ঠেস দিয়া শুধু সেলোলয়েড ফ্রেমে বাধা জীবন্ত মাকে দেখতে লাগলাম বটে কিন্তু মা আমার এখন ঈশ্বরের একদম কাছে চলে গেছে। এখন তার আর ঝড়কে ভয় পাবার কোনো কারন নাই, একা থাকার ভয় নাই, পৃথিবীর কোনো মায়া, কোনো কষ্ট, বা কোনো সুখের প্রভাব নাই। 

সাতদিন পর আমার বড় ভাই আমাকে একটা মেইল করলেনঃ মেইলটা আমি হুবহু আজ এখানেই তুলে দিলাম।

To: Mohammad Akhtar Hossain <makhtar@dotbd.com>
From: “Mohamed Habibullah” <M.HABIBULLAH@neu.edu>
Subject:
MIME-Version: 1.0
Date: Mon, 25 Mar 2002 13:10:31 -0500
Message-ID: <OFF893F0BA.F371BA0B-ON85256B87.0063D6FA@neu.edu>
X-MIMETrack: Serialize by Router on HUB02/Server/NEU(Release 5.07a |May 14, 2001) at 03/25/2002
01:10:51 PM
Content-type: text/plain; charset=us-ascii
Status:
Monday USA time 1:00 P.M.

Dear Akhtar

I just recieved your e-mail. Also.Today, I received a call from Shelly Apa and came to know that Ma died (Inna lillahe wa inna ilaihe rajeoon). I will miss Ma from now on. May Allah keep her in peace in the grave. I know I could not come to see her off. PLease let me know where you buried her. Let me also know everything anout everybody including Badir Bhai, Laila, Fatema and Meherunnesa. Take care.

কি প্রয়োজন এই সব সন্তানের জন্য যাদের হাতে তার জন্মদাত্রী মায়ের মৃত্যুতেও শেষকৃত্য করার জন্য হাতে সময় থাকে না? সম্পর্কের থেকে বেশী যখন নিজের সম্পদের দাম বেড়ে যায়, নিজের জন্মদাত্রির শেষকৃত্য করার জন্য যখন কোনো সন্তানের সময় থাকে না, আল্লাহ বা ঈশ্বর কিংবা ভগবান এইসব কিছুর একটা রেকর্ড রাখেন যাতে কোনো এক সময় যখন তাদের শেষকৃত্য হবে, হয়তো তাদের বেলাতেও এটাই রিপিট হয়। তবে আমি দোয়া করি যেনো, আমার কোন বংশধর অথবা আত্তীয়ের বেলায় এ রকমের শুন্যতা না আসে।

প্রিয় আখতার,

এইমাত্র আমি তোর চিঠি পেলাম। আজকে আমি শেলী আপারও টেলিফোন কল পেয়েছি এবং জানতে পারলাম যে, মা মারা গেছেন (ইন্না নিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহির রাজেউন)। আমি মাকে এখন থেকে অনেক মিস করবো। দোয়া করি আল্লাহ মাকে জান্নাতবাসী করুন। আমি জানি, মার মৃত্যুতে আমি মাকে দেখতে আসতে পারবো না। আমাকে জানাস মাকে কোথায় করব দিলি। বদির ভাই, লায়লা, মেহের এবং ফাতেমাদের সম্পর্কেও আমাকে বিস্তারীত জানাইস। নিজের যত্ন নিস।

১২/১২/২০০০-প্রিয় মেজর নিজান স্যার,

প্রিয় নিজান স্যার,

আমার অন্তরস্থলের গভীর তলদেশ থেকে আপনার প্রতি আমার পরম শ্রদ্ধ্যা। আমার এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি আমার বর্তমান পোষ্টিং আদেশটি সাইন করার জন্য। আজকের এই পোষ্টিং আদেশটির চেয়ে আর কোনো ভালো খবর আমার আর নাই। এই পষ্টিং তা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য খুবই দরকার এবং প্রয়োজন ছিলো। এটা আমাকে এবং আমার পরিবারের জন্য অবশ্যই একতা অতীব সুখবর ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আবারো আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এবং আমার আন্তরীক শুভেচ্ছা জানাই। ইনশাল্লাহ দেখা হবে ঢাকায় আর্মি হেড কোয়ার্টারে।

আল্লাহ আমাদের সবার হহায় হোন।

ইতি

মেজর আখতার

ছাত্র অফিসার

ওজি এস সি-এ ডি-২

আঋলারী সেন্টার এন্ড স্কুল, চট্টগ্রাম

12/12/2000-Dear Major Nizan Sir,

My heartiest respect to you. I must and must thank you from my side and on behalf of my family too for the posting order you signed. Nothing was better news than that of my posting order today. This is really going to help my family, I told you earlier sir. Again I express my sincere gratefulness to you. I will be meeting you soon at AHQ, Dhaka insshaallah.

May Allah help us all.

Maj Akhtar Hossain

OGSC (AD) –2

Arty Center and School

Halishahar

১২/১২/২০০০-প্রিয় কর্নেলস

আসসালামুয়ালাইকুম। আশা করি আপ্নারা সবাই ভালো আছেন, আর সেই সাথে রইলো আমার আসন্ন ঈদের শুভেচ্ছা। আমার পক্ষ থেকে আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সবাইকে আমার প্রান ঢালাশ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা রইলো। আমি আমার গানারী কোর্ষ-এডি করার সময় আপনাদের উপস্থিতি আমি এখনো তাজা মনে অনুভব করি এবং সত্যি বলতে কি, আমি বগুড়ায় জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ (অপারেশন) এর দায়িত্তে থাকা কালীন আপনাদের সাথে কাতানো সময় তা এখন খুব মিস করি। সেটা ছিলো একতা অদ্ভুদ চমৎকার সময় আমার জীবনে।

স্যার, আপ্নারা শুনে হয়তো খুব খুশী হবেন যে, আমি আমার অফিসার্স গানারী ষ্টাফ কোর্ষ-২ (এয়ার ডিফেন্স) খুব সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেছি। এবং আগামীকাল আমি ঈদের ছুটি শেষে পুনরায় আমার নতুন কর্মস্থল আর্মি হেড কোয়ার্টারস এর মিলিটারী ট্রেনিং ডিপার্ট মেন্টে জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ (মিলিটারী ট্রেনিং) এ যোগদান করতে যাচ্ছি।  আমি আপনাদের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ যে, প্রাথমিক ভাবে এই অফিসার গানারী কোর্ষের নির্বাচনী পরীক্ষায় আপ্নারা আমাকে এক মাসের পূর্ন ছুটি দিয়ে যে সাহাজ্য করেছে, তা আসলেই ভুলার মতো নয়। এবং আপনাদের এই সাহাজ্য না পেলে আমার জন্য এতা সত্যি বাস্তবায়ন করা সমভব হতো না। আপ্নারা সবাই জানেন যে, একজন জেনারেল ষ্টাফ অফিসার -২ (অপারেশন) এর কতটুকু গুরু দায়িত্ত থাকে এবং কি পরিমান ওয়ার্ক লোড থাকে।

স্যার, আমি আশা করি, আর্মিতে সবার আগে আমার করা ইন্ট্রানেট ফেসিলিটি নিসচয়ই আপ্নারা উপভোগ করছেন। আমি জানি না, এই মুহুর্তে উক্ত ইন্ট্রানেট প্রোজেক্ট তা কেমন চলছে তবে আমি গর্বের সাথে বলতে পারি যে, যদি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া আমাকে এই কাজে সর্বাত্তক সাহাজ্য না করতেন, তাহলে এই প্রোজেক্ট কোনোভাবেই দাড় করানো সম্ভব হতো না। আজ হয়তো অনেকেই এর মাহাত্য বুঝবে না বা জানছে না, ফলে অনেকেই এর সুফল ভোগ করতে পারছে না স্রেফ এটা না বুঝার কারনে কিন্তু আজ অন্তত ডিভিশনের সবাই জানে ইন্টারনেট কি এবং ইন্ট্রানেট কি। একদিন হয়তো তারা এতার মাহাত্য এবং সুফল কি বুঝতে পারবে এবং তখন হয়তো আজকে আমার করা এই প্রোজেক্ট সবার কাছে একতা প্রশংসার দাবী রাখবে। তখন তারা হয়তো বুঝবে যে, ইনফর্মেশ হাই ওয়ে ছাড়া আসলে জীবন প্রায় অচল।

স্যার আমার জন্যে দোয়া করবেন। স্যার শুনে খুশী হবেন যে, আমার আরো একটি চমৎকার মেয়ে হয়েছে। ওর বয়স এখন দুই মাস। আপ্নারা ভালো থাকবেন। আমার আবারো শুভেচ্ছা এবং শ্রদ্ধ্যা রইলো।

মেজর আখতার

ছাত্র অফিসার

ও জি এস সি- (এ ডি-২)

হালি শহর, চট্টগ্রাম 

Dear Cols,

Assalamualaikum. I wish you a very good Eid Mubarok and happy New Year 2001. Our best regards and respect to you and your family. I often remembered you during my course ‘Officers’ Gunnery Staff Course (OGSC), Air Defense –2’. Sir I really had a very good time with you at Bogra while serving at the Div HQ.

Sir, you will be certainly happy to know that I have just completed my OGSC (AD) –2. Right day after tomorrow we all will be leaving the Artillery School. I will be joining at my new working place (AHQ, MT Dte as GSO-2) right after Eid vacation. Sir, I just wanted to say my deep thanks to you for all types of blessings that I received from you. I just can remember fresh that you gave me complete one-month leave for my preparation. Without that period, it would not be possible to qualify in the entrance test. And you are certainly aware of the load of GSO-2 (Ops). My family and I will remember your kindness.

Sir I hope you are enjoying the Internet facility at Bogra. I don’t know what is the condition of our Local Intranet System but I can proudly boast that if Brig. Gen. Ikbal Karim Bhuiyan and you would not be there, it would not be possible. May be as on today mass people are not yet habituated or dependent on the Information Technology (IT) system, that’s why the project could not get the required speed and cooperation from many users but at least our divisional officers’ came to know, there is something called Intranet and people can interact each other using this Information Super Highway.

Sir, pray for me and for my family. Sir I have been blessed with a beautiful daughter. She is my second daughter. She is two months old now.

My best regards to Madam and your family. Eid Mubarok.

                                                            Maj Mohammad Akhtar Hossain, psc

Student Officer

OGSC- (AD) –2

Halishahar, Chittagong

December 2000

To:

Col Mollah

Col Azim

Col Hasan Shorawardi

২৫/০৪/২০০০-মৃত্যুর সপ্নদেখা

মঙ্গলবার, রাত ১০টা, হালিশহর-

গত ২২ তারিখে সম্ভবত দুপুর বেলা অথবা ২৩ তারিখ দুপুর বেলায় আমি আমার মৃত্যুকে স্বপ্নে দেখেছি। মাঝে মাঝেই আমি আমার মৃত্যুকে একদম সামনে থেকে সরাসরি স্বপ্নে দেখি। সবগুলি সপ্নের দিন তারিখ আমার মনে নাই কিন্তু প্রায় একই রকমের স্বপ্ন আমি প্রায়ই দেখি আর সেটা হচ্ছে আমার মৃত্যুর স্বপ্ন। 

স্বপ্নে দেখলাম, আমি লাশ হয়ে শুইয়ে আছি।আমার জানাজা হচ্ছে। জানাজার মধ্যে যারা হাজির তাদের আমি কাউকেই চিনি না কিন্তু তাদের জন্য আমি অসস্থি বোধ করছি না। আমার শুধু মনে হলো লিখনের আব্বার কথা যিনি এই কয়দিন আগে মারা গেছেন। লিখনের আব্বা আমার স্ত্রীর বড় ভাই। আমার মনে হলো, অনেকবার শুনেছিলাম যে, লাশ নাকি অনেক জোরে জোরে সবাইকে ডাকে কিন্তু কেউ তার সেই ডাক শুনতে পায় না। স্বপ্নে আমার তাই মনে হলো যে, আমি ডাকছি কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতেই পাচ্ছে না। আমার বেশ ভয় লেগেছিলো। আমার কাছে মনে হয়েছে, হ্যা আমি মারা গিয়েছি সেটা সত্য। আমার মরতে খুব ভয় লাগে। 

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তখন দুপুর। লাঞ্চ খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সম্ভবত গতকালের সেমিনারের মানসিক চাপে অনেক ক্লান্ত ছিলাম, তাই খুব গভীর ঘুমে আবোল তাবোল স্বপ্ন দেখেছি। আমি অবশ্য আমার সপ্নগুলিকে কখনো আবোল তাবোল মনে করি না। এর কিছু ব্যাখ্যা দাড় করানোর চেস্টা করি। 

একটা সময়তো আসবেই যখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব মৃত্যুই আমাকে দেখা দিবে এবং তখন আমি আর কাউকে কিছুই জানাতে পারবো না। কারন মৃত্যু যখন আমাকে আলিঙ্গন করবে তখন অন্য কারো সাথে আমার কথা বলা হয়ে যাবে নিষিদ্ধ কোনো এক নীতি। সেখানে আমি পরাজিত এক সৈনিক নই, সেখানে আমি ভিন দেশি কোন প্রিজনার। 

০২/০৪/২০০০-তুমি কিসের নেশায় আমার কাছে

হালিশহর, আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুল

তুমি কিসের নেশায় আমার কাছে ছুটে এসেছিলে? আমি ই বা কিসের নেশায় এমন লোভনীয়তায় পড়ে তোমার কাছে এই রকম পাগলের মতো দিকবিদিক জ্ঞ্যান হারিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম।

পৃথিবীতে স্বার্থ ছাড়া কেউ কোনো কাজ করে না। আজ যে শিশুর জন্ম হয়েছে, যার বোধ শক্তিকে আমরা শুন্য মনে করছি, যার কোনো কিছুই বুঝবার ক্ষমতা নাই, তারও কোনো আরামে ব্যাঘাত ঘটলে নিঃস্বার্থভাবে নির্মম কান্নায় সে প্রতিবাদ করে। প্রকৃতি যখন এই রকমই , সেখানে আমাদের একে অপরের প্রতি ছুটে আসবার কারন নিশ্চয় নিছক পরোপোকার নয়। একে আজ কেউ তাকে রোমান্টিক নামে, ভালোবাসার অনেক নামে নামাঙ্কিত করেছে। কিন্তু এই ভালোবাসার পিছনে কি কোনো ক্ষত বিক্ষতের ইতিহাস বা বোধ নাই? একজন খুনী কি ভালবাসে না? বাসে। সেও তার প্রিয়জনকে ভালোবাসে, নিজেকে ভালোবাসে। তাহলে তো খুনী আর ভালোবাসার মানুষের মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নাই। খুব সুক্ষ একটা লাইন মাত্র। 

কেউ ভালোবেসে খুন করে, কেউ ভালোবাসায় খুন হয়। কেউ খুন করে নিজকে আবার কেউ খুন করে অন্যকে। প্রকাশ্য দিবালোকে খুন যে করে তাকেই আমরা দেখি, অথচ প্রতিদিন প্রতিক্ষনে আনাচে কানাচে কত খুন খারাবি হচ্ছে চেতনায়, অচেতনায় তাকে আমরা কতটুকু দেখি? অথচ তার সংখ্যাটাই বেশি।

কি এমন ছিলো তোমাতে? রুপ? যৌবন? অহমিকা? ধন সম্পদ? পৃথিবীতে কি তোমার থেকে রুপবতী আর কেউ নাই যে তোমার কাছেই আমাকে এই রকম হন্যে হয়ে হুমড়ি খেয়ে যেতে হবে? তোমার থেকে কি আর কেউ রপবতী ছিলো না? তাহলে? তাহলে আমি কি তোমার অহমিকাকে ভেঙ্গে চুরমার করার জন্যই নেশায় পড়েছিলাম? তাও না। ধন সম্পদ? সেটা তুমি চিরকাল জানো যে, ওইসব ধন সম্পদের উপর আমার কখনো কোনো লোভ ছিলো না। দেখো , তারপরেও ঘটনা ঘটেছে, আমি পাগল হয়েছি, আমি নেশায় পড়েছি। হয়ত, তুমি তোমার মতই আর হয়ত তোমার মতো আর কেহ নাই বলেই তুমি ইউনিক।  তাই হয়ত বারবার ফিরে এসেছি তোমার কাছে। 

সবচেয়ে বড় কথা হলো, তোমারও যেমন পরাজয় হয় নাই, আমারো জয় হবার মতো তেমন কিছু আমি দেখিনি। সেই একই গীত যা পুরান আমল থেকেই বেজে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও বাজবে। হয়ত সুরের কিছু পরিবর্তন আর প্রলয়ের কিছু উচ্ছ্বাস থাকবে তাদের নতুন উপদানের অংশ। তাতে কি কোনো পার্থক্য হয়? 

হয় না। 

২২/০৩/২০০০-আমি দাড়িয়েছিলাম কিছুক্ষন বারান্দায়।

হালিশহর মেস, বুধবার, সময়-১৯২৫ ঘন্টা।

আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুল, হালিশহর। …

আমি দাড়িয়েছিলাম কিছুক্ষন বারান্দায়। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো তখন। তিনতলা থেকে অনেকদূর পর্যন্ত শহরের আলো দেখা যাচ্ছিলো। বেশ দূর থেকে চট্টগ্রাম শহর থেকে ট্রেনের হুইশেলের আওয়াজ শুনা যাচ্ছিলো। আর্টিলারি মেস হালিশহর, প্রায় ১০/১২ কিলোমিটার দুরে। তারপরেও এখান থেকেই যেনো বুঝতে পারছিলাম ট্রেন প্রায় ছাড়বে ছাড়বে। লোকজন নিশ্চয় খুব ব্যস্ত এখন, কেউ প্লাটফর্মে, কেউ কামড়ার ভিতরে। কেউ হয়ত তার প্রিয়জনকে বিদায় দিতে এসে চোখের জল মুছছে, আবার কেউ হয়ত এই শহর ছেড়ে যেতে পারলেই বাচি বলে চোখ বুজে আছে। দুনিয়া বড় আজব।

আমাদের আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুলের রাস্তা দিয়ে দুয়েকটি প্রাইভেট কার চলাফেরা করছে। আমি বারান্দায় একা, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি, আর সিগারেট টানছি। মশারা আমাকে একা পেয়ে বেশ খাবলে খাবলে খাওয়ার চেষ্টা করছে। বিরক্ত হচ্ছি না। আমার মৃত্যুর কথা মনে পরলো।

এটাই মনে হলো যে, এখন যা চলছে, এইসব কিছুই তখনো চলবে। দিনের শেষে অন্ধকার হয়ে যাবে, লোকজন যার যার ঘরে ফিরে আসবে। নিত্য নৈমিত্তিকের মতো খাওয়া দাওয়া করবে, টিভি, সিনেমা সবই চলবে, গল্প করবে, হাসি তামাশা, কিংবা পাখিদের কিচির মিচির, সকালের সূর্য উঠা কিংবা এই একটু আগে যেভাবে সূর্য ডোবে গিয়ে এখন একটা ভুতুরে সন্ধ্যা নামিয়ে দিয়েছে এই রকম করে আবারো ভুতুরে এক সন্ধ্যা তখনো নামবে। এই যে আমি আজ যেখানে দাড়িয়েছিলাম ঠিক এই জায়গাটাতে হয়ত এমনি করেই আরো একজন দাঁড়িয়ে হয়তো আমার মতোই ভাববে। কেইবা জানে, এখন থেকে অতিতে কোনো একসময় আরো একজন কেউ এমন করে ভেবেছিলো কিনা। হয়তো বা কোনোটাই সত্য নয়।

আমার আরো অনেক কিছু ভাবনা, অনেক কিছু কথা মনে আসছিলো। এই আমার মা, আমার বোন, আমার ভাই, আমার বউ, আমার মেয়ে, আমাদের নসিরন, তার সাথে বদিভাই, শিমুল, মোস্তাক ইত্যাদির মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? কেউ কারো কাছে কোনো কিছুর জন্যই বাধ্য নয়। ছোট বড় সবার জন্য এক পলিসি, তারপরেও নিজেদের টানে, নিজেদের স্বার্থের কারনে একে অপরের কাছে চলে আসে। আবার কোন এক অস্থিরতার মধ্যেই তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। আর এর মাঝেই মানুসজন নিজেদের কারনেই কিছু কিছু কমন নিয়ম কানুন মেনে চলে। সেগুলো নিতান্তই নিজেদের স্বার্থেই।

আজ থেকে হাজার বছর পূর্বের আমার পূর্ব পুরুসের নাম আমি যেমন জানি না, আমার প্রয়োজন নেই তাদের নাম জানার। তারা আমার জীবনে কোনো কাজে আসবেন না, আর এজন্যই আমি তাদের খোজ করি না, নাম জানি না, জানার প্রয়োজন বোধ করিনা। তাহলে আজ থেকে পরের হাজার বছর পরেও কেনো আমার বংশধরেরা আমাকে খোজে বের করবে? কোন যুক্তি আছে? নাই।

অংক একটাই। কবরের পাশে নিজের নাম খোদাই করা থাকলেও তাদের প্রয়োজনেই ওই নাম প্রতিস্থাপক হয়ে আরো নতুন নাম সেখানেই ঢোকবেই। আর একেই বলে রিপ্লেস্মেন্ট। অতএব কোথাও তোমার পদধ্বনি থাকবে বলে আশা করো না। এই  পৃথিবী বর্তমানের অধীশ্বর। আমার বলতে কিছু নাই। তোমার বলতেও কিছু নাই।

-হতাত কার হাতের স্পর্শে যেনো সম্বিত ফিরে পেলাম। ঘাড় নেড়ে দেখি, আমার দোস্ত মেজর আকবর। আমরা একসাথে গানারী স্টাফ কোর্স করতে এসেছি। আকবর ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র আর আমি মির্জাপুর ক্যাডে কলেজের। আকবরের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় শহিদুল্লাহ হলের ক্যাম্পাসে।

১৬/২/২০০০-লেঃ মাসুদ ইকবাল, রাজশাহী

ওর বড় ভাই সম্ভবত ৩য় লং কোর্সে আর্মিতে ভর্তি হয়েছিল কিন্তু কোন এক মেয়ের পাল্লায় পড়ে শেষ পর্যন্ত কমিসন পান নাই। কিন্তু তিনিও পরবর্তীতে বে-সামরিক চাকুরিতে বেশ ভাল করেছেন। বউদি সম্ভবত ঐ বালিকাই যার জন্য তিনি তার আর্মি ক্যারিয়ারটা আর করতে পারেন নাই। ভীষণ মজার মানুষ তিনি। আর ২লেঃ মাসুদ পরবর্তীতে মেজর পর্যন্ত ক্যারিয়ার করতে পেরেছিলেন কিন্তু তার এক শারীরিক অসুস্থতার কারনে তিনি আর আর্মিতে বেশী দূর যেতে পারেন নি এবং আর্মি ক্যারিয়ার শেষ করে বে-সামরিক এক গার্মেন্টস এবং পড়ে নিজে এক্তা বাইং হাউজ দিয়ে ক্যারিয়ার গরতে চেয়েছিলেন। ওটা আরেক গল্প। এখানে তার বিস্তারিত আলাপের প্রয়োজন মনে করছি না। তবে এটুকু জানা যায় যে, তিনি মেহেরপুরের মিঃ জাহাঙ্গির নামে এক সনাম ধন্য এডভোকেট এর মেয়ে সুরাইয়া পারভিন ওরফে তানি কে বিয়ে করেছেন। ঐ ভদ্র মহিলা তানি আমার বিশেষ পরিচিত।

১৫/০২/২০০০-১১ পদাতিক ডিভিশন, বিদায় জি-২ (অপ্স)

মাঝিরা সেনানিবাস-

১১ পদাতিক ডিভিসন থেকে আমার ফেয়ারওয়েল হয়েছে কারন আমি অফিসারস গানারী স্টাফ কোর্স করতে যাবো হালিশহরে। আমি বেসিক্যালি ফিল্ডের অফিসার কিন্তু গানারী কোর্স করতে যাচ্ছি এডি শাখার। আমি কখনো এডিতে কাজ করি নাই কিন্তু আমার বেসিক কোর্সে এডি এবং ফিল্ড থাকায় আমি যে কোনো গানারী কোর্সের জন্য কোয়ালিফাইড। গানারী স্টাফ কোর্সটাও একটা সিলেক্টিভ পরীক্ষার মাধ্যমে করতে হয়। ভরসা ছিলো না যে পাশ করবো কিন্তু যেভাবেই হোক হয়ে গেছে। জিএসও-২ পদবীতে থেকে এইসব পরীক্ষায় পাশ করা সহজ নয়।

আমি প্রকৃতপক্ষে ১১ পদাতিক ডিভিসন থেকে একপ্রকার এস্কেপ করার জন্যই আমি এডি গানারী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। এমন একটা পদবী (জিএসও-২ অপারেসন) কেউ ইচ্ছা করে ছাড়তে চায় না। কিন্তু আমি বুঝতেছিলাম যে, জেনারেল আনোয়ার এর বিদায়ের পর ডিভিসনে অনেক হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তখনো কোন জিওসির আগমন ঘটে নাই। শুনছিলাম যে, জেনারেল ইমাম নাকি আসবেন। আমি জেনারেল ইমামের সাথে ৪৬ ব্রিগেডে কাজ করেছি একবার যখন ঊনি ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। শক্ত মানুষ। পুরুপুরি বিএনপি ঘেঁষা। সরাসরি রাজনৈতিকবিদ বলা চলে।

যাই হোক, পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি সিউর ছিলাম না যে পরীক্ষায় পাশ করবো কিনা। এর মধ্যে বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। জেনারেল ইমাম আসার আগে ১১ আর্টিলারি কমান্ডার ব্রি জেনারেল রফিক এক্টিং জি ও সি হিসাবে ১১ পদাতিক ডিভিসনের দায়িত্ত পালন করছেন। এই ভদ্র লোক কেনো জানি আমাকে একদম পছন্দ করেন না। কোনো কারন নাই, কথা নাই, বার্তা নাই, ঊনি আমাকে পছন্দ করেন না। এক্টিং জিওসি হবার পর ঊনি যেনো একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন কিভাবে তিনি আমাকে একটু বেকায়দায় ফেলবেন। ব্যাপারটা আমার কাছে একদমই ভালো লাগছিলো না। আমি অনেক খুজেছি কারনটা কি হতে পারে?

পরে অবশ্য জেনেছি ব্যাপারটা। কোনো একটা অফিশিয়াল কমেন্টকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে আমাকে অপছন্দ করা শুরু করেছেন। যেটা ওনার ঠিক হয় নাই। যাই হোক, আমি আমার জায়গায় তিনি তার জায়গায়। এখানে আরো একটা মন্তব্য না করলে হয়ত ভুল হবে যে, আওয়ামীলীগ ক্ষমতার আসার পর, মুজিব কিলিং এর জন্য অনেক ব্রিগেডিয়ারদেরকে এই আর্মি থেকে অকালীন অবসর দেওয়া হয়েছে। তারমধ্যে এই ১১ পদাতিক ডিভিসনের অধীনের অনেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জড়িত ছিলেন। আমাদের ১১ আর্টিলারি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিক সাহেবের নামেও একটা চিঠি এসেছিল মুজিব কিলিং এর ব্যাপারে। ভুলক্রমে চিঠিটি যদিও খুব টপ সিক্রেট ছিলো কিন্তু চিঠিটি চলে আসে আমাদের ডিভিসন হেডকোয়ার্টারে। আর আমার হেড ক্লার্ক কিচ্ছু না বুঝে চিঠিটি খুলে ফেলে যা একটা মারাত্মক অপরাধের মধ্যে পরে। আমি তখন ডিভিসন হেডকোয়ার্টারের বাইরে অনুশীলন এলাকায় ছিলাম। আমি যখন সন্ধায় অফিসে আসি, তখন দেখি এটা নিয়ে আমাদের ক্লার্ক লেবেলে বেশ কথা বার্তা হচ্ছে, যে, এখন কি করা যায়।

আমি চিঠিটি পড়েছিলাম এবং পরবর্তীতে ব্রিঃ জেনারেল রফিকের ব্রিগেড মেজর (বিএম) মেজর কায়সারকে ব্যাপারটা শেয়ার করে চিঠিটি পাঠিয়েছিলাম। ব্রিগেডিয়ার জেনারাল রফিক ভাবলেন যে, সম্ভবত আমি ইচ্ছে করে তার ব্যক্তিগত এমন একটা সেন্সেটিভ চিঠি পরার সাহস করেছি। ব্যাপারটা কোনো অবস্থাতেই সঠিক নয়। আর যেহেতু ওই চিঠিটা নিতান্তই ব্যক্তিগত ছিল না, এটা ডিভিসন হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিককে জানাতে বলা হয়েছে, সুতরাং এদিক দিয়ে আমাদের ডিভিসনের পক্ষ থেকে কোন ভুলও হয় নাই চিঠি খোলার কারনে। তবে এই ধরনের চিঠি সাধারনত স্টাফ লেবেলের অফিসারগন সরাসরি হ্যানডেল করেন বিধায় এটা হেড ক্লার্কদের কোনো অবস্থায়ই খোলার ইখতিয়ার নাই।

যাই হোক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিক আমাকে পছন্দ করুক আর নাইবা করুক, তাতে আমার কিছুই যায় আসেনা। আর তার সাথে আমি ইচ্ছে করলেও সরাসরি কাজ আমার সাধারনত হয় না। যদি আমাদের শাখার কোন কাজে তিনি আমার কাছে কৈফিয়ত চান, তাহলে হয়ত আমার সরাসরি দেখা বা কথা বলা হতে পারে। আর তা না হলে জিএসও-১ আছেন, কর্নেল স্টাফ আছেন ইত্যাদি।

আমি একটু এড়িয়েই চলছি এই ভদ্রলোককে। আমার ধারনা, তিনিও আমাকে বেশ এড়িয়ে চলছেন কিন্তু এটার কোনো প্রয়োজন ছিলো না।

এখানে আরো একটা মজার ঘটনা বলি। সম্ভবত তিনি আমার বড় ভাইয়ের শুসুর বাড়ির আত্তিয় সজনের মধ্যে কেউ চেনা জানা। কারন একবার আমি আমার বড় ভাইয়ের শশুর বাড়ির কোনো একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছিলাম ঊনার আগমন। পরে জানলাম যে, তিনি আমার বড় ভাইয়ের শশুর বাড়ির আত্তিয়দের মধ্যে কেউ হন। আমার একদম ভালো লাগে নাই এটা জেনে। কিন্তু সব ভালো লাগা তো আর আমার উপর নিরভর করে না। বেশীদিন এই যন্ত্রনা আমাকে সহ্য করতে হয় নাই কারন বেশ তাড়াতাড়ি জেনারেল ইমাম জিওসি হিসাবে চলে এসেছিলেন। 

৩১/১২/১৯৯৯-বাক্তার চরে অসুস্থ্য মায়ের পাশে

নতুন বাক্তার চর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-

গ্রামে এসেছি। ভাইয়া সাথে আছে। মিতুল ও সাথে আছে। মাসুদ কয়েকদিন আগে গ্রামে এসেছিলো বটে কিন্তু এবার আসে নাই। ঢাকায় রয়ে গেছে। বেশ শীত বটে। বিল্লাল ভাইও গ্রামে এসেছে মায়ের কাছে। মা খুব সুস্থ নন। 

রাত হয়ে গেছে। আমরা সবাই খাটের উপর বসে কথা বলছি। বোনেরা আছে, মা বারবার কাশি দিচ্ছেন। ঘরের ওপাশে মা কাথা গায়ে দিয়ে শুইয়ে  আছেন। আমি বারবার মায়ের কাছে যাচ্ছি যেন মায়ের কোন অসুবিধা হলে বুঝতে পারি। বিল্লাল ভাই নিজেও ডাক্তার। ফলে অন্তত একজন ডাক্তার সাথে আছে এটা আমার একটা ভরসা। 

রাত প্রায় ১১টা বাজে। মা খুব ঘনঘন কাশছেন। আমি মায়ের কাশিটা সহ্য করতে পারছিনা। বিল্লাল ভাই, আমার অন্যান্য বোনেরা সবাই মায়ের কাছে এসে বসলেন, কিন্তু হাবীব ভাই মায়ের কাছে এসে বসার আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। আমি একটু রাগের সাথেই হাবীব ভাইকে বললাম, আপনি মায়ের কাছে যাচ্ছেন না কেনো? ঊনি মায়ের কাশিতে ওনার সমস্যা হতে পারে এই কারনে তিনি মায়ের ওখানে যেতে চান না। আমার এম্নিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলে রাগ উঠে যায়। আর মায়ের ব্যাপারে আমি কোনো কিছুই মানতে পারি না।  রাগ উঠতেছিলো। হাবিব ভাইয়ের প্রতি আমার সম্মানটুকু অনেক কমে গেলো। নিজের মায়ের উপর তার এই ভালবাসা আর শ্রদ্ধ্যা? আমার তো ধারনা যে, মা যদি মারাও যান, হাবিব ভাই আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। 

মা হাবিব ভাইয়ের কাছে একটা বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে মনে হল। মায়ের উপর হাবিব ভাইয়ের কোনো শ্রধ্যাবোধ নাই মনে হলো। ভাবলাম, ভাইয়া, আপনারও কিন্তু সন্তান আছে, কোনো একদিন দেখবেন, আজকে যে আচরনটা আপনি আপনার মায়ের প্রতি করে যাচ্ছেন, কোনো একদিন আপনার সন্তানেরা যখন এই আচরনটা করবে, তখন আজকের দিনের এই আচরনটা আপনার মনেও পড়বে না হয়ত কিন্তু এইটাই হলো আপনার ফেরত পাবার দান। 

আগামিকাল হাবিব ভাই পুনরায় আমেরিকায় চলে যাচ্ছেন। আর কোনদিন তার সাথে মায়ের কিংবা অন্যান্য কারো সাথে দেখা হয় কিনা আমরা কেউ জানি না। 

উম্মিকা মাসুদের সাথে অনেক এঞ্জয় করেছে। উম্মিকা, মাসুদ এরাই আমাদের প্রথম বংশধর যাদের জন্য আমরা একটা পরিবার পেয়েছি। মিতুল খুব ভালো মেনেজ করেছে পুরু পরিস্থিতিটা। বিল্লাল ভাইয়ের বউও এসেছে। 

০২/১২/১৯৯৯-হাবিব ভাই এবং মাসুদের বগুড়া ভ্রমন

মাঝিরা সেনানিবাস, বগুড়া- 

হাবিব ভাই দেশে এসেছেন। সাথে মাসুদ। ভাইয়ের বড় ছেলে। আমার খুব পছন্দের একটা  ছেলে। মাসুদের ভাষায় ঢাকা হচ্ছে একটা ধুলাবালির দেশ আর তার সাথে ধুয়ার একটা চিমনি। সারাক্ষন তার বমি বমি আসে এই অটোরিক্সার ধুয়ায় আর সারাদেশের ধুলাবালির আবহাওয়ায়। মাসুদ কয়েকদিন তার নানীদের বাসায় থাকলো কিন্তু তার কাছে একেবারেই ভালো লাগে নাই। এমনিতেই বাচ্চা ছেলে, তার মধ্যে ঢাকায় তার কোনো বন্ধু বান্ধব নাই। তার মধ্যে আবার কেউ তার সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে হয় বলে অনেকেই এড়িয়েই চলে।

একটা কম্পিউটার দিয়ে দিয়েছি ওর জন্য। কিনতে হয় নাই। আমার দোস্ত আলমগীরের ভাই মাহবুব আমাদের ডিভিসনে কম্পিউটার সাপ্লাই দেয়, তাকে বলে দিয়েছিলাম যেন কয়েকদিনের জন্য একটা কম্পিউটার দিয়ে দেয় আমার ভাতিজা মাসুদের জন্য। মাহবুব তাই করেছে। হয়ত এই কম্পিউটারের জন্যই মাসুদ কয়েকদিন একা একা ওর নানীদের বাসায় থাকতে পেরেছে।

গতকাল মাসুদ এবং ভাইয়া সাথে মিটুল বগুড়া সেনানিবাসে এসেছে। আমি আর মিটুল একরুমে, ভাইয়া আর মাসুদকে অন্যরুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। বেশ শীত পড়েছে বগুরায়। 

হাবিব ভাই সারাদিন বগুড়ার সেনানিবাস দেখলেন, ওনার অনেক বন্ধু বান্ধবের সাথেও দেখা করার সুযোগ হলো। কিন্তু সেনানিবাস হওয়াতে অনেকেই আসতে পারলেন না। জেনারেল আনোয়ারকে ভাইয়ার কথা বলাতে জেনারেল আনোয়ারও ভাইয়ার সাথে দেখা করার মনোবৃত্তি প্রকাশ করলেন। আমি ভাইয়াকে নিয়ে গেলাম জেনারেল আনোয়ারের অফিসে। আর্মি নিয়ে অনেক কথা হলো ভাইয়ার সাথে জেনারেল আনোয়ারের। 

এক সময় ভাইয়া জেনারেল আনোয়ারকে যেতা বললেন সেটা হলঃ 

২১ শতকের সেনাবাহিনী হবে আসলে ভুমিভিত্তিক নয়, এটা হবে সাইবারভিত্তিক। আমরা যদি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে আধুনিকভাবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর সাথে সক্ষমভাবে মোকাবেলা করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে এখনি এই সাইবার ভিত্তিক সেনাবাহিনির দিকে নজর দিতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির দিকে আরো বেশি নজর দিতে হবে। আর এর সাথে সাথে আরসেনালও বাড়াতে হবে। যদি সেনাবাহিনী চায়, তাহলে আমরা আমেরিকায় অনেকেই এই প্রযুক্তির সাথে জড়িত আছি, আমরা বিনে পারিশ্রমিকে এই  সুযোগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দিতে পারি। 

জেনারেল আনোয়ার চীফের সাথে (লেঃ জেনারেল মুস্তাফিজ বর্তমানে বাংলাদেশের চীফ হিসাবে আছেন) কথা বলে ভাইয়ার এই সাজেসনে কি করা যায় জানাবেন বলে আশ্বাস দিলেন। 

বাংলাদেশ আর্মি। কিছুই বলা যায় না। সিদ্ধান্ত নিতে বড্ড ভুল করে। দিন কে দিন এই আর্মির অফিসারেরা মেধাহীন হয়ে যাচ্ছে আর পয়সার দিকে বেশী ঝুকে যাচ্ছে বলে কোয়ালিটি পূর্ণ অফিসার আর তৈরী হচ্ছেনা। দেখা যাক, শেষ তক কি সাজেসন বা সিদ্ধান্ত আসে এই সব জেনারেলদের কাছ থেকে। আমার ধারনা নেগেটিভ হবারই কথা। হয়ত বুঝতেই পারবে না কি নিয়ে কথা হচ্ছে।

৩০/১১/১৯৯৯-জিএসও-২ (অপারেশন) আমার কর্তব্য

মাঝিরা সেনানিবাস, বগুড়া। ১১ পদাতিক ডিভিসন-

বেশ অনেকদিন যাবত একটা লিখা লিখবো লিখবো করে লিখা হচ্ছে না। আমি বেশ অনেকদিন হয়ে গেলো এই ১১ পদাতিক ডিভিসনে জিএসও -২ (অর্থাৎ জেনারেল স্টাফ অফিসার-২ অপারেসনের দায়িত্তে আছি)। আমার কাজ অনেক। এই ডিভিসনে যদি ক্ষমতার দিক দিয়ে বিবেচনা করা হয়, তাহলে জিওসি হচ্ছেন এক নম্বর, তারপর হচ্ছেন কর্নেল স্টাফ, তারপর জিএসও-১, তারপরেই আমি। কমান্ড লেবেলে ব্রিগেড কমান্ডার গন তো আছেনই কিন্তু তারপরেও আমার এই পদটা অনেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।

আমি যেদিন এই ডিভিসনে পোস্টিং হয়ে আসি, আমাকে অনেকেই গ্রহন করতে দ্বিধা বোধ করছিলেন কোনো কোনো ডিভিসনের স্টাফগন। এর পিছনে কারনটা আমি খুজতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু খুব সাফল্য পাই নাই। পেলাম একদিন কোনো এক খেলার অনুষ্ঠানে। ইয়াসিন স্যার (যিনি একিউ ব্রাঞ্চের ডিকিউ), তিনি বললেন, আমাদের জি ব্রাঞ্চের অফিসারগন বিশেষ করে আমার আগের জিএসও-২ (মেজর সাইফ, ১৪ লং কোর্সের)  সাথে একটা ডিস্ট্যান্স মেইটেইন করতো যা তাদের ভালো লাগতো না। তারা সবাই ধরে নিয়েছেন, আমি যেহেতু আর্টিলারি অফিসার, আমার হয়তো আরো বেশি নাক উচা হবে। আমি হয়ত কারো সাথেই মিশবো না।

আমার নীতীটা ভিন্ন। আমার চাকুরী করতে গিয়ে আমি কোথায় কি অবস্থায় আছি, বা থাকি সেটা ভিন্ন। আমার সাথে সব অফিসারদের হতে হবে একেবারে খাটি সম্পর্ক। যার যার জায়গায় সে সে তার অবস্থানে থাকে, সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নাই কিংবা তাদের সাথে আমার কোন বৈরিতা নাই। তাহলে কেনো আমার সাথে তাদের সম্পর্কটা খারাপ হবে?

আমি খুব সহজেই সবার কাছে খুব গ্রহনযোগ্যতা পেলাম। উপরের তালায় বসেন কর্নেল বশীর। কর্নেল এডমিন, একসময় আমার সিও ছিলেন সাভারে ১০ মিডিয়াম ইউনিটে।

আমার কর্নেল স্টাফ এখন কর্নেল আইকেবি, যার পুরু নাম ইকবাল করিম ভুইয়া। বেশ প্রোফেশনাল মানুষ। ভালো মানুষ। কিন্তু জিওসি জেনারেল আনোয়ারের সাথে ঊনি অনেক কিছুই মানিয়ে চলেন। জেনারেল আনোয়ারের পিছন ইতিহাস  বেশ ঘোলাটে। তিনি নাকি অনেকেরই ক্ষতি করেছেন হয় প্রোমোশনের দিক দিয়ে অথবা এসিআর খারাপ দিয়ে। ফলে কেউ তার সাথে এমন কিছু করে না যাতে জেনারেল আনোয়ার তার আগের ফর্মের মত কোনো কাজ করেন এবং অফিসারগন ক্ষতিগ্রস্থ হন।

জিওসির এডিসি ক্যাঃ তৌহিদ খুব অমায়িক ছেলে। আমার পাশের রুমেই থাকে। মেসে। আমার জিএসও -১ হিসাবে কাজ করছেন লেঃ কঃ হাসান সারোয়ারদি। খুব নরম শরম মানুষ। তিনি তার স্ত্রীকে রিতিমত সমিহ করেই চলেন। কেনো এতো সমিহ করেন সেটা আমার জানা নাই। তবে ভেজাল পছন্দ করেন না তিনি। আমার আশেপাশের অন্যান্য অফিসারগন যারা আছেন, সবাই বেশ ভালো। জিএস-২ (আই) মানে ইন্টিলেজেন্স হিসাবে কাজ করছেন নাইন লং কোর্সের জাহিদ স্যার। আমরা এক সাথে ওএমটি কোর্স করেছি ১৯৮৮ সালে। তিনি খুলনার ছেলে। বেশ বুদ্ধি রাখেন সব কিছুতেই। আমরা পাশপাশি রুমেই থাকি।

যেটা বলছিলাম।

আমি পন করেছি, আমার কাছে যে যেই জিনিসের জন্যই সাহাজ্য চাইবে, আমি যতোটুকু সম্ভব তাদেরকে সর্বাত্মক সাহাজ্য করবো। আমি চাই, এই ডিভিসনে সবাই ভাবুক যে, জিএসও-২ এর কাছে কোনো সাহাজ্য চাওয়া মানে সেটা পাওয়া যায়। যে কোনো অবস্থায় যে কোনো র‍্যাংকের অফিসার, যে কোনো ইউনিট সবসময় যেনো আমাকে তাদের সমস্যার কথা সাহস করে বলতে পারে আমি সেটাই চাই। এটা হবে আমার ইনভেস্টমেন্ট। দেখি না কোথায় কি দাঁড়ায়।

আমি ইদানিং এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি। আমার ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। কোনো অসুবিধা নাই। আমি মেসে একাই থাকি। আমি লোড নিতে পারবো।

৩০/১১/১৯৯৯-বদল চাই প্রশাসনের

মঙ্গলবার, ৩ঃ৫৬ঃ৪৪ বিকাল, বগুড়া সেনানিবাস-

আমি নিজেকে প্রশংসা করছি না, এখন যেটা বলছি সেটা লিখে। এটা জাস্ট আমার মনে হয়েছে। মানুষগন যদি তাদের আবেগ এবং বহিরপ্রকাশ ভনিতা করে না দেখায় তাহলে আমার কথাই হয়তো সত্যি। দেশের বেশির ভাগ রাস্ট্র নায়কদের পতন হয় তার আশে পাশের উপদেস্টাদের ভুল জিনিস ভনিতা করে ঠিক জিনিস দেখানোর মধ্যে। রাস্ট্রনায়কগন যা দেখছেন তা সত্য দেখছেন না, যা ভাবছেন তা ভুল জিনিসের উপর বিশ্বাস রেখে ভাবছেন, এবং যা মুল্যায়ন করছেন তা নিতান্তই একটা ভুল জিনিসের উপর দাঁড়িয়ে মুল্যায়ন করছেন। এর কারন তিনি সবকিছুই দেখছেন ওইসব উপদেস্টাদের দেখানো তথ্যের উপর ভিত্তি করে। উপদেস্টাগন কতটুকু কি দেখাচ্ছেন, তা বুঝা যায় রাষ্ট্রনায়কের পতনের পর। কিন্তু তখন যা হবার তা হয়ে গেছে। 

আমি রাষ্ট্রপ্রধান নই। আমার কোন উপদেস্টা নাই। আর যারা উপদেস্টা হিসাবে কাজ করে, তাদের কোনো উপদেশ আমি খুব একটা গ্রহন করছি সেটা এমন নয়।  

গতকাল লিখেছিলাম যে, আমি আমার সাধ্যের বাইরে গিয়ে হলেও সবাইকে সব ধরনের সাহাজ্য সহযগীতা করবোই। ব্যাপারটা কাজে লাগছে/আমি বুঝতে পারছি, ডিভিসনের লোকজন আমার সঙ্গ পছন্দ করা শুরু করেছে। হতে পারে এটা যে, আমি ডিভিসনের অত্যান্ত ক্ষমতাধর একজন মেজর, হয়ত সবাই এইজন্য আমার সঙ্গটা পছন্দ করছে। কেনো করছে সঠিক কারন টা খুব শিঘ্রই বের করে ফেল্বো। তবে অনেক কারন আছে আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার। ওগুলো আমার ক্ষমতার বাইরে। যেমন, আমার চেহাড়া এমন নয় যে, রাজপুত্রের চেহাড়া, কিংবা এমন জিনিয়াস নই যে, সবাই আমাকে নিয়ে নাচবে। খাওয়া দাওয়াও তো এমন না যে, এই জন্য আমার সাথে সবাই থাকে বলে ওই ঊছিলায় তারাও খেতে পারে। 

আমি যদি কারো কাছ থেকে কিছু চাই, থাকলে না দিতে উছিলা দিতে মনে বাধবে। 

আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করছি যে, জেনারেল আনোয়ার কিছু কিছু অফিসারদের বেলায় পক্ষপাতিত্ব করছেন যা আমার কাছে ন্যায়সঙ্গত মনে হচ্ছে না। অনুপ কুমার চাকমা একজন খুব প্রোফেসনাল অফিসার কিন্তু ঊনি চাকমা। তাতে কি? তিনি ৩৯ সাপোর্ট ব্যাটালিয়ানের সিও হিসাবে আছেন। আগামি প্রোমসন বোর্ডে ঊনার নাম আছে কিন্তু আমার ধারনা জেনারেল আনোয়ার তাকে পছন্দ করছেন না এবং যে কোনভাবেই হোক তার মাধ্যমেই তাকে ভুল ধরিয়ে ধরিয়ে এমন কিছু করে ফেলা যেনো ঊনার প্রোমসন এসিয়ারে জেনারেল আনোয়ার প্রোমসনের জন্য রিকমেন্ড না করলেও জেনারেল আনোয়ারের কোনো দোস থাকে না। ব্যাপারটা অন্যায়। 

আমি স্যারকে খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করছি। তাকে কেউ কেউ কান কথা দিচ্ছে। জেনারেল আনোয়ার খুব খারাপ মানুষ না। কিন্তু তাকে বা তার উপদেষ্টাগন তাকে ঠিক জিনিসটা দেখতে দিচ্ছে না। আমি নিজেও কিছু করতে পারছি না। তাই ভাবছি, আমি এইসব অফিসারদের জন্য এমন কিছু করে দেওয়া যাতে জেনারেল আনোয়ার তাদের ভুল কিছু ধরতে না পারেন। 

হতাত হতাত করে জেনারেল আনোয়ার এইসব ইউনিটে ভিজিটে চলে আসেন। সবসময় সিওদের পক্ষে ১০০% ঠিক রাখা সম্ভব নয়। সৈনিকের ছুটি নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে, ফলে ট্রেনিং এ লোক কম থাকতেই পারে। একটা  দুর্বল ড্রাইভার কোথাও গিয়ে একটা এক্সিডেন্ট করতেই পারে, তাতে সিও সাহেবের কিছু করার থাকে না। জেনারেল আনোয়ার কোন জিনিসটা  ধরবেন বলে মনোস্থির করে রেখেছেন, যা আমি আগে ভাগেই জানি, আমি চাইছি সেই গোপন তথ্যগুলি ওই সব অসহায় অফিসারদেরকে দিয়ে দেওয়া যাতে অন্তত জেনারেল আনোয়ার ভাবেন যে, এই সব অফিসারগন তাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছেনএবং ভুল  করছেন না। 

হতাত দেখা গেলো জেনারেল আনোয়ার বললেন, জি-২, কাল অমুক ইউনিটে সকালে পিটি করার সময় আমি যাব, দেখবো, কারা কারা ইউনিটে সকালে বিশেষ করে সিও কিংবা টু আইসিরা পিটিতে যায় না। কি যন্ত্রনা। কি দরকার জেনারেলদের এই সব নিয়ে এতো চিন্তা করার? কন্সেপ্টটাই আমার ভালো লাগতো না। এটা একটা ধরাধরির বাতিক। এভাবে আসলে চলে না। 

আমি হয়ত রাতের বেলায় ওই ইউনিটের সিওকে বলে দিলাম, স্যার , আগামি কাল জিওসি আপ্নাদের ইউনিটে  সাডেন ভিজিটে যাবেন। কে বা কারা কারা পিটিতে অনুপস্থিত থাকে তা দেখার জন্য। একটু সাবধানে থাকতে হবে। দেখা গেলো, ১০০% অফিসার, সৈনিক হাজির। এটাও আই ক্যাচিং। জিওসি বুঝে যাচ্ছে, ইনফরমেশন লিক হয়ে যাচ্ছে। 

দেখা গেলো বাৎসরিক ফিটনেস ভিজিটে আমি অনেক পয়েন্ট গননার মধ্যেই আনি নাই। জিওসি তো আর সবসময় সবকিছু মনে রাখেন না। আবার এমন হয়েছে যে, কোনো কোনো ইউনিটের সিওগন তাদের বাৎসরিক ফিটনেস প্রোগ্রামটা বেশ কিছুদিন পিছিয়ে আরো একটু সময় নিয়ে করতে চান। যদি অফিশিয়ালি চিঠি পাঠাতে বলি, জেনারেল আনোয়ার, কিংবা জিএসও-১, বা কর্নেল স্টাফ হয়তো মানবেন না। আমি কোনো কিছুই না জানিয়ে সবার সিডিউলে একেবারে বদল করে দিয়ে ফাইনাল করে ফেলতাম যাতে সিওরা একটু সস্থিতে কাজ করতে পারে।

এই রকম অনেক কিছু আমি আমার তরফ থেকে সবার জন্য কাজ সহজকরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও অনেক ছোট খাটো উপদেস্টা আছে যাদের কারনে জিওসি অনেক কিছু জেনে যান আর সবার অসুবিধা হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ উপদেস্টা হচ্ছে এফআইইউ র অধিনায়ক। বর্তমানে এফআইইউ র অধিনায়ক হিসাবে আছে মেজর ফারুক। ছেলেটা খারাপ না কিন্তু আরো অনেক কিছু করতে পারতো সবার জন্য। 

ভাবছি, এবার জেনারেল আনোয়ারকে সরাসরি ম্যানেজ করা যায় কিনা। মানুষ তাকে বুঝালে হয়তো বুঝবে। এই সামনের তিন দিনের গ্রুপ ট্রেনিং এক্সারসাইজ আছে। সেটা হবে আমার টার্গেট। 

বদল করে দিতে চাই পুরু কন্সেপ্ট। সবাইকে নিয়ে থাকতে চাই এক সাথে। আমার সবাইকে প্রয়োজন।

২৬/১১/১৯৯৯-একা আমি

০১২০ ঘণ্টা, মাঝিরা সেনানিবাস

সবাই আমার বাইরেরটাই দেখে, কিন্তু আমি নিজে ভিতরে ভিতরে কতোটা  একা তা কেও জানে না। আমি আমার ভিতরে কতটা অসহায় এবং  কতটা  দুঃসহ জীবন কাটাই তা কেও জানে না। আমার  ছুটির দিনে আমি সুধু সিগারেট খাই আর টিভি দেখি। কখনো কখনো সারারাত কম্পিউটার এ কাজ করি, অহেতক কাজ।  তবু ভাল লাগে। কোন কিছুই করার নেই তাই। ঘুমও আসে না, সময়টা অনেক লম্বা মনে হয়। ছুটিরদিনে আমার খাওয়া দাওয়া এত  তাঁরতম্ম্য হয় যে মাঝে মাঝে নিজের ওপর খুব রাগ হয়। আলসেমি আমার বড় বোঝা । পেটের ভিতর  ক্ষুধার আগুন অথচ আলসেমি আমাকে ভর করে রেখেছে। আমি এখানে একা। আমি আমাকে গোছায়ে রাখতে পারি না অথচ গুছানো ঘর আমার খুব প্রিয় । মাঝে মাঝে আমি নিজেও আমার অগোছালো  ঘরটাকে   পসন্দ  করি না। তাই আমি নিজে নিজেই একবার গুছানুর চেষ্টা করি কিন্তু মাত্র ২দিন, আবার যেমন ছিলে।

২৬/১১/১৯৯৯-মিতুলের একক ভাবনা আমি

সুক্রবার, ১১১৫ ঘণ্টা, মাঝিরা সেনানিবাস

সব কিছুর ওপর এটা সত্য, মিতুল আমাকে ছাড়া আর কাওকে ভাবে না।  জিবনের শেষে যেমন  মৃত্যু সত্য, মিতুলের ভাবনার মধ্যে  সুধু আমি, এটাও তাঁরই মতো সত্য। আমি সুখি, মিতুলকে দেখে আমারও মনে হয় সে সুখি। তাঁরপরেও আমাদের দুজনের হয়ত অনেক পারসনাল ভাবনা থাকতে পারে এবং আছেও। এটা কোন পাপ নয়।

১৩/১১/১৯৯৯-আতাউরের ক্যান্টনমেন্ট ভিজিট

শনিবার, মাঝিরা সেনানিবাস, ১৫৫০ ঘণ্টা

আজ আতাউর (মুজিব কাকার ছোট ভাই) তাঁর বউ, শালি (নাজমুন্নাহার), এবং এক শ্যালক নিয়ে আমার এখানে আসলো। মজার পাব্লিক। সউদি আরবে থাকে।  সারখখন সুধু টাকা আর টাকা। তাঁর শ্বশুরের এই আছে, ওই আছে, সে এই পাবে, সে ওই পাবে। কি জ্বালা। কিন্তু একটা  মজার বেপার লক্ষ্য করলাম। বউ এর থেকে শালির ওপর নযর বেশি। ব্যাপারটা আরও ভাল করে লক্ষ্য করলাম। চোখে পরার মতো মাখামাখি। কিনতু ওর বউ কিছু বলে না  কেন? আমার কিছু ব্যাখ্যা আছে। তা হুল এমনঃ

 (১)   আতাউর এর বউ খুব সর্ট। সে দেখতে খুব সুন্দুরি ও নয়। আর একবার যখন বউ পোরানো হয়ে যায়, তখন নতুন একজন মাগনা পেলে খারাপ কি?

(২)  আতাউর এর বউ শিক্ষিত না খুব এতটা। কিন্তু ওর শালি আবার বেশ শিক্ষিত।

(৩) আতাউর এর বউ সম্ভবত ব্যাপারটা বুঝে কিন্তু কিছু না বলার  কারন সম্ভবত যে, সে জানে তাঁর মতো এক জন মেয়ে আরেক বার স্বামী পাওয়া অনেক কষ্টের।

(৪)   সে মেনে নিয়েছে।

বিবাহ জীবন এক বিচিত্র জীবন। কে যে কখন কাকে কিভাবে চায়,তাঁর কোন রুল নাই। কলহ আর রাগের শেষে যদি অনুরাগ না থাকে, তাহলে  দাম্পত্য জীবনের শেষ মুহূর্তটিও বিপদ জনকই থেকে যায়। 

২৩/০৯/১৯৯৯-জেনারেল আনোয়ারের বিদায়

বৃহস্পতিবার , মাঝিরা ক্যানটনমেনট

গতকাল থেকেই একটা কেমন কেমন যেন শূন্য শূন্য অনুভব করছি। সব কিছুই আগের মতই আছে অথচ আগের মতো আজকে অফিসে আমার মন বসছে না। আগের মতো কোন কাজে গতি পাচ্ছি না। মনে হয় খুব টায়ার্ড লাগছে। বারবার এবং খনে খনে মনে হচ্ছে কি যেন মিসিং। কি যেন নাই। কি নাই? একটা প্রিয় মানুষকে হারালে যা মনে হয়, আমার যেন তাই মনে হচ্ছে। আমি কি জেনারেল আনোয়ার কে ভালোবাসি?  ওনি গতকাল ঢাকায় চলে গেছেন।  গতকাল রাতে আমি মেজর জেনারেল আনোয়ার এর বাসায় ফোন  করেছিলাম। সম্ভবত মেজর জেনারেল আনোয়ার এর ছেলে ঊপল ফোনটা ধরেছিল। আমি আসলে জানতে চেয়েছিলাম, মেজর জেনারেল আনোয়ার ঠিক মতো ঢাকাতে  পৌঁছায়েছে কিনা। উপল বলল যে জেনারেল আনোয়ার এখনো পৌঁছান নাই। আমি কেন ফোনটা করেছি, অথবা ফোনটা আদৌ করা ঠিক হয়েছে কিনা আমি জানি না, আমি জিএসও- ২ (অপস) হিসাবে জিএসও- ১ অথবা কর্নেল  স্টাফকেও ফোন করে জেনে নিতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, জিএসও- ১ (Lt Col Azim) অথবা কর্নেল  স্টাফ (Col Mollah Fazle Akbar) কেহই জিনিষটা পসন্দও করবেন না। আগের জিএসও- ১ ছিলেন Lt Col Hossain Shahid Shohrawardi and Col Staff was Col Iqbal karim bhuiyan. আমি আসলে কোন জিএসও- ১ অথবা কর্নেল  স্টাফ এর সাথে  অতটা ফরমাল ছিলাম না। তাঁরপরেও কেন যেন ওঁনাদেরকে ফোন করা হয় নাই। রাত ৯২০ মিনিটে কমান্ড ভইসে আমাকে জানাল যে জিওসি জেনারেল আনোয়ার তাঁর ঢাকার বাসায়  পৌঁছেছেন।  তৌহিদও (এ ডি সি) জেনারেল আনোয়ার এর  সঙে গেছে ঢাকায়।

শুনতে পাচ্ছি, ১১ আর্টিলারী কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার রফিক আপাতত দায়িত্ব পালন করবেন। 

২২/০৯/১৯৯৯-জেনারেল আনোয়ারের ফেয়ারওয়েল

বুধবার  , মাঝিরা ক্যানটনমেনট

আজ মেজর জেনারেল আনোয়ার এর ফেয়ারওয়েল হল। সব ব্রিগেড কমানডাররা, ব্রিগেড স্টাফ, ডিভিসনের স্টাফরা, সব সিওরা এবং কমানডেনটরা সবাই হাযির ছিলেন। এ এক হৃদ্যয় বিদারক  কাহিনি। একটিং জিওসি হিসাবে ব্রিগেডিয়ার রফিক কাজ চালাবেন। ১১ আটিলারি ব্রিগেড কমানডার। আমার সাথে তাঁর সম্পরকটা বড্ড খারাপ। কিন্তু আমি জানি না কি কারনে এই সম্পরকটা বড্ড খারাপ হয়েছে। ডিভিসনের স্টাফ হলে অনেক কিছু জানা যায়। কেও কারো গোপন কথা ফাঁস  করতে চায়না।যাই  হোক, ফেয়ারওয়েল এর সময় জেনারেল আনোয়ার এতই আবেগ আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। প্রায় ১৫ মিনিট সুধু দারিয়ে থাকলেন। আমরাও চুপচাপ। কেও কেও আবার কৃত্তিম চোখের জলও ফেললেন। জিওসি র ফেয়ারওয়েল বলে কথা। জিওসি  সুধু এ কথাটা বললেন যে তিনি এই আর্মিতে তিনবার জন্ম গ্রহন করেছেন। প্রথমবার তাঁর কমিশনের সময়, ১৯৭১ সালে আরেকবার, এবং এখন একবার। এই ত্রিতিয়বার তিনি বুঝলেন, জন্মটা বড্ড কষ্টের । তাঁর ভাবতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে যে তিনি আর কখন ইউনিফরম  পরতে পারবেন না।  আচ্ছা, ইউনিফরম খোলে ফেলা কি খুব কষ্টের? এই মুহূর্তে হয়ত আমি ইউনিফর্ম খুলে ফেলার কি কষ্ট সেটা হয়ত আমার উপলব্ধিতেই আনতে পারবো না, কিন্তু যেদিন আমি নিজে এই কাজটি করবো হয়ত আজকের দিনের জেনারেল আনোয়ারের আবেগ তা আমার কাছে আরো বাস্তব এবং কঠিন হয়ে ধরা দেবে। 

১৯/০৯/১৯৯৯-জেনারেল আনোয়ার এর সম্পর্কে

রবিবার, মাঝিরা ক্যানটনমেনট, ০২৪৮ a.m

তীর ভাঙগা ঢেউ আর তীরে  ভাঙগা ঢেউ কি একজিনিশ? নাহ, কখনই দুটুজিনিষ এক হতে পারে না।  একটি হচ্ছে প্রচণ্ড শক্তিশালী  গতিসমপন্ন জিবনের প্রতিক আর অন্যটি হচ্ছে একটি মরা ইতিহাস যার শুধু অতীত আছে কিন্ত বরতমান বা ভবিসশত নাই। এমনই একটা ইতিহাস যেন রচিত হল এই সপ্তাহে। ঘটনাটা মেজর জেনারেল আনোয়ার কে নিয়ে।  আমি তাঁর GSO-II (Operation) Staff হিসাবে কাজ করছি। আমার সেনাবাহিনির  জীবনে এটা একটা বড় এপ্য়েনমেনট এবং আটিলারি হিসাবে এটা কোরের জন্য অনেক বেশি সম্মানের। আমি নিজেও এই এপ্য়েনমেনট কে আমার এবং আমার কোরের একটা টারনিং পয়েন্ট হিসাবে মেনে নিয়েছি।  পদাতিক ডিভিশন এ যেখানে সব পদাতিকের আদিপত্ত, সেখানে এক জন আটিলারি হিসাবে খুব বেশি সুখের  হবার কথাও নয়। তাঁর পরেও আমি চ্যালেঞ্জেটা সাহসের সাথেই নিয়েছিলাম। যা হোক, এ ব্যাপারে পরে লেখা যাবে। এখন যা বলতে চেয়েছিলাম,  তাই বলি।

মেজর জেনারেল আনোয়ার ১১ পদাতিক ডিভিসনের জিওসি। রাজা যাকে বলে আরকি। জিওসির অপারেশনাল কোড নামও কিন্তু “সম্রাট”।  সুতরাং বুঝতেই পারছেন জিওসি মানে আসলেই রাজা।  মেজর জেনারেল আনোয়ার এর গায়ের রং যদিও কালো কিন্তু চেহারার মধ্যে  একটা বনেদি ভাব আছে। এবং তিনি প্রকরিত পক্ষে একজন বনেদি ঘরের লোকও বটে। কিন্তু  তাকে নিয়ে অনেক রিওমার আছে ক্যানটনমেনট এর ভিতরে।    রিওমার আছে যে, কেহ কেহ মেজর জেনারেল আনোয়ার কে যমের মতো ভয় পায় আবার কেহ কেহ মেজর জেনারেল আনোয়ার কে  ঘ্রিনা করে। কেন করে এর  ব্যাখ্যা আমার  কাছে নাই।  তবে আমার কাছে  মেজর জেনারেল আনোয়ার আজ পর্যন্ত এমন কোন কিছুই করেন নাই যার জন্য আমি তাকে খারাপ কিছু বলতে পারব। আমি  তাকে পসন্দ করি। মেজর জেনারেল আনোয়ার সম্ভবত আর্মির চিপ হবার একটা স্বপ্ন দেখছেন।  তাঁর সে আশার একটা মৃত্যু হল আর কি। তাঁর   পোস্টিং হয়েছে  Ministry of Foreign Affairs এ। সম্ভবত বাইরে কোথাও Ambassador হিসাবে পাঠানো হবে। He may not come back to Uniform again, But what I thought is that he was needed for a better army. When he was CGS, he tried to implement a system in the training doctrine in Bangladesh Army, and when I worked with him as GSO-II (operation), I found his very meticulous in implementing training as soldiers’ requirements. That’s why I just want to say that for a better Army, he was a wave which was waiting to hit the target. কিন্তু কিছুই করার নাই, বালাদেশের রাজনিতি বড় কঠিন।  কে যে কখন কি হয়ে উঠে তাঁর হিসাব রাখা ভারী মস্কিল।

১২/০৯/১৯৯৯-পৃথিবী না দেখা একজন মানুষের গল্প

রবিবার, ১৮০০ ঘণ্টা, মাঝিরা ক্যানটনমেনট

গত সুক্রবার (১০.৯.১৯৯৯) আমি আর মিতুল বেশ ভোরে around 6 o’clock in the morning, strip দিয়ে মিতুল এর ইউরিন   পরীক্ষা করলাম। মিতুল conceived করেছে। আমরা দুজনেই  মানসিক ভাবে প্রস্তত to take the second baby. ফলে খবরটা আমাদের দুজনকেই খুশি করেছে। আমরা দুজন কে দুজন অনেকক্ষণ জরিয়ে রেখেছিলাম। আমরা বেশ কিছুদিন যাবত এটা আশা করছিলাম। আজ খুব ভাল লাগল। আমাদের দিনটা শুধো next calculation করেই কেটে গেল। আমরা কাল্কুলেসন করছিলাম কেমন করে মিতুল মীরপুর থেকে ঘিওর যাবে কলেজ করতে? কিংবা উম্মিকা কে ইসকুলে কেমন করে আনা নেওয়া করা হবে? একটা  সমস্যা হয়ে দাঁড়াল।

সব মিলে  আমরা decision নিলামঃ

(১) মিতুলকে ওতি  তাড়াতাড়ি  মানিকগনজে shift করতে হবে। primary stage এ কোন অব্তাতেই long journey   করতে দেয়া যাবে না। মানিকগনজ থেকে ঘিওর যাওয়া better than that of from Mirpur.

(2)  মানিকগনজ না যাওয়া অবধি মিতুল should be at home. She must not go for a single day long journey for college at Ghior.  তাই ১৫ দিনের ছুটির জন্য দরখাশ্ত করল মিতুল কলেজ বরাবর। শনিবার দিন (১১।৯।১৯৯৯)   আমি একা কলেজে ওর দরখাস্তটা নিয়ে এলাম। 

আমকে রাতে পুনরায় ঢাকা থেকে  বগুড়া যেতে হবে অথচ এখন ঢাকা থেকে ঘিওর এবং ঘিওর থেকে ঢাকা লম্বা  জারনিটাও খারাপ লাগছে না। বরং I was feeling all through happy because we are taking care for our next baby inshallah.

মিতুল ভাবছে এবার আমাদের ছেলে হবে। আমারও  তাই ধারনা। হয়ত এটা মনের ব্যাপার বা ভাবনা। এই ভাবনার মধ্যে কোন বৈজ্ঞানিক কারন নাই। তবে  যদি আর একটা মেয়েও হয়, আমার কোন খারাপ লাগবে না। আমার একটাই চাহিদা, ও যেন মিতুল এর মতো অথবা আর সুন্দর হয়। আমার মিতুল এর চেয়ে এতো সুন্দর এবং এতো পবিত্র আর কেহ নয় এবং আমি আজো কাওকে দেখিনি।

“ হে আমার আদরের আগত মানব সন্তান, আমি  তোমাকে এ পৃথ্বীর আলোতে স্বাগত  জানাই। এ বড় সুন্দর পৃথিবী, তোমাকে এ পৃথিবী নেশাগ্রস্ত করে ফেলবে, আমরা আছি তোমার পাশে। তুমি এসো  তোমার মায়ের কোলে। পৃথ্বী কি তোমাকে ডাকছে না? এখানকার আকাশ বড় নীল, সাগর বড় বিশাল, এখানে সূর্য সবাইকে আলো দেয়, পাহাড় আছে, সবুজ গাছ আছে, সুন্দর সুন্দর ফুল আছে, তুমি কি লাল ফুল ভালবাস নাকি নীল? আমি নীল ভালবসি। নীল জানো কি  কিসের অর্থ? “

০২/০৯/১৯৯৯-পারিবারিক অন্তর্কলহ

বৃহস্পতিবার, ছুটির দিন, ১৩৫৭ ঘণ্টা, মাঝিরা 

আমাদের পরিবারটির মধ্যে অন্তরকলহ ব্যাপক বেশি। আমি আমার পরিবার বলতে আমি, আমার বোনেরা, আমার ভাইয়েরা কে বোঝাচ্ছি। আমার মা বড় নিরিহ মানুষ। সে কোন পক্ষেই নয়। সে সত্তেই খুব অসহায়। আমি আমাদের পরিবারের সদস্যদের এবং যাদের সংগে আমাদের সদস্যরা মেলামেশা করে, আমি তাদের সবাইকে খুব কাছে থেকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি। আমি তাদের কারোর মধ্যে কোন difference দেখিনি। এই পরিবারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিটি সদস্য প্রতিটি সদস্যকে ভালবাসে, কিন্ত বিশ্বাস করে না। আবার অন্যদিকে, এই ভালবাসার বহিরপ্রকাশ খুব কম। এরা যানেনা কেমন করে ভালবাসার কথা বলতে হয়। ফলে একজন আরেকজনকে খুব সহজেই ভুল বুঝে। আর ভুল বুঝাবুঝির থেকে Gap তৈরি হয়। আমাদের পরিবারেও এই gap অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। গ্যাপ তৈরি হয়েছে ভাইয়ের সংগে  বোনের, বোনের সংগে ভাইয়ের, ভাইয়ের সঙে ভাইয়ের। একজন আরেক জন তাদের এই ভুল বুঝার কারন বেখ্যা করতে পারেনা। তারা অবস্য জানে না কি কারনে তাদের  এই সমস্যা। ফলে শেষে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে হৈ চৈ আর রাগারাগি। সমাধান নাই।

এই পরিবারের সদস্যরা নিজের ভুল কখনই স্বীকার করে না, এবং তারা যা ভাবে ওটাই মনে করে যে সবচেয়ে ভাল সিদধান্ত। অন্য কারও সিদ্ধান্ত্ব গ্রহনযোগ্য নয়। এখানে আরো একটা মজার ব্যাপার হল, তারা নিজেরা জয় হবার জন্য  যা কিছু করার তাও করার অবকাশ রাখে। ফলে স্বার্থ বজায় রাখার কারনেই  একই ঘটনা এক এক জনের কাছ থেকে এক এক রকম শোনা যায়। এবং এর কোন শেষ নেই। “I am sorry, or I love you, or I miss you” এই জাতিয় কোন কথা এই ফামিলির লোকজন বলতে শিখেনি। তাই  বলে কি এই সব এই  ফামিলিতে  ঘটছে না?

অবস্যই ঘটছে, কিন্তু বহির প্রকাশ ঘটছে না। এই গুলোর বহির প্রকাশ থাকাটা অত্যন্ত জররি। তবে  একটা জিনিশ আমি এখন জানি না, তা হল, এরা কি এদের নিজ নিজ ফামিলির সঙে এই বার্তা আদান প্রদান করে? হয়ত করে এবং সেটা আমার জানা নাই। যেমন, আমি চাই আমার  সন্তান বোজক যে আমি ওদের কে ভালবাসি। আমি ভুল করলে সরি বলতে চাই, মিস করলে বলতে চাই, আমি তোমাকে মিস করছি। এবং এভাবেই ওরা শিখুক যে একটা ফামিলি এভাবেই গড়ে  ওঠোক।  আমি এখনো বুঝিনা আমার ভাই আমাকে কতটা ভালবাসে, আমি এখনো বুঝিনা আমার বোন আমাকে  কতটা ভালবাসে, আমি এখনো বুঝিনা আমি আমার ভাইকে বা বোনকে কতটা ভালবাসি। মাঝে মাঝে আমি আসলে কিছুই বোঝতে পারি না। কি জানি একই অভিযোগ না জানি আমার সন্তানেরা করে কিনা কে জানে।

০১/০৯/১৯৯৯-নিঃসঙ্গতা

বুধবার, ১৯২৪ ঘণ্টা, বগুড়া ক্যানটনমেনট।

নিসঃসঙ্গতা আমার প্রতিদিনের একটা সংগি। চারিপাশে এতো মানুষজন, এতো সারি সারি অট্টালিকা, হাই স্পীডের গাড়ি ঘোড়া চলমান, সবাই কোনো না কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত। কেউ তাদের পরিবার নিয়ে, কেউ নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে, কেউ আবার মহাকাশের অন্তর্নীহিত রহস্য ভেদ করা নিয়ে ব্যস্ত। আমার সব কিছুই আছে, অথচ দিনের বেশীরভাগ সময়ই আমি কেনো জানি একা। কাজের মধ্যে ডুবে থাকি, তারপরেও আমি একাই মনে হয়। দিনশেষে সন্ধ্যায় আমি একা, দিনের আলো ফুটবার সময়েও আমি একা, ভরদুপুর লোকারন্য পরিবেশেও আমি একা।

বাইরে যখন বৃষ্টি হয়, টিনের চালের রিমঝিম শব্দ হয়, কিংবা ঝড়ো হাওয়ায় যখন পাশের গাছ গাছালীগুলি একে একে একদিক থেকে আরেকদিকে দিকবিদিক জ্ঞান হারানোর মতো হেলে দুলে উঠে অথচ ওরা ওদের স্থান পরিবর্তন করে এই ঝড় হাওয়া থেকে মুক্তির পথ খুজে পায় না, তেমনি আমার কাছে মনে হয়, আমি সব কিছুর পরেও অন্য কোথাও যাওয়ার কোনো পথ দেখি না। আমি ও ওই গাছ গাছালী গুলির মতো কোথাও পালাতে পারি না।

গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, আমি জেগে থাকি একা। নিশিচরের মতো আমার চোখে ঘুম নাই, বাইরের অন্ধকার রাতের মতো আমি আমার জীবনের অনেক কিছু তখন আর চোখের সামনে দেখতে পাই না। আমার ভয় করে। কিসের ভয়, কাকে ভয় আমি সেটাও স্থির করতে পারিনা। একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আমাকে চাপা হাতে রুদ্ধ করে কি জানি কানে কানে বলে যায়, আমি তার ভাষা বুঝি না।

আমার সংসার আছে, কেউ না কেউ আমার উপর ভরষা করে। আমি অনেকের ভরষার জায়গা বটে কিন্তু আমি শক্ত করে কোথাও দাড়াতে পারি না। সারাক্ষন মাথা যেনো ভন ভন করে। ক্ষুধা লাগে, খাবার আছে অথচ আমার পেট ভরে না।

আমি একা।

আমার এই একাকীত্ব অবশ্য আজকের একদিনেই তৈরী হয় নাই। দিনে দিনে আমি একটা বাস্তব খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম, এই বিশাল দুনিয়ার মধ্যে এতো সব মানুষ নিজের কাধের উপরে থাকতেও কেনো যেনো মনে হয় কেউ আমার হাতটা ধরে বলে না- আছি তো আমি। এতো ভয় কিসের?

তবে আমি আমার এই একাকীত্ব কে খুব উপভোগ করি মাঝে মাঝে। আমার এই জীবনে কেউ থাকুক বা না থাকুক, আমি তো আছি আমার জন্য। যখন রাত হয়, আমি আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজকে দেখি, যখন সকাল হয় আমি আবার আয়নায় গিয়ে দাড়াই, নিজেকে দেখি। অদ্ভুত লাগে আমাকে। আমার আশেপাশে যাদেরকে দেখি তারা আমার সাহস, আমার কনফিডেন্স, আমার জিদ, আমার নতুন নতুন ইগো দাঁড়িয়ে আছে। ওরা শুধু আমাকে কখনো সাহস দেয়, আমার কনফিডেন্স আমাকে অনেক দূর যেতে সাহাজ্য করে, আমার জিদ আমাকে একা থাকার প্রেরনা জোগায়, আর আমার ইগো? আমার ইগো আমাকে শুধু এটাই বলে, তুমি কারো থেকেই কম কিছু নও। এই দুনিয়ায় তোমার মতো আরো অনেক পুরুষ কিংবা মানুষ জন্মেছিলো যারা একাই সমুদ্র পার করেছে, তারা সমাজকে পরিবর্তন করেছে। তারা এক সময় তোমার থেকেও দূর্বল ছিলো।

কেউ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছি? সদা হাস্যজ্জোল চোখে আমি তড়িত উত্তর দেই- খুব ভালো আছি। কিন্তু আমি কি আসলেই ভালো আছি? হয়তোবা আমি আসলেই ভালো আছি। আমার জগত আলাদা, আমার ভাবনা আলাদা, আমার কষ্ট আলাদা, আমার পছন্দ আলাদা, আমার সুখটাও সবার থেকে আলাদা। পৃথিবীর কেউ সুখী না। আমিও হয়তো সবার মতো সুখী না কিন্তু আমার একাকীত্ব আমাকে সুখী করেছে। সেই সুখটা আমি একাই ভোগ করি। আমি খেতে গেলে একাই খাই, ঘুমুতে গেলে একাই ঘুমাই, হাসলে একাই হাসি। কেউ হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু আমার অপেক্ষার রাত শেষ হয় না, আমার দিন শেষে মনে হয় আমি তো ভালোই আছি।

একটা সময় আসবে, আমি বুড়ো হয়ে যাবো, আমার মন পরিবর্তন হয়ে যাবে। আমার আজকের দিনের অনেক শখ আহ্লাদ পরিবর্তন হয়ে যাবে। আমি হয়তো তখন আর আজকের দিনের বৃষ্টি, আজকের দিনের নিশীথ রাত, কিংবা চাদনী চাঁদ কিছুই আর আকর্ষন করবে না।

আমি তখনো একাই থাকবো। হয়তো তখন আমার সন্তানেরা আশেপাশেই থাকবে, আমার পরিবার এক ছাদের নীচেই থাকবে কিন্তু সেই থাকা আর আজকের দিনের না থাক্র মধ্যে হয়তো কোনো পরিবর্তনই হবে না।

আমি নিঃসঙ্গ একটি মানুষ যার প্রতিটি দিন আর রাতের চরতিত্র এক। তার কষ্ট আর সুখের সংগা এক, তার হাসি আর চোখের জলের ধারা একই। কারন নিঃসঙ্গ মানুষেরা এই রকমেরই।

আমাদের এই নিঃসঙ্গতা (আমার এবং মিতুলের)  আমরা এক রকম মেনেই নিয়েছি। তবে একেবারে অভ্যস্ত হয়ে যাইনি। দু জনের কর্মখেত্র আলাদা আলাদা। তাই ব্যাপারটা মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় আমি দেখছি না। সুতরাং এই  দূরে থাকাটা আমাদের কাছে একটা  রুটিন এর মত মনে হয়। কিন্ত সমস্যা আরেকটী তৈরি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আর সেটা হল আমার মেয়ে ঊম্মিকাও অভ্যাস্ত হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় আসবে যখন এই সময়টা নিয়ে আমরা কঠিন একটা সিচুয়েসন এর মাঝে পড়ব। এই সমস্যা সমাধানের কি কোন উপায় আছে? আমি জানি এর সমাধান কি। আমাকে আর্মি ছাড়তে হবে। কারন, মিতুল তাঁর চাকরি ছাড়বে না। মেয়েরা তাদের চাকরি ছাড়তে চায়না। আমিও ওকে  চাকরিটা ছাড়তে দিতে হয়ত দেব না। সুতরাং অপসন একটা।

২৮/০৮/১৯৯৯-মীরপুর স্টাফ কলেজ থেকে বগুড়া

Almost এক বছরের ও বেশি সময় মিরপুর স্টাফ কলেজ এ ছিলাম। বগুড়া ক্যানটনমেন্টে পোষ্টটিং হয়েছে। ফ্যামিলিকে ঢাকায় রাখতে হবে। বদি ভাই অগ্যত কারনেই একটু positive মনে হয় কিন্তু মাঝে মধ্যে এমন এমন মন্তব্য করেন যা আমার কাছে দূরভেদ্য মনে হয় whether he is positive or negative. ঢাকায় কোথায় ফ্যামিলিকে রাখবো এটা নিয়ে অনেক ভাবলাম। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম যে মীরপুর লক্ষ্মীকঞ্জুতে বাসা ভাড়া নেব এবং নিলাম। ভাবলাম মেয়েটি ছোট, আসমাকে কলেজ করতে হয় সেই ঘিওর। বদি ভাই সাহাজ্যে আসতেও পারেন। কিন্তু লাভ হয় নাই। ওনি হজে গেলেন, বিসশের সবাইকে বলে গেলেন, আমার পাশের ফ্লাটে বলে গেলেন, অথচ আমাকে বলে গেলেন না। আমার মেয়েকে দেখলেও তিনি ডাক দেন না। আমি সালাম দিলেও ওনি সালামের উত্তর নেন না। মুখ ঘুরিয়ে নেন। এর কারনটা কি? ব্যাখ্যা করছি। লক্ষ্মীকঞ্জুর বাড়ির মালিক যিনি, তিনি অততান্ত অসৎ এবং ঘোষখোর। আবার লক্ষ্মীকঞ্জুর মালিকের বড় ভাই বদি ভাইয়ের খুব ভাল বন্ধু। বদি ভাই যে কোন কারনেই হোক, তিনি এই বাড়িটার কেয়ারটেকারের কাজটা করছেন। এই কেয়ারটেকারের কাজটা করার জন্য আমার ধারনা তিনি কোন টাকা পয়সা নেন না। তবু তিনি কাজটা করেন। আমি জিনিসটা সাপোর্ট করিনি। তাই তার এতো রাগ। তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, লক্ষ্মীকঞ্জুর মালিকের আরেক ভাই যিনি তার বন্ধু, তিনি অসৎ নন। And by profession, he is a teacher and ex-principal. So, he cant leave him as friend even his brother partner is not honest.যদিও বদি ভাই কথাটা মুখে বলেন নি কিন্তু কাজকর্মে বুজাছছেন। আমার সঙ্গে বদি ভাইয়ের সম্পর্কটা একদম চরমে। আসমাকে উদ্দেস্য করে উনি একদিন বললেন, আসমা একটি ডাইউস, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, দাইউশ মানে কি? উনি বললেন, যে কোন হুযুরকে জিজ্ঞাসা করলেই জানতে পারব দাইউশ মানে কি। পরে জানতে পারলাম যে, দাইউশ মানে খারাপ মেয়ে।

১৫/০৭/১৯৯৯-উম্মিকার কাছে আমার জিজ্ঞাসা

Dear Ummika,

(My Dream that got fulfilled.)

 In the year of flood-95, the story took place. The true victim was narrating his experiences in the national TV media.

The man was running towards the safe zone because the hurricane, with hot water and very high speed, was rushing towards them from Bay of Bengal. They could not reach to the safe zone. The waters caught them enroute. Thinking immediate sanctuary, he claimed up the big banian tree with his two small kids, Faria , the daughter and Parvez Zaman, the son. The man was holding his two kids very tightly so that none go missing. But  the current of the water was so high that his hands were unable to hold two kids together anymore or otherwise his life was in danger.  Now time has come to decide to surrender one minimum to survive marginally. The man could not decide any thing. What should he do? He can not surrender anyone!  At the moment of “no time left” things happened automatically. The man survived. His one kid is also alive. And the kid is Parvez Zaman, the son. Naturally the daughter was sacrificed. What he could do? He could do so many things but he could not do anything. I do not say any thing right now sitting in a comfortable situation what I will do then, but what the man did it might happen to me too. Luck only can decide their fate, my daughter or my son. Only God knows.

 What you would do Ummi?

০৬/১২/১৯৯৮-মা কি আমাদের পরিবারের বন্ডেজ?

রবিবার, মাঝিরা সেনানীবাস, রাতঃ ১১টা ২৩ মিনিট

মাঝে মাঝে আমি একটা অদ্ভুদ ব্যাপার নিয়ে ভাবি। কিন্তু আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার মাঝে মাঝে বেশ ভাবতে ইচ্ছে করে। আমরা দুই ভাই, পাচ বোনের মধ্যে এখন চারজন বেচে আছেন। মাও বেচে আছেন। মা গ্রামে থাকেন, আমরা সবাই মাকে কেন্দ্র করেই প্রকৃতভাবে আসলে ঈদে, পর্বে কিংবা যে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে একত্রিত হই। আমি বগুড়ায় আছি, মিতুলকে ছাড়াও আমি যখন ছুটি নিতে চাই, তার মাঝেও মায়ের সাথে দেখা করার প্রবনতায় আমার ছুটি যেতে ইচ্ছে করে। হাবীব ভাই আমেরিকায় থাকেন, তার সাধারনত সবসময় বাংলাদেশে আসা হয় না। উনি আসতেও হয়তো চান না। হাবীব ভাইয়ার এই যে না আসার অনীহা, কোনো একদিন হয়তো উনাকে এর বড় মাশুল দিতে হতে পারে। এর কারন একটাই। আজ হাবীব ভাই যে সব কারনে তার অনীহা হচ্ছে, যেমন, বোনদের প্রতি উনার আস্থা নাই বললেই চলে, গ্রামের প্রতি উনার অনেক অনীহা কারন গ্রাম তার স্ট্যান্ডার্ড নয়। থাকা অসুবিধা, খাওয়া অসুবিধা, পায়খানা প্রস্রাবে অসুবিধা। পরিবেশ তার মনের অনুকুলে নয়। তার উপর তার সমসাময়ীক কোনো বন্ধুরাও নাই যে, উনি কোথাও আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে পারবেন। একদিক দিয়ে ভাবলে ব্যাপারটা মনে হয় ঠিকই আছে। আবার যদি সুদূরপ্রসারী ভাবনায় ভাবি, এই বিচ্ছিন্নতা কোন একদিন হাবীব ভাইকে হয়তোবা মাশুল দিতে হবে। কেনো বলছি, তার একটা ব্যাখ্যা আছে। মানুষ বড় হয়, তার সম্পদ হয়, একদিন সম্পদের চাহিদা আর থাকে না। তখন দরকার হয়, আসলে দরকার না, এটাই হবে যে, ইচ্ছে হবে সেই চেনা পরিচিত বাল্যকালের জায়গাগুলিতে ফিরে যাই, তারপর সেখানে সেই গ্রাম, সেই আদি নদী, মেঠো পথের ধারে হাটতে হাটতে সময় কাটানোর বাসনা হবে। সবাই ওই সময় একসাথে জীবিত নাও থাকতে পারে, কিন্তু এই সমসাময়ীক বন্ধুদের ডালপালারা অর্থাৎ তাদের বাচ্চা কাচ্চারাও এক সময় বন্ধুতে পরিনত হতে পারে। কিন্তু এটা সম্ভব তখনই যখন অবিচ্ছিন্ন একটা সম্পর্কের মধ্যে কেউ থাকে।

যাই হোক, আমি ঢাকার বাইরে থাকি বিধায় মায়ের উপর সন্তানের যে প্রাত্যাহিক দায়িত্ত, বাজার সদাই, দেখভাল ইত্যাদি করা সম্ভব হয় না। কিন্তু আমাদের বদি ভাই অত্যান্ত আন্তরীকতার সাথেই মায়ের এই যত্নটা করেন। যদিও তিনি আমার আপন সহোদর ভাই নন। মাসে মাসে এককালীন বাজার করে দিয়ে আসেন, মায়ের খোজ খবর নেন। মাকে তিনি মা বলেই জানেন। এই রকম একজন নিঃসার্থবান মানুষ যুগে যুগে পাওয়া যায় না। বদি ভাইয়ের সাথে আমার বোনদের দেখা হয়, কথা হয়, যেদিন তিনি গ্রামে যান, সেদিন সবার সাথেই উনার দেখা সাক্ষাত হয়। এমন কি আমাদের গ্রামের অনেকের সাথেই উনার এখন ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। সবাই উনাকে স্যার বলেই সম্বোধন করেন।  

কিন্তু সবচেয়ে বড় ভয় হয় আমার যে, হাবীব ভাই দেশে না আসার কারনে যেমন তার সন্তানদের সাথে আমাদের অন্যান্য ভাই বোনদের সন্তানদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠছে না, তেমনি বদি ভাইও তার সন্তানদেরকে আমাদের এই সম্পুর্ন পারিবারিক সিস্টেমের সাথে বহুমুখী বন্ধনের চেষ্টা করছেন না। ফলে আমাদের বোনদের সন্তানেরা যেমন বদি ভাইয়ের সন্তানদের সাথে বন্ধুত্ত গড়ে উঠছে না, তেমনি হাবীব ভাইয়ের সন্তানদের সাথেও একই অবস্থা। এই বন্ধনটা ছাড়া ছাড়া ভাবের। সতস্ফুর্ততা নাই। আমি যখন ঢাকায় যাই, বেশীর ভাগ সময়ই আমি খেয়াল করেছি যে, আমার সময় কাটে কিছু অংশ মানিকগঞ্জে, কিছু অংশ গ্রামে আর মাঝে মাঝে মীরপুর বদি ভাইয়ের বাসায়। আর সেটাও বেশ অল্প সময়ের জন্য।

হাবীব ভাইয়ের ছেলে মাসুদের সাথেও কারো কোনো সখ্যতা গড়ে উঠছে না। এমনকি আমার সাথেও না। তাতে যেটা হচ্ছে তা হলো, কোনো একদিন, আমরা হয়তো এভাবেই ছাড়া ছাড়া ভাবেই দুনিয়া ত্যাগ করবো। কে যে কখন দুনিয়া থেকে চলে যাবে, তখন পরিবারের অনেকেই হয়তো পাশে থাকবে না। এটা মর্মান্তিক।

আমার কাছে মনে হচ্ছে, মাকে কেন্দ্র করে এখনো কিছুটা বন্ডেজ আমাদের সবার মধ্যে আছে। কিন্তু এই বন্ডেজটা কি খুব শক্ত একটা বন্ডেজ? এই বন্ডেজের সবচেয়ে দূর্বল দিক হচ্ছে, যেদিন মা থাকবেন না, সেদিন এই সেনটার পয়েন্ট “মা” এর অভাবে বাকী সব বন্ডেজ নিমিষেই ভেংগে যেতে পারে। কিন্তু এটা তো কোনো পারিবারিক সম্পর্ক হতে পারে না?

কিন্তু আজ যদি আমরা এমন একটা বন্ডেজ তৈরী করতে পারতাম যেখানে “মা” সেন্টার পয়েন্ট নয়, তাহলে মা যেদিন থাকবেন না, সেদিনও এই পারিবারিক বন্ডেজটায় কোনো প্রকার হুমকীর সম্মুখীন হতো না। কিন্তু আমার ধারনা, আমরা সেটা করছি না। আর এর ফলাফল দূর্বিসহ। আমাদের পরবর্তী জেনারেশন একে অপরের কোনো খোজ রাখবে না, চিনবে না, হয়তো কখনো জানবেও না যে, অতীতে কোনো একসময় আমাদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক বিরাজ করেছিলো। অথচ তখনই হয়তো এই বন্ডেজটার অনেক প্রয়োজন।

একটা সময় আসবে, হাবীব ভাইয়ের সবকিছু থাকা সত্তেও তিনি অনিরাপদ ফিল করবেন, পাশে কাউকে হয়তো পাবেন কিন্তু তারা তার পরিবারের কেউ না। আমিও হয়তো ভাববো, আহা যদি এই মুহুর্তে আমার পাশে কেউ থাকতো যাদের শরীরে আমার রক্ত বা যারা আমার একান্ত লোক। আমার পরিবারের বাচ্চারাও হয়তো একদিন প্রশ্ন করবে, আমাদের অতীতের জেনারেশন ছিলো না? তারা কোথায়?

আজ আমি একটা হাইপোথিসিস ডায়াগ্রাম তৈরী করে বুঝতে চেয়েছি, আসলে মা সেন্টারড বন্ডেজ কি আর মা ছাড়া বন্ডেজ কি। গা শিউরে উঠে।

১৮/০৯/১৯৯৮-আমি অসহায় একজন মানুষ

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট,  Friday,

কেনো বললাম আমি অসহায় একজন মানুষ? আমরা বলি যখন কোনো মানুষের হাত তাহকে না, পা থাকে না, চোখে দেখে না, কিংবা কোনো না কোনো ভাবে সে নিজের কাজ কর্মের কাছে অসহায়। তাঁকে অন্য কারো সাহাজ্যে চলতে হয়। এদেরকে বলা হয় আসলে শরাঈরিক প্রতিবন্ধী। আমি সে রকমের কেউ নই। আমার হাত আছে, আমার পা আছে, আমার কোনো অসুবিধা নাই। আমি দৌড়াতে পারি, আমি গান গাইতে পারি, আমি হাসতে পারি, আমার দুচোখ ভরে খুশীতে কান্নায় অশ্রু আসে। তাহলে আমি কেনো নিজেকে অসহায় মনে করছি?

আসলে অসহায়ত্ব এমনি এক বেদনার নাম যা নিজের চোখের সামনে প্রিয়জনের সর্বনাশ হতে দেখেও যখন কেউ তাঁকে রক্ষা করতে পারে না, তার নাম। নদীর ওপারে যখন নিজের পোষা কোনো আদরের কুকুরটি কিংবা মানুষটি কারো হাতে নাজেহাল হয় আর তখন নিজে সাতার না জানার কারনে নৌকার অভাবেও তার কাছে পৌঁছানো না যায় আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের আকুতি শুনতে হয়, তার নাম “অসহায়ত্ব”।

আমি যখন আমার চোখ বন্ধ করি, আমি পরিষ্কার দেখতে পাই , আমার বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার প্রিয় মানুষ গুলির পাশে কিংবা বিপদের পাশে কেউ নাই। এমন কি আমিও যদি কোনো বিপদে আর্তনাদ করি, আমার জন্য কেউ হয়তো দৌড়ে সাহাজ্যের হাত বাড়িয়ে কাছে আসবে না। কারন সে রকমের কোনো বন্ড, মায়া, মহব্বত কিংবা দায়িত্তশীল কোনো মানবের সাথে আমার যোগাযোগ হয় নাই। আমি যাদেরকে আমার চোখের সামনে দেখছি, যেমন বদি ভাই, কিংবা হাবীব ভাই, তারা কেমন যেনো সেলফ কেন্দ্রিক কিছু মানুষ। যে পরিস্থিতির ভয়ে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েও পড়তে চাই নাই, যে ভয়ে বুয়েটে চান্স পেয়েও পড়তে চাই নাই, যে পরিস্থিতির ভয়ে আমি নিজেকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও এই সেনাবাহিনীতে এসেছিলাম, সেই রকমের ভরষার স্থান আজো আমি তৈরী করতে পারিনি মনে হচ্ছে। তাই যখন আমার অকাল মৃত্যুর কথা মনে পড়ে, যখন মনে পড়ে আমার কিছু প্রিয়জন আছে, যেমন তুমি (মিটুল) অথবা উম্মিকা এদের পাশে হটাত কোনো আকষ্মিক সাহাজ্য এসে হাজির হবে কারো কাছ থেকে এটা আমার মনে হয় নাই। তারা আছে, থাকবে আবার নাইও। আমার মা আমাকে ভালোবাসেন কিন্তু তার সামর্থ নাই যেখানে নিজের জীবন দিয়েও কিছু করতে পারে। আমার বোনেরা তো আরো অসহায়। কাউকেই আমি কোনো প্রকারের দোষারুপ করতে পারি না। আসলে সম্ভবত আমরা সবাই অসহায়।

তবে কেনো জানি আমার শুধু একটা কথা প্রায়ই মনে হয়, কোনো একদিন, আবার বলছি, কোনো একদিন হয়তো আমার এই দুশ্চিন্তার অবসান হবে, আমি আর নিজেকে অসহায় মনে করবো না এবং আমার নিজের উপর নিজেরই কনফিডেন্স থাকবে একাই সব সামাল দেয়ার। কিন্তু কেনো মনে হয়, বা কিভাবে এটা হবে আমার জানা নাই। ইন্টিউশন থেকেই এটা মাঝে মাঝে আসে। হয়তো ঠিক তখন আমার প্রিয়জনগুলিও জানবে না আজকের দিনের এই সময়ে এই পরিস্থিতিতে আমার বুকের ভিতর কতটা রক্ত ক্ষরন হয়ে সেইখানে দাড়াতে পেরেছি।

Do my people know how much unhappy I am! Do they know how much uncomfortable I am! No body will ever know this. I am very much alone here. My loneliness always keeps me in unhappiness and more comfortableness.  I start thinking of something like death, like loneliness, something like darkness. Does anyone know what is the pain bearing the loneliness? It is too heavy. It is quiet difficult to bear for a prolong time. If anytime anyone breaks for a while, he has To destroy him and die. Why do I consider myself so lonely? I know if anytime I am caught by any kinds of awkwardness, none is there to stand beside me. I know, the so-called Badi Bhai or my own brother might not stand beside me. I know for-sure that these people will not rather. There is none and really none for me. If I die right now, none will come beside you, Mitul. It is so correct that even those people do not know. We all know how to avoid each other. We are not comfortable to face each other rather. So everyone is lonely. Even though I sometimes feel for them very deeply, they make me sick for sad news and equally make me happy when I hear something good. But maximum times I always get the bad news.

১৪/০৯/১৯৯৮-পৃথিবী বড় সুন্দর

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট, সময় রাত দুইটা সোমবার।

বড় বড় মনিষীরা তাদে বিখ্যাত বিখ্যাত লেখনীতে বারংবার একতা কথাই লিখে গেছে- পৃথিবী বড় সুন্দর।

আসলে এই সুন্দরটা আসলে কি? এটা কি রংগীন? এটা কি নীল? অথবা লাল? নাকি সবুজে ভরা কোনো আকাশ? অথবা নীলে ভরা কোনো পার্ক? কেউ কেউ তাহলে এতো সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে আত্মাহুতির পথ কেনো বেছে নেয়? তারা কি পৃথিবীর এই রুপময় সউন্দর্য দেখে না? অথবা তারা কি এটা জানে না যে, পৃথিবী সুন্দর!! আসলে পৃথিবী সুন্দর তখন যখন মনে অফুরন্ত ভালোবাসার কলি ফুটে, আনন্দের ধারা বয়ে যায় কিংবা মায়ার জালে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে, চলমান পিপ্রার সারি দেখলে তার রুপ মনকে নাড়া দেয়, কিংবা কোনো অবুজ শিশুর অবুঝ বায়নায় সারাদিন সারারাত কান্না কাটি করলেও মনে কেমন যেনো একটা মহব্বতের সুর বেজে উঠে। অজস্র মেঘে ঢাকা আকাশ, খরতাপ মাঠ কিংবা ঝড়ো হাওয়ার মতো তান্ডবেও যখন কোনো প্রকৃতি এলোমেলো হয়ে আছড়ে পড়ে পথের পাশে, সেই সব দৃশ্য ও মনকে পুলকিত কিংবা আন্দোলিত করে আর সেখানেই যেনো লুকিয়ে থাকে এই পৃথিবীর প্রতিটি সুন্দর। বেদনার রং হয়তো নীল কিন্তু এই নীলেও অনেক আহত বেদনার সুখ লুকায়িত থাকে যা সময়ের স্রোতে মনকে দোলায়।

মিটুল সে রকমের একতা প্রকৃতি আমার জীবনে। ওর জন্যে আমার যেমন ঝড়ো হাওয়ার মতো তছনছ হয়ে যেতে পারে সারাটা জীবন আবার ওর জন্যেই বয়ে যায় আমার সুখের বাতাসের মতো শিহরন। যদি ঝরে যায়, যদি হারিয়ে যায়, যদি আর খুজে না পাওয়া যায় তাহলে সেটা হবে আমার জগতের সবচেয়ে বড় মারাত্তক বিপর্যয় কিন্তু যদি রয়ে যায়, যদি আর কোথাও না হারিয়ে যায়, এই প্রথিবী হবে আমার সর্গরাজ্যের মধ্যে উত্তম। পারবে কি তুমি কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকতে? অথবা হারিয়ে যেতে?

আমি তোমাকে সবচেয়ে সুন্দর পৃথিবীটা উপহার দিতে চাই। জানি না কিভাবে। যদি কিছুই দিতে না পারি, অন্তত আমি তোমাকে দেবো স্বাধীনতা আর দেবো ভালোবাসা।

The earth is very beautiful. There are so many things to see so many things to enjoy. A man dies before he sees lot of things of the earth. Why a life is so short? Can it be not more longer, lengthier!

Do you know Mitul, why I could not break myself to anyone? It was not for that reasons that I afraid people. Or I care people for self-prestige. It is nothing but I know someone is waiting for me till death. How can I deprive her from my love? I can not break, rather I don’t want to break to anyone other than Mitul. She is my only friend in this earth! How can I give her pain? It will obviously come back to me with double triple strength. Mitul is my only precious thing. She is an asset for me. Mitul, I will never leave you, you believe me. Please you don’t leave me alone. Even you don’t get any comfort here even though you remain with me, with my daughter. Ummika needs you so much. I need you more. Where you will go. We will go there. How you will stay leaving us! Can you stay a single night without us! I can have bated that you can’t stay even few hours without us, if we could really love you. You are a very nice lady. I love you mony, I love you too much.

০৮/০৯/১৯৯৮-Why I not greedy for

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট,  অফিসারস মেস, বগুড়া 

Why I not greedy for anything around me? I basically do not find anything very precious to be so. But I always am greedy for one very precious piece i.e. Mitul. I never feel sorry for my marriage. What I did with Mitul (marrying without anybody’s consent) I will do the same thing everytime in every single life even none supports me anytime.

০৬/০৯/১৯৯৮-কি চেয়েছিলো তারা আমার কাছে?

অফিসারস মেস, বগুড়া

What they wanted?

Did they want to have a very beautiful girl for me! Or they wanted to do some business with their family! Or they wanted to have complete freedom to others as they have freedom to their own hens, cows or goats. Whenever they want to slaughter them, they can do it without the consent of the slaughterer, whereas the slaughterer must have the rights to know about his death.Did they want like this? Then why could not they accept her! She is absolutely a beautiful lady. So this can’t be the reason not to like her. She qualifies the beautiful they way they wanted. Again if they wanted to do some business with her, why should I do it even they wanted to do it! I am not at all greedy for anything given by anyone! So even they had a plan to do so, they could not do it fore me. These people again love me sometimes very deeply. So here also she is not at fault.

If these people thought the third option to have complete freedom, in that case they have done a great mistake. Because I will never allow anyone to supersede my presence. Neither I will curve her freedom. We want to make a dependent life to each other. Why not to share each other completely! So nothing could work.They did not become happy on our attitude, our behavior and our conduct. Everyone prayed for me, felt for me but none felt for her and afterward my daughter joins with her mother. No one wanted to take any interest and initiative on these two girls. Thereby whenever they used to get some kind of wrong clue where they can punish Mitul, they never used to loose it. They used to complain to me against her. I used to become very emotional and sometimes I used to abuse Mitul very wrongly. She never used to reply it back on the spot. She used to cry only seating beside me. This was the punishment they could achieve.

 Might be they wanted more punishment. But what kind of punishment they wanted? Did they want me to divorce Mitul? Oh God! This is the only thing that I can not do. I love her so much that I can sacrifice the whole world but her. She is the most precious thing to me in this world. Then Ummika. I will not forget ever Mitul. She will be in my heart, in my head, in my illusion always.

০৫/০৯/১৯৯৮-লনলীনেস

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট, ০০০০ রাত. অফিসারস মেস, বগুড়া 

I feel very lonely here. How many days a man can stay alone? -Can it be for whole life? -May be or may not be. But I feel sometimes that I do not like the accompany of people even Mitul! I feel to be remaining absolutely free at my own. In that time I think about death, about love and about the GOD. Is there anything called GOD at all? Sometimes I think I don’t believe in GOD. But in the next moment I afraid of GOD if HE is there what will happen then! Mitul believes in GOD fully. She is a perfect human being and best lady amongst everyone. GOD says and orders people to believe HIM even there is no prove in hand. Mitul believes it hundred percents. She is that kind of lady whatever she asks from GOD she gets it without much waiting. She is also accepted by the GOD HIMSELF.

She is very nice. That is one of the great reasons why I loved her at the first instant

০৩/০৯/১৯৯৮-আমি এই প্রোফেশনটাকে

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট, ০০৩৯ রাত.

অফিসারস মেস, বগুড়া 

I did not want to choose this profession! But nobody can be blamed for this reason that someone forced me to choose it as a profession. If I would have been so lucky to have the proper guardians like father, in that case I would have think otherwise. There were lots of people who were responsible by humanitarian ground or religion based relations. And it was all!

Why I not greedy for anything around me? I basically do not find anything very precious to be so. But I always am greedy for one very precious piece i.e. Mitul. I never feel sorry for my marriage. What I did with Mitul (marrying without anybody’s consent) I will do the same thing everytime in every single life even none supports me anytime.

২৬/০৮/১৯৯৮-আমি কেনো ওকে এতো ভালোবাসি?

মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট। অফিসারস মেস, বগুড়া 

Why did I love her so much? Was she very beautiful or very extra ordinary? What was the exceptional quality she had by which she could attract man like even me!  I have seen more pretty looking girl than that of her, I have found girl like a millionaires. Nothing attracted me but herself.

 -Why?

She is not a daughter of a rich man! She neither was very much famous by any means. Even I loved her. Because I wanted a lady who is very smart looking but polite, I wanted someone who should wait for me even at the cost of her life the way I do. I wanted to have a nice hearted lady who will not have any hidden subject within herself. Mitul qualifies all the qualities. She is a very sweet looking girl, she is an extra ordinary mother, an outstanding lover of husband. She waits with full-hearted love and ocean of tear in eyes for me. She is the only place where I enjoy my full kingdom with full concentration. She loves me so much. I can not stay for a single moment without her. Staying together heart to heart.

Sometimes Mitul thinks I always do not trust her. But her this belief can never be corrected. I sometimes abuse her wrongly it is absolutely true. But never I remember about any incident. I never de-trust her. She is the perfect lady in my eyes. She never deprived me from my desire, my wrong behaviors. She used to absorb everything and never protested even she had all the reasons to do so. Instead she used to cry only. She used to cry more thinking that I am getting pain in my heart.  I can tolerate everything but I can not tolerate her tears. I again hug her and she hugs me more tightly. She cries and cries and I feel in my heart that her burning is going away. We trust each other very deeply.

Ummika is an asset for both of us. She is the centre nerve of our plan, happiness and dream. We sometimes feel very pensive in this regard. God is something very special. HE can do and undo anything we can guess. No one will understand what is a blessing getting a kid at his or her own unless someone becomes a parent. It is a matter of experience. No magazine, article or listening from someone will give the actual feeling of being a parent. It is something very special. We are the special group of people. Ummika will not also be able to understand this great affair with the parent. We did not understand. Those who understand, they are very lucky. They are very fortunate.  We want Ummika should be one of them who all are lucky. I always want my Ummika should be just like her mother. I have not seen another good lady like Mitul. Mitul is the perfect.

এই কথাটা আমার তো প্রায়ই মনে আসে, হয়ত অনেকেরই আসে, কেনো আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি? ওকি প্রিথিবীর সেরা সুন্দরী? তার কি এমন কিছু ব্যতিক্রম কোয়ালিটি ছিলো বা আছে যা অন্য কারো নাই? আমার এই ছোট্ট জীবনে তো অনেক মেয়েকে দেখেছি, ওর থেকেও আরো অনেক সুন্দুরী মেয়েকে আমি দেখেছি, দেখেছি পাহাড় সমান সম্পদের মালিকানা পরিবারের মেয়েদেরকেও। কিন্তু কই আমি তো ওইসব মেয়েদের প্রতি কখনো দুর্বল হই নাই? তাহলে আমি ওর ব্যাপারে এতো বেপরোয়া হয়ে ভালোবাস্লাম কেনো?

সে তো কোনোবড় লোকের মেয়েও নয় যে, আমি তার বাবার সম্পত্তির লোভে তাকে ভালোবেসেছি। না ও নিজে খুব বিখ্যাত কেউ। তারপরেও আমি ওকে অনেক ভালোবেসেছি। এর প্রথম কারন হতে পারে যে, আমি একজন দায়িত্তশীল মেয়েকে খুজছিলাম। আমি এমন কাউকে খুজছিলাম যার উপর আমি নির্ভর করতে পারি এবং যে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারে। হয়ত মিতুল এই সব কিছুই কোয়ালিফাই করে।

(অসমাপ্ত……)

১৮/০৪/১৯৯৮-মিতুলকে

MY SWEETEST:

When I was coming back to Bogra after enjoying my last casual leave, I was thinking so many things standing on the platform of the ferry! And most interesting was that I was dreaming about a new baby and you. Every time I was thinking about my family (I always mean my family is yourself, Ummika, myself and mother) I always found your role was extremely significant. Nobody will understand how much sacrifice we made out of our determination and tenacity. All were possible because of you. I always care your demand. You really sacrificed lots of things for me, for us specially. No one can say that someone did something for us. That’s why our understanding became stronger, more meaningful and love becomes the every day’s power of inspiration and power of next day’s power.  How many people can boast about their personal life! How many people and couple can strongly declare that both of them (husband and wife) are equally happy in their conjugal life! Even someone tells, a very few percentage may be correct and maximum will be wrong in saying so. But I declare with challenge that we both of us are equally happy and equally satisfied in our life. It is not an only dialogue but the fact of our two men-life.  I have been told by lots of people that I look and act like a completely happy man, as I do not have any tension and anxiousness. This happened only because I am really a happy man because of you. 30th may, the most finest and glorious day for both of us. I will be always worshipping this day to almighty God. This is the day for which every body can not just take pride. Only few people like us can tell the story of old days to their grandsons and granddaughters. Don’t you think that this is a history!  There are someone who have tremendous set back on this date because they did not want it to be happened. This is one of the reasons why people does not want to come to attend our ceremony even you give them the invitation. But in the same time I enjoy their this pain too. Wish you all the best and my best regards to you. My love and affection will be with you always and always. Have good life and good mind. May Allah make you a very honored lady to everyone in respect to all aspects.

ঢাকা থেকে ছুটি কাটিয়ে বগুরা ফেরার পথে ফেরিতে উঠার প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়েওনেক কিছু ভাবছিলাম। এবং সবচেয়েমজার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমি এইবার প্রথম আমার নতুন বাচ্চার কথা ভাবছিলাম এবং সাথে মিটুলের কথা। প্রতিটি মুহূর্তে মি আমার পরিবারের কথাই (আমার পরিবার বলতে আমি মিতুল, উম্মিকা, আমারমা আর আমাকেই মিন করি) ভাবছিলাম। যখনি আমি আমার পরিবারের প্রতি কারকারকি কন্ট্রিবুসন আছে সেটা ভাবি, তখন যা দেখি তা হচ্ছে, তোমার কন্ট্রিবুইসন সবচেয়ে বেশি বলেই আমি মনে করি। কেউ কখনো বুঝতেপারবে না আমরা কোথা থেকে কিভাবে কি ত্যাগ করছি আমাদের ভালোর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য। অনেক কিছু যা এই মুহূর্তে কঠিন, তা সম্ভভচ্ছেতোমার ত্যাগের কারনে, তোমার অধ্যাবসায়ের কারনে। এটা আম্র ধারনা।

আমি তোমার প্রয়োজনীয় আশা আখাংকার প্রতি খেয়াল রাখার চেষ্টা করি, চেষ্টা করিতোমার সব চাহিদা পুরন করার।  আমাদের জন্য কেউ কিছুই করে নাই। আমি চাইও না কেউ আমাদের জন্য কিছু করে আমাদেরকে বাধিত করুক। আমরা যা করছি, তা আমরাই করছি। আমরা যুগল চেস্টায় করছি। আর এই কারনেই আমি মনে করি আমাদের মধ্যে আন্দারস্ট্যান্ডিং ধীরে ধীরে আরো জোরালো হচ্ছে এবং আমরা আরো একিভুত পরিবার হচ্ছি। আমি তোমাকে নিয়ে যেমন খুশি, তেমনি আমি সুখিও বটে। কত জন কাপল আমার মতো বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তারা সুখি এবং একে অপরের জন্য খুসি? আমি তো বলতে পারছি।

এই সব কিছুর জন্ম হয়েছিল ৩০ মে এর কারনে। এই৩০ মে তারিখটি আমার জীবনে একটা বিশাল স্মরণীয় দিন এবং এই দিন টিকে আমি পুজা করার মতো ভালোবাসি। এই ৩০ তারিখটি তোমাকে নিয়েয়ামার সাথে যে সম্পর্ক টা হয়েছিলো সেতা করতে না দিতে অনেকেই চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এটাও আমরা সার্থক করে আমাদের মধ্যে আনতে পেরেছি। এটা আমদের ইতিহাস। এটা আমার আর তোমার ইতিহাস। আমাদের এই ইতিহাস আমাদের পরবর্তী বংশধরেরা কত টুকু বুঝবে বা বুঝতে পারবে সেতা আমি জানি না কিন্তু তাদের ইতিহাস এই ৩০ মে এর কারনেই হয়েছে সেটা তারা বুঝলেই হল।

২৯/১১/১৯৯৭-ষ্টাফ কলেজ থেকে ভারত ভ্রমন

গত ২৩/১১/১৯৯৭ থেকে ছয় দিনের শিক্ষা সফরে মীরপুর ষ্টাফ কলেজ থেকে দেশী-বিদেশী ছাত্রদের নিয়ে আমরা পাশের দেশ ভারতে গিয়েছিলাম। আমাদের ষ্টাফ কলেজের ব্যাচে প্রায় শতাধিক ছাত্র বিধায় ছাত্রদেরকে তিনটি গ্রুপ করে ভাগ করা হয়েছে। কেউ কেউ ভারত, কেউ কেউ শ্রীলংকা আবার কেউ কেউ নেপাল। এটাই ষ্টাফ কলেজ থেকে প্রথম শিক্ষা সফর দেশের বাইরে। আর এটা এ বছরই চালু হলো। আমি ভারতে যাওয়ার চয়েজ দিয়েছিলাম। সে মোতাবেক গত ২৩ নভেম্বরে আমরা প্রায় ৩৭ জন স্টুডেন্ট ভারতের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করলাম।

আমাদের সাথে আছেন ডিএস (ডাইরেক্টিং ষ্টাফ) লেঃ কর্নেল শফিক, লেঃ কর্নেল তানভীর, চীফ ইন্সট্রাকটর কর্নেল জহির, চীফ ইন্সট্রাকটর মইন ইউ আহমেদ এবং আরো কিছু। আমাদের শিক্ষা সফরটা একটা ডিপ্লোমেটিক ভিজিট হিসাবে গন্য ছিলো। আগে থেকে আমাদের বেশ কিছু অফিশিয়াল ভিজিট কনফার্ম করা ছিলো।

আমরা সকাল বেলায় যার যার ব্যাগ পেটরা নিয়ে জিয়া ইন্টার ন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। ষ্টাফ কলেজ থেকে বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। ভারতে এটাই আমার প্রথম ভ্রমন।

ভারতে গন্ডোগোল চলছে। বেশ ভালই গন্ডোগোল। কিন্তু তাতে আমরা শংকিত নই। আমাদেরকে প্রোটেকশন দেয়া ভারত সরকারের দায়িত্ত। আমরা কলকাতার গ্রান্ড হোটেল “হোটেল ইন” এ সবাই উঠেছি। কলকাতার পরিবেশ মূটামূটি ভালো। শান্ত। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, কলকাতা আর আমাদের ঢাকার গুলিস্থানের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নাই। সব জায়গায় বাংলা কথা বলার লোক। খায়ও বাংগালীদের মতো ডাল ভাত। তবে এখানে ঢোশাটা বেশ জনপ্রিয়। আমাদের হোটেলের পাশেই একটা সিনেমা হল আছে। ওখানে “দিল তো পাগল হ্যা” ছবিটি মাত্র রিলিজ হয়েছে। ৮ম লং কোর্ষের মেজর মোর্শেদ স্যার আমাদের স্টুডেন্ট কোঅর্ডিনেটরের কাজ করছেন। তাকে সাহাজ্য করছেন ৯ম লং কোর্ষের মেজর হক স্যার। কঠিন লোক বটে।

সন্ধ্যা হতে না হতেই ডাক পড়লো যে, রাত আটটায় আমরা ইন্ডিয়ার ডিফেন্স এটাচির আমন্ত্রনে তার অফিশিয়াল বাসভবনে যেতে হবে। ড্রেস হবে সিরিমনিয়াল। মানে এসডি (সার্ভিস ড্রেস)। তড়িঘড়ি করে রেডি হতে হলো। বেশী দূর নয়, মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। পড়ে বুঝলাম, আসলে এটা ডিফেন্স এটাচির বাসা নয়, এটা এয়ারফোর্সের একটা মেস।

পৃথিবীর সকল আর্মির আস্তানাগুলি প্রায় একই ড্রিল অনুসরন করে। মেস ওয়েটারগন আমাদের দেশের মেস ওয়েটারদের মতোই ড্রেস আপ করা, মেসগুলিও প্রায় একই প্যাটার্নের, কালচার বা প্রাকটিসও তাই। ইন্ডিয়ার বেশ কিছু হাই অফিশিয়াল আমাদের উদ্ধ্যশ্যে কিছু কথা বললেন বটে কিন্তু কি বললেন, ভালো মতো বুঝাও গেলো না। আমরা অনেকেই যার যার গল্পে মশগুল ছিলাম। এরমধ্যে ধীরে ধীরে খাবার আসতে লাগলো, সফট ড্রিংক্স, হট ড্রিংক্স, সবই ছিলো। যে যার মতো যা খুশি খেতে পারেন। কোনো বাধা নাই।

এর মধ্যে একজন মেস ওয়েটারের সাথে কথা হলো, নাম, জামিলুর। তার বাড়ি বাংলাদেশের চাপাইনবাবগঞ্জে। সে নাকি আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে তার বাবার সাথে ইন্ডিয়ায় চলে এসেছিলো, আর বাংলাদেশে যায় নাই। এখন সে এয়ারফোর্স মেসে মেস ওয়েটারের কাজ করে। বাংলাদেশী কিছু অফিসার বেড়াতে এসেছে এখানে, তাতেই তার অনেক আনন্দ। যেনো বাড়ির মেহমান এসেছে বহুদিন পর।

রাতে ডিনার শেষ হলো। অনেক অফিসাররা ফ্রিতে বিয়ার আর মদ পেয়ে নাক ডুবিয়ে যেনো খেয়েই যাচ্ছিলো। রাত প্রায় সারে দশটায় আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হলো। ফিরে এলাম হোটেলে। আমি, মেজর আকবর, মেজর আফতাব আর নাইজেরিয়ার মেজর লালা একরুমে থাকি। হটাত দেখি, কিছু অফিসার এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপারটা কি? পড়ে শুনলাম, কিছু অফিসাররা পাশের সিনেমা হলে ‘দিল তো পাগল হায়” দেখার জন্যে যাচ্ছেন। এতো রাতে আবার সিনেমা? যাক, অসুবিধা নাই। আমি আর গেলাম না।

তার কিছুক্ষন পর আবার একটা কেওয়াস শুনলাম। অফিসাররা সিনেমা হলে গিয়ে গেঞ্জাম করেছেন। কারন ইতিমধ্যে হলে সিনেমা শুরু হয়ে গিয়েছিলো, আবার কোনো সিটও খালি ছিলো না। তারা অনেকটা মাতাল অবস্থাতেই সিনেমা হলের ম্যানেজারকে জোর জবরদস্তি করে হলে ঢোকে সিনেমা দেখবেনই এই রকমের নাকি একটা আচরন করেছেন, যা অফিশিয়াল অভিযোগ হিসাবে ইতিমধ্যে দাখিল হওয়াতে বাংলাদেশের একজন দুতাবাসের কর্মকর্তা (নাম মেজর ফজলে আকবর) মধ্যস্ততা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে দিয়েছেন। খুব দুক্ষজনক ব্যাপারটা। নতুন আদেশ জারী হলো যে, কোর্স ডিএস এর অনুমতি ছাড়া কেউ অযথা বাইরে যেতে পারবেন না। কিন্তু কেউ কি কারো কথা শুনে?

পরেরদিন আমাদের ভিজিট ছিলো ফোর্ট উইউলিয়াম দুর্গে। সকাল ১১ টায় সেখানে যেতে হবে। আমরা তার আগেই সেখানে পৌঁছে গেলাম। আগে অনেক নাম শুনেছি। কিন্তু এবার দেখলাম দূর্গ কি জিনিষ। চারিপাশ প্রায় ২০/২৫ ফুট উচু দেয়াল ঘেরা এবং দেয়ালের প্রশস্থতা প্রায় ৩০/৪০ ফুট। যার দ্বারা প্রচুর গাড়ি ঘোড়া চলে। ভিতরে দালান কোঠা সেই ব্রিটিশ আমলের। একেকটা বিল্ডিং এর উচ্চতা প্রায় ২০ ফুটের মতো। ফ্যানগুলি অনেক লম্বা লম্বা ডান্ডা দিয়ে ঝুলানো। প্রচুর গাছপালা।

কমান্ডার ইন চীফ এলেন প্রায়  একটার দিকে। নিজে আর তার এডিসি। কোনো ড্রাইভার দেখলাম না। তার নিজের গাড়িতেই স্টার আছে, সাথে আছে এম্বুলেন্সের মতো হর্ন। এডিসি গাড়ি ড্রাইভ করে এলেন, আর সেকেন্ড সিটার হলেন কমান্ডার। শীখ মানুষ। বেশ ফর্সা। অদ্ভুদ লাগলো ব্যাপারটা। আমাদের দেশে হলে গাড়ির বহরে আর এমপির গাড়ির ঠেলায় ভীর লেগে যেতো, কিন্তু এতো বড় অফিসার এলেন তাও আবার মাত্র এডিসি আর তিনি নিজে। ড্রাইভার ও নাই।

ঘুরে ঘুরে বিল্ডিংগুলি আর আশপাশ দেখছিলাম। অফিসারদের থাকার জায়গাগুলিও বেশ অদ্ভুদ। এখানে যিনি ইনচার্জ, তার কোনো এসি রুম নাই। তবে গরমের দিনে যেনো পরিবেশ ঠান্ডা থাকে তার জন্য এক ধরনের পানির পাইপের মাধ্যমে সারাক্ষন পানির সঞ্চালন করে থাকে, তাতে বাতাস ঠান্ডা থাকে। আর আমাদের দেশ হলে তো এসির কারনেই পরিবেশ গরম হয়ে যেতো যদিও কমান্ডার নিজে ঠান্দায় থাকতেন। ইন্ডিয়া কেনো বড় হবে না? তাদের প্রতিটি কাজের মধ্যে ইকোনোমিক্যাল একটা বাজেট থাকে। এই যেমন কমান্ডার যখন এলেন, তিনি ইন্ডিয়ায় তৈরী মার্সিডিস গাড়িই নিয়ে এলেন। সেটা আবার এসি করা নয়। আর আমাদের দেশে তো জাপানিজ এসি গাড়ি না হলেই তার মান সম্মান থাকে না।

৩য় দিনে আমাদের যাওয়ার কথা দিল্লী। কিন্তু ভারত জুড়ে এতো গন্দগোল যে, আমরা যাবো কিভাবে সেটাই এখন বড় ধরনের প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। বিজেপি, এক ধরনের বক্তব্য, কংগ্রেস আরেক ধরনের পালটাপাল্টি বক্তব্য এবং রামাবাই কিলিং নিয়ে অনেক বিতর্কিত আলোচনা টিভি জুড়ে চলছেই। আমাদের যাওয়ার কথা ছিল এয়ারপোর্ট হয়ে দিল্লিতে কিন্তু একেক বার একেক সংবাদ আসায় আমাদের মুড অফ জার্নি নিয়ে একটা অচলবস্থা তৈরী হলো।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো যে, আমরা বাসে করে কলকাতা থেকে দিল্লী যাবো। প্রায় ২২ ঘন্তার জার্নি।

কলকাতা থেকে আমরা বাসে করে দিল্লী রওয়ানা হলাম। রাস্তা বেশ ভালো কিন্তু বেশ ফাকাও। আমাদের প্রোটেকসনের জন্য ইন্ডিয়ান আর্মির স্কট ছিলো, আর ছিলো হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশ পথে টহলের ব্যবস্থা। প্রায় সন্ধ্যার দিকে দিল্লীতে পৌঁছলাম। হোটেল “সেরেনা” তে আমাদের থাকার জায়গা।

দিল্লীর শহর আসলেই আধুনিক একটা শহর। লাইফ যথেষ্ট পরিমান ফাষ্ট। দিল্লীতে ডিফেন্স মিনিশট্রি থেকে আমাদের জন্য একটা ভিজিট রেখেছেন। তাদের ডিফেন্স মিনিশট্রারের প্রতিনিধি আমাদের ব্রিফ করবেন। আমাদেরকে ডেকে আমাদের ডিএস জানালেন, আমরা যেনো কোন সেনসেটিভ প্রশ্ন না করি। এখানে আমরা ডিপ্লোমেটিক আলোচনায় আসিনি, তাই এমন কোনো প্রশ্ন যেনো আমরা না করি যাতে পরিবেশ অন্যদিকে টার্ন নেয়। কিন্তু কাজের বেলায় ঠিক সে রকম হয় নাই। মেজর হক স্যার এমন এক প্রশ্ন করে বসলেন, যা কিনা বেশ ভালই বিতর্কের জোগান দেয়। সেটা আর এখানে নাইবা বললাম। পড়ে এক সময় আবার বলা যাবে।

আমরা দিল্লী ঘুরে বেড়ালাম। “ভাই” টেমপলে গেলাম। জায়গাটা বেশ সুন্দর। “ভাই টেমপল”টা হচ্ছে তিন ধর্মের জন্য একটা কমন প্রার্থনার স্থান। অদ্ভুত কন্সেপ্ট। এটা নাকি সম্রাট আকবরের সময় করা। ইন্ডিয়া গেট দেখলাম। এই জায়গায় ইন্ডিয়ার সব রাজনৈতিক নেতাদের বসবাস।

দিল্লী থেকে আমরা পরের দুপুরে আগ্রায় গেলাম। আগ্রায় “আকবরিয়া” হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা যখন বাস থেকে নামলাম, তখন একদল বাদ্যবাদক ড্রাম, পাইপার বাজিয়ে আমাদেরকে অভিবাধন জানালেন। দেখলাম, হোটেলের ঠিক সামনেই বিশাল করে ফুল আর ফুলের পাপড়ি দিয়ে ওয়েলকাম বাংলাদেশ লেখা। ভালো লাগলো। আমাদের বাক্সপেটরা নিয়ে গেলেন হোটেলের কর্মচারীরা। আসলে এটা ছিলো সম্রাট আকবরের নিজস্ব প্যালেস। এই প্রথম আমার জিবনে কোনো প্যালেসে রাত্রিজাপন করবো।

সম্রাট আকবরের প্যালেসটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বিশাল বিশাল রুম। খুবই সুন্দর। আমাদের আসার কারনে এখানে কোন গেষ্ট এলাউ করেনি সরকার। মানে শুধু আমরাই থাকবো এখানে দুই দিন আর এক রাত। আমরা জমায়েত হলাম সম্রাট আকবরের খাস কামরা সেটা ছিলো সেখানে। গিয়ে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। ওখানে যে ঝাড় বাতিটা আছে সেটার সাইজ প্রায় ডাবল রুমেরও বড়। আর এটার যে ডান্ডাটা সেটা একটা বিশাল পিলারের সমান। এই খাস কামরার যাওয়ার পর যেটা দেখালাম, এর পাশ দিয়ে একটা বেশ চওড়া রাস্তা গেছে, যার হাইট একটা লম্বা মানুষের সমান উচ্চতা। জিজ্ঞেস করলাম, এই রাস্তাটা কেনো যেখানে আরো রাস্তা বা প্রবেশ দ্বার আছে? আমাদের যে গাইড ছিলেন, তিনি বললেন যে, সম্রাট যখন হেরেমে বসতেন, তখন কোনো কারনে যদি তার রানী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয় তাহলে এই হেরেম খানায় কি ঘটছে সেটা যেনো তার নজরে না আসে, সেই জন্য শুধুমাত্র রানির ব্যবহারের জন্য এই উচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা রাস্তাটা তৈরী। বুঝলাম, এমনি এম্নিতেই তো আর আকবর সাহেব সম্রাট হন নাই।

রাতেই আগ্রার অনেক জায়গা ঘুরলাম। কিন্তু বেশী রাত হয়ে যাচ্ছে বলে বেশী দূর যাওয়া হচ্ছিলো না। রাতেই আবার আকবরিয়ায় ফিরে এলাম। আগামীকাল গাইড আমাদেরকে তাজমহল এবং আগ্রার আরো কিছু জায়গা আমাদের দেখাবেন। সকালেই আমাদের ভিজিট শুরু হবে। প্রথমে তাজমহল দিয়ে।

২৬/১১/১৯৯৭-কুতুব মিনার ভিজিট

দিল্লিতে থাকাকালে আমাদের সাথে থাকা গাইড কুতুব মিনার নিয়ে গিয়েছিলেন। লাল বেলে পাথরে তৈরী এই মিনারটি ভারতের প্রথম মুসলমান শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেকের আদেশে কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে, তবে মিনারের উপরের তলাগুলোর কাজ সম্পূর্ণ করেন ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। প্রখ্যাত সুফি কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। কুতুব মিনার দেখার সময় আমাদের পাশেই একদল ছাত্রদের নিয়ে কিছু ভারতীয় টিচার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কুতুব মিনারের ইতিহাস বুঝাচ্ছিলেন। আমরাও তার কিছু কিছু তথ্য বিভ্রাটে ছিলাম। আমার মনে হলো যে, ঐ টিচাএ এই ভারতীয় ছাত্রদেরকে কুতুব মিনারের আসল সত্যটা না বলে এমন কিছু মন গড়া তথ্য দিচ্ছিলেন, যা কিনা কুতুব মিনারের নামে নেগেটিভ ভাব প্রকাশ পায়। আমরা কিছু বলি নাই কারন ইতিহাস তার নিজের ধারায় উম্মোচিত হয়। তবে কুতুব মিনারের ভঙ্গুর দশা দেখে আমার কাছে মনে হলো, এক সময় এই কুতুব মিনারটির আর কোনো অস্থিত্ত হয়তো থাকবে না।

২৬/১১/১৯৯৭-সম্রাট আকবর প্যালেস।

সম্রাট আকবরের প্যালেসে আমরা যখন পৌছাই তখন বেলা প্রায় ১২টা বাজে। এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমরা যেখানে যেখানে ভিজিটে যাচ্ছি, সেখানে সেখানেই সেদিন অন্য কনো আউট সাইডার ভিজিটর এলাউ ছিল না। ফলে আমরাই গাইডের সাহাজ্যে খুব নিরিবিলিতে পুরু জিনিষগুলি দেখার সুযোগ পাচ্ছিলাম, কোনো কোলাহল ছিলো না, কোনো ভীড়ও ছিলো না।

যাই হোক, সম্রাট আকবরের প্যালেসে  এসে দেখলাম এখানে বেশ কিছু অটোমেটিক নিরাপদ বলয়ের ব্যবস্থা সম্রাট গন আগে থেকেই করে রেখেছেন। যেমন-

(১) আগেকার দিনে সব সম্রাটগনই তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের জন্য, প্রতিটি মেইন গেট এমনভাবে তৈয়ার করেছেন যে, কোনো অতর্কিত হামলায় যেনো বেশ কিছু সময় পাওয়া যায়, এই ব্যবস্থা গুলি করা। আগেকার দিনে হাতী ছিলো শক্তির একটা প্রতিক। যখন কোনো বহির্গমন শত্রু হামলা করতে আসতো, তারা হাতীর ব্যবহার বেশী করতেন। তার সাথে করতেন ঘোড়ার ব্যবহার। হাতী এবং ঘোড়া যখন তার সমস্ত শরীর দিয়ে কোনো একটা বাধা ধাক্কা দিতে চায়, সেক্ষেত্রে তাকে একটা গতির মোমেন্টাম তৈরী করতে হয়। সম্রাটগন এই অংকটা জানতেন। তাই তাদের বাসস্থান এমন একটা উচু জায়গায় করতেন যার উচ্চতা স্বাভাবিক উচ্চতার থেকে প্রায় ১০০ /১৫০ ফুট উপরে। আর এই ১০০/১৫০ ফুট উপরে উঠতে কয়েক ধাপে ঢালুর ব্যবস্থা থাকতো। এই ঢালুগুলি এই রকম করে ঝিকজ্যাক করে তৈরী করা যাতে বাক থাকে, আর প্রতিটি বাক একেবারে ৯০ ডিগ্রী বাকানো। যাতে হাতি বা ঘোড়া কিছুদুর গিয়ে তাকে পুরুপুরি ৯০ ডিগ্রী ঘুরতে হয় এবং সে আবার শুন্য গতিতে চলে আসে। তাতে হাতী বা ঘোড়ার শক্তিও শুন্য হয়ে যায়। ফলে সম্রাট শাহজাহানের প্যালেসে ঢোক্তেও ঠিক এই রকমের কিছু প্রতিবন্ধকতা দিয়েই প্রবেশ পথ সুরক্ষিত। এইরকম প্রায় ৫ থেকে ৬টা বাক আছে, আর প্রবেশ পথগুলি একেবারেই মসৃণ নয়। হাতী বা ঘোরা এই অমসৃণ পথে চলতে তাদের পায়ে ব্যথা অনুভব করতো, ফলে পায়ে ব্যাথা পাবাএ কারনেও হাতী বা ঘোড়া সঠিক গতিতে আসতে পারতো না। এবড়ো থেবড়ো কংক্রিটের রাস্তা। আমরাই স্বাভাবিক জুতা নিয়ে ঐ রাস্তায় হাটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। প্রতিটা রাস্তার দুই ধারে আবার ছোট ছোট পটহোল আহে, যেখানে সেন্ট্রিরা রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো যাতে কোনো শত্রু ঢোকতে গেলে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে মারা যায়।

(২) আমরা উঠে গেলাম সম্রাটের বাসভবনে। উঠেই দেখি, আরেক জগত। বিশাল চত্তর, চারিদিকে গাছগাছালীতে ভরা। একটা মালভূমির মতো। ঠিক মাঝখানে একটা পিতলের বিশাল বড় কলসি। এই কলসীটা এতো বড় যে, অনায়াসে ১০ বারো জন মানুষ এর মধ্যে খেলা করতে পারে। গাইড জানালো যে, শীতের দিনে সম্রাট এই কলসীতে পানি ভরে রাখতেন, সুর্যের তাপে এই পানি গরম হতো, আর রানী তার সহচরীদেরকে নিয়ে এই গরম পানিতে জলকেলি করতেন আর স্নান করতেন। রানী বলে কথা। তখন আমরা প্রশ্ন করলাম, তাহলে গরমের দিনে রানী কিভাবে ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন? গাইড জানালো, আমরা ওইটাও দেখবো কিভাবে সম্রাট রানীর জন্য ঠাণ্ডা জলের ব্যবস্থা করেছিলেন। রানী যেখানে স্নান করতেন, সেখানে কোনো সরাসরি প্রহরী নিয়োগ থাকতো না যাতে তারা দেখতে পায় রানীর গোসল বা জলকেলী। কিন্তু এলাকাটা এমনভাবে ঘেরাও করা যে, বাইরের থেকে কোনো বিপদের সম্ভাবনা নাই। সেভাবেই আউটার চত্তরে গার্ড নিয়োগ করা আছে। যাও আবার গার্ড, তারা আবার নপুংসক সব গার্ড। যাতে কেউ যদি শারীরিকভাবে উত্তেজিত হয়েও যায়, তাতে কোনো সক্ষম পুরুষ রানী কিংবা রানীরে দলবলের কোন ক্ষতির আশংকা না থাকে। শুধু এটাই শেষ নয়। কোনো কারনে যদি বৃষ্টি হয়, ঝড়ো পরিবেশ থাকে অথচ রানী গরম জলেই নিরাপদে অন্যত্র স্নান করতে পারেন, তারও ব্যবস্থা সম্রাট করে রেখেছিলেন। আরেকটি কামরা আছে যেখানে সূর্যের আলোক রশ্মি এমনভাবে ঐ রুমে পতিত হয় যেনো ঐ বড় কলসীতে রাখা পানি ঘরের ভিতরেই ধীরে ধীরে গরম হতে থাকে। সেখানে থাকতো মহিলা নিরাপত্তার বেষ্টনী। আর নিরাপদ দুরুত্তে নপুংসক কিছু রাইফেলধারী প্রহরী।

(৩) এবার গেলাম আমরা আরেকটি কামরায় যেখানে রানী তার সহচরীদের নিয়ে ঠান্ডা জলে গরমের দিনে স্নান করতেন। পাশেই গঙ্গা নদী। ঐ নদী থেকে পানির পাইপ দিয়ে সারাক্ষন ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ থাকতো যাতে কামড়াটা সারাক্ষন জলীয় বাস্পের মাধ্যমে ঠাণ্ডা থাকে। আর এই ঠান্ডা পরিবেশে কলসীতে রাখা পানিও বেশ ঠাণ্ডা থাকে। রানী গরমের দিনে এই শীতল পানিতে স্নান করেন।

পুরু জায়গাটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, আর ভাবলাম, কোনো এক সময় এই সম্রাটদের পদচারনা এ সব স্থানে পড়েছে। তারা পুরু ভারতবর্ষ এসব প্রাসাদ থেকে পরিচালনা করতেন। এখানে সবার প্রবেশের কোনো অনুমতিও ছিলো না। অথচ আজ এতো বছর পর যে কেঊ ১০০ টাকার টিকেট কেটেই যখন তখন ঢোকে যেতে পারে। রাজা নাই, সম্রাট নাই, কোনো প্রহরী নাই, আছে তাদের সমস্ত স্মৃতি আর ইতিহাস। এখান থেকে তাজমহলের চুড়াগুলি দেখা যায়। গাইড বললেন যে, সম্রাট শাহজাহানের পরিকল্পনা ছিলো এই গংগার পাড়ে শাহজাহান মহল তৈরী করার। কিন্তু তার সে পরিকল্পনা বাস্তবরূপ নেবার আগেই তিনি তার ছেলের হাতে বন্দি হন এবং বন্দি অবস্থাতেই মারা যান। সম্রাট শাহজাহানের দেহ সমাধী করা হয় তাজমহলে নূরজাহানের কবরের পাশে। আর এই কবরটাই হচ্ছে একমাত্র আইটেম যা ব্যতিক্রম। আর এর ফলে তাজমহলের সেমিট্রিক্যাল চরিত্রকে আর সেমিট্রিক্যাল রাখে নাই। অর্থাৎ তাজমহলকে যেখান দিয়েই দুইভাগ করা হোক না কেনো, শাহজাহানের সমাধির কারনে এটা দুই ভাগের যে কোনো এক ভাগে থেকে যায় সম্রাটের দেহ, সব কিছুই আর সমান সমান থাকে না।

যখন ফিরে আসছিলাম, অনেক ভাবনা মনে আসছিলো। মনে হচ্ছিলো যেনো, এই মাত্র নবাবের সাথে আমরা দেখা করেই এলাম। কেনো মনে হচ্ছিলো এ রকম?

২৬/১১/১৯৯৭-তাজমহল ভিজিট

আমরা পরদিন (২৬ নভেম্বর)  সকালে তাজমহলের উদ্দেশ্যে সবাই এক সাথে রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমাদের সাথে কোনো এক ইউনিভার্সিটির টিচার গাইড হিসাবে ছিলেন যিনি খুব ভালো ইতিহাস জানেন এবং ভাল ইংরেজি বলতে পারেন। তিনি একে একে তাজমহলের প্রবেশ দ্বার থেকে সব কিছু বলতে থাকলেন কেনো এটা প্রিথিবিতে ৭ম আসচর্জের মধ্যে একটা স্থান পেয়েছিলো। আমরাও এর অনেক কারন জানতাম না। আমি এখানে কিছু কিছু ব্যাখ্যা তুলে ধরি তিনি আমাদেরকে কি কি বলেছিলেন।

প্রথমেই তিনি তাজমহল সৃষ্টির কারন গুলি উল্লেখ করলেন। মমতাজের আসল নাম ছিলো আরজুমান্দ বানু বেগম। মহলটির কাজ শুরু হয়েছিলো ১৬৩২ সালে আর শেষ হয়েছিলো ১৬৫৩ সালে। প্রায় ২১ বছর। শিল্পনৈপুণ্যসম্পন্ন একদল নকশাকারক ও কারিগর সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন যারা উস্তাদ আহমেদ লাহুরির সাথে ছিলেন, যিনি তাজমহলের মূল নকশাকারক হওয়ার প্রার্থীতায় এগিয়ে আছেন। তাজমহলকে (কখনও শুধু তাজ নামে ডাকা হয়) মুঘল স্থাপত্যশৈলীর একটি আকর্ষণীয় নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়, যার নির্মাণশৈলীতে পারস্য, তুরস্ক, ভারতীয় এবং ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। যদিও সাদা মার্বেলের গোম্বুজাকৃতি রাজকীয় সমাধীটিই বেশি সমাদৃত, তাজমহল আসলে সামগ্রিকভাবে একটি জটিল অখণ্ড স্থাপত্য।

এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল। মমতাজ ছিলো সম্রাট শাহ জাহানের ২য় স্ত্রী।

তাজমহলের সামনের চত্বরে একটি বড় চারবাগ (মুঘল বাগান পূর্বে চার অংশে বিভক্ত থাকত) করা হয়েছিল। ৩০০ মিটার X ৩০০ মিটার জায়গার বাগানের প্রতি চতুর্থাংশ উঁচু পথ ব্যবহার করে ভাগগুলোকে ১৬টি ফুলের বাগানে ভাগ করা হয়। মাজার অংশ এবং দরজার মাঝামাঝি অংশে এবং বাগানের মধ্যখানে একটি উঁচু মার্বেল পাথরের পানির চৌবাচ্চা বসানো আছে এবং উত্তর-দক্ষিণে একটি সরলরৈখিক চৌবাচ্চা আছে যাতে তাজমহলের প্রতিফলন দেখা যায়। এছাড়া বাগানে আরও বেশ কিছু বৃক্ষশোভিত রাস্তা এবং ঝরনা আছে। চারবাগ মানেই যাতে স্বর্গের বাগানের প্রতিফলন ঘটবে।

তাজমহলের চত্বরটি বেলে পাথরের দুর্গের মতো দেয়াল দিয়ে তিন দিক থেকে বেষ্টিত। নদীর দিকের পাশটিতে কোনো দেয়াল নেই। এই দেয়ালবেষ্টনির বাইরে আরও সমাধি রয়েছে যার মধ্যে শাহজাহানের অন্য স্ত্রীদের সমাধি এবং মুমতাজের প্রিয় পরিচারিকাদের একটি বড়ো সমাধি রয়েছে। 

(১) তাজমহলে ডোকতে মোট চারটা গেট আছে, প্রতিটি গেট থেকে মেইন তাজমহল একই রকম দেখা যায়। একই রাস্তা, একই গাছ, গাছের সংখ্যাও সমান। প্রশস্ত, এবং দুরত্ত সমান। সব গাছ একই গাছ।

(2) যে গাছ গুলি তাজমহলের প্রবেশ পথ থেকে মেইন বিল্ডিং পর্যন্ত লাগানো আছে, সেই গাছগুলি এমন একটা উচ্চতা পর্যন্ত বড় হবে যা রানীর জন্য সুবিধাজনক। গাছগুলিতে ফুল ফুটলে যেনো রানীর মাথা নুয়ে ফুল তুলতে না হয়, সখীদের নিয়ে হাটতে হাটতে ফুল তুলতে পারেন, ঠিক সেই পরিমান বড় হয়ে গাছ গুলি আর বড় হবে না। কি অদ্ভুদ।

(৩) তাজমহলের প্রবেশ পথে দাডিয়ে মেইন বিল্ডিং এ তাকালে চোখে পড়বে “লা ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”। এই লেখাটা যদি কাছে গিয়া দেখা যায়, দেখা যাবে যে, প্রতিটি অক্ষর কিন্তু সমান নয়। কিন্তু তাজমহলের প্রবেশ পথে দাড়াইয়া দেখলে প্রতিটি অক্ষর সমান মনে হবে। আর এটা সূর্যের আলোর প্রতিসরনাংকের ফর্মুলা কাজে লাগিয়ে করা হয়েছে। এটা খুবই সুক্ষ একটা গনিতের ফর্মুলা। এটা এই তাজমহলে এপ্লাই করা হয়েছে।

(৪) তাজমহলের যেখান দিয়াই কেউ ডোকুক না কেনো, তাকে যদি দুই ভাগ করা হয়, তাহলে প্রতিভাগে সমান সংখ্যক গাছ, সমান সংখ্যক রাস্তা, সমান সংখ্যক বিল্ডিং, সমান সব কিছু হবে। তাই একে বলা হয় সিমেট্রিক্যাল কন্সট্রাকশন বা স্ট্রাকচার।

(৫) তাজমহলে একপাশে একটা মসজিদ আছে। তাজমহলের এই সিমেট্রিক্যাল হবার জন্য পাশাপাশি দুটো মসজিদ বানানোর নিয়ম নাই বলে, একপাশে একটা মসজিদ আর আরেকপাশে মসজিদের ন্যায় একটা জাওয়াব বানানো হয়েছে। বাহ্যিকভাবে দেখে বুঝার উপায় নাই, কোনতা মসজিদ আর কোনটা জাওয়াব । জাওয়াব আলাদা শুধু এর মেহরাম নেই আর এর মেঝে নকশা করা যেখানে মসজিদের মেঝে ৫৬৯ জন মুসল্লির নামাজ পড়ার জন্য কালো পাথর দিয়ে দাগ কাটা। তাজমহল দেয়াল ঘেরা আগ্রা শহরের দক্ষিণ অংশের একটি জমিতে তৈরি করা হয়েছিল যার মালিক ছিলেন মহারাজা জয় শিং। শাহজাহান তাকে আগ্রার মধ্যখানে একটি বিশাল প্রাসাদ দেওয়ার বদলে জমিটি নেন।

(৬) তাজমহলের চার পাশে চারটা বড় বড় পিলার আছে। স্বাভাবিক চোখে দেখলে মনে হবে যে, পিলারগুলি সোজা এবং খাড়া, কিন্তু আসলে এই পিলারগুলি একেবারেই সোজা খাড়া না। এই পিলারগুলি একটু বাইরের দিকে হেলিয়ে বানানো। কোনো কারনে যদি প্রাকৃতিক কারনে পিলারগুলি ভেঙ্গে পড়ে, পিলারগুলি যেনো কোনো অবস্থাতেই তাজমহলের ভিতরের সাইডে না পড়ে সেভাবে বানানো। এটা তার ওজনেই তাজমহলের বাইরের দিকে পড়ে যাবে, যাতে তাজমহলের কোনো ক্ষতি না হয়।

(৭) এবার যাই তাজমহলের ভিতরের অংশে। ভিতরে রঙ বেরংগের পাথর দিয়ে অনেক ইতিহাস লেখা। কখনো যৌবনের প্রতিক, কখনো কোনো প্রেমের কাহিনী। বিভিন্ন কালারের পাথর দিয়ে দিয়ে সমন্নয় করে একটা পাথর আরেকটা পাথরের সাথে নেচারালী লাগানো। কথিত আছে, সম্রাট শাহজাহান একটা পাথরও কেটে লাগাতে দেন নাই। অবিকল পাথরগুলি যেভাবে ছিলো সেটাই একটার সাথে আরেকটা খাপে খাপ মিলিয়ে মিলিয়ে সংযোগ করে লাগানো এবং প্রতিটি পাথর একে অপরের সাথে নিখুতভাবে লাগানো। কত বছর যে লেগেছে এই পাথর বাছাই করার জন্য, এবং তার সাথে রঙ এবং সাইজ মেলানোর জন্য, তার কোনো ইয়াত্তা নাই।

(৮) পাথরগুলি সেমিট্রান্সপারেন্ট। যদি ওয়ালের বা দেয়ালের এক পাশ থেকে টর্চের লাইট দেয়া হয়, ওয়াল বা দেয়ালের উলটো দিকে এই লাইট বেশ প্রবাহিত হতে পারে।

(৯) রানী নূরজাহান যেখানে শুয়ে আছেন, অর্থাৎ তার কবর, সেটায় যেনো কোনো ভিজিটর ভিজিট এর কারনে রানি বিরক্তবোধ না করেন, তার জন্য একই ডিজাইনে, একই তরিকায় ঠিক এমন জায়গায় আরেকটি নূরজাহানের কবরের মতো কবর বানানো হয়েছে যে, যেদিক থেকেই তাজমহলকে ভাগ করা হোক, একদিকে নূরজাহানের অরিজিনাল কবর আর অন্যভাগে নূরজাহানের রেপ্লিকা অর্থাৎ ফেক কবর ভাগে পড়বে। সমস্ত ভিজিটরদেরকে নূরজাহানের এই রেপ্লিকা কবর পর্যন্তই যেতে দেয়া হয়। কিন্তু আমরা যেহেতু ভারতের রাষ্ট্রীয় গেষ্ট হিসাবে বিবেচিত ছিলাম, ফলে আমরা খুব ভাগ্যবান যে, আমরা নূরজাহানের অরিজিনাল করব পর্যন্ত ভিজিট করার অনুমতি ছিলো। দেখে বুঝার উপায় নাই, কোনটা নূরজাহানের অরিজিনাল করব আর কোনটা নূরজাহানের ডুপ্লিকেট। দুটুর ডিজাইন, স্টাইল এবং সব কিছুই এক।

(১০) একষ্টিক থিউরী ব্যবহার করা হয়েছে এই তাজমহলের ভিতরে। একষ্টিক থিউরী হচ্ছে বাইরের কোনো শব্দ তার কোন সুর, কিংবা আওয়াজ নষ্ট না হয়ে বক্তা যে আওয়াজে যে সুরে কথা বলবেন, ঠিক সেতাই শুনা যাবে এই তাজমহলের ভিতরে বসেও। এটা দেখার জন্য আমাদে গাইড জানালেন যে, সম্রাট শাহজাহান, চেয়েছিলেন, যখন বাইরে আজান পড়বে, রানির ঘর থেকে যেনো অই আজানটা অবিকল কোনো শব্দ ডিসটরসন না হয় এবং রানি নূরজাহান ঠিক ঐ আওয়াজটাই শুনতে পান। এটা প্রমান করার জন্য গাইড প্রথমে আমাদেরকে একটা সুমধুর আওয়াজের অডিও শুনালেন বাইরে দাড় করিয়ে, তারপর নিয়ে গেলেন, রানীর কবরের পাশে। আবারো সেই সুমধুর আওয়াজটা বাজানো হলো। আসলেই ঠিক তাই, যে সাউন্ডটা আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম, তদ্রুপ রানীর ঘর থেকেও একই আওয়াজ শুনা যাচ্ছিলো।

(১১) তাজমহল একটা জাইরো সিস্টেমে তৈরী করা। অর্থাৎ পুরা তাজমহল কোনো কারনে যদি ভুমিকম্পের কবলে পড়ে তাহলে এটা অর্থাৎ পুরু তাজমহল প্রায় একদিকে সারে সাত ডিগ্রি অন্য দিকে সারে সাত ডিগ্রী হেলে গেলেও তাজমহলের কোনো ক্ষতি হবে না। অর্থাৎ দুই দিকে মিলে তাজমহল প্রায় ১৫ ডিগী হেলতে পারে। এর ফলে তাজমহল প্রায় ৭ রেক্টর স্কেলের ভুমিকম্প সহ্য করার মতো একটা স্ট্রাকচারাল ডিজাইন হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাজ মহল এর মধ্যে নাকি পর পর দুবার প্রায় এই সম পরিমান ভুমি কম্পে পড়েছিলো কিন্তু এই হেলতে পারা জাইরোর কারনে তাজমহলের কোনো ক্ষতিই হয় নাই। 

(১২) তাজমহলে দাঁড়িয়ে যদি সকালবেলা পূর্ব দিকে সুর্য উঠা দেখেন, তাহলে সুর্য শাহজাহান মহল থেকে যেনো উদিত হচ্ছে এটাই বুঝা যাবে, এটা বছরের যে কোনো সময়ের জন্যই প্রযোজ্য। আবার শাহজাহান মহলে কেউ দাড়াইয়া যদি সুর্যাস্ত দেখেন, তাহলে বছরের যে কোনো সময় মনে হবে যে, সুর্য মমতাজ মহলের উপর দিয়ে সুর্যাস্ত হচ্ছে।

এই রকমের আরো অনেক বৈজ্ঞানিক কারন রয়েছে যার কারনে তাজমহল বিশ্ববাসীর কাছে ৭ম আসচর্যের মধ্যে একটা স্থান করে নিয়েছে। এটা কোনো স্বাভাবিক বিল্ডিং বা স্ট্রাকচার নহে।  আমরা প্রায় ঘন্তা তিনেক তাজ মহলে থাকার পর বেরিয়ে গেলাম সম্রাট আকবরের আস্তানায়।

০৬/০৩/১৯৯৬-ডমিনিকান ভ্রমন

হাইতিতে জাতী সংঘের অধীনে মিশন করতে এসে আশে পাশের অনেক গুলি দেশ বেরানর ইচ্ছা প্রথম থেকেই আমার ছিলো। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে ছিলো ডমিনিকান দেশটি ঘুরে দেখার। এর প্রধান কারন হলো, এতা হিসপানিওয়ালার একটি দেশ। অনেক ছোট বেলায় পড়েছিলাম ইবনে বতুতার কথা, তারপর সেই আমেরিকা আবিষ্কারের কথা। আমেরিকা আবিষ্কার যিনি করেছিলেন যেই জাহাজতা দিয়ে তিনি এসেছিলেন, এটা নাকি এই ডমিনিকানে এখনো আছে। এই রকম আরো অনেক কাহিনী ছোট বেলায় পরেছিলাম। স্বাভাবিক কারনেই এতো কাছে এসে ডমিনিকানে যাবো না, এটা হবে একতা অন্যায় বা অপরাধ। 

যাই হোক, আমরা একতা গ্রুপ করে ফেললাম ডমিনিকানে যাওয়ার জন্য। গাড়ির পথ। হাইতির পাশাপাশি দেশ। আমাদের নিজস্ব গাড়ি আছে। ইউ এন এর গাড়ি। কোনো ভিসার দরকার নাই। ডমিনিকানের চেক পোষতে গিয়ে আমাদের জাতীসংঘের স্টাফ হিসাবে পরিচয় দিলেই আমরা ঢোকতে পারবো এতাই আমাদেরকে জানানো হয়েছিলো কন্সুলেট অফিস থেকে।

আমি, মেজর ইশতিয়াক (৯ম লং কোর্ষ), মেজর মোসাদ্দেক (১১ তম লং কোর্ষের), মেজর ফরিদ (১১তম লং কোর্ষের), মেজর ইলিয়াস (১৭ তম লং কোর্ষের) মেজর ফারুক (১০ম লং কোর্শগের) আর নেভীর একজন অফিসার মিলে আমরা সবাই বেরিয়ে গেলাম ডমিনিকানের উদ্দেশ্যে।

আকাবাকা পাহাড়ি সরু রাস্তা, আশেপাশে কোনো গ্রাম চোখে পড়লো না খুব একটা। মাঝে মাঝে কিছু লকের আনাগোনা দেখা গেছে আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের মতো কিন্তু তারা কোথা থেকে কই যায় বা কোথায় থাকে এ ব্যাপারে খুব একটা জানা হলো না। আমরা ছুটে চলছি তো চলছিই। ক্যারিবিয়ান পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূরা এখানেই অবস্থিত যার নাম পিকো ডুয়ার্তো। সেন্ট ডমিনিকের নামানুসারেই এই দ্বীপ টির নাম হয়েছিলো। এর রাজধানির নাম সেন্ট ডমিনিগো। বর্তমানে ডমিনিকানের প্রেসিডেন্ট হিসাবে আছেন লিওনেল ফার্নেন্দেজ।

প্রায় ৪ ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে প্রায় সকাল ১১ তার দিকে আমরা ডমিনিকান চেক পোষ্টে পৌঁছে গেলাম। খুব একটা সুরক্ষিত বর্ডার বলে মনে হলো না। আমাদের দেশের কিছু বিডি আর সেনাদের মতো লেথাজিক কিছু সৈনিক দিয়ে ডমিনিকা বর্ডারটার চেক পোষ্ট পাহাড়া দেয়া আছে। তবে মেইন গেটে কাতা তারের বেড়ায় কোনো লোক ঢোকতে পারে না এটা ঠিক। আমরা ইউ এন এর গাড়ি গেটের সামনে থামতেই গুটি কয়েক ডমিনিকান সৈনিক আমাদের কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের আসার হেতু কি। হাইতি এবং ডমিনিকানের সাথে যে কমন শহর, তার নাম আসলে মন্ট ক্রিষ্টি। যদিও মন্ট ক্রিষ্টি ডমিনিকানেরই একটি শহর কিন্তু আমরা সেখানকার কো-বর্দার দিয়েই ডমিনিকানে ঢোকেছি।

এখানে একতা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম যে, হাইতিতে প্রায় ৯০% মানুষ কালো আর ডমিনিকানের প্রায় ৯০% লোক সাদা চামড়ার। পাশাপাশি দেশ কিন্তু বিস্তর তফাত। হেসিয়ান লোকগুলি অনেক অস্থির, চালাক আর ফ্রড জাতীয় কিন্তু ডমিনিকানের লোকগুলি ধীর স্থির, কো-অপারেটিভ, ভদ্র বলেই মনে হলো। গেটের সৈনিকগুলি আমাদের সবার পাস পর্ট নিয়ে চলে গেলো ভিতরে। প্রায় ৪০ মিনিট পর এসে জানালো যে, তারা আমাদের পাস্পোর্ট এখুনি ফেরত দিবে না, যখন আবার ব্যাক করবো, তখন গেট থেকে নিয়ে গেলেই হবে। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, যে, যেহেতু আমরা ইউ এন এর গাড়ি নিয়েই ভিতরে যাবো, তখন যদি কোনো প্রশাসন কিংবা আইন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা আমাদেরকে কিভাবে ডমিঙ্কানে প্রবেশ করলাম জিজ্ঞেস করে, তাহলে কি বল্বো? আমাদের কোনো সমস্যা হবে কিনা। ব্যাপারটা তারা বুঝতে পারলেন। ফলে আমাদের সাথে তাদেরই একজন একোম্পানি করবেন বলে রাজী হলেন। এতে আমাদের লাভ হলো দুটু। একজন বিনে পয়সায় গাইড পাওয়া গেলো আবার কোনো ঝামেলা হলে সেইই ব্যবস্থা নিবে।

আমরা ঢোকে গেলাম ডমিনিকানে। খুব সাজানো গুছান একতা দেশ। গরমের সিজন। দেখলাম, ছেলেমেয়েরা খুব নিরাপদেই গাছের ছায়ায় কেউ ঘুমাচ্ছে, আবার কেউ কেউ আড্ডা মারছে। সবাই খুব ভদ্র। আমাদেরকে দেখে অনেকেই এগিয়ে এলেন, হাত মিলালেন, হাসিখুসিতে অনেকে আবার ছবিও তুল্লেন/ ব্যাপারটা খুব মজার। অনেকেই ইংরেজী বলতে পারেন কিন্তু তাদের প্রধান ভাষা হচ্ছে স্প্যানিশ।

ডমিনিকানের প্রধান ধর্ম হচ্ছে রোমান ক্যাথোলিজম। এদের মুদ্রার নাম ডমিনিকান পেসো। আমাদের কাছে ডলার ছিলো, এদেশে ডলার চলে। কিন্তু কোনো কিছু কিনতে গেলে ডলার নেয় ঠিকই কিন্তু দেয় পেসো। আর এক ডলার সমান প্রায় ১৫০০ পেসোর সমান। হাইতিতে অবশ্য ওদের এক হেসিয়ান ডলারের সমান প্রায় ৫ হেসিয়ান ডলার। এদিক দিয়ে ডমিনিকান দের কারেন্সীর অবমুল্যায়ন ধরা যায়। ডমিনিকানে হেসিয়ান ডলার ও চলে। তবে বেশী আগ্রহী অয় তারা। আমরা খুব বেশী মার্কেটিং করার ইচ্ছায় এখানে আসি নাই, তাই এটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথ ব্যথাও নাই।

আমরা আশেপাশের কিছু জায়গা ঘুরে দেখলাম। আমরা আসলে মন্টি ক্রিষ্টি শহরের মধ্যেই ছিলাম। এর বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় নাই কারন আমরা আবার সেদিনই হাইতিতে ফিরে যেতে হবে আর আমাদের রাত থাকার অনুমতি ছিলো না। দুপুরের দিকে আমরা একতা দোকান থেকে কিছু ড্রাই ফুড খেয়েই আবার বিকাল দুইতার দিকে হাইতির উদ্দেশ্যে র ওয়ানা দিয়ে চলে এলাম হাইতিতে।

আমাদের সেই হিস্পানিওয়ালার জাহাজ দেখা হয় নাই। কিংবা আরো বড় বর যে ইতিহাস পড়েছিলাম, তার কিছুই দেখা হয় নাই। এ জীবনে আর কখনো এদেশে আসা হয় কিনা আমার জানা নাই তারপরেও ভাবলাম, ডমিনিকান এর বর্ডার টা তো ছুয়ে গেলাম।

১৮/১২/১৯৯৫-হাইতির জেনারেল (প্রেসিডেন্সিয়াল) ভোট

অনেক চড়াই উতড়াইপার হয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা হাইতিতে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন করতে পারলাম। গতকাল ১৭/১২/১৯৯৫ তারিখে প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন হয়ে গেলো। এখানে মুলত ১৪ জন ক্যান্ডিডেটস ছিলো যার মধ্যে মুলত তিন জনের মধ্যেই লড়াইটা হয়েছে। প্রথম জন রেনে গারসিয়া প্রিভাল (যাকে সবাই রেনে প্রিভাল নামেই চিনে), তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্তে ছিলেন। অত্যান্ত অমায়িক একজন মানুষ। প্রায়ই তিনি আমাদের বেস ক্যাম্পে আসেন, সবার সাথে কথা বলেন, সন্ধায় এলে সবাই আমরা মিলে চা কফি খাই। বেশ সাধারন একজন মানুষ। একটা দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট যে এতো সাধারনভাবে আমাদের ক্যাম্পে আসেন, বুঝাই যায় না। এখানে তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারটা নিয়ে তিনি একেবারেই উদ্বিগ্ন নন। কারন পুরু বেস ক্যাম্পটাই নিরাপদ। এই ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনে প্রিভাল গতকাল ইলেকশনে প্রায় ৮৮% ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরিস্টিডের স্থলাভিষিক্ত হবেন আগামি ৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬ তারিখ থেকে। ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনে প্রিভাল “ল্যাভালাস পলিটিক্যাল অরগ্যানাইজেশন” (যাকে সক্ষেপে বলা হয় ওপিএল) থেকে দাড়িয়েছিলেন। মুখ ভর্তি দাড়ি। দেখলে অনেকটা আমাদের এশিয়ান এশিয়ান টাইপের মনে হয়।

২য় ব্যক্তি ক্যান্ডিডেট হিসাবে ছিলেন লিও জুন। তিনি সতন্ত্র দল বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে দাড়িয়েছেন। ভোটের দিক দিয়ে তিনি মোট ভোট পেয়েছেন প্রায় ২.৫% । তাকে আমরা দেখি নাই। অন্তত আমি এখনো দেখি নাই। আর ৩য় ব্যক্তি যিনি ক্যান্ডিডেট হয়েছিলেন তাঁর নাম ছিলো ভিক্টোর বিনোত। তিনি দাড়িয়েছিলেন “কোনাকমঃ (KONAKOM) পার্টি থেকে। কোনাকম পার্টি আসলে মডারেট সোশ্যালিস্ট পলিটিক্যাল পার্টি যার ইংরেজী নাম হচ্ছে ন্যাশনাল কংগ্রেস অফ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং হেসিয়ানরা একে চিনে কোনাকম নামে। তাঁর ভোটের পরিমান ছিলো সবচেয়ে কম, মাত্র ২.৩%

বাকী ১১ জনের নাম ও আমরা প্রায় আগে খুব ভালভাবে শুনেছি বলে মনে হয় না। তাদের নাম গুলি এই রকমেরঃ

রেনে জুলিয়েন,

ক্লার্ক প্যারেন্ট- হেসিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি

ইদি ভোলেল – ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক র‍্যালি

রিচার্ড ব্লাদিমির -প্যারাদাইস পার্টি

ফ্রান্সিস জীন – রিভুলেশনারী মিলিটারি ফোর্স

জীন আর্নল্ড ডুমাস-ন্যাশনাল পার্টি অফ ওয়ার্কার্স ডিফেন্স

জুলিও লারোসিলেরী-

মিষ্টার জোসেফ- হেসিয়ান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি

গেরাল্ড ডাল্ভিয়াস – অল্টারনেটিভ পার্টি অফ হেসিয়ান ডেভেলপমেন্ট পার্টি

রকফেলার গুরি – ইউনিয়ন অফ ডেমোক্র্যাটিক প্যাট্রিওটস

ফার্মিন জীন লুইস 

মজার ব্যাপার হলো বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরিস্টিড এই ইলেকশনে অংশ গ্রহন করেন নাই। করলে হয়ত তিনি পাশ করতেন। কিন্তু হেসিয়ান সংবিধানের বাধ্যবাদকতার জন্য তিনি অংশ গ্রহন করেন নাই। তবে তাঁর মনোনীত এবং তারই অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনে প্রিভালকে তিনি মনোনীত করেছেন। এবং ফলাফল তাইই হয়েছে যে, রেনে প্রিভাল জয়ী হয়েছেন। সেক্ষেত্রে ধরা যায় যে, যদি এরিস্টিড দাড়াতে পারতেন, তাহলে এবারো তিনিই প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন।

আমি বহুবার এই ধর্মজাজক মানুষটির সাথে মিশেছি। আমি তাঁর প্যালেসে প্রায় তিন মাস একটানা ডিউটি করেছি। মাঝে মাঝেই আমি তাঁর খুব কাছ থেকে অনেক সান্নিধ্য পেয়েছি। 

০৫/১২/১৯৯৫-নর্থ ইষ্টার্ন ইনিভার্সিটি এবং এমআইটি ভিজিট

ভাইয়া নর্থ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে প্রোফেসারি করেন। এর ঠিক উলটো দিকেই হচ্ছে এম আই টি ইউনিভার্সিটি। ভাইয়া আমাকে ওনার ইউনিভার্সিটি তে নিয়ে গেলেন। আজ একটু শীত কম পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশাল বড় একটা ইউনিভার্সিটি। ভাইয়ার অফিসে গেলাম, ভাইয়ার আরো অনেক কলিগ, তাদের অফিসেও গেলাম। এরা সবাই অনেক উচু দরের মানুষ। ভাইয়া আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, তুই ইউনিভার্শিটিটা ঘুরে ঘুরে দেখতে পারিস। কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরে যাস না। দুপুরে একসাথে অন্যান্য কলিগদের সাথে ক্যাফেটেরিয়ায় লাঞ্চ করবো। এর মাঝে আমি কিছু কাজ সেরে নেই, আর তুইও ঘুরে ঘুরে দেখ। ভালোই হলো। ভাইয়া সাথে থাকলে আমার সিগারেট খাওয়া হয় না। এবার আনন্দের সাথে সিগারেট খাওয়া যাবে।

আমি ভাইয়ার অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রথমেই যেখানে পৌঁছলাম, সেতাই আসলে স্টুডেন্ট ক্যাফেটেরিয়া। দেখলাম, অনেক ছেলেমেয়েরা একটা বোর্ডের সামনে বেশ সুন্দর করে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অদূরে দাঁড়িয়ে একতা সিগারেট ধরালাম। এখানে সিগারেট খাওয়া যায় কিনা আগে আমি চেক করে নিয়েছি। আমি দেখেছি এক ভদ্রলোক, সম্ভবত ছাত্রই হবে, সে সিগারেট খাচ্ছিলো। ফলে আমার ধারনা যে, এই স্থানে সিগারেট খাওয়া যায়। আমি সিগারেট খাচ্ছি আর ঐ জটলা ছেলেমেয়েদেরকে দেখছি। একজন একজন করে তারা কি যেনো একটা নোটিশ বোর্ডে পিন দিয়ে লাগাচ্ছে। লাগিয়েই আবার চলে যাচ্ছে।

আমার সিগারেট খাওয়া শেষ হলে আমি বোর্ডটির কাছে গিয়ে দেখি তখন মাত্র দুজন ছাত্র দাঁড়িয়ে। ওরা ইলেকশন পোষ্টার লাগাচ্ছে। কয়েকটি দলের ছাত্র ওরা। পোষ্টার দেখে বুঝলাম।

খুব মজার ব্যাপার হলো, যে যেই দলই করুক, তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো দন্দ দেখলাম না। হানাহানি, হিংস্রতা, কিংবা একে অন্যের উপর রেষারেষি তো নাইই। আমাদের দেশে হলে ইতিমধ্যে মারামারি লেগে যেতো।

০২/১২/১৯৯৫-অস্ত্র ক্রয়

শেষ পর্যন্ত আমার আগ্নেয়াস্ত্র টা মনে হয় কেনাই হলো। বেরেটা পিস্তল। খুব সুন্দর। হাতের তালুতেই রাখা যায়। বব নামের একটি দোকান থেকে কিনতে গেলাম। কেনার আগে অনেকগুলি অস্ত্র দেখালো আমাকে। দোকানদারকে আগেই সমস্ত কাগজপত্র ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ভাইয়া। ফলে এই দুইদিন দোকানদার সমস্ত কাগজ ভেরিফাই করে আজকে আমি যেটা কিনতে চাই সেতা কিনতে পারবো বলে দোকানে গিয়েছিলাম। দোকানীদের ছোট একটা এসি করা ফায়ারিং রেঞ্জ আছে। ওখানে টেষ্ট ফায়ার করা যায়। তবে সর্বোচ্চ ৫ রাউন্ড পর্জন্ত ফায়ার করতে পারবেন। আমি টেষ্ট করলাম। মাত্র ২০০ ডলার। খুবই সস্তা। বাংলাদেশ থেকে আমি যে আগ্নেয়াস্ত্রলাইসেন্স পেয়েছিলাম, সেটা করমুক্ত লাইসেন্স। ফলে আমাকে কোনো কর দিতে হবে না। যদি কর দিতে হতো, তাহলে আমাকে ৩৫০% ট্যাক্স দিয়ে এই অস্ত্র কিনতে হতো। তখন এর দাম পড়তো (২০০+ ৭০০)= ৯৫০ ডলার। কিন্তু আমার পড়ছে মোট ২০০ ডলার।

দোকানদার এই মর্মে জানালেন যে, আমি এখনই এই অস্ত্র সাথে করে নিয়ে যেতে পারবো না। ওনারা উক্ত অস্ত্র বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন, আমাকে বাংলাদেশ থেকে রিসিভ করতে হবে। কিছুই করার নাই কারন আমেরিকায় আমাই অস্ত্র সহ ঘুড়তে পারবো না, সেই অনুমতি আমার নাই। আবার আমি আমেরিকা থেকে হাইতিতেও অস্ত্র বিশেষ করে ব্যক্তিগত অস্ত্র নিয়ে যেতে পারবো না, হাইতির আইনেও আমি অনুমতি প্রাপ্ত নই। ফলে কবে নাগাদ দোকানদার এই অস্ত্র বাংলাদেশে পাঠাবে, সেই তারিখতা আমাকে বলে দিতে হবে যাতে বাংলাদেশে পৌছার পরেই যেনো বেশি দেরী না করে আমি এয়ারপোর্ট থেকে অস্ত্রটি তুলে নিতে পারি।

আমি তাতক্ষনিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বলতে পারলাম না। তবে ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে কনফার্ম তারিখ বলতে পারবো এতা জানালাম। দোকানদার তাতেই মন্তব্য লিখে আমাদেরকে একটা চালান কপি দিয়ে দিলেন।

খুব ভালো লাগছে যে, অনেকদিনের আমার একটা শখের জিনিষ কেনা হলো। এতা দিয়ে আসলেই আমার কোনো উপকার হবে কিনা আমি জানি না কিন্তু শখ বলে কথা। মাসুদ সাথে গিয়েছিলো। ওর হাজার রকমের প্রশ্ন। ও নিজে একটা কিনতে পারবে কিনা, কিনলে কিভাবে এতা চালাইতে হয়। ইত্যাদি।

৩0/১১/১৯৯৫-পিস্তল কেনার প্রস্তুতি

হাইতিতে আসার সময়  বাংলাদেশ থেকে আমি একতা অনুমতি নিয়ে এসেছিলাম যে, যদি আমেরিকায় যাওয়া হয়, তাহলে ওখান থেকে একতা পিস্তল কিনবো। ভাইয়াকে গত সপ্তাহে জানালাম আমেরিকা থেকে পিস্তল কেনা যায় কিভাবে। ভাইয়া কোথায় কোথায় কি কি জানি ফোন করে করে আমাকে জানালেন যে, কেনা যাবে তবে বেশ কিছু কাগজপত্র লাগবে। তাঁর মধ্যে দুটো কাগজ আমার কাছে নাই আর বাকী সবগুলিই আছে। দুটূ কাগজের মধ্যে একটা হচ্ছে আমেরিকার দুতাবাস থেকে ছাড়পত্র এবং আমি যেখানে কাজ করছি (অর্থাৎ হাইতি, সেখানকার কন্টিনজেন্ট কমাডারের অনুমতি পত্র)।

আমি হাইতি থেকে আসার পথে কন্টিনজেন্ট কমান্ডারের কাছে এই ব্যাপারে এপ্লাই করে এসেছিলাম, ফলে ফ্যাক্সের মাধ্যমে চাইলেই সেটা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমেরিকার দুতাবাস থেকে ছাড়পত্র কিভাবে নেবো? ভাইয়া, আমেরিকায় বাংলাদেশ দুতাবাসে ফোন করলেন। বাংলাদেশ এম্বেসী অফিসের ডি এ (ডিফেন্স এটাশে) হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুনসুর আহমেদ। এক সময় আমাদের ৯ আর্টিলারী ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। আমার সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। ভাইয়া নিজেই কথা বললেন দুতাবাসের সাথে, হাবিলদার আছে একজন, সে ভাইয়ার ফ্যাক্স নাম্বারে ছাড়পত্র আগামী দু একদিনের মধ্যেই পাঠিয়ে দেবেন এবং সাথে সাথেই হার্ড কপিও ডি এইচ এল এর মাধ্যমে আমাদেরকে পাঠিয়ে দেবেন বলে নিশ্চিত করলেন। ফলে আমার অস্ত্র কেনায় আর কোনো ঝামেলা রইলো না। এবার খুজে বের করতে হবে কোথায় অস্ত্র বিক্রি করে। এতাও ভাইয়াই খুব আগ্রহের সাথে এখানে সেখানে যোগাযোগ করছেন। আমার কিছুই করতে হচ্ছে না।

২৯/১১/১৯৯৫-আমেরিকায় সেল

একটা মজার কথা না বললেই হচ্ছে না। আজ প্রায় ১৫ দিন পার হয়ে গেলো আমি ভাইয়ার বাসায় আমেরিকাতে এসেছি। এর মধ্যে অনেক জায়গায় গিয়ে অনেক পদের মার্কেটিং করছি ভাবিকে নিয়ে। বেশীরভাগ মার্কেটিং করছি কসমেটিক্স আর কিছু নিত্য ব্যবহারের জিনিষ। যখনই আমি ঐ যে এয়ারপর্ট থেকে পাওয়া কার্ডটি দিচ্ছি, সবাই খুব অবাক হচ্ছে। কারন এই কার্ডধারী খুব একজন সাধারন মানুষ হতে পারে না। যতোবারই কার্ড তা দেখিয়েছি, আমি লাইনে থাকা মানুষ গুলির মধ্যে প্রাইয়োরিটি পাচ্ছি, আর কোনো প্রকারের ভ্যাট, ট্যাক্স দিতে হচ্ছে না। এখানে প্রায় ৩০% ট্যাক্স দিয়ে সব কিছু কিনতে হয়। এর মানে আমি যদি ১০০ ডলারের একটা জিনিষ কিনি, আমাকে পে করতে হবে ১৩০ ডলার। কিন্তু আমার বেলায় ১০০ ডলারের জিনিষ ১০০ ডলারই। দারুন একতা ব্যাপার। এতা যখনই ভাইয়ার ক্লজ বন্ধু বান্ধবদের কাছে জানাজানি হয়ে গেলো, অনেকেই আমার এই কার্ড ব্যবহার করে অনেক মার্কেটিং করে নিলো। আমারো খুব ভালো লাগছিলো যে, আমি অন্তত একটা ব্যতিক্রমী জিনিষ উপহার দিতে পারছিলাম।

আরেকটি জিনিষ আমার কাছে খুব অবাক লাগলো যে, প্রায় সারা বছরই আমেরিকার দোকানগুলিতে “সেল” লেগেই থাকে। “সেল” মানে হচ্ছে ডিস কাউন্টে কোনো কিছু ছেড়ে দেওয়া। হিড়িক পড়ে যায় তখন। আবার এমন হয়েছে যে, গতকাল আমি একটা জিনিষ কিনেছি, কিন্তু সেল” হয়েছে আজ থেকে ঐ আইটেমটার উপর। আমি যদি গতকালের রিসিপ্ট নিয়ে ঐ দোকানে যাই, তারা আবার আজকের দিনের “সেল” এর হিসাব ধরে টাকা হিসাব করে আমাকে বাকী টাকা ফেরত দিবে। কি তাজ্জব ব্যাপার এই দেশে। শুধু তাই না। আরো একতা মজার কাহিনী চোখে পড়লো যে, প্রায় ১৫ দিন আগে কেউ একটা শার্ট বা প্যান্ট কিনে নিয়ে গেছে, ব্যবহার করেছে, ১৫ দিন পরে এসে দোকানে বল্লো যে, আমার এই শার্ড় টা আর ভালো লাগছে না, আমি ফেরত দিতে চাই, ওমা, তারা সব তাকা ফেরত দিয়ে দিচ্ছে আবার “সরি” ও  বলছে যে, জিনিষটা ক্রেতার পছন্দ হয় নাই বলে। বাংলাদেশ হলে বাঙ্গালীরা সারা বছর খালী এভাবে মাগনা মাগনা কিনতো আর বদল করে করে নতুন জিনিষ নিয়ে আবার বদল করতো। এটা আমেরিকা। কোনো যুক্তি ছাড়া এরা দুই নম্বরী করে না।

২৫/১১/১৯৯৫-বোষ্টনে বাঙ্গালি পরিবারে দাওয়াত

সন্ধার সময় ভাইয়া আজকে আমাকে নিয়ে একটি বাঙ্গালী পরিবারে বেরাতে নিয়ে গেলেন। ভাইটির নাম বশীর। তিনি পাকিস্থানী। কিন্তু আপা আমাদের ঢাকার তেজকুনী পাড়ার মেয়ে। বহু বছর আগে তারা দেশ ছেড়েছে। আগে থেকেই সম্ভবত তারা জানতেন যে, আমি আসবো। ফলে আমার সুবাদে এবং ভাইয়ার সুবাদে আরো অনেক বাঙ্গালী পরিবারের কেউ কেউ এসেছেন। আমি কাউকে চিনি না বলে খুব একটা সখ্যতা গড়ে তুওলতে পারছি না। কিন্তু এদের মধ্যে অনেকেই আমাকে একটি প্রশ্ন বারবার করছিলেন যে, আমার ভাই আমেরিকার এতো বড় একতা ইউনিভার্সিটিতে প্রোফেসর কিন্তু আমি আর্মীতে গেলাম কেনো? আর্মী একতা ভালো প্রোফেশন না। তারা মনে করেন, Why should someone to choose a profession to kill someone to survive himself? Its risky and not a good profession.

আমি হেসে হেসেই বলছিলাম, কাউকে না কাউকে তো দেশের আর্মীতে যেতে হবে, সেতা না হয় আমরা কজন গেলামই।

পার্টিতে হাতে বানানো মিষ্টি খেলাম, পোলাও করেছিলো, সবাই খুব আনন্দের সাথে ত্রিপ্তি করে খেয়ে বল্লো, যাক, ছোট ভাইয়ের সুবাদে আজ নাকি তারা বাঙ্গালি খাবার খেলো।

২০/১১/১৯৯৫-বোষ্টন

এই কয়দিন ভাইয়ার বাসায় আছি। শীতের প্রকোপ কমছে না। বাইরে গেলেই তুষারপাত। গতকাল সবাই মিলে একটি ছবি দেখলাম। দি রেইন ম্যান। একটা অটিষ্টিক বাচ্চার কাহিনী। ইউসুফের সাথে প্রচন্ড মিল রয়েছে। সকালের দিকে আমি মাসুদের স্ক্লে গিয়েছিলাম। সুন্দর একটা স্কুল। কো-এডুকেশন অবশ্য। স্কুলে গিয়ে বুঝলাম মাসুদ খুব জনিপ্রিয়। ওর ক্লাশ টিচারের নাম মিস ম্যাপল। মাসুদ আমাকে ওর ক্লাশ টিচারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর ঊনি আমাকে বললেন যে, আমার পক্ষে সম্ভব কিনা হাইতির উপর একটা ছোট খাটো প্রেজেন্টেশন দেওয়া। আমি আসলে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। তারপরেও বললাম, যদি ম্যাপ থাকে তাহলে আমি হয়ত চেষ্টা করতে পারি।

যেই বলেছি যে, আমি ৩০/৪০ মিনিটের একটা ক্লাশ নেবো, অমনি সব ছাত্ররা তাদের টেবিল চেয়ার রুমের একদিকে টানাটানি করে সরিয়ে দিলো, একটা হল ঘর হয়ে গেলো। এই চেয়ার টানাটানির সময় আমি আর মাসুদ মিলে ওদের কম্পিউটার থেকে হাইতির একটা ম্যাপ বের করে ফেললাম। আর আমি একটা ছোট নোট লিখে ফেললাম কি কি বল্বো আর কি কি বল্বো না।

বাচ্চারা খুব হাসি খুশীতে সবাই বসে পড়লো। আমারো খুব ভালো লাগছিলো এই সব পটেনশিয়াল বাচ্চাদেরকে কিছু একটা বলতে।

তাদের হাইতি সম্পর্কে যতোতা না উতসাহ, তাঁর থেকে বেশি উতসাহ দেখলাম আর্মীর জীবন নিয়ে। কি হয়, কিভাবে থাকি, কিভাবে অস্ত্র চালাই, সব অস্ত্র চালাইতে পারি কিনা। একটা গুলি করলে কতজন মরে, আমি শত্রুদেরকে কিভাবে ঘায়েল করি। আকাশ থেকে লাফ দিয়ে পড়তে পারি কিনা। যদি পারি, আর যদি আর না বাচি তাহলে কিভাবে কি আরো কতো যে কি?

হাইতিতে আমি কতজনকে এরেষ্ট করেছি, ওরা আমাদেরকে মারে কিনা, ওদের কি অস্ত্র আছে, সরকার সবাইকে একসাথে ধরে মেরে ফেলে না কেনো ইত্যাদি। ৪০ মিনিটের ক্লাস হয়ে গেলো প্রায় দেড় ঘন্টার। মিস ম্যাপেল শেষে এসে বললেন, মাসুদ এবং আমাকে অনেক ধন্যবাদ ওদেরকে সুন্দর কিছু বলার জন্য এবং আমি টাইম দেওয়ার জন্য।

ওদের স্কুল দেখে একটা জিনিষ বুঝলাম, স্কুলের প্রতিটি দেওয়ালে দেওয়ালে হরেক রকমের ইনফর্মেশন, ম্যাপ, বিভিন্ন সংবাদ এবং বিশেষ ব্যক্তিদের ছবি সহ তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী। মাসু মাত্র ক্লাস এইটে পড়ে। ওদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক বাস্তব ধর্মী। বিভিন্ন ধর্মের ছেলেমেয়েরা আহে। কয়েকজন মুসলমান ছাত্রো এবং ছাত্রীকে দেখলাম। ছাত্রীরা ছোট ছোট হেজাব পড়ে আছে। আমাকে দেখে সালামও দিয়েছে।

সুন্দর একতা সময় কাটলো আজ কে মাসুদের স্কুলে।

১৬/১১/১৯৯৫-আমেরিকা গমন-উইজার্ড ৯৫

বহুদিন ধরেই আমেরিকায় যাবো যাবো করে যাওয়া হচ্ছে না। এখান থেকে আমেরিকা মাত্র ৪৫ মিনিটের ফ্লাইট জার্নি। হাবীব ভাইয়ের সাথে প্রায়ই কথা হয়। হাবিব ভাইও আমাকে বারবার যাওয়ার জন্য বলছেন। অনেকে আবার একবার আমেরিকার ভিসা লাগানোর কথা বলছেন। এ জাতীয় ব্যাপারে আমি বড় উদাসীন। তারপরেও এতো কাছাকাছি এসে ভাইয়ার কাছে যাবো না এটা হয় না। তাই ভিসার জন্য এপ্লাই করেছিলাম, ভিসা পেয়েছি এক বছরের মাল্টিপ্যাল ভিসা। কেএলএম বিমানে টিকেট কাটা হয়েছে, ১৫ নভেম্বর, অর্থাৎ গতকাল। আমার ফ্লাইট সিডিউল হচ্ছে হাইতি-লোগান (বোষ্টন) সরাসরি। 

যেহেতু বিমান বন্দরের সবাই আমাকে চিনে এবং এখানেই আমার ডিউটির জায়গা। ভাবলাম, শেষ মুহুর্তে গেলেও কোনো অসুবিধা নাই। আমার ফ্লাইট বিকাল ৫ টায়। ভিভিআইপির মতো ইমিগ্রেশনে গেলাম প্রায় সাড়ে চারটায়।

ওমা। গিয়ে দেখি বিমানের ডোর ইতিমধ্যে ক্লোজ হয়ে গেছে। ওরা তো আর জানতো না যে, আমি এই বিমানের যাত্রী। তাদেরকে আমি আগে থেকেও জানাই নাই। ফলে দোষটা যে আমার এটাতে কোনো সন্দেহ নাই। ইমিগ্রেশন অফিসার জানালো যে, স্যার, এখন তো আর কোনোভাবেই আপনাকে ঢোকানো সম্ভব না। আপনি এক কাজ করেন, নেক্সট ফ্লাইট আছে রাত আটটায়। কিন্তু ওটা সরাসরি না গিয়ে জেএফকে হয়ে তারপর কানেক্টিং ফ্লাইটে বোষ্টন এয়ারপোর্ট লোগানে যেতে হবে। কিছুই করার নাই।

ফলে আমি ওদেরকে বললাম, সেভাবেই তাহলে আমার ইমিগ্রেশন করে রাখেন। ওরা আমাকে একটু আগেভাগেই এম্বারকেশন টিকেট হাতে ধরিয়ে দিলো। কিন্তু এবার যাচ্ছি আমেরিকান এয়ারলাইন্সে। কেএলএম বাদ। আমার ভাই জানেন যে, আমি কেএলএম বিমানে সরাসরি ফ্লাইটে লোগানে নামবো। আমি এই চেঞ্জটা আর ভাইয়াকে জানাই নাই কারন যেহেতু যাচ্ছিই আর আমি যে এই রকম একটা বোকার মতো কাজ করে ফেলেছি সেটা আর জানাতে চাই নাই।

ঠিক সময় মতো আমেরিকান এয়ারলাইন্স বিমান জেএফকে এর উদ্দ্যেশে ছেড়ে দিলো। কাছাকাছি আসার পর পাইলট জানালেন, লোকাল আবহাওয়া অত্যান্ত খারাপ, বরফে আচ্ছাদিত এয়ারপোর্ট। আমরা নামার চেষ্টা করছি। কয়েকবার এটেম্পট নেবার পরেও পাইলট সম্ভবত নামার ক্লিয়ারেন্স পাচ্ছিলো না। প্লেন নামলো রাত মোটামুটি সাড়ে নয়টায় এবং আমাদের লাগেজ পেতে পেতে আরো আধা ঘন্টা সময় পেড়িয়ে গেলো। যেহেতু এটা সরাসরি ফ্লাইট ছিলো না, ফলে জেএফকে থেকে আরেকটা আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্ল্যান ছেড়ে যাবার কথা রাত সোয়া দশটায়। আমি খুব তাড়াহুরা করছি। অনেক পেসেঞ্জার ইমিগ্রেশনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কানেক্টিং ফ্লাইট মিস করা যাবে না। 

জেএফকে এয়ারপোর্টে পেসেঞ্জার লাইনে পেসেঞ্জারদের ইমিগ্রেশন সুবিধার জন্য কর্তৃপক্ষ চারটি লেনে সাইন বোর্ড দিয়ে রেখেছেন। প্রথম সারি হচ্ছে যারা প্রথম আমেরিকায় এসেছেন তাদের জন্য, ২য় সারি হচ্ছে যারা ডিপ্লোম্যাট তাদের জন্য, তৃতীয় সারি হচ্ছে যারা ২য় বার আমেরিকায় এসেছেন তাদের জন্য। আর ৪র্থ সারি হচ্ছে শুধুমাত্র আমেরিকানদের জন্য।

আমার বুঝতে কোনো অসুবিধা নাই। আমি ১ম আমেরিকায় এসেছি। ফলে আমি ১ম সারিতেই ঢোকে গেলাম। খুব বেশি লোক নয়। আমার টার্ন আসতে মাত্র ৪ জন বাকি। যেইমাত্র আমি ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে দাড়ালাম, তিনি একজন বয়স্ক মহিলা, আমার দিকে ভ্রু কুচকে তাকালেন। আমি জিন্সের একটা প্যান্ট পড়া একটা ওভারকোট কাধে ঝুলানো। হাতে ছোট একটা ব্যাগ।

মহিলা অনেক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে কি যেনো ভাবলেন। প্রেমে পড়েছে কিনা বুঝতে পারছি না, আর প্রেমে পড়লেও লাভ নাই, আমার স্ত্রী এই বয়ষ্ক মহিলার থেকে ঢেড় সুন্দুরী। কিন্তু ওনার চোখ মুখ প্রেমের কথা বলছেনা, বলছে কিছু একটা ভুল হচ্ছে আমার সাথে। তিনি আমাকে একটু ভিতরে ডেকে নিয়ে গেলেন এবং ইমিগ্রেশন পুলিশকে কি যেনো বললেন।

হটাত করে তিন চার জন ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে এমনভাবে জেরা করা শুরু করলেন, আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ইংরেজী ভাষা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই, আমি ইংরেজীটা বাংলার মতোই ভালো বলতে পারি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ করে রেগে গেলে আমি বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই বেশি কথা বলতে সাচ্ছন্দ বোধ করি। তাই আমারও জেরা করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তাদের ধারনা, আমি জাল ভিসা নিয়ে আমেরিকায় ঢোকার চেষ্টা করছি। এই ভিসা আমার নয়।

আমি বললাম, কেনো জাল ভিসা হবে?

তারা বল্লো যে, তারা বাংলাদেশ, পাকিস্থান, ইন্ডিয়ার পাসপোর্ট দেখলেই অনেক বেশী সতর্ক হয়ে যান, কারন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এই তিন দেশের লোকেরা জাল ভিসা নিয়ে আমেরিকায় আসার চেষ্টা করে।

আমি বললাম, কে কি করলো, সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। আমি জাল ভিসা নিয়ে আমেরিকায় ঢোকবো কেনো? আমেরিকা এমন কি মধুর দেশ যে, আমাকে এই কাজ করতে হবে? তোমরা আমেরিকাকে কি মনে করো? সর্গরাজ্য?

আমার এমন কথায় পুলিশ একটু সতর্ক হয়ে গেলো। আমার কথার মধ্যে কোনো জড়তা ছিল না বরং ছিলো প্রচন্ড রাগ। তারা আমাকে আবার বল্লো যে, আমার ছবির সাথে নাকি আমার পাশপোর্টের ছবি মিল নাই। আমার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো।

আমি বললাম, তাহলে পাশপোর্টে কি আমার দাদার ছবি নাকি আপনাদের প্রেসিডেন্টের ছবি লাগানো লাগানো যে আমাকে চেনা যাচ্ছে না? তারা আসলেই আমাকে নিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেলো। এই রকম টাস তাস করে তো জাল ভিসাধারী কথা হয়ত কখনো বলে নাই বা বলে না। তাহলে কি কোনো ভুল হচ্ছে আমার সাথে?

আমি বললাম, আমার কানেক্টিং ফ্লাইট আছে সাড়ে দশটায়। যদি মিস করি, আমি আপনাদের দায়ী করবো এবং আমি সময়মতো আমার নেক্সট ষ্টেশনে পৌছতে চাই।

এবার আরো কিছু নতুন পুলিশ আসলো। আমাকে দেখলো, আমার পাস্পোর্ট দেখলো, তারপর বল্লো, স্যার আপনার কাছে কি আরো কোনো ছবি আছে? তারা আমার সাথে কোনো প্রকার ফালতু ব্যবহার করছে না, বরং আমিই একটু উত্তেজিত হয়ে কথা বলছি। কারন, আমি খুব এম্বেরাসড হচ্ছিলাম মনে মনে।

বললাম, দেখতে হবে, আমার ব্যাগে ছবি আছে কিনা। আমি ব্যাগ চেক করতে গিয়ে প্রথমে বেরিয়ে এলো আমার জাতিসংঘের আইডি কার্ড। পুলিশ সাথে সাথে ঐ আইডি কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখে বল্লো, স্যার আপনি কি জাতিসংঘে কাজ করেন?

বললাম, হ্যা।

এবার তাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে গেলো। এবার তারা আমাকে বল্লো, ওহ স্যার, আপনি আগে কেনো বলেন নাই যে, আপনি জাতীসংগে কাজ করেন, তাহলে তো এতো বিরম্বনা হতো না?

আমাকে এবার তারা এতো সমীহ করে কথা বলা শুরু করলেন যে, তারা যেনো এখন অপরাধি আর আমি পুলিশ।  বলি এবার ব্যাপারটা কোথায় তাদের ধান্দায় ফেলেছিলো।

ব্যাপারটা দাড়িয়েছিলো এই রকমঃ

আমি যখন আমেরিকার ভিসার জন্য এপ্লাই করি, হাইতির কন্সুলেট অফিস আমাকে ডিপ্লোম্যাট ভিসা ইস্যু করেছিল। যেহেতু আমি ডিপ্লোমেটিক হিসাবেই জাতীসংগে কাজ করছি। এটা আমার জানা ছিলো না। আমার ডিপ্লোমেটিক ভিসার কারনে আমার দাড়ানোর কথা ২য় সারিতে। যেহেতু আমি জানতাম না যে আমি ডিপ্লোমেট ভিসায় এসেছি, ফলে আমি এইবারই যেহেতু প্রথম আমেরিকায় এসেছি, ফলে আমি ২য় সারিতে না দাঁড়িয়ে দাড়িয়েছিলাম ১ম সারিতে। এতে ঐ বয়স্ক মহিলার প্রথম সন্দেহ হয় যেহেতু বাংলাদেশী পাসপোর্ট, আবার ভুল জায়গায় দাড়িয়েছি। বয়স্ক মহিলা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন কারন আমার বয়স অল্প, ডিপ্লোম্যাট হবার মতো নয়। এদিকে সাধারনত ডিপ্লোম্যাটরা স্যুট টাই পড়ে এক্সিকুইটিভ হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে চলাচল করেন, আর আমি জিন্সের একটা প্যান্ট তাও আবার ওভারকোট যেটা নিয়েছি সেটা কাউ বয়ের মতো কাধে ঝুলিয়ে দাড়িয়েছি।

এতোগুলি অসামঞ্জস্যতা মহিলা সমন্নয় করতে পারছিলো না। ফলে তাঁর সন্দেহ হবারই কথা। তিনি আমাকে পুলিশের কাছে পাঠিয়েছিলেন ব্যাপারটা ভেরিফাই করার জন্য। কিন্তু এটা তো আর আমার জানার কথাও না আবার দোষও না।

আমি রীতিমত অফেন্ডেড ফিল করছিলাম এবং বললাম, আপনাদের কমপ্লেই রেজিস্টার আনুন, আমি আন্তর্জাতীক পেসেঞ্জার হিসাবে এয়ারপোর্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো। আমি জানতাম, যদি আমাকে এইভাবে হেনস্থা করার জন্য যদি মিলিয়ন ডলারের মামলা করি, সরকার সেটা আমাকে দিতে বাধ্য এবং ইমিগ্রেশন পুলিশেরও শাস্তি হবে। তারা ব্যাপারটা ততক্ষনাত সামাল দেওয়ার জন্য আমাকে অনেক অনুনয় বিনয় করে বল্লো, স্যার, আমরা আসলে বুঝতে পারি নাই ব্যাপারটা। অভিযোগ আপনি করতে পারেন কিন্তু আমরা দুক্ষিত।

তারা তাদের ভুলটা যে একেবারে অমুলক নয় সেটা প্রমান করার জন্য আমাকে অনেক অনুরোধ করে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটা রুমে নিয়ে গেলেন। কফি খাওয়ালেন এবং ঐ রুমে নিয়ে আমাকে যা দেখালেন, তা দেখে আমি হতবাগ। সেখানে বেশ কিছু বাঙ্গালী, পাকিস্তানী এবং ইন্ডিয়ান পেসেঞ্জারকে পিছনে হাত বেধে রাখা হয়েছে জাল ভিসার কারনে। তাদেরকে প্রপার ইন্টারোগেশন করে প্রমান করেছে যে তারা জাল ভিসায় আমেরিকায় ঢোকার চেষ্টা করেছে। এখন তাদেরকে আগামী কাল ফিরতি ফ্লাইটে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

যাই হোক, আমি ব্যাপারটা বুঝেও না বুঝার ভান করলাম। এবার আরো সিনিয়র একজন পুলিশ এসে আমাকে বল্লো, স্যার, আজ সমস্ত কানেক্টিং ফ্লাইট বন্ধ কারন এতো তুষারপাত হচ্ছে যে, কোনো এয়ারপোর্টই ক্লিয়ারেন্স দিতে পারছে না। গত ২৫ বছরেও আমেরিকায় এতো পরিমান তুষারপাত হয় নাই। তাই আজকের এই তুষারপাতের কারনে এর নাম দেওয়া হইয়েছে “উইজার্ড ৯৫”। আগামিকাল বলা যাবে কখন কোন কোন ফ্লাইট যেতে পারবে। ইতিমধ্যে কয়েকটা ফ্লাইট নামার সময় মারাত্তক দূর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। আজকে আপ্নারা যারা আমেরিকায় এসেছেন, তাদেরকে এই এয়ারপোর্টেই থাকতে হবে অথবা আপনাদেরকে রুম দেওয়া হবে, সেখানে আপনি থাকতে পারবেন। তবে স্যার, যেহেতু আপনার সাথে আমাদের একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে, আমরা আপনাকে একটা কিছু দিয়ে অনার করতে চাই যদি অভিযোগ না করেন।

আমি কিছুই বললাম না। এরপর সে আমাকে আরো একটি রুমে নিয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষন পর আমার হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি যে কয়দিন এখানে থাকবেন, এই কার্ডটি দিয়ে যাইই কিনবেন, সব ট্যাক্স মাফ। এটা আমেরিকার ট্রেজারী ব্রাঞ্চ থেকে এবং এস এস ডিপার্টমেন্ট থেকে আপনার জন্য অনার। তারা আরো একটা অনার আমাকে করলেন, সেটা হল তাদের কাছে কিছু ভিআইপি রুম থাকে সেখানে নেক্সট ফ্লাইট না ছাড়া পর্যন্ত আমি থাকতে পারবো। যখন কোনো ফ্লাইট লোগানে যাবে, তারাই আমাকে ডেকে ফ্লাইটে তুলে দেবেন।

দেখলাম, খামাখা কেচাল করে লাভ নাই। আর আমি অভিযোগ করার পর আবার কোন ঝামেলায় পরে যাই তাই কি দরকার এইসব করে যখন তারা আমাকে এতো করে সম্মান দেখাচ্ছেন। আমি কার্ডটি নিলাম। আমি তখনো জানি না এই কার্ডের আসল মাহাত্য কি। তারপরেও সাথে করে নিয়ে গেলাম। কার্ডে আমার ছবি আছে যেটা ওনারা ইমিগ্রেশন করার সময় ওয়েব ক্যামে নিয়েছিলেন।

আমি ইমিগ্রেশন অথোরিটির নির্ধারিত স্যুটে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি ৬ ফুট লম্বা আরেক নিগ্রো পুলিশ অফিসারও আমার সাথে আছেন। তিনি ঐ স্যুটের দায়িত্তে।

আমি পুলিশ অফিসার (নাম তাঁর ফ্রান্সিস) কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি যেনো সিগারেট খেতে পারি এমন একটা রুম দেয়। সে জানালো, এখানে সিগারেট খাওয়া যায় না। কিন্তু একটা করিডোর আছে সেখানে গিয়ে খাওয়া যায়। সে নিজেও সিগারেট খায় বলে মুচকি হেসে দিয়ে বল্লো, You Major must be a bad man like me, because we both smoke.

তখন রাত বেজে গেছে প্রায় বারোটার উপরে। আমি করিডরে দাঁড়িয়ে দেখালাম, বাইরে অনেক সাদা সাদা বরফ। আমার জীবনে আমি কখনো বরফ দেখি নাই। এইই প্রথম। ছুতে চাইলাম, ফ্রান্সিস আমাকে বল্লো, তুমি ওখানে যেও না, প্রচন্ড ঠাণ্ডা। চারিদিকে বিমান বন্দরের আলো কিন্তু এতো বরফ পড়ছে যে, বেশিদূর দেখা যায় না। বরফের বৃষ্টি এইই আমি প্রথম দেখে খুব ভালো লাগছিলো।

ভাবলাম, এবার ভাইয়াকে একটা ফোন করে বলি যে, আমি জেএফকে এয়ারপোর্টে আটকা পড়েছি, চিন্তা করো না। কারন ইতিমধ্যে আমার সিডিউল অনুযায়ী আমার লোগানে থাকার কথা। অনেকবার চেষ্টা করেও ভাইয়াকে পেলাম না। বারবার ভুল নাম্বারে চলে যাচ্ছে ফোন। ওপাশে যিনি ফোন ধরছেন, তিনি একসময় বিরক্ত হয়ে কি যেনো বলছিলো আমাকে, সেটা আমি ভালোমত বুঝতেও পারছিলাম না। কিছু আমেরিকানরা ভালোমত ইংরেজীও বলতে পারে না। নোয়াখালি টাইপের ইংরেজী বললে কি আর আমি বুঝবো? সে মনে হয় আমেরিকান নোয়াখালির লোক।

যাক, রাতে আর ঘুমানোর প্ল্যান করছিলাম না যদিও আমার রুম আছে। বাইরেই ফ্রান্সিসের সাথে প্রায় ১ ঘন্টা সিগারেট খেয়ে গল্প করে কাটিয়ে দিলাম। ভালোই লাগছিলো। সে আসলে আমেরিকার অরিজিনাল লোক নয়। সে জ্যামাইকার মাইগ্রেটেড অফিসার। প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁর পরিবার এখানে মাইগ্রেট করেছিলো। অনেক গল্প বল্লো। তাঁর ছেলেমেয়েদের কথা। তাঁর পরিবারের কথা। আর আমি বললাম, আমার আজকের ইমিগ্রেশনের বাজে ইন্সিডেন্টের কথা। সে খুব হাসলো। বল্লো, তুমি তো ইচ্ছে করলে অভিযোগ করলে বেশ কিছু কম্পেন্সেশন পেতে পারতা। আমেরিকা এইসব অভিযোগকে খুব ভয় পায়। ফ্রান্সিস জানালো, তাঁর ডিউটি আছে, যেতে হবে।

ফ্রান্সিস যাবে এমন সময় একজন মহিলা কোথা থেকে উদয় হয়ে আমাকে সিগারেট খেতে দেখে লাইটারের জন্য এগিয়ে এলো। বুঝলাম, সে সিগারেট খায়। এটাও আমার কাছে নতুন একটা অভিজ্ঞতা। মহিলারা স্মোকার। সেও আটকা পড়েছে এই উইজার্ড-৯৫ এ। যাবে ডেনভার। আমি এখানের কোনো রাজ্যই চিনি না।

ফ্রান্সিস চলে গেলো আর বলে গেলো, সিগারেট খাওয়া হয়ে গেলে যেনো রুমে চলে যাই, ওখানে কিছু ড্রাই ফুড আছে, ইচ্ছে করলে আমি সেসব বিনে পয়সায় খেতে পারি, কোনো বিল উঠবে না। আর এও বলে গেলো, ফ্লাইট চালু হলে সে আমাকে নিয়ে যাবে, কোনো অসুবিধা নাই। এখন মনে হচ্ছে, ইমিগ্রেশনে ঝামেলা হয়ে ভালোই হয়েছে। সুফল পাচ্ছি।

মহিলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে আর আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাবো, কি করি, এইবারই আমেরিকায় প্রথম কিনা ইত্যাদি গল্প জুরে দিলো। যখন সে শুনলো আমি মেজর এবং জাতীসংগে কাজ করছি, তিনি একটু খুশী হয়েছেন বলে মনে হলো। কারন তাঁর একটা ছেলে আছে যে, আমেরিকার নেভিতে কাজ করে। বর্তমানে সে মালয়েশিয়া আছে। মহিলার নাম লিন্ডা।

আমি বললাম, আপনার এতো বড় ছেলে আছে যে কিনা নেভীতে কাজ করে? আপনাকে দেখে তো সে রকম মনে হয় না?

সে বেশ খুশি হলো মনে মনে যে, আমি তাকে অনেক ইয়াং বলে ভাবছি বলে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, বলেন তো, আমার বয়স কত হবে?

মনে মনে ভাবলাম, পৃথিবীর সমস্ত মহিলারা তাদের বয়স বাড়তে দেয় না। বয়স যাই হোক, সে সেটা গোপন রেখেই কম বয়সটা বলে থাকে আর কেউ তাকে ইয়াং বলুক সেটাই চায়। এটা হোক বাঙ্গালী মেয়ে আর হোক আমেরিকার ইংরেজী বলা কোন নারী। আমি চিন্তা করলাম, যদি উনার ছেলে নেভীতে কাজ করে, তাহলে কমপক্ষে ছেলের বয়স ২০। আর এই মহিলা যদি অন্তত ২০ বছর বয়সেও বিয়ে করেন, তাহলে মহিলার বয়স এখন প্রায় ৪০!। আমি বললাম, আপনার বয়স হয়তোবা ৪০ হবে।

ওরে বাপ, তাঁর চেহাড়াই বদল হয়ে গেলো। মনে হলো তাকে ৪০ বলায় তিনি ক্ষিপ্ত। হয়ত আশা করেছিলো আমি ২৫ বা ৩০ বল্বো।

লিন্ডা বল্লো, আমি কি এতোই বুড়া দেখাচ্ছি মেজর?

বুঝলাম, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু এখন তো আর শোধরানোর কোনো পথ দেখি না। আমি বললাম, যদিও তোমার বয়স ৪০ হতে পারে কিন্তু তোমাকে ৩০ এর বেশী লাগে না।

খুশী হলো না। সিগারেট খাওয়া শেষ হলেই লিন্ডা আমাকে কোনো প্রকার সম্মোধন ছাড়াই বিদায় নিলো। আর বল্লো, ধন্যবাদ লাইটারের জন্য। বাই। বলে গট গট করে তাঁর হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে চলে গেলো। একবার পিছন ফিরে তাকালোও না। হায়রে মহিলাদের বয়স। 

আরেক অভিজ্ঞতা হলো। বয়স যাই হোক, আমি আর কোনো মহিলাকে ৩০ এর বেশী বলব না বলে শিক্ষা পাইলাম। তাঁর বয়স ৯০ হলেই কি আর ৩০ হলেই কি। আমার তো কিছু যায় আসে না। কিন্তু খুশী তো করা গেলো কাউকে!! এইবা কম কি। কিসের পাল্লায় পড়লাম রে ভাই। প্রতি ক্ষনে ক্ষনে অভিজ্ঞতা বাড়ছে।

রাত তিনটার দিকে ফ্রান্সিস এলো রুমে। এসেই বল্লো, মেজর, তুমি কি এখন যাবা? একটা ফ্লাইট যাচ্ছে বোষ্টনে। লোকাল ফ্লাইট। ইথিউপিয়ান এয়ারলাইন্স। যদি যাও তাহলে ১০ মিনিটে রেডি হও, আমি নিয়ে যাবো। বললাম, এতো রাতে গিয়ে কি করবো। সকালে কোনো ফ্লাইট নাই?

ফ্রান্সিস বল্লো, সেটা এখনো ডিক্লেয়ার দেয় নাই। আমার মনে হয় তোমার যাওয়া উচিত কারন পুরু বিমান বন্দরে যে পরিমান যাত্রী আটকা পড়েছে, সকালের ফ্লাইট না ধরে তুমি বরং লোগানে গিয়ে নেমে যাও। আমরা তোমাকে ট্যাগ করে দেই যদি ওখানে রেষ্ট করার জন্য কোনো রুম লাগে সেটাও পাবা। আমরা তোমাকে একটা স্লিপ দিয়ে দেবো, সেটা লোগানে দেখালেই তুমি একটা ভালো রুম পাবে যদি চাও। সিদ্ধান্ত নিলাম, চলেই যাই। ফ্রান্সিস আমাকে চট করে একটা এয়ার ট্যাক্সিতে করে একেবারে বিমানের সামনে নিয়ে গেলো। ব্যাগপত্র ফ্রান্সিস নিজেই ক্যারি করে নিয়ে গেলো। আমি ইথুপিয়ান বিমানে উঠে গেলাম।

ফ্রান্সিসকে বিদায় দিতে আমার কষ্ট হচ্ছিলো, হয়তো ওর সাথে আমার আর দেখা হবে না। হ্যান্ডশেখ করতে গিয়ে বললাম, ফ্রান্সিস, তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে মনে রাখবো। ফ্রান্সিস হেসে দিয়ে বল্লো, এটাই মজা। মিসিং পিপল সো সেডলী। তুমিও ভালো থেকো। একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়ে দিলো যদি কখনো এখানে আবার আসি, যেনো ওর মোবাইলে কল করি। কার্ডটা যত্ন করে পকেটে রাখলাম। আমি এখন প্লেনে বসে পড়েছি। অনেক পেসেঞ্জার, যদিও লোকাল প্লেন কিন্তু বেশ বড়। বেশীরভাগ মানুষই মনে হচ্ছে লোগানের বাসিন্দা। আমি একজন বয়স্ক মহিলার পাশে বসেছি। বয়স তাঁর প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি।

প্রায় আরো ৪০ মিনিট ফ্লাই করে লোগানের উপর দিয়ে প্লেন হোবার করছে। এখানেও নামতে মনে হয় দেরী হবে। অনেক বরফে জমে আছে বিমান বন্দর। পাইলট জানালেন, আমরা নামতে নামতে আরো ১৫ মিনিট দেরী হবে।

আমরা শেষতক খুব নিরাপদেই নামলাম। লাগেজ নিতে যেতে হবে অনেক দূরে। প্রায় ১ কিলোমিটার দূর আমাদের লাগেজ ডেলিভারী পয়েন্ট। আমরা নেমেছি সি ব্লকে। একেকটা ব্লক এতো বড়? আমাদের জিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টও তো ওদের একটা ব্লকের সমান না!!

লাগেজ নিলাম। এবার ভাইয়াকে ফোন করা উচিত। এয়ারপোর্টেই টেলিফোন বুথ আছে। পঞ্চাশ সেন্ট ড্রপ করে কথা বলা যায়। আমার কাছে মাত্র একটা কয়েন আছে। ডলার আছে কিন্তু আমার কাছে তো আমেরিকার কয়েন নাই। এদিকে কয়েন ছাড়া ফোন করা সম্ভব না। যাই হোক, কোথায় কয়েন পাবো সেটাও জানি না। যে কয়েনটা ছিলো সেটা দিয়েই চেষ্টা করলাম। ঐ একই সমস্যা। ভুল নাম্বারে ফোন চলে যাচ্ছে এবং একই বাসায় যাচ্ছে। আমি ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতেছিনা, আরে বাবা, যদি ভুল নাম্বারেই যাবে, তাহলে একই নাম্বারে যাচ্ছে কেনো?

এইবার ঐ পাশের ভদ্রলোক মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারছে যে, আমি কিছু একটা ভুল করছি। সে আমাকে বল্লো, আমি আসলে কোথায় ফোন করছি? এবার তাঁর কথাগুলি আমার কাছে ক্লিয়ার মনে হলো। আমি বললাম, এটা কি এই নাম্বার?

সে বল্লো, হ্যা, এটা এই নাম্বারই যেটা আমি বলেছি।

বললাম, আমি আসলে আমার ভাইকে ফোন করছিলাম যিনি থাকে বোস্টনে। এবার তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন। বললেন, আপনি যেখানে আছেন, সেটা লোগান, যদিও ম্যাসাচুসেট এর অধীনে। আপনি আপনার নাম্বারের সাথে একটা ১ যোগ করেন, তারপর ডায়াল করেন, আপনি আপনার ভাইকে পেয়ে যাবেন। যদি ১ যোগ না করেন, তাহলে বারবার আমার নাম্বারেই কল আসতে থাকবে। আর এরইমধ্যে আমার কয়েন শেষ, লাইন কেটে গেলো। আমার কাছে আর কোনো কয়েনও নাই। কি মুশকিল। ভালো লাগলো অন্তত এটা জেনে যে, এবার আর ভুল হবে না। ভাইয়াকে ফোনে অন্তত পাওয়া যাবে। 

কোথায় পাই কয়েন? একটা দোকানে ঢোকলাম এইভেবে যে, কিছু কিনি এবং কয়েন নেই। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হচ্ছে না। কয়েনের যোগাড় হচ্ছে না। হটাত দেখলাম, একজন পুরুষ ক্লিনার ফ্লোর ক্লিন করছে। ভাবলাম, তাকে জিজ্ঞেস করে দেখি সে আমাকে কিছু কয়েন দিতে পারে কিনা। লোকটিকে বলার সাথে সাথে সে বল্লো, তাঁর কাছে ৩ ডলার পরিমান কয়েন আছে। সেটা সে ৫ ডলার হলে দিয়ে দেবে। আরেক অভিজ্ঞতা। সব দেশের ৪র্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের এই এক সমস্যা। ধান্দাবাজী। মেনে নিলাম। কারন আমার কাছে এক টাকাও যা, এক ডলারও তা সেটাই মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত। আমি তাকে ৫ ডলারের একটা নোট দিয়ে ৩ ডলার সম পরিমাণ কয়েন নিলাম।

আমি ঐ ভদ্রলোকের কথা মতো ভাইয়ার বাসার নাম্বারের আগে ১ যোগ করে যেই না ডায়াল করেছি, অপর প্রান্ত থেকে আমার ভাবী ফোন ধরলেন। তিনি এতোই অবাক হলেন আমার ফোন পেয়ে যেনো কেদেই দিলেন। ভাবী বললেন, তুমি বেচে আছো? আমি বললাম, কেনো? আমি মরবো কেনো? কি ব্যাপার?

ভাবী বললেন, আরে ভাই, তুমি যেই প্ল্যানে লোগানে নামার কথা কাল, কেএলএম বিমান, সেটা নামার সময় ক্রাশ করেছে, বহু লোক চরম ভাবে আহত/নহত হয়েছে, কেউ কেউ বলছে মারাও গেছে এবং এখনো রেস্কিউ চলছে। তোমার ভাই তো তোমাকে খুজে খুজে পাগলের মতো অবস্থা। তুমি এখন কোথায় আছো?

আমি বললাম, আমি তো সি ব্লকে আছি। আর আমি তো জানি না যে, কেএলএম ক্রাশ করেছে। কোনো এক কারনে আমি তো ঐ ফ্লাইট মিস করে পরে আমেরিকান এয়ারলাইন্সে এসেছি জেএফকে হয়ে। এখন ইথুপিয়ান এয়ারলাইন্সে একটু আগে নামলাম। আমি ভালো আছি। এবার বলেন, ভাইয়াকে পাবো কিভাবে?

ভাবী এতোটাই আবেগে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন আমার সাথে কথা বলে যে, ভালোমতো কথাই বলতে পারছিলেন না। মরা মানুষের খোজ পাওয়া, চারটিখানি কথা তো আর না। ভাবী বললেন, তুমি যেখানে আছো সেখানেই থাকো, কোথাও যাবে না, আমি তোমার ভাইকে জানাচ্ছি। যেহেতূ তোমার কাছে মোবাইল নাই, তুমি কিন্তু ওখানেই থাকো। আর পারলে একটু পরে আমাকে তোমার কারেন্ট লোকেশানটা জানাও।

প্রায় ২০ মিনিট পর ভাইয়া হাজির। কি যে ভালো লাগলো ভাইয়াকে পেয়ে। ভাইয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, অনেক প্রেসারে ছিলাম তোকে নিয়ে। যাক আল্লাহর রহমত যে, তোকে ভালোভাবে পেলাম। তুই এখানে দাড়া, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।

ভাইয়াকে নিয়ে আমি বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। ভাইয়া নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। দুই ভাই, অনেক গল্প করতে করতে গাড়িতে আসছিলাম। চারিদিকে বরফ, রাস্তায় অনেক গাড়ি দিয়ে লোকজন রাস্তা ক্লিয়ার রাখার চেষ্টা করছে। প্রায় ৪০ মিনিট ড্রাইভ করে আমি আর ভাইয়া ভাইয়ার বাসার এসে হাজির হইলাম।

শান্তি। এক মাস থাকবো এখানে। মাসুদের সাথে দেখা হলো, ইউসুফের সাথে দেখা হলো। তখন বেলা প্রায় ১১টা দিন কিন্তু সূর্য মামার কোনো খবর নাই। চারিদিকে বরফের বৃষ্টি। গাছের চেহাড়া দেখলে মনে হয়, বরফের গাছ, আশেপাশের সবকিছু বরফে ঢেকে আছে। কি দেশ রে বাবা।

সারাদিন গল্প করলাম, বাইরে যাওয়ার কোনো স্কোপ নাই। ঘরের ভিতরে হিট করে ঘর গরম রাখা হচ্ছে। আমি আর মাসুদ এক রুমে থাকার প্ল্যান করেছি। ইউসুফ অন্য ঘরে। পুরু ঘরটাই কার্পেটে মোড়ানো। হাইতিতে গরম অথচ এখানে এসে পড়েছি উইজার্ড-৯৫ এর পাল্লায়। মানে শীতের দেশ।   

১৫/১০/১৯৯৫-আলগোর এবং তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ টিপারের ভিজিট

কয়েকদিন যাবত অবর্ননীয় ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছি। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর হাইতিতে ভিজিটে আসবেন। সাথে আল গোরের স্ত্রীও আসবেন, এই জন্য। চারিদিকে অনেক কাজ, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন প্রকারের নিরাপত্তা বিষয়ক ট্রেনিং, সেমিনার এবং রিহার্সেল, ইত্যাদি। ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের নিরাপত্তার জন্য চারটি লেয়ার নির্ধারন করা হয়েছে। ১ম লেয়ারে থাকবেন আমেরিকার ঈগল বেসের মিলিটারী, ২য় স্তরে থাকবেন আমাদের বাংলাদেশের সামরিক সদস্যগন, ৩য় স্তরে থাকবেন ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্থান বাহিনী, আর ৪র্থ স্তরে থাকবেন সিভিলিয়ান পুলিশ প্লাস এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির লোকজন। আমি কিউ আর এফ হিসাবে এস এস (সিক্রেট সার্ভিস) এর সাথে ১ম স্তর এবং ২য় স্তরের সাথে থাকবো। অর্থাৎ আল গোর যখন বিমান থেকে নাম্বেন, তখনো আমরা অর্থাৎ কিউ আর এফ দল তাঁর সাথে থাকতে পারবো। ভাইস প্রেসিডেন্টের গাড়ী বহরের সামনে পিছনে এস্কর্টে থাকবে বাংলাদেশের  নিরাপত্তা বাহিনী। এর সাথে সিক্রেট সার্ভিসের লোকজনও।

আজ সকাল ৯টার সময়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট হাইতির বিমান বন্দরে নামলেন। সকাল থেকেই নিরাপত্তা খুবই জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত ফ্লাইট গুলির উপর অনেক করাকড়ি আরোপ করা হয়েছে। যাত্রীদের ইমিগ্রেশনে একেবারে কঠিন চোখ রাখা হচ্ছে। বাথরুম, এয়ারপোর্টের অলি গলি, লবি, সব জায়গায় কঠিন নজরদারী। হ্যান্ড লাগেজ গুলি চেক করা হচ্ছে আগের থেকে আরো বেশী। যাত্রীদের চেকিং করায় বেশী সময় নেওয়াতে ফ্লাইট গুলি, বিশেষ করে আউট গোয়িং ফ্লাইট গুলির যাত্রা বিলম্ব হচ্ছে। অন্যদিকে ইনকামিং ফ্লাইট গুলিরও যাত্রীদেরকে একটা সরল রেখায় যেতে বাধ্য করা হচ্ছে যাতে যাত্রীরা এদিক সেদিক না যায়। আমরা এরই মধ্যে কয়েক রাউন্ড দিয়ে ফেলেছি সব জায়গায়। সিসি ক্যামেরাগুলি চেক করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যেনো কোনো একটা জায়গাও গ্যাপ না থাকে। ফুল কাভারেজ। এয়ারপোর্টের  ছাদেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে। যে সব জায়গায় আগে সংরক্ষিত ছিলো না, সহজেই কেউ যাতায়ত করতে পারতো, সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে কথা।

আমাদের কাছে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের এবং তাঁর স্ত্রীর ভিন্ন ভিন্ন ভিজিট সিডিউল দেওয়া আছে। ম্যাডাম এর নাম এলিজাবেদ টিপার। ভাইস প্রেসিডেন্ট বিমান বন্দরে নেমেই একটা বক্তৃতা দিবেন। তারপর তিনি চলে যাবেন প্রেসিডেন্ট এরিস্টিডের প্যালেসে। সেখানে তিনি এক বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা ছোট খাটো ভাষন রাখবেন এবং হাইতির কেবিনেট সদস্যদের সাথে দি-পাক্ষীয় আলোচনা করবেন। কি নিয়ে আলোচনা করবেন তাঁর এজেন্ডা আমাদের কাছে নাই। অন্যদিকে ম্যাডাম এলিজাবেথ টিপার হাইতির একটি শহর সিটি সোলেতে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ভিজিট করবেন। স্বাস্থ্য সেন্টারের নাম ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের স্ত্রীর নামের সাথে মিল আছেঃ এলিজাবেথ স্বাস্থ্য সেন্টার।

ঠিক ১১ টায় ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের অফিশিয়াল বিমান হাইতির এয়ারপোর্টে এসে নামলো। চারিদিকে সুনসান। কোনো দৌড়াদৌড়ি নাই। যার যার জায়গায় তারা কাজ করছেন। বিমানের দরজা খোলার পর আল গোরের দেহরক্ষীগন প্রথমে অস্ত্রসহ বিমানের গেট খুললেন এবং প্রায় ১০ মিনিট অব্জার্ভ করলেন পরিস্থিতি। অতঃপর ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর এবং তাঁর স্ত্রী একে একে বিমান থেকে বেরিয়ে এলেন। বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করা হলো না, সারাক্ষণ গেট খোলাই রাখা হলো। গেটে দুইজন শসস্ত্র পাহারা মূর্তির মতো দাড়িয়েই রইলেন।

বিমানের সামনেই একটা স্টেজ করা হয়েছিলো। যেখান থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর সবার উদ্ধেশে ভাষন দিলেন। আমরা খুব কাছ থেকে সেই ভাষণ শূনলাম কিন্তু সব সময় নজর ছিলো চারিদিকে যেনো কোনো অঘটন না ঘটে। এই সময় সমস্ত যাত্রিদের মুভমেন্ট সম্পুর্নরুপে বন্ধ করা হয়েছিলো। কারো বাথরুম দরকার হলেও এলাউ করা ছিল নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র আউত গেটে কয়েকটা ল্যাভাটরি স্থাপন করা হয়েছিলো, তাও আবার নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত ছিলো। কারো অধিক জরুরী বাথরুমের প্রয়োজনে সেই আউটদোর ল্যাভাটরি গুলি ব্যবহার করতে পারবে।

প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর সবার উদ্দেশ্যে ভাষন দিলেন। এই ভাষনের সময় হাইতির প্রেসিডেন্ট হাজির ছিলেন না। আল গোর ভাষন শেষে গাড়িতে উঠবেন। ম্যাডাম টিপার ও তাঁর জন্য ভিন্ন মটরক্যাদ তৈরী ছিলো, তিনি আলাদা উঠবেন। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়।

আমি কখনো এই ধরনের নিরাপত্তায় কাজ করি নাই। ফলে প্রতিটি কাজ, ড্রিল, এবং স্তর আমার কাছে ছিলো নতুন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর যে গাড়িতে উঠবেন ঠিক সেই রকমের আরো তিনটা গাড়ি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলো। তিনি কোনটায় উঠবেন সেটা আমরাও জানি নাই। এটা জানে শুধু সিক্রেট সার্ভিসের লোক। তিনটা গাড়িতেই আমেরিকার ফ্ল্যাগ চড়ানো। একই ব্রান্ডের, একই চেহাড়া, একই কালার, সব কিছু এক। কালো গ্লাসে মোড়ান জানালা। বুলেট প্রুফ গাড়ি। যেই মুহুর্তে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর ভাষন শেষ করলেন এবং গাড়িতে উঠার জন্য রেডি হলেন, অমনি দেখলাম, একোতা বলয় সৃষ্টি হয়ে গেলো। এবং খুব দ্রুত বলয়টা তৈরী হয়ে গেলো। এই চক্করের মধ্যে আমি এতো কাছে থেকেও বুঝতে পারলাম না ভাইস প্রেসিডেন্ট কোন গাড়িটায় উঠলেন। উঠার সাথে সাথে গাড়ির সামনে থাকা আমাদের এস্কর্ট এবং সিক্রেট সার্ভিসের দেওয়া এস্কর্ট গাড়ি এতো দ্রুত চলে গেলো যা একটা চমকের মতো। ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর হাইতির প্রেসিডেন্ট এরিস্টিডের প্যালেসে চলে গেলেন। থাকলেন ম্যাডাম টিপার।

ম্যাডাম টিপারের বেলায় ও ব্যাপারটা প্রায় একই রকমের ঘটলো। তাঁর সাথে দুইজন খুব সুন্দুরী মেয়ে বডি গার্ড হিসাবে সার্বোক্ষনিক থাকেন। আমি দেখলাম একজনমহিলা বডি গার্ড সবার সামনেই তাঁর উপরের জামাটা খুলে ফেললেন, কালো ব্রা দেখা যাচ্ছে, আর উপরের জামার পরিবর্তে এইবার তিনি একটা অস্ত্র সহহ জ্যাকেট পড়ে এতো দ্রুত ম্যাডামের গাড়িতে উঠে গেলেন যেনো বিদ্যুৎ। মেয়েটার বয়স সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ২৬ এর মধ্যে হবে। আমেরিকান মহিলা। ম্যাডাম প্রথম গাড়িটাতেই উঠলেন সেটা আমি ক্লিয়ার বুঝতে পারলাম।

ম্যাডাম টিপারকে নিয়ে আমাদের ব্যান কনের মেজর ফিরোজ এস্কর্টের কাজ করলো। আমরা পিছনের গাড়িতে ম্যাডামকে ফলো করছি। যাবো সিটি সোলের একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ম্যাডাম ওখানে হেলথ সেন্টার দেখবেন, পরিদর্শন করবেন। সিটি সোল খুব বেশী দূর নয়। মাত্র ৪০ মিনিটের ড্রাইভ।

সিটি সোলে যাওয়ার পথে ঠিক সিটি সোলে ঢোকার পথেই হটাত দেখা গেলো বেশ অনেকগুলি জনতা রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে টায়ার পুড়িয়ে রেখেছে। ওরা ম্যাডাম টিপারের আগমনে আন্দোলন করছে এই কারন দেখিয়ে যে, ওদের জন্য যে টাকা পয়সা বরাদ্ধ হয়েছে, সেটা তাদের জন্য খরচ করছে না এরিস্টিড প্রশাসন। এর তীব্র প্রতিবাদে তারা ম্যাডাম টিপারের গাড়িতে আক্রমন। অনেক ইট পাটকেল ছুড়ে স্বাভাবিক এস্কর্ট গাড়ির বেশ কয়েকটা কাচ ভেঙ্গে ফেল্লো। আমাদের গাড়িও বুলেট প্রুফ (হাম্বি গাড়ী) এবং অন্তত দুইটা মাইন বিস্ফোরন থেকে রেহাই পায় এমন গাড়ি। মেজর ফিরোজ সেই ধরনের একটা গাড়ি এস্কর্টের কাজ করছিল। হেসিয়ান লোকজন চাচ্ছিলো ম্যাডাম টিপারকে পথে থামিয়ে দিয়ে কিছু একটা আদায় করতে। আমরা আসলে এই খবরটা পুর্বে জানতেই পারি নাই যে, সামনে এই ধরনের একটা প্রতিবাদ আন্দোলন হতে পারে। ব্যাপারটা একেবারেই স্পন্টিনিউয়াসলি ঘটে গেলো।

মেজর ফিরোজ আমাদের ওয়াকিটকিতে জানালো যে, সামনে বেশ গেঞ্জাম, স্থানীয় লোকজন রাস্তায় টায়ার পুড়িয়ে রাস্তা ব্লক করে রেখেছে এবং ভিভি আইপির গাড়িতে ঢিল ছুড়ছে। কি করা উচিত এখন? সবচেয়ে বড়সমস্যা হলো, এই ভি ভি আই পি কে নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের নাই এবং নেওয়াও ঠিক না। কিন্তু এটাও বুঝতেছি যে, বেশীক্ষন এই অবস্থায় আটকে থাকলে সমস্যা আরো বেড়ে যাবে। এই খান থেকে যে কোনো উপায়েই বের হয়ে যাওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

মেজর ফিরোজ সহসাই তাঁর নেতৃীত্তে টায়ার পোড়া আগুনের উপর দিয়েই বুলেট প্রুফ গাড়ি চালিয়ে পার হয়ে যায়। সাথে অন্যান্য গাড়িগুলিও। এটা ছিলো খুবই একটা রিস্কি ব্যাপার। সফল হওয়াতে সবাই বাহবা দিলেন ঠিকই কিন্তু কোনো মেজর অঘটন ঘটে গেলে ব্যাপারটা দাড়াতো মারাত্তক। ম্যাডাম টিপার ব্যাপারটা খুবই উপভোগ করেছে বলে পরে সব বাংলাদেশীদেরকে প্রশংসা করেছেন। ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয় নাই। ম্যাডাম টিপার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যাওয়ার পর সেখানেও অনেক লোকজন বিদ্রোহ করছিলো। তিন জন উত্তেজিত লোক তো কম্পাউন্দেই ঢোকে গিয়ে গাড়িতে ইট পাটকেল মারতে শুরু করে। টিয়ার গ্যাস ছুড়তে হলো বিদ্রোহী জনতাকে সামাল দিতে।

কিছুক্ষন পর হেসিয়ান বিদ্রোহী জনতারা আমেরিকার বিরুদ্ধেই স্লোগান দেওয়া শুরু করে এই বলে যার অর্থ এই রকম যে, গো হোম ইয়াংকি, গো। ইউ এন সদস্যদের গাড়িতেও তারা অনেক ইট পাটকেল ছুড়ে।

যাই হোক, খুব অসস্থিতেই গেলো দিনটা। কিন্তু আমাদের দেশের মিলিটারী সদস্যদের প্রশংসায় সিক্রেট সার্ভিস, ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর এবং ম্যাডাম টিপার অনেক মেসেজ দিলেন। এও বলে গেলেন যে, দেশে গিয়ে এই রকম একটা সাহসী পুর্ন কাজের জন্য “লেটার অফ এপ্রিশিয়েশন” ইস্যু করবেন। আমি জানি না সেটা আবার কি ধরনের কি।

যাই হোক, জাতিসংঘের মহাসচিব ভুট্রুস ঘালি গতকাল হাইতিতে এসেছেন। আজ বিকেলে ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর এবং মহাসচিব দুজনেই চলে গেলেন। একটা ব্যস্ত দিন গেলো সব মিলিয়ে।  এয়ারপোর্টেই এই দুই ভিভিআইপি প্রায় ৩০ মিনিট একত্রে কি কি আলোচনা করলেন, তারাই জানে। এই সময়ে আমাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিলো এতোটাই কঠিন যে, কোনো কেউ এর ভিতর দিয়ে পার পেয়ে যাবার মতো নয়।